Chapter - 1 - আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও
‘আর রেখ না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’
আমার ইচ্ছে করে, সকাল-দুপুর-রাত একা হেঁটে বেড়াই, নদীর ধারে, গ্রামের মাঠে আলপথে, শহরের ফুটপাথে, পার্কে স্রেফ একা হাঁটি। আমার বড় ইচ্ছে করে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে যেতে, ইচ্ছে করে হঠাৎ একদিন শালবন বিহার গিয়ে পুরো বিকেল কাটাই। ইচ্ছে করে সেন্ট মার্টিনের সমুদ্রে নেমে গাঙচিলের খেলা দেখি, ইচ্ছে করে খুব মন খারাপ করা দুপুরে ঘাসের ওপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। ইচ্ছে করে সংসদ-ভবনের সিঁড়িতে একা বসে থাকি, বিকেলে রমনায় গাছে হেলান দিয়ে অলস দাঁড়াই, ক্রিসেন্ট লেকের জলে সারা সন্ধে পা ডুবিয়ে বসে থাকি, হঠাৎ আবার শীতলক্ষায় নৌকো নিয়ে ঘুরি।
আমি জানি, খুব ভাল করেই জানি, আমার ইচ্ছেগুলো ঘটাতে গেলে আমাকে লোকের ঢিল, থুতু, গা-ধাক্কা খেতে হবে। আমাকে অপদস্থ হতে হবে, ধর্ষিতা হতে হবে। আমাকে কেউ ‘পাগল’ বলবে, কেউ ‘নষ্ট’ বলবে, কিন্তু সকলে নিশ্চয় এ-কথা স্বীকার করবেন, কোনও পুরুষের বেলায় এ-ধরনের ইচ্ছেকে পূর্ণতা দিতে গেলে অশ্লীল বাক্যবাণে তাকে আহত হতে হয় না, কোনও পুরুষের বেলায় অপহরণ, অপঘাত, ধর্ষণ, হত্যা ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটে না। কেবল নারীর বেলায় ঘটে। কারণ নারী কেন সঙ্গে একজন পুরুষ ছাড়া হেঁটে বেড়াবে? পুরুষের না হয় বিচিত্র স্বভাব থাকে, পুরুষকে তা মানায় বটে! নারী কেন ফুটপাতে হাঁটবে, গাছের ছায়ায় দাঁড়াবে, সিঁড়িতে একা বসবে, ঘাসের ওপর শোবে? নারীর এত ইচ্ছে থাকতে নেই। নারীকে ঘরে বসে থাকতে হয়, নারীর জন্য ঘরের দেওয়ালে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা আছে, ওই ভেন্টিলেটর ফুঁড়ে যে আলো-হাওয়া তার গায়ে এসে লাগে, সেটিই কি যথেষ্ট নয় বেঁচে থাকবার জন্য?
হ্যাঁ, যথেষ্টই বটে। বেঁচে থাকবার জন্য এটুকু আলো-হাওয়াই যথেষ্ট। নারীর বেঁচে থাকাটুকু সকল পুরুষই চায়। কারণ নারীকে তাদের প্রয়োজন। ভোগের জন্য, বংশরক্ষার জন্য। নারী না হলে পুরুষের ভোগ হবে না, বংশরক্ষা হবে না, নারী না হলে কর্তৃত্ব করবার, শক্তি খাটাবার, গলার জোর, গায়ের জোর দেখাবার জায়গা কোথায় পুরুষের! ওপরতলার মানুষের নিয়মই নীচের তলার মানুষকে শোষণ করা, সবল চিরকাল দুর্বলের ওপর চড়াও হয়। উচ্চবিত্ত সুযোগ খোঁজে নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে। নারীর ওপর পুরুষের তাই সর্বময় অধিকার, তাকে চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় করবার, তাকে আহত করবার। নারী নীচের তলার মানুষ, নারী দুর্বল, নারী সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তু। তাই নারীকে বাঁচিয়ে রেখে নারীর ওপর চড়াও হবার ইচ্ছা সকল ভদ্রলোকের।
খাঁচার ভেতর পাখির জন্যও আলো ঢোকবার ব্যবস্থা থাকে, পাখিকে সময়মতো আহার দেওয়া হয়, পাখিকে কিছু বাঁধা কথা মুখস্থ করানো হয়। একই রকম নারীকেও, নারীর জন্য ভেন্টিলেটর; নারীর জন্য সকাল-দুপুর খাবার দেওয়া হয়, নারীকে কিছু সমাজসম্মত কথা শেখানো হয়, নারীকে তার সীমিত বাক্য, সীমিত পথ, সীমিত আহার, সীমিত আকাঙ্ক্ষা, সীমিত স্বপ্ন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দান করা হয়। নারী খাঁচায় বন্দি পাখির মতো খোলা আকাশ, খোলা মাঠ, বন-বনান্তর, অনন্ত সবুজের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।
নারীকে দুর্বল ভাবে কারা? যারা বলে, নারী শরীরে দুর্বল, ভুল বলে। যারা বলে, নারী মনে দুর্বল, তারা ভুল বলে। তারা মিথ্যে বলে। এখনও দুটো ছেলে ও মেয়ে- শিশুকে ভরা পুকুরে ছেড়ে দিলে যে শিশুটির আগে মৃত্যু হবে, সে ছেলে-শিশু। যদি মেয়ে-শিশুর ফুসফুস বা হৃদপিণ্ড ছেলে-শিশুর চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয়, যদি প্রতিরোধ-ক্ষমতা বা বেঁচে থাকবার প্রচণ্ড ক্ষমতা মেয়ে-শিশুরই বেশি হয়, তবে কী করে একবাক্যে রায় দেওয়া হয় যে, মেয়েমাত্রই দুর্বল!
আসলে এ-সবই নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিশেষণ। নারী বিবেকবুদ্ধি দ্বারা অধিক চালিত বলে বা মমতা ও ভালবাসা ধারণ করবার ক্ষমতা সে বেশি রাখে বলে সে হিংস্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে না, এর অর্থ এই নয়, সে দুর্বল। আদিম যুগে নারী-পুরুষ কাড়াকাড়ি করেই জীবজন্তুর মাংস খেত। তখন একটুও প্রমাণ হয়নি, নারী দুর্বল বলে সে কেড়ে খেতে পারছে না। নারীকে গর্ভবতী হতে হয় বলে গর্ভরক্ষার কারণে তাকে কম পরিশ্রমে অভ্যস্ত হতে হয়, তাকে শিকারে কম যেতে হয়, তাকে কাড়াকাড়ি কম করতে হয়, সে পেশির চেয়ে বুদ্ধি দ্বারা জীবিকানির্বাহ করে; সন্তানের প্রতি তার মায়া জন্মে, সে ভালবাসার কাছে নত হয়, নিমগ্ন হয়। এর অর্থ এই নয়, নারী দুর্বল, ভীতু, লজ্জাবতী। নারীকে ভয় এবং লজ্জা শিখিয়েছে সমাজের পুরুষেরা। ভয় এবং লজ্জা থাকলে পুরুষের আধিপত্য বিস্তারে বেশ সুবিধে হয়, ভয় এবং লজ্জাকে তাই নারীর ‘ভূষণ’ বলে ভাবা হয়, নির্ভীক এবং লজ্জাহীন নারীকে সমাজে খুব কম লোকই আছে যে মন্দ বলে না। যেহেতু ভয় এবং লজ্জাকেই নারীত্বের প্রধান গুণ ভাবা হয়, যেহেতু সীমিত পথই নারীর চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট হয়, তাই সে যদি রমনায়, রাস্তায়, রকে, রেস্তোরাঁয় একা হাঁটে বা বসে, লোকে তার দিকে অবাক তাকাবে, শিস দেবে, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পরখ করবে, মেয়ে ‘বেশ্যা’ কি না। কারণ বেশ্যা ছাড়া কোনও মেয়েই দুর্বিনীত হাঁটে না, বেশ্যা ছাড়া কেউ শহর জুড়ে একা, উদ্ধত, সীমানা ছাড়া পথ পেরোয় না।
যারা ঘরে বসে থাকে, যারা অভিভাবক নিয়ে বা পুরুষ নিয়ে নিরাপদে ঘরের বার হয়, অথবা একাই শোভন সীমানার মধ্যে বিচরণ করে প্রয়োজন-শেষে ঘরে ফেরে, সমাজ তাদের ‘ভদ্র মেয়ে’ বলে। ভদ্রতার বাইরে গেলেই মেয়েদের ‘বেশ্যা’ বলে গাল দেওয়া হয়। পুরুষেরা ‘বেশ্যা’কে গাল দেয় ঠিকই কিন্তু বেশ্যা ছাড়া তাদের চলেও না, তারাই নিজেদের স্বার্থে নিজেদের নাগালের মধ্যে বেশ্যালয় খুলেছে।
পুরুষেরা বেশ্যা বলবে বলে নারী একা হেঁটে বেড়ায় না দূরের কোনও খোলা, মাঠে, নারী ইচ্ছে করলেও চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যায় না, ইচ্ছে করলেও নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়ানো হিজল গাছের ছায়ায় বসে দুএক কলি গান গায় না, ইচ্ছে করলেও নির্জন ফুটপাত ধরে একা হাঁটে না। নারী বেশ্যা নামটিকে বড় ভয় পায়, এই নাম থেকে সে বড় গা বাঁচিয়ে চলে।
পুরুষের চোখে নিজেকে আকর্ষণীয় করবার জন্য নারী সাজে। চোখে, গালে, ঠোঁটে রং লাগায়। পুরো পৃথিবীতে প্রসাধনী দ্রব্যের উৎপাদন কী হারে বাড়ছে তা আমার সাধ্য নেই, হিসেব করি। বেশ্যারা সাজে অসামাজিক খদ্দেরের আশায়, আর ভদ্র নারীরা সাজে সামাজিক খদ্দেরের আশায়—দু’সাজের উদ্দেশ্যই খদ্দের পাওয়া। যার যত ভাল খদ্দের জোটে, তার ইহলৌকিক সুযোগ-সুবিধে তত বেশি। নারীকে তারা সুযোগ-সুবিধে দিচ্ছে বলে, খেতে-পরতে দিচ্ছে বলে নারীর পায়ে তারা শেকল পরায়, ছাগলকে মাঠে ছেড়ে গলায় দড়ি-বেঁধে যেমন খুঁটি গেড়ে দেওয়া হয়, অনেকটা তেমন। নারীকে গোরু-ছাগল-ভেড়ার মতোই একটি মাপা গণ্ডির ভেতর চলতে ফিরতে দেওয়া হয়। পুরুষেরা দড়ি-বাঁধা নারীর স্বাদ পেতে চায়, আবার দড়ি-ছেঁড়া নারীর স্বাদও। মূলত পুরুষের রসনা তৃপ্ত করবার জন্যই নারীকে একবার ঘরবন্দি হতে হয়, আরেকবার ঘরছাড়া। নারী কিন্তু নারীই, সে বেশ্যা হোক, সে কুলবধূই হোক। দুর্ভোগ পোহাবার জন্যই তার জন্ম।
সমাজের নারীরা পুরুষ ছোবল দেবে ভয়ে, আবার পুরুষ তাদের মন্দ বলবে ভয়ে ইচ্ছে করলেও মহাস্থানগড় থেকে একবার বেড়িয়ে আসে না, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে উদাস হেঁটে বেড়ায় না, ব্রহ্মপুত্রের জলে আনন্দে সাঁতার কাটে না, সুন্দরবনের পূর্ণিমায় শরীর ভেজায় না। একটাই মাত্র জীবন মানুষের। এই জীবনকে নারী যেমন ইচ্ছে যাপন করতে পারে না। এই জীবনকে মানুষের কাছে, আকাশ ও নক্ষত্রের কাছে, জল ও হাওয়ার কাছে, সবুজ অরণ্যের কাছে, একলা নদীর কাছে এনে জীবন চেনায় না। তার সকল ইচ্ছে, তার সকল সাধ ও স্বপ্নের ঘরে আগুন জ্বেলে সে পুরুষের ঘর আলোকিত করে।
নারীর ব্যর্থ এই জীবনের জন্য শোকে ও সন্তাপে আমি মাথা নত করছি। পাঠক, যদি মনুষ্যত্ব বলে কিছু থাকে আপনার, আপনিও মাথা নত করুন।
Chapter - 2 - আশায় আশায় থাকি
আশায় আশায় থাকি
বছর তিনেক আগে একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলে বাংলা অ্যাকাডেমির গেটের ভিড় সম্পর্কে এক পত্রিকায় লিখেছিলাম—“শরীরে শাড়ি নেই, ব্লাউজ ছেঁড়া, এই অবস্থায় সেদিন ভিড় থেকে বেরিয়েছে একুশ-বাইশ বছরের একটি মেয়ে; এইমাত্র ধর্ষিতা হয়ে অবিন্যস্ত পায়ে হেঁটে-আসা নারীর মতো তাকে মনে হয়—দেখে আমি আমূল শিহরিত হই, এই যদি একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেল, এই যদি হয় ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন, তবে যারা এই বিকৃত যৌনআনন্দ-শেষে ভালমানুষের মতো মিশে যায় বইমেলায়, বই দেখে, কেনে, গান গায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো – ধিক সেই বাঙালি, ধিক সেই মুখে একুশে ফেব্রুয়ারির গান।” আরও লিখেছিলাম—“এমন মেয়ে নেই, যে মেয়ে ভিড় পার হয়ে মেলায় ঢুকছে অথচ তার নারীঅঙ্গে কারও অসৎ থাবা পড়েনি। আমি অনেক মেয়েকে ভিড়ের ভয়ে ফিরে যেতে দেখেছি, তারা ফিরে যায় কারণ জানে নিগ্রহের প্রকৃতি ওখানে কীরকম। যারা ভিড় পেরিয়ে যায়, তারা কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়ে, কেউ লজ্জায় নত হয়, যেন সমস্ত গ্লানি নারীরই, যেন নারীঅঙ্গ ধারণের পাপ নারীর, যেন নারীজন্মের প্রায়শ্চিত্ত এভাবেই হয়, একুশের চেতনায় উদ্দীপিত পুরুষ এভাবেই সহযাত্রী নারীকে স্বাগত জানায়।”
এ-বছর ছাত্রী ব্রিগেড নেমেছে অ্যাকাডেমির মাঠে, বইমেলার যাবতীয় দুর্ঘটনা ছাত্রী বিগ্রেড দ্বারা প্রতিহত হবে। বইমেলা ব্যবস্থাপকদের এই অভিনব উদ্যোগের প্রশংসা করছি। ছাত্রী ব্রিগেডের দু’একজনকে দেখেছি সাদা অ্যাপ্রন গায়ে ঘোরাফেরা করতে। ওরা মাঠে এ-অবধি কতটুকু সন্ত্রাস দমন করেছে আমি জানি না। এ-অবধি নারীর ওপর ছুড়ে দেওয়া ক’টি অশ্লীল বাক্যের প্রতিবাদ করেছে, নারীর ওপর এগিয়ে আসা ক’টি চতুর আঙুল ওরা সরিয়েছে, আমি খোঁজ নিয়ে দেখিনি। কেবল ছাত্রী ব্রিগেডের কথা উঠলেই দেখি দল বেঁধে পুরুষেরা ছাত্রী ব্রিগেড দেখতে যায়। যেন অদ্ভুত কোনও প্রাণী এসেছে মেলায়; দুটো হাত, দুটো পা, নাক, চোখ, ঠোঁটওয়ালা অবিকল মানুষের মতো প্ৰাণী।
বইমেলায় বইয়ের প্রসঙ্গ নেই, প্রসঙ্গ ছাত্রী ব্রিগেডের। ছাত্রী ব্রিগেডের চারপাশে ভিড় করছে এই প্রজন্মের প্রাণবান সন্তানেরা। তারা শিস দিচ্ছে ওদেরই দিকে, তারা চোখ টিপছে ওদেরই দিকে, তারা অশ্লীল আস্ফালন করে সভ্যতার খেলা দেখাচ্ছে। এখন নিরাপত্তার কারণেই নাকি সন্ধে ছ’টার সময় ছাত্রী ব্রিগেডের চলে যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেকে বলেছে, যাদের নিজেদেরই নিরাপত্তা নেই, তারা কী করে অন্যকে নিরাপত্তা দেবে? অনেকে বলছে, মেলার এই ‘চিড়িয়া’ দেখতেই লোকে ভিড় জমাচ্ছে বেশি। লোকে তো কত কথাই বলে, বলুক। এই সমাজের সব নারীই তো চিড়িয়া। যে নারীকে পুরুষেরা অপদস্থ করছে, সে নারীও চিড়িয়া; আর নারীকে সকল অপমান থেকে রক্ষা করতে চায় যে নারী; সেও চিড়িয়া। এইসব চিড়িয়ার দিকে, এইসব নারীর দিকে পুরুষেরা থুতু ছুড়ছে, ঢিল ছুড়ছে, ছুড়ে দিচ্ছে যৌনগন্ধময় উচ্চারণ।
এমন বিরুদ্ধ পরিবেশে ছাত্রী ব্রিগেডের মাঠ-বিচরণ, এমন বিরুদ্ধ পরিবেশে ছাত্রী ব্রিগেডের দুর্বিনীত চলাচল আমাকে প্রাণিত করে। ওদের পক্ষে কোনও অশ্লীলতার মূল ধরে নাড়া দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়, ওদের পক্ষে অসভ্য পুরুষের জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়, তবু এই যে ওরা দাঁড়িয়েছে সুন্দরের বাগানে অসুন্দরের উৎপাতের বিরুদ্ধে—এ তো কিছু কম নয়; এ তো কম অর্জন নয়, যখন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর তীব্র করবার জন্য এক-এক করে মিছিলে নেমে আসে অনেকে। যদিও এই দেশের জন্য, লালন করা একটি সংস্কৃতির জন্য, এ বড় লজ্জার কথা যে, বাঙালি যখন পুরো এক ফেব্রুয়ারি উৎসব করে নিজের ভাষার আনন্দে ও গৌরবে, বাঙালি যখন নিজের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির আলোয় নিজেকে আলোকিত করবার পথে অগ্রসর হয়, তখন সেই মহতী উৎসবে ব্রিগেড় নামাতে হয় অশ্লীলতা রোধ করতে। এত সৃজন ও শ্লীলতার মধ্যে কিছু অসভ্য বাঙালি নোংরা করতে আসে সব আয়োজন। ছাত্রী ব্রিগেড তাদের অসভ্যতা রোধ করতে দাঁড়িয়েছে। বাঙালি সভ্য হয়েছে যত, অসভ্যও কিছু কম হয়নি। এও কিছু কম লজ্জার কথা নয়।
তবু অভিনন্দন ছাত্রী ব্রিগেডকে, অভিনন্দন মেলা পরিচালনা কমিটিকে। নারী আজ নারীর স্বার্থে ঘরের বাইরে বেরিয়েছে। শুধু মেলা কেন, মেলা ছাড়া আর যত নির্যাতন হয়, আর যত নিষ্পেষণ চলে নারীর ওপর, সে-সব ফেরাবে কারা? সে-সব ফেরাবার জন্য রাষ্ট্র কি কোনও ব্রিগেড নামাবে না ঘরে এবং ঘরের বাইরে?
কে ফেরাবে তাবৎ অনাচার? কে ফেরাবে অগণন ধর্ষণ, কে ফেরাবে অপহরণ, অশ্লীলতা? কে ফেরাবে নারীকে অবদমনের অসংখ্য শৃঙ্খল? বইমেলার শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের ভিড়েও নারীর জন্য নিরাপত্তা দরকার হয়; তবে পুরো রাষ্ট্রের মূর্খ, ধর্মান্ধ ও অশিক্ষিত মানুষের ভিড়ে নারীর নিরাপত্তা কি সামান্যও কিছু আছে, নাকি থাকে?
নেই। নারী জন্মাবার পরই পুরুষের তৈরি নানা নিয়ম ও নীতির কামড় খেয়ে বাঁচে। নারীর শরীর রক্তাক্ত, নারীর হৃদয় রক্তাক্ত, নারী যে পথে হাঁটে, সে পথে কাঁটা বিছানো। নারী তার গতিকে যত দীর্ঘ ও বেগবান করে, তত সে রক্তাক্ত হয়, তত তার অস্তিত্বে ক্ষত জমা হয়, তত সে আঘাতে আক্রান্ত হয়।
নিরাপত্তা দরকার হয় দুর্বল মানুষের জন্য, শিশুর জন্য, পঙ্গুর জন্য এবং নারীর জন্য। মেলায় ব্রিগেড নেমে নারীর দুর্বলতা কিছু কাটাচ্ছে কি না, অথবা নারী যে দুর্বল, সে-কথা প্রমাণ করবার জন্যই এই ব্যবস্থা কি না আমি জানি না। আমি কেবল উদ্দীপিত হচ্ছি এই ভেবে যে, অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যত ক্ষীণ হোক, মৃদু হোক, তবু সেই প্রতিবাদ এই একচিলতে মেলার মিছিলে পথ চলতে চলতে রাজপথেও একদিন উঠবে নিশ্চয়ই।
Chapter - 3 - আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
আমাদের বুদ্ধিজীবীরা
১
দু’সপ্তাহ আগে ‘বিচিন্তা’র এক সাক্ষাৎকারে স্বনামখ্যাত হুমায়ুন আজাদ নিজের স্তুতি এবং অপরের নিন্দা করে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কবিকুলের ঢালাও নিন্দা করতে গিয়ে আমার নামটিও তালিকা থেকে বাদ দেননি। তিনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, আমি নাকি এখনও কবি হয়ে উঠিনি। এতে অবশ্য আমি দুঃখ করিনি সামান্যও। কারণ নির্মলেন্দু গুণের প্রেমের কবিতাগুলোকে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা থেকে উঠে আসা’। এ ছাড়া কবি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন কেবল নিজেকে এবং নিজের দু’একজন খাতিরের লোককে। এই যদি হয় কে কবি এবং কে কবি নয় তা বিচার করবার স্পর্ধা—তবে আমি যে এখনও কবি হইনি, সে আমার সৌভাগ্য।
তো এই হুমায়ুন আজাদই গতকাল বইমেলার এক স্টলে আমার একটি ইংরেজি অনুবাদ-কবিতার বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে দেখছিলেন এবং বলছিলেন, ‘সেই কবিতাটির অনুবাদ নেই, সেই যে, সাতসকালে খড় কুড়োতে গিয়ে, আমার ঝুড়ি উপচে গেছে ফুলে, এত আমার কাম্য ছিল না তো?’ অনুবাদক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বললেন——নেই।’ হুমায়ুন আজাদ বললেন——তা তো থাকবেই না, ভাল কবিতার অনুবাদ কেউ করে না।’
তাঁর এই কথায় আমি অবাক হয়ে বলি, ‘আমার কবিতাকে আপনি ভাল বলছেন? আজাদ বললেন—‘আপনার অনেক কবিতাই আমার বেশ ভাল লাগে।’
এবার আমি হেসে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে যে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তসলিমা নাসরিন এখনও কবি হয়ে ওঠেনি?”
ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদের কণ্ঠে এরপর কোনও ভাষার খেলা দেখিনি। সম্ভবত তিনি প্রস্থানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। দ্রুত প্রস্থান না করলে এই প্রৌঢ় লোকটিকে ‘বালক’ বলেও বিদ্রূপ করা যেত। কারণ আমি এবং হুমায়ুন আজাদ দু’জনই যখন এক পত্রিকায় কলাম লিখতাম, আমাদের দু’একদিন যা কথা হয়েছে, তাতে তিনি যে আমার কলাম নিয়মিত পড়েন তা বেশ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন; মাঝে আমি ক’মাস লিখিনি বলে একদিন উপদেশও দিলেন—‘লেখা বন্ধ করবেন না, লিখে যান, লিখে যান।
তো এই হুমায়ুন আজাদই যখন তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তসলিমা নাসরিনের কলাম হয়তো বালক-বালিকারা পড়তে পারে, আমার জন্য নয় ওর কলাম,’ তখন কি আমার বলতে ইচ্ছে করে না যে, তবে আপনি ‘বালক’ নিশ্চয়ই?
২
কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বাংলা অ্যাকাডেমির একজন উপ-পরিচালক। তিনি মেলা- পরিচালনা কমিটির অন্যতম। সতেরোই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মেলায় কিছু সন্ত্রাসী একটি অশ্লীল বাক্য লেখা ব্যানার নিয়ে হাঁটে। এই খবর শুনে যে-কোনও দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুহম্মদ নুরুল হুদা। আমার জন্য একটি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তিনি সন্ত্রাসীদের সতর্ক করতে মেলাপ্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করেন। তাঁর দায়িত্বশীলতা আমাকে মুগ্ধ করে।
অথচ একদিন তিনি বলে বসলেন, “ও-সব নেহাতই বানানো বা সাজানো ঘটনা ছিল।’ অর্থাৎ অশ্লীল ব্যানার নিয়ে হাঁটা, স্টলের বই ছিঁড়ে ফেলা, স্টলে আমার বই যেন না রাখা হয়—এই হুমকি দেওয়া—সবই ছিল বানানো জিনিস! কার বানানো? আমার? আমি আমার জন্য এত সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছি?
বুদ্ধিজীবী এখনও হইনি তাই বুদ্ধিও খোলেনি আমার, তা না হলে নিজের স্বাদের জন্য যে মাঝেমধ্যে নিজের জন্য ফাদও পাতা যায় তা আমি কিছুটা হলেও জানতাম।
৩
কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক আমাকে কন্যা বলে পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করতেন। লেখাপ্রসঙ্গে উৎসাহ সব সময় এভাবেই দিতেন যে—লিখে যাও, আমি আছি বা আমরা আছি তোমার পাশে। পাশে তিনি সব সময় থাকেন বা ছিলেন কিন্তু যখন সত্যিকার পাশে থাকবার সময়, যখন তাঁর কন্যা বা একজন লেখকের ওপর শারীরিক আক্রমণের প্রতিবাদ করবার সময়, তখন তিনি গা বাঁচিয়ে দূরে চলে যান।
পাশে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা থাকেন, তবে সব সময় নয়। দুঃসময় এলেই কন্যা যে সত্যিকারের কন্যা নয়, বা এ যে বানানো একটি ডাক, নিজের প্রয়োজনেই কেবল এই পরিচয়কে ব্যবহার করা তা তিনি পাশে না থেকে, পাশ কাটিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিলেন।
৪
মানুষের জীবন খুব অল্প সময়ের। এ অল্প সময়ে মানুষ নানা রকম মানুষ দেখে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মানুষ নন, ‘মহামানব’ গোছের কিছু হবেন। আমার মনে হয় মানুষ দেখা বা চেনার চেয়ে ‘মহামানব’ চেনা খুব আরামদায়ক। কারণ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শ এত ‘চমকপ্রদ’ এবং ‘অসামান্য’ ঘটনার জন্ম দেন যে ‘মানুষের’ সাধ্য নেই তা ঘটায়। বুদ্ধিজীবীদের আর কিছু না থাক, এ-কথা স্বীকার করতেই হয় যে ‘বুদ্ধি’ আছে। তবে এই বুদ্ধিগুলোয়, দুঃখ এই যে, সারল্যের চেয়ে চাতুর্য বেশি।
Chapter - 4 - আগ্রাসন
আগ্রাসন
ছোটবেলায় বিয়েবাড়ির গেট সাজানো দেখতাম, দু’পাশে কলাগাছ পুঁতে বিয়ের গেট সাজানো হত অথবা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ফ্রেম বানিয়ে ঝাউপাতায় সাজানো হত গেট। গেটের উপর কুলোর ভেতরে নানা রং দিয়ে ‘শুভ বিবাহ’ লেখা হত। মাটির কলসিতে আলপনা এঁকে সাজানো হত, শীতলপাটিতে নানা রকম নকশা এঁকে গায়েহলুদের দিন মাটিতে বিছিয়ে রাখা হত। তা ছাড়া ঘরের মেঝে ভরে আলপনা আঁকা হত। লাল-নীল কাগজ কেটে দেওয়ালে ঝোলানো হত।
আজকাল আর ও-সব দেখি না। আজকাল বিয়েবাড়ির গেট, জন্মদিনের গেট, মিলাদ মাহফিলের গেট, গায়েহলুদের গেট, মুসলমানির গেট, আকিকার গেট সব একই কায়দায় সাজানো হয়। শহরে এখন ডেকোরেটরদের ব্যাবসা জমজমাট। তারা যে-কোনও অনুষ্ঠানে ডাক পড়লেই কাপড়ের গেট বানাতে যায়। কাপড় পেঁচিয়ে এক রকম গম্বুজ আকৃতির জিনিস তৈরি করে, যার নীচ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। কাপড় প্যাঁচানো এ-জাতীয় গেটের সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্যের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। ঢাকা শহরে ভিআইপি রোডের দেওয়ালে এক সময় ইসলামি স্থাপত্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহার ঘটেছিল। সরকার বদলেছে, দেওয়ালে ইসলাম সাঁটার কাজ আপাতত বন্ধ হয়েছে।
আপাতত বলছি এ-জন্য যে, যেহেতু প্রতিটি সরকার ‘ইসলাম’কে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সবচেয়ে উপযোগী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে, তাই দেওয়ালে, রাস্তায়, ফুটপাতে, সড়ক-দ্বীপে ইসলামি নকশা তৈরির কাজ শুরু হতে আর কতক্ষণ!
সংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে। অন্তত বদলাবার জন্য জোর চেষ্টা চলছে। আমাদের দীর্ঘ বছরের অভ্যাসের উপর নতুন এক আগ্রাসন আমাদের হাড়মাংসে টের পাইয়ে দিচ্ছে যে প্রলয় আসছে, এই প্রলয়ে ওলটপালট হচ্ছে আমাদের এতকালের বোধ ও বিশ্বাস, আমাদের যাপিত জীবনের ছবি।
আজকাল গায়েহলুদেরও গেট হয়, কানের ফুটো করলেও গেট, আকিকা দিলেও গেট। কেন গেট হয়, এই গেটের উদ্দেশ্য কী, আমি ভেবেছি অনেক। ভেতরে কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে, গেটটি সম্ভবত সে-কথা বোঝাবার একটি ভাষা। এই বোঝাবার ভাষাটি দিন দিন কৃত্রিম হয়ে উঠছে। ক্রমেই এটি বানানো-সাজানো অনান্তরিক হচ্ছে। আগে গেট সাজাত আয়োজকের নিজের লোকেরা। পাড়াপড়শি বা স্বজন মিলে। এর পেছনে কাজ করত তারুণ্যের আবেগ-উচ্ছ্বাস, দল বেঁধে কিছু করবার আনন্দ। এখন আর আলপনা আঁকবার ধুম পড়ে না, সারারাত জেগে কাগজ কেটে, কুলোয় ছবি এঁকে বাড়ি সাজায় না কেউ।
এখন টাকা দিয়ে লোক এনে বাড়ির গেট বানানো হয়, রাতের বাতি সাজিয়ে দেওয়া হয় ডেকোরেটরদের পছন্দ যেমন, তেমন। মানুষ যত সভ্য হচ্ছে, শিক্ষিত হচ্ছে যত, তত কমে যাবার কথা অর্থ দিয়ে কৃত্রিমতা কেনা, অর্থ দিয়ে অর্থহীনতা কেনা। অথচ এ-দেশে শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে মিথ্যে একটি বোধ, অন্য এক সংস্কৃতি।
রমজান মাস কৃচ্ছ্র করবার মাস বলেই জানতাম। অথচ এ-মাসটিকেই সবচেয়ে বেশি ভোগের এবং বিলাসিতার মাস বলে আমার মনে হয়। এই কৃচ্ছ্রের মাসে এত ভোজনবিলাসের আয়োজন হয় যে, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায়, শাকসবজি, মাছমাংস সব চড়া মূল্যে বিক্রি করে মুসলমান ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যায় বাড়ি বাড়ি ইফতার পার্টির ধুম শুরু হয়। টেবিলজুড়ে সাজানো হয় অসংখ্য বাহারি খাবার। দেখে মনে হয় না এ-মাস কৃচ্ছ্রের মাস, সংযমের মাস, এ-দেশ দরিদ্রের দেশ।
আমাদের এই বিশাল গ্রামের মতো দেশটির ওপর ইটপাথরের যে নগরায়ণ হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপে ভিন্ন এক সংস্কৃতিকে ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একটি জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি নিয়ে আধা-নগর, আধা-গ্ৰাম এমন এক মিশ্র পরিবেশে বাঙালি মানুষ হচ্ছে ঠিকই (অর্থাৎ হাত-পা-মাথা ইত্যাদি অঙ্গ বর্ধিত হচ্ছে ঠিকই) কিন্তু সত্যিকার বাঙালি হচ্ছে না, অথবা প্রকৃত মানুষ হচ্ছে না।
আমাদের সংস্কৃতির ওপর লেপন করা হচ্ছে শবেবরাতের রুটি-হালুয়া, পটকা পটাশ, এখন আমাদের সংস্কৃতির ভেতর কোনও সুখের সংবাদ শোনামাত্র মিলাদ মার্ফিল, এখন আমাদের সংস্কৃতি বিশালাকার সিন্ধি গোরু জবাই করে তেলে-মশলায় রান্না করে খাওয়া, এখন আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে গেছে পোলাও, কোর্মা, বিরানি, তেহারি, গোরু-খাসির রেজালা, কাবাব, কোপ্তা, বোরহানি, জর্দা, খেজুর। এখন আমাদের সুস্থ সংস্কৃতির মধ্যে আসন গেড়েছে তেলে ডোবা ভোগ্যবস্তু। ক্ষুধার্ত এক জাতির সামনে এখন আলোকসজ্জা, এখন বস্ত্রহীন জাতির সামনে কাপড়ে সাজানো গেট, এখন ঝলমলে সুগন্ধি ছড়ানো জুসমে জুলসে। এখন তেলে ও মশলায় ডোবা গোরু-খাসি, এখন জাফরান রঙের পোলাও।
আমরা, আমরা বাঙালি নামের মানুষ কোন দিকে বাড়াব আমাদের হাত? কোন সভ্যতার দিকে, কোন সংস্কৃতির দিকে? এ-সময়ই কি শ্রেষ্ঠ সময় নয় নিজেকে চিহ্নিত করবার যে, আমরা কোন জাতি এবং আমরা লালন করি কোন সংস্কৃতি? ভিন্ন সংস্কৃতি আমাদের গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে। এখনও যদি সচেতন না হই তবে ধ্বংস ছাড়া বাঙালির আর গন্তব্য থাকবে না কোথাও যাবার।
Chapter - 5 - নগর-যাপন
নগর-যাপন
আমরা যারা লিখি, আমাদের এমনই নিয়ম যে, সারা বছর লিখে একটি মাস কেবল লিখব না, সারা বছর নিরানন্দে ভেসে একটি মাস কেবল উৎসব করব আনন্দের। আমাদের এমনই নিয়ম, আমরা যারা লিখি তারা পাশাপাশি হেঁটে বা দাঁড়িয়ে, বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে বা বসে বলব আমাদের না-দেখা সারা বছরের গল্প, আমরা কথা বলব আমাদের লেখা যারা পড়েন তাঁদের সঙ্গেও।
এই উৎসবের মাসটি ফেব্রুয়ারি মাস। এই উৎসবের মাসটি নিশ্চয়ই ফেব্রুয়ারি মাস। এই ফেব্রুয়ারি আমাদের মাস। আমরা যারা বছরের এগারো মাস দুঃখ করি, তারা কি একটি মাস মন খুলে আনন্দ করব না? নিশ্চয় করব তাই আনন্দ করি। তাই ফেব্রুয়ারির বিকেলে কুশল শুধোতে যাই যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁদের, যাঁরা গল্প-উপন্যাস লেখেন তাঁদের, যাঁরা প্রবন্ধ লেখেন, যাঁরা আমাদের মতো একই রকম ভাবনা ভাবেন, তাঁদের। এ-বছরের বইমেলায় একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, এ-কথা সবাই জানে। যারা বইমেলায় যায় তারাও জানে, যারা যায় না তারাও। অপ্রীতিকর ঘটনাটি এ-রকম, দশ-বারোটি ছেলে আমার লেখা পছন্দ করে না, পছন্দ করে না বলে তারা আমার বই স্টল থেকে টেনে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে, বই যেন বিক্রি না হয় সে-হুমকি দিয়েছে, আরও বলেছে, আমি বাংলা অ্যাকাডেমির মেলায় এলে আমাকে অপমান করা হবে, শারীরিক আঘাতের কথাই তারা বুঝিয়েছে।
পরে জেনেছি, আমার ‘দৌড়, দৌড়’ ও ‘বালিকার গোল্লাছুট’ কবিতার জন্য তাদের এই আক্রোশ। ‘দৌড়, দৌড়’ কবিতাটি এ-রকম—‘তোমার পেছনে একপাল কুকুর লেগেছে/ জেনে রেখো, কুকুরের শরীরে র্যাবিস।/তোমার পেছনে একপাল পুরুষ লেগেছে,/ জেনে রেখো, সিফিলিস।’
‘বালিকার গোল্লাছুট’ কবিতাটি এ-রকম—‘আমরা বালিকারা যে খেলাটি খেলবো বলে পৃথিবীতে বিকেল নামতো/ সে খেলার নাম গোল্লাছুট।/সারা মাঠ জুড়ে বিষম হৈ চৈ/ সেই নিশ্ছিদ্র আনন্দ থেকে/ গড়িয়ে গড়িয়ে কবেই এসেছি শতচ্ছিন্ন দুঃখের ছায়ায়,/ মনে নেই, মনে নেই কোন দল কোন দিকে ছোটে,/ কাকে ছুঁলে হয় নিখাদ বিজয়!/ বালিকারা এখনো কি খেলে হাওয়ায় উড়িয়ে চুল গোল্লাছুট খেলা?/ আমার আবার ইচ্ছে করে খেলি/ এখনো মাঝে মধ্যে আকুপাকু করে পায়ের আঙুল/ ধুলোয় ডুবতে চায় গোপন গোড়ালি।/ ইচ্ছে করে যাই/ পৃথিবীর সকল বয়স্ক বালিকা দিই গোল্লা থেকে ছুট।’
অভিযোগ এই, ‘পৃথিবীর সকল বয়স্ক বালিকা দিই গোল্লা থেকে ছুট’–এর অর্থ ঘর-সংসারের সকল মা-বোনকে ঘর থেকে বের করতে চাচ্ছি আমি! অভিযোগ আরও, পুরুষের শরীরে ‘সিফিলিস’ বলে আমি পুরো পুরুষ জাতিকে দোষ দিচ্ছি।
অভিযোগ দুটো সরাসরি আমার সামনে উত্থাপন করা হয়েছে। আমাকে আমার লেখার কৈফিয়ত দিতে হয়েছে নিতান্তই অর্বাচীন, সনাতন সংস্কারে নিমজ্জিত সশস্ত্র যুবকদের কাছে। কৈফিয়ত দিতে হয় কবিতার, কৈফিয়ত দিতে হয় প্রতি বাক্যের, শব্দের। যেন অপরাধ করেছি লিখে, যেন অপরাধ করেছি শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসবার আহ্বান জানিয়ে, যেন অপরাধ করেছি নারীকে মানুষ হবার প্রেরণা দিয়ে। এই নোংরা সমাজের দলিত, পিষ্ট, শোষিত নারীর পক্ষে উচ্চারিত যে-কোনও শব্দকে ‘অশ্লীলতা’ বলে গণ্য করা হয়। কোন শব্দ আমি কোন কবিতায় লিখেছি এবং কেন–তা আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। আমি অধিকাংশ সময় পার করেছি নির্বাক এবং নিরুত্তর। বয়স্ক বালিকারা গোল্লা থেকে ছুটে যাবে, গোল্লা অর্থ এই ছকবাঁধা জীবনের গণ্ডি, গোল্লা অর্থ শৃঙ্খল, গোল্লা অর্থ অন্ধকার ঘর, যে ঘরকে নারীর একমাত্র জগৎ বলে ভাবা হয়। নারীকে এই অবদমন, এই পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবার কথা বলা আমার অন্যায় হয়েছে, তারা এ-রকমই অভিযোগ করল।
একবিংশ শতাব্দী শুরু হবে, আর আমাকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, আমি কেন সমাজের নিয়মনীতির বাইরে অন্য কথা বলি, প্রচলিত জীবনের বাইরে অন্য জীবনের ডাক দিই! আমার এই অপরাধের ক্ষমা নেই। অন্তত তাদের কাছে, যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমার হাত থেকে কলম কেড়ে নেবার
আমার লজ্জা হয়, আমার সত্যিই লজ্জা হয় ভেবে যে, আমি কোন দেশে বাস করি, কারা আমার সহযাত্রী, কারা আমার পাঠক! আমার লজ্জা হয়, আমার ক্রোধও কি কিছু কম হয়?
আমি এর মধ্যে হঠাৎ একদিন ভেবে বসলাম, যেমন লেখা লিখি, তেমন আর লিখব না। আমি এখন হুমায়ুন আহমেদের মতো উপন্যাস লিখব, সুরাইয়া খানমের মতো কবিতা লিখব—ব্যাস কেউ আর ফাঁসির দাবি নিয়ে মিছিল করবে না, কেউ আর মেলা থেকে কেড়ে নেবে না আমার সব বই, কেউ আর আমাকে বিবস্ত্র করবার হুমকি দেবে না। আমি তো অন্তত নিরুপদ্রব বেঁচে থাকব।
আমি শেষ অবধি এ-রকম একটি ভাবনাকে স্থায়ী করতে পারিনি বেশিক্ষণ। আমি যাবতীয় দুর্ভাবনাকে দূর করেছি এই ভেবে যে, আমাকে যদি মৌলবাদীরা ধর্মহীনতার দোষে ফাঁসি দেয়, দেবে; যদি মৌলবাদী এই নতুন প্রজন্ম আমার লেখার হাতকে ছিঁড়ে ফেলতে চায়, কেড়ে নিতে চায় কলম এবং বিবস্ত্র করতে চায় শরীর; তবে করুক। এই আমি দাঁড়ালাম সকল অপশক্তির বিপক্ষে। এই আমি নারীর ওপর ধর্মের সমাজের, রাষ্ট্রের নির্যাতনের বিপক্ষে দাঁড়ালাম। কেউ আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলে করুক। আমি আপস করতে চাই না কোনও ক্ষমতাবান সন্ত্রাসীর সঙ্গে। তারা আমাকে আরও অভিযুক্ত করেছিল, বলেছিল—“আপনি ‘জয় বাংলা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘এই জয় বাংলাকে জীবনের রক্তে মাংসে/ যারা লালন করতে না জানে তাদের, সেই দুর্ভাগাদের মৃত্যু হোক।’ এর অর্থ কি. এই নয় যে, আপনি আমাদের মৃত্যু চাইছেন?
এও আমার দোষ, আমি ‘জয় বাংলা’কে অন্তরে ধারণ করি। আমার এত দোষ মোচন করবার শক্তি আমার নেই। আমি এই অহংকার করতে চাই, এই একটি অহংকার যেন আমাকে আরও সমৃদ্ধ করে যে, আমার দিকে ধাবিত রাষ্ট্রের এবং সমাজের বুলডোজারকে গায়ের জোরে নয়, সত্যের জোরে থামাতে চাই। কেউ যদি একে দোষ বলে, আমি দোষী হতে চাই আরও।
Chapter - 6 - ঘরের শত্রু বিভীষণ
আমি এ-জীবনে দুর্যোগ কিছু কম দেখিনি। আমার ফাঁসি চেয়ে মিছিল করেছে মৌলবাদীরা, আমি সেই মিছিল ডিঙিয়ে বাড়ি ফিরেছি। আমি এ-জীবনে দুর্ভোগ কিছু কম পোহাইনি। বিরুদ্ধ একটি সমাজের ভদ্রলোকেরা আমাকে নিরন্তর চাবকাচ্ছে। আমি অনেক দিন দুঃখ করতে ভুলে গেছি। আমি বিস্মিত হতে হতে এখন স্থবির পড়ে আছি, কোনও বেদনা বা বিস্ময়ের বোধ আমাকে আর গ্রাস করে না। তবু সেদিন হঠাৎ একেবারে হঠাৎই নানা দুর্ভোগ পোহানো মানুষ আমি বিস্ময়ে বাদ্ধ হলাম। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির সতেরো তারিখ। বাংলা অ্যাকাডেমির বইমেলায় সাত-আটজন অথবা দশ-বারোজন ছেলে একটি ব্যানার নিয়ে ঘুরছে, ব্যানারে অশ্লীল কিছু বাক্য, বাক্যের নীচে লেখা—তসলিমা নাসরিন পেষণ কমিটি’—এই দৃশ্য আমি দেখিনি, এই দৃশ্যের কথা আমাকে কেউ-কেউ জানিয়ে যায়। আমার উদবিগ্ন শুভাকাঙ্ক্ষীরা ‘মেলা পরিচালন কমিটি’কে দৃশ্যটির কথা জানান। তাঁরা আমাকে অ্যাকাডেমির মহাপরিচালকের রুমে এনে আপাত একটি নিরাপত্তা দেন।
খবর পাই, ব্যানারটি কেড়ে নিয়ে গেছে কয়েকজন যুবক। মহাপরিচালকও মঞ্চের মাইকে ব্যানারবাহকদের উদ্দেশ্যে কড়া বক্তব্য রেখে ফিরে আসেন; এসেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনাকে নিয়ে কেন এই মিছিল হচ্ছে? প্রশ্নটি আমাকে নিরুত্তর করে রাখে। কেন এই মিছিল, কী এদের উদ্দেশ্য আমি জানি না। মহাপরিচালক আমার উত্তরের জন্য ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিলেন, যেন এই জটিল উত্তরটি তাঁকে জানাতেই হবে, যেটি কেবল আমিই জানি বলে তিনি ধারণা করছেন। নিরুত্তর সময়গুলো তাঁকে কিছু সন্দিগ্ধ করছে মনে করে আমি বললাম, ‘সম্ভবত লেখালেখির কারণেই এই সব।’
আমার সরল উত্তরে তাঁর ভ্রূ কুঞ্চিত হল, তাঁর চোখের তারায় অবিশ্বাস নাচল, তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হল অদ্ভুত একটি বাক্য—‘লেখালেখি তো আরও অনেকেই করে, কই তাদের বিরুদ্ধে তো মিছিল বেরোয় না?’
এই প্রশ্ন আমাকে আবারও স্তব্ধ করে। উপস্থিত চার-পাঁচজন লেখক মহাপরিচালকের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেউ নিচু কণ্ঠে, কেউ উঁচু কণ্ঠে। কেন আমার বিরুদ্ধে এই মিছিল, লেখক তো এ-দেশে অনেকেই আছেন, সকলকে বাদ দিয়ে কেন ‘পেষণ’-এর জন্য ওরা, এ-দেশের সুযোগ্য সন্তানেরা, আমাকেই নির্বাচন করল— মহাপরিচালকের প্রশ্নের পেছনে ধ্বনিত হয় একটি সূক্ষ্ম বিদ্রূপ। আমার বিশ্বাস হয় না আমি উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছি, কথা বলছি বাংলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে। আমার বিশ্বাস হয় না, যে মানুষটির সঙ্গে আমি কথা বলছি, তিনি সত্যের বিরুদ্ধে খেপে ওঠা উন্মত্ত অসত্যের ঢল সম্পর্কে কিছুই জানেন না। প্রচলিত সমাজের বিপক্ষে কথা বলতে গেলে কম নির্যাতন, নিপীড়ন বা পেষণের শিকার হতে হয়? আর যদি কণ্ঠস্বরটি খুব আপসহীন;এবং বলিষ্ঠ হয়—তবে কার না শখ হয় কণ্ঠরোধ করতে, কার হাত এবং হাতের আঙুলে ইচ্ছে জাগে না তাকে পেষণ করবার? অর্ধশত বছর অতিক্রম করেও মহাপরিচালক ইতিহাস বিস্মৃত হন; তিনি গ্যালিলিও গ্যালিলি, জিয়োর্দানো ব্রুনো, সক্রেটিস, জোন অব আর্ক, মেরি ওলস্টোনক্রাফট, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সালমান রুশদির কথা ভুলে যান।
আর যদি কণ্ঠস্বরটি কোনও নারীর হয়? নারীকে এই সমাজে দাঁড়াবার সুযোগ দেয় ক’জন? নারীই জানে নারীকে কত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছোতে হয়। নারীই জানে তার অমসৃণ পথ ও পথের প্রতিকূলতা। সম্ভবত মহাপরিচালক হারুন-অর- রশিদ একজন নারীর ওপরে ঘরে-বাইরের দুর্বৃত্ত পুরুষের অত্যাচার সম্পর্কে জ্ঞাত নন। মহাপরিচালক লোকটি হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক একটি কথা বলেন। বলেন—আমি অবশ্য আপনার কোনও লেখা পড়িনি। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ তো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন আপনি নাকি এখনও লিখতেই শেখেননি।’ আমি অবাক হয়ে এবার তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। লিখতে গেলে হুমায়ুন আজাদের সার্টিফিকেটের দরকার হয়, এ আমি কখনও ভাবিনি। হুমায়ুন আজাদ নানা রকম সাক্ষাৎকারে বলে বেড়াচ্ছেন প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে তাঁর মতো মননশীল আর কেউ নেই। তিনিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ, কবি নির্মলেন্দু ‘বড়-অকবি’, হুমায়ুন আহমেদ ‘অপন্যাস’ লেখেন, সৈয়দ শামসুল হক ‘কপট কবি’, তসলিমা নাসরিন ‘এখনও কবি হয়ে ওঠেনি’। হুমায়ুন আজাদ নিজের প্রশংসা করতে গিয়ে সকল লেখক সম্পর্কে উদ্ভট সব মন্তব্য করেন। এইসব মন্তব্য, নিজের সম্পর্কে এইসব অশোভন উন্নাসিকতা, নিজে ছাড়া বাকি সবাইকে গাধা ও গোরু, বাকি সবাইকে তুচ্ছ ভাবা সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ নয়। এই আচরণ যে নেহাতই দৃষ্টি আকর্ষণের হীন উদ্দেশ্য তা অনেকের কাছে স্পষ্ট। লেখক হিসেবে হুমায়ুন আজাদ আমাকে সার্টিফিকেট দেননি বলে মহাপরিচালকও আমার ওপর তুষ্ট নন। আমি জানি না মহাপরিচালককে মানুষ হিসেবে হুমায়ুন আজাদ যদি স্বীকৃতি না দেন, তবে নিজেকে তিনি অমানুষ ভাববেন কি না।
আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না, আমাকে হতবাক করে মহাপরিচালক বলেন— ‘এমন লেখা লিখবেন যেন এইসব ‘গণ্ডগোল’ না হয়, মেয়ে হয়ে ‘পুরুষালি’ লেখা লেখবার দরকার কী, কেন ধর্মকে আক্রমণ করে লেখেন, মেলায় গণ্ডগোল হলে আমরা মেলা থেকে বই উইথড্র করতে বাধ্য হব।’
মহাপরিচালক আমাকে শেখাতে চান কী করে লিখতে হয়, কী করে লিখলে কোনও গণ্ডগোল হয় না। কী করে লিখলে হুমায়ুন আজাদ লেখক বলে স্বীকার করেন। আমার সৌভাগ্য এই, আমি এইসব বর্বর শিক্ষিত দ্বারা সংক্রামিত হই না। ওই ব্যানারবাহক দুর্বৃত্তদের চেয়েও এইসব প্রগতিশীল মূর্খ থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিই।
Chapter - 7 - কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ
‘কার নিন্দা কর তুমি। মাথা কর নত। এ আমার এ তোমার পাপ।’
আমার জন্ম শহরে। শহরেই বড় হয়ে উঠেছি। বাবার মুখে গ্রামের গল্প শুনতাম ছোটবেলায়। বইপত্রে গ্রাম সম্পর্কে পড়তাম ‘গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গোরু, পুকুর ভরা মাছ।’ একাত্তরে যুদ্ধের সময় চোখের সামনে গ্রাম দেখলাম, তাও ঠিক গ্রাম নয়, শহরতলিই বলা যায়। সেও বেশিদিন নয়। আলপথে হেঁটে, পুকুরে সাঁতার শিখে দেখতে দেখতে পাঁচ-ছ’মাস কেটে গেল। আমাদের ফিরতে হল আবার শহরে।
আসলে গ্রাম আমার দেখা হয় ট্রেনের জানালা দিয়ে। ট্রেনের টিকিট কাটতে গেলে আমার শর্ত থাকে সিট যেন জানালার পাশে হয়। শীত হোক, বর্ষা হোক আমি জানালা খুলে গ্রাম দেখি। কোথাও শনে ছাওয়া ঘর, কোথাও মাটির উঠোনে খড়ের গাদা, গাছের ছায়ায় বসে গোরু জাবর কাটছে। গ্রামে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে শানবাঁধানো স্বচ্ছ জলের পুকুর আর বট-অশ্বত্থের ছায়া। বৃক্ষের ছায়ায় বসে দিগন্ত অবধি সবুজ ধানখেত দেখলে মন ভরে যায়।
সেদিন গ্রামে সারাদিনের জন্য ঘুরে বেড়াবার সুযোগ হল। আমি বেশ আহ্লাদিত। সেই একাত্তরে যেমন দেখেছিলাম, লাল-সবুজ ফুলপাতা আঁকা সবচেয়ে ভাল কাচের গ্লাসে পানি দেবে। গাছের আম-পেয়ারা-জাম যা থাকে পেড়ে এনে সামনে দেবে। গায়ে হাত বুলিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করবে। টিনের ট্রাংক খুলে ফুল-আঁকা চিনেমাটির থালা বার করে গরম ভাত খেতে দেবে, সঙ্গে খেতের সবজি, পুকুরের মাছ। এ-রকমই ছিল আমার চোখে গ্রামের ছবি। তো এবার, এই যে গ্রামে গেলাম, আমার চারপাশে বাচ্চাদের ভিড় জমে জমে গেল। ওরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আমার দিকে অবাক তাকিয়ে রইল। এতগুলো মানুষ তাকিয়ে থাকলে কেমন অস্বস্তি লাগে। আমি অস্বস্তি কাটাতে উঠোনে হেঁটে বেড়ালাম। বাড়ির বড় মেয়েরা অচেনা চোখে আমাকে দেখল, গৃহিণীরা নিজেদের কাজে মেতে রইল। আমার জন্য কেউ গাছের ডাব পাড়ল না, কেউ তরতর করে পেয়ারা গাছে উঠে পেয়ারা পাড়ল না। যেন আমি অদ্ভুত এক শহুরে জীব এসেছি, আমার খিদে-ফিদে লাগে না, আর আমি ফলমূল খেতেও জামি না।
যে বাড়িতে বেড়াতে এসেছি, দুপুর গড়িয়ে যায়, কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করতে আসেনি আমার খিদে পেয়েছে কি না, কিছু খাব কি না। বিকেলে সাড়ে তিনটের দিকে টিনের থালায় করে এক মহিলা আমার জন্য ভাত নিয়ে এলেন, সঙ্গে সজনের ডাল। জিজ্ঞেস করলাম—‘আপনারা খেয়েছেন?’ মহিলা মাথা নাড়লেন—‘না।’
খেতে গিয়ে দেখি গলায় আটকে যাচ্ছে ভাত। খেতে পারি না। মহিলা দাঁড়িয়েই রইলেন, জিজ্ঞেস করলাম—‘আপনার ছেলে-মেয়ে যেন ক’জন?’ বললেন— ‘এগারোজন।’
‘এগারো জন?’ আমি চমকে উঠলাম। কারও বাচ্চা এগারোটা পর্যন্ত হয় নাকি? জিজ্ঞেস করলাম—‘সবই আপনার পেটের?
মহিলা আঁচলে মুখ ডেকে বললেন—‘হ্যাঁ।’
ভাত মাখতে মাখতে জিজ্ঞেস করলাম—‘এখানে পরিবার পরিকল্পনার লোক আসে না?’
‘আসে।’
‘তারা বলে না কিছু?’
‘তাদের বাড়িতে ঢুকতে দেয় না।’
‘কে দেয় না?’
‘সিরাজের বাপ।’
সিরাজের বাবা মানে মহিলার স্বামী। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলে ক’জন আপনার?’
‘সাতজন।’
একবার ভেবেছিলাম, যা হয়—একটি ছেলের আশায় অনেক বাচ্চার জন্ম দেয়।
যেমন কেবলই মেয়ে জন্মাচ্ছে, দশটি মেয়ে হওয়ার পর এগারো নম্বরটি ছেলে হল, তারপর তারা উৎপাদন থামাল। এ-ক্ষেত্রে এগারোর মধ্যে সাতটিই ছেলে।
জিজ্ঞেস করি, ‘কেউ কি পড়াশুনা করে?’ মহিলা আঁচল টেনে বললেন, ‘না।’
আমার ভাত খাওয়া থেমে গেল। হাত ধুয়ে নিলাম। এঁরা আমার দূর-সম্পর্কের আত্মীয়। প্রথমে বেড়াতে এসেছি গ্রামে, গ্রামের সবুজ প্রাণ দেখব বলে আসা।
‘এতগুলো ছেলেপুলে খাওয়াতে পারেন?
এর মধ্যে সিরাজের বাবা এলেন, তাঁকেও এই একই প্রশ্ন করলাম। বললেন- ‘আল্লাহ্র বান্দা, আল্লাহ্ই খাওয়ায়।’
‘আল্লায় খাওয়ায় মানে? আপনাকেই তো খেতে ছুটতে হয়, সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা জোটে তাই তো খান এবং ওদের খাওয়ান। আপনি না খাওয়ালে দেখুন তো আল্লাহ্ খাওয়ায় কি না। আর আল্লাহ্ আপনাদের ডিম, দুধ, মাছমাংসই বা কেন খাওয়ায় না?’ সিরাজের বাবা নিঃশব্দে হাসলেন। বললাম—‘পরিবার পরিকল্পনার লোককে নাকি বাড়িতে ঢুকতে দেন না?’ সিরাজের বাবা দাওয়ায় বসে সাদা চোখে তাকিয়েছিলেন উঠোনের দিকে, বললেন, ‘ওগুলো মানলে গুনাহ হবে।’
‘পরিবার পরিকল্পনা করলে গুনাহ হবে? ‘
‘হ্যাঁ, আল্লাহ্ আত্মা দিয়েছেন। এই আত্মা যে আমি মারব, আল্লাহ্ বলেছেন তুমি যদি আত্মা বানাতে পারো তবে তুমি আত্মা মারো। আল্লাহ্র দেওয়া আত্মা মারলে নির্ঘাত দোজখবাস। ‘
এই সিরাজের বাবা রহিসউদ্দিন দোজখের ভয়ে জন্মশাসন করেন না। তিনি বেহেশতে যেতে চান। সবারই খুব বেহেশতের শখ। রইসউদ্দিন দাড়ি রেখেছেন। মাথায় টুপিও পরেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আরবিতে যে সুরা পড়ছেন, সুরার অর্থ জানেন?
রইসউদ্দিন হেসে বললেন—না। আল্লাহ্ নামাজ পড়তে বলেছেন, তাই পড়ি। আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, অর্থ কী করে জানব?
গ্রাম তো কেবল সবুজ ধান-পাট নয়, কেবল স্বচ্ছ জলের পুকুর নয়। বৃক্ষের ছায়া নয়। গ্রাম মানে গ্রামের মানুষও তো। তারা এগারো সন্তান নিয়ে সংসারে অসচ্ছলতা ডেকে আনে। দারিদ্র্যের চাবুক পড়ে পিঠে। তারা বেহেশতের লোভে জীবন ছেড়ে দেয় অদৃষ্টের হাতে। আর অদৃষ্ট খেলা করে মানুষ নামক এইসব বোকা ও নিরীহ প্রাণী নিয়ে। আমরা লেখাপড়া-জানা শহুরে মানুষেরা নানা রকম তত্ত্বকথা জানি, মার্কসবাদ জানি, অর্থনীতি, রাজনীতির যোগ-বিয়োগ জানি, আমরা কেবল তাদের উদ্ধার করতে জানি না। অলৌকিকতার পঙ্গপাল থেকে আমাদের সুন্দর, সবুজ গ্রামকে আমরা রক্ষা করতে জানি না।
Chapter - 8 - দুঃখরাতের গান
‘দুঃখরাতের গান’
এই ঢাকা শহরে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ক’জন আছেন আমি জানি না। বেশ ক’জন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে আজকাল জানাচ্ছেন, এ-শহরে আপনার শত্রু খুব বেশি। কেউ এও বলেছেন, ‘বাইরে একা বেরোবেন না।’ কেউ আবার এও জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আচ্ছা, শত্রু বেশি হবার কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?
শত্রু কেন বেশি—এ আমি আসলেই জানি না। আমি জন্মেছি আদর্শবাদী চিকিৎসক পিতা ও অল্পশিক্ষিত ধর্মভীরু মায়ের সংসারে, আমাদের কখনও অঢেল বিত্ত ছিল না, তবে সচ্ছলতা ছিল। আমি এবং আমার ভাই-বোনেরা লেখাপড়া করেছি, নম্রতা শিখেছি এবং শিখেছি শিষ্টতা, শিখেছি মানুষের অনিষ্ট না করা। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমাদের যা আছে তা কেড়ে নিচ্ছে দূরের আত্মীয়রা, আমাদের ফুলের বাগান পাশের বাড়ির গোরু-ছাগল এসে তছনছ করে দিচ্ছে, শখ করে পড়শিরা লেলিয়ে দিচ্ছে সাপ, আমাদের জলভরা পুকুর দখল করে নিয়ে গেছে পেশিবাজ মানুষরা, মাস গেলেই বাড়িতে ডাকাত পড়ে, লুঠ করে নিয়ে যায় সহায়সম্বল; আমরা নিরীহ, নির্যাতিত প্রাণী একের পর এক শক্তিমান শোষক দ্বারা নিঃস্ব হয়েছি।
আমি ব্যক্তিগত জীবনেও একাধিক মানুষ দ্বারা অসম্মানিত হয়েছি। আমার বাবা বলতেন, ‘লেখাপড়া করলে সব দুঃখ ধুয়ে যাবে।’ লেখাপড়া করেছি, বড় হয়েছি, আর বুকের মধ্যে সেইসঙ্গে দুঃখও তার শরীর-স্বাস্থ্যসহ পাহাড়সমান বড় হয়েছে। এই পাহাড় ধোবার জল আমার সমুদ্রে নেই। আজ পর্যন্ত, এটি স্থির সত্য, আমি কারও অনিষ্ট করিনি, কোনও মানুষের কোনও ক্ষতি আমি জ্ঞানে হোক, অজ্ঞানে হোক, করিনি। আমি কেবল সকল সর্বনাশ নিয়ে নিজের ভেতর নিজে গুটিয়ে থেকেছি।
লিখেছি, যদি কিছু অন্যায় করে থাকি, এটিই করেছি। ভেতরের অভিমানী, অন্তর্মুখী নিঃস্ব, নির্জন মানুষটি ক্ষোভের কথা, কষ্টের কথা অকপটে লিখেছে। এতে কি শত্রু বেড়েছে—কেন লিখি, কেন হাতের আঙুলে উঠেছে অবাধ্য, অস্থির কলম?
শত্রু বেড়েছে, আমার চেয়ে এ-কথা বেশি টের পান শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁরা নানা আড্ডায়, আলোচনায় শত্রুদের বাক্যবাণে আহত হন। আমার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য আমি কোনও আড্ডায় বা আলোচনায় সাহিত্যের হোক, অসাহিত্যের হোক, অংশগ্রহণ করি না। নিজেকে অযোগ্য ঠেকে হয়তো। এত জ্ঞানীগুণীজনের ভিড়ে আমি এত অকিঞ্চিৎকর যে, আড়ালে থাকি, অদৃশ্যে থাকি।
কিছু লিখি, একেবারে সামান্য, এ-নিয়ে আমার অহংকারের কিছু নেই, যে-কোনও দিন লেখা ছেড়ে বনবাসে যেতে পারি। যে-কোনও দিন লেখা ছেড়ে হাওয়ায় হারাতে পারি। লিখি বলে কেউ-কেউ পেষণ কমিটি করে, লিখি বলে মৌলবাদীরা ফাঁসির দাবি তোলে, লিখি বলে কারও মতের সঙ্গে আমার মতের গরমিল হলেই বেনামে চিঠি যায় পত্রিকায়। একটি অভব্য পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আমার সাক্ষাৎকারের জন্য তিনদিন এসেছিল আমার বাড়িতে, আমি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি না হওয়ায় মেয়েটি তার পত্রিকায় আমাকে যাচ্ছেতাই গালাগাল করেছে। গালগাল করছেই, কার সাধ্য আছে বন্ধ করে? আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি আমি অসম্মানিত হলেও আমার শত্রু বাড়ে, আবার সম্মানিত হলেও বাড়ে। আমি যখন কারও দ্বারা চরম অসম্মানিত হই, শহরে শত্রুসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়, কাগজে কাগজে খবর বের হয়—উদ্ভট সব খবর। আবার সম্মানিত হলেও একই অবস্থা, এত বড় সম্মান আমার জুটেছে, আর কারও কেন জোটেনি সে নিয়ে আমাকে হেনস্থা করবার জন্য দ্বিগুণ, ত্রিগুণ, চতুর্গুণ বেড়ে যায় শত্রুসংখ্যা। আমি সর্বংসহা মৃত্তিকার মতো স্থির দাঁড়িয়ে থাকি, আমি জীবন পেতে দিই, ওরা আমার জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে হল্লা করে, উদ্বাহু নৃত্য করে।
আমার দ্বারা, আমি জানি, আমার সুস্থ স্নায়ুতন্ত্র জানে, আমার নিরীহ আত্মীয়রা জানে—কারও কোনও ক্ষতি হয়নি। কারও পাকা ধানে মই দিতে জানি না, কারও বাড়া ভাতে আমি ছাই দিতে জানি না। তবু এই নির্বোধ আমি, নিরুচ্চার নিরুত্তাপ আমি, আমাকেই দেখতে হয় চারদিকের দা-কুড়ুল হাতে নিয়ে আসা, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ওঠা বীভৎস মুখ। আমাকে ভেসে যেতে হয় বিরুদ্ধ স্রোতে, বাঁচবার জন্য আমাকে খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে হয়, আমাকে ডুবতে হয়। আমাকে মরতে হয়।
হ্যাঁ, মরতেও হয় বই কী। মাঝেমধ্যে বেঁচে আছি কি মরে গেছি—ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। বেঁচে থাকা ঠিক কার নাম, বেঁচে থাকতে হলে কী করে শ্বাস নিতে হয়, কী করে পা ফেলতে হয় মাটিতে, কী করে দৌড়োতে হয়, কী করে হাসতে হয়, কাঁদতে হয় আমি জানি না। আমি বোধহয় বেঁচে থাকবার যোগ্য মানুষ নই।
আসলে বাবা আমাদের শেখায়নি কেবল সারল্য দিয়ে জীবনে সাফল্য আসে না, একটু-আধটু চতুরতা দরকার, একটু-আধটু কৃত্রিমতা। বাবা আমাদের শেখায়নি আমার গালে কেউ চড় দিলে তার গালেও চড় দিতে, বাবা শিখিয়েছেন কেউ চড় দিলে তাকে নিজেরই আরেক গাল বাড়িয়ে দিতে। বাবা উদারতার কথা বলতেন, সহিষ্ণুতার কথা বলতেন।
শত্রু বাড়ছে, আমার হাতে কোনও লাগাম নেই শত্রু সংযত করবার। আমি নিঃস্ব, নির্জন হাতে দাঁড়িয়ে আছি, আমার অর্থ নেই, যশ নেই কেবল জীর্ণ এক হৃদয় আছে, আঘাতে ও আগুনে এই হৃদয় এখন ক্লান্ত। অসংখ্য গুণী লেখকের কাছে, বিজ্ঞ পাঠকের কাছে এবং সম্মানিত শত্রু বা নিন্দুকের কাছে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করি। আমাকে ক্ষমা করুন, আমি বুঝে গিয়েছি আমি ডানে ফিরলেও মন্দ, বাঁয়ে ফিরলেও মন্দ। ডানে ফিরলে লোকে বলবে, কেন বাঁয়ে তাকাইনি, নিশ্চয় কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আমার ছিল! আর বাঁয়ে ফিরলেও মন্দ, নিশ্চয় বাঁ থেকে কোনও পরশপাথর পাবার অপরাধ করেছি! কেউ আমার গালে চড় দিলেও আমার দোষ, না দিলেও আমার দোষ। এখন বেঁচে থেকেও দেখি দোষ। জানি মরলেও দোষ হবে। দোষের হাত থেকে আমার উদ্ধার নেই।
Chapter - 9 - বৃত্ত
বৃত্ত
চিত্রকলায় এ-যাবৎ নারীঅঙ্গ যত ব্যবহৃত হয়েছে, পুরুষঅঙ্গ কি তার শতভাগের একভাগও ব্যবহৃত হয়েছে? এর উত্তর আমি একবাক্যে বলব, না।
নারীর স্তন, কোমর, নিতম্ব, ঊরু, পা’র প্রতি চিত্রকরদের যে প্রচণ্ড আকর্ষণ তা পুরুষের যৌনাঙ্গ, হাত, পা, নিতম্বের প্রতি নেই। এর প্রধান কারণ কি এই যে, চিত্রকররা সাধারণত পুরুষ হয়, নারী নয়! আর চিত্রকর পুরুষ বলেই বিপরীত লিঙ্গ নারীঅঙ্গের প্রতি তাদের স্বাভাবিক এক আকর্ষণ জন্মায়। তাই তারা নারীঅঙ্গ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে! আমি অনেক নারী-চিত্রকরের কাজ দেখেছি। ওরাও নারীকে পুরুষের চোখে দেখে, পুরুষের শেখানো তুলিতে ওরা নারীকে আঁকে। আমি এমন নারী-চিত্রকর দেখতে চাই—যে চিত্রকর পুরুষের সুঠাম বাহু, পুরুষের নিতম্ব, ঊরু ও পুরুষের যৌনাঙ্গের ছবি আঁকবে। কারণ পুরুষঅঙ্গের প্রতি নারীর স্বাভাবিক এক আকর্ষণ আছেই। পুরুষের শরীর নানান রঙের খেলায় নারী-দর্শকের পিপাসাও মেটায়। শুধু রঙে ও রেখায় নয়, পুরুষের ভাস্কর্যও কম আকর্ষণীয় নয়—অন্তত নারীর চোখে।
নারী-ভাস্করকে দেখেছি নারীর স্তন গড়তে, তবে পুরুষাঙ্গ গড়বে কারা? পুরুষ যদি ভার নিয়েছে নারীকে গড়ে তোলবার তবে নারী নিশ্চয় দায়িত্ব নিতে পারে পুরুষের মূর্তি গড়বার। আমরা নারীরা পুরুষের সুঠাম, সুন্দর শরীর দেখতে চাই চিত্রকলায়, ভাস্কর্যে। আমরা আমোদিত হতে চাই পুরুষ-শরীর দেখে। আমরা তৃষ্ণার্ত হতে চাই, আহ্লাদিত হতে চাই। কয়েক শতক ধরে পুরুষ-শিল্পীদের ঘরে নারী কেবল মডেল হন। তাঁরা উলঙ্গ বসে থাকেন সামনে আর শিল্পীরা তাঁদের ছবি আঁকেন অথবা মূর্তি গড়েন। বিশ্বখ্যাত ভাস্কর রদ্যা তাঁর প্রায় কোনও নারী-মডেলকেই ভোগ না করে ছাড়েননি। আমি কোনও পুরুষ-মডেলের নাম আজ অবধি শুনিনি। পুরুষ-মডেল নারী-শিল্পীদের সামনে উলঙ্গ হয়ে বসবেন, নারী-শিল্পীরা তাঁদের ছবি আঁকবেন, মূর্তি গড়বেন এবং সবশেষে পুরুষ-মডেলদের তাঁরা ভোগ করবেন—এই ঘটনা কেন জগতে ঘটছে না, যেখানে নারীরা চিত্রকর ও ভাস্কর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত?
