ভয়
ভয়
তোমাকে তো আমি বললাম, আমার খুব দরকারি একটা কাজ ছিল! আর থাকতে পারব না। সেইজন্যই হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে চলে এলাম। আসলে কিন্তু আমার কোনো কাজই ছিল না। দ্যাখো না, তোমার কাছ থেকে ফিরে এসেই বাড়িতে এখন তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি।
কেন যে চলে এলাম! আসল কারণটা বলব? রাগ করবে না? আসলে আমার ভয় করছিল।
এই পর্যন্ত পড়েই শান্তনু এমন রেগে গেল যে চিঠিটা দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলল মাটিতে।
সব সময় খালি ভয় আর ভয়। এই ভয়ের জ্বালায় আর পারা যাবে না। ওরা কি চুরি ডাকাতি কিংবা মানুষ খুন করেছে যে সব সময় ভয় পেতে হবে?
যেদিনকার কথা লিখেছে স্নিগ্ধা, সেদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। সকাল এগারোটার সময়। সেই সময় চেনাশুনো অন্য কারুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার কোনোই সম্ভাবনা ছিল না। অফিস পালিয়ে আসতে হয়েছিল শান্তনুকে। অফিসেরই কাজ নিয়ে ডালহৌসিতে যাবার বদলে চলে এসেছিল আলিপুরে।
কলকাতা শহরের যে-কোনো জায়গায় দেখা করতেই ভয় পায় স্নিগ্ধা। সারা কলকাতাতেই নাকি ওর আত্মীয়স্বজন ছড়ানো। সেইসব আত্মীয়রা ধারালো চোখ নিয়ে সব সময় পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্নিগ্ধাকে দেখে ফেলার জন্য।
স্নিগ্ধার বাড়িতে ফোন করার উপায় নেই, চিঠি লেখার উপায় নেই। বাইরে দেখা করতে গেলে তো প্রায় একটা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করতে হয়।
স্নিগ্ধা চিঠি লেখে। প্রত্যেক চিঠিতেই সে আকুতি জানায়, কখন শান্তনুকে দেখবে। শান্তনুকে সে প্রত্যেকদিন দেখতে চায়, অথচ দেখা করতেও ভয়। এ তো মহা মুশকিল।
একসঙ্গে সিনেমায় যাওয়ার উপায় নেই। কোনো প্রকাশ্য জায়গায় পাশাপাশি বেড়াবার তো প্রশ্নই ওঠে না। একটা মাত্র জায়গা আছে, মিউজিয়াম, যেখানে কলকাতার বাঙালিরা সাধারণত যায় না। কিন্তু সেখানেও যাওয়া চলে না বারবার, স্নিগ্ধার ধারণা, দারোয়ান, চাপরাশিরা তাকে চিনে ফেলেছে। চিনে ফেললেই যে কী বিপদ, তা বোঝে না শান্তনু। চিনুক না। তারা তো মিউজিয়ামে কিছু চুরি করতে যাচ্ছে না।
আর একটা জায়গা হচ্ছে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি। এখানে স্নিগ্ধাকে মাঝে মাঝে বই নিতে আসতে হয়। বাড়ির অনুমতি আছে। তাও স্নিগ্ধা আসবে সকালের দিকে। বিকেলে বা সন্ধেবেলা এখানে অনেক ভিড় হয়ে যায়, তাদের মধ্যে চেনাশুনো কেউ কেউ তো থাকতেই পারে। অফিসের দিনে সকাল সকাল আসতে গেলে শান্তনুকে যে কী অসুবিধেয় পড়তে হয়, তা সে শুধু নিজেই জানে, স্নিগ্ধাকে বলেনি কখনও।
শান্তনু এটাই শুধু বুঝতে পারে না, কেউ দেখে ফেললেই বা ভয়ের কী আছে? সে স্নিগ্ধাকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করার জন্য বদ্ধপরিকর। স্নিগ্ধাও অন্য কারুকে বিয়ে করবে না, বাড়ির যদি খুব অমত থাকে, স্নিগ্ধা বাড়ি থেকে চলে আসতেও রাজি।
অবশ্য স্নিগ্ধার বাড়ি থেকে আপত্তি করার বিশেষ কোনো কারণও নেই। শান্তনু পড়াশুনোয় ভালো ছিল, এখন মোটামুটি ভালোই চাকরি করে। পরিচ্ছন্ন সচ্ছল পরিবারের ছেলে। স্নিগ্ধাদের বাড়িতে জাত-বিচারের বাড়াবাড়ি নেই, স্নিগ্ধার জ্যাঠতুতো দাদা অসবর্ণ বিয়ে করলেও বাড়ির লোক তাদের ভালোভাবেই মেনে নিয়েছে।
মুশকিল বাধিয়েছেন স্নিগ্ধার বাবা। ভদ্রলোক বেশ ভালোমানুষ, অর্থনীতির অধ্যাপক, বেশ সুরসিক। কিন্তু তিনি হঠাৎ ইরানে ভিজিটিং প্রফেসারের চাকরি নিয়ে চলে গেছেন এক বছরের জন্য। ওঃ, সেই এক বছরটা কী অসম্ভব লম্বা স্নিগ্ধার বাবাকে এখনও কথাটা জানানোই হয়নি।
স্নিগ্ধা চিঠি লিখে বাবাকে জানাতে চায় না। বাবা ভাববেন, তিনি নেই বলে মেয়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। শান্তনুকে চোখে না দেখে বাবা বুঝবেন কী করে যে কোন রকম ছেলে সে। বাবা ফিরে এলে সে বাবাকে নিজের মুখে বলবে। এই জন্য মাকেও কিছু জানতে দিচ্ছে না। কারণ মা তাহলেই বাবাকে চিঠি লিখবেন। অতদূর ইরান থেকে তো শুধু শুধু হঠাৎ চলে আসা যায় না। বাবা যদি চিঠি পেয়ে চলে আসেন, সেটা খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে।
শান্তনু অবশ্য এক বছর অপেক্ষা করতে রাজি আছে। কী আসে যায় এক বছরে। কিন্তু তা বলে কি এই এক বছর মুখ দেখাদেখিও বন্ধ থাকবে? স্নিগ্ধার যুক্তি হচ্ছে, যদি কোনো রকমে কোনো আত্মীয়স্বজন একবারও স্নিগ্ধাকে শান্তনুর সঙ্গে ঘুরতে দেখে, তাহলেই তারা কথাটা মায়ের কানে তুলবে। মা অমনি বাবাকে চিঠি লিখবেন। বাবা অতদূরে বসে দুঃখ পাবেন। বাবাকে যে দারুণ ভালোবাসে স্নিগ্ধা।
শান্তনু ঠাট্টা করে, তোমার আত্মীয়স্বজনদের কি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই যে তোমার পাশে কোনো ছেলেকে হাঁটতে দেখলেই অমনি তোমার মায়ের কাছে নালিশ করতে যাবেন?
স্নিগ্ধা বলে, নালিশ নয়, এমনি যদি কথায় কথায় বলে দেয় কেউ—
বলুক না। তোমার মাকে তুমি বুঝিয়ে বলবে।
আমার লজ্জা করে।
লজ্জা আর ভয়। এই দুটো জিনিসই যেন ভালোবাসার প্রধান শত্রু। সব সময় দুজনে তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে একটু দেখা করার জন্য, কাছাকাছি বসে একটু কথা বলার জন্য— আর কেউ এতে বাধা দিচ্ছেও না। যত বাধা এই লজ্জা আর ভয়।
সেদিন অত কষ্ট করে শান্তনু গেল ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। ভেতরে কথা বলার সুযোগ নেই, তাই ওরা এসে দাঁড়িয়েছিল বাইরে একটা গাছের নীচে। পাতলা রোদ সবুজ ঘাসে মোলায়েম হয়ে ছড়িয়ে আছে।
স্নিগ্ধার হাতে দুটি বই। একটা শান্তনুকে দিয়ে বলল, এটা তোমার হাতে রাখো।
কেন?
তাহলে সবাই ভাববে, তুমিও বই নিতে এসেছ লাইব্রেরিতে।
শান্তনু হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, এখানে সবাইটা কোথায়? কেউ তো নেই। আমাদের শুধু দেখছে ওই বড়ো বড়ো গাছগুলো।
স্নিগ্ধা বলল, আস্তে আস্তে তো লোকজন আসবে।
শান্তনু বলল, চলো, ঘাসের ওপর গিয়ে বসি।
স্নিগ্ধা একটুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, না।
কেন, এতে আবার কী অসুবিধে?
এখানে দাঁড়িয়ে থাকতেই তো ভালো লাগছে।
স্নিগ্ধা কারণটা না বললেও শান্তনু বুঝল। ঘাসের ওপর বসলে দৃশ্যটা অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। এমনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুজনে কথা বললে, কেউ দেখে ফেললেও মনে করবে, দুজন ছাত্রছাত্রী বুঝি পড়াশুনোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
একটা উজ্জ্বল লাল রঙের সোয়েটার পরে ছিল স্নিগ্ধা। মাথার চুল এক বেণী করে বাঁধা। নামের সঙ্গে তার মুখটার খুব মিল আছে। চোখ দুটোর দিকে তাকালেই কী রকম যেন ঠান্ডা লাগে। মুখে সব সময় একটা লজ্জা ভাব।
একটু বাদেই স্নিগ্ধা বলল, তুমি এবার যাবে না?
শান্তনু অবাক হয়ে বলল, চলে যাব? এক্ষুনি? কেন?
বাঃ, তোমার অফিস নেই?
সে আমি ঠিক ম্যানেজ করব।
না, না, অফিসে যদি তোমার নামে কেউ কিছু বলে, তাহলে আমার খুব খারাপ লাগবে।
কে কী বলবে? আমি তো একটা কাজেই বেরিয়েছি, কাজটা ঠিকই সেরে ফিরব।
কাজটার জন্য এক ঘন্টার বেশি দেরিও তো হতে পারে।
স্নিগ্ধা ঠিক যেন মানলো না। তার চোখ দুটি চঞ্চল হয়ে রইল। ঘাসে বসা হল না বলে শান্তনু প্রস্তাব করল একটু হেঁটে বেড়াতে। স্নিগ্ধা তাতেও রাজি হতে চায় না। অনেক পেড়াপীড়িতে সে এক পাক মাত্র ঘুরতে রাজি হল।
একবার স্নিগ্ধার কাঁধে হাত রাখার জন্য শান্তনুর বুকের মধ্যে আকুলিবিকুলি করে। কিন্তু তার উপায় নেই। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে স্নিগ্ধার শরীরের সুন্দর গন্ধটা উপভোগ করে শান্তনু। সবচেয়ে কি স্বাভাবিক ছিল না, স্নিগ্ধাকে এখন একবার জড়িয়ে ধরা? এখানে, প্রকাশ্যে, আকাশের নীচে তাকে একবার চুমু খাওয়া? কিন্তু সে তো কল্পনাই করা যায় না।
শান্তনু খপ করে স্নিগ্ধার একটা হাত চেপে ধরল।
স্নিগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে ছাড়িয়ে নিল হাতটা। চোরা চোখে তাকে একবার বকুনি দিল। তারপর যেখান থেকে হাঁটতে শুরু করেছিল, সেইখানে এসেই স্নিগ্ধা বলল, এবার তুমি যাও।
এ কী, তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ?
বাঃ, তোমার অফিসের কত দেরি হচ্ছে।
হোক।
না। না, আমার ভয় করে।
আবার ভয়! স্নিগ্ধাও হেসে ফেলল এবার। তারপর বলল, আমার মতন একটা বাজে বিচ্ছিরি মেয়েকে নিয়ে তুমি খুব বিপদে পড়েছ, তাই না?
শান্তনু বলল, খুব। দারুণ বিপদ ওই দ্যাখো। ওই একজন আত্মীয় আসছে তোমার।
কোথাও একজনও মানুষ দেখা যায় না। শুধু বড়োবড়ো গাছপালা ওদের দর্শক।
শান্তনু জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, শোনো, আমরা যদি ওইখানে সরে গিয়ে ওই রাধাচূড়া গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াই, তাতে তোমার আপত্তি আছে?
কেন, ওখানে কী আছে?
কিছুই না। ওখানে দাঁড়ালে আমাদের সহজে দেখা যাবে না।
ওখান দিয়ে লোকজন হাঁটে না বুঝি?
ঠিক আছে। আমি কথা দিচ্ছি, যদি একটি লোককেও ওখানে আসতে দেখি, এক্ষুনি আমরা চলে আসবো। লোক না-আসা পর্যন্ত আমরা ওখানে দাঁড়াবো। রাজি?
স্নিগ্ধাকে রাজি হতেই হল। জায়গাটা সত্যি নির্জন। তবু এই নির্জনতার মধ্যেও শান্তনু স্নিগ্ধার কাঁধে হাত রাখলো না। চুমু খাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। শুধু একটু বেশি ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য, এক একবার কাঁধে কাঁধ ছুঁয়ে যায়, শান্তনু সিগারেট মুখে দিলে স্নিগ্ধা দেশলাই জ্বেলে দেয়। এইটুকুতেই অনেকখানি পাওয়া।
স্নিগ্ধা এক সময় বলল, বাঃ, লোক না এলেও বুঝি আমরা এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবো?
আমি এখানে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। তুমি পারো না?
শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে?
আমার তো শুধু তোমাকে দেখতেই ভালো লাগে।
আমার ভয় করে।
আবার ভয়? এখানেও ভয়?
স্নিগ্ধার চোখ দুটি আরও বেশি চঞ্চল। সে সুস্থির হতে পারলে না কিছুতেই। এবার অনুনয় করে বলল, শোনো লক্ষ্মীটি, আমার একটা দারুণ কাজ আছে, আমাকে বারোটার মধ্যে ফিরতেই হবে।
বারোটার মধ্যে? তাহলে তো এক্ষুনি যেতে হয়।
হ্যাঁ, বই দুটো বদলেই—
মোটে এইটুকু সময়ের জন্য আমি এলাম?
লক্ষ্মীটি রাগ করো না, আর একদিন…
কী কাজ তোমার?
বিশ্বাস করছো না? মাকে বলে এসেছি, আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে…
স্নিগ্ধাকে আর আটকানো যায়নি কিছুতেই। শান্তনু খানিকটা ক্ষুণ্ণ মনেই ফিরে এসেছিল। অন্য কেউ হলে হয়তো সন্দেহ করত, স্নিগ্ধা বুঝি শান্তনুকে তেমন ভালোবাসে না। সে বুঝি শান্তনুর কাছে মিথ্যে কথা বলে অন্য কারুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। কিন্তু স্নিগ্ধা সম্পর্কে সেরকম সন্দেহ কিছুতেই করা যায় না। কারুকে ঠকাবার কোনো ক্ষমতাই নেই স্নিগ্ধার।
মেঝে থেকে শান্তনু স্নিগ্ধার দলা পাকানো চিঠিটা আবার তুলে নিল। পড়তে লাগল পরের অংশটুকু।
রাগ করবে না? আসলে আমার ভয় করছিল। কীসের ভয় জানো? কারুর দেখে ফেলার ভয় নয়। ভয় করছিল নিজেকেই। আমার মনে হচ্ছিল, বেশিক্ষণ থাকলে, আমাকে যদি তোমার আর দেখতে ভালো না লাগে? আমি তো সুন্দরী নই। তুমি কত সুন্দর। তোমার সামনে আমাকে কেমন যেন…আমি বেশি সাজতেও পারি না, আমার ভয় হয়, যদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তুমি হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে নাও। আমার চিবুকটা বিচ্ছিরি, তাই না?
শান্তনু আবার অবাক হল। এ আবার কী রকম ভয়? স্নিগ্ধাকে তার দেখতে খারাপ লাগবে? যাকে দেখার জন্য সে সব সময় ছটফট করে, হঠাৎ কোথাও আচমকা দেখা হয়ে গেলে সে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যায়, সেই স্নিগ্ধাকে দেখতে তার খারাপ লাগবে? স্নিগ্ধার মতন সুন্দরী আর কে আছে? ওর চিবুকে একটা ছোট্ট কাটা দাগ, সেই জন্যই মুখটা আরও মিষ্টি দেখায়, ইচ্ছে করে ওই কাটা জায়গাটায় চুপুস করে একটা চুমু খেতে। এই জন্য স্নিগ্ধা এত তাড়াতাড়ি চলে গেল! কোনো মানে হয়।
পরে কোথায় আবার দেখা হবে, সে সম্পর্কে স্নিগ্ধা কিছু লেখেনি। তার মানে এখন দু-তিন দিন আর স্নিগ্ধা বাড়ি থেকে বেরুবে না। স্নিগ্ধার অন্য ভাইবোনরা ছোটো ছোটো। বাবা এখানে নেই বলে স্নিগ্ধাই যেন এখন বাড়ির অভিভাবক। ওর মতন নরম মেয়েকে কি ভাইবোনরা মানে একটুও? বাবা এখন এখানে নেই বলেই, সেই সুযোগে স্নিগ্ধা এখন প্রেম করে বেড়াচ্ছে—এই অপবাদটাকেই স্নিগ্ধার বেশি ভয়।
এদিকে অফিসের কাজে তিনদিন পর আবার শান্তনুকে পাটনা যেতে হবে। তার মানে এর মধ্যে আর স্নিগ্ধার সঙ্গে দেখা হবে না? পাটনা থেকে ফিরতে ফিরতেও তো তিন-চার দিন লাগবে। পাটনা যাওয়ার কথাটা স্নিগ্ধাকে জানাবেই-বা কী করে?
স্নিগ্ধা চিঠি লেখে কিন্তু শান্তনুর চিঠি লেখার উপায় নেই। টেলিফোন করাও চলবে না। স্নিগ্ধাই কখনো-সখনো বাড়ি একেবারে ফাঁকা থাকলে শান্তনুকে টেলিফোন করে, বাড়িতে কিংবা অফিসে। যদি স্নিগ্ধা সেরকম ফোন করে…
পাটনা থেকে ফিরতে ফিরতে শান্তনুর পাঁচদিন লেগে গেল। ফেরার পথে আর এক ঝামেলা। ট্রেন কলকাতায় এসে পৌঁছোবার কথা ভোরে, কিন্তু ইঞ্জিনে গণ্ডগোল হওয়ায় গাড়ি মাঝ রাস্তায় থেমে রইল ঘন্টার পর ঘন্টা। আগের জংশনে খবর দিয়ে নতুন এঞ্জিন আনতে পাঁচ ঘন্টা কেটে গেল। অতক্ষণ থেমে থাকা ট্রেনে অপেক্ষা করা এক বিরক্তিকর ব্যাপার। তাও মাঠের মধ্যে। কিছুই করার নেই। নেমে পায়চারি করতে গেলেও চড়া রোদ গায়ে বেঁধে। হঠাৎ শীত চলে গিয়ে গরম পড়ে গেছে। প্রথম গ্রীষ্ম দারুণ চিটচিটে হয়। ট্রেনের মধ্যে বসে থাকলেও গরম, বাইরে রোদ্দুরে ঘোরাও অসম্ভব। ঘামে জামা-টামা চিটচিটে হয়ে গেল। মুখে বিরক্তির ভাঁজ।
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেও আর এক ঝামেলা। ট্যাক্সি নেই। অনেক দৌড়োদৌড়ি করেও কোনো ফল হল না। শেষ পর্যন্ত, এক ভদ্রলোকের প্রাইভেট গাড়ি ওকে হাজরা মোড় পর্যন্ত নামিয়ে দিতে রাজি হল।
হাজরায় পৌঁছে, হাতের ছোটো ব্যাগটা নিয়ে শান্তনু গাড়ির ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে যেই মুখ তুলল, অমনি দেখল এক অপরূপ দৃশ্য।
রাস্তার ওপারে, বাস গুমটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে স্নিগ্ধা। সঙ্গে আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। সেই মেয়েটিও বোধহয় এক্ষুনি চলে যাবে, কেননা, একবার একটুখানি চলে গিয়ে আবার ফিরে এসে কী যেন বলল। স্নিগ্ধার সঙ্গে দেখা করার এমন আকস্মিক সুযোগ পাওয়া যায় না। বুকের মধ্যে থেকে একটা খুশি লাফিয়ে উঠল।
কিন্তু শান্তনু তার চিবুকে হাত বুলোল। দাড়ি কামানো হয়নি, বেশ খোঁচা খোঁচা দাড়ি টের পাওয়া যাচ্ছে। মুখে চটচটে ঘাম। জামাটাও ঘামে জবজবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ট্রেনে পাজামা পরে ছিল, তার ওপরেই শার্ট পরে নিয়েছে। এই চেহারায় সে স্নিগ্ধার সামনে দাঁড়াবে?
শান্তনু আর দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে সামনের চলন্ত মিনিবাসে লাফিয়ে উঠে পড়ল।
বাড়িতে এসেই কিন্তু মন খারাপ হয়ে গেল আবার। এমন দুর্লভ সুযোগ পেয়েও সে স্নিগ্ধার কাছে যেতে পারল না? আজ যা দেরি হয়ে গেছে, অফিসে যাবার কোনো প্রশ্ন নেই—স্নিগ্ধার সঙ্গে দুটো-চারটে কথাও বলতে পারত অন্তত, তবু কেন গেল না? তার লজ্জা করছিল? কিংবা ভয়?
পরদিনই স্নিগ্ধার চিঠি এল।
জানো, কাল তোমাকে দেখলাম। নিজের চোখকে আমি বিশ্বাসই করতে পারি না। হঠাৎ মনে হল যেন স্বর্গ থেকে দেবতারা আমার জন্য একটা পুরস্কার পাঠালেন। তুমি একটা কালো রঙের গাড়ি থেকে হাজরা মোড়ে নামলে। আমি হাত তুলে তোমাকে ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তোমার বোধ হয় খুব তাড়া ছিল, তুমি একটা মিনিবাসে উঠে পড়লে। তুমি আমায় দেখতে পাওনি, আমি কিন্তু তোমায় দেখে নিয়েছি। আমার ভাগ্যটা কত ভালো বলো তো!
দাড়ি কামাওনি, মুখে নীল নীল দাড়ি, পাজামার ওপরে একটা লাল চেক চেক শার্ট পরেছিলে। তোমাকে কী ইয়াং আর কী সুন্দর দেখাচ্ছিল।
কে শত্রু কে বন্ধু
কে শত্রু কে বন্ধু
দোতলা বাসের জানলার ধারে বসবার জায়গা পাওয়া একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। অনেকটা দূরে যেতে হবে। বাসের অল্প আলোয় একটা বই খুলে পড়ছিলাম। কতটা সময় কেটে গেছে খেয়াল করিনি, হঠাৎ চোখ তুলে বাইরে তাকিয়ে দেখি আমার গন্তব্য পেরিয়ে গেছে। রাত প্রায় সাড়ে ন-টা। ব্যস্ত হয়ে বই মুড়ে দাঁড়ালাম। বাসে তখন বেশ ভিড়। আমার সিট ছেড়ে সবেমাত্র বাইরে এসেছি, হঠাৎ আমার চোখে জগৎসংসার অন্ধকার হয়ে গেল, আমি পা দুমড়ে বসে পড়লাম।
উঃ করে একটা আওয়াজ করেছিলাম শুধু। হাত দিয়ে ঢেকে ফেলেছিলাম মুখ, তারপর কয়েকটা মুহূর্ত কিছুই শুনতে পাইনি। চোখেও দেখতে পাচ্ছিলাম না। একটু পরে আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। শুনতে পেলাম, দু-তিনজন লোক জিজ্ঞেস করছে, কী হল মশাই? ও ভাই কী হল? আমি হাত দুটো চোখের সামনে আনলাম। দুহাত ভরা রক্ত।
বছর সাতেক আগের কথা। তখন কলকাতার পথেঘাটে মানুষ খুন করার উৎসবের রেওয়াজ ছিল না। আহত ও নিহত মানুষ দেখলে লোকে ফেলে পালাত না। চলন্ত বাসে অনেক লোক আমাকে ঘিরে ব্যাকুল হয়ে রইল।
আমার যে ঠিক কী হয়েছে, তা আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না। আমার দুহাত ভরা শুধু রক্ত, আমার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে—কোনো ব্যথাও তখন টের পাচ্ছি না। লোকজন ধরাধরি করে আমাকে দাঁড় করাল। রক্ত তখনও পড়ছে অনর্গল। অনেকে চিৎকার করে বাস থামাল।
আমাকে কি কেউ জোরে মেরেছে? কিন্তু বাসের কোনো লোক আততায়ীকে দেখেনি। কেউ দুদ্দাড় করে নেমে চলে যায়নি। ব্যাপারটা এমন হঠাৎ হয়েছে যে, আমি ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ বসে না পড়লে কেউ লক্ষই করত না।
কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সেখানে সেরকম কিছু নেই।
একজন লোক আমার দিকে মুখ নীচু করে জিজ্ঞেস করল, আপনার নাকে কে এরকম ঘুষি মারল?
আমি রক্তাক্ত মুখ তুলে লোকটিকে দেখতে চাইলাম। রক্তস্রোতে আমার বিস্ময় চাপা পড়েছিল। চোখেও যেন ঘোর লেগেছিল একটু।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে?
অনেকগুলি কণ্ঠ প্রশ্ন করলো, কে? কে? কে? কে?
উত্তর নেই।
কে মেরেছে, কেউ ঠিক বলতে পারছে না। একজনের হাত আমার মুখের সামনে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে আসতে দেখেছে। হয়তো সেই হাতে কঠিন কোনো জিনিস ছিল। খালি হাতে এতটা আঘাত লাগার কথা নয়। যে মেরেছে সে হয়তো এখনও বাসের দোতলাতেই রয়েছে।
দুর্ঘটনা নয়। কেউ আমাকে মেরেছে, এটা শুনেই আমার ব্যথা বোধ হতে শুরু করল। অসম্ভব তীব্র ব্যথা।
আপনি কোথায় যাবেন?
আমি এখানেই নামব।
নিজে নামতে পারবেন?
আমি এবার সোজা হয়ে চারদিক তাকালাম। অনেকেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, সবারই মুখ বন্ধুর মতন। যন্ত্রণা অনেকটা কমে গেল।
আমি নামবার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি, একজন লোক বললেন, দাঁড়ান আমি ধরছি আপনাকে।
কারুর সাহায্য নিতে আমার লজ্জা করে। অথচ উপকারী মানুষের প্রতি রূঢ় ব্যবহার করাও যায় না। কোনো রকমে বললাম, ঠিক আছে—
তবু তিনি আমার হাত ধরলেন। তার সঙ্গে নামতে লাগলাম। তখন একটি রিনরিনে কণ্ঠস্বর বলে উঠল, আপনার বইটা? বইটা যে রয়ে গেল।
ময়ূরকণ্ঠী শাড়ি পরা একটি তেইশ-চবিবশ বছরের মেয়ে, মোটামুটি সুশ্রী এবং সপ্রতিভ। বইটা বাড়িয়ে ধরেছে আমার দিকে।
আমি মুখে ধন্যবাদ না জানিয়ে শুধু কৃতজ্ঞতার ভাব দেখিয়ে বইটা নিলাম। বইটা হারালে খুব মুশকিল হত, লাইব্রেরি থেকে আনা।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আপনাকে কে মারল?
এমনিতে এরকম একটি অচেনা যুবতী মেয়ে আমার সঙ্গে যেচে কথা বলত না। আমার রক্তমাখা মুখ দেখে ওর মনে বুঝি দয়া হয়েছে।
আমি বললাম, পৃথিবীতে আমার কোনো শত্রু নেই।
মেয়েটি বোধহয় এরকম কোনো উত্তর আশা করেনি। তাই আমার কথা শুনে সে একটু হেসে ফেলল হঠাৎ। রক্তাক্ত চেহারার মানুষকে দেখে কেউ হাসে না।
বাস এর আগেই চলতে শুরু করেছে। আমাকে নামতে হবে পরের স্টপে। মেয়েটির প্রশ্ন ও চিন্তা আমার মধ্যে নতুন করে সাড়া জাগায়। কে আমাকে মারল? কী দোষ আমি করেছি? হঠাৎ লেগে যাবার ব্যাপারও নয়, এত জোরে লেগেছে। কেউ যদি সামনাসামনি কোনো অভিযোগ জানাত, ঝগড়া করত, আচমকা মেরে বসত, তাহলেও না হয় মানে বুঝতাম। কাপুরুষের মতোই আত্মগোপন করে কেন মারল আমাকে? কোনো কাপুরুষের সঙ্গে আমার শত্রুতা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
বাসটি ততক্ষণ চলতে শুরু করেছে। যে ভদ্রলোক আমার হাত ধরে নামাচ্ছিলেন তিনি বললেন রোককে। রোককে।
বাস তবু থামল না। তিনি আরও জোর গলায় বললেন, রোককে। দেখছেন না অ্যাকসিডেন্ট।
ভদ্রলোক ব্যাপারটাকে নাটকীয় করতে চান। যন্ত্রণার মধ্যেও আমার লজ্জা হয়। আমাকে কেন্দ্র করে কোনো নাটকীয় ব্যাপার আমি পছন্দ করি না। অনেক লোক একসঙ্গে আমার দিকে তাকালে আমার শরীর কুঁকড়ে যায়।
একতলার কিছু লোক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কেউই খুব একটা কৌতূহল দেখাল না। কন্ডাক্টর দুজনই নীচতলায় গল্প করছিল, তারা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? আমি তাদের কোনো উত্তর দিলাম না। বাস থামতেই নেমে পড়লাম।
যন্ত্রণায় তখনও আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। শরীরের কোনো জায়গার বদলে নাকে লেগেছে বলেই ব্যথাটা এত বেশি। রক্ত বন্ধ হয়নি তখনও। আমার প্রথমেই চিন্তা হল, রক্তটা বন্ধ করা দরকার।
অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ হয়ে গেছে। কাছাকাছি কোনো ডাক্তারখানা নেই।
আমার সঙ্গী ভদ্রলোক বললেন, একটু হাঁটতে পারবেন? আমহার্স্ট স্ট্রিটের কাছে একটা ডাক্তারখানা আছে।
আমি কাছেই একটা টিউবওয়েল দেখতে পেলাম। বললাম, আগে রক্তটা ধুয়ে নিই। আমার জামায় রক্ত, রুমালটা জবজবে ভিজে , প্যান্টে, এমনকি জুতোতেও রক্তের ফোঁটা পড়েছে। এই অবস্থায় রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না।
ভদ্রলোক পাম্প করতে লাগলেন, আমি জল দিয়ে ধুতে লাগলাম। ঠান্ডা জলের স্পর্শে খানিকটা ভালোই লাগল। যেন অজানা কারুর স্নেহের মতন। নাকের মধ্যে জলের ঝাপটা দিলেও রক্ত বন্ধ হতে চায় না।
সেই অবস্থায় হঠাৎ আমার মনে পড়ল, একটু আগে বাসে দেখা মযূরকণ্ঠী শাড়ি পরা সেই মেয়েটির কথা, যে আসলে বইটা ফেরত দিয়েছিল। মেয়েটির মুখখানা খুব চেনা মনে হয়, যদিও একথাও ঠিক, ওকে আমি আগে কখনও দেখিনি। কারুর কারুর ক্ষেত্রে হয় এরকম—একবার দেখলেই মনে হয় অনেকদিনের চেনা। কিন্তু মেয়েটি হাসল কেন? আমার দুরবস্থা দেখে ওর কি হাসা উচিত? আমি এতই অপমানিত বোধ করলাম যে, আমার কান্না এসে গেল। তখন আমি চোখেমুখে জলের ছিটে দিচ্ছি, কেউ আমার কান্না বুঝবে না।
ভদ্রলোক বললেন, কমেছে?
আমি বললাম, অনেকটা। কিন্তু আপনি আমার জন্য কষ্ট করে নামলেন এখানে—
না, আমারও এখানেই নামবার কথা। কাছেই বাড়ি। আপনি কোথায় যাবেন?
আমি এখান থেকে থ্রি-বি বাস ধরব।
এক্ষুনি বাসে উঠতে পারবেন? শরীর দুর্বল লাগবে না?
না, চলে যাবো ঠিক।
আপনার যদি খুব তাড়া না থাকে, তাহলে আমাদের বাড়িতে একবার আসবেন? একটু বসে, তারপর চলে যেতেন। খুব কাছেই আমার বাড়ি।
না, না, শুধু শুধু আপনাকে বিব্রত করতে চাই না। আপনি এমনিতে আমায় যা সাহায্য করলেন—।
আরে মশাই, চলুন, অত ভদ্রতা করছেন কেন! আসুন, একটু কফি খেয়ে যাবেন।
বড়ো রাস্তার অদূরে গলির মধ্যে ভদ্রলোকের বাড়ি। ইতিমধ্যে নাম জেনে নিয়েছি। ওঁর নাম অনুপম সরকার, এক সরকারি অফিসের লাইব্রেরিয়ান।
সদর দরজা খোলাই ছিল। অন্ধকার, সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে অনুপমবাবু বললেন, একটু সাবধানে উঠবেন, আবার যেন ধাক্কাটাক্কা না লাগে।
আমি নাকের ওপর হাত চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। অন্য যে জায়গায় লাগে লাগুক, আবার নাকে লাগলে আমি এবার ঠিক অজ্ঞান হয়ে যাব।
নিস্তব্ধ বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে একতলা, দোতলা, তিনতলা পার হয়ে গিয়েও অনুপমবাবু থামলেন না। আমার একটু একটু অস্বস্তি হতে লাগল। কোথায় চলেছি? এত রাত্রে একজন সম্পূর্ণ অচেনা লোকের সঙ্গে এখানে না আসাই উচিত ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ক-তলায়?
অনুপমবাবু আমার হাত চেপে ধরে বললেন, আসুন না!
হঠাৎ আমি অন্য একটা কথা ভাবলাম। এই লোকটার মতলব কী? আসলে কোথায় নিয়ে যাবে? এই লোকটাই আসলে মারেনি তো? এখন আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার নিয়ে যাচ্ছে আরও কঠিন শাস্তি দেবার জন্য?
যদিও লোকটিকে আমি জীবনে কখনও দেখিনি, এর সঙ্গে আমার শত্রুতা থাকার কোনো কারণ নেই। তবু পৃথিবীতে অনেক অসম্ভব ব্যাপার ঘটে।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক সবলে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, আরে মশাই, লজ্জা পাচ্ছেন কেন! আসুন।
গলার আওয়াজ পেয়েই বোধহয় দরজা খুলে গেল। একজন মহিলা সেখানে দাঁড়িয়ে, কুচকুচে কালো রং, স্নিগ্ধ মুখখানা, এক মাথা চুল। অন্ধকারের মধ্যে ভদ্রমহিলা প্রথমে আমাকে দেখতে পাননি, হঠাৎ দেখতে পেয়ে মুখ দিয়ে একটা আর্ত শব্দ করলেন—তারপরই ছুটে ঘরের মধ্যে কোথায় চলে গেলেন।
অনুপমবাবু হেসে আমাকে বললেন, আসুন।
আমার পক্ষে অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। কিন্তু এখন আর ঘরের মধ্যে না গিয়ে উপায় নেই।
বিরাট খাটের ওপর দুটি বাচ্চা ঘুমুচ্ছে। ভদ্রমহিলা সেখানে নেই। ঘরে একটিমাত্র চেয়ার। অনুপমবাবু আমাকে বললেন, এই চেয়ারটায় বসুন। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?
বসলাম। দূরে একটা ড্রেসিং ট্রেবিলের আয়নায় দেখতে পেলাম আমার চেহারা। এমন বিসদৃশ এবং বোকা ভঙ্গিতে কোনো মানুষকে বসে থাকতে আমি এর আগে দেখিনি।
একটু বাদেই মহিলা ফিরে এলেন এ ঘরে। নিজের স্বামীর সঙ্গে কোনো কথা বলার আগেই জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
আমার বদলে ওঁর স্বামীই বললেন, ভদ্রলোক বাসে আসছিলেন, হঠাৎ কী যে হল, অদ্ভুত ব্যাপার—
আমি বাধা দিয়ে বললাম, হঠাৎ লেগে গেছে।
উনি বললেন, না। কে যেন মেরেছে।
কে মেরেছে?
তা তো জানি না।
ভদ্রমহিলা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ছিঃ, মারামারি করতে নেই। মানুষের সঙ্গে মারামারি করে কী লাভ!
এতক্ষণ বাদে আমার হাসি পেল। উনি ধরেই নিয়েছেন, আমি মারামারি করেছি। এই রকমই হয় বোধহয়। এক পক্ষের আঘাতে কি রক্তপাত হয় এতটা?
আমি বললাম, না, মারামারির ব্যাপারই নয়। আমার বোধহয় ধাক্কা-টাক্কা লেগেছে কোথাও। এত রাত্রে আপনাদের খুব বিব্রত করলাম। আমি এবার চলি?
অনুপমবাবু বললেন, কি ওঁকে এই অবস্থায় যেতে দেওয়া যায়?
মহিলা বললেন, না, আজ আর যাবার দরকার নেই। আপনি আজ এখানেই থেকে যান না। কোনো রকমে জায়গা হয়ে যাবে।
আমি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, না, না, তার কোনো দরকার নেই। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
মহিলা বললেন, ঠিক আছে, একটু পরে যাবেন। এক্ষুনি ওঠবার দরকার নেই।
অনুপমবাবু আবার হাসতে হাসতে বললেন, করবী তুমি প্রথমে ওঁকে দেখেই পালিয়ে গেলে কেন? ভয় পেয়েছিলে?
অনুপমের স্ত্রীর নাম করবী। এই কথাটায় খুবই লজ্জা পেয়ে গেলেন কেন প্রথমে বুঝতে পারিনি। খুব নীচু করে বললেন, না, ভয় পাইনি।
এখন বুঝতে পারলাম। ভদ্রমহিলা গায়ে ব্লাউজ পরে ছিলেন না তখন। শোওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলেন। অচেনা পুরুষ দেখে তাই তাড়াতাড়ি পোশাক ঠিক করতে গিয়েছিলেন।
করবীর বয়স তিরিশের কাছাকাছি। আর একবার ওঁর দিকে তাকিয়ে মনে হল, এরকম সুন্দরী নারী আমি খুব কম দেখেছি। মুখের মধ্যে একটা কমনীয় ভাব, শান্ত দৃষ্টি, এই নারী বোধহয় পৃথিবীতে কোনো পাপের কথা জানে না।
পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে বেশ রহস্যময় লাগছিল গোড়া থেকে। ভদ্রলোক আমাকে ডেকে আনলেনই বা কেন, আজ তিনি আমাকে আর থাকবার জন্য পেড়াপীড়ি করলেনই বা কেন। ঘরদোরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, এদের অবস্থা সচ্ছল নয়।
করবী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, নাকের ওপর দুটো নখের দাগ বসে গেছে। কেউ খুব জোরে মেরেছে। ভীষণ লেগেছিল তাই না? উঃ! খুব লেগেছিল?
আমি দেখলাম, করবীর চোখে জল। আমার বিস্ময় বুকের মধ্যে আরও লাফিয়ে উঠল। উনি কাঁদছেন আমার কষ্টের কথা ভেবে! এরকম কখনও হয়?
আমি বললাম, না। ততটা লাগেনি।
করবী চোখ মুছলেন। আবার লজ্জিত মুখে বললেন, আপনি একটু বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি।
আমি অসহায়ভাবে অনুপমবাবুকে বললাম, আমাকে এবার সত্যি চলে যেতে হবে। আপনার নিশ্চয়ই এখনও খাওয়াদাওয়া হয়নি।
অনুপমবাবু বললেন, দাঁড়ান করবীকে না বলে তো যেতে পারবেন না। ওকে এখনও চেনেননি আপনি।
প্রতি মুহূর্তেই আমার সন্দেহ হচ্ছিল, এদের বুঝি কিছু একটা মতলব আছে আমাকে নিয়ে। যদিও তার সঙ্গে করবীর চোখের জল ফেলাটা মেলাতে পারছি না। করবী ফিরে এল এককাপ দুধ আর একবাটি গরমজল নিয়ে। দুধটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা খেয়ে নিন! অনেকখানি রক্ত বেরিয়েছে তো।
আমি লাফিয়ে উঠলাম। অসম্ভব। এদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। দুটো বাচ্চা রয়েছে—এদের দুধ আমি খাব কেন? কলকাতায় এইসব পরিবারে যে অঢেল দুধ থাকে না, তা আমি জানি।
আমি কিছুতেই খাব না। ওরাও দুজন মিলে আমাকে দারুণ পেড়াপীড়ি করতে লাগলেন। করবীর গলায় হুকুমের সুর। এই দুধের মধ্যে বিষ মেশানো নেই তো? কিংবা ঘুমের ওষুধ?
শেষ পর্যন্ত ওদের জোরাজুরিতে অতিষ্ঠ হয়ে রীতিমতন বিরক্ত মুখে এক চুমুকে খেয়ে ফেললাম সবটা দুধ। কোনো প্রতিক্রিয়া হল না।
করবী বললেন, এবার চুপটি করে বসুন। আমি ওই জায়গাটা মুছে দিচ্ছি গরমজল দিয়ে।
আমার আর প্রতিবাদ করবারও ক্ষমতা নেই। যা হয় হোক। হাত-পা ছড়িয়ে বসে রইলাম চুপ করে। উনি গরমজলে তুলো ভিজিয়ে খুব যত্ন করে মুছে দিতে লাগলেন আমার ক্ষত। সস্নেহে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, লাগছে না তো! ব্যথা লাগছে না? এবার একটু ডেটল লাগিয়ে দিই? তাহলে আর ভয় নেই।
আমার মুখের খুব কাছেই করবীর মুখ। কী বড়ো দুটি চোখ, আঙুলগুলো যেন করুণা মাখা। আমার চোখ বুজে আসছিল বার বার। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এ সব হচ্ছে কী? যাদের বিন্দুমাত্র চিনি না—তারা আমাকে এ রকম যত্ন করছে কেন?
করবীর অনুরোধে আমাকে জামাটাও খুলে ফেলতে হল। মেয়েদের সামনে আমি কোনোদিন জামা খুলি না—কিন্তু আমার কোনো ওজরই টিকল না। করবী সেই জামাটা বাথরুমে নিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে, আমাকে ওঁর স্বামীর একটা শার্ট পরতে দিলেন। বলতে লাগলেন, বাড়িতে ওরকম রক্তমাখা জামা পরে গেলে বাড়ির লোক ভয় পেয়ে যাবে।
প্রায় এক ঘন্টা ধরে করবীর সেবা নেবার পর আমি সত্যিই একসময় বিদায় নিলাম। করবী তাঁর স্বামীকে হুকুম করলেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাসে তুলে দিয়ে আসবার জন্য। অনুপমবাবু আমার শেষ আপত্তি সত্ত্বেও বেরিয়ে এলেন রাস্তায়।
গোড়া থেকে আমি কত রকম সন্দেহ করছিলাম, কিন্তু খারাপ কিছুই ঘটল না তো। শুধু সেবা আর যত্ন। রাস্তায় বেরিয়ে কিছুটা আসবার পর আমার মনে পড়ল, করবীকে সে রকম কোনো কৃতজ্ঞতা জানানো হল না তো।
অনুপমবাবুকে বললাম, আপনার স্ত্রী যা করলেন।
অনুপমবাবু বললেন, করবী বড্ড ভালো, জানেন। ওর মতন মেয়ে হয় না। নিজের স্ত্রী বলেই বলছি না।
সে তো নিশ্চয়ই।
আর একটু মিশলে দেখবেন, পৃথিবীতে এ যুগে এ রকম মেয়ে হয় না। যে-কোনো মানুষ দুঃখকষ্ট পেলে ও এত দুঃখ পায়—
সত্যি এ যুগে এরকম মেয়ে—
আমার মতন একজন গরিবের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, সারাদিন খাটাখাটনি করে, বাইরে বেরুতে পারে না—তবু আমার ইচ্ছে হয় কী জানেন, বাইরের লোককে ডেকে ডেকে দেখাই। সবাইকে বলি, দেখো, এ যুগেও এরকম মেয়ে আছে। তাই আপনাকে আজ নিয়ে এলাম।
আজ রাত্তিরের সমস্ত ঘটনাটাই রহস্যময়। কেন বাসে একজন মারল? তারপর কীরকমভাবে এরকম একটি পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হল। যাদের কাজ হচ্ছে, বিনা কারণে উপকার করা। সম্পূর্ণ বিপরীত এই অভিজ্ঞতা।
পরক্ষণে আবার মনে পড়ল আমার আততায়ী তো আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তার জন্যই অনুপম আর করবীর সঙ্গে আমার পরিচয় হল। আমার লাভের পরিমাণটা অনেক বেশি। আততায়ীকে এ কথাটা জানানো দরকার।
রানি ও অবিনাশ
রানি ও অবিনাশ
অবিনাশের চেহারাটা এমনিতেই বেশ লম্বা, পা ফাঁক করে দাঁড়ালে অনেকটা বড়ো ছায়া পড়ে। কিন্তু এখন ছায়াটা একটু বেশি লম্বা—রাস্তা পেরিয়ে গেছে। সকাল সাড়ে দশটা বাজে, এখন সকলেরই ছায়া ছোটো-ছোটো, আর একটু বাদেই বিন্দু হয়ে যাবে—অথচ অবিনাশের ছায়াটা এমন বিচ্ছিরি লম্বা হল কী করে? রাত্তিরের দিকে পিছন থেকে আলো পড়লে ছায়া আপনি লম্বা হয়ে যায়, অনেক সময় অতিকায়, পঞ্চাশ-ষাট ফুট পর্যন্ত, কিন্তু এখন সূর্য প্রায় মাথার ওপরে। অবিনাশ এদিক-ওদিক তাকিয়ে আলাদা কোনো আলোর খোঁজ করল—কিছুই নেই। তা হলে কী করে এতবড়ো ছায়া—পিচের রাস্তা পেরিয়ে ওপাশের গ্যাসপোস্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে তার মাথা। যাই হোক, ও নিয়ে আর অবিনাশ ব্যস্ত হল না, বিজ্ঞানের আবিষ্কার-ফাবিষ্কার যত বেশি হচ্ছে—ততই অলৌকিকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে—সে ভাবলে।
ভারী ভারী বাসগুলো তার ছায়ার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, অনেক ব্যস্ত মানুষ, রিকশা—এমনকি ঠেলাগাড়িও চলে যাচ্ছে তার ছায়ার বা কাঁধের ছায়া মাড়িয়েই—যাই হোক, ব্যথা তো আর লাগছে না। তবু, অবিনাশ কয়েকবার সরে সরে দাঁড়াল।
প্রজাপতিরঙা ছোটো ছোটো মেয়েরা স্কুল ছুটির পর বেরিয়ে আসছে—অবিনাশ দ্রুত চোখ চালিয়ে দিচ্ছে ওদের মধ্যে একবার করে—না সর্দারনিরা এখনও বেরোয়নি। মেয়েদের সাইজ ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। কচি কচি মেয়েদের পর এখন আসছে ডাঁসা মেয়েরা। ওয়ান-টু থেকে ক্লাস নাইন-টেনের মেয়েদেরও ছুটি হয়ে গেল। এমনকি দু-একটা মেয়ের চেহারা দেখে এখন আর ছাত্রী কি মাস্টারনি বোঝা যায় না। তবে, চশমা-পরা কালো ঠোঁট দুজন শিক্ষয়িত্রী না হয়ে যায় না। এমনও হতে পারে, রানি আজ স্কুলে আসেনি। অথবা অন্য স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে। কতদিন আগেকার শোনা খবরে এসেছে অবিনাশ। অথবা, রানি হয়তো এখন আর চাকরি-টাকরি করে না। ওর স্বামীর এতদিনে যথেষ্ট পদোন্নতি হবার কথা। অফিসারদের বউদের কি আর মাস্টারি করলে মানায়! কিন্তু অবিনাশ শেষপর্যন্ত দেখে যাবে। আর ক-মিনিট—এরপরই তো দুপুরের ছেলেদের স্কুল শুরু হয়ে যায়—সুতরাং, আর বেশিক্ষণ নিশ্চিত ভিতরে বসে থাকবে না রানি, যদি স্কুলে এসে থাকে।
প্রথমে যেমন জাহাজের মাস্তুলটুকু শুধু দেখা যায়, তেমনি দূরে অবিনাশ দেখতে পেল রঙিন প্যারাসোল, একটি সুডৌল হাত—মুখ না দেখতে পেলেও অবিনাশ চিনতে পেরেছে—ওই হাঁটার ভঙ্গিটা তার খুব চেনা। হুঁ, এখনও বেশ শৌখিন আছে দেখছি, চমৎকার কায়দায় শাড়িটা পরেছে, ফুলহাতা মিডভিকটোরিয়ান ব্লাউজ, শান্তিনিকেতনের চটি। ইস্কুলে কাজ করলে তো এসব শখ বেশিদিন থাকে না। দিদিমণি দিদিমণি দেখাচ্ছে না যা হোক। তবে একটু মোটা হয়েছে ঠিকই।
অবিনাশ এগিয়ে গেল না। আর একটা সিগারেট ধরাল। আগে চোখাচোখি হোক না। আধ ঘন্টার ওপর অবিনাশ দাঁড়িয়ে আছে, লোকেরা কি তাকে লক্ষ করছে? পাড়ার ছোঁড়ারা না আবার আওয়াজ দেয়। যাকগে। বাসে উঠে পড়বে না তো টপ করে।
রানি কিন্তু এদিকে তাকাল না। ছাতা না বন্ধ করে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। সুতরাং, অবিনাশই এগিয়ে গিয়ে ঘুরে কোনো কথা না বলে ওর সামনে দাঁড়ালো। বললে, চিনতে পারো?
একি, তুমি? রানি যেন খুব বেশি অবাক হয়নি। কিন্তু প্রকাশ্য রাস্তাতেই অবিনাশের হাত চেপে ধরলো। এতদিনে মনে পড়ল অভাগিনীকে? একটু দয়া-মায়া নেই শরীরে তোমার? মেয়েটা বেঁচে আছে কি মরে গেছে, একটা খবরও নিলে না।
সত্যি, কতদিন পর তোমাকে দেখলুম, রানি।
পাঁচ বছর আট মাস।
অবিনাশ চমৎকৃত হয়ে গেল। রানি কি প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস গুনছে নাকি? না, টপ করে মুখে যা এল বলে দিল। পরে মিলিয়ে দেখতে হবে। শেষ কবে দেখা হয়েছিল—সেই আলিপুরের ট্রামে না শশাঙ্কর বিয়ের সময়, না, —যাকগে যাক। রানি ওর বাহু ছুঁয়ে আছে। অবিনাশেরও ইচ্ছে করল রানির কাঁধে হাত রাখে—কিন্তু এইভাবে রাস্তায় ওর ছাত্রী-ফাত্রি বোধহয় দেখে অবাক হবে। থাক। তুমি কেমন আছ রানি?
ভালো নেই। তোমার জন্য সবসময় মন কেমন করে। বলেই রানি হেসে ফেলল। তারপর হাসতে হাসতেই দুষ্টুমির হাসি, গোপন করতে না পেরে বলল, বিশ্বাস হল না তো? সত্যিই কিন্তু হেসে ফেলল, তোমার জন্য খুব মন কেমন করে!
থাক আর ইয়ার্কি করতে হবে না। শরীরটা নষ্ট করলে কেন? এরকম মোটা হতে হয়? কি সুন্দর ফিগার ছিল তোমার। এখন অত বড়ো বড়ো—
এই, অসভ্যতা করো না, লোকে শুনতে পাবে। কী হবে আর এই পোড়া শরীরের দিকে নজর দিয়ে। আর তো আমার কেউ স্তুতি করার লোক নেই। আমি ঘরের বউ।
কেন, স্কুলের সেক্রেটারি? তিনি বাড়িতে মাঝে মাঝে চা খেতে ডাকেন না? কিংবা, পাড়ার ছেলেরা, স্বামীর বন্ধু, অথবা পাশের ফ্ল্যাটের কোনো সংগীতরসিক, তোমার স্তাবক নিশ্চিত এখনও অসংখ্য।
না, রানি ছদ্মম্লান গলায় বলল, আবিসিনিয়ার রাজকুমার ছাড়া আমার রূপের প্রশংসা আর কেউ করেনি!
এটা একটা পুরোনো ঠাট্টা। রানির চেহারাটা ছেলেবেলায় ছিল ভারি সুন্দর, খুব কোঁকড়ানো চুল আর ফরসা রঙের জন্য ওকে অনেকটা রানি এলিজাবেথের (প্রথম) মতোই দেখাত। ওর নাম আসলে প্রতিমা, কিন্তু সবাই ‘রানি! রানি’ বলে ডাকে। কিন্তু অবিনাশকে কোনোক্রমেই রাজা বা রাজকুমার বলা যেত না ছেলেবেলায়। ছেলেবেলা থেকেই ওর চেহারাটা চোয়াড়ে, কাঠখোট্টা, রং বেশ কালো। তাই রানি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলত, ‘আহা, সব রাজকুমারই কি সুন্দর হবে নাকি? আফ্রিকার রাজকুমাররা, যত বড়ো রাজার ছেলেই হোক না—কালো কুচ্ছিৎতো হবেই! তুমি আমার আবিসিনিয়ার রাজকুমার!’
রানি জিজ্ঞাসা করল, এখন কি চাকরি-টাকরি করছ?
কিচ্ছু না। বিদেশে গিয়েছিলুম, ফিরে এসে আবার বেকার!
ফিরলে কেন?
আমি বিদেশে গিয়েছিলুম, তুমি জানতে?
জানতুম না? সব খবর রাখি। দেখা না হলে কি হয়। ফিরলে কেন এত তাড়াতাড়ি?
তোমার জন্য মন কেমন করছিল!
দুজনেই আবার হেসে উঠল অনেকক্ষণ। রানি বলল, জান, আমার এখন সাড়ে তিনশো—চারশো টাকা রোজগার। আমাকে বিয়ে করলে এখন তোমাকে বসিয়ে খাওয়াতুম। কি, আমাকে বিয়ে না করার জন্য এখন তোমার অনুতাপ হয় না?
মোটেই না। খুব বেঁচে গেছি। প্রথম প্রথম, তুমি যখন ওই হুঁৎকোটাকে বিয়ে করলে, প্রথম দু-তিন মাস বিষম কষ্ট হয়েছিল। মনে হত, অবিশ্বাসিনী, ছলনাময়ী নারী। বুক ফেটে যেত। মনে হত, সব মেয়েই এই রকম। তারপর বুঝতে পারলুম, খুব বেঁচে গেছি! ওফ! বন্ধু-বান্ধবদের তো দেখেছি—বিয়ে করে এক একজন লেধরুস হয়ে যাচ্ছে, কীরকম বোকা বোকা তেলতেলে মুখ হচ্ছে এক একজনের। আমি কত খোলা হাত পা আছি—যখন খুশি বাড়ি ফিরতে পারি, জামার তলায় ময়লা গেঞ্জি পরলে ক্ষতি নেই, পকেটে পয়সা থাকল বা না থাকল যে-কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে পারি।
কী নিষ্ঠুর, বাবা। অন্তত মিথ্যে করেও তো বলতে পারতে আমার জন্য কষ্ট হয় তোমার।
মিথ্যে কথা বলার কি আর বয়স আছে! বুড়ো হয়ে গেলুম প্রায়, আমার বয়েস বত্রিশ, তোমারও তো আটাশ! নাকি আরও বেশি, তখন বয়েস ভাঁড়িয়েছিলে!
এখন সে-সন্দেহ হচ্ছে কেন?
বাঃ, পাঁচ বছরে যদি কারুকে দশ বছরের বুড়ি হতে দেখি, তবে সন্দেহ হবে না!
যাঃ মিথ্যে! মোটেই দশ বছর নয়! দু-বছর ভাঁড়িয়েছিলুম, এখন আমার তিরিশ। আর প্রেম করা—বাহাদুরি তো জানি, লাজুক কোথাকার—এখনও নিশ্চয়ই মেয়েদের গায়ে হাত দিতে হাত কাঁপে। আমিই তো তোমাকে প্রথম সিডিউস করেছিলুম। তাও কী ভয়—
সেদিন আর নেই! বিদেশে অন্তত শ-খানেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছি।
ওসব বীরত্ব আমার কাছে দেখাতে হবে না। আমার চেয়ে আর কেউ বেশি চেনে না তোমাকে।
একটু থেমে রইল দুজনেই। অবিনাশ রানির সারা শরীরে চোখ ঘোরায়। রানি পাশ-চোখে তা লক্ষ করে হাসে।
সত্যিই বুড়ি হয়ে গেলুম। ইস্কুলে যখন মাস্টারনি সেজে বসে থাকি গম্ভীর হয়ে, এক এক সময় কীরকম হাসি পায়। জীবন কাটিয়ে দেওয়া তাহলে এত সহজ! কালকে জান—একটা মজার ঘটনা হয়েছিল। ক্লাস টেনের মেয়েরা একটা কাগজ গোপনে চালাচালি করছিল, আমি ধরে ফেললুম। প্রেমপত্র। একজন লিখেছে, বাকিরা সেটা কপি করে নিচ্ছে। খুব বকুনি দিলুম, আসলে কিন্তু মনে মনে খুক খুক করে হাসছিলুম। বেশ লিখেছে, আমারও কপি করে নিতে ইচ্ছে করছিল। এক জায়গায় কী লিখেছে জান, ‘তোমার জন্য আমার বুকের মধ্যে ব্যথা করে, যেন অসম্ভব জ্বর হয় আমার।’ কীরকম অসভ্য! আমাদের সময় আমরা লিখতুম ‘হৃদয়’, এখনকার মেয়েরা লেখে ‘বুক’। একটু দুঃখও হল আমার, আর কেউ নেই যাকে আমি আজ আর প্রেমপত্র পাঠাতে পারি।
কেন, আমার ঠিকানা জানতে না?
ইস! শখ কম নয়! জান চিঠিতে একটা রবীন্দ্রনাথের কোটেশান পর্যন্ত দেয়নি। তার বদলে কোন আধুনিক কবির, কি জানি, তোমারই হয়তো।
কেন, আমার কবিতা চেনো না? পড়ো না বুঝি আজকাল?
যা তা রাবিশ লিখছ তো এখন! কে পড়ে ওসব!
তোমার ইস্কুলের দু-একটা কচি মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দাও না।
ফাজলামি করতে হবে না। বাড়ি যাই—
রানি, তোমার সঙ্গে একটা দরকারি কথা ছিল।
আর দরকারে কাজ নেই। ঢের বেলা হল, তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিলে আমার বাড়িতে হাঁড়ি ঠেলবে কে?
ও এবার বুঝি রাগ হল।
না রে, পাগলা, সত্যি বাড়ি যেতে হবে। এগারোটায় ঝি চলে যাবে—তারপর ছেলেটাকে ধরতে হবে না
দ্যাখ, খুকি, চালাকি করিস না। এতদিন পরে দেখা হল, অমনি বাড়ি আর বাড়ি! আচ্ছা ঠিক আছে, আমিও তোর সঙ্গে বাড়িতে যাই।
অত খাতির নয়। আমার কত্তা ছুটি নিয়ে বাড়িতে আছে। দেবে গলা ধাক্কা।
তবে চল কোনো চায়ের দোকানে বসি। সত্যি একটা খুব দরকারি কথা আছে তোর সঙ্গে।
আবার তুই-তুকারি শুরু করেছিস!
তুই-ই তো প্রথম আরম্ভ করলি। তোর ছেলের কী নাম রেখেছিস?
তোর নামে নয়। ভাবছি অবিনাশ নাম দিয়ে একটা বাচ্চা কুকুর পুষব, সবসময় বুকে জড়িয়ে থাকব তাকে।
রানি তোকে খুব জরুরি একটা কথা বলতে এসেছিলুম!
কোনো দরকার নেই।
সত্যি, একটা বিশেষ কথা আছে।
না, অবি, কেন এসেছিস এতদিন পর। কেন ভেঙে-চুরে দিতে এসেছিস? বেশ তো আছি সংসার পেতে, চাকরি করছি, স্বামী-পুত্র নিয়ে ছেলেবেলার পুতুল খেলার মতো বউ বউ খেলছি। তুই চাস, সব টান মেরে ফেলে দিই আবার? কিন্তু তুই তো পাগল, তুই তো আমার পাশে থাকবি না জানি। কেন এসেছিস আমার সর্বনাশ করতে। তুই যা।
না রে, আমি এসেছি মাত্র একদিনের জন্য। শুধু একদিন। চল, কোথাও গিয়ে একটু বসে কথা বলি।
উপায় নেই যে। সবাই ব্যস্ত হয়ে খোঁজাখুজি শুরু করবে। এত দেরি করে তো কোনোদিন ফিরি না। ওই বাসটায় উঠি।
একটু দাঁড়া। আচ্ছা মনে কর খুব ট্রাফিক-জ্যাম। বাসে ওঠার কোনোক্রমে উপায় নেই। তাহলে কী করতিস, দেরি তো হতোই।
তাহলে হেঁটে যেতাম।
আচ্ছা চল, হেঁটেই যাই। এইটুকু সময় তোকে একটা কথা বলি। এখনও শীত যায়নি, রোদ্দুরের তাত নেই।
অবিনাশ এতক্ষণ লক্ষ করেনি যে, রানি ওর ছায়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বস্তুত, সূর্য এখন মাথার কাছে এসেছে, স্বাভাবিক এবং ছোটো হয়ে গেছে অবিনাশের ছায়া। অবিনাশ ঘুরে এসে রানির ছায়ার ওপরে দাঁড়াল, দাঁড়িয়ে বেশ আরাম পেল।
রাস্তার লোকজন অনেক কমে গেছে। কোথায় পরের বাড়ি জলের দরের মতো নিলাম হচ্ছে, অধিকাংশ লোক সেখানেই ছুটে যাচ্ছে সন্দেহ কি। দুজনে দুজনের ছায়া সরিয়ে হাঁটতে লাগল।
রানি ওর রঙিন ছাতাটা অল্প অল্প দোলাচ্ছে। অবিনাশ ওর সুন্দর কারুকাজ করা হাতব্যাগটা টেনে নিয়ে বলল, দেখি কী আছে? ঠোঁট উলটে রানি বলল, কিছুই নেই, কী আর থাকবে—বাড়ি থেকে ইস্কুল আর ইস্কুল থেকে বাড়ি যাই। কটা খুচরো পয়সা আছে।
ভেবেছিলুম, কটা টাকা চুরি করব।
একসময় তো অনেক চুরি করেছ বাপু।
তা সত্যি। অনেক টাকা নিয়েছি তোর কাছ থেকে, রানি।
কেন আজ দেরি করিয়ে দিলি, এতক্ষণে কবে বাড়ি পৌঁছে যেতুম।
সত্যিই তোর ইচ্ছে করছে না আমার সঙ্গে থাকতে? একসময় তো আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছটফট করতিস।
ছেলেবেলায় ওরকম হয়। আগে তো বৃষ্টির জন্যও ছটফট করতুম। এখন বৃষ্টি পড়লে বিরক্ত লাগে।
অবিনাশ হঠাৎ গম্ভীর গলায় ডাকল, রানি?
রানি তখুনি জল কুলকুচি করার মতো হেসে বলল, এবার বুঝি বোকা-বোকা প্রেমের কথা শুরু করবি? খবরদার! এখন আর কচি খুকিটি নেই যে ভোলাতে পারবে!
কবেই-বা তোকে ভোলাতে পেরেছি। ছেলেবেলা থেকেই তো তুই পাকা একটি। প্রেমের কথা তো তুই-ই আমায় শিখিয়েছিস। তোর ওপরের ঠোঁটে পাতলা পাতলা ঘাম জমেছে। খুব ইচ্ছে করছে একটা চুমু খাই। এতক্ষণ কথা বলছি অথচ একটাও চুমু খাইনি তোকে। এরকম আগে কখনও হয়েছে?
তবে আর কি, রাস্তার মধ্যে শুরু করো। হাজারটা ক্যামেরায় ছবি উঠুক।
ওই জন্যই তো বলছিলুম কোথাও গিয়ে বসি।
ইস, কোথাও বসলেও যেন দিতাম আর কি! এখন থেকে কোথাও বসলে আমরা বসব টেবিলের দুপাশে।
দেখিস চেষ্টা করে। তোর স্বামী যখন থাকবে না, দুপুরে একদিন বাড়িতে গিয়ে হাজির হব।
শাশুড়ি থাকে।
থাকুক। শাশুড়ি যেদিন গঙ্গায় স্নান করতে যাবে, আমি তক্কে তক্কে থাকব।
আমি দরজায় খিল দিয়ে থাকি। খুলব না। কেন খুলব? তুই আমার কে?
আমি জলের পাইপ বেয়ে উঠব।
কেন? তুই আমার কে?
আমি তোর সর্বস্ব! তুই-ই তো বলতিস।
ইস, কোথাকার সর্বস্ব রে! দেখি মুখখানা।
তুই আমাকে একেবারে গ্রাহ্যই করিস না রানি। আমি বিলেত ঘুরে এলুম হাজার হোক, আমি এখন একটা বিলেতফেরত।
ওরকম বিলেতফেরত গন্ডায়গন্ডায় রাস্তায় ঘুরছে। তুই আমাকে এতদিন পর বিলেত দেখিয়ে ইমপ্রেস করতে এসেছিস! কী অধঃপতন তোর।
রাস্তা থেকে একদিন জোর করে ধরে নিয়ে যাব।
চেষ্টা করে দেখিস। আমার গায়ে এখনও জোর আছে। তা ছাড়া এমন চেঁচাব যে রাস্তার হাজারটা লোক এসে গাঁট্টা মেরে তোর মাথা ফাটিয়ে দেবে। বেশ হবে।
ওসব লোকফোক আমাকে দেখাসনি। আমি অবিনাশ মিত্তির, ছেলেবেলা থেকেই গুন্ডা। একটা গাড়ি নিয়ে এসে চলতি রাস্তা থেকে তোকে টেনে তুলে নিয়ে যাব।
নিয়ে গিয়ে কী করবি?
তোর পায়ের তলায় আমার মুখ ঘষব।
রানি হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, এখুনি ঘষ না, এই যে দাঁড়িয়েছি, লোকে দেখুক, ক্ষতি নেই।
তারপর তোর মুখও ঘষবি, আমার পায়?
তার দরকার নেই। তোর ওই কুচ্ছিৎ পা-জোড়া সবসময় রাখা আছে আমার বুকের মধ্যে।
ও, তাহলে রানি সান্যাল রোমান্টিক হতে জানে।
সান্যাল নয়, রায়চৌধুরী এখন। পরস্ত্রী, মনে থাকে না বুঝি?
বাঃ। পরস্ত্রী। আয় না রানি, আমরা লুকিয়ে অবৈধ প্রেম করি। পরকীয়া প্রেম খুব ফাস্টক্লাস জিনিস।
অবৈধ প্রেমই যদি করব তবে পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে কেন? আমি বুঝি নতুন একজন জোগাড় করতে পারি না?
করেছিস নাকি এর মধ্যেই।
অবিনাশ রানির ছাতার একটা খোঁচা খেলো। ছাতার বাঁটের নীচে কাদা ছিল। অবিনাশের জামায় একটা গোল দাগ পড়ল। অবিনাশ যে সে-দাগটা তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে আর একটা সিগারেট ধরাল—তাতেই খুশি ছড়িয়ে পড়ল রানির মুখে। ঈশ্বরের রাজত্বে কে কীসে খুশি হয় বোঝা যায় না। খুশি হয়ে রানি বলল, আজকাল এত বেশি সিগারেট খাস কেন?
তুই খাবি নাকি? আগে তো দু-একটা খেয়েছিস।
হ্যাঁ, আমি পরপুরুষের সঙ্গে দিনেরবেলায় সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে রাস্তা দিয়ে যাই। তাহলে আর আমার বাকি থাকে কী?
অবিনাশ একটু চুপ করে রইলো। তাকিয়ে দেখল, ওদের ছায়া-টায়া কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। এমন বিশ্রি রাস্তা—কোথাও একটা গাছ পর্যন্ত নেই যে ছায়া পড়বে। নিছক রোদ্দুর, কোনো মানে নেই। সিগারেটে জোর টান দিয়ে অবিনাশ বলল, সত্যি রানি, আমরা অনেক দূর সরে গেছি—অথচ মাত্র ছ-সাত বছর। তোর মুখ থেকে ‘পরপুরুষ’ শব্দটা কীরকম অদ্ভুত শোনাল, যেন একটা বিদেশি শব্দ, যেন আমি একটা লৌহমানব, হাতে তলোয়ার নিয়ে তোর পাশে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ, মনে আছে, প্রত্যেকদিন সকালে—তুই যখন কলেজে যেতিস—
থাক, পুরোনো কথা। আমি ভালো আছি অবিনাশ।
আমিও খুব ভালো আছি। বিশ্বাস কর আমি কোনো দুঃখের কথা বলতে আসিনি।
রাস্তাটা উঁচু হয়ে উঠে গেছে। ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটা পথ আছে—নীচ দিয়েও আছে একটু সরু কাঠের রাস্তা। ওরা নীচ দিয়েই গেল। রেলিং ধরে দাঁড়াল দুজনে। নোংরা জলে অল্প স্রোত—অবিনাশ ওর সিগারেটের টুকরোটা ফেলল জলে, ব্রিজের নীচ দিয়ে ভেসে গেল। রানি একেবারে জল ভালোবাসে না। অবিনাশ রানিকেই পৃথিবীর একমাত্র মেয়ে জানে—জলের প্রতি যার বিন্দুমাত্র আসক্তি নেই। যেমন রানি এক্ষুনি ওই জলে থুতু ফেলল।
রানি বলল, এইবার শুনি কী দরকারটা? কী এমন দরকার আমার কাছে? ইস, কত বেলা হয়ে গেল যে!
অবিনাশ জানত রানি এইবার ওকথা বলবেই। কিন্তু অবিনাশ দ্বিধা করছে। ঠিক কিরকমভাবে আরম্ভ করবে বুঝতে পারছে না। রানি ওর দিকে দুটো সম্পূর্ণ চোখ তুলে বলল, কী?
তোকে একটা কথা বলব রানি। তুই কিন্তু কিছু মনে করতে পারবি না। দূরে সরে গেলেও আমি তো তোর সেই অবিনাশই আছি।
অত ভনিতার দরকার কী? কী চাই বল না।
রানি তোর বুকে সেই তিলটা আছে এখনও।
হুঁ। ওর খুব একা একা লাগত—তাই পাশে আর একটা নতুন তিল উঠেছে। যাক বাজে কথা—দরকারি কথাটা কী? কী চাইতে এসেছিস এতদিন পর?
মুক্তি। এককথায় বলতে গেলে—
সে আবার কী? তুই-ও আমাকে মুক্তি দিয়েছিস আমিও তোকে দিয়েছি।
বন্ধনটা আর কোথায়?
সে রকম নয়। তুই আমার শরীরকে মুক্তি দিসনি। আমার মন ছাড়া পেয়ে গেছে কিন্তু—
রানি অবাক হয়ে চেয়ে রইল। এই প্রথম অবিনাশের একটা কথা সে বুঝতে পারল না। সেই জন্যই বোধহয় অবিনাশের সারা মুখটা ও তন্নতন্ন করে খুঁজল। কোনো সংকেত নেই। অবিনাশ আবার বলল, বেশ থেমে থেমে ঠান্ডা গলায়—তোর কথা ভুলে যাবার পর—আমি বেশ কয়েকটি মেয়ের সংস্পর্শে এসেছি, আর, ইয়ে, মানে শুয়েছিও কয়েকজনের সঙ্গে—কোথাও তৃপ্তি পাইনি ঠিক। কেন পাইনি জানিস, সবসময় মনে হয়েছে, সত্যিকারের রহস্য যেন তোর শরীরেই লুকিয়ে আছে। তোর শরীর তো আমি জানি না।
এবার বাড়ি যাই।
না, না, শোন, আমার পক্ষে খুব জরুরি কথা। আমার জীবনমরণ সমস্যা। আমার পুরো ছেলেবেলাটা কেটেছে তোর সঙ্গে—তোর কথা, হাসি, পাগলামি, শরীরের গন্ধ অর্থাৎ যা কিছু ফেমিনিন—তার স্বাদ আমি তোর কাছেই পেয়েছি। তোকে মনে হত একটা রহস্যের সিন্দুক। তোকে চুমো খেয়েছি, তোর জামার বোতাম খুলে বুকে মুখ চেপে ধরেছি—কী অসম্ভব উথালপাথাল করত তখন মাথার মধ্যে। ছেলেবেলায় সক্কলেরই যা হয় আর কী। কিন্তু কোনোদিন তোর সঙ্গে শুইনি, সাহস পাইনি—ভাবতুম, অতখানি আমার সইবে না। ওই অসম্ভব মাধুর্য আমাকে পাগল করে দেবে। আমি টুকরো টুকরো হয়ে যাবো। এইসব আর কী। এখন দেখ, কত বদলে গেছি। চোয়ালের কাছে শক্ত দাগ পড়েছে, প্রেম-ফ্রেম ঘুচে গেছে মন থেকে, মদ খেতে শিখেছি খুব, মেয়েদের এখন অন্যভাবে চাই। অর্থাৎ মেয়েদের জানতে দিতে চাই না ওদের কাছ থেকে আমি কতখানি পাচ্ছি—খুব গোপনে, ওদের একদম বুঝতে না দিয়ে—আমার যেটুকু বিষম দরকার আমাকে নিতেই হবে। ওরা ভাববে বুঝি সাধারণ কাণ্ডকারখানাই হচ্ছে—আসলে কাক যেমন কোকিলের ছানাকে পালন করে না জেনে আমাকে একটা দুর্লভ জিনিস দিয়ে যাবে। তেমনি মেয়েরা সম্পূর্ণ নিজেদের অজ্ঞাতসারে ওদের শরীরটা পুষে রাখে। কিছুই মানে বোঝে না শরীরের। আমি চাই ওরা না জেনে—ওদের কোনোদিন বলব না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই আমি সম্পূর্ণ পাচ্ছি না কখন—সব সময় মনে হয় কিছু বাকি থেকে যাচ্ছে, একটি সম্পূর্ণ মেয়েকে কখনও পাইনি। তখনই তোর কথা মনে পড়ে—তোর কত-কিই তো আমি জানি—প্রায় গোটা জীবন—কিন্তু আমি তোর সম্পূর্ণ শরীর জানি না। তাই মনে হয়, সমস্ত রহস্য বা তৃপ্তি লেগে আছে তোর শরীরে, আমার জীবনের প্রথম নারীর কাছে। মানে, তুই কিছু মনে করছিস না তো—আমি অন্য মেয়ের সঙ্গে শুয়েছি এ কথা বললুম বলে। তুই-ও তো তোর স্বামীর সঙ্গে শুচ্ছিস—আমি কি আর কিছু মনে করছি। তুই নিশ্চয়ই আশা করিসনি—আমি সারা জীবন তোর বিরহে ব্রহ্মচারী হয়ে থাকব।
বয়ে গেছে আমার মনে করতে। যাক, এ সব প্রলাপ শুনে আমার লাভ কি। আমি কী করব?
তুই বুঝতে পারছিস না রানি? তোর উচিত আমাকে সাহায্য করা।
কীরকম সাহায্য? আমার কাছে কী চাইছিস?
একটি দিন।
তার মানে?
আমি তোর সঙ্গে একবার—
তাতে কী লাভ হবে?
আমি নিঃসন্দেহ হতে চাই যে—আসলে তুই-ও খুব সাধারণ। অন্য মেয়েদেরই মতো। তোর শরীরেও কোনো আলাদা রহস্য নেই। তোকে হারিয়ে অন্য মেয়েকে পেলেও আমি আসলে একটি সম্পূর্ণ মেয়েকেই পাব। তার বেশি আর কিছু পাবার নেই।
রানি হঠাৎ চোখ দুটো খুব নীচু করল। যেন ওর চোখ দুটো একেবারে ঢুকে গেল মুখমণ্ডলের মধ্যে। কপালের নীচে আর কিছু নেই, সাদা। সেইরকম ভাবেই বলল, অসভ্য, ইতর কোথাকার।
অবিনাশ বিষম অবাক হয়ে গেল। একটু দ্বিধা করে আলতোভাবে রানির কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, একি রানি, তুই রাগ করছিস? আমি কিন্তু তোকে আঘাত করার জন্য বলিনি। আসলে, ভেবে দ্যাখ, আমরা দুজনেই তো খুব সাধারণ। অন্যদেরই মতো। আমি শুধু নিঃসংশয় হতে চাই।
রানি ফুঁসে উঠে বলল, না, আমি সাধারণ নই। আমি অসাধারণ!
এটা তো ছেলেমানুষি! আমাদের এত বয়েস হল, এখন তো আমরা জানি। তোকে না পেলে আমি সবটুকু রহস্য পাব না—একি সম্ভব নাকি!
হ্যাঁ তাই। তুই যেখানেই যা—তৃপ্তি পাবি না। তোর প্রাণ একটা কৌটোয় পোরা ভ্রমরের মতো আমার কাছেই থাকবে। আমি তাকে মুক্তি দেব না।
ওসব কিছু না, রানি। জীবন অন্য রকম। মানুষ বিষম ভুলে যেতে পারে। অনেক বদলে যেতে পারে। তুই একবার—
তারপর আমার কী হবে? একজন মাত্র মানুষের কাছেও আমি অসাধারণ থাকব না? অবি, তোকেও তো আমি সম্পূর্ণ পাইনি। একদিন পেয়ে যদি দেখি, তুইও সাধারণ, আমার স্বামীরই মতো—তাহলে আর আমার জীবনে কি রইল? তোকে দেখলে এখনও আমার বুক কেঁপে ওঠে। আজ প্রথম দেখে বিষম রক্ত ছলাৎ করে উঠল। যদি দেখি,—তুইও তাহলে, আমার এই চাকরি-করা, স্বামীর সংসার, ছেলে মানুষ-করা সবই ব্যর্থ হয়ে যাবে না? আমার আর কী থাকবে তা হলে? আমার একটিও না-দেখা স্বপ্ন থাকবে না? একজনের কাছে অন্তত রানি হয়ে থাকব না? আমার জীবনে থাকবে না একজন অদেখা রাজকুমার? আমার আবিসিনিয়ার রাজকুমার! না, অবি, আমি সব কিছু জানতে চাই না। তুই দূর হয়ে যা।
কিন্তু জানাই তো ভালো। নিশ্চিত হবার মতো এমন তৃপ্তি আর নেই। জীবন শেষ করার আগে জেনে যেতে হবে, জীবনে আমার কী কী প্রাপ্য ছিল। রহস্যের ভাবনায় কাটানো খুব কুচ্ছিত।
তুই আর আমার সামনে আসিস না। কোনোদিন না। সবচেয়ে ভালো হয় তুই যদি এখন মরে যাস। তাহলে তোকে জেনে ফেলার কোনো ভয়ই আর থাকে না। তাহলেই তোকে আমি চিরকাল ভালোবাসতে পারব।
তুই ভুল করছিস। ওকে ভালোবাসা বলে না। কী দরকার ভালোবাসার। ভালোবাসা ছাড়াও জীবন খুব সুন্দর কেটে যেতে পারে। বড়ো কথা হল জানা। যদি তোকে—
আমি তোকে আর সহ্য করতে পারছি না, অবিনাশ। তুই আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা। তোর চোখে আমি ফের পাগলামি দেখতে পাচ্ছি। তোর জন্য আমার মায়া হয়।
পাশ দিয়ে যে সমস্ত লোক হেঁটে যাচ্ছে—তারা কিছুই বুঝতে পারছে না, এমন শান্তভাবে কথা বলছে রানি! কিন্তু ওর মুখের একটি সামান্য রেখা দেখেও বোঝা যায়, ও দাঁড়িয়ে আছে ত্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো। অবিনাশ সত্যি বুঝতে পারছে না, হঠাৎ রানি কেন এমন রাগ করল। রানির ওপর জোর ছিল কত। কত হুকুম করেছে একসময়। ওর কথায় রানি একবার একহাত চুল কেটে ফেলেছিল নিজের। কলেজের মাইনের টাকা দিয়ে দিয়েছে অবিনাশকে। আজ একটা সামান্য কথায়—অবিনাশ বললে, আমি ঝোঁকের মাথায় বলছি না, রানি। অনেক ভেবেচিন্তে এসেছি। আমরা দূরে সরে গেছি, কিন্তু আমাদের শারীরিক মুক্তি হয়নি। তোর সংসার আমি নষ্ট করতে চাই না মোটেই। আমাদের জীবন আলাদা হয়ে গেছে—আমরা দূরে দূরেই থাকব। কিন্তু তার আগে—
হঠাৎ অবিনাশ দেখল রানি চলতে শুরু করেছে। পিছনে ফিরল না, যেন ও একাই চলে যাবে। কী ভেবে অবিনাশ ওকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না। মনে মনে আন্তরিকভাবে বিদায় জানাল রানিকে। ওখানে দাঁড়িয়েই ও আর একটা সিগারেট ধরাল। একা একা কিছু না ভেবে সিগারেট শেষ করল। সত্যি সেইটুকু সময় ওর কিছু মনে পড়ল না, রানির কথা তো নয়, সম্পূর্ণ সাদা মন ও নীচের ময়লা জলের স্রোত দেখল। পকেটে হাত দিয়ে একবার খুচরো পয়সাগুলো গুনে দেখল অনাবশ্যক। তারপর একটা ট্রামের টিকিট পাকিয়ে কান খুঁচতে খুঁচতে রানির জন্য হঠাৎ ও খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল, আমি কি রানিকে অপমান করলাম? আমি তো মোটেই চাইনি। আসলে, যত বয়েস বাড়ছে, রানি ততই ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছে। আবার বছর পাঁচেক বাদে রানিকে এই কথাটা বুঝিয়ে বলা যায় কিনা—অবিনাশ পরে ভেবে দেখবে।
মনীষার দুই প্রেমিক
মনীষার দুই প্রেমিক
আমি মনীষাকে ভালোবাসি। মনীষা আমাকে ভালোবাসে না। মনীষা অমলকে ভালোবাসে।
ব্যাপারটা এরকমই সরল। কিন্তু অমল সম্পর্কে আমার একটা দুশ্চিন্তা থেকে যায়। এক বিশাল সন্ধেবেলা দিকচিহ্নহীন মন্থর আলোর মধ্যে অমল ও মনীষাকে যখন আমি পাশাপাশি দেখতে পাই—অমলের চওড়া কব্জির ধার ঘেঁষে মনীষার মসৃণতা সামান্য গ্রীবা তুলে মনীষা রাসবিহারী অ্যাভিনিউকে কৃতজ্ঞ ও ধন্য করে —আমি তখন একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলি। যাক, একই বাতাসের মধ্যে তো আমরা আছি। অমল, তুমি সৎ হও, আরও বড়ো হও, কতখানি দায়িত্ব এখন তোমার ওপর। অমল, তুমি পারবে তো? নিশ্চয়ই পারবে, কেন পারবে না? আমি সর্বান্তঃকরণে তোমাকে সাহায্য করব।
অমল বিমান চালায়। ভোরবেলা একটা স্টেশন ওয়াগন এসে অমলের বাড়ির সামনে হর্ন দেয়, অমল বেরিয়ে আসে—তখনও চোখে মুখে ঘুম, কিন্তু সাদা পরিচ্ছদে তাকে কী সুন্দর দেখায়! দাড়ি কামাবার পর অমলের গালে একটা নীলচে আভা পড়ে, ঠোঁট দুটি ওর ভারি পাতলা—সিগারেট ঠোঁটে চেপে কথা বলবার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে টুপ করে সিগারেটটা খসে পড়ে যায়। স্টেশন ওয়াগনে উঠে অমল ফের নিজের বাড়ির তিনতলার জানলার দিকে তাকায়। একটু পরেই দমদম থেকে অমল ইস্তাম্বুল উড়ে চলে যাবে। আবার ফিরেও আসবে।
অমল বিমান চালায়। অমল মোটরগাড়ি চালাতে জানে কিনা—আমি ঠিক জানি না। কিন্তু একথা জানি, অমল সাইকেল চালাতে পারে না। অমল কি সাঁতার জানে? খোঁজ নিতে হবে তো! সাইকেল ও সাঁতার দুটোই আমি জানি, দেওঘর থেকে ত্রিকূট পাহাড় পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে গিয়েছিলাম একবার, গিরিডিতে উশ্রী জলপ্রপাতে একবার সাঁতার কাটতে গিয়ে স্রোতের টানে পড়ে বহুদূর ভেসে গিয়েছিলাম, বাঁচব এমন আশা ছিল না তবুও তো বেঁচে গেছি। কিন্তু ছি ছি এসব আমি কী ভাবছি! আমি কি গর্ব করব না এ নিয়ে? ভ্যাট। সাইকেল কিংবা সাঁতার জানা এমন কিছুই না! ও তো কত হেঁজিপেঁজি লোকেও জানে। কিন্তু অমল বৈমানিক, দৃঢ় স্বাস্থ্যময়, গৌরবর্ণ উজ্জ্বল মুখ অমল নীলিমার বুক চিরে রূপালি বিমান নিয়ে উড়ে যায় ইস্তাম্বুল কিংবা সাওপাওলো বন্দর পর্যন্ত। আবার ফিরে আসে। কিন্তু অমল, তোমাকে আরও মহীয়ান হতে হবে।
সবার চোখে পড়ে না, কিন্তু আমি জানি, একটু ভালো করে লক্ষ করলেই দেখা যাবে, মনীষার পা পৃথিবীর মাটি ছোঁয় না। এই ধুলোবালির নোংরা পৃথিবী থেকে কয়েক আঙুল উঁচুতে সে থাকে। মনে আছে, সেই বৃষ্টির দিনের কথা? একটু আগেও রোদ ছিল, হঠাৎ সব মুছে গিয়ে খয়েরি রঙের ছায়া পড়ল সারা শহরে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এল। আমি ছুটে একটা গাড়িবারান্দার নীচে দাঁড়ালাম। দেখতে দেখতে রাস্তায় হাঁটু সমান জল জমল, গাড়ি-ঘোড়া অচল হল, বৃষ্টির তখনও সমান তেজ। জলের ছাটে ভিজে যাওয়া সিগারেট টানতে যে রকম বিরক্তি, সেই রকম বিরক্ত বা বিমর্ষভাবে আমি দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় মনীষাকে দেখতে পাই, দুজন সখির সঙ্গে সে জল ভাঙতে ভাঙতে উচ্ছল হয়ে আসছে। আমাকে ডাকতে হয়নি, মনীষাই সব জায়গায় সকলকে দেখতে পায়—মনীষাই আমাকে দেখে চেঁচিয়ে বলল, এই বরুণদা, একা একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসুন, আসুন, চলে আসুন! আজ বৃষ্টিতে ভিজব!
জলের মধ্যে মানুষ ছুটতে পারে না, কিন্তু আমার ইচ্ছে হল ছুটে যাই। একটু আগেও গায়ে সামান্য জলের ছাট অপছন্দ করছিলুম, কিন্তু তখন মনে হল হাঁটু গভীর জলে সাঁতার কাটি। সখি দুজন ইডেন হসপিটাল রোডের হস্টেলে চলে গেল, আমি আর মনীষা মাঝরাস্তা দিয়ে হাঁটছি জল ভেঙে ভেঙে, তখনও অঝোরে বৃষ্টি, সারা রাস্তায় আর কেউ নেই, সব পায়রারা খোপে ঢুকে গেছে—চুপচুপে ভিজে গেছি আমরা দুজনে। মনীষার কানের লতিতে মুক্তোর দুলের মতন টলটল করছে এক ফোঁটা জল, এইমাত্র সেটা খসে পড়ল। সেদিনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, মনীষা অন্য কারুর মতো নয়—এই চেনা পৃথিবী, এই নোংরা জল-কাদা, রাস্তার গর্ত, ভেসে যাওয়া মরা বেড়ালছানা—এসবের মধ্যে থেকেও মনীষা এত আনন্দ পাচ্ছে কী করে? বেড়াতে গেলে মানুষ এমন আনন্দ পায়—মনীষা যেন অন্য গ্রহ থেকে এখানে দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছে। আমরা এখানকার শিকড়-প্রোথিত অধিবাসী, অনেক কিছুই আমাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে গেছে—মনীষার কাছে সবকিছুই নতুন এবং আনন্দোজ্জ্বল।
বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ওয়েলিংটন পর্যন্ত চলে আসি। এই সময় ট্যাক্সি পাওয়া কত কঠিন, কিন্তু একটা খালি ট্যাক্সি এসে আমাদের পাশে দাঁড়ায়, বিশালকায় ড্রাইভার ক্রীতদাসের মতন বিনীত ভঙ্গিতে মনীষার দিকে চেয়ে বলে, আসুন! যেন তার নিয়তি তাকে মনীষার কাছে পাঠিয়েছে, তার আর উপায় নেই। মনীষা হঠাৎ আবিষ্কারের মতন আনন্দে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, এবার ট্যাক্সি চড়বেন? যতক্ষণ বৃষ্টি না থামে, ততক্ষণ ঘুরব কিন্তু!
দরজা খোলার পর মনীষা যখন নীচু হয়ে ঢুকতে যায়, তখন তার ফরসা পেট আমার চোখে পড়ে, জলে ভেজা নাভি, দার্জিলিং-এর কুয়াশায় আমি একদিন এই রকম চাঁদ দেখেছিলাম। আঁচল নিংড়ে মুখ মুছতে মুছতে মনীষা বলে, আঃ যা ভালো লাগছে আজ! এই বরুণদা, আপনি অত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? আমি বিনা দ্বিধায় মনীষার কাঁধে হাত রেখে বলি, তুমি একদম পাগল! বৃষ্টিতে ভিজতে এত ভালো লাগে তোমার?
ভীষণ! ভীষণ! বৃষ্টিতে ভিজলেও আমার কখনও ঠান্ডা লাগে না।
তুমি তাকাও তো আমার দিকে! তোমাকে ভালো করে দেখি।
ভালো করে দেখবেন? আমি পাগল না আপনি পাগল?
তাহলে দুজনেই।
মোটেই না, আপনার সঙ্গে সঙ্গে আমিও পাগল হতে রাজি নই! একথা বলার সময়েও মনীষা আমার দিকে ঘুরে তাকায়। নির্নিমেষে আমি দেখি। সুকুমার ভুরুর নীচে দুটি দ্বিধাহীন চোখ, এই যে নাক—ইটালির শিল্পীরা এক সময় এই রকম নাক সৃষ্টি করেছে, উড়ন্ত পাখির ছড়ানো ডানার মতো ঠোঁটের ভঙ্গি, একটু দুষ্টু দুষ্টু হাসি মাখানো। একথা ঠিক, ওর ভেজা শাড়ি-ব্লাউজের রং ভেদ করে জেগে ওঠা রুপোর জামবাটির মতন স্তন আমার চোখে পড়লেও, সেখানে হাত দিতে ইচ্ছে করেনি, ইচ্ছে করেনি কুয়াশার আধো-ভেজা চাঁদ ছুঁতে। এক এক সময় হয় এ রকম, তখন সৌন্দর্যকে নষ্ট করতে ইচ্ছে হয় না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, মনীষার সেই সিক্ত সৌন্দর্যের পাশে আমার লোমে ভরা শক্ত হাতটা সেই মুহূর্তে মানাবে না। আমার ইচ্ছা হয়েছিল, মনীষা আরও হাসুক, উচ্ছল হাসির তরঙ্গে ওর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠুক, তা হলেই ওর রূপ আরও গাঢ় হবে। কিন্তু কী করে ওকে আরও খুশি করব—ভেবেই পাচ্ছিলাম না। আমি বললাম, মনীষা, ভাগ্যিস তোমার সঙ্গে দেখা হল, নইলে আমি বোধহয় এখনও বোকার মতন সেই গাড়ি-বারান্দার নীচেই দাঁড়িয়ে থাকতাম!
রাস্তার জলের দিকে তাকিয়ে মনীষা বলল, দেখুন দেখুন, কীরকম ঢেউ দিচ্ছে ঠিক নদীর মতন।
তুমি এদিকে কোথায় এসেছিলে?
ইউনিভার্সিটিতে। লাইব্রেরির দুখানা বই ছিল ফেরত দিয়ে গেলাম। ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সম্পর্ক চুকে গেল।
কেন, তুমি রিসার্চ করবে না?
ঠিক নেই। আপনি ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?
তুমি আসবে, সেই প্রতীক্ষায় ছিলাম।
চোখে চোখ রাখল, একটু হাসল, হাসি মিশিয়েই বলল, সত্যি, কোনোদিন আমার জন্য প্রতীক্ষা করবেন? আপনি যা অহংকারী।
অমল আমাদের বাড়ির তিনখানা বাড়ির পরে থাকে। আমি নয়, সত্যিকারের অহংকারী হচ্ছে অমল। পাড়ার কোনো লোকের সঙ্গে মেশে না। আমাকে দেখেছে, মুখ চেনে, তবু আমার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলেনি। তা হোক, তবু অমলকে আমি পছন্দ করি। অমলের চেহারায় ব্যবহারে একটা দীপ্ত পৌরুষ আছে—অহংকারের যোগ্য সে, আমি ওইরকম অহংকার দেখতে ভালোবাসি। সপ্তাহে তিনদিন অন্তত অমল কলকাতায় থাকে, ছুটির দিন সকালে ন-টা আন্দাজ অমল বাড়ি থেকে বেরোয়, তার গভীর ভুরুর নীচের চোখ দুটিতে তখনও ঘুম লেগে থাকে—ধবধবে পাজামা ও পাঞ্জাবি পরা, পাঞ্জাবির হাত গোটানো, পথের দুপাশে না তাকিয়ে অমল হাজরা মোড় পর্যন্ত যায়, অধিকাংশ দিনই সে ল্যান্সডাউন রোড ধরে হাঁটতে থাকে—অমলকে আমি কোনোদিন বাসে উঠতে দেখিনি, দেশপ্রিয় পার্কের কাছে এসে অমল একটু দাঁড়ায়, সিগারেট ধরিয়ে অমল এবার পূর্ণ চোখ মেলে চৌরাস্তার মানুষজন দেখে। বস্তুত, পথের সমস্ত মানুষও একবার অমলকে দেখে, এমনই তার পৃথক ব্যক্তিত্ব। তখনও মনীষার সঙ্গে অমলের পরিচয় তত প্রগাঢ় হয়নি, অমল রাস্তা পেরিয়ে সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের দিকে তার এক বন্ধুর বাড়িতে চলে যায়।
একদিন নয়, অমলকে দেখতে ও চিনতে আমার সময় লেগেছে। আগে আমি অন্যমনস্কভাবে অমলের প্রশংসাকারী ছিলাম। অথবা, তার ঠিক পটভূমিকায় তাকে আমি দেখিনি।
হঠাৎ দেখা না হলে মনীষার সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো উপায় নেই। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত সব জায়গায় মনীষার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। দিল্লি থেকে কয়েকদিনের জন্য এসেছে কোনো বন্ধু, তার সঙ্গে দেখা করতে গেছি—সেখানে সমস্ত বাড়িতে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে রয়েছে মনীষা। সেই বন্ধুর সঙ্গে ওর কীরকম আত্মীয়তা। সাদা সিল্কের শাড়িতে মনীষাকে খুবই হালকা, প্রায় অপার্থিব দেখায়—আমার কাছে এসে মনীষা বলে, একি, আপনার জামার মাঝখানের বোতামটা লাগাননি কেন? অবলীলায় মনীষা আমার বুকের খুব কাছে দাঁড়িয়ে বোতাম লাগিয়ে দেয়।
মনীষাদের বাড়িতে আমি কখনো যাবো না। ওই বিশাল বাড়িতে অন্তত সাতখানা ঘর ফাঁকা থাকে, যদি সেখানে কোনোদিন আমি দস্যু হয়ে উঠি? যদি রূপ-হন্তারক হতে সাধ হয় আমার? মনীষা একদিন আয়নার সামনে দাঁতে ফিতে কামড়ে চুল বাঁধছিল, আমি ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম—সেই দৃশ্যটা আমার বুকে বিঁধে আছে। সেই দৃশ্যটা আমি ভুলতে পারি না। মনীষা আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে—কিন্তু আয়নার মধ্যে আমরা দুজনকে দেখছিলাম—আমরা দুজনে একই দিকে তাকিয়ে—অথচ দুজনকে আমরা পরস্পর দেখতে পাচ্ছি—মনীষার আঁচলটা বুক থেকে খসে পড়ব পড়ব—অথচ খসেনি, কী এক অসম্ভব কায়দায় সে দুটি মাত্র হাতে চুল, চুলের ফিতে, চিরুনি এবং আঁচল সামলাচ্ছে—চোখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি। মনীষা কখনও অপ্রতিভ হয় না—পিছনে আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, কি মেয়েদের প্রসাধনের রহস্য দেখার খুব ইচ্ছে বুঝি? ঠিক আছে, দাঁড়িয়ে থাকুন, দেখবেন—আমি এগারো রকমের স্নো-পাউডার মাখব।
আমি বললুম, ওরে বাবা, এত সাজপোশাক, কোথাও বেড়াতে যাবে বুঝি?
হুঁ।
কোথায়?
ছাদে।
আয়নার ফ্রেমের মধ্যে দেখা সেই এক শ্রেষ্ঠ শিল্প। সেই শিল্পের মধ্যে আমার স্থান ছিল না। আমি নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিলুম। কিন্তু মুশকিল এই, আয়নার মধ্যে নিজের মুখের ছায়া না ফেলে অন্য কিছুও যে দেখা যায় না।
সেইরকমই এক রবিবারের সকালে অমল ল্যান্সডাউন রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে মোড়ে এসে পৌঁছল, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে আসছিল মনীষা, দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ওরা ঠিক সমকোণে মিলিত হল—সম্ভ্রমপূর্ণ ভদ্রতার সঙ্গে অমল মনীষাকে বলল, কি ভালো আছেন?
মনীষা উদ্ভাসিত মুখে বলল, আরেঃ আপনি? আপনি ব্যাংকক গিয়েছিলেন না? কবে ফিরলেন?
কাল সন্ধেবেলা?
পরশু গিয়ে কাল ফিরে এলেন?
অমল সংযতভাবে হেসে বলল, হ্যাঁ। আপনি এখন কোনদিকে যাবেন?
একটু লেক মার্কেটের কাছে যাবো।
চলুন, এক সঙ্গে যাওয়া যাক।
সেই প্রথম আমি অমলকে সোজা না গিয়ে ডানদিকে বেঁকতে দেখলাম। আমি খুব কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। মনীষা আমাকে দেখতে পায়নি। সেই প্রথম মনীষা আমাকে দেখতে পেল না। কিন্তু আমি ওকে ডাকিনি কেন? আমি ডাকলে মনীষা আমার সঙ্গেই যেত—অমলের সঙ্গে যেত না—অমলের সঙ্গে ওর তখনও তোমন গাঢ় চেনা ছিল না। কিন্তু আমি ডাকিনি কেন? ঠিক জানি না। হঠাৎ মনে হয়েছিল, মনীষা আর অমল যদি কখনও পাশাপাশি আয়নার সামনে দাঁড়ায়, অমলকে সরে যেতে হবে না।
ওদের দুজনকে বড়ো সুন্দর মানায়। বুকটা টনটন করে উঠছিল। পরমুহূর্তে ভেবেছিলাম, ধ্যাৎ! চেহারাই কি সব নাকি? আমি একটু বেশি রোগা—কিন্তু রোগা মানুষরা কি ভালোবাসার যোগ্য হতে পারে না?
জি এম আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে বললেন, তুমি তো বিয়ে করোনি, সন্ধেগুলো কাটাও কী করে?
অফিসে জি এম-এর মুখ থেকে এরকম প্রশ্ন আশা করিনি। সামান্য হেসে বললুম, কী আর করব, বাড়ি ফিরে স্নান করি, তারপর চা খেয়ে বইটই পড়ি, রেকর্ড শুনি।
সে কি হে? আর কোনো এন্টারটেইনমেন্ট নেই? তবে যে শুনি তোমাদের মতন ইয়ংম্যানদের জন্য কলকাতা শহরে, মানে, অনেক নাইট স্পট।
স্যার, ব্যাপারটা কী বলুন তো?
শোনো, দিল্লি অফিস থেকে মি. চোপরা আসছেন। ওঁকে আমরা আজ গ্র্যান্ডে ডিনার দিচ্ছি। তুমিও থাকবে। মি. চোপরা একটু ইয়ে মানে লাইট স্বভাবের লোক, তুমি ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ওকে নিয়ে কলকাতার নাইট লাইফ একটু দেখিয়ে আনবে।
নাইট লাইফ মানে?
সে আমি কী বলব? তোমরা ইয়ংম্যান যা ভালো বুঝবে! চোপরার একটু ফুর্তিটুর্তি করার বাতিক আছে।
স্যার আমি পারবো না। অন্য কাউকে এ ভার দিন।
সেকি পারবে না কি? চোপরার সঙ্গে তোমার আলাপ হয়ে থাকলে তোমারই তো সুবিধে। সহজেই লিফট পেয়ে যাবে—ওরাই তো হর্তাকর্তা।
না স্যার, এসব ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা নেই। পাঞ্জাবি তো—ওর সঙ্গে যদি আমার রুচিতে না মেলে।
পারবে না? ঠিক আছে, দাসাপ্পাকে বলে দেখি। ওর আবার ইংরেজি উচ্চারণটা ভালো নয়—
সন্ধের পর স্বয়ং জি এম গাড়ি নিয়ে আমার বাড়িতে উপস্থিত। বললেন, শিগগির তৈরি হয়ে নাও, তোমাকেই যেতে হবে। দাসাপ্পার মেয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে, হাসপাতালে—সে আসতে পারবে না। নাও নাও তাড়াতাড়ি, আটটায় ডিনার।
কিন্তু স্যার, আমার যে ওসব ভালো লাগে না! ডিনারের পর আমি আর কোথাও যাব না কিন্তু।
—বাজে বোকা না! তোমারই ভালোর জন্য বলছি—চোপরাকে খুশি করতে না পারলে তোমারও বিপদ, আমারও বিপদ। তোমাকে আমি তিনশো টাকা আলাদা দিয়ে দেব—ডিনারের পর ওকে নিয়ে একটু…
আমাকে ছেড়ে দিন! আমি পারব না।
—শুধু শুধু দেরি করছো! চটপট তৈরি হয়ে নাও, এখন কথা বলার সময় নেই। চাকরি করতে গেলে বড়ো কর্তাদের খুশি করতেই হয়—তাও তো আমাদের আমলে আমরা সাহেবদের…
জি এম-কে বসিয়ে রেখেই আমাকে পোশাক পালটে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বেঁধে নিতে হল। জি এম আমার সর্বাঙ্গের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, জুতোটায় একবার ব্রাশ ঘষে নাও।
ওঁর সঙ্গে নীচে নেমে, যখন গাড়িতে উঠছি, সেই সময় হঠাৎ আমার মনে হল, আমি মনীষার যোগ্য নই। …আমি মনীষার যোগ্য নই। আমি ওপরে ওঠার বদলে আরও নীচে নেমে যাচ্ছি।
মনীষাকে দেখলে রাজহংসীর কথাই প্রথমে মনে পড়ে। পরিষ্কার টলটলে জলে যেখানে রাজহংসী নিজের ছায়া নিজেই দেখে। টাটকা তৈরি ঘিয়ের মতন মনীষার গায়ের রং ঠোঁট একটু লালচে—এমন সাদা দাঁত শুধু শিশুদেরই থাকে। মনীষার ঠোঁট আর চোখ দুটো সব সময় ভিজে ভিজে, এই চোখকেই ইংরেজিতে বলে ‘লিকুইড আইজ’—মনীষাকে আমি কখনও গম্ভীর হতে দেখিনি, বেড়াতে গিয়ে কি আর কেউ গম্ভীর থাকে! ওই যে বললুম, মনীষাকে দেখলেই মনে হয়—এ পৃথিবীর কোনো কিছুই ওর কাছে পুরোনো নয়।
ঠিক চার মাস বারো দিন মনীষাকে দেখিনি। দেখিনি, কিংবা দেখা হয়নি, কিংবা মনীষা আমাকে খুঁজে পায়নি। তারপর একদিন লেক স্টেডিয়ামের ধারে মনীষাকে দেখতে পেলাম। মনীষার শরীরের এক-একটা অংশ আমার এক-একদিন নতুন করে ভালো লাগে।
সেদিন চোখে পড়ল ওর পা দুটো। জয়পুরী কাজ করা লাল রঙের চটি পরেছে, কী সুন্দর ওই পা দুটো—মসৃণ নরম, এ পৃথিবীতে মনীষাই একমাত্র মেয়ে এই ধূলিমলিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও যার পায়ে এক ছিটে ধুলো লাগে না! মনে হল, মনীষার ওই পা দুখানি হাতের মুঠোয় নিয়ে গন্ধ শুঁকলে আমি ফুলের গন্ধ পাব!
মনীষা হাসল, অবাক হল এবং অভিমানের সুরে বলল, যান, আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না!
কেন? আমি কী দোষ করেছি?
আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনি মোটেই আমার কথা ভাবেন না।
মনি, অভিমান করলে তোমাকে এত সুন্দর দেখায়!
সাড়ে চার মাস বাদে দেখা হলেও পথের মধ্যে মনীষার হাত ধরা যায়। হাত ধরে আমি বললুম, মনি, তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ? আমার সঙ্গে চলো—
এখন? ক-টা বাজে? ওমা, সাড়ে পাঁচটা? একজন যে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে।
একজন? একজন তাহলে অপেক্ষা করে আছে? সে তাহলে অহংকারী নয়?
মনীষা ঠিক বুঝতে পারল না, একটু অন্যমনস্কভাবে বলল, আপনি চেনেন তাকে, অমল রায়, চলুন না, আপনিও আমার সঙ্গে চলুন—উনি দাঁড়িয়ে থাকবেন।
একবার লোভ হয়েছিল বলি, না, অমলের কাছে যেতে হবে না—তুমি আমার সঙ্গে চলো! দেখাই যাক না একথা বলার পর কী ফল হয়। কিন্তু অতটা ঝুঁকি নিলাম না। আলতোভাবে বললুম, না, তুমি একাই যাও, আমি অন্য জায়গায় যাচ্ছিলাম।
মনীষার চলে যাওয়ার দিকে আমি তাকিয়ে থাকি। আমার কোনো রাগ বা অভিমান হয় না। এতে কোনো সন্দেহ নেই, অমলই মনীষার যোগ্য। কিন্তু অমল, তুমি মনে করো না, তুমি মনীষাকে জিতে নিয়েছ। তা মোটেই না। আমিই মনীষাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। অমল, তোমাকে মনীষার যোগ্য হতে হবে। তুমি বিচ্যুত হয়ো না।
আকাশে অমল বিমান চালিয়ে ইস্তাম্বুল যাচ্ছে—আমার কল্পনা করতে ভালো লাগে—সে বিমানে আর কেউ নেই, মনীষা ছাড়া, ওরা দুজন শূন্য থেকে উঠে যাচ্ছে মহাশূন্যে, ইস্তাম্বুলের পথ ছাড়িয়ে গেল অজানা পথে—ইস, ওদের দুজনকে কী সুন্দর মানায়—শিল্প এরই নাম।
আমার হাত টনটন করছে, আমি আর পারছি না, দাঁতে দাঁতে চেপে গেছে, মুখ চোখ ফেটে যেন রক্ত বেরুবে, আমি আর পারছি না… না—! আমার ছোটো ভাই টাপু ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে, ন্যাড়া ছাদে পিছোতে পিছোতে হঠাৎ গড়িয়ে পড়ে গিয়েও কার্নিশ ধরে ফেলে ঝুলছিল, ওর আর্ত চিৎকারে আমি ছুটে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরেছি, কিন্তু টেনে তুলতে পারছি না, চোদ্দো বছরের টাপু এত ভারী, কিছুতেই আর ধরে রাখতে পারছি না, আমার হাত দুটো যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে শরীর থেকে—টাপু একটু একটু করে নীচে নেমে যাচ্ছে আর পাগলের মতন চেঁচাচ্ছে, আমিও একটু একটু এগিয়ে যাচ্ছি—এবার দুজনেই পড়বো—তিন তলা থেকে শান বাঁধানো ফুটপাথে—প্রাণ ভয়ে একবার আমার ইচ্ছে হল টাপুকে ছেড়ে দিই। ছেড়ে দেবো, ছেড়ে দেবো, টাপুকে—এখান থেকে পড়লে টাপুকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না—টাপু আমাকে টানছে, জলে ডোবা মানুষকে বাঁচাতে গেলে দুজনেই অনেক সময় যেমন মরে—আমিও পাগলের মতন চেঁচাতে লাগলুম—সেই সময় পিছন থেকে কারা যেন তিন-চারজন আমাকে ধরল—টাপুকেও টেনে তুলল। ঝড়ো বেগে ছুটে এসে মা টাপুকে বুকে চেপে ধরলেন। সেই তিন-চারজন আমার পিঠ চাপড়ে ধন্য ধন্য করতে লাগল। কিন্তু ওরা জানে না, আমি এক সময় টাপুকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। টাপুকে ফেলে আমি নিজে বাঁচতে চেয়েছেলাম। এমন কিছু অস্বাভাবিক কি? জীবনের চূড়ান্ত মুহূর্তে বেশির ভাগ মানুষই শুধু নিজের জীবনের কথা ভাবে। টাপুকে মেরে ফেলে নিজে বাঁচতে চেয়েছিলাম। বেশির ভাগ মানুষই তাই করত। আমি বেশির ভাগ মানুষের দলে। এইসব স্বার্থপর বর্ণকালা, অন্ধ মানুষ কেউই প্রেমিক হতে পারে না! নাঃ আমি মনীষার যোগ্য নই, সত্যিই। অমল মনীষাকে তুমি নাও। আমি বিনা দ্বিধায় সরে দাঁড়াচ্ছি। মনীষার সঙ্গে আর কোনোদিনই দেখা করব না।
পরদিনই মনীষাকে টেলিফোন করলাম। আগে কখনও ওকে এমনভাবে ডাকিনি। মনি, তুমি আগামীকাল ঠিক ছটার সময় লেক স্টেডিয়ামের কাছে আসবে। আসতেই হবে। অন্য হাজার কাজ থাকলেও ক্যানসেল করে দাও!
মনীষা খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল আসব আসব, ঠিক আসব, কেন কী ব্যাপার?
দেখা হলে বলব, কালই দেখা করা চাই, ঠিক আসবে, উইদাউট ফেইল! কথা দাও আমাকে!
মনীষার গলা একটু কেঁপে উঠল। একবার কি সে টেলিফোনটা কাছ থেকে সরিয়ে তার অনিন্দ্য দুই ভুরু একটুক্ষণ ভাবল কিছু? দু-তিন মুহূর্ত বাদে মনীষা বলল, বলছি তো যাব? আপনি একটা পাগল!
কাল এল। অফিস যাইনি। অফিস গেলেই আত্মায় একটা ময়লা দাগ পড়ে। বিকেলে স্নান করে দাড়ি কামিয়েছি। আয়নার সামনে আমার নিজস্ব শ্রেষ্ঠ চেহারা। আয়নার সামনে থেকে যেই সরে গেলাম—চোখে ভেসে উঠল অন্য একটা আয়না। তার সামনে মনীষা, দুটি মাত্র হাতে চুল, চিরুনি, ফিতে এবং আঁচল সামলাচ্ছে—মুখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি—তার পাশে আমি—না, না, এটা মানায় না, শিল্প হিসেবে এটা সার্থক। আমি সরে গেলাম সে ছবি থেকে—অন্য মূর্তি এল সেখানে—হ্যাঁ, এখন দুটি মুখের আলো একরকম, আমি মানতে বাধ্য।
স্টেডিয়ামের কাছে গেলাম না আমি। অমল মনীষাকে তুমি নাও, আমি তোমাকে দিলাম।
মাঝে মাঝে দূর থেকে ওদের দুজনকে দেখি। তৃপ্তিতে আমার বুক ভরে যায়। গ্রিক-পুরুষের মতন সুদর্শন অমল, তার মুখ যোগ্য অহংকারে উদ্ভাসিত, প্রতি পদক্ষেপে পৃথিবীকে জয় করার আস্থা। আর মনীষা? তাকে দেখলে মনে হয়—প্রতি মুহূর্তে আরও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।
আজকাল খুব বেশি সিনেমা দেখি! সময় কাটে না বলে প্রায় প্রতিদিনই নাইট শো-তে সিনেমা দেখতে যাই। সেইরকমই একদিন সিনেমা দেখে বেরিয়ে রাত্রি সাড়ে এগারোটা আন্দাজ চৌরঙ্গিতে ট্যাক্সির জন্য দাঁড়িয়েছিলুম। গ্র্যান্ড হোটেল থেকে অমলকে বেরুতে দেখলুম। সঙ্গে ও কে? অবনীশ না? কী সর্বনাশ, অবনীশের সঙ্গে অমলের চেনা হল কী করে? খুব যেন বন্ধুত্ব মনে হচ্ছে। অমলের পা টলছে একটু, মদ খেয়েছে, তা খাক না, পাইলটের কাজ করে—ওকে কত দেশে যেতে হয়, কত লোকের সঙ্গে মিশতে হয়—মদ খাওয়া এমন কিছু দোষের নয়, কিন্তু পা না টললেই ভালো ছিল। অবনীশের সঙ্গে অত বন্ধুত্ব হল কী করে? অবনীশ সেনগুপ্ত তো সাংঘাতিক লোক। বড়োলোকের ছেলেদের বখানোই ওর কাজ। খুব সুন্দর চটপটে কথা বলে, কথার মোহে ভোলায়, বড়ো বড়ো হোটেলে এসে মদ খাওয়ার সঙ্গী হয়, তারপর নিজের বাড়ির জুয়ার আড্ডাতে টেনে নিয়ে যায়। এলগিন রোডে ওর কুখ্যাত জুয়ার আড্ডা, জুয়ার নেশা ধরিয়ে অবনীশ সেই ছেলেদের সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে। আমি একদিন মাত্র ওর পাল্লায় পড়েছিলাম। অমলকে দেখে তো মনে হচ্ছে অবনীশের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব। রাস্তায় গলা জড়াজড়ি করে দুজনে ওপাশে অমলের গাড়িতে উঠল। অমল নতুন গাড়ি কিনেছে। অমল নিশ্চয়ই অবনীশের স্বরূপ জানে না।
পরদিন এলগিন রোডে অবনীশের বাড়িতে আমি হাজির হলুম। দরজা খুলল, অবনীশের শয়তানি কাজের যোগ্য সঙ্গিনী, তার স্ত্রী—স্বরূপা। স্বরূপার মোহিনী ভঙ্গি অগ্রাহ্য করে অবনীশকে ডাকলুম এবং বিনা ভূমিকায় বললুম, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, লালবাজারের ডি সি ডি ডি আমার মেসোমশাই হন। আমি আপনার এই বেআইনি জুয়োর আড্ডা এক্ষুনি ধরিয়ে দিতে পারি। লোকাল থানায় ঘুষ দিয়ে পার পেলেও লালবাজারকে এড়াতে পারবেন না। কিন্তু সে-সব আমি করব না, একটি মাত্র শর্তে, আপনি অমল রায়ের সংসর্গ একেবারে ত্যাগ করবেন। তার ছায়াও মাড়াবেন না। সে এখানে আসতে চাইলেই তাকে বাধা দেবেন। মোট কথা অমল রায়কে কোনোদিন আমি এ বাড়িতে দেখতে চাই না। কি রাজি?
অবনীশ হতভম্ব হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আচ্ছা রাজি। কিন্তু অমল রায় আপনার কে হয়?
আমার অত্যন্ত নিকট আত্মীয় সে। কিন্তু আমি যে আপনার কাছে এসেছিলাম এ কথাও তাকে বলতে পারবেন না।
আমি নিজে কখনও বাজার করতে যাই না। দু-একদিন গিয়ে দেখেছি, আমি একেবারেই দরদাম করতে পারি না—আমায় সবাই ঠকায়। তবু হঠাৎ একদিন বাজারে যাবার শখ হল। বাজারে অমলের সঙ্গে দেখা হল। আশ্চর্য যোগাযোগ। অমল নিশ্চয়ই কোনোদিন বাজার করে না। বাজার করা টাইপ ও নয়। যে-লোক এক-একদিন এক এক দেশে থাকে—সে আজ ল্যান্সডাউন রোডের বাজারে এসেছে নিছক কৌতুকের বশেই নিশ্চয়ই। চাকরকে নিয়ে অমল খুব কেনাকাটি করছে। অমল যে প্রত্যেকটা জিনিসই কিনতে খুব ঠকছে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত এবং বেশ মজা লাগল। অলক্ষে আমি ওর দিকে নজর রাখছিলুম। কাদা প্যাচপ্যাচ করছে বাজারে, অমলের পায়েও কাদা লেগেছে, ঘামে ভিজে গেছে পিঠ। একটুর জন্য আমি অমলকে হারিয়ে ফেলেছিলুম, হঠাৎ শুনতে পেলুম টম্যাটোর দোকানে কী একটা গোলমাল। তাকিয়ে দেখি সেখানে অমল, রাগে তার মুখখানি টকটকে লাল, অমল বেশ চিৎকার করে কথা বলছে। আমি সেদিকে এগিয়ে গেলুম। অমল একবার তরকারিওয়ালাকে বলল, এক চড় মেরে তোমার দাঁত ভেঙে দেব। অমল চড় মারার জন্য হাতও তুলেছে। আমি দারুণ আঘাত পেলুম—এই দৃশ্য দেখে। মনে মনে বললুম, ছি, ছি, অমল, এমন ব্যবহার তো তোমাকে মানায় না! তরকারিওয়ালাকে চড় মারাটা মোটেই রুচিসম্মত নয়—তার যতই দোষ থাক। যাক হয়তো অমল বেশি রাগের মাথাতেই—আমি গিয়ে অমলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালুম মৃদু স্বরে বললুম, অত মাথা গরম করবেন না। তাতে আপনারই—। অমল আমার দিকে তাকাল, চেনার ভাব দেখাল না, কিন্তু আমাকে একজন সাহায্যকারী হিসেবে ভেবে নিয়ে বলল, বুঝলাম তো, আজকাল এই সব রাস্কেলদের এমন বাড় বেড়েছে—যা মুখে আসবে তাই বলবে। আমি আরও আঘাত পেলুম, তরকারিওয়ালারও একটা আত্মসম্মান আছে, সেখানে আঘাত দেওয়া তো অমলের উচিত নয়। আমি কথায় কথায় ভুলিয়ে অমলকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলাম। এসব ছোটোখাটো ব্যাপার ধর্তব্য নয় অবশ্য অমলের তো এসবের অভ্যেস নেই—হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিল। ইশ তরকারিওয়ালা উলটে যদি ওকে একটা খারাপ গালাগাল দিয়ে বসত!
অন্ধ ভিখারিকে পেরিয়ে গিয়েও মনীষা আবার ফিরে আসে, তারপর ব্যাগ খুলে মনীষা যখন ঝুঁকে তাকে পয়সা দেয়—তখন মনে হয়, মনীষা শুধু ওকে পয়সাই দিচ্ছে না, তার সঙ্গে নিজের আত্মার একটা টুকরোও দিয়ে দেয়। মনীষা, তোমার এত বেশি আছে যে অমলের ছোটোখাটো দোষ তাতে সব ঢেকে যাবে। অমল দিন দিন আরও তোমার যোগ্য হয়ে উঠবে। আমি তো পারিনি, অমল পারবে।
অমলকে আমি চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করি। বাতাসের তরঙ্গে একটা চিন্তা সব সময় অমলের কাছে পাঠাবার চেষ্টা করি, অমল, তুমি মনীষার প্রেমিক, এই বিরাট দায়িত্বের কথা মনে রেখো। তোমাকে নীচে নামলে চলবে না।
অফিসের কাজে দমদমের ফ্যাক্টরিতে যেতে হল দুপুরবেলা। মি. চোপরা দিল্লি ফিরে যাবার পরই আমার একটা লিফট হয়েছে। অফিস থেকে আমাকে গাড়ি দেবারও প্রস্তাব উঠেছে। শিগগিরই যার গাড়ি হবে তাকে এখন ট্রাম বাসে চড়লে মানায় না। মিশন রো থেকেই ট্যাক্সি নিয়ে দমদম যাচ্ছিলাম, দমদম রোডের ওপর একটা বেশ বড়ো ভিড় চোখে পড়ল। একটা মোটরগাড়ি ঘিরে উত্তেজিত জনতা, আমি সেটা পাশ কাটিয়েই যাবো ভাবছিলাম—হঠাৎ হালকা নীল রঙের গাড়িটা দেখে কীরকম সন্দেহ হল—অমলের গাড়ি না? তাইতো, ওই তো ভিড় ছাড়িয়ে অমলের মতো দেখা যাচ্ছে। পাইলটের পোশাকে—অমল এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছে। কী সর্বনাশ! অমলের গাড়ি কোনো লোককে চাপা দিয়েছে নাকি? তা হলে তো ওরা অমলকে মেরে ফেলবে। আমি ট্যাক্সিওয়ালাকে বললুম, রোককে রোককে। ঘ্যাচ করে ট্যাক্সি ব্রেক কষতেই আমি দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে এলাম। চেঁচিয়ে উঠলাম, অমল, অমল।
আমাকে দেখে অমল যেন ভরসা পেল, ভিড়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে কী যেন বলল। অমলের টাইয়ের গিঁট আলগা, মাথার চুল এলোমেলো। অমলের গাড়িতে একটা যুবতী বসে আছে, মনীষা নয়। যুবতীটির সাজপোশাকে এমন একটা কৃত্রিম সৌন্দর্য আছে যে, এক পলক দেখলেই বোঝা যায় এয়ার হোস্টেস। এয়ার হোস্টেসটিকে অমল নিশ্চয়ই বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছিল।
কোনো লোক চাপা পড়েনি, চাপা পড়েছে একটা ছাগল। ছাগলটা থ্যাঁতলানো অবস্থায় পড়ে আছে রাস্তার মাঝখানে, টকটকে লাল রক্ত। লোকগুলো কিন্তু মানুষ চাপা পড়ার মতনই উত্তেজিত। অমল চেঁচিয়ে বলল, যার ছাগল সে সামলাতে পারেনি কেন? রাস্তাটা কি ছাগল চরাবার জায়গা? ত্রুদ্ধ জনতা চেঁচিয়ে বলল, অত তেজ দেখাবেন না, মোটরগাড়ি আছে বলে ভারী ফুটানি … দে না শালাকে দু-ঘা।
অমল আকাশে উড়ে বেড়ায়—এইসব মানুষ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা নেই। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে অমলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললুম, না, না, আমাদের আর একটু সাবধান হওয়া উচিত। আমরা এই ছাগলটারই দাম যদি দিই—
‘আমরা’ কথাটা আমি ইচ্ছে করেই বললুম। কেন না, ছাগলটার দাম চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা হবে নিশ্চয়ই—অমলের কাছে দৈবাৎ সে টাকা না-ও থাকতে পারে। আমার কাছে দৈবাৎ আছে। টাকাটা আমি তক্ষুনি বার করে দিতে পারতুম। কিন্তু দিলুম না, তাতে নিশ্চয়ই অমলের অহংকারে লাগবে। আগে দরদাম ঠিক হোক, তারপর না হয় আমি অমলকে ধার দেবার প্রস্তাব করব। আমাকে না-চেনার ভান করলে কী হয়, অমল আমাকে ঠিকই চেনে, অন্তত এক পাড়ার লোক হিসেবে চেনে। অমল রুক্ষ গলায় বলল, কেন দাম দেব কেন? আমি রাস্তার মাঝখান দিয়ে আসছিলাম, হর্ন দিয়েছি।
ইঃ উনি হর্ন দিয়েছেন। ছাগলকে হর্ন দিয়েছেন!
ক্যারদানি কত! পাশে মেয়েছেলে নিয়ে, দিনরাত্তির জ্ঞান নেই! আমি অমলের বাহুতে চাপ দিয়ে অনুনয়ের সুরে বললুম, না, না, দাম দেওয়াই উচিত আমাদের, যার ছাগল তার তো ক্ষতি হয়েছে ঠিকই! কত দাম? ছাগলটার কত দাম বলুন?
ছাগলের মালিক কাছেই ছিল, সে বলল, একশো টাকা।
অমল বলল, একশো টাকা! একটা ছাগলের দাম একশো টাকা? অন্যায় জুলুম করে—
—তবু তো কম করে বলেছি! অন্তত আঠারো কেজি মাংস হবে, বারাসাতের হাটে বেচলে।
আমি অমলকে মৃদু স্বরে জানালুম, আমার কাছে টাকা আছে। অমল রুক্ষভাবে বলল, টাকা থাকা না-থাকার প্রশ্ন নয়। জুলুম করে এরা—
লোকগুলো এবার আরও গরম হয়ে উঠেছে। ক্রমশ আমাদের গা ঘেঁষে আসছে! শুরু হয়েছে গালাগালি, এসব সময়ে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হয় অমলের ধারণা নেই। ওরা আমাদের সবাইকে মেরে গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। অমলও এবার যেন একটু বিচলিত হয়ে বলল, ঠিক আছে, কত টাকা দিতে হবে? কত টাকা? আমি বললুম, দাঁড়ান, আপনি চুপ করুন, আমি দরদাম ঠিক করছি।
ভিড়ের মধ্যে দু-তিনজন লোক একসঙ্গে কথা বলছিল, আমি তাদের উত্তর দিচ্ছিলাম, হঠাৎ দারুণ চিৎকার শুনলাম, পালাচ্ছে, পালাচ্ছে শালা—এই শালাকে ছাড়িস না, ধর ধর।
নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হঠাৎ একটা সুযোগে অমল গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। ভিড় ভেদ করে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেল আমার দিকে তাকালোও না—এক দল লোক হইচই করে ছুটে গেল সেই গাড়ির দিকে, আর একদল আমার কলার চেপে ধরল। অমলের গাড়িকে আর ধরা গেল না—আমি দুবার শুধু অমল, অমল বলে চেঁচিয়েই হঠাৎ চুপ করে গেলুম।
কিন্তু মনে মনে আমি কাতরভাবে আর্তনাদ করতে লাগলুম, অমল, তুমি যেও না, তুমি যেও না! এ কাপুরুষতা তোমাকে মানায় না। তুমি মনীষার প্রেমিক, তোমার মধ্যেও এই দীনতা দেখলে আমি তা সহ্য করব কী করে? অমল, তুমি মনীষার এমন অপমান করো না! তাহলে যে প্রমাণ হয়ে যাবে, এ পৃথিবীতে আর একজনও যোগ্য প্রেমিক নেই মনীষার।
মঞ্জরী
মঞ্জরী
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি সেই কতক্ষণ ধরে। কখন বাস আসবে তার ঠিক নেই। এতক্ষণে মাত্র একটা বাস এসেছিল, তাতে এত ভিড় যে পা রাখাও অসম্ভব। আমি হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে পারি না। অথচ বাসে যাওয়া ছাড়া আর তো কোনো উপায় নেই এখন। মধ্য কলকাতার বিকেলবেলায় ট্যাক্সি পাওয়া একটা অলৌকিক ব্যাপার, ট্যাক্সি পাওয়ার চেয়ে একটা নতুন গাড়ি কিনে ফেলা অনেক সহজ।
বিরক্ত হয়ে ভাবছি শেষ পর্যন্ত হেঁটেই যাবো কিনা, হঠাৎ এই সময়ে রাস্তার ওপারের একটা বইয়ের দোকান থেকে মঞ্জরী বেরিয়ে এলো। সঙ্গে আর একটি মেয়ে। আশ্চর্য, মঞ্জরী এতক্ষণ আমার এত কাছাকাছি ছিল আর আমি শুধু শুধু বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছি! ওই দোকানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম কয়েকবার, বেশ ভিড়, দু-একটি মেয়ের পিঠ দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু তেমন মনোযোগ দিইনি।
এক এক সময় মনে হয়, পৃথিবীতে কোনো ময়লা নেই, দুর্গন্ধ নেই, ঘাম নেই। কোথাও মানুষকে মানুষ মারছে না। মোলায়েম স্নিগ্ধ হাওয়ায় পৃথিবীটা ভরে গেছে। মঞ্জরীকে দেখলে আমার এই রকম হয়। একথাও স্বীকার করতে লজ্জা নেই মঞ্জরীকে দেখলে আমার বুক কাঁপে! কেন কাঁপে? পৃথিবীর কোনো বিশেষজ্ঞ এর ব্যাখ্যা দিতে পারেন না।
মঞ্জরী আমাকে এখনও দেখতে পায়নি। ডাকবো? মঞ্জরীর সঙ্গে আর একটি মেয়ে রয়েছে, তাকে চিনি না। যাই হোক, আমার আর এখন বাসে ওঠবার তাড়া নেই, কোথায় যেন যাবার কথা ছিল তাও ভুলে গেছি।
মঞ্জরী তার সঙ্গের মেয়েটির সঙ্গে কথা বলায় খুব মগ্ন হয়ে আছে। দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা উলটোদিকের ফুটপাথ ধরেই হাঁটতে লাগলো। একটুক্ষণের মধ্যেই ওরা আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে।
রাস্তা না পেরিয়ে আমিও এ ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। এরকম করার যে কি মানে হয় কে জানে? আমি কি এক্ষুনি রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে মঞ্জরীর নাম ধরে ডাকতে পারি না? সেটাই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এই রাস্তাটা যেন একটা নদী, আমরা দুজনে দুদিকে রয়েছি, পার হবার উপায় নেই।
একটা ট্যাক্সি দারুণ শব্দে ব্রেক কষলো। একটি ছেলে প্রায় চাপা পড়ে যাচ্ছিল, একটুর জন্য বেঁচে গেছে। বেঁচে গেল ট্যাক্সিড্রাইভারটিও। সেই শব্দে রাস্তার সব লোক দাঁড়িয়ে পড়েছে, তাকিয়েছে সেইদিকে, মঞ্জরীরাও। এবারও মঞ্জরী আমাকে দেখতে পেল না। আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম, এই মঞ্জরী—
মনে মনে আমি দেখতে চাইছিলাম, মঞ্জরীই রাস্তা পেরিয়ে আসে কিনা, কিংবা আমাকে যেতে বলবে ওদিকে। যেন ওর ওপরেই অনেকখানি নির্ভর করছে। মঞ্জরী আমার ডাক শুনতে খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর আমাকে দেখতে পেয়ে হাসি ঝলমল করে তুলল মুখখানা। আমি তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি, আমাকে ডাকলো না, মঞ্জরীই সেই মেয়েটির সঙ্গে চলে এল রাস্তার এদিকে।
যাক, একটা ব্যাপার চুকে গেল।
মঞ্জরী এসে বলল, এই সুনীলদা, এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
মঞ্জরীকে দেখার পর আমার আর কোথাও যাবার থাকে না, কোনো কাজের কথাই মনে থাকে না, কিন্তু মুখে সে কথা বলা যায় না। আমি একটু ব্যস্ত ভাব দেখিয়ে বললুম, এই এদিকে এসেছিলাম একটু বিশেষ কাজে। তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
বই কিনতে এসেছিলাম। একে চেনেন, এর নাম সর্বাণী। আপনাদের বাড়ির কাছেই থাকে।
মঞ্জরী দেখতে সুন্দর, বড্ড বেশি সুন্দর—এত সুন্দর যে একটু ভয় করে। কেননা, কোনো সুন্দর জিনিসই পৃথিবীতে বেশিদিন থাকে না। সর্বাণী মেয়েটি সাদামাটা, দেখতে খারাপ নয়, তবে কেউ সুন্দরীও বলবে না। অন্তত মঞ্জরীর পাশে দাঁড়ালে। সর্বাণী বোধহয় একটু বেশি লাজুক। আমাকে দেখে ছোট্ট একটু নমস্কার করলো।
আমি মঞ্জরীকে বললাম, বাড়ি ফিরবে কী করে? এখন তো বাসে-ট্রামে উঠতে পারবে না। একটা মিছিল বেরিয়েছে, তাই ট্রাফিক জ্যাম।
মঞ্জরী হাসতে হাসতে বলল, আমি বাড়ি ফিরবো না।
একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় যাবে?
কোথাও একটু গেলেই হয়। এখনও ঠিক করিনি।
এখন, এই মুহূর্তে সর্বাণীর উচিত বিদায় নেওয়া। আমাদের দুজনকে আলাদা থাকতে দেওয়া। এখন মঞ্জরী বাড়ি যাবে না, আমারও কোথাও যাবার নেই, আমরা পৃথিবীর শেষ সীমান্তে যেতে পারি।
মঞ্জরী অপ্রত্যাশিতভাবে বলল, সুনীলদা, আপনি একটু সর্বাণীকে পৌঁছে দিন না। ও তো আপনার বাড়ির দিকেই।
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আমি তো এখন বাড়ি ফিরবো না।
কেন ফিরবেন না? না হয় আমার কথা শুনেই একটু ফিরুন। সর্বাণী যদি বাসে উঠতে না পারে—আপনার উচিত নয় ওকে পৌঁছে দেওয়া?
সর্বাণী অপ্রস্তুত হয়ে বললো, না, না, আমাকে পৌঁছে দিতে হবে না। আমি ঠিক যেতে পারবো।
মঞ্জরী রীতিমতন ধমক দিয়ে বলল, না, তুই দাঁড়া। সুনীলদা তোকে পৌঁছে দেবে।
আমি বললাম, তা না হয় পৌঁছে দেবো, কিন্তু তোমাকে রাস্তার মাঝখানে ছেড়ে দিয়ে যাবো নাকি? তুমি কোথায় যাবে?
মঞ্জরী কি বুঝতে পারছে না, আমি শুধু ওর সঙ্গে যাবার জন্যই ব্যাকুল। কতদিন নিরালায় ওর সামনে মুখোমুখি বসে কথা বলিনি!
মঞ্জরী খুব দুষ্টু দুষ্টু মুখ করে বলল, আপনি কি ভাবছেন আমি নিরুদ্দেশে যাচ্ছি নাকি?
তুমি যে বললে বাড়ি ফিরবে না? সন্ধের পর বেশিক্ষণ তো তোমায় বাইরে থাকতে দেখিনি!
বাড়িতে তো ফিরবোই না! এই তো কাছে, আমহার্স্ট স্ট্রিটে আমার মামার বাড়ি।
কদিন ধরে ওখানেই আছি।
বাঃ। তাহলে তো খুবই ভালো হল। চলো, কোথাও বসে একটু চা খাই। কিংবা, কফি হাউসে যাবে?
এখন? ইমপসিবল! আমাকে সাড়ে ছটার মধ্যে ফিরতেই হবে।
প্রথমবার যদি রাজি না হয়, তাহলে হাজার অনুরোধ করলেও মঞ্জরীকে আর রাজি করানো যাবে না, আমি জানি। আমিও গম্ভীরভাবে বললাম, ঠিক আছে, তাহলে চলি—
একি, আপনি যে বললেন সর্বাণীকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন?
আমি সত্যি এখন বাড়ি ফিরবো না, আমার অনেক দেরি আছে।
সর্বাণী রীতিমতন লজ্জা পেয়ে বলতে লাগল, সত্যি কোনো দরকার নেই, আমি নিজেই যেতে পারবো, রোজ যাই—
মঞ্জরী আমার চোখে চোখ রেখে বলল, সুনীলদা, প্লিজ আজ ওকে পৌঁছে দিন।
আমার একটা কথা রাখবেন না?
মঞ্জরী আমার কোনো কথা রাখবে না, কিন্তু ওর কথা আমাকে রাখতেই হবে।
এই ওর জোর। এই জোর ওকোথা থেকে পেল কে জানে। কিন্তু আমিও তো অগ্রাহ্য করতে পারি না।
সর্বাণীকে আমি বাড়ি পৌঁছে দিলাম ঠিকই, কিন্তু সারা রাস্তা সে আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলল না। বলবেই বা কেন?
মঞ্জরীর সঙ্গে আবার একদিন দেখা হল রমেনের বাড়িতে। রমেনের বোনের বিয়ে ছিল সেদিন। একগাদা ভিড় ঠেলে এসে মঞ্জরী আমাকে বলল, সুনীলদা, আপনাকে আমি ভীষণ খুঁজছি। আপনার সঙ্গে আমার খুব দরকার।
লাল রঙের বেনারসিতে মঞ্জরী একেবারে রাজেন্দ্রাণীর মতন সেজেছে। তার মুখেও একটা লালচে আভা। আমি বললুম, উঃ কী দারুণ সেজেছো—আজ তোমারই বিয়ে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
প্রশংসায় লজ্জা পায় না মঞ্জরী। ছেলেমানুষের মতন খুশি হয়। বললো, আমি ঠিক জানতুম, আপনি প্রশংসা করবেন। আপনার কথা ভেবেই তো এরকম সাজলুম।
সত্যি!
সত্যি না তো কি মিথ্যে কথা বলছি!
আমার তো আজ এখানে আসবার কথাই ছিল না। আমার আজ জামসেদপুরে যাবার কথা—নেহাৎ ট্রেন বন্ধ—
আমি ঠিক জানতুম, আপনি আসবেন!
এসব প্রেমের কথা নয়। ইয়ার্কির কথা। মঞ্জরী এরকম বলতে ভালোবাসে। আমিও শুনতে ভালোবাসি। আশেপাশের লোকদের অগ্রাহ্য করে বললো, আপনাকে আমি কদিন ধরে যা খুঁজছি না! এত দরকার আপনার সঙ্গে।
কোথায় কোথায় খুঁজলে বলো তো?
সব জায়গায়! কোথাও আপনাকে পাওয়া যায় না! কোথায় থাকেন সারাদিন?
আমার বাড়িতে একবারও খোঁজ করেছিলে? একজন মানুষকে পাওয়ার সবচেয়ে সোজা উপায় তো তার বাড়িতে—
আপনি একবার আমার খোঁজ নিতে পারেন না?
তুমি তো সব সময়ই ব্যস্ত। কত তোমার অ্যাডমায়ারার! যাকগে আমার সঙ্গে কী দারুণ দরকারি কথা আছে বলছিলে?
আমার ন্যাশনাল লাইব্রেরির কার্ডটা হারিয়ে গেছে। কি করে রিনিউ করতে হয় আমি জানি না। আপনি একটু করে দেবেন?
আমি একটু দমে গেলাম। একটু কেন, বেশ খানিকটা। এই দরকার!
খানিকটা ক্ষুণ্ণ হয়ে বললাম, এইজন্য? একি আর কেউ করে দিতে পারত না?
এটা তো এমন কিছু শক্ত কাজ নয়?
আপনি ছাড়া আর কেউ পারবে না।
এইজন্যই বুঝি আমাকে তোমার মনে পড়ে?
এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ভুরু কুঁচকে অদ্ভুতভাবে হাসল মঞ্জরী। এ মেয়েকে ঠিক ছলনাময়ীও বলা যায় না। মঞ্জরী শুধু মঞ্জরীর মতন। ওকে একটু আঘাত দেবার জন্য আমি বললাম, আজকাল আমি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বেশি যাই না। ও কাজ আমার দ্বারা হবে না। অন্য কারুকে বলো।
গাঢ় অবিশ্বাসের চোখে মঞ্জরী আমার দিকে তাকালো, একটু ম্লান হয়ে বলল, আপনি আমার জন্য একটু করে দেবেন না? কার্ডটা হারাবার পর থেকেই আপনার কথা ভেবে রেখেছি।
আচ্ছা, আচ্ছা, দেবোখন। আমাকে দেখলেই তোমার শুধু কাজের কথা মনে পড়ে। আমি যে তোমার জন্য অত দূরে যাবো—তার জন্য আমাকে তুমি কী দেবে?
মঞ্জরী আমার বাহুতে ওর হাত ছুঁইয়ে বলল, আপনি কী চান বলুন?
আমি কেন চাইব? তুমি নিজে থেকে বুঝি দিতে পারো না?
আপনি না চাইলে আমি বুঝব কী করে? বলুন, আপনি কী চান?
যা চাইব, তাই-ই দেবে।
চেষ্টা করব।
আমার বাহুতে মঞ্জরীর হাত, আমি চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঝর্নার জলের মতন ঝকঝকে মুখ, ওর দৃষ্টিতে কোনো মালিন্য নেই। আমি আর কী চাইব? দেবীমূর্তির সামনে বসে স্বামী বিবেকানন্দও কিছু চাইতে পারেননি। এই হচ্ছে বিশুদ্ধ সৌন্দর্য, এর দিকে তাকিয়ে থাকলে বুক শিরশির করে, কিন্তু এই সৌন্দর্য কখনও সম্পূর্ণ করে পাওয়া যায় না। গাছ থেকে ছেঁড়ার পরের মুহূর্তেই ফুল আর সেই ফুল থাকে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, না, কিছু চাই না।
সেইজন্য তো আপনাকে এত ভালো লাগে। আপনি কিছু চান না।
আর সবাই বুঝি চায়?
আপনি বুঝি জানেন না? পৃথিবীতে সবাই তো সব সময় হাত বাড়িয়ে বলছে, দাও, দাও, আরও দাও—
আমি সে কথা বলিনি! তোমার কাছে অন্যরা অনেক কিছু চায়?
মঞ্জরী আমার হাতের ওপর ছোট্ট একটা চড় মেরে বলল, ধ্যাৎ!
মঞ্জরী এই পৃথিবীতে এসে অনেক কিছু পেয়েছে। জন্মেছে সচ্ছল পরিবারে, গা ভরা রূপ ও স্বাস্থ্য—সেই সঙ্গে ওর মালিন্যহীন প্রাণশক্তি। সুঠাম সুবেশ যুবকরা মঞ্জরীর চারপাশে তো ঘুরঘুর করবেই। মঞ্জরীর সঙ্গে দেখা করার বেশি সুযোগ আমার হয় না। কখনো-কখনো খুব ইচ্ছে হয়, কোথাও নিরালায় মঞ্জরীকে নিয়ে বসে থাকি—আর কোনো চোখ সেখানে উঁকি দেবে না—আমি মঞ্জরীকে একটু ছুঁয়ে দেখবো। ওই রূপ, ওই সৌন্দর্যের বিভা সব সময় মনের মধ্যে ছায়া ফেলে থাকে। অবশ্য মঞ্জরীর সঙ্গে সেরকমভাবে দেখা হয় খুব কমই। মঞ্জরী যখন আমাকে দেখে, কথা বলে খুবই অন্তরঙ্গভাবে—আবার যখন দেখা হয় না তখন ভুলে যায় আমাকে।
হঠাৎ কোনো কাজের দরকার হলে মনে পড়ে আমাকে। হঠাৎ বিকেলবেলা অফিসে টেলিফোন বেজে ওঠে, তুলেই শুনতে পাই মঞ্জরীর ব্যস্ত গলা, সুনীলদা কোথায় আপনি? বারবার টেলিফোন করেও পাওয়া যায় না!
আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করি, তুমি কতবার টেলিফোন করেছিলে?
অনেকবার! আপনি আমাকে একবার টেলিফোন করতে পারেন না?
অকারণে টেলিফোন করবো কেন?
অকারণে? আমার সঙ্গে বুঝি আপনার কথা বলতে ইচ্ছা করে না?
ইচ্ছে করলেই কি পৃথিবীতে সবকিছু হয়? আমার তো আরও অনেক কিছু ইচ্ছে করে। যাকগে, কীজন্য হঠাৎ তলব?
কিছুর জন্য না! এমনিই। শুনুন, আজ সন্ধেবেলা একবার আমাদের বাড়িতে আসবেন। আসতেই হবে কিন্তু!
আজই? অন্য একদিন গেলে হয় না?
না, না, আজই। কোনো কথা শুনতে চাই না, আসতে হবেই! আপনার সঙ্গে ভীষণ দরকার।
অন্য কেউ যদি পাশ থেকে শুনতো এই কথাবার্তা, তাহলে কি মনে করতো না যে আমাদের দুজনের মধ্যে গভীর টান? এমন জোর দিয়ে তো যে-কোনো মেয়ে ডাকতে পারে না। আমারও তো না গিয়ে উপায় নেই।
এবারও গিয়ে যথারীতি নিরাশ হলাম গোপনে। খুবই অকিঞ্চিৎকর ব্যাপার।
মঞ্জরীর এক মামা থাকেন নিউগিনিতে। তিনি একখানা মস্তবড়ো খাতা-ভরতি ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন, নিজের টাকাতেই ছাপাবেন। কিন্তু তার আগে, মঞ্জরী চায় আমি যেন সেটা আগাগোড়া পড়ে আমার মতামত জানাই। আমি তো লেখক, তাই আমার মতামতের মূল্য আছে। তা ছাড়া বানান ও ভাষাও ঠিক করে দিতে হবে আমাকে।
আমি বললাম, সেইজন্য টেলিফোনে এত জরুরি ডাক? এটা তো আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেও পারতে।
কেন আপনাকে আমি ডাকতে পারি না? আপনার সময় নষ্ট হল?
তা তো হলই! তা ছাড়া, এসব আজেবাজে লেখা আমার পড়তে ভালো লাগে না। এই রকম ঘুচিমুচি হাতের লেখা—
সুনীলদা, আমার জন্য আপনি এইটুকু কষ্ট করবেন না?
সেই অধিকারহীন দাবি জানায় মঞ্জরী। কি করে যেন জেনে গেছে, এক হিসেবে আমি ওর ক্রীতদাস। ও যদি বলে, সুনীলদা আমার জন্য আপনি সাপের মাথার মণি এনে দিন! আমার জন্য এটুকু কষ্ট করবেন না?—তাহলেও আমাকে সাপের মাথার মণির জন্যই যেতে হবে।
মঞ্জরীর বিয়েতে আমি যাইনি। মঞ্জরী যখন নেমন্তন্ন করতে এসেছিল, আমি বাড়িতে ছিলাম না, নিজের মুখে নেমন্তন্ন জানাবার সুযোগ পায়নি। আমিও একটা ছুতো করে সেই সময়টা কলকাতার বাইরে চলে গেলাম। আমার ঈর্ষা খুব প্রবল। আমার চোখের সামনে মঞ্জরীর হাতের ওপর অন্য কেউ হাত রাখবে—এটা সহ্য করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। যদিও জানতাম, মঞ্জরীর একদিন তো বিয়ে হবেই কিন্তু সেই দৃশ্য আমার নিজের চোখে দেখার দরকার নেই। পৃথিবীতে আমার চোখের আড়ালে তো কত রূপ ঝরে যায়, কত সৌন্দর্য অন্যের ভোগে লাগে, তা নিয়ে তো আর আমার মন খারাপ লাগে না।
বিয়ের পর মঞ্জরী চলে গেল বাঙ্গালোরে। ওর স্বামী ওখানে খুব একটা বড়ো কাজ করে। মঞ্জরী ওখানেই থাকবে। সুতরাং, আমার সঙ্গে ওর আর দেখা হবে না। অফিস থেকে আমাকে সাউথ ইন্ডিয়া পাঠাতে চেয়েছিল বিশেষ কাজে, আমি কিছুতেই রাজি হলুম না যেতে। মাঝে মাঝে মঞ্জরীর খবর এর-ওর মুখে শুনতে পাই। মনে মনে ভাবি, মঞ্জরী যেন সুখে থাকে, ভালো থাকে।
এলিট সিনেমার সামনে মঞ্জরীকে দেখে সত্যি খুব চমকে গিয়েছিলাম। কবে যে কলকাতায় এসেছে, তা-ও শুনিনি। বিয়ে হয়েছে দু-বছর আগে, কিন্তু একটুও বদলায়নি চেহারা। কিংবা হয়তো বদলেছে, আমার চোখে ধরা পড়েনি। পাশে দাঁড়িয়ে ওর স্বামী, বেশ সুপুরুষ ও ভদ্র।
মঞ্জরীই আমাকে প্রথম দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলল, এই সুনীলদা, এই তো আজ ধরেছি। আমাদের বিয়েতে যাননি কেন?
প্রশ্নটা এড়িয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, মঞ্জরী, তুমি কেমন আছো?
ভালো আছি।
আরও কিছুক্ষণ কথা হল। কিন্তু সেসব কথা আমি মন দিয়ে শুনিনি। একটি কথাই আমার কানে বাজতে লাগল, ভালো আছি। ভালো তো থাকবেই, দুঃখ মানায় না মঞ্জরীকে, আমিও চাই মঞ্জরী ভালো থাকুক। কিন্তু আমাকে আর দরকার নেই মঞ্জরীর। এবার আর বলল না, একটা দারুণ দরকারে আপনাকে খুঁজছি।
আর বলবে না, আমার জন্য এইটুকু কষ্ট করবেন না?
যে-কথার উত্তরে আমি বলতে পারতাম, তার বদলে আমাকে কী দেবে তুমি?
আপনি কী চান বলুন?
আমি কিচ্ছু চাই না।
এসব কথা আর বলা হবে না। বুকের মধ্যে সরু সুতোর মতন একটা ব্যস্ততা ঘুরে বেড়ায়। বিদায় নেবার আগে মঞ্জরী বলল, সুনীলদা, আপনার খবর-টবর সব ভালো তো? ভালো আছেন তো?
আমি হেসে উত্তর দিলাম, হ্যাঁ ভালো আছি। খুব ভালো আছি।
নীরার অসুখ
নীরার অসুখ
ডালহৌসি স্কোয়ারে ট্রাম থেকে নেমে সবেমাত্র একটা সিগারেট ধরিয়েছি, হঠাৎ মনে হল, পৃথিবীতে কোথাও কিছু গণ্ডগোল হয়ে গেছে। কীসের যেন একটা শোরগোল শুনতে পাচ্ছিলাম। তাকিয়ে দেখলাম দূরাগত একটা মিছিল। এ পাড়া থেকে কি একশো চুয়াল্লিশ ধারা উঠে গেছে? সারাবছরই তো থাকে। উঠে যায়নি। অবিলম্বে পুলিশ এসে মিছিলের গতি রোধ করল। উত্তেজনা ও গোলমাল বাড়ল। তারপরই হুড়োহুড়ি। লোকজন ছুটোছুটি করছে চারদিকে। ঠিক যেন ভিড়ের মধ্যে একটা পাগলা ষাঁড়কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ধাবমান লোকগুলির কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই।
আমি গড্ডলিকা প্রবাহে গা না মিশিয়ে প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গাড়ি-বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। কলেজজীবন থেকেই পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার-গ্যাস চালানো এত বেশিবার দেখেছি যে এইসব গোলমালের চরিত্র বুঝতে আমার ভুল হয় না। লাঠি টিয়ার-গ্যাসের অবস্থায় এখনো আসেনি।
লোকজনের ছুটোছুটি ক্রমশ বাড়ছিল। তার ফলে লেগে গেল একটা বিশ্রী ট্রাফিক জ্যাম। কতক্ষণে এর জট ছাড়বে কে জানে। এর ওপর আবার আকস্মিকভাবে আরম্ভ হয়ে গেল বৃষ্টি। রীতিমতন জোরে।
বৃষ্টি আসার ফলে লোকজনের ছুটোছুটি, মিছিল ও পুলিশের তাণ্ডব সবই অকিঞ্চিৎকর হয়ে গেল। বর্ষার তেজি বৃষ্টি অন্য কিছু সহ্য করে না। কয়েক মিনিট পরে আর সব কিছুই শান্ত, শুধু বৃষ্টিরই প্রবল প্রতাপ দেখা গেল।
আমি তখন আমার আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম! যতদূর সম্ভব অন্যান্য গাড়ি-বারান্দাগুলোর তলা দিয়ে যাওয়া যায়। পুরোটা রাস্তায় সেরকম সুযোগ নেই, বেশ ভিজতে হল আমাকে। বুক পকেটটা শুধু চেপে রইলাম সিগারেট দেশলাই আর সামান্য যা টাকাপয়সা আছে তা যেন না ভেজে।
বেশিদূর নয়, আমার যাবার কথা রাজভবনের পশ্চিমদিকের গেটের সামনে। নীরা ওখানে আসবে, ঠিক সাড়ে চারটের সময়। আমার মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি হয়েছে।
সিংহমূর্তির কাছেই একটা গাছতলায় দাঁড়ালাম। নীরা এখনো আসেনি। নীরা কোনোদিন দেরি করে না।
কিন্তু সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বিরাট গাড়ির লাইন পড়েছে। ট্রাফিক জ্যাম ছড়িয়ে পড়েছে এদিকেও। এর মধ্যে নীরা আসবে কী করে? ট্রাম বাস সব অচল। নীরা যদি ট্যাক্সি নিয়েও থাকে, তবু এই জ্যাম ভেদ করে ট্যাক্সি আসতে পারবে না। ওরা আসতেও চায় না।
ভীষণ রাগ হল আমার। ঠিক এই সময়ে কি ট্রাফিক জ্যাম না হলে চলছিল না? এদিকে বৃষ্টির বিরাম নেই।
বৃষ্টির সময় গাছতলায় আশ্রয় নেওয়া খুব সুবিধের ব্যাপার নয়। প্রথম প্রথম জলের হাত থেকে বাঁচা যায়। তারপর গাছ নিজেই মাথা ঝাঁকিয়ে জল ঝাড়তে থাকে।
আর একটা সিগারেট ধরাবার জন্য পকেট থেকে সিগারেট দেশলাই বার করলাম। সিগারেট ভেজেনি বটে কিন্তু দেশলাইটা নেতিয়ে গেছে। কয়েকটা কাঠি নিয়ে জ্বালাবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম বার বার। ছাল-চামড়া শুধু উঠে আসে!
আমার পাশে আরও কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজনের মাথায় ছাতা। তবু তিনি আশ্রয় নিয়েছেন গাছের নীচে। তাঁর মুখে জ্বলন্ত সিগারেট।
খুব বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলুম, আপনার কাছে দেশলাই আছে?
লোকটি আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। নিজের মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে।
হয় ওঁর কাছে দেশলাই নেই অথবা উনি কাঠি খরচ করতে চান না।
সাবধানে ওঁর সিগারেটটা ধরে আমি আমারটা জ্বালিয়ে নিলাম। তারপর ওঁরটা ফেরত দেবার জন্য হাত বাড়িয়ে আমি বললাম, ধন্যবাদ।
আমার ধন্যবাদের উত্তরে উনি বললেন, ফেলে দিন।
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। ওঁর সিগারেটটা মাত্র আধখানা পুড়েছে, উনি ফেরত নিতে চাইছেন না কেন? আমরা তো আরও অনেক দূর পর্যন্ত টানি।
আমি আবার বললাম, এই নিন।
উনি একইরকম গলায় বললেন, দরকার নেই ফেলে দিন। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিলেন অন্যদিকে। আমার মুখখানা অপমানে কালি হয়ে গেল। এর মানে কি? আমি কি অচ্ছুৎ? আমার ছোঁয়া সিগারেট উনি স্পর্শ করবেন না? তাহলে দিতে গেলেন কেন? আমি তো সিগারেটের আগুন চাইনি। আর যদি ফেলতেই হয়, আমার কাছ থেকে নিয়েও তো নিজে ফেলতে পারতেন।
অথচ এই নিয়ে তর্ক করাও যায় না। অভদ্র লোকদের এই একটা সুবিধে, ভদ্রলোকেরা তাদের চ্যালেঞ্জ করে না। তারা নিজেরাই সহ্য করে যান। আমি মনে মনে গজরাতে লাগলুম।
পাঁচটা বেজে গেল, নীরা এখনও এল না। ট্রাফিক জ্যামের জট ছেড়ে গেছে, বৃষ্টির তেজ একটু কম। নীরা তো কোনোদিন এত দেরি করে না।
সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। আর কোনো সন্দেহ নেই যে নীরা আজ আর আসতে পারবে না। নিশ্চয়ই আকস্মিক কোনো অনিবার্য কারণে আটকে গেছে। আর অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না।
বৃষ্টি থেমে গেছে। আমি গাছতলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। আর একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু আমি কারুর কাছে দেশলাই চাইব না।
সবে মাত্র পা বাড়িয়েছি, এই সময় পটাং করে আমার একটা চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেল। চামড়ার চটি জলে ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গিয়েছিল।
এখন এই ছেঁড়া-চটি নিয়ে আমি কী করি। রাজভবনের সামনে মুচি খুঁজে পাওয়া একটা অসম্ভব ব্যাপার। অথচ ছেঁড়া-চটি ঘষটে ঘষটে হাঁটাও একটা অসম্ভব ব্যাপার। চটি-জোড়া পুরোনো, ফেলে দিলেও ক্ষতি নেই—কিন্তু খালি পায়ে হাঁটার মতন মনের জোর নেই।
অগত্যা সেই চটি টেনে টেনেই হাঁটতে লাগলুম। অত্যন্ত বিশ্রী লাগছে। চটি ছিঁড়ে গেলে মানুষের সমস্ত ব্যক্তিত্ব চলে যায়।
খানিকটা এগোতেই কার্জনপার্কের মোড়ের কাছে দড়াম করে জোর একটা শব্দ হল। চোখ তুলে সেদিকে তাকালাম। না তাকালেই ভালো হত। একটা লরি ধাক্কা মেরেছে একটা টেম্পোকে। টেম্পো থেকে একটা লোক ছিটকে পড়েছে রাস্তায়। গল-গল করে রক্ত বেরুচ্ছে।
এতকাল কলকাতায় আছি, কিন্তু আমি নিজের চোখে কখনও কোনো দুর্ঘটনা দেখিনি। আজই প্রথম। আজ বিকেল থেকে পর পর একটার পর একটা খারাপ ঘটনা ঘটছে কেন? পৃথিবীর যন্ত্রপাতিতে কি কোথাও কোনো গণ্ডগোল হয়েছে? হঠাৎ আমার মনে হল, নীরার নিশ্চয়ই কোনো অসুখ হয়েছে। সেই জন্যই আসতে পারেনি। কালকেও নীরাকে পরিপূর্ণ সুস্থ দেখেছি, আজ তার অসুখ হবার কোনো কারণই নেই। তবু আমার ওই কথাই মনে হল—সেইজন্যই আজ আমি একটার পর একটা কু-চিহ্ন দেখছি। এইসব ঘটনার সঙ্গে নীরার অসুখের নিশ্চয়ই সম্পর্ক আছে। এই জগৎ তো মায়ার প্রতিবাস, আমার মনের অবস্থা অনুযায়ীই সব কিছু ঘটে থাকে।
নীরার অসুখ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আমার এক্ষুনি জানা দরকার। ওদের বাড়িতে সাধারণত আমি টেলিফোন করি না, আজ করতে হবে।
কোথায় টেলিফোন? ট্রাম গুমটিতে। ছেঁড়া-চটি পায়ে দিয়েই ছুটলাম সেই দিকে। তিন-চারজন আগে থেকেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে। মেয়েরা টেলিফোন করতে অনেক সময় লাগায়। আমার ইচ্ছে হল, এদের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করে বলি, আমাকে একটু আগে সুযোগ দিন, পৃথিবীর সমস্ত কাজের চেয়েও আমার কাজটা বেশি জরুরি।
কিন্তু এ কথা মুখে বলা যায় না। নীরস মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম সবার পেছনে। মেয়েটি যথারীতি বহুক্ষণ সময় লাগাল। ও যেন কার সঙ্গে ঝগড়া করছে। তাতো করবেই। আজ এই মুহূর্তে, পৃথিবীতে কেউ সুখে নেই।
প্রায় আধঘন্টা বাদে আমার সুযোগ এল। ঠিকঠাক খুচরো পয়সা পকেটে আছে আগেই দেখে নিয়েছিলাম। কানেকশান হবার পর এনগেজড টোন পেলাম। তবু ফোন ছাড়লাম না। পর পর তিনবার চেষ্টা করলাম। একই অবস্থা। তখন টেলিফোন অফিসে লাইন ধরে জিজ্ঞেস করলাম, এই নাম্বারটার কী অবস্থা দেখুন তো। দূরভাষিণী জানালেন, ওই নাম্বার এখন আউট অব অর্ডার হয়ে আছে।
খুব একটা আশ্চর্য হবার মতন ব্যাপার কিছু নয়। আজ বিকেল থেকে পর পর যা ঘটছে, তার সঙ্গে বেশ মিল আছে।
এরপর আমি একটা কাজই করতে পারি। পা ঘষটে ঘষটে চলে এলাম ধর্মতলার মোড়ে। সন্ধের পর কলকাতার রাস্তায় মুচি পাওয়া অসম্ভব—ঈশ্বর এরকম নিয়ম করেছেন। সুতরাং, আমি আমার পুরনো চটি-জোড়া ফেলে দিয়ে ফুটপাথ থেকে একজোড়া রবারের চটি কিনে নিলাম। তারপর মিনিবাস ধরে দ্রুত নীরার বাড়িতে।
দরজা খুলল চাকর। কোনো দ্বিধা না করে জিজ্ঞেস করলাম, দিদিমণি আছে?
অন্য দিন হলে নীরার বাবার সঙ্গে প্রথমে কথা বলতাম, একটা কোনো জরুরি প্রসঙ্গ বানিয়ে নিতে হত। আজ আর ওরকম অছিলা খোঁজার কোনো মানে হয় না।
চাকরটি বলল, দিদিমণি ওপরে শুয়ে আছেন।
অসুখ করেছে?
না এমনিই শুয়ে আছেন।
খবর দাও, বলো, সুনীলবাবু দেখা করতে এসেছেন। চাকরটি ওপরে চলে গেল। আমি বসবার ঘরে দাঁড়িয়ে ছটফট করতে লাগলাম। বসতেও ইচ্ছে করল না। টেবিলে অনেক পত্র-পত্রিকা পড়ে আছে, ছুঁয়েও দেখলাম না।
চাকর একটু পরে এসে বললো, দিদিমণির জ্বর হয়েছে।
আমার প্রচণ্ড চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল, আমি আগেই বলেছিলাম না?
খুব শান্তভাবে বললাম, আমি একবার ওপরে যাব। দিদিমণির বাবা কিংবা মাকে একটু বলে এসো আমার কথা।
বলেছি, আপনি আসুন।
চাকরটির আগে আগেই আমি সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠে এলাম। নীরার ঘর আমি চিনি। তিনতলায় সিঁড়ির পাশেই।
নীরা শুয়ে আছে চিৎ হয়ে, গায়ে একটা পাতলা নীল চাদর, চোখ বোজা। ওর মা শিয়রের কাছে বসে কপালে জলপটি দিচ্ছেন।
নীরার মা আমাকে দেখে সামান্য একটু অবাক হলেন, কথায় তা প্রকাশ করলেন না অবশ্য। বললেন, ওই চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসো।
আমাকে বলতেই হল যে নীরার বিশেষ বন্ধু স্নিগ্ধা, যে আমার মাসতুতো বোন, সে নীরাকে একটা খবর দিতে বলেছিল, আমি এ পাড়ায় এসেছিলাম অন্য কাজে, এসে শুনলাম, নীরার অসুখ।
ওর মা বললেন, দ্যাখো দেখি, হঠাৎ কী রকম জ্বর। দুপুরেও ভালো ছিল।
কী হয়েছে?
বুঝতে পারছি না তো। টেম্পারেচার একশো ডিগ্রি।
ডাক্তার এসেছিলেন?
রথীনকে তো খবর পাঠিয়েছি। ন-টার সময় আসবে বলেছে। টেলিফোনটা আবার আজকে খারাপ। ওর বাবাও এখনও অফিস থেকে ফেরেননি।
কথাবার্তা শুনে নীরা চোখ মেলে একবার তাকাল। ঘোলাটে দৃষ্টি। আমাকে চিনতে পারল কি না কে জানে।
আমি চেয়ারে বসে নীরার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো ওষুধ-টোষুধ আনতে হবে? আমি এনে দিতে পারি?
