← Back

মোহিনী

Chapter - 1 - দিন শুরু হয় রাতের প্রহরে

তাঁর দিন শুরু হয় রাতের সেই প্রহরে, যখন পৃথিবীতে যোগীরাই জেগে থাকেন। দীর্ঘদিন ওই একই সময়ে নিদ্রাদেবী তাঁকে মুক্তি দিয়ে যান। কোনো জানান দেওয়া ঘড়ির প্রয়োজন হয় না। বিছানায় উঠে বসে তিনি বিশাল কাচের জানলার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে পর্দা এমন ভাবে ওখানে টেনে দেওয়া হয় যাতে তিনি একফালি আকাশ দেখতে পান। এ আকাশে কখনও হলুদ তারা জ্বলে কখনও মেঘ ময়লাটে। কিন্তু ঘাড় ফিরিয়ে ওদিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকাটাও আজ তার অভ্যাসে মিশে গেছে।

সূর্য উঠতে এখনও অনেক দেরি। আর কে না জানে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই সময়টাই পৃথিবী পবিত্র থাকে! বিছানা থেকে মাটিতে দুটো পায়ের পাতায় সমানভাবে ভর দিয়ে দাঁড়াতেই এখনও তাঁর সমস্ত শরীরে শিহরন ছড়ায়। এই শরীর, যার প্রতিটি শিরাকোষ বহু বহু ব্যবহৃত, যার প্রতিটির অস্তিত্ব তিনি যেন আলাদা করেই জানেন, এখন, এই মুহূর্তে, তারা ক্লান্তির কথা জানান দেয়। এবং তখনই সচল হন তিনি। সংলগ্ন টয়লেট থেকে যখন বেরিয়ে আসেন তখন জলের ফোঁটায় মুখ শীতল। এই সময় তিনি কখনোই আলো জ্বালেন না। এই আবছা অন্ধকার তাঁকে অনেক বেশি স্বস্তি দেয়। জানলার পাশে শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর শীতলপাটি বিছানো থাকেই। তিনি এবার শরীরের সমস্ত কোষ এবং শিরায় উদ্যম ছড়িয়ে দেন। সমস্ত ক্লান্তি সযত্নে মুছে নিয়ে ওদের সতেজ করে তোলেন। মাত্র দশ মিনিটের এই শরীরচর্চা, যা কিনা কয়েকটি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পুজোয় বসার আগে শুদ্ধি দরকার। এই দশ মিনিট তারই প্রস্তুতি।

পৃথিবীর যে-কোনো দেশ এবং আবহাওয়া তাঁকে আসনের পর স্নান থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। স্নানের সময় ঘর আবছা বা কখনও গাঢ় অন্ধকারে জড়ানো থাকে। চব্বিশ ঘণ্টার এই সময়টাই তাঁর শরীর নিরাবরণ, জলের ধারা নামে চুলের গোড়া ছুঁয়ে পায়ের নখ পর্যন্ত। এখন আর শরীরের দিকে তাকান না তিনি। আর এই অন্ধকার সেই না-দেখার ইচ্ছেটাকে সাহায্য করে বিনীতভাবে। চোখ বন্ধ, কিন্তু মন আপাদমস্তক জরিপ করে নেয়। সবই ঠিক আছে। পায়ের প্রতিটি শিরা থেকে হাতের প্রতি রোমকুপ। কোথাও কোনো বিদ্রোহ অথবা নিস্পৃহতা নেই জানার পর তাঁর মুখে সেই অন্ধকারেই স্বস্তি ফুটে ওঠে।

নির্মল শরীর পরিষ্কার কাপড়ে জড়িয়ে তিনি তাঁর ঈশ্বরের উপাসনায় নিমগ্ন হন স্নানের ঘর থেকে বেরিয়ে। নটরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওই আবছা অন্ধকার শরীরে বিদ্যুতের জন্ম হয়। একটি চরণের ওপর শরীর রেখে, অন্যটি ঈষৎ ওপরে তুলে চার হাতে চার রকম মুদ্রায় যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর সামনে বসে তিনি প্রতি দিনের জীবন সংগ্রহ করেন। নটরাজ অমঙ্গলের সংহারক, সুন্দরের জন্মদাতা। নটরাজ, নৃত্যের যিনি সম্রাট, যাঁর নাচ আনন্দ এবং দুঃখের দ্বিবিধ অনুভূতিতে, কখনও একা, কখনও সদলে, প্রতি মুহূর্তে ছন্দের জন্মদাতা, সত্য ও শক্তির স্রষ্টা। সেই ঈশ্বরের সামনে বসে থাকতে তাঁর শরীরে-মনে কম্পন জাগ্রত হয়। যেন একটি প্রদীপ থেকে আর একটি প্রদীপের সলতে ধরিয়ে নেওয়া। আপ্লুত তিনি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানান সেই মুহূর্তে, যখন পূর্ব দিগন্তে সূর্যদেব দেখা দিতে প্রস্তুত।

উপাসনার পর তিনি এসে দাঁড়ান, ঘরের দরজা খুলে শ্বেতপাথরের বারান্দায়। যদিও বারান্দা শব্দটা সঠিক প্রয়োগ নয়। আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন আঠারো নম্বর ইন্দিরা মার্গের এই বাড়িটি। কেউ কেউ একে রানির প্রাসাদ বলে থাকে। প্রায় বাইশটি সাদা সিঁড়ি ভেঙে এ বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছাতে হয়। নির্জন ইন্দিরা মার্গে এমন সাদা বাড়ি আর দ্বিতীয়টি নেই। বাড়িটির ডান পাশ দিয়ে গাঁথুনি ওপরে উঠে বিস্তৃত হয়ে গেছে তার শোওয়ার ঘরের সামনে। একে বারান্দা বলা চলে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু তিনি দুটো হাত বুকের ওপর যুক্ত করে সেখানেই দাঁড়িয়ে সূর্যদেবকে আঁধার সরিয়ে উঠে আসতে দ্যাখেন।

যখন তিনি আলোকিত, তখন পেছনে শব্দ হয়। তিনি মুখ ফিরিয়ে কমলাকে দেখতে পান। স্নান সেরে কমলা এসেছে তার ইচ্ছে জানতে। তিনি প্রাতরাশে আজ কী পছন্দ করবেন, দুপুরে কী খাবেন! এই প্রশ্ন করতে আসাটা এখন নিয়মের পর্যায়ে এসে গেছে। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি যে খাবারের কথা বলবেন তাই প্রতি সকালে খেয়ে চলেছেন দীর্ঘকাল। কিন্তু তার এই সময় নানা রকম খাদ্যদ্রব্যের কথা ভাবতে ভাল লাগে। কমলাও অনভ্যস্ত রান্নার কথা বলে সুখ পায়। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একটি কিশোরীকে সে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে দেখল। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই সময়টুকু ছাড়া যার সঙ্গে দুটো কথা বলার সুযোগ কমলা পায় না।

ঠিক সাতটা বাজতেই সদর দরজার বেলের বোতামে চাপ পড়বে। দরজা খুলে দেবে শ্রীনিবাস। কমলার মতো পঁয়ত্রিশ বছর নয়, কিন্তু ওই প্রৌঢ়েরও দেখতে দেখতে পঁচিশ বছর হয়ে গেল এই সংসারে। সংসার শব্দটা নিয়ে শ্রীনিবাসের খুব আপত্তি ছিল। কিন্তু কমলা তাকে বলেছে আপত্তি করার কিছু নেই। সঙ্গীতের সংসার। দরজা খুলে নমস্কার জানাবে শ্রীনিবাস। দুই প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া প্রায় একই সঙ্গে প্রত্যহ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। মৃদঙ্গ বাদক শাস্ত্রীজী এবং শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী, যাঁর গলায় সুর স্বচ্ছন্দে খেলা করে। তারপরেই এই রানির প্রাসাদে মৃদঙ্গের বোল ওঠে। দুই প্রবীণ প্রবীণা একটি দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলনের প্রস্তুতিতে মগ্ন। আর সেই সময়ে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে তিনি নমস্কার জানাবেন সহশিল্পীদের, প্রণাম করবেন বাদ্যযন্ত্রগুলোকে। সহশিল্পীদের কাজ আরম্ভ এবং তার আগমন প্রায় ঘড়ি ধরে ঘটে যায় প্রতিদিন। এ ব্যাপারে তাকে নিয়ে বিরূপ গল্প প্রচলিত আছে। তার উগ্র মেজাজ, আপোসহীন কথাবার্তা নাকি কখনও কখনও ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। শ্ৰীমতী বিজয়লক্ষ্মীর আগে যিনি তাকে কিছুদিন কণ্ঠসঙ্গীতে সাহায্য করতেন তিনি কিছুতেই সময়ে আসতে পারতেন না। কোনো কোনো মানুষের স্বভাবে সময় রাখতে পারাটা আসে না। তাঁকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে দুজনের বাদানুবাদও হয়েছিল। সে সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু রূঢ় বাক্য ব্যবহার করেছিলেন। ব্যাপারটা সাংবাদিকরা জানতে পেরে তাঁকে প্রশ্ন করেন। তিনি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেন, সময় আমার কাছে ঈশ্বরের মতো। যে মানুষ সময়ের অমর্যাদা করতে পারেন তিনি আমার ক্ষমা পাবেন না। আমি শুধু ঈশ্বরের জন্যেই অপেক্ষা করতে পারি কিন্তু কোনো মানুষের জন্য নয়।

সহশিল্পীদের সঙ্গে সম্ভাষণ বিনিময়ের পর রিহার্সাল শুরু হয়। ছয় ঘণ্টা ধরে পঞ্চাশ বছরের শরীর প্রতিটি পদক্ষেপ, মুদ্রার অঙ্গ সঞ্চালনে নিজেকে নিয়োগ করে নিঃশর্তে। ছয় ঘণ্টার এই অনুশীলন তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রতিটি পর্বের স্টাইল আলাদা। দ্বিতীয় বিরতির সময় কমলা সকালের খাবার নিয়ে আসে। তিনজনে বসে ইদলি, সম্বর আর দক্ষিণ ভারতীয় কফি পান করেন। দুপুর গড়িয়ে গেলে সহশিল্পীরা বিদায় নেন। ওঁদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেন তিনি। তারপর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার স্নানের ঘরে। এবং তার পরে পূজা। এই মুহূর্তে তিনি ব্রাহ্মণকন্যা। যে ব্রাহ্মণ মনে করেন, ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং শিব জগতের নিয়ামক। ব্রহ্মা হলেন জ্ঞানের দেবতা। বেদ তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত। শিব সুন্দর, শক্তি এবং নৃত্যের দেবতা। আর বিষ্ণু, যাঁকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বরণ করে নিয়েছে, তিনি নানা অবতাররূপ ধারণ করে দুর্জনকে ধ্বংস করতে পৃথিবীতে যুগে যুগে ফিরে আসেন।

তাঁর পূজায় এই তিন দেবতা কোনো প্রাপ্তির কারণে নয়, স্বীকৃতির শ্রদ্ধায় নিবেদিত। যখন পৃথিবীর মানুষেরা নিজেদের মধ্যে স্থূল মারামারিতে ব্যাপৃত ছিল এবং বেদ শুধু ব্রাহ্মণদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে কুক্ষিগত, তখন দেবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মাকে অনুরোধ করলেন এমন কিছু উদ্ভাবন করতে, যা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণীয় হবে। চার বেদের মূলতত্ত্ব গ্রহণ করে ব্রহ্মা তখন শব্দ, সঙ্গীত, মূকাভিনয় এবং আবেগের মিশ্রণে পঞ্চম বেদ সৃষ্টি করলেন। তারপর ভরতমুনিকে ডেকে তাঁকে এই বেদে অভিজ্ঞ করে তুললেন। প্রাপ্ত জ্ঞান নিজের একশ সন্তানের মধ্যে বিতরণ করে ভরতমুনি তা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিলেন। কিন্তু এই পঞ্চম বেদে নৃত্যের কোনো স্থান ছিল না। দেবাদিদেব শিব ভরতমুনিকে পরামর্শ দেন নৃত্যকেও গ্রহণ করতে। কিন্তু নৃত্য সম্পর্কে ভরতমুনির কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় শিব তার প্রধান অনুচর নন্দীকেশ্বরকে নিয়োগ করেন সাহায্য করতে। সেই শুদ্ধ নৃত্যের বিস্তৃত বিবরণ অভিনয় দর্পণ এবং ভারতার্ণব। শিব, যিনি নটরাজ, তিনি নৃত্যের স্রষ্টা। নৃত্যকে পাঁচটি অধ্যায়ে তিনি বিভক্ত করেছেন। সৃষ্টি, রক্ষা, ধ্বংস, প্রত্যাখ্যান এবং আশীর্বাদ। আর এই পাঁচটি নিয়ে যে নৃত্যের যাত্রা শুরু, তার নাম ভরতনাট্যম। পূজার আসনে যতক্ষণ তিনি বসে থাকেন ততক্ষণ তার শরীরে যেন শিবের সেই ডম্বরু বাজতে থাকে মাতালের মতো।

পূজার পর মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশন করে কমলা। যদিও তখন প্রায় অপরাহ্ন। গত তিরিশ বছরে খাদ্যাভাস একটুও পাল্টায়নি যাঁর তাঁর কিন্তু কখনই খাদ্যগ্রহণে বিরক্তি আসে না। তিনি ঘরের আসবাবপত্রের স্থান প্রায়ই পরিবর্তন করেন, এমন কী দেওয়ালের রঙও। কিন্তু কৈশোরের অভ্যস্ত খাবার পরিবর্তন করার কোনো প্রয়োজন অনুভব করননি। তাঁর পূজার ঘরে ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের ছবি, তিরুপতি মন্দিরের আলোকচিত্রর যেমন দেখা পাওয়া যায় তেমনি প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিব রয়েছেন বিভিন্ন চেহারায়। বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ করে মৃদঙ্গ, বাঁশি এবং বীণার দেখা পাওয়া যাবে ঘরে ঘরে। অবশ্য কমলা প্রায়ই এদের জায়গা বদল করে দেয়। কিন্তু কোনো দেওয়ালেই বাঁধানো মানপত্র অথবা প্রশংসাপত্র ঝোলে না, কোথাও পদকের চিহ্ন দেখা যায় না। যদিও গত তিরিশ বছর ধরে তিনি নিয়মিত ওসব পেয়ে গেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। কিন্তু কখনই চোখের সামনে রাখতে চান না।

খাওয়া শেষ হলে তিনি ফিরে আসেন টেবিলে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিয়মিত বন্ধুবান্ধবরা চিঠি লেখেন। সপ্তাহে দুদিন এই সব চিঠি পড়ে জবাব দেওয়া হয়। এই ব্যাপারে অনুষ্ঠান না থাকলে সেক্রেটারি তাকে সাহায্য করেন। মিস্টার আয়ার বস্তুত তার সমস্ত ব্যবসায়িক দিকটাই দেখে থাকেন। ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের ইচ্ছায় তিনি সৎ কর্মচারি পেয়েছেন।

মাতৃভাষায় লেখা চিঠিপত্র সহজেই পড়তে পারেন তিনি। তেমন একটি চিঠির কয়েক লাইন পড়তে পড়তে সোজা হয়ে বসলেন তিনি। চিঠিটা শুরু হয়েছে এইভাবে, জানি না এই চিঠি আপনার হাতে পড়বে কিনা। আপনার মতো পৃথিবীবিখ্যাত ভরতনাট্যমের শিল্পীর কাছে যদি এই চিঠির সারমর্ম পৌঁছায় সেই আশায় লিখছি। আমার গ্রামের নাম পাণ্ডানুল্লুর। এই গ্রামে আপনি এককালে এসেছিলেন। পিতৃদেবের কাছে শুনেছি সেই সময় আপনি কথাকলি নৃত্যের ছাত্রী ছিলেন। দীর্ঘসময় আপনি আমার পিতামহের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। সেসব অনেক কাল আগের কথা। আপনার নিশ্চয়ই অজানা নয় যে, আমার পিতামহকে ভরতনাট্যম নৃত্যের একজন শ্রদ্ধেয় সেবক বলা হয়ে থাকে। তিনি এই গ্রামেই সব রকম বৈভব থেকে দূরে থেকে সাধারণ জীবন যাপন করে পরিণত বয়সে দেহ রেখেছিলেন। সেই মানুষটির শততম জন্মজয়ন্তী এই মাসের বাইশ তারিখে। আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া কি আপনার পক্ষে সম্ভব হবে? আমার আর্থিক সঙ্গতি নেই। এই অনুষ্ঠান গ্রামের দরিদ্র মানুষ, যাঁরা ভরতনাট্যম নাচকে এখনও ভালবাসেন, বোঝেন, তাঁদের জন্যেই। বিনীত আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী, নানা পিল্লাই।

ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটে। সেটা ছড়িয়ে পড়ল দু-প্রান্তে। নানা কে? সেই রোগা কালো কিশোর, যাকে তার পিতামহ কখনই অনুশীলনের সময় ঘরে ঢুকতে দিতেন না? এত বছর পরে তার নাম মনে নেই। যদি সেই কিশোরই হয় তাহলে তারা সমবয়সী। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। এই একই ভুল মানুষেরা বারংবার করে যায়। পরিচিতির গণ্ডিটা অনেক বড় করে ফেললে অতীতের পরিচিত দূরের মানুষ হয়ে যায়। শুধু নানা পিল্লাই নয়, অতীতের অনেককেই মনে করে আজ আর তাদের কাছে পৌঁছানো যাবে না। এটা অবশ্য সব সময় খারাপ কাজ করে না। কিন্তু গুরুদেবের জন্মশতবার্ষিকীতে তিনি নিস্পৃহ থাকবেন তা এরা ভাবল কী করে! মিস্টার আয়ারের জন্যে অপেক্ষা করলেন না তিনি। সুন্দর চিঠি লেখার প্যাডটা টেনে নিয়ে কলম খুললেন, ভাই নানা, আপনার চিঠি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সত্যি কথা বলছি আমি আপনাকে স্পষ্ট স্মরণ করতে পারছি না। তার কারণ পাণ্ডানুল্লুরে আমি যখন ছিলাম তখন গুরুদেব আমাকে এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন, অন্য সব স্মৃতি গৌণ হয়ে গিয়েছে। আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি এখন খুবই ব্যস্ত। দেশ এবং বিদেশের নানান জায়গায় আমাকে আগামী মাসগুলোতে অনুষ্ঠান করতে যেতে হবে। সেকারণে অনুশীলনের প্রয়োজন। কিন্তু একটি জায়গায় আপনি ভুল করেছেন। আমাকে গঠন করেছেন তাঁকে অস্বীকার করা মানে আমার জীবনকে অস্বীকার করা। কারণ নৃত্যই আমার জীবন। বাইশ তারিখে আমার জন্যে সময় রাখবেন। বিনীত, আপনাদের আশা রাও।

একটু আগে আয়ার সাহেব বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। চিঠিপত্রের উত্তর কী হবে জেনে নিয়ে সেগুলো পরিচ্ছন্ন টাইপে রূপান্তরিত করে সই করিয়ে নিয়েছেন। আগামী তিন মাসে তার যে অনুষ্ঠান স্থির ছিল আজকের চিঠির জন্যে পরিবর্তন করতে হওয়ায় আয়ার সাহেব বেশ বিরক্ত হয়েছেন। গৌহাটি থেকে পাণ্ডানুল্লুর, ফিরে এসে আবার তাঁকে কলকাতায় যেতে হবে। মাঝখানে শিলঙ-এর উদ্যোক্তাদের হতাশ করতে হবে। কিন্তু যতই বিরক্ত হন আয়ার সাহেব কখনই প্রকাশ করেন না সরাসরি। তিনি বুঝে নেন। আজ মনটা ভাল লাগছে। নানার চিঠি তো বটেই, নিউইয়র্ক থেকে পুরনো বন্ধু হেনরি টার্নার চিঠি লিখেছে। হেনরি তাঁর প্রথম আমেরিকান ট্যুর স্পনসর করেছিল। হেনরি লিখেছে, সবই তো জানি, তবু মানতে পারি না তোমার এই একাকিত্ব। বিশদ জানতে চাই। আয়ার সাহেব মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন। কী উত্তর হবে তা জানতে তিনিও উন্মুখ। আশা চোখ বন্ধ করেছিলেন ক্ষণিক। তারপর জবাব দিয়েছিলেন প্রশ্নটির, আমার একটা গোপন আকাশ আছে যেখানে আমি ইচ্ছে করলেই উড়ে যেতে পারি। আর একটা কথায় এর জবাব দেওয়া যায়, এখনও অনেকটা পথ সামনে পড়ে রয়েছে।

আয়ার সাহেব চলে যাওয়ার পর আশা বাইরের বারান্দা অথবা চাতালে চলে এলেন। নীচে ইন্দিরা মার্গ আলোয় আলোকিত। সমস্ত শহরে হিরে জ্বলছে। কিন্তু মুখ তুললেই নীল আকাশ। কী শান্ত। লম্বা ডেকচেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে থাকতে আশার খুব ভাল লাগে। চেয়ারটা এমন, শরীর এলিয়ে দিলেই আকাশ আর তারারা সরাসরি চোখের ওপর উপুড় হয়ে আসে। এই সময় কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না। কোনো অতিথিকে কমলা আপ্যায়ন করবে না। এমনকী রাতের খাবারের জন্যে দরজায় এসে দাঁড়াবে না। তার জানা আছে তিনি অপরাহ্নের পর রাত্রে আর কিছু গ্রহণ করেন না। ফ্লাস্কে খুব ঠাণ্ডা দুধ রেখে দিয়ে যাবে কমলা। যদি ইচ্ছে হয় শোওয়ার আগে তাই খেয়ে নেবেন।

আশা রাও। আজ এই শব্দ দুটো সমস্ত ভারতবর্ষের মানুষের চেনা। কিছুদিন আগে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধি দান করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। এর আগে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির সম্মান তিনি পেয়েছেন। পদ্মভূষণ পেতে কার না ভাল লাগে। কিন্তু সেখানেই একটা গোলমাল হয়ে রয়েছে। পদ্মভূষণ দেওয়া হয়েছে তাঁকে তাঁর নাচের জন্যে। রাষ্ট্রপতি ভবনে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে একমাত্র তাঁকেই। কিন্তু এ কেমন কথা! ভরতনাট্যমের শিল্পী হিসেবে তিনি কী করে তাঁর সহশিল্পীদের অস্বীকার করেন? তাঁর নাচের প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্দর হতো না, যদি এঁরা না থাকতেন। তাই এঁদের ফেলে তিনি একা ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেন না। আয়ার সাহেবকে এই চিঠি লিখতে বলেছিলেন তিনি। সই করাবার আগে আয়ার মৃদুস্বরে বলেছিলেন, সরকারি অফিসার এই চিঠি পেয়ে বিরক্ত হতে পারেন।

উষ্ণ হয়েছিলেন আশা, কে কী হল তা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না আমি। যা অন্যায় তার সঙ্গে আপস করা মানে ঈশ্বরের আরাধনার অধিকার হারানো। সেই চিঠির উত্তর এখনও আসেনি। আশা চোখ বন্ধ করলেন। কখনও কখনও তারারা চোখের মণিতে অস্বস্তি তৈরি করে। ছুঁচলো শলাকার মতো বিদ্ধ করে।

ম্যাঙ্গালোরের সেই গ্রামে কতকাল যাওয়া হয়নি। যার একদিকে সমুদ্র আর কাজুবাদামের জঙ্গল, যে গ্রামের মেয়েদের সুন্দরী হিসেবে খ্যাতি ছিল সেই গ্রাম তাঁর জন্মভূমি। পিতামাতার একমাত্র সন্তান যদি কন্যা হয় তাহলে পৈতৃক বাড়ির স্থায়িত্ব বেশিদিন হয় না। আত্মীয়-স্বজনের পরিমণ্ডল ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। ম্যাঙ্গালোরের সেই গ্রামের মাটির সঙ্গে আজ তাঁর কাছে ভারতবর্ষের যে-কোনো জায়গার মাটির কোনো প্রভেদ নেই। একটিও মানুষ সেখানে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে নেই, যার কাছে যাওয়ার জন্যে হৃদয় উন্মুখ হয়।

পিতা বলতেন তাদের শরীরে কাশ্মীরের শুদ্ধ ব্রাহ্মণদের রক্ত আছে। কয়েকশো বছর আগে তারা একটি পবিত্র নদীর সন্ধানে কাশ্মীর ছেড়ে দক্ষিণ ভারতে এসেছিলেন।

পঞ্চাশ বছর আগে যে মেয়ে রাও পরিবারে জন্মেছিল, বিধাতা তার শরীরে অসুখের পাকা বন্দোবস্ত করে দিতে চেয়েছিলেন। কারণে অকারণে ভুগত সে। শরীর হাড়সর্বস্ব, মুখে লাবণ্যের চিহ্ন নেই। গরম অথবা ঠাণ্ডা মানেই বিছানায় শুয়ে থাকা। এ মেয়ের ঘরের বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। বাড়ির লোকেরা তাকে কখনই গেট পর্যন্ত যেতে দেয়নি। একটু বড় হওয়ার পর যখন স্কুলে যাওয়ার সময় হল, তখন অসুস্থতা প্রায়ই বাধা হয়ে উঠত। আশার পিতৃদেব দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারতেন না। মোটামুটি সফল ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। আশার আরোগ্যের জন্যে সবরকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কোনো চিকিৎসকের ঔষধ কাজ করছিল না। কোনো সমবয়সী বন্ধু আশার কাছে আসতে আনন্দ পেত না। বালিকার সর্বসময়ের সঙ্গী বাড়ির প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা। এই সময় আচমকা তাঁর পিতৃদেব পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। মুহূর্তেই বালিকার জীবন থেকে স্নেহ ভালবাসার বাড়ানো হাত সরে গেল। এবং তখনই সেই বালিকা আবিষ্কার করল শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে স্নেহ ভালবাসার বঞ্চিত বেদনা অনেক বেশি কষ্টকর। আর এই বোধ তার মনে জেদের জন্ম দিল। তাকে বাঁচতে হবে। তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবেই, কোনো আপস নেই। কারণ কেউ তার হাতে প্রিয় জিনিস তুলে দেবে না। কিন্তু লক্ষ্যটা কী তাই তো ছিল অজানা। এই সময় সে নটরাজের মূর্তি দেখতে পেল। নৃত্যের স্থির প্রতিকৃতি। রোগজীর্ণ-দুর্বল শরীর নিয়ে সেই নৃত্যরত ভঙ্গির অনুকরণ করতে চেষ্টা করত সে। দুটো হাতে চার হাতের মুদ্রা ফোটাতে চাইত আর এই করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল আশা। মা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন নাচ শিখতে চায় কি না। গৃহ চিকিৎসক উপদেশ দিল নাচ এক ধরনের ব্যায়াম যার ধকল সহ্য করতে পারলে শরীরের উন্নতি হবে। বালিকা এসব গ্রাহ্য করত না। সে শুধু অনুভব করত নটরাজের অনুকরণ করলেই শরীরে রোমাঞ্চ জাগে। শেষ পর্যন্ত মা তাঁকে নিয়ে গেলেন গ্রামের একজন নৃত্য শিক্ষকের কাছে। ভদ্রলোক খুব গরিব। একটু পাগলাটে স্বভাবের। নাচ নিয়েই থাকেন সারাদিন। ফলে অভাব হাঁ করে বসে থাকে তাঁকে ঘিরে। আশার দিকে একপলক তাকিয়ে তিনি মাকে বলেছিলেন, মেয়েকে খুন করতে চান করুন কিন্তু আমাকে জড়াবেন না। ওই হাড়ে নাচ হয় না।

কথাটা শুনে আশা কেঁদে ফেলেছিল। হকচকিয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তারপর সামলে নিয়ে কিছুটা রসিকতার ছলে জিজ্ঞাসা করেছিলেন শরীরটাকে দোলাও তো। মানে যেকোনো নাচের একটা ভঙ্গি করো তো দেখি। হাঁটু ঢাকা ফ্রক সামলে আশা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারপর নটরাজের চেনা ভঙ্গিটির অনুকরণ করল সে। কিন্তু আজ তার পা কাঁপতে লাগল। হাত ভারী হয়ে উঠল। নৃত্যশিক্ষকের চোখে সামান্য বিস্ময়। দুটো হাত বুকে জড়ো করে বলেছিলেন, যা করলে তার মানে জানো? জানো না। ডম্বরু হল সৃষ্টির উৎস। হাতের মুদ্রায় যে আশা তা রক্ষা করবে জগতকে, রোষাগ্নি ধ্বংস করবে অমঙ্গলকে আর পদক্ষেপ মুক্তি দেবে যন্ত্রণা থেকে। বসো।

এই সব কথাবার্তার একটা অর্থও তার বোধগম্য হল না। কিন্তু যখন লোকটি তাকে এই কথাগুলো বলেছিলেন তখন সে যে একটি বালিকা তা যেন ভাবছিলেন না। মুখ চোখে যে আন্তরিকতা তা আশাকে নিজের সম্বন্ধে নতুন করে ভাবাল। কেউ তাকে বড়দের মতো সম্মান দিচ্ছে এ অভিজ্ঞতা তার প্রথম। অতএব মানুষটির কথাবার্তা সে না বুঝলেও ভাল লাগল। শিক্ষক তাকে ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সে বসেছিল বাবু হয়ে। মাথা নিচু করে। হঠাৎ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষক বললেন, মুখ তুলে তাকাও। হ্যাঁ। কী নাচ শিখতে চাও তুমি? কথাকলি না ভরতনাট্যম?