সেদিন এক চিত্রপ্রদর্শনীতে দেখি, এখানকার নারী-চিত্রকররা ছবি এঁকেছেন কিছু মেয়ের, ওরা আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছে, ওরা হেসে হেসে ঢলে পড়ছে একজন আরেকজনের গায়ে, ওরা সাজছে, বাঁশঝাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। কার অপেক্ষায়? নিশ্চয় পুরুষের অপেক্ষায়।
ছবির মেয়েরা যখন সাজে, আমাদের বুঝতে হবে যে এই সাজগোজ করা অর্থাৎ মুখে স্নো-পাউডার মাখানোর উদ্দেশ্য পুরুষকে প্রলোভিত করা। পুরুষকে নিজের রূপে মুগ্ধ করানো ছাড়া নারীর সত্যিকার কোনও কাজ নেই, যা চিত্রকরের তুলিতে ফুটে ওঠে, তা নিতান্তই অকর্মণ্য সজ্জিত নারীদের অলস অপেক্ষা। পুরুষ দু’একটি যা গড়া হয়েছে, তা একেবারে ফরমায়েশি, ধরা যাক স্বোপার্জিত স্বাধীনতায় মুক্তিযোদ্ধা পুরুষ, কাজি নজরুল—যা শামিম শিকদার করেছেন।
এ ছাড়া সর্বত্র নারী, এ ছাড়া সর্বত্রই নারীমুখ, নারী-শরীরের খাঁজভাঁজ প্রদর্শন। পুরুষ-শরীরকে যদি আঁকা হয় বা গড়া হয়—তা একেবারেই বীরের প্রতীক হিসেবে। নারীকে বীরের প্রতীক নয়, বীরের সঙ্গিনী বা রূপের আড়ত হিসেবেই আঁকা হয় বা গড়া হয়। নারীকে মেধার জন্য নয়, শরীরের জন্যই মূল্য দেওয়া হয় বেশি, শুধু বেশিই বা বলি কেন, সবটুকুই।
.
শুধু কি নারী চিত্রকর বা ভাস্কর? নারী-লেখকরা কী করেন? সম্প্রতি ‘রোমেনা আফাজ’ নামের এক লেখক বলেছেন, ‘নারীর স্বাধীনতা আমি পছন্দ করি না।’নারীর স্বাধীনতা আসলে নারীরাই পছন্দ করেন না, তাঁরা নারীকে মালা, দুল, চুড়ি পরিয়ে পুরুষের যোগ্য করেন, প্রেমের যোগ্য, বিবাহের যোগ্য। তাঁরা যে করেই হোক, নারীর ‘সতীত্ব’ বজায় রাখেন। যে সতীত্বের জোরে নারী-চরিত্র উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা পায়, লোকে তাকে ধন্য ধন্য করে। মনে রাখতে হবে, এই সতীত্বের সঙ্গে সততার কোনও সম্পর্ক নেই, এই সতীত্বের অর্থ যৌনাঙ্গকে অকেজো রাখা।
আমার প্রশ্ন, কেন পুরুষ-লেখকদের দেখাদেখি নারীর এই প্রবণতা? এখানকার রিজিয়া রহমান বা সেলিনা হোসেনের লেখা পড়ে কখনও মনে হয় না এ কোনও নারীর লেখা। নারীরা দুর্বল ভাষা ও দুর্বল বিষয়-বক্তব্য নিয়ে পুরুষের অনুকরণ করেন। নারী নিজেদের এতকালের অবনমন, অবদমন, এতকালের দাসত্ব, শৃঙ্খল, সর্বনাশ কিছুই প্রকাশ করেন না, তাঁদের লেখায় কোনও ক্রোধ, কোনও প্রতিবাদ ফুটে ওঠে না। তাঁরা অবিকল ‘প্রভু পুরুষের’ মতোই সুখের গদ্য লেখেন, প্রেমের কবিতা লেখেন; তাঁরা যে সমাজের ভোগ্যবস্তু, তাঁরা যে ধর্মের এবং সমাজের উপাদেয় সামগ্রী, তাঁরা যে দাসী, তাঁরা যে পুতুল, তাঁদের সারা শরীরে যে অত্যাচারের কালো দাগ, শৃঙ্খলের দাগ—কোথায় এর প্রকাশ? নারীর লেখায় কোথায় এর সামান্য ছাপ? নেই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে নারীই এসেছেন—তাঁরা আজও পুরুষের অনুকরণ করে ছবি আঁকছেন, ভাস্কর্য নির্মাণ করছেন, কবিতা লিখছেন, উপন্যাস লিখছেন, প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁদের দুর্দশার কথা কোথাও আঁকা নেই, তাঁদের পঙ্গুত্বের কথা কোথাও লেখা নেই। নারীর মুক্তি এবং প্রগতির কথা যা লেখা হচ্ছে বেশির ভাগই লিখছেন পুরুষেরা। অবশ্য সেই লেখায় ফাঁকিও আছে। কায়দা করে নিজেদের উদার এবং মহৎ সাজাবার এও আরেক কৌশল পুরুষের। এই কৌশল রপ্ত করলে বেশ আধুনিক প্রগতিশীল পুরুষ হিসেবে লোকের বাহবা পাওয়া যায়, আবার শিক্ষিত আধুনিক নারীদেরও পক্ষপাত জোটে। তাঁরাও সময়-সুযোগমতো এইসব পুরুষের গা ঘেঁষে রাস্তাঘাটে চলেন। শেষ অবধি কী হয়, এই পুরুষেরা উন্নত রুচির নারীদের সেই পুরনো রান্নাঘরেই পোরেন। নারীরা সেখানে চুলোয় খড়ি ঠেলেন, ভাত সেদ্ধ হল কি না পরখ করে দেখেন। আর ‘মুক্তবুদ্ধির পুরুষটি চুলে টেরি কেটে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সন্ধের আড্ডায় যান, সেখানে নারী-আন্দোলন নিয়ে তুখোড় আলোচনা জমে ওঠে।
অবশেষে আড্ডায় নারী-আন্দোলনকারী পুরুষেরা যে যার ঘরে গিয়ে স্ত্রী-ধর্ষণ করেন।
যাঁদের স্ত্রী নেই, তাঁরা অগত্যা বেশ্যা-ধর্ষণে অগ্রসর হন।
Chapter - 10 - নাগরিক খাঁচা
নাগরিক খাঁচা
সেদিন একটি ঝকঝকে টয়োটা স্প্রিন্টার হাতের কাছে পেয়ে মন নেচে ওঠে। শহরের প্রিয় রাস্তাগুলোয় নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়াই, গাড়ির ভেতর গান ছেড়ে দিই—“আমি কান পেতে রই,’শান্তিদেবের খোলা গলা আমাকে বিহ্বল করে রাখে। হাতে স্টিয়ারিং, ডান পায়ে চাপ দিই একস্যালেটরে, বাঁ হাতে আলতো করে বদলে দিই গিয়ার। গতি চিরকালই আমাকে আকর্ষণ করে, গতিহীন স্থবির জীবনে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
ব্যবহারের জন্য কোনও গতিময় যান আমার নেই। হঠাৎ হঠাৎ কোনও স্বজন বা বন্ধু থেকে টয়োটা বা মার্সিডিজ পেলে আমি গতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখি, দেখি জীবন যদি টপ গিয়ারে আশি কিলোমিটার স্পিডে পার করতে পারি—তবে কতদূর বেশি পৌঁছোতে পারি ঠেলা বা মানুষচালিত তিন চাকার সাইকেল রিকশার চেয়ে।
মানুষের তো নিয়মই এই, মানুষ এগোবে বেশি, কম সময়ে। আমাদের সময় বড় মাপা, বিজ্ঞান অনেক দূর অগ্রসর, এই দরিদ্র দেশের মানুষেরা আমরা অগ্রসর বিজ্ঞানকে ছুঁতে পারি না। আমরা পিছিয়ে পড়া হতশ্রী মানুষ। যানজট পেরিয়ে আমার কর্মক্ষেত্রে যেতে, যা বড়জোর দু’কিলোমিটার পথ, সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। মানুষ এখনও দু’পায়ে চাকা চালিয়ে মানুষ বহন করে। এ এক অদ্ভুত যান, রিকশা। সভ্যতা বোধহয় তৃতীয়ে বিশ্বে থমকে দাঁড়িয়ে থাকে, সম্ভবত এখানকার যানজটে সভ্যতা আটকা পড়েছে।
যানজটে, নাকি অশিক্ষার জটে? ভুল রাজনীতি ও ভুল অর্থনীতির জটে? ভুল ধর্মের জটে? সভ্যতা আটকা পড়েছে আসলে এসবেরই জটে। এই যে স্টিয়ারিং ছিল আমার হাতে, আমাকে চারদিক থেকে দেখছিল ওরা, রিকশাওয়ালা, রিকশা-আরোহী, মোটর সাইকেল চালক, বেবি-ট্যাক্সিচালক ও আরোহী, পথচারী সকলে আমাকে দেখে হাসছিল, কেউ শিস দিচ্ছিল, কেউ অশোভন মন্তব্য করছিল, কেউ ছুড়ছিল গালি, অশ্লীল বাক্য। আমি ওদের দৃষ্টি, শব্দ, বাক্যবাণে বিদ্ধ হতে হতে ভাবছিলাম—এ কীরকম দেশ, কীরকম তার মানুষ, দেশটিকে যত দেখি তত অবাক হই। সেই জন্ম থেকে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না।
আমাকে কেউ সাইড দিতে চায় না সামনে যাবার জন্য। ইনডিকেটর জ্বললেও আমাকে কেউ জায়গা দিতে চায় না এগোবার। সকলে ভিড় করে আমাকে দেখে। আসলে আমাকে দেখে না, আমার নাক-চোখ-মুখ-চুল সবই তো আর দশটি মানুষের মতোই দেখতে—-আসলে ওরা মেয়েমানুষ দেখে। মেয়েমানুষের হাতে স্টিয়ারিং- এই অদ্ভুত কাণ্ডটি ওরা দেখে। দেখে ওদের বড় আনন্দ হয়, যেন চিড়িয়াখানার বাঁদর দেখছে, যেন শিম্পাজিকে দেখছে মানুষের মতো খোসা ভেঙে বাদাম খেতে। আমি বুঝি, ওরা মেয়েমানুষের এই অদ্ভুত আচরণে বড় মজা পায়, মেয়েমানুষ যে পুরুষের মতো স্টিয়ারিং হাতে নিতে পারে তা দেখে ওরা কেউ বিস্মিত হয়, কেউ রাগ হয়, কেউ নাক সিটকে ব্যঙ্গ করে।
আমি ধলেশ্বরীর দিকে যাই, বুড়িগঙ্গা ব্রিজের ওপর দিয়ে ধলেশ্বরী নদীর দিকে চলে গেছে সবুজ বৃক্ষে ছাওয়া দীর্ঘ নির্জন পথ। লোকালয় ছেড়ে ওই নির্জনতার দিকে যেতে যেতে মনে হয় এখনও সবুজ গ্রামের মধ্যেই বোধ হয় আছে সততা ও সরলতা। সভ্যতার ক্লেদ বোধহয় ওদের মধ্যে ততটা নেই, যত আছে কলকারখানার ধুলো ও ধোঁয়ার নাগরিক জীবনে। যেতে যেতে মনে হয় আমি যদি গতিময় হতে চাই, কোথায় হব? নাগরিক ব্যস্ত পথে—নাকি নির্জন শ্যামল গ্রামে?
আমার গতিময় জীবনকে বারবারই আটকে দিচ্ছিল নাগরিক যান ও যানযাত্রীরা। বৃক্ষ আমাকে ছায়া দিচ্ছে, হাওয়া দিচ্ছে, শহর পেরিয়ে এসে দেখি মাল্টিস্টোরিড নগরের চেয়ে স্নিগ্ধ সবুজই আমাকে সম্ভাষণ জানাচ্ছে বেশি। আমি প্রকৃতির প্রতি নত হই, নম্র হই, মগ্ন হই।
একসময় গাড়ি এসে থামে ধলেশ্বরীর পাড়ে। নেমে হাঁটতে থাকি সূর্যাস্তের দিকে। আমাকে ভিড় করে দেখে বালক-বালিকারা, যুবকেরা, প্রৌঢ়রা। তাদের জিজ্ঞাসা— আমি কে? এখানে কী চাই?
বলি, দেখতে এসেছি ধলেশ্বরী দেখতে কেমন?
ওরা অবাক হয়—জল তো দেখতে সব একই, নদীর জল, পুকুরের জল, টিউবওয়েলের জল, কোনও জলে কি পার্থক্য আছে কোনও?
না, সব জল হয়তো একই, যে পাত্রে যায়, সে পাত্রের রং ধরে। তবু ধলেশ্বরী- ধলেশ্বরী কি অনেকটা ব্রহ্মপুত্রের মতো? গোড়ালি ভেজালে ঢেউ এসে চুম্বন করে পায়ে? ধলেশ্বরী কি তেমন প্রাণবান প্রেমিক? সূর্যাস্তের আলো ধলেশ্বরীর জলে খেলা করে—সেদিকে তাকিয়ে থাকি, কিন্তু স্নায়ু আমাকে উদাস হতে দেয় না, নিবিড় হতে দেয় না, ওরা সব ভিড় করে আমার কাপড়চোপড় দেখে, চুল দেখে, মুখের কথা দেখে, হাঁটা দেখে, হাসি দেখে, দৃষ্টি দেখে।
ওদের জিজ্ঞাসা—আমি মেয়েমানুষ, আমি বাইরে এসেছি কেন? আমার চুল ছোট কেন? আমি একা কেন? আমি গাড়ি চালাচ্ছি কেন?
এ-সবের উত্তর আমার দিতে ইচ্ছে করেনি। ওরা একটু-একটু করে ঘিরে ধরছিল আমাকে, আমি ওদের থাবা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আমার যানযন্ত্রের দিকে এগোলাম। স্টার্ট দিচ্ছি, ওরা কেউ ঢিল ছুড়ছে, কেউ চড় দিচ্ছে, কেউ কিল দিচ্ছে স্প্রিন্টারের ধাতব শরীরে। আমার মনে হল স্প্রিন্টারের ধাতব শরীরে নয়, ওরা আমার শরীরে দিচ্ছে চড়, কিল, ঢিল। আমার শরীরে এসে লাগছে ওদের ছুড়ে দেওয়া অবজ্ঞা।
ওদের জিজ্ঞাসা, মেয়ে হয়ে আমার এত পুরুষের মতো ঢং কেন? পুরুষেরা গাড়ি চালাবে, পুরুষেরা একা ঘুরবে, সূর্যোদয় দেখবে, সূর্যাস্ত দেখবে। মেয়েদের এ-সব সাজে না, মেয়েরা এ-সব করলে লোকে তাদের পাগল বলে, পেছনে ভিড় জমে ওঠে ঢিল ছোড়া বালকদের।
নগর আমাকে গ্রহণ করেনি। সুজলা-সুফলা গ্রামও নয়। ফিরে এসে নিজের বাড়ির গেটে জোরে ব্রেক কষি। যান নয়, যানজট নয়, আসলে এত গতি মেয়েদের মানায় না। এত গতি মেয়েরা ধারণ করুক—তা কেউ চায় না। সমাজের লোকেরা মেয়েদের পথে অসংখ্য গতিরোধক বসিয়েছে। মেয়েরা যেন স্থির হয়, স্থবির হয়, মেয়েরা যেন দুরন্ত না হয়, দুর্দান্ত না হয়, অপ্রতিরোধ্য না হয়। মেয়েরা যেন গতিহীন স্থবির বসে চুল বাঁধে, রান্না করে, ঠোটে লিপস্টিক মাখে, গালে পাউডার ঘষে আর স্বামীর অপেক্ষা করে—এর বাইরে বেরোলে প্রকৃতি হয়তো তাকে গ্রহণ করে, মানুষ কিন্তু করে না। মানুষ তাকে ছি ছি বলে। মানুষ তাকে দুয়ো দেয়।
যে মেয়েই তার জীবনে গতিসঞ্চার করে সেই দেখি জোরে ব্রেক কষে বসে। আমি কার জন্য দুঃখ করব, থেমে থাকা মেয়েদের জন্য? নাকি যারা মেয়েদের থামায় সেই বর্বরদের জন্য? কার জন্য?
Chapter - 11 - নিজ বাসভূমে পরবাসী
‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’
ছোটবেলায় ইদের চেয়ে বেশি আনন্দ করতাম পুজোয়। দুর্গাপুজো শুরু হত আর আমাদের পাড়ার অন্ধকার গলিগুলো আলোয় ভরে উঠত, গাছের পাতায় পাতায় আলো, বাড়ির দেওয়াল জুড়ে আলো, রাস্তার এক ল্যাম্পপোস্ট থেকে আরেক ল্যাম্পপোস্ট পর্যন্ত তার বেঁধে তার উপর ঝুলিয়ে দেওয়া হত নানা রঙের বাতি। চারদিকে মাইক। ভোরবেলা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গান হত। এক-একটি প্রিয় গান শুনে লাফিয়ে উঠতাম আনন্দে। মণ্ডপের পেছনে গিয়ে মাইকওয়ালার সঙ্গে গোপনে খাতির জমাতাম, বলতাম—ওই গানটি আবার দিন, ‘আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’…
পুজো এলে আমাদের পড়ালেখা সব বন্ধ। মাইকে গান হচ্ছে সারাদিন, চারদিকের গানের শব্দে পড়া যে কিছু হবে না, সে বাবাও বুঝতেন। তাই পুজোর সময় বাবাও আর ঘন ঘন পড়া দেখতে আসতেন না। আমরা সারাদিন ছুটে বেড়াতাম। কোন মূর্তি বেশি বড়, কোন মণ্ডপ বেশি সাজানো এ-নিয়ে হইহল্লা, প্রসাদ খাবার ধুম, আরতির উৎসব, সে যে কী ভীষণ আনন্দ ছিল আমাদের। বিসর্জনের দিন আমরাও চোখের জল মুছতে মুছতে ব্ৰহ্মপুত্রের দিকে যেতাম। আমার সেই আশ্চর্য সুন্দর শৈশবকে এখনও বড় ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেখি।
কেবল ইচ্ছে করলেই কি হয়? আমাদের বাড়ির ঠিক উলটোদিকের বাড়ি ছিল স্বপন-সরস্বতীদের, এখন সে-বাড়িতে এসে ঢুকেছে আব্দুস সালাম। পেছনে গৌরীদের বাড়ি কিনে নিয়েছে রইসউদ্দিন। আমাদের বাড়ির পশ্চিমের বাড়িটি প্রফুল্লদের বাড়ি। এখন কেউ নেই আর, প্রফুল্ল নেই, প্রফুল্লর না-থাকা জুড়ে ছিল প্রফুল্লর বউ। ঘিয়ের কৌটো, এলাচ, দারুচিনির কৌটো আগলে আগলে রাখতেন, সব ফেলে একদিন তিনিও চলে গেলেন, মরে কাঠ হয়ে পড়েছিলেন বিছানায়, পড়শিরা খবর পেয়ে ‘বোল হরি হরি বোল’ বলে কাঁধে তুলে তাঁকে শ্মশানে নিয়ে গেল। তাঁর মুখাগ্নি করল পাশের বাড়ির পরিতোষ। তাঁর ঘিয়ের কৌটো পড়ে আছে, পড়ে আছে দারুচিনির কৌটো। উঠোনে বড় বড় ঘাস গজিয়ে গেছে।
পুজোয় অনেকদিন যাই না ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একলা পড়ে থাকা আমার প্রিয় শহরটিতে। আমি জানি, এখন আর আগের মতো কালীপুজোর উৎসব হয় না, এখন আর সরস্বতী পুজোয় বইখাতা নিয়ে ছেলে-মেয়েরা মণ্ডপে তেমন দৌড়োয় না, এখন আর ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর নাড়ু হয় না, এখন আর আগের মতো ব্ৰহ্মপুত্রে অষ্টমী স্নানের ভিড় হয় না, এখন আর অষ্টমীর বিশাল মেলা বসে না আমপট্টি স্বদেশি বাজার, ছোট বাজারের ফুটপাতে, মাঠে, সিদ্ধেশ্বরীরা কোথায় যেন চলে গেছে, মিঠুদিরা আর নেই, গৌতম নেই, যাদব নেই, নিয়তিদি, মায়াদি, রতনকাকু, শোভা, যমুনাদি, সুধীরদা, শ্যামলদা, কোথায় যেন চলে যাচ্ছে।
শুনেছি, জিনিসপত্র সব বেচে দিয়ে ওরা ভারত চলে যাচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে ওরা একটি নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে। বাপ-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে ওরা এক কাপড়ে দেশত্যাগ করছে। ঘরবাড়ি ফেলে ওরা আরেক দেশের উদ্বাস্তু হচ্ছে। লক্ষ লোক দেশ ছেড়ে, নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তপ্রহরীকে দুশো-পাঁচশো টাকা ঘুষ দিয়ে কাঁটাতার পার হচ্ছে। পাকিস্তানের বর্বর পশুগুলো বাঙালির লুঙ্গি তুলে পরীক্ষা করত তার ধর্ম। এখনও স্বাধীনতার একুশ বছর পরও বাঙালির লুঙ্গি তুলে পরখ করা হয় তার ভোট দেবার অধিকার আছে কি নেই, চাকরিতে তার পদোন্নতি হবে কি না, তার ঘরদোর লুট হবে কি না।
কেরানিগঞ্জের ভালবাসা সরকার আমাকে জানিয়েছেন, যাঁরা শাঁখা-সিঁদুর পরেন, তাঁদের কাউকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি গত নির্বাচনে। আগের রাতে কারা যেন বাড়ি বাড়ি এসে বলে গেছে, ‘কাল তোরা কেউ ঘরের বার হবি তো গলা কাইট্টা ভাসাইয়া দিমু বুড়িগঙ্গায়।’ ভোট দিতে ভালবাসা যাননি, হরিপদ যাননি, নীলরতন যাননি। নব্বইয়ের দাঙ্গায় লুট হয়েছে দেবব্রতদের ঘরবাড়ি। নারায়ণ বসু রিটায়ার করেছেন, পদোন্নতি হয়নি তাঁর, জুনিয়ররা তাঁকে কবেই টপকে গেছে।
খুব গোপনে এই দেশ কিন্তু বড় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। শেকড় উপড়ে চলে যাচ্ছে দেশের মানুষ। তারা আর ফিরবে না। শেকড়ের গভীর ক্ষত বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এই দুর্ভাগা দেশের দীর্ঘশ্বাস আমাদের গায়ে কি কাঁটার মতো বিঁধবে না? আমরা কি কোনওদিন দগ্ধ হব না অনুশোচনার তীব্র আগুনে?
কল্যাণী মুখার্জি আমার মায়ের মতো ভালবাসেন আমাকে। ছোটবেলায় তাঁর ছোট মেয়ে মিতালি মুখার্জির গানের মুগ্ধ শ্রোতা ছিলাম আমি। বিদ্যাময়ী স্কুলের অডিটোরিয়ামে গানের আসর বসত, মিতালির গান শুনতে আমি সামনের সারিতে গিয়ে বসতাম। সেই মিতালি এখন বড় শিল্পী। আর এই শিল্পীর গর্বিত মা ঘরবাড়ি বিক্রি করে, বাপ-ঠাকুরদা স্বামী-শ্বশুরের ভিটে ফেলে, স্বজন-পড়শি, জন্মজন্মান্তরের গাছপালা, নদী-মাঠ ফেলে চলে যাচ্ছেন সীমান্তের ওই পারে। আমি তাঁর চলে যাওয়ার দিকে অবাক তাকিয়ে আছি; আমার মায়ের সমান মানুষটি তাঁর মায়ামমতার শেকড় উপড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছেন, দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি এবং স্বপ্ন মাড়িয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কি তাঁর দুর্মতি? নাকি অন্য কিছু? তাঁর শাঁখা-সিঁদুর, তাঁর নামের পদবি? অমাবস্যার শব্দে তাঁর হঠাৎ জেগে ওঠা, ঘোর অনিশ্চয়তা, নিদ্রাহীন দীর্ঘ রজনি? ঝিঁঝির ভুতুড়ে ডাক, ঘর লুট, তুলসীতলায় কুডুলের কোপ? কল্যাণী মুখার্জি দু’চোখ বুজলেই শোনেন ‘বোল হরি হরি বোল’ বলে কালীবাড়ি শ্মশানঘাটের দিকে চলে যাওয়া দু’কোটি মানুষের পায়ের শব্দ।
আমি তাঁকে কী বলে ফেরাব? এ তো তাঁরই দেশ—এই দেশ তাঁকে মাটির কামড় দিয়ে আটকাবে কী, তাঁকে তো দেশের মানুষই কামড়াচ্ছে ঢের বেশি। গত পয়লা আগস্ট কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে বাঙালি সম্মেলন অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় বলেছেন, ‘দেশকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে, এর জন্য পরকে দোষ দিতে পারি। কিন্তু লোক বিনিময়ের দুর্মতি এল কোন সূত্র থেকে? এখনও সে-রকম প্রয়াসের অন্ত হয়নি। বাঙালির দুর্গতির মূলে তাঁর দুর্মতি। আর এই দুর্মতি দূর না হলে তাঁর দুর্গতিও দূর হবে না।’
বাঙালির দুর্মতি কবে দূর হবে, আমি জানি না। ওখানকার শওকত ওসমান, রশিদ করিম, শওকত আলি, শফি আহমেদ এখন এখানে—এখানকার বুদ্ধদেব বসু, শ্ৰীপান্থ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, গৌরকিশোর ঘোষ ওখানে। ‘লোক বিনিময়’ চলছেই। শেকড় ওপড়ানো ক্ষত অধিকাংশের বুকে। রক্তাক্ত হৃদয় তাঁদের। আর সকল জাতির দুর্গতি তো দূর হয়, কেবল বাঙালির হয় না।
আমরা এক ‘নেশন’ ছিলাম। দুই ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে সাতচল্লিশে দুই ‘নেশন’ বলে রায় দেওয়া হল। এক বোম্বেওয়ালা মুসলমান ক্ষমতার লোভে এক নেশনকে দুই নেশনে ভাগ করল, ভাগ করল দেশ, প্রদেশ। সাতচল্লিশের পাপ আমরা ধুয়ে ফেলেছি একাত্তরে। একাত্তরে আমরা দেখিয়েছি ধর্ম কখনও জাতিগঠনের ভিত্তি নয়।
বাঙালির জাতীয়তাবাদের জন্য আমরা এখনও লড়াই করছি, বাঙালির কৃষ্টি, ঐতিহ্য, বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখবার জন্য সভাসমিতিতে বক্তৃতা দিচ্ছি। অথচ আমাদের বাঙালি স্বজন, বাঙালি পড়শি মাটির মায়া ত্যাগ করে যাচ্ছেন নিরুদ্দেশযাত্রায়। তাঁদের আমরা বেঁচে থাকবার ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারি না। আর এদিকে ‘বাঙালি’ বলে আমরা গর্ববোধ করি। বাঙালি কি আদৌ কোনও মানুষের জাত?
Chapter - 12 - সকল সন্তানই বৈধ
সকল সন্তানই বৈধ
প্রাচীন গ্রিসের দুটো মহাকাব্য ইলিয়ড এবং ওডিসির কথা আমরা জানি, জানি ভারতের রামায়ণ ও মহাভারতের কথাও। মহাভারতের অমর কবি মহামনীষী ব্যাস অবিবাহিতা মৎস্যগন্ধার সন্তান ছিলেন। আমরা নিশ্চয়ই মৎস্যগন্ধার কাছে কৃতজ্ঞ।
মোট এগারোটি উপনিষদকে যৌক্তিক বলে মনে করা হয়, ছান্দোগ্য উপনিষদ এদের অন্যতম। ছান্দোগ্য উপনিষদের কাহিনিটি এ-রকম—বহুচারিণী জবালার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন মুনি সত্যকাম। সত্যকাম ঋষি গৌতমের শিষ্য হওয়ার জন্য গৃহত্যাগ করবার উদ্যোগ নেন। গৃহত্যাগের সময় সত্যকাম মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কোন গোত্রে বা বংশে আমি জন্মেছি?’ মা জবালা জবাব দেন—তুমি যে কোন বংশ বা পরিবারের তা তো জানি না। যৌবনে বহু লোকের পরিচর্যা করে তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি। কাজেই তুমি কোন বংশ বা পরিবারের তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নাম জবালা আর তুমি সত্যকাম। সুতরাং বলতে পারো তুমি সত্যকাম জ্বালা’ অর্থাৎ জবালার পুত্র সত্যকাম। যেমন মরিয়মের পুত্র জিশু।’
শুধু জবালাপুত্র সত্যকাম নয়—গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, কুন্তীপুত্র কর্ণ ও ঘৃতাচীপুত্র দ্রোণ সম্পর্কেও একই কথা। মুনি, কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন প্রমুখ বিশ্বপূজ্য পুরুষেরা জারজ পুত্র। অগণিত বীরপ্রসূ বারাঙ্গনা পৃথিবীকে ধন্য করেছেন।
অজারজ (Born in wedlock) ও জারজ (not born in wedlock) সন্তানে তবে পার্থক্য কী? ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষেরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, স্বয়ং ঈশ্বরই অজারজ ও জারজে কোনও পার্থক্য করেননি। পার্থক্য করেছে আসলে পৃথিবীর মানুষেরা। পৃথিবীর মানুষেরা বৈষম্য নির্মাণ করেছে শ্রেণির, উচ্চবিত্তে-নিম্নবিত্তে, বড় জাতে-ছোট জাতে। তবে কি এ-কথাই সত্য যে, ঈশ্বরের চেয়ে মানুষের স্পর্ধা বেশি মানুষকে ঘৃণা করবার? ঈশ্বর মানুষকে অসম্মান করেননি, কিন্তু মানুষ করেছে। তারা কি ঈশ্বরকে ছাড়িয়ে যেতে চায় প্রভুত্বে এবং কর্তৃত্বে? আমি তাদের এই স্পর্ধা দেখে বিস্মিত হই। মানুষের নিয়মের জালে বন্দি হয় মূলত মানুষই। এই পৃথিবীতে যাবতীয় নিয়ম ও নীতির প্রবর্তক মূলত পুরুষ। তাই পুরুষের তৈরি বিভিন্ন ফাদে নারীই পতিত হয়। পুরুষের তৈরি বিধানের জালে নারীকেই জড়াতে হয় জীবন। ‘জারজ’ শব্দটিকে ঘৃণা করা হয়, ঘৃণা করা হয় ‘জারজ’ সন্তানধারক নারীকে, ঘৃণা কিন্তু পুরুষকে করা হয় না, অথচ পুরুষের ব্যভিচার বা ধর্ষণে আক্রান্ত নারীকেই জারজের দায় বহন করতে হয়। পুরুষকে কোনও দায় ভোগ করতে হয় না, লজ্জা পোহাতে হয় না, সমাজের ছুড়ে দেওয়া থুতু নারীর গায়েই লাগে, পুরুষেরা বেঁচে যায় অসতীত্ব ও জারজ-জন্মের পাপ থেকে। তবে কি এ-কথা সত্য নয় যে, পুরুষের নিয়ম ও নীতির জালে কেবল নারীর আটকা পড়বার ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।
এ-কথা সত্য, আমি জানি, অনেকেই আমার মতো জানে। জানে, কিন্তু সকলে হাত গুটিয়ে বসে থাকে, জিহ্বা আড়ষ্ট করে সকলে নির্বিকার চেয়ে থাকে পেছনের দিকে। যেন পেছনই এখন আরাধ্য, অতীত এবং আদিই যেন এখন প্রার্থনীয়। আমরা যদি না এগোতে পারি সামনে, আমরা যদি না ছিঁড়তে পারি গায়ে জড়িয়ে থাকা শৃঙ্খল, আমরা যদি তাবৎ নিয়ম ও রীতির শরীর থেকে খুলে নিতে না পারি অন্ধত্ব, তবে কী লাভ এই পৃথিবীতে এই প্রজন্মের মানুষ হয়ে বেঁচে থেকে? কিছু লোভী ও কামুক পুরুষের তৈরি সমাজ ও সংস্কার আমাদের ক্রমাগত পেছনে ঠেলছে। আর আমরাও সময়ের ভীত ও সন্ত্রস্ত প্রজন্ম, সবই মাথা পেতে বরণ করে নিচ্ছি।
বোধোদয় কবে হবে আমাদের? আমরা কবে মুক্তি পাব চেতনার এই সর্বনাশ থেকে? বুদ্ধির স্খলন থেকে? কেউ কি নেই, যে দাঁড়ায়—দাঁড়িয়ে বলে মানি না! এত দেখি নারী-পত্রিকা, নারী-সংগঠন গজিয়ে উঠেছে শহরে, গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়! কেউ তো উদ্ধত, দুর্বিনীত একবারও বলছে না—‘মানি না’। সকলে কিছু খোরপোশ চায়, সকলে কিছু খুদকুঁড়ো চায়—সামান্য সুযোগ কিংবা সুবিধা হলেই সকলের স্বস্তি। কেউ উপড়ে ফেলতে চায় না শেকড়, কেউ একটি অসুস্থ বৃক্ষের গোড়া ধরে টান দিতে চায় না সজোরে। কেবল বিনীত নিবেদন, কেবল দু’ফোঁটা আনন্দের জন্য আকুলতা। কী লাভ এই সামান্য করুণালাভে?
নারীকে অবদমনের যাবতীয় ডালপালা, যাবতীয় শেকড়বাকড় উপড়ে ফেলে সমাজের গোড়ার ঘা সারাতে চাই। এতে আমার ক্ষতি হবে জানি। আমার সমাজ-সংসার উচ্ছন্নে যাবে, ব্যক্তি-আমাকে অপদস্থ হতে হবে নিরন্তর। কিন্তু তবুও এই যে আমি দাঁড়িয়েছি, একা এবং দুর্বিনীত, আমি এমন অনড় দাঁড়াবই। আমার দুটো জিনিসই হাতে সম্বল—সাহস এবং সততা।
Chapter - 13 to 20
সকল সন্তানই বৈধ
প্রাচীন গ্রিসের দুটো মহাকাব্য ইলিয়ড এবং ওডিসির কথা আমরা জানি, জানি ভারতের রামায়ণ ও মহাভারতের কথাও। মহাভারতের অমর কবি মহামনীষী ব্যাস অবিবাহিতা মৎস্যগন্ধার সন্তান ছিলেন। আমরা নিশ্চয়ই মৎস্যগন্ধার কাছে কৃতজ্ঞ।
মোট এগারোটি উপনিষদকে যৌক্তিক বলে মনে করা হয়, ছান্দোগ্য উপনিষদ এদের অন্যতম। ছান্দোগ্য উপনিষদের কাহিনিটি এ-রকম—বহুচারিণী জবালার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন মুনি সত্যকাম। সত্যকাম ঋষি গৌতমের শিষ্য হওয়ার জন্য গৃহত্যাগ করবার উদ্যোগ নেন। গৃহত্যাগের সময় সত্যকাম মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কোন গোত্রে বা বংশে আমি জন্মেছি?’ মা জবালা জবাব দেন—তুমি যে কোন বংশ বা পরিবারের তা তো জানি না। যৌবনে বহু লোকের পরিচর্যা করে তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছি। কাজেই তুমি কোন বংশ বা পরিবারের তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নাম জবালা আর তুমি সত্যকাম। সুতরাং বলতে পারো তুমি সত্যকাম জ্বালা’ অর্থাৎ জবালার পুত্র সত্যকাম। যেমন মরিয়মের পুত্র জিশু।’
শুধু জবালাপুত্র সত্যকাম নয়—গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, কুন্তীপুত্র কর্ণ ও ঘৃতাচীপুত্র দ্রোণ সম্পর্কেও একই কথা। মুনি, কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন প্রমুখ বিশ্বপূজ্য পুরুষেরা জারজ পুত্র। অগণিত বীরপ্রসূ বারাঙ্গনা পৃথিবীকে ধন্য করেছেন।
অজারজ (Born in wedlock) ও জারজ (not born in wedlock) সন্তানে তবে পার্থক্য কী? ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষেরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, স্বয়ং ঈশ্বরই অজারজ ও জারজে কোনও পার্থক্য করেননি। পার্থক্য করেছে আসলে পৃথিবীর মানুষেরা। পৃথিবীর মানুষেরা বৈষম্য নির্মাণ করেছে শ্রেণির, উচ্চবিত্তে-নিম্নবিত্তে, বড় জাতে-ছোট জাতে। তবে কি এ-কথাই সত্য যে, ঈশ্বরের চেয়ে মানুষের স্পর্ধা বেশি মানুষকে ঘৃণা করবার? ঈশ্বর মানুষকে অসম্মান করেননি, কিন্তু মানুষ করেছে। তারা কি ঈশ্বরকে ছাড়িয়ে যেতে চায় প্রভুত্বে এবং কর্তৃত্বে? আমি তাদের এই স্পর্ধা দেখে বিস্মিত হই। মানুষের নিয়মের জালে বন্দি হয় মূলত মানুষই। এই পৃথিবীতে যাবতীয় নিয়ম ও নীতির প্রবর্তক মূলত পুরুষ। তাই পুরুষের তৈরি বিভিন্ন ফাদে নারীই পতিত হয়। পুরুষের তৈরি বিধানের জালে নারীকেই জড়াতে হয় জীবন। ‘জারজ’ শব্দটিকে ঘৃণা করা হয়, ঘৃণা করা হয় ‘জারজ’ সন্তানধারক নারীকে, ঘৃণা কিন্তু পুরুষকে করা হয় না, অথচ পুরুষের ব্যভিচার বা ধর্ষণে আক্রান্ত নারীকেই জারজের দায় বহন করতে হয়। পুরুষকে কোনও দায় ভোগ করতে হয় না, লজ্জা পোহাতে হয় না, সমাজের ছুড়ে দেওয়া থুতু নারীর গায়েই লাগে, পুরুষেরা বেঁচে যায় অসতীত্ব ও জারজ-জন্মের পাপ থেকে। তবে কি এ-কথা সত্য নয় যে, পুরুষের নিয়ম ও নীতির জালে কেবল নারীর আটকা পড়বার ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।
এ-কথা সত্য, আমি জানি, অনেকেই আমার মতো জানে। জানে, কিন্তু সকলে হাত গুটিয়ে বসে থাকে, জিহ্বা আড়ষ্ট করে সকলে নির্বিকার চেয়ে থাকে পেছনের দিকে। যেন পেছনই এখন আরাধ্য, অতীত এবং আদিই যেন এখন প্রার্থনীয়। আমরা যদি না এগোতে পারি সামনে, আমরা যদি না ছিঁড়তে পারি গায়ে জড়িয়ে থাকা শৃঙ্খল, আমরা যদি তাবৎ নিয়ম ও রীতির শরীর থেকে খুলে নিতে না পারি অন্ধত্ব, তবে কী লাভ এই পৃথিবীতে এই প্রজন্মের মানুষ হয়ে বেঁচে থেকে? কিছু লোভী ও কামুক পুরুষের তৈরি সমাজ ও সংস্কার আমাদের ক্রমাগত পেছনে ঠেলছে। আর আমরাও সময়ের ভীত ও সন্ত্রস্ত প্রজন্ম, সবই মাথা পেতে বরণ করে নিচ্ছি।
বোধোদয় কবে হবে আমাদের? আমরা কবে মুক্তি পাব চেতনার এই সর্বনাশ থেকে? বুদ্ধির স্খলন থেকে? কেউ কি নেই, যে দাঁড়ায়—দাঁড়িয়ে বলে মানি না! এত দেখি নারী-পত্রিকা, নারী-সংগঠন গজিয়ে উঠেছে শহরে, গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায়! কেউ তো উদ্ধত, দুর্বিনীত একবারও বলছে না—‘মানি না’। সকলে কিছু খোরপোশ চায়, সকলে কিছু খুদকুঁড়ো চায়—সামান্য সুযোগ কিংবা সুবিধা হলেই সকলের স্বস্তি। কেউ উপড়ে ফেলতে চায় না শেকড়, কেউ একটি অসুস্থ বৃক্ষের গোড়া ধরে টান দিতে চায় না সজোরে। কেবল বিনীত নিবেদন, কেবল দু’ফোঁটা আনন্দের জন্য আকুলতা। কী লাভ এই সামান্য করুণালাভে?
নারীকে অবদমনের যাবতীয় ডালপালা, যাবতীয় শেকড়বাকড় উপড়ে ফেলে সমাজের গোড়ার ঘা সারাতে চাই। এতে আমার ক্ষতি হবে জানি। আমার সমাজ-সংসার উচ্ছন্নে যাবে, ব্যক্তি-আমাকে অপদস্থ হতে হবে নিরন্তর। কিন্তু তবুও এই যে আমি দাঁড়িয়েছি, একা এবং দুর্বিনীত, আমি এমন অনড় দাঁড়াবই। আমার দুটো জিনিসই হাতে সম্বল—সাহস এবং সততা।
‘জারজ’ শব্দের বিলুপ্তি চাই
জোসেফের সঙ্গে মেরির শারীরিক সম্পর্ক হয়তো হয়নি কিন্তু অন্য পুরুষের সঙ্গে হয়েছিল, এ-কথা চার্চের অনেকেই আজকাল বিশ্বাস করেন। ক্যাথলিক র্যাংক হিনিমেন বলেছেন—জিশু হচ্ছে a monstrous product of neurotic sexual fanta- sy, এ কথা শুনে ভ্যাটিকান থেকে মত দেওয়া হয়েছে——The church doesn’t have problems with sex . The world does.
পুরুষের স্পার্মাটোজোয়া নামক পদার্থটি ছাড়া নারীর জরায়ু নানা রকম সন্ত্রাস হয়তো জন্ম দিতে পারে, কিন্তু সন্তান নয়। এই কথাটি যে-কোনও সুস্থ মানুষই স্বীকার করতে বাধ্য। কুমারী নারীর গর্ভে সন্তানধারণ বৈধ নয়—পুরুষ-তৈরি এই নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি প্রতিটি নারীর জরায়ু। নারীর যেমন কোথাও স্বাধীনতা নেই, নারীর জরায়ুরও নেই। জিশু রক্ষা পেয়েছেন জারজ শব্দটির হাত থেকে। ‘ঈশ্বর’ তাঁকে রক্ষা করেছেন। ঈশ্বর শুধু জিশুকেই রক্ষা করেছেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে করেননি। এমন আরও অনেককে করেননি। ষোলো বছরের কুমারী মেয়ের সন্তান লিওনার্দো দা ভিঞ্চির পক্ষে সম্ভব হয়েছে ‘লাস্ট সাপার’, ‘ভার্জিন অব দ্য রকস’, ‘দ্য এডোরেশন অব দ্য মেগি’র মতো অবিস্মরণীয় শিল্পসৃষ্টি। এই জারজ সন্তানের শিল্প বিভিন্ন গির্জায় এখন সম্মানিত হয়।
ফিলিপপিনো লিপপির ‘জন্মের ঠিক নেই’ কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি বহু ধর্মযাজকের ঈর্ষার কারণ। লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে রাখা তাঁর ‘দি ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড উইদ সেন্ট ডোমেনিক’ ছবির পটভূমিতে আছে, ‘শুভ্র বসন্ত-পুষ্পের পবিত্রতা’ ও স্নিগ্ধতা, ‘তরুশ্রেণির ও দিগন্তের নম্র নীল আকাশে অপার অগাধ শান্তির অনন্ত আশ্বাস’।
বুদ্ধিভিত্তিক রেনেসাঁসের স্রষ্টা ও রাজা ছিলেন মহাত্মা মার্টিন লুথারের বন্ধু, রোটডামের ওলন্দাজ মনীষী ইরাস মাস। ইরাস মাস এক ধর্মযাজকের ‘অবৈধ সন্তান’। তাঁকে বাদ দিয়ে রেনেসাঁসের কল্পনা করা যায় না। “He is considered by many scholars the greatest Humanist of the entire Renaissance” Doris van de Bogart (Introduction to the greatest Humanities. New York) fa আলেকজান্ডার পোপ তাঁর Essay on criticism-এ ইরাস মাসকে যাজককুলের গৌরব বলেছেন।
পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হার্মেঞ্জ ভ্যান রাইন রেমব্রান্ট আমস্টারডামের ওলন্দাজ। তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম সাপার অ্যাট ইউমাস এবং দ্য নাইট ওয়াচের আলো-ছায়ার খেলার চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হয়নি এমন কেউ নেই। এই অন্তর্মুখী শিল্পী হেনড্রিকিযে স্টফেলস নামের এক তরুণীকে সারা জীবনের সঙ্গী করেন। আনুষ্ঠানিক বিয়ে প্রয়োজন মনে না হওয়ায় তাঁরা বিয়ে করেননি। হেনড্রিকিযে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় ক্যালভিনিস্ট চার্চের পাণ্ডারা মায়ের পাপে অজাত সন্তানের নরকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয় দেখান।
ফ্রান্সের সৃষ্টিশীল দার্শনিক, জ্ঞানদীপ্ত চিন্তাবিদ্, শ্রেষ্ঠ অঙ্কবিদ জ্যা রঁ দালেম বেয়ার ছিলেন মাদাম দ্য তস্যার ‘অবৈধ সন্তান’। তাঁর পিতা শেভালিয়ে দেসতুশে ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর কমিসার জেনারেল, তিনি পুত্রকে এমন প্রখর শিক্ষায় শিক্ষিত করেন যে, এই পুত্রই হয়ে ওঠেন কালের শ্রেষ্ঠতম গণিতবিদ। প্রখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক গি দ্য মোপাসাঁর পিতা ছিলেন গুস্তভ ফ্লবের, মোপাসাঁর মা লবের সঙ্গে ছিল তাঁর ‘অবৈধ সম্পর্ক’। এতে মোপাসাঁর প্রতিভার কোনও হেরফের হয়নি।
আমরা কনফুসিয়াসের কথা জানি। তাঁর নাম আসলে কংফু-সে। চিনের বিখ্যাত দার্শনিক কনফুসিয়াস তাঁর জ্ঞান, মনীষা ও পাণ্ডিত্যের কারণে খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৭ অব্দে চিনের বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী হন। কনফুসিয়াস ছিলেন সুনীতি ও সদাচরণের প্রবক্তা—তিনি চিনের জনগণকে ভদ্র, সদাচারী, মহৎ ও সংস্কৃতিমনস্ক করে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি ধর্মগ্রন্থের সমান সম্মান পেয়েছিল, যে সম্মান হিন্দুরা বেদ ও গীতাকে, খ্রিস্টানরা বাইবেলকে এবং মুসলমানরা কোরানকে করে। আড়াই হাজার বছর ধরে চিনের মানুষ তাঁকে The most Sage Ancient Teacher হিসেবে শ্রদ্ধা করছে। তাঁর পিতা শানতুং প্রদেশের এক জেলার গভর্নর। কিন্তু লোকে বলে কনফুসিয়াস তাঁর পিতার ঔরসে জন্মগ্রহণ করেননি। এ তো সামান্য ক’টি উদাহরণ। পুরো পৃথিবীতে এমন প্রচুর কৃতী সন্তান।
পৃথিবীতে অনেক অসভ্য শব্দের জন্ম হয়েছে—এর মধ্যে ‘জারজ’ শব্দটি অন্যতম একটি। মানুষের সকল জন্মই বৈধ। কোনও সন্তানই অবৈধ নয়, সব সন্তানই মানবসন্তান। জারজ ও অজারজ সন্তানে কোনও পার্থক্য নেই। সব সন্তানই বৈধ, সব সন্তান সুন্দর, পবিত্র।
যে নারীকে অসতী বলা হয়, যে শারীরিক সম্পর্কের কারণে বলা হয়, সে-কারণে, কোনও পুরুষকে এ-জাতীয় কোনও নামে অসম্মানিত করা হয় না। তাই ‘অসতী’– এই অশ্লীল ও অসভ্য শব্দটি সমাজ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়া যেমন উচিত, ‘জারজ’ শব্দটিরও তেমন,বিলুপ্তি দরকার।
নারীভোজ
বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, একটা সময় ছিল যখন কিছু উৎসর্গ করা হত। এই ‘কিছু’ কিন্তু জ্যান্ত, কচি, টগবগ করে লাফায় এমন প্রাণী, প্রাণীর মধ্যে আবার যে-সে প্রাণী নয়, একেবারে মানুষ। মানুষ তো দু’রকমের, এক বড়জাতের দুই ছোটজাতের। ছোটজাতের মধ্যে পড়ে ‘মেয়েমানুষ’, সেই মেয়ে মানুষই, কুমারী মেয়ে। কুমারী মেয়েকে বলি দেওয়া হত প্রভু এবং কল্যাণের নামে।
গ্রিসের উর্বরতা, বিবাহ এবং প্রজননের দেবী আর্তেমিস একবার আগামেমননের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে চাইলেন আগামেমননের কন্যা ইফজেনিয়াকে। ইফজেনিয়াকে বলি দেবার সময় আর্তেমিস অবশ্য একটি মৃগী বলি দিতে আদেশ করলেন। আর ইফজেনিয়া হয়ে গেল আর্তেমিসের মন্দিরে দেবদাসী। দেবদাসী হওয়া এবং বলি হওয়ার মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য করি না।
ট্রয়ের নৃপতি প্রিয়াসের কন্যা পলিকসেনা ছিল একিলিসের বাগদত্তা। ট্রয় ধ্বংসে একিলিসের মৃত্যুর পর প্রেতাত্মা এসে দাবি করল পলিকসেনার বলি। গ্রিকরা একিলিসের সমাধির উপর অগত্যা পলিকসেনাকে বলি দিল। প্রেতাত্মার উদ্দেশ্যেও বলি হয়, বলি অবশ্য কেবল নারীকেই দেওয়া হয়।
দুর্ভিক্ষ বা মহামারিতে এথেন্সের জনগণ এক দৈববাণীর আদেশ মান্য করে গেরিসটাস সাইক্লপস-এর সমাধির উপর হেসিস্থাসের কন্যাদের বলি দিত।
লোক্রিস থেকে একবার এক কুমারীদলকে এথেনার মন্দিরে পৌরোহিত্য করবার জন্য সেবাদাসী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। পরে সেই কুমারীদের হত্যা করা হয়। আর হত্যার ছাই পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। দেবতা থেকে শুরু করে প্রেতাত্মা পর্যন্ত কুমারী মেয়ের রক্তপান করে সন্তুষ্ট হতেন। যুদ্ধের দেবতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য দেশের রাজা, এমনকী সাধারণ নাগরিকও কুমারী বলির জন্য আগ্রহ দেখাতেন।
শুধু প্রাচীন গ্রিসেই নয়, কেলটিক জনগোষ্ঠীর পুরোহিত দ্রুইদরা দেবতার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুমারী বলি দিতেন। প্রাচীন ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ, ওয়েলস আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীদের মধ্যেও কুমারী-বলিপ্রথা প্রচলিত ছিল। জিহোবার উদ্দেশ্যে কুমারী-বলির কথা বাইবেল থেকেই জানা যায়।
দক্ষিণভারতে শক্তিসাধন পদ্ধতির অঙ্গ হিসেবে কুমারী-বলির প্রচলন ছিল। কারও আরোগ্যকামনায় কালীদেবীর কাছে কুমারী বলি দেওয়ার ঘটনা বেশ ঘটত। পাঞ্জাবের কাংড়া পার্বত্য অঞ্চলে প্রতি বছর একটি প্রাচীন দেবদারু গাছের কাছে একটি কুমারী মেয়েকে বলি দেওয়া হত। নগ্নদেহ কুমারীকে শস্যখেতে নিয়ে হত্যা করলে খেতের উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়—এই বিশ্বাস পৃথিবীর সকল জাতিকোষগুলোর মধ্যে ছিল। কুমারী কন্যার আত্মাহুতি শুকনো পুকুরকে জলে পূর্ণ করে—এমন বিশ্বাসও প্রচলিত ছিল পাঠানকোটের কাছে চম্পাবতী শহরে।
নীলনদের জল যেন বাড়ে, এই কামনা করে প্রতি বছর একটি কুমারী মেয়েকে নীলনদে ডুবিয়ে দেওয়া হত। নীলনদের জলস্ফীতি আমার দেখা হয়নি, আমি জানি না, বছরের কুমারীভোগ ওকে কতটা টইটম্বুর করত।
মিশরের প্রাচীন সিলমোহরেও প্রতি বছর একটি যুবক ও যুবতীকে বলি দেওয়ার ঘটনা লেখা আছে।
গ্রেট বেনিনের একটি মেয়েকে এক গাছের ডালে বেঁধে চাবকে মেরে ফেলা হয়েছিল। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, মেয়েটি ওই গাছেই ঝুলে থাকবে। শকুনে তাকে খাবে। এই মেয়ে-বলির উদ্দেশ্য বর্ষণ-এর দেবতার অনুগ্রহ লাভ।
মড়ক লাগলে ‘চিপোয়া’রা মনে করত এ তাদের পাপের ফল। এই পাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং প্লেগের হাত থেকে বাঁচবার জন্য তারা গোষ্ঠীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে জলে ডুবিয়ে মারত।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে দৈত্যদেবী পেলির কাছে কুমারী মেয়েকে উৎসর্গ করা হত। আগ্নেয়গিরি ‘কিলোউয়া’র দেবী পেলি। বলির নিয়ম ছিল আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে মেয়েটিকে ভেতরের গনগনে লাভার মধ্যে ফেলে দেওয়া।
মালডাইভ দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা দেখত প্রতি মাসে একটি জিন অসংখ্য প্ৰদীপ জ্বালিয়ে একটি জাহাজে করে দ্বীপের দিকে আসছে। দেখে দ্বীপবাসীরা যে-কোনও কুমারীকে নতুন বধূর সাজে সাজিয়ে সমুদ্রপাড়ের মন্দিরে রেখে আসত। পরদিন মেয়েটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যেত। পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীরা কুমির রাজপুত্রকে তৃপ্ত করবার জন্য একই কাজ করত।
প্রায় সকল আদিম, অসভ্য জাতি মেয়ে-শিশুকে হত্যা করত। রাজপুতরা করত, আরবেরা কন্যা জন্মালে জ্যান্ত পুঁতে ফেলত। কেঁধা প্রদেশের আরবেরা মেয়ে-শিশুর পাঁচ বছর বয়সে শিশুর মাকে বলত—‘এইবার মেয়েকে গন্ধ মাখিয়ে দাও, সাজিয়ে দাও, আজ সে তার মায়ের ঘরে যাবে।’ এর অর্থ, মেয়ে এখন কুয়োর মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। কোরাইশ বংশের লোকেরা মক্কার কাছে আবুদেলামা পাহাড়ে নিজেদের কন্যাকে হত্যা করত। অস্ট্রেলিয়ার অসভ্য অধিবাসীরাও কুমারী মেয়েকে জীবন্ত পুঁতে ফেলে ভূদেবীকে প্রসন্ন করত এবং সেই কবরের উপর সমস্ত গ্রামের শস্যবীজ রেখে যেত, তারা বিশ্বাস করত, মেয়ে দেবতা হয়ে ওই বীজের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং শস্য ভাল হবে। চিনের প্রাচীন এবং পবিত্র শহর ‘পিকিন’-এর ঘণ্টা নির্মাণের পেছনেও আছে কুমারী কন্যার আত্মাহুতি। ঘণ্টার উত্তপ্ত মিশ্র ধাতুকে যথোপযুক্ত করে গড়ে তুলবার জন্য কারিগরের কন্যাকে আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রথম ঋতুমতী কুমারী মেয়ের ঋতুরজঃ ব্যবহৃত হত জার্মানিতে শানিত তরবারি তৈরির লোহাকে উত্তপ্ত করবার জন্য। জাপানে বছরের এক বিশেষ সময় সাপ ও বানরের কাছে কুমারী মেয়েদের উৎসর্গ করা হত। কোরীয় রাজ্য-সমাধির উপর একইসঙ্গে নরনারী বলি দেওয়ার রীতি ছিল। নিউগিনির আদিম অধিবাসীরাও কুমারী বলি দিত। পিউবারটি রাইটস নামের অনুষ্ঠানে একজন কুমারী মেয়েকে বিচিত্র রং ও পোশাকে সাজিয়ে উৎসবের উদ্যোক্তারা একের পর এক মেয়েটির সঙ্গে মিলিত হয়। মন্ত্রোচ্চারণ হয়, বাদ্যযন্ত্র বাজে, তারপর মেয়েটির সঙ্গে শেষ মিলনের জন্য একটি তরুণকে নির্বাচন করা হয়। মিথুনাবস্থায় ওদের উপর ভারী কিছু ফেলে ওদের পিষে মারা হয়। বাদ্যযন্ত্র ও জনতার উল্লাস ওদের আর্তনাদকে ডুবিয়ে দেয়। পরে মৃতদেহ দুটোকে টুকরো-টুকরো করে কেটে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলা হয়।
বলির শবদেহ পুড়িয়ে খেয়ে ফেলবার রীতি মেক্সিকোর রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যেও ছিল। আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে নতুন রাজার অভিষেকের সময় প্রায় একই ধরনের বলি হত। মিথুনাবস্থায় তরুণ-তরুণীকে আগুনে পুড়িয়ে গর্তে ফেলে দেওয়া হত।
আজটেকদের ভুট্টাদেবীর নাম চিকোমেকোহয়াতল। প্রতি শরতে এর পুজো হত। পুজোর সাতদিন আগে থেকে ভক্তরা উপোস করত। পুজোর দাস পরিবার থেকে এক কুমারী মেয়ে নিয়ে ভুট্টাদেবীরূপে সাজাত। এই দেবী নিয়ে মন্দিরে নানা রকম আচার-অনুষ্ঠান পালন করে পুরোহিতরা স্তূপীকৃত শস্যের উপর মেয়েকে ফেলে গলা কেটে ফেলত। এর পর একজন পুরোহিত দেবীর সাজসহ মেয়ের চামড়া কেটে নিয়ে নিজের গায়ে চড়াত এবং ভক্তবৃন্দসহ শুরু হত সমবেত নৃত্য।
পাওনিদের মধ্যে কুমারী-বলি প্রচলিত ছিল। তারা এক কুমারী মেয়েকে বাড়ি-বাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এসে ফাঁসিকাঠের ফ্রেমের সঙ্গে বেঁধে ফেলত। এর পর আগুনে ঝলসানো হত তাকে। পরে তির বিঁধিয়ে মেরে ফেলা হত। প্রধান পুরোহিত এগিয়ে এসে মৃত মেয়ের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলত। তারপর হাড় থেকে মাংসগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে শস্যখেতে নিয়ে যাওয়া হত, ওখানে মাংসের টুকরো থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত খেতে বোনা শস্যবীজের উপর ছড়িয়ে দিত।
লাগোস অঞ্চলে ফসলপ্রাপ্তির আশায় কুমারী কন্যাকে ভেড়া, ছাগল, ভুট্টা, কলা, আলুর সঙ্গে পরপর শূলবিদ্ধ করে রাখা হত।
প্রাচীন পৃথিবীর বিশাল অঞ্চল জুড়ে, ভিন্ন ভিন্ন সমাজব্যবস্থায় বিচিত্র পদ্ধতিতে কুমারী বলি হয়েছে। কখনও এদের হত্যা করা হয়েছে সন্তানকামনায়, কখনও ধরিত্রীকে ঋতুমতী করে শস্যের ফলনবৃদ্ধির সংস্কারে, কখনও নদী বা জলদেবতার সন্তুষ্টির জন্য, কখনও মহামারির হাত থেকে গোষ্ঠীকে রক্ষা করবার আশায়, কখনও অপদেবতা প্রেতাত্মার তুষ্টিতে, কখনও যুদ্ধজয়ের জন্য।
এখনকার পৃথিবীকে আমরা আধুনিক বলি এবং মানুষকে বলি সভ্য। এখনও কি পুরুষের তৈরি ধর্ম ও বিকৃত সমাজব্যবস্থা মেয়েদের বলি দিচ্ছে না, হয়তো জ্যান্ত পুঁতে ফেলছে না বা আগুনে পোড়াচ্ছে না কিন্তু এখনকার জীবিত মেয়েরা আর কতটা জীবন্ত? তারা এক-একজন নিজেদেরই লাশ বহন করে চলছে নিজেদের ভিতর। পুরনো দিনের বলি বোধহয় এর চেয়েও কম কষ্টকর, কারণ তখন নিরন্তর একটি কষ্ট বহন করে বেড়াতে হত না। মুহূর্তে মৃত্যু এবং মুহূর্তেই মুক্তি। এখন মুক্তি নেই, এখন মৃত্যুর সঙ্গে সচল বসবাস। এও এক বিচিত্ৰ বলি।
তথ্য: মানবসভ্যতায় কুমারী বলি (দীনেন্দ্রকুমার সরকার)
‘তৃষ্ণার শান্তি সুন্দর কান্তি’
এলিজাবেথ ডিউক নামে বিলেতে একটি নামকরা জুয়েলার্স আছে। এতে রবার্ট এডওয়ার্ড, ড্যানিয়েল ইত্যাদি নামাঙ্কিত ব্রেসলেট পাওয়া যায় ছেলেদের জন্য। এ-সব নামের লকেটও পাওয়া যায়। বিলেতের ছেলেরা এখন লম্বা চুল রাখে, শুধু লম্বা চুলই নয়, সেই চুলে তারা বেণিও বাঁধে। গলার হার, কানে মাকড়ি, নাকে নথ, কবজিতে ব্রেসলেট—সবই পরছে তারা। আমার প্রশ্ন, বিলিতি পুরুষদের এই ফ্যাশন এ-দেশে এখনও কেন সংক্রামিত হচ্ছে না? এখানে খুব কম ছেলেদের দেখি চুলের ফ্যাশন করতে, মুখে মেকআপ করতে, ভ্রূ প্লাক করতে, গলার মালা, কানের দুল পরতে। এখানকার জুয়েলার্সগুলো আফজাল, মিলন, হুমায়ুন, হারুন নামের লকেট বা ব্রেসলেট রাখতে পারে, পুরুষেরা সে-সব কিনে গলায় পরবে, কবজিতে পরবে। কানে নানা রকম দুল পরবে। নাকে নথ পরবে। ফ্যাশনের নিয়মই উন্নত বিশ্ব থেকে অনুন্নত বিশ্বের দিকে গড়িয়ে নামা। মাঝেমধ্যেই আমরা লক্ষ করি, শেরাটন, সোনারগাঁও-এর ফ্যাশন শো’তে মেয়েরা বিচিত্র পোশাক পরে মঞ্চের ওপর বিভিন্ন কায়দায় হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষের পোশাকেও ফ্যাশন আসছে, একবার চোঙা, একবার ঢলঢলে। টেডি, বেলবটম, এলিফ্যান্ট, ব্যাগি নামের পোশাক তারা পেরিয়ে এসেছে—এখন তাদেরও ফ্যাশন শো প্রয়োজন। তারাও হাল-আমলের পোশাক পরে বড় বড় হোটেলে শরীর দুলিয়ে হাঁটবে। দর্শক হাততালি দেবে। পুরুষেরা মেকআপ করবে, কেশচর্চা করবে। বড় চুল রাখবে, বেণি করবে, অলংকার পরবে। জুয়েলারির দোকানগুলো পুরুষের ভিড়ে ফরে উঠবে। পুরুষের চুলের তেল, শ্যাম্পু, পুরুষের মুখে মাখবার স্নো-পাউডার, ক্রিম, ময়শ্চারাইজার, পুরুষের আফটারশেভ ও সুগন্ধিতে দোকান ছেয়ে যাবে। পুরুষ এবং নারীর সমান ভিড় হবে প্রসাধনীর দোকানে। যা ঘটছে এখন ইউরোপে, তা নিশ্চয় ঘটা উচিত এশিয়াতেও।
সেদিন এক সুদর্শন যুবকের চিবুকের নীচে দেখি সাত-আটটা আঁচিল। বললাম, ‘তোমাকে মোটেও ভাল দেখাচ্ছে না।’ যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে ছুটে গিয়ে ইলেকট্রিক কটারাইজেশন করে আঁচিলগুলো নির্মূল করে এল, ব্যথা পেয়েছে খুব তবু করেছে, করেছে তাকে ভাল দেখাবার জন্য। যেন তাকে ভাল বলি—এই লোভে। আরও এক যুবককে দেখেছি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলবার আগে প্যান্টের পেছন-পকেট থেকে ছোট চিরুনি বের করে তড়িঘড়ি চুল আঁচড়ে নেয়, চুল যে খুব এলোমেলো থাকে তার—তা কিন্তু নয়। চুল আঁচড়াবার কারণ, তাকে আরও ভাল দেখা যাক, সে চায়।
পুরুষ যেহেতু চায় তাকে সুন্দর দেখাক, ‘বেশ সুন্দর লাগছে’ বলে মেয়েরা তার দিকে উড়ো চুমু ছুড়ে দিক তবে কেন এই শহরে পুরুষের সাজগোজের জন্য কোনও বিউটি পার্লার নেই? নিশ্চয় থাকা উচিত। মেয়েদের চুল কাটবার, সাজগোজ করবার পার্লার এই শহরে এখন সংখ্যায় কত তা আমার সাধ্য নেই হিসেব করি। পুরুষের জন্য প্রকাশ্যে সেলুন আছে, গোপনে ম্যাসাজ পার্লারও আছে, কচিকচি মেয়েরা সেখানে বুড়ো পুরুষদের গা-হাত-পা টিপে দেয়। কিন্তু এ তো কোনও কাজের কথা নয়। পুরুষদের সুন্দর হতে হবে। দেখতে সুন্দর। তাদের ফ্যাশন-সচেতন হতে হবে। তাদের অলংকার পরতে হবে। মুখে রং লাগাতে হবে।
সেদিন এক ছেলেকে বললাম, তোমার গায়ে ঘামের খুব গন্ধ, তুমি দুৰ্গন্ধনাশক কিছু ব্যবহার করো। কিছু সুগন্ধির নাম বললাম, সে ইদানীং সেগুলোই ব্যবহার করছে। আরেক যুবক এক শার্ট পরে আমার সঙ্গে তিনদিন দেখা করতে এল, জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি আর শার্ট নেই? যুবকটি পরদিন থেকে নতুন নতুন শার্ট পরে আসে। জুতো কালি করা। প্যান্টে শার্ট ইন করে বেশ ফিটফাট বসে থাকে। আমি প্রায়ই তার নাক, চোখ, চুল, চিবুক, বুক ও বাহুর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলি; তাকে দেখতে ভাল, তার জামা-জুতো ভাল—এইসব প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ, দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করি। যুবকটির ঠোঁট ঘোর কালো, বলি –একটু লাল হলে ভাল মানাত কিন্তু। সে এর পর খানিকটা রংও মাখে গোপনে। এই সব গোপন করবার প্রয়োজন কী? ছেলেদের আলাদা পার্লারের ব্যবস্থা হোক, সেখানে তারা নিজেদের খুঁতগুলো সারাক। কিছু ছেলের আবার মুখভরতি ব্রণ, ওরা মাসে একবার ‘ফেশিয়াল’ করতে পারে। কারও কারও ভ্রূ একেবারে বেশি মোটা, ঘন—ওরা খানিকটা পাতলা করে আসতে পারে। গোঁফগুলোও নানা সাইজে কাটা যায়। অধিকাংশ পুরুষের মুখ থেকে বড় দুর্গন্ধ বেরোয়, মেয়েদের সামনে কথা বলতে গেলে তাদের পৌরুষ আর যথাস্থানে থাকে না, তাই মুখের দুর্গন্ধ দূর করবারও ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তাদের পার্লার এ-ব্যাপারে সচেতন হবে, আমার বিশ্বাস।
পুরুষেরা চায় নারী দেখতে সুন্দর হোক। নারীও তেমন চায় পুরুষ সুন্দর হোক, আকর্ষক হোক। পত্রিকায় ‘নারীর সৌন্দর্য’ রক্ষা করবার জন্য একটি বিভাগ থাকে, এদিক থেকে পুরুষকে বঞ্চিত করা কি উচিত? তারা কী করলে, কী পরলে, কীভাবে দাঁড়ালে, হাঁটলে, কী করে বসলে, কথা বললে মেয়েরা পছন্দ করবে তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করবার জন্য দেশের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটি বিভাগ খোলা প্রয়োজন। ছেলেরা নিজেদের সৌন্দর্য সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ এবং তা রক্ষা করতে আরও অজ্ঞ।
কেউ-কেউ এখন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে। সকাল-বিকেল ভুঁড়িওয়ালা পুরুষেরা শহরের উদ্যানগুলোয় হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়োয়, ওদের বেশির ভাগই অবশ্য বুড়ো। যুবকেরা স্বাস্থ্য সম্পর্কে তো নয়ই, নিজেদের রূপ সম্পর্কেও একেবারে উদাসীন।
আমাদের নারীরা নিজেদের রূপ নিয়ে এত বেশি মগ্ন যে, পুরুষেরও যে রূপ আছে তা তারা মোটেও স্বীকার করতে চায় না। নারীর এই স্বার্থপরতা আমাকে বড় আহত করে। পুরুষকে দু’চোখ মেলে দেখতে হয়, তাদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছুকে দর্শনীয় বস্তু করে তুলতে হয়। পুরুষের মাথায় টাক থাকলে ঘনিষ্ঠ নারীরা তাদের উপদেশ দেন উইগ বা পরচুলা ব্যবহার করতে। তারা যেন টাক ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যেন তারা কখনও না ভাবতে পারে, টাক থাক বা না থাক, তারা এমনিতেই খুব মূল্যবান মানুষ, ইশারা করলেই নারী তাদের হাতের মুঠোয় উপস্থিত হবে। পুরুষদের দুর্বলতাগুলো আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, দেখিয়ে দেবার দায়িত্ব কিন্তু নারীর।
পুরুষের কিন্তু হরেক রকম খুঁত। পুরুষেরা নখে ময়লা, দাঁতে ময়লা, গায়ে কালি, মুখে গন্ধ, গালে ব্রণ নিয়েও নিখুঁত সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ফুটফুটে মেয়ে দাবি করে অনায়াসে। তা কেন হতে দিচ্ছে আমাদের নির্বোধ নারীরা বুঝি না। পুরুষেরা দু’বেলা স্নান করুক, পুরুষের জন্য নানা রকম সাবান উৎপাদন হোক এবং সেই সাবানের বিজ্ঞাপনে পুরুষের মুখ ব্যবহৃত হোক। পুরুষ এবং পণ্য একইসঙ্গে বিজ্ঞাপিত হোক। নারী কেন একা কেবল বিজ্ঞাপিত? নারী কি তাবৎ রূপ ও সৌন্দর্যের ইজারা নিয়েছে?