না। রথীন এসে দেখুক।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম , উনি কি একবারও ঘর ছেড়ে উঠে যাবেন না?
আজকালকার মায়েরা তেমন অবুঝ নন। একটু বাদেই উনি বললেন, তুমি একটু বসো। আমি একটু গরম দুধ নিয়ে আসি, যদি খায়।
উনি ঘর থেকে চলে যাওয়া মাত্রই আমি উঠে গিয়ে দরজার কাছে উঁকি মেরে দেখলাম, উনি একতলার রান্নাঘরেই যাচ্ছেন কিনা। উনি তাই-ই গেলেন। তাহলে ফিরতে অন্তত দু-মিনিট তো লাগবেই।
নীরার শিয়রের কাছে এসে আমি ওর কপালে হাত দিলাম। কপালটা যেন পুড়ে যাচ্ছে একেবারে।
নীরা চোখ মেলে তাকাল আবার। তারপর অস্পষ্ট গলায় বলল, আমি আজ যেতে পারিনি।
ও কথা এখন থাক। তোমার কষ্ট হচ্ছে?
আমার মন খারাপ লাগছে খুব।
ছিঃ এখন মন খারাপ করে না। হঠাৎ অসুখ বাধালে কী করে?
আমার তো অসুখ হয়নি, আমার মন খারাপ।
লক্ষ্মীটি এখন মন খারাপ করো না।
নীরা আমার হাতটা টেনে নিজের চোখের ওপর রাখল। আমি ভালো লাগায় বিভোর হয়ে গেলাম। আবার ভয়ও করতে লাগল। ওর মা এক্ষুনি এসে পড়বেন না তো?
নীরা বলল, তুমি যেও না।
আমি হাত সরিয়ে নিয়ে চেয়ারে এসে বসলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওর মা এসে ঢুকলেন ঘরের মধ্যে। উত্তেজনায় আমি কাঁপছি।
ডাক্তার না-আসা পর্যন্ত আমি বসেই রইলাম সেই ঘরে। এর আগেই নীরার বাবা এলেন, দু-চারটে কথা বললেন আমার সঙ্গে। আমি জানি, ওঁরা তো আমাকে জোর করে চলে যেতে বলবেন না।
ডাক্তার এল সাড়ে ন-টায়। ওদের কিরকম আত্মীয়। নীরার সঙ্গে তুই তুই করে কথা বলেন। নীরার জ্বর তখনও একটুও কমেনি। বরং বেড়েছে মনে হয়।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, কী রে, তোর হঠাৎ কী হল?
নীরা বলল, আমার কিছু ভালো লাগছে না।
কোথায় ব্যথা?
নীরার সেই একই উত্তর, আমার কিছু ভালো লাগছে না।
ওরা কেউ জানে না, শুধু আমি জানি, নীরা কখনও অসুখের কথা আলোচনা করতে ভালোবাসে না। কোনোদিন ও শরীরের কোনো ব্যাপার নিয়েই অভিযোগ করেনি। কিংবা আমার সামনে করে না।
ডাক্তার নীরার বুক-পিঠ পরীক্ষা করে গম্ভীর হয়ে গেলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, জ্বর তো একশো পাঁচের কম নয় মনে হচ্ছে। কোনো রকম ভাইরাস ইনফেকশান মনে হচ্ছে। রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। আজ তো হবে না! কাল সকালেই পাঠিয়ে দেব।
তার পরদিন থেকে কলকাতা শহরে কি তুলকালাম কাণ্ড। আগের দিনের ঘটনার জেরে ছাত্র ধর্মঘট। পুলিশের সঙ্গে আবার মারামারি। ট্রাম বাস পুড়ল। কলকাতা শহরটা বিকল হয়ে গেল।
আমি বিকেলে দৌড়তে দৌড়তে গেলাম নীরার কাছে। নীরার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কোনো কথা বলতে পারছে না, প্রায় অজ্ঞানের মতন অবস্থা। এদিকে রক্ত পরীক্ষার কোনো ফলাফল তখনও আসেনি।
বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম নীরাদের বাড়ি থেকে। রাস্তাঘাট ফাঁকা থমথমে। যে কয়েকজন লোককে দেখা গেল, সকলের মুখ থমথমে। মাঝে মাঝে হিংস্র চেহারায় পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে।
আমি তো জানি, কলকাতার এই অবস্থা তো শুধু নীরার জন্যই। নীরার অসুখ ঠিক না করলে এই শহর রসাতলে যাবে।
পরদিনও নীরার ঠিক সেই একই রকম অবস্থা। ডাক্তাররা কিছু বলতে পারছেন না। আমি তীব্রভাবে মনে মনে বলতে লাগলুম, আপনারা করছেন কী? আপনারা কি কলকাতা শহরটাকে ভালোবাসেন না? ওকে সারিয়ে না তুললে যে এই শহরটা ধবংস হয়ে যাবে। হঠাৎ ভূমিকম্পে সবকিছু ভেঙে পড়তেও পারে!
সেদিন কলকাতার সাত জায়গায় ট্রামে বাসে আগুন লেগেছে, পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে অনেক জায়গায়। আমি একটু ফাঁকা ঘর পেয়ে অচেতন নীরার কপালে হাত দিয়ে বললাম, নীরা, ভালো হয়ে ওঠ। তোমাকে ভালো হয়ে উঠতেই হবে। তুমি এতগুলো মানুষের কথা ভাব।
পরদিন কলকাতায় কারফিউ জারি হবে কিনা এরকম জল্পনাকল্পনা চলছিল, কেউ কেউ বলছে, আর্মিকে ডেকে আনা হবে। কিন্তু সেদিনই রক্ত পরীক্ষার ফল পাওয়া গেল, জানা গেল ভাইরাস। ঠিক ইনজেকশন দেবার পরই নীরার জ্ঞান ফিরে এল।
এক ঘন্টা বাদে ওর মুখের রংটা দেখাল অনেক স্বাভাবিক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম নীরা, এখন কেমন আছ?
নীরা সামান্য হেসে বলল, আমার মন ভালো হয়ে গেছে।
সেদিন বাইরে এসে দেখলাম, চমৎকার ফুরফুরে হাওয়া বইছে। রাস্তায় অনেক বেশি লোকজন। কয়েকজন পুলিশের মুখেও হাসি।
পরদিন সকাল থেকে কলকাতা একেবারে স্বাভাবিক।
ভিতরের চোখ
ভিতরের চোখ
অফিসের কাজে বোম্বে গিয়েছিলাম, ভাবলাম, চট করে একবার গোয়া থেকে ঘুরে আসা যাক। হাতে তিনদিন সময় আছে। পাঞ্জিমে একদিন কাটাবার পর চলে গেলাম কালাংগুটের সমুদ্রতীর দেখতে।
তখন বিকেল শেষ হয়ে এসেছে চতুর্দিকে অপরূপ নরম আলো। দূরে সমুদ্রে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। দৃশ্যের সৌন্দর্য এখানে একটা বিশাল মহিমা বিস্তার করেছে। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
এখানে বেশ ভিড়। হিপিদের বড়ো একটা দল তো রয়েছেই, তা ছাড়া এখন ভ্রমণকারীদের মাস এবং ভ্রমণকারীদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা যথেষ্ট।
প্রায় বিচের ওপরেই একটা ছোট রেস্তোরাঁ। সেখানে বসবার জায়গা নেই। বালির ওপরে হুটোপুটি করছে অনেকে। কেউ কেউ এগিয়ে যাচ্ছে জলের দিকে। জল বেশ খানিকটা দূরে।
একটি পুরুষ ও একটি রমণীকে আমি পাশাপাশি জলের দিকে এগিয়ে যেতে দেখলাম। আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি তাদের পিঠের দিক। সূর্যাস্তের দিকে এগোচ্ছে বলে, বিপরীত দিক থেকে আসা আলোয় তাদের শরীর দুটি কালো রেখায় আঁকা। হাওয়ায় উড়ছে মেয়েটির আঁচল, ছেলেটির হাতে সিগারেট। মন্থর তাদের চলার ভঙ্গি।
হঠাৎ আমার বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগল। মনে হল ওই মেয়েটির হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি আমার পরিচিত।
আর একবার তাকিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। রূপাকে আমি এতদিন ধরে এতভাবে দেখেছি যে, আমার ভুল হবার কথা নয়। শুধুমাত্র পেছন দিকটা দেখে, তাও প্রায় একশো গজ দূর থেকে এবং গোধূলিকালীন ম্লান আলোয় কোনো মেয়েকে চিনতে পারার কথা নয়, কিন্তু আমার মনে কোনো দ্বিধা রইলো না।
আমি অপেক্ষা করলাম না। পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলাম। রূপা জলের ধার থেকে এক্ষুনি ফিরে আসবে, আজ যেন আমাকে দেখতে না পায়। আমার অভিমান বড়ো তীব্র।
তা ছাড়া, রূপা হয়তো ভেবে বসতে পারে, ও ওখানে ওর স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে আসবে জেনেই আমি এখানে এসেছি। মেয়েদের মন বড়ো বিচিত্র। আমি এখনো রূপার জন্য কাতর হয়ে আছি কিংবা ওদের সুখে বিঘ্ন ঘটাতে এসেছি—এরকম ভেবে বসাও বিচিত্র নয়।
আমার ট্যাক্সি অপেক্ষা করছিল। ফিরে এসে বললাম, চলো।
ট্যাক্সিওয়ালা অবাক। মাত্র পনেরো মিনিটের জন্য কেউ এতটাকা খরচ করে ট্যাক্সিভাড়া নিয়ে কালাংগুটের বেলাভূমি দেখতে আসে না। কিন্তু প্রকৃতি আমার জন্য বিস্বাদ হয়ে গেছে।
পাঞ্জিমে ফিরে ঠিক করলাম, তার পরের দিন ভোরেই বাস ধরে ফিরে যাবো বোম্বে। রূপাও নিশ্চয়ই পাঞ্জিমে আসবে, তখন আমার সঙ্গে দেখা হোক, আমি চাই না।
একবার শুধু মনে হয়েছিল, যদি রূপা না হয়! আমার দিকে পিছন ফিরে থাকা একটি নারীমূর্তি, উড়ন্ত শাড়ির আঁচল—শুধু এইটুকু দেখেছি। পরক্ষণেই মনে হল, ওই মেয়েটা রূপা ছাড়া আর কেউ নয়। আমি নিজের সঙ্গেই নিজে একটা বাজি ধরে ফেললাম। এবং ফিরে গেলাম পরদিন ভোরে।
রূপার সঙ্গে দ্বিতীয়বার আমার দেখা কলকাতা রবীন্দ্রসদনে। দেখা মানে, এবারও এক পক্ষের ব্যাপার, অর্থাৎ আমিই শুধু দেখেছি, রূপা দেখেনি।
একটা বিখ্যাত নাটক দেখতে এসেছিলাম। টিকিট হাতে নিয়ে রবীন্দ্রসদনের কাচের দরজাগুলোর সামনে এসে সবেমাত্র দাঁড়িয়েছি, দেখলাম, ভেতরের লবিতে আরও দু-তিনজন নারী-পুরুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে রূপা। এবারও আমার দিকে পেছন ফেরা। নতুন ডিজাইনের খোঁপা, একটা ময়ূরকণ্ঠি রঙের সিল্কের শাড়ি পরেছে, হাতে একটা অনুষ্ঠান-পত্র, খুব গল্পে মত্ত।
দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি। আজ চিনতে ভুল হবার কোনো প্রশ্নই নেই। বিয়ের পর সামান্য একটু শারীরিক পরিবর্তন হয়েছে, আগের মতন ছিপছিপে ভাবটা আর নেই। তবু ওর হাতের একটা আঙুল শুধু দেখলেও বোধহয় আমি চিনতে পারবো।
এখন ভিতরে ঢুকলে রূপার চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা খুবই। ঠিক করলাম, একটু পরে ঢোকা যাবে। এখন গিয়ে দরকার নেই।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে চলে গেলাম ময়দানে। একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে লাগলাম। খানিকটা বাদে ঘড়ি দেখে বুঝলাম, এতক্ষণে নাটক আরম্ভ হয়ে গেছে, এখন সকলেই ভিতরে ঢুকে গেছে। এখন যাওয়া যেতে পারে।
তবু আমার যেতে ইচ্ছে করলো না। মনে মনে একটা যুক্তি খাড়া করলাম, নাটক শুরু হবার পরে ভিতরে ঢোকা অভদ্রতা। অন্য দর্শকদের ব্যাঘাত হয়। আসলে, একই হলঘরের মধ্যে, এক ছাদের নীচে, যেখানকার হাওয়ায় রূপার নিশ্বাসের সঙ্গে আমার নিশ্বাস মিলবে—আমি থাকতে চাইছিলাম না। আমার জীবনে রূপা নামে কেউ নেই।
অনেকক্ষণ একলা একলা ঘুরলাম ময়দানের অন্ধকারে। তারপর হঠাৎ একসময় আমি ভাবলাম আমার কি মন খারাপ? আমি একা অন্ধকারে ঘুরছি কেন?
কথাটা ভেবেই আমার হাসি পেল। আড়াই বছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে রূপার। এখনও সেইজন্য মন খারাপ করে করে ঘুরে বেড়াবার মতন নরম প্রেমিক তো আমি নই। এমনকি এই জন্য একটা থিয়েটারে টিকিট নষ্ট করারও কোনো মানে হয় না। অথচ রূপাকে দেখলেই আমার মনে একটা দুরন্ত অভিমানবোধ জেগে ওঠে। যুক্তিহীন এই অভিমান। রূপার বিয়ের আগে আমি তো জোর করে কিছু বলিনি। রূপাকে শুধু বলেছিলাম, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে। রূপা আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারেনি। আমি তো নিজেই জানি, ওর অনেক অসুবিধা ছিল। যাই হোক সেসব এখন চুকে-বুকে গেছে।
কিন্তু কলকাতা শহরটা আসলে খুব ছোটো। কোথাও না কোথাও দেখা হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকেই। আমাকে অবশ্য চাকরির জন্য প্রায়ই কলকাতার বাইরে থাকতে হয়। রূপার স্বামীও বদলির চাকরি করে শুনেছি।
কিছুদিন পরেই রূপাকে আর একবার দেখলাম। এইবার রূপাও হয়তো আমাকে দেখেছে, তাও দু-এক পলকের জন্য মাত্র।
আমার এক বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়েছিলাম হাওড়া স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে প্রচুর ভিড়, কিন্তু ব্যস্ততার কিছু ছিল না আমাদের। সিট রিজার্ভ করাই ছিল। আমি আর অসিত পাশাপাশি হাঁটছিলাম। অসিতের সঙ্গে ছোটো সুটকেস, কুলি নেওয়ারও দরকার ছিল না।
হঠাৎ একটি কামরার জানলার দিকে চোখ পড়ল। রূপা বসে আছে জানালার ঠিক পাশটিতেই। একেবারে চোখাচোখি হয়ে গেল।
চোখের পলক পড়তে বোধহয় একটু দেরি হয়েছিল। কিন্তু আমি থামিনি। এগিয়ে গেলাম। রূপা কি আমাকে চিনতে পেরেছে? যদি অন্যমনস্ক থাকে তা হলে লক্ষ না করতেও পারে।
হঠাৎ রূপার দিকে আমার চোখ গেল কেন? অসিতের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত ছিলাম, কোনোদিকে তো আগে তাকাইনি। অবশ্য, মেয়েদের দিকে চোখ আপনি চলে যায়। কিন্তু রেলের এতগুলো কামরায় আর কোনো জানালার পাশে আর কোনো মেয়ে কি বসে নেই।
অসিত জিজ্ঞেস করল মেয়েটিকে চেনা চেনা মনে হল না?
আমি কথা ঘোরাবার জন্য বললাম, কে? ওই সামনে যিনি যাচ্ছেন লম্বা মতন?
অসিত বলল, না, ওই যে জানলায় যাকে দেখলাম।
কারুর চোখের দিকে ঠিক তাকিয়ে আমি মিথ্যে কথা বলতে পারি না। তাই সিগারেট ধরাবার ছলে মুখ নীচু করে বললাম, আমি ঠিক লক্ষ করিনি।
অসিতের সংরক্ষিত আসন সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল। আমরা দু-জনে কামরায় উঠে বসলাম। ট্রেন ছাড়তে এখনো মিনিট পনেরো দেরি আছে।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর আমি লক্ষ করলাম, প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রূপা। হাতে একটি জলের ফ্লাস্ক। চোখে কিছু একটা খোঁজার দৃষ্টি। কি আর খুঁজবে, জলের কল নিশ্চয়ই।
একটু পরে যখন ট্রেন ছাড়ল আমি প্ল্যাটফর্মে নেমে দাঁড়ালাম। ট্রেনটা চলতে লাগল আমার সামনে দিয়ে। অসিতের উদ্দেশে আমি রুমাল ওড়াতে লাগলাম। আর একবার রূপার দিকে চোখ তো পড়বেই। কিন্তু সঠিক সময়ে আমি চোখ ফিরিয়ে নিতে পেরেছি, এবং রুমালটা পুরে নিয়েছি পকেটে। ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাবার পর আমার মনে হল, আমি এবার সত্যিই রূপাকে আমার জীবন থেকে বিদায় দিলাম।
এরপর সত্যিই আর বছর তিনেকের মধ্যে রূপার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। সময়ে অনেক কিছু ম্লান হয়ে যায়। কত গাছের পাতা ঝরে পড়ে। এই চোখে পুরোনো হয়ে যায় পৃথিবী। অনেক গুরুতর মান-অভিমানও হয় অতি সামান্য।
অফিসের কাজেই গিয়েছিলাম দিল্লিতে। উঠেছি হোটেলে। সারাদিন বহু অকিঞ্চিৎকর লোকের সঙ্গে দেখা করার কাজ। অকারণ ভদ্রতার হাসি দিতে দিতে চোয়াল ব্যথা হয়ে যায়।
পরদিন খুব ভোরে উঠে হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, কী যেন একটা পুজোর প্যান্ডেল সেখানে। এর মধ্যেই পরিচ্ছন্ন পোশাকের অনেক নারী-পুরুষের ভিড়। দুম করে মনে পড়ে গেল আজ সরস্বতী পুজো। আমার খেয়ালই ছিল না।
খুব ছেলেবেলা থেকেই আমি সরস্বতী পুজোর দিন অঞ্জলি দিয়ে থাকি। সেই ছেলেবেলায় যখন নিজেরাই পুজো করতাম, তখন তো আমরা এটা মেনে চলতাম খুব। ছেলেবেলার অনেক কিছুই আর নেই, শুধু এই অভ্যেসটা রয়ে গেছে। চা খেলাম না। ভাবলাম, এত কাছেই যখন পুজো তখন অঞ্জলিটা দিলেই তো হয়। সরস্বতীর সঙ্গে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। খবরের কাগজ আর ইংরেজি গোয়েন্দা কাহিনি ছাড়া কিছু পড়ি না—তবু পুরোনো অভ্যেসটা খোঁচা মারতে লাগলো।
ধুতিটুতি নেই। প্যান্ট-শার্ট পরেই চলে গেলাম পুজো প্যান্ডেলে। এখানে কারুকেই চিনি না। তবু বাঙালিদের ব্যাপার, নিজেকে খুব একটা বহিরাগত মনে হয় না।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিচ্ছিলাম। পাশ থেকে একটা সুগন্ধ পেলাম। ফুলের নয়, কারুর চুলের অনেক কালের চেনা গন্ধ। লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে রূপা। হাতের ফুলগুলি ছুঁড়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছ?
পুরোনো অভিমান-টভিমান সব মরে গেছে। আমি হাসিমুখে বললাম, ভালো।
তুমি কেমন?
রূপা বলল, চা খাওনি নিশ্চয়ই? তুমি তো অঞ্জলি দেবার আগে কিছু খেতে না।
মনে আছে!
সব মনে আছে। আমার বাড়ি কাছেই। আসবে?
এর আগে রূপাকে দেখলেই এড়িয়ে চলে গেছি। আজ এই সকালবেলার প্রসন্ন আলোয় আমার বাল্যকালের বান্ধবীকে দেখে মনের মধ্যে আর কোনো রাগ দুঃখ অনুভব করলাম না। মনে হল, এই রোদ হাওয়া ও শিশুদের কলরবের মতন সবকিছু স্বাভাবিক।
পুজো-প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এলাম দুজনে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার স্বামী আসেননি?
না, এখনো ঘুম ভাঙেনি।
কয়েক পা নিঃশব্দে চলার পর কিছু একটা বলার জন্যই আমি বললাম, কতদিন পর দেখা। প্রায় ছ-বছর তো হবেই। কি বলো?
রূপা বলল, কেন?
এর আগে তো আরও দেখা হয়েছে।
রূপার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আমি অবাক হবার ভান করে বললাম, কোথায়?
রূপা হাসল। বলল, কেন?
আমার বিয়ের কয়েক মাস পরেই, গোয়ার কালাংগুট বিচে তুমি ছিলে না?
চমকে উঠলাম। শুধু মাত্র পেছন দিক থেকে দেখে আমি সেই মেয়েটিই রূপা কিনা এ সম্পর্কে একটু দ্বিধা করেছিলাম। আর রূপা আমাকে কখন দেখল?
রূপা বলল, আমি ফিরে এসে তোমাকে আর খুঁজে পেলাম না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম তোমার জন্য।
আমার হাতে বেশি সময় ছিল না। ট্যাক্সি অপেক্ষা করছিল।
আমি ভেবেছিলাম। পাঞ্জিমে ফিরে এসে অন্তত দেখা হবেই। ছোটো জায়গা তো। তোমাকে কয়েকটা কথা বলার ছিল।
আমি পরদিন ভোরেই…
তারপর রবীন্দ্রসদনে—তুমি গেট দিয়ে ঢুকছিলে।
সেদিন তুমি আমাকে দেখতে পেয়েছিলে?
কেন পাবো না?
তুমি অন্যদিকে ফিরে ছিলে।
মেয়েদের ভিতরে একটা আলাদা চোখ থাকে জানো না? সেই চোখ দিয়ে দেখেছিলাম। তুমি গেট ঠেলে ঢুকতে গিয়েও ঢুকলে না। আমি ভাবলাম, কিছু একটা বোধহয় ফেলে এসেছো। আমি তোমার জন্য বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। নাটক শুরু হয়ে গেল, তবু আমি ভিতরে ঢুকিনি, কিন্তু তুমি এলে না আর। কোনো মিথ্যে অজুহাত দিতে ইচ্ছে করল না আর। তাই চুপ করে রইলাম।
রূপা আবার বলল, তারপর একদিন হাওড়া স্টেশনে, আমি জানলার ধারে বসে।
সেদিন বোধহয় তুমি আমাকে দেখতে পাওনি, না?
মৃদু গলায় বললাম, পেয়েছিলাম।
তবু তুমি আমার সঙ্গে কোনো কথা বললে না কেন? চেনা কারুর সঙ্গে দেখা হলে বুঝি চোখ ফিরিয়ে চলে যেতে হয়?
না, ঠিক তা নয়।
তারপর আমি প্ল্যাটফর্মে নেমে তোমাকে খুঁজলাম। গাড়ি ছাড়ার আগে পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলাম।
কেন দাঁড়িয়েছিলে রূপা? আমি ভেবেছিলাম। ওইসব সময়ে তুমি কোনোবারই আমাকে দেখতে পাওনি। তাই আমি—
রূপা খুব নরমভাবে বলল, কেন এরকম ভাবলে? আমি তোমায় না দেখে পারি?
আমি রূপার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম। সত্যিই আজ কোনো রাগ আর অভিমান নেই। রূপা আজ এই সকালবেলাটার মতনই সুন্দর। আজকের সকাল শুধু আজকেরই সকাল।
রূপা আবার বলল, তুমি এক-সময় আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলে। আমি তখন পারিনি। তারপর, তোমাকে যখনই দেখেছি, গোয়ার সমুদ্রের ধারে, রবীন্দ্রসদনে, হাওড়া স্টেশনে—আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করে থেকেছি—তোমাকে একটা কথা বলার ছিল, কিন্তু তুমি আসনি।
আমি বললাম, আজ আর সে কথা বলার দরকার নেই। আমি সব বুঝতে পেরে গেছি।
সত্যি বুঝতে পেরেছো?
না হলে মনটা এমন পরিষ্কার লাগছে কেন?
জনবিরল রাস্তার বিরাট আকাশের নীচে, নরম রৌদ্রে রূপার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে আমার মনে হল, এই নারী আর আমার নয়, কিন্তু আমি কিছুই হারাইনি। সবই থেকে গেছে। অভিমান আমাকে রিক্ত করে দিয়েছিল, কিন্তু এখন আমি অনুভব করতে পারি—আবার কখনও সমুদ্রবেলায় সূর্যাস্তের মুখোমুখি এই নারীকে হেঁটে যেতে না দেখলেও, সেই দৃশ্য শাশ্বত হয়ে থাকবে।
অপরেশ রমলা ও আমি
অপরেশ রমলা ও আমি
আমি প্রথমটা দেখতে পাইনি। বাসে উঠতে যাচ্ছি, একজন মহিলা নামছেন দেখে পথ ছেড়ে দাঁড়িয়েছি। এক পায়ে চটি, ভদ্রমহিলার পায়ের দিকে তাকিয়েই আমার বুকটা একটু শিরশির করে উঠল। মনে হল, এই পা দুটি আমার হাতের মতন, বহুদিন আমি এই দুটি পা আমার হাতের মুঠোয় ধরেছি। চোখ তুলে মুখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলাকে পুরোপুরি দেখে বললুম, তুমি?
রমলা তখন বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। আমার সে বাসে ওঠা হল না। জিজ্ঞেস করলুম, কেমন আছ?
রমলা হেসে সামান্য ডানদিকে ঘাড় হেলিয়ে বললো, আপনি কেমন আছেন?
‘আপনি’ শুনেই বুঝলুম, রমলার পিছন পিছন যে দীর্ঘকায় বলিষ্ঠ লোকটি নেমেছে, সেই রমলার স্বামী। রমলা কোনোদিনই আমাকে অন্য লোকের সামনে তুমি বলত না। অন্য লোকের সামনে আমি ছিলাম ওর দাদার একজন বন্ধুই।
রমলার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললুম, ভালো আছেন?
অপরেশ রায় মুখে কিছু না বলে ঘাড় হেলালেন। কিন্তু আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। অপরেশ রায়কেও আমি আগে চিনতাম কিন্তু বছর সাতেক দেখিনি, মুখ মনে ছিল না অথচ রমলার পা দেখেই আমি চিনতে পেরেছিলুম ঠিকই। এই সাত বছরে রমলার পা নিশ্চয়ই খানিকটা বদলেছে, আমারও চোখ বদলেছে নিশ্চিত, তবু মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পেরেছিলুম।
হঠাৎ চৌরঙ্গিতে এই শেষ বিকেলবেলায় ওদের সঙ্গে দেখা হতে আমার ভালোই লাগল। শেষ যখন দেখেছিলুম, তখন ওর চোখের দুধার বড়ো শুকনো ছিল, এখন পুরো মুখটাই মসৃণ হয়েছে। কী জানি এই ছয়-সাত বছর রমলা কলকাতাতেই ছিল কিনা, আমি ছিলাম না মাঝে দু-এক বছর—তবু, এর মধ্যে কোথাও একদিনের জন্যেও দেখা হয়নি। গত তিন-চার বছর একবারও ওর কথা মনেও পড়েনি বোধহয়। কিন্তু এই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হল, রমলা আমার থেকে খুব দূরে সরে যায়নি , চোখের কোণে চিকচিকে হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি বেশ সরল হাস্যে বললুম—বাঃ, বেশ সুন্দর চেহারা হয়েছে তোমার!
অপরেশবাবু, আপনারা কোথায় আছেন এখন?
অপরেশ কোনো কথা না বলে তেমনি হাসিমুখেই দাঁড়িয়ে রইলেন। রমলাই উত্তর দিল, আমরা এখন গড়িয়াহাটায় থাকি। ওঁর অফিস থেকে কোয়ার্টার দিয়েছে।
আপনি এখন কী করছেন?
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই অপরেশ বললেন, এক সেকেন্ড! তারপর স্ত্রীকে ডেকে নীচু গলায় কী যেন বলতে লাগলেন।
আমি ওদের দিকে—সস্নেহে বললে খুব ভারিক্কি শোনাবে কিন্তু, বেশ সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে রইলুম। অপরেশের পাশে রমলাকে ভারী সুন্দর মানিয়েছে। রমলা আগে ছিল রোগা-পটকা। এখন অপরেশের সবল চেহারার পাশে ওকেও খানিকটা স্বাস্থ্যবতী হতে হয়েছে। আমি যে রমলাকে একসময় সত্যি ভালোবাসতুম তা এই মুহূর্তে আবার বুঝতে পারলুম, কারণ ওদের একসঙ্গে দেখে আমার একটুও ঈর্ষা হচ্ছে না। গ্রীষ্মকালে এক গ্লাস ঠান্ডা জল পাওয়ার মতো, ওদের দেখার পর থেকেও আমার বুকের মধ্যে যেন আস্তে আস্তে খুশি গড়িয়ে আসছে। অপরেশকে বিয়ে করে খুবই বুদ্ধিমতীর কাজ করেছিল রমলা—তার বদলে আমাকে বিয়ে করলে বেচারার দুর্ভোগের সীমা থাকত না। স্বাস্থ্য কি এমন নিটোল হতে পারত? না, তার বদলে এতদিনে মুখে পড়ত ক্লান্তির ছাপ—আমিই আমার নিজের জীবন নিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি, সেই জীবন আশ্রয় করে কতদিন শান্তিতে থাকতে পারত রমলা? তা ছাড়া গড়িয়াহাটায় অফিস থেকে পাওয়া কোয়ার্টার—তা জোগাড় করা কোনোদিন আমার পক্ষে সম্ভব হত না। সত্যি রমলা, তুমি যে সুখে আছ, এ দেখে আমারও খুব ভালো লাগছে।
অপরেশ বললেন, আপনারা একটু দাঁড়িয়ে কথা বলুন। আমি এক মিনিট আসছি। আমি রমলাকে জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় গেল তোমার স্বামী?
চুরুটের বাক্স কিনতে।
খুব চুরুট খান বুঝি?
হুঁ! আর কোনো বিশেষ নেশা নেই—কিন্তু চুরুট না হলে চলে না। সবসময় হাতে চুরুট থাকা চাই। এক এক দিন চায়ের মধ্যে চুরুটের ছাই পড়ে যায়! মশারির মধ্যে ঢুকেও—
আমি হাসতে লাগলুম। রমলা বলল, ওর বাবাও এমন চুরুট খান—
আমার মনে হল, অপরেশ বোধহয় আমাদের দুজনকে নিরালায় দু-একটা কথা বলার সুযোগ দেবার জন্যই ছুতো ধরে চলে গেল। কিন্তু সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা অপরেশ আর তার বাবার চুরুট খাওয়ার নেশা নিয়েই কথা বলতে লাগলুম।
তা ছাড়া আর কিই-বা বলতে পারতুম! বলা যায় কি, রমলা আমাকে তোমার মনে পড়ে? নাঃ! আমারই ওকে মনে পড়ে না—ওরই বা পড়বে কেন? কিংবা, একথাও কি বলা যায়, তোমার মনে আছে তোমার সেই প্রতিজ্ঞা? তোমাদের ছাদের চিলেকোঠায়, সরস্বতী পুজোর রাত্রে তুমি বলেছিলে, তোমার বুকের বাঁ দিকটা আমার। আমি যখন খুশি দাবি করতে পারি—বুকের ওপরটা বা ভিতর যা ইচ্ছে। না, এরকম দাবি জানাবার ইচ্ছেও আর আমার মনে পড়েনি।
কোনোদিন যদি চুরুট একেবারে ফুরিয়ে যায় তখন কী করে জান? সাদা কাগজ মোটা করে পাকিয়ে—হাতে ধরে থাকে। মাঝে মাঝে কাগজটা মুখে টানার ভান করে, অন্যমনস্কভাবে অবিকল চুরুটের ছাই ঝাড়ার মতো আঙুল দিয়ে টোকা দেয়। নেশাটা মুখের না হাতের…আমার…
রমলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমিও হাসছিলুম। অপরেশ ফিরে এলেন এর মধ্যে। এবার অপরেশের মুখের হাসিটা আর দেখা যায় না। আমি বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলুম, কোনো বিশেষ কাজে যাচ্ছিলেন নাকি? নইলে, আসুন না, একটু বসে চা খাওয়া যাক। অপরেশ বললেন, না আমার একটু তাড়া আছে।
কত আর সময় লাগবে! একটু চা খেয়ে যাওয়া—
অপরেশ ভ্রূকুটি করে বলল, বাঃ, আমি থাকব কী করে? অলি মাসির বাড়ি আমি যাব বলে কথা দিয়েছি! তুমি একা গেলে কী ভাববেন ওঁরা।
তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, আজ চলি! একদিন আসুন না বাড়িতে!
আমি আর বিশেষ জোর করলুম না! রমলার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে পরে ঘাড় ঘুরিয়ে অপরেশকে একবার নমস্কার জানালুম। অপরেশ ততক্ষণে এগুতে শুরু করেছে।
রমলা ওর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলল, অথচ ঠিকানা দিয়ে গেল না। তার মানে ওটা কথার কথা। অথবা ধরেই নিয়েছে আমি যাব না, বা যাবার দরকার নেই আমার।
কিন্তু সেই পড়ন্ত বিকেলে ওদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ায় আমার বেশ ভালো লাগছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের সঙ্গে বসে একটু গল্প করি, প্রচুর হাসাহাসি হোক, অপরেশের সামনে রমলাকে দু-একটা পুরোনো কথা তুলে লজ্জা দিই—যাতে অপরেশও প্রচুর মজা পেয়ে হাসতে পারে।
ছ-সাত বছর ওদের কথা একেবারেই ভাবিনি কিন্তু সেই দেখা হওয়ার পর, একদিন আমি এক বন্ধুকে টেলিফোন করার জন্য গাইডের পাতা ওলটাতে অন্যমনস্কভাবে অপরেশ রায়ের নাম খুঁজতে লাগলুম। অফিস থেকে কোয়ার্টার দিয়েছে যখন, তখন বাড়িতে ফোন থাকা খুবই স্বাভাবিক। গাইডে তিনজন অপরেশ রায়—গড়িয়াহাটের ঠিকানা যার—আমি তার নম্বর ঘোরাতে লাগলুম। এখন দুপুরবেলা—অপরেশের বাড়িতে থাকার কথা নয় যদিও।
রমলা আমাকে কখনও টেলিফোন করেনি কিন্তু গলা শুনেই আমি চিনতে পারলুম। আমি বললুম, রমলা, আমি।
ওপাশে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। তারপর শান্তসুরে জিজ্ঞেস করল, এতদিন পর তুমি হঠাৎ ফোন করলে যে?
আমায় চিনতে পারছ তো?
হ্যাঁ। কিন্তু এতদিন পর!
এতদিন পর হঠাৎ সেদিন দেখা হল কিনা। তুমি কেমন আছ?
আমি ভালো আছি। কিন্তু তুমি আর কোনোদিন ফোন করো না।
সে কী! রমলা, আমার তো কোনো খারাপ মতলব নেই। এমনিই তো শুধু—
না, লক্ষ্মীটি। ও তোমার জন্য এখনও কষ্ট পায়।
কে? অপরেশ? আমার জন্য? কেন?
কেন, তুমি জানো না?
আমি কী করে জানব? আমি ওর মনের কথা কী করে বুঝব?
ও ভাবে, তোমার সঙ্গে এখনও আমার লুকিয়ে দেখা হয়।
যাঃ। সাত বছরেও…
অথবা…
অথবা কী?
ও ভাবে, আমি তোমার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কখনও কাঁদি।
সত্যি কাঁদ নাকি?
আমি টেলিফোনে অনেকখানি হাসি পাঠিয়ে দিলুম রমলার কাছে। বললুম, যতসব পাগলের কাণ্ড! অপরেশকে দেখে মনে হল বেশ বুদ্ধিমান, সপ্রতিভ লোক। সে সাত বছরেও নিজের স্ত্রীকে চিনতে পারল না? সাত বছর আগে যা চুকে গেছে—
হ্যাঁ, চুকেই তো গেছে। কিন্তু, তুমি আর কোনোদিন ফোন করো না লক্ষ্মীটি। আমরা তো দুজনে আর কেউ কারোর নই—তবে কেন আর—
আচ্ছা, ফোন করব না আর কখনও। কিন্তু রমলা, আমার ইচ্ছে ছিল, অপরেশের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হোক—তাহলে হয়তো ওর ভুল ভেঙে যাবে। ও তো আগে সবই জানত। জানত—তুমি ইচ্ছে করেই ওকে বিয়ে করেছ—কেউ তোমাকে জোর করেনি। আমার সাধ্য ছিল না তোমাকে আঁকড়ে রাখি।
প্লিজ, নীলুদা, ওসব কথা থাক। তুমি আমাকে ভুলে যাও। আর কোনোদিন—
লাইন ছেড়ে দিল। আমি দুঃখিত হাতে কিছুক্ষণ রিসিভারটা ধরে রইলুম তবু। কড়-র-র শব্দ হতে লাগল। আমি রিসিভারটা একবার রেখেই আবার তুলে নিয়ে সেই একই নম্বর আবার ডায়াল করলুম। ওপাশ থেকে তুলতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে বললুম, রমলা, আবার আমি—
নীলুদা। তুমি আমার সঙ্গে শত্রুতা করতে চাও?
না, রমলা। আমায় বিশ্বাস করো। আমি তোমাকে সুখী করতে চাই। আমি আর কোনোদিন তোমাকে ফোন করব না। পথে দেখা হলেও এড়িয়ে যাব। সত্যি রমলা, তোমাদের জীবনে একটুও ব্যাঘাত করার ইচ্ছা নেই আমার। ভেবেছিলুম বন্ধুর মতো একটু দেখাশোনা করে গল্প-গুজব করব। তাও দরকার নেই। কিন্তু অপরেশের কথা শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল, সে বুদ্ধিমান ছেলে, লেখাপড়া শিখেছে—কিন্তু এ কীরকম মন তার। সাত বছর আগেকার ব্যাপার সে মনে পুষে রেখেছে? সেদিন তো দেখে কিছু বুঝতে পারিনি।
ওই যে সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, ইচ্ছে করে একটুক্ষণ আড়ালে চলে গেল। ধরেই নিয়েছিল, তোমার সঙ্গে আমি গোপন দুঃখের কথা বলব।
গোপন দুঃখ? তা নিয়ে আবার মুখে কথা বলা যায় নাকি? কী সর্বনাশ। অপরেশ কি তোমাকে কষ্ট দেয়?
মোটেই না। নিজেই মন খারাপ করে। প্রায়ই বলে, আমি ওকে ভালোবাসি না। কারণ আমি নাকি তোমাকে ভুলতে পারি না।
ইশ, ছি ছি। আচ্ছা, আমি আর এর মধ্যে থাকতে চাই না। আমি আর কোনোদিন তোমাদের মধ্যে আসব না। অপরেশ কোন অফিসে চাকরি করে?
কেন? তুমি জানতে চাইছ কেন?
কোনো ভয় নেই তোমার, রমলা। আমি তোমাকে আমার পুরোনো গলায় বলছি, কোনো ভয় নেই। আমাকে প্রায়ই নানা কাজে অনেক অফিসে যেতে হয়, অপরেশের অফিসের নামটা জেনে রাখি—সেখানে কোনোদিন যাব না। যাতে কোনোদিন ওর সঙ্গে হঠাৎও আর দেখা না হয়।
আলফা এক্সপোর্ট। স্টিফেন হাউসে অফিস।
আচ্ছা রমলা, আমি ছেড়ে দিচ্ছি এবার। রমলা আমরা অনেক দূরে সরে গেছি।
এতদূর থেকে কেউ কারুর দিকে হাত বাড়াতে পারি না? আমার দিক থেকে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার। যাই—আর কোনোদিন হয়তো দেখা হবে না।
নীলুদা, তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ তো?
ক্ষমার কথা উঠছে কীসে? রমলা, ছেলেবেলাতে আমি যা করেছি—তার জন্য আমি কোনোরূপ অনুতাপও করি না, আবার অতৃপ্তির হাহাকারও নেই। ছেলেবেলায় যা করেছি, তা ছেলেবেলাতেই মানায়, এখন যেমন মানায়—সেই রকম ভাবেই বেঁচে আছি। কোথাও কোনো দুঃখ নেই। তুমি ভালো থেকো রমলা।
আচ্ছা!
এর পরদিন আমি যা করলুম, তার ঠিক যুক্তি হয়তো দেখাতে পারব না। আমি লোকটা তেমন খারাপ নই—স্বাভাবিক মানুষ যেমন হয়—সেই রকম। তবে, নিজের কয়েকটি ইচ্ছার আমি নিজেই যুক্তি খুঁজে পাই না। যেমন, একদিন আমি পার্কে আলুকাবলি খেয়ে বেরিয়েছি, খুব ঝালে ঠোঁট উস উস করছি—দুহাতে লঙ্কার গুঁড়ো, নুন আর ঝোল লেগে আছে—হাত মোছা হয়নি। কোথায় হাত মুছব ভাবছিলুম—পকেট থেকে রুমাল বের করে মোছা যায় কিন্তু সেই রুমাল দিয়ে ভুল করে যদি কখনও মুখ মুছতে যাই—তবে চোখের সর্বনাশ হয়ে যাবে। কী করব ভাবছিলুম, সেই সময় একটি সুবেশ যুবকের দিকে আমার চোখ পড়ে। চমৎকার চেহারা, খুব দামি পোশাক পরা—পরিচ্ছন্ন চেহারার যুবকটি পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ আমার ইচ্ছা হল, সেই যুবকটির গায়ের জামায় হাত দুটি মুছে দিই! ভাবতেই আমার হাসি পেল, এখন সোজা গিয়ে যদি ওর ফর্সা জামায় আমার হাত দুটি ঘষে দিই—কী অবস্থা হবে? যুবকটি হয়তো কোনো নারীর জন্য অপেক্ষা করছে—তাহলে … আমার ইচ্ছাটা এমন প্রবল হল যে, আমি ওর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালুম। কিন্তু সামনা-সামনি হাতে ঘষে দেব তত সাহস আমার নেই। কিন্তু প্রবল ইচ্ছা হতে লাগল। ছেলেটির চোখে কালো গগলস—সেই দেখেই কিনা, হঠাৎ আমার মনে হল, ছেলেটি আমার শত্রু, এর ওপর প্রতিশোধ নিতেই হবে—অথচ ওকে আমি কোনোদিন দেখিনি।
যুবকটি হাঁটতে শুরু করতেই আমি ওকে অনুসরণ করলুম। দশ মিনিট হাঁটল সে—আমিও ওর পিছনে পিছনে যাচ্ছি। তখন আর আমার ফেরার উপায় নেই, তাহলে আমি ওর কাছে হেরে যাব। আমার হাতের পাঞ্জা দুটি খোলা—তখনও লঙ্কা তেঁতুলের টক লেগে আছে। হাজরার মোড় থেকে ছেলেটি একটি বাসে উঠল। সেই আমার সুযোগ—আমিও বাসে উঠে পড়লুম—খুব ভিড় ছিল, ভিড় ঠেলে আমি ওর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়েছি এবং এক সুযোগে ওর পিঠে এঁকে দিয়েছি, আমার দু হাতের ছাপ। তারপরেই জয়ের গর্বে মন ভরে তুলতে—আমি নেমে পড়েছি বাস থেকে।
বোধহয় সেইরকম কোনো যুক্তিতে, আমার বার বার মনে হতে লাগল, অপরেশের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করা দরকার। সে আমাকে শত্রু ভাবছে, অথচ আমি তো সত্যই তার বন্ধু। রমলাকে সে বিয়ে করে সুখী করেছে—সে আমার বন্ধু হবে না? আমি রমলাকে এক সময় পাগলের মতো ভালোবাসতুম—এখনও ভালোবাসি নিশ্চয়ই। যদি দেখতুম রমলার স্বামী একজন কুচ্ছিত গরিব লোক কিংবা মাতাল লম্পট জুয়াড়ি—তার ওপর আমি নিশ্চিত রেগে যেতুম, সে হত আমার শত্রু। কিন্তু অপরেশ অমন দৃপ্ত স্বাস্থ্যবান—সে রমলাকে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে—সে আমার শত্রু হবে কেন?
এতসব ভাববার আগেই কিন্তু আমি আলফা এক্সপোর্ট কোম্পানির অফিসে ঢুকে পড়েছি। আলাদা ঘরের সামনে অপরেশের নাম লেখা—বেশ বড়ো অফিসারই মনে হল। বাইরের কোনো বেয়ারার হাত দিয়ে স্লিপ পাঠালে যদি অভিমানী অপরেশ আমার সঙ্গে দেখা করতে না চায়, এই ভেবে আমি দরজা খুলে সোজা ঘরে ঢুকে পড়লুম।
আমাকে দেখে অপরেশ নিশ্চিত খুবই অবাক হয়েছেন—কিন্তু অফিসাররা মুখের বিস্ময় লুকোতে জানে। ফাইলে মুখ গোঁজা ছিল, মুখ তুলে নির্বিকারভাবে বললেন, কী ব্যাপার?
আমি বললুম, পাশের অফিসে আমার এক বন্ধু কাজ করে, তার ওখানেই আপনার নাম শুনে ভাবলুম একবার দেখা করে যাই। খুব বেশি ব্যস্ত ছিলেন নাকি!
না খুব নয়।
অপরেশ তখনও আমাকে বসতে বলেননি। সে অভিমান করে আছে। কিন্তু আমার এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে কিছু মনে করলে চলে না। আমি নিজেই চেয়ার টেনে বসলুম। বললুম, সেদিন পথে দেখা হল কিন্তু আপনার সঙ্গে ভালো করে কথাই হল না।
হুঁ।
এ অফিসে কতদিন আছেন?
একটা কথা আগে জিজ্ঞেস করে রাখি। আপনি নিশ্চয়ই আপনার ভাইপো বা বন্ধুর ভাইয়ের জন্য চাকরির উমেদারি করতে আসেননি? এখন লোক নেওয়া হচ্ছে যদিও কিন্তু আমাদের অফিসে ওসব চলে না।
এ যে স্পষ্ট অপমান। এ কথায় আমার খুব রেগে ওঠাই উচিত ছিল বোধহয়। তবু হেসে বললুম, না আমি কারুর চাকরির জন্য আসিনি। আমার নিজের জন্যও নয়। আমি আন্তরিকভাবেই দু-একটা কথা বলতে এসেছিলাম।
আমার কাছে? হঠাৎ!
আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করছেন না। তার কারণ হয়তো—
কোনোই কারণ নেই। আপনার সঙ্গে আমার কোনোদিনই ভালো করে পরিচয় ছিল না—হঠাৎ অর্ধপরিচিত লোকদের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা করা আমার স্বভাবও নয়। আমার স্ত্রীর মাকে আমি মা বলে ডাকি, তা বলে আমার স্ত্রীর সব বন্ধুদেরও আমি বন্ধু ভাবব, তার কী মানে আছে?
‘স্ত্রীর বন্ধু’ বলতে আপনি ঠিক কী ভাবছেন?
ঢং ঢং করে বেল টিপে অপরেশ বেয়ারাকে ডাকলেন। তারপর রুক্ষ গলায় বললেন নন ফেরাস মেটালের ফাইলটা এখনও পেলাম না কেন?
অপরেশের সঙ্গে ওর অফিসে এসে দেখা না করলেই ভালো হত—অফিসের বাইরে ছুটির পর দাঁড়িয়ে থাকাই উচিত ছিল আমার। এইসব অফিসারদের ব্যবহার এমন হাস্যকর হয়—যতক্ষণ নিজের কামরায় বসে থাকে! বাইরে বেরুলেই এরা সাধারণ মানুষ কিন্তু নিজের এই পার্টিশন করা ঘরের মধ্যে টেবিলের উলটোদিকে নিজের ঘুরোনো চেয়ারে বসলেই আর কিছুতে মুখের ভাব সরল করতে পারে না। কার্টুনের মতো মুখভঙ্গি করে থাকে। অপরেশ আমার দিকে ফিরে আবার বললেন, বলুন।
আমি চেয়ারটাকে টেবিলের আরও কাছে টেনে আনলুম। আমার মুখে হাসি। বললুম, আপনার সময় জরুরি। সুতরাং অল্প সময়ে স্পষ্ট করে কথা বলে যাই। সেদিন আপনাদের দেখে একটা কথা মনে হল। আপনি আমাকে পছন্দ করছেন না। না করুন, কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু মনে কোনো জ্বালা রাখবেন না। রমলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল—একথা জেনেও আপনি ওকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু তারপর আর ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ছেলেবেলায় এরকম বন্ধুত্ব অনেকেরই থাকে—আপনারও হয়তো কোনো মেয়ের সঙ্গে ছিল। বিয়ের পর আর ওসব কে মনে রাখে? রমলাকে আমার মনেও পড়ে না।
আপনি এসব কথা আমাকে বলতে এসেছেন কেন দয়া করে সেটা জানাবেন কি? রমলাকে আপনি মনে রেখেছেন কি রাখেননি এটা শুনে সে দুঃখিত বা খুশি হতে পারে—কিন্তু আমার কি করার আছে? আমার স্ত্রীর সব ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাব—এরকম আমি হীন নই। আপনার সঙ্গে যদি তার গোপনে সেন্টিমেন্টাল অ্যাফেয়ার থেকেই থাকে—তাতেই বা—
আমি হঠাৎ টেবিলে দুম করে একটা ঘুষি মেরে চেঁচিয়ে বললুম, যদি বলছেন কেন? বলছি না, নেই! কিছু নেই! আমার মুখ দেখে বুঝতে পারছেন না?
অপরেশের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। অহংকারী গলায় বললেন, এটা একটা অফিস, দয়া করে মনে রাখবেন। নাটক করার জায়গা নয়—
এখনও মনে হচ্ছে বুঝি নাটক করছি?
আপনি আমার কাছে মহত্ত্ব দেখাতে এসেছেন, আপনি প্রেমিক আর আমি স্বামী। অর্থাৎ আপনি হলেন নায়ক, আমি ভিলেন। আপনার আত্মত্যাগ কী অসামান্য—রমলাকে আপনি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন আবার এসেছেন উদারতা দেখাতে—আপনি ব্যর্থ প্রেমিক—আপনি এসেছেন নায়িকাকে সুখী করতে! আমার কিছু যায় আসে না, আপনি রমলার সঙ্গে ব্যভিচার করুন কী মনের দুঃখে আত্মহত্যা করুন, আমার কিছু যায় আসে না। দয়া করে শুধু আপনার ওই ফিলথি ফেস আমাকে আর দেখাবেন না।
অপরেশবাবু শুনুন—
আপনি যদি এখন চলে না যান, আমাকে ইংরেজিতে গেট আউট বলতে হবে। সেটা খুবই কর্কশ শোনাবে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে ভর দিয়ে অপরেশের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলুম।
সেই হাসি দিয়ে আমি ওকে বললুম, তুমি একটা বিষম বোকা লোক।
সেখান থেকে বেরিয়ে আমি সোজা চলে এলাম গড়িয়াহাটায়। ঠিকানা খুঁজে পেতে দেরি হল না। তেতলায় তিনটে ঘরের ফ্ল্যাট। রমলা দরজা খুলতেই আমি জোর করে ঢুকে পড়লুম।
বিবর্ণ মুখে রমলা বলল, নীলুদা, একি সর্বনাশ করতে এসেছ আমার?
আমি দুহাতে জড়িয়ে ওকে বললুম, মিলু, আমাকে দয়া কর, দয়া কর। সাত বছর তোমাকে দেখিনি, আমি তো বেশ ছিলুম। কিন্তু সেদিন তোমাকে একবার দেখে আমার বুকের মধ্যে আবার সব ওলট-পালট হয়ে গেছে। আমি আর থাকতে পারছি না। এখন বুঝতে পারছি, মিলু, এই সাত বছর আমি তোমার কথাই ভেবেছি। তোমাকে ছাড়া আমি কী করে বাঁচব মিলু?
না, না, নীলুদা, ও যে-কোনো সময়ে এসে পড়বে, এখন যাও, তোমার পায়ে পড়ি—
না, আসবে না। অফিস ছুটি হতে অনেক দেরি। তার আগে আমি তোমার সামনে বসে একটু কথা বলতে চাই।
সাড়ে চারটের সময় আমার ছেলেকে আনতে যেতে হবে স্কুল থেকে। নীলুদা, তুমি যাও।
সাড়ে চারটেরও একঘন্টা দেরি। মিলু, আমাদের আগেকার সবই কি মিথ্যে হয়ে গেল?
নীলুদা, তুমি কেন বিয়ে করোনি? কেন আমাকে ভুলে যাওনি। এ আমি সহ্য করতে পারব না।
আমি আর অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারি না। আমি আজ তোমার কাছে আমার দাবি জানাতে এসেছি। তোমার বুকের বাঁ দিক আমার ছিল। আমি আমার জমি আবার উদ্ধার করে নিতে চাই।
রমলার মসৃণ, সৌরভময় শরীর আমার বাহুর মধ্যে। আমি বুঝতে পারলুম ওর শরীর কাঁপছে। হয়তো আমার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়—কিন্তু ওর একটা হাত আমার পিঠে। আমি ওর মুখ উঁচু করে কপালে ও ঠোঁটে চুমু খেলুম। মনে হল, ওর একটা ঠোঁট ঠান্ডা, একটা ঠোঁট উষ্ণ। আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এলুম।
রমলা ঠোঁটে হাত চেপে আর্তকণ্ঠে বলল, না, না, আমি পারব না, আমার ঘর সংসার সব ভেসে যাবে। আমি পারব না। তাহলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। কিন্তু আমার ছেলে আছে—
রমলার পায়ের কাছে বসে বললুম, মিলু, এবার তোমার পা দুটো আমার বুকের ওপর রাখি। বিশ্বাস করো, আমি সাত বছরে একটুও বদলাইনি। আমি দুর্বৃত্ত ডাকাত হয়ে যাইনি, কিছুই কেড়ে নেব না জোর করে। …আমি নিজেকে বুঝতে পারি না …কাল পর্যন্ত জানতুম, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ ভুলে গেছি, তোমার প্রতি আমার কোনো লোভ নেই—কিন্তু আজ অপরেশের সঙ্গে দেখা করার পর—
তুমি ওর সঙ্গে দেখা করেছিলে? কেন? তবে যে আমাকে কথা দিয়েছিলে—
জানি না। কেন যে দেখা করতে গেলাম জানি না। কিন্তু অপরেশ আমাকে অপমান করল—
রমলা আমার বুকের ওপর এসে হুহু করে কাঁদতে লাগল। ফিসফিস করে বলল, আমিও তোমাকে ভুলতে চেয়েছিলাম, ভুলতে পারিনি, অনেক চেষ্টা করেছি—ও আমার মুখ দেখে ঠিকই বুঝতে পারত—কিন্তু তুমি আবার কেন এলে? কেন?
জানি না। এক ঘন্টা আগেও ভাবিনি, তোমার কাছে কখনও আবার আসব। কিন্তু দেখলুম অপরেশ নির্বোধ।
সাত বছর আগে তুমি আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলে কেন?
সে কথা সাত বছর আগে জানতুম। এখন ভুলে গেছি! এই সাত বছরে তুমি আরও সুন্দর হয়েছ। কিন্তু তোমার শরীর এখনও আমার কাছে ঠিক সেই রকম চেনা।
তোমার চেহারা এমন রুক্ষ হয়ে গেছে কেন?
যদি বলি তোমার জন্য, তাহলে কি খুশি হবে? কিন্তু তা বোধহয় সত্যি নয়। মিলু, এখন যদি অপরেশ এসে পড়ে?
তাহলে আমাকে বিষ খেয়ে মরতে হবে—
না, না, তুমি মরবে কেন? কিন্তু আমাকেও যেন জানালা দিয়ে লাফাতে বলো না। তিনতলা থেকে আমি লাফাতে পারব না। বাথরুমেও লুকোতে পারব না। বাথরুমের মধ্যে আমি ধরা পড়তে চাই না। খাটের তলায়ও ঢুকে থাকা অসম্ভব।
ওখানে নিশ্চয়ই আরশোলা আছে।
নীলুদা, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ, সত্যি করে বলো?
আমি রমলার চুলের মধ্যে হাত বুলতে বুলতে বললুম, অপরেশ আমাকে আসতে বলল।
কী।
আমি অপরেশের কাছে গিয়েছিলাম। দেখলুম, ও একটা বোকা অহংকারী। ও আমার মুখ দেখে বুঝতে পারল না যে, আমি সত্যি কথা বলেছি! ও আমাকে অপমান করে সুখী হতে চায়। যেমন, ও তোমাকে চিরকাল সন্দেহ করেই সুখে থাকবে। ও তোমার ওপর অত্যাচার করবে না কোনোদিন। তোমাকে সন্তান দেবে, সম্পদ দেবে—তোমাকে ভালোবাসবে—কিন্তু সন্দেহ করে যাবে বহুদিন, সারাজীবন। আমার কাছ থেকে তোমাকে জয় করে নিয়েছে—এটা যেমন ওর গর্ব, তেমনি স্বামী হিসেবে তোমাকে সন্দেহ না করলে ওকে মানায় না—এ কথাও ও জানে। অর্থাৎ তোমার গোপন প্রেমের দুঃখ সত্ত্বেও—সবল সুস্থ স্বামী হিসেবে ও তোমাকে অধিকার করে আছে—এই হবে ওর সারাজীবনের অহংকার।
নীলুদা, তুমি কী বলছ।
ঠিক বলছি। ওর কাছ থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ আমার মনে হল, তাহলে আমিও বা কেন ক্ষতি স্বীকার করবো। আমি চাই তোমাকে দেখতে, আমি চাই তোমাকে ছুঁতে, তোমার বুকের গন্ধ শুঁকতে। সন্দেহ যখন ও করবেই—তখন আমি কেন ফিরে আসব না? শুধু গোপনতা রক্ষা করাই যথেষ্ট। অপরেশ এমন দুর্বল নয় যে, দুপুরে হঠাৎ অফিস থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর ওপর গোয়েন্দাগিরি করবে।
রমলা আমার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ব্লাউজের বোতাম আঁটতে আঁটতে বলল, কিন্তু আমি পারব না। এরকম আমি কিছুতেই পারব না। তুমি ওর দিকটাই ভেবে দেখছ, আমার কথা ভাবছ না? আমি কেউ নই, আমি একটা খেলনা? এতদিন আমি মনে মনে জানতাম, আমি বিয়ের পর থেকে ওর সঙ্গে কোনো ছলনা করিনি। মনে মনে তোমাকে ভুলতেই চেয়েছি। কিন্তু এখন ওর সঙ্গে অভিনয় করতে হবে নিয়মিত—সে গ্লানি আমি সইব কী করে?
তবে কি তুমি আমার সঙ্গে চলে আসবে?
কোথায়? সেদিন কাপুরুষের মতো দূরে সরে গিয়েছিলে, আজ আর কোথায় যাব! আজ তোমার সঙ্গে যেতে আমাকে যত মূল্য দিতে হবে—ভালোবাসার জন্য ততটা কি মূল্য দেওয়া যায়? না, যায় না!
ঠিক। শুধু ভালোবাসার জন্য কে আজকাল দুঃখকষ্ট সহ্য করতে চায়। অপরেশ জানে না, প্রেমিকরা আজকাল আর নায়ক নয়, স্বামীরাই নায়ক! নাটক নভেলে সেই পুরাতন ব্যাপার দেখা গেলেও জীবন এখন বদলে গেছে। প্রেমের জন্য কে আর আত্মত্যাগ করতে চায়। সব প্রেমিকই এখন ব্যর্থ প্রেমিক।
আমি আর একটা চুমু খেয়ে মিলুর চোখের জল মুছে নেব ভেবেছিলুম—এমন সময় দরজায় ধাক্কা পড়ল। মিলু ঝট করে ঘুরে সরে দাঁড়িয়ে বলল, এবার? এবার আমার কী হবে?
আমি জিজ্ঞেস করলুম, অপরেশ নাকি?
নিশ্চয়ই।
যাঃ, তা হতেই পারে না। প্রতিবেশী হতে পারে, কোনো সেলসম্যান বা তোমার ঝি নেই।
হিংস্র চোখে রমলা বলল, আমি ওই আওয়াজ চিনি। শেষে তুমি আমার সর্বনাশ করে গেলে।
সর্বনাশ কী মিলু। আমি তো তোমার পাশেই আছি!
রমলার চেহারা কী রকম হিংস্র হয়ে উঠেছে। বিস্রস্ত চুল, অল্প অল্প কান্নায় ফুঁসছে। দরজায় আবার ধাক্কা পড়তেই আমি দরজাটা খুলতে এগিয়ে গেলুম।
রমলা বললো, চুপ।
আমি বললুম, তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে দেওয়াই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক।
রমলা অল্প অল্প কান্নার আওয়াজ করতে করতে বলল, তুমি আমার কেউ নও। শুধু শুধু তুমি আমার সঙ্গে খেলা করতে এসে সর্বনাশ করে গেলে। আমি তোমাকে কোনোদিনও ভালোবাসিনি।
কিন্তু আমি এ ঘরে প্রথম ঢোকার পরই তুমি আমার আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছিলে।
চুপ। বলেই পাগলাটে ধরনের রাগে রমলা কী একটা পেপারওয়েট না অন্য কোনো ভারী জিনিস ছুড়ে মারল আমার দিকে। ওর ব্যবহার এমনই অস্বাভাবিক যে আমি মুখটা সরিয়ে নিইনি। সোজা এসে সেটা আমার কপালে ও নাকে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝিম ঝিম করে উঠলেও মনে হল ভাগ্যিস চোখে লাগেনি! আমার সাধারণ শরীর, তাই নাক দিয়ে বেশ রক্ত বেরিয়ে এল। আমি রুমাল দিয়ে নাকটা চেপে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলুম। রমলা আরও কি একটা যেন ছুড়ে মেরেছে আমাকে। কিন্তু ততক্ষণে আমি দরজা খুলে দিয়েছি।
একটা ফুটফুটে ছ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে, অপরেশ নয়। রমলার ছেলে—একাই বা কারুর সঙ্গে ফিরে এসেছে। ভারী সুন্দর দেখতে হয়েছে তো ছেলেটাকে। মায়ের মুখ পেয়েছে।
ছেলেটা ঘরে ঢুকতেই, ঘরের কোণ থেকে এগিয়ে এল রমলা। রমলার কপালের টিপটা ধেবড়ে গেছে, চোখের পাশে শুকনো কান্না। কিন্তু এতটুকু ছেলের চোখে কি এসব ধরা পড়বে?
রমলার মুখের চেহারা আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। জিজ্ঞেস করল, তুই কার সঙ্গে এলি?
বিলটুদের গাড়িতে। তুমি এলে না।
নীলুদা, তুমি একটু বেঞ্জিন লাগাবে?
আমি হেসে বললুম, না, এমন কিছু লাগেনি। আমি যাই। আমি ছেলেটার চুলে হাত দিয়ে একটু আদর করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম—রমলা পেছন থেকে তাকিয়ে আছে কিনা তা দেখারও ইচ্ছে হল না একবার।
আমাদের মনোরমা
আমাদের মনোরমা
আমাদের এই খেপুতে জগুদার চায়ের দোকান ছিল খুব বিখ্যাত। এই খেপুতে আরও দুটো চায়ের দোকান আছে, কিন্তু সেগুলো হল রেস্টুরেন্ট। সে দুটোই বাজারের মধ্যে, একটা জুতোর দোকানের পাশে আর একটা বনশ্রী সিনেমা হলের গায়ে। সেখানে চায়ের সঙ্গে চপ-কাটলেটও পাওয়া যায়। সেই রেস্টুরেন্টে ঢুকলেই পেঁয়াজ আর বাসি মাছের আঁশের গন্ধে কেমন যেন গা গুলিয়ে ওঠে। টেবিলে ভনভন করে নীল রঙের ডুমো ডুমো মাছি, সেগুলো উঠে আসে কাঁচা নর্দমা থেকে। পয়সা খরচ করে মানুষ অমন নরকেও খেতে চায়!
আমাদের জগুদার চায়ের দোকান ছিল একদম আলাদা। এ দোকানের কোনো ছিরি-ছাঁদ নেই। বাজার থেকে অনেকটা দূরে, একটা ছোটো টিনের ঘর, সেখানে চারটে নড়বড়ে কাঠের টেবিলের সঙ্গে আটখানা চেয়ার। তার আগে দুখানা বেঞ্চি, দরজার কাছে আড়াআড়ি করে পাতা—বেশি ভিড় হলে খদ্দেররা সেখানে বসে। অবশ্য তেমন বেশি ভিড় হয় কালেভদ্রে।
জগুদার দোকানে শুধু চা আর নোনতা বিস্কুট ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায় না বেশির ভাগ সময়। আর কেউ যদি সন্ধে ছটা থেকে আটটার মধ্যে গিয়ে পড়তে পারে জগুদার দোকানে, তাহলে সে পেতে পারে তিরিশ পয়সার এক প্লেট মাংসের ঘুগনি। আহা, তার যা সোয়াদ, বহুক্ষণ জিভে লেগে থাকে। আমরা বাজি রেখে বলতে পারি অমন ঘুগনি বদ্ধোমান বা কলকেতার কোনো দোকানেও কেউ পাবে না। তা আমাদের যখন ইভিনিং ডিউটি থাকে, তখন আর ওই ঘুগনি আমাদের ভাগ্যে জোটে না। ডিউটি শেষ করে বেরুতে বেরুতে রাত দশটা বাজে, ততক্ষণে ওই ঘুগনি ফিনিশ। কত করে আমরা বলেছি, জগুদা, তোমার ওই ঘুগনি একটু বেশি করে বানালেই পারো।
জগুদা ঘাড় নেড়ে বলেছে, না ভাই, তা হয় না। ওসব মাল একসঙ্গে বেশি রান্না করলে ঠিক সোয়াদ আসে না। সে ম্যাড়মেড়ে বারোয়ারি তারের জিনিস হয়। তা ছাড়া খদ্দেরের মর্জির ওপর কী বিশ্বাস আছে? আজ তোমরা রাত দশটায় ঘুগনি খেতে এলে, কাল যদি না আসো? দোকানের মাল তাড়াতাড়ি ফিনিশ হয়ে যাওয়াই বিজনেসের লক্ষ্মী!
জগুদার মাংসের ঘুগনির নাম ছিল প্যাঁটার ঘুগনি। শুধু খেপুতে কেন, আশপাশের সাত-আটখানা গাঁয়ের কোন মানুষটা অন্তত একবার জগুদার দোকানের বিখ্যাত প্যাঁটার ঘুগনি খায়নি?
ইভিনিং ডিউটির পর আমরা অনেক সময় জগুদার দোকানে শুধু চা খেতেও আসতাম। বারো নয়া পয়সায় এক কাপ গুড়ের চা। জগুদা সবাইকে বলে দিত, এই মাগগিগন্ডার বাজারে সে চিনি দিতে পারবে না। তবে সেই গুড়ের সঙ্গে আদা-টাদা মিশিয়ে এমন চা বানাতো যে একদিন খেলে রোজ না খেয়ে উপায় নেই।
আমরা জিজ্ঞেস করতাম, কী জগুদা, তুমি কি চায়ে আফিং মেশাও নাকি? নইলে এত টানে কেন?
জগুদা হেসে বলত, হ্যাঁ ভাই, আপিং বুঝি মাগনা পাওয়া যায়? বারো নয়ার চায়ে আমি কি আপিং মিশিয়ে ফৌত হব?
জগুদার দোকানে ধারের কারবার নেই। কোনো খদ্দের এক কাপ চা নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকলেই জগুদা হাঁক দিতেন, এই মনো, টেবিল মুছে দে!
ওইটাই খদ্দেরকে উঠে যাওয়ার ইঙ্গিত।
পথ চলতি মানুষ অবশ্য জগুদার দোকানে বিশেষ আসে না। শনি মঙ্গলবারের হাটের দিনে তবু কিছু ভিড় হয়। আর বাদবাকি দিন আমাদের এই দেশলাই কারখানার ওয়ার্কাররাই আসে। কারখানার দরজা থেকে বিশ পা গেলেই জগুদার দোকান। তাও রাস্তা ছেড়ে খানিকটা দূরে মাঠের মধ্যে। দোকানের পেছনে দশ কাঠা জমি জগুদারই, সেখানে সে মটর ডাল আলুর চাষ করে। ওই দোকানেরই লাগোয়া একখানা ঘরে জগুদার শোয়ার জায়গা।
এই দোকান আমরা দেখে আসছি আজ বিশ বছর ধরে। দোকানের অবস্থা একই রকম আছে, ক্ষতিও হয়নি, বৃদ্ধিও হয়নি।
বিয়ে-থা করেনি জগুদা। নিজের বলতে কেউ নেই। তবে বছর সাতেক আগে তার এক বিধবা মাসি এসে হাজির। সঙ্গে আবার বারো-তেরো বছরের একটি মেয়ে। অবস্থার বিপাকে মাসির ভিটেমাটি উচ্ছন্নে গেছে, দু-মুঠো অন্ন জোটে না। তাই জগুদার কাছে কেঁদে পড়েছিল।
জগুদা তাদের ফেলে দেয়নি একেবারে। দোকানের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। মাসির মেয়েটি হয়ে গেল দোকানের বয়। এর আগে জগুদা নিজেই খদ্দেরের টেবিলে চা এনে দিত, তখন থেকে সেই মেয়েটা এনে দেয়। আর মাসি বাসনপত্তর মাজে, ঘর মোছে, খেতের কাজ দেখে। অনেকদিন বাদে জগুদার ভাগ্যে খানিকটা আরাম জুটল। মাঝে-মাঝে জগুদা নিজেও এক কাপ চা নিয়ে খদ্দেরের সঙ্গে গল্প করতে বসত।
আড়াই বছর বাদে সেই মাসি মারা গেল ওলাওঠায়। আমরাই কাঁধ দিয়ে মাসিকে পুড়িয়ে এসেছিলাম নদীর ধারে।
মাসির মেয়ের নাম মনোরমা। এর মধ্যেই সে দোকানের কাজ বেশ শিখে নিয়েছে। ঠিক জগুদার মতনই চা বানায়। তার হাতের প্যাঁটার ঘুগনি বুঝি জগুদার থেকেও বেশি স্বাদের। আর পয়সা-কড়ির হিসেবেও বেশ পাকা। জগুদা তার ওপরে দোকানের ভার ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তি।
মনোরমার বয়েস আর কতই বা, বড়ো জোর পনেরো-ষোলো, কিন্তু দেখে মনে হয় যেন পঁচিশ ছাবিবশ। বেশ লম্বা, বড়ো-সড়ো চেহারা। একটু মোটার দিকে ধাত। রংটা তো বেশ কালোই, তার ওপর আবার ছেলেবেলায় পান বসন্ত হয়েছিল বলে মুখে একটা পোড়া পোড়া ভাব। মনোরমার গলার আওয়াজটা অনেকটা ছেলেদের মতন। লোকের মুখে মুখে চটাস চটাস করে কথা বলে সে।
জগুদা আর মনোরমা তখন থেকে সেই দোকানঘরেই একসঙ্গে থাকত বলে কেউ কেউ অকথা-কুকথা বলতে শুরু করেছিল। লোকের তো আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই। সব সময় জিভ সুড়সুড় করে, একটা কিছু পেলেই হল। মনোরমার মতন সোমত্ত মেয়ে রাত্তির বেলায় জগুদার মতন একটা পুরুষমানুষের কাছাকাছি শোয়—নিশ্চয়ই এর মধ্যে মন্দ কিছু থাকবে। হোক না মাসির মেয়ে—কী রকম মাসি তাই-বা কে জানে!
এসব কথা জগুদার কানে আসার পর সে দুঃখ পেয়েছিল। আমরা যারা পুরোনো খদ্দের, আমাদের কাছে আপসোস করে বলেছিল, আচ্ছা তোমরাই বলো দিকিনি, এমন পাপ কথাও লোকের মনে আসে? মেয়েমানুষে আমার অরুচি, নইলে এতগুলো বছর কেটে গেল একটা কি বিয়ে-থা করতে পারতুম না? ছি ছি ছি, ঘেন্না—নিজের মাসতুতো ভগ্নী, তাকে নিয়ে এমন কথা! মেয়েটা এখানে শোবে না তো কোথায় শোবে? ও মেয়েকে যদি কেউ বিয়ে করতে চায়, আমি এক্ষুনি বিয়ে দিতে রাজি আছি। ধার দেনা করেও বিয়ে দেবো। তোমরা দ্যাখো না , কোনো পাত্তর আছে?
না, মনোরমার বিয়ে দেওয়া সহজ কথা নয়। তার পোড়া পোড়া মুখে বসন্তের দাগ—তাকে কে বিয়ে করবে? তা ছাড়া মনোরমার অমন দশাসই চেহারা, তার সঙ্গে মানাবে এমন জোয়ান মদ্দই-বা কোথায়?
আমি, রতন, পরাণ আর জিতেন—আমরা ডিউটি সেরে রোজই একবার জগুদার চায়ের দোকানে যাই। আমরা জানি, জগুদা মানুষটা মন্দ না। মেয়েমানুষের দিকে তার টান নেই সত্যিই, নইলে এতগুলো বছরের মধ্যে একদিনও তো অন্তত একটা খিস্তি-খেউড় শুনতে পেতুম ওর মুখে।
তা, জগুদা আর মনোরমাকে নিয়ে বদনামটা রটবার পর কিন্তু জগুদার দোকানে ভিড় বেশ বেড়ে গেল! এক একসময় এসে আমরাই জায়গা পাই না। মনোরমার মুখখানা নাই-বা সুন্দর হল তার জামা উপছোন বুক আর ভারী পাছার দিকে নতুন খদ্দেররা হ্যাংলার মতন তাকিয়ে থাকে। তারা দু-তিন কাপ করে চা খায়। বাজারের দুটো রেস্টুরেন্টের কোনোটাতেই তো কোনো মেয়ে এসে চা দেয় না।
এত খদ্দের বেড়ে যাওয়ায় জগুদা কিন্তু খুশি হয়নি। তার নিরিবিলি দোকানের বাঁধা খদ্দেরই পছন্দ। অচেনা খদ্দেররা কখনও একটু বেশি চেঁচিয়ে কথা বললে জগুদা হাঁক দেয় আস্তে, আস্তে, এটা হাটবাজার নয়।
যাই হোক, তবু তো বেশ চলছিল! এর মধ্যে জগুদা একটা মহা নির্বুদ্ধিতার কাজ করল। এই বছর প্রথম বর্ষার শুরুতে জগুদা একদিন হুট করে মরে গেল। মেয়ের কী দশা হবে, সেটা একবার ভাবল না পর্যন্ত।
সেদিন আমাদের নাইট ডিউটি ছিল। নাইট ডিউটি শেষ হয় ভোর সাড়ে পাঁচটায়—ডিউটি সেরে আমরা ক’জন, না, সেদিন পরাণ ছিল না, তার বদলে আমাদের সঙ্গে ছিল পঞ্চু—গুটিগুটি এলাম জগুদার দোকানে। এমন অনেকবার হয়েছে, আজ ভোরে জগুদার দোকানের ঝাঁপ ওঠেনি, আমরাই ডেকে তুলে উনুনে আঁচ দিয়েছি। অসময়ে এলেও জগুদা অসন্তুষ্ট হত না।
সেদিন এসে দেখি মনোরমা মড়াকান্না কাঁদতে বসেছে! ও দাদা, দাদাগো—বলে সুর টেনে চলেছে মনোরমা। তাকে এর আগে আমরা তো কখনও কাঁদতে শুনিনি, তার মায়ের মৃত্যুর সময়েও সে চেঁচিয়ে কাঁদেনি—সেইজন্য তার ভাঙা ভাঙা গলা শুনে আমরা একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম।
ওপাশের ঘরটায় উঁকি দিয়ে দেখি মেঝের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে আছে জগুদা। চোখ দুটো খোলা, ওরে বাবারে, ওরকম চোখ দেখলেই ভয় করে। পঞ্চু নীচু হয়ে জগুদার গায়ে হাত ছুঁয়ে বলল, এ তো একেবারে ঠান্ডা কাঠ। অনেকক্ষণ আগেই মারা গেছে।
পাশাপাশি দুটো বালিশ। জগুদা আর মনোরমা পাশাপাশি শুত তাহলে। সেমিজের ওপরে একটা আলুথালু শাড়ি জড়িয়ে মনোরমা হাপুস হয়ে কাঁদছে। আমি অন্যদের অলক্ষ্যে মনোরমার বালিশটা পা দিয়ে ঠেলে ঘরের কোণের দিকে সরিয়ে দিলাম। এরপর পাঁচটা লোক আসবে, তারা এ নিয়ে আবার পাঁচ রকম কথা বলবে, কী দরকার।
শরীরে কোনো রোগব্যাধি ছিল না জগুদার। তবু এমন করে মরে গেল কেন? সবাই বলল, সন্ন্যাস রোগ। ও রোগে মানুষ এমনিই রাত্তিরবেলাই নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে হঠাৎ চলে যায়। আমাদের পঞ্চু বলল, জগুদার নিশ্চয়ই হার্ট উইক হয়ে গেশল। হোমিওপ্যাথিতে এর ভালো চিকিচ্ছে আছে। আহা, আগে জানলে—
যাই হোক আমরা সবাই মিলে তো জগুদাকে পুড়িয়ে-ঝুড়িয়ে এলুম। কিন্তু এবার মেয়েটার কী গতি হবে? সেই কথা বলেই মনোরমা কাঁদছিল। ও মা গো, আমি এখন কোথায় যাবো গো। আমি কার কাছে যাবো!
দু-তিন দিন তো এইভাবেই কাটল। আমরা রোজই আসি। চা বন্ধ, কিন্তু এই দোকানটাতে আসাটাই যে আমাদের নেশা। গত কুড়ি বছর ধরে আসছি, হঠাৎ কি না এসে পারা যায়?
শেষে আমরাই মনোরমাকে পরামর্শ দিলাম, তুই আবার দোকান খোল দিদি। তোকে তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে, এই দোকানই তোর ভরসা। তা ছাড়া এই দোকানটাই ছিল জগুদার প্রাণ, এটাকে বাঁচিয়ে না রাখলে যে জগুদার আত্মা তৃপ্তি পাবে না।
ছ’দিনের মাথায় মনোরমা চোখের জল মুছে আবার দোকানের ঝাঁপ তুলল। আবার খদ্দের আসতে লাগল। জগতে কেউ কারুর জন্যে বসে থাকে না। অমন যে জবরদস্ত হাসি-খুশি মানুষটা ছিল জগুদা, সে চলে যাওয়ায় কিছুই ঘাটতি পড়ল না, কিছুই থেমে থাকল না।
তবে ধন্য সাহস বটে মনোরমার। ওই মাঠের মধ্যে দোকানঘরে সে একলা থাকে। যে ঘরে জগুদা মরেছে, সেই ঘরেই সে এখন একলা শোয়, একটুও ভয়ডর নেই তার। আমরা বলেছিলুম কোনো একটা বুড়ি মেয়েমানুষকে ওর কাছে রাখতে। কাজকম্মেও সাহায্য হবে, রাত্তিরেও কাছে থাকবে। মনোরমা বলেছে, তার কোনো দরকার নেই। একটা লোক রাখা মানেই তো বাড়তি খরচ।
এক বচ্ছর কেটে গেছে, এর মধ্যে একদিনের জন্যেও একটা চোর পর্যন্ত ঢোকেনি ওই দোকানঘরে। আমাদের এদিকে চোর ছ্যাঁচোড়গুলোও সব রোগা প্যাংলা, তাদের এমন সাহস নেই যে, মনোরমার মতন অমন খান্ডারনি মেয়েমানুষের ঘরে ঢোকে। মনোরমার এখন ভারভাত্তিক চেহারা, দেখে কেউ ওর বয়স বুঝবে না। আমরা জানি, ওর বয়েস বাইশ। কিন্তু লোকে ভাববে বত্রিশ।
অ্যাদ্দিন কোনো সাইনবোর্ড ছিল না, এখন মনোরমা দোকানের সামনে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। ‘জগুদার চায়ের দোকান’। জগুদা এখন নেই, তবু দোকানের সঙ্গে তার নামটা টিকে গেল।
দোকান বেশ ভালোই চালাচ্ছে মনোরমা। আমরা ক’জন হলুম’গে তাঁর গার্জেন। আমরা সবচেয়ে পুরোনো খদ্দের, আর বলতে গেলে জগুদার বন্ধুই ছিলাম, তাই, আমাদের সে অধিকার আছে। মনোরমাও আমাদের তেমনভাবেই মান্য করে। আমাদের পরামর্শ-টরামর্শও মন দিয়ে শোনে। রোজ একবার করে আমরা খবর নিতে আসি। আমি, তরুণ, পরাণ আর জিতেন, মাঝে মাঝে পঞ্চুও এসে আমাদের সঙ্গে জোটে।
আমাদের দেশলাই কারখানায় তিন-রকমের ডিউটি। ডে, ইভিনিং আর নাইট। আমাদের কোন সপ্তায় কখন ডিউটি থাকবে, তা পর্যন্ত মনোরমার মুখস্থ। সেই অনুযায়ী সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে। কখনও যদি আমাদের চারজনের এক শিফটে ডিউটি না পড়ে, তাহলে হয় গণ্ডগোল। তখন আর একসঙ্গে আসা হয় না। তবু একবার করে ঘুরে যাই সবাই।
একহাতে দোকান চালাবার ক্ষমতা রাখে বটে মনোরমা। সে-ই চা বানাচ্ছে, সে-ই ঘুগনি রাঁধছে, সে-ই টেবিল পরিষ্কার করছে। আজকাল আবার সে মামলেটও বানায়। নোনতা বিস্কুট ছাড়া, সে একটা কাঁচের বোয়ামে কেকও এনে রেখেছে।
এক এক সময় আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি তার কেরামতি। কোনো একটা খদ্দের একটা অচল আধুলি দিয়েছিল। এক পেলেট ঘুগনি আর এক কাপ চা খেয়ে সে খুচরো আট পয়সা ফেরত চাইল না। বাবুগিরির কায়দায় সে মনোরমার সামনে আধুলিটা রেখে বলল, খুচরোটা তুমিই নিও!
সে খদ্দের দোকানের দরজার কাছে পৌঁছবার আগেই মনোরমা ছুটে গিয়ে তার কাছা ধরেছে। কড়কড়ে গলায় মনোরমা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ওরে আমার ভালোমানুষের ছেলে! আমি কি তোমাকে নকল খাবার দিয়েছি যে তুমি আমাকে নকল পয়সা চালাচ্ছ?
খদ্দের যেন কিছুই জানে না , আমসিপানা মুখটি ভরে বলল, নকল পয়সা! কে বলেছে? এই তো আমি সিগ্রেটের দোকান থেকে একটু আগে ভাঙিয়ে আনলাম।
মনোরমা আধুলিটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো, সে তুমি সিগ্রেটের দোকানদারের সঙ্গে বোঝো গে। আমার খাঁটি জিনিসের খাঁটি পয়সা দিয়ে যাও!
পয়সাটা মাটিতে পড়ে ঠং করে শব্দ পর্যন্ত হল না।
খদ্দের পকেট উলটে বলল, আর তো পয়সা নেই!
খাবার বেলা সে কথা মনে ছিল না?
আমরা চারজন কোণের টেবিলে বসে মিটিমিটি হাসছি। আমরা তো জানিই, ও খদ্দের ব্যাটা বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করলে তক্ষুনি গিয়ে ওর টুঁটি টিপে ধরব। আমরা মনোরমার গার্জেনরা এখানে বসে আছি। ও ভেবেছে মনোরমা অবলা মেয়েছেলে!
আমাদের সে রকম কিছু করবার দরকার হল না। মনোরমা নিজেই দোকানের বাকি খদ্দেরের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, আপনারাই পাঁচজনে বলুন, আমি খেটেখুটে দোকান চালাচ্ছি, কোনো দিন কারুকে খারাপ জিনিস দিইনি—কাল দুটো পচা ডিম বেরুল, তাও আমি প্রাণে ধরে ফেলে দিলুম—আর আমাকে এরকমভাবে লোকে ঠকাবে? এই কি ধর্ম?
যেসব নতুন খদ্দেররা মনোরমার গতর দেখতে আসে। তারা সঙ্গে সঙ্গে বললে, খুব অন্যায়! নিশ্চয়ই ওর ট্যাঁকে আরও পয়সা আছে।
মনোরমা তখনো লোকটার কাছা টেনে ধরে আছে। লোকটার তখন কাঁদো কাঁদো অবস্থা। মনে হয় কোনো সাধারণ হাটুরে লোক। তা বলে ওকে ছেড়ে দেবার কোনো কথাই ওঠে না।
পরাণ হাঁক দিয়ে বললে, ওর জামা খুলে নে, মনো!
লোকটা হাত জোড় করে বললে, আমাকে আজ ছেড়ে দিন। আমাকে একটা শ্রাদ্ধবাড়িতে যেতে হবে। আমি কাল ঠিক এসে পয়সা দিয়ে যাবো!
শ্রাদ্ধবাড়ির কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম। রতন বললে, ব্যাটা শ্রাদ্ধবাড়িতে যাবি তো জুতো পরে যাবার দরকার কী? জুতো জোড়া খুলে রেখে যা!
লোকটার পায়ে প্রায় নতুন এক জোড়া রবারের পাম্পশু। জামার বদলে শেষ পর্যন্ত জুতো জোড়া খুলে রেখে লোকটা নিস্তার পেল। সে লোকটা আর জুতো নিতে আসেনি। জুতোজোড়া পড়েই ছিল দোকানে, শেষ পর্যন্ত আমাদের কারখানার দারোয়ান দেড় টাকা দিয়ে সে-দুটো কিনে নিল।
আর একবার একটা লোক নাকি দুপুর দুপুর এসে ইচ্ছে করে মনোরমার গায়ে হাত দিয়েছিল। পয়সা দেবার সময় ইচ্ছে করে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল একেবারে মনোরমার বুকের ওপর। ঘটনাটি আমি নিজের চোখে দেখিনি, রতনের মুখে শুনেছি। আমাদের মধ্যে শুধু রতন ছিল দোকানে।
রতন লাফিয়ে উঠে গিয়ে লোকটার ঘাড় চেপে ধরেছিল। তাকে ঠেলতে ঠেলতে দোকানের বাইরে করে দিচ্ছিল, সেই সময়ে মনোরমা এসে বলেছিল, দাঁড়াও রতনদা, এ লোকটার বেশি রস উথলে উঠেছে, একটু শিক্ষা দিয়ে দিই! এই বলে মনোরমা লোকটার নাকে এমন ঘুষি মারল যে রক্ত বেরিয়ে গেল! মনোরমার ওই গোদা হাতের মার সহ্য করার ক্ষমতা আছে কার?
মনোরমা লোকটাকে সেই অবস্থায় দোকানের বাইরে ঠেলে ফেলে দিয়ে বলেছিল, ফের যদি এদিকে আসিস তোর একটা হাড়ও আস্ত রাখব না। গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে দেব মুখে, বুঝলি।
এরপর থেকে রসিক ছোকরারা শুধু চাউনি দিয়ে মনোরমার গা চেটেই যা সুখ পায়, ধারে কাছে ঘেঁষতে আর সাহস করে না কেউ।
জগুদার সঙ্গে মনোরমার একটা ব্যাপারে বেশ মিল আছে। বেশি খদ্দের টেনে এনে বেশি লাভ করার দিকে তারও লোভ নেই। বাছাই করা খদ্দের নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট দোকান চালাতেই সে চায়। সে খাঁটি জিনিস দেবে। তার বদলে ভেজাল খদ্দের তার দরকার নেই।
যে যে হপ্তায় ইভিনিং ডিউটি থাকে, সেইসব সময়েই জগুদার দোকানে আমরা বেশিক্ষণ কাটাই। ডিউটি শেষ হয় রাত নটায়—কোনো কোনোদিন সাড়ে আটটার মধ্যেই বেরিয়ে আসি। আট ঘন্টা ডিউটির পর আমাদের শরীর ক্লান্ত থাকে তবু তখুনি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে হয় কোথাও নিরিবিলিতে বসে একটু সুখ-দুঃখের গল্প করি।
তা রাত নটার পর জগুদার দোকান একেবারে নিরিবিলিই হয়ে যায়। লাস্ট বাস চলে যায় ন’টা দশে, তারপর এ রাস্তায় তো আর মানুষজন থাকেই না বলতে গেলে। মনোরমা আমাদের ডিউটির সময় জানে , আমরা দোকানে ঢুকে বসবার সঙ্গে সঙ্গে সে চা এনে দেয়। অ্যাসট্রের ছাই ফেলে পরিষ্কার করে আনে। তারপর সে ক্যাশের সামনে বসে সারাদিনের হিসাব করতে বসে। সেই সময় সে আপন মনে গান গায়।
মনোরমার গান ভারী অদ্ভুত। তার গলা ভালো না। কথা বলার সময় তার গলাটা পুরুষমানুষের মতন হেঁড়ে হেঁড়ে মনে হয়। কিন্তু গান গাইবার সময় সে একটা অদ্ভুত সরু গলা বার করে, অনেকটা কুকুরের কুঁইকুঁই-এর মতন। যে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে সেই কুকুরই তো আবার কুঁইকুঁই করে এক সময়। মনোরমাও সেই রকম। আর রোজ সে একই গান গায় :
যে জ্বরে জ্বরেছে মা, তোর কানাই
মা, তোমায় কেমনে জানাই
এমন ছেলের এমন রোগ দেখি নাই—
শুধু ওইটুকুই আর বেশি না। ওই ক’টা লাইনই বার বার ঘুরে ফিরে গায়। এই অদ্ভুত গান। এই অদ্ভুত গান কোথা থেকে সে শিখল তাও জানি না।
রতন জিজ্ঞেস করে, আজ কত বিক্কিরি হল মনোদির?
মনোরমা উত্তর দেয়, সাতাশ তিরিশ নয়া। তা ভালোই হয়েছে।
যেদিন বিক্কিরি অনেক কম হয়, সেদিন সে কোনো আফসোস করে না। রোজই পয়সা গোনার সময় সে এ রকম সন্তুষ্টভাবে গান গায়।
এক একদিন সে আমাদের জন্য ঘুগনি বাঁচিয়ে রাখে। বিশেষ করে শনিবার। মনোরমা জানে। রবিবার আমাদের অফ ডে, তাই শনিবার রাত্রে স্ফুর্তি করি। চায়ের কাপ নিয়ে আমরা চুপচাপ বসে থাকি এক কোণের টেবিলে। কোনো কথাও বলি না। শেষ খদ্দেরটি চলে যাবার পর আমরা আড়মোড়া ভাঙি। তখন রতন বলে, মনো দিদি, চারটে গেলাস দিবি?
মনোরমা আমাদের সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে জাঁদরেল ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। তারপর চোখ পাকিয়ে বলে, এখন বুঝি ওইসব ছাই-ভস্ম খাওয়া হবে আবার?
আমাদের একজনের পকেট থেকে একটা বাংলার পাঁইট বেরোয়। আমরা বলি, এই তো এইটুকুনি, এ তো এক চুমুকেই শেষ হয়ে যাবে!
মনোরমা বলে, ঠিক? আর বেশি খাবে না?
না দিদি, আর পাবো কোথায়?
আমরা মনোরমার গার্জেন। কিন্তু এই সময় সে-ই আমাদের ওপর গার্জেনি করে। আমাদের প্রত্যেকের পকেটেই যে একটা করে পাঁইট আছে, সে কথা জানতে দিই না ওকে।
মনোরমা চারটে গেলাস নিয়ে আসে। নাক সিঁটকে বলে, ইঃ কী বিচ্ছিরি গন্ধ। তোমরা এসব খেয়ে যে কী আনন্দ পাও!
তুই একটু খাবি নাকি? তাহলে তুইও আনন্দ পাবি!
রক্ষে করো! আমার আর আনন্দ পেয়ে দরকার নেই। আমি বেশ আনন্দেই আছি!
প্রত্যেক শনিবার ঠিক এই একই কথা হয়। প্রত্যেকবারেই আমরা এতে আনন্দ পাই। মনোরমা আমাদের জন্যে চার প্লেট ঘুগনি নিয়ে আসে। তখনও গরম। আমাদের জন্য যত্ন করে ঘুগনিটা আবার গরম করেছে, এই জেনে বেশ সুখ হয়।
মনোরমা কিচেনে গেলেই আমরা পকেট থেকে বোতল বার করে আবার গেলাসে ঢেলে নিই। ক্রমে ক্রমে নেশা ধরে, আমাদের চোখ চকচকে হয়ে আসে, কপালে বিন বিন করে ঘাম। পরাণ একটু গান ধরতে গেলেই জিতেন তাকে ধমকে ওঠে, চোপ। তুই গান গাইবি না। এখন আমরা মনোরমার গান শুনবো।
রতন বলে, মনো, আমাদের কাছে একটু আয় না দিদি!
মনোরমা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, তোমরা আর কত দেরি করবে?
এই তো হয়ে এলো, আর একটু বাদেই চলে যাব। আয় না, আমাদের কাছে এসে একটু বোস, দুটো কথা বলি।
মনোরমা একটা চেয়ার টেনে এনে বসে। একটু দূরে, যাতে বাংলার গন্ধটা তার নাকে না যায়।
জিতেন বলে, ধর তো মা তোর ওই গানটা!
মনোরমা অমনি তার সেই গান ধরে, এমন ছেলের এমন রোগ দেখি নাই—
বার বার শুনতে শুনতে আমাদের ঘোর লেগে যায়। মনে হয়, আহা, কী আশ্চর্য গান! এমনি কখনও শুনিনি! পরাণ টেবিল চাপড়ে তাল দেয়। রতন আহা আহা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে।
মনো, তুই নাচ জানিস না দিদি?
মনো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, দেখবে? আমার নাচ দেখবে?
অমনি সে দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে চোখ বুজে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। ঠিক আনি মানি জানি না খেলার মতন। এই রকম বোঁ বোঁ করে ঘোরাকে যে কেন ও নাচ বলে, তা আমরা বুঝি না। তবু প্রত্যেক শনিবার আমরা মনোরমাকে নাচতে বললেই সে এরকম ঘোরে।
তখন মনোরমাকে বড়ো সুন্দর লাগে আমাদের! হোক না সে কালো, বসন্তের দাগওয়ালা পোড়া পোড়া মুখ, হাত-পাগুলো মুগুরের মতো, আর বিরাট বিরাট দুই বুক আর পাছা—তবু সুন্দর দেখায় তাকে।
মনোরমার নাচের সময় আমরা চারজন উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ি। ওর নাচটা আমাদের খেলা। আমরা বয়স্ক চারজন লোক সেই সময় খেলায় মেতে উঠি। আমরা দূর থেকে বলি, মনো, আমাদের ধর দেখি!
মনোরমা ঘুরতে ঘুরতে এসে আমাদের একজনের গায়ের ওপর পড়ে। সে তখন টুঁ শব্দটি করে না। তখন মনোকে বলতে হবে, সে কাকে ছুঁয়েছে।
মনোরমা চোখ না খুলেই তার গায়ে হাত বুলোয়। থুতনি ধরে নাড়ে, দুষ্টুমি করে কান দুটো টানে, তারপর চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ও এ তো বঙ্কুদা!
মনোরমা যখন আমাকে ধরে এরকম গায়ে মুখ হাত বুলোয়। আমার শরীরটা একেবারে জুড়িয়ে যায়। ইচ্ছে হয়, মনোরমা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে চিনতে না পারুক!
অন্যরা তখন হিংসে হিংসে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে দূরে। এক রাত্তিরে এই খেলা দু’বার খেলে না মনোরমা। সুতরাং একজনেরই ভাগ্যে শুধু মনোরমা আসে এক এক শনিবারে।
আমাদের বাড়িতে বউ ছেলেপুলে আছে। বুড়ি মা আছে, অভাব আছে, ফুটো টিনের চাল আছে। পোকা লাগা বেগুন আছে। আর অনেক কিছুই নেই। বাড়িতে গেলেই তো শুনতে পাই হ্যানো নেই, ত্যানো নেই। কিন্তু শনিবার রাত্তিরে এ সময়টা আমরা সেসব কিছু ভুলে যাই। তখন শুধু আমরা চারজন আছি, আর মনোরমা।
ছেলে-ছোকরারা হাতে পয়সা পেলেই বাজারের সিনেমা হলে ছোটে। সেখানে ধর্মেন্দর আর হেমা মালিনীর জাপটা-জাপটি দেখে তারা কী সুখ পায় কে জানে। আমাদের সিনেমা হলটাও হয়েছে এমন, হপ্তায় দুবার করে বই পালটায়। আমরা ওসব দেখতে যাই না কখনও। আমাদের মনোরমা আছে।
রাত এগারোটা সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। মনোরমা বলে, ওগো, তোমরা বাড়ি যাবে না? এরপর বাড়ি গেলে যে বউ তোমাদের প্যাঁদাবে।
আমরা হা হা করে হেসে উঠি। মনো এমন মজার কথা বলে। আমরা জানি, মনোরমা এরপরই একটা গল্প বলবে। প্রত্যেক শনিবারই বলে। বর্ধমানে ওরা কিছুদিন এক কাকার বাড়িতে ছিল। সে বাড়ির ওপরতলায় থাকত এক ভদ্রলোক আর তার বাঁজা বউ। ভদ্রলোকটি রোজ রাত্তিরে মাল টেনে আসত আর বাড়ির দরজায় ঢুকেই বলত, আর করব না, আর কোনোদিন করব না! কিন্তু তার বউ তখুনি ছুটে এসে তাকে দুমদাম করে মারত। সে কী মার! অনেক দূর থেকে সেই শব্দ শোনা যায়। লোকে শুনে ভাবে, ছাদ পেটাই হচ্ছে।
গল্প শুনে আমরা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ি। প্রত্যেক শনিবার। জিতেন পেট চেপে ধরে বলে, থাম, মনো থাম, আর বলিস না! ওসব ভদ্রলোকদের কথা আর বলিস না! টাকা রোজগার করে যে বউকে খাওয়াবে আবার সেই বউয়ের হাতে মারও খাবে, এসব ভদ্রলোকেরাই পারে!
পরাণ বলে, মনো, আমাদের মতো কেউ যদি তোকে বিয়ে করত, তুই তাকে মারতিস!
মনোরমা বলে, মারতাম না আবার! মেরে একেবারে পাট করে দিতাম।
রতন বলে, ভাগ্যিস আমি তোকে বিয়ে করিনি! তোর হাতের মার খেলে আমি মরেই যেতাম!
রতন এক-এক দিন নানারকম দুষ্টু বুদ্ধি বার করে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হঠাৎ উ-হু-হু করে ওঠে। তারপর বলে, ইস পায়ে খিল ধরে গেল। মনো একটু টেনে তোল তো আমাকে!
মনোরমা এসে তাকে টেনে তুলতেই সে মনোরমার গলা জড়িয়ে ধরে। ঠিক যেন বাতের রুগি। কিন্তু ওসব চালাকি কি আর আমরা বুঝি না!
পরাণ আজ বলে, আমাদেরও পায়ে খিল ধরেছে। কি রে বঙ্কা, তোর ধরেনি? জিতেন?
আমরা বলে উঠি, হ্যাঁ আমাদেরও পায়ে খিল ধরেছে। আমরা তো একসঙ্গে বসে আছি।
জিতেন বলে, রতনকে মনো টেনে তুলেছে। আমাদেরও টেনে তুলবে!
মনো হেসে ফেলে বলে, তোমরা সব বুড়ো খোকা! তোমাদের নিয়ে আর পারি না! এবার যাও, নইলে ঝেঁটিয়ে বিদায় করব বলছি!
ব্যাস, ওই পর্যন্ত। ওর বেশি আর আমরা এগোই না। এবার আমাদের বাড়ি ফেরার পালা। আমাদের তো ঘরসংসার আছে। একটা করে বাড়ি আছে। সে বাড়িতে কত কিছুই নেই। আমরা বেরিয়ে আসার পর মনোরমা ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। আমরা চারজন পাশাপাশি হাঁটি।
এক সময় রতন বলে, আমাদের মনো বড়ো ভালো মেয়ে।
আমরা বাকি তিনজন তখন ওই এক কথাই ভাবছিলাম।
রতন বলে, এমন ভালো মেয়ে, অথচ তার একটা বিয়ে হল না! মেয়েটা সারা জীবন এরকম কষ্ট পাবে?
আমরা আমাদের মনের মধ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখি। মনোরমার সঙ্গে বিয়ে দেবার মতো কোনো পাত্রের কথা মনে পড়ে না।
রতন কাঁদতে আরম্ভ করে। একটু নেশা হলেই কান্নাকাটি করা রতনের স্বভাব। ফোঁপাতে ফোঁপাতে এক সময় সে বলে, আমি যদি আগে বিয়ে না করে ফেলতাম তাহলে আমিই মনোকে বিয়ে করতাম। এ কথা নিশ্চয় করে বলছি। আহা মনোরমার হাতে মার খেয়েও আমার সুখ হত।
বলতে বলতে রতন হঠাৎ থেমে যায়। আমাদের চোখের দিকে তাকায়। আমরা ওর দিকে কটমট করে চেয়ে আছি। রতনটা স্বার্থপরের মতো কথা বলছে। আমরাও তো ভুল করে ফেলেছি আগে। আমাদেরও বাড়িতে প্যানপেনে রোগাপটকা, অসুখে-ভোগা, হাড়-জ্বালানি বউ আছে। তার বদলে মনোরমাকে বিয়ে করলে অনেক বেশি সুখ হত। কিন্তু, একজন কেউ বিয়ে করলেই তো মনোরমা শুধু তার হয়ে যেত। বঞ্চিত করা হত আর তিনজনকে। তখন কি আর অন্য কেউ পায়ে ঝিঁঝি ধরেছে বলে মনোরমার গলা জড়িয়ে ধরতে পারত?
না! আমরা আগে বিয়ে করেছি, ভালোই হয়েছে। আমরা কেউ আর মনোরমাকে বিয়ে করতে পারব না। সেইজন্যই, মনোরমা আমাদের চারজনের হয়ে থাকবে। তাই তো আমাদের আড্ডায় পঞ্চুকেও সঙ্গে আনি না।
আমাদের দেশলাই কারখানায় দুম করে পাঁচজন লোক ছাঁটাই হয়ে গেল। তার মধ্যে আমরা কেউ পড়িনি বটে, কিন্তু শুনছি আরও ছাঁটাই হবে। কখন কার ওপর কোপ পড়বে তার ঠিক নেই। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। বাজার খুব মন্দা! ম্যাড্রাস থেকে সস্তা দামের দেশলাই এসে বাজার ছেয়ে ফেলেছে।
ডিউটি শেষ করে বেরুবার সময় মুখটা তেতো তেতো লাগে। প্রত্যেকদিন ভয় হয়, কাল এসে কী নুটিস ঝুলতে দেখবে কে জানে। আবার কেউ কেউ বলছে, লক আউট হবে!
ব্যাজার মুখ করে জগুদার চায়ের দোকানে আসি। মনোরমা দোকানটাকে বেশ দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। প্রায় সে বলে, দোকানের জন্য এবার সে ফার্নিচার করবে। চেয়ার টেবিলগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে, কয়েকখানা না বদলালেই নয়।
আমরা মনোরমাকে ঠান্ডা মাথায় উপদেশ দিই। এক্ষুনি হুট করে কিছু করে ফেলিস না দিদি! দিন কাল ভালো নয়। হাতে পয়সা থাকা ভালো।
মনোরমা বলে, তোমরা আজকাল এত গোমড়া মুখে থাকো কেন গো? আর বুঝি এ দোকানের চায়ে স্বাদ নেই?
আমরা হাহা করে উঠি। সে কি কথা! মনোরমার চায়ের হাত দিন দিন মিষ্টি হচ্ছে। গুড় দিতে ভুলে গেলেও মিষ্টি।
আমরা মনোরমার দোকানে কখনও ধার রাখি না। এ নিয়ম সেই জগুদার আমল থেকে চলে আসছে। ধার রাখলেই ধার জমে যায়—পরে আর শোধ করা হয় না। ধার রাখলেই দোকানের মালিকের সঙ্গে ভাব নষ্ট হয়। আমরা চারজন এখন মনোরমার গার্জেন, কিন্তু কেউ বলুক দেখি কোনো একদিনও ওর দোকানে মাগনায় খেয়েছি। হাতে পয়সা না থাকলে সেদিনটা আর দোকানেই আসি না। তবে, আমরা সকলেই জানি। আমাদের একজন না গেলেও অন্য তিনজন যাবে, মনোরমার দেখাশোনা করে আসবে।
তবে, শনিবারের আড্ডায় কেউ বাদ পড়ি না। কারখানার ফোরম্যানকে ঘুষ দিয়ে হাত করা আছে, কোনো রবিবার আমাদের নাইট ডিউটি দেবে না!
শনিবার দিন পকেট থেকে আমরা মালের বোতল বার করলে প্রত্যেকবার মনোরমা বকাঝকা করে। কিন্তু আমরা জানি, শনিবারের এই মজাটুকু মনোরমাও পছন্দ করে খুব, সারা হপ্তা মনোরমাও মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাটে, ওর তো জীবনে আর কোনো আনন্দই নেই। আমাদের সঙ্গে ওইটুকু খেলাধুলোই ওর ফুর্তি।
তা এক শনিবার আমরা অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছি, শেষ লোকটা আর কিছুতেই ওঠে না। লোকটা এক টেবিলে একা বসে আছে, একটা হাত থুতনিতে, কী যেন ভেবেই চলেছে। রোগা লম্বাটে চেহারা লোকটার, জামাকাপড় বেশ ফরসা। একে আগে কখনও দেখিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, লোকটা বুঝি মনোরমার দিকে হ্যাংলা দৃষ্টি দিচ্ছে, তারপর বুঝলাম, তা না, লোকটার চোখ শুধু দেয়ালের দিকে—সে অন্য কিছুই দেখছে না।
আমাদের এ দোকান থেকে বিনা দোষে কোনো খদ্দেরকে কখনও তাড়িয়ে দিই না। কেউ যদি একটু বেশিক্ষণ বসতে চায় বসুক না! কিন্তু লোকটা এক কাপ মাত্র চা নিয়ে বসে আছে তো বসেই আছে।
রতন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ক’টা বাজল।
পরাণ বলল, ন’টা বেজে গেছে!
জিতেন বলল, লাস্ট বাস এক্ষুনি চলে যাবে বোধহয়!
আমরা ভাবলাম, যদি এসব কথা শুনে লোকটা উঠে পড়ে। ভিনদেশী লোক, লাস্ট বাস চলে গেলে ফিরবে কী করে?
লোকটা এসব কথা শুনেও উঠল না। বরং টেবিলের ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল। আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকালাম। এ আবার কী ব্যাপার!
আমরা মনোরমাকে চোখের ইশারা করলাম। মনোরমা লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে তার সেই ক্যারকেরে গলায় বলল, আপনি চা খাবেন না? এ তো অনেকক্ষণ ঠান্ডা হয়ে গেছে!
লোকটা কোনো কথা না বলে শুধু মুখ তুলে মনোরমার দিকে তাকাল।
মনোরমা আবার বললে, আমি এবার দোকান বন্ধ করব।
লোকটা আস্তে আস্তে বলল, আমি এই টেবিলের ওপর শুয়ে থাকব শুধু আজকের রাতটা।
এ আবার কেমনধারা কথা! সুবিধে মনে হচ্ছে না তো! গলার আওয়াজ শুনে মনে হল লোকটা নেশাখোর। ওসব ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই এখানে চলবে না। ও তো জানে না, আমরা মনোরমার গার্জেন, এখানে উপস্থিত আছি!
রতন উঠে গিয়ে বললে, এই যে মশাই উঠুন! এটা ঘুমোবার জায়গা নয়!
লোকটা বললে, শুধু রাতটা…এখানে থাকব…তার জন্যে পয়সা দেব।
রতন এবার লোকটার প্রায় ঘাড়ের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে বলল, ঘুমোতে হয় তো হোটেলে যান না, এখানে কেন?
হোটেল আছে এখানে?
বাজারের কাছে আছে অন্নপূর্ণা হোটেল, সোজা সেখানে চলে যান।
তাই যাব, আমাকে একটু ধরে তুলুন তো, উঠতে পারছি না।
রতন লোকটার গায়ে হাত দিয়েই চমকে বলে উঠল, ওরে বাবা, এ কী?
তারপর আমাকে ডেকে বলল, বঙ্কু, একবার এদিকে আয় তো।
আমি উঠে যেতেই রতন বলল, লোকটার কী হয়েছে, দ্যাখ তো?
লোকটা আবার ঘাড় গুঁজে শুয়ে পড়েছে। আমি তার একটা হাত ছুঁয়ে রতনের মতনই চমকে উঠলাম। লোকটার গা অসম্ভব গরম।
আমি বললাম, এ লোকটার তো খুব জ্বর হয়েছে দেখছি।
লোকটি আবার মুখ তুলল, চোখ দুটো অসম্ভব লাল। সে বলল, আমাকে একটু তুলে ধরুন, আমি ঠিক যেতে পারব।
লোকটির কথাবার্তা আমাদের মতন নয়। বোঝাই যায়, শহুরে ভদ্দরলোক। টিকোলো নাক, টানা টানা চোখ, ফরসা রং—সিনেমায় এমন চেহারা দেখা যায়। এমন লোক হঠাৎ আমাদের এখানে এসেছে কেন?
আমি আর রতন লোকটিকে দুদিক থেকে ধরে তুললাম। লোকটি মাতালের মতন টলতে লাগল। রতন জিজ্ঞেস করল, আপনার কী হয়েছে?
লোকটি বললে, মাথায় অসহ্য ব্যথা!
জিতেন চেঁচিয়ে বলল, বোধহয় ম্যালেরিয়া ধরেছে।
আমি বললাম, আপনি এই অবস্থায় যাবেন কী করে? মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন যে। আপনার বাড়ি কোথায়?
অনেক দূর।
এখানে কোথা থেকে এসেছেন?
সে কথার উত্তর না দিয়ে লোকটা বলল, আমাকে দয়া করে একটু রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিন!
মনোরমা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। এবার সে জিজ্ঞেস করল, জ্বর হয়েছে, না নেশাভাঙ করেছে?
আমি বললাম, নেশা করলে গা গরম হয় না।
রাস্তা দিয়ে কি হাঁটতে পারবে?
বোধহয় পারবে না!
তাহলে ওই টেবিলের ওপরই শুইয়ে রাখো!
এই কথাটা আমিও ভাবছিলাম। একটা অসুখে পড়া অসহায় লোককে রাস্তায় ফেলে রেখে আসার কোনো মানে হয় না। চেহারা দেখেই বোঝা যায় ভদ্রলোক, পয়সাওয়ালা বাড়ির ছেলে। সে এখানে মরতে এল কেন?
লোকটাকে আমরা টেবিলের ওপরেই শুইয়ে দিলাম। একটা ডাক্তার এনে দেখালে ভালো হত। কিন্তু অত রাত্তিরে ডাক্তারই বা কোথায় পাওয়া যাবে?
আমি বললাম, আপনি কিছু ওষুধ-টষুধ খাবেন না!
লোকটা বলল, না, দরকার নেই, কাল সব ঠিক হয়ে যাবে।
মনোরমা বলল, একটু জল দিয়ে মাথাটা ধুইয়ে দেব?
তা দাও না।
মনোরমা ঘর মোছার বালতিতে করে নিয়ে এল এক বালতি জল আর মগ। মগে করে মাথায় জল ঢালতে গিয়ে বলল, ও মা, এর মধ্যে দেখছি অজ্ঞান হয়ে গেছে। ডান পায়ের গোড়ালিটা দ্যাখো রতনদা, কতখানি ফুলে আছে , নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে পায়ে। সাপে-টাপে কামড়ায়নি তো?
রতন বলল, দূর! সাপে কামড়ালে কি এতক্ষণ কেউ কথা বলতে পারে? এমনি জ্বর-জারি হয় না মানুষের! সত্যি কি অজ্ঞান হয়ে গেছে? দেখি—রতন দু’চার বার নাড়াচাড়া দিয়ে দেখল, তবু লোকটার আর সাড়া নেই। সত্যিই অজ্ঞান হয়ে গেছে। মনোরমা তবু জল দিয়ে তার মাথাটা ধুইয়ে দিল।
এত হাঙ্গামার মধ্যে আর আমরা পকেট থেকে বাংলার বোতল বার করতেই পারিনি। রাত বাড়ছে, বাড়িতেও তো যেতে হবে।
পরাণ অধৈর্য হয়ে বলল, ও মনো চারটে গেলাস দে ভাই, আর দেরি করতে পারছিনি।
সেদিন খাওয়া হল বটে, কিন্তু জমল না। মনোরমা গান গাইল না। আমরা তাকে নাচতে বলতেও পারলাম না। ঘরের মধ্যে একটা অচেনা লোক হাত পা চিতিয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে কি আমরা আনি মানি জানি না খেলতে পারি! প্রতি শনিবার রাতে মনোরমার সঙ্গে আমাদের এই যে খেলাটা—সেটা তো সারা পৃথিবীর অজান্তে। তখন আর বাইরের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকে না। আজ শুধু আমরা চারজন আর মনোরমা। এর মধ্যে আবার এই উটকো উৎপাত এল কেন? এর বদলে একটা ডাকাত এলেও আমরা প্রাণপণে লড়াই করে তাকে মনোরমার কাছে ঘেঁষটে দিতাম না। কিন্তু এ যে একজন অসুস্থ লোক, একে রাস্তায় ফেলে দেওয়া যায় কী করে? মনোরমা এর মাথা ধুইয়ে দিলেও আমরা আপত্তি করতে পারি না।
অনেকটা ঝিম মেরে বসে থেকেই আমরা সময় কাটিয়ে দিলাম। এবার যেতে হবে। উঠে এসে আমরা প্রত্যেকে আবার লোকটার কপাল ছুঁয়ে দেখলাম। আমরা সঠিক জেনে নিতে চাই লোকটা সত্যিই অসুস্থ কিনা। যদি অসুখের ভান করে ঘাপটি মেরে থাকে, তাহলে এই দণ্ডেই আমরা ওকে লাথি মেরে বার করে দেবো।
না। গা এখনও গরম আগুন। এখনও জ্ঞান নেই। নিজের গা কেউ ইচ্ছে করে গরম করতে পারে না!
আমরা বিদায় নেবার জন্যে তৈরি হচ্ছি দেখে মনোরমা জিজ্ঞেস করল, এ এমনিই শুয়ে থাকবে? রাত্তিরে খাবে-টাবে না কিছু?
রতন বলল, খাওয়ার আর ক্ষমতা নেই।
ও রতনদা, যদি লোকটা মরে-টরে যায়?
আরে না। মরা অত সহজ নাকি? জ্বর হলে কেউ মরে না। লোকটা থাক এ রকম শুয়ে। সকাল হলে বিদায় করে দিবি।
আমরা বেরিয়ে এলাম। মনোরমা ঝাঁপ বন্ধ করে খিল লাগাল। আমাদের চার জনেরই মনের মধ্যে অস্বস্তি। আমরা মনোরমার গার্জেন , আর রাত্তিরবেলা তার কাছে আমরা অচেনা লোককে রেখে এলাম। এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী?
একটু বাদে জিতেন বলল, লোকটা কে? চোর ছ্যাঁচোড় না তো?
পরাণ বলল, দেখে তো তা মনে হয় না।
আরে রাখ রাখ! চেহারা দেখে কি আর মানুষ চেনা যায়? বড়ো বড়ো শহরের চোরদের চেহারা ওরকম ভদ্দরলোকের মতনই হয়!
তা শহরের চোর জগুদার চায়ের দোকানে কী চুরি করতে আসবে?
রাজবন্দি নয় তো? জেল-টেল থেকে পালাতে পারে!
লোকটা নাম বলেনি, ধাম বলেনি! কোথা থেকে এল!
পুলিশ-টুলিশের হাঙ্গামা হবে না তো!
রতন থমকে দাঁড়াল। চিন্তিত ভাব করে বলল, আমাদের কারো আজ রাতে মনোরমার কাছে থাকা উচিত ছিল। যদি কোনো বিপদ-টিপদ হয়।
আমরা বাকি তিনজন তীক্ষ্ণ চোখে ওকে বিঁধলাম। রতনটা স্বার্থপরের মতন কথা বলছে। আমাদের প্রত্যেকেরও কি সেই ইচ্ছে হচ্ছে না? মনোর বিপদের সময় তার পাশে বুক পেতে দাঁড়াতে কি আমরা চাই না? কিন্তু এ কথাও জানি, আমাদের মধ্যে একলা কেউ মনোর সঙ্গে সারারাত থাকলে সে একলা একলা আনি মানি জানি না খেলা খেলবে। তাতে আমাদের বাকি তিনজনের বুক জ্বলে যাবে না।
রতন আমাদের তীক্ষ্ণ চোখ দেখে থতমত খেয়ে গেল। আবার চলা শুরু করে সে বলল, বাড়ি না ফিরলে বউ কি আমাকে ছাড়বে? নিজেই ছুটে আসবে হয়তো! জানে শনিবার এই সময়টা কোথায় থাকি!
আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আমাদেরও ঘরে বউ ছেলেপুলে আছে। অশান্তি এত বেশি আছে যে আর বেশি অশান্তি ডেকে এনে কোনো কাজ নেই। মনোরমার কাছে যদি রাত্রে থেকে যাই, তাহলেই বাড়িতে অশান্তি। মনোর কাছে কেউ একা এল কিনা, সেটা দেখবার জন্যে আমরা বাকি তিনজন তক্কেতক্কে থাকি। মনোরমা আমাদের চারজনের একা কারুর না।
রোববারটা আমাদের চারজনেরই ছুটি। সকালবেলা বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়ে আমি চলে এলাম জগুদার দোকানে। আর তিনজনও এসে গেল অল্পক্ষণের মধ্যে। যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।
চায়ের জন্য তখন আর কোনো খদ্দের আসে নি। শুধু আমরাই চারজন। সেই লোকটা টেবিলের ওপর নেই।
ও মনো, মনোদিদি!
কোনো সাড়াশব্দ নেই। পিছনে রান্নাঘর। অন্যদিন তো উনুনে আঁচ পড়ে যায় এই সময়। সেখানে উঁকি দিয়ে দেখি, রান্নাঘরের মেঝেতেই আঁচল পেতে শুয়ে ঘুমুচ্ছে মনোরমা। আবার আমাদের ডাক শুনে সে ব্যস্ত হয়ে উঠে বসল। চোখ মুছে বললে, তোমরা এসে গেছ।
তুই এখানে ঘুমুচ্ছিস কেন?
ঘুমুচ্ছিলাম কোথায়, শুয়েছিলাম! সারা রাত একটু ঘুমুতে পারিনি। আমার এত ভয় করছিল!
আমরা অবাক! মনোরমার ভয়? তাকে আমরা কোনোদিন এ রকম কথা বলতে শুনিনি। বলি, কেন মনোদিদি, ভয় করছিল কেন? কী হয়েছে?
মনোরমা আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে বলল, সারারাত লোকটার বুকের মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছিল, আর মাঝে মাঝে মা মা বলে ডেকে উঠছিল। আমি ভাবছিলাম, ও বুঝি যে-কোনো সময় মরে যাবে। এ রকম একটা লোককে তোমরা এখানে রেখে গেলে কী আক্কেলে। আমার কথাটা ভাবলে না?
ভেবেছিলাম মনো, আমরা তো সারারাতই তোর কথা ভেবেছি। পাশে শোয়া রোগা বউ, ছেলেমেয়েগুলোর চ্যাঁ ভ্যাঁ কান্না, এর মধ্যেও তো আমরা তোর কথাই ভাবি। তুই ছাড়া আমাদের কী আর আছে! কিন্তু আমাদের উপায় ছিল না। ইচ্ছে থাকলেও আমরা একলা কেউ তো এখানে থাকতে পারি না। তা লোকটা গেল কোথায়? চলে গেল?
কোথায় চলে যাবে? দেখো গে শুয়ে আছে আমার ঘরে।
তোর ঘরে? নিজে নিজে উঠে গেল? তাহলে তো মানুষটা অতি বদ।
নিজে নিজে যাবে কেন! সে শক্তি কি আছে? রাত্তিরবেলা অমন ঘড়ড় ঘড়ড় করছিল, আমার ভয় হল যদি টেবিল থেকে উলটে পড়ে যায়? তাহলে তো সেই অবস্থাতেই মরবে। তখন আমারই তো হাতে দড়ি পড়বে।
আমরা তাড়াতাড়ি গিয়ে উঁকি দিলাম মনোরমার ঘরে। যে-বিছানায় জগুদাকে মরে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম, সেইখানে ঠিক সেই রকম হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে লোকটা। আমাদের বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল একবার। সত্যি মরে গেছে নাকি?
পরেই বুঝলাম, না। নিশ্বাসে বুক উঁচু নীচু হচ্ছে। লোকটার কপালে জলপটি। মনোরমা যত্ন করে তার গায়ে একটা চাদর টেনে দিয়েছে।
মনোরমা নিজেই একে পাঁজাকোলা করে তুলে এনেছে টেবিল থেকে। মনোরমার সে শক্তি আছে। লোকটিকে কিন্তু এখানে মানায় না। ঠিক যেন মনে হয় গরিবের ঘরে এসে ঘুমিয়ে আছে কোনো রাজপুত্তুর!
কিন্তু এ কতক্ষণ এখানে আরাম করে ঘুমোবে। একটু পরেই লোকজন আসবে। ব্যাপারটা জানাজানি হলে পাঁচজনে পাঁচকথা বলতে পারে। যা হোক, একটা কিছু বলে দিতে তো মানুষের জিভে আটকায় না—
আমরা চারজন দরজার কাছে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছি। কে আগে লোকটিকে ডাকবে ঠিক করতে পারছি না। এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। এমন সময় লোকটি নিজেই চোখ মেলল।
আমাদের চারজনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেন ভয় পেয়ে গেল। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বলল, আমি কোথায়?
রতন বললে, আপনার অসুখ করেছে।
আপনারা কারা!
পরাণ বললে, কাল আমরাই তো আপনাকে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিয়ে গেলাম, মনে নেই?
ও। কিন্তু এটা তো বিছানা।
হ্যাঁ, বিছানা। এটা চায়ের দোকানের মালকিনের বিছানা।
রতন লোকটির কপালে হাত রেখে বললে, এখনও তো বেশ জ্বর আছে দেখছি। তাহলে তো ডাক্তার ডাকতে হয়। আপনি হাসপাতালে যেতে পারবেন?
লোকটি বললে, কোনো দরকার নেই! আমি খানিকটা বাদে ঠিক হলে আপনা আপনি চলে যাবো। আমি যে এখানে আছি, সে কথা কারুকে বলার দরকার নেই।
কেন? আপনি কে?
লোকটি হাত জোড় করে বললে, বিশ্বাস করুন। আমি কোনো খারাপ লোক নই। আমার পরিচয় এখন জানাবার অসুবিধে আছে।
কোনো ভদ্রলোকের ছেলে আমাদের সঙ্গে হাত জোড় করে কথা বললে আমাদের গা চিড়চিড় করে। এরকম ন্যাকাপনা আমার একদম সহ্য হয় না। দরকারের সময় হাত জোড় করে আবার অন্য সময় চোখ রাঙানো, এসব আমরা ঢের দেখেছি। কিন্তু লোকটির মুখের ওপর কোনো কথা বলতে পারলাম না। লোকটি এমনভাবে কথা বলছে, যাতে মনে হয়, ওর খুব কষ্ট হচ্ছে , বেশ ভোগাবে মনে হচ্ছে।
বাড়িতে বাজার করে নিয়ে যাবার কথা। আর তো বেশি দেরিও করা যায় না। হপ্তায় এই একটা দিনই তো নিজের হাতে বাজার করা।
বেরিয়ে এসে দেখি, মনোরমা রান্নাঘরে উনুন ধরিয়ে ফেলেছে। দুধ জ্বাল দিচ্ছে। আমাদের দেখে বললে, তোমরা একটু বসো গো। চায়ের জল এবার চাপাব। কেমন দেখলে।
এখনও তো বেশ জ্বর!
কাল কিছু খায়নি। এখন একটু গরম দুধ খাইয়ে দিই, কি বলো?
দে, তাই দে!
চা-টা খেয়েই আমরা দৌড় লাগালুম। সেদিন সারাদিনে আর চায়ের দোকানে যাওয়া হল না। কারখানা বন্ধ থাকলে আর এত দূরে বার বার আসা হয় না। রবিবারে এই জন্যই এ দোকানে খদ্দের খুব কম থাকে।
এরপর দিন তিনেকের মধ্যেও লোকটি গেল না। জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় বুকে অসহ্য ব্যথা। রতনের ধারণা ওর নিমোনিয়া হয়েছে। জিতেনের ধারণা, ক্ষয়কাশ। এসব ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে মনোরমার কি থাকা উচিত? কিন্তু মনোরমা দিনরাত সেবা করছে লোকটাকে। এমনকি দোকান চালাবার দিকেও তার মন নেই, খদ্দেররা চায়ের জন্যে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে করে চলে যায়। এমনকি আমরা যে মনোরমার গার্জেন, আমাদের দিকেও তার নজর নেই আর। আমরা কিছু বলতে গেলেই ও বলে, তা বলে কী লোকটাকে মরে যেতে দেব। একটা ভদ্দরলোকের ছেলে, সে কি আমার হাতে জল খেয়ে মরতে এসেছে? তোমাদের মায়া হয় না।
রতন এক কবিরাজের কাছ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ওষুধ এনে দিয়েছে। কথাটা সে আমাদের কাছ থেকে গোপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের নজর এড়াবার উপায় নেই। ধরা পড়ে গিয়ে সে বলল, বুঝলি না, ওকে তাড়াতাড়ি সারিয়ে তুলে বিদায় করতে পারলে তো আমাদেরই সুবিধে। নইলে, মনো যেমন নাওয়াখাওয়া ভুলে গেছে, তাতে দোকানটাই না উঠে যায়!
জিতেন বলল, আজ সকালে বটতলায় শুনলাম, দুটো লোক বলাবলি করছিল যে, জগুদার চায়ের দোকানে কে একটা লোক নাকি লুকিয়ে আছে। এখন এ কথাটা চাউর হয়ে গেলেই তো বিপদ!
আমরা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ালাম। সত্যি তো বিপদের কথা। লোকটা নিজের পরিচয় জানাতে চায় না। আমরা মনোরমার বিপদে-আপদে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু মনোরমাকে এই বিপদ থেকে কী করে বাঁচাবো।
পাঁচদিনের মাথায় লোকটা অনেকটা সুস্থ হয়ে বিছানায় উঠে বসল! এর মধ্যে গত দু’দিন মনোরমা চায়ের দোকান বন্ধই রেখেছিল। সবাই জানে মনোরমার অসুখ। শুধু আমরা আসল ঘটনাটা জানি। আমরা চুপিচুপি সন্ধের দিকে একবার এসে খবর নিয়ে যাই। সে-সময় মনোরমা আমাদের চা খাওয়াতেও ভুলে যায়।
লোকটা বিছানায় উঠে বসেছে, আমরা দরজা দিয়ে উঁকি মারলাম। মনোরমা ঘরের কোণে বসে একদৃষ্টে চেয়ে আছে লোকটার মুখের দিকে।
লোকটা আমাদের দেখে বলল, এ যাত্রা বেঁচেই গেলাম মনে হচ্ছে।
আমরা চারজনে ঘরে ঢুকে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। আমাদের বুকের ভেতরে একটা চাপা আনন্দ। লোকটা তাহলে এবার বিদায় হবে। আবার শনিবার এসে গেছে, আবার আমরা মনোরমাকে নিজেদের করে পাবো।
লোকটা মনোরমার দিকে তাকিয়ে বলল, এঁর সেবাতেই বেঁচে গেলাম। এঁর শরীরে খুব দয়া-মায়া আছে! নইলে, আমি অচেনা-অজানা লোক।
মনোরমার শরীরে যে দয়া-মায়া আছে, এ কথা আমরা প্রথম অন্য কারুর মুখে শুনলাম। সবাই জানে, সে দুর্দান্ত রাগী আর জাঁদরেল। অবশ্য মনোরমা কী রকম সে-কথা আর আমাদের বলতে হবে না। দয়া না থাকলে সে আমাদের কারুর পায়ে ঝিঁঝি ধরলে হাত ধরে টেনে তোলে?
লোকটি বলল, এর ঋণ কী করে শোধ করে যাবো, জানি না। আমার কাছে টাকাপয়সা কিছুই নেই—
মনোরমা ঝংকার দিয়ে বলল, থাক আপনাকে আর ঋণ শোধের কথা চিন্তা করতে হবে না , এখনও হাঁটতে গেলে পা টলটল করে।
লোকটি বলল, তবে আমি উপকার ভুলি না। একদিন ঠিক আবার ফিরে আসব, যদি বেঁচে থাকি।
সে তো পরের কথা। এখন আপনাকে যেতে দিচ্ছে কে? আগে খেয়ে-দেয়ে গায়ে জোর করুন।
লোকটা বলল, তা মন্দ না। বেশ, খেয়ে-দেয়ে গায়ে জোর করে তারপর আমি এই রেস্টুরেন্টে বয়ের কাজও করতে পারি। লোককে চা দেব, কাপ ডিশ ধুয়ে দেব।
পরদিন আমরা গিয়ে দেখি, দোকান খোলা, কিন্তু একজনও খদ্দের নেই। ক্যাশ কাউন্টারে মনোরমা একা বিমুখ হয়ে বসে আছে। আমাদের দেখেও একটা কথা বললে না।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় গেল? সেই লোকটা কোথায় গেল? মনোরমা ডান হাতখানা হাওয়ায় ফেরালো শুধু?
কী হয়েছে, মনো দিদি? হলটা কী?
মনোরমা চেঁচিয়ে ধমকিয়ে বলল, চলে গেছে। সে চলে গেছে।
আমাদের আনন্দে নৃত্য করতে ইচ্ছে করছিল। চলে গেছে তো আপদ গেছে!
আবার চায়ের দোকানের বয় হবার কথা বলছিল! রাজপুত্তুরের মতো চেহারা নিয়ে চায়ের দোকানে বয়গিরি, যতসব ন্যাকাপনা কথা?
কখন গেল? কী করে গেল?
সে কি আমাকে বলেছে? একবার ঘুণাক্ষরে জানতেও দিলে না। আমি তাকে একলা রেখে একটু খালপাড়ে চান করতে গেছি—ফিরে এসে দেখি সে নেই। যে মানুষটা ভালো করে হাঁটতে পারে না, সে এমনি এমনি চলে গেল!
নিশ্চয়ই ওর মতলব ভালো ছিল না। কিছু নিয়ে-টিয়ে যায়নি তো?
মনোদিদি, সে কিছু চুরি করেনি তো?
মনোরমা বললে, আহ তোমরা চুপ করবে, আমার ভালো লাগছে না। কী এমন হাতি ঘোড়া আছে আমার, যে সে নেবে!
ধমক খেয়ে আমরা চুপ করে গেলাম।
তারপর শনিবার এলো, কিন্তু মনোরমা আর গাইল না। নাচল না। আমাদের আনি মানি জানি না খেলা হল না। মনোরমা আর সেই মনোরমা নেই, সে আর আমাদের গ্রাহ্য করে না। ঠায় চুপচাপ বসে থাকে। এমনি করেই দিনের পর দিন যায়। আমরা বুঝতে পারি, সেই লোকটা অন্য কিছু চুরি না করলেও সম্পূর্ণ চুরি করে নিয়ে গেছে মনোরমার মন। সেই মনটার চেহারা যে কীরকম তা আর কখনও বুঝিনি।
রতন একবার সাহস করে বলেছিল, ও মনো, সে লোকটা চলে গেল বলে তুই কতদিন আর এমনি করে থাকবি? দোকানটা যে যায়।
মনোরমার চোখের কোণে জল আসে। আস্তে আস্তে বলে, কিন্তু সে যে আবার ফিরে আসবে বলেছে!
ওসব শহুরে লোকের ন্যাকাপনা কথা। এর কি কোনো দাম আছে? এ কথা আমরা মনোরমাকে বোঝাই কী করে?
যদি সম্ভব হত, আমরা লোকটাকে ঘাড় ধরে নিয়ে আসতাম এখানে। কিন্তু কোথায় তাকে খুঁজতে যাব? আমাদের কারখানায় যে-কোনোদিন লক আউট হতে পারে, এখন একটি দিনও কাজ কামাই করতে ভরসা হয় না।
তবু রাগে আমাদের গা জ্বলে যায়। আমাদের আর কিছু নেই। সংসারেও শুধু নেই, নেই, নেই। আমাদের ধর্মেন্দর-হেমা মালিনী নেই, বাকি পৃথিবীর কিছুই জানার দরকার নেই। শুধু আমাদের মনোরমা ছিল, কিন্তু সেই লোকটা, রাজপুত্তুরের মতন চেহারা, শহুরে মানুষ—ওদের তো কত কিছু আছে, কত রকম আমোদ আর রঙ্গ রস। তবু সে কেন আমাদের মনোরমার মনটা কেড়ে নিয়ে গেল।
ব্যর্থ প্রেমিক
ব্যর্থ প্রেমিক
আহত বাঘ যেমন নিজের ক্ষতস্থানটা বার বার চাটে, সেই রকমই মণিময় তার দুঃখগুলোকে ভালোবাসে। কখনও একলা হয়ে পড়লেই সে তার নিজের দুঃখগুলোকে আদর করে।
সন্ধে সাড়ে ছ-টা, অফিস থেকে বেরিয়ে এসে মণিময় দাঁড়িয়ে আছে মনুমেন্টের কাছে। এরপর সে কোথায় যাবে জানে না। এই জায়গাটা থেকে অনেক রকম বাস ছাড়ে, মিনিবাস দাঁড়ায়, শেয়ারের ট্যাক্সিও পাওয়া যায়, অর্থাৎ এখান থেকে কলকাতার যে-কোনো জায়গায় যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মণিময় মনস্থির করতে পারে না। পরপর দুটি সিগারেট সে শেষ করল। প্রায় প্রত্যেকদিনই অফিস থেকে বেরিয়ে মণিময়ের এরকম হয়।
কোথায় সে এখন যাবে?
মণিময়ের একটা বাড়ি আছে, সেখানে মা-বাবা, দুই ভাই, তিন বোন নিয়ে বেশ বড়ো সংসার। মণিময়ের আছে নিজস্ব একটা ঘর। তাদের বাড়িতেও বিশেষ অশান্তি নেই, সব সময় বেশ একটা হইচই ভাব। মণিময় তো অন্য আর সবার মতন বাড়িও ফিরে যেতে পারে, স্নান করে জলখাবার খাবে, তারপর একটা বই নিয়ে বসবে, কিংবা রেডিয়ো শুনবে, কিংবা গল্পে মেতে যাবে। যা সবাই করে। আবার সে তো একটা সিনেমাও দেখতে পারে। একা যেতে না পারে, সঙ্গীরও অভাব নেই। তার বোনেরা প্রায়ই তাকে সিনেমা দেখাবার জন্য আবদার করে। তাদের পাড়াতেই থাকে বাসবী, তার মেজ বোনের বান্ধবী। বাসবী প্রায়ই আসে তাদের বাড়িতে এবং মণিময়ের দিকে এমনভাবে তাকায় যে বোঝা যায় মণিময়ের প্রতি তার একটা মুগ্ধতার ভাব আছে। বাসবীকে তো দেখতে সবাই ভালোই বলে, মেয়েটি পড়াশোনাতেও ভালো, এ বছর থেকে রিসার্চ করছে কেমিস্ট্রিতে। এই বাসবীর সঙ্গে মণিময় কি প্রেম করে সন্ধেগুলো কাটাতে পারে না? একদিন তো মণিময় তাদের বাড়ির ছাদের আলসের কাছে দাঁড়িয়ে বাসবীকে বলেছিল, তোমার হাতের আঙুলগুলো খুব সুন্দর। এরপর আরও তো অনেক কিছু বলার থাকে।
মণিময় একেবারে নির্বান্ধবও নয়। তার বেশ কয়েকজন কলেজজীবনের বন্ধু ছড়িয়ে আছে কলকাতার নানা প্রান্তে, তাদের অনেকের বাড়িতেই এ সময় গেলে আড্ডা দেওয়া যায়।
মণিময় সে রকম কোনো জায়গাতেই গেল না। সে একটা মিনিবাস ধরে চলে এল নিউ আলিপুরে। পেট্রোল-পাম্পের কাছে নেমে হাঁটতে লাগল মন্থরভাবে। যেন এখনও সে জানে না কোথায় যাবে। মিনিট সাতেক হাঁটার পর সে একটা চারতলা ফ্ল্যাট-বাড়ির সামনে থমকে দাঁড়াল। সন্ধে এখন গাঢ় হয়ে এসেছে, কিন্তু আকাশে একটাও তারা নেই। ওপরে তাকালে দেখা যায় গর্ভিনী মেঘ।
ফ্ল্যাট-বাড়িটার সব ঘরেই আলো জ্বলছে। বেশ পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে চেহারা বাড়িটার। মণিময় একটুক্ষণ দ্বিধা করে তারপর বাড়িটার ভেতরে ঢুকল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল চারতলায়। বেশ খাড়া খাড়া সিঁড়ি, চারতলায় উঠতেই হাঁপিয়ে যেতে হয়। মণিময় একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে দম নিল।
দু-পাশে দুটি ফ্ল্যাট। একই রকম দরজা, একই রকম কলিং বেল। তবে দুটি আলাদা নাম লেখা। মণিময় ডান দিকের দরজার সামনে এসে বেল টিপল। সামান্য একটুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল, দরজা খুলে দিল একটি বাচ্চা চাকর।
দরজা থেকেই বসবার ঘরটা দেখা যায়। সুন্দর সোফা-সেট দিয়ে সাজানো। একটি সোফার ওপর পা মুড়ে বসে আছে অনীতা, হাতে একটি পাতলা বই, সে কৌতূহলে তাকিয়ে আছে দরজার দিকেই।
মণিময় সরু করিডরটা পেরিয়ে বসবার ঘরে চলে এল। অনীতা উঠে দাঁড়াল না, কোনো কথা বলল না, শুধু চেয়ে আছে তার দিকে।
মণিময় জিজ্ঞেস করল, ভালো আছ?
অনীতা ঘাড় হেলিয়ে জানাল, হ্যাঁ।
মণিময় জানে, অনীতা নিজে থেকে তাকে বসতে বলবে না। সে শুধু শান্তভাবে চেয়েই থাকবে একদৃষ্টে।
মণিময় নিজেই বসল। ফ্ল্যাটটা ফাঁকা এবং নিঃশব্দ, সেই নৈঃশব্দ অনুভব করে মণিময় আবার জিজ্ঞেস করল, অরূপ বাড়ি নেই?
অনীতা বলল, না।
অনীতার ভুরু সামান্য কুঁচকে এসেছে। মণিময় খুব ভালো করেই জানে, অরূপ এ সময় বাড়ি থাকে না। অরূপ একটি বিদেশি বিমান কোম্পানিতে কাজ করে, তাকে সপ্তাহে তিনদিন এই সময় এয়ারপোর্টে থাকতে হয়। বাড়ি ফিরতে রাত দশটা তো বাজবেই।
হাতের বইটা নামিয়ে রাখল অনীতা। পাতলা চটিবই, আকাশি রঙের মলাট। মণিময় লক্ষ করে দেখল, ওটা একটা কবিতার বই। একলা সন্ধেবেলা অনীতা একটা কবিতার বই পড়ছিল। অনীতাকে এসব মানায়। অন্য মেয়েরা এসময় সিনেমা পত্রিকার পাতা ওলটায় কিংবা পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েদের সঙ্গে গল্প করতে যায়। কিন্তু অনীতার রুচি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কবিতা কিংবা গানে সে মগ্ন হয়ে থাকতে পারে।
মণিময় বলল, অরূপ একদিন আসতে বলেছিল, তাই এলাম!
কথাটা একদম মিথ্যে নয়। অথচ সত্যি তা নয়, সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহই নেই। অরূপ একদিন মণিময়কে আসতে বলেছিল ঠিকই। অরূপ আর অনীতার সঙ্গে মণিময়ের একদিন নিউ মার্কেটের কাছে দেখা। অরূপের সঙ্গে মণিময়ের মোটামুটি পরিচয় আছে, দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিংয়ের ছাদের হলে তাদের একই সঙ্গে পরীক্ষার সিট পড়েছিল। অনীতার কিছু ব্যস্ততা ছিল বলে সেদিন নিউ মার্কেটের সামনে অরূপ বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেনি মণিময়ের সঙ্গে। সে বলেছিল, একদিন এসো না আমাদের বাড়িতে, গল্প করা যাবে।
এটা নিতান্ত কথার কথা। এরকম নেমন্তন্নে হঠাৎ কেউ কারুর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় না। তাও বেছে বেছে মণিময় ঠিক এমন সময়েই এসেছে, যখন অরূপ বাড়িতে থাকে না।
অনীতা এবার উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি চা খাবে?
মণিময় বলল, খেতে পারি!
বাড়িতে নিশ্চয়ই রান্নার লোক আছে। অনীতা তো সেখান থেকেই জোরে চায়ের কথা বলে দিতে পারত। তা বলল না। নিজেই চলে গেল, তারপর অনেকক্ষণ আর এল না। খানিকবাদে বাচ্চা চাকর এসে চা দিয়ে গেল, তবু অনীতার দেখা নেই।
মণিময় একটু হাসল। অনীতা বুঝিয়ে দিতে চায় যে, মণিময় এখানে অবাঞ্ছিত। অতিথিকে একলা বসিয়ে রেখে নিজে অন্য জায়গায় থাকার মতন অভদ্র তো অনীতা নয়। সে ইচ্ছে করেই মণিময়কে এরকম অপমান করলে!
আর কোথাও, কেউ মণিময়কে এরকম অবহেলা বা অপমান করে না। তার স্বাস্থ্য ভালো, চেহারা সুন্দর, এক কালে খুব নামকরা ছাত্র ছিল, এখনও সে অরূপের চেয়ে কিছু খারাপ চাকরি করে না, সে কথাবার্তাও ভালো বলতে পারে, কোথাও অযথা বকবক করে অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করে না। অন্য অনেক জায়গাতেই সন্ধেবেলা মণিময় খাতির পেতে পারত, কিন্তু তবু সে এখানে ইচ্ছে করে অপমান সহ্য করতে এসেছে।
একটু পরে অনীতা এসে জিজ্ঞেস করল, তোমায় চা দিয়েছে?
তুমি ভালো আছ, অনীতা?
অনীতা এবার স্পষ্টত বিরক্ত হয়ে উঠল। ঝংকার দিয়ে বলল, তুমি বার বার এ কথাটা জিজ্ঞেস করো কেন বলো তো? হ্যাঁ আমি ভালো আছি, নিশ্চয়ই ভালো আছি, খারাপ থাকব কেন? তুমি কি চাও, আমি খারাপ থাকি?
মণিময় শুকনো গলায় বলল, না, আমি তা চাই না। সত্যি চাই না।
মণিদা, আমাকে এখন একটু বেরোতে হবে।
কোথায় যাবে? চলো আমি তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি।
না, আমি যাব নীচের ফ্ল্যাটে। টেলিভিশনে আটটার সময় একটা ভালো প্রোগ্রাম আছে। সেটা দেখব।
টেলিভিশনের প্রোগ্রাম? সেটা না দেখলে হয় না আজ?
আমি ওদের বলে রেখেছি, আমি না গেলে ওরা ডাকতে আসবে।
মণিময় বুঝতে পারে, এটা একটা অতি সামান্য ছুতো। অনীতা তাকে চলে যেতে বলছে, এর থেকে ভদ্রভাষা আর কী হতে পারে? অনীতা কি তার সামনে বসতে ভয় পায়, না বিরক্ত হয়?
কিন্তু মণিময়ও এর চেয়ে বেশি অভদ্র হতে পারে না। এ কথা বলার পর মণিময়ই বা আর কী করে বসে থাকবে? এক্ষুনি তার চলে যাওয়া উচিত।
সে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ব্যথার চিহ্ন নেই, বরং একটা পাতলা চাপা হাসি। সে তো এরকম পাওয়ার আশা করেই এসেছিল। সে জানত, অনীতা ঠিক এরকম ব্যবহার করবে।
মণিময় বলল, অরূপের সঙ্গে দেখা হল না!
অনীতা মণিময়কে উঠে দাঁড়াতে দেখে খুশি হয়েছে। সে বলল, ওর সঙ্গে দেখা করতে হলে রবিবার আর বৃহস্পতিবার—ওই দুদিন ও বাড়িতেই থাকে।
অরূপকে বলো, আমি এসেছিলাম।
অনীতা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল না। মণিময় একাই বেরিয়ে এসে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিল। অনীতা তখনও বসবার ঘরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
অন্য অনেক মেয়েই এই অবস্থায় ঝগড়া করত কিংবা খারাপ কথা বলত। অন্য কেউ অনায়াসেই বলতে পারত, মণিদা, আমি চাই না তুমি এরকমভাবে আমার বাড়িতে আসো। আমি চাই না, তুমি আমার স্বামীর সঙ্গে গায়ে পড়ে বেশি ভাব করতে যাও! কেন তুমি আমাদের জীবনে অশান্তি এনে দিতে চাইছ? তুমি ফের এরকমভাবে এলে আমি চ্যাঁচামেচি করে লোক জড়ো করব!
কিন্তু অনীতা এরকম কথা কোনোদিন মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারবে না। তার রুচি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ব্যবহার খুব মার্জিত। সে আকারে ইঙ্গিতে মণিময়কে এইসব কথা বোঝাতে চায়, কিন্তু মুখে কোনো কটু কথা বলবে না। এক সময় সে মণিময়কে ভালোবাসত, এখন ভালো না বাসুক, ভদ্রতাটুকু মুছে ফেলতে পারবে না কিছুতেই। মণিময় সেই ভরসাতেই তো এখানে এসেছে।
অন্য কোনো লোক হলে মণিময় যে কথাটা জানবার জন্য বার বার অনীতার সঙ্গে দেখা করতে চায়, সেটা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করত। কিন্তু মণিময় তা পারে না। সে আশা করে থাকে, অনীতা নিজেই তা বলবে।
মণিময় যখন বাড়ি ফিরল, তখন তাদের বাইরের ঘরে তুমুল আড্ডা জমিয়েছে ভাই-বোনেরা! বাসবীও আছে সেখানে। সে ঢুকতেই তার ছোটো বোন বলল, সেজদা তুমি এইখানে, এই জায়গাটায় এসে একটু পাশ ফিরে দাঁড়াও তো!
কেন, কেন?
দাঁড়াও না, একবার।
তার বোন নিজেই মণিময়ের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে মুখটা একপাশে ঘুরিয়ে দিল। তারপর বলল, এই দ্যাখো, বলছিলাম না সেজদার মুখের সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনের অনেকটা মিল আছে! দ্যাখো, এপাশ থেকে দ্যাখো!
বাসবী বলল, সত্যিই তো!
মণিময় ওদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিয়ে সেখানেই বসে পড়ল। একটা সিগারেট ধরিয়ে শুনতে লাগল ওদের কথা। এখানে বেশ আনন্দময় পরিবেশ। এরা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, একটু আগেই মণিময় কতখানি অপমান সয়ে এসেছে। এরা কেউ বিশ্বাসই করবে না যে, মণিময়কে কেউ অপমান করতে পারে।
শুধু অনীতা পারে। সেই কথাই খানিকটা বাদে, নিজের ঘরে এসে একা একা শুয়ে থেকে মণিময় ভাবছিল। এ জীবনে এ পর্যন্ত আর কেউ মণিময়কে এরকম আঘাত দেয়নি। অনীতা নিজেও হয়তো জানে না, সে মণিময়ের কতখানি ক্ষতি করেছে। মণিময় আর কিছুতেই সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারছে না।
সেই কলেজজীবন থেকেই বন্ধুবান্ধবরা সবাই জানত, মণিময় অনীতাকে বিয়ে করবে। প্রতিটি বিকেল দুজনে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াত। বোটানিক্যাল গার্ডেন, বালিগঞ্জ লেক, দক্ষিণেশ্বর—এইসব জায়গায় ওদের পাশাপাশি বসে থাকার ছবি, মণিময়ের মধ্যে এখনও একটুও ম্লান হয়নি।
অনীতার সঙ্গে মণিময়ের আলাপ হয়েছিল খুব সামান্য ঘটনা থেকে। তার বন্ধু শুভেন্দুর বাড়িতে মণিময় প্রথম অনীতাকে দেখে। শুভেন্দুর বোনের তিন-চারজন বান্ধবী এসেছিল সেদিন, তার মধ্যে অনীতা একজন। এমনিই ভদ্রতার আলাপ হয়েছিল। প্রথম দর্শনেই প্রেম হয়নি। কিন্তু এর ঠিক পরের দিনই অনীতার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যায় আকস্মিকভাবে। প্রবল বৃষ্টির দিন ছিল সেটা, রাস্তাঘাট ভেসে যাচ্ছে, তার মধ্যে মণিময় অতিকষ্টে একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে বাড়ি ফিরছিল, পার্ক স্ট্রিটের কাছে দেখল অনীতা দাঁড়িয়ে আছে, সর্বাঙ্গ ভেজা। ঠিক আগের দিনই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় হলেও তাকে চিনতে একটু দেরি হয়েছিল মণিময়ের। শুধু মনে হয়েছিল চেনা-চেনা, কোথায় যেন দেখেছে। অনীতার সঙ্গে চোখাচোখি হতে অনীতা নিজেই চেনা-ভাবে হাসল, তখন মনে পড়ে গেল মণিময়ের। এইরকম অবস্থায় একটি মেয়েকে দেখলে তাকে লিফট দেওয়াই ভদ্রতা। তবু মণিময় নিজে থেকে সে-কথা বলতে একটু লজ্জা পেল, ট্যাক্সিটা অনীতাকে ছাড়িয়ে চলে গেল। তারপর মণিময়ের মনে হল আজ ট্রাম-বাসে চড়া খুবই কঠিন ব্যাপার, ট্যাক্সিও পাওয়া খুব শক্ত, এইরকম সময় সে পরিচিত একটি মেয়েকে বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে দেখেও চলে যাচ্ছে! ট্যাক্সি থামিয়ে সে নিজেই নেমে দৌড়ে এসে অনীতাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কোন দিকে যাবেন?
সেদিন যদি মণিময় এভাবে ট্যাক্সি থামিয়ে ফিরে না আসত, তাহলে অনীতার সঙ্গে তার গভীর পরিচয় হতই না কোনোদিন, তার জীবনটা এরকম বদলে যেত না। এক একটা মুহূর্তে মানুষের জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
সেদিন ট্যাক্সিতে অনীতাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়নি। ভবানীপুরের কাছে রাস্তায় প্রায় এক কোমর জল, সেখানে ট্যাক্সি আটকে গেল। দুজনকেই নেমে পড়তে হল সেখানে। তারপর জলের মধ্যেই প্যান্ট আর শাড়ি ভিজিয়ে হাঁটতে লাগল দুজনে, তাতেই ওরা খুব কাছাকাছি এসে গেল। অনীতা দেখতে যে দারুণ একটা সুন্দরী তাও নয়, সাধারণভাবে সুশ্রী বলা যায়। কিন্তু মণিময় দেখেছিল, অনীতার রুচি বা কথাবার্তার ধরনের সঙ্গে তার একটা মিল আছে। দুজনেই একই ধরনের বই পড়তে ভালোবাসে।
প্রায় চার বছর ওরা দুজন দুজনকে তীব্রভাবে ভালোবেসেছে। অনীতা নিজেই দু-তিন দিন মণিময়ের সঙ্গে দেখা না হলেই ছটফট করত। মণিময়ের বুকে মাথা রেখে বলত, তুমি কোনোদিন আমাকে ভুলে যাবে না, বলো!
নিজের বাড়িতেও অনীতার কথা গোপন করেনি মণিময়! শেষের দিকে একদিন অনীতাকে বাড়িতে নিয়েও এসেছিল। তাদের বাড়ির লোকজন অনীতার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছে। মণিময় নিজের পছন্দ মতন কারুকে বিয়ে করলে তাদের বাড়ি থেকে কোনোরকম আপত্তি ওঠবার কথা নয়। তাদের বাড়ির আবহাওয়াই সেই রকম। মণিময়ের মা পরে অনীতা সম্পর্কে বলেছিলেন, মেয়েটি বেশ! খুব নম্র, চমৎকার ব্যবহার।
অনীতাও মণিময়দের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলেছিল, তোমাদের বাড়ির সবাই কী চমৎকার! তোমার মা, কী সুন্দর শান্ত চেহারা, ঠিক একটা মা-মা ভাব আছে, আর তোমার ভাই-বোনেরা এত ভালো, একটু আলাপেই কত আন্তরিক ব্যবহার করল। তোমার ভাই-বেনেরা তোমাকে খুব ভালোবাসে, তাই না?
মণিময় বলেছিল, হ্যাঁ, ভাই-বোনেরাও আমার বন্ধুর মতন।
এর পরদিন থেকে অনীতা মণিময়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে দিল। চিঠি লিখলেও কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বিস্মিত নয়, মণিময় একেবারে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল বলা যায়। গণ্ডগোলটা কোথায় হল? তার বাড়ির লোকেরা অনীতাকে পছন্দ করেছে, অনীতার ভালো লেগেছে সবাইকে। তবু কেন অনীতা ঠিক এর পর থেকেই দূরে সরিয়ে দিল মণিময়কে? কেন সব ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে গেল? মণিময় আগে কোনোদিন অনীতাদের বাড়িতে যায়নি। অনীতা নিয়ে যেতেও চায়নি। সে বলেছিল, তার বাবা একটু কড়া ধরনের, তিনি পছন্দ করবেন না। তবু প্রায় সাত আটখানা চিঠি লিখেও অনীতার উত্তর না পেয়ে মণিময় একদিন গিয়েছিল অনীতাদের বাড়ি। অনীতার দেখা পায়নি, একটি চাকর এসে বলেছিল, অনীতা বাড়ি নেই, কিন্তু মণিময়ের সন্দেহ হয়েছিল, সেটা মিথ্যে কথা, অনীতা নিজেই দেখা করতে চায় না। অনীতা কেন এমন অপমান করতে চাইল তাকে, তার দোষটা কোথায়? অনীতা কি তার বাবাকে এতখানি ভয় পায়? এত ভয়ের কী আছে? মণিময়েরও কোনো অযোগ্যতা নেই, এমনকি জাতের পর্যন্ত মিল আছে!
এর আট মাস পরে সে পেয়েছিল অনীতার বিয়ের চিঠি এবং অরূপের সঙ্গে অনীতাদের জাতেরও মিল নেই। তাহলে, মণিময়ের বদলে কেন অরূপকে বিয়ে করতে গেল অনীতা? চার বছরের মধ্যে তো সে একদিনও অরূপের কথা শোনেনি? অনীতা অরূপের কথা গোপন করে গিয়েছিল? না, তা হতেই পারে না। অনীতা মিথ্যে কথা বলে না, কোনওরকম লুকোচুরি সে পছন্দ করে না। অনীতার ভালোবাসার মধ্যে কোনো গলদ ছিল না, তবু সে এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করল কেন?
ব্যর্থ প্রেমে মণিময় পাগল হয়ে যায়নি। সে জানে, একটি মেয়েকে বিয়ে করতে না পারলে কারুর জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না। সময় সব কিছু ভুলিয়ে দেয়। সে আবার অন্য কারুকে ভালোবেসে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু তার আগে তার শুধু জানা দরকার। অনীতা তাকে অপমান করতে চায়, করুক, দেখা যাক, অপমানে কোন চরম সীমানায় সে যেতে পারে। এবং কেন?
আবার মণিময় গেল অনীতার ফ্ল্যাটে। দরজা খুলে অনীতা ভুরু কোঁচকাল, মণিময়কে ভেতরে এসে বসতে পর্যন্ত বলল না।
ঠোঁটে পাতলা হাসি টেনে মণিময় বলল, আমি আবার এসেছি। অরূপ নেই?
অনীতা বলল, তোমাকে তো আমি বলেইছি, এরকম সন্ধের সময় অরূপ বাড়ি থাকে না।
কিন্তু আজ বেস্পতিবার। তুমি বলেছিলে রবি আর বেস্পতিবার সে থাকে!
তা অবশ্য ঠিক! বেস্পতিবার অরূপ বাড়ি ফেরে , কিন্তু আজ একটা জরুরি কাজে তাকে এয়ারপোর্ট যেতে হয়েছে, অরূপ অফিস থেকে খবর পাঠিয়েছে।
মণিময় এক পা দরজার ভেতরে রাখল। সে দেখতে চায় অনীতা তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবে কিনা। অনীতা কি এতদূর যাবে?
অনীতা অবশ্য তা পারল না। দরজার কাছ থেকে সরে এল। মণিময় জিজ্ঞেস করল, আমি একটু বসব? অরূপ যদি একটুক্ষণের মধ্যে ফেরে!
অনীতা বলল, অরূপের সঙ্গে তোমার হঠাৎ কোনো দরকার আছে?
সোফার ওপর বসে পড়ে মণিময় বলল, না। আমি অরূপের সঙ্গে দেখা করতে আসি না! আমি তোমাকেই দেখতে আসি।
অনীতা কিছু বলতে যাচ্ছিল, মণিময় তাকে বাধা দিয়ে বলল, তুমি কি ভেবেছিলে আমি কোনো খারাপ লোকের মতন, তোমার ওপর প্রতিশোধ নেবার জন্য অরূপকে আমাদের পুরোনো সব কথা বলে দেব? অরূপকে জানিয়ে দেবো যে, গঙ্গায় নৌকোর ওপর তুমি চুমু খেয়েছিলে। তুমি আমাকে এরকম খারাপ লোক ভাব।
না, তা অবশ্য ভাবি না।
আমি তোমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় আজ একঘন্টা দাঁড়িয়েছিলাম। অরূপকে ফিরতে দেখিনি বলেই তোমার কাছে এসেছি।
তুমি চা খাবে?
না। আজ তোমার কোনো টেলিভিশন প্রোগ্রাম দেখতে যাবার কথা নেই? অরূপ নিজেই টেলিভিশন সেট কেনে না কেন?
আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে। এখন এভাবে দেখাশোনা করা আমাদের উচিত নয়।
অর্থাৎ, তুমি ভয় পাচ্ছ! এখন যদি অরূপ হঠাৎ এসে পড়ে, সে ভাববে, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার সঙ্গে প্রেম করছ!
মণিদা!
তুমি আগে আমাকে শুধু মণিময় বলে ডাকতে, এখন দাদা বলো।
আমি অনুরোধ করছি, তুমি পুরোনো সব কথা ভুলে যাও!
তোমার ভয় নেই, আমি তোমার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম কিংবা ব্যভিচার করতে চাই না। ওসব আমার চরিত্রে নেই। এখন পুরোনো কথা ভুলে যেতে বলছ। অথচ, একদিন তুমিই বলেছিলে তোমাকে যেন আমি ভুলে না যাই!
আমি ক্ষমা চাইছি।
মণিময় এমনভাবে উঠে দাঁড়াল, যেন তক্ষুনি সে অনীতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনীতার ওপর। সে সহ্যের শেষ সীমায় এসে গেছে। চাপা গলায় প্রায় গর্জন করে সে বললে, আগে বলো, কেন? কেন তুমি আমাকে অপমান করলে?
অনীতা মুখ নীচু করে বলল, অপমান করতে চাইনি। আমি তোমার অযোগ্য বলে সরে এসেছি।
কীসে তুমি অযোগ্য? চার বছর আমরা একসঙ্গে ছিলাম!
তখন আমি বুঝতে পারিনি। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, তোমাকে পাব, সেই স্বপ্নে আর সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন ঘোর ভাঙল, আমি বুঝতে পারলাম। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হতে পারে না! আমি তোমার সম্পূর্ণ অযোগ্য!
কেন? সেটাই তো জানতে চাইছি।
তুমি শুনবেই?
না শুনে আজ আর আমি যাব না এখান থেকে।
তবে শোন। আমার যখন চার বছর বয়েস, তখন আমার মা আমার বাবার এক বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে যান। আমার বাবা একটি নার্সকে রক্ষিতা রেখেছে। সেই আমাদের বাড়ির কর্ত্রী। আমার পরিচয় এরকম কালি মাখা তোমাকে কখনও বলতে পারিনি।
মণিময়ের মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেল। তার মনে হল, আজ এই কথা বলে অনীতা তাকে যা অপমান করল, সে রকম বেশি অপমান আগে ও করেনি।
সে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, অরূপ এসব জানে?
হ্যাঁ।
অনীতা, তুমি ভাবলে যে অরূপ এসব জেনেও তোমাকে বিয়ে করতে পারে, আর আমি পারতাম না? আমার মধ্যে সেটুকু উদারতা নেই? আমি তোমার সামাজিক পরিচয়টা এত বড়ো করে দেখতাম। এতদিন আমার সঙ্গে মিশে আমাকে তুমি এই চিনেছ?
আমি জানতাম, তোমার সে উদারতা আছে। কিন্তু সেই উদারতার সুযোগ নিলে সেটা হত আমার পক্ষে দারুণ স্বার্থপরতা। সেটা আমি কবে বুঝেছিলাম জানো?
কবে?
যেদিন তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তোমাদের বাড়ির সব লোক এত ভালো, এমন একটা আনন্দময় পরিবেশ—সে বাড়িতে বউ হয়ে গিয়ে আমি নিজেকে কিছুতেই মানাতে পারতাম না। আমি মিথ্যে কথা বলি না, আমার বাড়ির সব কথা আমাকে বলতেই হত, না বললেও ওঁরা জানতেন ঠিকই—ওঁরা মনে করতেন, আমি একটা নোংরা কুৎসিত বাড়ির মেয়ে।
কিন্তু অনীতা, আমি তো তোমাকেই চেয়েছিলাম! তোমার বাড়ির যাই ব্যাপার থাক না কেন?