মা বললেন, ভরতনাট্যম।

হঠাৎ ওকে নাচ শেখাতে এনেছেন কেন?

আসলে ও খুব অসুখে ভোগে। ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছে না। আমাকে বলল নাচ শিখলে–

কি? শিক্ষক চেঁচিয়ে উঠলেন, আমি ব্যায়াম করিয়ে আপনার মেয়ের শরীর সারাব? মোটেই নয়। নিয়ে যান ওকে কোনো ব্যায়ামাগারে। এটা নাচ শেখার জায়গা।

মা খুব অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। কথাটা ঠিকঠাক বলা হয়নি বুঝতে পেরে অনুনয় করতে লাগলেন। শিক্ষকের মত পরিবর্তনের জন্যে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষক রাজি হলেন। কিন্তু তারপর থেকে যে শিক্ষা শুরু হল তার বিবরণ বাড়িতে দিতে অসুবিধে হত। বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। আর শিক্ষক তাকে ভরতনাট্যমের ইতিহাস বলতেন। আগে মনের মধ্যে নাচটাকে নিতে হবে তারপর শরীরে ফোটাতে হবে অভিব্যক্তি। কী করতে যাচ্ছ সেটাই যদি না জানো তাহলে করাটা অন্ধ অনুকরণের বাইরে যাবে না কোনদিন। মা জিজ্ঞাসা করতেন, কেমন নাচ শিখছিস একটু দেখা! কিন্তু সেটাই হতো না। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগত। কিন্তু এক সময় জড়িয়ে গেল সে।

ভরতনাট্যম হল একমাত্র ভারতীয় নৃত্য, যা বহুযুগ ধরে অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে। নাট্য শাস্ত্রানুযায়ী এই শিল্পের তিনটি ভাগ, নৃত্ত, নৃত্য এবং নাট্য। নৃত্ত যে অংশে অঙ্গবিক্ষেপ তা পরিমণ্ডল সাজানোর কাজেই লাগে, কোনো মানে তৈরি করে না। কিন্তু নৃত্ত হল শুদ্ধ নাচের মূলস্তম্ভ। আর নৃত্য হল অর্থবহ। হাতের বিভিন্ন মুদ্রায়, মুখের অভিব্যক্তি, মূকাভিনয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন শিল্পী। নাট্যে, কখনও চলতি কথার সাহায্যে, অভিব্যক্তি ও অভিনয়ের মাধ্যমে, শরীর সঞ্চালনে একটি নাটকীয় জগত সৃষ্টি করেন শিল্পী। কিন্তু সরলীকরণের সূত্রে ভরতনাট্যমের প্রকাশ এখন দুটো খাতে। নৃত্য আর অভিনয়। ভারতীয় নৃত্যকলায় মানুষের শরীর নিয়ে নানান পরীক্ষা হয়েছে। শরীরের ওজন এবং তার ব্যালেন্স স্থির রাখার চিন্তা মাথায় রেখেই নৃত্যের উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিশেষ করে মাধ্যাকর্ষণ থিওরির যথার্থ প্রয়োগ নাচের বিভিন্ন ভঙ্গিতে পরিষ্কার বোঝা যায়। কখনও কখনও অঙ্কের হিসেবে নাচের কম্পোজিশন তৈরি বলে মনে হবে।

নাচ শুরু হবে সমাপদ অবস্থা থেকে। নাচের এটাই প্রথম অবস্থা যেখানে পা সামনের দিকে থাকবে। নাচিয়ের শরীর সহজ ভঙ্গিতে থাকবে। খুব সচকিত অথবা অলস নয়। এরপর দুটো পা দুপাশে নিয়ে যাওয়ার অবস্থাকে বলে কলাই তিরুপুডাল। অর্ধমণ্ডলী আসছে এর পরে। এখানে শুধু পা-ই নয়, হাঁটুও দুপাশে নামিয়ে আনতে হবে।

শিক্ষক প্রথম অনুশীলন শুরু করালেন এই অবস্থায়, সমাপদ থেকে অর্ধমণ্ডলী। পায়ে জড়তা এবং কোমরে অস্বস্তি। বারংবার সে বিফল হচ্ছিল। শিক্ষক মাথা নাড়লেন, না, যতক্ষণ তুমি অর্ধমণ্ডলীতে পৌঁছাতে না পারছ, ততক্ষণ আমি আর একটা কথাও বলছি না, পুরো ব্যাপারটা আবার দেখে নাও। প্রথমে পা দুপাশে নিয়ে যাবে, হাঁটু বেঁকিয়ে আনবে এবং হাত হয় দুপাশে ছড়িয়ে দেবে। অথবা কোমরে শক্ত করে রাখবে। জ্যমিতি বোঝো? একদম জ্যামিতিক নিয়মে এই ভঙ্গি অনেকটা ত্রিকোণ সৃষ্টি করবে। তোমার কাঁধের রেখা একটা ত্রিকোণের জন্ম দেবে, আবার কোমর থেকে পায়ের বিস্তার থাই এবং পায়ের গুলির মাধ্যমে ত্রিকোণকে দৃশ্যমান করবে। মাটিতে পায়ের অবস্থান সঠিক রাখা খুব জরুরি। দুটো পা এমনভাবে জমি স্পর্শ করবে যাতে শরীরের ওজন ঠিকঠাক বিভক্ত হয়। পায়ের পাতা মাটিতে সমানভাবে রাখার নাম টাট্টু। দ্বিতীয় পর্যায়ে শুধু পায়ের আঙুলের ওপর শরীরের ওজন রেখে গোড়ালি উঁচু করতে হবে। তৃতীয় পর্যায়ে শরীরের ভার থাকবে গোড়ালির ওপর আর আঙুল উঠে আসবে ওপরে। অর্ধমণ্ডলী অবস্থায় এই তিন পর্যায়ে পায়ের সঞ্চালন। এর পরে দুটো পায়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে একই ভঙ্গির বিনিময় ঘটবে।

এখন ভাবতে অবাক লাগে অর্ধমণ্ডলী অবস্থায় স্বচ্ছন্দ হতে সেই রুগণা বালিকার তিন সপ্তাহ লেগেছিল। নাচের প্রথম নিবেদনের নাম যে আলারিপ্পু তাই জানতে কতদিন লেগে গিয়েছিল। ঈশ্বরকে অভিজ্ঞান এবং দর্শকদের অভিনন্দন জানানোর জন্যেই আলারিপ্পু চিহ্নিত। এটি ভরতনাট্যম নাচের স্বল্পমেয়াদী পর্যায়। নৃত্য শিল্পীর কাছে এই পর্যায় শরীর গরম করে নেওয়ার সুযোগ এবং দর্শকরা সুযোগ পান শিল্পীর কলাকৌশলের একটা প্রাথমিক আন্দাজ তৈরি করার। আলারিপ্পুর অর্থ হল কুঁড়ির প্রস্ফুটন। হাত, চোখ, ঘাড় এবং শরীরের পাঁজরার সঞ্চালনে ভূমিতে নামার আগে ভূমিকার কাজ করে।

আশার দিনগুলো খুব আনন্দে কাটত যদি শিক্ষকটি সুস্থির হতেন। মানুষটি সব সময় একই মেজাজে থাকতেন না। একদিন তিনি ডুবে যেতেন শিক্ষকতায় অন্যদিন বিনা কারণে আশাকে ফিরিয়ে দিতেন। ফলে শিক্ষার ধরাবাহিকতায় প্রায়ই বিঘ্ন ঘটত। মন ভাল থাকলে তিনি বলতেন, নাচ হল ঈশ্বরের আরাধনায় মানুষের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এই পূজার জন্যে আগে নিজেকে তৈরি করতে হয়। সাধারণ মানুষ যা পারে না তা অর্জন করতে একজন শিল্পীকে দীর্ঘদিন অনুশীলন করতে হয়। কিন্তু এই জ্ঞান অন্য কোনো উদ্দেশ্যের জন্যে আহরণ করা পাপ। তুমি যা শিখবে তা কখনই বসন্তের কোকিল যারা, তাদের শেখাবে না। এই কথাগুলো আশা কোনোদিন ভুলতে পারেননি।

ভরতনাট্যম নাচের ইতিহাস এবং তার গঠন নিয়ে মোটামুটি খবর জানা এবং শরীরের প্রাথমিক চর্চা আশাকে আরও বেশি উৎসাহী করে তুলল। যিনি মনে করেছিলেন যে আশা নাচ শিখলে তার শরীরে পরিবর্তন হবে তিনি খুশি হলেন। কিন্তু আশা বুঝতে পারছিল না যে তার সামনে আর কিছু নেই। তার পাগল শিক্ষককে সব সময় পাওয়া যায় না। গেলেও যে মানুষ তিন-চার রকম নাচের জগতে এক সঙ্গে প্রবেশ করেন তার দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত থাকে। এক সকালে ঘুম থেকে উঠেই আশা বাইরের বারান্দায় শিক্ষকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। সে কৌতূহলী হয়ে বাইরের ঘরে ছুটে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল শিক্ষক এবং তার কাকা মুখোমুখি বসে আছেন চেয়ারে। মা দাঁড়িয়ে আছেন সামান্য দুরে। বাইরে তখন সূর্যদেব উঠেছেন কী ওঠেননি। কিন্তু পৃথিবীতে একটা হালকা আলো নেমেছে।

শিক্ষক বললেন, আমার মনে হচ্ছে এই কথাগুলো আপনাদের বলা উচিত। এখানে এসে মনে হল আসবার সময়টা ঠিক নির্বাচন করিনি। মুশকিল হল আমি নিজের জীবনের ক্ষেত্রে বারংবার একই ভুল করে গেছি বলেই তার দাম মিটিয়ে যাচ্ছি।

কাকা গম্ভীর গলায় বললেন, আমাদের কোনো অসুবিধে হয়নি। ভোরবেলায় ওঠায় আমরা অভ্যস্ত। শিক্ষক মাথা নাড়লেন খুশিতে, বাঃ। মন ভাল হল। আপনাদের মেয়েকে প্রথম দেখে মনে হয়েছিল নাচের পরিশ্রম সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু এমন জেদী এবং আগ্রহী মেয়ে এর আগে আমি দেখিনি। ওর সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে। আমার চিনতে ভুল হয়নি। এই মেয়ে যদি নাচ শেখার সুযোগ পায় তাহলে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। আমার পক্ষে হয়তো আরও কিছুদিন ওকে শেখানো সম্ভব। কিন্তু আমি চাই ও এই নরম অবস্থাতেই সঠিক গুরুর সঙ্গ লাভ করুক। এই অনুরোধ জানাতেই এখানে আমার আসা।

কাকা মায়ের দিকে তাকালো। মা নিচু স্বরে বললেন, কিন্তু গাঁয়ে সেই রকম মানুষ–।

আহা! আমাদের গ্রামটাই কি পৃথিবী! দক্ষিণ ভারতে অনেক গুণী সাধক আছেন। শিক্ষক বললেন, আপনারা রাজি থাকলে তাঁদের কারো সঙ্গে আমি যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।

কাকা মাথা নাড়লেন, আপনি একটা কথা বুঝতে ভুল করছেন। ছোট মেয়ে গ্রামের শিক্ষকের কাছে নাচ শিখল, সেটা এক ব্যাপার। আর কিছু দিন পরে ভাল পাত্র খুঁজে ওকে বিয়ে দিতে হবে। ওর বাবা নেই, কর্তব্য আমারই। এই অবস্থায় গ্রামের বাইরে গিয়ে নাচ শিখে কী লাভ হবে!

শিক্ষক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। সেই দৃষ্টির সামনে কাকাও যেন সংকুচিত হলেন। শিক্ষক বললেন, এসব কথা তো আমাকে আগে বলেননি। আর যে পাঁচটা মেয়ে বিয়ের জন্যে আমার কাছে নাচ শিখতে আসে আশা যদি তাদের দলে বলে জানতাম তাহলে এই ভোরে আপনাদের বিরক্ত করতাম না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে তিনি। মা তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, আপনি কি আর ওকে নাচ শেখাবেন না?

না। যে মেয়েকে নিয়ে আপনি আমার কাছে গিয়েছিলেন তার চেহারা কীরকম ছিল? ওষুধ খাইয়ে যাকে সুস্থ করতে পারেননি তার বিয়ে কী করে দিতেন আপনারা? বাড়িতে রুগণা অসুস্থ হয়ে যদি বাকি জীবন পড়ে থাকত তাহলে খুশি হতেন? না, আর আমার প্রয়োজন নেই। শিক্ষক আর দাঁড়াননি। হনহনিয়ে গেট খুলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আর দরজার আড়ালে আশার ছোট্ট শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। পায়ের তলায় ভূমিকম্প শুরু হল যেন। এবং তার পরেই আশার শরীরটা মাটিতে পড়ল সম্বিত হারিয়ে। শব্দটা শুনে ছুটে এলেন আশার মা, কাকা।

দুদিন ধরে অঝোরে চোখের জল পড়া আর বুকের খাঁচায় যন্ত্রণা দেখার পর কাকা যে কখন গেছেন শিক্ষকের কাছে তা তার জানা নেই। হঠাৎ ঘরে সেই মানুষটার আবির্ভাব হল। তাদের মতো ব্রাহ্মণ পরিবারে বাইরের লোককে সচরাচর অন্তঃপুরে আনা হত না। বিছানার পাশে এসে তিনি দুই হাতে আশার ছোট্ট গাল স্পর্শ করলেন। তারপর বললেন, তুমি এত বোকা মেয়ে কেন? আমি তো ভাবতেই পারছি না। সব সময় বলেছি বুকের ভেতরে যে মন আছে তাকে শক্ত করবে। ওঠো, উঠে বসো। একজন শিল্পী কখনও চোখের জল ফেলে না। সে রক্ত দিয়ে জল পড়ার কারণটাকে জয় করে। কী হল, উঠে বোসো! সেই ধমক খেয়ে উঠে বসল আশা কাঁপতে কাঁপতে। তার শরীর পারছিল না। কিন্তু ওই স্পর্শ, ওই শব্দগুলো যেন শারীরিক দৌর্বল্যকে উপেক্ষা করতে সাহায্য করল। শিক্ষক বললেন, তৈরি হও, তোমাকে কেরালায় যেতে হবে।

তখনও শরীরে যৌবন আসেনি। নারীত্বের কোনো চিহ্ন ফুটে ওঠেনি আশার শরীরে। কৈশোরের ক্রমাগত অসুস্থতা তার শরীরকে এমন কাহিল করে তুলেছিল যে বয়সের তুলনায় তাকে বেশ ছোটই দেখাত। সেই মেয়ে মায়ের স্পর্শ ছাড়া অন্য কিছুর অভাব বোধ করেনি যখন কাকার সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে রওনা হল। শিক্ষক কারো অনুরোধ ছাড়াই তাদের সঙ্গী হলেন। মহাকবি ভি এম মেনন শোরানপুরে কথাকলি নৃত্যনাট্যের যে কলামণ্ডলম তৈরি করেছিলেন শিক্ষক সেখানেই আশাকে প্রথমে নিয়ে গেলেন। প্রথমবার বাড়ির বাইরে পা দিয়ে, অচেনা মানুষের মধ্যে এসে আশা নিজের মতো করে কিছুই ভাবতে পারছিল না। সব কিছুই তার কাছে এমন নতুন ও চমক নিয়ে উপস্থিত হচ্ছিল যে সে তাতেই বুঁদ হয়ে ছিল। প্রচুর মন্দিরের শহর। চারপাশ ছোট পাহাড়ে ঘেরা।

কলামণ্ডলমের প্রধানাধ্যক্ষ তাকে দেখলেন। একটি শীর্ণা মেয়ে, যার শরীরে কোনো পরিশ্রম সহ্য করার শক্তি আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, তার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে বললেন, তোমাকে এখানে আনা হয়েছে কেন? তুমি কি নাচ জানো?

আশা অসহায় চোখে শিক্ষকের দিকে তাকাল। তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁকে নীরব থাকতে অনুরোধ করলেন প্রধানাধ্যক্ষ। দ্বিতীয়বার প্রশ্নের পর আশা মাথা নাড়ল, না। প্রধানাধ্যক্ষের মুখে হাসি ফুটল, তাহলে? কিছুই কি জানো না?

আমি ইতিহাস জানি আর জানি কীভাবে শুরু করতে হয়!

কীসের ইতিহাস? কীসের শুরু?

ভরতনাট্যমের। আশা ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিয়েছিল।

দেখা যাক। যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই দেখাও কী জানো।

আশা স্থির মনে আলারিপ্পু পরিবেশন করল। প্রধানাধ্যক্ষের মুখে হাসি ফুটে উঠল আবার, যে শুরুটা জানে তার শেষ জানতে চাওয়ার নিশ্চয়ই অধিকার আছে। তবে সব সময় মনে রেখো শিল্পের কোনো শেষ নেই। কোথাও শিল্প থেমে থাকে না।

কিন্তু কলামণ্ডলম অথবা অ্যাকাডেমি অফ আর্টসের অধ্যাপক মেনন প্রচণ্ড আপত্তি জানালেন আশার ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে। কলামণ্ডলমে কোনো ছাত্রী নেই। আসলে মেয়েদের পক্ষে এত পরিশ্রম সহ্য করা সম্ভব নয় জেনেই কখনই তাদের ভর্তি করা হয় না। যদিও কোনো লিখিত আইন নেই কিন্তু প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে যাওয়া মেননসাহেবের অভিপ্রেত নয়। তাছাড়া তার ধারণায় কথাকলি নাচ পুরুষশিল্পীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রতিদিন রাত আড়াইটের সময় শিল্পীরা অনুশীলন শুরু করেন। চোখের বিভিন্ন ভঙ্গির অনুশীলন দিয়ে যার শুরু, তার শেষ বারো ঘন্টা পরে। এই কঠোর শ্রম পুরুষেরাই শুধু সহ্য করতে পারে বলে মেয়েদের ভর্তি করা হয় না।

প্রধানাধ্যক্ষ মেননের সঙ্গে একমত হলেন, হ্যাঁ, ওই পরিশ্রম এইটুকু মেয়ে সহ্য করতে পারবে না। হঠাৎ আশা বলে উঠল, পারব। আমি পারব।

অনেক আলোচনার পর স্থির হল আশাকে সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে না পারে তাহলে ভবিষ্যতে যে সব ছাত্রী এখানে ভর্তি হতে চাইবে তাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে রাখার সুবিধে হবে। অধ্যাপক মেনন বললেন, তুমি ভেব না মেয়ে বলে তোমাকে বিশেষ সুবিধে দেওয়া হবে। এতগুলো শাসানি মাথায় নিয়ে আশা কলামণ্ডলমের ছাত্রী হল।

কথাকলি ভরতনাট্যমের মতো একক নৃত্য নয়। কত্থকের মতো রাজ দরবারের নৃত্য নয় অথবা মণিপুরী নৃত্যের কাব্যধর্মিতা এতে নেই। কথাকলির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নাট্যধর্মিতা। রূপকথা বা উপকথার জগত থেকে দেবতা, দৈত্য বা আত্মারা জমজমাট পোশাকে নেমে এসে কথাকলি নাচে, একটি নাটকীয় পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে। কথাকলি নৃত্যে নাচিয়ের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অংশগ্রহণ করে। অন্য কোনো ভারতীয় নৃত্যে হাড় এবং পেশীর এমন ব্যবহার হয় না। পেশী, বিশেষ করে মুখের পেশীর সঞ্চালন অনুশীলন পর্বে প্রধান ভূমিকা নিয়ে থাকে। আশার ছোট্ট শরীরের পক্ষে এই পরিশ্রম খুব কষ্টকর। কিন্তু তবু সে মুখ বুজে সহ্য করছিল। প্রায় দুবছর ধরে সে প্রতিটি অনুশাসন মেনেছে। এমনকী মেনন সাহেবের মতো কড়া অধ্যাপকও স্বীকার করেছেন যে এই মেয়েটি ব্যতিক্রম।

কিন্তু কথাকলির মধ্যে ডুবে গিয়ে আশা আবিষ্কার করল তার মন ভরছে না। এই সময়ের মধ্যে সেই কিশোরীর মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। পরিশ্রম করার ক্ষমতা, জেদ এবং নিজেকে যাচাই করে বোঝার শক্তি তাকে ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। এই সময় কাকা এলেন তাকে দেখতে। এবং তখনই সে মনের কথা জানাল। এখানে তার মন ভরছে না, কলামণ্ডলম বা কথাকলির জগৎ তার জন্যে নয় বলে বিশ্বাস হচ্ছে। একজন গুরু চাই যিনি তাকে সঠিক পথে পৌঁছে দিতে পারবেন। কাকা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন যে এইখানেই তার থাকা উচিত। কী অসুবিধে হচ্ছে জানালে তিনি তার প্রতিবিধান করতে পারেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার কী মনে হচ্ছে এত পরিশ্রম সহ্য করতে পারছ না?

সে উত্তর দিয়েছিল, না। তার উল্টো। আমার মনের পরিশ্রম হচ্ছে না।

এইরকম ভাষায় কথা বলতে পারে আশা তা ধারণাতেই ছিল না। কাকা বুঝলেন ব্যাপারটা আর সাধারণ পর্যায়ে নেই। এতদিন যে ছিল পাহাড়ের ঘেরের মধ্যে আটকে থাকা ছোট্ট পুকুর, সেই এখন মুখ খুঁজে নিয়ে ঝরনায় রূপান্তরিত হয়ে নদী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এখন আর অন্য কোনো পথ নেই। অনিচ্ছা থাকলেও তার কর্তব্য হচ্ছে একে সঠিক পথে চালিত করা।

প্রধানাধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করলেন তিনি। পরিষ্কার বললেন তার নিজের তেমন কোনো ধারণা নেই। কিন্তু মেয়ে কথাকলি নাচের গণ্ডিতে আটকে থাকতে চাইছে না। সে আরও বড় জায়গায় পৌঁছাতে চাইছে। এক্ষেত্রে তাঁর কী করা উচিত। প্রধানাধ্যক্ষ প্রথমে বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। কথাকলি নৃত্যনাট্যের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে তিনি কখনই বরদাস্ত করতে পারেন না সেই ছাত্রীকে, যে এতে সন্তুষ্ট নয়। পরিচিত পৌরাণিক গল্প, অভ্যস্ত সঙ্গীত, প্রতীকধর্মী মেকআপ, স্টাইলাইজড পোশাক কথাকলি নৃত্যনাট্যের দর্শককে একটা আকাঙ্ক্ষিত জগতে সহজেই নিয়ে যেতে পারে। একমাত্র কথাকলি নৃত্যনাট্যেই সেই প্রাচীন ঐতিহ্য এখনও রয়েছে, যেখানে নাট্যগুণ রসসৃষ্টিতে সক্ষম। এই নৈপুণ্য অন্য ভারতীয় নাট্যশালায় প্রায় লোপ পেতে বসেছে। প্রধানাধ্যক্ষ আশাকে ডেকে পাঠালেন।

ঘরে ঢুকে আশা গুরুজনদের প্রণাম সেরে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। প্রধানাধ্যক্ষ মেয়েটিকে ভাল করে লক্ষ্য করলেন। তার হঠাৎ খেয়াল হল কোনো শিক্ষকই আশা সম্পর্কে কখনও অভিযোগ করেনি বরং তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং গ্রহণ করার জন্যে উৎসাহ দেখে সবাই প্রশংসাই করেছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,

তোমার এখানে ভাল লাগছে না?

মাথা নিচু করেই আশা জবাব দিল, ভাল লাগছে।

তাহলে এখান থেকে চলে যেতে চাইছ কেন?

আমার তো মায়ের কাছে থাকতে খুব ভাল লাগত। তবু তো এত দূরে এসেছিলাম।

প্রধানাধ্যক্ষ কথাগুলো শুনে অবাক হলেন। এমন ইঙ্গিতে রূঢ় কথা সরল গলায় যে জানিয়ে দিতে পারে সে সহজ মেয়ে নয়। তিনি আর শাসনের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবু খানিকটা পরীক্ষা করার গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, কথাকলির প্রাথমিক পাঠ তোমার নেওয়া হয়ে গিয়েছে। তোমার কি মনে হচ্ছে এখানে আর কিছু শেখার নেই?

আমার একথা বলার মতো স্পর্ধা যেন কখনও না হয়। কিন্তু আমি একক নৃত্যের মাধ্যমে নিজের কথা বলতে চাই।

কেন? পৌরাণিক চরিত্ররা কী আমাদের কথাই বলে না? দলগত অভিনয়ের মাধ্যমে সেই জীবন কী স্পষ্ট হয় না?

আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর, হ্যাঁ, বলে। কিন্তু তাদের দশটা কথার একটা কথা আমার। যে পাখি খোলা আকাশে উড়তে চায় তার কী বড় খাঁচায় ডানা মেলতে ভাল লাগে? আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দলগত অভিনয় দর্শকের কাছে অর্থবহ এবং দৃষ্টিনন্দন। তাতে নাট্যরস বেড়ে যায়। কিন্তু আমি একজন অভিনেত্রী হিসেবে অন্যের জীবন পরিস্ফুট করে যাচ্ছি। কিন্তু সেই সুখটা তো নকল সুখ।

প্রধানাধ্যক্ষ আচমকা প্রশ্ন করলেন, তুমি কি ভরতনাট্যম শিখতে চাও?