পুরুষ দাঁত মেলে হাসবে, টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন দেবে, এই মুহূর্তে পেপসোডেন্ট টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনটি স্মরণ করছি এবং বিজ্ঞাপনদাতার সৌন্দর্যের তারিফ করছি। নারীর যদি ইচ্ছে করে পুরুষদের চুলে মুখ ঘষতে, পুরুষকে সতর্ক থাকতে বলছি— সেই চুল থেকে যেন কন্ডিশনারের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। নারী যেন মুগ্ধ হয়। নারীকে মুগ্ধ করবার দায়িত্ব কিন্তু পুরুষের। পুরুষেরা তাই নিজেদের খুঁত নিরাময়ে যত্নবান হোক, পুরুষেরা তাই ঘষেমেজে নিজেদের যোগ্য করে তুলুক। নারী কেন একা সাজবে? পুরুষও সাজবে। যদি ধর্ম দু’জনকে সমান অধিকার দেয়, যদি সমাজ এবং রাষ্ট্র সমান অধিকার দেয়—তা দিচ্ছে বলে অধিকাংশ মানুষেরই বিশ্বাস—তবে পুরুষের কেন সাজবার অধিকার থাকবে না? পুরুষের দু’হাতে জামার সঙ্গে ম্যাচ করা চুড়ি বেজে উঠুক টুংটাং। এদেশের পুরুষেরা আঙুলে আংটি পরছে, চেইন পরছে, কানে দুলও পরছে কেউ-কেউ, তবে চুড়ি পরতে দোষ কোথায়, নাকে নথ পরতেই বা দোষ কোথায়?
‘মুক্ত করো ভয়’
আমরা কেবল স্থির দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়িয়ে সর্বনাশ দেখি মানুষের। মানুষের সর্বনাশে আমাদের কিছু যায় আসে না। বরং কারও সর্বনাশ হলে আমরা তুড়ি বাজিয়ে হেসে উঠি। আমাদের জন্য এখন ভাবা অসম্ভব হয়ে গেছে যে, কেউ খেতে না পেলে আমরা তাকে খাবার দেব, কারও বস্ত্র বা বাসস্থানের অভাব হলে তাকে বস্ত্র বা বাসস্থান দেব। যদি কেউ কারও একটু-আধটু উপকার করে সে কেবল স্বার্থের কারণে। কেউ যদি কারও জন্য চোখে জলও ফেলে, সে স্বার্থের কারণে। স্বার্থ ছাড়া কেউ দু’পা এগোয় না, পেছোয় না, স্বার্থ ছাড়া কেউ কাঁদে না, হাসেও না।
চোখের সামনে খুন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। চোখের সামনে মানুষের চোখ উপড়ে নিচ্ছে মানুষ, চোখের সামনে ধর্ষণ, চোখের সামনে অবাধ লুটপাট, অপহরণ, ছিনতাই—তবু মানুষ নিরুত্তাপ, নির্লিপ্ত। মানুষ কী করে এত নির্লিপ্ত হয়? জানি না। তাই এখন মন বড় বিমর্ষ থাকে।
সেদিন এক সুসংবাদ শুনে সারাদিন আমার বড় মন ভাল ছিল। সুসংবাদটি এই—এক বিকেলে বস্ত্রমেলার গেটের কাছে কোনও এক মহিলার হাতব্যাগ, গলার চেইন ইত্যাদি ছিনতাই করছিল কিছু ছেলে। আজরা জ্যাবিন নামের এক মেয়ে ঘটনাটি দেখে ছিনতাইকারীদের আক্রমণ করেন। তিনি এই নির্মম একটি দৃশ্যের প্রতিবাদ করেছেন, তিনি কেড়ে নিতে পেরেছেন সন্ত্রাসীদের হাত থেকে ছিনতাই হওয়া জিনিস। সন্ত্রাসীদের হাতে ছিল ছোরা, আজরা জ্যাবিন এই ছোরার আঘাতে আহতও হয়েছেন। তিনি আহত না হয়ে নিহতও হতে পারতেন। নিহত হবার আশঙ্কা নিশ্চয় ছিল। আজকাল পথেঘাটে অকস্মাৎ নিহত হওয়া এমন কোনও বিরল ঘটনা নয়। কিন্তু এই যে তিনি সব আশঙ্কা তুচ্ছ করে এগিয়ে গেলেন একজন বিপন্নকে সাহায্য করতে, এ-রকম ক’জন আসে, ক’জন বুক পেতে এগিয়ে যায় অন্যের বিপদে! পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল, দাঁড়িয়ে ছিল অগণন দর্শক, কেবল জ্যাবিন এগিয়ে গেলেন। আমি তাঁর ‘এগিয়ে যাওয়া’র দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। এ-রকম এগিয়ে যাবার মন সবার হয় না। এ-রকম এগিয়ে যাবার সাহস বা সততা সবার থাকে না। ঘরে-বাইরে লক্ষ লক্ষ অন্যায় ঘটে, কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসে না, যারা আসে, তারা আহত হয়, তারা নিন্দিত হয়, তারা নিগৃহীত, নির্যাতিত হয়। এখন চারদিকে অন্যায়েরই জয়জয়কার। এখন দেশে অন্যায়েরই রাজত্ব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস অর্জন করেছে যে মানুষ, তাঁকে অভিনন্দন জানাই, তাঁকে আমার সবটুকু ভালবাসা নিবেদন করি।
২
গৌরীরানি দাস নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এক সপ্তাহ আগে পরিচালকের গাড়ির ড্রাইভার, অফিসের পিয়োন এবং তাদের আরও ক’জন সঙ্গী দ্বারা ধর্ষিতা হয়। সে তার কর্মস্থল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসেছিল তার বকেয়া বেতনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে। তখন এই ধর্ষকদের দৃষ্টি পড়ে গৌরীর শরীরে। গৌরী কি খুব গৌরী ছিল, তাই এই অত্যাচার? গৌরী কি বড় একা ছিল, তাই এ নির্যাতন? নাকি গৌরী চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, দরিদ্র, নাকি গৌরী সংখ্যালঘুদের একজন—তাকে ছ’সাত অথবা দশ-বারোজন লোলুপ লুম্পেন উপর্যুপরি ধর্ষণ করে গেলে কারও কোনও ক্ষতি হবার কারণ নেই?
এই সব ছোটখাট অন্যায় নিয়ে সমাজের ও রাষ্ট্রের লোকেরা মোটে ব্যস্ত হয় না। সম্ভবত ধর্ষণ নামক ঘটনাটি এখন আর অন্যায় বা অত্যাচারের পর্যায়ে পড়ে না। ধর্ষণ যেহেতু নারীর ওপর এক ধরনের আক্রমণ, তাই এটিকে হয়তো অন্যায় বলা যায় না। কারণ নারীর ওপর নানা রকম অন্যায়ের খেলা চলে সমাজে, এই অন্যায়গুলো অত্যন্ত সাদরে গৃহীত হয়। যেহেতু কোনও ধর্ম বলেনি নারীকে মর্যাদা দিতে, যেহেতু সমাজের কর্তাব্যক্তিরা বলেনি নারীকে মূল্য দিতে, যেহেতু রাষ্ট্রনায়ক বা নায়িকারা নারীকে মানুষের সমান সম্মান দেবার ব্যবস্থা করেনি তাই গৌরীরানিকে ধর্ষিতা হতে হয় দিনের আলোয়, ধর্ষিতা হতে হয় যখন সে তার শ্রম এবং পারিশ্রমিকের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরোয়। না, শুধু ঘরের ভেতরে বন্দি থাকলেই যে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তা নয়। ঘরের ভেতরের নারীও নিরন্তর ধর্ষিতা হচ্ছে, ঘরের বাইরের নারীও ধর্ষিতা হয় পথে বা কর্মস্থলে, কর্মস্থলে বা মহাপরিচালকের অধিদপ্তরে। কোথায় নিরাপত্তা নারীর? কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে নারীর আশঙ্কা নেই ধর্ষিতা হবার, এই পৃথিবীর কোথায় সেই স্থান?
আমাদের সমাজে আজ যে-কোনও নারীই গৌরীরানি। যে-কোনও নারীর জন্য অপেক্ষা করছে অপমান, অপেক্ষা করছে অসভ্য পুরুষের কালো থাবা। গৌরীরানির মতো অত্যাচারিত অনেকেই
আজরা জ্যাবিন নামের এক ম্যাজিশিয়ান মেয়ে কোনও এক নারীর পক্ষে একা দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা, নারীরা সকলেই কি নারীর ওপর আক্রমণকে এমন দু’হাতে রোধ করতে পারি না? পারি। আমরাও সেই সাহসী মেয়ের মতো এগিয়ে আসতে পারি মঙ্গলকামনায়। আমরা এগিয়ে আসতে পারি ধর্ষণের বিরুদ্ধে, যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে। দুষ্ট ক্ষতগুলো দিন দিন বেড়ে উঠছে। আমরা, নারীরা একবার কেন প্রচণ্ড এক শক্তি হয়ে উঠি না সকল অসত্যের বিপক্ষে?
‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না’
মীরা মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি খুঁজে পেতে খুব কিন্তু অসুবিধে হয়নি আমার। ভবানীপুরের বৃক্ষশোভিত একটি দোতলা বাড়ি। আমার হাতে শ্রীনিখিল সরকারের চিঠি। চিঠি দেখালে ভাস্কর মীরা মুখোপাধ্যায় তাঁর বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দেবেন। এমনিতে তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেন না, দরজায় নোটিস সেঁটে দিয়েছেন ‘দেখা করা নিষেধ’। একবার নাকি কোনও এক সাংবাদিককে দরজা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।
চিঠি হাতে। তবু ভয়ে বুক কাঁপে, যদি বলে বসেন—না, দেখা হবে না! কড়া নাড়ি। ভেতর থেকে কর্কশ স্বরের একটি ‘কে’ শব্দ আমার হৃৎপিণ্ডে আঘাত করে। কর্কশ স্বরের লোকটি দরজা ফাঁক করে গলা বাড়ালে চিঠিটি দ্রুত তার হাতে চালান করে দিই। খানিক পরে ভেতরঘর থেকে বেরিয়ে আসেন অপরূপ সেই নারী, কোমল, ধবলবসনা নারী। আমি তাঁর পেছন পেছন একেবারে ভেতরে তাঁর শোবার ঘরে ঢুকি। যে-বারান্দা পেরিয়ে ভেতরঘরে ঢুকি, সে-বারান্দায় স্তূপ করে রাখা ঢালাই-এর কাজ, ছাঁচ, বড় এক বুদ্ধমূর্তি। মূর্তির গায়ে লেখাজোখা। ব্রোঞ্জের গায়ে পদ্য লেখা—একেবারেই মীরা মুখোপাধ্যায়ের নিজস্ব।
স্নিগ্ধ নারীটিকে অপলক দেখি। কী কথা বলব তাঁর সঙ্গে, আমি চিত্রকলার কিছু জানি না, ভাস্কর্যের বিষয়-আশয় কী আর বুঝি, কেবল দু’চোখ ভরা মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া! মীরা মুখোপাধ্যায় আমাকে তাঁর বিছানায় বসালেন, নিজেও বসলেন।
পুরনো বাড়ি। লোহার গরাদের ফাঁক গলে সকালের রোদ এসে পড়ছে ধোয়া মেঝেয়। ঘরের মেঝেয় রাখা এক সাঁওতালি মেয়ে, দু’হাতে ঝুড়ি বুনছে। দেখে এত ভাল লাগে যে, চোখ ফেরাতে পারি না, মেয়েটির গলাভরতি মালা, গলাটি লম্বা হয়ে মিশেছে শরীরে। পাশে আরেকটি মূর্তি, মায়ের মূর্তি, নীচে পিলপিল করছে তার ছানাপোনা। আরেক পাশে এক বিচারসভা, সভায় জজ বসেছেন, উকিল-ব্যারিস্টার আছেন, আর কাঠগড়ায় আছেন মীরা মুখোপাধ্যায় নিজে। ক’দিন আগে বাড়ি নিয়ে এক মামলা হল, কোর্ট অবধি দৌড়ুতে হল, সেটিরই ছবি ধাতুতে গড়ে রেখেছেন।
আমার ইচ্ছে করে স্নিগ্ধ নারীটির হাত একবার ছুঁয়ে দেখি, কী করে এই হাত ছবি আঁকে, ঢালাইয়ের কঠিন কাজে এই হাত কী করে নিবেদিত হয়, বাটাল হাতুড়ি নিয়ে এই হাত ব্রোঞ্জ কেটে কেটে জীবন তৈরি করে কী করে, একবার ছুঁয়ে দেখি।
ছোটবেলায় আমার স্কুলে যেতে হচ্ছে করত না, আমার বাগান ভাল লাগত, ভাল লাগত ফুলের বাগান। গাছগাছালির সঙ্গে মনে-মনে কথা বলতাম। লেখাপড়ায় মন বসত না।’ মীরা মুখোপাধ্যায়ের কথার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম। কণ্ঠে তাঁর আবেগ উপচে পড়ে। বললেন, কখনও নিজেকে ভাবতে দিইনি যে, আমি মেয়ে, ভেবেছি মানুষ, মেয়ে হয়েছি বলে আলাদা করে কারও কাছে স্বাধীনতার দাবি করিনি। আমি একটি জিনিসই সারা জীবনে বুঝেছি—কোনও চিৎকার-চেঁচামেচি করে নয়, পথে নেমে এই করো-সেই করো স্লোগানে নয়, মানুষের যা হয় তা কাজেই হয়। আমি যদি ভাল কাজ করতে পারি, আমার ভাল কাজই বুঝিয়ে দেবে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। আমি তাই মুখ বুজে কাজ করে গেছি।
মীরা মুখোপাধ্যায় কেবল এগিয়ে গেছেন, থামেননি। পথে কতরকম প্রতিবন্ধক ছিল। তখনকার রক্ষণশীল সমাজ ধরে বেঁধে বিয়েও দিয়েছিল তাঁকে, মেলেনি। মেলেনি বলে মীরা কিন্তু আপস করেননি। লোকে তাঁকে মন্দ বলেছে। মীরার সবচেয়ে বড় গুণ, মীরা লোকের কথায় কখনও ফিরে তাকাননি। গান ভালবাসতেন, ছবি আঁকতে ভালবাসতেন, সবুজ পাতার সঙ্গে সেই শৈশব থেকে যাঁর নিবিড় ভাব তাঁকে কি সমাজ-সংসারের জালে ধরা যায়, নাকি চার দেয়ালের ঘরে তাঁকে কোনওরকম মানায়?
মীরা মুখোপাধ্যায়ের গানের গুরু বিমলাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। গান শেখাতে শেখাতে বলতেন—‘গান কি রোজ আসে, প্রথম প্রথম মাঝে মাঝে আসে। কিন্তু একসময় এমন দিন আসবে যে, ওরা আর তোকে ছেড়ে দেবে না।’ মীরা গাইলেন ‘সখী আঁধারে একেলা ঘরে মন কেমন করে’—গাইলেন, কিন্তু গান নয়, ধাতুর কাজই তাঁকে ছেড়ে আর কোথাও গেল না। ওরা আসল কিন্তু ছেড়ে গেল না। সুখেদুঃখে ওরা তাঁর আঙুলে জন্মের মতো ঘর বাঁধল।
লোকে যাকে ঘর-করা বলে, সেই ঘর-করা মীরার হয়নি, এ-নিয়ে কোনও দুঃখ তাঁর নেই। তাঁর সংসার গোলবিবি, হারানের মা, নুরবানু, অসিত, প্রশান্ত, মায়া, গৌরী, চৈতালি, হরেন, প্রতাপ, নজরুলের বউকে নিয়ে। ওরা ঘুঁটে দেয়, ঢালাইয়ের পর ছাইয়ের ভেতর থেকে কাঠকয়লা বাছে। মীরা নিজে ধাতু গালাই করেন, নিজে ঢালাই করেন, ধাতুকে যত আয়ত্ত করবার চেষ্টা করেন, তত বোঝেন–ধাতুর মধ্যে অদ্ভুত এক রহস্যময়তা আছে।
রবীন্দ্রসংগীতেও মন ভরেনি মীরার, তাঁর আসলে অন্য কিছু চাই। বাঙালি-অবাঙালি প্রতিবেশীরা তাঁকে পাড়াছাড়া করতে চেয়েছে, বাড়িওলা বাড়ি ছাড়তে বলেছে, দিল্লিতে ছবি আঁকবার ক্লাসে যুবকেরা ফাঁক পেলেই গায়ে হাত বুলোতে চাইত—কেউ পারেনি, কেউ তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে মাথা সোজা করে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি। সব তুচ্ছ করে মীরা তাঁর কাজ করে গেছেন। সংসার ফেলে চলে আসা মেয়েটির গায়ে আঁচড় দিতে হয়েছে, গোপনে কামড় বসাতে চেয়েছে সমাজের ভালমানুষেরা। সকল থাবা থেকে গা বাঁচিয়ে মীরা কেবল কাজ করেছেন। নোংরা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই তাঁর নিরন্তর সংগ্রাম।
আমার সঙ্গে এত কথা বলবার তাঁর কোনও দরকার ছিল না। না বললেও পারতেন। বললেন—ঘোল খাবে? ঠান্ডা ঘোল খাওয়ালেন। নিখিলদা সম্ভবত লিখে দিয়েছেন, ও আপনার সঙ্গে গল্প করতে চায়। যে মানুষ কারও সঙ্গে দেখাই করেন না, দরজা থেকে দর্শনার্থী বিদেয় হয়, সেখানে একেবারে শোবার ঘরে বসে ঠান্ডা পানীয় খেতে খেতে ঘরভরতি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে স্বয়ং ভাস্করের সঙ্গেই দীর্ঘ সময় কথা বলবার সৌভাগ্য খুব কমজনেরই হয়, সে আমি নিশ্চয় বুঝি।
সত্তরের কাছাকাছি বয়স তাঁর, বড় একটি বই লিখেছেন, ভারতের বিভিন্ন এলাকার ধাতুশিল্প নিয়ে। দিনরাত ব্যস্ত থাকেন, একটানা অনেক দিন ঢালাইয়ের কাজ করেন, তারপর শুরু হয় হাতুড়ির ঘায়ে বুদ্ধের নাক-চোখের আদল দেওয়া, নৃত্যরত রমণীদের হাত-পায়ে ছন্দ দেওয়া, মোষের পালের পেছনে রাখালের শরীর গড়া। মীরা একেবারেই বসে থাকবার মানুষ নন, গোলাপের বাগান থেকে উঠে আসা মুগ্ধ কিশোরী এখন হৃৎপিণ্ডের অসুখে ভুগছেন কিন্তু দুটো কর্মঠ হাতকে তিনি একটি দিনের জন্যও অশ্রদ্ধা করেননি। সমাজের ছকবাঁধা জীবনের বাইরে বেরিয়ে তিনি কম গলিঘুপচি, কম আঁধার পেরিয়ে আলোর পৃথিবীতে আসেননি। আঁধারে একলা ঘরে তাঁর মন মানেনি—তাই স্কেচ করবার কালিকলম, ছবি আঁকবার রংতুলি, মূর্তি গড়বার ব্রোঞ্জ ধাতু সবকিছুর মধ্যে ডুবেছেন, সারা জীবন চেষ্টা করেছেন ভাল মানুষ হবার, ভাল ভাস্কর হবার। তিনি বলেন, ভাল ওইটুকু হল, যেটুকু হল।
মীরা মুখোপাধ্যায়ের হয়নি কী, সবই হয়েছে। শান্তিনিকেতন, দিল্লি, মিউনিখ ঘুরে এসে, ভারতের আনাচকানাচ চষে এসে, শাস্ত্রীয় ধাতুর স্বভাব সব শিখে এসে প্রিয় কলকাতায় যখন কাজ করতে চাইলেন—তাঁকে চাকরি দেওয়া হল কারিগরের, দিনে দশ টাকা মজুরি। মীরার দারিদ্র্যও দেখা হয়েছে কম নয়, এই দুর্ভাগা দেশ জানত না, কাকে সে দশ টাকা মজুরি দিয়ে পরিশ্রম করিয়ে নিচ্ছে, এ-মানুষ কোনও সস্তার মেয়েমানুষ নয়, এ-মানুষ মীরা মুখোপাধ্যায়, যাঁর ভাস্কর্য কিনতে লক্ষ টাকা নিয়ে লোকে দরজায় ভিড় করে, মীরা সেই দরজার দিকে এখন বড় একটা তাকান না।
‘ব্রোঞ্জের কাজ আসলেই খুব এক্সপেনসিভ।’ বললেন—‘লোকে বারগেইন করে, শেষ অবধি দেখা যায় ধাতুর দামই ওঠে না, শ্রমের দাম তো বাদই। শিল্পের সঙ্গে কি বারগেইনিং মানায়?’ এই নির্মোহ, নির্লোভ, প্রচারবিমুখ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন তাঁর কাজকে। তিনি বলেন, ‘ধাতু কোনওরকম গাফিলতি আর অন্যমনস্কতাকে ক্ষমা করেনি। আগুনের মতো শক্তি দিয়ে সে আমার সমস্ত সত্তাকে পাকড়ে রেখেছে। আর আমিও আমার শক্তি আছে কি নেই—এ-নিয়ে প্রশ্ন করিনি। ভালবেসে কাজ করে গেছি।’ কাজ হয়তো অনেকেই করে কিন্তু ভালবেসে ক’জন করে মীরা মুখোপাধ্যায়ের মতো? বস্তুর প্রাণকে বার করে আনতে চেয়েছেন তিনি। সমস্ত সাধারণের ভেতর থেকে অসাধারণকে বার করে এনেছেন। এতেই তাঁর মুক্তি। পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, নদী ডিঙোতে ডিঙোতে তিনি তাঁর প্রিয় প্রকৃতির সঙ্গে গোপন আলাপ সেরেছেন। আসমুদ্র হিমাচল ছুটতে ছুটতে নিজেই বলেছেন, ‘সবারে দিয়েছ ঘর, এ ভবেশ এ শঙ্কর আমারে দিয়েছ শুধু পথ। ‘
মীরা মুখোপাধ্যায় সেই পথ পেরিয়ে কি গন্তব্যে পৌঁছেছেন, নাকি শিল্পীর কোনও গন্তব্য থাকতে নেই! শিল্পীর থাকবে যখন যেদিকে খুশি, সেদিকে যাবার অবাধ স্বাধীনতা।
একসময় দুপুর হয়ে এল, কাজপাগল মানুষকে এভাবে বসিয়ে রেখে গল্প করতে ইচ্ছে হয়নি আর। যদিও শুনতে ভাল লাগছিল শৈশব থেকে একটি-একটি করে তাঁর প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আসবার গল্প। জীবনের অনেক দেখেছেন তিনি, অনেক জেনেছেন। আমি তাঁর তুলনায় নিতান্তই ক্ষুদ্র বালুকণা, যদি তিনি মরুভূমি হন, তাঁর তুলনায় আমি এক বিন্দু জল, যদি তিনি সমুদ্র হন। মীরা ভাল শিল্পী হতে চেয়েছিলেন, নিখিল ভারত জানে মীরা ভাল শিল্পী হয়েছেন। মীরা ভাল মানুষ হতে চেয়েছিলেন, সম্ভবত অনেকেই জানেন এবং আমিও জানি, মীরা ভাল মানুষ হয়েছেন, ভাল মানুষ তিনি তাঁর জন্ম থেকেই ছিলেন নিশ্চয়। তাঁর অসাধারণ দুটো হাত আবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, ছুঁয়ে বলি, আপনাকে আমার বড় ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। আমি এমন আশ্চর্য স্নিগ্ধ-সুন্দরের পাশে কখনও ঘনিষ্ঠ বসিনি। আবার নিশ্চয় দেখা হবে আমাদের।
বুকের ভেতর তাঁর অনেক আগুন ছিল, আমি বুঝি। যে আগুনে এখন ধাতু ঢালাইয়ের কাজ চলে, সে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর কাজের আনন্দে গভীর ডুবে থাকেন। এ আগুনের চেয়ে বুকের সেই আগুন কিছু কি কম দহন করেছে তাঁকে? সিঁড়ি বেয়ে নামতে না বলি, তবু তিনি নেমে আসেন, আমাকে বিদায় দিতে একেবারে নীচের গেট অবধি। বড় ভাল লাগে তাঁকে, তাঁর কঠোর সারল্যকে।
আমি কেবল তাঁর ঘোরে ডুবে থাকি, তাঁর স্বপ্নে আমি মগ্ন হই, আমি তাঁর বেদনা ও ভালবাসা কণ্ঠে ধারণ করে বলি—সখী, আঁধারে একেলা ঘরে আমারও মন মানে না।
‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’
কোন খেলা ছেলেদের এবং কোন খেলা মেয়েদের তা ভাগ করেছে কে—আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। মাঝেমধ্যে আমার মস্তিষ্ককে একটি রবারের গোলাকার পিণ্ড মনে হয়, ইচ্ছে করলেই এটিকে গলিয়ে চ্যাপটা করা যাবে অথবা চৌকো। মাঝেমধ্যে ভেতরটা বড় ফাঁপা লাগে। আমি তখন বুঝতে পারি না, মানুষের জন্য দু’রকম নিয়ম কারা বানায় এবং কেন বানায়।
ছেলেরা ফুটবল খেলবে, ক্রিকেট খেলবে, ছেলেরা লন টেনিস খেলবে, স্কোয়াশ খেলবে, বিলিয়ার্ড খেলবে। আর মেয়েরা খেলবে উঠোনের মাটিতে দাগ কেটে এক্কাদোক্কা, আর পাথর বা ইটের টুকরো তুলে ষোলোগুটি। মেয়েরা লুডো খেলবে ঘরে বসে। ছেলেরা হাডুডু খেলবে বাইরের মাঠে, মেয়েরা পুতুল খেলবে, পুতুলের বিয়ে দেবে, পুতুলকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়াবে, সকাল-বিকাল পুতুলের জামা-জুতো পালটাবে, মেয়েরা রান্নাবান্না খেলবে। ইট পিষে লাল মশলা বানাবে, নানা রকম ফুল-পাতা ছিঁড়ে ইটের মশলা দিয়ে মিছিমিছি মাছমাংস রান্না চড়াবে। এই মিছিমিছি খেলায় মেয়েদের উৎসাহ দেয় পরিবারের সবাই। ছেলেরা শীতের সন্ধ্যায় মাঠে আলো জ্বেলে ব্যাডমিন্টন খেলে, ছেলেরা তাস খেলে। মেয়েরা দল বেঁধে গোল্লাছুট খেলে, বউচি খেলে, গোলাপ-পদ্ম খেলে। এই খেলাগুলোর বাইরে মেয়েরা হয়তো অন্য খেলাও খেলে কিন্তু তা ছেলেদের খেলা মেয়েরা খেলছে বলেই বিবেচিত হয়।
আমার প্রশ্ন, যে খেলাকে ছেলেদের খেলা বলে নির্দিষ্ট করা হয়, তা কেন ছেলেদের খেলা? মেয়েরা কি ফুটবল খেলতে, ক্রিকেট খেলতে জানে না? ছোটবেলায় আমি ক্রিকেট খেলতাম, ব্যাট বা বল করবার দক্ষতা আমার চেয়ে বেশি ছিল না বাকি ছেলে খেলোয়াড়দের। ছোটবেলায় আমি মার্বেল, ডাংগুলি, লাটিম খেলতাম, আমার খেলার সঙ্গী মেয়ের চেয়ে ছেলেই বেশি ছিল। আমার জন্ম নানাবাড়িতে, শৈশব-কৈশোর কেটেছে ওখানে, আমার সমবয়সি মামারা ও তাদের বন্ধুরাই ছিল আমার খেলার সঙ্গী। মার্বেলে তাদের হাতের টিপ আমার চেয়ে ভাল ছিল না। লাটিমের ঘূর্ণন আমার হাতের চেয়ে বেশি কারও হাতেই উঠত না।
আমি পুতুল খেলেছি, এক্কাদোক্কা খেলেছি, গোল্লাছুট খেলেছি। আমি ছেলেদের-মেয়েদের খেলাগুলো আলাদা করে বুঝতে পারিনি—কেন এটি ছেলেদের, কেন এটি মেয়েদের নয়। আমি লক্ষ করেছি আমার সেই কিশোর বয়সে আমার হাতে হকিস্টিক, ক্রিকেটের ব্যাট, আমার পায়ে বল দেখলে আমার পড়শিরা হাসত, যেন একটি উদ্ভট কাণ্ড করছি আমি। যেন আমার হাতে পুতুলই মানায়, কড়ি মানায়, ষোলোগুটির গুটি মানায়, এক্কাদোক্কা বা কুতকুত খেলার চ্যারা মানায়। মেয়েরা আসলে সবই খেলতে পারে, মেয়েরা নাভ্রাতিলোভা, পি টি উষা, স্টেফি গ্রাফ, ক্যাপ্রিয়েতি হতে পারে। মেয়েরা রুদ গুলিত, জিকো, রজার মিল্লা, মারাদোনাও হতে পারে। মেয়েরা বাস্কেটবল, সাঁতার, টেনিস, কিংবা দৌড়ে ছাড়িয়ে যেতে পারে প্রতিযোগী ছেলেদের।
অপেক্ষাকৃত হালকা চালের খেলা, যেখানে শারীরিক শ্রম নেই, উত্তেজনা নেই, আনন্দ নেই—সেই খেলাগুলোই মেয়েদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আর ছেলেদের জন্য আকর্ষণীয়, উত্তেজক, শারীরিক গতি ও শক্তির খেলাই নির্ধারণ করা হয়। এর কারণ মেয়েদের দুর্বল বলে ভাবা হয়, মেয়েদের ভাবা হয় শরীরে ও মনে নিতান্তই অক্ষম কিছু, পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ কিছু—তাই মেধা বা শক্তির প্রয়োজন নেই, এমন খেলাই মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট হয়। তারা ঘরে খেলবে, বড়জোর উঠোনে খেলবে, মাঠ তাদের জন্য নয়, আকাশের নীচ তাদের জন্য নয়, রোদ-বৃষ্টি তাদের জন্য নয়। পুতুলখেলা আর রান্নাবান্নার খেলা খেলতে খেলতে তারা যোগ্য হয়ে উঠবে, তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে গৃহস্থালির কাজে। মূলত সংসার জীবনের মহড়া দেবার জন্যই মেয়ে-শিশুকে পুতুল এবং খেলনা-বাসন কিনে দেয় অভিজ্ঞ(!) অভিভাবকেরা। আর ছেলে-শিশুর জন্য কিনে আনে চাবি দিলে সাঁ করে ছুটে যায় এমন গাড়ি, অথবা রিমোট কন্ট্রোল, সনিক কন্ট্রোল ইত্যাদি নানা আকারের, নানা জাতের নতুন প্রযুক্তির গতিসম্পন্ন যন্ত্র। বাল্যবেলা থেকেই মেয়ে-শিশুর মেধাকে দুর্বল, অকেজো ও ঘর-সংসারের তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজে আচ্ছন্ন করে রাখবার জন্য বাসনপত্র ও পুতুল দেওয়া হয়। ছোট পুতুল, বড় পুতুল। কিশোর ছেলেকে দেওয়া হয় বিশাল মাঠ, কিশোর মেয়েকে দেওয়া হয় একচিলতে উঠোন। মেয়ের অঙ্গ ও মেধাকে বন্দি করবার কৌশল হিসেবে খেলাধুলার সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে সমাজ। সমাজের কতিপয় মানুষ।
এ-কথা যে-কোনও বুদ্ধিমানই স্বীকার করতে বাধ্য যে, যে-কোনও খেলাই মেয়েরা খেলতে পারে, মেয়েরা যদি ভলিবল খেলতে পারে, ফুটবল পারবে না কেন? আজকাল মেয়েদের জন্য ফুটবল খেলবার ব্যবস্থা হচ্ছে, অর্থাৎ খেলাটি মেয়েরাই কেবল খেলছে। কেবল মেয়েরাই কেন? মেয়েরা কেন কেবল মেয়েদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী করছে খেলতে গিয়ে? কেন ফুটবলের এগারোজনের দলে পাঁচজন মেয়ে, ছ’জন ছেলে নয়? অথবা ছ’জন মেয়ে, পাঁচজন ছেলে? একইভাবে ক্রিকেটেও, একইভাবে হকি এবং বেসবলে? একইভাবে লন টেনিসে? যেখানে নাভ্রাতিলোভা জন ম্যাকেনরোর সঙ্গে, মনিকা সেলেসের সঙ্গে বরিস বেকার, সাবাতিনির সঙ্গে আগাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার খেলা খেলতে নামবে? সেই দিন কত দূরে, যেদিন কেবল মেয়েরা মেয়েদের কিছু নির্দিষ্ট খেলা খেলবে না, ছেলেরাও তাদের নির্ধারিত খেলা খেলবে না?
ছেলেরা-মেয়েরা প্রতিদ্বন্দ্বী হবে সাঁতারে, দৌড়ে, দাবায়, হাইজাম্পে, লংজাম্পে, ওয়েট লিফটিং-এ। ছেলেরা-মেয়েরা একই দলে খেলবে ফুটবল, ক্রিকেট, বিলিয়ার্ড, স্কোয়াশ, ম্যারাথন দৌড়, আইসস্কেটিং, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন
ইন্ডোর গেম ছেড়ে মেয়েরা আউটডোরে যাবে। মানুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন হয়, ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের তেমনই হবে। মেয়েরা নিশ্চয় সাফল্য অর্জন করবে, মেয়েরা নিশ্চয়ই ছেলেদের পেছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যাবে সমানে। এগিয়ে গিয়ে বিশ্বকাপের কাপ হাতে নিয়ে উল্লাসে নৃত্য করবে।
যারা প্লেয়ার, তারা প্লেয়ারই। লিঙ্গভিত্তিক খেলার অবসান না হলে মেয়েদের দক্ষতাকে কখনও সম্মান করা হবে না। তাই আলাদা-আলাদা দলে ভাগ না করে ছেলে এবং মেয়েকে মানুষ হিসেবে বা প্লেয়ার হিসেবে জার্সি নাম্বার দেওয়া হোক। অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গের পার্থক্য জার্সির নীচে হারিয়ে যাক। দক্ষতাই হোক প্লেয়ারের প্রধান পরিচয়।
নারীকে যদি মানুষ হিসেবে সত্যিকার মূল্য দিতে হয়, তবে এই বৈষম্য দূর হোক। সমাজের অলিতে-গলিতে বৈষম্য। ঘরের উঠোনে, মাঠে বৈষম্য। বৈষম্য কোথায় নেই! নারী তার ঘর এবং ঘরের আঙিনা ছেড়ে খেলবার জন্য বিশাল মাঠ খুঁজে নেবে, দেশের মাঠ ছেড়ে বিদেশের মাঠ। গণ্ডিবদ্ধ জীবন ছেড়ে ক্রমশ বিশালতার দিকে তাকে যেতেই হবে যদি সে শক্তিমান মানুষ হিসেবে দাঁড়াতে চায়।
কেউ তাকে সুযোগ দেবে না। সুযোগ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। নিজের জন্য জায়গা নিজেকেই দখল করতে হবে।
‘আমাদের যাত্রা হল শুরু’
সম্প্রতি কানাডায় নতুন এক বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়ে গেল। ওখানকার আইন বলে, পুরুষেরাই শুধু অধিকার রাখেন শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রেখে চলাফেরা করবার। নারীর এ অধিকার নেই, নারীর উত্তমাঙ্গ অনাবৃত রেখে ঘরের বাইরে বেরোনো চলবে না। এই আইনের প্রতিবাদকারীরা কানাডার রাস্তায় মিছিল করেছেন। এই মিছিলে কিছু নারী ছিলেন, তাঁদের উত্তমাঙ্গ অনাবৃত ছিল। নারীর অনাবৃত শরীর দেখে সভ্য এবং অসভ্য দু’ ধরনের মানুষই ছি ছি করেছেন। তাঁদের কাছে এই প্রতিবাদের উপলক্ষ এবং প্রতিবাদের ধরন দুই-ই উদ্ভট ঠেকেছে। নারীদেহ অনাবৃত হতে পারে বিভিন্ন অবস্থায়। একজন চিকিৎসক যখন কোনও নারীদেহ অনাবৃত করে রোগপরীক্ষা করেন অথবা অস্ত্রোপচারে উদ্যত হন, তখন সেই নারীদেহকে অশ্লীল মনে হয় না, যদিও এই একই দেহ চিকিৎসকের নাগালের বাইরে গিয়ে অনাবৃত হলে অশ্লীল ঠেকে। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশে নারীদেহ প্রদর্শিত হলে সেই দেহও নিঃসন্দেহে অশ্লীল মনে হবে। আর সুস্থতার প্রয়োজনে, শিল্পের প্রয়োজনে এবং প্রতিবাদের প্রয়োজনে যে নারীদেহ অনাবৃত হয়, তাকে আমার আদৌ অশ্লীল মনে হয় না। দেশি উদাহরণ দিতে গেলে, সওদাগর ছবির উদোম অঞ্জু ঘোষ এবং সূর্য দিঘল বাড়ির উদোম ডলি আনোয়ারের মধ্যে নিশ্চয় পার্থক্য লক্ষ করি। অঞ্জু ঘোষকে উদোম করবার উদ্দেশ্যটি অশ্লীল ছিল, ডলি আনোয়ারকে উদোম করবার উদ্দেশ্য, আমরা সকলেই স্বীকার করি, অশ্লীল ছিল না।
প্রতিবাদের প্রয়োজনে কানাডার নারীরা উত্তমাঙ্গ অনাবৃত রেখে মিছিল করেছেন। এখানে আমি বলব, আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই মনে করতে পারেন, তাঁরা উত্তমাঙ্গ অনাবৃত রেখে চলাফেরা করতে আগ্রহী। আসলে তা নয়, আসলে তাঁরা প্রতিবাদ করছেন সেই আইনের বিরুদ্ধে, যে আইন নারীকে নির্দেশ দিচ্ছে উত্তমাঙ্গ অনাবৃত না করবার। যে বাধা বা যে প্রতিবন্ধকতা রচিত হয়েছে কেবল নারীর ক্ষেত্রে—নারীরা তার প্রতিবাদ করেছেন মাত্র। এই প্রতিবাদকে আমি ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ বলতে চাই। কারণ কানাডার সচেতন নারীরা নারী-পুরুষের আইনের মধ্যে কোনও বৈষম্য মানতে রাজি নন। প্রতিবাদের প্রক্রিয়া যেমনই হোক, উদ্দেশ্য কিন্তু একটিই, তাঁরা সকল বৈষম্যের অবসান চান।
ষাটের দশকে আরও এক ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। পাশ্চাত্যে তখন নারীমুক্তি আন্দোলন তুঙ্গে, পুরুষশাসিত সমাজ নারীর শরীরকে নানা রকম বল্কলে ঢাকে, অন্তর্বাসকে এমন এক বল্কল আখ্যা দিয়ে পাশ্চাত্যের স্বাধিকার-সচেতন নারীরা তাঁদের অন্তর্বাস পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অন্তর্বাস পোড়ানোর নেতিবাচক ব্যাখ্যা দিতে পুরুষতন্ত্রের সকল শাখাপ্রশাখা তখন অত্যন্ত তৎপর ছিল। পুরুষতন্ত্রের কৌশলই এই, নারীপক্ষের যে-কোনও আন্দোলনকে যে-কোনও উপায়ে ধূলিসাৎ করা, অন্তর্বাস পোড়ানোর মূল উদ্দেশ্যের দিকে না গিয়ে পুরুষতন্ত্রের আদরে-আহ্লাদে লালিত মানুষেরা দৃষ্টি ফেরাল বস্তু অন্তর্বাসের দিকে। এই বিচারবিভ্রাট ষাটের দশকে ঘটেছিল, আশঙ্কা করি, কানাডার এই সাম্প্রতিক প্রতিবাদেরও এমন বিচারবিভ্ৰাট ঘটবে। এই প্রতিবাদ নিন্দিত হবে সকল মহলে। প্রতিবাদ প্রতিবাদই। উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়, সুস্থ হয়, তবে প্রতিবাদের পদ্ধতি যেমনই হোক—তা দৃষ্টিকটু হতে পারে না। আমরা এখন পদ্ধতির দিকে নয়, সমান অধিকারের দাবির দিকে, বৈষম্য নির্মূলের দিকে নজর দেব। আমরা এখন অন্তর্বাস এবং উত্তমাঙ্গ নিয়ে নয়, নারীর শরীরকে আবৃত করবার যে অসৎ উদ্দেশ্যটি সকল পুরুষশাসিত সমাজই যত্নসহ লালন করছে, সেটিকে প্রকাশ করতে চাই। পুরুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে নারীর শরীরকে সুগঠিত করবার নানা রকম কৌশল আবিষ্কার করেছে। তারা নারীর শরীরকে রঙে ডুবিয়েছে যেন রঙিন সৌন্দর্যে তারা মোহিত হয়। নারীদেহকে স্বাদে-গন্ধে উপাদেয় করবার জন্য যা-যা প্রয়োজন, যতটুকু রংঢং, যতটুকু বন্দিত্ব এবং যতটুকু মুক্তি, সবই নারীর ওপর আরোপ করেছে পুরুষেরা। নারী অন্তর্বাস ব্যবহার করবে কি করবে না তা সম্পূর্ণ তার নিজের ব্যাপার। সে ইচ্ছে করলে তার অন্তর্বাস পোড়াতে পারে, ছুড়ে ফেলতে পারে, আবার ইচ্ছে করলে ব্যবহারও করতে পারে। নারী উত্তমাঙ্গ অনাবৃত করবে কি না করবে, তাও সম্পূর্ণ নারীর ইচ্ছের উপর নির্ভর করে। কিন্তু আইন কেন নারীর উপর আরোপ করা হবে? আইন কেন নারীকে সতর্ক করে বলবে যে, তার জন্য এ-কাজটি নিষিদ্ধ! হয়তো নারী নিজেই উত্তমাঙ্গ অনাবৃত করবে না, কিন্তু না করবার জন্য এই যে নির্দেশ, এটি তার সম্মান নষ্ট করছে নিশ্চয়ই। তাই আইনের এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কানাডার নারীরা পথে নেমেছেন।
আমি, তৃতীয় বিশ্বের এক দগ্ধ নারী, কানাডার প্রতিবাদী নারীদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমার এই দেশে পথেঘাটের প্রায়-উলঙ্গ নারীরা এক টুকরো বস্ত্র চেয়ে বেড়ায় লজ্জা ঢাকবার জন্য। তাদের উত্তমাঙ্গ অনাবৃত থাকে, এই দেশ তাদের বস্ত্র দিতে পারে না পরিধানের জন্য, তাদের কাছে কানাডার প্রতিবাদ হাস্যকর ঠেকবে নিশ্চয়। আমরা চিৎকার করছি নারীর অন্নবস্ত্র, বাসস্থানের জন্য, আন্দোলন করছি নারী যেন স্বাবলম্বী হয়ে নিজের সকল প্রয়োজন মেটাতে পারে। এও নারীর মঙ্গলের আন্দোলন। কানাডার বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনও নারীর মঙ্গলের আন্দোলন। দু’ধরনের দেশে দু’রকমের আন্দোলন। নারীর মঙ্গলের জন্য যে-কোনও বিক্ষোভের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছি আমি এবং আমার মতো আরও অনেকে।
আমরা কি পারি না নারীকে অবনমনের সকল আইনের বিরুদ্ধে একযোগে পথে নেমে বিক্ষোভ করতে?
Chapter - 21 to 30
‘খসিল কি আপন পুরনো পরিচয়?
১
সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশ দিয়ে আমি যখনই যাই, উদ্যানের দিকে আমার তাকাতে হয়, তাকাতে হয় মানে কিন্তু এই নয় যে, কেউ আমার ঘাড় জোর করে ফিরিয়ে দেয় ওদিকে, আমাকে তাকাতে হয় কারণ বোধের ভেতর অদ্ভুত এক শক্তি আমাকে কখনও স্থির হতে দেয় না, চোখ চলে যায় খুঁজতে কুতুব মিনারের মতো বিশাল কোনও স্মৃতিস্তম্ভ। না, নেই, কোনও স্মৃতিস্তম্ভ ওখানে দর্পভরে দাঁড়িয়ে নেই, ছোট একটি ইটের গাঁথুনি কেবল আছে, একা, দরিদ্র, গাছগাছালির আড়ালে ঢাকা, ওটিকে রীতিমতো বাতি জ্বেলে খুঁজতে হয়।
একজন সেদিন বললেন, ‘একাত্তরে দেশ স্বাধীন হবার পর সাতই মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের জায়গায় একটি-একটি করে ইট ফেললেও তো এতদিনের কুতুব মিনার ছাড়িয়ে যেত।’ হ্যাঁ, তা যেত। আমার প্রশ্ন, ইট কেন ফেলেনি কেউ সেখানে? কেন ঐতিহাসিক সেই স্থানটিকে খুঁজে বের করতে সময় খরচ হয়? চোখে পড়ে ‘তিন নেতার মাজার’, ‘জিয়ার মাজার’—চোখে কেন পড়ে না পবিত্র সাতই মার্চ? চোখে কেন পড়ে না ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির মিনার’? এই জাতি নিয়ে আমরা গর্ব করি, এই জাতি নিয়ে কি লজ্জা কম হয়? কেন এই দেশের শহরে, নগরে, গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের অজস্র স্মৃতি নেই?
পাঠক বিশ্বাস করুন, সেদিন এক বাড়িতে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘ এক আড্ডা হচ্ছিল, ওখানে কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারি বাড়ির ভদ্রলোকটি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আমি যখন এই সুসংবাদ শুনে আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, ভদ্রলোক এবং তাঁর স্ত্রী আমার আনন্দধ্বনি শুনে বিস্মিত হলেন এবং আমাকে নিবৃত্ত করলেন এই বলে যে, এ-কথা যেন কেউ না জানে। মুহূর্তে চুপসে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? এ তো জানাবার কথা সবাইকে। এ তো খুব গৌরবের কাজ।
ভদ্রলোক এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনই অত্যন্ত লজ্জিত হলেন যেন। যেন এ বড় লজ্জার কথা যে, তিনি যুদ্ধ করেছেন। তাই লুকোতে চাইছেন, যেন বড় অন্যায় একটি কাজ তিনি করে ফেলেছেন। আমি যতই যুদ্ধকালীন ঘটনাগুলো জানতে চাই, ততই তিনি নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রাখেন। এর নাম বিনয় নয়, এর নাম অপরাধ লুকোনোর প্রবণতা।
আমি নিশ্চিত, ভদ্রলোক তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে ভুল বলে ভাবছেন। একাত্তরের মার্চে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই আজ বিশ্বাস করেন। একাত্তরের খুনি রাজাকারদের চেয়ে বিভ্রান্ত এঁরা, আমার তাই মনে হয়। এই দুর্ভাগা জাতির জন্য দুঃখ করা ছাড়া আমার আর করবার কিছু নেই।
২
বাহাত্তর, তিয়াত্তর, চুয়াত্তর, পঁচাত্তর পর্যন্ত আমরা যে গান শুনেছি, সেই গানগুলো কি শেষ পর্যন্ত আমরা বিস্মৃত হব? রক্তে জেগে ওঠা সেই ক্রোধ, সেই ক্ষোভ, সেই আনন্দ এখন কোথায়? কেন সেই গানের অধিকার নেই আমাদের আন্দোলিত করবার?
অনেকে ভাবেন গানগুলো আওয়ামি লিগের নিজস্ব গান। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’, ‘চাষাদের মুটেদের মজুরের’, ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা”, “বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে’–এ-রকম আরও অসংখ্য গান। আমি এই গানগুলো গ্রীষ্মের, শরতের, ফাগুনের তপ্ত দুপুরে খুব জোরে যখন ‘ক্যাসেট-রেকর্ডারে বাজাই, পড়শিরা বলেন, ‘করছেন কী ভাই?’
বলি, ‘গান শুনছি।’
পড়শিরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুব নিচুস্বরে বলেন, ‘একটু আস্তে বাজানো যায় না এই সব গান? বোঝেনই তো, যে দিনকাল! ‘
তা হলে এই বুঝতে হবে যে, এখন যে সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো এখন শোনা আমাদের নিষেধ! যেমন এ-সব নিষিদ্ধ ছিল একাত্তরে দেশজুড়ে পাকিস্তানি বর্বরদের নৃশংস ধ্বংসলীলার সময়। তবে কি তেমনি কোনও বর্বরের তাণ্ডব চলছে এখনও? তাই কান পেতে গোপনে শুনতে হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় প্রিয় গান। গোপনে শুনতে হয় যেন কেউ টের না পায়, পড়শি যেন না শোনে, পথচারী যেন না বোঝে এমন গোপনে।
আমরা জোরে বাজাব ‘এক-দো-তিন’… ‘দেখা হ্যায় পহেলি বার, সাজন কি আঁখো মে পেয়ার…’, ‘বহত পেয়ার করতে হ্যায়’—তা হলেই তো জাতে ওঠা যাবে। এ-দেশের জাত আবার অন্য রকম। এখানে জাতে উঠতে গেলে কিছুটা বিজাতীয় হতে হয়, কিছুটা রাজাকার হতে হয়, কিছুটা অসৎ হতে হয়, আবার কিছুটা হতে হয় স্মৃতিভ্রষ্ট।
আমাদের ‘জাতে ওঠা’ নাগরিকেরা সুখেই আছেন। আর আমরা যারা বিবেকের তোয়াক্কা বেশি করি, তাদেরই সমাজ-সংসারে স্বস্তি নেই, শান্তি নেই। দুর্ভাগ্য তাদেরই তাড়ায় বেশি।
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’
রাজা রামমোহন রায়ের কথা জানি, বিদ্যাসাগরের কথা জানি। কিন্তু ক’জন আমরা লীলা নাগের কথা জানি? এই ঢাকা শহরে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন হাতেগোনা যে ক’জন মানুষ, লীলা নাগ তাঁদের অন্যতম। তিনি নারী শিক্ষা মন্দির’ নামে একটি বালিকা বিদ্যালয় গড়েছিলেন, আজ সেটি নেই। সেটি নেই মানে সেই দালানকোঠা আছে, বিদ্যালয়ও আছে কিন্তু ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ নামটি নেই, সেটি এখন শেরে বাংলা বালিকা বিদ্যালয় বা এইজাতীয় কিছু একটা নামে দাঁড়িয়েছে। লীলা নাগের নাম সম্ভবত উচ্চারণ করা বারণ, তাই ‘নারী শিক্ষা মন্দির’-এর উচ্চারণেও নিষেধ আছে। এও ঠিক বি এল কলেজ, এম সি কলেজ বা পি সি কলেজের মতো। সংক্ষেপের জট খুললে এই মুসলমানের দেশে আবার হিন্দুত্ব না প্রকট হয়ে ওঠে! তাই বোধহয় লীলা নাগের ‘মন্দির’ নামক বিদ্যালয়টি যেমন কাগজেকলমে বিলুপ্ত হয়েছে, মানুষের স্মৃতি থেকেও তাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবার ব্যবস্থা চলছে। এই ব্যবস্থার প্রথম শর্ত, ইতিহাসকে স্মরণ না করা।
কিন্তু নিজে মেয়ে হয়ে আমি এত অকৃতজ্ঞ হব কেন যে, আমি স্মরণ করব না নমস্য লীলা নাগকে, যিনি এই বাংলার ঘরবন্দি নারীদের ডেকেছিলেন বাইরে বেরোতে, সূর্যের আলো আর শিক্ষার আলো, দুটোই গায়ে মাখতে।
১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বারোজন সদস্য নিয়ে লীলা নাগ ‘দীপালি সংঘ’ গড়ে তোলেন। এই ‘দীপালি সংঘ’ পুরোটাই মেয়েদের সংঘ, এর উদ্যোগে ঢাকায় বারোটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়, তা ছাড়া ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ ‘ ও ‘শিক্ষাভবন’ নামে দুটো ইংরেজি স্কুল তো আছেই। লীলা নাগ ‘দীপালি স্কুল’ নামেও একটি ইংরেজি উচ্চবিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। ১৯২৪ সালে ‘দীপালি শিল্প প্রদর্শনী’ নামে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। এই প্রদর্শনীতে প্রধান থাকত মেয়েদের হাতে তৈরি নানা ক্ষুদ্রশিল্প। আজ থেকে ৬৭ বছর আগে মেয়েদের শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন খুব একটা সহজসাধ্য ছিল না। লীলা নাগের ‘দীপালি ছাত্রী সংঘ’ বাংলা ও আসামের নানা স্থানে শাখাপ্রশাখা মেলে বিস্তৃত হয়। এই ‘দীপালি সংঘ’ ১৯৩০ সালে মেয়েদের সীমিত চলাফেরার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, ‘ছাত্রীভবন’ নামে কলকাতায় একটি ছাত্রীনিবাস গড়ে তোলে। ১৯২৭-২৮ সালে ‘নারী আত্মরক্ষা ফান্ড’ নামে লীলা নাগ একটি ফান্ডও খোলেন। ঢাকা, কলকাতা ছাড়াও দেশের অন্যান্য স্থানে মেয়েদের লাঠিখেলা, ছোরাখেলা এবং জুজুৎসু শেখানো ছিল এই ফান্ডের কাজ শিক্ষাবিস্তারের এই ভূমিকা ছাড়াও লীলা নাগ রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন ওতপ্রোত। ১৯২১ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজি অনার্সে প্রথম হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ-তে ভরতি হন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। তাঁকে প্রথমে ভরতির অনুমতি দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত লীলা নাগকে দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষা চালু হয়। ১৯২৩ সালে এম এ পর্ব সেরে তিনি বেরিয়ে আসেন। ১৯২১ সালে ‘নিখিল বঙ্গ নারী ভোটাধিকার কমিটি’র সদস্য লীলা নাগ বাঙালি মেয়েদের ভোটের অধিকারের জন্য আন্দোলন করেন। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহের সময় লীলা নাগ ‘ঢাকা মহিলা সত্যাগ্রহ সমিতি’ গঠন করেন। এই সমিতির সদস্যরা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে লবণ তৈরি আইন ভাঙেন। মহাত্মা গান্ধীর ডাঙি অভিযান ও তার পটভূমি সংক্রান্ত তথ্য প্রচার করবার জন্যে লীলা নাগ ও সহকর্মীরা বেশ পরিশ্রম করেন।
১৯৩১ সালে লীলা নাগকে রাজবন্দি করে আটকে রাখা হয় জেলে। সঙ্গে সহকর্মী সুশীলা দাশগুপ্ত, প্রমীলা গুপ্ত, হেলেনা দত্ত, বীণা রায়, সীতা সেন, অনুপমা বসু, রেণুকণা দত্তকেও জেলে ভরা হয়। ১৯৩৭ সালে লীলা নাগ জেল থেকে বের হন। জেল থেকে বের হয়েই তিনি ‘কংগ্রেস মহিলা সংঘ’ গঠন করেন। লীলা নাগ এই সংঘের কথা সুভাষ বসুকে জানান। সুভাষ বসু তখন কংগ্রেসের সভাপতি, তিনি লীলা নাগকে এ-ব্যাপারে উৎসাহ দেন। ১৯৩৮ সালে সুভাষ বসু জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করে লীলা নাগকে মহিলা সাব-কমিটির দায়িত্ব দেন। ‘৩৯-এ ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করবার পর লীলা নাগকে তিনি সহযোগী হিসেবে নির্বাচন করেন। এই সুভাষ বসুর নির্দেশেই তিনি ফরোয়ার্ড ব্লক নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এ ছাড়াও ‘জয়শ্রী’ নামে লীলা নাগ মেয়েদের একটি কাগজ সম্পাদনা করতেন। জয়শ্রী প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৩০ সালে, সেই ‘জয়শ্রী’ এখনও বার হচ্ছে, অবশ্য অন্যের সম্পাদনায়।
১৯৪২ সালেও লীলা নাগকে জেলে নেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পেয়ে বাংলার সাধারণ আসন থেকে ভারতের কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির সদস্য হন, ভারতীয় সংবিধান রচনায়ও লীলা নাগের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৬-এ নোয়াখালিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এই দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, এগিয়ে আসেন লীলা নাগ।
‘৪৭-এর দেশভাগের পর প্রিয় দেশ, প্রিয় শহর ছেড়ে লীলা নাগ চলে গেলেন। সিলেটের গিরীশচন্দ্র নাগ ও কুঞ্জলতা নাগের ঘরের মেয়ে লীলা নাগকে তাঁর প্রিয় কর্মক্ষেত্র ছেড়ে চলে যেতে হল অন্য দেশে—এ কার পরাজয়? তখনকার কংগ্রেসের? নাকি নিরীহ মানুষের? না এক বুদ্ধিদীপ্ত প্রখর নারী লীলা নাগেরই?
তাঁর প্রিয় শহর এই ঢাকা! ঢাকা কি মনে রেখেছে লীলা নাগকে? ঢাকা কি মনে রেখেছে এই ঢাকায় নারীশিক্ষার জন্য কী অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন তিনি—এই কথা? সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কি কম হয় এখানে? কই, লীলা নাগের কথা তো শুনি না, কেউ তো অভিযোগ করে না ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ কেন নামপরিচয় পালটালো?
১১ জুন লীলা নাগের মৃত্যুদিন, ২ অক্টোবর জন্মদিন। কত ২ অক্টোবর যায়, চোখের সামনে কত পার হয় ১১ জুন। কেউ স্মরণ করে না তাঁকে। এই অকৃতজ্ঞ জাতি, কোথাও কোনও আলোচনা-আড্ডায় তাঁর নাম উচ্চারণ করে না, এই শহরে তাঁর কোনও স্মৃতিফলক নেই।
অকৃতজ্ঞ জাতির, আমি যতদূর জানি, কোনও উন্নতি হয় না। পাঠক, এই দুর্ভাগা জাতির জন্যে চলুন আজ আমরা অশ্রুপাত করি।
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী
১৯৮৮ সালে জুনিয়র ও উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র ও ছাত্রীসংখ্যার একটি জরিপে দেখা যায় জুনিয়র বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৬৩.২৫ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ৩৬.৭৫ জন। একইভাবে উচ্চবিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৬৭.০৫ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ৩২.৬৭ জন। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৭৮.৭৮ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ২১.২২ জন। স্নাতক শ্রেণিতে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৭৭.৫৩ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ২৩.৪৭ জন।
এই ছাত্র ও ছাত্রীসংখ্যার অনুপাত থেকে আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করছি জুনিয়র বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়ে ছাত্রীসংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। ১৯৮৮ সালের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায় ছাত্রীসংখ্যা নিম্ন থেকে উচ্চ শ্রেণিতে ক্রমশ নিম্নগামী হয়। যেমন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩৬.৮৭%, সপ্তম শ্রেণিতে ৩৪.৪৪%, অষ্টম শ্রেণিতে ৩৩.০৬%, নবম শ্রেণিতে ২৮.৯৩% এবং দশম শ্রেণিতে ২৭.৯৭%। আমার প্রশ্ন, কেন বিদ্যালয়ের উঁচু শ্রেণিতে এবং মহাবিদ্যালয়ে ছাত্রীসংখ্যা ছাত্রসংখ্যার তুলনায় কমে আসে? ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থী’ ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীই অধিক কেন? এই ‘কেন’র কারণ অনেক। প্রথম কারণ সংস্কার। আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের সংস্কার এবং বিশ্বাস এই যে, বিয়ের পর মেয়েরা সাংসারিক দায়িত্ব পালন করবে। আর সেই লক্ষ্যেই কিছু ধর্মীয় শিক্ষা আর লিখন-পঠন ও হিসাবনিকাশ করতে পারাই হচ্ছে নারীশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। প্রচলিত এই ধারণাই নারীশিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। দ্বিতীয় কারণ, সাংসারিক কাজে জড়িয়ে পড়া, বেতন পরিশোধে অনিয়ম, বইপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব, মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার লোকের অভাব, প্রতিবেশীর রক্ষণশীল মনোভাব, রাস্তার বখাটে ছেলেদের উৎপাত ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের কম অংশগ্রহণের প্রধান কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তো আছেই, তার উপর শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর শহরভিত্তিক অবস্থান এবং পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে শহরে এসে উচ্চশিক্ষা লাভ সম্ভব হয় না। অধিকাংশ অভিভাবকই শহরের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে রেখে ছেলেকে পড়াশোনা করাতে রাজি হলেও মেয়েকে রাজি হয় না। তাই লক্ষ করি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা অধিকাংশই শহুরে এবং সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। গ্রামের যদি কেউ হয়েই থাকে তবে অবশ্যই সে মেয়ে বিত্তবানের মেয়ে। তা ছাড়া কোনও দরিদ্র ছেলের পক্ষে নিজে উপার্জন করে লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব, কিন্তু দরিদ্র কোনও মেয়ের জন্য নিজের উপার্জনের ব্যবস্থা করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। মেয়েদের নির্ভর করতে হয় মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন বা বৃত্তির উপর। দারিদ্র্য শেষ অবধি উপার্জন-অক্ষম মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে।
শিক্ষায় মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণের উপায় নিয়ে অনেকে ভাবছেন, কেউ-কেউ বলছেন—‘যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েদের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবার জন্য পিতা-মাতার ইচ্ছা-অনিচ্ছা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই নিরক্ষর পিতা-মাতাকে বয়স্কশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত করা একটি প্রধান কাজ।’ সকল ছেলে-মেয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা বাড়িয়ে মেয়েদের শিক্ষিত হতে উৎসাহ দেওয়া সরকারের উচিত। প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় তৈরি যদি আপাতত সম্ভব না হয় তবে কোএডুকেশন মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় অধিক নারী-শিক্ষক এবং মেয়েদের জন্য আলাদা কমনরুম এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের বাসস্থান এবং যানবাহনের ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের বয়সসীমা শিথিল করতে হবে। যেহেতু উচ্চ আর্থসামাজিক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের মেয়েরাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে তাই দরিদ্র ও নিম্নআয়ভুক্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য প্রচুর বৃত্তি, অনুদান ও বিশেষ আর্থিক সহায়তা স্কিম প্রচলনের মাধ্যমে মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের স্বল্পকালীন কাজের সুযোগ দিতে হবে যেন তারা তাদের শিক্ষাব্যয় কিছু লাঘব করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আকর্ষণীয় করা এবং কাজের সঙ্গে সমন্বয় করবার পাশাপাশি মেয়েদের কর্মব্যবস্থার সুযোগ এবং সুবিধা বাড়াতে হবে।
এ-কাজগুলো শিক্ষায় মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণে সাহায্য করবে—এ-কথা একেবারে অসত্য নয়। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষাকে প্রধান কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত ও গুরুত্ব প্রদান করলে এবং নারীশিক্ষার ব্যাপারে সকলে অধিক সচেতন হলে নিশ্চয়ই ঝরে পড়া শিক্ষার্থী’র হার ক্রমশ কমে আসবে। অন্ধকারের শেকলে বন্দি হওয়া নারীরা শিক্ষা এবং চেতনার বন্ধনহীন আলোয় আলোকিত হবে। সমাজের নানা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, বিশেষ করে নারীকে অবনমনের নানা কলা ও কৌশলের বিরুদ্ধে একমাত্র শিক্ষাই করতে পারে প্রবল প্রতিবাদ। এই শিক্ষাই পারে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথ মসৃণ করতে। নারীর ওপর আর্থিক, সামাজিক ও শারীরিক জোরের যে প্রবণতা পুরুষের, তা থেকে নারী যদি সার্বিক মুক্তি চায়, তবে শিক্ষা ছাড়া তার আর পথ নেই এগোবার। শিক্ষাই নারীকে শক্তিমান ও বেগবান করতে পারে, শিক্ষাই নারীকে বিদ্যমান সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার সাহস জোগাতে পারে।
‘বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে’
‘সমীক্ষণ’-এর যে ছেলেটি আমার লেখা নিয়ে যায়, তার নাম পারভেজ। সেদিন পারভেজের সঙ্গে লেখাপ্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি বললাম, আমি আপনাদের পত্রিকায় লিখি, পত্রিকার লেখক বা কলামিস্টের প্রতি নিশ্চয়ই আপনাদের শ্রদ্ধা থাকা উচিত।’
পারভেজ বলল, ‘হ্যাঁ আপা, তা তো অবশ্যই।’
“তবে যে ভিন্নমত কলামে উদ্ভট এক লেখা ছেপে দিলেন! যে ছেলেটি ওই চিঠি লিখেছে, সে আমার লেখা কিছু পড়েছে বলে মনে হয় না। নারী-স্বাধীনতা বলতে আমি কেবল জরায়ুর স্বাধীনতা বুঝি, অবাধ যৌনমিলনই বুঝি—কিছু না পড়ে, না বুঝে হঠাৎ কেউ এ-রকম এক রায় দিয়ে দেবে। আর আপনারা তা হাইলাইট করবেন?’
