রিনা একজন কর্মজীবী নারী। সম্প্রতি তার ঘাড় ও পিঠে ব্যথা শুরু হয়েছে। অফিসে দিনভর কম্পিউটারে বসে কাজ শেষে বাসায় ফিরে ঘরের কাজ সামলান। এরপর একটু আরামের আশায় হাতের কাছে থাকা মোবাইল ফোনেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করেন। মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে থাকতে থাকতে কখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, টেরও পান না।
প্রথমে সামান্য ঘাড় ব্যথা দিয়ে তার অস্বস্তি শুরু হয়। ধীরে ধীরে পিঠে ব্যথা ও টান অনুভব করেন। ক্রমশ মাথাও ভারী বোধ হয়। কাজের চাপের ফল ভেবে তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখলেন, ঘাড় নাড়াতেই কষ্ট হচ্ছে। ঘাড় একদম শক্ত, সামান্য বাঁকাতেই তীব্র ব্যথা। উদ্বিগ্ন হয়ে রিনা চিকিৎসকের শরনাপন্ন হলেন।
ফিজিওথেরাপিস্ট তাকে পরীক্ষা করে জানালেন, সমস্যাটা খুব সাধারণ—কিন্তু অবহেলা করলে মারাত্মক হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে থাকার ফলে তার দেহভঙ্গি (Posture) একদমই বিগড়ে গেছে। এ ধরনের ভঙ্গির কারণে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন:
১. টেক্সট নেক সিনড্রোম (Text Neck Syndrome)
২. সারভাইক্যাল পেইন (Cervical Pain)
৩. ফ্রোজেন শোল্ডার (Frozen Shoulder)
৪. মেরুদণ্ডের ডিস্কে সমস্যা
চিকিৎসক আরও ব্যাখ্যা করলেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে থাকলে শরীরে সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা দেয়:
ঘাড় ব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
পিঠ বা কোমরে ব্যথা
কাঁধে টান ও ব্যথা
হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব
চোখে ক্লান্তি ও জ্বালাপোড়া
মাথাব্যথা
সারাদিন দুর্বল লাগা
ঘুমের সমস্যা
মুড সুইং (মেজাজের ওঠানামা)
চিকিৎসক রিনাকে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ দিলেন:
ঘাড় ও পিঠের ব্যথা এড়াতে বা কমাতে করণীয়:
১. দেহভঙ্গি ঠিক রাখুন:
* কাজের সময় চেয়ার-টেবিলের উচ্চতা নিশ্চিত করুন।
* মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন। কখনোই নিচু করে বা ঝুঁকে দেখবেন না।
২. নিয়মিত বিরতি নিন:
* প্রতি ৩০-৪০ মিনিট কাজের পর ১-২ মিনিট চোখ বন্ধ করুন, দাঁড়ান, একটু হাঁটাচলা করুন বা স্ট্রেচিং করুন।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম করুন:
* ঘাড়, পিঠ, কাঁধ, কোমর, হাত ও পায়ের জন্য সহজ স্ট্রেচিং ব্যায়াম নিয়মিত করুন।
* ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক ব্যায়ামের রুটিন মেনে চলুন।
৪. গরম বা ঠাণ্ডা সেক দিন:
* ব্যথা তীব্র হলে উষ্ণ গরম পানির বোতল বা আইস প্যাক দিয়ে সেক নিতে পারেন (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে)।
৫. পর্যাপ্ত পানি পান ও ঘুম নিশ্চিত করুন:
* দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
* রাতে পর্যাপ্ত (৭-৮ ঘণ্টা) গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি।
৬. ফিজিওথেরাপি নিন:
* প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, ম্যানুয়াল থেরাপি বা ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশিত বিশেষ ব্যায়াম করুন।
৭. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন:
* ধ্যান, মেডিটেশন বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (ব্রিদিং এক্সারসাইজ) মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকের এই গাইডলাইন মেনে চলার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই রিনার জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়ামে তার ব্যথা কমে, ঘাড়-পিঠ-কাঁধের জড়তা দূর হয়। সবচেয়ে বড় লাভ হলো, তিনি এখন সচেতন। বুঝতে পেরেছেন, প্রযুক্তি ও কাজ থাকবেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া।
এই ডিজিটাল যুগে মোবাইল-ল্যাপটপ ছাড়া চলা কঠিন, কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার হাতে। সময় থাকতে সতর্ক না হলে ছোট সমস্যাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
আপনারও যদি এ ধরনের লক্ষণ (ঘাড়-পিঠ ব্যথা, কাঁধে টান, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি) দেখা দেয়, তবে অবহেলা করবেন না। দ্রুত ফিজিওথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তাদের নির্দেশিত ব্যায়াম ও চিকিৎসা নিয়মিত অনুসরণ করুন। দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
মনে রাখবেন: শরীর যদি সুস্থ না থাকে, কোনো সাফল্যেই প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই সময় থাকতেই নিজের যত্ন নিন। সুস্থ থাকুন, সক্রিয় থাকুন।