এবার চোখ তুলল আশা, আপনারা যদি সুযোগ করে দেন।

প্রধানাধ্যক্ষ হাসলেন, বেশ। তোমার ইচ্ছেই পূর্ণ হোক। যে অধ্যবসায় এবং মানসিকতা তোমার লক্ষ্য করছি তাতে এইটুকু বলতে পারি সাধনা থেকে যদি তুমি ভ্রষ্ট না হও তাহলে একদিন তুমি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পীর স্বীকৃতি পাবে। এখন তুমি যাও, আমি তোমার অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করব।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচারিত হয়ে গেল আশা কথাকলি নৃত্যনাট্যে আর আগ্রহী নয়। কারণ সে মনে করে কথাকলি তাকে তেমন কিছু দিতে পারছে না। ফলে এই নিয়ে রসিকতা যা রীতিমতো আক্রমণের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হল। ছাত্ররা তাদের একমাত্র সহ-শিক্ষার্থিনীকে হারাবার আশঙ্কায় বিমর্ষ এবং ক্রুদ্ধ হল। শেষের দলটিকে ইন্ধন জোগালেন সেই সব শিক্ষক, যাঁরা কথাকলিকেই শ্রেষ্ঠ নৃত্য মনে করেন। এখনও এই বয়সে পৌঁছে কোনো কোনো সাংবাদিক অতীতের সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে মাঝে মাঝে প্রশ্ন তোলেন। কথাকলিকে তুচ্ছ করার মতো দুঃসাহস এবং হীনমানসিকতা তার কোনোকালেই ছিল না একথা আর কতবার বলবেন তিনি। সবাই সব কিছুর জন্যে তৈরি হয় না। নদীর মতো তাকে নিজের খাত খুঁজে নিতে হয়। সেই খোঁজার চেষ্টাই সেই সময় বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন সবাই। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে আবার তালিম নিয়ে তিনি কথাকলি নৃত্যনাট্যে অংশ নেবেন। অন্তত ওই নাচের প্রতি তিনি যে অশ্রদ্ধা পোষণ করেন না, এতে প্রমাণিত হবে। কিন্তু এখন যেভাবে সময় নিয়ন্ত্রিত, তাতে বাড়তি সময় বের করা সম্ভব নয়।

প্রধানাধ্যক্ষের পরামর্শে কাকা দুদিন পরে তাকে নিয়ে যাত্রা করলেন। যাত্রা করার সময় কয়েকজন বন্ধু তাকে বিদায় জানাতে এসেছিল, তাদের মধ্যে একজন, শ্রীনিবাসন, কেঁদেই ফেলেছিল সবার সামনে। তখন তাদের বয়স পনেরো ছোঁয়নি। কিন্তু শ্রীনিবাসন যে অমন করবে সে ভাবেনি। কিন্তু আশার চোখে জল আসেনি। এই ব্যাপারটা নিয়ে পরে অনেক ভেবেছে। যখনই কোনো নতুন সাধনার উদ্দেশ্যে আগের মাটি থেকে শেকড় তুলতে হয়েছে তখন কোনো পিছুটান অনুভব করেনি সে। সব সময় তার আগামীদিনের আকাঙ্ক্ষা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রধানাধ্যক্ষের সঙ্গে কাকার কী কথা হয়েছিল আশা জানে না কিন্তু যেতে যেতে তিনি তাকে। বলেছিলেন, মনে রাখবে তুমি একটি তীর্থক্ষেত্রে যাচ্ছ। একজন তীর্থযাত্রীর সঙ্গে তোমার কোনো পার্থক্য নেই। তীর্থযাত্রী যেমন তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছে জাগতিক সুখের সন্ধান করে না, তার লক্ষ্য থাকে ঈশ্বরের আশীর্বাদে ধন্য হওয়া তেমনি তুমিও সেইমত আচরণ করবে। হয়তো প্রধানাধ্যক্ষ কাকাকে বলেছিলেন তার মন প্রস্তুত করে দিতে। এসব বলার পরেও কাকা নিচু স্বরে বলেছিলেন, তবে আমার মনে হয় এত কষ্টের মধ্যে না গিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভাল। তোমার মায়ের তো তুমি ছাড়া কেউ নেই। ঈশ্বরের আশীর্বাদে যখন এই দুই বছরে অসুখবিসুখ আর ফিরে আসেনি তখন সংসারধর্ম করার ব্যাপারে অসুবিধে হবেনা। আশা অন্যদিকে তাকিয়েছিল, কথা শেষ হতে সে নিজের অজান্তেই এমনভাবে কাকার দিকে মুখ ফিরিয়েছিল যে তিনি আর প্রসঙ্গ টানতে চাননি। এই মানুষটিকে তার এক সময় খুব কড়া প্রকৃতির বলে মনে হত। কিন্তু যত তার সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে লাগল তত মনে হচ্ছিল মানুষটির চারপাশের দেওয়ালগুলো একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে।

সারারাত জেগে ওরা যখন পাণ্ডানুল্লুর গ্রামে পৌঁছেছিল তখন সবে ভোর হয়েছে। তবু প্রচণ্ড উত্তেজনায় আশার শরীরে এক ফোঁটা ক্লান্তি নেই। তখনও গ্রামের মানুষের ঘুম ভাল করে ভাঙেনি। শক্ত মাটির পথ দিয়ে ওর হেঁটে আসছিল আধফোঁটা রোদ্দুরে। সেই সাতসকালে এক প্রৌঢ় তার কাজে যাচ্ছিলেন, কাকা নাম বলতেই তিনি নিজের কাজ ছেড়ে দিয়ে ওদের পথ দেখাতে দেখাতে নিয়ে এলেন একটি ছোট্ট ঘরের সামনে। দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। ঘরটিকে কুঁড়েঘর বললে ঠিক বলা হবে। দরজা বন্ধ।

ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে দরজার গায়ে। কাকা তাকেই ইশারা করলেন দরজায় আঘাত করতে। সেই বন্ধ দরজায় শীর্ণা মেয়েটি মৃদু আঘাত করল। কোনো শব্দ এল না ভেতর থেকে। আশা কী করবে বুঝতে না পেরে কাকার দিকে তাকাল। কাকা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন মুখে। আশা আবার দরজার দিকে ফিরল। এমন কিছু মজবুত নয়। সে এবার শব্দ করল বেশ জোরে। এই ঘরের ভেতরে যিনি আছেন তিনি ভরতনাট্যম নাচকে নিজের মধ্যে যেভাবে সঞ্চয় করেছেন সেভাবে আর কেউ এই মুহূর্তে পারেননি। সেই তাঞ্জোর রাজাদের সময় থেকে এই শাস্ত্রে যেসব পণ্ডিত পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন ইনি তাদের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী। এসব কাকা তাকে বলেছেন আসবার সময়।

দরজা খুলল। ঘরের অন্ধকারে বাইরের আলো ছড়িয়ে পড়তেই বৃদ্ধ দেখা দিলেন। প্রথমে বিস্ময়, তারপর শীর্ণ মেয়েটিকে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আশা দেখল তার সামনে যে কালো জীর্ণ শরীর এসে দাঁড়িয়েছে তার লজ্জা নিবারণ হয়েছে একটি লেংটির মাধ্যমে, মুখে অজস্র বলিরেখা এবং একটি চোখ অন্ধ। কোনো পরিচয় জিজ্ঞাসা না করে বৃদ্ধ বললেন, এসো, ভেতরে এসে বসো তোমরা। কথাগুলো বলেই তিনি চোখের আড়ালে চলে গেলেন।

দৃশ্যটি আশাকে বাকরহিত করে তুলেছিল। তার সমস্ত চেতনা এক সঙ্গে জানান দিয়েছিল যে সে প্রকৃত গুরুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে গেল। এই সময় কাকা পেছন থেকে এগিয়ে বসে তার পিঠে হাত রাখলেন, চলো। আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি।

ঘরের ভেতরে ঢুকে একটা চওড়া মাদুর দেখতে পেল ওরা। প্রায় সমস্ত ঘর জুড়ে সেটি পাতা। পাশেই আর একটা দরজা। বোধহয় সেখানেই তিনি শুয়েছিলেন। কাকা বসলেন মাদুরের ওপর। সে দাঁড়িয়ে দেখল ঘরের এক পাশে মৃদঙ্গ রয়েছে। আর কোনো আসবাব নেই এখানে। খানিকবাদে তিনি আবার বেরিয়ে এলেন পাশের ঘর থেকে। এবার তাঁর কোমর থেকে সাদা কাপড় জড়ানো। খানিকটা ভদ্র হবার চেষ্টা আর কী। তিনি এসে দাঁড়ানো মাত্র আশা এগিয়ে গিয়ে তার দুই পা স্পর্শ করে বসে পড়ল। এক মুহূর্ত পরে মাথার ঠিক মাঝখানে হাতের স্পর্শ পেল সে। এটা সেই ধরনের স্পর্শ যার মাধ্যমে আশীর্বাদ অনুভব করা যায়। তারপর প্রশ্ন করলেন, ইনি আপনার মেয়ে?

কাকা নমস্কার করলেন অর্ধনত হয়ে, আজ্ঞে না, আমার দাদার মেয়ে। দাদা নেই।

ওহো। একটা বিষাদের স্বর ফুটে উঠল গলায়। একটু সময় নিলেন এবং সেই সময় বোঝা গেল তার কথা বলার ভঙ্গি স্বাভাবিক নয়। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কোত্থেকে আসছেন আপনারা?

কাকা তাঁকে সব কথা খুলে বললেন। তিনি তার ভাল চোখটি বন্ধ করে সব শুনলেন। তারপর আশার দিকে তাকালেন, দু’বছর শিক্ষা নেওয়ার পর তোমার মতি পাল্টালো। কিন্তু তুমি কী শিখেছ তা তো আমাকে দেখাতে হবে মা।

প্রায় এক ঘন্টা পরে তিনি ইঙ্গিত করলেন আশাকে মাদুরের ওপর বসতে। কোনো যন্ত্র নেই, সঙ্গীতের সহযোগিতা নেই, নিজের মুখে শব্দ উচ্চারণ করে শরীর সঞ্চালন করতে করতে আশার মনে আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হচ্ছিল, সে কিছুতেই ফিরে যাবে না। বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, এবার তুমি বলো ঠিক কী চাও তুমি? কত কষ্ট সহ্য করতে পারবে?

আপনি যা আদেশ করবেন, সে তড়িঘড়ি বলে উঠল, আমি আজ থেকে আপনার কাছে শিখতে চাই।

তিনি হেসে মাথা নাড়লেন, তা সম্ভব নয়।

কেন? প্রায় আর্তনাদ করে উঠল আশা।

নিজের জীর্ণ বুকের খাঁচার ওপর হাত রাখলেন তিনি, এই শরীর বাদ সেধেছে। নিঃশ্বাসের কষ্ট হয়। বিশেষ করে বছরের এই সময়। শরীরও আর আগের মতো মনের কথা শোনে না। সেই কারণেই নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের আমি শিক্ষা দিতে পারি না।

হঠাৎ সোজা হয়ে বসল আশা, কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে ফিরে যাব না।

সেই এক চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, তুমি খুব জেদী, না?

আশা মাথা নিচু করল। এর জবাবে কী বলতে পারে সে। হঠাৎ তার কানে গেল, তেই ইয়া তেই ইয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আশা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু’বার ডান পা মাটিতে ঠুকল। ডান, ডান, বাঁ, বাঁ বা ডান।

এই প্রথম পর্যায়ে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ ছেলেমানুষের খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। ইশারায় তিনি কাছে ডাকলেন। আশা কম্পিত পায়ে সামনে এসে দাঁড়াতেই মুখ দুলিয়ে বসতে বললেন। আশা পা মুড়ে বসতেই তার এক চোখ দীর্ঘক্ষণ তার চোখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর হঠাৎই প্রশ্নটা ছিটকে এল, তুই পারবি? সমস্ত শরীর নড়ে উঠল আশার, চোখের পলক না ফেলে বলল, পারব।

পাণ্ডানুল্লুর গ্রামটি খুব বড় নয়। কিন্তু এ গ্রামের মানুষেরা তাদের জীবনযাত্রার মধ্যে সঙ্গীত এবং নৃত্যকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছেন যে আশার দিনগুলো চমৎকার কেটে যাচ্ছিল। যতক্ষণ আবহাওয়ার পরিবর্তন না ঘটছে ততক্ষণ গুরুদেব সক্রিয়ভাবে তাকে শিক্ষা দেবেন না। তার শরীর সেটা দিতে তাকে সাহায্য করবে না। প্রথমে কথাটা শোনার পর মন ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। অপেক্ষা করার ধৈর্য তার ছিল না। প্রতিদিন গুরুদেবের সামনে বসে কথা শুনতে হবে অথচ নাচ শিখতে পারবে না এ কেমন কথা।

কিন্তু দিন গড়াতে আশা ধৈর্য ধরতে শিখল। কাকা চলে গেছেন সেইদিনই। যাওয়ার আগে তার এখানে থাকার ব্যবস্থা করে গেছেন গুরুদেবের ছেলের সঙ্গে কথা বলে। গুরুদেব এই বাড়িতে থাকেন একা। কিন্তু পাশেই তাঁর পরিবারের লোকজনেরা থাকেন। গুরুদেবের তিন ছেলে এবং অনেক নাতি নাতনি। ছেলেরাও ভাল নাচেন কিন্তু নাচ নিয়ে সর্বক্ষণ থাকেন না। পিতার প্রতিভা তাঁরা পাননি কিন্তু পিতার প্রতি শ্রদ্ধায় সব সময় নিবেদিত প্রাণ। গুরুদেবের নাতি নানা পিল্লাই কিন্তু নাচ নিয়ে আদৌ মাথা ঘামাত না। ওই ঘরে ঢুকে শরীর সঞ্চালনের বদলে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, টিলায় ওঠা, নদীর জলে ডুব দিতে তার বেশি ভাল লাগত। আর এই কারণে নাচের ঘরে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তাতে তার কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হত না। সে থাকত নিজের মনে। আশা তারই সমবয়সী। ফলে আশার সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করত। সেটা এমন একটা সময় যে সমবয়সী ছেলের সম্পর্কে মেয়েদের কৌতূহল জাগবেই। কিন্তু সেই কালো দামাল ছেলেটা তাকে খুব একটা টানত না। বরং একা একা টিলায় টিলায় ঘুরে বেড়াবার সময় নাচের মুদ্রায় নিজেকে ছড়িয়ে দিতে অনেক বেশি আরাম লাগত। কীভাবে মেঘেরা শরীর ভাসায় দেখার পর সে ভাসতে চেষ্টা করত, গাছেরা হাওয়ার দোলায় যেভাবে ডাল দোলায় তার অনুকরণ করার চেষ্টা করত। একদিন একটি বিরাট পাথর দেখে সে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। পাথরটি কুঁজো হয়ে যেন সমস্ত ছন্দ বন্ধ করে মহাকালের মতো স্থির হয়ে বসে রয়েছে। সারাটা দুপুর কেটে গিয়েছিল সেই পাথরের মতো স্থির হয়ে শরীরটাকে অর্থবহ করতে। এবং এই একাকী ঘুরে বেড়ানো তাকে একটি আবিষ্কারের দিকে নিয়ে গেল। প্রকৃতির বাইরের চেহারাটা চোখের আরাম দেয় কিন্তু তাকে ঘিরে মনের আবর্ত তৈরি হলে নতুন অর্থ তৈরি হয়ে আসে। আর সেই বেরিয়ে আসা অর্থটি সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

আশার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল নানা পিল্লাইদের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে সে থাকত হাতে গোনা সময়ে। ভোর হলেই সে চলে যেত তাতার কাছে। গ্রামের সমস্ত মানুষ গুরুদেবকে ওই নামেই ডাকত। বৃদ্ধ ঘুম থেকে উঠে তাকে বসতে বলতেন হাসিমুখে। যেদিন তার নিঃশ্বাসের কষ্ট হত সেদিন কথা বলতে পারতেন না। যেদিন শরীর একটু ভাল থাকত সেদিন গল্প করতেন।

তেই ইয়াম দাত তা তেই ইয়াম তা হা। পায়ের গোড়ালির ওপর শরীরের ভর রেখে পাতা ওপরে রাখতে হবে। তারপর এক পা সামনের দিকে প্রসারিত করতে হবে ডান বা বাঁদিকে। তারপর সেই পা ফিরিয়ে আনতে হবে, পেছনের পায়ের পাশে।

তৃতীয় পর্যায়ে আসছে তাত্ তেই তাম্। সমান পাতায় শরীরের ভর রেখে আঙুলের ওপর সামান্য এগোনো। পায়ের আঙুল থেকে গোড়ালির মধ্যে সঞ্চালন শুরু হল।

একটু একটু করে নবম পর্যায়ের বিশদ বিবরণ তাতার মুখে শুনতে পেল আশা। সে মনে মনে গেঁথে নিল বোলগুলো, তেই ইয়াম্ দাত, তা তেই ইয়াম্ তা হা, তাত্ তেই তা তেই হাত তেই হি, তাত তেই তা হা, তেই তেই তা, ডি ডি তাই। অষ্টম পর্যায়ে নিঃশব্দে শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তন এবং নবম পর্যায়ে তা ডিট ডিট তাই। এসবের শুরুতে প্রথম বোল তেই ইয়া তেই ইয়ে তো রয়েছেই। কিন্তু ভরতনাট্যমের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নবম পর্যায়ের বিস্তারে পার্থক্য আছে। কিন্তু মূল অংশটি নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। সাহিত্য ও স্থাপত্য বলছে ভরতনাট্যম পরিবেশিত হত একক এবং দলগতভাবে। উনিশ শতকে তাঞ্জোরের চার ভাই, চিন্নার্য, পন্না, ভাদিভেলু এবং শিবানন্দন দলগত নৃত্যের বদলে একক নৃত্যে পুরোপুরি ভরতনাট্যমকে নিয়ে আসেন। এ কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, ভরতনাট্যম নাচ সাধারণত মন্দিরে ঈশ্বরের সামনে পরিবেশিত হত কিন্তু রাজদরবারের নৃত্যের সঙ্গে এর পার্থক্য প্রমাণ করে দুটো নাচের শুধু অভিব্যক্তিতে।

দুমাস কাটানোর পর আশার মনে হল তাদের গ্রামের শিক্ষক যে কথা গল্প করে বলতেন সেই সব কথার সঙ্গে তার কথার কোনো পার্থক্য নেই। শুধু সেই মানুষটি কখনই এক বিষয়ে স্থির। থাকতেন না। কিন্তু তাতা সেই বিষয়ের গভীরে তাকে নিয়ে যেতেন। সক্রিয় শিক্ষা শুরু হবার আগে তাতা তাকে নির্দেশ দিলেন মাকে দর্শন করে আসতে, কারণ তিনি মনে করেন মায়ের আশীর্বাদ না পেলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তাতার এক ছেলে আশাকে পৌঁছে দিয়ে এল বাড়িতে।

সেই প্রথমবার আশার মনে হল সময় যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না পরিচিত পরিবেশে। যেখানে সে জন্মেছে, যে চৌহদ্দিতে তার শৈশব কেটেছে সেখানে কোনো কিছু নতুন করে পাওয়ার নেই। এমন কী খুড়তুতো ভাই বোনেদের জীবনযাত্রার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। শুধু মায়ের পাশে শোওয়ার পর তিনি যখন তার গায়ে হাত রাখেন তখন সমস্ত শরীর-মনে একটা শান্তির প্রলেপ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে ফিরে আশা যে দুঃসংবাদটি পেয়েছিল তা সে বাকি জীবনে ভুলতে পারেনি। তার সেই শিক্ষক, যিনি নাচ ভালবেসেছিলেন নিজের মতো করে, একটি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। মাঝ রাতে একটি কুয়োর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি এমন আশঙ্কা করা হয়েছে। হঠাৎ পরিচিত পৃথিবী থেকে একটি বিশেষ মানুষ উধাও হয়ে গেছে, সমস্ত চেষ্টাতেও যার হদিস পাওয়া সম্ভব নয়, আশাকে নাড়িয়ে দিল। নিজের পিতৃদেবের মৃত্যু তাকে এই বোধ দেয়নি। কারণ তখন তার নিজস্ব অনুভূতির জন্ম হয়নি। সে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায় সেই খেয়ালি মানুষটিকে যিনি বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতেন না। তাকে তো অনেকেই আধ পাগল বলত। সাংসারিক নিয়মের বাঁধাপথে মানুষটি কখনও চলেননি। কিন্তু আশাকে নৃত্য সম্পর্কে প্রথম অবহিত করেছিলেন এই মানুষটি। নিজে উদ্যোগী হয়ে তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বপ্নের দরজায়। এখনও মাঝে মাঝে আশার গোলমাল হয়ে যায় ঠিক কাকে তার গুরুদেব বলা উচিত? তাতা না সেই শিক্ষককে।

তাতার কাছে ফেরার তাগিদ আশাকে বেশিদিন শোকভিভূত রাখতে পারেনি। কিন্তু ফেরার সময় এবার একটা কাণ্ড হল। কাকার শরীর খারাপ তাই কাকার এক ছেলে তাকে পৌঁছে দিতে চলেছিল। কিন্তু হঠাৎ মা ঘোষণা করলেন তিনি সঙ্গে যাবেন। তিনি নিজের চোখে দেখে আসতে চান তাঁর মেয়ে কীরকম পরিবেশে থাকছে। দূরত্বটা অনেক কিন্তু প্রৌঢ়া কিছুতেই নিরস্ত হলেন না। শেষ পর্যন্ত কাকাও বললেন, তোমার মায়ের যাওয়া দরকার। কারণ আমি তো পিল্লাই পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাইনি; তিনি গেলে সেটা সম্ভব হবে এবং আমরাও নিশ্চিন্ত হব। অতএব মা চললেন সঙ্গে। বাড়ি থেকে বের হবার পর কিন্তু আশার খুব ভাল লাগল মায়ের সঙ্গ। পথের সব কিছুতেই মায়ের কৌতূহল, আশারও।

মায়ের জন্যেই স্টেশনে নেমে গরুর গাড়ি নেওয়া হল। অবশ্য দূরত্বটা কম নয়। এখানে পাঁচ সাত ক্রোশ মানুষ অক্লেশে হেঁটে যায়। পাণ্ডানুল্লুরের কাছ দিয়ে অবশ্য রাস্তা গিয়েছে বাসের, হাঁটতেও হয় না বেশি, কিন্তু গরুর গাড়িতে চেপে আশারও ভাল লাগল। বেশ হেলতে দুলতে প্রকৃতিকে একটু একটু করে আবিষ্কার করা যাচ্ছিল।

গ্রামে যখন পৌঁছাল ওরা, তখন সূর্য মাথার ওপরে। আশার বার তর সইছিল না। ওকে দেখে যারা এগিয়ে এসেছিল তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা দুলিয়ে সে মায়ের হাত ধরে চলল তার কাছে। তার ঘরের দরজা খোলা। তিনি বসেছিলেন দেওয়ালের সামনে। কয়েকজন শিল্পী তাঁর কাছে সম্ভবত তালিম নিচ্ছিল। মৃদঙ্গে বোল উঠছিল। দরজায় তাদের দেখে তাতা মুখ তুলে চাইলেন। এবং তারপরই ওঁর মুখ হাসিতে ভরে উঠল। দ্রুত ব্যবধান ঘুচিয়ে তার পায়ে মাথা ঠেকাল আশা। বৃদ্ধের শীর্ণ আঙুল তার মাথায়, তিনি বললেন, বাঃ তুমি এসে গেছ! যেন তার আসার পথ চেয়েছিলেন তাতা। খুশিতে মন ভরে গেল আশার। সে মুখ তুলে বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন আমার মা।

তাই? কোথায় তিনি? সচকিত হয়ে দরজার দিকে তাকালেন তাতা। তারপরেই দুটো হাত মাথার ওপরে তুলে নমস্কারের ভঙ্গি করে বললেন, আসুন। আমি ভাল দেখতে পাই না। মা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তারপর নতজানু হয়ে তার পা স্পর্শ করতে করতে সবাইকে অবাক করে সশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটল যে আশা পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে গেল। হাত বাড়াতে গিয়েও তাতা থেমে গেলেন। ঘরের অন্য মানুষেরা চুপচাপ দৃশ্যটি দেখছেন। শেষ পর্যন্ত তাতা বললেন, মা আপনি শান্ত হন।

আমি পারছি না, আমি আর সইতে পারছি না। মা মুখে আঁচল চাপা দিলেন।

আমাকে যদি একটু খুলে বলেন–। তার গলায় মমতা।

ওকে ছেড়ে আমি আর থাকতে পারছি না। পৃথিবীতে ওই মেয়ে ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আপনি ওকে বুঝিয়ে বলুন। মায়ের কান্না জড়ানো শব্দগুলো কানে আসামাত্র আশা কাঠ হয়ে দাঁড়াল। এ কী বলছেন মা? এতটা পথ আসবার সময় সে বুঝতেই পারেনি এখানে মায়ের আসার উদ্দেশ্য কী! সে তীব্র গলায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে কেঁদে ফেলল। মা তখন বলেই চলেছেন আশা তার জীবনের কতখানি। অল্প-স্বল্প নাচ শেখাতে তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু গ্রামের যে শিক্ষক প্রথম আশাকে নাচ শিখিয়েছিলেন তিনি মারা যাওয়ার আগে একদিন তাকে বলেছিলেন, আশা যদি সত্যিকারের শিল্পী হয়ে ওঠে তবে তার জগৎ হবে আলাদা, সেখানে মা দাদা বোনের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই কথা শোনার পর তিনি আর চান না মেয়ে পর হয়ে যাক।

ততক্ষণে শক্তি ফিরে পেয়েছে আশা। এগিয়ে এসে মায়ের বাজু ধরে বলল, তুমি ওঠো।

মা সেই কথায় কান দিলেন না, আমার বুকে জমে থাকা কষ্ট আমি কাউকে বলিনি। এমনকী ওই মেয়েকেও নয়। কিন্তু আপনাকে দেখার পর মনে হল আপনি আমাকে বুঝতে পারবেন।

আশা কেঁপে উঠল। তার ভবিষ্যতের ওপর একটা কালো পর্দা নেমে আসছে। মায়ের কথা শুনে তাতা তাকে এইবার বলবেন চলে যেতে। এবং তা যদি হয় তাহলে সে গ্রামে ফিরে গিয়েই কুয়োয় ঝাঁপিয়ে পড়বে। এখন যদি কোনোমতে মাকে তাতার সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া যেত! চুপচাপ শুনছিলেন তাতা, এবার কথা বললেন, মা, আমি আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি বলুন তো, আপনার সন্তান যখন বিবাহের পর স্বামীর ঘরে চলে যাবে তখন আপনি কী করবেন? সেই একাকিত্ব সহ্য করবেন কী করে?

মা একটু থমকে গেলেন। তারপর দৃঢ় গলায় বললেন, তখন আমার সান্ত্বনা থাকবে এই ভেবে যে আমার মেয়েকে যত্ন করার মানুষ এসেছে। তার ভবিষ্যৎ আর অনিশ্চিত নয়।

ও, তাহলে আপনার মেয়ের মঙ্গল হলে আপনি এই একাকিত্ব সহ্য করতে পারবেন?

মা মুখে কিছু না বলে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে স্বীকৃতি জানালেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল, বেশ। আমি আপনার মেয়ের বিবাহের আয়োজন করছি।

শুধু মা নন, আশাও চমকে উঠল। এ কী কথা বলছেন তাতা।

মা মুখ ফিরিয়ে তার মুখ একবার দেখে নিয়ে বললেন, আমি, আমি ঠিক প্রস্তুত নই।

এই বিবাহে প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না মা!

পাত্র কে?

জগদীশ্বর। শিব। নটরাজ। সুরের দেবতা। শিল্পের জনক। তাঁর সঙ্গে বিবাহ হলে যে যত্ন এবং নিরাপত্তা আপনার মেয়ে পাবে তা পৃথিবীর কোনো মানুষ ওকে দিতে পারবে?

হঠাৎ মা দ্রুত মাথা নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়ালেন, না।

না মানে? তাতার গলার স্বর চড়া।

দরকার নেই। ও এখানে থাকুক, ওর যেমন ইচ্ছে তেমন শিখুক। আমি চেষ্টা করব আমার কষ্ট অতিক্রম করতে। না, আমি আর ওর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা দেব না।

Chapter - 2 - ইন্দিরা মার্গের এই বাড়ি

ইন্দিরা মার্গের এই বাড়ির সেই বিশেষ ভাবে তৈরি বারান্দায় চেয়ারে শরীর এলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি মায়ের মুখ কল্পনা করছিলেন। আজকাল প্রায়ই মুখগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মা চলে গেছেন অনেককাল আগে। কিন্তু এখনও তার বোধগম্য হল না কেন মা তাতার কথা শোনার পর অমন আঁতকে উঠেছিলেন। এবং তারপরেই নিজের সমস্ত ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে আশাকে অনুমতি দিয়েছিলেন এগিয়ে যেতে? তারপরে কখনই তিনি তাকে সংসারী করার চেষ্টা করেননি। তাতা তাকে প্রায়ই রসিকতা করে বলতেন, তোমার সঙ্গে নটরাজের বিবাহ হয়ে গিয়েছে, মনে রেখ।

প্রায় সেইরকম বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন তিনি। আশা চেয়ার ছেড়ে ওঠার কথা ভাবলেন। এক গ্লাস জল চাই। কমলা কিংবা শ্রীনিবাসকে ডাকলেই ছুটে আসবে। কিন্তু আজ আশার কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করছিল না। রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের প্রয়োজন অতিক্রম করা যায়। ওই মেঘেরা যেভাবে শরীর পরিবর্তন করে সারা আকাশ জুড়ে নেচে বেড়ায় তা দুচোখ ভরে দেখে যেতে বড় ভাল লাগে তার।

তাতার কাছে তার হাতে-কলমে নাচ শেখা শুরু হল। এ এক অপূর্ব আনন্দ। বৃদ্ধের জীর্ণ শরীর যেন শুধু তার জন্যেই কথা বলতে শুরু করল। অত্যন্ত ভাগ্যবতী না হলে ওই প্রতিভাবান মানুষের সংস্পর্শে সে আসতে পারত না। নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞানের ভাণ্ডার তিনি উন্মুক্ত করে দিচ্ছিলেন তার কাছে। মনে হচ্ছিল এক জীবনে এসব শিখে ওঠা যাবে না। তাতা তার অন্য শিষ্যদের কথা বলতেন। যারা শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। সেই সব দেবদাসীর গল্প বলতেন যারা নৃত্যকেই জীবনে বাঁচার একমাত্র পথ বলে মনে করত। তাতা যাদের কাছে শিক্ষা পেয়েছেন সেই সব পূর্বসূরীর কথাও বলতেন। প্রতিটি শব্দ, নৃত্যের প্রতিটি ব্যাখ্যা আশা মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছিল। আর প্রতি রাত্রে খাতায় লিখে রাখত। সেসব খাতা এখনও রয়েছে কিন্তু পৃথিবী থেকে সেই ভাল মানুষেরা কখন যেন উধাও হয়ে গেছে!

