বাউণ্টি হাণ্টার্স ১.১
মাসুদ রানা ৪৩৩ – বাউণ্টি হাণ্টার্স (প্রথম খণ্ড) – কাজী আনোয়ার হোসেন – সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ২০১৪
রচনা: বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে
মাসুদ রানা
বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই, গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। বিচিত্র তার জীবন। অদ্ভুত রহস্যময় তার গতিবিধি। কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর, সুন্দর এক অন্তর। একা। টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না। কোথাও অন্যায়-অবিচার-অত্যাচার দেখলে রুখে দাঁড়ায়। পদে পদে তার বিপদ-শিহরন-ভয় আর মৃত্যুর হাতছানি। আসুন, এই দুর্ধর্ষ, চিরনবীন যুবকটির সঙ্গে পরিচিত হই। সীমিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের একঘেয়েমি থেকে একটানে তুলে নিয়ে যাবে ও আমাদের। স্বপ্নের এক আশ্চর্য মায়াবী জগতে। আপনি আমন্ত্রিত। ধন্যবাদ।
এক
রিপাবলিক অভ ফ্রান্স।
প্যারিস থেকে সামান্য দূরে ব্যক্তিগত মস্ত এক পার্কের মাঝে রাজকীয় বাগানবাড়ি!
অক্টোবরের বারো তারিখ। সন্ধ্যা সাতটা।
বোর্ডরুমের মিটিঙে যাঁরা এসেছেন, সংখ্যায় তারা বারোজন! সবাই পুরুষ। সবাই বিলিয়োনেয়ার।
এই বারোজনের ভিতর ষাট বছরকে পিছনে ফেলেছেন দশজন। অন্য দুজন বিশের কোঠায়। এদের বাবা এই কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন, নইলে হয়তো এখানে বসবার সুযোগ মিলত না এদের। কাউন্সিল নিশ্চিত হয়েছে–এদের বিশ্বস্ততা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবার কোনোই কারণ নেই।
এই কাউন্সিলে যোগ দিতে পূর্বপুরুষের বিপুল সম্পদ পেতে হবে, এমন নয়। তবে, এই কাউন্সিলের প্রায় সবাই তাদের বাবার কাছ থেকেই জন্মসূত্রে পেয়েছেন হাজার হাজার কোটি ডলার।
বিশেষ এই কাউন্সিলের তরফ থেকে সাধারণত কাউকে সদস্য-পদ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় না।
এঁরা টাকার কুমির নন, একেকজন ডলার-পাউণ্ড ও ইউরো কারেন্সির মস্ত সব কিলার ওয়েইল।
দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সফ্টওয়্যার কোম্পানির মালিক এই কাউন্সিলের সহ-প্রতিষ্ঠাকারী।
পরেরজন বিখ্যাত কয়েকটি সুইস ব্যাঙ্কের মালিক। তৃতীয়জন সৌদি তেল কুবের। চতুর্থজন বিশ্বের সবচেয়ে সফল স্টক ব্যবসায়ী।
পঞ্চমজন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শিপিং কোম্পানির হর্তাকর্তা। ষষ্ঠজন ইউএস ফেডারেল রির্ভের ভাইস চেয়ারম্যান।
পাঁচ বছর আগে মৃত বাবার কাছ থেকে মস্ত এক ইস্পাত রাজত্ব পেয়েছে একজন। তার কোম্পানিগুলো ইউএস সরকারকে সরবরাহ করে মিলিটারি হার্ডওয়্যার এবং মিসাইল।
কাউন্সিলে কোনও মিডিয়া ব্যারন নেই এর মূল কারণ, ধরে নেয়া হয়েছে, ধার এবং শেয়ার বাজারের কারণে যখন-তখন হ্রাস বা বৃদ্ধি পাবে তাদের সম্পদ। এই কাউন্সিল আসলে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে বড় সব ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, কাউন্সিলের সদস্যরাই আকাশে তোলে বা ধুলোয় মিশিয়ে দেয় মিডিয়া ব্যারনদেরকে।
একই কারণে কাউন্সিলে কোনও জাতীয় নেতা নেই। কাউন্সিলের সবাই জানে, খুব দ্রুত হারিয়ে যায় নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা। মিডিয়া ব্যারনদের মতই, রাজনীতিকদের দাপট হঠাৎ করেই শেষ হয়। তার চেয়েও বড় কথা, এই কাউন্সিল অতীতে নানা দেশে প্রেসিডেন্ট তৈরি করেছে, আবার পছন্দ না হলে কান ধরে নামিয়ে দিয়েছে গদি থেকে। একই কথা খাটে স্বৈরশাসকদের বিষয়েও।
অনেক আগেই স্থির হয়েছে, কাউন্সিলে রাখা হবে না কোনও মহিলাকে।
অতীতে কাউন্সিলাররা একমত হন, কোনও মহিলাকে মিটিঙে বসতে দেয়া হবে না। তা সে রানি হলেও নয়। নামকরা ফরাসী কসমেটিক্স কোম্পানির মালিক লিলি মাখসাখের থাকতে পারে ত্রিশ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু কখনও তাকে আসতে দেয়া হবে না এই মিটিঙে।–উনিশ শ আঠারো সাল থেকে প্রতি বছর দুবার করে মিটিঙে বসছে এই কাউন্সিল।
কিন্তু এ বছর নয়বার মিটিঙে বসেছেন তারা।
এই বছর আসলে নানাদিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
সুইটয়ারল্যাণ্ডের ড্যাভোসে বাৎসরিক ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামে মিলিত হয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া দুনিয়ার বড় সব ট্রেড অর্গানাইযেশনের মিটিঙেও। এমন কী একবার মিটিং হয়েছে। ক্যাম্প ডেভিডে। তখন অবশ্য ওখানে ছিলেন না ইউএসএ-র প্রেসিডেন্ট।
আজকের মিটিং বসেছে মস্ত বাগানবাড়িতে।
দেখা গেল প্রত্যেকে হা-সূচক ভোট দিয়েছেন।
তা হলে সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ, বললেন চেয়ারম্যান। ১৩ অক্টোবর থেকেই শিকার শুরু। আজই গতানুগতিক চ্যানেলে প্রকাশ করা হবে টার্গেটদের নাম। যারা বাউন্টি নিয়ে আসবে, তাদের কাছ থেকে মাল বুঝে পেলে পাওনা পরিশোধ করবেন এজিএম-সুইসের মোসিউ পি. এস. ড্যাবলার।
সবমিলে পনেরোটি টার্গেট। এ ছাড়া পরে আরও দুটো টার্গেট দেয়া হবে। প্রতিটি বাউন্টির জন্য দেয়া হবে তেত্রিশ মিলিয়ন ইউএস ডলার।
এর একঘণ্টা পর শেষ হলো মিটিং। টেবিলে পড়ে রইল নোট। সবার নোটপ্যাড উপুড় করে রাখা, কিন্তু চেয়ারম্যানের সামনে টেবিলের উপর উল্টে গেছে প্যাডের পাতা।
ওখানে রয়েছে নামের একটি লিস্টি:
নাম – দেশ – সংগঠন
ক্যাপলান, স্কট এম. – ইউকে – এসএএস
ডসন, রিচার্ড কে. – ইউকে – এমআই-৬
অ্যাটলক, হার্লি. – ইউএসএ – ডেল্টা
এরিখ, সোলে টি. – ফ্রান্স – ডিজিএসই
কোসলোস্কি, চার্লস্ আর. – ইউকে – এসএএস
ওয়েলন, জে. – ইউএসএ – ডেল্টা
আজিজ আমিন – লেবানন – হামাস
রেইসার্ট, জন আর. – ইউএসএ – ইউএসএএমআরএমসি
রবিন, কার্লটন – ইউএসএ – ইউএস মেরিন
হ্যারিস, টেরেন্স এক্স. – ইউএস – আইএসএস
ম্যাকিন, ডেনিস ই. – ইজরায়েল – মোসাদ
রানা, মাসুদ চৌধুরি. – বাংলাদেশ – বিসিআই
গ্র্যাঞ্জার, রেমণ্ড কে. – ইউএসএ – ইউএস মেরিন
আলাল, হোসেন – সৌদি আরব – আল-কায়েদা
অ্যামনন, আব্রাম – ইজরায়েল – আইএএফ
দুনিয়া-সেরা এলিট মিলিটারি ইউনিট, যেমন ব্রিটিশদের এসএএস, ইউএস আর্মির ডেল্টা ডিটাচমেন্ট, মেরিন কর্পস, ইজরায়েলি এয়ার ফোর্স, বা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি মোসাদ, বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সিআইএ ওরফে আইএসএস এর সদস্যদের ওই তালিকাকে হালকাভাবে নেয়া যায় না। এ ছাড়া, আল-কায়েদা ও হামাসের সদস্যদের নামও রয়েছে ওই তালিকায়।
বিশেষ কাজে দক্ষ ওই লোকগুলো দুনিয়া জুড়ে নাম করেছে। তাদের বিপজ্জনক পেশার কারণে।
কিন্তু ভয়ঙ্কর শক্তিশালী কাউন্সিল স্থির করেছে–ওই পনেরোজনকে আগামীকাল থেকে কুকুরের মত তাড়িয়ে হত্যা করা হবে। সেজন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র তিনটি দিন।
দুই
১৩ অক্টোবর।
স্থানীয় সময় সকাল নয়টা।
সাইবেরিয়ার এ অংশে শোঁ-শো বইছে তুমুল মেরুঝড়, ধবল বরফ ছাওয়া জমির বুকে তীর্যক ভাবে নেমে আসছে নরম তুষারের পুরু শুভ্র চাদর।
পৃথিবীর আরেক প্রান্তে ইউএসএ-র ই.এস.টি. রাত নয়টা, ১২ অক্টোবর।
ঝড়ের অনেক উপর দিয়ে সাইবেরিয়ার আকাশে শব্দের গতির চেয়ে জোরে রকেটের মত ছুটে চলেছে একটি বিমান।
কোন রাশান স্টেশনের রেইডার স্ক্রিনে একবারের জন্যও ধরা পড়েনি। প্রচণ্ড গতি ভেঙে দিয়েছে সাউণ্ড ব্যারিয়ার, কিন্তু কোনও সনিক বুম নেই। এই বিমান ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক ওয়েভ-নেগেটিভিং সেন্সর।
সাধারণত এ ধরনের মিশনে পাঠানো হয় না মহামূল্যবান এই বিমান। রাগী ভুরুওয়ালা ককপিট উইণ্ডো, কালো রেইডার অ্যাবসর্বেণ্ট রং এবং অদ্ভুত ডানা নিয়ে বিদ্যুদ্বেগে চলেছে বি-২ স্টেল্থ বোমারু বিমান। ওটা বহন করতে পারে চল্লিশ হাজার পাউণ্ড অর্ডন্যান্স তার ভিতর থাকতে পারে লেসার গাইডেড বোমা বা এয়ার লঞ্চডু থার্মোনিউক্লিয়ার ক্রুজ মিসাইল।
কিন্তু আজকে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস ও রাশার সাইবেরিয়ার মাঝের এই সুদীর্ঘ ভ্রমণে বোমারু বিমানে কোনও বোমা বা মিসাইল নেই।
মডিফাই করা হয়েছে বিমানের বম বে, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে হালকা কিন্তু দ্রুতগামী একটি ভেহিকেল। পাশেই ছয়জন ইউনাইটেড স্টেটস মেরিন এবং দুজন বাঙালি সেনা। শেষের দুজনের একজন প্রাক্তন মেজর, অন্যজন বাংলাদেশ আর্মির সার্জেন্ট। দুজনই কমাণ্ডো যোদ্ধা।
স্টেলথ বোমারু বিমানের ককপিটে এসে ঢুকল বিসিআই এজেন্ট, মাসুদ রানা। ওর জানা নেই, গতকাল এই মায়াবী জগৎ থেকে ওকে বিদায় দিতে জারি করা হয়েছে নির্দেশ দেখামাত্র হত্যা করতে হবে মাসুদ রানাকে, কেটে আনতে হবে তার মাথা। এ আসলে গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাউন্টি হান্ট। ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর কিন্তু সুযোগ্য একদল লোক খুঁজতে শুরু করেছে মাসুদ রানাকে।
ধূসর সাইবেরিয়ার আকাশে চোখ মেলে দিয়েছে রানা। পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি দীর্ঘ ও, সুঠামদেহী। কাট চুলগুলো ঢাকা পড়েছে সাদা-ধূসর কেভলার হেলমেটের নীচে। মুখে এখন চিন্তার ছাপ। প্রচণ্ড চাপের মুখেও শীতল থাকে ওর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। যারা ওর অধীনে কাজ করেছে, তারা বলে: ও এক অদ্ভুত মানুষ, ওর উপর ভরসা করা যায় নিশ্চিন্তে। সঙ্গিকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজ জীবনের ওপর ঝুঁকি নিতে সামান্যতম দ্বিধা করে না।
গত কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল মাসুদ রানা। সে কথাই ভাবছে বি-২ বোমারু বিমানের ককপিটের ভিতর দাঁড়িয়ে।
ফোনটা এসেছিল হঠাৎ করেই। লস অ্যাঞ্জেলেসে রানা এজেন্সির নিজস্ব অফিসে চুপ করে ফাইল দেখছিল রানা। চটকা ভাঙল ল্যাণ্ড ফোনের রিং শুনে।
রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল রানা। হ্যালো?
মেজর রানা? গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল ওদিক থেকে।
কে বলছেন, প্লিজ।
জরুরি আলাপ আছে আপনার সঙ্গে, বলল লোকটা। আপনি হয়তো এ বিষয়ে আগ্রহী হতে পারেন।
আপনি কে? আবার জানতে চাইল রানা।
আমি কর্নেল বব জেনকিন্স, মেরিন ফোর্সে আছি।
বলুন। ততক্ষণে পুরো সচেতন হয়ে উঠেছে রানা।
ফোন করেছি আপনার এক বন্ধুর খবর জানাতে, খুকখুক করে কাশলেন ভদ্রলোক।
কার বিষয়ে জানাতে চান? জিজ্ঞেস করল রানা।
মেরিন ফোর্সের মেজর রবিন কার্লটন। গতকাল সন্ধ্যায় রিকন ইউনিট নিয়ে সাইবেরিয়ায় গেছে সে। সঙ্গে এক রিকন ডেল্টা ডিটাচমেন্ট। হঠাৎ করেই থেমে গেলেন তিনি।
রানার মনে পড়ল, অ্যান্টার্কটিকার তুষার ছাওয়া এক নির্জন স্টেশনের কথা। ওখানে মস্ত বিপদ থেকে ওকে রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল রবিন কার্লটন। হাসিখুশি মানুষ, উদার মনের, বন্ধুদের জন্য ঝুঁকি নিতে মোটেও দ্বিধা করে না। অল্প কিছুদিনের ভিতর ওরা হয়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
কয়েক মুহূর্ত পর বললেন কর্নেল, ইউএসএ-র কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া একদল সন্ত্রাসী দখল করে নিয়েছে। সাইবেরিয়ার এক পরিত্যক্ত মিলিটারি শহর। তাদের ইচ্ছা: ওখানে গুদামজাত নিউক্লিয়ার মিসাইল ব্যবহার করে উড়িয়ে দেবে আরবের কয়েকটি দেশের রাজধানী। দুএকটা ফেলবে ওয়াশিংটন ডি.সি.-র ওপরেও।
এসব আমাকে জানাচ্ছেন কেন? সন্দেহ নিয়ে জানতে চাইল রানা।
কারণ, আজ দুপুরে যোগাযোগ করেছে মেজর রবিন কার্লটন। ওই পরিত্যক্ত শহরে হেভিলি আর্মড সন্ত্রাসীরা সংখ্যায় ওদের চেয়ে অনেক বেশি। শহরের কেন্দ্রে ঢুকবার পর ওদেরকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। মস্ত বিপদে রয়েছে আপনার বন্ধু। বিরতি দিলেন কর্নেল, তারপর আবারও বললেন, আপনি এখন মেজর কার্লটনের কণ্ঠস্বর শুনবেন। রিসিভারের ভিতর খট আওয়াজ হলো, তারপর কথা বলে উঠল রবিন কার্লটনের রেকর্ড করা কণ্ঠ, স্যর, পাতাল সাইলোর কাছে কোণঠাসা হয়েছি। মারা গেছে আটজন, বাকি কজন রয়ে গেছি না থাকার মতই। জানি না, এ ফাঁদ থেকে বেরুতে পারব কি না। আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। বাইরে থেকে সাহায্য না পেলে মরতে হবে… রবিনের কণ্ঠ হারিয়ে গেল, বদলে বলে উঠলেন কর্নেল, আমরা চাই না রাশা জানুক আমাদের নেভি ও আর্মির দুই দল কমাণ্ডোকে পাঠানো হয়েছে তাদের দেশের ভিতর।
চুপ করে অপেক্ষা করছে রানা।
আমরা আপাতত আরেকটা দল পাঠাব। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুত রিকন ইউনিট এ মুহূর্তে এ রাজ্যের এ অংশে আমাদের হাতে নেই। ভোরের দিকে ডেল্টা ডিটাচমেন্টের এক প্লাটুন রওনা হবে, কিন্তু ততক্ষণে বহুকিছুই ঘটে যেতে পারে সাইবেরিয়ায়। রাশান আর্মির হাতে ধরা পড়তে পারে আমাদের ছেলেরা। সেক্ষেত্রে মস্ত সমস্যা হবে আন্তর্জাতিক আঙিনায়। এর ফলে পারস্পরিক দোষারোপ থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে। সবই করতে হচ্ছে গোপনে। …ঠিক হয়েছে, আপনার পরিচিত সুযোগ্য এক নন-কমিশণ্ড অফিসারের অধীনে প্রাথমিকভাবে কজন মেরিন সৈনিক পাঠাব আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে একটা বি-২ স্টেলথ বমার, কিন্তু অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যাঁমিলটনের সঙ্গে আলাপ করবার সময় তিনি বললেন, আপনি হয়তো যেতে চাইবেন বন্ধুকে উদ্ধার করার জন্য। আমরা আসলে চাইছি আপনি এ দলের নেতৃত্ব নিন। আপনি চাইলে আমরা আপনাকে–এবং আপনার সঙ্গীদেরকে পুরোপুরি সশস্ত্র অবস্থায় বি-২ স্টেলথ মারে তুলে দিতে পারি।
এক মুহূর্ত ভাবল রানা, তারপর বলল, আপনার ফোন নাম্বার দিন। অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যাঁমিলটনের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে ফোন দেব।
লিখে নিন নাম্বার। গড়গড় করে সংখ্যাগুলো দুবার বললেন ভদ্রলোক, তারপর রেখে দিলেন ফোন।
প্যাডে কর্নেলের ফোন নাম্বার তুলে নিয়েছে রানা। এবার অত্যাধুনিক কমপিউটারে খুঁজে নিল ফোন ডিরেকটরি। মিলিয়ে দেখে নিশ্চিত হলো, লস অ্যাঞ্জেলেসের বাইরের এক এয়ার বেস থেকেই ফোন এসেছে।
এরপর দেরি না করে যোগাযোগ করতে চাইল রানা নুমার চিফ অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যাঁমিলটনের সঙ্গে।
ভদ্রলোক এ সময়ে থাকেন নুমা অফিসে। তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দিল রানা।
একবার রিং হতেই ওদিক থেকে ভেসে এল, হ্যালো, রানা? কী খবর, মাই বয়?
ভাল আছি, স্যর। আপনি কেমন আছেন?
ভাল।
স্যর, আমি ফোন করেছি শিয়োর হতে, আপনি মেরিন কর্নেল বব জেনকিন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন।
হ্যাঁ, বিশ মিনিট আগে। যা শুনলাম, তোমার বন্ধু রবিন কার্লটন লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে।
তা জানতেই ফোন করেছিলাম, স্যর, বলল রানা।
তুমি কি যেতে চাও ওকে সাহায্য করতে?
আমার সঙ্গে কমাণ্ডো যোদ্ধা বলতে মাত্র এক তরুণ, বলল রানা। ওকে নিয়ে রওনা হতে পারি। অবশ্য, তার আগে চিফের অনুমতি নিতে হবে।
যদি যেতে চাও, চটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে। শুনলাম, এক ঘণ্টার ভিতর রেডি হবে বি-২ স্টেলথ বমার। …রাহাতের অনুমতি পেলে দেরি না করেই পৌঁছে যেতে হবে এয়ার বেস এইচ. এন. ম্যাকেঞ্জিতে।
জী, বলল রানা। কথা না বাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে ফোন। রেখে দিল।
এবার যোগাযোগ করল বিসিআইএর চিফের সরাসরি ফোনে।
বলো, রানা? গুড়গুড় করে উঠল মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের কণ্ঠ।
সংক্ষেপে পরিস্থিতি খুলে বলল রানা। ওর কণ্ঠ বলে দিল, বন্ধুকে সাহায্য করতে পারলে খুশি হবে।
রানা জানে না, রাহাত খানও চাইছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রতি ওর আন্তরিকতা যেন কখনও নষ্ট না হয়।
বেশ, ঘুরে এসো, কয়েক মুহূর্ত পর বললেন তিনি। তোমার সঙ্গের ছেলেটার নাম তো সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত খবির? ওর তো এখনও আর্মির ছুটি শেষ হয়নি। যদি যেতে চায়, মনে করি না কেউ আপত্তি তুলবে।
তিনি আর কিছুই বলছেন না, কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন রানা কিছু বলে কি না, তারপর রেখে দিলেন ফোন।
এবার রানা এজেন্সির এজেন্ট শাহাদাত হোসেনকে ফোন দিল রানা। শাহাদাঁতের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেই উঠেছে খবির। দুচার কথায় পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিতেই খবিরকে ধরিয়ে দিল সে।
তুমি যদি আমার সঙ্গে যেতে চাও, আধঘণ্টা পর তোমাকে তুলে নেব, খবিরকে বলল. রানা।
কোথায় যেতে হবে, স্যর? জানতে চাইল খবির।
সাইবেরিয়ায়।
নতুন কোনও মিশন, স্যর?
হ্যাঁ। তবে এবার দেশের জন্য কাজ করছি না।
তাই? …আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি, স্যর, বলল খবির।
মাত্র একটি মিশনে রানার অধীনে কাজ করেই বিপুল শ্রদ্ধা জন্মেছে ওর মানুষটার প্রতি। বুঝে গেছে, মস্ত হৃদয় আছে। স্যরের। ওঁর নিখাদ ভালবাসা স্পষ্ট অনুভব করা যায় বুকের ভেতর।
.
মেরুঝড় পিছনে ফেলে উত্তর সাইবেরিয়ার এক পরিত্যক্ত সোভিয়েত ইন্সটলেশন লক্ষ্য করে আকাশ চিরে ছুটে চলেছে বি ২ বোমারু বিমান।
সোভিয়েত আমলে ওই আর্মি শহরের নাম ছিল: পাবলো-৯। ওটা পেনাল অ্যাণ্ড মেইনটেন্যান্স ইন্সটলেশন। ওখানে কঠোর শ্রম দিত কারাবন্দিরা।
আর্কটিকের পাবলো-৯ কারাগার-নগরীতে আটটি কম্পাউণ্ড। কমিউনিস্ট আমলে ওসব কম্পাউণ্ডের নাম ছিল: পাবলো-১, পাবলো-২, পাবলো-৩ ইত্যাদি।
মাত্র দুদিন আগেও পাবলো-৯ ছিল বহুদিন আগে ভুলে, যাওয়া সোভিয়েত আউট-স্টেশন- আধা-কারাগার, আধা মেইনটেন্যান্স ফ্যাসিলিটি। ওখানে কাজ করতে বাধ্য করা হতো রাজনৈতিক বন্দিদেরকে। এমন অসংখ্য কারাগার-নগরী বা
ফ্যাসিলিটি ছড়িয়ে আছে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে। এসব শহর যেমন প্রকাণ্ড, তেমনি কদর্য। তেলমাখা সব দালান ও কারখানায় ভর্তি।
উনিশ শ একানব্বই সাল পর্যন্ত ওসব কারাগার-নগরীই ছিল ইউএসএসআর-এর ইণ্ডাস্ট্রিয়াল হৃৎপিণ্ড। কিন্তু এখন সঙ্গত কারণেই এসব কারাখানা-নগরীর বেশিরভাগ পরিত্যক্ত। তুষারের ভিতর কোল্ড ওয়ারের ভূতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির দিকে।
কিন্তু মাত্র একদিন আগে, বারো তারিখে বদলে গেছে সব।
আমেরিকার কয়েকটি কারাগার থেকে পলাতক সম্পূর্ণ সশস্ত্র এবং প্রশিক্ষিত তিরিশজন বন্দি দখল করে নিয়েছে পরিত্যক্ত ৯ পাবলো-৯। গতকাল আমেরিকান সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, আরব ভূখণ্ডের কয়েকটি রাজধানী এবং ওয়াশিংটন ডি.সি. শহর উড়িয়ে দেবে রাশার তৈরি এসএস-১৮ নিউক্লিয়ার মিসাইল দিয়ে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়লে ওই মিসাইলগুলো রয়ে গিয়েছিল সাইলোর ভিতরেই।
পলাতক বন্দিদের মাত্র দুটো দাবি: এক–তাদের দলের আর সবাইকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিতে হবে। তুলে দিতে হবে বিমানে। অনুসরণ করা চলবে না। দুই বন্দিদের হাতে দিতে হবে পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার। তারাই ঠিক করবে কোথায় যাবে বা কাকে দেবে ওই বিপুল অর্থ।
তাদের কথা যদি মেনে না নেয়া হয়, নিউক্লিয়ার মিসাইল হিটের দায়-দায়িত্ব নিতে হবে আমেরিকান সরকারকে।
এরপর থেকে দরদাম করছে আমেরিকান নেগোশিয়েটাররা।
এদিকে আমেরিকান সরকার ব্যাপক খোঁজ-খবর নিয়েছে।
পাবলো-৯ কোল্ড ওয়ার শেষে পরিত্যক্ত সাধারণ কোনও ইন্সটলেশন ছিল না।
মিথ্যা বলছে না পলাতক সন্ত্রাসীরা।
কমিউনিস্ট রেজিম জানায়নি কিছুই গণতান্ত্রিক সরকারকে, কিন্তু পাবলো-৯-এ রয়ে গেছে ষোলোটি নিউক্লিয়ার মিসাইল।
ওগুলো এসএস-১৮ নিউক্লিয়ার-টিপড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল চুপ করে বসে আছে পাতাল সাইলোর ভিতর।
ইউএস স্যাটালাইট যে ছবি তুলেছে, তাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, পাবলো-৯ আসলে কোনও কারখানা-নগরী নয়, ওটা একটি মিসাইল-লঞ্চ সাইট। প্রাক্তন সোভিয়েত আমলের ক্লায়েন্ট দেশগুলো, যেমন সুদান, সিরিয়া, কিউবা এবং ইয়েমেনে এখনও রয়ে গেছে এমন গোপন অনেক সাইট।
পাবলো-৯-এ প্রস্তুত রয়েছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল, এ তথ্য পাওয়ার পর আমেরিকান সরকারের উচ্চমহল থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে: ওই পলাতক সন্ত্রাসীদেরকে যত দ্রুত সম্ভব পৃথিবী থেকে বিদায় দিতে হবে।
এবং সেজন্য আর্মি এবং নেভির রিকন ইউনিট সাইবেরিয়ায়। পাঠানো হয়েছে।
আর্মির তরফ থেকে গেছে কাউন্টার-টেরোরিস্ট ইউনিট ডেল্টা ডিটাচমেন্ট। ওই দলের নেতৃত্বে রানার পরিচিত টেরোরিজম স্পেশালিস্ট মেজর হার্লি অ্যাটলক। তাদের পাশে লড়বে মেরিন রিকন ইউনিট, নেতৃত্বে রানার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর রবিন কার্লটন।
এই দুই মেজর কোণঠাসা হয়ে পড়ায় এবং আপাতত লস অ্যাঞ্জেলেসে ডেল্টা ডিটাচমেন্ট প্রস্তুত না থাকায়, আর্মি ও নেভি থেকে স্থির করা হয়েছে: আপাতত পাঠানো হবে একটি মেরিন টিম, যেটার দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশের মেজর মাসুদ রানা।
মাঝরাতের পরে রওনা হবে আরেকটি ডেল্টা ডিটাচমেন্ট।
বি-২ স্টেলথ বিমানের ককপিটে দাঁড়িয়ে মেরিন কর্নেল আব্রাহাম কনেলির ব্রিফিঙের কথাগুলোই ভাবছিল মাসুদ রানা। ঘুরে দাঁড়িয়ে আবারও গিয়ে ঢুকল বম বে-তে, ওর মুখে হাই অল্টিচ্যুড মুখোশ।
সামনেই মাঝারি আকারের কার্গো কন্টেইনার। ওটার ভিতর রয়েছে ফাস্ট অ্যাটাক কমাণ্ডো স্কাউট ভেহিকেল। আমেরিকান মিলিটারিতে আর্মার্ড সব ভেহিকেলের ভিতর ওটা সবচেয়ে হালকা এবং দ্রুতগামী যেন স্পোর্টস্ কার ও হামভির সংকর।
কন্টেইনারের ভিতর ভেহিকেলের সিটে বসেছে ছয়জন রিকন মেরিন সদস্য এবং বাংলাদেশ আর্মির সার্জেন্ট খবির। রানাসহ আটজনকে নিয়ে এই টিম। সবার পরনে সাদা-ধূসর বডি আর্মার, সাদা-ধূসর হেলমেট, সাদা-ধূসর ব্যাটল ড্রেস ইউনিফর্ম। সামনে চেয়ে আছে সবাই, গম্ভীর মুখ।
সবার উপর চোখ বুলিয়ে নিল রানা, নিজেকে কেমন বুড়ো মনে হলো ওর। এ দলে সবাই তরুণ। কারও বয়স তেইশ হয়নি। আর ওর? আটাশ পেরিয়েছে বেশ কদিন আগে।
কাছের তরুণের দিকে চাইল রানা। গিগস, হাতের কী অবস্থা?
বিমানে উঠবার পর দেয়ালে হোঁচট খেয়ে কবজি মচকে গিয়েছিল তরুণের।
এখন ঠিক আছে, স্যর, উৎসাহ নিয়ে বলল কর্পোরাল গিগস। ভীষণ অবাক হয়েছে, আগে কখনও কোনও অফিসারকে এভাবে জুনিয়রদের ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করতে দেখেনি।
আস্তে করে মাথা দোলাল রানা। চট করে মনে পড়েছে তিশা ও নিশাতের কথা। এই মিশনে ওরা থাকলে ভাল হতো। কিন্তু তা হওয়ার নয়। ওরা এখন ইউএন-এর তরফ থেকে কঙ্গোর মাউণ্ট স্ট্যানলি পাহাড় এলাকায়, লড়ছে অর্থপিশাচ ও রক্তলোভী এক ওয়ার লর্ডের বাহিনীর বিরুদ্ধে।
খবিরের দিকে চাইল রানা। চুপচাপ মানুষ খবির। নাটবল্টর মত পোক্ত সৈনিক। বেশিরভাগ সময় কুঁচকে থাকে ওর পুরু দুই ভুরু। দিনকে দিনকে হয়ে উঠছে ওর বাবার মত। অবশ্য, হোসেন আরাফাত দবিরের মত হাসির কথা মুখে আসে না ওর।
চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরুল রানার বুক চিরে। মনে পড়ে গেছে খবিরের বাবার স্মৃতি। দুর্দান্ত যোদ্ধা ছিল সে। কিন্তু মন ছিল ফুলের মত নরম। ছোট্ট একটা মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে ধরা পড়ে শত্রুর হাতে, ভয়ঙ্করভাবে মরতে হয় তাকে। ওই করুণ দৃশ্য এখনও রানার চোখে ভাসে।
মন সরিয়ে নিয়ে, ভাইব্রামাইকে স্যাটালাইট রেডিয়োতে যোগাযোগ করল রানা। গলার পাশে ওই ভাইব্রেশন-সেন্সিং মাইক্রোফোন ঠিক ধরবে ওর ভয়েস বক্সকে। জিএসএক্স-৯ নতুন ব্যাণ্ডে আপলিঙ্ক পৌঁছে দেবে স্যাটালাইটে। ইউএস মিলিটারির সর্বাধুনিক কমিউনিকেশন সিস্টেম ওটা। পোর্টেবল জিএসএক্স-৯ ইউনিটের কারণে রানার কণ্ঠ কয়েক হাজার মাইল দূর থেকেও পরিষ্কার শুনবে ইউএস মিলিটারি রিসিভার। আবার ওদিকের কথাও একইরকম স্পষ্ট শুনবে রানা।
বেস, স্ট্যালিয়ন থ্রি বলছি, সিচুয়েশন জানান।
রানার ইয়ারপিসে ভেসে এল একটি, কণ্ঠ। ওই স্বর আলাস্কার ম্যাককোল এয়ার ফোর্স বেসের রেডিয়ো অপারেটারের।
স্ট্যালিয়ন থ্রি, বেস থেকে বলছি। শত্ৰু-দলের সঙ্গে লড়ছে। স্ট্যালিয়ন টু ইউনিট। জানিয়েছে, মিসাইল সাইলো দখল করে নিয়েছে ওরা। শত্রুদের বেশ কজনকে শেষ করেছে। এখন অপেক্ষা করছে রিইনফোর্সমেন্টের জন্য। স্ট্যালিয়ন টু ইউনিট আরও জানিয়েছে, মেইন মেইনটেন্যান্স বিল্ডিঙের ভিতর এখনও রয়ে গেছে কমপক্ষে বারোজন টেরোরিস্ট।
ঠিক আছে, বলল রানা। আমাদের পরে যাদের আসার কথা, তাদের কী খবর?
ফোর্ট লিউইস থেকে আসছে পুরো এক কোম্পানি আর্মি রেঞ্জার। সংখ্যায় এক শ জন। আপনারা পৌঁছবার একঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছুবে।
ঠিক আছে। সুইচ টিপে রেডিয়ো বন্ধ করল রানা।
আর্মার্ড স্কাউট ভেহিকেলের ভিতর বলে উঠল লেখক টু খবির, ওরা কী বলেছে, স্যর?
ঘুরে চাইল রানা। পিছনে আরেকদল আসছে। আর একটু পর ড্রপ করব আমরা।
পাঁচ মিনিট পর স্টেলথ বোমারু বিমানের পেট থেকে খসে পড়ল বাক্সের মত কার্গো কন্টেইনার, মাটির দিকে রওনা হলো রকেটের গতি তুলে।
কন্টেইনারের ভিতর আর্মার্ড গাড়ির পেটে বসে আছে রানা ও তার দলের সবাই। সাঁই-সাই করে নেমে চলেছে- থরথর করে বেদম কাঁপছে প্রত্যেকে। সিটবেল্ট না থাকলে ছিটকে পড়ত।
ভেহিকেলের দেয়ালে ঝুলন্ত অ্যান্টিমিটারের দিকে চেয়ে আছে রানা, নীচের দিকে নামছে কাঁটা।
পঞ্চাশ হাজার ফুট… পঁয়তাল্লিশ হাজার ফুট… চল্লিশ হাজার… তিরিশ… বিশ… দশ হাজার…
পাঁচ হাজার ফুট উপরে এনগেজড হবে প্যারাশুট, নিস্পৃহ স্বরে বলল লোডমাস্টার, কর্পোরাল এ. এন. ক্যালভার্ট। ঠিক জায়গায় ল্যাণ্ডিঙের জন্য টার্গেট ঠিক করেছে জিপিএস গাইডেন্স সিস্টেম। এক্সটার্নাল ক্যামেরাগুলো ভেরিফাই করেছে এল যেড ক্লিয়ারেন্স।
দ্রুত ঘুরতে থাকা অ্যান্টিমিটারের দিকে চোখ রানার।
আট হাজার ফুট।
সাত হাজার ফুট… ছয় হাজার ফুট…
সব ঠিক থাকলে পাবলো-৯-এর পনেরো মাইল পুবে নামবে ওরা। দিগন্তের ওপাশে ওই ইন্সটলেশনের ফ্যাসিলিটি থেকে ওদেরকে দেখতে পাবে না কেউ।
এনগেজিং প্রাইমারি শুটস ঘোষণা করল ক্যালভার্ট।
এবার ভয়ঙ্কর ঝাঁকি খেল পড়ন্ত কন্টেইনার, ভীষণ চমকে গেল সবাই। খুব দুলে উঠেছে পুরো বাক্স। সিটে কাঁপতে শুরু করেছে ওরা। ছয় ফিতার সিট-বেল্ট ও রোববার না থাকলে মারাত্মকভাবে জখম হতো।
তখনই হঠাৎ করে কন্টেইনারের তিনদিকের প্যারাশুট ভাসিয়ে তুলল ওদেরকে।
পরিস্থিতি, ক্যালভার্ট? জানতে চাইল রানা।
কন্টেইনারের এক্সটার্নাল ক্যামেরা ও জয়স্টিক দিয়ে ওদেরকে নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে চলেছে কর্পোরাল।
দশ সেকেণ্ড। উপত্যকার মাঝে সরু মেটো পথে নেমে আসছি। আপনারা সবাই শক্ত হয়ে বসুন। তিন… দুই… এক…
জোরালো ধুপ আওয়াজ তুলে শক্ত জমিতে নেমে এল কন্টেইনার। সঙ্গে সঙ্গে বাইরের দিকে খুলে গেল বাক্সের সামনের দেয়াল। ফোর-হুঁইল-ড্রাইভ কমাণ্ডো স্কাউট লাইট অ্যাটাক ভেহিকেল ও বাক্সের চারপাশের সংকীর্ণ অংশে এসে। ঢুকল ফ্যাকাসে আলো। এক সেকেণ্ড পর কন্টেইনারের ভিতর থেকে পিছলে সাইবেরিয়ার ধূসর দিনে বেরিয়ে এল যুদ্ধযান।
কাদাভরা সরু পথে রওনা হয়ে গেল ওরা। দুপাশে তুষারে ছাওয়া টিলা। ঢালে অসংখ্য ধূসর গাছ, পাতা বলতে কিছুই নেই। সবই কংকালের মত নিথর। তুষারের কার্পেটের এখানে ওখানে ছুরির মত উঠে এসেছে তীক্ষ্ণ কালো সব পাথর।
রুক্ষ এলাকা, নিষ্ঠুর। আমাদের নরকের ঠিক উল্টো, ঠাণ্ডা।
আবারও এলাম সাইবেরিয়ায়, মনে মনে বলল রানা। লাইট অ্যাটাক ভেহিকেলের পিছন সিটে বসেছে, বলে উঠল থ্রোট মাইকে: স্ট্যালিয়ন ওয়ান, আমরা স্ট্যালিয়ন থ্রি। আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?
ওদিক থেকে কোনও জবাব এল না।
আবারও বলছিঃ স্ট্যালিয়ন ওয়ান, আমরা স্ট্যালিয়ন থ্রি। আমার কথা শুনছেন?
জবাব নেই কারও তরফ থেকে।
এবার রবিন কার্লটনের মেরিন ইউনিট বা স্ট্যালিয়ন টু-র সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইল রানা।
সাড়া নেই।
চিন্তিত হয়ে পড়েছে রানা, আলাস্কার বেসের সঙ্গে যোগাযোগ করল স্যাটালাইট ফ্রিকোয়েন্সিতে।
বেস, আমরা থ্রি। স্ট্যালিয়ন ওয়ান বা টু-র সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের সঙ্গে আপনাদের কন্ট্যাক্ট আছে?
অ্যাফারমেটিভ, মেজর রানা, জবাব এল আলাস্কা থেকে। এই তো একটু আগে কথা হয়েছে। তখন…
হঠাৎ করেই থেমে গেল সিগনাল। খডমড আওয়াজ শুরু হয়েছে ইয়ারপিসে। ক্যালভার্ট? কর্পোরালের দিকে চাইল রানা।
সরি, বস, সিগনাল হারিয়ে গেছে, ভেহিকেলের ওয়াল কন্সোলের কাছ থেকে বলল তরুণ। আমাদের কিছু করার নেই। …শুনেছিলাম এসব নতুন স্যাটালাইট রিসিভার কখনও নষ্ট হবে না।
ভুরু কুঁচকে গেল রানার। জানতে চাইল, কোনও জ্যামিং সিগনাল হতে পারে?
জী-না, স্যর। খোলা রেডিয়ো এয়ারস্পেসে আছি। ওই সিগনাল কেউ ঠেকাতে পারবে না। সমস্যা বোধহয় ওদিকে।
ওদিকে… বিড়বিড় করল রানা। এবার ড্রাইভারের উদ্দেশে বলল, আমরা ভিশু্যয়াল রেঞ্জে পৌঁছব কখন?
স্কাউটের ড্রাইভার এক মেরিন সার্জেন্ট, নাম বব গ্রেসন। রানা ছাড়া অন্যদের চেয়ে বয়সে বড়। তিরিশ সেকেণ্ড পর ওদিক থেকে আমাদেরকে দেখা যাবে, স্যর।
সামনে ঝুঁকে বসল রানা, গ্রেসনের কাঁধের উপর দিয়ে চাইল।
স্কাউটের নীচে দ্রুত পিছিয়ে চলেছে কালো কাদাময় পথ। ঢালু এক টিলার চূড়ার দিকে চলেছে ওরা।
ওই টিলা পেরুলে সামনে দূরে চোখে পড়বে পাবলো-৯।
তিন
রাশান পরিত্যক্ত ইন্সটলেশনের দিকে যখন ছুটে চলেছে রানা ও তার দল, ওই একই সময়ে আলাস্কার ম্যাককোল এয়ার ফোর্স বেসে জন রেমন নামের তরুণ এক রেডিয়ো অফিসার হতাশ ও বিরক্ত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে মেরিন এবং বাংলাদেশি টিমের সিগনাল।
কয়েক সেকেণ্ড আগে রেমনকে হতবাক করে কমিউনিকেশন ফ্যাসিলিটির সমস্ত যন্ত্র বিকল হয়েছে, দপ্ করে নিভে গেছে কন্সেলের বাতি। অথচ বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে ঘরে।
রেডিয়ো অফিসার কী করবে ভাবছে, এমন সময় খুলে গেল ঘরের দরজা, এসে ঢুকলেন এয়ার রেস ম্যাককোলের কমাণ্ডার।
স্যর, বলল রেমন, আমরা…
জানি, বাছা, নরম স্বরে বললেন সিও। সবই জানি।
বেস কমাণ্ডারের পিছনে আরেক লোককে দেখল রেডিয়ো অফিসার। নতুন ওই লোককে আগে দেখেনি সে। বয়স্ক, দীর্ঘ এবং শক্তপোক্ত। চুলগুলো গাজর রঙের, মুখটা ছুঁচোর মুখের মত চোখা। পরনে সিভিলিয়ন সুট, একবারও চোখের পাতা পড়ে না তার। শীতল চোখে ঘরের চারপাশ দেখে নিল সে।
বেস কমাণ্ডার নিচু স্বরে বললেন, বাছা, কিছু করার নেই, ইন্টেলিজেন্স ইশ্য। আমাদের হাত থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওই মিশন।
.
স্কাউট অ্যাটাক ভেহিকেল শুভ্র তুষারাবৃত টিলার চূড়া পেরুতেই দূরে চাইল রানা। সামনে বিস্তৃত উপত্যকার কোলে অতীত কীর্তি নিয়ে থম মেরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত পাবলো-৯- তুষার ছেয়ে দিয়েছে সব দালানের ছাত ও দেয়াল।
হ্যাঙার, স্টোরেজ শেড, বিশাল মেইনটেন্যান্স ওয়্যারহাউস, একপাশে পনেরোতলা কাঁচ-কংক্রিটের দানবীয় অফিস টাওয়ার, নিচু বেশকিছু দালান- এসব নিয়ে শ্রম-নগরী পাবলো-৯।
বিশফুট উঁচু রেযার ওয়ায়ার ফেন্স ঘিরেছে গোটা কম্পাউণ্ডকে। দুমাইল দূরে রাখার উপকূল, বরফ ঢাকা সৈকতে অবিরাম মাথা কুটছে আর্কটিক সাগরের শীতল ঢেউ।
কোল্ড ওয়ার শেষে সমস্ত গুরুত্ব হারিয়ে বসেছে পাবলো-৯, নিথর পড়ে আছে মূল্যহীন মৃত মানুষের মত।
নগরীর রাস্তাগুলো নির্জন। সবই ঢেকে দিয়েছে শুভ্র তুষার। রানার ডানদিকে মেইন মেইনটেন্যান্স ওয়্যারহাউস, আকারে চারটে ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। ওয়্যারহাউসের এক দেয়ালে হেলান দিয়ে দানবীয় স্কুপ তৈরি করেছে অসংখ্য লোহা-লক্কড় এবং ভাঙা যন্ত্রপাতি।
বামে প্রকাণ্ড ছাউনি, ওখান থেকে ছাতওয়ালা এক সেতু গেছে সুউচ্চ অফিস টাওয়ারে। পনেরোতলা অফিসের ছাত থেকে নেমেছে দীর্ঘ ছোরার মত সব বরফের টুকরো, মাধ্যাকর্ষণকে কাঁচ কলা দেখিয়ে দিব্যি আছে বছরের পর বছর।
শহরের উপর ভয়ানক হামলা করেছে বরফ-শীতল পরিবেশ। তুষার বা বরফ সরিয়ে নেয়ার কেউ নেই, কাজেই ফেটেছে সব দালানের জানালাগুলোর কাঁচ ওখানে যেন অসংখ্য মাকড়সার জাল। এখানে-ওখানে কাঁচ-ভাঙা সব চৌকো গর্ত, দালানে ঢুকছে হু-হুঁ হাওয়া।
ভুতুড়ে নগরী পাবলো-৯-এর পাতালে কোথাও থম মেরে বসে আছে ষোলোটি নিউক্লিয়ার মিসাইল।
শহরের প্রবেশ-পথের ফটক উড়িয়ে দেয়া হয়েছে আগেই। আশি কিলোমিটার গতি তুলে ওদিক দিয়ে ঢুকে পড়ল রানাদের স্কাউট। ঢালু পথ বেয়ে উঠছে কমপ্লেক্সের দিকে। আর্মার্ড কারের পিছনে ৭.৬২ এমএম মেশিনগান টারেটে এক মেরিন সৈনিক।
ড্রাইভার গ্রেসনের কাঁধের উপর দিয়ে কমপিউটার স্ক্রিনে চোখ রেখেছে রানা। বলল, লোকেটর দিয়ে খুঁজে দেখো ডেল্টা ও মেরিন ফোর্স কোথায়।
কি-বোর্ডে টোকা দিতে শুরু করেছে গ্রেসন। কমপিউটার স্ক্রিনে ভেসে উঠল পাবলো-৯-এর মানচিত্র।
এক মানচিত্রে দেখানো হয়েছে কমপ্লেক্সের এক পাশ।
ওদিকে মুখোমুখি দুটো ব্লক।
এক ব্লকে অফিস টাওয়ার, উল্টো ব্লকে প্রকাণ্ড মেইনটেন্যান্স শেড।
দুই বিশাল দালানের প্রথমতলায় বেশকিছু লাল বিন্দু।
বিল্ডিং এবং ছাউনির ভিতর রয়েছে ডেল্টা ও মেরিন। ইউনিট।
কিন্তু মানচিত্রের ভিতর কোথায় যেন গোলমাল রয়েছে।
এক সেকেণ্ড পর বুঝল রানা, টিপটিপ করা লাল বিন্দুগুলো। মোটেও নড়ছে না।
একদম স্থির।
শিরশির করে উঠল রানার ঘাড়ের খাটো চুলগুলো। সার্জেন্ট গ্রেসন, নিচু স্বরে বলল, গিগস, ওয়ারেন আর ক্যালভার্টকে নিয়ে অফিস টাওয়ার কাভার করবে তুমি। এদিকে খবির, জন ও টমিকে নিয়ে মেইনটেন্যান্স বিল্ডিং সিকিয়োর করব আমি।
ঠিক আছে, স্যর।
ফাঁকা সরু এক রাস্তা ধরে চলেছে স্কাউট। ভাসমান কংক্রিট ওয়াকওয়ের নীচ দিয়ে পেরিয়ে গেল গাড়ি, নানাদিকে ছিটকে পড়ল তুষারের স্তূপ।
কয়েক সেকেণ্ড পর বিশাল মেইনটেন্যান্স ওয়্যারহাউসের সামনে ছোট পারসোনেল দরজার পাশে থামল আর্মার্ড কার।
ঝটকা দিয়ে খুলে গেল স্কাউটের পিছনের হ্যাচ, স্নো ক্যামোফ্লেজ পরনে রানা এবং অন্য তিন যোদ্ধা ছিটকে গিয়ে ঢুকল ওয়্যারহাউসের সংকীর্ণ পারসোনেল দরজা দিয়ে।
ওরা নেমে যেতেই বাঁক নিয়ে রওনা হলো স্কাউট, চলেছে।
কাঁচ ঢাকা অফিস টাওয়ারের দরজা লক্ষ্য করে।
আর্মার্ড কারের চলে যাওয়া লক্ষ করেনি রানা, তার আগেই মেইনটেন্যান্স বিল্ডিঙের ভিতর ঢুকে পড়েছে পিস্তল হাতে।
ওর সঙ্গে রয়েছে হেকলার অ্যাণ্ড কচ-এর পুরনো এমপি-৫ এর পুত্র এমপি-৭। ওটা খাটো ব্যারেলের মেশিন পিস্তল। ছোটখাটো, কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র। এ ছাড়া রয়েছে ডের্ট ঈগল সেমি-অটোমেটিক পিস্তল, কে-বার ছোরা এবং পিঠের হোলস্টারে আর্মালাইট এমএইচ-১২। ওটা দেখতে দুই গ্রিপ ওয়ালা অস্ত্রের মত–ম্যাগনেটিক এ্যাপলিং হুক লঞ্চার।
এই মিশনের জন্য রয়েছে স্ট্যাণ্ডার্ড কিট। বাড়তি গুলি, ছয়টা হাই-পাওয়ার্ড থার্মাইট-অ্যামাটল ডিমোলিশন চার্জ। ওগুলো যে-কোনও বড় দালানকে, তা সে যত বড়ই হোক, সেকেণ্ডে ধসিয়ে দিতে পারবে।
দুসারি অফিস-ঘরের মাঝের করিডোর দিয়ে চলেছে রানা ও তার দলের তিনজন। কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল একটা দরজার সামনে। ওখানে থামল ওরা। কোনও আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করল কান খাড়া করে।
কয়েক সেকেণ্ড পেরিয়ে গেল, টু শব্দ নেই। খুব সাবধানে কবাট খুলল রানা। ওদিকে বিশাল এলাকা, একেবারে ফাঁকা।
এবার এক ধাক্কায় দিয়ে পুরো দরজা খুলে ফেলল রানা, সঙ্গে সঙ্গে চমকে গেল।
ইয়াল্লা!
ওয়্যারহাউসের এই দরজা থেকে শুরু হয়েছে ওঅর্ক এরিয়া। বহুদূর পর্যন্ত প্রকাণ্ড হ্যাঙার বে, ছাতের ফাটল ধরা কাঁচ দিয়ে আসছে সাইবেরিয়ার ধূসর আকাশের মরাটে আলো।
কিন্তু সাধারণ হ্যাঙার বে নয় এই ওয়্যারহাউস।
পেনাল কলোনির পুরনো কোনও মেইনটেন্যান্স ছাউনিও নয়।
মস্ত দালানের মেঝের চারভাগের তিনভাগ এলাকা জুড়ে কংক্রিটের তৈরি চারকোনা এক বিশাল গহ্বর।
আর ওই খাদের ভেতর কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক মঞ্চ।
তার ওপর নিশ্চিন্তে বসে আছে দু শ মিটার লম্বা প্রকাণ্ড এক সাবমেরিন।
সত্যিই মস্ত, কাছ থেকে মনে হলো অস্বাভাবিক বড়। যেন বসে আছে রাজ-সিংহাসনে।
কংক্রিটের ব্লকগুলো চারপাশের আসবাবপত্র। যেন পিঁপড়ের দল তৈরি করেছে খুদে সব আকুতি।
গুঁড়ো হওয়া বরফ ও তুষার ছেয়ে দিয়েছে সবকিছুকে।
সাবমেরিনের ওপর দিয়ে গেছে ক্রেন ও ক্যাটওয়াক। সবই দানবীয় শেডের কংক্রিট মেঝেতে মিশেছে। সরু এক গ্যাংওয়ে উঠেছে সাবমেরিনের তিনতলা উঁচু কনিং টাওয়ারে। কিছুটা দূরে শেডের উপরের ব্যালকনি। সাবমেরিনের কনিং টাওয়ারের মেঝে এবং ব্যালকনির মেঝে একই উচ্চতায়।
বিস্ময় কাটিয়ে এসব তথ্য হজম করতে চাইছে রানা।
তবে প্রথমে চিনল সাবমেরিনটাকে। ওটা টাইফুন। ইউএসএসআর-এর নিউক্লিয়ার আর্সেনালবাহী সাগরগামী নৌযানগুলোর ভিতর সেরা যুদ্ধযান ছিল। টাইফুন ক্লাস সাবমেরিনকে বলা চলে প্রতাপশালী কমিউনিস্ট রাজের মুকুট। মাত্র ছয়টি ব্যালেস্টিক মিসাইল সাবমেরিন তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমা লেখকদের বিভিন্ন উপন্যাস এবং হলিউডি ছায়াছবি বিখ্যাত করে তুলেছে ওগুলোকে। টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন দেখতে দারুণ আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবে ভরসা করা যেত না তার ওপর। যন্ত্রাংশ প্রতি মাসেই আপগ্রেড করতে হতো, এ ছাড়া লেগেই ছিল মেইনটেন্যান্স-এর সমস্যা। অবশ্য, ওই জলযান আজ পর্যন্ত মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় সাবমেরিন।
মেইনটেন্যান্স শেডের ভিতর সাবমেরিনের সামনের টর্পেডো বে-তে কাজ করা হচ্ছিল, এমন সময় পরিত্যক্ত হয় শ্ৰম-নগরী পাবলো-৯। সাবের নাকের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে টর্পেডো টিউব। একটা একটা করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে খোলের প্লেটগুলো।
কিন্তু আর্কটিক সাগর থেকে দুই মাইল ভেতরের কোনও মেইনটেন্যান্স শেডে কীভাবে আসে টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন?
এর জবাব নীরবে দিল বিশাল মেইনটেন্যান্স বিল্ডিং।
টাইফুন সাবমেরিনের ড্রাই ডকের আরেক দিকে রানা। দেখল, দেয়ালের মত খাড়া, উঁচু, প্রকাণ্ড এক প্লেট-স্টিল সি গেট।
ওই কবাটের ওদিকে রয়ে গেছে সাগরের পানি।
ইনডোর স্টেডিয়ামের মত এক জায়গায় প্রায় জমাট বেঁধেছে থকথকে বরফ। ওই শীতল পানিকে ড্রাই ডক থেকে দূরে রেখেছে বাঁধের মত সি গেট।
রানা আন্দাজ করল, ওই পানির নীচে রয়েছে কোনও সুড়ঙ্গ। সেটা সোজা মাটির নীচ দিয়ে চলে গেছে সাগরে। নইলে মেরামতের জন্য সাবমেরিন আসত না পাবলো-৯-এ। অনেক আগেই ধরা পড়ত আমেরিকান গুপ্তচর স্যাটালাইটের চোখে।
এখন সবই বুঝতে শুরু করেছে রানা।
পাবলো-৯ আর্কটিক উপকূল থেকে পুরো দুই মাইল ভিতরে, এবং মানচিত্রে বলা হয়েছে, ওটা রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য সশ্রম কারাগার।
কিন্তু বাস্তবে এ শহর ছিল টপ সিক্রেট সোভিয়েত সাবমেরিন রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি।
অবশ্য, এসব নিয়ে ভাববার বিশেষ সময় পেল না রানা। কারণ ঠিক তখনই দেখল দেহগুলো।
ড্রাই ডকের গহ্বরের পাশেই পড়ে আছে: চারটে দেহ।
পরনে ইউএস সামরিক বাহিনীর তুষারের ফ্যাটিগ, দেহে সব ধরনের আর্মার… এবং প্রত্যেকে অনেক আগেই মারা গেছে গুলি খেয়ে!
ওদিকের মেঝেতে আছে রক্তের প্রলেপ। লাশের মুখে ছলাৎ করে লেগেছে, বুকে, সারাদেহেও। জমে যাওয়ার আগে ছড়িয়ে পড়েছিল মেঝেতে রক্তের স্রোত।
শালার মাদারফাঁকার, শ্বাস আটকে ফেলেছে কর্পোরাল টমি ম্যাগান। যিশু! এরা ছিল ডেল্টা ডিটাচমেন্টের যোদ্ধা, সেরাদের সেরা! যুবকের চোখে রানার মতই সবুজ রে-ব্যান সানগ্লাস।
চুপ হয়ে গেছে রানা। দেখছে লাশগুলোর ইউনিফর্ম বদল করা হয়েছিল মালিকের ইচ্ছেমত। কারও ডান কাঁধের প্লেট খুলে নেয়া হয়েছে, আবার কারও স্নো গিয়ারের কনুইয়ের আস্তিন নেই।
এ কাজ করে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর ডেল্টা যোদ্ধারা।
গহ্বরের ভিতর আরও দুটো দেহ, ওগুলো পড়ে আছে। তিরিশ ফুট নীচে। গুলি খেয়ে ঝাঁঝরা হয়েছে।
জমে যাওয়া রক্তের চারপাশে শত শত বুলেটের খোসা। পাল্টা গুলি করেছে ডেল্টা যোদ্ধারা।
রানার মনে হলো, এরা একইসময়ে চারপাশে গুলি করেছে, এবং তখনই মারা পড়েছে শত্রুদের হাতে।
.
অস্পষ্ট ফিসফিসে কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
সব মিলে কজন?
এখানে চার। সবুজ টিম বলছি, অফিস টাওয়ারে ঢুকেছে আরও চারজন।
ওদের কথা বাদ দাও। এদের ভেতর মাসুদ রানা কোজন?
সবুজ সানগ্লাস।
স্নাইপার রেডি হও। বলামাত্র গুলি করবে।
.
একটা মতদেহ মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে রানার।
প্রায় বরফের মূর্তির মত জমাট বেঁধে গেছে নিজেও।
প্রথমে দেখতে পায়নি, কারণ দেহের উপরের অংশ ঝুলছিল ড্রাই ডকের খাদের ভিতর। কিন্তু এখন পরিষ্কার দেখা গেল।
সব মিলে ছয়টা দেহ। কিন্তু বিশেষ এই মানুষটির মাথা কেটে নেয়া হয়েছে গর্দান থেকে।
দৃঢ় হয়ে গেল চোয়াল, চুপ করে চেয়ে রইল রানা। মুহূর্তের
জন্য বমি এল। তারপর বিদায় নিল বাজে অনুভূতিটা।
কাটা গর্দান থেকে ঝুলছে থকথকে, লালচে মাংস। পুরো কাটা পড়েছে ইসোফ্যাগাস ও শ্বাসনালী।
হায় আল্লা, চাপা স্বরে বলল খবির, পৌচেছে রানার পাশে। আসলে এখানে হচ্ছেটা কী, স্যর?
বিশাল এই দালানে রানা ও তার তিন সৈনিক ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে দেখছে চারপাশ। ড্রাই ডকের পারে ও নীচে লাশ।
কিন্তু ওরা জানে না, ওদের উপর চোখ রেখেছে কমপক্ষে বিশজন লোক। তারা রয়েছে হল-এর কি স্ট্যাটেজিক পয়েন্ট এ। প্রত্যেকের পরনে একই পোশাক–স্নো ফ্যাটিগ। কিন্তু হাতে বিভিন্ন অস্ত্র।
নীরব উত্তেজনা নিয়ে আমেরিকান ও বাংলাদেশি যোদ্ধাদের দিকে চেয়ে আছে তারা, কমাণ্ডার একবার খুন করতে নির্দেশ দিলেই শুরু হবে হত্যাযজ্ঞ।
মস্তকহীন দেহের পাশে বসেছে মাসুদ রানা, লাশটা দেখছে।
ডেল্টা ডিটাচমেন্টের যোদ্ধাদের সঙ্গে আইডি ট্যাগ বা প্যাঁচ নেই। কিন্তু ট্যাগ বা প্যাঁচ লাগল না রানার, ও ভাল করেই চেনে বিশেষ এই লোকটিকে। সবই বলে দিল দেহের গড়ন।
এ মেজর হার্লি অ্যাটলক, ডেল্টা ডিটাচমেন্টের নেতা।
চারপাশ একবার দেখে নিল রানা। আশপাশে কোথাও দেখা গেল না মাথাটা। ভুরু কুঁচকে গেল ওর। বিসিআই-এর একটি খবর মনে পড়ে গেছে। আবারও হার্লি অ্যাটলকের উপর স্থির হলো ওর চোখ। শুধু যে লোকটার মাথা কাটা হয়েছে, তা নয়, নিয়ে যাওয়া হয়েছে…
মেজর রানা, ওর ইয়ার পিসে বিস্ফোরিত হলো একটা কণ্ঠ। সার্জেন্ট গ্রেসন বলছি। আমরা অফিস টাওয়ারে। যা দেখছি বিশ্বাস করবেন না।
দেখো বিশ্বাস করি কি না। জানাও, কী হয়েছে।
অফিস টাওয়ারে আমাদের আগে আসা মেরিনরা সবাই শেষ। আর, স্যর… মেজর কার্লটনের মাথা কেটে নিয়ে গেছে কোন্ এক কুকুরের বাচ্চা!
মেরুদণ্ড বেয়ে হিমশীতল স্রোত নামল রানার। ঝড়ের গতিতে ভাবতে শুরু করেছে। চোখ বোলাচ্ছে চারপাশের হল এ। ফাটল ধরা জানালাগুলোর কাঁচ সাত রঙা আলো ফেলছে। বরফে ছাওয়া ধূসর দেয়ালে।
পাবলো-৯ পরিত্যক্ত, কেউ নেই, কিন্তু..
কোথাও নেই আমেরিকান সন্ত্রাসীরা…
হঠাৎ করেই হারিয়েছে রেডিয়ো কন্ট্যাক্ট। এর অর্থ…
ডেল্টা ও মেরিন ফোর্সের সবাই খতম। শুধু তাই নয়, হার্লি অ্যাটলক ও রবিন কার্লটনের মাথা কেটে নেয়া হয়েছে।
এখন বুঝতে শুরু করেছে মাসুদ রানা।
সার্জেন্ট গ্রেসন! থ্রোট-মাইকে নিচু স্বরে বলল রানা। এক্ষুণি এসো! ফাঁদে ফেলেছে, বদ্ধ খাঁচায় আটকে ফেলেছে আমাদের!
কথার ফাঁকে রানার চোখ গিয়ে পড়েছে ডকের হল-এ ছোট তুষারের এক স্তূপের উপর। ওমনি দেখেছে ওটার পিছন থেকে উঁকি দিয়েছে এক লোক। পোশাক ক্যামোফ্লেজ করা, হাতে কোল্ট কমাণ্ডো অ্যাসল্ট রাইফেল। তাক করেছে ওরই মাথা লক্ষ্য করে!