তা হয় না। তুমি হয়তো আমার জন্য তোমার বাড়ি ছেড়ে আলাদা এরকম কোনো ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে। কিন্তু তোমাদের বাড়ির আনন্দময় পরিবেশ আমি ভেঙে দিতে চাইনি! সেটা হত পাপ! তোমাকে তোমার মা কিংবা ভাইবোনদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে—
ওরাও হয়তো মেনে নিতেন অনীতা, আমি বুঝিয়ে বললে…
অনীতা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। মণিময়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, তোমাকে আমি কত ভালোবাসতাম, তুমি জানো না? তুমি ছিলে আমার কাছে দেবতার মতন। তবু, আমি বুঝেছিলাম, আমি তোমাকে পাব না। আমার বাবা-মায়ের অপরাধ তোমার বাবা-মা মেনে নিতে পারতেন না কিছুতেই। আমি জানি! আমার জন্য তুমি ওদের ছেড়ে এলে শান্তি পেতে না—আমি কত কেঁদেছি, একলা একলা, মণিদা, এখনও কাঁদি।
মণিময় স্তব্ধ হয়ে রইল। তার শরীরটা কাঁপছে। সে হঠাৎ বুঝতে পেরেছে। অনীতা তার চেয়েও অনেক বড়ো। অনীতা যা বলছে, তা অস্বীকার করা যায় না। এক কুলটা নারীর মেয়েকে তার মা কি পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে পারতেন? অথচ, অনীতার তো কোনো দোষ নেই।
অনীতাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য সে তার কাঁধে হাতটা রাখল। আবার তুলে নিল হাতটা। অনীতাকে সে কী সান্ত্বনা দেবে? অনীতার কান্না থামাবার মতন কোনো ভাষা সে জানে না! সে একজন বঞ্চিত মানুষের মতন চুপ করে বসে রইল। তারা হেরে গেছে। সে আর অনীতা দুজনেই হেরে গেছে তাদের বাবা-মায়েদের কাছে।
স্বপ্নের একটি দিন
স্বপ্নের একটি দিন
মনোলীনার মাথায় যত সব অদ্ভুত প্রশ্ন আসে। কখন যে সে কোন কথাটা বলবে, তার কোনো ঠিক নেই। প্রসঙ্গ বদলে ফেলতে তার এক মুহূর্তও লাগে না। সেই জন্যই মেয়েটিকে বড়ো বেশি রহস্যময়ী মনে হয়।
শুভ্র ভর দুপুরবেলা ওর সঙ্গে এসেছে গঙ্গার ধারে। বেশি ভিড় নেই এখন এখানে। চার পাঁচ জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে-সেখানে। আর কিছু অলস চেহারার মাঝবয়েসি লোক, পৃথিবীর সমস্ত পার্ক বা বেড়াবার জায়গায় এই ধরনের কিছু লোককে বসে থাকতে দেখা যায়। তবুও অনেক বেঞ্চ খালি। কিন্তু একটাও পছন্দ নয় মনোলীনার। বেশ সুন্দর, গাছের ছায়ার নীচের ফাঁকা বেঞ্চ দেখেও সে বলছে, উঁহু, এখানে নয়!
শুভ্র হেসে বলল, তোমার যদি বসতে ইচ্ছে না করে, আমরা হেঁটে বেড়াতে পারি। আমার রোদ্দুরের মধ্যে হাঁটতে ভালো লাগে।
মনোলীনা জিজ্ঞেস করল, হাঁটু পর্যন্ত কাদার মধ্যে তুমি হেঁটেছ কখনও?
শুভ্র বলল হ্যাঁ! কেন হাঁটবো না!
শেষবার কবে? এমনি কলকাতা শহরের কাদা নয়। হাঁটু পর্যন্ত কাদা!
শুভ্র একটু মুশকিলে পড়ল। ঠিক বলা শক্ত, শেষবার কবে সে কাদার মধ্যে দিয়ে হেঁটেছে। বারবার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। যেন শুভ্র একটা বাচ্চা ছেলে, ইচ্ছে করে কাদার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করছে, কোন এক অচেনা নদীর ধারে।
শুভ্র সময় নিচ্ছে দেখে, মনোলীনা বলল—থাক, বলবার দরকার নেই।
মনে পড়েছে! একবার সুন্দরবন গিয়েছিলাম…নৌকো থেকে নেমে—দারুণ কাদা…ঝিনুকের টুকরোয় আমার পা কেটে গিয়েছিল।
কতদিন আগে?
আট-ন-বছর হবে। দাঁড়াও, হিসেব করে দেখছি, না, ঠিক এগারো বছর আগে।
তখন আমি ফ্রক পরতাম।
মনোলীনার বয়েস কুড়ি-একুশের বেশি নয়। শুভ্রর বয়েস প্রায় চল্লিশ ছুঁয়েছে, বেশ কিছু পাকা চুল দেখা যায়। ওদের দেখলে কেউ ঠিক প্রেমিক-প্রেমিকা ভাববে না। ওরা তা নয়ও বোধহয়।
শুভ্র জিজ্ঞেস করল কফি খাবে? দোকানটা খোলা আছে দেখছি।
মনোলীনা সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল আমি কোথায় জন্মেছি, জানো?
তুমি যদি জিজ্ঞেস করো, আমি কোথায় জন্মেছি, তাহলে আমি বলব রাস্তায়।
তার মানে?
আন্দাজ করো।
ট্রেনের মধ্যে? প্লেনে? গাড়িতে যেতে যেতে?
না, হল না।
তাহলে? এ তো খুব শক্ত ধাঁধা দেখছি?
আমি তোমাকে আমার জন্মস্থান দেখিয়েও দিতে পারি। সেটা সত্যিই একটা রাস্তা।
ব্যাপারটা কী, খুলে বলো!
আমরা তখন দুবরাজপুরে থাকতাম। মানে, আমার মা আর বাবা থাকতেন। আমি তো তখন পৃথিবীতে ছিলামই না। তারপর আমি জন্মালাম। একটা ছোট্ট সুন্দর সাদা একতলা বাড়ি। এখন সে বাড়িটা নেই। সেই বাড়িটা ভেঙে এখন সেখান দিয়ে একটা রাস্তা হয়েছে। বাস যায়, ট্রাক যায়।
মনোলীনা খুব হাসতে লাগল। তারপর হাতের বইগুলো ঘাসের ওপর ছুড়ে দিয়ে বললে এখানে বসবে?
শুভ্র বলল না। রোদ্দুরের মধ্যে আমি হাঁটতে পারি, কিন্তু বসে থাকতে ভালো লাগবে না।
মনোলীনা বলল তাহলে ওই গাছের নীচে। মোট কথা মাঠে বসব, বেঞ্চিতে না।
গাছটার তলায় গিয়ে মনোলীনা বসলেও না, সোজা শুয়ে পড়ল। জায়গাটা খুব পরিষ্কার নয়, কিছু আখের ছিবড়ে পড়ে আছে। দু-একটা আইসক্রিমের গেলাস। মনোলীনা সেসব গ্রাহ্য করল না।
শুভ্রর একটু অস্বস্তি লাগছে। একটা মেয়ে মাঠের মধ্যে এরকমভাবে শুয়ে থাকলে পথচারীরা ফিরে ফিরে তাকাবেই। তবু শুভ্র ঠিক করল, সে মনোলীনার কোনো ইচ্ছেতেই বাধা দেবে না।
আমি যখন জন্মাই, তুমি তখন কোথায় ছিলে।
শুভ্র একটু হিসেব করে নিয়ে বললে খুব সম্ভব বিলেতে। আমি উনিশ বছর বয়েসে বিলেতে গিয়েছিলাম পড়তে।
অনেকদিন ছিলে?
প্রায় দশ বছর।
আর তুমি যখন জন্মাও, তখন আমি কোথায় ছিলাম?
শুভ্র এবার হাসলে। এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন কোনো মেয়ের কাছ থেকে কখনও শোনেনি শুভ্র। সে যখন জন্মায়, তখন মনোলীনা কোথায় ছিল?
শুভ্র বলল ওই যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আছে না। ‘ইচ্ছা হয়েছিল মনের মাঝারে—’! তোমার নামটাও এদিক থেকে খুব সার্থক!
তুমি কবিতা পড়ো বুঝি?
কেন ইঞ্জিনিয়ারদের বুঝি কবিতা পড়তে নেই? এখন অবশ্য সময় পাই না, কিন্তু এককালে পড়তাম।
বিলেতে যাবার আগে তুমি কোনো মেয়ের প্রেমে পড়োনি?
না। বিলেত যাবার পরই!
তুমি ইংরেজিতে প্রথম প্রেম করেছো?
তাও না। বিলেতে গিয়ে আমি একটি বাঙালি মেয়েরই প্রেমে পড়েছিলাম।
সেই মেয়েটিই হাসিদি?
উঁহু। হাসির সঙ্গে আমি প্রেম করেছি দেশে ফিরে এসে।
তাহলে সেই মেয়েটি, যাকে তুমি প্রথম ভালোবেসেছিলে। তাকে তুমি বিয়ে করলে না, নাকি সেই তোমাকে বিয়ে করল না?
সে-ই আমাকে বিয়ে করল না। তার বদলে সে টুপ করে মরে গেল।
তাকে তোমার মনে আছে? তার মুখটা মনে আছে?
হ্যাঁ, সব মনে আছে।
কত বয়েস ছিল তার, যখন সে মরে যায়?
প্রায় তোমারই বয়েসি ছিল।
সেই জন্যই আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমার মনে হয়, আমি যদি এখন মরে যাই, তাহলে আমাকে অনেকে অনেকদিন মনে রাখবে। নইলে, আমি সকলের কাছেই একদিন না একদিন পুরোনো হয়ে যাব।
মনোলীনা, তুমি সত্যিই একটা অদ্ভুত মেয়ে!
মনোলীনা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মাটি থেকে পটাং পটাং করে কয়েকটা ঘাস ছিঁড়ল। তারপর সেইগুলো শুভ্রর কোটের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল তোমাকে যে আজ ডেকে আনলাম, সেজন্য তুমি রাগ করেছ?
শুভ্র বলল না, রাগ করব কেন? তবে একটু অবাক হয়েছি ঠিকই।
অবাক হওয়াটাই তো খুব ভালো। আমার মানুষকে অবাক করে দিতে খুব ভালো লাগে।
আমরা তো আজকাল চট করে অবাক হই না।
জীবনে আমরা যতবার অবাক হই, তার চেয়ে অনেক বেশিবার রেগে যাই, তাই না? অথচ, আমরা কেউ রাগতে চাই না। অবাক হতে চাই।
মেয়েটি এত সুন্দরভাবে কথাটা বলল যে, শুভ্র একটা তীব্র খুশি বোধ করল শরীরে। তার ইচ্ছে করল, মেয়েটিকে আদর করতে। কিন্তু এই দুপুরবেলা খোলা মাঠের মধ্যে।…তা ছাড়া মনোলীনার সঙ্গে তার পরিচয় মাত্র কয়েক দিনের।
তবু সে হাত বাড়িয়ে মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা মনোলীনার একটা হাত চেপে ধরল। মনোলীনা হাত সরিয়ে নিল না, তার কোমল হাতের স্নিগ্ধ উত্তাপ উপহার দিল শুভ্রকে। তারপর বলল তুমিও শুয়ে পড় না এখানে!
শুভ্র ভুরু উঁচু করে বলল, শুয়ে পড়ব!
হ্যাঁ, কেন, তোমার ইচ্ছে করছে না? টাই আর কোট পরে তোমায় মজার দেখাচ্ছে। কোটটা খুলে ফেলে মাথার বালিশ করে নাও!
হঠাৎ মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়ব?
এমনিতেই শুভ্রর চেনাশুনো কেউ তাকে এই দুপুরবেলা মাঠের মধ্যে বসে থাকতে দেখলে আঁতকে উঠবে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারবে না। শুভ্রজ্যোতি সেনগুপ্ত একজন বিরাট ব্যস্ত মানুষ। বিলেত থেকে ফেরার পরে শুভ্র কিছুদিন সরকারি দপ্তরে কাজ করেছিল, তারপর নিজের ফার্ম খোলে। সারা ভারত জুড়ে তাদের কাজ কারবার, এমনকি মালয়েশিয়াতেও কাজ করেছে কিছু। কাজের ব্যাপারে শুভ্র দারুণ সিরিয়াস। তা ছাড়া, সে হালকা স্বভাবের মানুষ নয়। সে নেশা করে না, বা মেয়েদের পেছনে ছোটাছুটি করে না। গোপনে যদি নারীদের উপভোগ করতে চাইতো সে, তা হলেও তার কোনো অসুবিধে ছিল না। প্রায়ই তাকে কলকাতার বাইরে যেতে হয়, টাকা দিয়ে সে মেয়েদের কিনতে পারে। কিন্তু শুভ্রর সে রকম ইচ্ছে হয় না। বিবাহিত জীবনে সে পরিতৃপ্ত।
মনোলীনার সঙ্গে তার আলাপ মাত্র কয়েকদিন আগে। তার ছোটো শ্যালিকার বান্ধবী এই মেয়েটি। একটি নেমন্তন্ন বাড়িতে প্রথম পরিচয় হয়। সেদিন উৎসব ভাঙতে বেশ রাত হয়েছিল। তার ছোটো শ্যালিকা বলেছিল, শুভ্রদা, তুমি একটু আমার বান্ধবীকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দেবে? অনেক রাত হয়ে গেছে, ওকে একা একা যেতে হবে…।
হাসির জ্বর হয়েছিল বলে সেদিন সে নেমন্তন্ন বাড়িতে আসেনি। গাড়িতে আরও লোক উঠেছিল, সবাইকে নামাতে নামাতে গিয়েছিল শুভ্র। মনোলীনার বাড়ি সবচেয়ে শেষে। মনোলীনার বাড়ির সামনে এসেও গাড়ির মধ্যে অন্তত আধঘন্টা কথা বলেছিল দুজনে। প্রথম আলাপেই মনোলীনা তাকে ‘তুমি’ বলতে শুরু করেছিল। আজকালকার মেয়েরা বোধহয় এ রকমই বলে।
সেদিন মনোলীনা বলেছিল—তুমি সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দিলে, কিন্তু কারুর সঙ্গে একটাও কথা বললে না কেন?
শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিল কথা বলিনি? কই, বললাম তো!
সে শুধু ভদ্রতার কথা। সবাই তোমাকে ধন্যবাদ জানাল, তুমি তার উত্তরে ভদ্রতা দেখালে। তুমি অন্য কথা ভাবছিলে? তুমি বুঝি সব সময় কাজের কথা ভাবো?
প্রথম দিনের আলাপেই কেউ এ রকমভাবে কথা বলে না। তা ছাড়া, একটা কলেজেপড়া বাচ্চা মেয়ে…তার তুলনায় শুভ্র রীতিমতো একজন দায়িত্বপূর্ণ ভারিক্কি লোক।
সেদিন গাড়ি থেকে নামবার সময় মনোলীনা বলেছিল—পাইপ খাও, এক এক সময় তোমার চোখ বুজে যায়—আমি লক্ষ করছিলাম। যারা লোকজনের মাঝখানে চোখ বুজে পাইপ টানে, তাদের সেই সময়টায় খুব বোকা বোকা দেখায়।
শুভ্র এ কথা শুনে রাগ করবে না বিরক্ত হবে, ঠিক করতে পারছিল না। মনোলীনা তক্ষুনি আবার বলেছিল—এবার থেকে চেষ্টা করে চোখ খুলে রেখো…তুমি তো আর সত্যি সত্যি বোকা নও!
শুভ্র এরপর তার ছোটো শ্যালিকা জয়িতাকে বলেছিল—তোমার বান্ধবীটি ভারী অদ্ভুত তো! কী রকম যেন কথা বলে…
জয়িতা বলেছিল ওই মনোলীনা তো, কলেজে ওকে অনেকে পাগলি বলে কিন্তু দারুণ ভালো মেয়ে। মনটা একেবারে সোনার মতন।
দু-তিনদিন বাদেই মনোলীনা একদিন ওদের বাড়িতে এসে হাজির। কয়েক মিনিটেই হাসির সঙ্গে তাঁর দারুণ ভাব হয়ে গেল। কোনো রকম আড়ষ্টতা না দেখিয়ে সে ঘুরে ঘুরে দেখল সব কটা ঘর। শুভ্রর ঘরের দেয়ালে একটা ছবি বাঁকা হয়ে ঝুলেছিল, সেটাকে সোজা করে দিল। চা খেল তিন কাপ। তখন টেলিভিশানে সিনেমা শুরু হবার কথা, তাকে বলা হয় সিনেমা দেখে যেতে। কিন্তু সে তক্ষুনি হাতের বইগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল—না, আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে।
সে কেন এসেছিল, কেন হঠাৎ চলে গেল, কিছুই বোঝা যায়নি। সে যাবার পর দেখা গেল, একখানা বই সে ফেলে গেছে।
আজ সে হঠাৎ শুভ্রর অফিসে এসে হাজির। শুভ্র তখন বোর্ড মিটিং-এ ব্যস্ত ছিল। অন্য যে কেউ হলে সে দেখাই করত না। কিন্তু হাজার হোক একটি যুবতী মেয়ে এবং ছোটো শ্যালিকার বান্ধবী, সুতরাং পুরোপুরি অবজ্ঞা করা যায় না। হাতের কাজ খানিকটা সরিয়ে রেখে সে মনোলীনাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কী ব্যাপার!
যেন কতকালের চেনা, এইরকমভাবে মনোলীনা বলেছিল, তোমার অফিসটা দেখতে এলাম! একজন মানুষকে শুধু নেমন্তন্ন বাড়িতে দেখলে চেনা যায় না। নিজের বাড়িতে, অফিসে সে নিশ্চয়ই আলাদা আলাদা মানুষ!
শুভ্র বলেছিল, বিভিন্ন পরিবেশে মানুষ তো খানিকটা আলাদা হয়ে যায়ই। এতে আর আশ্চর্য কী আছে?
তুমি আমার সঙ্গে একটু বেরুবে? গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাব।
শুভ্র আকাশ থেকে পড়েছিল। অফিসে হাজার ব্যস্ততার মধ্যে নিশ্বাস ফেলার পর্যন্ত সময় থাকে না। অন্যের অফিস নয় যে, শুভ্র মাঝে মাঝে ফাঁকি মারবার চেষ্টা করবে। এটা তার নিজের অফিস। তা ছাড়া দুপুরবেলা গঙ্গার ধারে বেড়ানো …সে তো কলেজের ছেলেদের ব্যাপার।
শুভ্র বলেছিল, তোমার গঙ্গার ধারে বেড়াতে ইচ্ছে করছে…আমার সঙ্গে…কেন, তোমার নিজের বন্ধু টন্ধু নেই?
মনোলীনা বলেছিল, কেন থাকবে না, অন্য অনেকের সঙ্গেই তো বেড়াতে যাই…আজ তোমার সঙ্গেই যেতে ইচ্ছে করছে, তুমি যাবে না?
শুভ্র বলতে যাচ্ছিল, না, এটা একটা অবাস্তব ব্যাপার। অফিসের জরুরি কাজকর্ম ফেলে সে একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে যাবে? মনোলীনা সরল ঝকঝকে দুটি চোখ মেলে তাকিয়েছিল তার দিকে। যেন এই মেয়েটিকে কিছুতেই আঘাত দেওয়া যায় না।
তখন হঠাৎ শুভ্র ভেবেছিল, একদিন নিয়মের ব্যতিক্রম করলেই বা ক্ষতি কী? দেখাই যাক না, এই মেয়েটি তার কাছে কী চায়। অফিসের সমস্ত লোককে বিস্মিত করে শুভ্রজ্যোতি সেনগুপ্ত দুপুর তিনটের সময় বেরিয়ে পড়েছিল একটি সুন্দরী যুবতী মেয়ের সঙ্গে।
শুভ্র বলল, আমি টাই পরে আছি বলে তোমার খারাপ লাগছে। আচ্ছা, খুলে ফেলছি।
মনোলীনা বলল, তুমি এই মাঠের ওপর শুয়ে পড়তে লজ্জা পাচ্ছ? কিন্তু, শুয়ে থাকলে কতখানি আকাশ দেখা যায়…শুয়ে আকাশ দেখা মানুষের ভাগ্যে খুব কম হয়…
শুভ্র খুলে ফেলল কোটটা। সেটা সাবধানে ভাঁজ করে রেখে সেও শুয়ে পড়ল, হচ্ছে যখন, ছেলেমানুষির চূড়ান্ত হোক। এই অবস্থায় শুয়ে থাকা আইনবিরুদ্ধ কিনা কে জানে! যদি তাদের পুলিশে ধরে।
মনোলীনা পাশ ফিরল শুভ্রর দিকে। শুভ্রর বুকের ওপর সে নিজের এক হাত রেখে বলল, তুমি জান না, তোমার মুখখানা এখন একেবারে অন্য রকম দেখাচ্ছে! তুমি নিজেই দেখলে বোধহয় চিনতে পারবে না।
শুভ্র বলল, আমি এখন সত্যিই একটা অন্য মানুষ!
তুমি ফুল ফোটা দেখেছ?
ফুল ফোটা মানে? কী ফুল?
যে-কোনো ফুল। গাছে প্রথমে একটা কুঁড়ি এল, তারপর আস্তে আস্তে একটু একটু করে সেটা ফুটল, একদিন পুরোপুরি ফুল হল, তারপর আবার ঝরে গেল…
না দেখিনি…ফুল অনেক দেখেছি, ফুলের মালা…ফ্লাওয়ার ভাসে সাজানো ফুল।
ফুলের চেয়েও ফুল ফোটা বেশি ভালো লাগে।
কী করে দেখবো বলো…আমরা শহুরে মানুষ।
অনেক বাড়ির ছাদে ফুলের টব থাকে।
হাসি কয়েকটা টব রেখেছিল ছাদে, তারপর ঠিক মতন যত্ন নিতে পারেনি।
তুমি যত্ন করোনি?
আমি? আমার সময় কোথায়?
একটি অল্পবয়েসি বাচ্চা এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে। পয়সা চাইছে। গাছতলার ছায়ায় স্নিগ্ধ বাতাসের মধ্যে শুয়ে থেকে শুভ্র যেন সত্যিই এক নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছে। এ সময় ভিখিরির উৎপাত তার ভালো লাগলো না। ভিখিরিদের বিদায় করার সবচেয়ে ভালো উপায় দুটো-চারটে পয়সা দিয়ে বিদায় করা। কিন্তু একজনকে দিলেই আরও আসবে। তা ছাড়া, শুভ্রর কাছে একেবারেই খুচরো পয়সা নেই।
এই যাও।
কিন্তু ছেলেটি যাবে না। বিরক্তি সৃষ্টি করাই তার অস্ত্র। শুভ্র বেশ জোরে বকুনি দিল ছেলেটিকে।
মনোলীনা তার ছোট্ট ব্যাগ খুলে একটা দশ পয়সা বার করে শুভ্রর হাতে দিয়ে বলল এই নাও!
মনোলীনা তো নিজেই ভিক্ষে দিতে পারত ছেলেটিকে। তার বদলে পয়সাটা সে শুভ্রর হাতে দিল কেন? শুভ্র একটু ক্ষুণ্ণ হল। খুচরো পয়সা থাকলেও সে তো পুরো একটা টাকাই দিয়ে দিতে পারত ছেলেটিকে। তার কাছে এক টাকার দাম কিছুই নয়।
মনোলীনা কি ওই দশ পয়সা শুভ্রকেই ভিক্ষে দিল? পয়সাটা সে ছুড়ে দিল ছেলেটির দিকে। বলল এরপর আরও ছেলেরা আসবে।
মনোলীনা বলল আমার কাছে আরও খুচরো পয়সা আছে।
টাটকা হাওয়ায় শুভ্র জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগল। এমনকি তার পাইপ ধরাবারও ইচ্ছে হল না। এতক্ষণে সে একবারও পাইপ খায়নি।
মনোলীনা, আমার মনে হচ্ছে আমি তোমার সমান বয়েসি হয়ে গেছি।
তুমি বুঝি নিজেকে খুব বড়ো ভাব?
বয়সের দিক থেকে তো বটেই, সেটা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তা ছাড়া আমি ভীষণ একটা কাজের জগতে, ব্যস্ত জগতে ঢুকে গিয়েছিলাম… কোনোদিন দুপুরবেলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি…তুমি ভাগ্যিস আমাকে ডেকে আনলে…তা তোমার কাছে আমি কতটা কৃতজ্ঞ।
আমরা অনেকে এরকম প্রায়ই আসি…শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি।
আমাকে তোমাদের দলে নেবে?
উত্তর না দিয়ে মনোলীনা হাসল শুধু। শুভ্রর ইচ্ছে করল, ওই নির্মল হাসিটুকু সে মনোলীনার ওষ্ঠ থেকে চেটে নেয়। এরকম ইচ্ছে তার আগে কখনও হয়নি। আজ সে বাচ্চা বয়সের মতন উত্তেজনা বোধ করছে।
মনোলীনা বলল তুমি এমন কোনো জায়গা জানো, যেখানে কোনো অশান্তি নেই, দুঃখ নেই, হিংসে নেই, লোভ নেই।
শুভ্র বলল সেরকম জায়গা পৃথিবীতে আবার আছে নাকি। আমার তো মনে হয় না।
আছে।
আছে? কোথায়? তুমি সেরকম জায়গা খুঁজে পেয়েছ?
না, এখনও খুঁজে পাইনি। কিন্তু কোথাও না কোথাও আছে নিশ্চয়ই…যতদিন সে জায়গাটা খুঁজে না পাই, ততদিন মনে মনে সেরকম জায়গা বানিয়ে নিতে পারি…এরকম আকাশের নীচে শুয়ে, চোখ বুজে…তুমি চোখ বুজে দেখো…
শুভ্র সত্যিই চোখ বুজল? অমনি তার মনে পড়ে গেল অফিসে ফেলে রেখে আসা কাজের কথা। সে বিরক্ত হয়ে উঠল নিজের ওপর। সব কিছু ভুলে যেতে চাইল। একটু পরেই মনে হল, সে বুঝি হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুমের মধ্যে একটা লোভহীন, হিংসাহীন শান্তিময় জায়গা আছে বটে।
শুভ্র উঠে বসল। মনোলীনা তখনও চোখ বুজে আছে। এই মেয়েটি তার কাছে কী চায়?
মনোলীনা, সত্যি করে বলো তো, তুমি আমাকে এখানে ডেকে আনলে কেন?
এমনিই!
এমনিই? কিন্তু …যদি আমার নেশা ধরে যায়? যদি আমি বারবার তোমার সঙ্গে এখানে আসতে চাই?
তা তুমি চাইবে না!
যদি চাই?
আমাকে ডেকো, আমি আসবো!
কিন্তু কেন আসবে? আমি তোমার কে? তোমার নিশ্চয়ই অনেক সমবয়সি বন্ধু-বান্ধব আছে…ইস, পাঁচটা বাজল, আমাকে অফিসে যে একবার ফিরতেই হবে।
চল, ফিরে যাই।
যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু উপায় নেই, যেতেই হবে, একবার অন্তত, কিছু বলে আসিনি…আমি না ফেরা পর্যন্ত অনেকে বসে থাকবে।
চলো।
তুমি কোনদিকে যাবে?
আমি অন্যদিকে…একটু এগুলেই বাস পেয়ে যাবো।
আমি ট্যাক্সি নিচ্ছি, তোমায় কোথাও নামিয়ে দেবো?
না।
তুমি আর কখনও নিজে থেকে এসে আমায় ডাকবে?
কী জানি।
আজ তবে কেন এলে? কেন হঠাৎ ডাকলে?
এমনিই ইচ্ছে হল।
মনোলীনা, তুমি এত সুন্দর…তুমি আজ আমাকে কী চমৎকার দুটি ঘন্টা উপহার দিলে…যদি আবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই…কিংবা যদি আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই।
মানুষকে মানুষ ভালোবাসবে, এই তো স্বাভাবিক।
সেরকম ভালোবাসা নয়…আমি যেন তোমাকে বহুকাল ধরে চিনি, তুমি আর আমি খুব কাছের মানুষ।
চোখ বুজে পাশাপাশি শুয়ে থাকলে এই রকম মনে হয়। তারপর চোখ খুলে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকবার পর সেটা ভেঙে যায়।
মনোলীনা চট করে উঠে দাঁড়াল, তারপর শুভ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললে ওঠো, তোমার দেরি হয়ে যাবে।
শুভ্রর পিঠে ধুলো লেগেছিল, মনোলীনা সযত্নে ঝেড়ে দিল পিঠটা। শুভ্র যেন শিশু একটা। তারপর শেষ বিকেলের রঙিন আলোর মতন ঝলমলিয়ে হেসে মনোলীনা বলল, যারা খুব কাছের মানুষ, কিছুক্ষণের জন্য তাদের কাজ ভুলিয়ে দিতে আমার খুব ভালো লাগে।
আবার দেখা হবে?
হ্যাঁ, যখন তোমার ইচ্ছে হবে।
আর দেরি করা যায় না। শুভ্রকে এগিয়ে আসতেই হল রাস্তার দিকে। সহজেই পাওয়া গেল ট্যাক্সি। কিন্তু মনোলীনা কিছুতেই রাজি হল না সেই ট্যাক্সিতে চাপতে। সে হাঁটবে। শুভ্রর ট্যাক্সি ঘুরে গেল উল্টো দিকে। পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সে অনেকক্ষণ ধরে দেখল। মনোলীনা মাথা নীচু করে হাঁটছে আস্তে আস্তে। যেন সে দিগন্তের মধ্যে মিলিয়ে যাবে।
পাইপ জ্বালবার জন্য কোটের পকেটে হাত দিয়ে অন্য কী যেন টের পেল শুভ্র। এক মুঠো ঘাস। মনোলীনা এক সময়ে তার পকেটে ভরে দিয়েছিল। সেগুলো ফেলে দিতে গিয়েও ফেলল না শুভ্র। অফিসে ফিরে এসে রেখে দিল নিজের ড্রয়ারে।
তারপর আবার আগেকার মতন দিন কাটতে লাগল, সেই একঘেয়ে ব্যস্ততায়। এক সপ্তাহের মাথাতেই তাকে অফিসের কাজে যেতে হল দিল্লি। ফিরে এল দুদিন বাদেই। মনোলীনা আর আসেনি। মনোলীনার কথা হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় শুভ্রর। এক এক সময় বুকটা মুচড়ে ওঠে।
মনোলীনাকে যখন সে জিজ্ঞেস করেছিল, আবার দেখা হবে? তার উত্তরে সে বলেছিল, যখন তোমার ইচ্ছে হবে। শুভ্রর কি ইচ্ছে হয় না। কিন্তু ইচ্ছেটাই সব নয়!
মনোলীনা তার কাছে কিছু চায়নি। শুভ্র খুব ভালোমতন ভেবে দেখেছে, মেয়েটির অন্য কোনো মতলব ছিল না। সে শুভ্রকে প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমে পড়তে চায়নি। শুভ্রর টাকা পয়সা, প্রতিপত্তি আছে, কিন্তু সে সম্পর্কে কোনো আগ্রহই দেখায়নি মনোলীনা। একটা পয়সা খরচ হয়নি তার জন্য। বরং মনোলীনাই দশটা পয়সা দিয়েছিল শুভ্রর হাতে। যেন সে প্রচুর সম্পত্তির মালিক সেইভাবে বলেছিল, আরও অনেক খুচরো পয়সা আছে।
মনোলীনা আর কিছু চায়নি, শুধু তার ইচ্ছেটুকু চেয়েছিল। কিন্তু ইচ্ছেটাই সব নয়। ইচ্ছে থাকলেও শুভ্র আর গঙ্গার ধারে মাঠের ওপর দুপুরবেলা শুয়ে থাকার সময় করতে পারে না। মনোলীনাকে খুঁজে বার করার চেষ্টাও সে করেনি। তার ছোটো শ্যালিকা জয়তীর কাছে মনোলীনার খোঁজ নিতে লজ্জা পেয়েছে। এমনকি মনোলীনার বাড়িও সে চেনে। একদিন মাঝ রাতে পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু শুভ্র কি হঠাৎ মনোলীনার বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বলতে পারে, তুমি আমার সঙ্গে বেড়াতে চলো। তা হয় না। সে শুভ্রজ্যোতি সেনগুপ্ত, দারুণ ব্যস্ত মানুষ, এসব ছেলেমানুষি তাকে মানায় না।
মাঝে মাঝে টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে সেই ঘাসগুলো দেখে। শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে এসেছে। তবু থাক। শুভ্রর দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সেই গাছের তলায় ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা দুপুরবেলা, তার বুকের ওপর মনোলীনার একটা হাত, সেই দৃশ্যটা যেন স্বপ্ন মনে হয়। কিন্তু স্বপ্ন তো নয়, ঘাসগুলো রয়েছে।
মনোলীনা জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি যখন জন্মেছিলে, তখন আমি কোথায় ছিলাম?
শুভ্র বলেছিল, ‘ইচ্ছে হয়ে ছিলে মনের মাঝারে’।
এখন, শুভ্রর বুকের মধ্যে মনোলীনা একটা ইচ্ছে হয়েই রইল।
বাইরের আলো
বাইরের আলো
সারাদিন অসংখ্য কাজ। পর পর সব ছক-বাঁধা কাজ ঠিক হয়ে আছে আগে থেকেই। এমনকি দুপুরে খাওয়ার অবসর পর্যন্ত নেই, লাঞ্চের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে একজনের সঙ্গে, সেখানেও কাজের কথা হবে।
দাড়ি কামাবার যন্ত্রটাতে ঘরর ঘরর করে আওয়াজ হচ্ছে, তবু মনীশ দ্রুত চিন্তা করে যাচ্ছে যে, এর মধ্যে কোনো কাজটা আজ বাদ দেওয়া যায় কিনা। আজ ইন্দ্রাণী আসবে, মনীশের কি উচিত নয়, এয়ারপোর্টে গিয়ে তাকে নিয়ে আসা? প্রথম বিদেশে আসছে, এয়ারপোর্টে একটা চেনা মুখ দেখলে ভালো লাগে।
কিন্তু কী করে যাবে মনীশ? শিকাগো এখান থেকে একশো আশি মাইল দূর। যাওয়া-আসায় অন্তত পাঁচ ঘন্টা ছিনিয়ে নেওয়া একেবারে অসম্ভব।
আর ভেবে লাভ নেই, মনীশ মন ঠিক করে ফেলল। কলেজ থেকে মনীশ ভেঙ্কটকে পাঠিয়ে দেবে গাড়ি দিয়ে। সে নিয়ে আসবে ইন্দ্রাণীদের কোনো অসুবিধে হবে না।
ইন্দ্রাণীরা এখানে আসছে কেন? ইন্দ্রাণীর স্বামীর কী একটা অফিসের কাজ পড়েছে ভ্যাঙ্কুবারে। ইন্দ্রাণীও আসবে সঙ্গে। সরকারি কাজ, শুধু সোজাসুজি ভ্যাঙ্কুবার যাওয়া-আসার ভাড়া দেবে। মাঝখানে ওরা একটু বেড়িয়ে নিতে চায়। মা চিঠি লিখেছিলেন মনীশকে, ইন্দ্রাণীরা তোর ওদিকেই কাছাকাছি যাচ্ছে, তোর ওখানে একদিনের জন্য থাকতে চায়, তোর কি অসুবিধে হবে?
কাছাকাছি। মায়ের ধারণা, এরোপ্লেনে করে যারাই ভারতের বাইরে আসে, তারাই তাঁর ছেলের কাছাকাছি যায়। কোথায় ভ্যাঙ্কুবার আর কোথায় সিডার র্যাপিডস! তবু মনীশ তো আর আপত্তি করতে পারবে না। সে সংক্ষেপে লিখে দিয়েছিল, আসতে পারে।
এরপর সব দিনক্ষণ জানিয়ে ইন্দ্রাণী নিজে লেখেনি, লিখেছিল তার স্বামী। ইংরেজিতে! গত এগারো বছরে একটাও চিঠি লেখেনি ইন্দ্রাণী।
রান্নাঘরে গিয়ে ডিম আর সসেজ ভেজে নিল তাড়াতাড়ি। তারপর ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ল মনীশ। ফ্রিজ প্রায় খালি, কিছু খাবার-দাবারও আনিয়ে রাখতে হবে। আজ এসব দায়িত্বও দিতে হবে ভেঙ্কটকে। ভেঙ্কট ছেলেটি ভালো, খুব কথা শোনে।
গাড়ির ওপর বরফ জমে আছে। কাচেও বরফের আস্তরণ। ভেতরে ঢুকে মনীশ হিটার চালু করে দিল। ভেঙ্কটকে তুলে নিয়ে প্রথমে কলেজে যেতে হবে। পর পর তিনটি ক্লাস, তারপর প্রফেসার ফ্রিডম্যানের সঙ্গে লাঞ্চ, তারপর ফ্যাকাল্টি মিটিং তারপর যেতে হবে সেইনস শহরে, সেখানে একটা সেমিনার আছে, ফিরে এসেই সাড়ে ছটায় নোবেল লরিয়েট ড. ভ্যান অ্যালেনের রিসেপশান, আটটার সময় ডিন অব দ্য ফ্যাকাল্টি ড. এঙ্গেল কী একটা কাজের কথার জন্য তাঁর বাড়িতে ডেকেছেন…। ইন্দ্রাণীরা পাঁচটার মধ্যে এখানে পৌঁছে যাবে।
সস্তার বাড়ি ভাড়ার জন্য ভেঙ্কট থাকে শহর থেকে খানিকটা দূরে। মনীশ ব্যস্ততার প্রতিমূর্তি হিসেবে দুরন্ত গতিতে তার থান্ডারবার্ড গাড়িটা চালাচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন আগে বরফ পড়া শুরু হয়েছে, সব গাছের পাতা এখনো ঝরেনি, এখনও রাস্তার দু-পাশের মেপল গাছ থেকে টুপটাপ করে খসে পড়ছে পাতা। একটুখানি দূরত্বের মধ্যেই মনীশ পর পর, তিনটি মরা পাখি দেখতে পেল। অনেকটা ছাতারে ধরনের পাখি, এরা শীতের শুরুতেই এক এক করে মরে। এরা বোধহয় বেশিদূর উড়ে যেতে পারে না।
একটা বড়ো গাছের তলায় মনীশ হঠাৎ গাড়িটা থামাল। হাত থেকে গ্লাভস খুলে ফেলে ধরাল একটা সিগারেট। মনটা আজ বড়ো চঞ্চল হয়ে আছে। দেশ থেকে মাঝে মাঝেই তো এরকম দু-একজন আসে। সুপ্রিমকোর্টে একটা মামলা হয়ে যাবার পর এখন ভারতের যে-কেউ টিকিট কেটে বিদেশের যে-কোনো জায়গায় বেড়াতে যেতে পারে। যাদের টাকা আছে তারা অনেকেই এখন এক মাস দেড় মাসের জন্য হুড়োহুড়ি করে পৃথিবীর অর্ধেকটা ঘুরে দেখে যায়। তবে ফরেন এক্সচেঞ্জের কড়াকড়ির জন্য তাদের হাতে যেহেতু বেশি টাকা থাকে না, তাই বিদেশে যে-কোনো সূত্রে কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-পরিজন খোঁজে। মনীশের কাছেও আগে এসেছে চার-পাঁচ জন, এদের দু-এক জনের জন্য বেশ বিরক্তিই বোধ করেছে মনীশ। নিছক বাঙালি দেখামাত্রই খুশি হয়ে ওঠার মতন মনোবৃত্তি অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছে মনীশের।
আজ যদি তার অসুখ হত? মনীশ ভাবল অসুস্থ হয়ে পড়লে তো সে আজ কোনো কাজেই যেতে পারত না। বাড়ি ফিরে গিয়ে মনীশ টেলিফোনে সবাইকে জানিয়ে দেবে? কেউ অবিশ্বাস করবে না। এমনকি সে কতখানি অসুস্থ, সে খোঁজও নিতে আসবে না কেউ। এদেশে সেরকম নিয়ম নেই। কিন্তু সত্যিকারের অসুস্থ হওয়া আর অসুখের ভান করার মধ্যে অনেক তফাত। বাজে লোকরা ওসব করে। গত দশ বছরের মধ্যে এরকম কিছু একদিনও করেনি। তার স্বভাব পালটে গেছে। সে পারবে না।
মনীশ আবার গাড়িতে স্টার্ট দিল এবং একটু পরেই সারাদিনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সন্ধে সাড়ে ছটার সময় উডস্টক হোটেলের রিসেপশানে একগাদা লোকের মধ্যে দেঁতো হাসি হেসে কথা বলতে বলতে হঠাৎ এক সময় মনীশের মনে হল, ইন্দ্রাণীরা এতক্ষণ নিশ্চয় তার বাড়িতে এসে বসে আছে। কী রকম চেহারা হয়েছে ইন্দ্রাণীর, তা এক্ষুনি দেখতে ইচ্ছে করে মনীশের। ইন্দ্রাণী অনেক বদলে গেছে। দশ-এগারো বছরে সবাই বদলায়।
কিন্তু এক্ষুনি তো যাবার উপায় নেই। ভেঙ্কটকে বলে রাখা আছে, ওদের খাবার-টাবারের সব ব্যবস্থা করে দেবে। কাল শুক্রবার, কাল দুপুর তিনটের পর থেকে মনীশের আর কোনো কাজ নেই। শনি রবি তো পুরো ছুটি। ইন্দ্রাণীরা কতদিন থাকবে কে জানে!
মনীশ ছুটি পেল রাত দশটায়। খানিক আগে ঝুরঝুর করে বরফ পড়তে শুরু করেছে। একদম হাওয়া নেই, থমথমে আবহাওয়া, এতেই বোঝা যায় রাত্রে প্রচুর তুষারপাত হবে। এই শুরু হয়ে গেল, এখন চলবে তিন-চার মাস।
রাস্তা-ঘাট নির্জন, মনীশ ট্যাক্সিতে হু-হু করে বাড়ি ফিরে এল। তার বাড়িটা প্রায় অন্ধকার। টর্চের আলো নেভান, বসবার ঘরের আলো নেভান, শুধু একটা ঘরে আলো জ্বলছে।
মনীশ একটু হাসল। যারা নতুন আসে, তারা প্রত্যেকেই এরকম করে। আলো নিভিয়ে রেখে খরচ বাঁচাতে চায়। ভারতীয় অভ্যেস। মনীশ তার শোওয়ার ঘর ছাড়া আর সব ক-টি ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখে সারারাত। সবাই রাখে। একে একে আলো জ্বালতে জ্বালতে ভেতরে ঢুকল মনীশ। বসবার ঘরে ঢুকে ওভারকোটটা খোলামাত্র তার শীত করতে লাগল। সেন্ট্রাল হিটিংও চালায়নি নাকি? ভেঙ্কটকে তো সব বলে দিয়েছিল মনীশ।
গেস্ট রুমটায় ইন্দ্রাণীদের জন্য বিছানা-টিছানা পেতে সব বন্দোবস্ত করে গিয়েছিল। শুধু সেই ঘরটায় আলো জ্বলছে। ওরা ঘুমিয়ে পড়ল নাকি এর মধ্যে। দরজা বন্ধ।
একটু পরেই খুট করে দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এল ইন্দ্রাণী। সোয়েটার, কোট সবকিছু পরা। মনীশ তখন টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজগুলো সরাচ্ছিল, শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
না। মনীশের বুক কাঁপল না। বুক অনেক কঠিন হয়ে গেছে। ইন্দ্রাণীর চেহারা খুব একটা বদলায়নি, সামান্য একটু মোটা হয়েছে, চোখ-মুখের সেই ধারালো ভাবটা আর নেই। তার ফলে তাকে এখন বেশ লাবণ্যময়ী মনে হয়।
একটু হেসে মনীশ জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ? কোনো অসুবিধা হয়নি তো।
ইন্দ্রাণী এক পা এগিয়ে এসে বলল, এ কি চেহারা হয়েছে তোমার! প্রথমে চিনতেই পারিনি।
মনীশ বলল, কই, আমার চেহারা তো বদলায়নি তেমন। কয়েকটা চুল পেকেছে শুধু।
ইন্দ্রাণী বলল, মোটেই না, তোমার চোয়াল দুটো আগে এত চওড়া মতন ছিল না, কাঁধ দুটো উঁচু হয়ে গেছে, তুমি অনেক লম্বা হয়ে গেছ।
মনীশ বলল, বাঃ, এই বয়েসে আবার কেউ লম্বা হয় নাকি? তোমার স্বামী কোথায়? ঘুমিয়ে পড়েছেন?
না, ডাকছি।
ইন্দ্রাণীর স্বামী প্রবীর ঘোষ বেরিয়ে এল একটা ড্রেসিং গাউন পরে। মনীশের চেয়ে বয়েসে সামান্য ছোটো মনে হয়, মাঝারি ধরনের চেহারা, মুখখানা বেশ ভালো মানুষ ভালো মানুষ ধরনের।
ইন্দ্রাণীর স্বামীকে আগে দেখেনি মনীশ। ইন্দ্রাণীর বিয়ের এক মাস আগে চলে আসে এদেশে। তখন অবশ্য ঠিক ছিল পোস্ট ডক্টরেট রিসার্চ করে তিন বছর বাদেই সে দেশে ফিরে যাবে। তারপর দশ বছর কেটে গেছে মনীশের আর ফেরা হয়নি।
আর কেউ জানে না শুধু ইন্দ্রাণীই বুঝেছিল যে মনীশ ইচ্ছে করেই তাড়াহুড়ো করে ইন্দ্রাণীর বিয়ের আগে চলে এসেছিল। সেই জন্যই ইন্দ্রাণী কি তার স্বামীকে দেখাতে নিয়ে এসেছে?
প্রবীরের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হল। প্রথমে কিছু ভদ্রতার কথা। প্লেন দেরি করেনি তো? ভেঙ্কট ঠিক সময়ে গিয়েছিল? খাওয়া হয়ে গেছে? মনীশ খুব দুঃখিত যে সে এয়ারপোর্টে যেতে পারেনি।
ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল, মনীশদা, তুমি খাবে না?
পার্টিতে টুকিটাকি খাবার খেয়েছে মনীশ। পুরো ডিনার খায়নি। তার আর কিছু খাবার ইচ্ছেও নেই। সারাদিন ঘোরাঘুরি আর এত লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সে ক্লান্ত বোধ করছে।
কাবার্ড থেকে একটা ব্র্যান্ডির বোতল আর কয়েকটা গ্লাস বার করে মনীশ জিজ্ঞেস করল প্রবীরকে, আপনি কি ব্র্যান্ডি খাবেন? কিংবা অন্য কিছু? আমার কাছে আছে—
প্রবীর ইন্দ্রাণীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমি খাব?
ইন্দ্রাণী মনীশের দিকে চেয় বলল, না, ও খাবে না। ওর সহ্য হয় না।
মনীশ শুধু নিজের গেলাসে ঢেলে একটা ছোটো চুমুক দিল। দেশ থেকে তার আত্মীয়-স্বজন এসেছে বলে যতখানি উৎসাহিত হয়ে ওঠা উচিত ছিল, ততটা হতে পারছে না। পাছে ওরা কিছু মনে করে, তাই মনীশ নকল উৎসাহ দেখিয়ে বলল, তোমরা কিছুদিন থাকছ তো? কাল বিকেল থেকে আমার ছুটি আছে, গাড়ি নিয়ে কোথাও বেড়াতে বেরিয়ে পড়া যাবে। আমি তো ভেবেছিলাম, আজই তোমাদের নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাব, কিন্তু একটু বেশি রাত হয়ে গেল।
তবু এখনও যাওয়া যায়—
প্রবীর বলল, আর খাওয়া! আপনার বোন তো কিছুই খেতে চাইছে না, প্লেনে চড়ার জন্য এখনও নাকি গা গুলোচ্ছে।
বোন? কথাটা মনীশের কানে খট করে লাগল। হ্যাঁ, সকলেই অবশ্য বলবে যে ইন্দ্রাণী তার বোন। বেশ কাছাকাছি একটা সম্পর্ক আছে। তার মায়ের খুড়তুতো বোনের মেয়ে। শুধু মনীশই এই সম্পর্কটা মানতে চায়নি। সে কোনোদিন দেখেনি তার মায়ের কাকাকে। অল্প বয়সে তিনি মারা যান। ইন্দ্রাণীদের বাড়ি মজঃফরপুরে। কলকাতায় এম এ পড়তে এসেছিল ইন্দ্রাণী, একটা হোস্টেলে থাকত, কী একটা গোলমালে হোস্টেলটা বন্ধ হয়ে যায়, তখন মনীশের মা ইন্দ্রাণীকে তাঁদের বাড়িতে এনে রেখেছিলেন কয়েক মাস। ঠিক ভাই-বোন নয়, অনেকটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়েছিল, ইন্দ্রাণীর সঙ্গে মনীশের। সে পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ইন্দ্রাণীর যখন বিয়ের ঠিক হল, তখন মনীশ আপত্তি জানায়। ইন্দ্রাণী অন্য কারুর হয়ে যাবে, এটা সে কিছুতেই মানতে পারছিল না। মনীশের সঙ্গে ইন্দ্রাণীর বিয়ে যেন একটা অসম্ভব প্রস্তাব, এমনকি ইন্দ্রাণী পর্যন্ত রাজি হয়নি।
সে কতদিন আগেকার কথা। এখন সেই অভিমানের সামান্য চিহ্নও মনীশের বুকের মধ্যে জমা নেই।
ইন্দ্রাণী বলল, আমরা কাল বিকেলেই চলে যাব।
মনীশ অবাক হয়ে বলল, কাল বিকেলেই?
প্রবীর বলল, শনিবার ভ্যাঙ্কুবারে আমার মিটিং। রবিবার একটা কেবলস ফ্যাক্টরি দেখতে যেতে হবে। সোমবার কন্ট্রাক্ট সাইন হবার কথা।
মনীশ বলল, মাত্র একদিনের জন্য এখানে এলেন? কিছুই তো দেখা হবে না!
প্রবীর বলল, সরকারি কাজ, এ তো ঠিক বেড়াতে আসা নয়। ফেরার পথে আপনার বোনকে একটু বিলেত প্যারিস ঘুরিয়ে নিয়ে যাব। নিউ ইয়র্কেও দুদিন থাকার কথা আছে।
তারপর প্রবীর একটা ছোটো কাশি দিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে একটা দরকারি কথা ছিল!
মনীশ জানে এবার প্রবীর কোন দরকারি কথা বলবে। সবাই ওই একটাই কথা বলে।
প্রবীর বললে, আপনি তো দেশে কিছু টাকা পাঠান। সেই টাকাটা আমরা দেশে পে করে দেবো। তার বদলে আপনি যদি কিছু ডলার দিতে পারেন আমাদের, জানেনই তো, মেয়েদের কিছু কেনাকাটার শখ থাকে।
মনীশ জিজ্ঞেস করল, কত?
প্রবীর বলল, এই আড়াইশো তিনশো ডলার। চারশো পেলে আরও ভালো হয়। মনীশ খানিকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, সেটা এমন কিছু ব্যাপার নয়। কাল সকালেই ব্যবস্থা করে দেবো।
শুধু মনীশকে দেখার জন্যই ইন্দ্রাণী এত দূর ছুটে আসেনি। এসেছে স্বার্থের কারণে।
ইন্দ্রাণী কথা ঘোরাবার জন্য বলল, তোমার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। খুব সুন্দর বাড়ি। এত বড়ো বাড়িতে তুমি একা থাক?
মনীশ বলল, এদেশে চাকর-বাকর পাওয়া যায় না, আর কে থাকবে?
ইন্দ্রাণী আর প্রবীর চোখাচোখি করল।
মনীশ বলল, আগে একটা কুকুর রেখেছিলাম। তা আমি সারাদিন বাড়ি থাকি না, ওকে ঠিকমতন খাবার দেওয়া হয় না, তাই অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছি কুকুরটা।
ইন্দ্রাণী উঠে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়াল। ফ্যাকাসে আলোয় দেখা যায় অবিরল তুষারপাত। পথঘাট এর মধ্যেই সাদা হয়ে গেছে।
ইন্দ্রাণী বলল, কী সুন্দর, না? ইচ্ছে করে এই বরফের মধ্যে ছুটোছুটি করতে। কখনও এমন বরফ পড়া দেখিনি।
মনীশ বলল, যাও না। ভালো লাগবে।
প্রবীর বলল, ওর দারুণ সর্দি হয়েছে। আর ঠান্ডা লাগলে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। মনীশ হাসতে হাসতে বলল, গায়ে বরফ লাগলে সর্দি সেরে যায়।
ইন্দ্রাণী ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, সত্যি?
মনীশ বলল, সত্যি। যারা প্রথম প্রথম আসে, অনবরত ঠান্ডা-গরমে তাদের সর্দি লেগে যায়। ঘরের মধ্যে গরম, বাইরে ঠান্ডা। মাঝে মাঝে একটু ঠান্ডা লাগিয়ে সহ্য করিয়ে নিতে হয় শরীরটাকে।
ইন্দ্রাণী বলল, চল না, আমরা তাহলে বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি।
মনীশ প্রবীরের দিকে তাকিয়ে বলল, চলুন।
প্রবীর বলল, ওরে বাবা, আমি যাব না। আমার একদম ঠান্ডা সহ্য হয় না। আপনারা ঘুরে আসুন না।
ইন্দ্রাণী বলল, ও ভয়ানক শীত-কাতুরে। ও থাক, চল আমরা একটু বেড়িয়ে আসি!
প্রবীর বলল, তাই যান।
মনীশ এক চুমুকে গেলাসের ব্র্যান্ডিটা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে প্রবীরের কনুই ছুঁয়ে বলল, আরে মশাই, চলুন চলুন, ভালো লাগবে। দেখবেন, বরফের মধ্যে বেশি শীত করে না। কাছেই সিডার নদী, দেখবেন জমে গিয়ে বরফ হয়ে গেছে। প্রবীর মিনমিন করে বলল, আমি ওভারকোট আনিনি।
ইন্দ্রাণী বললে, ও না যেতে চায়, থাক না। জোর করে লাভ নেই। চলো আমরা ঘুরে আসি।
মনীশ বলল, আমার একটা একস্ট্রা ওভারকোট আছে, ওকে দিচ্ছি। আর ইন্দ্রাণী, তোমাদের ঘরের ওয়ার্ডরোবে দেখো একটা লাল রঙের কোট আছে। সেটা তোমার হয়ে যাবে।
ইন্দ্রাণী কোটটা নিয়ে এসে বলল, এটা কার? এটা তো মনে হচ্ছে মেয়েদের।
মনীশ সংক্ষেপে বলল, ওটা ছিল আমার স্ত্রীর। নিয়ে যায়নি।
ইন্দ্রাণী আর প্রবীর আবার চোখাচোখি করল।
ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল, তোমার স্ত্রী…সে এখন কোথায়?
মনীশ সংক্ষেপে জানাল, সে এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকে, দেড় বছর আগে তার সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। চলো যাওয়া যাক।
দেশে এই নিয়ে ফিসফাস চলছিল অনেক দিন, মনীশ একটা মেমকে নিয়ে থাকে। তাই দেশে ফেরার দিকে তার মন নেই। মনীশ অবশ্য এক চিঠিতে লিন্ডা নামের সেই মেয়েটিকে বিয়ে করার কথা জানিয়েছিল। কেউ ঠিক বিশ্বাস করেনি। আত্মীয়-স্বজন কেউ দেখল না, সে আবার কী রকম বিয়ে? যাক, মেয়েটা তাহলে ঘাড় থেকে নেমে গেছে।
ইন্দ্রাণী জিজ্ঞেস করল, মনীশদা, মাসিমা তোমাকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন, তুমি আর বিয়ে করবে কি না?
মনীশ বলল, তুমি বুঝি আমার মায়ের চর হয়ে এখানে এসেছ? ফিরে গিয়ে রিপোর্ট করবে?
ইন্দ্রাণী বলল, ও মা, চর আবার কী? মাসিমা বলেছেন তুমি চার-পাঁচ লাইনের বেশি চিঠি লেখো না।
প্রথমে বড়ো দরজা তারপর জালের দরজাটা খুলে ফেলে মনীশ বলল, এসো।
তারপর প্রবীরকে জিজ্ঞেস করল, গাড়িতে যাবেন, না হেঁটে? হাঁটলেই বেশি মজা লাগবে।
ইন্দ্রাণী বলল, হেঁটেই যাব।
বাইরে পা দিয়েই সে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠল। সামনে ছোটো বাগানটাতে সে দৌড়ে গিয়ে বললে, ওমা, গায়ে কী সুন্দর বরফ পড়ছে, কিন্তু ভিজে যাচ্ছে না তো কিছু, ফুলের পাপড়ির মতন।
আজ চাঁদ ওঠার কথা, কিন্তু চাঁদ দেখা যায় না। সারা আকাশ জুড়ে রয়েছে কিছুটা আবছা আলো। উইলো গাছগুলোর ডালে এমনভাবে বরফ জমে আছে যেন মনে হয় থোকা থোকা সাদা ফুল। চতুর্দিক একদম নিস্তব্ধ। বরফ পড়ার সময় কোনো শব্দ শোনা যায় না।
ওরা হাঁটতে লাগল সিডার নদীর দিকে। ইন্দ্রাণী একেবারে ছেলেমানুষের মতন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই রাস্তা থেকে তুলে নিচ্ছে পেঁজা বরফ। হাতের মুঠোতে নিয়ে গোল বল তৈরি করছে। তারপর সেগুলো ছুড়ে দিচ্ছে গাছের দিকে। একটা বল সে সোজা মনীশের মুখের ওপর ছুড়ে মেরে বলল, তুমি ভীষণ গম্ভীর আর অন্যরকম হয়ে গেছ।
হেসে, কোনো কথা না বলে গা থেকে বরফের গুঁড়োগুলো ঝেড়ে ফেলল মনীশ। প্রবীর একটু পিছিয়ে পড়েছে। তার জন্য অপেক্ষা করল। প্রবীর কাছে আসতেই সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে বলল, নিন।
প্রবীর বলল, আমি ঠান্ডায় পকেট থেকে হাত বের করতেই পারছি না। আপনি খান।
প্রবীরের অবস্থা সত্যিই কাহিল। সুতরাং, আর বেশিক্ষণ বেড়ানো চলে না। যাওয়া হল না নদী পর্যন্ত।
ইন্দ্রাণী বলল, এই জন্যই তো বলেছিলাম, ওকে থেকে যেতে। ও ফিরে যাক না, মনীশদা চলো, তুমি আর আমি নদীটা দেখে আসি।
মনীশ বলল, উনি একা একা থাকবেন কেন? কাল সকালে গাড়িতে তোমাদের চট করে ঘুরিয়ে আনব এখন!
ফিরে এসে মনীশ নিজের গেলাসে আবার একটা ব্র্যান্ডি ঢালল। প্রবীরকে বলল, আপনিও একটু খেয়ে নিলে পারতেন। ঠান্ডাটা কেটে যেত।
প্রবীর ইন্দ্রাণীকে জিজ্ঞেস করল, খাবো?
ইন্দ্রাণী বলল, আচ্ছা একটুখানি খাও, একটুখানি।
তখন উৎসাহিত হয়ে প্রবীর বলল, তুমিও একটু খাও না, সর্দি হয়েছে, ভালো লাগবে।
লাল রঙের কোর্টটা গা থেকে খুলে ফেলে ইন্দ্রাণী বলল, এটা কিন্তু আমার গায়ে বেশ ফিট করে গেছে। তোমার বউ বুঝি আমার মতন লম্বা ছিল?
মনীশ বলল, তুমি ওটা নিয়ে যেতে পারো। এখানে তো কোনো কাজে লাগে না। তোমার কাজে লাগবে, ক্যানাডায় বেশ শীত।
ইন্দ্রাণী বলল, ও তোমার জিনিসগুলো দিতে ভুলে গেছি।
দৌড়ে সে ঘরের মধ্যে চলে গেল। ফিরে এল তিন-চারটে প্যাকেট নিয়ে। তার মা পাঠিয়েছেন দু তিন রকম আচার আর পাঁপড়। ছখানা গেঞ্জি (ও দেশে গেঞ্জির নাকি খুব দাম!) আরও টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র। একটা প্যাকেটে একটা র-সিল্কের ঝলমলে শার্ট।
ইন্দ্রাণী বলল, শার্টটা আমি তোমার জন্য এনেছি।
মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখলেও গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নতুন কিছু নয়, সবাই আনে। যারাই দেশ থেকে এসে একদিন দু-দিনের জন্য তার এখানে এসে থাকে, ডলার চায়, তারাই উপহার আনে একটা করে শার্ট। আশ্চর্য, সবাই র-সিল্কের শার্ট আনে কেন? ওই রকমের জামা কতদিন পরবে?
দেশে থাকতে মনীশ খুব ঝাল খেতে ভালোবাসত। এখন তার খানিকটা আলসারের মতো দেখা দিয়েছে বলে সে আর ঝাল খেতে পারে না। মা সে কথা জানেন না, এখনও লোকজন এলেই তার হাতে ঝাল আচার পাঠাবেন। গেঞ্জি পরার রেওয়াজই নেই এদেশে। স্নেহের দান, তবু অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে।
খুব সুন্দর হয়েছে শার্টটা, মনীশ বলল।
প্রবীর বেশ তৃপ্ত হল কথাটা শুনে। একটা উদ্যত হাই চেপে সে বলল, ইন্দ্রাণী অনেক দোকান ঘুরে এটা কিনেছে। কিছুতেই ওর পছন্দই হয় না।
ইন্দ্রাণী বলল, একবার পরে দেখো না, মাপ ঠিক হয়েছে কিনা।
মনীশ খানিকটা ত্রস্তভাবে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক হবে নিশ্চয়ই, এইতো কলারের মাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ইন্দ্রাণী তবু বলল, একবার পরেই দেখো না বাবা! আমরাও একটু দেখি!
এখন ওদের সামনে নিজের জামা-টামা খুলে তারপর মনীশকে এই জামা পরতে হবে? একটা বিশ্রী বোকা বোকা ব্যাপার। সে খানিকটা জোর দিয়ে বলল, কাল সকালে পরে দেখাব।
কাল সকালে কখন তোমাকে বেরুতে হবে?
আমাকে ঠিক সাড়ে আটটার মধ্যে বেরুতেই হয়। তবে কাল তিনটের মধ্যে ফ্রি হয়ে যাব।
ততক্ষণে আমাদের এয়ারপোর্টে যাবার সময় হয়ে যাবে। তোমার সঙ্গে তো তাহলে গল্পই করা হবে না একদম। এতদুর থেকে এলাম—
মনীশ চুপ করে রইল। কিন্তু মনে মনে বলল, তোমরা তো আমার সঙ্গে গল্প করতে আসনি। এসেছই মাত্র একদিনের সময় নিয়ে। বড়ো বড়ো শহরের তুলনায় এ জায়গাটা প্রায় একটা গন্ডগ্রাম, এখানে কেউ বেড়াতে আসে না, আসে শুধু কয়েক ঘন্টার জন্য বিশ্রাম নিতে আর কিছু ডলারের সন্ধানে।
মনীশদা, তুমি কখন ঘুমোও?
ঠিক নেই, কোনো কোনো দিন দুটো আড়াইটে বেজে যায়।
আজ আমরা অনেকক্ষণ গল্প করবো।
তোমরা আজ ক্লান্ত, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো বরং, সারাদিন প্লেনে এসেছ।
আমি একটুও ক্লান্ত হইনি। একটু গা বমি করছিল, এখন কেটে গেছে।
প্রবীরবাবুর ঘুম পেয়ে গেছে।
প্রবীরের সত্যই ঘন ঘন হাই উঠছে। তবু সে সোজা হয়ে উঠে বসে বলল, আমি আরও জেগে থাকতে পারি, কিন্তু মনীশবাবু সারাদিন খেটেখুটে এসেছেন। ওরই এখন বিশ্রাম দরকার।
ইন্দ্রাণী ঝঙ্কার দিয়ে বলল, বসে বসে গল্প করতে আবার পরিশ্রম হয় নাকি? তোমার ঘুম পেয়েছে, তুমি বরং শুয়ে পড়ো গিয়ে। মনীশদার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।
মনীশ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আজ তোমরা শুয়েই পড়ো। এতখানি প্লেন জার্নির একটা স্ট্রেন আছে। কাল সকাল সকাল যদি উঠতে পারো, গাড়িতে তোমাদের এক চক্কর ঘুরিয়ে আনতে পারি। অবশ্য দেখবার বিশেষ কিছু নেই।
ইন্দ্রাণীর ফরসা মুখে একটা লালচে ভাব এল। সে ঘরটার চারদিকে তাকিয়ে বলল, তোমার এই বাড়িটার সবই ভালো, কিন্তু এই পর্দাগুলো কার পছন্দ, তোমার না তোমার বউয়ের?
মনীশ হেসে বললেন আমার—কেন?
ইন্দ্রাণী বলল, আমি হলে অন্য পর্দা লাগাতাম। এই সবুজ রংটা একদম মানায় না।
মনীশ বললে, আমার পছন্দ খুব খারাপ সবাই বলে। গুড নাইট, কাল সকালে দেখা হবে।
মনীশ নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজার কাছে গিয়ে বলল, বাইরের আলো সারারাত জ্বালাই থাকে। তোমাদের অসুবিধে হলে অবশ্য নিভিয়ে দিতে পারো।
ঘরে ঢুকেই প্রবীর দ্রুত পোশাক বদলে গরম কম্বলের তলায় ঢুকে পড়ল। মুখটুকু শুধু বার করে বলল, ভুল করে যেন জানলা খুলে ফেলো না। তাহলে মারা যাব!
ইন্দ্রাণী ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে সেই লাল কোটটা—সেটা সে বিরক্তির সঙ্গে ছুড়ে দিল একপাশে। তার আগেকার বউয়ের ব্যবহার করা কোট মনীশদা তাকে দিয়ে দিতে চায়। ইন্দ্রাণী মোটেই ওটা নেবে না।
এই ঘরে ড্রেসিং টেবিল কেন? এটাই কি লিন্ডার ঘর ছিল? এই বিছানায় সে শুত?
মনীশদা আজকাল বড্ড কম কথা বলে। আগে মোটেই এরকম ছিল না। ঘন্টার পর ঘন্টা দুজনে গল্প করে কাটিয়েছে। বিদেশে এসে মানুষ বড্ড বদলে যায়। শুধু কাজ আর কাজ। আমরা এসেছি, তবু একদিন সে ছুটি নিতে পারল না? এত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা রোজগার করে হবে কী?
অন্যমনস্কভাবে চুল আঁচড়ে যাচ্ছে তো আঁচড়েই যাচ্ছে ইন্দ্রাণী। অনেক কথা মনে পড়ছে। বিদেশে আসার কথা উঠলেই ইন্দ্রাণী মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল, অন্তত একদিনের জন্যে হলেও মনীশদার এখানে আসবেই। একবার তাকে দেখে যাবে। মনীশদা রাগ করেছিল তার ওপর, কিন্তু ইন্দ্রাণীও যে কতটা দুঃখ চেপে রেখেছিল, তা কি মনীশদা বোঝেনি? মেয়েদের পক্ষে সংস্কার ভাঙা কি সোজা কথা? বিদেশে কাজিনদের মধ্যে আকছার প্রেম হয়, বিয়ে হয়, কিন্তু আমাদের দেশে…।
মুখে এখন ক্রিম ঘষছে ইন্দ্রাণী। এক সময় সে নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেল। প্রবীরের এই স্বভাব, শোওয়া মাত্র ঘুম। নতুন জায়গায় এসেও তার ঘুমের অসুবিধে হয় না! ইন্দ্রাণীর সহজে ঘুম আসবে না।
আরও কিছুক্ষণ পরে পোশাক বদলে, আলো নিভিয়ে সে জানলার পাশে দাঁড়াল। কাচের মধ্য দিয়ে বাইরের বরফ পড়ার দৃশ্য দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন কেমন করে।
ইন্দ্রাণী বাইরে বেরিয়ে এসে মনীশের ঘরের দরজার সামনে একটু দাঁড়াল। তার বুক কাঁপছে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে আস্তে দরজাটা ঠেলবার পর সেটা খুলে যেতেই সে খুশি হয়ে উঠল। সে জানত।
ঘরে ঢুকে দেখল, মস্ত বড়ো খাটের একধারে পাশ ফিরে শুয়ে আছে মনীশ। মাথার কাছে একটা টেবল-ল্যাম্প জ্বালা।
পা টিপে টিপে ইন্দ্রাণী মনীশের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর সে অবাক হল। মনীশের চোখ বোজা, মনীশ ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনীশ ঘুমিয়ে পড়েছে? এইটুকু সময়ের মধ্যে? এই যে সে বলল, কোনো কোনো দিন দুটো-আড়াইটে পর্যন্ত জাগে! আর আজই সে ঘুমিয়ে পড়ল, এ কি সম্ভব?
অনেকদিন আগে, ইন্দ্রাণীর বিয়ের আগে, যখন সে মনীশদের বাড়িতে থেকে এম এ পরীক্ষা দিচ্ছিল, সেই সময় সে একদিন রাত একটার সময় মনীশের ঘরে ঢুকেছিল, হাতে অনেকগুলো জানলার পর্দা। মনীশেরও তখন রাত জেগে পড়াশোনা করার স্বভাব ছিল। ইন্দ্রাণীকে দেখে অবাক হয়েছিল মনীশ, খুশিও হয়েছিল। ইন্দ্রাণী বলেছিল, তোমার জানলার পর্দা কাচা হয়েছিল আজ, লাগিয়ে দেওয়া হয়নি, তাই লাগিয়ে দিতে এলাম।
পর্দা লাগাতে, এত রাত্রে?
তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে ওঠে এসে ইন্দ্রাণীকে জোর করে কোলে তুলে মনীশ নিয়ে গিয়েছিল বিছানায়।
আজও শুতে যাবার আগে সেই পর্দার কথা উল্লেখ করে ইন্দ্রাণী ভেবেছিল, মনীশ ঠিক বুঝতে পারবে। মনীশ ভুলে গেছে সেদিনের কথা? ইন্দ্রাণী সব মনে রেখেছে, আর মনীশ ভুলে যাবে? যে দেশে এমন সুন্দর বরফ পড়ে, যে দেশে বরফ-রঙা শরীরের মেয়েদের সঙ্গে যখন তখন বিয়ে আর ডিভোর্স হয়, সে দেশে থাকলে বুঝি এইসব স্মৃতি আর মনে পড়ে না?
ইন্দ্রাণী ঘরটার চারপাশে তাকাল। বইয়ের র্যাক, দরজার দু-পাশে দুটো জম-কালো স্ট্যান্ড ল্যাম্প, একটা সুন্দর ছোট্ট গোল টেবিল, দেয়ালে দুটি বাঁধানো আঁকা ছবি। ইন্দ্রাণী হলে গোল টেবিলটা খাটের ওপাশে না রেখে এপাশে সরিয়ে দিত, ছবি দুটো জানলার পাশ থেকে সরিয়ে এনে দিত মাঝখানে।
কিন্তু এসব ভেবে লাভ কী? তার তো কোনো অধিকার নেই।
সে মৃদু গলায় ডাকল, মনীশদা!
মনীশ চোখ খুলল না।
ইন্দ্রাণী হাত বাড়িয়ে মনীশের গায়ে ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু সরিয়ে নিল। সে আর কত নীচে নামবে? জেগে উঠে যদি মনীশ তাকে অপমান করে?
সে তো কতবার চেষ্টা করেছে, মনীশের সঙ্গে একটু নির্জনে কথা বলার। প্রবীরকে বাড়িতে রেখে তারা দুজনে একটু বাইরে বেড়িয়ে আসতে পারত না? প্রবীর কিছু মনে করত না। সবাই তো জানে, মনীশ তার ভাই। কিন্তু মনীশদা ইচ্ছে করে প্রত্যেকবার তাকে এড়িয়ে গেছে। এত গাঢ় ঘুমও তো মনীশের আগে কখনও ছিল না।
আস্তে আস্তে ইন্দ্রাণী বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার পাঁচ ও সাত বছরের দুটি ছেলে-মেয়েকে রেখে এসেছে নিজের মায়ের কাছে। কলকাতায় যোধপুর পার্কে জমি কিনে রেখেছে প্রবীর। সেখানে তাদের নতুন বাড়ি হবে। ইন্দ্রাণীর ভবিষ্যৎ জীবনটা ছক-বাঁধা হয়ে গেছে। আর কিছু বদলাবার উপায় নেই।
নিজেদের ঘরে এসে আলো জ্বালতেই দেখল, নাক ডাকা বন্ধ করে দু-চোখ মেলে প্রবীর স্পষ্ট তাকিয়ে আছে।
ইন্দ্রাণীর শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। সে কিছু অন্যায় করেনি, প্রবীর কি তা বুঝতে পারবে। প্রবীর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলল, বাইরের আলোটা বড়ো চোখে লাগছিল, তাই ভাবলাম নিভিয়ে দিয়ে আসি।
প্রবীর বলল, কিন্তু নেভাতে ভুলে গেছ। যাও নিভিয়ে দিয়ে এস।
পূজারি
পূজারি
কলিং বেলটা বেশ মিষ্টিভাবে টুং টাং টুং টাং শব্দে বাজে।
সুপ্রিয়া একটি ইংরেজি উপন্যাসের মধ্যে গভীরভাবে ডুবে ছিল দুপুরবেলাটা। এই সময়ে সে বিছানায় শুয়ে বই পড়ে, কিন্তু ঘুমোয় না। কলিং বেলের শব্দ শুনে সে শিয়রের কাছে ঘড়িটা দেখল। তিনটে বাজে। এই সময় তো কারুর আসবার কথা নয়।
অনেক সময় ফেরিওয়ালারা এসে বিরক্ত করে। কিন্তু দরজা না খোলা পর্যন্ত বেল বাজিয়েই যাবে। উপায় নেই, বই মুড়ে রেখে সুপ্রিয়াকে উঠতে হল।
সুপ্রিয়া খেয়াল করেনি, বাইরে কখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বারান্দায় অনেক জামাকাপড় মেলা আছে, সেগুলো এক্ষুনি না তুললে একেবারে ভিজে যাবে। অথচ কলিং বেলটা বাজল তৃতীয়বার।
সুপ্রিয়া দৌড়ে গিয়ে আগে দরজাটা খুলল।
হাতে একটি ছাতা, ধুতির ওপর শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে শশধর। মুখে বিগলিত হাসি। সে বলল, অসময়ে এসে বিরক্ত করলাম নাকি?
সুপ্রিয়া অবাক হবারও সময় পেল না। আপনি বসুন বলেই সে ছুটে গেল বারান্দায়।
এর মধ্যেই জামা-কাপড়গুলো একটু একটু ভিজে গেছে। আকাশ কালো, বৃষ্টি আরও বাড়বে, তাই সুপ্রিয়া জামা-কাপড়গুলো তুলে ফেলাই ঠিক করল। ঘরের মধ্যে মেলে দিতে হবে। কাপড় তুলতে তুলতে সুপ্রিয়ার ভুরু কুঁচকে গেল। হঠাৎ এই সময় ওই লোকটা এসেছে কেন?
শশধর সুপ্রিয়ার স্বামী সিদ্ধার্থর বন্ধু! ঠিক বন্ধুও বলা যাবে না, এক সময় সিদ্ধার্থ আর শশধর একসঙ্গে স্কুলে পড়ত। তারপর দুজনের জীবন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু স্কুলের পুরোনো বন্ধুকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারে না সিদ্ধার্থ। রাস্তায় দেখা হলে দু-চারটে কথা বলে। সিদ্ধার্থর খুব তাস খেলার নেশা। ছুটির দিনে কোথাও না কোথাও তাস খেলতে যাবেই। মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতেও সে তাসের আসর বসায়। সেই রকমই দু-একটা তাস খেলার আসরে শশধরকে দেখেছে সুপ্রিয়া।
সুপ্রিয়া আবার ভাবল, অফিসের দিনে দুপুরবেলা লোকটা কি মনে করেছে যে এখানে তাস খেলা চলছে? অদ্ভুত তো!
পরক্ষণেই তার মনে হল, লোকটা টাকা ধার চাইতে আসেনি তো? সিদ্ধার্থর কাছে যেন দু-একবার শুনেছে যে, ওই লোকটার অবস্থা ভালো নয়। ওর চেহারা এবং পোশাকও সিদ্ধার্থর বন্ধু হিসেবে একেবারে বেমানান। সিদ্ধার্থর আর কোনো বন্ধু ধুতির ওপর শার্ট পরে রাস্তায় বেরোয় না। হাতে আবার একটা পুরোনো ছাতা!
কাপড়-টাপড়গুলো গুছিয়ে সুপ্রিয়া এল বসবার ঘরে।
শশধর একটি পত্রিকার ছবি দেখছিল, সেটা নামিয়ে রেখে সে আবার ঠোঁটে বিগলিত হাসিটুকু এঁকে জিজ্ঞেস করল, বৌদি, ছেলে কেমন আছে?
ছেলে? কেন?
শশধর একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল, পরশুদিন অজয়বাবুর বাড়ি থেকে সিদ্ধার্থ তাস খেলা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে এল। বলল, ওর ছেলের জ্বর। আমি কালই আসব ভেবেছিলাম, হয়ে ওঠেনি। আজ এ পথ দিয়ে যাবার সময়ে মনে করলাম, আপনার ছেলেকে একবার দেখে যাই।
সুপ্রিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। হঠাৎ কেউ এসে ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলেই বুক কেঁপে ওঠে। সে হেসে বলল, বাবলু! হ্যাঁ পরশু বিকেল থেকে ওর গা-টা একটু গরম হয়েছিল। বৃষ্টিতে ভেজে তো…কিন্তু কালই কমে গেছে…আজ তো বাবলু স্কুলে গেছে!
স্কুলে গেছে? দু-একদিন বিশ্রাম দিলে পারতেন। এই সময়টা ভালো না, বাচ্চাদের প্রায়ই জ্বর হচ্ছে শুনতে পাই।
ওরা কি আর এমনি বিছানায় শুয়ে থাকতে চায়। ছটফটে ছেলে, বাড়িতে থাকতেই চায় না।
না না, তবু সাবধান হওয়া ভালো। বুকে ঠান্ডা বসে গেলে অনেক ঝামেলা হতে পারে, এই তো আমার এক ভাগ্নে ব্রংকাইটিসে ভুগছে।
শশধরের কাছ থেকে সুপ্রিয়া এসব ব্যাপারে কোনো উপদেশ শুনতে চায় না। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান আছে। ছেলের কী করে যত্ন নিতে হয় সে জানে। বন্ধুর ছেলের সাধারণ একটু জ্বর হলেই কেউ এমন দুপুরবেলা দেখতে আসে? অদ্ভুত!
শশধর এক পায়ের চটি থেকে পা বার করে অন্য পায়ের ওপরে উঠিয়ে বসল!
এই রে, লোকটা আরও অনেকক্ষণ বসবে নাকি? সুপ্রিয়ার মন টানছে রহস্য গল্পের বইটি।
কিছুদিন সিদ্ধার্থ বোম্বাইতে বদলি হয়েছিল। প্রায় বছর তিনেক। বোম্বাইয়ের বেশিরভাগ মেয়েই আজকাল বাড়ির মধ্যে শাড়ি পরে না। সেই থেকে সুপ্রিয়ারও অভ্যেস হয়ে গেছে, কলকাতাতেও সে বাড়িতে একটা লম্বা ঢোলা ম্যাক্সি পরে থাকে। এই গরমে, লোডশেডিং-এ শাড়ির চেয়ে ম্যাক্সি অনেক আরামের। বিশিষ্ট কোনো লোক এলে সুপ্রিয়া এর ওপর একটা মোটা ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে দেয় তাড়াতাড়ি।
কোনো ফেরিওয়ালা-টেরিওয়ালা বেল দিয়েছে ভেবে সুপ্রিয়া ড্রেসিং গাউনটা না চাপিয়েই দরজা খুলেছিল। এখন তার একটু অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু এখন আবার ড্রেসিং গাউনটা পরে এলে এ লোকটা ভাবতে পারে, সে তাকে আরও কিছুক্ষণ বসতে বলছে। তা ছাড়া এ তো আর বিশিষ্ট লোক নয়। চলে গেলে কিছু যায় আসে না। সুপ্রিয়া চেয়ারে না বসে দাঁড়িয়ে রইল।
শশধর সরাসরি সুপ্রিয়ার শরীর বা মুখের দিকে তাকায় না। লাজুকভাবে মুখ নীচু করে আছে। সে আবার বলল, বৌদি, কখনও দরকার হলে বলবেন, আমার চেনা খুব ভালো ডাক্তার আছে, ড. জি. সি. দাস নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই?
সুপ্রিয়া বলল, আমার নিজের দাদা ডাক্তার।
ও, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। তবু বলে রাখলাম, যদি কখনও দরকার হয় ড. জি. সি. দাসকে আমি ডাকলে না বলতে পারে না কখনও।
সুপ্রিয়া বুঝল লোকটা নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করবার চেষ্টা করছে। কে, কোথাকার জি. সি. দাস তার ঠিক নেই। সুপ্রিয়ার দাদা নাম করা ডাক্তার। কলকাতার সব বড়ো বড়ো ডাক্তাররা তাঁকে চেনেন।
সুপ্রিয়ার একটুও ইচ্ছে করছে না লোকটার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু মুখের ওপর তো বলা যায় না, আপনি এখন চলে যান।
শশধর পকেট থেকে একটি কাগজের ঠোঙা বার করল। তার মধ্যে একটা লাল টুকটুকে আপেল। খুব সলজ্জভাবে সেটি টেবিলের ওপর রেখে বলল, আপনার ছেলের জন্য এনেছিলাম। ভাবলুম, জ্বর মুখে যদি ভালো লাগে।
সুপ্রিয়া হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। তার বাড়িতে সব সময় আপেল থাকে। বাবলু একদম খেতে চায় না। আজকালকার ছেলেরা ভালো জিনিস পছন্দ করে না, আপেল এক কামড় দিয়ে ফেলে দেবে, কিন্তু ফুচকাওয়ালা আসুক কিংবা ঝালমুড়ি, অমনি গপাগপ করে খাবে।
এই লোকটা আপেল নিয়ে এসেছে, তাও একটা। মোটে একটা আপেল কেউ কারুর বাড়িতে নিয়ে আসে? তা ছাড়া ওই লাল টুকটুকে আপেলগুলো ভীষণ টক হয়। লোকটা আপেলও চেনে না।
এ কি, আপনি আবার এ সব আনতে গেছেন কেন?
এমনিই, ভাবলাম, খালি হাতে যাব। রেখে দিন, ওকে খেতে বলবেন।
সুপ্রিয়া আবার দু-একবার আপত্তি জানাল। কিন্তু কেউ ছোটোদের জন্য কিছু জিনিস নিয়ে এলে তা জোর করে ফেরত দেওয়া যায় না।
এবার লোকটাকে কিছু একটা খেতে-টেতে বলা উচিত। সুপ্রিয়া দ্রুত চিন্তা করতে লাগল। কাজের লোকটি ছুটি নেওয়ায় এমন মুশকিল হয়েছে। গতকাল তার ফেরার কথা ছিল, ফেরেনি। ওরা কথা রাখে না।
ফ্রিজে মিষ্টি-টিষ্টি কিছুই নেই। থাকলে বড্ড ভালো হত। থাকবার মধ্যে আছে কিছু আপেল আর কলা। ও আপেল এনেছে, এখন ওকে ও আপেল খেতে বলা যায় না। আপনি একটু কলা খাবেন? এ কথাও কি বলা যায়! ধুৎ।
বাধ্য হয়েই সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, আপনি চা খাবেন?
শশধর বলল, না, থাক। আপনার অসুবিধে হবে, এই অসময়ে।
না, অসুবিধে আর কি?
তাহলে খেতে পারি আপনার হাতের চা।
সুপ্রিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেল। রহস্য গল্প পড়তে পড়তে উঠে আসা যে কি কষ্টকর! এখন আবার তাকে চা বানাতে হবে। বাড়িতে কফিও নেই। কফি চায়ের চেয়ে তাড়াতাড়ি বানানো যেত?
গ্যাস স্টোভে গরম জল চাপিয়ে সুপ্রিয়া এবার ড্রেসিং গাউনটা পরে নিতে গেল। যতই এলেবেলে হোক, তবু একজন পুরুষ মানুষ তো, বেশিক্ষণ এই পাতলা, ম্যাক্সিটা পরে সহজভাবে ঘোরাফেরা করা যায় না।
শশধরের চেহারা রোগা-পাতলা, মুখখানাও শুকনো, নাকের নীচে সরু গোঁফ। সে অধিকাংশ সময়ই মাটির দিকে চেয়ে থাকে, দু-একবার চকিতে সুপ্রিয়াকে দেখে নেয়। এখনও কোনো নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলে অনেকে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে, ওই সুন্দরী মহিলাটি কে?
চা তৈরি হবার আগে খুব ঝেঁপে বৃষ্টি এল। বারান্দার দরজাটা বন্ধ করার পরও খানিকটা জল গড়িয়ে এল ভেতরে। বৃষ্টির ঝাট লেগে লেগে দরজাটার অবস্থা কাহিল হয়ে গেছে। সুপ্রিয়া আপন মনেই বলল, এই এক ঝামেলা, যখন তখন বৃষ্টি আর অমনি ভেতরে জল আসবে!
শশধর উঠে গিয়ে দরজাটা পরীক্ষা করল। তারপর বিজ্ঞভাবে বলল, খানিকটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত দরজার নীচের দিকে লাগিয়ে দিলে বৃষ্টি আটকাতে পারে। তাতে আর জল ঢুকবে না।
এই উপদেশ সুপ্রিয়াকে আরও দু-একজন দিয়েছে। এর বিরুদ্ধেও বলেছে কয়েকজন। সে চুপ করে রইল।
লাগাবেন অ্যালুমিনিয়ামের পাত? আমি জোগাড় করে দিতে পারি!
তাতে কোনো লাভ হবে।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই হবে। আমি নিয়ে আসব। চেনা মিস্তিরিও আছে, সে-ই ঠিকঠাক করে।
নাঃ, দরকার নেই। দরজাটাই পালটে ফেলতে হবে।
পুরো-দরজাটা পালটাবেন? কেন, আগে খানিকটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত লাগিয়ে দেখুন না। তাতে খরচ কম পড়বে—আমার চেনা আছে।
বসবার ঘরের দরজার খানিকটা অংশে অ্যালুমিনিয়ামের পাত লাগালে যে বিচ্ছিরি দেখায়, তা বোঝবার ক্ষমতা নেই এই লোকটার।
সুপ্রিয়া দৃঢ়ভাবে বলল, না, দরজাটাই পালটাব ঠিক করে ফেলেছি।
মাত্র এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এল সুপ্রিয়া।
শশধর জিজ্ঞেস করল, এ কী, আপনি খাবেন না?
না। আমি বেশি চা খাই না। আপনার বন্ধু ফিরলে ছ-টার সময় ওর সঙ্গে এক সঙ্গে এক কাপ খাই।
সিদ্ধার্থ তো খুব চা খায়।
হ্যাঁ, ও খায়।
ইশ, শুধু শুধু আমার জন্য আপনাকে চা বানাতে হল কষ্ট করে।
না, এতে কষ্টের কী আছে?
লোকটা বুঝি ভেবেছিল, সুপ্রিয়াও ওর সামনে চায়ের কাপ নিয়ে বসবে। তাতে ও আরও গল্প জমাবার সুযোগ পাবে। সুপ্রিয়া এ পর্যন্ত একবারও ওর সামনে বসেনি। এই ধরনের লোকদের সঙ্গে সুপ্রিয়ার গল্প করার মতন কিছুই নেই।
শশধর একটি সিগারেট ধরাল।
এই রে, আরও কতক্ষণ বসে থাকবে কে জানে! এই ধরনের লোকদের যে কীভাবে বিদায় করা যায়, তা সুপ্রিয়া জানে না। এর চেয়ে আরও কত বেশি ঠান্ডা ব্যবহার করবে।
আপনি নিজেই চা নিয়ে এলেন, আপনাদের সেই কাজের লোকটি কোথায়?
সে ছুটি নিয়েছে। এমন মুশকিলে পড়েছি।
ওরা ছুটি নিলে সহজে ফিরতে চায় না। কত দিনের জন্য গেছে?
বলেছিল সাত দিন, এই তো বারো দিন হয়ে গেল।
তাহলে দেখুন, ফেরে কিনা সন্দেহ।
ছেলেটা খুব বিশ্বাসী ছিল। এখন লোক পাওয়া এমন শক্ত।
আর কথা না বাড়িয়ে সুপ্রিয়া চলে গেল অন্য কোনো ঘরের জানলা দিয়ে জল ঢুকছে কিনা দেখতে।
শশধর উঠল বৃষ্টি ধরে যাবারও দশ মিনিট পরে। টেবিলের ওপর পড়ে রইল তার আনা টুকটুকে লাল রঙের আপেলটা। ওটা সুপ্রিয়া তার ঠিকে ঝিকে দিয়ে দেবে ঠিক করল। তারপর আবার সে ফিরে গেল ওর গল্পের বইয়ে।
রাতে সুপ্রিয়া তার স্বামীকে বলল, আজ দুপুরে তোমার এক বন্ধু এসেছিল।
কে?
ওই যে শশধর না কি যেন নাম?
সিদ্ধার্থ হাসতে আরম্ভ করল উঁচু গলায়।
হাসছ কেন?
আমি ভাবলুম, আমার কোনো বন্ধু বুঝি লুকিয়ে লুকিয়ে দুপুরবেলা আসছে তোমার সঙ্গে প্রেম করতে। বাড়িতে সুন্দরী স্ত্রী থাকার বিপদ অনেক।
বাজে কথা বলো না!
তাহলে শশা এবার তোমার ওপর ভর করবে মনে হচ্ছে।
তার মানে?
রমেন বলছিল, কিছুদিন ওর বাড়িতেও যাতায়াত শুরু করেছিল শশা। রমেন যখন থাকে না, সেই সময়ে যায়। রমেনের বউ রত্না তো একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিল। অথচ মজা কি জানো, শশা কক্ষনো কোথাও খারাপ ব্যবহার করে না, কোনো অসভ্যতা করে না, দুচোখ দিয়ে বিশ্রীভাবে মেয়েদের শরীর চাটে না, শুধু চুপচাপ বসে থাকে।
আজ দুপুরেও সেই রকম বসেছিল!
ওই তো বললুম। আমরা স্কুলে ওকে বলতুম শশা। শশা জিনিসটারও কোনো গুণও নেই, দোষও নেই। ও ঠিক সেই রকম।
রত্না শেষ পর্যন্ত কী করল?
রত্না তোমার থেকে অনেক বেশি ভদ্র। রোজ দুপুরে ওকে চা করে খাওয়ায়। বেচারির আবার দুপুরে ঘুমোনো অভ্যেস। রত্নাকে ছেড়ে এখন তোমার কাছে কেন এসেছে তা অবশ্য বুঝতে পারছি না।
একদিনই তো মোটে এসেছে। বাবলুকে দেখতে এসেছিল। তুমি পরশু বলেছিলে না বাবলুর জ্বর?
হ্যাঁ, তা বোধহয় বলেছিলাম। আমাদের তাস খেলার আসরে ও চুপচাপ বসে থাকে। আজকাল তো ওকে খেলতে নেওয়া হয় না।
কেন, খেলতে নাও না কেন?
আমরা তো স্টেকে খেলি। ও পয়সা পাবে কোথায়?
উনি চাকরি-টাকরি করেন না?
করপোরেশানে কী যেন একটা সামান্য চাকরি করে! শুনেছি ওদের ডিপার্টমেন্টে খুব ঘুষের ব্যাপার আছে। তা শশধরটা এমনই অপদার্থ যে, ঘুষও নিতে পারে না। শুধু ওই অফিসে কাজ করার একটা সুবিধে, যখন তখন বেরিয়ে পড়া যায়।
বাবলুর জন্য একটা আপেল এনেছিলেন।
ওরেব বাবা! পয়সা খরচ করেছে শশা? ও যে হাড় কিপটে। তাহলে খুব গুরুতর ব্যাপার বলতে হবে। তুমি এর মধ্যে খুব সেজেগুজে কোনোদিন বেরিয়েছিলে? আর সে সময় ও তোমায় দেখেছে?
ধ্যাৎ!
পরদিন দুপুরে লোডশেডিং। কলিং বেল বাজবে না। দরজায় আওয়াজ হচ্ছে ঠুক ঠুক ঠুক ঠুক।
সুপ্রিয়া শিয়রের দিকে চেয়ে দেখল ঠিক তিনটে বাজে। উঠে এসে সে দরজায় ম্যাজিক আই দিয়ে দেখল! কোনো সন্দেহ নেই, আজও শশধর এসেছে!
দরজা না খুললে তো ঠুক ঠুক করতেই থাকবে। আজ কোন ছুতোয় এসেছে লোকটা? শুধু যেন সেই জানার কৌতূহলেই দরজা খুলল সুপ্রিয়া।
আজও সেই একই পোশাক, হাতে ছাতা, মুখে বিগলিত হাসি।
আজও প্রথম কথাটি একই, অসময়ে এসে আপনাকে বিরক্ত করলাম।
সুপ্রিয়া আজ আগেই মোটা হাউস কোটটা পরে শরীর ভালো করে ঢেকে নিয়েছে। সে কোনো কথা বলল না।
একটু দূরে দাঁড়ানো কাকে যেন ডেকে শশধর বলল, এই আয়, এদিকে আয় দেখুন তো একে আপনার পছন্দ হয় কি না।
সুপ্রিয়া সবিস্ময়ে তাকাল। মলিন ধুতি ও গেঞ্জি পরা আর একটি লোক দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।—এ কে?
আমাদের অফিসের একজন বেয়ারার ভাই। সবে দেশ থেকে এসেছে, চাকরি খুঁজছে। তাই আমি ভাবলাম, আপনার এখানে নিয়ে আসি। আপনার রান্নার লোক নেই…একে দিয়ে যদি কাজ চালানো যায়।
লোকটির চেহারা দেখে মনে হয় না সে কোনোদিন কোনো গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করেছে। কেমন যেন বুনো বুনো ভাব। গ্রামের দিকে কোনো নৌকার মাঝি কিংবা মোষের পালের রাখাল হলেই যেন একে মানায়।
আমতা আমতা করে সুপ্রিয়া বলল, এ কি রান্নাবান্নার কাজ পারবে?
হ্যাঁ সব পারবে। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখুন না।
এই যে, তোমার নাম কী?
জীবনকৃষ্ণ দাস।
তুমি কোথাও রান্নার কাজ করেছ কখনও?
আজ্ঞে না।
সুপ্রিয়া শশধরের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তবে?
শশধর সঙ্গে সঙ্গে বলল, কখনও করেনি বলে যে পারবে না তার তো কোনো মানে নেই। শিখিয়ে নিলে সবই পারবে। বৌদি, ভালো করে শেখালে বাঘকে দিয়েও হাল চাষ করানো যায়। ঠিক কি না!
শশধর বোধহয় সিদ্ধার্থের চেয়ে বয়েসে বড়োই হবে, অন্তত চেহারায় সেই রকম দেখায়। সে সুপ্রিয়াকে বৌদি বলে ডাকে বলে সুপ্রিয়ার বেশ অস্বস্তি হয়।
এই শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা সুপ্রিয়ার ঠিক পছন্দ নয়। ঝি, চাকর, রান্নার লোককে অনেক চেষ্টায় কাজ-টাজ ঠিক মতন শেখালে তারপর সে একদিন ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। তখন রাগ ধরে দারুণ। তার চেয়ে বাবা তৈরি লোক নেওয়াই ভালো।
শশধর সেই লোকটিকে বলল, তুই একটু বাইরে বোস।
তারপর সুপ্রিয়াকে বলল, ভেতরে চলুন, আপনাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি।
সুপ্রিয়া এতক্ষণ শশধরকে ভেতরে আসতে বলেনি। কথাবার্তা সব হচ্ছিল বাইরে দাঁড়িয়ে।
ভেতরে ঢুকে নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিল শশধর। তারপর যেন একটা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল, মাইনে দিতে হবে খুব কম। এমনকি প্রথম মাসে কিছু না দিলেও চলবে!
সুপ্রিয়া হেসে ফেলল।
শশধর বলল, হ্যাঁ, ও কিছু চাইবে না। ওর তো এখন খাওয়া থাকারই জায়গা নেই। আজকাল কোনো লোককে মাইনে না দিয়ে কাজ করানো যায়?
আমি বলছি বৌদি, ও বর্তে যাবে! এমন ভালো বাড়িতে থাকবে।
শশধর চেয়ার টেনে বসল। এবার বোধহয় সে চায়ের আশা করবে।
সুপ্রিয়া হঠাৎ কণ্ঠস্বর বদলে বলল, আমার এখন লোক দরকার নেই।
শশধরের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল, অ্যাঁ!
আমি এখন লোক রাখব না।
আপনার লোক নেই, আপনার এত অসুবিধা হচ্ছে—
শুনুন, আমার যে লোক আছে, সে খুব বিশ্বাসী।
এও খুব বিশ্বাসী, বৌদি। আমি গ্যারান্টি।
আমার লোকটি কাজকর্ম খুব ভালো জানে। ছুটি নিয়ে গিয়ে ফিরতে দু-চারদিন দেরি করছে বটে, কিন্তু আমি জানি, সে ঠিকই ফিরে আসবে। এখন আমি নতুন লোক রাখব না।
অন্তত দু-চারদিনের জন্য রাখুন। আপনার অসুবিধে হচ্ছে ভেবেই ওকে এনেছি।
নতুন লোক রাখার অসুবিধে আছে। তাতে কাজের ঝঞ্ঝাট আরও বাড়ে।
ওঃ। বলে শশধর একটুক্ষণ মাথা নীচু করে চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে সুপ্রিয়ার দিকে একবার কাতরভাবে তাকাল। সে যেন সুপ্রিয়ার কাছ থেকে কিছু একটা দয়া চায়।
বাইরের দরজাটা বন্ধ করে দিলে এই ফ্ল্যাটটা একেবারে আলাদা হয়ে যায় গোটা বাড়ি থেকে। পরপর কয়েকটা দুপুর সুপ্রিয়া একদম একা আছে। শশধর কি তা জেনে শুনেই এসেছে?
অবশ্য শশধরকে দেখে একটুও ভয় পায় না সুপ্রিয়া।
শশধর তার দৃষ্টি, সুপ্রিয়ার মুখে নয়, তার নগ্ন ডান বাহুর ওপর স্থির রেখেছে। খুব ফরসা রং বলে সুপ্রিয়ার হাতখানি মাখনের তৈরি বলে মনে হয়।
সুপ্রিয়া জানে শশধরের ওই লোকটিকে রাখলে আবার কাল দুপুরে আসবে শশধর। তখন তো ও ভালো রকম ছুতো পেয়ে যাবে। তার দেওয়া লোক কেমন কাজ করছে, সে খবর নিতে শশধর তো আসতেই পারে।
তাহলে ওকে রাখবেন না বৌদি?
না।
শশধর কি এখন চায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। রোজ রোজ সুপ্রিয়া কাউকে চা তৈরি করে খাওয়াতে পারবে না।
আমার দিদির জ্বর। একবার দেখতে যাবো…আমাকে এক্ষুনি বেরুতে হবে।
শশধর আবার বলল, অ্যাঁ?
আমাকে এক্ষুনি বেরুতে হবে আজ।
শশধর এমন বোকা নয় যে, এই ইঙ্গিত বুঝবে না। সে খুব লজ্জিত ভাব করে বলল, ও! আপনাকে অসময়ে এসে বিরক্ত করলাম।
সুপ্রিয়া ভদ্রতা করেও কোনো উত্তর দিল না। শশধর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি তাহলে আজ যাই। আপনাকে বেরুতে হবে যখন।
দরজার কাছে গিয়েও মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করে শশদর আবার বলল, আপনি কোন দিকে যাবেন?
সুপ্রিয়া গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, যোধপুর পার্কে।
আপনি কীসে যাবেন? একটা ট্যাক্সি ডেকে দেব?
ট্যাক্সির দরকার নেই, আমি রিকশা করে চলে যাব।
তাহলে রিকশা ডেকে দিই?
আমাদের বাড়ির নীচেই রিকশা পাওয়া যায়? আমার তৈরি হতে খানিকক্ষণ সময় লাগবে।
ও। আচ্ছা চলি, বৌদি।
এবার সত্যি সত্যি চলে গেল শশধর।
দরজা বন্ধ করে হাউস কোটটা খুলে ফেলল সুপ্রিয়া। লোডশেডিং-এর গরমের মধ্যে এই মোটা জিনিসটা এতক্ষণ পরে থাকতে তার রীতিমতন কষ্ট হচ্ছিল।
দুপুরবেলা এই ধরনের উটকো জ্বালাতন কারুর ভালো লাগে না।
বিছানায় ফিরে গিয়ে গল্পের বই খোলার একটু পর সুপ্রিয়ার হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল। লোকটা বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নেই তো?
হয়তো শশধর যাচাই করতে চায় সুপ্রিয়া সত্যিই এখন বাড়ি থেকে বেরুবে কি না। অথবা মিথ্যে কথা বলে তাকে বিদায় করা হল। কথাটা মনে পড়া মাত্র সুপ্রিয়া আবার উঠে বাইরের দিকের বারান্দায় চলে এল।
এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখতেই চোখে পড়ল মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে শশধর। সিগারেট টানছে আর এই বাড়ির দিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছে। সুপ্রিয়ার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। শশধরের কী তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি!
সুপ্রিয়া দৌড়ে চলে এল ভেতরে।
হাউসকোট ছাড়া শুধু এই একটা পাতলা জামা পরে সে কখনও বাইরের দিকের বারান্দায় দাঁড়ায় না। পাড়ার ছেলেরা হ্যাংলা ভাবে তাকায়। সুপ্রিয়া সেটা খেয়ালই করেনি।
বিছানায় ফিরে এসে সে আপন মনে হাসতে লাগল। একলা একলা হাসতে অনেক সময় দারুণ ভালো লাগে। শশধর দাঁড়িয়ে থাক যতক্ষণ খুশি। সে কি আবার জিজ্ঞেস করবে, কই বৌদি, বেরুলেন না তো! এতখানি সাহস তার হবে?
ঘন্টাখানেক বাদে সুপ্রিয়া আর একবার গায়ে হাউসকোট চাপিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখে এল। না, শশধর নেই।
সেদিন রাতে সিদ্ধার্থকে সুপ্রিয়া বলল, তোমার বন্ধু আবার এসেছিল।
সিদ্ধার্থ বলল, কে? শশা! এত ঘন ঘন!
সুপ্রিয়া জিজ্ঞেস করল, ওদের কি অফিসে কাজ-টাজ কিছুই থাকে না? ঠিক তিনটের সময়।
ওদের কাজকর্ম না করলেও চলে। আজ কি ছুতো নিয়ে এসেছিল?
আমার জন্য রান্নার লোক জোগাড় করে এনেছিল।
শশাটা করিৎকর্মা আছে তো। একদিনে লোক জোগাড় করে ফেলল! লোকে আজকাল মাথা কুটেও চট করে একজন রান্নার লোক পায় না। তাকে রাখলে না?
একদম গাঁইয়া। আমাদের কাজ চলবে না।
তোমার দিদির বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে না কেন? তার তো একদম লোক নেই।
হ্যাঁ দিদির বাড়িতে ওকে পাঠাই, তারপর তোমার বন্ধু শশধর রোজ দুপুরে দিদির কাছে গিয়ে উৎপাত করুক আর কি। দিদিও দুপুরে একলা থাকে।
তোমাকে ছেড়ে ও এখন চট করে অন্য কোনো মহিলার কাছে যাবে না। তোমাকেই ওর পছন্দ।
আমি আজ ওকে চা দিইনি। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বিদায় করে দিয়েছি।
কী করে তাড়ালে?
সুপ্রিয়া সবিস্তারে ঘটনাটি খুলে বলল।
সিদ্ধার্থ আফসোসের সুরে বলল, ইস, বেচারাকে তাড়িয়ে দিলে! তোমার এলেম আছে বলতে হবে…মাত্র দুদিনেই! রমেনের বউ রত্না কিন্তু দু-মাসের মধ্যেও ওকে কিছু বলতে পারেনি।
আমি রত্নার মতন অমন ভালোমানুষ নই।
শশাটা এমনিতেই খুব নিরীহ। বিয়ে-টিয়ে করেনি, নিরালায় সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে গল্প করাটা ওর নেশা। সুন্দরী মেয়েদের ও মনে মনে পুজো করে।
বিয়ে করেনি কেন?
খুব সুন্দরী মেয়ে ছাড়া ওর অন্য কোনো মেয়ে পছন্দ নয়। আমাদের একদিন বলেছিল। যে-সে মেয়েকে ও বিয়ে করবে না। খুব সুন্দরী মেয়ে ওর মতন একটা লোককে বিয়ে করবেই-বা কেন? তাই বেচারার বিয়েই করা হল না।
ইস, ওই চেহারায় আবার সুন্দরী বিয়ে করার শখ! ও বুঝি নিজের চেহারাটা কোনো দিন আয়নায় দেখেনি?
ও কথা বলো না। দ্যাখো, দুর্গাঠাকুর কিংবা সরস্বতী পুজো করে কারা? অধিকাংশই তো রোগা, সিড়িঙ্গে, বিচ্ছিরি চেহারার পুরুষ। দেবীরা খুব রূপসী, তা বলে পূজারিকেও যে সুন্দর হতে হবে, তার তো কোনো মানে নেই। ও আগে প্রত্যেকদিন দুপুরের শো-তে হিন্দি সিনেমায় যেত, সুন্দরী অভিনেত্রীদের দেখবার জন্য। এখন বোধহয় জ্যান্ত সুন্দরীদের দেখতে চায়।
আমার কাছে আর আসবে না। রোজ রোজ দুপুরে ও সব ন্যাকামো আমার ভালো লাগে না। দুপুরে একটু পড়াশুনো করি।
সুপ্রিয়া ফিলসফিতে এম এ পাস। আজকাল অবশ্য তার পড়াশুনো বিলিতি হালকা গল্পের বইতেই সীমাবদ্ধ।
সিদ্ধার্থ পাশ ফিরে ঘুমোবার আগে বলল, দেখো, ও ঠিক আর একটা কোনো ছুতো খুঁজে আসবে। তোমাকে ওর খুব পছন্দ। আমি আগেও লক্ষ করেছি তোমার নাম শুনলেই ওর মুখখানা কেমন গদ গদ হয়ে যায়।
পরদিন দুপুরে সুপ্রিয়া আবার দরজায় খুট খুট শব্দ শুনল। সেদিনও লোডশেডিং। রীতিমত রেগে গেল সুপ্রিয়া। আজ আর শশধরকে ভেতরে ঢুকতেই দেওয়া হবে না। দরজার কাছ থেকেই তাকে কড়া কথা বলে বিদায় দিতে হবে। হাউসকোটটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সুপ্রিয়া এসে দরজা খুলল। কেউ নেই।
সুপ্রিয়া বাইরে বেরিয়ে এদিক ওদিক দেখল। কই, কেউ নেই তো? কোনো দুষ্টু ছেলে দরজায় টোকা দিয়ে পালিয়েছে। আগে তো কোনোদিন এরকম হয়নি। তাহলে কি সুপ্রিয়ার মনের ভুল! কেউ টোকা দেয়নি! আশ্চর্য!
দরজা বন্ধ করে কাছেই দাঁড়িয়ে সুপ্রিয়া একটুক্ষণ অপেক্ষা করল, না, আর কেউ টোকা দিল না। বিনা কারণে সুপ্রিয়া একবার রাস্তার দিকের বারান্দাটাতেও ঘুরে এল। রাস্তায় কেউ নেই।
এমন ভুল করার জন্য সুপ্রিয়া নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে উঠল।
হাউসকোটটা খুলে সবেমাত্র বিছানায় শুয়েছে। আবার দরজায় টোকা। সুপ্রিয়া উৎকর্ণ হয়ে রইল। এবারেও মনের ভুল?
এরপর বেশ জোরে শব্দ হল দরজায়। এটা কিছুতেই মনের ভুল হতে পারে না। ফের এসে রাগত ভঙ্গিতে দরজা খুলেই সুপ্রিয়ার মুখটা খুশির হাসিতে ভরে গেল। দরজার সামনে অপরাধীর মতন মুখ করে দাঁড়িয়ে রঘু। ওদের রান্নার লোক।
খুশির চোটে তাকে বকুনি দিতেও ভুলে গেল সুপ্রিয়া। স্নেহের স্বরে বলল, তোরা কী করিস? এমন চিন্তায় ফেলিস! আমি ভাবলুম, দেশে গিয়ে তোর আবার কোনো অসুখ বিসুখ হল নাকি!
রঘু কোনো উত্তর দিল না।
আয় ভেতরে। কী হয়েছিল?
রঘু আমতা আমতা করে বলল, এবার দেরিতে বৃষ্টি হল, জমিতে ধান রোওয়া বাকি ছিল…
ধান রোওয়া-টোওয়ার ব্যাপার সুপ্রিয়া কিছু বোঝে না। রঘু ওকে যা খুশি মিথ্যে বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু খুশির আতিশয্যে সেসব ভুলে গিয়ে সুপ্রিয়া বলল, ইস! কদিনের জন্য দেশে গিয়ে এমন রোগা হয়েছিস? ওখানে ভালো করে খেতে পেতিস না বুঝি? রান্নাঘরে দ্যাখ আলুর দম আর রুটি আছে। খেয়ে নে।
সুপ্রিয়ার স্বস্তির কারণ, রঘু এসে গেছে। আর তাকে নিজে এসে দরজা খুলতে হবে না। এই যে ধোপা কিংবা ডিমওয়ালা কিংবা ঠিকে ঝি এলেও সুপ্রিয়াকে গিয়ে দরজা খুলতে হয়েছে এই কদিন, এটা তার কাছে বিরক্তিকর।
সুপ্রিয়া নিজের ঘরে ফিরে এল। এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে লাগল পাখা। রঘু আসার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছে সুসময়।
একটু পরে বেজে উঠল কলিং বেল।
এখন তো বাবলুর ফেরার সময় হয়নি! তাহলে কি—
সুপ্রিয়া শুয়ে শুয়েই টের পেল, রঘু দরজা খুলে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে।
কে রে, রঘু?
রঘু বলল ইস্তিরিওয়ালা। যে জামাকাপড় মেলা ছিল আমি দিয়ে দিচ্ছি।
যাক, রঘু এসে গেছে, এখন সব নিশ্চিন্ত। রঘুই সব ব্যবস্থা করবে।
রঘুকে বলে দিতে হবে, দুপুরবেলা যে-সে এসে দরজায় ধাক্কা দিলে রঘু যেন জানিয়ে দেয়, বাড়িতে কেউ নেই। চেনা লোক হলেও রঘু যেন হুট করে তাকে ভেতরে না ঢুকতে দেয়।
পরদিন কিংবা তার পরদিনও শশধর আর এল না।
কিন্তু পরের শনিবার সুপ্রিয়া তার দিদির সঙ্গে নিউ মার্কেটে শাড়ি কিনতে গেছে, হঠাৎ দেখল একটা স্টলের পাশে শশধর দাঁড়িয়ে। সুপ্রিয়ার দিকে তার পিঠ ফেরানো। সে যেন সুপ্রিয়াকে দেখছে না। দোকানের জিনিস দেখছে খুব মন দিয়ে। সুপ্রিয়া ওকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেল।
ফেরার পথে সুপ্রিয়ার মনে একটা খটকা লাগল। ওই শশধরটা কি ওখানে হঠাৎ গেছে? পুরুষ মানুষ দুপুরবেলা নিউ মার্কেটে একলা একলা ঘুরে বেড়ায়? অথবা সে জানে যে সুপ্রিয়া ওখানে যাবে? কী করে জানল? শশধর ওদের বাড়ির কাছ থেকে অনুসরণ করেছে?
যাক গে, এটা এমন কিছু মাথা ঘামাবার ব্যাপার নয়, এই ভেবে সুপ্রিয়া চিন্তাটাকে উড়িয়ে দিল!
দুপুরবেলা কলিং বেল বাজলেই কিংবা দরজায় খুটখাট শব্দ হলেই সুপ্রিয়া চমকে চমকে ওঠে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসে। ধোপা কিংবা কোনো ফেরিওয়ালা কিংবা পাশের ফ্ল্যাটের কেউ। আগেও যে প্রায় দুপুরেই এ রকম কেউ না কেউ আসত, সুপ্রিয়ার যেন মনেই ছিল না।
একদিন সকাল এগারোটায় সুপ্রিয়া লেডিজ কর্নার থেকে তার অর্ডারি ব্লাউজ ও শায়া আনতে গেছে, দেখল যে পাশের পানের দোকানের সামনে ধুতি ও নীল শার্ট পরা একজন রোগা, চিমসে চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা খয়েরি হয়ে আসা ছাতা। খুব মন দিয়ে দেশলাই কিনছে শশধর।
সুপ্রিয়া না-দেখার ভান করে দোকানের মধ্যে ঢুকে গেল। এই দোকানটা শুধু মেয়েরাই চালায়। লোকটা এখানে এই মেয়েদের দেখতে আসে? সকাল এগারোটায়? অফিসে যাওয়া কি একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে? এই দোকানের কোনো মেয়েকেই তো খুব সুন্দরী বলা যায় না।
সে দোকানে প্রায় এক ঘন্টা সময় লাগল সুপ্রিয়ার। মাপ-টাপ মিলিয়ে নেবার ব্যাপার আছে।
যখন সে দোকান থেকে বেরুল, তখন চকিতে একবার দেখে নিল, শশধরের এখনও যেন দেশলাই কেনা শেষ হয়নি। সেই একই ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে।
শশধর একবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল সুপ্রিয়ার দিকে।
কিন্তু চোখাচোখি হবার আগেই সুপ্রিয়া উঠে পড়ল একটা রিকশায়। সুপ্রিয়ার হাসিও পায়, রাগও ধরে। এ কী শুরু করেছে লোকটা? পাগল হয়ে গেছে নাকি? সুপ্রিয়ার যেন মনে পড়ছে, এর মধ্যে আরও কয়েকবার সে শশধরকে তার কাছাকাছি ঘোরাফেরাও করতে দেখেছে। লোকটা সব সময় তাকে অনুসরণ করে? কিন্তু এজন্য রাস্তার মাঝখানে তো ওকে গিয়ে ধমক দিতে পারে না।
মেট্রো সিনেমায় ছবি ভাঙার পর ওপরের সিঁড়ি দিয়ে সুপ্রিয়া তার দিদি ও দুই বান্ধবীর সঙ্গে নামছে, এমন সময় সে বলে উঠল, এই রে।
সিঁড়ির নীচে কাচের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শশধর। সেই একই রকম পোশাক, কদিন ধরে বৃষ্টির নাম গন্ধ নেই, তবু হাতে সেই ছাতা। করুণ, তৃষ্ণার্ত চোখ মেলে চেয়ে আছে সুপ্রিয়ার দিকে।
দিদি জিজ্ঞেস করল, কী হল?
সুপ্রিয়া বলল, কিছু না। ভাবছিলাম, বুঝি চাবিটা ফেলে এসেছি। না। ব্যাগের মধ্যে আছে।
দিদি কিংবা বান্ধবীদের কাছে কথাটা বলা যায় না। ওরা নিশ্চয়ই হাসি-ঠাট্টা করবে।
শশধর কিন্তু সরে গেল না। সুপ্রিয়ারা নীচে নেমে যখন কাচের দরজা পেরিয়ে যাচ্ছে, তখনও সে একদৃষ্টে চেয়ে আছে সুপ্রিয়ার দিকে। যেন তার উষ্ণ নিশ্বাস এসে লাগল সুপ্রিয়ার ঘাড়ে। সুপ্রিয়া মুখখানাকে সোজা রাখল, ওর দিকে একবারও তাকাল না।
যখন সঙ্গে সিদ্ধার্থ থাকে, কিংবা জামাইবাবু কিংবা যে-কোনো পুরুষ মানুষ, তখন কিন্তু শশধরকে কক্ষনো দেখা যায় না। সে সুপ্রিয়াকে একা দেখতে চায়। কিংবা অন্য মেয়েরা সঙ্গে থাকলেও ক্ষতি নেই। এটা সুপ্রিয়া লক্ষ করেছে। কিন্তু রাস্তায় বেরুলেই যদি মনে হয়, দূর থেকে কেউ তাকে লক্ষ করছে, তাহলে খুব অস্বস্তি লাগে না? এর একটা প্রতিকার করা দরকার। এ ব্যাপারটা সিদ্ধার্থকে বলবে কি বলবে না, সুপ্রিয়া মনস্থির করতে পারে না। সিদ্ধার্থ হয়তো হেসে উঠবে। যা হালকা স্বভাব ওর।
একদিন মুখোমুখি হয়ে গেল।
সুপ্রিয়ার পরনে গাঢ় লাল শাড়ি। পায়ে লাল চটি, মাথায় লাল ছাতা। তার গৌরবর্ণ এই রক্তিম আভরণে যেন সোনার মতন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সুপ্রিয়ার দিকে রাস্তায় অনেক মানুষই তাকায়। সেটা সুপ্রিয়ার ভালোই লাগে, কিন্তু একজন বিশেষ কেউ তাকিয়ে থাকলেই আর স্বাভাবিক হওয়া যায় না।
গোলপার্কে রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে দিয়ে হাঁটছে সুপ্রিয়া, বিকেল পৌনে ছ-টা, আকাশটাও তার পোশাকের মতন রক্তবর্ণ, সেই সময় উলটো দিক থেকে ঠিক মুখোমুখি হেঁটে এল শশধর। চোখে সেই একই রকম করুণ, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি! সুপ্রিয়া থমকে দাঁড়িয়ে সোজা তাকাল ওর দিকে।
শশধর আরও দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল। তার মুখে যেন আলো ফুটে উঠেছে। সুপ্রিয়ার মুখে সে হাসি দেখতে পেয়েছে।
একেবারে কাছাকাছি এসে সে কথা বলার জন্য সবে ঠোঁট ফাঁক করেছে, সুপ্রিয়া সেই সময় তার পোশাকের মতন চোখও রক্তবর্ণ করে ফেলল, তারপর দারুণ ঘৃণার সঙ্গে বলল, ছিঃ।
ওই একটা মাত্র শব্দ, আর কিছু না। তারপরই সুপ্রিয়া ডানদিকে ফিরে একটা রিকশা ডাকল। রিকশায় উঠে আর একবার পিছন ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। ইচ্ছে করেই একটু বেশি খারাপ ব্যবহার করতে হল সুপ্রিয়াকে। ওই লোকটাকে আর বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। দিনের পর দিন পথেঘাটে একজন লোককে নিয়ে ঘোরা, এ যেন একটা দারুণ বোঝা। এ অন্য কেউ বুঝবে না। সবাই শুনলে বলবে, এতে আর এমন কি হয়েছে, লোকটা তো কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু এ যে এক সাংঘাতিক মানসিক চাপ। সবসময় একটা লোক তাকিয়ে থাকবে? ওর লোভী দৃষ্টি যেন সুপ্রিয়ার পিঠে ফোটে।
আজ একটু হেসে কথা বললেই আর কোনো উপায় ছিল না। আবার ঠিক বাড়িতে আসতে আরম্ভ করত। এরা এক ধরনের রোগী, এদের শিক্ষা দেওয়া দরকার। সেইজন্যই সুপ্রিয়া আজ ইচ্ছে করে বেশি সাজগোজ করে বেরিয়েছিল।
কদিন বাদে রাস্তায় বেরিয়ে সুপ্রিয়ার মনে হল, তার শরীরটা যেন বেশ হালকা হয়ে গেছে। মেজাজটাও ভালো লাগছে। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল। না, শশধর কোথাও নেই। সত্যিই নেই। সুপ্রিয়া ঠিক বুঝতে পেরেছে।
তারপর আর কোনো দিনই শশধরকে দেখা গেল না।
রাস্তায় এমনিই তো মানুষের সঙ্গে মানুষের হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। শশধরের সঙ্গে সেরকমও দেখা হয় না কখনো। সুপ্রিয়ার পথ থেকে শশধর নিজেকে যেন সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলেছে। যাক নিশ্চিন্ত!
নিছক কৌতূহলেই সুপ্রিয়া একদিন তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করল, তোমার সেই বন্ধুর কী খবর। ওই যে শশধর না কি যেন নাম? তোমাদের তাসের আড্ডায় আর আসে-টাসে না?
সিদ্ধার্থ বলল, শশা? না, সে তো আর অনেক দিন আসে না। সবাই মিলে ওর পেছনে খুব লাগা হত তো। রমেন বলেছিল, ওরে শশা, ইংলন্ডের রাজকুমারীর ডিভোর্স হয়েছে তুই তাকে বিয়ে করবি নাকি? বল তাহলে সম্বন্ধ করি।
যাঃ, একটা নিরীহ লোককে নিয়ে তোমরা এরকম নিষ্ঠুর রসিকতা করো।
নিরীহ ভালোমানুষদেরই তো পিছনে লাগে সবাই। আমাকে নিয়ে কি কেউ ওরকম বলতে পারবে?
আর আসে না?
নাঃ! একদম যেন হারিয়েই গেছে। আগে বলত, আমি ভাই ব্যাচেলার মানুষ, সন্ধের পর সময় কাটে না। তাই তোমাদের কাছে আসি। তাস খেলায় ওকে নেওয়া হত না, তবু চুপচাপ বসে থাকত। হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেছে।
এরপর শশধর মুছে গেল ওদের জীবন থেকে। তবে, পেন্সিলের লেখা ও ইরেজার দিয়ে খুব ভালো করে মুছলেও একটু না একটু সূক্ষ্ম দাগ থেকে যায়।
রাস্তায় বেরিয়ে সুপ্রিয়া এখনও হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়! সেই শুকনো মুখওয়ালা মানুষটা চট করে কোথাও সরে পড়ল না তো? পানের দোকানের পাশ দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল না? কিন্তু না, এ সব ব্যাপার বুঝতে ভুল হয় না। মেয়েদের পিঠেও চোখ থাকে।
সুপ্রিয়া মাঝেমাঝেই ভাবে, লোকটা গেল কোথায়?
পরক্ষণেই সে ভাবে, এ কী, আমি লোকটার কথা ভাবছি কেন? লোকটা গেছে, বাঁচা গেছে! কম জ্বালান জ্বালিয়েছে এই ক-মাস!
দুপুরবেলা কেউ কলিং বেল বাজালে সুপ্রিয়া এখনও চমকে চমকে ওঠে। সুপ্রিয়া যেন শশধরের জন্যই প্রতীক্ষা করে। লোকটা যে সত্যিই আর আসবে না কিংবা রাস্তায় অনুসরণ করবে না, সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে, এটা সুপ্রিয়ার কাছে এখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়।
একদিন নির্জন দুপুরে আবার বেল বাজে। দরজা খুলে দেয় রঘু। অচেনা বা অল্প চেনা লোক হলে দুপুরে ঢুকতে দেওয়া হবে না, এরকম নির্দেশ আছে রঘুর ওপর। কিন্তু একজন অচেনা আগন্তুক রঘুকে গ্রাহ্যই না করে দরজা খোলা মাত্র সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ে করুণ গলায় ডাকে, সুপ্রিয়া! সুপ্রিয়া।
সেই ডাক শুনে সুপ্রিয়ার বুক ধড়াস ধড়াস করে ওঠে। খাট থেকে নেমে ড্রেসিং গাউন পরতে ভুলে গিয়ে, প্রায় দৌড়েই নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সে! তারপর থমকে গিয়ে বলে, তুমি?
সব সুন্দরী রমণীদেরই একাধিক প্রেমিক থাকে। রূপের কিছু স্তাবক না থাকলে রূপ কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শুধু নিজের স্বামীর জন্য কোনো বিবাহিতা রমণী বছরের পর বছর রূপচর্চা বা সৌন্দর্যচর্চা করে? মেয়েরা প্রসাধন করে বাইরে বেরুবার সময়।
চেনাশুনোদের মধ্যে সুপ্রিয়ার চার-পাঁচজন ঘনিষ্ঠ স্তাবক আছে বটেই, তা ছাড়া আছে একজন বাল্যপ্রেমিক।
সেই সময় মেয়েরাই ভাগ্যবতী, যাদের একজন বাল্যপ্রেমিক থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে বিয়ে হয় না, বিয়ে হয় একজন বেশ স্বাস্থ্যবান, সচ্ছল, নির্ভরযোগ্য মানুষের সঙ্গে, তারপর বাকি জীবন সেই বাল্যপ্রেমিকটির সঙ্গে কাছাকাছি বা দূরত্বে একটি মধুর সম্পর্ক থেকে যায়। সুপ্রিয়া সেই রকম ভাগ্যবতী।
তার বাল্যপ্রেমিকটির নাম অভিজিৎ। সব দিক থেকেই রোমান্টিক প্রেমিক হবার যোগ্যতা আছে তার। সে শুধু সুদর্শন নয়, তাকে দেখা যায় খুব কম। সে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। অবশ্য চাকরির কারণে। এবং সে বিয়ে করেনি।
অভিজিৎ আসে ন-মাসে ছ-মাসে একবার। এবার এল ঠিক পৌনে দু-বছর পর। সুপ্রিয়া খুশি ও অভিমান মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, মনে আছে, তাহলে?
চিঠি লেখার অভ্যেস নেই অভিজিতের। তা ছাড়া চিঠি লেখার অসুবিধেও আছে। সে বলল, তুমি জানতে না, আমি বাঙ্গালোরে আছি এখন?
অভিজিতের সঙ্গে একটা ক্ষীণ সূত্র আছে যোগাযোগের। অভিজিতের মাসতুতো বোন স্বপ্না আবার সুপ্রিয়ার বান্ধবী। তবে স্বপ্নার সঙ্গেও আজকাল বেশি দেখা হয় না, আর দেখা হলেও সুপ্রিয়া মুখ ফুটে তার কাছে অভিজিতের কথা জিজ্ঞেস করতে পারে না!
বাঙ্গালোর বুঝি পৃথিবীর ওপারে? সেখান থেকে কি এতদিন পর পর আসতে হয়?
অভিজিৎ বলল, সত্যিই এর মধ্যে একবারও কলকাতায় আসতে পাইনি। তুমি কেমন আছ?
কেমন দেখছ?
আগের চেয়েও সুন্দর।
অভিজিৎ পূজারি নয় এবং নিছক স্তাবক। সে বাল্যপ্রেমিক। বাল্যপ্রেমিকরা হিংস্র হয়, শুধু মুখের কথা নয়, তারা আরও অনেক কিছু চায়।
‘আগের চেয়েও সুন্দর’ কথাটা উচ্চারণ করে অভিজিৎ গাঢ়ভাবে বেশ কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে সুপ্রিয়ার দিকে। তারপর সে বলে, আমাকে কি বসতে বলবে না?
তোমার সঙ্গে ভদ্রতা করতে হবে বুঝি?
অভিজিৎ একটা চেয়ারে বসে পড়ে আর একটা চেয়ার টেনে কাছে এনে বলে, তুমি বসো এটাতে।
সুপ্রিয়া তবু দাঁড়িয়ে থাকে। সে দেখে অভিজিতের মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ কোঁকড়া চুল ঠিক দশ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও সেই রকমই আছে।
অভিজিতের ব্যবহার অত্যন্ত সাবলীল। সে সুপ্রিয়ার উরুতে ডান হাতের পুরো পাঞ্জাটা রেখে বলে, এসো আমার কাছে এসে একটু বসো।
যেন আগুনের স্পর্শ লেগেছে, এইভাবে ভয় পেয়ে সুপ্রিয়া ছিটকে সরে যায়।
চোখ দিয়ে সে ভর্ৎসনা করে অভিজিৎকে। অভিজিতের কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। রঘু আছে না?
অভিজিৎ লজ্জা না পেয়ে হাসে।
রঘু দুপুরবেলা দরজার কাছে যেখানে শুয়ে থাকে, সেখান থেকে বসবার ঘরের কথাবার্তা ঠিক শোনা যায় না। কিন্তু রঘু যদি এখানে হঠাৎ এসে পড়ে? সুপ্রিয়া কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চায় না। অভিজিৎ যদি আগে খবর দিত তাহলে সুপ্রিয়া একটা কিছু ব্যবস্থা করত। সবচেয়ে সুবিধে, বাইরে কোথাও দেখা করা।
দুপুরবেলা আগন্তুক সম্পর্কে যাতে রঘুর কোনো কৌতূহল না জাগে সেই জন্য সুপ্রিয়া সাড়ম্বরে রঘুকে ডেকে বলল, রঘু, দুকাপ চা করে দে তো। কিংবা কফি থাকলে কফি করে দে!
রঘু যতক্ষণ কফি বানায়, ততক্ষণ অভিজিৎ টুকিটাকি কথা বলে সুপ্রিয়ার সঙ্গে। কিন্তু তার ভেতরটা ছটফট করে। অনেক দিন পর, অনেক দূর থেকে এসে দেখা করলে তার একটুও দূরত্ব পছন্দ হয় না। সুপ্রিয়া কেন অত দূরে বসে আছে?
রঘু কফি দিতে এলে অভিজিৎ প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বলে, যাঃ, সিগারেট আনতে ভুলে গেছি। তারপর সে রঘুর দিকে চেয়ে মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করে, ভাই, এক প্যাকেট সিগারেট এনে দিতে পারবে?
সুপ্রিয়া তীক্ষ্ণভাবে প্রশ্ন করে, কেন, কাছে সিগারেট নেই?
না, একদম ভুলে গেছি।
তাহলে আর সিগারেট নাই-বা খেলে! এখন খেতে হবে না।
চা কিংবা কফি খাওয়ার পর সিগারেট না খেলে চলে? আজকাল অনেক কমিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কফির পর একটা—
সুপ্রিয়া শোবার ঘরে খুঁজতে গেল। এবং সত্যিই সিদ্ধার্থের কোনো সিগারেট খুঁজে পেল না। একটা প্যাকেট আছে, তা-ও খালি।
ততক্ষণে অভিজিৎ টাকা বার করে ফেলেছে। সুপ্রিয়া ফিরে আসা মাত্র সে টাকাটা রঘুকে দিয়ে বলল, ভাই, চট করে এক প্যাকেট নিয়ে এসো। কাছেই দোকান আছে না?
রঘু দরজা টেনে বেরিয়ে গেল। এ এমনই দরজা, একবার টেনে দিলে বন্ধ হয়ে যায়, বাইরে থেকে খোলা যায় না।
রঘু বাইরে যাওয়া মাত্র অভিজিৎ লাফিয়ে উঠল।
অভিজিতের আলিঙ্গনের মধ্য থেকে চুম্বন ভেজানো ঠোঁটে সুপ্রিয়া বলল, শোন, তোমাকে আমি শশধর বলে ডাকব!
অভিজিৎ ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, শশধর সে কে?
কেউ নয়?
হঠাৎ ওই বিদঘুটে নামটাই বললে কেন?
এমনিই। বিদঘুটে কেন হবে, শশধর মানে চাঁদ। চাঁদও তো তোমারই মতন।
রোহিণীকে ভুলে থাকে।
তুমি বুঝি রোহিণী?
সময় খুব কম, রঘু এক্ষুনি ফিরে আসবে, তাই, অভিজিৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সেই অবস্থার মধ্যেও সুপ্রিয়া মনে মনে একটা সংলাপ তৈরি করে রাখে।
সাবধানতার জন্য আজ রাতেই সে খাওয়ার টেবিলে তার স্বামীকে হাসতে হাসতে বলবে, আজ দুপুরে তোমার সেই বন্ধু হঠাৎ আবার এসে হাজির হয়েছিল।
ওই যে শশধর, না কি যেন নাম?
সীমান্ত প্রদেশ
সীমান্ত প্রদেশ
দরজার আড়াল থেকে হীরেন দেখতে পেল, ওর স্ত্রী ললিতাকে ওর বন্ধু হেমকান্তি চুমু খাচ্ছে। হীরেন একটু হাসল।
হীরেন চিঠি ফেলতে গিয়েছিল, কাল বিকেলবেলা বেড়াতে গিয়ে ওরা যে দোকান থেকে ঢাকাই পরোটা খেয়েছে, তার পাশেই অশ্বত্থগাছের সঙ্গে লাগানো ডাকবাক্স, হেমকান্তির কাছে ডিরেকশন শুনে নিয়ে হীরেন সেটা ঠিকই চিনতে পারত এবং তাহলে চিঠিটা ফেলে আসতে হীরেনের সময় লাগতো বারো মিনিট, মেরে কেটে দশ মিনিট তো বটেই। তা বলে হীরেন যে অন্য সময় অনুপস্থিত থাকে না তা নয়, বা কালকে বিকেলেই তো বেড়াবার সময়, একটা লোকের হাতে বেতের তৈরি ব্যাগ দেখে হীরেন এমন মোহিত হয়ে যায় যে, সেই লোকটির সঙ্গে বেত-শিল্প বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা জুড়ে দেয়, বিরক্ত হয়ে সেই মন্থর অবসন্ন সন্ধ্যায় ললিতা ও হেমকান্তি আলাদা হাঁটতে থাকে মাঠের মধ্যে, অনেক দূর চলে গেলে হেমকান্তি চেঁচিয়ে বলেছিল, এই হীরেন, আমরা খালের ধারে গিয়ে বসছি! তুই আয়—এ কথা বলারও অনেকক্ষণ পর হীরেন এসেছিল।
সুতরাং, এখন এই চিঠি ফেলতে যাবার দশ মিনিটের কোনো আলাদা মূল্য নেই, শুধু, হীরেন যদি সত্যি সত্যি দশ মিনিট ব্যয় করত, তাহলে এই দৃশ্যটা তাকে দেখতে হত না। কারণ, ললিতা ও হেমকান্তি এ বিষয়ে মুখে কিছু আলোচনা না করে নিলেও দুজনেই মনে মনে নিশ্চিন্ত ছিল, এখন সময় আছে দশ মিনিট এবং ললিতা ঝটকা মেরে হেমকান্তিকে ঠেলে দেবার সময় বলেছিল, কী করছেন কী! আপনি পাগল, এক্ষুনি ও এসে পড়বে! হেমকান্তি বলেছিল, না, আসবে না, একবার, একবার।
কিন্তু হীরেন দশ মিনিট খরচ করেনি। সেটা ঠিক তার দোষও নয়। হীরেনের হাতে ঘড়ি নেই, কিন্তু বোধহয় ও সাড়ে তিন কি চার মিনিটের মধ্যেই ফিরে এসেছে। এই অসময়ে ফিরে আসার জন্য পরোক্ষে হেমকান্তিই দায়ী। পিসিমাকে বলে এসেছিল পৌঁছে সংবাদ দেবে, কিন্তু যেদিন হীরেনরা হেমকান্তির কাছে এসে পৌঁছোয় সেদিন শনিবার বিকেল, পরদিন রবিবার ডাক বন্ধ, আজ সোমবার সকালে চা-পর্ব শেষ করার পর, হীরেনেরই মনে পড়ে চিঠি লেখার কথা, ওর সুটকেসেই পোস্টকার্ড ছিল, হীরেন একপিঠে লেখার পর অন্যদিকে ললিতার পিসতুতো বোন বুলুকেও কয়েক লাইন লিখে দেয়, হেমকান্তি তখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে দাড়ি কামাচ্ছে, ললিতা মুরগির মাংসের গা থেকে পালক ছাড়াচ্ছে। সে সময় হীরেনের ঠিক কিছুই করার নেই ভেবে সে নিজেই চিঠিটা ফেলে আসার কথা ভাবল, চাকর এই মাত্র বাজার থেকে এসেছে, তাকে আবার এখুনি পাঠানো ঠিক নয়।
পরনে সিল্কের লুঙ্গি ছিল, তার ওপর পাঞ্জাবিটা চাপিয়ে নিয়ে হীরেন যখন বেরুবে, তখন হেমকান্তি চেঁচিয়ে বলেছিল, সিগারেট নেই, দুপ্যাকেট সিগারেটও আনিস তো! হীরেন আচ্ছা বলে বেরিয়ে যায়, ভুজিয়াওয়ালার দোকান পর্যন্ত পৌঁছেই ওর মনে পড়ায় পকেটে হাত দিয়ে দেখে যে পকেট ফাঁকা। কাল রাত্তিরে, হেমকান্তি বলেছিল এখানে বড়ো চোরের উপদ্রব, তাই হীরেন পকেট থেকে টাকাকড়ি ও খুচরো পয়সা পর্যন্ত সবই সুটকেসের মধ্যে রেখেছিল। তাহলে সিগারেট কেনার পয়সা আনার জন্যই তাকে ফিরতে হয়।
হীরেন ভেবেছিল বাড়িতে আর না ঢুকে জানলা দিয়েই পয়সা নেবে। কিন্তু তখন মনে পড়ে, উঠোনের রোদে বসে হেমকান্তিকে ও দাড়ি কামাতে দেখে এসেছে, ললিতাও রান্নাঘরের সামনে বারান্দায়, সুতরাং ওরা কেউ শুনতে পাবে না। হীরেন তাই বাড়ির মধ্যে ঢুকে বৈঠকখানা পেরিয়ে, হেমকান্তির ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় হেমকান্তির ঘরের একপাল্লা ভেজানো দরজা দিয়ে একেবারে ওপাশের দেয়ালের কাছে সেই চুম্বনের দৃশ্য দেখতে পায়।
ঠিক ওদের না দেখলেও, হয়তো আলমারি-জোড়া আয়নায় ওদের ছায়া দেখেছিল, মোট কথা হীরেন দেখেছিল মাত্র এক ঝলক, ললিতার চুলের মধ্যে হেমকান্তির হাত ও মুখের কাছে মুখ। আর হীরেন কয়েকটা কথাও শুনতে পেয়েছিল, সে কথাগুলো ছবির মতন, সব দেখতে পাওয়া যায়। উঠোনে হেমকান্তির দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম ছড়িয়ে আছে, রান্নাঘরের বারান্দায় রাখা আছে আনাজ ও মাংস, চাকর বাথানি বাইরের কুয়ো থেকে জল তুলছে। হীরেন একটু হাসল।
অন্তত দশ মিনিট হীরেনের বাইরে থাকার কথা ছিল, তার মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন কি চার মিনিটে ফিরে এসেছে। না এলেই ভালো হতো। এই দশ মিনিটের দাম বড়ো কম নয়, হয়তো সারাজীবন। দশ মিনিট বাদে এলে ওরা নিশ্চয়ই সাবধান হয়ে যেত, ওরা দুজনের কেউই তো কাণ্ডজ্ঞানহীন নয়।
হীরেন এক মিনিট কী দেড় মিনিট ওখানে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপরই মনে পড়ল, হঠাৎ ওরা ওকে এখন দেখতে পেলে ব্যাপারটা বিশ্রী লজ্জাজনক হয়ে পড়বে। ওরা দুজন হয়তো ভাববে, হীরেন আগে থেকেই ওদের সন্দেহ করেছিল বলেই গোপনে ফিরে এসে চোরের মতন দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে হীরেনের এই কথায় মনে হয়, সে মোটেই এমন খুঁতখুঁতে ও অনুদার নয় যে বন্ধুকে সন্দেহ করবে। বন্ধুর সঙ্গে নিজের স্ত্রীকে একা রেখে সন্দেহবশে আড়ি পেতেছে। ওরা যদি তাকে দেখে এখন সেই কথা ভাবে, সেটা খুবই অন্যায় হবে। হীরেন ঘুণাক্ষরেও এ সব কিছু ভাবেনি, সেইটা প্রমাণ করার জন্যই যেন তার সেখান থেকে তখুনি চলে যাওয়া দরকার।
তা ছাড়া, দ্বিতীয় কারণটি এই, এখুনি যদি তারা দুজনে তাকে দেখে ফেলে তা হলেই ব্যাপারটা সারা জীবনের মতো, স্থায়ী হয়ে গেল, হেমকান্তির সঙ্গে সে ঝগড়া করতে বাধ্য হবে। ঘটনাটা দুজনের কাছেই জানাজানি হয়ে গেলে তারপর আর শান্তভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, ললিতার সঙ্গেও তার সম্পর্ক কী দাঁড়াবে কে জানে—শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা আত্মহত্যা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকতে পারে। অথচ সামান্য একটা চুমুর জন্য, দেখে ফেলার জন্য।
এখানেই হীরেন একবার হাসল। ভাবতে ভাবতেই আরও তিন-চার মিনিট কেটে যায়, চুম্বন শেষ করে ললিতা ও হেমকান্তি একটু দূরে সরে গিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে। এই অবসরে হীরেন খুব সাবধানে আবার উঠোন পেরিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে। নিজের বাড়ি থেকে তাকে সন্তর্পণে লুকিয়ে বেরুতে হচ্ছে, এটাও একটা হাসির ব্যাপার।
এখন আর সিগারেট খাবার কোনো উপায় নেই জেনে সামান্য অস্বস্তি হল, শরীরটার মধ্যেও খানিকটা চিনচিন করছে, কাছে সিগারেট না থাকলে সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছেটা কী সাংঘাতিক প্রবল হয়, বস্তুত হীরেন শরীরে এক ধরনের অবসাদ বোধ করতে থাকে, ললিতার চুলের গুচ্ছে হেমকান্তির একটা হাত মুঠো করা—হেমকান্তি মুখখানা আস্তে আস্তে এগিয়ে আনছে—এই দৃশ্যটাই শুধু তার চোখে ভাসছে। হীরেন লক্ষ করল, ওর কপালের কাছে ও নাকের ডগাটা একটু গরম গরম লাগছে, অর্থাৎ ও উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। অথচ ব্যাপারটা এমন কিছু নয়, হীরেন ভাবল , কিছুই এতে আসে যায় না, সামান্য একটি চুমু, সে নিজেও কি আগে একাধিক মেয়েকে চুমু খায়নি? সে কি তাদের জন্য বিরলে দুঃখ বোধ করে? মোটেই না তারা কোথায় হারিয়ে গেছে, বিশেষ বিশেষ সেই সব চুমু খাবার মুহূর্তে খানিকটা আকর্ষণ বোধ করেছিল—এই পর্যন্ত। একমাত্র অরুণা, মাঝে মাঝে অরুণার ব্যাপারটা একটু খটকা লাগে, কিন্তু সে ঘটনাই তো অন্য রকম। অরুণাকে তার মাঝে মাঝে মনে পড়ে, মনে পড়লেই একটু খারাপ লাগে , কিন্তু অরুণা তাকে ভুলে গেছে নিশ্চয়ই, ভুলে যাওয়াই ভালো। ললিতাও হেমকান্তিকে ভুলে যাবে—এবার হেমকান্তির জন্য একটা ভালো পাত্রী দেখে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে দেখছি।
লাল ডাকবাক্সটার গায় এমন একটা মরচে ধরা তালা লাগানো যে দেখলে সন্দেহ হয়—কোনোদিন এটা খোলা হয় কি না! হীরেন একটু ইতস্তত করল। এ সব মফস্বল শহরের ডাক ব্যবস্থায় ঠিক বিশ্বাস নেই, সে মিষ্টির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করতে গেল। দোকানে কাঠের বেঞ্চিতে চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে কয়েকজন যুবক আড্ডা দিচ্ছে , চায়ের দোকানে আড্ডা মারার স্বভাব কলকাতা থেকে পুরুলিয়ার মতন শহরেও পৌঁছে গেছে। হীরেনের খুবই লোভ হল ওই দোকানে বসে একটু চা খায়, আরও খানিকটা সময় কাটিয়ে ফিরতে চায়, কিন্তু উপায় নেই, পকেটে একটা পয়সা পর্যন্ত নেই। সিগারেটের তৃষ্ণাও তাকে আকুল করে তোলে। এখানে একা বসে চায়ের সঙ্গে সিগারেট খেতে পারলে তার মুখখানা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারত, তখন সে ওদের দুজনের মনে সামান্যতম সন্দেহ না জাগিয়ে বাড়ি ফিরতে পারত।
স্বাভাবিক তাকে হতেই হবে, হীরেন খুব মনের জোর দিয়ে কথাটা ভাবল, একটা চুমুর জন্য কিছু আসে যায় না। হেমকান্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব সে নষ্ট করতে পারবে না। আর, ললিতার ভালোবাসা হারালে পৃথিবীতে সে আর কোথায় আশ্রয় পাবে? হীরেন তখন একটু আগে দেখা সেই দৃশ্য ও গুণের দুজনের যা সামান্য কথা সে শুনতে পেয়েছে তাই মনে করার চেষ্টা করল।
হীরেন যখন দরজার কাছাকাছি এসেছিল, তখন ললিতার কাঁধে হেমকান্তির হাত। তা দেখে হীরেনের একটুও খটকা লাগেনি, এমনকি একথাও ভাবেনি, মাত্র সাড়ে তিন মিনিট আগে ওরা দুজন ছিল উঠোনে ও রান্নাঘরে এরই মধ্যে দুজনে দুজনের কাজ ফেলে ঘরের মধ্যে চলে এল কী করে? তবে কি আগে থেকেই ওদের ঠিক করা ছিল, হীরেন বেরিয়ে যাবার পরই চোখোচোখিতে কথা ঠিক হয়ে যায়? হীরেন তখনও একথা ভাবেনি, ভেবেছিল পরে, তার আগে সে অন্যমনস্কভাবে দরজা পেরিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় শুনতে পেল, কী করছেন। কী? আপনি পাগল! এক্ষুনি ও এসে পড়বে। আর, তারপরই হেমকান্তির ব্যাকুল মিনতিপূর্ণ গলা, না আসবে না, একবার, একবার! হীরেন তখন দাঁড়িয়ে পড়েছিল, যেন নিজের স্ত্রী ভেবে নয়, কোথাও কোনো যুবতীকে কোনো যুবক চুমু খাচ্ছে—এই দৃশ্য দেখে ফেললে যেমন আড়াল থেকে আরও দেখতে ইচ্ছে হয়—অনেকটা সেই রকম। ললিতা বলেছিল, না, একবারও না , ছিঃ।
হেমকান্তি বলেছিল, এসো, একবার, শুধু একবার!
না! না!
হ্যাঁ! এসো!
না! কেন আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন।
আমি কত কষ্ট পাচ্ছি, তুমি জানো না।
এরপর হেমকান্তি একহাত ললিতার কোঁকড়ানো চুলের গুচ্ছে ডুবিয়ে অন্য হাতে ললিতার চিবুক ধরে, এবং ললিতার সকালবেলার ফোলা ঠোঁটে প্রগাঢ় চুম্বন করে। একবার মাত্র। চুম্বনের পর দুজনই কয়েক সেকেন্ড একেবারে নিঃশব্দ। তারপর ললিতা খানিকটা কাতর গলায় বলেছে, কেন এ রকম করলেন?
হেমকান্তি চাপা গলায় স্বীকার করে, আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না, তুমি এত সুন্দর!
ও কথা আর বলবেন না।
ওকথা বারবার বলব। কিন্তু এইমাত্র যা করলুম, তার জন্য আমার অনুতাপ হচ্ছে, হীরেনকে আমি দুঃখ দিতে চাই না।
সত্যি এরকম আর কখনও করবেন না বলুন? ও আপনার কতদিনের বন্ধু।
আমার ওপর রাগ করো না, আমাকে ক্ষমা করো, আর কখনও না।
এই সময় হীরেন চলে এসেছিল।
চিঠি ফেলার পর হীরেন স্টেশনের দিকে বেড়াতে যায়। মাত্র একটা ট্রেন ছেড়ে গেল। এই ট্রেনে খবরের কাগজ এসেছে, কিন্তু তার তো কাগজ কেনারও উপায় নেই। সে উঁকি মেরে প্রথম পাতার খবরগুলো দেখে নেবার চেষ্টা করে। চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ ও সিগারেট খাওয়া—কলকাতার এই বাঁধা অভ্যেস আজ কিছুতেই রাখা যাচ্ছে না। কিন্তু এখানকার রোদ্দুরটা এত ভালো কলকাতার সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না, বেশ গাঢ় ধরনের শীতের সকালে এমন সাদা রোদ্দুর, সারা শরীরটাকে বেশ মোলায়েম করে তুলেছে। এই রোদ্দুরে বুড়ি ভিখারির মুখও সুন্দর মনে হয়।
স্টেশনের বাইরে পুরোনো ডাকবাংলো, সাহেব-মেম বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে রোদ্দুরে আরাম করছে। ওদিকে বোকারোর কাজ শুরু হয়েছে বলে, এ পথ দিয়ে আবার অনেক খাঁটি সাহেব-মেমের যাতায়াত শুরু হয়েছে। টুকটুকে লালরঙের সোয়েটার পরা ফুটফুটে বাচ্চা বল নিয়ে খেলা করছে মাঠের মধ্যে, একটি অষ্টাদশী মেম-তরুণী কি-যেন খেলার নিয়ম বোঝাচ্ছে ওদের। নীল-রঙা গাউন, মাথায় হলদে স্কার্ফ বাঁধা, কি স্বচ্ছন্দ স্বাস্থ্য মেয়েটির, মসৃণ চামড়া, ঝকঝকে সাদা দাঁত, নরম রক্তিম ঠোঁট। হীরেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ খেলা দেখতে লাগল। ওদের তো ওসবে কিছুই আসে যায় না। অনেক সময় স্বামীর সামনেও বউকে চুমু খেলে সেটা হয় ঠাট্টা। কি যেন একটা রুমাল-চোর ধরনের খেলা আছে ওদের? যে জিতবে, সেই পাশের মেয়েটিকে একবার চুমু খাবে।
দরজা খোলা ছিল কেন? ওরা দরজাটা বন্ধ করে নিলেই পারত। কিন্তু সকালবেলা ঘরের দরজা বন্ধ করা দৃষ্টিকটু। সাড়ে তিন কি চার মিনিটেই ওরা ব্যাপারটা ঠিক করে ফেলল কী করে? আসলে যা মনে হয়, ওরা কিছুই আগে ঠিক করেনি, রান্নাঘরের বারান্দায় ছিল ললিতা, উঠোনে বসে হেমকান্তি দাড়ি কামাতে কামাতে দুএকটা ফষ্টিনষ্টি করছিল। কিছু একটা দরকারে ললিতা এসেছিল ঘরের মধ্যে, সেই সময় হেমকান্তিও টপ করে উঠে এসে ঝোঁকের মাথায় ওকে জড়িয়ে ধরে! একটা অন্ধ আবেগের ব্যাপার। ছবিটা ভেবে নিয়ে নিজের যুক্তিবাদী কল্পনা শক্তিতে হীরেন বেশ খুশি হয়ে ওঠে। অন্ধ আবেগের ব্যাপার, হঠাৎ করে ফেলে দুজনেই এখন অনুতপ্ত, তা তো ওদের কথা শুনেই বোঝা গেল। ললিতা তো রাজি হয়ইনি, হেমকান্তিটা বরাবরই একগুঁয়ে, যখন যা মনে হয়, না করে ছাড়ে না, কিন্তু পরে অনুতাপ করে।
হেমকান্তির অন্যায় আবদারে ললিতা যে চেঁচিয়ে ওঠেনি, কান্নাকাটি করে নাটক বাধায়নি, এতে ললিতার প্রতি হীরেনের কৃতজ্ঞতাই বোধ হয়, নাটকীয় ব্যাপার সে একেবারেই পছন্দ করে না।…ওদের যে-কটা কথা শুনেছে, তাতে হীরেন স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে যে, ললিতা আগাগোড়াই হেমকান্তিকে বাধা দিয়েছে, হেমকান্তির ছেলেমানুষি দৌরাত্ম্যির কাছে একবারের মতো আত্মসমর্পণ করলেও মন থেকে সায় দেয়নি কিছুতেই। ললিতার কথার সুরে একথাও ফুটে উঠেছে যে, হেমকান্তির অন্যায় আবদারের জন্য—হীরেনকে বলে দিয়ে সে কোনো শাস্তি আদায় করতেও পারবে না।
হেমকান্তি হীরেনের প্রায় জন্ম থেকে বন্ধু, গোটা ইস্কুল আর কলেজ জীবন একসঙ্গে কাটিয়েছে, হীরেনের বিয়ের সাতপাকের সময় হেমকান্তি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল পর্যন্ত। সেই হেমকান্তির সঙ্গে হীরেনের বিচ্ছেদ কল্পনাও করা যায় না, ললিতাও তা জানে! তার বদলে, সামান্য একবার।
‘কেন আমায় কষ্ট দিচ্ছেন?’ ললিতা একথা বলেছিল কেন? হীরেন আবার একটু হাসলো। পরপুরুষের মুখে রূপের স্তুতি শুনে একটু অন্তত বিচলিত বোধ করবে না এমন মেয়ে আবার হয় না কি? ওটা তো স্বাভাবিক, যেমন স্বাভাবিক, যত প্রিয় বন্ধুই হোক, তার সুন্দরী স্ত্রীকে আড়ালে পেলে যে কোনো পুরুষের পক্ষেই একটু ফষ্টিনষ্টি করার লোভ জাগে। দুজনের মধ্যে কেউ যদি একটু বদ হত, তাহলেই ব্যাপারটা অনেক দূরে গড়াত। কিন্তু হীরেন হেমকান্তিকে জানে ওর চরিত্রে হঠকারিতা থাকলেও মলিনতা নেই এক ছিটে। আর—ললিতা, সাড়ে চার বছর বিয়ে হয়ে গেছে, তবু হীরেন জানে—ললিতাকে ছাড়া তার জীবনটা শূন্য হয়ে যাবে, ললিতা ছাড়া তার আর কোনো অবলম্বন নেই। স্ত্রীর কাছ থেকে শুধু ভালোবাসা পাওয়াই যথেষ্ট নয়, ললিতার স্বভাবের মধ্যে একটা গভীর সমবেদনা আছে।
ললিতার প্রথম কথাটাতেও একটু খটকা লাগতে পারে। ‘কী করছেন কী? এক্ষুনি ও এসে পড়বে!’ হীরেনের এসে পড়াতেই একমাত্র আপত্তি। একমাত্র না হোক হীরেন ভাবল সত্যিই তো এইটাই প্রধান। দেখে ফেলাটাই তো সবচেয়ে ভয়ংকর! অন্য কেউ দেখে না ফেললে, আর সব কিছু মিটিয়ে ফেলা যায়, ভুলে যাওয়া, দূরে যেতে পাওয়া যায়, কিন্তু একবার কেউ দেখলেই তা শাশ্বত হয়ে গেল! ভাগ্যিস, হীরেন যে দেখে ফেলেছে, তা ওরা দেখেনি।
অজান্তেই হীরেন মনে মনে হিসেব করে, সাত না আট? আটজন এ পর্যন্ত ললিতা ছাড়া আরও আটটি মেয়েকে চুমু খেয়েছে হীরেন, সেজো মামিমাকে ধরেই বিয়ের পরই তো দুজনকে, একবারও কেউ দেখেনি, কেউ সন্দেহও করেনি, তাই কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই! দীপ্তির সঙ্গে এখনও দেখা হয়, ললিতার সঙ্গে একদিন সিনেমা দেখতে গিয়েও তো দীপ্তির সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কত স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা হল, মুখের একটি রেখাও বদলায় নি। কল্যাণী বিয়ের পর বোম্বাইতে আছে, তিনটি ছেলেমেয়ে হয়েছে না কি। নীলি, মানে নীলিমা—হীরেনের পিসতুতো বোন, তাকে তো চুমু ছাড়াও আরও কত কি সে তো এক আই এ এস-কে বিয়ে করে এখন খুব সমাজসেবিকা হয়েছে—সুবাদে সেজোমামিমা এখনও নিরালায় দেখলেই চোখের ইঙ্গিত জানায়—এসব তো আর কেউ দেখেনি, তাই কোথাও অশান্তি নেই। দেখাটাই তো একমাত্র দোষের, তা ছাড়া কোথায় কী ঘটেছে—কে জানে! ওদের কারুর জন্য হীরেনের পিছুটানও নেই, শুধু একমাত্র অরুণা, অরুণার কথা ভাবলেই হীরেনের বুক শিরশির করে। না অরুণাকে চুমু খাবার সময়েও কেউ দেখেনি কিন্তু একমাত্র অরুণাকেই ও চুমু খেয়েছিল জোর করে।
তখন হীরেনরা থাকত কোন্নগরে ওদের পাশের বাড়ির পরিবারটা ছিল ছন্নছাড়া। অরুণার বাবা গগনবাবু ছিলেন রেসের বুকি, লোকের কাছ থেকে পাঁচ আনা দশ আনা পয়সা নিয়ে রেসের বাজি ধরতেন, প্রত্যেক শনিবার ওদের বাড়ির সামনে চেঁচামেচি হই-হল্লা লেগেই থাকত। গগনবাবুকে দেখলেই মনে হত লোকটা ভালো নয়, মানুষ ঠকানোই ওঁর কাজ। তা ছাড়া, স্টেশনের পাশে রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে বসে গগনবাবুকে দিশি মদ খেতে হীরেন নিজের চোখে দেখেছে। অরুণার দাদা সাধনটা তো ছিল এক নম্বরের গুন্ডা, শুধু পাড়ায় বখামিই নয়, রাত্তিরবেলা ছিনতাই, জোচ্চুরির কাজেও ছিল, দু-তিনবার পুলিশেও ধরা পড়েছিল, পাড়ার এক রাজনৈতিক নেতা বারবার ওকে ছাড়িয়ে এনেছে। অরুণার ছোটো ভাইবোনেরা বস্তির ছেলেদের সঙ্গে মিশে রাস্তায় ছিপি খেলত, কী কুৎসিত গালাগালি শিখেছিল দশ-বারো বছরেই—অরুণার মা বালিশের ওয়াড় আর ফ্রক-পায়জামা সেলাই করে বিক্রি করতেন। সেই বাড়ির মেয়ে অরুণা, অরুণা কলেজে পড়ত। অসম্ভব তেজ ছিল তার। পাড়ার কারুর সঙ্গে, বাড়ির কারুর সঙ্গে একটাও কথা বলত না, নিরেট মুখ করে সোজা হয়ে হেঁটে যেত রাস্তা দিয়ে। পাড়ার ছেলেরা, অনেক সময় সাধনের বন্ধুরাও অরুণাকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল মন্তব্য করেছে, সিটি দিয়েছে, অরুণা কোনোদিন ঘাড় তুলে তাকায়নি। সন্ধেবেলা দুটো টিউশনি করত, তাই দিয়ে পড়ার খরচ চালিয়েছে। হীরেন চেয়েছিল অরুণার কাছাকাছি আসতে। গোড়ার দিকে অরুণাকে শ্রদ্ধা করত সে, ক্রমে এক ধরনের মায়া ও শারীরিক আকর্ষণ জাগে। বছর সাতেক আগের কথা, হীরেন তখন সদ্য পোর্ট কমিশনার্স অফিসে চাকরি পেয়েছে, হীরেন চেয়েছিল অরুণাকে বিয়ে করে তাকে ওই পরিবেশ থেকে উদ্ধার করবে।
কিন্তু অরুণা হীরেনকে গ্রাহ্য করেনি, কিছু যেন একটা ব্রত ছিল তার। অরুণা একমাত্র কিছুটা কথাবার্তা বলত হীরেনের দিদির সঙ্গে। হীরেনের দিদি তখন উইমেন্স কলেজে পড়ান, অরুণা মাঝে মাঝে দিদির কাছে আসত পড়াশুনো দেখে নিতে। হীরেন চেষ্টা করেছিল অরুণার সঙ্গে ভাব করতে, অরুণা ঠান্ডা গলায় কাটাকাটা উত্তর দিয়েছে শুধু, অরুণার চোখ দুটো অসম্ভব জ্বলজ্বলে, সবসময় চোয়াল শক্ত, ভেতরে ভেতরে যেন সর্বক্ষণ একটা তীব্র ক্রোধ জ্বলছে। হীরেন একদিন বলেছিল, বাগবাজারে একটা মেয়েদের স্কুলে একটা চাকরি খালি আছে—আমার এক বন্ধু বলছিল, তুমি করবে নাকি? আমার বন্ধুর কাকা সেই স্কুলের সেক্রেটারি। অরুণা শুধু সংক্ষেপে জানিয়েছিল আমি কারুর চেনাশোনার জোরে কোনো চাকরি নিতে চাই না!
হেমকান্তির মতন হীরেন অমন হঠকারী নয়, কিন্তু অরুণার ব্যাপারে হীরেন কিছুদিনের জন্য ক্ষেপে উঠেছিল। সে যে সৎ এবং ভালো উদ্দেশ্যেই অরুণার সঙ্গে মিশতে চায়—অরুণা এটুকুও বুঝতে চায়নি বলেই যেন হীরেন ক্রমশ বেশি ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। একদিন দিদির ঘরে অরুণাকে একা পেয়ে, দিদি তখন নীচে বাথরুমে গেছে, হীরেন অকস্মাৎ এসে অরুণার হাত ধরে আবেগবিহ্বল গলায় বলেছিল অরুণা, শোনো! অরুণা এক ঝটকায় সরে গিয়ে তিক্ত গলায় বলেছিল হাত ধরেছেন কেন? হীরেন তক্ষুনি কাঁচুমাচুভাবে বলেছিল, অরুণা, তুমি আমাকে ভুল বুঝ না, আমি তোমার বন্ধুত্ব চাই! অরুণা ওর দিকে না তাকিয়েই বলে, আমি কারুর বন্ধুত্ব চাই না। হীরেন আহতভাবে জিজ্ঞেস করল, কেন? সত্যি, বিশ্বাস করো। অরুণা অস্থির হয়ে জ্বলে ওঠে, আপনি কি চান, আমি এখান থেকে চলে যাই?
আরও দু-তিনটি কথা বলার পর অরুণার তিক্ততা আরও বাড়তে দেখে হীরেন উন্মত্তের মতন হয়ে যায়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে অরুণাকে জড়িয়ে ধরেছিল, অরুণা সমগ্র শক্তিতে বাধা দিয়ে হীরেনের চুল ধরে টানতে থাকে, এক হাতে সরিয়ে দিতে চায় হীরেনের মুখ তবু হীরেন জোর করে অরুণার ঠোঁট কামড়ে ধরে, একহাত নেমে আসে অরুণার বুকের কাছে তখনও কাতরভাবে বলতে থাকে অরুণা আমায় বিশ্বাস করো—কোনোক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে অরুণা বলে আপনারা সবাই আমার সঙ্গে শত্রুতা করবেন? আপনারা সবাই—অরুণা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে এবং তক্ষুনি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সে ঘটনাও কেউ দেখেনি দিদি জানতে পারেনি, কেউই জানেনি, কিন্তু অরুণা আর কখনও ওদের বাড়িতে আসেনি এবং মাসখানেকের মধ্যেই বাঁকুড়া না কোথায় ইস্কুলের কাজ নিয়ে চলে যায়। যাবার আগে অরুণা ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে বিষম ঝগড়া করেছিল।
রোদের তাপ বেশ চড়া হতে হীরেনের খেয়াল হয় অনেকক্ষণ আগেই তার ফেরা উচিত ছিল। এতক্ষণ না ওরা আবার তার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এবং ডাক বাংলোর কাছ থেকে সরে এসে কখন যে সে চৌরাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে—তাও খেয়াল করেনি। একটু দ্রুত বাড়ি ফেরার পথ ধরতেই কিছুটা দূরে গিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির সামনে হেমকান্তির সঙ্গে তার দেখা হয়। হেমকান্তির স্নান করা চেহারা, পুরোদস্তুর স্যুট-টাই ও পালিশ-করা জুতো। হেমকান্তি এখানকার আদালতের হাকিম। হীরেনকে দেখে সে জিজ্ঞেস করল কীরে, ঘুরে-ফিরে শহরটা দেখছিলাম ছোটো হলেও মন্দ না শহরটা, বেশ ছিমছাম।
তোকে সিগারেট কিনতে বলেছিলুম, ললিতা বলল, তুই পয়সা নিয়ে বেরোসনি!
হীরেন সহসা উত্তর দিল, এই পর্যন্ত এসে পকেটে হাত দিয়ে দেখি যে খালি! দে সিগারেট দে!
হেমকান্তির কাছ থেকে সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে হীরেন জিজ্ঞেস করল, তোর ছুটি পাওনা নেই?
আজ সোমবার তো, আজ অ্যাটেন্ডেন্স দিয়ে তারপর টানা চারদিন ছুটি নিয়ে নেব। কাল অযোধ্যা পাহাড়ে যাবি?
সেটা কতদূরে? পুরুলিয়ায় আবার পাহাড় আছে নাকি?