মাঝে মাঝে তাতার ইচ্ছে হলে আশাকে নিয়ে বাইরে বের হতেন। মাঠে দাঁড়িয়ে মায়ের ডাক শুনে ছুটে আসা বাছুরের শরীরের ছন্দ লক্ষ্য করতে বলতেন। লজ্জাবতী গাছের ডালে আঙুল রেখে ওদের কুঁকড়ে যাওয়া এবং শেষে ডালগুলোর মাথা নুইয়ে নেওয়া দেখিয়ে নকল করতে বলতেন। এ এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। তাতা বলতেন আমাদের চারপাশের যে জগত সেখানেই নৃত্যের সব উপকরণ ছড়ানো আছে। যে শিল্পী সে ওই জীবন দেখে নিজেকে তৈরি করে নেয়।

একদিন তাতা তাকে পুঁটুলি বেঁধে নিতে বললেন। তাতার ছেলেদের আপত্তি ছিল। কিন্তু বৃদ্ধ একবার যা সিদ্ধান্ত নিতেন তা বদল করতেন না। অতএব গরুর গাড়ি ডেকে আনা হল। ছেলেরা চেয়েছিল সঙ্গে পরিবারের কেউ যাক। অন্তত নাতি নানা গেলেও নিশ্চিন্ত হতে পারে তারা। কিন্তু তাতা কাউকেই সঙ্গে নিতে চাননি। কেন চাননি তা পরে বুঝতে পেরেছিল আশা। দুজনে গরুর গাড়ির ছই-এর মধ্যে বসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কুম্বাকোনামে পৌঁছেছিল। সমস্ত পথ তাতা চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। আর তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল আশা। পৌঁছাবার মুখে তিনি উঠে বসলেন, আমরা এখন যার কাছে যাচ্ছি সে ঈশ্বরের দাসী। নাচ আছে তার রক্তে। কিন্তু ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারো সামনে সে কখনো নাচেনি। মনে রেখ প্রকৃত গুণীর সান্নিধ্যে সব সময় তোমার অন্তরকে শক্তিমান করবে। তা তিনি যদি কিছু না দিতে চান তবুও তুমি কিছু পাবে।

আশা অবাক হয়ে দেখল এত কষ্ট করে তাতা যাঁর কাছে এলেন তার বয়স পঁচাত্তর তো হবেই। শরীর বেশ ভারী, চুলে কালো ছোপও নেই। কিন্তু তিনি তাতাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ছুটে এলেন বাইরে। তাতা মাটিতে দাঁড়ানো মাত্র হাঁটু মুড়ে বসে দুটো হাত বুকে জড়ো করে নমস্কার জানালেন। পরে, অনেক পরে আশা জেনেছে মহিলা একমাত্র ঈশ্বরকেই মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করেন। অভিবাদন সেরে উঠে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা বললেন, আমার কি সৌভাগ্য!

কেমন আছ পুষ্প? তাতা জিজ্ঞাসা করলেন সস্নেহে।

তাঁর আশীর্বাদে এখনও বেঁচে আছি তাতা। আসুন ভেতরে আসুন।

বাড়িটা ছোট। কিন্তু ভেতরে ঝকঝকে বাঁধানো উঠোন রয়েছে। হাত-পা ধাওয়ার পর তাতা পরিচয় করিয়ে দিলেন, এর কথাই তোমায় বলেছিলাম। আর পুষ্প, এর নাম আশা। এই বয়সে ওই মেয়ে আবার নাচ শেখাতে বাধ্য করেছে।

আপনাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না তাতা। নিশ্চয়ই এই মেয়ের ক্ষমতা আছে যার জন্যে আপনি রাজি হয়েছেন। বৃদ্ধা সস্নেহে আশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

জলযোগ শেষ হলে তাতা বললেন, আমরা এত দূরে এলাম তোমার নাচ দেখতে পুষ্প!

আমার? চমকে উঠলো পুষ্প।

হ্যাঁ। এই মেয়েকে আমি আমার যা কিছু অভিজ্ঞতা দিয়ে যেতে চাই। কিন্তু যেটা আমি নিজে কখনও পারব না সেটা ও তোমার মধ্যে দেখুক। তাতা মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন।

লজ্জায় যেন কুঁকড়ে গেলেন বৃদ্ধা, না-না, এ আদেশ করবেন না।

উঁহু, তোমার অভিনয়, ভঙ্গি আর অভিব্যক্তি আর কারো মধ্যে আমি দেখিনি।

কিন্তু এখন যে আমার বয়স হয়ে গেছে। পুষ্প প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন।

যে তিনটি বিষয়ের কথা বললাম তা কোনো সময় থামিয়ে দিতে পারে না পুষ্প।

বেশ কাতর চোখে বৃদ্ধা তাতার দিকে তাকালেন। বোঝা যাচ্ছিল তিনি আর অমান্য করতে পারবেন না। পুষ্প মন্থর ভঙ্গিতে চলে গেলেন ঘরের ভেতর। তারপর আসন সুষ্ঠু ভেঙ্কটেশ্বরের ছোট্ট একটা মূর্তি সযত্নে বা নিয়ে এলেন বারান্দায়। একটু সময় নিলেন নিজেকে তৈরি করতে। তারপর আভূমি নত হয়ে দেবতাকে প্রণাম জানালেন। আজ্ঞা নিলেন তাতার কাছ থেকে। তারপর শুরু করলেন।

ওই শরীর, যার সর্বাঙ্গে বয়স জেঁকে বসেছে, আশার কল্পনা কিছুতেই কাজ করছিল না তিনি কীভাবে সক্ষম হবেন। পুষ্প সেই পদ শুরু করলেন যেখানে কৃষ্ণের জন্যে বিরহিণী রাধার আর্তি ফুটে উঠেছে। সেদিন আশা যা দেখেছিল তা এক মুহূর্তের জন্যেও মন থেকে মুছে যায়নি। এখনও চোখ বন্ধ করলে বৃদ্ধার সেই নাচ ভেসে ওঠে। সমস্ত শরীরে শিহরন বয়ে গিয়েছিল তার। দ্যাখো, দেখে শেখো, এই দেখার জন্যেই তোমার জন্ম হয়েছিল। নিজেকে প্রায়ই এই কথা বলতেন তিনি যখনই পুষ্পর কথা মনে পড়ত। নাচের একটি অংশের কথা বিশেষ করে মনে পড়ে যেখানে রাধা এক সহচরীর জন্যে অপেক্ষা করছেন যে কৃষ্ণের বার্তা বহন করে আনছে। শুধু নাকছাবির ওঠা নামা এবং চাহনিতে সেই আর্তি এবং উদ্বেগ ফুটিয়ে তুললেন পুষ্প। কোথাও কোনো মাসল নড়ল না। এই হল প্রকৃত শিল্পীর কাজ। তাতা বলতেন, সবাই নাচে কিন্তু কেউ কেউ শুধু নাচের মাধ্যমে নিজের জগৎ তৈরি করে নিতে পারে।

পাণ্ডানুল্লুর ফিরে আসার পর প্রতিটি দিন শেষ হত আর আশার মনে হত সে ঢেউ-এর ওপরে ভেসে বেড়াচ্ছে। দিনে পনের ঘন্টা অনুশীলন আর ব্যাখ্যা শোনা। সে টের পেত বিশাল কলসির তলায় যেন একটু একটু করে জল জমছে। আর তখনই ঈশ্বর তাকে ভাগ্যহীনা করলেন। এক প্রত্যুষে সে বিছানা ছেড়ে মাটিতে পা দিতেই খবর পেল মা চলে গেছেন। গ্রাম থেকে খবর আসতে, সময় লেগেছে। কিন্তু কাকা তার জন্যে মায়ের দেহ রেখে দিয়েছেন। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে সে ছুটে গিয়েছিল তাতার দরজায়। বৃদ্ধ সংবাদটা সম্ভবত আগেই জেনেছিলেন। দুহাতে আশার মাথা বুকে টেনে নিয়েছিলেন। শুধুই কান্না। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলেনি। বৃদ্ধের শুকনো খাঁচার মতো বুকে মুখ রেখে যে শান্তি খুঁজেছিল আশা তার স্মৃতি আজও স্পষ্ট। নিজের বাবাকে খুব অল্প বয়সে হারিয়েছিল সে। কিন্তু তার মধ্যে সে সত্যিকারের পিতাকে খুঁজে পেয়েছিল।

তাতা বলেছিলেন, মন শক্ত রেখো। তোমার মায়ের শরীর তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। যদি পৌঁছে তাঁকে দেখতে না পাও তবু ভেঙে পড় না। পৃথিবীতে সব সময় কষ্ট সইবার জন্যে তৈরি থাকতে হয়। যত তোমার বয়স বাড়বে তত তোমার চেয়ে বয়স্করা বয়স্কতর হবে।

কিন্তু আমার যে কেউ রইল না! ডুকরে উঠেছিল আশা।

সে কী! তোমার নাচ রইল। তোমার নটরাজ রইল। নাচ আর নটরাজের বয়স কখনও বাড়ে না। একদিন তুমি তাদের ছাড়িয়ে যাবে কিন্তু তারা নয়।

সেই সকালেই পাণ্ডানুল্লুর থেকে রওনা হয়েছিল আশা। কিন্তু মায়ের শরীর দেখার সুযোগ পায়নি আর। সেই গ্রাম, সেই বাড়ি একই আছে শুধু তার জন্যে সব সময় ভাবত যে মানুষটা তাকে আজ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মৃতদেহ সংরক্ষিত রাখার কোনো বৈজ্ঞানিক সাহায্য না পাওয়ায় কাকা মুখাগ্নি করেছেন। মায়ের খাট, জামাকাপড়, পুরনো ছবি আর তখনও ঘরময় ভেসে বেড়ানো মা গন্ধ নিয়ে কয়েকদিন অঝোরে কেঁদে গেল আশা। তাকে কাঁদতে দিয়েছিলেন কাকা। মায়ের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে যখন আবার তাতার কাছে ফিরে যেতে প্রস্তুত তখন কাকা কথাটা বললেন। মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে মা নাকি আবার ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন আশার বিয়ে নিয়ে। একে ওকে ডেকে বলতেন। এবং সেই সুবাদে একটি সুপাত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন। ছেলেটি শিক্ষিত। এম. এ পাশ করে স্কুলে শিক্ষকতা করছে। সুদর্শনও। মায়ের এই শেষ ইচ্ছার মূল্য নিশ্চয়ই আশার দেওয়া উচিত। কী জবাব দেবে বুঝতে পারেনি আশা। তখনও চারপাশে মায়ের স্মৃতি এত প্রকট এবং এত বেদনাময় যে চট করে মায়ের বিরোধিতা করতে পারল না সে। কিন্তু কাকা যে তার নীরবতাকেই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে পাত্রপক্ষকে খবর পাঠাবেন তা কে জানত!

সেটা জানতে পেরেই ফুঁসে উঠল সে। কিন্তু তখন ব্যাপারটা এত দূরে এগিয়ে গেছে যে কাকা নিজের এবং পারিবারিক সম্মানহানির ভয়ে খেপে উঠলেন। গৃহস্থের মেয়ে হিসেবে যতটা নাচ শেখা দরকার তার অনেক বেশি শেখা হয়ে গেছে। তাছাড়া নাচ ওকে ভবিষ্যতে কী দেবে? একমাত্র দেবদাসীরাই যৌবনে এই বৃত্তি বাঁচিয়ে রাখে। দেবদাসী লোপ করার বিল যখন উনিশশো দশ সালে পাশ হয়ে গেল তখনই ভরতনাট্যম বিরাট ধাক্কা খেল। সেই উকিল, যার নাম কৃষ্ণ আয়ার, তিনি এগিয়ে না এলে কী হত বলা যায় না। তার মুখে আশা আয়ারের কথা শুনেছে। ভদ্রলোক নাকি মেয়েদের সাজে সেজে মঞ্চে ভরতনাট্যম পরিবেশন করতেন যাতে এই নাচ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা স্পষ্ট হয়। দেবদাসী নৃত্য মানেই একধরনের পতিতাদের দ্বারা মনোরঞ্জনের নাচ নয়, তাই প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন ভদ্রলোক। ভরতনাট্যমকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে মানুষটি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। পাত্রপক্ষ কাকাকে জানিয়েছেন, পুত্রবধূ করতে তারা সম্মত কিন্তু পাত্রীকে ওই নাচ বাদ দিতে হবে।

আর এই শর্ত আরও খেপিয়ে তুলল আশাকে। এরা ভাবে কী! কে বলেছে সময় পাল্টে গেছে? কৃষ্ণ আয়ারজীকে তখন যে বিরোধিতার সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল তার নিদর্শন তো আজকেও। লন্ডনের মিস টেনান্ট যদি এগিয়ে এসে জনমত তৈরি করতে সাহায্য না করতেন এবং উনিশশো সাতাশ সালে মাদ্রাজে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে সমাজ সংস্কারকদের সামনে সঙ্গীত সম্মেলনের ব্যবস্থা যদি আয়ার না করতেন তাহলে কী হত কে জানে। উনিশশো বত্রিশ সালের ডিসেম্বর মাদ্রাজের মুখ্যমন্ত্রীর সম্মানে একজন দেবদাসীর দ্বারা ভরতনাট্যমের ব্যবস্থা হল। খবরের কাগজে এই নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়। এর এক বছর আগে আয়ার সাহেব কল্যাণী কন্যাদের দিয়ে প্রথম মঞ্চে নাচিয়েছিলেন। এক বছর বাদে তার পুনরাবৃত্তি করেন। এবং সেই থেকে সমস্ত বিরোধিতাকে নস্যাৎ করে ভরতনাট্যম তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হল। তাতা এসব কথা তাকে বলেছিলেন। কিন্তু জীবনে এর বিপরীত ছবি দেখতে পাচ্ছে সে।

আশা স্পষ্ট জানিয়ে দিল সে কিছুতেই নাচ ছাড়বে না। বস্তুত মায়ের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে নিয়মিত অনুশীলন করে যাচ্ছিল। বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন কাকা এলেন তার ঘরে। আশা তখন অনুশীলন করছে। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত চলে গেলেন তিনি। ওই প্রথম তাঁর মনে হল কোনো আত্মমগ্ন মানুষকে বিরক্ত করা ঠিক নয়। কিন্তু সেদিন তিনি নৃত্যরত আশার মধ্যে কী দেখেছিলেন তিনিই জানেন, কারণ বাড়ির সবাইকে উদ্বিগ্ন রেখে কাকা ফিরে এসেছিলেন পরের দিন। এসে জানিয়েছিলেন বিবাহ বাতিল করে দিয়ে এসেছেন তিনি। পাত্রপক্ষকে কী কারণ দেখিয়েছিলেন তা কোনোদিন জানা হয়নি আশার।

পাণ্ডানুল্লুরে ফিরে যাওয়ার দিন ঠিক করতে করতে বেশ সময় চলে গিয়েছিলেন। কাকা যখন তাকে নিয়ে পাণ্ডানুল্লুরে পৌঁছালেন তখন আশা জানত না তার জন্যে কী অপেক্ষা করছে। সেই ভোরেই সমস্ত গ্রাম যেন প্রাণহীন। রাস্তায় লোক নেই। ঘরদোর বন্ধ। এমন কী মাঠে গরুগুলোও ডাকছে না। তার বাড়ির সামনে পৌঁছাতে হল না। দূর থেকেই ওরা দেখতে পেল সমস্ত গ্রামের মানুষ বাড়ির সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাকা দাঁড়িয়ে পড়লেন সহসা, আর বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না আশার। সে ছুটে গেল মানুষের ভিড় বাঁচিয়ে দরজায়।

তাতা শুয়ে আছেন মাদুরে। তাঁর ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতে শবযাত্রার আয়োজন করছে। মেয়েরা কাঁদছে সুর করে। নানা পিল্লাই বসে আছে তার ঠাকুর্দার মাথার পাশে। তার চোখ বন্ধ। দরজায় দাঁড়িয়ে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে অবশ হয়ে গেল আশা। পৃথিবীর সব কিছু বিস্মরিত হয়ে শুধু মনের পর্দা জুড়ে ওই মুখ। সে তার মায়ের মৃতদেহ দ্যাখেনি। বস্তুত পিতার মৃত্যুর সময় তার বোধ পরিস্ফুট হয়নি। এখন তাতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল প্রকৃত সন্ন্যাসীর অভিব্যক্তি এই রকম হওয়া উচিত। কোথাও কোনো সঙ্কোচন নেই। একটি মাসলও নড়ছে না। জীবনের সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করে নিজেকে সবকিছুর উর্ধ্বে তুলে নেওয়ার সক্ষমতা এখন তাতার মুখে। কোনো সুখ অথবা দুঃখ হাজার চেষ্টা করলেও তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

মাঝে মাঝে শহরেও অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। জ্যোৎস্নার রাত্রে একজোড়া সাদা লক্ষ্মীপ্যাঁচা উড়ে আসে কোনো গোপন আস্তানা থেকে। এসে বসে ব্যালকনির রেলিঙে। বসে থাকে চুপচাপ। ওরা সম্ভবত এখন আশাকে ভয় পায় না। এই এখনই ওরা এল। দুটো পাখি যাদের দেখতে কখনই তার খারাপ লাগে না। সাদা রঙের আভিজাত্য এবং সারল্য সমস্ত খুঁত ঢেকে দিতে পারে। আশা নড়ে বসলেন। এখনও তাতার সেই মুখ সামনে। সারা জীবন ধরে চেষ্টা করে গেছেন নাচের বিশেষ মুহূর্তে ওই অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু না তার নাকে স্পন্দন শূন্য হয়েছে, না গালের কাঁপুনি। কীভাবে মুখের সমস্ত বোধ অসাড় করে আর একটি অর্থ ফুটিয়ে তোলা যায় তা তিনি আজও বুঝে উঠতে পারলেন না।

তাতার মৃত্যু তার জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। পর পর দুজন গুরুর কাছে শিক্ষা নিলেন তিনি। এবং তারপর মাদ্রাজের মিউজিয়াম থিয়েটারে তাঁর প্রথম নৃত্যপ্রদর্শনীর আয়োজন হল। আর সেই সূত্রেই তীর্থনারায়ণের সঙ্গে তার আলাপ। মাদ্রাজে তীর্থের নাচের স্কুল ছিল। এক কালে সে তাতার কাছে কিছুদিন নাচ শিখেছিল। আশার কথা কানে এসেছিল। সে এগিয়ে এসে প্রস্তাব দিয়েছিল একক নৃত্যের অনুষ্ঠান করার জন্যে। প্রতিটি শিক্ষার শেষে একটা সময় আসে, যখন শিক্ষার্থী নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, তীর্থের প্রস্তাব এল আশার সেই সময়ে। অন্তত দশ বছরের বড় ছিল তীর্থ। কিন্তু মেদহীন শরীরে একটা তকতকে ভাব থাকত সব সময়। কাকার আশীর্বাদ নিয়ে সম্মতি জানাল সে। জীবনে প্রথমবার দর্শকের সামনে নিজের নাচ দেখাতে যাওয়ার আগে খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল আশা। তীর্থ তাকে সান্ত্বনা দিত। মাত্র মাসখানেকের আলাপেই তীর্থ তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে আরম্ভ করল যেন সে অনেক দিনের চেনা। উৎসাহ দেখাবার উৎসাহে সে আশাকে অনেক কথা বলত। সমবয়স্ক মানুষের সান্নিধ্যে এত পুলকিত সে কখনও হয়নি। এবং এই প্রথম মনে হয়েছিল পৃথিবীতে তার নিকট কোনো আত্মীয় নেই। বয়সের কারণে কাকাকে সব জায়গায় সে পায় না। তাছাড়া যেসব জায়গায় প্রিয়স্মৃতি জড়ানো সেখানে প্রিয়মানুষটির মৃত্যুর পরে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করত না সে। ফলে তীর্থের ওপর তার নির্ভরতা বাড়ল। তীর্থ যখন বলল, তোমার মতো মেয়ের সন্ধানে ছিলাম আমি যে ভরতনাট্যমকে ভারতবর্ষের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দেবে। তখন কী ভালই না লেগেছিল।

পুরনো গয়না, হলুদ রঙের ফুল, কালো কাপড়ে ব্যাক স্টেজ সাজিয়ে তাতে কমলা রঙের আলো আর বিশেষ ছাঁদের কোরানাডু শাড়ি নিয়ে সে উপহার দিল অনুষ্ঠানটি। অনামী একজন নৃত্যশিল্পীর নাচ দেখতে তেমন ভিড় হয়নি। কিন্তু তীর্থ শহরের কিছু নামী মানুষ এবং দামি খবরের কাগজের সাংবাদিকদের উপস্থিত করতে পেরেছিল। অনুষ্ঠানের শেষে যে হাততালি পড়েছিল তা ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত ভারতবর্ষে। তারপর থেকে আর তাকে পেছন ফিরে থাকতে হয়নি। তাতা এবং আরও বিখ্যাত দুই গুরুর যোগ্য শিষ্যা হিসেবে তাকে মেনে নিল পণ্ডিত সমাজ। প্রচলিত ভরতনাট্যম থেকে তার নাচ কিছুটা আলাদা। তার কাছ থেকে পাওয়া ক্লাসিক্যাল ফর্মের সঙ্গে নিজস্ব বুদ্ধির প্রয়োগ তাকে এই স্বাতন্ত্র্য এনে দিল। আর তখনই শুরু হল তীর্থের সঙ্গে মনোমালিন্য।

তাতা তাকে একদিন বলেছিলেন, কখনও শুধু অর্থের জন্যে নাচবে না। আরও ভাল থাকা-পরার জন্যে লালসা যেন তোমাকে নাচতে বাধ্য না করে। কখনই ভেব না যে সব শিখে গেছ। নিজেকে শিক্ষিত না করা পর্যন্ত তুমি স্বাচ্ছন্দ থেকে দূরে থাকবে। আর কে না জানে শিক্ষার কখনও শেষ। নেই। কথাগুলো মেনে নিয়েছিল আশা। তাই যখন তীর্থ সাফল্যের গন্ধ পেয়ে একের পর এক অনুষ্ঠান করতে চাইল সে আপত্তি করল। তীর্থ বলেছিল, লোহা গরম থাকতে থাকতে আঘাত করতে হয়। এখন তোমার নাম সব কাগজে বড় জায়গা নিচ্ছে। এই সময় অনুষ্ঠান করলে হু হু করে টিকিট বিক্রি হবে, এটা বুঝছ না কেন?

আশা মাথা নেড়েছিল, না। আমার তো বেশি টাকার প্রয়োজন নেই। আর তেমন যদি দরকার কখনও হয় তাহলে আমি অন্য কাজ করব। কিন্তু নিজেকে সম্পূর্ণ তৈরি করার আগে নেচে টিকিট বিক্রি করতে পারব না।

ক্ষিপ্ত হয়ে তীর্থ বলেছিল, তুমি একটা পাগল।

নটরাজ যেন এই পাগলামি আমাকে চিরকাল দিয়ে থাকেন। তীর্থ তাকে অনেক অনুনয় করেছিল। শেষ পর্যন্ত, বলেছিল, আমার কথা তোমাকে শুনতেই হবে। আমার ইচ্ছের কোনো দাম নেই তোমার কাছে?

নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আমার আদর্শের বিনিময়ে নয়।

আমাদের দুজনের আদর্শ আলাদা হতে পারে না। যেখানে আমি আমার সব কিছু তোমার জন্যে নিয়োগ করছি সেখানে তুমি আমাকে অমর্যাদা করতে পার না। তাছাড়া এসব আমি করছি আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে।

আমাদের ভবিষ্যৎ?

নিশ্চয়ই। তুমি কী বুঝতে পার না আমি তোমাকে নিয়েই–একটা ঠোঁট টিপল তীর্থ, কীভাবে বলা যায় আমি তোমাকে ভালবাসি।

বোধে ছিল কিন্তু সেই প্রথম নিজেকে প্রকাশিত করল তীর্থ। আর সমস্ত শরীর মন এক অজানা অনুভূতিতে ঝঙ্কার দিয়ে উঠল। এই প্রথম কোনো পুরুষ তাকে স্পষ্ট ভালবাসার কথা বলল। মুখ নামিয়েছিল আশা। এরপরে তীর্থ যা চাইছে তা না করা কী উচিত হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তীর্থ উচ্চারণ করল, ভেবে দ্যাখ আমি যদি এগিয়ে এসে তোমার অনুষ্ঠানের আয়োজন না করতাম তাহলে কোথায় থাকতে তুমি! তুমি যত বড় গুণীই হও না কেন যদি ঠিকমতো উপস্থাপিত না হতে পার তাহলে কখনই প্রথম সারিতে উঠে আসতে পারবে না। এ ব্যাপারে আমার ভূমিকা ভেবে দ্যাখ।

আর মন স্থির করতে ইতস্তত করেনি আশা। সে তীর্থের মুখের দিকে তাকাল, তোমার প্রতি

[পরের দুই পেজ মিসিং]

এই সময় কমলা এল তাকে সাহায্য করতে। তিনি উদাস গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, হ্যাঁরে কমলা, আমি কি এবার বুড়ি হতে চললাম?

থমকে দাঁড়াল কমলা। আয়নায় সে আশাকে দেখল। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা দুলল। প্রতিবাদে বলল, যে বলবে তার চোখের ছানি কাটাতে বলল। এমন শরীর শুধু অপ্সরারাই পেয়ে থাকেন।

অঙ্গরা? থমকে গেলেন আশা।

নিশ্চয়ই দেবীদের চেহারা তো ভাল নয়, কয়েকজনকে বাদ দিলে আর সবাই খুব আটপৌরে, দেবতাদের আনন্দ দিতে তাই অপ্সরাদের সৃষ্টি। তাদের চেহারার সঙ্গে কার তুলনা। তুমি যেদিন স্বর্গে যাবে সেদিন ঠিক উর্বশীর চাকরি থাকবে না।

ঠোঁট কামড়ালেন তিনি। আজকাল কমলাও মন-জোগানো কথা বলে। কিন্তু উর্বশী? কী নাচ নাচত সে? দেবতা ছাড়াও যে মহিলা ঘন ঘন মুনি-ঋষিদের শরীরের সঙ্গ পাওয়ার জন্যে ছটফট করত সে বড় নাচিয়ে হতেই পারে না। উর্বশীর সঙ্গে তার তুলনা করে বেচারা কমলা তাকে ছোটই করল।

কিন্তু সাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর নিজের দিকে তাকিয়ে চমকৃত তিনি। সেই বালিকা যার হাত ধরে মা নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের শিক্ষকের কাছে যাতে নিয়মিত অসুস্থতা থেকে মেয়ে মুক্তি পায় নাচ শিখে, সে কখন হারিয়ে গিয়েছে। তার বদলে এক অনির্বচনীয় আনন্দ সামনে দাঁড়িয়ে। টার্নার ওর নাচ দেখে একবার লিখেছিল আশার শরীর যেন ইস্পাত এবং সিল্কের মিশ্রণ। শুধু মুখের গড়নে কিছু ভ্রান্তি আছে। তা থাক। ঈশ্বর ওঁর শরীর গড়তে এত ব্যস্ত ছিলেন যে মুখের সৌন্দর্য সঠিক করতে সময় পাননি।

হ্যাঁ। আশা মাথা নাড়লেন। তার চোয়াল একটু বেশি চওড়া। ঠোঁট বেশ পুরু। খুঁটিয়ে দেখলে তবেই এসব নজরে পড়ে। নইলে পঁচিশ বছর ধরে তার কাছে ছবিতে নামার প্রস্তাব আসছে কেন। এখনও কেউ কেউ তাকে নায়িকা করতে চান। মানুষগুলোর কিছুতেই খেয়াল হয় না যে তিনি পঞ্চাশে পৌঁছে গেছেন। অবশ্য এই সাজে দেখলে তা খেয়ালে আসার কথাও নয়। আজকাল বাইশে পৌঁছেই মেয়েরা কোমরে পাশবালিশের মতো চর্বি জমিয়ে নেয়। বিয়ের পর কাঁধ পিঠ থেকে শুরু করে সর্বত্র প্লাবন ডেকে আনে। শরীর রাখতে তো পরিশ্রম করতে হয়; তাতে এদের অনীহা। এরা কী করে সুন্দর থাকবে। সঙ্গে নিয়ে আসা নটরাজের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চোখ বন্ধ করলেন। চোখের পর্দায় এখন নটরাজের মুখ। মুখ ক্রমশ মিশে গেল মনে। সঙ্গে সঙ্গে জগৎ বিস্মৃত হয়ে গেলেন। এখন তার সমস্ত শরীরে নাচ। সমস্ত শরীরে নটরাজের স্পর্শ। ঈশ্বর যেন দেখে নিচ্ছেন তাঁর সৃষ্টিকে।

কাশ্মিরী শালে শরীর জড়িয়ে আশা গাড়ি থেকে নামলেন। ভিড় সরিয়ে উদ্যোক্তারা তাকে নিয়ে গেল মঞ্চের পাশে। নাচের আগে একটি ছোট্ট অনুষ্ঠান। তার পদ্মভূষণ প্রাপ্তি উপলক্ষে উদ্যোক্তারা একটা সংবর্ধনা দিতে চান। এ ধরনের প্রস্তাব আগে জানানো হয়নি তাঁকে। আশা মিস্টার আয়ারের দিকে তাকালেন। মিস্টার আয়ার বুঝে গেলেন। তিনি বললেন, মিস রাও নাচের অনুষ্ঠানে এসে ঈশ্বরের আরাধনা করেন, সেখানে নিজের সংবর্ধনা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