ঠিক তখনই হল-এর চারপাশ থেকে শুরু করল গুলি। বিশজন আততায়ীর গুলির তোড়ে মুহূর্তে ড্রাই ডক ফ্যাসিলিটি হয়ে উঠল রণক্ষেত্র।
বাঁচবার জন্য ডাইভ দিয়ে আরেক পাশে গিয়ে পড়ল রানা, আর তখনই ওর মাথার উপর দিয়ে হুশ-হুঁশ আওয়াজ তুলে। বেরোল দুটো বুলেট।
রানার মতই একই কাজ করেছে লেখক টু খবির ও কর্পোরাল জন হুক, ডাইভ দিয়ে পড়েছে ডেল্টা যোদ্ধাদের লাশের মাঝে। মেঝেতে লেগে রঙিন স্ফুলিঙ্গ তুলে নানাদিকে ছুটছে অজস্র বুলেট।
কিন্তু কপাল মন্দ দ্বিতীয় মেরিন টমি ম্যাগানের। চোখে রানার মতই সবুজ রে-ব্যান সানগ্লাস। কোনও সুযোগই পেল না
সে, অন্তত বিশটা গুলি বিধল ওর বুক-পেটে। ঝটকা দিয়ে নাচতে নাচতে পিছিয়ে গিয়ে ছিটকে পড়ল লাশটা মেঝেতে
জলদি! গলা ফাটিয়ে নির্দেশ দিল রানা, সাবমেরিনের নীচে! খবির ও জন হককে প্রায় ক্র্যাশ-ট্যাকল করল ও, সরিয়ে দিল লাইন অভ ফায়ার থেকে। গড়াতে শুরু করেছে তিনজন, উপরের এই পার থেকে খসে পড়ল ড্রাই ডকের দিকে। এক সেকেণ্ড পর উপরের মেঝে খুবলে নিয়ে ওদের মাথার উপর দিয়ে গেল কয়েক শ গুলি
রানা এবং ওর সৈনিকরা নীচে পড়ছে, তবে হেভিলি আর্মড ৩-ফোর্সের নেতার চোখের আড়ালে সরতে পারল না।
কমাণ্ডারের নাম কার্ট কে, এবেলহার্ড, অতীতে সাউথ আফ্রিকান এলিট রেকনেসেন্স কমাণ্ডো বাহিনীর মেজর ছিল।
তা হলে এই সে বিখ্যাত মাসুদ রানা, ভাবল এবেলহার্ড। দ্রুত পড়তে দেখছে সে বাঙালি কমাণ্ডোকে। এ লোকই শেষ করেছে ইউটাহ স্টেটে বিজ্ঞানী, কর্নেল বয়েস ইংগিলসকে। সত্যিই দারুণ রিফ্লেক্স লোকটার! কিন্তু, বাছা…
নিজের অবস্থান থেকে ধীরেসুস্থে নেমে এল কার্ট কে. এবেলহার্ড। সত্যিকারের নক্ষত্র ছিল সে রেকণ্ডো বাহিনীতে। প্রাক্তন ওই বর্ণবাদী বাহিনীর অনেকেই আজও তাকে মস্ত হিরো মনে করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতন্ত্র এলেও প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেনি এবেলহার্ড আসলে রক্তপিশাচ ও বর্ণবাদী। কিন্তু তারপর কালো এক সৈনিককে বুট ক্যাম্পে খুন করে বসল সে। যুবক সৈনিককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল হ্যাণ্ড-টু-হ্যাণ্ড ট্রেনিঙের সময়। এ কাজ আগেও করেছে, কিন্তু শেষবার ধরা পড়ল।
আসলে কার্ট কে, এবেলহার্ডের মত সৈনিক কখনও খুন না। করে থাকতে পারে না। সে সাইকোপ্যাথ, সোশিওপ্যাথ, খুনি–সামরিক বাহিনী থেকে জোর করে অবসর দেয়া হলে বাধ্য হয়ে সরে যেতে হলো তাকে। জঙ্গি দেশ পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনও দেশেই সামরিক বাহিনীতে রাখা হয় না তার মত উন্মাদ বেজন্মাদের।
অবসর নেয়ার কিছু দিনের ভিতর এবেলহার্ডকে ভাড়া করা হলো বিপুল টাকার বিনিময়ে। এই বিশেষ ইউনিটের কমাণ্ড তুলে দেয়া হলো তার হাতে। এটি হয়ে উঠল দুনিয়ার সেরা মার্সেনারি অর্গানাইযেশনের স্পেশাল অপারেশন টিম। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অপারেট করে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী, বর্ণবাদী ওই কোম্পানি। নাম: একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ বা ই.এস.ওয়াই.।
ই.এস.ওয়াই, বেশিরভাগ সময় আফ্রিকান স্বৈরশাসকদের হয়ে কাজ করে, বদলে তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করে ডায়মণ্ড মাইনিঙের মুনাফার একটা বড় অংশ। এ ছাড়া, সুযোগ পেলেই ই.এস.ওয়াই লোভনীয় সব আন্তর্জাতিক বাউন্টি হান্ট-এ অংশ নেয়।
আর আজ যে দারুণ আর্কষণীয় বাউন্টি হান্ট শুরু হয়েছে, তাতে অংশ না নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সতেরোজন লোককে শেষ করে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে। প্রতিটা মাথার জন্য মিলবে তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার করে। কাউন্সিলে ই.এস.ওয়াই-র লোক ছিল, আর তার মাধ্যমে খবর পেয়ে এরই ভিতর দুটো মাথা জোগাড় করে ফেলেছে তারা। তৃতীয় মাথাটাও আজই একটু পরে তার হাতে আসবে।
এবেলহার্ডের পাশে থামল তার রেডিয়ো অপারেটার। স্যর, সবুজ টিম বলছে তারা অফিস টাওয়ারে মেরিনদের সঙ্গে লড়তে শুরু করেছে।
আস্তে করে নড করল এবেলহার্ড। তাদের জানাও, কাজ শেষ হলে যেন ব্রিজ ধরে ড্রাই ডকে ফেরে।
স্যর, আরেকটা কথা, বলল রেডিয়ো ম্যান।
বলো?
র্যানডলফ ছাদে, বলছে এক্সটার্নাল রেইডারে পাওয়া যাচ্ছে। দুটো ইনকামিং সিগনাল। চুপ হয়ে গেল যুবক। কয়েক মুহর্ত পর বলল, দুই সিগনেচার থেকে ওর মনে হয়েছে, ওই দুই যুদ্ধবিমান রাশান। একটাতে রয়েছে বাউন্টি হান্টার পোলিশ, অন্যটাতে মিস্টার ফগ।
কতটা দূরে তারা?
পোলিশের আসতে লাগবে পঁচিশ মিনিট। আর মিস্টার ফগের আসতে পনেরো মিনিট।
নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল এবেলহার্ড। পোলিশ ভয়ঙ্কর চতুর বাউন্টি হান্টার। সত্যিকারের হারামজাদা লোক। আর মিস্টার ফগ রহস্যময় এক বৈজ্ঞানিক। আগেও একবার এক মেয়েকে কেড়ে নিয়েছিল ওদের হাত থেকে। কেউ জানে না সে দেখতে কেমন, বা কোথায় তার আস্তানা। শুধু জানা গেছে, সে সুঠামদেহী, চোখে থাকে সানগ্লাস। পরনে কালো আলখেল্লা।
এ ধরনের মিশন মন থেকে ঘৃণা করে এবেলহার্ড। ঘৃণা করে বাউন্টি হান্ট। সঠিক সময়ে টার্গেট দখল করলেও চুতিয়া শালার বাউন্টি হান্টাররা হাজির হয়, ছোঁ দিয়ে কেড়ে নেয় শিকার। সোজা কথায়, এক বাউন্টি হান্টার চুরি করে আরেক বাউন্টি হান্টারের মাল। হাতে পেলেই গিয়ে টাকা বুঝে নিয়ে উধাও হয়।
সামনা-সামনি দুই দল মিলিটারি লড়লে যে দল জিতেছে তাদেরকে বিজয়ী ধরে নেয়া যায়, কিন্তু বাউন্টি হান্ট জিনিসটা ঠিক তেমন নয়। বাউন্টি হান্ট-এ সে জিতবে, যে সঠিক সময়ে ফিরতে পারবে পুরস্কার নিয়ে।
ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল এবেলহার্ড: পোলিশকে ঠেকাতে পারব আমি। ও একটা গণ্ডার কিন্তু আমিও কম না। আমরা ওকে এদিকে ভিড়তেই দেব না। কিন্তু ফগ ব্যাটা… সে বড় ধরনের সমস্যা করতে পারে।
সাবমেরিন গহ্বরের দিকে চাইল ই.এস.ওয়াই. কমাণ্ডার। মাইক্রোফোনে বলল, যা করার তাড়াতাড়ি করো। দেরি না করে মাসুদ রানার মুণ্ডু নিয়ে এসো আমার কাছে।
.
ড্রাই ডকের দেয়াল ঘেঁষে পড়ছে মাসুদ রানা, হোসেন আরাফাত খবির ও কর্পোরাল জন হক। ওরা তিরিশ ফুট নীচে ধপ করে এ পড়ল ডেল্টা ডিটাচমেন্টের দুই যোদ্ধার লাশের উপর।
জলদি! মুভ! মুভ! মুভ!
কংক্রিটের হঁটের উপর বসে আছে বিশাল কালো টাইফুন সাবমেরিন, দুই যোদ্ধাকে ওটার নীচে টেনে নিল রানা।
একেকটা কংক্রিটের ব্লক ছোটখাট গাড়ির সমান। এমন চারটে সারি ওজন নিয়েছে বিশাল সাবমেরিনের। ফলে টাইফুনের নীচে তৈরি হয়েছে সরু সব গলি। মাথার উপর সাবমেরিনের কালো স্টিলের খোল।
আঁধার গলির ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে ছুটতে শুরু করেছে রানা, তারই ফাঁকে থ্রোট-মাইকে বলে উঠল: গ্রেসন! সার্জেন্ট গ্রেসন! শুনছ?
ব্যস্ত কণ্ঠে ভেসে এল পাল্টা জবাব: মেজর! শিট! বৃষ্টির মত গুলি করছে! আর সবাই শেষ, স্যর। আমি… বাজে ভাবে আহত! সরে যেতে পারব না! দুঃখিত, স্যর, আমার পক্ষে আর… ওহ… না…
ওদিকে পটকার মত কয়েকটা গুলির আওয়াজ শুনল রানা। পরক্ষণে কেটে গেল সিগনাল।
পিছনে মোলায়েম কয়েকটা আওয়াজ শুনল রানা। চরকির মত ঘুরেই এমপি-৭ তুলল। কংক্রিটের ব্লকের তৈরি জঙ্গলের ওদিকে দড়ি বেয়ে গহ্বরে নামছে শত্রদল।
পিছনে খবির ও জনকে নিয়ে সামনে বাড়ল রানা। ছায়াময় গলির মত জায়গা। মাথার উপর টাইফুন সাবমেরিন। পিছন থেকে আসতে শুরু করেছে বুলেট।
ওদের পিছনে কংক্রিটের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে শত্র। সংখ্যায় কমপক্ষে দশজন। রণকৌশল অনুযায়ী একে অপরকে কাভার দিচ্ছে, সামনে বাড়ছে ছুটে ছুটে। দীর্ঘ গলিগুলোর ভিতর ভারী গুলিবর্ষণ চলছে। ড্রাই ডকের শেষে সি গেটের দিকে ছুটছে। রানার দল।
দৌড়ের ফাঁকে শত্রুদের দেখছে রানা। বুঝে নিচ্ছে তাদের ট্যাকটিক্স। নজর রেখেছে তাদের অস্ত্র কী ধরনের। স্ট্যাণ্ডার্ড রণকৌশল ব্যবহার করছে লোকগুলো। তাড়িয়ে নিয়ে শত্রুকে কোণঠাসা করতে চাইছে। কিন্তু তাদের অস্ত্রগুলো…
এরা কারা? রানার পাশে ছুটতে ছুটতে প্রশ্ন করল খবির।
জানি না, বলল রানা। তবে আঁচ করছি। কথাটা শুনতে ভাল লাগবে না তোমার।
বলুন তাও?
ওদের অস্ত্রগুলোর দিকে খেয়াল দাও।
চট করে পিছনের আততায়ীদের অস্ত্রের উপর চোখ বুলিয়ে নিল খবির। সাদা মুখোশ পরা কয়েকজনের হাতে এমপি-৫, আবার অন্যদের কাছে ফ্রেঞ্চ ফ্যামাস অ্যাসল্ট রাইফেল বা আমেরিকান কোল্ট কমাণ্ডো রাইফেল। দুয়েক জনের সঙ্গে একে ৪৭ বা চায়নিজ একে-৫৬।
দেখেছ অস্ত্র? ছোটার ফাঁকে বলল রানা। নানান জিনিস ওদের কাছে।
কুকুরগুলো তা হলে মার্সেনারি? জানতে চাইল খবির।
তাই তো মনে হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের খুন করতে চায় কেন?
এখনও জানি না।
আমরা এখন কী করব? অসহায় সুরে বলল কর্পোরাল জন হক।
সেটাই ভাবছি, বলল রানা। চট করে দেখল মাথার উপরে সাবমেরিনের স্টিলের খোল। ওর চোখ খুঁজছে এসকেপ রুট।
একটা কংক্রিটের ব্লকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল রানা, উঁকি দিল ওদিকে। দূরে দেখা গেল ড্রাই ডক পিট। এ গহ্বরের পুবে সাগরের বরফ-ঠাণ্ডা বিপুল পানিকে সরিয়ে রেখেছে ওই উঁচু স্টিলের সি গেট।
ড্রাই ডকের মেকানিক্স নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে রানা।
মস্ত টাইফুন সাবমেরিনকে এই ডকে আনতে গিয়ে নামাতে হয়েছে সি গেট। পানিতে টইটম্বুর হয়েছে ড্রাই ডক। নইলে ভিতরে আসত না ইয়াজদাহা নৌযান। কাজটা শেষে আবারও উঁচু করা হয়েছে সি গেট, তারপর আবারও পানি সরিয়ে খালি করেছে ড্রাই ডক। সে সময় কংক্রিটের ব্লকগুলোর উপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে সাবমেরিন। নৌযানের উপর কাজ শুরু করবার আগে পরিচ্ছন্ন, শুকনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।
আর ওই সি গেট…
এখন তীক্ষ্ণ চোখে ওদিকটা দেখছে রানা। আঁচ করছে ওই কবাটের ওপাশে রয়ে গেছে সাগরের মস্ত সুড়ঙ্গ। এবার উল্টো দিক দেখল রানা। ওদিকে সাবমেরিনের বো। ওখানেই দেখল
ওদের বাঁচবার একমাত্র উপায়।
খবির ও জনের দিকে ফিরল রানা, জানতে চাইল, তোমাদের সঙ্গে ম্যাগহুক আছে?
জী, স্যর, বলল জন হক।
আছে, স্যর, বলল খবির।
জিনিসটা ব্যবহারের জন্যে তৈরি থাকো, বলল রানা। চট করে আবারও দেখল প্রকাণ্ড স্টিলের সি গেট। ওটার উচ্চতা প্রায় তিনতলা, চওড়ায় কমপক্ষে নব্বই ফুট। পিঠের হোলস্টার থেকে ম্যাগহুক বের করে ফেলল ও।
আমরা কি ওই পথে বেরোব, স্যর? জানতে চাইল জন হক, ভয়ে কেঁপে গেল সাঁতার না জানা আমেরিকান সৈনিকের গলা।
না। উল্টো দিকে যাব। কিন্তু সেটা করতে হলে আগে উড়িয়ে দিতে হবে সি গেট।
সি গেট উড়িয়ে দেবেন? হাঁ হয়ে গেল জন হক। চট করে খবিরের দিকে চাইল।
কাঁধ ঝাঁকাল খবির। ওঁর কৌশল অন্যরকম।
ঠিক তখনই ওদের চারপাশের কংক্রিটের ব্লকে লাগল এক পশলা গুলি। সি গেটের দিক থেকে এসেছে।
কাভার নেয়ার জন্য উবু হলো রানা, চট করে উঁকি দিল, ওদিকটা। পিটের ওদিকে নেমে পড়েছে কমপক্ষে আরও দশজন। মার্সেনারি সৈনিক।
রানা টের পেল, শিরিষের মত শুকিয়ে গেছে গলা। পিটের মাঝখানে ওরা, আর ওদের দুপাশে রক্ত-লোভী লোকগুলো।
এগুতে শুরু করেছে মার্সেনারিদের নতুন দল।
যা করার এখনই, খবির ও হককে বলল রানা।
চার
ড্রাই ডকের উপর থেকে নজর রেখেছে কার্ট কে, এবেলহার্ড। দেখল, মাসুদ রানা এবং ওর দুই সঙ্গীকে দুপাশ থেকে চেপে ধরতে চলেছে মার্সেনারিরা।
শীতল হাসি হাসল কার্ট কে, এবেলহার্ড।
বড় সহজেই লোকটাকে মুঠোয় পাওয়া গেছে।
.
কমব্যাট ওয়েবিং থেকে দুটো থার্মাইট-অ্যামাটল ডেমোলিশন চার্জ বের করেছে রানা। চাপা স্বরে বলল, খবির, হক, ম্যাগহুক তৈরি?
মুখে জবাব না দিয়ে ম্যাগহুক বের করে ফেলেছে দুই সৈনিক।
এবার মনোযোগ দাও, টাইফুন সাবমেরিনের পোর্ট সাইটে সরে গেল রানা। ম্যাগহুক তুলেই ফায়ার করল। এত কম রেঞ্জে তাক ফস্কে যাওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই।
জোরাল শব্দ হলো: ঠং!
রানার মত একই কাজ করল, খবির ও হক।
ঠং! ঠং! দুই আওয়াজ ছড়িয়ে গেল মস্ত ড্রাই ডকে।
সাবমেরিনের পিছন দিক দেখে নিল রানা। বলল, জলোচ্ছাস এলেই ম্যাগহুকের দড়ি গুটিয়ে নেবে। উঠবে সাবমেরিনের বাইরের দিক দিয়ে।
জলোচ্ছাস? বলল হক, কিন্তু জলোচ্ছাস আসবে কোথা…
জবাব দিল না রানা। হাতের দুই ডেমোলিশন চার্জ দেখাল। চট করে টিপে দিল টাইমারের সিলেক্টর সুইচ।
থার্মাইট-অ্যামাইল চার্জে তিন রঙের টাইমার সুইচ থাকে লাল, সবুজ এবং নীল। লাল সুইচের কারণে পাঁচ সেকেও সময় পাওয়া যায়। সবুজ সুইচ সময় দেবে তিরিশ সেকেণ্ড। এবং নীল পুরো এক মিনিট।
রানা টিপেছে লাল সুইচ।
দেরি না করে ছুঁড়ে দিল বেসবলের মত। উড়ে গেল ওগুলো ড্রাই ডকের মাঝ দিয়ে। মার্সেনারিদের মাথার উপর দিয়ে গিয়ে লাগল প্লেট-স্টিলের সি গেটে। ঠনাৎ করে পড়ল গেটের পায়ের কাছে।
ওদিকটাই গেটের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। গেট ওখানে মিশেছে কংক্রিটের ডানদিকের দেয়ালে।
পাঁচ সেকেণ্ড…
চার…
ভাগার সময় ব্যথা লাগবে… বলল খবির। ম্যাগহুকের দড়ি পেঁচিয়ে নিল বাম বাহুতে। দেখাদেখি একই কাজ করল জন হক।
ওয়ান! ফিসফিস করল রানা। চেয়ে আছে বাঁধের দিকে। এবার!
বুম করে ফাটল বোমা।
থার্মাইট-অ্যামাটল ডেমেলিশন চার্জের দুই বিস্ফোরণ কাঁপিয়ে দিল গোটা ড্রাই ডক বিল্ডিঙের দেয়াল।
ঝলসে উঠল অত্যুজ্জ্বল সাদা আলো। সি গেট দেখে মনে হলো সাক্ষাৎ নরকের দরজা। চারপাশে ছিটকে গেল কটগন্ধী। ধোঁয়া, কংক্রিট ব্লকগুলোর গলির মাঝ দিয়ে ছুটল। ধোঁয়া ঘিরে ফেলেছে কাছের আততায়ীদেরকে। চলার পথে যা পেল, ঢেকে ফেলল। ঢাকা পড়ল রানা, খবির ও হক।
এক সেকেণ্ডের জন্য নামল থমথমে নীরবতা।
পরক্ষণে বিকট কড়াৎ! শব্দ হলো। সাগরের বিপুল পানির চাপে ভেঙে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত সি গেট। কমপক্ষে এক শ মিলিয়ন লিটার পানি ঢুকল গহ্বরের ভিতর। ধাক্কা খেয়ে সরে গেল ধোঁয়া, সে জায়গা নিল মস্ত এক জলপ্রাচীর।
গা শিউরে দেয়া আওয়াজ তুলছে আগ্রাসী সাগরের পানি। গহ্বর ধরে ছুটে এল গুড়-গুড় শব্দ তুলে। পাক খেয়ে উঠছে। ফেনা। জলপ্রাচীর গড়িয়ে আসছে অ্যানাকোণ্ডা সাপের মত।
উড়ে গেল কাছের মার্সেনারিরা, তাদেরকে তলিয়ে দিয়ে ছুটে গেল পানির দেয়াল পশ্চিমদিক লক্ষ্য করে। যে-কোনও সময়ে চাপা পড়বে রানা, খবির ও হক।
পরের সেকেণ্ডে, ওদেরকে গিলে নিল সাগর-দানব। এক মুহূর্ত আগে ওরা যেখানে ছিল, সেখান থেকে ছোঁ দিয়ে তুলল। উপরের খোলে ঠুকে গেল মাথা, ছেঁড়া পুতুলের মত ছিটকে চলেছে ওরা টাইফুন সাবমেরিনের বো-র দিকে।
রক্ষা পেল না মার্সেনারিদের দ্বিতীয় দলও। গড়িয়ে যাওয়া। পানির দেয়াল ছিটকে ফেলল তাদেরকে ড্রাই ডকের কংক্রিটের দেয়ালে। তলিয়ে গেল বেশিরভাগ মার্সেনারি। ভরে উঠতে শুরু করেছে দু শ মিটার দৈর্ঘ্যের পিট।
অবশ্য, রানারা কেউ ছিটকে পড়ল না কংক্রিট দেয়ালে। সিংহের মত গর্জনরত পানির দেয়াল ওদেরকে তুলে নিতেই শক্ত করে ধরেছে ওরা ম্যাগহুক লঞ্চার, টিপে দিয়েছে ম্যাগনেটিক হুকের সুইচ। বিদ্যুদ্বেগে দড়ি গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে লঞ্চার।
টাইফুন সাবমেরিনের বো-র পাশে পৌঁছে যেতেই চেঁচিয়ে উঠল রানা, দড়ি গুটিয়ে নেয়া বন্ধ করো!
ম্যাগহুকের গ্রিপের বাটন টিপে দিয়েছে নিজে। ফলে দড়ি টেনে নেয়া বন্ধ করেছে ক্ল্যাম্পিং মেকানিম।
রানার মত একই কাজ করল খবির ও হক।
ঝটকা খেয়ে থেমে গেছে ওরা টাইফুন সাবমেরিনের বো-র পাশে। চারপাশে খলখল করে হাসছে সাগর। ওদেরকে ভিজিয়ে দিচ্ছে লক্ষ মিহি জলকণা।
পাশেই টাইফুন সাবমেরিনের পোর্ট সাইডের খোলা টর্পেডো টিউব আগেই দেখেছে রানা।
পাবলো-৯ পরিত্যক্ত হওয়ার সময় ওটা রিপেয়ার-হচ্ছিল।
এখন ছুটন্ত পানির সামান্য উপরে খোলা টর্পেডো টিউব।
ভেতরে ঢোকো! মাইকে চেঁচাল রানা। টিউবের ভেতর!
পানির উচ্চতা বাড়ছে। রানার নির্দেশে সাপের মত পিছলে টর্পেডো টিউবে ঢুকল খবির ও হক। এগুতে হচ্ছে জলস্রোত কেটে। সাবমেরিনের ভিতর ঢুকে পড়েছে সাগর।
কয়েক সেকেণ্ড পর নীরবতা নামল চারপাশে।
সবার শেষে টর্পেডো টিউবে ঢুকেছে রানা। খাটো সুড়ঙ্গ শেষে নিজেকে আবিষ্কার করল সোভিয়েত টাইফুন-ক্লাস। ব্যালেস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের পেটে।
শীতল স্টিলের রাজ্যে অনুপ্রবেশ করেছে ওরা।
ঘরের মাঝে টর্পেডোর কয়েক সারি র্যাক, সব খালি। ছাতে পাইপের সারি। বদ্ধ এ পরিবেশে আজও রয়ে গেছে ভয়ের গন্ধ, সাবমেরিনারদের ঘামের গন্ধ।
দুই খোলা টর্পেডো টিউব দিয়ে ঘরে এসে পড়ছে মোটা দুই জলের ধারা। ক্রমেই ভরে উঠছে ঘর।
প্রায়ান্ধকার পরিবেশ। আলো বলতে টর্পেডো টিউব দিয়ে আসা সামান্য ধূসর আভা।
এমপি-৭-এর ব্যারেলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে নিল ওরা।
এসো, প্রত টর্পেডো রম থেকে বেরিয়ে এল রানা। সামনে এগোচেই হাটু পানি ভেঙে।
ওরা চলে এল টাইফুল সাবমেরিনের ভয় জাগানো সাইলো হল-এ।
দীর্ঘ ব্যারাকের মত ঘর, অনেক উপরে ছাত। পাশাপাশি বিশটি প্রকাণ্ড সাইলো, মেঝে থেকে হাত পর্যন্ত। দেখলে কেন যেন মনে হয় দানৰীয় চুরুট! সাইলোর পাশে নিজেদেরকে বামন মনে হলো ওদের!
এসব সাইলো পাশ কাটিয়ে ছুটতে শুরু করেছে রানা। খেয়াল করল, কোনও কোনও সাইলোর হ্যাচ খোলা।
ভিতরে মিসাইল নেই।
তবে কমপক্ষে ছয়টা সাইলোর হ্যাচ পুরোপুরি বন্ধ।
আন্দাজ করা যায় ভিতরে রয়ে গেছে মিসাইল।
এবার কী, স্যর? জানতে চাইল খবির।
কন্ট্রোল রুম! বলল রানা, এদের ব্যাপারে তথ্য দরকার।
কাছের রাং-ল্যাডার বেয়ে উঠল রানা, চলে এল ফ্লাই-এ।
তিরিশ সেকেণ্ড পর পৌঁছে গেল টাইফুন সাবমেরিনের কন্ট্রোল রুমে।
চারপাশে ধুলো। ঘরের প্রতি কোণে মাকড়সার ঝুল। রানা, খবির ও হকের ফ্ল্যাশলাইটের রশিতে দেখা গেল, কোথাও কোথাও ধুলোর তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে চকচকে ইস্পাতের কন্সেল।
কমাণ্ড প্ল্যাটফর্মে গিয়ে থামল রানা, ওখানেই পেরিস্কোপ। মেঝে থেকে স্কোপ তুলল ও, ঘুরে চাইল খবিরের দিকে।
দেখো তো বিদ্যুৎ পাওয়া যায় কি না। সাবমেরিনের সঙ্গে বেসের ইলেকট্রিকাল কানেকশন থাকার কথা। ওমনিবাস সেন্ট্রাল কন্ট্রোল সিস্টেমের সুইচ খুঁজে বের করো। ওটা অন করলেই পাব ইএসএম আর রেডিয়ো। অ্যান্টেনা অন লাইনে থাকার কথা।
জী, খুঁজতে শুরু করেছে খবির।
পেরিস্কোপ পুরো উপরে তোলা। জিনিসটা প্রাথমিক পর্যায়ে। রয়ে গেছে, বৈদ্যুতিক শক্তি লাগে না। স্কোপে চোখ রাখল রানা।
পরিষ্কার দেখা গেল ড্রাই ডক হল। সাবমেরিনের পাশে নাচছে সাগরের পানির ঢেউ। উপরে ড্রাই ডকের মেঝের পারে ছয়জন মার্সেনারি, চেয়ে আছে এদিকে। এখনও ভরে উঠছে ড্রাই ডক।
পেরিস্কোপ সরিয়ে অন্যদিকে চাইল রানা। ওর চোখ গেল ড্রাই ডকের দোতলা উঁচু ব্যালকনির উপর।
ওখানে আরও বেশ কজন মার্সেনারি। তাদের ভিতর একজন ক্ষ্যাপা নর্তকের মত হাত নাড়ছে। নির্দেশ দিচ্ছে বোধহয়। ছয় মার্সেনারি ছুটল গ্যাংওয়ের দিকে। ওই গ্যাংওয়ে টাইফুন সাবমেরিনের কনিং টাওয়ারের ব্যালকনির মেঝের সমান উচ্চতায়।
লোকগুলোকে দেখছে রানা। তাড়া দিল, খবির? বিদ্যুৎ পেলে?
কী যে কী বুঝি না, স্যর, হতাশ স্বরে বলল খবির। রাশান ভাষা জানি না!
চট করে ওর পাশে চলে গেল রানা। সুইচগুলো দেখতে শুরু করেছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পটাপট কটা সুইচ টিপল। হুমমম্ আওয়াজ তুলে কী যেন চালু হয়েছে। জ্বলে উঠল বাতি।
এই যে, স্যর, বলল খবির।
ওর হাত থেকে ধুলোভরা হেডফোন নিল রানা। কানেশন দিল সাবমেরিনের ইলেকট্রনিক সাপোর্ট মেযারের অ্যান্টেনার সঙ্গে। শেষ জিনিসটা প্রতিটি আধুনিক সাবমেরিনেই থাকে। ইএসএম অ্যান্টেনা দুরন্ত স্ক্যানার। বেশিরভাগ রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি ধরবে, নজর রাখবে কোথায় কী হচ্ছে।
কানে হেডসেট বসিয়ে নিতেই কণ্ঠস্বর শুনল রানা।
…উন্মাদ হারামজাদা উড়িয়ে দিয়েছে সি গেট!
…ঢুকে পড়েছে টর্পেডো টিউবে! শালারা আছে সাবমেরিনের ভেতর!
শোনা গেল একটা শান্ত কণ্ঠ।
আবারও পেরিস্কোপে চোখ রেখেছে রানা। ব্যালকনি লেভেলে একজনকে দেখল। গম্ভীর ভঙ্গিতে কথা বলছে ওই লোক।
…সবুজ দল, কনিং টাওয়ারের মাধ্যমে সাবমেরিনে ঢোকো। নীল দল, আরেকটা গ্যাংওয়ে খুঁজে নাও। ওটাকে সেতু হিসেবে ব্যবহার করবে। দুজনের দল তৈরি করবে। সাবমেরিনের সামনে দিয়ে ঢুকবে একদল, অন্যদল পিছনের এসকেপ হ্যাচ দিয়ে…
লোকটার কণ্ঠ খেয়াল করছে রানা।
কড়কড়ে স্বরে কথা বলছে সে। উচ্চারণ দক্ষিণ আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গদের মত। শান্ত, কোনও উত্তেজনা নেই কণ্ঠে।
লোকটার দিকে চেয়ে কু ডাকতে লাগল রানার মন।
এইমাত্র বানে ভেসে গেছে কমপক্ষে বারোজন সৈনিক, তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সে। চেহারায় রাগের কোনও অনুভূতি নেই।
স্যর, রেইডার থেকে বলছি। দুটো ইনকামিং এরিয়াল কন্ট্যাক্ট পাওয়া গেছে। একটা ইয়াক-১৪১ স্ট্রাইক ফাইটার, অন্যটা সুখোই ফাইটার, স্যর।
জানতে চাইল কমাণ্ডার, ইটিএ?
বর্তমান গতি অনুযায়ী প্রথমটা পৌঁছবে পাঁচ মিনিট পর, অন্যটা এসে যাবে তার দশ মিনিট পর।
মনে হলো চিন্তা করছে কমাণ্ডার। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ক্যাপ্টেন হডসন, তোমার দলের সবাইকে এখানে পাঠিয়ে দাও। প্রথম ফাইটার সম্ভবত মিস্টার ফগের। দ্বিতীয়টাতে আছে বাউন্টি হান্টার পোলিশ। ওকে নিয়ে ভাবছি না, কিন্তু মিস্টার ফগ সমস্যা তৈরি করতে পারে। তার উদ্দেশ্য আমাদের কাছে মোটেও পরিষ্কার নয়। প্রতিযোগীরা আসার আগেই এদিকের কাজ শেষ করতে চাই।
সবাইকে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, জবাবে বলল ফ্রেঞ্চ কণ্ঠস্বর।
বিদ্যুদ্বেগে ভাবতে শুরু করেছে রানা।
ঝড়ের মত এসে হাজির হবে লোকগুলো। কনিং টাওয়ার, ফরওয়ার্ড ও.রিয়ার এসকেপ হ্যাচ গলে আসবে।
রিইনফোর্সমেন্ট আসছে তাদের।
কিন্তু আসছে কোথা থেকে?
আবারও ভাবো, নিজেকে বলল রানা।
তোমার শত্রুরা আসলে কারা?
কোনও ধরনের মার্সেনারি দল।
তারা এখানে এসেছে কেন?
বিসিআই-এ থেকে রানা শুনেছিল শুরু হতে পারে মস্ত এক বাউন্টি হান্ট। যেন সাবধানে থাকে।
আর এখন অ্যাটলক ও রবিনের মাথা কেটে নিয়েছে তারা।
আর কী জানি? ভাবল রানা।
দক্ষিণ আফ্রিকান কমাণ্ডার বলেছে, তাদের প্রতিযোগীরা আসতে শুরু করেছে।
এখন এই পরিস্থিতিতে ওর নিজের কী করা উচিত?
বেশি কিছু করার নেই।
কোনওভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না ম্যাককোল এয়ার ফোর্স বেসে।
এখান থেকে সরে যাওয়ারও উপায় নেই।
অপেক্ষা করতে হবে কখন পৌঁছুবে রেঞ্জার ফোর্স।
কোনও ভুল না হয়ে থাকলে তারা আসবে তিরিশ মিনিট পর।
কিন্তু এই তিরিশ মিনিট ওরা টিকে থাকবে কী করে?
সময় এখন শত্রুদের পক্ষে।
এদের প্রতিযোগীদের কথা বাদই থাক, এদের হাতে অফুরন্ত সময়। ডালে বসে থাকা পাখির মত ওদেরকে মারতে পারবে।
ভাবছে রানা, প্রথমেই পাল্টে দিতে হবে এই পরিস্থিতি। প্রথম কাজ হওয়া উচিত শত্রুদের অফুরন্ত সময় সংক্ষিপ্ত করে দেয়া।
চারপাশে চাইল রানা। কন্ট্রোল রুমে জ্বলছে পাইলট লাইটস।
তার মানে বিদ্যুৎ আছে।
ভাল।
তার মানে…
সিল করা ছয় মিসাইল সাইলোর কথা ভাবতে শুরু করেছে। রানা।
অন্য হ্যাচগুলোর মুখ খোলা, কিন্তু ওই ছয়টা…
ভিতরে মিসাইল থাকতে পারে।
নিশ্চয়ই ওয়ারহেড সরিয়ে ফেলেছিল রাশানরা।
কিন্তু মিসাইল হয়তো রয়ে গেছে হ্যাঁচের ভিতর।
এদিকে এসো, জন হককে পেরিস্কোপের দিকে ইঙ্গিত করল রানা। ওদের ওপর চোখ রাখো।
রানার হাত থেকে পেরিস্কোপ নিল কর্পোরাল। দ্রুত সামনের কন্সেলের কাছে চলে গেল রানা। খবির, কাজে হাত লাগাও।
কী করতে হবে, স্যর? জানতে চাইল খবির।
জানতে চাই সাবমেরিনের মিসাইল এখনও কাজ করে কি না।
পাওয়ার সুইচ টিপতেই জ্যান্ত হয়ে উঠল কলে। পর্দায় ভেসে উঠল কোড স্ক্রিন। আইএসএস-এর কমপিউটার থেকে হ্যাঁক করা অল-পারপাস সোভিয়েত কোড বিসিআই-এর জন্য ডাউনলোড করেছিল রায়হান রশিদ, মনে আছে রানার। ম্যাককোল এয়ার ফোর্স বেসে ওই একই কোড ওকে দেয়া হয়েছিল পাবলো-৯-এর জরুরি ডিজিটাল কিপ্যাড খুলবার জন্য। ওটা ওকে মুখস্থ করিয়েছিল গলাছেলা শুকনের মত এক কর্নেল। ওটা ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড। আলটিমেট ইলেকট্রনিক স্কেলিটন কি, ডিযাইন করা হয়েছিল সিনিয়র সোভিয়েত পারসোনেলদের জন্য। আট ডিজিটের কোড। সোভিয়েত আমলের প্রতিটি কিপ্যাড লকে কাজ করত। একই জিনিস আমেরিকানদেরও রয়েছে, ওটা জানেন শুধু প্রেসিডেন্ট ও জনা কয়েক অত্যন্ত সিনিয়র সামরিক অফিসার।
ব্যালকনিতে ছয়জনকে দেখছি, গ্যাংওয়ের দিকে আসছে! জানাল জন হক, গ্রাউণ্ড ফ্লোরে আরও চারজন। একটা সেতু নিয়ে এসেছে, সাবমেরিনে উঠতে চায়!
একবার রানাকে দেখল খবির, তারপর এমপি-৭ হাতে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ব্যস্ত হাতে কন্সেলে সুইচ টিপছে রানা। একের পর এক তথ্য আসছে পর্দায়।
হ্যাঁ, টাইফুন সাবমেরিনের সামনের সাইলোয় রয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা মিসাইল।
তাই, আনমনে বলল রানা!
সাইলোর ভিতর রয়েছে মিসাইল, কিন্তু সরিয়ে নেয়া হয়েছে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। সংখ্যায় মিসাইল ছয়টি।
আমার শুধু একটা দরকার, ভাবল রানা। খবিরের দিকে না। চেয়েই বলল, খুলে দাও সাইলোর ছয় হ্যাচ। সপ্তম হ্যাচও খোলা রাখবে।
বাড়তিটা দিয়ে কী করবেন, স্যর? জানতে চাইল খবির।
পরে বলব।
কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে গেল খবির। একমিনিট পর খুঁজে পেল নির্দিষ্ট জিনিস। টিপতে লাগল হ্যাচ সুইচ। ওগুলো সাইলো রুমের ডান পাশে।
.
অদ্ভুত দৃশ্য দেখে চোখ বিস্ফারিত হলো কার্ট কে. এবেলহার্ডের। ড্রাই ডকের মাঝে টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন, এবং ওটার পিঠে উঠছে তার লোক। ফরওয়ার্ড ও রিয়ার হ্যাচ গলে ভিতরে ঢুকবে। কিন্তু সেজন্য বিস্মিত হয়নি এবেলহার্ড, অন্য কারণে বিড়বিড় করে বলল, লোকটা করছেটা কী?
হাইড্রলিক কজার উপর ভর করে খুলে যাচ্ছে সাবমেরিনের ফরওয়ার্ড মিসাইল হ্যাচ।
.
কী করতে চান, স্যর? জানতে চাইল খবির।
যুদ্ধের জন্যে বেঁধে দেয়া সময় বদলে দেব, বলল রানা। অন্য স্ক্রিন আনল কমপিউটারে। দেখা গেল পাবলো-৯-এর। জিপিএস কো-অর্ডিনেটস।
এবার কমপিউটারকে জরুরি তথ্য দিল রানা। ওর নির্দেশ অনুযায়ী উৎক্ষেপণ করা হবে মিসাইল। ওটা আকাশ চিরে ছুটবে বিশ মিনিট, এরপর টার্গেট করা কো-অর্ডিনেটস্ অনুযায়ী আঘাত হানবে।
ছয়টি মিসাইলই কাজ করবে, এমনটা আশা করছে না রানা।
গত কয়েক বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সলিড-ফিউয়েল রকেট বুস্টারের ও-রিং সিল। হয়তো একটা মিসাইলও ফায়ার হবে না।
কিন্তু শুধু একটা কাজ করলেই চলবে ওর।
এক এক করে মিসাইলগুলোকে জাগাতে চাইল রানা।
সাড়া দিল পঞ্চম মিসাইল।
ওটার সবুজ রঙের গো লাইট জ্বলে উঠেছে।
এবার কমপিউটার চাইল ফাইনাল অ্যাপ্রুভাল-কোড।
ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড ব্যবহার করল রানা।
অথোরাইযেশন মেনে নেয়া হলো।
দেরি না করে ফায়ার বাটন টিপে দিল রানা।
.
আগেই আওয়াজ শুনেছে কার্ট কে. এবেলহার্ড, এবার চোখের সামনে দেখল আশ্চর্য দৃশ্য।
সাবমেরিনের বুকের গভীরে আওয়াজ উঠছে ধ্রমমমমমম্। পরক্ষণে কান ফাটিয়ে দেয়া সাঁৎ শব্দের বিস্ফোরণ হলো। সাবমেরিনের ফরওয়ার্ড হ্যাঁচের একটা থেকে শোও করে বেরিয়ে গেল এসএস-এন-২০ ব্যালেস্টিক মিসাইল।
যেন আকাশে উঠছে স্পেস শাটল। চারপাশে ছুটল বিপুল ধোঁয়া, উন্মাদের মত ছড়াতে শুরু করেছে, পুরো ঢেকে ফেলল ড্রাই ডক হল। ধূসর কুয়াশায় হারাল প্রকাণ্ড টাইফুন সাবমেরিন বা মার্সেনারিরা।
বিদ্যুদ্বেগে উঠছে মিসাইল, চুরমার করল ফাটল ধরা কাঁচের ছাত, দেখতে না দেখতে হারিয়ে গেল সাইবেরিয়ার ধূসর আকাশ থেকে।
বিচলিত হলো না এবেলহার্ড। শান্ত স্বরে বলল, তোমরা হামলা শুরু করো। …ক্যাপ্টেন হডসন, কোথায় রিইনফোর্সমেন্ট?
কেউ দিগন্ত থেকে শ্ৰম-নগরী পাবলো-৯কে দেখলে তার চোখে পড়বে অবিশ্বাস্য দৃশ্য: মৃত শহরের মাঝ থেকে দীর্ঘ ধোঁয়ার কলাম রকেটের মত উঠছে আকাশ চিরে।
এবং সত্যিই ওই দশ্য দেখেছে দুজন।
তারা বসে আছে রাশান সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি ইয়াক ১৪১ ফাইটার জেট বিমানের ককপিটে।
ওই বিমান ছুটে চলেছে পাবলো-৯ লক্ষ্য করে।
পাঁচ
টাইফুন ক্লাস সাবমেরিনের কন্ট্রোল রুমে চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল রানা। জন হকের কাছে জানতে চাইল, ওরা কোথায়?
চারপাশ ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছে, স্যর, বলল কর্পোরাল। কিছুই দেখছি না।
পেরিস্কোপের ওদিকে শুধু ঘন ধূসর ধোঁয়া। জায়গাটা সাবমেরিনের কনিং টাওয়ারের ছোট্ট ঘর। কনিং টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত সরু এক গ্যাংওয়ে ওখানে, চলে গেছে সোজা ব্যালকনির মেঝেতে।
দেখছি না কিছু…
পেরিস্কোপ ঘষা দিয়ে গেল এক লোক। প্রকাণ্ডদেহী, মুখে গ্যাস মাস্ক।
ওরে বাবা! আইপিস থেকে ছিটকে পিছিয়ে এল জন হক। যিশু! ওরা চলে এসেছে! আমাদের মাথার ওপর!
তাতে সমস্যা নেই, বলল রানা। নীচে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগুতে শুরু করেছে। এবার আমরা সরে যাব, দেখা হবে না ওদের সঙ্গে।
মিসাইল সাইলো হল-এ খবিরের সঙ্গে মিলিত হলো রানা ও হক। ছুটতে শুরু করেছে রানা, ওর দেখাদেখি অন্য দুজন। মেঝেতে জমেছে এক ফুট পানি।
খালি একটা সাইলোর সামনে থামল রানা, ইশারা করল খবির ও হককে। আগেই খোলা হয়েছে এই সাইলোর হ্যাচ। গোলাকার ঘরে ঢুকে পড়ল ওরা।
দৈত্যাকার চুরুটের মত মিসাইল সাইলো, উপরে উইঞ্চ। মনে হলো ওটা খুব ছোট। দেখা গেল সাবমেরিনের খোলা আউটার হাল হ্যাচ। সপ্তম সাইলোর ভিতর ঢুকেছে রানা। মেঝে থেকে শুরু করে ছাতে পৌঁছে গেছে রাং ল্যাডার।
মই বেয়ে উঠতে শুরু করল রানা ও তার দুই সৈনিক।
সাইলোর ছাদ সমতলে মাথা পৌঁছে যেতেই উঁকি দিল রানা। দেখল, সাবমেরিনের ফরওয়ার্ড এসকেপ হ্যাঁচের ভিতর হারিয়ে গেল দুই মার্সেনারি। তারা ছিল মাত্র তিন মিটার দূরে।
ভাল, ভাবল রানা। এরা গিয়ে ঢুকছে সাবমেরিনের পেটে, আর ওরা বেরিয়ে যাচ্ছে বাইরে।
আরও ভাল, ড্রাই ডক ও সাবমেরিন এখনও ডুবে আছে সাদাটে ধোঁয়ায়।
ব্যালকনির দিকে গেল রানার চোখ।
মার্সেনারিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকান কমাণ্ডার।
ওই লোকের সঙ্গে কথা বলতে চাই, ভাবল রানা। সাইলো থেকে বেরিয়েই ছুটতে শুরু করল ও। এবার রাং ল্যাডার বেয়ে উয়ে পড়বে টাইফুন সাবমেরিনের কনিং টাওয়ারে। ওখান থেকে যাবে ওদিকের ব্যালকনিতে।
রানা এবং দু সৈনিক তরতর করে উঠে এল কনিং টাওয়ারে, ছুটতে লাগল সরু গ্যাংওয়ে ধরে। চলেছে সামান্য উপরের ওই ব্যালকনির মেঝের দিকে।
ব্যালকনির আরেক পাশে ছোট ইন্টারনাল অফিস। দরজায় দাঁড়িয়ে রেডিয়োতে নির্দেশ দিচ্ছে মার্সেনারি কমাণ্ডার। ধোঁয়ার মাঝে সাবমেরিনের দিকে চেয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক সশস্ত্র বডিগার্ড।
ধূসর ধোঁয়ার কাভার নিয়ে কনিং টাওয়ার থেকে ব্যালকনির দিকে ছুটছে রানা ও দুই সৈনিক।
আরও কয়েক সেকেণ্ড পর লাফিয়ে উঠল দক্ষিণ আফ্রিকান মার্সেনারি কমাণ্ডার এবং তার বডিগার্ড।
খবরদার! কানের কাছে গর্জে উঠেছে রানা। একই সময়ে গুলি করল বডিগার্ড ও জন হক। বুকে রানার গুলি নিয়ে ছিটকে পড়ল বডিগার্ড। আগেই তার গুলি খেয়ে ধপ করে পড়ে গেছে জন হক।
তখনই হোলস্টার থেকে ছোঁ দিয়ে পিস্তল নিল মার্সেনারি কমাণ্ডার, দেখল খুবই কাছে মাসুদ রানা। ডাইভ দেয়ার পর গড়িয়ে যাওয়ার ফাঁকে গর্জে উঠল রানার ডেযার্ট ঈগল। ওর দুই গুলি বিধল কার্ট কে, এবেলহার্ডের বুকে এবং হাতে।
ঝটকা খেয়ে চারফুট পিছিয়ে গেল লোকটা। পিস্তল পড়েনি হাত থেকে। ধাক্কা খেল অফিসের বাইরের দিকের দেয়ালে। বসে পড়েছে মেঝেতে।
হক! ঠিক আছ? জানতে চাইল রানা। উঠে দাঁড়িয়ে এক লাথিতে উড়িয়ে দিল এবেলহার্ডের পিস্তল।
কাঁধে গুলি খেয়েছে জন হক, কুঁচকে রেখেছে মুখ।
ওর ক্ষত পরীক্ষা করল খবির।
মাংস ভেদ করে বেরিয়ে গেছে।
এবেলহার্ডেরও তেমন কিছুই হয়নি। স্লো গিয়ারের নীচে ছিল বুলেট ভেস্ট। অফিসের বাইরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। বিদঘুঁটে চেহারা করে বামহাতে টিপে ধরেছে আহত ডান কব্জি।
তার কপালে ডেযার্ট ঈগলের নলের মুখ ঠেকাল রানা। কে তুমি, এবং এখানে কেন?
কেশে চলেছে এবেলহার্ড। শ্বাস নিতে চাইছে হাঁপিয়ে।
আরেকবার বলব: তুমি কে, এবং এখানে কেন?
কর্কশ কণ্ঠে ফিসফিস করল সে, আমার নাম… কার্ট কে, এবেলহার্ড… একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র সঙ্গে আছি।
মার্সেনারি, মনে মনে বলল রানা। মুখে বলল, এখানে কেন তোমরা? কী কারণে আমাদেরকে খুন করতে চাইছ?
সবাইকে না, মেজর। শুধু তোমাকে।
আমাকে এত বিশেষ খাতির করার কারণ?
ডেল্টা ডিটাচমেন্টের মেজর হার্লি অ্যাটলক, মেরিন ফোর্সের মেজর রবিন কার্লটন আর তোমাকে চেয়েছি আমরা।
কেন?
এসব জেনে লাভ কী তোমার? বাঁকা হাসল এবেলহার্ড।
কথা বাড়াবার সময় নেই। দেরি না করে লোকটার আহত কব্জির উপর ডান বুট চাপিয়ে দিল রানা। সামান্য মাড়িয়ে দিতেই উফ করে উঠল লোকটা।
সরাসরি রানার চোখে চাইল। চোখ থেকে ঝরছে গোক্ষুরের বিষ।
তোমাদের মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। যারা তোমাদের মাথা কাটবে, তারা বাউন্টির পুরস্কার পাবে।
বুকের ভিতর ভয়ের শিহরন টের পেল রানা। বামহাতে বুক পকেট থেকে মোচড়ানো কাগজ বের করল এবেলহার্ড। ওটা বাড়িয়ে দিল। পড়ে দেখো।
প্রায় ছো দিয়ে কাগজটা নিল রানা। পড়তে শুরু করেছে।
ওটা মানুষের নামের লিস্ট।
রানা চট করে দেখে নিল, ওই লিস্টে আছে হার্লি অ্যাটলক, রবিন কার্লটন এবং ওর নাম।
প্রতিশোধ নেয়ার জন্য চকচক করছে চোখ, এবেলহার্ড বলে উঠল, এবার তুমি দুনিয়ার সেরা বাউন্টি হান্টারদের দেখবে, মেজর। একই কথা খাটে তোমার মত অন্য সবার বেলায়ও। দরকার পড়লে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবীদের আটকে রাখবে বাউন্টি-হান্টাররা, যে গর্তেই লুকাও, সেখান থেকে বের করে আনবে তোমাদের।
শীতল অনুভূতি নামল রানার মেরুদণ্ড বেয়ে।
ঘনিষ্ঠদের বন্দি করে ভয়ঙ্কর অত্যাচার করতে পারে বাউন্টি হান্টাররা।
কেন যেন নিশাত সুলতানা আর তিশার কথা মনে পড়ল। রানার। ওরা আছে আফ্রিকায় কঙ্গোর মাউন্ট স্ট্যানলি পর্বতে, ইউএন-এর হয়ে লড়ছে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এক রক্তপিশাচ ওয়ার লর্ডের বিরুদ্ধে।
চট করে বর্তমানে ফিরল রানা।
কী কারণে মাথা কাটছ তোমরা? জানতে চাইল।
নাক দিয়ে ঘোৎ আওয়াজ বের করল এবেলহার্ড।
আবারও ডান বুট বাড়িয়ে দিল রানা রক্তাক্ত কব্জির দিকে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, ব্যাখ্যা দিচ্ছি, দাঁত খিঁচিয়ে বলল এবেলহার্ড। তোমার মাথার দাম তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার। ওই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে আরও ষোলজনের মাথার ওপর। ফ্রান্সের এক দুর্গে এসব মাথা পৌঁছে দিলেই টাকা পাওয়া যাবে। আগে কখনও এত টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি। শেষে হয়তো দেখবে, তোমাদের সংগঠন থেকেই বড়কর্তারা পাগল হয়ে উঠেছে যার যার লোকের মাথা কাটতে।
বাংলাদেশের কেউ আমার গায়ে একটা টোকাও দেবে না, গর্ব নিয়েই বলল রানা।
ভীষণ বাকা হাসল এবেলহার্ড। আমাদের কাছে তথ্য আছে। রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে যাদের আসার কথা, সেসব রেঞ্জার ফোর্ট লিউইস থেকে এখনও রওনাই হয়নি। হবেও না। যা করার করতে হবে তোমার নিজেকেই। মনে রেখো, মেজর রানা, তুমি এখানে একা… আর আমরা তৈরি তোমার জন্যে। আমরা ঠিকই কেটে নেব তোমার মাথা।
মগজে ঝড় চলছে, দ্রুত ভাবতে শুরু করেছে রানা।
এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, আগে ভাবেনি। অবশ্য বিসিআই থেকে সামান্য আভাস ওর কাছে পাঠানো হয়েছিল। দুদিন আগে এ-ও জানিয়ে দেয়া হয়, ওটা অনিশ্চিত তথ্য।
ভাবনার ভিতর এবেলহার্ডকে অদ্ভুত একটা কাজ করতে দেখল রানা। দ্বিতীয়বারের মত চোখ সরিয়ে নিল লোকটা। কিছু একটা দেখছে ওর পাশ দিয়ে পিছনে।
আধ পাক ঘুরে চাইল রানা। চমকে উঠেই বিস্ফারিত হলো ওর দুই চোখ।
ড্রাই ডকের মাঝের লেকে জমতে শুরু করেছে বরফ, কিন্তু গভীর থেকে বলকে উঠছে আগ্নেয়গিরির লাভার মত বুদ্বুদ। জোরালো ঠা-ঠাস আওয়াজ তুলে ফাটল পাতলা বরফের সাদা আস্তরণ।
বুদ্বুদের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে কী যেন।
ওটা কি প্রকাণ্ড কোনও তিমি?
না, ভুস করে ভেসে উঠল স্টিলের কালো খোল।
ওটা সোভিয়েত আমলের অ্যাকুলা-ক্লাস অ্যাটাক সাবমেরিন!
অ্যাকুলা সাবমেরিন খুব বেশি বিক্রি হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক আর্মস মার্কেটে ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠছে। কিছুদিন হলো বিক্রি করছে রাশান সরকার, এতে আসছে বিপুল টাকা।
রানা বুঝে গেছে, একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ আসলে রাশার কাস্টমার। অথবা উল্টোটাও হতে পারে।
বরফ জমতে থাকা লেকে সামনে বাড়ছে অ্যাকুলা। খুলে গেছে হ্যাচ, বেরিয়ে আসছে একদল সশস্ত্র মার্সেনারি। তীরে নামবার জন্য গ্যাংওয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কয়েক সেকেণ্ড পর ডাঙায় নামবে তারা।
কুঁচকে গেল রানার ভুরু।
এখন ওকে মোকাবিলা করতে হবে কমপক্ষে তিরিশজন মার্সেনারির।
শয়তানির হাসি হাসল এবেলহার্ড।
হাসতে থাকো! বলল রানা। চট করে হাতঘড়ি দেখল। আমাকে ধরার জন্যে বেশি সময় পাবে না। নেমে আসছে। কেয়ামত। তখন থাকবে না এই বেস। তার আগ পর্যন্ত যত খুশি ফুর্তি করো।
খটাৎ আওয়াজ হলো।
এবেলহার্ডের নাকের হাড়ে নামিয়ে এনেছে রানা ডের্ট ঈগলের নল।
কাত হয়ে ধুপ করে মেঝেতে পড়ল লোকটা, অচেতন।
জলদি! খবিরের পাশে চলে গেল রানা। ওকে ধরে তোলো।
জন হককে উঠতে সাহায্য করল দুজন মিলে।
টলছে কর্পোরাল। আমি নিজেই দাঁড়াতে পারব, বলল। আর তখনই বিস্ফোরিত হলো ওর বুক। ছিটকে বেরোল একগাদা রক্ত। ঠোঁটে জমা হলো ছোট কয়েকটা রক্তাক্ত বুদ্বুদ ফুটো হয়ে গেছে ফুসফুস। রক্তে ভিজে গেল রানার চেস্টপ্লেট।
অবাক চোখে দেখল খবির, নিভে এল জন হকের চোখের আভা। পড়ে গেল ও গ্রিল করা ক্যাটওয়াকে, মারা গেছে। পিছন থেকে গুলি করা হয়েছে তাকে। হঠাৎ হাজির হওয়া সাবমেরিনের মার্সেনারিরা নামছে ড্রাই ডকের হল-এ।
বিমর্ষ চোখে একবার কর্পোরালের লাশ দেখল রানা। মানতে কষ্ট হচ্ছে, খবির এবং ও ছাড়া ওর টিমের কেউ বেঁচে নেই!
চট করে চারপাশ দেখল রানা।
পরিত্যক্ত সাইবেরিয়ান বেসে আটকা পড়েছে ওরা দুজন। ওদেরকে খুন করতে আসছে কমপক্ষে চল্লিশজন মার্সেনারি। ওর পাশে লড়তে পারে এমন যোদ্ধা মাত্র খবির। আসবে না কোনও রিইনফোর্সমেন্ট।
পালাতে পারবে না কোথাও!
খবিরের দিকে চেয়ে ইশারা করল রানা, ছুটতে শুরু করল। দুজন।
প্রাণ বাঁচাতে হবে। অন্তত চেষ্টা করতে হবে শেষ পর্যন্ত।
এক পশলা গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তিনদিকের প্লাস্টারবোর্ড দেয়াল।
রানাকে খুন করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র নতুন গ্রুপ। উঠে আসছে রাং ল্যাডার বেয়ে। ড্রাই ডক হল ধরে পালাতে শুরু করেছে তাদের শিকার।
কিন্তু ভাগতে দিলে চলবে না, বিসিআই-এর মাসুদ রানার মুণ্ডু চাই-ই চাই।
মার্সেনারিদের যারা ঢুকেছে টাইফুন সাবমেরিনে, এখন বুঝে গেছে পালিয়ে গেছে মাসুদ রানা।
তারা আবারও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ডেকে, হাতে আগুন ঝরানো অস্ত্র।
পশ্চিমদিক লক্ষ্য করে লেজ তুলে ভাগছে রানা ও খবির। উঠতে হবে কংক্রিটের ওভারপাস সেতুর উপর।
ওই সেতু গেছে ড্রাই ডক থেকে পাবলো-৯-এর অফিস টাওয়ারে।
সেতুর দিকে ছুটবার সময় রানা দেখল, ব্যস্ত হয়ে উঠেছে একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র মার্সেনারিরা কেউ কেউ উঠছে ব্যালকনিতে। অন্যরা দেখেছে মেঝেতে দুই পলাতক, চলেছে ড্রাই ডকের সেতুর দিকে।
একটা বিষয় বুঝেছে রানাঃ মার্সেনারিরা আসার আগেই যেভাবে হোক যেতে হবে অফিস টাওয়ারে, নেমে পড়তে হবে ওই সেতু থেকে। যদি তা না পারে, আটকা পড়বে পনেরোতলা দালানে।
ওভারপাস সেতু ধরে পাখির মত উড়ে চলেছে দুজন। পিছনে পড়ছে ফাটল ধরা কংক্রিটের বুকে জানালার ফ্রেম।
তীরের মত সেতু পেরোল ওরা, ঝড়ের গতিতে ঢুকল অফিস টাওয়ারে। ওখানেই ব্রেক কষে থেমে গেল।
ওরা আছে এক ব্যালকনির শুরুতে।
ছোট ক্যাটওয়াক। পনেরোতলা দালানে এমন অনেকগুলো আছে। সঙ্গে অসংখ্য মই।
মাঝের মস্ত গোলাকার জায়গা একেবারেই ফাঁকা।
এটা আসলে কোনও অফিস টাওয়ারই নয়। ফাঁকা গ্লাস ও স্টিলের কাঠামো। নকল জিনিস। দেখলে মনে হয় দানবীয় গ্রিনহাউস।
চারপাশের চিড় ধরা কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা গেল সাইবেরিয়ার মৃত প্রকৃতি।
আকাশছোঁয়া দালানের মেঝের দিকে চেয়ে সবই বুঝে গেল রানা।
চারটে প্রকাণ্ড আইসিবিএম মিসাইল সাইলো ডেবে আছে। মেঝেতে। মাথার অনেক উপরে দালানের নকল ছাত। আজ পর্যন্ত ইউএস স্পাই স্যাটালাইট খুঁজে পায়নি এর অস্তিত্ব।
রানা আঁচ করল, পাবলো-৯-এর অন্য অফিস দালানও একই জিনিস।
একতলা নীচে সাইলোর পাশে দশটা মৃতদেহ।
আগে আসা মেরিন কর্পসের সৈনিক ও অফিসার, একটু দূরে সার্জেন্ট গ্রেসনের স্কোয়াড।
সবাই মৃত। চট করে হাতঘড়ি দেখল রানা। কাউন্টডাউন চলছে। টিকটিক করে নেমে চলেছে সময়। সঠিক সময়ে পাবলো-৯-এ ফিরবে সাবমেরিনের মিসাইল। ১৫:৩১… ১৫:৩০… ১৫:২৯…
তাড়া দিল রানা, নীচে নামতে হবে।
কাছের রাং-ল্যাডার লক্ষ্য করে ছুটল ওরা। তখনই পিছন থেকে এল এক ঝাঁক বুলেট। মনে মনে কপাল চাপড়ল রানা।
আগেই একতলার মেঝেতে পৌঁছে গেছে মার্সেনারিরা। ড্রাই ডক ওয়্যারহাউস থেকে তুষার ভরা রাস্তা ধরে এসেছে এই টাওয়ারে।
কী যেন বিড়বিড় করল রানা।
এবার কী, স্যর? জানতে চাইল খবির।
উপায় নেই, ওপরে ওঠো, বলল রানা।
মই বেয়ে ঝড়ের মত উঠতে লাগল ওরা।
কয়েক সেকেণ্ড পর মনে হলো, বাঁদরের মত বেয়ে উঠতে হচ্ছে রাং-ল্যাডার, কিন্তু ওপরে কলার কাঁদি নেই!
মার্সেনারিদের গুলি এড়াতে চাইছে, লাফিয়ে উঠছে ব্যালকনি বা পরের মইয়ে। দশতলা উঠবার পর থামল রানা। প্রথমবারের মত সাহস করে নীচে চাইল।
ধক করে উঠল ওর বুক। মন থেকে বিদায় নিল সব আশা। মন বলে দিল: রানা রে, এবার আর পারলি না তুই!
টাওয়ারের মেঝেতে কংক্রিট মিসাইল সাইলোর চারপাশে জড় হয়েছে মার্সেনারি ফোর্সের সবাই।
সংখ্যায় কমপক্ষে পঞ্চাশজন।
দুভাগে ভাগ হয়ে গেল তারা, মাঝে দাঁড়াল এক লোক।
সে কার্ট কে, এবেলহার্ড।
ভচকে যাওয়া নাক থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে এখনও।
একবার হাতে পেলে ব্যাটা কী করবে, ভাবতে গিয়ে স্বস্তি পেল না রানা। ওদেরকে ধাওয়া করতে প্রথমেই মই বেয়ে পাঠাবে মার্সেনারি। ওদের গুলি ফুরিয়ে গেলে খুন করবে যেমন ভাবে খুশি।
ওরা সিটিং ডাক।
কোনও স্ট্রাটেজি নেই।
ফাঁকা টাওয়ারে গমগম করে উঠল এবেলহার্ডের কণ্ঠ: মেজর রানা! ভাল দৌড়াতে পারো! কিন্তু পালাতে পারবে না কোথাও! জানেই বাঁচবে না! প্রতিধ্বনিত হতে লাগল কথাটা।
কমব্যাট ওয়েবিং থেকে কী যেন বের করেছে লোকটা। জিনিসগুলো চিনল রানা। থমকে দাঁড়িয়ে গেল। জিনিসগুলো ছোট এবং সিলিণ্ডারের মত। থার্মাইট-অ্যামাটল ডেমোলিশন চার্জ।
সংখ্যায় চারটে। রানার সঙ্গের মৃত মেরিনদের কাছ থেকে পেয়েছে বোধহয়।
পরিষ্কার এবেলহার্ডের পরিকল্পনা বুঝল রানা। চার মার্সেনারির হাতে একটা করে চার্জ দিল লোকটা। আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল দালানের চারদিকের চার পিলার। ঝট করে ওয়েবিং থেকে নিয়ে ফিল্ড বিনকিউলার চোখে লাগাল রানা।
থার্মাইট চার্জগুলোর রঙিন সুইচ চোখে পড়ল–লাল, সবুজ ও নীল।
টাইমার চালু করো! নির্দেশ দিল এবেলহার্ড।
থার্মাইট-অ্যামাটল চার্জের নীল টাইমার বাটন টিপল লোকগুলো।
নীল টাইমার মানে একমিনিট, ভাবল রানা।
মস্ত ঢোক গিলল ও।
মাত্র ষাট সেকেণ্ড পাবে খবির আর ও, তারপর চুরমার হবে কাঁচের দালান।
হাতঘড়ির স্টপওয়াচ চালু করল রানা।
০০:০১… ০০:০২… ০০:০৩…
মেজর রানা, ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করব তোমার লাশ! তখন কেটে নেব ওই মগজহীন মাথাটা! প্রস্রাব করব তোমার গলার ভেতরে! …সোলজার্স, আউট!