আমার লেখা সম্পর্কে যে-কোনও যুক্তিসংগত সমালোচনা আমি গ্রহণ করি, অযৌক্তিক এবং অনর্থক সমালোচনা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলি। সে আমার একেবারেই অন্তর্গত চরিত্র। কিন্তু পত্রিকাগুলোর প্রকৃতি অন্যরকম, আমি বেশ লক্ষ করেছি ‘তসলিমা নাসরিন’ নামটির বিরুদ্ধে কিছু লেখালেখি হলে পাঠক মজা পাবে বলে ধারণা করা হয়। যেন নারীর স্বাধীনতার পক্ষে এই অকপট সত্য উচ্চারণ, নারীর জীবন এবং জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে নিজের অধিকার বিষয়ে সজাগ থাকা, নারীকে দাসত্বের সকল শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবার কথা বলা নেহাত তুচ্ছ কিছু, অকিঞ্চিৎকর কিছু! তাই এর বিপক্ষে মন্দ কথা বললে পাঠক মজাই পায়। এই মজা বা আনন্দের আমি কোনও ব্যাকরণ জানি না, এই মজা বা আনন্দের কোনও সরল সমীকরণ আমার জানা নেই।
একবার এক সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলাম। ভাষা নিয়ে এক বিতর্কে আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি, আমার লেখার পক্ষে ওই পত্রিকায় কুড়িটি চিঠি এসেছে এবং বিপক্ষে দুটি। পক্ষের চিঠিগুলো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনায় এত ঋদ্ধ যে, আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। ভেবেছিলাম এই চিঠিগুলো থেকে দু’-একটি সম্ভবত ছাপা হবে। কিন্তু পরের সপ্তাহে পত্রিকা বের হলে দেখি পত্রিকায় বিপক্ষের দুটো চিঠিই ছাপা হয়েছে।
পক্ষের একটিও নয়। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি সেইমতো মতান্তর নির্বাচনের নিরপেক্ষতা (!) দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। আমি এখনও জানি না, পক্ষের চিঠি বিলুপ্ত করে বিপক্ষে কিছু অযৌক্তিক ও অশ্লীল চিঠি ছাপলে পত্রিকার কাটতি বাড়ে কি না বা পাঠক মজা পায় কি না। আমি এই মজা বা আনন্দের কোনও অনুবাদ জানি না।
কেন এই বৈরিতা? কেন এই অমূলক বিদ্বেষ? এ অবধি মৌলবাদীরা দু’বার আমাকে ফাঁসি দিয়েছে। এবং প্রগতির পক্ষের পত্রিকায় ফাঁক পেলেই আমাকে অসম্মান করবার কারণ আমি যে একেবারেই বুঝি না তা নয়। মৌলবাদীরা আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় আমি ধর্ম মানি না বলে এবং ধর্মের অনাচার ও অসত্য আঙুল তুলে দেখিয়ে দিই বলে। আমার ধর্ম আমি মনে করি মানবতা, আমার ধর্মে কোনও ক্ষুদ্রতা বা স্বার্থপরতার স্থান নেই। আমার ধর্ম আমাকে মনে ও মননে বিশাল ও বিস্তৃত হতে শেখায়।
আমি বুঝি প্রগতির পক্ষে যার যত জোর কণ্ঠস্বর হোক, তারা সকলেই একটি সংস্কারের কাছে বড় নিবিড় করে বাঁধা। সংস্কারটির নাম নারী—লজ্জাবনত, মৃদুভাষী, রূপ ও সাংসারিক গুণে টইটম্বুর দ্বিপদী এক জীব, নারী। এর বাইরেই নারী মানে দেখবার জিনিস, মজার জিনিস, উপভোগের জিনিস এবং ভোগের জিনিস। যে নারী দৌড়োয়, সাঁতার কাটে, লোকে তার দৌড় বা সাঁতারের গতির চেয়ে বেশি দেখে তার সুঠাম ঊরু, তার ছন্দোময় স্তন। যে নারী অভিনেত্রী, লোকেরা তার অভিনয়-দক্ষতার চেয়ে বেশি দেখে আনন্দ পায় তার শরীরের বন্ধুর পথ ও পথের মসৃণতা। বেশি আনন্দ পায় শুনে সনাতন সংস্কার ভাঙা নারীর দুর্ঘটনা, দুঃখ ও দৈন্য। যে নারী গান গায়, যে নারী লেখে—তার গান এবং লেখার সুর এবং শিল্পগুণের চেয়ে লোকে বেশি দেখে নারীর রূপ ও সৌন্দর্য—নারী যদি সংস্কার ভাঙে, নারী যদি বানানো সব নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে লোকে তার সবল অস্বীকারকে ‘স্ক্যান্ডাল’ বলে জানে। লোকে তাকে নিয়ে মজা করে মজা দেখে। আমি অস্বীকার করব না, কিছু শিক্ষিত (!) ও প্রগতির সপক্ষে কণ্ঠবাজদের মজার শিকার আমি। এরা কি কুৎসিত মৌলবাদীর চেয়ে ভিন্ন কিছু, পৃথক কোনও অস্তিত্ব? আমার বিশ্বাস হয় না।
আমার প্রথম দোষ আমি নারী। ড. পূরবী বসু আমার আরও এক দোষের কথা বলেন, দোষ—আমি দেখতে ভাল, দেখতে মন্দ হলে লোকের এত আক্রোশ হত না আমাকে আক্রমণ করবার। দেখতে মন্দ হলে আমাকে নিয়ে ওরা মেতে উঠত না পাশবিক উচ্ছ্বাসে। আমার আরও দোষ আছে, দোষ—আমি পুরুষের যাবতীয় আধিপত্য ও হিংস্রতাকে অস্বীকার করতে পারি।
এত সব দোষে আমি দূষিত। পরদা ছেড়ে বেরিয়েছি ধর্মবিমুখ নারী- মৌলবাদীরা আমাকে ধিক্কার দিচ্ছে। নারীর জন্য ‘মাত্রাতিরিক্ত’ স্বাধীনতার কথা বলায় ‘যৌগবাদীরা’ও আমাকে দাঁতে-নখে ছিঁড়তে চায়।
আমি তবু দাঁড়িয়ে আছি। অনেকেই, এই শহর এবং দূরের অনেক শহর থেকে এসে আমাকে বলে যায়, বলে যায়, তসলিমা নাসরিন একটি আন্দোলনের নাম। ওরা কেবল বলেই যায়, গোপনে বলে যায়। আর আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি, একদিকে বিরুদ্ধ সমুদ্র, অন্যদিকে উদার আকাশ, কেউ আমাকে গ্রাস করে, কেউ আমাকে ছায়া দেয়।
তবু ছায়া আর কত, চোখ বুজলেই টের পাই একশো হাঁ-মুখো হাঙর আসে আমাকে গিলে খেতে। সকল প্রতিবন্ধকতা একাই ঠেকিয়ে বেঁচে আছি। এই যে তবু বেঁচে আছি, এ কি আশ্চর্য নয়? বা প্রতিবাদ নয় সকল নোংরামির বিরুদ্ধে?
নাস্তিক্যবাদ
পৃথিবীতে ধর্মবিশ্বাসী বা আস্তিক যেমন আছেন, তেমন নাস্তিক, ধর্মহীন বা অধার্মিক মানুষও আছেন। ১৯৯০ সালের হিসেবে পৃথিবীর অধার্মিক মানুষের সংখ্যা অর্থাৎ যাঁরা প্রচলিত কোনও ধর্মপরিচয়ে নিজেদের পরিচিত করান না, যাঁরা মুক্তচিন্তার ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ, তাঁদের সংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৬.৪ ভাগ। ১৬.৪ ভাগ মানে ৮৬ কোটি। এ তো গেল অধার্মিকদের সংখ্যা। এছাড়া শতকরা ৪.৪ জন নাস্তিক। নাস্তিকদের মধ্যে সন্দেহবাদী, ধর্মবিরোধী মানুষও আছেন। ৪.৪ জনের হিসেব দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৩০ লক্ষ। নাস্তিক্যবাদ এবং অধার্মিকতা প্রায় সমার্থক হলেও বিভিন্ন দেশের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এদের পরিচিতিও দু’রকম করা হয়েছে। অধার্মিক আছেন পৃথিবীর ২২০টি দেশে এবং নাস্তিক আছেন ১৩০টি দেশে।
পৃথিবীতে খুব কম করে ধরলেও ১১০ কোটি মানুষ নাস্তিক। নাস্তিকেরা কেউ অসৎ মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত নন। তাঁরা কেউ সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক নন। আস্তিকেরা ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির ভয়ে ভাল কাজ করেন। কিন্তু নাস্তিকেরা নিজের বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধ থেকেই সৎ ও মহৎ হন।
মানবসভ্যতার অতি অগ্রসর চেতনায় নাস্তিকতার উদ্ভব। প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর আগে নিয়ানডার্থাল মানুষেরা আত্মা, ঈশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি কল্পনার বীজ বুনেছিল, সেই বীজ হাজার হাজার বছর ধরে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তারপর মানুষের জ্ঞান, বোধ ও যুক্তি বিকশিত হতে মাত্র আড়াই হাজার বছর আগে নাস্তিকতাবোধের আলোকে মানুষ প্রথম আলোকিত করে নিজেকে। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, মিথ্যা বিশ্বাস, যুক্তিহীনতা থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ আজ নাস্তিক্যবাদী। কিন্তু দুঃখ এই, তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেহেতু দরিদ্র, দেশের মূল পুঁজি ধর্ম, তাই কোনও-না-কোনও ধর্মের আবরণে মানুষকে আবৃত করবার নিয়ম তৈরি হয়েছে।
এ-দেশের রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে ইসলাম। ধর্ম এক ধরনের বিশ্বাস। অলৌকিক বিশ্বাস। মানুষের অধিকার আছে এটিকে বিশ্বাস করবার এবং না করবার। মানুষের এই স্বাভাবিক অধিকারকে চরম অপমান করে এই দেশের জন্য একটি ধর্ম নির্ধারণ করা হয়েছে। কাগজেকলমে সকলকেই যে-কোনও একটি ধর্মের নামে পরিচিত হতে হয়। কিন্তু এই দেশে বা সরকারিভাবে ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, এমন আরও অনেক দেশে মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার অপহৃত। আমি নিজে কোনও ধর্মে বিশ্বাস করি না কিন্তু একটি বিশেষ ধর্মের ছাপ মাথার ওপর সরকারিভাবে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে, সমাজে সকল জায়গায় আমি ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত হচ্ছি। ধর্মে বিশ্বাস না করবার গণতান্ত্রিক অধিকার আমাদের মতো অনুন্নত দেশে অস্বীকৃত। সম্ভবত এ-সবই অনুন্নত দেশের অনুন্নত অবস্থার লক্ষণ।
১১০ কোটি নাস্তিক রয়েছে পৃথিবীতে, কিন্তু এই সংখ্যাও সঠিক নয়, কারণ বহু দেশের নাস্তিক বা অধার্মিককে এখনও যোগ করা হয়নি এই সংখ্যায়। ধর্মে সরকারি বাতাবরণ থেকে মানুষের বেরিয়ে আসবার আন্দোলন অনেক দেশেই সফল হচ্ছে না বলেই পরিসংখ্যান এখনও দুর্বল।
ধার্মিক মানুষের অসদাচরণ, নৃশংসতা পৃথিবীতে এত বেশি মাত্রায় বিরাজমান যে, তা দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলাম লিখেছেন- ‘মানুষেরে ঘৃণা করি ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি।/ ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,/ যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতা সেই মানুষেরে মেরে/ পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!’
সূত্র–Enccylopaedia Britanica, 1991 Book of the year.
নিজের পায়ে নিজের কুড়োল
‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’—এ-কথা অনেকেই বলে। আমি তা বিশ্বাস করতে চাই না। কোনও মেয়ে যখন অন্য এক মেয়ের শাশুড়িতে পরিণত হয়, আমরা সাধারণত লক্ষ করি, শাশুড়ি-মেয়ে বউ-মেয়ের ওপর ভীষণ মারমুখো, বাপ তুলে গালাগাল করছে, দিনভর খাটাচ্ছে, সময়ে অসময়ে গায়েও হাত তুলছে, কোথাও কোথাও তো এমনও হচ্ছে যে, ননদ-শাশুড়ি মিলে বউকে একেবারে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলল, নয়তো দা’য়ে কুপিয়ে মারল। এক্ষেত্রে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে অর্থাৎ তার ছেলের প্রতিনিধি হিসেবে সেই মেয়ে উপনীত হয় এবং অবিকল পুরুষেরই মতো অত্যাচার করে নারীকে। ঠিক একইভাবে সেই মেয়ে যখন অন্য এক ছেলের শাশুড়ি তখন ছেলে-জামাই-এর ওপর সে বড় নম্র, সুশীলা, সুভদ্র, হাসিমুখো, পাতে তুলে দিচ্ছে মাছের মুড়ো, আস্ত মুরগি, চিতল মাছের কোপ্তা। কারণ সে তখন তার মেয়ের পক্ষ, মেয়ে মানেই সহায়হীন দুর্বল, ন্যুব্জ, বিজিত।
এ ছাড়া আরও একটি কারণে মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু হয়, সে হল ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স। এটি একটি রোগ। এই রোগে অধিকাংশ মেয়েই ভোগে। মেয়েদের ‘ইনফিরিওর’ করে রাখা সমাজের যেন নৈতিক দায়িত্ব। মেয়েরা ‘ইনফিরিওর’ না হলে, অধিকাংশ মানুষই ভাবে যে, সংসার টেকে না। তাই বিয়ে করতে হলে দৈর্ঘ্যে কম, প্রস্থে কম, বিদ্যায় কম, বুদ্ধিতে কম, এমন মেয়েকে ঘরে নিয়ে এসে ঘর ব্যালেন্স করা হয়। এতে করে সংসারের মূল উপার্জনের দায়িত্বের মতো, যে-কোনও সিদ্ধান্ত এবং গুরুদায়িত্ব একা ছেলেকেই বহন করতে হয়। এ অবশ্য সুপিরিওর হবারও একটি চমৎকার কৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করে সব ছেলেই অনায়াসে সুপিরিওর বনে কিন্তু মেয়েরা ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স রোগে মুহুর্মুহু আক্রান্ত হয়।
এই কমপ্লেক্স থেকে জন্ম নেয় ঈর্ষা। ভয়ংকর ঈর্ষা। ‘গৃহবধূ’ ঈর্ষা করে চাকরিজীবী মেয়েকে, স্বামী দ্বারা নির্যাতিত মেয়ে ঈর্ষা করে স্বামীকে তালাক দিয়ে চলে আসা ব্যক্তিত্বশালী মেয়েকে, নিচু ক্লাস অবধি পড়া মেয়ে ঈর্ষা করে বিদুষী মেয়েকে; অক্ষমতার এই ক্রোধ কী ভয়ংকর হিংসার রূপ নেয় তা ওই হিংসার অনলে একবার না পুড়লে বোঝা যাবে না।
শিক্ষিত মেয়েরা হাতে ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার বড়াই করে। ‘শিক্ষা’ কোনও অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় অর্জিত হয় না। মেয়েরা, কিছু মেয়েরা, পরীক্ষায় পাস করছে বটে, শিক্ষিত হচ্ছে না। ‘শিক্ষিত’ হওয়া অন্য জিনিস। শিক্ষিত হলে মানুষ ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে না, সেই কমপ্লেক্স থেকে হিংসার আগুনে সেও পোড়ে না, অন্যদেরও পোড়ায় না।
লোকে এও বলে, ‘মেয়েরা মেয়েদের যত হিংসা করে, ছেলেরা তত করে না। মেয়েদের মধ্যে নীচতা, হীনতা, কূটকচাল, হিংসে, লোভ ইত্যাদি বেশি। মেয়েরাই মেয়েদের সম্ভ্রম নষ্ট করে, মেয়েরাই মেয়েদের অগ্রসর ইচ্ছের গলা টিপে ধরে, মেয়েরাই মেয়েদের ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি।’ এই ক্ষতি কিন্তু একটি অশিক্ষিত, নির্বোধ মেয়ে যতটা করে, তার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি করে অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত (!) বুদ্ধিমান মেয়েরা; এই শিক্ষিতরা যদি একবার কমপ্লেক্সে ভোগে, সে বড় মারাত্মক ভোগা, তাদের দূষিত দীর্ঘশ্বাসে চারপাশ সংক্রামিত হয়; তাদের ধ্বংসযজ্ঞে মেয়েরাই সুযোগ্য বলি হিসেবে ধৃত হয়।
আমার বড় করুণা হয়। আহা নারী! আহা হতভাগ্য নারী! লেখাপড়া করে ‘বুদ্ধি’ হবে বলে তাকে লেখাপড়াই শেখানো হয় না, আর লেখাপড়া শিখে যাদের ‘বুদ্ধি’ হয়েছে, তারা এমনই হতভাগ্য যে, নিজেদের বুদ্ধি অপব্যবহার তারা এভাবেই করে যে, দুর্বলের ওপর তারা খড়্গহস্ত হয়, তারা অসহায়কে দাঁত খিঁচোয়, তারা দুর্গতদের ভাত কেড়ে নেয় এবং নিগৃহীতদের গালগাল করে। যে ‘বুদ্ধি’ দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয়, নারীর যে বুদ্ধি আরেক নারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—আমি তাকে বুদ্ধি বলি না। বলি- ছোবল, বিষধর সাপের ছোবল।
গোটা দুই ‘পতিত’, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ হলে জমত বেশ
বাংলাভাষায় ‘রক্ষিতা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘রক্ষিত’ শব্দ থেকে এসেছে। এটি সাধারণত বিশেষ্য হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়। শব্দটির অর্থ, পালিতা উপপত্নী। এই শব্দটির কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই। ‘রক্ষিত’–এর পুংলিঙ্গ শব্দ নয়। কারণ ‘রক্ষিত’ শব্দটি বিশেষণ, এর অর্থ রক্ষা করা—রাখা হয়েছে এমন অথবা পরিত্রাত, পালিত, গচ্ছিত। ‘রক্ষিত’ শব্দ ‘পালিত উপপতি’ বোঝায় না। যেমন বোঝায় ‘রক্ষিতা’ দ্বারা ‘পালিত উপপত্নী’।
‘রক্ষিত’ শব্দটির অর্থ পালিত উপপতি নয়, কারণ সমাজে উপপতি রাখবার নিয়ম চালু করা হয়নি অথবা চালু করতে দেওয়া হয়নি। সমাজে যা চালু হয়নি তা শব্দার্থে চালু হবে কেন! রক্ষিতা চালু আছে সব দেশেই। আরবের আমিররা নাকি সত্তর-আশিটি করে রক্ষিতা রাখেন। এ-দেশের বিত্তবান মুসলমানরাও রক্ষিতা পছন্দ করেন, কেউ গোপনে, কেউ প্রকাশ্যে এই ব্যবস্থার চর্চা করছেন। রক্ষিতা তো আছেই। চারদিকে রক্ষিতা। কিন্তু ‘রক্ষিত’ কেন নেই? ‘রক্ষিত’ শব্দটি আমি বিশেষ্য হিসেবে এবং রক্ষিতার পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছি। আশা করছি এই শব্দটি অভিধানে এবং উচ্চারণে রক্ষিতার পুং প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যার অর্থ হবে উপপতি। পালিত উপপতি। খুঁজলে কি ‘রক্ষিত’ পাওয়া যাবে না এই দেশে? অথবা অন্য দেশে? আমি জানি পাওয়া যাবে। বিত্তবান নারীরা সত্তর-আশিটা না হোক একজন-দু’জন ‘রক্ষিত’ রাখবেন না, এ কেমন কথা! কেবল একতরফাভাবে বিত্তবান পুরুষেরাই এ কৃতিত্বের অধিকারী হবেন—এ কি মানা যায়? মানুষ তো মানুষকে দেখেই শেখে? নারী না হয় পুরুষের ‘রক্ষিতা’ রাখবার কায়দাকানুন শিখে নিজেই ‘রক্ষিত’ রাখলেন। নারীরও তো কৃতিত্ব দরকার। নারীরও তো বীরত্ব দরকার। পুরুষই কেবল একা ‘বীর’ হবে, একাই শৌর্য, তেজ, পরাক্রমের অধিকারী হবে? একাই ‘বীর্যবান’ হবে? ‘বিত্তবান নারী’ জগতে অনেক আছেন। তাঁরা ‘রক্ষিত’ রেখে অভিধানে ‘রক্ষিত’ শব্দটি যথার্থ অর্থে প্রচলন করবেন—এ আশা আমি করি। এ বিশ্বাস আমার আছে, একদিন ঘরে ঘরে ‘রক্ষিত’ জন্মাবে।
আমাকে যাঁরা পছন্দ করেন এবং না করেন, তাঁদের অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন অথবা আমার ব্যাপারে একটি অভিযোগই করেন তা হল— আমি কেন একের বেশি বিবাহ করেছি। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে আমি উত্তর এড়িয়ে যাই। আমার এক সময় খুব ইচ্ছে ছিল, পুরুষ যেমন চার বিয়ে করে এক বাড়িতে চার বউ নিয়ে জীবনযাপন করবার অধিকার রাখে, তেমন আমিও চার বিয়ে করে চার স্বামী নিয়ে জীবন কাটাব। অনেক মেয়েই এ ঘটনা দেখে উৎসাহী হবে। আর মানুষের তখন টনক নড়বে যে, যে বিধানটি এ সমাজে প্রচলিত, তার উলটো চর্চা শুরু হলে কেমন দেখায়। কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। মেঘে মেঘে বিদ্যুৎ কেমন খেলে। ‘বিধান’ যখন ভাল কথায় সরানো যায় না, বিধানের অপকারিতা বোঝাতে হয় বিপরীত বিধানের আশ্রয় নিয়ে।
দুঃখ এই, চার বিয়ে করা শেষ অবধি আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবু যেটুকু সম্ভব হয়েছে তা-ই অনেককে যন্ত্রণা কম দেয় না। অসৎ পুরুষদের যন্ত্রণা দেখলে আমার অদ্ভুত আনন্দ হয়। বিত্ত থাকলে আমিও ‘রক্ষিত’ পুষতাম। বিত্তবানেরা শখ করে কুকুর পোষেন, অ্যালসেশিয়ান, শেফার্ড, শখ করে রক্ষিতা পোষেন, সুন্দরী, শিক্ষিতা। আমারও বড় সুদর্শন, শিক্ষিত, গুণবান ‘রক্ষিত’-এর শখ। বিত্ত থাকলে সত্তর-আশিটি না হোক, ছ’সাতটি ‘রক্ষিত’ পোষা গেলে মন্দ হত না।
‘পতিতা’র পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ হিসেবে ‘পতিত’ এবং রক্ষিতার পুং প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রক্ষিত’ এখন সমাজ-সংসারে উচ্চারিত হোক। অভিধানে শব্দ দুটো নতুন অর্থসহ সংযোজিত হোক। অনাচার কেবল এক ক্ষেত্রে কেন, দু’ক্ষেত্রেই হোক। সংবিধানে যখন নারী ও পুরুষের অধিকার সমান, তখন নারী ও পুরুষের দু’জনেরই নিশ্চয় সমান অধিকার যে-কোনও কাজে, কর্মে, ভাবনায়, বিশ্বাসে।
দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে, যে-কোনও বৈষম্য দূর করতে গেলে নারীর প্রথম কর্তব্য স্বনির্ভর হওয়া। স্বনির্ভর না হলে সবার যেমন বাকরুদ্ধ থাকে, পা অচল থাকে, হাত স্থবির থাকে, চেতনাও তেমন ভোঁতা থাকে, এই ভোঁতা চেতনার নারীদের, এই জড়বস্তুদের কাছ থেকে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আশা করা আর খচ্চরের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখা একই কথা
নারী শিক্ষিত হোক, স্বনির্ভর হোক। তবেই সে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে। সে তার প্রাপ্য অর্জনের জন্য উদ্যোগী হবে। তা না হলে কী তার প্রাপ্য এবং কী নয় তা সে নিজেই জানবে না। যা অধিকাংশ নারীই এখন জানে না।
খারাপ মেয়ের গল্প
১
এখানেই আমার দাঁড়াবার কথা ছিল। ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউটের ঠিক উলটো দিকের গেট দিয়ে ঢুকে হাতের ডান দিকে প্রথম যে নারকেল গাছটি পড়বে, সেই গাছের নীচে। বলেছিল, ‘মাঠের দিকে মুখ করে দাঁড়াবে, নয়তো রাস্তার লোকগুলো আবার ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে। আমি মাঠেই থাকব, ঠিক ছ’টায়, কেমন?’ কোথায় ছ’টা? ছ’টা বেজে পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে গেল। তবু রতনের দেখা নেই। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আবার ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউট দেখে নিলাম। উলটো দিকের সবচেয়ে কাছের গেট এটিই। রতনের তো এ-রকম দেরি হবার কথা নয়। ব্যাগের ভেতর দামি সব জিনিসপত্র, একা এ-সব নিয়ে এই গাছের নীচে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও নিরাপদ নয়। এর মধ্যে ছ’সাতজন যুবক ঘুরেফিরে বারবারই যাচ্ছে সামনে দিয়ে। আমি চোখ নামিয়ে রাখি, যেন ‘ভদ্রঘরের মেয়ে’ বলে ভাবে আমাকে। কেউ-কেউ শিস দেয়। হিন্দি ছবির গান গায়, একজন তো কোমর দুলিয়ে নাচল, আর একজন আড়চোখে দেখলাম, লুঙ্গি ওপরের দিকে ওঠাতে ওঠাতে এত বেশি উঠিয়ে ফেলল যে, লজ্জায় আমিই অন্য দিকে মুখ ঘোরালাম। অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর উপায় ছিল না। বাড়ির দিকেও যাওয়া যায় না। বাড়িতে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খবর হয়ে গেছে—রীতা পালিয়েছে। মা’র গয়না, ভাবির গয়না সব চুরি করে পালিয়েছে বাড়ির অষ্টাদশী মেয়ে। সাতটা বাজে। সন্ধে নেমে এল। যুবকেরা ছ’সাতজনের জায়গায় এখন বারো-তেরোজন হয়েছে। এদিক-ওদিক বিচ্ছিন্ন দাঁড়িয়ে সকলে দেখছে আমাকে। যেন আমি অদ্ভুত একটি মানুষ এসে জুটেছি এখানে। এখানে বেশ্যারা দাঁড়ায়, দুলে দুলে হাঁটে, পুরুষ দেখলে হাসে। আমি এ-সবের কিছুই করছি না। আমি সাজগোজ করিনি, কারও দিকে তাকাচ্ছি না, হাসছি না, বারবার ঘড়ি দেখছি। এ-সবের মানে আমি বেশ্যা নই, আমি কারও জন্য অপেক্ষা করছি। আমার বেশ ভয়ও লাগছিল, অন্ধকার নেমে এলে এরা যদি আমাকে ঘিরে ধরে, আমি বেশ্যা নই জেনেও আমাকে এই পার্কের আরও ভেতরে নিয়ে যায়, আরও অন্ধকারে! খাদে, ঝোপঝাড়ে নিয়ে এই দাঁড়িয়ে থাকা, হেসে ওঠা, শিস দেওয়া, গান গাওয়া যুবকেরা যদি অমন লুঙ্গি ওঠাতে ওঠাতে একেবারে উঠিয়েই ফেলে পুরো?
২
রতন পৌনে আটটায় এল। ভয়ে আমার গা ঘামছে। ব্যাগটাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। রতন এসে ফিসফিস করে বলল—“এসো।’ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুটারে উঠলাম দু’জন। আমি রতনের একটা হাত চেপে ধরলাম।
বললাম, ‘দেরি করলে কেন?’ কণ্ঠ এত ভেজা, নিজেই অবাক হলাম যে, এতক্ষণ গাছের সঙ্গে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ভেতরে আমি নিশ্চয়ই কাঁদছিলাম। রতন আবার ফিসফিস করে বলল, ‘ওগুলো কোথায়?’ আমি ব্যাগ দেখালাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত দেরি কেন করলে? আমার কী ভীষণ ভয় লাগছিল!’
রতন হো হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘ভয়? ভয় কেন?’
দু’জন ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে—’কত?’
‘তুমি কত বললে?’ রতন হেসে আমার দিকে তাকাল।
রতনকে চিনি ছ’মাস। এই ছ’মাস কলেজ পালিয়ে আমরা পার্কে, সিনেমায় দেখা করেছি, রেস্তোরাঁয় খেয়েছি, বন্ধুর বাড়ি আড্ডা দিয়েছি, শুয়েছি। হ্যাঁ, শুয়েছিও। কী করব, রতন মানে না। বলে, ‘ভাবো না কেন বিয়ে হয়ে গেছে আমাদের।’ মনে-মনে আমি তা-ই ভাবতাম, আমাকে রতন শোবার আগে ভাবতে শেখাত আমরা স্বামী-স্ত্রী। বলত, ‘বিয়ে বোধহয় আমাদের পালিয়েই করতে হবে।’ আমি এ-সব পালানো-ফালানোয় ভীষণ লজ্জা পেতাম। বলতাম, ‘আমার দ্বারা ওটি হচ্ছে না।’ শেষ পর্যন্ত অবশ্য আমাকে রাজি হতেই হল, কারণ দু’মাস আমার মাসিক হচ্ছে না। ডাক্তার বলেছে, ‘বাচ্চা পেটে।’ ব্যাস পালাতে হল, রতন হিসেবনিকেশ করে আমাকে বুঝিয়েছে, খেয়েপরে বাঁচতে হলে হাতে কিছু টাকাপয়সা থাকা চাই। যেহেতু টাকাপয়সা রতনের হাতে নেই, চাকরিবাকরি করে না, বি কম পাস করে তিন বছর বসে আছে, যেহেতু ওর বাবা-মাও এখন বিয়ে করাবে না, অগত্যা আমাকেই টাকাপয়সার ব্যবস্থা করে বেরিয়ে আসতে হল।
৩
মিরপুরে ছোট্ট একটি বাড়ির সামনে স্কুটার থামে, রতনের পেছনে হাঁটছি, হাতে শক্ত করে ধরে আছি ব্যাগ। ব্যাগে মা’র আর ভাবির গয়না, আলমারি খুলে ভরদুপুরে বাড়ির সবাই যখন ঘুমোচ্ছিল—নিয়ে এসেছি। এর মধ্যে ওরা কি থানায় খবর দিয়েছে? মনে হয় না। মা অন্তত এই কাজ করতে দেবে না। যত হোক, নিজের মেয়ে তো! মা নিশ্চয়ই কাঁদছে, খানিকটা মায়াও হয় মা’র জন্য। ভাবি নিশ্চয়ই আমার নামে মা’কে শুনিয়ে অকথ্য সব কথা বলবে। মা কী জবাব দেবে এর! এতকাল কূটকচাল করতে গেলে মা রুখে দাঁড়িয়েছে, বলেছে, ‘ছেলের ওপর আমার দাবি আছে। এই ছেলে বানের জলে ভেসে আসেনি। ছেলের বাড়িতে তার মা থাকবে, বোন থাকবে।’ থাকবেই তো। রতন একতলা বাড়িটির তালা খুলে ভেতরে ঢুকল। অন্ধকারে হঠাৎ গা-ছমছম করে উঠল, নিজেকে বোঝালাম রতন আছে পাশে, কীসের ভয়! দেশলাই জ্বালাতে চোখে পড়ল কাঠের একটি টেবিল, টেবিলের উপর মোমবাতি। রতন আরেক কাঠি জ্বেলে মোমবাতি ধরাল। রতন নিশ্চয়ই এ ঘরটি ভাড়া নিয়েছে। নিজের সংসারে এই একটি টেবিল ছাড়া কিছু নেই। না থাক, ব্যাগের সোনাদানা বিক্রি করে ঘরখানা সাজিয়ে নেব। রতন আমার কত কাছের মানুষ, স্বামীর চেয়ে আপন পৃথিবীতে আর কে আছে? বাপ-মা, ভাই-বোন সবই তো আসলে পর।
আমাকে ঘরে একলা রেখে রতন রাতের খাবার আনতে গেল; দেরি করেনি, ও ফিরে এলেই এত আনন্দ হয় যে ওকে জড়িয়ে ধরি। রাতে খেয়েদেয়ে দু’জন এই প্রথম পুরো রাত কাটালাম। এর আগে পুরো রাত তো আমরা পাইনি। আমার ঘুম আসে না খানিকটা দুশ্চিন্তায়, খানিকটা আনন্দে। আনন্দ রতনকে নিবিড় করে পাওয়ার। আর দুশ্চিন্তা বাড়ির মানুষগুলো এর মধ্যে কী কী করছে না জানি ভেবে, এই বাড়িতে ক’দিন থাকা হবে, রতন কী কাজ করবে অথবা আমিই বা কী করব, এ-সব নিয়ে রতনের সঙ্গে কথাবার্তা বলাটা খুব জরুরি অথচ আমি ওকে যত জিজ্ঞেস করি কী হবে, না হবে, ও আমার গায়ের জামা খুলতে খুলতে বলে—“আজ সব বাদ, আজ শুধু আদর, আদর আর আদর।’ হ্যাঁ, আমারও ভাল লাগে আদরে ডুবে থাকতে। কিন্তু জীবনযাপনেরও তো নানা ঝামেলা আছে। না, রতন কিছু শুনবে না। ও ডুবে গেল শরীরে। অনেকটা রাত অবধি আমার জেগে থাকার দিকে তাকিয়ে বারবারই বলল, ‘ঘুমোও তো! না ঘুমোলে শরীর খারাপ করবে।’
‘তুমি চাকরির চেষ্টা করবে কবে থেকে?’
‘কাল থেকে।’
‘এই ঘর কি ভাড়া নিলে?’
‘হুঁ’
‘ঘর গুছোতে হবে না?’
‘হুঁ।’
‘কবে গুছোব?’
‘কাল।’
‘কিছু জিনিসপাতি তো কিনতে হবে। আপাতত বিছানার তোশক, বালিশ, মশারি, আর থালাবাসন, চুলো, তাই না? কবে কিনবে?”
‘কাল।’
‘ভাইজান যদি আমাকে খুঁজতে বেরোয়, পাবে?”
‘আরে না।’
‘তোমাদের বাড়িতেই বরং উঠলে পারতে। তোমার মা-বাবাকে ঘটনাটা জানাও। কবে জানাবে গো?’
‘কাল।’
‘আচ্ছা, বিয়েটা আমাদের কবে হবে?’
‘কাল।’
বলতে বলতে রতনের নাক ডাকল আর আমি একটি সংসারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিদ্রাহীন পার করলাম রাত। ভোরের দিকে ঘুম নামল চোখে।
৪
ঘুম ভাঙল জানালা গলে রোদ এসে চোখ তাতাল, তারপর। উঠে দেখি রতন উঠে গেছে আগেই। কী লজ্জা, বউ ঘুমোচ্ছে, আর স্বামী উঠেছে, নিশ্চয়ই মুখ ধুচ্ছে কোথাও, মাঠে একটা টিউবওয়েলের মতো চোখে পড়েছে রাতে। নাকি নাশতা আনতেই গেল। ভাবতে ভাবতে চুল আঁচড়াব, চিরুনি নিতে গিয়ে ব্যাগ খুলে দেখি, ব্যাগে গয়নাগুলো নেই। সব আছে, আমাদের এতদিনকার লেখা চিঠি, ডাক্তারের কাগজ, চিরুনি, কলম, মুখের ক্রিম সবই ঠিকঠাক আছে। আচ্ছা রতন কি এগুলো বিক্রি করে ঘরের জিনিসপত্র কিনে আমাকে চমকে দেবে? আমার একবার ভালও লাগে, আরেকবার কষ্টও হয়। কেন না জানিয়ে যাবে ছেলে?
৫
সকাল পেরিয়ে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হয়। রতন ফেরেনি। বিকেলে চার-পাঁচজন ছেলে দরজা ঠেলে ঢুকল। ঢুকে আমাকে দেখে অবাক, বলল, ‘তুমি কে? এখানে কেন?’ আমি বললাম, ‘এটা তো আমার ঘর, তোমরা কে?’
‘আমরা?’ বলে চার-পাঁচজন তুমুল হেসে উঠল। বলল, ‘বাইরে সাইনবোর্ডে কী লেখা দেখে এসো, লেখাপড়া জানো নিশ্চয়ই?’
সাইনবোর্ড? বেশ একটু অবাক হয়ে বাইরে গিয়ে দেখি ঘরের ওপর সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা, নবারুণ যুব সংঘ। এর মধ্যে ওদের বয়সের একটি ছেলে মাথায় করে একটি ক্যারাম বোর্ড নিয়ে ঢুকল। আমার আর ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করেনি। বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘রতনকে চেনো?’
ওরা জিজ্ঞেস করল, ‘কোন পাড়ার?’ আমি জানি না রতন কোন পাড়ার, কল্যাণপুরে বাড়ি বলেছিল, সিটি কলেজে পড়ত, ব্যাস এটুকুই জানি। ঘুরে বেড়ায়, গান গায়, মাঝে মাঝে কবিতাও বলে। ওর বাবা উকিল। না, রতনকে ওরা কেউ চেনে না।
আমি কি অপেক্ষা করব? সন্ধে নামতে থাকে, আমার আর অপেক্ষা করা কি মানায়? খিদেয় পেট জ্বলে যায়, কেউ তো ভিক্ষেও দেবে না। ফিরে যাব বাড়িতে? ভাবি বলবে, চোর। ভাই বলবে, মা-ও বোধহয় মনে-মনে বলবে। তাঁদের সামনে কী মুখে দাঁড়াব এখন? আমি, আমার কাছেই খুব অবাক লাগে, বাড়ি যাচ্ছি না, বাড়িতে প্রথমে মারধর করলেও পরে তো এক সময় ক্ষমাই করে দেবে, তবু লজ্জায় ও অপমানে মুখ তুলতে পারছিলাম না, তার ওপর পেটের মধ্যেও উটকো আরেক ঝামেলা। একটি স্কুটারে চেপে ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউটের সামনে এলাম। মনে-মনে রতনকেই খুঁজছিলাম কি না, কে জানে। উলটো দিকের গেটে ঢুকে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দেখি আমার গা-হাত-পা কেমন কাঁপছে। আমার এ কেমন পরাজয়! কোথাও এখন আশ্রয় নেই। স্কুটারওয়ালাকে হাতের ঘড়ি খুলে দিয়েছি। এখন নিজের কাছে নিজের শরীর ছাড়া কিছু নেই। অন্ধকারে কে একজন গায়ে হাত রাখে। চমকে উঠি। হাত রাখা লোকটি ঠা ঠা করে হাসে, এত কাছে তার মুখ যে, মুখের দুর্গন্ধও আমার নাকে এসে লাগে। বলে, ‘এই মেয়ে এদিকে আয়।’
আমার পেটে তখন খিদে। প্রচণ্ড খিদে। মাথা বনবন করে ঘুরছে। লোকটি আমাকে হাত ধরে টেনে স্কুটারে ওঠাল। আমি চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম। আমি এক স্কুলমাস্টারের মেয়ে রীতা। ছোটবেলায় নীতি আর আদর্শের বাক্য শিখে বড় হয়েছি। বাবা মারা যাবার পর ভাইয়ের সংসারে পাখির মতো পালকে ঢেকে মানুষ করেছে মা। আর আমি কিনা এমন অমাবস্যার রাতে অচেনা এক পুরুষের সঙ্গে যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি জানি না।
পাশের লোকটির নাম কি রতন? আমার, আমি জানি না কেন, একেও রতন নামের কেউ বলে মনে হয়।
পুনশ্চ : পাঠক, এই গল্প কি আসলেই খারাপ মেয়ের গল্প?
শব্দবাণবিদ্ধ নারী
১
আপনার স্ত্রী কী করেন? স্বামীকে প্রশ্ন করলে, অথবা স্ত্রীকে প্রশ্ন করলে আপনি কী করেন—প্রায়ই একটি উত্তর পাওয়া যায়, উত্তরটি হল—‘হাউজওয়াইফ’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় গৃহবধূ। পেশা হিসেবে গৃহবধূত্ব ঠিক কোন পর্যায়ের তা আমার এখনও বুঝে ওঠা হয়নি।
গৃহভৃত্যত্ব এক ধরনের পেশা। গৃহভৃত্য ও গৃহবধূকে পেশাজীবী হিসেবে আলাদা স্থান দেওয়া হয়, কিন্তু গৃহস্বামীকে নয়। গৃহস্বামিত্বকে কোনও পেশা বলে মনে করা হয় না। একজন বেকার গৃহস্বামীকে কখনও পেশার পরিচয় ‘গৃহস্বামী’ দিতে হয় না। যদিও ‘হাউজওয়াইফ’-এর পেশা এ-দেশে বেশ জনপ্রিয়।
গৃহবধূ তাঁর পারিশ্রমিক পান শাড়ি, গহনা, দু’বেলা ভাত-তরকারি ইত্যাদি। বিনিময়ে রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া, বাচ্চা লালন, বাচ্চা পড়ানো ইত্যাদি কাজ করতে হয়। নিজের হাতে না করলেও অন্তত পরিচালনা তো করতেই হয়। ভৃত্যের কাজও প্রায় একই। ভৃত্য এবং ভার্যা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যেহেতু এক, কাজের ধরনও তাই এক। তবে ভৃত্যের যেটুকু স্বাধীনতা আছে, ভার্যার তা নেই। ভৃত্য যখনতখন ঘর ছাড়তে পারে, ভার্যা পারে না। ভার্যার আছে একশো রকম শৃঙ্খল। ভৃত্যের আছে যখন যেখানে খুশি সেখানে চলে যাবার অবাধ স্বাধীনতা। . ভার্যার সামনে বৃত্ত আঁকা—পরাধীনতার, সীমিত চলাচলের।
২
‘স্বামী’ শব্দের অর্থ প্রভু, মনিব, মালিক, অধিপতি। আমাদের শিক্ষিত, সচেতন মেয়েরা তাঁদের বিবাহিত বন্ধুকে ‘স্বামী’ বলতে কোনও দ্বিধা করেন না। তাঁরা নিঃসংকোচে তাঁদের বিবাহিত বন্ধুকে প্রভু, মনিব, মালিক বা অধিপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁরা কি জানেন না ‘স্বামী’ শব্দের আভিধানিক অর্থ? তাঁরা যদি তা জানেনই তবে ‘স্বামী’ শব্দটি তাঁরা ব্যবহার করছেন কেন, যেখানে এই শব্দ ব্যবহার করবার অর্থ নিজেদের দাসী প্রমাণ কর।! ‘স্বামী’র স্থলে এমন কোনও শব্দ তাঁদের ব্যবহার করা উচিত, যে শব্দের অর্থ অন্তত প্রভু, মনিব বা মালিক নয়।
‘বিয়ে বসা’ এবং ‘বিয়ে করা’ দু’রকমের ক্রিয়া। বিয়ে বসা মেয়ের বেলায় আর বিয়ে করা ছেলের বেলায়। ছেলে করে, মেয়ে বসে। মেয়ে নিষ্ক্রিয় বসে থাকে আর ছেলেটি করে। ক্রিয়ার এই পার্থক্য ছেলে-মেয়ের বিবাহিত জীবনেও প্রবল প্রভাব ফেলে। বৈষম্যের ব্যবস্থাগুলোও তাই বেশ ঘটা করে করা হয়। ছেলেরা ঘরের বার হবে, কাজ করবে, মজা করবে, খেলবে, দুলবে, হাসবে। আর মেয়েরা ঘরে বসে ছেলের প্রতীক্ষা করবে, ঘরে বসে কাঁদবে, গোঙাবে।
মেয়েরা, আমি দেখেছি, নিজেরাই ‘বিয়ে বসা’ শব্দদ্বয় সানন্দে ব্যবহার করেন। শুনে আমি বিস্মিত হই। সচেতন এবং বুদ্ধিমান মেয়েরা, যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চান না, তাঁরা কি ইচ্ছে করলেই ‘বিয়ে বসা’র মতো অনর্থক শব্দকে নির্মূল করতে পারেন না, অন্তত করে নিশ্চয় দেখিয়ে দিতে পারেন যে, তিনি করেছেন, খামোখা বসে থাকেননি।
৪
বাংলাভাষায় একটি অত্যন্ত নোংরা শব্দ আছে, শব্দটির নাম ‘অসতী’। অসতী শব্দের অর্থ ব্যভিচারিণী, ভ্রষ্টা, কুলটা। অসতীর পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ যদি অসৎ ধরা হয় তবে অসতী শব্দের যা অর্থ, অসৎ-এর কিন্তু সেই অর্থ হয় না। অসৎ শব্দের অর্থ মন্দ, অসাধু, সত্তাহীন, অবিদ্যমান। আসলে অসতী শব্দের কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই, যেমন সতী শব্দের নেই। সতী-অসতী শব্দগুলো স্রেফ মেয়েদের জন্য আলাদা করে রাখা। এই সব শব্দবাণে তাঁদের বিদ্ধ করবার জন্য। মেয়েরা যদি শব্দনিয়ন্তাদের চাতুর্য অনুধাবন করতে পারেন, তবে নিশ্চয় কোনও শব্দবাণেই তাঁরা আর আহত হবেন না।
৫
‘অলক্ষ্মী’ও এমন এক শব্দ। অর্থ হচ্ছে দুর্ভাগ্যের দেবী, দুর্ভাগিনী বা দুর্ভাগ্যদায়িনী নারী। দুর্দশাগ্রস্ত হওয়াকে অলক্ষ্মীতে পাওয়া বলে। শ্রীহীনতা বা দারিদ্র্যকে অলক্ষ্মীর দশা বলে। অলক্ষ্মীরও কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই। অলক্ষ্মী কেবল নারীর জন্য প্রযোজ্য। পুরুষের জন্য ময়। পুরুষেরা দুর্ভাগ্যের দেবতা হয় না, পুরুষের জন্য মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত হয় না, শ্রীহীনতা, দারিদ্র্য পুরুষের প্রতীক নয়।
৬
‘পতিতা’ শব্দের অর্থ ভ্রষ্টা, কুলটা, কুচরিত্র, বেশ্যা। ‘পতিত’ শব্দের অর্থ ভ্রষ্ট, স্খলিত, অধোগত, দুর্দশাপ্রাপ্ত, পাপী। কিন্তু তবুও পতিতা যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, পতিত সেই অর্থে নয়। সমাজে পতিতার জন্য আলয় আছে, পতিতের জন্য নেই। মেয়েরা যাঁরা নিজেদের সম্মান সম্পর্কে সচেতন, তাঁরা ‘পতিত’ বলবার রীতি তৈরি করুন সেই পুরুষদের, যারা পতিতাদের দিকে হাত বাড়ায়, যারা ব্যভিচারে অভ্যস্ত। আমার বিশ্বাস, এদেশে ‘পতিত’ খুঁজতে গেলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়’-এর অবস্থা হবে।
৭
যেহেতু এখনও ভোগের বস্তু হিসেবে নারীর মূল্যায়ন হয়, যেহেতু ঘর ও উঠোনেই নারীকে বন্দি করা হয়, তাই গৃহ থেকে ‘গৃহিণী’, রমণ থেকে ‘রমণী’, অঙ্গন থেকে উদ্ভূত ‘অঙ্গনা’ শব্দ নিয়ে কারও কোনও আপত্তি দেখি না।
নারীকে আমি ভোগের বস্তু বলে ভাবি না, ‘মানুষ’ ভাবি। নারীর জন্য কোনও শৃঙ্খল আমি স্বীকার করি না—তাই নারীর নাম হিসেবে ব্যবহৃত এই অশ্লীল গৃহিণী, রমণী, অঙ্গনা শব্দগুলো নিষিদ্ধ করতে বলি।
থ্রি চিয়ার্স ফর হাসিবা
এই শহরে, শুধু এই শহরেই বা বলি কেন, বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে মেয়েরা নানা রকম কাজ করছে, স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, চাকরি করতে, বেড়াতে, বাজার করতে তারা এখন স্বচ্ছন্দ চলাফেরা করছে। মধ্যবিত্ত মেয়েরা তাদের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে বাস, টেম্পো, রিকশা ইত্যাদি। আমার প্রশ্ন, মেয়েরা কেন এই দেশে সাইকেল ব্যবহার করে না? সাইকেল চালালে দুটো কাজ একসঙ্গে হয়, যাতায়াতের কাজটি দ্রুত হয় এবং শরীরের বাড়তি মেদের কিছুটা স্খলন হয়।
তবু, এ-দেশের মেয়েরা সাইকেলকে বাহন হিসেবে মেনে নিচ্ছে না। আসলে ‘মেয়েরা মেনে নিচ্ছে না’ কথাটি ঠিক নয়। মেনে নিচ্ছে না আসলে ছেলেরা। ছেলে মানলে তবে তো মেয়ের মানা! সমাজের বড় মাথাগুলো যদি সায় না দেয় তবে কি কোনও মেয়ের সাধ্য আছে যে, সে নিয়ম তৈরি করে! ঢাকা শহরে হাতেগোনা মাত্ৰ দু’একজন মেয়ে সাইকেল এবং মোটর সাইকেল চালায়। তারা কি নির্বিঘ্নে চালায়? না। তাদের সামনে প্রতিবন্ধকতার বিশাল পাহাড়। দু’একটি এন জি ও মেয়েদের মোটর সাইকেল চালাতে বাধ্য করছে। প্রথমে অবশ্য কথা ছিল মেয়েরা সাইকেলে চড়ে আশেপাশের গ্রামগুলোয় কাজ করতে যাবে। গ্রামের মাতব্বররা এতে বাধা দিল। বলল——অসম্ভব, মেয়েরা সাইকেল চালাবে আমাদের চোখের সামনে। আর আমরা তা বসে বসে দেখব?’ গ্রামের ছেলেছোকরারা মেয়েদের গায়ে ঢিল ছুড়ল, মেয়েদের গাল দিল। এন জি ও-র লোক গিয়ে গ্রামের লোকদের বোঝাল, শেষ পর্যন্ত গ্রামের লোকরা রাজি হল—ঠিক আছে, মোটর সাইকেল চলবে, কিন্তু সাইকেল চলবে না। মেয়েদের মোটর সাইকেল চালাবার অনুমতি দেওয়া হল, কিন্তু সাইকেল চালাবার নয়। দুটোই কিন্তু সাইকেল, দুটোই দু’চাকার, দুটোতেই বসতে হয়, দুটোই গতিসঞ্চার করে। তবে কেন একটি অনুমতি পায় এবং অন্যটি পায় না? আসলে এর ব্যাখ্যা একটিই—সাইকেলে দু’পা আন্দোলিত হয়, যা মোটর সাইকেলে হয় না। মেয়েদের দু’পায়ের আন্দোলন নিশ্চয়ই পুরুষের জন্য স্বস্তিকর নয়, তারা নিশ্চয় ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করেন এবং তৃষ্ণার্ত হন।
মেয়েদের শরীরের আন্দোলন গ্রহণ করার যোগ্য হয়ে ওঠেনি এখনও এই দেশ, শুধু এই দেশই বা বলি কেন—ইসলামের গন্ধযুক্ত যে-কোনও দেশই। ‘হাসিবা বুলমেরকাহ’ আলজিরিয়ার মেয়ে। নব্বই সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ইসলামি মৌলবাদীরা পার্লামেন্টে বসেছে, সামরিক বাহিনীর কারণে এখনও তারা দেশ শাসন করতে পারছে না, কিন্তু শোষণ করছে দেশ—ইসলামের শোষণ। হাসিবা বুলমেরকাহ এবারের অলিম্পির্কে সোনা জিতেছেন। আলজিরিয়ার ইতিহাসে এটিই অলিম্পিকের প্রথম ট্র্যাক ও ফিল্ড পদক। অথচ এই অলিম্পিকে আসতে হাসিবাকে বাধা দিয়েছিল আলজিরিয়ার মৌলবাদী দল। হাসিবা পৃথিবীর সকল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আলজিয়ার্সের রাস্তায় যখন আমি ট্রেনিং করি, তখন অনেকেই আমাকে থুতু দেয়, পাথর ছোড়ে। অপরাধ, মুসলমান মেয়ের নগ্ন পায়ে দৌড়োনো। কনস্টানটাইনে পাহাড়ের নীচে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে এক সময় দৌড়োতাম। ভয় হত, মৌলবাদী নেতারা না আমার কোনও ক্ষতি করে দেন। মেয়ে হয়ে আমি কোনও অপরাধ করিনি। দৌড়োবই বা না কেন? ওদের বিরুদ্ধে আমার এটাই প্রতিবাদ। আমার সঙ্গে ট্রেনিং করত ইয়াসিয়া হাজিজি, হেপ্ট্যাথলিট। একজন পথচারী ওকে পতিতা বলায় ট্রেনিং-ই ছেড়ে দিল।’
হাত-পা উন্মুক্ত রেখে দৌড়েছিল বলে ইয়াসিয়া হাজিজিকে লোকে পতিতা বলেছে। এই দেশেও একই অবস্থা, যদিও এখানে মৌলবাদী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। যদিও এই দেশ ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ নাম এখনও ধারণ করেনি। তবু হাত-পা উন্মুক্ত রেখে এখানে চলা বারণ, এখানে জার্সি পরা মেয়েরা বড়জোর দেওয়ালঘেরা মাঠে দৌড়োতে পারে। খোলা রাস্তায় নয় বা খোলা মাঠেও নয়। এখানে নগ্ন পা নিয়ে খেলাধুলা করতে গেলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। যে মেয়েরা খোলা পুকুরে সাঁতার কাটে, খোলা মাঠে দৌড়োয়, এখানেও লোকে তাদের দিকে থুতু ছোঁড়ে।
আলজিরিয়ার মেয়ে হাসিবা বুলমেরকাহ তাঁর জিতে নেওয়া সোনাটি উৎসর্গ করেছেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট বুডেফের উদ্দেশে। প্রেসিডেন্ট বুডেফের উদারতাই হাসিবাকে অলিম্পিকের দিকে যাত্রা করবার পথ মসৃণ করেছে। পার্লামেন্টে মৌলবাদী দল চেয়েছিল বিল এনে মেয়েদের খেলা বন্ধ করবে। এখনও পারেনি। এখনও সেই বিল পাস হয়নি। হাসিবা শুধু খেলেই প্রতিবাদ করেনি। সেই উদ্ভট বিলের বিরুদ্ধে, অসভ্য মৌলবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে হাসিবা প্রতিবাদ করেই যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আলজিরিয়ার অসংখ্য মেয়ে আমার মতোই পরদার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আমার লড়াই ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি হেরে গেলে ওদের আকাঙ্ক্ষারও মৃত্যু হবে।’
হাসিবা হেরে যাননি। জিতেছেন। আলজিরিয়ার নাম মানুষ মনে রাখবে হাসিবার নাম দিয়ে। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে হাসিবার সবচেয়ে বড় বিজয় এটিই। যারা মেয়েদের পরদার আড়াল থেকে বাইরে বেরোতে দেয় না, যারা বলে কোরানে কোথাও নেই মেয়েদের খেলাধুলা করবার কথা, যারা বলে মেয়েরা কেবল ঘর-সংসার, স্বামী-সন্তানের যত্ন করবে, যারা বলে মেয়েদের প্রধান কাজ পুরুষের মনোরঞ্জন এবং সন্তান উৎপাদন, এ ছাড়া তার আর কোনও প্রতিভা গ্রহণযোগ্য নয়, তাদের মুখেই এবার থুতু ছুঁড়লেন হাসিবা বুলমেরকাহ। এই মৌলবাদী অপশক্তির গায়েই হাসিবার দ্রুত পায়ের লাথি পড়ল এবার।
হাসিবা বলেছেন, ‘এই পদকটা আমার পাওয়া খুব দরকার ছিল। ধর্ম আর রাজনীতিকে যাঁরা মিশিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠবার জন্য। আমি মুসলিম, মনেপ্রাণে মুসলিম। কিন্তু ধর্মান্ধ নই। এখানে আমার টার্গেট ছিল পদক। এবার লক্ষ্য বিশ্বরেকর্ড। আমি পারবই।’
অন্ধকার-বন্দি আলজিরিয়ার মেয়েদের শেকল খুলে বেরিয়ে আসতে বলেছেন সোনার মেয়ে হাসিবা। তিনি তাঁর দৃঢ়তা, তাঁর অটল, অনড়, অবিচল মনের সাহস ও শক্তি নিয়ে মৌলবাদের খাঁচায় আটকে পড়া মেয়েদের উদ্ধার করবেন। আমরা, মৌলবাদে আক্রান্ত বাংলাদেশের মেয়েরা, হাসিবা বুলমেরকাহর জন্য আমাদের সর্বোত্তম ভালবাসা নিবেদন করছি।
এই বাংলাদেশেও জন্ম হোক অসংখ্য সোনার মেয়ে হাসিবার। তারা পাঁকে পড়া অন্ধকার-জীবন থেকে বেরিয়ে আসুক আলোর অরণ্যে। তারা তাদের শরীর ও মনের সকল শৃঙ্খল ভেঙে, তারা পান থেকে সংস্কারের চুন খসিয়ে হাসিবার মতো জয়ধ্বনি করুক। ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির নিষ্পেষণ থেকে নিজেদের মুক্ত করে এবার তারা সত্যিকার বাঁচুক।
Chapter - 31 to 40
‘বড় বিস্ময় লাগে’
রতন সেন খুন হয়েছেন। ভোরবেলায় মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি, দৌড়ে এসে খবরটি আমাকে দিল আমার ছোটভাই। বলল, ‘রতন সেনকে ওরা খুন করেছে, তোমাকেও না আবার কবে মেরে ফেলে। বুবু, তুমি আর একা বাইরে যেয়ো না। ‘
একা বাইরে যাব না—এ হয় নাকি? আমি খবরের কাগজ হাতে বারান্দায় বসলাম। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়া আমাকে সম্ভাষণ জানাল। কাগজে লেখা ‘সকাল সাড়ে ন’টায় স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক জামায়াত শিবির চক্র প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সিপিবি সম্পাদকমণ্ডলীর সাবেক সদস্য ও খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি কমরেড রতন সেনকে রিকশা থেকে নামিয়ে দু’হাতের রগ কেটে বুকে ও পিঠে ১৪টি ছুরিকাঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে রতন সেনের মৃত্যু হয়।’
আমি হিম হয়ে বসে রইলাম বারান্দায়। ওরা, ওই জামায়াত শিবির ফ্রিডম পার্টি চক্রের সন্ত্রাসীরা তাঁকে ছুরির আঘাতে খুন করেও তুষ্ট হয়নি, তাঁর হাতের রগ দুটো কেটে দিয়েছে। ছোটভাই আমার কাঁধ ছুঁয়ে আশঙ্কায়, বেদনায় কম্পিত স্বরে আবার বলল, তুমি আর একা-একা বাইরে যেয়ো না, বুবু!
জামায়াত শিবির ফ্রিডমের রোষানলে আমিও পড়েছি। রতন সেনের মতো যে-কোনও দিন, প্রকাশ্য দিবালোকে, সকাল-দুপুর-বিকেল যে-কোনও সময় ওরা আমাকে রিকশা থেকে নামিয়ে অতর্কিতে উপর্যুপরি ছুরি চালাবে, আমার দু’হাতের রগ ওরা কেটে দেবে। কে ওদের বাধা দেবে, দেশে কোন শক্তি আছে যে ওদের বাধা দেয়?
একবার জামায়াতির এক লম্বা মিছিলে পড়েছিলাম আমি এবং কবি শামসুর রাহমান। মিছিলের স্লোগান ছিল—ভারতীয় দালাল খতম করো, নির্মূল কমিটির সদস্যদের খতম করো, নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর।’ যেন আল্লাহ্র নাম নিয়ে এঁদের সবার গলায় ছুরি বসাতে চাইছে। এমন বীভৎস মিছিলের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় কবিকে নিয়ে আমি একটি অসহায় স্কুটারে বসে ছিলাম, না পারছিলাম সামনে যেতে, না পারছিলাম পেছনে। আমার চোখের সামনে এর আগে আরও মিছিল যেতে আমি দেখেছি। একবার এক মিছিলে ছিল ‘তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চাই’ লেখা ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড। আমি ভয় পাইনি, মিছিল চলে গেলে রাস্তা অতিক্রম করেছি, মিছিলের কেউ আমাকে চিনতে পারেনি।
কিন্তু সেদিন স্কুটারে বসে ভয়ে আমার নীল হয়ে উঠছিল মুখ, নিজের জন্য নয়, দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবির জন্য। আমাকে না চিনলেও কবি শামসুর রাহমানকে নিশ্চয় ওরা চিনতে পারবে। আর’সেই বীভৎস, উন্মত্ত মিছিল,যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার প্রিয় কবির ওপর? স্কুটারওয়ালাকে, ভীষণ উদবিগ্ন অস্থির আমি, মিছিলের মধ্য থেকে ডানে-বামে যে-কোনও একদিকে যেতে বলছিলাম, ওদের নাগাল থেকে একটি নিরাপদ দূরত্বে যাবার জন্য আমি মরিয়া হয়ে উঠছিলাম, আমার জন্য নয়, কবি শামসুর রাহমানের জন্য, যাঁকে ওরা ভারতীয় দালাল তালিকার এক নম্বরে রেখেছে।
যাঁরা প্রগতির কথা বলেন, সুস্থ, সহনশীল ও যুক্তিবাদী মন যাঁদের, ওরা তাঁদেরই ‘ভারতীয় দালাল’ বলে রায় দেয়। ওরা দালালদের তালিকা করেছে, একটি-একটি করে খুন করে হাতের রগ কেটে রাস্তায় ফেলে রাখবার জন্য। ‘ভারতীয় দালাল’ হিসেবে খুলনায় বিভিন্ন দলের বত্রিশজন নেতাকে চিহ্নিত করে তাঁদের নির্মূল করবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, রতন সেন ছিলেন ওই তালিকায় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি।
আমি এখন আশঙ্কা করি কবি শামসুর রাহমানের জীবনের জন্য; জাহানারা ইমাম, কাজি নুরুজ্জামান, শাহরিয়ার কবির, নির্মলেন্দু গুণ, কে এম সোবহান, রামেন্দু মজুমদার, সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত, রাশেদ খান মেমন, আহমদ শরিফ, যতীন সরকার, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, শওকত ওসমান সকলের জন্য আমার আশঙ্কা হয়। কবে না জানি হঠাৎ সকালে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চমকে উঠব, আমাকে পড়তে হবে ‘গতকাল সকালে জামায়াত শিবির ফ্রিডম চক্র শেখ হাসিনা, বদরুদ্দিন ওমর, কবির চৌধুরি, বেলাল চৌধুরি, নির্মল সেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেছে,’ পড়তে হবে ‘ড. কামাল হোসেন, আমিরুল ইসলাম, গাজিউল হক, পান্না কায়সার, শিশির ভট্টাচার্যের হাতের রগ কেটে দিয়েছে ওরা’ এবং আমার আত্মীয়রা সকালে ঘুম চোখে এও হয়তো পড়বেন—‘গতকাল সকালে, প্রকাশ্য দিবালোকে, পুলিশ অফিসের সামনে জামায়াত শিবির ফ্রিডমের সন্ত্রাসী যুবকমান্ড গ্রুপ তসলিমা নাসরিনকে রিকশা থেকে নামিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে, হাতের রগ কেটে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।’আমার ছোটভাই, তার কণ্ঠে আমি আশঙ্কা টের পাই। কিন্তু আমার তো যেতেই হবে বাইরে, একা, রিকশায়।
রতন সেনের জন্য দুঃখ করব, নাকি দুঃখ করব রতন সেনের মতো মেধা ও সুস্থ মনন নিয়ে যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন—তাঁদের জন্য? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সন্ত্রাস, রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা, গোলাম আজমের নিরাপদ বেঁচে থাকা, রতন সেনের হঠাৎ খুন হয়ে যাওয়া, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি অফিসে সন্ত্রাস, ওদের বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল—এ-সব কি বুঝিয়ে দেয় না আমাদের এখন আশঙ্কা করবার সময়! আমাদের সামনে এখন ভয়াবহ দুঃসময়!
সন্ত্রাসীদের বিচার হয় না। রতন সেনের খুনিরাও জানি বেঁচে যাবে। গোলাম আজম যেমন বেঁচে যায়। জামায়েত ইসলামি তাদের নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া রাজনীতি নিয়ে এখন দেশজুড়ে রাজনীতির নামে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। এখন দেশজুড়ে সকল মেধার রগ কেটে দিচ্ছে ওরা। ঠিক একাত্তরে যেমন দেশের শত্রুরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার।
দেশে কি আবার এক একাত্তর এসেছে? দু’দিন আগে আমার পাশের বাড়ির পাঁচ বছরের মেয়ে আমার ঘরে এসে খুশিতে বেশ লাফাচ্ছিল, বলছিল, ‘কী মজা, কী মজা।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীসের মজা, তৃণা?’ বলল, ‘আমাদের দেশটা এখন পাকিস্তান হয়ে যাবে কিনা, তাই খুব খুশি লাগছে।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘কে বলল তোমাকে এই কথা?’ পাঁচ বছরের অবুঝ মেয়েটি বলল, ‘আমার আব্বু-আম্মু বলল।’ আমি স্তম্ভিত। বাচ্চা মেয়েটির বাবা-মা নিশ্চয় পাকিস্তান হবার গোপন স্বপ্ন দেখছেন ঘরে বসে। শুধু গোপনই বা বলি কেন? এই স্বপ্ন তো এখন প্রকাশ্যে দেখছে জামায়াত শিবির ফ্রিডমের সংগঠিত ধূর্ত সদস্যরা। আর আমরা হতবাক নিরীহ জনতা ওদের স্বপ্নের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। কার কাছে অভিযোগ করব? সরকারের কাছে? মায়ের দোষ মাসিকে জানাব?