উদ্যোক্তারা হকচকিয়ে গেল। একজন মন্ত্রী এসে অপেক্ষা করছেন এই উপলক্ষে। সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ। উপহার হিসেবে আসামের নিজস্ব কিছু শিল্পসামগ্রী আনা হয়েছে। কিন্তু উইংসের পাশ থেকে ওঁকে নাড়ানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত মিস্টার আয়ার প্রকাশ করলেন ঘটনাটা। শোনার পর উদ্যোক্তাদের নেতা মঞ্চে গিয়ে ঘোষণা করলেন, আমরা শ্রীমতী আশা-রাও এর নৃত্যানুষ্ঠান শুরু করার আগে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ হিসেবে তার স্বীকৃতির জন্যে একটি সংবর্ধনানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। মাননীয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এই উপলক্ষে এসেছিলেন। কিন্তু নীতিগত কারণে আশাদেবী এই সংবর্ধনা নিতে অস্বীকার করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে তিনি কয়েকটি বিষয়ে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন। তার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এই সম্মান গ্রহণ করতে রাজি নন। অতএব অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হল, কিন্তু সেই সঙ্গে আমি আশাদেবীকে অনুরোধ করছি ভরতনাট্যম সম্পর্কে তাঁর মুখ থেকে আমরা দুচার কথা শুনতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ করতালিতে সোচ্চার হল।

ঘোষণা কানে আসা মাত্র চকিতে মিস্টার আয়ারের দিকে তাকালেন আশা। চাপা গলায় বললেন, এর পরের অনুষ্ঠানে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে তা দেখা আপনার কর্তব্য হবে। তারপর শালটাকে খুলতে গিয়ে মত পরিবর্তন করলেন। উদ্যোক্তারা তখন হাসিমুখে এগিয়ে এসেছে তাকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আশা শাল এমনভাবে জড়িয়ে নিলেন যাতে দর্শকরা শুধু তাঁর মুখ দেখতে পায়। তিনি মঞ্চে ঢোকামাত্র আবার করতালি শুরু হল। মাইকের সামনে পৌঁছে তিনি কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন। তারপর সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, এই প্রেক্ষাগৃহে যাঁরা আমার চেয়ে বয়স্ক তাদের নমস্কার এবং অন্যান্যদের অভিবাদন জানাচ্ছি। আমি একজন সামান্য নৃত্যশিল্পী। বক্তানই। ভরতনাট্যমের তত্ত্ব নিয়ে পণ্ডিতরা আলোচনা করতে পারেন, আমার সে যোগ্যতা নেই। আপনারা আমার নাচ দেখতে এসেছেন এটা খুব আনন্দের কথা। আমি শুধু এই বিষয়েই কয়েকটা কথা বলতে পারি। আশা চোখ বন্ধ করলেন, প্রায় তিন হাজার বছর ধরে ভরতনাট্যম তার স্বকীয়তা বজায় রেখে বেঁচে আছে। হাতের মুদ্রায় ফুল তার পাপড়ি মেলে, আঙুলের ডগায় পাখি তার ডানা মেলে। শরীর কেঁপে ওঠে কখনও অহঙ্কারে কখনও সমর্পণে। মুখের প্রতিটি পেশী কথা বলে, চোখের অভিব্যক্তি তার সঙ্গে সঙ্গত করে। কিন্তু সমস্ত মুখ এই মুহূর্তে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করল পরের নিঃশ্বাস তার বিপরীত অর্থ ছড়িয়ে দিল। কিন্তু এই নাচ কখনই সম্পূর্ণ নয় যদি তার সঙ্গে কবিতা অথবা গান এসে না যুক্ত হয়। একটি গাড়ির চাকা, ইঞ্জিন, স্টিয়ারিং যেমন আলাদা ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা একত্রিত হতেই গাড়ি চলে, তেমনি ভরতনাট্যমের নাচ গান ও বাজনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দুঃখের কথা, এই মুহূর্তে ষাট কোটি মানুষের দেশ ভারতবর্ষে প্রকৃত উঁচুমানের ভরতনাট্যম শিল্পীর সংখ্যা মুষ্টিমেয়। একমাত্র তামিলনাড়ু যেখানে শতকরা দশ ভাগ মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী নাচকে অনুধাবন করতে পারেন, কিন্তু তার বাইরে সমস্ত দেশে এর প্রকৃত সমঝদার পাওয়া দুর্লভ ঘটনা। ভারতবর্ষের যে সব বড় শহরে আমি নাচতে গিয়েছি সেখানেই দেখেছি একমাত্র বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পসচেতন মানুষরাই অনুষ্ঠান দেখতে আসেন। এঁরা নাচ দেখে চমৎকার সুন্দর বাহবা ইত্যাদি বিশেষণ প্রয়োগ করেন। অনেক সমালোচক কাগজে প্রশংসা অথবা নিন্দা লিখে থাকেন। কিন্তু কী করে তারা এসব কাজ করেন! আত্ম-অহঙ্কারে তাঁরা ভুলে যান এই নাচের সঙ্গে যে গান গাওয়া হয় তার ভাষা জানা না থাকায় অর্থ বোঝা সম্ভব হচ্ছে না। গানের অর্থ বোঝা না গেলে শিল্পী তার নাচে ঠিক কি ফুটিয়ে তুলছে তা শুধু অনুমানেই ধরতে হচ্ছে। মূকাভিনয় দেখলে নিজের ইচ্ছেমতন কল্পনা করে নেওয়া যায়। কিন্তু শিল্পী যেখানে গানের মধ্যে দিয়ে বলা একটি বিশেষ ভাবকে ফুটিয়ে তুলছেন সেখানে তার কল্পনা কী করে পৌঁছাবে। তিনি শরীরের কয়েকটি ভঙ্গি, হাতের মুদ্রা, যতি এবং অভিব্যক্তি বুঝতে পারেন, কিন্তু কোন কারণে সেগুলো ঘটছে তা স্পষ্ট হতে পারে না। হিব্রু ভাষায় তোলা কোনো ছবি দেখতে গিয়ে আমরা যেমন মূলের বিশভাগ অনুধাবন করতে পারি, এও তেমনি।

আমি জানি শুধু একটি নাচ বোঝার জন্যে অপরিচিত ভাষা শিখে নেওয়া বাস্তব ব্যাপার নয়। যখন মাত্র বিশভাগ বুঝেও আপনারা এইভাবে আমাদের নাচ দেখতে সময় দেন তখন সেটাকে আমি ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলেই মনে করি।

পরের দিন খবরের কাগজে ঐ নিয়ে লেখালেখি হয়েছিল। মানা হচ্ছে ভরতনাট্যমের সঙ্গে দক্ষিণী ভাষায় গানও কবিতা বলা হয়ে থাকে এবং সে সব অনেকেরই বোধগম্য হয় না কিন্তু এসব উল্লেখ করে আশা রাও কী দর্শকদের অজ্ঞানতাকে খোঁচা দিতে চেয়েছিলেন। তার কথার মধ্যে যে জ্বালা ছিল তা তো অনেকেরই কানে বেজেছে। অতএব এর পরে যে নৃত্য তিনি পরিবেশন করেন তার সমালোচনা করতে দ্বিধা আসে। শুধু বলা যেতে পারে তার অভিব্যক্তি, মুদ্রা এবং শরীর সঞ্চালন চমকপ্রদ, এই বয়সেও। নাচ মানুষের কোনো একটি বিশেষ প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়নি। প্রায় চব্বিশশো বছর আগে ভরত নাট্যশাস্ত্রে এই কথাটি স্পষ্ট করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, নাচের প্রয়োজন হয়েছিল সৌন্দর্য সৃষ্টির তাগিদ থেকে। যেহেতু সর্ব শ্রেণীর মানুষ নাচ দেখতে ভালবাসে তাই এর পবিত্রতা অনস্বীকার্য। নাচ আনন্দের উৎস। বিবাহ, শিশুর জন্ম, এমন কী জামাতার আগমনেও মানুষ নৃত্যকে ব্যবহার করে থাকে। বেঁচে থাকার সবরকম আনন্দের সঙ্গে যখন নাচ মিশে রয়েছে, তখন ভাষা বোঝার অক্ষমতা বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে না।

বক্তৃতা শেষ করে গ্রীনরুমে চলে গিয়েছিলেন তিনি। পর্দা ফেলে শেষবার মঞ্চ দেখে নিচ্ছিলেন। মিস্টার আয়ার। নাচের জন্যে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছিলেন আশা। মিস্টার আয়ার গিয়ে তাঁকে জানালে তিনি আসবেন মঞ্চে। এই সময় উদ্যোক্তাদের একজন ছুটে এল মিস্টার আয়ারের কাছে। ট্রাঙ্ককল এসেছিল হোটেলে, অপারেটার খবর রেখে সেই লাইনটাকে আবার প্রেক্ষাগৃহে ট্রান্সফার করে দিয়েছে। দ্রুত পা ফেলে অফিসঘরে ঢুকে টেলিফোন ধরলেন মিস্টার আয়ার। একটু বাদে ও পাশে শ্রীনিবাসের গলা পাওয়া গেল। সে বলল একটু আগে দিল্লি থেকে টেলিফোন এসেছিল। তারা জানিয়েছে যে পদ্মভূষণ উপাধিদানের অনুষ্ঠানে আশা রাও-এর সহশিল্পীরা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন কিন্তু তাদের সবাইকে একই মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। নানা পিল্লাই-এর কোনো চিঠি বা খবর এখনও এসে পৌঁছয়নি।

রিসিভার নামিয়ে রেখে এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন মিস্টার আয়ার। এখন আশার স্টেজে আসার সময় হয়ে গিয়েছে। এই সময় তাকে খবরটা জানানো ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারলেন না। ব্যাপারটা আশা সহজভাবে নিশ্চয়ই নেবেন না। এবং তার ফলে যদি নাচ খারাপ হয়ে যায়? আবার তিনি তো পরে জানতেই পারবেন কখন আয়ার খবরটা পেয়েছিলেন। ফলে প্রশ্ন করতেই পারেন, তখনই সেটা ওকে জানানো হয়নি কেন?

দোটানায় না থেকে মিস্টার আয়ার সোজা এগিয়ে গেলেন গ্রিনরুমের দিকে। সেখানে কিছু উৎসাহী কর্মীর ভিড়। তাদের সরিয়ে দরজায় টোকা দিতে কমলা সেটা খুলল। ঘরের ভেতর ঢুকে রুমালে মুখ মুছলেন মিস্টার আয়ার। উঠে দাঁড়ালেন আশা, সব ঠিকঠাক আছে?

আজ্ঞে হ্যাঁ, মিস্টার আয়ার বললেন বটে কিন্তু তার মুখে অন্য ছাপ ফুটল।

বলুন। চোখ চোট ছোট করলেন আশা।

শ্রীনিবাস টেলিফোন করেছিল।

সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হলেন আশা, নানার খবর এসেছে?

আজ্ঞে না। দিল্লি জানিয়েছে আপনার প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বলেই ফেললেন আয়ার। তারপর দেখলেন আশা বাসন্তীকে ইঙ্গিত করলেন তাঁকে অনুসরণ করে স্টেজে যেতে। আয়ারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একমুহূর্তে দাঁড়িয়ে বললেন, ওদের জানিয়ে দিন আমি উপাধি গ্রহণ করতে অক্ষম।

রাত্রে হোটেলে ফিরে তিনি যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন তখন কমলা জানান শাস্ত্ৰীজী এবং বিজয়লক্ষ্মী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। ব্যাপারটি অভিনব। সঙ্গীত এবং নৃত্যবিষয়ক আলোচনা ছাড়া এই মানুষ দুটি কখনই তাঁকে বিরক্ত করেন না। এমন কী তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলতে কখনই ওঁদের দেখা যায়নি। শাস্ত্ৰীজী মাদ্রাজের মানুষ নন, কিন্তু দীর্ঘকাল এই প্রদেশে বাস করে নিজেকে চমৎকার মানিয়ে নিয়েছেন। তিনি কথা বলেন কম, বাজানোর সময় যেন সুরদেবীকে তাঁর হাতে ভর করেন।

তিনি আজ বিপরীত আচরণ করলেন। সোজা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে শাস্ত্রীজী এবং মিস্টার আয়ার যে ঘরে আছেন সেখানে চলে এলেন। গিয়ে দেখলেন শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী সেখানে বসে কথা বলছেন। ওঁকে দেখে তিনজনই অপ্রতিভ। শাস্ত্ৰীজী বললেন, আপনি কেন এলেন, আমরাই তো দেখা করব বলেছিলাম।

আশাকে ছেড়ে দেওয়া চেয়ার তিনি গ্রহণ করলেন না। একথার জবাব দেওয়ার আগ্রহও দেখা গেল না। তিনি হাসিমুখে তাকালেন যেন এই সবই অতি সাধারণ ঘটনা।

শাস্ত্ৰীজী বললেন, আমি কখনও আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলিনি। কিন্তু এবার পরোক্ষে জড়িয়ে আছি বলেই না বলে পারছি না। আপনাকে অনুরোধ করছি যাতে ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন। আপনার প্রতি ভারত সরকার যে সম্মান দেখিয়েছেন তা সমস্ত দেশের মানুষের হয়ে দেওয়া। সামান্য অভিমানের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করবেন না।

একবার চোখ ছোট হল তাঁর, নিমেষের জন্যে, তারপর মুখ স্বাভাবিক।

শ্ৰীমতী বিজয়লক্ষ্মী বললেন, আপনি আমাদের যে সম্মান দিয়েছেন তাতেই আমরা গর্বিত। কিন্তু সেই কারণে আপনি বঞ্চিত হলে আমাদের লজ্জার সীমা থাকবে না।

মাথা নিচু করলেন আশা, তারপর বললেন, জীবনের কিছু কিছু অনুভূতি এত কোমল যে তা নিয়ে কথা বলতে গেলে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। মোহিনী আট্টমে কর্ণের একটা উক্তি আমার খুব ভাল লাগে, আমি আমার মায়ের স্নেহ থেকে বহুদূরে চলে এসেছি। ঠিক তাই। আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যা চলে গিয়েছে তাকে আর টেনে আনতে বলবেন না।

শাস্ত্ৰীজী মুখ তুললেন। তাঁর চোখে বিস্ময়। আশা বললেন, আমরা আগামীকাল এমন একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতেভারতবর্ষের আর এক প্রান্তে যাব যা ইদানীং অভিজ্ঞতায় নেই। নিউইয়র্ক, লন্ডন, কলকাতা, দিল্লির কথা ভুলে যান। মনে করবেন আমি একটি পূজায় যাচ্ছি। তিনি কথা শেষ করে বেরিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন, এই পূজায় মাথা নিচু করার আনন্দ যে কোনো পুরস্কারের চেয়ে অনেক গুণ বেশি মূল্যবান।

মিস্টার আয়ার বলে উঠলেন, কিন্তু পাণ্ডানুল্লুর থেকে আর কোনো চিঠি আসেনি এখনও!

না আসুক! রক্তের অধিকার যে কেউ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু সুরের অধিকার? আমি ওই মাটিতে না পৌঁছালে শান্তি পাব না আয়ার সাহেব। আপনি সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলুন। নমস্কার। লম্বা ছিপছিপে শরীরটি ঋজু পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

.

গৌহাটি শহরের জন্যে কোনো বিশেষ টান আশার নেই। আসলে হোটেলের ঘরে ঢুকে গেলে সেই শহরের কোনো বিশেষ আকর্ষণ না থাকলে কখনই বাইরে পা বাড়াননি তিনি। খোদ নিউইয়র্কে তিনি সময় কাটিয়েছেন ঘরে কিংবা ব্যালকনিতে যখন রিহার্সাল বা অনুষ্ঠান করতে হয়নি। অনর্থক ঘোরাঘুরি তার কখনই ভাল লাগেনি। রাত্রে যে সব শিল্পকীর্তি আলোয় সাজিয়ে সুন্দর করে তোলা হয় তা দেখার আগ্রহ মনেই আসে না। আর ওই সব ছাড়াতো পৃথিবীর সমস্ত শহর মোটামুটি একই চরিত্রের। আজ হোটেলের বিছানায় শরীর এলিয়েই তাঁর কলকাতার কথা মনে পড়ল। পাণ্ডানুল্লুর থেকে ফিরে কলকাতায় আসতে হবে। অনেক কাল পরে কলকাতায় যাওয়া। অথচ এক সময় প্রায় প্রতি বছরই তাকে যেতে হত ওই শহরে। সবাই বলত কলকাতার সমঝদারের বাহবা পাওয়া একটা অন্য অভিজ্ঞতা। সেখানকার রসিকরা সঙ্গীত নৃত্য নাটক নিয়ে মশগুল থাকেন। নিজের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলেনি। কিছুদিন আগেও ওই শহরে শীত পড়লে বড় বড় অনুষ্ঠান হত। সমস্ত ভারতবর্ষের গুণী শিল্পীরা সেই সব সম্মেলন যোগ দিতেন। অনেক বছর আগে ওই রকম এক সম্মেলনে পৌঁছে। মাইহারের আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের দর্শন পেয়েছিলেন তিনি। তখন তার পরিচয় সবে ছাড়তে শুরু করেছে। খাঁ সাহেব তখন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। রবিশঙ্কর কিংবা আলি আকবর সে সময় নিজস্ব জায়গা। তৈরি করে নিয়েছেন। খাঁ সাহেবের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই সেই স্নিগ্ধ হাসি বৃদ্ধের মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। কোনো কথা বলেননি। কিন্তু সেই হাসিটিকে আশীর্বাদের মতো গ্রহণ করেছিলেন আশা।

কলকাতার কথা মনে পড়লেই আর একটা স্মৃতি চলকে ওঠে তার। তখন কত বয়স, তিরিশ হলেও হতে পারে। মাদ্রাজ থেকে ট্রেনে চেপে হাওড়া স্টেশন, সেখান থেকে উদ্যোক্তাদের গেস্ট হাউসে। তার সঙ্গী শিল্পীদের রাখা হয়েছিল কাছাকাছি হোটেলে। তখনই কমলা তাঁর সঙ্গে। আশা শুনেছিলেন এককালে নাকি ওই কলকাতায় রাজা জমিদার অথবা বাবুদের আগ্রহে বড় আসর বসত। সেই সব মানুষেরা ছিলেন প্রকৃত সমঝদার। কিন্তু অনুষ্ঠানগুলোয় তাদের ইচ্ছাই শেষ কথা ছিল। এই অনুষ্ঠান অবশ্য সেইধরনের নয়। তবে একজন রঈস আদমী এর উদ্যোক্তাদের একজন। ওরা কলকাতায় এসেছিল অনুষ্ঠানের একদিন আগে। বিকেলবেলায় একটি লোক এল সেই রঈস আমীর দূত হিসেবে। কমলা তার সঙ্গে কথা বলে এসে নিবেদন করল, আজ যেহেতু অনুষ্ঠান নেই তাই ওই রঈস আদমী চাইছেন আশা তার বাগানবাড়িতে আয়োজিত নৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিক। এর জন্যে টাকা পয়সার কথা চিন্তা করতে হবে না। আশা সম্মতি দিয়েছিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন আগামীকালের অনুষ্ঠানের মতো এটি আর একটি অনুষ্ঠানমাত্র। ভদ্রলোক যেহেতু অর্থবান তাই আলাদা ব্যবস্থা করেছেন মাত্র।

সন্ধের পর গাড়ি এল। ওঁরা যখন কলকাতার উপকণ্ঠে পৌঁছালেন তখনও মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি। বিশাল গেট পেরিয়ে অন্ধকার বাগান ডিঙিয়ে ওঁদের গাড়ি থামল যে বাগানবাড়িতে তার কোথাও কোন শব্দ নেই। মাটিতে পা দিয়েই প্রথম অস্বস্তি টের পেয়েছিলেন আশা। বারান্দায় দুজন কর্মচারি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে তাদের সম্ভাষণ জানিয়েছিল। তারপর সসম্ভ্রমে নিয়ে গিয়েছিল দুটো ঘর ডিঙিয়ে একটা বিশাল হলঘরে। সেখানে পৌঁছে চমকে উঠেছিলেন আশা। এত সুন্দর সাজানো হল তিনি এর আগে কখনও দ্যাখেননি। পায়ের তলায় নরম সুদৃশ্য কাশ্মিরী কার্পেট। দেওয়ালে প্রায় ছাদ ছোঁওয়া চমৎকার বাঁধানো রঙিন ছবি। ছাদের মাঝখানে পুরনো কাচের ঝাড়বাতির আলো থেকে স্বপ্ন গলে পড়ছে। কিন্তু সেই সুরম্য ঘরে কোনো মানুষ নেই। এ কেমন অনুষ্ঠান যার কোনো দর্শক নেই? সেই দুজন কর্মচারি তাদের ঘরের একপ্রান্তে বসবার ব্যবস্থা করে দিয়ে চলে গেলেন। এবং তখনই আশার মনে অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে লাগল। তিনি কমলাকে ইশারায় কাছে ডাকলেন, ওদের বলো এখানে আমার নাচার ইচ্ছে নেই।

কমলার মুগ্ধ চোখ চারপাশ দেখছিল। চমকে জিজ্ঞাসা করল, ওমা, কেন?

জায়গাটাকে বড় অপবিত্র লাগছে। আশার মুখে কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে এক বিশাল শরীরের প্রৌঢ় ঘরে ঢুকলেন। টকটকে লাল গায়ের রঙ, পাঞ্জাবি এবং ধুতিতে আভিজাত্য, আঙুলের হিরে আলো ফিরিয়ে দিচ্ছে। ঘরে ঢুকেই তিনি নমস্কার করলেন, আমার এই ক্ষুদ্র কুটিরে আপনি এসেছেন বলে কৃতার্থ হয়েছি। গতবার যখন কলকাতায় এসেছিলেন তখন আপনার নাচ আমি মঞ্চে দেখেছি। কিন্তু মুশকিল হল, যা সত্যি ভাল তা জনতার সঙ্গে ভাগ করে নিতে আমার মোটেই ইচ্ছে করে না। এতে আমি তৃপ্তি পাই না। তাই এই আসরের আয়োজন।

যৌবন তার রশ্মি গুটিয়ে নিচ্ছে মানুষটার মুখ থেকে এবং সেই সঙ্গে তার অপকীর্তির চিহ্ন রেখে যাচ্ছে গাঢ় রেখায়। কিন্তু আশা চট করে কিছু বলতে পারলেন না। রঈস মানুষটি নীরবতাকে দ্বিধা বলে মনে করলেন না, না না কোনো সঙ্কোচ করবেন না। আমার এই জলসাঘর আপনার মতো গুণীর ছোঁয়া পেয়ে এসেছে গত একশ বছর ধরে। ভারতবর্ষের এমন কোনো বড় শিল্পী নেই যিনি এখানে এসে অনুষ্ঠান করেননি। আমাদের বংশের কণ্ঠে সঙ্গীত নেই, কিন্তু রক্তে রয়েছে। কথা শেষ করে তিনি খানিকটা হেঁটে আশার উল্টো দিকে সাজিয়ে রাখা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসলেন। যেন এই ঘরে তিনি যা বলবেন তা পালন করা হবে। আশা অবাক হয়ে মানুষটাকে দেখছিলেন। বসামাত্র একজন ভৃত্য রুপোর রেকাবিতে পানীয়ের বোতল এবং জাপানি গ্লাস এনে তার সামনে সযত্নে রাখল। ইশারায় ভৃত্যকে চলে যেতে বলে রঈস মানুষটি অবলীলায় বোতলের পানীয় গ্লাসে ঢেলে বললেন আমি জানি নাচ শেষ হবার আগে অনেকেই পান করেন না। কিন্তু আপনারা সবাই চুপচাপ কেন? নিন, শুরু করুন।

আশার গলা থেকে একটা শব্দ ছিটকে উঠল, না।

না মানে? ঠোঁটের কাছে পৌঁছবার আগেই গ্লাস থেমে গেল। সবিস্ময়ে রঈস আদমি বললেন, না মানে?

এই রকম নোংরা পরিবেশে আমি নাচতে পারি না। আশা দৃঢ় গলায় বললেন।

নোংরা পরিবেশ? আপনি আমার জলসাঘরকে নোংরা জায়গা বলছেন?

নিশ্চয়ই। যেখানে একটি পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্যে সঙ্গীত নৃত্য এবং পানীয় একসঙ্গে কাজ করে সেখানে পবিত্রতা থাকতে পারে না। আমি এতে অভ্যস্ত নই।

আচ্ছা! মানুষটি উঠে বসলেন, আপনি অজ্ঞতাবশত এই কথা বললেন বলে আমি কিছু মনে করছি না। কিন্তু জেনে রাখুন এই জলসাঘরে আপনার চেয়ে অনেক বেশি গুণী, ভারতীয় সঙ্গীতাকাশের অনেক বড় বড় নক্ষত্র অনুষ্ঠান করেছেন আমার সামনে, আমার পিতা এবং পিতামহের সামনে। আপনি বলুন ঠিক কত টাকা পেলে আপনার এই অস্বস্তি দূর হবে?

টাকা? রাগে ঘেন্নায় উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্গীদের দিকে তিনি ইঙ্গিত করে বললেন, আপনি যদি ভেবে থাকেন টাকা দিয়ে আশা রাওকে কিনতে পারবেন তাহলে ভুল করছেন। আপনার জলসাঘরের নটী হবার জন্যে আমাকে ভাঁওতা দিয়ে এখানে এনেছেন বলে আমি আগামীকালের অনুষ্ঠানও করব না।

রঈস মানুষটি হাসলেন, বাঃ। আগামীকালের অনুষ্ঠানের সঙ্গে আজকের ফারাকটা কোথায়?

সেটা নিজেই বুঝে নিন।

আমি বুঝতে অক্ষম। আগামীকাল আপনি কয়েক হাজার মানুষের সামনে একটা প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠান করবেন আর এখানে একটি মানুষের সামনে আপত্তি থাকছে কেন? সেই হাজার মানুষের মধ্যে নব্বই ভাগ চোখে নোংরা দৃষ্টি থাকতে পারে। সেই সব দর্শকের নিরানব্বই ভাগেরই নৃত্য সম্পর্কে কোনো বোধ নাও থাকতে পারে। তারা শুধু আপনার দেহসৌষ্ঠব দেখতে এলে নিজেকে অপবিত্র ভাববেন না? আর সবার বিনোদন করে আপনি তো টাকাও নিচ্ছেন। তাই না? প্রশ্ন করে মানুষটি ঠোঁটে এমন একটা হাসি আনলেন যা দেখে আপাদমস্তক জ্বলে গেল আশার। তাঁর সঙ্গীরাও এবার উঠে দাঁড়িয়েছে। আর একটা ইঙ্গিত পেলেই ফিরে যাবে সবাই। কিন্তু শহরের এই উপকণ্ঠ তাঁদের পরিচিত নয়। ফিরে যেতে হলে এঁর সাহায্য দরকার। যেন ভুলিয়ে ফাঁদে নিয়ে আসা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু সেই সঙ্গে ওই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন তিনি!

মাথা উঁচু করে জবাব দিলেন আশা, আমি যে নাচ শিক্ষা করেছি তা ঈশ্বরের কাছে নিবেদনের জন্যে। যখনই আমি নাচি তখনই আমার সামনে ঈশ্বর থাকেন। কোনো একটি সাধারণ মানুষের মন ভোলাবার জন্যে নাচার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়। হাজার মানুষের কথা বললেন, আমাদের শাস্ত্রে তো জনতাকে ভগবান বলা হয়েছে। এক হাজার অপবিত্র মানুষ একত্রিত হলেও সবাই একই ধারায় চিন্তা করে না। তাদের সামনে নাচলে আমার মনে কোনো বিশেষ ব্যক্তির ছায়া পড়ে না। তাদের মিলেমিশে এক করে ঈশ্বর সামনে এসে দাঁড়ান। আর টাকা? ঈশ্বরের পূজা দিতে গেলেও দক্ষিণার প্রয়োজন হয়। আপনি এবারে আমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে উচিত কাজ করবেন।

মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আশাকে লক্ষ করলেন। তারপর বললেন, রাতের শেষ প্রহরে এই জলসাঘর থেকে শিল্পীর ফিরে যাওয়াটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম প্রহরেই যদি আপনি চলে যেত চান আমি বাধা দেব না, কিন্তু পাঁচজনের কাছে অপমানিত হব। তা হই কিন্তু আমার আপনার সঙ্গে কথা বলতে বেশ ভাল লাগছে। সত্যি কথা বলতে কী এর আগে কোনো শিল্পীকে এমন বিচক্ষণ কথা বলতে শুনিনি। আপনি বললেন নাচের সময় ঈশ্বর আপনার সামনে থাকেন। কোন ঈশ্বর? এককালে সুতনুকা নামের দেবদাসী তাঁর প্রিয়তম মানুষ দেবদত্তের জন্যে নেচে কি অপবিত্র কাজ করেছিল? যে কোনো সুন্দর জিনিস সৃষ্টি মানেই ঈশ্বরের আরাধনা। আর সেই আরাধনায় দুজনে তো একসঙ্গে অংশ নিতে পারে। আপনি ঈশ্বরের সামনে যা নিবেদন করেছেন তা কী পূর্ণতা পাবে যদি দর্শক উপস্থিত না থাকে?