আশপাশে ঢিল পড়লে যেভাবে চমকে যায় পাখি, সেভাবে ছিটকে গেল মার্সেনারিরা। ছুটতে শুরু করেছে সবাই গ্রাউণ্ড ফ্লোরের একটি লক্ষ্য করে।
অসহায় চোখে চেয়ে রইল রানা ও খবির।
কঁচ ঢাকা জানালার এপাশ থেকে চাইল রানা। নীচে বরফ ঢাকা জমিন।
দালান থেকে বেরিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলেছে মার্সেনারিরা, হাতে উদ্যত অস্ত্র।
অজান্তে ঢোক গিলল রানা।
খবির আর ও অসহায়ভাবে আটকা পড়েছে কাঁচের দালানে।
এবং সবই বিস্ফোরিত হবে মাত্র বায়ান্ন সেকেণ্ড পর!
মার্সেনারিদের দিকে চেয়ে আছে রানা, তখনই শুনল অদ্ভুত জোরালো আওয়াজ।
শুরু হয়েছে গুমগুম শব্দ। কোনও জেট ফাইটার বিমান।
ওটার কথা আগেও শুনেছি, চাপা স্বরে বলল রানা।
কী বললেন, স্যর? জানতে চাইল খবির।
তখন টাইফুন সাবমেরিনে ছিলাম। মার্সেনারি কমাণ্ডারকে জানিয়েছিল এরিয়াল কন্ট্যাক্টের কথা। ইয়াক-১৪১ স্ট্রাইক ফাইটার। ওটাতে করে আসছিল মিস্টার ফগ নামের কেউ।
সে কি বাউন্টি হান্টার?
খুব সম্ভব, এদের প্রতিযোগী। ইয়াক-১৪১ ফাইটার নিয়ে আসছে। আর ইয়াক-১৪১ হচ্ছে… থেমে গেল রানা। এসো, খবির! জলদি!
কাছের রাং-ল্যাডারে পৌঁছে গেল ওরা। দেরি না করে মই বেয়ে উঠতে লাগল তীরের গতিতে। যেতে হবে অফিস টাওয়ারের ছাতে।
কয়েক সেকেণ্ড পর ছাতের হ্যাচ ঝটকা দিয়ে খুলল রানা, উঠে এল খোলা আকাশের নীচে। এক সেকেণ্ড পর ওর পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল খবির। সাইবেরিয়ার হিমশীতল কনকনে হাওয়ায় থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে দুজন।
স্টপওয়াচের সংখ্যাগুলো উপরে উঠছে।
০০:২৮)
০০:২৯
০০:৩০
পাবলো-৯-এর পরিত্যক্ত সব দালান ও সাইবেরিয়ার বরফ ঢাকা টিলাগুলোর ভিতর খুবই ছোট দুটো আকৃতি রানা ও খবির।
ছাতের কিনারায় চলে গেল রানা, খুঁজছে ইঞ্জিনের আওয়াজের উৎস।
০০:৩২
০০:৩৩
০০:৩৪
ওই যে!
নিচু গম্বুজ মাথায় নিয়ে এক দালান, তার পাঁচ শ গজ দূরে পশ্চিমে ভাসছে ইয়াকোভলেভ-১৪১ স্ট্রাইক ফাইটার।
ব্রিটেনের হ্যারিয়ার ফাইটারের আদলে তৈরি হয়েছে রাশান ফাইটার, আজ পর্যন্ত যত বিমান তৈরি হয়েছে, তার ভিতর সবচেয়ে কুৎসিত আকাশযান।
চৌকো দেহ, পিছনে মোটা আফটারবার্নিং ইঞ্জিন। ওটাকে সুন্দর করবার কোনও চেষ্টাই করা হয়নি।
কজার সাহায্যে আফটারবার্নার ঘুরিয়ে নামিয়ে নেয়া হয়, একই জায়গা থেকে উঠতে-নামতে পারে বিমান, ভাসতে পারে হেলিকপ্টারের মত।
০০:৩৮
০০:৩৯.
০০:৪০
এমপি-৭ বের করে ভাসমান ইয়াকের নাক লক্ষ্য করে ম্যাগাযিনের তিরিশটা গুলি খরচ করল রানা।
আকর্ষণ করতে চাইছে মনোযোগ। এতে কাজও হলো।
সেই যুগে টেরোডাকটিলের খাবারে বাগড়া দিলে বোধহয় এমনই করত, বাতাসে ভর করে সরে গেল ইয়াক-১৪১ ফাইটার জেট। মনে হলো রানা এবং খবিরকে দেখতে পেয়েছে পাইলট। হোঁচট খেয়ে সামনে বাড়ল কুশ্রী বিমান, দ্রুত ছুটে এল কাঁচের টাওয়ারের দিকে।
আসেন, ফগা ভাই! বোকার মত চিৎকার করল খবির।
০০:৪৮
০০:৪৯
০০:৫০…
কাছে চলে এসেছে ইয়াক-১৪১, থামল টাওয়ারের পঞ্চাশ গজ উপরে।
যথেষ্ট কাছে আসেনি।
পাইলটকে পরিষ্কার দেখল রানা। ফ্লাইট হেলমেটের কারণে মুখ দেখা গেল না, কুঁচকে রেখেছে ভুরু।
ব্যস্ত হাতে ইশারা করছে খবির। ফাটিয়ে ফেলছে গলা।
০০:৫১
০০:৫২
০০:৫৩
কয়েক ফুট সামনে বাড়ল জেট বিমান।
পঁয়তাল্লিশ গজ সামনে আকাশযান।
০০:৫৪
আল্লার দোহাই! চেঁচাল খবির।
চট করে ছাতের মেঝের দিকে চাইল রানা।
এবার ফাটবে থার্মাইট চার্জ।
০০:৫৫
দেরি হয়ে গেছে, বলল রানা। ঘুরে চাইল খবিরের দিকে, চোখে ইশারা। চট্র করে বের করল মেরিনদের ম্যাগহুক।
ওকে দেখে একই কাজ করল খবির।
আমি যা করি, ঠিক তাই করো, বলল রানা। নইলে বাঁচবে না!
পনেরোতলা ছাত থেকে দৌড় শুরু করল ওরা!
০০:৫৬।
ঝেড়ে দৌড় দিয়েছে, তিন সেকেণ্ড পর কিনারায় পৌঁছেই ঝাঁপ দিল।
০০:৫৭
মাত্র তিন সেকেণ্ড পর একমিনিট ছুঁয়ে দিল স্টপওয়াচ।
বেড়ে থাকা প্যারাপেট থেকে উড়াল দিয়েছে রানা ও খবির, আর তখনই ওদের নীচে বিস্ফোরিত হলো গোটা দালানের নীচের অংশ। চারপাশে ছিটকে গেল কংক্রিটের ধূসর ধুলোর মেঘ।
পুরো দুই শ ফুট উঁচু দালানের সমস্ত কাঁচের দেয়াল, কংক্রিট পিলার ও ছাত একই জায়গায় ভুশ করে বসে গেল। রানা ও খবিরের নীচে যেন মস্ত কোনও গাছ ভূমিসাৎ হলো।
ইয়াক-১৪১ বিমানের পাইলট অবাক বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইল। চোখের সামনে থেকে উধাও হয়েছে পনেরোতলা বাড়ি। মুড়মুড় করে গুড়ো হলো সব, ধীরগতিতে রওনা হলো নীচে।
মস্ত এক মেঘের কুণ্ডলী তৈরি করল ধুলো।
দ্বিধান্বিত হয়ে উঠেছে জেট বিমানের পাইলট।
কয়েক সেকেণ্ড আগে ছাতে দেখেছে রানাকে। এ-ও জানে বাউন্টির লিস্টে আছে রানা। ওখান থেকে এক লোককে নিয়ে লাফিয়ে পড়ে রানা। আর তখনই ধসে গেল বাড়িটা।
কিন্তু কোথাও দেখা যাচ্ছে না রানা বা সেই লোকটাকে।
ভেসে উঠছে ছাতার মত প্রকাণ্ড ধুলোর মেঘ, ছেয়ে ফেলছে। আধ মাইল এলাকা। ১৯
বিধ্বস্ত সাইটের উপর চক্কর কাটল পাইলট। খুঁজছে কোথায় গিয়ে পড়েছে ওই দুজন।
দি ওই সাইট চারদিক ঘিরে ফেলেছে একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ মার্সেনারিরা। বাড়ি ভেঙে পড়তেই দৌড়ে সামনে বাড়ল।
কিন্তু কোথাও নেই মাসুদ রানার লাশ।
অস্ত্রগুলো তৈরি রাখল পাইলট, নামতে লাগল একটু দূরের একটা বাড়ির ছাতে।
.
পাবলো-৯-এর ছোট এক দালানের ছাতে নামল ইয়াক-১৪১ অ্যাটাক জেট বিমান। পিছনের রিয়ার থ্রাস্টার উড়িয়ে দিল ছাতে জমা সব আবর্জনা।
বিমান নেমে আসতেই খুলে গেছে ক্যানোপি, বেরিয়ে এল। দীর্ঘদেহী, সুঠাম এক লোক। হাতে রেমিংটন বন্দুক।
দশফুট দূরে গিয়ে থামল। নীচে চাইল ছাতের কিনারা থেকে।
বিমান থেকে নেমেছে তাল গাছের মত লম্বা সাত ফুটি এক লোক। বসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তখনই পিছন থেকে বলে উঠল কে যেন: অস্ত্রটা ফেলো! ঘুরেও চাইল না কালো আলখেল্লা পরা লোকটা। আড়ষ্ট হয়ে গেছে সাত ফুটি।
ইয়াক-১৪১-এর পেটের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে রানা, হাতে উদ্যত এমপি-৭। নল তাক করেছে লোকদুটোর দিকে।
তোমার বোধহয় রওনা হয়ে যাওয়া উচিত, রানা, গম্ভীর কণ্ঠে বলল কালো আলখেল্লাধারী। এবং বলেছে সে খাস বাংলা ভাষায়!
কুয়াশা! চমকে গেল রানা।
সেই কুয়াশা! বছরখানেক আগে ম্যাহোনি হলে ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা। আটকা পড়েছিলেন আহত অবস্থায়। বস্টনে জিয়োভানি, গুইদেরোনির আস্তানা ম্যাহোনি হল জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে। যাওয়ার পর আবার গিয়েছিল রানা ওখানে কুয়াশার খোঁজে। দুর্গের মত বাড়িটা থেকে কোন্ গুহা খুঁজে নিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করেছিল কুয়াশা, সেটা দেখে এসেছে নিজ চোখে। নিশ্চিন্ত হয়ে পরবর্তী একমাস ধরে মহানন্দে, বিপুল উদ্যমে ফেনিস কাউন্সিলের সর্বনাশের কাজটা সেরেছিল ও।
সেই কুয়াশা! হারিয়ে গিয়েছিল কুয়াশার অন্তরালে।
যদ্দূর জানি, বিপদের মুখে আছে তোমার বান্ধবী তিশা, ঘুরে দাঁড়াল কুয়াশা। ওরা ওকে তুলে আনতে চাইছে।
কুয়াশার সঙ্গী ধীর গতিতে ঘুরে দাঁড়াল, চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র চিন্তার ছাপ নেই।
কাঁচের টাওয়ার ধসে পড়তেই ছাত থেকে খোলা আকাশে লাফিয়ে পড়েছে রানা ও খবির, এবং পনেরোতলা থেকে পড়বার সময় ব্যবহার করেছে ম্যাগহুক। ম্যাগনেটিক হেড গিয়ে লেগেছে ইয়াক ফাইটারের নাকের নীচে। সামান্য ঠক আওয়াজ শুনতে পায়নি কুয়াশা। আকাশ থেকে পড়তে শুরু করে হঠাৎ করেই থেমে গেছে রানা এবং খবিরের পতন।
এরপর বিমান কাছের দালানের ছাতে নেমে আসবার আগেই ইণ্টারনাল স্কুলার ব্যবহার করেছে ওরা, উঠে এসেছে ফাইটারের নাকের কাছে। নীচে উড়ছিল ঘন ধুলো, ওদেরকে দেখেনি মার্সেনারিরা। এ ফাইটার বিমান ল্যাণ্ডিঙের সময় অসুবিধা হয়েছে, ছাতের অজস্র ধুলোবালি ও আবর্জনা লেগেছে চোখে-মুখে। তবে ক্ষতি হয়নি ওদের।
ইয়াক-১৪১ নামতেই নীচ থেকে গড়িয়ে সরে গেছে ওরা।
তখন রানার সহজ পরিকল্পনা ছিল: যেভাবে হোক দখল করবে বিমানটা।
খবির চেনে না রহস্যমানব বৈজ্ঞানিক কুয়াশা বা তার সঙ্গীকে, তাদের দিকে তাক করে রেখেছে অস্ত্র। ব্যাটা আবার বাংলা বলে!
আপনিও কি বাউন্টি হান্ট করছেন? কুয়াশার কাছে জানতে চাইল রানা।
না, আস্তে করে মাথা নাড়ল বিজ্ঞানী।
এখানে এলেন কীভাবে?
জানা ছিল তোমার গর্দান নিতে চাইছে বাউন্টি হান্টাররা। কাজেই খোলা ছিল চোখ-কান। জানলাম, ফ্রান্সের এক দুর্গে তোমাদের মাথা পৌঁছে দিলে প্রতি জনের জন্যে দেবে তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার।
আপনি জানেন কোন দুর্গে নিতে হবে?
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন, বিড়বিড় করল রানা। এত টাকা কারা দিচ্ছে, জানেন? আমাদেরকে খুন করতে চাইছে কেন?
মাথা নাড়ল কুয়াশা। এখনও জানতে পারিনি। আমার লোক খোঁজ-খবর করছে। …এবার রানা, তোমার রওনা হয়ে যাওয়াই ভাল।
আপনাদেরও থাকার উপায় নেই, বলল রানা। চট করে হাতঘড়ি দেখল। এগারো মিনিট পর চারপাশ নরক করে দেবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল
তুমি রওনা হও, আমাদের অন্য ব্যবস্থা আছে, বলল কুয়াশা।
বিজ্ঞানীর চোখে চাইল রানা। বুঝে গেল, যা বলবার বলে দিয়েছে প্রতিভাবান মানুষটা।
ঘুরেই বিমানের মইয়ের দিকে চলল রানা, কয়েক সেকেণ্ডে উঠে পড়ল ককপিটে।
রানাকে যেন বন্দুক হাতে রক্ষা করছে মস্ত মনের রহস্যময়। বিজ্ঞানী কুয়াশা।
রানার পিছনের সিটে বসে খবির বলল, স্যর, একদিন আমেরিকানদের এই কচুর ম্যাগহুক সত্যিই কাজে আসবে না। সেদিন…
তুমি নেতিবাচক মনের লোক, খবির। এখন থেকে ইতিবাচক চিন্তা শুরু করো, নইলে নিজেও সুখী হবে না, কাউকে সুখীও করতে পারবে না।
ব্যস্ত হয়ে উঠেছে রানা, আগেও ব্যবহার করেছে হ্যারিয়ার বিমান, বুঝতে অসুবিধা হলো না কীভাবে চালাতে হবে ইয়াক ১৪১ স্ট্রাইক ফাইটার জেট।
ভাটিকাল টেক-অফ থ্রাস্টার চালু করল রানা, ছাত থেকে ভেসে উঠল বিমান। ব্যবহার করল, আফটারবার্নার, বিদ্যুদ্বেগে ছুটতে শুরু করেছে বিমান সাইবেরিয়ার টিলাগুলোর মাথা ছুঁয়ে।
নিচু দালানের ছাতে ঢ্যাঙা সঙ্গীর পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কুয়াশা। যেন মস্ত এক কালো বাদুড়, পতপত করে উড়ছে তার কালো আলখেল্লা।
ছয়
পিছনে হারিয়ে গেছে পরিত্যক্ত রাশান ইন্সটলেশন। চুপ করে বসে আছে রানা ইয়াক-১৪১ স্ট্রাইক ফাইটারের ককপিটে।
পিছনের সিট থেকে বলল খবির, স্যর, কী ভাবছেন? আমরা। কি ওই দুর্গে যাব?
যাওয়া উচিত, বলল রানা। তবে আপাতত ওখানে যাওয়া জরুরি নয়।
এবেলহার্ডের কাছ থেকে পাওয়া বাউন্টি লিস্ট পকেট থেকে বের করল রানা। জরুরি এটা, আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল কাগজে। ভাবছে, এই পনেরোজনের মাঝে মিল কোথায়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে: প্রত্যেকে এরা লড়াকু মানুষ হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
ব্রিটেনের লোক স্কট এম. ক্যাপলান, কাজ করে এসএএস-এ, রিচার্ড কে. ডসন এমআই-৬-এর নাম করা গুপ্তচর। ইহুদী রাষ্ট্র ইজরায়েলের আইএএফ-এ কাজ করে পাইলট আব্রাম অ্যামনন। মেজর জেনারেল রেইমণ্ড কে. গ্র্যাঞ্জার ইউএসএ-এর মেরিন বাহিনীর লোক। আমেরিকার ওই বাহিনীতে এত কম বয়সে তাঁর মত অত উচ্চ পদে খুব কম লোকই পৌঁছুতে পেরেছে।
মিডল-ইস্টের লেবানন ও সৌদির দুই সন্ত্রাসী আজিজ আমিন। এবং হোসেন আলাল রয়েছে তালিকায়।
হোসেন আলাল… ভাবতে শুরু করেছে রানা।
ওই লোক ছিল ওসামা বিন লাদেনের বামহাত।
উত্তর আফগানিস্তানে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে আমেরিকান বাহিনী। তাদেরই আরেকদল খুঁজছে তাকে কঙ্গোর মাউন্ট স্ট্যানলি পর্বতে। ওখানে রয়েছে তিশা ও নিশাত।
কুয়াশার বক্তব্য মনে পড়ল রানার।
বিজ্ঞানী বলেছিল: যদ্দূর জানি, বিপদে আছে তোমার বান্ধবী তিশা।
এবার কার্ট কে, এবেলহার্ডের কথাগুলো খচখচ করতে লাগল। রানার মনে।
লোকটা বলেছে: দরকার পড়লে আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু বান্ধবীদের আটকে রাখবে বাউন্টি-হান্টাররা… গর্ত থেকে বের। করে আনবে তোমাদের।
ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা।
কঙ্গোর মাউন্ট স্ট্যানলি পর্বতে খোঁজা হচ্ছে হোসেন–আলালকে। তার মাথা নেয়ার ফাঁকে তিশা বা নিশাতকে আটকে ফেললে ক্ষতি কী বাউন্টি হান্টারদের?
সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না রানার।
দক্ষিণ-পশ্চিম দিগন্তের দিকে সেট করল ইয়াকের অটো পাইলট। গন্তব্য আফ্রিকার কঙ্গো।
.
সার্জেন্ট খবিরকে নিয়ে মাসুদ রানা পাবলো-৯ ত্যাগের এগারো মিনিট পর ইন্সটলেশনের আকাশে দেখা দিল সাদা ধোঁয়ার দীর্ঘ আঙুল। নামছে টাইফুন সাবমেরিনের এসএস-এন-২০ মিসাইল। বিশ মিনিট আগে ওটাকে উৎক্ষেপ করা হয়েছিল।
বজ্রপাতের মত সুপারসনিক গতিতে আসছে পাবলো-৯ লক্ষ্য করে।
ছয় হাজার ফুট…
তিন হাজার ফুট..
এক হাজার ফুট…
পর মুহূর্তে ড্রাই ডকের চার শ ফুট উপরে বিকট আওয়াজে বিস্ফোরিত হলো ভয়ঙ্কর মিসাইল।
লক্ষ-কোটি টুকরো হয়েছে পটকার মত। পাশ থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট এক লেসার-গাইডেড মিসাইল ধ্বংস করে দিয়েছে ওটাকে।
কোনও ক্ষতি না করেই মিসাইলের চকচকে টুকরো ঝরঝর করে ঝরে পড়ল পাবলো-৯-এর বুকে।
ধোঁয়া সরে যেতেই শ্ৰম-নগরীর আকাশে দেখা দিল দ্বিতীয় ভাসমান ফাইটার জেট বিমান।
ওটা আগে আসা বিমানের চেয়ে সরু, দৈর্ঘ্যে ঢের বেশি। দেহ কালো রঙের। অন্য রং বলতে শুধু নোজ কোন সাদা। বিমানের ডানাদুটো ঢালু হয়ে সামান্য সামনে বেড়েছে। ককপিটে বসতে পারে দুজন।
কালো বিমান সুখোই এস-৩৭। রাশার তৈরি, মৌমাছির মত ভাসতে পারে, পুরনো ইয়াক-১৪১ বিমানের চেয়ে অনেক আধুনিক। বেশ কিছুদিন হলো চোরাই অস্ত্র বাজারে বিক্রি হচ্ছে এ জিনিস।
সাইবেরিয়ান বেসের ওয়্যারহাউসের আকাশে ওটা যেন কোনও বাজপাখি। নীচে চেয়ে পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে পাইলট।
রাস্তাগুলো নির্জন, কোথাও দেখা গেল না একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র মার্সেনারি।
কয়েক মিনিট সার্ভেইল্যান্স করবার পর প্রকাণ্ড ড্রাই ডক ওয়্যারহাউসের একপাশে খোলা জমিতে নেমে এল বিমান।
ককপিট থেকে নামল মাঝারি আকৃতির এক লোক, হাতে এএমডি অ্যাসল্ট রাইফেল। জিনিসটা হাঙ্গেরির তৈরি, একে-৪৭ এর মতই। অবশ্য সামনে রয়েছে হ্যাণ্ডগ্রিপ।
চারপাশ দেখে নিল সে।
শহরে মাসুদ রানাকে খুঁজতে শুরু করবে কি না ভাবছে। কিন্তু তার ডানদিকের বরফ ঢাকা: জমি থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল দীর্ঘদেহী এক লোক, ডানহাতে অস্ত্র। বামহাতে খপ করে ধরল পাইলটের ঘাড়। তা মাত্র তিন সেকেণ্ডে জন্য।
নিশ্চিন্তে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ল পোল্যাণ্ডের বাউন্টি হান্টার। ছেড়ে দিতেই মুখ থুবড়ে পড়ল তুষারে।
একটু দূরের ড্রাই ডক ওয়্যারহাউসের আড়াল থেকে বেরোল সাত ফুটি দানব। পিটপিট করে দেখছে বসকে।
কুয়াশা একপলক দেখল বাউন্টি হান্টারকে, তারপর স্যাঙাৎকে পাহারা দিতে ইশারা দিল। নিজে চলে গেল ড্রাই ডকের ছোট এক গেটের সামনে।
এদিক দিয়েই ভিতরে ঢুকেছিল মাসুদ রানা। সাদা তুষারের বুকে বিক্ষিপ্ত সব পদচিহ্ন। ড্রাই ডক ওয়্যারহাউসে ঢুকল কুয়াশা। কেউ নেই।
ভিতরে রয়ে গেছে গোলাগুলির কটু ধোঁয়া। ড্রাই ডকের মাঝে চুপ করে বসে আছে টাইফুন সাবমেরিন।
উধাও হয়েছে একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ মার্সেনারিরা।
কোথাও দ্বিতীয় কোনও সাবমেরিন নেই।
মেঝেতে ডেল্টা ডিটাচমেন্ট সৈনিকদের লাশ, কেটে নেয়া হয়েছে একটা লাশের মাথা।
পুরস্কার সংগ্রহ করছে বাউন্টি হান্টাররা। ঝুঁকে একটা লাশ স্পর্শ করল কুয়াশা। দেহ এখনও উষ্ণ। রানার সঙ্গে আসা আমেরিকান সৈনিক টমি ম্যাগানের লাশ। ড্রাই ডকের পাশে উপুড় হয়ে ভাসছে কয়েকটা মৃতদেহ।
মাপা পদক্ষেপে সি গেটের পাশে চলে গেল কুয়াশা। দেখে নিল কীভাবে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে সুড়ঙ্গের ফটক।
মনে মনে রানার প্রশংসা না করে পারল না বিজ্ঞানী।
সঙ্গীরা মারা যাওয়ার পর ফাঁদে আটকা পড়েছিল বাঙালি গুপ্তচর। তখন উড়িয়ে দিয়েছে ডাই ডকের সি গেট। যেসব মার্সেনারি ওর পিছু নিয়েছিল, তাদেরকে শেষ করেছে জলোচ্ছ্বাস তৈরি করে।
প্রকাণ্ড দালানের মাঝের লেকের পারে থামল কুয়াশা। মেঝের ছাপগুলোর দিকে চাইল। লোকগুলোর পায়ে ছিল কমব্যাট বুট।
এরা বোধহয় পরে এসেছে। বুটের সোলের ছাপ নানা ধরনের। ভেজা জায়গা মাড়িয়ে এদিকের মেঝেতে উঠেছে। কুয়াশা আঁচ করল, দ্বিতীয় কোনও সাবমেরিন এসেছিল। তার মানেই একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ।
খুব দ্রুত সরে পড়েছে তারা। অনেক বেশি জলদি।
যে বা যারা বাউন্টি হান্টের আয়োজন করেছে, সে বা তারা এদেরকে নতুন কোনও তথ্য জোগান দিয়েছে।
একটা আওয়াজ শুনল কুয়াশা, ঝট করে ঘুরে চাইল ক্ষিপ্ত বেজির মত। উঁচু করে ধরেছে খাটো ব্যারেলের রেমিংটন ৮৭০ পাম্প শটগান।
ওই আওয়াজ এসেছে ওয়্যারহাউসের দোতলার ব্যালকনি থেকে।
কয়েক সেকেণ্ডে কাছের রাং-ল্যাডারের পাশে পৌঁছে গেল। কুয়াশা, দ্রুত উঠে এল ছোট, ইন্টারনাল অফিসের ব্যালকনিতে।
অফিসের দরজার কাছে পড়ে আছে দুটো দেহ। প্রথমজন মারা গেছে।
অন্যজন সম্ভবত মার্সেনারি। পাশেই ফ্রেঞ্চদের তৈরি অ্যাসল্ট রাইফেল। লোকটা এখন বিত।
তবে বেশিক্ষণ নেই সে। গুলি লেগেছে মুখে, উড়ে গেছে চোয়ালের বড় একটা অংশ।
লোকটাকে আরেকবার দেখল কুয়াশা। চোখে কোনও করুণা নেই।
মার্সেনারি ডানহাত বাড়িয়ে দিল কুয়াশার দিকে। চোখে। মিনতি। ভাই… দয়া করুন… সাহায্য করুন…
এক পলক দেখল কুয়াশা।
এই লোক বাঁচবে না।
কারও কিছু করার নেই, চুপচাপ মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করো, ঘুরে দাঁড়াল কুয়াশা।
ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে মার্সেনারি। তা হলে মেরে রেখে যান, সেটাই অনেক দয়া হবে। ওভাবে বাঁচতে দিন!
ঘুরে চাইল কুয়াশা, পরক্ষণে বন্দুকের এলজি শেল গেঁথে দিল লোকটার মগজে।
পাঁচ মিনিট পর কালো, সরু সুখোই অ্যাটাক ফাইটারের সামনে হাজির হলো কুয়াশা। ওর পিছন পিছন বিমানের ককপিটে উঠে পড়ল সাত ফুটি মইয়ের মত লোকটা।
একমিনিট পেরুবার আগেই আকাশে ভাসল ফাইটার, চলেছে পশ্চিম লক্ষ্য করে।
সুখোই রওনা হতেই নড়ে উঠেছে বাউন্টি হান্টার পোলিশ। উঠে বসে চেয়ে রইল খুইয়ে বসা ফাইটারের দিকে। তার কাছে। তথ্য আছে, বুঝতে পারল কোথায় চলেছে ওই বিমান।
সরু হয়ে গেল পোলিশের দুই চোখ।
সাত
অক্টোবরের ১৩ তারিখ।
ব্রিটানি, রিপাবলিক অভ ফ্রান্স। ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
ফ্রান্সের রুক্ষ উত্তর-পশ্চিম এলাকায় পাহাড়ি এক দুর্গ ওটা, অতলান্তিক মহাসাগরের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে।
১২৮৮ সালে তৈরি করেছিল উন্মাদ এক কাউণ্ট জ্যান দো শ্যাটিয়ন।
মোটেও সাধারণ কোনও ফ্রেঞ্চ দুর্গ নয় এ ফোট্রেস। ফ্রান্সের বেশিরভাগ ফোর্টিফায়েড দালান তৈরির সময় দুর্গের সৌন্দর্যের দিকে খেয়াল রাখা হয়েছে, কিন্তু ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন নির্মাণকালে এর ব্যবহারিক যৌক্তিকতার উপর জোর। দেয়া হয়।
গম্ভীর চেহারার কুৎসিত, পাথরের দুর্গ।
নিরেট পাথরের পুরু দেয়াল জায়গায় জায়গায় ক্ষত-বিক্ষত। সে আমলের অন্যান্য দুর্গের তুলনায় ঢের আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। নির্মাণের সময় জায়গা বাছাই করা হয়েছিল দক্ষতার সঙ্গে, ফলে সেসময় এ দুর্গ আক্রমণ ছিল আত্মঘাতী।
মূল কারণ: এ দুর্গ তৈরি হয়েছে একটামাত্র প্রকাণ্ড পাথরখণ্ডের উপর। ওই পাথর উঠে এসেছে সাগরের বুক থেকে। দানবীয় বোল্ডার ও মস্ত দুর্গ রয়েছে উপকূলের উঁচু জমি থেকে পুরো ষাট গজ দূরে। মাঝে ডাইনীর মত খলখল করে হাসছে খ্যাপা সাগর।
পাতাল থেকে সাগর-ফুড়ে-ওঠা পাহাড়ের তিনদিকে দুর্গের পুরু প্রাচীর। ওদিকে সোজা খাড়াভাবে সাগরে নেমেছে পাহাড়। ওই ভিত্তির পায়ে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে আটলান্টিক। দুর্গ রয়েছে পুরো চার শ ফুট ওপরে।
স্থলভূমির সঙ্গে যোগাযোগ বলতে ষাট গজ দীর্ঘ পাথরের সেতু। দুর্গের দিকে সেতুর প্রথম বিশ গজ ড্রব্রিজ, প্রয়োজনে তুলে নেয়া যায়।
এ মুহূর্তে ড্রব্রিজ পেরিয়ে দুর্গের আঙিনায় পা রাখল দুই বাউন্টি হান্টার। একবার দেখে নিল গম্ভীর, কালো, প্রকাণ্ড দুৰ্গটাকে। এত উপরে আটলান্টিকের ঝোড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিতে চাইছে তাদেরকে।
দুই বাউন্টি হান্টার তাদের মাঝে সাদা একটা বাক্স বহন। করছে। বাক্সের উপর আঁকা রেড ক্রস। নীচে লেখা:
হিউম্যান অর্গান: ডু নট ওপেন এক্সপ্রেস ডেলিভারি।
ফোট্রেসের সাত শ বছরেরও বেশি পুরনো পোর্টকালিসের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গেল দুই বাউন্টি হান্টার। এক মুহূর্ত পর। ইস্ততত করে ঢুকে পড়ল দুর্গের ভিতর।
উঠানে ঢুকতেই ছোটখাটো এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হলো। তার পরনে কড়া ইস্ত্রি করা সুট। নাকের ডগায় ঝুলছে ওয়ায়ার ফ্রেমের পিন্স-নেয়।
শুভ সকাল, মোসিউস্, বললেন ভদ্রলোক। আমি মোসিউ ড্যাবলার। …আপনাদেরকে কী সাহায্য করতে পারি?
দুই আমেরিকান বাউন্টি হান্টারের পরনে সুয়েড জ্যাকেট ও। জিন্স। পায়ে কাউবয় বুট। পরস্পরকে দেখল তারা।
আকারে বড়জন ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বলল, আমরা এসেছি। দুএকটা বাউন্টির পুরস্কার নিতে।
মোসিউ ড্যাবলার ভদ্রতা করে হাসলেন। নিশ্চয়ই। …আর, কী নাম আপনাদের?
প্রকাণ্ডদেহী বাউন্টি হান্টার জানাল, আমি ফ্যারেল, অ্যালেক্স ফ্যারেল। টেক্সাস রেঞ্জার। …আর এ আমার ভাই নাইজেল।
সম্মান দেখিয়ে বাউ করলেন ড্যাবলার। আচ্ছা, বিখ্যাত ফ্যারেল ব্রাদার। আসুন, ভেতরে যাওয়া যাক।
দুই বাউন্টি হান্টারকে পথ দেখিয়ে মস্ত, এক গ্যারাজে নিয়ে এলেন তিনি। ভিতরে দেখা গেল দুর্লভ, দামি গাড়ির কালেকশন। শুরুতেই লাল রঙের ফেরারি মডেনা, পাশেই রপালি পোর্শ জিটি ২, এরপর অ্যাস্টন মার্টিন ভ্যাঙ্কুইশ। এ ছাড়া রয়েছে বেশকিছু রেসিং র্যালি কার। আর এই শো-রুমের ঠিক মাঝখানে রাজার মত গর্বিত ভঙ্গিতে বসে আছে একটা গাড়ি, চকচকে কালো এক ল্যামবোরঘিনি ডায়াবলো।
সুপারকারগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছে দুই আমেরিকান বাউন্টি। হান্টার। তাদের পরিকল্পনা ঠিক চললে শীঘ্রি তারাও দু একটা আমেরিকান পেশিবহুল গাড়ি ব্যবহার করবে।
ওগুলো কি আপনার, স্যর? ঘোঁৎ করে উঠল অ্যালেক্স ফ্যারেল। মোসিউ ড্যাবলারের পিছনে হেঁটে চলেছে।
সামান্য হেসে চুপ করে কিছু যেন ভাবলেন ড্যাবলার। কয়েক মুহূর্ত পর বললেন, না, ওগুলো আমার নয়। আমি সুইটহার ল্যাণ্ডের সামান্য এক ব্যাঙ্কার, কাজ করছি ক্লায়েন্টের হয়ে। ফাণ্ড বাটোয়ারা করে দেব। …এসব গাড়ি দুর্গের মালিকের, আমার নয়।
গ্যারাজের শেষে পাথরের সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নিচু এক সমতলে নামিয়ে আনলেন ড্যাবলার দুই ফ্যারেল ভাইকে।
তারা যেন প্রবেশ করেছেন মেডিইভেল আমলে।
পৌঁছে গেলেন গোলাকার পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা অ্যান্টি রুমে। এ ঘর থেকে ডানে গেছে সরু সুড়ঙ্গ। পাতালপুরির। দুপাশের দেয়ালে ধিকিধিকি জ্বলছে মশাল। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে হলদেটে আগুনের আলোছায়া।
এখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন মোসিউ ড্যাবলার। ঘুরে দাঁড়িয়ে দুই ভাইয়ের ছোটজনের উদ্দেশে বললেন, তরুণ মোসিউ নাইজেল, আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আপনার ভাই আর আমি পরীক্ষা করব বাউন্টি।
ছোট ভাইকে নিশ্চিন্ত করতে মাথাটা সামান্য নড় করল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
প্রকাণ্ডদেহী ফ্যারেলকে নিয়ে আবারও হাঁটতে লাগলেন।
ড্যাবলার। মশালের আলো ভৌতিক করে তুলেছে পরিবেশ।
সুড়ঙ্গ শেষে অপূর্ব এক অফিস কামরা। একদিকের গোটা দেয়াল পিকচার উইণ্ডো। ওদিক দিয়ে দেখা গেল আদিগন্ত আটলান্টিক মহাসাগরের অকল্পনীয়, অপরূপ দৃশ্য।
পাথরের সুড়ঙ্গের শেষে দাঁড়িয়ে পড়লেন মোসিউ ড্যাবলার। প্রিয, আপনার কোনও আপত্তি না থাকলে কেসটা দিন।
সাদা মেডিকেল ট্রান্সপোর্ট বাক্স ড্যাবলারের হাতে তুলে দিল বাউন্টি হান্টার।
মোসিউ ড্যাবলার বললেন, এখানে একটু অপেক্ষা করতে হবে।
অফিসে গিয়ে ঢুকলেন ড্যাবলার, দরজার বাইরে রয়ে গেল। টেক্সান বাউন্টি হান্টার। সে এখনও পাথুরে সুড়ঙ্গে।
ডেস্কের সামনে গেলেন ড্যাবলার, ওখান থেকে তুলে নিলেন। ছোট রিমোট কন্ট্রোল, টিপ দিলেন নির্দিষ্ট বাটনে।
ঘটাং! ঘটাং! ঘটাং!
সুড়ঙ্গের ভিতর আটকা পড়ল অ্যালেক্স ফ্যারেল। ছাত থেকে নেমেছে ইস্পাতের দেয়াল। প্রায় বাক্সের মত করে তুলেছে সুড়ঙ্গ।
একইসময়ে দুই ইস্পাতের দেয়াল আড়াল করেছে গোলাকার পাথরের অ্যান্টি-রুমের দুই দরজা।
উপরের ওই গ্যারাজে যাওয়ার উপায় নেই এখন। সরু সুড়ঙ্গে ঢুকবার মুখেও পুরু ইস্পাতের দেয়াল। ওদিকে রয়ে গেছে নাইজেল ফ্যারেলের বড় ভাই। তৃতীয় ইস্পাতের দেয়াল আলাদা করেছে সুড়ঙ্গ থেকে, অফিস।
নিজ অফিসে আলাদা হয়ে গেছেন মোসিউ ড্যাবলার।
প্রতিটি ইস্পাতের দরজায় রয়েছে খুদে থার্মোপ্লাস্টিকের জানালা।
নিজ নিজ বন্দিশালা থেকে বাইরে দেখতে পাবে দুই বাউন্টি হান্টার।
ছাতের স্পিকারে ভেসে এল মোসিউ ড্যাবলারের কণ্ঠ: জেন্টলমেন, শান্ত থাকুন। নিশ্চয়ই বোঝেন, কোটি ডলারের বাউন্টি হান্টে কত মানুষ আগ্রহী হবে? অল্প কথায় বলা যায়: অনেকেই টাকার লোভে নিজের কপাল ঠুকে দেখতে চাইবে। আমি আপনাদের অসম্মান করছি না। তবে আপাতত যেখানে আছেন, ঠিক সেখানেই থাকবেন–আর আমি পরীক্ষা করব আপনারা সঠিক মানুষের মাথা এনেছেন কি না।
মেডিকেল ডেলিভারি বাক্স ডেস্কের উপর রাখলেন ড্যাবলার, দক্ষ হাতে খুলে ফেললেন ঢাকনি।
তার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে দুটো বিচ্ছিন্ন মুণ্ডু।
একজনের মুখে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছিট-ছিট দাগ, চেয়ে আছে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে।
অন্য মাথাটার বেহাল অবস্থা। খুব পুড়ে গেছে বামপাশ মোটেও বিরক্ত মনে হলো না ড্যাবলারকে।
দুহাতে সার্জিকাল গ্লাভস পরে নিল, শান্ত চেহারায় বাক্সের ভিতর থেকে বের করে আনল রক্তের দাগওয়ালা মাথাটা। কমপিউটারের পাশের স্ক্যানিং ডিভাইসে রাখল।
আচ্ছা! এ মস্তক কার বলে দাবি করছেন আপনি? ইন্টারকমে অ্যালেক্স ফ্যারেলের কাছে জানতে চাইল ড্যাবলার।
ইজরায়েলি ডেনিস ই, ম্যাকিন, বলল বাউন্টি হান্টার।
ডেনিস ই, ম্যাকিন, কমপিউটারের কিবোর্ডে কয়েকটা টোকা দিল ড্যাবলার। হুম্… মোসাদ এজেন্ট… ডিএনএ-র কোনও রেকর্ড নেই। বেশিরভাগ ইজরায়েলির মতই। তাতে কিছু যায় আসে না। এ বিষয়ে আমাকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য উপায় ব্যবহার করতে হবে।
কাটা মাথার নীচে স্ক্যানিং ডিভাইস চালু করল ড্যাবলার। সিএটি স্ক্যানারের মতই, বিচ্ছিন্ন মাথার উপর বেশ কয়েক ধরনের লেসার বিম ব্যবহার করল যন্ত্রটা।
স্ক্যানিং শেষে রক্তাক্ত মাথার মুখ হাঁ করাল ড্যাবলার, কয়েকটা দাঁত ধরল লেসার স্ক্যানারের উপর।
কিবোর্ডে আবারও কয়েকটা বাটন টিপল।
কমপিউটারের রেকর্ডের সঙ্গে ছিন্ন মাথার অ্যানালাইসিস করা রেকর্ড মিলাতে শুরু করেছে।
বিপ করে উঠল কমপিউটার।
মাথা দুলিয়ে হেসে ফেলল মোসিউ ড্যাবলার।
ক্রস-রেফারেন্স অনুযায়ী স্কোর পাওয়া গেল ৮৮.২৩%। আগেই আমাকে বলা হয়েছে, ভেরিফিকেশন করার সময় ৭৫% বা তার বেশি মিললে বাউন্টির টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে। জেণ্টলমেন, প্রথম মাথার ক্র্যানিয়াল শেপ এবং ডেন্টাল রেকর্ড অনুযায়ী এ লোকই মোসাদের মেজর ডেনিস ই. ম্যাকিন। আপনারা এখন তেত্রিশ মিলিয়ন ডলারের মালিক।
পাথরের আলাদা খাঁচার ভিতর হাসল দুই বাউন্টি হান্টার।
এবার দ্বিতীয় মাথা নিল ড্যাবলার। জানতে চাইল, আর ইনি কে?
টেক্সাস রেঞ্জার অ্যালেক্স ফ্যারেল বলল, আজিজ আমিন। হামাসের লোক। তাকে পেয়েছি মেক্সিকোতে। ড্রাগ লর্ডের কাছ থেকে এক চালান এম-১৬ রাইফেল কিনছিল।
সত্যি, কী আশ্চর্য, বলল ড্যাবলার।
দ্বিতীয় মাথাটা জায়গায় জায়গায় পুড়ে কালো। দাঁতের অর্ধেক উধাও। গুলি বা হাতুড়ির আঘাতে এমন হতে পারে।
ক্র্যানিয়াল এবং ডেন্টাল লেসার টেস্ট শুরু করল ড্যাবলার।
শ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে দুই বাউন্টি হান্টার। বুঝতে শুরু করেছে, কেন ড্যাবলার দুই মাথা ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখছে।
করোটি এবং ডেন্টাল রেকর্ড থেকে মিলল ৭৮.৭৬% স্কোর।
মোসিউ ড্যাবলার বলল, সন্দেহ নেই মারাত্মক আগুন এবং বুলেটের ক্ষতির কারণে পার্সেন্টেজ হয়েছে ৭৮.৭৬%। আর আপনারা তো জানেনই, আমাকে আগেই বলে দেয়া হয়েছে, কী করতে হবে। ছিন্ন মস্তকের ৭৫% মিললে বা তার চেয়ে বেশি মিললে আমি বুঝিয়ে দেব পুরো টাকা।
এক কান থেকে আরেক কানে চলে গেল দুই ভাইয়ের হাসি।
কিন্তু কথা রয়ে যায়, নির্দিষ্ট ব্যক্তির ডিএনএ-র রেকর্ড না পেলে তখন দিতে হবে পুরস্কার, বলল ড্যাবলার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমার রেকর্ড অনুযায়ী এই লোকের ডিএনএ-র স্যাম্পল আছে।
মুখ থেকে দপ করে নিভে গেল দুই ভাইয়ের হাসি। দূর থেকে পরস্পরের দিকে চাইল।
ও, হ্যাঁ, আমার রেকর্ড অনুযায়ী, আবারও শুরু করল ড্যাবলার, উনিশ শ আটানব্বই সালে স্কটল্যাণ্ডে বন্দি হয় আজিজ আমিন। গ্রেফতার করা হয়েছিল বেআইনী আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে। তখন রক্তের স্যাম্পল নেয়া হয় তার। এবং রেকর্ড করা হয় ডিএনএ।
কথাটা শুনেই ভীষণ ভয় পেল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
মোসিউ ড্যাবলার ততক্ষণে পোড়া মাথার বাম গালে হাইপোডারমিক নিডল গেঁথে দিয়েছে। সংগ্রহ করছে রক্ত।
ওই শুকিয়ে যাওয়া রক্ত রাখা হলো কমপিউটারের পাশের এক অ্যানালাইসার-এ।
একবার বিপ্ করে উঠল যন্ত্রটা। আগের মত মৃদু আওয়াজ নয়, জোরালো।
ভুরু কুঁচকে ফেলল ড্যাবলার, হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে গেছে। তাকে এখন মারাত্মক বিপজ্জনক লোক বলে মনে হচ্ছে।
জেন্টলমেন… বলল সে।
বরফের মূর্তির মত জমে গেছে দুই বাউন্টি হান্টার।
চুপ হয়ে গেছে সুইস ব্যাঙ্কার, ভঙ্গি দেখে মনে হলো তাকে ভীষণ অপমান করা হয়েছে। জেন্টলমেন, এই মাথা নকল। এটা আজিজ আমিনের মাথাই নয়।
দাঁড়ান, একমিনিট… বলে উঠল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
মিস্টার ফ্যারেল, দয়া করে চুপ করো, বলল ড্যাবলার। কসমেটিক সার্জেরি যথেষ্ট ভাল ছিল। ডাক্তার ভাল প্লাস্টিক সার্জেন। ভিশু্যয়াল আইডেন্টিফিকেশন উধাও করতে পোড়ানো হয়েছে মাথা। চালাকি করেছ তোমরা। কিন্তু এসব কৌশল পুরনো। নতুন করে বসিয়ে নেয়া হয়েছে দাঁত। কিন্তু তোমরা জানতে না তার ডিএনএ-র রেকর্ড আছে আমাদের হাতে।
না, জানতাম না, ঘড়ঘড় করে বলল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
ম্যাকিনের মাথাও তা হলে নকল?
ওটা জোগাড় করেছে আমাদের পরিচিত এক বাউন্টি হান্টার, মিথ্যা বলল অ্যালেক্স। সে বলেছিল ওই মাথা…
কথা যাই হোক, তোমরা আমার কাছে এনেছ, মোসিউ ফ্যারেল। কাজেই দায়-দায়িত্ব তোমাদের। পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছি। সততা এ মুহূর্তে তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে। বলো, ম্যাকিনের মাথাও কি নকল?
হ্যাঁ, চোর-চোর চেহারা করল অ্যালেক্স।
তোমরা আইন ভেঙেছ, মিস্টার ফ্যারেল। এটা ভয়ঙ্কর অপরাধ। এ ধরনের জালিয়াতি পছন্দ করেন না আমার ক্লায়েন্ট। আমি কি তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারলাম?
একটা কথাও বলল না অ্যালেক্স ফ্যারেল।
কিন্তু এ পরিস্থিতির কথা ভেবেই আমাকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, বলল ড্যাবলার। চাইল অ্যালেক্সের চোখে। মোসিউ ফ্যারেল, তুমি যে টানেলে আছ, ওটা কী তা জানো?
না।
ও-আচ্ছা, আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম তোমরা আমেরিকান। নিজেদের প্রেসিডেন্টের নাম ছাড়া দুনিয়ার ইতিহাস বলতে কিছুই জানো না। বড়জোর জানো প্রতিটি রাজ্যের রাজধানীর নাম। তোমাদের জানার কথা নয় মেডিইভেল আমলে কী ধরনের যুদ্ধ চলত ইউরোপে।… তোমরা কি জানো এ বিষয়ে?
চুপ করে রইল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
কাঁধ ঝকাল ড্যাবলার। মোসিউ ফ্যারেল, তুমি যে টানেলে আছ, আগে সেখানে আটক করা হতো দুর্গে হামলাকারীদেরকে। ওই টানেল ধরে আসত শত্রু সৈনিক, আর তখন দেয়ালের নালা থেকে ছিটকে পড়ত ফুটন্ত তেল। ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়ে মরত লোকগুলো।
ঝট করে টানেলের দুদিকের দেয়াল দেখল অ্যালেক্স ফ্যারেল।
দেয়ালে সত্যিই ছাতের কাছে বাস্কেট বলের সমান সব গর্ত!
অবশ্য, পরবর্তীতে সামান্য আধুনিকীকরণ হয়েছে এই দুর্গের, বলল ড্যাবলার। নইলে নতুন টেকনোলজি কাজে লাগানো যেত না। এবার ছোট ভাইয়ের দিকে দেখো।
চরকির মত ঘুরল অ্যালেক্স, পিংপং বলের মত হয়ে উঠেছে। দুই চোখ। পুরু ইস্পাতের দরজায় বসানো প্লাস্টিকের জানালা দিয়ে চাইল ছোট ভাইয়ের দিকে।
এবার, বিদায় দাও ভাইকে, স্পিকারে বলল ড্যাবলার।
অফিসের ভিতর আবারও উঁচু করে ধরেছে রিমোট কন্ট্রোল। নতুন একটা বাটন টিপল।
মুহূর্তে শুরু হলো যান্ত্রিক গুঞ্জন। ওটা চালু হয়েছে নাইজেলের গোলাকার অ্যান্টি-রুমে। ক্রমেই বাড়ছে গুঞ্জন। যেন লাখ লাখ ভিমরুল উড়তে শুরু করেছে।
প্রথমে মনে হলো কিছুই হচ্ছে না নাইজেল ফ্যারেলের। তারপর হঠাৎ করেই ঝটকা খেল সে। বুকে এসে ঠেকল চিবুক। ডানহাতে খামচে ধরল বুক। পরক্ষণে চেপে ধরল দুই কান। পরের সেকেণ্ডে দুই কান থেকে ছিটকে বেরোল তাজা রক্ত।
বিকট চিৎকার জুড়েছে সে।
অসহায় চোখে ছোট ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইল অ্যালেক্স ফ্যারেল। তার চোখের সামনে ঘটছে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা।
তীব্র হয়ে উঠেছে গুঞ্জনের আওয়াজ, হঠাৎ করেই বিস্ফোরিত হলো তার ছোট ভাইয়ের বুক। ছিটকে বেরোল গোটা বুকের খাঁচা। ফিনকি দিয়ে নানাদিকে গেল রক্ত, সঙ্গে মাংস ও শিরা।
অ্যান্টি-রুমের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল নাইজেল ফ্যারেল। তার আগেই চোখ থেকে বিদায় নিয়েছে দৃষ্টি। ছিন্নভিন্ন বুক নিয়ে মরে পড়ে থাকল সে।
ভীষণ চমকে গেছে অ্যালেক্স ফ্যারেল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই চরকির মত ঘুরল। মুক্তির জন্য চারপাশে চাইল।
পালাবার পথ নেই কোথাও!
গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল অ্যালেক্স ফ্যারেল, হারামজাদা কুত্তার বাচ্চা! তুই বলেছিলি সৎ থাকলে আমাদেরকে ছেড়ে দিবি!
শীতল হাসল ড্যাবলার। বোকা আমেরিকান! ভাবছ প্রাণ ভিক্ষা চাইবে আর মাফ পেয়ে বেরিয়ে যাবে এখান থেকে? আমি বলেছিলাম, সততা তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমি ঠিক করেছি, তোমাদেরকে সাহায্য করব না।
ছোট ভাইয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ চোখে পড়ছে জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের। তা হলে ওর মত করে আমাকে শেষ করবি তুই?
বাঁকা হাসল ড্যাবলার। ওভাবে নয়। তোমার মত নই, আমি ইতিহাসের ভক্ত। কখনও কখনও পুরনো পথ অনেক বেশি আনন্দদায়ক। রিমোট কন্ট্রোলের তৃতীয় বাটন টিপল সুইস। ব্যাঙ্কার।
ছাতের গর্তগুলো থেকে অ্যালেক্স ফ্যারেলের উপর ঝরঝর করে ঝরতে শুরু করল উত্তপ্ত তেল। সব মিলে এক হাজার লিটার।
এক ফোঁটা তেল পড়তেই হ্যাঁৎ করে পুড়ছে চামড়া ও মাংস। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে পুড়ে গেল অ্যালেক্স ফ্যারেলের গোটা মুখ। পোশাকে যেখানে লাগল তেল, সে অংশের চামড়া পুড়িয়ে ঢুকল মাংসের ভিতর।
ধুপ করে মেঝেতে পড়ল সে। ছটফট করতে করতে বিকট আর্তনাদ ছাড়ছে।
ভয়ঙ্কর কষ্ট থামল একসময়। মারা গেছে লোকটা। কেউ শুনল না তার শেষ আর্তনাদ।
আটলান্টিক মহাসাগরের অনেক উপরে ব্রিটানির উপকূলে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন, সবচেয়ে কাছের শহর কমপক্ষে বিশ মাইল দূরে।
আট
সেন্ট্রাল আফ্রিকা।
অক্টোবর ১৪
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অভ দ্য কঙ্গো।
এ দেশ কঙ্গো ফ্রি স্টেট, বেলজিয়ান কঙ্গো, রিপাবলিক অভ কঙ্গো বা যায়ার নামে বারবার পরিচিত হয়েছে–গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত এক জনবহুল রাষ্ট্র।
প্রথম গৃহযুদ্ধে এ দেশের সরকারকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দিয়ে বিপুল খনিজসম্পদ দখল করবার জন্য হামলা শুরু করেছিল রুয়াণ্ডা ও ইউগাণ্ডার সেনাবাহিনী। এবং উনিশ শ আটানব্বই সালে আবারও দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল। শান্তিচুক্তি হলো দুহাজার তিন সালে, কিন্তু পুব অঞ্চলে আসলে থামেইনি লড়াই।
বাস্তব কথা: অসহায় কোটি কোটি মানুষের জন্য কিছুই করতে পারেনি ইউএনও।
দুহাজার নয় সালে কঙ্গোর বুকে প্রতিমাসে খুন হতো পঁয়তাল্লিশ হাজার মানুষ। আজ পর্যন্ত মারা গেছে বিশ থেকে চুয়ান্ন লাখ মানব সন্তান। তাদের নব্বইভাগ লড়াইয়ের কারণে খুন হয়নি, তাদেরকে মরতে হয়েছে ম্যালেরিয়া, ডায়ারিয়া, নিউমো নিয়ার মত রোগের আক্রমণে। খাবারের অভাবে ধুকছে মস্ত এই দেশ, অথচ ঠিকভাবে চাষবাস করলে এবং খনিজসম্পদ আহরণ করলে এ দেশ হতে পারত স্বর্গ। দুর্ভিক্ষ এবং ছড়িয়ে পড়া মহামারীর মত রোগে মরছে লাখে লাখে মানুষ, তাদের বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
নতুন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে: প্রতিবছর চার লক্ষ নারী ধর্ষিত হচ্ছে ওখানে।
বাসস্থান, পানি, খাবার এবং ওষুধের অভাবে নরক হয়ে আছে। গোটা দেশ।
খুনি ওয়ার লর্ডদের সরিয়ে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে শেষপর্যন্ত এ দেশে নাক গলিয়েছে ইউএন।
মাউণ্ট স্ট্যানলি পর্বতমালার পূর্বাঞ্চল।
এ অঞ্চল যেন দাউ দাউ আগুনে পোড়া নরক।
গরমের জন্য নয়, চারমাস হলো নতুন করে লড়াই বেধেছে এদিকে।
মাউন্ট স্ট্যানলি এলাকায় ইউএন-এর শান্তিবাহিনী রুখতে চাইছে ইউগাণ্ডা সরকার সমর্থিত রক্ত-পিশাচ, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ওয়ারলর্ড কিলাই বাবাম্বার বাহিনীকে। নইলে নতুন করে খুন হবে লাখে লাখে মানুষ, দেশের অন্য সব অংশে ছড়িয়ে পড়বে যুদ্ধ।
এ দেশে ইউএন-এর শান্তিবাহিনীতে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশের সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈনিক।
নিজেদের কয়েকজন অফিসার ও সৈনিক পাঠিয়ে দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে আমেরিকা ও ব্রিটেনের সরকার, কিন্তু গাট মেরে বসে আছে নেতৃত্বে। বরাবর তা-ই করে ওরা। এসব অফিসার সৈনিকরা রয়ে যাচ্ছে অন্য দেশের অফিসার ও সৈনিকদের পিছনে। সোজা কথায়, গা বাঁচিয়ে চলছে তারা। মরলে কালো চামড়ার মানুষ মরুক। সিএনএন, ফক্স টেলিভিশন বা বিবিসির সাংবাদিকরা এখানে এসে এসব দেখেও দেখছে না, যদিও জানে তাদের বাহিনী কী করছে। বড় করে দেখানো হচ্ছে সামান্য কজন সামরিক অফিসার ও তাদের সৈনিকদের। ভঙ্গি নেয়া হচ্ছে, আসল লড়াই যেন তারাই করছে।
কদিন হলো বৃষ্টির দেখা নেই, ধুলোর ঝড় তৈরি করে ছুটছে লেফটেন্যান্ট তিশা করিমের আট চাকার হালকা আর্মার্ড ভেহিকেল। আর মাত্র দু শ গজ পেরুলেই পৌঁছবে ওয়ারলর্ড কিলাই বাবাম্বার নতুন ঘাঁটি পাহাড়ি খনির সুড়ঙ্গ-মুখে।
দ্রুতগামী এলএসভির চারপাশে লাগছে শিলাবৃষ্টির মত একরাশ গুলি, পিছন থেকে খনির মুখে অসীম দক্ষতায় আর্টিলারি কাভারেজ দিচ্ছে বাঙালি সৈনিক সার্জেন্ট হালিম পাঠান।
গত পাঁচ দিনে এটা শান্তিবাহিনীর নবম হামলা।
পাহাড়ের জটিল সুড়ঙ্গ-পথ দখল করতে চাইছে তারা।
আটদিন আগে জানা গেছে, দলের সেরা সৈনিকদের নিয়ে ফ্রেঞ্চদের পরিত্যক্ত খনির ভিতর ঘাঁটি গেড়েছে কিলাই বাবাম্বা।
এরা সত্যিকারের টেরোরিস্ট।
এদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা দিচ্ছে এ খনি, মিথেন গ্যাসের মৃত্যুফাঁদ।
কয়লা থেকে বেরোয় মিথেন, অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস। পরিবেশে পাঁচ শতাংশ থাকলে বিস্ফোরিত হতে পারে। সামান্য আগুনের ফুলকি থেকেই নরক হয়ে উঠতে পারে চারপাশ।
পরিত্যক্ত খনির ভিতর তাজা অক্সিজেন সরবরাহে রয়েছে চিমনির মত ভেণ্ট, কিন্তু সম্ভব ছিল না সুড়ঙ্গগুলোর গভীরে বাতাস পাঠানো।
এককথায়: আক্রমণকারী বাহিনী চাইলেও এখানে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না।
গত কয়েকদিনে বোঝা গেছে: কিলাই বাবাম্বার সৈনিকরা আত্মসমর্পণ করবে না। এ খনির আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ-পথগুলোকে নিজেদের শেষ ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে।
খনি-মুখে রয়েছে রি-ইনফোর্সড কংক্রিট আর্চওয়ে, বড় যে কোনও ট্রাক ঢুকবে।
শুরু থেকেই প্রতি-আক্রমণ করছে বাবাম্বার সৈনিকরা। এরা সেরা। তবে দলের অনেকে ইতিমধ্যে আবারও ফিরেছে নিজ দেশে।
খনি-মুখ থেকেই খাড়া প্রাচীরের মত আকাশে উঠেছে পাহাড়। ওখানে ছড়িয়ে অবস্থান নিয়ে স্নাইপিং করছে কিলাই বাবাম্বার বারো-চোদ্দজন দক্ষ সৈনিক।
পাহাড়ের আরও অনেক উপরে, চূড়ায় রয়েছে খনির দুই এয়ার ভেণ্ট। প্রতিটি দশ মিটার চওড়া শাফট, খনি থেকে সোজা। উঠেছে আকাশে। ওগুলোর মাধ্যমে তাজা বাতাস ঢুকবার কথা খনিতে। কিন্তু কিছুদিন আগে কিলাই বাবাম্বার সৈনিকরা ওই দুই শাফটের উপর ক্যামোফ্লেজ ঢাকনি বসিয়েছে। ফলে ভিতরের লোকগুলোর উপর চোখ রাখবার উপায় নেই গুপ্তচর বিমানের।
ওই দুই শাফট দখল করতে হবে এখন জাতিসঙ্ঘ বাহিনীকে।
খনির ভিতর ঢুকে উড়িয়ে দিতে হবে ভেণ্টদুটোর ঢাকনি, ওখানে বসাতে হবে টার্গেটিং লেসার। তা হলেই নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে নেবে সি-১৩০ বোমারু বিমান, নিখুঁতভাবে বোমা ফেলতে পারবে শাফটে।
ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা ও লেফটেন্যান্ট তিশা করিমের কাজ শেষে ওদের, দলের একমাত্র কর্তব্য হবে একুশ হাজার পাউণ্ড ওজনের অর্ডন্যান্স বোমা পড়বার আগেই লেজ গুটিয়ে ভেগে যাওয়া।
আজ ভোরের প্রথম এবং দ্বিতীয় আক্রমণ সফল হয়েছে।
সুড়ঙ্গ-পথের মুখ দখল করে নিয়েছে বাঙালি-ভারতীয় নেপালি এবং মালয়েশিয়ান সৈনিকরা।
অবশ্য তৃতীয় আক্রমণ ছিল আত্ম-বিধ্বংসী। রাশার তৈরি রকেট-প্রপেল্ড গ্রেনেডের ক্রসফায়ারে পড়েছে শান্তিবাহিনীর সৈনিকরা। দুটো হালকা সাঁজোয়া যান বিধ্বস্ত হয়েছে, বাঁচতে পারেনি একজন সৈনিকও।
নিশাত সুলতানা ও তিশা করিমের আক্রমণ চতুর্থ প্রচেষ্টা।
ওদেরকে এগোবার সুবিধা দেয়ার জন্য শত্রুদের গুলি আকর্ষণ। করছে আরও দুটো রণযান। এদিকে নিশাত ও তিশার পিছু নিয়ে। আসছে আট চাকার আরও একটি সাঁজোয়া যান।
তারা প্রায় পৌঁছে গেছে খনি-মুখের কাছে। খনির ভিতর শক্ত অবস্থানে ফেলছে মর্টার শেল।
এতে কাজ হচ্ছে।
অন্য দুই রণযানে লাগছে অটোমেটিক অস্ত্রের গুলি, চারপাশে বিস্ফোরিত হচ্ছে আরপিজি। কাভার নেয়া অবস্থান থেকে ছিটকে সামনে বাড়ছে তিশার এলএসভি-২৫। পিছনে আসছে দ্বিতীয় আট চাকার রণযান।
খনি-মুখের উপরের পাহাড়ে গিয়ে পড়ছে মর্টার শেল, এদিকে তীরের মত চলেছে এলএসভি দুটো, কয়েক সেকেণ্ড পর ঢুকে পড়ল অন্ধকার খনির ভিতর। থেমে গেল গুলিবর্ষণ, কিন্তু নিশাত তিশা এবং ওদের সৈনিকরা ঢুকে পড়েছে নতুন এক নরকে।
আমেরিকান বড় অফিসারদের কেউ কেউ ভরসা রাখতে শুরু করেছে কালো চোখের, কালো চুলের, মিষ্টি চেহারার তিশার উপর। তারা শুনেছে: স্বয়ং আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তিশা করিমের প্রশংসা করেছেন তাদের চেয়ে ঢের বড় অফিসারদের কাছে। এরা আরও শুনেছে: গোপন, এক ইউএস এয়ার ফোর্স বেসে প্রেসিডেন্টের প্রাণরক্ষা করেছিল এ মেয়ে।
সেসব বাদই যাক, দেখতে তিশা দারুণ সুন্দরী। অবশ্য কেউ তল খুঁজে পায়নি ওর। মিষ্টি হেসে সবাইকে কীভাবে যেন এড়িয়ে যায়। দুএকজন আগ্রহী হলেও সামান্যতম প্রশ্রয় পায়নি। আর একটি ব্যাপার কারও চোখ এড়ায়নিঃ নিজের জন্য তিশার সামান্যতম চিন্তা করতে হয় না, কারণ ভয়ঙ্কর এক মহিলা ওকে সর্বক্ষণ আড়াল করে রাখে, যেন আপন ছোট বোন।
সে ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা। ছয় ফুট দৈর্ঘ্য নিয়ে মস্ত এক দৈত্য যেন। এক পা নকল, কিন্তু সৈনিক হিসেবে দক্ষতা তাতে এক বিন্দু কমেনি।
মাউন্ট স্ট্যানলি পাহাড়ে আজকের হামলার নেতৃত্বে রয়েছে। সে। পাশে রয়েছে তিশা।
.