পাহাড় মানে ঢিবি আর কি। বেশি দূরে না, তবে জায়গাটা সুন্দর, একটা চমৎকার বাংলো আছে। দেখি লাহিড়িকে বলে একটা স্টেশন ওয়াগন জোগাড় করতে পারি কি না! না হলে, কোনো ট্যাক্সির সঙ্গে কথা বলে রাখব—
তুই খেয়েছিস?
না, লতিকা মাংস চাপিয়েছে। দুপুরে এসে খাবো এখন।
হেমকান্তির হনহন করে হেঁটে যাওয়া চেহারার দিকে হীরেন খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। পাতলার ওপর চেহারা, হেমকে দেখলে এখনও তিরিশের নীচে বয়েস মনে হয়।
বারান্দাতেই তোলা উনুন এনে লতিকা মাংস চাপিয়েছে। এর মধ্যে স্নান সারা হয়ে গেছে তার, একরাশ কোঁকড়া চুল পিঠময় ছড়ানো, রোদ্দুরে এখন আর অমন ধবধবে সাদা নেই, এখন একটু হলদেটে, তবু এই মফস্বল রোদ্দুরে ললিতার সুন্দর মুখ আরও সুন্দর মনে হয়। উনুনের আঁচে খানিকটা লালচে ছায়াও পড়েছে।
হীরেনের দিকে চোখ তুলে ললিতা জিজ্ঞেস করে, এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
হীরেন বলল, ঘুরে ফিরে দেখে এলাম। এখানে বেতের জিনিস বেশ সস্তা। ভাবছি যাবার সময় এখান থেকে কয়েকটা বেতের চেয়ার নিয়ে যাব।
হ্যাঁ। অ্যাদ্দুর থেকে আর বেতের চেয়ার নিতে হবে না। তা ছাড়া বেতের চেয়ার বেশিদিন টেঁকে নাকি?
বরং কয়েকটা বেড কভার নিয়ে যাব। ঠাকুরপো বলল, এখানকার বেড কভারও নাকি ভালো।
কথা বলতে বলতে হীরেন এসে রান্নাঘরের বারান্দাতেই বসে পড়ে। বাথানি এক কোণে বসে শিল-নোড়ায় পেঁয়াজ বাটছে আর গামছা দিয়ে চোখের জল মুছছে। বড়ো সাইজের দুতিনটে দাঁড়কাক কীজন্য চিৎকার করছে কে জানে? হীরেন জিজ্ঞেস করল, তোমার রান্নার কত দেরি?
ললিতা মুখ টিপে বলল, তোমার এর মধ্যেই খিদে পেয়েছে নাকি?
তা মন্দ পায়নি! এখানকার জলে বেশ খিদে হয়!
কলকাতার জলেও তো তোমার খিদে কম দেখি না।
তা বলে তুমি মোটেই আমাকে পেটুক বলতে পারো না। কতক্ষণ চাপিয়েছ, দাও একটু চেখে দেখি।
বেশিক্ষণ চাপেনি, এখনও কাঁচা। তুমি বরং ততক্ষণ স্নান করে নাও না। আর একটা উনুনে ভাত বসিয়ে দিয়েছি।
দাঁড়াও, এখুনি কি চান করব? খবরের কাগজ দেয়নি, না?
উঁহু!
হেমটা বোধহয় কাগজের পয়সা বাঁচায়। কোর্টে গিয়ে কাগজ পড়ে!
তোমার বন্ধু বোধহয় একটু কৃপণ আছে না?
কৃপণ? হেম? মোটেই না—
চারজন খাব দুবেলা, মোটে একটা মুরগি আনতে দিয়েছে কেন? তুমি কিন্তু কাল সকালে নিজে বাজার করবে? সবকটা দিন বন্ধুর ঘাড়ে চালিও না।
হেম মোটেই কৃপণ নয়। ও খাওয়া-টাওয়া বেশি পছন্দ করে না, কিন্তু অন্য অনেকরকম শৌখিনতা আছে। দেখছ না, ঘরে কত রকম স্নো-পাউডার সেন্টের শিশি। ব্যাচেলার মানুষ, বেশ আছে!
তোমার বুঝি লোভ হচ্ছে? তুমি খুব খারাপ আছো, না?
আমার মতন ওর তো কোনো বন্ধন নেই!
আমি তোমার বন্ধন?
বন্ধনই তো—
এ কথা বলে হাসতে হাসতে অভ্যাসবশে হীরেন ললিতার দিকে হাত বাড়ায়। ললিতা ত্রস্তে সরে গিয়ে চাকরকে ইশারায় দেখিয়ে ভ্রূভঙ্গি করে বলে, কী হচ্ছে কি? যত দিন যাচ্ছে তত তোমার লোভ বাড়ছে।
কথা শেষ করে ললিতা ছোট্ট করে মধুরভাবে হাসে। দাঁড়িয়ে উঠে হীরেন বলে, ভাগ্যিস ও বেচারা একবর্ণ বাংলা বোঝে না।
বারান্দা থেকে নেমে উঠোনে এসে হীরেন আবার একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। ভারী মনোরম এই ছুটি, এই সকাল, দূরে ট্রেনের হুইশল বেজে উঠল, বাইরে একটা ছাগলের বাচ্চা তখন থেকে একটানা ডাকছে—কোথাও কোনো গরমিল নেই। হঠাৎ হীরেনের মনে হল, সকালে ওই দৃশ্যটা ওকি সত্যিই দেখেছিল, নাকি তার দিবাস্বপ্ন? রাস্তায় দেখা হল হেমকান্তির সঙ্গে, ওই তো ললিতা বসে পিঠে চুল মেলে, কোথাও কোনো আড়ষ্টতা নেই, জড়তা সেই, সবই স্বচ্ছন্দ, সারা পৃথিবী কি তার সঙ্গে অভিনয় করে যাচ্ছে নাকি আজ সকালে? নাঃ, ও রকম কিছু সত্যিই ঘটেনি, সবটাই হীরেনের কল্পনা? দিবাস্বপ্নকে কে গুরুত্ব দেয়?
আস্তে আস্তে হীরেন এসে হেমকান্তির ঘরে ঢুকল। খুব সন্তর্পণে দরজাটা তখন যেমন ছিল, সেইরকম আধখোলা রাখল। বন্ধ জানলাটার কাছে আলমারি, এখানে ললিতা দাঁড়িয়েছিল, আলমারির দুটো পাল্লাজোড়া আয়না, আয়নায় ছায়া পড়ছিল। হয়তো আলমারি থেকে মাখনের টিন নিতেই ললিতা তখন ঘরে ঢুকেছিল। ওইখানে দাঁড়িয়েছিল হেমকান্তি, হীরেন নিজে এসে ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়াল না, এখান থেকে দরজা দেখা যায় না। হীরেন ফিসফিস করে বলল, একবার! একবার! এ কথা কি বাইরে থেকে শোনা যায়? শুনতে পাবারই তো কথা!
হঠাৎ হীরেনের মনে হল, হেমকান্তি আর ললিতা যেন দুজনেই তাকে উকিল হিসেবে নিয়োগ করেছে, সে যেন প্রাণপণে ওদের দুজনের পক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করছে। আর ওদিকে আদালতে বসে হেমকান্তি এতক্ষণে অন্য লোকদের শাস্তি দিচ্ছে।
এই সময় ললিতা এসে ঘরে ঢুকল। ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখটা হালকা করে হীরেন বলল, তোমায় আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে লতু।
ললিতা ওর কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ হয়ে এসে, বুকে শরীরটা হেলান দিয়ে একটু আদুরে গলায় বলে, মাঝে মাঝে বাইরে বেড়াতে এলে, বেশ হয়, না? এবার থেকে আমরা বছরে একবার করে আসব।
খরচ কম নয়—
এমন কিছু খরচ নয়। সারা বছর চেষ্টা করলে ঠিকই হয়।
হীরেন দুহাত দিয়ে ললিতাকে বেষ্টন করে। ললিতার বুকের ওপর ওর হাতের চাপ পড়লেও ললিতা বিশেষ আপত্তি করে না, শুধু বলে, চাকরটা যদি এদিকে আসে আবার।
হীরেন নিজের মুখটা ললিতার কাছে এগিয়ে এনেও ভাবে, আচ্ছা, এখন থাক, অন্তত একটা দিন থাক না। সে তার গালটা রাখে ললিতার গালে, আঃ কি ঠান্ডা, কি শান্তি, গরিবের ঘরের বউ হয়েও ললিতা স্বাস্থ্যটা ভালো রেখেছে। গালে গাল রেখেই হীরেন ললিতার শরীরটা দোলাতে থাকে, এবং ইয়ার্কি করার মতন লঘু গলায় বলে, হেম আবার তোমার সঙ্গে প্রেম-ট্রেম করার চেষ্টা করেনি তো?
ললিতা বলল কেন, ভয় আছে নাকি তোমার? আমার মাথা ঘুরে যেতে পারে? হীরেন বলল, তা নয়, হেমটা আবার একটু কবি-কবি স্বভাবের আছে। ও যদি কখনও একটু বেশি গদগদ হয়ে ওঠে, তুমি আবার সেটা খুব সিরিয়াসলি নিও না।
কলহাস্য করে উঠে ললিতা বলে, বত্রিশ বছর বয়েস হয়ে গেল, এখন আর এ চেহারা দেখে কারুর কবিত্ব জাগবে না—তোমার ছাড়া!
গাল সরিয়ে এনে, উদাসীনভাবে হীরেন বলে, বাথরুমে জল দিয়েছ?
হ্যাঁ, জল আছে। আমি দেখি, মাংসটা ধরে গেল নাকি! ছাড়ো—
হেমকান্তির বাথরুমও খুব শৌখিনভাবে সাজানো। সিঙ্ক, বেসিনগুলো পরিষ্কার ঝকঝকে। এরকম মফস্বল শহরের বাড়িতেও এরকম আধুনিক কায়দার বাথরুম আশা করা যায় না। তাকে সারি সারি সাজানো সাবান, শেভিং ক্রিম, পেস্ট-শ্যাম্পু। র্যাকে দু-তিনটে তোয়ালে। হীরেন নিজের তোয়ালে নিয়ে এসেছিল, একটু বাদে ও খেয়াল করল, তোয়ালে কাঁধে নিয়ে ও বাথরুমের মধ্যে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কেন দাঁড়িয়ে আছে, নিজেই প্রশ্ন করল। পরক্ষণেই বুঝতে পারল, এরকমভাবে তো সে কোনোদিনই স্নান করে না। একে শীতকাল তার ওপর কুয়ো থেকে তোলা কনকনে ঠান্ডা জল, এরকম জলে হীরেন কখনও স্নান করতে পারে না। তার বিষম ঠান্ডার ধাত, বারো মাস সে গরম জলে স্নান করে, শীতকালে তো কথাই নেই। সে পুকুরে কিংবা নদীতে পর্যন্ত সাঁতার দিয়ে স্নান করতে পারে না।
ললিতা আজ তাকে গরম জল দিতে ভুলে গেছে। কালও গরম জলে স্নান করার ব্যাপারে হেমকান্তি তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গরম জল না করিয়ে হীরেন কিছুতেই স্নান করেনি। আজ, ললিতার গরম জলের কথা মনেই পড়েনি। হীরেন একবার ভাবল চেঁচিয়ে ললিতাকে গরম জলের কথা বলে, কিন্তু মনে পড়ল, দুটো উনুনেই রান্না চাপানো—এখন জল গরম করা অনেক ঝঞ্ঝাট! যেন ললিতার সঙ্গে ঠাট্টা করার লোভেই হীরেন আজ বহুকাল বাদে ঠান্ডা জলেই স্নান করবে ঠিক করে ফেলল। ব্রাশে পেস্ট নিয়ে মুখ ঘষতে লাগল সে।
সেই দারুণ ঠান্ডা জল বালতির পর বালতি মাথায় ঢেলে অল্পক্ষণে স্নান সেরে ফেলে হীরেন, সমস্ত শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেছে, দাঁত ঠকঠক করছে তার। তাড়াতাড়ি গা মুছে দরজার সামনে আসে, পা-টা তখনও ভিজে বলে তোয়ালে দিয়ে পা মুছতে থাকে বার বার। তারপর, বাথরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দরজা না খুলে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায় একটু। বাথরুমের মধ্যে এইমাত্র কি যেন একটা ঘটে গেল! কী ঘটল? হীরেন ভাববার চেষ্টা করে এবং একটু বাদেই সেটা বুঝতে পেরে অপরাধীর মতন লাজুকভাবে হাসে। হেমকান্তির ওপর সত্যিই তার রাগ হয়েছে তাহলে। কেননা, হীরেন বুঝতে পারলে, অন্যমনস্কভাবে সে হেমকান্তির পেস্ট থেকে দাঁত মাজতে গিয়ে, টিউবের প্রায় অর্ধেকটা টিপে অনেকখানি পেস্ট মাটিতে ফেলে নষ্ট করেছে। হেমকান্তির দামি চন্দন সাবানখানা গায়ে মাখার পর সে সাবানটা মাটিতেই ফেলে রেখেছে—জলের মধ্যে সাবানটা ক্ষয়ে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবং ততক্ষণে সে নিজের তোয়ালের বদলে হেমকান্তির দামি তোয়ালেটা দিয়েই পায়ের তলা মুছছিল। সাবানটা তুলে রেখে, তোয়ালেটা ভালো করে জল দিয়ে ধুয়ে হীরেন আপন মনে সস্নেহে বলল, না, হেম, আমি তোর ওপর রাগ করিনি। ওসব কিছু না, মুহূর্তের ভুল। ওতে কিছু যায় আসে না। সেজোমামাও তো বউয়ের একেবারে আঁচল ধরা, আমার সঙ্গে সেজোমামির ব্যাপারটা কখনও জানতে পারেননি বলেই তো।
দুপুরে হেমকান্তি এসে চলে যাবার পর, ললিতা চাকরটাকে পাঠিয়েছে পান আনতে এবং গরম কাপড়ের ব্লাউজটা হীরেনের সামনেই খুলতে আরম্ভ করে। শুধু ব্রেসিয়ার পরা বুকে ললিতা যখন মাটিতে উবু হয়ে বসে সুটকেস খোলে—তখন হীরেন খানিকটা অস্থির বোধ করে। দিন কয়েক ধরে ওদের দাম্পত্য ব্যাপারটা হয়নি। শনিবার ট্রেন জার্নি করে এসে খুব ক্লান্ত ছিল, এসেই মড়ার মতন ঘুমিয়েছে। কালকেও বেড়িয়ে ফেরার পর, তিনজনে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছে ঘরে বসে, শেষের দিকে ললিতারই চোখ ঘুমে ঢুলে আসছিল। সুতরাং আজ দুপুরবেলা, এখনই তো ঠিক সময়, কিন্তু হীরেন চঞ্চল হয়ে ভাবে—একটা দিন থাক না। হীরেন উঠে জামা গায়ে দিতে দিতে বলে, এখানে আমার এক পিসেমশাই থাকেন, একটু খোঁজ নিয়ে আসি বুঝলে? তুমি দরজা-টরজা বন্ধ করে শুয়ো।
ললিতা অবাক হয়ে বলল, এখন এই দুপুরবেলা যাবার দরকারটা কী?
যদি শোনেন, দুদিন ধরে এখানে এসেছি অথচ খোঁজ করিনি, আমি চট করে ঘুরে আসছি। তুমি দরজা বন্ধ করে থেকো।
হীরেনের ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে হয়ে যায়। ললিতা ও হেমকান্তি তখন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল, হীরেনের চেহারা দেখে আঁতকে ওঠে দুজনেই। হীরেনের চোখ দুটো টকটকে লাল, সারা শরীরটা কাঁপছে। বারান্দার মেঝের ওপরই বসে পড়ে হীরেন আস্তে আস্তে বলে, দ্যাখো তো, আমার বোধহয় খুব জ্বর এসেছে! কথা বলতে বলতেই হীরেন সেখানে শুয়ে পড়ে। ললিতা ছুটে এসে হীরেনের মাথাটা কোলে তুলে নেয়, সত্যি জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। হেমকান্তি ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করে, এতক্ষণ তুই কোথায় ছিলি?
হীরেন চোখ দুটো বন্ধ করে অস্পষ্টভাবে বলে, একটু ওইদিকে গিয়েছিলাম। আজ ঠান্ডা জলে চান করেছি তো, তাই বোধহয় জ্বর এসে গেল।
দেখতে দেখতে হীরেনের জ্বর বাড়তে থাকে, জ্বরের ঘোরে ছটফট করে। ওর খুবই কষ্ট মনে হয়। একটা তীব্র যন্ত্রণা পাওয়া চাপা গলায় শুধু বলে, আঃ, আঃ!
কপালের জলপট্টি বারবার ভিজিয়ে দিতে দিতে ললিতা কাঠ হয়ে বসে থাকে ওর শিয়রের কাছে। হেমকান্তি ডাক্তার ডাকতে চলে যায়। হীরেন বিছানার এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত ছটফট করে, খালি সেই যন্ত্রণাসিক্ত গলায় বলে, আঃ আঃ!
ললিতা বিপন্ন-আকুলভাবে ওর বুকে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, তোমার ব্যথা করছে? কোথায়? পেটে না বুকে? হীরেন কোনো উত্তর দিতে পারে না।
ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। বললেন, আর তো কোনো খারাপ লক্ষণ দেখছি না, কিন্তু একশো পাঁচ জ্বর উঠে গেল হঠাৎ! ওই ঠান্ডা জলের জন্যই—নিউমোনিয়া না হয়ে যায়! জ্বর আজ কমে গেলে আর ভয় নেই।
জ্বরের ঘোরে হীরেনের সারা শরীর দুমড়ে-মুচড়ে উঠতে থাকে, আর ওর দুপাশে হেমকান্তি আর ললিতা বসে থাকে নিঃশব্দে। ললিতা একসময় বলল কোনোদিন ওর ভুল হয় না, অথচ আজ যে কেন ঠান্ডা জলে চান করল। হেমকান্তি বলল একদিন ঠান্ডা জলে চান করলেই ওরকম জ্বর হবে তার কোনো মানে নেই। অসুখ কেন হয়, তা কেউ জানে না! ফুড পয়জন হয়নি তো?
তাহলে তো তিনজনেরই হতে পারত। একই খাবার—
তা ঠিক। অনেক সময় হঠাৎ একজনেরও হয়।
ঠাকুরপো, তুমি তো ওঁকে অনেকদিন জানো, এরকম হঠাৎ জ্বর ওঁর আগে কখনো হয়েছে?
এরকম তো কখনো দেখিনি। অবশ্য এটাও এমন কিছু না, ডাক্তার তো বললই দু-একদিনে সেরে যাবে।
তবু কেন যে এরকম হল—
ঘন্টা চারেক ছটফট করার পর হীরেন খানিকটা আচ্ছন্নের মতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ওর মুখখানা ভারী করুণ আর অসহায় দেখায়। ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে ওর মুখখানা কুঁচকে আসছে। এতক্ষণ টানা উৎকণ্ঠার মধ্যে থেকে ললিতা আর হেমকান্তির মুখও শুকিয়ে এসেছে। ললিতার আর খাওয়া-দাওয়া করার কোনো ইচ্ছেই নেই, হীরেনের শিয়র ছেড়ে সে আর উঠলোই না। খানিকক্ষণ বাদে হেমকান্তিও নিজের ঘরে চলে গেল।
হীরেনের ঘুম ভাঙলো মাঝ রাত্তিরের দিকে। তখনও গায়ে বেশ জ্বর, বুকে ব্যথা! ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে হাত বাড়িয়ে হীরেন ডাকল—লতু! লতু! মশারি গুঁজে এতক্ষণ বসেই ছিল ললিতা, কোন এক সময় ঘুমের মধ্যে এক পাশে লুটিয়ে পড়েছে। ডাক শুনে তাড়াতাড়ি জেগে উঠল, হীরেনের মুখের কাছে মুখ এনে বলল—এখন কেমন আছো? ভালো লাগছে একটু? ইস জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে এখনো।
হীরেন ক্লিষ্ট স্বরে বলল—লতু, আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছে।
ললিতা জিজ্ঞেস করল কোথায়?
তা ঠিক জানি না, দম আটকে আসছে যেন মনে হচ্ছে।
ডাক্তার এসেছিলেন, বলেছেন ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একটু ঘুমোও।
হীরেন একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর কী ভেবে আবার ছটফট করে উঠে বলে লতু! লতু! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আর পারছি না, যদি মরে যাই।
ওকি অলুক্ষুণে কথা! চুপ! না-না-কিছু হয়নি তোমার।
ললিতা প্রায় হাহাকার করে। জোর করে একহাতে হীরেনের মুখ চাপা দেয়। অন্য এক হাতে হীরেনের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। হীরেন একটু শান্ত হয়ে মুখ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, আঃ, এখন আরাম লাগছে। আগে হাত বুলিয়ে দাওনি কেন?
দিচ্ছি তো, অনেকক্ষণ থেকে। এখন কম লাগছে?
অনেক কম লাগছে। হঠাৎ আমার এমন অসুখ হল কেন বলো তো?
কী জানি!
হীরেন একটা অনেক বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ ওর চোখটা ভিজে এল। পাশ ফিরে ললিতার জানু দুটো চেপে ধরে বলল না, মরব কেন? এমনি বলছিলাম, যদি হঠাৎ মরে যাই।
আবার ওই কথা? তুমি চুপ করে ঘুমোও বলছি।
লতু, তোমায় আমি কতটা যে সত্যি ভালোবাসি, তুমি জানো?
জানি।
তোমায় যদি একটা কথা বলি, তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসবে?
কী কথা?
লতু, কথা দাও আগে, সেকথা শুনেও আমায় তুমি ভালোবাসবে?
ললিতা সমস্ত শরীর নিয়ে হীরেনের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। ভয় পাওয়া গলায় বলে, ওকি, তুমি ওরকম করছ কেন? তোমার ঠোঁট কাঁপছে। আজ আর কিছু বলতে হবে না। কাল বলো—
না, কথা দাও, সেকথা শুনেও—
কথা দিচ্ছি। তুমি তো জানোই, তোমায় আমি চিরদিনই ভালোবাসবো।
না, আজ সকাল থেকে একটা কথা মনে পড়ে এমন মন খারাপ লাগছে। আমি একবার খুব অন্যায় করেছিলুম, ওঃ! জানো লতু, অরুণা বলে একটা মেয়েকে আমি একবার জোর করে চুমু খেয়েছিলাম। তার একটুও ইচ্ছে ছিল না, সে আমায় পছন্দ করত না, তবু আমি গায়ের জোরে, জন্তুর মতন, ওঃ আমার জন্যই মেয়েটা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একথা শুনেও তুমি আমাকে ভালোবাসবে বলো? বলো? হঠাৎ দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে হীরেন শিশুর মতন কাঁদতে শুরু করে!
বিশাখা
বিশাখা
দেবনাথ বলল, তুমি তাহলে এখন কোন দিকে যাবে? সাউথের দিকে ফিরবে নাকি?
আমি বললাম, না ভাই! আমি একটু কলেজ স্ট্রিট ঘুরে যাবো ভাবছি। দেবনাথ হাতার বোতাম খুলে ফেলে শার্ট সরিয়ে সাবধানে ঘড়ি দেখলো। তারপর বলল, সাড়ে সাতটা তো বাজল! এখন আর কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে কী করবে?
আমি মনে মনে ভাবলুম, দেবনাথ কী প্রত্যেকবারই ঘড়ি দেখবার জন্যে শার্টের হাতার বোতাম খোলে! তাহলে বোতাম আটকানোর কী দরকার? অথবা ঘড়ি না পরলেই হয়।
বললাম, এই এক বন্ধুর সঙ্গে একটু দেখা করে যাবো!
কে বন্ধু?
আছে একজন, তুমি চিনবে না!
আমিও তো তোমার বন্ধু। আজ না হয় আমার বাড়িতেই যেতে—একটু চা খেয়ে তারপর ফিরতে!
আজ নয় ভাই, আর একদিন যাবো!
তুমি আর গেছো! যেদিনই দেখা হয়, তোমার শুধু ওই এক কথা! গেলে না তো একদিনও। বিশাখা প্রায়ই তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।
আমি কয়েক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হবার সুযোগ নেবার জন্য পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করতে লাগলুম। একটা ডবল-ডেকার একেবারে ফুটপাথ ঘেঁষে আসছে। আমরা দুজনেই সরে দাঁড়ালুম। প্যাকেটটা দেবনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলুম সে খাবে কিনা। যেন কোনোই ইচ্ছে নেই, নেহাত উপরোধে ঢেঁকি গিলছে এইভাবে দেবনাথ বললে, দাও একটা!
আমি নিজের সিগারেটটা ধরিয়ে আরাম করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করলাম, বিশাখা কেমন আছে?
ভালোই আছে। তবে বড্ড একা একা থাকে। তোমরা মাঝে মাঝে গেলে-টেলে—
আচ্ছা ভাই চলি আজ, আবার পরে দেখা হবে।
তুমি তাহলে কলেজ স্ট্রিটেই যাবে? আমার সঙ্গে যেতে চাও না?
না, না, তোমার সঙ্গে গেলে তো ভালোই হতো! কিন্তু কলেজ স্ট্রিটে একটা বিশেষ কাজ আছে।
তাহলে এসো কিন্তু একদিন বাড়িতে। কবে আসবে? কাল, পরশু? আমি তা হলে বিশাখাকে বলবো—
না, কাল, পরশু হবে না—এই মাসটা একটু ব্যস্ত আছি। চলে যাবো যে-কোনো একদিন।
রাস্তা পার হয়েও পাশে গিয়ে আমি ষড়যন্ত্রকারীর মতন আড়চোখে দেবনাথকে দেখতে লাগলুম। আমার এখন দক্ষিণ কলকাতাতেই ফেরা দরকার যদিও, কিন্তু দেবনাথের সঙ্গে একসঙ্গে যেতে চাই না। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে কথা বলছি দেবনাথের সঙ্গে, বাকি পথটাও ওর বকবক শোনার ইচ্ছে আমার নেই। তা ছাড়া দেবনাথ কতকগুলো অদ্ভুত ব্যবহার করে। আমি দিচ্ছি, আমি দিচ্ছি বলে পকেটে হাত পুরে কন্ডাক্টরের সামনে টিকিট কাটার জন্য পেড়াপীড়ি করে। আমি যদি ভদ্রতা করে একবার মাত্র বলি, না, না, আমিই দিই না—ব্যস, দেবনাথ আর পকেট থেকে হাত বার করবে না। আমার টিকিট কাটা থেকে খুচরো পয়সা ফেরত নেওয়া পর্যন্ত সরু চোখে তাকিয়ে থাকবে, তারপর উল্টে চাপ দেবে আমাকেই। অনুযোগের সুরে বলবে, কেন, আমি টিকিট কাটলে বুঝি তোমার মানে লাগতো? আমি কী একদিনও টিকিট কাটতে পারি না! না হয় আমি এখন…
সামান্য দু-চার আনা পয়সার জন্য এসব কথা কার শুনতে ভালো লাগে? এর আগে দুদিন আমার এ-রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। অথচ বছর দুয়েক আগেও দেবনাথ নিজের গাড়িতে ঘুরে বেড়াতো। যখন তখন গাড়ি থামিয়ে লিফট দিতে চাইতো আমাদের।
আমি লক্ষ করতে লাগলুম, দেবনাথ বাসে উঠে পড়েছে কিনা! ও চলে গেলে আবার আমাকে রাস্তা পেরিয়ে ওদিককার বাস ধরতে হবে। কে জানে, দেবনাথও হয়তো নজর রেখেছে, আমি সত্যিই কলেজ স্ট্রিটের বাসে উঠি কিনা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে দেবনাথ, সিগারেটটা পুরো শেষ করার আগে যে সে বাসে উঠবে না, এতো জানা কথাই!
সম্পূর্ণ পরাজিত মানুষের সংসর্গ আমার ভালো লাগে না। দেবনাথকে দেখলেই মনে হয় ওর ভেতরটা একেবারে মরে গেছে, বেঁচে আছে শুধু ওর পঞ্চভূতের শরীরটা। সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে ওর শুধু অনুযোগ আর অভিমান। বেঁচে থেকে আর কী হবে, এই ধরনের একটা ভাব নিয়ে দেবনাথ বেঁচে আছে। এর থেকে তো মরে গেলেও পারে? আমি যদি দেবনাথকে খুন করি, তাহলে হত্যাকারী হিসেবে আমার শাস্তি হবে, কিন্তু মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দেওয়া কি অপরাধ?
দেবনাথের মুখোমুখি পড়ে গেলেই আমার অস্বস্তি হয়! অথচ ভদ্রভাবে এড়িয়ে যেতেও পারি না। এক সময় সুন্দর চেহারা ছিল দেবনাথের, ফর্সা, লম্বা ঋজু শরীর, তীক্ষ্ণ নাক—এখনও সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু মুখে এক ধরনের শির শিরে হতাশা। এইসব মুখ অন্য মানুষের মধ্যে দারুণ প্রভাব ফেলে। দেবনাথের মতন লোকদেরও সমাজের বাইরে বার করে দেওয়া উচিত। বিশাখার জন্যে আমার দুঃখ হয়। কিন্তু আমি ওকে কি সাহায্য করতে পারি? বিশাখা তুমি নিজেই তো এ-জীবন বেছে নিয়েছো।
আমি জয়ী নই, কিন্তু সম্পূর্ণ পরাজিতও নই। কখনও খুব মন খারাপ থাকে, মনে হয়, জিভে একটি নিমপাতা লাগানো, চোখের সামনে সব কিছুই ম্যাটমেটে। আবার কখনও সামান্য একটু ফুরফুরে হাওয়া দিলেই এবং পকেট যদি নিতান্ত খালি না থাকে, তখন মনে হয়, আঃ বেঁচে থাকাটা কী চমৎকার ব্যাপার! কী সৌভাগ্যে এই মানব জন্মটা পেয়েছি! মানুষ হয়ে না জন্মালে কী টের পেতাম বিকেল ও সন্ধেবেলার সন্ধিক্ষণে একটা অদ্ভুত আলো দেয়, সেই আলোতে বড়ো রহস্যময় মনে হয় এই জীবনটা। এই আলোয় ঝানু পাত্রীপক্ষরা মেয়ে দেখায়, জলের রং পর্যন্ত বদলে যায় এই আলোয়—এই রকমই এক ঠান্ডা আলোর মধ্যে আমি একটি নারীর পাশে বসে দেখেছিলাম, পুকুরের জল দুভাগ করে সাঁতরে আসছে একটি সাদা হাঁস। মন ভালো থাকার মুহূর্তে প্রায়ই আমার সেই সাদা হাঁসটার কথা মনে পড়ে।
আর, এইরকম সময়েই কোথা থেকে যেন দেবনাথ এসে উদয় হয় আমার সামনে! বিমর্ষ মুখে একটু হাসির প্রেত দেখিয়ে বলে, এই যে, ইয়ে, সুনীল, কোথায় চললে? চলো না, আমার বাড়িতে একটু চা-টা খেয়ে যাবে। বিশাখা বলছিল…কি বিশ্রী ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে—চারদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা হচ্ছে এখন! একদিন একটা ডবল-ডেকারের সামনে দেবনাথকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলে কী হয়?
উঁকি মেরে দেখলুম রাস্তার ওপাশে দেবনাথ নেই। তবু সাবধানের মার নেই, ভালো করে চার পাশ খুঁজে নিলুম। না, দেবনাথ সত্যিই চলে গেছে। রাস্তা পেরিয়ে এসে আমি পরবর্তী বাসে উঠে পড়লুম, এবং সৌভাগ্যবশত প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দুজন লোক নেমে যেতেই জানলার ধারে একটা বসবার জায়গা পেয়ে গেলুম।
চারটে স্টপও যেতে হল না। হইহই করে একদল লোক থামালো। সন্ধে পৌনে আটটায় সাধারণত ছাত্র আন্দোলন হয় না, প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো লোক চাপা পড়েছে, কিংবা দুই পার্টির দাঙ্গা হলেও হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা তার চেয়ে অনেক নিরীহ, আগের একটা বাস ব্রেক-ডাউন, তার সব যাত্রীরা এই বাসে উঠবে। জানলা দিয়ে দেখলুম যেসব লোক ওঠার জন্য ছোটাছুটি করছে, তাদের মধ্যে আর কে, দেবনাথ!
আমি একেবারে মরমে মরে গেলুম। আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য এটা একটা নিয়তির চক্রান্ত ছাড়া আর কী! কোনো সন্দেহ নেই, দেবনাথ ঠিক দোতলায় উঠে আসবে, আমাকে দেখতে পাবেই, একটুও না হেসে বলবে কী, কলেজ স্ট্রিট গেলে না তাহলে! আমি যেন চোর ধরা পড়েছি! দেবনাথ নিজেই তো একটা চোর, শুধু চোর নয়, একটা মিটমিটে বদমাশ! অথচ এখন আমাকেই ও প্যাঁচে ফেলবে। কেন, আমার কি হঠাৎ মত পাল্টাবার উপায় নেই? কলেজ স্ট্রিট যাবো ভেবেও রাসবিহারী এভিনিউ-র দিকে কি যেতে পারি না? আমি আমার যা খুশি করবো!
তবু আমি মুখ লুকিয়ে বসে রইলুম। বাসে বেশ ভিড় হয়ে গেছে, এখন আমাকে দেখতে না-পাবার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে। আমি নামবো দেবনাথের বাড়ি ছাড়িয়ে অনেক দূরে। খুব মনোযোগ দিয়ে আমি দেখতে লাগলুম রাস্তার দোকানের বিজ্ঞাপনগুলো।
আমার পাশের লোকটি উঠে যেতেই আমার গা কিরকির করতে লাগলো। জানি এখানে দেবনাথ এসে বসবেই। আমি একেবারে নিশ্বাস বন্ধ করে প্রতীক্ষা করতে লাগলুম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার পর্যন্ত সাহস নেই। দেবনাথ না, একজন মোটা মতন লোক এসে বসলো। তাও নিশ্চিন্ত হতে পারলুম না। শেষ পর্যন্ত যা ভেবেছিলাম, তা-ই হল! একটু বাদেই পিছনের সিট থেকে দেবনাথ আমার পাশের লোকটিকে বলল, দাদা, আপনি একটু এখানে এসে বসবেন? আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলবো!
বন্ধু না কচু! এক্ষুনি এক ঘুষিতে তোমার মাথার খুলি উড়িয়ে দিতে পারলে আমি খুশি হতুম!
আমি হেসে কৈফিয়ত দেবার সুরে বললাম, কলেজ স্ট্রিটের বাসে যা ভিড় তাই আর যাওয়া হল না! যেন আমাকে দয়া করছে, এই ভঙ্গিতে দেবনাথ বলল, হ্যাঁ, বাসে বিশ্রী ভিড় তো লেগেই আছে! ট্যাক্সিও পাওয়া যায় না! কলকাতার যা অবস্থা হচ্ছে দিন দিন।
সেই মুহূর্তে কলকাতা সম্পর্কে কোনো অভিযোগ অবশ্য আমার মনে ছিল না, কিন্তু দেবনাথের সঙ্গে মত মেলাতেই হল। কিছুদিন আগেও দেবনাথের একটা গাড়ি ছিল, তখন অবশ্য ট্রাম বাসের ভিড় সম্পর্কে ওর কোনো মন্তব্য শোনা যেত না।
দেবনাথ জিজ্ঞাসা করল, তাহলে এখন কোথায় যাবে? বাড়ি ফিরবে, না কোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাবে?
এ কথাটার মধ্যেও খোঁচা আছে। দেবনাথ বোঝাতে চাইছে, আমার অনেক বন্ধুবান্ধব আছে, ওর কোনো বন্ধু নেই। আর, দেবনাথ আমার সঙ্গে চার বছর কলেজে পড়লেও, আমি বন্ধু হিসেবে আড্ডা দিতে চাই না ওর সঙ্গে।
বললাম, না, বাড়ির দিকেই যাবো ভাবছি! তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বো আজ।
চলো না, আমার ওখানে। এক কাপ চা খেয়ে যাবে। বিশাখা বলছিল…
আর একদিন তো যাবো বলেছিই! আজ নয়।
তুমি তো কলেজ স্ট্রিটে যাচ্ছিলেই। সেখান থেকে তো ন-টা সাড়ে ন-টার আগে ফিরতে পারতে না?
আর কতবার না বলতে পারে মানুষ। আমার বিরক্তি একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছেছে। ইডিয়েটটা কি বুঝতে পারে না যে, আমি বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে চাই না। যাকে দেখেছিলাম এক সময় অহংকারী দেবীর মতন, এখন তার মহিমা-বর্জিতা মূর্তি আমার দেখার ইচ্ছে নেই একটুও!
শেষ চেষ্টা করে বললাম, তার চেয়ে তুমিই চলো না আমার বাড়িতে। ওখানেই চা-টা খাবে। তুমি তো আমার বাড়িতে যাওনি কখনও!
না ভাই, তা হয় না। বিশাখা একা একা থাকবে। তুমিই চলো না—তুমি তো আর বিয়ে করোনি, এই তো কাছেই।
ভাবছিলুম, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে…
আমার বাড়িতে যেতে যদি তোমার কোনো আপত্তি থাকে, তাহলে অবশ্য জোর করবো না।
না, না, তা নয়। ঠিক আছে, চলো—
ভদ্রতার এই তো অসুবিধে, মুখের ওপর সত্যিকথা বলা যায় না। হাজরা মোড়ের এক স্টপ আগে উঠে দাঁড়ালো দেবনাথ, তাকালো না, শুধু তাকালো আমার দিকে। আমিও উঠে পড়লুম।
আগে ফর্সা উজ্জ্বল চেহারা ছিল দেবনাথের, এখন মুখখানা মনে হয় রক্তশূন্য। তবু তার লম্বা ছিপছিপে চেহারাটা দেখে মেয়েরা সুপুরুষই বলবে। দেবনাথ কি এখনও আবার নতুনভাবে জীবনটা শুরু করতে পারে না?
বাস থেকে নামার পর দেবনাথ বলল, দেখলে, একটা লোক কী রকম ইচ্ছে করে আমার পা মাড়িয়ে দিলে!
আমি মৃদু প্রতিবাদ করে বললাম, ইচ্ছে করে কি আর দিয়েছে? ভিড়ের মধ্যে দেখতে পায়নি নিশ্চয়ই।
না, না, এক টাইপের লোক আছে তারা ইচ্ছে করে অন্যদের পা মাড়িয়ে দিয়ে আনন্দ পায়। আমার এরকম প্রায়ই হয়।
আর কিছু বললুম না। যদিও বা সেই ধরনের লোক থাকে তারা কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো দিন আমার পা মাড়িয়ে দেয়নি। তারা ঠিক ভিড়ের মধ্যে দেবনাথের পা খুঁজে বার করে।
দেবনাথের বাড়ির রকে চার-পাঁচজন ভিখিরি শুয়ে-বসে আছে। দেবনাথ একেবারে খেঁকিয়ে উঠলো, এই, যা, যা এখান থেকে। যত সব!
ভিখিরিরা আড়মোড়া ভাঙছে, সহজে যাবে না। দেবনাথ চাকরের নাম ধরে চেঁচাতে লাগলো, দামু দামু। আবার এগুলোকে এখানে বসতে দিয়েছিস।
এক বছরে মানুষ কত বদলে যায়। দেবনাথের গলার এই রুক্ষতা আগে কখনো শুনিনি। ভিখিরিরা রক নোংরা করে ঠিকই, কিন্তু পাড়ার ছেলেরা ওখানে নোংরা কথার ফোয়ারা ছোটালে দেবনাথ কি ওরকম খেঁকিয়ে উঠতে পারতো?
দরজা খোলার পর সিঁড়িতে পা দিয়েই আমার মনে হল, ভদ্রতা রক্ষার জন্য মানুষ কত অসহায়। আমি কেন এখানে এসেছি? আমার তো দেবনাথকে বলা উচিত ছিল, তুই একটা চোর, ঘুসখোর, ঘৃণ্য জীব। সামাজিকভাবেই তো তোর সঙ্গে আর কারুর মেশা উচিত নয়! তোর বাড়িতে আসা তো দূরের কথা, তোর সঙ্গে আমার কথা বলা বলাই উচিত নয়! কিন্তু এসব কথা কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারি না! মুখ তুলে দেখলাম, সিঁড়ির ঠিক মাথায় বিশাখা দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে এখনো তাকে ঠিক দেবীমূর্তির মতনই দেখায়।
বছর তিনেক আগে একবার এসেছিলাম দেবনাথদের বাড়িতে। তখন এ বাড়ির দামি দামি আসবাব দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। এখনও সেইসব জিনিসই আছে, কিন্তু একটা কেমন যেন অগোছালো ভাব। এক সময় দারুণ ঘর সাজাবার বাতিক ছিল বিশাখার।
লিন্ডসে স্ট্রিটের মুখে বেশ কিছুক্ষণ আগে একবার দেখা হয়েছিল বিশাখার সঙ্গে, সেদিন বিশাখা শুধু পর্দার কাপড়ের চিন্তায় উদ্বিগ্ন। মেরুন রঙের একটা বিশেষ সেডের পর্দার কাপড় নাকি সারা দক্ষিণ কলকাতার কোথাও পাওয়া যায় নি, তাই নিউ-মার্কেটে খুঁজতে গিয়েছিল। জানলায় এখনও রয়েছে সেই চাপা মেরুনরঙের পর্দা—সোফার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে, কিন্তু অনেকদিন সোফার ধুলো ঝাড়া হয়নি ভালো করে। মাঝখানের টেবিলটা বসানো রয়েছে বাঁকাভাবে।
দেবনাথ বলল, নিয়ে এলাম সুনীলকে ধরে!
বিশাখা বলল কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখলাম তোমাকে। মাসিমা কেমন আছেন?
বিশাখা তো আগে আমাকে আপনি বলতো। আজ হঠাৎ তুমি বলার কারণটা বুঝলাম না। হয়তো অনেকদিন দেখা না হওয়ায় ভুলে গেছে আগেকার সম্বোধন। আমারও এরকম হয় মাঝে মাঝে—কিন্তু বিশাখার এরকম ভুল হবার কথা ছিল না।
আমি বললাম, বিশাখা, তুমি কিন্তু একটু রোগা হয়েছো।
বিশাখা একটু অদ্ভুতভাবে হেসে বলল, তুমি ছাড়া একথা এতদিন আমাকে আর কেউ বলেনি। কী খাবে?
শুধু চা।
চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবে না? তুমি এখনো মিষ্টি খেতে ভালোবাস? আমাদের এ পাড়ায় খুব ভালো মিষ্টি, পাওয়া যায়।
না, না, আজকাল আর মিষ্টি খাই না। তুমি আমাকে আগে এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও।
ঠান্ডা জল। খুব ঠান্ডা জল তো নেই।
দেবনাথ বিরস মুখে বলল, আমাদের ফ্রিজটা খারাপ হয়ে গেছে।
বিশাখার মুখে তখনও হাসির আভা লেগে আছে, সেটা বজায় রেখেই বলল, হ্যাঁ ভাই, আমাদের ফ্রিজটা দু-মাস হল খারাপ হয়ে পড়ে আছে!
একই কথা বলল দু-জনে কিন্তু দুজনের ভঙ্গি যে দুরকম সেটা আমি লক্ষ না করে পারলুম না। দেবনাথের কথার সুরেই ফুটে উঠলো, ভারতের সমস্ত রেফ্রিজারেটর কোম্পানিগুলো অসৎ, কিংবা বেছে বেছে তাকেই একটা বাজে ফ্রিজ গছিয়েছে। বিশাখা বলতে চায়, ফ্রিজটা এমনি খারাপ হয়ে আছে, যে-কোনো সময় সারিয়ে নিলেই হয়। হয়ে উঠছে না আর কী! বিশাখার ওই লঘু ভাবটুকুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ বোধ করলুম। পৃথিবী সম্পর্কে দেবনাথের অভিযোগ শুনতে শুনতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। অবশ্য, বিশাখা কোনোদিন পরাজিত হবে, এমন আমি আশাও করিনি।
বললাম, আমার বাড়িতে তো ফ্রিজই নেই। আমার কুঁজোর জলই যথেষ্ট!
দোতলায় অনেকগুলো ঘর, ডানদিকের ঘরগুলোতে দেবনাথের ভাই সোমনাথ তার স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে থাকে। একসময় সোমনাথের সঙ্গে আমার ভালো আলাপ ছিল, ক্রিকেট ম্যাচের মাঠে প্রায়ই দেখা হতো। একবার ভাবলাম সোমনাথকে ডাকতে বলবো। তারপরই ক্ষীণ সন্দেহ হল, হয়তো সোমনাথরা এখন আলাদা রান্না করে খায়, দু-ভাইয়ের মধ্যে কথা বন্ধ হওয়াও বিচিত্র নয়। সুতরাং সোমনাথকে ডাকলে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা হতে পারে।
বিশাখা নিজেই গেল জল আনতে। দেবনাথ সেই ফাঁকে আমাকে জিজ্ঞেস করল, বিশাখা রোগা হয়েছে বললে কেন? তোমার তাই মনে হচ্ছে?
তাই তো মনে হল। অনেকদিন পর দেখছি তো।
দু-বছর ধরে ওর ওয়েট কিন্তু একই আছে।
তাই নাকি? কিন্তু দেখে তো মনে হল—
কিন্তু ওজন একটুও কমেনি।
ব্যাপারটার ওপর দেবনাথ এমন অহেতুক গুরুত্ব দিচ্ছে কেন বুঝতে পারলাম না।
‘ও’ বলে চেপে যাওয়াই শ্রেয় এখানে।
বিশাখা জল নিয়ে আসতেই দেবনাথ আবার বলল, বিশাখা, দু-বছরের মধ্যে তোমার ওজন একটুও কমেছে? কোনো অসুখ বিসুখও করেনি। তবু সুনীল বলল কেন?
বিশাখা আগের মতনই চাপা কৌতুকে বলল, সুনীলদা আমাকে একটু রোগা হিসেবেই দেখতে পছন্দ করে, সেইজন্য বলছে।
সেটা আলাদা কথা।
কথার কথা হিসেবেই বলেছিলাম, তার জন্য এত। এটা ঠিক, বিশাখার সুন্দর স্বাস্থ্য আর উজ্জ্বল মুখখানির জন্য, তাকে এখনও অনায়াসেই কুমারী মেয়ে মনে করা যায়। পিঠ ভরতি এক রাশ কোঁকড়া চুল, এত চুল শহরের মেয়েদের মধ্যে খুবই কম দেখা যায় আজকাল। দুর্গা প্রতিমার মতন টানাটানা দুটি চোখ, টিকোলো নাকের ঠিক নীচেই ওপরের ঠোঁটের মাঝখানে একটা খাঁজ, এই রকম খাঁজ থাকলে মেয়েদের খুব বুদ্ধিমতী মনে হয়। সবচেয়ে সুন্দর বিশাখার চিবুক, অবিকল শিশুর মতন, কিংবা খুব কচি সাদা রঙের বেগুনের মতন তকতকে। একটা গোলাপ ফুল ছাপা শাড়ি পরে আছে বিশাখা।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বিশাখাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেনি, এমন ছেলে একটিও ছিল না। বিশাখাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরুনোই ছিল মুশকিল, কেউ না কেউ সিটি দেবেই। বিশাখা শুধু সুন্দরী ছিল না, তার রূপ বড্ড চোখে পড়তো। আশ্চর্য, আজ কিন্তু বিশাখার দিকে চোখ ভরে তাকাতে পারছি না আমি। দু-এক পলক ওর চোখে চোখ রেখেই সরিয়ে নিচ্ছি।
দেবনাথের সঙ্গে বিয়ে হবার পর, সবাই বলেছিল, ভারী সুন্দর মানিয়েছে! আমিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন কিন্তু আর মানায় না, দেবনাথ এখন অনেক নিষ্প্রভ।
বিশাখা দেবনাথকে জিজ্ঞেস করল, তুমিও চা খাবে তো।
দেবনাথ বলল, না, এত রাত্তিরে চা খেলে আমার অম্বল হয়!
আমি বললাম, বাঃ তুমিই চা খাবার জন্য পেড়াপেড়ি করলে আমায়, এখন তুমি নিজে বলছো খাব না!
দেবনাথ বলল তুমি দিনে অনেক কাপ চা খাও নাকি। আমার ভাই সহ্য হয় না!
দেবনাথ, তোমার আর আমার বয়েস তো প্রায় সমান।
বয়েস দিয়ে কী আর সব কিছু বিচার করা যায়! তুমি বিয়ে করোনি, আমার বিয়ে হয়েছে সাড়ে চার বছর আগে।
বিশাখা বলল, বাঃ বিয়ে করলে বুঝি মানুষ তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যায়?
ঠাট্টা ইয়ার্কির ধার ধারে না দেবনাথ। ঠান্ডা গলায় বলল, বুড়ো হয়েছি কিনা জানি না। তবে বিয়ের পর থেকেই আমার অম্বলের ধাত শুরু হয়েছে।
মোটেই না। দু-বছর আগেও তোমার ওসব কিছু ছিল না। বেশি ভাবলেই মানুষের এসব অসুখ হয়।
না ভেবে আর উপায় কী!
আমার কিন্তু জীবনে কখনও ওসব অম্বল টম্বল হয়নি!
এতক্ষণ বাদে একটু স্বচ্ছভাবে হাসলো দেবনাথ। বলল, সেই কথাই তো বলছিলাম, তোমার কোনো অসুখ নেই, তোমার রোগা হবার কোনো কারণও নেই!
আবার সেই প্রসঙ্গ! কী ভুলই করেছিলুম ওই কথাটা বলে! দেবনাথ একসময় বেশ চৌকশ কথা বলতে পারতো, এখন যেন সে ইচ্ছে করেই দিন দিন বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। অন্যের বিরক্তি সৃষ্টি করেই সে আনন্দ পায়।
দাসীর হাত থেকে চায়ের ট্রে নিয়ে এসে বিশাখা রাখলো সেন্টার টেবিলে। চায়ের কাপ আর সসারগুলো আলাদা রঙের, সাধারণত এসব খুঁটিনাটি আমার লক্ষ করার কথা নয়, কিন্তু বিশাখার বাড়ি বলেই নজর পড়ছে।
বিশাখা বলল, তুমি যখন চা খাবেই না, তাহলে চান করতে চলে যাও। আমি সুনীলদার সঙ্গে গল্প করি! ওর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।
দেবনাথ উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল, হ্যাঁ ভাই, চানটা করে আসি। রোজ বাড়ি ফিরে চান না করলে আমার অস্বস্তি লাগে। যা ধুলো কলকাতার রাস্তায়। তুমি বসো, চলে যেও না।
হ্যাঁ, বসছি।
আমি জানতাম, দেবনাথ আমাকে কিছুক্ষণ বিশাখার সঙ্গে একা থাকার সুযোগ দেবে। কিন্তু বিশাখা নিজে থেকেই যে সে কথা বলবে তা আশা করিনি।
দুজনে এক সঙ্গে চুমুক দিলাম চায়ে, একসঙ্গে কাপ নামিয়ে রাখলাম। মুখ তুলতেই চোখাচোখি হল! আমিই আবার চোখ সরিয়ে নিলাম প্রথম, চায়ের কাপে সামান্য একটুকরো সর ভাসছে, সেটাই যেন আমার প্রধান দ্রষ্টব্য!
বিশাখা বলল, কী, সুনীলবাবু এত গম্ভীর কেন? বাবুর কি মন খারাপ?
বিশাখা দেবী হঠাৎ আজ আমায় তুমি বললেন কেন?
বিশাখা দেবী কদিন ধরেই সুনীলবাবুর কথা ভাবছিলেন কিনা। তাই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।
মিথ্যে কথা! বিশাখা দেবীর তো আমার কথা ভাবার কোনোই কারণ নেই।
বিনা কারণেও লোকে ভাবে। হঠাৎ হঠাৎ একজনের কথা মনে পড়ে যায়। যায় না?
যখন তখন যার তার কথা ভাবা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়।
আবার দুজনে একসঙ্গে চায়ের কাপ তুললাম। একসঙ্গে চুমুক, একসঙ্গে নামিয়ে রাখা। আবার চোখাচোখি হতেই দুজনের সামান্য হাসি। বিশাখা বললে, সুনীলদা, তুমি যখন অ্যাদ্দিন বিয়ে করোনি, তখন বিয়ে করো না। আর বিয়ে করলেই যদি ছেলেরা বুড়ো হয়ে যায়, কিংবা অম্বলের অসুখ হয়, তাহলে ছেলেদের পক্ষে বিয়ে না করাই তো ভালো!
ঠিক আছে। এখন থেকে মেয়েরাই শুধু বিয়ে করবে। ছেলেরা আর বিয়ে করবে না।
বিশাখা মুখ ভরতি চা নিয়ে এমন হাসতে লাগলো যে ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে আসে আর কী। আমি আমার মুখের সামনে হাত আড়াল করে ত্রস্তভাবে বললাম, এই, এই, কী হচ্ছে কী!
কিন্তু বিশাখার অকুণ্ঠ হাসি দেখতে আমার ভালোই লাগছিল। আমি বিশাখার সঙ্গে দেখা করতেই ভয় পাচ্ছিলাম এই আশঙ্কায়, যদি সে আগের মতন প্রাণবন্ত না থাকে? দেবনাথের ছোঁয়াচ কি ওর একটুও লাগবে না? কিন্তু দেবনাথের প্রসঙ্গ বিশাখার কাছে এখন মোটেই তোলার ইচ্ছে নেই আমার।
জিজ্ঞেস করলাম, বিশাখা, তুমি আজকাল বাইরে-টাইরে বেরোও না? কখনও তো দেখি না। মাঝে মাঝে দেবনাথের সঙ্গে দেখা হয়।
মনে মনে হিসেব টিসেব করলো বিশাখা। তারপর বলল, প্রায় ছ-মাসের বেশি—একটাও সিনেমা দেখিনি, কোথাও বেড়াতে যাইনি।
কেন?
এমনিই। ভালো লাগে না।
সারা দিনরাত বাড়িতে বসে থেকে কী করো?
জানলার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, কবে সুনীলদা আসবে, আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বলবে।
ঠাট্টা-ইয়ার্কিরই সম্পর্ক ছিল আমাদের। আমি বিশাখার ব্যর্থ প্রণয়ী নই। পাশাপাশি বাড়ি ছিল এক পাড়াতে, বিশাখার প্রেমে হন্যে হয়ে হুড়োহুড়ি করতো সাত-আটটা ছেলে, তাদের দলে ভিড়ে পড়ার একটুও ইচ্ছে ছিল না আমার। আমার ছোটো বোনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, আমাদের বাড়িতে আসতো মাঝে মাঝে। বিশাখার আড়ালে যখন বিশাখার নিন্দে হতো আমাদের বাড়িতে, তখন তাতে মাঝে মাঝে আমিও যোগ দিয়েছি। আমার মা বলতেন, রংটা ফর্সা বলে মেয়েটা বড্ড দেমাকি হয়ে গেছে, মাটিতে যেন পা পড়ে না। ওর বাবা মা আবার বেশি আস্কারা দিয়ে মেয়েটার মাথা খাচ্ছে। আবার বিশাখা বাড়িতে এলে, মা-ই বলতেন, তুই তো আমার মেয়ের মতন, তোর আবার লজ্জা কী রে! আমার বোনের নাম অঞ্জনা, কিন্তু ওদের দুজনকে সবাই বলতো ললিতা-বিশাখা।
আমার বোনের বিয়ে হয়ে যাবার পরও বিশাখা মাঝে মাঝে আসতো আমাদের বাড়িতে। আমি ওকে দু-একদিন সিনেমায় নিয়ে গেছি, লেকেও গিয়েছিলাম কয়েকবার। এর জন্য অবশ্য ছাদ থেকে চিঠি ছোড়াছুড়ি করতে হয়নি আমাদের, সিঁড়ির পাশে নিরালায় দাঁড়িয়ে গাঢ় স্বরে কথা বলতে হয়নি। বিশাখাই এসে কোনো বিকেলে বলতো, সুনীলদা, তুমি বড্ড কিপটে হয়ে যাচ্ছো, গ্রেগরি পেকের বইটা তুমি দেখাও না আমাকে। মাসিমা, আপনি একটু বলুন তো। ছেলেবেলা থেকেই বিশাখা নামকরা সুন্দরী, সে ধরেই নিয়েছিল, তাকে প্রায়ই কেউ না কেউ সিনেমা দেখাবে, বেড়াতে নিয়ে যাবে। অনেকেই যেত। কিন্তু বিশাখার চরিত্রে একটা ঝকঝকে দিক ছিল, এইজন্য কেউ তার অপবাদ ছড়ায় নি।
আমাদের বাড়িতে আমরা সবাই জানতাম যতই ছেলেটেলের সঙ্গে ঘুরুক, বিশাখার বিয়ে হবে বাড়ির পছন্দমতো কারুর সঙ্গে। বিশাখাও তাতে আপত্তি করবে না। আজকাল আর কোনো ধনী পরিবারের মেয়ে হঠাৎ কোনো গরিব স্কুল মাস্টারের প্রেমে পড়ে না। কিংবা একটু-আধটু প্রেম হলেও বিয়ে করতে চায় না।
বিশাখার প্রেমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাছোড়বান্দা ছিল মনুজেশ। মনুজেশকে আমিও চিনতাম, আমার মাসতুতো ভাইয়ের বন্ধু ছিল সে। আমাদের গলির মোড়ে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। বিশাখার প্রেমে সে একেবারে পাগল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মনুজেশ তখন জানতো না, একটি মেয়েকে শুধু ভালোবাসাই তাকে পাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। মনুজেশ আমাকে বলতো, ওর হয়ে একটু চেষ্টা করতে।
কিন্তু বিশাখার তখন ঠিক প্রেমের চেতনা ছিল না। ছেলেদের সঙ্গে বেড়াবে, গল্প করবে, হাতে হাত রাখবে, এই কি প্রেম? বড়ো জোর কেউ জড়িয়ে ধরতে চাইলে বলবে অসভ্য। বিয়ে তো অন্য ব্যাপার।
হলও তাই, বিশাখার বাড়ি থেকে পছন্দ করা হল দেবনাথকে। বিয়ের কিছুদিন আগে বিশাখার সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেওয়া হল, তারা তখন প্রেমিক-প্রেমিকার মতন ঘোরাঘুরি করতে লাগল। তখন বেশ চালু ছেলে ছিল দেবনাথ, একটা নীল রঙের গাড়িতে চেপে এসে হর্ন দিত বিশাখা বাড়ির সামনে।
আমার সঙ্গে আবার দেবনাথের পরিচয় বেরিয়ে পড়ল, আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়তাম, খুব বন্ধুত্ব ছিল না যদিও, কিন্তু মুখ চিনতাম। এমন অনেকদিন হয়েছে, দেবনাথ একসঙ্গে আমাকে আর বিশাখাকে গাড়িতে চাপিয়ে বেড়াতে কিংবা রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে গেছে। বিশাখা তার অন্য প্রেমিকদের নানা কীর্তিকলাপ নিয়ে গল্প করতো আমার কাছে। কিন্তু দেবনাথ বিষয়ে কিছু বলেনি। যথেষ্ট ছেলেমানুষ ছিল তখনও, কিন্তু এটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছিল যে, যাকে বিয়ে করবে, তাকে খুশি করে চলতে হয়। তখন দেবনাথের সামনে বিশাখা আমাকে আপনি বলতো।
বিশাখাকে আমি কোনোদিন বিরলে প্রেম জানাই নি, সুতরাং তার বিয়েতে আমার মন কেমন করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে, যে-কোনো কুমারী মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই যে-কোনো যুবকের বুকটা একটু টন টন করে ওঠে। সাত পাকের সময় আমিই পিঁড়ি ধরে ঘুরিয়েছিলাম বিশাখাকে। পড়ে যাবার ভয়ে কিংবা কিছু একটা সান্ত্বনা পাবার জন্য আমার হাত চেপে ধরেছিল বিশাখা। বিয়ের দিন কী সুন্দর দেখাচ্ছিল বিশাখাকে, সেদিন যে আমার একটু দুঃখ হয়েছিল, সেটা ব্যর্থ প্রেমিকের মন খারাপ নয়, অসম্ভব সুন্দর কিছু দেখার বেদনা।
আমি বললাম, এখন বিয়ে হয়ে গেছে, এখন আবার অন্যদের সঙ্গে বেড়াতে যাবার ইচ্ছে কেন?
বিয়ে হয়ে গেছে বলে কি আমি বদলে গেছি নাকি?
আমার বোন অঞ্জনা তো দুটো বাচ্চা হবার পর রীতিমত গিন্নি হয়ে গেছে। বিশাখা একটু দুঃখিতভাবে বলল, অঞ্জনা আর আমাকে এখন চিঠি লেখে না। ও এখন কানপুরেই আছে তো? আমি আশা করেছিলাম, এই সময়ে আমাকে অনেকেই চিঠি লিখবে।
অঞ্জনা বোধহয় কিছু জানে না! ও নিজের সংসার নিয়েই এত ব্যস্ত। তোমার তো ছেলেপুলে হয়নি, তুমি বুঝবে না।
বিশাখা আবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
হালকা ভাব আনার জন্য আমি আবার বললাম, তোমার সব আগেকার প্রেমিকদের সঙ্গে দেখা হয় না?
সংক্ষিপ্তভাবে বিশাখা জানালো, না।
মনুজেশের সঙ্গেও আর দেখা হয় না। ও বেচারা বড্ড আঘাত পেয়েছিল।
মনুজেশের বিয়ে হয়নি?
আমি তো যদ্দুর জানি, এখনো বিয়ে করেনি।
বিশাখা ও প্রসঙ্গ নিয়ে আর কথা বলতে চাইলো না। একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, মাসিমা কেমন আছেন?
ভালো।
আর তোমার ছোটো ভাই রঞ্জু?
ও তো এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরি খুঁজছে।
জানো, রঞ্জুর সঙ্গে আমার রাস্তায় দেখা হয়েছিল, ও আমাকে চিনতেই পারলো না। দেখেও না দেখার ভাব করে এড়িয়ে গেল!
আমি বিব্রতভাবে বললাম, যা সে কী! ও নিশ্চয়ই দেখতে পায়নি। দেখলে চিনতে পারবে না কেন?
বিশাখা হঠাৎ চটে উঠলো। ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, বাজে কথা বলো না। আমি জানি আজকাল সবাই আমাকে এড়িয়ে যেতে চায়। আমি সেইজন্যেই তো আজকাল আর বাইরে বেরোই না! তুমিও ওই জন্যই আসো না, আমি জানি!
না, বিশাখা, সত্যি বিশ্বাস করো, আজকাল অফিসের কাজে এত ব্যস্ত থাকতে হয়। প্রায়ই যেতে হয় ট্যুরে।
এক পলকের মধ্যে বিশাখার সুন্দর মুখখানা কী রকম অসহায় হয়ে গেল। সাঁতার জেনেও মানুষ যখন সমুদ্রে ডুবে যায় তখন তার মুখের চেহারা বোধহয় এইরকম হয়। বিশাখার মতন মেয়েকে দেখেও যে চেনা লোকেরা এড়িয়ে যেতে চায়, একথা অকল্পনীয়, মর্মান্তিক, নিষ্ঠুর হলেও কিছুটা যে সত্যি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা এড়িয়ে যেতে চায়, তাদেরও খুব দোষ দেওয়া যায় না, তারাও পড়তে চায় না একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে। অবশ্য, বিশাখার এইরকম অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছুলোক যে তার দিকে বেশি বেশি উৎসাহ দেখাবে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশাখার আত্মসম্মান জ্ঞান এত প্রবল যে, তাদের সে গ্রাহ্যই করবে না নিশ্চিত। এখন বিশাখাকে যারা বেশি সমবেদনা দেখাতে আসবে, তাদেরও সে ঘৃণা করবে।
একটুক্ষণের মধ্যেই বিশাখা নিজেকে সামলে নিল। নম্রভাবে বলল, জানি, অফিসে তোমার উন্নতি হয়েছে। এখন তো তুমি ব্যস্ত থাকবেই।
না, না, এমন কিছু উন্নতি নয়! এই একটা পোস্ট খালি হয়েছিল।
আমার চাকরিতে উন্নতির জন্য আমার একটু লজ্জা করতে লাগল। দেবনাথের এই অবস্থায় আমার উন্নতি হওয়াটা যেন একটা অপরাধ। আমি একটু অস্থিরভাবে বললাম, দেবনাথ এখনও এল না! কতক্ষণ ধরে চান করছে?
ওর প্রায় একঘন্টা লাগে! বাতিক হয়েছে তো আজকাল।
বিশাখা, আজ আমি উঠি। অনেক রাত হয়ে গেল।
মোটে ন-টা বাজে। আর একটু বসো! সুনীলদা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
বিশাখা কী জিজ্ঞেস করবে, আমি জানি। এতক্ষণ মনে মনে এর জন্যই ভয় পাচ্ছিলাম। কত সাবধানে কথা বলতে হয়েছে। কিন্তু আর তো উপায় নেই। আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। এখন এক দৌড়ে ছুটে পালিয়ে যাওয়া যায় না? কোনোক্রমে মুখে হাসি এনে বললাম, কী কথা? তোমার জন্য এখনও আমার কষ্ট হয় কিনা?
না, ঠাট্টা নয়—
আমি মোটেই ঠাট্টা করছি না।
না, তুমি আগে বলো, তুমি ব্যাপারটা বিশ্বাস করো?
কোন ব্যাপারটা?
তুমি ঠিক জানো। তুমিও এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছো?
না, মানে, দেবনাথকে আমি যে-রকম চিনতাম, তাতে সত্যিই তো বিশ্বাস করা যায় না। তা ছাড়া, তুমি নিজেই তো এ ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে।
সে কথা নয়, তুমি নিজের কথা বলো। তুমি নিজে বিশ্বাস করো কিনা! এ কখনও সত্যি হতে পারে?
খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বেরিয়েছিল খবরটা। চেনাশোনা তো এমন কেউ নেই যে দেখেনি। সি বি আই-এর তদন্তের ফলে কলকাতায় এগারোজন অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল, দেবনাথ তার মধ্যে একজন। দেবনাথের বাবা ইনকাম ট্যাক্সের কমিশনার ছিলেন এক সময়, বাবার জোরেই বড়ো চাকরি পেয়েছিল। দেবনাথের বাবা রিটায়ার করার পরের মাসেই মারা যান। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রায় সাতষট্টি হাজার টাকার অপব্যবহারের অভিযোগ দেবনাথের নামে। ফলাও করে ছাপা হয়েছিল এইসব। অফিসারদের ঘুস খাওয়ার ব্যাপারটা এতই সাধারণ এখন যে, কারুর নামে ছাপার অক্ষরে ওই অভিযোগ বেরুলে কে আর অবিশ্বাস করবে। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও অনেকে ওরকম ঘুসখোর অফিসার-টফিসার থাকে , তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু যে ধরা পড়ে, সেই ঘৃণ্য।
দেবনাথের অবশ্য এখনও চাকরি যায় নি। সাসপেন্ডেড হয়ে আছে, সি বি আই-র রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে কেস তুলেছে হাইকোর্টে। দু-মাস অন্তর তার ডেট পড়ে। জিনিসটা যে কতখানি মিথ্যেভাবে সাজানো এবং তাকে অপদস্থ করার জন্য সহকর্মীদের চক্রান্ত, সে কথা দেবনাথের মুখে বহুবার শুনতে হয়েছে আমাকে। মিথ্যে যে হতে পারে না তা নয় কিন্তু তারপর থেকেই কেন এরকম বিবর্ণ পরাজিত হয়ে গেল দেবনাথ? তার সততা যদি প্রশ্নের অতীত হয়, তাহলে সাহসের সঙ্গে সে কেন রুখে দাঁড়াতে পারছে না? তার নিজের ব্যবহারেই সে সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাচ্ছে।
আমি বিশাখাকে বললুম, দ্যাখো, সত্যি কথা বলতে কী, আমি নিজেও একজন সরকারি অফিসার। আমার এ সম্পর্কে এখন কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়। মামলা চলছে, মামলার ফলাফলেই আসল ব্যাপারটা জানা যাবে।
বিশাখা একটু চুপ করে রইলো। তারপর বলল, তোমাকে কি আজ ও জোর করে ধরে এনেছে?
সত্যি কথাটা সব সময় তো বলা যায় না। আমার নিজের চাকরির স্বার্থে এবং আমার বিবেক অনুযায়ী, দেবনাথের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। তার চেয়েও বড়ো কথা, তার ওই পরাজিত মনোভাব মাঝে মাঝে আমার অসহ্য লাগে, সেইজন্যই আমি ওকে এড়িয়ে চলতে চাই।
চেষ্টা করে হাসি ফুটিয়ে বললাম, না, না, আজ বাসে ওর সঙ্গে দেখা হল ভাবলাম অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি তাই চলে এলাম। জোর করে আনবে কেন?
ভদ্রতা রাখার জন্য বলছো তো?
আমি সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা বলছি, তবু বিশাখার কাছে নকল অভিমান দেখিয়ে বললাম, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছো না!
আমি কয়েকদিন থেকেই তোমার কথা ভাবছিলাম। মনে মনে আশা করছিলাম, হয়তো তুমি একদিন আসবে।
এই তো এলাম। আমি ঠিক টেলিপ্যাথিতে খবর পেয়েছিলাম।
আমার হাসির উত্তর দিল না বিশাখা। গম্ভীরভাবে বলল, আমি সত্যি ঘটনাটা জানাতে চাই।
তুমি ওর স্ত্রী। তোমারই তো আসল কথাটা জানা উচিত।
আমাকে তো কোনোদিন কিছু বলেনি। কোনোদিন তো ও বাড়িতে খুব বেশি টাকা আনেনি।
বিশাখা, তুমি তো টাকা-পয়সার হিসেব কিছুই বুঝতে না।
এটুকু অন্তত বুঝি? তোমার মেসোমশাই দিল্লিতে হোম ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি না? এখনও আছেন, না রিটায়ার করেছেন?
এখনও আছেন।
সেন্ট্রাল বুরো অব ইনভেসটিগেশন তো হোম ডিপার্টমেন্টেরই অধীনে? তাই না? সুনীলদা, তুমি একটু তোমার মেসোমশাইকে অনুরোধ করে সঠিক খবরটা জেনে দেবে?
এবার আমার গম্ভীর হবার পালা। নখ দিয়ে টেবিলের ওপর দাগ কাটতে কাটতে বললাম, তুমি এইজন্যই কদিন ধরে আমার কথা ভাবছিলে?
ভারি কাতরভাবে হাসলো বিশাখা। এরকম কাতরতা ওর মুখের সঙ্গে মানায় না। কুণ্ঠিতভাবে বলল যদি বলি হ্যাঁ, তুমি খুব আহত হবে?
না, না, আহত হবো কেন?
সত্যি কথা বলতে কী, অনেকটা এইজন্যই। তা ছাড়া কোথা থেকে একটা বিশ্বাসও এসে গিয়েছিল, আর সবাই আমাদের এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও তুমি করবে না। এক সময় তো আমরা তিনজনেই বন্ধু ছিলাম। তোমাকে এমনিতেও দেখতে ইচ্ছে করতে পারে তো?
আমার মেসোমশাই দারুণ কড়া লোক। অফিসের কাজের ব্যাপারে মাথা গলানো একদম পছন্দ করেন না?
তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি কোনো অন্যায় সুযোগ চাইছি না। দয়াও চাই না। আমি চাই শুধু সত্যি কথাটা জানতে!
একবার আমার বলতে ইচ্ছে হল, বিশাখা, তুমি শুধু শুধু দেবনাথকে আঁকড়ে থাকতে চাইছো। দেবনাথ ফুরিয়ে গেছে, শেষ হয়ে গেছে, দোষী বা নির্দোষ যাই হোক, দেবনাথ আর আগেকার অবস্থা ফিরে পাবে না। তোমার মন এখনও এমন তাজা, স্বাস্থ্য এত সুন্দর, তুমি দেবনাথকে ছেড়ে চলে যাও।
কিন্তু এ কথা বলা যায় না। কোনো মেয়েকে কোনো পুরুষ বলতে পারে না, স্বামীকে ছেড়ে তুমি চলে যাও, বলতে হয়, স্বামীকে ছেড়ে তুমি আমার সঙ্গে চলে এসো! কিন্তু আমি তো সে কথা বলতে চাই না। আমি তো বিশাখা সম্পর্কে ওরকম ভাবে কখনও ভাবিনি। তা ছাড়া বিশাখা দারুণ জেদি মেয়ে, আমি ওকে চিনি, অন্য সময় দেবনাথের ওপর রাগ করে ও হয়তো চলে যেতে পারতো, কিন্তু দেবনাথকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে ও পালাবে না। সে স্বভাব ওর নয়। অসহায় মানুষকে ছেড়ে যেতে বোধ হয় কোনো মেয়েই পারে না।
বললাম ওর যদি সত্যিই কোনো দোষ না থাকে, তাহলে তো মামলায় জিতবেই। এরকম অনেক দেখা গেছে, মামলায় জেতার পর আবার চাকরি ফিরে পেয়েছে।
আমি চাকরির কথা ভাবছি না! মামলার কি সব নির্দোষ লোকেরা ছাড়া পায়? সব দোষী শাস্তি পায়? সে-কথা যাক, মামলা কবে শেষ হবে তারই তো ঠিক নেই। তুমি আমাকে সাহায্য করবে কিনা বলো?
কথা এড়াবার জন্য বললাম, শোনো বিশাখা, তুমি দেখতে পাচ্ছো না, দিন দিন দেবনাথ কীরকম মনমরা হয়ে যাছে, এত ভেঙে পড়ার কী আছে! কত সত্যিকারের চোরও তো আজকাল বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
বিশাখা কঠোরভাবে বলল, কোনো সত্যিকারের চোরের সঙ্গে আমি একসঙ্গে থাকতে চাই না। তাহলে যেসব শাড়ি আমি পরেছি, যেসব গয়নায় সেজেছি, সেগুলোর জন্য আমার শরীর জ্বলে যাবে। সুনীলদা, তুমি তোমার মেসোমশাই-এর কাছ থেকে আমাকে সত্যিকারের ব্যাপারটা জেনে দেবে কিনা আগে বলো। শুধু জেনে দাও, সত্যিকারের কোনো প্রমাণ আছে কিনা।
দেখো, এসব মারাত্মক ব্যাপার তো চিঠিতে লেখা যায় না। তাহলে আমাকে দিল্লি যেতে হয়।
বিশাখা উঠে এলো আমার পাশে। আমার হাতের ওপর হাত রেখে গাঢ় স্বরে বলল, তুমি আমার জন্য একবার যাবে?
শোনো বিশাখা, ব্যাপারটা—
না, তুমি আমাকে বলো আগে, তুমি আমার জন্য এটুকু করবে কিনা?
আমার হাতের ওপর রাখা বিশাখার হাত। নরম কোমল আঙুল, নখে লালচে স্বাস্থ্যের আভা, অনামিকায় একটা পান্না বসানো আংটি। বিয়ের দিন সাতপাকের সময় যখন পিঁড়ি ধরে ঘোরাচ্ছিলাম, তখন এই আংটি-পরা হাতে বিশাখা আমার হাত চেপে ধরেছিল। মানুষ পারে এরকম অনুরোধ উপেক্ষা করতে? বুকের মধ্যে শিরশির করতে লাগল, নাকে এসে লাগছে বিশাখার শরীরের নিজস্ব ঘ্রাণ।
বললাম, আচ্ছা যাবো—
কথা দাও?
কথা দিলাম।
এজন্য আমি তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসবো।
ছিঃ, বিশাখা, এসময় ভালোবাসার কথা বলে না।
এবার আমার অসৎ হবার পালা। এখন আমাকে অনেক মিথ্যে কথা বলতে হবে, পালিয়ে বেড়াতে হবে বিশাখার কাছ থেকে। বিশাখাকে আমি কথা দিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু সে-কথা রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমার মেসোমশাই আমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারেন না। আমার মাসতুতো বোন রন্টি একটি মাদ্রাজি ক্রিশ্চানকে বিয়ে করেছে, মেসোমশাই প্রায় সারা ভারতের পুলিশবাহিনী নিয়োগ করে সেই বিয়ে আটকাতে চেয়েছিলেন। পারেন নি। সেই সময় আমি রন্টিকে খানিকটা সাহায্য করেছিলাম, সেই থেকে রাগ! আমি দিল্লিতে কখনও গেলে হোটেলে উঠি, মেসোমশায়ের বাড়িতে উঠি না। মাসিমা মারা যাবার পর, মেসোমশাই কঠোর সন্ন্যাসীর মতন কৃচ্ছ্র জীবনযাপন করছেন, অবশ্য ঈশ্বরের বদলে তাঁর সাধনা চাকরির উন্নতির জন্য। সেন্ট্রালে হোম ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি হয়েছেন, আশা আছে, রিটায়ার করার আগে সেক্রেটারি হবেন। এসব কথা বিশাখাকে বলা যেত না। ও তাহলে ধরেই নিত, আমি নিছক ওকে এড়াবার জন্যই এগুলো বানিয়ে বলছি। সত্যি কথাও অনেক সময় খুব দুর্বল শোনায়।
তা ছাড়া মেসোমশায়ের সঙ্গে যদি আমার ভালো সম্পর্কও থাকত, তাহলেও চাকরির ব্যাপারে সামান্য গোলমাল হতে পারে, এরকম কাজ উনি কিছুতেই করতেন না। সি বি আই-এর গোপন রিপোর্ট বাইরের কারুর কাছে, বিশেষত অভিযুক্ত লোকের কাছে ফাঁস করে দেওয়া মারাত্মক অপরাধ। এ খবর জানতে চাইলে মেসোমশাই হয়তো আমাকেই পুলিশে ধরিয়ে দিতেন!
এটা আমার চাকরির পক্ষেও বিপজ্জনক। দিল্লি না হোক, কলকাতার ছোটো ডিপার্টমেন্টেও আমার দু-একজন চেনা আছে। কিন্তু সেখানে খোঁজখবর নেবারও দারুণ ঝুঁকি আছে। একজন দুর্নীতিপরায়ণ অফিসারের জন্য আমি তদ্বির করছি এ-কথা কেউ প্রকাশ করে দিলে, আমার অবস্থা কী হবে? আমাকেও ওই দলে ফেলা হবে না? খবরের কাগজের লোকেরা মুখিয়ে আছে, তাদের চর আছে সব সরকারি অফিসে। যে কেরানিটি আমাকে ফাইল দেখাবে, সে-ই হয়তো জানিয়ে দেবে খবরের কাগজে। বেশির ভাগ খবরের কাগজ কেচ্ছা ছাপাতে খুব উৎসুক, পাঠকরাও ওই সবই পড়তে চায়। একবার যদি কারুর নামে স্পাই কিংবা ঘুসখোর অপবাদ রটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়রাও পুরোপুরি অবিশ্বাস করতে চায় না। তা ছাড়া বিশাখার জন্য আমি এইসব ঝুঁকি নেবো কেন, আমি তো বিশাখার প্রেমিক নই! দেবনাথ সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও নেই।
যত রাগ পড়ল দেবনাথের ওপর। তুমি নিজেই এই কাণ্ডটি বাধিয়েছো, নিজে এর থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে পারো না! তা নয়, আমাকে জোর করে বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়ে বউয়ের সামনে ভজিয়ে দিয়ে নিজে ঢুকে রইলে বাথরুমে! মহা হারামজাদা একটি! সুন্দরী বউকে দিয়ে বন্ধুদের ব্ল্যাকমেইল করানো। তুমি ঘুস খেয়েছো, আর সি বি আই-এর কোন অফিসার ঘুস খায় না? ষাট-পঁয়ষট্টি হাজার টাকা যদি মেরেই থাকো, তার থেকে কিছু ঘুস দিলে পারতে! নাকি সে বেলায় কিপটেমি করেছিলে? শুধু লেবোরাম দেবো না দাস হয়ে থাকতে চাও? কিন্তু যদি অত টাকাই নিয়ে থাকে, তাহলে অতগুলো টাকা দিয়ে দেবনাথ করল কী?
দিন চারেক বাদে অফিস থেকে দুপুরবেলা ফোন করলাম মনুজেশকে। মনুজেশ সব সময়ই বেশ উৎফুল্ল থাকে। একটা মার্কেন্টাইল ফার্মে চাকরি করে, মদ খায়, মেয়েদের সম্পর্কে বেশ তরল। এককালের সেই গদগদ প্রেমিকটি কোথায় হারিয়ে গেছে।
মনুজেশ, হাতে কাজ কীরকম? আজ আমার সঙ্গে লাঞ্চ খাবে নাকি?
হ্যালো, ওল্ড বয়! হঠাৎ নেমন্তন্ন যে!
এমনিই, আজ শখ হল চিনে খাবার খাবো। একা একা তো খাওয়া যায় না।
তা বলে আমার সঙ্গে? এরকম লাভলি ওয়েদার, এসময় তো কোনো মেয়ে বন্ধুটন্ধুর সঙ্গে যাওয়া উচিত।
আমি আর মেয়েবন্ধু কোথায় পাবো বলো?
কেন, গত বছর যে একটি ম্যারেড মেয়ের সঙ্গে খুব ঘুরতে দেখতাম?
আরে, সে তো আমার মাসতুতো বোন রন্টি।
মাসতুতো বোন? আপন, না দূর সম্পর্কের? চোরে চোরে যেমন মাসতুতো ভাই হয় সেরকম—
বাজে কথা ছাড়ো, তুমি আসবে?
শুধু খাবার খাওয়া হবে? এরকম ওয়েদার, একটু হজমি কিছু পানটান করা হবে না।
সে তুমি খেতে পারো ইচ্ছে হলে এখন সওয়া একটা বাজে, তাহলে ঠিক দুটোর সময়—
মনুজেশকে ডাকার আগেও আমার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিশাখার কাছে কথা দিয়েও কথা রাখতে পারবো না ঠিক করে ফেলেও বিশাখার চিন্তা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছিলাম না। একা একা নিজের সঙ্গে তর্ক করছিলাম অনবরত। দেবনাথের জন্য কি বিশাখাকেও দোষী করা যায়? সে কেন এর ফল ভোগ করবে? ওর মতন অমন একটা সুন্দর প্রাণবন্ত মেয়ে—দিনের পর দিন ঘরের মধ্যে বসে থাকবে, লোকের সঙ্গে মিশতে লজ্জা পাবে কেন? কিন্তু বিশাখার জন্য আমি কী করতে পারি? বিশাখা, তুমি আমায় মিথ্যাবাদী করলে কেন? কেন আমার শান্তি নষ্ট করলে? মানুষ আজকাল নিজের সমস্যা নিজেই সামলাতে পারে না, অপরের সমস্যা কেন ঘাড়ে চাপানো।
মনুজেশকে দেখেই আমার মাথায় আইডিয়াটা খেলে গেল। মনুজেশ আজকাল কী রকম স্মার্ট হয়েছে, টেরিলিনের স্যুটটা পরেছে নিখুঁত কায়দায়, কী অবহেলার সঙ্গে সিগারেটটা ধরে আছে। যে-কোনা মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে, অথচ পড়বে না। কমার্শিয়াল ফার্মে ঢুকলে ক্যাবলারাও চালাক হয়ে যায়। আর সরকারি অফিসে আমাদের তো যা অবস্থা, দিন দিন বেড়ালের মতন গোঁফ দিয়ে ফিক ফিক করতে হয়।
মুরুবিব চালে আমার কাঁধে চাপড় দিয়ে মনুজেশ বলল, কী খবর বলো!
খবর আর কী! অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা নেই।
তুমি তো আর পার্ক স্ট্রিট পাড়ায় আসো না! তা হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল যে?
একজনের মুখে তোমার নাম শুনলাম কিনা!
একজন? কে একজন?
বিশাখা।
মনুজেশ এমনভাবে আমার দিকে তাকালো, যেন ও আমাকে সেই মুহূর্তেই খুন করতে চায়, কিংবা আমার মধ্যে ও অলৌকিক কিছু প্রত্যক্ষ করেছে। ওর মুখে যে বুদ্ধির চাকচিক্য কিংবা শৌখিনতার জৌলুস ছিল—সেটা সম্পূর্ণ মুছে গেল, ফুটে উঠলো একটা সরল লাজুক মুখ, তাতে সামান্য বেদনার চিহ্ন। কিন্তু তিরিশ বছর বয়েস পেরিয়ে গেলে মানুষ এই ধরনের সরল মুখ দেখাতে লজ্জা পায়। মনুজেশও একটু লজ্জা পেয়ে, সেটা কাটানোর জন্য তুখোড় কায়দায় টুসকি দিয়ে বেয়ারাকে ডাকল, ডেকে বলল, হামারা লিয়ে এক বিয়ার, একদম চিলড হোনা চাইয়ে, আউর সাহাবকো লিয়ে—সুনীল তুমি কী খাবে?
আমি ওসব খাবো না। আমি সুপ খাবো। চিকেন উইথ কর্ন। বেয়ারা চলে যাবার পর মনুজেশ নীচু গলায় বলল, বিশাখার সঙ্গে কোথায় দেখা হল।
কয়েকদিন আগে বিশাখার বাড়িতে গিয়েছিলাম।
তোমার সঙ্গে বুঝি ওর যোগাযোগ আছে এখনও?
হ্যাঁ। দেবনাথও তো আমার বন্ধু!
ওর নামে কি একটা স্ক্যান্ডাল বেরিয়েছে না কাগজে?
তুমি জানো তাহলে?
খবরের কাগজে বেরোয় তো লোককে জানাবার জন্যই! তা ছাড়া আমাদের অফিসে মিত্তিরের কাছে শুনেছি। মিত্তিরের সঙ্গে ওর তো আবার প্রায়ই রেসের মাঠে দেখা হয় কিনা!
দেবনাথ রেস খেলে?
তুমি জানো না? আমিও তো দু-একদিন গিয়েছিলাম, তখনও ওকে দেখেছি। দেবনাথের এ পরিচয়টা আমার সত্যিই জানা ছিল না। রেস খেলার ব্যাপারটা যেন দেবনাথের চরিত্রের সঙ্গে মানায় না। সন্দেহ কী, দেবনাথ প্রতিবার ভুল ঘোড়ার ওপরই বাজি ফেলেছে। যে হেরে যাবার জন্য বদ্ধপরিকর, তাকে কে জেতাবে? কিন্তু মনুজেশ মিথ্যে কথা বলছে না তো? প্রাক্তন প্রেমিকার স্বামীকে কেউই পছন্দ করে না। তার সম্পর্কে নিন্দে ছড়ানোই নিয়ম।
আমি সাবধান হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, তোমারও রেসটেস খেলার অভ্যেস আছে নাকি?
মনুজেশ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, মাঝে মাঝে যাই মাঠে, স্পার্টস হিসেবে দু-একটা খেলি। এর জন্য দেবনাথের মতন আমাকে অফিসের টাকা মিস অ্যাপ্রপ্রিয়েট করতে হয় না অবশ্য। হি ইজ এ সিলি অ্যাস।
আমি এবার হৃষ্টভাবে হাসলাম। বললাম, তোমার এখনও ঈর্ষা আছে দেবনাথ সম্পর্কে। ওইসব ঈর্ষাটির্ষা কিন্তু বাচ্চা বয়সেই মানায়।
মনুজেশ একটু অবাক হয়ে বলল, ঈর্ষা। ধ্যাৎ, দেবনাথ সম্পর্কে আমার মায়া হয়।
আচ্ছা, দেবনাথের তো অনেক গুণ ছিল, তবু সে এরকম হয়ে গেল কেন?
তার কারণ, ও ওর স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারেনি।
তোমাকে বুঝি সেকথা ও কানে কানে বলে গেছে?
একটু ভেবে দেখলেই তো বুঝতে পারা যায়! ব্যাপারটা কী হয়েছে জানো, বিশাখা ওর পক্ষে মাপে একটু বড়ো হয়ে গেছে—দেবনাথের যতখানি ভালোবাসার ক্ষমতা, বিশাখার দাবি তার চেয়ে অনেক বেশি। দেবনাথ বেচারা তাই উদভ্রান্ত হয়ে গেল!
রাবিশ! দাম্পত্য ব্যাপারটা অতখানি জটিল নয়!
তুমি সব জেনে বসে আছো! ক-বার বিয়ে করেছ তুমি? আমি নিজে বিয়ে না করলেও জানি।
কিন্তু বিশাখার মধ্যে অসাধারণত্ব কী আছে? বিশাখা বেশ সুন্দরী কিন্তু ওরকম সুন্দরী মেয়ে ঢের ঢের আছে।
সেরকমভাবে বিচার করতে গেলে অবশ্য অসাধারণত্ব কিছু নেই।
বিয়ের সময় ছেলে হিসেবে দেবনাথও মোটেই খারাপ ছিল না।
দেখো, আমারও একটা ভদ্রতাবোধ আছে। দেবনাথ যেহেতু বিশাখার স্বামী, সেইজন্যই তার আমি কোনোরকম নিন্দে করতে চাই না—তাহলে সবাই ভাববে আমি ঈর্ষা থেকে বলছি। কিন্তু যে লোক বউকে খুশি করার জন্য অফিসে টাকা চুরি করে—
আমি মনুজেশের মুখের সামনে হাত তুলে বললাম, শোনো, শোনো, মনুজেশ, উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছো কেন? আস্তে কথা বলো! প্রথম কথা, দেবনাথ যে টাকা চুরি করেছে, সেটা এখনও প্রমাণিত হয়নি—সুতরাং তোমার ওভাবে বলা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে আরও ঢের ঢের লোক অফিসে টাকা চুরি করে, তারা সবাই বউয়ের কথা ভাবে না।
খবর নিয়ে দেখো গে, তারা সবাই বউকে খুশি করার জন্যই যত সব অপকীর্তি করে। এর মধ্যে দুধরনের লোক হচ্ছে রিয়েল গাধা—এক, যারা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, আর এক হচ্ছে—যারা বুঝতেই পারে না, তাদের বউ এতে সত্যি খুশি হবে কিনা। বিশাখা যে এতে খুশি হতেই পারে না—সেটা বুঝতে পারেনি দেবনাথ।
কিন্তু দেবনাথেরও অবস্থা বেশ সচ্ছলই ছিল।
তুমি আমার পয়েন্টটাই বুঝতে পারলে না!
আমি দুজনের জন্য খাবার অর্ডার দিলাম, মনুজেশ আর এক বোতল বিয়ার নিল। মনুজেশের কথা শুনে যতই বুঝতে পারছি যে বিশাখা সম্পর্কে এখনও তার দুর্বলতা আছে, এখনও সে বিশাখার কথা তীব্রভাবে ভাবে—ততই আমার মাথায় পরিকল্পনাটা দানা বাঁধছে। আমার মুক্তির উপায় আমি পেয়ে গেছি।
মনুজেশ বলল, তা যাক গে। বিশাখা আমার কথা কী বলল বলো!
বিশাখার এই বিপদের সময় কি তোমার একটু খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল না?
এটা এমন ধরনের বিপদ যাতে অন্য কেউ সহানুভূতি জানাতে পারে না! কারুর ছেলেপুলে মারা গেলেই সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাই না আমরা। আর এখানে গিয়ে কী বলবো, আহা তোমার স্বামী টাকা চুরি করেছে, তাতে আর কী হয়েছে। আফটার অল, এটা একটা সামাজিক অন্যায়, আমরা কেউ এতে সমর্থন জানাতে পারি না।
সেটা ঠিক। দেবনাথের সঙ্গে আমাদের কোনোরকম সংস্পর্শই রাখা উচিত নয়। কিন্তু তুমি কী বলতে চাও, এজন্য বিশাখাকেও ঘৃণা করতে হবে?
বিশাখার উচিত এখন কিছুদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকা।
বিশাখাকে তুমি চেন না? অসম্মানের বোঝা মাথায় নিয়ে সে অন্য কোথাও যাবে না!
তুমি বিশাখাকে কী রকম দেখলে বলো। মনমরা হয়ে আছে?
ঠিক তার উল্টো। বিশাখা দারুণ হাসিখুশি, সব সময় হালকাভাবে কথা বলছে। কিন্তু এটাই অস্বাভাবিক নয় কি? আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি, বিশাখা ভিতর ভিতরে দারুণ বিষণ্ণ হয়ে আছে। ভিতরে ভিতরে দারুণ ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমার এত কষ্ট হচ্ছিল।
আমি কী করতে পারি বলো! আমি দেবনাথকে বাঁচাতে পারবো না। বাঁচাবার ক্ষমতা থাকলেও সে চেষ্টা করতাম কিনা সন্দেহ।
কিন্তু বিশাখা তোমার কথা বলছিল, হয়তো তোমাকে দেখলে সে একটু সান্ত্বনা পাবে। ও ভাবছে, সবাই ওকে পরিত্যাগ করতে চায়!
এক চুমুকে গেলাসটা শেষ করে মনুজেশ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। এত সহজে তার নেশা হবার কথা নয়, কিন্তু তার চোখে একটা চকচকে জলের পর্দা। আমার চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছে না, যেন আমার ভেতর পর্যন্ত দেখার চেষ্টা করছে। কিংবা তাও নয়, হয়তো আমার দিকে তাকিয়েও আমাকে দেখছেই না। মানুষের মন হঠাৎ নরম হয়ে গেলে, এইরকম দৃষ্টি হয়!
সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে মনুজেশ বলল, না বিশাখার সঙ্গে দেখা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
চলো, এবার ওঠা যাক।
না, আর একটু বসো। আমি আর একটা বিয়ার নেবো। তুমি তাহলে কিছু খাবে না?
না। তুমি তাহলে একা বসো। আমি এবার উঠি।
আঃ, একটু বসো না! বিশাখার কথা বলে এমন মন খারাপ করিয়ে দিলে! বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে না কেন জানো! আমার ভয় হয় ওকে দেখলে আমি বোধহয় নিজেকে সামলাতে পারবো না। তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি, এরপর তিন-চারজন মেয়ের সঙ্গে প্রেম-প্রেম খেলা খেলেছি, বুকে জড়িয়ে ধরেছি, তবু আমার বুকটা ফাঁকা রয়ে গেছে। মনে হয় বিশাখাকে না পেলে আমার বুকের ওই শূন্যতা কিছুতেই ভরবে না। আর তো কোনো মেয়ের আঙুল ছুঁয়ে বিদ্যুতের তরঙ্গ পাইনি!
মনুজেশ আরও কিছু বলতে লাগল উচ্ছ্বাসের কথা। সে সব আর আমার কানে ঢুকলো না, আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। নিজের ভিতরটা যাচাই করতে লাগলাম তন্নতন্ন করে। আমার কি রাগ হচ্ছে মনুজেশের কথা শুনে? আমার অভিমানে কি ঘা লাগছে? বিশাখা সম্পর্কে শারীরিক ভাষায় প্রেম কথা শোনাচ্ছে মনুজেশ, এতে কি আমার আহত হবার কথা? কিন্তু আমার মনটা তো হালকাই লাগছে।
আমি হালকাভাবেই হেসে বললুম, কোনো মেয়ে সম্পর্কে আমার যদি ওরকম ফিক্সেশন থাকতো, আমি কিছুতেই ন্যাকা প্রেমিকদের মতন সে মেয়ের থেকে দূরে সরে থাকতাম না।
মনুজেশের বোধহয় আঁতে একটু ঘা লাগল। রীতিমতন চটে উঠে বলল, দ্যাখো, আমি রীতিমতন ভদ্দরলোক! আমি ফেয়ার গেম-এ বিশ্বাস করি। এক সময় দেবনাথের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি হেরে গিয়েছিলাম। এখন দেবনাথ বিপদে পড়েছে বলেই আমি তার সুযোগ নেবো, আমি সে রকম মানুষ নই!
দ্যাখো মনুজেশ, তোমার মনটা বড়ো অপরিচ্ছন্ন! সুযোগ নেবার কথা উঠছে কোত্থেকে? বন্ধুর সঙ্গে বন্ধু দেখা করে না, বিপদের সময়? বিশাখা এক সময় তোমার বন্ধু ছিল—
কিন্তু ভাই এখন অভ্যেসটাই এমন হয়ে গেছে, শরীর ছাড়া অন্য কোনো রকম সম্পর্ক ভাবা একটু কষ্টকর মেয়েদের সম্পর্কে। এখন কি আর ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু মুখোমুখি বসে গল্প করার দিন আছে? শুনেছি পঞ্চাশ বছর বয়েস হয়ে গেলে আবার মানুষ ওতে আনন্দ পায়।
মনুজেশ আমি এবার উঠবো!
আরে বোসো না! নিজেই ডেকে আনলে! তুমি তাহলে বলছ, বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে?
আমি কিছুই বলছি না। সেদিন বিশাখার সঙ্গে কথা বলে মনে হল, ও তোমার কথা এখনো ভাবে।
কিন্তু দেবনাথ যে আমাকে একদম পছন্দ করে না। বিয়ের পর দু-তিনবার গিয়েছিলাম ওদের বাড়িতে, দেবনাথ এমনভাবে তাকাতো—
দেবনাথের তাকানো গ্রাহ্য না করলেই হয়। মুখে কিছু বলার সাহস আর দেবনাথের নেই! আমি তো যাই, আমাকে তো কিছু বলে না। আমিও তো বিশাখার বন্ধু ছিলাম।
হ্যাঁ, তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? বিশাখা সম্পর্কে তোমার একটুও দুর্বলতা নেই?
রেস্তোরাঁর দেয়াল-জোড়া আয়নাতেই তো দেখতে পাচ্ছি, আমার মুখের একটা রেখাও বদলালো না। মনুজেশের হাত চাপড়ে বললাম, না—, সেদিকে তোমার কোনো ভয় নেই। আমার সেরকম কিছু নেই বিশাখা সম্পর্কে।
কেন নেই?
এক সময় একটু আধটু ছিল হয়তো। কিন্তু এখন আমি অন্য একটি মেয়েকে ভালোবাসি, দু-মাসের মধ্যেই তাকে বিয়ে করবো!
তাই নাকি। কে মেয়েটি, আমরা চিনি?
সেসব কথা পরে হবে! চলো, এবার ওঠা যাক। আমাকে অফিসে ফিরতে হবে! বাইরে বেরিয়ে আসার পর মনুজেশ বলল, তুমি বিশাখার কথা এমনভাবে মনে করিয়ে দিলে, না গিয়ে আর উপায় নেই। কিন্তু যদি মাথা ঠিক রাখতে না পারি! আমি ঠাট্টার ভঙ্গিতে বললাম, যদি চাও তো আমি দেবনাথকে সন্ধের পর বাইরে ডেকে এনে তোমায় সুযোগ করে দিতে পারি।
মনুজেশ সান্যাল ওসব সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না? মনুজেশকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আমি একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনটা আবার আস্তে আস্তে ভারী হয়ে আসতে লাগল। বেশ তেষ্টাও পাচ্ছে। অফিসে আজ না ফিরলেও খুব ক্ষতি হবে না। আমি আস্তে আস্তে আবার রেস্তোরাটাঁয় ফিরে এসে এক বোতল বিয়ারের অর্ডার দিলাম। এসব আমি কদাচিৎ খাই। কিন্তু আজ, সিনেমার ভিলেনদের মতন, আমাকে সামনে মদের গেলাস নিয়ে বসতেই হবে।
আমি বিশাখার কাছে কথা রাখতে পারবো না। তাই পরিকল্পনা করে মনুজেশকে ওর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। আমার সাহস নেই, স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেবার মতন মনের জোর পাচ্ছি না। বান্ধবীর স্বামী যদি ঘুসখোর হয়, তবে কীভাবে তাকে সাহায্য করা উচিত একথা আমাকে কেউ বলে দিতে পারে না।
বিশাখা সত্য জানতে চেয়েছিল। কী হবে সত্য জেনে? দেবনাথ যদি সত্যিই ঘুসখোর হয়, তাহলে কি বিশাখার উচিত স্বামীকে ত্যাগ করা? সমাজের নির্দেশ কি তাই? দেবনাথের তো বিচারে ফাঁসি হবে না, বড়োজোর দু-তিন বছরের জেল হতে পারে। জেল থেকে সে ফিরে আসবেই—তারপরও সারা জীবন লোকে তার অপরাধের কথা ভুলবে না। আর বিশাখা সেই গ্লানির বোঝা বইবে?
আর বিশাখা যদি দেবনাথকে ছাড়তেও চায়, তার তো আর কোনো আশ্রয় দরকার। কে সেই আশ্রয় দেবে? আমি নই! বিশাখার বিয়ের সময় আমারও মন কেমন করেছিল, কিন্তু একজন ঘুসখোর সরকারি অফিসারের ডিভোর্স করা বউয়ের সঙ্গে আর একজন সরকারি অফিসারের সম্পর্ক থাকা ভালো না! সেটা তার চাকরির সুনামের পক্ষে ক্ষতিকর। আঃ, চাকরি চাকরি! ভালোবাসা-টালোবাসার চেয়েও চাকরি অনেক বড়ো।
আমরা সবাই কিছু-না কিছু অসৎ, কেউ সমাজের কাছে, কেউ হৃদয়ের কাছে। দেখেছি তো অনেকেই কিছু-না কিছু কথা রাখে না। সবচেয়ে ভালো হয় বিশাখাও যদি একটু অসৎ হয়। মনুজেশের সঙ্গে সেও যদি অন্যায় কোনো ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে, তারও কিছু গোপন করার মতন ব্যাপার থাকে—তবে সেও আর দেবনাথের অন্যায়টাকে বড়ো করে দেখবে না। তাই তো নিয়ম! মনুজেশ পারবে না?
বছর পাঁচ সাড়ে পাঁচ আগে, বিশাখার সঙ্গে আমি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফিসের পিছন দিকের বাগানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ভিতরে একটা মস্ত বড়ো পুকুর—তখন বিকেল শেষ হয়ে গেছে, ভালো করে সন্ধে নামেনি, আকাশটা অনেক নীচু হয়ে নেমে এসেছিল মন্থর আলোয়—একটা সাদা হাঁস পুকুরটার জল দুভাগ করে এগিয়ে আসছিল আমাদের দিকে। বিশাখা সেই দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ভারী সুন্দর, না? সে সুন্দর কথাটা উচ্চারণ করার জন্যই, সেই দৃশ্যটা সব সময় আমার চোখে ভাসে। স্মৃতিতে সেদিনকার সেই বিকেলের আকাশে কখনও সন্ধে হয়নি। আজও অন্ধকার ঘনিয়ে এল। আমার মনে হল, আজ এইমাত্র আমি কী যেন একটা বহুমূল্য জিনিস হারালাম। আমার বুকের মধ্যে দারুণ ব্যথা করতে লাগল। সবাই ঠিক সময় ভালোবাসার কথা বোঝে না। সেদিন বুঝিনি, এতগুলো বছরেও বুঝিনি, আজ, মনুজেশকে বিদায় দেবার পর আমি বুঝতে পারলাম। আমি শুধু বিশাখাকেই ভালোবাসি। কিন্তু আমি বিশাখাকে চাই না।
বিশাখা আমাকে জোর করে পাঠালো। আমি আসতে চাইনি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। আমি খুব সম্ভবত আগামী সপ্তাহেই দিল্লি যাচ্ছি।
তোমাকে দিল্লি যেতে হবে না।
অস্বস্তিকর অবস্থা। বিকেলবেলা অফিস থেকে বেরিয়েই দেখি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দেবনাথ। আমাদের জয়েন্ট ডাইরেক্টর আমাকে তাঁর গাড়িতে রাসবিহারী মোড় পর্যন্ত লিফট দেবেন বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গেই সিঁড়ি দিয়ে নেমেছিলাম। দেবনাথকে দেখেই আমি না দেখার ভান করেছি। বলা তো যায় না, দেবনাথের সঙ্গে যদি জয়েন্ট ডাইরেক্টরের কোনোক্রমে মুখ চেনা থাকে তাহলে তিনি নিশ্চয়ই ওর ব্যাপার সব জানেন। কিন্তু দেবনাথই হাত তুলে আমাকে ডাকলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে মনস্থির করে জয়েন্ট ডাইরেক্টরকে বললাম, স্যার, আমি একটা লাল ফ্ল্যাগ দেওয়া ফাইল টাইপ করতে দিয়ে এসেছিলাম, সেটা সই করে আসিনি। আমি আর একটু অফিসে থাকবো, আপনি চলে যান বরং।
জয়েন্ট ডাইরেক্টর সরু চোখে একবার দেবনাথকে দেখে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, তাড়াতাড়ি সেরে নিও। ইয়ংম্যানদের ছুটির পর বেশিক্ষণ অফিসে থাকা ভালো না, ওতে স্বাস্থ্য টেকে না।
এই সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই দেবনাথ আর একটু রোগা হয়েছে। চোখ দুটোর তলায় ঘন কালো দাগ, দৃষ্টি জ্বলজ্বলে। এক মুহূর্তের জন্য যে দেবনাথের ওপর আমার একটু মায়া হল না, তা নয়! কেন দেবনাথের এই অবস্থা হল? বিশাখার মতন একটি রূপসী মেয়েকে বিয়ে করে ওর কি সুখী হবার অধিকার ছিল না? নিছক বুদ্ধিভ্রমে ওর এই দশা?
প্রথমে আমি ওকে বলতে উদ্যত হয়েছিলাম। কী ব্যাপার, এখানে দাঁড়িয়ে আছ যে? অফিসের ভিতরে এলেই পারতে? কিন্তু বলিনি, নিজেকে সামলে নিয়েছি ঠিক সময়ে। সর্বনাশের ব্যাপার হত তাহলে, সি বি আই-এর রিপোর্টে যাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে—সে এসেছে অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করতে, একথা কেউ না কেউ কি আর জয়েন্ট ডাইরেক্টরের কানে তুলতো না! কান ভারী করার লোকের কি অভাব আছে? আমাকে যে কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে ডেপুটি সেক্রেটারি করে পাঠাবার কথা হচ্ছে, সেটা তাহলে পিছিয়ে যেত না? অথচ দেবনাথ গেলে আমি তাকে তাড়িয়ে দিতে পারতাম কি? হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে বসিয়ে চা খাওয়াতে হত না! দেবনাথ যে আমার অফিসে ঢোকেনি, এজন্য সে আমাকে কৃতজ্ঞ করেছে বলা যায়। সুতরাং তার সঙ্গে হাসিমুখেই কথা বলতে হল।
দেবনাথ কিন্তু আজ আর তেমন নির্জীব নিরুৎসাহ নয়। কোথা থেকে সে যেন একটা নতুন শক্তি পেয়ে গেছে। রীতিমতন জোর দিয়ে সে বলল, তোমাকে আর দিল্লি যেতে হবে না!
আমি একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললাম, কেন!
এই শুক্কুরবার আমার মামলার তারিখ পড়েছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। এবার আমি তাড়াতাড়ি মামলা চুকিয়ে ফেলতে চাই। আমি কী করবো, আমি ঠিক করে ফেলেছি।
আমি রীতিমতন ভয় পেয়ে গেলাম। সাত আট মাসের মধ্যে দেবনাথের সঙ্গে আমার ঘুরে ফিরে বেশ কয়েকবারই দেখা হয়েছে, কখনও তাকে এমন পরিষ্কার তেজের সঙ্গে কথা বলতে শুনিনি।
কী ঠিক করে ফেলেছ?
আমি আমার উকিল ছাড়িয়ে দিচ্ছি। আমি জজের সামনে নিজে দাঁড়িয়ে বলবো, আমি সব অভিযোগ মেনে নিচ্ছি! আমি দোষ স্বীকার করছি।
কী বলছ কী! তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি।
দেবনাথ হাসলো। কী কঠিন ঠান্ডা সেই হাসি। আমার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, তুমি বিশ্বাস করো, আমি নিরপরাধ!
ইয়ে মানে, আমার বিশ্বাস করা না-করায়, কী আসে যায়? তোমার যদি সত্যি দোষ না থাকে, আইনের কাছে তুমি নিশ্চয়ই তাহলে ছাড়া পাবে! অ্যাকুইট্যাল হয়ে গেলে তুমি চাকরি তো ফিরে পাবেই, সাসপেনসান পিরিয়ডের সমস্ত মাইনে ফেরত পাবে।
আইন আমাকে বাঁচাবে? আমার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি, আমি পেছন ফিরলেই সবাই আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে চোর বলে, এমনকি আমার স্ত্রীও আমায় বিশ্বাস করেনি।
না, না, বিশাখা মোটেও সে রকম ভাবে না।
আশাকরি আমার স্ত্রীকে আমার চেয়ে তুমি বেশি চেনো না।
এবার আমার প্রস্তুত হবার পালা। আমি সতর্ক ভঙ্গিতে বললাম, ঠিক আছে, তুমি আমার কাছে এসেছ কেন আজ?
হাঁটতে হাঁটতে আমরা লালদিঘি পেরিয়ে রাজভবনের পাশ দিয়ে চলেছি। রাস্তায় আর কেউ যাতে শুনতে না পায় এইরকম ভাবে ফিসফিসিয়ে দেবনাথ আমাকে বলল, বিশাখা আমাকে জোর করে পাঠালো। তুমি ওর কাছে কী যেন কথা দিয়ে এসেছিলে, সেটা ভুলে গেছো কিনা জানতে। বিশাখা তোমাকে দুদিন অফিসে ফোন করেছিল, পায়নি। একদিন তোমার অফিস থেকে বলেছে, তুমি নাকি লাঞ্চ খেতে বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরোনি—আর একদিন তুমি অন্য কোন অফিসারের ঘরে ছিলে—সেখান থেকে তোমাকে ডেকে দেওয়া যাবে না। ওর ধারণা হয়েছে, তুমি যে-কথা দিয়েছিলে বোধ হয় সেটা রাখতে চাইছো না!
বিশাখাকে আমি কী কথা দিয়েছিলাম তুমি জানো না?
জানি। তাই তো তোমাকে বারণ করতে এলাম। আমায় আর কারুর কাছ থেকে কোনো সাহায্যের দরকার নেই। আমি আইনের কাছ থেকেও সুবিচার চাই না। আমি সব দোষ স্বীকার করবো।
তুমি সত্যিই ওসব করেছিলে?
তোমার জেনে কী লাভ?
নেতাজি মূর্তির কাছাকাছি এসে, রাস্তা পার হবার জন্য আমরা থমকে দাঁড়িয়েছি। দূরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পিছন দিকটায় ডুবে যাচ্ছে সূর্য। আমার হঠাৎ মনে হল দেবনাথ আমার সঙ্গে একটা সাংঘাতিক খেলা খেলছে। জামার হাতা থেকে ও এখনো সব তাস বার করেনি। আমাকে জানতেই হবে, দেবনাথ সত্যিই ওই সব অপরাধ করেছিল কী না!
দেবনাথের হাত চেপে ধরে আমি খুব মিনতি করে বললাম, দেবনাথ, কেন এরকম হচ্ছে সব কিছু? বিশ্বাস করো, আমি তোমার বন্ধু। আমাকে তুমি সত্যি কথাটা বলো, আমার দ্বারা যদি কিছুমাত্র সাহায্য করা সম্ভব হয়—
আমি যে মিথ্যে বলেছি, তা সেই মুহূর্তে আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম। একথা ঠিক, দেবনাথকে কোনোরকমে সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবু সেই মিথ্যে বলার সময়েও আমার গলায় আন্তরিকতার ছোঁয়া লেগেছিল।
দেবনাথ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অস্বাভাবিক দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, হ্যাঁ, আমি ওই সব অন্যায়গুলো করেছি। করেছি, কারণ ওইগুলো করাই সহজ ছিল। আমি যে পোস্টে কাজ করতাম, সেই পোস্টে অন্যায় না করাই শক্ত! কিছুদিন চাকরি করার পর আমি জানতে পারলাম, আমার বাবাও ঘুস নিতেন। আমাদের ভবানীপুরের বাড়িটা ঘুসের টাকায় তৈরি।
দেবনাথ!
শুনতে তোমার খারাপ লাগছে তো! কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি। আমার বাবাও ইনকাম ট্যাক্সের কমিশনার ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে আরও সহজ ছিল। যাক গে, তুমি এখন কোন দিকে যাবে?
আমি কোন দিকে যাবো, তা তো আমি নিজেই জানি না। বিশাখার মুখটা চকিতে একবার ভেসে উঠলো চোখের সামনে। বিশাখা সত্যি কথাটা জানতে চেয়েছিল কেন? মুনি ঋষিরা যে কারণে সত্যের সন্ধান পেতে চায়, সেই জন্য? না সামাজিক অপবাদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য।
আমি বললাম, দেবনাথ, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। তুমি কিছু একটা চালাকি করতে চাইছ।
রেড রোডের ওপর দাঁড়িয়ে দেবনাথ হাসতে লাগল। তার মুখে এরকম হাসি আমি কখনও শুনিনি। দেবনাথ ফিরে পাচ্ছে তার আগেকার চেহারা, আগেকার প্রাণোচ্ছলতা। অথচ এখন তো তার এসব ফিরে পাবার কথা নয়।
আমাদের বাড়ি যাবে নাকি? বিশাখার সঙ্গে দেখা করে আসবে!
তুমি ওকে বলেছ যে, তুমি আদালতে সব স্বীকার করতে যাচ্ছ?
না, ওকে এখনও বলিনি। আজ সকালবেলাই ঠিক করলাম। সেই থেকে আমার মনের ভাব কেটে গেছে। অন্যায় করার মতন অন্যায় স্বীকার করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেও অনেক দেরি লাগে। অফিসে প্রথম দু-তিন বছর আমিও ভদ্রলোক ছিলাম, কড়া অফিসার হিসেবে আমার নাম ছিল। তারপর আমাকে মাদ্রাজে ট্রান্সফার করার কথা উঠল, আমি তখনও কারণটা বুঝতে পারিনি। একদিন একজন বুড়ো কেরানি আমাকে আমার বাবা সম্পর্কে ইঙ্গিত করল, সে আমার বাবার সঙ্গে বাঙ্গালোরেও চাকরি করেছিল!
আমি এসব শুনতে চাই না।
সত্যি তো, তোমাকে এসব শোনাবার কি-ই-বা মানে হয়। চলো, আমাদের বাড়িতে চলো, বিশাখার সঙ্গে দেখা করে যাবে। বিশাখার শরীরটা ভালো নেই দুদিন থেকে।
কেন, কী হয়েছে ওর।
দেবনাথ আবার হাসতে আরম্ভ করল। স্ত্রীর অসুখের কথায় হাসির কী আছে। মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি ছেলেটার? অথচ আজই এতদিন বাদে দেবনাথের কথাবার্তা সব সুস্থ ধরনের। তবে আবছা অন্ধকারময় রেড রোডে দাঁড়িয়ে নিজের কোন রসিকতায় এমন প্রশান্তভাবে হাসছে ও? ঘুসখোরের ছেলে ঘুসখোর, তার আবার এত আনন্দ কীসের?
আমার আর সহ্য হচ্ছে না। কেন এই জটিলতার মধ্যে আমাকে জড়ানো! ইচ্ছে হল, দেবনাথের কাছ থেকে ছুটে পালিয়ে যাই। আমার তো এখন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বসার কথা। রেকর্ড প্লেয়ারে চড়ানো থাকবে সেতারের লং প্লেয়িং। বছর দু-এক আগে জয়াকে যদি বিয়ে করতাম তাহলে দৃশ্যটা কমপ্লিট হত। এইসবের জন্যই তো চাকরি।
রীতিমতন ধমক দিয়ে বললাম, হাসছো কেন? কী হয়েছে বিশাখার?
হাসবো না? আজ আমার বড়ো আনন্দের দিন হে। শোনো, বিশাখাকে আমি সব সময় খুব যত্নে রেখেছি। বড়ো ভালো মেয়ে! নিজের স্ত্রী বলে বলছি না, তুমিও তো জানো। ওকে কখনও কোনো কষ্ট দিইনি। বিশাখা আমাকে ভালোবাসে না জানি, তবুও কোনো কষ্ট দিইনি।
দেবনাথ আমার দিকে উৎসুকভাবে তাকাল। আমি কোনো মন্তব্য করলাম না। ওদের দাম্পত্য ব্যাপার, এতে আমার বলার কী আছে!
দেবনাথ আবার বলল, বিশাখা অবশ্য চেষ্টা করেছিল খুব, কিন্তু পারেনি। ও তো আবার তোমাকেই ভালোবাসে কিনা—
আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম, কী বলছো কী যা তা! বিশাখা আমার ছোটোবোনের মতন।
সংকটের সময় মানুষ আপনা আপনি কী রকম মিথ্যে কথা বলে। বিশাখা সম্পর্কে আমার আর যা-ই মনোভাব হোক, আমি ওকে কোনোদিন ছোটোবোন হিসেবে মোটেই দেখিনি। সেটা আমার স্বভাব নয়। কিন্তু দেবনাথের ঠান্ডা গলায় ওই কথা শুনে আমি দারুণ ভয় পেয়ে গেলাম। আমি আবার জোরের সঙ্গে বললাম, বিশাখা আমার ছোটোবোনের বন্ধু ছিল, ও আমার ছোটোবোনের মতন।
আহা-হা, তোমাকে তো কোনো দোষ দিচ্ছি না! আমার বউ যদি মনে মনে তোমাকে ভালোবাসে, সেটা কি তোমার দোষ? তুমি যে ব্যাপারটাকে কখনও গুরুত্ব দাওনি, তা তো আমি জানিই। বিশাখাকেও দোষ দিতে পারি না। ওরকম মনে মনে খানিকটা ভালোবাসা প্রায় সব মেয়েরই থাকে অন্য কারুর জন্য। ধরো, তোমার সঙ্গেই যদি বিশাখার বিয়ে হত, তাহলে তখন বোধহয় আমার প্রতি একটু একটু ভালোবাসা থাকতো!
দেবনাথ, এসব আজেবাজে কথা শোনার সময় নেই আমার!
আরে শোনোই না, সবচেয়ে মজার কথা কী জানো, যেদিন থেকে আমি সাসপেন্ড হলাম, তারপর থেকেই কিন্তু বিশাখা আমাকে খুব ভালোবাসতে লাগল। কী এর রহস্য জানি না, কিন্তু বিশাখা প্রাণপণে চেষ্টা করতো আমার দুঃখ ভুলিয়ে দিতে। হয়তো তার একটা কারণ এই, বিশাখা গোড়া থেকেই আমার নামে সব অভিযোগগুলো বিশ্বাস করে ফেলেছিল। আর প্রমাণহীন সেই বিশ্বাসের জন্যই অনুশোচনা হয়েছিল ওর।
দেবনাথ, তুমি কখনও রেস খেলতে?
রেস? জীবনে একদিনও খেলিনি। হঠাৎ একথা তোমার মনে হল কেন?
টাকাগুলো কী করলে তবে?
কীসের টাকা? আমার সব টাকা আমি স্টেট ব্যাংকের পাটনা ব্রাঞ্চে বিশাখার নামে জমা করে দিয়েছি। তাতে আর কেউ হাত ছোঁয়াতে পারবে না।
টাকাগুলো যে নষ্ট হয়নি, একথা শুনে আমার একটা নিশ্চিত নিশ্বাস পড়ল কেন? মনুজেশ মিথ্যে কথা বলেছে! কিন্তু ওই পাপের টাকা তো নষ্ট হওয়াই উচিত ছিল। তবু, টাকা জিনিসটা এমন, কোথাও সেটা আছে—সেটা জানলেই ভালো লাগে? ঘেন্নায় শিউরে ওঠা উচিত ছিল না আমার?
প্রায় তিয়াত্তর হাজার টাকা জমা রেখেছি বিশাখার নামে। সে টাকা আর আমারও তোলার ক্ষমতা নেই। তোমার কী ধারণা, বিশাখা সে টাকা কখনও ব্যবহার করবে না? আমার টাকা বলে বিলিয়ে দেবে? মেয়েরা তা পারে?
দেবনাথের মাথায় কি ভূত চেপেছে? কিছু একটা শয়তানি পরিকল্পনা নিয়ে সে খেলা করছে। কিন্তু আমি কেন তার মধ্যে! আমার মুক্তি চাই। আমি কাতরভাবে বললাম, দেবনাথ, আমি এবার বাড়ি যাবো।
আসল কথাটাই এখনও তোমাকে বলা হয়নি। দিন দুয়েক ধরে বিশাখার খুব বমি হচ্ছিল। কাল ডাক্তার এসে বললো, ইউরিন টেস্টও হয়ে গেছে—বিশাখার ছেলেমেয়ে হবে। সাড়ে তিন মাস চলছে।
সত্যি?
হ্যাঁ। কনফার্মড। এ-কথা জানার পরই আমি ঠিক করলাম—কোর্টে গিয়ে সব স্বীকার করবো।
দেবনাথ! এ-কথার মানে কী?
বুঝতে পারলে না? আমার বাবা আমার কাছে কিছু স্বীকার করে যাননি। কিন্তু আমার ছেলে বা মেয়ে যাই হোক—সে অন্তত বুঝতে পারবে, তার বাবা যাই করে থাকুক—সত্যি কথা বলেছিল।
সত্যি কথা বললেই কি সবকিছু মিটে যায়? এ-কথা স্বীকার করলে তোমার জেল হবেই। তুমি বিশাখাকে এই অবস্থায় ফেলে জেলে যাবে? তোমার সন্তান যখন জন্মাবে—
তাহলে আমি কী করবো?
তুমি কেস চালিয়ে যাও! বিচারে যদি ছাড়া পাও তবে শুধু শুধু তুমি জেল খাটতে যাবে কেন?
দেবনাথ আবার হাসল। বলল, আমি ওই দোষগুলো করেছি জেনেও তুমি আমাকে কেস কনটেস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছো? তুমি বলছো, অপরাধ করেও আমার শাস্তি পাওয়া উচিত নয়?
দেবনাথ এমনভাবে প্রশ্নটা রাখল যে, আমি প্রায় ‘না’ বলে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলুম। আমি নিজে একজন বিবেকবান নাগরিক হয়ে কী করে একজন অপরাধীকে প্রশ্রয় দেবো? কিন্তু দেবনাথের সমস্ত ব্যাপারটাই যেন একটা চক্রান্ত, সে কি এক ভয়ংকর প্রতিশোধ নিতে চায় বিশাখার বিরুদ্ধে। গর্ভবতী অবস্থায় বিশাখাকে ফেলে গিয়ে সে হাসতে হাসতে জেলে যেতে চাইছে। বাপের বাড়িতে গিয়ে পর্যন্ত মুখ দেখাতে পারবে না। হাসপাতালে সবাই জানবে, নবজাতকের পিতা একজন জেলের কয়েদি।
আমি তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, এ-কথা তুমি বিশাখাকে এখনও বলোনি?
একটা উদাসীন নিশ্বাস ফেলে দেবনাথ বলল, বিশাখাকে আর বলে কী হবে। তার শরীর এখন ভালো না। তোমার কি ধারণা, জানলেও বিশাখা আমাকে আটকাবে?
তুমি নিজের অপরাধের বোঝা বিশাখার ওপরেও চাপিয়ে দিতে চাইছো কেন?
আমি বিশাখাকে খুব যত্নে রেখেছি এতদিন। প্রত্যেক বছর পুজোর সময় তাকে নিয়ে গেছি রানিক্ষেত কিংবা উটকামণ্ড কিংবা ডালহৌসি। এখন আমার বিপদের সময় সে অংশ নেবে না? নিশ্চয়ই নেবে—বিশাখা সেই রকমই মেয়ে।
চলো, আমি বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
যাবে? আমি জানতাম তুমি যাবে। আগে রাজি হলেই পারতে। তাহলে এতক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে হত না। বিশাখার সামনে গিয়ে তো এইসব কথাগুলোই আবার বলতে হবে।
একটা ট্যাক্সি ডেকে দুজনে উঠে বসলাম। আর একটাও কথা বললাম না ওর সঙ্গে। দেবনাথের বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামতেই দেখলাম মনুজেশ ওই বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে। আমাদের দেখেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলল, সুনীল, ট্যাক্সিটা ছেড়ো না। ইয়ে, দেবনাথবাবু, আপনি ওপরে যান। বিশাখা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে, আমি আর সুনীল গিয়ে একজন ডাক্তার ডেকে আনি—
দেবনাথ বিনা উত্তেজনায় মৃদু হাস্যে বলল, আপনাদের যেতে হবে না। আপনারাও ওপরে আসুন। আমি টেলিফোনে আমাদের চেনা ডাক্তারকে ডেকে আনছি!
বসবার ঘরেই সোফার ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে বিশাখা। পা দুটো গোটানো, কিন্তু একটা হাত ঝুলছে, কাঁপছে একটু একটু। একজন দাসী তার মাথায় জল ঢেলে দিচ্ছে, ভিজে গেছে কার্পেট। দেবনাথ আমাদের দিকে তাকিয়ে, ক্ষমাপ্রার্থীর ভঙ্গিতে বলল, চিন্তার কিছু নেই। ওর এরকম আগেও দু-একবার হয়েছে। আপনারা বসুন।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেবনাথ পুরনো কালের সবুজ রঙের স্মেলিং সল্টের শিশি বার করল। বিশাখার নাকের কাছে সেটা ধরতেই একটু বাদে জ্ঞান ফিরে এল তার। চোখ মেলে আমাকে দেখেই বিশাখা ধড়মড় করে উঠে বসল। উদভ্রান্তভাবে ঘরের সবার দিকে পর্যায়ক্রমে তাকালো একবার, মনুজেশের দিকে তার দৃষ্টি দু-এক মুহূর্ত থেমে রইল। তারপর দাসীকে বলল, ঠিক আছে, সুরোর মা, তুমি এখন যাও!
বিশাখা আমাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকলো! প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, সুনীলদা, তুমি খবর নিয়েছিলে?
এক মুহূর্তও দ্বিধা করলাম না। আমি উৎফুল্ল ভাব এনে বললাম, মেসোমশাইয়ের সঙ্গে দুদিন আমার ট্রাংককলে কথা হয়েছে।
কী?
ওর কোনো দোষ নেই। সমস্ত অভিযোগ মিথ্যে। খুব সম্ভবত অন্য লোকের সঙ্গে ওকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। আবার ফ্রেস তদন্ত হবে।
ঘাড় ফেরাতেই দেখি, দেবনাথ আমার দিকে চেয়ে নিঃশব্দে হাসছে। বিশাখাও হাসলো স্বামীর দিকে চেয়ে। তারপর আবার আমাকে জিজ্ঞেস করল, দু-এক মাসের মধ্যেই তোমার বিয়ে? মনুজেশদার মুখে শুনলাম! কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে?
বললেও বলতে পারতাম যে, মনুজেশকে আমি ও কথা ঠাট্টা করে বলেছি। বিয়ে করার কথা আমার মনেই পড়ে না। কিন্তু সেকথা বলতে পারলাম না। লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললাম, এখনও একেবারে ঠিক হয়নি। কথাবার্তা চলছে। না, মেয়েটিকে তুমি চেনো না।
ঘরের সবারই এখন হাসিমুখ। মানুষের হাসিমুখ দেখতে সত্যি খুব ভালো লাগে, এর জন্য দু-একটা ছোটোখাটো মিথ্যে বলায় কোনো দোষ নেই।
দেবনাথ আত্মহত্যা করার দেড় বছর পর মনুজেশ একদিন আমার বাড়িতে এল। মনুজেশ অনেকটা বদলে গেছে, রীতিমতন দায়িত্ববান গম্ভীর ধরনের মানুষ এখন। চিন্তিতভাবে বলল, সোমনাথ বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। বিশাখার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে একেবারে।
বেশ কিছুদিন আমি কলকাতায় ছিলাম না। আমাকে কটেজ ইন্ডাস্ট্রির ডেপুটি সেক্রেটারি করা হবে না পুরুলিয়ার এ ডি এম করে পাঠানো হবে—এই নিয়ে টালবাহানা চলছিল। আমি জোরজার করে জয়েন্ট ডাইরেক্টরকে ধরে চলে গিয়েছিলাম পুরুলিয়া। বেশ শান্তিতে ছিলাম। ছুটিতে মাত্র দশ দিনের জন্য এসেছি, মনুজেশ কী করে খোঁজ পেয়ে গেছে।
যে শুক্রবার মামলার ডেট ছিল দেবনাথের, তার আগের দিন রাত্তিরে সে আত্মহত্যা করে। আজও আমি দেবনাথের আত্মহত্যার কারণটা ঠিকমতন বুঝতে পারিনি। ও কি নিশ্চিত জানতোই যে ওর শাস্তি হবেই—তাই তার হাত এড়িয়ে গেল? অথবা, নিজের সন্তানকে—জেলখাটা কয়েদির সন্তান—এই অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়ে গেল? কিংবা, বিশাখার কাছে আমি বলেছিলাম, দেবনাথ নির্দোষ—সেটা মিথ্যে প্রমাণ করার জন্যই ও মরে দেখিয়ে দিয়ে গেল? দু-এক বছরের জেল খাটাই-বা এমন আর কী! কি এমন অভিমান ছিল তার, যে-জন্য সে আর বাঁচতে চাইলো না? নৈরাশ্য থেকে মরেনি দেবনাথ, সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠেই সে আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু দেবনাথের মৃত্যুর পর আমি আর বিশাখার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। আমি কাপুরুষ।
মনুজেশের মুখেই শুনলাম, খুব সুন্দর ফুটফুটে ছেলে হয়েছে বিশাখার। দেবনাথের ছোটোভাই সোমনাথ প্রথম কিছুদিন বেশ ভালো ব্যবহারই করেছিল ওর সঙ্গে। এখন আবার আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। অফিসে বোধহয় ঘুষ নিতে পারে না সোমনাথ, কিন্তু টাকার লোভ তারও কম নেই। পাটনার ব্যাংকে বিশাখার নামে জমা দেওয়া একগাদা টাকার খোঁজ সে পেয়ে গেছে কী করে—এখন সে সেই টাকারও অংশ চায়। তার দাদা পৈতৃক সম্পত্তিই সরিয়ে রেখেছে বৌদির নামে—এই তার অভিযোগ। নইলে বৌদি প্রকাশ্যে স্বীকার করছে যে, ওই টাকা ঘুসের টাকা!
মনুজেশ বলল, বিশাখা কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না। কিন্তু ও যতদিন না রাজি হয়, আমি ওর জন্য অপেক্ষা করতে চাই।
কী ব্যাপারে?
আমি বিশাখাকে বিয়ে করতে চাই।
বাঃ, ভালো কথাই তো। বিশাখার বাবাও তো মারা গেছেন, তাই না?
হ্যাঁ। ওইটুকু বাচ্ছা নিয়ে ওর পক্ষে একা একা থাকা কি সম্ভব?
তা বিশাখা রাজি হচ্ছে না কেন?
ঠিক অরাজি নয়, এক একবার রাজি হয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে, মনস্থির করতে পারছে না আর কী!
ধরো, বিশাখার সঙ্গে তোমার বিয়ে হল। তাহলে তুমি ওই পাটনা ব্যাংকের টাকাটা নিয়ে কী করতে চাও?
মনুজেশ মুখ কুঁচকে বলল, আমি ও টাকা ছুঁতেও চাই না। তবে, দেবনাথ মারা যাবার পর কেস ডিসমিস হয়ে যায়, আসল ব্যাপারটা আর জানা যায়নি। কিন্তু তুমিই তো বিশাখাকে বলেছিলে যে, তোমার মেসোমশায়ের কাছ থেকে জেনেছো, দেবনাথ নির্দোষ ছিল। তাহলে ও টাকাটাও নির্দোষ। ওটা বিশাখার ছেলের জন্যই জমা রাখা উচিত। সোমনাথকে দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
আমি মনে মনে হিসেব করে দেখলুম, কলকাতায় আমি আর মাত্র দুদিন থাকবো। এর মধ্যে আর ওদের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কোনো রকমে হালকাভাবে কথা বলে কাটিয়ে দিলেও হয়। মনুজেশটা দারুণ ভাবপ্রবণ দেখছি। একজন বেদনাগ্রস্ত লোকের বাচ্চাসমেত বিধবাকে ও বিয়ে করতে চায়। প্যাচপ্যাচে প্রেম বলে একেই। বুঝবে ঠ্যালা! আমার আর কী!
বললাম, তা বটে! সোমনাথের এটা অন্যায় দাবি! সে তো আর কচি ছেলেটি ছিল না যে তার ভাগের টাকা দেবনাথ ঠকিয়ে নেবে!
তুমি বিশাখাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?
কী?
এই ইয়ে, মানে ও যাতে সোমনাথের চাপে পড়ে কিছু ছেড়ে না দেয়। ও তো তোমাকে একেবারে দাদার মতন ভক্তি করে!
আজকাল সব মেয়েরা নিজের দাদাকেও তেমন ভক্তি করে না।
বিশাখা কিন্তু করে। তোমার কথা উঠলে—
তুমি প্রায়ই যাও বুঝি ওর কাছে?
প্রায় রোজ। একা একা থাকে ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে—তা ছাড়া দেখো, বিশাখা ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
সেদিন, তুমি থাকতে থাকতেই বিশাখা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল কেন?
ও কথা থাক। ও কথা আর তুলো না!
ঠিক আছে। কিন্তু দেবনাথের ছেলেকে তুমি নিজের ছেলের মতন মানুষ করতে পারবে?
কেন পারবো না? শিশুদের কোনো দোষ লাগে না।
দাঁড়াও, আমি পোশাকটা পালটে আসছি। আমিও তোমার সঙ্গে বেরুবো।
মনুজেশকে বসিয়ে ভিতরের ঘরে এলাম। কাচা শার্ট প্যান্ট রয়েছে, কিন্তু একটাও পরিষ্কার গেঞ্জি পাচ্ছি না। ঠিক দরকারের সময় যে এগুলো কোথায় যায়! চাকরবাকর দিয়ে আর কাজ চলে না। নাঃ, এবার একটা বিয়ে করেই ফেলতে হবে। হোম সেক্রেটারি তাঁর ভাগনি সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিয়ে তো মানুষ শেষ পর্যন্ত একটি মেয়েকেই করে, হোম সেক্রেটারির ভাগনিই বা মন্দ কী! ওঁর এখনও রিটায়ার করতে তিন বছর দেরি আছে, এর মধ্যে বিয়ে করাই আমার পক্ষে সুবিধাজনক। একবার মফস্বলে গেলে আর সহজে কলকাতায় পোস্টিং হয় না—এখন ওরকম কারুর সুপারিশ ছাড়া কলকাতায় ফেরার আর আশা নেই। ভাবতে ভাবতে একটু হাসি পেল আমার। সামান্য চাকরিতে বদলির সুবিধের জন্য আমি বিয়ের কথা ভাবছি? কিন্তু এমন অস্বাভাবিকই বা কী, অনেকে তো টাকার জন্যও বিয়ে করে। ভালবাসার জন্য বিয়ে করে আর ক-জন, বিশেষত তিরিশ বছর বয়েস হয়ে গেলে—মনুজেশের মতন দু-একটা মূর্খ ছাড়া?
বিশাখাকে দেখে একেবারে চোখ ভরে যায়। এখন সত্যিই একটু রোগা হয়েছে, কিন্তু মোমবাতির আলোর মতন রূপ। কোমল চোখ দুটিতে বিষণ্ণতার ছায়া। বাচ্চাটাও দারুণ সুন্দর হয়েছে, বছর খানেক বয়েস, দেবশিশুর মতন মুখশ্রী, দেয়াল ধরে ধরে টলমল করে হাঁটে, মুখভরতি খলখলে হাসি, বিশাখা আর বাচ্চাটার মুখের দিকে পর পর তাকিয়ে, আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠলো। এ আর কিছু নয়, সুন্দর জিনিস দেখার বেদনা। মনুজেশ এই গোটা সুন্দর দৃশ্যটাই আয়ত্ত করতে চায়, বুঝতে পারলাম। আমার পক্ষে দূর থেকে দেখাই যথেষ্ট। বেচারা দেবনাথ, ওর জন্য মায়া হল আমার, ও এই সুন্দর দৃশ্যটি একটুও ভোগ করতে পারলো না—চলে গেল কোথায় কোন অন্ধকারে। খানিকটা অভিমান মেশানো গলায় বিশাখা বলল, কেমন আছো?
ভালো আছি।
তারপরেই, মনুজেশকে চমকে দিয়ে আমি আবার বললাম, এবার কিন্তু আমি তোমার কাছে প্রার্থী হয়ে এসেছি।
ফ্যাকাশেভাবে হেসে বিশাখা বলল, আমার কাছে? আমার কাছে কি চাইবে তুমি?
বিশাখার চোখে নিবিড় কৌতূহল। সেদিকে আমার দুচোখ নিবদ্ধ রেখে আমি বললাম, পুরুলিয়াতে সরকারি উদ্যোগে আমরা একটা উন্মাদ আশ্রম খুলছি। যে-সমস্ত পাগলকে তাড়িয়ে দেয় আত্মীয়-স্বজনরা, যাদের কেউ দেখবার নেই—তাদের চিকিৎসার জন্য। টাকার জন্য কাজ আটকে আছে। জনসাধারণের কাছ থেকেও সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, অনেকে জমি কিংবা টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে। তোমার তো পাটনার ব্যাংকে অনেকগুলো টাকা আছে, তুমি তা এখানে দিয়ে দাও না!
মনুজেশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ওর ছেলের ভবিষ্যতের জন্য লাগবে না?
আমি মনুজেশের দিকে ফিরে বললুম, আজকালকার ছেলেদের জন্য বিষয়-সম্পত্তি রাখতে নাই। নিজের পায়ে দাঁড়ানোই ভালো। আর ওর লেখাপড়ার খরচ চালাবার উপায় নিশ্চয়ই আছে?
মনুজেশ এবারও সঙ্গে সঙ্গে বলল, তা আছে!
বিশাখার দিকে ফিরে, আবার তার চোখে চোখ রেখে বললুম, আত্মা বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে দেবনাথের আত্মা নিশ্চয়ই এতে খুশিই হবে।
বুদ্ধিমতী মেয়ে বিশাখা, বুঝতে ওর দেরি হল না। এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে বলল, ঠিক আছে, আমি এক্ষুনি চেক লিখে দিচ্ছি—কার নামে চেক লিখতে হবে?
লেখো, ডি এম অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, পুরুলিয়া মেন্টাল হোম স্কিম।
মনুজেশ বলল, এক হিসেবে এই-ই ভালো হল। ও টাকা সোমনাথকে দেবার কোনো মানে ছিল না।
ঘরের মধ্যে যেন একটা টাটকা তাজা হাওয়া খেলে গেল। বিশাখা লঘু পায়ে উঠে গেল চা করতে। আমি ওর ছেলেটাকে আদর করতে লাগলুম। পর্দার কাপড়ের রং না মিললে নিউ মার্কেটে ছুটতো বিশাখা, দুর্লভ পারফিউম সংগ্রহ করা ছিল ওর শখ—সেই বিশাখা এখন নির্মোহ হতে পেরেছে।
চা নিয়ে ফিরে এসে বিশাখা একটু হালকাভাবে বলল, শুধু এই চাইতে এসেছো? আর কিছু চাইবে না?
হ্যাঁ, আর একটা আছে। এবার সত্যি সত্যি আমি বিয়ে করছি, মাস তিনেকের মধ্যে।
কাকে? চেনাশুনো কেউ?
না, আমাদের হোম সেক্রেটারির ভাগনি। মেয়েটি এমএ পাস—সেই বিয়েতে তোমায় যেতে হবে। শুনেছি, এখনও তুমি বাড়ি থেকে বেরোও না—আমার বিয়েতে কিন্তু তোমাকে যেতেই হবে।
যাবো, নিশ্চয়ই যাবো! আমার বিয়ের সময় তুমি পিঁড়ি ধরেছিলে, সেকথা মনে আছে?
আমার সব মনে আছে।
সব?
হ্যাঁ, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফিসের পিছনে দিকের পুকুরে বসে সেই সাদা রাজহাঁস দেখা পর্যন্ত!
সেটা কবে বলো তো?
সেটা তোমার মনে নেই তো? সেই দিনটাই আমার বেশি মনে আছে।
বিশাখার মুখটা একটু উদাস হয়ে গেল। অন্যমনস্কভাবে ছেলের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল।
আমি বললাম, আমার বিয়ের আগে, আর একটা বিয়ের ঘটকালি করে যাবো নাকি?
বিশাখা আর মনুজেশ পরস্পরের চোখের দিকে একবার তাকালো। তারপর বিশাখা শুকনো গলায় বলল, না, এখন না, আর কিছুদিন পরে।
মনুজেশও বলল, হ্যাঁ, আর কিছুদিন যাক।
আমি বললাম, মনুজেশ তুমি তাহলে বসো। আমি এবার উঠি। আমার একটা কাজ আছে।
সিঁড়ি পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিতে এল বিশাখা। সিঁড়ির রেলিং-এ আমার হাতের ওপর হাত রাখল। আরও দুদিন এ রকম হাত রেখেছিল, ওর বিয়ের দিন, আর যেদিন দেবনাথ সম্পর্কে খোঁজ নেবার জন্য আমাকে অনুরোধ জানিয়েছিল। ওর হাতে সামান্য চাপ দিয়ে আমি নেমে এলাম।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার আগে আর একবার পিছন ফিরে দেখলাম, তখনও বিশাখা দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির ওপর। চওড়া কালো পাড়ের শাড়ি পরা সেই অপরূপ মূর্তিকে আমি আর একবার দেখে নিলাম ভালো করে। তারপর বাইরে বেরিয়ে এলাম।
মনে মনে বললাম। বিশাখা, তুমি আর কখনও আমাকে ডাকবে না, আর আমাকে তোমার প্রয়োজন হবে না। আমি তোমার কাছে একটা কথাও রাখিনি, একটাও মনের কথা বলিনি। কিন্তু বিশাখা, আমি তোমাকেই ভালবাসি। জীবনে দেরি করে যে ভালোবাসার কথা বোঝা যায়, সে ভালোবাসায় কিছুই পাওয়া যায় না, কিন্তু সারা জীবনে তা আর ভোলাও যায় না।
আমার একটি পাপের কাহিনি
আমার একটি পাপের কাহিনি
মেয়েটির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল একটা পার্টিতে। তখন আমি থাকতাম অ্যারিজোনায়। মন-টন খুব খারাপ—অনেকদিন বাড়ি থেকে চিঠি পাই না। বন্ধু-বান্ধবও বিশেষ নেই। আমার মনমরা অবস্থা দেখে আমাদের ডিপার্টমেন্টের এক অধ্যাপক রিচার্ডসন আমাকে জোর করে একটা পার্টিতে ধরে নিয়ে গেলেন। সেখানেও ভালো লাগছিল না। চুপচাপ একা বসেছিলাম।
পার্টি চললো রাত দুটো পর্যন্ত, তারপর আস্তে আস্তে বাড়ি ফেরার পালা। প্রায় পঞ্চাশজন নারী-পুরুষ উপস্থিত, প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই একবার না একবার কথা বলা হয়ে গেছে। অনবরত ভদ্রতার হাসি হাসতে হাসতে চোয়াল ব্যথা হবার অবস্থা। মেয়েরা-ছেলেরা টুইস্ট নেচে-নেচে এখন ক্লান্ত, গ্লাসের পর গ্লাস শুধু বরফ মেশানো হুইসকি খেয়ে আমার মাথাটা ভারী ভারী লাগছে—এবার বাড়ি ফেরার পালা।
আমার গাড়ি নেই, সেখান থেকে আট মাইল দূরে আমার অ্যাপার্টমেন্ট—অত রাত্রে ফেরার অন্য কোনো উপায় নেই। অপেক্ষা করে আছি—অধ্যাপক রিচার্ডসন কখন উঠবেন—তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে ফিরবো। রিচার্ডসনের বয়েস ষাটের কম নয়, কিন্তু ছেলে-ছোকরার মতন তিনিও স্যুট-টাই পরা ছেড়েছেন—প্যান্টের ওপর শুধু উলের গেঞ্জি—ছেলে-ছোকরাদের চেয়েও বেশি উৎসাহে হাসছেন, হাসাচ্ছেন—মাঝখানে একবার দু-চক্কর নেচেও নিলেন। উৎসাহ তাঁর কিছুতেই ফুরোয় না।
হাতের গ্লাস খালি, আর এক গ্লাস খাব কিনা মনস্থির করতে পারছি না, বেশি নেশায় যদি লটকে পড়ি—তাহলে এই বিদেশ-বিভুঁয়ে বদনাম হয়ে যাবে—এই সময় রিচার্ডসন এসে বললেন, ফিল লাইক গোয়িং হোম?
তক্ষুনি মনস্থির করে আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললুম ইয়েস। চলো, এবার বাড়ি যাওয়া যাক। ঘুমের কথা বললুম না, বললুম, কাল সকালে উঠেই একটা পেপার তৈরি করতে হবে। যেন কত লক্ষ্মী ছেলে আমি, পড়াশুনোয় কী মন আমার। অধ্যাপক হেসে আমার কাঁধ চাপড়ালেন।
রিচার্ডসনের থান্ডারবার্ড গাড়ি সদ্য স্টার্ট নিয়েছে, হঠাৎ তিনি বললেন, ওঃ হো—মণিকাকেও তো পৌঁছে দেবো বলেছিলাম! তুমি যাও তো সরকার, মণিকাকে ডেকে আনো।
মণিকা? পার্টিতে তো একটাও বাঙালি মেয়ে দেখিনি। অবাক হয়ে বললুম, কে মণিকা? চিনি না তো?
অধ্যাপক বললেন, এখনো মণিকাকে চেনোনি? তুমি একটা বুদ্ধুরাম। এই পার্টিতে সেই তো সবচেয়ে মিষ্টি মেয়ে। দাঁড়াও, আমি ডেকে আনছি।
অধ্যাপক যাকে ধরে আনলেন, সে মোটেই বাঙালি মেয়ে নয়, ছিপছিপে তরুণী মেম এবং মিষ্টিই-বা কোথায়—হিংস্র বনবিড়ালীর মতন রিচার্ডসনের বাহু-বন্ধনে ছটফট করছে—কিছুতেই সে আসবে না। তখন রিচার্ডসন বললেন, না, এবার বাড়ি চলো, বড্ড নেশা হয়ে গেছে তোমার।
বুঝতে পারলুম, মেয়েটি ইটালিয়ান। কয়েকদিন আগেই একটা ইটালিয়ান সিনেমা দেখেছিলাম, আন্তোনিয়ানি’র ‘রাত্রি’—সেই বইতে উপনায়িকা ছিল মোণিকা ভিট্টি নামে একটি মেয়ে। অনেক ইটালিয়ান মেয়ের নামই বাঙালি-বাঙালি শোনায়।
রিচার্ডসন জোর করে মেয়েটিকে গাড়ির মধ্যে বসালেন। বললেন—সরকার, এই হচ্ছে মোণিকা, আর মোণিকা, মিট সুনীল।
মেয়েটি দায়সারা ভাবে আমার দিকে ভালো করে না চেয়েই বলল, ‘হ্যালো—’ তারপর সেই ছেড়ে-আসা পার্টির দিকে সতৃষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল!
গাড়ি এসে দাঁড়াল আমার অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর সামনে। আমি নামবার আগেই মণিকা সেখানে হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল। অধ্যাপক হাত নাড়িয়ে বাই বাই বলে হুস করে গাড়ি ছেড়ে দিলেন।
নির্জন রাস্তায় আমরা দুজন দাঁড়িয়ে। মেয়েটি কাছাকাছি কোথাও থাকে বোধ হয়। ভদ্রতা করে আমি বিদায় নেবার জন্য বললুম, গুড নাইট! মেয়েটিও বলল, গুন্নাইট। আমি বাড়ির দিকে পা বাড়ালুম। মেয়েটিও সেদিকে এল। তারপর একই বাড়ির প্রবেশপথে এসে দুজনে আবার মুখোমুখি দাঁড়ালুম। আমার ধারণা হল, মেয়েটা অতিরিক্ত মাতাল হয়ে সব কিছু ভুলে গেছে নিশ্চয়ই! আজ ঝামেলা বাধাবে দেখছি! মণিকা ভুরু কুঁচকে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি আমার সঙ্গে আসছো কেন? লিভ মি অ্যালোন!
আমার রাগ হল। আমি বললুম, মাই ডিয়ার ইয়াং লেডি, আমি এই বাড়িতেই থাকি—তুমিই আমার পিছন পিছন আসছো!
মণিকা এবার হাসল! বলল, ইজ ইট সো? তারপর হাত ব্যাগ থেকে একটা চাবি বার করে বলল, এই দ্যাখো, আমার ঘরের চাবি, নাম্বার এইট্রি থ্রি! তোমার কত?
আমার ঘরের নম্বর তিয়াত্তর। ন-তলা বাড়িতে অন্তত নম্বই জন ভাড়াটে—সকলকে চেনা সম্ভব নয়। তা ছাড়া আমি এসেছি মাত্র একমাস। আমি বললুম, আমার নম্বর তিয়াত্তর—তার মানে তোমার ঠিক নীচের ঘরটাই আমার। আমি যে প্রায়ই ওপরে ধুপধাপ আওয়াজ শুনি, এখন বুঝলুম, সেটা তোমারই মধুর পায়ের ধবনি।
মণিকা এবার খিলখিল করে হেসে বলল, হ্যাঁ, আমি নাচ প্র্যাকটিস করি।
তারপর হঠাৎ যেন খেয়াল হল, জিজ্ঞেস করল, এই, তুমি কোন দেশের লোক? ইজিপ্ট?
আমি মুচকি হেসে বললুম, না।
তবে? জাপান?
ওঃ, পৃথিবী এবং তার মানুষজন সম্পর্কে কী জ্ঞান ওর! মজা দেখার জন্য আমি সেবারও বললুম, না।
বুঝতে পেরেছি, তুমি টার্কিশ।
উঁহু।
তবে, তবে আফ্রিকান?
না! এবারও হল না।
এই, বলছো না কেন? তুমি কে?
আমি একজন ইন্ডিয়ান।
ইন্ডিয়ান শুনে ও একটু সচকিত হয়ে তাকাল। একটু সন্দেহ আর অবিশ্বাস ওর মুখে খেলা করে গেল। বুঝতে পারছি, ও আমাকে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান ভাবছে। ফের জিজ্ঞেস করল, রিয়েলি? ইউ আর অ্যান ইন্ডিয়ান?
হ্যাঁ, খাঁটি ইন্ডিয়ান।
এবার মণিকার চোখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, বুঝতে পেরেছি, ইউ আর অ্যান ইন্ডিয়ান ফ্রম ইন্ডিয়া—
আমি প্রাচীন নাইটদের কুর্নিশের ভঙ্গিতে দুহাত ছড়িয়ে কোমর বেঁকিয়ে বললুম, সি, সিনোরিটা!
হাউ ওয়ান্ডারফুল ইট ইজ টু মিট আ রিয়াল ইন্ডিয়ান—
গ্র্যাৎসি সিনোরিটা!
মণিকা বলল, এসো, এখানে একটু বসি।
আমরা দুজনে পর্চে সিঁড়ির ওপর বসে পড়লুম। মধ্যরাত ঝিমঝিম করছে। চওড়া রাস্তায় ধবধবে জ্যোৎস্না। ওপারে একটা উইলো গাছের মাথার ওপর দিয়ে হাওয়া বয়ে গেলে একটা করুণ শব্দ হয়—এগুলোকে এইজন্য উইপিং উইলো বলে। আগস্ট মাস—এখন শীতের চিহ্ন নেই।
মণিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে আমার দেশের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। ইটালির অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে মণিকা, আমেরিকায় পড়তে এসেছে—পড়াশোনার চেয়ে হই-হুল্লোড়েই বেশি উৎসাহ। ভারতবর্ষ সম্পর্কে ও কিছুই জানে না—যাকে বলে কিছু না—এমনকি গান্ধিজির নামটাও ওর পেটে আসছে মুখে আসছে না। কোথাও শুনেছে, মনে করতে পারছে না ঠিক। আমার ভারি মজা লাগতে লাগল। অথচ ইটালি সম্পর্কে আমরা অনেক খবর রাখি!
গল্প করতে করতে রাত তিনটে বাজলো, তখন উঠলুম। লিফটে কোনো চালক নেই, অটোমেটিক। বোতাম টিপে দুজনে দাঁড়িয়ে রইলুম। আমার সাততলা ওর আটতলা—আমাকেই আগে নামতে হবে—সাততলায় আসতে আমি বললুম, গুড নাইট মণিকা!
অভ্যেস মতন মণিকা গালটা এগিয়ে দিল। ওখানে বিদায়-চুম্বন দেবার কথা। ইচ্ছে ছিল ভদ্রতাসূচক একটা ঠোনা মারা চুমুই দেবো গালে—কিন্তু হঠাৎ মাথার গোলমাল হয়ে গেল—যাকে বলে ‘প্রগাঢ় চুম্বন’—হঠাৎ তাই একখানা দিয়ে ফেললুম, তারপর বললুম, কাল দেখা হবে তো?
পরের দিন রবিবার। সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। আমি পূর্ববঙ্গের ছেলে—বৃষ্টি পড়লেই মনটা একটু উদাস হয়ে যায়। নিজে রান্না করে খেতে হবে—এই সব বৃষ্টির দিনে আর রাঁধতে ইচ্ছে করে না একটুও। সকালে গুটি চারেক হট ডগ সেদ্ধ করে নিয়েছিলাম, চায়ের সঙ্গে খাবার মতো—তাতেই পেট অনেকটা ভরে আছে—আজ আর দুপুরে রান্নার ঝামেলায় যাবো না—না হয় এক টিন চিকেন-অনিয়ন সুপ গরম করে নেবো!
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে পূর্বদিকের বড়ো জানলাটার পাশে হাতে বই নিয়ে বসলুম। রাস্তার ওপারে একটা গ্যাস স্টেশন, দূরে দেখা যায় ক্যাপিটালের চূড়া।
দুপুর একটা নাগাদ দরজায় ধাক্কা। খুলতেই মণিকা এসে ঢুকল। তখনও ড্রেসিং গাউন পরা, চুল এলোমেলো, হাতে একটা চিঠি লেখার প্যাড আর কলম, খুব ব্যস্ত ভাব। সারা সকাল বোধ হয় বিছানাতেই শুয়ে ছিল। এই কাণ্ড কোনো ইটালিয়ান মেয়ের পক্ষেই সম্ভব। ড্রেসিং গাউন পরে, কোনো সাজ পোশাক না করে—এক দিনের চেনা কোনো বন্ধুর ঘরে আর কোনো জাতের মেয়ে আসবে না।
ব্যস্তভাবে মণিকা বলল, এই, তোমার পুরো নামের বানানটা কী? ছানিল? সুননীল? তারপর কি যেন?
আমি হাসতে হাসতে বললুম, কেন, আমার নাম দিয়ে কী হবে?
এই দ্যাখো না, মায়ের কাছে চিঠি লিখছি।
গড়গড় করে মণিকা ইটালিয়ান ভাষায় কী যেন পড়ে গেল! এক বর্ণও বুঝলাম না। জিজ্ঞেস করলুম, এর মানে কী? ইংরেজিতে বলো।
একটু হকচকিয়ে তাকিয়ে মণিকা ইংরেজি অনুবাদে বলল, মা, কাল রাতে আমার কী অভিজ্ঞতা হয়েছে, তুমি ভাবতে পারো? তুমি কল্পনাই করতে পারবে না! একজন ভারতীয়, সত্যিকারের ভারতবর্ষের লোক—সেই সুদূর বে-অফ বেঙ্গলের পাড়ে থাকে—তার সঙ্গে পরিচয় হল। শুধু তাই নয়, আমরা এক বাড়িতেই থাকি। ছেলেটি প্যান্ট শার্ট পরে, গায়ের রং জলপাই ফলের মতন, ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, কথায় কথায় হাসে—
আমি হো-হো করে হাসতে লাগলুম। মণিকা বলল, এই হাসছো কেন? আমার ইংরেজি ট্রানস্লেশন খারাপ হচ্ছে?
উত্তর দেবো কী? আমি তখনও হাসছি। তারপর বললুম, আমিও আমার মাকে চিঠি লিখবো—না, মঙ্গলগ্রহের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, যে দুপুর একটাতেও ড্রেসিং গাউন পরে থাকে, বিশ্বসুদ্ধ সবাই ইটালিয়ান ভাষা জানে না শুনে অবাক হয়
এই-ই, ভালো হবে না বলছি!
আমার কাছে এসে মণিকা আমার মুখ চাপা দেয় হাত দিয়ে। আমি ওর হাত সরাবার জন্য ওকে কাতুকুতু দেবার চেষ্টা করি।
একটু বাদে মণিকা বলল, তুমি সত্যিই ইটালিয়ান ভাষা জানো না, তাহলে তো মুশকিল—আমি বেশিক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলতে পারি না।
আমি বললুম, ইংরেজি সম্পর্কে আমারও সেই দশা! বেশ তো মাঝে মাঝে তুমি ইটালিয়ান ভাষায় কথা বলবে, আমি বাংলায় বলবো! ঠিক বুঝে যাবো।
গুড! বাংলা? এ-ই, তুমি আমায় বাংলা শেখাবে?
নিশ্চয়ই!
এখন একটা সেনটেন্স শেখাও।
আমি তক্ষুনি ওকে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বাক্যটি শিখিয়ে দিলুম। বাক্যটির মানে জেনে নিয়ে তক্ষুনি আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে হাসতে হাসতে বলল—সুননীল, আমি টোমাকে বালোবাসি!—এবার তুমি ইটালিয়ান কোন কথাটা আগে শিখতে চাও, বলো?
আমি বললুম, আমি দু-চারটে শব্দ জানি। তা ছাড়া জানি, দু-লাইন কবিতা। শুনবে?
মণিকাকে চমকিত করে আমি আবৃত্তি করলুম ‘Incipit vita nova. Ecce deus fortior me, qui veniens dominibatur mihi.’ দান্তের সেই অমর কবিতা! তাঁর জীবনের পরম-রমণী সম্পর্কে কবি যা বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমার নতুন জীবন শুরু হল। আমার চেয়েও শক্তিমান এই দেবতা আমাকে আচ্ছন্ন করলেন।’ (মণিকা তো জানে না, বাঙালি ছেলেরা কত চালু হয়। কাল রাতে ওর সঙ্গে পরিচয় হবার পর আজ সকালেই আমি খুঁজে ওই লাইন দুটো বার করে বাথরুমে বারবার পড়ে মুখস্থ করে রেখেছি! কিন্তু, পরে বুঝেছিলাম, আমার ভুল হয়েছিল। মণিকাকে মুগ্ধ করার জন্য কোনো রকম চেষ্টা করার দরকার হয় না।)
মণিকা ডাগর চোখ মেলে সবিস্ময়ে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি দান্তের কবিতা পড়েছো? তুমি বুঝি কবিতা পড়তে খুব ভালোবাসো? আমি আস্তে আস্তে বললুম, যে কবিতা পড়তে ভালোবাসে না, আমি তাকে সম্পূর্ণ মানুষ বলেই মনে করি না।
আজ থেকে তাহলে আমরা দুজনে একসঙ্গে কবিতা পড়বো?
সত্যই মণিকাকে মুগ্ধ করার জন্য কোনো চেষ্টা করতে হয় না। সরল নিষ্পাপ ওর আত্মা। যা কিছু নতুন কথা শোনে, তাতেই অবাক বিস্ময় মানে। ভারতবর্ষ সম্পর্কে ও কিছুই জানতো না—তাই জানার নেশা ওকে পেয়ে বসে। রোমে কিছু ভারতীয় আছে বটে, কিন্তু মিলান শহর থেকে ২০ মাইল দূরে একটা ছোট্ট শহরের মেয়ে মণিকা, সেখানে কখনও কোনো ভারতীয় ও চোখে দেখেনি!
প্রায় প্রতিদিন সন্ধেবেলা মণিকা আমার ঘরে আসতে লাগল, দুজনে একসঙ্গে বসে গল্প করি, হাসি—খুনসুটি হয়—ক্রমশ আমরা অন্তরঙ্গ হয়ে পড়লুম। মাঝে মাঝে মণিকা আমার ঘরে এসে রান্না করে দেয়—দুজনে একসঙ্গে খাই। প্রথম প্রথম ভারতীয় রান্না সম্পর্কেও ওর ভয় ছিল। আমি যখন ওকে বললুম, আমরা, বাঙালিরা ম্যাকারুনি আর পিৎসা খাই না বটে, কিন্তু ভাত খাই, মশুর ডাল অর্থাৎ লেনটিল সুপ, নানা রকম মাছ—তোমাদের প্রিয় ইল অর্থাৎ বান মাছও খাই, ফুলকপি, বাঁধাকপি এবং মাংসের কোনোরকম রান্নাতেই আপত্তি নেই—অর্থাৎ ইটালিয়ানদের সঙ্গে আমাদের খাওয়ার খুব একটা তফাত নেই—তখন ও আশ্বস্ত হল।
কোমরে অ্যাপ্রন জড়িয়ে মণিকা যখন রান্নাঘরে গ্যাসের উনুনের সামনে দাঁড়াতো, তখন ভারি সুন্দর দেখাতো ওকে। এমনিতে খুব রূপসী নয় মণিকা—একটু বেশি লম্বাটে, উচ্চতায় প্রায় আমার কাছাকাছি—কিন্তু ভারি ছটফটে। সহজ স্বাভাবিকতার মধ্যে যে সৌন্দর্য—মণিকা সেই সুন্দরী। কোনোরকম আড়ষ্টতা নেই, কোনো পাপ নেই, অকপট সরল ওর ব্যবহার। ওর সাহচর্যে আমিও সৎ হয়ে উঠতে লাগলুম।
মাঝে মাঝে ওকে এক একটা কথা বলে ফেলে বিপদে পড়ি। একদিন ঠাট্টা করে ওকে বললুম, জানিস, আমাদের নিমতলার শ্মশানঘাটে একটা পাগলি দেখেছিলুম, তোকে দেখলে আমার তার কথা মনে পড়ে। এর পরই বিপদ—বোঝাও ওকে! প্রথমে বোঝাতে হবে নিমতলা কোথায়, তারপর বোঝাতে হবে শ্মশান কী জিনিস—সেখানে মানুষ পোড়ায় কেন? আমাদের দেশে সব পাগলিরাই রাস্ত-ঘাটে খোলা অবস্থায় ঘুরে বেড়ায় কিনা—তারা বৃষ্টির সময় কোথায় শোয়, কী খায়? বেশিক্ষণ ইংরেজি বলতে গেলেই আমার দম আটকে আসে—এসব বোঝাতে তো প্রাণান্ত!
একদিন কথায় কথায় ওকে শরৎচন্দ্রের একটা গল্প শোনাতে গিয়ে বলেছিলুম, জানিস, আমাদের দেশের মেয়েরা এমন—স্বামী অফিস থেকে ফিরলে বউরা অমনি তার জুতোর ফিতে খুলে দেয়, পাখার হাওয়া করে। মণিকা শুনে বলল, হাউ নাইস অ্যান্ড সুইট!
পরদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরেছি, মণিকা আগে থেকেই আমার ঘরে বসেছিল, আমি ঢুকতেই হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বসে বুটজুতোর ফিতে খুলতে গেল। মাথার ঝাঁকরা চুল দুলিয়ে বলল, এইরকমভাবে বসে তোমার দেশের মেয়েরা?