আশা এর উত্তর দিলেন না। কারণ তাঁর মনে হচ্ছিল মানুষটি অনর্থক কথা বাড়িয়ে তার ফিরে যাওয়াটাকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। তিনি কোনো ব্যক্তির সামনে নাচতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া আর কারো প্রীতি তিনি কামনা করেন না। বড় অনুষ্ঠানে যাঁরা দর্শক হিসেবে আসেন তারা নিজস্ব পরিচিতি হারিয়ে শুধুই দর্শক হয়ে যান। সেই মানুষগুলোর সামনে নাচলে মনে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া ওঠে না। আশা কিছুটা উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন যদিও তিনি জানতেন সাহায্য ছাড়া এই জলসাঘর থেকে বেরুনো প্রায় অসম্ভব।

রঈস মানুষটি হঠাৎ বললেন, আপনি তো ভরতনাট্যমে নাচেন! আমি শুনেছি আপনার গুরুর কথা। হ্যাঁ, যে গুরুর কাছে আপনি বাল্যকালে শিক্ষা নিয়েছিলেন। তাই আগ্রহ ছিল দেখতে আপনার মধ্যে তার ছায়া কতটুকু! না, তাঁর নাচ আমি দেখিনি।

আশা প্রশ্ন না করে পারল না, আপনি তাতার নাচ দ্যাখেননি অথচ আমার মধ্যে তাতার ছায়া দেখতে চাইছেন! কথাটা খুব অসংলগ্ন হয়ে গেল না?

তাতা? কে তাতা? ওহো, আপনি সেই পাণ্ডানুল্লুরের মহাগুরুর কথা বলছেন? না না, তিনি নন। শুনেছি আপনার গ্রামের এক উদাসীন শিক্ষকের কাছে আপনার নাচের দীক্ষা হয়েছিল। কথাটা কি মিথ্যে?

মানুষটি প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই সর্বাঙ্গে কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল। গুরু বলতে এখন শুধু তাতার মুখই মনে আসে। কিন্তু গ্রামের সেই মানুষটি, যার কাছে মা অসুস্থতা সারাতে নিয়ে গিয়েছিল, যিনি তাঁকে ভরতনাট্যমের ইতিহাস শোনাতেন দুটো হাত বুকের ওপর ভাঁজ করিয়ে রেখে। তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো প্রথম দিকে ওই ভঙ্গিতে এবং এখন মনে হয় ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই অবস্থায় নিজের অজান্তে। শুধু শরীরের সঞ্চালন নয়, মনের পরতে পরতে নাচ সম্পর্কে আগ্রহ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই শিক্ষক। প্রথমে যা শুধু বক্তৃতার মতো নীরস মনে হত তাই এক সময়ে রক্তে মিশে গিয়েছিল। অনেক পরে তাতার কাছে শিক্ষা গ্রহণের সময় ওই মিশে যাওয়াটাকে অনুভব করেছিলেন আশা। কিন্তু যে মানুষটির নাম তাঁর গ্রামের বাইরে কেউ জানত না, যাঁর কথা এখন কারো স্মরণে নেই তাঁর প্রসঙ্গ এই রঈস মানুষটি জানল কী করে? শিক্ষকের আত্মীয় বা ঘরের লোকজন কেউ ছিল না। মানুষটি মারা গিয়েছিল নিঃশব্দে, দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা তা নিয়ে সেই সময় প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এখন সেসব ঘটনা কারো মাথায় আসে না। কিন্তু আশা যেন নিজের সামনে সেই শিক্ষককে দেখতে পেলেন। তিনি চিৎকার করে বলছেন, আমি ব্যায়াম করিয়ে আপনার মেয়ের শরীর সারাব? ওকে নিয়ে যান কোনো ব্যায়ামাগারে। এটা নাচ শেখার জায়গা।

সম্মোহিতের মতো মাথা নাড়লেন আশা, হ্যাঁ। কিন্তু তাঁর কথা আপনার কাছে পৌঁছালো কী করে?

তাঁর স্ত্রীর কাছে শুনেছি।

তাঁর স্ত্রী? চমকে উঠলেন আশা। সেই বাউণ্ডুলে মানুষটিকে সে আশৈশব একা দেখে এসেছিল।

হ্যাঁ। এই শহরে আছেন তিনি। যদি ভরতনাট্যমের কথা বলেন তাহলে বলব আমার দেখা যে কোনো শিল্পীর চেয়ে এই মহিলা অনেক বড়, অনেক বেশি গুণী।

কী নাম তার? আশা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

নাম বললে তো চিনতে পারবেন না। তিনি কোনো বারোয়ারী অনুষ্ঠান নাচেন না। তিনি নাচতেন বেঁচে থাকার জন্যে। তাঁর সামনে যারা দেবতা হিসেবে উপস্থিত থাকতে তাদের শরীর ছিল রক্ত মাংসের।

কী বলছেন আপনি?

বিন্দুমাত্র মিথ্যে বলছি না। আমার দেখা ভরতনাট্যমের শ্রেষ্ঠ শিল্পী এই কলকাতায় একজন সাধারণ বাঈজী হিসেবে দীর্ঘদিন বাস করে এখন জরাগ্রস্ত।

কিন্তু আপনি বললেন তিনি আমার সেই শিক্ষকের স্ত্রী?

সেটাও সত্য। জীবন বড় অদ্ভুত বেনিয়মে চলে।

তিনি আমার নাম জানলেন কী করে?

তার স্বামীর কাছেই জেনেছিলেন হয়তো। আমি এর বেশি কিছু জানি না। রঈস মানুষটি হাসলেন, আমার সময় নষ্ট হচ্ছে। যান আপনারা, আমার কর্মচারিরা আপনাদের পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছে। এই কে আছিস। শেষের শব্দ তিনটে যেন বিরক্তির সঙ্গে উচ্চারণ করলে মানুষটি।

আশার সঙ্গীরা কর্মচারিকে দেখামাত্র পা বাড়াচ্ছিল। কিন্তু আশা দাঁড়িয়ে রইলেন। যে কথাগুলো এইমাত্র তিনি শুনলেন তার সঙ্গে নিজের স্মৃতি মেলাতে পারলেন না। পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক ভেবেছেন এ ব্যাপারে। কে তার গুরু? সেই শিক্ষক না তাতা? যে শিশুকে হাতেখড়ি দিয়ে অক্ষর লিখতে শেখায়, না যে পরবর্তীকালে তাকে নির্মাণ করে? এর স্পষ্ট উত্তর আজ পর্যন্ত পাওয়া গেল না। সেই গৃহশিক্ষকের একটা ডাকনাম তার কাছে অস্পষ্ট আছে। অনেকেই তো ওঁকে পাগলা মাস্টার বলে ডাকত। সমাপদ থেকে অর্ধমণ্ডলী যিনি তাঁকে পৌঁছে দিয়েছেন তার মুখটাও আজ ভাল করে মনে পড়ে না। কিন্তু তার স্ত্রী, সত্যি যদি কেউ থেকে থাকে, এই মানুষটি তাঁকে শ্রেষ্ঠ ভরতনাট্যম শিল্পী হিসেবে সম্মান জানাচ্ছেন। কৌতূহল ক্রমশ ফণা তুলছিল। ভরতনাট্যমের যাঁরা গুণী শিল্পী তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিচার করা বোকামি। কিন্তু হঠাৎই যদি কাউকে শ্রেষ্ঠ বলা হয় তাহলে কৌতূহল জাগে বৈকি। দ্বিতীয়ত, সেই শিক্ষকের ব্যক্তিজীবন জানার আগ্রহ তীব্র হল। তৃতীয়ত, সেই মহিলা কীভাবে তার নাম জানলেন সেটাও জানতে ইচ্ছে করছিল। আশা দেখলেন মানুষটি ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তিনি ডাকলেন, শুনুন!

মানুষটি ঘুরে দাঁড়ালেন। এবং এতক্ষণে আশার বিশ্বাস জেগেছে খুব সাধারণ শ্রেণির মাতাল এবং লম্পটের দলে ইনি পড়েন না। অন্তত নাচ-গান সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এঁর আছে। আশা বললেন, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে সেই মহিলার ঠিকানাটা একটু বুঝিয়ে দেবেন? আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

বিস্ময় ফুটে উঠল মুখে, রঈস মানুষটি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি তার সঙ্গে দেখা করবেন? কেন?

সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনার অসুবিধে আছে?

বিন্দুমাত্র নয়। কিন্তু—! এক মুহূর্তে দ্বিধা নিয়ে তিনি বললেন, কিন্তু সেই পরিবেশে আপনার যাওয়া সঙ্গত হবে কি না ভেবে দেখুন। আপনার রুচিতে লাগতে পারে।

তার মানে? আশা কথাটার অর্থ স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন না।

আপনাকে বলেছি তিনি বাঈজীর জীবন যাপন করতেন। যদিও এখন তার বয়স হয়েছে কিন্তু তিনি সেই পরিবেশেই আছেন যেখানে মানুষ নৃত্যগীত এবং শরীর উপভোগ করতে যায়।

ও! আশা শুধু এই শব্দটি উচ্চারণ করতে পারলেন।

কিন্তু সত্যি আপনি যেতে চাইলে আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমি নিতে পারি। আপনার রুচিতে না বাধলে আপনি সসম্ভ্রমে সেখান থেকে যাতে ঘুরে আসতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু তার আগে আমাকে জানতে হবে কেন আপনি যেতে চাইছেন?

যাঁকে আপনি শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সম্মান দিচ্ছেন তিনি কেন আড়ালে রইলেন চিরকাল জানার আগ্রহ হচ্ছে। তাঁর স্বামীর কাছে আমি ঋণী। সেটাও ধরুন একটা কারণ।

কিন্তু যিনি ঈশ্বরের সামনে নৃত্য পরিবেশন না করে সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করতেন তার কাছে যেতে তো আপনার আপত্তি হওয়া উচিত।

নিশ্চয়ই। কিন্তু কী কারণে সেটা তিনি করতেন তা জানার জন্যে যাওয়া দরকার।

.

কিছু সময় বাদে তিনটি গাড়ি উপকণ্ঠ ছেড়ে শহরে চলে এল। প্রথমটিতে সেই রঈস মানুষ একা, বাকি দুটোতে আশা এবং তার সঙ্গীদের দলে আরও দুজন সুদেহী পুরুষ। বোঝা যায় এদের প্রয়োজন ঝামেলা থেকে বাঁচার কারণে। আশা এবং কমলা পেছনের আসনে বসেছিল। কমলা শেষ পর্যন্ত ভীরু গলায় না বলে পারেনি, বাঈজী পাড়ায় না গেলে চলত না। ওই মাতাল লোকটি নেশার ঘোরে কী বলতে কী বলল আর তাই তুমি বিশ্বাস করছ?

আশা কোনো উত্তর দেননি। এবং সেই প্রথম কৌতূহল ছাপিয়ে আর একটি অনুভূতির অস্তিত্ব আবিষ্কার করলেন। যে মানুষটা ক্রমশ তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল হঠাৎ এক ধাক্কায় তার ভূমিকা পাল্টে গেল। যদি তাঁর স্ত্রী ভরতনাট্যমে বিশেষ পারদর্শিনী হন তাহলে সেই শিক্ষক কী শুধু পাগলামির ভান করে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন, গুপ্ত সম্পদ কাউকে দান করতে তাঁর প্রবল অনীহা ছিল? এবং এই ভাবনা থেকেই মনে ঈর্ষার জন্ম নিল। আশার জেদ বেড়ে গেল মহিলাকে দেখতেই হবে।

Chapter - 3 - কলকাতায় ট্রাম দেখা

কলকাতায় এলে ট্রাম দেখা যায়। চলন্ত ট্রামগাড়ি দেখতে খুব ভাল লাগে আশার। রঈস মানুষের গাড়ি ট্রাম লাইন ছেড়ে অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তায় ঢুকল। দুপাশে রেডিও চলছে। লোকজন রাস্তায় উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরছে। কিন্তু রঈস মানুষটির ওপর তাঁর আস্থা তখন পুরোপুরি। বাগানবাড়িতে যে ওইরকম ভদ্রতা করেছে সে কেন এখানে এসে ছোট হবে? সামনের গাড়িটা থেমে গেছে। গাড়ির ড্রাইভার নেমে এসে জানাল তিন-তিনটে গাড়ি ওই গলিতে ঢুকলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বাবু শুধু আশাজীর গাড়িটাকেই যেতে বলেছেন। এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে কমলা তার হাত আঁকড়ে ধরলেও সেটা গ্রাহ্য করলেন না আশা। অতএব তার গাড়ি এবার গলিতে ঢুকল। সম্ভবত মহিলা বলেই গাড়ির আরোহীদের জন্যে কৌতূহলী হয়ে উঠল পথচারীরা। নানা মন্তব্য এবং সেই সঙ্গে কিছু সিটি ভেসে আসতেই আশা কুঁকড়ে গেলেন। কোনো মাতালের গলায় চিৎকার উঠল, যব সে বালম ঘর আয়ে, জিয়ারা মচল যায়ে। আর তখনই সামনের গাড়িটা থমকে গেল। যে বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে সেটি দোতলা। গাড়ির শব্দ পেয়ে কয়েকটি অল্পবয়সী মেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এসেও আবার ফিরে গেল চুপচাপ। রঈস মানুষটি এগিয়ে এলেন নিজের গাড়ি ছেড়ে, নেমে আসুন। আমরা পৌঁছে গিয়েছি।

কিন্তু–! আশা ততক্ষণে এখানে আসার জন্যে প্রায় আফসোসের স্তরে পৌঁছে গিয়েছেন।

আপনি আমার সঙ্গে এসেছেন যখন তখন আপনার অসম্মান হবে না। সিটি গান অথবা চিৎকার এখানে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। বড় বড় মন্দিরের সামনে পৌঁছালেও তো ঝামেলায় পড়তে হয়। আসুন।

কমলাকে ইশারা করে তিনি গাড়ি থেকে নামতেই রঈস মানুষটি বাড়ির ভেতর এগিয়ে গেলেন। যেসব মেয়ে একটু আগে বাইরে ছুটে গিয়েছিল তাদের দেখতে পেলেন নীচের বারান্দায়। যেন ওদের দেখেই সবাই এক জায়গায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রঈস মানুষ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছিলেন। হঠাৎ তরতর করে ওপর থেকে একজন নেমে এল, নমস্তে বাবুসাহাব। আরেব্বাস, আপনি আসবেন। অথচ আমরা কোনো খবর পাইনি।

হ্যাঁ। হঠাৎ চলে এলাম।

আমি এইমাত্র খবর পেয়ে ছুটে এলাম। মুশকিল হল গোলাপবালা–। লোকটা কথা শেষ করতে দ্বিধা করল।

আমি গোলাপবালার কাছে আসিনি। মীনাজী আছেন? রঈস মানুষ প্রশ্ন করলেন।

হ্যাঁ হ্যাঁ। আছে, কিন্তু এঁরা?

আমার মেহমান।

লোকটি ওদের পরপর কয়েকটা বন্ধ ঘরের সামনে দিয়ে নিয়ে এল একটি ছাদে। সেখানেই তাদের বসার ব্যবস্থা করে সে গেল সম্ভবত খবর দিতে। হঠাৎ আশা আবিষ্কার করলেন আশেপাশের অনেক জায়গায় নূপুর বাজছে এবং সেই সঙ্গে রাগাশ্রয়ী হিন্দি সিনেমার গান। রঈস মানুষটি কোনো কথা না বলে ছাদে পায়চারি করছেন। আশা বসে আছেন চুপচাপ, পেছনে কমলা দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ওপাশের দরজা খুলে গেল। আশা দেখলেন একটি দীর্ঘাঙ্গী মহিলা, যার বয়স এত স্বল্প আলোয় বোঝা মুশকিল, এগিয়ে আসতে আসতে থমকে গেলেন। মহিলার পরনে সালোয়ার পাঞ্জাবি, চুল লম্বা বেণীতে সংযত। মহিলার গায়ের রঙ অসম্ভব ফর্সা। রঈস মানুষটি ঘুরে দাঁড়িয়ে মহিলাকে দেখতে পেয়েই দ্রুত এগিয়ে এলেন। তিনি কিছু বলার আগেই মহিলার ধরা গলা শোনা গেল, কী ব্যাপার? শুনলাম আপনি আমার কাছে এসেছেন?

হ্যাঁ। এভাবে খবর না দিয়ে আসার জন্যে দুঃখিত। আপনি কি ব্যস্ত?

না না। ভাবছিলাম এবার শুয়ে পড়লেই হয়।

এত তাড়াতাড়ি? আপনার রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে?

আমি তো দিনে একবার খাই। আর এখন তো শোওয়া ছাড়া আমার কোনো কাজ নেই। এরা?

এঁর জন্যেই আপনাকে বিরক্ত করলাম। আমরা কি এখানে বসব?

হ্যাঁ। মহিলা একটি ছোট মোড়া টেনে নিয়ে নিজে বসলেন, ঘরে এবাড়ির তিনটে বাচ্চা শুয়ে আছে। এখন তো আমার বেশি ঘরের দরকার নেই। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না চারপাশের এত ঝরনা, নদী ছেড়ে আপনারা একটা মজা ডোবার কাছে কেন এলেন?

রঈস মানুষটি হাসলেন, ধরুন, আপনার সঙ্গে গল্প করতে।

তা ভাল। বাঙালিদের একটা খুব মজার অভ্যেস।

আপনিও তো বাঙালি হয়ে গিয়েছেন।

না না। আমি পাক্কা হিন্দুস্থানী। যা দিলাম তার থেকে বেশি নিলাম।

কী দিয়েছেন তা জানি, কী নিয়েছেন?

বিষ। মনে, শরীরে। বলেই হাসলেন, আপনি, না তুমিই বলছি, অনেক ছোট, তুমি কিছু মনে কর না। কী করো তুমি? ওঁর সঙ্গে এখানে কেন? তুমি যদি ভদ্রঘরের মেয়ে হও তাহলে বলি এখানে তোমাদের কেউ আসে না। মহিলার কথায় কোনো ঝাঁঝ নেই।

আশা প্রথম কথা বললেন, আপনাকে দেখতে।

মীনাজী সজোরে হেসে উঠলেন, ওমা! আমার মতো একটা বুড়িকে দেখার কী আছে।

আশা বললেন, ওর সঙ্গে আমার আজকেই পরিচয়। উনি হঠাৎ আপনার কথা বলতে আমরা এখানে চলে এলাম।

আমার কথা? একজন বৃদ্ধা বাঈ-এর আর কী কথা থাকতে পারে?

রঈস মানুষ এবার কথা বললেন, মীনাজী, ওঁর পরিচয় দিচ্ছি। উনি আজ কলকাতায় এসেছেন সারা বাংলা সঙ্গীত সম্মেলনে নিমন্ত্রিত হয়ে। আপনি তো জানেন আমি কোনো সম্মেলনে রস উপভোগ করতে পারি না। তাই ওঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার বাগানবাড়িতে। কোনোরকম অসম্মান করিনি তবু উনি আমাকে নাচ দেখাতে অস্বীকার করেছেন। কোনো ব্যক্তিমানুষের সামনে উনি নাচেন না! ঈশ্বরকে দর্শক হিসেবে কল্পনা করে উনি খুশি হন। তখনই আপনার প্রসঙ্গ উঠল।

তুমি নাচো? বাঃ। মীনাজী কথার মাঝখানে বাধা দিল, কোন্ নাচ?

ভরতনাট্যম। আশা নিচু গলায় জানালেন।

কার কাছে শিখেছ?

আমি শেখা শুরু করেছিলাম তাতার কাছে।

তাতা? পাণ্ডানুল্লুরের তাতা? প্রায় চিৎকার করে উঠলেন মীনাজী।

আজ্ঞে হ্যাঁ। তিনি চলে যাওয়ার পর আরও দুজনকে গুরু হিসেবে পেয়েছি।

মীনাজী উত্তেজিত ভঙ্গিতে মোড়া থেকে উঠে কাছে এলেন, তুমি তাতার কাছে শিখেছ! আহা কী ভাগ্যবতী তুমি। কী নাম তোমার?

আশা দেখলেন, তাঁর কাছে এগিয়ে আসা মানুষটির বেশ বয়স হয়েছে। মুখে অজস্র ভাঁজ। কোনোভাবেই সত্তরের নীচে নয়। তিনি নিজের নাম বললেন। তাতে বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া হল না। কারণ তখন মীনাজী যেন তাতার কথাতেই বিভোর। মীনাজী বললেন, মানুষটিকে আমি শুধু চোখে দেখেছি, তুমি কী ভাগ্যবতী। তারপরেই গুনগুনিয়ে উঠলেন একটি পদ, যা আশার খুব চেনা। নিজের অগোচরেই আশা তাতে গলা মেলালেন। খুবই নিচু গলায় একটু সুরের সেতু তৈরি হতেই মীনাজীর পায়ে তাল ফুটল। হঠাৎ থেমে গিয়ে মীনাজী বলে উঠলেন, এই মেয়ে, তোমার গল্প শুনি।

আশা হেসে উঠলেন, আমার কোনো গল্প নেই।

তুমি কি শুধু নাচ নিয়েই থাকো?

এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে দিলেন না রঈস মানুষটি। তিনি বললেন, মীনাজী, আপনার স্মরণশক্তি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আপনার কী মনে পড়ছে না আশার কথা? আপনিই তো একদিন বলেছিলেন ওর কথা। আপনার স্বামী–! হঠাৎ মাথা নিচু হয়ে গেল মীনাজীর। সেটা লক্ষ্য করে রঈস মানুষ বললেন, তিন বছর আগে আশাদেবী যখন এই শহরে নাচ দেখাতে এসেছিলেন তখন খবরের কাগজে ওর ছবি বেরিয়েছিল। সেটা দেখার পর আপনি ওর কথা আমাকে বলেছিলেন। আপনার কি মনে পড়ছে না?

হঠাৎ চেহারা পাল্টে গেল বৃদ্ধার। কঠোর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন নিয়ে এসেছেন ওকে?

রঈস মানুষটি শান্ত গলায় জবাব দিলেন, আপনার সঙ্গে ওঁর পরিচয় হওয়া দরকার।

এবার আশা প্রশ্ন না করে পারলেন না, একথা কি সত্যি, যিনি আমাকে প্রথম নাচ সম্পর্কে আগ্রহী করেছিলেন তিনি আপনার স্বামী? ওঁর কথাটা শোনার পর আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।

মীনাজী মুখ তুললেন, কেন?

কারণ আমি খুব ছোটবেলা থেকে আমার শিক্ষককে দেখেছি। তিনি ছিলেন বাউণ্ডুলে প্রকৃতির। গ্রামের বাচ্চাদের নাচ শেখাতেন ইচ্ছেমতন। তাঁর পরিবারের কাউকেই আমি দেখিনি। গ্রামের মানুষরা তাঁকে বলত পাগলা মাস্টার। সত্যি বলতে কী তিনি সব সময় স্বাভাবিক ছিলেন না।

মীনাজী চোখ বন্ধ করলেন, আচ্ছা, তোমার প্রথম পাঠের দিনগুলোর কথা মনে আছে? তিনি কি তোমাকে দুটো হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলতেন? আর তুমি যখন সেই রকম করতে তখন তিনি কি ভরতনাট্যমের ইতিহাস শোনাতেন? প্রথম দিকে কি তোমার খুব খারাপ লাগত? পরে কী তুমি একটু একটু করে সেই রস গ্রহণ করতে পেরেছিলে?

হ্যাঁ। এবার আশা সোজা হয়ে বসলেন, আপনি কী করে জানলেন?

প্রত্যেকের মানুষের কিছু নিজস্ব অভ্যেস থাকে। অবস্থা পরিবর্তিত হলেও তার কিছুটা না কিছুটা কোথাও থেকে যায়। যদি কোনো মানুষকে আপন করে নাও তাহলে সেই অভ্যেসগুলোকে চিনে নিতে পারবেই।

আশা তখন প্রায় আত্মবিস্মৃত, আপনি আমার কথা জানলেন কী করে?

উনি জানিয়েছিলেন। হঠাৎ লিখলেন একটি ছাত্রী পেয়েছি। খুব রোগা, মাঝেমাঝেই ভোগে কিন্তু মনে হচ্ছে জিনিস আছে। তার বেশ কিছুদিন পরে লিখলেন, উচ্চশিক্ষার্থে ছাত্রীটিকে বিদেশ পাঠাতে গৃহশিক্ষকের যা অবস্থা হয় এখন আমার তাই। সে গেছে তাতার কাছে। আমার বিশ্বাস এই মেয়ে একদিন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হবে। ব্যস এইটুকু। তোমার নাম ছিল চিঠিতে। যেবার তোমার ছবি কাগজে ছাপা হল তখনই ওর চিঠি বের করে মিলিয়ে নিলাম। আশা নামটা ও বড় ভালবাসত।

তিনি আপনাকে এত গুছিয়ে চিঠি লিখতেন?

হ্যাঁ। কারণ তাঁর বাউণ্ডুলেপনাটাই সাজানো ছিল। কথাগুলো বলেই আচমকা একটা কান্নার শব্দ ছিটকে এল মীনাজীর গলা থেকে। খোলা আকাশের তলায় ওই রাত্রে সবাই যখন নিশ্চুপ তখন নিচের রাস্তায় হুল্লোড়ের শব্দ, আশেপাশে হারমোনিয়ামের আওয়াজ আর সেই সঙ্গে সুরেলা গলায় গান ছড়িয়ে পড়ছে।

আশা অনেক পিছিয়ে গিয়ে মানুষটির মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন। নাঃ, কিছুতেই মিলছে না। শিক্ষককে দেখে কখনই মনে হতো না তিনি বিবাহিত। তিনি আচরণ করতেন সেটা তাঁর ভান। আশা জানেন না ঠিক কোন সুবাদে শিক্ষক ওই গ্রামে বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন। চিন্তাটা কখনই মাথায় আসেনি। কোথাও ভুল হচ্ছে না তো! এই বৃদ্ধা অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন না তো! কিন্তু তা কী করে হবে। ওঁর বর্ণনার সঙ্গে নিজের স্মৃতির কোনো অমিল খুঁজে পাচ্ছেন না। আশা বললেন, আমার খুব খারাপ লাগছে এভাবে এসে আপনার স্মৃতিকে আহত করতে। আসলে আমি চেয়েছিলাম–।

কথা থামিয়ে দিলেন মীনাজী, না, না। সঙ্কোচ কোরো না, আমার খুব ভাল লাগছে। অনেক, অনেকদিন পরে তার কথা আমি আলোচনা করছি। এই কথা বলার সময় তো আমি তাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাচ্ছি।

আপনি ওঁর বিবাহিতা স্ত্রী? আচমকা প্রশ্নটি না করে পারেননি আশা।

বিবাহ বলতে তুমি কী বোঝ? মন্ত্র, পূজা এবং আত্মীয় প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য?