রানার ইয়াক-১৪১ অ্যাটাক ফাইটার জেট প্রায় দুই মাক গতি তুলে বাতাস চিরে ছুটে চলেছে পশ্চিম লক্ষ্য করে। মাটির মাত্র পঞ্চাশ ফুট উপর দিয়ে উড়ে চলেছে বিমান।
প্রায় একদিন হতে চলল পাবলো-৯-এর লড়াই পিছনে ফেলে এসেছে রানা ও খবির।
এ সময়ে রাশার নভোসিবিরস্ক-এর পরিত্যক্ত এক সামরিক বিমানবন্দরে নেমে তেল খুঁজে নিয়ে ইয়াক-১৪১ অ্যাটাক ফাইটারের পেট পুরিয়ে নিয়েছে রানা, বিশ্রাম নিয়েছে ওরা। সেখান থেকে রওনা হওয়ার পর নেমেছে কাজাখস্তানের আরেকটি পরিত্যক্ত এয়ারপোর্টে। এরপর থেমেছে তুরস্কের আরমির-এ, তখন বিসিআই-এর স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে ফিউয়েল জোগাড় করেছে। ওখান থেকে নেমেছে রানা মিশরের নিউ ভ্যালি গভার্নোরেট-এর কাছে এক মরুভূমিতে। তখন এক মিশরীয় বন্ধুর সহায়তা নিয়েছে। ট্রাকে করে তার আনা ফিউয়েল সংগ্রহ করে চলে এসেছে সে ডিআর কঙ্গোর মাউন্ট স্ট্যানলি পর্বতমালায়।
এবার খুঁজে নিতে হবে: রানাকে ইউএন-এর ক্যাম্প, নামতে হবে ইয়াক-১৪১ অ্যাটাক ফাইটার নিয়ে।
শেষবার যখন ফিউয়েল নিয়েছে, তখন মিশরীয় বন্ধু যথেষ্ট হাই অকটেন, আনতে পারেনি। কাজেই প্রায় ফুরিয়ে এসেছে জরুরি রসদ।
অবশ্য এ নিয়ে বেশি ভাবছে না রানা। ওর গর্দান থেকে মাথা আলাদা করতে চাইছে বাউন্টি হান্টাররা, কিন্তু তিশা, নিশাত ও খবিরের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ও। স্থির করেছে, দেরি না করে সতর্ক করবে তিশা-নিশাতকে, খুলে বলবে কেন ওদেরকে জিম্মি করতে চাইছে একদল রক্তপিশাচ।
সাইবেরিয়া থেকে রওনা হওয়ার সময় রানা ঠিক করেছে, ভুলেও বিশ্বাস করবে না আলাস্কার কোনও এয়ার বেসকে। কাজেই একটু আগে ইউএস-এর ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির দুর্বল এক স্যাটালাইটের ফ্রিকোয়েন্সি খুঁজে নিয়েছে।
ওর পরিচয় ভেরিফাই হতেই সরাসরি পেন্টাগনের সাইফার অ্যাণ্ড ক্রিপটোঅ্যানালাইসিস ডিপার্টমেন্টের কেভিন কনলনের সঙ্গে এইমাত্র যোগাযোগ করেছে ও।
হ্যাঁ, বলুন, কেভিন কনলন বলছি, তরুণ কণ্ঠ শুনল রানা। ইয়ারপিসে।
হাই, কনলন, আমি মাসুদ রানা, বলল রানা।
আরেহ, মেজর রানা! চমকে গেছে যুবক। অনেকদিন হলো দেখা নেই আপনার! কেমন আছেন? আজ কী ধ্বংস করলেন?
মৃদু হাসল রানা। তেমন কিছুই না। শুধু গত চব্বিশ ঘণ্টায় বন্যা তৈরি করেছি একটা টাইফুন-ক্লাস সাবমেরিনের ভেতর, লঞ্চ করেছি রাশান একটা ব্যালেস্টিক মিসাইল, ওটা সম্ভবত ধুলো করে দিয়েছে এক ড্রাই ডক আর মস্ত ওয়্যারহাউস।
তা হলে তো কোনও কাজই করেননি, মেজর!
আরও কিছু করতে হলে তোমার সহায়তা দরকার, কাজের কথায় এল রানা।
নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন।
এয়ার বেস যিরো নাইন দুর্ঘটনার পর রানার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে কেভিন কনলনের, পছন্দ করে ওরা পরস্পরকে। রানা, নিশাত, তিশা এবং খবিরের মত কেভিন কনলনও প্রেসিডেন্টের
কাছ থেকে সাহসিকতার জন্য পেয়েছিল ক্লাসিফায়েড মেডাল।
রানার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে তার এরপর। রানা এজেন্সির অফিসেও এসেছে। প্রতিবার তাকে লাঞ্চ বা ডিনার না খাইয়ে ছাড়েনি রানা। মুগ্ধ হয়ে গেছে আমেরিকান যুবক বাঙালি একদল যুবক-যুবতীর নিঃস্বার্থ আন্তরিক আচরণ দেখে। ওরা একদম আপন করে নিয়েছিল কনলনকে।
সেসব অতীতের কথা, বর্তমানে পাহাড়ি এলাকার উপর দিয়ে তীর গতিতে ছুটে চলেছে ইয়াক-১৪১। রানা মনের চোখে দেখল ডেভিড কনলনকে পেন্টাগনের আণ্ডারগ্রাউণ্ড ঘরে কমপিউটারের সামনে বসে আছে যুবক, পরনে মুক্স টি-শার্ট, জিন্স, পায়ে নাইকি, নাকে চশমা, একের পর এক চিবিয়ে চলেছে চিউইং গাম। যেন গ্রাজুয়েট কলেজের কল্প-কাহিনির হ্যারি পটার। কিন্তু এই হ্যারি পটার যে-কোনও কোড ক্র্যাক করার ব্যাপারে সত্যিকারের জিনিয়াস।
আসলে কী ধরনের সাহায্য চাই, রানা? জানতে চাইল কনলন।
তিনটে বিষয়ে জানতে চাই, কনলন, বলল রানা।
বলে ফেলুন।
প্রথম কথা: খুঁজে বের করতে হবে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অভ দ্য কঙ্গোর মাউন্ট স্ট্যানলি পাহাড়ে ঠিক কোথায় আছে তিশা করিম। নির্দিষ্ট জিপিএস লোকেশন দরকার।
যিশু, বলেন কী! ওটা তো অপারেশনাল ইনফর্মেশন। জানতে চাওয়ার ক্লিয়ারেন্স নেই আমার। ওই তথ্য খুঁজতে গেলে আমাকে গ্রেফতারও করতে পারে।
ক্লিয়ারেন্স জোগাড় করো, গম্ভীর কণ্ঠে বলল রানা। সেজন্য যা করবার করো। আমাকে যে মিশনে সাইবেরিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, সেখান থেকে পালাতে হয়েছে। খুন হয়ে গেছে ছয়জন তরতাজা মেরিন সৈনিক। বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আমেরিকান সামরিকবাহিনীর কেউ। ফাঁদে ফেলা হয়েছিল, একদল বাউন্টি হান্টারের হাতে তুলে দিয়েছিল আমাদেরকে। প্রায় কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না, কনলন।
ঠিক আছে, আমি দেখছি। আর অন্য দুটি বিষয় কী?
একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র কমাণ্ডার এবেলহার্ডের কাছ থেকে পাওয়া মানুষের নামের লিস্ট বের করল রানা। এই লিস্টের নাম অনুযায়ী তাদের বর্তমান অবস্থান জানতে চাই।
বাউন্টি লিস্টের নামগুলো একে একে জানাল রানা।
এদের মাঝে অনেক মিল। ক্যারিয়ার হিস্ট্রি, স্নাইপিং স্কিল, চুলের রং… যা পাও জানাও। ভাল হয় প্রতিটি ডেটাবেসে ক্রস চেক করলে।
ঠিক আছে। …বেশ, আর তিন নম্বর গুরুত্বপূর্ণ কাজ?
ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা, ভাবছে। তৃতীয় কাজ: খুঁজে বের করো সাইবেরিয়ার পাবলো-৯ রাশান বেস। জানা দরকার কেন ওখানে অ্যাম্বুশ করা হলো আমাদেরকে। কে করাল কাজটা।
.
অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহার ভিতর ব্রেক কষে পিছলে থেমে গেল তিশা করিমের আট চাকার এলএসভি। ঝটকা দিয়ে খুলে গেল গাড়ির পিছনের দুই কবাট, লাফিয়ে নামল ছয়জন সৈনিক, হাতে উদ্যত অস্ত্র।
এলএসভি থেকে নেমে পড়ল নিশাত ও তিশা, ওদের পরনে কাদাটে রঙের ফ্যাটিগ, একই রঙের হেলমেট ও বডি আর্মার। হাতে এমপি-৭ এবং পিস্তল আকতির ক্রসবো।
গুহার এ অংশ চওড়া, ছাত অনেক উঁচু। দেয়ালগুলো কংক্রিট দিয়ে তৈরি। মেঝের বুক চিরে দর আঁধারে হারিয়ে গেছে ট্রেনের লাইন। ওদিকের সুড়ঙ্গ বেশ খাড়াভাবে নীচে নেমে গেছে। এ ধরনের সুড়ঙ্গকে বলা হয় ড্রিফট, এ পথেই নামতে হয় খনির ভিতর।
রক বার্ড, আমি নিশাত, থ্রোট মাইকে বলল মহিলা ক্যাপ্টেন। আমরা ভেতরে ঢুকে পড়েছি। …আপনারা কোথায়?
এক ভারতীয় কণ্ঠ বলল, রক বার্ড বলছি, ক্যাপ্টেন নিশাত। ভগবান, এখানে নরক নেমেছে! আমরা আছি খনির পুবের কিনারায়! ড্রিফট থেকে দুই শ ফুট নীচে! দুই শাফটের সামনে বাঙ্কার করে অপেক্ষা করছে ওরা, আর…
সিগনাল হারিয়ে গেল।
রক বার্ড? রক বার্ড? তিশার দিকে চাইল নিশাত।
আস্তে করে মাথা দোলাল তিশা।
পাশে দাঁড়ানো দু সৈনিককে বলল, আফজাল, কৃষ্ণ, ওপরে গিয়ে আরপিজির ফক্সহোলগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা নিন। ইন্টারনাল টানেল থাকার কথা। শেয়ালগুলোকে শেষ করার পর খনিতে নামতে পারব আমরা।
জী, লেফটেন্যান্ট, রওনা হয়ে গেল বাংলাদেশ ও নেপালের দুই সৈনিক।
অন্যরা আমাদের সঙ্গে চলো, নির্দেশ দিল নিশাত।
.
মাউন্ট স্ট্যানলি পর্বতমালার উপর দিয়ে ছুটছে রানার অ্যাটাক ফাইটার জেট বিমান। চিন্তিত হয়ে উঠেছে রানা, যা ফিউয়েল আছে তাতে বড়জোর দশ মিনিট চলবে ইয়াক-১৪১, তারপরও আকাশে রয়ে গেলে বিধ্বস্ত হবে।
এমন সময় আবারও জেগে উঠল রেডিয়ো।
কেভিন কনলন।
শুনছেন, রানা? দুচারটে তথ্য পেলাম। তিশা করিমের খোঁজ পাওয়া গেছে। তার ইউনিট আছে কর্নেল ক্লিন্ট ওয়াই. উডের
অধীনে। ধীরে ধীরে বলে গেল সে জিপিএস কোঅর্ডিনেট।
ঠিক আছে, বলল রানা। টাইপ করে ট্রিপ কমপিউটারে তুলে নিয়েছে কো-অর্ডিনেটস।
এবার বলল কনলন, আপনার ওই লিস্টের ব্যাপারে। কয়েকটা তথ্য পেয়েছি। পনেরোজনের সাতজনের নাম সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছি ন্যাটোর পারসোনেল ডেটাবেসে। স্কট এম. ক্যাপলান, জে ওয়েলন, চার্লস আর. কোসলোস্কি, স্টিফেন আর. এডওয়ার্ডস, রবিন এন. কার্লটন, জন আর, রেইসার্ট আর আপনি। ন্যাটোর নয় সালের ডিসেম্বরের জয়েন্ট সার্ভিস এমএনআরআর স্টাডিতে আছেন আপনারা। ব্রিটিশদের সঙ্গে আমেরিকানদের কোনও জয়েন্ট মেডিকেল স্টাডি মনে হচ্ছে। আপনি ওদের মাঝখানে কোথা থেকে কীভাবে কাবাবের হাডিড হলেন, বুঝলাম না।
কোথায় করা ওই পরীক্ষা? জানতে চাওয়ার পর মনে পড়ল। রানার। নুমার তরফ থেকে ববি মুরল্যাণ্ড আর ওকে পাঠানো হয় টেস্ট-এ। বিসিআই অনুমতি দেয়ায় গিয়েছিল রানা।
তথ্য দিল কনলন: ইউএসএএমআরএমসি। আর্মি মেডিকেল রিসার্চ অ্যাণ্ড মেটেরিয়াল কমাণ্ড।
ওটার বিষয়ে আরও তথ্য জোগাড় করা যায়?
নিশ্চয়ই।
আর কী জানলে?
আজ ভোরে কাজাখস্তানের আকাশে অচেনা এক এয়ারক্রাফট থেকে ট্রান্সমিশন ধরেছে আমাদের ইশেলন স্পাই স্যাটালাইট। আপনার ওই লিস্টের কয়েকটি নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পড়ে শোনাচ্ছি: বেস, আমি হেণ্ডিক। কঙ্গোতে ধরা পড়েছে জেনারেল রেম কে, এ্যাঞ্জার। এখন কঙ্গোর মাউণ্ট স্ট্যানলির খনির দিকে চলেছি। লিস্টের বেশ কয়েকজনকে পেয়ে যাব ওখানে। একই জায়গায় চারজন, ভাবা যায়? স্কট এম. ক্যাপলান, এরিখ টি, সৌলে, চার্লস আর. কোসলোস্কি আর আলাল হোসেন। তা ছাড়া, ওখানে পেতে পারি মাসুদ রানার বান্ধবীকে।
গম্ভীর হয়ে গেল রানা।
বলে চলেছে কনলন: একটা নোটিফিকেশন দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই লোকের কথা বলবার ভঙ্গি ব্রিটিশদের মত। আর ওই কণ্ঠের মালিক আসলে… থেমে গেল সে।
বলো? তাড়া দিল রানা।
আবারও পড়ছে কনলন: ওই কণ্ঠ চেনা গেছে, ওটা ডেভিড এন. হেন্ড্রিকের। ব্রিটিশ ওই এসএএস-এর প্রাক্তন কর্নেলের কলসাইন ছিল দ্য ডেভিল। চুপ হয়ে গেল কনলন। কয়েক মুহূর্ত পর শুরু করল আবার, দুহাজার দশ সালের দিকে সে ছিল বিশাল লোক, কিন্তু তারপর কোর্ট মার্শাল হয়। তার খাতির ছিল। এসএএস-এর প্রধানের সঙ্গে। বাজে এক লোক। নাম ছিল জুলিয়াস বি. গুণ্ডারসন।
হ্যাঁ, জুলিয়াস বি. গুণ্ডারসনকে চিনতাম, বলল রানা।
ডেভিড এন. হেণ্ডিকের দশবছরের জেল হয়, কিন্তু হোয়াইটমুর প্রিযনে নেয়ার সময় পালিয়ে যায়। খুন করে ফেলে। যায় দশজন প্রহরীকে। সে এখন আছে ফ্রিল্যান্স বাউন্টি হান্টিং অর্গানাইযেশন কন্টিনেন্টাল সোলজার-এর সঙ্গে। ইউনিট ৬৬, বা সিএস-৬৬-এর প্রধান। কাজ করছে পর্তুগালে।…রানা, আপনি আমাকে এ কী নরকে ঠেলছেন? শুকনো হাসল কনলন। তাই বলে অবশ্য ভয় পাচ্ছি না। চুপ হয়ে গেল সে।
বুঝতে পারছি খুবই সতর্ক থাকতে হবে, নইলে আমার গর্দান নেবে এরা, চট করে একবার খবিরকে দেখল রানা।
আর আপনার বলা সেই পাবলো-৯, বলল কনলন, ওটার ব্যাপারে শুধু জানতে পেরেছিঃ উনিশ শ সাতানব্বই সালের মে মাসে ওই ফ্যাসিলিটি বিক্রি করে দেয়া হয় এক আমেরিকান কোম্পানি, স্করপিয়ন শিপিং কোম্পানির কাছে। ওই কোম্পানির যে শিপিং বিজনেস আছে, শুধু তাই নয়, তাদের অয়েল ইন্টারেস্টও আছে। সাইবেরিয়ার উত্তরাংশে দশ হাজার হেক্টর জমি কিনে এক্সপ্লোরেশন করার সময় তাদের ভাগে পড়ে পাবলো
এক মুহূর্ত ভাবল রানা, তারপর বলল, আর কিছু?
না, আর কিছু না।
তোমাদের আইএসএস-এর কাছ থেকে কিছু তথ্য পেলে ভাল হতো, বলল রানা। ১০১
কী বিষয়ে জানতে চান?
বৈজ্ঞানিক কুয়াশা সম্পর্কে। জানা জরুরি ওদের মূল্যায়ন কেমন। ওদের সঙ্গে তার টক্কর লেগেছিল কেন।
আমি খোঁজ নেব, কথা দিল তরুণ অ্যানালিস্ট।
অনেক ধন্যবাদ, কেভিন, বলল রানা। নতুন কিছু পেলে। জানিয়ে দিয়ো।
নিশ্চয়ই, ঠিক আছে।
রেডিয়ো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে আফটারবার্নার চালু করল রানা।
সাত মিনিট পর মৌমাছির মত ভাসতে ভাসতে মাটির দিকে নামতে লাগল ইয়াক-১৪১। বিমানের নীচে ছিটকে উঠছে বিপুল ধুলো। একটু দূরেই আমেরিকান সব ভেহিকেল ও কমাণ্ড তাঁবু।
নয়
কালো ফাইটার সামরিক শিবিরের মাঝে নেমে আসতেই চারপাশ থেকে ওটাকে ঘিরে ফেলেছে সৈনিকরা। আনঅথোরাইড রাশান বিমান দেখে ভয়ঙ্কর চেহারা করেছে মেরিনরা, হাতে উদ্যত অস্ত্র। কিন্তু ক্যানোপি খুলে রানা ও খবির নামতেই ওদেরকে চিনে ফেলল মেরিন অফিসার মেজর জন কালাহান। সৈনিকদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে এল সে, চোখে বিস্ময়। মেরিন বাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত লোক মাসুদ রানা, তার কারণে এ বাহিনীকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছে আমেরিকার অন্যসব বাহিনী।
হাত বাড়িয়ে রানার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল সে। আপনি হঠাৎ কোথা থেকে? জানতে চাইল।
পরে বলব, সংক্ষিপ্ত জবাব দিল রানা। আগে আমাদেরকে নিয়ে চলুন কর্নেল উডের কাছে।
আস্তে করে মাথা দোলাল মেজর কালাহান। একদল মেরিন সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে রানা ও খবিরকে এস্কোর্ট করল অফিসার।
পাহাড়ের ছোট এক টিলার নীচে কমাণ্ড তাঁবু। খনির মুখ থেকে তিন হাজার গজ দূরে। ধুলোভরা ঝোঁপঝাড় ও গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল ওদিক থেকে ফিরছে দুটো রণযান।
কর্নেল উড দাঁড়িয়ে আছে ম্যাপ টেবিলের সামনে, গলা ফাটিয়ে ফেলছে রেডিয়োতে।
আসবার সময় মেজর কালাহান জানিয়েছে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ায় মেজাজ অত্যন্ত খাট্টা কর্নেলের, কাজেই সে নিজে তাঁবুর ভিতর ঢুকতে চায় না।
সামান্যতম ইতস্তত না করেই কর্নেলের গুহায় ঢুকে পড়ল রানা ও খবির। ৬ চেঁচিয়ে চলেছে লোকটা: আরে, বললেই হলো? কীভাবে কী করবে আমি শিখিয়ে দেব? অত বুঝি না, ওদিকের রেডিয়ো সিগনাল চালু করো! দরকার হলে খনির ভেতর অ্যান্টেনার কেবল নেবে! বোমারু বিমান আসার আগেই ওদেরকে সরে আসতে বলতে হবে!
লোকটা সামান্য থামতেই বলল রানা, কর্নেল উড, আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি, কিন্তু আসতে হলো জরুরি কাজে। …আমি মেজর মাসুদ রানা, ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা আর লেফটেন্যান্ট তিশা করিমকে দরকার আমার। ওরা…
টেবিলের সামনে চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল কর্নেল। কী? কোন্ চুতিয়া তুমি, শালা!
নামটা মাসুদ রানা, আবারও বলল রানা, শান্ত রাখছে মেজাজ। জানি ওই খনির ভেতর ওয়ারলর্ডের বাহিনী আছে, কিন্তু আরও খারাপ কেউ থাকতে পারে। তারা বাউন্টি হান্টা…
মেজর, তুমি এমওএবি বোমা নিয়ে সি-১৩০ হারকিউলিস বোমারু বিমানের পাইলট না হয়ে থাকলে, আমি তোমার কথা শুনতে চাই না। বাইরে গিয়ে চুপ করে বসে থাকো…
আরে! ওটা কী? বাইরে চেঁচিয়ে উঠেছে কে যেন।
তাঁবু থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল কর্নেল। একই সময়ে রানা, ও খবিরও। কিছুক্ষণের জন্য ওরা দেখল বিশাল এক রাশান ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার ঝুলতে শুরু করেছে খনি-মুখের সামনে। নেমে পড়ল ওটা ধুলো উড়িয়ে।
কপ্টার থেকে লাফিয়ে নামল মুখোশ পরা কমপক্ষে বিশজন লোক। ছুটে ঢুকে পড়ল খনির ভিতর।
লোকগুলো গুহায় হারিয়ে যেতেই আবারও আকাশে উঠল রাশান কপ্টার, কামান দাগতে শুরু করেছে কিলাই বাবাম্বার স্নাইপারদের উপর। একমিনিট পেরুনোর আগেই কপ্টার নিয়ে সন্তুষ্ট মনে পাহাড়ের উত্তরদিকে রওনা হয়ে গেল পাইলট, দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল চূড়াগুলো টপকে।
এটা কী হলো? পাহাড়ের দিকে চেয়ে আছে কর্নেল।
এমআই-১৭, জানাল স্পটার, গায়ে রাশান ইনসিগনিয়া! স্যর, ওরা যারা নামল, সবাই স্পেন্যায ইউনিটের লোক!
শালার চুতিয়া দেশ, পুরো চুতিয়া… বিড়বিড় করল কর্নেল। ঘুরে চাইল। ঠিক আছে, এককথায় বলো কী চাও, মেজর।
কিন্তু আশপাশে নেই মাসুদ রানা বা হোসেন আরাফাত খবির।–ভুরু কুঁচকে গেল উডের। তখনই দেখল চাকা পিছলে সামনে বাড়ছে একটু দূরের এক লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল। ভিতরে কেলে ব্যাটা মাসুদ রানা আর তার ঝোঁপের মত মোটা ভুরুওয়ালা চ্যালা!
খনির সামনের নো-ম্যানস-ল্যাণ্ড লক্ষ্য করে ছুটছে রণযান। পিছনে একগাদা ধুলো।
খনির উপরের পাহাড় থেকে শুরু হয়েছে গুলি। খটাখট লাগছে চাকাগুলোর আশপাশে।
লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল ডুন বাগির মত, উইণ্ডস্ক্রিন বা আর্মার নেই। কিন্তু ড্রাইভার ও প্যাসেঞ্জারের জন্য খাঁচা তৈরি করেছে। একরাশ রোল বার। এ হালকা রণযান তুলতে পারে তুমুল গতি, একদিক থেকে আরেকদিকে সরে অবিশ্বাস্য দ্রুত।
এলএসভি নিয়ে খনির কাছে বৃত্তাকারে ঘুরছে রানা, তৈরি করছে বিপুল ধুলো, লুকিয়ে পড়ছে ওই মেঘেরই ভিতর। এখন আর আশপাশে আসছে না স্নাইপারদের গুলি।
একটু পর খনি মুখের দিকে গাড়ির নাক তাক করল রানা। আবারও পশলা পশলা বুলেট আসতে লাগল।
তখনই হঠাৎ করেই খনি-মুখের উপরের পাহাড়ে কয়েকটা বিস্ফোরণ হলো। ছয়জন স্নাইপারের আস্তানা উড়ে গেল আকাশে। ঝরঝর করে নীচে পড়ছে ধুলো, মাটি ও পাথর।
থেমে গেছে গুলি।
খনির ভিতর থেকে হামলা করেছে কেউ, শেষ করে দিয়েছে। স্নাইপারদের ঘাঁটি।
মেঝের সঙ্গে অ্যাক্সেলারেটার টিপে ধরল রানা, সৎ করে ঢুকে পড়ল খনি-সুড়ঙ্গের ভিতর।
.
সমতল থেকে ছয় শ ফুট নীচে পাথুরে সুড়ঙ্গ ধরে হেঁটে চলেছে। তিশা করিম। ঘুটঘুঁটে আঁধারে বাতি বলতে হেলমেট ও এমপি-৭-এর ফ্ল্যাশলাইট।
তিশার সঙ্গে মাত্র তিনজন সৈনিক।
একটু পর পর মিথেনোমিটার দেখছে তিশা। ওই যন্ত্র মাপছে পরিবেশের মিথেনের মাত্রা।
আপাতত দেখিয়ে চলেছে: ৫.৮১%। তার মানে, পরিস্থিতি ভাল নয়। ওরা এখনও রয়ে গেছে খনির বাইরের দিকের অংশে। এদিকটা যেন জটিল গোলকধাঁধা।
চৌকো, নিচু সব সুড়ঙ্গ। রেলগাড়ির সুড়ঙ্গের মত আকৃতির, সবই ডানদিকে বাঁক নিয়ে হারিয়ে গেছে দূরে। কিছু গেছে গাঢ় আঁধারে, অন্যগুলো হঠাৎ করেই শেষ হয়েছে কানাগলির মত।
চারপাশ ধূসর রঙের।
পাথুরে দেয়াল, নিচু ছাত, এমন কী ওই ছাত ধরে রাখা কট কট আওয়াজ তোলা পিলার-বিমও ধূসর।
চারপাশের সবকিছুতে ভুতুড়ে ধূসর ছাইয়ের মত পাউডার।
ওই পাউডার থেকে রক্ষা নেই কিছুর। লাইমস্টোনের গুড়ো, এ দিয়ে দেয়ালগুলোর অত্যন্ত দাহ্য কয়লার গুঁড়োর তেষ্টা মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফলে তৈরি হয়েছে আরও বেশি বিপজ্জনক আগুনের ফাঁদ।
খাড়া ড্রিফট টানেল শেষে এক নেপালি কমাণ্ডোর দেখা পেল তিশা। রেডিয়ো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাকে পাঠানো হয়েছিল বার্তাবাহক হিসাবে।
এখান থেকে বামে কনভেয়ার বেল্ট, জানাল সে। ওখান থেকে বেল্ট গেছে শত্রুদের ব্যারিকেডে। বেল্ট থেকে সরবেন না, সরলে হারিয়ে যাবেন।
নেপালি কমাণ্ডের কথা অনুযায়ী ছুটতে শুরু করেছে তিশার দল। আরও দু শ মিটার যাওয়ার পর বাঁক নিল পাথুরে টানেল। ওখানে দেখা গেল ভাসমান কনভেয়ার বেল্ট।
মিথেনোমিটার দেখিয়ে চলেছে:
৫.৭২%… ৫.৬৩%… খনির এত গভীরে কমতে শুরু করেছে মিথেনের মাত্রা।
ভাল, ভাবল তিশা।
তখনই চারপাশ দেখে ফিরল নিশাত সুলতানা। তিশার পাশে। ছুটবার ফাঁকে বলল, বুঝলে, তিশা, রানা আর তুমি, এবার বিয়েটা করে ফেললে…
আপা, থাক না এসব, আপত্তির সুরে বলল তিশা। খোলামেলা আলোচনা ভাল লাগছে না তার।
এই মিশন শেষে রানার সঙ্গে ওর যাওয়ার কথা ইতালি। বিখ্যাত অ্যারোস্টাডিয়া ইতালি এয়ার শো হবে মিলানে। হৈ-চৈ পড়ে গেছে, নাসার রকেট বিমান এক্স-১৬এস ওখানে প্রথমবারের মত দেখানো হবে। ওটা আজ পর্যন্ত মানবসৃষ্ট সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান। এয়ার ফিল্ড থেকে সামান্য দূরে চমৎকার এক ভিলা ভাড়া নিয়েছে রানা, জানিয়ে দিয়েছে নিশাত আর খবিরকে, ওদেরকেও যেতে হবে ওর সঙ্গে। আর ধরে নিয়েছে নিশাত, এবার হয়তো সত্যি সত্যি ভালবাসার মেয়েটিকে বিয়ে করবে মাসুদ রানা।
রানা কিন্তু তোমাকে সত্যি…
নিশাতকে থামিয়ে দিল তিশা, ও তো কিছু বলেনি, আপা।
কদিন আগে বলছিল, তিশা যদি ফিরিয়ে দেয়… আমি বললাম… থেমে গেল নিশাত।
ওরা পৌঁছে গেছে বাঁকে। ওদিক থেকে আসছে গুলির আওয়াজ।
আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে ওরা। থেমে গেছে আলাপ। ওদিকে উঁকি দিল ওরা।
দূরে দেখা গেল আঁধারে হেলমেটের ফ্ল্যাশলাইটের বাতি। ছায়ার মত ছোটাছুটি করছে মিত্রপক্ষের কয়েকজন। ব্যারেল ও বাক্সের মত পুরনো মাইনিং ইকুইপমেন্টের তৈরি এক ব্যারিকেডের আড়াল নিয়েছে তারা।
ওই ব্যারিকেডের ওদিকে গুরুত্বপূর্ণ এয়ার ভেন্ট।
বদ্ধ, চৌকো, নিচু ছাতের সুড়ঙ্গের এই দুনিয়া যেন চেপে বসতে চাইছে বুকের উপর। সামনে ফাঁকা জায়গা দেখে স্বস্তির ভাব এল ওদের মনে।
ওদিকটা কমপক্ষে সাততলা।
জ্বলজ্বল করছে ফসফরাস ফ্লেয়ার, যেন কোনও পাতাল ক্যাথেড্রাল।
ছাত ফুড়ে সোজা উঠেছে দশ মিটার চওড়া দুই এয়ার ভেন্ট। আর তার নীচে তুমুলভাবে লড়াই চলছে দুই দল যোদ্ধার।
কিলাই বাবাম্বার যোদ্ধারা পুরোপুরি প্রস্তুত।
প্রকাণ্ড গুহায় নিজেদের শক্তপোক্ত ব্যারিকেড তৈরি করেছে তারা। মিত্রবাহিনীর ব্যারিকেড অনেক নাজুক।
বাবাম্বার লোক ব্যবহার করেছে বড় সব মাইনিং ইকুইপমেন্ট। তার ভিতর রয়েছে পরিত্যক্ত সব ভেহিকেলের হেমিস্ফেয়ারিকাল ড্রিল, ফ্রন্ট-এণ্ড লোডার, কয়লাভরা টিপ-ট্রে ও পুরনো সাদা হামভির মত ট্রাক। শেষেরগুলো ড্রিফটরানার।
মিত্র ব্যারিকেডের পিছনে পৌঁছে গেল নিশাত, তিশা এবং ওদের সৈনিকরা।
গুহার আরেকদিকে শত্রুদল। সংখ্যায় কমপক্ষে এক শ জন। পরনে কাদাটে সাদা শার্ট ও ছেঁড়া প্যান্ট। কয়লার গুঁড়োর কারণে ভূতের মত লাগল লোকগুলোকে। নানান অস্ত্র তাদের হাতে।
একে-৪৭, এম-১৬এস এবং আরপিজি।
পাতাল-গুহায় পাহাড়ের উপর থেকে তাজা বাতাস আসছে, ফলে নিশ্চিন্তে গুলি ছুঁড়ছে।
তিশা এবং নিশাত আলাদা হয়ে গেল। ব্যারিকেডের দুপাশে অবস্থান নিয়েছে। মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের সংখ্যা বড়জোর বিশ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মালোয়েশিয়ার যোদ্ধা।
এদের নেতা ভারতীয় মেজর জয়ন্ত মিত্র খেয়াল করেছে নিশাত ও তিশার দল পৌঁছে গেছে।
একে বলে রক্তাক্ত দুঃস্বপ্ন! গুলির আওয়াজের উপর দিয়ে বলল সে। কোনওভাবেই সরবে না এরা! আর একটু পর পর… হায় রাম! ওই যে আসছে আরেকটা! অ্যাই, গুলি করে ফেলে দাও!
চট করে মিত্র ব্যারিকেডের উপর দিয়ে ওদিকে চাইল তিশা।
সামনের ব্যারিকেডের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক কিশোর বয়সী আফ্রিকান ছেলে, এখনও গোঁফ জন্মায়নি তার। ছিটকে এল মোটরসাইকেলে চেপে, বামহাতে একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল।
বাবা কিলাই বাবাম্বা! চিৎকার ছাড়ছে, সেসঙ্গে গুলিবর্ষণ।
তিশার মনে হলো, কিশোর সৈনিকদের ড্রাগে অভ্যস্ত করে তুলেছে ওয়ারলর্ড। নইলে এভাবে আত্মহত্যা করত না কেউ।
ছেলেটার বুকে ব্যাণ্ডেজের মত চার খণ্ড সি৪।
তাকে গেঁথে ফেলল উপমহাদেশীয় তিন সৈনিক। থেমে গেল। তাদের অটোমেটিক রাইফেল।
ছুটন্ত মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে গেল আত্মঘাতী কিশোর। মেঝেতে পড়তেই ভেসে উঠল একরাশ ধুলো, আর তখনই বিস্ফোরিত হলো দেহটা।
এক সেকেণ্ড আগে সে ছিল, পরের সেকেণ্ডে উধাও।
তিশার দিকে চাইল মেজর জয়ন্ত মিত্র। এরা পুরো উন্মাদ! একটু পর পর একজন একজন করে আসছে মরতে! তবে বড় কথা, আমাদের ব্যারিকেডের কাছে আসার আগেই শেষ করতে পারছি! বোধহয় পিছনে সাপ্লাই গুহা! জেনারেটার, গ্যাসোলিনের অভাব নেই, সঙ্গে প্রচুর খাবার, পানি আর অ্যামিউনিশন! মনে করি না আগামী এক বছরে ওরা নড়বে ওখান থেকে!
আমরা যদি এদেরকে ঘুরে পিছনে যাই? বলল তিশা, ডানদিকে একসারি সুড়ঙ্গের দিকে ইশারা করল।
না, ওদিকে বুবি-ট্র্যাপ! ট্রিপ ওয়ায়ার! ল্যাণ্ড মাইন! ওদিকে পাঠিয়ে শেষ করেছি আমার দুইজন ট্রেই সৈনিক! লড়াইয়ের জন্যে বেশ কদিন ধরে অপেক্ষা করছে এরা! মুখোমুখি লড়াই ছাড়া উপায় নেই। আমার আরও লোক দরকার!
তখনই দেখা গেল, পিছনের সুড়ঙ্গে অস্ত্রের ব্যারেলের ফ্ল্যাশলাইট।
ওদের অন্তত আরও বিশজন সৈনিক আসছে।
যাক, রিইনফোর্সমেন্ট, খুশি হয়ে বলল মেজর মিত্র।
রওনা হয়ে গেল সে।
ওদিকে চোখ রেখেছে তিশা, দেখল ওই দলের নেতার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল মেজর।
অবাক তো, ভাবল তিশা। কর্নেল উড বলেছিল পরের টিম আসবে কমপক্ষে বিশ মিনিট পর। তা হলে এরা এত দ্রুত পৌঁছায়…
তিশা দেখল, হাত নেড়ে ব্যারিকেড দেখাল মেজর মিত্র। পরিস্থিতি বোঝাতে শুরু করেছে। নতুন দলের দিকে পিঠ দিয়েছে। সে। আর তখনই নতুন দলের নেতা ঝট করে কী যেন বের করল বেল্ট থেকে। জিনিসটা চালাল মেজর মিত্রের ঘাড়ের উপর।
প্রথমে বুঝল না তিশা, কী ঘটছে। সামান্যতম নড়ল না মেজর জয়ন্ত মিত্র। পরক্ষণে সবই বুঝল তিশা, হতবাক হয়ে গেল।
ছিটকে একদিকে রওনা হয়েছে মেজরের মাথা। এক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে থেকে ধড়াস্ করে মেঝেতে পড়ল বেচারার প্রাণহীন ধড়।
চমকে যাওয়ারও সময় পেল না তিশা, গর্জে উঠেছে নতুন। দলের সাবমেশিনগান।
গুলি শুরু করেছে পিছন থেকে।
বিদ্যুদ্বেগে স্টিলের মিনি-স্কিপগুলোর ওপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ল তিশা। চারপাশে বিধছে বুলেট। এক সেকেণ্ড পর তিশার পাশে ঝাঁপিয়ে নেমে এল নিশাত এবং ওর দলের অন্য দুই সৈনিক।
মিত্রপক্ষের অন্যান্য অফিসার ও সৈনিকের কপাল এত ভাল নয়।
পিছন থেকে আসা বুলেটের ঝড় শেষ করে দিয়েছে সবাইকে খোলা জায়গায়। অসংখ্য রক্তাক্ত গর্ত তৈরি হয়েছে তাদের দেহে। থরথর করে কাঁপছে লাশগুলো গুলি খেয়ে।
আল্লা, এ কী! জং ধরা স্টিলের মিনি-স্কিপের দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়েছে তিশা।
ওরা আটকা পড়েছে দুই দলের মাঝে। একদল সামনে। একদল পিছনে। ওদের অবস্থা স্যাণ্ডউইচের মত।
আমাদের বাঁচতে হবে, তিশার কানের কাছে বলল নিশাত। এসো!
কোথায়, আপা?
এদিকে!
লাফ দিয়ে উঠে নিশাতের পাশে ছুটল তিশা।
পিছনে আসছে দলের দুই সৈনিক।
মিনি-স্কিপের ওদিকে দুই ব্যারিকেডের মাঝের সুড়ঙ্গ ধরে ছুটতে গিয়ে বেড়ালের ক্ষিপ্র গতি তুলল ওরা।
.
তিশা ও নিশাত যখন পাতাল-সুড়ঙ্গ ধরে ছুটছে; ওই একই সময়ে খনি-মুখে গুহার ভিতর ব্রেক কষে থামল রানা ও খবিরের লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল।
সামনের ড্রিফটের মেঝেতে রোলার কোস্টারের মত ট্র্যাক দেখল রানা। দূরে, বহু নীচে গেছে দুই সমান্তরাল লাইন। তখনই পাশের এক টানেল থেকে ছিটকে বেরোল দুই লোক।
ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল রানা, ও খবির, হাতে এমপি-৭ সাবমেশিনগান। একই কাজ করল লোকদুটো।
আফজাল না? জানতে চাইল রানা, কুঁচকে গেছে ভুরু। আফজাল হোসেন?
স্যর, আপনি? অস্ত্র নামিয়ে নিল ডানদিকের লোকটা। আরেকটু হলে আপনাকে খুনই করে ফেলতাম, স্যর!
এইমাত্র পাহাড়ের উপর কিলাই বাবাম্বার স্নাইপারদের শেষ করে ফিরেছে তারা।
আফজালের পাশের লোকটার নাম কৃষ্ণ গোপাল হাওলাদার।
লেফটেন্যান্ট তিশাকে খুঁজছি, বলল রানা। সে কোথায়?
নীচে, স্যর, বলল আফজাল।
তিরিশ সেকেণ্ড পর লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেলে চেপে, ঢালু ড্রিফট বেয়ে নীচে রওনা হয়ে গেল রানা, পাশে খবির। ভাগাভাগি করে বসেছে রিয়ার গানারের সিটে অন্য দুই সৈনিক।
দূরে গিয়ে পড়েছে এলএসভির হেডলাইট। তিরিশ ডিগ্রি ঢালু পথ, বুক চিরে রেলগাড়ির লাইন।
পথের শেষে পৌঁছে এলএসভির গিয়ার নিউট্রাল করল রানা, পরক্ষণে ব্যবহার করল ব্যাক গিয়ার। বনবন করে উল্টো ঘুরতে লাগল চাকাগুলো। নেমে যাওয়ার গতি কমছে।
রানার স্ট্যাটেজি কাজে এল, কয়েক সেকেণ্ডে কমে গেল নীচে যাওয়ার গতি। পরের দশ গজ যাওয়ার পর আবারও এলএসভির ফার্স্ট গিয়ার ফেলল রানা, গতি তুলল গাড়ির।
ড্রিফট টানেলের শেষে গোলকধাঁধার মত জায়গা। পাশ কাটাল ওরা নেপালি কমাণ্ডোর লাশ।
.
পুরোপুরি খোলা জায়গায় নিশাত, তিশা এবং ওদের দুই সৈনিক।
মাত্র তিরিশ গজ দূরে শত্রুদের ব্যারিকেড।
ওখানে রয়েছে কমপক্ষে দুই শ ড্রাগ অ্যাডিক্ট আফ্রিকান সৈনিক।
তিশাদের দলটাকে শেষ করে দেয়ার মস্ত সুযোগ তাদের। তিশা ধরেই নিয়েছে, এবার মরতে হবে ওদেরকে। কিন্তু মরতে হলো না।
অবশ্য গুলির আওয়াজ পেল তিশা। ওই গুলি শুরু হয়েছে শত্ৰুদলের ব্যারিকেডের পিছনে।
ভুরু কুঁচকে গেল তিশার। আগে কখনও এমন গোলাগুলির আওয়াজ শোনেনি।
গুলি চলছে বড় দ্রুত। অস্ত্রটা হতে পারে ছয় ব্যারেলের মিনি-গান। এরপর যা দেখল তিশা, অবাক না হয়ে পারল না। কিলাই বাবাম্বার ব্লকেড উড়ে যাচ্ছে গুলির ঝড়ে।
ব্যবহার করা হচ্ছে কমপক্ষে এক লাখ হাইপারভেলোসিটি বুলেট।
হুলুস্থুল পড়ে গেছে কিলাই বাবাম্বার বাহিনীর ভিতর। নিজেদের ব্যারিকেড টপকে পালাতে চাইছে সবাই। ছুটে আসছে নো-ম্যান্স-ল্যাণ্ড লক্ষ্য করে। পিট্টি খাওয়া কুকুরের মত ভেগে আসছে। একটু আগে একইভাবে তিশাদেরকে খতম করতে চাইছিল তারা।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার বুঝল তিশা।
ওদের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর একদল লোক ধাওয়া করেছে। ড্রাগ অ্যাডিক্ট টেরোরিস্টদেরকে।
নিজেদের ব্যারিকেড ফেলে পালাচ্ছে আফ্রিকানরা, কোমরে পিঠে-মাথায় বুলেট খেয়ে মরছে। নানাদিকে ছিটকে পড়ছে লাশগুলোর কাঁচা মাংস ও রক্ত।
ব্যারিকেড পেরুবার সময় টুকরো টুকরো হয়ে গেল এক আফ্রিকান টেরোরিস্ট। এক মুহূর্ত আগে সবুজ টার্গেটিং লেসার। স্থির হয়েছিল তার উপর।
সবুজ লেসার… ভাবল তিশা।
তিশা! পাশ থেকে চেঁচাল নিশাত, কী হচ্ছে বুঝতে পারছ?
বোধহয়, পাল্টা জানাল তিশা। আমরা এখানে দুই দল নই, কমপক্ষে চারটা দল! আপা, আসুন! জলদি!
কোথায় যাবে?
একটা কাজ নিয়েই তো এসেছি। আসুন, সেটা শেষ করি!
কুঁজো হয়ে নো-ম্যান্স্-ল্যাণ্ড ধরে ছুটতে লাগল নিশাত ও তিশা। ঢুকে পড়ল কনভেয়ার বেল্টের নীচে। ছুটছে বামদিকের এয়ার ভেণ্ট লক্ষ্য করে।
ভাসমান কনভেয়ার বেল্টের উত্তরাংশে পৌঁছে গেল, আর তখনই ব্যারিকেডের ওদিক থেকে তাড়া খেয়ে এল মাঝবয়সী চার টেরোরিস্ট।
তাদের তিনজন আছড়ে-পাছড়ে উঠল কয়েকটা বাক্সের উপর। ওগুলো রাখা ছিল সিঁড়ির ধাপের মত। উপরের বাক্স থেকে লাফ দিয়ে কনভেয়ার বেল্টে নামল তারা। চতুর্থজন টিপে দিল কন্সেলের পেটমোটা সবুজ বাটন।
সগর্জনে চালু হয়ে গেল কনভেয়ার বেল্ট।
পরের মুহূর্তে দেখা গেল, বেল্টের উপরে ওঠা তিন টেরোরিস্ট রওনা হয়েছে তুমুল গতি তুলে।
চলেছে মিত্র ব্যারিকেডের দিকে।
চতুর্থজন লাফিয়ে উঠল বেল্টে, সে-ও রওনা হলো দক্ষিণ দিক লক্ষ্য করে।
বেল্টের গতি দেখেছ! বলল নিশাত।
আপা, চলুন! শত্রু ব্যারিকেডের দিকে ছুটছে তিশা।
খোলা জায়গা পেরিয়ে পৌঁছে গেল ওরা মজবুত ব্যারিকেডের ওপাশে। জায়গাটা সাততলা ক্যাথেড্রালের মত।
মৃদু ওয়াটের ইলেকট্রিক সাদা বাতি জ্বলছে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ভুতুড়ে আলো।
পরিষ্কার ওরা বুঝল, কী কারণে ব্যারিকেড টপকে পালাতে চেয়েছে কিলাই বাবাম্বার সৈনিকরা।
হাজির হয়েছে কালো পোশাক পরা পনেরোজন কমাণ্ডো। চোখে সবুজ রঙের নাইট-ভিশন গগলস।
টেরোরিস্টদের পিছনে উত্তর-পুবের ছোট টানেল থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা।
তাদের হাতের অস্ত্র দেখে চমকে গেছে তিশা-নিশাত। ওই জিনিসের ভয়েই প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে টেরোরিস্টরা।
এ দলের সৈনিকের হাতে মেটালস্টর্ম এম১০০ অ্যাসল্ট রাইফেল।
রেল গান।
মেটালস্টর্ম অস্ত্রে সাধারণ মুভিং পার্ট থাকে না। প্রতিটি বুলেটের জন্য ট্রিগার হিসাবে কাজ করে র্যাপিড-সিকোয়েন্স ইলেকট্রিক শক। ফলে মাত্র এক মিনিটে ফায়ার করা যায় দশ হাজার গুলি। ধাতুর ঝড় তৈরি করে, কাজেই নাম হয়েছে অস্ত্রের মেটালস্টর্ম।
নতুন এই দলের লোকগুলোর চোখে ভুতুড়ে সবুজ লেসারসাইটিং ডিভাইস।
আপাতত এদের পরিচয় না পাওয়া পর্যন্ত তিশা ঠিক করল, এরা কৃষ্ণ-হরিৎ ফোর্স।
এদের একটা বিষয় বড় অস্বাভাবিক।
এরা পাত্তাই দিচ্ছে না ওদেরকে। তাড়া করছে পলায়নরত টেরোরিস্টদের।
চারপাশে হুলুস্থুল।
এই সুযোগে বামের এয়ার ভেণ্টের ধুলোময় মেঝেতে পৌঁছল তিশা। ব্যস্ত হাতে বসাল মেঝেতে নাক উঁচু করা মর্টার লঞ্চার।
একমিনিট পর গলা উঁচিয়ে বলল তিশা: ক্লিয়ার! টিপে দিল ট্রিগার।
জোরালো হুম্প আওয়াজ তুলে আকাশে রওনা হলো মর্টার রাউণ্ড। রকেটের মত উধাও হলো এয়ার ভেণ্ট ধরে।
পরক্ষণে পাহাড়ের উপর থেকে এল বিকট বুম! আওয়াজ।
ছয় শ ফুট উপরের পাহাড়ে আঘাত হেনেছে মর্টার শেল।
হাজারো টুকরো হয়ে উড়ে গেল কিলাই বাবাম্বার দলের বসানো ক্যামোফ্লেজ ঢাকনি।
ঝরঝর করে নীচে পড়ল আবর্জনা। একই সময়ে গুহার ভিতর এল ধূসর প্রাকৃতিক আলো।
আবর্জনার বৃষ্টি শেষে আবারও সামনে বাড়ল তিশা, ওকে ঘিরে রেখেছে দলের অন্যরা। দেরি না করে শাফটের নীচে বসিয়ে দিল তিশা আধুনিক কমপ্যাক্ট লেসার ডাইয়োড।
টিপে দিল সুইচ।
সঙ্গে সঙ্গে চিমনি থেকে বেরিয়ে আকাশ স্পর্শ করল অত্যুজ্জ্বল রক্তিম লেসার বিম।
অল ইউনিটস, নিশাত সুলতানা বলছি, রেডিয়ো করল নিশাত। আপনারা মনোযোগ দিন! সেট করা হয়েছে লেসার! দশ মিনিটের ভেতর হাজির হবে বোমারু বিমান! এবার ত্যাগ করুন খনি এলাকা!
.
ইউএন-এর সামরিক শিবিরে কন্সেলের সামনে পিঠ সোজা করে বসল কমিউনিকেশন অফিসার। হড়বড় করে বলল, কর্নেল! খনি থেকে বেরুচ্ছে টার্গেটিং লেসার। আমাদের কাজ শেষ।
এক পা সামনে বাড়ল কর্নেল উড।
সি-১৩০-এর সঙ্গে যোগাযোগ করো, জানিয়ে দাও ওরা লেসার পাবে। এভ্যাকিউয়েশন ক্রুদের বলো খনির-মুখে অপেক্ষা করতে। কেউ বেরোলে সরিয়ে নেবে। দশ মিনিট পর ইতিহাস হবে ওই খনি। সবাইকে আশপাশ থেকে সরে যেতে বলো।
.
একইসঙ্গে ঘুরে চাইল নিশাত, তিশা এবং ওদের দুই সৈনিক।
ওরা রয়ে গেছে কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেডের পিছনে। এবার বেরিয়ে যেতে হবে খনি-মুখের ঢালু পথ ধরে। মাত্র কয়েক গজ যেতেই থামতে হলো ওদেরকে। কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেডের সামনে নো-ম্যানস্-ল্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে চার টেরোরিস্ট। তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে কৃষ্ণ হরিৎ ফোর্স। মেটালস্টর্ম রাইফেলের বিম পড়ছে শত্রুদের মুখে।
ব্যারিকেডের পিছন থেকে উঁকি দিল তিশা।
কৃষ্ণ-হরিৎ দলের নেতা সামনে বাড়ল, খুলে ফেলল স্কি মাস্ক। নামকরা পুরুষ মডেলদের মত দৃঢ় চোয়াল, সত্যিকারের হ্যাণ্ডসাম। দুচোখ নীল। টেরোরিস্টদের একজনকে বলল, তুমি আলাল? …আলাল হোসেন?
থুতনি বাঁকা করে ঘাড় কাত করল আরব।
আমিই আলাল হোসেন, আড়ষ্ট স্বরে বলল, তুমি চাইলেও আমাকে খুন করতে পারবে না।
কৃষ্ণ-হরিৎ দলের নেতা জানতে চাইল, কেন পারব না?
কারণ আমার রক্ষাকারী স্বয়ং আল্লা, বলল আলাল হোসেন। তুমি জানো না? আমাকে পাঠানো হয়েছে মুসলিম জাহানকে উদ্ধার করতে! গলা চড়ে গেল তার, রাশানদের জিজ্ঞেস করো! মুজাহিদিনদের শেষ করেছে, তাজিক জেলখানায় পাতাল-ঘরে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে কিন্তু ঠিক ছিলাম আমি। জিজ্ঞেস করো আমেরিকানদের! আফ্রিকান এম্বেসির ওপর ক্রজ মিসাইল হামলা হলেও আমি ছিলাম পুরো সুস্থ! গলা আরও চড়ছে তার, জিজ্ঞেস করো মোসাদকে! ওরা জানে! তাদের বারোজন আততায়ী আমাকে খুন করতে চেয়ে খতম হয়ে গেছে নিজেরাই! দুনিয়ায় কোনও বাপের ব্যাটা নেই যে আমাকে খুন করতে পারে! আমাকে পাঠানো হয়েছে আল্লার তরফ থেকে! আমি আল্লার বার্তাবাহক! কেউ পারবে না আমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে!
তুমি ভুল ভাবছ, নরম স্বরে বলল কৃষ্ণ-হরিৎ দলের নেতা। পরক্ষণে এক হাতে আলালের চুলের ঝুঁটি চেপে ধরল সে। বলল, দ্যাখো, পারে কি না!
বলেই ডানহাতের ম্যাচেটি চালিয়ে ঘঁাচ করে কেটে নিল কল্লাটা। লাশ মেঝে স্পর্শ করবার আগেই ঘুরে দাঁড়াল সে।
বিস্ফারিত হলো তিশার চোখ।
সামান্য হাঁ হয়ে গেছে নিশাত।
দশ
চেয়ে আছে তিশা ও নিশাত।
অলসভঙ্গিতে আলাল হোসেনের কাটা মাথা সাদা মেডিকেল বাক্সের ভিতর রাখল কৃষ্ণ-হরিৎ দুলের নেতা।
আস্তে করে শ্বাস ফেলল নিশাত। এখানে হচ্ছে কী, তিশা?
জানি না, আপা, বলল তিশা। জানার সময়ও নেই, বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।
পিছনে পায়ের ধুপ-ধাপ আওয়াজ পেয়ে ঘুরে চাইল ওরা।
ওদের দিকেই আসছে একদল আফ্রিকান টেরোরিস্ট, লক্ষ্য কনভেয়ার বেল্ট। বিকট শব্দে চিৎকার জুড়েছে, মাথার উপর তুলে রেখেছে গুলিশূন্য একে-৪৭।
পিছন থেকে তেড়ে আসছে একদল কৃষ্ণ-হরিৎ কমাণ্ডো। তিশার গুলিতে ছিটকে পড়ল চার টেরোরিস্ট।
একই কাজ করল নিশাত, গুলি করে ফেলে দিল তিন। আফ্রিকান সৈনিককে। দুই মহিলা অফিসারের দুই সৈনিক কোনও সুযোগ পেল না, তার আগেই ধাক্কা খেয়ে পদ দলিত হলো। ওদের গায়ের উপর দিয়ে ছুটে গেল লোকগুলো। শেষ কজন রাইফেলের কুঁদো ব্যবহার করেছে তিশাদের সৈনিকদের মাথার উপর। চাপা পড়েছে বেচারাদের মরণ আর্তনাদ।
এরা অনেক! তিশা বলল নিশাতকে। বামদিকে ডাইভ দিল নিজে, সরে গেল বাবাম্বার সৈনিকদের সামনে থেকে।
ওদিকে বাক্সগুলোর উপর উঠছে নিশাত, তারই ফাঁকে গুলি ছুঁড়ল শত্রু লক্ষ্য করে। অবশ্য তা কসেকেণ্ডের জন্য মাত্র, তারপর টেরোরিস্টদের ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল চলন্ত কনভেয়ার বেল্টের উপর।
টেরোরিস্টদেরকে কনভেয়ার বেল্টে চেপে পালাতে দেখে অবাক হয়েছে কৃষ্ণ-হরিৎ দলের কমাণ্ডেরা।
তাদের একজন চলে গেল বেল্টের কন্ট্রোল কন্সেলের সামনে, টিপে দিল বড়সড় হলদে বাটন।
গুহার ভিতর আরও বাড়ল যান্ত্রিক গর্জন। ধুলোময় মেঝে থেকে ঘুরে চাইল তিশা।
মিত্রবাহিনীর ব্যারিকেডের ওদিকে কনভেয়ার বেল্টের শেষে। চালু হয়ে গেছে পাথর-ভাঙা প্রকাণ্ড এক মেশিন।
জিনিসটা মস্ত দুটো রোলার, মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেঙে পড়বে কনভেয়ার বেল্টে রাখা পাথর।
রোলারদুটোর গায়ে হাজার হাজার দাঁত। চোখ বড় বড় করে চেয়ে রইল তিশা।
প্রাণ বাঁচাতে কনভেয়ার বেল্টে উঠেছে টেরোরিস্টরা, এবং এদের মাঝে আটকা পড়েছে নিশাত আপা।
এখন আর নামতে পারবে না। সাই-সাই করে ছুটে চলেছে রক ক্রাশারের ঘুরন্ত পাথর-ভাঙা মেশিন ষাট গজ দূরে। ওদিকে গুলি শুরু করল নিশাত। কিন্তু তিশা দেখল, খপ করে নিশাতের দুই হাত ধরে ফেলেছে দুই টেরোরিস্ট। তিনজনই হুড়মুড় করে পড়ল বেল্টের উপর।
কনভেয়ার বেল্ট থেকে লাফিয়ে নামছে বাবাম্বার লোক। কিন্তু নিশাতকে আটকে রাখা দুজন পুরো নেশাগ্রস্ত। জাপ্টে ধরেছে ক্যাপ্টেনকে।
দ্রুত চলছে কনভেয়ার বেল্ট, রক ক্রাশারের সামনে পৌঁছে আবারও ফিরছে তলা দিয়ে। বেল্টের গতি ঘণ্টায় কমপক্ষে তিরিশ ১ কিলোমিটার প্রতি সেকেণ্ডে আশি মিটার।
হাতাহাতি করতে গিয়ে অস্ত্র হারিয়ে বসেছে নিশাত, লড়বার ফাঁকে পরিষ্কার বাংলায় চিৎকার করল, শুয়োরের বাচ্চারা! ছয় ফুটি শরীরে ষাঁড়ের শক্তি ওর, ঠেকিয়ে রেখেছে দুই শত্রুকে–কিন্তু বাগে আনতে পারছে না।
তোরা ভেবেছিস মেরে ফেলবি, না? ডানদিকের লোকটার মুখে থুতু ফেলল নিশাত। জীবনেও পারবি না!
উঠে দাঁড়িয়েই বামপাশের জনের অণ্ডকোষে কষে লাথি দিল ও। আর্তনাদ করে উঠল টেরোরিস্ট। খপ করে তার হাত ধরল নিশাত, টান দিয়ে কাঁধের উপর দিয়ে ছিটকে ফেলল রক
ক্রাশারের দিকে। পাথর-ভাঙা মেশিন মাত্র বিশ গজ দূরে।
আড়াই সেকেণ্ডে রক ক্রাশারে পৌঁছবে টেরোরিস্ট। অন্তর থেকে বুঝল নিশাত, এবার নেমে পড়তে হবে। কিন্তু দুহাতে ওকে জাপ্টে ধরল দ্বিতীয় লোকটা, ফেলে দিল। বেল্টের উপর।
রক ক্রাশারের দিকে পিছন ফিরেছে টেরোরিস্ট। দ্রুত সামনে বাড়ছে বেল্ট।
পেটে ভর করে শুয়ে আছে নিশাত। যদি ঢেকে রক ক্রাশারে, আগে ঢুকবে ওর মাথা।
আবারও ওকে জড়িয়ে ধরল লোকটা, যেন ধর্ষণ করবে।
ছাড়, শুয়োরের বাচ্চা! চেঁচিয়ে উঠল নিশাত।
কিলাই বাবাম্বার সৈনিক ঢুকছে রক ক্রাশারের ভিতর। মারা যাওয়ার সময় কিচকিচ আওয়াজ তুলল ইঁদুরের মত।
চোখের সামনে রক্তের বিস্ফোরণ দেখল নিশাত। ভিজে গেল গোটা মুখ। তখনই হঠাৎ বুঝল সব।
ফুরিয়ে গেছে সময়। অনেক দেরি করে ফেলেছে। এবার মরবে ও! ধীর হয়ে গেল সময়।
এখনও নিশাতের হাত আঁকড়ে ধরে আছে টেরোরিস্ট, রক ক্রাশারের ভিতর ঢুকে গেছে দুপা। তারপর কোমর এবং…
খুব কাছ থেকে দেখল নিশাত, খপাৎ করে লোকটাকে গিলে ফেলল মেশিন। এক সেকেণ্ডে উধাও হলো সাড়ে ছয় ফুটি দেহ।
প্লাৎ শব্দে নানাদিকে ছিটকে গেল আঠালো রক্ত।
দ্বিতীয়বার ভিজে গেল নিশাতের মুখ। কয়েক ইঞ্চি দূরে রোলারদুটো, দেখল নিশাত। চোখে পড়ল রক্তে ভেজা প্রতিটি এবড়োখেবড়ো দাঁত। নিশাতের হাতদুটো ঢুকছে মেশিনের ভিতর। আর তখনই কে যেন হ্যাচকা টানে তুলে নিল ওকে শূন্যে। নীচে বনবন করে ঘুরছে রক ক্রাশার!!
কনভেয়ার বেল্টের মাত্র দু ইঞ্চি উপরে টেনে তুলেছে। নিশাতকে, ফলে এখন আর সামনে বাড়ছে না ও।
ভুরু কুঁচকে ফেলল নিশাত
ভঙ্গিটা এমন: জরুরি কাজে বাগড়া দেয়া কেন!
একহাতে উপরের স্টিল ওভারহেড বিম ধরে ঝুলছে কে যেন, অন্য হাতে ধরেছে নিশাতের কলারের বডি আর্মার।
আপা, একবার আমাকে বলেছিলেন: আমাদের ফেলে কোথায় চলেছ, বলল মাসুদ রানা। ওই কথা তো এখন আমিও জানতে চাইতে পারি।
পাঁচ সেকেণ্ড পর শক্ত জমিতে নামল নিশাত। ঝুপ করে ওর পাশে নামল রানা। ওদের কাভার দিল খবির, আফজাল ও কৃষ্ণ গোপাল। একটু দূরে মিত্রবাহিনীর ব্যারিকেডের কাছে ওদের লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল।
তিশা কোথায়? হৈ-চৈয়ের ভিতর জানতে চাইল রানা।
ওদিকের ব্যারিকেডের কাছে, জানাল নিশাত।
ওদিকে চাইল রানা।
স্যর, কী হচ্ছে এখানে? জানতে চাইল নিশাত, এরা কারা?
এখনও জানি না এরা কারা, এবং কী হচ্ছে, বলল রানা।
শুধু জানি এরা বাউন্টি হান্টার। তাদের একদল খুঁজছে তিশাকে।
খপ করে রানার কনুই ধরল নিশাত। স্যর, খারাপ খবর! বোমারু বিমানের জন্যে টার্গেটিং লেসার বসিয়ে দিয়েছি আমরা! আমাদের হাতে… চট করে হাতঘড়ি দেখল ক্যাপ্টেন। আর মাত্র আট মিনিট! এর পর উড়ে যাবে খনি একুশ হাজার পাউণ্ডের বোমার আঘাতে!
তার আগেই তিশাকে খুঁজে বের করতে হবে, বলল রানা।
.
কিলাই বাবাম্বার লোকদের স্ট্যাম্পিড থামার পর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে তিশা আর তখনই দেখল কয়েকটা সবুজ লেসার বিম পড়ল ওর বুকের আর্মারের উপর।
মুখ তুলে চাইল তিশা। ঘিরে ফেলা হয়েছে ওকে।
এরাও কালো-সবুজ ফোর্স। দলে ছয়জন, তাক করেছে মেটালস্টর্ম রাইফেল।
এদের একজন এগিয়ে এল সামনে। হেলমেট খুলতেই দেখা গেল তার মুখ।
ওই মুখ জীবনে ভুলবে না তিশা।
কখনও না!