নানা কারণে সেই সময়টায় আমেরিকা আমার ভালো লাগছিল না। সব সময় পালাই পালাই মন। এখানে কোনো অভাব নেই, অফুরন্ত মদ, প্রচুর মেয়ের সাহচর্য, অর্থের চিন্তা নেই, কাজকর্মও বিশেষ নেই—তবু ভালো লাগছিল না, তবু কলকাতার ভিড়ের ট্রাম-বাস, রাস্তার কাদা আর চায়ের দোকানের বন্ধুবান্ধবের জন্য আমার মন কেমন করে। একমাত্র মণিকার জন্যই কিছুটা ভালো লাগছিল। মণিকার সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে কিরকমভাবে যেন সময়টা বেশ কেটে যেত অজান্তে।
একদিন একটা পার্টিতে আমি আর মণিকা দুজনেই গেছি। খুব হইচই আর হুল্লোড়ের পার্টি। মণিকা নাচতে ভালোবাসে—এর ওর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে নাচছে। আমি অনবরত হুইসকি খেয়ে যাচ্ছি। এই সময় ডম বলে আমার চেনা একটা ছেলে এসে বলল, এ-ই সুনীল। তুমি কী খাচ্ছো স্কচ না বার্বন? এসো, একটু জামাইকা রাম খেয়ে দ্যাখো! খুব ভালো জিনিস।
একসঙ্গে দুরকম মদ আমার সহ্য হয় না। কিন্তু ঝোঁকের মাথায় রাজি হয়ে গেলুম। ডম খুব মস্তানি দেখাচ্ছিল—এক একটা রামের গেলাস নিয়ে এক চুমুকে শেষ করছে, আমিও ওর সঙ্গে পাল্লা দিতে লাগলুম। একটু বাদেই মাথায় নেশা লেগে গেল। আমি টলতে টলতে মণিকার সামনে গিয়ে বললুম, এসো মণিকা, তুমি আমার সঙ্গে নাচবে। তুমি আর কারুর সঙ্গে নাচবে না।
মণিকা খিলখিল করে হেসে বলল, ধ্যাৎ। তোমার নেশা হয়ে গেছে। তুমি চুপটি করে বসো।
না, নেশা হয়নি। আমি নাচবো।
আবার দুষ্টুমি? যাও, ওখানে গিয়ে বসো!
মণিকা, তুমি আমায় রিফিউজ করছো?
কী পাগলামি করছো। বলছি, তুমি ওখানে গিয়ে বসো। যাও—
মাতালের অপমানবোধ বড়ো সাংঘাতিক। আমার এমন অভিমান হল যেন মনে হতে লাগল, সমস্ত পৃথিবীই আমাকে অবজ্ঞা করছে! আমার আর বেঁচে থাকার কোনো মূল্যই নেই। আমি মাথা নীচু করে গুম হয়ে একটা সোফায় বসে রইলুম। আমার হাত থেকে বারবার সিগারেট খসে পড়তে লাগল।
বাড়ি ফিরতে হল একসঙ্গেই। ফেরার পথে আমি মণিকার সঙ্গে একটাও কথা বললুম না। লিফট এসে থামল আমার ঘরে তলায়। আমি বিদায় না জানিয়েই বেরুতে যাচ্ছি—মণিকা বলল, দাঁড়াও, আমি তোমাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসছি। আমার তখন মাথা ঘুরছে, আমার তখন হাত নেই, পা, নেই, গোটা শরীরটাই নেই, শুধু একটা প্রবল ভারী মাথা—তবু আমি রুক্ষভাবে বললুম, না কোনো দরকার নেই। থ্যাঙ্কস, থ্যাঙ্কস এ লট!
মণিকা জোর করে আমার বাহুর নীচে ওর হাত ঢুকিয়ে এগিয়ে এল। আমি ওকে সুদ্ধু দুলছি, তবু আমার মাথা প্রবল অভিমান ভরে বলছে, ওকে ছেড়ে দাও, ওকে ছেড়ে দাও, মেয়েদের কেউ কখনো বিশ্বাস করে?
কোনোরকমে অ্যাপার্টমেন্টের দরজাটা খুলে ঘরে পা দিয়েছি, কীসে একটা হোঁচট লাগতেই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠল। আমি সেখানেই পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলুম। আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান হল শেষ রাতে। সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসলুম। আমি কোথায়? আমি নিজের বিছানাতেই। আমার পা থেকে জুতো খুলে নেওয়া হয়েছে, গায়ে কোট নেই, গলায় টাই নেই—গায়ে কম্বল চাপা দেওয়া—পাশে মণিকা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। শিশুর মতো প্রশান্ত ঘুম তার মুখে। দরজার কাছে যেখানে আমি পড়ে গিয়েছিলাম—সেখানে অল্প-অল্প বমির দাগ—নিজের মুখে হাত দিলাম, কিছু নেই। মণিকা আমার জামা-জুতো খুলে দিয়েছে, বমি মুছেছে—তারপর আমার এই হেভি লাশ টেনে এনে বিছানায় শুইয়েছে। অনুশোচনায় ও গ্লানিতে মন ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা গভীর মমতাবোধে আচ্ছন্ন হয়ে গেল মন। মনে হল, আঃ, এই যে এই পৃথিবীতে আমি শুধু বেঁচে আছি—এটাই কি বিরাট ঘটনা। আমাকে এক বুক কাদার মধ্যে যদি শেকল দিয়ে বেঁধে ক্রীতদাস করেও রাখা হয় তবুও আমি বেঁচে থাকতে চাইবো!
খুব নরমভাবে আমি মণিকার কপালে হাত বুলোলুম একবার। মণিকা একটু কেঁপে উঠে ঘুমের ঘোরেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি নুয়ে ওর কপালে একটা চুমু খেলাম। মণিকা চোখ মেলে তাকালো, বলল, উঃ, বড্ড শীত করছে। আরও দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করতেই এক নিমেষে চলে এল উষ্ণতা। পাখির বাসার মতন গরম ওর বুক—সেখানে মুখ গুঁজে কাতরভাবে আমি বললুম, মণিকা, তুমি আমার ওপর রাগ করোনি? আমার কানের কাছে মুখ এনে মণিকা বাংলায় বলল—সুননীল, আমি টোমাকে বালোবাসি।
আবার জ্ঞান হারালুম। আমাদের দুজনের পোশাক ছিটকে পড়ল খাটের বাইরে। চুমু খেতে খেতে আমার জিভ ওর আলজিভ স্পর্শ করতে ছুটে গেল। আমার পিঠে এমন খিমচে ধরল মণিকা যে স্পষ্ট টের পেলুম সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। এক ধরনের অসহ্য সুখের যন্ত্রণায় গোঙাতে লাগলুম আমরা দুজনেই।
ঘুম ভাঙল বেলা ন-টায়। চোখ মেলেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ড্রেসিং গাউনটা চাপিয়ে, দরজার তলা থেকে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে আমি মুখ আড়াল করলুম। মণিকা তার আগেই স্নান সেরে নিয়েছে। কিচেনে টুং-টাং শব্দ শুনতে পাচ্ছি। একটু বাদে মণিকা আমাকে চা খেতে ডাকল।
চায়ের টেবিলে দুজনে নিঃশব্দ। পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছি। বেশ কিছুক্ষণ বাদে আমি গাঢ় স্বরে ডাকলুম, মণিকা—। ও বলল, চুপ, এখন কোনো কথা বলো না।
আমাকে একটা কথা বলতে দাও।
না, কিছু বলো না।
আমাকে বলতেই হবে। শোনো, যা হয়েছে তার জন্য আমি কোনো অনুতাপ করতে চাই না। কিন্তু আমাকে স্বার্থপর, সুবিধাবাদীও তুমি ভেবো না। তুমি যা বলবে, আমি তার সবকিছুই করতে রাজি। এমনকি বিয়েও…
চুপ, ও কথা বলো না! না!
কেন?
বিয়ে কি ওই ভাবে হয়—কোনো অবস্থার চাপে কিংবা কোনো ঘটনার ফলে? বিয়ে হয় আরও পবিত্র কারণে।
মণি, তুমি তো জানো—
তাও হয় না, তুমি আঘাত পেয়ো না—এ নিয়ে আমরা আর কথা বলবো না। এসো, এটা আমরা ভুলে যাই। আমার মায়ের অনেক দিন থেকেই অসুখ—অন্য কোনো ধর্মের লোককে যদি আমি বিয়ে করি—তিনি সহ্য করতে পারবেন না। তাঁকে আমি আঘাত দিতে পারবো না। মাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। তুমি এ নিয়ে কিছু ভেবো না—দোষ তো আমারই।
রবিবার দিন ভোরবেলা মণিকা গির্জায় চলে গেল। ইটালিয়ানরা গোঁড়া ক্যাথলিক—মণিকাদের পরিবারে ধর্মবিশ্বাস খুবই প্রবল। গির্জার প্রধান পাদ্রির কাছে মণিকা তার পাপের কনফেশান দিয়ে এল এবং এক মাস মদ, সিগারেট ছোঁবে না ও মাছ ছাড়া আর কোনো আমিষ খাবে না ঠিক করল। কিন্তু সেদিনই রাত্তিরবেলা পাশাপাশি বসে পল ভেরলেইন-এর কবিতা পড়তে পড়তে আমি অন্যমনস্কভাবে যেই মণিকার কাঁধে হাত রেখেছি, মণিকা সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে ফিরে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, অস্ফুটভাবে বলল, আমি পারছি না, আমি পারছি না! তুমি আমায় ভালোবাসবে না?
মণিকা আমার বুকের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঈশ্বর বিশ্বাসের চেয়েও তীব্রতর কোনো শক্তিতে ওর শরীর ফুঁসছে। আমি ঈশ্বর মানি, না, ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ঐশী সীমারেখা জানি না—আমার মনে হয়েছিল, জীবনের সেই মুহূর্তের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবার কোনো যুক্তি নেই। আমি মণিকাকে আলিঙ্গন করে ওর কোমরের কাছে হাত নিতেই তীব্র আবেগে মণিকা আমার বুকে কামড় বসিয়ে দিল।
তারপরের দিনগুলো কাটতে লাগল হু হু করে। দুজনে দুজনের মধ্যে ডুবে রইলাম। সেই সময়টায় আমার লেখাপড়া-টড়াও ডকে উঠে গিয়েছিল। স্থানীয় ভারতীয় ছেলেরাও আমাকে বয়কট করেছিল দুশ্চরিত্র বলে। কিন্তু মণিকার মধ্যে আমি এমন একটা জিনিস পেয়েছিলুম—আমি কদাচিৎ বাইরে বেরোই, অন্য লোকের সঙ্গে দেখাই করি না—মণিকা বাইরের দরকারি কাজগুলো দ্রুত সেরেই আমার ঘরে চলে আসে। আগে ওর আরও অনেক বন্ধু ছিল—এখন আর কারুর সঙ্গে দেখা করে না। আমরা দুজনেই যেন শৈশবে ফিরে গিয়েছিলুম—যেখানে কোনো অভাববোধ নেই, প্রয়োজনের গুরুভার নেই।
মাসখানেক বাদে এই আচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে উঠতেই হল। পনেরো দিন পরে মণিকার পরীক্ষা। আগের সেমেস্টারে ও পরীক্ষা দেয়নি, এবারও পরীক্ষা না দিলে ওর ভিসার সময় বাড়াতে অসুবিধা হবে। আমার তখন পরীক্ষা-টরীক্ষার বালাই নেই—তবু আমি মণিকাকে পড়াশুনো করার জন্য জোর করলুম। মণিকা আমার ঘরে বসেই বইপত্র ছড়িয়ে পড়াশুনো করে—আমি ওকে ছুঁই না, দূর থেকে ওকে দেখি।
আমি এ পর্যন্ত কোনো পাপ করিনি। একটা মেয়ের সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল—বিয়ে না করেও একসঙ্গে থাকতুম—এটাকে আমি পাপ মনে করিনি।
আমার পাপের কাহিনি এর পর থেকে শুরু। একদিন আমি স্নান করছি, বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে মণিকা বললে, সুননীল, শিগগির খোলো, একটা জরুরি কথা আছে। শিগগির!
ওর গলার আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে আমি তাড়াতাড়ি তোয়ালে জড়িয়েই বেরিয়ে এলুম। মণিকার মুখ ফ্যাকাশে—হাতে একটা ওভারসিজ টেলিগ্রাম। পড়লাম। ওর বাবা পাঠিয়েছে, ওর মায়ের খুব অসুখ।
মণিকা কাঁপতে কাঁপতে বলল, বুঝতে পারছি না, মা এখনও বেঁচে আছেন কিনা। মাকে আমি আর দেখতে পাবো না—তা কি হয়? তুমি বলো, তা কি হয়? অসম্ভব! আমি আজই যাবো।
মণিকার মায়ের বারণ ছিল, মণিকা যেন কখনও প্লেনে না চাপে। প্লেন সম্পর্কে তাঁর দারুণ ভয়। ইউরোপ-আমেরিকায় এখনও এরকম মা আছে! কিন্তু এখন জাহাজে যাবারও সময় নেই। মাকে দেখার জন্য মণিকা দারুণ ব্যস্ত হয়ে উঠল—সেদিনই প্লেনে চাপতে চায়! স্টুডেন্ট কনসেশন পেলেও প্লেনে ভাড়া প্রায় তিনশো ডলার লাগবে। মণিকার কাছে তখন সব মিলিয়ে দেড়শো ডলার ছিল, আমার নিজের কাছে ছিল বিরাশি ডলার—তার থেকে পঁচাত্তর ডলার ওকে দিয়ে দিলাম, বাকি টাকাটা ওর দুই বান্ধবীর কাছ থেকে ধার করে সেদিন বিকেলেই প্লেনের টিকিট কাটল। টিকিট পেতে অসুবিধে হল না!
আমি এয়ারপোর্টে মণিকাকে তুলে দিতে গেছি। তখনও সময় আছে। মালপত্র জমা দিয়ে এদিক-ওদিকে ঘুরছি আমরা। সঙ্গে টাকাকড়ির অবস্থা সঙ্কটজনক। ইচ্ছে থাকলেও এয়ারপোর্টের বার-এ গিয়ে বসার উপায় নেই। মেশিন থেকে দুটো কোকাকলার বোতল নিয়েই তৃষ্ণা মিটিয়েছি। মণিকা আমাকে বলল, গিয়ে যদি দেখি মা একটু ভালো হয়ে গেছেন—তাহলে আমি সাতদিনের মধ্যেই ফিরে আসবো। এবার আমি পরীক্ষা দেবোই।
আমি বললুম, আমার মনে হচ্ছে, তোমার মা ভালো হয়ে উঠেছেন এর মধ্যে!
আচ্ছা দেখি, ইন্ডিয়ান যোগীর কথা মেলে কিনা।
ঠিক মিলবে। মিললে তুমি ফিরবে তো?
নিশ্চয়ই!
নাকি বাড়িতে গিয়ে আমাদের কথা ভুলে যাবে?
ইস! ওরকম কথা বললে সবার সামনেই তোমার গালটা কামড়ে দেবো বলছি!
দাও না, আপত্তি নেই! কে জানে এই শেষবার কিনা—
আবার ওই কথা?
একটু বাদেই মাইকে যাত্রীদের নামে ডাক শোনা গেল। যাত্রী-যাত্রিনীরা একে একে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। পাশের এক কাউন্টারে ইনসিওরেন্স করা হচ্ছে। প্লেনের সাধারণ ইনসিওরেন্স ছাড়াও এখানে যাত্রীরা অতিরিক্ত ইনসিওরেন্স করাতে পারে। খুব সস্তা। এক ডলারে পনেরো হাজার ডলার। মণিকা বলল, একটা ইনসিওরেন্স নেবো নাকি? কখনও করাইনি আমি। করবো?
আমি বললুম, কী হবে? শুধু শুধু টাকা নষ্ট!
মোটে তো এক ডলার!
এক ডলারই এখন আমাদের যথেষ্ট দামি।
তা হোক। তবু একটা করাই।
ও সেই কাউন্টারে গিয়ে একটা ফর্ম চাইল। ফর্মের এক জায়গায় নমিনির নাম লিখতে হয়। দুর্ঘটনা হলে টাকাটা যে পাবে। মণিকা ঝকঝকে হাসিমুখে বলল, এখানে তোমার নামটা বসাই। টাকা জমা দিয়ে ফর্মের একটা কপি ও আমার হাতে দিয়ে বলল, এই নাও, সাবধানে রেখো। আমি মরলে তুমি বড়োলোক হয়ে যাবে। আমি তখনও বিরক্তভাবে ওকে বলেছি, তুমি শুধু শুধু একটা ডলার বাজে খরচ করলে। যত পাগলামি।
এবারে যাত্রীদের প্লেনে উঠতে হবে। মণিকা দাঁড়িয়েছে লাইনে সবার শেষে। আমি ওর পাশে পাশে গল্প করতে করতে এগোচ্ছি। গেটের ওপাশে আর আমাকে যেতে দেবে না। গেট পেরিয়ে চলে গেল মণিকা, আমি ওকে রুমাল উড়িয়ে বিদায় দিলুম। হঠাৎ ও আবার এক ছুটে ফিরে এল। ওই একগাদা লোকের মধ্যেই আমাকে বিষম অপ্রস্তুত করে আমার ঠোঁটে একটা দ্রুত চুমু দিয়ে বলল—তুমি কিছু ভেবো না, আমি আবার সাতদিনের মধ্যেই ফিরে আসবো। লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থেকো এই কটা দিন।
টিপ-টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ইস, আজকের দিনে বৃষ্টি না পড়লেই ভালো হতো। বৃষ্টির সময় একটা পাতলা কুয়াশায় সব কিছু অস্পষ্ট হয়ে যায়। প্লেনে জানলার ধারে সিট পেয়েছে মণিকা, বৃষ্টি না পড়লে আরও কিছুক্ষণ আমি ওর শরীরের অস্পষ্ট আভাস দেখতে পেতুম। কাচের ভেতর দিয়ে ও আমাকে দেখতে পেতো স্পষ্ট। দারুণ তৃষ্ণার্ত মানুষের মতন মণিকাকে আরও একটু দেখার জন্য ছটফট করছিলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল, সব বাধা ভেঙে ছুটে গিয়ে প্লেনের মধ্যে উঠে আরেকবার দেখে আসি। মায়ের অসুখ না সারলে আবার কবে ফিরবে মণিকা তার ঠিক কী! ততদিন আমি থাকবো কিনা কী জানি! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, মণিকা যদি ফিরতে না পারে—যেমন করেই হোক, দুএক মাসের মধ্যে আমি ইটালিতে চলে যাবো।
প্লেন ছাড়ার আগেই বৃষ্টি প্রবল এল। সঙ্গে সঙ্গে উঠল ঝড়। এখানে ঝড় সহজে আসে না, কিন্তু যখন আসে—তখন বড়ো দুর্দান্ত। তবু সেই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই প্লেন উড়ল।
রানওয়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে হঠাৎ ভেসে উঠল হাওয়ায়, চক্রাকারে ঘুরতে লাগল একটুক্ষণ। আমি সেই দিকে আকুল হয়ে তাকিয়ে রইলুম। আমার বুকের মধ্যে গুড়গুড় করতে লাগল।
ইস আজকেই এমন ঝড়-বৃষ্টি। মণিকার মায়ের অসুখ নিয়ে এমনিতেই তার মন খারাপ, তার ওপর ঝড়-বৃষ্টির জন্য আরও মন খারাপ লাগবে। যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়? না, না, কোনো দুর্ঘটনা হবে না—এসব বোয়িং বিমান কয়েক মিনিটের মধ্যেই পঁচিশ-তিরিশ হাজার ফুট উঁচুতে উঠে যাবে—সেখানে ঝড়-বৃষ্টির কোনো চিহ্ন নেই।
দুর্ঘটনা? হঠাৎ অন্য ধরনের একটা অনুভূতি আমার শরীরে শিহরণ খেলিয়ে গেল! মণিকার বিমান সদ্য দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে গেছে, আমি তখনও আকাশের দিকে চেয়ে আছি, আমার হাতে সেই ইনসিওরেন্সের কাগজ—হঠাৎ আমার মনে হল, দুর্ঘটনায় যদি বিমানটা ভেঙে পড়ে—তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমি পনেরো হাজার ডলার অর্থাৎ একলক্ষ বারো হাজার টাকার মালিক হয়ে যাবো। এক লক্ষ বারো হাজার টাকা!
আমার মুখখানা ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে গেল। বুকের মধ্যে একটা তীব্র ব্যথা বোধ করলুম। ছি, ছি, এ আমি কী ভাবছি। মণিকা, তাকে আমি এত ভালোবাসি—আমি তার মৃত্যু চিন্তা করছি? এমন সরল সুন্দর মণিকা—কত শ্বেতাঙ্গ প্রেমিককে উপেক্ষা করে আমার মতন একটা সাধারণ ভারতীয়কে সে অমন সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছে—আমার সুখের জন্য, তৃপ্তির জন্য ও করেনি এমন কাজ নেই—আর আমি তার মৃত্যু চাইছি!
কিন্তু বুকের ভিতর থেকে আমার দ্বিতীয় আত্মা বলতে লাগল, না, না, তুমি তার মৃত্যু চাইছো না। বিমান দুর্ঘটনার ব্যাপারে তোমার তো কোনো হাত নেই। তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর কিছু নির্ভর করে না—কিন্তু ধরো যদি ঝড়-বৃষ্টিতে বিমানটা ভেঙেই পড়ে—তুমি তো তা আর আটকাতে পারছো না—তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই তুমি পেয়ে যাবে এক লক্ষ বারো হাজার টাকা—এক লক্ষ বারো হাজার টাকা কতখানি তা বুঝতে পারছো!
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফিরে এলুম। সারা ঘরে মণিকার স্মৃতি। মণিকার চটিজুতো জোড়া আমার ঘরেই ফেলে গেছে। প্রায় রাত্তিরে চুপি চুপি আমার ঘরে নেমে এসে ও আমার বিছানায় শুতো। ওর শ্লিপিং স্যুটও রাখা আছে আমার এখানে। বালিশে এখনও লেগে আছে ওর কোমল মুখের স্পর্শ। ছড়ানো রয়েছে ওর বইখাতা, চিরুনি, নাইলনের মোজা। মণিকাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমার বুক মুচড়ে মুচড়ে উঠতে লাগলো। আগেও দু-চারজন মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে এদেশে—কিন্তু মণিকার মতন এমন আর কারুর প্রতি নিবিড় আকর্ষণ বোধ করিনি।
দেয়ালে লাগানো বিশাল আয়না—এই আয়নার সামনে একদিন মণিকাকে দাঁড় করিয়েছিলুম , একে একে খুলে ফেলেছিলুম ওর সব পোশাক। মণিকা আপত্তি করেনি। মুখ টিপে-টিপে হাসছিল—ওর লিলিফুলের মতন নরম গাল দুটিতে আমি আলতোভাবে চুমু খেয়েছিলুম, ওর ঠোঁটে জিভ ঠেকিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিলুম। পুকুরঘাটে বাংলাদেশের মেয়েরা জল আনতে গিয়ে কলসির গলা জড়িয়ে ধরে যে রকম আনন্দ পায়—সেই রকম শান্তিময় আনন্দ পেয়েছিলুম ওর সরু কোমর জড়িয়ে। ফর্সা উরু দুটিতে স্বর্গের সুষমা—দুই বুকের সন্ধিস্থলে মুখ গুঁজে বলেছিলাম, মণিকা, তুমি দেবীর মতন, তুমি সত্যিই দেবী, আমি তোমাকে ভালোবাসি—তুমি আমায় ছেড়ে যেও না। মনে হয়, মণিকা যেন এখনও সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—সেইরকমভাবেই আমার দিকে চেয়ে হাসছে।
চেয়ারে কতক্ষণ গুম হয়ে বসেছিলুম মনে নেই। হঠাৎ খেয়াল হল আমি সেই ইনসিওরেন্সের কাগজখানাই বার বার পড়ছি। পড়ে দেখছি, যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেই—টাকাটা আমি পাবো কিনা—আইনগত কোনো অসুবিধা হবে কিনা। কোনোই অসুবিধে নেই, সে নিজে হাতে প্রাপক হিসেবে আমার নাম-ঠিকানা লিখে নীচে সই করে গেছে। মৃত্যু প্রমাণিত হলেই কোম্পানি বাড়ি বয়ে এসে আমাকে টাকা দিয়ে যেতে বাধ্য। এক লক্ষ বারো হাজার টাকা! উঃ কী নীচ, শয়তান, পাষণ্ড আমি! সামান্য টাকার জন্য আমি মণিকার মৃত্যু চাইছি! স্বর্গ-দুর্লভ ভালোবাসার স্বাদ দিয়েছে মণিকা আর আমি…
চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার কাছে চলে এলাম। আয়নার গায়ে মুখ লাগিয়ে ব্যাকুল ভাবে বললাম, না, না, না—মণি, আমার সোনা, আমার দেবী, আমি তোমাকে ভালোবাসি—শুধু তোমাকেই—পৃথিবীর বিনিময়েও আমি তোমার মৃত্যু চাই না। না—। আমি শুধু তোমাকেই চাই। প্রচণ্ড রাগে ইনসিওরেন্সের কাগজটা আমি জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলুম।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, যদি একটা কিছু ঘটেই যায়—তাহলে টাকাটা শুধু শুধু নষ্ট করার কোনো মানে হয় না! এক লক্ষ বারো হাজার টাকা! আমি না নিলে ওটা আর কেউ পাবে না। তৎক্ষণাৎ ছুটে বেরিয়ে গেলাম—লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সাততলা সিঁড়ি হুড়মুড় করে নেমে চলে এলাম রাস্তায়। কাগজটা তখনও পড়ে আছে—একটু জল লেগেছে কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু ক্ষতি হবে না।
নিজেকে সত্যিকারের পাপি মনে হয়েছিল আমার। আমি ভারতীয়, আমি ভিখিরি জাতের লোক—হঠাৎ টাকা পাবার লোভ কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারি না! আমাদের চোখে এখন টাকার তুলনায় প্রেম, মমতা, কৃতজ্ঞতা এসবই তুচ্ছ। এক লক্ষ বারো হাজার টাকা পেলে আমি এই পোড়ার দেশে আর একদিনও থাকবো না। প্রবাসের রুক্ষ জীবন কে চায়? এক লক্ষ বারো হাজার টাকা পেলে তক্ষুনি আমি দেশের টিকিট কাটবো—প্লেনের না, জাহাজের—ফিরে গিয়ে কলকাতাতেও থাকবো না, চলে যাবো ফ্রেজারগঞ্জে। সেখানে একটা ছোটো বাড়ি বানাবো। আমার অনেক দিনের শখ। আর কারুর দাসত্ব করতে হবে না, কারুর কাছে মাথা নোয়াতে হবে না। সেখানে জমি কিনে আমি নোনা মাটিতে ফসল ফলাবো, সমুদ্রে মাছ ধরবো। জল-কাদার মধ্যেও পরিশ্রম করবো আমি, জেলে- ডিঙি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে চলে যাবো ঝড়-বাদল তুচ্ছ করে। এই সব পরিকল্পনা করতে করতে ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম আমি। হঠাৎ যেন মনে হল, আমি মণিকার মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে আনন্দে খলখল করে হাসছি।
সেদিন সন্ধেবেলা আমার বন্ধু ডম আমাকে ডাকতে এল। বলল—এই সুনীল, চলো, আজ আমাদের একটা সোয়েল পার্টি আছে—মণিকা কোথায়? নেই? তাই তোমাকে এমন মনমরা দেখছি! চলো, চলো, তুমি একাই চলো—
জোর করে ধরে নিয়ে গেল আমাকে। গোপন নিষিদ্ধ পার্টি। এ পার্টিতে সামাজিক ভদ্রতা নেই, মদ নেই, খাবারও নেই। শুধু মেরুআনা (গাঁজা) আর এল এস ডি’র পার্টি! পুলিশ জানতে পারলে যে-কোনো মুহূর্তে এসে ধরে নিয়ে যাবে। সাতটা ছেলে আর ন-টা মেয়ে। মেয়েগুলোরই উন্মত্ততা বেশি। ডম প্রস্তাব করল, আজ সুনীল আমাদের ইয়োগা শেখাবে। আমি যতই বলি যে আমি যোগ, তন্তর-মন্তর কিছু জানিও না, বিশ্বাসও করি না—কিছুতেই ওরা শুনবে না। শেষ পর্যন্ত আমি ওদের পদ্মাসনে ওঁং তৎ সৎ জপ করা শেখাবার চেষ্টা করলুম। মাটিতে বসা অভ্যেস নেই—পা মুড়ে তো বসতে জানেই না, বসতে গেলে উল্টে পড়ে যায়। ঘরময় ছেলেদের গড়াগড়ি। সে একখানা দৃশ্য বটে!
মনের মধ্যে আমার দারুণ অস্বস্তি সবসময়, তাই আমি ওদের হইচইতে ঠিক যোগ দিতে পারছিলুম না সেদিন। মন অত অস্থির থাকলে এল এস ডি খাওয়া উচিত নয়—বলে আমি এড়িয়ে গেলাম। পাইপে খানিকটা মেরুয়ানা ভরে টানতে লাগলাম। তবু মনের অস্বস্তি কাটে না। পকেটে মাত্র সাত ডলার আছে—সপ্তাহ না ফুরালে আর টাকা পাবার আশা নেই। এই সপ্তাহটা এ দিয়েই কোনোক্রমে টেনে-টুনে চালাতে হবে। তখন কলকাতায় আমাদের বাড়ির সংসার খরচও আমাকে এখান থেকে চালাতে হয়। আমার নিজেরও রোজগার তখন বেশি নয়। সেদিন বিকেলেই বাবার চিঠি পেয়েছি—আমার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের গুরুতর অসুখ—স্পেশালিস্ট দেখাতে হবে, বাড়িভাড়া তিনমাস বাকি—অর্থাৎ আরও টাকা পাঠাতে হবে।
নেশার ঝোঁকে অনেকেরই অবস্থা বেসামাল। ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে ডম শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে রেখেছে। দরজা জানলা সব বন্ধ, ধোঁয়ার গুমোট আবহাওয়া, তার মধ্যে অতগুলি সুগঠিত স্বাস্থ্যবান প্রায় নগ্ন নারী-পুরুষ—এক অকল্পনীয় বিস্ময়কর দৃশ্য। দু-চারজন পরস্পরকে জড়িয়ে শুয়ে পড়েছে মেঝেতে, অনেকেই কিন্তু মুখোমুখি বসে নিস্পৃহের মতো গল্প করে যাচ্ছে। আমি ছিলাম জানলার কাছে। এই সময় ক্যারোলিন বলে একটা মেয়ে আমার কাছে এসে বলল—এ-ই, তুমি একা একা অমন গ্লাম ফেসেড হয়ে বসে আছো কেন?
আমি উত্তর না দিয়ে শুধু একটু হাসলাম। ক্যারোলিনের বিশাল চেহারা, শক্ত উন্নত স্তন, কলাগাছের মত দুই উরু, শিল্পীদের মডেল হয় ক্যারোলিন। কথা নেই বার্তা নেই ক্যারোলিন আমার কোলের ওপর বসে পড়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল, হ্যালো সু-ই-টি!
কী যেন হল আমার, রূঢ়ভাবে ধাক্কা দিয়ে আমি ক্যালোলিনকে নামিয়ে দিলাম। সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম মণিকা ছাড়া আর অন্য কোনো মেয়েকে আমি চাই না। অন্য কোনো মেয়েকে ছোঁয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মণিকার জন্য আমার শিরায় শিরায় ব্যাকুলতা জেগে উঠল, আর ক্যারোলিনের প্রতি এল ঘৃণা। ক্যারোলিন অবাক হয়ে বলল, হেই। ইউ আর ক্রস? কী হয়েছে তোমার?
আমি বললুম, মাপ করো, আমার ভালো লাগছে না। আই অ্যাম আ ড্রপ আউট টু নাইট!
তক্ষুনি আমি আমার কোট পরে নিলাম এবং সকলের অনুরোধ, মিনতি উপেক্ষা করে বাইরে চলে এলাম! বাইরের মুক্ত হাওয়ায় সুস্থভাবে নিশ্বাস নিয়ে মনে হল মণিকাকে যেন আমি আবার ফিরে পেয়েছি।
পরদিন সকালে রেডিয়োতে খবর বলা শেষ করার আগে সংক্ষিপ্তভাবে জানাল—সুইজারল্যান্ড আর ইটালির সীমান্তে একখানা বিমান ধবংস হয়েছে। যাত্রীদের কাউকে উদ্ধার করা যায়নি। বুকের মধ্যে ধক করে উঠে যেন দম-আটকে গেল আমার। রান্নাঘর থেকে রেডিয়োর কাছে ছুটে এলাম। খবর সেখানেই শেষ হয়ে গেছে। কাঁটা ঘুরিয়ে আমি অন্য স্টেশন ধরার চেষ্টা করলুম। কোথাও আর তখন খবর নেই। হারামজাদারা—ওইরকম সাংঘাতিক খবর অত সংক্ষেপে বলার কোনো মানে হয়? কোন কোম্পানির প্লেন, কোত্থেকে আসছিল, যাত্রীদের নামের তালিকা—আঃ অসহ্য, অসহ্য, সেই বিকেলবেলা খবরের কাগজ বেরুবে—তাতে যদি থাকে—অ্যালিটালিয়া বিমান কোম্পানির অফিসে ফোন করবো? মণিকার পুরো নাম—মণিকা আর্লিংগেটি—ইনসিওরেন্সের কাগজটা ড্রয়ারে রেখেছিলাম—ঠিক আছে তো? অন্য বিমানও হতে পারে অবশ্য—কিন্তু কাগজটা সাবধানে, একলক্ষ বারো হাজার টাকা—প্রায় উন্মাদের মতন ছটফট করছিলুম আমি—এক সময় সংবিৎ ফিরে এলো। নিজের প্রতি দারুণ ঘৃণায় বিমর্ষ হয়ে পড়লুম। মণিকা বেঁচে আছে কিনা। সেকথা আমি জানতে চাইছি না, আমি জানতে চাই মণিকা মরে গেছে কিনা। মণিকা যদি সত্যই মরে—তবে আমিই তার হত্যাকারী। আমি তো ওর নিরাপদে পৌঁছুবার কথা একবারও ভাবিনি, ওর মৃত্যুর কথাই ভেবেছি শুধু।
ঠিক করলুম, আর রেডিয়ো খুলবো না, আর খবরের কাগজ পড়ব না। আমি কিছু জানতে চাই না। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তার পরের কয়েকটা দিন যে নিরন্তর মানসিক যন্ত্রণায় কাটিয়েছি—তা বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই! মুহূর্তে মুহূর্তে মণিকার মুখ মনে পড়ায় আমার বুকের মধ্যে হু হু করে উঠেছে, আবার প্রতি মুহূর্তে আমি দরজার কাছে একটা ভারী জুতো পরা পায়ের আওয়াজের প্রতীক্ষা করেছি, পিওনের পায়ের আওয়াজ টেলিগ্রাম নিয়ে আসবে—যে টেলিগ্রামে থাকবে আমার এক লক্ষ বারো হাজার টাকা পাওয়ার খবর! ছয়দিনের মধ্যে মণিকার কোনও চিঠি এল না, ঠিক সাতদিনের মাথায় আমার দরজায় কে যেন বেল টিপলো। টেলিগ্রাম পিওন ভেবে আমি দৌড়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলাম মণিকা দাঁড়িয়ে আছে। সত্যি, না স্বপ্ন? একটা নীল রঙের রেন কোট পরা, তার থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল পড়ছে, হাতে দুটো চামড়ার ব্যাগ, রক্তিম ঠোঁট ফাঁক করে ঝকঝকে দাঁতে আলো করে হাসলো মণিকা!
আমি কঠোর পুরুষ, জীবনে অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করেছি, অনেক নিষ্ঠুর নির্দয় ব্যবহার পেয়েছি ও দিয়েছি, কখনও আমার চোখে জল আসেনি। কিন্তু সেদিন আমার চোখ জ্বালা করে উঠল, শেষ পর্যন্ত কাঁদিনি কিন্তু ওই চোখের জল আসার ইঙ্গিতেই আমি বুঝতে পারলুম, আমার পাপের অবসান হয়েছে। আমি আর লোভী নই, আমি আর কিছু চাই না, শুধু মণিকাকেই চাই। আমি দুহাত বাড়িয়ে ডাকলুম, মণি,—সত্যি—তুমি—
হাতের ব্যাগ দুটো ঘরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মণিকা ছুটে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বলল, আমি কথা রেখেছি। দ্যাখো আমি ঠিক সাতদিনের মধ্যেই ফিরে এসেছি।
আমি কোনো কথা বলতে পারছিলুম না, ওকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইলুম। ও আবার খুশি খুশি গলায় বলল, তোমার কথাই কিন্তু সত্যি হয়েছে। গিয়ে দেখলুম, মা ভালো হয়ে গেছেন। আমি না গেলেও পারতুম—যাকগে গিয়েছি ভালোই হয়েছে, নিজের চোখে দেখে এলাম—এখন নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারবো! এ-কদিন শুধু তোমার কথাই ভেবেছি—তুমি নিশ্চয়ই আমার কথা একটুও ভাবোনি তো? এ—ই?
আমি তবু চুপ করে রইলুম।
এ-ই, তুমি কথা বলছো না কেন?
মণিকা আমি খুব খারাপ লোক! এই কদিন শুধু ভাবছিলুম, যদি তোমার কোনো দুর্ঘটনা হয়—
তুমিও তাই ভাবছিলে!
মণিকা আমাকে ছেড়ে এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর পরিপূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুলের মতন হাসিমুখে বলল—জানো, আমার মাও শুধু ওই কথা ভাবছিলেন। মা যখন শুনলেন, আমাকে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছে, তখন থেকেই মায়ের কী চিন্তা। আমি প্লেনে আসবো মা ভাবতেই পারেন না। ফেরার সময়েও যখন প্লেনে এলুম মায়ের কী কান্নাকাটি, কিছুতেই আসতে দেবেন না। প্রায়ই প্লেন অ্যাকসিডেন্ট হয়, আমি যদি মরে যাই—শুধু এই কথা। তুমিও দেখছি, আমার মায়ের মতনই।
না, সে রকম নয়। আমি খারাপ লোক, আমি তোমার মৃত্যুর কথা অনবরত ভাবছিলুম, আর—
জানি, তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো।
না, আমি তোমাকে ভালোবাসার যোগ্য নই।
পাগল। তুমি কিছু বোঝো না। শোনো, যে যাকে যত বেশি ভালবাসে—সে তত বেশি তার বিপদের চিন্তা করে। দ্যাখো না—ছেলেমেয়েরা যখন বাইরে খেলাধুলো করতে যায়—মা তখন বলেন, দেখিস, গাড়ি চাপা পড়িস না, মারামারি করিস না, চোর ডাকাত যেন ধরে না নেয়—শুধুই বিপদের কথা, ভালো কথা কি বলে? ভালোবাসার নিয়মই এই। মায়ের মতন তুমিও আমার মৃত্যুর কথাই শুধু ভেবেছো। মা ছাড়া আমাকে আর কেউ এত ভালোবাসে নি—তোমার মতন।
আমি আচ্ছন্ন, অভিভূত মানুষের মতন দাঁড়িয়ে রইলুম। মণিকা অভিমানী গলায় বলল,—তুমি আমাকে একটুও আদর করোনি তখন থেকে এসে—
মণিকা নিজেই এসে আমার বুকে মাথা রাখলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজলাম ওর পিঠে। আমার দুই হাত ওর পিঠের ওপর রাখা। সেদিকে তাকিয়ে মনে হল, এই হাত মণিকাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
তেহেরানের স্বপ্ন
তেহেরানের স্বপ্ন
কটা বাজল?
মনীষা ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই ঘুমের মধ্যেই সে দেখতে পেল, বড়ো ঘড়ির কাঁটাটা এসে থামল পাঁচটার ঘরে, তারপর খ-র-র-র-র শব্দ, তারপর ঢং ঢং ঢং।
ধড়ফড় করে উঠে মনীষা ঘড়ি দেখতে ছুটে এল পাশের ঘরে। না, পাঁচটা বাজেনি, এখন তিনটে কুড়ি। সঙ্গে সঙ্গে তার ভুরু কুঁচকে গেল। তিনটে কুড়ি! তাহলে টুম্পু এল না কেন? সে তো তিনটে পাঁচের মধ্যে রোজ এসে যায়।
মনীষা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তা দিয়ে অনেক রিকশা যাচ্ছে, তার মধ্যে বেশ কটিতেই স্কুল-ফেরত শিশুরা। ব্রিজের পাশ দিয়ে যে রিকশাটা বেঁকল, তার মধ্যে কি টুম্পু? না তো!
মনীষার কপালে এবার উদবেগের তিনটি রেখা। অথচ সে ঠিক ভয়ও পেতে চাইছে না। ভয় পেতেও ভয় করে। রিকশাওয়ালা অনেকদিনের চেনা। খুব বিশ্বাসী। সে কোনো গোলমাল করবে না। টুম্পুর স্কুল ছুটি হয় আড়াইটের সময়, প্রত্যেকদিন টুম্পু মোটামুটি আধঘন্টার মধ্যে ফিরে আসে।
যদি রিকশাওয়ালা আজ না গিয়ে থাকে? যদি তার অসুখ হয়? কিংবা অ্যাকসিডেন্ট?
তিনটে পঁয়ত্রিশ হবার পর মনীষা আর থাকতে পারল না। দ্রুত হাতে মাথায় চিরুনি চালাল, আটপৌরে শাড়িটাই ঠিক করে নিল একটু, তারপর হাতব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দরজাটা বাইরে থেকে টানলেই তালা বন্ধ হয়ে যায়।
রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটছে, তখন মনীষার মুখ চোখ ঠিক কোনো পক্ষীমাতার মতন ব্যাকুল, তার বুক কাঁপছে। সামনে একটা ট্যাক্সি পেয়ে সে ঝট করে উঠে পড়ল। মাত্র মাইল খানেক দূরে স্কুল। তার গেট ফাঁকা। একটি ছাত্রীও নেই। দারোয়ান কিছু বলতে পারল না। না, দারোয়ান তো টুম্পুর কথা মনে করতে পারছে না। রোজ যেমন যায়, সেইরকমই গেছে নিশ্চয়ই। রিকশা না এলে নিশ্চয়ই সে দাঁড়িয়ে থাকত কিংবা কান্নাকাটি করত।
সেই ট্যাক্সি নিয়েই মনীষা ফিরে এল বাড়িতে। ভাড়া না দিয়ে ছুটে উঠে এল ওপরে। তারপর গম্ভীরভাবে নিশ্বাস ফেলল। বন্ধ দরজার সামনে বসে আছে টুম্পু, পা ছড়িয়ে, টপ টপ করে পড়ছে চোখের জল।
মনীষা এসে ছোঁ মেরে তাকে কোলে তুলে নিল। টুম্পু দাপাদাপি করে হেঁচকি তুলে কেঁদে কেঁদে বলল, তুমি দুষ্টু, তুমি চলে গিয়েছিলে…কেন? আমার খিদে পেয়েছে।
মনীষা চুমু দিয়ে তার কান্না মুছিয়ে দিয়ে বলল, তোমার এত দেরি হল কেন মামণি? আমি তো তোমাকেই খুঁজতে গিয়েছিলাম।
টুম্পু বলল, আমি আজ রিকশায় আসিনি। আমি মণিদীপার মায়ের সঙ্গে গাড়িতে এসেছি।
ব্যাগ খুলে চাবি বের করতে গিয়ে আর এক বিপত্তি। হুড়োহুড়িতে মনীষা চাবি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল। এখন আর ঢোকা যাবে না।
এদিকে অধৈর্য ট্যাক্সিচালক নীচে হর্ন দিচ্ছে বারবার। টুম্পুকে কোলে নিয়ে মনীষা আবার নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। ট্যাক্সিতে উঠে বলল, শিগগির চলুন। যোধপুর যাব।
যে-কেউ দেখলে ভাববে, মনীষা বুঝি অন্য কারুর মেয়েকে চুরি করে পালাচ্ছে। ভুলো মন বলে মনীষা একটা চাবি রেখে গিয়েছে মায়ের কাছে। গত মাসেও এরকম একবার চাবি আনতে হয়েছিল। এখন যদি সে যোধপুর পার্কে গিয়ে দেখে মা বাড়ি নেই, সিনেমা দেখতে গেছেন কিংবা বেড়াতে গেছেন নিজের বাপের বাড়ি, তাহলেই সর্বনাশ। এদিকে পাঁচটার মধ্যে আসবে মনীষার ছেলে শান্তনু। সেও যদি এসে দেখে দরজা বন্ধ, তাহলে তুলকালাম কাণ্ড বাধাবে।
রাত্রে খাবার টেবিলে রজতের সঙ্গে এটাই হল প্রধান আলোচনার বিষয়। জানো আজ কী হয়েছিল—এই বলে চোখ বড়ো বড়ো করে শুরু করল মনীষা। রজত শুনে গেল নিঃশব্দে। খাওয়ার সময় তার বই পড়ার অভ্যেস। বই থেকে সে চোখ তুলল না।
মনীষার কথার মাঝপথে হো হো করে হেসে উঠল রজত। তারপর বলল, তোমরা মেয়েরা…সত্যি…সারাদিন কোনো কাজ নেই…তাই সামান্য ব্যাপার থেকেই…তুমি যদি আর মাত্র পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে, তাহলে এসব কিছুই ঘটত না।
মনীষা রেগে গিয়ে বলল, বাঃ, সাড়ে তিনটে বেজে গেল, তখনও টুম্পু আসছে না!
রজত বলল, এক কাজ করলেই তো পারো। দুপুরবেলা তুমিই তো রোজ টুম্পুকে আনতে যেতে পারো, শুধু শুধু না ঘুমিয়ে।
আমি আর কতক্ষণ ঘুমোই? বড়ো জোর একঘন্টা তাও রোজ হয় না।
আমরা সেসময় অফিসে কাজের চাপে পাগল হয়ে যাই, আর তোমরা দিব্যি ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে পাখা চালিয়ে—
রাধার মা ছুটি নিয়ে সেই যে দেশে গেল, এখনো এল না, আমাকে বেরুতে হলে দরজা বন্ধ করে বেরুতে হয়।
সেটা আর এমন কী শক্ত ব্যাপার! অবশ্য যদি রোজ রোজ চাবি নিতে ভুলে যাও আর ট্যাক্সি করে তোমার মায়ের কাছ থেকে চাবি আনতে যেতে হয়, তাহলে খরচ পোষাবে না।
ও, টাকা খরচটাই তোমার গায়ে লাগছে। ঠিক আছে, কাল থেকে আমি যাব, তাতে টুম্পুর জন্য তোমার রিকশা ভাড়াটাও বাঁচবে!
আমি সেকথা বলিনি। টুম্পুকে নিয়ে তুমি রিকশা করেই আসবে, অনেক মা-ই তো বাচ্চাদের আনতে যায়।
সত্যি, তুমি অনেক পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করো, আর আমি তোমার টাকা বাজে খরচ করে উড়িয়ে দিই।
আরে কী মুশকিল। এসব কথা উঠছে কেন! আমি কখন বললাম যে তুমি বাজে খরচ কর?
নিশ্চয়ই বলেছ। আমি আমার মায়ের বাড়িতে ট্যাক্সি করেও যেতে পারব না? ঠিক আছে, এবার থেকে হেঁটেই যাব।
শোনো মনীষা, খাওয়ার সময় মিছিমিছি ঝগড়া করলে খাওয়া হজম হয় না। একটু শান্তিতে বসে খাও।
তুমি খাও, যত ইচ্ছে শান্তিতে বসে খাও!
মনীষা নিজের থালা ঠেলে উঠে চলে গেল। রজত দুবার ডাকল। মনীষা, মনীষা! সাড়া না পেয়ে সে নিঃশব্দে আবার নিজের খাবারের থালায় মন দিল। ধীরে সুস্থে সব শেষ করে সে বাথরুমে হাত ধুতে এসে দেখল, মনীষা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
রজত বলল, কী যে ছেলেমানুষি করো। এই—কী হল?
রজত মনীষার কাঁধটা ছুঁতেই সে মুখ ফিরিয়ে শুকনো গলায় বলল, কিছু হয়নি! ছাড়ো!
বেশ কিছুক্ষণ পরে, রান্নাঘর গুছিয়ে মনীষা যখন শোবার ঘরে এল, রজত তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনীষার ঘুম ভাঙে সকাল ছটায়। ওই সময় ঠিকে ঝি আসে, দরজা খুলতে হয় মনীষাকেই। আগে রাঁধুনি ছিল তখন অসুবিধে ছিল না। কিন্তু রাঁধুনি দেশে পালিয়েছে, সে ফিরবে কিনা ঠিক নেই, এদিকে নতুন লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গিয়েছিল চোদ্দ-পনেরো বছরের একটি ছেলে। কিন্তু বাড়িতে চবিবশ ঘন্টার জন্য পুরুষলোক রাখতে রজতের ঘোর আপত্তি। সে বলে , বিদেশে আজকাল কোনো বাড়িতেই ঠাকুর-চাকর থাকে না। আর তোমরা শিক্ষিত মেয়ে হয়েও বাড়ির রাঁধুনি কয়েকদিনের ছুটি নিলে রেগে যাও। আমরা যে অফিস থেকে এক মাসের ছুটি নিই?
অফিসের কাজে রজত একবার মাত্র আড়াই মাসের জন্য বিলেত গিয়েছিল। তারপর থেকে সে কথায় কথায় বিদেশের উদাহরণ দেয়।
রজত আরও বলে, একটা চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলে সারাদিন বসে বসে রান্না করছে—এই দৃশ্যটাই খারাপ। অমানবিক!
নারীবর্ষের জের টেনে মনীষা এই তর্ক করেছিল রজতের সঙ্গে।
সে যা-ই হোক, এখন সকালের চা করতে হচ্ছে মনীষাকেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে চা খাওয়ার আনন্দ সে আর পায় না।
রজত অফিসে বেরিয়ে যায় সাড়ে নটার সময়। সেই সময় সে টুম্পুকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে যায়। সুতরাং সকাল ছটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যে এক মিনিট নিশ্বাস ফেলার সময় থাকে না মনীষার মনীষার, টুম্পুকে তৈরি করাও এক বিরাট ঝামেলা। কিছুতেই সে স্নান করতে চায় না। তাকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হয়।
বাবলু স্কুলে যায় সাড়ে দশটায়। সে রোজ হাঙ্গামা বাধায় খাওয়া নিয়ে। চোদ্দ বছর বয়েস ছেলের। এর মধ্যেই খাওয়া নিয়ে নানা রকম বাছ-বিচার। কোনো মাছই তার পছন্দ নয়। সে মাংস ভালোবাসে। কোন বাড়িতে রোজ রোজ মাংস রান্না হয়?
ঠিক সাড়ে দশটার সময় বাবলুর এক স্কুলের বন্ধু নীচতলা থেকে চেঁচিয়ে ডাকে, শান্তনু—শান্তনু!
অমনি অর্ধেক খাওয়া হলেও তা ফেলে রেখে উঠে পড়ে বাবলু। হাত ধুয়েই নীচের দিকে দৌড়ায়। রোজ রোজ যদি এরকম আধপেটা খেয়ে যায়, তাহলে কি আর স্বাস্থ্য ভালো হবে?
এরপর ফ্ল্যাট ফাঁকা। ঠিকে ঝি আজকাল আরেকবার এসে তরকারি কুটে বাসন মেজে দিয়ে যায়। মনীষা বাকি রান্না, বিকেলের জলখাবার এমনকি রাত্তিরেরও দু-একটা পদ রেঁধে রাখে। এতেই বেজে যায় একটা দেড়টা। স্নান করতে যাবার সময় একটু মুস্কিল। ওই সময় কেউ এলে দরজা খুলে দেওয়া যায় না। অথচ মনীষা স্নান করতে ঢুকলেই কেউ না কেউ আসবে। হয় মুরগিওয়ালা, নয়তো পোস্টম্যান অথবা পাশের বাড়ির কেউ। ঝনঝন করে কলিং বেল বাজতেই থাকে। বাথরুমের দরজা বন্ধ থাকলে বেলের আওয়াজ শোনা যায় না, তাই সে বাথরুমের দরজা খুলেই স্নান করে।
সবচেয়ে খারাপ লাগে একলা বসে খেতে। আগে টুম্পু থাকত, এখন সেও স্কুলে যায়। কী তীব্র নিঃসঙ্গ দুপুর। শুয়ে শুয়ে বই পড়তে গেলে ঘুম আসে। সেই ঘুম গাঢ় হবার আগেই টুম্পু আর বাবলু ফিরতে শুরু করে।
মনীষা সাইকোলজি নিয়ে এম. এসসি পাস করেছিল, আর কিছু কাজে লাগে না! শুধু স্কুল ফাইনাল পাস করলেই বা কী ক্ষতি ছিল। কেন খেটেখুটে এতখানি পড়াশোনা করতে গেল? বাড়ির রান্না আর ছেলেমেয়েকে স্নান করিয়ে খাইয়ে স্কুলে পাঠানোর জন্য এম. এসসি পাস করার দরকার হয় না।
প্রায়ই মনীষা বলে, সে একটা চাকরি করবে।
রজত জবাব দেয়, করো না, কে আপত্তি করেছে?
টুম্পু জন্মাবার আগে মনীষা কিছুদিন একটা স্কুলে পড়িয়েছিল। সেটা ছিল মর্নিং স্কুল। এখন তার পক্ষে মর্নিং স্কুলের কাজ করা সম্ভব নয়। বাড়িতে রান্নার লোক যদি থাকেও। ছেলেমেয়ে দুটোর পড়াশোনাও তো একটু দেখিয়ে দিতে হয়। রজত ও সব কিছু করবে না। দশটা পাঁচটার সুবিধে মতো চাকরি কে-ই বা দিচ্ছে মনীষাকে। রজত কিছু চেষ্টা করে না। তার মনে মনে খুব ইচ্ছে নয়, মনীষা চাকরি জগতে যাক। সে চায় মনীষা বাড়িতে থেকে ছেলেমেয়েদের মানুষ করুক। রজতের সম্প্রতি চাকরিতে উন্নতি হয়েছে। চাকরিতে উন্নতি মানেই অফিসের কাজে আরও বেশি আত্মবিক্রয়। সাড়ে নটায় বেরোয়। ফেরে সেই প্রায় সাড়ে নটায়। তখন সে ক্লান্ত হয়ে থাকে। প্রায়ই মনীষার সঙ্গে তার হুঁ হাঁ ছাড়া কোনো কথাই হয় না। চাকরিতে এবার উন্নতির পর থেকেই রজত ডিসপেপসিয়ায় ভুগছে।
সন্ধেবেলায় ছেলেমেয়েদের পড়তে বসায় মনীষা। বাবলুর জন্য একজন মাস্টারমশাই রাখতে হয়েছে, তিনি সপ্তাহে তিনদিন আসেন। বাবলুটার পড়াশোনাতে মাথা থাকলেও দারুণ ফাঁকিবাজ। মাস্টারমশাই যেসব দিন আসে না, সেসব দিন সে নিজের পড়ার বই ছুঁয়েও দেখে না। খালি গল্পের বই, তাই সব সময় নজর রাখতে হয় মনীষাকে।
ছেলে মেয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি! তারপর মনীষাকে প্রতীক্ষায় বসে থাকতে হয়, কখন রজত আসবে। এক একদিন রজতের ফিরতে সাড়ে দশটা এগারোটাও হয়ে যায়, মনীষা ঘুমোতে পারে না। কে দরজা খুলবে? তা ছাড়া সারাদিন খেটেখুটে বাড়ি ফেরার পর রজত তো আর নিজের খাবার নিজে নিয়ে খাবে না?
মনীষা প্রায় ভাবে, এই কি তার জীবন? শুধু ছেলেমেয়েদের মানুষ করা আর স্বামীর জন্যে প্রতীক্ষা করে বসে থাকা? আগেকার দিনে মেয়েরা এতেই সন্তুষ্ট থাকত। অবশ্য তখন ছিল একান্নবর্তী পরিবার, সারাদিন আরও অনেকের সঙ্গে গল্প, হাসি ঠাট্টা, না হোক ঝগড়াঝাঁটি কিছু একটা করে সময় কাটত। এখন মনীষা দিনের অধিকাংশ সময়ই নিঃসঙ্গ। মেয়েদের জীবনে কি আলাদা কিছু করবার নেই? সেদিন বেলা সাড়ে এগারোটায় দারুণ মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরে এল মনীষা। হাতের ব্যাগটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজের ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল। সে কি অনেক বদলে গেছে? কপালে কোঁচকানো দাগ দেখা যাচ্ছে? দু-এক প্যাকেট বিস্কুট আর কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনতে বেরিয়েছিল মনীষা। চেনা স্টেশনারি দোকান, একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বসেন সেখানে। আজ সেখানে বসেছিল একটি কুড়ি একুশ বছরের ছেলে। খুচরো পয়সা ফেরত দেবার সময় সেই ছেলেটি বললে, এই নিন মাসিমা!
মাসিমা?
মনীষা একেবারে চমকে উঠেছিল। দোকানদাররা তাকে দিদি বলে সব সময়। আজ সে হঠাৎ মাসিমা হয়ে গেল কী করে? সে কি বুড়ি হয়ে গেছে? বিরক্ত মুখে মনীষা বেরিয়ে এসেছিল দোকান থেকে।
কিন্তু এক একদিন পরপর দুর্ঘটনা ঘটে। পাড়ার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি ছেলে। সকলেরই মুখ চেনা। তার মধ্য থেকে দুটি ছেলে এগিয়ে এসে বলল, সামনের সোমবার সকালে কিন্তু আমরা সরস্বতী পুজোর চাঁদা আনতে যাব মাসিমা।
মনীষার মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেল। গত বছরেও এই ছেলেরা তাকে বৌদি বলেছিল। এক বছরের মধ্যে এদের চোখে সে মাসিমা হয়ে গেল? নাকি গত বছর অন্য ছেলেরা এসেছিল?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনীষার মনে হল, সে সত্যিই বুড়ি হয়ে গেছে। তার বয়েস ঠিক তখন পঁয়তিরিশ। একসময় সুন্দরী হিসেবে তার নাম ছিল। স্কুলে তার সঙ্গেই পড়ত বন্দনা সেন, সে এখনও সিনেমায় নামকরা নায়িকা, এখনও সে কলেজের মেয়ে সাজে, মানিয়েও যায়। অথচ কলেজে সবাই বলত বন্দনা সেনের চেয়ে মনীষা মুখার্জি অনেক বেশি সুন্দরী। সেই বন্দনা এখনও যুবতি রয়েছে, আর মনীষা হয়ে গেল মাসিমা?
মন খারাপের জের রয়ে গেল বেশ কয়েকদিন। একদিন সকালে রজত দেখল রান্নাবান্না ছেড়ে মনীষা আয়নার সামনে বসে কাঁদছে।
রজত বলল, এ কী ব্যাপার! তুমি নাটক করছ নাকি?
রজত সবসময় আজকাল একটু খোঁচা দিয়ে কথা বলে। একসময় তাকে কত ভালোবাসত রজত। রাস্তা দিয়ে চলার সময় কেউ মনীষার গায়ে একটু ধাক্কা দিলে রেগে আগুন হয়ে মারতে যেত তাকে। মনীষার একটু অভিমান হলে রজত সেদিন অফিসেই যেত না।
মনীষা বলল, তুমি চাও আমি পাগল হয়ে যাই কিংবা মরে যাই?
রজত বলল, আমি এরকম অদ্ভুত জিনিস চাইতে যাব কেন? তুমি পাগল হলে বা মরে গেলে—দুটোতেই আমার দারুণ ঝামেলা।
তুমি শুধু নিজের ঝামেলার কথাই ভাবো, আর কিছুই ভাবো না!
লক্ষ্মীটি, সকালবেলাতেই এত রাগ কেন? কী হয়েছে খুলে বলো তো?
আমার দিকে একটু চেয়ে দেখার সময় নেই তোমার। তুমি দেখতে পাও না যে আমি বুড়ি হয়ে গেছি?
বুড়ি? কে বললে? এখনো রাস্তায় বেরুলে সবাই তোমার দিকে তাকায়।
মোটেই না। সেদিন একজন দোকানদার আমাকে মাসিমা বলেছে।
রজত হো হো করে হেসে উঠল।
মনীষা আরও রেগে গিয়ে বলল, তুমি হাসছ?
হাসব না? কোন দোকানদার তোমাকে মাসিমা বলেছে, সেইজন্য সকালবেলা আমি বকুনি খাব? সেইজন্য সকালবেলা তুমি পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে?
আমি সত্যিই তো বুড়ি হয়ে গেছি। আমার কপালে একটা দাগ পড়েছে।
কই আমি তো দেখতে পাচ্ছি না! শোন, পঁয়তিরিশ বছর বয়সে কি আর ষোল বছরের মতন চেহারা থাকে? সব বয়েসেরই একটা আলাদা সৌন্দর্য থাকে। আমিও কি আর আগের মতো যুবক আছি?
কিন্তু বন্দনা সেন, সে আমারই বয়েসি।
তুমিও সিনেমায় নামো। মেক-আপ টেক-আপ নিয়ে তোমার বয়েসও অনেক কম দেখাবে।
খানিকটা বাদে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে রজত বলল, মনি, আর একটা কাজ করতে পারো। তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কারুর সঙ্গে প্রেম করা শুরু করে দাও! নতুন প্রেমে পড়লে বয়েস অনেক কমে যায়।
মনীষা বলল, তুমি কারুর সঙ্গে প্রেম করছ বুঝি।
আমার সময় কোথায়? সারাদিনই তো খেটেখুটে মরছি। সময় থাকলে নিশ্চয়ই প্রেম করতাম। দেখলে না মাথায় টাক পড়ে যাচ্ছে আমার? নতুন কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করলে টাক পড়ত না, ব্লাড কোলেস্টেরল হত না। প্রেমে পড়লে শুনেছি হার্ট অ্যাটাকও হয় না। তোমার তো সারাদিনে অঢেল সময়—কারুর সঙ্গে জমিয়ে ফেল। আমি দুপুরে বাড়ি থাকি না। তোমার অনেক সুবিধে। কথা দিচ্ছি, কোনোদিন হঠাৎ অসময়ে বাড়ি ফিরে তোমায় চমকে দেব না।
চুপ করো, বাজে কথা বলো না।
আমি সিরিয়াসলি বলছি!
আহা, এমনি এমনি বুঝি কারুর সঙ্গে প্রেম করা যায়? আমি কোথাও যাই? কারুর সঙ্গে মিশি? রাস্তায় গিয়ে লোককে ডেকে ডেকে বলব ওগো তোমরা কেউ আমার সঙ্গে প্রেম করবে? প্রেম করবে?
রজত আবার হাসতে হাসতে বলল, তাহলে মন্দ হয় না ব্যাপারটা!
অফিসে বেরুবার সময়ও রজত দেখল মনীষার মুখ থমথমে। ছেলেমেয়েদের লুকিয়ে সে মনীষাকে একবার জড়িয়ে ধরে বলল, মনি, আমার ওপর এত রেগে আছ কেন? এই যে আমি এত খাটছি, এ কি আমার নিজের জন্য? তোমার জন্য নয়? তুমি যা চাও, তাই দিয়েছি। তোমার কোনো অভাব রাখিনি। যাদবপুরে জমি কিনে রেখেছি, সামনের বছরে বাড়ি শুরু করব, তুমি যেমন চাও, ঠিক সেই রকম। তোমার সময় কাটে না, আগামী মাসে একটা টি ভি কিনছি।
নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মনীষা বলল, আমি ওসব কিছু চাই না। কিচ্ছু চাই না। আমাকে একটা নতুন জীবন দাও—
সেদিনই দুপুরে খেতে বসে, কাগজ পড়তে পড়তে চোখে পড়ল একটা খবর, বন্দনা সেন বিলেতে যাচ্ছে। আবার রাগ হয়ে গেল মনীষার। বন্দনা এই নিয়ে কতবার বিদেশে গেল? অথচ সে যেতে পারবে না। তার রূপ বা গুণ কোনোটাই কি কম ছিল?
শনিবার মনীষার দিদি জামাইবাবুদের বাড়িতে নেমন্তন্ন। কিন্তু রজত যেতে পারবে না। তার অফিসের কোন সাহেব আসছে, সেইজন্য তাকে যেতে হবে এয়ারপোর্টে। ফিরতে ফিরতে সেই রাত এগারোটা।
ছেলেমেয়েকে নিয়ে মনীষা একাই গেল। অনেক লোকজন এসেছে। তার মধ্যে একটি মেয়ে কী সুন্দরী! চবিবশ পঁচিশ বছর বয়েস, মুখ দিয়ে যেন একটা দীপ্তি বেরুচ্ছে। মনীষার দিদি হঠাৎ বলল, বিয়ের ঠিক আগে মনীষাকেও দেখতে এই রকম ছিল।
মনীষা বলল, যাঃ, মোটেই না। ও অনেক বেশি সুন্দরী।
গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মনীষা। ওই বয়েসটা তো সে আর কোনোদিন ফিরে পাবে না!
মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হল। ওর নাম দেবযানী। বয়েস অত কম নয়। মেয়েটি নিজেই বলল, ওর বয়েস আটাশ। বিয়ে হয়েছে দু-বছর আগে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থাকে তেহেরানে।
মনীষার জামাইবাবু বললেন, ওর কাছে তেহেরানের অনেক গল্প শুনছিলাম। দারুণ ব্যাপার বুঝলে! স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করে, মাইনে পায় ডলারে। ফ্রি এয়ার কন্ডিশানড বাংলো, ফ্রি গাড়ি—খরচই নেই। ওরা তো টাকা জমিয়ে একবার বিলেত-ফ্রান্স ঘুরে এল।
মনীষা জিজ্ঞেস করল, আপনারা দুজনেই ওখানে একসঙ্গে চাকরি পেয়েছেন?
দেবযানী বললেন, না, প্রথমে ও একলাই চাকরি নিয়ে গিয়েছিল। আমি একলা একলা সারাদিন থাকতাম। তাই ভাবলাম, বসে থেকে কী করব। একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে নিলাম।
ওখানে বুঝি সহজেই চাকরি পাওয়া যায়?
হ্যাঁ। এখন তো আমাদের দেশ থেকে অনেকেই যাচ্ছে। ওরা ইন্ডিয়ানদের বেশ পছন্দ করে।
জামাইবাবু বললেন, বুঝলে না, পেট্রোলের টাকা, অঢেল টাকা। কী করে খরচ করবে ভেবে পায় না। বহু লোক নিয়ে যাবে এদেশ থেকে।
মনীষা জিজ্ঞেস করল, আমি চাকরি করতে পারি? আমার একটা এমএসসি ডিগ্রি আছে।
দেবযানী বেশ আগ্রহের সঙ্গে বললেন, তাহলে তো আপনি নিশ্চয়ই পাবেন। অন্তত স্কুলে তো পাবেনই!
কত মাইনে?
আমাদের টাকার হিসেবে প্রায় চবিবশশো টাকা। তাছাড়া বাড়ি ফ্রি। বছরে একবার যাতায়াতের ভাড়া।
জামাইবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তেহেরানে যাবে ভাবছ নাকি?
মনীষা মুচকি হেসে বলল, ভাবছি। গেলে মন্দ হয় না।
তোমার তিনটি ছেলেমেয়েকে কার কাছে রেখে যাবে?
তিনটি?
বাঃ, রজতও তোমার ছেলেরই মতন। তোমাকে ছাড়া নিজে কিছু করতে পারে না। গেঞ্জি আন্ডারওয়্যার কোথায় থাকে, তার খবরও রাখে না পর্যন্ত।
আহা-হা! তখন রাখবে। আমি এতদিন ছেলেমেয়ে দেখাশোনা করেছি, এবার কিছুদিন ও করুক।
দেবযানী বলল, ওখানে গেলে কিন্তু তিন বছরের কন্ট্রাক্টে যেতে হবে। তার আগে কাজ ছেড়ে দিলে টাকা ফেরত দিতে হয়।
জামাইবাবু হাসিঠাট্টা করে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন।
পরদিন সকালে মনীষা রজতকে বললে, আমি যদি তেহেরান যাই, তোমার আপত্তি আছে?
রজত আকাশ থেকে পড়ল, তেহেরান? সেখানে তুমি হঠাৎ যাবে কেন? যাবেই-বা কী করে?
মনীষা হাসতে হাসতে বলল, চাকরি নিয়ে যাব। ইচ্ছে করলেই সেখানে চাকরি পেতে পারি।
তাই নাকি? ইচ্ছে করলেই পেতে পারো?
হ্যাঁ মাইনে কত জানো? চবিবশশো টাকা! ডলারে পেমেন্ট। ওই টাকা জমিয়ে বিলেত ফ্রান্স ঘুরে আসতে পারি। কি—যেতে দেবে?
দু-এক মুহূর্ত মাত্র চুপ করে থেকে রজত বললে, তোমার যদি ইচ্ছে হয় যাবে। তোমার কোনো ইচ্ছেতে আমি বাধা দিয়েছি?
মন থেকে বলছ?
নিশ্চয়ই!
ছেলেমেয়েদের কী হবে?
আমি দেখব ওদের।
হুঁ তুমি দেখবে ছেলেমেয়েদের। তোমার সময় কোথায়?
একজন বয়স্কা মহিলা রেখে দেবো, যে ওদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা দেখাশোনা করবে! একটু ভোর ভোর উঠে আমি ওদের পড়াব। চেষ্টা করব, অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে।
এখন ফেরো না কেন তাড়াতাড়ি?
এখন ফিরি না, কারণ ওদের দেখাশোনা করবার জন্য তুমিই তো আছ।
ছেলেমেয়েদের দেখাশোনাটাই বড়ো কথা? শুধু আমার জন্য বুঝি তাড়াতাড়ি ফিরতে পারো না?
সোনা, অফিসে যখন খুব কাজ থাকে, তখন কি আমি বলতে পারি যে আমার স্ত্রী বাড়িতে অপেক্ষা করছে, আমাকে চলে যেতে হবে? বিয়ের তেরো চোদ্দ বছর পর এ কথাটা বলা যায় না, ন্যাকামির মতো শোনায়। কিন্তু মা বাড়িতে নেই, ছেলেমেয়েরা একলা রয়েছে, এজন্য কাজ ফেলেও তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা যায়। দুদিন হয়তো একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা যায়।
দুদিন হয়তো একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে, তারপর আড্ডায় মেতে আবার ভুলে যাবে।
না, ভুলে যাব না। তা ছাড়া, আমাদের চাকরিতে কিন্তু লোকের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াও একটা কাজ।
আমি যদি যাই, ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাব?
অসম্ভব! ওদের পড়াশোনা নেই? ছেলেটা ক্লাস এইটে উঠেছে, এখন একদিনও ওর পড়াশোনা নষ্ট করা উচিত নয়।
টুম্পু। টুম্পু যদি যায়? ও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।
টুম্পুকে নিয়ে যেতে পারো। ও ছোটো আছে।
তখনকার মতন কথাবার্তা সেইখানেই থেমে রইল। মনীষা অন্যদিনের মতন মেয়েকে স্নান করিয়ে রজতকে খাবার সাজিয়ে দিল। অন্যদিনের চেয়ে সেদিন একটু গম্ভীর মনে হল রজতকে। কথাবার্তা তার ঠিকঠাকই আছে, কিন্তু মুখে যেন একটা পাতলা ছায়া।
দুপুরবেলা কিছুতেই ঘুম এল না মনীষার। গুমোট গরম পড়েছে দুদিন ধরে। পাখার হাওয়াতে ঘাম শুকোয় না। …ইরান দেশটাও খুব গরম নিশ্চয়ই। হোক না গরম, এয়ারকন্ডিশানড বাড়ি…দেবযানী বলেছিল, ওখানকার স্কুল হয় সকাল আটটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত, এসময় ছুটি…ওদেশের খাবার-দাবার কেমন হয় সে জানে…মনীষা নিজেরটা নিজেই রান্না করে নেবে, দারুণ চাল পাওয়া যায়। দেবযানী বলেছিল দুধ, মাখন সব খুব সস্তা…টুম্পুর স্বাস্থ্যটা যদি ফেরে…তার পর এক ছুটিতে প্যারিসে ঘুরে আসা…ছেলেবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল একবার প্যারিস যাওয়ার…
বিকেলবেলা বাবলু স্কুল থেকে ফেরার পর, তাকে জলখাবার দিয়ে মনীষা জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে বাবলু, আমি যদি তিন বছরের জন্যে বাইরে কোথাও যাই, তুই বাবার কাছে থাকতে পারবি?
একটু বাদে বাবলুর ফুটবল খেলার বন্ধুরা ডাকতে আসবে। তার আগে সে এইটুকু সময়ের জন্যই একটা গল্পের বই খুলে বসেছে। মায়ের কথাটার কোনো গুরুত্ব না দিয়েই সে বললে, হ্যাঁ পারব! তুমি কোথায় যাবে মা?
তেহেরান।
ও!
ও বললি যে? তুই জানিস তেহেরান কোথায়?
জানি। ইরানের রাজধানী।
আমি অতদূরে চলে গেলে তোর মন কেমন করবে না?
বাঃ—, মন কেমন করবে কেন? তুমি তো বললে তিন বছর পরে ফিরে আসবে। মনীষার মনটা একটু দমে গেল। বাবলু তার কথায় কোনো গুরুত্বই দিল না। একবার জানতে চাইলে না, মা কেন চলে যাবে! তার গল্পের বই আর বন্ধু-বান্ধবরাই এখন সব। অথচ মাত্র দু-বছর আগেও রাত্তিরে একটা না একটা গল্প না বললে বাবলু ঘুমোত না। ছেলেটা দূরে সরে যাচ্ছে, তিন বছর পর বাবলু আর তাকে চিনতে পারবে কিনা কে জানে!
মনীষা গাঢ় গলায় ডাকল, বাবলু।
এই ডাক শুনে বাবলু চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাল।
মনীষা বুকের ভেতরকার বাষ্প চেপে রেখে বলল, বাবলু, তিন বছর পরেও যদি আমি ফিরে না আসি, যদি আমি মরে যাই, তোদের কোনো কষ্ট হবে না, না রে?
বাবলু বই ছেড়ে উঠে এসে মনীষার গলা জড়িয়ে ধরে বললে, মা তোমার কী হয়েছে? তোমার মন খারাপ হয়েছে?
যদি আমি মরে যাই?
ধ্যাৎ!
সেদিন রজত বাড়ি ফিরল রাত সাড়ে এগারোটার পর। অনেকখানি হুইস্কি খেয়েছে, চোখ লাল। ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছে না।
মনীষা বলল, এই তোমার তাড়াতাড়ি ফেরার নমুনা? আজই কথা হল আর আজই তুমি দেরি করে ফিরলে?
রজত কড়া গলায় বললে, তাতে কী হয়েছে? তুমি তো আজই বাগদাদ না দার-এস-সালাম কোথায় যেন চলে যাওনি? আজ আমার দরকার ছিল তাই দেরি হয়েছে!
দরকার! রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত কারুর অফিসের দরকার থাকে? মুখে মদের গন্ধ! তোমাদের অফিসে কি আজকাল মদ্যপানও চলছে না কি !
রজত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, অফিসে বসে মদ খাব কেন? হোটেল হিন্দুস্থানে গিয়ে খেয়েছি, ক্যাবারে নাচ দেখেছি, কত বিল হয়েছিল জানো? চারশো দশ টাকা। তার ওপর চল্লিশ টাকা টিপস দিয়েছি। বিশ্বাস হচ্ছে না?
তোমার মতো মানুষের ওপর আমি ছেলের ভার দিয়ে যাব?
ছেলের জন্যে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না! সে আমি দেখব!
আজকাল বাড়ির কথা তুমি একটুও চিন্তা করো না। অফিসের কাজের নাম করে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত বাইরে থাক, তারপর বাড়িতে এসে নির্লজ্জের মতন মাতলামি করছ।
বেশ করছি! হ্যাঁ, আমি নির্লজ্জই তো।
আমি, আমি…
এখন নাকি কান্না কেঁদো না। প্লিজ…
মনীষা বাথরুমে চলে গেল কাঁদতে। খানিক বাদে বেরিয়ে এসে দেখল রজত অঘোরে ঘুমোচ্ছে। গায়ের জামাটাও খোলে নি। উপুড় হয়ে মুখগুঁজে আছে বালিশে। মনীষা এসে বারান্দায় দাঁড়াল। রজতের জন্য সে এতক্ষণ না খেয়ে বসে ছিল। এখন আর তার খেতে ইচ্ছে করছে না। রজতকে এখন আর ডেকে লাভ নেই। বাইরের রাতটা ভারি সুন্দর। পাতলা ফিনফিনে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে আকাশে। ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস। মাত্র কয়েক বছর আগেও সে আর রজত রাতে খাওয়ার পর এই বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে অনেকক্ষণ গল্প করত। এখন গল্প তো দূরের কথা, সারাদিনে রজতের সঙ্গে দুটো-চারটের বেশি কথাই হয় না। রজত কত বদলে গেছে।
…তেহেরানের বাড়িটার রং কী হবে? সাদা? সাদা রঙই মনীষার পছন্দ। সাদা ছিমছাম, একতলা বাড়ি। সামনে একটা ছোটো বাগান থাকবে। নিজের হাতে যত্ন করবে মনীষা। ওই বাগান নিয়েই তার সময় কেটে যাবে। ওদেশে কী কী ফুলগাছ পাওয়া যাবে? গোলাপ ফুল নিশ্চয়ই আছে। গোলাপ তো ওই সব দেশ থেকেই এসেছে। বসরাই গোলাপ বিখ্যাত!
ওইসব মরুভূমির দেশের আকাশ অনেক পরিষ্কার হয়। জ্যোৎস্না অনেক গাঢ় হয়। এই রকম সময়, গোলাপ বাগানের মধ্যে জ্যোৎস্নার নীচে বসে থাকবে মনীষা একা। আঃ, শান্তি, শান্তি!
পরদিন মনীষার ঘুম ভাঙল একটু দেরিতে। রজত আগেই উঠে পড়ে বসবার ঘরে কাগজ খুলে বসেছে। সামনে খালি চায়ের কাপ। নিজেই চা বানিয়ে নিয়েছে বোধহয়। মুখখানা গম্ভীর।
মনীষা আপন মনে নিজের কাজ করতে লাগল। বসবার ঘরে এল না একবারও। আজ ছুটির দিন, তাই ছেলেমেয়েদের জাগাল না।
রজত একবার ডাকল, মনি, শোন!
মনীষা কোনো সাড়া দিল না।
রজত আরও দু-তিন বার ডেকে সাড়া না পেয়ে চলে এল রান্নাঘরে।
মনীষা পিছনে না ফিরেই তার উপস্থিতি টের পেয়ে শুকনো গলায় বলল, টোস্ট আর ডিম সেদ্ধ দেওয়া হচ্ছে।
রজত বলল, ঠিক আছে, আমার কোনো তাড়া নেই। শোন, আমি ভাবছিলাম আজ দুপুরে রান্নাবান্না করার দরকার নেই। সবাই মিলে চল বাইরে গিয়ে কোথাও খেয়ে আসি।
মনীষা বলল, দরকার নেই। আমি বাড়িতেই রেঁধে নিতে পারব।
সে তো রোজই রাঁধছ। চল, আজ কোনো চিনা দোকানে খাই!
ঘুষ দিতে চাইছ?
ঘুষ?
আগের দিন বাড়ি ফিরে মাতলামি করে পরদিন চিনে খাবারের ঘুষ? তোমার যদি ইচ্ছে হয় আজ আবার হোটেল হিন্দুস্থানে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেও ওসব।
রজত একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বেশ গম্ভীরভাবেই বলল, কাল রাতে তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি, সেজন্যে আমি দুঃখিত। কাল আমার মেজাজটা ভালো ছিল না।
এসব কথা বলার জন্য যতটা গলার আওয়াজ নরম করা উচিত, যতটা বিনীত হওয়া উচিত, রজতের কথায় তা নেই! সে যেন কথাগুলো বলছে দায়সারা ভাবে। মনীষার আরও রাগ হয়ে গেল।
রজত ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে রান্নাঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল, সাড়ে চারশো টাকা খরচ করে হোটেল হিন্দুস্থানে গিয়ে মদ খাবার মতন দুর্মতি যে আমার হয়নি, সেটা তোমার বোঝা উচিত ছিল। টাকাটা দেবে কোম্পানি। একজন অপরিচিত পাঞ্জাবির সঙ্গে বীভৎস ক্যাবারে নাচ দেখবার মতন রুচি যে আমার নেই, আশা করি এটাও তুমি জানো। তবু আমাকে যেতে হয়েছিল। লোকটি একজন আর্মি অফিসার। আমাদের একটা জিনিসের কোয়ালিটি ও অ্যাপ্রুভ না করলে বারো লাখ টাকার একটা অর্ডার ক্যানসেলড হয়ে যেতে পারে। সেইজন্য কোম্পানি থেকে ওই লোকটিকে ঢালাও তোষামোদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই লোকটিই ক্যাবারে দেখতে চেয়েছিল, আমাকে ওর পাশে বসে সর্বক্ষণ দেঁতো হাসি হাসতে হয়েছে।
মনীষা মুখ ঘুরিয়ে ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, ও রকম চাকরি করা কেন? ছেড়ে দিতে পারো না? চাকরি করতে গেলে এরকম নোংরা কাজ করতে হবে?
এ দেশের সব কোম্পানি এক্সিকিউটিভদেরই নানা রকম নোংরা কাজ করতে হয়। সকলে এই কাজগুলোকে নোংরা মনে করে না অবশ্য।
ছেড়ে দাও ওই চাকরি?
মেয়েদের পক্ষে এইসব কথা বলা সোজা। তারা একবারও চিন্তা করে না, টাকাটা রোজগার হয় কীভাবে। অথচ টাকা না থাকলেই তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। যে মাসে একটু টাকা পয়সার অসুবিধে থাকে, সেই মাসটা একটু টেনেটুনে চালাতে বললে, অন্তত সাতবার শোনাবে, কত দরকারি জিনিস সে মাসে কেনা হল না। তোমার দিদি কিংবা কোনো মাসি কত বেশি টাকা খরচ করে, বলো না?
তুমি চাকরি ছেড়ে দাও, দরকার হলে আমরা গাছতলায় গিয়ে থাকব।
সেখানেও তোমার মোজাইক করা পরিষ্কার বাথরুমের দরকার হবে। তা ছাড়া আমরা গাছতলায় থাকবই বা কেন? আমরা নিজেদের বাড়িতে আর পাঁচজনের মতন ঠাট বজায় রেখেই থাকব। সেজন্যে কিছু মূল্য দিতেই হয়।
আমি কিন্তু তেহেরানে চলে যাবই।
আমি তো আপত্তি করিনি। আমি তোমার কোনো কাজে কখনও বাধা দিয়েছি। এখানে তোমার জীবন যদি একঘেয়ে লাগে, তুমি কিছুদিনের জন্য নিশ্চয়ই ঘুরে আসতে পারো।
অন্তত তিন বছর।
বেশ তো?
রজত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটু পরেই আবার ফিরে এল। মনীষার কাঁধে হাত রেখে শান্তভাবে বলল, একটা জিনিস কখনো ভুল করো না। আমি তোমায় ভালোবাসি।
দেবযানী মেয়েটি ফিরে গেছে ইরানে। সেখান থেকে সে মনে করে ফর্ম পাঠিয়ে দিয়েছে মনীষাকে। দুপুরবেলা রেজিস্টার্ড পোস্টে খামটা আসবার পর মনীষা বহুক্ষণ ধরে ফর্মগুলো পড়ে দেখল। বাবা রে বাবাঃ, কত রকম নিয়ম কানুন। বাবা, মা, ঠাকুর্দা, ঠাকুমা, দিদিমাদের কারুর কোনো অসুখ আছে কিনা তা পর্যন্ত জানাতে হবে। কিন্তু মাইনে বেশ ভালো। বছরে এগারো মাস কাজ। এক মাস পুরো ছুটি। সেই সময় দেশে ঘুরে যাবার ভাড়া দেবে ইরান সরকার।
…একবছর পর ফিরে এসেছে মনীষা। টুম্পুটার দারুণ স্বাস্থ্য হয়েছে। পাড়ার ছেলেরা তাকে ট্যাক্সি থেকে নামতে দেখেই বলল, বৌদি, কোথায় ছিলেন এতদিন? নীচতলায় ভাড়াটে বলল, মনীষাদি কী সুন্দর দেখতে হয়েছ তুমি! ঠিক যেন দশ বছর বয়েস কমে গেছে! মনীষার সঙ্গে প্রচুর জিনিসপত্তর। সকলের জন্য উপহার এনেছে নানা রকম। রজত হাসতে হাসতে বলল, তোমাকে যেন চেনাই যাচ্ছে না। ঠিক যেন মনে হচ্ছে অন্য কাদের বউ। মনীষা লাজুকভাবে হেসে বলল, আহা হা, এক বছরে কেউ এতখানি বদলায় নাকি? তারপর সে আবার খুব উৎসাহের সঙ্গে বলল, জানো, আসবার আগে গ্রিস ঘুরে এলাম! এথেন্সে ছিলাম, আরও দু-একটা জায়গায় যেতাম, কিন্তু টুম্পুটা বাড়ি ফেরার জন্য কান্নাকাটি করল, অনেকদিন তোমাকে দেখেনি তো…
দরজায় শব্দ হল। টুম্পু এসে গেছে স্কুল থেকে। মনীষার মেজাজটা আজ খুব ভালো। টুম্পুর হাত থেকে বই খাতা নিয়ে সে বলল, টুম্পু শোন, তোমাকে আর এই স্কুলে পড়তে হবে না।
টুম্পু বলল, আমাকে বড়ো ইস্কুলে ভরতি করে দেবে? বড়ো হয়ে গেছি!
না। আমরা দূরে এক জায়গায় বেড়াতে চলে যাব। তুমি সেখানকার স্কুলে পড়বে।
কোথায় মা?
সে অনেক দূর। এরোপ্লেনে করে যেতে হবে। দাদা আর বাবা কিন্তু যাবে না।
শুধু তুমি আর আমি।
দাদাকে নিয়ে যেও না। দাদা দুষ্টু। বাবা যাবে!
না, বাবাও যাবে না।
টুম্পু একগাল হেসে ফেলে বলল, হ্যাঁ, আমি জানি বাবা যাবে। তুমি মিথ্যে কথা বলছ। বাবা না গেলে কে আমাদের নিয়ে যাবে?
কেন? আমি বুঝি নিয়ে যেতে পারি না?
পুরীতে যাবার সময় তুমি যে রেলের টিকিট হারিয়ে ফেললে?
ও মা! সেকথা তোর এখনো মনে আছে? তুই তো তখন অনেক ছোটো!
হ্যাঁ, মনে আছে। বাবা বকল তোমাকে সেইজন্য।
একবার টিকিট হারিয়ে ফেলেছি তো কী হয়েছে। এবার কিছু হারাবে না!
পরদিন সকালে রজতকে ফর্মগুলো দেখাল মনীষা। রজত প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বলল, এখানে ছেলেমেয়েদের কথা কিছু লেখা নেই। যার চাকরি হবে, সে যাওয়ার ভাড়া পাবে। ছেলেমেয়েদের ভাড়া দেবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না!
মনীষা একটু দম নিয়ে বলল, এই রে, তাহলে টুম্পু যাবে কী করে?
রজত বলল, সেটা এমন কিছু ব্যাপার নয়। সব ব্যবস্থা যদি হয়ে যায়, তাহলে টুম্পুর ভাড়া আমি জোগাড় করে দিতে পারব।
কত টাকা।
সে দেখা যাবে। কিন্তু তোমার পাসপোর্টও তো করিয়ে রাখা দরকার। হঠাৎ যদি সব ঠিক হয়ে যায় তাহলে পাসপোর্টের জন্য আটকে যেতে পারে। আমি পাসপোর্টের ফর্ম আনিয়ে দেব কালই।
খানিক বাদে মনীষা বলল, তুমি কাল রাতে ভয়ংকর কাশছিলে?
রজত বলল, কই না তো!
হ্যাঁ, ঘুমের মধ্যে কাশতে কাশতে একবার উঠে বসলে পর্যন্ত।
ও কিছু না।
তুমি একবার ডাক্তার দেখালে পারো!
সামান্য কাশির জন্য কেউ ডাক্তার দেখায়? তা ছাড়া এখন আমার সময়ও নেই। সিগারেটটা একটু কমিয়ে দিলেই হবে।
পাসপোর্টের ফর্মের কথা রজত নিজে বললেও সেটা আবার সে ভুলে গেল। দুদিনের মধ্যেও সে আর উচ্চবাচ্য করল না দেখে মনীষার একটু সন্দেহ হল, তা হলে কি রজত তার যাওয়াটা ঠিক চায় না? কিন্তু এদিকে মনীষার মনের ভাব এমন যেন তার তেহেরান যাওয়া একেবারে ঠিকঠাক হয়ে গেছে। সে এখন সাদা রঙের একতলা বাড়িটা যখন তখন দেখতে পায় চোখের সামনে। সে এমন কী সেই বাড়িটা তার মনের মতন করে সাজাতে শুরু করে দিয়েছে। মনে মনে।
তৃতীয় দিনে সে জিজ্ঞেস করল, তুমি সেই পাসপোর্টের ব্যাপারটা…তোমার যদি অসুবিধে থাকে, তাহলে আমিই না হয়—
রজত খুবই লজ্জিত হয়ে বলল, এই রে ছি ছি। আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আজই অফিসের একটা কাজ নিয়ে এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছি কদিন ধরে…অন্য কোনো দিকে মনই দিতে পারছি না।
অফিসে থেকে কেন এত দুশ্চিন্তা করো! শরীর খারাপ হয়ে যাবে শেষে! মালিকরা টাকা দেয় বলে কি তোমাকে কিনে নিয়েছে নাকি?
চাকরি মানে তো অনেকটা তাই! তা ছাড়া, একটা ব্যাপার কী জানো, কোনো একটা কাজ হাতে নিয়ে সেটা ঠিকমতন শেষ করতে না পারলে শান্তি পাওয়া যায় না। পুরুষ মানুষের একটা চ্যালেঞ্জ। যাক গে, তোমার পাসপোর্টের ফর্ম আমি আজই আনিয়ে দেব।
আমি ফর্মটা ফিলাপ করেছি।
তাহলে ওটা পাঠিয়ে দাও, দেরি করছ কেন?
একটা জায়গায় বুঝতে পারছি না। তুমি একটু দেখে দেবে?
রজত ফর্মটা নিয়ে যেটুকু বাকি ছিল, সব ভরতি করে দিল। পাড়ার স্টুডিও থেকে এর মধ্যেই মনীষা পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলিয়ে এনেছে ছখানা। সেই কখানা ছবি দিতে হবে অ্যাপ্লিকেশনের সঙ্গে। ছবিটা দেখে রজত বলল, তোমাকে একটা বাচ্চা মেয়ের মতন দেখাচ্ছে!
মনীষা বলল, যাঃ, বুড়ি হয়ে গেছি। দেখি, যদি ওখানে গিয়ে শরীরটা সারে।
খামের ওপর ঠিকানা লিখে রেখেছে মনীষা আগেই। এবার তার মধ্যে সব কাগজপত্র ভরে আঠা দিয়ে আটকে দিল। রজত বলল, দাও, আমি অফিস থেকে বেয়ারা পাঠিয়ে ওটা পোস্ট করে দেব এখন।
মনীষা বলল, রেজিস্ট্রি করে পাঠাতে হবে।
রজত বলল, তা তো নিশ্চয়ই। সে আমি ঠিক করে দেব এখন।
তুমি পাঠিয়ে দেবে? যাক।
কেন?
তুমি কেন কষ্ট করবে। আমি আজ একবার বেরুব, পোস্ট অফিস তো কাছেই, আমিই পোস্ট করে দেব এখন।
আমার আবার কষ্ট কী। বেয়ারা পাঠিয়ে দেব।
যাক। আমিই দেব এখন।
রজত কয়েক মুহূর্ত স্থিরভাবে তাকিয়ে রইল মনীষার দিকে। গুপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অফিস যাবার পথে ম্লান হয়ে রইল তার মুখ। মনীষা তাকে বিশ্বাস করে না। মনীষা বোধহয় ভেবেছে, রজত ঠিক মতন ওই খামটা না-ও পাঠাতে পারে।
মনীষা কিন্তু এসব বুঝল না। সে নিজের আনন্দে মশগুল হয়ে আছে। এই খামটা যেন তার নতুন জীবনে প্রবেশের চাবিকাঠি। এটা সে নিজের হাতে পাঠাবে, এই কথা ভেবেই উত্তেজিত হয়ে আছে।
সেদিন হঠাৎ সন্ধে সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এল রজত। হাত মুখ ধুয়ে, জামা কাপড় ছেড়েই সে ছেলেকে ডেকে বলল, বাবলু, তোর ইংরেজি গ্রামার বইটা নিয়ে আয়।
বাবলু রীতিমত অবাক। বাবা কোনোদিন তাকে পড়ায় না। কিন্তু সেদিন রজত দারুণ তোড়জোড় করে পড়াতে বসল বাবলুকে। পড়াবার অভ্যাস নেই বলেই সে রেগে উঠতে লাগল প্রায়ই। রাত সাড়ে নটা বেজে গেছে, ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে বাবলুর, রজত তবু নিষ্কৃতি দেবে না।
মনীষা বলল, আজ আর থাক। এবার ওঠো।
রজত বলল, ও গ্রামারে খুবই কাঁচা রয়েছে দেখছি! কিছুই জানে না।
মনীষা হেসে বলল, তুমি কি একদিনেই ওকে পণ্ডিত করে তুলবে নাকি?
এবার থেকে প্রায়ই ওকে নিয়ে বসব ঠিক করেছি।
তাহলে তো ভালোই হবে। ওর মাথা আছে, কিন্তু বড্ড ফাঁকি দেয়।
টুম্পু অভিমান করে রইল বাবার ওপর! বাবা কেন দাদাকে পড়াচ্ছে, আমাকে পড়াচ্ছে না? বাবা কি দাদাকে বেশি ভালোবাসে তার চেয়ে?
কয়েক মাস কেটে গেছে, মনীষা পাসপোর্ট নিয়ে তৈরি হয়ে বসে আছে। কিন্তু ইরান থেকে আর উত্তর আসে না। মনীষা আলাদা চিঠি লিখল সেই দেবযানী নামের মেয়েটিকে। দিন পনেরো বাদে উত্তর এল। দেবযানী এখন আর তেহেরানে নেই, তার স্বামী আরও ভালো চাকরি পেয়ে চলে এসেছে বাগদাদে। ওরা ঠিক খবর দিতে পারবে না। কিন্তু মনীষার তো হয়ে যাবার কথা। ওর চেনা একজন বড়ো অফিসারকে বলে এসেছিল মনীষার কথা।
একদিন মনীষা সকালবেলা ক্ষুণ্ণভাবে বলে ফেলল, তিনমাস হয়ে গেল। কোনো উত্তর এল না? দূর ছাই, ওরা বোধহয় আর ডাকবে না!
রজত অতি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের সঙ্গে বলল, খামটা তো তুমি নিজেই পাঠিয়েছিলে রেজেস্ট্রি করে। পৌঁছেচে নিশ্চয়ই।
মনীষা ব্যঙ্গটা ধরতে পারল না। সে বলল, পৌঁছবে না কেন? ওরাই উত্তর দিচ্ছে না!
মনীষার মন খারাপ করা মুখের দিকে চেয়ে রজত একটু সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আসবে, এখনো বেশি দেরি হয়নি, মোটে তো তিন চার মাস হল—
তারপর সে একটু মিনমিন করে বলে, শুনেছিলাম, আজকাল বাইরের সব চাকরিই মিনিষ্ট্রি অব এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্সের থ্রু দিয়ে আসতে হয় সেটাও কিছু অসুবিধে হবে না। ওরা কিছু লিখলে দিল্লি থেকে অনুমতি আনিয়ে নেওয়া যাবে। নিছক একটা নিয়ম রক্ষার ব্যাপার।
কিন্তু পরের মাসেও কোনো চিঠি এল না। এদিকে সেই গোলাপ বাগান ঘেরা একতলা বাড়িটা তেহেরান শহরে এখনো খালি পড়ে আছে। মনীষা তার জানলার পর্দার রং পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পায়।
রজতের অফিসের ব্যাগটায় মনীষা কখনো হাত দেয় না। অনেক দরকারি কাগজপত্র থাকে, মনীষার ভুলো মন, যদি কোনো কাগজ হারিয়ে যায়। সেইজন্য একদিন ব্যাগটা খাবার টেবল থেকে ঘরে নিয়ে রাখতে গিয়ে হঠাৎ খুলে গেল। পড়ে গেল কয়েকটা কাগজ। সেগুলো তুলতে গিয়ে ঠিক আসল কাগজটাই সে দেখে ফেলল। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। রজতের ব্লাডপ্রেসার অনেক বেড়েছে। তার ব্লাড কোলেস্টেরল হয়েছে, হার্টের ই সি জি করাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেওয়া হয়েছে একগাদা ওষুধ।
মনীষা গালে হাত দিয়ে বসে রইল। রজত এসব কথা কিছুই বলেনি। এর একটাও ওষুধ নেই বাড়িতে। রজত এমনিতেই চাপা স্বভাবের, নিজের অসুখ বিসুখের কথা সে কখনো বলে না। কিন্তু এত বড়ো একটা ব্যাপার সে গোপন করে যাবে! রজত তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়।
এরপর একদিন রাত এগারোটা বেজে গেল, তবুও রজত ফিরল না। অফিসে বেরুবার সময় সে সামান্য একটু আভাস দিয়ে গিয়েছিল যে তার ফিরতে দেরি হতে পারে। কত দেরি? রজতের শরীর ভালো নেই, প্রায়ই রাতে সে খুব কাশে, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেই হাঁপিয়ে যায়। তবু অফিসের জন্য এত খাটুনি, এত রাত করা, হঠাৎ যদি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে? যাতে তার তেহেরান যাওয়ার ব্যাঘাত না হয়, তাই রজত তার অসুখের কথাটা গোপন করে গিয়েছিল।
বিছানায় কাঠ হয়ে শুয়ে রইল মনীষা। রাস্তায় যে-কোনো লোকের পায়ের শব্দ বা যে-কোনো গাড়ির আওয়াজ শুনলেই মনে হয়, ওই বুঝি রজত এলো! কিন্তু সে আসে না।
মনীষা অন্ধকারের মধ্যে চেয়ে থাকে—আস্তে আস্তে সেই অন্ধকারের মধ্যে ফুটে ওঠে একটা সাদা বাড়ি। ভেতরটা ঠান্ডা। বাইরের আকাশে প্রগাঢ় জ্যোৎস্না। গোলাপ বাগান ধুয়ে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। সেই বাগানে একটি চেয়ার। ফাঁকা। এ বাড়িটার নাম মুক্তি। অনেক অনেক দূরে ওই বাড়ি, মনীষা ওখানে কোনোদিনও যাবে না।
মর্মবেদনার ছবি
মর্মবেদনার ছবি
লেক মার্কেটে নাকি অন্য বাজারের চেয়ে ভালো মাছ পাওয়া যায়। যত সব বাজে কথা! এক একজন আছে, নিজের পাড়াটাকে সব ব্যাপারে বড়ো করে দেখাতে চায়। মর্নিং ওয়াকের সময় রোজ রোজ ধরণিধরের কাছে লেক মার্কেটের নানান গুণপনার কথা শুনে কিশোর আজ গিয়েছিলেন সেখানে। গিয়ে দেখেন কীসের কী। মাছের বদলে মাছির দৌরাত্মই বেশি। পড়ে আছে কিছু আড় মাছ আর বড়ো বড়ো নোনাজলের ভেটকি, যার কোনো স্বাদ নেই।
মনঃক্ষুণ্ণভাবে বাজার সারলেন কিশোর। এর মধ্যে অনেকবার ধরণিধরের মুণ্ডুপাত করা হয়েছে। জগুবাবুর বাজার এর চেয়ে অনেক ভালো, সেখানে দোকানিরা সবাই চেনা, কেউ খারাপ জিনিস দেয় না। কিশোর ঠিক করে ফেলেছেন, আর কোনোদিন পরের কথায় নাচবেন না। জীবনের আর যে-কটা দিন বাকি আছে, নতুন করে আর অচেনা লোকের সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবার দরকার নেই। মানুষের জীবনের একটা সময়ে গণ্ডিটা ছোটো হয়ে আসে, তখন অল্প কয়েকজনকে নিয়েই খুশি থাকতে হয়। যাক, এই একটা শিক্ষা হল আজ।
ফলের দোকানগুলোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ একটা ঝুড়ির দিকে চোখ পড়ল। দোকানের বাইরে রাখা আছে ঝুড়িটা, তাতে ভরতি কামরাঙা ফল।
কিশোর থমকে দাঁড়ালেন। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন কামরাঙাগুলোকে। তারপর নীচু হয়ে একটা তুলে নিলেন হাতে। ঠান্ডা সবুজ রঙের কামরাঙা ছুঁয়ে তাঁর হাতের অদ্ভুত আরাম হল। সেই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন যে, ঠিক পঁয়ত্রিশ কিংবা তারও বেশি, বোধহয় চল্লিশ বছর বাদে তিনি কামরাঙা ফল হাতে ছুঁচ্ছেন। একটা চেনা জিনিস জীবনে এতদিন বাদ ছিল?
কোনোদিনই কিশোর কামরাঙা কেনেননি। তাই দাম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই। এ দেশে কামরাঙা দুর্লভ জিনিস নিশ্চয়ই, নইলে এতদিন চোখে পড়েনি কেন?
এগুলো কত করে?
দোকানদারটিও বেশ বয়স্ক। গোঁফটি পুরো পাকা। বেশ ভরাট মুখ। দৃষ্টিতে গাম্ভীর্য আছে।
আশি পয়সা জোড়া। তিনটে এক টাকা।
কিশোর খুশি হলেন। বেশ সস্তাই বলতে হবে। পাঁচ টাকা জোড়া শুনলেও তিনি আশ্চর্য হতেন না। মনে মনে হিসেব করে তিনি বললেন, আচ্ছা, তা হলে নটা দিন।
নটা শুনে দোকানদারটি বিস্মিতভাবে তাকালেন কিশোরের দিকে। তারপর কিছু যেন বুঝতে পেরে হাসলেন। কিশোরের সঙ্গে তার একটা সমমর্মিতা স্থাপিত হল। তিনি বললেন, ন্যান, আপনে দশটাই ন্যান, তিন টাকা দেবেন।
বেশ মন দিয়ে বেছে বেছে একটা একটা তুলতে লাগলেন কিশোর। কয়েকটা আছে আধপাকা, কিন্তু সেই রং কিশোরের পছন্দ নয়। স্বচ্ছ সবুজ রঙটাই চোখকে স্নিগ্ধ করে। পাকা কামরাঙা কিশোর কখনো দেখেছেন কি না ঠিক মনে করতে পারলেন না। এগুলো বেশ ভালো জাতের, পাঁচটা শিরাই বেশ উন্নত।
মাছের ব্যাপারের দুঃখটা ভুলে গিয়ে তাঁর মন প্রফুল্ল হয়ে গেল। একটা নতুন জিনিস, বাড়ির সবাই অবাক হবে। ট্রাম ধরে তিনি চলে এলেন ভবানীপুরে।
ওপরের বারান্দা থেকে সুনন্দা তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, দাঁড়াও কানাইকে পাঠাচ্ছি।
কিছুদিন আগে হৃৎপিণ্ডে একটা ছোট্ট খোঁচা লেগেছিল বলে ডাক্তার তাঁকে ভারী জিনিস বইতে বারণ করেছেন। কিন্তু কিশোর সব সময় সে নির্দেশ মানেন না। বাজার করা তাঁর বরাবরের অভ্যেস, এটা তিনি কিছুতেই ছাড়তে পারবেন না। সুনন্দা কানাইকে সঙ্গে দিতে চান, তাও কিশোরের পছন্দ নয়। বাজারে তিনি নানা রকম রঙ্গ-রসিকতা করেন, চাকর সঙ্গে থাকলে কি তা চলে?
কানাই আসবার আগেই তিনি দুটো থলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন। রিটায়ার করার পর শরীরটা একটু ভাঙলেও মনের জোর আছে যথেষ্ট। তিনতলায় উঠতে একটু হাঁপ ধরে গেলেও সুনন্দার সামনে সেটা গোপন করে গেলেন।
সুনন্দার হাতে তোয়ালে, এক্ষুনি বাথরুমে ঢুকলেন। এটা কিশোরের পছন্দ নয়। কানাই রান্না করে, সেই সব জিনিস গুছিয়ে রাখে, তবু বাজার এলে বাড়ির গিন্নি একবার তা দেখবে না? সুনন্দার এসব ব্যাপারে আগ্রহই নেই। কিশোর যে কত খুঁজে খুঁজে অসময়ে এঁচোড় কিংবা কাঁচা আম নিয়ে আসেন, সুনন্দা তা খেয়ালও করেন না। বাড়িতে কোনো গুণগ্রাহী না থাকলে বাজার করার আনন্দ নেই। কিশোরের মনে আছে, বাবা বাজার করে ফিরলেই মা সব কিছু ঢেলে ফেলতেন রান্নাঘরের সামনে, প্রত্যেকটি জিনিস সম্পর্কে মন্তব্য করতেন। বাবার ভুল ধরতেন। যেমন পুঁইশাক আনলে কুমড়োও আনতে হয়, কই মাছের দিনে ফুলকপি না আনলে চলে না, শোল মাছের সঙ্গে মুলো চাই আর পাবদা মাছের সঙ্গে বড়ি।
বাথরুমের দিকে যেতে যেতে একটা উড়ো দৃষ্টি দিয়ে সুনন্দা জিজ্ঞেস করলেন, ওগুলো কী?
কৃতার্থ হয়ে গিয়ে কিশোর এক গাল হেসে বললেন, কামরাঙা। তুমি চেনো না? সুনন্দা বললেন, চিনবো না কেন? কিন্তু অতগুলো—কী হবে ওগুলো দিয়ে?
খাবে। সবাই মিলে খাবে। রেয়ার জিনিস। আচ্ছা তুমি মনে করে দ্যাখো, এই যে আমরা কতলোকের বাড়িতে যাই, কোনো দিন, কারুর বাড়িতে তুমি কামরাঙা খেতে দেখেছ? কেউ তোমায় অফার করেছে? তাহলেই বুঝতে পারছো, এরকম একটা ভালো জিনিস চট করে পাওয়া যায় না।
সুনন্দা প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন।
মা বাবা শখ করে এঁর নাম দিয়েছিলেন কিশোর। তখন খেয়াল করেননি, তাঁদের ছেলে একদিন প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ হবে, তখন এই নামটা কত বেমানান হবে। অবশ্য এই প্রসঙ্গ উঠলেই কিশোর বলেন, কেন, বোম্বাইতে এই নামে আমার চেয়েও অনেক বুড়ো বুড়ো লোক আছে।
বয়েস প্রায় বাষট্টি হলেও কিশোরের মনের মধ্যে একটা ছেলেমানুষির ভাব রয়ে গেছে এখনো। নানান ছোটোখাটো জিনিস থেকে আনন্দ পান। বাজার থেকে এক একদিন এক একটা অদ্ভুত জিনিস এনে মহা উৎসাহ দেখান, যেমন একদিন নিয়ে এলেন ঢেঁকি শাক, খুবই নাকি অপূর্ব ব্যাপার। কিন্তু কিশোর ছাড়া সেই শাক আর কেউ খেতে চায়নি।
কামরাঙার ব্যাপারেও প্রায় তাই হল।
দুই মেয়ে মিলি আর জুলি, এক জনের বয়েস তেইশ, অন্য জনের বয়েস একুশ। ওরা কেউ বাড়িতে শাড়ি পরে না, অন্তত সকালের দিকটা ঢোলা হাউসকোট পরেই কাটিয়ে দেয়।
পড়ার ঘর থেকে দুই মেয়েকে ডেকে আনলেন কিশোর। বেছে বেছে সব চেয়ে বড়ো দুটি কামরাঙা তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, দ্যাখ, খেয়ে দ্যাখ, কোনোদিন তো খাসনি।
দুজনেই গভীর সন্দেহের চোখে ফল দুটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল।
জুলি বলল, এটা কী?
কিশোর রহস্য করে বললেন, কী বল তো? কখনো দেখিসনি তো?
মিলি বলল, আমি দেখেছি। একবার শান্তিনিকেতনে একটা বাড়িতে দিয়েছিল।
কামরাঙা না কী যেন নাম?
কিশোর একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বললেন, শান্তিনিকেতন? সেখানে পাওয়া যায়? আশ্চর্য! এসব আমাদের পূর্ববঙ্গের ফল, আমরা ছেলেবেলায় কত—
এখন খেতে ইচ্ছে করছে না, বাবা।
খেয়ে দ্যাখ না! খেয়ে দ্যাখ না! একটা ফল খাবি।
একটু আগে চা খেয়েছি!
তাতে কী হয়েছে? চা খাবার পর অন্য কিছু খেতে নেই?
পরে খাবো। বিকেলে খাবো।
দুই বোনের মধ্যে ছোটোজনের ব্যক্তিত্ব বেশি। সে কামরাঙাটা রেখে দিল ফ্রিজের মাথায় বেতের ঝুড়িতে। মিলি এখনও সেটা হাতে ধরে আছে।
কিশোর ভাবলেন, শহরে মানুষ হবার এই দোষ। কোনো নতুন জিনিস খেতে চায় না, খাবার নিয়ে পরীক্ষা করতেও চায় না। ধরা-বাঁধা কয়েকটা জিনিস খেয়ে গেলেই হল। গ্রামে যারা মানুষ হয়, তারা নিত্যনতুন কত কিছু আবিষ্কার করে। কতরকম ফল তিনি খেয়েছেন ছেলেবেলায়। ডউয়া বলে একটা ফলের কথা তিনি কারুকে বোঝাতেই পারেননি। কেউ কেউ ডউয়া দেখেনি, নামও শোনেনি। এখানকার বাজারে ওঠেই না। অথচ কী চমৎকার স্বাদ ডউয়ার। শহরের ছেলেমেয়েরা আপেল খায়, আর আপেল জিনিসটা কিশোরের অখাদ্য লাগে। ঠিক মনে হয় রুগির পথ্য। তিনি ক্ষীণ অভিমানের সুরে বললেন, খাবি না?
মিলি তার বাবার এই অভিমানটুকুর মূল্য দেয়। সে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আচ্ছা, আমি খাচ্ছি। একটা কামড় দিয়েই সে বলল, ও মা গো! ভীষণ টক।
কিশোর বললেন, টক তো হবেই। কামরাঙা টক হবে না? তবে কী রকম অন্যরকম টক সেটা বল? কাঁচা আম কিংবা তেঁতুল কিংবা পাতিলেবু কিংবা চালতা—কোনো কিছুর সঙ্গেই মিল নেই। কামরাঙার টক স্বাদটা একেবারে নিজস্ব। সেইটাই তো এর মজা। এই দ্যাখ, আমি খাচ্ছি।
কিশোর একটা কামরাঙাকে ঠিক মাউথ অর্গানের মতন মুখের সামনে ধরে সযত্নে একটি কামড় বসালেন।
মিলি বলল, না, বাবা, তুমি খাবে না। তোমার না অ্যাসিডিটি। এত টক খেলে—
কিশোর বললেন, কিচ্ছু হবে না। ফেভারিট জিনিস খেলে কখনো শরীর খারাপ হয় না।
কামরাঙা তোমার ফেভারিট। আগে কোনোদিন খেতে দেখিনি তো।
তোদের জন্মের আগে…
ছোটো ছেলে বাবুসোনা ছাদে খেলছিল। এই সময় সে জল খেতে নীচে এল। কিশোর খুব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, এই, তুই খাবি! এই দ্যাখ কামরাঙা, কোনোদিন খাসনি, খেয়ে দ্যাখ।
বাবা ও দিদিদের পারিবারিক দৃশ্যটি বাবুসোনা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, কারণ, তার হাতে এখন একটুও সময় নেই।
তবু বাবার কথা শুনে সে সবুজ রঙের পাঁচকোনা জিনিসটা হাতে নিয়ে কিছুই না দেখে ঘ্যাঁক করে এক কামড় দিল। সঙ্গে-সঙ্গে মুখটা কুঁচকে বলল, এঃ, বাজে!
কামরাঙাটা সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিল, কিশোর দুহাত তুলে বললেন, ফেলবি না, ফেলবি না, আমাকে দে। একটি বিস্মিত দৃষ্টি সম্মত এঁটো ফলটি বাবার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেল বাবুসোনা।
মিলি বলল, বাবা তোমার এ জিনিস চলবে না।
এরই মধ্যে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছেন সুনন্দা। তিনি স্বামীর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে মেয়েদের বললেন, তোরা ওগুলো নষ্ট করিস না, রেখে দে। কানাইকে বলবো চাটনি করে দিতে। কিশোর প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, চাটনি। কক্ষনো না। সুনন্দা বললেন, কেন?
কামরাঙা কখনও রান্না করতে নেই।
রান্না করতে নেই, তার মানে?
অনেক ফল আছে, যা রান্না করা চলে না। যেমন আমলকী, পেয়ারা, বেল, কামরাঙা…
সুনন্দা বললেন, কেন, বেলের মোরববা হয় না?
মিলি বলল, পেয়ারার জেলি হয়।
কিশোর বিরক্তভাবে বললেন, ওসব এদেশে হয়—
সুনন্দা বললেন, তোমার বাঙাল দেশের কথা ছাড়ো তো। টক জিনিস দিয়ে ভালো চাটনি হবে।
কিশোর দুঃখ পেলেন। তিনি কোনোদিন কামরাঙার চাটনি খাননি। আর খেতেও চান না। নিজের হাতের কামরাঙাটা তিনি খেতে খেতে, আর একটিও কথা না বলে বারান্দার দিকে চলে গেলেন।
এত টক জিনিস তিনি আর খেতে পারেন না, লেবুর রস খেলেও পেট জ্বালা করে, তবু তিনি কামরাঙাটা ফেলবেন না, যেমন করেই হোক শেষ করবেনই।
এখন বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে তাঁর প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে কাগজ পড়ার সময়। তিনখানা কাগজ তন্নতন্ন করে পড়া চাই। যত রোদ বাড়বে, তত চেয়ারটা টেনে টেনে সরিয়ে নিতে হবে ছায়ায়!
একটু নুন পেলে ভালো হত, কিন্তু নুন চাওয়া মানেই পরাজয়। আশ্চর্য, আজকাল অল্প বয়েসি ছেলেমেয়েরা টক খেতে ভালোবাসে না। অথচ তাঁদের ছেলেবেলায় টক জিনিসগুলোই ছিল ছোটোদের সবচেয়ে প্রিয়। নুন দিয়ে কাঁচা আম মেখে খাওয়া, তারপর চালতা, করমচা। দিশি আমড়া, কাঁচা তেঁতুল…
টুসটুসে কামরাঙার রস গড়িয়ে পড়ল তাঁর জামায়। পাঁচটা দিক খাওয়া হয়ে যাবার পর মাঝখানটা চুষলেন খানিকক্ষণ, তারপর ভেজা হাতটাও তিনি পরম সন্তোষে তাঁর ধুতিতে মুছলেন।
তারপর চোখের সামনে লম্বা করে মেলে করলেন ইংরেজি কাগজটা। হেড লাইন কয়েকটা দেখতে না দেখতেই তাঁর মন উধাও হয়ে গেল। তিনি আর অক্ষর দেখছেন না। তিনি সবুজ রঙের ছবি দেখছেন।
দুটো গাছ ছিল। বেশি বড়ো নয়, তবে অনেক ডালপালা, পাতাগুলো মিহিন। কামরাঙা ফুল কী রকম যেন হয়? মনে পড়ছে না। আশ্চর্য, কেন মনে পড়ছে না। সাদা নয়? করমচার ফুল সাদা, আমড়ার সাদা।
একটা গাছ ছিল দত্ত বাড়ির পেছনে, আর একটা ওদেরই পুকুরে যাবার পথে। কিশোর দ্বিতীয় গাছটির পাশে এসে দাঁড়ালেন। স্পষ্ট মনে আছে, তিনি এই গাছটার ওপরের ডালগুলোর নাগাল পেতেন না। লাফিয়ে লাফিয়ে ফল পাড়তে হল। কিন্তু এখন তিনি নাগাল পাচ্ছেন, তাঁর বাষট্টি বছরের শরীরটি ওই গাছটার প্রায় সমান। কিন্তু এরকম হচ্ছে কেন? তাঁর সেই ছেলেবেলার চেহারাটা কোথায়? সতেরো-আঠারো বছর বয়েস, কী রকম দেখতে ছিলেন তিনি তখন? কই মনে পড়ছে না তো! পুকুর ধার থেকে হেঁটে আসছেন বেণুদি। বাইশ-তেইশ বছর বয়েস, ঠিক সেদিনকার চেহারা। বেণুদির এক মাথা চুল। দুর্গা ঠাকুরের মতন মুখ, চোখ দুটিতে সব সময় অবাক-অবাক ভাব। কামরাঙা গাছটার পাশে একজন বৃদ্ধকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেণুদি মুখটা নীচু করে চলে গেলেন। তাঁর দু-হাতে এক গাদা ভিজে কাপড়।
প্রায় হাহাকার গলায় কিশোর বললেন, বেণুদি, বেণুদি, আমার চিনতে পারছেন না? আমি কিশোর! আমি চ্যাটার্জিদের বাড়ির কিশোর!
বেণুদি শুনলেন না, মুখও ফেরালেন না।
একটা শব্দ পেয়ে কিশোর মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজটা সরালেন। তাঁর বড়ো মেয়ে মিলি।
কিশোর মনে মনে হিসেব করে দেখলেন, সেই সময়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে বেণুদিও তো মিলির বয়েসিই ছিল। অথচ, মিলি তো একটা বাচ্চা মেয়ে, হাবভাবে কত ছেলেমানুষ, কিন্তু বেণুদিকে কত বড়ো মনে হত। চেহারায়, ব্যবহারে পরিপূর্ণ এক নারী। তিনি মিলির দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন।
মিলি এসব লক্ষ করল না, সে রেলিং দিয়ে উঁকি মেরে কী যেন দেখতে লাগল। কাগজের দিকে চোখ ফিরিয়েও কিশোর আর সেই কামরাঙা গাছটার ছবি ফিরিয়ে আনতে পারলেন না। মিলির উপস্থিতির জন্যই এরকম হচ্ছে? নিজের ছেলেমেয়ের কাছে নিজেকে সব সময় বয়স্ক বাবা মনে হয়। যদিও একথা স্বীকার করতে নিজের কাছে অন্তত বাধ্য যে মিলির বয়েসি অন্য কোনো মেয়ে দেখলে তিনি বেশ একটা সুখের উত্তেজনা বোধ করেন।
বেণুদি তাঁর চেয়ে বয়েসে চার পাঁচ বছরের বড়ো ছিলেন। গ্রামে ওই বয়সি সব মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়, বেণুদির হয়নি। কেউ কেউ যেন বলতো, অল্প বয়েসেই বেণুদি এক জায়গায় বিয়ের সব ঠিকঠাক হবার পর ভেঙে গিয়েছিল। বেণুদির ছোটো বোন রেণু কিশোরের চেয়ে এক বছরে ছোটো, কিন্তু রেণুর কথা মনে নেই। রেণু নয়, বেণুদিকে দেখলেই কিশোর যখন সত্যিকারের কিশোর ছিলেন, তখন বুক কাঁপত।
কী দেখছিস রে মিলি?
সুরঞ্জন আসবে বলেছিল নটার সময়। এখনো এল না। মহা ক্যাবলা ছেলে। কিছুতেই কথার ঠিক রাখতে পারে না।
সুরঞ্জন কি তোর বন্ধু? আমি তো ভেবেছিলুম জুলির।
জুলিরও বন্ধু না, আমারও বন্ধু না। সুরঞ্জন হল আমাদের জিপ গাড়ি! যখন ইচ্ছে ওকে নিয়ে যেখানে খুশি যাওয়া যায়।
কী অদ্ভুত কথা তোদের।
তোমরা এসব বুঝবে না।
কেন বুঝবো না রে?
তোমাদের আমলে তো ছেলে-মেয়েদের মেলামেশা ছিল না। ওই যে, সুরঞ্জন এসে গেছে—
কিশোরকে প্রতিবাদ করার সুযোগ না দিয়েই মিলি ছুটে চলে গেল।
কিশোর মনে মনে বললেন, তোরা কি আমাদের গত শতাব্দীর মানুষ ভাবিস। কে বললে মেলামেশা ছিল না? আমাদের পূর্ব বাংলার গ্রামে…কই পথে দাঁড়িয়েও মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার বাধা ছিল না তো? মেয়েরাও বন্দি থাকত না ঘরের মধ্যে। এ বাড়ি ও বাড়ি যাতায়াত করত। ওরে মিলি, তোরা কী বুঝবি, তখন অনেক ভালো ব্যাপার ছিল, গ্রামের প্রত্যেকটির সুন্দরী মেয়েরই একজন দুজন প্রেমিক থাকত, জাতের মিল না হলে বিয়ে হতে পারতো না বটে, কিন্তু প্রেম কি কেউ আটকাতে পারত? প্রেমের পর বিরহ আর সারাজীবন তার মধুর স্মৃতি।
হ্যাঁ, আমারও ছিল একজন প্রেমিকা, চৌধুরীদের বাড়ির মাধুরী এখন সে লখনউতে থাকে। তোরা দেখিসনি তো তাকে, এখনও তোদের মায়ের চেয়েও অনেক সুন্দরী।
কিশোর এবারে দেখতে পেলেন চৌধুরী বাড়িটি। পাকা বাড়ি, দোতলা। তাদের গ্রামের সবচেয়ে ঝকঝকে বাড়ি। ডান পাশের দিঘিটি পদ্মপাতায় ভরা। সেই দিঘির ঘাটটায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে তিনটি ছেলে মেয়ে। তার মধ্যে গোলাপি রিবন বাঁধাটিই মাধুরী না? কত বয়েস, বড়ো জোর ন-দশ? এর থেকে অনেক বড়ো বয়সেও তো মাধুরীকে দেখেছেন কিশোর। মাধুরীর সেই চেহারা কোথায়?
চৌধুরীদের বাড়ির প্রতিটি ঘর মনে আছে কিশোরের। কিন্তু কোনো ঘরেই তিনি বড়ো বয়সের মাধুরীকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এ যেন ফ্রেমটি রয়েছে অটুট, ভিতরে ছবিটি নেই। এতো বড়ো অস্বস্তি।
সিনেমার দৃশ্যান্তরের মতন আবার কামরাঙা গাছটির ছবি ফিরে এল। পুকুর ঘাট থেকে আসছেন বেণুদি। একেবারে পরিষ্কার, জীবন্ত। ভিজে কাপড়ে তাঁর শরীরের প্রত্যেকটি রেখা স্পষ্ট, ঠিক যেন কুমোরের তৈরি নিখুঁত কোনো মূর্তি, দেখলে এখনো মাথা ঘুরে যায়।
বেণুদি, বেণুদি, চিনতে পারছেন না, আমি কিশোর?
পাশেই একটা সুপুরি গাছ, তার আড়ালে নিজেকে ঢাকা দিয়ে বেণুদি থমকে দাঁড়ালেন, তারপর কিশোরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখে নিয়ে বললেন, কে, ধীরেনকাকা? আপনি এখানে?
ছবিটা আবার খবরের কাগজ হয়ে গেল। কিশোরের বুকে যেন আঘাত করেছে। বেণুদি চিনতে পারলেন না। বেণুদি তাঁকে ধীরেনকাকা ভাবলেন? ধীরেন তো ছিলেন কিশোরের জ্যাঠামশাই, কত বছর আগে মারা গেছেন। কিশোরকে কি ধীরেন জ্যাঠামশাইয়ের মতন দেখতে হয়েছে এখন? আগে কেউ বলেনি তো এরকম কথা।
ধীরেন জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে বেণুদির বাবার কী নিয়ে যেন একটা ঝগড়া ছিল। তাই তিনি এ বাড়িতে যেতেন না। সেই জন্যই বেণুদি অবাক হয়েছেন।
কাগজটা হাত থেকে পড়ে গেল কিশোরের। তিনি অন্য একটা কাগজ তুলে নিলেন। নিজের সতেরো-আঠারো বছরের চেহারাটা দেখতে পাচ্ছেন না বলে মন খারাপ লাগছে! পুরনো স্মৃতিতে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে একটা মাদকতা আছে, কিন্তু সেখানে তাঁর এই বুড়ো বয়েসের শরীরটা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে কেন?
মিলি এসে জিজ্ঞেস করল, বাবা, তুমি চা খাবে? কিশোর মুখ না ফিরিয়েই বলল, হঠাৎ এত দয়া?
সুরঞ্জন চা খেতে চাইছে। মায়ের এখন স্কুলে যাবার তাড়া, চা করতে বললেই কানাই চ্যাঁচাবে। তবু তোমার নাম করলে যদি দেয়।
বেশ, তাহলে বলো আমার নাম করে।
থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ, বাবা।
শোন মিলি, সুরঞ্জন যদি তোদের জিপ গাড়ি হয়, তাহলে আমি তোদের কী হলুম রে।
তুমি হচ্ছে আমাদের গুড ওল্ড ম্যান, তোমার সঙ্গে কার তুলনা।
সব সময় বুড়ো বুড়ো করিস, জানিস বাষট্টি বছর বয়েসে অনেকে নতুন করে…
ওল্ড ম্যান মানে বুড়ো নাকি? ওল্ড ম্যান মানে বাবা। কে তোমায় বুড়ো বলেছে? দেবানন্দ আর তুমি সমান বয়েসি।
কিশোর আবার ঝিম মেরে বসে রইলেন, কিন্তু কোনো ছবি ফিরে এল না।
একটু পরেই সুনন্দা সেজেগুজে এসে বললেন, আমি চললুম। তুমি দুপুরে কোথাও বেরুবে না তো। কিশোর দুদিকে মাথা নাড়লেন। এই সময় সুনন্দাকে বেশ কম বয়সি দেখায়। কিশোর রিটায়ার করে গেলেও সুনন্দার এখনো পাঁচ বছরের চাকরি আছে স্কুলে। খুব যে একটা দরকার আছে তা নয়। তবু সুনন্দা চাকরি করতে ভালোবাসে। সুনন্দাকে খানিকটা হিংসে করেন তিনি এজন্য।
পূর্ব বাংলার সেই গ্রাম থেকে কিশোর কত দূরে চলে এসেছেন। যেন অন্য গ্রহে। মাস্টারের বাড়ির ছেলে, তা অভাব অনটন কম দেখেননি। শৈশবের কত সাধ অতৃপ্ত থেকে গেছে, মা কত পুড়িয়ে পুড়িয়ে কথা শুনিয়েছেন বাবাকে।
শেষ বয়েসে বাবা-মাকে খানিকটা সুখের মুখ দেখিয়েছেন কিশোর। প্রথমে বেহালায় বাড়ি, তারপর সেটা বিক্রি করে ভবানীপুরে বড়ো রাস্তার ওপর এই বাড়িটা কিনেছেন। তা ছাড়া ঘাটশিলায় একটা বাড়ি আছে, বিবেকানন্দ রোডে একটা ওষুধের দোকান। এজন্য অবশ্য কিশোরকে খাটতে হয়েছে অনেক। যৌবনের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎ হুস করে এতগুলো বছর কী করে যে কেটে গেল। বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেছে, কিশোরের খেয়ালই হয়নি এতদিন…
…কামরাঙা খেলেই জ্বর হত। একটা তো নয়। এক সঙ্গে তিনটে, চারটে, পাঁচটা। কচু পাতায় খানিকটা নুন আর কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা নিয়ে এসে পুকুর ধারে বসে বসে খাওয়া। পরদিনই জ্বর। সত্যিই কি কামরাঙা খাওয়ার সঙ্গে ওই জ্বরের কোনো সম্পর্ক ছিল? মা বারণ করতেন, জ্বর হলেই বলতেন, আবার দত্তদের বাড়ি থেকে চুরি করে কামরাঙা খেয়েছিস?
কামরাঙা, কী সুন্দর না। অবশ্য কেন ওই নাম তা কে জানে। এ ফল তো কোনো দিন লাল হয় না। অবশ্য রাঙা মানে লালই হবে কেন, যে-কোনো রং। কামরাঙার পাতলা সবুজ রংটা কিশোরকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে। পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফলগুলো, হঠাৎ একটা পেয়ে গেলে…যেগুলো উঁচু ডালের সেগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে…
বেণুদি একটা আঁকশি নিয়ে এসে বলেছিলেন, ওরে, গাছটা ভেঙে ফেলবি নাকি? কটা চাস বল, আমি পেড়ে দিচ্ছি।
শুধু বেণুদিকেই দেখা যাচ্ছে, কিশোরকে নয়। গাছ কোমর বাঁধা শাড়ির আঁচল পিঠের ওপর খোলা চুল, বেণুদি আঁকশি দিয়ে কামরাঙা পাড়ছেন। সেই বয়েসটায় পুরুষের চোখ অসম্ভব মাংস লোভী হয়, তাই বেণুদির শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশই শুধু ঝলসে উঠছে, গাছ থেকে ফল-পাড়া নয়, যেন একটা নাচ, কিশোর দেখছে, চারদিকের নানা রকমের সবুজের মধ্যে এক গৌরবর্ণ মাংস প্রতিমা, আকাশটা নীচু হয়ে এসেছে চাঁদোয়ার মতন, একটা কুবো পাখি ডাকছে অবিশ্রান্ত সুরে, বেণুদির পায়ের ছন্দের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সেই ডাক। হীরের গয়নার মতন এত উজ্জ্বল হয় স্মৃতির ছবি?
আজ কামরাঙা কিনে এনেছেন বলেই যে কিশোরের মনে পড়ছে বেণুদির কথা, তা নয়। বেণুদির মুখ তার জীবনে বরাবরই ফিরে ফিরে এসেছে। যেন বেণুদিকে ঘিরে তাঁর মধ্যে রয়েছে এক গভীর মর্মবেদনা। অথচ, বেণুদির সঙ্গে সেরকম তো সম্পর্ক কিছু ছিল না। পাড়ার আর পাঁচটা কমবয়েসি ছেলের চেয়ে কিশোরকে তিনি কখনো আলাদাভাবে দেখেননি। সেরকম মনোযোগই দেননি।
একদিন, কিংবা হয়তো কয়েকদিন হবে, বেণুদির সঙ্গে প্রতাপদাকে দেখেছিলেন কিশোর। ধুতির ওপর ঢোলা পাঞ্জাবি পরা, তার বুকের বাঁ দিকে বোতাম, সবাই বলত প্রতাপকে প্রমথেশ বড়ুয়ার মতন দেখতে। সেই প্রতাপদা বেণুদির কাছ থেকে আঁকশিটা নিয়ে বলেছিলেন, দাও, আমি পেড়ে দিচ্ছি। একটা মাত্র ফল পেড়ে, সেটা কিশোরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে প্রতাপদা বলেছিলেন, এই নে! এখন যা পালা।
কী সাংঘাতিক অপমান লেগেছিল সেই কথাটায়। এখনো যেন কানে ঝনঝন করে বাজে। কামরাঙা ফল পেকে পেকে গাছের নীচে পড়ে যায়। পাড়ার ছেলেরা যার যখন ইচ্ছে পেড়ে নিয়ে যায়, কেউ আপত্তি করে না। সেই ফল একটা মাত্র দিয়ে একটি সতেরো বছরের ছেলেকে অবহেলার সঙ্গে বিদায় করে দেওয়া! আশ্চর্য, বেণুদিও কোনো প্রতিবাদ করেননি তখন। বরং, খানিকবাদে, পুকুরধারে মুখ গোঁজ করে বসে থাকার সময় কিশোর শুনতে পেয়েছিলেন বেণুদি আর প্রতাপদার সম্মিলিত হাসি।
বাষট্টি বছর বয়েসেও এই কথা মনে পড়ায় কিশোরের শরীরের প্রতিটি রোমকূপ যেন সচকিত হয়ে উঠল। প্রতাপদাকে হাতের কাছে পেলে যেন তিনি এই মুহূর্তে তাঁর গলা চেপে ধরতে পারেন।
তারপরেই তিনি অবাক হলেন। প্রতাপদার ওপরে এখনো এত রাগ রয়ে গেছে কেন? প্রতাপদাকে তিনি আর বেশি দেখেননি, দিল্লি না কানপুর কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন তিনি। বেণুদিকে তিনি বিয়ে করেননি। কিশোরও তার পরের বছরই গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন।
মিলি চা দিয়ে বলল, বাবা, আমি আর জুলি একটু বেরুবো সুরঞ্জনের সঙ্গে।
নিশ্চয়ই ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যাবি!
কী করে বুঝলে?
ওই জায়গাটার নাম বলাই তো সবচেয়ে সুবিধে, তাই না?
মোটেই না। আমরা যাচ্ছি অনাময়দার বাড়ি।
সে আবার কে?
ও একটা স্কাউন্ডেল। ওকে তোমার না চিনলেও চলবে।
তা একটা স্কাউন্ডেলের বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে কেন দল বেঁধে?
অনাময়দা আমার বন্ধু, ভাস্বতীর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। ভাস্বতী বেচারা আর লজ্জায় বাড়ি থেকে বেরুতেই পারে না।
তা সেখানে গিয়ে কি মারামারি হবে নাকি?
দরকার হলে মারতেও পারি। সেই জন্যই তো সুরঞ্জনটাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি?
থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়াবে না তো? দেখিস।
না, না, সেসব কিছু নয়। স্রেফ ভয় দেখাবো। ওর নামে কাগজে বিজ্ঞাপন দেবো। তুমি আবার বসে বসে চিন্তা করতে যেও না যেন আমাদের জন্য।
কিশোর প্রসন্নভাবে হাসলেন। ছেলেমেয়েদের কোনো গতিবিধিতেই বাধার সৃষ্টি করেন না তিনি। ওদের সঙ্গে ইয়ার্কি ঠাট্টা হয়। তার সুফল এই যে ওরা কখনো মিথ্যে কথা বলে না তাঁর কাছে। সত্যি কথার সৌরভই আলাদা। শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়।
সুরঞ্জন ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো, অথচ জুলি-মিলি তাকে মনে করে জিপ গাড়ি। এরা দল বেঁধে যাচ্ছে এদের একজন বান্ধবীর পক্ষ নিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে ঝগড়া করতে। এদের ধরন-ধারণই আলাদা।
হঠাৎ কিশোর ভাবলেন, এই যে মিলি-জুলি, সুরঞ্জন, ভাস্বতী আর অনাময় এরা কি কেউ কারুকে ঈর্ষা করে? দেখলে তো বোঝা যায় না। একালের ছেলেমেয়েরা বুঝি ঈর্ষা ভুলে গেছে।
নারীদের ব্যাপারে কিশোরের মনে সে রকম কোনো গুপ্ত অতৃপ্তি নেই। কাজের খাতিরে তাকে বহু জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। নিজের স্ত্রী ছাড়াও নারীদের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক হয়েছে কোনো কোনো সময়ে। সুনন্দার সঙ্গে বিয়ের আগে অন্তত আরও দুজনকে চেয়েছিলেন। আজ তাঁর প্রথম প্রেমিকা সেই চৌধুরীদের বাড়ির মাধুরী, বেশ একটা মধুর বাল্যপ্রেম জমেছিল তার সঙ্গে। কিন্তু সেই মাধুরীর মুখখানাও ঠিক মতন মনে পড়ে না। অন্যান্য মেয়েদের তেমন করে মনে রাখেননি কারুকে। প্রথম যৌবনের খেলার সঙ্গীদের অনেকের নাম বা চেহারা অনেক কষ্ট করে স্মৃতিতে আনতে হয়। নিজের চেহারাটাই মনে নেই।
কিন্তু বেণুদি আর প্রতাপদা, বেণুদির হাত থেকে প্রতাপদার সেই আঁকশি নিয়ে নেওয়ার ছবি তার স্মৃতিতে যেন আগুনে ঝলসানো উল্কির মতন দগদগ করছে। সেই প্রথম অপমান, সেই প্রথম তীব্র ঈর্ষা, তা কিছুতে ভোলা যায় না।
পুকুরের ধারের পায়-চলা রাস্তাটাতে কাঁচা পাকা চুলের প্রৌঢ় মানুষটি দাঁড়িয়ে কাকুতিমিনতি ভরা গলায় বলতে লাগলেন, বেণুদি, একবার আমার দিকে তাকাও একবার আঁকশি-ধরা হাতখানি উঁচু করো, কুবো পাখিটার ডাকের ছন্দে তোমার পা উঠুক-নামুক, শুধু আমার জন্য। এখন তো প্রতাপদা কাছে নেই।
আগামীকাল
আগামীকাল
মেয়েটি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছিল। ভিতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না। দু-একবার তাকাচ্ছিল ওপরের দিকে, যদি কোনো ঘরের জানলায় কারুকে দেখা যায়। অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুজন প্রৌঢ় লোক। একজন একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে চাই?
মেয়েটি মুখ তুলে বলল, তপন আছে?
প্রৌঢ়টি একটু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, তপন? তপন কী?
তপন রায়চৌধুরী।
যাদবপুরে পড়ে?
হ্যাঁ।
ওদের ফ্ল্যাট তিনতলায়। ওই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যান।
তাকে একটু নীচে ডেকে পাঠানো যায় না?
কে ডাকবে? আমি অন্য ফ্ল্যাটে থাকি।
মেয়েটি একটুক্ষণ চিন্তা করে বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে।
মেয়েটি গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোল।
সে চোখের আড়াল হবার পর প্রৌঢ়টি একটু হেসে অপর প্রৌঢ়কে বললেন, দিনকাল কী রকম বদলেছে দেখেছ? আমাদের সময়ে কোনো ছেলেই কোনো মেয়ের বাড়িতে ডাকতে যেতে সাহস করত না। এখন মেয়েরাই ছেলেদের বাড়িতে ডাকতে আসে।
অপর প্রৌঢ় বললেন, মেয়েটি তিনতলার তপনের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে বুঝি?
তাই তো মনে হয়।
আমাদের সময়ে কোনো ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে মেয়েরা লোকজনের সামনে দাদা-টাদা বলে ডাকত। তপনদা কিংবা অজয়দা। এখন এরা স্রেফ নাম ধরেই ডাকে।
আপনি-টাপনি বলারও ধার ধারে না। প্রথম থেকেই তুমি।
তুই তুকারিও করে শুনেছি।
প্রথম প্রৌঢ় একটা নকল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হেসে বললেন, আমরা বড্ড অসময়ে বুড়ো হয়ে গেলুম হে। আমরা এসব কিছুই পেলাম না।
মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে গিয়ে থামল। সিঁড়ির দু-পাশে দুটি ফ্ল্যাট। কোন ফ্ল্যাটটা তপনদের সে কী করে বুঝবে? এরা দরজায় নাম লিখে রাখে না কেন?
মেয়েটি প্রথমে ডানদিকের দরজায় কলিং বেল টিপল। দরজা খুলল একটি বলিষ্ঠ চেহারার যুবক।
তপন আছে?
যুবকটি একটু রূঢ়ভাবে বলল, এখানে তপন নামে কেউ থাকে না। এ কথা বলেও যুবকটি দরজা বন্ধ করল না। মেয়েটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটি বুঝতে পারল, পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাটের মধ্যে নিশ্চয় ভাব নেই।
ছেলেটির অন্তত বলা উচিত ছিল, উলটো দিকের ফ্ল্যাটে দেখুন।
মেয়েটি বলল, ও, আমার ভুল হয়ে গেছে।
উলটো দিকে ফিরে সে চলে এল অন্যদিকের ফ্ল্যাটে। সেখানে বেল টিপতে দরজা খুলল একজন চাকর শ্রেণির লোক।
তপনবাবু আছেন?
আছেন। দাদাবাবুর জ্বর।
আমি একটু দেখা করব।
চটি ফটফট করে তপন নিজেই এগিয়ে এল দরজার কাছে। উলটো দিকের ফ্ল্যাটের যুবকটি তখনও দাঁড়িয়ে আছে এদিকে চেয়ে। তাকে দেখে তপনের ভুরু কুঁচকে গেল। মেয়েটিকে বলল, তুমি? এসো ভেতরে এসো।
এই সময় উলটো দিকের দরজাটা দড়াম শব্দে বন্ধ হল।
তপন মেয়েটিকে নিয়ে এল বসবার ঘরে। বেশ ছিমছাম সাজানো। হালকা রঙের সোফাসেট, এক কোণে নীচু টেবিলে পেতলের বুদ্ধ মূর্তি, তার পাশে ফুলদানি, ফুল নেই।
দূর থেকে তপনের মা জিজ্ঞেস করলেন, কে এসেছে রে?
তপন বলল, আমার এক বন্ধু। তুমি এসো একটু—
মা উত্তর দিলেন, যাচ্ছি। একটু পরে যাচ্ছি।
মেয়েটি ধপাস করে একটা সোফায় বসে পড়ে বললে, পাখাটা খুলে দাও।
তপন পাখাটা চালিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। তারপর বলল, হঠাৎ আমার বাড়ি চলে এলে যে?
এমনিই এলাম। তোমাদের উলটো দিকের ফ্ল্যাটের ছেলেটার সঙ্গে বুঝি তোমার ঝগড়া।
ও, সত্যেন, ও তো একটা লোফার।
লোফার মানে? কী করে?
পাড়ায় মস্তানি করে। আসল ব্যাপারটা কী, এ বাড়ির একতলার ফ্ল্যাটে সুস্মিতা বলে একটা মেয়ে থাকত, তাকে সত্যেনের খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু সুস্মিতা আবার আমার প্রেমে পড়ে গেল। আমার কাছ থেকে বই-টই নিতে আসত। সেই থেকেই আমার ওপর সত্যেনের রাগ।
নিজের বাড়িতেও বুঝি প্রেম করা হয়েছে তোমার?
নিশ্চয়ই। ফ্ল্যাট বাড়িতে কিংবা পাড়ার মধ্যেই তো প্রথম প্রেমের হাতেখড়ি হয়। তারপর তো কলেজ ইউনিভার্সিটিতে।
সুস্মিতা এখন আর আসে না বই নিতে?
ওর বিয়ে হয়ে গেছে।
তোমার সব প্রেমিকাদেরই এত তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায় কেন?
তার মানে?
তোমার প্রেমিকাদের তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায় কিন্তু তোমাকে কেউ তারা বিয়ে করতে চায় না।
তপন হো হো করে হাসল। সিগারেটে টান দিল আবার।
তপনের মা এসে ঢুকলেন। বেশ জমকালো একটা শাড়ি পরা। এক্ষুনি বাইরে বেরুবেন মনে হয়।
তপন সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বলল, মা, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। এর নাম খুকু—এই তোমার ভালো নাম কী যেন?
মেয়েটি প্রথমে হাত জোড় করে নমস্কার করে বলল, আমার নাম সুবর্ণা চ্যাটার্জি।
তারপর সে উঠে গিয়ে তপনের মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
তিনি বললেন, আরে থাক থাক, পায়ে হাত দিতে হবে না।
তপন বলল, সুবর্ণা আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ওর সাবজেক্ট ফিলজফি।
মা বললেন, হ্যাঁ, তোমার কথা শুনেছি। তুমি আগে আমাদের বাড়িতে আসোনি তো!
সুবর্ণা বলল, না আসা হয়নি। তপন কখনও আসতেই বলেনি।
এবার থেকে আসবে। তুমি কী খাবে চা না কফি?
আমি কিছু খাব না মাসিমা।
কিচ্ছু খাবে না? একটু শরবত করে দিই?
আচ্ছা দিন।
মা তপনকে বললেন, আমি রঘুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারপর আমি একটু বেরুব। সাড়ে বারোটা বাজলে তুই রঘুকে মনে করে পাঠিয়ে দিস বাপ্পাকে যেন স্কুল থেকে নিয়ে আসে।
তপন জিজ্ঞেস করলে, তুমি কোথায় যাবে?
দু-একটা জিনিস কেনাকাটা আছে, তারপর তোর ঝুনুমাসির বাড়ি থেকেও একটু ঘুরে আসতে হবে।
তিনি সুবর্ণার দিকে তাকিয়ে বললেন, আচ্ছা তোমরা গল্প করো—
মা চলে যাবার পর তপন জিজ্ঞেস করলে, মাকে তো বললে আমি তোমাকে কখনও বাড়িতে আসতে বলিনি। তাহলে এলে কেন?
এমনিই ইচ্ছে হল।
হঠাৎ এরকম ইচ্ছে?
তোমাদের টেলিফোনের লাইনটা খারাপ?
দু-তিন দিন ধরে খারাপ হয়ে আছে।
তুমি চারদিন ক্লাসে যাওনি—
আমার জ্বর।
বাজে কথা।
বাজে কথা মানে? আমি কি বাড়ির চাকরকেও মিথ্যে শিখিয়ে রেখেছি নাকি?
সুবর্ণা তপনের গলার কাছটা ছুঁয়ে বললে, কই গা গরম নেই তো!
কাল রাত পর্যন্ত ছিল।
আগে তো অনেকবার এর থেকে বেশি জ্বর কিংবা শরীর খারাপ নিয়েও ইউনিভার্সিটিতে যেতে।
তা যেতাম। তুমি চারদিন আমাকে না দেখেই উতলা হয়ে পড়েছিল নাকি? সেইজন্যই আজ দেখতে এলে?
না। সেজন্যে নয়। তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম।
কী।
চাকর রঘু একটা ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে এল। এক গেলাসে অরেঞ্জ স্কোয়াসের শরবত আর একটি প্লেটে চারখানা শোনপাপড়ি।
তপন জিজ্ঞেস করলে, রঘু, মা বেরিয়ে গেছেন?
হ্যাঁ, এই মাত্র গেলেন।
দরজাটা বন্ধ করে রাখিস।
চাকর ট্রে-টা রেখে চলে যাবার পর তপন নিজেই আগে প্লেট থেকে একটা শোনপাপড়ি তুলে মুখে পুরল। তারপর বলল, শোনপাপড়িগুলো লাভলি, মা নিজে বানিয়েছে, খেয়ে দেখো।
সুবর্ণাও একটা তুলে মুখে দিয়ে বলল, সত্যি খুব ভালো হয়েছে তো!
এবার তোমার খবরটা বলো।
আগামী সোমবার আমি রণজয়কে বিয়ে করছি।
এ আর নতুন খবর কী?
তুমি জানতে?
আগামী সোমবারই যে বিয়ে করবে, তা জানতাম না। রণজয়ই আমাকে বলছিল তুমি বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছ।
তোমার কাছ থেকে একটা পরামর্শ চাইতে এলাম।
বলো।
আমার কি এক্ষুনি বিয়ে করা উচিত?
সব মেয়েরই তাড়াতাড়ি বিয়ে করা উচিত। আমার মতে—
ইয়ার্কি নয়। একটু সিরিয়াসলি চিন্তা করে বলো—
এ নিয়ে এত চিন্তা-ভাবনা করার কী আছে?
বাড়িতে কারুকে এখন জানাচ্ছি না।
ও। কিন্তু তুমি হঠাৎ বিয়ের জন্য এত ব্যস্ত হয়ে উঠলেই বা কেন?
কারণ নিশ্চয়ই একটা আছে। তুমি সবটা জানো না তপন। রণজয় একলা একটা ঘর নিয়ে থাকে রয়েড স্ট্রিটে। সেখানে আমাকে প্রায়ই যেতে হয়। মানে আমি না গেলে ও ছেলেমানুষের মতন জেদ করে, রাগারাগি করে। দু-তিন দিন আমি না গেলে ও এমনকি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়, পড়াশুনোও একেবারে করে না।
রোজ একবার করে গেলেই পারো।
তাই তো যাই। তার ফলে কী হয় বুঝতেই পারো।
পারছি। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাড়া, ডিসটার্ব করার কেউ নেই।
আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হয়।
দুশ্চিন্তা! তোমার ভালো লাগে না! এত চমৎকার সুযোগ। দ্যাখো, আঠারো থেকে চবিবশ বছর সময়টা হচ্ছে সবচেয়ে চমৎকার বয়েস। এই সময়ে সেক্স জিনিসটা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ ছেলেমেয়েই এই সময়টা নষ্ট করে। সুযোগ পায় না। পড়াশুনো শেষ না করে চাকরি-বাকরি না পেলে কেউ বিয়ে করতে পারে না। কিন্তু পড়াশুনো কিংবা চাকরির সঙ্গে সেক্সের কী সম্পর্ক? বাবা মায়ের শাসনে থেকে অনেককেই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তুমি এরকম সুন্দরভাবে সেটা পেয়ে গেছ, অথচ বলতে চাও, সেটা তোমার ভালো না!
ভালো লাগা না লাগার কথা নয়। আমার ভয় হয়, কিছু যদি হয়ে-টয়ে যায়!
প্রি-কশান নিলেই পারো। হাতের কাছে যখন সব কিছুই পাওয়া যায়—
ভুলে যেও না, এদেশটা এখনও ইউরোপ আমেরিকা হয়ে যায়নি।
ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশে মেয়েদের কি চারটে করে হাত-পা আছে নাকি? ওদের সঙ্গে তুলনা দেবার তো দরকার নেই। আমি বলছি, সেটা খুব সহজ এবং স্বাভাবিক ব্যাপার।
মেয়েদের সব ব্যাপার তোমরা এখনও বুঝতে পারো না।
ও, এদিকে অন্য সময় ছেলেদের সঙ্গে সমান সমান হবার ইচ্ছে আর অসুবিধাতে পড়লেই মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যাপার।
অসুবিধের কিছু নেই এর মধ্যে? আমি ভাবছিলাম, ভবিষ্যতে তো রণজয়কে আমি বিয়ে করবই—তাহলে রেজিস্ট্রেশনটা সেরে রাখলেই বা দোষ কী?
ব্যাপারটা আইনসংগত করে রাখা?
হ্যাঁ।
আইনসংগত করলে স্বাদটা কমে যায়। গোপন ব্যাপার থাকলেই সেক্সটা ভালো জমে। আইন-টাইনের ব্যাপারটা যতদিন দূরে সরিয়ে রাখা যায়।
তুমি বড্ড বাজে কথা বল। তুমি কি সবজান্তা নাকি?
তুমিই তো আমার কাছে পরামর্শ চাইলে।
আমি তোমার কাছ থেকে জানতে চাইছি, এখন বিয়েটা করে রাখলে কী রণজয়ের পড়াশুনোর ক্ষতি হবে?
রণজয় ফার্স্ট ক্লাস পাবেই।
তুমি জানো না, আজকাল ওর পড়াশুনোয় মন নেই।
তার মানে তুমি ওকে অতৃপ্ত করে রেখেছ। ছটফটানি থাকলে পড়াশুনোয় মন বসবে কী করে? বিয়েটাই করে ফেল তাহলে। নিশ্চিন্ত হয়ে পড়াশুনোয় মন দেবে।
তাহলে তুমি বলছ?
হ্যাঁ, বলছিই তো। রণজয় পাত্র হিসেবেও ভালো। ভারতবর্ষে যতই চাকরির সমস্যা থাকুক, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ইঞ্জিনিয়ারদের এখনও চাকুরির অভাব হবার কথা নয়। তা ছাড়া, ওদের ফ্যামিলির অনেক রকম কানেকশান আছে।
এই কথার পর সুবর্ণা কেন যে হঠাৎ রেগে উঠল তার কোনো যুক্তি নেই। সে শরবতের গেলাসটা ঠক করে নামিয়ে রেখে ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল, এসব কথা বলছ কেন? আমি রণজয়কে বিয়ে করছি, তার কারণ ও আমাকে ভালোবাসে। আমিও ওকে ভালোবাসি।
তপন হাসতে হাসতে লঘু গলায় বলল, সে তো আমিও তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও আমাকে ভালোবাসো।
থাক, আর বাজে কথা বলতে হবে না। তোমার কত অসংখ্য মেয়ে বন্ধু।
তাদের সবাইকে আমি ভালোবাসি। তোমাকে একটু বেশি ভালোবাসি।
এর নাম ভালোবাসা?
তা ছাড়া কী? যাক, আমার কথা থাক। তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
মোটেই না।
তাহলে আজ আমার কাছে ছুটে এসেছ কেন?
তোমার কাছে এসেছি বন্ধু হিসেবে একটা পরামর্শ নিতে।
বন্ধুকে বুঝি ভালোবাসা যায় না? ভালো না বাসলে আবার বন্ধু কী? তুমি যে অন্য কোনো বন্ধুর কাছে না গিয়ে আমার কাছেই এসেছ, তাতেই প্রমাণ হয়, তুমি আমাকে একটু বেশি ভালোবাসো।
এসব বাজে কথা থাক। আমি এবার উঠব। অনেক বেলা হয়েছে।
কটা বাজল?
বারোটা কুড়ি।
ওরে বাবা, খেয়ালই করিনি। বসো, আর একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি।
তপন উঠে গিয়ে রঘুকে ডাকল। তাকে বলল, তক্ষুনি বেরিয়ে গিয়ে ছোটো ভাইকে স্কুল থেকে আনতে।
রঘু চলে যাবার পর তপন দরজা বন্ধ করে দিল। গোটা ফ্ল্যাটটাতে এখন সে আর সুবর্ণা ছাড়া আর কেউ নেই। এ রকম সময় আবহাওয়াটা হঠাৎ কীরকম বদলে যায়।
তপন ঘরে ফিরে এসে এবার বসল সুবর্ণার পাশে। তার কাঁধে হাত রেখে বলল, তুমি কি এখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে যাবে?
সুবর্ণা বলল, না। আজ আর যাব না।
তাহলে কোথায় যাবে? রণজয়ের ফ্ল্যাটে?
ও নেই এখন। বাড়িতেই যাব।
আমার দিকে একটু তাকাও তো—
সুবর্ণা ওর দিকে মুখ ফেরাতেই তপন আলতোভাবে তার ঠোঁটে একটা চুমু খেল।
তারপর বলল, তোমাকে খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।
সুবর্ণা বলল, আমাদের একলা রেখে তোমার মা বেরিয়ে গেলেন।
তাতে কী হয়েছে?
উনি কিছু ভাবলেন না?
কী আবার ভাববেন? ছেলের চরিত্র খারাপ হয়ে যাবে? এতে মেয়ের মায়েরা ভয় পেতে পারেন, কিন্তু এতে ছেলের মা ভয় পাবেন কেন?
ছেলে হলেই বুঝি তাদের সব রকম স্বাধীনতা দেওয়া যায়?
আমি পাই। এমন কি, ছেলেবেলা থেকেই আমি একটু মেয়ে-টেয়েদের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসি। আমার মা কখনও বাধা দেবার চেষ্টা করেননি।
তুমি ভাগ্যবান, এরকম মা পেয়েছ।
আমার মা-ও ভাগ্যবান, আমার মতন ছেলে পেয়েছেন। এত মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করেও তো আমি বয়ে যাইনি। হায়ার সেকেন্ডারিতে সেভেনথ স্ট্যান্ড করেছিলাম। এবারেও ফাইনাল পরীক্ষাতে ফার্স্ট ক্লাস তো পাবই, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টও হতে পারি।
তোমার বড্ড অহংকার!
সত্যি কথাই বলছি। লোকজনদের মাঝখানে তো আর চেঁচিয়ে বলতে যাচ্ছি না যে অহংকার হবে।
আচ্ছা, এবার সত্যি বলো তো, এই চারদিন কেন ইউনিভার্সিটিতে যাওনি?
বলছি। তার আগে আমাকে একটা চুমু খাও।
সুবর্ণা ঠোঁটটা এগিয়ে আনল। তপন বলল, উঁহু, ও রকমভাবে নয়। এক হাতে আমার চুল মুঠো করে ধরো, এক হাত রাখ আমার কাঁধে—
সুবর্ণা সরে গেল। একটু রাগের ভাব দেখিয়ে বলল ইস, আবদার, না? দুদিন বাদে আমি পরের বউ হয়ে যাচ্ছি না?
বাঃ, তাতে কী হয়েছে?
কী হয়েছে মানে? আর একজনকে বিয়ে করেও বুঝি আমি তোমার সঙ্গে এই সব করব?
রণজয় তোমাকে বিয়ে করছে বলে কি পুরোপুরি কিনে নিচ্ছে নাকি? তোমার আর কোনো স্বাধীনতা থাকবে না?
স্বাধীনতা মানে বুঝি এই সব? সব কিছুরই একটা যুক্তি থাকা চাই।
চমৎকার যুক্তি রয়েছে তো। এই ঘরে শুধু তুমি আর আমি আছি, ফ্ল্যাটে আর কেউ নেই। এই সময়টা একটু ভালোভাবে কাটানো উচিত নয়? আর চুমু খাওয়ার মতন এমন ভালো জিনিস আর কী আছে বলো? রণজয়ের ফ্ল্যাটে গিয়েও কি তুমি এই সব করো না?
সেইজন্যই তো তাকে আমি বিয়ে করছি।
আঃ, মেয়েরা বড্ড বিয়ে পাগলা হয়। বিয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? মানুষের শরীর কখনও ক্ষয়ে যায় না, শরীর কখনও অপবিত্র হয় না। এসো, এসো, দেরি করে লাভ কী।
আমি যদি রাজি না হই, তুমি কি জোর করবে?
মোটেই না। ওই সব ব্যাপারে আমি জোর-জার একেবারেই পছন্দ করি না।
আমি রাজি নই।
তপন সঙ্গে সঙ্গে সোফা থেকে উঠে পড়ল। বলল, ঠিক আছে।
সুবর্ণা মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল। তপন জানলার কাছে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।
সুবর্ণা একটু পরে মুখ তুলে বলল, তুমি রাগ করলে?
না, এতে রাগের কী আছে? আমি তোমাকে ভালোবাসি সুবর্ণা, তোমার সব রকম ব্যবহারই আমার ভালো লাগে।
তুমি ভালোবাসার কথা মুখে উচ্চারণ করো না। তুমি জানোই না কাকে ভালোবাসা বলে।
কোন বইয়ে ভালোবাসার ডেফিনেশান লেখা আছে? নামটা বলে দাও? পড়ে মুখস্থ করে নেব। তারপর সেই অনুযায়ী ভালোবাসার চেষ্টা করব।
এই ঘরে এখন অন্য কোনো মেয়ে থাকলে, তাকেও তুমি চুমু খেতে চাইতে?
যদি তাকে আমার পছন্দ হত, তাহলে চাইতাম।
যে-কোনো মেয়ে?
বললাম তো, যদি পছন্দ হত, যদি সেও রাজি হত।
বুঝলাম। আচ্ছা, আমি এবার চলি—
ঠিক আছে। বিয়ের নেমন্তন্ন খাওয়াচ্ছ তো?
সুবর্ণা উঠে দাঁড়াল। গাঢ় চোখে তাকাল তপনের দিকে। তপন মিটিমিটি হাসছে। সুবর্ণা তপনের দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল, একবার কিন্তু!
তপন মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলল, চুলের মুঠি ধরো।
সুবর্ণা মুঠো করে ধরল তপনের চুল, আর একটা হাত রাখল ওর কাঁধে, তারপর ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
তপন সুবর্ণাকে কাছে টেনে নিয়ে প্রচণ্ডভাবে আলিঙ্গন করল। সুবর্ণার শরীরটাকে তার শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাইল যেন…
প্রায় দম বন্ধ হবার শেষ মুহূর্তে ওরা ছাড়াছাড়ি করল। সুবর্ণা একটু একটু হাঁপাচ্ছে। তার গালে লেগেছে লালচে রং।
নিজেকে একটু সামলে নেবার পর সুবর্ণা লজ্জিতভাবে বলল, আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো এটা কি পাপ নয়?
পাপ পুণ্যের কথা পরে হবে। আগে বলো, তোমার ভালো লাগেনি?
যাঃ!
চিরকালই মেয়েরা এই সময় লজ্জা পাবে। কিছুতেই সত্যি কথা বলবে না। যাই হোক, লজ্জাটাও এই সময় সুন্দর দেখায়।
সুবর্ণা তপনের বুকে দুটো কিল মেরে বলল, তুমি কি কিছুতেই একটু সিরিয়াস হতে পারো না?
তপন আবার জড়িয়ে ধরল সুবর্ণাকে। আবার একটি দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন।
সুবর্ণার দিক থেকে বাধা দেবার কোনো চিহ্ন নেই।
তপন বলল, এবার তোমার পাপ-পুণ্যের প্রশ্নটার উত্তর দিচ্ছি। দুজন মানুষ যদি কোনো একটা কাজ করে আনন্দ পায় এবং তাতে অন্য কারুর কোনো ক্ষতি না হয় তাহলে সেটা পাপ হতেই পারে না।
রণজয় যদি জানতে পারে, তাহলে ক্ষতি হবে না?
তুমি অত্যন্ত নির্বোধ না হলে নিশ্চয়ই রণজয়কে এইসব কথা বলতে যাবে না।
আর তা ছাড়া আমার মনে হয়, রণজয় জানতে পারলেও এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। তোমার কী ধারণা, রণজয় তোমাকে ছাড়া আর কোনো মেয়েকে জীবনে ছুঁয়ে দেখেনি?
না, তা মোটেই ভাবি না।
তাহলে? এইসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার কী!
আচ্ছা, তুমি যদি জানতে পারো একটি মেয়ে অন্য একজনের সঙ্গে শুয়েছে, তারপরেও তুমি সেই মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারবে?
বাঃ, তাহলে একবার ডিভোর্স করার পরেও মেয়েদের আবার বিয়ে হয় কী করে?
তুমি আমাকে শুচিবায়ুগ্রস্ত ভেবেছ নাকি? তোমাকে তো বলেইছি, মানুষের শরীর কখনও অপবিত্র হয় না। যত কিছু ঝঞ্ঝাট মানুষের মন নিয়ে। বলে তপন একটা সিগারেট ধরাতে গেল।
সুবর্ণা হাত বাড়িয়ে বলল, দাও, আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।
সুবর্ণার মুখে সিগারেট, তপন দেশলাই জ্বালিয়ে দিল। সুবর্ণা দুবার জোরে টান দিয়ে সিগারেটটা এগিয়ে দিল তপনের দিকে।
সুবর্ণা বলল, এবার বলো, কেন তুমি চারদিন ইউনিভার্সিটিতে যাওনি?
পরীক্ষা এসে গেছে, এখন আর ক্লাসে না গেলেও হয়। তা ছাড়া—
তা ছাড়া?
আমার মনে হচ্ছিল, রণজয় যেন আমাকে একটু হিংসে করছে। আমি শুনেছিলাম তোমাদের শিগগিরই বিয়ে হবে। কিন্তু ক্যাম্পাসের মধ্যে তুমি আমার সঙ্গে বার বার দেখা করো, বেশি কথা বলো আমার সঙ্গে, এটা যেন রণজয়ের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। ও আগে এরকম ছিল না, এখন যেন ওর ভেতর একটা হিংসে এসে ঢুকেছে। তাই আমি ভাবলাম আমার কিছুদিন দূরে থাকাই ভালো। বিয়ের আগে অশান্তি করার কোনো মানে হয় না। অর্থাৎ তোমার কথা ভেবেই।
আমার কথা ভেবে?