না। তবে প্রচলিত মত তাই।

সে-বিয়ে আমাদের হয়নি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় বিয়ে আমাদের হয়েছিল। আমরা পরস্পর সততার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে ভালবাসার মন্ত্রে বিবাহিত হয়েছিলাম। কথাগুলো বলতে বলতে মীনাজী কী কেঁপে উঠলেন! লজ্জা কী তাঁকে এই বয়সেও অধিকার করতে চাইল! তারপর দ্রুত সেই অবস্থাকে অতিক্রম করে বললেন, উনি এসেছিলেন আমার দিদিমার কাছে নাচ শিখতে। ব্রাহ্মণের ছেলে নাচ শিখতে আসাটা আমাদের সবাইকে অবাক করেছিল। নাচ আমাদের একত্রিত করেছিল। দেবদাসীর মেয়ের সংসারী হবার স্বাধীনতা আজ সমাজ করে দিয়েছে। সেই সময় সমাজ যেমন লাল চোখ দেখাত তেমনি আমাদের পরিবারের সংস্কারে বাধত। ঈশ্বরকে মন দিয়ে শরীরটাকে বিলিয়ে দিতে হত জমিদার বা অর্থবানদের কাছে। জীবনকে ওইভাবে মেনে নিয়েছিলেন আমার মা-দিদিমারা। ভালবাসার জোয়ার সম্ভবত সমুদ্রের ঢেউকে হার মানায়। তাই সব কিছু বিস্মরিত হয়ে যখন আমি তাকে গ্রহণ করেছি এবং তিনি আমাকে নিয়ে সংসার এবং নাচের জগতে পা বাড়াতে চাইছেন তখনই প্রবল আপত্তি উঠল। আমার পরিবার তাদের ভবিষ্যতের আয়ের উৎসটিকে হারাতে চাইল না। আর ওঁর পরিবার সম্মান হারানোর ভয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হল না। প্রায় বলপ্রয়োগ করে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হবেন যদি তিনি আমার সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তিনি আমার নৃত্য সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহী। এর অন্যথা হলে আমার ওপর ভয়ঙ্কর অভিশাপ নেমে আসবে। এ ধরনের বিয়ে করার যে চেষ্টা করেছে সে তার স্বামীকে হারিয়েছে অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু এ সব কথা আমাকে পাখি-পড়ার মতো বোঝানো হলেও আমি জানি সেই সব ব্যক্তি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যাঁরা আমাকে ভোগ করার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন। আর তার ব্রাহ্মণ পিতামাতা যতই ঈশ্বরভক্ত হন, দেবদাসীর মেয়েকে ঘরের বউ করার উদারতা দেখাতে রাজি হচ্ছিলেন না। তবু যখন তিনি প্রচণ্ড জেদ দেখাচ্ছেন তখন তাকে পরিবারের সমস্ত উত্তরাধিকারত্ব থেকে বঞ্চিত করা হল। মীনাজী হাসলেন। এই স্বল্প আলোয় সেই হাসির বিষণ্ণতা আশার মন ছুঁয়ে গেল। মীনাজী বললেন, তারপরের গল্প তো খুব ছোট্ট। এক রাত্রে আমাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হল মন্দিরে, দেবাদিদেব মহাদেবের সামনে। তাঞ্জোরের মহারাজের নাকি চারশো দেবদাসী ছিল। তারা থাকতো শিবের মন্দিরের গায়ে বাসা বেঁধে। রাজা তাদের সব রকম কর থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, জমি দিয়েছিলেন। তখন সেই দেবদাসীরা অনেক বেশি স্বাধীন ছিল। তারা সাধারণজীবনে এবং সামাজিক কাজে অংশ নিতে পারত। ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত বলে একজন দেবদাসী কখনই বৈধব্যের দুর্ভাগ্য বহন করত না। যদিও তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতেন রাজা অথবা তারপরে কোনো ধনী পুরুষ, কিন্তু যে-কোনো অনুষ্ঠানে তাদের ব্যবহার করত সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু তারপরে একজন ধনী নয় সংখ্যা বাড়তে লাগল দেবদাসীর রক্ষকদের। সেক্ষেত্রে তার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের কোনো বালাই ছিল না। আমার মাকে শুনেছি এক সময় আক্ষেপ করতে, এর চেয়ে একটি সাধারণ গণিকা অনেক স্বাধীন জীবন যাপন করে, কারণ সে নিজের পছন্দ প্রয়োগ করতে পারে। অথচ আমার দীক্ষার দিনে মা কিন্তু নিজে উদ্যোগী হলেন। এ বড় বিচিত্র মানসিকতা। ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গিত হয়ে গেলে দেবদাসীকে ভোগ করতে কোনো ধনীর আপত্তি নেই। সেই রাত্রে তিনি উন্মাদের মতো বাধা দিতে এসেছিলেন। কিন্তু অর্থবান এবং ধর্মাত্মা ব্যক্তিরা যখন একত্রিত হয় তখন একক শক্তি অসহায় হয়ে পড়ে। তার পরে, আমি একজন দেবদাসী, আমার শরীরে কামুকের বিচরণ আর মনে চাপিয়ে দেওয়া হল ঈশ্বরের প্রেম। তিনি চলে গেলেন নিরুদ্দেশে। সেই সময় আমি প্রায় উন্মাদিনী। নাচ ভুলে গেলাম। দেবদাসীর পক্ষে যা কিনা মারাত্মক অপরাধ। আর সব দরজা চিরকালের জন্যে বন্ধ হয়ে গেছে বুঝতে পারার পর আমার ধনী অভিভাবকের এক শহুরে বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।

আশা জিজ্ঞেস না করে পারলেন না, কী করে?

মনের জোরে। যখন সবাই ভেবেছে পাখি পোষ মেনেছে, তখনই তো উড়ে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। মায়ের কথাটা মনে বারংবার বাজত। যদি শরীর আর মন নির্ধারিত পুরুষকে দিতে না পারি তাহলে স্বাধীনভাবে বাঁচব না কেন? আমার অভিভাবকের বন্ধুটি ছিলেন লক্ষৌয়ের এক জমিদার। তিনি আমার মনের কথা বুঝেছিলেন। তিনি আমাকে নিয়ে এলেন লক্ষ্ণৌতে। আজ বলতে দ্বিধা নেই ওই মানুষটি সত্যি আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন। আমাকে নাচ শিখতে সুযোগ দিয়েছিলেন নতুন করে। এবং আমি আবিষ্কার করলাম বাঈজীর বিশেষ সম্মান আছে। শুধু নৃত্যগানের মাধ্যমে পুরুষদের মনোরঞ্জন করেই সে তার ব্যবসা চালাতে পারত তখন। একজন বাঈজীকে শুধু টাকার জোরে কখনই দখল করা যেত না। ঈশ্বরকে পুতুল করে দাঁড় করিয়ে আমাকে কামুকের লালসা মেটাতে হত না। তবে নদীতে নেমে যদি কেউ শরীরে জল না ছোঁয়াতে চায় তবে উন্মাদ বলেই ভাবতে হবে। কিন্তু ও-ব্যাপারে আমার মর্জি ছিল শেষ কথা। আমার রক্ষক অনেক চেষ্টার পর তার খবর এনে দিলেন। তিনি তখন তোমাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার, কথা বলার জন্যে আমি ছটফট করতে লাগলাম। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে হত, যে-জায়গাটা আমরা এক সময় তৈরি করেছিলাম সেই জায়গা যদি নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে চিঠি দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর এল। দেখলাম তিনি আমার সব খবর জানেন। আর তারপরে ওই চিঠি দেওয়া নেওয়াই হল আমাদের একমাত্র সেতুবন্ধন। তিনি তার সব কথা আমাকে জানাতেন কিন্তু আমি আমার ব্যবসার জীবনের কথা ওকে লিখতে পারতাম না। আমার বাঈজীর জীবন সম্পর্কে তার কী ধারণা ছিল তা কখনই তিনি জানাননি।

লক্ষ্ণৌ থেকে আমি এলাম কলকাতায়। এই বউবাজার স্ট্রিটের বাঈজী পাড়ার তখন বেশ ইজ্জত ছিল। আমার নাচের প্রশংসা তখন এই মহলে মুখে মুখে ছড়িয়েছিল। সঙ্গীতের কোনো জাত নেই। কলকাতায় যেসব গুণী শিল্পী অনুষ্ঠান করতে আসতেন তাঁদের কেউ কেউ আমার নাচ দেখতে অথবা কথা বলতে এখানে আসতেন। আমি ভালই ছিলাম। বেশ ভালই ছিলাম।

কিন্তু মানুষের রুচি যখন নিম্নগামী হয় তখন কোনো বাধা তাকে আটকাতে পারে না। অপসংস্কৃতির ঢেউ লাগতে শুরু করল এ পাড়ায়। শাস্ত্রীয় নৃত্যগীতের বদলে চটুল নাচগান চাইতে শুরু করল নবীন খদ্দেররা। শুধু আমরা কয়েক ঘর পড়ে রইলাম আমাদের সম্পত্তি নিয়ে। আর সেই সঙ্গে বাঈজীদের সঙ্গে সাধারণ স্বৈরিণীর ব্যবধানও কমে যেতে লাগল দ্রুত।

যেন চোখ বন্ধ করে ওই অবক্ষয়ের ছবিটা দেখতে লাগলেন মীনাজী। আবিষ্ট হয়ে শুনছিলেন আশা। এবার সচেতন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, উনি আত্মহত্যা করলেন কেন?

এখানে এসেছিলেন। আমাকে না জানিয়ে। হয়তো আর ধৈর্য ধরতে পারেননি। এসে পৌঁছেছিলেন দুপুরে। তখন তো আমাদের বিশ্রামের সময়। দারোয়ান তাঁকে প্রথমে ঢুকতে দেয়নি। কারণ তার পোশাকসম্মানজনক ছিল না। মীনাক্ষী যে মীনাজী হয়ে গেছে তা তিনি জানতেন না। যাহোক, আমার ঘরে এসে তিনি ছেলেমানুষ হয়ে গেলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু তিনি জড়িয়ে ধরামাত্র আমি শিউরে উঠলাম। কত পুরুষ তো ওই কাজ করল কখনই তেমন অনুভূতি হয়নি। আমি অনেক চেষ্টায় তাঁকে সংযত করলাম। তিনি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমি জানতাম তা আর সম্ভব নয়। সকালের শেফালির শরীরে রোদ পড়লে তাকে আর বিকেলে ফিরে পাওয়া যায় না। তিনি কোনো আপত্তি শুনতে নারাজ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার নাচ দেখতে চাইলেন। কথা বলতে বলতে মীনাজী উঠে দাঁড়ালেন। আর তার পরে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য দেখলেন আশা। কোনো প্রস্তুতি নেই, এমন কী পায়ে নূপুর পর্যন্ত নেই। কিন্তু সম্মোহিতের মতো নাচ শুরু করলেন মীনাজী। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, হঠাৎ কেঁপে উঠলেন আশা। এ সেই নাচ। যে নাচের কথা শিক্ষক বলতেন। যে নাচের গল্প তাতার কাছে তিনি শুনেছিলেন। শব্দহীন শারীরিক সঞ্চালনে যে ছবি মূর্ত হয়ে ওঠে পলকে। এই জরাগ্রস্ত শরীরেও মীনাজী নিজেকে প্রকাশ করলেন। ক্রমশ মোহিনীরূপের শেষ ধাপে পৌঁছে গেলেন মীনাজী। আর তারপরে সেই ছাদের ওপর বসে কান্নায় কেঁপে উঠলেন। আশা উঠে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মীনাজী কান্না জড়ানো গলায় বললেন, তিনি চলে গেলেন। আচমকা। আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিলেন না। আমার নাচে তিনি কী দেখেছিলেন জানি না। কিন্তু–। যাহোক, আমি চিঠি দিলাম তাঁকে। চিঠি ফিরে এল। টেলিগ্রাম করলাম পোস্টমাস্টারকে। তিনি জানালেন আত্মহত্যার ঘটনাটা। কেন ওভাবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া আমি জানি না। কী অপরাধ করেছিলাম আমি নাচ দেখিয়ে? নিজেকে যেন ধিক্কার দিচ্ছিলেন মীনাজী। তারপর হঠাৎ আশাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি জানো? আত্মহত্যার আগে তিনি কী কিছু বলেছিলেন?

মাথা নেড়েছিলেন আশা নীরবে। না।

বোঝা যাচ্ছিল মীনাজীর শরীর বেশ খারাপ হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। তিনি আশার অঙ্গ স্পর্শ করলেন কাঙালের মতো, তুমি তাকে দেখেছ। তোমার সম্পর্কে তাঁর অনেক বড় আশা ছিল। আজ বেঁচে থাকলে তিনি খুশি হতেন। শোনো, ঈশ্বর আছেন। তাকে সামনে রেখে নাচা মানে নিজের সঙ্গে প্রতারণা করা। কিন্তু সে প্রতারণা বরং ঢের ভাল। রক্তমাংসের মানুষকে ভালবেসে মোহিনী হওয়া যায়, শিল্পী নয়।

রঈস মানুষটি উদ্যোগী না হলে এখানে আসা যেত না, তিনি ব্যস্ত হলেন বলেই শেষ পর্যন্ত ওই বাড়ি ছেড়ে গেস্ট হাউসে পৌঁছাতে পারলেন আশা। বুকের ভেতরে অসম্ভব এক ভার তখন। তিনি বিদায় নেবার সময় রঈস মানুষটিকে বললেন, আমাকে একটা কথা দেবেন?

বলুন।

কালকের অনুষ্ঠানে ওঁকে নিয়ে আপনি আসবেন?

হাসলেন মানুষটি। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, না উনি কোথাও বের হন না। আর আমার কথা তো আগেই বলেছি। হাজার মানুষের ভিড়ে আমি নাচ দেখতে যাই না। তাছাড়া আজ যে নাচ দেখলাম তার স্মৃতি কিছুদিন স্মরণে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

গৌহাটির হোটেলে এখন মধ্যরাত। আশা মনে মনে স্থির করলেন, এবার কলকাতায় ফিরে এসে ওই মানুষটির খোঁজ করতে হবে। একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন সেই রাতে ছাদে যে নাচ দেখেছিলেন, তার স্মৃতি যদি এখনও অটুট থাকে তাহলে আশা সেটি সক্ষমতার সঙ্গে অতিক্রম করতে পারছে কিনা! তিনি জানেন পারবেন! তারপরেই তাঁর খেয়াল হল অনেক সময় চলে গিয়েছে। আজ সেই মানুষটি অথবা মীনাজী পৃথিবীর পরিবেশে আছেন কি না তা জানা নেই। হঠাৎ তাঁর সমস্ত শরীরে কাঁপুনি এল। জীবনের কোনো ব্যাকরণ নেই কেন?

আলারিপ্পু, যতিসভরম, সবদম, ভরণম, অভিনয় পদম এবং তিল্লানা। ব্যাকরণ মানতেই হয় যে কোনো শিল্পীকে, কারণ তাতে একটি নির্দিষ্ট পথ পেতে সুবিধে হয়। তাছাড়া প্রতিটি সৃষ্টির একা নিজস্ব চরিত্র থাকে এবং সেই চরিত্র ব্যাকরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হলে বিক্ষিপ্ত, এলেমেলো হয়ে পড়ে। কিন্তু ওই বিভক্ত পর্বের মধ্যে থেকেও ভরতনাট্যম শিল্পী নিজেকে আলাদা করতে পারেন অন্য শিল্পীর থেকে। সেখানে তার অবাধ স্বাধীনতা। সৃষ্টিশীল শিল্পী নিজেকে প্রকাশ করেন বিশিষ্টভাবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার না করে। ভরতনাট্যম, কথাকলি কিংবা মোহিনী আট্টমে বিষয় খুঁজে নিয়ে তা পরিস্ফুট করাই শিল্পীর সাধনা।

ভরতনাট্যমে নিয়োজিত হয়েও আশা মাঝে মাঝেই মোহিনী আট্টমে নিজেকে খুঁজতে চেয়েছে। সাধারণত পৌরাণিক কাহিনি নির্ভর হওয়া সত্ত্বেও কেরালার মানুষের সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্য এবং ভগবান বিষ্ণুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা এই নাচে ফুটে ওঠে। আসলে মোহিনী আট্টমে পৌরাণিক কাহিনির মাধ্যমে রক্ত মাংসের মানুষের প্রেম ভালবাসার কথা বলা হয়ে থাকে। ঈশ্বরের প্রতি আর্তি আর প্রেমিকের প্রতি আকাঙ্ক্ষায় প্রেম আর পূজা একাকার। মোহিনী আট্টমের মোহিনী কে? রূপকথা কিংবা লোককথার মোহিনী কে? রূপকথার কিংবা লোককথার যে সব সুন্দরীদের নাম শোনা যায়। তাদেরই একজন? আশা ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন গুরুর কাছে। তিনি বলেছিলেন, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়। মালাবারে এই শিল্পের উৎপত্তি। নায়ারদের সঙ্গে নামবুদ্রি ব্রাহ্মণদের বৈবাহিক সম্পর্ক সুবিদিত। এক নায়ার রাজকন্যার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল নামবুদ্রির সঙ্গে। কন্যা তাদের পারিবারিক মন্দিরে পূজা করত। সেই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা বিষ্ণুর আর এক রূপ পদ্মনাভ। প্রতি রাতে সেই কন্যা সখীদের নিয়ে জঙ্গলের পথ বেয়ে পদ্মনাভের পূজা করতে মন্দিরে যেতেন। সেই মন্দিরে কন্যার পিতার নির্বাচিত নামবুদ্রি পুরোহিতদের সমাগম হত যাতে সুপাত্র নির্বাচন করা সম্ভব হয়। কিন্তু রাজকন্যার ইচ্ছে ছিল না এইভাবে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হতে। সে সেই পুরুষদের কাছে আত্মনিবেদন করতে পারে যাকে শ্রদ্ধা করা যায় এবং যে তাকে মমতার চোখে দেখবে। একই জীবিকার একজন পুরুষের দ্বারা সেটা কী সম্ভব। এই কারণেই অনেক নামবুদ্রি যুবক ব্যর্থ মনে ফিরে গেল। কিন্তু রাজকন্যা তবু প্রতি সন্ধ্যায় জঙ্গল পেরিয়ে মন্দিরে যান পদ্মনাভের পূজা করতে। সখীদের জ্বালানো প্রদীপের আলোয় একদিন রাজকন্যার শরীর রোমাঞ্চিত হল। পদ্মনাভের মূর্তির সামনে একনিষ্ঠ হয়ে বসে সে মূর্তির চোখে এক নবীন জ্যোতি দেখতে পেল। যেন তাঁর চোখে জীবনের দীপ্তি চলকে উঠেছে। শিহরিত রাজকন্যার সমস্ত অন্তর সেই মূর্তির ভেতরে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক সত্তার কাছে নিবেদিত হয়ে গেল। ওই মূর্তিতে প্রাণ আছে বলে সে নিশ্চিত হল। কিন্তু কী করে ওই পাথরের মূর্তি ছেড়ে তিনি রক্তমাংসের চেহারা নেবেন? সে দিনটি কবে আসবে! রাজকন্যা উতলা হয়ে পড়ে। প্রতিদিন যে মন্ত্র সে পদ্মনাভের সামনে বসে উচ্চারণ করে তা তো পর্যাপ্ত নয়। এই ধরাবাঁধা মন্ত্রে অতিরিক্ত কিছু পাওয়া যায় না। কী করে সে ঈশ্বরকে তার কাছে নিয়ে আসবে? সে নাচ শুরু করল পদ্মনাভের সামনে। মুখ এবং শরীরকে ব্যবহার করল তার আকাঙ্ক্ষায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে? প্রতি রাতে সে নৃত্যের মাধ্যমে যে আর্তি ফুটিয়ে তুলছিল তা মোহিনীরূপ ধারণ করছিল। এবং এই নৃত্য থেকেই মোহিনী আট্টমের উৎপত্তি। ভগবান পদ্মনাভের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টায় কোনো পাপ নেই। ঈশ্বরের পদতলে নিজেকে সমর্পণ করার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হিসেবে নৃত্যকে নির্বাচন করেছিল রাজকন্যা। শুধু ঈশ্বরের পাথরে মূর্তির সামনে পা মুড়ে বসে থাকতে তার তৃপ্তি ছিল না। তাই সে পাগলের মতো প্রতি রাত্রে নেচে যেত ঈশ্বরের সামনে। এইভাবে দেবতাকে প্রিয় করার চেষ্টায় সে নিজেকে নিবেদন করেছিল এই ভেবে তার প্রভুকে সে নৃত্যের মাধ্যমে স্পর্শ করেছে। মোহিনী আট্টমের শুরু হয়েছিল এইভাবেই। আশার কাছে এই গল্প অন্য উৎসাহ তৈরি করেছিল। পদ্মনাভ নয়, নটরাজের কাছে নিজেকে উৎসর্গ করতে বলেছিলেন তাতা। কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, সেই পাথরের মূর্তির সঙ্গেই তার সংযোগ। কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি সেই রাজকন্যার মতো পাথরের চোখে কোনো দ্যুতি দেখতে পাননি। মোহিনী আট্টমকে বলা যেতে পারে। ভরতনাট্যম কিংবা কথাকলির একটি প্রশাখা কিংবা দুই-এর মিশ্রণ। আবার এই নৃত্যে কেরালার। লোকনৃত্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মোহিনী আট্টমে গল্প আছে কিন্তু তা শুধু অলঙ্কারের মতো। অন্য নৃত্যে কাহিনিকে পরিস্ফুটন মূল ভূমিকা নেয়। মোহিনী আট্টমে শিল্পী শরীরের মাধ্যমে গল্প শুরু করে ধীরে ধীরে এক অতীন্দ্রিয় জগতে পৌঁছে যান। তখন সমস্ত জাগতিক আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভালবাসায় সম্মোহিত। সেই ভালবাসায় কোনো নির্দিষ্ট গল্প নেই, শুধু অনুভূতির বিভিন্ন প্রকাশ ফুটে ওঠে মুদ্রায়। যেমন সাংকেতিক ভাষায় লক্ষ পাতার বই-এর গল্প দশ লাইনে বলা যায়।

ভরতনাট্যমের শাস্ত্রীয় রীতিতে নয়, মোহিনী আট্টমের সরল সমর্পণে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বারংবার মনে হতে লাগল আশার, গৌহাটি থেকে ফিরে যাওয়ার পথে। পৃথিবীর সমস্ত বড় শহরে কত ঘোরাঘুরি হল নাচের কারণে কিন্তু কখনই এই অনুভূতি মনে আসেনি। তার স্মৃতি এত প্রকট যে সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে পাণ্ডানুল্লুরের কোথায় কী রয়েছে। ওই স্মৃতির কারণেই এত বছর সেখানে যায়নি আশা। আজ যখন যাচ্ছে তখন কেন ব্যাকরণের বেড়াকে মেনে নেওয়া, মোহিনী আট্রামেই নিজেকে প্রকাশ করা উচিত। ভরতনাট্যমে বাঁ কিংবা ডান অথবা মাথার ওপরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যায় কিন্তু মোহিনী আট্টমে একমাত্র সামনের আরাধ্য দেবতার দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। অর্থাৎ দৃষ্টি হবে একমুখী। শিল্পের সমস্ত কৌশল ত্যাগ করে, ব্যাকরণের সমস্ত আগল সরিয়ে রেখে সম্মোহিত শিল্পী ভালবাসায় মজে যান মোহিনী আট্টমে। হয়তো শাস্ত্র একে উঁচু মানের শিল্প বলে স্বীকৃতি দেবে না, নাই দিক।

পাণ্ডানুল্লুরে যাওয়ার ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। ডিল্যাক্স বাস দ্রুতগতিতে পাণ্ডানুল্লুরের ওপর। দিয়ে ছুটে যায়। ইচ্ছে করলে নিজের গাড়ি নিয়েও আশা আরামে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি ঠিক করলেন ট্রেনেই যাবেন। ঠিক যেভাবে প্রথম দিন কাকার সঙ্গে মধ্যরাতে স্টেশনে নেমে গরুর গাড়িতে চেপে ভোরবেলায় গ্রামে পৌঁছেছিলেন ঠিক সেইভাবেই আজ যাবেন। মিস্টার আয়ার অবাক। এত কষ্ট আশা কেন সহ্য করতে চাইছে খামোকা, তাই তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। তিনি বোঝাবার চেষ্টা করতে গেলে আশা বললেন, অনেকদিন তো ট্রেনে চাপিনি। যা বলছি তা আমি ভেবেই বলছি। এ এমন উত্তর যার সঙ্গে তর্ক করা চলে না।

তিরিশ বছর আগে যে সময় ট্রেন চলত এখন সেই সময়ে চলবে এমন আশা করা যায় না। যে গতিতে চলত তারও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। হিসাবে দেখা গেল পাণ্ডানুল্লুরে পৌঁছতে সকালের বদলে দুপুর গড়িয়ে যাবে। একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন আশা কিন্তু তবু তিনি ট্রেনেই যাবেন স্থির করলেন। সকালে স্টেশনে এসে দ্রুত প্রথম শ্রেণির কামরায় উঠে বসলেন তিনি। বসেই মনে হল কাকার সঙ্গে যেদিন গিয়েছিলেন সেদিন উঠেছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কামরায়। যদিও তখন খুব বেশি ভিড় হত না। দ্রুতগতির ট্রেন, রাতের মতো শোওয়ার দরকার নেই, অতএব কুপেতে কমলা, শাস্ত্রীজী এবং শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী ছিলেন। মিস্টার আয়ার বাদ্যযন্ত্র এবং নাচের পোশাক ও সেই সংক্রান্ত বাক্সগুলো ঠিকঠাক রাখছিলেন। ওড়নায় মুখ ঢেকে জানলায় এমন ভঙ্গিতে বসেছিলেন আশা যে প্ল্যাটফর্মের মানুষেরা তাকে চিনতে পারছিল না। অলস চোখে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়েছিলেন তিনি। হয়তো কিছুই দেখছিলেন না কিংবা তাঁর মন কিছুতে ব্যস্ত ছিল।

হঠাৎ কমলা তাকে প্রশ্ন করল শরবত খাওয়ার ইচ্ছে আছে কিনা? তিনি মুখ ফিরিয়ে অসম্মতি জানিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকালেন। অনেক বেশি হকার, যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেছে খুব। বাজারের চিৎকারকেও সম্ভবত হার মানায়। হঠাৎ একটি পরিবারের দিকে তার নজর পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে গেল শরীরে। মাথা থেকে পায়ের ডগা পর্যন্ত শিরশির করে উঠল। তার চোখ ছোট হয়ে এল। তিনজন মানুষ। একটি বছর বারোর ছেলে, বছর সতের-আঠারোর মেয়ে এবং শীর্ণ, আধপাকা দাড়ি লম্বা শরীরের প্রৌঢ়। বসার জায়গার সন্ধানে ওরা প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটছে। সম্ভবত যাত্রী বোঝাই এই ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওরা উঠতে পারছে না। পোশাক দেখে দ্বিতীয় শ্রেণি না ভাবার কোনো কারণ নেই। আশা সোজা হয়ে বসলেন। মনের ভেতরে বাতাস জোরালো হয়েছে। ওরা ক্রমশ চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে, তিনি শেষ পর্যন্ত কমলাকে ডাকলেন জানালার পাশে, ওই যে ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে ভদ্রলোক যাচ্ছেন ওদের ডেকে আন এখানে। কমলা অবাক! আশাকে এমন গলায় কথা বলতে সে অনেকদিন শোনেনি। কিন্তু সে দ্রুত কুপ থেকে বেরিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াল। তিনটি মানুষ অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে কামরাগুলোর দিকে। কমলা প্ল্যাটফর্মে নেমে প্রৌঢ়র সামনে দাঁড়াল, আপনি একটু আসবেন?

প্রৌঢ়ের কপালে ভাঁজ পড়ল, আমি?

হ্যাঁ, আপনারা তিনজনেই।

কেন? কী ব্যাপার? প্রৌঢ়ের কথা শেষ হবার আগেই কমলা ফিরল। বড় মেয়েটি বলল, বাবা ট্রেন এখনই ছেড়ে দেবে। উনি কে?

আমি চিনি না মা। প্রৌঢ়কে উদভ্রান্ত দেখাচ্ছিল।

বালক বলল, চলো না, ডাকছে যখন ওখানে জায়গা পাওয়া যেতে পারে।

ওরা কামরার সামনে এগিয়ে এসে দেখল কমলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রৌঢ় ততক্ষণে বুঝতে পেরেছেন কামরাটি প্রথম শ্রেণির! তিনি উঠতে ইতস্তত করছিলেন। কমলা বলল, তাড়াতাড়ি উঠে আসুন, ট্রেন এখনই ছাড়বে। ওর কথা শেষ হওয়ামাত্র বালক উঠে পড়ল কামরায়। তারপর মেয়েটি। অতএব প্রৌঢ়ের না উঠে উপায় রইল না। প্রৌঢ় বললেন, কিন্তু আমাদের টিকিট তো সেকেন্ড ক্লাসের।

সে চিন্তা আপনার নয়। আপনি, আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। কমলা এগিয়ে গেল কুপের দিকে।

সেই মুহূর্তে মিস্টার আয়ার কুপের দরজায় দাঁড়িয়ে বলছিলেন, আমরা কি ফেরার সময় ট্রেনেই ফিরব? তাহলে স্টেশনে নেমে ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে শেষ মুহূর্তে খুব অসুবিধে হয়।

আশা বললেন, ফেরার সময় আমরা ট্রেনেই ফিরব। আপনি ট্যাক্সির ব্যবস্থা করবেন। তাঁর চোখ আর একবার প্ল্যাটফর্মের দিকে গেল। সবে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। যাত্রীদের ছুটোছুটি হাঁকাহাঁকির মধ্যে আবার ট্রেন থেমে গেল। সম্ভবত কেউ চেন টেনেছে। আর তখনই কমলাকে দেখে সরে দাঁড়ালেন কুপের দরজা থেকে মিস্টার আয়ার। কমলা বলল, ওঁরা এসেছেন।

মুখ না ফিরিয়ে আশা জিজ্ঞাসা করলেন, কিছু বলেছিস?

আজ্ঞে না। তবে ওঁদের সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট।

মিস্টার আয়ারকে বল সেটার ব্যবস্থা করতে।

এবার বালক কমলার পাশে। সে সন্দিগ্ধ প্রৌঢ়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা ভেতরে গিয়ে বসুন। ওখানে জায়গা রয়েছে। প্রৌঢ় জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু আমাদের কেন ডেকেছেন তাই বুঝতে পারছি না। সে কথার জবাব না দিয়ে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকা মিস্টার আয়ারকে কমলা বলল, আপনাকে ওদের তিনজনের টিকিট সেকেন্ড ক্লাস থেকে ফার্স্ট ক্লাসে পাল্টে দিতে বললেন উনি। তোমরা যাও, ভেতরে যাও।

প্রথমে বালক তারপরে তরুণী এবং সবশেষে প্রৌঢ় কুপেতে ঢুকল। ছোট কুপেতে বড়জোর আটজন মানুষ মোটামুটি বসতে পারে। শাস্ত্রীজীর পাশে বসে শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী এঁদের দেখছিলেন। কমলা এখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। আয়ার সাহেব চলে গেছেন সম্ভবত চেকারের কাছে।

ছেলেমেয়ে বসেছে দেখে প্রৌঢ় শাস্ত্রীজীকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলেন কিছু, এই সময় আশা মুখ ফেরালেন, দাঁড়িয়ে কেন, বসো।

ওড়না সরে গেছে, সেই মুখের দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ় চমকে উঠলেন। তার চোখ চকিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। প্রবল বিস্ময়ে তিনি উচ্চারণ করলেন, আশা!