এ লোক যেন উঠে এসেছে হরর সিনেমা থেকে। ।
অতীতে ভয়ঙ্করভাবে পুড়ে গিয়েছিল মাথা। বিকটভাবে কুঁচকে গেছে করোটির চামড়া, সেখানে ফোস্কার মত সব ফুসকুড়ি, একটা চুলও নেই। গলে চোয়ালে মিশে গেছে কানের লতির নীচের অংশ।
কিন্তু এখন খুশিতে চকচক করছে লোকটার চোখ।
তুমি লেফটেন্যান্ট তিশা করিম, তাই না? ভদ্র সুরে বলল। তিশার হাত থেকে সরিয়ে নিল এমপি-৭।
জ্ব-জী, বলল বিস্মিত তিশা।
প্রথম কৃষ্ণ-হরিৎ দলের নেতার মতই এ লোকের উচ্চারণ ব্রিটিশ। বয়স হবে চল্লিশ। অভিজ্ঞ। চতুর।
তিশার পিঠের খাপ থেকে ম্যাগক সরিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে।
ওটা রাখতে দিতে পারি না, কী বলো, ডার্লিং, পারি? …তিশা করিম, তোমার বয়স চব্বিশ। চতুর হরিণী বলা হয় তোমাকে। আর্মি ট্রেইনিং ক্লাসে প্রথম হয়েছিলে। বাংলাদেশ আর্মির সঙ্গে আছ। সাহায্য করেছ আমেরিকান মেরিন অভিযানে। তার চেয়েও বড় কথা: তোমাকে খুবই পছন্দ করে বিসিআই এজেণ্ট মাসুদ রানা।
আপাতত তুমি কাজ করছ কর্নেল ক্লিণ্ট ওয়াই, উডের সঙ্গে। …আর এবার বলছি আমার নাম: আমি ডেভিড এন. হেন্ড্রিক। কলসাইন: দ্য ডেভিল। এরা আমার লোক, আমরা কাজ করছি। কন্টিনেন্টাল সোলজার নামের বাউন্টি হান্টারদের সংগঠনে। আমাদের ইউনিট নম্বর ৬৬। আশা করি তুমি রাগ করবে না; আপাতত কিছু দিনের জন্যে তোমাকে সরিয়ে নেব আমরা।
ডেভিলের কথা শেষ হতেই পিছন থেকে একহাতে তিশাকে জড়িয়ে ধরল এক বাউন্টি হান্টার, অন্যহাতে ভেজা রুমাল। নাক মুখে চেপে ধরল ট্রাইক্লোরোমিথেন (ক্লোরোফর্ম)। চোখের সামনে লাল-নীল-সাদা নক্ষত্র দেখল তিশা, ঝটকা-ঝটকি করল পাঁচ সেকেণ্ড, তারপর জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ল।
ডেভিলের পাশে এসে থামল সুদর্শন সেই লোক। এ-ই কেটে নিয়েছে আলাল হোসেনের মাথা। এখন লোকটার হাতে তিনটে মাথা রাখা যাবে এমন এক মেডিকেল ট্রান্সপোর্ট কন্টেইনার।
স্যর, ডেভিলকে বলল, এখন আমাদের হাতে আলাল, কোসলোস্কি আর ক্যাপলানের মাথা থাকার কথা। কিন্তু ক্যাপলানের মাথা আগেই উধাও। আমার ধারণা, তাকে শিকার করেছে কোবরা ইউনিটের লোক।
চিন্তিত চেহারায় মাথা দোলাল হেন্ড্রিক। হুম, মেজর পেরোনভ আর ওর স্পেন্যায কোবরা ইউনিট। …ডার্কহ্যাম, ভাল দেখিয়েছ তুমি। এই অভিযানে যথেষ্ট মাথা পেয়েছি আমরা। তিশার অচেতন দেহের দিকে চাইল। আর এ মেয়ের কারণে হয়তো পাব আরেকটা পুরস্কার। সবাইকে জানিয়ে দাও, পিছন-দরজা দিয়ে বেরোব। দেরি না করে উঠতে হবে বিমানে। একটু পর বোমা পড়বে খনির ওপর। রওনা হয়েছে আমেরিকান বমার।
.
বাঁক নিল রানার লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল, কড়া ব্রেক কষে থামল কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেডের কাছে। চারপাশে ছড়িয়ে গেল ধূসর ধুলো।
লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামল রানা, নিশাত, খবির, আফজাল এবং কৃষ্ণ। অস্ত্র হাতে খুঁজতে শুরু করেছে তিশাকে।
আপা, বোমা পড়তে কতক্ষণ বাকি? জানতে চাইল রানা।
ছয় মিনিট, স্যর!
আশপাশে কোথাও দেখা গেল না তিশাকে।
কালো-সবুজ দল অদৃশ্য হয়েছে।
কেউ নেই কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেডের ওদিকে। লড়াই শেষ। পড়ে আছে অসংখ্য লাশ।
কনভেয়ার বেল্টের কাছেই ব্যারিকেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিশাত। আস্তে করে মাথা দোলাল। তিশাকে শেষবার এখানে দেখেছি তখন এক টেরোরিস্টের মাথা কেটে নিল সুন্দর দেখতে এক লোক। তাদের দলের সবার পরনে ছিল কালো ইউনিফর্ম। সবুজ লেসার ফেলছিল। তখনই ওদিক থেকে পালাতে লাগল। কিলাই বাবাম্বার সৈনিকরা।
মস্ত গুহার উত্তর-পুব কোনা দেখাল নিশাত। ওদিকে রয়েছে এয়ার ভেন্ট। ওপাশে গ্যারাজের দরজাঁর মত এক টানেল।
ওখানে আরও কিছু দেখেছে রানা, মেঝের উপর একটা ম্যাগহুক।
দ্রুত পায়ে গিয়ে ম্যাগহুক তুলে নিল রানা, অস্ত্রের উপর সাদা মার্কার কলম দিয়ে লেখা: তিশা করিম।
এটা তিশার ম্যাগহুক। অর্থাৎ, ওকে ধরে নিয়ে গেছে বাউন্টি হান্টারের একটা দল, পরে নিশ্চয়ই যোগাযোগ করবে ওর সঙ্গে।
অস্ত্রটা বেল্টে আটকে নিল রানা। ফিরে চলল সবার উদ্দেশে। নিশাতের ভাঙা কথা শুনতে পেল: …হ্যাঁ, এদিকে চতুর্থ দল এসেছে।
চতুর্থ দল, আপা? জানতে চাইল রানা। তারা কারা?
খনির ভেতর আমরা চারটা দল ছিলাম, বলল নিশাত। ইউএন-এর ফোর্স, কিলাই বাবাম্বার সৈনিক, কালো পোশাক পরা সবুজ লেসারওয়ালা ওরা, আর চতুর্থ আরেক দল। ওই দল মিত্রবাহিনীর ব্যারিকেডের কাছে ব্রিটেনের এসএএস বাহিনীর ক্যাপ্টেন স্কট এম. ক্যাপলানকে পায়।
মেরে ফেলেছে তাকে? জানতে চাইল রানা।
মাথা কেটে নিয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল রানা, তারপর বলল, তা হলে ওরা বাউন্টি হান্টার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: চতুর্থ দল কোথায়?
স্যর… মনে হয় ওরা এখানেই… শুরু করেও থেমে গেল খবির।
কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেডের চারপাশে ভূতের মত উদয় হয়েছে একদল লোক। সংখ্যায় কমপক্ষে বিশজন। পরনে কাদাটে রঙের ফ্যাটিগ। মুখে স্কি-মাস্ক। পায়ে হলদে রাশান কমব্যাট বুট। আফ্রিকান ওয়ারলর্ডের সৈনিকদের ব্যারিকেডের সামান্য দূরে তাদের ড্রিফটরানার ভেহিকেল।
বেশিরভাগ কমাণ্ডোর হাতে ভয়ঙ্করদর্শন খাটো ব্যারেলের ভিযেড-৬১ স্করপিয়ন মেশিন পিস্তল।
রাশান স্পেৎন্যাযের স্পেশাল ফোর্স ব্যবহার করে ওই অস্ত্র। রানার দলকে বাগে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা।
ঘিরে ফেলা দলটি থেকে সরে এল এক লোক। কাঁধের বার এর কারণে বোঝা গেল, সে মেজর। কঠোর সুরে বলল, হাত থেকে ফেলোলা অস্ত্র।
এক পলক দ্বিধা করল রানা, তারপর হাতছাড়া করল অস্ত্র। ওর দেখাদেখি অন্যরাও। এবার রানার দিকে এল দুই স্পেন্যায সোলজার। দুপাশ থেকে রানার দুই হাত ধরল তারা, মুচড়ে ঠেলে দিল পিঠের উপর।
মেজর রানা, তোমাকে দেখে খুশি হলাম, বলল স্পেন্যায় মেজর। আমাদের ইন্টেলিজেন্স বলেনি তুমি এই সাইটে থাকবে। মন্দ লাগছে না বাড়তি বোনাস পেয়ে। তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার খারাপ কী? তা ছাড়া, ভাল লাগছে সম্মানের কথা ভেবে। আমার হাতে বিদায় নেবে দুনিয়া-সেরা গুপ্তচর।
রানার দিকে চেয়ে আছে রাশান মেজর। তবে সবাই বোধহয় বাড়তি প্রশংসা করত। …ঠিক আছে, এবার বসে পড়ো হাঁটু গেড়ে, হাতদুটো মাটিতে।
না বসে দাঁড়িয়েই রইল রানা। মাথা কাত করে দেখাল তিশার বসানো লেসার ডাইয়োড়। ওদিকে ওই ডিভাইসটা দেখেছ? ওটার কারণে হাজির হবে লেসার গাইডেড একুশ হাজার পাউণ্ডের একটা বোমা। আর বড়জোর পাঁচ মিনিট, তারপর… আমি বলছি, হাঁটু গেড়ে বসো! চিৎকার করে বলল রাশান মেজর।
ক্যাথেড্রালের মত জায়গায় ভেণ্টের ঠিক নীচে ও। ধূসর আলো আসছে উপর থেকে।
রানার ডান হাঁটুর পিছনে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে আঘাত করল এক বাউন্টি হান্টার। ধপ করে বসতে হলো ওকে।
পিঠের খাপ থেকে সড়াৎ আওয়াজে খাটো কসাক ফাইটিং তলোয়ার নিল রাশান মেজর। আবছা আলোয় চকচক করছে তীক্ষ্ণধার ইস্পাতের ফলা।
সত্যি বলতে কি, হতাশই হয়েছি, রানার দিকে এগুতে শুরু করেছে মেজর, ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে চলেছে তলোয়ার। ভেবেছিলাম অনেক কষ্টে বাগে পাব তোমাকে। এখন দেখছি, তুমি শালা একেবারেই কিছুই নও।
দুহাতে-হ্রাতল ধরে মাথার উপর তলোয়ার তুলল সে। মাথাটা সামান্য একটু ঝকাল রানা নিশাতের উদ্দেশে। ঝপ করে বসে পড়ল নিশাত, হাতে তুলে নিয়েছে ফেলে দেয়া অস্ত্র। সাই করে নামছে ক্ষুরধার তলোয়ারের ফলা। ঠিক তখনই চরকির মত ঘুরে মেজরকে ল্যাং মারল রানা। লোকটা ধুপ করে পড়তেই থাবা মেরে কেড়ে নিল কসাক তলোয়ার, একইসময়ে তার কোমরের হোলস্টার থেকে তুলে নিয়েছে পিস্তল। গুলি শুরু করবে, এমন সময়…
বাউন্টি হান্টারদের ওপর স্থির হলো নীল লেসারের ফোঁটা। পরক্ষণে উড়ে গেল দুই গার্ড। ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে গুলির আঘাতে।
ঝট করে ঘুরে চাইল রানা, উঠে দাঁড়িয়েছে। তলোয়ার ফেলে একহাতে ঘাড় ধরে টেনে তুলল রাশান মেজরকে। অন্য হাতে পিস্তল, মাযল ঠেকিয়ে দিয়েছে শত্রুর কপালে।
প্রত্যেকের চোখ স্থির হয়েছে বিশেষ এক লোকের উপর।
খোলা জায়গায় এয়ার ভেন্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে সে, যেন মস্ত কোনও বাদুড়। দুই হাতে দুটো রুপালি রেমিংটন শটগান। এমনভাবে ধরেছে, যেন ভারী বন্দুক নয়, ছোট্ট দুটো পিস্তল। শটগানের ইস্পাতের ব্যারেলে হাইটেক নীল লেসার সাইটিং ডিভাইস।
দুপাশে ট্রাইপডে তৈরি রিমোট অপারেটেড এফএন-এমএজি মেশিনগান। নাকের উপর নীল লেসার সাইট। একটা লেসার। পড়েছে স্পেন্যায মেজরের বুকে। অন্যান্য লেসার ঘুরছে রাশান ট্রপের উপর।
নতুন এই আগন্তুককে চিনে ফেলেছে রানা। কুয়াশা! চোখে অ্যান্টি-ফ্ল্যাশ গগলস।
রানা খেয়াল করল, এয়ার ভেন্টে নেমেছে পুরু দড়ি। চোখের সামনে সড়াৎ করে উপরে রওনা হয়ে গেল ওটা, যেন ভুতুড়ে কোনও ভয়ঙ্কর সাপ।
মিখাইল পেদরোনভ, গমগম করে উঠল কুয়াশার গম্ভীর কণ্ঠ, আবারও দেখা হলো।
মনে হলো না কুয়াশাকে দেখে খুশি হয়েছে রাশান মেজর। লক্ষ্য করেছে, তার নিজের বুকে নীল লেসারের বিন্দুটা সম্পূর্ণ স্থির। চুপ করে রইল সে।
নীল লেসারের আওতা থেকে দূরে সরে দাঁড়াল রানা।
সামনে বাড়ল কুয়াশা। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত স্পেন্যায ইউনিটের মাঝ দিয়ে এগুতে শুরু করেছে, পাত্তাই দিচ্ছে না কাউকে।
রানা দেখল, কুয়াশার আলখেল্লার বুকে-পেটে কমপক্ষে বিশটা পকেট। ফুলে আছে দুপাশের পকেটগুলোও। বেরিয়ে আছে দুএকটা মিলিটারি ডিভাইসের ডগা। তার ভিতর রয়েছে। হ্যাণ্ডকাফ, মাউন্টেন ক্লাইমিং পিটন, হাতে ধরা যায় এমন ছোট একটা স্কুবা ট্যাঙ্ক বা পনি বটল। এমন কী বাদ পড়েনি খুদে ওয়েল্ডিং টর্চও।
কখন কী লাগে বলা যায় না, রানার উদ্দেশে পরিষ্কার বাংলায় বলল কুয়াশা।
রাশান এক ট্রুপারকে পাশ কাটাতে শুরু করেছে বাঙালি বৈজ্ঞানিক, তখনই হঠাৎ অস্ত্র তুলল লোকটা।
কড়াৎ আওয়াজে গর্জে উঠল অস্ত্র। ঝলসে উঠল আগুন।
অন্ততঃবিশটা গুলি বুকে নিয়ে ছিটকে পড়ল রাশান ট্রপার।
ঘুরন্ত রোবোট মেশিনগান ঝিরঝির আওয়াজ তুলল, তার আগেই আবারও নল তাক করেছে আরেক দিকে।
মনে হলো না কুয়াশা চিন্তিত, সোজা এসে দাঁড়াল রানা এবং রাশান মেজরের সামনে। মৃদু হাসল রানার দিকে চেয়ে। দেখছি কোবরা ইউনিটের দেখা পেয়ে গেছ। মেজর পেরোনভের আচরণে কষ্ট পেয়ো না। দুদিন ধরে মানুষের মাথা কাটার কাজ নিয়েছে। …আর আমি এসেছি আকাশে তিশাদের লেসার দেখে। …এবার কাজের কথায় আসা যাক: বোমা পড়বে কখন?
রানা মুখ খুলবার আগেই বলল নিশাত, সাড়ে চার মিনিট পর। আরেকবার হাতঘড়ি দেখে নিল ও।
মিস্টার ফগ, আপনি যদি মাসুদ রানার মাথা নেন, আমরা আপনাকে দুনিয়ার শেষমাথা পর্যন্ত ধাওয়া করব, হুমকির সুরে বলল মেজর পেরোনভ। নিজ হাতে আপনাকে খুন করব।
মিখাইল, আরও গম্ভীর হয়ে গেল কুয়াশার কণ্ঠ: জেনে রাখো, তুমি সারাজীবন চেষ্টা করলেও আমার একটা চুল স্পর্শ করতে পারবে না।
জানেন, এখনই আপনাকে শেষ করে দিতে পারে আমার লোক?
তার আগেই তোমাকে মরতে হবে, মিখাইল, বলল কুয়াশা। দরাজ গলায় হেসে উঠল। দেখলে না, সে চেষ্টা করতে গিয়ে তোমার লোকটার কী দশা হলো? উপায় নেই, মেজর। ভাল। যোদ্ধা, কিন্তু বাস্তবে তুমি একটা সাইকোটিক পেশেন্ট। মানুষ মারতে পছন্দ করো, কিন্তু মরতে খুব আপত্তি আছে তোমার। মরণকে ভীষণ ভয় তোমার। কিন্তু আমার কথা আলাদা, মরতে আমার দ্বিধা নেই।
কথাগুলো হজম করতে গিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল মেজর পেরোনভের মুখ, সবই শুনেছে তার লোক।
রানা টের পেল, রাশান মেজরকে হালকাভাবে উড়িয়ে দিয়েছে প্রতিভাবান বাঙালি বৈজ্ঞানিক।
এসো, রানা, মেঝে থেকে এমপি-৭ তুলে রানার হাতে ধরিয়ে দিল কুয়াশা। তোমার দলের সবাইকে বলো, আমার সঙ্গে যেতে হবে।
দ্বিতীয় দফা গুলিবর্ষণ হলো না, স্পেন্যায ইউনিটকে এড়িয়ে কুয়াশার পিছনে রওনা হয়ে গেল রানার দল।
ইনি কে, স্যর? রানার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল নিশাত।
পেরোনভের পিস্তলটা দূরে ছুঁড়ে ফেলল রানা, নিচু স্বরে বলল, এমন এক বাঙালি বৈজ্ঞানিক, যাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে বাংলাদেশ–কিন্তু অতীতে কিছু কারণে এঁকে খুঁজছিল পুলিশ।
পরে রানার কাছ থেকে ওসব জেনে নিয়ো, মেয়ে, বলল কুয়াশা। শুধু জেনে রাখো, আমি তোমাদের ক্ষতি চাই না।
ওরা পৌঁছে গেছে পুবে কিলাই বাবাম্বার ব্যারিকেড়ের কাছে। ওখান থেকে সামান্য দূরে শুরু হয়েছে একটা টানেল।
ব্যারিকেডের শেষে একটা ড্রিফটরানার ট্রাক। ওটার দরজা হ্যাচকা টানে খুলল কুয়াশা। এসো, ওঠো। হলো
রানা ক্যাবে উঠতেই পিছু নিল ওর দলের অন্যরা।
থমথমে রাগ নিয়ে দেখছে কোবরা ইউনিটের স্পেন্যায সৈনিকরা।
ড্রিফটরানারের ড্রাইভিং সিটে বসল কুয়াশা, মুচড়ে দিল। ইগনিশন চাবির কান। রানার দিকে চাইল। তৈরি থাকো। রিমোট মেশিনগানের কাভার হারিয়ে গেলেই ওরা ধাওয়া করবে।
আমি তৈরি, বলল রানা।
গুড।
মেঝের সঙ্গে অ্যাক্সেলারেটার টিপে ধরল কুয়াশা, ঝটকা দিয়ে সামনে বাড়ল ড্রিফটানার, দেখতে না দেখতে ঢুকে পড়ল আঁধার টানেলে।
কুয়াশা ও রানারা উধাও হতেই নড়ে উঠল স্পেন্যায সৈনিকরা, লাফিয়ে গিয়ে উঠল তাদের ড্রিফটরানারগুলোয়।
লোক বেশি বলে রানার লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেলে চাপল। তিনজন।
গর্জে উঠল ইঞ্জিনগুলো। শুরু হলো পলাতকদের অনুসরণ।
বাউণ্টি হাণ্টার্স ১.২
এগারো
নিকষ অন্ধকারে চোখ মেলেছে উজ্জ্বল হেডলাইট। ধুলোভরা গুহায় যুদ্ধে ব্যস্ত তলোয়ারের মত নাচছে বাতিগুলো।
তুমুল গতিতে সরু টানেলে সগর্জনে চলেছে কুয়াশার ড্রিফটরানার। আকারে হামভি ট্রাকের মতই, বড় একটা পিকআপ, বললেও দোষ হবে না। পিছনে দীর্ঘ ট্রে। প্রায় ঘিরে রাখা হয়েছে। ড্রাইভারের কম্পার্টমেন্ট। অবশ্য, ট্রে-র দিক থেকে দেয়াল বা জানালা দিয়ে আলাদা করা হয়নি ড্রাইভিং সেকশনকে। কেউ চাইলে ট্রে পেরিয়ে দুসারি সিট টপকে আসতে পারবে সামনে।
কালো টানেল চৌকো, নিরেট গ্র্যানিটের। পুরু কাঠের কলাম। ও বিম ওজন নিয়েছে পাথুরে ছাতের। নিক্ষিপ্ত তীরের মত গেছে। সরল পথ। ড্রিফটরানারের দুপাশে বড়জোর এক ফুট জায়গা, তারপর প্রস্তর প্রাচীর। প্রচণ্ড গতি ট্রাকের। ছাতের চারফুট উপরে সিলিং। পিছনে চলে এসেছে কোবরা ইউনিট।
কুয়াশার ড্রিফটরানারের পিছনে রানার এলএসভি, ওতে করে আসছে তিন রাশান কমাণ্ডো। তাদের যান অনেক দ্রুতগামী, সরে যেতে পারে ঝট করে। উন্মাদের মত আসছে ড্রাইভার, ড্রিফটরানারের উপর ভিযেড-৬১ মেশিন পিস্তল থেকে গুলি শুরু করছে তার দুই সঙ্গী।
এলএসভির ছুটন্ত হেডলাইটের রশ্মি ভাসিয়ে দিয়েছে নিশাত, আফজাল ও কৃষ্ণকে। পাল্টা গুলি শুরু করল ওরা।
এলএসভির পিছনে আরও তিন ড্রিফটরানার, আসছে স্পেন্যায ইউনিটের মেজর মিখাইল পেরোনভ সহ সতেরোজন কমাণ্ডো।
ছোট কাফেলা, পাথুরে টানেলে ভয়ঙ্কর গতি তুলেছে।
আপা! ড্রাইভিং কম্পার্টমেন্ট থেকে চেঁচাল রানা। সময়?
তিন মিনিট!
এই সুড়ঙ্গ কতদূর গেছে? কুয়াশার কাছে জানতে চাইল। রানা।
মোটামুটি চার মাইল।
ঠিক সময়ে বেরুতে না পারলে… চুপ হয়ে গেল খবির।
নিশাত, খবির, আফজাল ও কৃষ্ণের অস্ত্রের মাযল থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে লালচে আগুন। পালাক্রমে গুলি করছে দ্রুতগামী এলএসভির উপর। দুজন গুলি করলে অন্য দুজন অস্ত্র রিলোড করছে।
এ নিয়ম মেনে ঝট করে বসে পড়ল নিশাত ও খবির, ব্যস্ত হয়ে উঠল অস্ত্রে গুলি ভরতে। ওদের জায়গা নিল আফজাল ও কৃষ্ণ। তখনই তুমুল বৃষ্টির মত এল কয়েক পশলা বুলেট। মুহুতে উধাও হলো কৃষ্ণের মুখ, ওখানে রইল শুধু থকথকে রক্ত ও চেরা মাংস। কণ্ঠে গুলি খেয়ে ছিটকে পড়ল আফজাল। গাড়ি থেকে ওর পতন ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকাল খবির। ধরে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু মস্ত সুযোগ পেয়ে গেল কোবরা ইউনিটের কমাণ্ডারা।
গুলি ভরবার ফাঁকে পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছে নিশাত, ঘুরেই দেখল কী ঘটছে। এলএসভির প্যাসেঞ্জার সিট থেকে সামনে বেড়েছে দুই যাত্রী, উঠেছে গাড়ির বনেটে, লাফ দিয়ে নামল ড্রিফটরানারের পিছনের ট্রে-তে।
আফজালকে দুহাতে ধরে আছে খবির।
এবার আর রক্ষা নেই ওর।
খবিরের মাথা লক্ষ্য করে অস্ত্র তুলল কোবরা ইউনিটের দুই সদস্য।
তারই ফাঁকে খবির দেখল, আস্তে করে কাত হয়ে গেল আফজালের মাথা। মারা গেছে ছেলেটা।
গুলিভরা অস্ত্র নেই নিশাতের হাতে, ঝড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল দুই রাশান সৈনিকের উপর।
পর মুহূর্তে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে ট্রে-র মেঝেতে পড়ল ওরা তিনজন। দুপাশে সাঁই-সাই পিছিয়ে চলেছে টানেলের পাথুরে, ধূসর দেয়াল।
কুয়াশা ও রানা সবই দেখতে পেয়েছে। সিট থেকে উঠেই ঘুরে দাঁড়াল রানা।
এটা নাও! গুড়গুড় করে উঠল কুয়াশার কণ্ঠ। বাড়িয়ে দিয়েছে রুপালি রেমিংটন। ওদেরকে সাহায্য করার পর পিছনের গাড়ি ঠেকাতে চেষ্টা কোরো!
ড্রিফটরানারের ট্রে-তে ডাইভ দিয়ে নামল রানা। দেখল, মেঝেতে দুই কমাণ্ডের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে নিশাত। মৃত আফজালকে দুহাতে ট্রে-তে তুলে নিল খবির। নাকের কাছে হাজির হয়েছে এলএসভি। বদ্ধ টানেলে দিনের আলো দিচ্ছে উজ্জ্বল হেডলাইট। একজনকে লাথি মেরে ফেলে দিল রানা ট্রে থেকে, অপরজনকে মাথার ওপর তুলে ছুঁড়ে দিল নিশাত পিছনের গাড়ির দিকে। পিষে গেল সে এলএসভির চাকার নীচে।
দুহাতে রুপালি রেমিংটন তুলল রানা, গুলি করল এলএসভি লক্ষ্য করে।
জোর লাথি দেয়ার মত ঝাঁকি মারল বন্দুক। তার চেয়ে ঢের অবাক করা একটা কাজ করল। বিশেষ কোনও গুলি ব্যবহার করে কুয়াশা।
ওই অদ্ভুত গুলির কারণে নানাদিকে ছিটকে গেল এলএসভির বডি, লাফিয়ে উঠেছে চেসিস থেকে। মুহূর্তের জন্য আকাশে ভাসল এলএসভি, তারপর কাত হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পাশের দেয়ালে। তীব্র গতিতে উল্টে গেল লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল, ডিগবাজি দিতে শুরু করে পিছু নিল সামনের ড্রিফটরানারের। কয়েক মুহূর্ত পর ধুপ করে পড়ল মুচড়ে যাওয়া ছাতে ভর করে।
আশ্চর্যজনক, গাড়ির ড্রাইভার এখনও সুস্থ!
কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়।
পরের সেকেণ্ডে পিছন থেকে ছিন্নভিন্ন হলো এলএসভি। লক্ষ টুকরো হলো পিছনের ড্রিফটরানারের আঘাতে। বিস্ফোরিত। এলএসভি মাড়িয়ে বেরিয়ে গেল পর পর তিনটে ড্রিফটরানার।
কয়েক মুহূর্ত পর আবারও কুয়াশার ড্রিফটরানারের পিছনে হাজির হলো রাশান কমাণ্ডোরা।
ধূসর ধুলো উড়িয়ে ছুটছে কুয়াশার যান।
রাশানদের সামনের ট্রাকের গতি প্রচণ্ড, গুঁতো দিল রানাদের গাড়ির পিছনে।
বেদম ঝাঁকি খেল দুই জিপ।
তখনই কয়েক লাথিতে ভেঙে পড়ল রাশানদের সামনের গাড়ির উইণ্ডশিল্ড। বনেটে উঠে এল কয়েকজন। কিছু করবার সময় বা সুযোগই পেল না রানা। আবছা আলোর সুড়ঙ্গে ওদের ড্রিফটরানারের ট্রে-তে লাফিয়ে নেমে এল তিন কমাণ্ডো। খবির বা নিশাতকে পাত্তাই দিল না, সামনে বাড়ল রানার মুখোমুখি হতে। হাতে উদ্যত মেশিন পিস্তল।
রিয়ার ভিউ মিররে এদের দেখেছে কুয়াশা। দেরি না করে দাঁড়িয়ে গেল ব্রেক প্যাডেলের উপর।
মস্ত হোঁচট দুলিয়ে দিল ওদের ড্রিফটরানারকে।
হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই। হেঁচড়ে সামনে এগোলো নিশাত, খবির ও মৃত আফজাল। পড়ে যেতে গিয়েও সামলে নিল রানা।
পিছনের তিন জিপ যেন পলকা ডোমিনো, হামলে পড়ল পরস্পরের উপর। কর্কশ আওয়াজ উঠল লোহা ভাঙার।
রানাদের ড্রিফটরানারে তিন কোবরা কমাণ্ডে ছিটকে পড়ল সামনে। অস্ত্র হাত ছাড়া করল তাদের একজন, কিছু ধরতে চাইল। দুহাতে। ডানদিকের লোকটা মেঝেতে পড়েছে রানার পাশেই, এবং তৃতীয় লোকটা উড়ে গিয়ে পড়ল ড্রাইভারের কম্পার্টমেন্টের ভিতর। নাক-মুখ ঘেঁচে গেল ড্যাশবোর্ডে লেগে। কয়েক মুহূর্ত পর মুখ তুলে দেখল, চোখের দিকে চেয়ে আছে রুপালি বন্দুক। ব্যারেলে জ্বলছে নীল বিন্দু, আলোকিত করে তুলেছে তার নাকটাকে।
এক সেকেণ্ড পর গর্জে উঠল কুয়াশার বন্দুক।
টাশ্শ্!
তরমুজের মত বিস্ফোরিত হলো টুপারের মাথা। টমেটোর সুপের মত নানাদিকে ছিটকে গেল রক্ত।
আবারও মেঝের সঙ্গে টিপে ধরল কুয়াশা অ্যাক্সেলারেটার, ঝটকা দিয়ে সামনে বাড়ল গাড়ি।
তাল সামলে নিয়েছে অন্য দুই স্পেন্যায় কমাণ্ডো। তাদের লক্ষ্য মাসুদ রানা।
অস্ত্রহীন ওরা সবাই।
খাপ থেকে সড়াৎ করে ওয়ারলক হান্টিং নাইফ বের করল দুই রাশানের একজন, অন্যজন চট করে মেঝে থেকে তুলে নিল। ভিযেড-৬১ মেশিন পিস্তল। ঘুরেই গুলি করতে চাইল।
কিন্তু তখনই ঝট করে ঘুরে চাইল কুয়াশা, বুঝতে দেরি হয়নি বিপদে পড়েছে রানা।
বিদ্যুদ্বেগে নড়ে উঠেছে বাঙালি গুপ্তচর।
কারাতের চপে মেশিন পিস্তল সরিয়ে দিল ও, অন্যহাতে খপ করে ধরতে চাইল অস্ত্রের নল।
তখনই গর্জে উঠল শত্রুর মেশিন পিস্তল। পাশ কাটিয়ে গেল গুলি, কিন্তু বুঝতে দেরি হলো না রানার, একা দুজনকে ঠেকাতে পারবে না ও।
ছোরা হাতে লাফিয়ে সামনে বাড়ল কোবরা ইউনিটের দ্বিতীয় কমাণ্ডো, একপাশ থেকে চালাল ওয়ারলক হান্টিং নাইফ।
এবার কচ করে কাটা পড়বে রানার গলা। কিন্তু তার আগেই ঝটকা দিয়ে সিট ছেড়েছে কুয়াশা, অবিশ্বাস্য গতিতে উপস্থিত হলো ট্রে-র মুখে। দুকাঁধে বাইসনের শক্তি, অনায়াসেই ঠেলে ফেলল দুরাশান কমাণ্ডোকে। ভিযেড-৬১ হাতে লোকটাকে রানার কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছে বৈজ্ঞানিক, এক টানে ভরে দিল ড্রাইভিং কম্পার্টমেন্টের ভিতর।
তখনই পিছন থেকে গুতো দিল রাশান ড্রিফটরানার।
জোরালো হোঁচট খেল কুয়াশা ও দুই স্পেন্যায় কমাণ্ডো। উইণ্ডশিল্ডের ভিতর দিয়ে গিয়ে ড্রিফটরানারের বনেটে পড়ল ওরা।
ভাঙেনি উইণ্ডশিল্ড, ওই কাঁচ শাটারপ্রুফ, মাকড়সার জালের মত ফাটল ধরেছে ওখানে। ধুপ আওয়াজ তুলে ছিটকে গেছে। ফ্রেম থেকে, বনেটে নেমেই স্থির হয়েছে। চৌকো কাঁচের তৈরি চিড় ধরা ম্যাট্রেস যেন।
সুরু টানেলে তুমুল গতি তুলছে চার ড্রিফটরানার।
প্রথমবারের মত রানা দেখল, গ্যাস প্যাডেলে স্টিলের একটা দণ্ড ঠেস দিয়ে রেখে ড্রাইভিং সিট ছেড়েছে কুয়াশা। সরলরেখার মত সোজা টানেলে ছুটছে জিপ। দুপাশের পাথুরে দেয়ালে এদিক-ওদিক লাগছে গাড়ির বডি।
বনেটের উপর দু কমাণ্ডের সঙ্গে হাতাহাতি লড়ছে কুয়াশা। রানাকে শেষ করতে আবারও ফিরতে চায় ছোরাওয়ালা। এদিকে নিজেকে বনেটে স্থির করতে গিয়ে হারিয়ে বসেছে তার সঙ্গী ভিযেড-৬১।
উইণ্ডশিল্ড নিয়ে পড়বার সময় সবচে বিপদে পড়েছে কুয়াশা। পা-দুটো ঝুলছে দ্রুতগামী ড্রিফটরানারের নাকের কাছে। একহাতে ধরেছে বুল-বার। তারই ফাঁকে দেখল, আবারও হাঁচড়ে-পাঁচড়ে রানার দিকে ফিরতে চাইছে ছোরাওয়ালা। ডানহাতে তার বুট আঁকড়ে ধরল কুয়াশা, হ্যাচকা টানে নিয়ে এল নিজের পাশে। পরের টানে সে গিয়ে পড়ল ড্রিফটরানারের সামনে।
ড্রিফটরানারের নীচে যাওয়ার সময় বিকট আর্তনাদ ছাড়ল কমাণ্ডো, পরক্ষণে চাপা পড়ল চাকার নীচে। লাফিয়ে উঠল গোটা গাড়ি, পেরুল লোকটাকে। কয়েক সেকেণ্ডে তাকে চেপ্টে দিল পুরো কাফেলা। চতুর্থ ট্রাক যাওয়ার পর দেখা যাবে, পড়ে আছে। হাড় চুর চুর হওয়া এক রক্তাক্ত লাশ।
কোবরা ইউনিটের দ্বিতীয় লোকটা সবই দেখেছে। লাথি দিতে শুরু করেছে কুয়াশার হাতে। কিন্তু লাফিয়ে উঠে খপ করে তার বেল্ট ধরল বৈজ্ঞানিক, নিজের দিকে টানতে লাগল।
না! ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল লোকটা, না!
ভয় কীসের? কঠিন সুরে বলল কুয়াশা। বনেটের শেষ প্রান্তে টেনে আনল কমাণ্ডোকে। পাশাপাশি হলো দুজন। রাশান লোকটা নিজেও প্রকাণ্ডদেহী, থরথর করে কাঁপছে রাগে-ভয়ে। দুহাতে খপ করে ধরল কুয়াশার গলা।
আমি যদি পড়ি, তোকেও মরতে হবে! গর্জে উঠল।
বেশ, শান্ত স্বরে বলল কুয়াশা। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই পা সরিয়ে নিল ড্রিফটরানারের বাম্পারের উপর থেকে। সঙ্গে নিয়েছে রাশান কমাণ্ডোকে। ট্রাকের সামনে ধুলোময় পথে পড়ল দুজন।
মেঝেতে পড়েই গড়ান দিল স্পেন্যায ট্রুপার, তখনই মড়াৎ আওয়াজ তুলে চেপ্টে গেল ড্রিফটানারের সামনের চাকার নীচে। কুয়াশার মত করে খপ করে ধরতে পারেনি উইণ্ডশিল্ডের ম্যাট্রেস।
পড়বার সময় ফাটল ধরা কাঁচের মাদুর সঙ্গে নিয়েছে কুয়াশা। নীচে রেখেছে ওটাকে, নেমে এসেছে বুনো বিড়ালের মত। কয়েক মুহূর্ত সামনে বেড়েছে কাঁচের মাদুর, তখনই ওটার উপর দিয়ে সগর্জনে পেরুল প্রথম ড্রিফটরানার।
দেখতে না দেখতে হু-হুঁ করে কুয়াশাকে পেরিয়ে গেল চার ড্রিফটরানার।
মাদুরে নিশ্চিন্তে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে কুয়াশা। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। চতুর্থ গাড়ি পেরুতেই ব্যস্ত হয়ে উঠল বিজ্ঞানী। আলখেল্লা থেকে নিয়েছে দ্বিতীয় শটগান। শক্ত করে ব্যারেল ধরে ব্যবহার করেছে পিস্তল-গ্রিপ, বাধিয়ে নিয়েছে চতুর্থ গাড়ির রিয়ার বাম্পারের নীচে।
সাঁৎ করে পিঠের তলা থেকে সরে গেছে কাঁচের মাদুর। আঁধার টানেলে কুয়াশাকে নিয়ে ছুটে চলেছে কাফেলার পিছনের গাড়ি। পাথুরে মেঝেতে বেকায়দাভাবে ঠোকর লাগছে কুয়াশার পা।
ব্যারেল বেয়ে সামনে বাড়ল বিজ্ঞানী, কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছল পিছনের ড্রিফটরানারের ট্রের কাছে। এবার উঠে পড়বে গাড়িতে। নতুন করে লড়বে শত্রুদের বিরুদ্ধে।
.
দেরি না করে ড্রিফটরানারের ড্রাইভিং সিটে বসে পড়েছে মাসুদ রানা। উইণ্ডশিল্ড নিয়ে বনেটে কুয়াশা পড়বার পর, লাথি দিয়ে অ্যাক্সেলারেটার আটকে রাখা ইস্পাতের দণ্ড সরিয়ে দিয়েছে ও, ড্রাইভ করছে ঝড়ের গতিতে।
রিয়ার ভিউ মিররে দেখল, দুই স্পেন্যায কমাণ্ডের সঙ্গে আনআর্মড কমব্যাটে ব্যস্ত নিশাত-খবির।
কিন্তু দ্বিতীয় ড্রিফটরানার থেকে ওদের যানের ট্রেতে নামল আরও দুই ট্রুপার। তেড়ে এল ড্রাইভিং কম্পার্টমেন্ট লক্ষ্য করে।
ওরা সংখ্যায় অনেক, ড্রাইভিঙের ফাঁকে ভাবল রানা।
কোবরা ইউনিটের নতুন দুই সৈনিকের হাতে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র। যখন তখন খতম হবে রানা। খনির ভেহিকেল বিষয়ে একটা কথা চট করে মনে পড়ল ওর। দেরি না করে হাত বাড়িয়ে দিল সিটবেল্টের দিকে।
আপা! খবির! শক্ত করে কিছু ধরুন!
ড্রাইভিং সিট থেকে আরেকদিকে হাত বাড়াল রানা, জোর ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল প্যাসেঞ্জার দরজা।
ফলাফল বিস্ময়কর।
আচমকা কাজ করল ড্রিফটরানারের হ্যাণ্ডব্রেক। প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। যেন কোনও মাইনার আহত না হয়, সেজন্য খনির সব ভেহিকেলে থাকে ওই সেফটি ফিচার। দরজা খুললেই নিউট্রাল হয় গিয়ার, সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে হ্যাণ্ডব্রেক।
প্রস্তুত ছিল না, ফলে দ্বিতীয় ড্রিফটরানার বেদম গুঁতো দিল রানাদের গাড়ির পিছনে। পরের দুই গাড়ি যেন বুজে আসা বাদ্যযন্ত্র অ্যাকর্ডিয়ন।
পিছন থেকে গুতো আসতেই বেকায়দাভাবে হোঁচট খেয়ে সামনে বাড়ল রানার পিকআপ ট্রাক।
শত্রুদেরকে শেষ করতে এসে মস্ত বিপদে পড়েছে দুই কোবরা কমাণ্ডো, একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। প্রথমজন রানাকে পাশ কাটিয়ে উইণ্ডশিল্ডের ফাঁকা জায়গা দিয়ে উড়ে গেল। নামল কমপক্ষে পনেরো ফুট দূরে। ড্রাইভিং কেবিনের ছাতে বেধে গেল দ্বিতীয়জনের থুতনি, ছিটকে বেরিয়ে গেল দুই পা, কিন্তু আটকা পড়ল তার মাথা–কড়াৎ আওয়াজে ভাঙল ঘাড়।
এদিকে রানার কথায় হাতাহাতি বাদ দিয়ে খপ করে ট্রের একপাশ ধরেছে নিশাত ও খবির। ড্রিফটরানার থামতেই ছিটকে সামনে বাড়ল দুই স্পেন্যায কমাণ্ডে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল ড্রাইভিং ও প্যাসেঞ্জার সিটের পিছনে।
মাথায় বাড়ি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারাল তাদের একজন। অন্যজন সামান্য আহত, উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার মাথার উপর নামল নিশাতের এমপি-৭-এর বাট। জ্ঞান হারিয়ে ধুপ করে পড়ল লোকটা।
দুই অচেতন কমাণ্ডোকে গাড়ি থেকে ফেলে দিল খবির ও নিশাত।
কাজ শেষ, হাত বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা বন্ধ করল। রানা, মেঝের সঙ্গে টিপে ধরল অ্যাক্সেলারেটার।
নতুন উদ্যমে সামনে বাড়ল গাড়ি। খুব ক্ষতি হয়নি পিছনের ড্রিফটানারগুলোর যাত্রীদের। পিছু নিল তারা সামনের পিকআপের।
সংখ্যায় ট্রপাররা এখনও কমপক্ষে দশজন। কিন্তু তখনই নিজের কাজ শুরু করল কুয়াশা। পিছনের গাড়ি গুঁতো খেয়ে থামতেই ট্রে বেয়ে উঠছিল, ফলে আহত হয়নি। নতুন করে চার ড্রিফটরানার রওনা হতেই উঠে এল পিছনের গাড়িতে। কোনও সুযোগই পেল না কোবরা ইউনিটের কমাণ্ডারা।
বাধা দিতে চাইল, অস্ত্র তুলল শত্রুকে শেষ করতে। কিন্তু কুয়াশা যেন নিজেই একটা মেশিন গান।
পিছনের ট্রেতে বন্দুকের গুলি খেয়ে উড়ে গেল দুই কোবরা কমাণ্ডো। প্রথমজন মরল মাথায়, বুলেট নিয়ে। একহাতে দ্বিতীয়জনের গলা চেপে ধরল কুয়াশা, মাথাটা ঠেলল ড্রাইভিং কম্পার্টমেন্টের ছাতের চেয়ে উপরে। দ্রুতগতিতে পিছিয়ে যাওয়া এক ওভারহেড বিমে লাগল সৈনিকের মাথা, ধড় থেকে গোটা মুণ্ডু খটাং করে ছিটকে গেল আরেকদিকে।
পরক্ষণে ড্রাইভারের কম্পার্টমেন্টে হাজির হলো কুয়াশা, টাশশ আওয়াজ তুলল খাটো নলের রেমিংটন, উগরে দিল লালচে আগুন। ছিন্নভিন্ন হলো যাত্রী।
হতবাক হয়ে ঘুরে চাইল ড্রাইভার।
কিন্তু তাকে পাত্তাই দিল না কুয়াশা, এক গুলিতে উড়িয়ে দিল উইণ্ডশিল্ড, পর মুহূর্তে ওই ফাঁকা জায়গা দিয়ে লাফিয়ে উঠে এল তৃতীয় ট্রাকের ট্রের উপর।
এ ট্রাকে রয়েছে মেজর পেরোনভ। কুয়াশাকে দেখতে পেয়েই আড়াল খুঁজতে চাইল সে। ড্রিফটরানারের মাঝ ধরে এগোচ্ছে বৈজ্ঞানিক। উড়ে গেল দুপাশের কমাণ্ডোরা। পাল্টা গুলি করতে চাইল দুএকজন, কিন্তু তাদের চেয়ে অনেক দ্রুত কুয়াশা। কী করে যেন আগেই বুঝছে এরপর কী করবে সৈনিকরা।
ড্রাইভিং কম্পার্টমেন্টের দিকে কুয়াশা যেতেই ড্যাশবোর্ডের নীচে লুকিয়ে পড়তে চাইল পেরোনভ।
মাত্র এক সেকেণ্ড তাকে দেখল কুয়াশা, স্থির করল এখানে সময় নষ্ট করবে না। রওনা হলো রানার ড্রিফটরানার লক্ষ্য করে।
রাশান মেজরকে শেষ না করেই লাফিয়ে দ্বিতীয় ট্রাকে নামল কুয়াশা।
.
এদিকে তুমুল গতি তুলেছে রানা। গাড়িতে শত্রু নেই। বহু দূরে ছোট্ট চারকোনা সাদা আলো। ওদিক দিয়ে বেরুতে পারবে সুড়ঙ্গ থেকে।
ওর পাশে প্যাসেঞ্জার সিটে এসে বসল নিশাত। স্যর, এরা কারা? আর কালো আলখেল্লা পরা ওই বৈজ্ঞানিক?
পরে কথা হবে, আপা, বলল রানা। খেয়াল করল, পিছনের ড্রিফটরানারের বনেটে উঠেছে কুয়াশা। শুধু জেনে রাখুন, আশপাশে যত লোক, তাদের ভিতর ওই কুয়াশা একমাত্র মানুষ, যে আমাদেরকে খুন করতে চাইছে না।
পরে হয়তো চাইবে, পিছনের ট্রে থেকে বলল খবির, একে এড়িয়ে যাওয়াই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ।
আমারও তাই মনে… চুপ হয়ে গেল নিশাত।
সুড়ঙ্গের শেষভাগে পৌঁছে গেছে ওরা। উজ্জ্বল সাদা চৌকো আলো আসছে দূর থেকে। ওখানে পৌঁছুতে আর বড়জোর দুই শ গজ পেরুতে হবে। অন্য কারণে কথা থামিয়ে দিয়েছে নিশাত।
সুড়ঙ্গের শেষে খোলা আকাশে ভাসছে পৈশাচিক এক দানবীয় জিনিস, যেন প্রাগৈহাসিক কোনও টেরোডাকটিল।
ওটা জেট ফাইটার বিমান। কালো রঙের। সুখোই এস-৩৭, ভাসছে সুড়ঙ্গের মুখে।
খাড়া নাক তাক করেছে ড্রিফটরানার লক্ষ্য করে। ঝুলে আসা ডানায় ভরা আছে মিসাইল। অশুভ এক বাজপাখি যেন। মুখোমুখি হওয়ার জন্য চেয়ে আছে ভয়ঙ্কর চেহারা করে।
ধুপ আওয়াজ পেল রানা। ড্রিফটরানারের ট্রেতে নেমেছে কুয়াশা, সিটের কাছে পৌঁছে বলল, ভয় নেই। ফাইটার বিমানের দিকে ইশারা করল। ওটা আমাদেরকে সরিয়ে নেবে। রিস্ট গার্ড-এ বাটন টিপল, চালু হয়ে গেল রেডিয়ো। রঘুপতি, আসছি! পিছনে শত্রুদের ড্রিফটরানার। ব্যবহার করবে সাইডওয়াইণ্ডার। আবারও বলছি, ডানদিকের ডানা থেকে মিসাইল। নিচু করে তাক করবে। দুই শ মিটারের জন্য আর্ম করো। গতবছর যেমন হয়েছিল আর্জেন্টিনায়।
ইয়েস, বস! গম্ভীর কণ্ঠ শুনল ওরা।
রানাকে বলল কুয়াশা, আপত্তি না থাকলে ড্রাইভ আমি করি।
সিট থেকে সরে গেল রানা, সেখানে বসল কুয়াশা। এক সেকেণ্ড পর মাপা হাতে মোচড় দিল স্টিয়ারিং হুইলে।
দেয়াল ঘেঁষে ছুটছে পিকআপ, আরেকবার হুইলে মোচড় দিল কুয়াশা, তখনই ধপ্ আওয়াজ তুলে বামদিকের চাকাগুলো উঠে গেল দেয়ালে। গতি কমল না, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কাত হয়ে ছুটছে গাড়ি।
ঠিক আছে, রঘুপতি, এবার! রিস্ট মাইকে বলল কুয়াশা।
দিগন্তে ভাসছে কালো ফাইটার, ডানদিকের ডানা থেকে ছিটকে বেরোল ধোঁয়ার রেখা। ফাপা আওয়াজ তুলে সুড়ঙ্গের ভিতর রওনা হয়ে গেছে সাইডওয়াইণ্ডার।
মিসাইল আসছে মাটি ঘেঁষে, গতি প্রচণ্ড।
রানা দেখল, মিসাইল আসছে বা দেয়াল ছুঁয়ে। দেখতে না দেখতে পৌঁছে গেল নাকের কাছে। তারপর পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কাত হওয়া ড্রিফটরানারের তলা দিয়ে হুস্ আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল। বিধল গিয়ে পিছনের ট্রাকের নাকে।
ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হলো। ভেঙে পড়ল সুড়ঙ্গের চারপাশ। লক্ষ টুকরো হলো প্রথম স্পেন্যায ড্রিফটরানার। ওটার নিতম্বে নাক গুজল পরের ড্রিফটরানার। শেষেরটা হুমড়ি খেল সামনের গাড়ির উপর। মুহূর্তে থামল তিন গাড়ির গতি।
আর একইসময়ে সুড়ঙ্গের মুখ থেকে ছিটকে উজ্জ্বল আলোয় বেরিয়ে গেল রানাদের ড্রিফটরানার।
পাহাড়ের খাড়া উপত্যকা এদিকটা। পথ গেছে এঁকেবেঁকে নীচে।
সামান্য দূরে একহাজার ফুট নেমেছে খাদ। পাশেই ভাসছে সুখোই ফাইটার।
নিশাতের দিকে চাইল কুয়াশা। বোমা পড়তে কতক্ষণ বাকি?
হাতঘড়ি দেখল ক্যাপ্টেন। তিরিশ সেকেণ্ড।
খুশি হবে না মেজর পেদরোনভ। রিস্ট মাইকে বলল কুয়াশা, রঘুপতি, পরের বাঁকে দেখা করো। রানার দিকে চাইল। আমার সঙ্গে যেতে আপত্তি আছে?
না।
পঁচিশ সেকেণ্ড পর পাহাড়ের সমতল এক প্ল্যাটফর্মের মত জায়গায় নামল চকচকে সুখোই। তখনই পৌঁছে গেল রানাদের ড্রিফটরানার।
কালো বিমানের পাশে গাড়ি রাখল কুয়াশা।
তখনই ওরা দেখল, হাজির হয়েছে সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান। তিশার রেখে যাওয়া লেসার ডাইয়োডের কারণে সহজেই খুঁজে নিয়েছে খনির শাফট। পেট থেকে ছেড়ে দিল একুশ হাজার পাউণ্ডের এমওএবি বোমা।
নিখুঁতভাবে কাজ করেছে গাইডেন্স সিস্টেম। সাঁই-সাই করে নামছে বোমা। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল টার্মিনাল ভেলোসিটিতে। মুহূর্তে মস্ত বোমা মিলিয়ে গেল খনির চিমনির ভিতর। সময় গনতে শুরু করেছে রানা। ওয়ান থাউযেও ওয়ান… ওয়ান থাউযেণ্ড টু…. ওয়ান থাউযেণ্ড থ্রি… এবার বিস্ফোরিত হওয়ার কথা ওই বোমা। তখনই থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা পাহাড়।
আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মত কান ফাটানো বিকট বুমবুম! আওয়াজ শুরু হয়েছে।
যেন মাথার উপর নামছে ভয়ঙ্কর বজ্র।
সুখোই বিমানের ককপিটে দুজন বসতে পারে, তরতর করে মই বেয়ে উঠছে খবির ও নিশাত।
কুয়াশাকে ইশারা করল রানা, যেন আগে ওঠে বিমানে।
মাথা নাড়ল বিজ্ঞানী। তুমি আগে।
বাধ্য হয়ে মই বাইতে শুরু করল রানা, কিন্তু টলে উঠতে হলো ওকে জোরালো ভূমিকম্পের কারণে।
চোখ গেল আকাশছোঁয়া চূড়ার দিকে। ওখানে লাফিয়ে উঠেছে বিপুল মাটি-পাথর-ধুলোবালি।
বুঝতে দেরি হলো না, কী ঘটছে। চাপা স্বরে বলল রানা, জলদি! অ্যাভালাঞ্চ শুরু হয়েছে!
বারো
বিমানের মই বেয়ে উঠবার ফাঁকে খনি-সুড়ঙ্গের দিকে চাইল। রানা। এইমাত্র টলতে টলতে বেরিয়ে এসেছে দুই লোক। দুই সেকেণ্ড পর রকেট গতিতে টানেল থেকে বেরোল তপ্ত তীব্র। হাওয়া, সঙ্গে ছিটকে এল কোবরা ইউনিটের ব্যবহৃত অবশিষ্ট তিন ড্রিফটরানার।
মাটিতে পড়ে যাওয়া ওই দুজনকে পাশ কাটিয়ে ডিগবাজি দিতে দিতে পাহাড়ি খাদের পারে পৌঁছে গেল তিন ড্রিফটরানার, দিগন্তের দিকে রওনা হলো আকাশ পথে কিন্তু কয়েক সেকেণ্ডে পর খসে পড়ল কার্টুনের দৃশ্যের গাড়িগুলোর মত। এক হাজার। ফুট নামল কয়েক সেকেণ্ডে, বিস্ফোরিত হলো সব র্যাভিনে পড়ে।
তখনই পাহাড়ের উপর থেকে এল ভয়ঙ্কর গুড়গুড় আওয়াজ।
সুখোই বিমান যেখানে সমতলে নেমেছে, তার চেয়ে কমপক্ষে একহাজার ফুট উপরে শুরু হয়েছে ভূমিধস। নড়ে উঠল পাহাড়ের গোটা চূড়া, বিপুল পাথর-মাটি নিয়ে হুড়মুড় করে নামতে লাগল ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসের মত আওয়াজ তুলে।
আপা-খবির! জলদি! মই বেয়ে উঠতে শুরু করে দ্বিতীয়বার তাড়া দিল রানা।
গতি বাড়ছে পাথর-মাটির ধসের। নানাদিকে ছিটকাচ্ছে বিপুল ধুলো।
ভয় লাগিয়ে দেয়া গুড়গুড় আওয়াজের উপর দিয়ে গম্ভীর সুরে বলল কুয়াশা, ওঠো বম বে-তে।
হাচড়েপাছড়ে খুদে ককপিট পেরিয়ে পিছনের বম বে-তে পৌঁছে গেল নিশাত ও খবির।
বম বে জায়গাটা বদলে নিয়েছিল পোলাণ্ডের বাউন্টি হান্টার পোলিশ, ব্যবহার করত কারাগারের মত করে।
কয়েক সেকেণ্ড পর ককপিট পেরোল রানা, বসে পড়ল রিয়ার গানারের সিটে। পাঁচ সেকেণ্ড পর ওকে পাশ কাটিয়ে বম বে-তে ঢুকল কুয়াশা।
চোখের সামনে নেমে আসছে পাহাড়ি ভূমিধস। যে-কোনও সময়ে চাপা পড়বে ওরা।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল কুয়াশা, রঘুপতি!
ব্যস্ত, বস!
সামনের সিটে থ্রটল নিয়ে কী যেন করছে লোকটা। এক সেকেণ্ড পর ভাসতে শুরু করল সুখোই ফাইটার।
রানা দেখল, টগবগে পানির মত বলকে উঠছে উপরের অ্যাভালাঞ্চ। ঝড়ের গতিতে নামছে প্লাবনের মত। বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ছে মস্ত সব পাথর। কানে তালা লেগে গেল ভয়ঙ্কর আওয়াজে।
মৌমাছির মত ভেসে উঠছে সুখোই, পাশেই পাহাড়ের ক্লিফের চূড়া। তখনই হাজির হলো মাটি-বালি ও পাথরের ভয়ঙ্কর স্রোত। ছোট-বড় পাথর লাফিয়ে ধরতে চাইল কালো বিমানকে। চারপাশে বিকট আওয়াজ। খট-খটাং আওয়াজে বিমানের পেটে লাগছে ছোট পাথরগুলো। পরক্ষণে চূড়া পেরোল সুখোই। কয়েক ফুট নীচ দিয়ে গেল ভূমিধস, চলেছে অনেক নীচে।
আপনাদের মৃত্যু ছিল খুব কাছে, মন্তব্য করল রঘুপতি।
তিন মিনিট পর ইউএন-এর শিবিরে রানার ইয়াক-১৪১ ফাইটার বিমান থেকে এক মাইল দূরে মাউণ্ট স্ট্যানলির আরেকটি ঢালে সমতল জায়গা দেখে নেমে এল সুখোই এস-৩৭ ফাইটার বিমান।
ককপিটের মই বেয়ে মাটিতে নামল রানা, কুয়াশা, নিশাত ও খবির। বিমানে রয়ে গেছে থামের মতই দীর্ঘদেহী রঘুপতি, অবশ্য কয়েক মুহূর্ত পর নেমে এল ইঞ্জিন বন্ধ করে।
ওর নাম রঘুপতি, বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট, সবার সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল কুয়াশা।
জবাবে একটা কথাও বলল না লম্বু।
অন্যদের চেয়ে একটু সরে দাঁড়াল রানা, ডুবে গেছে চিন্তার গভীরে। গতকাল থেকে যা ঘটেছে, সেসব নিয়ে ভাবছে। তখনই খড়মড় করে উঠল ওর ইয়ারপিস।
মেজর রানা, আমি কেভিন কনলন, আপনি কোথায়?
কঙ্গো, জবাবে বলল রানা।
শুনুন, যে লিস্ট দিয়েছিলেন, সে তালিকায় একজনের নাম। নেই। কুয়াশার কথা বলেছিলেন, তার নাম আছে এফবিআই ও আইএসএস-র ওয়ান্টেড লিস্টে।
বলতে থাকো, বলল রানা। এ তথ্য ওর জানা আছে।
ওই লোক ভয়ঙ্কর… পেন্টাগনের আণ্ডারগ্রাউণ্ড অফিসে জ্বলজ্বলে কমপিউটারের সামনে বসে আছে কনলন। অফিস পুরো ফাঁকা। মনিটরে কুয়াশার ছবি, দূরপাল্লার ক্যামেরায় তোলা হয়েছে। ছুটছে বৈজ্ঞানিক, দুহাতে রেমিংটন শটগান।
লেখাগুলো পড়তে লাগল কনলন, এ লোকের আসল নাম মনসর আলী। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ মত। দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে ছয় ফুট। কিছুদিন হলো চোখের সমস্যার কারণে ব্যবহার করছে সানগ্লাস। ধারণা করা হচ্ছে, আণবিক রিয়্যাকশনে রেটিনাল ক্ষতি হয়েছে। সহ্য করতে পারে না সাধারণ আলো।
কুয়াশার দিকে চোখ চলে গেল রানার। পরনে কালো আলখেল্লা। কোমরের দুপাশে দুই খাপে নল কাটা দুই বন্দুক। সুখোই বিমানের পাশে দাঁড়িয়ে খবিরের কথা শুনছে।
সে ইউনাইটেড স্টেটসের চরম শত্রু। সুদানে শেষ করার চেষ্টা করে আমেরিকান আর্মি। আইএসএস-এর ধারণা: তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল স্থানীয় আলকায়েদার। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া। হয় তার গবেষণাগার। ধরা পড়ে, কিন্তু বেরিয়ে যায় তেরোজন ডেল্টা ডিটাচমেন্টের সৈনিককে খুন করে।
পাঁচ মাস পর দেখা দেয় আর্জেন্টিনায়। আমেরিকান সামরিক বাহিনী পাঠায় নেভির ছয় সিল কমাণ্ডোকে। একজনও প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি।
এরপর উধাও হয় মনসুর আলী। সেই সময়ে রাশান ডেপুটি প্রেসিডেন্টের মেয়েকে অপহরণ করে একদল কিডন্যাপার। তখন হঠাৎ করেই উদয় হয় কুয়াশা, নয়জনকে মেরে কেড়ে নেয় ওই মেয়েকে, পৌঁছে দেয় বাবার হাতে। আইএসএস-র ধারণা: চাইলে পৃথিবীর দ্বিতীয় সেরা বাউন্টি হান্টার হতে পারত সে।
কালো বিমানের দিকে চাইল রানা।
ডানার দিকে রওনা হয়েছে রঘুপতি।
চাইলে দ্বিতীয় সেরা বাউন্টি হান্টার হতে পারত? এখন সেরা। কে? জানতে চাইল রানা।
আগেও বলেছি তার কথা। নামটা: ডেভিড এন. হেন্ড্রিক। এক সেকেণ্ড, মনসুর আলীর কথা শেষ করতে পারিনি। প্রিয় মেয়েকে পাওয়ার পর তাকে সরকারের তরফ থেকে একটা ইয়াক-১৪১ যুদ্ধবিমান দেন ডেপুটি প্রেসিডেন্ট। দুনিয়ার যে কোনও রাশান বেস থেকে হাই-অকটেন রিফিউয়েল করতে দেয়া হয়। লোকে ওই বিমানের নাম দিয়েছে কালো দাঁড়কাক।
আচ্ছা, বলল রানা। এখন দেখছি সুখোই এস-৩৭ ফাইটার। প্লেন। ওর দিকে পা বাড়িয়েছে কুয়াশা।
ভয়ঙ্কর লোক ওই মনসুর আলী, আবারও বলল কনলন, আপনার বোধহয় খুব সতর্ক হওয়া উচিত।
এখন আর সে উপায় নেই, বলল রানা। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরে কথা হবে।
খুট আওয়াজ তুলে কেটে গেল যোগাযোগ।
দাঁড়কাক তোমাকে দিয়েছি, নিজে জুটিয়ে নিয়েছি কালো শকুন, গম্ভীর মুখে বলল কুয়াশা, নিজের তৈরি অত্যাধুনিক ইয়ারপিসে সবই শুনেছে। এখন থেকে ওই সুখোই ব্যবহার করব। হাতের ইশারা করল। এসো, আলাপ সেরে নেয়া যাক।
বৈজ্ঞানিকের পাশে বিমানের দিকে পা বাড়িয়ে বিস্মিত হলো রানা।
সুখোই ফাইটারের ফিউয়েল ট্যাঙ্কের ক্যাপ খুলেছে রঘুপতি। বুকপকেট থেকে বের করেছে ইস্পাতের নল, ওটা ভরে দিল ট্যাঙ্কে, অন্যপ্রান্ত মুখে পুরে চো-চো করে গিলতে লাগল হাই অকটেন!
চট করে বাঙালি বৈজ্ঞানিকের দিকে চাইল রানা।
হতবাক হয়ে লম্বুর কীর্তি দেখছে নিশাত ও খবির।
ও রোবট, স্বাভাবিক সুরে বলল কুয়াশা, আমার তৈরি। সামান্য কাধ ঝাঁকিয়ে পাল্টে ফেলল প্রসঙ্গ, খবিরের কাছে শুনলাম সাইবেরিয়ায় পৌঁছবার পর কী ঘটেছে।
তখন থেকেই এই লড়াই শুরু, মন্তব্য করল নিশাত।
দুদিনের লড়াইয়ে ওদের এক শজন শেষ, জানাল খবির।
আপা, আপনি কি আঁচ করতে পারেন তিশা কোথায়? নিশাতের কাছে জানতে চাইল রানা।
শেষবার দেখেছি সবুজ লেসার সাইট পরা একদল লোককে। তখন ছিটকে পড়লাম কনভেয়ার বেল্টে, তারপর…
তখন ওই মেয়েকে কিডন্যাপ করেছে, জানাল কুয়াশা। কাজটা ডেভিড এন. হেন্ড্রিক ও তার লোকজনের।
আপনি জানলেন কী করে? জিজ্ঞেস করল খবির।
রঘুপতির দিকে ইশারা করল বৈজ্ঞানিক। খুলে বলো।
মুখ থেকে পাইপ সরাল লম্বু, ফিউয়েল ট্যাঙ্কের ক্যাপ আটকে দিয়ে পকেটে রেখে দিল নল, খুব নরম সুরে বলল: বসকে ভেন্টে নামিয়ে দেয়ার পর চলে এলাম পিছনের ওই সুড়ঙ্গ-মুখে। বসের নির্দেশে ছড়িয়ে দিলাম মাইক্রোডট অ্যারোসল। কাজ শেষে গেলাম একমাইল দূরে, যেমন বলেছেন বস।
পাঁচ মিনিট পর এলেন আপনারা, কিন্তু এর একমিনিট আগে ওই সুড়ঙ্গের সামনে নামল প্রকাণ্ড এক চিনুক কপ্টার দুপাশে দুই লিংক্স অ্যাটাক চপার। তখনই এল দুটো এলএসভি এবং একটা ড্রিফটরানার। সোজা উঠে গেল চিনুকের ভিতর। তারপর ভেসে উঠল হেলিকপ্টার, পাহাড়ের উপর দিয়ে চলে গেল পুবে।
কীভাবে জানলে ওদের সঙ্গে তিশা আছে? জানতে চাইল রানা।
বুকের উপর হাত রাখল রঘুপতি। আমার কাছে ছবি আছে। বস বলেছিলেন, তিনি খনিতে থাকতে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে। যেন ছবি তুলে রাখি।
লম্বুকে নতুন চোখে দেখছে রানা। এই ধেড়ে মাল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চালাতে পারে হোভার কেপেবল রাশান ফাইটার অর্থাৎ এর আছে ফিযিক্স ও অ্যারোডাইনামিক্সের উপর গভীর জ্ঞান। কথা বলে ভূত্যের মত নরম সুরে। দক্ষ সৈনিকের মত নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্য জন্ম। আরও কী গুণ একে দিয়েছে কুয়াশা, কে জানে!