হ্যাঁ, তোমার ভালোর জন্যই—
সুবর্ণা ঠাস করে চড় মারল তপনের গালে। বেশ জোরে।
তপন গালে হাত বুলিয়ে নিল একবার। তারপর হেসে জিজ্ঞেস করল, এটা কীসের জন্য?
তুমি আজ সারাক্ষণ শুধু আমাকে অপমান করছ।
অপমান? তার মানে?
নিশ্চয়ই অপমান করেছ। রণজয়ের হিংসে হয়, আর তোমার বুঝি হিংসে হতে পারে না?
আমার হিংসে হবে কেন?
তুমি একবারও আমাকে বলতে পারতে না, তুমি রণজয়কে বিয়ে করো না!
তোমাদের বিয়ে তো আগেই ঠিক হয়ে গেছে।
ঠিক হয়ে গেলেই-বা, তুমি যদি একবার বলতে—
বলব কেন সে কথা, রণজয়ের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই তোমার চেনা—ও তোমাকে পাগলের মতন চায়—তুমিও ওকে ভালোবাস, তোমাদের দুজনের বিয়ে হবে, এটাই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার।
তাহলে তুমি কেন বলেছিলে, তুমি আমাকে ভালোবাস?
সে কথাও বলতে পারব না? তাতে দোষটা কী হয়েছে।
এরকম মিথ্যে কথা আর কজনকে বলেছ?
না, মিথ্যে নয়। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসলেই কি একেবারে নিজের দখলে রাখতে হবে? তুমি অন্য কারুর স্ত্রী হয়ে গেলেও কি তোমাকে আমি ভালোবাসতে পারি না! কারুর বাড়ির সুন্দর বাগান দেখে যদি আমার খুব ভালো লাগে তাহলেই কি আমি বাগানটা দখল করে নেবার চেষ্টা করব? …কথা বলতে বলতে থেমে গেল তপন। সুবর্ণার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
তপন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এ কী?
সুবর্ণা কোনো উত্তর দিল না।
তপন সুবর্ণার কোমর ধরে তাকে আবার সোফায় বসিয়ে দিল জোর করে। একটা আঙুল দিয়ে আলতোভাবে সুবর্ণার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, বিয়ের আগে সব মেয়েরাই কাঁদে, তাই না? ভয় হচ্ছে বুঝি?
তুমি আমার এরকম ক্ষতি করলে কেন?
কী ক্ষতি করলাম?
আমার মনের মধ্যে কী হচ্ছে, তুমি একবার ভেবেও দেখো না। আমি রণজয়কে বিয়ে করতাম, ওকে বিয়ে করে সুখী হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি মাঝখান থেকে এসে সব গণ্ডগোল বাধিয়ে দিলে! তুমি কেন আজ আমায় নিয়ে এরকম করলে!
কী করেছি?
সবটাই তোমার ছেলেখেলা?
তপন হঠাৎ রেগে উঠল। ঘড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে কড়া গলায় বলল, আর মাত্র পনেরো মিনিট সময় আছে, তারপরই রঘু আমার ছোটো ভাইকে নিয়ে এসে পড়বে, এই পনেরো মিনিট আমরা আনন্দ করতে পারি। তুমি আমার সঙ্গে যদি বিছানায়—ছি ছি, তুমি আমাকে এই ভাব!
আমি ঠিকই ভাবি, মেয়ে মানেই কি এক একটা সংস্কারের ডিপো? তুমি আজ বড্ড ন্যাকামি করছ।
তপন, তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি।
সুবর্ণা তুমি নিজে থেকেই এখানে এসেছ, আমি তোমাকে ডাকিনি।
আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি।
গেট আউট!
সুবর্ণা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এদিক ওদিক তাকাল। তপনকে আঘাত করার জন্য সে একটা কিছু খুঁজছে। সে রকম কিছুই নেই, নীচু টেবিল থেকে বুদ্ধ মূর্তিটাই তুলে নিল। অহিংসার প্রতিমূর্তিটি দিয়ে সে ঠকাস করে মারল তপনের মাথায়। তখন সুবর্ণার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, একদম খুন করে ফেলব কিন্তু। তুমি আমার রাগ চেনো না!
আমাকে ছেড়ে দাও, অসভ্য কোথাকার!
না ছাড়ব না। আমি জানি তোমার ব্যাপার, তুমি রণজয়কে বিয়ে করতে চাও, আবার আমাকেও ছাড়তে চাও না, দুজনকেই একসঙ্গে বিয়ে করে দ্রৌপদী হতে চাও?
আমাকে ছেড়ে দাও, আমি আর কোনোদিন তোমায় মুখ দেখাব না।
না, কিছুতেই ছাড়ব না, তুমি আমাকে মেরেছ।
তপন, তুমি বলেছিলে তুমি আমার ওপরে জোর করবে না।
তুমিই চাইছ, আমি জোর করি।
না, প্লিজ না।
তপন ছেড়ে দিল সুবর্ণার হাত। তার ফরসা হাত দুটি তপনের দৃঢ় মুষ্টিতে লাল হয়ে গেছে। ধরা গলায় সুবর্ণা বলল, আমি চলে যাচ্ছি, আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না।
তপন বলল, নিশ্চয়ই দেখা হবে। তোমার বিয়ের দিনে।
না।
হ্যাঁ হবেই। তুমি নেমন্তন্ন না করলেও রণজয় করবে।
আমি ওকে বারণ করে দেব।
ও শুনবে না। ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে কী চমৎকার ব্যবহার!
স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে তোমারই বা কী চমৎকার ব্যবহার। আমার বুদ্ধ মূর্তিটা তুমি ভেঙে ফেলেছ।
আর একটা কিনে পাঠিয়ে দেব।
তাই দিও।
আমি যাচ্ছি এখন।
যাও।
সারা জীবন মনে থাকবে, তুমি আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ।
আর একটা কথাও মনে রেখো। আমি তোমাকে ভালোবাসি। এখনও ভালোবাসি। পরেও ভালোবাসব।
আবার ওই কথা! খবরদার বলবে না।
বেশ করব বলব। একশোবার বলব। কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না।
সুবর্ণা দু হাতে মুখ ঢেকে করুণ গলায় বললে, কেন বার বার ওই মিথ্যে কথাটা বলে আমাকে কষ্ট দিচ্ছ? আমাকে কষ্ট দিয়ে তোমার কী লাভ?
তপন ওকে নিজের বুকের ওপর টেনে নিয়ে বলল, একটুও মিথ্যে নয়। মুখটা তোল। সুবর্ণা মুখটা তুলতেই তপন তাকে খুব নরমভাবে চুম্বন করল। আদর করে বলল, তুই কি একটা পাগলি।
সুবর্ণা বলল, আর তুই কি? একটা ডাকাত!
চোখের জলের দাগটাগ লেগে রয়েছে! এই অবস্থায় রাস্তা দিয়ে যেতিস কী করে? মুখটা ধুয়ে ফেল ভালো করে।
সুবর্ণা তপনের বুকে মাথা রেখে বলল, আমি কিন্তু রণজয়কে খুবই ভালোবাসি।
কে বারণ করছে ভালোবাসতে? আয় না, আমরা সবাই সবাইকে ভালোবাসি।
না আমি তোকে ভালোবাসতে পারব না, তাহলে যদি বার বার তোর কাছে চলে আসতে ইচ্ছে হয়।
ইচ্ছে হলে আসবি।
তা হয় না। এরকমভাবে বিবাহিত জীবন কাটানো যায় না?
পরীক্ষা করে দেখ না কিছুদিন। যদি খুব অসুবিধা হয় আমি নিজেই তোকে বারণ করব।
সুবর্ণা আর দেরি করল না। বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তপন তাকে সিঁড়ির তলা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় তপন সুবর্ণার কাঁধে হাত রেখেছিল। ঠিক দুই বন্ধুর মতন।
সুবর্ণা আজ আর ইউনিভার্সিটিতে যাবে না। বাড়ি ফিরবে ভেবেছিল। কিন্তু মনটা খুব চঞ্চল হয়ে আছে। মনের মধ্যে একটু একটু অপরাধবোধ। তপন তাকে দু-একবার চুমু খেয়েছে কিংবা জড়িয়ে ধরেছে, সে জন্য নয়। তার নিজেরই তো খুব ইচ্ছে করছিল তপনের আদর পেতে—এই জন্য।
বাড়ির দিকে না গিয়ে সুবর্ণা চলে এল রণজয়ের ফ্ল্যাটের দিকে।
এই পাড়াটা পাঁচমিশেলি। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, চিনে, গরিব মুসলমান এবং সাহেবি ঢং-এর হিন্দুরা বেশ সহাবস্থান করে আছে। কোন বাড়িতে কে এল, কিংবা কোন মেয়ে গেল কোন পুরুষের ঘরে, এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সুবর্ণার একবার মনে হল, তার মুখটা কলঙ্কিনীর মতন দেখাচ্ছে না তো? আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে নিল ভালো করে।
ওপর থেকে একটি মেয়ে নেমে আসছে তরতর করে। পাতলা ছিপছিপে চেহারা, কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ। মেয়েটি সুবর্ণার পাশ দিয়ে যাবার সময় একবার সোজাসুজি তাকাল ওর দিকে। একটু যেন রাগ আর অভিমান মেশানো দৃষ্টি। সুবর্ণার একটু চেনাচেনা মনে হল মেয়েটিকে, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারল না। তবে মেয়েটি যে রণজয়ের কাছেই এসেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বাড়িতে আর একটিও পরিবার থাকে না।
দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে রণজয়ের গলা শোনা গেল, কে? দরজা খোলাই আছে।
একটাই লম্বা টানা ঘর রণজয়ের। এত লম্বা ঘর সচরাচর হয় না। হয়তো এককালে বারান্দা ছিল, এখন ঢাকাঢুকি দিয়ে ঘর বানানো হয়েছে।
দরজার কাছেই রণজয়ের খাট ও কয়েকটি চেয়ার পাতা। আর একটু দূরে তার পড়ার টেবিল ও বইয়ের আলমারি। তার ওপাশে রান্নার জায়গা। রণজয় অবশ্য বাইরেই খায়, তবু রান্নার ব্যবস্থা আছে।
অত্যন্ত অগোছালো রণজয়ের ঘর। সব জায়গায়, এমনকি, রান্নার জায়গাতেও বই ও পত্রপত্রিকা ছড়ানো। নিজের বিষয় ছাড়াও রণজয় বহু রকমের জিনিস পড়ে। তার জামা, কাপড়, রুমাল, তোয়ালেও এদিক ওদিক পড়ে থাকে।
সুবর্ণার প্রথম কাজই হচ্ছে, এখানে এসে সব কিছু গোছগাছ করে দেওয়া।
রণজয় সুবর্ণাকে দেখে একটুও অবাক হল না। খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে বই পড়ছিল, তাড়াতাড়ি উঠে বলল, তুমি এসেছ? বাঃ! খুব খিদে পেয়েছে। একটা কিছু রান্না করে দাও না আমার জন্য।
সুবর্ণা হাতের ব্যাগটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে বলল, তোমার কাছে একটা মেয়ে এসেছিল?
হ্যাঁ।
কে বল তো মেয়েটি? চেনা চেনা লাগছিল!
ওর নাম তো ভাস্বতী বসু। পার্টির কাজ করে। খুব ভালো ওয়ার্কার।
তোমার কাছে এসেছিল কেন?
পার্টির চাঁদা চাইতে। আমিও একসময় কাজ করতাম।
ইউনিভার্সিটিতে ওকে দেখেছি মনে হচ্ছে। তোমাদের সঙ্গে অনেকদিনের চেনা?
অনেকদিনের। ওকে আমি খুব ছেলেবেলা থেকে চিনি। তুমি কি অমলেশকে দেখেছ? আমাদের থেকে সিনিয়ার। সেই অমলেশ হচ্ছে ওর পুরুষ। একসঙ্গেই থাকে বিয়ে-টিয়ে এখনও করেনি, করে নেবে এক সময়।
সুবর্ণা হঠাৎ রেগে গেল। বলল, চাঁদা চাইতে তোমার বাড়িতে আসবার দরকার কী? ক্যাম্পাসেই তো চাইতে পারে।
রণজয় একটু অবাক হয়ে বলল, বাড়িতে আসবে না কেন? আমিই তো ওকে একদিন আসতে বলেছিলাম।
কেন!
আরে তুমি রেগে যাচ্ছ নাকি , এসেছে তো কী হয়েছে।
আমার হিংসে হচ্ছে।
রণজয় উঠে এসে সুবর্ণাকে আলিঙ্গন করে বলল, ধ্যাৎ পাগলি। এ আবার কী ছেলেমানুসি। ভাস্বতী খুব ভালো মেয়ে। কারণ সিরিয়াস। ওদের পার্টির কাছে ও একটা জুয়েল। পলিটিক্যাল সায়েন্সটাও অনেকের থেকে ভালো বোঝে। ছেলেবেলায় কানপুরে আমরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম।
তখন তুমি বুঝি ওকে ভালোবাসতে?
শুধু তখন কেন এখনো তো ভালোবাসি।
সুবর্ণা নিজেকে রণজয়ের আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল। আরক্ত মুখে জিজ্ঞেস করল, তুমি এ রকম আর কজনকে ভালোবাস?
গুনে দেখিনি। অনেককে।
ছাড়! আমাকে ছাড়! আমি ভালোবাসার ভাগাভাগিতে বিশ্বাস করি না। তুমি যদি অনেককেই ভালোবাসতে চাও—
মানুষ কি শুধু একজনকে ভালোবেসে বেঁচে থাকতে পারে নাকি? মাকে-বাবাকে কিংবা ছেলেমেয়েকে ভাইবোনকে ভালোবাসে না?
সেটা অন্য ব্যাপার।
এটাও অন্য ব্যাপার। আমি আরও অনেক মেয়েকে ভালোবাসি, কিন্তু তোমাকে বিশেষ রকম ভালোবাসি বলেই তোমাকে নিজের করে চাই। অন্য কোনো মেয়েকে তো এইরকমভাবে চাইনি!
ঠিক আছে বুঝেছি। ছাড়ো রান্না করে দিচ্ছি, কী খাবে বলো—
তুমি খিচুড়ি রাঁধতে পারো?
কে না পারে? সবাই পারে।
তাহলে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা—
সসপ্যানে চাল ধুতে ধুতে সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল, ওই মেয়েটি কতক্ষণ ছিল?
রণজয় ওর ঘাড়ে একটা চুমু খেয়ে বলল, অনেকক্ষণ। আধঘন্টা তো হবেই।
চাঁদার কথা বলতে কি এতক্ষণ সময় লাগে?
আমি কি সহজে চাঁদা দিই নাকি? ওকে আটকে রাখার জন্যই তো নানা কথা বলছিলাম।
সেই সময় যদি আমি এসে পড়তাম?
তাহলে আরও জমত। আফ্রিকার দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কথা উঠেছিল।
ভাস্বতীর বেশ পরিষ্কার চিন্তা আছে এ বিষয়ে।
শুধু এইসব কথা হল।
মাথা খারাপ? তুমি কি ভাস্বতীকে নীরস মেয়ে ভেবেছ নাকি! যারা দিনরাত রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনো কথা চিন্তা করে না, তাদের গাল-টাল তুবড়ে কী রকম বিচ্ছিরি চেহারা হয়ে যায়। ভাস্বতী মোটেই সে রকম মেয়ে নয়। আমরা কিছুক্ষণ ছেলেবেলার গল্প করলাম। ভাস্বতী এক সময় আমাকে একটা প্রেমপত্র লিখেছিল, তখন ওর বয়স এগারো বারো হবে। সেই কথা বলে হাসলুম খুব।
এখনও তোমার সম্পর্কে ওর কোনো দুর্বলতা নেই।
দুর্বলতা! না, জিনিসটা নেই ভাস্বতীর চরিত্রে। ও যা করে, সোজাসুজি জোর দিয়ে করে। অন্য কিছু গ্রাহ্য করে না। যেমন ধরো অমলেশের সঙ্গে যে ও একসঙ্গেই প্রায় থাকে—সে ব্যাপারে ও ওর বাবা মা কিংবা অন্য কারো আপত্তি গ্রাহ্যই করে না।
একসঙ্গে থাকে যখন বিয়ে করে না কেন?
এখনও বিয়ের জন্য তৈরি হয়নি। কিংবা ওদের নিজস্ব কোনো প্ল্যান থাকতে পারে। এ ব্যাপারেও ওর সঙ্গে কথা উঠেছিল। ওর ভাবনা-চিন্তা বেশ পরিষ্কার। ওর একটা শরীরের দাবি আছে, অমলেশেরও আছে। সেই দাবিটা অগ্রাহ্য করলে অন্য কাজ মন দিয়ে করা যায় না। খাওয়া-দাওয়ার মতনই তো সেক্সটা একটা শারীরিক প্রয়োজন। সেটাকে বাদ দিয়ে যারা কাজ করতে চায়, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কীরকম অস্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠে। ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে, তাই একসঙ্গে থাকে। খোলাখুলি ব্যাপার।
যদি বাচ্চা-টাচ্চা হয়ে যায়।
সে কথাও আমি ভাস্বতীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওর সেজন্য চিন্তা নেই।
সুবর্ণা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, সত্যি কথা বলো তো, তুমি ওই মেয়েটির সঙ্গে এতক্ষণ শুধু গল্পই করেছ? আর কিছু—
দুষ্টু দুষ্টু হেসে রণজয় বলল, সত্যি কথা বলব, রাগ করবে না?
আগে বলো।
আমার হাতে হাত রেখে বল রাগ করবে না।
এই তো হাত রেখেছি।
আমি ওকে একটা চুমু খেয়েছি।
সুবর্ণা হাতটা সরিয়ে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রণজয় তার থুতনিটা ধরে উঁচু করে বলল, রাগ করবে না প্রতিজ্ঞা করলে যে?
সুবর্ণা, সত্যিই রাগ করেনি, মনটা শুধু উতলা লাগছে। মনটাকে সামলাবার চেষ্টা করছে সে। তারপর মুখ তুলে হাসিমুখে বলল, শুধু একটা?
তাহলে আরও সত্য কথা বলি? একটা নয় তিনটে। ওকে একটাই বলেছিলাম। তারপর একটু বেশি লোভ হল। কিন্তু এর চেয়ে আর বেশি কিছু না, এটা কিন্তু ঠিক।
হঠাৎ উঠে গিয়ে?
না, না, না। আমি নানারকম কথা বলছিলাম। এক সময় কী যেন মনে হল ডান পাশ থেকে ওর মুখখানা বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল, তাই আমি বললাম, ভাস্বতী অনেক তো কথা হল, এবার একটা চুমু খেলে কী হয়!
ও বলল, কেন? আমি বললাম, এমনিই।
তারপর ভাস্বতী বলল, ছেলেবেলার কথা ভেবে আমি একবারের জন্য রাজি হতে পারি, কিন্তু তুমি দুরন্ত ছেলে! তুমি আরও বাড়াবাড়ি করবে।
আমি বললাম, না না, মোটেই না।
রণজয় সুবর্ণার কাঁধে হাত রেখে ঠোঁটটা এনে বলল, আমি তখন এইরকমভাবে আলতো করে একটু চুমু খেলাম। কিন্তু তাতে আশা মিটল না বলেই, আর একটু জোরে পরপর আর দুবার—তারপর ভাস্বতী আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
দরজা বন্ধ করেছিলে?
এইরকম ভেজানোই ছিল।
তখন যদি আমি, ধরো ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়তাম।
এরকম তো গল্পে হয়। কিন্তু ধরো তুমি সত্যিই সেই সময় এসে পড়লে, তারপর কী হত? তুমিই বলো না। তুমি কি রণঙ্গিনী মূর্তিতে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে? না আমাকে খুন করতে চাইতে?
তুমি বলো আমার কী করা উচিত সেই সময়?
তুমি একটু লজ্জা পেতে হয়তো। আমরাও লজ্জা পেতাম। কিংবা তিনজনেই হেসে ফেলতাম। এর থেকে আর বেশি কী হবে? এমন তো কিছু নয়।
সুবর্ণা রণজয়ের চোখে একবারে স্থির দৃষ্টি রেখে বলল, এবার আবার আর একটা উত্তর দাও। মনে করো, তুমি একদিন হঠাৎ এই ঘরে ঢুকলে—আমাকে অন্য কেউ হয়তো তোমার কোনো বন্ধু চুমু খাচ্ছে। তখন তুমি কী করতে?
একটু চিন্তা না করে রণজয় বলল, আমি একটু রেগে যেতাম।
রেগে যেতে? বাঃ! তুমি যা খুশি করতে পারো, আর আমি কিছু করলেই তুমি রেগে যাবে কেন?
একটু তো বলেছি। বেশি তো না। ছেলেদের একটু অহংকার বেশি কিনা।
আমি মোটেই তা বিশ্বাস করি না। তোমার অহংকার থাকতে পারে, আর আমার থাকতে পারে না?
পারেই তো। কিন্তু তোমাকে যদি কেউ চুমু-টুমু খায় আমি দেখে ফেললে, হেসেই ফেলব। একটু রাগের ভাব ভেতরে থাকবে অহংকারটাকে সুড়সুড়ি দেবার জন্য।
কীসের অহঙ্কার?
এই যে আমি পুরুষ, আমি বহু নারীকে জয় করতে পারি, কিন্তু কোনো নারীই আমাকে ছাড়া অন্য কারুকে চাইবে না। এইটাই তো বহুকালের ট্র্যাডিশন—সেটা কাটাতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
ওসব চলবে না। একজন ছেলে যদি অনেক মেয়েকে চায়, তাহলে একটি মেয়েও অনেককে চাইতে পারে।
পারেই তো! না হলে ভাস্বতী রাজী হল কেন? ও যদি প্রথমেই না বলত, আমি কি জোর করতুম?
সুবর্ণা রণজয়ের দুহাত ধরল নিজের দুহাতে। তারপর বলল, তুমি জানো, তোমার হাত ছুঁয়ে আমি কখনও মিথ্যে কথা বলি না। আমি তোমাকে একটা কথা বলছি। তোমার এখানে আসবার আগে আমি তপনের বাড়ি গিয়েছিলাম একটা কথা জিজ্ঞেস করবার জন্য।
রণজয় সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বললে, নিশ্চয়ই ওই রাস্কেলটা তোমাকে চুমু খেয়েছে?
সুবর্ণা চুপ করে রইল!
রণজয় আবার জিজ্ঞেস করল, কটা।
তিন-চারটে!
আমি জানতাম। ও কিছুতেই ছাড়বে না। তপনটা ভাবে কী জানো, আমি ওকে হিংসে করি! ইডিয়েট একটা! ওকে আমি হিংসে করব কেন? আমি তো জানিই তুমি ওকে ভালোবাস!
তুমি জানো? তুমি কিচ্ছু জানো না। আমি তোমার মতন আর কারুকেই ভালোবাসি না।
তাও জানি। কিন্তু তার জন্য তপন বা আর কারুকে একটু ভালোবাসতে দোষ কী? এস আমরা সবাই মিলে সবাইকে ভালোবাসি।
তপনও ঠিক এইরকম একটা কথা বলছিল।
বলবেই। আমরা অনেক কালের বন্ধু।
তপন যে আমাকে… তাই শুনে তোমার একটুও রাগ হয়নি?
ভাস্বতীর কথা শুনে তোমার যতখানি রাগ হয়েছিল, ঠিক ততখানিই।
তারপরই রণজয় সুবর্ণাকে টানতে টানতে বিছানার কাছে নিয়ে এসে বলল, কিন্তু তপন যদি তোমাকে তিনটে চুমু খেয়ে থাকে, তাহলে তুমি আমাকে এক্ষুনি তিনশোটা চুমু খেতে দেবে। না হলে কিন্তু আমি ভীষণ রেগে যাব! হঠাৎ কথা থামিয়ে পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। সেই দৃষ্টি চিরকালের।
ঈর্ষা
ঈর্ষা
বিনয়েন্দ্র বললেন . সব ঠিক হয়ে গেল। আজ অ্যাডভান্স জমা দিয়ে এলুম। বুঝলে!
অনিমা ড্রেসিং টেবিলের আয়না মুছছিলেন, বললেন জানালাগুলো রং করে দেবে তো? বারান্দার কোলাপসিবল গেটটাও ঢকঢক করে নড়ছিল।
সব ঠিক করে দেবে। বাড়িওয়ালা লোকটি ভালো। একতিরিশ তারিখ রোববার আছে, সেদিনই সিফট করব। যতীনকে বলেছি দুটো লরি পাঠাতে।
বাবলু আর অদিতি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। ওরা কৌতূহলে ছটফট করছে।
বাবলু বললো . বাবা, ওখানে ফুটবল খেলার মাঠ আছে?
বিনয়েন্দ্র হাসলেন। বললেন . অত বড়ো মাঠ নেই—তবে ছোটো একটা লন আছে। ইচ্ছে করলে ব্যাডমিন্টনের নেট ফেলতে পারবি।
রাস্তার নাম কী বাবা?
রত্নাকর সেন রোড। সিক্স রত্নাকর সেন রোড, মুখস্থ করে রাখো। পোস্ট অফিসে একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।
বাবলু তাড়াতাড়ি ছুটে গেল পাশের ফ্ল্যাটে ওর বন্ধু সুজিতকে খবরটা জানাতে। অদিতি এসে দাঁড়াল মায়ের পাশ ঘেঁষে। অনিমা বললেন . হ্যাঁ গো, ভাড়া সেই সাড়ে পাঁচশোই রইল? এত টাকা ভাড়া দিয়ে কুলোতে পারবে তো? কমালে না?
নাঃ! ভাড়া কি আজকাল কেউ কমায়? তবে পাড়াটা ভালো, ওদের ইস্কুল কাছে হল। সামনের বছর অদিতি পাস করলে ওকে বেব্রোনে ভরতি করব— তাও খুব দূরে হবে না।
যাক ভালোই হল। এ বাড়িটা আর আমার একটুও পছন্দ হচ্ছিল না। আশেপাশে যা হই-হট্টগোল দিনরাত!
অদিতি অনুযোগের সুরে বলল . বাড়ি ঠিক হয়ে গেল, আমরা এখনও দেখলুম না। যদি এর থেকে ভালো না হয়!
এর চেয়ে ঢের ভালো। বাইরে থেকেও কত সুন্দর দেখতে, গোলাপি গোলাপি রং, সামনের লনে একটা ছোটো ইউক্যালিপটাস গাছ আছে—কলকাতা শহরের কোন বাড়িতে তুই ইউক্যালিপটাস গাছ পাবি? ওটা একেবারে ঠিক আমাদের জানালার পাশে। একটা ছোটো ঘর আছে—ওটা আমি ভেবে রেখেছি তোর জন্য একেবারে আলাদা। পড়াশুনোর সুবিধে হবে—সঙ্গে ছোটো ব্যালকনি, অ্যাটাচড বাথরুম।
বাথরুমে শাওয়ার আছে?
হ্যাঁ, খুব মোটা জল পড়ে দেখে এলুম।
কলিং বেল আছে?
কলিং বেল কি বাড়িওলা দেয়। ওটা আমাদেরই গিয়ে লাগিয়ে নিতে হবে। আজ বা কাল তোরা গিয়ে বাড়িটা দেখে আয় না। দেখিস, তোদের ঠিক পছন্দ হবে।
বাবলু গিয়ে সুজিতকে বলল . জানিস, আমরা সামনের মাস থেকে চলে যাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে গেছে।
কোথায় রে? অনেক দূরে?
হুঁ, বহুৎ দূর, বালিগঞ্জে যাচ্ছি।
বালিগঞ্জ আবার দূর নাকি? এই তো পরশুদিন টুবলুমামার গাড়িতে ঘুরে এলুম বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ—একটা দোকানে আইসক্রিম খাওয়ালেন, দোকানটা কী ঠান্ডা। তোরা বেশ রোজ রোজ ওই দোকানে আইসক্রিম খেতে পারবি।
বাবা বলেছেন, আমাদের নতুন বাড়ির ঠিক পাশেই একটা আইসক্রিমের দোকান আছে। জানিস, আমি এই ইস্কুল ছেড়ে দেবো।
ইস্কুল ছেড়ে দিবি? তারপর কী করবি?
ওখানে ইংরেজি ইস্কুলে পড়ব। সেই ইস্কুলের বাস আছে। রোজ আমাদের বাড়ির সামনে বাস থামবে।
সুজিত একটুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর বলল . যাবার সময় তোরা ছাদ থেকে রেডিয়োর এরিয়ালটা খুলে নিয়ে যাবি?
হ্যাঁ। এরিয়াল নিয়ে যাবো, জানালার পর্দা, নিয়ন লাইট সব নিয়ে যাবো।
সুজিত বলল . ভালোই হল। তোদের এরিয়ালটার জন্য ছাদে ভালো করে ঘুড়ি ওড়াতে পারতুম না। এখন পুরো ছাদটা ফাঁকা পাবো। তোদের ফ্ল্যাটে যতদিন না অন্য ভাড়াটে আসে ততদিন তো দোতলাটাই আমাদের—কী মজা হবে তখন! শানু, পিন্টু, শুভাদের ডেকে রোজ চোর চোর খেলব।
বাবলু গম্ভীরভাবে জানাল . আমাদের নতুন বাড়িতে ব্যাডমিন্টন খেলা হবে।
সুজিতের দাদা ইন্দ্রজিৎ বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। সদ্য কলেজে ভরতি হয়েছে ইন্দ্রজিৎ, এই কিছুদিন আগেও সে সিঁথি কেটে চুল আঁচড়াত—এখন উলটে আঁচড়ায় বলে মুখখানা একটু বদলে গেছে। স্বভাবও একটু বদলেছে তার—আগে সে যখন তখন বাবলুদের সঙ্গে ক্যারাম খেলতে বসত—এখন আর খেলতে চায় না। সে গম্ভীরভাবে বলল . তোমাদের বাড়ি বদলানো ঠিক হয়ে গেল বাবলু?
হ্যাঁ ইন্দ্রদা, খুব চমৎকার বাড়ি। বাবা বলেছেন…
তোমাদের তো বদলানো দরকারই। তোমার বাবার কাছে কত লোক আসেন, কিন্তু এখানে তোমাদের ভালো বসবার ঘর নেই…
ওখানে আমাদের ছ-খানা ঘর, তার মধ্যে দুটো বসবার ঘর, বাবার একটা মা-র একটা।
কবে যাচ্ছো তোমরা?
এই তো একত্রিশ তারিখ রোববার—বাবা বলেছেন সকালবেলায় চলে যেতে হবে—চারখানা লরি আসবে—
চারখানা লরি কীসে লাগবে?
বাঃ, অ্যাত্ত জিনিস, আমি প্রথম লরিটায় ড্রাইভারের পাশে বসব।
অনিমা বললেন . বাড়িটা তো ভালোই ঠিক হয়েছে। কিন্তু আপনাদের ছেড়ে চলে যাবো, ভাবতে এত খারাপ লাগছে—
সুজিতের মা রত্নপ্রভা বললেন . এমন কিছু তো দূর নয়। বাসে চড়লেই দশ মিনিট। যাওয়া-আসা তো থাকবেই।
আচ্ছা তা তো থাকবেই। তবু এখানে যেমন আপনজনের মতন পাশাপাশি ছিলুম শান্তিতে—কোনো ঝঞ্ঝাট ছিল না, এসব ছেড়ে নতুন জায়গায়—অবশ্য পাড়াটা ভালো—আশেপাশে কোনো বস্তি নেই, সবই নতুন বাড়ি।
আমার এক মাসতুতো ভাই ওই সি. আই. টি. রোডে বাড়ি করেছে। বলছিল যে, সবই ভালো, শুধু বর্ষাকালে বড্ড জল জমে। আর মশা খুব। আমাদের এদিকটায় কিন্তু মশা নেই। তোমাদের ভাড়া কত পড়বে?
ভাড়া? ইয়ে, সাড়ে ছ-শো ঠিক হয়েছে, গ্যারেজ নিলে পুরো সাতশোই পড়বে। ভাবছি আপিসের গাড়িটা এখন থেকে বাড়িতেই রাখব।
আমরাও ভাবছি যাদবপুরের জমিটায় এইবার একটা বাড়ি তোলা শুরু করবো। এখন ব্রিজ হয়ে গেছে তো—ওদিকটা এমন সুন্দর হয়েছে—ভাড়া বাড়িতে আর ভালো লাগে না। অজিত এবার কানপুরের ট্রেনিং শেষ করে ফিরবে—তখন আর কি এইসব বাড়িতে থাকতে চাইবে?
তা ঠিক। নিজের বাড়ির তুলনায় কী আর ভাড়া বাড়ি! আমাকেও তো মা আর দাদারা বলছেন বাড়ি করো, বাড়ি করো। বাড়ি তো করাই যায়—কিন্তু ওর আপিস থেকে যে এতগুলো টাকা বাড়িভাড়া দেয়—নিজের বাড়ি হলে তো তা আর দেবে না। শুধু শুধু এতগুলো টাকা ছাড়ি কেন বলুন!
তোমার কী ইয়ে অদিতির বাবার আর ক-বছর চাকরি আছে?
এখনো সাত বছর। যাই, প্রেসার কুকারে মাংস চাপিয়ে এসেছি। দূরে চলে যাচ্ছি বলে ভুলে যাবেন না আমাদের রত্নাদি। বিপদে আপদে আপনাদের কাছে কত রকম সাহায্য পেয়েছি!
আহা সাহায্য আবার কী? পাশাপাশি ছিলুম দু-বোনের মতন—দূরে চলে গেলেও তুমিও কি আমাদের ভুলতে পারবে?
ছাদে একটা ছোট্ট ঘর, সেটা ইন্দ্রজিতের দখলে। একটা চেয়ার, একটা টেবিল আর একটা ছোট বুকশেলফ—এখানেই সে জানালার ধারে বসে পড়াশুনো করে, আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে দেখে পায়রাদের ওড়াউড়ি। আর তার নতুন শেখা সিগারেট খাওয়ার জন্যই সারা বাড়িতে এই একটি মাত্র জায়গা। যখনই তার মন খারাপ হয়—আজকাল প্রায়ই হয়—সে এসে সেই ছাদের ঘরে জানালার পাশে বসে। এখান থেকে সে বহুদূর পর্যন্ত তাকিয়ে দেখতে পারে—তার আস্তে আস্তে মন ভালো হয়ে যায়। ইন্দ্রজিৎ সেই ঘরে বসেছিল, পিছন দিক দিয়ে অদিতি এসে টপ করে টেবিলের ওপর একটা বাটি রেখে বলল . এই নাও।
ইন্দ্রজিৎ মনোযোগ দিয়ে উপন্যাস পড়ছে, ঘাড় না ফিরিয়ে বলল . কী?
আচার। যা ঝাল হয়েছে না, আমরা কেউ খেতে পারছি না—তোমার খুব পছন্দ হবে।
উঁহু, আমি এখন আচার খাবো না।
কেন?
আমি এইমাত্র সিগারেট খেয়েছি। এখন আচার খেলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে।
ইস, এর মধ্যেই পাকা নেশাখোরের মতন কথা! রঞ্জিতদাকে বলে দেবো একদিন, তখন বুঝবে।
বলতে হয় তো এখুনি বলো, পরে তো আর সুযোগ পাবে না!
অদিতির কিশোরী মুখখানি এমন ঝকঝকে স্পষ্ট যে সমস্ত মনোভাবের তৎক্ষণাৎ ছায়া পড়ে। ছাদের সিঁড়িতে ওঠার সময় তার মুখ ছিল ঝাল লেগে বিব্রত, ঘরে ঢোকার পর কৌতুকের, এইমাত্র সে মুখে ম্লান ছায়া পড়ল। সে ইন্দ্রজিতের কাছে সরে এসে বললে. আমরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি, তুমি শুনেছো?
হুঁ।
তোমার বইটা এখন রাখো তো! আমার এখন মন খারাপ লাগছে—আর উনি বসে বসে বই পড়ছেন!
কেন, মন খারাপ লাগছে কেন?
নতুন বাড়িতে যাবো শুনে বেশ আনন্দও হচ্ছে, আবার মন খারাপও লাগছে।
মন খারাপ লাগছে কীজন্য?
তুমি জানো না বুঝি?
না তো। আমি কেমন করে জানবো—কীজন্য তোমার মন খারাপ!
ঠিক আছে জানতেও হবে না। জানি তো, আমার কথা কেউ ভাবে না।
অদিতি সত্যিই রাগ করে চলে যাচ্ছিল, ইন্দ্রজিৎ দ্রুত উঠে গিয়ে তার হাত ধরলো। বলল. এই, রাগ করো না। শোনো, তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
না, আমি কোনো কথা শুনতে চাই না—আমার সময় নেই।
ইন্দ্রজিৎ জোর করে ওকে টেনে চিলেকোঠার সিঁড়িতে বসাল। নিজেও বসল পাশে। অদিতির কচি হাতের আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে বলল . জানো অদিতি, তোমরা চলে যাবে শুনে প্রথমটায় আমারও মন খারাপ লাগছিল—এখন কিন্তু বেশ ভালো লাগছে।
কেন, ভালো লাগছে কেন?
আমি বিকেলবেলা কলেজ থেকে ফেরার পথে প্রত্যেকদিন তোমাদের বাড়িতে যাবো—
সত্যি যাবে? না, মিথ্যে কথা, বিকেলবেলা তোমার কত বন্ধু-বান্ধব।
না, না, সত্যিই। শোনো, বিকেলবেলা তো এ বাড়িতে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয় না—মায়েরা তখন ছাদে আসেন, তা ছাড়া, দাদা তো আমাকে দেখলেই একটা না একটা কাজে পাঠাবে—তোমাদের বাড়িতে তো আর কোনো কাজ থাকবে না, আমরা তখন…
আমরা বিকেলে ওখানে ব্যাডমিন্টন খেলব।
হ্যাঁ খেলবো, আর বাগানে বসে গল্প করব। আমার প্রত্যেকটি বিকেলবেলা কেমন যেন মন খারাপ মন খারাপ লাগে, কলেজ থেকে বাড়ি আসতে ইচ্ছা করে না—এখন থেকে আমাদের নতুন বাড়িতে…
অদিতি আলতোভাবে ইন্দ্রজিতের আঙুলে চাপ দেয়। সে মনোভাব লুকোতে জানে না, খুশি ঝলমল চোখে বলল . বাড়ি বদলে তাহলে খুব ভালো হল, না? ভালো কি খারাপ, আমি এতক্ষণ বুঝতে পারছিলুম না।
খুব ভালো হল। মাঝে মাঝে আমরা আলাদা বেড়াতে যাবো। কী করে যাবো জানো? তোমার মাকে বলব . মাসিমা, অদিতিকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি! আসলে কিন্তু আমাদের বাড়িতে আসব না। আমরা আলাদা বেড়াব।
মা জানতে পারবেন না?
উহুঃ! এমন কায়দা করে ম্যানেজ করব—আমরা কখনো একসঙ্গে বেড়াইনি, দেখো কী ভালো লাগবে! তুমি লেকে গেছ কখনও? আমি তোমাকে লেক দেখাতে নিয়ে যাবো—
যদি আমাদের কেউ রাস্তায় দেখে ফেলে?
কেউ দেখবে না, আমি অনেক অচেনা অচেনা রাস্তা জানি।
আর পাঁচদিন বাদেই একতিরিশের রোববার। জিনিসপত্র গুছোনো, বাঁধাছাদা শুরু হয়ে গেছে। ইন্দ্রজিতের দাদা রঞ্জিত এসব কাজে খুব পাকা, সে ওদের সাহায্য করছে খুব। একটা পায়া ভাঙা টেবিল অনিমা রঞ্জিতকে দানই করে দিলেন। বাবলুর খুব ইচ্ছে আগে একবার গিয়ে নতুন বাড়িটা দেখে আসে। রোজই তাই নিয়ে বায়না ধরছে। বিনয়েন্দ্রের সময় নেই, অনিমা তাই বললেন . আচ্ছা তুই আর দিদি আজ বিকেলবেলা ঘুরে আয়। ইন্দ্রজিৎকে বল না তোদের সঙ্গে নিয়ে যাবে।
বাইরে বেরুবার সময় অদিতি আজকাল ফ্রক পরে না, একটা কালো রঙের সিল্কের শাড়িতে ওকে একটা ফুরফুরে দোয়েল পাখির মতন দেখাচ্ছে। বাবলু কিছুতেই মোজা পরতে চায় না, অদিতি ওকে জোর করে সু এবং মোজা পরিয়েছে। ইন্দ্রজিৎ পরেছে পায়জামা আর মুগার পাঞ্জাবি, তার চটি পরা পা দুখানি তার মুখের মতনই ঝকঝকে পরিষ্কার। পথে বেরিয়ে অত্যন্ত দায়িত্বসম্পন্ন মানুষের মতন সে বাবলুর হাত ধরে রইল, বাসে ওঠবার সময় সে সাবধানে বলল . লেডিজ, একদম রোখকে। পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে গম্ভীরভাবে টিকিট কাটল। মাঝে মাঝে অদিতির সঙ্গে চোখাচোখি হতে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে রইল, বাবলু সঙ্গে আছে—তাই যে-সব কথা বলতে ইচ্ছে করছে তা সে বলতে পারছে না। একবার সে শুধু একটু ফিসফিস করে বলেছিল . তোমাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে অদিতি, সত্যি।
অদিতি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, যাঃ।
ইন্দ্রজিৎকে কেউ বলে দেয়নি, তবু যেন সে মনে মনে কল্পনা করে রেখেছিল—
অদিতিদের নতুন বাড়ি হবে একটা সুন্দর বাংলো ধরনের একতলা, আলাদা বাড়ি, সামনে থাকবে চমৎকার একটা বাগান, কেন জানি না সে ভেবেছিল, বাড়িটার রং হবে ধবধবে সাদা। বাগান পেরিয়ে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি, তার কাছেই থাকবে বৈঠকখানা।
ঠিকানা মিলিয়ে এসে দেখলো, একটা লালচে রঙের দোতলা বাড়ি, সামনে একটুখানি জমি আছে বটে, তাতে কয়েকটা এলোমেলো গাছ—কোনো বাগান নেই। বাড়ির দোতলায় বাড়িওলা থাকে, একতলাটা শুধু অদিতিদের। দরজায় অন্যলোকের নাম লেখা পাথরের ট্যাবলেট লাগানো। গেটের কাছে এসে দাঁড়াতেই একটা বিশাল কুকুর ঘেউঘেউ করে ছুটে এল। ইন্দ্রজিৎ কুকুরকে বিষম ভয় পায়, সে সঙ্কুচিত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
একটু পরেই ভেতর থেকে একুশ-বাইশ বছরের একটি সুন্দর মতন ছেলে বেরিয়ে এল, তার পরনে প্যান্ট ও তোয়ালে জামা, মাথায় ঝাঁকড়া—কোঁকড়া চুল। ছেলেটি বলল . কী চাই? ওরা কেউ কিছু বলার আগেই বাবলু বলে উঠল . আমরা এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি। আমরা বাড়ি দেখতে এসেছি! ছেলেটি বলল . ও আপানরা মি. সেনগুপ্তর ফ্যামিলি থেকে? আসুন!
ছেলেটি শক্ত হাতে কুকুরটার বগলস চেপে ধরে গেট খুলল। মাঠটা পেরুবার সময় বললো . আপনারা তিন ভাই বোন?
ইন্দ্রজিৎ বলল . না, না…
অদিতি বলল . উনি আমার দাদা নন।
ইন্দ্রজিৎ বলল . ওদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকি! সঙ্গে এসেছি!
ছেলেটি বলল . ও, নমস্কার। আমার নাম সিদ্ধার্থ মজুমদার।
ইন্দ্রজিৎ বলল . নমস্কার। আমার নাম ইন্দ্রজিৎ রায়চৌধুরী। ওর নাম অদিতি, আর এর নাম বাবলু, ভালো নাম দেবকুমার।
একতলায় সাড়ে তিনখানা ঘর অদিতিদের, নতুন বাড়ি—তাই ঘরগুলো বেশ পরিষ্কার, বাথরুমটা বেশ বড়োসড়ো, রান্নাঘরে গ্যাসের কানেকশান আছে। সিদ্ধার্থ ওদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। সিঁড়ির পাশের ঘরটাও ওরা ভেবেছিল অদিতিদের, কিন্তু সেই ঘরের দরজা খুলে সিদ্ধার্থ বলল . এইটে আমার পড়ার ঘর। আসুন, একটু বসবেন। চা খাবেন তো, আপনি নিশ্চয়ই খাবেন? আর আপনি? দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হল অদিতিকে, সে উত্তর দেবার আগেই বাবলু বলল . আমিও চা খাবো।
অদিতিকে এর আগে কোনো ছেলে আপনি বলে কথা বলেনি, সে লাজুকভাবে ঘাড় হেলালো শুধু। সিদ্ধার্থ বলল . বসুন, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।
বেশ ছিমছাম সাজানো ঘর। রেক্সিন মোড়া বড়ো টেবিল, বইয়ের র্যাকে অনেক বই—বেশির ভাগই ইংরেজি। দেয়ালে ব্র্যাডম্যান, ফ্রাঙ্ক ওরেল, ডব্লু. জি. গ্রেস ইত্যাদির বাঁধানো ছবি। চাকর এসে চা দিয়ে গেল। ইন্দ্রজিৎ ছবিগুলো দেখছিল, তাই সিদ্ধার্থ বলল . আমি কলেজের ক্রিকেট টিমের স্কিপার। আপনার কোন কলেজ? আমার সেন্ট জেভিয়ার্স। থার্ড ইয়ার।
ইন্দ্রজিৎ বলল . আমি আশুতোষে পড়ি।
ও। কোন ইয়ার?
ফার্স্ট ইয়ার?
দুনিয়ার সমস্ত থার্ড ইয়ারের ছেলে সমস্ত ফার্স্ট ইয়ারের বালকদের দিকে যে রকম কৃপার দৃষ্টিতে তাকায়, সিদ্ধার্থ সেইরকম সূক্ষ্মভাবে তাকিয়ে বলল . আপনাদের আশুতোষে স্পোর্টসের ব্যাপারে বোধ হয় তেমন এনকারেজমেন্ট নেই। ওখানে তো ইউনিয়ন নিয়েই সবসময় গণ্ডগোল লেগে আছে—
ইন্দ্রজিৎ বিব্রতভাবে বলল . আমি ওসবের মধ্যে থাকি না। বাড়ির কাছে বলেই আমি আশুতোষে ভরতি হয়েছি, ইচ্ছে করলে প্রেসিডেন্সিতেও আমি ভরতি হতে পারতুম। আমিও ফার্স্ট ডিভিশান পেয়েছিলুম।
কথাটা বলেই ইন্দ্রজিৎ লজ্জা পেল। ছি, ছি, ফার্স্ট ডিভিশনের কথাটা নিজের মুখে বলা তার উচিত হয়নি। অদিতি চকিতে একবার ওর দিকে তাকাল। সিদ্ধার্থ খুব ভদ্র, সে ওর লজ্জা ঢাকা দেবার জন্য তাড়াতাড়ি বলল . না, সব কলেজেই পড়াশুনো প্রায় এক। বাড়ির কাছে কলেজই ভালো। আননেসেসারিলি বাস জার্নির অরডিয়েল ভোগ করতে হয় না। আর, আপনি কোন কলেজে?
এবার অদিতির লজ্জা পাবার পালা, সে টেবিলে আঙুল নিয়ে আঁচড় কাটতে কাটতে বললো . আমি কলেজে পড়ি না। আমার ক্লাস ইলেভেন।
বাবলু বলল . আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। আচ্ছা এ বাড়ির ছাদ আছে?
হ্যাঁ আছে, ওই সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠে যাও। যাও না, কোনো ভয় নেই, আমি কুকুর বেঁধে রেখেছি।
অদিতি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল . কুকুরটার নাম কী?
জুলি। আপনি কুকুর খুব ভালোবাসেন?
হ্যাঁ।
ওই কুকুরটাকে নিয়েই আমার বেশি সময় কাটে। বাড়ি তো ফাঁকা—মা, বাবা আর আমি। আমার বাবা টেনান্ট নেবার ব্যাপারে খুব সিলেকটিভ। পছন্দ না হলে নেন না, তিনমাস আমাদের ওই অ্যাপার্টমেন্ট খালি পড়ে আছে। আপনারা এলে আবার বাড়িটা বেশ জমজমাট হবে।
বেশি দেরি করলে বাড়িতে চিন্তা করবে, তাই ইন্দ্রজিৎ একবার ওঠার কথা বলল। বাবলুকে ডেকে আনা হল। ঢোকার সময় নজর করেনি, এবার ওরা লক্ষ করল সামনের জমিটায় একটা ছিপছিপে সাদা রঙের গাছ। ইন্দ্রজিৎ জিজ্ঞেস করল . এইটা ইউক্যালিপটাস, না?
হ্যাঁ। আমাদের মধুপুরের বাড়িতে অনেক ইউক্যালিপটাস আছে। এখানে তিনটে লাগানো হয়েছিল, মাত্র ওই একটাই বেঁচেছে।
এর পাতাগুলোর গন্ধ এমন সুন্দর হয়!
বাবলু বলল . ইন্দ্রদা, আমায় দুটো পাতা পেড়ে দাও না।
ইন্দ্রজিৎ বলল . না, এখন না, এ বাড়িতে তো থাকবেই, মাটিতে অনেক শুকনো পাতা পাবে—শুকনো পাতাতেও গন্ধ হয়।
না, এখন দাও।
নীচে একটাও শুকনো পাতা পড়ে নেই। ইন্দ্রজিৎ এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজছিল। সিঁড়িতে দাঁড়ানো সিদ্ধার্থ বলল . হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিন না কয়েকটা পাতা। গন্ধটা ভালো লাগবে।
হাতের নাগালে একটাও পাতা নেই। সাদা রঙের গুঁড়িটা সোজা উঠে গেছে। একটু উঁচুতে কচি কচি চিকন পাতা। ইন্দ্রজিৎ গোড়ালির ওপর ভর দিয়েও পাতা ছুঁতে পারল না। তখন একটু ছোটো লাফ দিয়ে ধরার চেষ্টা করল, তাও হাত যায় না! বাবলু সোৎসাহে বলছে . ইন্দ্রদা, আরও জোরে লাফাও, আর একটু। ইন্দ্রজিৎ আরও জোরে লাফালো, তবু হাত যায় না, আরও জোরে লাফাতেই পকেট থেকে মানিব্যাগ, কলম ছিটকে পড়ে গেল। সে সেগুলো নীচু হয়ে তুলতে যেতেই সিদ্ধার্থ বলল . দাঁড়ান, আমি পেড়ে দিচ্ছি।
সিদ্ধার্থ সাবলীলভাবে একটি মাত্র লাফ দিয়ে একটা ছোটো ডাল ধরে ফেলল। কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে এনে, দুটো দিল বাবলুকে, বাকিগুলো হাতের তালুতে মুড়ে কচলাবার পর বলল. এবার দেখুন কী সুন্দর গন্ধ! অদিতি মুখ নীচু করে বড়ো শ্বাস টেনে বলল . আঃ, কী সুন্দর কচি কচি গন্ধ! আঃ—অদিতি নিজের থেকেই নাকটা কাছে এনে সিদ্ধার্থের হাতে ছুঁইয়ে বলল . কী চমৎকার লাগছে না গন্ধটা, ইন্দ্রদা, দেখুন!
ইন্দ্রজিৎ নিজের নাকটা নিয়ে এলো সিদ্ধার্থর হাতের দিকে। কিন্তু দমবন্ধ করে রইলো। নিশ্বাসে সে ঘ্রাণ নিল না।
বাইরে বেরিয়ে বাবলু অবিরাম বকবক করছিল, আর অদিতি একবার জিজ্ঞেস করল . ইন্দ্রদা অ্যাপার্টমেন্ট মানে কী?
ভাড়া দেয়ার ফ্ল্যাটকেই কায়দা করে অ্যাপার্টমেন্ট বলছিল।
ওঁর ইংরেজি উচ্চারণ ভারি চমৎকার না? কী রকম সুন্দরভাবে বলছিলেন!
কথা ছিল ইন্দ্রজিৎ আর রঞ্জিত মালপত্র নিয়ে ওদের সঙ্গেই যাবে। কিন্তু শনিবার দিন বেশি রাত্রে বাড়ি ফিরে ইন্দ্রজিৎ মাকে বলল . মা, কাল আমায় খুব ভোরে ডেকে দেবে। আমাদের কলেজের পিকনিক আছে।
রত্নপ্রভা বললেন . সে কি রে? কাল ওরা বাড়ি পাল্টাচ্ছে, তুই ওদের সঙ্গে যাবি না?
না, উপায় নেই। কলেজের প্রফেসাররা সব যাচ্ছেন—আমাকে যেতেই হবে। ডেকে দিও, ঠিক।
ইন্দ্রজিৎ পাশের ঘরে যেতেই রত্নপ্রভা স্বামীকে বললেন . ও পাশের গিন্নি মিষ্টি কথা বলে ছেলে দুটোকে একেবারে চাকরের মতন খাটাচ্ছে। আমি পরের ছেলেকে ওরকমভাবে খাটাতে পারতুম না।
ইন্দ্রজিৎকে ডাকতেও হয়নি, সারারাত বুঝি সে জেগেই ছিল। খুব ভোরে, তখন আলো ফোটেনি, কারুকে কিছু না বলে হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় বদলে সে বেরিয়ে পড়ল। হাঁটতে হাঁটতে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে শুনল ফার্স্ট ট্রেন ছাড়ছে ক্যানিং-এর দিকে। ক্যানিং-এর টিকিট কেটে সে উঠে পড়ল। এই প্রথম সে একা একা ট্রেনে যাচ্ছে, কিন্তু তার একটুও ভয় করছে না। জানালার ধারে মাথা রেখে সে ভোরের টাটকা হাওয়া বুক ভরে নিতে লাগল।
খানিকটা বাদেই দেখল একটা স্টেশনের নাম চম্পাহাটি। হঠাৎ সেখানেই নেমে পড়ল ইন্দ্রজিৎ। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চা আর এস বিস্কুট খেল। তারপর স্টেশন ছেড়ে, পুকুরপাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাজারে এসে পৌঁছোলো। বাজার পেরিয়েও সোজা রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে দেখল একটা কচুরিপানা ভরতি খাল। খালের উঁচু পাড় ধরে ইন্দ্রজিৎ আপন মনে হাঁটতে লাগল। পাশে দু-একখানা নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে—তারপর ফাঁকা মাঠ। একটা ফণীমনসার গাছে দুটো প্রজাপতি ছুঁই ছুঁই খেলার মতন একবার করে বসছে আর উড়ে যাচ্ছে, বসছে আর উড়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে ইন্দ্রজিৎ আপন মনে বললো . সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়লেই ভালো ইংরেজি জানা হয় না। আমিও ইংরেজিতে সিক্সটি সিক্স পারসেন্ট নম্বর পেয়েছিলুম। অমন কথায় কথায় কায়দা করে ইংরেজি বলা পছন্দ করি না! বুঝলে?
খালের পাড় ধরেই ইন্দ্রজিৎ হাঁটতে লাগল। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় তার এত ভালো লাগছিল যে সে ঠিক করল সারাদিন ওই মাঠের মধ্যেই থাকবে। একটু বাদে সে আপন খেয়ালে দৌড়তে লাগল। যেন সে ছুটতে ছুটতে গিয়ে ওই খালটা কোথায় শেষ হয়েছে তাই দেখবে। বেশ কিছুক্ষণ দৌড়বার পর সে হাঁপিয়ে গিয়ে এক জায়গায় বসল। তখন ও বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিচ্ছে। খালের জলে অল্প স্রোতে কচুরিপানাগুলো ভেসে যাচ্ছে। কয়েকটা মাটির ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে টুপটুপ করে জলে ছুঁড়তে লাগল। এবার আমি ওই ফুলটায় লাগাবো, ওই যে ওইটা।
ঠিক টিপ মতন এক জায়গায় ঢিল লাগাবার পর ইন্দ্রজিৎ মনে মনে বলল . সবাই উঁচু দিকে লাফাতে পারে না। আমি হাইজাম্পে পারবো না। কিন্তু আমার সঙ্গে রানে রেস দিয়ে কেউ পারবে? আসুক দেখি! আমি সামনে ছুটে যাবার প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হবো?
স্বর্গের বারান্দায়
স্বর্গের বারান্দায়
আমি প্রায়ই স্বর্গের স্বপ্ন দেখি। আমি এমনিতেই স্বপ্ন দেখি একটু বেশি, বলা যায় স্বপ্ন দেখা আমার রোগ বিশেষ। আমার পেট ও মাথা দুই-ই গরম, কোনো রাত্রেই ভালোভাবে ঘুম হয় না, তাই সিনেমার মতো অজস্র স্বপ্ন আমার চোখের সামনে ভেসে যায় এবং অধিকাংশ স্বপ্নই তার পরের সকালবেলাতেও আমার মনে থাকে। সেই সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে দিলে ফ্রয়েড কিংবা ইয়ুং সাহেবরাও হিমসিম খেয়ে যেতেন।
অন্যান্য লক্ষ লক্ষ স্বপ্নের মধ্যে স্বর্গের স্বপ্নটাই ঘুরে ফিরে আসে। এই স্বপ্নটাতে আমি অত্যধিক উল্লসিত হয়েও উঠি না কিংবা ভয়ও পাই না। স্বর্গ আমার চেনা হয়ে গেছে। এই স্বর্গের সঙ্গে কিন্তু পুরাণে-ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত স্বর্গের দৃশ্যের কোনো যোগ নাই। আমার স্বপ্নে দেখা স্বর্গে কখনো দেবদেবীদের দেখিনি, অপ্সরা-উর্বশীদেরও দেখিনি—একবার মাত্র কয়েক পলকের জন্য রম্ভা নামের নর্তকীকে দেখেছিলাম—যমরাজ বা চিত্রগুপ্তকেও দেখিনি।
আমার দেখা স্বর্গ অনেকটা সুন্দরভাবে সাজানো কোনো ডাকবাংলোর মতন। পাহাড়ি জায়গায় ডাকবাংলোর মতন বেশ খানিকটা উঁচু ভিতের ওপর একটা ধবধবে সাদা রঙের বাড়ি, অনেকগুলি কাচের দরজা ও জানালা। সামনে বেশ বড়ো একটি পরিচ্ছন্ন বাগান, বাড়িটার পিছনে অরণ্য। তবে স্বর্গে মাত্র ওই একটাই মোটে বাড়ি তো হতে পারে না, তাই আমার মনে হয়, ওই অরণ্যের মধ্যে আরও অনেক বাড়ি আছে—সেগুলো আমি দেখিনি। সামনের ওই বাড়িটা স্বর্গের বিশ্রাম-গৃহ, তাই ডাকবাংলোর মতন চেহারা। বহুদূরের পথ পেরিয়েই তো মানুষ স্বর্গে পৌঁছবার পর ওই বাড়িতে প্রথমে একটু বিশ্রাম নেয়।
ওই দৃশ্যটাই যে স্বর্গের দৃশ্য, তা আমি চিনলাম কী করে?
কোথাও তো কোনো সাইন-বোর্ড লেখা নেই! তবু আমি ঠিকই চিনেছিলাম। আমি জীবনে বহু ডাকবাংলোতে থেকেছি কিন্তু ওই বাড়িটা দেখামাত্রই বুঝতে পেরেছিলাম, এটা সব কিছুর থেকে আলাদা। তাকিয়ে থাকলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয়, যদি ওখানে আশ্রয় পাওয়া যেত তাহলে জীবনে আর কিছু চাই না।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, সামনের বাগানটুকু। অসংখ্য ফুল ফুটে আছে। অথচ একটাও চেনা ফুল নয়। সবুজ, কালো কিংবা বেগুনি রঙের ফুল কি পৃথিবীতে তেমন দেখা যায় , স্বর্গের বাগানে বেগুনি রঙের প্রাধান্য। রামধনুর প্রথম রং বেগুনি বলেই বোধ হয় এরকম। পৃথিবীতে এক ধরনের লাল শাক আছে, ইট চাপা ঘাসের রং হয় হলদে, এ ছাড়া সব গাছই সবুজ। ওই বাগানের সব গাছই বেগুনি এবং সেই গাছগুলোর ভেতর থেকে আলো বেরোয় ঠিক যেন ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অথচ তৈরি নয়, সজীব।
প্রথমবার এই দৃশ্যটাই দেখে ঠিক চিনতে পারিনি অবশ্য গাছগুলো দেখেই বিস্মৃত হয়েছিলাম আমি যেন বেড়াতে বেড়াতে সেই বাগানের কাছে গেছি, ফুলগাছগুলো দেখে অবাক। ভাবছি এগিয়ে গিয়ে ফুল ছিঁড়ে নেব কিন্তু পরের বাগানের ফুল কাউকে না জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত নয়। খানিক পরে এক ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেলাম। তিনি নীচু হয়ে ফুলের গন্ধ শুঁকছেন। মেমসাহেবরা সাঁতার কাটার সময় যেটুকু পোশাক পরে, মহিলার শরীরে সেইটুকু পোশাক। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মহিলার উরু দুটি। কলাগাছের মতন সুডৌল এবং এত মসৃণ ও ঝকঝকে যে মনে হয় ভেতর থেকে আলো বেরুচ্ছে, কলাগাছেরই মতন সবুজ ও হলদে মেশা আলোর আভা। পরে জেনেছিলাম, ওই মহিলারই নাম রম্ভা। লোকে কথায় কথায় রম্ভোরু বলে না?
আমি বাগানের বাইরে থেকে ভদ্রমহিলাকে বললাম, ফুলগুলো আশ্চর্য সুন্দর তো! এই জায়গাটার নাম কী?
মহিলা উত্তর দিলেন, আপনি জানেন না? লোকে এই জায়গাটাকে স্বর্গ বলে।
শুনে একটুও চমকে উঠলাম না। বরং আমার মনে হল, তা তো হবেই। স্বর্গ না হলে এ রকম হয়!
আমি ওঁকে অনুরোধ করলাম, শুনুন, আপনি আমাকে ফুলগাছের একটা চারা দেবেন? মায়ের জন্য নিয়ে যাব। আমার মায়ের ফুল গাছের খুব শখ।
মহিলা খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, ভিতরে আসুন না। ওই যে আপনার ডানদিকেই গেট আছে। একটু ঠেলা দিলেই খুলে যাবে।
বুক সমান উঁচু কাচের তৈরি গেট। বাগানের ধারেও মেহেদি গাছের বেড়া, কাঁটা তার বা দেয়াল-টেয়াল নেই। একটু জোর করলে গেটটা ভেঙে ফেলা যায়, কিংবা লাফিয়ে ওপারে যাওয়া যায়। আমি সে-রকম কিছু করলাম না। আস্তে গেটে ঠেলা দিলাম। খুলল না। আমার খুব দুঃখ হল। ঘুম ভাঙার পরেও অনেকক্ষণ আমার বুকের মধ্যে সেই দুঃখবোধ চাপ বেঁধে ছিল। আমার জন্য স্বর্গের দরজা খুলল না, আমি কি পাপী? খানিকটা বাদে মনে পড়ল, আমি তো এখনও মরিইনি। আমার তো স্বর্গে যাবার প্রশ্নই ওঠে না। তখন মনটা হালকা হয়ে গেল।
এরপর মাঝে মাঝেই আমি স্বর্গের স্বপ্ন দেখছি। যেদিন আমি কোনো জায়গা থেকে বড়ো রকমের মানসিক আঘাত পাই, সেই রাত্রেই স্বর্গের স্বপ্ন আমার চোখে আসে। কখনো আর ঢোকার চেষ্টা করিনি ভিতরে। দাঁড়িয়ে থেকেছি বাগানের পাশে। দেখতাম মাঝে মাঝেই অনেক নারী পুরুষ বাইরে থেকে এসে দাঁড়াচ্ছে ওই গেটের সামনে। কেউ কেউ হাত দিয়ে ঠেললেই আপনি খুলে যাচ্ছে গেট। তখন তারা বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে গিয়ে উঠছে সেই সাদা বাড়িটার বারান্দায়। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চেহারাগুলো ভারি সুন্দর হয়ে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো মানুষ গেট ঠেললেও খুলছে না। তখন তাদের চোখে জল আসে। সেই জলের ফোঁটা মাটিতে পড়ার আগেই তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি এ পর্যন্ত আমার পরিচিত কোনো মানুষকে স্বর্গের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে দেখিনি। একবার শুধু…
তার আগে দুটি মৃত্যুর কথা বলা দরকার আমার যখন আঠাশ বছর বয়স সেই সময় আমি পশ্চিম দিনাজপুর থেকে একটি প্রেমপত্র পাই। বন্দনা সরকার নামে একটি মেয়ে আমার লেখা-টেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেছে। আমাকে তার ভীষণ ভালো লাগে ইত্যাদি। চিঠির শেষে সে আমার উদ্দেশে দু-লাইন কবিতাও লিখেছে। যেহেতু সেই চিঠিতে তিনটি বানান ভুল ছিল, তাই সে চিঠির উত্তর আমি দিইনি।
মাস দু-এক পরে সেই মেয়েটিই আমাকে চিঠি লিখল ডায়মন্ডহারবার থেকে। এবং আর তিন মাস পরে আবার মেদিনীপুর থেকে। ব্যাপারটা একটু রহস্যময় লাগতে শুরু করেছিল। কিন্তু রহস্যভেদের কোনো উদ্যোগ করিনি, কারণ মেয়েটির চিঠিতে বানান ভুলের সংখ্যা কমেনি। তারপর মেয়েটি নিজেই একদিন আমার বাড়িতে এসে হাজির হল।
বন্দনা বলেছিল ওর বয়েস তখন পঁচিশ, কারণ ও জানত আমার বয়েস তখন আঠাশ। আসলে বন্দনা তখন তিরিশ ছুঁয়েছে এবং দেখলেই বোঝা যায়। বন্দনা স্কুল মাস্টারি করে এবং এক জায়গায় তার মন টেকে না বলে ঘনঘন চাকরি বদলায়। আমি তাকে বলেছিলাম, স্কুল শিক্ষয়িত্রীর পক্ষে এ রকম বানান ভুল করা উচিত নয়—তার উত্তরে সে জানিয়েছিল যে, সে অঙ্কের টিচার, বাংলা বানান তার ভালো না জানলেও চলে। তা হয়তো ঠিক, কিন্তু বানান ভালো না জেনে যে প্রেমপত্র লেখা চলে না, এটা কে তাকে বোঝাবে!
আমার সেই বয়সে কত বন্ধু-বান্ধব, কত হই-হুল্লোড় আড্ডা। সারা শহর তোলপাড় করে ছোটাছুটি, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে। কখনো অসম্ভব নেশা করে গুন্ডাদের সঙ্গে জুয়া খেলতে যাই, কখনও শ্মশানে গিয়ে কোরাস গান করি। মেয়েদের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করা ছিল তখন আমার প্রিয় বিলাসিতা। বিশেষত, একটি মফস্বলের মেয়েকে নিয়ে ব্যাপৃত থাকার কোনো সময়ই আমার ছিল না।
বন্দনার চিঠির বানান ভুল অনায়াসে ক্ষমা করা যেত, যদি তার শরীরে রূপ থাকত। অবশ্য কোনো রূপসি মেয়ে আমাকে প্রেমপত্র পাঠাবেই বা কেন? বন্দনাকে ঠিক কুৎসিতও বলা যায় না—লম্বাটে ধরনের চেহারা, গায়ের রং মাজা মাজা, নাক চোখও ঠিকঠাক। তবু তার চেহারায় এমন একটা কিছু ছিল, যে জন্য তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। বন্দনার প্রধান দোষ ছিল চোখ পিটপিট করা। কোনো মেয়ের এই রোগ আমি আগে দেখি নি, বন্দনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর অনবরত চোখ পিটপিট করছে, দেখলেই কী রকম অস্বস্তি লাগে। শুকনো ভদ্রতা দেখিয়ে বন্দনাকে আমি বিদায় করলাম। তবু বন্দনা নিয়মিত চিঠি লেখে। আমি উত্তর দিচ্ছি না অথচ একজন আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখে যাচ্ছে এও তো এক দারুণ যন্ত্রণা। বন্দনার পর পর আটখানা চিঠি পাবার পর আমি সংক্ষিপ্ত ভদ্রতায় একবার উত্তর দিলাম। তাতে বন্দনা এত বেশি উৎসাহিত হয়ে উঠল যে দু-দিন পরেই স্কুল কামাই করে দেখা করতে এল আমার সঙ্গে, আমাদের বাড়ির বসবার ঘরে সে বসে রইল দু-ঘন্টা, আমি ব্যস্ততার ইঙ্গিত করাতেও উঠল না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা আমার হাতের আঙুল নিয়ে সে খেলা করতে চায়। তখন তার চোখ পিটপিট করাও বেড়ে যায় খুব।
এই অবস্থায় আমার করণীয় কী ছিল? আমার দোষ এই, আমি আমার কর্তব্য ঠিক করতে পারি না চট করে। বিশেষত, এই রকম অদ্ভুত সমস্যায় পড়লে। বন্দনা আমার প্রেমে পড়তে চায়। বস্তুত, আমার প্রেমে পড়ার জন্য সে বদ্ধপরিকর। আমি আমার কোনো লেখায় লিখেছিলুম, এ পর্যন্ত কোনো মেয়ে আমাকে ভালোবাসেনি। সেটা পড়েই বন্দনা ধরে নিয়েছিল, আমি খুব দুঃখী মানুষ এবং সে এসেছিল আমার উদ্ধারকর্তা হিসাবে। সে দেখিয়ে দিতে চায়, মেয়েরাও ভালোবাসতে জানে।
ভদ্রতাসম্মতভাবে বন্দনাকে প্রত্যাখ্যান করার যতগুলি উপায় আছে সবগুলিই আমি ব্যবহার করেছি। বন্দনা কিছুতেই বুঝবে না। ওর ধারণা, এসব আমার অভিমানের কথা। কী যে মুশকিলে পড়া গেল।
মোট কথা, বন্দনা তারপর থেকে অতিষ্ঠ করে তুলল আমার জীবন। স্কুলের ছুটি হলেই সে ঘন ঘন কলকাতায় চলে আসে এবং ছায়ার মতো আমায় অনুসরণ করে। ছোটোখাটো অপমান সে গায়েই মাখে না। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি শুরু করেছে।
একদিন বন্দনা চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে আমার কাছে এসে বলল, তার বাবা মা তার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করেছে।
আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, এ তো চমৎকার কথা। পাত্রটি কী করে?
বন্দনা বলল, পাত্র একটি কলেজে পড়ায়। কিন্তু মরে গেলেও সে তাকে বিয়ে করবে না। আমি কি বন্দনাকে সাহায্য করব না?
আমি কিঞ্চিৎ কঠোর ভাষাতেই জানালাম যে আমার কাছ থেকে কোনো কিছু যেন সে প্রত্যাশা না করে।
বন্দনার আসল ইচ্ছাটি আস্তে আস্তে জানা গেল। ছেলেবেলা থেকেই তার প্রতিজ্ঞা সে কখনো বাপ-মায়ের পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করবে না। সে কারুকে ভালোবাসবে, তারপর তার সঙ্গে যদি বিয়ে হয়—কিংবা তাকে যদি কেউ ভালোবেসে বিয়ে করতে চায়…। দীর্ঘ তিরিশ বছরের মধ্যে বন্দনার প্রেমে কেউ পড়েনি। এইজন্যই লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়। বন্দনার চেয়ে ঢের খারাপ চেহারার মেয়ের প্রেমেও অনেক লোক পড়ে—কিন্তু বন্দনার কোনো প্রেমিক জোটেনি। এতদিন পর বাবা-মা জোর করে বিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত। তখন বন্দনা আমাকেই তার প্রেমিক হিসেবে বেছে নিয়েছে—তার কারণ আমার সেই লেখা, যার মধ্যে লিখেছিলাম, আমি কখনও ভালোবাসা পাইনি। দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে! আমি তিন চারটি মেয়ের নাম বলেছি আমার প্রেমিকা হিসেবে—দুজনের সঙ্গে বন্দনার আলাপও করে দিয়েছি, তাও বন্দনা নিবৃত্ত হয় না।
বাবা মায়ের ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে বন্দনার বিয়ের কথা যত পাকা হতে লাগল বন্দনা ততই মরিয়া হয়ে উঠল। একদিন আমার কাছে এসে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিল। বন্দনা বেশ কয়েক বছর মাস্টারি করে সাতশো টাকা জমিয়েছে, সেই টাকা নিয়ে সে আমার সঙ্গে ছুটিতে বাইরে কোনো হোটেলে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে কাটিয়ে আসতে চায়! বিয়ে না হয় না-ই হল, তবু তো সাতটা দিন তার জীবনে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সেই প্রস্তাব শুনে আমি নিষ্ঠুরের মতো বলেছিলাম, সাতশো টাকার বদলে তুমি যদি সত্তর হাজার টাকা আনতে তাহলে না হয় চিন্তা করে দেখা যেত। তুমি বরং অন্য কোনো ছেলেকে খুঁজে নাও। অন্য অনেকে রাজি হতে পারে। যদি চাও তো আমিই অন্য ছেলে জোগাড় করে দিচ্ছি।
বন্দনা সেদিন কেঁদে ফেলেছিল। আমারও অসহ্য লেগেছিল তখন।
দিন দশেক বাদে পি. জি. হাসপাতাল থেকে একটা চিঠি পেলাম। পেন্সিলে লেখা খামটাও খুব ময়লা। বন্দনার চিঠি। লিখেছে যে হঠাৎ তার পেটে খুব ব্যথা হওয়ায় ও হাসপাতালে ভরতি হয়েছে। আমি যেন অবশ্যই ওর সঙ্গে দেখা করি। চিঠি লেখার সরঞ্জাম অতি কষ্টে জোগাড় করতে হয়েছে।
হাসপাতালের ত্রিসীমানায় আমি পারতপক্ষে যাই না। বন্দনার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার তো কথাই ওঠে না। পেটে ব্যথা হয়েছে তো আমি দেখতে গিয়ে কী করব!
দু-দিন বাদে বন্দনার আর একটা চিঠি এল। সেই চিঠিখানা আমার কাছে এখনো আছে। তাতে লিখেছে, আমি বুঝতে পারছি আমি আর দু-তিন দিনের বেশি বাঁচব না। তুমিই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি একটু ভালোবাসার জন্য কাঙাল ছিলাম। তুমি এত কৃপণ, যে আমাকে একটু ভালোবাসতে পারলে না! একবার আসবে? তুমি যদি এসে একবার আমাকে একটা চুমু দাও, শান্তিতে মরতে পারব তাহলে। কোনো ক্ষোভ থাকবে না।
এ চিঠিখানাও আমার অসহ্য ন্যাকামি বলে মনে হয়েছিল। দু-তিন দিন বাদে যে মারা যাবে, তার চিঠি লেখার ক্ষমতা থাকে না। পেটে ব্যথা হলে কেউ মরে না। তা ছাড়া হাসপাতালে গিয়ে চুমু দেব—এ কি ইয়ার্কি নাকি? বাচ্চা মেয়ে হলেও কথা ছিল, অত বড়ো ধিঙ্গি মেয়েকে হাসপাতালে চুমু! ভেবেছিলাম, সময় পেলে হাসপাতালে গিয়ে বন্দনাকে আর একবার ধমকে দিয়ে আসব। সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে তিন দিনের দিন বন্দনা মারা গেল।
আসলে তার লিউকোমিয়া ছিল, সে জানত না। অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথার জন্য অপারেশন করতে গিয়ে ধরা পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।
বন্দনার মৃত্যুর খবর শুনে আমি বেশ রেগে গিয়েছিলাম। এ রকম দুম করে মরে যাবার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া তার মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ী করা কেন? পি. জি. হাসপাতালের শ্রেষ্ঠ ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করেছে। আমার পক্ষে কি জোর করে ভালোবাসা সম্ভব? আমি ওর সঙ্গে বেলেল্লা করিনি, সেটা কি আমার অপরাধ?
অতৃপ্ত ভালোবাসা নিয়ে বন্দনা মরে গেল তিরিশ বছর বয়সে?
বন্দনাকে হাসপাতালে দেখতে যাইনি কিন্তু নির্মলকে দেখতে গিয়েছিলাম। খবর পেয়েই বুঝেছিলাম নির্মল বাঁচবে না। আমরা গিয়েছিলাম ওকে সান্ত্বনা দিতে, ওর কপালে হাত রেখে বলেছি, ভয় নেই দুদিনেই সেরে উঠবি।
নির্মল ছিল ওর বাবা মায়ের এক ছেলে। আসলে ওরা ছিল পাঁচ ভাই বোন। কিন্তু আশ্চর্য নিয়তির খেলায় ওর অন্য সব ভাই-বোনই অল্প বয়সে মারা যায়। সেইজন্যই নির্মলের মা ওকে সব সময় চোখে চোখে রাখতেন, কয়েক ঘন্টা না দেখলে উতলা হয়ে উঠতেন। আমরা সন্ধেবেলায় যখন তুমুল আড্ডা দিচ্ছি, তখন নির্মলকে নিরস মুখে বাড়ি ফিরে যেতে হত। কেউ ঠাট্টা করলে নির্মল বলত, জানিস না তো আমার মাকে, একটু দেরি হলেই মা আবার ফিট হয়ে যাবেন। আমি ভাই মাকে কষ্ট দিতে পারি না। শেষ পর্যন্ত নির্মলের মা-ই তার মৃত্যুর কারণ হন।
নির্মলরা থাকত দমদমে—ওদের বাড়ির পাশেই ইস্কুল ও কলেজ। বাড়ির পাশে কলেজ না থাকলে নির্মলের পড়াশুনা করাই হত না। তা-ও তো দু-তিন পিরিয়ড পর পর নির্মলকে একবার বাড়ি এসে দেখা দিয়ে যেতে হত। নির্মল যখন দিল্লি কিংবা বেনারসে বেড়াতে গেছে, ওর মাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়েছে। মাকে কষ্ট দেবার কোনো উপায়ই ছিল না নির্মলের—ওর মা তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যেতেন—তখন ডাক্তার ডাকা, ছুটোছুটি।
এইরকম ভাবে মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় থাকতে থাকতে নির্মলের স্বভাবটাও একটু অদ্ভুতরকমের হয়ে গিয়েছিল। বাইরের লোকের সঙ্গে মিশতে পারত না, কথা বলতে পারত না। বেশির ভাগ সময়েই বাড়িতে কাটাত, আমরা আড্ডা দিতে ওদের বাড়িতেই যেতাম, ওর মা অবশ্য যত্ন করতেন খুব।
বাবা মারা যাবার পর নির্র্মল আরও একা হয়ে পড়ে। বাড়িতে শুধু মা আর ছেলে, বাড়িখানা ওদের নিজস্ব। আত্মীয়স্বজনেরা পরামর্শ দিলেন নির্মলের বিয়ে দেবার জন্য। নির্মল জীবনে কখনো কোনো মেয়ের সঙ্গে মেশেনি। নির্মলের মা চতুর্দিকে পাত্রী দেখে বেড়াতে লাগলেন। কিছুতেই আর পছন্দ হয় না—উনি ডানা-কাটা পরি খুঁজছেন। আমরা গেলে নির্মল একগাদা মেয়ের ছবি তাসের মতো মেলে জিজ্ঞেস করত, বল তো, কাকে পছন্দ করা যায়?
নির্মলের বাড়ির পাশের মাঠে প্রতি বছর সরস্বতী পুজো হয়। সকালবেলা নির্মলের পরনে ধুতি আর গেঞ্জি। নির্মল নিজেদের পাঁচিল দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে—পুজো শেষ হয়েছে কি না। অঞ্জলি না দিয়ে নির্মল চা খেতে পারছে না। পাঁচিলের পাশেই একটা তোলা উনুন ধরতে দেওয়া ছিল, নির্মল সেটা দেখতে পায়নি। সেই উনুন থেকে লকলকে শিখা উঠে নির্মলের ধুতিতে লাগল। নির্মল যখন খেয়াল করল, তখন তার ধুতি দাউদাউ করে জ্বলছে।
সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল ধুতিটা কোনোক্রমে খুলে ফেলা কিংবা মাটিতে গড়াগড়ি দিলেও আগুন নিভে যেত। এ সব তো সবাই জানে। নির্মলও কি জানত না। তবু ওর মাথার গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল আগুন দেখে। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে মা মা চিৎকার করে ছুটে গেল নির্মল। মা তখন দোতলায়। সেই ছুটে যাওয়ায় আগুন জ্বলতে লাগল আরও বেশি। দোতলার বাথরুম থেকে সেই আর্ত চিৎকার শুনে বেরিয়েই মা দেখলেন তার জ্বলন্ত সন্তানকে। একটা কম্বল এনে চেপে ধরার বদলে মা তাড়াতাড়ি এক বালতি জল এনে ঢেলে দিলেন নির্মলের গায়ে! তারপর আরও এক বালতি। নির্মলের যদিও বা বাঁচার আশা ছিল কিন্তু ওই জল ঢালার ফলে সেই সম্ভাবনাও ঘুচে গেল।
তিনদিনের মধ্যে নির্মলের জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তাররা বিমর্ষভাবে ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন, বাঁচার আশা নেই! যদি বা কোনোক্রমে বাঁচে, পা দুটো আর ব্যবহার করতে পারবে না—সে আর পুরুষ থাকবে না।
তিনদিন পর নির্মলের জ্ঞান ফিরল। তখন আমরা গেলাম ওকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিতে। নির্মল মানুষ চিনতে পারছে, কথাও বলছে। লোকজনের ভিড় করা একেবারে নিষেধ। নির্মল তার ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত আমার হাতে রেখে জিজ্ঞেস করল, সুনীল, আমি সত্যিই বাঁচব তো? বল, সত্যি করে বল, বাঁচব?
নির্মলের দু-চোখে জল। আমি অম্লান বদনে বললাম, কী বলছিস পাগলের মতন! এক সপ্তাহের মধ্যেই তোকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে।
নারে, আমি বাঁচব না। আমি জানি! দু-চোখে অনর্গল জল, নির্মল আস্তে আস্তে বলল, অতগুলো ছবি, যদি যে-কোনো একজনকে আগেই পছন্দ করে ফেলতাম আমি এ পর্যন্ত কোনো মেয়েকে ছুঁয়ে দেখিনি। মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া যে কী জিনিস জানি না, আমার ভাগ্যে নেই…
কয়েক ঘন্টা বাদেই নির্মল মারা যায়। ওর শবদেহ দাহ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল। পরপর দু-রাত্তির আমারও ঘুম হয়নি। বাড়ি ফিরে স্নান করে চা খেয়েই শুয়ে পড়লাম, সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
সেদিন আবার দেখলাম স্বর্গের দৃশ্য। বাগানটা আজ ফাঁকা, বাড়িটাতেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না—আলোর মতন জ্বলন্ত ফুলগাছগুলো হাওয়ায় দুলছে। চারপাশে একটা অস্পষ্ট নীল আলোর আভা।
বাগানের বাইরে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নির্মল! অর্ধদগ্ধ বিকৃত শরীর। দগদগে ঘা-গুলো দেখা যাচ্ছে। দরজার ওপর হাত রেখে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠ্যালা দিতে সাহস পাচ্ছে না—যদি ঢুকতে না পায়। ঝলসানো মুখে বিষণ্ণতা ফুটে উঠেছে। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল তো দাঁড়িয়েই রইলো।
হঠাৎ তার হাতের ওপর আর একখানি হাত এসে পড়ল। নারীর হাত। দূর থেকে আমি দেখলাম, বন্দনা এসে দাঁড়িয়েছে গেটের সামনে। নির্মল চমকে তাকাল বন্দনার দিকে। এই প্রথম তার শরীরে মা ছাড়া অন্য নারীর স্পর্শ। চমকে উঠেছে নির্মল। বন্দনা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নির্মলের দিকে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, বন্দনা আর চোখ পিটপিট করছে না।
বন্দনা চাপ দিতেই গেট খুলে গেল। নির্মলের দিকে ফিরে ডাকল আসুন!
আমি জানতাম, নির্মলের জন্য দরজা বন্ধ থাকবে না। ওরা দুজনেই ভালোবাসার অতৃপ্তি নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে।
বাগানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই নির্মলের শরীরের পরিবর্তন দেখা দিল, আবার সে সজীব স্বাস্থ্যবান শরীর ফিরে পেয়েছে। বন্দনার মুখে এসেছে আশ্চর্য কমনীয়তা। পরস্পর হাত ধরাধরি করে ওরা বাগান পেরিয়ে উঠল সেই সাদা বাড়িটার সিঁড়িতে।
অল্পক্ষণের জন্য ওরা আমার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল। আবার ফিরে এল সেই সাদা বাড়ির বারান্দায়। হাস্য-উজ্জ্বল মুখ দুজনেরই। কী যেন একটা রসিকতায় ওরা হঠাৎ একসঙ্গে হেসে উঠল। তারপর বালক-বালিকার মতন আনন্দে লঘু পায়ে ছোটাছুটি করতে লাগল বারান্দায়। একটু পরেই সুখী পায়রার মতন ওরা পরস্পরের মুখ চুম্বন করল। যেন একজনের ঠোঁট থেকে আর একজন সত্যিকারের মিষ্টি কিছু পান করছে।
আমার বুকখানা আনন্দে ভরে গেল। মনে হল এমন সুন্দর কোনো দৃশ্য আমি সারা জীবনে কখনও দেখিনি। আমি চিৎকার করে ডাকলাম, নির্মল! বন্দনা! ওরা দুজনেই শুনতে পেয়েছে ঠিক। উজ্জ্বল রেলিং ধরে শিশুর মতন ঝুঁকে হাত নাড়তে লাগল আমার দিকে। আমার প্রতি খানিকটা দয়া কিংবা অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠেছে ওদের মুখে। যেন ওরা বলতে চাইছে, তুমি আসতে পারবে না, তুমি কোনোদিন এখানে আসতে পারবে না।
ওরা এই পৃথিবীর কেউ নয়
ওরা এই পৃথিবীর কেউ নয়
পঞ্চাশ টাকার নোটটা হাতে নিয়েই বসে রইলেন রশিদ খান। ছেলে-মেয়ে দুটি এ টাকা প্রত্যাখ্যান করেছে। ছেলেটি শুধু মাথা নেড়েছে হাত জোড় করে, মেয়েটি জিভ কেটে বলেছে, আমাদের প্রতিদিন মুদ্রা ছুঁতে নাই গো বাবু।
মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে সিলিপ সিলিপ শব্দ করে। একটু আগে আবদালি ওদের যথাযথভাবে কাপ-প্লেটে চা দিতে এসেছিল। তখন মেয়েটি বলেছিল, মাপ করবেন গো, আমরা বাসন-কোসনে কিছু খাই না।
রশিদ খান ভাবলেন, টাকা নিতে চাইছে না কেন ওরা? পঞ্চাশ টাকা কি কম হয়েছে! একশো দিলে নেবে? মেয়েটি বলেছে, প্রতিদিন মুদ্রা ছুঁতে নাই। এর মধ্যে প্রতিদিন কথাটার মানে কী?
মেলার একটেরেয় পুলিশ সাহেবের রঙিন তাঁবু। এর নাম সুইস কটেজ। খানিক আগে একবার টহল দিতে বেরিয়ে রশিদ খান এই দুজনকে দেখতে পান। দুজনেরই বয়েস বেশি না। ছেলেটি বছর তেইশ-চবিবশেক, মেয়েটি একুশ-বাইশ। দুজনেরই মুখে এখনও লেগে আছে কৈশোরের লাবণ্য। এলা মাটিতে ছোপানো একজনের ধুতি আর পিরান, অন্য জনের শাড়ি, দুজনেরই মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা।
সরকারিভাবে মেলা শেষ হয়ে গেছে গতকাল। এখন ভাঙা মেলা, ফেরার পালা। তবু মানুষজন আছে যথেষ্ট। ভিড়ের মধ্যে গান শোনা যায় না। নানা দিকে নানা অ্যামপ্লিফায়ারের ক্যাকোফোনি। তাই রশিদ খান ওদের ডেকে এনেছেন নিজের তাঁবুতে।
হাঁটতে হাঁটতেই তিনি জেনে নিয়েছিলেন এরা কোনো প্রসিদ্ধ বাউলের চেলা নয়। এদের কোনো আখড়া নেই। দুজনে মিলে জুটি বেঁধেছে। এক জঙ্গলের মধ্যে নাকি ওদের দেখা হয়েছিল। কথা বলে বেশ টুসটুসে রস মিশিয়ে।
তোমাদের বাড়ি ছিল কোথায়? কোন গ্রামে? এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি বলেছিল গ্রামে তো নয়, মরুভূমিতে। আর ছেলেটি বলেছিল, সাগরে, আমি ভাসতে ভাসতে এসেছি।
আর গান শিখেছ কোথায়?
মেয়েটি বলেছিল, বাতাসের কাছ থেকে। কত শত গানই তো বাতাসে উড়ে এসে আমাদের কানে সেঁধিয়ে যায়। বাতাস না থাকলে তো কিছুই শোনা যায় না।
ছেলেটি বলেছিল, মানুষ যখন কাঁদে, তখন তার মধ্যেও গান থাকে। তাই নয় কি বাবু?
রশিদ খান মাথা নেড়ে বলেছিলেন, ঠিক।
গ্রামের অনেক মানুষই রূপক মিশিয়ে ভাবের কথা বলে। এ সব শুনতে তাঁর মন্দ লাগে না।
কিন্তু এরা টাকা নেবে না কেন? বাউল তিনি ঢের দেখেছেন। বাউলরা তো আর যাযাবর নয়। তাদের মাথার ওপরে একটা ছাউনি থাকে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে একটা সংসার থাকে। টাকা-পয়সা বর্জিত জীবনযাপন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারোর কারোর মধ্যে কিছুটা ভোগবাদও ঢুকে গেছে। তা অস্বাভাবিকও নয়। এই তো কিছুদিন আগে এক বাউল তার ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠাবে বলে পাসপোর্টের জন্য তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। যেখানেই বাউলরা গান শোনাতে যায়, সেখানে কি তারা কিছু টাকা-পয়সা আশা করে না? খুব বিনীত ভঙ্গিতে দরাদরিও করে। ট্রেনে যারা গান গায়—
রশিদ খান কখনও কারোকে ভিক্ষে দেন না। কেউ গলায় কাছা বেঁধে করুণ গলায় অভিনয় করে বাবার শ্রাদ্ধের জন্য সাহায্য চাইতে এলে তিনি বলেন, যে-ছেলে অন্যের সাহায্য নিয়ে বাবার শ্রাদ্ধ করে, তার বাবার আত্মার মুক্তি হয় না, ভূত হয়ে ফিরে আসে, তা জানো না?
কিন্তু ট্রেনে কেউ গান গেয়ে ভিক্ষে করলে রশিদ খান সবসময় কুড়ি-তিরিশ টাকা দেন তাকে। এটা ভিক্ষে নয়, একজন সংগীতশিল্পীর দক্ষিণা।
চা খাওয়া হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে দুটি এবার বিদায় নেবে। রশিদ খান ঝোঁকের মাথায় একটা কাণ্ড করে ফেললেন।
অনেকেই বলে, তাদের মধ্যে তাঁর কয়েকজন বন্ধুও, যে পুলিশ শুধু মানুষের কাছ থেকে নিতেই পারে, কোনো মানুষকে কিছু দেয় না। সেই কথাটা হঠাৎ মনে পড়ায় তিনি একটু হাসলেন। তারপর পকেট থেকে পার্সটা বার করে পঞ্চাশ টাকার নোটটা ঢুকিয়ে বার করলেন একটা পাঁচশো টাকার নোট।
সেটা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, এটা নাও, তোমাদের কাজে লাগবে।
এবারেও ছেলেটি হাত জোড় করে মাথা নাড়তে নাড়াতে পিছিয়ে গেল। মেয়েটি বলল, মাপ করেন গো বাবু, আজ আমাদের মুদ্রা ছুঁতে নাই।
ঈষৎ বিরক্ত হয়ে রশিদ খান বললেন, আজ ছুঁতে নাই মানে? আজ তোমাদের কোনো ব্রত আছে?
মেয়েটি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, না গো, ব্রত-ট্রত কিছু নাই। আজ আমাদের মন ভালো আছে।
বেশ, মন ভালো আছে। কিন্তু কিছু খেতে-টেতে তো হবে। খিদে-তেষ্টা তো থেমে থাকবে না।
মন ভালো থাকলে ক্ষুধা-তৃষ্ণা তেমন গায়ে লাগে না। কিছু খেলেও হয়, না খেলেও চলে।
তা-ও না হয় বুঝলাম। কিন্তু কাল যদি মন ভালো না থাকে, তখন যে হু হু করে ক্ষুধাতৃষ্ণা বেড়ে যাবে।
আপনি আশীর্বাদ করেন গো বাবু, যেন কালও আমাদের এমনটিই মন ভালো থাকে।
এরপর আর কথা চলে না। রশিদ খান গুম হয়ে রইলেন।
নমস্কার জানিয়ে ছেলেমেয়ে দুটি তাঁবু থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই রশিদ খান গা ঝাড়া দিয়ে উঠে হাঁক দিলেন, নিতাই নিতাই, আরদালি! নিতাইকে ডাক।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিতাই এসে উপস্থিত। নীল রঙের হাফ হাতা জামা ও ধুতি পরা। তার সরু গোঁফের মতন চোখের দৃষ্টিও ছুঁচোলো। সে একজন আধা-পুলিশ ইনফরমার। পার্ট টাইম কাজ করে।
রশিদ খান বললেন, নিতাই, তোমাকে আমি একটা ডিউটি দিচ্ছি। এই যে ছেলেটা আর মেয়েটা বেরিয়ে গেল। তুমি ওদের খুব ডিসক্রিটলি ফলো করবে। দেখবে ওরা কোথায় যায়, কী খায়, কাদের সঙ্গে মেশে, রাত্তিরে কোথায় থাকে। এখন কটা বাজে? পৌনে আটটা। রাত বারোটা পর্যন্ত তোমার এই ডিউটি, আমি সব ডিটেলস চাই।
নিতাই কুতকুতে ধরনের হাসি দিয়ে বলল, আপনি স্যার ঠিকই আন্দাজ করেছেন। এদান্তি কিছু ছিনতাইবাজ আর ছিঁচকে চোর মাঝেসাঝে বাউলের ভেক ধরে থাকে। এমন অ্যাকটিং করে, যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। আপনার স্যার অভিজ্ঞ চোখ।
রশিদ খান বললেন, বটে! সে রকম কারোকে তুমি চেন নিশ্চয়ই!
নিতাই বলল, তা তো আলবত চিনি। কয়েক ব্যাটাকে ধরিয়েও দিয়েছি। আপনার নিশ্চয় মনে আছে স্যার, গত মাসে এক ডাকাতির আসামি আবার ধরা পড়ল, এক বার পুলিশের ভ্যান থেকে লাফিয়ে পালিয়েছিল। সে ব্যাটাও তো আলখাল্লা পরে ঘাপটি মেরে ছিল এক বাউলদের ঠেকে। আমিই দূর থেকে আঙুল দেখিয়ে…
রশিদ খান জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলে-মেয়ে দুটোও সেই দলের?
নিতাই বলল, তা এখনই ঠিক বলতে পারব না স্যার। এরা লাইনে নতুন এসেছে। আগে দেখিনি। তবে জানি, ছিনতাইবাজদের যে রিংটা আছে তারা এখন বেছে বেছে অল্প বয়েসিদের রিত্রুট করছে।
রশিদ খান বললেন, যাও আর দেরি কোরো না। যদি ওরা হারিয়ে যায়…
নিতাই চলে যাবার পর রশিদ খান অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে জরুরি কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আজ ভাঙা মেলাতেও তিনটি ছিনতাইয়ের কেস ধরা পড়েছে। দুটো ধরা পড়েনি। একটা বাচ্চা মেয়ে হারিয়ে গেছে, একটা দোকানের ক্যাশ থেকে চুরি গেছে সাঁইতিরিশ হাজার টাকা…
এই সময় ওই ছেলে-মেয়ে দুটির কথা তিনি ভুলে গেলেন, অথচ মনেও রাখলেন। অর্থাৎ মনের ওপরের স্তরে শুধু কাজের কথাবার্তা, আর ভেতরের স্তরে গাঁথা রইল ওদের মুখচ্ছবি।
সাড়ে ন-টার পর তিনি একলা থাকতে চান। এ সময় তাঁর কয়েক পাত্র হুইস্কি পান না করলে চলে না। ক্যাসেটে উচ্চাঙ্গ সংগীত বাজে। পুলিশের পরিচয়ের বাইরে তিনি একজন সংগীতপ্রিয় মানুষ এবং শখের কবি।
রশিদ খান তাঁর হেড কোয়ার্টারে বেশি থাকেন না, প্রায় ট্যুরে যান এদিক-সেদিক। পরিবারে তাঁর যে সেরকম কিছু অশান্তি আছে তা নয়। ঘুরে বেড়ানো তাঁর নেশা। বিভিন্ন ডাকবাংলোয় কিংবা তাঁবুতে থাকা তাঁর বেশ পছন্দ। অনেক সময় তাঁর কয়েকজন বন্ধুও সঙ্গে থাকে। এবারেও দুজন কবি-বন্ধু ছিল। তারা ফিরে গেছে সন্ধের একটু আগে।
রাত্রি জাগরণেও তাঁর ক্লান্তি নেই। যথেষ্ট হুইস্কি পান করলেও তিনি সহজে বেএক্তার হন না বরং তার কান তখন অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়, গান বেশি করে মর্মে যায়।
রাত বারোটা পঞ্চাশে নিতাই তাঁবুর বাইরে থেকে সন্তর্পণে মৃদু গলায় ডাকল, স্যার, স্যার!
ভেতরে এসে নিতাই যে রিপোর্ট দিল তা বেশ সংক্ষিপ্ত এবং মামুলি। সত্যতার প্রমাণ দেবার জন্য সে একটা ছোটো খাতায় লিখে এনেছে। আটটা পঁচিশ, রথতলার টিউকলে জলপান, আবার হাঁটা, এক জায়গায় দুটো লরি অ্যাকসিডেন্ট করেছে, ওরা দাঁড়ায়নি। নটা দশ, একটা গাছতলায় বসল। পৌনে এগারোটায় আবার হাঁটা। সাইড রোড দিয়ে ব্যাক করেছে। বাঁকিপুরের যে পুরোনো শিবমন্দিরের চাতাল, বসল গিয়ে সেখানে। আরও কয়েকজন শুয়েছিল। ওরা খানিকটা দূরে। তারপর বারোটা পাঁচ পর্যন্ত নিতাই ওদের ওয়াচ করেছে।
না, গাঁজা খায়নি। অন্য কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলেনি। কোনো খাবারও খায়নি, যত দূর মনে হয়, হয়তো একটা পুঁটুলিতে চিঁড়ে-মুড়ি থাকতেও পারে।
রশিদ খান জিজ্ঞেস করলেন, শিবমন্দিরের চাতালে গিয়ে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল?
নিতাই বলল, না স্যার, আমি যতক্ষণ ছিলুম, ওরা শোয়নি, মুখোমুখি বসেই ছিল, আর গাইছিল গুনগুন করে।
কী গান গাইছিল, শুনেছিলে?
না স্যার, অত কাছে যাইনি, তবে একবার একটা পাখি ডেকে উঠল। ওই যে-পাখি রাত্তিরেও ডাকে—চোখ গেল, চোখ গেল বলে, হিন্দিতে বলে পিউ কাঁহা, সেই পাখিটা ডেকে উঠতেই এ মেয়েটা গলা মেলাল। পাখিটাও উত্তর দিল।
একটু থেমে নিতাই আবার বলল, একটা কথা বলব স্যার? আমার মনে হল, মেয়েটাই ছেলেটাকে পটকেছে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, ছেলেটা নরম-গরম, মেয়েটা ওস্তাদনি, ও-ই ছেলেটাকে বাপমায়ের কাছ থেকে টেনে এনেছে। এখন হিঁদু আর মোছলমান হলেই গণ্ডগোল হতে পারে। এইসব প্রেম তো পাবলিক পছন্দ করে না। একবার বক্রেশ্বরে এক গোয়ালাদের মেয়েকে নিয়ে একটা মোছলমান ছেলে পালিয়েছিল।
রশিদ খান হাত তুলে নিতাইকে থামতে বললেন।
নিতাই তবু বলল, স্যার, কাল আবার ওদের ফলো করব? যদি জাত-পাতের গণ্ডগোল থাকে…
রশিদ খান বললেন, এ সব নিয়ে তুমি বিনোদ চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা বলো। আমাকে আর কিছু রিপোর্ট করার দরকার নেই!
রশিদ খান ওই ছেলেমেয়ে দুটি সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। জাত-পাতের ব্যাপার নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতে রাজি নন। পাঁচশো টাকার নোট নিতে অস্বীকার করার জন্যই তিনি ওদের সম্পর্কে কৌতূহলী হয়েছিলেন। হয়তো ভালো বংশের ছেলেমেয়ে, হয়তো জমানো টাকা আছে। ওরা যে গান গেয়েছিল, তা আহা মরি কিছু নয়, মাঝারি গোছের বলা যেতে পারে। রশিদ খান তেমন কিছু বাউল গানের ভক্তও নন, দু-তিনখানার বেশি শুনতে চান না, একঘেয়ে লাগে। তাঁর মন মজে আছে মার্গ সঙ্গীতে। সুতরাং, ওই বাউল যুগলকে মনে রাখার কোনো কারণ রইল না।
দু-দিন পর তিনি ছেলে ও মেয়েটিকে আবার দেখতে পেলেন আমেদপুরের রাস্তায়। সারা সকাল আকাশ মেঘে কালো হয়েছিল। শোনা যাচ্ছিল গুরুগুরু শব্দ, সূর্যকে দেখা যায়নি। দুপুরের পর শুরু হয়েছে বর্ষণ, আকাশ যেন পুকুর ঢেলে দিচ্ছে।
গাড়ি নিয়ে বোলপুরের দিকে যেতে যেতে তিনি ড্রাইভারকে বললেন, থামো থামো!
বৃষ্টির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছেলেটি ও মেয়েটি। বৃষ্টির জন্য কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই, জ্যোৎস্নার মধ্যে বসন্ত বাতাসেও মানুষ এভাবে হাঁটতে পারে।
জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রশিদ খান বললেন, এই ভিজছ কেন? উঠে এসো, উঠে এসো।
দুজনেই হাসিমুখে তাকাল তাঁর দিকে। হাত তুলে নমস্কার করল।
রশিদ খান আবার বললেন, ওঠো, গাড়িতে উঠে এসো।
ছেলেটি বলল, কেন সাহেব, আমাদের হাঁটতেই ভালো লাগছে।
রশিদ বলল, তা বলে এভাবে ভিজবে? অসুখ করবে যে!
মেয়েটি বললো, এই যে গাছগুলো ভিজছে? ওই যে মাঠে কয়েকটা গোরু, ওরা ভিজছে। ওদের তো কোনো অসুখ করে না!
গাড়িতে অন্য পুলিশরা হেসে উঠল।
রশিদ খান বললেন, ওদের সঙ্গে বুঝি মানুষের তফাত নেই? মানুষ তো জামাকাপড় গায়ে দেয়।
মেয়েটি বলল, আমরা বৃষ্টিকে ডাকছিলাম, কখন বৃষ্টি আসবে, কখন বৃষ্টি আসবে। এখন বৃষ্টি এসেছে, আমরা যদি পালিয়ে যাই বৃষ্টি রাগ করবে না?
রশিদ খান তাঁর এক সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বললেন, পাগল আর কাকে বলে। অবশ্য বয়েস কম, ভিজুক। ভিজুক যত ইচ্ছে।
গাড়িটা ওদের ফেলে বেরিয়ে গেল।
দিল্লি থেকে একজন বেশ বড়ো গোছের ভি আই পি আসছেন শান্তিনিকেতনে। তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিখুঁত করার জন্য রশিদ খানকে এখন প্রায়ই আসতে হচ্ছে এদিকে।
যাওয়া-আসার পথে আমেদপুরের রাস্তাতেই আবার দেখতে পেলেন ছেলেটিকে এক বিকেল-সায়াহ্ণের আলো-আঁধারিতে। গুপিযন্ত্র বাজিয়ে গান গাইছে, এক গাছতলার নির্জনে।
ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন, খানিকটা এগিয়ে গিয়েও গাড়িটা আবার পিছিয়ে এল। ওরা কী খায়, কেমন করে খাওয়া জোটায়, এটাই তিনি জানতে চান।
ওদের দেখেও ছেলেটি গান বন্ধ করল না। রশিদ খান ধারে-কাছে কোথাও মেয়েটিকে দেখতে পেলেন না। অথচ তাঁর মনে হয়েছিল, ওরা অবিচ্ছেদ্য।
তিনি এখন ব্যস্ত, তাই গান শেষ হবার অপেক্ষা না করেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওহে তোমার সঙ্গিনীটি কোথায় গেল? সেই যে মরুভূমির মেয়ে?
ছেলেটি গান থামিয়ে ভক্তিভরে নমস্কার জানিয়ে মৃদু গলায় বলল, সে তো এখানে নেই। তাকে মরুভূমির মানুষরাই নিয়ে গেছে।
রশিদ খান বুঝতে না পেরে বললেন, মরুভূমির মানুষরা মানে? ওদের বাড়ির লোকজনরা?
ছেলেটি বলল, না গো বাবু। মরুভূমির মানুষরা যাদের হৃদয়ে দয়া-মায়া কিছু নেই।
এ বারে অস্থির হয়ে খানিকটা ধমক দিয়ে বললেন, রহস্য ছাড়ো। সোজা কথায় বলো, কারা নিয়ে গেছে, জোর করে?
ছেলেটি বলল, চার-পাঁচজন জোয়ান-মদ্দ, মনে হয় যেন তারা পাতালের প্রাণী, হাতে লাঠিসোঁটা, সবলে নিয়ে গেল।
রশিদ খান বললেন, মেয়েটাকে কেড়ে নিয়ে গেল, তুমি কিছু করতে পারলে না।
ছেলেটি নিরুত্তাপ গলায় বলল, অত জনকে রুখব, সে-শক্তি তো ভগবান আমাকে দেননি। আপনি থাকলে পারতেন।
রশিদ খান বুঝলেন, এ প্রশ্নটা করা তাঁর উচিত হয়নি। এ ছেলেটাকেও যে খুন করে রেখে যায়নি, সেটাই আশ্চর্যের!
কখন এটা ঘটেছে?
আজকের দিনটা গেল। কালকের রাত, তার পরের দিন যখন শুরু, সবে মাত্র পাখি ডেকেছে।
তুমি এর মধ্যে আমাকে খবর দাওনি কেন?
আজ্ঞে, আমি এ জায়গা ছেড়ে যাই কী করে? সে যখন ফিরে আসবে, তখন যে আর আমাকে খুঁজে পাবে না।
রশিদ খানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ফিরে আসবে? ওরা আর ফিরে আসে না। নারীহরণের ঘটনা সম্প্রতি বেড়েছে। মেয়েটির তেমন কিছু রূপের জেল্লা না থাকুক, শরীরটা তো বাঁকাচোরা নয়, সুস্বাস্থ্যের একটা দীপ্তি আছে। ওইসব লোকদের চোখে সে শুধু লোভনীয় নারী-মাংস আজকাল গাছতলার নীচে পথিকরাও ঘুমোও না।
ধরে নিয়ে গিয়ে শুধু ধর্ষণ নয়, তার পর খুন করে ফেলাটাই এখনকার রেওয়াজ। ছ-সাত বছরের মেয়েকেও ধর্ষণ করে। তাতে আনন্দ পায়? না, আনন্দ-টানন্দ কিছু নয়, সে-বোধ যাদের থাকে, তারা রক্ত দর্শন করে না। ধর্ষণের পর বিক্রিও করে দেয়, অনবরত জ্যান্ত মেয়ে-শরীর চালান যাচ্ছে দেশ-বিদেশে।
প্রথমে ছেলেটার ওপরেই খানিকটা রাগ হল তাঁর। এ ছেলেটা এত অপদার্থ কেন? শুধু কাব্য করলে চলে? সঙ্গিনীর নিরাপত্তার কথা না ভেবে মন্দিরের চাতালে কিংবা গাছতলায় শুয়ে থাকছে? এ তো ওদের লোভ দেখানো।
তিনি কর্কশ গলায় বললেন, থানাতেও খবর দাওনি, শুধু এখানেই বসে থাকলে চলবে?
ছেলেটি বলল, আমার তো অন্য কোথাও যাবার উপায় নেই। সে এখানেই ফিরে আসবে যে! এখানেই আবার দেখা হবে।
যারা জোর করে তাকে ধরে নিয়ে গেছে, তাদের হাত ছাড়িয়ে সে ফিরবে কী করে?
ফিরতে তো তাকে হবেই। যদি বাঁধন ছিঁড়তে না পারে, তাহলে বাঁধনের মধ্যেই সে ডুব দেবে।
ধরো যদি সত্যিই সে ফিরে না আসে?
বললাম তো বাবু, কোনো বাঁধনই তাকে ধরে রাখতে পারবে না। শরীরটা পড়ে থাকবে কিন্তু সে আর থাকবে না সেখানে। আর তাই-ই যদি হয়, তাহলে সে খবরও আমি ঠিক পেয়ে যাব। এখানে বসে বসেই পাব। বাতাস শুনিয়ে যাবে। তখন আমি আর এখানে বসে থেকে কী করব। এই খাঁচা থেকেও পাখিটাকে উড়িয়ে দেব।
রশিদ খান মনে মনে বললেন, এ যে দেখছি এ যুগের রোমিও-জুলিয়েট। আদিখ্যেতা আর কাকে বলে! তার পরেই তিনি তাঁর সহকর্মীদের দিকে ফিরে তীব্র ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, বিনোদবাবু, আপনারা কী করতে আছেন? প্রায় প্রত্যেক দিনই যে একটা-দুটো মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে…
বিনোদবাবু বললেন, স্যার, এফ আই আর করা হয়নি।
আরও গলা তুলে রশিদ খান বললেন, জেনারেল সিচুয়েশন যে এত খারাপ হচ্ছে, সেটা আপনারা দেখবেন না। এফ আই আর-এর নিকুচি করেছে। ক্রাইম হবার আগে প্রিভেনশনও বুঝি পুলিশের কাজ নয়? সেসব বুঝি ভুলে গেছেন। শুনুন, আমি আপনাদের ঠিক আটচল্লিশ ঘন্টা সময় দিচ্ছি, এর মধ্যে মেয়েটাকে খুঁজে বার করতেই হবে। আগে দেখুন, কাছাকাছি তার বডি পাওয়া যায় কি না। যদি না পাওয়া যায়, ওয়েল অ্যান্ড গুড, তাকে কোথাও আটকে রেখেছে পাচার করার জন্য। সেইসব গ্যাং-এর যে কোনো একটাকে ধরুন। আপনারা চেনেন, আমি জানি ওরা একদমেই মেয়েগুলোকে অনেক দূর নিয়ে যায় না। থেমে থেমে যায়। ওদের অনেক হাইড আউট থাকে। রেল-পুলিশকে অ্যালার্ট করুন। বর্ধমান আর মুরশিদাবাদের এস পি দের মেসেজ পাঠান। আমি বেশি রাত্তিরে ওঁদের সঙ্গে কথা বলব।
পুলিশ অনেক কিছু পারে না। আবার অনেক কিছু পেরেও যায়। যা পারে না, তা বোধহয় পারতে চায়ও না। তবে যা পারতে চায়, তা পেরে যেতে দেরি হয় না।
আটচল্লিশ ঘন্টার একটু আগেই সেই বাউল সঙ্গিনীটিকে উদ্ধার করা হল হেতমপুরের এক পোড়ো বাড়ি থেকে। মৃত নয়, জ্যান্ত। সঙ্গে আরও সাতটি মেয়ে।
টেলিফোনে খবর দেওয়া হল রশিদ খানকে। অন্য মেয়েদের থানায় রেখে এই মেয়েটিকে নিয়ে আসা হল তাঁর কাছে। তিনি তখন বোলপুরের পি ডব্লিউ ডি বাংলোতে অবস্থান করছেন।
মেয়েটির দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন তিনি। এই কয়েকটি দিনেই তাকে অনেক শীর্ণ মনে হচ্ছে। চোখের নীচে যেন কেউ লেপে দিয়েছে ভুসো কালি। পোশাক ধুলিমলিন, কাঁধের কাছে একটু ছেঁড়া। কিন্তু শরীরে দৃশ্যমান আঁচড়-কামড়ের দাগ নেই। চুল খোলা বলে তার মুখটাও একটু অন্য রকম।
রশিদ খান একটু পরে কোমল গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না?
সে দু-দিকে আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, না-তেমন কিছু নয়।
রশিদ খান আবার বললেন, তোমার ওপর ওরা, ইয়ে মানে, অত্যাচার করেছে?
মেয়েটি বলল, শরীরটাকে যদি কখনও মনে করে যায়, এটা আমার নয়…মানে এ শরীর আর নিজের নয়, এই বোধ পাকা হলে তখন কে কী অত্যাচার করল না করল, তাও তো বোঝা যায় না। তখন শরীর হয়ে যায় দেহ। তার কোনো সাড়া শব্দ নেই।
বেশ চিন্তিত হয়ে রশিদ খান বললেন, এ তো উচ্চাঙ্গ জ্ঞানের কথা। তুমি এত কম বয়েসে এ সব শিখলে কী করে?
মেয়েটি বলল, আমি তো কিছু শিখিনি। আমি শুধু আমার মনটাকে বোঝবার চেষ্টা করি। মনই তো সব কথার উত্তর দেয়।
তোমাকে যখন ওরা জোর করে তুলে নিয়ে গেল, তখন তুমি ভয় পাওনি?
মরুভূমিতে তো কত রকম বিপদ-আপদই ঘটে। কত মানুষ অসময়ে হারিয়ে যায়। আবার এই সবের মধ্যেই তো কত সাধ-আহ্লাদ!
শেষ কথাটুকু না শুনেই রশিদ খান চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর মনে পড়ে গেছে সেই ছেলেটির কথা। সে বলেছিল, গাছতলাতেই বসে থাকবে। আরও বলেছিল, বাতাস তাকে দুঃসংবাদ দিলে সেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। বাতাসে তো কত রকম ভুল খবর, দুঃসংবাদ ছড়ায়। এর মধ্যে ছোকরাটি আবার আত্মহত্যা-টত্যা করে বসেনি তো? তখন এই মেয়েটি, আবার রোমিও-জুলিয়েট?
এই দু-দিন ভি আই পি-ব্যস্ততার জন্য তিনি ছেলেটির কোনো খবর নিতে পারেননি।
তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, গাড়িতে স্টার্ট দাও, এক্ষুনি যেতে হবে।
গাড়িতে বসে মেয়েটির সঙ্গে আর কোনো কথা হল না। তাঁর মনে পড়ল রজনীকান্তের একটা গান, ‘যবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব…’। সংসারটাকে মরুভূমির সঙ্গে তুলনা দেবার একটা ধারণা এদের মধ্যেও চালু আছে। আর ছেলেটি যে বলেছিল সাগরের কথা, ভব সমুদ্র তো বলেই। বই না পড়েও এরা এগুলো শিখে যায়।
তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন, এ বার দেখা হবার পর ওরা দুজন প্রথমে কী বলবে?
তিনি কল্পনায় দেখলেন, সেই গাছতলায় পৌঁছবার পর গাড়ি থেকে নেমেই মরুকন্যাটি ছুটতে ছুটতে গেল সেই সাগর-সন্তানের দিকে। কোনো কথা নয়, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুধু কান্না।
কান্নার মধ্যে মিলন দৃশ্য যেমন মধুর, তেমনই দুর্লভ। ছেলেটি বলেছিল, মানুষের কান্নার মধ্যেও গান থাকে। ঠিকই বলেছিল।
আসলে কিন্তু তেমন ঘটল না। সেই গাছতলায় এসে গাড়িটা থামল রাস্তার উলটো দিকে। ছেলেটি বসে আছে গাছের গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে, যেন সে এই ক-দিন ওখান থেকে একবারও ওঠেনি। যেন সে গৌতম বুদ্ধের মতন বসে আছে সাধনায়। আকাশ আজ পরিষ্কার, জ্যোৎস্নায় তাকে দেখা যাচ্ছে আবছাভাবে।
মেয়েটি আস্তে আস্তে নামল গাড়ি থেকে। দৌড়ে গেল না। সে বলে উঠল, সেই ফুল কোথায় গেল গো, যে ফুলে ভ্রমর বসেনি…
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল না, কোনো উত্তেজনা নেই। সে বলে উঠল, নদীতে নাই জলের ধারা, নদী আছে সেইখানে।
সুর দিয়ে বলছে ছেলেটি, মেয়েটির বাণীতেও একটু সুর ছিল।
মেয়েটি আবার সুর করে বলল, একাদশীর চাঁদ উঠেছে, বাজিয়ে মোহন বাঁশি।
ছেলেটি গাইল, পিঁপড়ায় মধু খেয়েছে, পিঁপড়া এখন দিক জানে না।
মেয়েটি গাইল, অচিন দেশের নাইয়া এখন নাওয়ের মধ্যে ঘুমায়।
ছেলেটি গাইল, চক্ষু ভরে দেখছ রে মন, চক্ষু কিন্তু মন দেখেনি।
বিস্ময়ে রশিদ খানের চোখ দুটি ঠিকরে পড়ার মতন অবস্থা। এ রকম বিপর্যয়ের পরও দেখা হতে ওরা গান গাইছে? এ কি হিন্দি সিনেমা? এটা ওদের দেখানেপনা!
তার পরেই তিনি বুঝলেন, এর মধ্যে একটুও কৃত্রিমতা নেই। এ গান ঠিক সংলাপও নয়, চরণের শেষে মিল নেই। যেন আলাদা আলাদা গানের লাইন। পরস্পরের কুশল সংবাদের বদলে গানের বিনিময়। কিংবা, এ কি কোনো গুপ্ত সংকেতের ভাষা? এর মধ্যে রয়েছে এক তীব্র আকুতি, যেন দুটি পাখির সাড়া দেওয়া ডাক।
হঠাৎ এক তীব্র ভালোবাসার আবেগে রশিদ খানের বুক ভরে গেল। তিনি একবার কেঁপে উঠলেন।
তাঁর উপলব্ধি হল, আর কোনো মানুষের সঙ্গে ওদের তুলনা হয় না। নিশ্চিত ওরা এই পৃথিবীর কেউ নয়। ওরা এই পৃথিবীর কেউ নয় একটু বেড়াতে এসেছে। ইচ্ছে করলেই ওরা এই মরুভূমি ছেড়ে চলে যেতে পারে যে-কোনো সময়ে।
ওরা কি সেই কথাই বলতে চাইছে গানের মধ্যে। তাহলে তো এখনি ওরা অদৃশ্য হয়ে যাবে। সে দৃশ্য দেখতে নেই।
এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে রশিদ খান চক্ষু বুজে ফেললেন। কতক্ষণ লাগবে অদৃশ্য হতে? বড়ো জোর দশ সেকেন্ড, তার মধ্যেই ওরা দুজনে দুজনকে ছুঁয়ে ফেলবে হাত বাড়িয়ে।
তিনি মনে মনে গুনতে লাগলেন, এক দুই তিন চার…
প্রথম মানবী
প্রথম মানবী
ভোরবেলা সেই নারী প্রবেশ করল আদিম উদ্যানে। তখন পৃথিবীর সৃষ্টিরও ঊষাকাল।
কোথাও কোনো শব্দ নেই। যত দূর দৃষ্টি যায় মনুষ্য আকারের আর কোনো প্রাণী নেই। লতাগুল্মে, ক্ষুদ্র-বৃহৎ তরু-বৃক্ষে ফুটে আছে বিভিন্ন বর্ণের ফুল, সেগুলিরও নাম নেই। কোথাও ফুল থেকে ফল ফলেছে, কোনো কোনো গাছের শাখা ফলভারে নুয়ে পড়েছে, সেইসব ফলও নামহীন।
এখানে ফুলের সৌরভে আর কোনো কটু গন্ধ মেশেনি। বাতাস স্নিগ্ধ। মাঝে মাঝে বয়ে চলেছে তরঙ্গময় নির্ঝরিণী, তাদের জল স্ফটিক-স্বচ্ছ। একেবারে তলদেশের পাথরগুলি পর্যন্ত মালিন্যহীন।
বাতাস ও ঝরনা ছাড়া আর যা সঞ্চরণশীল, তা কুয়াশা। যেন আকাশের মেঘ নীচে নেমে এসে ভূমি স্পর্শ করতে চাইছে। তবে পূর্ব গগনের তরুণ সূর্য আস্তে আস্তে এদের ভক্ষণ করতে শুরু করেন। কুয়াশাই সূর্যের প্রাতরাশ।
আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটছে সেই রমণী। তার শরীরে কোনো আবরণ নেই, আভরণ নেই। সুদীর্ঘ চুল পিঠ ছাড়িয়ে নেমেছে মসৃণ নিতম্বে। দুই বাহু ও ঊরুসন্ধিতেও নবীন তৃণের মতন রোম। নাসিকা তীক্ষ্ণ, ভ্রূদ্বয় গাঢ়, অক্ষিপল্লব সূক্ষ্ম। তার বক্ষের দুটি ঢেউ এবং কটিদেশের খাঁজ কোনো শিল্পীর নিপুণ হাতে গড়া। ঢেউ দুটিতে ভাসছে স্ফুটনোন্মুখ দুটি কুঁড়ি। চাঁদের অর্ধ কলার মতন নাবি।
রমণীটি যেন ঈষৎ উন্মনা, কোনোদিকেই স্থির দৃষ্টিপাত করছে না।
তার কোনো বয়স নেই। তার বাল্য, কিশোরীকাল নেই, ভবিষ্যৎ জরা সম্পর্কে কোনো উপলব্ধি নেই। সে যৌবনজাত। সে দেখেছে মাত্র কয়েকটি ঋতু, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শীত। এবারেও সে টের পাচ্ছে আসন্ন শীতের মিহিন বাতাস।
এই আদিম উদ্যান সে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল এক বর্ষার রাতে। আশ্রয় নিয়েছিল দূরবর্তী এক পাহাড়ের গুহায়। এখানে তার ফেরা নিষেধ, তবু মাঝে মাঝে তার শরীর তোলপাড় করে দেয় এক ঘূর্ণি হাওয়া, তার সব কটি আঙুলের অগ্রভাগ, এমনকি কানের লতিতেও জ্বালা ধরায়। অনেক গণ্ডূষ জল পান করলেও তৃষ্ণা মেটে না। ঘুম আসে না রাত্রে। যেমন কাল সারা রাত সে চক্ষু মেলে শুধু অন্ধকার দেখেছে।
পর্বতগুহা ছেড়ে সে যে আজ প্রত্যুষে চলে এসেছে, তা সে নিজেই জানে না। এক জলপ্রপাতে স্নান সেরে সে হাঁটতে শুরু করেছিল বিপরীত দিকে। সচেতন সিদ্ধান্ত ছাড়াও মানুষ এমনভাবে কখনো-কখনো যায়। দিনের পর দিন একাকিত্ব তার অসহ্য বোধ হচ্ছিল, সে নেমে এসেছে সমতলে।
এ উদ্যানে কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই। কখনো-কখনো বৃক্ষগুলির শাখা-প্রশাখা দুহাতে সরিয়ে যেতে হয়। পায়ে লাগে লতাজাল। কখনও পার হতে হয় অপ্রশস্ত সরণি।
হঠাৎ ঝুপ ঝুপ করে বর্ষণ শুরু হল। এখানকার বৃষ্টি শীত-গ্রীষ্ম মানে না।
রমণীটি একটি বৃহৎ বৃক্ষের তলায় এসে দাঁড়াল। সেখানে একটি দুগ্ধবতী গাভীও আশ্রয় নিয়েছে, তার গাত্রবর্ণ পিঙ্গল। এই প্রকার গাভীদের চক্ষু সব সময় সজল থাকে।
সে গাভীটির গলকম্বল স্পর্শ করে স্নেহ জানাতেই গাভীটি সন্তোষজনক শব্দ করল। অর্থাৎ, সে এই নারীকে চিনতে পেরেছে, কয়েক বিন্দু দুগ্ধক্ষরণ হল তার বাঁট থেকে।
সে এবার অনুভব করল, অনেক গাছপালাও যেন তার উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন। নানারকম অদৃশ্য তরঙ্গ লাগছে তার শরীরে।
সে সহাস্যে বলল, কেমন আছ তোমরা সকলে? আমি এসেছি বলে খুশি হয়েছ তো?
হাসিটি সত্য, কথাগুলি অনুচ্চারিত। এখনও মনুষ্য ভাষার সৃষ্টি হয়নি। এই রমণী হাসতে পারে, সশব্দে কাঁদতে পারে, কণ্ঠ দিয়ে কখনও দু-একটি সুর ধবনিত হয়। কিন্তু অর্থবহ কোনো শব্দ সে জানে না।
ভাষা নেই, কিন্তু ভাব তো আছে। তাই অনেক কথা হয়, অনেকের সঙ্গে, নিঃশব্দে, মনে মনে।
তার নিঃশব্দ প্রশ্নের উত্তরে সে নানা দিক থেকে যেন তরঙ্গে তরঙ্গে ধবনিত হল। অনেকদিন পর এলে, তোমাকে দেখে খুশি হয়েছি অবশ্যই। তুমি আরও সুন্দর হয়েছ!
একটি গাছ থেকে একটি বর্তুল গড়নের পাকা ফল এই মুহূর্তে খসে পড়ল মাটিতে। এটাও যেন ভাষা। গাছটি স্বাগত জানাচ্ছে তাকে।
যুবতীটির মন ভার ছিল, গত রাতে তার বুক ভরা ছিল কান্নায়, এখন সে অনেক স্বচ্ছন্দ বোধ করল। বৃষ্টি থেমে গেছে, সে ফলটি তুলে নিয়ে গিয়ে বসল এক ঝরনার ধারে পাথরের পইঠায়।
সারা আকাশ জুড়ে রামধনু ফুটে উঠেছে।
সে এখন যে পাহাড়ের গুহায় থাকে, সেখান থেকে কোনোদিনই রামধনু দেখা যায় না। এখন পরিচিত রামধনুকে দেখেও সে প্রশ্ন করল, কেমন আছে?
রামধনু উত্তর দিল কি না, তা বোঝা গেল না।
আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে সে তাকাল জলের দিকে। দেখতে পেল নিজের মুখের প্রতিবিম্ব। এই জন্যই সে বার বার জলের ধারে বসে। দিনের পর দিন নিজের মুখচ্ছবি ছাড়া সে আর কোনো মানুষকে দেখে না। নিজের সঙ্গেই শুধু কথা হয়।
ঝরনার ওপাশ থেকে কী যেন একটি প্রাণী সাঁতার কেটে আসছে। এদিকে আসার পর বোঝা গেল, একটি সাপ। বেশ দিঘল চেহারা। চক্ষু দুটি কপালের ওপরে, জলেই অর্ধেক শরীর ডুবিয়ে সে চেয়ে রইল রমণীটির দিকে।
ভয় পাবার প্রশ্ন নেই। এই সাপটিকে সে এখানে আগেও কয়েকবার দেখেছে। কাছাকাছি এসে চেয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। কী যেন বলতে চায়। কিন্তু সাপের মনের তরঙ্গের সঙ্গে এই রমণীর মনের তরঙ্গ মেলে না, তাই সে কিছু বুঝতে পারে না।
রমণীটি তাকে বলল, তুমি যাও!
তবু সাপটি স্থির হয়ে রইল এক জায়গায়।
রমণী তখন হাঁটতে শুরু করল পুনরায়।
ঝরনাটি কিছুটা নীচের দিকে নেমে গিয়ে মিশে গেছে আর একটা স্রোতস্বিনীর সঙ্গে। দূর থেকে সেই সংগম স্থানটি দেখা যায়।
সেখানে জংঘা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ।
এই রমণীরই মতন সেও নিপাট নগ্ন। তার শরীর অনেকটা রোমশ, দীর্ঘ কেশ, মুখমণ্ডল শ্মশ্রুতে প্রায় আবৃত। সুঠাম বক্ষ।
পুরুষটিকে দেখা মাত্র রমণীটির আশিরপদনখ শিহরিত হল। তারপর জ্বালা। তারপর উত্তাল বক্ষস্পন্দন। তার ইচ্ছে হল তৎক্ষণাৎ ঝড়ের মতন ছুটে যেতে। ওই কঠিন বক্ষে তার কোমল বক্ষ মেলাতে। তার শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণু ওই মানুষটির সঙ্গে লীন হতে চায়।
তবু নিজেকে সংযত করল সে।
এ উদ্যান তার জন্য নিষিদ্ধ। এখানে সে বিধি ভেঙে এসেছে। যদি ওই পুরুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করে? যদি আরও কঠিন হয়ে উঠে তাকে দূরে ঠেলে দেয়? এখানে অলক্ষ্যে কোথাও আছে সৃষ্টিকর্তার তিন প্রহরী, যদি পুরুষটি তাদের ডাকে?
সে আপনমনে বলল, হে সখা, তুমি তো নিঃসঙ্গ। আমরা বিবাদ করেছি, তবু তো আমি দূরে সরে থাকতে পারি না। তোমারও কি মন উচাটন হয় না? তুমি তো কখনও এই উদ্যান থেকে বেরিয়ে পর্বতগুহায় আমার সন্ধানে যাওনি। তুমি কি এখনও ক্রোধ পুষে রেখেছ?
শরীর চাইছে ধেয়ে যেতে, মন টেনে ধরছে রাশ, রমণীটি এক স্থানে স্থির অথচ দোদুল্যমান।
আকাশে রামধনুটি এখনও মিলিয়ে যায়নি। প্রকৃতিতে চলেছে সুন্দরের কত রকম খেলা, বাতাসে মুগ্ধতার আবেশ, তবু ওই পুরুষটিকে দেখার পর রমণীটির আর কোনো দিকে মন গেল না, নিদারুণ তৃষ্ণার্তের মতন সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল পুরুষটির দিকে।
একটু পরে পুরুষটি মিলিয়ে গেল জঙ্গলের আড়ালে।
কোথাও একটা পাখি খুব জোরে ডেকে উঠল।
তার ধবনিটি অনেকটা যেন টিট্রিভ, কিংবা লিললিথ! একবার মনে হয়, টিট্রিভ, আর একবার মনে হয়, লিললিথ।
রমণীটি ঘোর ভেঙে পাখিটাকে খুঁজতে লাগল। এই পাখিটির ডাক শুনেছে সে, কখনও দেখতে পায়নি। কিছু কিছু পাখি শুধু ঘন পাতার আড়ালে বসে ডাকে, কিন্তু যখন প্রকাশ্যে আসে কিংবা উড্ডীয়মান, তখন ডাকে না।
রমণীটি ব্যাকুলভাবে বলল, ওরে পাখি, আরও জোরে ডাক। নীচের দিকে নেমে যা আমার পুরুষ যেন এই ডাক শুনতে পায়। তাহলে হয়তো আমার কথা তার মনে পড়বে।
এই পাখির ডাক থেকেই রমণীটির নাম—লিলিথ।
সৃষ্টিকর্তা প্রথম যে মানব সৃষ্টি করেন, সে পুরুষ। জল, মৃত্তিকার মতন প্রকৃতির উপাদান দিয়েই সে গড়া। প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, তোমার নাম দিলাম আদম। পরে তুমি বহু নামে পরিচিত হবে। তুমি স্বচ্ছন্দে এই স্বর্গোদ্যানে বিচরণ করো।
কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি একটা গভীর ভুল করেছেন। তিনি প্রথম মানুষটি গড়েছেন অনেকটা নিজের শরীরের আদলে, কিন্তু তিনি তো নারীও নন, তাঁর তো এক থেকে বহু হবার প্রয়োজন নেই, তিনি অদ্বিতীয়, তিনি এলোহিম। কিন্তু মানুষটিকে তিনি পুরুষলিঙ্গ দিয়েছেন, সে অবিরাম বিপরীত লিঙ্গের একজনকে চাইবে। তাঁর অন্যান্য সব সৃষ্টিই তো এক থেকে বহু হয়।
আদমের উপভোগের সব উপাদানই আছে এই কাননে, তবু প্রায়শই সে নিরানন্দ থাকে কারণটা সে নিজেই জানে না, কিন্তু দূর থেকে তাকে লক্ষ করে তার স্রষ্টা বোঝেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তির মনোবেদনা দেখে তিনি ব্যথিত হন নিজেও।
আবার একদিন সময় করে তিনি শিল্পকার্যে মন দিলেন। প্রকৃতির সব কিছুর সৌন্দর্য থেকে ছেনে ছেনে তিনি গড়ে তুললেন এক তিলোত্তমা মূর্তি। পুরুষের তুলনায় এর সব কিছুই কোমল, এমনকি হাতের আঙুলের লীলায়িত ভঙ্গি পর্যন্ত।
প্রাণসঞ্চার করা মাত্র শায়িত মূর্তিটি উঠে দাঁড়াল, একবারে পুরুষটির মুখোমুখি। দুজনে এমনভাবে চেয়ে রইল যেন সেই দৃষ্টিতে রয়েছে একটি সেতু।
আর তখনই শোনা গেল সেই পাখিটির ডাক, টিট্রিভ! লিললিথ?
তৃপ্তির হাসে ফুটে উঠল সৃষ্টিকর্তার মুখে। এতদিনে সম্পূর্ণ হল তাঁর সৃষ্টির কাজ।
তিনি এই মানব-মানবীকে বললেন, এবার তোমরা এই পৃথিবীকে চালনা করার ভার নাও। আদম, ওই পাখিটির ডাক অনুযায়ী তোমার এই সঙ্গিনীর নাম রাখা হল লিলিথ। তোমরা পরস্পরের পরিপূরক হও। কখনও কোনো সংকট হলে আমার শরণাপন্ন হোয়ো। আমি তোমাদের শব্দ দেব, ভাষা দেব। কিন্তু তা আয়ত্ত করতে তোমাদের সময় লাগবে। ততদিন তোমরা মুখোমুখি দাঁড়ালেই তোমাদের মনের তরঙ্গ বিনিময় হবে। মুখ দিয়ে কিছু উচ্চারণ না করেও তোমরা পরস্পরের সব বাক্য হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে।
সৃষ্টিকর্তা অদৃশ্য হয়ে যেতেই আদম তার সঙ্গিনীকে বলল, এখন তোমার শরীরে ধূলি লেগে আছে। এসো, আমরা অবগাহন করি।
তারপর কাটতে লাগল দিনের পর দিন। দুজনের পরিচয় প্রগাঢ় হল। অবশ্য শরীর মিলনের চেতনা জাগল না। তারা দুই কুরঙ্গ-কুরঙ্গীর মতন পাশাপাশি বিচরণ করে স্নান করে একসঙ্গে, ফলমূল ভাগ করে খায়, শুয়ে থাকে কাছাকাছি। এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছেদ নেই। এমনকি ঘুমের মধ্যেও এক একবার জেগে উঠে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
একদিন একটা গাছ থেকে একটি সুপক্ব ফল পাড়তে গেল লিলিথ, আদম বলল ও ফলটি নিও না।
সরল কৌতূহলে লিলিথ জিজ্ঞেস করল, কেন?
আদম বলল, কোন ফলটি ভালো, আমি তোমায় চিনিয়ে দেব। আমি আহরণ করে দেব তোমার জন্য।
লিলিথ সহাস্যে বলল, হে সখা, তুমি দেবে, আমি অঞ্জলি পেতে গ্রহণ করব।
আর একদিন এক নতুন জলাশয়ে অবগাহন করতে চাইল লিলিথ, তার এক বাহু চেপে ধরে আদম বলল, ওখানে নেমো না।
লিলিথ বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল, কী কারণে?
আদম বলল, এই সরোবরে কয়েকটি ফুল ভাসছে! এই ফুলগুলি আমি আগে দেখিনি। জলে কেন ফুল ভাসবে? চল, তোমাকে আমি অন্য নির্মল সলিলে নিয়ে যাব।
নতুন সরোবরটিতে আর ওদের অবতরণ করা হল না।
এক অপরাহ্ণে আকাশ ধারণ করল রুদ্র রূপ।
সূর্য হারিয়ে গেলেন ঘন কালো মেঘের আড়ালে। সেই মেঘও যেন পাথরের মতন কঠিন। পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে শব্দ হতে লাগল প্রচণ্ড। যেন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে স্পর্ধা করছে তাঁর কোনো প্রবল প্রতিপক্ষ, আজ সমস্ত সৃষ্টি ধবংস করে দেবে মাঝে মাঝে যেন সূর্যের চেয়েও তেজি বিদ্যুৎ চমক।
আগে একবার আকাশে এরকম রণ-হুঙ্কারের সময় সৃষ্টিকর্তা আদমকে দর্শন দিয়ে অভয় জানিয়েছিলেন। আদম তাই জানে, আকাশে যতই তর্জন-গর্জন হোক, এক সময়ে থেমে যাবে। লিলিথ দেখেনি আকাশের এই রূপ। কোনো অজানা আশঙ্কায় কম্পিত হচ্ছিল তার বুক।
তারপর শুরু হল ঝড়। তার এমনই শক্তি এবং তীব্র বেগ যে বহু বৃক্ষের শাখা ভেঙে পড়তে লাগল। কোনো কোনো বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে চলে গেল সুদূরে। এরকম সময়ে পাহাড়ের গুহা তবু নিরাপদ।
ওরা দুজনে বসে রইল একটি প্রায় শুষ্ক নদীর খাতে। তার এক দিকটা প্রাচীরের মতন, ওপর দিয়ে অনেক কিছু উড়ে গেলেও ওদের গায়ে লাগে না।
ঝড়ের পর এল বর্ষণ। প্রস্তর মেঘ এখন দ্রব। আকাশ যেন এখন এক হ্রদ, একসঙ্গে নেমে আসছে মাটিতে।
নদীর খাতে ওরা দুজনে কিছুটা আশ্রয় পেয়েছে বটে, কিন্তু কিছুক্ষণ ধারাপাতের পর ওদের শৈত্যবোধ হল। পাথরে হেলান দিয়ে বসেছিল পাশাপাশি, একসময় আদম বলল, লিলিথ, তুমি কাঁপছ? তুমি শুয়ে পড়, আমি তোমাকে আচ্ছাদিত করে থাকব।
পরম যত্নে সেই পুরুষ তার সঙ্গিনীকে শীতের বাতাস এবং বৃষ্টির ছাঁট থেকে রক্ষা করার জন্য সর্বাঙ্গ আবৃত করে রইল। বুকে বুক, মুখে মুখ, হাতে হাত, উরুতে উরু।
একটু পরেই মিলিয়ে গেল শীত বোধ। এককভাবে সমস্ত নারী ও পুরুষেরই শরীরে শীত আশ্রয় নিতে পারে, কিন্তু দুজনে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলে শীত পলায়ন করে। তখন সেই দুই শরীরের দখল নেয় উষ্ণতা।
ওদের এই অভিজ্ঞতাই ছিল না, দুজনেই বিস্মিত হয়ে পরস্পরের নাম ধরে ডেকে উঠল, আদম! লিলিথ!
উষ্ণতা ক্রমশ সঞ্চারিত হতে লাগল শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আগুনের মতন এতে দহন নেই, আছে পরস্পরের মধ্যে মিলিয়ে যাবার জন্য আশ্লেষ। একসময় আদম অনুপ্রবেশ করল লিলিথের গভীরে।
স্বয়ং প্রকৃতি তাদের নির্দেশ দিতে লাগলেন।
মনুষ্য জীবনে যে এত সুখ আছে তা জানত না দুজনের কেউ।
একসময়ে এই মিলনখেলা সাঙ্গ হবার পর শ্রান্তভাবে পাশাপাশি শুয়ে রইল এই নারী ও পুরুষ! অবিলম্বেই ঘুম এসে গেল।
এরপর কয়েকটি দিন, সকাল নেই, দুপুর নেই, সন্ধ্যা নেই, রাত্রি নেই, যে-কোনো সময়, যে-কোনো স্থানে ওরা মেতে উঠতে লাগল এই মিলনখেলায়। সমস্ত পশু-পাখি, বৃক্ষলতা, কীটপতঙ্গের মধ্যেও যে অনবরত এই মিলনখেলা চলছে, তা আগে ওরা লক্ষই করেনি। এবার সকৌতুকে ওদের লক্ষ করতে লাগল প্রাণীকুল।
দিন কেটে যাচ্ছে এক রোমাঞ্চকর উন্মাদনায়। এখন বৃষ্টি, রৌদ্র, ঝড়, বিদ্যুৎ সবই বেশি বেশি ভালো লাগে। সময় বড়ো মোহময়।
একদিন সেই নদীর খাতে, যেখানে নরম তৃণভূমিতে ওরা এখন একটি শয্যা নির্মাণ করেছে, আদম লিলিথের হাত ধরে মিলনের আহ্বান জানাল।
লিলিথ আদমের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, সখা, অনেকবার আমরা মিলনসুখ পেয়েছি, আমি নীচে, তুমি ওপরে। আজ আমরা বিপরীত বিহার করি না কেন? তুমি আগে শয়ন করো।
আদম বিস্মিতভাবে বলল, আমি নীচে থাকব? কেন?
লিলিথ বলল, দেখি না, কেমন লাগে?
আদম বলল, না, তা হয় না।
লিলিথ চপলভাবে বলল, কেন হবে না। এসো না পরীক্ষা করে দেখি।
আদম বলল, তা হয় না, লিলিথ! প্রথমবার আমরা যেমনভাবে শুরু করেছি, সেটাই প্রকৃতির নির্দেশ। পুরুষের ইচ্ছাটাই নারীর মান্য। নারীর ওপরে পুরুষ।
এবার লিলিথের বিস্ময়ের পালা। ভুরু উত্তোলন করে বলল, প্রকৃতি কে? তিনি আমায় কেন নির্দেশ দেননি?
আদম বলল, প্রকৃতি আমাদের সৃষ্টিকর্তার এক প্রতিনিধি।
লিলিথ বলল, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যে আমাদের বলে গেলেন, আমরা পরস্পরের পরিপূরক!
আদম বলল, অবশ্যই। ক্ষুদ্র ও বৃহতেও তো পরিপূরক হয়। দুর্বল এবং সবলে। আমি তোমাকে সবসময় রক্ষা করব, তুমি আমায় মাধুর্য দেবে। এইভাবে আমরা পরিপূরক।
লিলিথ বলল, একেবারে সমানে সমানে পরিপূরক কি আমরা হতে পারি না?
আদম কিছু না বলে শুধু হাসল।
লিলিথ আবার বলল, এক একদিন আমি আগে অবগাহনে নেমে তোমাকে ডাকি। আবার কোনোদিন তুমি আগে ঝাঁপ দাও। এও তো সে রকম।
আদম বলল, অবুঝ হোয়ো না সখি। এও সেরকম নয়। পুরুষের ওপরে নারীকে যেতে নেই। এসো, আমি উত্তপ্ত হয়েছি।
কেন যেন লিলিথের মনটা বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে গেল, সে আদমের বক্ষে থেকেও তাপ বোধ করল না। সে উঠে গিয়ে নদীতে নামল। একা দাঁড়িয়ে রইল কটিতট নিমগ্ন জলে।
পরদিন আদম আবার তাকে আহ্বান জানাল, আজও লিলিথের সেই একই শর্ত। সে ওপরে থাকবে।
আদম তাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করল। কিন্তু এই কোমলাঙ্গী তরুণীটি যে এমন কঠিন প্রতিজ্ঞ হতে পারে, তা কল্পনাই করা যায়নি।
লিলিথ বলল, আমরা সারা দিনক্ষণ সব কিছু একসঙ্গে করি, তবু কেন আমরা দুজনে সমান হতে পারব না, তা বুঝিয়ে দাও! আমি লক্ষ করছি, আমি কোন গাছের ফল খাব, কোন সরোবরে স্নান করব, সে ব্যাপারেও তুমি আমাকে নির্দেশ দিতে চাও। আমার বোধ-বুদ্ধি তোমার তুলনায় কীসে কম? সরোবরে ফুল ভাসলে সে সরোবর কেন অস্পৃশ্য হবে?
আদম বলল, আমার কথা অনুযায়ী চললে তোমার কদাচ বিপদ হবে না। আমি তোমার সব ভার নিয়েছি, তাই তুমি সবরকম চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পার।
লিলিথ বলল, তোমার শরীর যেসব উপাদান দিয়ে গড়া, আমার শরীরও সেরকম। আমাদের একই রকম প্রাণ, এক জীবন। তবু কেন অসমান হবে? আমি যে বুঝতে পারছি না সখা। আমাকে বুঝিয়ে দাও।
আদম বলল, তোমাকে এত কিছু চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমার কেশে দুটি পুষ্প গুঁজে নেবে? তাহলে তোমাকে আরও সুন্দর দেখাবে!
লিলিথ করুণ কণ্ঠে বলল, আমি সুন্দর হতে চাই না, আদম। আমি তোমার সঙ্গে জীবনের প্রতিটি ব্যাপার সমানভাবে ভাগ করে নিতে চাই।
আদম এবার ঈষৎ বিরক্তভাবে বলল, পুরুষ আর নারী কখনো সমান হতে পারে না—এটাই সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ। তা কি অবহেলা করা যায়!
লিলিথ বলল, তুমি আগে একবার বলেছিলে, প্রকৃতির নির্দেশ। এখন বলছ সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ। তুমি কী করে এই নির্দেশ পাও, আমি কেন পাই না।?
আদম গম্ভীরভাবে বলল, চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করলে যে অভিজ্ঞতা হয়, তা থেকেই এই নির্দেশ বোঝা যায়। সিংহ থেকে শশক পর্যন্ত যে-কোনো প্রাণীদের নিরীক্ষণ করো, সব সৃষ্টির মধ্যে পুরুষ কি প্রধান নয়? পুরুষ উপরে, নারী নীচে।
লিলিথ বলল, পশুজগৎ… কী জানি… সৃষ্টিকর্তা বলেছিলেন, আমরা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
আদম বলল, যদি সব ব্যাপারে সমানই হতে হবে, তা হলে সৃষ্টিকর্তা পুরুষ আর নারীকে পৃথক রূপ দিয়ে সৃষ্টি করলেন কেন? আমাদের শরীরের গড়ন কি কিঞ্চিৎ পৃথক নয়? তুমি কি আমার তুলনায় কিঞ্চিৎ দুর্বল ও খর্ব নও?
লিলিথ বলল, তা ঠিক। হ্যাঁ, ঠিকই তো? আমি এতটা বুঝতে পারিনি। তবে, আর একটা কথা জিজ্ঞেস করব, রুষ্ট হোয়ো না, আমাদের হৃদয়, আমাদের মস্তিষ্ক, তাও কি ছোটো বড়ো? চিন্তাশক্তিতেও কি আমি তোমার চেয়ে ন্যূন?
আদম বলল, বলেছি তো, তোমাকে এসব চিন্তা করতে হবে না।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর লিলিথ আবার আদমের দেহ স্পর্শ করে কোমল কণ্ঠে বলল, থাক মিছে তর্ক। সখা একবার অন্তত আমরা বিপরীত বিহারের পরীক্ষা করে দেখিই না। যদি তাতে উপভোগ আরও বেশি হয়?
আদম বলল, এই কদিন আমরা যেভাবে মিলিত হয়েছি, তাতে কি আমাদের উপভোগের চরম হয়নি? তুমি তৃপ্তির পূর্ণতা লাভ করোনি? বলো, বলো, তবে কেন এবং কীসের জন্য অন্য পরীক্ষা?
আদম মুখ ফিরিয়ে রইল। লিলিথ চলে গেল অন্য দিকে। এইভাবে কাটল কয়েকটি দিন।
তারপর আবার এক মেঘাচ্ছন্ন দুপুরে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে, পাখিরা ডাকছে পরস্পর মিলন কামনায়, ফুলেরা সৌরভ ছড়িয়ে আহ্বান জানাচ্ছে তাদের দয়িতদের, আদমও কামমোহিত হয়ে আলিঙ্গন করতে গেল লিলিথকে।
সে আলিঙ্গনে ধরা দিয়ে লিলিথ অনুনয় করে বলল, একবার বিপরীত বিহার হোক, অন্তত একবার! তুমি আমার এই ইচ্ছেটুকুর মূল্য দেবে না?
এবারে ধৈর্যচ্যুতি হল আদমের। ক্রোধে জ্বলে উঠে সে বলল, বার বার শুধু ওই এক কথা? আমাকে অপদস্থ করতে চাস তুই নারী? তোর ইচ্ছে আবার কী? আমার সকল ইচ্ছে মেনে নেওয়াই তোর জীবনের সার্থকতা।
আদম সবলে লিলিথকে ভূপতিত করতে যেতেই লিলিথ কোনোক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড় দিল।
পুরুষ ব্যাঘ্রের মতন তাকে তাড়া করে গেল আদম।
উত্তেজনায়, দুরন্ত বাসনায়, ক্রোধে চিৎকার করতে লাগল আদম। কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না লিলিথ। একটি সুবৃহৎ বৃক্ষের কাণ্ড প্রদক্ষিণ করে সে ঘুরছে, হাসছে সকৌতুকে।
আদমের মুখে হাসি নেই। তার চক্ষু দুটি জ্বলন্ত।
তার চিৎকারে সমস্ত কাননভূমি যখন কম্পিত, তখন অকস্মাৎ তিনটি প্রাণী সেখানে আবির্ভূত হল। এদের আকৃতি প্রায় মানুষেরই মতন, আবার পক্ষীর মতন ডানাযুক্ত। আকাশচারী এই তিন প্রাণী সৃষ্টিকর্তার দূত, এদের নাম সেনয়, সানসেনয় এবং সেমনগেলফ।
এই তিনজন লিলিথকে ঘিরে ফেলে প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার, এই উদ্যানে এমন অশান্তি কেন?
লিলিথ কিছু বলার আগেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদম বলল, এই নারী আমার অবাধ্য। আমি ওকে যেভাবে কামনা করি, ও তা মেনে নিতে চায় না। ও যদি আমার কথা না শোনে, তবে এমন সহচরীর প্রয়োজন নেই আমার।
লিলিথ এবার কিছু বলতে যেতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে ওদের একজন বলল, এ কী মতিভ্রম তোমার, নারী? সবসময় পুরুষের প্রীতি অর্জন করতে পারলেই তো তুমি সুখী হবে। অবাধ্যপনাতে শুধু অশান্তি।
লিলিথ বলল, আমার একটি কথা শুনুন—
অন্য একজন বলল, শোনার তো কিছু নেই। তুমি এই পুরুষটির অনুগমন করো।
তৃতীয়জন কৌতুকহাস্যে বলল, নারী-পুরুষের এরকম ক্ষুদ্র কলহ তো মাঝে মধ্যে হতেই পারে। সৃষ্টিকর্তা অন্য পশু-প্রাণীদের এই বোধ দেননি, শুধু মানুষকেই দিয়েছেন, তার নাম মান-অভিমান। এই মান-অভিমানও মিলনখেলার অঙ্গ। যাও নারী, আমরা অন্তর্হিত হচ্ছি, তোমরা মান ভেঙে উপগত হও।
লিলিথ এবার অস্থিরভাবে বলল, আমার কথাটা শুনতেই হবে। পুরুষ যে বলল, ওর অবাধ্য হলে আমার মতন সহচরী ও চায় না, তাহলে আমিও কি বলতে পারি না, ও আমার অবাধ্য হলে আমিও ওর মতন সহচর চাই না?
তৃতীয়জন হাসতে হাসতেই বলল, ওসব তো কথার কথা।
প্রথমজন কিন্তু কঠোরভাবে বলল, সহচর নির্বাচনের অধিকার তোমার নেই, নারী! তুমি পূর্বনির্দিষ্ট। পুরুষের প্রয়োজনেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এটা সব সময় মনে রাখবে।
এইসব কথার মধ্যে আদম এসে লিলিথের এক বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। অন্য তিনজনও তাকে ঠেলে দিতে লাগল পুরুষটির দিকে।
পাশবদ্ধ হরিণীর মতন ছটফটিয়ে লিলিথ বলতে লাগল, না, না, আমাকে পাবে না, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শরীর পাবে না, কিছুতেই না, না, না।
এরপর যা কাণ্ড হতে লাগল, তাতে আর যাই হোক, মিলনখেলা কিছুতেই সম্ভব নয়। বলপ্রয়োগে নারীকে পরাস্ত করা যায়, কিন্তু তার কাছ থেকে মাধুর্য আদায় করা যায় না।
একসময় অন্য তিনজনও রুষ্ট হয়ে উঠল। একজন বলল, আদম, তুমি যদি একে না চাও, তবে একে এই পবিত্র উদ্যান থেকে দূর করে দেওয়া যাক!
আদম বলল, আমি আর ওর মুখদর্শন করতে চাই না। আমি নিঃসঙ্গ থাকব, সে-ও ভালো।
সকলে মিলে টানতে টানতে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে লিলিথকে কাননের বাইরে নিক্ষেপ করল। সে জায়গাটি ঢালু হয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে। সেখান থেকে গড়াতে গড়াতে সে গিয়ে পড়ল পাহাড়ের সানুদেশের এক নদীতে। ভাসতে লাগল, অচেতন হয়ে।
তবু তার প্রাণ গেল না। তারপর থেকে সে আশ্রয় নিয়েছে এক গিরিগুহায়। এ পাহাড়েও কিছু গাছপালা আছে। তেমন বৈচিত্র্য নেই বটে, তবে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য যথেষ্ট ফল পাওয়া যায়।
প্রথম কয়েকটা দিন কেটেছিল শুধু কান্নায়।
সে বুঝতেই পারে না, তার কী দোষ হয়েছিল? সে শুধু আদমের সঙ্গে সব ব্যাপারে সমান হতে চেয়েছিল, সে অধিকার তাকে কেন নেওয়া হবে না? সে তো অতিরিক্ত কিছু দাবি করেনি!
মানুষের এত কান্না কোথায় জমা থাকে? অবিরত ক্রন্দনেও অশ্রু ফুরোয় না।
কান্নাতে কোনো কিছুর উত্তরও পাওয়া যায় না।
সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দিয়েছেন মান-অভিমান, অন্য কোনো প্রজাতি এই বোধ পায়নি। এই অভিমান কখনও এমন তীব্র হতে পারে যেন কোনো কোনো মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করতেও দ্বিধা করে না। লিলিথও কয়েকবার নদীর জলে আত্মবিসর্জন দেবার কথা চিন্তা করেছে, শেষ পর্যন্ত পারেনি।
কিছুদিন পর তার মন দুর্বল হয়ে গেল। দিনগুলি তবু কাটে কিন্তু রাত্রিগুলি যেন শেষই হতে চায় না। নিঃসঙ্গতা তাকে অসহ্য অস্থির করে দেয়। আদমের সঙ্গে তার কয়েকটি ঋতু একসঙ্গে সহবাস করার সুখস্মৃতি তার মনে পড়ে সর্বদা। সেই স্মৃতিতেই তার সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চ হয়।
একদিন সে ঠিক করল, এভাবে জীবনযাপন করা অর্থহীন। বরং আদমের প্রভুত্ব মেনে নেওয়াই ভালো। আদমের সব ইচ্ছা সে মান্য করে চলবে। আদমের কাছে গিয়ে দয়া ভিক্ষা করলে কি আদম তাকে ফিরিয়ে নেবে না?
পুরুষের নীচে থাকাই যদি নারীর নিয়তি হয়, তবে তা অস্বীকার করে লাভ কী?
এইসব কথা সে ভাবে, মনস্থির করতে পারে না, ফিরে যাবার মতন মনোবলও আসে না। এরই মধ্যে এক প্রভাতে সৃষ্টিকর্তার সেই তিন দূত এসে উপস্থিত হল তার সামনে।
প্রথমজন, সেনয় বলল, তোমাকে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, সেই দণ্ড প্রত্যাহার করা যেতে পারে, যদি তুমি পূর্বশর্তগুলি মেনে নাও।
দ্বিতীয়জন, সানসেনয় বলল, তুমি আর চাপল্য দেখিয়ে পুরুষের সমান হতে চেয়ো না। তোমার আরও সুখের দিন আসন্ন। আদমের অনুগত হয়ে তুমি থাকবে সেই পবিত্র কাননে।
তৃতীয়জন, সেমনগেলফ কিছুটা কৌতুকের সুরে বলল, দেখো, কালে কালে পুরুষ নিজেই তোমার অনুগত হতে চাইবে, তুমি মুখে কিছু বলো না।
লিলিথ তো সব শর্ত মেনে নিতে রাজিই। এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সে ফিরে যেতে চায় এই কন্দর ছেড়ে। শুধু তার একটিই আশঙ্কা আছে।
সে নতনেত্রে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, আদম বলেছিল, সে আমার মতন সহচরী চায় না। এমনকি সে আর আমার মুখদর্শনও করতে চায় না। তার ক্রোধ কি প্রশমিত হয়েছে? সে কি আমাকে পুনঃগ্রহণ করতে রাজি আছে?
প্রথমজন বলল, আমরা বুঝিয়ে বললে সে অবশ্য রাজি হবে। কারণ, এখন তোমার গর্ভে তার সন্তান।
সন্তান? সে আবার কী বস্তু?
তবে কয়েকদিন ধরে লিলিথ অনুভব করছে বটে যে তার নিম্ল উদরটি কিছুটা স্ফীত হয়েছে, মাঝে মাঝে উদরের গভীরে কী যেন নড়াচড়া করে।
আহত অভিমানে লিলিথ বলল, আমার জন্য সে ব্যাকুল হয়নি। আমার গর্ভে কিছু একটা এসেছে বলেই সে আমাকে গ্রহণ করতে চায়?
দ্বিতীয় দূত বলল, শোনো নারী, তোমার মধ্য দিয়ে পুরুষ তার বংশবিস্তার করবে বলেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। নইলে আদমের সঙ্গী হিসেবে তো আর একটি পুরুষকেই নির্মাণ করা যেত! সৃষ্টিকর্তা তো নিজ হাতে বারবার মানব সৃষ্টি করতে পারেন না, সে ভার দেওয়া হয়েছে পুরুষকে। তুমি হবে ভবিষ্যৎ মানবদের গর্ভধারিণী।
লিলিথ বলল, আমি ধারণ করব? বেশ! কিন্তু কখন, কোন ঋতুতে আমার শরীর গ্রহণক্ষম হবে, তা আমি ঠিক করতে পারব না? আমারই তো শরীর?
প্রথম দূত বলল, শরীর তোমার। তুমি আধার মাত্র। তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।
আবার দপ করে জ্বলে উঠল লিলিথের তেজ।
সে বলল, আমার বাসনার কোনো মূল্য দেওয়া হবে না? আমি চাই না অমন মিলন। আদমকে গিয়ে বলুন, আদম নিজে এসে যদি আমাকে যাচ্ঞা করে, তবেই আমি ফিরে যাব। নইলে আমার গিরিকন্দরই ভালো।
এরপর কিছুক্ষণ ধরে তিনজন দূত নরম ও গরম ভাষায় লিলিথকে বোঝাবার চেষ্টা করল, কিন্তু অনড় হয়ে রইল লিলিথের জেদ। আদম নিজে এসে তার মিলন ভিক্ষা না করলে সে এখান থেকে এক পাও নড়বে না!
তখন প্রথম দূত আঙুল তুলে অভিশাপ দিল, তবে থাক তুই এখানে চিরনির্বাসিতা হয়ে। তোর গর্ভের সন্তানকে আমি ধবংস করে দিচ্ছি! পুরুষের বীর্যে আর তোর অধিকার রইল না। তুই আর কোনোদিন সন্তান পাবি না।
সেই অভিশাপে প্রায় দগ্ধ হয়ে ভূপতিত হয়ে রইল লিলিথ।
গর্ভ নষ্টে অসুস্থ হয়ে রইল দিনের পর দিন। তবু তার অদম্য প্রাণশক্তি। তার মৃত্যু হল না।
আবার শরীরের বল ও রূপ ফিরে পেয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর তার সঙ্গীর প্রয়োজন নেই। সে পশুপাখি, বৃক্ষ-লতাপাতার সঙ্গেই বন্ধুত্ব করে নেবে। যদি আকাশকে আপন করে নেওয়া যায় তাহলে আর কোথাও কোনো শূন্যতা থাকে না।
তবু মন যে মানতে চায় না। এক এক সময় বড়ো বেশি উতলা হয়ে ওঠে। জল যেমন জলের দিকে ধায়, তেমনই শরীর পেতে চায় আর একটি শরীর। রতি-অতৃপ্তির জন্য দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
এইভাবে আরও দুটি ঋতু পার করে দেবার পর আজ সে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারেনি। সারা রাত নিদ্রাহীনতার মধ্যে সে শুধু আদমের কথাই চিন্তা করেছে। সমস্ত শরীর-মন আকুল হয়ে আছে সেই পুরুষটির জন্য।
তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই দীর্ঘপথ পার হয়ে সে গোপনে প্রবেশ করেছে আদিম কাননে। সে শুধু একবার মাত্র আদমকে প্রশ্ন করবে, সখা, তুমি সত্যিই আমাকে আর চাও না? তুমি আমাকে ঘৃণা করো? যদি তাই হয়, তাহলে আমি আর কখনও তোমার সম্মুখে আসব না। তোমাকে আর আমার মুখদর্শন করতে হবে না। আমি চিরবিদায় নেব! আমাদের সেই মধুর দিনগুলি তোমার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে।
দূর থেকে একবার আদমকে দেখেও লিলিথ তার নিকটে যেতে সাহস পেল না। যদি আদম রূঢ় বাক্যে তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা সে সইতে পারবে তো? বরং দূর থেকে যতক্ষণ পারা যায়, আদমের জীবনযাত্রা লক্ষ করা ভালো, সে যদি আপনমনে কখনও লিলিথের নাম উচ্চারণ করে ফেলে, কিংবা যে-যে স্থানে তাদের রতিশয্যা পাতা হয়েছিল, সেইসব স্থানে যদি আদম একাকি গিয়ে শুয়ে থাকে, তবে হয়তো তার স্মৃতিকাতরতা বোঝা যাবে।
ছায়ার মতন আদমকে অনুসরণ করতে লাগল লিলিথ।
না, ঠিক ছায়া বলা যায় না, মাঝখানে দূরত্ব অনেকখানি। আর সে সবসময় নিজেকে আড়ালে রাখে। হাঁটে নিঃশব্দে। আদম কোথাও থেমে গেলে সেও কোনো বৃক্ষের নীচে অপেক্ষা করে।
একবার আদম সেই শুষ্ক নদীর খাতের ধার দিয়ে গেল, যেখানে এক বর্ষণমুখর দিনে তাদের প্রথম মিলন হয়েছিল। আদম সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করল না।
লিলিথ লক্ষ করল, আদমের যেন কিছু কিছু পরিবর্তন হয়েছে এর মধ্যে। মাঝে মাঝে সে কণ্ঠে একটা সুর তুলছে গুনগুন করে। আগে এমন শোনা যায়নি। বৃক্ষলতাদের মধ্যে শুধু ফলবান বৃক্ষদের প্রতিই ছিল তার আকর্ষণ, তার প্রিয়, নির্বাচিত ফল আহরণের জন্য। ফুলের প্রতি মনোযোগ দিত না। এখন সে স্নেহস্পর্শ ফুল্ল কুসুমকে। কোনো লতাকে জড়িয়ে দিচ্ছে বনস্পতির গায়ে।
এক স্থলে এক সঙ্গে অনেক ফুল ফুটে আছে, সেসব ছিঁড়ে নিয়ে আদম বসে পড়ল মাটিতে তারপর গাঁথতে লাগল মালা। লিলিথের বেশ কৌতুক বোধ হল। যখন দুজনে একসঙ্গে ছিল, তখন লিলিথ কখনো-কখনো মালা গেঁথেছে বটে, পরেছে নিজের গলায়। আদমকেও পরাতে গেছে, কিন্তু আদম স্বস্তি বোধ করেনি, ছিঁড়ে ফেলেছে একটুক্ষণ পরেই।
আজ আদম মালা গাঁথছে নিজের কণ্ঠে ধারণ করার জন্য? তবে কি লিলিথের কথা মনে পড়ছে তার? এবার সে আদমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারে?