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে’
‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল, স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল’—গানটি শুনতে শুনতে ঘুম ভাঙল। সেদিন দোলের দিন, শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব। আমরা গৃহবাসী দ্বার খুলে আম্রকুঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেন ঋতুরাজ এসে আম্রকুঞ্জেই আজ বসেছে। তাকে নিয়ে হবে আনন্দ-উৎসব আমাদের। আমার মুগ্ধ চোখ কোনও বনতল, বৃক্ষ, গানে ও রঙে নিমগ্ন মানুষ থেকে সরেনি। আমি বাহির থেকে কেবলই অন্তরের দিকে এগোচ্ছি। মানুষের মধ্যে এখনও এত সুস্থতা, এখনও এত সৌন্দর্য আমাকে বড় অবাক করে দেয়। আমরা তৃতীয় বিশ্বের কঙ্কালসার জাতি, আমরা কী করে ধারণ করি এত অমল আনন্দ? ভোরবেলা থেকে বসন্তের গান, বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে নাচ, লক্ষ মানুষ সেই সুরে ও ছন্দে মেতে আছে। আমিও মিশে আছি স্রোতে, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে দাঁড়িয়ে আমারও মনে লেগেছে দোলের দোলা; এত গভীর করে এর আগে বসন্তকে গ্রহণ করিনি। এর আগে বসন্তের উতল হাওয়া এমন লাগেনি গায়ে। এমন বাসিনি ভাল আগে পৃথিবীর আলো, হাওয়া, মাটি ও মানুষ।
গা পেতে সকলে সকলের আবির নিয়েছে। মাঠে, আম্রকুঞ্জে, কলাভবনে, সংগীত ভবনে আবির ছড়ানোর উৎসবে সকলের কণ্ঠে ছিল গান, সকলের শরীরে ছিল নৃত্য। আহা, যারা এই সুখের স্বাদ পায়নি, তাদের জন্য বড় মায়া হয় আমার।
শান্তিনিকেতনের আলাদা একটি ঘ্রাণ আছে। আমি জানি না কোত্থেকে এক ঘ্রাণ এসে প্রাণ ভাসিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথকে এত কাছ থেকে দেখতে কেমন জানি লাগে। তাঁর স্মৃতি ও স্বপ্নের গভীর নিকটে দাঁড়িয়ে আমি ভুলে গিয়েছি আমার সারা জীবনের শোক। আমি আবির ছড়িয়ে দিয়েছি আমার মনে। নানা রঙের আবিরে আমি এখনও প্লাবিত।
রাতে কোপাই নদীর ধারে পূর্ণিমার জলে ডুবেছি। আমার সারা শরীরের বেদনা ধুয়ে দিয়েছে সাদা জ্যোৎস্নার জল। চাঁদের সঙ্গে আমরা খেলেছি অপরূপ খেলা। কে বলে কোপাই-এ জল নেই, শুকিয়ে কাঠ? জ্যোৎস্না এত জল ফেলেছে কোপাই-এ! এত জল, এত স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ জল। কোপাই-এর জলেও আমি ডুবেছি শতবার।
বসন্ত উৎসবকে বলেছি, আবার দেখা হবে, আবার আমি আবির ছড়িয়ে দিতে, বোলপুরের দগ্ধ মাটিতে ভালবাসার জল ছিটোতে আসব, দেখা হবে। উত্তরায়ণকে বলেছি, দেখা হবে। ছাতিমতলাকে বলেছি, দেখা হবে। উপাসনালয়, আশ্রম, আম্রকুঞ্জ— সকলকে বলেছি, দেখা হবে। রামকিঙ্করের সাঁওতাল রমণীকে বলেছি, দেখা হবে। বুদ্ধকে বলেছি, ‘সুজাতাকে বলেছি। কালোর দোকান, সুবর্ণরেখাকে বলেছি—দেখা হবে। দেখা হবেই। যদি গান ভালবাসি, দেখা হবে। ঝাউবনকে বলেছি, সাইকেলে চেপে ছুটে যাওয়া রবীন্দ্র-তরুণীকে বলেছি, দেখা হবে। ধুলো, বালি, ঘাস, পাথরকুচিকে বলেছি, দেখা হবে। দেখা তো হবেই। কোপাই, তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আবার পূর্ণিমায় আমরা অমন আনন্দে মাতব। আবার সব দুঃখ ধুয়ে দিতে জ্যোৎস্নার জলে জীবন পেতে দেব।
রবীন্দ্রনাথকে আমি ঈশ্বর বলে মানি। আমার চোখের সামনে ঈশ্বরের যে ছবিটি হঠাৎ হঠাৎ ভেসে ওঠে, সে তার রক্তমাংস শিল্পস্বপ্নসহ কেবলই রবীন্দ্রনাথ। এই আমার ধর্ম, আমি এই এক ঈশ্বরের কাছে পরাজিত। আর কোনও ঈশ্বর-দোষ, আর কোনও লৌকিক বা পারলৌকিক মোহ আমার নেই। জগতে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সামনে কোনও দেওয়াল রাখিনি, আর কোনও গন্তব্য নেই আমার যাবার।
বসন্ত উৎসবের আবিররাঙা দুপুরে সুনীলদা’র বাড়ির শীতল মেঝেয় বসে সমরেন্দ্র সেনগুপ্তর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সমরেন্দ্র বললেন, ‘আমি তাঁর সংগীতের দাসানুদাস।’ তখন বাড়ির পুকুরে সাঁতার দিচ্ছেন সুনীলদা, আর আমার ভেতর-ঘরে বাজছে ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায়…’
না, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বাড়িয়ে বলছি না যে, তাঁর পূর্ণিমায় ভিজে আমি শুদ্ধ হয়েছি। বাড়িয়ে বলছি না, তাঁর সংগীতের দাসানুদাস হবার জন্য আমার আরও সহস্র বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে। কবি সমরেন্দ্রর হাতে কোনও পানপাত্র ছিল না। সুনীলদার হাতেও নয়। সুনীলদার হাতে ছিল আবির, যে আবির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তিনি উৎসবে হেসেছেন। আমরা তাঁর সংগীত পান করেছি সারা দিন, সারা জ্যোৎস্না। এই পানে কার না নেশা হয়!
যে কখনও গান গাইতে জানে না, সেও গেয়েছে। এই আমি, আমার কণ্ঠে সুর ওঠে না বলেই জানি। অথচ আমিও গানে মেতেছিলাম। শান্তিনিকেতনের সবকটি বৃক্ষ গেয়েছিল, সবকটি ফুল, পাতা, পাখি, সবকটি হু হু হাওয়া, নদীর সবকটি ঢেউ। সন্ধ্যার ‘শ্যামা’য় দাঁড়িয়ে চৈতালি গেয়েছিল, কোপাই-এর দিকে যেতে যেতে উর্মিলা গেয়েছিল, গৌতম গেয়েছিল, ভর জ্যোৎস্নার মাঠে বসে দীপেন গেয়েছিল, সুপর্ণাদি গেয়েছিল। ছাদে বসে খোলা রাতে গেয়েছিল রেখা মৈত্র, সৌমিত্রদা, অশেষ, মৃদুল। আহা, এমন গানের জীবন রেখে কে ফিরতে চায় ইট-কাঠ-সুরকির নিরালোকে!
আমার ফিরতে ইচ্ছে করেনি। আমি তাঁর পায়ের কাছে নতজানু বসতে চেয়েছি। আমি তাঁর সুধারসে ভেসেছি, আমি আকণ্ঠ ডুবেছি তাঁর অতলে। এখনও, ঢাকায় ফিরে, প্রতি ভোরে আমি খুব গোপনে গোপনে লক্ষ করি, কে যেন ডাকে আমাকে। সূর্য ওঠার আগে আমাকে কেউ ডাকে, খুব নিবিড় করে ডাকে, ডেকে বলে ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল…’। আমি দ্বার খুলে ভোরের সূর্যোদয় দেখি। আমার কাছে সবকিছু, এই আলো, হাওয়া, বৃক্ষ, নদী, মাটি ও মানুষ সব বড় আপন আপন লাগে। সব বড় স্নিগ্ধ মনে হয়, বড় স্বপ্নময়, সুন্দর।
এ কি ভেতরে-বাইরে শুদ্ধ হওয়া নয়? আমি এক সুন্দরের দিকে যাচ্ছি জানি, অসুন্দরের খোয়া পাথর ডিঙিয়ে আমার সুন্দরের দিকে। আমার ঈশ্বরের দিকে। কে আছে আমাকে ফেরায়? কোনও ধর্মযুদ্ধ, কোনও আধিভৌতিক অপশক্তির সাহস আছে আমাকে ফেরায়?
‘মন কেমন করে’
১
শেষ বিকেলে ঘরে একেবারেই মন টেকে না। ইচ্ছে করে বাইরে বেরোতে। গাছগাছালির না হোক, নাগরিক দরদালানের পাথুরে হাওয়াটাও তো গায়ে এসে লাগে। আর সন্ধে থেকে লোডশেডিং-এর যে প্রতাপ শুরু হয়েছে, তাতে ঘরের মধ্যে বসে থাকবার অর্থ, জ্বলন্ত চুলোর ওপর বসে থাকা। প্রায়ই বাইরে বেরিয়ে রিকশা নিই, সঙ্গে ভাই-বোন কেউ একজন থাকে। হুড খুলে রিকশাকে বলি যেতে। কোথায় যাবে তা কখনও বলি না। এদিক-ওদিক দু’ঘণ্টা ঘুরে বাড়ি ফিরে আসি।
এ শহরে হাওয়া খাওয়ার জায়গা তো কম নয়। কিন্তু পয়লা বৈশাখ ছাড়া রমনা পার্কে কখনও যাইনি। সোহরোওয়ার্দি উদ্যানে গিয়েছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে একটি গান বা কবিতার অনুষ্ঠানে। আমার বাড়ি থেকে এই উদ্যান দুটো খুব কাছে, কিন্তু যাওয়া হয় না, শেষ বিকেলে বা সন্ধেয় এই উদ্যান দুটোয় জমে ওঠে মেয়েমানুষের হাট, এই হাটে পুরুষেরা দরদাম করে মাংস কেনে। রমনা পার্কের পেছনে সরকারের বাৎসরিক খরচ কয়েক লাখ টাকা—এর রক্ষণাবেক্ষণ করে কী লাভ দেশে পতিতাবৃত্তির প্রসার ছাড়া? আজকাল কাকরাইল মসজিদেও ধর্মলিপ্সু যুবক ও বৃদ্ধের ভিড় বাড়ছে, ফুটপাত পেরিয়ে রাস্তায় উপচে পড়ছে ওরা। ওরাও জিকির-ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাঁটতে বের হয় রমনায়। হাঁটতে হাঁটতে একেবারে হাটে। হাটে টুপি-দাড়ি বেমানান বলে অগত্যা টুপিখানা পাঞ্জাবির পকেটে লুকোতে হয়। আমাদের কোথাও যাবার জায়গা নেই। রমনায়, সোহরোওয়ার্দির হাটে মাংসের গন্ধ। ক্রিসেন্ট লেকে ইচ্ছে করে সন্ধে কাটাতে। তাও সম্ভব হয় না। বিপর্যস্ত তরুণেরা অসৎ আনন্দে এগিয়ে আসে সামনে। সবখানে বাধা, সবখানে সন্ত্রাস, ষড়যন্ত্র, সবখানে দূষিত বাতাস।
এই ঢাকা শহরে কোথায় গিয়ে ঘ্রাণ নিতে পারব স্নিগ্ধ সবুজের? কোথায় গেলে নিশ্বাসে পাব নির্মলতা? ঘর ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে আনন্দ নেই, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয় রিকশায় বসেই, কোথাও নেমে দাঁড়াবার মাটি নেই, সিঁড়ি নেই, গাছের গোড়া নেই। বাচ্চাকে প্যারামবুলেটরে করে দম্পতিরা ছুটে আসে, ছোট ছোট সাইকেল নিয়ে শিশুরা খেলতে আসে বিকেলে সংসদ ভবনে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় মেলা বসেছে। মেলায় ফুচকা, চটপটির হুড়োহুড়ি।
আমাকে অগত্যা ফিরতে হয় ঘরেই। ঘরের লোডশেডিং তখনও কাটে না, তবু ফিরতে হয়। কারণ রিকশাওয়ালাকে অত বেশি পরিশ্রম করাবার ইচ্ছে আমার নেই, তাকে পারিশ্রমিক দেবার ক্ষমতাও আমার কম কিনা।
২
পরিবার পরিকল্পনার দিকে সরকারের দৃষ্টি বড় সজাগ। এই খাতে বিদেশি সাহায্যও বেশ আসে। ঢাকা শহরের দোতলা বাসগুলো ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’ জাতীয় উপদেশ বিতরণ করতে করতে যায়। গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশি ‘কম্বিনেশন ফাইভ’। কিন্তু দরিদ্রের কোলেকাখে তো কম প্রাণী নেই। বাড়ছেই। পুত্রলিপ্স পিতারা পুত্রসন্তান না হওয়া তক উৎপাদন বন্ধ করতে রাজি নন। তাঁরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সরকার একবার স্লোগান দিয়েছিল—দু’টি নয়, একটি সন্তানই যথেষ্ট। একটি সন্তান পুত্র হলে যথেষ্ট হয় মানি। কন্যা হলে কোন পরিবারে তা যথেষ্ট বলে— বাংলাদেশের কটি পরিবার একে যথেষ্ট মনে করে?
যথেষ্ট মনে করবার জন্য সরকারই বা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? যদি ব্যবস্থা নিয়েই থাকে তা কার্যকর হচ্ছে কতটুকু? আর আমাদের সমাজই বা একে যথেষ্ট মনে করবার জন্য কতটুকু যোগ্য হয়েছে?
বিজ্ঞাপনের নারী
বিজ্ঞাপনে নারীর ‘জয়জয়কার’। বিজ্ঞাপনে কী করে ব্যবহৃত হয় নারী, কী করে সে বঞ্চিত হয়, আমার প্রসঙ্গ সেটি নয়। প্রসঙ্গ অন্য। বলছি, পত্রিকা অফিসে একজন ‘বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি’র প্রয়োজন হয় এবং এই বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণত নারীকেই নির্বাচন করা হয়। কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে নির্বাচন করা হয়, কেন পুরুষকে নয়—এই প্রশ্নটি আমার অনেক দিনের।
আজকাল কালো টাকার মালিকেরা ভিখিরিদের দান-খয়রাত করবার চেয়ে পত্রিকা বার করতেই বেশি আগ্রহী। টাকার পাহাড় যদি উঁচু হতে হতে এমন অবস্থা হয় যে, পাহাড় ক্রমশ আকাশ ফুঁড়ে উঠছে, তখন পাহাড়ের মালিকটি হজ করতে যান। হজ করে এসে বাড়িতে বসে গা চুলকান, ফোনে কথাবার্তা বলেন মন্ত্রী-টন্ত্রির সঙ্গে, তেলে-মশলায় রান্না করা খাবার খান, বিকেলে ক্লাবে মদ খেতে এবং নারী দেখতে যান, ঠিক দেখতে না বলে এখানেও ‘খেতে’ শব্দটি ব্যবহার করা যায়, তাঁর অলস অবসর দেখে কেউ কেউ বুদ্ধি দেয় পত্রিকা করুন, একটা কাজের কাজ হবে। তখন কালো টাকার মালিকটি পত্রিকা বার করেন। পত্রিকা কী জাতের হবে তা নিয়ে এক রাতে হয়তো বন্ধুবান্ধব ডেকে লটারি করলেন, কাগজের এক টুকরোয় ‘রাজনীতি,’ আরেক টুকরোয় ‘সেক্স’। ব্যস, অফিস নেওয়া হল, সাংবাদিক ডাকা হল, কোথায় কোথায় দেশি-বিদেশি নারী-শরীরের ছবি পাওয়া যায়, জোগাড় করো, প্রচ্ছদে সেঁটে দাও, ভেতরে রাখো রগরগে যৌনতা। হিট। লোকে বলবে এ তো দেখি যেখানেই হাত দেয় সেখানেই সোনা। আর বাকিটি হল ‘রাজনীতি’। এও একই কায়দা। কোথায় কী হচ্ছে, কে কাকে গালি ছুড়ছে, কার অনাস্থা, কোনও সংশোধনী, কে জেলে, কে বাইরে ইত্যাদির বর্শা, বল্লম, হুল ছোড়াছুড়ি। আবার পাশাপাশি নানারকম দর্শনের কচকচানো। এতেও লাভ। মালিক রাতারাতি বুদ্ধিজীবী বনে যাবেন। পাটভাঙা পাঞ্জাবি পরে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে সভাসমিতিতে পতির আসন অলংকৃত করতে হবে, লোকে বিবৃতি চাইবে, অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত লোক বাহবা দেবে, বলবে আপনার মধ্যে যে এত গুণ ছিল তা কিন্তু আমাদের জানা ছিল না। মালিক তখন মৃদু হাসবেন। তখন তাঁর ঠা ঠা করে হাসাও চলবে না। যথাসম্ভব গম্ভীর হতে হবে। তখন কালোকে আর লোকে কালো বলবে না, বলবে সাদা।
কালোকে সাদা করবার পদ্ধতি বর্ণনা করা আজ আমার বিষয় নয়। আমার বিষয়, পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন আনবার কাজ যে মানুষটি করে, সেই নারীটি—সে তার পথে কী করে হাঁটে, সে তার গন্তব্যের দিকে কী করে অগ্রসর হয়, আমি তার যাত্রার দিকে একবার দৃষ্টি ফেরাব।
আমি একজন বিজ্ঞাপন প্রতিনিধির কথা জানি, সে বিজ্ঞাপন আনতে গেলে প্রতিটি কোম্পানির মালিক বা ম্যানেজার দ্বারা তাকে অপদস্থ হতে হয়। সে নিরীহ এক মেয়ে, স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে, পড়াশোনা আই এ পর্যন্ত! চাকরি খুঁজতে গেলে পত্রিকায় এই চাকরিটিই দেওয়া হল, কারণ সম্ভবত তার স্বামী নেই, তাই ভাবা হয়, মেয়েটি খুব একটা ‘সুবিধের’ হবে না, আর ‘সুবিধের’ না হলেই তো বিজ্ঞাপনে ভাল খাপ খাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বামী তালাক দিলেই মেয়েরা বিজ্ঞাপনে খাপ খায়, কথাটি ঠিক নয়। যে প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেবে, তাকে সেই প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তার সামনে বসে বিজ্ঞাপনের কথাবার্তা বললেই শুধু চলে না, বড়কর্তার ইচ্ছেয় ঘরের দরজা বন্ধ হয়, বড়কর্তা এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন এবং বিজ্ঞাপন দেবার আগে প্রস্তাব করেন—চলুন একদিন কোথাও বেড়াতে যাই সারা দিনের জন্য।
মেয়েটি যদি বলে, কোথায়?
বড়কর্তা চোখ নাচিয়ে উত্তর দেন, কেন, বুঝতে পারছেন না কোথায়?
মেয়েটি বুঝতে পারে কোথায়। কারণ তাকে এর আগেও আরও প্রতিষ্ঠান চিনিয়ে ছেড়েছে এই, ‘কোথায়’টি আসলে কোথায়!
মেয়েটি নিজেকে সংযত করে বলে—না।
বড়কর্তা টোপ ফেলেন, বলেন—অনেক টাকার বিজ্ঞাপন পাবে।
মেয়েটি তবুও ‘না’ বলে। এবার খেপে যান বড়কর্তা। বলেন, তবে এই লাইনে এলে কেন?
এই লাইনে এলে কেন? তা হলে কি ভাবা হয় বিজ্ঞাপন নেবার লাইন খারাপ লাইন?
আর খারাপ লাইন বলে এখানে ‘মেয়েদের’ নিয়োগ দেওয়া হয়। বড়কর্তাদের হাতে শরীর সঁপে দিয়ে মেয়েরা বিজ্ঞাপন এনে দেবে, পত্রিকাওয়ালারা সেই বিজ্ঞাপন ছাপবে আর মেয়ে তার ওপর সামান্য কমিশন পাবে, এই তো?
এও তো এক ধরনের বেশ্যাবৃত্তি, সভ্য বেশ্যাবৃত্তি। শরীরের বিনিময়ে টাকা। যত শরীর এলিয়ে দেবে বড়কর্তার গায়ে, তত বাড়বে বিজ্ঞাপনের মূল্য। অগ্রণী ব্যাংক, সোনালি ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, সমবায় ব্যাংক, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ভাইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, পেট্রোবাংলা, বি সি আই সি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর— কোথাও থেকে বিজ্ঞাপন নিতে যাওয়া মেয়েরা রেহাই পায় না।
আসলে মেয়েরা যে কাজেই এগিয়ে আসে, একেবারে বড় কর্মকর্তার পদ বাদ দিলে বাকি প্রায় সব পেশাকেই নিচু চোখে দেখা হয়। সব পেশায় শরীর-শরীর গন্ধ ছড়ানো থাকে। আমি এক সময় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের চিকিৎসক ছিলাম।
এই বিভাগের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট সকলকেই উপপরিচালক লোকটি স্রেফ তার ভোগের বস্তু বলে ভাবত। প্রতিদিন সে এক-একটি মেয়ের দিকে হাত বাড়াত, তাদের ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করত, চাকরি যাবার ভয় দেখিয়ে ওদের চিৎকার থামাত। এই সব ঘটনা আমি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। প্রতিবাদ করেছি বলে আমার কম অসুবিধে হয়নি।
সে পুরনো কথা। এখন বলছি, মেয়েরা যে-কোনও কাজেই এগিয়ে আসতে পারে, এতে তাদের সম্মান যায় না। প্রিন্সেস ডায়নাও এক সময় লোকের বাড়িতে বাসন মাজবার কাজ করত, এতে তার মানমর্যাদা সামান্যও লোপ পায়নি। মেয়েরা যে-কোনও কাজেই দক্ষতা দেখাতে পারে, তবে সমাজের ভদ্রলোকদের তো এইটুকু সহনশীল হতেই হবে— যে মেয়েটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন চাইতে এসেছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞাপন বিষয়েই আলাপ হোক, বিজ্ঞাপন দেওয়া হোক অথবা না হোক। মেয়েদের আসলে ব্যবহার করছে দু’পক্ষই। একদিকে পত্রিকাওয়ালা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের মালিক। মাঝখান থেকে কাজ করতে আসা মেয়েরা কাজের ওপর থেকে শ্রদ্ধা হারাচ্ছে, তারা অতঃপর যদি চার দেওয়ালের ঘরেই নিজেদের নিরাপদ ভাবে, তবে লজ্জা কি শুধু আমাদের নারীদেরই? সভ্য, শিক্ষিত পুরুষদের নয়?
কোনও কাজই অসম্মানের নয়। গার্মেন্টস-এর নারী, অফিস-আদালতের কেরানি-নারী, হাসপাতালের নার্স, আয়া, মেথরানি— কেউই অসম্মানের কাজ করেন না। সকলকে শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে। যে বেশ্যা, তারও মর্যাদা আছে, সরকার তাকে বেশ্যাবৃত্তি করবার অনুমতি দিয়েছে, সেও অধিকার রাখে সম্মানিত হবার মেয়েরা চার দেওয়ালের অন্ধকার গুহা থেকে বাইরে বেরিয়েছে কাজ করতে, তাকে কাজ করবার সুযোগ না দিয়ে যারা শরীর কামড়াতে আসে তাদের চিহ্নিত করা হোক। তাদের আজ সতর্ক করা হোক।
‘কে বলেছে তোমায় বঁধু এত দুঃখ সইতে…’
কিছু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ছাড়া প্রায় সব বাঙালিই হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মের প্রভাবে, বাঙালি সমাজের প্রভাবে বাঙালি সমাজের নিয়মনীতি গড়ে উঠেছে। তৃতীয় বিশ্বে বাস বলে অধিকাংশ বাঙালি নিম্নবিত্ত, মানবেতর জীবনে অভ্যস্ত। গুটিকয় বিত্তশালী, বাকিরা মধ্যবিত্ত জীবনে মাঝারি মাপের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে ধর্মকে মূলমন্ত্র বলে মানে।
বাঙালি পরিবারে মেয়ে-জন্ম কখনও কাঙ্ক্ষিত নয়। কাঙ্ক্ষিত নয় এই কারণে যে, প্রচলিত সমাজব্যবস্থা কোনও মেয়েকেই মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। ছেলে জন্মালে বাঙালি মুসলমান জন্মের আনন্দ প্রকাশ করতে আঁতুরঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আজান দেয়, মুসলমানের জন্য ‘আজান’ পবিত্র একটি আহ্বান। মেয়ে জন্মালে আজান দেবার নিয়ম নেই। ছেলে জন্মালে ‘আকিকা’ নামক অনুষ্ঠানে একটি গোরু বা দুটো খাসি ‘কোরবানি’ করতে হয়, আর মেয়ের বেলায় একটি খাসি হলেই চলে।
জন্মের বৈষম্যের পরপর শুরু হয় শৈশব-কৈশোরের বৈষম্য। বাঙালি মেয়ে-শিশুর জন্য শিক্ষা অর্জন এক সময় নিষিদ্ধ ছিল। হিন্দুধর্মে ছেলেদের উপনয়ন হয়, মেয়েদের হয় না, যাদের উপনয়ন হয় না, তাদের জন্য বেদশিক্ষা ছিল নিষিদ্ধ। মুসলমান ছেলেরা বইখাতা হাতে স্কুলে লেখাপড়া করতে যায়, মেয়েরা ঘরে বসে রান্নাবান্না, ঘর সংসারের কাজ করে। মূলত মেয়েদের শরীর ও মনকে ঘর সংসারের কাজে অভ্যস্ত করবার জন্যই এই ব্যবস্থা।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে মেয়েদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয়। মেয়েদের প্রথম নিয়মিত স্কুল খোলা হয় ১৮১৯ সালে। মিশনারিরা খুলেছিলেন। বাঙালির উদ্যোগে প্রথম মেয়ে-স্কুল বারাসাতের বিদ্যালয় খোলা হয় ১৮৪৭ সালে। ১৮৫০ সালে খোলা হয় বেথুন স্কুল। বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রচারের ফলে তেইশজন ছাত্রীর মধ্যে ষোলোজনই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মেয়েদের শিক্ষার বিরুদ্ধে তখন এ-ধরনের রুচিহীন আলোচনা পত্রপত্রিকায় লেখা হত—‘বালিকাগণকে বিদ্যালয়ে পাঠাইলে ব্যভিচার সংঘটনের শঙ্কা আছে, কেন-না বালিকাগণ কামাতুর পুরুষের দৃষ্টিপথে পড়িলে অসৎ পুরুষেরা তাহাদিগকে বলাৎকার করিবে, অল্পবয়স্ক বলিয়া ছাড়িবে না, কারণ খাদ্য-খাদক সম্পর্ক।…ধনবানদিগের কন্যারা পথিমধ্যে ভৃত্য দ্বারা রক্ষিত হইয়া গমন করিলে তথাপি কৌমার হরণের ভয় আছে, কেননা রক্ষকেরাই স্বয়ং ভক্ষক হইবে।’
ধর্ম বলে, নারীকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে। পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে যদি কিছুর উৎপত্তি হয় তবে মানুষ হিসেবে সে সম্পূর্ণ নয়— এ-কথায় কারও দ্বিধা নেই নিশ্চয়ই। নারীকে পরদার ভেতর থাকতে হবে, আপন বাবা, ভাই, চাচা, মামা ইত্যাদি হাতেগোনা ক’জন আত্মীয় ছাড়া আর কোনও পুরুষের সামনে আসা তার নিষেধ। মুসলমান নারীকে অবরোধে রাখবার জন্য ধর্মের শৃঙ্খল সবচেয়ে বড় শৃঙ্খল; এই শৃঙ্খলের কারণে অধিকাংশ মেয়ে আজ নিরক্ষর, উত্তরাধিকার-বঞ্চিত, বাল্যবিবাহ, তালাক ও বৈধব্যের নির্যাতনের শিকার।
বাঙালি হিন্দু মেয়েরা পিতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। (এটি অবশ্য বাংলাদেশের বেলায় প্রযোজ্য। ভারতে হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্ট ১৯৫৬ অনুসারে পিতার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অধিকার সমান।) বাঙালি মুসলমান মেয়েরা যা পায় তা ছেলের অর্ধেক, অবশ্য তা কেবলই কাগজপত্রে। বাস্তবে মেয়েদের ভাগ্যে প্রায় জোটে না কিছুই। মেয়েদের জন্য উত্তরাধিকারসূত্রে এই যৎসামান্য পাওয়া এবং কিছুই না পাওয়া—তাদের মর্যাদা খর্ব করেছে সবচেয়ে বেশি। মেয়েরা পিতার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি যেমন পায় না, তেমন মানুষ হিসেবে সম্মানও পায় না।
বয়ঃপ্রাপ্তির পরপর বাঙালি মেয়েদের আগলে রাখতে হয় সবচেয়ে বড় এক সম্পদ, ধর্ম এবং সমাজ শিখিয়েছে এই সম্পদের নাম সতীত্ব। সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে পারলেই মেয়েদের মূল্য সমাজে বেশি। মূল্য এই অর্থে যে, লোকে তাকে অপাঙ্ক্তেয় বা অস্পৃশ্য ঘোষণা করবে না। পৃথিবীতে প্রচলিত প্রতিটি ধর্মেই মেয়েদের সতীত্বের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও ধর্মেই পুরুষের জন্য কোনও ‘সতীত্বে’র ব্যবস্থা নেই। বাংলা অভিধানে সতীর পুংলিঙ্গ কোনও প্রতিশব্দ নেই। এর অর্থ এই, পুরুষের জন্য একগামিতার প্রয়োজন নেই, তার জন্য গণিকালয়ে যাবার সুযোগ ধর্ম এবং সমাজ দুই-ই করে রেখেছে, তার জন্য চারটি বিয়ে ‘হালাল’ করা হয়েছে ইসলাম ধর্মে, তার ‘ভোগের’ জন্য ঘরের দাসীকেও বৈধ করা হয়েছে।
পতিসেবা নারীর পরম ধর্ম। ‘পতি ধর্ম, পতি কর্ম, পতি সারাৎসার। পতি ভিন্ন রমণীর গতি নাই আর।/ পতি আজ্ঞা, সতী পক্ষে, বেদের সমান/ পতি তুষ্ট হলে, তুষ্ট প্রভু ভগবান।’ ‘রমণীর পতি বিনা গতি নাই/পতির বিষয়ে বিশেষ জানাই। পতি যা বলেন তাহাই করিবে/ পরম যতনে পতিকে সেবিবে। পতি খেলে খাবে, না খেলে খাবে না। পতি শুলে শোবে, না শুলে শোবে না।’ সতী হবার জন্য এইসব সারকথা নারীর মস্তিষ্কে প্রবেশ করানো হত। এখনও হয়, যদিও রাধাকান্ত দেব, গৌরমোহন বিদ্যালংকার, রাজা বৈদ্যনাথ রায়, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কল্যাণে মেয়েদের জন্য শিক্ষা জুটছে, তবু এখনও বাঙালি মুসলমান মেয়েরা জানে স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত। জানে স্বামীকে তুষ্ট রাখতে পারলে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা খুশি হন। তাই বেহেশতের লোভ দেখিয়ে স্বামীর পদসেবায় স্ত্রীদের নিয়োজিত রাখা এক ধরনের কৌশল, ধর্মের এবং সমাজের।
বাঙালি মেয়েরা স্বামী ও পুত্রের এঁটোকাঁটা খেয়ে ধর্মীয় পুণ্য অর্জন করে। এতে স্বামীসেবাও হয়, ধর্মরক্ষাও হয়, কিন্তু যা হয় না—তা হচ্ছে স্বাভাবিক পুষ্টিরক্ষা। পুষ্টির অভাবে বাঙালি মেয়েরা অধিকাংশই স্বাস্থ্যহীন, শ্রীহীন এবং কিছুটা মেধাহীনও বটে। নারী কেবল পুরুষের যৌনসামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসলাম ধর্মে নারীর যৌনঅঙ্গ হিফাজত করবার কথা বলা হয়েছে। এও বলা হয়েছে, ‘নারী হচ্ছে তোমাদের শস্যক্ষেত্র, এই শস্যক্ষেত্রে তোমাদের যেভাবে ইচ্ছা গমন করো।’ নারীকে অবাধ ভোগের কথা সকল ধর্মই বলেছে, নারীকে মূল্যবান সামগ্রী হিসেবে উপঢৌকন দেবার কথা, যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত অঞ্চলের নারীকে ভোগের বস্তু করা সকল ধর্মেই স্বীকৃত।
বাঙালি নারী কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে চুড়ি বা শাঁখা পরে এয়োতির চিহ্ন বহন করে; যদিও পুরুষের শরীর বিবাহের কোনও চিহ্ন বহন করে না। বৈধব্যের চিহ্নও নারী একা লালন করে। বিধবা নারীকে নানা রকম ব্রত পালন করতে হয়, পোশাক ও আহারে আমূল পরিবর্তন আনতে হয়। কিন্তু বিপত্নীক কোনও পুরুষকে সঙ্গীহীনতার কোনও গ্লানি ভোগ করতে হয় না। নিরামিষ আহারের মূল কারণ বিধবা মেয়ের স্বাস্থ্যহীনতা, শ্রীহীনতার পাশাপাশি যৌনাকাঙ্ক্ষা নিবারণ করা। যদিও বিপত্নীকের জন্য এই সব অনাচার জরুরি নয়।
বাঙালি নারীর কাছে স্বামী হচ্ছে প্রভু, মালিক, মনিব, অধিকর্তা ইত্যাদি। স্বামী-পুরুষকেই নারীর উদ্ধারকর্তা ভাবা হয়। হিন্দু মেয়েরা বিয়ের আগে নানা রকম ব্রত করে, সব ব্রতের মূলকথা স্বামী পাওয়া, পুত্রসন্তানের জননী হওয়া এবং নির্বিঘ্নে সংসার যাপন করা। সংসার যাপনের অর্থ সমাজ এমনই বুঝিয়েছে যে স্বামীসেবা, শ্বশুরকুলের সেবা এবং সকলকে মুগ্ধ করবার জন্য নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া।
যে মেয়ে পুরুষ-তৈরি ‘ধর্ম ও আইন’-এর খাঁচায় নিজেকে বন্দি রাখে অথবা বিসর্জন দেয়, তাকে সকলেই খুব ভাল বলে। সকলেই তার সুখ্যাতি করে। এও পুরুষতন্ত্রেরই এক কৌশল, যে নারী খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসে, তাকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করা, তাকে সামাজিক নিগ্রহের শিকার করা—যেন যে-কোনও নারীর কাছেই ‘সংসার-খাঁচা’টিই হয় পরম আরাধ্য।
মাতৃত্বের মাহাত্ম্য বর্ণনা হয় সব জায়গায়। কিন্তু সমাজ পিতার পরিচয়কেই অগ্রগণ্য মানে। পিতার নাম ছাড়া কোনও সন্তান কোথাও পরিচিত হতে পারে না। সর্বত্র মাতৃত্বের এই পরাজয় নারীর অবমূল্যায়নের বড় একটি দিক। আইনের দিক থেকেও সন্তানের ওপর পিতার অধিকারই বেশি।
‘বিয়ে’ নামক ঘটনাটি নারীর বিক্রি হওয়ার পদ্ধতি। যৌতুকের বিনিময়ে, দেহমোহরের বিনিময়ে অর্থাৎ মানুষে-মানুষে সম্পর্কের চেয়ে অর্থকড়ির সঙ্গে নারীর একটি ক্রয়বিক্রয়ের সম্পর্ক তৈরি করা হয়। ‘পণ্য’ হিসেবে নারী তখন পাকাপোক্তভাবে সমাজে অধিষ্ঠিত হয়। নারী পণ্য বলেই তাকে পরদায় আবৃত হতে হয়, নারী পণ্য বলেই তার চলাচল নির্দিষ্ট হয় ঘর এবং ঘরের বাইরে মাপা একটি পথ পর্যন্ত, নারী পণ্য বলে নারীর সাজসজ্জার জন্য নানারকম প্রসাধনীর ব্যবস্থা করা হয়।
এই নারী-পণ্যকেই যৌনসামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে ঘরে-ঘরে স্থাপন করা হয় বিবাহ নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। স্বামীর পরিচয়ে নারী পরিচিত হয়। যুগ বদলেছে, মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে, কাজকর্ম করছে, অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও হচ্ছে অনেকের—কিন্তু পিতা বা স্বামীর সংসারে অর্থবৃদ্ধির সহায়তা ছাড়া নারীর জন্য সত্যিকার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটছে না। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কোনও উন্নতি হয়নি, নারীর উপর নির্যাতনের প্রক্রিয়ার কোনও পরিবর্তন হয়নি। নির্যাতন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার, নির্যাতন এই ব্যবস্থার কাঁধের ওপর বসে থেকে আরাম করা নানারকম মানুষের।
ইসলামি থাবা
ঠিক কবে থেকে ওঁরা এই নিয়মটি মানছেন, আমি সনতারিখ জানি না। লক্ষ করে বেশ অবাক হয়েছি, এতে ওঁদের এবং অন্যান্যদের কী লাভ হচ্ছে আদৌ, নাকি নিয়মটি তৈরি হয়েছে কর্তাদের সন্তুষ্টির জন্য? কর্তারা সন্তুষ্ট হলে অবশ্য লাভের কোনও কমতি হয় না।
টেলিভিশনে খবর পড়তে বা ঘোষণা করতে যে মেয়েরাই আসেন, ক্যামেরার সামনে ওঁদের শাড়ির আঁচল সামনের দিকে টেনে বসতে হয়। আগে এই নিয়মটি ছিল না, এখন আঁচল টেনে রাখবার কারণ কী? এক সময় রোজার মাসে মাথায় আঁচল তুলে ঘোষিকা বলতেন—শুরু হচ্ছে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘রংবেরং’। মাথা থেকে নেমে আঁচল এখন ডান বাহু ঢেকে ফেলেছে। তবু তো ঢেকেছে কিছু, কিছু না ঢাকলে নাকি অনেকের স্বস্তি নেই।
প্রথম ভেবেছিলাম আঁচলের কারুকাজ দেখাবার জন্য বুঝি খুব ফ্যাশন-সচেতন কেউ কেউ আঁচল সামনে এনেছেন, পরে দেখি সবাই—সবাই এই একই কাজ করছেন। সবাই যখন করছেন তখন নিশ্চয় এটি আর শখ থেকে নয়, আদেশ থেকে, কর্তৃপক্ষের আদেশ। শখ থেকে একই পদ্ধতি দীর্ঘকাল অনুসরণ করে না কেউ। কিন্তু কেন এই আদেশ? আঁচল সামনে না আনলে, যা এতকাল ছিল, কী অসুবিধে হয়? কার অসুবিধে? অসুবিধে নিশ্চয়ই মেয়েদের নয়, কারণ খবর বা ঘোষণার পরই ওঁরা আঁচল সরিয়ে ফেলেন সামনে থেকে। তবে এই কৃত্রিম সাজের কারণ কী? আমি কি তবে এই ধরে নেব যে, ইচ্ছে নেই, তবু এই কাজে ওঁরা বাধ্য হচ্ছেন?
কেন এই অদ্ভুত নিয়মটি (আমি নিয়মটিকে অদ্ভুতই বলব যেহেতু আড়ালে এটি আর পালন হয় না, কেবল প্রদর্শনের বেলায় এটি সুচারু, সুন্দর) মেয়েদের গায়ে চাপানো হল? সঙ্গে তো খবরপাঠক বা ঘোষক-ছেলে ছিলেন, ওঁদের গায়ে তো নতুন করে জড়াতে হয়নি কিছু!
নাকি জড়ালে মেয়েদের গায়েই জড়াতে হয় কাপড়চোপড়, চাপালে মেয়েদের ওপরই চাপাতে হয় নিয়ম? অনেকে বলছে এ নাকি ইসলামি নিয়ম। আঁচলে চুল ঢাকলে যেহেতু চুলের খোঁপা, বা চুলের নানা রকম কায়দাকানুন ঢাকা পড়ে যায়— তাই মেয়েরা চুল ঢাকতে রাজি নন। দুই নেত্রী ঢাকছেন তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থে, টেলিভিশনের মেয়েদের সে-রকম কোনও স্বার্থ নেই। অতঃপর আঁচলটি মাথায় না উঠে কাঁধে উঠেছে। অগত্যা এটিই ওরা পালন করছেন। যে দেশে ইসলামের জয়জয়কার, সে দেশে কিছুটা রাখঢাকের দরকার আছে, আর কোথাও না থাক, মেয়েমানুষদের গা-গতর না ঢেকে রাখলে পুরুষমানুষেরা তো যেখানে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সম্ভবত কামুক পুরুষদের সামাল দেওয়ার জন্য ইসলামের অধিকাংশ বিধিবিধান তৈরি হয়েছে।
যদি ইসলামকে মানতেই হয়, তবে সবটুকুই মানতে হয়। এ-রকমই নিয়ম। সেক্ষেত্রে টেলিভিশনের পরদায় মেয়েদের ছবি ভেসে ওঠাই তো অত্যন্ত অন্যায়। মেয়েরা পরদা পুশিদা মতো থাকবে, ঘরের বার হবে না, রামপুরায় যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের হাসিঠাট্টা বন্ধ হবে, নাটকে নারীচরিত্র থাকবে না, মেয়েরা গান গাইবে না, নাচবে না। ইসলামকে মানতে হলে উচিত সবটুকু মানা, আধাআধি মানবার তো কোনও অর্থ হয় না। শুধু সেটুকু বা কেন মানা হয়, যেটুকুতে পুরুষের কোনও কর্তব্য নেই, কর্তব্য কেবল মেয়েদের? ইসলামের আইন এদেশে কেবল নারীর ওপরই কেন অকাতর বর্ষিত হয়?
উত্তরাধিকার আইনে নারীকে বঞ্চিত করেছে ইসলাম, পুত্রসন্তানের জন্য রেখেছে দু’ভাগ, কন্যাসন্তানের জন্য এক ভাগ। এই অসভ্য উত্তরাধিকার আইনটি এই দেশে প্রচলিত। বিবাহ আইনে মেয়েরা দেনমোহরের শর্তে পুরুষের কাছে একরকম বিক্রি হয়, পুরুষেরা স্ত্রীদের খাওয়াপরা জোগাবে আর পুরুষের নির্দেশমতো স্ত্রীরা কাজকর্ম করবে, বাড়ির পোষা কুকুরকে যেমন মনিবেরা সময়মতো খাবার দেয়, বিনিময়ে বিশ্বস্ত কুকুরটি বাড়ি পাহারা দেয়, এ অনেকটা সে-রকম। পুরুষেরা চার বিয়ে করবার অনুমতি পায়, এক ঘরে চার বউ নিয়ে বিবাহিত জীবনযাপন করবার অধিকার কেবল পুরুষেরই আছে।
কেবল নারীকে অবদমনের ক্ষেত্রেই ইসলামের নিয়ম চালু হয়েছে দেশে। বাকি নিয়ম কোথায়, চুরি করবার হাতকাটা আইন? ব্যভিচার করলে পাথর ছোড়া বা বেত মারা? অক্টোপাসের মতো দুর্নীতি তার শত বাহু মেলে বিকশিত হচ্ছে। কই, কোনও শাস্তির নিয়ম তো নেই! নাকি পুরুষেরা দুর্নীতিতে অভ্যস্ত বলে পুরুষ-কর্তারা শাস্তির নিয়মটি বহাল করতে চান না! কেবল টুপি-পাঞ্জাবি পরে মসজিদে দৌড়োলেই গা থেকে পাপ খসে পড়ে!
যে-কোনও সচেতন মানুষই এ-কথা খুব ভাল করেই জানেন—ইসলাম হচ্ছে এক ধরনের বর্ম। পাপী ও পতিত মানুষের বর্ম, অত্যাচারী ও ব্যভিচারী মানুষের বর্ম। এই বর্মটি এ-দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। যেহেতু রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সমাজ ও সমাজের মানুষ, তাই বর্মটি ব্যবহার হতে থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, রেডিয়ো, টেলিভিশনে, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ মেয়েদের না নাচালে ব্যাবসা করতে পারবে না, তাই নাচাচ্ছে, আর সে সঙ্গে মেয়েদের গায়ে ইসলামের সুগন্ধ ছিটিয়ে পাকপবিত্র করাও হচ্ছে। মেয়ে ছাড়া একদিকে চলেও না, অন্যদিকে ইসলাম ছাড়াও চলে না। তাই মেয়েদের কিছু সৌন্দর্য, রংঢং, সাজগোজ, নাচগান যেমন প্রয়োজন, ইসলামও তেমন কিছুটা হলেও প্রয়োজন। তাই কিছু ইসলাম এবং কিছু নারী উপস্থিত করে টেলিভিশনওয়ালারা ভীষণ এক জগাখিচুড়ি করছেন। না পারছেন নারী বর্জন করতে, না পারছেন ইসলাম। এতে হচ্ছে কী, কোনওটারই স্বাভাবিক বিকাশ হচ্ছে না। নারী ঠিক মানুষ হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, কারণ, যখন-তখন তার ওপর এটা-সেটা চাপানো হচ্ছে, সে নিজের রুচি এবং পছন্দমতো যাপন করতে পারছে না জীবন, তার ব্যক্তিস্বাধীনতা বারবার ব্যাহত হচ্ছে। আর ইসলামেরও নিশ্চয় ক্ষতি হচ্ছে আধাআধি ব্যবহারে। হলে সবটুকু হবে, না হলে কিছুই নয়। ইসলাম যদি জেঁকে বসতে না পারে তবে আর বসা কেন! থাবা দিলে পাঁচ আঙুলে দেওয়াই ভাল, দু আঙুলে থাবা জমে না।
ইসলামকে তাঁরা সময়-সুযোগমতো দুর্বলের ওপর চাপাতে চান, ইসলাম ধৰ্ম বটে, বর্মও কম নয়। নেতারা এই বর্ম দিয়ে ঠেকিয়ে রাখেন অসততা, টেলিভিশন কর্তৃপক্ষও নিশ্চয় এই বর্ম দিয়ে ঠেকিয়ে রাখেন নিজেদের অসৎ বাণিজ্য। ইসলাম দুর্বলের ওপরই বর্ষিত হয় বেশি। এই দুর্বলেরা, এই নির্বোধ মেয়েমানুষেরা যদি একবার এই চাপানো নিয়ম থেকে নিজেদের মুক্ত করেন তবে তাঁদের ব্যক্তিত্বের কাছে সবিনয় শ্রদ্ধা নিবেদন করতে শুধু আমি কেন, সচেতন অনেকেই চাইবেন।
আমি বলছি না ডান কাঁধ থেকে আঁচল ফেলে দিয়ে আপনারা বিদ্রোহ করুন। আমি কেবল এটুকুই অনুরোধ করছি, আঁচল যদি আপনাদের টানতে ইচ্ছে হয় টানুন। যদি টানতে ইচ্ছে না হয়, টানবেন না। আপনাদের ইচ্ছের মর্যাদাটুকু আপনারা দিন। অন্যের ইচ্ছেয় নয়, নিজের ইচ্ছেয় জীবনযাপন করে দেখুন, জীবন আপনাকে স্বাগত জানাবে। পথ হয়তো বন্ধুর, ঝোপঝাড়, সাপখোপ হয়তো বেশি, তবু জয় আমাদের হবেই। ইচ্ছে প্রবল হলে কোনও অকল্যাণের সাধ্য নেই গন্তব্যকে আড়াল করে।
নিজের গোলা শূন্য
১
একটি মেয়ে। বাবা মরে যাবার পর ভাইয়ের সংসারে মানুষ। ভাইটি তাকে বেচে দিয়ে গেল পতিতালয়ে। পতিতালয় থেকে মেয়েটি পালিয়ে বাঁচতে চাইল। সেটিও হতে দিল না আমাদের সাধুপুরুষেরা। রিকশা থেকে টেনে নামিয়ে তাকে ধর্ষণ করল। গণধর্ষণ। মেয়েটি এখন রক্তাক্ত যৌনাঙ্গ নিয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে। সাংবাদিকরা বিছানা ঘেরাও করে তার দুঃখের গল্প শুনছে, ক্যামেরায় ফ্লাশ জ্বলছে সারাদিন। বাঃ, কী মজা! ক্যামেরাম্যানের মজা, সাংবাদিকের মজা, পত্রিকাওয়ালার মজা, হকারের মজা এবং পাঠকেরও মজা নিশ্চয়।
‘নারী নিয়ে কিছু কেলেংকারি’ ছাপা না হলে আজকাল পত্রিকা তেমন জমে না। অনেকে, আমি লক্ষ করেছি, পত্রিকা খুলেই নারীবিষয়ক ঘটনাগুলো বেশ খুঁটিয়ে পড়ে। জানি না এতে ওরা আনন্দ পায় কি বিমর্ষ হয়। অবশ্য বিমর্ষ হবার কোনও লক্ষণ দেখি না সমাজের কোনও স্তরে। সকলে লুটছে, সকলে খাচ্ছে, সকলে চাইছে ‘নারী-সম্পদ’। নারী অনেকটা দোপিয়াজা মাংসের মতো, খেতে মজা। নারী অনেকটা আমের আচারের মতোও—একে চেটেও মজা।
২
নারী এমনই এক মজাদার বস্তু এ-দেশে, পুরুষেরা এই মজা দেবার বস্তুটিকে বিগড়ে যেতে দেখলেই দেবে চড়, দেবে লাথি, দেবে তার গলা টিপে, মারবে দা দিয়ে কুপিয়ে। আমাদের গ্রামগুলোয় যৌতুক না দেবার অপরাধে বধূহত্যা এখন ডালভাতের মতো। মেরে পুকুরে ভাসিয়ে দেওয়া, মেরে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া এখন খুব একটা দক্ষ হাতেরও কাজ নয়। পুলিশ দু’একদিন খোঁজাখুঁজি করে। খোঁজাখুঁজি অবশ্য আসামি ধরবার তাগিদে যত না, তার চেয়ে বেশি কিছু টাকাপয়সা নেবার আশায়। খুনখারাপির মামলা-মোকদ্দমায় নাকি নানারকম টাকাপয়সার খেলা চলে।
কিন্তু যৌতুক সমস্যার হবে কী? যৌতুক দেবে বলে মেয়েটিকে কারও কাছে গছিয়ে দরিদ্র পিতা যদি ব্যর্থ হয়- যৌতুকের টাকা, ট্রানজিস্টর, সাইকেল, ঘড়ি জোগাড় করতে? শুনেছি যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া—দুটোই নাকি আইনত নিষিদ্ধ। এ-কথা কেবল শুনেছিই। অথচ এই নিষিদ্ধ কাণ্ডটি ঘটেই যাচ্ছে নিরন্তর। মেয়ের বাবার কাছ থেকে ধনসম্পদ পাবার আশায় পুরুষেরা উৎসাহী হয় বিবাহে। দেনমোহরের টাকাও দেয় কমিয়ে। কারণ যখন খুশি তখন তালাকের পথটি মসৃণ করা চাই যে! মেয়ের বাবা সময়ের হেরফের করলে পুরুষেরা মেয়ের বুকের খাঁচা থেকে প্রাণটি বের করে নেয়, যেন খাঁচা থেকে অকম্পিত হাতে বের করে নেওয়া পোষা কবুতর।
৩
লোকে বলে, পুরুষেরা খাটে বেশি। এই বাক্যটি যে কত বড় মিথ্যে একটি বাক্য, তা অনেকেই জানে না। ধরা যাক, গ্রামের একটি সচ্ছল বাড়ি—কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে জাগবে বাড়ির ‘মেয়েমানুষ’টি, সে উঠোন ঝাঁট দেবে এবং ঘর যদি মাটির হয়, সে একাই প্রতিটি ঘর লেপবে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে চুলো ধরাবে। লকড়ি না থাকলে কুড়োলে লকড়ি কেটে নিয়ে তবে ধরাবে। চুলোয় ভাত চড়াবে, ডাল-তরকারি নয়, কিছু পিঠে-টিঠে। এসবের আয়োজন করতে হয় তাকে একাই। এই কাজ সারবার মধ্যে হয়তো দেখা যায় বাড়ির পুরুষটি একটি দাঁতন হাতে নিয়ে দাওয়ায় বসে। শীতের রোদ পোহায়, পাড়াপড়শি অথবা বাড়ির পুরুষ-আত্মীয়দের সঙ্গে বসে, গল্পগুজব হয়। গোরুগুলো গোয়ালঘর থেকে বার করে। বার করে এসে পিঁড়িতে বসে।
মেয়েমানুষটি পুরুষটির থালায় ভাত বেড়ে দেয়, ডাল-তরকারি দেয়, লবণ দেয়, কাঁচা লঙ্কা দেয়, জল দেয় গ্লাসে। পুরুষটি খেয়ে ঢেঁকুর তুলে চলে যায় খেতে। খেতে গিয়ে পুরুষটি চাষ করে, ধান বোনে, সার দেয় নয়তো ধান কাটে। সেই ধান বাড়ি নিয়ে আসে। ধরা যাক, ধান বাড়ি এল। বাড়ির মেয়েমানুষটি সেই ধান মাড়াল, ধান নিয়ে বড় বড় ডেকচিতে তুলে সেদ্ধ করল, ঢেঁকিতে ধান ছাটল, সে ধানের চাল বাড়ির গোলায় রাখল। মেয়েমানুষটি ধান মাড়াই ও সেদ্ধর ভারী ভারী কাজের ফাঁকে এসে চুলোয় ভাত বসায়। তরকারি রাঁধে। আর পুরুষটি পুকুর থেকে স্নান সেরে মাথায় সরষের তেল মেখে মাদুর বা পিঁড়িতে বসে। তৃপ্তি করে খায়।
মেয়েমানুষটি গোয়ালের গোবর সাফ করে। পুরুষটি খেয়েদেয়ে বাইরে বেড়াতে যায়। অথবা দাওয়ায় বসে হুঁকো খায়। গল্পগুজব, হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠে। বাড়ির মেয়েমানুষটি গোরুর খাবার জন্য ভাতের মাড়ের সঙ্গে নুন গুলে দেয়, খড় কেটে দেয়। সেই সকালে দু’মুঠো পান্তা মুখে দিয়েছিল, সন্ধে নেমে আসে, তার আর খাবার সময় হয় না। আবার সন্ধের পর কুপি বা হারিকেন জ্বালিয়ে খাবার দেবার আয়োজন করা, থালাবাসন মাজা, ঘর-উঠোন ঝাঁট দেওয়া। মেয়েমানুষের সময় নেই খায়, সময় নেই চুল বাঁধে, শাড়ি পালটায়। বিকেল-সন্ধে হেঁটে বেড়িয়ে বাড়ির পুরুষটির আবার খিদের উদ্রেক হয়। সন্ধের পর পরই আবার খেয়েদেয়ে সে বিছানায় শোয়। মেয়েমানুষটি সব কাজ সেরে ঘুমোতে আসে—পুরুষটি তখন তার ক্লান্ত, জীৰ্ণ, আধপেট-খাওয়া, ঘর্মাক্ত শরীরটিকে ভোগ করে। নারী অবশ্য জানে না, এই সম্ভোগে তার প্রাপ্য কী, জানে এতে কেবল পুরুষেরই তৃপ্তি।
পরিশ্রম নারীই করে বেশি। পুরুষের ঘরের গোলায় নারী ধান ভরে দেয়। তার নিজের গোলা থাকে শূন্য।
‘নপুংসক’ বিষয়ক
মঞ্চে কবিতা পড়তে উঠলে আমি লক্ষ করেছি, দর্শকদের মধ্যে থেকে কেউ-কেউ চিৎকার করে বলে ওঠেন—নপুংসক কবিতাটি পড়ুন।’ কেউ-কেউ স্লিপও এগিয়ে দেন হাতে, ‘নপুংসক’-এর অনুরোধ। এই ‘নপুংসক’ কবিতাটির অর্থ আমি যা উদ্ধার করেছি, তা হল ‘নিয়তি’ নামে আমার একটি কবিতা আছে, কবিতাটির সারমর্ম এ-রকম—এক মেয়েকে প্রতি রাতে এক নপুংসক পুরুষ চুম্বনে, আলিঙ্গনে সিক্ত এবং উত্তেজিত করে তোলেন, পুরুষের স্পর্শে মেয়ে যখন কাতর হন, তখন পুরুষটি তাঁর চরম অক্ষমতা নিয়ে গুটিয়ে থাকেন।
এই কবিতাটি পড়ে আমার এক চিকিৎসক বন্ধুকে আমি কাঁদতে দেখেছি। কারণ তার জীবনেও প্রতি রাতে এমন ঘটনাই ঘটে, প্রতি রাতে তার নপুংসক স্বামী এসে তাকে জাগায়, তাকে কাঁদায়। মেয়েটি না পারে সমাজের বন্ধন ছিঁড়তে, না পারে স্বামীকে ভালবেসে গৃহবাসী হতে। এক অস্থির, অসুখী জীবন তার। শুধু তারই বা বলি কেন—এই সমস্যা সমাজের অনেকেরই। এই কবিতা পড়ে, চেনা-অচেনা অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করেছেন, বলেছেন, আপনি বড় সত্যকথা লিখেছেন। এই সত্যকথার কবিতা নিয়ে আমাদের ছেলেছোকরারা বড় মজা করে, তারা মঞ্চের দিকে ছুড়ে দেয় ‘নপুংসক’ কবিতাটি পড়বার জন্য অনুরোধের তির। আমি যদি এই কবিতাটি পড়িই, এই অসম্ভব কষ্টের কবিতাটি, তবে দর্শকের সারিতে বসে ওরা শিস দেবে নিশ্চয়, ওরা অদ্ভুত আনন্দ পাবে। আনন্দ পাবে কারণ এই কবিতায় কিছু কিছু শব্দ আছে যা তাদের উত্তেজিত করবে যেমন স্তন, ঠোঁট, চুমু ইত্যাদি, এই কবিতা থেকে ওদের আনন্দ অর্জন করার আরও একটি কারণ, এই কবিতায় বর্ণনা করা হয়েছে ব্যর্থ এক যৌনজীবন।
যৌনসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক এবং একইসঙ্গে অনালোচিত একটি প্রসঙ্গ। তাই এটি নিয়ে এই নিরক্ষরের দেশে সমস্যাও কম নয়। সমস্যা যত হচ্ছে, সমাধান সে-হারে হচ্ছে না। অধিকাংশ নারী নানা রকম যৌন জটিলতায় ভোগেন। তাঁরা অনেকে জানেনই না, যৌনজীবনে ‘শীর্ষ সুখ’ জিনিসটি ঠিক কীরকম।
যৌনজীবনের প্রতি অদ্ভুত এক ঘৃণা এবং ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছে সাধারণ মানুষের দর্শক-শ্রোতারা একেবারেই অশিক্ষিত তা আমি বলব না, তাঁরা লেখাপড়া করেছেন, তাঁরা মানুষের জীবনের দুঃখ-সুখ সম্পর্কে সামান্যও জ্ঞান রাখেন না তাও নয়। তাঁরা আসলে যৌনগন্ধময় শব্দাবলি পুরুষের মুখেই শুনতে অভ্যস্ত। একজন নারী ছাপার অক্ষরে যৌনজীবনের কাহিনি বর্ণনা করলে তা সফল বা ব্যর্থ যে যৌনজীবনেরই হোক না কেন, তাতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই ক্ষুব্ধ হবেন। এই ক্ষুব্ধ হওয়া থেকেই উৎপন্ন হয় স্থুল রসিকতা। শিস দেওয়া, চিৎকার করা, অশ্লীল উক্তি ছোড়া।
আমার প্রশ্ন, একজন কবি, তিনি যদি পুরুষ হন, তিনি কিন্তু নারীর স্তন, ঊরু, যোনি ইত্যাদি শব্দ নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করতে পারেন, সম্ভোগের নিখুঁত বর্ণনায় কোনও দর্শক-শ্রোতা তখন উত্তেজিত হন না। উত্তেজিত হন আসলে নারীর বেলায়। কারণ তাঁদের এমনই ধারণা, এই শব্দগুলো উচ্চারণ করবার অধিকার একমাত্র পুরুষেরই আছে। নারীর কলমে এই সব শব্দ লেখা হলে তাঁরা নারীটিকে মনে করেন, ‘প্রমোদের বস্তু’, নারীর মুখে এই সব শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে শুনলে পুরুষ দর্শক-শ্রোতারা লাফিয়ে ওঠেন বিকৃত উল্লাসে। তাঁরা মনে করেন, নারীর উচ্চারণ করা উচিত নয় এমন সব শব্দ বা বাক্য যা কেবল পুরুষের উচ্চারণের অধিকারভুক্ত! পুরুষেরা সাহসী মানুষ, তারা যুদ্ধ করে, জয় করে, ভোগ করে। যেহেতু ভোগ পুরুষেরাই একা করে, তাই পুরুষের দ্বারাই যাবতীয় দুর্ভোগ সম্ভব, যাবতীয় অনাচার, অত্যাচার, অসৌজন্য, অশ্লীলতা পুরুষকেই মানায়। অবাধ অশ্লীলতা করে আনন্দ অর্জন করবার অধিকার কেবল পুরুষেরই আছে। তাই নারী যখন ‘অশ্লীলতা’ করে, সমাজ থেকে তাকে বার করে দেওয়া হয়, নারী যখন অশ্লীল শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করে, তাকে খুব একটা ভাল চোখে দেখা হয় না। সমাজ ছাড়া মেয়েদের মুখেই ‘অশ্লীল শব্দাবলি’ অর্থাৎ যৌনগন্ধময় শব্দ মানায়, সমাজের মেয়েরা যদি সমাজের ভেতরেই আয়োজিত কোনও মঞ্চে উঠে ‘অশ্লীল শব্দ’ উচ্চারণ করে তবে আর রক্ষে নেই অথবা হয়তো অন্য এক মজাও আছে এতে। ‘ভদ্রমহিলার’ মুখ থেকে ‘অভদ্র’ উচ্চারণের স্বাদই অনেকের কাছে আলাদা। কবি শামসুর রহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ কেউই ‘নিয়তি’ কবিতাটি লিখলে বা পাঠ করলে পাঠক এবং দর্শক-শ্রোতাদের কোনও আপত্তি থাকত না, আপত্তি আসলে তসলিমা নাসরিন বলেই, আপত্তি ফাহমিদা সুলতানা হলেও হত, শাফিনাজ পারভিন হলেও হত। দোষ আসলে কবিতার নয়, দোষ কোনও যৌনগন্ধময় শব্দের নয়, দোষ রচয়িতার লিঙ্গের। রচয়িতা যদি নারী হয়, তবে সুড়সুড়ি লাগে বেশি। রচয়িতা পুরুষ হলে কোনও সুড়সুড়ি তো লাগেই না বরং সবকিছু বড় শ্লীল এবং সংযতই মনে হয়।
এই সমাজের চোখে ‘নিয়তি’ কবিতাটি ভীষণ দোষে দূষিত। ১৯৮৮ সালে এই কবিতাটি ‘রোববার’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তথ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করে একজন সহকারী সচিব আমাকে পরে জানিয়েছিল, এই কবিতাটিকে অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে ‘রোববার’ পত্রিকাটির ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করে দেবার জন্য কাজ চলছে। শেষ অবধি অবশ্য পত্রিকাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু ‘নিয়তি’ কবিতাটি যদি পাঠকের চোখে অশ্লীল বলে মনে হয় তবে আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের পুরুষ-কবিদের অধিকাংশ কবিতাই অশ্লীল হতে বাধ্য।
‘নপুংসক’ শব্দটি নারীর ‘কোমল জিহ্বায়’ উচ্চারিত হচ্ছে—এ ঘটনা ‘শিশ্বসর্বস্ব পুরুষদের’ রাগের কারণ বই কী। আর অনেকের চোখে এ এক ধরনের বেয়াদবিও, কারণ পুরুষের দোষ, দুর্বলতা কেউ ফাস করে দিলে কি প্রাণে সয়? পুরুষ তো আর যে-সে জীব নয়। নারীর ‘প্রভুই বলতে গেলে। তা ছাড়া কথাই তো আছে Boss is always right. সে ‘পুংসক’ হলেও right, ‘নপুংসক’ হলেও right.
‘MEGALOMANIA, THY NAME IS MAN’
এক অসভ্য পুরুষ সেদিন বলল, ‘পুরুষের চরিত্রের কালিমা মুছতে চার ইঞ্চি কাপড়ই যথেষ্ট, কিন্তু মেয়েদের চরিত্রের কালিমা বারো হাত কাপড়েও ঢেকে রাখা যায় না।’
এই পুরুষটিকে কিন্তু কেউ অসভ্য বলে না। তার এই অদ্ভুতুড়ে বাক্য শুনে কেউ অসন্তুষ্ট হয় না। এই অসভ্য পুরুষকে লোকে ‘ভদ্রলোক’ বলে জানে। এমন ‘ভদ্রলোক’দের মধ্যে আমাদের বাস, আমাদের বলতে ‘নারীদের’; ন্যুব্জ, নষ্ট, নিৰ্ধন, নির্গুণ, নীচ নারীদের।
চরিত্রের কালিমা নাকি পুরুষেরা চার ইঞ্চি কাপড়েই মুছে ফেলতে পারে। অর্থাৎ বীর্যস্নাত পুরুষাঙ্গকে ছোট কাপড়েই মুছে ফেলা যায়। আর মেয়েদের চরিত্রের কালিমা বারো হাত কাপড়েও ঢেকে রাখা যায় না—এর অর্থ, মেয়েরা গর্ভবতী হলে শাড়ি ফুঁড়ে তা প্রকাশিত হয়, ‘ভদ্রলোকদের মতে মানুষের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করে যৌনসম্পর্ক। যৌনসম্পর্কের কারণে মেয়েরা গর্ভবতী হয়। আর এই গর্ভবতী হওয়াকে আমাদের অসভ্য ভদ্রলোকটি চরিত্রের কালিমা’ বলছেন, বলছেন অবশ্য বৈধ-অবৈধের ছকে ফেলে। কালিমা তখনই লেপন করা হয়, যখন তা অবৈধ বলে চিহ্নিত হয়। বৈধ-অবৈধের রচনাকারী পুরুষেরা অবশ্য তাদের সুবিধেমতোই নারীর বৈধ গর্ভ এবং অবৈধ গর্ভ চিহ্নিত করে। আর সমাজের অসহায়, অনাথ, অবর, অক্ষম নারী পুরুষের বিচারসভায় নিজেকে আসামি বলে মানে। ‘চরিত্র’ কি তুচ্ছ এই সম্পর্ক দ্বারাই মাপা হয়? চরিত্রের আর কোনও বৈশিষ্ট্য নেই? আর কোনও অবলম্বন? ‘ভদ্রলোকেরা’ চরিত্রকে চার-ছ’ইঞ্চি জায়গার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছে। চরিত্রের উৎপত্তি এবং বিনাশ এখানেই নির্ধারিত হয়।
আসলে চরিত্র এত তুচ্ছ জিনিস নয়, চরিত্রের কালিমা গর্ভস্থ সন্তানের ওপর কখনও পতিত হবার নয়, সন্তানমাত্রই পবিত্র, সুন্দর—তাকে স্পর্শ করা উচিত নয় সমাজের কোনও ক্লেদের। সামাজিক বিবাহবন্ধনের সঙ্গে নারীর সন্তানের যোগসূত্র থাকতেই হবে—এ কোনও সভ্য মতবাদ নয়। নারী যদি ইচ্ছে করে, তার গর্ভে ফুল ফুটুক, তবে তার এবং তার গর্ভের অধিকার আছে ফুল ফোটাবার। ভদ্রলোকেরা বিবাহের দলিল চাইবে দেখতে, সামাজিক চৌকিদারেরা নারীর চরিত্রে কালি ছোড়বার আয়োজন করবে, তারা তাদের বানানো সতীত্বের সংজ্ঞা’ এনে দাঁড় করাবে সামনে, এতে নারী এবং তার সন্তানের কিছুই যায় আসে না। নারী এবং তার সন্তানকে সমাজের ভদ্রলোকেরা নর্দমায় ছুড়বে, গাল দেবে, বেত্রাঘাত করবে, জেলে ভরবে—এতে নারী এবং তার সন্তানের পবিত্রতা সামান্যও ম্লান হবে না। কারণ নারীর এই নিরন্তর স্ট্রাগল একদিন এ-কথা প্রমাণ করবেই, নারীর সর্ব অঙ্গের ওপর নারীরই অধিকার আছে, নারীরই অধিকার আছে তার অঙ্গের সংকোচন এবং প্রসারণ ঘটাবার এবং বারো হাত কাপড়ে নারী-অঙ্গের যে-কোনও প্রসারণই ঢাকতে বাধ্য।
‘Frailty, Thy name is woman’—খুব বিখ্যাত একটি বাক্য। সকলের মুখে মুখে ফেরে। Frail শব্দের অর্থ ভঙ্গুর, পলকা, ক্ষণস্থায়ী, নশ্বর, দুর্বল, অক্ষম, অথর্ব, জরাগ্রস্ত, নৈতিক দুর্বলতাগ্রস্ত, অসচ্চরিত্র, অসতী। Frail থেকে Frailty. কেউ এই বাক্যের প্রতিবাদ করেন না। সকলেই মেনে নিয়েছেন, এমনকী Woman-রাও। Woman-দের জমাট আসরে কোনও ভদ্রলোক তাঁদের কাতুকুতু দিয় হাসান এবং কথায়-কথায় বলে ওঠেন Frailty, Thy name is woman তখন ‘woman’-রা হাসতে হাসতে এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়েন। তাঁরা ভাবেন, বড় মধুর কথা শোনানো হল তাঁদের। বড় সম্মানিত হলেন তাঁরা।
এই নির্বোধ নারীরা পুরুষদের জন্য কোনও ‘বিখ্যাত’ বাক্য তৈরি করেন না, যে বাক্য ছুড়ে দিয়ে ওদেরও জব্দ করা যায়। পুরুষ কিছুটা জব্দ না হলে দোলনায় পুরুষই কেবল দুলবে, আর নারী তাদের পেছন থেকে দোলা দিয়েই যাবে, তাঁর আর ভাগ্যে হবে না দোলনায় চড়বার, দোল খাবার।
পুরুষ ভাবে, সে তার মাংসল পেশি এবং চার ইঞ্চি পুরুষাঙ্গ দিয়ে পৃথিবী জয় করেছে। সে বিস্তর, বিপুল এবং বিশাল কিছু। আসলে তা কিন্তু সত্য নয়। এখন মেধার যুগ, চার ইঞ্চি জিনিস দিয়ে জগৎ কুপোকাত হবে না, ঘটে যদি বুদ্ধি থাকে তবেই কিছু উপার্জন হবে, নচেৎ ফক্কা। চার ইঞ্চির বাহাদুরি যথেষ্ট হয়েছে। এবার বাপু রাস্তা মাপো।
যা আছে, পুরুষ দেখায় তার দ্বিগুণ। পুরুষ ততটুকু শক্তিধর নয়, যতটুকু দেখায়। পুরুষের জন্য চমৎকার একটি বাক্য উপহার দেবার সময় হয়েছে—‘Megalomania, Thy name is man’। শেকসপিয়রের সময় থেকে সময় নিশ্চয় এগিয়েছে অনেক। যুগ বদলেছে, যুগ আরও বদলাবে। এই বাংলাদেশের কিছু অসভ্য পুরুষ নিয়েই পৃথিবী আবর্তিত হবে না। ‘ভদ্রলোক’দের তৈরি এই নষ্ট ‘সমাজ’ নিয়ে এই গ্রহ কিন্তু পড়ে থাকবে না। সমাজ বদলাবে। সমাজ যারা বদলাবে, তাদের কিছুটা ‘অভদ্ৰ’ না হলে হবে না। ‘অভদ্ররাই পারে ‘ভদ্রলোক’দের শিশ্নের জোর কমাতে।
ধর্মের কাজ ধর্ম করেছে
মেয়েরা হাঁটতে গেলে, দৌড়োতে গেলে, বসতে গেলে, শুতে গেলে, হাসতে গেলে সর্বত্র এক ধরনের বাধা অনুভব করেন। তাঁকে কতটুকু হাঁটা মানায়, কতটুকু দৌড়, কতটুকু বসা, শোওয়া, হাসা—সবকিছুর একটি হিসেব আছে। যদি জিজ্ঞেস করা হয়—এই হিসেব কারা তৈরি করল, এর একটিই উত্তর—কেন! আল্লাহ্তায়ালা!