ছবি দেখাও ওকে, বলল কুয়াশা।
বোতাম সরিয়ে শার্টের নীচে কী যেন টিপল রঘুপতি। এক সেকেণ্ড পর বেরোল ডিজিটাল স্ক্রিন। ওটা বাড়িয়ে দিল রানার দিকে। স্ক্রিনে খনির ওদিকের সুড়ঙ্গের বাইরের দৃশ্য। র্যাম্প পেতে বসে আছে চিনুক হেলিকপ্টার। তিন সেকেণ্ড পর পাল্টে গেল দৃশ্য।
দেখা গেল খনির পিছনের, সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়েছে দতগামী কয়েকটা গাড়ি। সামনে চলেছে এক লাইট স্ট্রাইক ভেহিকেল।
রানার পাশ থেকে বলল কুয়াশা, প্যাসেঞ্জার সিটে তিনটে সাদা বাক্স দেখছ? মেডিকেল ট্র্যান্সপোর্ট কেস। ওখানে রয়েছে। তিনটে কাটা মাথা।
স্ক্রিনে এবার দেখা দিল ঝাপসা ছবি। দুই এলএসভির পিছনে ছুটছে এক ড্রিফটরানার।
পিছনের ট্রে খেয়াল করুন, বলল রঘুপতি। প্রায় প্রত্যেকের পরনে কালো পোশাক। কিন্তু একজন… তার মাথায় হেলমেট নেই। পরনে ইউএন-এর ইউনিফর্ম। তিশাকে দেখতে পেল রানা।
খুবই ঘোলাটে ছবি, কিন্তু চেনা যায় পরিষ্কার। ড্রিফটরানারের রিয়ার ট্রের উপর পড়ে আছে, অচেতন। ঘাড়ের কাছে শিরশির করে উঠল রানার। দুনিয়ার সেরা বাউন্টি হান্টারের হাতে আটকা পড়েছে তিশা। যে করে তোক উদ্ধার করতে হবে ওকে।
না, রানা, যা ভাবছ, তা ভুল চিন্তা, বলল কয়াশা, যেন মন পড়ছে। হেন্ড্রিক চায় তুমি ওর হাতের মুঠোয় চলে যাও। কোনও তাড়াহুড়ো করতে যেয়ো না। আমি জানি কোথায় থাকবে তিশা। ভুলেও ওকে খুন করবে না হেন্ড্রিক। ওই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে ওর, নইলে তোমাকে হাতের মুঠোয় পাবে না।
আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী ভাবে? জানতে চাইল রানা।
কারণ, আমি নিজে হলেও ওই একই কাজ করতাম, বলল কুয়াশা।
পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে দুজন। কয়েক মুহূর্ত পর রানা। বলল, আপনি এই বাউন্টি হান্ট সম্পর্কে কতটা জানেন?
কাঁধ ঝাঁকাল বৈজ্ঞানিক। তুমি নিশ্চয়ই জানো বহু কারণে। বাউন্টি হান্ট করা হয়, রানা? অন্য দেশের কাছে গুপ্ত তথ্য বিক্রি করতে চাইছে, এমন বিশ্বাসঘাতক গুপ্তচরকে শেষ করতে এমন করা হয়। কোনও কিডন্যাপারকে ধরে আনবার জন্যেও দেয়া হয়। টাকা। কিন্তু এসব কারণে তোমাকে খুন করতে চাইছে না এরা। …এখনও জানি না কারা টাকা দিচ্ছে। কিন্তু এটা জানি, টাকা দেয়া হবে এক সুইস ব্যাঙ্কারের হাত দিয়ে। তার নাম পি. এস. ড্যাবলার। এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা আছে তার। আর টাকা যখন দেবেই, কার কাছ থেকে টাকা আসছে তা নিয়ে ভাবতে যায় না বাউন্টি হান্টাররা। গত দু-এক দিন থেকে শুরু হয়েছে মাথা কেটে নেয়ার প্রতিযোগিতা। প্রতিজনের জন্যে তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার। মোটমাট প্লনেরোটা মাথা। সবমিলে চার শ পঁচানব্বই মিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর যে-কোনও বড় আর্থিক পুরস্কারের চেয়ে অনেক বেশি দেয়া হচ্ছে।
মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার, খুশি-খুশি সুরে বলল রঘুপতি।
সন্দেহ নিয়ে তাকে দেখল নিশাত ও খবির।
আপনাদের ভয় নেই, ভয় সব মেজর রানার, হাসির সুরে বলল রঘুপতি।
রোবটের কৌতুক ভাল লাগছে না, খেঁকিয়ে উঠল নিশাত।
আমারও ভাল লাগে, তা নয়, বলল কুয়াশা। কিন্তু মানবিক গুণ দিতে গিয়ে এমন হয়েছে। রানার দিকে চাইল। আগামীকাল নিউ ইয়র্ক সময় দুপুর বারোটার আগেই শেষ হবে শিকার পর্ব।
একবার হাতঘড়ি দেখল রানা। কঙ্গোর সময় অনুযায়ী বাজে প্রায় সকাল আটটা। চিন্তা থেকে জেগে উঠল রানা, কুয়াশাকে বলল, এবার কী করতে চান?
আপাতত তোমার পাশে থাকব, মানুষ-শিকারের সময়টা পেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত, বলল বৈজ্ঞানিক। আমি তোমাকে বন্দি করিনি, তুমি মুক্ত থাকবে, যেখানে খুশি যেতে পারো। পাশে পাবে। আমাকে।
কেন আমার জন্যে এতকিছু করছেন? সরাসরি জানতে চাইল রানা।
মৃদু হাসল বাঙালি বৈজ্ঞানিক। বলতে পারো নিজ অন্তরের তাগিদে। গতবার যখন আমাদের দেখা হলো, তারও আগে অনেক কিছুই জেনেছি তোমার বিষয়ে। বুঝতে সময় লাগেনি, আমাদের ওই ছোট্ট, সুন্দর, সবুজ, মায়াময় দেশটাকে সত্যিই প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসো তুমি। আর এটা জানা আমার জন্যে যথেষ্ট। রাশার এক সরকারী গবেষণাগারে কাজ করছিলাম গুপ্ত পরিচয়ে, তখনই জানলাম মেরে ফেলা হবে তোমাকে। এর পর দেরি করিনি।
চুপ করে থাকল রানা।
হৃদয়ের গভীরে অনুভব করল, এই ভিন দেশেও মস্ত এক উপকারী সত্যিই ওকে সাহায্য করবে।
তা ছাড়া আরও একটা কারণ আছে, বলল কুয়াশা। সেটা খুব সম্ভব তুমি জান। তোমারই কারণে আমার বিরুদ্ধে অতীতের সব অভিযোগ তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তোমার বস সে দিকটা ম্যানেজ করেছেন। তিনি আমারও শ্রদ্ধেয় একজন নিষ্কলঙ্ক মানুষ। এখন আমি বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক, যখন খুশি নিজের দেশে ফিরতে পারি।
আপনি জানলেন কী করে তিশাকে কোথায় নেবে? জানতে চাইল ও।
মাইক্রোডট অ্যারোসলের কারণে, বলল কুয়াশা। হেণ্ডিকের লোক আসার আগেই ওই জিনিস ছড়িয়ে দিয়েছে রঘুপতি।
আস্তে করে মাথা দোলাল রানা।
শুনেছে মাইক্রোডট টেকনোলজির কথা।
ওটা হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সেরা ন্যানোটেকনোলজি। মাইক্রোডট আসলে মাইক্রোস্কোপিক সিলিকন চিপস, একেকটা বড়জোর পিনের ডগার সমান বা তার চেয়েও ছোট। কিন্তু প্রতিটির রয়েছে অকল্পনীয় কমপিউটিং ক্ষমতা। অনেকে ধারণা করছে, ভবিষ্যতে মাইক্রোডট ব্যবহার করে তৈরি করা হবে লিকুইড বেড সুপারকমপিউটার- সে তরলের কণাগুলোর থাকবে বিপুল চিন্তাশক্তি।
আপাতত মাইক্রোডট ব্যবহার হচ্ছে দামি সব গাড়ি খুঁজে বের করবার জন্য।
ধরে নেয়া যাক, কোনও ফেরারি গাড়িতে স্প্রে করা হলো। মাইক্রোডট পেইন্ট, তারপর ওই গাড়ি যেখানেই থাকুক না কেন, দুনিয়ার যে-কোনও জায়গায়, তা খুঁজে নিতে লাগবে বড়জোর কয়েক সেকেণ্ড
বারোটা বাজবে গাড়িচোরের।
রঘুপতি সুড়ঙ্গের মুখে মাইক্রোডটের মেঘ ছড়িয়ে দেয়ায়, ওই। এলাকায় ছিল কয়েক বিলিয়ন খুদে কমপিউটার।
হেন্ড্রিক, তার লোক, ভেহিকেল বা তিশার দেহে আটকে গেছে আমার তৈরি মাইক্রোডট, বলল কুয়াশা। বেল্ট থেকে নিল ছোট্ট পাম কমপিউটার। ওটা, বড়জোর পিডিএ-র সমান। মনে হলো ওয়াটারপ্রুফ।
স্ক্রিনে দুনিয়ার মানচিত্র।
সুদানের দিকে রওনা হয়েছে ঝিলমিলে অসংখ্য কণা। ডেভিড এন. হেন্ড্রিক ও তার দল।
ওই মাইক্রোডট দুনিয়ার যে-কোনও জায়গা থেকে এই স্ক্রিনে দেখতে পাবে, বলল কুয়াশা।
এখন ওর পরিকল্পনা স্থির করতে হবে, কীভাবে কী করবে ভাবতে শুরু করেছে রানা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, আমাদের প্রথমে জানতে হবে কেন এসব ঘটছে।
শতবারের মত বুক পকেট থেকে বাউন্টি লিস্ট বের করল ও। ওর কাঁধের পিছন থেকে লিস্টি পড়ল নিশাত ও খবির।
কাজটা বোধহয় মোসাদের, নিচু স্বরে মন্তব্য করল নিশাত। এইমাত্র একটা এন্ট্রির উপর চোখ পড়েছে।
ওখানে লেখা: ম্যাকিন, ডেনিস ই.। ইজরায়েল, মোসাদ।
কী কারণে এমন ভাবছেন, আপা? জানতে চাইল রানা।
খনির ভেতর ইজরায়েলের মোসাদ সম্পর্কে কী যেন বলছিল টেরোরিস্ট আলাল হোসেন। তারপর এক লোক ঘঁাচ করে কেটে নিল ওর মাথা। বদ্ধ উন্মাদ ছিল লোকটা, বলছিল: সোভিয়েত গবেষণাগারে তার কিছুই হয়নি, ইউএস ক্রুজ মিসাইল পড়লেও সে পাত্তা দেয়নি, মোসাদও তাকে কখনও ছুঁতে পারবে না। আগেও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে তারা।
মোসাদ… বিড়বিড় করল রানা। স্যাটালাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে চাইল কেভিন কনলনের সঙ্গে। কেভিন, তুমি এখনও লাইনে আছ?
জবাব এল, যতক্ষণ কফি আছে, আমিও অফিসে আছি।
কেভিন, আলাল হোসেন আর ডেনিস ই. ম্যাকিনের মধ্যে ক্রস-ম্যাচ করতে পারবে?
এক সেকেণ্ড, বলল প্রতিভাবান কোড উইয়ার্ড। হ্যাঁ, তথ্য আসতে শুরু করেছে। ইউএস-ইজায়েলি ইন্টেলিজেন্স একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছিল। মেজর ডেনিস ই, ম্যাকিন ছিল আলাল হোসেনের কাটসা, বা কেস অফিসার। কাজ ছিল ওই টেরোরিস্টের ওপর চোখ রাখা। হাইফাতে পোস্টিং হয়। কিন্তু গতকাল তাকে পাঠানো হয়েছে লণ্ডনে মোসাদ হেডকোয়ার্টারে।
লণ্ডন? বিড়বিড় করল রানা। মনের ভিতর তৈরি হচ্ছে। নাতিদীর্ঘ পরিকল্পনা।
গতকাল লড়াইয়ের শুরু থেকেই এক পা এক পা করে পিছাতে হচ্ছে ওকে। এবার সামনে বাড়তে চাইছে ও।
আপা, লণ্ডনে মেজর ম্যাকিনের সঙ্গে দেখা করতে আপত্তি আছে আপনার? সে হয়তো এই পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করতে পারবে।
আপনার জন্যে খুশি মনে যাব, বলল নিশাত।
আমিও তা হলে আপার সঙ্গেই যাই, বলল খবির।
ভাল হয়, বলল রানা।
মন দিয়ে ওদের কথা শুনল কুয়াশা, কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না।
আরেকটা কথা, মেজর রানা, ভেসে এল কনলনের কণ্ঠ। আগে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে বলা হয়নি। কথাগুলো ইউএস আর্মি মেডিকেল রিসার্চ অ্যাণ্ড মেটারিয়াল কমাণ্ডের তথ্য। ওই ন্যাটো এমএনআরআর স্টাডি? ওসব তথ্য রয়ে গেছে আমার নাগালের বাইরে। দুমাস আগে জরুরি হয়ে ওঠে ওসব। এবং ওই সময়ের পর ইউএসএএমআরএমসি কমপিউটার থেকে সব মুছে ফেলা হয় বা ধ্বংস করা হয় সমস্ত কাগজ। শুধু জেনেছি, অ্যারিঘোনার এক ওয়্যারহাউসে রয়ে গেছে। একটামাত্র কপি।
কিন্তু যারা মেডিকেল রিসার্চ কমাণ্ডের তথ্য জড় করেছিলেন, তাঁদের দুজনের ঠিকানা জোগাড় করেছি। এঁদের নাম বেইন্স ও ওয়াকার। একবছর আগে অবসর নিয়েছেন বেইন্স। এখন থাকেন। ফ্লোরিডার এক রিটায়ারমেন্ট ভিলেজে। কিন্তু মাত্র দুমাস আগে ইউএসএএমআরএমসি থেকে অবসর নিয়েছেন ওয়াকার। এখন ভার্জিনিয়ার জন্স হসপিটালের ইআর বিভাগের চিফ ফিজিশিয়ান। জায়গাটা পেন্টাগন থেকে বেশি দূরে নয়।
তাই? বলল রানা, কেভিন, একদিনের জন্যে ফিল্ড অফিসার হবে?
আমার আপত্তি নেই, অফিস থেকে বেরুতে পারলে বাঁচি। আমার বর্তমান বস্ দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য গাধার পোঁদ!
তা হলে সুযোগ বের করে বেরিয়ে পড়ো, যাও সেন্ট জন্স হসপিটালে। আলাপ করে দেখো মিস্টার ওয়াকারের সঙ্গে।
প্রথম সুযোগে তা-ই করব আমি, রাখলাম, লাইন কেটে গেল।
আর আপনি কী করবেন, স্যর? রানার কাছে জানতে চাইল নিশাত। মিস্টার কুয়াশার সঙ্গে… চট করে রহস্যময় বৈজ্ঞানিককে দেখে নিল ও। বিশ্বাস করছে না এক ফোঁটাও।
মৃদু কুঁচকে গেল কুয়াশার ভুরু। কোনও মন্তব্য করল না।
স্যর, আমাদের সঙ্গেই চলুন, বলল খবির।
এই বাউন্টি হান্টের গোড়ার কাছে পৌঁছুতে চাই, বলল রানা। প্রথমে যাব ফ্রান্সের ওই দুর্গে।
স্যর, আপনি নিশ্চয়ই সদর-দরজায় গিয়ে টোকা দেবেন না? জানতে চাইল নিশাত।
না, তা করব না, বলল রানা। আগে জোগাড় করব কাটা মুণ্ডু। তারপর ওটা নিয়ে যাব পুরস্কার আদায় করতে।
তার মানে, স্যর… বিস্ফারিত হলো নিশাতের চোখ। কারও ধড় থেকে কেটে নেবেন মাথা?
না, অন্য কাজ করব, অন্যমনস্ক হয়ে কুয়াশার পাম কমপিউটারের দিকে চাইল রানা! স্ক্রিনে দেখল, কোথায় চলেছে। দুনিয়াসেরা বাউন্টি হান্টার ডেভিড এন. হেন্ড্রিক ওরফে ডেভিল। এখন জানি কোথায় পাব তাজা মাথা। সেসব জোগাড় করব, তারপর ফিরিয়ে আনব তিশাকে।
তেরো
পাইন রিটায়ারমেন্ট ভিলেজ।
মায়ামি, ফ্লোরিডা।
অক্টোবর ১৩। সন্ধ্যা মাত্র সাতটা।
সামনের ডেস্কের নার্সের বুঝবার উপায় ছিল না ওই লোক ভয়ঙ্কর খুনি।
নরম সুরে জানতে চাইল নার্স, কোনও সাহায্যে আসতে পারি?
জবাবে লোকটা মাথা নেড়ে বলল, সে এসেছে পাইন রিটায়ারমেন্ট ভিলেজের অসুস্থ এক রোগীর ব্যক্তিগত জিনিসগুলো হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার জন্য।
খুনি লম্বা ও চিকন, গায়ের রং কুচকুচে কালো, ফুলে ওঠা কপাল। সবমিলে মনে হয়, আফ্রিকান লোক। সাক্ষীরা জানবে না, কিন্তু দুনিয়া জুড়ে বাউন্টি হান্টিং সমাজে তার নাম: দি আফ্রিকান।
ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর আততায়ী সে।
পরনে সাদা ল্যাবকোট। দালানে ঢুকে খুব শান্ত পায়ে হাঁটছে। পাশ কাটিয়ে গেল নার্সকে হাতে অর্গান-ডেলিভারি সাদা বক্স।
কয়েক সেকেণ্ডে খুঁজে নিল নির্দিষ্ট ঘর, ভিতরে ঢুকে দেখল এক বয়স্ক লোক ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। নাম তার ফেড বেইন্স।
পাইন রিটায়ারমেন্ট ভিলেজের কর্তপক্ষ থেকে শুরু করে প্রত্যেকে পছন্দ করে তাকে, খুব হাসিখুশি মানুষ। সবাই জানে, পেশায় বেইন্স ডাক্তার ছিল, একবার গলফ কোর্সে বয়স্ক এক রেসিডেন্টের হার্ট অ্যাটাক হলে তার প্রাণও বাঁচিয়েছিল।
কিন্তু অবাক ব্যাপার, আর সবার মত কখনও নিজের জীবনের সাফল্যের কথা বলে না সে।
জিজ্ঞেস করলে বড়জোর জানায়, ফোর্ট ডেট্রিকের ইউএস আর্মি মেডিকেল রিসার্চ অ্যাণ্ড মেটেরিয়াল কমাণ্ডের সায়েন্টিস্ট ছিল। আর্মড ফোর্সের জন্য সামান্য কিছু মেডিকেল টেস্ট করত। তারপর তো অবসরই পেল।
ঘুমন্ত বেইন্সের পাশে থামল দি আফ্রিকান, কোটের তলা থেকে বের করল ধারালো ম্যাচেটি…
দুঘণ্টা পর এয়ারপোর্টের লং-টার্ম কারপার্কে তার পরিত্যক্ত, গাড়ি পেল পুলিশ।
ততক্ষণে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের যিরো সিক্স-থ্রি ফ্লাইটে প্যারিসের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে কুচকুচে কালো খুনি। পাশের সিটে সাদা অর্গান-ডেলিভারি বক্স।
জার্মানি। বার্লিন।
অক্টোবর, ১৩।
ইউনাইটেড স্টেট অভ আমেরিকার নাগরিক হ্যারিস এক্স. টেরেন্স। তারচেয়েও বড় কথা, সে চাকরি করে আইএসএস-এ। একসময়ে ছিল খুবই দক্ষ এজেণ্ট। আজকাল অফিস ছুটির পর হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ বুড়ো ইবলিশ।
কচি মেয়ের শরীর চাই প্রতিদিন। গণ্ডারের মত পিছন থেকে ভোগ করবে। ফুর্তি চরমে উঠলে বিকট হাঁক ছাড়বে উন্মত্ত কাউবয়ের মত, খামচে ধরবে নধর নিতম্ব।
বার্লিনের রেড লাইট ডিস্ট্রিক্টের এক পতিতার কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছে আজকের মেয়েটি।
আগের সেই দিন আর নেই হ্যারিস এক্স. টেরেন্সের। কোল্ড ওঅরের সময়ে সে ছিল ইস্টার্ন ব্লকের বিষয়ে এক নম্বর এক্সপার্ট, সবাই গুরুত্ব দিত তার প্রতিটি কথায়। এখন বার্লিনের আইএসএস অফিসে ডেস্ক জবে বসিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। হ্যারিসের বয়সও হয়েছে, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মগজের ধার। আশির দশকের শেষভাগে যে দুর্দান্ত সব কাজ করেছে, আজকাল সেইসব স্মৃতির জাবর কাটে।
কেন, সোভিয়েত রাশা থেকে কিয়েভ ফাইল নিয়ে নরমানোভ পালিয়ে আসতে চাওয়ায় তাকে পশ্চিম ব্লকে সরিয়ে আনেনি সে?
এসব ভুলে যায় নতুন সব এজেন্ট।
আসলে মেনে নিয়েছে হ্যারিস, নতুন অচেনা এই বিশ্বে পুরনো, বুড়ো এক ঘেয়ো কুকুর হয়ে উঠেছে সে।
আজ রাতে সহজেই এই মেয়েটির উপর চোখ পড়েছিল।
অবাক হওয়ার কিছুই নেই। দেখবার মতই দীর্ঘ, পেলব, সুডৌল ঊরু। দামি যে-কোনও মডেলের মত সুঠাম দুকাপ। আর ওই পূর্ণ আপেলের মত ধবল দুই স্তন যেন এসেছে খোদ স্বর্গ থেকেই। ইউরোশিয়ান দুই চোখে নরম চাহনি।
হ্যারিস শুনেছে কেউ কেউ ওই মেয়েকে ডাকে: বরফ-শুভ্র রানি।
হ্যারিসের বিছানার উল্টোদিকে বারকাউন্টারে পার্স রেখে শাওয়ার নিতে গিয়েছিল মেয়েটি, এইমাত্র বেরিয়ে এসেছে জন্মদিনের আদিম পোশাকে। দুহাত রেখেছে পিছনে, ফলে আরও উদ্যত হয়ে উঠেছে ধবধবে স্তন।
খুশিতে সাত পাটি দাঁত বেরোলো হ্যারিসের, ঝাঁপিয়ে পড়ল বিছানায়, ঝটকা দিয়ে চিত হলো কিন্তু তখনই দেখল মেয়েটার হাতে খাটো একটা সামুরাই তলোয়ার।
সাঁই করে ওটা নেমে এল হ্যারিসের গলার উপর!
.
বেইরুত, লেবানন।
অক্টোবর ১৩। রাত নয়টা।
পরে সাক্ষীরা বলবে, খুনটা করেছে খুবই পেশাদার একদল আততায়ী। তাদের নিজেদের কারও কিছুই করবার ছিল না।
ধারণা করা হয়, সিনিয়র হামাস কমাণ্ডার আজিজ আমিনকে। ট্রেনিং দিয়েছিল সোভিয়েত সেনাবাহিনী।
খুবই সতর্ক লোক, চারপাশ ভালভাবে দেখে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে ঢুকেছে।
আর তখনই ক্রিচ-ক্রিচ আওয়াজ তুলে লবির বাইরে থামল দুটো সেডান, নেমে এল আটজন কমাণ্ডো, ছিটকে ঢুকল বাড়ির ভিতর। তাদের একজনের হাতে সাদা একটা বাক্স। একপাশে লাল রেড ক্রস চিহ্ন আঁকা।
সাক্ষীরা অবশ্যই বলবে: আততায়ীদের প্রত্যেকের হাতে ছিল ভিযেড-৬১ স্করপিয়ন মেশিন পিস্তল।
মাত্র দুমিনিট ব্যয় করেছে লোকগুলো। তারপর আবারও চাকার কর্কশ আওয়াজ তুলে বিদায় হয়েছে।
পাঁচ মিনিট পর নির্জন লবির একপাশে পাওয়া গেছে আজিজ আমিনকে। কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার মাথাটা।
চোদ্দ
ব্রিটানি, রিপাবলিক অভ ফ্রান্স।
অক্টোবর ১৪, স্থানীয় সময় এগারোটা পঞ্চাশ মিনিট। ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
নির্দিষ্ট মানুষটি সেই ছোটবেলা থেকেই সবসময় বিশৃঙ্খলা পছন্দ করত।
ভাবতেই তার ভাল লাগত উদ্দাম-উচ্ছল জীবন।
বৈধ-অবৈধ সরকার, ন্যায্য আইন বা সমাজ?
উঁহু!
মানব-সমাজে ন্যায়-নীতি-আইন-শৃঙ্খলা এসব থাকবে কেন!
ভাল লাগে তার নতুন করে বুঝতে, কীভাবে সুযোগ পেলেই ভয়ঙ্কর স্বার্থপর হয়ে ওঠে মানুষ!
হয়তো ধসে পড়ল গোটা ফুটবল স্টেডিয়াম, আর একে অপরকে মাড়িয়ে খুন করছে!
বা ঘটে গেল ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প। এটাই স্বাভাবিক যে সাধারণ মানুষ লুট করবে অন্যের সর্বস্ব।
আর যুদ্ধ বাধলে?
নানজিং, মাই লাই, স্ট্যালিনগ্রাদ… সবাই মিলে কী করে?
একে অপরের মা-বোনকে ধর্ষণ করে, খতম করে জানের শত্রুকে।
এমনই তো হবে মানুষ!
জীবন তো এমনই!
আহ্, ভাবতেই ভাল লাগে!
কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে টেলিকনফারেন্স শুরু হতে আরও দশ মিনিট।
তার মানেই বারো নম্বর সদস্যের হাতে সামান্য সময় আছে। সময়টা নষ্ট করা ঠিক নয়, ভাবছে সে। বারো নম্বর সদস্যের নাম ডেমিয়েন ডগলাস। বয়স মাত্র সাতাশ। কাউন্সিলের কনিষ্ঠ সদস্য। জন্ম নিয়েছিল বিপুল ধনদৌলতের মাঝে। বাবা আমেরিকান, মস্ত ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। মা ফ্রেঞ্চ নামকরা জমিদার পরিবারের মেয়ে।
ছোটবেলা থেকে যা চেয়েছে, সবই জুগিয়ে দেয়া হয়েছে ডেমিয়েনকে। কোনও চাহিদা পূরণ হয়নি, এমন হওয়ারও উপায়। ছিল না। বাবা-মার একমাত্র সন্তান সে, চোখের মণি।
তার চাহনি সাপের মত শীতল, দ্বিতীয়বার চিন্তা করে কথা বলে সবাই। শাপে বর হয়েছে ওই সর্পদৃষ্টি। মস্ত সাহসীর বুক কাঁপিয়ে দিতে পারে মাত্র পাঁচ সেকেণ্ডে।
আরেকটা বড় অস্বাভাবিকতা: ডেমিয়েন ডগলাসের এক চোখের মণি গাঢ় নীল, অন্যটা পচা ডিমের কুসুমের মত হলদেটে।
অসংখ্য মস্ত সব কোম্পানির বিপুল মুনাফার কারণে তার। বর্তমান সম্পদ এখন ঊনষাট বিলিয়ন ডলার।
তার মার দিক থেকে পাওয়া সম্পত্তি ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
কাউন্সিলের নয় নম্বর সদস্যকে মোটেও পছন্দ করে না ডেমিয়েন।
সে-লোলাকের অন্যান্য সম্পদ তো আছেই, এ ছাড়া পেয়েছে। জন্মসূত্রে টেক্সাসের বেশ কয়েকটি তেলখনি।
নয় নম্বর সদস্যের বুদ্ধি স্বল্প বলে ধারণা করে ডেমিয়েন।
আটান্ন বছর চলছে লোকটার, কিন্তু আজও যে-কোনও কিছু নিয়ে এঁড়ে তর্ক করে।
এ কারণে তাকে গণ্ডারও বলা যেতে পারে।
যখন থেকে কাউন্সিলের মিটিঙে বসছে ডেমিয়েন, তখন থেকেই তার প্রতিটা কথায় আপত্তি তুলছে এই লোক।
আর এখন, এ মুহূর্তে নয় নম্বর দাঁড়িয়ে আছে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের চওড়া ডানজনের নীচতলায়। সঙ্গে দুই এইড ও দুই বডিগার্ড। চারপাশে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে পুরু পাথরের বৃত্তাকার দেয়াল। ভয়ে সাদা হয়ে গেছে দুই এইডের চেহারা। তাদের একজন মহিলা। দুই ব্যক্তিগত বডিগার্ডের দিকে চাইছে না নয়। নম্বর। অস্বস্তি বোধ করছে। চোখ ডানজনের নির্দিষ্ট জায়গায়।
ওই অংশকে বলা হয় শার্ক পিট।
মস্ত কুয়া পাথুরে দেয়ালে ঘেরা। ষোলো ফুট গভীর। বৃত্তাকৃতি। বৃত্তের ব্যাস দেড় শ ফুটের কম নয়।
কুয়ার মেঝেতে রয়েছে পাথরের ছোট-বড় মঞ্চ।
একটা বিষয় একেবারে পরিষ্কার: কাউকে এ পিটে নামিয়ে দিলে কারও সাহায্য ছাড়া নিজ চেষ্টায় উঠে আসতে পারবে না।
কুয়ার ঠিক মাঝখানে খাড়া নেমে গেছে দশফুট চওড়া একটা গর্ত, সেটা সাগরে গিয়ে মিশেছে।
কিছুক্ষণ হলো সাগরে আসতে শুরু করেছে জোয়ার।
শার্ক পিট বেয়ে কুলকুল আওয়াজে দ্রুত উঠছে পানি, বিশাল গর্তে ধীরে ধীরে বাড়ছে লোনা জল।
মেঝের পাথুরে মঞ্চগুলো হয়ে উঠছে যেন ছোট ছোট দ্বীপ।
একটু পর তলিয়ে যাবে সব।
নয় নম্বর সদস্য এবং বডিগার্ডদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। দেখছে ডেমিয়েন ডগলাস, হাসছে মনে মনে।
এইমাত্র শার্ক পিটে হাজির হয়েছে কালোদুটো ছায়া। অলস ভঙ্গিতে সাঁতার কাটছে দ্বীপগুলোর মাঝ দিয়ে।
পানি-সমতলে ভেসে ওঠেনি, কিন্তু পরিষ্কার দেখা গেল ডর্সাল ফিন ও বুলেটাকৃতি মাথা।
মস্ত দুই টাইগার শার্ক ওগুলো। জোয়ার এলেই খাবারের খোঁজে আসে।
কয়েক সেকেণ্ড পর পানির নীচে দেখা দিল আরও দুই ছায়া। দুর্গের ডানজনের দক্ষিণ দিকে ব্যালকনি।
ফ্রান্সে বিপ্লব শুরু হওয়ার আগে ডানজনে গ্ল্যাডিয়েটারদের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করত ফ্রেঞ্চ অভিজাত কর্তারা। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে লড়ত সাধারণ মানুষ। অবশ্য, ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নে সবসময়ই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে ক্ষুধার্ত সিংহ, বাঘ বা নেকড়েকে।
এই ডানজনের উঁচু ব্যালকনি থেকে পরিষ্কার দেখা যায় শার্ক পিট।
ব্যালকনির নীচে সবচেয়ে বড় পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক ডিভাইস: বারো ফুট উঁচু গিলোটিন।
মজা পাওয়ার জন্য ওটা ডানজনে যোগ করেছে ডেমিয়েন। ডগলাস।
গিলোটিনের পায়ের কাছে কাঠের তাকিয়া। মাঝে মাথা রাখবার জন্য খোড়লের মত জায়গা। দুপাশের কাঠের স্লটে আটকে দেয়া হবে বন্দির দুই হাত। গিলোটিনের পাশে ক্র্যাঙ্ক হ্যাঁণ্ডেলের মাধ্যমে উপরে তুলতে হবে ক্ষুরধার ফলা। তারপর বড় একট লিভার সরিয়ে নিলেই…
উনিশ শ সাঁইত্রিশ সালে চায়নিজ শহর ন্যানজিঙে জাপানি সৈনিকরা যা করেছিল, সেটা পড়েই উৎসাহিত হয়েছে ডেমিয়েন।
ওই ভয়ঙ্কর তিন সপ্তাহে জাপানিরা বীভৎস অত্যাচার করেছিল চিনাদের উপর। খুন করেছিল তিন লাখ ষাট হাজার মানুষকে। পরে জানা গেল, জাপানি সৈনিকরা নিজেদের ভিতর চৈনিকদের মাথা কাটবার প্রতিযোগিতা করছিল। আরও খারাপ কিছু করত। যেমন, কারও বাবাকে বলা হতো: তোমার মেয়েকে ধর্ষণ করতে হবে তোমার, নইলে… বা ছেলেকে বলা হতো: মা-র সঙ্গে যৌন মিলন করতে হবে তোমার, নইলে মরতে হবে তোমাকে।
এসব জেনে খুব আমোদ পেয়েছে ডেমিয়েন।
সাধারণ চিনা পুরুষরা অকল্পনীয়, নারকীয় এসব প্রস্তাব ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে সম্মানের মৃত্যু বরণ করত।
কিন্তু কেউ কেউ তা করেনি।
আর তাতেই দারুণ বিমোহিত হয়েছে ডেমিয়েন।
আশ্চর্য, নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে কতবড় পশু হতে পারে মানুষ?
চমৎকার ব্যাপার না?
এসব নিয়ে ভাবতে গিয়েই শার্ক পিটের ডানজনে গিলোটিন বসিয়েছে ডেমিয়েন।
মানুষকে দুধরনের মৃত্যুর ভিতর যে-কোনোটা বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয় সে।
মরতে পারো টাইগার শার্কের ভয়ঙ্কর হামলায়, অথবা চট করে মরতে পারো প্রায়-ব্যথাহীন গিলোটিনে যেটা খুশি!
ওর প্রচণ্ড আনন্দ হয় যখন কজনকে নামিয়ে দিতে পারে শার্ক পিটে, বলতে পারে: গিলোটিনে চড়িয়ে শেষ করে দাও তোমাদের বসকে, তাহলেই আমি তোমাদেরকে ছেড়ে দেব। অথবা বলতে পারে: খুন করো ওই মহিলাকে, বন্ধ করো ওর চিৎকার, তোমাদের ছেড়ে দেব।
অবশ্য, শেষ পর্যন্ত কাউকেই ছাড়ে না সে।
অসহায় বন্দি মানুষগুলো প্রথমে বোঝে না, তাদেরকে নিয়ে কী নিষ্ঠুর খেলা খেলছে ডেমিয়েন।
কখনও কখনও দেখা যায়, তারা বাঁচবার জন্য নিজ হাতে খুন করছে প্রিয় কাউকে।
এতে গলা ফাটিয়ে হাসে ডেমিয়েন, তারপর খুনিকে খতম করার সময়ও একই রকম আনন্দে হেসে কুটিপাটি হয়।
নিজেকে তার সবসময় মনে হয় সত্যিকারের ঈশ্বর। চাইলে যখন-তখন কেড়ে নিতে পারে যে-কারও জীবন। আবার ফিরিয়েও দিতে পারে।
জীবিত বা মৃত লোকের জিন ব্যবহার করে ঠিক তারই মত অন্য কাউকে সৃষ্টি করতে পারে।
টাকা তার জন্য কোনও সমস্যা নয়।
এ-মুহূর্তে কুয়ার পাথুরে দেয়াল বেয়ে উঠে আসতে চেষ্টা করছে পাঁচজন অসহায় মানুষ, যার যার জান বাঁচাতে ব্যাকুল। কী ঘটতে চলেছে টের পেয়ে গেছে পরিষ্কার।
তাদেরকে ঘিরছে সাগরের জল, উঠছে প্রতি সেকেণ্ডে।
দেয়াল বেয়ে খামচে দুফুট উঠল নয় নম্বরের মহিলা এইড, ধরতে পেরেছে ছোট কিছু পাথর কিন্তু তা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। প্রকাণ্ডদেহী এক গার্ডও পাথরগুলো দেখেছে, মহিলাকে টেনে নামিয়ে দিয়ে নিজে উঠতে লাগল।
দক্ষিণ ব্যালকনি থেকে দেখছে ডেমিয়েন। ভাবছে: এদের একজনের দাম ছত্রিশ বিলিয়ন ডলার। অন্যদের বেতন বছরে কমপক্ষে এক লাখ বিশ হাজার ডলার।
কিন্তু বাস্তবে কারও মূল্য কম বা বেশি নয় এ মুহূর্তে।
একেই বলে বিশৃঙ্খলা, ভাবল ডেমিয়েন। ওটা এমনই জিনিস, সমান করে দেয় সবাইকে।
দেখতে না দেখতে পিটের মেঝেতে জমল পাঁচ ফুট উঁচু পানি। উঠে এল সবার গলা লক্ষ করে। আগের চেয়ে সহজে গহ্বরের ভিতর ঘুরছে টাইগার শার্কগুলো। মানুষগুলো প্রথমে যে মঞ্চে ছিল, সেটা তলিয়ে গেছে।
পাঁচ মানব সন্তান। চারটে হাঙর। দৃশ্যটা আন্দদায়ক নয় তো কী!
অসহায় মানুষগুলোকে লক্ষ্য করে ছুটে গেল একটা টাইগার শার্ক, গুঁতো দিল একজনের বুক-পেটে। পরক্ষণে উপড়ে নিল লালচে চাকা-চাকা মাংস। দোদুল্যমান পানির ভিতর ছড়িয়ে পড়ল তাজা রক্ত। লালচে ফেনা ছুটে গেল নানাদিকে।
রক্তাক্ত বডিগার্ড তলিয়ে যেতেই হাউমাউ করে উঠল সবাই।
জীবন ভিক্ষা চাইল নয় নম্বর সদস্যের মহিলা এইড। ডেমিয়েনকে মাথা নাড়তে দেখে প্রাণ দিতে চাইল গিলোটিনের নীচে। ব্যবস্থা করে দিল ডেমিয়েনের লোক নিরাপদ দূরত্ব থেকে।
পরের পাঁচ মিনিটের মধ্যে ধারালো ফলা বিচ্ছিন্ন করল মহিলার মাথা। বাকি দুজনকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে তিন হাঙর।
নিজেও গিলোটিন বেছে নিল নয় নম্বর সদস্য। হাঙরের মুখে পড়বার চেয়ে গিলোটিন ঢের ভাল। লিভারটা তাকেই টানতে হলো।
কিছুক্ষণ পর গিলোটিনের মঞ্চে নাচতে লাগল উদ্যত, খ্যাপা সাগর, নীরবে মুছে দিল সমস্ত প্রমাণ।
হাঙরগুলো তৃপ্তি নিয়ে চিবাচ্ছে লাশগুলো।
আর কিছু দেখবার নেই, একবার আস্তে করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজ অফিস লক্ষ্য করে রওনা হয়ে গেল ডেমিয়েন ডগলাস।
জরুরি টেলিকনফারেন্স শুরু হবে একটু পর।
.
পাথুরে দেয়াল জুড়ে প্রকাণ্ড সব টেলিভিশন পর্দা, সেখানে দেখা দিয়েছে পরিচিত কজনের মুখ।
এঁরা কাউন্সিলের সদস্য, মিটিঙের জন্য সময় দিচ্ছেন দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে।
নিজের সিটে বসে পড়ল ডেমিয়েন ডগলাস।
পাঁচ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ায় তার মস্ত শিপিং এবং ডিফেন্স কন্ট্রাক্টিং সাম্রাজ্য পেয়েছে সে। এই অসংখ্য কোম্পানির গোলকধাঁধার নাম ড্রাগন কর্পোরেশন। বহু কিছুর ভিতর ডেস্ট্রয়ার ও লং-রেঞ্জ মিসাইল তৈরি করে ড্রাগন কর্পোরেশন। সরবরাহ করা হয় ইউএস সরকারকে। বাবা মারা যাওয়ার পর পাঁচ বছরে ড্রাগন কর্পোরেশনের মুনাফা পাঁচগুণ বাড়িয়ে ফেলেছে ডেমিয়েন।
এর কিছুদিনের ভিতর ওকে কাউন্সিলে যোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন বর্তমান চেয়ারম্যান। আপত্তি করেনি ডেমিয়েন।
নয় কোথায়, বারো? তার না তোমার সঙ্গে থাকার কথা? টেলিভিশনের পর্দায় নড়ে বসল চেয়ারম্যান।
মৃদু হাসল ডেমিয়েন। সুইমিংপুলে সাঁতরাতে গিয়ে পায়ের পেশিতে খিচ ধরেছে। আমার ব্যক্তিগত ডাক্তার তাকে দেখছে।
সব ঠিক আছে তো?
হ্যাঁ, চিন্তা করবেন না, দ্বিধা না করে বলল ডেমিয়েন। নোয়ার জাহাজগুলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট প্রতিটি জায়গায় পজিশন নিয়েছে। গতসপ্তাহে ডিজিএসই-র লোক শেষ করে দিয়েছে আমেরিকান সৈনিকদের। আমার নরফোকের ফ্যাসিলিটি রক্তে ভাসছে। আমরা ইউএস ইন্সপেক্টরদের জন্যে তৈরি। কাজ করছে সমস্ত সিস্টেম। সিগনাল দিলেই শুরু হবে সব। মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল ডেমিয়েন, গ্লাস তুলে এক ঢোক পানি গিলে নিয়ে বলল, অবশ্য, মিস্টার চেয়ারম্যান, আগেও বলেছি, এখনও দেরি হয়ে যায়নি, আমরা বাড়তি কাজটাও সেরে নিতে পারি।
বারো! কড়া সুরে বললেন চেয়ারম্যান। আগেই স্থির হয়েছে। সব, এবং এখন কাজ থেকে পিছিয়ে যাব না। আমি দুঃখিত, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, যদি আবারও ওই বাড়তি কাজের কথা তোলেন, সেক্ষেত্রে আপনার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করা হবে।
আস্তে করে মাথা দোলাল ডেমিয়েন। আপনার যা ইচ্ছে, মিস্টার চেয়ারম্যান।
কাউন্সিলের শাস্তি যে করে হোক এড়াতে হবে।
পঞ্চাশের দশকে কাউন্সিলের আইন ভেঙে জাপানের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করায় চরম শাস্তি দেয়া হয় জোসেফ কেনেডিকে, তার হারাতে হয় বিখ্যাত দুই সন্তানকে। আর চার্লস লিবার্গের শিশু সন্তানকে কিডন্যাপ করে খুন করা হয়। ভদ্রলোককে ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়: আমি আসলে অ্যাডলফ হিটলারকে খুবই পছন্দ করি। উনিশ শ ত্রিশের দিকে কাউন্সিলের অমতে নাযিদের সঙ্গে ব্যবসা করবার কারণে চরম শাস্তি পেতে হয় তাকে।
এরপর গত কয়েক বছর আগে কী হলো?
কাউন্সিলের সদস্য ছিল না এনরন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, একেবারে শেষ করে দেয়া হলো অতবড় কর্পোরেশন এবং তার ডিরেক্টরদেরকে।
টেলিকনফারেন্স চলতে থাকল।
দ্বিতীয়বার টু শব্দ করল না ডেমিয়েন ডগলাস।
বর্তমান ইশ্যর বিষয়ে তার ধারণা: কাউন্সিলের অন্যান্য সদস্যের চেয়ে অনেক বেশি জানে সে।
যিম্বাবুইয়ের এক্সপেরিমেন্ট তার নিজ আইডিয়া। আর ওটার কারণেই জানা গেছে, এর পর কী ঘটতে চলেছে বিশ্বে। দশকের পর দশক ইউরোপিয়ানদের হাতে অর্থনৈতিক অত্যাচার সইবার পর দারিদ্র-পীড়িত আফ্রিকার জনগণ বা সরকারগুলো এখন মানতে রাজি নয়, শ্বেতাঙ্গদের ব্যক্তিগত কোনও সম্পত্তি থাকতে পারে।
তা ছাড়া, গ্লোবাল পপুলেশন গ্রোথের উপর থুবফোর্ড রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর সব হিসাব বদলে যেতে শুরু করেছে।
পশ্চিমাদের জনসংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনক হারে। এবং এর ফলে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে দরিদ্ররা।
কিন্তু এ মুহূর্তে কাউন্সিলে এসব উপাত্ত তুলে তর্ক জুড়লে মস্ত বিপদে পড়বে ডেমিয়েন।
আরও কিছুক্ষণ পর শেষ হলো কাউন্সিলের টেলিকনফারেন্স, অবশ্য অনলাইনে রয়ে গেল কজন কাউন্সিল সদস্য নিজেদের ভিতর গল্পগুজব করছে।
চুপচাপ তাদেরকে দেখছে ডেমিয়েন ডগলাস।
কথার ছলে এক সদস্য জানাল, …গতকাল ওই ড্রিলিং স্বত্ব কিনেছি এক বিলিয়ন ডলারে। বললাম, হয় এক বিলিয়ন, নইলে বাদ থাক তোমাদের সঙ্গে ব্যবসা। উপায় আছে নির্বোধ-গাধা ওই আফ্রিকান সরকারগুলোর সর্বোচ্চ নেতাদের?
হাসছে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। আর গতকাল ক্লাবে লিলি মাখসাখের সঙ্গে দেখা। খুব আগ্রহী মনে হলো ওকে। আবারও জানতে চাইল, কাউন্সিলে পদ দেয়া হবে কি না। আমি বললাম, কত বিলিয়ন ডলার তোমার, লিলি? বলল, তিরিশ বিলিয়ন। জিজ্ঞেস করলাম, আর তোমার কোম্পানির? গর্ব করে বলল, এক শ সত্তর বিলিয়ন। এবার বললাম, বাহ্, যথেষ্ট আছে তো তোমার, তো চলে এসো মেন্স রুমে, আমাকে এক শট দারুণ খেলা দিলেই সিট পাইয়ে দেব। এরপর আর থাকল না মেয়ে, ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল ক্লাব ছেড়ে!
শালা আস্ত ডাইনোসর, ভাবল ডেমিয়েন। পুরনো সব ধারণা নিয়ে পার করে দিল জীবনটা!
মস্ত ব্যবসায়ীর মুখে এসব মানায় না!
বাটন টিপে দিল ডেমিয়েন, অফ করে দিল সিগনাল। মুহূর্তে কালো হয়ে গেল চারপাশের টেলিভিশনের পর্দা।
পনেরো
সাইপ্রাস দ্বীপের পশ্চিমাকাশ চিরে চলেছে কালো সুখোই ফাইটার বিমান।
মাথার উপর নীলাকাশ, নীচেও একই রং গাঢ় নীল ভূমধ্যসাগর।
অক্টোবর ১৩। স্থানীয় সময় দুপুর বারোটা।
কুয়াশার তৈরি মাইক্রোডট জানাচ্ছে কোথায় চলেছে বাউন্টি হান্টার ডেভিড এন. হেণ্ডিকের বিমান।
কঙ্গোর স্ট্যানলি পর্বতমালার কয়লা খনি ত্যাগ করবার পর মাত্র একবার অবতরণ করেছে হেণ্ডিকের বিমান। তাদের জন্য স্থির করা মিশরীয় এয়ারফিল্ডে নামতেই দুভাগে ভাগ হয়েছে। কন্টিনেন্টাল সোলজারদের ইউনিট ৬৬।
একটি বিমানে উঠেছে এক দল, তাদের গন্তব্য লণ্ডন।
অন্য দলটি রয়ে গেছে আগের সেই বিমানেই। ওই কার্গো বিমানের কমপিউটার ডেটা অনুযায়ী ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিম উপকূল লক্ষ্য করে রওনা হবে তারা।
লণ্ডনের দিকে অগ্রসরমাণ বিমানটি চকচকে গালফস্ট্রিম ১৪. এগযেকিউটিভ জেট, ঝোড়ো গতি তুলছে।
পনেরো মিনিট পর ফ্রান্স লক্ষ্য করে রওনা হয়েছে রয়াল এয়ার ফোর্সের সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমান। রিফিউলিং এবং চেকআপের সময়ও দেয়া হয়নি।
তখনই ঘণ্টি বেজেছে রানার মগজে। বুঝে গেছে, হেন্ড্রিককে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। চারপাশে যা ঘটছে, তার সবই জানে তারা। তাদেরই অনুরোধে ওই বিমান নামতে দিয়েছিল মিশরীয় কর্তৃপক্ষ।
লক্ষণটা ভাল নয়। আকাশ চিরে ছুটছে কুয়াশার কালো সুখোই বিমান। এ মুহূর্তে বম বে-তে বসে আছে রানা। দুশ্চিন্তার কারণে কপাল কুঁচকে আছে।
হেন্ড্রিকের বিমানের বহু দূরে দিগন্তের ওপাশে উড়ছে কুয়াশার সুখোই, ব্যবহার করছে স্টেলথ ফিচার।
আমার জানা তথ্য অনুযায়ী, ওটা হেন্ড্রিকের কমন ট্যাকটিক, জানাল কুয়াশা। দুই ভাগে ভাগ করেছে দলকে। প্রথমটা ডেলিভেরি টিম, অন্যটা স্ট্রাইক টিম। শেষেরটার কাজ পরবর্তী টার্গেটকে খতম করা। এবং একই সময়ে ডেলিভারি টিম গন্তব্যে পৌঁছে দেবে বিচ্ছিন্ন মাথা।
স্ট্রাইক টিম যাচ্ছে লণ্ডনে, মন্তব্যের সুরে বলল রানা। এবারের কাজ বোধহয় ডেনিস ই, ম্যাকিনকে শেষ করা।
আমারও তা-ই ধারণা, সায় দিল কুয়াশা।
এবার? কী করবেন, স্যর? রানার দিকে চেয়ে জানতে চাইল নিশাত।
চট করে একবার কুয়াশাকে দেখল রানা। ওর মন চাইছে এখনই হারকিউলিস বিমানে হামলা করতে।
ওখানে অসহায় অবস্থায় বন্দি তিশা।
সম্ভব হলে ফ্রান্সগামী ওই বিমানের পিছু নেব, বলল রানা।
আপত্তি এল না কয়াশার তরফ থেকে, বরং কমপিউটার কঙ্গেলে দটো বাটন টিপল। কয়েক মুহর্ত পর বলল, ঠিক আছে, ওদের কমপিউটারের ফ্লাইট ডেটা পেলাম। নব্বই মিনিট পর তুরস্কের পশ্চিমে মিড-এয়ার রিফিউয়েলিং করবে।
কোথা থেকে টেকঅফ করবে ট্যাঙ্কার বিমান? জানতে চাইল রানা।
সাইপ্রাস দ্বীপের ব্রিটিশদের অ্যাকরোটিরি এয়ারফোর্স বেস থেকে, বলল কুয়াশা। এরিয়াল ট্যাঙ্কারটা ভিসি-১০। আকাশে উঠবে পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর।
চট করে নিশাত ও খবিরকে দেখল রানা। পরক্ষণে কুয়াশাকে বলল, আপনার আপত্তি না থাকলে আমি চাই আপা আর খবিরকে লণ্ডনে পৌঁছে দিক রঘুপতি। আপনি ওদের নেতৃত্ব দিলে খুশি হব। হেন্ড্রিকের ওই দল ম্যাকিনকে শেষ করার আগেই পৌঁছতে হবে। সেজন্যে সুখোই ফাইটার লাগবে।
লণ্ডনে গিয়ে আমাদের কাজ কী হবে, স্যর? জানতে চাইল নিশাত।
বলছি, বলল রানা। সোজা লণ্ডনে যাবেন। আর আমি নামব সাইপ্রাসে…
আমার আপত্তি আছে। আমি তোমার সঙ্গে থাকছি, বলল বৈজ্ঞানিক, অন্তত এই বাউন্টি হান্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
আস্তে করে মাথা দোলাল রানা। নিশাত ও খবিরকে খুলে বলতে লাগল, কী করতে হবে লণ্ডনে পৌঁছবার পর।
.
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর এয়ার-টু-এয়ার রিফিউয়েলিঙের জন্য সাইপ্রাস দ্বীপের ব্রিটিশ এয়ার বেস থেকে আকাশে উঠল ভিকার্স ভিসি-১০, পেটমোটা বিমান।
কিন্তু বিমানের চার ক্রু ভুলেও জানল না রিয়ার কার্গো বে-তে উঠেছে অচেনা দুই লোক।
অ্যাকটিভ স্টেলথ পর্দার আড়ালে বিমান থেকে মাসুদ রানা এবং কুয়াশাকে সাইপ্রাসের সাগরতীরে নামিয়ে দিয়েছে রঘুপতি।
এরপর লণ্ডন লক্ষ্য করে রওনা হয়েছে তিনজনের দলটি।
রানা ভেবেছিল বিএসএস-এর চিফ মার্ভিন লংফেলোর সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তার সাহায্য নিয়ে ওই রিফিউয়েলিং বিমানে উঠবে।
কিন্তু পরে নাকচ করেছে চিন্তাটা।
সাগরতীর থেকে মাত্র দশ মিনিটে পৌঁছে গেছে প্রায় পরিত্যক্ত ব্রিটিশ এয়ার বেসে। কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে লুকিয়ে পড়েছে। ঝোঁপঝাড়ের ভিতর। পরবর্তী দশ মিনিট নজর রাখবার পর, উঠে পড়েছে ভিসি-১০এর পেটে।
বিমান আকাশে উঠবার কিছুক্ষণ পর তুরস্কের আকাশসীমা পেরোলো ভিসি-১০। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নিয়েছে, পরবর্তী কয়েক মিনিট পর কঙ্গো থেকে আসা আরএএফ হারকিউলিসের পাশে পৌঁছে গেল ট্যাঙ্কার বিমান।
দুই বিমানের পাইলটের ভিতর নিশ্চয়ই কথা হয়েছে। হারকিউলিস বিমানের সামনে চলে গেল ভিসি-১০। পিছনের বিমান থেকে সামান্য উপরে ভাসছে। রিয়ার হ্যাচ থেকে বাড়িয়ে দেয়া হলো দীর্ঘ ফিউয়েল হোস। সত্তর মিটার দীর্ঘ ওই নলকে অনেকে বলে বুম। শেষমাথায় স্টিলের গোলাকার ড্রোউগ। ওটার অন্য অংশ আটকে দেয়া হবে পিছনের বিমানের ট্যাঙ্কের পাইপে।
ট্যাঙ্কার বিমানের পিছনে অপেক্ষা করছে একাকী অপারেটার। তার কাজ কাঁচে ঢাকা কমপার্টমেন্টে উপুড় হয়ে শুয়ে পিছনের হারকিউলিস বিমানের রিসিভিং প্রোবে বুম আটকে দেয়া।
হারকিউলিসের রিসিভিং প্রোব দিগন্তের দিকে না তাক করা পাইপ। ওটা আছে কার্গো বিমানের ককপিট উইণ্ডোর খানিকটা উপরে।
আকাশে বিপদ না ঘটিয়েই ব্যালে ড্যান্স শেষ করেছে দুই বিমানের পাইলট।
ট্যাঙ্কারের বুম অপারেটার বাড়িয়ে দিয়েছে নল। স্থির রাখছে জিনিসটা। পিছনে সামান্য নীচে আসছে হারকিউলিস।
কারক্লাঞ্চ! আওয়াজ তুলে হারকিউলিসের রিসিভিং পোব লক হলো ড্রোউগে। কাজে নামল ভাসমান দুই বিমানের মাঝের নল, হারকিউলিসের পেটে ঢুকতে লাগল হাই-অকটেন।
ওদিকে খেয়ালই নেই কুয়াশার। এইচঅ্যাণ্ডকে পিস্তলে ভরছে অদ্ভূত কয়েকটা নাইন এমএম রাউণ্ড। এসব গুলির থুতনির নীচে কমলা রঙের ব্যাণ্ড আঁকা।
এ জিনিস ব্যবহার করলে ছুটন্ত ষড়ও হোঁচট খেয়ে পড়ে, রানাকে বলল। কখনও কখনও ব্যবহার করি। গ্যাস এক্সপ্যাণ্ডিং নাইন মিলিমিটার রাউণ্ড। হলো পয়েন্ট গুলির চেয়ে ঢের ভাল। টার্গেটের বুক বা পেটে লাগলে স্রেফ বিস্ফোরিত হবে লোকটা।
বিস্ফোরিত হবে? ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা।
কোমর থেকে দুটুকরো হয়ে যাবে। কয়েকটা লাগবে?
না, ধন্যবাদ।
তাও রাখো, রানার কমব্যাট ওয়েবিঙে কমলা ব্যাণ্ডের কয়েকটা গুলি গুঁজে দিল কুয়াশা। পরে লাগতে পারে।
বৈজ্ঞানিকের আলখেল্লার অসংখ্য পকেট খেয়াল করছে রানা।
কী নেই ওখানে!
পনি বটল, ছোট ব্লো-টর্চ, মাউন্টেনিয়ারিং পিটন..
ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা। ছোট একটা পাউচের মত জিনিসটা দেখে চমকে গেছে। ওটা বোধহয় রোল ব্যাগ!
ওটা কি বডি ব্যাগ? জানতে চাইল রানা।
হ্যাঁ, মাকোভ টাইপ-১১১, জানাল কুয়াশা, এ জিনিস তৈরিতে সেরা ছিল সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা। অন্যদেশের বিজ্ঞানীরা ওদের ধারেকাছেও যেতে পারেনি।
আস্তে করে মাথা দোলাল রানা।
মার্কোভ টাইপ-১১১ আসলে কেমিকেল বডি ব্যাগ। সঙ্গে ডাবল-স্ট্রেংথ যিপলক ও পলি-কোটেড নাইলন দেয়াল।
নিরাপদে রাখা সম্ভব ভয়ঙ্কর দূষণে মৃত লোকের লাশ। ছড়িয়ে পড়বে না কোনও বিপদ। প্লেগ, কেমিকেল ওয়েপন্স, এমন কী সুপার হিটেড রেডিয়োঅ্যাকটিভ আবর্জনাও আটকে রাখবে নিজের পেটে। চের্নোবিল দুর্ঘটনার পর এমন অসংখ্য বডি ব্যাগ ব্যবহার করেছিল রাশানরা।
অবশ্য এসব দেখে নয়, রানা হাসল পিটনগুলো দেখে।
মনসুর আলী ওরফে বিজ্ঞানী-বৈমানিক কুয়াশা নানা কাজেই বডি ব্যাগ রাখতে পারে, কিন্তু তাই বলে বিমানে চেপে যাওয়ার সময় পিটন কেন?
বিমান দুর্ঘটনার পর খসে পড়বে আকাশ থেকে, তখন নামবে কোনও পাহাড়ে, তারপর আবারও আকাশ ছোঁয়ার জন্য শুরু করবে ক্লাইমিং?
এসব পিটন ছোট স্প্রিং লোডেড কাঁচির মত জিনিস।
যে-কোনও ছোট ফাটলকে সর্বশক্তিতে খামচে ধরে, পাহাড়ে উঠবার সময় ক্লাইমাররা এই জিনিসের সঙ্গে আটকে নেয় দড়ি। দেয়াল বা ফাটলের উপর এত জোরে কামড় বসায় পিটনের প্রিং, যে অনায়াসেই ঝুলতে পারে পর্বতারোহী।
মনে মনে বলল রানা, এ জিনিস দিয়ে করে কী লোকটা?
একটা কথা জানতে চাই, কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করল ও, পিটন দিয়ে কী করবেন?
অলসভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল বৈজ্ঞানিক হয়তো দেয়াল বেয়ে উঠতে কাজে লাগবে।
জিজ্ঞেস করল রানা, নিশ্চই আরও বহুকিছু আছে আপনার কাছে? যেমন ধরুন অত্যাচার করার মত কিছু?
রানার চোখে চোখ রাখল কুয়াশা। সামান্য হাসল। একেবারে নেই, তা নয়। তবে নির্যাতন নয়, ওগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করি।
রিফিউয়েলিং প্রায় শেষ, আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াল ওরা।
তুমি বুমার লোকটার ব্যবস্থা নাও, রানাকে বলল বৈজ্ঞানিক। নতুন একটা নাইন এমএম পিস্তল বের করেছে। আমি ককপিটের ক্রুদের ব্যবস্থা করছি।
একটা কথা, বলল রানা। একবার হারকিউলিসে উঠলে যা। খুশি করতে পারেন, কিন্তু আমি চাই না এ বিমানের কেউ মারা যাক। সম্ভব হলে বন্দি করবেন পাইলট ও অন্যদেরকে। পরে যেন নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারে ওরা।
তাতে সময় নষ্ট হবে! আপত্তির সুরে বলল কুয়াশা।
এ বিমানের কেউ সামান্যতম অন্যায় করেনি আমাদের প্রতি, যুক্তি দিল রানা।
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবল বৈজ্ঞানিক, তারপর বলল, ঠিক আছে, দেখি কী করতে পারি।
ধন্যবাদ, কুয়াশা, এর বেশি কিছু চাইছি না আপনার কাছ থেকে, বলল রানা।
অস্ত্র হাতে দুদিকে রওনা হলো দুই জগতের দুই প্রতিভাবান বাঙালি।
.
ব্রিটিশ সি-৩০ হারকিউলিস বিমানের ককপিটে পনেরো খণ্ডের জানালা দিয়ে খুব ভালভাবেই দেখা যায় চারপাশ। দুই পাইলট খেয়াল করছে, একটু সামনে ও উপরে ঝুলছে ভিসি-১০ বিমানের পাখির নিতম্বের মত অংশ। ওখান থেকে আসছে ফিউয়েল হোস–নানাদিকে সরছে মস্ত অজগরের মত। শেষাংশ এসে লাগবে ককপিটের উপরের রিসিভিং প্রোব-এ।
জীবনে বহুবার মিড-এয়ার রিফিউয়েলিং করেছে দুই পাইলট। একবার দুই বিমানের মিলন হলেই অটো-পাইলট চালু করবে পাইলট। তখন থেকে একমাত্র কাজ হয়ে উঠবে ফিউয়েল পাম্পিং স্ট্যাটাস লক্ষ্য করা। জানালা দিয়ে চারপাশের সুন্দর
শ্য দেখবার সময় পাবে না তখন।
এবং সে কারণেই ক্রুদের কেউ জানল না, সামনের বিমান থেকে বেরোল যমের মত কালো পোশাক পরা এক লোক। ফিউয়েল হোস বেয়ে ঝুলতে ঝুলতে এল সে, তোয়াক্কা করছে না। বিপদের। দক্ষ স্টান্টম্যানের মত নামছে ককপিট লক্ষ্য করে। পরক্ষণে এক পশলা গুলিতে বিস্ফোরিত হলো জানালার কাঁচ।
দৃশ্যটা সত্যিই অদ্ভুত।
আকাশের বিশ হাজার ফুট উপরে ভাসছে প্রকাণ্ড দুই বিমান। সামনের উড়োজাহাজের পিছন থেকে দীর্ঘ ঝুলঝুলে ফিউয়েল হোস গেছে পিছনের আকাশযানের কপালে।
আর দোদুল্যমান হোস বেয়ে নামছে দুই লোক, যেন ছোট্ট দুই পুতুল। _ হোস ঘিরে তৈরি করেছে দড়ির নূপ। একহাতে দড়ির দুই প্রান্ত চেপে ধরে নেমে আসছে কুয়াশা ও রানা। অন্যহাতে হেকলার অ্যাণ্ড কচ্ অটোমেটিক পিস্তল। হারকিউলিস বিমানের ককপিট লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করছে।
অসংখ্য কাঁচের টুকরো চোখে-মুখে বিধতেই সিট ছেড়ে লাফিয়ে ককপিটের মেঝেতে উপুড় হলো দুই পাইলট।
সামনে থেকে আসছে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া।
অটোমেটিক পাইলটে চলছে বিমান, আগের মতই স্থির।
তীব্র গতিতে ফিউয়েল হোস থেকে বিমানের ককপিটে পৌঁছল কুয়াশা, লাফিয়ে নামল মেঝেতে। মুখে হাই-অল্টিচ্যুড মুখোশ, পিঠে আল্টা-কমপ্যাক্ট এমসি-৪/৭ অ্যাটাক প্যারাশুট।
পাশাপাশি শুয়ে থাকা দুই পাইলট চেয়ে রইল, দৃষ্টি বিস্ফারিত, সম্পূর্ণ হতবাক।
কাছের জনের মাথায় অস্ত্র তাক করেছে কুয়াশা। খতম করতে পারবে এক গুলিতে দুই পাখি। অন্যহাতে কোমর থেকে নিল হ্যাণ্ডকাফ, দুজনের কব্জিতে আটকে দিল ইস্পাতের দুই কড়া। পিস্তলের জোরালো দুই টোকা পড়ল তাদের চাদির উপর।
সন্তুষ্ট হলো কুয়াশা। আপাতত কমপক্ষে একঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকবে এরা।
কই, তুমি কোথায়, রানা! রেডিয়ো মাইকে বলল কুয়াশা।
আপনার পিছনেই! জানাল রানা। পরক্ষণে নামল ককপিটের মেঝেতে। মুখে ব্রেদিং মাস্ক, পিঠে ঝুলছে খুদে ও চ্যাপ্টা অ্যাটাক প্যারাশুট।
.