তার দ্বিধা কাটার আগেই আদম মালাটি গেঁথে উঠে দাঁড়াল। নিজের গলায় দিল না। মালাটি হাতে নিয়ে ছুটতে শুরু করল। উচ্চকণ্ঠে কী যেন একটা শব্দ বার করছে।
লিলিথও তাল রক্ষা করে ছুটতে লাগল, সেই দিকে।
একটুক্ষণ পরেই সে থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল তার। আর একটি নারী।
আদম ছাড়া এ উদ্যান জনশূন্য বলে ধরেই নিয়েছিল সে। তা তো নয়, এর মধ্যেই আদমের একটি সঙ্গিনী এসে গেছে। সৃষ্টিকর্তা গড়ে দিয়েছেন আর একটি নারী? সৃষ্টিকর্তাও লিলিথের সব অধিকার প্রত্যাহার করে নিয়েছেন?
অপর নারীটিও প্রায় লিলিথেরই আদলের। শুধু সে লিলিথের মতন তীক্ষ্ণনাসা নয়, চক্ষু দুটিতে ঘুম ঘুম ভাব। এ ছাড়া তার বক্ষের ডৌল, কোমরের খাঁজ ও নিতম্বের গড়ন একেবারে নিখুঁত।
সেই নারীটিও কয়েকটি বড়ো বড়ো গাছের পাতার ওপর কিছু ফলমূলের আবরণ-ত্বক ছাড়িয়ে রাখছে আদমকে দেখে সহাস্যে সম্ভাষণ জানাল।
আদম সেখানে বসে পড়ে মালাটি পরিয়ে দিল নারীটির কণ্ঠে। নারীটি পুলকিত হয়ে ফুলগুলি দেখল প্রথমে। তারপর একপাতা ফল তুলে একটি একটি করে খাওয়াতে লাগল তার পুরুষকে।
লিলিথ কখনও আদমের মুখে ফল তুলে দেয়নি, কখনও একই ফল খেয়েছে দুজনে দু-দিক থেকে। কিংবা যার যখন ক্ষুধা বোধ হয়েছে, বৃক্ষ থেকে ফল আহরণ করে ভক্ষণ করেছে।
ওদের আহার শেষ হবার পর নারীটি চলে এল আদমের পিঠের দিকে। সেই ঘর্মাক্ত প্রশস্ত পৃষ্ঠদেশে হস্ত সঞ্চালন করতে লাগল সে।
কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে অতি সন্তর্পণে লিলিথ আর একটু কাছে এল।
আদমের পৃষ্ঠদেশে ছোটো ছোটো সাদা সাদা কী যেন হয়েছে। ওগুলি ঘর্মচর্চিকা, অন্য নারীটি তার নখ দিয়ে চেপে ধরছে সেগুলিকে। বেশ আরাম বোধ হচ্ছে আদমের।
তারপর আদম লম্বা হয়ে শয়ন করল। আবার এদিকে চলে এসে নারীটি পদসেবা করতে লাগল তার। আদমের চক্ষু বুজে এল, তরুণীটি দু-হাতে মর্দন করতে লাগল তার পা।
এসব কিছু জানেই না লিলিথ।
সে আর অশ্রু সংবরণ করতে পারল না। পাছে তার কান্নার শব্দ হয়, তাই দ্রুত সরে গেল সেখানে থেকে।
একটি ঝরনার ধারে এসে ঝুঁকে পড়ে সে তার অশ্রুবিন্দু মেশাতে লাগল জলে।
দু-একবার আদমের ডাক শুনে সে বুঝতে পেরেছে, ওই দ্বিতীয় নারীটির নাম হবা। এখন এই পবিত্র উদ্যান শুধু ওদের দুজনের। লিলিথ আর এখানকার কেউ নয়। আদম আর কোনোদিন তাকে কামনা করবে না।
কতক্ষণ মনোবেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল লিলিথ তার ঠিক নেই। এক সময় নিদ্রিত হয়ে পড়ল সেখানেই। সর্বসন্তাপহারী নিদ্রা।
আবার যখন সে জাগরিত হল, তখন দিনমণি অস্তাচলে গেছেন। আকাশের অধিপতি এখন চন্দ্র। আজ আকাশ একেবারে নির্মেঘ। চন্দ্রকিরণে সমস্ত কানন অপরূপভাবে আলোকিত হয়ে আছে। সুপবন আমোদিত হয়ে আছে ফুলের সৌরভে।
ফিরে যেতে হবে, তবু পা উঠছে না লিলিথের। আজ থেকে সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল। কোনো আশাও রইল না।
বঞ্চনার দুঃখ থেকে হঠাৎ হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠতে পারে রোষবহ্নি। লিলিথের রক্তপ্রবাহ দ্রুত হল, নাসারন্ধ্র দিয়ে বেরতে লাগল উষ্ণ নিশ্বাস। জ্বলন্ত হল দুই চক্ষু।
সে তার সব অধিকার ছেড়ে দেবে? কী অপরাধ করেছে সে! সে এখনও মনে করে, সৃষ্টিকর্তা তাকে আর আদমকে সমানভাবে গড়েছেন। তবু কেন আদমের প্রতি তাঁর এই পক্ষপাতিত্ব?
সৃষ্টিকর্তা কি জানেন, নারীর মান-অভিমান বোধের চেয়েও আর একটি বোধ কত প্রবল হতে পারে? তার নাম ঈর্ষা।
পূর্বাপর চিন্তা না করে সে ধেয়ে গেল আদম ও হবার সন্ধানে।
এক স্থানের ঘন লতাকুঞ্জের মধ্যস্থলে খানিকটা ভূমি পরিষ্কার করে লিলিথ রাত্রিযাপন করত আদমের সঙ্গে। স্থানটি প্রায় চারদিক ঘেরা। প্রথমেই লিলিথ গেল সেদিকে।
ঠিক সেখানেই শুয়ে আছে দুজনে। এ নীড় তো লিলিথেরই গড়া, এখানে অন্য নারীকে স্থান দিতে একটুও চক্ষুলজ্জা হল না আদমের?
দুজনেই নিদ্রায় বিভোর। আদম শুয়ে আছে আকাশমুখী হয়ে, হাত-পা ছড়িয়ে, এটাই তার শয়নের নিত্যদিনের ভঙ্গি। হবা একটু দূরে গুটিসুটি হয়ে ঘুমন্ত।
একটুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল লিলিথ। শুধু আকাশের চন্দ্র ছাড়া আর কেউ তাকে দেখছে না। ঈষৎ শীতের বাতাসের মধ্যেও তার শরীরে ফুটে উঠেছে বিন্দু বিন্দু স্বেদ।
হঠাৎ আর আত্মসংবরণ করতে পারল না লিলিথ। সে সোজা গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আদমের উন্মুক্ত বক্ষে।
সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠল আদম। স্পর্শমাত্রই সে বুঝেছে, এ তার বর্তমান সঙ্গিনী নয়, পূর্বের নারী।
সে চিৎকার করে বলল, আবার তুই এসেছিস।
সে ঠেলে সরিয়ে দিতে গেল লিলিথকে। লিলিথও কিছুতেই নিজের দাবি ছাড়বে না।
ধস্তাধস্তির শব্দে জেগে উঠল হবা। সে বিস্ময়ে বিহ্বল। সে লিলিথের অস্তিত্বই জানে না। সে ভাবল, এ বুঝি কোনো অপ্রাকৃত উৎপাত।
সেও টেনে সরাতে গেল লিলিথকে। লিলিথের শরীরে যেন এখন দারুণ শক্তি, ওরা দুজনে মিলেও তাকে নিরস্ত করতে পারছে না।
অচিরে হাজির হল সৃষ্টিকর্তার সেই তিন দূত। এবারে লিলিথের চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করিয়ে দিল তারা। আর শুধু ভর্ৎসনা বা কটুবাক্য নয়, নির্মমভাবে প্রহার করতে করতে নিয়ে চলল এই নারীকে। রক্তাক্ত হয়ে গেল লিলিথের সর্বাঙ্গ।
এক ঘৃণ্য প্রাণীর মতন কাননপ্রান্তে তাকে ছুড়ে দিয়ে সেই দূতত্রয় বলল, এই শেষবার! আবার এখানে এলে তোর মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য।
অত প্রহার সত্ত্বেও লিলিথ ভয় পায়নি, তার ক্রোধও কমেনি। প্রতিশোধস্পৃহায় তার রক্ত এখন ফুটন্ত।
গুহার দিকে যেতে যেতে সে একটি বৃক্ষের নীচে একটি বিচিত্র প্রাণীকে দেখতে পেল। এ সেই স্থূলকায় সর্পটি, খোলস এখনও লেগে আছে, তার থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি প্রায় মনুষ্যাকৃতি মুখ, তার মস্তকে দুটি ছোটো শৃঙ্গ।
মনুষ্য ভাষায় সে বলল, দাঁড়াও, লিলিথ। তুমি আমাকে চিনতে পারনি। তোমার সৃষ্টিকর্তার চেয়ে আমি কিছু কম শক্তিশালী নই। আমার নাম ইবলিশ। তুমি আমার সঙ্গিনী হও। আমরা দুজনে মিলে তোমার সৃষ্টিকর্তার এই অবিচারের প্রতিশোধ নেব!
লিলিথ তার সৃষ্টিকর্তাকে দেখেছে। সে ছিল আদমের মতন সুপুরুষের মিলনসঙ্গিনী। সে এখন এই কদাকার প্রাণীটির সঙ্গিনী হবে? তার ঘৃণাবোধ হল। প্রতিশোধ নিতে হলে সে একাই নেবে। সে সদর্পে বলল, তুমি দূর হও।
লিলিথ ফিরে চলল তার গুহার দিকে। সে ঠিক করেছে, সে আর কখনও কাঁদবে না।
আহত বাঘিনীর মতো সে চাটতে লাগল নিজের শরীরের ক্ষতস্থানগুলি।
সে রাত্রে বিস্ময়ে ও ভয়ে বড়ো বেশি আপ্লুত হয়ে পড়েছিল হবা। আদম অনেকক্ষণ ধরে নানারকম সান্ত্বনা বাক্যে তাকে আশ্বস্ত করতে সমর্থ হল। প্রকৃতির উপাদান নয়, হবাকে গড়া হয়েছে আদমেরই একটি পঞ্জর দিয়ে। তাই সে আদমের সঙ্গে একাত্ম, সে সবসময় আদমের কথা মান্য করে। আদম বার বার বলল, ওই হিংস্র রমণীটি আর কখনও আসবে না। সৃষ্টিকর্তার দূতরা নজর রাখবেন, ওই রমণী আবার এই কাননে পদপাত করলেই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। তুমি আর চিন্তা কোরো না, হবা। সব চিন্তার ভার আমার।
কিন্তু কয়েকদিন পরেই ফিরে এল লিলিথ। দূতদের অগোচরে।
মধ্যরাত, আদম ও হবা দুজনেই নিদ্রাবিষ্ট। যথারীতি হবা একটু দূরে, কারণ আদম ঘুমের মধ্যেও হাত-পা সঞ্চালিত করে। চিৎপাত হয়ে শয়ন করতেই ভালোবাসে সে।
অকস্মাৎ আদম টের পেল তার বক্ষের ওপর কেউ এসে পড়েছে। চেনা স্পর্শ, অবশ্যই লিলিথ। আদম তাকে ঠেলে সরাতে গেল, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, তার হাত দুটি শক্তিহীন অবস্থায় পাশে পড়ে রইল, উঠল না! সে চিৎকার করতে গেল, ফুটল না কণ্ঠ। সে পাশ ফিরে হবাকে ডাকতে গেল। সক্ষম হল না। এমনকি সে মেলতেও পারল না চক্ষু। সে নীচে, ওপরে লিলিথ তার সর্বাঙ্গ জুড়ে আছে। তাকে নিজের গভীরে নিতে চাইছে। তার দুই রম্ভোরু দিয়ে দিচ্ছে প্রবল চাপ। বাধা দেবার সব শক্তিই চলে গেল আদমের। আবেশ ছড়িয়ে পড়ল দেহ জুড়ে। তার রেতঃপাত হয়ে গেল এক সময়।
তারপর ধড়মড় করে উঠে বসল আদম।
কোথায় লিলিথ? সে তো নেই। সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ রাত, ভূমিতে খসে পড়া শুষ্ক পত্ররাজিতেও কোনো পদশব্দ শোনা যাচ্ছে না। হবাও জাগেনি, নিশ্চিন্তে নিদ্রিত। তবে কি লিলিথ হানা দিয়েছিল শুধু স্বপ্নে! কিন্তু সে বীর্য হরণ করেছে, তা স্বপ্ন নয়, সত্য।
হবাকে কিছুই বলল না আদম। বিমূঢ় হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর কেটে গেল বহু ঋতু ও যুগ। অনেক পুত্রকন্যার জন্ম দিল দুজনে। তাদেরও সন্তানসন্ততি হল। বৃদ্ধ হয়ে পিতামহ ও পিতামহী হিসেবে সুখ ভোগ করে এক সময় আদম ও হবা মৃত্যুবরণ করল।
লিলিথ কিন্তু রয়ে গেল।
অতৃপ্ত, বঞ্চিত, অপূর্ণ রতির ক্ষোভ নিয়ে সে বেঁচে রইল যুগের পর যুগ। তার নশ্বর শরীর? অদৃশ্য হয়ে গেল বটে, তবু সে দেখা দেয় যুবা পুরুষদের স্বপ্নে।
অমিতার কথা
অমিতার কথা
বইটা শেষ করে এক পাশে নামিয়ে রাখল অমিতা।
বুকের মধ্যে দারুণ মোচড়াচ্ছে, গলার কাছে কী যেন আটকে আছে, এইবার চোখ ফেটে জল আসবে। কিন্তু কাঁদতে চায় না অমিতা, বই পড়ে কান্নার কোনো মানে হয়! তবু সে সামলাতে পারল না, আঁচল চাপা দিল চোখে।
নিস্তব্ধ দুপুর, ছাপ্পান্ন বছর বয়েসি এক মহিলা, উপন্যাসের পাতার কাল্পনিক নায়ক-নায়িকার সমব্যথী হয়ে কাঁদছে। কেউ দেখার নেই।
দুঃখের বই নয়, যাকে বলে সাধারণ বিয়োগান্ত কাহিনি, তাও নয়, ওসব পড়লে অমিতার কান্না আসে না। উপন্যাসের মধ্যে মৃত্যু বা বিচ্ছেদ তো থাকেই, ঠিকমতন লেখা হলে তাতে অল্প ব্যথার অনুভূতি হয় এবং যদি তা হয় জীবনের সার্থক রূপ, তাতে যে রসের সৃষ্টি হয়, তা আসলে আনন্দই দেয়। সাহিত্যপাঠ তো সেই জন্যই।
কিন্তু অমিতা ভুল বোঝাবুঝি একেবারে সহ্য করতে পারে না। জীবনটা এত ছোটো, তবু কত সামান্য ভুল বোঝাবুঝির জন্য নষ্ট হয়ে যায় কত সুন্দর সম্পর্ক। লেখক অনিমেষ রায়চৌধুরি এই রকম একটা ভুল বোঝাবুঝির কাহিনিই লিখেছেন বড়ো নিস্পৃহভাবে। লেখকরা এমন নিষ্ঠুর হন কেন?
একটা বাড়ির কথা প্রায়ই মনে পড়ে অমিতার। এই ধরনের বই পড়লে সেই বাড়িটার দু-ধরনের রূপ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যাদবপুরের দিকে রাস্তার ধারে ছোটোখাটো একটা পুকুর, সেখানে তৈরি হচ্ছিল একটা বাড়ি। তখন অমিতাকে প্রায়ই যেতে হত যাদবপুরে তার দেওরের বাড়িতে, যাওয়া-আসার পথে চোখে পড়ত, সাধারণ বাক্স-ধরনের বাড়ি নয়, বোঝাই যায় বেশ শখের বাড়ি, নানান ধরনের বারান্দা, বাইরের দিকে দু-তিনখানা সিঁড়ি। এক সময় বাড়িটা সম্পূর্ণ হল, চোখ জুড়ানো রং হল, বাসের যাত্রীরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। অমিতার দেওর দিল্লিতে বদলি হবার পর আর ওদিকে যেতে হয়নি। বছরখানেক পর এক রবিবার সকালে পিকনিক ছিল সোনারপুরে, গাড়িতে যেতে হঠাৎ সেই সুশ্রী বাড়িটার কথা মনে পড়ায় জানালা দিয়ে দেখতে গিয়ে আঁতকে উঠেছিল অমিতা! বাড়িটা সেখানে নেই। একটা নতুন বাড়ির জায়গায় রয়েছে একটা পোড়ো বাড়ি। তবে কি জায়গাটা ভুল হল? না, এই তো সেই পুকুর, আর এক পাশে স্টেট ব্যাংক। একই বাড়ি, আগে ছিল ভোরের আকাশ-নীল, এখন রান্নার হাঁড়ির মতো কালো, এমনভাবে পুড়েছে যে কায়দার সিঁড়ি ও বারান্দাগুলো অদৃশ্য।
অমিতা পাশ ফিরে তার স্বামীর বাহু চেপে ধরে ব্যাকুলভাবে বলেছিল, ওই দ্যাখো, বাড়িটা পুড়ল কী করে?
সুবিমল সহসা উত্তেজিত হয় না। তার ধারণা, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই অকারণে বাজে কথা বলতে ভালোবাসে, বিশেষত স্ত্রীজাতি সম্পূর্ণ যুক্তিহীন জীবনযাপন করে।
সে মৃদু হাস্যে বলল, আমি সবজান্তা নই। কোন বাড়ি কেন পোড়ে তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাবই বা কেন?
সুবিমলের কাছে সব সময় এ রকমই উত্তর পায়, তবু অমিতার মনে থাকে না, সে তার ব্যাকুলতা বা তীব্র অনুভূতি ভাগ করে নিতে চায় স্বামীর সঙ্গে।
সারাদিন ওই বাড়িটার কথাই মন জুড়ে ছিল অমিতার, পিকনিকে মন বসাতে পারেনি। স্বামীর অফিসের সহকর্মীদের পিকনিক, তেমন উপভোগ্যও হয় না, কোনোবার এমনিই আসতে হয়।
অমন স্বপ্ন দিয়ে গড়া বাড়িটা এক বছরের মধ্যে কেন পুড়ে বীভৎস হয়ে গেল? বাড়ি তো নয়, একটা সংসার। কত সংসার ওরকম নষ্ট হয়ে যায় ভুল বোঝাবুঝিতে ইলেকট্রিকের আগুন, গ্যাস স্টোভ ফেটে যাওয়া, বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার কথা অমিতার মনে আসে না। সে যেন দেখতে পায় এক অচেনা স্বামী-স্ত্রীকে, তাদের জন্য তার খুব কষ্ট হয়।
অনিমেষ রায়চৌধুরীর উপন্যাসটা অমিতা আবার তুলে নিল, শেষ কয়েকটা পাতা তার আর একবার পড়তে ইচ্ছে করছে।
যে বই পড়ে কষ্ট হয়, চোখে জল আসে, সেই বইও মানুষ আবার পড়তে চায় কেন?
অশোক আর ঊর্মিলা এই কাহিনির নায়ক-নায়িকা, শেষ পরিচ্ছেদে তারা তীব্র অভিমানে পরস্পরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ ভালোবাসা ক্ষয়ে যায়নি, মানুষ হিসেবেও দুজনেই অসৎ নয়। লেখক তো ইচ্ছে করলেই ওদের ভুল ভেঙে দিতে পারতেন। একটা-দুটো বাক্যই যথেষ্ট ছিল। অমিতা যদি কোনোক্রমে এই কাহিনির মধ্যে ঢুকে পড়তে পারত, তা হলে সে বলে দিত, ওরে ঊর্মিলা, ভুল বুঝছিস কেন, অশোক তোকে সত্যিকারের ভালোবাসে, বাকি সব ঘটনা তুচ্ছ!
বইটা নামিয়ে পাশে রেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অমিতা। দু-চোখ দিয়ে নেমে আসছে কান্নার ধারা। এই সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল এক যুবা। পঁচিশ-ছাবিবশ বছর বয়েস, সুঠাম স্বাস্থ্য, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গালে অল্প অল্প দাড়ি, জিনস ও হলুদ গেঞ্জি পরা, ঠিক যেন আধুনিকতার ছাঁচে তৈরি।
যুবকটির ভুরু কুঁচকে গেল, সে বলল, এ কী, কী হয়েছে?
হাসি ফুটে উঠল অমিতার মুখে, বেশ ঝলমলে হাসি, চোখে জল থাকলেও মানুষ হাসতে পারে, তখন মুখখানা অপরূপ দেখায়।
সে বলল, এ কী, জোজো, তুই হঠাৎ চলে এলি যে?
জোজো অর্থাৎ নিপুণ বলল, তুমি কাঁদছ কেন, কোনো খারাপ খবর এসেছে?
না, না, সেসব কিছু না। তুই আজ ফিরে এলি কী করে?
কেন, তাতে তোমার আপত্তি আছে? ছেলে বাড়ি ফিরে এলে মা খুশি হয় না?
সে কথা হচ্ছে না, তুই চলে এলি…দুর্গাপুরে তোর জরুরি কাজ ছিল—
মনে করো, সাডেনলি আই ফেলট হোমসিক…ওখানে এত বাজে রান্না, আই মিসড ইয়োর আলুপোস্ত।
এই দুপুরবেলা…কোন ট্রেন?
কথা বলতে বলতে বাচ্চা মেয়ের মতন, কোনো অপরাধ করে ধরা না পড়ার জন্য আস্তে আস্তে বইটাকে পেছন দিকে সরাবার চেষ্টা করল অমিতা। নিপুণ ঠিক দেখে ফেলেছে। কাছে এসে বলল, বাংলা বই…এই জন্য চোখের জল…বেঙ্গলি বুকস আর লাইক অনিয়ানস।
বাজে কথা বলিস না। তোরা তো কিছু পড়িস না—
তোমাকে আগেও বাংলা বই পড়ে কাঁদতে দেখেছি।
শেকসপিয়রের ওথেলো পড়িসনি? তোর কষ্ট হয়নি?
হু রিডস শেকসপিয়র দিজ ডেইজ? মা, আই অ্যাম স্টারভিং!
খেয়ে আসিসনি? এক্ষুনি খাবার গরম করে দিচ্ছি। চান করবি না?
ছোটো দোতলা বাড়ি, সুবিমলের বাবার আমলের। এক সময় বাড়ি ভরতি লোক ছিল, এখন স্বামী-স্ত্রী দুটি মাত্র প্রাণী। নিপুণ প্রায়ই থাকে না, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে জার্মানিতে। সেই জন্য কাজের লোক বেশি রাখা হয়নি। একটি ঠিকে মেয়ে দু-বেলা রান্না করে দিয়ে যায়, আর অনেক দিনের পুরোনো লোক রামরতন সরকারি অফিসে চাকরি করে, রাত্তিরে থাকে এখানে। বাড়ি পাহারা দেবার ভার তার ওপর।
দুপুরবেলা একতলাটা একেবারে ফাঁকা থাকে। তাতে একটাই অসুবিধে, হঠাৎ কেউ এলে অমিতাকে নীচে এসে দরজা খুলতে হয়। বাবা আর ছেলের কাছে চাবি থাকে, অন্য কেউ বেল বাজালে অমিতা দোতলার বারান্দায় এসে দেখে নেয়। ফেরিওয়ালা বা অচেনা কারোকে দেখলে খোলেই না।
রান্নাঘর একতলায়। ফ্রিজে কিছু-না-কিছু খাবার থাকেই। নিপুণ ভাত খেতে চায় না, পাউরুটি আছে। খানিকটা মাংসও আছে, নিপুণ এর বেশি খাবে না। ফ্রিজে দু-বোতল বিয়ারও আছে ঠান্ডা হয়ে, যদি ওর ইচ্ছে হয় তো নেবে। মাইক্রোওয়েভে মাংসটা গরম করতে দিয়ে অমিতা গোটাচারেক টোস্ট সেঁকে নিল।
স্নান করেনি নিপুণ, এর মধ্যে কমপিউটার নিয়ে বসে গেছে। ইন্টারনেটের প্রবল নেশা। এক একদিন কমপিউটারের সামনে বসে সারারাত কাটিয়ে দেয়। একটা ইঁদুর দেখিয়ে দেয় সারা পৃথিবী।
মাংসের বাটিতে টোস্ট চুবিয়ে খেতে খেতে নিপুণ বলল, প্রথমে তোমার চোখে জল দেখে আমার মনে হল, দিম্মার বুঝি কিছু হয়েছে—
অমিতার মা থাকেন পাটনায়, আশি বছর বয়সে আছাড় খেয়ে পা ভেঙেছিল। শয্যাশায়ী হলেও এতে অবশ্য মৃত্যুভয় নেই।
হাউ ইজ শি?
দিম্মা একই রকম আছে। রাত্তিরে ফোন করব।
সাডেনলি আই রিয়ালাইজড, তোমার চোখে জল থাকলে মুখটা অন্য রকম হয়ে যায়। মেয়েদের সবচেয়ে পিওর দেখায়, যখন তারা কাঁদে।
সেইজন্যই বুঝি পুরুষজাতটা এতকাল ধরে মেয়েদের কাঁদাচ্ছে।
আই ডোনট রিপ্রেজেন্ট পুরুষজাত টু ইউ! আই অ্যাম ইয়োর ডিয়ার লিটল সান।
অন্য মেয়েদের কাঁদাসনি যেন। সুপর্ণার কী খবর রে? অনেকদিন আসে না।
ওসব কথা বলার এখন সময় নেই। গেট লস্ট। আমার অনেক কাজ আছে। রাত্তিরে আলুপোস্ত রান্না কোরো।
অমিতা চলে এল নিজের ঘরে। ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। একেবারে স্থির হয়ে।
বিয়ের পর এই বাড়িতেই কেটে গেল তিরিশ বছর। সে গৃহকর্ত্রী, কোণের ঘরটায় বসে আছে তার একমাত্র ছেলে, তার স্বামী ফিরে আসবে সন্ধের সময়, কয়েক মুহূর্তের জন্য এই সব বোধই কেমন যেন হালকা হয়ে গেল, যেন অস্পষ্ট জলরঙে আঁকা। এর তুলনায় অশোক আর ঊর্মিলা নামে দুজন নারী-পুরুষ অনেক বেশি বাস্তব। অন্য রাস্তায়, অন্য একটা বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে অশোক আর ঊর্মিলা।
সুবিমল বলেছিল, সারাদিন তুমি একা থাক, মেয়েটার বিয়ে হলে গেল, জোজো তো বাড়িতে থাকবেই না। তুমি সময় কাটাবে কী করে? লেখাপড়া শিখেছ, কিছু একটা কাজ নাও, স্কুলে-টুলে পড়াবার দরকার নেই, একটা ছোটোখাটো ব্যাবসা করে দিতে পারি।
অমিতা রাজি হয়নি। ব্যাবসা সম্পর্কে তার ভয় আছে। একবার জয়ন্তী আর শ্রীলেখার সঙ্গে মিলে শখ করে শাড়ির ব্যাবসা শুরু করেছিল। মাঝপথে বন্ধ হয়ে অনেক টাকা দণ্ড গেছে। তার স্বামীরই তো টাকা।
তা ছাড়া ব্যাবসা-ট্যাবসা লোকে করে টাকা উপার্জনের জন্য। টাকা দিয়ে কী হবে? কোনো অভাব তো নেই। যারা টাকার অভাবে সংসার চালাতে পারে না, তারা ওসব করুক।
সময় কাটাবার জন্য বই পড়া যায়, গান শোনা যায়, মাঝে মাঝে থিয়েটার দেখা…এসব তো মানুষেরই জন্য। ছোটোবেলা থেকেই বই অমিতার প্রিয় সঙ্গী। বিয়ের পর কাছাকাছি সময়ের মধ্যে মেয়ে আর ছেলে জন্মাল, তাদের মানুষ করে তোলা, সুবিমল সব সময় ব্যস্ত, তাই মেয়ে আর ছেলের স্কুল কলেজের দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়েছে, নিজে বই পড়ার সময় পায়নি। এখন তো সে ঝাড়া হাত-পা। মাঝখানের বছরগুলির না-পড়া বইগুলি সে পড়ে নিতে পারে।
নতুন করে বই পড়া শুরু করে অমিতা। একসময় বুঝতে পারল, বই পড়ারও সঙ্গী লাগে, একা একা হয় না।
অল্প বয়েসে ভালো কিছু একটা পড়লেই বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে হত। ভালো কোনো খাবার ভাগ করে নেবার মতন। বন্ধুদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হত এক একখানা বই নিয়ে। রাত জেগে কোনো একটা বই শেষ করেই তক্ষুনি ফোন করতে ইচ্ছে হত কোনো বন্ধুকে। মায়ের কাছে এজন্য অমিতা বকুনি খেয়েছে কতবার!
ছেলেবন্ধুরা সবাই হারিয়ে গেছে। শুধু একজন, অসিত, বিয়ের পরও সম্পর্ক রাখতে চেয়েছিল। দুপুরবেলা ফোন করত, অমিতাই কাটিয়ে দিয়েছে তাকে। বান্ধবীদের মধ্যে জয়ন্তী আর শ্রীলেখার সঙ্গেই যোগাযোগ আছে এখনও, কিন্তু ওদের সংসারযন্ত্র বোধহয় বেশি ঘোরালো-প্যাঁচালো, বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছে ওরা। কয়েকবার সদ্য পড়া কোনো বই সম্পর্কে জয়ন্তীর সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছে, একটু পরেই জয়ন্তী অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। আর শ্রীলেখা চাল মেরে বলে, আমি ভাই আজকাল গল্প-উপন্যাস পড়ি না, যা সব রদ্দি লেখা হচ্ছে, মাঝে মাঝে শুধু কবিতা পড়ি। অমিতা জানে, এ কথাটাও সত্যি নয়, শ্রীলেখার মুখে একটাও কবিতার লাইন সে কখনও শোনেনি।
নিপুণ যখন ছোট্ট ছিল, অতি দুরন্ত, তাকে ঘুম পাড়াবার সময় গল্প বলতে হত। তারপর এমনই তার গল্পের নেশা হয়ে গেল যে সবসময় জ্বালাতন করত, গল্প বলো, মা, গল্প বলো। তখন কত গল্প বানাতে হয়েছে অমিতাকে। একটু বড়ো হতেই সে গল্পের নেশা কোথায় মিলিয়ে গেল। এখন বাংলা দূরের কথা, ইংরেজি গল্পের বইও পড়ে না।
কোলের কাছে শুইয়ে বাচ্চা-নিপুণকে ঘুম পাড়াবার জন্য থাবড়াতে থাবড়াতে গল্প বলার কথা এখনও হঠাৎ মনে পড়ে। সেই ছেলে এখন মাকে বলে গেট লস্ট। অবশ্য ইয়ার্কি করেই বলে।
ছেলে আর মেয়ে দুজনকেই পড়ানো হয়েছে মিশনারি স্কুলে। সেটাই তো এখনকার রীতি। এই ধরনের পরিবারের সব ছেলেমেয়েরাই তো ওই সব স্কুলে পড়ে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে যে মাতৃভাষা যত্ন করে শেখানো হয় না, দেশের সরকারেরও তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই, তা তো অমিতা জানত না। বুঝতে বুঝতে এতটাই সময় কেটে গেল যে, তখন আর কিছু করার উপায় নেই। ক্লাস সেভেন-এইটের ছেলেমেয়েকে স্কুল ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে ভরতি করার প্রশ্নই ওঠে না। অমিতা সে-রকম প্রস্তাব দিলে তাকে সবাই পাগল বলত। ছেলেবেলায় সে-রকম ক্ষীণ ইচ্ছে হয়েছিল অমিতার, কিন্তু তখন নিপুণকে মিশনারি স্কুল ছাড়িয়ে বাংলা স্কুলে পড়ালে সে কি এমন কমপিউটার এক্সপার্ট হতে পারত? এই বয়েসেই বিভিন্ন কোম্পানি তাকে ডাকাডাকি করে। নিপুণ চাকরি নেবে না, কনসালটেন্ট হিসেবে তার ভালো উপার্জন।
মেয়ে বাসবীর বিয়ের সময় কয়েকখানি বই উপহার পেয়েছিল। আজকাল বিয়েতে বই দেওয়ার রেওয়াজ উঠেই গেছে। বিশাল আয়োজন হয়েছিল সেই বিয়ের, কেউ বাদ থাকেনি, বোধহয় গরিব আত্মীয়স্বজনরা দিয়েছে ওই বইগুলো। বিয়ের পরই জার্মানি যাওয়া, অত উপহারসামগ্রীর অনেক কিছুই রেখে যেতে হবে। অমিতা বলেছিল, বইগুলো নিয়ে যাবি না খুকি? বাংলা যে একেবারে ভুলেই যাবি। তবু সময় পেলে একটু-আধটু পড়বি, লোকে তো সেইজন্যই দিয়েছে।
বাসবী খানিকটা অভিমানের সুরে বলেছিল, আমাকে কি ভালো করে বাংলা শিখিয়েছ তোমরা? স্কুলে এলেবেলে বাংলা, অন্য কত পড়ার চাপ, তোমরা সব সময় বলতে ফার্স্ট হ, ফার্স্ট হতে হবে! বাংলা পড়ব কখন? কলেজে বাংলা সাবজেক্টই ছিল না। অভ্যেস নেই, এখন বাংলা বই দু-তিন পাতার বেশি পড়তে গেলে হাঁপিয়ে যাই, অনেক কথার মানে বুঝতে পারি না। ডিকশনারি দেখে দেখে গল্পের বই পড়া যায়? তা ছাড়া বইয়ের কত ওজন হয় জান না?
বাসবীর স্বামী অভিরূপ দিল্লির ছেলে, অতি ভালো ও ভদ্র, সে বাংলায় বেশ কথা বলতে পারে, কিন্তু এক বর্ণও পড়তে পারে না। অক্ষরজ্ঞানই হয়নি। সুতরাং, প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিয়ে গুচ্ছের বাংলা বই জার্মানিতে নিয়ে যাবে কেন?
ঝনঝন করে টেলিফোনে বেজে উঠল।
টেলিফোনের সঙ্গে ফ্যাক্স মেশিন জোড়া আছে, ধরতে দেরি করলে সেই মেশিন চালু হয়ে যায়। অমিতা দৌড়ে গেল।
হ্যালো, কে, অমিতা? আমায় চিনতে পারছ?
ঠিক ধরতে পারছি না।
আগে গলা শুনেই চিনতে পারতে।
আপনার কী দরকার বলুন।
আমি অসিত!
ও, অসিত। কী খবর? তুমি তো বাইরে ছিলে…কোথা থেকে বলছ?
কলকাতা থেকে। গত সপ্তাহে এসেছি। এখন কিছুদিন থাকব। তুমি ভালো আছ? অবশ্য জয়ন্তীর কাছ থেকে তোমার খবর মাঝে মাঝে পাই, একদিন তোমার সঙ্গে দেখা হতে পারে?
তোমার স্ত্রী, কী যেন নাম? কেয়া, সে আসেনি।
হ্যাঁ এসেছে, ছেলেমেয়েরাও।
তোমার স্ত্রী-ছেলেমেদেদের নিয়ে একদিন বাড়িতে এসো।
কেয়ার শরীরটা ঠিক ভালো নেই, আমি একা যদি কোনোদিন, তোমার বাড়িতে না হোক, অন্য কোথাও, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে…
কেয়ার শরীর ভালো হোক, তারপর ওকে নিয়ে একদিন বাড়িতেই এসো।
ফোন রেখে দিল অমিতা। অসিত, অতীতের প্রেত। বিয়ের আগে প্রায় রোজই দেখা হত, অসিতের মধ্যে প্রেম প্রেম ভাব ছিল, হাত জড়িয়ে ধরত প্রায়ই, কিন্তু অমিতা কখনও প্রশ্রয় দেয়নি। মানুষ হিসেবে অসিতকে সে কখনও ঠিক পছন্দ করতে পারেনি, চরিত্রে গভীরতা নেই, সব কথাই যেন কথার কথা। অমিতার সামনে যেসব স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করত, ঠিক সেই কথাগুলোই আবার আড়ালে বলত জয়ন্তীকে। এই নিয়ে জয়ন্তী আর অমিতা যে কত হাসাহাসি করেছে, তা অসিত জানে না।
জয়ন্তীর সঙ্গে যে অসিতের এখনও যোগাযোগ আছে, তাও অবশ্য জানত না অমিতা। জয়ন্তী আগে সব কথা বলত তাকে, এখন গোপন করে যায়। করুক! সেই অসিত তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। একা। কোনও প্রশ্ন ওঠে না।
বিয়ে হয়েছে সম্বন্ধ করে সুবিমলের সঙ্গে, অমিতা মানিয়ে নিয়েছে। সুবিমলের সঙ্গে তার ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ সে দেয়নি কখনও। আসেনি কোনো তৃতীয় ব্যক্তি। একবারই একটা উপক্রম ঘটেছিল, তাও অমিতার অজ্ঞাতসারে। বিয়ের সময় ভরতি বাড়ি, অমিতার দেওর চন্দনের একগাদা বন্ধুবান্ধব আড্ডা দিতে আসত প্রায়ই। চন্দনের এক বন্ধু রজত গান গাইত বেশ ভালো, এখন গায়ক হিসেবে মাঝারি ধরনের খ্যাতিও হয়েছে। সেই রজত খুবই বউদি বউদি করত, অমিতাকে দিয়ে গান গাওয়াবার চেষ্টা করত, অনেকটা ন্যাওটা ধরনের হয়ে গিয়েছিল। ওই রজতকে যে সুবিমল পছন্দ করে না, তা বেশ কিছুদিন বুঝতে পারেনি অমিতা। সুবিমল অনেকটা উদাসীন ধরনের, আড্ডা দিতে ভালোবাসে না, বাড়িতে কী হচ্ছে, কারা আসছে, তা নিয়ে যেন মাথা ঘামাবারও সময় নেই। একদিন শুধু রজতের প্রসঙ্গে সুবিমল বলেছিল, ওই রাস্কেলটা আবার এসেছে, যাও, তোমাকে গান শোনাবার জন্য ডাকছে! ওই একটি শব্দ শুনেই সজাগ হয়ে গিয়েছিল অমিতা, সঙ্গে সঙ্গে রজতকে বাদ দিয়ে দিয়েছে নিজের জীবন থেকে।
তৃতীয় ব্যক্তি! না, রক্তমাংসের কেউ নেই।
কলেজ জীবনে প্রথমে ‘ওথেলো’ পড়ে খুব কষ্ট হয়েছিল অমিতার। তারপর অরসন ওয়েলসের ফিলম, সেটা দেখেও সে চোখের জল সামলাতে পারেনি। সেও তো ভুল বোঝাবুঝির কাহিনি। ওথেলো আর ডেসডিমোনা, দুজনেই সরল নিষ্পাপ, ভালোবাসায় স্বাদ ছিল না, শুধু ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুজনেরই জীবন নষ্ট হয়ে গেল। ওই কাহিনিতে অবশ্য একটা খলচরিত্র ছিল, ইয়াগো, সে-ই নানান কুচক্র আর দুজনের মধ্যে চরম অবিশ্বাস এনে দিয়েছে।
একালে আর ওইরকম খলচরিত্র বা তৃতীয় ব্যক্তির দরকার হয় না। মানুষ এমনই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে যে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতেই চায় না কিছুতে। ইয়াগোর বদলে স্থান নিয়েছে ইগো। সেই ইগোই যখন তখন সংঘর্ষ বাধায়।
সুবিমলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়নি অমিতার। কিন্তু কোনো বোঝাবুঝিই কি হয়েছে? এতগুলো বছর একসঙ্গে কেটে গেল, তবু কতটুকু চেনে পরস্পরকে? অমিতার মনের খবর কিছুই রাখে না সুবিমল। অমিতাও কি সুবিমলকে বোঝবার চেষ্টা করেছে? নিজের ব্যাবসা নিয়ে সদা ব্যস্ত সুবিমল, ব্যাবসাই তার ধ্যান-জ্ঞান, তাতে অনেক রকম ওঠা-পড়া থাকে, কখনো কখনো নিশ্চয়ই সে দারুণ মানসিক যন্ত্রণায় থাকে, কিন্তু অমিতা তার ভাগ নিতে পারে না।
বইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই সুবিমলের, সকালে অন্য পত্রিকায় সামান্য চোখ বুলিয়ে মন দিয়ে পড়ে বিজনেস জার্নাল। তবে, অমিতার বই পড়ায় কখনও বাধা দেয়নি সে। শুধু একদিন তার একটা মন্তব্যে অমিতা যেন আঁতে ঘা খেয়েছিল। রাত্তিরবেলা বই হাতে অমিতাকে দেখে সুবিমল বলেছিল, আজ আবার ওটা কী পড়ছ, কবিতা নাকি? অ্যাঁ?
কথার সুরে এমনই অবজ্ঞার ভাব ছিল যে, তা একেবারেই পছন্দ করেনি অমিতা।
আহতভাবে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন, কবিতা পড়াটা কি দোষের?
সুবিমল বলেছিল, ওসব তো কলেজের ছোকরা-ছুকরিরা পড়ে। তোমার বয়েস হয়ে গেছে, টের পাও না? এখনও ওইসব ন্যাকা ন্যাকা কথা ভালো লাগে?
মুখে মুখে তর্ক করা স্বভাব নয় অমিতার। চুপ করে গিয়ে সে মনে মনে গুমরেছিল। বয়েস হয়ে গেলে কবিতা পড়তে নেই? তাহলে বয়েস হয়ে গেলেও কবিরা কবিতা লেখে কেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে আশি বছর বয়েস পর্যন্ত কবিতা লিখে গেলেন, সবই কি অল্পবয়সিদের জন্য? সবই ন্যাকা ন্যাকা কথা?
প্রথম প্রথম অবশ্য সুবিমলকে দলে টানার চেষ্টা করেছে অমিতা। কবিতা শুনে বুঝবে না, কিন্তু গল্প শুনে তো ভালো লাগতে পারে। রাত্তিরে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ার পর অমিতা বলছিল, তুমি তো বই টই পড় না। আজ একটা উপন্যাস পড়ে আমার খুব ভালো লাগল, এত সুন্দর লেখা, তুমি গল্পটা শুনবে?
মেজাজ বেশ প্রসন্ন ছিল সুবিমলের। সে বলেছিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, শোনাও না গল্প।
তিন থেকে চার মিনিট, তার পরেই নাক ডাকতে শুরু করে তার। অমিতা আদর করে ঠেলা দিয়ে বলে, এই, এই, তার পর শোনো। সুবিমল জড়ানো গলায় বলে, বাকিটা কাল শুনব প্লিজ…
বাড়ি ফিরে প্রতিদিন ঠিক তিন পেগ হুইস্কি পান করার অভ্যাস সুবিমলের। সেই জন্য খাওয়ার পর শোওয়া মাত্র ঘুম। এক বিছানায় পাশাপাশি দুজন। ইদানীং শরীরের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। স্বামী-স্ত্রী মানে একসঙ্গে থাকা, ছেলেমেয়ের মা-বাবা হওয়া তো ঠিকঠাক হয়েই গেছে, সামাজিকতা করার জন্য স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়, অফিসের পার্টিতে সকলেই স্ত্রী আনে, আর বাড়িতে ঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া…। ন-মাসে ছ-মাসে হঠাৎ যেন মনে পড়ে, শরীর বলে একটা ব্যাপার আছে। ষাট পেরিয়ে গেলেও যে পৌরুষ একেবারে ক্ষয়ে যায়নি, এটা প্রমাণ করার জন্যই যেন সুবিমল দাপাদাপি শুরু করে বিছানায়, আত্মসমর্পণে একটুও কুণ্ঠা প্রকাশ করে না অমিতা , তবু কিছুই যেন আগেকার মতন ঠিক সুরে বাজে না। রতিকর্মটি সেরে ঘুমিয়ে পড়ে সুবিমল, তার স্ত্রীর তৃপ্তি হল কি না, কিছু অসমাপ্ত রইল কি না, সে প্রশ্নই মাথায় আসে না তার।
সুবিমলের তুলনায় অমিতার ঘুম অনেক কম। আলো জ্বেলে বই পড়লে স্বামীর ঘুমের ব্যাঘাত হবে, তাই প্রায়ই রাতে সে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে পা টিপে টিপে চলে যায় পাশের ঘরে, বই খুলে বসে। দিনের বেলা অর্ধেক পড়া বই শেষ করার জন্য এক এক রাতে ছটফট করে সে। সব সময় নতুন বই পাবে কোথায়, তাই পুরোনো ক্লাসিক বইগুলিও পড়ে বারবার। শুধু বাংলা নয়, কলেজ জীবন থেকেই সে ইংরেজি সাহিত্য ভালোবাসে, ইংরেজি গোয়েন্দা গল্পও তার প্রিয়, আগাথা ক্রিস্টি মোট আশিখানা বই লিখেছেন, সবই তার পড়া। বেলজিয়ান লেখক জর্জ সিমেনোর বইগুলির ইংরেজি অনুবাদ তার খুব পছন্দ।
বই পড়া শেষ করে বিছানায় ফিরে এসেও কোনো কোনোদিন তার ঘুম আসে না। ছটফট করে। হঠাৎ হঠাৎ এক একজন পুরুষমানুষের কথা মনে পড়ে। হ্যাঁ, স্বামীর পাশে শুয়েও যে সে পরপুরুষের কথা চিন্তা করে, এটা সত্যি। সেইসব পুরুষদের কারো নাম হ্যামলেট, কারো নাম গোরা, কারো নাম শশী, হাল আমলের কয়েকটি নামও আছে। রক্তমাংসের জীবন্ত পুরুষের কথাও যে চিন্তা করে না তা নয়। কয়েক মাস ধরে অনিমেষ রায়চৌধুরী তার রাত্রির শয্যাসঙ্গী, লেখকরা এখন আর অলীক নয়, বই ও পত্রপত্রিকায় প্রায়ই তাদের ছবি ছাপা হয়, টিভিতে দেখা যায়, চেহারা চেনা যায়। অমিতা যে এই লেখকটির খুব ভক্ত তা নয়, তবে পরপর কয়েকটি বই পড়ে প্রায়ই ওঁর সঙ্গে মনে মনে কথা বলে। চাঁচাছোলা ভাষায় ইনি যেভাবে মানুষের জীবনের কথা লিখে যান, তাতে যেন অন্য রকম একটা জীবনদর্শন ফুটে ওঠে। প্রেমের কাহিনিই বেশি লেখেন ইনি, কিন্তু সেই প্রেমে চিরন্তনতা নেই, এটা কিছুতেই মানতে পারে না অমিতা। খানিকটা তির্যকভাবে এই লেখক যেন বলতে চান, হোক না দুবছর বা পাঁচ বছর, তার মধ্যেই ভালোবাসা সার্থক করে নাও। মানুষের জীবনকে ইনি ছোটো করে আনেন। একজন মানুষ আশি বছর বাঁচলেও তার আসল আয়ু যেন বড়ো জোর দশ বছর।
লেখকের সঙ্গে তো ইচ্ছে করলে দেখা করাও যায়। বইমেলায় অনেক লেখককে সই দিতে দেখেছে অমিতা। অনিমেষ রায়চৌধুরিকেও একদিন দেখেছিল নন্দন চত্বরে। ঠিকানা বা টেলিফোন নম্বর জোগাড় করা শক্ত কিছু নয়। কিন্তু পাঠক পাঠিকারা ফোন করলে কি লেখকরা বিরক্ত হন? বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে চাইলে কি দরজা বন্ধ করে দেন মুখের ওপরে? খ্যাতির সঙ্গে কি দাম্ভিক হয়ে যান এঁরা? অবশ্য এঁদের সময়ের দাম আছে, সবাই যদি বাড়িতে গিয়ে জ্বালাতন করে…
সংকোচ কাটিয়ে একদিন ফোন করেছিল অমিতা। অনিমেষ রায়চৌধুরি নিজেই ধরেছিলেন। অমিতার ধারণা ছিল, বিখ্যাত বা ব্যস্ত লোকদের সেক্রেটারি থাকে, তারা আগে ফোন ধরে জিজ্ঞেস করে, কে কথা বলছেন, কী চাই ইত্যাদি। প্রথমেই লেখকের গলা শুনে অমিতা একটু ঘাবড়ে গেল, সে বলল, আপনি আমাকে চিনবেন না, আমি একজন সাধারণ পাঠিকা, কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল— কিন্তু তাকে মাঝপথে থামিয়ে লেখকটি খানিকটা কৌতুকের সুরে বললেন, কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না তো? এরকম তো হয়ই, প্রথম আলাপেই কি গড়গড় করে সব কথা বলা যায়? আমারও তো এরকম হয়, অচেনা কারও সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে পারি না। আপনার নাম কী।
লেখকটির সাবলীল ভঙ্গিতে অনেকটা জড়তা কেটে গেল অমিতার। এরপর কিছুক্ষণ টুকটাক কথা হল। অমিতা জিজ্ঞেস করল, আমি কি একদিন আপনার বাড়ি গিয়ে দেখা করতে পারি? অনিমেষ রায়চৌধুরি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, হ্যাঁ, আসতে পারেন, যে-কোনো রবিবার সকালে। অমিতা তবু জিজ্ঞেস করল, আপনার অসুবিধে হবে না? মানে আপনার যদি সময় নষ্ট হয়…। লেখক বললেন, না, না, রবিবার আমি লিখি না, চলে আসবেন, কোনো অসুবিধে নেই। আমার বাড়ি চেনেন?
সুবিমল ট্যুরে গেছে ছেলেও দুর্গাপুরে, সেই রকম এক রবিবার সকালে অমিতা যাবার জন্য তৈরি হল। স্বামীকে বা ছেলেকে কিছু বলেনি, জানলে ওরা হাসাহাসি, ঠাট্টা-ইয়ার্কি করত নিশ্চিত। বাংলা বাইয়ের লেখক ওদের কাছে অকিঞ্চিৎকর প্রাণী! না জানানোটা কি দোষের? লেখকের বাড়িতে বউ-ছেলেমেয়ে আছে, রবিবার সকালে দেখা করতে যাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কোনো বড়ো মানুষের কাছে প্রথমবার গেলে কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে যাওয়া উচিত। কী নেবে! একটা শার্ট পিস কিংবা পাঞ্জাবি? সেটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না? কলম? ওঁদের নিশ্চয়ই অনেক কলম থাকে। শেষ পর্যন্ত পাড়ার দোকান থেকে এক বাক্স সন্দেশ নিয়ে গেল অমিতা।
মাঝপথে এসে অমিতার মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিল। টেলিফোনে আলাপ শুধু গলার আওয়াজ শুনেছেন, লোকটি ভেবে বসেননি তো যে অমিতা একটি তরুণী? ওঁরা তো কমবয়সিদেরই পছন্দ করেন। ওঁদের নায়িকারা সবাই তরুণী। এক প্রৌঢ়াকে দেখে নিরাশ হবেন না তো? হলে তো হবেন, কী আর করা যাবে। পাঠিকাদের সবাইকে সুন্দরী আর তরুণী হতে হবে নাকি? লেখক নিজেই কি কন্দর্পকান্তি? বয়েসও তো কম হল না।
অমিতার অবশ্য এ কথাও মনে হল, এই বয়েসেও তার শরীরের গড়ন অন্য অনেকের চেয়ে ভালো। সাজলে গুজলে এখনও…। জোজোটা মাঝে মাঝে ইয়ার্কি করে বলে মা, ইউ আর গেটিং ইয়ংগার এভরি ডে!
বেল দেবার পর দরজা খুললেন লেখক স্বয়ং। অমিতা আস্তে আস্তে নিজের নাম জানিয়ে বলল, আমি টেলিফোন করেছিলাম, আপনি আসতে বলেছিলেন…
অনিমেষ রায়চৌধুরি আন্তরিক ভদ্রতার সঙ্গে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ আমার মনে আছে, আসুন, আসুন!
মিষ্টির প্যাকেটটা নিয়ে বললেন, এসব আবার কেন আনলেন? কে খাবে?
রেখে দিলেন টেবিলের ওপরে।
চেহারায় তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই এই লেখকের, মধ্য বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছেন বোঝা যায়। সাজপোশাকের কোনও চেষ্টাও নেই, পাজামার ওপর একটা শার্ট। শার্টের বদলে অন্তত একটা পাঞ্জাবি পরা উচিত ছিল, দাড়ি কামানো হয়নি, কাঁচা-পাকা চুলে চিরুনিও পড়েনি মনে হয়।
পাজামার ওপর শার্ট পরা পছন্দ করেন না অমিতা, কিন্তু মানুষটি যে বিখ্যাত-বিখ্যাত ভাব করে নেই, সেটা তার ভালো লাগল।
বসবার ঘরে এসে সে অবশ্য দমে গেল। বিভিন্ন বয়েসের পাঁচজন নারী-পুরুষ বসে আছে সেখানে। লেখকটি তার সঙ্গে নিরিবিলিতে একলা দেখা করবেন, সেরকম তো কথা দেননি, তবু নিরাশ হয়ে গেল অমিতা। এত লোকের মধ্যে সে কী করে কথা বলবে? আড়ষ্টভাবে বসে পড়ল এককোণে। অন্যদের কথা শুনে সে বুঝতে পারছে, তারা কেউ তরুণ লেখক, কেউ এসেছে সভাসমিতিতে আমন্ত্রণ জানাতে, কেউ প্রকাশক। সকলের সঙ্গেই কথা বলছেন লেখক সরল সাদাসিধে ভাষা, সভা-সমিতির আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানও করছেন নম্রভাবে। একজন কিছু টাকা দিল, তিনি অবহেলার সঙ্গে রেখে দিলেন বুকপকেটে।
এর মধ্যে সকলের জন্য চা এল। লেখকের স্ত্রী একবার একটুক্ষণের জন্য এসে দাঁড়ালেন, দেখলেই বোঝা যায় বিদুষী মহিলা, চেহারাও সুশ্রী, তবে কিছুটা ব্যস্ত ব্যস্ত ভাব। সকালবেলা বাড়িতে এত লোক এলে তো গৃহকর্ত্রীকে ব্যস্ত থাকতেই হয়, মাঝে মাঝেই টেলিফোন বাজছে।
দু-তিনজন লোক উঠে গেল, আরও দু-তিনজন এল। অমিতা ভাবতে লাগল, একজন সাধারণ মানুষ আর একজন লেখকের মধ্যে তফাত কী? কিছুই তফাত নেই, এখানে এসে মনে হচ্ছে। অথচ এই লেখকই তাঁর বইগুলিতে যেন এক অন্য পরিচয়ে উপস্থিত। ধারালো ভাষা, মানুষের মনের গভীরে উঁকি মারার ক্ষমতা, মানুষে মানুষে সম্পর্কের জটিলতার উন্মোচন, জীবন ও মৃত্যুর নতুন ব্যাখ্যা, এইসব যেভাবে পাঠক-পাঠিকার মন আন্দোলিত করে, তার কিছুই এখন টের পাওয়া যাচ্ছে না। অমিতা এই সিদ্ধান্ত নিল যে, লেখকদের সামনাসামনি এসে তাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই।
তাহলে আর এখানে এসে লাভ কী? অল্পবয়সি মেয়েরা লেখকের প্রতি ভক্তিতে গদগদ হতে পারে। প্রেমেও পড়ে যেতে পারে, কিন্তু অমিতার তো সে অবস্থা নয়।
শুধু একটা ব্যাপার অমিতা লক্ষ করল, সকলের সঙ্গেই কথা বলে যাচ্ছেন লেখক, তবু একটু যেন আলগা আলগা ভাব। যেন ভেতরে ভেতরে মানুষটা উদাসীন। অমিতা যে কিছু না বলে চুপ করে বসে আছে, সেজন্যও কোনও প্রশ্ন করলেন না। শুধু দু-একবার অমিতার সঙ্গে চোখাচোখি হতে তাঁর চোখে যেন একটু কৌতুকের ঝিলিক ফুটে উঠল। যেন তিনি অমিতার অস্বস্তিটা উপভোগ করছেন।
ঘন্টাখানেক পরে উঠে পড়ল অমিতা। লেখক তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে মৃদু কণ্ঠে বললেন, আবার আসবেন।
অমিতা ঠিকই করে ফেলেছে, আর আসবে না। একটা কোনও আকর্ষণীয় লেখা পড়লে কারও সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করতে খুব ইচ্ছে করে! কিন্তু আর যার সঙ্গেই হোক, লেখকের সঙ্গে আলোচনা করা যায় না সে-বিষয়ে। ওখানে একজন লোক ওই লেখকের একটা গল্প নিয়ে টিভি সিরিয়াল বানাবে বলে দু-একটি চরিত্র নিয়ে কথা বলছিল। গল্পটা অমিতার পড়া, বেশ মনে দাগ কেটেছিল, কিন্তু স্বয়ং লেখক লাজুক হেসে বললেন, অনেকদিন আগে লেখা তো, গল্পটা আমার ভালো মনে নেই!
অমিতার এই ক্ষুদ্র ও ব্যর্থ অ্যাডভেঞ্চারটার কথা বাড়ির কেউ জানল না। অমিতা ভাবল, ওই লেখকটিকে সামনাসামনি গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখার পরও কি তাঁর লেখা পড়তে ভালো লাগবে? পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ওঁর একটা নতুন বই কিনে আনল অমিতা। কিছুটা পড়ার পর লেখকের কথা আর মনে রইল না, কাহিনির চরিত্রগুলি তার কাছে জীবন্ত ও বাস্তব, বিশেষত প্রধান মহিলা চরিত্রটি যেন অমিতারই মনের কথা বলে যাচ্ছে, অমিতা তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গল্পের পুরুষটির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পারে।
অনেকদিন পর সুপর্ণা এসেছে, জোজো বাড়িতে নেই, অমিতার সঙ্গেই গল্প করে গেল কিছুক্ষণ। মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা, জিনস ও টি শার্ট পরা। আজকাল একে বলে ইউনিসেক্স পোশাক। এতে অমিতার কোনো আপত্তি নেই। শাড়ি-ব্লাউজ পরতে সময়ও লাগে বেশি, ট্রামে বাসে ঘোরাঘুরি করারও অসুবিধে। অমিতার ঠাকুমা-দিদিমারা ব্লাউজের বদলে শেমিজ পরতেন। তারও আগে মহিলারা শাড়ির নীচে শায়া-শেমিজ কিছুই পরতেন না। মেয়েদের পোশাক অনবরত বদলায়। দিল্লিতে বয়স্কা মহিলারাও শালোয়ার-কামিজ পরে।
একটা ইংরেজি কাগজে কাজ করে সুপর্ণা। ওর সঙ্গে ইংরেজি বই নিয়ে কথা হয়। বাংলা বেশ ভালো বলে সুপর্ণা। কিন্তু বাংলা বই পড়ে না। সুপর্ণা বেন ওকরি-র লেখা ‘দা ফ্যামিশড রোড’ নামে একটা উপন্যাস নিয়ে কথা বলেছিল, অমিতার মাথার মধ্যে সদ্য শেষ করা বাংলা উপন্যাসটা গজগজ করছে, সে প্রায় মরিয়া হয়ে সুপর্ণার সঙ্গেই ওই উপন্যাসটার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাইল। বইটা নিয়ে এসে সে বলল, তুমি অনিমেষ রায়চৌধুরির লেখা পড়েছ?
বইটা হাতেও নিল না, একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে সে বলল, না আন্টি, বাংলা বই আমার পড়া হয়ে ওঠে না।
অমিতা জিজ্ঞেস করল, কেন পড়ো না? তুমি তো ভালোই বাংলা জানো। ইংরেজি কাগজে কাজ করলে বুঝি বাংলা পড়তে নেই!
সুপর্ণা হেসে বলল, সে রকম কোনো নিয়ম নেই। আমার কলিগরা তো কেউ কেউ পড়ে, আমি পড়ি না। মানে, বাংলা লেখার ঠিক কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই।
অমিতা এবার খানিকটা উগ্রভাবে বলল, কী করে জানলে? যদি তুমি না পড়ো? আচ্ছা, এখানকার লেখার কথা না হয় বাদ দিচ্ছি, তুমি সুকুমার রায়ের কবিতা পড়েছ? একটাও মুখস্থ বলতে পার? সতীনাথ ভাদুড়ির ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’-এর নাম শুনেছ? সেই লেখার চেয়ে ‘দা ফ্যামিশড রোড’-কে কেউ বেশি ভালো বললে আমি মনে করি সে পাগল!
সুপর্ণা কৌতুকের সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল অমিতার দিকে। তারপর দু-কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, হতে পারে। আমি ট্রাই করে দেখব। কী নাম বললেন বইটার?
এতখানি উত্তেজিত হওয়া অমিতাকে মানায় না। সে লজ্জা পেয়ে গেল। প্রসঙ্গ বদলে অনেক ভালো ভালো কথা বলল সুপর্ণার সঙ্গে। জোর করে নতুন গুড়ের সন্দেশ খাওয়াল।
সুপর্ণা হয়তো তার পুত্রবধূ হবে। খুব ভালো মানাবে। ওরা দুজনেই বাংলা পড়বে না। অমিতার নাতি-নাতনিরাও বাংলা পড়বে না কেউ। ওরা বাংলা থেকে হারিয়ে যাবে। সেটা কী বাংলার ক্ষতি না ওদের ক্ষতি? বাংলা হারিয়ে তার বদলে কী পাবে ওরা? সে যাই হোক, যে কটা দিন ওদের সঙ্গে থাকবে অমিতা, সেই সময়টায় সে তার ভালো লাগার অনুভূতি বিনিময় করতে পারবে না এদের সঙ্গে। দুঃখ সেটাই এবং সে দুঃখ তার নিজস্ব।
আজ একটু বেশি রাত করে ফিরেছে সুবিমল। খাওয়ার আগে হুইস্কি নিয়ে বসেও সে অফিসের কাগজপত্র দেখে। আজ আচমকা অমিতাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তুমি অসিত দাশগুপ্ত নামে কারুকে চেনো?
অমিতা বলল, অসিত, হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে কলেজে পড়ত।
কাগজ থেকে চোখ না তুলে সুবিমল বলল, খুব ভাবটাব ছিল তোমার সঙ্গে?
না, সে রকম কিছু নয়। এমনি কফি হাউসে আড্ডা দিতাম।
কদিন ধরে আসছে আমার অফিসে। তোমার কথা বলছে, এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে, যেন তোমার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিয়েটিয়ে করতে চেয়েছিল নাকি তোমাকে?
যাঃ, কী যে বলো! চাইলেই বা কে পাত্তা দিত ওকে? সেরকম কিছুই হয়নি।
অনেকদিন বম্বেতে ছিল। এখন কলকাতায় চলে এসেছে, তা জানো?
জানি। এর মধ্যে টেলিফোন করেছিল একদিন।
এখন একটা অর্ডার সাপ্লাই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আমাদের অফিসের কনট্রাক্ট চায়। তোমার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে এসেছে আমার কাছে। তুমি কী বলো?
আমি কী বলব?
খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি। ওর অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। বম্বেতে কিছু একটা গোলমাল করে এসেছে। একটু শেডি ক্যারেক্টার। আমাদের অফিসের কাজটা না পেলে ও খুবই মুশকিলে পড়বে। তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।
তোমার অফিসের ব্যাপারে আমি কোনোদিন মতামত দিয়েছি?
তোমার সঙ্গে ভাব ছিল, এখনও যদি কোনো দুর্বলতা থাকে?
দুর্বলতা আবার কী?
তোমাকে এর মধ্যে ফোন করেছিল, আমায় বলনি তো?
বলিনি, মানে এরকম কতই তো ফোন আসে, সব কি তোমায় বলি? নাকি তোমার শোনবার সময় আছে?
ফোন করেছিল, তার মানে এখনও তোমার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। সেটাও কি আমার জানবার কথা নয়?
কিচ্ছু সম্পর্ক নেই। তবু কেউ যদি নিজে থেকে ফোন করে—
তুমি বললে আমি ওকে কাজটা দিতে পারি। আমার পার্টনার তাতে আপত্তি করবে না। যদিও কিছুটা বেনিয়ম করতে হবে।
তা করবে কেন? তুমি যা ভালো বুঝবে, আমি কিছুই বলব না।
এবারে কাগজ থেকে চোখ তুলে অমিতার দিকে কয়েক মুহূর্ত বিচিত্রভাবে চেয়ে থেকে সুবিমল বলল, জোর দিয়ে না-ও বলতে পারছ না! ওলড ক্লেম।
অমিতা আহতভাবে বলল, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না?
উঠে দাঁড়িয়ে সুবিমল খানিকটা ঝাঁজালো গলায় বলল, খাবারের ব্যবস্থা করো। অফিসে এসে একজন আমার স্ত্রীর নাম করে…আই ডিটেস্ট ইট!
তারপর আর কোনো কথাই শুনল না সুবিমল। বিছানায় শুয়ে একটাও কথা বলল না, ঠিক চার মিনিট পরে শুরু হল নাক ডাকা।
ঠায় চোখ মেলে জেগে রইল অমিতা। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। এ কী হল? এইভাবেই ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়। কোন অতীত থেকে উঠে এসেছে অসিত, তার প্রতি অমিতার বিন্দুমাত্র দুর্বলতা নেই, তবু কিছু একটা সন্দেহ করছে তার স্বামী। অমিতাও ঠিক মতন বোঝাতে পারেনি, তার ভাষা ঠিক হয়নি, প্রথম থেকেই হাসতে হাসতে উড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। অসিত ফোন করেছিল, তার উত্তরে অমিতা কী বলেছিল, তা তো জানে না সুবিমল, জানলেও কি ভুল বুঝত? অমিতা উত্তরটা সুবিমলকে বলেনি, হঠাৎ তার মনে লেগেছিল, তার কাছে কোনো ফোন এলে তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে?
এতদিন পরে কি সুবিমলের ঈর্ষা হয়েছে? এটা হাসিরও ব্যাপার। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো রকম শারীরিক সম্পর্ক নেই, সারা দিনে কথাই বা কটা হয়, তার মধ্যেও ঈর্ষা? তাও অসিতের মতো তুচ্ছ একজনকে নিয়ে?
সকালবেলাতেও সুবিমল গম্ভীর। অমিতা কোনো দোষ করেনি বলেই তার মনের মধ্যে অভিমান জমছে, সেও সহজ হতে পারছে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে শেষ পর্যন্ত একজনকে ক্ষমা চাইতে হয়। ঝগড়া তো হয়নি, ক্ষমা চাইবে কে? সুবিমলের উৎকট গাম্ভীর্য দেখে মনে হয়, শুধু অসিতের প্রসঙ্গই নয়, আরও যেন কিছু ব্যাপার আছে। সেই আরও কিছুকে আড়াল করার জন্যই যেন কাল হঠাৎ অসিতের কথা তুলল সুবিমল। আর কী হতে পারে? সে কথা বলছে না কেন সুবিমল?
দুপুরবেলা অফিস থেকে সুবিমলের সেক্রেটারি ফোন করে জানিয়ে দিল, বিশেষ কাজে সন্ধের ফ্লাইটেই সাহেবকে দিল্লি যেতে হবে। বাড়ি ফেরার সময় হবে না, একটু পরে ড্রাইভার এসে জামাকাপড়ের সুটকেসটা নিয়ে যাবে।
হঠাৎ হঠাৎ দিল্লি-মুম্বাই যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সুবিমল সেটা নিজে জানাতে পারল না অমিতাকে? সে এতই ব্যস্ত? কিংবা সে অমিতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে না?
অমিতার চোখ জ্বালা করে এল। এসব কী হচ্ছে? ক্রমশ ফাটল বাড়বে? কোন কাঁটা ঢুকেছে সুবিমলের মনের মধ্যে? সুবিমল যে এতবার বাইরে যায়, সবই কি অফিসের কাজে? অমিতার মনে মাঝে মাঝে এ প্রশ্ন জাগে, কিন্তু মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে পারে না।
জোজো বাড়িতে নেই, অমিতা একা, এক সময় সে একেবারে অধীর হয়ে পড়ল। ফোন করল স্বামীর অফিসে। সেক্রেটারি জানাল, সাহেব নেই, তাঁকে যেতে হয়েছে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। কিন্তু এক্ষুনি যে একবার সুবিমলের সঙ্গে তার দেখা করা দরকার। কী করে তা হবে?
ঝোঁকের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরল অমিতা। স্বামীর অফিসে সে কোনোদিন যায়নি, একটা অনুচ্চারিত নিষেধও যেন আছে। অমিতা যাদবপুরের দিকে চলে এল, সেই পোড়ো বাড়িটার কাছে এসে ছেড়ে দিল ট্যাক্সি।
একটা বাজ-পড়া মরা গাছের মতন দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। এটা ভেঙে ফেলে আবার কেউ একটা নতুন বাড়ি বানাতেও চায় না? এ রকম অবস্থাতেই থাকবে?
এই বাড়িটা ছিল অশোক আর ঊর্মিলার। ভুল বোঝাবুঝি আর প্রচণ্ড অভিমান নিয়ে ওরা দূরে সরে গেছে। অহং-এর সংঘর্ষে পুড়ে গেছে এই সংসার। অথচ ভালোবাসা ছিল। কোথায় গেল সেই ভালোবাসা?
অশোক আর ঊর্মিলা, তোমরা কোথায়?
আলোকলতার মূল
আলোকলতার মূল
বিদেশ থেকে যেমন অনেকে নটরাজ মূর্তি, সস্তার কার্পেট, এথনিক গয়না ইত্যাদি সংগ্রহ করে আনে, পল কক্স সেইরকম সংগ্রহ করলেন একটি জীবন্ত মানুষরত্ন। বয়স বেশি নয়। একুশ-বাইশ হবে, তার মুখে এখনও লেগে আছে কৈশোরের আভা, খুব পাতলা চেহারা, থুতনিতে কচি ঘাসের মতন দাড়ি, মাথার চুল নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত, চোখ দুটি হিরের কুচির মতন।
হংকং থেকে দেশে ফেরার পথে পল কক্স কয়েকদিনের জন্য থেমেছেন কলকাতায়। তাঁর সফরসূচির মধ্যে কলকাতা ছিল না, এখানে তাঁর কোনো কাজ নেই কিন্তু কলকাতায় আমেরিকান কনস্যুলেটের ফার্স্ট সেক্রেটারি ডেরেক রবিনসন তাঁর সাক্ষাৎ ভায়রাভাই, একদা দু-জন টেনিস খেলতেন একসঙ্গে। সেই ডেরেকের আমন্ত্রণে তিনি এখানে এসেছেন। টেনিস খেলা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকদিন, তবু একটু হাত ঘামিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
জেনারেল মোটর্স-এর প্রতিনিধি হয়ে পল কক্সকে অনেক দেশে ঘুরতে হয়। ভারতে এসেছেন তিনবার, কিন্তু কলকাতায় আসার কোনো উপলক্ষ্য ঘটেনি। তিনি যে মহলে ঘোরাফেরা করেন, সেখানে কলকাতা শহরের নামটা কেউ উচ্চারণ করে না। ব্যবসার স্বার্থে তো নয়ই, নিছক ভ্রমণের জন্যও কলকাতার কোনো আকর্ষণ নেই। খেলাধুলো ছাড়াও পল কক্সের ভ্রমণ ও গানবাজনার নেশা আছে।
ডেরেক রবিনসনের স্ত্রী ন্যান্সি পল কক্সের স্ত্রী ডরোনির ছোটো বোন। ছোট শালিকার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক থাকে, ফস্টিনষ্টি করে অনেক সময় কাটানো যায়। কলকাতা শহরটা যদিও ধুলো, আবর্জনা, ট্রাফিক জ্যাম, সরু রাস্তা, মানুষ টানা রিকশা এবং চিটচিটে গরমের জন্য কুখ্যাত, কিন্তু এই সব উচ্চপদস্থ সাহেবদের সেসব কিছুই ভোগ করতে হয় না। তারা নিজেদের আরামের সব রকম ব্যবস্থা করে নিয়েছে। তাদের বাড়ি চবিবশ ঘন্টা বাতানুকূল। গাড়ির ভেতরটা ঠান্ডা, ছাই রঙের কাচ থাকে বলে বাইরের কুদৃশ্য দেখা যায় না। অফিসেও ঠান্ডা, গরমের আঁচ একটুও তাদের গায়ে লাগে না। ছোটো একটা গণ্ডির মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু নিজেদের ধরনের মানুষের মেলামেশা। এত বড়ো শহরের বাকি অবস্থা সম্পর্কে তারা প্রায় কিছুই জানে না। বাড়ির বাইরে কখনো-কখনো তারা আড্ডা দিতে যায় টলি ক্লাবে, সেখানকার গাছপালা ঘেরা অনেকখানি সবুজ প্রান্তর দেখে নিউ ইংল্যান্ডের কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
ন্যান্সির সঙ্গে ফুক্কুড়ি করে, টলি ক্লাবে দু-একবার গলফ খেলে এবং একবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে এসে কলকাতা সম্পর্কে পল কক্সের খুব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা হয়ে গেল। নিউমার্কেট ও কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রায় কিছুই পছন্দ হল না তাঁর। ভারতীয় সংগীত শোনার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রবিশঙ্কর ও আলি আকবর দুজনেই এখন আমেরিকায়। পল কক্স সেখানে তাঁদের বাজনা শুনেছেন একাধিকবার, কলকাতায় এখন বিশেষ কিছু হচ্ছে না।
হাতে আরও দু-তিন দিন সময় আছে। কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে গেলে হয় না? প্রথমেই মনে আসে দার্জিলিংয়ের কথা। ডেরেক আর ন্যান্সি মাত্র এক মাস আগেই দার্জিলিং থেকে ঘুরে এসেছে, এক্ষুনি আবার ভায়রাভাইকে নিয়ে সেখানে যেতে ইচ্ছে করে না, ডেরেকের ছুটিও নেই। আর তো কোথাও বেড়াতে যাবার নেই এই পশ্চিমবঙ্গে। এতখানি সমুদ্র তটরেখা রয়েছে, কিন্তু সমুদ্রতীরে নেই কোনো সুন্দর শহর। সমুদ্র উপভোগ করার জন্য একমাত্র যাওয়া যেতে পারে পুরীতে। তাও বেশ দূরে, সেখানে এত ভিড় হয় যে, ন্যান্সিরা একদিন থেকেই পালিয়ে এসেছিল।
আর একটা জায়গার নাম শোনা যায় বটে—শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। সেখানে অবশ্য ন্যান্সি আর ডেরেক এ পর্যন্ত যায়নি, শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখার যোগ্য হবে কিনা জানে না।
পল জিজ্ঞেস করলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে?
ডেরেক বলল, একজন কবি। এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপে তার খানিকটা নাম হয়েছিল। এখন সবাই ভুলে গেছে। আমেরিকায় অধ্যাপকরাও তার নাম জানে না। পৃথিবীতে এত কবি, ক-জনের নাম আর মনে রাখা যায়! এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে, ভাষা খুবই পুরোনা ও অপ্রচলিত, কেই বা কষ্ট করে পড়বে? ও হ্যাঁ, তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তা নিয়ে বাঙালিরা এখনও গর্ব করে।
পল কক্স অস্ফুট সুরে বললেন, টেগোর! টেগোর!
পল কক্স বাণিজ্য-বিশেষজ্ঞ হলেও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। সমাজে মেলামেশা করতে হলে সবরকম বিষয় জানতে হয়। ইমপ্রেশানিস্ট শিল্পীদের ছবি সম্পর্কে ভালো জানেন, পিকাসোর সঙ্গে সালভাদোর দালির তুলনা করতে পারেন, গানবাজনা বোঝেন, সাহিত্য সম্পর্কেও মোটামুটি ধারণা আছে, কথাবার্তার মধ্যে কেউ যদি বলে, ‘অ্যান্ড দা রেস্ট ইজ সাইলেন্স’ অথবা ‘মাইলস টু গো’, তাহলে ধরতে পারেন যে, এগুলো যথাক্রমে শেকসপিয়র ও রবার্ট ফ্রস্টের উদ্ধৃতি।
পল কক্স রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো লেখা পড়েননি, তাঁর পরিচিত সমাজে কেউ এ নাম উল্লেখ করে না। কিন্তু নামটা তাঁর স্মৃতিতে ধবনিত হল। তাঁর যখন দশ-এগারো বছর বয়েস, সেই সময় তাঁর বাবা প্রায়ই বলতেন এই কবির নাম, বাবার মুখে শুনে শুনে কয়েকটা লাইন পলের মুখস্থও হয়ে গিয়েছিল।
বাবা কখনও ভারতবর্ষে আসেননি, খুব আসার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শেষ বয়েসে বাবার কোমরে খুব ব্যথা হওয়ায় আর বিদেশ ভ্রমণের ঝুঁকি নিতে পারেননি।
অনেকটা যেন বাবার অতৃপ্ত বাসনা পূরণের জন্যই পল কক্স বললেন, তাহলে একবার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটাই দেখে আসা যাক।
বাতানুকূল গাড়িতে ভোরবেলা বেরিয়ে সন্ধের মধ্যে ফিরে আসা যায়। কিন্তু ডেরেক অফিসে খোঁজখবর নিয়ে জানলেন, রাস্তা খুবই খারাপ, এই বর্ষায় একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। বড়ো বড়ো গর্ত, বিদেশি শৌখিন গাড়ির অ্যাক্সেল পর্যন্ত ভেঙে পড়তে পারে। যদি বা না ভাঙে, সামান্য একশো চল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরুতেই লেগে যাবে ছ-সাত ঘন্টা, একদিনের মধ্যে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।
পল কক্স বললেন, তিনি ট্রেনেই যাবেন। ওখানে হোটেল বা টুরিস্ট লজে রাত কাটানো যাবে নিশ্চয়ই!
ডেরেক দুটো দিন ছুটি নিতে পারবে না, ন্যান্সিকে অনুরোধ করল তার জামাইবাবুকে সঙ্গ দেবার জন্য। এদেশের ট্রেনযাত্রাতে ন্যান্সির বড়ো ভয়। কখন কোথায় যে থেমে যাবে, অপেক্ষা করতে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা, তার ঠিক নেই। একবার ভুবনেশ্বর যেতে এই কাণ্ড হয়েছিল। সে নানা অজুহাত দেখাতে লাগল।
ডেরেক তখন তার অফিসের সুখেন্দু নামে এক নির্ভরযোগ্য ছোকরা কর্মচারীকে সঙ্গে দিয়ে দিল। বাংলা বুঝিয়ে দেবার জন্য এরকম একজনকে দরকারও বটে। সুখেন্দু সানন্দে রাজি, এর আগে আরও অনেক সাহেবকে নিয়ে সে ঘুরেছে, সাহেব তার কাছে জলভাত।
শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে একটি বাতানুকূল লাউঞ্জকার নামে বগি থাকে। এক-একদিন বিনা নোটিসেই সেটা খুলে রাখা হয়। সেটার ভাড়া খুব বেশি, তবু সাহেব-মেমদের তা গায়ে লাগার কথা নয়। সে কামরাটা ঠান্ডা তো বটেই, তা ছাড়া সুবিধে এই যে সেখানে ভিখিরি বা ফেরিওয়ালারা উঠে বিরক্ত করে না। আজ সেই বগিটা নেই।
তাহলে যেতে হবে সাধারণ ফার্স্ট ক্লাসে। সেটা ঠান্ডা তো নয়ই, বরং বেশ ভিড়। যাত্রীরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে, তাদের মধ্যে রেলের কর্মচারীই বেশি।
সুখেন্দু পল কক্সকে জিজ্ঞেস করলে, মিঃ কক্স আপনি সাধারণ সেকেন্ড ক্লাসে যাবেন? জানলার ধারে জায়গা পাওয়া যাবে। আজ মেঘলা আকাশ, গরম বেশি নেই। জানলার ধারে বসে বেশ দেখতে দেখতে যেতে পারব।
সুখেন্দুর সঙ্গে কথাবার্তা বলে পল কক্সের পছন্দ হয়েছে। তিনি বললেন, তুমি যা ভালো বুঝবে—
যদি বাতানুকূল বগিটা সেদিন থাকত, পল কক্স বসতেন সেখানে, তাহলে এর পরবর্তী ঘটনাগুলো কিছুই ঘটত না।
গরম সত্যিই নেই, মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। হাওড়ার ঘিঞ্জি অঞ্চল ছাড়বার পর দু-দিকে চোখ জুড়নো সবুজ প্রান্তর। পল কক্সের দেশে মানুষ বিশেষ দেখা যায় না। এমনকি ধান বা গমের খেতেও একটা-দুটো ট্র্যাক্টর ফট ফট করে, চাষি বলতে সেরকম কারোকে চোখে পড়ে না। কাস্তে হাতে কোনো চাষি ফসল কাটতে যায় না। বীজ বোনা থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত সবই যন্ত্রে সেরে ফেলা হয়।
আর এখানে মানুষ, শুধু মানুষ, ছোট্ট একটা ডোবায় জাল ফেলছে মানুষ, উদোম শিশুরা দাপাদাপি করছে কাদার মধ্যে। একদঙ্গল লোক এমনিই বসে আছে গাছতলায়, জীর্ণ চেহারার নারীরা কলমি শাক তুলছে। এই মানুষগুলোর স্বাস্থ্য ভালো নয়, মুখও সুশ্রী নয়, মলিন পোশাক, তবু সব মিলিয়ে এমন একটা শান্ত মন্থরতা আছে যা এই বিদেশিটির কাছে অভিনব মনে হয়। যেন এরা রয়ে গেছে বাইবেলের যুগে।
কামরার মধ্যে ফিরিওয়ালা যাচ্ছে অনবরত, তাদের কথা বোঝার সাধ্য নেই পলের, কে কী বিক্রি করছে তাও বুঝতে পারলেন না। সুখেন্দুর অনুরোধে এক ভাঁড় চা খেলেন। এত চিনি দেওয়া চা যে তাঁর প্রায় বমি এসে যাচ্ছিল। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ রোগা, তাই বোধহয় তাদের বেশি চিনি দরকার। চা-টা পছন্দ না হলেও তিনি ভাঁড়টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন। বেশ সুন্দর গড়নটি চা খাবার পর লোকে এটা ফেলে দেয়। মাটি দিয়ে তৈরি, পরিবেশ দূষণের প্রশ্ন নেই। এত সুন্দর জিনিসটা এরা ফেলে দেয় কেন, ঘরে বেশ সাজিয়ে রাখা যায়। এঁটো খুরিটা পকেটে নিয়ে নিলেন পল।
হঠাৎ তিনি একটি তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলেন।
গেরুয়া কাপড় পরা একটি লিকলিকে চেহারার ছেলে, মাথায় লম্বা চুলে গিঁট বাঁধা, ঝকঝক করছে চোখ দুটি। সে গান ধরেছে .
গোলেমালে গোলেমালে পিরিত করো না
পিরিতি কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়বে না…
ভাষা বোঝার প্রশ্ন নেই, পল মহাবিস্ময়ে লক্ষ করতে লাগলেন ছেলেটার কণ্ঠস্বরের তেজ তার এক হাতে গুপি যন্ত্র, পায়ে বাঁধা ঘুঙুর। একই সঙ্গে পায়ে নাচের তাল দিচ্ছে। হাতে যন্ত্রটা বাজাচ্ছে আর ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে তুলেছে তার গলা, একসঙ্গে তিনটে কাজ করছে।
গান সম্পর্কে পলের বিশেষ উৎসাহ আছে। পাশ্চাত্য সংগীত ছাড়াও সে জাপানি, আরবি, আফ্রিকান গানবাজনার রেকর্ড সংগ্রহ করে। আলি আকবর, রবিশঙ্কর তাঁর কানে অপরিচিত নয়, কিন্তু কণ্ঠসংগীতে এরকম সোপ্রানো ক্বচিৎ শুনেছেন। এ যে অপেরা গায়কদেরও হার মানিয়ে দিতে পারে।
তিনি সুখেন্দুকে নিম্লস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, চলন্ত ট্রেনের কামরায় ওই ছেলেটি অত চেঁচিয়ে গান গাইছে কেন? অন্য যাত্রীরা আপত্তি করে না?
সুখেন্দু বলল, না। আপত্তি করবে কেন? ও বেচারারা গান গেয়ে ভিক্ষে করে।
পরের মুহূর্তেই নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে সে আবার বলল, তা বলে ওদের সাধারণ ভিখিরি মনে করবেন না। ওরা হচ্ছে বাউল। ওদের একটা জীবনদর্শন আছে। ওরা কোনো জীবিকা অর্জনে বিশ্বাস করে না। এই বীরভূমে অনেক বাউল আছে।
পল বললেন, ব্যাউ-উ-ল?
সুখেন্দু বলল, আমেরিকাতেও তো একসময় বাউলরা খুব নাম করেছিল। আপনি নিশ্চয়ই বিখ্যাত গায়ক বব ডিলানের নাম শুনেছেন? সেই বব ডিলান একবার আমেরিকায় উডস্টক নামে একটা জায়গায় সমস্তরকম গাইয়ে-বাজিয়েদের জড়ো করেছিলেন। বিরাট একটা উৎসব হয়েছিল। আপনাদের কবি অ্যালেন গিনসবার্গের কাছে নাম শুনে বব ডিলান এদেশ থেকে আমাদের পূর্ণদাস বাউলকে স্পেশাল প্লেনে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, পূর্ণদাস সেই উডস্টকে গান গেয়ে সবাইকে মাতিয়ে দিয়েছিল।
পল অস্ফুট স্বরে আবার বললেন, ব্যা-উ-উ-ল। আমার ধারণা ছিল সে আফ্রিকান।
সুখেন্দু বলল, না, না আফ্রিকান কেন হবে, ইন্ডিয়ান। শুধু ইন্ডিয়ান নয়, আমাদের এই বেঙ্গলেই শুধু বাউলদের দেখা পাবেন। ওরা বংশানুক্রমে বাউল ঐতিহ্য মেনে চলে।
উডস্টক উৎসব হয়েছিল কুড়ি বছর আগে। আমেরিকায় সে উৎসবের কথা কে না জানে।
পল কক্স তখন ছিলেন একত্রিশ বছরের যুবক, তিনি নিজেই গিয়েছিলেন সেই উৎসবে। তিন দিন তিন রাত খোলা মাঠে কাটিয়েছেন। গানবাজনা নিয়ে সে ছিল এক দুরন্ত পাগলামির সময়।
তখন একজন বাউলের গান শুনেছিলেন বটে, ক্ষীণভাবে মনে আছে। সুখেন্দু নিজের জ্ঞানের পরিচয় দেবার জন্য আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে পল বললেন, এ ছেলেটিকে কাছে ডেকে কথা বলা যায়?
সুখেন্দু নিজে বাউল ভক্ত, সে উৎসাহিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিল। ছেলেটি কাছে আসবার পর তার হাতে দশটা টাকা গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?
তরুণ বাউলটির নাম গৌরহরি দাস। সে কিন্তু সাহেব দেখে গদগদ হল না। এই লাইনের ট্রেনে অনেক সাহেব-সুবো যায়। কেউ কেউ গান শুনে পয়সাও দেয়।
পলের নির্দেশে সুখেন্দু জিজ্ঞেস করল, তুমি কবে থেকে গান গাইছ, গৌরহরি?
গৌর মুচকি হেসে বলল, মায়ের পেটে থাকবার সময়েই!
তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
জগৎ-সংসার ভরা মানুষ, সব আমার বাড়িতে।
এই গুপি যন্ত্র বাজাতে শিখলে কার কাছে?
এটা তো আমি বাজাই না, নিজে নিজেই বাজে। সাহেবকে বলুন, গানও আমি গাই নাই। ভগবান আমাকে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন।
খানিকক্ষণ এই ধরনের কথাবার্তা বলার পরই পলের মাথায় বিদ্যুতের মতন একটা চিন্তা এল। এই উনিশশো চুরানববইতে আবার উডস্টক উৎসব হচ্ছে। সেখানে এই বাউলটিকে নিয়ে যাওয়া যায় না?
গৌরহরি। এই সাহেব তোমাকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে চান। তুমি যাবে?
এ প্রস্তাব শুনে গৌরহরি দারুণ কিছু বিস্মিত, পুলকিত কিংবা ভীত হল না। কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না তার মুখে। সে জানে, কত বাউল ঘুরে এসেছে বিলেত—আমেরিকা। তার পাশের বাড়ির পবন প্যারিসে যায় ঘন ঘন। এর আর নতুন কথা কী?
সে জানলা দিয়ে পিচ করে থুতু ফেলে এসে বলল, যেতে পারি!
ব্যবস্থা করতে দেরি হল না। পল কক্স গৌরহরি দাসকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে গেলেন আমেরিকা।
আপ-স্টেট নিউইয়র্কের রোজ ভ্যালি নামে একটি ছোট্ট জায়গায় পল কক্সের বাড়ি। স্বামী, স্ত্রী ও একটি কুকুরের সংসার। ওদের দুটি ছেলে মেয়ে, বনি আর স্টিফেন, তারা কোথায় যে কখন থাকে তা বাপ-মাও জানে না। পলের স্ত্রী সুজান ছেলেমেয়ের চেয়েও কুকুরটিকে বেশি ভালোবাসে। সুজান একসময় একটি সুপার মার্কেটে ম্যানেজারের কাজ করত, এখন চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। চাকরি করার চেয়ে বাগানচর্চা সে বেশি পছন্দ করে। স্থানীয় কলেজের একটি ছাত্র সপ্তাহে দু-দিন তার বাগানের পরিচর্যা করে দিয়ে যায়। আর একটি ছাত্রী সপ্তাহে একদিন বাসন-টাসন, জামা ও ঘরদোর পরিষ্কার করে।
বেশ বড়ো বাড়ি, ওপরে পাঁচখানা ঘর, বেসমেন্টটাও অতি প্রশস্ত। গৌরহরিকে থাকতে দেওয়া হল বেসমেন্টে। সেখানে আলাদা টয়লেট ও স্নানের জায়গা আছে।
পলও লক্ষ করেছেন, গৌরহরি কোনো কিছুই চায় না, কোনো কিছু দেখেই বিস্মিত হয় না। এইটুকু ছেলে এত উদাসীন হয় কী করে?
মাসখানেকের মধ্যে গৌরহরি ভাঙা ভাঙা ইংরেজি রপ্ত করে ফেলেছে। অনেক সময় কেউ বুঝুক বা না বুঝুক সোজাসুজি বাংলায় কথা বলে যায়।
হঠাৎ এরই মধ্যে একটি মেয়ে এসে মহা উপদ্রব শুরু করে দিল। পল আর সুজানের মেয়ে বনি এক স্প্যানিশ গিটারবাদকের সঙ্গে জোড় বেঁধেছিল কিছুদিন বোস্টনে। মাসখানেক আগে ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। এখন সে মনের জ্বালা জুড়োতে এক দঙ্গল বন্ধুর সঙ্গে মিলে মাদক সেবন করে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্রীও বটে। মাঝে মাঝে সে বাবা-মায়ের কাছে আসে কিছু টাকা-পয়সা নিতে। সবদিক থেকে স্বাধীন হলেও বাবা-মায়ের কাছ থেকে টাকা নেবার ব্যাপারে লজ্জা থাকলে চলে না।
গৌরহরিকে দেখে সে দারুণ আকৃষ্ট হল। ভারতীয় সে অনেক দেখেছে। কিছু ভারতীয় হয় অত্যন্ত ফর্মাল ও ভদ্র, কিছু ভারতীয় আবার বেশ হ্যাংলা। কিন্তু এ যে একটি টাটকা, গেঁয়ো ছেলে। শরীরে যেন বুনো ঝোপের গন্ধ। চুল আঁচড়াতে জানে না। দাড়ি কামাতে শুরু করেনি। সকলের সামনে উরু চুলকোয়, বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে, এরকম একটা প্রকৃত অমার্জিত মানুষ এদেশে পাওয়া যাবে কোথায়!
একবেলার জন্য এসেছিল বনি, থেকে গেল তিনদিন। বেসমেন্ট থেকে সে আর নড়ে না। অনবরত গান শোনে। গৌরহরির কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে খায়। তার নিজের গাঁজা ভরা সিগারেট ওকে দেয়। ছেলেটা একই সঙ্গে নাচে, বাজনা বাজায় ও গান গায়, কিছুতেই তার ক্লান্তি নেই।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধে, সন্ধে গড়িয়ে মাঝরাত, পল আর সুজান ঘুমিয়ে পড়ে, তখনও বনির গান শোনার বিরাম নেই। বনি পা ছড়িয়ে বসে থাকে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে গৌরহরি গান করে যায়। ছোট্ট একটা প্যান্ট পরা বনির রক্তচন্দনের মতো উরু প্রায় খোলা। বুকে ব্রা-হীন জামা, সে সুন্দরের প্রতিমূর্তি। কিন্তু গৌরহরি বনিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে না। তার দিকে লোভের দৃষ্টিও দেয় না।
বনি অবাক হয়। তার অহমিকায় একটু আঘাতও লাগে। এরকম নিরালায় তার কাছাকাছি থাকলে কোনো পুরুষই সংযম রাখতে পারে না। বিশেষ পছন্দ না হলে বনি তার এত কাছাকাছি ও নিরালায় থাকতেও দেয় না কোনো পুরুষকে।
বনি জিজ্ঞেস করল, তুমি ট্রেনে গান গেয়ে ভিক্ষে করতে?
গৌরহরি বলল, না তো! লোকে আমার গান শুনে পয়সা দেয়।
বনি বলল, এ দেশে গান গেয়ে তুমি অনেক পয়সা রোজগার করতে পারবে। গৌরহরি বলল, একটা মোটে পেট, তার জন্য কত পয়সা লাগে?
বনি বলল, তুমি আমার সঙ্গে বোস্টনে যাবে? আমার অ্যাপার্টমেন্টে থাকবে। আমার বন্ধুদের শোনাব তোমার গান।
গৌরহরি বলল, আমি এখানেও থাকতে পারি, তোমার ওখানেও থাকতে পারি।
বনি তিনদিন পরে বাবা-মায়ের কাছে আবদার ধরল, সে বাউলটিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।
পল আর সুজান দুজনেই বেঁকে বসেছে।
গৌরহরির সঙ্গে বনির এত ঘনিষ্ঠ মেলামেশা সুজানের পছন্দ হয়নি। স্প্যানিশ বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকত, সেটাও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু একটা কালো ছেলেকে নিয়ে আদিখ্যেতা সহ্য করা যায় না। পলের আপত্তি অন্য কারণে। এই ছেলেটি পবিত্র, নিষ্পাপ, নির্লোভ। একে তিনি কিছুতেই নষ্ট হতে দেবেন না। তাঁর মেয়েকে তিনি জানেন, সে ছেলেদের মাথা চিবিয়ে খায়। তিনি নিজের দায়িত্বে গৌরহরিকে এদেশে এনেছেন, তাকে তিনি রক্ষা করবেনই।
কিন্তু বনি দারুণ জেদি। বাবা-মায়ের আপত্তির সে তোয়াক্কা করে না। একদিন বিকেলে গৌরহরিকে নিয়ে বেড়াতে যাবার ছুতোয় নিজের গাড়িতে চাপাল, তারপর হুশ করে বেরিয়ে গেল রোজ ভ্যালি ছাড়িয়ে। রাতারাতি সে বোস্টনে পৌঁছে যাবে।
তিন ঘন্টা ড্রাইভ করার পর একটা রেস্ট এরিয়ায় গাড়ি ঢুকিয়ে দিল বনি। একটানা গাড়ি চালাতে তার ভালো লাগে না। সন্ধে হয়ে এসেছে, এখানে আর একটিও গাড়ি নেই, একেবারে নির্জন। জানলার কাচ নামিয়ে দিয়ে বনি একটা গাঁজাভরা সিগারেট ধরাল।
তারপর মুচকি হেসে বলল, তুমি কি বুঝতে পেরেছ যে আমি তোমাকে নিয়ে পালাচ্ছি?
গৌরহরি বলল, অনেক দূরে চলে যাচ্ছি, বুঝেছি।
তোমার আপত্তি আছে? আমার বাড়িতে থাকবে।
ও বাড়িও যা, তোমার বাড়িও তা।
আ, বাবা আর মা রেগে যা ছটফট করবে! ভারি মজা হবে। তোমার তো বাইশ বছর বয়স, তুমি অ্যাডাল্ট, তোমাকে ওরা জোর করে আটকে রাখতে পারেন না। ওগো বাউল, তুমি কি চুমু খেতে শেখোনি? জানো, চুমু খেতে কেমন লাগে? এরকম মনমাতানো সন্ধ্যায় চুমু খেতে হয়। এসো। আমি তোমায় শিখিয়ে দিচ্ছি।
জামার একটা বোতাম খুলে দিল বনি।
গৌরহরি বনির শেখাবার অপেক্ষা করল না। সে বলল, আমি পুরুষ, তুমি প্রকৃতি। ভগবানের ইচ্ছাতেই পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির মিলন হয়। তুমি যদি চাও।
সে হাত বাড়িয়ে বনিকে বুকে টেনে নিল।
গৌরহরি আবার ফিরে এসেছে দেশে। উডস্টক উৎসবে তার স্থান হয়নি শেষ পর্যন্ত। পল কক্স দারুণ ত্রুদ্ধ হয়ে, তার ভিসা ক্যানসেল করিয়ে, ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন।
গৌরহরি আবার ট্রেনে গান গায় নিয়মিত। একই রকম চেহারা, মুখে কোনো গ্লানির চিহ্ন নেই। কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, কীরে, আমেরিকায় গিয়ে কী দেখলি?
গৌরহরি জানলার বাইরের দিকে হাত দেখিয়ে বলে, এখানে যা দেখি ওখানেও তাই। ভগবানের রাজত্বে সবই তো সমান। একই পুরুষ, একই প্রকৃতি। এ দেশেও গাছপালা, সে দেশেও গাছপালা, এ দেশেও ফুল, সে দেশেও ফুল…
কেউ কেউ ফুক্কুড়ি করে বলে, হ্যাঁরে গৌর, কোনো মেমসাহেব তোর সঙ্গে পিরিত করতে চায়নি?
গৌরহরি চুপ করে থাকে। কিছু বলতে চায় না। কিন্তু অন্যরা ছাড়বে কেন? সবাই রসের কথা শুনতে চায়। দু-একজন তাকে ঠেলা দিয়ে বলে, বল না, বল না, সাদা মেয়েদের পিরিত কেমন?
গৌরহরি ফিক করে হেসে ফেলে গান ধরে .
পিরিত যগ ডুমুরের ফুল
সে যে আলোকলতার মূল—
আকাশচুম্বী
আকাশচুম্বী
সন্ধের পর থেকেই একটু একটু বৃষ্টি পড়ছে, ও এমন কিছু না। লোডশেডিং হয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে, তাতেই বা কী আসে যায়। কলকাতার রাস্তার সঙ্গে এখন গ্রামের রাস্তার কোনো তফাত নেই। ওদের দুজনের হাঁটতে একটুও অসুবিধে হয় না।
গড়িয়াহাটের মোড় পেরিয়ে ওরা এগিয়ে গেল গোলপার্কের দিকে। চতুর্দিকে এত মানুষের ভিড়, তার মধ্যে ওরা আলাদা। ওরা নিজেদের নিয়েই মশগুল।
মেয়েটি পরে আছে একটা ফুলছাপ শাড়ি। ওর নাম মুন্নি। ছেলেটি মালকোঁচা মারা ধুতির ওপর পরেছে একটা নীল হাফশার্ট। ওর নাম জাদু।
দুজনেরই তেজি চামড়া, শরীরের কোথাও এক ছিটে চর্বি নেই, কোথাও কোথাও একটু-আধটু ধুলোবালি লেগে আছে অবশ্য।
মুন্নি বলল, আজ রাতে ভাত খাব।
জাদু বলল, রুটি খাবি না? ও দোকানে তো ভাত পাওয়া যায় না।
মুন্নি তবু আদুরে গলায় বলল, অন্য দোকানে খাব। আজ রুটি খেতে ইচ্ছে করছে না।
তারপর ফিক করে হেসে বলল, আজ আমি খাবারের পয়সা দেব।
সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ওপর লেকের এককোণে পর পর কয়েকটা দোকানের মাঝখানে একটা হোটেল। ওখানেই রোজ সন্ধেবেলা ওরা খেতে আসে। রুটি, ডাল-তড়কা, সবজি, ডিমের ঝোল, কিমা, কারি। গরম গরম সেঁকে দেয় রুটি, পেঁয়াজ, লঙ্কা যত ইচ্ছে চাও দেবে।
রাস্তার উলটো দিকেই একটা চিনে রেস্তোরাঁ। সেখানের চেয়ে এই হোটেলের ভিড় অনেক বেশি।
আজ মুন্নি আর জাদু সেদিকে গেল না।
ওরা ঢাকুরিয়া ব্রিজ পার হয়ে বাস ডিপোর পিছনটায় আর-একটা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারের মধ্যে এখানে জ্বলছে একটা হ্যাজাক বাতি। কয়েকখানা বেঞ্চি পাতা। পেঁয়াজ মেশানো মুসুরির ডালের গন্ধে ম ম করছে বাতাস।
মুন্নি আর জাদু ভেতরে ঢুকতে দ্বিধা করছে খানিকটা, একটা বাচ্চা বেয়ারা বলল, আসুন, বসুন, এই তো জায়গা আছে!
ওরা দুজনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। কোনো কারণ নেই, এমনিই।
ভাত ডাল আর ঢেঁড়সের তরকারি নিল প্রথমে। সেই খাওয়া শেষ হতে না হতেই বাচ্চা বেয়ারাটা কানের কাছে চেঁচাতে লাগল, আর কী নেবেন। পারশে মাছ, ট্যাংরা মাছ, মটন কারি, ফাউল কারি…
মুন্নি বলল, আজ মাংস খাব!
জাদুর তাতে কোনো আপত্তি নেই। আজ দুজনের কাছেই অনেক টাকা। এক প্লেট মাংসের সঙ্গে দু-বার ঝোল চেয়ে নিয়ে আরও অনেকটা ভাত। শহুরে সরু চালের ভাত, ঠিক যেন পেট ভরতেই চায় না।
হোটেল থেকে বেরিয়ে মুন্নি আবার আবদার জানাল, পান খাব!
জাদু পানের দোকানে গিয়ে চার খিলি পান নিয়ে ফেলল। মিঠা পাতা, সুপারি, জরদা, ইলাইচ। পাঁচ টাকার নোট বাড়িয়ে দিতেও দ্বিধা করল না সে।
তারপর উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘুরল অনেকক্ষণ।
এক সময় বৃষ্টি বেশ ঝেঁপে এল, ওরা দাঁড়াল একটা গাড়ি বারান্দার তলায়। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।
শহরের রাস্তায় ছাতা না থাকলেও চলে। বারান্দার পর বারান্দা, আর দোকানের ঝাঁপের তলা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়।
বাড়ি। প্রকাণ্ড বাড়ি।
একতলায় অনেকে শুয়ে আছে ঘেঁষাঘেঁষি করে, কুণ্ডলী পাকিয়ে। বৃষ্টির আমেজে ঘুমিয়ে পড়েছে এর মধ্যে।
ওরা সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে গেল দোতলা।
মুন্নি বলল, আরও ওপরে চল!
একেবারে ধবধবে নতুন বাড়ি। গতকালই দেয়ালগুলোতে সাদা রঙের পোঁচ পড়েছে, চুন আর এলার গন্ধ। জানলার গ্রিলে রং। হাত দিলে এখনও লেগে যেতে পারে।
দরজা লাগানো হচ্ছে আজ থেকে। এখনও সব ঘর বন্ধ হয়নি।
মুন্নি বলল, আরও ওপরে যাব।
জাদু বলল, আরও ওপরে গিয়ে কী হবে? এখানেই থেকে যাবি!
মুন্নি সুর করে বলল, না, না, আরও আরও ওপরে যাব।
জাদু মুন্নির কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ইস একেবারে ভিজে গেছিস!
মুন্নি খিলখিল করে হেসে বলল, তুই বুঝি ভিজিসনি!
জাদু নিজের জামাটা খুলে ফেলল। মুন্নির দিকে তাকাল। মুন্নি তো এভাবে শাড়ি খুলে ফেলতে পারে না। সে পরে শাড়ি বদলাবে। এখন তার ওপরে ওঠার নেশা লেগেছে।
ছ-তলার ওপরে উঠে এসে জাদু বলল, থেকে গেছি। আর উঠতে হবে না। এই ঘরটা কী ভালো দ্যাখ! সব দিকে জানালা।
ঘরটায় ঢুকে পরিদর্শন করে দেখল মুন্নি। অন্ধকার বটে। কিন্তু দেয়ালের নতুন সাদা রং থেকে যেন কিছুটা আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
সঙ্গে একটা মস্ত বারান্দা।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ মজা লাগল মুন্নির। একটা নারকেল গাছের মাথা অনেক নীচে। গ্রামে থাকার সময় মুন্নি দেখেছে, নারকেল গাছের মাথা সবসময় বাড়ি ছাড়িয়ে যায়! এখানে নারকেল গাছটা পাল্লায় হেরে গেছে।
চিক করে একটু থুতু ফেলল মুন্নি। কোথায় হারিয়ে গেল সেই থুতু।
তারপর সে বলল, চল, ওপরে চল।
জাদু বলল, আবার? এই ঘরটা তোর পছন্দ হল না?
মুন্নি হেসে হেসে মাথা দোলাতে লাগল। কত ঘর, একশো, দুশো, এর মধ্যে যে-কোনো ঘরেই ইচ্ছে করলে ওরা থাকতে পারে। রাজা বাদশাদেরও এত ঘর থাকে না।
সে বলল, চল না। চল না।
সাত তলা, আট তলা, ন তলা…। দশ তলায় এসে মুন্নির পা ব্যথা হয়ে গেছে। সিঁড়ির রেলিং ধরে সে দম নিচ্ছে।
জাদু এখানেও থামবে না। ওপরেই যখন উঠেছে, তখন একেবারে ওপরে উঠে যাবে না কেন?
সে মুন্নির হাত ধরে টেনে বলল, আয়।
মুন্নি বলল, দাঁড়া, দাঁড়া, একটু শ্বাস নিই!
টপ করে জাদু পাঁজাকোলা করে তুলে নিল মুন্নিকে।
মুন্নি হাত-পা ছুড়ে বলতে লাগল, আরে আরে, ছাড়, ছাড়, পড়ে যাব। তুইও তো থেকে গেছিস!
কে শোনে কার কথা। মুন্নিকে কোলে নিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল জাদু।
ওপরে এসে একটা গোটানো মাদুরের মতন মুন্নিকে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল সে।
জাদুও খুব হাঁপিয়ে গেছে। বুকটা উঠছে আর নামছে তার।
এগারো তলা। এটাই সবচেয়ে উঁচু। সারা বাড়িতে আলো নেই, কিন্তু এখানে আকাশের আলো আছে। ভিজে শাড়িতে মুন্নির হিলহিলে শরীরটা স্পষ্ট।
জাদু বলল, এখানে থাকব। সকলের মাথার ওপরে। কোন ঘরটায় শুবি বেছে নে।
পর পর অনেকগুলো ঘর। যে-কোনো ঘর ওদের শয়নকক্ষ হতে পারে। মুন্নি আগেই একটা বেছে রেখেছে মনে মনে। দক্ষিণ দিকের কোণের ঘর।
তিন দিক খোলা এই ঘর। এখান থেকে গোটা শহরটাকেই পায়ের তলায় মনে হয়। দূরের দিগন্তকে মনে হয় সমুদ্র।
জাদু দেয়ালে হাত বোলাতে লাগল খুব মায়ার সঙ্গে। মুন্নি মাথায় করে ইট বয়ে এনেছে, সে সিমেন্ট গেঁথেছে। কত মসৃণ হয়েছে দেয়াল। এ ঘর তার সৃষ্টি। তাদের দুজনের।
কাল থেকে সব ঘরে দরজা বসে যাবে। দরজার সঙ্গে তালা। তখন সব ঘর বন্ধ হয়ে যাবে।
কাল থেকে ইলেকট্রিক মিস্তিরি, কলের মিস্তিরিরা কাজ করবে। জাদু মুন্নিদের কাজ শেষ। ওরা চলে যাবে।
আজ রাত পর্যন্ত এই সব ঘরের ওপর ওদের অধিকার আছে। এই শহরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘরখানিতে ওরা শুয়ে থাকবে পাশাপাশি। ওদের নিজের হাতে গড়া ঘর। না ঘুমিয়ে ওরা জেগে জেগে গল্প করবে সারারাত।
দুজনেই দেওয়ালে হাত বুলোচ্ছে। তারিফ করছে মসৃণতার।
জাদু জিজ্ঞেস করল, ভিজে শাড়িটা খুলবি না? এখানে তো আর কেউ নেই। শরমের কী আছে?
মুন্নি ভ্রূভঙ্গি করে বলল, না, খুলব না।
দুজনে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। বাবু-বিবিদের মতন পরস্পরের গলা জড়িয়ে ধরল। গালে ঠেকাল গাল।
মুন্নি হাসতে হাসতে বলল, আমাদের বাড়ি।
জাদু মুন্নিকে আরও জোরে টেনে বলল, আমাদের বাড়ি।
তারপর দুজনেই হাসতে লাগল পাগলাটে গলায়।
একটু পরে রেলিং-এ অনেকখানি ঝুঁকে মুন্নি তার জিভটা বার করল। নীচের দিকে অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে শহর। মুন্নি দেখছে ওপরের দিকে। জাদু জিজ্ঞেস করল, ও কী করছিস?
মুন্নি বলল, দ্যাখ দ্যাখ, আকাশ কত কাছে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে, না?
জাদু হাত তুলে বলল, কই, ছোঁয়া যাচ্ছে না!
মুন্নি বলল, দূর বোকা, তুই কিছু বুঝিস না। দ্যাখ না, মেঘ নীচু হয়ে আসছে। বৃষ্টি নামবে। একটু মেঘ খেয়ে দ্যাখ না। জিভে লাগছে।
জাদুও জিভ বার করে দিল।
তারপর দুজনে মহা উল্লাসে মেঘ খেতে লাগল।
এক কম্বলের নীচে
এক কম্বলের নীচে
মাঝে মাঝে মাঝ রাত্তিরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হঠাৎ ঝগড়া শুরু হবে, এ তো অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।
বিয়ের প্রথম দু-বছর বাদ, সে তো একটানা পিকনিক। তারপর যদি একটি-দুটি সন্তান জন্মায়, তখন স্ত্রী তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে কয়েক বছর। বাচ্চারা এই পৃথিবীতে জবর দখল করতে আসে, তাদের দাবিও থাকে অনেকরকম। ইংরেজিতে দাম্পত্য জীবনের সেভেন ইয়ার ইচ বলে একটি কথা আছে। তা নিয়ে একটা চমৎকার ফিলম হয়েছিল রূপসি-মোহিনী মেরিলিন মনরো-কে নিয়ে। বাংলায় বলা যায় এক দশকের গাঁট, সেটা পেরুলে স্বামী-স্ত্রীর জীবনটা হয়ে যায় নদীর মতন, কখনও প্রবল বর্ষায় খরস্রোতা, কখনও শীতকালের শীর্ণ, নিরুত্তাপ চেহারা।
কখনও ঝগড়া হয় না, সব সময় স্বামী আর স্ত্রীর হাসি মুখ, পরস্পরের মন জোগানো কথা, সে জীবন খুবই কৃত্রিম। আর সন্দেহজনক।
ঝগড়া তো হবেই। তবে ঝগড়া অনেক রকম। বেশির ভাগ ঝগড়াতেই আগুন থাকে না। আলেয়ার মতন হঠাৎ হঠাৎ দপ করে জ্বলে ওঠে, আবার সকাল হতে না হতেই মিলিয়ে যায়। আগুন-জ্বলা ঝগড়াই অনেক সংসার পুড়ে যায়। এ গল্প তাদের নিয়ে নয়।
অরূপ আর বিশাখার মাঝে মাঝে আলেয়া-ঝগড়া হয়। সবসময় নিজেদের বাড়িতেই। অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে তারা সামলে সুমলে থাকে, বিশেষত কোথাও বন্ধু-বান্ধবের কাছে অতিথি হয়ে থাকলে বড়ো জোর একটু আধটু কথা কাটাকাটি পর্যন্ত চলতে পারে, তা ছাড়া একেবারে আদর্শ দম্পতির ছবি।
তবু একবার একটু বেশি ঝগড়াই হয়ে গেল।
আগে তার একটু পটভূমিকা দেওয়া দরকার।
অরূপের বন্ধু অগ্নিভ থাকে শিলচরে, ঠিক শহরে নয়, অদূরের চা-বাগানে। অনেকবার সে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, ঠিক সুযোগ হয়ে ওঠেনি, এবারে অরূপের অফিসের কাজে মণিপুর যেতেই হল। সুতরাং অতিরিক্ত কয়েকটা দিন বন্ধুর সঙ্গে কাটিয়ে আসা যেতেই পারে। বিশাখা কলেজে পড়ায়, তারও এখন ছুটি, ওদের ছেলে পড়ে নরেন্দ্রপুরে, সেই হস্টেলে থাকবে।
অগ্নিভ চা-বাগানের ম্যানেজার, তার অতি চমৎকার বাংলো, দু-তিনখানা গাড়ি ব্যবহার করতে পারে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা দারুন, অগ্নিভর স্ত্রীর স্বভাবটাই হাসি-খুশি, খুব ভালো গানও গায়। সুতরাং চারজনে মিলে বেড়ানো, আড্ডা, খাদ্য-পানীয়ের সদব্যবহারেই ছুটির কয়েকটা দিন কেটে যাওয়ার কথা। এর মধ্যে ঝগড়াঝাটির তো প্রশ্ন ওঠার কথাই নয়। তবু এক রাত্রে দরজা বন্ধ ঘরের মধ্যে দপ করে জ্বলে উঠল আলেয়া। এ আলেয়াতে বেশ আঁচও আছে।
ঝগড়ার উপলক্ষ্য একটা কম্বল।
দ্বিতীয় দিনে অগ্নিভ কাছাকাছি চা-বাগানের কয়েকজন বন্ধুকে নেমন্তন্ন করেছিল সন্ধেবেলা। আরও তিনটি দম্পতি। সবাই উচ্চশিক্ষিত, উচ্চচাকুরে এবং উচ্চ বংশের মানুষ। কাবাব ও মাছভাজা সহযোগে প্রিমিয়াম স্কচ, চিতাবাঘ শিকারের গল্প (আসলে লিপার্ড), গান ও হাসি-ঠাট্টায় কেটে গেল কয়েক ঘন্টা, তারপর ডিনার। এসব জায়গায় এরকমই হয়ে থাকে।
অগ্নিভ আর রীতার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু সওকত আর রোশেনারা। চেহারার দিক থেকে অন্তত এমন মানানসই স্বামী-স্ত্রী খুব কমই দেখা যায়। সওকত যেমন সুপুরুষ, রোশেনারা তেমনই রূপসি। যেন সিনেমার নারী-পুরুষ। বস্তুত চলচ্চিত্রে নায়ক নায়িকা না হয়ে ওরা দুজন কেন চা-বাগানের নিস্তরঙ্গ জীবনে দিন কাটাচ্ছে, তা বোঝা শক্ত।
রোশেনারা বসেছিল অরূপের পাশে। কেউ পাশে বসলে তার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলা হয়েই যায়। আবার খানিকটা অস্বস্তিও বোধ করছিল অরূপ, এখন তিলোত্তমার মতন এক নারী তার সঙ্গে বেশি গল্প করছে, এতে অন্য পুরুষদের হিংসে হচ্ছে না তো? বিশাখা কি কিছু মনে করছে? অরূপ তো ইচ্ছে করে রোশেনারার পাশে বসেনি। একটি সুন্দরী মেয়ে পাশে বসলে উঠে যাওয়াটাও তো চরম অভদ্রতা।
সওকত ঘুরে ঘুরে গল্প করছে সকলের সঙ্গে, বিশাখার সঙ্গেও কী নিয়ে যেন আলোচনা করল খানিকক্ষণ। অরূপ এক জায়গাতেই বসে থাকে, সেটাই তার স্বভাব। রোশেনারা একবার উঠে গেল কী যেন কাজের কথা বলল রীতার সঙ্গে, আবার ফিরে এল অরূপের পাশে। অনেক চেয়ার ও সোফা খালি রয়েছে, রোশেনারা তো অন্য কারুর পাশে বসলেও পারত, তবু সে কেন আগের জায়গাতেই ফিরে এল, তা অরূপ কী করে জানবে? মেয়েটির কিন্তু তার রূপের জন্য একটুও গর্বের ভাব নেই, ন্যাকামিও নেই, যৌন ইঙ্গিতও ছড়ায় না, সোজাসুজি চোখের দিকে তাকিয়ে সহজভাবে কথা বলে।
রোশেনারা গানও জানে না। একটি নজরুল গীতি গাইতে গাইতে সে কথা ভুলে গিয়েছিল মাঝপথে।
অরূপের অনেক গান মুখস্থ থাকে, বিশাখা যখন গায়, অনেক সময় অরূপ কথা জুগিয়ে দেয়, সেই অভ্যেসে সে রোশেনারাকে ‘কাবেরী নদীর জলে কে গো’ গানটির দ্বিতীয় স্তবকের বাণী ধরিয়ে দিল, তখন অন্যরা বলল, আপনিও গান না ওর সঙ্গে, রোশেনারাও মিনতি করল দুজনে শেষ করল গানটা। ডুয়েট।
অরূপ রোশেনারার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে, গলা মিলিয়েছে। কিন্তু সে একবারও রোশেনারার হাত স্পর্শ করেনি।
কিছুটা মদ্যপানের পর অন্য মেয়েদের একটু গা ছুঁয়ে কথা বলার ঝোঁক থাকে পুরুষদের, অরূপ কিন্তু নিজেকে সামলে রেখেছে। মাঝে মাঝেই তার চোখাচোখি হচ্ছিল বিশাখার সঙ্গে, বিশাখা অবশ্য কোনোরকম রাগের ভাব দেখায়নি। অরূপের মনে হল, তার বউও এখানে বেশ সুন্দর আছে।
ডিনারের পর বিদায় নেবার পালাতেও কিছু সময় কেটে যায়। গাড়িতে ওঠার আগেও থেকে যায় গল্পের রেশ। সবাই দাঁড়িয়েছে বাইরের চাতালে। এখানে উজ্জ্বল আলো থাকলেও একটু দূরেই মিশমিশে অন্ধকার। বেশ শীত পড়েছে। দূরে ডাকছে একটা রাত পাখি।
অতিথিরা চলে যাবার পরেই বিশাখা বলল, আমার খুব ঘুম পেয়ে গেছে, আমি শুতে যাচ্ছি।
অরূপ আর অগ্নিভ একটুখানি কনিয়াক নিয়ে আরও বসল খানিকক্ষণ। অরূপেরই চোখ ঢুলে এল আগে।
ওদের শুতে দেওয়া হয়েছে ডানদিকের একটি কোণের ঘরে। সে ঘরটি খুবই প্রশস্ত, সংলগ্ন বাথরুমটিই বৈঠকখানার মতন বড়ো। জানলা খুললেই দেখা যায় বাগান, দূরে পাহাড়ের পটভূমিকা। পাহাড়ের চূড়ায় একটা মন্দিরের আলো জ্বলে।
ঘরের মধ্যে একটা আবছা নীল আলো জ্বলছে। কম্বলে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে বিশাখা, সম্ভবত ঘুমন্ত। পা টিপে টিপে এসে, শব্দ না করে পোশাক বদলে ফেলল অরূপ, বাথরুম ঘুরে এসে শুয়ে পড়ল। কলকাতায় ঘুমের আগে কিছু না কিছু বই পড়া অভ্যেস, এখানে বিছানার পাশে আলো নেই। রাতও হয়েছে অনেক।
রাত পাখিটার ডাক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল অরূপ।
কতক্ষণ পর কে জানে। কীসের যেন শব্দে ঘুম ভেঙে গেল অরূপের। কেউ কি কাঁদছে? কোনো নারীর আর্ত বিলাপ? নাকি এটা স্বপ্ন?
চোখ মেলে দেখল, বিছানার অন্য পাশে হাঁটুতে থুতনি দিয়ে বসে আছে বিশাখা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আপন মনে কী যেন বলছে!
ব্যস্ত হয়ে অরূপ জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, মণি? পেট ব্যথা করছে?
বিশাখা কোনো উত্তর দিল না।
অরূপ গড়িয়ে কাছে এসে বিশাখার একটা হাত ধরে আন্তরিক উদবেগের সঙ্গে বলল, কী হয়েছে, কিছু কষ্ট হচ্ছে?
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তীব্র গলায় বিশাখা বলল, যাই হোক না, তাতে তোমার কী আসে যায়? আমি মরে গেলে তো তুমি খুশি হবে!
অরূপ একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। প্রত্যেকের ঝগড়ার সূত্রপাত ঠিক এইভাবেই হয়। বিশাখা নিশ্চিত জানে, এই কথাগুলো অরূপের বুকে বিষের তিরের মতন বিঁধবে। মানুষ যে দোষ করে না, সেই দোষের অভিযোগ দিলে সবচেয়ে বেশি আহত হয়। বিশাখার মৃত্যু হলে কেন খুশি হবে অরূপ, সে কি অতটাই খারাপ লোক? বিশাখার বিরুদ্ধে তার তো তেমন কোনো অভিযোগ নেই। বিশাখাকে এখনও সে ভালোবাসে, হয়তো নতুন প্রেমিকার মতন নয়।
অরূপ আহত হলেও সংযত গলায় বলল, মরে যাবে কেন? কী অসুবিধে হচ্ছে, সেটা বলো।
বিশাখা বলল, তোমার জানার দরকার নেই। তুমি মদ খেয়ে মাতাল হবে, তারপর ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোবে, তাই ঘুমোও।
এটাও আর একটা বিষের তির। অরূপ নিয়মিত মদ্যপান করে বটে, কিন্তু বিশাখা ছাড়া তাকে আর কেউ মাতাল বলে না। সবাই বলে, অরূপকে কখনও বেচাল হতে দেখা যায় না। তাতে অরূপ গর্ব অনুভব করে। মাতাল শব্দটি সে অপছন্দ করে। এক একদিন হয়তো মাত্রা একটু বেশি হয়ে যায়। শরীর কিছুটা দোলে, কথা বলে উচ্চকণ্ঠে কিন্তু সে কারুর সঙ্গে অভদ্র ব্যবহার করে না, নিজের পায়ে দাঁড়াবার শক্তি হারায় না, গালমন্দও করে না। মেজাজ ফুরফুরে হয়। তারপর তো সকলেই ঘুমোয়। কে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোয়, কে নিঃশব্দে, তা কে জানে? অরূপের নাক-ডাকা সম্পর্কে বিশাখা কখনও তেমন অভিযোগ জানায়নি। আজকাল বিশাখাও পিচ পিচ করে নাক ডাকে, ঘুম না এলে অরূপ তা শুনতে পায়। কিন্তু একবারও সে কথা বলেনি বিশাখাকে।
অরূপ বলল, আমি মোটেই মাতাল হইনি? তুমিও তো আজ দিব্যি জিন খাচ্ছিলে দেখলাম। দুবার না তিনবার নিলে?
বিশাখা কণ্ঠস্বরে অনেকখানি ঝাল মিশিয়ে বলল, তুমি দেখছিলে? আমার দিকে দেখার তোমার সময় ছিল? তুমি তো একজন সুন্দরীকে নিয়েই মত্ত হয়ে ছিলে।
অরূপের মনে মনে এই আশঙ্কাই ছিল। রোশেনারা। সে কেন অরূপের পাশে বসেছিল সারাক্ষণ, তার জন্য তো অরূপ দায়ী নয়! সে তো মহিলাকে ডাকেনি, টানাটানিও করেনি।
এবার কি একটু ঝাঁজ এসে গেল অরূপের গলাতেও? সে বলল, মত্ত হয়েছিলাম মানে? একজন পাশে বসলে, কথা বলব না?
বিশাখা বলল, শুধু কথা? চোখ সরাতেই পারছিলে না? তারপর হিন্দি সিনেমার নায়কের মতন মাঝপথে গান জুড়লে!
এরপর কথার পিঠে গরম গরম কথা। চাপা গলায় ঝগড়া।
এক সময় অরূপ আবার বিশাখার হাত ধরে বলল, এত রাত্তিরে এইসব কথা বলে কোনো লাভ আছে? শুধু শুধু ঘুম নষ্ট। শুয়ে পড়ো। কাল সকালে কথা হবে।
বিশাখা বলল, তুমি ঘুমোচ্ছিলে, ঘুমোও না। কে বারণ করেছে , আমি একটুও ঘুমোতে পারিনি এতক্ষণ। তুমি নেশার ঝোঁকে কম্বলটা টেনে নিচ্ছিলে বারবার। ওঃ, আমার ইচ্ছে করছে, এক্ষুনি কোথাও চলে যেতে, এরকম বিছানায় কেউ শুতে পারে। শীতে কাঁপছি! কাল সকাল হলেই আমি কলকাতায় ফিরে যাব। তুমি থাকো এখানে, সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ফস্টিনস্টি করো, আমি এখন দেখতে খারাপ হয়ে গেছি—
অরূপ বলল, মণি প্লিজ। তুমি মোটেই দেখতে খারাপ হওনি। আমি তোমাকে আগের মতনই ভালোবাসি!
বিশাখা বলল, বাজে কথা বোলো না। পুরুষরা সবাই স্বার্থপর। টেনে নিয়ে নিজে ঘুমোচ্ছো, কার স্বপ্ন দেখছ, এদিকে আমি…
আসল সমস্যাটা কী তা হলে কম্বল নিয়ে?
এ কম্বলটা খুবই অভিনব। খাটটাই মস্ত বড়ো, অন্তত তিন-চারজন শুতে পারে। চারখানা মাথার বালিশ, দুখানা পাশ বালিশ, কিন্তু কম্বল একটি মাত্র। এত বড়ো কম্বল দেখাই যায় না। এবং মখমলের কভার, ভেতরে যে উল আছে তা বোঝাই যায় না, ভারি নরম আর আরামের। এ কম্বলের নীচে অন্তত চারজন শুতে পারে।
চা-বাগানের বাংলোয় নিশ্চয়ই আরও অনেক কম্বল আছে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর জন্য যে এই একটি মাত্র কম্বল দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চয়ই এই কম্বলটার বৈশিষ্ট্যের জন্যই।
মধ্য রাত্তির, বিবাদ এক সময় থেমে যাবেই। স্বামী আর স্ত্রী দুদিকে ফিরে শোবে, একসময় ঘুমিয়েও পড়বে।
কিন্তু অরূপের আর ঘুম আসে না।
মাতাল হওয়ার অভিযোগ তাকে কষ্ট দিয়েছে। একটি সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে মেতে উঠে নিজের স্ত্রীকে অবহেলা করার অভিযোগ সে মানতে পারেনি। অবশ্য এরকম অভিযোগ সে আগেও কয়েকবার শুনেছে প্রকারান্তরে।
সবচেয়ে বেশি আঘাত সে পেয়েছে স্বার্থপরতার কথা শুনে। সে স্বার্থপর? স্ত্রীকে শীতের কষ্ট দিয়ে সে একা কম্বল উপভোগ করেছে? অরূপের মতন পুরুষরা নিজের স্ত্রীর কাছেও শিভালরাস থাকতে চায়। নিজে কম্বল গায়ে না দিয়েও ছড়িয়ে দিতে চায় বিশাখাকে।
এক একজন পুরুষের শোয়াটা বেশ অদ্ভুত ধরনের হয়। ঘুমের মধ্যে তার সারা বিছানা ঘুরে বেড়ায়। পাশের লোকের গায়ে পা তুলে দেয়। বিয়ের আগে অরূপের এই দোষ খুবই ছিল। এখন শুধরে গেছে, বিশাখা কখনও অরূপের শোওয়া নিয়ে দোষ দেয়নি। কিন্তু কম্বল টেনে নেওয়া? কলকাতায় দুজনের জন্য আলাদা কম্বল থাকে। বিয়ের পরে প্রথম দিকে দুজনের আলাদা কম্বল, ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। ইদানীং দুজনে যখন শুতে যায়, মাঝে মাঝে শরীর নিয়ে মত্ততার পর, ঘুমোয় আলাদা আলাদা কম্বলে। শরীর-সুখের পর ঘুমের সুখ আরও বেশি। আলাদা কম্বলে ঘুমের সুখ অবধারিত।
ইদানীং শরীর নিয়ে মত্ততার রাত্রি ক্রমশ কমছে, বাড়ছে ঘুমের সুখের ব্যাকুলতা। ঘুম বিঘ্নিত হলে বিশাখার খুবই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। হয়তো সব মেয়েরই হয়।
এখন বিশাখার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ কম্বল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, ঝগড়ার পর বিজয়িনী হয়ে ঘুমিয়েও পড়েছে বিশাখা, শুধু জেগে থেকে ছটফট করছে অরূপ।
এ জাগরণ অন্যরকম।
আমরা অনেক সময় ভাবি, সারারাত ঘুম আসছে না। আসলে, পুরোপুরি জাগ্রত থাকার বদলে এ এক ধরনের আধো-ঘুম। পাতলা পাতলা স্বপ্নের মধ্যে কেটে যায় সময়।
অরূপও আধা জাগ্রত অবস্থার মধ্যে অনবরত ভেবে যেতে থাকল একটাই কথা। সে স্বার্থপর? সে বিশাখার কাছ থেকে এত বড়ো কম্বলের অনেকটা কেড়ে নিয়ে নিজে ঘুমিয়েছে? বিশাখার অভিযোগ হয়তো পুরোপুরি মিথ্যে নয়, সে কি অন্যদিনের তুলনায় আজ বেশি মদ্যপান করে ফেলেছে। রূপসি রোশেনারা পাশে ছিল বলেই তার শরীর বেশি চনমনে হয়ে গিয়েছিল। এত বড়ো কম্বল, তবু ঘুমের ঘোরে সে বিশাখার গা থেকে টেনে নিয়েছিল অনেকখানি? হতেও তো পারে।
আধো ঘুমের মধ্যে অনুতপ্ত বোধ করল অরূপ। বিশাখাকে তার আরও ভালোবাসতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এরকম ঝগড়ার পর হঠাৎ ভালোবাসার কথা ঠিক বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয় না। মনে হয় যেন মন-জোগানো কথা।
হঠাৎ একটা যুক্তি মাথায় এসে গেল অরূপের।
হতে পারে সে আজ একটু বেশি মদ্যপান করে ফেলেছে। হতে পারে, নেশাগ্রস্ত ঘুমের ঘোরে সে বিশাখার গা থেকে কম্বল টেনে নিয়েছে। কিন্তু তার তো একটা সহজ সমাধানও ছিল। বিশাখা কেন তার দিকে সরে এল না? বিশাখা যদি তাকে জড়িয়ে ধরত, তাহলে তো দুজনের জন্যই প্রচুর কম্বল থাকত। কেন এল না বিশাখা? সে তো বিশাখার শত্রু নয়! শীত করলে বিশাখা তাকে জড়িয়ে ধরবে না কেন?
এক্ষুনি বিশাখাকে জাগিয়ে এই যুক্তিটা কি শোনানো যায়? কী উত্তর দেবে সে?
কিন্তু বিশাখা এখন দিব্যি ঘুমোচ্ছে। এখন তাকে জাগাবার প্রশ্নই ওঠে না।
অরূপের আধো-ঘুমের স্বপ্নটা ক্রমশ অন্য রূপ নিতে লাগল। সে দেখল, একটা বিশাল কম্বল, শত শত মাইল লম্বা, তার নীচে অনেক মানুষ। এরা কারা? এরা সারা দেশের মানুষ। এক কম্বলের নীচে শুয়ে আছে। কখনও কম্বলটা সরে গেলে সবাই কাছাকাছি এসে জড়াজড়ি করছে। হাসছে, গোর্খাল্যান্ড, কামতাপুরি, সুন্দরবনের মানুষ। কম্বলটা এক দিক থেকে অন্য দিকে বেশি করে গেলে সবাই হাসাহাসি করে ঠিক করে নিচ্ছে।
শেষ রাতের স্বপ্ন হঠাৎ তো থেমে যায় না, চলতেই থাকে। যারা এরকম স্বপ্ন দেখে, তারা জানে অন্যমনস্ক হয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করলেও স্বপ্নটা চলতেই থাকে। অরূপ দেখতে লাগল, সারা আকাশ জুড়ে উড়ছে একটা কম্বল। রং বদলাচ্ছে, তবু প্রধানত নীল রঙের।
তারপর অরূপ দেখল, সারা পৃথিবী জুড়ে রয়েছে একটা নীল রঙের কম্বল, আকাশের বদলে, সেই কম্বলের নীচে পৃথিবীর সব মানুষ। আকাশের সেই কম্বল নিয়ে টানাটানি চলছে, আবার ঠিকঠাক করে নিয়ে খল খল করে হাসছে সব মানুষ, কালো, সাদা, খয়েরি রঙের মানুষ, ঝগড়া হচ্ছে, আবার মিটেও যাচ্ছে। মানুষ কাছাকাছি এলেই ঝগড়া মিটে যায়, দূরত্বই যত গণ্ডগোলের মূল।
আধো-ঘুমন্ত অরূপের ঠোঁটে উঠেছে হাসি, সে পৃথিবীর কী দারুণ একটা সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে আজ। আকাশটাকে সমগ্র মনুষ্যজাতির একটা কম্বল বলে ধরে নিলেই তো হয়। আর কক্ষনো ঝগড়া হবে না।
সকালে যখন অরূপের ঘুম ভাঙল, তখনও বিশাখা ঘুমন্ত, নিজের অজ্ঞাতেই সে জড়িয়ে আছে অরূপকে। শরীরে শরীর, বুকে বুক। অতবড়ো কম্বলটা পড়ে আছে খাটের নীচে।
ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী
ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী
এ কাহিনি অভিজিৎ সেনের। কিছুটা কিছুটা জেনেছি তাঁর ডায়েরি থেকে। আমি তাঁর মুখেই শুনেছি, অনেক নাম এবং জায়গাগুলিও বদলাতে হবে। সংশ্লিষ্ট পাত্রপাত্রীরা অনেকেই বেঁচে আছেন এখনও। অভিজিৎ সেন গোপনীয়তায় তোয়াক্কা করতেন না। কিন্তু আমি কেন খামোখা ফ্যাসাদে পড়তে যাব।
অভিজিৎ সেন নিজেই আমাকে বলেছিলেন, যদি পারিস আমার জীবনের এই ঘটনাটা লিখিস। তাতে লোকশিক্ষা হবে।
কাহিনির শুরু বম্বে মেলের ফার্স্ট ক্লাসের কামরায়।
তার আগে বলে নিই, বিখ্যাত অভিজিৎ সেন আমাদের কাছে অভিদা। আমার চেয়ে বয়েসে অন্তত পনেরো বছরের বড়ো। বেশ সুঠাম, তেজি চেহারা। অনেকদিন পর্যন্ত যৌবন ধরে রেখেছিলেন।
আমার সঙ্গে পরিচয় পাড়ার ছেলে হওয়ার সুবাদে। তখন উত্তর কলকাতার রাজবল্লভ পাড়ায় থাকি। কিছু কিছু বাড়ির সামনের রকে আড্ডার আসর বসাবার রেওয়াজ ছিল। এখন সেই সব আড্ডা রক ছেড়ে বৈঠকখানায় স্থানান্তরিত হয়েছে, রকগুলো ভেঙে হয়েছে দোকানঘর। কিন্তু রকের আড্ডা আর বৈঠকখানার আড্ডার চরিত্রের তফাত আছে। রকের আড্ডায় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে যে-কোনো লোক ভিড়ে যেতে পারে। যার যখন ইচ্ছে উঠে গেল, আবার নতুন কেউ এসে বসল।
বিভিন্ন রকে বিভিন্ন বয়সিদের আড্ডা। কোনোটা বুড়োদের, কোনোটা মাঝবয়েসিদের, আর কোনোটা ছেলে-ছোকরাদের।
কোনোটাতেই মেয়েদের যোগ দেওয়ার অধিকার ছিল না। ইংল্যান্ডে বা আমেরিকাতেও অনেক ক্লাবে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আমাদের কলকাতাতেও এখনও অনেক ক্লাবে মেয়েরা মেম্বার হতে পারে না।
পাড়ার রকে গোঁফ গজাবার আগে কোনো ছেলে বসতে চাইলে তাকে ধমকে বিদায় করে দেওয়া হত। আমার তখন সদ্য গোঁফ গজিয়েছে।
প্রত্যেক পাড়াতেই গর্ব করার মতন কয়েকজন লোক থাকে। আমাদের ওই পাড়ায় যেমন নুটুদা আর অভিদা। নুটুদা ক্রিকেট খেলোয়াড়, রঞ্জি ট্রফিতে দুবার চান্স পেয়েছিল। ওয়ান ডে ক্রিকেট চালু হওয়ার আগে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের এত রমরমা ছিল না, শীতকাল ছাড়া অন্য সময় তাদের নাম শোনা যেত না। কিন্তু অভিদার নাম প্রায় সারা বছরই দেখা যেত খবরের কাগজে। গায়ক হিসেবে নাম ছড়াবার পর ততদিনে মুম্বই থেকে তাঁকে ডাকাডাকি করছে। নমিতা সিংহ নামে একজন ফিল্মের অভিনেত্রীকেও এ পাড়ার মেয়ে বলে গণ্য করা হত। যদিও নমিতা সিংহ মাত্র সাড়ে চার মাস একটা ভাড়া বাড়িতে ছিল, তারপর চলে যায় নিউ আলিপুরে। তবু রাজবল্লভ পাড়া তার ওপর দাবি ছাড়বে না।
এ পাড়ায় অভিদাদের তিন পুরুষের পুরোনো বাড়ি। যৌথ পরিবার, অনেক নারীপুরুষে জমজমাট। বাড়ির মধ্যে একটা ছোটো মন্দির, তার মধ্যে রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ, সকাল-সন্ধে আরতি হত, সেই ঘন্টাধবনি শুনে আমরা সময় বুঝে নিতাম। সন্ধ্যারতির সময়ই আমাদের আড্ডা ভেঙে বাড়িতে ফিরে পড়তে হত।
মুম্বই পাড়ি দেওয়ার পরেও অভিদা মাঝেমাঝেই কলকাতায় আসতেন। তখন তিনি টালিগঞ্জে নিজস্ব একটা ফ্ল্যাট নিয়েছেন বটে, কিন্তু দু-চারদিন এ পাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে কাটিয়ে যেতেন। অন্তত যতদিন তাঁর মা বেঁচেছিলেন।
অত বিখ্যাত মানুষ, খবরের কাগজে ছবি বেরোয়, অথচ অহংকার ছিল না একেবারে। ক্রিকেট খেলোয়াড় নুটুদা বরং কলার উঁচিয়ে গম্ভীরভাবে হেঁটে যেতেন রাস্তা দিয়ে, বিশেষ কাউকে পাত্তা দিতেন না। কিন্তু অভিদা মিশতেন সব বয়েসিদের সঙ্গে।
আমাদের রকের আড্ডায় সাহিত্য-শিল্প-সিনেমা-পরনিন্দা-পরচর্চা সবই চলে। কথায় কথায় রাজা-উজির মারি। অল্প বয়েসে সব কিছুতেই আঘাত করার একটা প্রবণতা থাকে। আধুনিক গায়ক-গায়িকাদের আমরা নস্যাৎ করে দিতাম, অভিদাকেও বড়ো গায়ক মনে করতাম না। তবে গলার আওয়াজ জোরালো, আধুনিক গান না গেয়ে তাঁর ক্লাসিকাল গানে টিকে থাকা উচিত চিল। আমরা মুগ্ধ ছিলাম অভিদার ব্যক্তিত্বে।
বয়েসের অনেক তফাত থাকলেও আমাদের মতন অর্বাচীনদের আড্ডায় তিনি এসে বসতেন মাঝে মাঝে। অমন বিখ্যাত হয়েও পোশাকের কোনো আড়ম্বর ছিল না, পাজামা আর গেঞ্জি পরে রাস্তার ধারে বসতে দ্বিধা করতেন না। চওড়া বুক, ফরসা রং, তখনও পর্যন্ত একটাও চুল পাকেনি, চোখে পড়ার মতন চেহারা।
হাতে সবসময় সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। অকৃপণ সিগারেট বিলোতেন। আমরা প্রথম প্রথম সংকোচ বোধ করতাম, তিনি হাসি মুখে বলতেন, নে নে, অত লজ্জা কীসের। আমি ষোলো বছর বয়েস থেকেই বিড়ি টানতে শিখেছি।
উলটোদিকে নিবারণদার চায়ের দোকান। অভিদা হাঁক দিয়ে বলতেন, নেবাদা, এখানে এক রাউন্ড চা দিয়ে যাও। ঠিক আধ ঘন্টা অন্তর অন্তর চা দিয়ে যাবে।
তারপর আমাদের জিজ্ঞেস করতেন, এ পাড়ার লেটেস্ট খবর কী বল! কেউ কারুর বউকে নিয়ে ভাগেনি? ওই কোণের বাড়িটায় নতুন ভাড়াটে এসেছে, দুটো ডবগা ডবগা ছুঁড়িকে দেখলুম, তোরা কেউ প্রেম করিসনি?
উত্তর কলকাতায় সে সময়ে মুখের ভাষায়, শালা, মাগি, বেজম্মা এইসব শব্দ অনায়াসে মিশে থাকত। কেউ খুব আদর করে তার বন্ধুকে ডাকত। এই শুয়োরের বাচ্চা, এদিকে আয়।
একদিনের কথা মনে আছে। আমার বন্ধু মানস বরাবরই পেটরোগা। কথা বলতে বলতে হঠাৎ বাথরুমের দিকে ছুটত। তার মা তারকেশ্বরে পুজো দিয়ে মন্ত্র পড়া ফুলপাতা মুড়ে একটা বড়ো রুপোর মাদুলি বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা সব সময় তাকে গলায় পরে থাকতে হত। সেদিন রুপোর মাদুলিটা তার জামার বাইরে বেরিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অভিদা জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী রে?
মানস তারকেশ্বর, মা পেট খারাপ এই সব বলতেই অভিদা ঝুঁকে এসে হ্যাঁচকা টানে সেটা ছিঁড়ে নিলেন।
তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, এতে সত্যি কাজ হয়?
মানস বলল, অনেকটা কমেছে।
অভিদা বললেন, ভালো কথা, আমাদের বাড়িতে নেপু নামে একটা বাচ্চা চাকর আছে, সেটা যখন তখন পেট ব্যথায় ছটপট করে। তাকে পরিয়ে দেব, যদি তার সারে…তোর মাকে বলিস তোর জন্য আর একটা গড়িয়ে দিতে।
মানস কাঁচুমাচু হয়ে গেল। তাদের বাড়ির অবস্থা সচ্ছল, ওইটুকু রুপোর জন্য কিছু যায় আসে না, কিন্তু মন্ত্রঃপূত মাদুলি কি অন্যকে দেওয়া যায়? বাড়িতে খুব বকাবকি করবে।
অভিদা কিন্তু মাদুলিটা ফেরত দিলেন না। তাঁর এই ব্যবহারটা খুব অদ্ভুত লেগেছিল।
যাই হোক, এবার আসল গপ্পে আসা যাক।
সেদিন আমার বম্বে মেল ধরার কথা। হাওড়া ব্রিজে দারুণ জ্যাম, ট্যাক্সি আর নড়ে চড়ে না। আমার কাছে শুধু একটা বড়ো ব্যাগ ছিল, একসময়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে প্ল্যাটফর্মে যখন পৌঁছলাম, তখন ট্রেন নড়াচড়া শুরু করেছে।
হুড়মুড় করে উঠে পড়ে আমার কিউবিকল খুঁজে ভেতরে ঢুকে দেখলাম, তলার একদিকের বাঙ্কে বসে আছে দুজন যাত্রী, অন্য বাঙ্কে পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আর একজন।
সবে কলির সন্ধে, এসময় কারও শুয়ে থাকার কথা নয়। হয়তো লোকটি অসুস্থ, তাই ভালো করে লক্ষ করিনি। ব্যাগটা সিটের তলায় রেখে, অন্য দুজনের পাশে বসার পর দেখি, সেই শুয়ে থাকা ব্যক্তিটি আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথায় সামান্য টাক, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা।
সিগারেট দেশলাই পকেটে নেই, ব্যাগে ভরা আছে। আবার ব্যাগটা টেনে বার করে, সিগারেট দেশলাই নিয়ে একটা জ্বালাবার পর দেখি, তখনও শুয়ে থাকা যাত্রীটি চোখ ফেরায় নি। অন্য দুজন দক্ষিণ ভারতীয়, তারা গল্প করছে নিজেদের ভাষায়।
কয়েক মুহূর্ত পরে সেই লোকটি বলল, তুই সুনীল না?
সঙ্গে সঙ্গে গলার আওয়াজে চেনা গেল। অভিদা।
আশ্চর্য, আমি অভিদাকে চিনতে পারিনি, আর উনি আমাকে মনে রেখেছেন?
এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় বছর দশেক। আমি রাজবল্লভ পাড়া ছেড়ে চলে গেছি দমদম। অভিদার ছবি নিয়মিত পত্রপত্রিকায় দেখি, অনেক খবরও থাকে তাঁর সম্পর্কে। এখন তিনি আর শুধু গায়ক নন, অনেক হিন্দি ফিলমের সার্থক সুরকার।
আগে চশমা পরতেন না। মাথা ভরতি চুল ছিল। অভিজিৎ সেনের মতন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ওরকম খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ট্রেনে যাচ্ছেন, এটাও কি ভাবা যায়? সবাই খানিকটা সাজগোজ করে। আর ফিলম সংক্রান্ত লোকজনদের কিছুটা ঝলমলে উৎকট পোশাক পরাই রেওয়াজ।
অভিদা জনপ্রিয়তার শিখরে, তাঁর কথা তো আমি জানবই , কিন্তু আমার নামটা তিনি দশ বছর পরেও মনে রেখেছেন, স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর, তা মানতেই হবে।
প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর অভিদা জিজ্ঞেস করলেন, তুই এখন কী করছিস রে সুনীল? সাকসেসফুল হয়েছিস তা বোঝাই যাচ্ছে, ট্রেনে ফার্স্টক্লাসে ট্রাভল করছিস। চাকরি, না বিজনেস?
না, নিজের পয়সায় টিকিট কেটে ফার্স্টক্লাসে যাওয়ার মতন অবস্থা আমার হয়নি। তখন পর্যন্ত আমি শুধু কবিতাই লিখি। কবিতা লিখে কিছু নাম টাম হলে, টাকা পয়সার দিক থেকে কোনো সুবিধে হয় না বটে, তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে কবি সম্মেলন বা সাহিত্য বাসরে আমন্ত্রণ পাওয়া যায়, গল্প-উপন্যাস লেখকরা বরং এদিক থেকে খানিকটা বঞ্চিত। আমি ভ্রমণ-ক্ষ্যাপা, দূরের কোনো জায়গা থেকে ডাক পেলেই ছুটে যাই।
আমার গন্তব্য মুম্বই নয়, আমেদাবাদ। একটি গুজরাতি প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। তারাই ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে দিয়েছে। মুম্বইতে এক রাত্রি বাস করে পরদিন আমেদাবাদের ট্রেন ধরতে হবে।
একটু পরে জিজ্ঞেস করলাম, অভিদা, তোমার শরীর খারাপ নাকি? এখন থেকেই শুয়ে পড়েছ?
অভিদা বললেন, দুদিন ধরে গা-টা ম্যাজ ম্যাজ করছে। তা ছাড়া পায়ের যা অবস্থা, বসতে গেলে পা-টা একেবারে সোজা সামনে মেলে থাকতে হয়। সেটা ভালো দেখায় না।
তলার দিকে চাদরটা একটু সরালেন অভিদা। তাঁর একটা পায়ের অনেকখানি প্লাস্টার করা। খুব নতুন নয়, তার ওপরে কিছু মানুষের সই রয়েছে।
কোনো মানুষের পা ভাঙা দেখলেই কৌতূহল হয়। জিজ্ঞেস করলাম, কী করে ভাঙল?
অভিদা হাসতে হাসতে বললেন, ভগবান ভেঙে দিয়েছে।
সবসময় ঠাট্টা-মসকরা করা অভিদার স্বভাব। এটা কী ধরনের মসকরা? আমি বললাম, ভগবান নিজে এসে ভেঙে দিলেন? তুমি তাঁকে দেখতে পেয়েছিলে?
অভিদা বললেন, নারে, দেখতে পাইনি। পেছন দিকে ছিল। ওই যে কথা আছে না, ‘ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঠেলা’, সেই রকমই। ভূতের বদলে ভগবান আমায় পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিল।
আমার চোখে তখন কৌতূহল দেখে অভিদা বললেন, তোকে ব্যাপারটা পরে বলব। এখন একটা কাজ কর তো, তোকে যখন পাওয়াই গেছে, একটু খাটিয়ে নিই। এই বাঙ্কটার তলায় দ্যাখ আমার বড়ো ব্যাগটার পাশে একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা আছে, সেটা ওপরে নিয়ে আয়।
সেই ঝোলাটার মধ্যে একটা স্কচ হুইস্কির বোতল। লুকোবার কোনো চেষ্টাই নেই, ওপরের দিকটা বেরিয়ে আছে। একটা জলের ফ্লাক্স, আর একটি কাচের গেলাস।
অভিজিৎ সেনের জীবনযাত্রার কাহিনিও সুবিদিত।
ইচ্ছে করলে অভিদা হয়তো ফিলমের নায়কও হতে পারতেন। কিন্তু অত আলো ও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার এক কথা বলা তাঁর পছন্দ নয় বলে, কয়েকজন পরিচালক আগ্রহ দেখালেও অভিদা রাজি হননি। কিন্তু তাঁর অনেক কীর্তি-কাহিনি অনেক নায়ক-নায়িকাকেও হার মানিয়ে দেয়।
মুম্বইতে পাকাপাকি যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে এক উঠতি অভিনেত্রীর বিয়ে হয়। সে বিয়ে ভেঙেও যায় দেড় বছরের মধ্যে তারপর আর বিয়ে করেননি, গুজব ছড়িয়েছে নানা রকম। কিছুদিন স্মিতা পাটিলের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছিল। কোনো একটা পার্টিতে মদ খেয়ে নাকি মারামারি করেছিলেন রাজ বববরের সঙ্গে। এক গায়িকাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন ইউরোপ। এই তো কিছুদিন আগে মদ খেয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে পুণে শহরে এক ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়, অভিদা মাথা গরম করে সেই পুলিশকে চড় মেরে বসেছিলেন। সেজন্য আদালতে গিয়ে তাঁকে জরিমানাও দিতে হয়েছে।
এ সবই আমার কাগজে পড়া বা লোকমুখে শোনা। হয়তো এর বাইরেও আরও অনেক কিছু ঘটেছে। হিন্দি ফিলম আমি প্রায় দেখিই না। অভিদার গাওয়া বা সুর দেওয়া অনেক গানই আমার শোনা হয়নি। তবে পুজো প্যান্ডেলের অনেক গান বাধ্য হয়ে শুনতে হয়, হঠাৎ অভিদার গলার আওয়াজ চিনতে পারলে মন দিই। মানুষটিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলেই। অভিদা বাংলা গানও কিছু কিছু রেকর্ড করেছে, সেগুলো বিশেষ সুবিধের না, অন্তত আমার রুচির সঙ্গে মেলে না। তবে, এরই মধ্যে একটা ভাটিয়ালি খুবই ভালো লেগেছিল। স্বীকার করতেই হবে, এরকম দরাজ গলা এখন আর কারও নেই।
অভিদা জিজ্ঞেস করলেন, তোর কাছে গেলাস আছে?
আমি বললাম, না তো।
এই তো মুসকিলে ফেললি। মোটে একটা গেলাস এনেছি। ঠিক আছে ফ্লাক্সের ঢাকনাটা ব্যবহার করা যাবে। এ সব খাস-টাস তো?
যদি একটু প্রসাদ দাও।
প্রসাদ কণিকা মাত্র। একটুই পাবি, বেশি না। আগে আমারটা ঢাল। মুম্বইতে কোথায় রাত কাটাবি?
দাদারে একটা ছোটখাটো হোটেল চিনি।
মুম্বইতে যাচ্ছিস, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিসনি কেন?
তুমি বিখ্যাত লোক, আমাদের ধরা ছোঁওয়ার বাইরে। তা ছাড়া অনেকদিন যোগাযোগ নেই।
অভিদা অন্য সহযাত্রীদের দিকে গেলাস তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ডু ইউ মাইন্ড?
দুজনেই ভদ্রতা করে বললেন, নো, নো, নো।
অভিদা আবার বললেন, উড ইউ লাইক টু জয়েন আস?
দেখা গেল, দক্ষিণ ভারতীয় দুজনই সাত্ত্বিক প্রকৃতির। মদ স্পর্শ করে না। তবে আমাদের ব্যাপারে আপত্তি নেই।
অভিদা আমাকে বাংলায় বললেন, এত লম্বা জার্নি, মদ না খেয়ে লোকে কী করে যায়, আমি বুঝতেই পারি না। তোর কাছে বোতল আছে?
না।
সঙ্গে রাখিস না? তার মানে এখনও নেশা ধরেনি।
আমি শুধু অন্য কেউ খাওয়ালে খাই।
ওইভাবেই শুরু হয়। নেশাখোর হবি কি না এখন থেকে ঠিক কর। যদি না হতে চাস, এখন থেকেই আর ছুঁবি না। আর নয় তো আমার মতন অবস্থা হবে।
তুমি রোজ খাও?
রোজ খাদ্য খেতে হয় না? আমার খাদ্যের সঙ্গে পানীয়ও লাগে। আগে মার কাছে গেলে খেতাম না। এবার মার কাছেও পারমিশান নিয়ে নিয়েছি। মুম্বইতে খুব কাজ ছিল, মাকে দেখতেই কলকাতায় এসেছিলাম তিন দিনের জন্য।
তোমার মা…এখন ভালো আছেন?
আমাকে দেখেই তো ভালো হয়ে গেলেন! প্লেনে এসেছিলাম, কিন্তু এই পা নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে বেশ ব্যথা লাগে। তাই ফেরার সময় মনে হল, ট্রেনই ভালো।
টিকিট পেলে কী করে? অনেকদিন আগে তো কাটতে হয়।
কত দালাল আছে! আমার ভক্তও তো আছে রে। তারা জোগাড় করে দেয়। তুই আমার গান শুনিস?
তেমন শোনা হয়নি। একটা ভাটিয়ালি খুব ভালো লেগেছিল। এই রকম গান আরও বেশি গাও না কেন?
ওতে কি আর পয়সা আসে? এখন ফিলমে ঝিং চ্যাক ঝিং চ্যাক ছাড়া চলে না। ফাস্ট বিট। লাউড। সারা পৃথিবীতে প্রায় এক রকম। আমার টাকার দরকার, তাই ওই সব চ্যাংড়া গান গাই। আমরা নাকি রাজা রাজবল্লভের বংশ, তুই জানিস?
ও পাড়ায় থাকতে শুনেছি।
সত্যি কি-না কে জানে! বাবা-টাবাদের কাছে শুনেছি। হয়তো লতায়-পাতায় কিছু একটা সম্পর্ক ছিল। সে যাই হোক, সাহেবদের পা চেটে আমাদের কোনো পূর্বপুরুষ টাকা করেছিল অনেক। কলসির জল গড়াতে গড়াতে শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কিছু নেই। ওই যে অত বড়ো বাড়ি, তার চোদ্দোজন শরিক। তবু বনেদিয়ানাটা রয়ে গেছে। দেখিসনি, আমার বাবা-কাকারা কুচোনো ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি ছাড়া পরত না! সব ফোতো কাপতেন! পেটে ভাত নেই, মুখে পান। অল্প বয়েস থেকেই আমি বুঝেছিলুম, ওসব নকলিবাজি আমার দ্বারা পোষাবে না। আমার টাকা চাই, আমি ভোগী লোক, আমার অনেক টাকা দরকার। চাকরি-বাকরি করা আমার দ্বারা পোষাত না, নেহাত গলাটা আছে, তাই গান গেয়ে টাকা পাই।
তুমি কারও কাছে গান শেখোনি?
কার কাছে শিখব? ধৈর্য ছিল না। মহম্মদ রফি-কে নকল করতাম। রফি সাহেব আমার গুরু। দূর থেকে, মানে আমি একলব্য শিষ্য। দু-একটা পাড়ার জলসায় গান গেয়ে বেশ হাততালি পেতাম। ব্যাস, বুঝে গেলুম, এই লাইনটাই ধরতে হবে। প্রথম দিকে স্রেফ বড়ো বড়ো গায়কদের নকল করে পপুলার হয়েছি। মুম্বইতে আসার পর হেমন্তবাবু আমায় খুব সাহায্য করেছিলেন। উনিই প্রথম বলেছিলেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার নিজের গলাটা খোলো!
তোমার গলাটা সত্যিই ভালো!
তুই প্রশংসা করছিস? গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। মুম্বইতে নাম করেছি বটে, কলকাতার লোক এখন আর আমায় তেমন পছন্দ করে না জানি! তুই কবিতা টবিতা লিখিস বললি, আমি কিছুই পড়িনি। এক সময় খুব পড়ার নেশা ছিল, এখন আর বিশেষ সময় পাই না। তুই গান লিখিস না? দে, দু-চারখানা গান লিখে দে। হিন্দিতে ট্রানস্লেট করে কোনো ফিলমে লাগিয়ে দেব। তুই কিছু পয়সা পাবি।
না, অভিদা, গান লেখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি দুর্বোধ্য আধুনিক কবিতা লিখি, যা অনেক লোকই বোঝে না।
কেন, ওরকম লিখিস কেন?
কেউ কেউ তো খেয়াল তারানাও গায়, অনেকে বোঝে না।
হুঁ!
এর মধ্যে আমাদের রাত্তিরের খাবার এসে গেল। আমি ঢাকনা খুলে হাত দেওয়ার আগেই অভিদা ধমক দিয়ে বললেন, রেখে দে, আগে মালের নেশা না জমলে কেউ খায় নাকি?
ফ্লাস্কের ঢাকনায় আমি একটুখানি নিয়ে বসে আছি, অভিদা প্রায় আধবোতল উড়িয়ে দিলেন। তাতেও কথা একটুও জড়ায়নি, মাথা ঠিক আছে।
পায়ের ওপর থেকে চাদরটা সরে গেছে। ডান পায়ের গোড়ালি থেকে উরু পর্যন্ত মোটা প্লাস্টার। আমি ঝুঁকে পড়ে তার ওপর নাম সইগুলো পড়বার চেষ্টা করলাম। মাত্র তিনটে চারটে নামই চেনা, দিলীপকুমার, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, আশা ভোঁসলে, আরও অনেক নাম আছে।
অভিদা বললেন, তুই বুঝি ভাবছিস, আমি ফাঁট দেখাবার জন্য ওই সব হিরো-হিরোইনদের নাম সই করিয়েছি? কদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, তখন অনেকে দেখতে এসেছে নিজেরাই সই করেছে। গুড উইশ করার মতন। সুরকারদের সবাই খাতির করে, গান হিট হওয়ার ওপর ছবি হিট হওয়া নির্ভর করে অনেকখানি। তবে এগুলো আমি মুছিনি ইচ্ছে করে, কলকাতায় আমার ভাইপো ভাগনিরা দেখে মজা পাবে বলে। এখন মুছে ফেললেই হয়।
অভিদা হাতের গেলাস দিয়ে সেই নামগুলোর ওপর ঘষতে লাগলেন।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়েছিলে?
অভিদা বললেন, হ্যাঁ, তবে মদ খেয়ে গড়াইনি। দিনের বেলা, সুস্থ অবস্থায়। তখন বললুম না, ভগবান আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ভগবান সব সময় আমার পেছন পেছন ঘোরে। হয়তো, এই কামরাতেও অদৃশ্য হয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
এটাকে মাতালের প্রলাপ মনে করে মুখ ফেরাতেই অভিদা হা হা করে হেসে উঠলেন।
তারপর আমার একটা হাত ধরে টেনে বললেন, বিশ্বাস করলি না তো? আমি পাগল না, মাতালও হইনি। তবে শোন, তোকে গোড়া থেকে ঘটনাটা বলি। তবে, যতদিন না আমি অনুমতি দেব, তুই আর কারোকে বলতে পারবি না। তাতে রাজি আছিস?
আমি মাথা ঝোঁকালাম।
অভিদা এক বিচিত্র কাহিনি বলতে শুরু করলেন।
সেই অভিদার জবানিতেই শোনা যাক।
অভিদার কথা
আমি জানি, আমার চরিত্রে একটা বৈপরীত্য আছে। ডুয়াল পার্সোনালিটি। তবে ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মতন অতটা নয়। তবে কোনো খুনটুন করিনি। আমি ভালো লোক, আবার এই আমিই ঝোঁকের মাথায় এমন এক একটা কাণ্ড করে ফেলি, যাতে আমার নিজেরই চরম ক্ষতি হবে, শেষ মুহূর্তে সেটা আমি বুঝি, তবু জেদের বশে থামি না। কেন যে এরকম করি, তার যুক্তি খুঁজে পাই না। এক এক সময় স্বেচ্ছায় বিষাদ ডেকে আনি, যেন এটা আমার খেলা। আমার এক বন্ধু ডাক্তার, সে বলে, আমার মধ্যে নাকি আত্মহত্যা করার প্রবণতা আছে। হঠাৎ এত নামডাক, আর টাকাপয়সা পাওয়া আমার সহ্য হচ্ছে না। কথাটা ঠিক বলে মনে হয় না। আমি কক্ষনো আত্মহত্যার চেষ্টা করিনি, সে চিন্তাও মাথায় আসে না। যা কিছু পেয়েছি, তা নিজের চেষ্টায়, নিজের ক্ষমতার জোরে পেয়েছি, এ ব্যাপারে আমার কোনো হীনম্মন্যতাও নেই।
আমি হইচই ভালোবাসি, আবার নির্জনতাও ভালোবাসি। মুম্বইয়ের জীবন সব সময় উদ্দাম, বিশেষত আমাদের লাইনে। সব সময় সবাই ছুটছে, থামবার উপায় নেই। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত জাগা, মদ্যপান, মেয়েদের নিয়ে হুল্লোড়, এ সব তো লেগেই আছে। আমি খুব পছন্দ করি এই সব, লোকে জানে, আমি এক নম্বর হুল্লোড়বাজ।
আবার এক এক সময় এই সবে দারুণ বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। টানা দশ-পনেরো দিন চেনা কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলতেই ইচ্ছে করে না। টেলিফোনের আওয়াজে গায়ে যেন হুল ফোটে। ফিলম লাইনের সবাই জানে, আমি মাঝে মাঝে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যাই কয়েকদিনের জন্য। কোথায় যাই, কেউ টের পায় না।
সে সব সময়ে আমি কোনো হোটেলেও উঠি না। আলাদা একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকি। রান্নাবান্না, আর সব কিছুই নিজেরটা নিজে করে নিই। দাড়িও কামাই না সেই কদিন।
সে রকমই একবার গিয়েছিলুম এক জায়গায়, নাম বলছি না, ধরা যাক সে জায়গাটার নাম দুরানিগঞ্জ, মহারাষ্ট্রের মধ্যেই, নদীর ধারে ছোটো শহর, চারপাশে ছোটো ছোটো পাহাড়ঘেরা। শহর থেকে অনেকটা বাইরে, একটা পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো কটেজ বানিয়ে রাখা আছে, ভাড়া দেওয়ার জন্য। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আমি বুক করেছিলাম সেরকম একটা কটেজ।
দুরানিগঞ্জের একমাত্র সিনেমা হলে তখনও যে ছবিটা চলছে, সেটা আমারই সুর দেওয়া। সুরকারদের ছবি তো পোস্টারে থাকে না, তাই আমাকে দেখে কেউ চিনবে না। শহরে আমি যেতামই না, একসঙ্গে অনেক খাবারদাবার কিনে এনে বাড়িতে বসে থাকতাম চুপচাপ।
পরিবেশটা ভারি সুন্দর। আমার কটেজটা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায়, বারান্দায় দাঁড়ালেই অনেক নীচে দেখা যায় নদীটাকে। প্রচুর গাছপালা। অনেক পাখি এসে বসে। কোনটা কোন পাখি তা চিনি না। এক একটা পাখি দেখে মনে হয়, এ রকম পাখি আগে কখনও দেখিনি। আমি শহুরে মানুষ, পাখি আর দেখলাম কবে?