আসলে আল্লাহ্তায়ালার ওপর আর কোনও কথা চলে না। আল্লাহ্তায়ালা আল্লাহ্তায়ালাই। আল্লাহ্তায়ালা, তাঁর প্রেরিত পুরুষ এবং সেই প্রেরিত পুরুষের শিষ্যরা অর্থাৎ ‘সাহাবা’রা মেয়েদের চলাচল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মেয়েরা কতদূর যেতে পারবে, কার সঙ্গে শুতে পারবে, কত জোরে হাসতে পারবে, তার চুলচেরা হিসেব অহরহই প্রচার করছেন আমাদের ইসলামি চিন্তাবিদগণ, প্রচার করা হচ্ছে গ্রামে-শহরে ইসলামি জলসা বসিয়ে। প্রচার হচ্ছে রাজনীতির লোক দ্বারা (ইসলাম যাদের লোক ঠকানোর হাতিয়ার), সমাজের ভদ্রলোক দ্বারা। নারী ঘরের বার হবে, পড়ালেখা করবে, কাজকর্ম করবে, উপার্জন করবে, স্বনির্ভর হবে—এ-কথা ইসলাম কখনও মানেনি। কোরানে আল্লাহ্তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্বের জাহেলি যুগের মতো সেজেগুজে রূপ-সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব ৩৩)
এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আল্লামা আবু বকর জাসসাস লিখেছেন, ‘নারীকে তার গৃহের মধ্যে অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।’ (আহাকামুল কোরান, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৩)
নারীর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র গৃহ। ইসলাম জামায়াতবদ্ধভাবে নামাজ পড়াকে গুরুত্ব দিয়েছে কিন্তু কেবল পুরুষের বেলায়, নারীর বেলায় নয়। পুরুষের জন্য জামায়াতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা ফরজ কিন্তু নারীর জন্য নামাজ ফরজ হলেও জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা জরুরি নয়।
হজরত মুহম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ‘গৃহের নিভৃত প্রকোষ্ঠ হল নারীর জন্য সর্বোৎকৃষ্ট মসজিদ।’ (মসনাদে আহামদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৭ ও মুসতাদরিকে হাকেম ১৪ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৯)
একবার নবির এক সাহাবা আবু হুমায়েদ সায়েদির স্ত্রী নবির খেদমত করতে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ্র রসুল, আমি আপনার সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়তে চাই। এতে আপনার কী মত?’ নবি বললেন—‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সত্যিই তুমি তা চাও। কিন্তু জেনে রেখো, তোমার বাড়ির কোনও ছোট কামরায় নামাজ পড়া তোমার জন্য প্রশস্ত কামরায় নামাজ পড়বার চেয়ে উত্তম, কামরার মধ্যে পড়া বাড়ির মধ্যে পড়া থেকে উত্তম এবং মহল্লার মসজিদে পড়া নামাজের চেয়ে বাড়ির মধ্যে অবস্থান করে পড়া উত্তম।’ আবু হুমায়েদ সায়েদির স্ত্রী অতঃপর ঘরের নিভৃত অংশে সারা জীবন নামাজ পড়েছেন। (মুসনাদে আহমদ ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ৩৭১, আল-ইসতিয়ার, ইবনু আবদিলবার, তাজকিয়ায় উম্মে হুমায়েদ আল মায়িরাহ)
বলা হয়ে থাকে ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও রোগী ছাড়া প্রত্যেক মুসলমানের উপর জুমআর নামাজ ফরজ। শুধু জমায়েত থেকে নয়, জানাজা থেকে নারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। হজরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘আমরা নবির সঙ্গে একটি জানাজা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এ-সময় তিনি কোনও কোনও স্ত্রীলোককে পেছনে পেছনে অনুগামী হতে দেখে রাগতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি এটি বহন করছ? তারা বলল, না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তার দাফনের কাজে কি তোমরা অংশগ্রহণ করবে? তারা বলল, না। এবার নবি (সাঃ) বললেন, তোমাদের যখন এখানে কোনও কাজ নেই তখন সঙ্গে আসার কী প্রয়োজন আছে? এজন্য কোনও পুরস্কার বা সওয়াব তোমরা পাবে না। মাথা ও চুলের সৌন্দর্য নিয়ে ফিরে যাও।’ (ফাতহুল বারি, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৮)
হজরত আয়শা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন ‘নবি (সাঃ) বলেছেন, তোমরা গৃহকর্মে লেগে থেকো। এটা তোমাদের জিহাদ।’ (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮)
একবার এক মহিলা সাহাবা নবি (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহ্তায়ালা পুরুষের উপর জিহাদ ফরজ করেছেন। তারা বিজয়ী হলে গণীমাত লাভ করে এবং শহিদ হলে নিজের রবের কাছে জীবিত অবস্থায় রিজক প্রাপ্ত হয়। আমাদের কোন কাজটি এ-কাজের সমকক্ষ হবে? নবি (সাঃ) বললেন—স্বামী-আনুগত্য ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা। (আত তারগিব ওয়াত তারহিব, ৩য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃষ্ঠা।) অবশ্য কোনও মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নারীকে যদি ঘরের বাইরে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে অথবা দলবদ্ধভাবে ইবাদত করবার ব্যবস্থাকে তার জন্য উপকারী ও প্রয়োজনীয় মনে করা হয়ে থাকে তবে সঙ্গে সঙ্গে এমন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে যা প্রতি মুহূর্তে তার এ অনুভূতিকে জাগ্রত করে যে, যেখান থেকে সে বেরিয়ে এসেছে, সেটিই তার প্রকৃত ক্ষেত্র। ঘর থেকে বের হওয়ার অর্থ এ নয় যে, সে নারীত্বের সীমারেখাও অতিক্রম করেছে। নারীদের মসজিদে গিয়ে জামায়েত নামাজ পড়বার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু এই শর্তে দেওয়া হয়েছে যে, তারা পুরুষের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করবে না এবং ‘পুরুষপনা’ জাহির করবে না। বরং তাদের কাতার হবে পুরুষদের কাতার থেকে ভিন্ন। এই দূরত্ব যত বেশি হবে, শরিয়তের দৃষ্টিতে তা তত বেশি প্রিয় এবং প্রীতিকর। হজরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘নবি (সাঃ) বলেছেন, পুরুষদের সর্বোত্তম কাতার হচ্ছে প্রথম কাতার এবং নিকৃষ্টতম কাতার হল সর্বশেষ কাতার। আর মেয়েদের সর্বোত্তম কাতার হচ্ছে সর্বশেষ কাতার এবং নিকৃষ্টতম কাতার হল প্রথম কাতার।’ (মুসলিম, কিতাবুস সালাত ও আসহাবুস সুনানিল আরবায়া)। পুরুষের প্রথম কাতার ও নারীর শেষ কাতারের প্রশংসা করা হয়েছে কারণ এতে নারী-পুরুষের দূরত্ব বজায় থাকে এবং পুরুষ যে সামনে এবং নারী যে পেছনে, তারও একটি মীমাংসা হয়। মসজিদে নামাজ পড়বার বিপক্ষেই হজরত মুহম্মদ (সাঃ) রায় দিয়েছেন কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছেন, তাও শর্তসাপেক্ষ—পেছনে দাঁড়াতে হবে, পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা চলবে না ইত্যাদি। ঘর থেকে নারীর বার হওয়াই কারও কাম্য নয়। ঘরের কাজ করা এবং স্বামীর আনুগত্য প্রকাশকেই নারীর জন্য জিহাদের সমতুল্য কাজ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নারীর প্রতিভাকে নিবৃত্ত করবার জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, নারীকে অন্তর্মুখী করবার জন্য, ঠিক অন্তর্মুখী নয়, স্বামী এবং সংসারমুখী করবার জন্য এবং নারীর আর সব প্রতিভাকে ধামাচাপা দেবার জন্য ইসলাম পালন করছে মহান ভূমিকা। মুসলমান মেয়েরা কেউ এই ধামার মধ্যে চাপা পড়ছে, কেউ পড়ছে না। নানা ছুতোয় ঘরের বার হচ্ছে। হবেই বা না কেন? কারণ তারা জেনে গেছে, গৃহ এখন মেয়েদের একমাত্র কর্মক্ষেত্র নয়। গৃহ গৃহই। কর্মক্ষেত্র গৃহের বাইরে। তারা এখন গৃহের বাইরে কর্মক্ষেত্রে যাবার প্রয়োজন অনুভব করছে। এই প্রয়োজন অর্থনৈতিক। মানুষ সভ্য হলে অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হয়। মানুষ সভ্য হলে মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জরুরি হয়। ধর্মবাদী মানুষেরা যতই সমাজকে ঐশী রশি দিয়ে বেঁধে রাখতে চাক, রশি ছিঁড়ে সভ্যতা এগোবেই। মেয়েরা ঘরের বার হচ্ছে। লেখাপড়া শিখছে, কাজ করতে যাচ্ছে। এতে সেই পুরনো মূল্যবোধ ধসে যাচ্ছে। গ্রামের গরিব মেয়েরা যাদের কাছে ধর্মই একমাত্র নীতিনির্ধারক—তারা শ্রমিকের কাজ করতে ঘরের বার হচ্ছে। অথচ ঘরে বসে স্বামীর সেবা ও আনুগত্য প্রকাশকেই মেয়েদের একমাত্র কাজ বলে ধর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেয়েরা প্রয়োজনে ধর্মের এই নির্দেশ ভাঙছে— জীবনের প্রয়োজন, মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবার প্রয়োজন। মেয়েদের এই এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত দেখে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ধর্মের চেয়ে জীবন অনেক বড়।
Chapter - 41 to 50
কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত
১
আমার বাবা আজকাল প্রায়ই মৃত্যুর কথা বলেন, আমি তাঁর শিয়রের কাছে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকি, তিনি ক্ষীণকণ্ঠে বলেন—আমি বোধহয় আর বেশিদিন বাঁচব না, মা। বাবার রক্তচাপ বেশি. ডায়াবেটিসও বেশি। বয়সও হয়েছে বেশ। তাঁর দুই পুত্র, দুই কন্যাকে প্রায়ই তিনি আজকাল কাছে পেতে চান। দুই কন্যা মেলে, দুই পুত্র কিন্তু সহজে মেলে না। দুই পুত্রের সময় নেই বাবার অসুস্থ শরীরের পাশে ঘনিষ্ঠ দাঁড়াবার, দুই পুত্রের সময় নেই বাবার মনের দিকে দৃষ্টি ফেরাবার। বাবার সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করবার। শৈশব-কৈশোর একবার ছুঁয়ে দেখবার।
কেবল আমাদের দু’বোনেরই দেখি যত মায়া আর মমতা। দু’বোনই থাকি বাবার যে কোনও আনন্দ বা বিষাদের কাছাকাছি। দু’বোনই ভালবাসার হাত বুলিয়ে দিই বাবার ক্লান্ত কপালে। তাঁর যে-কোনও অসুখে আমরাই রাত পার করি, না ঘুমিয়ে।
আমার বাবা প্রায়ই মৃত্যুচিন্তায় মগ্ন হন। তাঁর সন্তানদের আর্থিক, সামাজিক সুখকামনায় তিনি অস্থির হন। তাঁর দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর স্নেহের কন্যা দু’জন। তিনি তাঁর পুত্রদের জরুরি খবর দিয়ে কাছে ডাকেন, পুত্রদের সঙ্গে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা করেন, কেবল পুত্র দু’জনের সঙ্গেই, সেখানে কন্যারা কিন্তু বাঞ্ছিত নয়, তাঁর দুই পুত্রকে তিনি তাঁর জমির দলিলপত্র কোথায় কী আছে দেখান। তাঁর দুই পুত্র জমিজিরেতের আলাপশেষে যে-যার বাড়ি চলে যায়। সম্ভবত তারা স্বপ্ন দেখে খোলা জায়গায় চমৎকার সব বাড়ি বানাবার, সম্ভবত তারা তৃষ্ণার্ত হয় রাতারাতি অঢেল সম্পদের অধিকারী হবার। সম্ভবত তারা কামনা করে না, অসুস্থ বিছানা থেকে বাবা আবার সুস্থসবল উঠে দাঁড়ান।
আমরা দু’বোন কিন্তু চাই বাবা আরও দীর্ঘ দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকুন। বাবা আমাদের সঙ্গে বেড়াতে যান দূরের সমুদ্রতীরে। বাবা আমাদের সঙ্গে হাসি-গানে-আড্ডায় কাটিয়ে দিন দীর্ঘ জীবন, কোনও পরবে-উৎসবে বাবা আমাদের কোলের কাছে বসিয়ে পুরনো দিনের গল্প করুন।
বাবা তাঁর দুই কন্যাকে স্নেহ করছেন বেশি। কিন্তু তিনি জানেন তাঁর জায়গা, জমি, সহায়, সম্পদ বেশিরভাগ চলে যাবে দু’পুত্রের হাতে। কন্যারা সামান্য কিছু পাবে কি পাবে না। যদি বাড়িঘর, জমিজমা কারও প্রয়োজন হয় সে তাঁর দু’কন্যারই, দু’পুত্রের টাকাও অঢেল, জমিও আছে, অভাব নেই সম্পত্তি বা সম্পদের। আমরা দু’বোনই জীবনের স্রোতের তোড়ে নোঙরহীন ভেসে আছি। অথচ আমরাই কম পাব, পাবে ওরা বেশি, যাদের আছে।
আমরাই সর্বহারাদের দলে। যারা পায়, তারা পেয়েই যায়, সেই বেশি পায়, আছে যার ভূরিভূরি।
২
আমি সেদিন এক পিতাকে দেখেছি ক্ষুব্ধ। তাঁর এক কন্যা। তিনি তাঁর সকল সম্পত্তি কন্যাকে লিখে দিতে চান। কারণ কন্যা জন্মাবার দোষে এ-দেশের আইন উত্তরাধিকার আইনে চলে যায় পিতার ভাইয়ের দিকে। এই পিতা চান তাঁর সম্পত্তি তাঁর সন্তানের থাক। তিনি তাই রেজিস্ট্রি করে কন্যার নামে লিখে দিতে চান সব। না লিখে দিলে তাঁর সম্পত্তি সাত ভূতে লুটে খাবে। অথচ রেজিস্ট্রি করলে শতকরা দশ ভাগ ট্যাক্স দিতে হয়। ধরা যাক, সম্পত্তির মূল্য এক কোটি টাকা, এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি ফি লাগবে দশ লাখ টাকা। কন্যা জন্মেছে বলেই পিতাকে দশ লাখ টাকা দণ্ড দিতে হচ্ছে। যদি পুত্র জন্মাত তবে এক কোটি টাকার সম্পত্তি সেই পুত্রকে পেতে হলে দশ লাখ টাকার এই বাড়তি খরচটুকু নিশ্চয়ই পিতাকে করতে হত না।
সন্তান একটি হলেই যথেষ্ট, সে পুত্র হোক অথবা কন্যা হোক। এটি আমাদের সরকারি স্লোগান। সরকার একদিকে কন্যাকে সন্তানের মর্যাদা দেবার বাণী আওড়াচ্ছে, আরেক দিকে রেজিস্ট্রি ফি-ও নিচ্ছে। কন্যা কেন পিতার সম্পত্তির সবটুকু পাবে না, যদি না-ই পায় তবে পিতা যদি তাকে লিখে দিতে চান সব সম্পত্তি, তবে কেন দুর্ভোগ পোহাবেন পিতা, এই যদি হয় কন্যাজন্মের ভোগান্তি, সরকার কন্যাকে পুত্রের সমান উত্তরাধিকার দেবে না, পিতা যদি দিতে চান, তাঁকে অর্থদণ্ড দিতে হবে—তবে কেন দম্পতিরা উৎসাহী হবেন কন্যাজন্মে? কেন তাঁরা কন্যাজন্মের পর পুত্রপিপাসু হবেন না? নিশ্চয় হবেন। ওপরে উদারতা দেখালেও ভেতরে তো সেই গলাকাটা সংস্কারের চাকু। যে চাকু এক সময় কন্যা জন্মালে কন্যার গলা কেটে দিত। ভেতরে সেই তো ঘোর অন্ধকার।
কন্যার কল্যাণকামী পিতা আমাকে সেদিন বললেন, ‘আপাতত টেন পার্সেন্ট রেজিস্ট্রি ফি নেওয়াটা তো বন্ধ হোক।’ আমি বললাম, ‘আসলে উত্তরাধিকারের শরিয়তি আইনটি তুলে দেওয়া উচিত। পিতার সম্পত্তিতে কন্যা ও পুত্রের থাকবে সমান অধিকার। আন্দোলন করলে আমরা বড় কিছু চেয়ে মাঠে নামব, তাকালে হিমালয়ের দিকে তাকাব, উইয়ের ঢিবির দিকে তাকাব কেন?’ পিতা নিরুত্তাপ চোখে আমাকে দেখলেন।
পিতা বললেন, ‘একটি পুত্র জন্মালে আমার কোনও রেজিস্ট্রি ফি লাগত না! আমি তো একটি কন্যার পর কোনও পুত্রের প্রয়োজন অনুভব করিনি।’
পিতা চলে যান। আমার কেবলই মনে হয় এই বিবেকবান পিতা কোর্টে তাঁর দশ লক্ষ টাকা কন্যাজন্মের প্রায়শ্চিত্ত ফি দিয়ে এসে একদিন নিশ্চয়ই অনুশোচনা করবেন–কেন একটি পুত্রের জন্ম তিনি দিলেন না!
অবদমন
পাঁচতারা হোটেলে ‘লেডিস টয়লেট’ পরিষ্কার করেন এমন এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে সেদিন আলাপ হল আমার। জিজ্ঞেস করলাম, বেতন কত পান? তিনি যা বেতন বললেন, চিকিৎসকের চাকরি করে আমি তার চেয়ে কম পাই। সংসারে কে কে আছে জিজ্ঞেস করাতে বললেন, তিন ছেলে-মেয়ে এবং এক স্বামী। স্বামী কী করেন? না, স্বামী কিছুই করেন না। সাত বছর যাবৎ বিছানায় শোয়া। বিছানায় শোয়া, কারণ তিনি পঙ্গু। সাত বছর আগে কী এক অসুখে শরীরের ডান অর্ধেক অবশ হয়ে গেল—সেই থেকে ভদ্রমহিলাই চাকরি করে সংসার চালাচ্ছেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, স্বামীকে খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন, চিকিৎসা করাচ্ছেন।
জিজ্ঞেস করলাম, একা আপনিই সংসারের সব খরচ বহন করছেন, স্বামীর বাবা-মা-ভাই-বোনেরা বহন করছে না? না, তারা করছে না। একা ভদ্রমহিলার কাঁধেই সকল দায়িত্ব। জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের যৌনজীবন? ভদ্রমহিলা অবাক চোখে তাকালেন আমার দিকে। সম্ভবত এই প্রশ্ন তাঁকে কেউ করেনি কখনও, এই যে এক পঙ্গু স্বামী থাকে ঘরে, যৌনজীবনে ব্যর্থ এক পুরুষ—এই অক্ষম পুরুষ নিয়ে দীর্ঘ সাত বছর তিনি কীরকমভাবে বেঁচে আছেন—কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি। ভদ্রমহিলার বুকের ভেতর এবং তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের শরীরের প্রতি লোমকূপে যে অসম্ভব এক কষ্ট বাসা বেঁধেছে—সেই কষ্টের দরজা-জানালা যেন সেদিন হাট করে খুলে যায় সব। বললেন, আমার স্বামী যে অক্ষম প্রাণী। সেই আটাশ-উনত্রিশ বছর বয়স থেকে যৌনজীবন যাপন করি না।
বিয়ে করেননি কেন?
স্বামীকে কোথায় ফেলি?
ধরুন, আপনার যদি এ অবস্থা হত, সাত বছর চলনশক্তিহীন হয়ে পড়ে থাকতেন ঘরে, তবে কি আপনি মনে করেন আপনার স্বামী আবার বিয়ে করত না?
মাথা নাড়েন ভদ্রমহিলা, নিশ্চয় করত, নিশ্চয় করত।
তবে আপনি কেন করেননি?
বাচ্চাকাচ্চা আছে। এদের যে অসুবিধে হত!
ঠিক আছে, বিয়ে না করলেন, শরীরকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? প্রয়োজনে একে তৃপ্ত করছেন না কেন?
ভদ্রমহিলা জিভে কামড় দিলেন, বললেন–ছি ছি তা কী করে হয়?
আপনার স্বামী কি সুস্থ অবস্থায় থাকলে এ-রকম একা কাটাত? সাত বছর? সাত বছর কি সে একজন পঙ্গু স্ত্রীকে ভালবেসে সন্ন্যাস যাপন করত?
ভদ্রমহিলা ভাবলেন। ভ্রূকুঞ্চিত হল তাঁর। বললেন—অসম্ভব।
তবে আপনার বেলায় তা সম্ভব হচ্ছে কেন? আমি বুঝিয়ে বললাম, সম্ভব হচ্ছে কারণ আপনি হচ্ছেন এই সমাজের ‘মেয়েমানুষ’। সমাজের মেয়েমানুষদের ‘যৌন অবদমন’ করা ‘অবশ্যকর্তব্য’—যদি সে অবিবাহিত হয়, যদি সে বিধবা হয়, যদি তালাকপ্রাপ্তা হয়, তালাকদাতা হয় এবং বিবাহিত হলে স্বামী যদি নপুংসক হয়, অথবা যৌনসঙ্গমে যে-কোনও কারণেই হোক, যদি স্বামী অক্ষম হয়—তবে।
সমাজের মেয়েমানুষেরা এ-সব ক্ষেত্রে যদি যৌন অবদমন না করেন তবে আর রক্ষে নেই। তাই রক্ষে পাবার আশায় আমাদের ভদ্রমহিলাটি সাত বছর কোনও ‘পরপুরুষ’কে স্পর্শ করেননি। পঙ্গু-অথর্ব স্বামী নামক জীবটিকে খাইয়ে-পরিয়ে বেশ বাঁচিয়ে রাখছেন। সমাজের লোকেরা বাহবা দিচ্ছে। ভদ্রমহিলার যৌন অবদমন সমাজের চোখে এখন বেশ ‘সতীসাধ্বী স্ত্রীর কাজ, ‘পুণ্যের কাজ’, ‘বেহেশত নসিব’-এর কাজ। পুরুষেরা সম্ভবত এমন অদ্ভুত ‘যৌন অবদমন’-এর বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ‘যৌন অবদমন’ নারীর জন্য বাধ্যতামূলক হলেও পুরুষের জন্য নয়।
সারা দেশে রোগী বাড়ছে। গ্রামেগঞ্জে, শহরে, নগরে ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসা কেন্দ্র যেমন বাড়ছে, তেমন বাড়ছে এদের রোগীসংখ্যা। দেশব্যাপী এদের প্রচার এবং প্রসার। এদের রোগীদের রোগের লক্ষণ এ-রকম—অতিরিক্ত সহবাসে বা হস্তমৈথুনে পুরুষাঙ্গ নরম ও রগ ঢিলা হবে। পুরুষাঙ্গ আকারে ছোট বা বেঁটে, আগা মোটা, গোড়া চিকন হবে। হঠাৎ গরম হয়ে আবার ঠান্ডা হবে। স্ত্রী-মিলন ২/১ মিনিটের অধিক স্থায়ী হবে না। ঘনঘন স্বপ্নদোষ, ধাতু তরল, প্রস্রাবের আগে-পরে নির্গত হবে, প্রস্রাবের যন্ত্রণা …ইত্যাদি।
যেহেতু রোগী বাড়ছে, সেহেতু আমাদের অনুমান করতে অসুবিধে হয় না, যৌনজীবনে জটিলতাও বাড়ছে। এ-দেশের মানুষকে যৌনশিক্ষায় শিক্ষিত করবার নিয়ম নেই। অধিকাংশ মানুষ নানা রকম ‘তেল, তাবিজ, বটিকা, সুধা’র ওপর নির্ভর করে আছে। যেহেতু রোগী বাড়ছে, সেহেতু আমাদের অনুমান করতেই হবে যে, যৌন অবদমনকারী নারীর সংখ্যাও সে হারে বাড়ছে।
কেবল নারীর বেলায়ই অবদমন। নারীই যেন দায়িত্ব নিয়েছে শরীর ও মনের স্বাভাবিক বাসনা অবদমনের। তাঁকে ‘দেবী’ বানানো হয়, ‘সতী’ বানানো হয়, ‘লক্ষ্মী’ বানানো হয়—বানিয়ে তাঁকে পুজো করা হয়, সম্মান করা হয়, মর্যাদা দান করা হয়; যেন পুজো বা সম্মানের লোভেই নারী দেবীসতীলক্ষ্মী হয়ে বেঁচে থাকে। তাবৎ ‘শুচিতা’ যেন একাই তাঁর অঙ্গে ধারণ করতে হবে। পুরুষেরা রমণীর ‘শুচির সমুদ্রে অবগাহন করে প্রভুত্বর আনন্দ লাভ করে। পুরুষকে ‘আনন্দদান’ করবার দায়িত্ব নারীর ওপরই যেহেতু বর্তেছে সেহেতু পুরুষের ‘সুখ ও শখ’ মেটাতে ‘সতীলক্ষ্মীদেবী’ হতে হয়, হতে হয় ‘পূতপবিত্র’।
সমাজের পুরুষেরা অর্থাৎ কর্তারা নারীর যৌন অবদমনকেই নারীর ‘পবিত্রতা’ বলে রায় দিয়েছে। পুরুষেরা চায় স্বচ্ছ জলে সাঁতার কাটতে। ঘোলা জলে তাদের আরাম নেই। শরীর-মন ঘিনঘিন করে। নারী হচ্ছে জলের মতো। নারীকে স্বচ্ছ বানাবার জন্য পুরুষের তৈরি সমাজের কৌশলের অন্ত নেই। পুরুষের ‘কালিকলঙ্ক’ নিজের ভেতর ধারণ করে নারী ‘ঘোলা’ হয়, আর ‘ঘোলা’ হলেই তাকে গাল দেয় পুরুষ, ‘ঘোলা’ জল ত্যাগ করে পুরুষেরা তখন নতুন কোনও স্বচ্ছ জলে ‘ডাইভ’ দেয়। এই তো নিয়ম।
গিনিপিগ
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে আমি তিন বছর চাকরি করেছি। আমাকে প্রায়ই গ্রামে যেতে হত ‘স্টেরিলাইজেশন ক্যাম্প’ উপলক্ষে। গ্রামের ‘পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে’ ক্লায়েন্ট আনা হত। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ওদের বন্ধ্যাকরণ ঘটিয়ে তবেই আমার ছুটি মিলত। আমার সঙ্গে যেত দু’জন ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর ও একজন আয়া। ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসিস্ট্যান্টরা ক্লায়েন্ট জোগাড় করেন, অপারেশনের যন্ত্রপাতি এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে আমরা কেন্দ্রে গিয়ে সেই ক্লায়েন্টদের ওপর চড়াও’ হই। আমি ভেবে অবাক হই, এই সব ক্যাম্পে পারতপক্ষে কোনও পুরুষ ক্লায়েন্ট আসে না, সবই ষোলো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের মহিলা। তিন বছরে আমি যদি এক হাজার টিউবেকটমি করে থাকি, ভ্যাসেকটমি করতে আসা পুরুষদের ‘ঘাটের মড়া’ বললেই ভাল মানায়। টাকা ও লুঙ্গির লোভ দেখিয়ে কেউ হয়তো কোনও চলনশক্তিহীনকে ফেলে রেখে যায় ক্যাম্পে। এ ছাড়া নিত্যদিনের একটি দৃশ্য আছে—এক ঝাঁক দরিদ্র নারী গায়ে লাল শাড়ি জড়িয়ে ভীত এবং বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে। এদের কারও স্বামী নেই, কারও আছে, কারও ছেলে-মেয়ে পাঁচজন-তিনজন-দু’জন-একজন, কারও হয়তো সন্তান ছিল—মরে গেছে, স্বামী তালাক দিয়েছে, তবু এসেছে, সরকারি শাড়ি পরে সামান্য একশো পঁচাত্তর টাকা পাবার আশায় বসে থাকে না-খাওয়া শরীর নিয়ে (অপারেশনের আগে কিছু সময় না খেয়ে থাকতে হয়)। আমি প্রায়ই আমার সহকারীদের জিজ্ঞেস করতাম—ভ্যাসেকটমির কেস নেই কেন?
ওরা বলত—পুরুষলোক আসে না।
কেন আসে না?
আসে না। পথের ভিখিরিও আসে না। একেবারে অথর্ব বুড়ো হলে দু’একটাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আনা যায়। তা ছাড়া সকলে নাক সিটকায়। ভাবে, এ বুঝি মেয়েদের কাজ। ভ্যাসেকটমি করতে কেন পুরুষের আগ্রহ কম—এ প্রশ্ন আমার অনেক দিনের। নারীর স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতির নাম টিউবেকটমি। টিউবেকটমির চেয়ে ভ্যাসেকটমি অনেক সহজ ও নিরাপদ অপারেশন। তবু এই অপারেশনে রাজি নয় আমাদের অগ্রসর পুরুষেরা। সম্ভবত পুরুষদের আকাঙ্ক্ষা থাকে আবার বিবাহের, তখন যদি বীর্যের প্রয়োজন হয় নতুন জরায়ুতে! নয়তো কী? দুটো-তিনটে এমনকী চার-পাঁচটি সন্তানও যদি বড় হতে হতে পিতা-মাতার উচ্চতা ছাড়িয়ে যায় তবু ভ্যাসেকটমি নৈব নৈব চ। স্ত্রী যা খুশি তা-ই ব্যবহার করুক। পিল, ফোম ট্যাবলেট, নরপ্লান্ট, ইঞ্জেকশন, টিউবেকটমি (লাইগেশন) – যা খুশি।
স্ত্রীরাই ব্যবহার করছে জন্মনিয়ন্ত্রণের যাবতীয় স্থায়ী ও অস্থায়ী পদ্ধতি।
কন্ট্রাসেপটিভ পিল এসট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরোন নামক দুটো হরমোন দ্বারা তৈরি। এই পিলের সুবিধে তো কিছু আছেই, অসুবিধেও কিন্তু কম নয়।
অসুবিধেগুলো হচ্ছে—
১. বমি-বমি ভাব
২. বমি
৩. মাথাব্যথা, মাথাঘোরা
৪. স্তনে ব্যথা
৫. বিষণ্ণতা
৬. চুল পড়ে যাওয়া
৭. কামশক্তি কমে যাওয়া
৮. পেট কামড়ানো এবং রজঃস্রাবের সময় পেটব্যথা হওয়া
৯. পায়ের মাংসপেশিতে যন্ত্রণাদায়ক খিল
১০. অনিয়ন্ত্রিত রজঃস্রাব
১১. সাদা স্রাব
১২. যোনি ও যোনিমুখে ক্যানডিডার আক্রমণ
১৩. ওজন বেড়ে যাওয়া
১৪. চর্বি বেড়ে যাওয়া
১৫. প্যানক্রিয়াটাইটিস
১৬. গলব্লাডার স্টোন
১৭. গ্লাইকোসুরিয়া
১৮. রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া
১৯. রক্তনালিতে রক্তের জমাট বেঁধে যাওয়া
২০. জরায়ুতে ফাইব্রয়েড নামক টিউমার হওয়া
২১. স্তনের ক্যানসার
কপারটি অথবা IUCD (ইন্ট্রাইউটেরাইন কন্ট্রাসেপটিভ ডিভাইস) ব্যবহারও বেশ চলছে। অথচ এটি ব্যবহারে যা-যা ঘটতে পারে তা হল—
১. IUCD ব্যবহারের সময় রোগী হঠাৎ মূর্ছা যেতে পারে
২. রজঃস্রাব অনিয়মিত হওয়া, রজঃস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া
৩. রজঃস্রাবের সময় তলপেটে ব্যথা
৪. সালফিংগো অফোরাইটিস (জরায়ুর নালি ও ডিম্বথলিতে ইনফেকশন)
৫. এন্ডোমেট্রাইটস
৬. জরায়ুর ক্যানসার
৭. জরায়ু ফুটো হয়ে যাওয়া
৮. জরায়ুর মুখে আঘাত লাগা
৯. ডিভাইস ভেঙে যাওয়া
১০. আপনা-আপনি জরায়ু থেকে ডিভাইস বেরিয়ে আসা
১১. টিউবাল প্রেগনেন্সি (জরায়ুতে নয়, ফেলোপিয়ান টিউব বা ডিম্বকনালিতে প্রেগনেন্সি
এ তো গেল পিল এবং কপারটি-বিষয়ক জটিলতা। লাইগেশন বা টিউবেকটমির জটিলতাও কিন্তু কম নয়। সুস্থ মানুষের শরীরে টিউবেকটমি অপারেশন হবার তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হার ০.১৩%। ক্লায়েন্ট অসুস্থ হলে এই হার আরও বেশি হয়। এ ছাড়া ‘একটোপিক প্রেগনেন্সি’ নামক একটি দুর্ঘটনাও ঘটে। ‘একটোপিক প্রেগনেন্সি মানে জরায়ুর বাইরে ভ্রূণোদ্গম হওয়া। এই প্রেগনেন্সি সাধারণত বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটায়, মৃত্যুও এর ফলে অসম্ভব কিছু নয়।
লাইগেশনের তুলনায় ভ্যাসেকটমি সহজ এবং নিরাপদ পদ্ধতি। কিন্তু ভ্যাসেকটমি করবার পুরুষ নেই দেশে, যদিও পরিবার পরিকল্পনা আন্দোলনে তাদের গলার জোরটাই বেশি। তাদের জন্য অন্য কোনও অস্থায়ী ব্যবস্থাও তৈরি হচ্ছে না। এর কারণ কী? পদ্ধতি কেবল নারীর ওপরই একতরফা চাপাতে হবে? নারীর ওপর চাপানো সহজ বলে?
জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাগুলো পুরুষকে তেমন গেলানো যায় না, যত যায় নারীকে। এই ব্যবস্থা নারীকেই একা গেলানো হয়, নারীর শরীরে এগুলো নানা রকম উৎপাত করে, তবু নারীকেই গিলতে হয় জগতের সকল গরল। গিলে রক্ষা করতে হয় পুরুষের ‘পরিকল্পিত পরিবার’। রক্ষা করতে হয় পুরুষের সুখ ও সমৃদ্ধি। রক্ষা করতে হয় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জগতের ভারসাম্য।
হিন্দুর উত্তরাধিকার
ভারতের হিন্দু সাকসেশন এক্ট (১৯৫৬) উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষে কোনও বৈষম্য রাখেনি। হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া যে-কোনও সন্তানই, সে পুত্র হোক বা কন্যা হোক, পাবে পিতা বা মাতার সম্পদ ও সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকার। ও-দেশে হিন্দুদের বহুবিবাহও আইনত নিষিদ্ধ। এ-দেশের হিন্দুদের জন্য এমন কোনও পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইন নেই যা পুত্র ও কন্যাকে সমান অধিকার দেয় বা বহুবিবাহ বন্ধ করে। দেখা যায়, এ-দেশের কুলীন ব্রাহ্মণরাও এক সময় আশি-নব্বইটি করে বিবাহ করত, এখনও শখ ও সুবিধা হলে তারা ত্রিশ-চল্লিশটি বিবাহের সুখ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করতে চান না। আইন তো আর মাথার ওপর খড়্গা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে নেই যে, তারা সংকোচ করবে। একই রকম বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ আইন পুরুষের একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি নেবার কথা বলে, এ-রকম আইন কিন্তু ভারতের মুসলমানদের ওপর এখনও বর্ষিত হয়নি।
এ-দেশের হিন্দু মেয়েরা পিতার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত। পুত্ররাই ভাগবাটোয়ারা করে নেয় পিতার সকল সম্পত্তি। হিন্দুশাস্ত্র পুত্রকে পিতার ধনসম্পত্তির একমাত্র অধিপতি বলে রায় দিয়েছে। জীমূতবাহনের দায়ভাগই এ-ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। জীমূতবাহন ছিলেন বাঙালি, একাদশ শতাব্দীর লোক। তাঁর দায়ভাগ কেবল এই বাংলাদেশেই প্রযোজ্য হচ্ছে এখন, ভারত তুলনায় সভ্য হয়েছে, তাই ‘দায়ভাগ’-এর রীতিও পালটে ফেলেছে।
যদি শাস্ত্রের কথাই ধরতে হয়, তবে মিতাক্ষরার শাস্ত্র কিন্তু দায়ভাগের মতো অত অনুদার নয়। মাদ্রাজ, বোম্বে, কাশি, মিথিলাতে এক সময় মিতাক্ষরার সমাদর ছিল, জীমূতবাহনের দায়ভাগের নয়। মিতাক্ষরার মতে অধ্যাগ্নি, অধ্যাবাহনিক, অন্বাধেয়, যৌতুক প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ ধন হচ্ছে স্ত্রীধন। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া ধনও স্ত্রীধন। স্ত্রীধনে নারীরই অধিকার। স্বামী তা থেকে কিছু নিলেও পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে।
যাজ্ঞবন্ধ্যের মতে, ‘স্বামী বা শ্বশুর যদি নারীকে স্ত্রীধন না দিয়া থাকেন তবে পুত্রদের সমান অংশ পত্নীকে দেওয়া উচিত’ এবং ‘যদি পিতা সব পুত্রের ভাগ সমান করিয়া দেন তবে সজাতীয় পত্নীদেরও সমান ভাগ দেওয়া উচিত। যদি স্বামী-শ্বশুরের দেওয়া কিছু স্ত্রীধন নারীরা পাইয়া থাকেন তবে যতটা দিলে পুত্রদের সঙ্গে তাহাদের ভাগ সমান হয়, ততটা দেওয়া কর্তব্য।’
মিতাক্ষরাও যাজ্ঞবল্ক্যের মত সমর্থন করেন।
পিতার জীবৎকালে বিভাগ হলে মাতাদের ভাগ সমান হবে। এই কথা বলে যাজ্ঞবল্ক্য বলেন, ‘পিতামৃতেও মাতারা সমাংশভাগিনী হইবে।’
যাজ্ঞবল্ক্য আরও বলেন, “পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির ভাগকালে মাতাও সমান অংশ পাইবেন।’ নারদও বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর মাতা সমাংশভাগিনী।’ বৃহস্পতি এই কথা মানেন, ব্যাসও সমর্থন করেন।
ব্যাস পিতামহীকেও মায়ের মতো ভাগাধিকার দেবার কথা বলেন। বিষ্ণু বলেন, ‘মাতা এবং অবিবাহিতা কন্যা পুত্রভাগানুসারীভাগহারী।’
বৃহস্পতির মতে, ‘মায়ের ভাগ সমান, কন্যার ভাগ এক-চতুর্থাংশ।’ কাত্যায়নও অবিবাহিতা কন্যার এক-চতুর্থাধিকার সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ‘সামান্য সম্পত্তি হইলে কন্যা ও পুত্রদের ভাগ সমানই হইবে।’ অনুদার যে মনু, সেই মনুও বলেন, ‘ভাইরা আপন ভাগ হইতে কন্যাকে ভাগ দিবেন। না দিতে চাইলে ভ্রাতারা পতিত হইবেন।’ মনু এও বলেন, ‘অপুত্রা সাধ্বী পত্নী স্বামীর পিণ্ডদানের ও সম্পূর্ণ অংশের অধিকারিণী।’ বরদরাজ বলেন, ‘ভার্যা অর্ধাঙ্গিনী, পুণ্যাপুণ্য ফলভাগিনী, তিনি বাঁচিয়া থাকিতে স্বামীর ধন কেন অন্যে পাবে।’ শ্রুতির মতে, ‘স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে এক পূর্ণ স্বরূপেরই দুই অংশ। ‘
স্ত্রী যদি স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী হন, তবে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর মধ্যেই তিনি থেকে যান। থেকে যাবারই তো কথা, তা না হলে আবার অর্ধাঙ্গিনী কীসেরা আর তাই যদি হয় তবে ধনসম্পদ যা আছে, মৃত্যু হলে তার অর্ধাঙ্গেরই তো প্রাপ্য সব
মনু-নারদ উভয়ে বলেছেন, ‘পুত্র যেমন আত্মসম, দুহিতাও তেমনি পুত্ৰসমা, কাজেই আপনার ও পুত্রকন্যার মধ্যে কোনও প্রভেদ নাই। সেই আপনি বাঁচিয়া থাকিতে, অর্থাৎ পুত্রকন্যা থাকিতে, কেন অন্যে ধন হরণ করিবে? পুত্রকন্যা উভয়ে সমান। কাজেই পুত্রাভাবে দুহিতাই পুত্র। পুত্রকন্যা উভয়ে পিতার বংশরক্ষা করে।’
সুতরাং এ-কথা সত্য যে, শাস্ত্র একেবারেই বিরূপ নয় নারীর প্রতি, জগতের মানুষ যত বিরূপ। ‘দায়ভাগ’ তৈরি করেছে একাদশ শতাব্দীর মানুষ। আর এই একবিংশ শতাব্দীর দুয়োরে দাঁড়িয়ে আমরা সকল পুরাতন ঝেড়ে ফেলে কত নতুনকে স্বাগত জানাচ্ছি, পুরনো সমাজ-সংস্কার-স্বভাব ত্যাগ করে নতুন করে গড়ছি, নতুন চেতনায়। জীবনে কত কিছুই তো ছুড়ে ফেলেছি, কেবল শাস্ত্রকেই পারিনি। শাস্ত্র আঁকড়ে ধরে এখন বেঁচে আছে আমাদের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এমনকী তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ
এ-দেশের হিন্দু সম্প্রদায় এখনও শাস্ত্রের নিয়মে চলছে। কোনও সভ্য আইন তৈরি হয়নি তাদের জন্য। তাদের বহুবিবাহ বন্ধের উত্তরাধিকারের সভ্য আইনটি তৈরি করে হিন্দু নারীদের অন্তত মানুষের মর্যাদা দেবার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।
বাঙালি মুসলমানের দুর্মতি ও দুর্গতি
মুসলমানের নানা রকম বাতিক আছে। বাঙালি মুসলমান একবার ঘোষণা দিয়েছিল—‘আমরা ইংরেজি পড়ব না।’ ম্লেচ্ছদের পড়ালেখা না করবার কুফল তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এখন। শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতিতে বাঙালি হিন্দুদের চেয়ে অন্তত দু’শো বছর পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমান এখন মাঝেমধ্যেই এগিয়ে থাকা বাঙালি হিন্দুর দিকে শিং বাগিয়ে তেড়ে আসতে চায়, কিন্তু মুশকিল হল, এই বাঙালি কিন্তু ওই বাঙালির নাগাল পায় না, গ্যাপ বেশি তো, তাই!
মুসলমানের আরও বাতিক ছিল। সেটি হল—নারীশিক্ষা চলবে না। বেগম রোকেয়া ১৩৩০ (বঙ্গাব্দে) সালে বলেছিলেন, ‘নারীর প্রতি মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের অবহেলা, ঔদাস্য এবং অনুদার ব্যবহারের প্রতি কটাক্ষপাত অনিবার্য হয়। প্রবাদ আছে, বলিতে আপন দুঃখ পরনিন্দা হয়। নারী ও পুরুষ বিরাট সমাজদেহের দুইটি বিভিন্ন অংশ। বহুকাল হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে আর নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে। পুরুষের পক্ষে নারায়ণী সেনা আছেন বলিয়া তাঁহারা এ-যাবৎ নারীর উপর জয়লাভ করিয়া আসিতেছেন। সুখের বিষয়, এতকাল পরে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আমাদের হিন্দু ভগিনীদের প্রতি কৃপাকটাক্ষপাত করিয়াছেন। তাই চারিদিকে হিন্দু সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবরোধবন্দিনি মহিলাদের মধ্যে জাগরণের সাড়া পড়িয়া গিয়াছে। তাঁহারা, বিশেষত মাদ্রাজের মহিলাবৃন্দ সর্ববিষয়ে উন্নতির পথে অগ্রসর হইয়াছেন। এবার মাদ্রাজের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ডেপুটি প্রেসিডেন্টের পদে একজন মহিলা নির্বাচিত হইয়াছেন। সম্প্রতি রেঙ্গুনে একজন ব্যারিস্টার হইয়াছেন। লেডি ব্যারিস্টার মিস সোরাবজির নামও সুপরিচিত; কিন্তু মুসলিম নারীর কথা আর কী বলিব? তাহারা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই আছে।’
‘মাতা যদি বিষ দেন আপন সন্তানে
বিক্ৰয়েন পিতা যদি অর্থ প্রতিদানে
তাহাকে আর কে রক্ষা করিবে?’
বেগম রোকেয়া আরও বলেছেন, ‘যদিও ইসলাম ধর্ম কন্যাদের শারীরিক হত্যা নিবারণ করিয়াছেন, তথাপি মুসলিমগণ অম্লানবদনে কন্যাদের মন, মস্তিষ্ক এবং বুদ্ধিবৃত্তি অদ্যাপি অবাধে বধ করিতেছেন। কন্যাকে মূর্খ রাখা এবং চতুষ্প্রাচীরের অভ্যন্তরে আবদ্ধ রাখিয়া জ্ঞান ও বিবেক হইতে বঞ্চিত রাখা অনেকে কৌলীন্যের লক্ষণ মনে করেন।’
বেগম রোকেয়ার শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে ছাত্রীদের অভিভাবক এই বলে চিঠি লিখতেন যে, তাঁদের মেয়েদের যেন সামান্য উর্দু ও কোরান শরিফ পাঠ ছাড়া আর কিছু, বিশেষত ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া না হয়। একবার শিক্ষাবিভাগ থেকে বেগম রোকেয়াকে অনুরোধ করে চিঠি পাঠানো হয়েছিল যে, বঙ্গদেশে যতগুলো মুসলিম মহিলা গ্র্যাজুয়েট আছেন, তাঁদের নাম ও ঠিকানা যেন তিনি লিখে পাঠান। তিন কোটি মুসলমানের মধ্যে মাত্র একজন মহিলা গ্র্যাজুয়েট পাওয়া গিয়েছিল।
আলিগড়ের বালিকা বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি শেখ আবদুল্লাহ সেই তখন বলেছিলেন—‘স্ত্রীশিক্ষার বিরোধীগণ বলে যে, শিক্ষা পাইলে স্ত্রীলোকেরা অশিষ্ট ও অনম্যা হয়। ধিক! ইহারা নিজেদের মুসলমান বলেন, অথচ ইসলামের মূল সূত্রের এমন বিরুদ্ধাচরণ করেন। যদি শিক্ষা পাইয়া পুরুষগণ বিপথগামী না হয়, তবে স্ত্রীরা কেন বিপথগামিনী হইবে? এমন জাতি, যাহারা নিজেদের অর্ধেক লোককে মূর্খতা ও পরদারূপে কারাগারে আবদ্ধ রাখে, তাহারা অন্যান্য জাতির, যাহারা সমানে সমানে
স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন করিয়াছেন; তাহাদের সহিত জীবনসংগ্রামে কীরূপে প্রতিযোগিতা করিবে? ভারতবর্ষে এক কোটি লোক ভিক্ষাজীবী, তন্মধ্যে মুসলমান-সংখ্যাই অধিক। সুতরাং তাহারা কোন মুখে অন্য জাতির সহিত সমকক্ষতা করিবে? আমরা আবার কৌলীন্যের বড়াই করি। ভিক্ষাবৃত্তি সর্বাপেক্ষা নীচ কাজ আর মুসলমানের সংখ্যাই ইহাতে অগ্রণী। ইহার কারণ এই যে, তাহারা স্ত্রীলোকদিগকে শারীরিক ও মানসিক বিকাশসাধনে বঞ্চিত রাখিয়া সর্ববিষয়ে পঙ্গু করিয়া রাখিয়াছে। ফলে তাহাদের গর্ভজাত সন্তান অলস ও শ্রমকাতর হয়; সুতরাং বাপ-দাদার নাম লইয়া ভিক্ষা ছাড়া তাহারা আর কী করিবে?’
বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালে। মৃত্যু ১৯৩২ সালে। আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে তিনি বলেছিলেন——মুসলমানদের যাবতীয় দৈন্যদুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রীশিক্ষার ঔদাস্য। ভ্রাতৃগণ মনে করেন, তাঁহারা গোটাকতক আলিগড় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর করিয়াই পুলসিরাত পার হইবেন আর পার হইবার সময় স্ত্রী ও কন্যাকে হ্যান্ডব্যাগে পুরিয়া লইয়া যাইবেন। কিন্তু বিশ্বনিয়ন্তা বিধাতার বিধান যে অন্যরূপ—যে বিধি অনুসারে প্রত্যেককেই স্ব-স্ব কর্মফল ভোগ করিতে হইবে। সুতরাং স্ত্রীলোকদের উচিত যে, তাঁহারা বাক্সবন্দি হইয়া মালগাড়িতে বসিয়া সশরীরে স্বর্গলাভের আশায় না থাকিয়া স্বীয় কন্যাদের সুশিক্ষায় মনোযোগী হন। কন্যার বিবাহের সময় যে টাকা অলংকার ও যৌতুক ক্রয়ে ব্যয় করেন, তাহারই কিয়দংশ তাহাদের সুশিক্ষায় ও স্বাস্থ্যরক্ষায় ব্যয় করুন।’
স্কুলে ছাত্রীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করতে গেলে ছাত্রীদের অভিভাবক চেঁচিয়ে উঠতেন, বলতেন, ‘স্কুল মে লড়কি পড়নে কো দিয়া হ্যায়, না যা বিচার করনে কো, কি আঁখ কমজোর, দাঁত কমজোর, হলক মে ঘাও হ্যায়, ফেফড়া খরাব হ্যায়। ইয়ে সব বোলনে সে হামারি লড়কি কি শাদি ক্যায়সে হোগি?”
বেগম রোকেয়া ছিলেন একটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক। তিনি অবাক হতেন বালিকাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার চেয়ে শাদি’র গুরুত্ব অধিক বলে।
সেই সময় থেকে এই সমরের ব্যবধান দীর্ঘ, কিন্তু এখনও মেয়েদের ‘শাদি’র গুরুত্ব কমেনি। এখনও একজন মেয়ে কতদূর লেখাপড়া করেছে, এই সংবাদের চেয়ে মেয়েটির বিয়ে হল কার সঙ্গে, এই সংবাদটি সমাজের সর্বস্তরের লোকের জন্য জরুরি। এ-দেশে নারীর শক্তি প্রমাণিত হয় তাঁর মেধা বা শিক্ষায় নয়, তাঁর স্বামীর যোগ্যতায়। বছরের পর বছর পার হচ্ছে, কিন্তু সেই অন্ধকার এখনও কাটছে না। বাঙালি মুসলমানের চেতনার ভেতর জমে থাকা ঝুলকালি, মাকড়সার জাল কারও বোধহয় সাধ্য নেই সরায়।
নারীর জন্য স্কুল-কলেজ খোলা হচ্ছে। এতে খাতাকলম নিয়ে যারা পড়তে আসছে, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার’ চেয়ে ‘স্বামীগত যোগ্যতায়’ দীপ্তমান হবার আকাঙ্ক্ষা—আমি নিশ্চিত—শতকরা অন্তত নিরানব্বইজনের মনে কাজ করে। এই দোষ আমি মেয়েদের দিচ্ছি না, এই দোষ তাদের—যারা নানা রকম অন্যায় সংস্কার বা বিশ্বাস সংক্রামিত করে এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের মধ্যে। যারা শক্ত শিকল পরিয়ে দেয় মানুষের এক পা থেকে আরেক পায়ে।
মুসলমান মেয়েরা শিকল-পরা পায়ে ঘর এবং আঙিনার বাইরে বেশিদূর যেতে পারে না, ভোঁতা মস্তিষ্কের কল্পনাশক্তিও বেশিদূর অগ্রসর হয় না। বিয়ে হয়ে যাবার পর মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেবার প্রবণতা আমাদের শিক্ষিত সমাজ থেকে এখনও দূর হয়নি। সরকারের লাখ টাকা খরচ করে শিক্ষাদীক্ষা অর্জন করে ঘরে বসে কেবল স্বামী ও সন্তানের সেবায় নিয়োজিত হওয়া মেয়েদের সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কমছে না।
বাঙালি মুসলমানের জগৎ থেকে এত কিছু দূর হল, হিন্দু দূর হল, উর্দুভাষী দূর হল, কেবল অন্ধকার দূর হয় না।
রাজনীতির ফাঁকফোকর
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দলটির এখন সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব, সেই দলটির নাম ‘জামায়াতে ইসলামি’। জামায়াতে ইসলামির রাজনীতি ধর্মভিত্তিক। তাদের চিন্তা-চেতনা, সন্ত্রাস, ষড়যন্ত্র সবকিছুই ধর্মের ছত্রচ্ছায়ায় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন, দু’দলের বন্ধুত্ব কী করে জমছে? এ যে একেবারেই সাপে-নেউলে আদর্শ। যে ধর্ম দ্বারা জামায়াতে ইসলামি লালিত, সেই ধর্ম বলে ‘পুরুষেরা যখনই নারীর আনুগত্য করেছে তখনই ধ্বংস হয়েছে।’ (বুখারি)
‘যে জাতি নারীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, সে জাতি কখনও সফলকাম হতে পারে না।’ (বুখারি)
‘কোনও জাতির জন্য নারীকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করাও জায়েজ নয়। কারণ অসাফল্য ও ক্ষতি নিশ্চিত করে এমন কাজ বর্জন করা আবশ্যক।’ (নায়ালুল আওতার
‘কিবলার অনুসারীদের ছোট ছোট দল-উপদল আছে তার কোনওটিই নারীর নেতৃত্বকে বৈধ মনে করে না।’ (আল ফাসল্ ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, ৪র্থ খণ্ড)
কারণ নারীদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা ও দীন (দৈহিক শক্তি) অসম্পূর্ণ। আর তাদের ফয়সালার স্থানসমূহে (বিচারালয়ে) এবং যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার অনুমতি নেই।’ (শারহু মাকাসিদ )
আর যখন তোমাদের দুষ্টু লোকেরা আমির শাসক আর মালদার ব্যক্তিরা কৃপণ হবে এবং তোমাদের যাবতীয় কার্যাবলি নারীদের হাতে সোপর্দ হবে, তখন এ পৃথিবীর পেট তার পিঠের তুলনায় (অর্থাৎ দুনিয়াতে না থাকাই) তোমাদের জন্য উত্তম হবে।’ (তিরমিজি শরিফ)
ইসলামের এই মৌলিক বিধানগুলোর আলোকে রাষ্ট্রপ্রধান ও নামাজের ইমাম হওয়া নারীর জন্য হারাম। শরিয়তের পরিভাষায় নামাজ পরিচালনা ও দেশ পরিচালনা, উভয়কেই ইমামতি বলা হয়। এই ইমামতি কোনও নারীর জন্য বৈধ নয়। নামাজের ইমামতিতে যেমন কোনও নারী দাঁড়িয়ে গেলে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া মুসলমানের জন্য ফরজ, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র নামক বড় মসজিদের পেশ মশল্লায় কোনও নারী অধিষ্ঠিতা হয়ে গেলে তাকেও সরিয়ে দেওয়া মুসলমানদের জন্য ফরজ। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অবৈধ বা নাজায়েজ ঘোষণা করা তাই জামায়াতে ইসলামির জন্য ফরজ একটি কাজ। যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন নারী এবং সেই নারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাই যুক্তিমতে বি এন পি-ই জামায়াতে ইসলামির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবার কথা। এ-ক্ষেত্রে দু’দলে কোনওরকম সখ্যের প্রশ্ন উঠে না।
সুরা নিসায় (আয়াত ৩০) লেখা আছে, ‘পুরুষই নারীর তত্ত্বাবধায়ক শাসক, কারণ আল্লাহ্ তাদের এককে অপরের ওপর প্রাধান্য দান করেছেন।’
যেহেতু ধর্ম বলে—‘নারীর কোনও ক্ষমতা নেই পুরুষের ওপর কর্তৃত্ব করবার, প্রাধান্য বিস্তার করবার’, যেহেতু ধর্ম বলে ‘নারী-নেতৃত্ব বৈধ নয়, জায়েজ নয়।’ তাই ধর্ম যাদের একমাত্র হাতিয়ার; তারা যে-কোনও নারীপ্রধান দলের বিরুদ্ধে জেহাদে নামবে— এই তো ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটল উলটো ঘটনা। জামায়াতে ইসলামি গোপনে হাত রেখেছে বি এন পি-র নারী-নেত্রীর হাতে। এ কি স্ববিরোধিতা নয়? শুধু স্ববিরোধিতাই বা বলি কেন—এ হচ্ছে ধর্মবিরোধিতা। ধর্ম যাদের প্রধান অস্ত্র, তারাই যদি হয় ধর্মবিরোধী, তবে দেশের নিরীহ জনগণ যাবে কোথায়? নাকি নাকের সামনে বেহেশতের মুলো ধরে নাচলেই মূর্খ জনগণের জিভে জল আসবে? আর তাই চাচ্ছে একাত্তরের পর গর্তের ভেতর ঢুকে যাওয়া বিষাক্ত সাপেরা, যারা আজ গর্ত থেকে মাথা তুলেছে, বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে! যারা আজ জাতির শেকড়ে, জাতির রক্তমাংস-মজ্জায় দিচ্ছে ভয়ংকর ছোবল।
জামায়াতকে দুধকলা খাইয়ে মানুষ করছে দেশের ক্ষমতাসীন দল বি এন পি। আর জামায়াতও শরিয়তবিরোধী নারী-নেতৃত্বের দুধকলা বেশ আয়েশ করে পান করছে। আর বলিহারি বি এন পি! যে দলের নেত্রী তাঁর বক্তৃতায় আমি খালেদা, খালেদা, খালেদা’ বলে জনগণকে জানান দিচ্ছেন যে, তিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, তিনি নারী এবং তিনি নেত্রী তবে তিনিই বা কেন মেনে নিচ্ছেন নারী-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হাদিস-ফতোয়াধারণকারী দল জামায়াতের রাজনীতি? জামায়াত, ফ্রিডম, যুবকমাণ্ডের রাজনীতি নিষিদ্ধ করবার জন্য মানুষ আজ পথে নেমেছে, এই নিয়ে গণসমাবেশ হয়ে গেল মাত্র সেদিন। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই নারী-নেত্রীর, প্রধানমন্ত্রীর।
সন্দেহ নেই যে, জামায়াত তার স্বার্থসিদ্ধির পর নারী-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে খেপে উঠবে বুনো ষাঁড়ের মতো। তখন খালেদা জিয়া মাথার ঘোমটা আরও লম্বা করলেও তাকে শিঙের গুঁতো খেতেই হবে, কারণ তারা ফাঁক পেলেই বলবে, “নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য ঘরের মধ্যেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন নবি করিম (সাঃ)।’ (ফাতহুল বারি
নারীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল ঘরবাড়ির তত্ত্বাবধান এবং স্বামী ও সন্তানের দেখাশোনা করা।’ (বুখারি)
নারীকে ঘরবাড়ির বাইরে জাতির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিতে সকলের আগে যে দলটি নারাজ হয়—সে জামায়াতে ইসলামি। তারা পরদাপ্রথার দোহাই দিয়ে একদিন বলবেই, পরপুরুষের সামনে আসা নারীর জন্য গুনাহের কাজ। তখন গুনাহগার প্রধানমন্ত্রীকে হয়তো ইসলামি আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
ধর্মের নামে এমন জগাখিচুড়ি বাজনীতিতে এখন আক্রান্ত দেশের সরল-সোজা মানুষ। এই সময়ে অসুস্থ ও অনগ্রসর রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করা জরুরি। খালেদা জিয়া এ-দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে আমি সকল নারীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা-সম্ভাষণ জানাচ্ছি এবং তাঁর এবং সকল নারীর মঙ্গলের জন্য জামায়াতে ইসলামি নামের দলটিকে নিষিদ্ধ করবার অনুরোধ করছি- এতে দেশ বাঁচবে, অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বাঁচবে দেশের বারো কোটি মানুষ।
নারীর নামপরিচয়
১
কোনও বায়োডাটা ফর্ম পূরণ করতে গেলে নাম, বয়স ও জন্মতারিখের পর ‘পিতা/স্বামী’র ঘরে আমার দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়। বিবাহিত পুরুষেরা পিতা এবং স্বামীর মধ্যে পিতাকে বেছে নেন, কারণ তাঁদের পিতা আছে, স্বামী নেই (পুরুষদের স্বামী থাকে না); বিবাহিত নারীর কিন্তু খানিকটা মুশকিল হয়, কারণ তাঁর পিতাও আছে এবং স্বামীও আছে। তাঁর বেছে নিতে হয় যে-কোনও একজনের ‘অভিভাবকত্ব’। বিবাহিত নারীদের সাধারণত স্বামীর অভিভাবকত্বই বরণ করতে হয়।
স্বামী ও স্ত্রীকে যদি একে অপরের পরিপূরক বলে ধরে নিই—স্ত্রী যদি স্বামীর নাম উল্লেখ করেন তাঁর জীবনবৃত্তান্তে, তবে স্বামীরও নিশ্চয় স্ত্রীর নামই উল্লেখ করা উচিত। আর তা না হলে নারী ও পুরুষ, উভয়কেই তাঁদের পিতা ও মাতার পরিচয়ই উল্লেখ করতে হবে। আমার মনে হয় পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে সে বিবাহিত হোক কি অবিবাহিত হোক—অভিভাবক হিসেবে পিতা ও মাতাকে স্বীকার করাই যুক্তিযুক্ত।
২. ধরা যাক, দেশের কোনও এক নাগরিক তার পিতা-মাতাসহ ময়মনসিংহে বসবাস করে, তার পিতার জন্ম এবং আদিবাড়ি রাজশাহি জেলায়, তার মায়ের জন্ম এবং আদিবাড়ি চট্টগ্রাম জেলায়। এই নাগরিককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার বাড়ি কোথায়, তবে সে কিন্তু ময়মনসিংহ নয়, চট্টগ্রাম নয়, বলবে রাজশাহি। ধরা যাক, রাজশাহি পিতার বাড়ি বটে, তবে রাজশাহিতে সে কখনও যায়নি, তার পিতা চট্টগ্রামের মেয়েকে বিবাহ করে কর্মসূত্রে ময়মনসিংহে চলে আসেন এবং দীর্ঘকাল সেখানে বসবাস করেন, তবু তার নিজের ‘গ্রামের বাড়ি বা দেশের বাড়ি’ রাজশাহিকেই মানতে হবে। এ এক অদ্ভুত ব্যবস্থা বটে। পিতার জন্মস্থানকে নিজের উৎসস্থল বলে চিহ্নিত করা।
এটির কারণ ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’—–পিতাই যেখানে পরিবারের প্রভু। সংসারে পিতার যদি কোনও অর্থনৈতিক অবদান না থাকে—পিতা যদি অথর্ব, অক্ষম, অসৎ ও অত্যাচারী হয় তবুও সন্তানকে পরিচিত হতে হয় পিতার পরিচয়ে। মাতা যদিও একটি ভ্রূণকে ন’মাস সাতদিন জরায়ুতে লালনপালন করেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা প্রসব করেন, তবু তাঁর পরিচয় সমাজে মুখ্য নয়। আমি বলছি না মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এই সমাজকে ফিরে যেতে হবে। বলছি না রোকেয়ার নারীস্থানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। আমার একটিই প্রস্তাব, যে গ্রাম বা শহরে মানুষ বাস করে, তার বাড়ির অবস্থান হিসেবে সেই গ্রাম বা শহরের নামই উল্লেখ করতে হবে। সেই সঙ্গে পিতার বাড়ি এবং মাতার বাড়িরও আলাদা উল্লেখ প্রয়োজন। অন্তত এই নিয়মটি যত শিগগিরই চালু করা যায়, ততই মঙ্গল।
মঙ্গল বলতে কিন্তু এই নয় যে, নারীর সকল সমস্যার সমাধান হয়ে গেল—নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটল, নারীর রাজনীতি করবার, মসজিদে যাবার, পড়ালেখা করবার, চাকরি করবার, বাণিজ্য করবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেল—ঘুচে গেল অন্ধকার—খুলে গেল তার সামাজিক সকল শৃঙ্খল!