হারকিউলিস বিমানের কার্গো হোল্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো পোশাক পরা আট কমাণ্ডো, একটু দূরে সুট পরিহিত দুজন। এদের সঙ্গে রয়েছে দুই বন্দি।
কন্টিনেন্টাল সোলজার বাউন্টি হান্টিং সংগঠনের ৬৬ ইউনিটের লোক আট কমাণ্ডো। তাদের কাজ পুরস্কার ঘোষণাকারী ব্যাঙ্কারের কাছে ছিন্ন মাথা পৌঁছে দেয়া।
সুট পরা যে দুজন, কেউ জানে না তাদের সঠিক নাম। অবশ্য, এদের রয়েছে এমআই-সিক্সের পরিচয়পত্র।
এককথায়, তারা কাজ করে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের হয়ে।
দুই বন্দির একজন বাংলাদেশ আর্মির লেফটেন্যান্ট তিশা করিম। অন্যজন জেনারেল রেমও কে. এ্যাঞ্জার। তাঁকে কঙ্গোর ইউএন শিবির থেকে কিডন্যাপ করেছে ডেভিড এন. হেখ্রিকের লোক।
এইমাত্র জ্ঞান ফিরেছে তিশার। চারপাশ দেখছে। ও আছে হারকিউলিস বিমানের চওড়া কার্গো হোল্ডে। পিঠের কাছে আটকা পড়েছে ওর দুই কব্জি ফ্লেক্সকাফে।
ক ফুট দূরে জেনারেল রেমণ্ড কে, গ্র্যাঞ্জার। এই ভদ্রলোক ইউএস মেরিন কর্পসের অন্যতম সিনিয়র অফিসার। ফেলে রাখা হয়েছে এক হামভি জিপের বনেটের উপর। চার খণ্ড দড়িতে টানটান করে বাঁধা চার হাত-পা, যেন চিত অবস্থায় ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন। হামভির দুই সাইড মিররের দণ্ডের সঙ্গে আটকে দেয়া হয়েছে হ্যাণ্ডকাফ, অন্য দুই কড়া বন্দি করেছে তাঁর দুই কব্জি।
ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে জেনারেলের ইউনিফর্মের আস্তিন। বাহুতে শক্ত করে বাঁধা রাবারের টুনিকে।
বন্দির দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে দুই এমআই-সিক্স এজেন্ট।
চেতনা ফিরতেই তিশা দেখেছে, সুটওয়ালা দুজনের ভিতর বেঁটে লোকটা পকেট থেকে বের করছে হাইপোডারমিক নিডল।
ওটা গেঁথে দিল জেনারেলের বাহুতে।
কয়েক মিনিট লাগবে, সঙ্গীকে চাপা স্বরে জানাল বাঁটকু।
মাথা তুললেন জেনারেল, জ্বলজ্বল করছে দুই চোখ।
হ্যালো, জেনারেল এ্যাঞ্জার, মৃদু হাসল লম্বা ইন্টেলিজেন্স অফিসার। আপনার ধমনীতে যে ড্রাগ দেয়া হয়েছে, ওটার নাম ইএ-৬২৭। জানি, যে পদমর্যাদার অফিসার আপনি, এ জিনিসের নাম আগেই শুনেছেন। এটা নিউরাল ডিজইনহিবিটার- এমন এক ড্রাগ, ঘোলা করে দেবে মস্তিষ্ক। মগজের নিউরোট্রান্সমিটার বা গ্যাবার ক্ষতি করবে। সোজা কথায়, এ ডাগ ব্যবহার করলে সব প্রশ্নের জবাব দিতে শুরু করবেন আপনি।
ক্ক…কী? অবাক হয়ে বাহুর দিকে চাইলেন গ্র্যাঞ্জার।
…৬২৭? …নাহ্…
দূর থেকে দেখছে বাউন্টি হান্টিং দলের লোকগুলো। তাদের নেতা অসাধারণ সুপুরুষ এক যোদ্ধা। একে কঙ্গোর কয়লা খনিতে দেখেছে তিশা। কুচ করে কেটে নিয়েছিল আস্ফালনরত আলাল হোসেনের মাথা।
ঠিক আছে, এবার আলাপ করা যাক, জেনারেল, বলল লম্বা এজেন্ট। দ্য ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড।…ওটা কী?
ভুরু কুঁচকে ফেললেন জেনারেল। কী যেন ভাবতে শুরু করেছেন। চিন্তাগুলোকে বাধা দিতে চাইলেন প্রাণপণে। কুঁচকে গেল গাল।
আমি… আমি… জানি না… কীসের কোড… বেসুরো কণ্ঠে বললেন।
জানেন তো অবশ্যই, জেনারেল। মনে করুন ইউনাইটেড স্টেটস আর ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোডের কথা। ওই কোড সিস্টেমকে। আজ ভোরে আপনি আমেরিকা থেকে কঙ্গোতে পৌঁছুনোর আগে এক ইউএস মিলিটারি প্রজেক্টের এন্ট্রি কোড জেনেছেন। ওই প্রজেক্টের নাম নোয়ায শিপ। আমরা নোয়ায শিপ সম্বন্ধে সবই জানি, জেনারেল। কিন্তু জানি না ওই কোড। আর ওই কোড আমরা জানতে চাই। …এবার বলুন, কী ওই কোড?
অবাক হয়ে শুনছে তিশা।
ওটা নাকি এমন এক নিউমেরিকাল কোড, যেটা ওভাররিড করবে ইউএস মিলিটারি সিকিউরিটি সিস্টেমের সব কিছুকে।
পিটপিট করে চাইলেন জেনারেল এ্যাঞ্জার। ড্রাগের বিরুদ্ধে লড়ছেন। না… নেই তো… এমন কিছু…
না, জেনারেল, জোর দিয়ে বলল লম্বা লোকটা, ওই জিনিস বাস্তবে আছে। আর আপনি ইউএস মিলিটারির সর্বোচ্চ পাঁচজন। কর্মকর্তার একজন। আমার বোধহয় ডোজ বাড়াতে হবে।
কোটের পকেট থেকে সিরিঞ্জ বের করল সে, জেনারেলের বাহুতে গেঁথে দিল নিডল।
গুঙিয়ে উঠলেন জেনারেল। …না…
শিরশির অনুভূতি তৈরি করে শিরার ভিতর দিয়ে চলেছে ইএ ৬২৭।
ঠিক তখনই বিস্ফোরিত হলো বিমানের ককপিটের জানালা।
গুলির আওয়াজ শুনেছে সবাই।
শুরু হলো শো-শো হাওয়ার জোরালো আওয়াজ।
.
কুয়াশা হারকিউলিস বিমানের ককপিটে পৌঁছে যাওয়ার কয়েক সেকেণ্ড পর ওর পাশে নামল রানা। তার আগেই ঝট করে সামনে বেড়ে দুই পাইলটের কব্জিতে হ্যাণ্ডকাফ আটকে দিয়েছে কুয়াশা। মাথায় পিস্তলের বাড়ি মেরে অজ্ঞান করে ফেলেছে তাদেরকে।
এবার দুটো গুলি করতে পারি? মৃদু হাসল বৈজ্ঞানিক।
খুশি মনে!
আসলে পারি না। আঙুল তুলে ককপিট ড্যাশবোর্ডের টিভি মনিটর দেখাল কুয়াশা। ওই পর্দা আসলে হারকিউলিস বিমানের রিয়ার হোল্ড দেখাচ্ছে।
রানা লক্ষ করল, ককপিটের দরজার কাছেই কমপক্ষে বারোটা ক্রেট। ওপাশে হামভির বনেটের উপর চিত হয়ে পড়ে আছেন জেনারেল এ্যাঞ্জার। একটু দূরে কালো ইউনিফর্ম পরা আট সশস্ত্র লোক। জেনারেলের দুপাশে সুট পরা দুই লোক। আর কার্গো হোল্ডে হামভির বামে, দেয়ালের বেঞ্চে বসে আছে তিশা। ওর দুই হাত পিঠের পিছনে আটকে রাখা হয়েছে হ্যাণ্ডকাফে। ১৮৫
ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি, বলল রানা। গোলাগুলি শুরু হলে…
জানি, কাজেই হ্রাস করতে হবে ওদের অস্ত্র।
আলখেল্লার পকেট থেকে দুটো ছোট জিনিস বের করেছে বৈজ্ঞানিক। হলদেটে। আকার ও আকৃতিতে নারকেলি বরইয়ের
কাজ কী ওগুলোর? জানতে চাইল রানা।
ব্রিটিশ এসি-২ চার্জের মত।
আপনার তৈরি অ্যাডহেসিভ-চাফ গ্রেনেড?
আস্তে করে মাথা দোলাল কুয়াশা। অ্যান্টি ফায়ারআর্ম চার্জ।
গুড!
কাউন্টার টেরোরিস্ট অপারেশনে এ ধরনের গ্রেনেড ব্যবহার করে এসএএস এক্সপার্টরা। সশস্ত্র কিডন্যাপারদের বিরুদ্ধে দারুণ কাজ করে। আসলে সাধারণ ফ্লাশব্যাং গ্রেনেড, কিন্তু আলাদা গুণও আছে।
তুমি তৈরি, রানা? মনে রেখো, একটা গুলি হলেই জ্যাম হবে অস্ত্র। …এবার দেখা যাক আমার বরই কেমন কাজ করে।
ককপিটের দরজা সামান্য ফাঁক করল কুয়াশা, কার্গো হোল্ডের ভিতর ছুঁড়ে ফেলল দুই গ্রেনেড। পরক্ষণে ধেয়ে গেল ওগুলোর পিছনে।
ককপিটের ওপাশে কাঠের কার্গো ক্রেট ডিঙিয়ে হোল্ডে ঢুকল দুই হলদে নারকেলি বরই, হামভির পাশের মেঝেতে পড়েই বিস্ফোরিত হলো।
প্রথমে দেখা দিল অত্যুজ্জ্বল সাদা আলো, পরক্ষণে ভয়ানক তীক্ষ্ণ শব্দ হলো: ফট্টাশ! ফট্টাশ!
যেন ফাটিয়ে দেবে কানের পর্দা।
চমকে গেছে সবাই, ঢেকে ফেলেছে দুই চোখ।
এবার তৃতীয় কাজ দেখাল কুয়াশার গ্রেনেড।
বিস্ফোরিত হতেই ওগুলোর পেট থেকে নানাদিকে ছিটকে গেল অতি ক্ষুদ্র হাজারে হাজারে সাদা-ধূসর কণা। ভরে উঠল কার্গো বে। এখন আর ভালভাবে চারপাশ দেখবার উপায় নেই।
বাতাসে ভাসছে অজস্র সাদা-ধূসর কণা, একটু দূরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেন চারদিক ঢেকে দেয়া হয়েছে পর্দা দিয়ে। ঘন কুয়াশা পড়লে বা তুমুল তুষারপাতের সময় এমন হয়।
রানা খেয়াল করল, কুয়াশার গ্রেনেডের অ্যাডহেসিভ জিনিসটা ভয়ঙ্কর আঠালো। যেখানে লাগছে, সেখানেই সেটে যাচ্ছে।
ঝট করে রাইফেলের দিকে হাত বাড়াল কাছের কমাণ্ডে। কিন্তু তার কপালে জুটল খাটো তীর। ওটা এসেছে কুয়াশার বাহুর সঙ্গে লাগানো খুদে ক্রসবো থেকে।
দ্বিতীয় কমাণ্ডো চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল। খট আওয়াজ উঠল তার কপালে। কুয়াশার বাম বাহুর ক্রসবোর তীর বিঁধেছে লোকটার মগজে।
অবশ্য ততীয় কমাণ্ডে, টিপে দিল কোল্ট কমাণ্ডা অ্যাসল্ট রাইফেলের ট্রিগার।
জ্যাম হয়ে গেছে।
লোকটার অস্ত্রের ব্যারেলের অভ্যন্তর অংশ আঠালো করে দিয়েছে কুয়াশার আবিষ্কার। বিকল হয়েছে ব্যারেল, রিসিভার এবং প্রতিটি মুভিং পার্ট। ওই রাইফেল আর গুলি করবে না, বড়জোর গদা হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ম্যাগহুকের বাঁট দিয়ে প্রচণ্ড এক বাড়ি মেরে লোকটার খুলি দাবিয়ে দিল রানা, থেঁতলে গেছে শত্রুর মগজ।
পাঁচ সেকেণ্ডও লাগল না তিন লাশ মেঝেতে পড়তে। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছে বাউন্টি হান্টার কমাণ্ডোরা, পরের দুই সেকেণ্ডে রানা ও কুয়াশার পাশের কাঠের ক্রেটে খট-খট আওয়াজে বিধল দুটো ওয়ারলক হান্টিং নাইফ।
জবাবে আলখেল্লার পকেট থেকে ভয়ঙ্কর কুৎসিত এক অস্ত্র বের করল কুয়াশা। জীবনে কখনও এত অশুভ জিনিস দেখেনি রানা।
না, দেখেছে।
ওটা খুদে চার ফলার নিনজা গ্রোয়িং নক্ষত্র–শুরিকেন।
ওটা রানার পাঞ্জার সমান হবে, চার ফলার ভিতর অংশে গোল ডিস্কে একটা গর্ত।
একহাতে দারুণ দক্ষতায় দেহের একপাশ থেকে নক্ষত্র ছুঁড়ল কুয়াশা। বাতাস চিরে সসস্ আওয়াজ তুলে ছিটকে গেল শুরিকেন।
পাশাপাশি দাঁড়ানো ৬৬ ইউনিটের দুই কমাণ্ডোর গলা খচ! খচ! শব্দে কাটা পড়ল!
ধড়াস্ করে মেঝেতে পড়ল দুই লাশ। মেঝের উপর গড়াতে শুরু করেছে তাজা রক্ত
আঁশটে গন্ধে ভরে গেল আশপাশ।
পাঁচটা গেল, ভাবছে রানা।
আরও তিনজন বাকি… এ ছাড়া রয়েছে সুট পরা দুই…
ঠিক তখনই খপ করে ওর কব্জি ধরল কে যেন। হাতে অসম্ভব শক্তি। পরক্ষণে প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেয়ে আবারও ককপিটের দরজার কাছে পৌঁছে গেল রানা। তাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে পড়ল মেঝেতে। মুখ তুলেই দেখল, ওর দিকে আসছে। বিশালাকৃতি এক ট্রুপার। লোকটা মস্ত কোনও কালো গ্রিজলি ভালুক যেন। দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে সাত ফুট। দুহাতে কিলবিলে পেশি। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে চেহারা।
তুই এখানে কী চাস? ঘোৎ করে উঠল কালো পাহাড়।
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই নড়তে শুরু করেছে রানা—লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েই ডানহাত ঘুরিয়ে চালাল ম্যাকহুক। ওটার বাঁট নামল লোকটার উঁচু চোয়ালের উপর।
জোরালো খট্টাস্ আওয়াজ হলো।
এবার বাপরে, গেছিরে বলে আর্তনাদ ছাড়বে লোকটা, ভাবল। রানা। কিন্তু কালো মানিক সামান্যও নড়ল না।
বাপরে, বিড়বিড় করল রানা নিজেই।
তখনই প্রচণ্ড এক ঘুষি নামল ওর চোয়ালে। ব্যথা ছাড়া আর কিছুই টের পেল না, উড়তে শুরু করেছে পিছনে। ছিটকে গিয়ে পড়ল জানালা ভাঙা ককপিটের ভিতর। নিজেকে ছেঁড়া কাপড়ের নড়বড়ে পুতুল মনে হচ্ছে ওর। ড্যাশবোর্ডে গুতো খেয়ে ধুপ করে পড়ল মেঝেতে।
কষ্ট করে উঠতে হলো না, এক লাফে পৌঁছে গেল দানব, একহাতে রানার গলা ধরে টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে নিল।
তুই যেদিক দিয়ে এলি, সেদিক দিয়েই যা–ওই ভাঙা জানালা দিয়ে।
কোনও আপত্তির সুযোগ পেল না রানা, সময় নষ্ট না করেই ওকে ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলল কালো মানিক।
খোলা আকাশে সাঁতার কাটছে রানা।
বহু নীচে ঝিলমিল করছে নীল ভূমধ্যসাগর!
ষোল
ভাসমান অজস্র সাদা-ধূসর কণা ভরা কার্গো হোল্ডে ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ছে কুয়াশা, শত্রুদের উদ্দেশে ছুঁড়ছে জাপানি নক্ষত্র। তারই ফাঁকে একবার চট করে পিছনে চাইল। ভাবছে, রানার কোনও অ্যাক্টিভিটি নেই কেন!
পরক্ষণে চমকে গেল কুয়াশা।
দেখল, ককপির্টের ভাঙা জানালা টপকে চড়ুই পাখির মত উধাও হয়ে গেল রানা!
যাহ্! বিড়বিড় করল কুয়াশা।
রানার মত ওর নিজের পিঠেও প্যারাশুট। চট করে বুঝে নিল, আকাশ থেকে পতনের ফলে মরবে না রানা।
তা না হয় হলো, কিন্তু একা এতজনের বিরুদ্ধে লড়াই খুবই কঠিন, ভাবল কুয়াশা। রেডিয়ো মাইকে বলল, রানা, ঠিক আছ?
জোরালো হাওয়ার উপর দিয়ে এল জবাব, আছি, আবারও উঠে আসছি।
.
বিশ হাজার ফুট উচ্চতায় ভাসছে হারকিউলিস বিমান। সামনে এবং একটু উপরে ভিসি-১০ ট্যাঙ্কার। ওটা থেকে কেউ উঁকি দিলে দেখবে, পিছনের বিমানের নোজ কোন-এ সেঁটে আছে এক মহাসাহসী লোক। সে যেন সুপারম্যান, শুধু বুক দিয়ে ঠেকিয়ে দেবে অত বড় বিমানের অগ্রগতি!
প্রকাণ্ড হারকিউলিস বিমানের নাকে ঝোড়ো হাওয়া পাত্তা না দিয়ে নীচের দুনিয়া দেখছে রানা। কপাল ভাল, সঙ্গে ছিল ম্যাগহুক, এবং ওটার ম্যাগনেটিক বা ওকে আটকে রেখেছে কার্গো বিমানের নাকে।
ভাঙা জানালায় উঁকি দিয়েছে কালো দানব, কুঁচকে ফেলেছে ঘন ভুরু।
কয়েক মুহূর্ত পর জানালা থেকে সরল। পেরোল কিছুক্ষণ, তারপর আবারও ফিরল, এখন হাতে ভয়ঙ্কর চেহারার কোল্ট ৪৫ রিভলভার। বোধহয় ককপিটেই ছিল। চোখে পড়েনি কুয়াশার।
রানার মাথার সামান্য উপর দিয়ে গুলি বেরিয়ে যেতেই ধূর শালা! বলে উঠল দানব।
মর শালা! মনে মনে বলল রানা। আশা করেছিল কালা পাহাড় ভাববে শত্রু পড়ে গেছে। রিয়ার হোল্ডে ফিরবে ব্যাটা, আর সে সুযোগে আবারও ককপিটে ফিরবে ও।
কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি।
বেল্ট থেকে তিশার ম্যাগহুক নিয়ে ব্যবহার করল ম্যাগনেটিক বালব। ঠং আওয়াজে ওটা সেঁটে গেল বিমানের নীচের অংশে। এবার দুই ম্যাগহুকের সাহায্য নিয়ে রওনা হলো রানা। বিমানের নাক থেকে খসে পড়েছে, হারিয়ে গেল কালো মানিকের লাইন অভ ফায়ার থেকে। কার্গো বিমানের তলে পেণ্ডুলামের মত ঝুলছে, বিশ হাজার ফুট নীচে নীল সাগর এবং দূরে রুক্ষ পাথুরে জমিন।
ভয়েস অ্যাক্টিভেটেড থ্রোট মাইকে বলল রানা, কুয়াশা! চেষ্টা করুন এক্সটার্নাল ডোর খুলে দিতে!
.
কার্গো বে-র ভিতর ঝট করে সরে গেছে কুয়াশা। এইমাত্র বুকের পাশ দিয়ে গেল উড়ন্ত ছোরা। ওই একই সময়ে সুট পরা এক লোকের বুকে বিঁধল ওর শুরিকেন।
লাল বড় কন্ট্রোল বাটনের উপর চোখ পড়ল ওর। ওটাই নিয়ন্ত্রণ করে হারকিউলিস বিমানের কার্গো র্যাম্প।
কুয়াশার একটা শুরিকেন গেল লাল বাটন লক্ষ্য করে।
আওয়াজ উঠল; খটাং!
ঠিকভাবেই লেগেছে শুরিকেনের এক বাহু, অন্য এক বাহু কন্সোলের সঙ্গে চেপে ধরেছে বাটনটাকে। সঙ্গে সঙ্গে নিচু হুমমমম আওয়াজ তুলে খুলতে লাগল হারকিউলিস বিমানের কার্গো র্যাম্প।
ঠিক আছে, রানা, খুলছে কার্গো র্যাম্প! জানিয়ে দিল কুয়াশা।
বৈজ্ঞানিকের কথা পরিষ্কার শুনল রানা, দুই হাত সর্বস্ব পিঁপড়ের মত চলেছে হারকিউলিস বিমানের পেট বেয়ে। মাথার উপরে সেঁটে আছে দুই ম্যাগনেটিক বালব। ও-দুটোর সাহায্য নিয়ে সামনে বাড়ছে। একটা ম্যাগনেটিক বালব ডিম্যাগনেটাই করে আবারও বিমানের অন্য অংশে আটকে নিচ্ছে ম্যাগনেট। ঝুলতে ঝুলতে পেরিয়ে এল প্রায় ষাট ফুট দৈর্ঘ্যের কার্গো হোল্ড। আর সামান্য পথ, তারপর সামনেই পড়বে খোলা রিয়ার র্যাম্প।
.
খোলা রিয়ার লোডিং র্যাম্পের কারণে ঝোড়ো হাওয়া ঢুকছে। কার্গো বে-তে। বিমানের পেট থেকে তীরের মত বেরুচ্ছে ভাসমান সাদা-ধূসর কণা, যেন শুরু হয়েছে ইনডোর ব্লিার্ড।
কার্গো হোল্ডের ভিতর তিশার কাছে পৌঁছে গেছে কুয়াশা। চট করে বসে পড়ল মেয়েটির পাশে।
তোমাকে সরিয়ে নেব, নিচু স্বরে বলল। হাতে ছুরি, এবার কাটবে ফ্লেক্স-কাফ, কিন্তু তখনই কালো দুই প্রকাণ্ড হাত জোর টান দিল পিছন থেকে।
হোঁচট খেয়ে হামভির পাশে পড়ল কুয়াশা, ছুটে গেল হাতের ছোরা।
নিজের কাভার থেকে বেরিয়ে এসেছে বাউন্টি হান্টি দলের নেতা। হামভির ডানদিকে লুকিয়ে ছিল।
ওর সানগ্লাস কেড়ে নাও! নির্দেশ দিল সে।
পরক্ষণে দানবের প্রচণ্ড ঘুষি নামল কুয়াশার সানগ্লাসে।
মড়াৎ করে ভাঙল দুই কাঁচের মাঝের ডাণ্ডি।
ঝরঝর করে খসে পড়ল ভাঙা দুই কাঁচ।
স্বাভাবিক আলো কুয়াশার চোখে পড়তেই ওহ! বলে উঠল। তীব্র ব্যথা পেয়ে বুজে ফেলেছে দুই চোখ।
পরক্ষণে বুকে নেমে এল আরেক ভয়ঙ্কর ঘুষি।
ওকে গাড়ির সামনে ধরো, বলল দলের নেতা। ঝটপট সরিয়ে দিল হামভির চাকার গোঁজগুলো। লাফ দিয়ে উঠল গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের পিছনে। পিষে দেব ওর হাঁটু!
নির্দেশ পালন করতে দেরি হয়নি কালো দানবের।
দৃষ্টিহীন, অসহায় কুয়াশাকে ধরেছে হামভির চাকার সামনে। নিজে বসেছে পিছিয়ে।
গর্জে উঠল ইঞ্জিন, পরক্ষণে হামভির গিয়ার ফেলল সুদর্শন নেতা। মেঝের সঙ্গে টিপে ধরল অ্যাক্সেলারেটার।
ঝাঁকি খেয়ে সামনে বাড়ল হামভি। চাকার চাপে গুঁড়ো করে দেবে কুয়াশার দুই হাঁটুর বাটি।
এক সেকেণ্ড পর খুশি হয়ে উঠল বাউন্টি হান্টারদের নেতা। সামনের লোকটার দেহের উপর চেপে বসেছে মস্ত জিপ। একটু গিয়েই একটা ক্রেটের গায়ে লেগে থামল গাড়ি।
ধুশশালা! চেঁচিয়ে উঠল কালো মানিক।
কী হলো? জানতে চাইল তার নেতা।
অন্য বদমাশটা ফিরেছে!
কেউ খেয়াল করেনি, আবারও হারকিউলিস বিমানে উদয় হয়েছে মাসুদ রানা।
বাউন্টি হান্টারদের নেতা এবং কালো মানিক ভেবেছিল হোল্ডে শত্রু বলতে ওই কালো আলখেল্লা পরা লোকটাই।
এ দিকে হোল্ডে পৌঁছেই রানা দেখেছে, জীবিত শত্রু বলতে সুর্দশন লোকটা, কালা পাহাড় এবং সুট পরা এক এজেন্ট।
কেউ জানে না ম্যাগহুকের সাহায্য নিয়ে ফিরেছে ও, হামভির ডানদিকের সরু গলি ধরে পৌঁছে গেছে সামনে। হ্যাচকা টানে। সরিয়ে নিয়েছে কুয়াশাকে। ওই একই সময়ে গাড়ির নীচে ঠেলে দিয়েছে একটা লাশকে। সেই সঙ্গে প্রাণপণ শক্তিতে জোরালো একটা লাথি লাগিয়ে দিল কালো মানিকের নাক-মুখ সই করে।
কুয়াশাকে নিয়ে হোল্ডের বামদিকের দেয়ালে আছড়ে পড়েছে। রানা, সামান্য দূরেই তিশা।
একহাতে দুই জখমী চোখ চেপে ধরেছে কুয়াশা, মুখ থেকে বেরোচ্ছে না সামান্যতম কাতর ধ্বনি।
সময় নেই, তিশার পাশে বসে পড়ল রানা, বাড়িয়ে দিল। নিজের ছোরা। জলদি, তিশা! চললাম, জেনারেলকে মুক্ত করতে হবে!
হামভির বনেটে রয়ে গেছেন এ্যাঞ্জার।
গাড়ির সাইড মিররের ডাণ্ডার সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছে দুই হ্যাণ্ডকাফ |
হাতে ছোরা নিয়েই জানাল তিশা, দাঁড়াও! ৬৬ ইউনিটের এক লোকের লাশের কোমর থেকে আগেই সরিয়ে নিয়েছে এক গোছা চাবি। দুটো চাবি বাড়িয়ে দিল রানার দিকে। হ্যাণ্ডকাফ খুলবে এগুলো!
চাবি হাতে উঠে দাঁড়াল রানা, কিন্তু তখনই ড্রাইভিং ডোর লাথি দিয়ে খুলল বাউন্টি হান্টারদের নেতা। ওই একই সময়ে রানা দেখল, কাঠের এক ক্রেট থেকে টান দিয়ে ছোরা বের করে নিল ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের লম্বা লোকটা।
দুই শত্রুর মাঝে আটকা পড়েছি, ভাবল রানা। দেরি না করে দুদিকে প্রসারিত করল দুহাতের দুই ম্যাগহুক। আঠালো কণা, ভরা বাতাসে মাত্র একবার সুযোগ পাবে ও।
দ্বিতীয়বার ভাবল না রানা।
সুদর্শন লোকটার বুকে বিঁধল না ম্যাগহুকের বাল। অবশ্য, খটাং করে লাগল দরজার উপর। এইমাত্র নামতে শুরু করেছিল লোকটা, খুব কাছ থেকে ম্যাগনেটিক বালব ব্যবহার হতেই বজ্রের মত আওয়াজ তুলে বন্ধ হলো আর্মার্ড দরজা। এতই জোরে যে, ছিটকে গিয়ে গাড়ির ভিতর পড়ল লোকটা।
দ্বিতীয় ম্যাগহুকের ম্যাগনেটিক বা লেগেছে সিক্রেট এজেন্টের বুকে। প্রচণ্ড আঘাতে দুভাঁজ হয়ে গেল লোকটা, মটমট করে ভাঙল পাঁজরের হাড়। উড়ে গিয়ে পড়ল সে পিছনের ক্রেটগুলোর পাশে।
ততক্ষণে ছোরার পোচে হাতকড়া কেটে ফেলেছে তিশা, চলে। এল হামভির সামনে। রানার কাছ থেকে চাবির গোছা নিয়ে খুলতে শুরু করেছে জেনারেলের বাম কব্জির কড়া।
ঠিক আছে, বলল তিশা, এবার অন্য কব্জি…
কিন্তু এমনি সময়ে তিশার অজান্তে হামভির পাশে উঠে দাঁড়াল কালো দানব, সত্যিকারের পাহাড়ের মতই। নাক-মুখ রক্তাক্ত।
এক লাফে তিশার পাশে পৌঁছে গেল রানা, জেনারেলের উপর চোখ রাখো। আমার সিগনাল পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবে।
কীসের সিগনাল? জানতে চাইল তিশা।
জবাব না দিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়াল রানা, মেঝেতে পড়ে থাকা একটা লাশের বুক থেকে খুলে নিল কুয়াশার দুই শুরিকেন।
রানার মত করেই কুঁজো হয়েছে দানব, হাসছে রক্তাক্ত হলদে দাঁত বের করে।
দানবের নীরব আহবানে সাড়া দিল রানা।
হামভি থেকে সরে গেল দুজন, পৌঁছল রিয়ার লোডিং র্যাম্পে। বিমানের হাঁ করা দরজা দিয়ে দেখা গেল নীল আকাশ ও সাদা মেঘ। হু-হুঁ করে বাতাস আসছে ভিতরে।
বুনো পশ্চিমের পুরনো আমলের দুই গান ফাইটারের মত মুখোমুখি হলো দুজন, দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট।
একজন দানবের মত প্রকাণ্ড। অন্যজন তার অর্ধেক। রানার হাতে চার ফলাওয়ালা শুরিকেন। শত্রুর হাতে মস্ত এক ছোরা। শুরু হলো রানা ও কালা পাহাড়ের লড়াই।
ছোরা হাতে ঝট করে সামনে বাড়ল দানব, কিন্তু শুরিকেনের ফলা দিয়ে ছোরার হামলা ঠেকিয়ে দিল রানা।
ঠং-ঠং! আওয়াজ উঠল।
এবার লাফ দিয়ে সামনে বেড়ে একপাশ থেকে ছোরা চালাল দানব।
ঠনাৎ আওয়াজ তুলে ছোরার ফলা সরিয়ে দিল রানা। কালা পাহাড় এবং ও লড়ছে কার্গো হোল্ডের শেষাংশে।
এদিকে জেনারেল এ্যাঞ্জারের ডান হাতও খুলে দিয়েছে তিশা। মুক্ত হয়েছেন ভদ্রলোক। হ্যাণ্ডকাফের অপর অংশ এখনও সাইড মিররের ভাণ্ডার সঙ্গে লাগানো। হামভি থেকে বিবশ জেনারেলকে নামতে সাহায্য করল তিশা, শুইয়ে দিল মেঝেতে।
বিড়বিড় করছেন গ্র্যাঞ্জার: হায় ঈশ্বর… ওই কোড… ইউনিভার্সাল কোড, হ্যাঁ, ঠিক, ওটা আছে, আছে, কিন্তু জানে মাত্র কয়েকজন… হ্যাঁ, আমি নোয়ায শিপগুলোর একটার কমপিউটারে… কিন্তু এ ছাড়াও… অন্য আরও একটা প্রজেক্ট… লিযার্ড…
কার্গো হোল্ডের পিছনে লড়ছে রানা ও কালো দানব। ছোরা ও শুরিকেনের টক্কর লাগছে ঠং-ঠনাৎ আওয়াজে। হামভির ডানদিকে সরে এল দুজন। সামান্য দূরে তিশা ও গ্র্যাঞ্জার। পিছাতে শুরু করেছে রানা, মনে হলো যুদ্ধে হারবে করুণভাবে।
তিশা! গলা চড়ল রানার, তুমি সিগনালের জন্য তৈরি?
হ্যাঁ। কিন্তু সিগনালটা কী?
এটাই সিগনাল!
পরমুহূর্তে কালা পাহাড় ছোরার স্ল্যাশ করতেই বিদ্যুদ্বেগে নড়ে উঠল রানা, দুই হাতে খপ করে ধরে ফেলল তার ডান বাহু। শত্রুর হাতটা টেনে বসিয়ে দিল হামভির বনেটের উপর। পাশেই সাইড মিররের ডাণ্ডা থেকে ঝুলছে হ্যাণ্ডকাফ। একটু আগে ওটাতে বন্দি ছিলেন জেনারেল এ্যাঞ্জার।
এবার, তিশা!
ঝট করে প্রতিক্রিয়া দেখাল তিশা, ঝাঁপিয়ে চলে এল বনেটের উপর, পরক্ষণে দানবের ছোরা ধরা কব্জি বন্দি হলো হ্যাণ্ডকাফের ভিতর। ধাতব ক্লিক আওয়াজ শুনে বিস্ফারিত হলো লোকটার দুই চোখ।
হামভির সাইড মিররের ডাণ্ডির সঙ্গে আটকা পড়েছে সে!
দেরি না করে জেনারেলের পাশে চলে গেল রানা।
আপনি সুস্থ, জেনারেল? জানতে চাইল।
ভড়ভড় করে বলে চলেছেন এ্যাঞ্জার: ওহ্, ঈশ্বর! শুধু নোয়ায শিপগুলো না… লিয়ার্ড প্রজেক্টও… হায় যিশু… ওই দুই প্রজেক্টই… নোয়ায শিপ আর মিসাইল। গোপন করার জন্যে… প্রতি সপ্তাহে একবার করে বদলে… দেয়া হয় ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড। আর এখন… সেভেন্থ… সেভেন্থ ম্… ম… মার্সেন… মার্সেন…
কানের কাছেই হুউশ আওয়াজ পেল রানা। ঝলসে উঠেছে চকচকে ইস্পাত। ঝটকা খেল জেনারেলের মাথা। গলা থেকে। ফিনকি দিয়ে বেরোল রক্ত।
এক সেকেণ্ড পর কাঁধ থেকে খসে পড়ল ভদ্রলোকের মাথা! ফুটবলের মত মেঝের উপর দুই গড়ান দিয়ে থামল রানার পায়ের সামনে। ধড় থেকে কারও মাথা কেটে নিলেও কখনও কখনও তিরিশ সেকেণ্ড চেতনা থাকে। জেনারেল এ্যাঞ্জারের দুই চোখ পিট পিট করে দেখছে রানাকে। গলার কাটা জায়গা থেকে গলগল করে পড়ছে রক্ত। বীভৎস দৃশ্য। আরও তিন সেকেণ্ড বিড়বিড় করে কী যেন বলল বেচারা, তারপর আস্তে করে শিথিল হলো গালের পেশি।
ঝট করে মুখ তুলে চাইল রানা।
ডেভিড এন. হেভ্রুিকের সুদর্শন ডেপুটি দাঁড়িয়ে আছে হামভির পাশে। হাতে দীর্ঘ ম্যাচেটি, ওটা থেকে টপটপ করে পড়ছে রক্ত।
রক্তিম দুই চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে লোকটার, যেন বদ্ধ উন্মাদ। ম্যাচেটি হাতে ঝড়ের বেগে সামনে বাড়ল।
কোপ ঠিকভাবেই নামত রানার ঘাড়ে, কিন্তু পিছন থেকে কে যেন খপ করে ধরল লোকটার কব্জি, আছড়ে ফেলা হলো হামভির বনেটের উপর। স্প্রিঙের মত লাফ দিল ম্যাচেটি, পাঞ্জা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। ওই একই সময়ে ক্লিক আওয়াজে সুদর্শন লোকটার কব্জি আটকে গেল হামভির অন্য হ্যাণ্ডকাফে।
ঝটকা দিয়ে ঘুরে চাইল বাউন্টি হান্টারদের নেতা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে কুয়াশা, চোখে নতুন সানগ্লাস।
আগেও তোমার ঢের কীর্তির কথা শুনেছি, গম্ভীর কণ্ঠে বলল বৈজ্ঞানিক। বিপদে পড়লে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাও। কিন্তু
এবার জানতে চাই, তুমি পাখির মত উড়তে পারো কি না!
হামভির ড্রাইভিং দরজার পাশে চলে গেল কুয়াশা, ভিতরে হাত ভরে রিভার্স গিয়ার ফেলল। ইশারা করল রানা ও তিশার দিকে। একটু সরে যাও তোমরা।
ভয়ঙ্কর আতঙ্ক নিয়ে কুয়াশার দিকে চেয়ে রইল কালা পাহাড় ও তার বস।
তোমাদের সঙ্গে নরকে দেখা হবে না, কারণ আমি ওখানে যাব না, চাপা স্বরে বলল কুয়াশা, পরক্ষণে অ্যাক্সেলারেটার প্যাডেলে চেপে আটকে দিল ম্যাচেটি।
পিছাতে লাগল হামভি, মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল খোলা রিয়ার কার্গো র্যাম্পে। গতি তুলেছে বিশ কিলোমিটার। মুহূর্তে বিমান থেকে বেরিয়ে গেল হামভির পিছন দিক, পরের সেকেণ্ডে কালা পাহাড় এবং তার বস্ হারিয়ে গেল চোখের সামনে। থেকে। সোজা চলেছে বিশ হাজার ফুট নীচে।
হামভি উধাও হতেই রানার বুকে মুখ গুঁজেছে তিশা, নীরবে কাঁদছে। বিড়বিড় করে বলল, আমি না তোমার কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়েছি, আমি কেন কাঁদব?
সবাই কাঁদে, কখনও কখনও, মৃদু স্বরে বলল রানা। আলতো হাতে তিশার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিল।
কয়েক সেকেণ্ড পর কুয়াশার উপস্থিতি খেয়াল হতেই রানার কাছ থেকে সরে গেল তিশা। জিজ্ঞেস করল, আসলে কী ঘটছে, স্যর?
এরা বাউন্টি হান্টার, বলল রানা। পনেরোজনের একটা তালিকা পেয়েছে, তার ভেতর আমার নামও আছে। তোমাকে আটকেছিল আমাকে হাতে পাওয়ার জন্যে।
সাইবেরিয়া, বাউন্টি হান্টার, একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ, পোলিশ বাউন্টি হান্টার, স্পেন্যায কোবরা ইউনিট সংক্ষেপে সবই খুলে বলল রানা। কথা শেষে দেখাল বাউন্টি লিস্টি।
আর ওই লোক? চাপা স্বরে বলল তিশা। চোখের ইশারায়। দেখাল কুয়াশাকে। তার কী ভূমিকা?
কথাগুলো শুনতে পায়নি কুয়াশা, এইমাত্র ককপিটে গিয়ে। ঢুকেছে। ট্যাঙ্কার বিমান থেকে সরিয়ে নেবে কার্গো বিমানকে।
ওঁর নাম কুয়াশা, মস্ত বড় এক বাঙালি বিজ্ঞানী, বলল রানা। জানি না কেন, আমাকে পছন্দ করেন, তাই ঠিক করেছেন আপাতত পাশে থেকে সাহায্য করবেন আমার বিপদে।
তোমাকে সাহায্য করবেন? অবাক হলো তিশা।
আস্তে করে মাথা দোলাল রানা।
হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করে জানাতে হবে আমি বেঁচে আছি, ভিন্ন প্রসঙ্গে গেল তিশা।
ককপিটে গিয়ে রেডিয়োতে জানিয়ে দিতে পারবে, বলল রানা। বলে দিয়ে তোমার ফিরতে দেরি হবে। আরও কী যেন বলবে, এমন সময় কাঠের ক্রেটগুলোর কাছ থেকে শুনল গোঙানির আওয়াজ।
ঝট করে ওদিকে ঘুরে গেল রানা ও তিশা।
ক্রেটগুলোর পায়ের কাছে পড়ে আছে সুট পরিহিত ব্রিটিশ এজেন্ট। দুহাতে ধরেছে ভাঙা পাঁজরগুলো। এর বুকেই ম্যাগহুক ব্যবহার করেছিল রানা।
ধরাশায়ী লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা।
জোর করে দম নিতে চেষ্টা করছে লোকটা, মুখের কোণে রক্ত ও ফেনা।
ঝুঁকে তাকে পরীক্ষা করল রানা। আস্তে করে মাথা নাড়ল। পাঁজরের হাড়গুলো ফুটো করে দিয়েছে ফুসফুস। তিশার দিকে চাইল। একে চেনো?
না চেনার মতই, বলল তিশা। জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম এ লোক আর তার সঙ্গী জেনারেল এ্যাঞ্জারকে জিজ্ঞেসাবাদ করছে। কড়া কোনও ডিসিনহিবিটিং ড্রাগ দিয়েছিল। জানতে চাইছিল আমেরিকার ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড। জোর দিয়ে বলছিল জেনারেল কোড জানেন। নোয়ায শিপ প্রজেক্ট না কী নিয়ে যেন… কাঁধ ঝাঁকাল তিশা।
তাই? আস্তে করে বলল রানা। ডিসিনহিবিটিং ড্রাগ? ওর চোখ পড়েছে মেঝের একটু দূরে পড়ে থাকা মেডিকেল কিটের উপর। ওখান থেকে খসে পড়েছে কয়েকটা সিরিঞ্জ, নিডল ও সেরামের বোতল। সেরামের একটা বোতল তুলে নিয়ে লেবেলটা। পড়ল রানা। মারাত্মক আহত লোকটার দিকে আবারও চাইল। ঠিক আছে, দেখা যাক নিজেদের আনা জিনিস ওর কেমন লাগে।
ক্রেটের পাশে লোকটাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল রানা।
তখনই ককপিট থেকে ফিরল কুয়াশা।
গুঙিয়ে চলেছে সুট পরা ব্রিটিশ এজেন্ট।
তার আস্তিন গুটিয়ে দিয়ে শিরার ভিতর দুই শ মিলিগ্রাম ইএ ৬২৭ ইনজেক্ট করল রানা।
পাশে এসে থামল কুয়াশা। ট্যাঙ্কার থেকে সরে গেছি। আপাতত অটো-পাইলটে চলছে বিমান। আগের কোর্স অনুসরণ করছি। ফ্রান্সের উপকূলে ব্রিটানির প্রাইভেট এক এয়ারফিল্ডে নামব। এইমাত্র যোগাযোগ করেছিল রঘুপতি। লণ্ডনের চল্লিশ মাইল দূরে পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডে তোমার দুজনকে নামিয়ে দেবে ও।
গুড। রানা ভাবছে এরপর কী করবে নিশাত ও খবির। ওদেরকে যেতে হবে লণ্ডনে, মোসাদের হেডকোয়ার্টারে।
বন্দি ব্রিটিশ এজেন্টের দিকে মনোযোগ দিল রানা।
বারকয়েক আপত্তি তুলতে চাইল লোকটা, কিন্তু মুখের লাগাম খুলে দিয়েছে ডিসিনহিবিটিং ড্রাগ।
তার নাম জেমস ব্রিক, এমআই-৬-এর সদস্য।
এই যে বাউন্টি হান্ট, এটা সম্পর্কে তুমি কী জানো? জিজ্ঞেস করল রানা।
প্রতিটি মাথার জন্য দেবে তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার। সতেরোটা মাথা। আগামীকাল নিউ ইয়র্ক সময় দুপুর বারোটার আগে
সবাইকে শেষ করতে হবে।
কারা এত টাকা দিচ্ছে?
নাক দিয়ে ঘোৎ আওয়াজ করল এজেণ্ট। আপত্তি আছে বলতে, কিন্তু ড্রাগের কারণে কয়েক সেকেণ্ড পর বাধ্য হয়ে মুখ খুলল, তাদের অনেক নাম। হাইডেলবার্গ গ্রুপ… নিউ ইয়র্ক গ্রুপ… স্টার কাউন্সিল… ম্যাজেস্টিক-১২… এম-১২… এরা। দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। এরাই চালায় বিশ্ব। এদের কথায় কান ধরে ওঠবস করে সরকার। দরকার পড়লে যে-কোনও দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভাঙে। যা চায়, তাই করতে পারে এরা। যদি…
থেমে গেছে লোকটা।
রানা টের পেল, শিরিশ কাগজের মত শুকিয়ে গেছে ওর গলা।
খুলে বলো, নিচু স্বরে বলল কুয়াশা।
তাদের নামগুলো বলো, তাড়া দিল রানা।
তাদের নাম জানি না, বলল ব্রিক। খোঁজ নেয়া আমার কাজ নয়। আমি বিশেষজ্ঞ আমেরিকান মিলিটারি বিষয়ে। শুধু জানি ম্যাজেস্টিক-১২ আছে। তারাই আয়োজন করেছে বাউন্টি হান্ট।
বুঝলাম। এবার বলো এই বাউন্টি হান্ট সফল হলে তাদের কী লাভ।
জানি না, মাথা নাড়ল ব্রিক। আমার কাজ ছিল জেনারেল গ্র্যাঞ্জারের মুখ থেকে ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড জেনে নেয়া। ওই কোড তুলে দেয়ার কথা ছিল বাউন্টি হান্টার হেন্ড্রিকের হাতে। ওটা দিয়ে ম্যাজেস্টিক-১২ কী করবে, আমি জানি না।
তার মানে এমআই-৬ সবই জানে?
রিচার্ড কে, ডওসন। তার কাছ থেকে ভিতরের খবর জানতে পারবেন। ম্যাজেস্টিক-১২ সম্পর্কে বা বাউন্টি হান্ট সম্পর্কে সবই তার জানা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এমআই-৬ জানে না সে এখন। কোথায়। দুদিন আগে হারিয়ে গেছে। নোয়ায শিপ বা লিয়ার্ড প্রজেক্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে খুঁজে বের করুন তাকে।
রিচার্ড কে. ডওসন, বিড়বিড় করল রানা। নামের লিস্ট বের করে পড়ল: ডসন, রিচার্ড কে, ইউকে, এমআই-৬।
নিশ্চয়ই নিজের কাভার হারিয়েছে লোকটা, বলল রানা। নইলে তার নাম এই লিস্টে তুলত না ম্যাজেস্টিক-১২।
নতুন আঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইল রানা। নোয়ায শিপ বা লিয়ার্ড প্রজেক্ট সম্পর্কে জেনারেল এ্যাঞ্জারের কাছ থেকে কী জানতে চাইছিলে?
ভুরু কোঁচকাল ব্রিক। ড্রাগের বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু মুখ খুলল: নোয়াজ শিপ ইউএস নেভির প্রজেক্ট। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নেভি বেশকিছু রণতরীকে ছদ্মবেশে ভিড়িয়ে দিয়েছিল কমার্শিয়াল ফ্রেইটারগুলোর বহরে। তাদের একটা জাহাজের নাম ছিল নোয়ায শিপ। এখন ওই একই কাজ করছে ইউএস নেভি। ছদ্মবেশী রণতরী রাখছে। দুনিয়ার জরুরি সব জায়গায়। দরকার পড়লে যখন তখন হামলা করবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল ব্যবহার করে। অথচ, জাহাজ দেখলে যে-কেউ ভাববে, ওগুলো সাধারণ মালবাহী জাহাজ বা সুপারট্যাঙ্কার।
সত্যি কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দেবে আমেরিকা? আনমনে বলল তিশা।
ঠিক আছে, নোয়ায শিপ বিষয়ে জানলাম, বলল রানা। এবার বলো লিয়ার্ড প্রজেক্ট কী।
জানি না।
সত্যি কথা বলো, নইলে ড্রাগের ডোজ বাড়াতে বাধ্য হব।
গুঙিয়ে উঠল জেমস ব্রিক। শুধু জানি, নোয়ায শিপ প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত লিয়ার্ড প্রজেক্ট। ভয়ঙ্কর কোনও পরিকল্পনা আছে এসবের পিছনে। জানি না তা কী। ওটার জন্যে হাইয়েস্ট ইউএস সিকিউরিটি ক্লাসিফিকেশন দেয়া হয়েছে।
ভুরু কুঁচকে উঠেছে রানার, ভাবছে।
জট ছাড়াতে পারছে না কিছুরই। ওর কাছে রয়েছে সামান্য কয়েকটা জিগসর টুকরো। সবই প্রকাণ্ড কোনও জিগস পাযলের অংশ। এক এক করে টুকরোগুলো ঠিক জায়গায় বসাতে পারলে ফুটে উঠবে পুরো দৃশ্য। তখন বোঝা যাবে সবই।
কে এসব জানে, মিস্টার ব্রিক? বলল রানা, কার কাছ থেকে ইউএস মিলিটারির তথ্যগুলো পাচ্ছে এমআই-সিক্স?
মোসাদের কাছ থেকে, ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ব্রিক। লণ্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফে ফিল্ড অফিস খুলেছে ওরা। গত মাসে কয়েকদিনের জন্যে ওদের অফিসে ছারপোকা রাখতে পেরেছিলাম আমরা। বিশ্বাস করুন, এম-১২. নোয়ায শিপ, লিয়ার্ড প্রজেক্ট বা আপনার ওই লিস্টির সবই জানে মোসাদ। কেন আপনাদেরকে শেষ করে দেয়া হচ্ছে, তাও জানে। শুধু তাই নয়, আরও একটা বিষয় ওরা জানে।
সেটা কী? জানতে চাইল রানা।
মোসাদ জানে অক্টোবরের পনেরো তারিখে কী ঘটাবে ম্যাজিস্টিক-১২।
সতেরো
কুইন্স টাওয়ার।
ক্যানারি ওয়ার্ফ, লণ্ডন। অক্টোবর, ১৪। স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটা।
চল্লিশতলা কুইন্স টাওয়ারের গা বেয়ে অত্যন্ত দ্রুতগামী একটি কাঁচমোড়া এলিভেটারে চেপে সাঁই-সাঁই করে উঠছে ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা ও সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত খবির।
একটু দূরে কাদাটে, মন্থরগতি টেমস, মস্ত কোনও অজগরের মত গা মুচড়ে হারিয়ে গেছে দূরের বাঁকে। চার দিগন্তে পুরনো লণ্ডন, অবশ্য এ মুহূর্তে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঝমঝম বৃষ্টির ধূসর পর্দা লুকিয়ে রেখেছে সব।
প্রাচীন শহর লণ্ডনকে কাঁচকলা দেখাতেই যেন জন্ম নিয়েছে। ক্যানারি ওয়ার্ক পরিষ্কার, ঝকমকে স্টিল ও কাঁচের তৈরি মস্ত সব দালান। বিযনেস ডিসট্রিক্ট। আকাশের বুকে খোঁচা দিচ্ছে। অসংখ্য স্কাইস্ক্র্যাপার। মাঝে মাঝে ম্যানিকিউর করা পার্ক। একটু দূরে ব্রিটেনের সবচেয়ে উঁচু দালান: অপূর্ব সুন্দর ক্যানারি ওয়ার্ক টাওয়ার। লণ্ডনের এদিকটা যেন আগামী কোনও শতকের জন্য
প্রস্তুত। এ ধূসর আকাশ পাশ কাটিয়ে উঠছে নিশাত ও খবিরের লিফট। কুইন্স টাওয়ারে যাত্রীদেরকে নিয়ে ওঠা-নামা করছে আরও চারটে লিফট–একেকটা দ্রুতগামী কাঁচের বাক্স যেন।
নিশাত-খবিরের পরনে সাধারণ পোশাক: সুয়েড জ্যাকেট, নীল ডেনিম জিন্স, টার্টলনেক জাম্পার। শেষের জিনিসটার কল্যাণে ঢাকা পড়েছে থ্রোট মাইক। পায়ে শক্তপোক্ত বুট। কোমরের পিছনে .৪৫ ক্যালিবারের কোল্ট রিভলভার।
ওদের লিফটে উঠেছে চমৎকার কাটের সুট পরা সুন্দরী এক এগযেকিউটিভ তরুণী। চওড়া কাঁধের দানবীয় নিশাতের পাশে যেন বামন হয়ে গেছে সে।
বড় করে শ্বাস নিল নিশাত, আস্তে টোকা দিল মেয়েটির কাঁধে। তোমার পারফিউম সত্যিই ভাল। জিনিসটার নাম কী?
লেডিস চয়েস, বলল তরুণী।
আমিও একটা কিনব, আন্তরিক হাসল নিশাত।
আজ রাশান যুদ্ধ-বিমানে অ্যাকটিভ স্টেলথ চালু রেখে ব্রিটিশ এয়ারস্পেসে ঢুকে পড়েছিল রঘুপতি, ওদেরকে নামিয়ে দিয়েছে লণ্ডনের বাইরের এক পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডে। ওখানে প্রায় ধসে পড়া এক দালানে উঠেছিল ওরা। দেরি না করে দাঁড় করিয়েছে। খসড়া পরিকল্পনা। এরপর যোগাযোগ করেছে রানা এজেন্সির শাখা প্রধান রাজিব আহসানের সঙ্গে। সে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। চার্টার হেলিকপ্টারের। আর আজই সোয়া তিনটের সময় বাঙালি পাইলট ওদেরকে নামিয়ে দিয়েছে ক্যানারি ওয়ার্ফের কমার্শিয়াল হেলিপোর্টে।
পিং! আওয়াজ তুলল এলিভেটারের স্পিকার। আটত্রিশতলার মেঝের সঙ্গে মিশে গেছে ওটার মেঝে। খুলে গেল দরজা।
প্রকাণ্ড রিসেপশন এরিয়ায় বেরিয়ে এল নিশাত ও খবির। ইলেকট্রনিকাল বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে:
সিলভারম্যান, নিউটন অ্যাণ্ড যেমির লইয়ার্স ফার্ম।
মস্ত দালানের উপরের তিনতলা জুড়ে প্রতিষ্ঠানটি। আটত্রিশ, ঊনচল্লিশ ও চল্লিশ তলা ভাড়া নিয়েছে তারা।
অন্য সব বড় শহরের নামকরা ল ফার্মের অফিসের রিসেপশন এরিয়ার মতই এ অফিস। অত্যন্ত দামি প্রতিটি আসবাবপত্র। প্রচুর জায়গা ছাড়া হয়েছে মস্ত অফিসে। কাঁচের ওদিকে অনেক নীচে লণ্ডন।
সাধারণ মানুষ এ অফিসে ঢু দিলে বুঝবে না সিলভারম্যান, নিউটন অ্যাণ্ড যেমির লইয়ার্স ফার্ম আসলে একেবারেই ভিন্ন কাজে ব্যস্ত।
তাদের মূল কাজটি আইনী সহায়তা দেয়া নয়।
এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে অসংখ্য অফিস বা মিটিং রুম, কিন্তু উনচল্লিশ তলার তিনটে অফিসে ভুলেও প্রবেশ করেন না উকিল সায়েবরা।
ওই তিনটে কামরা ইজরায়েলি সিক্রেট সার্ভিসের।
আন্তর্জাতিক সিক্রেট সার্ভিসগুলোর এজেন্টদের ভিতর চালু হয়ে গেছে একটা কথা: বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সংগঠন হচ্ছে মোসাদ।
তারাই নানান হামলা থেকে রক্ষা করছে ইজরায়েল রাষ্ট্রকে।
সেজন্য প্রতিটি দেশে নিজেদের লোক রেখেছে। সবার আগে। তাদের কানে পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক সমস্ত তথ্য।
একটা চিন্তা থেকেই কাজ করে ওই সংগঠনের সবাই। প্রথম কথা: রক্ষা করতে হবে ইজরায়েলী স্বার্থ। দ্বিতীয় কথা: রক্ষা করতে হবে ইজরায়েলী স্বার্থ। শেষ কথা: রক্ষা করতে হবে ইজরায়েলী স্বার্থ। এর বাইরে কিছু ভাববার দরকার নেই। প্রয়োজন পড়লে শেষ করে দাও যে-কাউকে।
আমি কোনও সাহায্যে আসতে পারি? নিশাতের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল রিসেপশনিস্ট।
পারেন, বলল নিশাত, আমরা এসেছি ডেনিস ই, ম্যাকিনের সঙ্গে আলাপ করতে।
দুঃখিত, কিন্তু ওই নামের কেউ তো এই অফিসে কাজ করেন না।
তা হলে চেয়ারম্যান বা তার পার্টনারদের জানান, ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা এবং সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত খবির এসেছে, দ্বিধা না করেই বলল খবির। আরও বলবেন, আমরা এসেছি
মেজর ম্যাকিনের সঙ্গে দেখা করতে। মেজর মাসুদ রানার তরফ, থেকে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। আরও ভাল হয় বললে, বিসিআই-এর মাসুদ রানা দুজনকে পাঠিয়েছেন।
সত্যিই দুঃখিত, স্যর, কিন্তু…।
কথার মাঝে থেমে গেল মেয়েটি, এইমাত্র বেজে উঠেছে রিসেপশনিস্টের ফোন। রিসিভার তুলে নিল সে, কয়েক মুহূর্ত শুনে খবিরের দিকে চাইল। আপনাদেরকে নিয়ে যেতে লোক পাঠাচ্ছেন চেয়ারম্যান। একটু অপেক্ষা করুন।
একমিনিট পর দূরের একটা দরজা খুলে গেল, বেরিয়ে এল চমত্ত্বার সুট পরা এক ভদ্রলোক। নিশাত ও খবির লক্ষ্য করল, তার সুটের নীচে ফুলে আছে উযি সাবমেশিনগান।
পিং! আওয়াজ শুনল ওরা। এইমাত্র থেমেছে একটা এলিভেটার। তারপর আরেকটা। ভুরু কুঁচকে ফেলল খবির, ঘুরে চাইল। ওই একইসময়ে খুলতে লাগল এলিভেটারের দুই দরজা।
পরক্ষণে হুড়মুড় করে এলিভেটার থেকে বেরিয়ে এল কমপক্ষে দশজন লোক। প্রত্যেকে সশস্ত্র। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে কন্টিনেন্টাল সোলজার ৬৬ ইউনিটের নেতা ডেভিড এন. হেন্ড্রিক।
যাহ শালা! বিড়বিড় করল খবির।
কালো পোশাকে একেকজনকে ওর মনে হলো সাক্ষাত যম। হাতে মেটালস্টর্ম রাইফেল। পরক্ষণে মাযলগুলোর মুখে ঝলসে উঠল কমলা আগুন।
তার এক সেকেণ্ড আগে রিসেপশন ডেস্কের ওদিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিশাত ও খবির। চারপাশ ঝাঁঝরা হলো হাইপার মেশিনগানের গুলিতে। জোরালো ঝিরঝির আওয়াজ তুলছে। অস্ত্রগুলো।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসা চৌকশ পোশাকের লোকটা কিমা হয়ে গেল শতখানেক গুলি খেয়ে। ছিটকে গেল মেঝের একদিকে। কপালে একটিমাত্র গুলি নিয়ে শুয়ে পড়ল সুন্দরী ইজরায়েলি রিসেপশনিস্ট। এ ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ছে ডেভিড এন. হেণ্ডিকের দলের সবাই। অবশ্য রয়ে গেছে তাদের একজন। এইমাত্র রিসেপশন ডেস্কের ওদিকে লাফিয়ে পড়া সিভিলিয়ান দুজনকে শেষ করবে সে।
সময় নষ্ট না করে কাউন্টার ঘুরে ওদিকে গেল লোকটা। আর তখনই গর্জে উঠল দুটো অস্ত্র।
নাকে বাড়তি দুটো ফুটো নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল বাউন্টি হান্টার। ধোঁয়া বেরুনো রিভলভার হাতে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল নিশাত ও খবির।
ওরা ম্যাকিনের জন্যে এসেছে, চাপা স্বরে বলল নিশাত। এসো, খবির!
ওরা যেন অনুসরণ করছে ভয়ঙ্কর কোনও টর্নেডোর গতিপথ। মেইন অফিস এরিয়ায় পৌঁছে গেল।
ডেস্কগুলোর উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, সুট পরিহিত পুরুষ ও মহিলা আইনজীবীরা। সারাদেহে রক্তাক্ত সব গর্ত। ছিন্নভিন্ন। হয়ে গেছে ওঅর্ক স্টেশনগুলো। ১৪-২০৯
ঝড়ের গতিতে ওপেন-প্ল্যান অফিস পেরিয়ে গেল হেন্ড্রিকের দল। ঝরঝর করে ভেঙে পড়ছে সামনের সমস্ত কাঁচ। বিস্ফোরিত হচ্ছে কমপিউটার মনিটর। বিশ্রী আওয়াজ তুলছে মেটালস্টর্ম মেশিনগান।
দূরে জ্যাকেটের তলা থেকে উযি বের করল এক সিকিউরিটি গার্ড–কিন্তু ওই পর্যন্তই, হাইপারভেলোসিটি মেটালস্টর্ম বুলেট ঝাঁঝরা করে দিল তাকেও।
বাঁক নেয়া অপূর্ব সুন্দর এক ইন্টারনাল স্টেয়ারকেস বেয়ে ঊনচল্লিশ তলা লক্ষ্য করে ঝড়ের বেগে উঠছে বাউন্টি হান্টাররা।
তাদের পিছনে ছুটতে শুরু করল নিশাত ও খবির।
কয়েক মুহূর্ত পর উঠে এল স্টেয়ারকেসের উপর অংশে। ওখান থেকে দেখল, দলের অন্যদের কাছ থেকে সরে গেল তিন বাউন্টি হান্টার, ঢুকে পড়ল ইন্টারোগেশন রুমে। তাদের গুলি শেষ করে দিল দুই সিনিয়র মোসাদ এজেন্টকে। তৃতীয়জনকে খুন করল না, তাকে হেঁচড়ে নিয়ে বেরিয়ে এল। দূর থেকে যুবককে ডেনিস ই, ম্যাকিন বলেই ধারণা করল নিশাত ও খবির। সুদর্শন, বয়স হবে পঁচিশ। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
দেরি না করে সামনে বাড়ল নিশাত ও খবির। শেষ কয়েকটি ধাপ পেরিয়েই গুলি করল তিন বাউন্টি হান্টারকে লক্ষ্য করে। কাঁচির দুই ফলার মত নিখুঁতভাবে কাজ করছে ওরা। খবিরের গুলিতে শুয়ে পড়ল বামদিকের লোকটা। ডানদিকের লোকটা মরল নিশাতের বুলেটে। পরক্ষণে ওদের দুজনের গুলিতে আত্মা খাঁচাছাড়া হলো তৃতীয় লোকটার।
ধপ করে মেঝের উপর পড়ল ম্যাকিন।
এক দৌড়ে তার দুপাশে পৌঁছে গেল নিশাত ও খবির, টেনে তুলে বসিয়ে দিল ইজরায়েলি এজেন্টকে।
আপনি ম্যাকিন? জানতে চাইল নিশাত, ডেনিস ই. ম্যাকিন?
হ্যাঁ, কিন্তু…
আমরা আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। বিসিআই-এর মেজর মাসুদ রানা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন।
এক সেকেণ্ড পর পরিচিতির ছাপ পড়ল যুবকের চোখে। বিসিআই-এর মাসুদ রানা… ওই লিস্টের…
বুম!
এক বাউন্টি হান্টার একটু দূরের অফিস থেকে বেরিয়ে আসতেই গুলি করেছে খবির।
আপা! কথা বলার সময় নেই এখন!
ঠিক! ছুটবার ফাঁকে কথা চলুক! টান দিয়ে ম্যাকিনকে দাঁড় করিয়ে দিল নিশাত। সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠবেন! জলদি!