যাক চিনতে পেরেছ তাহলে। এরা কী তোমার ছেলেমেয়ে। সুন্দর হয়েছে তো। তা এদের মা কোথায়? তিনি সঙ্গে নেই কেন? অনেকদিন বাদে অন্য রকম গলায় বলা কথাগুলো নিজের কানেই বেসুরো শোনাল।

আমাদের মা নেই। তরুণী শক্তমুখে উত্তরটা দিল প্রৌঢ়ের হয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেলেন আশা। এটা তিনি আশা করেননি। যে তরল গলায় কথা বলে সময়টাকে পার করবেন ভেবেছিলেন, তা যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না।

ততক্ষণে বালক প্রশ্ন করেছে, আপনি কে?

এবার প্রৌঢ় জবাব দিলেন, উনি আশা রাও।

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বলে ফেলল, আমি তাই ভাবছিলাম। ওঃ আপনার কথা বাবার কাছে অনেক শুনেছি। আপনি আমাদের না ডাকলে আজ ট্রেনে উঠতেই পারতাম না।

তোমরা যাচ্ছ কোথায়।

আমার মামার বাড়িতে। আপনি?

পাণ্ডানুল্লুরে।

ওখানে কি আপনার নাচের প্রোগ্রাম আছে?

না, ঠিক তা নয়–। আশা দেখলেন ট্রেন আবার ছেড়েছে। প্রৌঢ় বসেছেন একবারে কোনায়। মানুষটি একদম চুপচাপ, মুখ নীচের দিকে। এই সময় মিস্টার আয়ার এসে বললেন, আপনাদের টিকিট দিন।

কেন? প্রৌঢ় মুখ তুললেন।

সেকেন্ড ক্লাস টিকিটটা চাই ফার্স্ট ক্লাসে কনভার্ট করতে।

আমরা পরের স্টেশনে নেমে যাব।

একটা স্টেশন যাওয়াও তো বেআইনি। দিন।

প্রায় বাধ্য হয়ে প্রৌঢ় টিকিটগুলো দিয়ে দিলেন। মিস্টার আয়ার চলে যাওয়ার পর আশার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ সবের কোনো প্রয়োজন ছিল না। মিছিমিছি।

আশা বললেন, ওরা আরাম করে যাচ্ছে তাতে তোমার আপত্তি কেন? তুমি খুব বুড়ো হয়ে গিয়েছ কিন্তু। শরীর খারাপ?

না। বয়স হচ্ছে। প্রৌঢ় ম্লান হাসলেন।

মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাবার এমন অবস্থা। তরুণী বলল। মেয়েটি একটু বেশি কথা বলে মনে হল আশার। হঠাৎ বালক বলল, আমার দিদিও খুব ভাল নাচে, জানেন? সঙ্গে সঙ্গে তরুণী প্রতিবাদ করে উঠল, এ মা, ছি ছি। ওর কথা একদম বিশ্বাস করবেন না।

তুমি কী নাচ শেখ?

একটু-আধটু।

একটু-আধটু করে তো নাচ শেখা যায় না।

তরুণী মাথা নিচু করল, আমি বাবার কাছেই শিখি।

হঠাৎ প্রৌঢ় বললেন, অনেককাল পরে এভাবে দেখা হবে ভাবিনি।

তরুণী বলল, আমি তো প্রায়ই বাবাকে বলি আপনার কাছে নিয়ে যেতে।

তোমার বাবা কী বলেন?

বাবা সময়ই পান না। মাকেও নিয়ে যাননি।

তোমার মা আমার কাছে যেতে চেয়েছিলেন? চমকে উঠলেন আশা।

হ্যাঁ। মা-ও নাচত। খুব বড় শিল্পী হতো মা যদি না অ্যাকসিডেন্টে অন্ধ হয়ে যেত।

তোমার মা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল? আশা কোনো কূল পাচ্ছিলেন না।

হ্যাঁ। বাবা মাকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। সেখানে মায়ের নাচ ছিল। ফেরার সময়, গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করে। বাবারও হাত ভেঙে গিয়েছিল। অন্ধ হয়ে কি আর নাচা যায় বলুন? তখন ভাই মাত্র তিন বছরের।

তোমার মায়ের শেষে কী হয়েছিল?

হার্ট অ্যাটাক।

পরের স্টেশন এসে গেল। দ্রুতগতির ট্রেন অনেক ছোট স্টেশনে না দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনল। মেয়েটি তার ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে এগিয়ে দিল, একটা অটোগ্রাফ দেবেন?

না বলতে গিয়েও মত পাল্টালেন আশা। কলম নিয়ে লিখলেন, আশা রাও। তারপর সামান্য ভেবে জুড়লেন, আধাআধি নয়, পুরোপুরি। লেখাটা পড়ে মেয়েটি কি বুঝল সেই জানে, হেসে উঠল খুশিতে। তারপর তার বাবাকে দেখাল। সেটা দেখে প্রৌঢ়ের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে গেলেন আশা, যদি পারো তাহলে সময় করে একদিন এসো তোমরা।

মেয়েটি মাথা নাড়ল, তারপর বলল, আপনার জন্যে আমরা আরামে এলাম।

ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ প্রৌঢ় ঘুরে দাঁড়ালেন, কী দরকার ছিল?

আমি জানি না। আশা হাসলেন। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের কুপেতে ফিরে এলেন। জানালার পাশের আসনে বসে তিনি বাইরে তাকালেন। অনেক অনেক বছর সময় পেরিয়ে গেছে এতকাল যেন তাঁর মনেই ছিল না। তাঁর নাচ শিখতে যাওয়া, মায়ের মৃত্যু, তাতার মৃতমুখ অথবা তীর্থ– এসব চোখের সামনে ধরা ছিল। আজ তীর্থের শীর্ণ শরীর, জীর্ণ মুখ দেখে হঠাৎ তাঁর মনে হল নিজেরও বয়স হয়েছে। যেটা একটু একটু করে জানান দিচ্ছিল সেটা সটান চলে এল সামনে। মেয়েটি এবং বালককে তীর্থের সঙ্গে দেখে মনে কোনো জ্বালা আসেনি। আসলে তীর্থকে একদিন প্রত্যাখ্যান করার জন্যে যে বিষণ্ণতা পরবর্তীকালে বুকের পাঁজরে মেঘের মতো জড়িয়েছিল তা আজ উধাও হয়ে গেল। নিজের নাম, বৈভব এবং স্বীকৃতি তাঁকে তো কৃচ্ছ্রসাধনায় আবদ্ধ রাখেনি। নাচকে বিক্রি করতে চাওয়ায় তীর্থকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আজ সেই নাচ তাঁকে দুহাত ভরে দিয়েছে। বদলে তীর্থর অবস্থা আরও ধূলিধূসর। প্রতি মুহূর্তে তিনি সেই ব্যাপারে তির্যক সংলাপ আশংকা করেছিলেন। অথচ মানুষটি কিছুই মুখে বলল না। সময় বড় বিচিত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এমন কী ভালবাসাকেও অনেক মোড়ক পরিয়ে দেয়। কিন্তু মেরে ফেলতে পারে কী! আশা চট করে মুখ ফিরিয়ে কমলাকে খুঁজলেন। বললেন, মাথা ধরেছে।

.

দ্রুতগতির ট্রেন খোঁড়াতে আরম্ভ করলে প্যাসেঞ্জারকেও হার মানায়। নির্দিষ্ট স্টেশনে যখন ওরা নামতে পারল তখন বিকেল ঘন। মিস্টার আয়ার হিসেব করে দেখলেন আশার বাসনামতে এখান থেকে গরুর গাড়িতে চাপলে পৌঁছতে মধ্যরাত হওয়া বিচিত্র নয়। বরং লোকাল ট্রেন ধরে পাণ্ডানুল্লুরে পৌঁছে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু তিনি জানেন ইস্পাতকে বেঁকিয়ে নেওয়ার চেয়ে আশাকে বোঝানো অনেক বেশি কষ্টকর। মিস্টার আয়ার খোঁজ-খবর করতে স্টেশনের বাইরে এসে পুলকিত হলেন। গরুর গাড়ির কোনো পাত্তা নেই। সে সব যান অনেক বছর আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে। এখন রিকশা এবং অটোর বাজার। একটু দূরের যাত্রীর জন্যে ট্যাক্সি গণ্ডায় গণ্ডায়। দুটি ট্যাক্সির সঙ্গে কথা বলে স্থির করলেন তিনি। ওরা পাণ্ডানুল্লুরে অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না তাদের কাজ শেষ হয়। লোক দুটো খুব মজা পাচ্ছিল। এখান থেকে আজকাল কেউ পাণ্ডানুল্লুরে যায় না। সেখানে পৌঁছে যাওয়ার জন্যে রেললাইনও পাতা হয়েছে। অবশ্য বড় গাড়ি যায় না এই যা।

মিস্টার আয়ার ফিরে এলেন ওয়েটিং রুমে। তিনি ব্যবস্থার কথা বলার আগেই আশা বললেন, বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমার যতদূর মনে হচ্ছে মাঝরাতের আগে পৌঁছতে পারব না। আজকাল ট্রেনের ওপর আর নির্ভর করা যায় না দেখছি। কিন্তু অন্তত আটটার মধ্যে পৌঁছতে চাই।

দুভাবে যাওয়া যায়। লোকাল ট্রেনে চেপে ওখানে। সময় তাতে ঠিক নাও থাকতে পারে। অথবা ট্যাক্সিতে।

তাই চলুন। যে জন্যে আসা তাই যদি না হয়! আমাকে রাত বাড়বার আগেই পৌঁছতে হবে ওখানে।

স্টেশনের বাইরে এসে চারপাশে কিছু খুঁজে হতাশ গলায় আশা বললেন, ইস! সব কীরকম বদলে গিয়েছে। সেই দোকানগুলোও নেই। একটা গরুর গাড়িও দেখছি না।

মিস্টার আয়ার খুশি হলেন। এসব নিজে বুঝে নিলে পরে ব্যাখ্যা দিতে হয় না। কিন্তু ততক্ষণে রটে গিয়েছে খবরটা। ভিড় জমতে শুরু করেছে। সবাই আশা রাওকে দেখতে চায়। এই পথে সেই কিশোরী যখন কাকার হাত ধরে প্রথম পাণ্ডানুল্লুরে গিয়েছিল, তখন কেউ ভুলেও মুখ তুলে তাকায়নি। হঠাৎ আশার খুব ভাল লাগল। একজন বৃদ্ধকে ডেকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এখানে কতদিন আছেন? বৃদ্ধ বললেন, আমি এখানেই জন্মেছি মা।

আশা বললেন, তাহলে আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে এখান থেকে এককালে গরুর গাড়ি ছাড়তো।

সে তো অনেক আগের কথা। বৃদ্ধ হাসলেন।

অনেক আগের! ফিসফিসিয়ে বললেন আশা। এই সময় মিস্টার আয়ার মৃদু গলায় মনে করিয়ে দিলেন যে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আশা গাড়িতে উঠে বসলেন। ভিড় কাটিয়ে দুটো গাড়ি ছুটল পাণ্ডানুল্লুরের পথে। এখন রাস্তা চমৎকার। সন্ধের অন্ধকার নেমে আসছে পৃথিবীর পথে। এই সময়টা বড় বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন তিনি। অনেক আগের দিনগুলো কেন যে মানুষের মনে এমন জীবন্ত হয়ে থাকে! আজ যদি তীর্থকে না দেখতেন তাহলে একটি উজ্জ্বল পুরুষের ছবি চোখের সামনে ধরা থাকত যে তাকে প্রথম ভালবাসার কথা বলেছিল। পরবর্তীকালে সফল পেশাদারী শিল্পী হবার পর মাঝেমাঝেই তো অনুতাপ হয়েছে। আর সব কিছু সেই উজ্জ্বল পুরুষকে ঘিরে। যে কারণে মোহিনী আট্টম নাচতে গিয়েও নটরাজের বদলে সেই পুরুষকে কল্পনা করতেন নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মুহূর্তে অথচ আজ মনে হচ্ছে সব নিঃশেষ হয়ে গেল।

হঠাৎ যেন একটা নাড়া খেয়ে সোজা হয়ে বসলেন আশা। এ গাড়িতে তিনি আর কমলা। সামনের গাড়িতে ওরা যাচ্ছে তিনি ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলেন, পাণ্ডানুল্লুর আর কতদূর?

ড্রাইভার বলল, আর মিনিট পাঁচেক।

মাত্র সাতটা পনেরো ঘড়িতে। সময় ঠিক আছে। আজ তাতার জন্মশতবার্ষিকী হচ্ছে এখানে অনাড়ম্বরভাবে। সেই অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই আটটার মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে না। আশা মন স্থির করে নিলেন। যখন ড্রাইভার বলল, আমরা এসে গেছি, ওইটে বাসস্ট্যান্ড, তখন তিনি থামাতে বললেন ট্যাক্সি। ওঁদের থেমে যেতে দেখে সামনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেল। মিস্টার আয়ার এগিয়ে এলে তিনি বললেন, একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো তাতার জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানটি কোথায় হচ্ছে?

এখন রাস্তায় লোক নেই বললেই চলে। বাসস্ট্যান্ড বলেই কিছু দোকানপাট খোলা। মিস্টার আয়ার সেখান থেকে ঘুরে এসে বললেন, ওরা বলল, তাতার বাড়ির সামনেই স্টেজ বেঁধে হচ্ছে।

মুখ ঘুরিয়ে জায়গাটাকে দেখলেন তিনি। এ কেমন ব্যাপার! কিছুই যেন পরিচিত মনে হচ্ছে না। এখান থেকে তাতার বাড়িতে পৌঁছে যেতে তিনি কি একা পারবেন না? আশা বললেন, আপনি ওঁদের নিয়ে সোজা চলে যান মঞ্চের কাছে। কাউকে বলবেন না আমি এসেছি।

আপনি? মিস্টার আয়ার না জিজ্ঞাসা করে পারলেন না।

আমি কমলাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসছি ওখানে।

কিন্তু এই রাত্রে কি আপনি পথ চিনতে পারবেন?

এই গ্রাম আমার হাতের রেখার মতো চেনা।

অত্যন্ত অনিচ্ছা নিয়ে মিস্টার আয়ার, শাস্ত্রীজী এবং শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মীকে নিয়ে চলে গেলেন। আন্দাজে রাস্তা চিনে বেশ নির্জন অন্ধকারে পৌঁছে গেলেন আশা। কমলাকে বললেন, সাজসজ্জার জিনিসপত্র নামাতে। তারপর ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন তাতার বাড়ি খুঁজে নিয়ে যেখানে অনুষ্ঠান হচ্ছে সেই মঞ্চের কাছাকাছি থাকতে যাতে ডাকলেই পাওয়া যায়।

পাহাড়ের এই দিকটায় মানুষজন নেই। কিংবা যারা ছিল তারা অনুষ্ঠান দেখতে চলে গিয়েছে। নানা তার ঠাকুর্দার জন্মশতবার্ষিকীতে ঠিক কী ধরনের অনুষ্ঠান করছে তা জানা নেই। হঠাৎ মনে হল জায়গাটা তার খুব চেনা। বড় ভূমিকম্প না হলে পাহাড় বড় একটা বদলায় না। সেই পাথরটা এখনও যেন স্তব্ধ হয়ে রয়ে গেছে, অন্ধকারেও চিনতে পারলেন আশা। এইখানে তাকে নিয়ে এসেছিলেন তাতা। বলেছিলেন পাথরের যে জড়ত্ব তারও একটা অভিব্যক্তি আছে। ঠোঁট কামড়ালেন তিনি। তাহলে সময় সব কিছু পাল্টে দিতে পারে না। কোথাও না কোথাও প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে যায়।

সেই পাথরের আড়ালে পোশাক পরিবর্তন করলেন ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। পৃথিবীর খুব বড় প্রেক্ষাগৃহের ড্রেসিংরুমের আরাম যাঁর জানা তিনি কিন্তু একটুও অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করলেন না খোলা আকাশের নিচে তারার আলোয় দাঁড়িয়ে। তারপর সেই অন্ধকারেই কমলাকে বললেন, এবার আমাকে সাজিয়ে দিতে হবে যে! কমলা বিব্রত গলায় জিজ্ঞাসা করল, বড় অন্ধকার। দেখব কী করে?

আশা বললেন, দেখার দরকার নেই।

রাতের কোনো বিস্মিত পাখি মাথার ওপরে পাক দিয়ে ফিরে এসে বসল কাছের একটি পাথরে। মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করল। আকাশ হয়ে উঠল নীল, মেঘ শূন্য। কমলা বলল, আমি জানি না কীরকম সাজ হল!

আশা উত্তর দিলেন না। কারণ একটু একটু করে তার হৃদয় নৃত্যের জন্যে প্রস্তুত হয়ে পড়েছে। কমলা তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলে তিনি পা বাড়ালেন। সেই গাছটা নজরে এল। যে সামান্য বাতাসে পাতা নাড়াত, ঝড় উঠলে ডাল দোলাত। শরীরের ওই দোলার হেরফেরে দুরকম ভাব ফুটিয়ে তোলা যায়–এই শিক্ষা তো তিনি এখানেই পেয়েছিলেন। তারপরেই তিনি জেনেছিলেন দেখা এবং অদেখার বাইরে আর একটা জগৎ আছে, যা সৃষ্টি করতে জানলেই শিল্পী হয়ে ওঠা যায়। ওই গাছ যা কখনই পারবে না। কিন্তু পথ চিনিয়ে দেবার জন্য তো ওর কাছে তার চিরজীবনের কৃতজ্ঞতা।

দূর থেকে মৃদঙ্গের আওয়াজ ভেসে আসছিল। অনুষ্ঠানমঞ্চের আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে কয়েক হাজার মানুষকে দেখা যাচ্ছে নিমগ্ন হয়ে বসে থাকতে। আশা সন্তর্পণে জনতার শেষে এসে দাঁড়ালেন। মঞ্চের পেছনে তাতার একটি ছবি রাখা আছে। মঞ্চ জুড়ে লেখা গুরুর গুরু। এই মাত্র কোনো শিল্পীর নাচ শেষ হল। দর্শকরা হাততালি সম্বর্ধনা জানাচ্ছে। আশা চাপা গলায় বললেন, ওরা কোথায়?

কমলা বিব্রত হয়ে উত্তর দিল, এই ভিড়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ট্যাক্সি দুটোকে ওপাশে দেখেছি। যদি সেখানে থাকে তাহলে মঞ্চে আসতে বল।

ততক্ষণে এক প্রৌঢ় মঞ্চে এসেছেন। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত গলায় বলছেন, ভরতনাট্যমের মহাগুরুর আজ জন্মশতবার্ষিকী। রক্তসূত্রে তিনি আমার পিতামহ। এখনও এই গ্রামে তাঁর নৃত্যধারা যে বজায় আছে তার প্রমাণ আপনারা পেলেন। এই অনুষ্ঠানে আপনারা যে এসেছেন তাতে আমার পিতামহের আত্মাই সম্মানিত হয়েছে। আপনাদের মধ্যে যাঁরা আমার পিতামহকে চিনতেন তাঁরা যদি ওঁর সম্পর্কে কিছু বলতে চান তাহলে মঞ্চে আসতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন শুরু হল।

নানা! আশা চমকে উঠলেন। সেই জেদী কিশোর আজ শান্ত প্রৌঢ়। নৃত্য সম্পর্কে আগ্রহ না থাকায় তাতা একে তেমন পছন্দ করতেন না। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রণাম তো ওই জানাল! ভিড়ের পাশ দিয়ে যতটা সম্ভব নজর এড়িয়ে আশা মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন। শেষ দিকে তার সাজ দেখে কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছিল। দুপাশে উইংসের ধার ঘেঁষে যেমন মঞ্চে পৌঁছনো যায়, তেমনি সামনের দিকে একটি ছোট সিঁড়ি রাখা আছে ওপরে ওঠার জন্যে। আশা সেইটে ব্যবহার করতেই সমস্ত গুঞ্জন একসঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নানা চমকে তাকালেন এগিয়ে আসা মূর্তিটির দিকে। মঞ্চে সোজা এগিয়ে গেলেন আশা ছবিটির দিকে। দর্শকরা এখন বাকরহিত। তারপর নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন আশা তাতার ছবিকে। অপ্রস্তুত নানা কয়েক পা এগিয়ে থেমে গেলেন। তিনি লক্ষ করলেন প্রণামটি সাষ্টাঙ্গে নয়। কিন্তু এই অচেনা রমণীকে চিনতে চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এই সময় আশা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁকে নমস্কার করতেই তিনি বিস্ময়ে বলে উঠলেন, আশা!

আশা ততক্ষণে মাইকের সামনে এসে বিনীত গলায় উচ্চারণ করলেন, আমি আশা রাও।

সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র-গর্জনের আওয়াজও হার মানল। বিস্ময় এবং আনন্দ ছিটকে উঠল দর্শকদের গলা থেকে। সেটাকে কিছুটা কমে আসতে দিয়ে আশা বললেন, তাতা আমার গুরু। তাতা আমার সমস্ত বোধ, ভাবনার জন্মদাতা। তাতা যদি গুরু তবে মহাগুরু নটরাজ। আমি বলি পরম গুরু। আমার স্বামী।

এই সময় নানা এগিয়ে এলেন, আমি ভাবতে পারছি না, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে আপনি এসেছেন। আজই কাগজে পড়লাম আপনি গৌহাটিতে। আর আপনি অত বড় সরকারি খেতাব প্রত্যাখান করেছেন।

বাঁ হাত তুলে তাকে শান্ত করল আশা, বিচলিত হবেন না। যা ছিল আমাদের কর্তব্য তা আপনি করেছেন। ফলে কোনো অপরাধ আপনাকে স্পর্শ করবে না। আজ তাতার জন্মশতবার্ষিকী, আমি যদি না আসতাম তাহলে সমস্ত শরীরে বিষরক্ত বয়ে যেত এরপর। চোখ বন্ধ করলেন আশা। তাঁর শরীরে কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল। মাইকের সামনে পৌঁছে নানা বললেন, আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমার ঠাকুরদার কাছে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ভরতনাট্টম শিল্পী এককালে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁকে আমি আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি জবাবে আমাকে চিনতে পারছিলেন না বলে লিখলেও আসবেন বলে সম্মতি দিয়েছিলেন। অপমানিত বোধ করায় আমি আর যোগাযোগ করিনি। কিন্তু তিনি এসেছেন। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছেছেন। আমি কৃতজ্ঞ।

মাথা নাড়লেন আশা। বড় সাজানো কথা বলা হচ্ছে আমার সঙ্গে। এই গ্রাম এই মাটি আমাকে নবীন জন্ম দিয়েছে। ওই বৃদ্ধ অশক্ত শরীরে আমাকে জাগ্রত করেছিলেন। আজ সমস্ত আত্মীয়স্বজন যখন হারিয়ে গিয়েছে তখন তাঁর দেওয়া নাচ আমাকে ঘিরে রেখেছে। তিনি আমার স্বামী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন নটরাজকে। স্বীকার করছি, কখনই ওই সিদ্ধান্ত আমি অন্তরে গ্রহণ করতে পারিনি যদিও অবজ্ঞা করিনি। যখন আমি মঞ্চে নাচি আমার শরীর সেই নৃত্য পরিবেশন করে। যখন আমি মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসি তখন আমার হৃদয়ে নাচ শুরু হয়। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি। এসবই তাতারই দান। এখন আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আমার গুরুপ্রণাম শুরু করছি।

এই সময় মঞ্চের একধারে এসে বসলেন শাস্ত্রীজী সঙ্গে শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী। আশা তাদের দিকে তাকাতেই যেন ইশারা লক্ষ্য করলেন। তিনি এগিয়ে গেলেন মঞ্চের ধারে। বিনীত গলায় বিজয়লক্ষ্মী বললেন, আপনার মেকআপ ঠিকঠাক নেই।

না-ই থাক। আপনি সেই গানটি ধরুন। ভরণম-এ ঈশ্বরের প্রতি যে আর্তি ফুটেছে—

আপনি কি প্রথম থেকে শুরু করবেন না?

না। অভিনয় অংশই আমার শরীরে-মনে আসুক।

শ্ৰীমতী বিজয়লক্ষ্মী খুশি হলেন না। শাস্ত্রীজিও। মুখ দেখে বুঝতে পারলেন আশা। তারপর বললেন, থাক। শুরু থেকেই হোক। আদি থেকে অন্ত।

তাতার মুখ মনে করলেন আশা। ধীরে নিজেকে অতিক্রম করলেন। শরীরে স্পন্দন এল। এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ নাচটি তিনি শুরু করলেন। একে একে ভরতনাট্যমের একটির পর একটি দরজা অতিক্রম করতে লাগলেন তিনি। পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া এই শরীরটা যেন তাতার বয়ে-আনা মশালের দায়িত্ব নিয়ে এখন অনন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অভিনয় পর্বে এসে তিনি কী একটু থমকে দাঁড়িয়েছিলেন; ভরতনাট্যমের শিল্পী হয়ে ঐ মুহূর্তে মোহিনী আট্টমের সেই রাজকুমারীর মতো তাঁর নজরের মধ্যে আর এক নবীন দৃষ্টির উদয় হয়েছিল কি? কার দিকে তিনি অমন সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে নেচে চলেছিলেন? ডান কিংবা বাম নয়, মুখোমুখি কী কারো দর্শন পেয়ে আপ্লুত হয়েছিলেন? ভরণমের বিখ্যাত গান যখন বিজয়লক্ষ্মীর গলায় গীত হল, তখন তিনি আত্মহারা। সমস্ত শরীরে তখন ভূমিকম্প। অনেক হয়েছে তোমার লীলাখেলা। আর কতকাল এভাবে অপেক্ষায় রাখবে তুমি হে বধির সুন্দর, হে আমার প্রভু। তোমার স্পর্শ পাওয়ার জন্যে আর বিলম্ব সইতে পারি না। তোমার প্রতি বিশ্বস্ত এই হৃদয়কে যন্ত্রণা দিয়ে কী সুখ পাচ্ছ? হে প্রভু, হে আমার প্রাণ, কেন এগিয়ে আসতে এত দ্বিধা? কেন নিজেকে এমন আড়ালে রাখা? এই বিরহযন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারি না যে।

হঠাৎ সমস্ত শরীরে উত্তাল কান্না ছড়িয়ে পড়ল। তার প্রকাশ এল মুখ-চোখে। দর্শকরা শঙ্কায়িত হলেন। আবেগের সংক্রমণ বড় মারাত্মক। তারা এক অদ্বিতীয় শিল্পীকে দেখতে পেলেন। আর শিল্পীর চোখের সামনে তখন নটরাজ নয়, তাতা নয়, সবাইকে সরিয়ে একটি উজ্জ্বল সহাস্যমুখ বলছে, আমি তোমাকে ভালবাসি। যেন নিজেকে শক্ত ডাল থেকে ছিঁড়ে নেবার মতো নাচ থামিয়ে ভেঙে পড়লেন তিনি। দর্শকরা ভাবল আশা মিশে গিয়েছিলেন আরাধনায়।

.

ইন্দিরা মার্গের সমস্ত যানবাহন এখন নীরব। কোথাও কোনো শব্দ নেই। ব্যালকনির চেয়ারে বসেছিলেন আশা। সেই রাত্রে অনেক অনুরোধ এড়িয়ে তিনি চলে এসেছিলেন তাতার গ্রাম থেকে। নিজেকে সেদিন অপবিত্র মনে হয়েছিল বলে নাচ থামিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও সেই অনুভূতির কথা কেউ জানতে পারেনি।

আজ এই মধ্যরাত্রে নিদ্রাহীন আকাশের তলায় বসে দুই সন্তানের পিতা শীর্ণ মানুষটির মুখ মনে করলেন আশা। দেবতার মন্দিরে যে নাচ পরিবেশন করতে হয় সেখানে কেন মানুষের মুখ আসে মনের সামনে? সে কোন মানুষ? একা নিঃসঙ্গ মহিলা এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন প্রহরের পর প্রহর। সামনে বহু পথ পড়ে আছে কার ছায়া নিয়ে তিনি হাঁটবেন? ঈশ্বর না মানুষের!

[কপিলা বাৎস্যায়নের ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল ড্যান্স, মার্গ পত্রিকা এবং অশোক চ্যাটার্জির ড্যান্স অফ দি গোল্ডেন হল বই তিনটির কাছে আমি ঋণী। বস্তুত আশা রাও একজন জীবন্ত শিল্পীর ছায়ায় গড়া, কিন্তু কোনোমতেই তাঁর জীবনী নয়।]