এই সমাজের রক্তরন্ধ্র থেকে অসুখ দূর হওয়া সহজ কথা নয়। তবু সুস্থতার সামান্য যেটুকু চর্চা চলছে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে, আমি তারই বিস্তার চাই। মানুষ সজাগ হোক এবং মূলোৎপাটন করুক দুরারোগ্য ব্যাধিবৃক্ষের।
৩. পিতা এবং স্বামীর নাম নিজের নামে ধারণ করবার এক প্রকার শখ মেয়েদের মধ্যে বাড়ছে। মেয়েদের নামের ওপর ওগুলো চাপিয়ে দেবার নিয়মটি নতুন নয়। এই নিয়মটি আমি আশা করছি অচিরে বন্ধ হবে। অন্তত নিজের ব্যক্তিত্ব বলে সামান্য কিছু যাদের মধ্যে আছে, তারা পিতার রহমান, ইসলাম, হক অথবা স্বামীর চৌধুরি, হোসেন, মুস্তাফা ইত্যাদি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করবেন না। গঙ্গোপাধ্যায়, চক্রবর্তী, সাহা, পাল, সেনদের প্রতিও আমার একই আবেদন—পিতা বা মাতার পদবি, যেটি আপনাদের ইচ্ছে ধারণ করুন। অবশ্য সবচেয়ে ভাল হয় পদবির পতন। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি সন্তানদের এখন পদবিবিহীন বাংলা নাম রাখবার সময় এসেছে। কিছু নামের উদাহরণ দিচ্ছি—প্রজ্ঞা লাবণী, অথই নীলিমা, রৌদ্র সমুজ্জ্বল, সুখ সমুদ্র, শুক্লা শকুন্তলা, অরণ্য নিবিড়, রূপসি হৃদয়।
৪. সেদিন এক বড়সড় প্রতিষ্ঠানের ইন্টারভিউ বোর্ডে আমি উপস্থিত ছিলাম। অফিসার পদে লোক নিয়োগ করা হবে, প্রার্থীদের ন্যূনতম যোগ্যতা মাস্টার ডিগ্রি। চাকরিপ্রার্থী উচ্চশিক্ষিত নারী এবং পুরুষ এক-এক করে প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের মুখোমুখি হচ্ছেন। আমি পরিচালক নই, ঘটনাচক্রে উপস্থিত এবং নিতান্তই দৰ্শক একজন। আমি বিস্মিত হয়েছি নারী ও পুরুষ আবেদনকারীর প্রতি পরিচালকদের ভিন্ন আচরণে। যখন পুরুষ আবেদনকারী পরীক্ষকের সামনে উপবিষ্ট হন, পরীক্ষক জিজ্ঞাসা করেন প্রার্থীর কী নাম, কী ডিগ্রি, কোন সাল, কী সাবজেক্ট, কী অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। কিন্তু একই যোগ্যতাসহ একই পদে আবেদনকারী নারীর ক্ষেত্রে আচরণ হয় ভিন্ন। নামপরিচয়ের আগেই জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি ম্যারেড? ম্যারেড হলে স্বামীর নাম, স্বামীর পেশা, স্বামীর ঠিকানা ইত্যাদি নানা বৃত্তান্ত এবং আবেদনকারীর যোগ্যতার চেয়ে তাঁর স্বামীর যোগ্যতাকেই মনে হয় যেন প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্বামী কেরানি হলে আবেদনকারীর মান কমে যায়, স্বামী প্রকৌশলী হলে আবার তাঁর মান বেড়ে যায়। আবেদনকারীর যোগ্যতা তখন স্বামীর যোগ্যতার নীচে চাপা পড়ে যায়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আবার দৈহিক সৌন্দর্যকে নারীর যোগ্যতা বলে বিবেচনা করে। স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে নারীরা পড়াশোনা করছে, বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করছে, কিন্তু ‘যোগ্যতা’ অর্জন করছে না—কোথাও নিজের একার অস্তিত্ব এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়াবার যোগ্যতা।
কাজ
আমার ছোটবোন মাস্টার ডিগ্রি পাস করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য দরখাস্ত করছিল। দু’একটি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকও ছিল তালিকায়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সিটি ব্যাংক বা আল বারাকা ব্যাংক থেকে অফিসার চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি?”
‘দিয়েছে, কিন্তু ও-সবে তো আমার দরখাস্ত দেওয়া চলবে না।’ আমার বোন বলল।
‘কেন?’
“ওরা মেয়ে নেয় না।’
‘শিক্ষা-যোগ্যতা থাকলেও নেয় না?’
‘না। ওরা ‘পুরুষ হবার যোগ্যতা’ চায়।’
‘এর কারণ কী?’
‘যতদূর শুনেছি মেয়েদের মেটারনিটি লিভ দিতে হয়, মেয়েদের দিয়ে ওভারটাইম করানো যায় না—এ-সব কারণে ওরা মেয়ে নেয় না।’
মানুষের অধিকার আছে যে-কোনও কাজ করবার, সে পুরুষ হোক বা নারী হোক। এ-দেশে শুধু ব্যাংক নয়, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান মেয়েদের কাজে নেয় না। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা সবই তুচ্ছ হয়ে যায়, সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে।
একবিংশ শতাব্দী শুরু হবে আর মেয়েরা চাকরি পাবে না মেটারনিটি লিভ নিতে হয় বলে—এ কি কোনও সভ্য দেশের প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চারিত ঘোষণা বলে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোয় নিম্নবিত্ত মেয়েরা কাজ করছে, একটি দেশি ওষুধ প্রতিষ্ঠান চলছে সম্পূর্ণ মেয়েদের দিয়ে, এন জি ও-গুলো প্রচুর মেয়েকে কর্মী হিসেবে নিচ্ছে—এ-সব অত্যন্ত শুভ লক্ষণ, যদিও অভিযোগ থেকে যায়, মেয়েদের খুব কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। আর কম পারিশ্রমিকই মেয়েরা মেনে নেয় বলে ‘সস্তার শ্রমিক’ হিসেবে তারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেয়েরা ‘সস্তা’ বলে কাজ পায় বেশি। খোদ আমেরিকাতেই যে কাজ করে একটি মেয়ে ৫৯ সেন্টস পাচ্ছে, একই কাজ করে একটি ছেলে পাচ্ছে এক ডলার।
অসভ্য দেশগুলোর অসভ্য সমাজ এক ধরনের ‘ফতোয়া’ প্রচার করে যে, মেয়েরা ঘরে বসে থাকবার ‘জিনিস’, তাদের ঘরের বাইরে কাজ করা উচিত নয়, স্বনির্ভর হওয়া উচিত নয়। যে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক স্বনির্ভর নয়, সে দেশ কখনও সভ্য হবার নয়। এ আমার বিশ্বাস।
এ-দেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা লেখা আছে। অথচ এ-দেশেই বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংবিধানের বিধান লঙ্ঘন করেও বাণিজ্য করবার ছাড়পত্র পাচ্ছে। এ-ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার কথা বলে কোনও লাভ নেই, সে আমি জানি। কারণ সরকারই জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ সম্পূর্ণ অনুমোদন করেননি, সমান অধিকারের জন্য কিছু কাজের আদেশ-নির্দেশ ওতে আছে কিনা, তাই।
লেখাপড়া শিখে যত মেয়ে চাকরি করে, তার চেয়ে অধিকসংখ্যক মেয়ে বেকার বসে থাকে। অথচ কাজের অভাব থাকবার কথা নয়। অনেকে বলে মেয়েরা শক্ত কাজ করতে পারে না, তাই হালকা ধরনের কাজগুলো ওদের জন্য রাখা হয়— এটি একটি চূড়ান্ত মিথ্যেকথা। গ্রামের কৃষক পরিবারের মেয়েরা কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি একটানা যে কাজগুলো করে, কোনও পাষণ্ডও বলবে না এ-সব হালকা কাজ। মেয়েরা মাটি কাটছে, মাটি বহন করছে, ইট ভাঙছে, যে-কোনও কাজেই তারা পুরুষের সমান পারদর্শী। অথচ কাজের সুযোগ তাদের দেওয়া হয় না। সেদিন একটি রেস্তোরাঁয় কিছু মেয়ে কাজ করছে দেখে আমার চেনা দু’জন পুরুষ ঠোঁট চেপে হাসল। হাসবার কারণ একটিই, এই মেয়েদের ওরা ভাবছে ‘খারাপ মেয়ে’। এখনও এই সমাজ অভ্যস্ত হয়নি খুব নিচু এবং উঁচু স্তরে ছাড়া মেয়েরা কাজ করছে, দেখতে। হয় মেয়েরা ইন্ডাস্ট্রির মালিক হবে, নয় ঘুঁটেকুড়োনি, পতিতা, চাকরানি, মেথরানি ইত্যাদি হবে। মাঝামাঝি কোনও পদে মেয়েদের গ্রহণ করায় এখনও সমাজের জড়তা কাটছে না। সেনাবাহিনীতে মেয়েদের নেওয়া হয় না। এই না নেওয়ার পেছনে কারণ কী? মেয়েরা কি লাফাতে, দৌড়োতে, গুলি ছুড়তে পারে না? নিশ্চয় পারে।
অন্য দেশের মেয়েরা প্রমাণ দিয়েছে যে তারা পারে। তারা বিমান চালাতে ও জানে, জাহাজ চালাতেও জানে, গুলি ছুড়তেও জানে। মেয়েদের মনকে, শরীরকে অদ্ভুত এক রহস্যের জালে জড়িয়ে রেখে পুরুষ নামের প্রাণীরা বহু দর্শন, মনোবিজ্ঞান, কাব্য, মহাকাব্য রচনা করেছেন এবং মেয়েদের সরিয়ে রেখেছেন কঠোর বাস্তবতা থেকে, একইসঙ্গে মানুষের প্রাপ্য অধিকার থেকে। সেলস গার্ল হিসেবে, ট্রাক-বাস-টেম্পো-লঞ্চ-ট্রেনের ড্রাইভার হিসেবে, ব্যাংকে, ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, রেস্তোরাঁয়, হোটেলে, হাসপাতালে, লন্ড্রিতে, গ্যারেজে মেয়েরা সবধরনের দক্ষতা দেখাতে পারে। কাপড়, কাগজ, সাবান, শ্যাম্পু, স্নো-পাউডার, ওষুধ, জুতো, জুট, ইট, কলম, পেনসিল, মশলা, সিরামিক তৈরির কলকারখানায় অন্তত পঞ্চাশ ভাগ বাধ্যতামূলক নারী-শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা করলে, দেশের মেধাবী বেকারের সমস্যা যেমন ঘোচে, পরনির্ভর হওয়ার গ্লানি থেকে নারী যেমন রক্ষা পায়, তেমনি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও অধিক সৎ, নিষ্ঠ ও কর্মঠ শ্রমিক পেয়ে লাভবান হয়। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি হিসেবেও আমার বিশ্বাস— নারী পুরুষের তুলনায় অধিক দক্ষ।
বৈজ্ঞানিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ফিল্মমেকার, জজ, ব্যারিস্টার, উকিল, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেয়েরা পারদর্শিতা দেখিয়েছে। শুধু বড় কাজে নয়— ছোট-মাঝারি যে কোনও কাজেই মেয়েদের বাধ্যতামূলক নিয়োগের ব্যবস্থা থাকা উচিত সরকারি এবং বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে। সেই সঙ্গে কর্মজীবী মেয়ে-হোস্টেল নির্মাণও বাড়াতে হবে।
‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’ এ-কথা সকলে জানেন। মেয়েদের কাজকর্মহীন অলস জীবন উপহার দিয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির সমাজপতিরা মেয়েদের বানাতে চাচ্ছে এক-একটি আস্ত ‘শয়তান’। তারা সাজবে, নাচবে, হাসবে, খেলবে দুলবে— ব্যাস। তারা কানে আট-দশটি ফুটো করবে, ওতে সোনার রিং ঝুলোবে। তারা নাক ফুটো করেও গয়না লটকাবে, তারা জামায়, জুতোয়, শাড়িতে জরি লাগাবে, চুমকি বসাবে। তারা অনর্থক সব কাজ করবার জন্য অনুৎপাদক শয়তানে রূপান্তরিত হচ্ছে। সাজগোজ, ফ্যাশন, চমক ইত্যাদির প্রতি মোহ সৃষ্টির একমাত্র কারণ নারীর কর্মহীন অলস মস্তিষ্ক। বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়াও মেয়েদের জন্য নতুন একটি ফ্যাশনে দাঁড়িয়েছে। তারা নাকি ভোর ছটায় উঠে মেকআপ করতে বসে আটটায় বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছোতে হবে বলে। কিন্ডারগার্টেনগুলো ছাত্রছাত্রীদের থেকে পয়সা তো কম নিচ্ছে না, স্কুলবাসের ব্যবস্থার জন্য কেন তবে কোনও উদ্যোগ নেই? অভিভাবকগণ কি এই যৌক্তিক দাবিটি কখনও উত্থাপন করেছেন?
মেয়েরা ‘মেটারনিটি লিভ নেয়’, মেয়েদের কাজ করবার বিপক্ষে এটি কোনও যুক্তি নয়। সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনীতে এমনকী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে কাজ করেও যদি মেয়েরা মেটারনিটি লিভ নিতে পারে তবে এ-দেশের সিটি ব্যাংক এবং অল বারাকা ব্যাংকের স্পর্ধা কেন এত যে, তারা এই কারণ দেখিয়ে মেয়েদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করে? নাকি আরও কোনও কারণ আছে লুকিয়ে, যা আমরা জানি না? মেয়েদের অবরোধ রাখবার গূঢ় কোনও ষড়যন্ত্র? হতে পারে। কিছুই এখন আর অবিশ্বাস্য নয়।
সেদিন আমার এক আত্মীয় তাঁর শিক্ষিত কন্যা সম্পর্কে বললেন,
‘ও কোনও স্কুল বা কলেজে ঢুকতে পারলে ভাল হত।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্কুল-কলেজে কেন?’
আত্মীয়টি বললেন, “শিক্ষকতার চাকরিই মেয়েদের জন্য ভাল। নিরাপদ। ‘
ইতিমধ্যে সমাজ-সংসারে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে কোন চাকরিটি মেয়েদের জন্য ভাল, কোন চাকরিটি খারাপ। যে মেয়ে যে কাজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে বা দক্ষতা দেখাবে, সে কাজই বা সে চাকরিই সেই মেয়ের জন্য ভাল হওয়ার কথা। অথচ মেয়েদের জন্য এই চাকরি ভাল, ওই চাকরি খারাপ— এই যে একটি ভাগাভাগি চলছে, এর ফলাফল এক ধরনের নৈরাশ্য সৃষ্টি করবে ভবিষ্যতে। ‘মেয়েলি’ এবং ‘পুরুষালি’ বলে আলাদা কিছু দোষগুণ যেমন নির্ধারণ করা হয়েছে কিছু দুষ্ট পুরুষ দ্বারা। তেমনি ‘মেয়েদের কাজ : এবং ‘ছেলেদের কাজ’ বলেও বিশাল এই বিজ্ঞাননির্ভর উর্বর পৃথিবীতে এক ধরনের ভাগাভাগির খেলা চলছে।
নারী যদি মানুষ হয়, তবে যে কাজ করতে পুরুষের কোনও বাধা নেই, সে কাজে নারীরও বাধা থাকবার কথা নয়। মেয়েরা হাত-পা, মস্তিষ্কসহ সম্পূর্ণ মানুষ। তাদের অকেজো করে রাখবার অধিকার কোনও মানুষের নেই, প্রতিষ্ঠানের নেই, রাষ্ট্রের নেই।
পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা
১
উনিশ শো একাত্তর সালে কার সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তা আমাদের জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলো উচ্চারণ করে না। গত ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে টেলিভিশনে বারবার বলা হয়েছে, ন’মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশে স্বাধীনতা এসেছে। কার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল একাত্তরে বাংলাদেশ? দেশ কি তার ভাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে যে নাম উচ্চারণ করা নিষেধ? প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে মিত্রশক্তি ভারতের অবদান কৌশলে অস্বীকার করেছেন, তিনিও উচ্চারণ করেননি একাত্তরে কোন দেশি ভাসুর বা শ্বশুরেরা বাঙালির ঘরবাড়ি লুট করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে, নির্বিচারে হত্যা, অবাধ ধর্ষণ কারা করেছে, কারা বুদ্ধিজীবী ধরে ধরে খুন করেছে বধ্যভূমিতে। ইতিহাস স্বীকার করতে আমাদের ক্ষমতাসীন দলের এখন প্রবল আপত্তি।
গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে টিভিতে একটি নাটক প্রচার হচ্ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে কাহিনি শুরু হয়ে ক্রমে গড়িয়ে নামছে। হঠাৎ ভারতভাগের আগে মুসলিম লিগের ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানটি মুহুর্মুহু ধ্বনিত হল বিজয় দিবসের আগের রাতে টিভির নাটকে, কেন এই সদম্ভ উচ্চারণ? যদি বলা হয় ইতিহাস তুলে ধরা হচ্ছে, তবে তো একাত্তরের ডিসেম্বরে বাংলা আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে, সেই ‘জয় বাংলা’ কেন উচ্চারিত হয় না? যেখানে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণে বাধা, সেখানে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ উচ্চারণে কোনও বাধা নেই। এই গ্লানি আমরা রাখব কোথায় আজ?
২
একবার এক ছোট শহরে বইয়ের দোকান খুঁজতে খুঁজতে দু’-চারটে দোকানের দেখা মেলে। দোকানে কোনও গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ বা কবিতার বই নেই। এক র্যাকে স্কুলের পাঠ্য কিছু বই, বাকি র্যাকগুলোয় মকছুদোল মোমেনিন, বেহেশতি জেওর, তাজকেরাতুল আওলিয়া, নেয়ামুল কোরান, ছোটদের হজরত মুহম্মদ, হজরতের জীবনী, নবির বিবিগণ, হজরত খাদিজা-হজরত আয়শার জীবনী ইত্যাদি। অবাক হয়ে বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করি, ‘সব এই ধরনের বই কেন?”
বিক্রেতা বললেন, ‘এগুলো প্রাইজের বই।’
‘প্রাইজের বই মানে?’
স্কুলগুলোয় এখন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হচ্ছে। সারা বছর যারা লেখাপড়ায় ভাল করে তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এইসব বইই পছন্দ করে কিনে নিয়ে যান। ‘হজরত খাদিজা (রাঃ)’ নামের একটি বই র্যাক থেকে নামিয়ে পৃষ্ঠা উলটে দেখি, কী আছে বইয়ে। চরিত্র গঠনের জন্য খাদিজা কেন অপরিহার্য এই দেশে? হজরতের তেরো বা চোদ্দোজন বিবির জীবনী পড়ে স্কুলের মেয়েরা কোন আদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে তা আমার জানবার প্রয়োজন আছে বই কী! গ্রাম ও ছোট শহরগুলোর বালিকারা হজরত খাদিজার নিপুণ স্বামীসেবা বিষয়ক জ্ঞান আহরণ করে আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ রাঁধুনি এবং আদর্শ স্বামীসেবিকা হিসেবে নিজেদের তৈরি করবার, ব্যাপারে উৎসাহী হবে, কিন্তু কী লাভ হবে এতে দেশের এবং জগতের? তাদের কেন ‘জোন অব আর্কে’র গল্প, মেরি ওলস্টোনক্রাফটের জীবনী, বাংলার মাতঙ্গিনী হাজরা, সরোজিনী নাইডু, বেগম রোকেয়া, ননীবালা দেবী, লীলা নাগ, ইলা মিত্রের জীবন সম্পর্কে কোনও ধারণা দেওয়া হয় না?
তবে কি আমাদের এই ধরে নিতে হবে যে, সত্য ও সুন্দরের জন্য যে দীর্ঘকালের সংগ্রাম, ঘোর অন্ধকার থেকে আলোকিত জীবনে যাবার কণ্টকাকীর্ণ পথ সম্পর্কে কিছুই জানানো হচ্ছে না নতুন প্রজন্মকে, আলোর জগৎ থেকে ছিটেফোঁটা আলোও ছোড়া হচ্ছে না তাদের উদ্দেশ্যে। তাদের মননের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকেরা নিয়ন্ত্রণ করছে বালিকাদের ভাবনার গতি। আমার আশঙ্কা হয়, যখন যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেককে অন্তরে প্রবেশ করাবার সময়, ঠিক তখনই সেই আনকোরা মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় অলৌকিকের দুর্মর মোহ।
অলৌকিকে যাদের আসক্তি আছে, যে নারীদের, তাঁদের প্রতি আমার আকুল আবেদন— বেহেশ্ত আপনাদের কাঙ্ক্ষিত হবার কথা নয়, বেহেশতে আপনাদের শারীরিক এবং মানসিক সুখের কোনও ব্যবস্থা নেই এবং আপনাদের প্রিয় পুরুষেরা যখন অসংখ্য হুরের সঙ্গে জলকেলিতে মগ্ন হবে তখন অপমানে, ক্রোধে আপনাদের এও মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে, দোজখে নিশ্চয় এর চেয়ে অনেক স্বস্তি বিরাজ করে। অতএব বেছে নিন কোন পথে যাবেন, শুধুই স্বামীসেবায় না স্বনির্ভরতায়?
৩
এনেস্থেসিয়ার একজন প্রফেসর সেদিন অপারেশন থিয়েটারে কিছু ছাত্র পড়াচ্ছিলেন। কী করে রোগীকে ঘুম পাড়াতে হয় অর্থাৎ কী ইনজেকশন ব্যবহার করলে রোগী আট থেকে দশ সেকেন্ডের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে, অপারেশন শেষ হলে কী করে রোগীকে জাগাতে হয়— এ-সব তিনি বেশ যত্ন করে বোঝালেন এবং বললেন— ‘রোগী যখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে তখন এমন কোনও দুঃসংবাদ তাকে দেওয়া উচিত নয়- যে কারণে রোগী তার জ্ঞান ফিরে পাবার সময় আবার জ্ঞান হারাতে পারে।’
বিজ্ঞ প্রফেসর রোগীর স্নায়ুর ওপর আকস্মিক আঘাতের উদাহরণ দিলেন এভাবে— যদি কোনও নারীর সিজারিয়ান অপারেশন হয় এবং তার কন্যাসন্তান জন্মায় তবে রোগী তার অজ্ঞান অবস্থা থেকে সংবিৎ ফিরে পাবার সময় বলতে হবে আপনার বাচ্চা হয়েছে’। আর পুত্রসন্তান জন্মালে বলতে হবে ‘আপনার ছেলে হয়েছে’। কখনও যেন ‘আপনার মেয়ে হয়েছে’ এই সংবাদটি তাকে না দেওয়া হয়। কারণ এনেস্থেসিয়ার প্রবীণ অধ্যাপক তাঁর জীবনে নিশ্চয় অনেক দেখেছেন, কোনও রোগী যখন সিজারিয়ান অপারেশনের পর চোখ খুলতে খুলতে এই দুঃসংবাদ শোনে যে, তার মেয়ে হয়েছে তবে সে-চোখ তার জন্মের মতো বন্ধ হয়।
ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যুসংবাদ এবং কন্যার জন্মসংবাদ সম্ভবত দুঃসংবাদ হিসেবে একই।
কবরের খবর
১
এই খবরগুলো এত ছোট খবর যে চোখে পড়ে না। কোন মেয়ে কোন গাছে ফাঁসিতে ঝুলল, কোন বধূর গলায় কে ছুরি বসাল, কোন কিশোরীকে ধর্ষণের পর বস্তায় পুরে নদীতে ছুড়ে ফেলা হল, যৌতুক দেয়নি বলে কোন মেয়েকে গলা টিপে মারা হল, রাগ করে কার মুখে অ্যাসিড ছোড়া হল, কাকে রামদায় কোপানো হল— এ-সব এমন কোনও মূল্যবান খবর নয় যে, দেশসুদ্ধ একটা হইচই পড়ে যাবে। এত বড় বড় ঘটনা ঘটছে দেশে। সার্কের ফোয়ারা হচ্ছে, ফোয়ারার জলে সাত রং সাঁতার কাটছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেড়াতে আসছে, বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ হচ্ছে— বর্ণাঢ্য র্যালি হচ্ছে, সিনেমা হচ্ছে, সিএনএন হচ্ছে, মন্ত্রীরা নতুন বাণী দিচ্ছেন, সচিবেরা ফাইলপত্র নাড়ছেন। আর এর মধ্যে কোথায় কোন পতিতাকে কারা মরবার পরও কবরস্থানে জায়গা দিল না- এ আর এমন কী মূল্যবান খবর।
কবরস্থানে এক ধরনের সাইনবোর্ড ঝোলে, ওতে লেখা থাকে— মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। অর্থাৎ জ্যান্ত মহিলারা ওতে ঢুকতে পারে না, একমাত্র মরবার পরই তারা কবরস্থানে ঢোকবার যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু জামালপুর পৌরসভার ফৌতি কবরস্থানে সত্তর বছর বয়সের মালতীকে মরবার পরও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফৌতি কবরস্থানের মাটি মালতীকে গ্রহণ করতে আপত্তি করেনি, আপত্তি করেছে মানুষ। মানুষেরা মৃত মালতীকে মাটি স্পর্শ করতে দেয়নি। পৌরসভার মেম্বার লাশ দাফনে বাধা দেয়। পৌর কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসকও এই বাধার বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেনি।
কেন মালতীর মৃতদেহ মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটির তল পাবে না? এই কেন’র উত্তর ওরা দিয়েছে, বলেছে— ‘মালতী পতিতা ছিল।’ মালতী পতিতা ছিল বলে মালতীর পাপী শরীর কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট করবে, তাই জামালপুরের ‘পবিত্র পুরুষেরা’ পণ করেছেন তাঁরা কোনও পাপকে প্রশ্রয় দেবেন না। সৎকারের অভাবে দু’দিন পড়ে ছিল লাশটি। শেষ পর্যন্ত কবরস্থানের সীমানার বাইরে পতিত একটি জায়গায় লাশটি পুঁতে রাখা হয়।
কিন্তু এই নির্মমতার কারণ কী? মালতী পতিতা বলে তার ওপর এত রাগ কেন সমাজের? মালতীকে পতিতা হবার লাইসেন্স কে দিয়েছে? মালতী কেন পতিতা হয়েছিল সে ইতিহাস আমি জানি না। না জানলেও এ নিশ্চয় অনুমান করা যায় যে, সরলমতি মালতীকে ভুলিয়ে ফুলিয়ে কোনও চতুর পুরুষ পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল, অথবা স্বামী তাকে সংসার থেকে তাড়িয়ে দিলে পথের পুরুষেরা তাকে টেনেহিঁচড়ে ফেলে এসেছিল পতিতালয়ে। আমি অনুমান করি মালতীর পতিতাবৃত্তিকে সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এবং মালতী যেহেতু দরিদ্র ও সামাজিক নির্যাতনে ন্যুব্জ, যেহেতু সরকার তাকে আর কোনও কাজ দিচ্ছে না, বলছে অগত্যা, তুমি পতিতাবৃত্তিতে মনোযোগী হও। তাই মালতীও সমাজের ‘পবিত্র পুরুষদের’ শখের বীর্য নিজের শরীরে গ্রহণ করে নিজে সে ‘পাপী’ হয়েছে। বেঁচে থাকতে সমাজ তাকে স্থান দেয়নি। মরে গেলে কবরস্থানও তাকে স্থান দেয়নি।
সমাজের ভদ্রলোকদের আনন্দফূর্তির জন্য যে শরীরগুলো সরকার বাঁচিয়ে রাখে, সেই শরীরগুলো সৎকার করতে সরকারি লোকেরাই বাধা দেয়। পতিতাবৃত্তিতে বাধা নেই, অথচ পতিতার সৎকারে বাধা— এ কেমন নিয়ম? এ আমরা মানি না। আমরা মানে নারীরা, যে নারীরা সমাজের কিছু সুযোগ-সুবিধে পেয়ে পতিতা হবার দুঃসহ যন্ত্রণা হয়তো ভোগ করছি না, কিন্তু কোনও-না-কোনও যন্ত্রণা ভোগ করছিই। নারী হয়ে জন্মেছে অথচ যন্ত্রণা পোহায়নি— এমন নারী এ-জগতে নেই। সমাজের এবং সমাজের বাইরের সকল নারীরই নির্যাতন সইতে হয়। কারও কিছু কম, কারও বেশি। এই যা পার্থক্য।
একজন প্রধানমন্ত্রীকে আমি যে শ্রদ্ধা করি, একজন পতিতাকে তার চেয়ে কিছু কম করি না। মানুষ হিসেবে জগতের ওপর দু’জনের অধিকারই সমান। কেউ পতিতা হয়ে জন্মায় না। সমাজ কাউকে মহামনীষী করে, কাউকে মস্তান করে, কাউকে পুরোহিত করে, কাউকে পতিতা করে। সমাজের ‘সবলেরা’ সকল সুযোগ-সুবিধে নিজে নিয়ে দুর্বলকে ঠেলে দেয় অন্ধকারে, পাঁকে। পতিতা দুর্বল বলে তারা তাকে ভোগ করবে আর তাদের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেবে— এই যদি তাদের সমাজ হয় তবে আমি যে এই সমাজের মানুষ— এ-কথা ভাবতে নিজের প্রতিই আমার লজ্জা হয় খুব। ঘৃণাও কিছু কম হয় না।
এই সমাজের সকল নারীই আজ মালতী। সকল নারীকেই বহন করতে হয় পুরুষের কামড় এবং পুরুষের ধিক্কার। সকল নারীকেই আটকা পড়তে হয় পুরুষতন্ত্রের জালে। তাকে ভুগতে হয়। তাকে মরতে হয়।
যে মাটিতে মালতীর কবর খোঁড়া হয়নি, সেই মাটি কার? সমাজের কোন মহাপুরুষের সৎকারের জন্য সেই মাটি রাখা আছে, যে মাটিতে কবর হবার অধিকার মালতীর নেই, যে মালতী এই দেশের নারী, এই দেশের নাগরিক! মালতী এই মাটির নিঃস্ব, নির্যাতিত, দরিদ্র, দুর্বল মানুষ। এই মাটি যদি মালতীর নয়, এই মাটি তবে কার?
২
ছোটবেলায় একদিন ছাদের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে ভরদুপুরের নির্জনতা দেখছিলাম। এক সময় দেখি একজন মানুষ আসছে দূর থেকে ধীরে হেঁটে। ছাদে বসা ছিল আমার এক আত্মীয়। তাকে বললাম সারা রাস্তায় এখন একজন মানুষ মাত্র! শুনে আমার আত্মীয়টি দেখতে এল, সেও রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তায় তাকাল, এবং বিরক্ত হয়ে বলল— ‘কী যে বলো না, মানুষ কই, ও তো একটা মেয়ে।’
আত্মীয়টির কথা শুনে আমি বড় বিস্মিত হয়েছিলাম সেদিন এবং সেই ঘটনার পর উনিশ বছর প্রায় পার হয়ে গেছে, আজও আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না।
Chapter - 51 to 62
যদি সত্য কথা বলি
আজকাল মোল্লারাও বিজ্ঞানের জ্ঞান শেখাচ্ছে। কারণ তারা বুঝে গিয়েছে জগৎ যখন ক্রমশ বিজ্ঞাননির্ভর হয়ে উঠছে তখন বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল না মেলাতে পারলে তাদের ধর্মও আর টিকে থাকে না। তাই চতুর ধর্মব্যবসায়ীরা বিজ্ঞানকে তাদের দলে নেবার জন্য দেশে দেশে লোক নিয়োগ করেছে। এই লোকেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, দার্শনিক, কেউ আবার বিজ্ঞানীও। এরা যখন ধর্মপ্রচারে নিবেদিত হয় তখন সাধারণ মানুষ ভাবে যে, অত বড় মনীষী যখন বলছে তখন নিশ্চয় সে জেনেই বলছে। নিশ্চয় বেহেশত-দোজখ বলে কিছু আছে পরকালে। মরিস বুকাইলি নামের এক লোক কোরানকে বিজ্ঞান গবেষণাগারের টেস্টটিউবে রেখে লিটমাস পেপার ডুবিয়ে পরীক্ষা করে দেখিয়েছে বিজ্ঞানের সৌরজগৎ এবং কোরানের সৌরজগৎ একই, কোনও হেরফের নেই। আমাদের অশিক্ষিত লোকেরা ভাবছে, মরিস বুকাইলি যখন বলছে, ঠিকই নিশ্চয় বলেছে। ওল্ড টেস্টামেন্টের ছয় দিনে পৃথিবী বানাবার ঘটনাটি কোরানেও যখন হুবহু উচ্চারিত হয়, তখন মরিস সাহেব আরবি শব্দ উলটে দিয়ে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে কোরান রচনার ধৃষ্টতা দেখান। কোরানে লেখা ছয় দিন, মরিস বুকাইলি লিখে দেন ‘ছয় সময়কাল’। বুকাইলি বিংশ শতাব্দীর লোক, কিন্তু মুহম্মদ তো বিংশ শতাব্দীর লোক ছিলেন না। বুকাইলি বিজ্ঞানের সকল ব্যবহারকে কোরানসম্মত করে মূর্খ মানুষের বাহবা পেতে চেয়েছেন, পেয়েছেন। কেবল বুকাইলি নয়, এই উপমহাদেশে প্রফেসর সালাম, শমশের আলিও সস্তা বাহবার জন্য ইসলামের খাঁচায় বিজ্ঞানকে ঢুকিয়েছেন।
মিশরের চিন্তাবিদ আল্লামা ফরিদ আজদি লিখেছেন—
‘পুরুষের মগজ সাধারণত গড়ে ৪৯%, আউন্স। আর স্ত্রীলোকের মগজের ওজন মাত্র ৪৪ আউন্স। দুশো আটাত্তর জন পুরুষের মগজ ওজন করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় মগজের ওজন হচ্ছে ৬৫ আউন্স। আর সবচেয়ে ছোট মগজের ওজন ৩৪ আউন্স। পক্ষান্তরে, ২৯১ জন স্ত্রীলোকের মগজ ওজন করলে পর প্রমাণিত হল যে, সবচেয়ে ভারী মগজের ওজন হচ্ছে ৫৪ আউন্স, আর সবচেয়ে হালকা মগজের ওজন হচ্ছে ৩১ আউন্স। এ থেকে কি একথা প্রমাণিত হয় না যে, স্ত্রীলোকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও স্নায়ু পুরুষের তুলনায় অনেক অনেক গুণ দুর্বল।’ (ফরিদ আজদি)
ফরিদ আজদি বোঝাতে চেয়েছেন পুরুষেরা বুদ্ধি ও জ্ঞানে নারীর তুলনায় পরিপক্ব। প্রাণীজগতে মানুষের মগজের তুলনায় ভারী মগজ ধারণ করে এমন প্রাণীকে দেখা গেছে বোকা অথবা গবেট গোছের কিছু হতে এবং কম মগজ ধারণকারীকে দেখা যায় অধিক ধীসম্পন্ন হতে। মগজের আকার-আকৃতি, ওজন কখনও বুদ্ধি, ধীশক্তি, মেধা ও প্রতিভার ধারক নয়। তবে তো চড়ুই পাখির চেয়ে গন্ডার বুদ্ধিমান হত।
আরব মনীষী আব্বাসে মাহমুদ আকাস আল আক্কাদ লিখেছেন— ‘স্ত্রীর উপর স্বামীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব স্বাভাবিক মর্যাদা আধিক্যের কারণে এবং এ কারণে যে, স্ত্রীর যাবতীয় আর্থিক প্রয়োজন পূরণ করবার দায়িত্ব স্বামীর। আর এ কর্তব্য হচ্ছে কম মর্যাদাশালীর প্রতি অধিক মর্যাদাবান ব্যক্তির কর্তব্য। কেবল আর্থিক প্রয়োজন পূরণই এর একমাত্র ভিত্তি নয়। অন্যথায় যে স্ত্রী ধনশালী কিংবা যে স্বামী স্ত্রীর প্রয়োজন পূরণ, করে না বরং স্ত্রীর মেহমান হয়ে তার সম্পদ ভোগ করে, সেখানে স্ত্রীরই উত্তম কর্ত্রী হওয়া উচিত স্বামীর, কিন্তু ইসলামে তা কোনওদিন হতে পারে না।’
কোরানে অবশ্য এ-কথা স্পষ্ট লেখা— নারীর ওপর পুরুষের মাতব্বরি করবার প্রধান কারণ পুরুষেরা টাকাপয়সা উপার্জন করে তাই। নারী যদি টাকাপয়সা উপার্জন করে তখন কী উপায় হবে এ-কথা মুহম্মদের মাথায় আসেনি। কারণ তিনি আব্বাস মাহমুদের মতো চতুর ছিলেন না। তাই বর্তমানের আব্বাসেরা দায়িত্ব নিয়েছেন কোরানের সূত্র ধরে নারীর কর্ত্রী হবার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির।
বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে নতুন এক ধরনের উদারতা শুরু হয়েছে। কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে, ‘অতঃপর যদি সে তাহাকে তালাক দেয় তবে সে তাহার জন্য বৈধ হইবে না, যে পর্যন্ত সে অন্য স্বামীর সহিত সংগত না হইবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৩০)
কোরানে যা লেখা, সবই আল্লাহ্ বিধান। অথচ পারিবারিক আইনে তালাক হয়ে যাবার পর অন্য স্বামীর সঙ্গে সংগত হওয়া দূরের কথা, অন্য বিবাহ না করেই তালাকদাতা স্বামীকে বৈধ করবার বিধান চালু হয়েছে। আল্লাহ্ বিধান অমান্য করে নতুন বিধান যারা সৃষ্টি করল, তাদের নিশ্চয় কাফের বলা যায়। যারা কোরান মানে না, তারা কাফের। তবে পারিবারিক আইনে যা ধর্মসম্মত বলে প্রচার করা হয়ে থাকে তা আসলে ধর্মসম্মত নয়, বরং উলটো। আল্লাহতায়ালা কখনও এই অনুমতি দেননি যে, বান্দারা তোমরা তোমাদের সুযোগ-সুবিধেমতো কোরান রচনা করো অথবা বিধান সৃষ্টি করে নিয়ো।
যদি মানতে হয় আল্লাহ্র আদেশ, তবে পুরোটাই মানতে হবে। আর তা না হলে অগ্রসর বিজ্ঞানকে, সভ্যতাকে, নারীর অধিকারকে অল্প অল্প করে ধর্মের ফোকরে ঢোকাতে গেলে ধর্মের বারোটা বাজবে, সভ্যতাও অসভ্য হবে আরও।
পুরুষের চার বিয়ে করতে অনুমতি নিতে হয় স্ত্রীদের কাছ থেকে— এ হচ্ছে পারিবারিক আইন। ‘কোরানের চার বিয়ের’ সঙ্গে ‘সভ্যতার অনুমতি’ মিশিয়ে এখানে এমন একটি খিচুড়ি তৈরি করা হয়েছে যে, এর ফলে আল্লাকেও অমান্য করা হয় এবং সভ্যতাকেও অর্থাৎ নারীর অধিকারকেও ব্যঙ্গ করা হয়। কারণ কোরানে আল্লাহ্ বলেছেন— ‘বিবাহ করিবে নারীদের মধ্যে যাহাদের তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন অথবা চার। (সুরা নিসা, আয়াত ৩) কোথাও উল্লেখ নেই, স্ত্রীদের অনুমতি নিতে হবে দ্বিতীয়, তৃতীয় অথবা চতুর্থ বিবাহে। যারা অনুমতির বিধান চালু করেছে তারা নিঃসন্দেহে কাফের, কারণ তারা আল্লাহ্ আইন অমান্য করেছে। বর্তমান পারিবারিক আইনকে নিশ্চয় তবে ইসলামবিরোধী আইন বলা যায়।
আর বিরোধিতা করতে হলে এমন মিনমিনে বিরোধিতা কেন, জোর গলায় নয় কেন! বিরোধিতার অর্থ বিরোধিতাই। কণ্ঠ নিচু হোক, কণ্ঠ উঁচু হোক, ঘটনা একই।
সংসার-চিতা
রামমোহন রায় সম্ভবত জন্মেছিলেন ১৭৭৪ সালে। তখন ভারতবর্ষে ছিল ‘সহমরণ’ নামক একপ্রকার প্রথা। এই প্রথাটির অর্থ পতি নামক পুরুষের মৃত্যু হলে স্ত্রী নামক বস্তুটিকে পতি-পোড়ার আগুনে পুড়তে হবে। ভারতবর্ষে তখন সেই আগুনই দাউদাউ জ্বলছিল। ‘রাজা রামমোহন রায়’ নামটির সঙ্গে সহমরণের একটি নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। ১৮১৮-১৯ সালে রামমোহন রায় লিখেছিলেন, “স্বামী মরিলে পর যে স্ত্রী ওই পতির জ্বলন্ত চিতাতে আরোহণ করে সে অরুন্ধতি যে বশিষ্ঠের পত্নী তাঁহার সমান হইয়া স্বর্গে যায়। আর যে স্ত্রী ভর্তার সহিত পরলোকগমন করে সে মনুষ্যের দেহেতে যত লোম আছে যাহার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি তত বৎসর স্বর্গে বাস করে।… যে স্ত্রী ভর্তার সহিত পরলোকে গমন করে সে মাতৃকুল, পিতৃকুল এবং স্বামীকুল এই তিন কুলকে পবিত্র করে।” এ অবশ্য রামমোহন রায়ের কথা নয়। এ হচ্ছে ‘সহমরণ’ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ রচনাটির প্রবর্তকের ভাষ্য। নিবর্তকের ভাষায় রামমোহন বলেছেন, ‘তোমরা অগ্রে ওই বিধবাকে পতিদেহের সহিত দৃঢ় বন্ধন করো, পরে তাহার উপর এত কাষ্ঠ দেহ যাহাতে ওই বিধবা উঠিতে না পারে, তাহার পর অগ্নি দেওনকালে দুই বৃহৎ বাঁশ দিয়া ছুপিয়া রাখো। এ সকল বন্ধনাদি কর্ম কোন হারিতাদির বচনে আছে যে, তদনুসারে করিয়া থাকহ অতএব এ কেবল জ্ঞানপূর্বক স্ত্রী হত্যা হয়।’
আমাদের পূর্বপুরুষেরা জ্ঞানপূর্বক স্ত্রীহত্যা করেছেন। তাঁরা বলতেন, ‘এরূপ সহমরণে ও অনুসরণে পাপই হউক কিংবা যাহা হউক আমরা এ ব্যবহারকে নিবর্ত করিতে দিব না। ইহার নিবৃত্তি হইলে হঠাৎ লৌকিক এক আশঙ্কা আছে যে, স্বামীর মৃত্যু হইলে স্ত্রী সহগমন না করিয়া বিধবা অবস্থায় রহিলে তাহার ব্যভিচার হইবার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু সহমরণ করিলে আশঙ্কা থাকে না। জ্ঞাতি কুটুম্ব সকলেই নিঃশঙ্ক হইয়া থাকেন এবং পতিও জীবৎকালে জানিতে পারে তবে তাহারও মনে স্ত্রীঘটিত কলঙ্কের কোনও চিন্তা হয় না ইতি।’
জ্ঞানপূর্ব স্ত্রীহত্যার এই তো উৎকৃষ্ট নমুনা। বিধবা অবস্থায় ব্যভিচার করবার সম্ভাবনা অথবা আশঙ্কা আছে বলে স্ত্রীকে হত্যা করাই সংগত বলে আমাদের পূর্বপুরুষেরা মনে করতেন। তাই তারা নিঃশঙ্ক হতে চাইতেন স্ত্রীকে স্বামীর চিতার আগুনে পুড়িয়ে, স্বামীও নিঃশঙ্ক হতেন— স্ত্রী পুড়েছে, স্ত্রীর্ঘটিতে কলঙ্কের বোঝা আর তাকে বইতে হবে না বলে।
প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পার্বতী, চন্দ্রমুখী, রাজলক্ষ্মী, হরিলক্ষ্মী, ভবানী, সবিতা, সারদাদের নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, তাদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, স্বামীর ঘরে পাঠিয়েছেন, বিধবা বানিয়েছেন, প্রেমে পড়িয়েছেন। তিনিও জানতেন নারীত্বের মূল্য কী। তিনি লিখেছেন, ‘নারীত্বের মূল্য কী? অর্থাৎ কী পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণা, স্নেহশীলা, সতী এবং দুঃখকষ্টে মৌনা। অর্থাৎ তাহাকে লইয়া কী পরিমাণে মানুষের সুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং কী পরিমাণে তিনি রূপসি অর্থাৎ পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে কতটা পরিমাণে তিনি নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পারিবেন। দাম কষিবার এ ছাড়া আর কোনও পথ নাই, সে কথা আমি পৃথিবীর ইতিহাস খুলিয়া প্রমাণ করিয়া দিতে পারি।’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আরও বলেছেন, ‘যাঁহারা ইতিহাস পড়িয়াছেন, তাঁহারা জানেন বিধবাবিবাহ জগতের কোনও দেশে কোনওদিন সমাদর পায় নাই। কমবেশি ইহাকে সকলেই অশ্রদ্ধার চোখে দেখিয়া আসিয়াছে। এ অবস্থায় যে দেশে এ প্রথা একেবারেই নিষিদ্ধ, সে দেশে পুড়াইয়া মারা যে বিশেষ হিতকর অনুষ্ঠান বলিয়াই বিবেচিত হইবে, তাহা আশ্চর্য নয়। পুরুষ বুঝাইয়াছে, সহমৃতা হওয়া সতীর পরমধর্ম। মনুও বলিয়াছেন, এক পতি সেবা ব্যতীত স্ত্রীলোকের আর কোনও কাজ নাই। সে ইহকালে পুরুষের সেবা করিয়াছে, পরকালে গিয়াও করিবে।’
তিনি সহমরণ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘স্বামীর মৃত্যুর পরই তাহার বিধবাকে একবাটি সিদ্ধি ও ধুতুরা পান করাইয়া মাতাল করিয়া দেওয়া হইত। শ্মশানের পথে কখনও-বা সে হাসিত, কখনও বা কাঁদিত, কখনও-বা পথের মধ্যে ঢুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িতে চাহিত। এই তার হাসি, এই তার সহমৃতা হইতে যাওয়া। তারপর চিতায় বসাইয়া কাঁচা বাঁশের মাচা বুনিয়া চাপিয়া ধরা হইত, পাছে সতী দাহ-যন্ত্রণা আর সহ্য করিতে না পারে। এত ধুনা ও ঘি ছড়াইয়া অন্ধকার ধুঁয়া করা হইত যে, কেহ তাহার যন্ত্রণা দেখিয়া যেন ভয় না পায়; এবং এত রাজ্যের ঢাকঢোল, বাঁশি ও শাঁখ সজোরে বাজানো হইত যে, কেহ যেন তাহার চিৎকার, কান্না বা অনুনয়-বিনয় না শোনে! এই তো সহমরণ!’
আমাদের পূর্বপুরুষের হাতে এখনও বিধবার শাড়ি, চুল, হাত বা ঠ্যাং ধরে টেনেহিঁচড়ে চিতায় তুলবার দাগ, আমাদের পূর্বপুরুষের হাতে বাঁশ দিয়ে বিধবা মেয়েকে চেপে ধরবার দাগ, এখনও পূর্বপুরুষের হাতে আমি আগুনের, ভস্মের গন্ধ পাই। এখনও পূর্বপুরুষের রক্ত থেকে নারীকে অপদস্থ করবার, আগুনে পোড়াবার প্রবণতা দূর হয়নি। এখনও ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় সহমরণ প্রথা চলছে সমাজে। হয়তো স্বামী মরলে স্ত্রীকে ধরেবেঁধে এখন আর চিতার আগুনে পোড়ানো হয় না, তবে পোড়ানো হয় কিন্তু অন্য আগুনে।
শুধু সহমরণই বা বলি কেন? এখন হচ্ছে একক মরণের কাল। আর এই মরণটি একা নারীর মরণ। নারীকে জন্মের পরই মরতে হয়, হয় তাকে কেউ গলা টিপে মেরে ফেলে, আর যদি বা বেঁচেই থাকে, মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে করতে বাঁচতে হয়। বিবাহ হচ্ছে নারীর জীবনে সবচেয়ে যন্ত্রণাময় মৃত্যু। বিবাহিত জীবন এবং নরক জীবন অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে প্রায় একই। নরকে সাপ-বিচ্ছু নাকি নিরন্তর কামড়ায়, সংসারে স্বামী এবং স্বামীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা নারীকে সাপ-বিচ্ছুর চেয়ে কিছু কম কামড়ায় না। সাপ-বিচ্ছুর কামড় তবু দাঁতে দাঁত চেপে সওয়া যায়, কিন্তু মানুষের কামড় সওয়া যায় না, আর তারা তো শুধু দাঁতে কামড়ায় না, তাদের আছে বিচিত্র রকম নখর। তারা কিছু ‘নিয়মনীতি’ তৈরি করেছে মেয়েদের কামড় দেবার জন্য, সেই ‘নিয়মনীতি’র কামড়ে মেয়েরা বিবাহপূর্ব, বিবাহিত এবং বিবাহোত্তর, সব জীবনেই আক্রান্ত হয়।
রামমোহন রায় চিতার আগুনে বিধবা পোড়ানো বন্ধ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ ঘটিয়ে আরও এক পুণ্যের কাজ করেছিলেন বটে। ব্যভিচার ও ভ্রূণহত্যার ভয় দেখিয়ে তিনি বিধবাদের ‘গতি’ করেছিলেন। আপাতত চিতার আগুন এবং বৈধব্যের নির্যাতন থেকে নারী বাঁচল বটে— কিন্তু সত্যিকার বাঁচল কি? সংসার সমাজে নারীকে পোড়াবার আগুন কিছু কি কম লেলিহান?
এই আগুন কি নারীকে চিতার আগুনের চেয়ে কিছু কম দগ্ধ করছে? হয়তো শরীরের মৃত্যু ঘটছে না, কিন্তু মৃত্যু ঘটছে মানবতার, স্বাধীনতার। মৃত্যু ঘটছে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবার ন্যূনতম অধিকারের।
অনভ্যাস
১
তিনি একজন শল্যচিকিৎসক। নিখুঁত সেলাই করেন মানুষের শরীরের ভেতর এবং বাহির। সিল্ক, নাইলন, ক্যাটগাট ইত্যাদি সুতো সোজা, বাঁকা, বড়, ছোট সুঁইয়ে ভরে তিনি যখন মানুষের পাকস্থলী, অস্ত্র, পিত্তথলি, মাংস, চামড়া সেলাই করেন, তাঁর দক্ষ হাতের কাজ দেখে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারি না। কিন্তু এই মানুষটিই, আমি অবাক হয়েছি দেখে তাঁর শার্টের দুটো বোতাম ছিঁড়ে যাওয়ায় স্ত্রীকে ডেকে সেলাই করতে দিলেন, নিজে এক ঘণ্টা বসে রইলেন, কিন্তু বোতাম সেলাইয়ের কাজটি নিজের হাতে করলেন না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার সেলাইয়ের হাত এত ভাল, আপনি নিজেই কেন এ কাজটি করলেন না?
শুনে শল্যচিকিৎসক অপমানে লাল হয়ে উঠলেন। বললেন, আপনি আমাকে শার্টের বোতাম লাগাতে বলছেন!
অর্থাৎ এত তুচ্ছ কাজ আপনি আমাকে করতে বলছেন, আপনার স্পর্ধা দেখি কম নয়। তবু আবার বললাম— বোতাম লাগানো, শার্টের ছেঁড়াফেড়া বা কোনও কাপড়চোপড় সেলাইয়ে তো আপনি বেশ ভাল করবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
শল্যচিকিৎসক উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, তবে আর ঘরে স্ত্রী আছে কেন? তিনি উচ্চশিক্ষিত মানুষ। কিন্তু মানুষের চামড়া সেলাইয়ের ঘটনাটিকে তিনি ‘স্টিচ’ বলেন, আর ঘরের কাপড়চোপড় সেলাইয়ের ঘটনাকে তুচ্ছার্থে বলেন ‘সেলাই’। ‘স্টিচ’ হচ্ছে পুরুষের কাজ আর ‘সেলাই’ মেয়েদের— এই সংস্কার তাঁর উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তিনি রক্ষা করে চলেছেন, দূর করেননি।
সুঁইয়ের ফোড় কোথাও কোথাও তাঁকে গর্বিত করে, আর কোথাও কোথাও অপমানিত করে। অপমানিত করে কারণ তাঁরা ধরেই নিয়েছেন এটি মেয়েমানুষের কাজ। মেয়েমানুষের জন্য যে কাজগুলো নির্ধারিত তা করতে গেলে অপমানিত হতে হয়। মেয়েরা কি আর মানুষের জাত?
২
ব্যাংকে চাকরি করেন স্বামী-স্ত্রী। একই বেতন পান, দু’জন একই সঙ্গে অফিসে যান, একই সঙ্গে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু বাড়ি ফিরেই স্বামীটি গা এলিয়ে দেন বিছানায়, নয়তো বেড়াতে বেরোন, ক্লাবে যান, তাস পেটান, বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডায় মাতেন কিন্তু স্ত্রীটি রান্নাঘরে বাসন মাজেন, ভাত রান্না করেন, তরকারি কোটেন, মশলা তৈরি করেন, রান্না করেন এবং পরিবেশন করেন। তারপর এই রান্না করা জিনিসপত্র খান কিন্তু একজন নয়, দু’জন। স্বামীর থালায় ওঠে মাছ বা মাংসের বড় টুকরোটি। এর কারণ কী?
অর্থনৈতিক জোর? তা তো নয়। টাকা তো কামাচ্ছে দু’জনেই সমান, পদ তো দু’জনের একই, তবে?
এগুলো হচ্ছে সংস্কার। নারী বা পুরুষ যে কাজই করুক, স্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার হলে এবং স্বামী মেথর হলেও রান্নাবান্নার কঠিন কর্মটি স্ত্রীকেই করতে হয় এবং স্বামীকে যত্ন করে ভাল ভাল খাবারগুলো খাওয়াতে হয়। একবার এক সংসারে আমি স্বামী-স্ত্রী দু’জনের উদ্দেশে বলেছিলাম, আপনাদের এই রান্নার কাজটি ভাগাভাগি করে করা যায় না? স্বামী ভ্রূ কুঁচকে বললেন, কীরকম?
বললাম, ধরুন আপনি মশলা বাটলেন, স্ত্রী আনাজ কুটলেন, আপনি মাংসটা কষালেন, স্ত্রী ভাত চড়ালেন— এরকম।
শুনে লোকটি অপমানে লাল হয়ে উঠলেন, যার যেটা কাজ তাকেই সেটা করতে দিন।
স্বামী লোকটি বলতে চাচ্ছেন, রান্নার কাজ আসলে স্ত্রীর কাজ। পুরুষ লোকেরা রান্না জানলেও করা উচিত নয়।
কেন নয়?
আমার এই প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি। দেননি কারণ, এর পক্ষে কোনও যুক্তি তাঁর নেই। আছে একটি কেবল সংস্কার— রান্নাবান্না স্ত্রীর কাজ। যদিও বাইরে রান্নার কাজটি বাবুর্চি-পুরুষেরাই করেন, বাইরে সেলাইয়ের কাজটিও পুরুষ-দর্জিই করেন। কিন্তু ঘরের রান্না-সেলাই মেয়েদেরই করতে হয়। বাইরের সাফসুতরো করবার কাজের জন্য পুরুষ-ক্লিনার আছে কিন্তু ঘরের কুক, ক্লিনার, টেইলর হিসেবে নারীই বিনা পারিশ্রমিকে পরিশ্রম করে যান। যেখানে পারিশ্রমিকের প্রশ্ন, সেখানেই পুরুষের নিয়োগ, আর বিনা পারিশ্রমিকের কাজগুলো তোলা থাকে নারীর জন্য। নারীর আর টাকাপয়সার প্রয়োজন কী? তাকে তো খাওয়ায় পরায় পুরুষেরাই। পোষা ময়নাকে যেমন খাওয়ায়-পরায় মনিবেরা— এও ঠিক তেমনই। পাখির জন্য খাঁচা বানানো হয় আর নারীর জন্য বানানো হয় ঘর। পুরুষের পোষ্য এই নারী-প্রাণীটি যেন কোনওরকম স্বাধীনতা অর্জন না করে— তার জন্য সজাগ থাকে সমাজের অতন্দ্ৰ পুরুষ প্রহরী।
৩
ড. গোলাম মুরশিদ লন্ডন থেকে ‘যায় যায় দিন’-এ (১৭ নভেম্বর) চিঠি লিখেছেন। অবদমনের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, পঙ্গু স্ত্রী নিয়ে দীর্ঘ আঠারো বছর একজন সাংবাদিক সংসার করছেন কিন্তু তিনি আর কোনও নারীকে ঘরে আনেননি। আমার ‘অবদমন’ নামক রচনাটিতে ‘ঘরে আনা’ বা ‘না আনা’র সঙ্গে ‘অবদমন’কে মোটেও মেলানো হয়নি। সেই সাংবাদিক অন্য নারীকে ঘরে না আনলেও, অন্য নারীর ঘরে গিয়েছেন কি না সে-কথা ড. মুরশিদ স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। পঙ্গু স্বামী নিয়ে জীবন কাটানো নারীটিকে কিন্তু কোনও পুরুষকে ঘরে আনবার পরামর্শ আমি দিইনি। ঘরে না আনবার অর্থ অবদমন নয়।
৪
পিতা বা স্বামীর নাম নারীর নামে ধারণ না করলেই লোকে বলে, নারীর মূল সমস্যার সমাধান হবে? মূল সমস্যার কথা লিখুন। ধর্ম নারীকে কত রকম অমর্যাদা করেছে, তা জানালে লোকে বলে অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া নারীমুক্তি সম্ভব নয় সেটিই আগে বলুন। আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা লিখলে বলে যৌনমুক্তি ছাড়া নারীর সত্যিকার মুক্তি নেই, অযথা অন্য কথা লিখে কী লাভ। আর পুরুষতন্ত্রের প্রতিবাদ করতে গেলে লোকে পরামর্শ দেয়, আসলে ধর্ম থেকে নিস্তার না পেলে নারীর স্বাধীনতার জন্য চেঁচিয়ে কোনও লাভ নেই। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী লোকেরা বলে, ছো এইসব ফালতু কথা লিখে কেবল সময়খরচা, আসল কথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নির্মূল না হলে নারী কখনও মানুষ হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না।
সকলেই ভাবছে আগে একটি হতে হবে, পরে আপনা-আপনি বাকিগুলো হবে। কিন্তু মাঝখানে আমারও একটি কথা আছে, সেটি হল, যে-কোনও অন্যায় এবং বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে হবে, সমস্যা কোনওটি ছোট, কোনওটি বড়, কিন্তু কোনওটি তুচ্ছ নয়। যেহেতু তুচ্ছ নয়, প্রতিবাদ করতেই হবে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত। ছোটবড় সকল বৈষম্যের প্রতিবাদ।
আর এই প্রতিবাদ করবার দায়িত্ব আমার একার নয়— সকলের, গার্মেন্টসের শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত।
চিনদেশে মেয়েদের পায়ে লোহার জুতো পরিয়ে রাখা হত। এর ফলে চিনা মেয়েদের পা আকারে ছোট হয়ে গেছে। সেরকম বহু বছরের শৃঙ্খল তো এখানকার নারীর মনে ও শরীরে, তাদের মনও তাই হয়ে গেছে মরচেপড়া। মরচেপড়া মনে নতুন ভাবনাই আসে না, প্রতিবাদ তো দূরের কথা। অনেকটা খাঁচার পাখির মতো, না উড়তে উড়তে পাখি যেমন উড়বার অভ্যেস হারিয়ে ফেলে, এ-দেশের নারীরাও তাদের চারপাশের খাঁচা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবার অভ্যেস হারিয়ে ফেলেছে। অনভ্যাসে তারা প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে। আমাদের, যাদের এখনও কণ্ঠরোধ হয়নি, তাদের উচিত চিৎকার করা, ঘুমন্ত নারীর কানে যেন সেই চিৎকার পৌঁছে।
যে-কোনও নারীই আজ নুরজাহান
‘কমলগঞ্জের ছাতকছড়া গ্রামের মানুষেরা নুরজাহানকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলেছে’– এই কথা বললে লোকে বলবে ছাতকছড়া গ্রামের মানুষেরা নয়, মেরেছে মওলানা মান্নান। আমার প্রশ্ন— মওলানা মান্নানের আদেশে নুরজাহানকে যখন পাথর ছুড়ে মারা হয়, তখন ছাতকছড়ার ভালমানুষেরা কোথায় ছিল? তারা মওলানার ফতোয়া শুনেছে, ইসমাইলের বাড়িতে গর্ত খুঁড়েছে, গর্তের মধ্যে নুরজাহানকে দাঁড় করিয়েছে, পাথর মেরেছে অথবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে পাথর ছোঁড়া দেখেছে। তারা মওলানাকে ওই গর্তের মধ্যে পুরে কেন জীবন্ত মাটি চাপা দেয়নি? যেহেতু দেয়নি তাই দোষ একা মওলানার নয়, ছাতকছড়া গ্রামের সকলেই এই দোষে দোষী। মওলানা মান্নানদের চরিত্র বুঝতে এখনও কেন মানুষের দেরি হয়, আমি বুঝি না। যারা মওলানা মান্নানদের ফতোয়া মেনে চলে তারা আর মওলানা মান্নানে আমি কোনও পার্থক্য দেখি না। যদি রোধ করবার শক্তি না থাকে, তবে অন্যায়ের দায় কেবল মওলানাদের নয়, রোধ যারা করতে না পারে— তাদেরও। অনেকে অবাক হয়েছে, বলেছে, ‘এই যুগে পাথর ছুড়ে মারা, ছি ছি।’ শুনে আমি হেসে বলি, পাথর ছুড়ে মারবার দৃশ্য দৃষ্টিকটু লাগছে। পাথর এমন ছোড়াই হচ্ছে নিরন্তর নারীর শরীরে ও মনে— অদৃশ্য পাথর। লোকে তা দেখতে পায় না বলে পত্রিকায় ছাপা হয় না। কাউকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা— ব্যভিচারের বেলায় শরিয়তি আইন প্রায় এ-ধরনের কথাই বলে। সারা দেশ যখন আধা শরিয়তি আইন মেনে চলছে, প্রতিবাদ করছে না, ছাতকছড়া গ্রামে তখন খানিকটা কড়া করে শরিয়তি আইন যদি প্রয়োগ করা হয়, বাধা কে দেবে? অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে ওঠবার মানুষ দিন দিন কমে আসছে। মানুষ মাথা নত করছে, মানুষ নতজানু হচ্ছে, বাদ্ধ হচ্ছে মৌলবাদীদের সামনে।
মওলানা নুরজাহানকে নিজের ভোগের জন্য কামনা করেছিল। তার কাম চরিতার্থ হয়নি বলে সে এই নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়েছে। মওলানারা নুরজাহানদের কামনা করে এবং তাদের সর্বনাশ করে। কিছু সর্বনাশ দেখা যায়, কিছু দেখা যায় না। যে অদৃশ্য পাথর নারীকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তা আরও ভয়ংকর, আরও নৃশংস। নারীকে একা তা ভোগ করতে হয়। একা পোহাতে হয় সমাজের সকল সন্ত্রাস, একা তাকে পান করতে হয় সমাজে সবটুকু গরল।
আমি এর আগে বলেছি, হিংস্ৰ জন্তুও এত হিংস্র নয়, পুরুষ যত হিংস্র। পুরুষেরা নারীকে শাস্তি দেবার জন্য নানা রকম আইন, ফতোয়া তৈরি করেছে। এ-সব আরোপ করে তারা নারীর দুঃসহ যন্ত্রণা দেখে আনন্দ অর্জন করে। জন্তুও তার স্বগোত্র জন্তুকে এত কামড়ায় না, যত কামড়ায় পুরুষেরা নারীকে। জন্তুর জীবনে কোনও সভ্যতার বালাই নেই, তবু তাদের চরিত্রেও এ-যুগে এত নির্মমতা, পাশবিকতা, নৃশংসতা দেখা যায় না। মওলানা মান্নানের শাস্তি হবে না। তাকে কেউ এর বিপরীতে পাথর ছুড়বে না, সে চমৎকার থাকবে সমাজে। সে এর পর আরও আরও নুরজাহানের প্রতি লোভ করবে, না পেলে পাথর না হোক, অন্য কিছু ছুড়বে। এরা সমাজের বড় একটি গদিতে বসে নারীর দিকে ছুড়ে দিচ্ছে অবহেলা, অসম্মান, অন্যায়, অত্যাচার, অকথ্য নির্যাতন। নারী মরে যাচ্ছে, কেউ কেউ ধুঁকে ধুঁকে বেঁচেও থাকছে। তার মৃত্যু এবং বেঁচে থাকায় দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও অন্তর্গত কোনও পার্থক্য নেই।
নুরজাহান বেঁচে থাকলে কী এমন সুখ তার? এক স্বামী তালাক দিয়েছিল, আরেক স্বামীও তালাক দিত। লাথিঝাঁটা সে যে কোনও স্বামীর কাছেই পেত। সমাজের মুরুব্বিরা এসে, তাকে দিনের পর দিন যে অত্যাচার সইতে হত, তার সময় কমিয়ে একদিনেই তাকে না হয় মেরে রেখেছে। এও এক ধরনের বাঁচা, নুরজাহানের।
আমরা নারীরা আসলে সকলেই এক-একজন নুরজাহান। আমাদের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়েছে। আমাদের জন্য বিচিত্র বিচিত্র সব ফতোয়া জারি করা হয়। আমরা ঘরে বসে থাকবার জিনিস, আমরা পর্দার ভেতরে থাকবার জিনিস, আমরা জন্মের পর একটি পুরুষ-অভিভাবক দ্বারা শাসিত হই, বিয়ে নামক ঘটনা দ্বারা নিবেদিত হই স্বামী নামক অভিভাবকের কাছে, তার ভোগের জন্য শরীর এবং হৃদয় সঁপে দিই, আমাদের তালাক দেওয়া হয়, তালাকপ্রাপ্তদের বাঁচিয়ে রাখবার জন্য আবার খোরপোশও দেওয়া হয়, যেন বেঁচে থেকে আরও আরও পুরুষের ভোগের জন্য সমর্পিত হতে পারি। আমাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বনির্ভরতা ও সচেতনতার ব্যবস্থা নেই। যা আছে সবই অন্তঃসারশূন্য। সত্যিকার শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য নয়, সত্যিকার চৈতন্য নয়। সব লোকদেখানো।
এইসব ফতোয়া, সমাজের এইসব নীতি ও নিয়মের জালে ফেলে নারীকে অন্ধ, বধির করে রেখে পুরুষের আনন্দ অর্জন— সে অনেকদিনের কাহিনি। দেশের লক্ষ লক্ষ মওলানা এ-রকম লক্ষ কোটি নুরজাহানকে মেরে ফেলেছে। একটি পত্রিকায় ঘটনাচক্রে একটি খবর প্রচার হয়েছে, তার মানে এই নয় যে পত্রিকায় যখন আমরা হাসিনা-খালেদার বক্তৃতা ছাপা হতে দেখি, ক্লিনটনের নির্বাচন বা নির্বাচনোত্তর আনন্দ-উৎসব দেখি বা পড়ি, তখন নুরজাহানরা মরছে না। তখনও কিন্তু আমাদের এই দেশের কোথাও-না-কোথাও কোনও-না-কোনও নুরজাহানকে কোনও কোনও মওলানা গলা টিপে মারছে, ফাঁসি দিচ্ছে, বিষ খাওয়াচ্ছে, পাথর ছুড়ছে, জবাই করছে। যে নারী ভাবে যে, সে নুরজাহানের মতো অত্যাচারিত নয়, সে মিথ্যে ভাবে। বোধোদয় হলে সে একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে, সেও আসলে নিতান্তই এক নুরজাহান। আশা করছি, তখনই তার রুখে দাঁড়াবার আসল সময় উপস্থিত হবে।
ঘটনা-দুর্ঘটনা
১. সন্তানপ্রসবকালে প্রসবের সুবিধের জন্য নারীর যোনিমুখকে সামান্য কেটে প্রশস্ত করতে হয়, তা না হলে যোনির দেওয়াল প্রসবের সময় এমন বিচ্ছিরিভাবে ছিঁড়ে যায় যে, যোনি ও মলনালির পথ এক হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে। এই ক্ষতি এড়াতে চিকিৎসকরা প্রসূতির যোনিপথ প্রশস্ত করবার ব্যাপারে সচেতন হন। তাঁরা যোনির দেওয়াল কেটে প্রসবকষ্ট দূর করেন এবং কাটা অংশটুকু সেলাই করে দেন, যে সেলাই সাতদিনের মধ্যে শুকিয়ে মিলিয়ে যায়। এতে কারও আপত্তি থাকবার কথা নয়। অথচ আপত্তি করেন রোগীর স্বামী। কেন আপত্তি? ‘বউয়ের গোপন জায়গায় সেলাই পড়েছে, এই বউকে ঘরে তোলা ঠিক নয়।
২. উন্নত দেশগুলোয় সিজারিয়ান অপারেশনের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। যে নারীর আট-দশটি সন্তান গ্রহণ করবার প্রয়োজন নেই, তার সিজারিয়ান অপারেশনই অধিক যৌক্তিক এবং নিরাপদ। এতে নারী মুক্ত হয় নানা রকম বিপদের আশঙ্কা থেকে এবং তার সুস্থতাও যথাসম্ভব রক্ষা হয়। কিন্তু নারীর এই উপকারে অধিকাংশ পুরুষের বড় আপত্তি। নারীর শরীর হবে মসৃণ, কোমল। এতে দাগ পড়লেই তাঁদের বিরক্তি ধরে। তাঁরা ঠোঁট উলটে বলেন, ‘পেটকাটা বউ নিয়ে ঘর করা যাবে না।’
৩. ধরা যাক, জরায়ুর টিউমার বা অস্বাভাবিক রক্তপাতের কারণে জরায়ু কেটে বাদ দেওয়া হল। জরায়ুর চেয়ে জীবন বড়। জীবন বাঁচাতে জরায়ু নিঃসংকোচে ফেলে দিতে রাজি হবেন যে-কোনও সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ। কিন্তু সকলে রাজি হলেও স্বামী রাজি হতে চান না। হয়তো জরায়ু আর কোনও প্রয়োজনে আসছে না কারও। বংশরক্ষার জন্য যে পুত্রের জন্ম হওয়া জরুরি, তাও সারা হয়েছে। তবুও কেমন- কেমন জানি লাগে। জরায়ু নেই, এ আবার কেমন বউ। পঙ্গু-পঙ্গু মনে হয়। জরায়ু ছাড়া মেয়েলোক আবার মেয়েলোক নাকি?’ আর যদি এমন কোনও জরায়ু ফেলে দিতে হয় যেটি কোনও সন্তানধারণ করেনি তবে আরোগ্য হবার আগেই স্ত্রীকে ত্যাগ করেন স্ত্রীর ‘স্বামীদেবতা’।
৪. স্তনে টিউমার হলে স্তন কেটে ফেলাই সংগত। এই অবস্থায় স্তনের মায়ায় নারীর চেয়ে কাতর হন পুরুষ বেশি। অসুস্থ স্তনকেও দলিত-মথিত করে আনন্দ নেবার জন্য পুরুষের হাত নিশপিশ করে। তাঁরা স্ত্রীর স্তনহীনতার শোকে এত মুহ্যমান হন যে, স্তনকাটা মেয়ের জন্য প্রেম-ভালবাসা কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। তাঁরা নির্দ্বিধায় বলে ফেলেন, ‘আমারও তো সাধ-আহ্লাদ বলে কিছু’ আছে। বিকলাঙ্গ বউ নিয়ে কি বাঁচা যায়!”