প্রথম দু-তিনদিন কানের মধ্যে যেন ঝনঝন শব্দ হত। মুম্বইয়ের জীবন, পার্টি, পঁয়ষট্টিটা ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে মিউজিক, রেকর্ডিং অনবরত গাড়ির আওয়াজ, এ সবের রেশ বয়ে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে সেগুলো কমে গেল, উপভোগ করতে লাগলুম নির্জনতার ঝঙ্কার।
এরকমভাবে চাঁদও তো দেখিনি কতদিন। পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আস্ত একখানা চাঁদ, দুধের মতন তার জ্যোৎস্না। এক এক সময় আবার মনে হত, একটা সাদা সিল্কের চাদরের মতন জ্যোৎস্না দুলছে। আমি কবিটবি নই, অন্যের লেখা কবিতায় সুর দিয়ে গান গাই। তবে মনে এমন এমন সব ভাবনা আসত যে নিজেই অবাক হয়ে যেতুম। ধোঁওয়া নেই, ধুলো নেই, পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। সত্যি কথা বলছি, সেই আকাশের তলায় বসে থাকতে আমার মদ খাওয়ার ইচ্ছেটাই যেন চলে গিয়েছিল। অভ্যেসবশত একটু একটু খেতাম ঠিকই, আবার ভরতি গেলাস পড়েই থাকত, ছুঁতাম না।
এরকম চমৎকার জায়গায় একটাই শুধু অসুবিধে ছিল।
আমাদের দেশের অনেক পাহাড়ের চূড়াতেই একটা করে মন্দির থাকে। এ পাহাড়টাতেও ছিল, ঠিক মন্দির নয়, একটা আখড়া। বিশেষ এক ধরনের বৈষ্ণব কাল্টের আখড়া, সর্বেশানন্দ নামে এক সাধু এর প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বেঁচে নেই, তাঁর প্রধান শিষ্য প্রেমঘনানন্দ এই সম্প্রদায়ের গুরু, তাঁর বয়েস পঁচাশি। তিনি থাকেন ওই পাহাড়চূড়ায়।
আশ্রম বা আখড়া থাকে থাক, তাতে আমার কী! প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা ওখানে খোল-করতাল বাজিয়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েক ধরে কীর্তন বা প্রার্থনা-টার্থনা হয়, অনেক লোক একসঙ্গে গান গায়। সেই আওয়াজ আমার বাড়ি পর্যন্ত আসে। সেই গানে আমার শান্তি ভঙ্গ হয়। বিরক্ত লাগে। সুরেলা গান হলেও তবু কথা ছিল, কিন্তু তা তো নয়, মাঝে মাঝেই বেসুরো হয়ে যায়। আফটার অল আমি তো গানবাজনার লাইনের লোক, বেসুরো গান একেবারে সহ্য করতে পারি না।
কিন্তু কী আর করা যাবে! কারও বাড়িতে খুব বেশি চেঁচামেচি হলে অন্য কেউ নালিশ জানাতে পারে। কিন্তু ধর্মস্থানে যতই হল্লা হোক, কোনো আপত্তি করা চলবে না। সন্ধের সময় ওই দেড় ঘন্টা আমি দরজা জানলা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতাম।
একদিন বিপদ যেন পায়ে হেঁটে উপস্থিত হল আমার কাছে। সে বিপদ এল নারীর বেশে।
আমার বাড়ির পাশ দিয়েই পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে নামবার পায়ে-হাঁটা রাস্তা, এ আখড়ার লোকজনদের সেই রাস্তা দিয়ে ওঠা-নামা করতে দেখি। কারও সঙ্গে ডেকে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।
তখন বেলা এগারোটা, আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। নীচের নদীটায় স্নান করতে যাব কি না ভাবছি। দুটি মেয়ে পাকদণ্ডী ছেড়ে আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। একজন গেরুয়া পরা, একজন সাদা শাড়ি, বোঝা গেল, ওই আখড়ার।
প্রথম কয়েক মিনিট মনে হল, তারা আমার বাড়িটাই দেখছে। যদিও এমন কিছু দর্শনীয় নয়, ওখানকার সব বাড়িই এক রকম। কিছু বাড়ি ফাঁকাও পড়ে আছে।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে একজন বলল, আমরা একটু ভেতরে আসতে পারি?
এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার! আমি বেশি বেশি নারী-চর্চা করি। এ রকম একটা সুনাম বা দুর্নাম আমার আছে। কিন্তু আমি যখন এই ধরনের অজ্ঞাতবাসে যাই, তখন নারী-সঙ্গের কোনো অভাব বোধ আমার থাকে না। ইচ্ছে করলেই তো আমি মুম্বই থেকে যে-কোনো একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু ওই ধরনের লালসা পেছনে ফেলে রেখে আসি আমি। একাকিত্বের অনুভবটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়।
মেয়ে দুটিকে কোনো উত্তর না দিয়ে আমি ভেতরে চলে গেলেই ল্যাঠা চুকে যেত। ওরা আর ঢুকত না ভেতরে। অভদ্রতার মতন দেখালেও সেটাই আমার চরিত্রে মানায়। কিন্তু কোনো কারণে আমার মনটা তখন নরম ছিল। মনে হল, ওরা নিশ্চয়ই চাঁদা চাইতে এসেছে। কিছু দিয়ে দিলেই তো হয়।
বললুম, আসুন।
বাড়িটা দোতলা। বসবার ঘর একতলায়, খুব কাছেই সেই পায়ে-চলা রাস্তা। দরকার হয়নি বলে, এ ঘরটা আগে ব্যবহার করিনি। যদিও সোফাটোফা দিয়ে সাজানো আছে।
খুলে দিলাম সবকটা জানলা। মেয়ে দুটি চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে গেরুয়া শাড়ি পরা, তার বয়েস বছর তিরিশেক হবে। অন্যজন একটু ছোটো মনে হয়।
আমি বললুম, ভেতরে এসে বসুন।
ওরা তবু দাঁড়িয়েই রইল। গেরুয়া পরা মেয়েটি বলল, কাল পূর্ণিমা, আমাদের আশ্রমে একটা উৎসব আছে। আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আপনি একবার চরণধুলি দিলে আমরা ধন্য হব। গুরুদেব বলে দিয়েছেন, আপনি অনুগ্রহ করে ওখানেই প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
বৈষ্ণব বিনয়! চাঁদা চাইতে আসেনি, বরং নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে চায়। দু-চারজন শাঁসালো ভক্ত টাকা জোগায় বোধ হয়।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, আপনাদের ওখানে কীসের উৎসব?
সাদা শাড়ি চঞ্চল চোখে নীরব, গেরুয়া মেয়েটি কথা বলছে। সে দুহাত কপালে ঠেকিয়ে, চক্ষু বুজে প্রণাম করে বলল, পরমগুরু সর্বেশানন্দজির কাল আবির্ভাব দিবস। দয়া করে আসবেন। বেশিক্ষণ লাগে না ওপরে উঠতে, বড়োজোর দশ মিনিট। নামগান হবে, শুনেই চলে আসবেন।
জন্মদিনকে এরা বলে আবির্ভাব দিবস!
আমি ঠোঁট কাটা মানুষ, ফস করে বলে ফেললুম, নামগান হবে? কিছু মনে করবেন না। রোজ সন্ধেবেলা আপনাদের ওখানে কীর্তন-টির্তন হয়, এখান থেকেও শুনতে পাই। মাঝে মাঝে বড্ড বেসুরো শোনায়!
মেয়েটির ওষ্ঠে এবার একটা পাতলা হাসির রেখা ফুটেই মিলিয়ে গেল। সে বলল, বেসুরো হয় বুঝি? তাহলে আপনিই সুর শিখিয়ে দিন না।
একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললুম, আমি শেখাব? তার মানে, আমি কে, তা কি আপনি জানেন?
মেয়েটি আবার একটু হাসি দিয়ে বলল, এখানে অনেকেই জেনে গেছে, আপনি গায়ক অভিজিৎ সেন।
কী করে যে খবর ছড়ায়! এখানে এসে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি, দেখা হয়নি, তবু…। যে কেয়ারটেকারটি প্রথম দিন চাবি এনে দরজা খুলে দিয়েছে, সেই বোধ হয় নামটা বলে দিয়েছে অন্যদের।
এই গেরুয়া-নারী কি বাঙালি?
অবশ্যই। প্রথম থেকেই সে বাংলায় কথা বলছে আমার সঙ্গে। হয়তো মহারাষ্ট্রে জন্ম, কিন্তু বাংলা উচ্চারণ পরিষ্কার। কণ্ঠস্বর বেশ নরম, তার সঙ্গে বৈষ্ণব-বিনয় মিশে মধুর হয়েছে।
এরকম একটা অখ্যাত জায়গার আশ্রমে একটি বাঙালি তরুণী মেয়ে এল কী করে? কৌতূহল হবেই।
অন্য মেয়েটি বাঙালি নয়। সে এবার মারাঠি ভাষায় বলল, তাই চল! এরপর ঘিয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
গেরুয়া মেয়েটি তাকে মারাঠি ভাষায় উত্তর দিল, দাঁড়া, ইনি এখনও কথা দেননি!
আমি বললুম, আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।
গেরুয়া মেয়েটি একটি সোফায় বসল। অন্য মেয়েটির অস্থির ভাব।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, আপনাদের এই আশ্রমটি কত দিনের?
সে বলল, সত্তর বছর! তখন এখানে আর কোনো বাড়িঘর ছিল না।
আপনি কতদিন ধরে আছেন?
সাড়ে চার বছর।
এর মধ্যেই আপনাকে গেরুয়া দিয়েছে? আমি যতদূর জানি, এত তাড়াতাড়ি তো গেরুয়া দেওয়া হয় না।
আমাদের এখানে অন্য নিয়ম।
অন্য মেয়েটি এবার বলল, তুমি কথা বলো, আমি ততক্ষণে দৌড়ে গিয়ে কিনে আনি? না পেলে মুশকিল হবে! ফেরার সময় তোমাকে এখান থেকে ডেকে নেব?
গেরুয়া মেয়েটি বলল, না, চল, আমিও যাই তোর সঙ্গে।
তারপরই মত বদলে ফেলে বলল, আমি কি এখানে একটু বসতে পারি? আপনার অসুবিধে হবে? অনেকদিন বাংলা কথা বলিনি। এতদূরে তো বাঙালি বড়ো একটা আসে না!
বসুন না। কোনো অসুবিধে নেই।
বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও মাতৃভাষার ওপর টান থাকে। বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার বাসনা থাকে।
আমি এবার আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালুম। মেয়েটি তেমন কিছু সুন্দরী নয়, কিন্তু সুশ্রী বলা যায়। ফিলম দুনিয়ায় অনেক ডাকসাইটে সুন্দরীদের সঙ্গে মেলামেশা করেছি। তারা সবসময় লিপস্টিক মেখে থাকে, ভুরু কামিয়ে আঁকে, আরও নানারকম প্রসাধন করে। শুধু ফিলমের মেয়ে কেন, সমাজের মাঝারি স্তরের মেয়েরাও এরকমভাবে আছে। ভুরু আঁকা, লিপস্টিক ছাড়া মেয়েদের অনেক বছর দেখিইনি বলা যায়। সেই তুলনায় এ যেন একটি মাটির মেয়ে। গায়ের রং মাজা মাজা, কপালে আর নাকে চন্দনের রেখা, মুখের চামড়া ও চোখের দৃষ্টিতে একটুও উগ্রতা নেই। বরং যেন একটা স্নিগ্ধতার আলো রয়েছে।
তিন-চারদিন আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। কেয়ারটেকারটি দিনে একবার এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে হুঁ হাঁ বললেই কাজ চলে যায়, কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
লেখাপড়া শিখলে মানুষের মুখে একটা ছাপ পড়ে, এ মেয়েটির মুখে সেই ছাপ আছে।
জিজ্ঞেস করলুম, আপনার নাম কী?
সে বলল, অনসূয়া, আমাকে সবাই অনু বলে ডাকে।
পদবি বলল না। বিবাহিতা কি না বোঝবার উপায় নেই। বৈষ্ণবীদের কণ্ঠী বদল করে বিয়ে হতে পারে কারও সঙ্গে, কিন্তু তার বোধ হয় বাইরের কোনো চিহ্ন থাকে না।
আবার জিজ্ঞেস করলুম, আপনার এত কম বয়েস। এই জায়গাটার কথাও বেশি লোক জানে না, আপনি এখানে যোগ দিলেন কী করে?
অনসূয়া মুখ নীচু করে বলল, মন টেনেছিল। আমাদের আর একটি আশ্রম আছে কোলাপুরে, সেখানে একদিন গুরুজির ভাষণ শুনেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটাই আমার পথ।
আপনার বাড়ির লোক বাধা দেয়নি। বাবা-মা আছেন নিশ্চয়ই?
পূর্বাশ্রমের কথা আমাদের বলতে নেই।
আপনি সিনেমা দেখেন?
না।
লোকের মুখে শুনেছেন, আমি একজন গায়ক? নাকি, আপনি নিজে কখনও আমার গান শুনেছেন?
এখানে আসবার আগে শুনেছি।
দেখুন, হয়তো আমার বেশি কৌতূহল দেখানো হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে না করলে উত্তর দেবেন না। আপনার বয়েসি একটি মেয়ে, এখানে সারাজীবন থেকে যাবেন? কী পাবেন? কীসের আশায়…
কিছু তো পেতে চাই না। এখানে আমি স্বামী-সেবা করি।
স্বামী? ঠিক বুঝলাম না। আপনি বিবাহিতা?
হ্যাঁ।
স্বামী সেবার জন্য আশ্রমে থাকতে হবে কেন?
আমার স্বামী বংশীধারী, ব্রজবিহারী প্রভু শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর বিগ্রহের সঙ্গে মালা বদল করে আমার বিবাহ হয়েছে। আমাদের আশ্রমে যে-কজন মেয়ে আছে, সকলের জন্যই এই নিয়ম।
মীরাবাই? মীরাবাইয়ের তবু একজন জলজ্যান্ত স্বামী ছিল, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদিনি ছিল, সংসার ছিল। সেই সংসার জীবন অসহ্য বোধ হওয়ায় মীরাবাই কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। আপনার কি সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা আছে?
আমাদের এ সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের।
তার মানে কি দেবদাসী?
দাসী নই, আমি প্রভুর জীবনসঙ্গিনী।
একবার ইচ্ছে হল বাঁকাভাবে জিজ্ঞেস করি, ওই প্রভুটি কে? শ্রীকৃষ্ণের বকলমে গুরুজিটি নাকি? অনেক সাধুরই এরকম লীলাসঙ্গিনী থাকে।
তারপরই মনে হল, প্রথম দিন কেয়ারটেকারটি এ জায়গাটা সম্পর্কে হড়বড় করে অনেক কিছু শুনিয়েছিল। তখনই জেনেছি, পাহাড়ের ওপরের আখড়ায় গুরুজিটির বয়েস পঁচাশি। তবে আরও কমবয়েসি কয়েকজন চ্যালাট্যালাও থাকতে পারে। কিন্তু অনসূয়ার মুখের সারল্য দেখে ওই ধরনের কোনো সম্পর্কের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল না।
খানিকটা সহানুভূতির সঙ্গেই বললুম, আপনার কথা শুনেই বোঝা যায়, আপনি কিছুটা লেখাপড়া শিখেছেন। আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, একটা পাথরের বিগ্রহ কোনো জীবন্ত রমণীর স্বামী হতে পারে?
প্রভু তো শুধু পাথরের বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।
জীবন্ত? যে কথা বলে না, সাড়া দেয় না, যার চোখের পলকও পড়ে না, সে জীবন্ত হয় কী করে?
আমার প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন।
কথা বলেন? দেখুন, আমি এটা জানতে চাই, সত্যিই কি তা সম্ভব? পাথরের মূর্তি…
প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন স্বপ্নে। প্রত্যেক দিন। তিনি হাসেন, গল্প করেন…
এবার আমার হাসি পেয়ে গেল। বায়ুরোগ না থাকলে এরকম স্বপ্ন কেউ দেখে না। আর প্রত্যেকদিন একই স্বপ্ন দেখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব! অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
কেষ্টঠাকুরটিরও তো আহ্লাদ কম নয়। দ্বাপর যুগে সে তিনটি বউ, শ্রীরাধার মতন পরকীয়া এবং আরও ষোলো হাজার গোপিনীর সঙ্গে লীলাখেলা করে গেছেন। কলি যুগেও তার এমন দাপট? তার এমনই সেক্স অ্যাপিল যে অনসূয়ার মতন একটি সরল, কমনীয় মেয়ে এই আশ্রমেরই আরও কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে স্বামী হিসেবে তাকে ভাগ করে নিতেও রাজি?
এরপরেই আমি যে কাণ্ডটি করলুম, যার আপাত কোনো যুক্তি নেই। এটা আমার স্বভাবের সেই দিক, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অনসূয়া বসেছিল দরজার ঠিক কাছের সোফায়। আমি খানিকটা দূরে। হঠাৎ আমি বাঘের মতন এক লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে অনসূয়ার পিঠে একটা হাত জড়িয়ে, অন্য হাতে তার থুতনিটা উঁচু করে চুমু খেলুম। নিছক এক টোক্করের চুমু নয়, গভীর, গাঢ় চুমু। প্রথমে সে ঠোঁট খুলতে চায়নি, খানিকটা জোর করেই ঠোঁট ফাঁক করতে হল।
চুমু শেষ করে আমি দ্রুত ফিরে গেলুম নিজের জায়গায়।
ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক এবং অচিন্ত্যনীয় যে অনসূয়া আমাকে ঠিক মতন বাধা দিতেও পারেনি। তা ছাড়া আমার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন? আমি ছেড়ে দিতেই সে প্রথমেই ত্রস্তে জানলার দিকে তাকাল। এটা মেয়েদের সাধারণ ইনস্ট্রিংক্ট। জানলার পাশেই রাস্তা, মাঝে মাঝে লোক চলাচল করে, কেউ না কেউ দেখে ফেলতে পারত, দরজাও খোলা, ওর সঙ্গিনীও ফিরে আসতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে।
আমার কৈশোর বয়েসে মাসতুতো বোনকে ছাদের সিঁড়িতে জোর করে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিলাম। সে মুখে না না, একি একি বললেও সেটাকে খুব একটা জোর জবরদস্তি বলা যায় না, তার ব্যবহারে যথেষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এ ছাড়া আমার বাকি জীবনে আমি কখনো কোনো মেয়ের ওপর জোর করিনি। ‘কবিতা বনিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা।’ কবিতা যেমন জোর করে লেখানো যায় না, সেরকম কোনো বনিতাও স্বয়মাগতা হলেই সুখপ্রদা হয়। সহবাস সম্মতি আইনে আমি একেবারে নির্দোষ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে, অনসূয়ার প্রতি আমার ওই ব্যবহার প্রায় বলাৎকারের পর্যায়েই পড়ে। আমি আগের মুহূর্তেও তাকে সিডিউস করার চেষ্টা করিনি। আমি যে পুরোপুরি দোষী, তা আমি স্বীকার করতে বাধ্য।
অনসূয়ার চোখ দিয়ে দর দর করে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। নিদারুণ আহত গলায় বলল, এ আপনি কী করলেন? এ আপনি কী করলেন?
সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে দেখে আমার মায়া হল, খানিকটা অনুতাপও হয়েছিল কি? না, তা বোধ হয় হয়নি। অনুতাপ করলে তো কবেই আমি শুদ্ধ সাত্ত্বিক লোক হয়ে যেতুম।
আমি আবেগহীন গলায় বললুম, তোমাকে হঠাৎ আমার আদর করতে ইচ্ছে হল। হয়তো এটা অন্যায়। অনেকে তাই মনে করবে। আমি এরকমই।
দুদিকে মাথা নেড়ে সে বলল, না, না, ছি ছি। কী করলেন? আপনার যদি বিপদ হয়?
আমি বললুম, তুমি চেঁচিয়ে লোক ডাকতে পারো। সব কথা বলে দিতে পারো। তোমার কথা সবাই বিশ্বাস করবে!
সে আরও জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল আর ফোঁপাতে লাগল।
আমি বললুম, লোকজন এসে যদি শাস্তি দেয়, তা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি।
অনসূয়া বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব।
আমি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলুম, আমার জন্য প্রার্থনা করবে? কেন? কী প্রার্থনা করবে? আমি যাতে আজ রাত্তিরেই মরে যাই? যাতে কেউ কিছু জানতে না পারে?
অনসূয়ার সারা শরীরটা আরও জোরে কেঁপে উঠল। সে বলল, না, না, প্রভু যদি রাগ করেন, আপনাকে শাস্তি দিতে চান, আমি ক্ষমা চাইব।
প্রভু? মানে পাথরের বিগ্রহ?
আবার আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। একটা পাথরের মূর্তি আমার ওপর প্রতিশোধ নেবে? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? দেখি তো তার কত ক্ষমতা! চ্যালেঞ্জ রইল।
পাপ যদি করে থাকি, তাহলে আর একটু বেশিই করা যাক।
এইভাবে লাফিয়ে গিয়ে ফের জড়িয়ে ধরলুম অনসূয়াকে। পাগলের মতন আদর করতে করতে বলতে লাগলুম, এত সুন্দর একটা মেয়ে, সে সারাজীবন শুধু একটা পাথরের সঙ্গে…সে আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।
অনসূয়া ছটফট করলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। এবারে শুধু চুমু নয়, আরও আদর দিলুম তার বুকে। তার নীচে আর নামিনি। একটু পরে ফিরে এলুম নিজের জায়গায়।
দরজা জানলা সব খোলা। কোনো লোক দেখা যায়নি অবশ্য। অনসূয়া কোনো কথা বলছে না। কিন্তু শরীর যে উষ্ণ হয়ে উঠছিল, তাও আমি টের পেয়েছি। শুধু উষ্ণতা নয়, তার বুকে যেন আগুনের হলকা। সাধারণ জৈবিক নিয়মেই তার শরীর সাড়া দিয়েছে। কোনো পাথর কি এই উষ্ণতা জাগাতে পারবে?
বাগানের লোহার গেটে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। অন্য মেয়েটি ফিরে আসছে। অনসূয়াও শুনতে পেয়েছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। চোখ মুখ মুছে নিল ভালো করে। অন্য মেয়েটি বাগান পেরুবার আগেই অনসূয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একবার আমার দিকে সরাসরি চাইল। চক্ষু দুটি লাল, কান্নার ফলে মুখখানি ভাসাভাসা, ঠোঁট ফোলা। ধরা গলায় বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব প্রত্যেকদিন।
বলাই বাহুল্য, এরপর পাহাড় চূড়ায় সেই আখড়ার উৎসবে আমি যাইনি। ওখান থেকে আর কেউ আসেনি আমার কাছে। অনসূয়াকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতেও দেখিনি। দিন তিনেক পরে ফিরে এলুম কাজের জায়গায়।
শুধু কাজ তো নয়, আবার পার্টি, হইহল্লা, রাত্রি জাগরণ। প্রত্যেকটি দিনই উত্তেজনা ও অস্থিরতাময়। এর মধ্যে ওই নির্জন প্রবাসের স্মৃতি আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। মাঝে মাঝে এক এক ঝলক চোখে পড়ে, তারপর হারিয়ে যায়।
হারিয়ে গেল না অন্য একটি কারণে।
মুম্বই ফেরার ঠিক সাড়ে চার মাস পর আমার জন্ডিস হল। এমনই গুরুতর ধরনের যে ভরতি হতে হল নার্সিংহোমে।
আমাদের হাঁচি-কাশি হলেও কাগজে খবর বেরোয়। রেডিয়োতে বলে। অনেক ভক্তর চিঠি আসে। দেখতেও আসে অনেকে। আমার একজন সেক্রেটারি আছে বটে, চিঠি সব আমি নিজেই পড়ি। নার্সিংহোমে শুয়ে শুয়েই অন্য অনেক চিঠির মধ্যে একখানা চিঠি দেখে চমকে উঠতে হল।
নাম সই নেই। গোটা গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা . আমি তিনদিন উপবাসে থেকে আপনার জন্য প্রার্থনা করছি। আপনি ভালো হয়ে উঠবেন। আপনি ক্ষমা পাবেন।
এ চিঠি নিশ্চিত অনসূয়ার। আসলে ওর ধারণা! ওর ভগবান রাগ করে আমাকে এই জন্ডিস রোগের শাস্তি দিয়েছে।
ভগবানগুলো খুব হিংসুটে হয় বটে। ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর তো নিজের মুখেই বলেছেন, আই অ্যাম আ জেলাস গড। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন, মামেকং শরণং ব্রজ। একমাত্র আমাকেই শরণ করো। অন্যান্য ধর্মেরও ঈশ্বর বা অবতাররা বলেছেন, শুধু আমাকেই আশ্রয় করো, অন্য কোনো দিকে তাকাবে না! আরে বাপু, ভগবান হিসেবে যদি তোমার অতই গুণপনা ও আকর্ষণ থাকে, তা তোমাকে নিজের মুখে বলতে হবে কেন?
মুম্বইতে সেবার জন্ডিস প্রায় এপিডেমিকের আকার নিয়েছিল। আমার ওই নার্সিংহোমে প্রায় সব বেডেই জন্ডিসের রোগী। পটাপট করে কয়েকজন মরেও গেছে। তাহলে কি একা আমার অপরাধে অতগুলো লোককে ভগবান শাস্তি দিয়েছে? কিংবা ওই সব কটা লোকই ভগবানের বউদের ধরে টানাটানি করেছে? একমাত্র এই অপরাধ ছাড়া আর তো কোনো ব্যাপারে ভগবানের রাগারাগির চিহ্ন দেখি না। চতুর্দিকে জাল-জোচ্চুরি, কালোবাজার, নারীহরণ, নারী ধর্ষণ, নারী কেনা-বেচা, মাফিয়ারা থাকছে বুক ফুলিয়ে, রাজনৈতিক নেতাগুলো বদের ধাড়ি, দু-কান কাটা, চুরি করছে কোটি কোটি টাকা, কারুর কোনো শাস্তি হয়?
আমার পাশের বেডে রোগীটির বয়েস তেরো বছর, তার অবস্থা আমার চেয়েও সাংঘাতিক। সে কী অপরাধ বা পাপ করতে পারে?
অনসূয়া বৈষ্ণব, ক্ষমাই তার ধর্ম। আমার ওই গাজোয়ারি অপরাধ সে ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু তার যে আরাধ্য দেবতা, সে রাগে বা হিংসেয় আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এই তার বিশ্বাস।
নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে আরও কিছুদিন আমায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়। জন্ডিসের পর নিয়মকানুন মানতে হয় অনেক, ভাজাভুজি খাওয়া বারণ, মদ একেবারে নিষিদ্ধ। এ রোগের ওষুধ বিশেষ নেই, সংযম আর বিশ্রামই আসল। মুম্বইয়ের দিকে যেসব মাছ পাওয়া যায়, সেগুলো ঝোলের বদলে ভাজা খেতেই ভালো লাগে। মাছ ছাড়া আমি ভাত খেতে পারি না। মাঝে মাঝে মাছ ভাজা খেয়েছি, মদও দু-এক ঢোঁক খেয়েছি লুকিয়ে। তবু সেরে তো উঠলুম!
আবার গান রেকর্ডিং শুরু করার পর অনসূয়ার কাছ থেকে আর একটা চিঠি এল। এবারও অস্বাক্ষরিত। ‘আপনি সুস্থ হয়ে ওঠায় আমরা সবাই পুলকিত। আপনার নামে পূজা দিয়েছি। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।’
আমি নয়, আমরা? এটাই বৈষ্ণবদের ভাষা।
তা হলে, আমার অসুখ সারল অনসূয়ার পূজা ও প্রার্থনার জন্য, না আমার মনের জোরে?
এর পরের বছরও আমার নির্জন বাসের দরকার হয়েছিল। দুরানিগঞ্জ যাইনি, গিয়েছিলুম মধ্যপ্রদেশের বস্তারে। সেখান থেকে ফেরার পর একদিন স্টুডিয়োতে একটি নতুন মেয়ের গান রেকর্ডিং করাবার সময় আমার রক্তবমি হল। বেশ অনেকখানি। প্রথমে ধারণা হয়েছিল, জন্ডিস ভালো করে সারেনি বলেই এই বিপত্তি। ডাক্তাররা জোর করে নার্সিংহোমে শুইয়ে দিল। পরে ধরা পড়ল আলসার।
আমার খাওয়াদাওয়ার কোনো ঠিক নেই, এক একদিন সারাদিন কিছু খাওয়ার সময়ই পাই না, তারপর সন্ধের সময় প্রচুর ভাজাভুজি, চানাচুর, প্রচুর মদ্যপান, এত সিগারেট, ঘুম কম, আমার আলসার হবে না তো কার হবে?
এর মধ্যেই অনসূয়ার আর একটা চিঠি চলে এল। ওই একই রকম বয়ান। সে আমার জন্য প্রার্থনা করছে। এই আলসারও ভগবানের রাগের প্রকাশ? এবারে মেরেই ফেলবে নাকি?
এমন কড়া জান, অত সহজে কি যায়? অপারেশন না করিয়েই সেরে উঠলুম। একেবারে ফিট। আবার অনসূয়ার চিঠি। যেন তার প্রার্থনাতেই আমি সেরে উঠেছি!
কী করে ও খবর পায়, কে জানে! মুম্বইয়ের বাঙালিদের মধ্যে আভাসে-ইঙ্গিতে খোঁজ খবর নিয়েছি, তাদের পরিবারের কোনো মেয়ে বৈষ্ণবী হয়ে আখড়ায় যোগ দিয়েছে কি না। মুম্বইতে এত বাঙালি, কজনকেই বা চিনি! কোনো সন্ধান পাইনি। অনসূয়া একবার কোলাপুরের নাম বলেছিল, হয়তো ও সেখানকারই মেয়ে। কিন্তু কোলাপুরে আর কে খোঁজ নিতে যায়? আমার অত সময়ই বা কোথায়?
মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে কিছু অসুখবিসুখ, কিছু দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। বিশেষত আমাদের মতন যাদের বলগা ছাড়া জীবন, সব সময় অনিয়ম, আমাদের ঝুঁকি বেশি।
যখনই এরকম কিছু ঘটে, তখনই অনসূয়ার চিঠি আসে। সাধারণ জ্বর হলেও। যেন তার ভগবান কিছুতেই প্রতিশোধ নেবার কথা ভুলতে পারছে না। আরে বাবা, তোমার শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে আমার গলাটা কুচুৎ করে কেটে দিলেই তো পারে! সে চক্রখানা কি হারিয়ে গেছে?
একবার একটা দুর্ঘটনা হল ইউরোপে। রাইন নদীর একটা ফেরি পার হচ্ছিলাম। অতি সুদৃশ্য স্টিমার, দুপাশের দৃশ্যও চমৎকার। বেশ শীত, আমার গায়ে ওভারকোট, দাঁড়িয়েছিলুম বাইরে রেলিং ধরে। হঠাৎ একটা বার্জ এসে স্টিমারটার উলটো দিকে ধাক্কা মারল। খুব জোর ধাক্কা। সেই ইমপ্যাক্ট সামলাতে না পেরে আমি, আরও দুজন ছিটকে পড়ে গেলুম নদীতে।
এটাকে বাংলায় যাকে বলে মস্ত বড়ো ফাঁড়া। একে তো জল একেবারে বরফের মতন ঠান্ডা, আমি সাঁতার জানলেও ওভারকোট সমেত অত জবরজং পোশাক নিয়ে সাঁতার কাটাও যায় না। আর স্টিমারের চাকার নীচে পড়ে যাওয়ার খুবই সম্ভাবনা। আমি ছাড়া অন্য দুজন সাহেব, তাদের মধ্যে একজনকে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, পরে সে বেঁচেছে কি না জানি না। আমি উদ্ধার পেয়ে গেলুম অক্ষতভাবে।
কাগজে এই খবর ছাপা হয়েছিল। দেশে ফেরার পর দেখি, অনসূয়ার চিঠি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে।
তার ভগবানের ক্রোধ আমাকে ইউরোপ পর্যন্ত তাড়া করে গেছে? কথায় বলে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে? আর আমার বেলায় কৃষ্ণই বারবার আমাকে মারতে চেষ্টা করছে? আমি এটা ভাবতে চাই না। অনসূয়ার চিঠিই আমাকে মনে করিয়ে দেয়।
প্রত্যেকবার এরকম কিছু ঘটার পর আমি মনে মনে তেজের সঙ্গে বলি, কই হে, ভগবান, আমার কিছু করতে পারলে? তোমার মুরোদ তো বোঝা যাচ্ছে। চালিয়ে যাও, চেষ্টা চালিয়ে যাও।
আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। তবু এরকম মনে হওয়াটাই তো এক হিসেবে আমার পরাজয়। ভূতে বিশ্বাস না করে ভূতে ভয় পাওয়ার মতন।
অনসূয়ার এবারের চিঠিটা একটু অন্য রকম। যেন তার ঈশ্বর, তার জীবন স্বামীর প্রতি এতদিনে খানিকটা অভিমান হয়েছে। কেন তিনি আমাকে ক্ষমা করতে পারছেন না? কেন তিনি প্রতিশোধস্পৃহা ভুলতে পারছেন না। সেই জন্য, সে নিজের কাঁধে সব দোষ নিয়েছে। শাস্তি হিসাবে মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছে।
ইস, বড়ো সুন্দর চুল ছিল মেয়েটার। কিন্তু আমি কী করতে পারি? সে-ই তার ঈশ্বরকে বার বার দায়ী করছে, আমি তো করছি না? মানুষ কি জীবনে একবার দুবার আছাড় খায় না? মানুষ তো অনেক সময় শুকনো জায়গাতেও আছাড় খায়! মদ্যপান করার পর আমি সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় খুব সাবধানে নামি। কখনও দুর্ঘটনা হয়নি। একবার পোর্টে একটা জাহাজে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলুম। প্রচণ্ড খাওয়াদাওয়ার পর দড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়েছিল। ঠিক পেরে গেছি!
কদিন আগে নিজের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দিনদুপুরে পা পিছলে পড়ে গেছি। কলার খোসা ছিল না, কিচ্ছু ছিল না। তবু এরকম হতেই পারে। হয়তো অন্যমনস্ক ছিলাম। একটা গানের সুর কিছুতেই মনের মতন হচ্ছিল না। পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছি, কদিন বাদে সেরে তো যাবেই। তবু এর মধ্যে আবার অনসূয়ার সেই কাতর চিঠি। যেন এটাও তার ভগবানের কীর্তি।
ভগবানের কি খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই? বিশ্ব সংসার সামলাবার কথাও সে ভুলে গেছে? এ দেশে কত গরিব-দুঃখী, অনাথ-আতুর রয়েছে, তাদের জন্যও মাথাব্যথা নেই, শুধু ঘুরছে আমার পেছনে পেছনে? মাত্র দুখানা চুমুর জন্য এত?
ট্রেন প্রচুর লেট, ভিক্টোরিয়া টারমিনাসে পৌঁছল সন্ধেবেলা। অভিদা আগেই বলে রেখেছিলেন, আমার হোটেলে ওঠা চলবে না। ওঁর দুজন সহকারী গাড়ি নিয়ে স্টেশনে হাজির ছিল, অভিদার পায়ের অবস্থা বেশ খারাপ, ধরাধরি করে নিয়ে যেতে হল। মালাবার হিলস-এ একটা সতেরোতলা বাড়ি, তার সবচেয়ে উঁচু তলায় অভিদার ফ্ল্যাট। ঠিক সমুদ্রের দিকেই একটা চওড়া বারান্দা, সেখানে দাঁড়ালে চোখ জুড়িয়ে যায়। মুম্বইতে এলেই আমার মনে হয়, ইস কলকাতা শহরটা কেন যে সমুদ্রের ধারে হল না! তিন শয়নকক্ষের প্রশস্ত অ্যাপার্টমেন্ট, মস্ত বড়ো বসবার ঘর, একদিকে খাওয়ার জায়গা, দু-হাজার স্কোয়ারফুট তো হবেই। এখানে অভিদা একা থাকেন, একজন বাবুর্চি তাঁর রান্নাবান্না করে দেয়, রীতিমতন উর্দিপরা বাবুর্চি, মাথায় টুপি, ইংরেজিও বোঝে।
গায়ক ও সুরকারের বাড়িতে নানারকম গানবাজনার যন্ত্র তো থাকবেই। অত্যাধুনিক মিউজিক সিস্টেম। কিন্তু বেশি চোখে পড়ে বই। একটা ঘরের তিনদিকের দেয়াল জোড়া, বড়ো বড়ো র্যাক ভরতি বই, যত্ন করে রাখা। বহু রকমের বই, সাহিত্য, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি ছাড়াও বিজ্ঞান, দর্শন ও অনেক রকমের ধর্মগ্রন্থ। ইস, এরকম একটা জায়গায় যদি আমি টানা এক বছর থাকার সুযোগ পেতাম!
এইসব বাড়িতে সবাই লিফটে ওঠানামা করে। অভিদা তাহলে সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গেলেন কী করে?
সে কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, লিফটে উঠি ঠিকই, নামবার সময় হেঁটে নামি ইচ্ছে করে। এমনিতে তো ব্যায়াম-ট্যায়াম কিছু করি না, তবু নামবার সময় শরীরে কিছু নাড়াচাড়া হয়। এরকম দশ বছর নামছি, হঠাৎ একদিন পা হড়কে গেছে। সেটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়!
অভিদা, তোমাকে কি প্রত্যেকদিনই পার্টিতে যেতে হয়?
নিজের কাজের জন্য যেতে হয় না, তবে, একটা না একটা ছবির মহরত তো লেগেই আছে, তারা ডাকে। কোনো ছবি দশ সপ্তাহ চললেই শুরু হয়ে যায় সেলিব্রেশন। তা ছাড়া আজ এর জন্মদিন, কাল ওর বিবাহবার্ষিকী। তুই বিশ্বাস করবি না, এখানে কারও ডিভোর্স হলেও পার্টি হয়।
তা হলে তুমি নিজের জন্য সময় পাও কখন?
এরই মধ্যে সময় বার করে নিতে হয়। জীবনটা এরকমই চলছে, আর ফেরানো যাবে না। অনেক মানুষের জীবন মাটিতে আঁকা আলপনা, আর আমাদের মতন মানুষের জীবন হাউই কিংবা রকেট। আমাদের আয়ু কম নয়। কিন্তু আমাদের ছটা বেশি। যে যেটা বেছে নেয়! তবে যত রাতই হোক, আমি প্রত্যেকদিন ভোরবেলা উঠি। পরে দুপুরে খানিকটা ঘুমিয়ে-টুমিয়ে নিই, ভোরে ওঠা অভ্যেস হয়ে গেছে। তখন কিছুক্ষণ ধ্যান করি।
ধ্যান করো? কীসের ধ্যান?
যারা ধর্ম-টর্ম মানে, যাদের খুব ভক্তিভাব থাকে, তারা প্রত্যেকদিন পুজো-প্রার্থনা করে। নামাজ পড়ে। আমাদের ও সব ঝামেলা নেই। তবু আমাদেরও কিছু না কিছুর সাধনা করতে হয়। এটা আমি আমার এক জ্যাঠামশাইয়ের কাছে শিখেছি।
চোখ বুজে ধ্যান করো? তখন কীসের কথা ভাবো? কী দ্যাখো?
রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন, গান্ধিজি, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আবদুল করিম খাঁ, এঁদের ছবি মনের চোখে ভেসে ওঠে। এঁরাই তো এ যুগের দেবতা। ছেলেবেলায় গান শিখিনি তেমন, এখন গলা সাধি, কঠিন কঠিন রাগ গলায় তোলার চেষ্টা করি। তাতেই সকালবেলা মনটা ভালো হয়ে যায়! আর হ্যাঁ, লিভার ভালো রাখার জন্য নিমপাতার রস খাই। রবীন্দ্রনাথ মদ খেতেন না, তবু নিমপাতার রস খেতেন।
আটটা বাজতে না বাজতেই অভিদা বললেন, অনেকক্ষণ সন্ধে হয়ে গেছে, এখন আহ্নিক শুরু করতে হবে যে! গেলাস, সোডা আর বরফ দিতে বল। ওই কাবার্ডে বোতল আছে অনেক রকম, তোর যেটা ইচ্ছে নিয়ে আয়। সুনীল, তুই আমেদাবাদ গিয়ে কী করবি? এখানেই থাক না কদিন!
আমি বললাম, ওদের কথা দেওয়া আছে যে! স্টেশনে অপেক্ষা করবে!
কথা দিয়ে সব কথা রাখিস বুঝি? বেশ বেশ, অভ্যেসটা ভালো। আমার অবশ্য ধাতে নেই। তুই কবিতা-টবিতা তো লিখিস বুঝলাম, আর কিছু করিস?
একটা খবরের কাগজে…
সেই টিপিক্যাল ব্যাপার। সাহিত্য করতে গেলেই হয় খবরের কাগজে, আর নয় তো ইস্কুল-কলেজে মাস্টারি। সব জায়গায় এরকমই দেখি! অথচ যারা সাহিত্য রচনা করবে, তাদের সারা দেশ, এমনকি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো দরকার, মানুষকে চেনা দরকার। ছোটো একটা গণ্ডির মধ্যে থেকে…
ও সবের জন্য অনেক টাকা লাগে, অভিদা।
টাকা রোজগার করলেই পারিস! বড়ো বড়ো উর্দু কবিরা এখানকার সিনেমার জন্য গান লিখে অনেক টাকা রোজগার করে। আবার নিজস্ব কবিতা লেখে। তোরা বাঙালিরা পারিস না কেন?
বাংলা সিনেমায় তো স্কোপ নেই!
এখানে চলে আয়! তোর বয়েস এখনও কম, জীবনটা নিয়ে কী করবি ঠিক করেছিস? একটা কিছু জীবনদর্শন তো থাকা দরকার।
সত্যি কথা বলছি, অভিদা, সেরকম কিছু ঠিক করিনি। খানিকটা কনফিউজড অবস্থা বলতে পার!
তোকে আমার গল্পটা শোনাবার আগে জিজ্ঞেস করা হয়নি, তুই ধর্ম-টর্ম মানিস?
তেমনভাবে মানি না, আবার উড়িয়েও দিতে পারি না। মন্দিরে-টন্দিরে মাথা ঠুকি না। কিন্তু সরস্বতী মূর্তি দেখতে ভালো লাগে।
সেটা অন্য ব্যাপার। লিবিডোর ব্যাপার।
আচ্ছা অভিদা, উত্তর কলকাতায় তোমাদের বাড়িতে নিত্য তিরিশ দিন রাধাগোবিন্দের পুজো হতে দেখেছি। ছেলেবেলায় আমরা প্রসাদও খেয়েছি। সেই বাড়ির ছেলে হয়ে তুমি নাস্তিক হলে কী করে?
ওই মন্দিরটাই আসল কারণ। তুই জগদীশ্বর সেন-এর নাম শুনেছিস?
জগদীশ্বর সেন…মানে যিনি ইতিহাসের বই লিখেছেন?
হ্যাঁ।
বেশ কয়েকটা বই লিখেছেন, তার মধ্যে একটা আমার দারুণ লেগেছে, ‘টোটেম অ্যান্ড রিচুয়ালস’, এ বইটার বাংলা অনুবাদ হওয়া উচিত।
ওই জগদীশ সেন আমার জ্যাঠামশাই। কলকাতা ইউনিভার্সিটির কারমাইকেল অধ্যাপক ছিলেন। আমার বাবারা সাত ভাই, চার বোন। জ্যাঠামশাই সবচেয়ে বড়ো। বাড়ির তিনি একজন প্রধান শরিক। অন্য ভাইদের সঙ্গে তার গণ্ডগোল লেগেছিল ওই রাধাগোবিন্দ মন্দিরের নিত্যপূজা নিয়ে। পড়ন্ত অবস্থায় বেশিরভাগ শরিকের কোনো রোজগার নেই। মন্দিরে প্রতিদিন দুবেলা পুজো চালাতে তো খরচ আছে, কে দেবে। এ ওকে ঠেলাঠেলি করে। একদিন বড়ো জ্যাঠামশাই সবার সঙ্গে এক সঙ্গে খেতে বসেছেন, হঠাৎ প্রস্তাব দিলেন—
মন্দিরের পুজো বন্ধ করে দাও। পঞ্চ ধাতুর বিগ্রহটা পুরোনো, ওটা দান করে দেওয়া হোক মিউজিয়ামে। মন্দিরটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে, এখন আমাদেরই ঘরে কুলোচ্ছে না। মন্দিরটা ভেঙে ওখানে অনায়াসে একটা তিনতলা বাড়ি উঠতে পারে। কিছু ভাড়া দিলে রোজগারও হবে।
খাবার টেবিলে যেন একটা বাজ পড়ল। কতদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য, সেই পুজো বন্ধ করার কেউ প্রস্তাব দিতে পারে? তার ওপর মন্দির ভাঙার কথা? এ যেন কানে শোনাও পাপ।
শুরু হয়ে গেল চিৎকার চেঁচামেচি, বড়ো জ্যাঠামশাই আবার দৃঢ় গলায় বললেন—
আগে যখন জমিদারি ছিল, তখনই এসব মন্দির গড়া হত। সব জমিদারই মন্দির বানিয়েছে, মন্দিরের খরচ চলত প্রজাদের শোষণ করা টাকায়! এখন জমিদারি উচ্ছন্নে গেছে, এখন আর নিজেদের মন্দির রেখে লাভ কী? বাইরেতো কত বারোয়ারি মন্দির আছেই।
আমার ঠাকুমা তখন বেঁচেছিলেন। ঠাকুমা দারুণ ইন্টারেস্টিং ক্যারাকটার। তাঁর কথা তোকে পরে একদিন বলব। বড়ো জ্যাঠামশাইয়ের ওই কথা শুনে ঠাকুমা বললেন—
জগু, তুই যদি আর একবার ওই রকম কথা উচ্চারণ করিস, তাহলে আমি গলায় কাটারি দেব! আমি যতদিন বেঁচে আছি…
বড়ো জ্যাঠামশাই বললেন—
সে তুমি যাই বলো বলো মা, এটাই আমার কথা। তোমরা যদি না মানো, আমি আমার বাড়ির অংশ বেচে দিয়ে চলে যাব!
আমার তখন সতেরো-আঠারো বছর বয়েস। ওই যে তুই বললি না, কনফিউজড অবস্থা, আমারও সেই রকম। বড়ো জ্যাঠামশাইকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু তিনি এটা কী বললেন? অন্যরা যে বলছে, মন্দির ভাঙলে বংশনাশ হবে?
বড়ো জ্যাঠামশাই থাকতেন বাড়ির ডান দিকের তিনতলার অংশে। বড়ো জ্যাঠাইমা মারা গেছেন দুবছর আগে, ওঁদের একটিমাত্র মেয়ে, আমাদের যমুনাদি, বিয়ের পর থাকে আলজিরিয়ায়। জ্যাঠামশাই একা হয়ে গেছেন। আমি দেখা করতে গেলাম তাঁর সঙ্গে।
বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বড়ো জ্যাঠামশাইয়ের বিশেষ ভাব ছিল না। এতগুলো ছেলেমেয়ে, সবার নামও জানতেন না বোধ হয়। আমার মুখ চিনলেন অবশ্য। প্রথমে আমার দু-একটা প্রশ্ন শুনে উনি ঠিক পাত্তা দিলেন না, গম্ভীরভাবে বললেন—
আমি যা বলব, তা তোমাকে মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তুমি যুক্তি দিয়ে বুঝতে শেখো।
আমি খুব আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করলুম—
বড়ো জ্যাঠামশাই, একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারি না। যুক্তি গুলিয়ে যায়। আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন তো ঈশ্বর বলে সত্যিই কি কেউ আছে, না নেই?
জ্যাঠামশাই আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। মানুষটা বেশ লম্বা। ধারালো নাক, বয়েস হলেও মাথায় চুল কমেনি, চুল কপালের ওপর এসে পড়ে, তিনি কথা বলতে বলতে চুল সরান। তীব্রভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ আছেন। কোটি কোটি মানুষ যাঁকে বিশ্বাস করে, তাঁকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
উনি আবার বললেন—
তবে ঈশ্বর মোটেই একজন নয়, কয়েকজন। এক এক ধর্মের এক এক ঈশ্বর। প্রত্যেক ধর্মের লোকই মনে করে, তাদের ঈশ্বর শক্তিমান, তিনিই বিশ্ব জগতের স্রষ্টা। চার-পাঁচজন সর্বশক্তিমান আর স্রষ্টা হয় কী করে। সুতরাং, এই ঈশ্বরের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। বিশ্বাসের ওপর যুক্তি চলে না।
হয়তো একজনই আছে। বিভিন্ন ধর্মে তাঁকে আলাদা করে দেখা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেছেন, যত মত তত পথ।
ওটা কথার কথা। শ্রীরামকৃষ্ণ একজন সাধক, সমস্ত হিন্দুর ধর্মগুরু নন। অধিকাংশ হিন্দুই তাঁর এই কথা মানে না। তাঁকে অন্য ধর্মের লোকরা তো একেবারেই মানে না। তারা মনে করে, মতটাই ঠিক পথ ও একমাত্র পথ। অন্য ধর্মের লোকরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সারা পৃথিবীতে এখনও এরকম ধর্মীয় ভেদাভেদই চলছে।
কিন্তু সব ধর্মেই তো কিছু মানুষ ঈশ্বর উপলব্ধির কথা বলেন। তাঁরা কি মিথ্যে কথা বলেছেন?
তাঁদের সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না। বলবে মনস্তাত্ত্বিক বা ডাক্তাররা। ধরে নেওয়া যাক, সত্যিই একজন ঈশ্বর আছেন। থাকলেই বা কী? মানুষের ভালো বা মন্দ, কিছু করার ক্ষমতাই তাঁর নেই। কলাগাছে মুলো ফলাবার ক্ষমতা তাঁর নেই। এইসব গাছপালা, জীবজগৎ তিনি সৃষ্টি করেননি, এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে।
বিজ্ঞান কি একেবারে শেষ কথা বলে দিতে পারে? বড়ো জ্যাঠামশাই, অনেক বৈজ্ঞানিকেরও ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, আমরা পড়েছি।
বিজ্ঞান কখনও শেষ কথা বলতে পারে না। অনন্ত জিজ্ঞাসার নামই বিজ্ঞান। এখনও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে মানুষের। হয়তো এরপর এমন কিছু আবিষ্কার হবে, যাতে এখনকার সব ধারণা আবার বদলে যাবে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হতেও পারে। হোক না! একটা ব্যাপার এর মধ্যে অবধারিতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে। একজন মানুষ যদি সারা জীবনেও কোনো ধর্মের আওতায় না থাকে, কোনো রকম আচার-অনুষ্ঠান না মানে, ঈশ্বর আছেন কি নেই, তা নিয়ে মাথাও না ঘামায়, তাহলেও সে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। অর্থাৎ ঈশ্বরকে তার জীবনে প্রয়োজন নেই, ঈশ্বরও তাকে ঘাঁটায় না। পৃথিবীতে এই ধরনের মানুষের সংখ্যা অনেক বাড়ছে। লোকে এদের বলে নাস্তিক। কথাটা ঠিক নয়। ঈশ্বর নিয়ে যে মাথাই ঘামায় না, তার চিন্তা নেগেটিভ হবে কেন? সেটা পজিটিভ।
আর বৈজ্ঞানিকদের কথা বলছিস? বিজ্ঞান নিয়ে যারা চর্চা করে, বিজ্ঞান যাদের পেশা, তারা সবাই বৈজ্ঞানিক নয়। অনেকের অনেক সংস্কার যায় না। কেউ কেউ প্রকাশ্যে অস্বীকার করতে এখনও ভয় পায়। জিয়োর্দানো ব্রুনো, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিয়ো এঁদের কী অবস্থা হয়েছিল মনে নেই? আইনস্টাইন খুব চালাক। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি না বলুন। আইনস্টাইন কায়দা করে বলেছিলেন, আমি স্পিনোজার ঈশ্বরকে মানি। (স্পিনোজা না স্পিনোৎসা, কী উচ্চারণ হবে কে জানে?) দার্শনিক স্পিনোজা বলেছিলেন, এই যে প্রকৃতির এত বিচিত্র সৃষ্টি, এই সৃষ্টির এমন নিয়মশৃঙ্খলা, এটাই ঈশ্বর, এর বাইরে আকাশে ঈশ্বর খোঁজার দরকার কী?
অভিদা একটুখানি থামলেন। মাছ ভাত খেতে খেতে আমরা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। আমার মাথায় অনসূয়ার কাহিনিটা ঘুরছে। ওই কাহিনির মধ্যে এখনও যেন অনেক না-বলা কথা রয়ে গেছে।
এ সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, অভিদা, অনসূয়া তোমাকে যে চিঠিগুলো লিখেছে, তা আমাকে দেখাতে পারো? যদি তোমার আপত্তি না থাকে।
অভিদা বললেন, আপত্তি কী আছে? প্রথম দুটো চিঠি আমি রাখিনি, পড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। পরেরগুলো রেখে দিয়েছি। কেন ফেলিনি কে জানে? তুই পাশের লাইব্রেরি ঘরে গিয়ে দ্যাখ, টেবিলের ডানদিনের দেরাজে, একটা হলদে খামের মধ্যে।
একটা টেলিফোন এল, অভিদা কথা বলতে লাগলেন, আমি পড়তে লাগলাম চিঠিগুলো। পরিষ্কার সাদা কাগজে লেখা। চিঠিগুলো ক্রমশ বড়ো হয়েছে, তাও বেশি বড়ো নয়, প্রথমটা তিন লাইন, শেষতমটি দশ লাইন। শেষের দিকে ব্যাকুলতা যেন বেড়েছে, অভিদার বিপদের চিন্তায় মেয়েটি খুবই কাতর।
টেলিফোন করা শেষ হলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, অভিদা, তুমি এই চিঠির কখনও উত্তর দিয়েছ?
অভিদা বললেন, উত্তর দেওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। চিঠিতে নাম নেই। তা ছাড়া আশ্রমে চিঠি পাওয়ার কোনো নিয়ম আছে কি না, তাই বা কে জানে!
এগুলো পড়লে মনে হয়, মেয়েটি তোমাকে আসলে ভালোবেসে ফেলেছে। তুমি তা বোঝোনি?
সেটা বুঝব না, আমি কী এতই গবেট? তুই কবিতা লিখিস বলে সব বুঝে ফেলবি? প্রেম বা এক ধরনের আকর্ষণ ওর হয়েছে তা ঠিকই। কিন্তু ও নিজে কি তা বোঝে? বোঝে না। ওর ধারণা, ও ক্ষমার আদর্শ প্রচারের জন্য প্রাণপাত করে যাচ্ছে।
তুমি কী করে জানলে যে ও বোঝে না? ওর সঙ্গে তোমার আর দেখা হয়েছে?
হ্যাঁ, হয়েছে আর একবার!
আরে সেই কথাটাই বলনি এতক্ষণ? কবে দেখা হল, কোথায়?
দাঁড়া, কেন দেখা হল, সেটা আগে বুঝিয়ে বলা দরকার।
গেলাস শেষ করে অভিদা আবার ঢাললেন। সিগারেট ধরিয়ে ছড়িয়ে দিলেন ভাঙা পা-টা, তারপর বলতে শুরু করলেন।
আমার যে মাঝে মাঝে অসুখ হয়েছে কিংবা একটা-দুটো দুর্ঘটনায় পড়েছি, এগুলো একবারে স্বাভাবিক ব্যাপার, আমি জানি। মানুষের জীবন বদলাবার কোনো ক্ষমতা যে ঈশ্বরের নেই, তার আমি মর্মে মর্মে প্রমাণ পেয়েছি অনেক ঘটনায়। সেসব আমি ডায়েরিতে লিখে এক সময় পড়তে দেব। ধর, গরিব বিধবার একমাত্র ছেলেটি যদি বিনা দোষে পুলিশের গুলিতে মারা যায়, তখন মনে হয় না, ঈশ্বরকে ঈশ্বরত্ব থেকে বরখাস্ত করা উচিত? কর্তব্যে চরম অবহেলা? অনেক ধর্মভীরু এই ঘটনার পরেও বলে কী জানিস, ওই বিধবার নিশ্চয়ই পূর্বজন্মে পাপ ছিল, তাই এ জন্মে শাস্তি পাচ্ছে। প্রথমত, পূর্ব জন্মটাই একটা ভুল ধারণা, আর সেই পাপে এ জন্মে শাস্তি? যত্তসব গাঁজাখুরি ব্যাপার।
আমি ভুলে থাকতে চাইলেও আমার কিছু একটা ঘটলেই যে অনসূয়ার চিঠি আসে, সেটা এক হিসেবে বিরক্তিকর! কেন আমি ওর জীবনবল্লভকে নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব?
সে যাই হোক, গত বছর অন্যরকম একটা ব্যাপার হল। আমি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসি। আমি আর বিয়ে করব না, আমার ছেলেপুলে হবে না, কোথাও আমার অবৈধ সন্তানও নেই, এটা বিশ্বাস করতে পারিস। কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে।
আমার মিউজিক হ্যান্ডসদের মধ্যে একজনের নাম রামরতন ঝাঁ। সে হারমোনিয়াম বাজায়। এখানকার অনেক গানেই তো আর হারমোনিয়াম লাগে না। সিন্থেসাইজারে কাজ চলে যায়। সেইজন্য বেচারির অবস্থা ভালো নয়। অনেক দিনের পরিচয়, এদের বাড়িতে মাঝে মাঝেই যাই। রামরতনের মেয়ে সবিতা, তাকেও ছোটো অবস্থায় দেখেছি, বড়ো হয়ে গেল, বিয়ে করল। বিয়ের ঠিক সাড়ে তিন বছরের মাথায় তার স্বামী মারা যায় রাস্তায় ট্রাক চাপা পড়ে। সাইকেলে সে বাড়ি ফিরছিল, মাথাটা এমনভাবে পিষে যায় যে চিনতেও কষ্ট হয়েছে। সবিতা দু-বছরের একটা ছেলেকে নিয়ে ফিরে এল বাবার কাছে। ছেলেটার নাম পিন্টো, কী সুন্দর, লাভলি বাচ্চা, একদম কাঁদে না। সব সময় হাসে, চেনা-অচেনা নেই। আমার সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল, গেলেই আংকেল আংকেল বলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে। আমারও এমন মায়া পড়ে গেল যে প্রত্যেকদিন ওকে দেখার জন্য মনটা কেমন করে। যতই কাজ থাক, দিনে একবার ওর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে আসি। সেই পিন্টোর হল টাইফয়েড, প্রচণ্ড জ্বর। অমন হাসিখুশি বাচ্চাটা বিছানায় শুয়ে কষ্টে ছটফট করে, সেই দৃশ্য সহ্য করা যায় না। এখন টাইফয়েড এমন কিছু শক্ত অসুখ নয়। ঠিক করলুম, যেমনভাবে হোক, ওকে বাঁচাতেই হবে, রামরতন যেন টাকার জন্য চিন্তা না করে।
আমি গিয়ে ওর শিয়রের কাছে বসে থাকতুম। তবু পিন্টোর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগল। হঠাৎ এক সময় আমার কী মনে হল জানিস? মানুষের সংস্কার কী সাংঘাতিক প্রবল। আমার মনে হল, আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য অনসূয়ার হিংসুটে ভগবান এই বাচ্চাটাকে মারতে চাইছে না তো? ঈশ্বরের অস্তিত্বে বদ্ধমূল অবিশ্বাস। তবু এরকম চিন্তা মাথায় আসে?
এমনকি, এ কথাও মনে হল, আমার অসুখের সময় অনসূয়া প্রার্থনা করে। অনসূয়া তো পিন্টোর অসুখের কথা জানে না। অনসূয়া প্রার্থনা করলে পিন্টোও সেরে উঠতে পারে? একবার অনসূয়াকে গিয়ে বলব?
আমারই যদি সব যুক্তি চলে যায়, তাহলে আমার চেয়ে যারা দুর্বল তারা তো বারবার হার মানবেই। তোকে সত্যি কথা বলছি সুনীল, ওই সময়টাই আমার বারবার মনে পড়ত অনসূয়ার কথা। খুব ইচ্ছে করত, তার কাছে ছুটে যাই।
যাওয়া হয়নি। বলতে গেলে, আমার কোলে মাথা রেখেই পিন্টো মারা গেল। এমন ফুটফুটে সুন্দর মুখটা কী শুকনো, বিবর্ণ হয়ে গেল আমার চোখের সামনে। আমি কাঁদিনি, আমার রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ডাক্তারদের ওপর ভরসা না রেখে শেষ পর্যন্ত সবিতা কোন মন্দিরে যেন মাথা ঠুকতে গিয়েছিল। আমার ইচ্ছে করছিল, কালাপাহাড়ের মতন সব কটা মন্দির ভেঙে দিই। পরের দিন সবটা রাগ পড়ল অনসূয়ার ওপর। তার ভগবান আমাকে মারতে না পেরে ওইটুকু শিশুকে মেরে প্রতিশোধ নিল, সে এত কাপুরুষ? অনসূয়া জানুক, বৈষ্ণবদের আরাধ্য ঈশ্বরও কত হৃদয়হীন হতে পারে।
অভিদাকে বাধা দিয়ে আমি বললাম, কিন্তু পৃথিবীতে অনেক শিশুই যে এভাবে মরে। আমাদের ব্যক্তিগত শোক হয় ঠিকই। কিন্তু চিকিৎসা সত্ত্বেও কে বাঁচবে আর কে বাঁচবে না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তুমিই তো বলেছ, ভগবান বলে কেউ থাকলেও মানুষের মঙ্গল বা অমঙ্গলের ব্যাপারে তার কোনো ভূমিকা নেই!
অভিদা বললেন, তা ঠিকই, কিন্তু ওই বললুম, পিন্টোর অসুখের সময় আমি এমনই কাতর হয়ে পড়েছিলুম যে যুক্তি-টুক্তি সব চলে গিয়েছিল। আমার ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছিল। আমি আবার ছুটে গেলাম দুরানিগঞ্জে। কিছু কিছু বাড়ি ওখানে খালিই থাকে। আগের বাড়িটা পাওয়া গেল না, অন্য একটা বাড়িতে উঠলুম, সেটা পাহাড়ের একটু নীচের দিকে। নদীটা স্পষ্ট দেখা যায়।
অনসূয়াদের আশ্রমে গিয়ে যে লণ্ডভণ্ড করা চলে না, এমনকি সেখানে অনসূয়ার সঙ্গে কথা বলাটাও ঠিক নয়, সেটুকু কাণ্ডজ্ঞান আমার ছিল। কিন্তু অনসূয়ার সঙ্গে দেখা করতেই হবে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি, দ্বিতীয় দিনে অনসূয়াকে দেখাও গেল, সঙ্গে আরও তিনটি মেয়ে, গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে। অনসূয়া এক পলক আমার দিকে তাকাল, যেন আমাকে চেনেই না।
পরদিন দুপুরবেলা রাস্তায় ওদের দলটাকে দেখতে পেয়েই আমি বাড়ি থেকে ছুটতে ছুটতে চলে এলুম। হাঁটতে লাগলুম ওদের পাশে পাশে। রাস্তা দিয়ে তো যে-কোনো লোক যেতেই পারে। কথা বলায়ও দোষ নেই। আমি আগে অন্য দু-একটি মেয়েকে নিরীহ কৌতূহলের সুরে জিজ্ঞেস করলুম, আপনারা কোন আশ্রমে থাকেন? আপনাদের উদ্দেশ্য কী? আপনারা কি গরিব-দুঃখীদের সেবা করেন? এই সব। এরা উত্তর দিয়েছিল। তারপর এক সময় অনসূয়ার পেছন পেছন গিয়ে, চাপা গলায় বাংলায় বললুম, অনসূয়া, তোমার সঙ্গে আমার দেখা করার বিশেষ দরকার। তুমি যদি আমার বাড়িতে আসতে না চাও, নদীর ধারে বড়ো বটগাছটার তলায় এসো, বিকেল বা সন্ধের সময়…
বিকেল হতে না হতেই আমি গিয়ে বসে রইলুম নদীর ধারে। এই নদীতে সকালের দিকে অনেকে স্নান করতে আসে। বিকেলের দিকে মানুষজন বেশি থাকে না, তা ছাড়া একটু একটু শীতও পড়েছে। সে দিনটা আবার আকাশ মেঘলা হয়ে গেল। শীতকালেও তো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। কী মুশকিল, বৃষ্টি হলে অনসূয়া আসবে কী করে?
ওই দিকটায় ওপর থেকে নামবার জন্য আর একটা সরু পাকদণ্ডী পথ আছে। আমি হাঁ করে সেই দিকে চেয়ে বসে রইলুম। একটার পর একটা সিগারেট পোড়াচ্ছি, কারুর জন্য এরকমভাবে অপেক্ষা করে থেকেছিস কখনও? থিয়োরি অব রিলেটিভিটির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। পাঁচ মিনিটকে মনে হয় এক ঘন্টা। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছি। আমি জীবনে কক্ষনো কোনো মেয়ের জন্য ওরকমভাবে প্রতীক্ষা করিনি। আমার একটা অহমিকা আছে, আমি মেয়েদের কাছে যাই না, তারা আমার কাছে আসে। অথচ সেই আমিই…
তা ছাড়াও, মনে হচ্ছিল, অনসূয়া আসবে তো? সে তো হ্যাঁ কিংবা না কিছু বলেনি। আশ্রম থেকে একা আসার অসুবিধে থাকতে পারে। যে-কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। এর মধ্যে কী অজুহাতে সে বেরুবে আশ্রম থেকে? কিংবা সে হয়তো আমার সঙ্গে আর দেখা করতেই চায় না। তাহলে আমি কী করব?
কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। তারই মধ্যে হঠাৎ একসময় দেখি, ওপর দিকের রাস্তায় কী যেন একটা উড়ছে। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তো, দৃষ্টি বিভ্রম হতে পারে! সত্যিই মনে হল, একটা পাখি যেন নেমে আসছে। পাখি নয়, সে অনসূয়া, নামছে দৌড়ে দৌড়ে। আমার অত কবিত্ব নেই। তবু অনসূয়াকে পাখি বলেই মনে হতে লাগল। শীতের জন্য সে একটা চাদর জড়িয়েছে, সেই চাদরটা উড়ছে ডানার মতন। আমার মনে হল, এমন সুন্দর দৃশ্য আমি আগে কখনও দেখিনি।
আমার শরীর থেকে সমস্ত রাগ চলে গেল। আমি একদৃষ্টে দেখছি সেই মেয়েটিকে।
অনসূয়া কাছে এসে ঝপ করে বসে পড়ে ব্যাকুলভাবে বলল, আপনার কী হয়েছে? কী হয়েছে বলুন? আমি প্রার্থনা করব, আমি আমার আয়ু দিয়েও…
অনসূয়া ভেবেছে, আমার শক্ত কোনো অসুখ হয়েছে, তাই আমি জীবন বাঁচাবার জন্য ওর কাছে প্রাণভিক্ষা করতে এসেছি!
আবার আমার রাগে জ্বলে ওঠা উচিত ছিল। তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে ওকে বিঁধতে পারতুম। প্রাণভিক্ষে করব আমি? অভিজিৎ সেন? ওর ভগবানের কাছে? তার আগে আমি থুতু ফেলে ডুবে মরব!
কিন্তু রাগ হল না, ওরকম কথাও এল না। একটি মেয়ে আমাকে তার আয়ু দিতে চায়। আমি ফস করে বলে ফেললুম, আমার সে সব কিছু হয়নি অনসূয়া, আমি এসেছি তোমাকে একটা বিশেষ কথা বলতে। তোমার মতন একটা নিষ্পাপ সরল মেয়ে, তাকে আমি জোর করে ছুঁয়েছি, এটা আমার অন্যায় হয়েছে! তুমি কী জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রমে যোগ দিয়েছ জানি না, তোমার আগের জীবনে কী ছিল জানি না। আমি বলতে এসেছি, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই!
বিশ্বাস করো সুনীল, এটা বলে ফেলার আগের মুহূর্তেও আমি এটা ভাবিনি। জীবনে আর কখনও বিয়ে করব না, এরকম আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল। কিন্তু অনসূয়াকে দেখে কী যেন হয়ে গেল, আমি বদলে গেলুম, আমি ওর হাত চেপে ধরে বললুম, অনসূয়া, আমি তোমাকে চাই। আমি তোমাকে যথাসাধ্য সুখী করবার চেষ্টা করব। অন্যরকম জীবনযাপন করব, তুমি যদি মুম্বই শহরে না থাকতে চাও…
অনসূয়ার মুখখানা রক্তশূন্য বিবর্ণ হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বলল, এ কী বলছেন আপনি? আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে!
আমি বললুম, পাথরের মূর্তির সঙ্গে সত্যি কারুর বিয়ে হতে পারে? ওর কোনো মূল্য নেই! অনেক সন্ন্যাসীও তো সংসার জীবনে ফিরে আসে। তুমি ফিরে এসো।
অনসূয়া বলল, তা কখনও হয়? তাতে আপনার বিপদ বাড়বে না। না, না, এমন কথা উচ্চারণও করবেন না। ছি ছি ছি ছি। আমি যাই, চলে যাই।
অনসূয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললুম, তুমি আমার বিপদের কথা ভাবছ? অনসূয়া, তোমার ঠাকুর আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখো! এভাবে তোমার জীবনটা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তোমাকে পেলে আমার জীবনটাও সুন্দর হবে।
অনসূয়া কোনো কথাই শুনতে চায় না, সে আবার কান্না শুরু করল। চলে যেতে চায়, আমার হাত ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। এক সময় আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হল, কিন্তু তখনও ওকে পাওয়ার ইচ্ছে আমার মধ্যে তীব্র। আমি ইচ্ছে করলে, সেইখানে ওকে জড়িয়ে ধরে ওকে ভোগ করতে পারতুম। আমি জানি, অনসূয়ার ইচ্ছে থাক বা না থাক, ও চিৎকার করে লোক জড়ো করত না। আমাকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করত না।
ওকে জোর করে বুকে টেনে আনতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে সংযত হয়েছি। সেটুকু বিবেক আমার এখনও অবশিষ্ট আছে। শরীর সম্ভোগকে আমি পাপ মনে করি না, কিন্তু ও করে। কেন ওকে কষ্ট দেব? ও আমাকে ওর আয়ু দিতে চায়, কিন্তু জীবনসঙ্গিনী হতে চায় না! এ কী ধরনের ভালোবাসা?
সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে আমি সেদিন ওকে ভোগ করিনি, সেজন্য কেউ কি আমাকে প্রশংসা করবে? আমি একটা অন্যায় করলে আমাকে ছি ছি করার লোক অনেক আছে। কিন্তু সেই নির্জন নদীর ধারে আমি যে অন্যায় ইচ্ছেটা দমন করতে পেরেছিলাম, সেজন্য কেউ আমাকে সাধুবাদ দেবে না!
অভিদার সঙ্গে এরপর থেকে মাঝে মাঝে আমার যোগাযোগ হত। কলকাতায় এলে আমাকে খবর দিতেন। অনসূয়ার সম্পর্কে আমার কৌতূহল যায়নি, কিন্তু ও প্রসঙ্গ তুললেই বলতেন, দূর দূর, ওর কথা বাদ দে। আমি মন থেকে মুছে ফেলেছি!
অভিদার ক্যানসার। একজন গায়কের পক্ষে এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে?
খবরটা পড়েই আমি কেঁপে উঠেছিলাম। এই কি তবে অনসূয়ার ভগবানের চরম প্রতিশোধ? এবারে আর নিষ্কৃতি নেই!
পরক্ষণেই মনে হয়েছিল, আমারও সংস্কার যায়নি? ক্যানসার তো কত লোকেরই হয়। সেটাকে আমি ভগবানের অভিশাপ ভাবছি কেন? শ্রীরামকৃষ্ণেরও গলায় ক্যানসার হয়েছিল, তাঁকে কে অভিশাপ দেবে? জন্ম-মৃত্যুরই মতন রোগভোগ প্রাকৃতিক ব্যাপার।
সেবারে অভিদা যখন কলকাতায় এলেন, তাঁকে দেখে খুবই কষ্ট হল। এর মধ্যেই রোগা হতে শুরু করেছেন, গলার আওয়াজ ফ্যাসফেসে। কিন্তু তেজ যায়নি। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, সে মেয়েটা আবার চিঠি লিখেছে জানিস তো? না খেয়েদেয়ে প্রার্থনা করছে। এবারে আর ও সবে কিছু হবে না। কাকতালীয়ও হবে না। সিগারেট, বুঝলি, সিগারেটই দায়ী।
তারপর বললেন—
জেনিভায় যাচ্ছি বুঝলি! অপারেশন করাব। টাকাপয়সা অনেক খরচ হবে, আমি আর টাকা নিয়ে কী করব? গলাটা না থাকলে বাঁচারই কোনো মানে হয় না। ডাক্তাররা বলছে ফিফটি-ফিফটি চান্স! হয় বাঁচব, গালা ঠিক হয়ে যাবে, নয়তো অপারেশন টেবিলেই ফুটে যাব! তোকে আমার ডাইরিগুলো আর চিঠিপত্র পাঠিয়ে দেব। যদি কখনও সুযোগ হয়, লিখবি আমার কথা। আমি জীবন কাটিয়েছি নিজের ইচ্ছেমতন, ভগবান-টগবানের তোয়াক্কা করিনি। জীবনের প্রতি আমার বিশ্বাস পজিটিভ। আমি মরতেও যাচ্ছি স্বেচ্ছায়!
বলতে গেলে একটা মিরাকলই ঘটিয়ে দিলেন অভিদা। জেনিভা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। অপারেশন সাকসেসফুল। ছ-মাস বাদে আবার রেকর্ড করলেন নতুন গান। গলা নষ্ট হয়নি।
এত বড়ো জয়ের পরও কিন্তু বেশিদিন বাঁচেননি অভিদা।
নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবার শুরু করেছিলেন উদ্দাম উৎসব। আবার আগেকার মতন মদ্যপান ও পার্টি। একটা পার্টিতে কোনো একটি অভিনেত্রীকে অপমান করার খবরও কাগজে ছাপা হয়েছিল। আমার ধারণা, জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন অভিদা, কিন্তু অনসূয়া-প্রত্যাখ্যান তিনি সহ্য করতে পারেননি। পাথরের বিগ্রহের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জিতেছেন বার বার , তবু তার কাছ থেকে ছিনিয়ে আনতে পারেননি অনসূয়াকে।
মুম্বই শহর থেকে খানিকটা দূরে পানবেল নামে একটা জায়গায় একজন প্রোডিউসারের বাগানবাড়িতে মস্ত বড়ো পার্টি ছিল। সেখানেই আকণ্ঠ মদ্যপান করে মধ্যরাত্রের পর একা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। গৃহস্বামী অনেক অনুরোধ করেছিল সেখানেই থেকে যেতে। কিন্তু ওই যে অভিদার জেদ? তাকে কে আটকাতে পারে!
এক জায়গায় রাস্তা সারাবার জন্য খানিকটা ঘেরা ছিল। সেখানেই দাঁড়িয়েছিল একটা রোড রোলার। অভিদা অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে সোজাসুজি ধাক্কা মারেন। গাড়ি বেশ স্পিডে আসছিল, হেড অন কলিশন যাকে বলে। বেশি যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি, সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।
অভিদা বলেছিলেন, মাটিতে আঁকা আলপনার মতো নয়, তাঁর জীবন উল্কার মতন। সেরকম জীবনের এরকম পরিণতিই তো স্বাভাবিক।
এটাও কি প্রতিশোধ? অনসূয়ার বিশ্বাসের ভগবান কখনো-কখনো বামন অবতার, কখনও নৃসিংহ অবতার হয়ে দুষ্টের দমন করেছেন। তিনি রোড রোলারের রূপও ধারণ করতে পারেন কি না জানি না!
অনসূয়ার সঙ্গে একবার দেখা করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। অভিদা যেবারে জার্মানিতে স্টিমার থেকে বরফগলা নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন, সেবার তার মাথার চুল সব কেটে ফেলেছিল। এবারে অভিদার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সে কী করেছে?
যাইনি। গিয়ে কী হবে? সে তো আমার প্রেমিকা নয়। আমাকে সে চিনতেই পারবে না।
দময়ন্তীর মুখ
দময়ন্তীর মুখ
আজকের সকালটি সোনার মতন উজ্জ্বল। কুয়াশা নেই, মেঘ নেই, বরফমাখা পাহাড় শৃঙ্গগুলিতে রোদ ঠিকরে পড়ছে, সেদিকে চোখ রাখা যায় না। বাতাসের তরঙ্গ একমুখী নয়, কেমন যেন এলোমেলো, যেন বাতাস আপন মনে কোনো খেলায় মেতে আছে। একটা কাঠঠোকরা পাখি উড়ে এসে বসলো খুব কাছে। এখানে কাছাকাছি বড়ো গাছ নেই, তবু পাখিটা কোথা থেকে যেন আসে মাঝে মাঝে। পাখিটা রাজকুমারের মতন রূপবান। মাথায় মুকুটের মতন চূড়া, অঙ্গে চিত্রিত মখমলের মতন পোশাক, গর্বিত পা ফেলে সে আস্তে আস্তে হাঁটে। তার দিকে মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলেন অর্চিষ্মান। পাখিটাকে যতবার দেখেন, ততবার তাঁর বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
গুহা থেকে বাইরে এসে এই সুন্দর সকালটি দেখে অর্চিষ্মানের মন প্রসন্ন হয়ে উঠল। যদিও শরীরটা ভালো নেই, সারা রাত ভালো করে ঘুম হয়নি, মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। উঠে বসে বুকে হাত বুলিয়েছেন। ওষুধ খাওয়ার প্রশ্ন নেই, গত প্রায় চল্লিশ বছর তিনি ওষুধ কাকে বলে জানেন না। এই পাহাড়ের রাত্রির বিশাল নিস্তব্ধতার মধ্যে তিনি নিজের প্রাণবায়ুকে ফিসফিস করে বলেছেন, শান্ত হও, শান্ত হও। যদি চলে যেতে হয়, শান্তভাবে যাও।
আজ সকালেও বুক ভার হয়ে আছে, পা দুটি দুর্বল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার ঊর্ধ্বে উঠে গেল তাঁর মন, দৃশ্য সৌন্দর্যের মহিমা তাঁকে আপ্লুত করে দিল। কাঠঠোকরা পাখিটির চরণ-ছন্দের দিকে চেয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। কম্বলটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে বসলেন গড়ুর সিংহাসনে। সেটি আসলে একটি বড়ো পাথরের চাঁই। এখানকার প্রত্যেকটি পাথরের তিনি নিজস্ব নাম দিয়েছেন। আর দুটি পাথরের নাম মহাকূর্ম এবং থিরবিজুরি। কোনো রহস্যময় কারণে থিরবিজুরি পাথরটিকে তাঁর মনে হয় নারী, সেজন্য তিনি ওই পাথরটির ওপরে কখনও বসেন না।
এর পর এল দুটি প্রজাপতি। এরকম রৌদ্র ঝলমল সকালেই ওরা আসে। কুয়াশা, বৃষ্টি, তুষারপাত আর হিমেল হাওয়ার দিনে ওরা কোথায় থাকে কে জানে! প্রজাপতি দুটি একটুক্ষণ ওড়াউড়ি করে বসলো ঘাস ফুলে। কী অপূর্ব ওদের ডানায় রঙের বিন্যাস। এতগুলি বছরেও প্রজাপতি সম্পর্কে অর্চিষ্মানের বিস্ময়বোধ কাটেনি। কেন ওরা এত সুন্দর, উত্তর পাননি সে প্রশ্নের। ওদের শরীরের বুঝি ওজন নেই, ছোট্ট একটা ফুলের ওপরেও সাবলীল ডানা মেলে বসে, বাতাসের সঙ্গে দোল খায়।
চোখ মুখ ধুতে যেতে হবে নদীতে। বেশি দূরে নয়। এই গুহামুখ থেকেই শোনা যায় নদীর কলকল ধবনি, সেই শব্দ ঢেকে দেবার মতন আর কোনো শব্দ এখানে নেই। ওইটুকু হেঁটে যেতেই অর্চিষ্মান আজ আলস্য বোধ করছেন। তবু একটু পরে উঠে দাঁড়ালেন, কোমরে একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে গেল। আগে কখনও এরকম ব্যথা অনুভব করেননি। বয়েসের থাবা! এবার বুঝি সত্যি বার্ধক্য এল। অর্চিষ্মান আবার প্রজাপতি দুটির দিকে চোখ ফেরালেন, নিজেকে ভুলে ওদের দিকে মনোযোগ দিলেন, অস্ফুট স্বরে বললেন, সুন্দর, সুন্দর!
নদীর পথটা ঢালু, নামা সহজ, তবু যাতে হোঁচট খেয়ে না পড়ে যান, সেই জন্য অর্চিষ্মান একদিকের পাথর ধরে ধরে এগোতে লাগলেন। প্রতিদিন সকালে নদীটিকে প্রথম দর্শনে তাঁর ভালো লাগে। অর্চিষ্মানের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই, তবু নদীটিকে দেখলেই তাঁর বলতে ইচ্ছে করে আমার, আমার।
পাহাড়ের বরফ গলা জল থেকে নেমে এসেছে খুবই ছোটো নদী, একটু দূরেই গিয়ে মিশেছে অন্য নদীতে। এ নদীর কোনো নাম ছিল না, অর্চিষ্মান নাম দিয়েছেন খরসা। খরস্রোতা থেকে খরসা। মুখে মুখে নামটা চালু হয়ে গেছে। অর্চিষ্মান যখন থাকবেন না, তখন তাঁর দেওয়া নামটা থেকে যাবে।
যেমন স্রোত, তেমনই ঠান্ডা জল। এতগুলো বছর কেটে গেল, তবু এখনও জলে হাত দেবার আগে কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়। ছেলেবেলায় শীতকালে পুকুরে স্নান করতে গেলে যেমন জলে নামতে ইচ্ছে করতো না, একসময় গামছাটা ছুড়ে দিয়ে, সেটা ডুবে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হত, এখানেও সেরকম ইচ্ছে হয়। কিন্তু অর্চিষ্মানের গামছা নেই, স্নানের পর গায়েই জল শুকোয়।
জলে অর্চিষ্মান নিজের মুখের ছায়া দেখলেন। মুখের দাড়ি গোঁফের জঙ্গল ভেদ করে সামান্য অংশই দেখা যায়, আজ যেন অনেকদিন পর নিজেকে দেখলেন, কেমন যেন অচেনা লাগল। চক্ষু দুটির জ্যোতি কমে এসেছে, এটাও অসুস্থতার লক্ষণ। কিছুতেই শরীরকে গুরুত্ব দেবেন না বলে অর্চিষ্মান আকাশের দিকে তাকালেন। এমন ঝকঝকে নীলাকাশ বুঝি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। মেঘশূন্য এমন নীলিমা এখানেও খুব দুর্লভ, কখন যে মেঘ এসে যাবে, চতুর্দিক অন্ধকার করে ঝড় বইবে তার ঠিক নেই। এই তো গত পূর্ণিমায় এমন ঝড় উঠেছিল যে তিনদিন টানা চলেছে, এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।
অর্চিষ্মান সেই নিবিড় নীলের দিকে তাকিয়ে শরীরের কষ্টের কথা ভুলে গেলেন। তাঁর মনে হল, কালস্রোত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তবু আকাশে তার কোনো রেখা পড়ে না। আকাশ চিরতরুণ।
নমস্তে বাঙালিবাবা!
নদীর ওপার দিয়ে একটা ভেড়ার বাচ্চা কোলে করে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে একজন মাঝবয়েসি মানুষ। ভেড়াটা কোনোভাবে আহত হয়েছে। খুব সম্ভবত শীর্ষিবাবার আশ্রমে নিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষিবাবা গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে অনেক রুগণ মানুষ, এমনকি পশুপাখিও সুস্থ হয়ে ওঠে।
অর্চিষ্মান হাত তুলে বললেন, জিতা রহো! লোকটির অবশ্য আর কথা বলার সময় নেই। সে ছুটছে।
এত বছরেও বাঙালিবাবা নামটা ঘুচল না। তাঁর গুরু যোগত্রয়ানন্দ অর্থাৎ যোগী অর্থাৎ যোগীবাবা অর্চিষ্মানের একটা অন্য নাম দিয়েছিলেন। তাঁর অঙ্গে গেরুয়া জড়িয়ে দিয়ে নাম দিয়েছিলেন বসভেশ্বরস্বামী, কিন্তু সে নাম চলেনি। অর্চিষ্মান হিন্দি ভালোই শিখেছেন, এই হিমালয়ে সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে হিন্দি ভাষাই লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা, কিন্তু তাঁর উচ্চারণে বাংলা টান যায়নি। দু-তিনটে বাক্য শুনলেই অন্যরা বুঝে যায়, বাঙালি।
অর্চিষ্মানের পূর্বাশ্রমের নামটাও একেবারে ঘুচে যায়নি। কেউ কেউ যে মনে রেখেছে, সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। এই তো গত বছরই ডিসেম্বর মাসে দুজন যুবক খুঁজে খুঁজে পাহাড়ের এতদূরে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা একটা লিটল ম্যাগাজিন চালায়, তারা অর্চিষ্মান গুহঠাকুরতার সাক্ষাৎকার ছাপাতে আগ্রহী। অর্চিষ্মান খুব হেসেছিলেন। লোকালয় থেকে বহুকাল বিচ্যুত, গুহানিবাসী এক সাধুর সাক্ষাৎকার পাঠ করে কার কী লাভ হবে? মানুষকে জানাবার মতন তো তাঁর কিছুই নেই। নিজেই এখনও অনুসন্ধানী।
ছেলে দুটি এত কষ্ট করে, প্রচুর উৎসাহ নিয়ে এসেছে বলে মায়া হয়েছিল অর্চিষ্মানের, তিনি ওদের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর না দিলেও আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।
ওরা ওদের পত্রিকার দুটি সংখ্যা প্রায় জোর করেই রেখে গেছে। অর্চিষ্মান পড়ে দেখতে চান না। কত বছর যে ছাপার অক্ষর পড়েননি, তার হিসেব নেই। এখানে সাল-তারিখের খেয়াল রাখারও প্রয়োজন হয় না। ওই পত্রিকার মলাটে লেখা আছে, ইংরেজি পঁচানম্বই সাল। তাতেই অর্চিষ্মানের খেয়াল হল যে, এই পাহাড়ে কেটে গেল ছত্রিশ বছর।
ছেলে দুটি বলেছিল, কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরির ইনডেক্স কার্ডে এখনো অর্চিষ্মান গুহঠাকুরতার নাম আছে। সেখানে তাঁর কবিতার বইটি এখনও পাওয়া যায়। একজন সাহিত্যিক সম্প্রতি আত্মজীবনী লিখেছেন, তাতে আড়াই পৃষ্ঠা জুড়ে আছে অর্চিষ্মান গুহঠাকুরতার কথা, সেই অংশটি পড়েই যুবাদুটি ছুটে এসেছে। এসব শুনেও অর্চিষ্মান শুধু হেসেছিলেন। তাঁর মনে কোনো কৌতূহল জাগেনি।
আপনি কেন সব ছেড়েছুড়ে চলে এলেন এই পাহাড়ে? ওদের বারবার এই প্রশ্নের উত্তরে অর্চিষ্মান বলেছিলেন, নিয়তি!
মানুষের নিয়তি কি মানুষ নিজেই নির্ধারণ করে? অথবা মনের অনেক গভীরে, অতলান্ত প্রদেশে এমন কিছু প্রক্রিয়া চলে, যেখানে মানুষের যুক্তিগ্রাহ্য জীবনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
উনিশশো ঊনষাট সালে চন্দননগর থেকে এগারোজনের একটি অভিযাত্রী দল এসেছিল সুন্দরডুঙ্গা হিমবাহ অভিযানে। সেই দলের ম্যানেজার ছিল এক তরুণ কবি। পাহাড়ে চড়া কিংবা ট্রেকিং-এর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, সে অনেকটা জোর করেই দলে ঢুকে পড়েছিল। লোকে বলে, পাহাড় নাকি মানুষকে টানে। অর্চিষ্মানকেও টেনে এনেছিল নগাধিরাজ হিমালয়? ঠিক তা নয়।
বেস ক্যাম্প ছিল উমলায়। রোমান্টিক তরুণ কবিটি কাহিল হয়ে গিয়েছিল শীতে, বা হাঁটুতে খানিকটা চোটও লেগেছিল, উমলা থেকে আর সে এগোতে পারেনি। সুন্দরডুঙ্গা ও পিণ্ডারি অভিযান সার্থক করে দলটি ফিরে এলো, এক রাত সহর্ষে নাচ-গান করে কাটালো, তারপর নীচে নেমে আসার উদ্যোগ করতেই তরুণ কবিটি জানালো, সে ওখানে আরও কিছুদিন থেকে যেতে চায় একা একা। বন্ধুদের অনেক অনুরোধ ও পেড়াপিড়িতেও সে ফিরতে সম্মত হল না।
প্রথমে ভেবেছিল, সেই সৌন্দর্যমণ্ডিত পাহাড় প্রকৃতির মধ্যে অন্তত মাসখানেক থাকবে, কিন্তু কেটে গেল মাসের পর মাস, বছর, যুগ এই তিনযুগ পেরিয়ে গেছে।
কলকাতা ছেড়ে আসার আগে এরকম কোনো বাসনা বা সিদ্ধান্ত তার মনের কোণেও ছিল না। কোনোরকম আধ্যাত্মিক টানও আগে কখনও অনুভব করেনি অর্চিষ্মান। কবিদের সাহচর্য, শহুরে জীবনের উত্তেজনাই তার পছন্দ ছিল, প্রকৃতির রূপের আকর্ষণ তার চেয়ে বেশি হল কী করে?
কারুর প্রতি অভিমান? নারী?
সে রকম একটা গৌণ কারণ ছিল বটে। খুব গৌণই বলা উচিত।
ছত্রিশ বছর আগে, অভিযাত্রী দলের সঙ্গে জুটে যাবার সময়, দময়ন্তী আর তার স্বামী এসে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল অর্চিষ্মানদের বাড়ির খুব কাছাকাছি। জানলা খুললে এ বাড়ি ও বাড়ি দেখা যায়। দময়ন্তীদের বাড়ির দোতলায় প্রশস্ত, ঢাকা বারান্দা, সেখানে চায়ের টেবিল পাতা, অর্চিষ্মানের ঘর থেকে স্পষ্ট দেখা যেত, ওরা স্বামী-স্ত্রী সকালে সেখানে চায়ের ট্রে নিয়ে বসেছে। এই দৃশ্য অর্চিষ্মানের অসহ্য বোধ হত।
সেই জন্যই সে আর ফিরল না? এটা একেবারে ছেলেমানুষির পর্যায়ে পড়ে। তখন কৃষ্ণনগর কলেজে চাকরি পেয়েছে অর্চিষ্মান, বাড়ি থেকে রোজ ট্রেনে যাতায়াতের ক্লান্তি কম নয়, সে তো কৃষ্ণনগরেই বাড়ি নিয়ে যেতে পারত। কৃষ্ণনগর জায়গাটি বেশ, সাহিত্যের পরিবেশ আছে। দময়ন্তীর কাছ থেকে দূরে সরে যাবার জন্য তাকে হিমালয়ের গিরিকন্দরে আশ্রয় নিতে হবে কেন?
নিয়তি, না খেয়াল? প্রথম দিকে খানিকটা খেয়ালের বশেই কি সে থেকে যেতে চায়নি? বুকের মধ্যে সেরকম কিছু অভিমানের তীব্র কুয়াশা ছিল না, বরং তার কবিসত্তা এই পরিবেশে স্পন্দিত হয়েছিল। মাসখানেকের বেশি এরকম ভালো লাগার বোধ থাকে না, তারপর ফিরে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক।
এখানকার একজন মানুষ তাকে আকৃষ্ট করেছিল। উমলা থেকে বেশ খানিকটা দূরে ছিল যোগত্রয়ানন্দের আশ্রম। অনেকেই সেখানে যায়, তরুণ কবি অর্চিষ্মানও সেখানে গিয়েছিল কৌতূহলবশে। ধর্ম সম্পর্কে তার মন ছিল মুক্ত, নিজে কোনো ধর্মাচরণ না করলেও অপরের ধর্মাচরণের ব্যাপারে অশ্রদ্ধা ছিল না। যার যা ভালো লাগে। ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা ছিল খুবই অস্পষ্ট, এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও পরিচালক একজন কেউ আছে না নেই, তা স্পষ্টভাবে বলা খুব দুষ্কর। এক এক সময় তার মনে হত ঈশ্বর এক অলীক কল্পনা মাত্র। আবার কখনও মনে হত, এই বিশ্বের সৌন্দর্য, কল্যাণ প্রবহমানতার জন্য যদি ঈশ্বর দায়ী হন, তাহলে কুশ্রীতা, হানাহানি, অশুভ শক্তির অভ্যুত্থান, এসবের জন্যও কি তিনিই দায়ী?
যোগত্রয়ানন্দ বা যোগীবাবার আশ্রমের বাইরে বেশ বড়ো একটা বাগান। নানা বর্ণের, কত বিচিত্র সব ফুল। আশ্রমে প্রবেশ করার আগে অর্চিষ্মান সেই বাগানে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেছিল। ফুলের বাহার দেখতে দেখতে অর্চিষ্মানের হঠাৎ মনে হয়েছিল, প্রতিটি গাছের ফুল আলাদা, এক একটি ফুলের কী অপূর্ব ডিজাইন, কতরকম রঙের তরঙ্গ এবং তা একেবারে নিখুঁত। এত রকম ফুলের সৃষ্টি করল কে? প্রকৃতির এই সৃষ্টির পেছনে কি কোনো চিন্তাশীল মন কাজ করেনি? চিন্তা না করলে সব আলাদা আলাদা হবে কী করে? শুধু তো ফুল নয়, এতরকমের গাছ, মানুষ, পশু, পাখি, কীট-পতঙ্গ। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মুখ আলাদা। কারখানায় প্রস্তুত সব জিনিস একরকম হয়, প্রকৃতির কারখানার পিছনে কি তা হলে ঈশ্বর নামে একজন শিল্পী আছেন? কিন্তু একা সেই ঈশ্বর বসে বসে এত কোটি কোটি ফুল-গাছ-মানুষ-জন্তু-কীট-পতঙ্গেও ডিজাইন আঁকছেন, এও তো অবাস্তব ব্যাপার!
যোগীবাবা বসেছিলেন উন্মুক্ত স্থানে, একটি বাঘের চামড়ার ওপরে। মোটাসোটা, দীর্ঘকায় মানুষটি, কোনো রকম উগ্রভাব নেই, বরং মুখখানি দেখলেই ভালো লাগে। কয়েকজন ভক্তের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বলছেন, নিজেকে জাহির করার ভাব নেই। প্রথম দিন অর্চিষ্মান যোগীবাবার সঙ্গে কোনো কথা না বলে, কিছুক্ষণ বসে থেকে ফিরে এল।
অর্চিষ্মানের আগে ধারণা ছিল সাধুগিরি এক ধরনের নিরাপদ ব্যাবসা। মূলধন লাগে না, কোনো খাটাখাটনি করতে হয় না, কিছু চটকদার কথা বলার ক্ষমতা থাকলেই হল। তাতেই কিছু চ্যালা জুটে যায়, তারা সেবা করে, খাবারদাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায় স্বচ্ছন্দে। সবাই জানে, উপমা আর যুক্তি এক নয়, কিন্তু সব সাধুই কথায় কথায় উপমা দিয়ে ভক্তদের মাত করে। মানুষের গুঢ় জিজ্ঞাসার উত্তরে সাধুরা একটা গল্প শুনিয়ে দেয়।
যোগীবাবার আশ্রমের পরিবেশটা অর্চিষ্মানের পছন্দ হয়েছিল। হই-চই নেই, দাও দাও ভাব নেই, পিছন দিকে একটি গম্ভীর পাহাড়চূড়া, সামনে সযত্নে রক্ষিত বাগান। যোগীবাবা নিজে বাগানে ঘুরে ঘুরে ফুলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন।
দিন তিনেক যাবার পর অর্চিষ্মান একদিন যোগীবাবাকে প্রশ্ন করল, সাধুজি, আপনি যে এখানে আশ্রম করে আছেন, তা কীসের জন্য? আপনি কী পেয়েছেন?
ফুলবাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যোগীবাবা আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ওই পেয়েছি।
অর্চিষ্মান চমকে গেল। এত সহজ উত্তর? অনেক বড়ো বড়ো যোগী সাধকও ঈশ্বরকে পেয়ে যাওয়ার কথা সরাসরি স্বীকার করেন না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্য কথা বলেন। এই লোকটা ভণ্ড, মিথ্যেবাদী নাকি?
সে জিজ্ঞেস করল, আপনার ঈশ্বর দর্শন হয়ে গেছে?
এর উত্তরে যোগীবাবা যদি হ্যাঁ বলতেন, তাহলে অর্চিষ্মান হয়তো আর কখনো ও আশ্রমে আসত না।
যোগীবাবা সামান্য হেসে বললেন, ঈশ্বর আকাশে থাকেন কিনা তা আমি জানি না। না, আমার আজও ঈশ্বর দর্শন হয়নি। আমি আকাশের দিকে দেখালাম, তার মানে আমি আকাশকে পেয়েছি। গাছের দিকে তাকিয়ে গাছকে পাই, মানুষের দিকে তাকিয়ে মানুষকে পাই, সবকিছুর ওপরে আকাশ।
এমন স্নিগ্ধস্বরে যোগীবাবা কথাগুলি বলেছিলেন, অর্চিষ্মান মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই মানুষটিও কবি।
যোগীবাবার সঙ্গে ভাব জমে যাবার পর তিনি অর্চিষ্মানকে এই আশ্রমে এসে থেকে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন। এর আগে অর্চিষ্মান ছিল পাহাড়িদের গ্রামের একজনের বাড়িতে। দৈনিক মাত্র দুটি টাকা দিলে তারা রুটি, ডাল, সবজি বানিয়ে দিত। ঘর ভাড়া কিছু লাগত না। খানিকটা যোগীবাবার ব্যক্তিত্বের টানেই সে চলে এল আশ্রমে।
এখানে তাকে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম মানতে হয়নি। যোগীবাবা তাকে কোনো পুজো-আচ্চা বা ধ্যানের অনুজ্ঞা দেননি। বলেছিলেন, যা মন চায় তাই করবি, পাহাড় দেখবি, নদী, গাছপালা দেখবি, খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখবি, সব কিছুর অন্তঃস্তল পর্যন্ত দেখবি, তাতেই হৃদয় পবিত্র হয়ে যাবে।
সেই অল্প বয়েসের অস্থিরতার অর্চিষ্মান বেশ কিছুদিন যোগীবাবাকে নানান প্রশ্ন করে জব্দ করতে চেয়েছে। পারেনি।
একদিন সে জিজ্ঞেস করেছিল, যোগীবাবা আপনি তো বলেন ঈশ্বর মঙ্গলময়। পৃথিবীতে যে এত অমঙ্গল, এত হানাহানি, তা কি ঈশ্বর দেখতে পান না? আপনি কী জানেন, জাপানে অ্যাটম বোমা ফেলে একদিনে লক্ষ লক্ষ লোক মারা হয়েছিল? সেই সব নিরীহ মানুষ কি সবাই পাপী ছিল? তারা মরলো কেন? হত্যাকারীরাও কোনো শাস্তি পায়নি। এটা ঈশ্বরের কোন লীলা?
যোগীবাবা সরলভাবে বলেছিলেন, আমি এ প্রশ্নের উত্তর জানি না। ঈশ্বরের হয়ে ওকালতি করার দায়িত্বও কেউ আমাকে দেয়নি। আমি ঈশ্বরকে খুঁজি আমার নিজস্ব শান্তির জন্য। জানি না কোনোদিন তাঁর দর্শন পাবো কিনা। তবে মাঝে মাঝে যেন আভাস পাই। একদিন শুধু তাঁর জ্যোতির্ময় প্রভাটুকু অন্তত দেখতে পাবো আশা করে আছি।
আর একদিন অর্চিষ্মান বলেছিল, মানুষের জীবনে ঈশ্বরকে খুঁজতেই হবে কেন? ঈশ্বর যদি থাকেন তো থাকুন। আমি এমন কিছু কিছু মানুষকে জানি, যাঁদের ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস নেই, ঈশ্বরকে নিয়ে মাথাও ঘামান না। তাঁরা লোক ঠকান না। অযথা মিথ্যা কথা বলেন না, সৎভাবেই জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন।
যোগীবাবা বলেছিলেন, ভালো, খুব ভালো। যার যা ভালো লাগে। আমি দেখেছি, অবিশ্বাসে বড়ো অশান্তি, বিশ্বাসে শান্তি। অবিশ্বাস নিয়েও যদি কেউ শান্তিতে জীবন কাটাতে পারে তা কাটাক না। তারাও শ্রদ্ধেয়।
একটু থেমে তিনি আবার বলেছিলেন, অবিশ্বাস থেকেও কেউ কেউ বিশ্বাসে পৌঁছে যায়। মাঝখানে সুদীর্ঘ কষ্টকর পথ। পৌঁছোবার পর সব ক্লান্তি দূর হয়, তারপর বড়ো শান্তি রে, বড়ো শান্তি। অপার, সুগভীর শান্তি। না পৌঁছোলে বোঝা যায় না। আমার মনে হয় তুই পারবি, তুই পৌঁছে যাবি।
অর্চিষ্মানের সেদিন খানিকটা কৌতুকের সঙ্গেই মনে হয়েছিল, তাই নাকি? আচ্ছা দেখাই যাক।
মাস দেড়েক কেটে যাবার পর ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিলেন বাবা। অল্প বয়েসে মাকে হারিয়েছে অর্চিষ্মান। বাবা, দুই দাদা, এক দিদি ও পিসিমাকে নিয়ে সংসার। বাবার শত অনুরোধ, আদেশ, কান্নাকাটিতেও বিচলিত হয়নি অর্চিষ্মান, সে ফিরে যেতে চায়নি। বাবাকে বলেছিল, আমার ইচ্ছে হলে ঠিক ফিরে যাবো, আমি দেখতে চাই আর কতদিন এখানে ভালো লাগে। আমি চিঠি লিখবো মাঝে মাঝে।
এরপরেও বড়োদাদা এসেছিল একবার, দুতিনজন বন্ধুও এসেছিল দেখা করতে। অর্চিষ্মান তখন মোহমুগ্ধ হয়ে আছে, তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব ছিল না।
যোগীবাবা তাকে বলেছিলেন, ঈশ্বরের জন্য হন্যে হয়ে চোখ বুজে তপস্যা করে কোনো লাভ নেই। চোখ খুলেই তাঁকে পাওয়া যায়। এই পৃথিবীর সব সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের দিব্যজ্যোতির স্পর্শ। সেই জন্য, গাছপালা, ফুল, পাখি, নদী পাহাড় এই সবকেই আগে চিনতে হয়। একদিন না একদিন এদের মধ্যেই দেখা যাবে সেই জ্যোতি।
সেইজন্য অর্চিষ্মান প্রকৃতিকে ভালোভাবে চেনবার চেষ্টা করছিল। কোনো কোনো ফুলগাছের সামনে তো সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত বসে থেকেছে। দেখেছে কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটা। দেখেছে মৌমাছি, প্রজাপতিদের খেলা। দেখেছে জীবনের স্রোত।
ফুলগুলি কেন এত সুন্দরভাবে সেজে পাপড়ি মেলে ধরে তা বোঝা যায়। ভ্রমর বা মৌমাছিদের অমন সাজগোজ করার দরকার নেই। কিন্তু প্রজাপতিরা কেন এত সেজে আসে? ওদের ডানায় কেন এত রঙের কারুকাজ। প্রকৃতির যে এত রূপ, তার সব কিছুর মধ্যেই কোনো না কোনো প্রয়োজনের কথাও লেখা আছে। এত স্বল্পজীবী প্রজাপতির ডানার শিল্পকীর্তির মধ্যে কোন প্রয়োজন? পাখিরা ওদের ধরে ধরে খেয়ে ফেলে।
ফুলগাছের কাছে কিরনা নদীর ধারে বসে থাকাই ছিল অর্চিষ্মানের ধ্যান। সেই ধ্যানে প্রায়ই বিঘ্ন ঘটাত দময়ন্তীর মুখ।
খানিকটা অভিমান থাকলেও দময়ন্তীর জন্য তার বুকে তেমন গভীর কোনো বেদনাবোধ ছিল না। দময়ন্তীর কাছ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল দময়ন্তীর বিয়ের অনেক আগে।
শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় নাগরদোলায় চাপতে গিয়ে আলাপ। অর্চিষ্মানের সঙ্গে ছিল কয়েকজন বন্ধু, দময়ন্তীর সঙ্গেও ছিল কয়েকজন বান্ধবী। চোখাচোখির টান। একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া, ঠিকানা বিনিময়। দময়ন্তী থাকে আসানসোলে, অর্চিষ্মান থাকে দমদম ক্যান্টরমেন্টের কাছে। ঠিকানা নিলেও অর্চিষ্মান প্রথমে চিঠি লেখেনি, দময়ন্তী অর্চিষ্মানের একটি কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার চিঠি পাঠিয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল চিঠির বন্যা। প্রথম প্রথম সপ্তাহে একটা দুটো, তারপর প্রতিদিন, এমন কী একদিনে দুটি চিঠিও লিখেছে অর্চিষ্মান।
নতুন দাঁত ওঠা শিশু যেমন সব কিছু কামড়াতে চায়, একজন তরুণ কবিরও সেরকম সব সময় আঙুল নিশপিশ করে। ভাষার মাধ্যমে জীবনযাপন। ভাষার মাধ্যমে মুক্তি। ভাষা নিয়ে আত্মরতি। অর্চিষ্মান তখন শুধু কবিতাই লেখে না, পুস্তক সমালোচনা, ছোটোখাটো প্রবন্ধ, রম্যরচনাও লিখেছে বেশ কিছু। ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তাকে পছন্দ করেন, তার একটি কাল্পনিক ভ্রমণকাহিনি পড়ে সাগরময় ঘোষ একদিন বলেছিলেন, তোমার গদ্যের হাতও বেশ ভালো, তুমি একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করবে নাকি, অর্চি? সে লাজুকভাবে মাথা নীচু করে বলেছিল, ওরে বাবা, উপন্যাস কি লিখতে পারবো, সাগরদা! সে যে খুব শক্ত! মুখে এই কথা বললেও ‘দেশ’ সম্পাদকের এই প্রস্তাবে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল অর্চিষ্মান।
টানা তিন বছর ধরে চলেছিল চিঠি লেখালেখির পালা। এর মধ্যে দময়ন্তীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাত্র একবার। মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে আসানসোল থেকে দময়ন্তী এসেছিল কলকাতায়, চিঠিতে আগেই ঠিক করা ছিল, বিয়েবাড়ি থেকে কিছুক্ষণের জন্য পালিয়ে এসে দময়ন্তী দাঁড়িয়েছিল ভিকটোরিয়া মেমোরিয়ালের পুকুরের ধারে। দুজনে পাশাপাশি হেঁটেছে, চিঠিপত্রে পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে এলেও কথাবার্তায় সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেউ কারুর অঙ্গ স্পর্শ করেনি। না, তা ঠিক নয়। একবার শুধু দময়ন্তীর চাঁপা ফুলের মতন একটি আঙুল ছুঁয়ে দিয়েছিল অর্চিষ্মান। সেইটুকুই যথেষ্ট।
এতদিনে অর্ধেক ছাপার খরচ দিয়ে একটা ছোটো প্রকাশনী থেকে অর্চিষ্মান গুহঠাকুরতার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেই বই পেয়ে দময়ন্তী লিখেছিল, তুমি প্রত্যেকটি কবিতা ছাপার আগে কপি করে আমার কাছে পাঠাবে। আমি প্রথম পড়তে চাই। তুমি আমার কবি। আমি জানি, আমার কবি একদিন নোবেল প্রাইজ পাবে।
তিন বছর পর দময়ন্তী এম এ পড়তে এলো কলকাতায়। টালিগঞ্জে তার মামার বাড়িতে উঠল। দমদম থেকে টালিগঞ্জ, দূরত্ব অনেকখানি। দময়ন্তীর মামার বাড়িটি মস্ত বড়ো, অনেক লোকজন, ছেলেমেয়েদের মেলামেশার কোনো বাধা নেই। সে বাড়িতে বেশ কয়েকবার গেছে অর্চিষ্মান, একতলাতে দুখানা বৈঠকখানা, দুপুরের দিকে গেলে নিরিবিলিতে কথা বলা যায় অনায়াসে।
এক মেঘলা দুপুরে ওরা ছোটো বসবার ঘরটায় বসেছিল অনেকক্ষণ। একপাশে পুরনো আমলে একটি সোফা পাতা, আর একদিকে একটি গোল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে কয়েকটি চেয়ার। দময়ন্তী বসে আছে সোফায়, ধূপের ধোঁয়া রঙের শাড়ি পরা, মাথার সব চুল খোলা। প্যান্ট শার্ট পরা অর্চিষ্মান বসে আছে একটু দূরের চেয়ারে, হাতে সিগারেট। এক মাথা চুল, গালে দু-তিন দিনের দাড়ি, পাশের খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা করবী গাছের ঝোপ। আকাশে মাঝে মাঝে গুরুগুরু শব্দ হচ্ছে। জানিয়ে দিচ্ছে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা। কথাবার্তা থামিয়ে ওরা চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে। এক এক সময় নীরবতাই বাঙ্ময়। চোখে চোখে প্রবাহিত হচ্ছে ওদের হৃদয়। এতদিন পরে এই প্রথম ওদের শরীর জেগে উঠেছে, চুম্বকের মতন পরস্পরকে টানছে, দুজনেরই ঠোঁটে দারুণ তৃষ্ণা, যে-কোনো মুহূর্তে অর্চিষ্মান উঠে যেতে পারে দময়ন্তীর কাছে।
সেই মুহূর্তটা এল না। কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। ওপর থেকে নেমে এল দময়ন্তীর মামাতো দাদা তপন, সঙ্গে তার এক বন্ধু, বন্ধুটির নাম অভিজিৎ, সে এয়ারফোর্সের অফিসার। লম্বা, ফর্সা অত্যন্ত সুদর্শন যুবা, পোশাকের ভাঁজ নিখুঁত, মাথার চুল কপালে এসে পড়ে না।
তারপর থেকে অভিজিৎকে প্রায়ই দেখা যায় ও-বাড়িতে। একসঙ্গে গল্প, হাসিঠাট্টা হয়। বাংলা কবিতার ধার ধারে না অভিজিৎ কিন্তু সে অশিক্ষিত নয়, বিদেশি বই পড়েছে অনেক। মোটামুটি জার্মান ভাষা জানে।
আইস স্কেটিং রিংকে একটি বিলিতি দলের নাচের অনুষ্ঠান চলছে, অভিজিৎ একদিন প্রস্তাব দিল, সবাই মিলে সেটা দেখতে যাওয়া হোক। তার চেনাশুনো আছে, ভিতর থেকে সে টিকিট জোগাড় করতে পারবে। দময়ন্তীর খুব উৎসাহ, সে বলল, হ্যাঁ চলো, চলো। তপন যেতে পারবে না, বৈষয়িক ব্যাপারে তাকে যেতেই হবে উকিলের বাড়িতে। দময়ন্তীর চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অর্চিষ্মান বলল, আমিও যেতে পারবো না, সন্ধেবেলা আমার বিশেষ কাজ আছে। দময়ন্তী তবু আবদারের সুরে বলল, চলো, চলো, দেখো, গেলেই তোমার ভালো লাগবে। অর্চিষ্মান তবু রাজি হল না। এর পরেও কি দময়ন্তী একলা যাবে অভিজিতের সঙ্গে? হ্যাঁ, ওরা দুজনেই গেল।
সেই দিন থেকেই সম্পর্কের শেষ। এর আগেও অভিজিৎ একবার দময়ন্তীকে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে চিনে খাবার খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন অবশ্য তপন ছিল সঙ্গে। ওসব জায়গা যাবার সাধ্য ছিল না অর্চিষ্মানের।
একদিন অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে নাচ-গান দেখতে গেলে কী এমন আসে যায়? ব্যাপারটা তা নয়। অর্চিষ্মান বুঝে গেল, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে সে অংশ নেবে না। অভিজিৎ একজন অস্ত্রধারী যোদ্ধা আর অর্চিষ্মান কবি। এদের মধ্যে কি লড়াই হতে পারে? কবিরা কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যায় না। কাপুরুষতা নয়, অরুচি, উপেক্ষা। লোকে মনে করবে পরাজয়। তা করুক। স্বেচ্ছা-পরাজয় কবির অহংকারকে উস্কে দেয়, তার সৃষ্টি ক্ষমতা বেড়ে যায় অনেকখানি।
অর্চিষ্মান আর কোনোদিন দমদম থেকে টালিগঞ্জে যায়নি।
পনেরো দিন পর দময়ন্তী চিঠি লিখেছিল। উত্তর না পেয়ে আর একটি। অর্চিষ্মান কী উত্তর দেবে? সেদিন দময়ন্তীর চোখের দিকে তাকিয়ে অর্চিষ্মান যে তাকে যেতে নিষেধ করেছিল, তা কি সে বোঝেনি? চোখের ভাষাই যদি বুঝতে ভুল করে তাহলে আর চিঠি লিখে কী হবে?
ছ-মাসের মধ্যে অভিজিতের সঙ্গে দময়ন্তীর বিয়ে হয়ে গেল। চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত হবার পর অভিজিৎ বিয়ে করবে ঠিক করে উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধানে ঘুরছিল। তারপর সে যখন দময়ন্তীকে নির্বাচন করল, তখন এ বিয়ে হবেই। জয়ী হবার জন্যই সে এসেছে।
অর্চিষ্মান তাতে আঘাত পায়নি। এটা সত্যি কথা। নিজের হাতে গড়া একটা মূর্তি হঠাৎ ভেঙে ফেললে সেই শিল্পী যেমন নিজেকেই দোষ দেয়, তার মনোভাব হয়েছিল সে রকম।
কিন্তু অভিজিৎ দমদম ক্যান্টরমেন্টের কাছেই বাড়ি নিতে গেল কেন? সে হয়তো অর্চিষ্মানের বাড়ি কোথায় তা জানত না, কিন্তু দময়ন্তীর তো জানা ছিল। আসতে যেতে প্রায়ই দেখা হয়ে যাবে। পাড়া-প্রতিবেশী হিসেবে ভাব হবে, দু-বাড়িতে আসা-যাওয়া, অর্চিষ্মানের পিসিকে দময়ন্তী পিসি বলে ডাকবে, অভিজিৎ চায়ের নেমন্তন্ন করবে, চোখের সামনে গর্ভবতী হবে দময়ন্তী, এই চিন্তাই অসহ্য বোধ হয়েছিল অর্চিষ্মানের।
কিন্তু সেজন্যই সে হিমালয়ে পালিয়ে আসেনি। হয়তো তার মনের গভীরে প্রকৃতির প্রতি জোরালো টান ছিল। পাহাড়ের গম্ভীর নীরবতা দেখে সে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিল। মানুষের জীবনে ভালো লাগাটাই তো আসল। কেউ প্রভুত্ব ভালোবাসে, কেউ পছন্দ করে একাকিত্ব।
যোগীবাবার সান্নিধ্যে তার মনের ব্যাপ্তি বেড়ে গিয়েছিল অনেকখানি। একটা গাছকেও তীব্রভাবে ভালোবাসা যায়। একগুচ্ছ ফুল, একটা স্বচ্ছতোয়া নদীও হতে পারে ভালোবাসার সামগ্রী। মাঝে মাঝে সে একটা অতীন্দ্রিয় অনুভূতিও বোধ করে। এই দৃশ্যমান সবকিছুর আড়ালে যেন রয়েছে একটা শক্তি। বিকেলের আকাশের রং ফেরা দেখে মনে হয়, এটাই কী ঈশ্বরের করুণার প্রকাশ।
দময়ন্তীকে একেবারে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। তা সম্ভব নয়। এক এক সময় বিশাল পাহাড়কেও আড়াল করে দময়ন্তীর মুখ ভেসে ওঠে। তারপরই সেই মুখখানি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
সে আগে কোনো মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশেনি, পরেও না। একদিন শুধু চুম্বনের জন্য উদ্যত হয়েছিল, তাও শেষ পর্যন্ত হল না। নারী তার কাছে অনাঘ্রাতাই রয়ে গেল। কোনো আফসোস নেই। নারীর চেয়ে প্রকৃতিও কম কিছু দেয় না। আর যদি ঈশ্বরের জ্যোতির সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে আর কোনো দিকেই মন যায় না।
অর্চিষ্মান একদিন খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সেই মেঘলা দুপুরে পরস্পর গাঢ় চোখাচোখির দৃশ্যটা মনে পড়তেই তার পুরুষলিঙ্গের উত্থান হল। উত্তপ্ত হয়ে উঠল শরীর। কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল।
এ কী হল তার? সে তো দময়ন্তীকে আর কামনা করে না, তবে কেন শরীরের এই চাঞ্চল্য? শরীর কি মনের অধীন নয়? নিজেকে খুব অপরাধী মনে হল। অনেকক্ষণ ঠায় বসে থেকে সে একসময় উঠে গেল যোগীবাবার কাছে।
যোগীবাবার সঙ্গে তার অনেক বিষয়েই খোলাখুলি কথা হয়। বিনা দ্বিধায় তাঁকে সব ঘটনাটা জানিয়ে দিল। যোগীবাবা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। যেন ধ্যানস্থ হলেন চোখ বুজে। তারপর একসময় তিনি অর্চিষ্মানের হাত ধরে বললেন, তুই আমারটা ধরে দেখ।
অর্চিষ্মান সবিস্ময়ে দেখল, যোগীবাবার পুরুষাঙ্গ লোহার মতন শক্ত!
তিনি বললেন, বেটা, আমি কখনও যোষিৎ সঙ্গ করিনি। তোর মতন কোনো প্রেমিকাকে পিছনে ফেলে আসিনি। ছোটোবেলা থেকেই আমার মিলনেচ্ছা ঈশ্বরের সঙ্গে। তীব্র মিলনেচ্ছাতে এ রকম হয়। এটা শরীরের নিয়ম। দেখবি, এমন দিন আসবে, যখন কোনো নারীর কথা চিন্তা না করলেও ঈশ্বর অনুভূতি হলে পুরুষার্থ জাগ্রত হবে।
যোগীবাবার কথা একদিন ফলে গিয়েছিল। মন থেকে মুছে গেছে দময়ন্তী, আর তার মুখ মনে পড়ে না। সে অনেক পরের কথা।
যোগীবাবার মৃত্যুর পর সাধক অর্চিষ্মান সেই আশ্রম ছেড়ে পাহাড়ের অনেক ওপরে উঠে গিয়ে এক গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। যোগীবাবার ইচ্ছে ছিল, অর্চিষ্মান এই আশ্রমের ভার নিয়ে নেন। কিন্তু বাবার অন্য শিষ্যদের মধ্যে ঈর্ষার ভাব দেখে তিনি সরে এসেছেন। সব সাধু তো এক হয় না। অনেক সাধুর টনটনে স্বার্থজ্ঞানও অর্চিষ্মানের চোখে পড়েছে।
এখানে গ্রাসাচ্ছাদনের কোনো চিন্তা নেই। অর্চিষ্মান নিজের জন্য কিছুই কখনও রান্না করেন না। মাইল পাঁচেক দূরে পোটালা গ্রাম একটি লঙ্গরখানা আছে, গুজরাটের এক সমিতি সেটা চালায়। সেই লঙ্গরখানায় যেতেও হয় না, সেখানকার স্বেচ্ছাসেবকরা এসে রুটি, গুড়, ছাতু, বাতাসা দিয়ে যায়। খুব ঝড়বৃষ্টির সময় তারা আসতে পারে না, তাতেই বা কী, দু-তিন দিন না খেয়ে থাকলেও কিছু ক্ষতি হয় না শরীরের। অবশ্য মনটা ছটফট করে, কখন আসবে, এই বুঝি এল এরকম অনুভূতি হয়।
মৃত্যুর আগে দুদিন যোগীবাবার বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অর্চিষ্মানের খুব জানতে ইচ্ছে করেছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি ঈশ্বরের জ্যোতি দেখতে পেলেন কিনা। শেষ দিনটিতে যোগীবাবার মুখে দেখেছিল অপূর্ব এক হাসি। কী পেয়েছেন তিনি?
কিছু একটা আছে, কোনো এক সময় সেই অনির্বচনীয়কে পাওয়া যাবে, এই বোধটাই জীবনকে উদ্দীপ্ত করে রেখেছে। সারাদিন পাহাড়ের রং বদলায়, মেঘ এসে গুম গুম শব্দ করে, এই সব কিছুর মধ্যেই যেন একটা রহস্য আছে। এতগুলি বছরের মধ্যে একটি দিনও অর্চিষ্মানের একঘেয়ে লাগেনি। তাঁর শাস্ত্র পাঠ করার দরকার হয় না, নিজের উপলব্ধিতেই তিনি এই বিশ্ব বিন্যাসের মধ্যে এক চৈতন্যের সন্ধান পেয়েছেন।
নদীতে স্নান করে ভিজে গায়ে রোদ্দুরে দাঁড়ালেন অর্চিষ্মান। বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার মতন শব্দ হচ্ছে। শরীরটা আজ এত গণ্ডগোল করছে কেন? তিনি কাঠঠোকরা পাখিটিকে খুঁজলেন, পেলেন না। সে উড়ে গেছে। প্রজাপতিরাও নেই। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। মনে মনে বললেন, হে সুন্দর, আমাকে শরীর ভুলিয়ে দাও।
আজ যেন বেশি শীত লাগছে। মেঘলা দিনের চেয়ে রৌদ্র ঝলমলে দিনে শীত বেশি পড়ে। এতগুলি বছরে শরীর তীব্র শীতেও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রাতে একটা কম্বলেই চলে যায়।
ভিজে গায়েই কম্বলটা জড়িয়ে নিয়ে অর্চিষ্মান এক পা এক পা করে এগোলেন গুহার দিকে। এখন শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। কাঠের আগুন জ্বেলে গা সেঁকতে পারলে ভালো হয়।
গুহা পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেন না অর্চিষ্মান। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। কপালটা ঠুকে গেল পাথরে।
আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। সর্বাঙ্গ একেবারে অবশ। তিনি ভাবলেন, এ কি তাঁর শেষ মুহূর্ত? তবে আসুক সেই মুহূর্ত, কোনো খেদ নেই।
হঠাৎ যেন অর্চিষ্মানের শরীরের সমস্ত ব্যথা বেদনা চলে গেল। শরীরই যেন নেই, শুধু মন, একেবারে নির্ভার। তাঁর চোখে ফুটে উঠল প্রগাঢ় মুগ্ধতা। দৃশ্যের পর দৃশ্য ঢেউ খেলে যেতে লাগল। পাহাড়চূড়া থেকে গড়িয়ে এল তরল সোনা। তারপর সেই সোনা বদলে গিয়ে হল সাদা রঙের স্নিগ্ধ ধোঁয়া। কোথায় যেন অনেকগুলি আরতির ঘন্টা বেজে উঠল। একরাশ ফুলের পাপড়ির মতন প্রজাপতি ঢেকে দিল সামনের পাথরটা। তারপর সেই ধোঁয়া ভেদ করে এগিয়ে এল একটা আলোর রেখা।
এই কী সেই ঈশ্বরের জ্যোতি। ধন্য, ধন্য এই জীবন। এই আলোর মতন পরম সুন্দর আর কিছু নেই।
সেই আলোর রেখায় ফুটে উঠল একটি মুখ। সেই মুখ দময়ন্তীর।
অর্চিষ্মান প্রথম চিনতে না পেরে চমকে উঠলেন। এই কি ঈশ্বরের রূপ? না, না, এ তো দময়ন্তী, সেই যৌবনের দময়ন্তী, একদিন যার শুধু একটা আঙুল স্পর্শ করেছিলেন অর্চিষ্মান। শেষের দিকে বছরের পর বছর আর দময়ন্তীকে মনে পড়েনি। অথচ এখন অবিকল সেই মুখ, সেই মুখে মাখা রয়েছে বিষাদ।
ভারী ক্লান্ত গলায় দময়ন্তী বলল, অর্চি, তুমি আমাকে কোনোদিন ভালোবাসনি।
অর্চিষ্মান বললেন, এখন আর সে কথা কেন? কেন এখন এলে? আমি তো আর সেই অর্চিষ্মান নই। তুমি কেন ঈশ্বরের জ্যোতি আড়াল করে দাঁড়ালে?
দময়ন্তী যেন সে কথা শুনতে পেলে না। সে আবার বলল, তুমি আমাকে ভালোবাসনি, তুমি ভালোবেসেছিলে তোমার গড়া এক নারীকে। আমাকে যত চিঠি লিখেছ, সে সব চিঠি তোমার নিজেকেই লেখা। তোমার ভাসার সাধনা। তুমি আমাকে গ্রহণ করতে চাওনি, তাই প্রথম সুযোগেই একজন পুরুষের হাতে আমাকে তুলে দিয়ে তুমি দূরে সরে গেলে।
অর্চিষ্মান কাতরভাবে বললেন, না, না, তা ঠিক নয়। যে কটা বছর আর কেউ আসেনি, আমি তোমাকেই শুধু ভালোবেসেছি। তাতে কোনো মিথ্যে ছিল না।
দময়ন্তী বলল, এই তোমার ভালোবাসা? আমি চিঠি দিয়ে তোমাকে ডেকেছি, তুমি সাড়া দাওনি। আমাকে ফেলে কত দূরে চলে গেলে, এতগুলি বছরে আমার কথা একবারও ভাবনি।
অর্চিষ্মান বললেন, এ জীবনে তোমাকে ছাড়া আর কোনো নারীকেই আমি চিনিনি। পাছে তোমার কথা ভুলে যাই, তাই আর কোনো নারীর সঙ্গে মিশিনি। আমার সেই ভালোবাসা অটুটভাবে রেখে দিয়েছি বুকের মধ্যে। প্রথম প্রথম তোমার কথা মনে পড়লে কী কষ্ট যে হত, তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। সেইজন্য আমি আস্তে আস্তে তোমার মুখচ্ছবিখানি বদলে দিয়েছি। এই যে পাহাড়, এই যে ছোটো নদী, ফুলের সমারোহ, প্রজাপতি এমনকি কাঠঠোকরা পাখিটির মধ্যেও ভাগ ভাগ করে দিয়েছি তোমাকে। আকাশের রংফেরা তুমি, বাতাসের সুগন্ধ তুমি, পাথরের ডৌল তুমি। সবই তুমি। দময়ন্তী, এইবার এসো, আমাকে তুলে ধরো।
সেই আলোর রেখাটি অর্চিষ্মানের নিষ্পন্দ শরীরে মিশে গেল।
এলাচের কৌটো
এলাচের কৌটো
সাইকেল রিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে খানিকটা এগোবার পরেই রত্নার মনে পড়ল একটা জিনিস নেওয়া হয়নি। সে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, এই এই, একটু থাম তো ভাই, একবার ফিরে যেতে হবে।
রিকশাচালক অপ্রসন্নভাবে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। এই সময় দুদিক থেকে দুটো ট্রেন আসে, অনেক যাত্রী, তাই রিকশাওয়ালাদের পোয়াবারো। কলকাতার ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মতন রুক্ষ হয়ে ওঠে। কী যেন নিজের মনে গজগজ করতে করতে রিকশাটা ফেরাল।
সদর দরজা খুলে যেতে হল দোতলায়। নিজের ঘরের টেবিলের ওপর রাখা আছে কৌটোটা। সেটা তাড়াতাড়ি ব্যাগে ভরে নিয়ে ফিরে যেতেই টান পড়ল আঁচলে। টেবিলের কোনায় যে চলটা উঠে আছে, সেখানে আটকেছে।
আঁচলটা ছাড়াতে গিয়ে শরীরটা কেঁপে উঠল রত্নার। আসল জিনিসটাই তো সে ভুলে গেছে। তার আইডেনটিটি কার্ড। এটা না থাকলে তো সে ঢুকতেই পারত না। আঁচলটা আটকাল বলেই তো মনে পড়ল। এটা যেন অলৌকিক ব্যাপার। ঠিক কেউ যেন তার আঁচল ধরে টেনে মনে করিয়ে দিল। ঠিক যেন ব্যাখ্যা করা যায় না।
রিকশাচালক বলল, অনেক টাইম লেগে গেল, দিদি। এক টাকা বেশি লাগবে।
তর্ক করতে ইচ্ছে করল না রত্নার। দেবে সে এক টাকা, কিন্তু কথা খরচ করবে না।
এই সময়টাতেই মফসসল শহর সবচেয়ে বেশি জেগে ওঠে। ট্রেন আসে, দোকানপাট খোলে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা বেরোয়। হাসপাতালেও ভিড় হয়। এই হাসপাতালের সামনেই আটকা পড়তে হয় ট্রাফিক জ্যামে। সামনে আবার একটা ময়লার গাড়ি। রত্না কয়েক দানা এলাচ মুখে দিল।
জেলখানার গেটে পৌঁছতে বেজে গেল সাড়ে দশটা। অবশ্য স্কুলে যাওয়ার মতন সময়ের অত কড়াকড়ি নেই। এক মাস ধরে স্কুলে যেতে হচ্ছে না রত্নাকে, তার ডিউটি পড়েছে জেলে! ন-বছর ধরে স্কুলে একই জিনিস পড়াতে পড়াতে একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল, সেই তুলনায় এখানকার কাজ তার ভালোই লাগছে। অন্য রকম অভিজ্ঞতা।
গেটের কাছে এসে কার্ডটা বার করল রত্না। তাতে তার ছবি লাগানো আছে। প্রথম দিন তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সুতপাদি, তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, কার্ডটা সাবধানে রাখিস। দেখিস, ভিতরে যেন কেউ জোর করে কেড়ে না নেয়। তাহলে কিন্তু তুই আর বেরুতেই পারবি না। এই গেটে আটকে দেবে।
কেউ অবশ্য কেড়ে নেবার চেষ্টা করেনি এর মধ্যে। তবে, দু-তিন জনের চোখের দৃষ্টি দেখলে ভয় ভয় করে।
জেলখানা। প্রথম দিন ঢুকে সত্যিই অবাক হয়েছিল রত্না। জেলখানার ভিতরটা কেমন হয় তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না, গল্প-উপন্যাস পড়ে মনে হত, অন্ধকার-অন্ধকার ঘর, লোভী আর হিংস্র চেহারার পাহারাদার, লোহার দরজা, ডাণ্ডাবেড়ি, আর মানুষ হয়েও অনেকের অমানবিক ব্যবহার। আগেকার দিনের রাজবন্দিদের লেখা কয়েকটা বই পড়েছে রত্না, অল্প বয়সে, ভালো মনে নেই। বেশি মনে আছে, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ আর জয়া মিত্রের ‘হন্যমান’। জাগরীতে একটা অধ্যায়ের নাম ‘আওরৎ কিতা . মা’, আর জয়া মিত্রের বইতেও জেলের মধ্যে মেয়েদের কথাই প্রধান। সতীনাথ ভাদুড়ীর একটা গ্রন্থাবলি আছে বাড়িতে, এখানে আসবার পর রত্না একবার ভেবেছিল ‘জাগরী’টা আর একবার পড়ে ঝালিয়ে নেবে। ওরে বাবা, কী সাংঘাতিক বই, খানিকটা পড়তে পড়তেই চোখের জলে পাতাগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। বিলুর ফাঁসি হবে, সেই রাতে তার মা-ও জেলে, তিনি নানাভাবে মনটাকে ফেরাবার চেষ্টা করছেন, এক জায়গায় বলছেন, ‘ছেলে তো নয়, একটা শত্রু। ছেলেদের কথা যত ভেবেছি, তার অর্ধেকও যদি ভগবানের কথা ভাবতাম, তাহলে নিশ্চয়ই ভগবানকে পাওয়া যেত!’ এই জায়গাটা পড়তে পড়তে রত্না ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল।
প্রথম দিন এসে জেলখানা সম্পর্কে তার পুরনো ধারণা কিছুই মিলল না। এ যেন একটা বাগানবাড়ি। সত্যিই বেশ বড়ো বাগান, কত ফুল ফুটে আছে, বড়ো বড়ো গাছও কয়েকটা, মাঝখানের বাড়িটার রং সাদা। শুধু চারদিকটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা।
অবশ্য আজকাল আর জেলখানা বলে না, নতুন নাম হয়েছে সংশোধনাগার, আর এটা শুধু মেয়েদের জন্য। এখানে একজনও পুরুষ নেই।
বাগানের মধ্যে একটা খড়ের চালাঘর। তার ভিতরে তিনখানা সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চ, একটা প্লাস্টিকের চেয়ারও আছে। আজ অবশ্য শীত পড়েছে একটু একটু, রোদ বেশ মোলায়েম, বাইরেও বসা যায়।
নানা বয়সের নারী, তবে আঠারোর নীচে কেউ নয়, ওপরের সীমা পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ। কেউ উৎকট গম্ভীর, কেউ বেশি কথা বলে, কেউ ঝগড়া ছাড়া থাকতে পারে না। অনেকেরই শরীরে রূপ নেই, স্বাস্থ্যও ভালো নয়।
রত্না ধীর পায়ে বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে এসে চালাটার মধ্যে চেয়ারে বসল। সে নিজে থেকে কারুকেই ডাকে না। মিনিট পাঁচেক সে বসে রইল চুপ করে। তারপর দুটি তরুণী দৌড়তে দৌড়তে এসে দাঁড়াল, হাত পাতল তার সামনে।
রত্না কৌটো খুলে কয়েকটা করে এলাচদানা দিল ওদের হাতে।
টপ করে তা মুখে পুরেই ওদের একজন জিজ্ঞেস করল, দিদি, আপনি পান খান না?
এই প্রশ্নটা তাকে এখানকার অনেকেই করে। প্রথম দিন থেকে। অর্থাৎ ওদের পান খাবার নেশা। রত্নার পান খাওয়ার অভ্যেস থাকলে নিশ্চয়ই সে পানের ডিবে রাখত, ওরা চেয়ে নিত। কিন্তু রত্না কখনও পান খায়নি, এমনকি বিয়েবাড়িতেও সে পান নেয় না। পানের পিক ফেলার দৃশ্যটা তার অশ্লীল মনে হয়।
অনেকদিন থেকেই এলাচদানা খায় রত্না। আগে তার কাছে একটা ছোট্ট রুপোর কৌটো থাকত, এখন এখানকার অনেককে দিতে হয় বলে, সে একটা বড়ো টিনের কৌটো রাখে। এলাচের দামও বেশ!
রত্না লক্ষ করেছে, এরা অনেকেই বাইরে থেকে কিছু কিছু জিনিস আনায়। কী উপায়ে, তা সে জানে না। কেউ কেউ শুধু দোক্তা খায়, কয়েকজনকে সে বিড়ি টানতেও দেখেছে। এক মাঝবয়েসি, স্থূলাঙ্গিনী একদিন তাকে ফিসফিস করে বলেছিল, দিদি, আমার জন্য ইসবগুলের ভুসি এনে দেবে? আমি তোমায় পয়সা দেব। রত্না রাজি হয়নি। যত তুচ্ছ জিনিসই হোক, বাইরে থেকে এদের জন্য কিছু এনে দেবার নিষেধ আছে। এখানকার সুপার সুতপাদি বলেছিলেন, তুই এরা কে, কোন কারণে জেল খাটছে, তা কখনও জিজ্ঞেস করবি না। এদের জীবনকাহিনি জানতে চাইবি না। তাহলে এক একজন সম্পর্কে মনের মধ্যে একটা ধারণা গেঁথে যাবে। বরং খোলা মন নিয়ে সবাইকে সমান মনে করাই উচিত।
রত্না কখনও কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তবু কী করে যেন জেনে গেছে, এখানে অন্তত তিনজন খুনের আসামি। নিজের হাতে খুন করেছে, যাবজ্জীবন বন্দিনী। তাদের মধ্যে একজন রত্নার ছাত্রী।
জেল কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিলেন, এখানকার মেয়েদের নানা রকম হাতের কাজ শেখাবার সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শেখাবারও চেষ্টা হবে। যাতে কারাবাস থেকে মুক্ত হবার পর, তারা সুস্থ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু লেখাপড়া তো জোর করে শেখানো যায় না। বেশিরভাগই সমাজের গরিব, নীচু শ্রেণির নারী। জীবনে বই কখনও ছুঁয়ে দেখেনি। বেশি বয়সে তারা একেবারে প্রথম থেকে শেখার আগ্রহ পায় না।
তবু নিয়মমাফিক দু-জন শিক্ষয়িত্রী আসে। তারা কয়েকজনকে এ-বি-সি-ডি, অ-আ-ক-খ শেখাতে চেষ্টা করে। রত্না অবশ্য বলে দিয়েছিল, সে অত প্রাথমিক স্তরে পড়াতে রাজি নয়। রত্নার ডাক পড়েছিল অন্য কারণে।
সুতপাদি একদিন জানতে পেরেছিলেন, খুনের আসামি বাসন্তী নামে একটি মেয়ে ঝগড়ার সময় ইংরেজিতে গালাগালি দেয়। সোয়াইন, ব্লাডি, বাস্টার্ড, বিচ, এইসব গালাগাল তার মুখ দিয়ে অনর্গল বেরিয়ে আসে। তার কেস হিস্ট্রিতে দেখা গেছে, সে একটি ধনী পরিবারে আয়ার কাজ করত। সেই বাড়িতে তাদের মুখ থেকে শুনে শুনে সে ওইসব গালাগাল মুখস্থ করেছে। সুতপাদি তার সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন, সে ইংরেজি-বাংলা পড়তেও পারে, আলেকজান্ডার এবং সম্রাট অশোকের নাম জানে, অর্থাৎ প্রায় ক্লাস এইট-নাইনের বিদ্যে। সুতপাদি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুই আরও পড়তে চাস? সে ঘাড় নেড়েছিল। বছর খানেক পড়ালে এ মেয়ে মাধ্যমিকও পাস করতে পারে। তেমন যদি হয়, তাহলে এই সংশোধনাগারেও বেশ নাম হবে, ছবি উঠবে কাগজে। তাই সরকারি স্কুলে আবেদন করে রত্না হালদারকে তিনি আনিয়েছেন এখানে।
বাসন্তীকে পড়াতে গিয়ে রত্না দেখেছে, এ-মেয়েটির মেধা আছে, যা পড়ে, তা বেশ মনে রাখতে পারে। চবিবশ-পঁচিশ বছর বয়স, মুখখানা সুন্দর নয়, কিন্তু শরীর বেশ আঁট, বুকের গড়ন যেন বেশি বেশি। মাঝে মাঝে সে বেশ সরলভাবে হেসেও ওঠে। এ মেয়ে কেন দু-দুটো খুন করেছে, তা জানার জন্য রত্নার মনটা আকুলি-বিকুলি করলেও প্রশ্ন করার উপায় নেই। নিজে থেকে যদি সে কখনও কিছু বলে।
বাসন্তী বইখাতা নিয়ে এসে বসল তার সামনে।
ওকে পড়াতে পড়াতে রত্নার মনে হয়, পরীক্ষায় পাস করলেও সে বিদ্যে নিয়ে ও কী করবে? ও কি কোনোদিন ছাড়া পাবে? যাবজ্জীবন মানে চোদ্দো বছর, এই কেসে অনেকের ধারণা, গুড কনডাক্টের রিপোর্ট থাকলে বারো বছর পরেই খালাস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে ব্যবস্থা তো আর নেই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আছে, যাবজ্জীবন মানে সারা জীবনই পচতে হবে জেলে। অন্তত কুড়ি-বাইশ বছরের আগে রিভিউয়ের প্রশ্ন নেই। সংশোধনাগার নাম হোক আর যাই-হোক, আসলে তো কারাগার।
আর একটি মেয়ে, সে রত্নার কাছে পড়তে আসে না, কিন্তু এই সময়টায় সে একটা খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে থাকে। সে কোনো কথা বলে না, কোনো প্রশ্ন করলেও উত্তর দেয় না। বৃষ্টির সময় বাসন্তী তাকে বলেছিল, এই মেদ্দা বসে বসে ভিজছিস কেন, ভেতরে উঠে যা!
তা শুনেও মেয়েটি উঠে আসেনি, একই জায়গায় বসে বসে ভিজেছে।
রত্না জিজ্ঞেস করেছিল, ওর নাম কী বলল, মেদ্দা? এ আবার কী রকম নাম? মানে কী?
ঠোঁট উলটে বাসন্তী বলেছিল, কী জানি! সবাই তো ওই নামেই ডাকে। ও আমারও আগে থেকে আছে।
নাম শুনে বোঝাও যায় না বাঙালি কিনা। কথাও বলে না। তবু ও একদিন চমকে দিয়েছিল!
সেদিন বাসন্তী ছাড়াও অন্য চারটি মেয়ে ছিল এখানে। এরকম মাঝে মাঝে অন্যরাও আসে। পড়াশুনোর জন্য নয়, রত্নার কথা শোনে বড়ো বড়ো চোখ মেলে। সেইসব দিনে রত্না বই খুলে পড়ায় না, নানা রকম গল্প করে।
একটি মেয়ের নাম সবিতা। তাকে রত্না জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি তোমার নামের মানে জানো?
সবিতা দুদিকে মাথা নাড়ে কৌতূহল ও বিস্ময় মিশিয়ে। যেন এই প্রশ্নটা আগে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেনি। রত্নাও কম অবাক হয় না। নিজের একটা নাম, সারা জীবন বয়ে বেড়াবে, অথচ তার মানে জানবে না?
সে জিজ্ঞেস করে অন্য মেয়েদের নাম। লতা, রুবাত আর প্রমদা। এর মধ্যে একমাত্র লতাই তার নামের অর্থ বোঝে, লতাপাতা। সে অবশ্য হেসে বলল, রাত্তিরবেলা সাপকেও লতা বলে, সেই ভেবেই বোধহয় বাপ-মা তার ওই নাম দিয়েছিল।
রুবাত শুনে রত্নার খটকা লেগেছিল। এ আবার কী ধরনের নাম। মেয়েটির নাকে একটা নাকছাবি, মুখে এমন একটা ভাব আছে, যাতে মুসলমান বলে মনে হয়। কী ভাবের জন্য এমন মনে হয়, তা বলা শক্ত। তার নাম আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করে রত্না বুঝল, তার অনুমানই ঠিক। মেয়েটির নাম রুবাইয়াত। ঠিক উচ্চারণ করতেও পারে না।
সে বলেছিল, তোমার নামের মানেটা খুব সুন্দর। রুবাই হচ্ছে চার লাইনের এক ধরনের কবিতা। কবিতা জানো তো—পদ্য কিংবা ছড়ার মতন। তার থেকে রুবাইয়াত। ওমর খৈয়াম নামে একজন বড়ো কবি রুবাইয়াত লিখেছেন, সে গল্প অন্য একদিন বলব। আর প্রমদা হচ্ছে সুন্দরী মেয়ে। হ্যাঁ, প্রমদা, তুমিও তো সুন্দর। আর সবিতা, তুমি হচ্ছ আকাশের সূর্য। সূর্যের অনেক নাম আছে। যেমন, আদিত্য, অরুণ, ভাস্কর, রবি—এ সবই কিন্তু ছেলেদের নাম হয়। রবি নামটা নিশ্চয়ই শুনেছ, অনেকেরই নাম রবি হয়। বাসন্তী, তুমি তো রবি বানান জানো। র আর ব-এ হ্রস্বই। কিন্তু যদি রবীন্দ্র হয়, তাহলে কিন্তু ব-এ দীর্ঘই হয়ে যাবে। বদলে যাবে।
সবিতা জিজ্ঞেস করল, কেন বদলে যাবে?
এ প্রশ্ন শুনে খুশি হয়ে রত্না বলল, এই যে তুমি কেন জিজ্ঞেস করলে, তার মানে তোমার পড়াশুনো করার ইচ্ছে আছে। ওটা ব্যাকরণের ব্যাপার, পরে একদিন বোঝাব। তোমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছ?
হায়, আমাদের এই বিশ্বকবির নাম গ্রাম-বাংলার অনেক নারীই জানে না। অনেক পুরুষও বোধহয় তাই। এদের মধ্যে একমাত্র বাসন্তী জানে।
রত্না জিজ্ঞেস করেছিল, বাসন্তী, তুমি রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা বা গান মুখস্থ বলতে পার?
বাসন্তী দু’দিকে মাথা নাড়ল।
রত্না বলল, তাঁর কত গান তো শোনা যায়, রেডিয়োতে, পুজো প্যান্ডেলে, সিনেমায়। তার একটাও মনে নেই?
বাসন্তী বলল, কী জানি।
রত্নার মনে হল, শুনেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কোনটা রবীন্দ্রসঙ্গীত তা সে জানে না।
এই সময় সেই কাণ্ডটা হল, রত্না সচকিতে মুখ ফেরাল।
খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকা মিদ্দা একটাও কথা না বললেও, সে নিশ্চয়ই এদের সব কথা কান খাড়া করে শোনে। সে এখন গুনগুন করে গাইছে, অশ্রু নদীর সুদূর পারে, ঘাট দেখা দেয়, তোমার দ্বারে…
সুর নির্ভুল তো বটেই, উচ্চারণেও স্পষ্ট। শিক্ষার ছাপ আছে।
একটুখানি মুগ্ধভাবে শুনে রত্না উচ্ছ্বসিতভাবে বলে উঠল, তুমি এত ভালো গান জানো? কোথায় শিখেছ?
সঙ্গে সঙ্গে মিদ্দা থেমে গেল তো বটেই, উঠে গেল সেখান থেকে।
ওই একদিনই, আর কখনও সে কথা বলেনি, গানও গায়নি। রত্না তার সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।
যার সম্পর্কে কিছু জানা যায় না, তার সম্পর্কেই কৌতূহল থাকে বেশি। যে এমন পরিশীলিত গলায় গান গাইতে পারে, তাও রবীন্দ্রসংগীত, সে কেন নির্বাক? আর মিদ্দার মতন একটা বিচ্ছিরি নামই বা তার হবে কেন?
বাসন্তীকে পড়াতে হলেও তাকে ঠিক পছন্দ করতে পারে না রত্না। প্রথম প্রথম তাকে সরল, সাধারণ মনে হলেও, ক্রমশ বোঝা যায়, সে বেশ লোভী। রত্না নতুন শাড়ি পরে এলেই সে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখে। চোখেমুখে ফুটে ওঠে ভিক্ষের ভাব। ইচ্ছে করলে রত্না ওকে একটা শাড়ি তো দিতেই পারে, কিন্তু কিছু দেওয়া যে নিষেধ। ওরা কেউ শাড়ি পরে না, একটা ঝোলা সেমিজের মতন পোশাক সবার। শাড়ি থাকলে গলায় ফাঁস বেঁধে কেউ যদি আত্মহত্যা করে?
একদিন রত্না এক জোড়া দুল কানে দিয়ে এসেছিল। বাসন্তী হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কানে হাত দিয়ে দুলটা দেখতে লাগল। শিউরে উঠেছিল রত্না, এটা একটা খুনির হাত তো বটে।
একদিন বাসন্তী নিজের থেকেই বলল যে, এখান থেকে ছাড়া পেলে সে আর লোকের বাড়িতে কাজ করবে না। কোনো স্কুলে চাকরি নেবে।
শুনে খুবই অস্বস্তি বোধ করেছিল রত্না। খুনি হিসেবে যার শাস্তি হয়েছে, তাকে কি কোনো স্কুল চাকরি দেবে? মনে হয় না। তা ছাড়া ওর মেয়াদ শুরু হয়েছে মাত্র তিন বছর আগে। যদি কখনও ছাড়াও পায়, তাও পনেরো-কুড়ি বছরের আগে নয়। তখন ওর বয়েস কত হবে?
এসব কথা বলে ওকে নিরাশ করতে চায়নি রত্না।
যারা পড়াশুনো করতে চায় না, তারাও রত্নার কাছে এসে এলাচদানা চায়। সবাইকে নিয়মিত খাওয়াতে গেলে সে দুদিনেই ফতুর হয়ে যাবে। সেই জন্য সে একটা শর্ত আরোপ করার কথা ভেবেছিল একবার। যে-যে পড়তে চাইবে, শুধু তাদেরই দেবে। তারপরই মনে হয়েছিল, জোর করে পড়িয়েই বা কী হবে? পড়াশুনো না করলেই বা কী আসে যায়! সামান্য কয়েকটা এলাচদানা, প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তাই এখন, যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ দেয়, ফুরিয়ে গেলে কৌটোটা উলটে দেখায়। সে এখন ছোটোএলাচের বদলে বড়োএলাচ কেনে, একটু সস্তা হয়।
মিদ্দা নামের মেয়েটি কোনোদিন এলাচ চায়নি। রত্না তাকে নিজে থেকে একদিন দিতে গিয়েছিল, সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
ফেরার জন্য রত্না উঠে দাঁড়ায়। বাগানের চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে মেয়েরা। সারা দুপুর তারা এখানেই থাকে। কয়েকজন দল বেঁধে কীসব খেলে, কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি করে। দুজন মহিলা ওয়ার্ডেন হেঁটে লাঠি হাতে পাহারা দেয়, কোথাও যদি কথা কাটাকাটি এক সময় হাতাহাতিতে গড়িয়ে যায়, তখন ওয়ার্ডেনরা এসে তাদের মারে। বেশ নিষ্ঠুরের মতনই জোরে জোরে পেটায়।
রত্নার মনে হয়, এই যে এতজন মেয়ে, এদের দেখলে বোঝাই যায় না, এরা সবাই জেল খাটার মতন অপরাধ করেছে। বাইরের সাধারণ মেয়েদেরই মতন তো। অবশ্য বাইরের সেইসব সাধারণ মেয়েদের মধ্যেও কি অপরাধী নেই? সবাই ধরা পড়ে না। রত্না নিজেও তো এখানে থাকতে পারত!
সব এলাচদানা ফুরিয়ে যাবার পরেও যে মেয়েটি এসে চাইল, রত্না বলল, কাল এসে প্রথম তোমাকেই দেব।
মেয়েটি হঠাৎ চোখ ছলছলিয়ে বলল, দিদি, আমি কিন্তু মুনশিবাড়ির গয়না চুরি করিনি। চুরি করল পারুল, আর ধরল আমাকে। আমাকে মিথ্যেমিথ্যি আটকে রেখেছে। আপনি একটু বলে দিন না। বাড়িতে আমার দুটো ছেলে…
রত্না দুর্বলভাবে বলল, আমি বললে শুনবে কেন?
মেয়েটি বলল, হ্যাঁ দিদি, আপনারা লেখাপড়া জানেন, আপনার কথা শুনবে।
এই মেয়েটির বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই। হয়তো ওর কোনো উকিলও ছিল না।
তার হাত ছাড়িয়ে চলে আসতে আসতে রত্না ভাবে, মেয়েটি কি সত্যি কথা বলছে, না অভিনয়? বিনা দোষেও অনেকে নিশ্চয়ই জেল খাটে। মুখ দেখলেই বোঝা যায়, এখানকার অধিকাংশ মেয়েই গরিব ঘরের। গরিবরাই আইনের সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয় অনেক সময়। যাদের পয়সা আছে, তারা আইনের লম্বা হাত দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারে পয়সার জোরে।
সুতপাদির সঙ্গে দেখা হল এক বিয়েবাড়িতে। তাঁর সঙ্গে অনেক আগে থেকেই পরিচয় ছিল রত্নার। তাপসের সঙ্গে যখন ছাড়াছাড়ি হয়, তখন সাংঘাতিক মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে এই সুতপাদিই অনেকখানি শুশ্রূষা করেছেন তার মনের। তাপস ওঁর পিসতুতো ভাই, তবু তিনি বলেছিলেন, তুই ওকে বিয়ে করতে রাজি হবার আগে আমাকে জানাসনি। ও তো একটা স্কাউন্ডেল। চেহারাটা চকচকে, বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। ও তো ওর মায়ের গায়েও হাত তোলে, তোকে মারধর করবে, এ আর আশ্চর্য কী!
বিয়েবাড়িতে সুতপাদির সঙ্গেই তার বেশি গল্প হয়। কেমন সে পড়াচ্ছে, বাসন্তী পাস করতে পারবে কিনা, জেলের মেয়েদের সম্পর্কে তার ধারণা কী, এইসব প্রশ্ন করেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। নিছক চাকরি নয়, নিজের কাজটা ভালোবাসেন সুতপাদি।
এক সময় রত্না জিজ্ঞেস করে ফেলল, ওই মিদ্দা নামের মেয়েটাকে একেবারে বুঝতে পারি না। কথা বলে না কারও সঙ্গে। অথচ ভালো গান গায়। ওর আসল নামটা কী?
সুতপাদি হেসে বললেন, যে-কোনো কথা বলে না, সে তো রহস্যময়ী হবেই। খুব একটা রহস্য নেই। সাধারণ ঘটনা। রাগের মাথায় একজনকে খুন করে ফেলেছে। একটা ব্যাপার তো আমি দেখছি, এই যে এতগুলো মেয়ে প্রিজনার, এদের প্রায় প্রত্যেকেরই ক্রাইমের সঙ্গে কোনো না কোনো পুরুষ জড়িত। পুরুষরাই তাদের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। যেমন ধরো, নারী পাচারের কেস আছে কয়েকটা, মেয়েরাই বোকাসোকা মেয়েদের ফুসলিয়ে এনে দেহ ব্যবসায় চালান দেয়। কেউ কেউ ধরা পড়ে, শাস্তি হয়। মেয়েরা দোষী, কিন্তু ফ্লেশ ট্রেড তো চালাচ্ছে পুরুষরা। আসল ক্রিমিনাল তো তারাই। তারা ধরা পড়ে না।
রত্না চমকে গিয়ে বলল, এই মিদ্দাও সেই রকম কোনো কেসে ধরা পড়েছে নাকি?
সুতপা বলল, না। বললাম না, ওর খুনের কেস। ওর নাম মাধবী। কেন ওকে অন্যরা মিদ্দা না মেদ্দা বলে তা আমি জানি না। ও ছিল তোরই মতন স্কুল টিচার। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই যা হয়, একজনের প্রেমে পড়ল, সে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে রেগুলার সেক্স রিলেশানও হল। এর মধ্যে একটা মন্দিরের সামনে গিয়ে বিয়ের ভানও করেছিল। তারপর মাধবী প্রেগন্যান্ট হতেই সে হারামজাদা নিজের মূর্তি ধরল। অ্যাবোরশান না করালে সে মাধবীকে ঘরে নিতে পারবে না। বিয়েই যদি হয়, তাহলে অ্যাবোরশানের প্রশ্ন উঠবে কেন? এই নিয়ে গালমন্দ, মারধর। মাধবী তখন গেল তার শাশুড়ির কাছে, সুবিচার চাইতে। সেই দিনই ঘটল ঘটনাটা। সেই মহিলা শুধু যে পুত্রস্নেহে অন্ধ তাই-ই নয়, তিনি এই সম্পর্কের কথা কিছুই জানতেন না। অন্য মেয়ের সঙ্গে তাঁর ছেলের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন। তিনি কুকুর-বেড়ালের মতন দূর দূর করে তাড়াতে চাইলেন মাধবীকে। খুব খারাপ ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে ওকে বলেছিলেন, বাজারের বেশ্যা। সেটাই সহ্য করতে পারেনি মাধবী। ওর সেই স্বামীটা, তোর তাপসের মতনই হারামজাদা, তখন বাড়িতেই লুকিয়েছিল। গালাগাল শুনে মাধবী ওর শাশুড়িকে এসে একটা ধাক্কা দেয় খুব জোরে। মহিলাটি ধড়াস করে পড়ে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে অক্কা। ডেড। কোনো চিকিৎসাও করা যায়নি।
রত্না বলল, এটা কি মার্ডার? খুনের কোনো ইনটেনশান ছিল না।
সুতপাদি বললেন, ম্যান শ্লটার বলা যায়। কিন্তু ওদের পক্ষের উকিল ভয়ংকরভাবে কেসটা সাজিয়েছিল, একটা হাতুড়ি, মার্ডার ওয়েপন হিসেবে দেখিয়েছিল, জাজ লাইফ ইমপ্রিজনমেন্ট দিয়ে দিলেন। অবশ্য একটা আপিলের মামলা এখনও ঝুলে আছে। এর মধ্যে ওর পেটের বাচ্চাটাও নষ্ট হয়ে গেছে। এখানেও তুই দ্যাখ, সব নষ্টের মূলে ওই হারামজাদাটা, কিন্তু তার কোনো শাস্তি হল না। আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সুতপাদি মাধবীর পাষণ্ড স্বামীটার সঙ্গে তাপসের তুলনা করায় রত্না কেঁপে উঠেছিল। হ্যাঁ, তুলনা করা যায় তো বটেই। কিন্তু রত্নার মনে পড়েছিল অন্য কথা। তাপস যেদিন তাকে প্রথম লাথি মারে, সেদিন অপমানে, দুঃখে সে শুধু কেঁদেছিল। মাঝে মাঝেই এরকম চলার পর, তাপস আরও নৃশংস হয়ে উঠল, একদিন তার উরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছিল। সেদিন কি রত্না ভাবেনি সে তাপসকে খুন করবে? পর পর কয়েকদিন সে প্রতিশোধ নেবার জন্য খুনের পরিকল্পনা করেছিল। বিষ খাওয়াবে না ঘুমের মধ্যে ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবে। কাগজে সেই সময় একটা খবর বেরিয়েছিল, বিদেশে একটি মেয়ে তার স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার পুরুষাঙ্গটা কেটে নিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত রত্না কিছুই পারেনি। তার সাহসে কুলোয়নি। এক বস্ত্রে পালিয়ে এসেছিল। খুনের ইচ্ছেটাও কি অপরাধ নয়? সত্যি সত্যি খুন করলে রত্নারও স্থান হত ওই জেলে। তার উরুতে এখনও সেই পোড়া দাগটা আছে।
দিন দুয়েক পর জেলের বাগানে গিয়ে রত্না একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল। সেই চালাঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গান গাইছে মেদ্দা অর্থাৎ মাধবী, তাকে ঘিরে আছে কুড়ি-পঁচিশটি মেয়ে। কয়েকজন তাল দিচ্ছে গানের সঙ্গে।
মাধবী গাইছে, ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে, তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ…।’
রত্না কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই অনেকে মিলে কলস্বরে জানাল, মেদ্দা খালাস হয়ে গেছে।
আপিলে বেকসুর মুক্তি পেয়েছে মাধবী। হাইকোর্টে খারিজ হয়ে গেছে অভিযোগ। হাতুড়িটিতে শুকনো রক্তের দাগ মানুষের নয়, মুর্গির। ওর শাশুড়ির গুরুতর হৃদরোগ ছিল। আগে দুবার অ্যাটাক হয়ে গেছে। মাধবী যে তাকে ধাক্কা দিয়েছে কিংবা কতটা জোরে, তার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, ঠিক সেই সময় অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না। বাড়ির দাসীটি স্বীকার করেছে, সে ছিল কলতলায়, শব্দ শুনে ছুটে আসে। অত্যধিক উত্তেজনায় ওরকম রোগীর হঠাৎ হার্ট ফেলিওর হতে পারে।
রত্না ভেবেছিল, মাধবীর যে মুহ্যমান অবস্থা এবং কারও সঙ্গে কথা না বলা, তা বোধহয় গভীর অনুতাপের জন্য। মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত মেয়ে, খুন-টুনের মতন ব্যাপারে নাম জড়িত হওয়াটা তো চরম অপমানই। কিন্তু তা তো নয়। মুক্তির খবর শুনেই সে এত খুশি। গান শেষ করে সে এক একজন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাচ্ছে। এতদিন সে কথা বলত না, তবু সে সকলেরই নাম জানে, নাম ধরে ডাকছে।
একবার সে রত্নার দিকে ফিরতেই রত্না বলল, আমিও খুব খুশি হয়েছি।
রত্না এলাচের কৌটোটা খুলে বাড়িয়ে দিল তার দিকে।
বেশ কয়েকটা এলাচদানা তুলে নিয়ে মুখে দিল মাধবী। একটু চিবিয়ে নিয়ে বলল, বাঃ, কী সুন্দর স্বাদ হয়ে গেল মুখে। আগে খাইনি কেন?
রত্না বলল, আমি তো আগেও তোমায় দিতে চেয়েছিলাম। তুমি নাওনি।
আরও দুবার বাঃ বাঃ করে মাধবী বলল, ঠিক আছে। ফিরে এসে আবার খাব। আমি তো শিগগিরই ফিরে আসছি এখানে।
রত্না চকিতভাবে বলল, কেন, ফিরে আসবে…কেন? তোমার তো পুরোপুরি…ওরা কি সুপ্রিম কোর্টে যাবে?
রত্নার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে মাধবী শান্ত গলায় বলল, না, সেজন্য না। বাইরে বেরিয়ে তো আমাকে আর একটা খুন করতে হবে। যে আমার নামে এই অপবাদ দিয়েছে, আমার পেটের সন্তান নষ্ট করেছে, তাকে শাস্তি দিতে না পারলে আমার বেঁচে থাকার মূল্য কী?