৫. গর্ভবতী নারীদের কারও কারও দেখা যায় যে, পা ফুলে উঠেছে, রক্তচাপ বেশি। এদের যদি চিকিৎসা না করা হয় তবে এরা ভয়াবহ খিঁচুনি রোগে আক্রান্ত হয়। একে বলে এক্লাম্পসিয়া। এই রোগে সন্তান তো মরেই, মা’ও মরে। এক্লাম্পসিয়া হয় একমাত্র অবহেলার কারণে, বউয়ের প্রতি স্বামী ও শ্বশুরকুলের অবহেলা। তাঁরা ঘরের বউকে চিকিৎসকের কাছে নেবেন না।
এক্লাম্পসিয়া হলে লোকে বলে জিনের আছড় লেগেছে। মাথায় কাপড় না দিয়ে বাঁশঝাড়ের তলায় গিয়েছিল, সেটিরই প্রায়শ্চিত্ত। তাবিজ, কবচ, মাদুলি বেঁধে, পানিপড়া খাইয়ে এক্লাম্পসিয়া-রোগীকে আরও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এর পর যদি চিকিৎসকের শরণে নেওয়া হয়, তাঁরা নারীর গর্ভের সন্তান দ্রুত প্রসব করিয়ে খিঁচুনি থেকে রোগীকে বাঁচান এবং ধীরে ধীরে বেঁচে ওঠে মৃত্যুর প্রায় দরজা ছুঁয়ে আসা নারী। কোনও কোনও নারীর অতি খিঁচুনির ফলে মস্তিষ্কবিকৃতিও ঘটতে পারে। তা ঘটুক এবং না ঘটুক, এই অসুস্থতাকে স্বামী-পুরুষটি ভাবেন, আর কোনও গর্ভবতী নারীর তো এমন হয় না, তার কেন হয়? নিশ্চয় কোনও পাপ সে করেছে; যার শাস্তি আল্লাহ্তায়ালা তাকে দিয়েছেন। একে ঘর থেকে তাড়াতেই হবে।’
৬. সন্তান হবার সময় হয়েছে। ধাই ডাকা হয়। সে এসে শরীরের শক্তি খাটিয়ে টানাটানি করে সন্তান বের করে। জরায়ুর স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণের ফলে সন্তানপ্রসব হবে— এইটুকু অপেক্ষা তারা করে না। সন্তান হয় ঠিকই, এর পর দেখা যায় টানাটানির ফলে জরায়ু ধীরে ধীরে যোনিপথে বেরিয়ে এসেছে। হাঁটলে, কাশলে, জরায়ু নীচের দিকে বেরিয়ে যায়। এই অসুস্থতা নারীকে ভোগায় খুব। আর ওদিকে নারীর এই অসুস্থতায় সবচেয়ে বেশি রুষ্ট হন নারীর স্বামী। যোনিপথে জরায়ু বেরিয়ে আসায় যোনিপথ ব্যবহার করে শরীরের আনন্দ অর্জন করতে স্বামীর অসুবিধে হয়। তাঁরই নির্দেশে ধাই এসেছিল বাড়িতে আর ধাইয়ের চিকিৎসায় জরায়ু নেমেছে নীচে। এই দায়িত্ব শেষাবধি কোনও স্বামীই নেন না। তাঁরা তাঁদের সংগম সুস্বাদু না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন— ‘এই বিচ্ছিরি মেয়েলোককে আজই তালাক দেব।’
.
যে ছয়টি দৃশ্যের প্রসঙ্গ এল, এগুলো ঘটে, প্রায়ই। আমাদের গ্রামগঞ্জ এমনকী শহরেরও মূর্খ, অশিক্ষিত এমনকী তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারেও ঘটে এই ঘটনাগুলো। শরীরের সুস্থতার জন্য আধুনিক বিজ্ঞান যদি শরীরে প্রয়োগ করা হয়— এখনও তা গ্রহণ করবার মানসিকতা স্বামী-পুরুষদের হয়নি। তাঁদের এই হীন মানসিকতার কুফল একা নারীকেই ভোগ করতে হয়। শুধু তাই নয়, স্বামীর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে স্ত্রীর মৃত্যু হয় অহরহই (এখানে স্বামীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেবার কারণ, যেহেতু কোনও সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার স্ত্রীর নেই, স্বামীই সিদ্ধান্তগ্রহণের একমাত্র অধিকর্তা) আর যদি নারী বেঁচে ওঠে হঠাৎ, তবে তার অসুস্থতা এবং অঙ্গহীনতার দোষে স্বামী তাকে ত্যাগ করেন। দরিদ্র হলে তালাকপ্রাপ্তা নারী আত্মীয়দের আশ্রয়ের আশায় ঘোরে অথবা পতিতালয়ে যায় অথবা ভিক্ষে করে। নারীর জন্য কাজের সংস্থান যেহেতু কম, তাই দ্রুত তার অবস্থা অবনতির দিকে ধাবিত হয়।
এর জন্য দায়ী কে আসলে? শুধু কি স্বামীই অথবা পুরুষই? ঠিক তা নয়। দায়ী আমাদের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সচেতনতা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেবার ক্ষমতা এই দেশ এখনও অর্জন করেনি। এই দেশে বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মে গতি বেশি। ভালর চেয়ে মন্দ ছড়ায় আগে। দেশ ছেয়ে গেছে মন্দে, এত মন্দের মধ্যে ভালর আশা করাটাই হয়তো বোকামো।
‘উই শ্যাল ওভারকাম’
কুসুম নামের এক মেয়ে আমার বাড়িতে কাজ করে, এটিকে সামান্য শোভন করে অবশ্য বলা যায়, কুসুম আমার সংসারের কাজে আমাকে সাহায্য করে। কুসুমের বয়স তেরো বা চোদ্দো। সে, আমি জানি না কোত্থেকে, কিছু আচার-ব্যবহার শিখে এসে প্রায়শ প্রয়োগ করে এখানে। সে, বেশ ক’মাস থেকে লক্ষ করছি, আমার বাড়ির চারদিক থেকে মাইকে যখন আজান শুরু হয়, তখন হাতের সব কাজ ফেলে দৌড়ে চলে যায় কলতলায়, অজু করে এবং বড় নিবিষ্টমনে রান্নাঘরের এক কোণে বসে নামাজ পড়ে। কারও তখন সাধ্য নেই, কুসুমকে দিয়ে অন্য কোনও কাজ করায়। চুলোয় যদি কিছু পুড়ে তখন ছাই হয়ে যায়, কুসুম শব্দ, গন্ধ, ধোঁয়া— সব পেছনে ফেলে আল্লাহ্র দরবারে হাত ওঠায়।
একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই যে তুই পাঁচবেলা নামাজ পড়ছিস, নামাজের সুরাটুরা জানিস তো?
কুসুম মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, দুইটা জানি।
কী কী?
আলহামদুলিল্লাহ আর কুলহুআল্লা
এই সুরাগুলোর অর্থ জানিস? মানে কী বলা হয়েছে এগুলোয়?
কুসুম শুনে আশ্চর্য হল, সুরার যে আবার কোনও অর্থ হয়, সে যেন প্রথম শুনল। সে হঠাৎ তার ভ্রূ কুঞ্চিত করে, আশঙ্কা করে একটি অশোভন কথা তার ওপর ছোড়া হচ্ছে, তাই সে কিছুটা রুষ্ট হয়েই বলে— কী যে বলেন, সুরার আবার অর্থ কী? সুরা তো সুরাই।
তা বটে, সুরা তো সুরাই। সুরার আবার অর্থ কী।
জিজ্ঞেস করলাম, এই যে তুই নামাজ পড়ছিস, কেন পড়ছিস?
কুসুম সরল এবং অকপট উত্তর করল, বেহেশতের জন্য।
কেন? বেহেশতে কী আছে?
কুসুম পা ছড়িয়ে মেঝেয় বসল, অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বলল– বেহেশতে মাছের কলিজা দিব খাইতে।
মাছের কলিজা খাওয়ার এত শখ তোর? ঠিক আছে, কালই আমি মাছের কলিজা এনে দেব বাজার থেকে।
কুসুম উঠে দাঁড়াল। বেশ প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল, দুনিয়ার মাছের কলিজা তো তিতা, বেহেশতের মাছের কলিজা হইল মিষ্টি।
এর পর অবাক হয়ে ওর অনমনীয় গ্রীবার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর করবার কিছু থাকে না। কুসুম তার বিশ্বাসের ব্যাপারে অটল, সে মাছের কলিজা খাওয়ার লোভে দিনে পাঁচবেলা নামাজ পড়বেই, তাকে বাধা দেবার সাধ্য কারও নেই।
আজকাল একটি দৃশ্য আমাকে আরও অবাক করে দেয়, তা হল ঝাঁকে ঝাঁকে মসজিদের দিকে ধাবমান তরুণ ও যুবক। আমার শৈশব-কৈশোরে মসজিদের দিকে এত লোক যেতে দেখিনি। যেত বেকার বৃদ্ধরাই, ঠকঠক করে খড়মে শব্দ তুলে অথবা লাঠিতে ভর রেখে রেখে, ধীরে। এখন শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়তে মার্সিডিজ হেঁকে বিত্তবান যান তারকাখচিত মসজিদে, এই বিত্তবানদের অধিকাংশই স্মাগলার, অসৎ ব্যবসায়ী, মিথ্যুক, অত্যাচারী। তাঁরা পাটভাঙা ফরসা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যান। কেউ যায় চোর, ছিঁচকে চোর— বেরোবার পথে অন্যের জুতো চুরি করে ঘরে ফেরে। আর যান মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সভ্য কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ। তাঁদের সকলের প্রার্থনায় বেহেশতে যাবার আকুলতা কিছু থাকেই।
অধিকাংশ বৃদ্ধ তাঁদের জীর্ণ শরীর নিয়ে কবরের আজাবের ভয়ে নীল হয়ে থাকেন, তাঁদের পায়ের আঙুল কুঁকড়ে পুলসেরাত পার হতে কী হয়, কী হয়, কী জানি কী হয় আশঙ্কায়। তাঁরা আখেরাতের ময়দানে নিজের দিকে পাল্লা ভারী করবার সাধনায় রাত্রিদিন বুঁদ হয়ে থাকেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই, জগতে তাঁদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে বোধহয়। কিন্তু টগবগে মেধাবী প্রাণবান তরুণেরা? কর্মক্ষম যুবকেরা? ওদের চোখে কেন চিকচিক করবে লোভ, … অলৌকিকের দুর্মর মোহ? এর একটি কারণই আমি আবিষ্কার করেছি— ফ্রাসট্রেশন ফ্রাসট্রেশন, ফ্রাসট্রেশন এবং ফ্রাসট্রেশন। যার বাংলা নাম নৈরাশ্য। চারদিকে নৈরাশ্য এখন। রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে। সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি, সমাজের সর্বত্র অব্যবস্থা, বেকারত্বের জাল পাতা— এই জালে আটকা পড়ছে অসংখ্য নির্দোষ তরুণ, দেশের প্রজন্ম সম্পদ। তারা কেউ ছিনতাই করছে, কেউ মাদকদ্রব্য সেবন করছে, কেউ মসজিদে যাচ্ছে। এর মূল কারণ ওই নৈরাশ্য। তারা সততা, সৌন্দর্য, মুক্তবুদ্ধি ও সুস্থ চিন্তাচেতনা অর্জন করেছে কিন্তু কোথাও এর প্রয়োগ নেই। যেখানেই অসততা, অসুস্থতা; ক্ষমতা বা বিত্তের জোর। তরুণেরা তাই নৈরাশ্যে ভুগতে ভুগতে যে- কোনও ধ্বংসের দিকে বাড়াচ্ছে দ্বিধাগ্রস্ত পা। কেউ মাছের মিট্টি কলিজা খাবার আশায়, কেউ পাখির মাংস, ফলমূল, কেউ মদ; আবার কেউ যেতে চায় হুরের আশায়, কেউ দোজখের জাক্কুম গাছের ফল, সাপ বিচ্ছু আর গরম পানির অত্যাচার থেকে বাঁচবার আশায়। এই জগৎ তরুণদের আর কোনও আশা দিতে পারছে না বলে তারা অগত্যা মদ-মাংস খাবার আশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই দোষ তাদের নয়, এই দোষ আমাদের অসৎ, লোভী ও মূর্খ রাজনীতিবিদদের, এই দোষ অথব রাষ্ট্রকাঠামোর, সমাজব্যবস্থার।
দেশে মাদকদ্রব্য-সেবনকারী বাড়ছে। বাড়ছে নৈরাশ্য থেকে মুক্তি পেতে আপাতত একটি আশার কাছে সমর্পিত হওয়া— আসলে যেটির ফলাফল আরও চরম নৈরাশ্য।
আমার মনে হয় মাছের কলিজা, মদ-মাংস-হুরের মোহ এবং মাদকদ্রব্যের ছোবল থেকে মানুষ তখনই মুক্ত হবে, যখন এই সমাজ বা দেশ তাদের জন্য বাসযোগ্য হবে। আর এই সমাজ এবং দেশকে বাসযোগ্য করবার দায়িত্ব আমাদের— আমরা যারা মাদক এবং কুসংস্কার দ্বারা এখনও আক্রান্ত হইনি।
‘ভাবনার ভাস্কর্য’
১
আমি বেশ ক’জন মেয়েকে জানি, ওরা সিগারেটে অভ্যস্ত। এই সমাজে বাস করে মেয়েদের সিগারেটে অভ্যস্ত হওয়া অবশ্য বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে যাই হোক, এই নেশায় আক্রান্ত মেয়েদের অপরাধবোধ এত প্রবল যে আমার বড় অবাক লাগে। ওদের নেশা চাপলে টয়লেটে চলে যায়, ওখানে বসে ধূমপান করে, তারপর মুখটুখ ধুয়ে মানুষের সামনে বেরোয়। ওরা না পারে অপরাধবোধ দূর করতে, না পারে নেশা ছাড়তে। ওদের দেখে আমার মায়া হয় বড়। কোনও পুরুষকে তো লুকিয়ে ধূমপান করতে হয় না, নারীর জন্যই রাখঢাক, নারীর জন্যই নিষেধের বেড়া।
কেন একটি মেয়ে ঘরে-বাইরে, খোলামাঠে, রাস্তায় ইচ্ছে করলে ধূমপান করতে পারে না? ধূম যদি খাদ্য হয়— সে নারী-পুরুষ সকলের খাদ্য। ধূম পুরুষের জন্য বাঁধা— এ-কথা কোথাও লেখা নেই। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, একথা মেনে নিয়েই বলছি, যে নারী ধূমপানে অভ্যস্ত— সে যেন যে-কোনও ধূমপান নিষিদ্ধ নয় এমন এলাকায় ধূমপান করে লজ্জা-ভয় সব বাদ দিয়ে। নারীর ধূমপানের জন্য টয়লেট বা কোনও কিছুর আড়াল যেন প্রয়োজন না হয়। নারীর যেন কোনও আড়ষ্টতা না থাকে তার যা করতে ইচ্ছে করে, সে যেন মেরুদণ্ড শক্ত করে, মাথা উঁচু করে সে কাজটি করে। তাকে যেন কখনও নত না হতে হয়, সমাজের কোনও নষ্ট নিয়মের কাছে সে যেন পরাজিত না হয়। (বি. দ্র.— নারী-পুরুষ উভয়েরই ধূমপান থেকে বিরত থাকা ভাল)।
২. গর্ভ নারীর। এই গর্ভে কিছু ধারণ করতে হলে অথবা গর্ভপাত করতে হলে গর্ভ যার, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। এই গর্ভের ওপর খবরদারি করবার অধিকার থাকা উচিত নয় কোনও পুরুষের, কোনও সমাজের বা রাষ্ট্রের। গর্ভপাত অথবা গর্ভধারণের স্বাধীনতা যতদিন নারীর হাতের মুঠোয় না আসছে ততদিন পর্যন্ত নারীকে ‘পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত কোনও মাংসের দলা’ বলে ডাকতে আমার কোনও দ্বিধা হয় না।
‘এম আর’ নামের আড়ালে প্রতিদিন এ-দেশে গর্ভপাত ঘটছে। অবিবাহিতা মেয়েরা এম আর করতে হাসপাতালে, ক্লিনিকে লম্বা লাইন দেয় অথচ তাদের মিথ্যে পরিচয় দিতে হয়, বলতে হয় তারা বিবাহিতা, প্রেমিক বা বন্ধুকে দেখিয়ে বলতে হয় স্বামী। কেন এই মিথ্যের আশ্রয়?
কেন তাদের সত্যকথা বলবার স্বাধীনতা দিচ্ছে না এই রাষ্ট্র? কেন গর্ভপাতের জন্য আজ অসংখ্য অবিবাহিতা, ধর্ষিতা নারীকে ‘দিয়ে মিথ্যেকথা বলানো হচ্ছে? রেজিস্টারে লেখা হচ্ছে অনেক মিথ্যে নামধাম। তার চেয়ে গর্ভ যার, গর্ভপাতের অধিকার তার— এই নিয়মটিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করলে নারীর স্বাধীনতা কিছু রক্ষা হয় আর অযথা মিথ্যের জটলা থেকেও মানুষ বাঁচে।
৩. জগতের কোনও প্রাণীর জরায়ু বাইরে বেরিয়ে আসে না, কেবল মানুষেরই আসে। এর কারণ সম্পর্কে গায়নোকোলজির প্রফেসর আবদুল বায়েছ ভুঞা বলেন— অন্য প্রাণী বা জন্তুর প্রসবের সময় ধাই থাকে না বলে জরায়ু বেরিয়ে আসে না। মানুষের বেলায় ধাই থাকে বলেই মানুষের এত দুর্ভোগ।
বাংলাদেশে অশিক্ষা এবং অন্ধত্ব এত প্রকট যে, আমার আশঙ্কা হয়, যতদিন এ- সব দূর না হবে ততদিন জরায়ু থেকে সন্তান টেনে বের করতে ধাইকে আসতেই হবে আর জগতের প্রাণীকুলের মধ্যে একমাত্র দুর্ভাগা মানুষের ততোধিক দুর্ভাগা নারীর জরায়ুই বেরিয়ে আসবে নীচে। কিন্তু অশিক্ষা এবং অন্ধত্ব কী করে দূর হবে এই দেশ থেকে? দূর করতে কি একা আমি পারি অথবা আমরা মাত্র ক’জন? যদি রাষ্ট্র এই দায়িত্ব না নেয় তবে আমাদের সাধ্য মেই, কেবল লিখে বা মিছিল করে যাবতীয় অশিক্ষা ও অন্ধত্ব দূর করি।
৪. ওভারসিজ কল বুকিং’ নম্বরে ডায়াল করে যদি কোনও নারী কল বুক করতে চায়, অপারেটর তাকে জিজ্ঞেস করে— আপনার নম্বর কত? ফোন নম্বর বলা হল। তার পরের প্রশ্ন হবে— কলার কে? যদি বলা হয় শামিমা, নাসিমা, খালেদা, নমিতা, রোকেয়া— এই জাতীয় কিছু। অপারেটর তবে প্রশ্ন করবেই— মিস না মিসেস?
মিস না মিসেস, না জেনে অপারেটর কিছুতেই স্বস্তি পাবে না। কারণ তাকে লিখে রাখতে হয় নামটি, নামের আগের সম্বোধনটুকু তার প্রয়োজন হয় তাই। এক্ষেত্রে বিবাহিত ও অবিবাহিত পুরুষের বেলায় যেমন Mr. সম্বোধনটি খাটে, তেমনই বিবাহিত ও অবিবাহিত দুই নারীর জন্যই Ms. সম্বোধনটি খাটে। আর বুকিংয়ের সময় নারী বিবাহিত কি বিবাহিত নয়— তা জানা জরুরি নয় মোটে।
নারীকে বিবাহিত এবং অবিবাহিতের পরিচয়ে চিহ্নিত করলে এ-রকম মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, বিবাহই নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিবাহকে নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করলে নারীর অমঙ্গল ছাড়া কখনও মঙ্গল হবে না। কারণ নারীর কর্মক্ষমতা, নারীর মেধা, প্রতিভা, সকলই ধূলিসাৎ হবে বিবাহ নামক ধ্বংসযজ্ঞে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, বিবাহকে আমি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে রায় দিচ্ছি। বিবাহ প্রয়োজনীয় বটে। কিন্তু বিবাহকে নারীর পরিচয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করবার ঘোর বিরোধী আমি, নির্বোধ নারী ছাড়া আমার বিশ্বাস, সকলেই বিরোধী হবে বিবাহ নামক মুকুটটিকে মাথায় চড়াতে।
৫. সংসদে কিছু ‘অলংকার’ বসে। এই অলংকারের সংসদে বসবার আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কী? আমার মনে হয় নেই। ওঁরা সংসদের শোভাবর্ধন ছাড়া আর কোনও কাজ করছে বলে আমার মনে হয় না।
এই দেশ মেয়েদের শিক্ষিত করাবে না, এই দেশ মেয়েদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে, মেয়েদের সমাজ-সংসারে মানুষের মতো চলতে দেবে না, এই দেশ মেয়েদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তার কাজ করবার, রাজনীতি করবার, সমাজের মাথা হবার বড় বাধা হবে এবং অবশেষে মেয়ে নামক ডেকোরেশন পিস এনে সংসদে সাজাবে।
এই যদি হয় দেশের অবস্থা তবে মেয়েদের সত্যিকার কোনও উত্থান যে সরকার চায় না, এ সম্বন্ধে নিশ্চয়ই সকলে নিঃসন্দেহ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মেয়েরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে যোদ্ধা ছিল। মেয়েরা ঘোড়ায় চড়ে সম্মুখ সমরেও নেমেছে। তবে এখন কোনও যুদ্ধ দূরে থাক, দেশের অতি সাধারণ নির্বাচনে মেয়েরা দাঁড়াবার উপযুক্ত পরিবেশ পায় না? পরিবার ও সমাজ তাদের সংসার-খাঁচায় আটকে রাখে। মেয়েরা কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া জয়ের সিংহাসনে বসলে এবং হাত-পা-মাথা ঢেকে ডেকোরেশন পিসের ভূমিকা পালন করলে মেয়েদের যত অপমান করা হয়, তত অপমান মেয়েদের চাবকে, ঠেঙিয়ে, গলা কেটে কিংবা ফাঁসিতে ঝুলিয়েও হয় না।
ওই তিরিশ অলংকারের কোনও অধিকার নেই মেয়ে হয়ে মেয়েদের অপমান করবার এবং দেশের ভোটে জেতা দলেরও অধিকার নেই দেশকে, এমনকী পুরো জগৎকে দেখিয়ে মেয়েদের উপহাসের বস্তু বানাবার
‘একলা চলো রে…’
১
ঢাকা শহরে মেয়েদের চলাফেরায় দুটো উন্নতি ঘটেছে। তারা কাঁচা বাজারে যায় এবং পাকা স্কুলে যায়। বাজারে যায় বাজার করতে, স্কুলে যায় বাচ্চা দিতে অথবা নিতে। এই দুটো কাজ অনেক ‘গৃহিণী’র জন্যই এখন বাঁধা। দুটো কি তার নিজের কাজ? নিজের কাজ বলতে আমার কোনও আপত্তি থাকবে না যদি বাজার করবার টাকাটি তার স্বোপার্জিত হয়, অথবা যে সন্তানকে সে আনা-নেওয়া করছে সে সন্তান তার পরিচয়ের হয়? না, কোনওটিই তার নয়। যে টাকা নিয়ে সে কেনাকাটা করে, সেটি অন্যের টাকা। যে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেয়, সে অন্যের সন্তান। অন্যের সন্তান মানে তার স্বামীর সন্তান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যে-কোনও সন্তানই পিতার পরিচয় নিয়ে বাস করে।
অতএব কাজদুটোকে মেয়েদের নিজের কাজ বলতে আমি রাজি নই। মেয়েরা বাজার করে, স্বামী-সন্তানের জন্য রাঁধে, তাদের খাওয়ায়। কারণ পুরুষের সেবা করবার জন্যই তার জন্ম এবং তার বেঁচে থাকা।
লোকে বলে, মেয়েরা এখন যেহেতু বাজার করে বা সন্তানপালনে সহায়তা করে সেহেতু তাদের স্বাধীনতা বেশ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। অথচ আশ্চর্য যে, কেউ বলছেন না বাজার করা এবং স্কুলে বাচ্চা নেওয়ার কাজ আসলে ভৃত্যের কাজ। বাড়ির ভৃত্যরাই সাধারণত এই কাজগুলোর দায়িত্ব পেত। সম্ভবত গৃহকর্তা এখন হিসেব করে দেখছেন যে, ভৃত্যদের অবিশ্বস্ততার জন্য মাঝে মধ্যে ‘লস’ খেতে হয়, তাই বাড়ির গৃহিণী নামক ‘বিশ্বস্ত ভৃত্য’ দ্বারাই কাঁচা বাজার এবং স্কুলের কাজ করানো যায়, এতে লসের সম্ভাবনা নেই, এদিকে গৃহিণীও ভেবে বসে আছে কাঁচা বাজার এবং স্কুল তাকে মুক্তির পথ দেখাবে। এখানেই তার সকল স্বাধীনতা।
২. প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে, এমন ন’জন মেয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ন’জনই বলেছে তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিষ্পেষিত। নিষ্পেষিত শব্দটি এখানে এই জন্য ব্যবহার করা হল যে, যেহেতু তাদের বিগ বস প্রায়ই তাদের কাজের ছুতোয় রুমে ডাকেন, মিঠে মিঠে গল্প করেন এবং ‘পেষণ’ করেন। আক্ষরিক অর্থেই পেষণ। ন’জনই বলল, তারা পিষ্ট হতে চায় না কিন্তু এ ছাড়া উপায় নেই, ‘পেষণ’ করতে না দিলে তাদের চাকরিটি যাবে। আর চাকরি গেলে তাদের বিষম ক্ষতি।
পুরুষ এবং নারী চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে বড় এক পার্থক্য আছে। চাকরিতে পুরুষের কেবল মেধা ও শ্রম দিলেই হয়, আর নারীকে মেধা ও শ্রম তো দিতেই হয়, তার উপর নিজেকে পিষ্ট হতে দিতে হয়। সুতরাং চাকরিতে নারীর ইনভেস্টমেন্ট সব সময় বেশি।
বেশি দিয়ে তাকে কম পেতে হয়। ঢালাও শ্রমিক নেবার প্রবণতা যে-সব কারখানার, তারা জানে নারীরা দেয় বেশি, পায় কম। শুধু কারখানায় নয়, প্রাইভেট ফার্মে নয়, সমাজের সর্বত্র নারীরা দেয় বেশি, পায় কম।
৩. আমার ছোটবোনের একটি মেয়ে হয়েছে। চমৎকার স্বাস্থ্যবান, সুন্দর একটি মেয়ে। আমার ছোটবোন, তার একটি মেয়ে হোক— এমনই চেয়েছিল। অথচ মেয়ে জন্মাবার পর থেকে তাকে অদ্ভুত সব কথা শুনতে হচ্ছে। যে প্রফেসর সিজার করলেন, তিনিই প্রথম আমার বোনের জ্ঞান ফেরবার পর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন— দুঃখ কোরো না, পরেরবার ছেলে হবে নিশ্চয়। কন্যা নিয়ে যখন বোন এবং বোনের স্বামী আনন্দে আত্মহারা, তখন পড়শিরা এক-এক করে সান্ত্বনা দিতে এলেন, তাঁদের একটিই কথা— মেয়ে হয়েছে, দুঃখ করবেন না ভাই, দুঃখ করে কী লাভ! বোন এবং বোনের স্বামী বলে— দুঃখ তো আমরা করছি না। এতে কিন্তু পড়শিরা মানেন না, তারা নিশ্চিত, কন্যা জন্মালে দম্পতিকে দুঃখ করতেই হয়।
বোনের স্বামী অফিসে গেল, বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় গেল। মেয়ে হবার সংবাদটি পরিবেশন করবার পর বন্ধুবান্ধব এবং অফিসের পিওন থেকে এম ডি পর্যন্ত সকলে বলল— থাক, দুঃখ কোরো না।
বোন এবং বোনের স্বামী বরং দুঃখ করে বলে— আমরা মোটেই দুঃখ করছি না। অথচ সকলে আমাদের আগ বাড়িয়ে দুঃখ না করবার পরামর্শ দিচ্ছে।
এই সান্ত্বনাগুলোই এখন ওদের বিব্রত করে বেশি। ওরা ভয় পেয়ে গেছে মানুষের আফসোস আর চুকচুক দুঃখধ্বনিতে।
৪. আড়ং-এ এবং বেইলি রোডের বেশকিছু শাড়ির দোকানে মেয়েরা সেলস গার্ল অথবা সেলস উইমেন-এর কাজ করে। আমি লক্ষ করেছি, বিক্রেতা হিসেবে মেয়েরা অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক এবং সহিষ্ণু। যেহেতু মেয়েরা কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে, মেয়েদের নিশ্চয় তবে এই কাজে খুব বেশি এগিয়ে আসা উচিত।
অনেকে বলে, বিক্রেতা হওয়া মেয়েদের জন্য বড় লজ্জার কাজ। বিক্রেতা হলে তার মানসম্মান লোপ পায়। এ কিন্তু ঠিক নয়, কোনও সৎ কাজেই কোনও মানুষের মান যাবার কথা নয়। অনেক বেকার মেয়ে ঘুরছে কাজের আশায়। অথচ তারা কাজ পাচ্ছে না, যেহেতু লোকে বলে মেয়েদের সেলস গার্ল হওয়া ঠিক নয়। দোকানের মালিকরাও এই কথায় সায় দেয় অথবা প্রভাবিত হয়।
মেয়েদের সেলস গার্ল হওয়া মানাবে কেন, তাদের ‘কলগার্ল’ হওয়া মানায়। মেয়েদের কলগার্ল বানাতে সমাজে যত উৎসাহ, সেলস গার্ল বানাতে তত উৎসাহ নেই।
মেয়েদের অকর্মণ্য করে রাখবার জন্য সমাজ-সংসার বড় তৎপর। তাদের এই অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সময় এখন।
অতঃপর নারী হবে মসজিদের ইমাম
চার্চ অফ ইংল্যান্ড নারীকে যাজক হবার অনুমতি দিয়েছে। চার্চের যাজক হবার কোনও অধিকার নারীর ছিল না, চার্চে যাদের কথা বলবারই অধিকার নেই, তারা আবার যাজক হবার অধিকার পায় কী করে! নারী এখন যাজক হবে শুনে একযোগে দেড় হাজার যাজক হুমকি দিচ্ছেন তাঁরা চার্চ অফ ইংল্যান্ড ছেড়ে দেবেন। ভ্যাটিকান থেকেও অনুশাসনবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা হয়েছে।
১৫৩৪ সালে সম্রাট অষ্টম হেনরির উদ্যোগে চার্চ অফ ইংল্যান্ড রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অ্যাংলিক্যানের এমন ঐতিহাসিক রায় শুনে পোপ দ্বিতীয় জন পল জানিয়েছেন, ধর্মীয় অনুশাসন অনুসারে রোমান ক্যাথলিক চার্চ নারীদের প্রিস্ট (যাজক) সম্প্রদায়ভুক্ত করাকে অনুমোদন করতে পারে না। পৃথিবীর সাত কোটি অ্যাংলিক্যান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের ধর্মীয় নেতা ক্যান্টারবেরি আর্চ বিশপ জর্জ কেরি নারীকে যাজক করবার সিদ্ধান্তকে খুব জোর সমর্থন দিচ্ছেন। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের নেতা কার্ডিনাল ব্যাসিল হিউম অবশ্য অ্যাংলিক্যান চার্চের এই নতুন বিপত্তির’ পরও মিলিতভাবে প্রার্থনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নারীকে যাজক করবার প্রস্তাবটির পক্ষে হাউস অফ বিশপের ভোট পড়ে ৭৫ শতাংশ, হাউস অফ ক্লারজিতে ৭০.৫ শতাংশ এবং হাউস অফ লেইটিতে ৬৭.৩ শতাংশ। আসলে সবচেয়ে বড় কথা, প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে। বিপক্ষে লোক আছে, সে তো থাকবেই। মেয়েরা মানুষের যোগ্য অধিকার অর্জন করবে- এতে বাধা তো দেবেই সমাজের বিচিত্র পুরুষেরা।
সাড়ে তিনশো বছর পর পোপ স্বীকার করেছেন, গ্যালিলিও ম্যালিলেইকে শাস্তি দিয়ে তাঁরা অন্যায় করেছেন। নারী-যাজক নিষিদ্ধ ছিল চার্চে, সেই নিষেধ উড়িয়ে নারী এখন যাজক হিসেবে চার্চে সম্মানিত।
আশা করছি, নারী এখন মন্দিরের পুরোহিত হবেন, মসজিদের ইমাম হবেন। পুরোহিত এবং ইমাম হওয়া নারীর জন্য এখনও নিষেধ। উপনয়নে নারীর অধিকার নেই, বেদাধ্যয়নে নেই, পৌরোহিত্য করবার অধিকার পাবার তো প্রশ্ন ওঠে না। মসজিদের ইমাম হওয়াও নারীর জন্য ধর্মমতে বৈধ নয়। ইমামতি করবার কাজ নারীর নয়। হাদিসে আছে, নারীর নেতৃত্ব মানলে জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রিস্ট হওয়ার বিপক্ষে কিন্তু একই রকম সংস্কার ছিল।
তবে তো এ নিশ্চয়ই আশা করা যায়, নারীও একদিন ইমামতি করবে দেশের মন্দির-মসজিদে। চার্চ অফ ইংল্যান্ডের সিদ্ধান্ত নারীকে অগ্রগামী করেছে আরও।
তার শত শৃঙ্খলের এক শৃঙ্খল খুলে গেছে, ভেঙে গেছে একটি অনড় দেয়াল, বেঁকে গেছে ধর্মের শক্ত তর্জনী।
আজ জয়োল্লাস করবার দিন নারীর। এক সময় নারীর ভোট দেবার অধিকার ছিল না। এই অধিকারটি নারী পেয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের পর, মাত্র বাষট্টি বছর আগে। আর দীর্ঘ সতেরো বছরের সংগ্রামের পর নারী পেয়েছে চার্চের যাজক হওয়ার অধিকার।
আন্দোলন ছাড়া এ জগতে নারী কিছুই অর্জন করতে পারেনি। মানুষের ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও সম্ভব নয় তার অধিকারভুক্ত করা। এই অবস্থায় নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সম্মুখ সমরে। এ ছাড়া মুক্তি নেই। ‘মুক্তি’ কেউ হাতে ধরিয়ে দেবে না, মুক্তিকে খুঁজে বার করতে হবে সকল বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে।
মসজিদে নামাজ পড়বার চেয়ে নারীর জন্য ঘরে নামাজ পড়াকেই উত্তম বলা হয়েছে। আর যদি মসজিদেই নামাজ পড়তে হয় তবে পড়তে হবে সবচেয়ে পেছনের কাতারে। নারী চার্চের প্রার্থনাকারী থেকে যাজকে উত্তীর্ণ হয়েছে, নারী পেছনের কাতার থেকেও একদিন নিশ্চয়ই সামনে যাবে। মিলাদ মাহফিল, জানাজা, জুম্মা ইত্যাদি পরিচালনা করবে নারীই। তখন নারীর জন্য এতকালের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেই জনতা ফুঁসে উঠবে। আমি বলছি না, ধর্মশালা এমন এক পবিত্র জিনিস যা ছোঁবার অধিকার নারীকে দিতেই হবে। আসলে এটি পবিত্রতা-অপবিত্রতার বিষয় নয়, সত্য-মিথ্যের বিষয়ও নয়। ধর্মপালন করে জগতের যে কোনও লাভ হচ্ছে— তাও আমি মানি না। কিন্তু আমার কেবল একটিই দাবি, নারী যেন জগতের সর্বত্র বাড়াতে পারে তার হাত, নারী যেন সর্বত্র বিচরণ করতে পারে দ্বিধাহীন। তার জন্য কোনও নিষেধের বেড়াজাল আমি স্বীকার করি না। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা মানুষের কল্যাণের প্রতীক নয়, কিন্তু এ-সবের অস্তিত্ব এখনও আছে এই পৃথিবীতে, আর আছে বলেই এ-সবের কর্তৃত্ব করবার অধিকারও থাকা উচিত নারীর, অথচ একতরফা কর্তৃত্ব করছে কেবল পুরুষ।
বৃত্ত আঁকা হয়েছে কেবল নারীর চারদিকেই, তার জন্যই কেবল মাপা গণ্ডি, তার জন্যই শত নিষেধ, তার জন্যই ধরা যাবে না, বলা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না ইত্যাদির নিয়ম এবং নীতি। নারীর জন্যই পাতা থাকে জাল, পাতা থাকে ফাঁদ, নারীর জন্যই গড়া হয় অদৃশ্য শেকল।
চার্চ অফ ইংল্যান্ড থেকে শেকল ভাঙবার শব্দ ভেসে আসছে। বাংলার অসভ্য পুরুষেরা, আপনারা কি তবুও বধির?
‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি…’
আমার ছোটবোনের একটি চমৎকার মেয়ে হয়েছে। বাড়ির সবাই আমাকে বলেছে সুন্দর একটি নাম দাও মেয়েটির। আমি নাম দিয়েছি ‘স্রোতস্বিনী ভালবাসা”। ডাকনাম ভালবাসা। নাম শুনে আমার আত্মীয়রা এ ওর মুখের দিকে তাকিয়েছে। কেউ মুখ টিপে হেসেছে, কেউ ভ্রূ কুঁচকেছে, কেউ বলেছে, এ আবার কী ধরনের নাম!
কেন?
ভালবাসা কোনও নাম হল? এই নাম মুরুব্বিরা ডাকবে কী করে?
ডাকলে অসুবিধে কী?
ছি, কী লজ্জা!
‘ভালবাসা’ নাম রেখে আমি সম্ভবত আমার ছোটবোনের স্বামীকে যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলেছি। সে তার আত্মীয়-বন্ধুদের সামনে নামটি উচ্চারণ করতে পারছে না। একটি ‘ভালবাসা’ নাম বাড়িসুদ্ধ কী ভীষণ অসন্তোষের সৃষ্টি করতে পারে তা আমি এ ক’দিনে বেশ উপলব্ধি করেছি।
তারা আরও আপত্তি করছিল, মেয়ে বড় হলে রাস্তার ছেলেরা এই নাম নিয়ে রীতিমতো টিজ করবে। এই নাম থেকে মেয়েকে মুক্ত করতে পারলে মেয়ের ‘শুভাকাঙ্ক্ষীরা এখন বাঁচে বই কী। ভালবাসা’ নামটি শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজ-সংসারে বড় দুঃসহ হয়ে উঠল। এই শব্দটিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় না করলে তাদের শান্তি নেই। আমি ভেবেছি এই শব্দ নিয়ে লোকের এত আপত্তি কেন? আমি এ-কথা খুব বেশি বিশ্বাস করি যে, ভালবাসার চেয়ে সুন্দর কিছু, বড় কিছু, মহান কিছু পৃথিবীতে নেই। তবে এই শব্দ নিয়ে পরিবারে এবং সমাজে এত লজ্জা কেন? নাকি আমাকে এ-কথা বিশ্বাস করতে হবে যে, যেহেতু সন্ত্রাসের এই দেশে ঘৃণা এবং ভয়ই প্রধান দুই উপলব্ধি তাই এর বাইরে অন্য কোনও সুখকর অনুভবের তেমন মূল্য নেই।
ভালবাসা এই দেশ থেকে, সমাজ থেকে, পরিবার থেকে নির্বাসিত প্রায়। তাই নির্বাসিত কোনও শব্দ বা অনুভব নিয়ে সকলের কুণ্ঠা, জড়তা ও আতঙ্ক কাজ করে। তারা ভাবে ‘ভালবাসা’ শব্দটি লজ্জার, টিজ করবার।
ভালবাসা আমাকে এ জীবনে ভুগিয়েছে খুব। ক্লাস টেনে যখন পড়ি, স্কুলে যাবার পথে সুদর্শন এক তরুণ একটি চিঠি গুঁজে দিয়েছিল আমার হাতে। ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে যায় আমার বাঙ্গিতে। আমি সেই চিঠিটি বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলাম, অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে ফাঁক পেলেই আমি সেই চিঠিটি পড়তাম। চিঠিটি একসময় ওরা আবিষ্কার করে ফেলে এবং আমাকে বেদম মারধর করে। আমার সঙ্গে সেদিন থেকে একটি লোক দেওয়া হয়, স্কুলে যাওয়া-আসায় পাহারাদার হিসেবে। যে তরুণ আমাকে চিঠি দিয়েছিল, তার সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ ও পরে সম্ভব হয়নি। ভালবাসা আমার মনে হয়, কখনও স্থির থাকবার জিনিস নয়। কাউকে ভালবাসলাম তো সারা জীবন ভালবাসলাম, আর কারও দিকে তাকালাম না— ভালবাসার ব্যাপারে আমি এতটা সন্ন্যাসী হতে রাজি নই। আমি আমার জীবনেই দেখেছি, যাকে ভালবাসি, খুব গভীর করেই আমি তাকে ভালবাসি। আমার ভালবাসায় কোনও খাদ থাকে না। কিন্তু যখন ভালবাসার মানুষ থেকে আমার মন ওঠে, চিরতরেই ওঠে। মন উঠবার মতো কারণও ঘটে অবশ্য, বিস্তর কারণ। আমি যে পরিবারে বড় হয়েছি, সে হচ্ছে একটি রক্ষণশীল পরিবার— ‘ভালবাসা’ এই পরিবারে অত্যন্ত অন্যায়, গর্হিত একটি কাজ। আমার যখন আঠারো-উনিশ বছর বয়স, তখন এক যুবকের প্রেমে পড়ি আমি। প্রেম সম্পর্কে আমার ধারণা তখন কেবলই বই-পুস্তক নির্ভর। আমার ইচ্ছে হত, দেবদাস যেমন পার্বতীকে ভালবাসে, রোমিও যেমন জুলিয়েটকে, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান যেমন বায়োনিক ওম্যানকে, তেমন করে প্রেমিক যুবকটি আমাকে ভালবাসুক। আমি কেবল মনের মধ্যে একশো একটা ইচ্ছেই পুষে বেড়াতাম। স্বপ্নই ছিল কেবল শীত-গ্রীষ্ম জুড়ে। স্বপ্নই ছিল কেবল হৃদয়-শরীর জুড়ে। কিন্তু প্রেমিকের ঘনঘন স্টার সিগারেট ফোঁকা, হিশি করবার তাগাদা, দুপুর হলেই ভাতের সঙ্গে গোরুর মাংসের হলুদ ঝোল মেখে খাওয়া, সব কেমন যেন অদ্ভুত লাগত, স্বপ্নের সঙ্গে মেলাতে পারতাম না কিছুই। আর আমিও ছিলাম লজ্জাবতী লতা। ভাববাচ্যে কথা বলতাম, ভালবাসার মানুষকে ‘তুমি’ সম্বোধন করতে আমার লেগেছিল পাক্কা পাঁচ বছর।
দেখলাম স্বপ্নে এবং বাস্তবে অনেক ফারাক। স্বপ্নে টাকাপয়সা হিসেব করতে হয় না, স্বপ্নে ঝগড়ঝাটি হয় না, মনখারাপ করা সময় আসে না, সারাদিন হয় বৃষ্টিতে, নয় উজ্জ্বল বিকেলে, নয় পূর্ণিমায় অবাধ সাঁতরে সাঁতরে জীবন পার হয়। আর বাস্তবে এদিক চেয়ো না, ওদিক ফিরো না, এটা কোরো না, ওটা করো ইত্যাদি নিয়মের জ্বালায় আমাকে স্থবির হয়ে থাকতে হয়। বাস্তব ব্যাপারটি ‘মেয়েদের’ জন্যই স্থবিরতাই দেয় বই কী
পুরুষ নামক প্রাণীকে ভাল কিন্তু আমিও কম বাসিনি। এর বিনিময়ে আমাকে বসিয়ে রেখে একজন টানবাজার’ সেরে এসেছিল মনে আছে। আমি দু’শো গোলাপ নিয়ে তার অপেক্ষা করেছিলাম, সে এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে নেচে উঠবে, আশা ছিল। আমার কেবল আশায় বসতি। কেউ একজন আমাকে ভালবাসে, আমাকে ছাড়া বাঁচবে না ইত্যাদি বলে-টলে আমার ব্যাগ থেকে সাতশো ডলার আর গলার একটি সোনার চেইন হাতিয়ে নিয়েছিল। একজন আমাকে ভালবাসে মুখে খুব বলত, আড়ালে আমার কুৎসা রটাত। আর একজন তো বোতল-বোতল মদ খেয়ে সারা রাত ধরে প্যান্টের বেল্ট খুলে আমাকে পেটাত। তারপরও এই পুরুষদের জন্যই দেখি আমার ভালবাসার কমতি হয় না। ভালবাসা এমনই এক আশ্চর্য জিনিস, দিন দিন এর কেবল স্ফুরণ হয়, এর কোনও বিনাশ-বিলুপ্তি নেই। তবে ভালবাসা যে দিনে দিনে পরিণত হয়, এ আমি খুবই মানি। এখন যাকে ভালবাসি, লক্ষ করেছি, আমার আবেগ যথেষ্ট সংযত, এখন আমার ষোলো আনাই ভালবাসার জন্য আগের মতো তুলে রাখি না। এখন নিজের জন্য রাখি আমি বারো আনা, ভালবাসার জন্য চার আনা। এতে যদি পড়তা পড়ে, থাকো, না পড়লে পথ মাপো। সোজা হিসেব। ভালবাসায় আগে খুব বেহিসেবি ছিলাম, দু’আনা নিয়ে ষোলো আনা দিতাম, এখন দু’আনা নিলে দু’আনা দিই। তবে যেটুকু দিই, তা ষোলো আনাই নিখাদ।
আইন বদল
এখন যে সমাজ দেখছি, সমাজ আসলে এ-রকম ছিল না। সমাজের অনেক বদল হয়েছে। সমাজে একসময় স্বামীর মৃত্যুর পর জীবন্ত স্ত্রীকে জোর করে আহুতি দেওয়া হত স্বামীর জলন্ত চিতায়। এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি লর্ড বেন্টিংককে সম্মত করিয়েছিলেন ১৮২৯ সালের ২৭নং আইন বিধিবদ্ধ করাতে। এই আইন নারীকে সহমরণের থাবা থেকে বাঁচিয়েছিল বটে কিন্তু সারা জীবন ব্রহ্মচর্য পালন করবার নিয়ম তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বাল্যবিধবাদের বাধ্য করা হত পোশাকে, আহারে, শরীরে ও মনে কঠোর সংযম পালন করতে। এই করেই দিন যাচ্ছিল, সমাজ চলছিল আর এই সমাজ বদলাতে তখন এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বিধবাদের পুনরায় বিয়ে দেবার জন্য ব্যভিচারের আশঙ্কা দেখিয়ে এবং শাস্ত্র দিয়ে শাস্ত্রকে আঘাত করে ১৮৫৬ সালের ১৫নং আইনের মাধ্যমে বিধবাবিবাহ বৈধ করিয়েছিলেন।
১৮৯১ সালে ‘এজ এফ কনসেন্ট অ্যাক্ট’ দ্বারা বাল্যবিবাহ রোধ হয়। ১৯২৩ সালের ৩০নং আইন অসবর্ণ বিয়েকে বৈধ বলে মানে। ১৯২৯ সালের ১৯নং আইনে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলের বয়স ন্যূনপক্ষে ১৮ এবং মেয়ের বয়স ১৫ করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালে ১৯নং আইন স্ত্রীদের অধিকার দেয় বিশেষ বিশেষ কারণে স্বামী ত্যাগ করতে। ১৯৪৯ সালের ২১নং আইন বিবাহক্ষেত্রে জাতি, বর্ণ, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের সকল বাধাবৈষম্য দূর করে। ১৯৫৫ সালের ২৫নং আইন আরও এগিয়ে বিবাহক্ষেত্রে নতুন শর্তারোপ করেছে। এই শর্তারোপ করবার ফলে আগের চেয়ে সমাজে নারীরা সুযোগ-সুবিধে বেশি পাচ্ছে।
বিয়ের ক্ষেত্রে মুসলমানদের আইন আবার ভিন্ন। হিন্দু বিয়ে যেমন এককালে শাস্ত্ৰ মেনে চলত, মুসলমান বিয়েও শাস্ত্র মেনে চলত। তিনবার ‘তালাক’ বললেই তালাক হয়ে যেত। তালাক উচ্চারণ করবার সময় কোনও সাক্ষী বা স্ত্রীর উপস্থিতিরও প্রয়োজন হত না। কোরানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তুমি যদি মনস্থির কর, তুমি তালাক বলবে, মনে রেখ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা। সুতরাং তালাক বললেই তালাক। এখন তালাক বললেই তালাক হয় না, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠাতে হয়। সেই চিঠির কপি স্ত্রীকে পাঠাতে হয়, তারও পর নব্বই দিন পার হলে তালাক হয়। কেবল তাই নয়, তালাকের পর ‘ইদ্দত’ কাল পার হলে আরেকটি বিয়ে ঘটিয়ে অতঃপর প্রথম স্বামীর ঘরে যেতে হয়। এই নিয়মটি এতকাল ছিল, এখন উঠে গেছে। উঠে যাওয়ার কারণ একটাই— মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে।
মুসলমানদের মধ্যে নিয়ম ছিল, পুরুষের যদি ইচ্ছে হয়, সে এক দুই তিন এবং চার পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে। তখন কিন্তু এ-রকম ছিল না যে, বিয়ে করতে হলে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে। এখন অনুমতির নিয়ম শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে আগের নিয়মগুলো বদলে যাচ্ছে। ভারতে ১৯৮৬ সালের আগে মুসলমান তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ‘ইদ্দত’-এর সময় স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ পেত না। ১৯৮৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট শাহবানু মামলায় তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব শাহবানুর প্রাক্তন স্বামীকে দিয়েছিল। এই নিয়ে ভারতের মুসলমান সমাজ হইচই শুরু করে, তারা বলে প্রাক্তন স্বামীর ওপর খোরপোশের দায়িত্ব অর্পণ করে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালের ৮ মে তারিখে সংসদে ‘তালাকের পর অধিকার সংরক্ষণ বিল’টি পাস হয়, এতে ইদ্দত-এর সময় স্বামীকে স্ত্রীর খোরপোশ দেবার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন স্ত্রীকে বিশেষ বিশেষ কারণে অধিকার দিয়েছে স্বামীর তালাক দেবার, যদিও শরিয়তি আইন স্ত্রীর তালাক দেবার অধিকার স্বীকার করেনি। প্রথম স্বামীকে আবার বিবাহের জন্য তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহের প্রয়োজন হয় না এখন। এখন না শরিয়তি, না সভ্য— এমন এক অবস্থায় আছে মুসলিম বিবাহ আইন। এই আইন কিছুটা শরিয়ত নিয়ে, কিছুটা সভ্যতা, নিয়ে অদ্ভুত একটি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। সভ্যতার দিকে তার গতি খুব ধীর। এত ধীর যে, বাঙালির এক সম্প্রদায়েই নিয়ম তৈরি হয়েছে, বিবাহকালে ‘স্বামীর অন্য স্ত্রী বা স্ত্রীর অন্য স্বামী জীবিত থাকবে না।’কিন্তু আরেক সম্প্রদায়েই স্ত্রী জীবিত থাকলেও এক-দুই-তিন-চার করে অনুমতিসাপেক্ষে বিবাহ করা যায়। সতীদাহের নিয়ম থেকে আধুনিক হিন্দু বিধিতে পৌঁছোতে সময় লেগেছে একশো আটাশ বছর। সেই তুলনায় শরিয়তি আইনের ওপর মুসলিম পারিবারিক আইনের মলম লাগাতে আরও দীর্ঘ বছর সময় লেগেছে এবং এ-কথাও সত্য যে, এই আইন হিন্দু আইনের তুলনায় অনেক অনুন্নত, অসভ্য, অনাধুনিক।
গতিকে আরও বেগবান করবার জন্য বাঙালি মুসলমানের উচিত এই আইনটির প্রচলন— ‘বিবাহকালে স্বামীর অন্য স্ত্রী বা স্ত্রীর অন্য স্বামী জীবিত থাকবে না।’ যতদিন পর্যন্ত এই আইনটি ‘মুসলিম বিবাহ আইনে’ অন্তর্ভুক্ত না হবে, ততদিন পর্যন্ত সমস্যা দূর হবে না। বিজ্ঞান দ্রুত এগোচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে আমাদের সমাজকে পিছিয়ে রেখে আমরা যতদূর যেতে চাই, আসলে তা যাওয়া নয়, সত্যিকার অগ্রসর নয়। সমাজ তার শরিয়তি থাবা দিয়ে মানুষকে পেছনে আটকে রাখবেই।
যৌতুক নিষিদ্ধ করলেও সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা বিদায় হয়নি। এই প্রথাকে নির্বাসন দেবার জন্য আইনকে আরও কঠোর হতে হবে। শরিয়তি আইনের যে ছিটেফোঁটা এখনও বর্তমান আছে, তার উচ্ছেদ প্রয়োজন এবং প্রয়োজন উত্তরাধিকার আইনে পুত্র কন্যার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। দেনমোহর, খোরপোশ ইত্যাদি প্রথা তুলে দিতে হবে কারণ এ-সবই নারীকে অমর্যাদা করে সবচেয়ে বেশি। নারীকে খোরপোশ বাড়িয়ে দিয়ে বা তালাকের পর আগের স্বামীর ঘরে যেতে হলে যে একটি বিবাহ ঘটাতে হত, সেই ‘ভায়া বিবাহ’ তুলে দিয়ে নারীর মর্যাদা বাড়ানো যাবে না। নারীর মর্যাদা বাড়বে তখনই, নারী যখন ‘বিয়ে করবে’, ‘বিয়ে বসবে’ না। আর তখনই তার বিয়ে করা যুক্তিসংগত হবে, যখন তার আর দেনমোহরের প্রয়োজন হবে না, খোরপোশের প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ কোনও দানদক্ষিণা বা করুণার প্রয়োজন হবে না। নারীকে শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হবার বাধ্যতামূলক আইন তৈরি করলে শরিয়তি আইন আপনাতেই বিলুপ্ত হবে। আর তা না হলে বর্তমান এই সমাজকে সভ্য সমাজ বলা আর গাধাকে মানুষ বলা আমার দৃষ্টিতে একই।
প্ৰথা
কিছু কিছু নিকৃষ্ট প্রথাকে মানুষ এখনও সমাজে জিইয়ে রাখছে। ‘বহুবিবাহ’ প্রথাটি নিকৃষ্ট প্রথা হিসেবে নিশ্চয় উল্লেখযোগ্য। একবার এক বিজ্ঞ সমাজতাত্ত্বিককে জিজ্ঞেস করেছিলাম— পুরুষের বহুবিবাহের অধিকার আছে, নারীর নেই কেন? তিনি আমাকে উত্তর দিলেন অবিকল এই ভাষায়— ‘প্রকৃতি— সে মানুষের হোক আর জন্তুজানোয়ারের হোক, একাধিক বিয়ের আকাঙ্ক্ষা তার থাকেই। বনের জন্তু তো বটেই, যদি গৃহপালিত জন্তুর কথাই ধরা হয়, তবে এ নিশ্চয়ই সকলে লক্ষ করেছেন যে, বহুসংখ্যক গাভি এবং ছাগীর জন্য একটি করে ষাঁড় এবং পাঁঠা থাকে। গাভি এবং ছাগীরা একটি ষাঁড় এবং পাঁঠার কাছ থেকে গর্ভধারণ করে। একই রকম মুরগির বেলায়, একাধিক মুরগির জন্য একটি মোরগই যথেষ্ট, একটি মোরগ কখনও রাজি নয়, অন্য এক মোরগ এসে তার আওতাধীন কোনও মুরগির প্রতি আকৃষ্ট হোক। সুতরাং জন্তু যেমন বহু স্ত্রী-গ্রহণে অভ্যস্ত, পুরুষও তেমন বহু স্ত্রী-গ্রহণে আগ্রহী হবে— এ তো খুব সাধারণ কথা।
হ্যাঁ, সাধারণ কথাই বটে। সাধারণ কথাটিই অবশ্য বড় অসাধারণ ঠেকেছে আমার কাছে। বহুবিবাহের পক্ষ নিতে গেলে পুরুষ নিজেকে গোরু, ঘোড়া, মোষ, ছাগলের সঙ্গে তুলনা করতে দ্বিধা করে না। যদিও ফাঁক পেলেই সে দাবি করে, সে আশরাফুল মুখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব।
২. ‘কনে দেখা’ বলে এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের চল আছে এই দেশে, শুধু দেশেই বা বলি কেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই। পুরুষেরা যখন নারীদের ভোগ করবার জন্য বিবাহ নামক স্বীকৃতির আশ্রয় নেয়, তখন ভোগের বস্তুটিকে নেড়েচেড়ে দেখবার বা পরখ করবার জন্য যে অনুষ্ঠানটি পালন করা হয়— তাকেই বলে ‘কনেদেখা’। বিবাহ ঘটে বর এবং কনের মধ্যে। কনেকে দেখতে যায় বর, দেখতে যায় মানে বাজিয়ে নিতে চায়, বস্তুটিকে ভোগের জন্য তার মনে ধরছে কি না। ‘বরদেখা’ বলে কোনও অনুষ্ঠানের চল নেই কোথাও। কনে তার নিজের জন্য দলবল নিয়ে বর দেখতে যায় না। বরের নাক, কান, চুল, চোখ, বুক, পেট, পা, বরের হাঁটাচলা, রাঁধাবাড়া, নাচগান, সেলাই, বরের পড়ালেখা, চাকরিবাকরি, স্বভাবচরিত্র ইত্যাদির খোঁজ নিতে কনে যায় না— এর কারণ ওই একটিই, চল নেই।
বরপক্ষ কনের বাড়ি এসে কনের গায়ের রং দেখে, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দেখে, দাঁত দেখে বাঁকা না সোজা, নাক দেখে খাড়া না বোঁচা, চোখ দেখে, চোখের দৃষ্টি দেখে, চুলের খোঁপা খুলে চুল মেপে দেখে কতটা দিঘল বা ঘন কালো মসৃণ। বরপক্ষ কনের পায়ের কাপড় তুলে পায়ের গোড়ালি দেখে জলে পা ভিজিয়ে মেঝেয় হাঁটতে বলে, পায়ের ছাপে যদি বক্রতা না থাকে তবে এ. নারী চরিত্রহীন, কনেকে হাঁটিয়ে, পড়িয়ে, লিখিয়ে, বলিয়ে, রাঁধিয়ে তারা আরও পরখ করে যে, বস্তুটি শরীরের খোরাক তো জোগাবেই, মনের খোরাকও যথেষ্ট জোগাতে পারবে কি না।
কনে দেখে পছন্দ হলে বরপক্ষ দরদাম করে কনে কেনে। আফটার অল মানুষ তো, তাই শশা, খিরা, ফুলকপি বা পালংশাক কিনে বাড়ি নিয়ে আসবার মতো নয় ব্যাপারটি। পছন্দ করে ‘বায়না’ করে আসতে হয়, তারপর ‘তুলে নেওয়া” বা ‘উঠিয়ে নেওয়া’। দামি পণ্যের বেলায় যা হয়।
বরপক্ষ একটি আংটি পরিয়ে আসে কনের কড়ে আঙুলে। এর নাম হচ্ছে মুখ, বুক, নিতম্বওয়ালা মাংসপিণ্ডটি এখন আমার জন্য বাঁধা, এটি এখন আর অন্য কোথাও বিক্রি হতে পারবে না। ব্যাস, পরে সময়মতো দেনমোহরের বিনিময়ে কনেটিকে ‘উঠিয়ে নিয়ে আসা’ হয়। দেনমোহরের টাকার ভেতরেও এক ধরনের ফাঁকি আছে, তা কেবলই উচ্চারিত, দেওয়া হবে তখন, যখন বস্তুটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে, বস্তুটির প্রয়োজন যখন ফুরিয়ে আসবে পুরুষের কাছে। এই চুক্তিতে যতদিন কনে বাঁধা থাকবে, কনেটি ক্রেতার ইচ্ছে- অনিচ্ছে, মন-মর্জি, মতিগতি, রুচি-বাসনার কাছেও বাঁধা থাকবে।
কনেদেখার নিয়মটি নতুন নয়। কোরানেও স্বয়ং আল্লাহতায়ালা বিবাহের আগে কনে পরখ করবার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। হজরত আনাস বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, হজরত মহম্মদ (সাঃ) একটি মেয়েকে বিয়ে করবার জন্য ভাবছিলেন, তখন মেয়েটিকে দেখবার জন্য অপর এক স্ত্রীলোক পাঠান এবং বলে দেন— কনের মাড়ির দাঁত পরীক্ষা করবে এবং কোমরের উপরিভাগ পিছন দিক থেকে ভাল করে দেখবে।
[মওলানা মুহম্মদ আবদুর রহিম: পরিবার ও পারিবারিক জীবন। পৃষ্ঠা ১৩০]
ইমাম আওজায়ি বলেছেন— কনে দেখতে গেলে কনের মুখ ও হস্তদ্বয় দেখা তো যাবেই, তার প্রতি তাকানো যাবে, খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখা যাবে এবং তার মাংসপেশিসমূহও দেখা যাবে।
দাউদ জাহেরি বলেছেন- তার সর্বশরীর দেখা যাবে। ইমাম হাজম বলেছেন- তার যৌনঅঙ্গকেও দেখে নেওয়া যেতে পারে। [প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা ১২৮]
.
যৌনঅঙ্গকে দেখতে হবে, কারণ যৌনঅঙ্গেই তো লুকিয়ে আছে ‘আসল মজা’। এখানেই আছে সতীত্ব ও অসতীত্বের চিহ্ন। যেহেতু পুরুষের যৌনঅঙ্গে কোনও চিহ্ন থাকে না, তাই তা দেখেও কোনও লাভ নেই। আর যদি দেখাই যায় যে, পুরুষের যৌনঅঙ্গে বহু উপগমনের দাগ, তবে কোনও কনের সাধ্য আছে পুরুষকে দোষ দেয়? না, এতে পুরুষের দোষ নেই। পুরুষেরা ‘প্রেরিত পুরুষ, পুরুষেরা কালিকলঙ্কহীন সাধুসন্ত, তাদের চুনকাম করা শরীরে কোনও কাদার ছোপ লাগে না।
‘কনেদেখা’ নিয়মটি এই সভ্য দেশে এখনও টিকে আছে। আমাকে আশ্চর্য হতে হয় আরও, দেশের শিক্ষিত নার:রা ‘কনেদেখা’ অনুষ্ঠানে সাজগোজ করে যখন অংশগ্রহণ করে। কোরবানির গোরুও রঙিন মালা পরে অপেক্ষা করে বিক্রি হবার। গোরুও মনে হয় মেয়েমানুষের চেয়ে অধিক ব্যক্তিত্বশালী। গৌরুও ক্রেতাকে সুযোগ-সুবিধেমতো শিংয়ের গুঁতো দেয়, দু’একটি লাথিও দিতে ছাড়ে না।
কিন্তু মেয়েমানুষ থাকে মুখ বুজে, চোখ নামিয়ে। তাকে যে পাত্রে দেওয়া হয়, সে পাত্রেই পতিত হয়। তার ইচ্ছে-অনিচ্ছের মূল্য নেই কোনও। তার সকল ইচ্ছে নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষেরা।
৩. ‘পণ’ বা ‘যৌতুক’ নামে এই দেশে আরও একটি প্রথা বেশ জনপ্রিয়। কনেপক্ষ বরপক্ষকে যৌতুক দান করে। এটি আইনত নিষিদ্ধ হলেও এর ব্যবহার রোধ করবার উপায় নেই। কারণ বরের দাবি না মানলে মেয়ে তো আইবুড়ো হয়ে মরবে। আইবুড়ো হলে, মেয়ের কোনও অসুবিধা হয় না, যত অসুবিধে সমাজের। যৌতুক শখ করে দিচ্ছে সব কনেপক্ষ, তা কিন্তু নয়। দরিদ্র কনেপক্ষ যৌতুকের শর্তে মেয়ে পার করছে বটে, কিন্তু শেষ অবধি শর্ত ঠিক পালন না হলে মেয়েকে গোরু জবাই-এর মতো জবাই করছে আমাদের ‘বিবেকবান পুরুষেরা’। একটি ট্রানজিস্টার, একটি সাইকেল বা একটি ঘড়ির লোভে যে পুরুষদের লালা গড়ায়, তারাই দরিদ্র মেয়েকে হয় ফাঁসিতে ঝোলায়, নয় পুড়িয়ে ফেলে, নয় গলা টিপে মেরে ফেলে। এ আর এমন কী আপদ দূর হল! আর যে যাই বলুক, এ-কথা তো স্বীকার করতেই হবে, একটি ট্রানজিস্টার, সাইকেল বা ঘড়ির চেয়ে মূল্যবান নয় মেয়েমানুষের জীবন।
তাই প্রতিদিন যদি যৌতুকের কারণে একশোটি বধূহত্যার খবরও পৌঁছোয় আমাদের কাছে, আমরা নির্লিপ্ত বসে থাকি, আমাদের পিঠে কোনও চেতনার চাবুক পড়ে না।
***