ওরা তিনজন দৌড়ে পৌঁছে গেল স্টেয়ারকেসে, ঝড়ের গতিতে উঠতে লাগল উপরতলা লক্ষ্য করে। পাশে পড়ল দেয়ালে বসানো চমৎকার এক সেট পিকচার উইণ্ডো। অনেক নীচে লণ্ডন। কিন্তু অন্য দৃশ্য দেখেছে নিশাত ও খবির। আকাশ চিরে হাজির হয়েছে অশুভ চেহারার একটা অ্যাসল্ট হেলিকপ্টার। দালানের বাইরে পজিশন নিচ্ছে। ওই কপ্টারের পাইলট এবং অন্য এক লোক চেয়ে আছে নিশাত, খবির ও ম্যাকিনের দিকে।
ব্রিটিশ মিলিটারির হিউ গানশিপের মতই একই জিনিস ওই হেলিকপ্টার লিঙ্কস। পাশে টো মিসাইল ও ছয় ব্যারেলের মিনিগান।
দৌড়ে ওঠো! ম্যাকিন-খবিরকে তাড়া দিল নিশাত। ওঠো! ওঠো! ওঠো! জলদি!
গুলি শুরু করেছে লিঙ্কস।
ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল পিকচার উইণ্ডোর কাঁচ। বেঁকে নেমে যাওয়া স্টেয়ারকেস ধসে গেল কপ্টারের গুলির আঘাতে। নড়বড় করছে সিঁড়ির ধাপগুলো। চারপাশে এক পশলা বৃষ্টির মত বয়ে গেল ভাঙা কাঁচের ঝড়। নিশাত ও খবির দুপাশ থেকে খপ করে ধরল ম্যাকিনকে, তাকে মাঝে রেখে তুমুল গতিতে উঠতে লাগল। গুলির তোড়ে খসে পড়ল নীচের কয়েকটা ধাপ। চল্লিশতলায় পৌঁছে গেল ওরা, ডাইভ দিয়ে পড়ল মেঝেতে। এক সেকেণ্ড দেরি করলে ওদেরকে নিয়ে নীচে রওনা হতো ভাঙা সিঁড়ি।
.
ঊনচল্লিশ তলা অফিসের ক্ষয়-ক্ষতির ভিতর হাঁটছে ডেভিড এন. হেন্ড্রিক, হেডসেট রেডিয়োতে মন দিয়ে শুনছে দলের সবার রিপোর্ট।
দিস ইয এয়ারবোর্ন ওয়ান। ওরা চল্লিশতলায়। পরনে সাধারণ পোশাক। কোনও ভুল না হলে ম্যাকিন ওদের সঙ্গে।
এয়ারবোর্ন টু। ছাতে ল্যাণ্ড করছি, নামিয়ে দেব দ্বিতীয় ইউনিটকে।
দিস ইয় এয়ারবোর্ন থ্রি। আমরা উত্তর-পুবে। পৌঁছব চল্লিশ…
টেকনিকাল টিম। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব এলিভেটার। আটত্রিশ তলায় আটকা পড়েছে, চারটে এলিভেটার। এখন আর কেউ ওগুলোতে করে…
বয়েজ, বলল হেন্ড্রিক। ওই দুই পিঁপড়েকে শেষ করো। ধরে আনো ম্যাকিনকে।
দূরে জোরালো গুঞ্জন তুলছে বাউন্টি হান্টারদের তিন লিঙ্কস। কপ্টার। কয়েক মুহূর্ত পর ওগুলো পৌঁছে গেল কুইন্স টাওয়ারের উপর। যেন বিরক্তি ধরিয়ে দেয়া নীল মাছি, নামবে কারও আম দই-কলা মাখা খাবারের পাতে।
মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর ছাতে নামল একটা কপ্টার। অন্যদুটো চক্কর কাটতে থাকল সবচেয়ে উপরের তিনতলা অফিস ঘিরে। উঁকি দিচ্ছে প্রতিটি অফিসের জানালায়।
একের পর এক জানালা বিস্ফোরিত হবার আওয়াজ পেয়েছে অনেকেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ যোগাযোগ করেছে পুলিশের সঙ্গে।
.
চল্লিশতম ফ্লোরের হলওয়ে ধরে ছুটে চলেছে নিশাত ও খুবির, নিজেদের মাঝে প্রায় বয়ে নিয়ে চলেছে ম্যাকিনকে।
আমাদেরকে জানান, ছুটতে ছুটতে বলল নিশাত, ওই তালিকা… আপনি বা মাসুদ রানা ওই তালিকার ভেতর কেন?
ফোঁস-ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে এজেন্ট। ম্যাজেস্টিক… ম্যাজেস্টিক-১২। ওখানে তুলে দিয়েছে আমাদের নাম। আমি লিস্টে আছি কারণ, জেনে ফেলেছি কারা ম্যাজেস্টিক-১২-র সদস্য। ওরা ওদের পরিকল্পনা গুছিয়ে নেয়ার আগেই হয়তো ওদেরকে ধরিয়ে দিতে পারি।
আর মাসুদ রানা? জানতে চাইল নিশাত।
তাকে শেষ করতে চায় অন্য কারণে। অত্যন্ত গিফটেড লোক রানা। তালিকার পনেরোজনের একজন। ইচ্ছা করলেই পাশ করবে সি স্নেক টেস্ট। পৃথিবীতে মাত্র নয়জন ডিসআর্ম করতে পারবে টাচলক-৯। ওটা ব্যবহার করা হয় লিযার্ড মিসাইল সিকিউরিটি সিস্টেমে…
কথা শেষ করতে পারল না ম্যাকিন, ওদের ডানদিকে দড়াম করে খুলে গেল ফায়ার ডোের, ছিটকে বেরিয়ে এল চারজন ৬৬ ইউনিটের লোক–হাতে মেটালস্টর্ম রাইফেল, জ্বলজ্বল করছে। সবুজ লেসার সাইট।
কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাবার সময় পেল না খবির ও ম্যাকিন, কিন্তু সতর্ক ছিল নিশাত- দুজনকে ঠেলে পার করিয়ে দিল একটা বাঁক। নিজেও থামল না, ঝেড়ে দৌড় দিল দীর্ঘ আরেক হলওয়ে ধরে। পিছনে ধেয়ে এল হাইপারমেশিনগানের শত শত গুলি।
উত্তরদিকের করিডোর ধরে ছুটছে খবির ও ম্যাকিন। পিছন থেকে গুলি খেয়ে যখন তখন পাখির মত মরবে। বামদিকে ছোট একটা অফিস দেখে ম্যাকিনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল খবির।
এই অফিস কানা গলির মত।
দুশশালা! কপালকে দোষ দিল খবির। এক দৌড়ে পৌঁছে গেল জানালার সামনে। ওর মনে হলো, নাকের সামনে দিয়ে গেল একটা লিঙ্কস হেলিকপ্টার।
তখনই দরজার বুকে বসানো কাঁচের ওপাশের দৃশ্য দেখল খবির। আবারও চাইল জানালার দিকে।
যে চার বাউন্টি হান্টার বেরিয়ে এসেছিল ফায়ার স্টেয়ারওয়েল থেকে, তারা এখন দুই ভাগে ভাগ হয়েছে–একদল আসছে ওদেরকে শেষ করতে। অন্য দুজন গেছে নিশাতের ব্যবস্থা। নিতে।
খবির ও ম্যাকিনকে করিডোর পেরিয়ে বিশ গজ দূরের অফিসে ঢুকতে দেখেছে প্রথম দলের দুই কমাণ্ডো। সাবধানে, নিঃশব্দে চলল তারা। ৫০০৪ সংখ্যা লেখা দরজার দুপাশে থামল।
টেকনিকাল টিম, ডলার ফাইভ বলছি, হেডসেটে ফিসফিস করল বয়স্ক কমাণ্ডো। ফ্লোর স্কেম্যাটিক চাই। অফিস নাম্বার ৫০০৪।
সঙ্গে সঙ্গে এল জবাব: কানাগলি ওটা, ডলার ফাইভ। ওদের আর কোথাও যাওয়ার নেই।
উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রুপারকে ইশারা করল বয়স্ক কমাণ্ডো।
জবাবে ভিড়িয়ে রাখা দরজায় বেদম এক লাথি বসাল তরুণ কমাণ্ডে। গর্জে উঠল হাতের মেটালস্টর্ম রাইফেল।
কিন্তু ঝাঁঝরা হলো না কেউ।
অফিস পুরো ফাঁকা।
মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত জানালার দামি কাঁচ আগেই ভেঙে পড়েছে। ঝিরঝির করে মেঝেতে নামছে লণ্ডনের বৃষ্টির ফোঁটা।
কোথাও নেই খবির। উধাও হয়েছে ম্যাকিন।
৬৬ ইউনিটের দুই কমাণ্ডো লাফিয়ে গিয়ে ঢুকল অফিসে, দ্রুত পায়ে পৌঁছে গেল কাঁচ ভাঙা জানালার সামনে। নীচে চাইল।
দেখবার কিছুই নেই। নীচে নেমে গেছে টাওয়ারের কাঁচের দেয়াল। সামান্য দূরে পার্ক, চকচক করছে বৃষ্টিস্নাত সবুজ ঘাসগুলো।
এবার উপরে চোখ গেল দুই বাউন্টি হান্টারের। শুনতেও পেল সর-সর আওয়াজ। উইণ্ডো ওয়াশার্স প্ল্যাটফর্মের নীচের অংশ এইমাত্র পেরিয়ে গেল এই তলা। কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছুবে ছাতে।
উইণ্ডো ওয়াশার্স প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে খবির ও ম্যাকিন, কুইন্স টাওয়ারের গা বেয়ে উঠছে।
শক্তপোক্ত দুই উইঞ্চ-ক্রেনের সাহায্যে ঝুলছে আয়াতাকার প্ল্যাটফর্ম। ছাত থেকে কয়েক ফুট বেরিয়ে এসেছে ক্রেনের দুই বাহু।
দুই আততায়ী বাউন্টি হান্টার অফিসে হামলা করবার কয়েক সেকেণ্ড আগে নিজেই খবির গুলি করে উড়িয়ে দিয়েছে জানালার কাঁচ। ম্যাকিনকে নিয়ে উঠে পড়েছে ক্যাটওয়াকে।
প্রথমে কাঁধে ইজরায়েলি এজেন্টকে উঠতে দিয়েছে খবির, তারপর যুবক উপরের প্ল্যাটফর্মে উঠতেই নিজেও উঠে এসেছে। ঝট করে সরিয়ে নিয়েছে দুই পা। তখনই অফিসে ঝড়ের গতিতে ঢুকেছে লোকদুটো।
.
নিশাতের পিছু নিয়ে আসছে হাইপারচার্জড বুলেট। যান্ত্রিক একটা পা নিয়ে হরিণীর মত ছুটছে বাংলাদেশ আর্মির ক্যাপ্টেন, চলেছে পশ্চিমদিকের হলওয়ে ধরে। পিছু নিয়েছে ৬৬ ইউনিটের দুই কমাণ্ডো।
কানের পাশ দিয়ে বুলেট বেরিয়ে যেতেই তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়ে বামের অফিসে ঢুকল নিশাত।
ও আছে সুসজ্জিত এক বোর্ডরুমের ভিতর।
চকচকে কাঠের মেঝে। চেয়ারগুলো চামড়া দিয়ে মোড়া। আগে কখনও এত বড় বোর্ডরুম টেবিল দেখেনি নিশাত। দৈর্ঘ্যে ওটা হবে কমপক্ষে তিরিশ ফুট।
শালার ব্যাটারা, বিড়বিড় করল নিশাত। কাজ একটাই, মক্কেলের পকেট ফাঁকা করা!
দালানের কোনায় এই অফিস। পুরো এক দেয়াল জুড়ে মেঝে থেকে শুরু করে সিলিং পর্যন্ত একটিমাত্র মস্ত জানালা। বাইরের দারুণ দৃশ্য দেখলে আটকে আসতে চায় শ্বাস। চোখে পড়ে পুরনো লণ্ডন। অন্যদিকে দালানের বাইরের এলিভেটার।
নিশাত একটু আগে বুঝেছে, ওর এই কোল্ট রিভলভার দিয়ে মেটালস্টর্ম রাইফেলের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। কাজেই দরজার আড়ালে সরে এল ও।
কয়েক সেকেণ্ড পর দুড়ম আওয়াজ তুলে খুলে গেল দরজা। টর্নেডোর মত হাজির হলো লোকদুটো।
প্রথম লোকটা ওকে লক্ষ্য করবার আগেই তার মাথার পাশে গুলি করল নিশাত। অন্য লোকটা ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। দেরি না। করে ট্রিগার টিপে দিল নিশাত। কিন্তু ক্লিক শব্দটা কানের কাছে হাতুড়ির বাড়ির মত আওয়াজ তুলল।
মর জ্বালা!
গুলি শেষ।
রিভলভারের চেম্বারে আছে শুধু গুলির খোসা।
দ্বিতীয় কমাত্তোর উপর ঝাঁপিয়ে নামল নিশাত, দুজন ছিটকে পড়ল বোর্ডরুম টেবিলের চকচকে পিঠে।
নানাদিকে গেল লোকটার হাতের মেটালস্টর্ম রাইফেলের গুলি।
মেঝে ও সিলিং পর্যন্ত কাঁচের জানালা, তার বুকে লাগল শ খানেক বুলেট। তৈরি হলো অসংখ্য মাকড়সার জাল।
বোর্ডরুম টেবিলের উপর হামলাকারীর বিরুদ্ধে লড়তে চাইল। নিশাত। লোকটা বিশালদেহী, শক্তিশালী। কোমরের খাপ থেকে বের করেছে ছোরা। ওই একই কাজ করেছে নিশাতও, দুজনের ছোরা টক্কর দিতেই ঠন আওয়াজ উঠল।
লড়বার ফাঁকে চোখের কোণে দরজা দেখল নিশাত। ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে দুই লোক।
কিন্তু তারা ৬৬ ইউনিটের কেউ নয়।
দামি সুট পরা দুই ইজরায়েলি, কাঁধ থেকে ঝুলছে উযি সাবমেশিনগান। শার্টের বুকে রক্তের ছাপ।
মোসাদের সিকিউরিটি গার্ড।
দুই ইজরায়েলি দেখছে বোর্ডরুমের টেবিলের উপর লড়ছে। দুজন।
শালার বাউন্টি হান্টার! মেঝেতে থুতু ফেলল ডানদিকের লোকটা।
চলে এসো! বলল অন্যজন, আবারও ফিরল হলওয়েতে। ওরা আসছে!
প্রথম গার্ড টিটকারির হাসি নিয়ে লড়াইরত নিশাত ও প্রকাণ্ড লোকটাকে দেখল। পকেট থেকে বের করল হাই-পাওয়ার্ড আরডিএক্স গ্রেনেড। খুলে ফেলল ক্যাপ, ছোট আনারসটা ছুঁড়ে ফেলল বোর্ডরুমের ভিতর। পরের সেকেণ্ডে উধাও হলো, দুই ইজরায়েলি গার্ড।
হামলাকারীর বিরুদ্ধে লড়বার ফাঁকে নিশাত দেখেছে, উড়ে এসেছে গ্রেনেড। হঠাৎ করেই ওটার গতি যেন ধীর হয়ে উঠল। মাত্র একবার মেঝেতে কপাল ঠুকল, পরক্ষণে অদৃশ্য হলো প্রকাণ্ড টেবিলের নীচে।
খটাৎ আওয়াজ পেল নিশাত।
এইমাত্র মস্ত টেবিলের গাছের গুঁড়ির মত মোটা এক পায়ার গায়ে লেগেছে গ্রেনেড। পরক্ষণে বিস্ফোরিত হলো বোমা।
এর প্রতিক্রিয়া হলো ভয়ঙ্কর।
টেবিলের এক অংশ উড়ে গেল করিডোরের দিকে। চারপাশে ছিটকে গেল হাজার হাজার কাঠের কুচি।
টেবিলের অন্য অংশ এখনও কমপক্ষে পঁচিশ ফুট দৈর্ঘ্যের, ভিন্ন পরিণতি হলো ওটার ভাগ্যে।
গ্রেনেডের কনকাশন ফোর্স মেঝে থেকে শূন্যে তুলে ফেলল অত বড় টেবিল, ছুটে যাওয়া রেলগাড়ির বগির মত রওনা হয়ে গেল। গতি প্রচণ্ড, দেখতে না দেখতে পেরোল বোর্ডরুম, বুলেটের মত গিয়ে লাগল ঘরের পশ্চিমের জানালায়।
এক সেকেণ্ড আগেই নিশাত বুঝেছে এরপর কী ঘটবে।
সুসজ্জিত, আরামদায়ক বোর্ডরুমের ফাটা কাঁচের জানালা বিস্ফোরিত করে ব্যাটারিং র্যামের মত বেরিয়ে গেল টেবিল চল্লিশতলা উঁচু আকাশে।
ভীষণ হোঁচট খেল ওটা।
হঠাৎ নিশাত টের পেল, পিছলে পড়ছে। মুখে ঝরঝর করে। নামছে বৃষ্টির শীতল জল।
চার শ ফুট নীচে রাস্তা!
দৃশ্যটা অদ্ভুত। টাওয়ারের উপরের তলা থেকে গলা বের করেছে মস্ত টেবিল। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য, তারপর হঠাৎ করেই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ তৈরি করে ঝুঁকে রওনা হয়ে গেল নীচে!
অবশ্য, এ পতন পলকের জন্য।
টেবিলের উপরাংশ গিয়ে বাধল সিলিঙে, এদিকে মেঝের কিনারায় আটকা পড়ল পুরু দুই পায়। ফলে হঠাৎ করেই আবারও ঝুঁকি খেয়ে থামল টেবিল, ঝুলছে উঁচু দালানের সবচেয়ে উঁচু তলা থেকে।
সরসর করে পিছলে পড়ছে নিশাত, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে টেবিলের বুকে ঘঁাচ করে বিধিয়ে দিল ছোরা। হাতলের তামার ফিঙ্গারহোল্ডে চেপে বসল দুই হাত। প্রায় খাড়া টেবিলের শেষে ঝুলছে ওর দুই পা।
নিশাতের হামলাকারী অত দ্রুত নড়তে পারেনি। ঝট করে টেবিলের দুপাশ ধরতে গিয়ে ফেলে দিয়েছে ছোরা। কিন্তু কপাল মন্দ, ধরা হয়নি কিছুই। অবশ্য ভাগ্য তার ভাল, সে ছিল উপরে। ঝরা পাতার মত নেমে এল নিশাতের ছোরার উপর বুট রেখে। বন্ধ হলো তার পতন।
নিশাতের কব্জির উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে।
ব্যথায় ছিঁড়ে যেতে চাইল নিশাতের হাত। মুখ তুলে চাইল। উপর থেকে চেয়ে আছে লোকটা, হাসছে বত্রিশ দাঁত বের করে!
টেবিলের দু পাশ ধরে ফেলেছে ব্যাটা, এবার নিশাতের কব্জির উপর লাথি মারতে লাগল।
দাঁতে দাঁত খিচে টিকে থাকতে চাইল নিশাত। একের পর এক লাথি পড়ছে কব্জির উপর। ব্যথায় বিকৃত হয়ে গেল মুখ। কখনও কখনও তামার ফিঙ্গারহোল্ডে লাথি নামছে, তখন সামান্য কমছে ব্যথা।
তখনই শুনতে পেল শব্দটা: ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ… ওই আওয়াজ হেলিকপ্টারের রোটরের। মাথা কাত করে ওদিকে চাইল নিশাত। সামান্য দূরে প্রকাণ্ড বোলতার মত ভাসছে লিঙ্কস কপ্টার।
হায়রে কপাল… বিড়বিড় করল নিশাত।
ওর কব্জির উপরে ভর করে পাইলটকে একহাতে ইশারা করল বাউন্টি হান্টার। বোঝাতে চাইছে যেন কপ্টার নিয়ে নীচে আসে।
সবই বুঝেছে পাইলট, কপ্টার নিয়ে এল নিশাতের পায়ের নীচে। সাঁই-সাই ঘুরছে রোটর। ঝাপসা আকৃতি তৈরি করেছে। সাদা কোনও চরকির। নিশাতের দুই পা থেকে মাত্র দশফুট নীচে ঘুরছে দুরন্ত পাখা।
সন্তুষ্ট হয়েছে বাউন্টি হান্টার। নতুন উদ্যমে শুরু হলো লাথি। কড়াৎ!
চারপাশের এত আওয়াজের ভিতরও নিজের আঙুলের হাড় ভাঙবার শব্দ শুনল নিশাত।
বাউন্টি হান্টারের উদ্দেশ্যে গলা ফাটাল: হারামজাদা, তোর মা বেশ্যা ছিল, আর তোর বাপ ছিল রাস্তার কুকুর!
তিনগুণ জোরে লাথি নামল।
নিশাতের বুট পরা দুই পায়ের দশ ফুট নীচে জোরালো গুঞ্জন তুলছে রোটর ব্লেডগুলো।
জোরালো শেষ লাথি মারতে তৈরি বাউন্টি হান্টার। ঝট করে। পা ছুঁড়ল…
ওই একই সময়ে অদ্ভুত কাজ করল নিশাত। টেবিলের বুক থেকে হ্যাচকা টানে খুলে নিল ছোরা! পিছলে পড়তে শুরু করেছে দুজন!
এবার টেবিলের শেষ অংশ পেরিয়ে নামবে গিয়ে ঘুরন্ত রোটরগুলোর ভিতর!
নিজ চোখকে বিশ্বাস করছে না নিশাতের হামলাকারী।
পায়ের নীচে ছুরিটা ছিল শক্ত মাটির মত, ভরসা করা যাচ্ছিল। ওটার উপর, কিন্তু এখন সব সরে যেতেই বোর্ডরুমের টেবিল থেকে পিছলে পড়ছে সে।
টেবিলের শেষাংশে পৌঁছে গেল নিশাত। কিন্তু হামলাকারীর মত অপ্রস্তুত নয় ও।
টেবিলের শেষ কিনারা পেরুতেই আবারও ছোরা চালাল ও। এবার কোপ দিয়েছে টেবিলের উল্টোদিকে হাত থেকে ছুটল না। ছোরার হ্যাঁণ্ডেল। জোরালো আঁকি খেয়ে থেমে গেল নিশাত।
ওর পাশ দিয়ে পড়ার সময় নিশাতকে ধরার জন্য হাত বাড়াল লোকটা, সঙ্গে সঙ্গে জোরালো এক থাবড়া হাকাল নিশাত, কড় কড় আওয়াজে ভাঙল লোকটার দুপাটির দশটা দাঁত বেরিয়ে গেল বাউন্টি হান্টার, পেরোল টেবিল। নীচে…
দৃশ্যটা যেন হয়ে উঠল স্লো মোশন ছায়াছবির মত।
লোকটার আতঙ্কিত চেহারা দেখল নিশাত। ডিমের মত বড় হয়ে উঠেছে ব্যাটার দুই চোখ। মস্ত হাঁ করেছে, ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওর আলাজিভ। পড়ছে… পড়ছে…
মাত্র এক সেকেণ্ড পর রোটর ব্লেডগুলোর উপর পড়ল সে। জোরালো একটা ভোঁতা আওয়াজ হলো।
মুহূর্তে হারিয়ে গেল লোকটা, তার জায়গায় চারপাশে বিস্তৃত হলো লাল একটা নক্ষত্র।
ছড়িয়ে গেল রক্তের কোটি কণা।
কপ্টারের উইণ্ডস্ক্রিনে ছলাৎ করে লেগেছে একরাশ লাল তরল। ঝাপসা হয়ে গেল উইণ্ডস্ক্রিন। দালানের পাশ থেকে সরে গেল লিঙ্কস কপ্টার।
তাতে স্বস্তির শ্বাস ফেলবারও সময় পেল না নিশাত।
বৃষ্টির ভিতর টের পেল, এইমাত্র নড়ে উঠেছে টেবিল!
নতুন করে হোঁচট খেয়ে নামছে। ঝট করে মুখ তুলে চাইল নিশাত।
চল্লিশতলার মেঝেতে আটকা পড়া টেবিলের দুই পায়ার একটা মচকে গেছে!
এবার সোজা নীচে রওনা দেবে গোটা টেবিল!
অ্যাই মিয়া, এটা কোনও বিচার হলো তোমার? আকাশের দিকে চেয়ে গলা ফাটাল নিশাত। না! আমি মরব না!
চারপাশে চোখ বোলাল। ও আছে দালানের এক পাশে। ঝুলছে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে।
সামান্য নীচে একটু দূরে কাঁচ ঘেরা একটা এলিভেটার। ওটা দালানের দক্ষিণের শুরুতেই আটত্রিশ তলায় থেমেছে।
ঠিক আছে, ফিসফিস করে নিজেকে বলল নিশাত। শান্ত থাকো। ভাবো, তোমার বস্ মাসুদ রানা হলে কী করত।
নিশ্চয়ই ম্যাগহুক ব্যবহার করত?–ভাবল।
বেল্ট থেকে ম্যাগহুক নিয়ে মাযল তাক করল চল্লিশতলার সিলিঙে, তারপর টিপে দিল ট্রিগার।
কিছুই হলো না। ম্যাগহুক ফায়ার করেনি।
শুধু ক্লিক আওয়াজ তুলেছে ট্রিগার, ব্যারেলের ভিতর থেকে বেরোল দুর্বল ফিজ-ফিজ শব্দ। ফুরিয়ে গেছে গ্যাস প্রোপেল্যান্ট।
যাহ শালা! রাগে গরগর করল নিশাত। এমন তো হয় না। রানার বেলায়!
তখনই আবারও হোঁচট খেল টেবিল। সড়াৎ করে নামল আরও দুফুট। ম্যানুয়ালি দড়ি গোটাতে শুরু করেছে নিশাত, কাজটা করতে হচ্ছে দাঁতের জোরে। তারই ফাঁকে বিড়বিড় করছে: ঠিক না, এসব একদম ঠিক না। শালার কপাল আমাকে জুতিয়ে দিচ্ছে!
চল্লিশতলার মেঝের কিনারায় টলমল করছে টেবিল। গুঙিয়ে উঠছে পায়া। যে-কোনও সময়ে ভেঙে পড়বে।
যথেষ্ট দড়ি পাওয়া গেছে বুঝতেই অন্যহাতে ম্যাগহুকের এ্যাপলিং হুক চল্লিশতলার মেঝে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল নিশাত।
মেঝের কিনারায় পড়ল এ্যাপলিং হুক, ভাঙা উইণ্ডাসিলে
আটকে গেল আঁকশি। তখনই জানালা থেকে ছুটে গেল টেবিল!
দেরি না করে ছোরা ছেড়ে দিল নিশাত, আরেক হাতে টেবিলে জোর এক ধাক্কা দিয়ে সরে গেল দূরে।
এ বষ্টিঝরা আকাশে নীচে রওনা হয়ে গেল টেবিল, পড়ছে দালানের গা ঘেঁষে।
দড়ি থেকে ঝুলছে নিশাত, দোল খেয়ে সরল বাড়ির কোণে, পৌঁছতে চাইল এলিভেটারের কাঁচের দেয়ালের পাশে। একবার খপ করে কাঁচের বাক্সের ছাতের কিনারা ধরতে পারলেই…
সাত সেকেণ্ড পর সিলভারম্যান, নিউটন অ্যাণ্ড যেমির লইয়ার্স ফার্মের বোর্ডরুমের প্রকাণ্ড টেবিল আছড়ে পড়ল ফুটপাথে, মুহূর্তে লাখখানেক টুকরো হলো।
.
উইণ্ডো-ওয়াশার্স প্ল্যাটফর্মে চেপে ছাতের পাশে পৌঁছে গেছে খবির ও ম্যাকিন। রেলিং টপকে চট করে লুকিয়ে পড়ল এগস্ট চিমনির আড়ালে। উঁকি দিয়ে দেখল, ছাতে নেমেছে হেণ্ডিকের লিঙ্কস কপ্টার। ঝমঝম বৃষ্টির ভিতর এখনও ঘুরছে রোটরগুলো।
আলাপ চলুক, ম্যাকিনকে বলল খবির। এই ম্যাজেস্টিক ১২ একটা তালিকা তৈরি করেছে। আর চাইছে মাসুদ স্যরকে মেরে ফেলতে। ওই তালিকায় আরও…
এসব করছে সি সেক টেস্টের কারণে, বলল ম্যাকিন। কারণ, ধরে নেয়া হয়েছে মাসুদ রানা এবং অন্য আটজন ওই টেস্টে পাশ করবে। ন্যাটো ওই টেস্টের নাম দিয়েছে: মোটর নিউরন র্যাপিডিটি অভ রেসপন্স টেস্ট।
মোটর নিউরন র্যাপিডিটি অভ রেসপন্স টেস্ট? বলল খবির, তার মানে রিফ্লেক্সের বিষয়?
ঠিকই ধরেছেন, বলল ম্যাকিন। সবই রিফ্লেক্সের ব্যাপার। বলতে পারেন সুপারফাস্ট রিফ্লেক্স। ওই তালিকার নয়জন দুনিয়া সেরা। অনায়াসে পাশ করবে সি স্নেক টেস্ট। এরা ডিসআর্ম করতে পারবে টাচলক-৯। আর এটাই হচ্ছে ম্যাজেস্টিক-১২-র পরিকল্পনা। আর ওই পরিকল্পনা কাজে লাগাতে হলে আগে এই লোকগুলোকে শেষ করতে হবে।
একটা মিসাইল সিকিউরিটি সিস্টেম…
হ্যাঁ, কিন্তু মনে কোনও ভুল ধারণা রাখবেন না। এই বাউন্টি হান্টের পরিকল্পনা ম্যাজেস্টিক-১২-এর মস্ত পরিকল্পনার সামান্য অংশ।
ওই মহাপরিকল্পনা কী?
বর্তমান দুনিয়ার রাজনৈতিক সমস্ত অবস্থান পাল্টে দেয়া। মূল কথা: তারা ছড়িয়ে দেবে গোটা দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ। নিজেদের খুশিমত আবারও জন্ম দেবে নতুন রাষ্ট্র। খবিরের কানের কাছে। বলল ম্যাকিন, আমার কথা শুনুন। এ বিষয়ে আস্ত ফাইল জোগাড় করেছি, দুইতলা নীচেই আছে ওটা। গত দুদিন ধরে আমার কাছ থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করছিল মোসাদ। ওই ফাইলে আছে কেন, কী কারণে ম্যাজেস্টিক-১২ বা এর সদস্যরা বাউন্টি হান্টের আয়োজন করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভয়ঙ্কর সেই মহাপরিকল্পনা কী তা…
আকাশ থেকে পড়া বাঙ্গির মত বিস্ফোরিত হলো ম্যাকিনের গোটা মাথা। ওটা যেন ছিল রক্তভরা পাতলা রাবারের বেলুন।
কিছুই টের পায়নি খবির।
ওর পিছন থেকে মেটালস্টর্ম রাইফেলের বিশটা বুলেট উড়িয়ে দিয়েছে মোসাদ এজেন্টের আস্ত মুখ।
চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল খবির। ত্রিশ গজ দূরে ফায়ার স্টেয়ার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে স্বয়ং ডেভিল ডেভিড এন. হেন্ড্রিক, কাঁধে মেটালস্টর্ম রাইফেলের বাঁট।
ঝট করে ম্যাকিনের দিকে চাইল খবির। ভাঙা পুতুলের মত
পড়ে আছে রক্তাক্ত লাশ! আর একটা কথাও বেরোবে না ওই মুখ। থেকে। মাথাটাই নেই তো তার আর কীসের মুখ বা কথা!
এবার নিজের জান বাঁচা, বাপু! ঘুরেই ঝেড়ে দৌড় লাগাল খবির। হাতে উদ্যত রিভলভার, গুলি করছে হেলিকপ্টারের পাশ দিয়ে। চলেছে ওই কপ্টার লক্ষ্য করেই। একবার চড়তে পারলে চিন্তা নেই। নিজের হাতে ওকে কপ্টার চালানো শিখিয়েছেন মাসুদ স্যর।
.
টারজানের মত ঝুলতে ঝুলতে চলেছে নিশাত, দুপায়ের দুই লাথিতে ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল এলিভেটারের কাঁচের দেয়াল। পরক্ষণে মেঝেতে নামল ও।
টাওয়ারের দক্ষিণে আটত্রিশতলায় প্রথম এলিভেটার থেকে। দেখল, প্রায় প্রতিটি এলিভেটার একই উচ্চতায় স্থির।
পাশাপাশি তিন এলিভেটার আটত্রিশতলায়। পরেরটা, অর্থাৎ চতুর্থ এলিভেটার নেই। কোনও কারণে ডেকে নেয়া হয়েছে। নীর্চে। মাঝের ওই ফাঁক বাদ দিলে ওদিকে পঞ্চম এলিভেটার। সেটাও আটকা পড়েছে আটত্রিশতলায়।
কন্ট্রোল প্যানেলের ওপেন বাটন টিপে দিল নিশাত।
ওর মনে হচ্ছে, দাঁড়িয়ে আছে ফিশবউলে। যে-কোনও সময়ে ওর খোঁজ নিতে আবারও ফিরবে লিঙ্কস কপ্টার। তার আগেই সরে যেতে হবে, নইলে নিশ্চিত মৃত্যু…
ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ… আসছে লিঙ্কস কপ্টার। ঘুরে চাইল নিশাত। পৌঁছে গেছে ওটা। ওর কাঁচের এলিভেটারের পশ্চিমে ভাসছে। এবার খরগোশের উপর ছোঁ দেবে ঈগল।
বারবার ওপেন বাটন টিপে চলেছে নিশাত। বিড়বিড় করে বলল, মর জ্বালা! কাজ করে না এই বাটন?
তখনই লিঙ্কসের সাইড মাউন্টেড মিসাইল পড়গুলো থেকে ভুস করে উঠল একরাশ ধোঁয়া। ও
অবাক হলো নিশাত। ওকে শেষ করতে মিসাইল মেরেছে শালারা! পড থেকে ছিটকে বেরোল টো মিসাইল। যেন দিগন্ত থেকে এল নিশাতের এলিভেটার লক্ষ্য করে। এইমাত্র খুলতে শুরু করেছে এলিভেটারের দরজা।
শো-শো গর্জন ছাড়তে ছাড়তে বিদ্যুদ্বেগে নিশাতের নাক লক্ষ্য করেই আসছে মিসাইল।
মস্ত শরীরটা চাপাচাপি করে দুই দিকের কবাট ঠেলে ওদিকের মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিশাত
তখনই এলিভেটারের পশ্চিম কাঁচ ভেঙে ভিতরে ঢুকল মিসাইল। ওটার লেজের উত্তপ্ত আগুন ঝলসে দিল এলিভেটারের ভিতরের অংশ। পরক্ষণে আরেকদিকের কাঁচের দেয়াল ভেঙে গিয়ে ঢুকল পাশের এলিভেটারের বুকে।
দৃশ্যটা বিস্ময়কর।
কুইন্স টাওয়ারের দক্ষিণ-দেয়াল ছুঁয়ে চারটে এলিভেটার ভেদ করে কাঁচ ভাঙবার ঝনঝনঝনঝন আওয়াজ তুলে টেমসে গিয়ে পড়ল মিসাইল। পানির মস্ত গিইজার তৈরি হলো নদীর বুকে।
কঠিন ক্যাচ ধরতে চাওয়া আনাড়ি ক্রিকেট খেলোয়াড়ের মত আটত্রিশতলার রিসেপশন এরিয়ায় ধুপ করে পড়েছে নিশাত। মুখ। তুলেই দেখল, এখনও ধীরে ধীরে খুলছে এলিভেটারের কাঁচের দরজা।
চোখের কোণে দেখল, বিধ্বস্ত রিসেপশন এরিয়ায় চার বাউন্টি হান্টার। বেশি দূরে নেই তারা!
নিশাত তাজ্জব বনে গেছে, কিন্তু ওর চেয়ে কম বিস্মিত হয়নি লোকগুলো।
শালার তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলোর ভেতর পড়েছি! বিড়বিড় করল নিশাত।
ঝট করে যার যার মেটালস্টর্ম রাইফেল ঘোরাল লোকগুলো।
ওই একই সময়ে লাফ দিয়ে উঠে সিধে হলো নিশাত, বুঝে গেছে মাত্র একটা জায়গায় যেতে পারবে: ক্ষিপ্র চিতার মত এক লাফে গিয়ে ঢুকল এলিভেটারের ভিতর।
লুকিয়ে পড়ল কন্ট্রোল প্যানেলের আড়ালে। এক সেকেণ্ড পর হাইপারমেশিনগানের অজস্র তপ্ত বুলেট ঢুকল খোলা দরজা দিয়ে।
দমকা হাওয়া ছেড়েছে, সেই সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি- পুরো ভিজে গেছে নিশাত। বিধ্বস্ত এলিভেটার হয়ে উঠেছে বড়জোর খোলা প্ল্যাটফর্ম, ওখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে লণ্ডন শহর।
টাওয়ারের দক্ষিণে চোখ গেল নিশাতের।
ওদিকে পাশাপাশি তিনটে এলিভেটার।
বাঁচতে চাইলে ঝুঁকি নে, বিড়বিড় করল। নইলে নির্ঘাত মরবি!
কাজেই দৌড় শুরু করল নিশাত।
আটত্রিশতলায় প্রথম এলিভেটার থেকে ছুটতে শুরু করেছে। একটু পর পর তিন ফুট জায়গা ফাঁকা, তারপর একের পর এক বিধ্বস্ত এলিভেটার।
দ্বিতীয় এলিভেটারে নামতেই আবারও হাজির হলো লিঙ্কস কপ্টার। নেমে এল চিলের মত, যেন ছোঁ দেবে। চালু করেছে মিনি-গান, ঝড়ের মত এল শত শত বুলেট, চুরচুর করে দিল দালানের কাঁচ।
ভাসতে ভাসতে ঘুরছে কপ্টার, ওটার ঝোড়ো বুলেটকে পিছনে ফেলে ছুটছে নিশাত। মাত্র একফুট পিছনে তেড়ে আসছে নিশ্চিত মৃত্যু। লাফিয়ে পড়ল তৃতীয় এলিভেটারের ভিতর।
এবার? চার নম্বর এলিভেটার নামিয়ে নেয়া হয়েছে অনেক নীচে। পাঁচ নম্বর এলিভেটারের আগে হাঁ করে আছে অতল খাদ। দৌড়ের গতি রোধ করল না নিশাত। মাঝের ফাঁক অনেক বেশি চওড়া পুরো বারো ফুট।
কিছু পাত্তা না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিশাত। সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে দুই হাত। আশা করছে আটত্রিশতলা বাড়ি থেকে পড়ে মরবে না। কেন যেন ওর মনে হলো: পৌঁছুতে পারবে পঞ্চম এলিভেটারে।
কিন্তু কপাল সবসময় সাহায্য করে না।
ঝাঁপিয়ে পড়েই বুঝে গেল নিশাত, দূরের ওই গন্তব্যে পৌঁছুবে না ও।
পঞ্চম এলিভেটারের মেঝের এক ইঞ্চি দূরে হাত পৌঁছতেই শুরু হলো পতন।
অবশ্য এলিভেটারের মেঝের কিনারায় ক্রিচ-ক্রিচ আওয়াজ তুলে আটকে গেল ম্যাগহুকের এ্যাপলিং হুক।
কাজ করছে না ম্যাগহুক, কিন্তু নিশাতের হাত থেকে পুরো একফুট সামনে বেড়ে আছে ওটা।
এর বেশি বাড়তি সুযোগ আশা করেনি নিশাত।
স্টিলের আঁকশির এক ফুট নীচে ঝুলছে ও।
লঞ্চার বেয়ে উঠতে শুরু করেছে, এমন সময়… আবার শুরু হলো ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ আওয়াজ! লিঙ্কস অ্যাটাক হেলিকপ্টার!
আবারও হাজির হয়েছে ওটা। চলে এসেছে নিশাতের এলিভেটারের খুব কাছে। কিন্তু এই কপ্টারের পিছনে উদয় হয়েছে আরেকটা কপ্টার।
ওটাও লিঙ্কস।
সামনের লিঙ্কস কপ্টারের পাইলটের হাসিটা পরিষ্কার দেখল নিশাত।
লোকটা খুশি মনে হাত নাড়ল, পরক্ষণে খপ করে ধরল গান ট্রিগার।
এলিভেটার প্ল্যাটফর্মের নীচে ঝুলতে ঝুলতে মাথা নাড়ল নিশাত। দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে।
কেউ চিরকালের জন্য আসে না।
বনবন করে ঘুরছে লিঙ্কসের মিনি-গান ব্যারেল। কিন্তু চোখের কোণে আরেকটা নড়াচড়া দেখল নিশাত।
এই লিঙ্কস কপ্টারের পিছনে ধূসর ধোঁয়া ছাড়ছে কী যেন… ওই যে পিছনের লিঙ্কস হেলিকপ্টারটা… তখনই সামনের কপ্টারের কোমরে বিধল মিসাইল।
ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হলো। থরথর করে কেঁপে উঠল বাতাস। সে সঙ্গে প্রচণ্ড আওয়াজ। যেন গা পুড়িয়ে দেবে আগুনের হলকা। নিশাতের চোখের সামনে হাজার টুকরো হলো বাউন্টি হান্টারদের কপ্টার। টাওয়ারের দেয়াল ঘেঁষে নীচে রওনা হয়ে গেল জ্বলন্ত টুকরোগুলো। গা থেকে উঠছে তেলতেলে ধোঁয়া।
বিধ্বস্ত কপ্টারের পোড়া কাঠামো প্রচণ্ড আওয়াজে আছড়ে পড়ল টাওয়ারের সামনের সবুজ ঘাসের লনে। বিস্ময় নিয়ে দ্বিতীয় লিঙ্কস কপ্টারের দিকে চাইল নিশাত। নিজের দলের লোককে শেষ করেছে ওই পাইলট?
তখনই চিনল তাকে। লেখক টু খবির!
ইয়ারপিসে নিশাত শুনল পরিচিত কণ্ঠ, আপা, কী করেন? ছাতে পেলাম এই মাল। বেচবে না পাইলট। এখন ঘুমিয়ে আছে।
বৃষ্টির ভেতর। তারপর এইমাত্র দেখলাম আপনি এখানে।
হাচড়ে-পাছড়ে এলিভেটারের মেঝেতে উঠে এসেছে নিশাত। বলল, পরে কথা হবে, ছুডু বাই! আগে মৃত্যু-প্রাসাদ থেকে সুন্দরী রাজকন্যা আপাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও!
নিশ্চই তাই করব। কিন্তু আগে একটা কাজ করে দেবেন, আপা?
.
তিন মিনিট পর।
ঊনচল্লিশতলার এক করিডোর ধরে রেলগাড়ির মত ছুটল নিশাত, হাতে উদ্যত কোল্ট।
চারপাশ একেবারে বিধ্বস্ত হয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে বুলেটের ক্ষত-বিক্ষত চিহ্ন। কোথাও আস্ত নেই একটা কাঁচও।
বাউন্টি হান্টাররা এখনও থেকে থাকলে, তাদের কাউকে দেখা গেল না।
ওটা আছে ইন্টারনাল স্টেয়ারকেসের কাছে, ইয়ারপিসে খবিরের কথা শুনল নিশাত। যে ঘরের কাছে ম্যাকিনকে পেয়েছিলাম। ওটা বোধহয় কোনও ধরনের ইন্টারোগেশন রুম।
বুঝতে পেরেছি, বলল নিশাত।
বাঁকা সিঁড়ির কাছেই ওই ঘরের দরজা।
কয়েক সেকেণ্ডে ওখানে পৌঁছে গেল ক্যাপ্টেন। ঘরে ঢুকে একটু দূরে দেখল টু-ওয়ে মিরর। ওদিকে ইন্টারোগেশন রুম। আয়নার এদিকে দুটো আধুনিক মুভি ক্যামেরা। টেবিলের পাশে পুরু ম্যানিলা ফোল্ডার এবং দুটো কেসে ডিভিডি।
আসলেই ইন্টারোগেশন রুম, থ্রোট মাইকে বলল নিশাত। ফাইল ফোল্ডার পেয়েছি। ডিভিডি দুটোও। এবার কী করতে বলো?
সব নিন। এ ছাড়া ম্যাজেস্টিক-১২ বা টাচলক-৯ সম্পর্কে যা। কিছু পাবেন, নেবেন। ক্যামেরার পেটেও কিছু থাকতে পারে।
মেঝের উপর কাত হয়ে পড়ে থাকা ছোট স্যামসোনাইট সুটকেস সিধে করল নিশাত। ওটার ভিতর ভরতে লাগল ফাইল ও ডিভিডি। দুই ক্যামেরাও এটে গেল।
অনেক নীচে অসহায় শিশুর ওঁয়া-ওঁয়া কান্না জুড়েছে পুলিশের একাধিক গাড়ির সাইরেন। যথেষ্ট হয়েছে, ভাবল নিশাত। বেরিয়ে এল ঘর ছেড়ে। ছুটতে শুরু করেছে সিঁড়ির দিকে। উঠবে ছাতে।
মাত্র পাঁচ মিনিট পর অন্য একটা সিঁড়ি ব্যবহার করে ছাতে পৌঁছে গেল, ছুটছে বৃষ্টির ভিতর।
আগেই লিঙ্কস কপ্টার নামিয়ে এনেছে খবির। দরজা খুলে দিতেই ঝটপট উঠে পড়ল নিশাত।
পঁচিশ সেকেণ্ড পর ছাত ছেড়ে আকাশে উঠল কপ্টার, বৃষ্টির ভিতর ধোঁয়াভরা কুইন্স টাওয়ারকে পিছনে ফেলে রওনা হয়ে গেল।
আঠারো
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধান অফিস।
সাব-লেভেল তিন, পেন্টাগন। অক্টোবর, ১৪। সকাল সাড়ে এগারোটা।
খুব নিরীহ ভঙ্গিতে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল কেভিন কনলন, যাবে ডক্টর ওয়াকারের কাছে সেন্ট জন্স হসপিটালে কিন্তু এমন সময় বুনো দাঁতাল শুয়োরের মত হামলে পড়ল ওর মোটকু বস।
তো, কোথায় চললেন, কনলন স্যর? টিটকারির সুরে বলল জন ওয়ার্ন। প্রকাণ্ডদেহী লোক সে, আগে আর্মিতে ছিল, দুবার ইরাকে লড়াই করে এসেছে। আর ওই কথাটা একটু পর পর আশপাশের সবাইকে মনে করিয়ে দেয়।
বাস্তবে নির্বোধ লোক। দুনিয়ার আর সব গাধার মতই, কোনও নিয়ম বা আইন থেকে নড়তে সম্পূর্ণ নারাজ। অথচ জটিল সমস্যার সমাধান হয়তো রয়েছে একেবারে হাতের নাগালে।
আমি একটু কফির জন্যে বেরুচ্ছি, বলল কেভিন।
আমাদের অফিসের কফির দোষটা কী, শুনি স্যর?
এর চেয়ে হাইড্ৰফ্লোরিক অ্যাসিড ভাল।
ঠিক তখনই অফিসে এসে ঢুকল ডানাকাটা পরী, তরুণী মেরিয়ান বিটন। সে মেইল: ক্লার্ক। আর ওই মুখ দেখলে জ্বলজ্বল করে কনলনের দুই চোখের তারা। কিন্তু দুঃখের কথা, ওর মতই কীসের যেন ভাষা খুঁজে পায় জন ওয়ার্নের কুতকুঁতে চোখ।
হাই, মেরিয়ান, নিজের সেরা হাসিটা দিল কেভিন।
হাই, কনলন, লাজুক হাসল তরুণী।
গলা চড়িয়ে বলল ওয়ার্ন, তুমি না অফিস ছেড়ে যাচ্ছিলে, কনলন? যাও, ঘুরে এসো। আসার সময় স্টারবাক থেকে আমার জন্যে গ্র্যাণ্ড ফ্রেপাচিনো এনো।
শালা, তোর নিকুচি করি, মনে মনে গাল দিল কেভিন। ত্যাগ করল। আপনি যা বলেন, ওয়ার্ন।
অ্যাই, ধমক দিল বস। আগেও বলেছি, আমাকে সার্জেন্ট ওয়ার্ন বলেই ডাকবে। তোমার মত মেরুদণ্ডহীন সামান্য কিবোর্ড টেপা ছোকরা আমাকে যা খুশি ডাকবে, সেজন্যে ইরাকে গুলি খাইনি আমি। সত্যি যখন বিপদে পড়ে দেশ, তখন আমার মত লোকই বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। চওড়া হাসি দিল সে মেরিয়ানের দিকে চেয়ে। তখন পিস্তলটা কি তোমার হাতে থাকবে, না আমার হাতে, কনলন?
অপমানে লাল হয়ে গেছে কেভিনের গাল। আস্তে করে শ্বাস ফেলে বলল, আপনি যা বলেন, ওয়ার্ন।
যা বললাম, এখন থেকে মনে রাখবে, ছোকরা!
বিরক্তি চেপে মেরিয়ানের দিকে সামান্য নড় করল কেভিন, বেরিয়ে এল অফিস ছেড়ে।
.
ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড, সেন্ট জন্স হসপিটাল।
আর্লিংটন, ইউএসএ। অক্টোবর ১৪। দুপুর পৌনে বারোটা।
সেন্ট জন্স হাসপাতালের ই.আর. বিভাগে ঢুকে রিসেপশন। কাউন্টারের সামনে থামল কেভিন কনলন। ২৩৩
বেলা বাড়ছে, কিন্তু আজ রোগী বা দর্শনার্থীদের ভিড় নেই। ওয়েটিং এরিয়ায় যোম্বির মত পেট ভাসিয়ে কাউচে বসে আছে পাঁচজন বয়স্ক লোক ও এক মুটকি মহিলা।
হাই, আমি কেভিন কনলন, ডক্টর জেফ ওয়াকারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
অলসভঙ্গিতে বাবলগাম চিবিয়ে চলেছে ডেস্ক নার্স। এক মিনিট। …ডক্টর ওয়াকার! আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন এক ভদ্রলোক!
পর্দা ঘেরা এক বেড-বে থেকে বেরিয়ে এল দ্বিতীয় নার্স। বেলিণ্ডা, শশশশ! উনি চোখ বুজে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি গিয়ে তুলে দিচ্ছি।
আবারও হলওয়েতে গিয়ে ঢুকল দ্বিতীয় নার্স।
ওই একই সময়ে রিসেপশন কাউন্টারে কনলনের পাশে থামল। অত্যন্ত দীর্ঘ এক কালো ভদ্রলোক। গরিলার মত ঢালু কপাল, ছড়ানো নাকের দুই ফুটো।
এই মাল খোদ আফ্রিকার, ভাবল কেভিন।
চোখে এলভিস সানগ্লাস। গায়ে বাদামি ট্রেঞ্চকোট।
কনলন বা নার্স জানে না, বাউন্টি হান্টারদের সমাজে এই লোকের নাম: দি আফ্রিকান।
গুড ইভনিং, আড়ষ্ট উচ্চারণে বলল সে। আমি ডক্টর, জেফ ওয়াকারকে খুঁজছি।
বাউন্টি হান্টারের দিকে ঘুরেও চাইল না কনলন। টের পেয়ে গেছে ওই লোক কে। ধুপ-ধাপ লাফাতে শুরু করেছে হৃৎপিণ্ড
তালগাছের মত উঁচু লোকটা যেন পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড়। তার বুক পর্যন্ত পৌঁছুবে না কেভিনের মাথা।
বাবলগাম দিয়ে বড় বল তৈরি করল নার্স। আজকে দেখি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন ডক্টর ওয়াকার! ওদিকে আছেন। বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছেন। এইমাত্র জিনা গেল ডেকে তুলতে।
কথাটা মাত্র শেষ করেছে, এমনসময় চোখ ডলতে ডলতে অথোরাইযড পার্সোনেল ওনলি লেখা করিডোর থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার।
বয়স্ক মানুষ। মাথার চুল ধূসর। কুঁচকে গেছে গাল। শার্টের উপর সাদা ল্যাবকোট। পকেট থেকে চশমা বের করে নাকের উপর চাপিয়ে নিলেন।
ডক্টর ওয়াকার? জানতে চাইল দি আফ্রিকান।
জী, কালো লোকটার দিকে এগিয়ে এলেন ডক্টর।
বাদামি ট্রেঞ্চকোটের তলা থেকে অস্ত্রটা বেরুতেই সবার আগে চোখে পড়ল কেভিনের।
একটা সিযেড-২৫ সাবমেশিনগান। বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত অস্ত্র। দেখতে অনেকটা উযির মত, কিন্তু আরও ন্যাংটো যেন দুই ভাই ওরা। পিস্তল গ্রিপের ভিতর থাকে চল্লিশ রাউণ্ড গুলি।
ডাক্তারের দিকে অস্ত্র তুলল লোকটা, পাত্তাই দিল না বেশ কজন সাক্ষী থাকবে। দেরি না করে টিপে দিল ট্রিগার।
লম্বু খুনির বিরুদ্ধে মাত্র একটা কাজই সম্ভব ছিল, ঠিক তাই করল কেভিন।
ওর ডানহাত ছিটকে লাগল পিস্তলের পাশে, ফলে ডক্টর ওয়াকারের মাথার তিন ইঞ্চি দূর দিয়ে গিয়ে দূরের দেয়ালে বিধল গোটা পনেরো গুলি। এ কাউচে বসা বয়স্ক লোকগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ল মেঝেতে। তাদের একজনের উপর পড়েছে ইয়া মোটা মহিলা। নীচে চাপা পড়ে মুরগির মত কক-কক্ আওয়াজ তুলল বেচারা লোকটা।
চিৎকার শুরু করেছে ডেস্কের নার্স।
ঘুরেই পিছনের করিডোরের মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ওয়াকার, পরক্ষণে উঠেই শুরু করলেন দৌড়।
দি আফ্রিকানের উল্টো হাতের প্রচণ্ড এক চড় খেয়ে ছিটকে গেল কেভিন, হুড়মুড় করে পড়ল একটু দূরে রাখা জ্যানিটরের ট্রলিতে।
সামান্যতম দুশ্চিন্তা নেই আফ্রিকান খুনির, রিসেপশন ডেস্ক পাশ কাটিয়ে চলে গেল স্টাফ ওনলি লেখা করিডোরে। এবার
সিযেড-২৫ দিয়ে খতম করবে ডাক্তার ওয়াকারকে।
একটা একটা করে গুলি করছে কিছুই পাত্তা না দিয়ে।
নানাদিকে ছিটকে পালাতে শুরু করেছে নার্সরা।
এইমাত্র করিডোরের একদিকের সাপ্লাই রুমে গিয়ে ঢুকেছেন। ডাক্তার, বাইরের দেয়াল ও কবাটে ফুলিঙ্গ তুলল গোটা দশেক গুলি।
ট্রলির উপর ছড়িয়ে পড়া জ্যানিটরের সাপ্লাইগুলোর মাঝে শুয়ে আছে কেভিন। দেখল, পাশেই পেটমোটা সাদা পাউডারের ব্যাগ। গায়ে পুরু নীল কালিতে লেখা:
যিয়োলাইট-ক্লোরিন ইণ্ডাস্ট্রিয়াল-স্ট্রেংথ।
ক্লিনিং এজেন্ট অ্যাভয়েড স্কিন কন্ট্যাক্ট।
খপ করে ব্যাগ তুলে নিল কেভিন, লাফ দিয়ে নামল ট্রলি থেকে। আর সবাই পালাতে শুরু করেছে, কিন্তু উল্টো দিকে রওনা হয়ে গেল ও। এক ছুটে ঢুকল স্টাফ ওনলি করিডোরে, দেখতে পেল আফ্রিকান লোকটা থেমেছে এক দরজার সামনে, হাতে উদ্যত সিযেড-২৫।
পাঁচ ফুট দূর থেকে ক্লোরিনের ব্যাগ ছুঁড়ে দিল কেভিন। লক্ষ্যভেদ নির্ভুল হলো। খুনির মাথার পিছনে গিয়ে লাগল ব্যাগ। চারপাশে ছিটকে উঠল সাদা গুড়ো।
ভয় পেয়ে নেড়ি কুকুরের মত কেঁউ করে উঠল খুনি, ঝট করে সরে গেল দরজার সামনে থেকে। একহাতে চাপড়াতে শুরু করেছে মাথা। সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর নর্তন-কুর্দন। এলভিস সানগ্লাসের কাছে পুরু হয়ে জমেছে সাদা পাউডার। যিয়োলাইটে ত্বক ও মাংস চিড়চিড় করে পুড়ছে, বড় বড় ফোস্কা পড়তে শুরু করেছে শরীরে।
ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ল কেভিন, দুই হাঁটুর উপর ভর করে ধুপ করে বসল। দি আফ্রিকানের পায়ের পাশে থেমেছে। দরজার ওপাশে ওই তো ডাক্তার! কয়েকটা সাপ্লাই শেলফের নীচে মাথা গুঁজে দুই হাতে ঢেকে রেখেছেন মুখ।
ডক্টর ওয়াকার! কথা শুনুন! আমি কেভিন কনলন! ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি থেকে এসেছি! কোনও হিরো নই! কিন্তু আর কেউ আপনাকে সাহায্য করবে না! যদি বাঁচতে চান, আমার সঙ্গে আসুন!
হাত বাড়িয়ে দিলেন ডাক্তার। উঠে দাঁড়িয়েছে কেভিন, দেরি না করে খপ করে তাঁর হাত ধরল, টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। ভদ্রলোককে। কালো লোকটাকে পাশ কাটিয়ে ছুট দিল দুজন। তীরের মত বেরিয়ে গেল রিসেপশন কাউন্টারের পাশ দিয়ে। কয়েক মুহূর্ত পর পৌঁছে গেল অটোমেটিক স্লাইডিং ডোরের সামনে। ওরা বেরিয়ে এল দুপুরের কড়া রোদে। পিছনে কর্কশ আওয়াজ ছাড়তে শুরু করেছে সিযেড-২৫।
ধাওয়া করছে দি আফ্রিকান। একবার হাতের নাগালে কেভিন বা ওয়াকারকে পেলে রক্ষা নেই।
ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দালানের সামনে পার্ক করা অ্যাম্বুলেন্স।
উঠে পড়ন! তাড়া দিল কনলন। দরজা খুলে লাফিয়ে উঠল ড্রাইভিং সিটে। প্রায় একইসময়ে প্যাসেঞ্জার সিটে বসল ডাক্তার।
ইগনিশন চাবি মুচড়ে দিতেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন। কেভিন অ্যাক্সেলারেটর টিপে ধরতেই ছিটকে রওনা হলো গাড়ি। দড়াম করে বন্ধ হলো দুই দরজা। কিন্তু তারই ভিতর শোনা গেল। জোরালো ধুপ আওয়াজ। কে যেন উঠেছে গাড়ির পিছনে।
যাহ্… বিড়বিড় করল কেভিন।
সাইড মিররে লম্বা, কালো লোকটাকে দেখছে।
সে দাঁড়িয়ে আছে-অ্যাম্বুলেন্সের রিয়ার বাম্পারে। দুহাতে শক্ত করে ধরেছে ছাতের কিনারা।
কিচকিচ আওয়াজ তুলে বাঁক নিল গাড়ি, আণ্ডারকাভার টার্নিং বে থেকে বেরিয়ে এল মূল পার্কিং লটে। ইচ্ছা করে একটা ড্রেনের উপর দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গেল কেভিন। আশা করেছিল বাম্পার থেকে খসে পড়বে লোকটা। কীসের কী, সে থাকল। মাতালের মত ভীষণ দুলছে গাড়ি, পেরিয়ে গেল আরেকটা বড় নর্দমা কেভিন নিশ্চিত হয়ে গেল, এত ঝাঁকুনির ভিতর কেউ টিকবে না।
কিন্তু এক সেকেণ্ড পর দড়াম করে খুলে গেল অ্যাম্বুলেন্সের পিছন দরজা, রিয়ার কম্পার্টমেন্টে এসে ঢুকল লোকটা।
যাশ্শালা! বিড়বিড় করল কেভিন।
এখন লোকটার কাছে সিযেড-২৫ নেই। অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে গিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছে দুহাত, ফলে হারাতে হয়েছে অস্ত্রটা।
এখন আর অ্যাম্বুলেন্স থেকে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। ট্রেঞ্চকোটের তলা থেকে বের করল দীর্ঘ ম্যাচেটি। কেভিন আর ওয়াকারের দিকে রক্তচোখে চাইল লোকটা।
ক্ষুরধার ম্যাচেটির দিকে চেয়ে গলা শুকিয়ে গেল কেভিনের।
রিয়ার কম্পার্টমেন্ট পিছনে ফেলে এগিয়ে আসছে বাউন্টি হান্টার। উঠে পড়ল চাকাওয়ালা স্ট্রেচারে, এগুতে শুরু করেছে।
যা করবার এখনই, ভাবল কেভিন।
সামনে দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে রাস্তা। একটা রাস্তা বামদিকে গেছে একযিটের দিকে, অন্যটা বাঁক নিয়েছে ডানদিকে। ওদিকে কংক্রিটের র্যাম্প গিয়ে উঠেছে হাসপাতালের বহুতল পার্কিং লটে।
ডানদিকের রাস্তা বেছে নিল কেভিন। বনবন করে ঘোরাল স্টিয়ারিং হুইল, ফ্লোরের সঙ্গে টিপে ধরল অ্যাক্সেলারেটার। ছুটে চলেছে র্যাম্পের দিকে। দ্রুত উঠছে, কাজেই পেয়ে বসল সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স। তাল হারাতে বাধ্য হলো খুনি। দড়াম করে বাড়ি খেল পাশের দেয়ালে। থেমে গেল তার অগ্রগতি।
কিন্তু শুধু উঠবার সময় এই সুযোগ পাব, ভাবল কেভিন। পার্কিং এরিয়া মাত্র ছয়তলা।
উঠতে পারবে আর মাত্র পাঁচতলা, তার আগেই ভেবে বের করতে হবে কিছু।
.
কেভিন, ডাক্তার এবং বাউন্টি হান্টার যখন পার্কিং লটে সই-সাঁই করে উঠছে, ওই একইসময়ে রাস্তা থেকে গভীর মনোযোগে তাদেরকে লক্ষ করছে অন্য কেউ।
সে অপূর্ব সুন্দরী, দীঘল দুই ঊরু যেন কোনও দেবীর। সুডৌল কাঁধ, কিন্তু পেশিবহুল। শীতল, কাঠবাদামাকৃতি চোখদুটো জাপানি।
নাম তার মাসু হোকামা, কিন্তু বাউন্টি হান্টারদের সমাজে তার নাম: তুষার-শুভ্র রানি। এরই ভিতর হ্যারিস এক্স, টেরেন্সের মাথা কেটে নিয়েছে সে। এখন এসেছে ডাক্তার জেফ ওয়াকারকে কতল করতে।
শুধু কালো চামড়ার পোশাক পরে সে। পরনে এখন হিপস্টার প্যান্ট, বাইকার জ্যাকেট। পায়ে কিলার বুট। বেণী করে রেখেছে। দীর্ঘ কৃষ্ণ চুল। জ্যাকেটের নীচে দুই শোল্ডার হোলস্টারে হাই টেক টায়ার এসপিপি মেশিন পিস্তল।
রাস্তার বাঁকে এনএসএক্স হোণ্ডা স্পোর্টস কারের ইঞ্জিন চালু করল মাসু, রওনা হয়ে গেল বহুতল পার্কিং লট লক্ষ্য করে।
.
পেঁচিয়ে ওঠা র্যাম্পে জোরালো কিচকিচ শব্দ তুলছে দ্রুতগামী অ্যাম্বুলেন্সের চাকা। গাড়ির পিছনের দুকবাট দড়াম দড়াম খুলছে বন্ধ হচ্ছে।
তৃতীয় লেভেলে উঠে এসেছে ওরা।
আর মাত্র তিনটে তলা, তারপর উঠবে ছাতে- আর তখন আবারও সামনে বাড়বে দি আফ্রিকান।
অবশ্য আগেই কেভিন ঠিক করেছে, এরপর কী করবে।
ছয়তলা ছাত থেকে ফেলে দেবে অ্যাম্বুলেন্স আর তার আগে ঝটকা দিয়ে দরজা খুলে ডাক্তারকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ছাতে। গাড়ির ভিতর থাকুক শালা বদমাশ খুনি!
ডক্টর ওয়াকার! গলা ছাডল কেভিন। চট করে চাইল বাউন্টি হান্টারের দিকে। আমার কথা মন দিয়ে শুনুন! আমরা হয়তো পরে আর কথা বলার সুযোগ পাব না! আন্তর্জাতিক বাউন্টি হান্ট শুরু হয়েছে! টার্গেট করা হয়েছে আপনাকে!
আমাকে? কেন!
এখন আপনার মাথার দাম তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার। আপনারা ন্যাটোর একটা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। আমার ধারণা সেজন্যেই আপনাকে শেষ করতে চাইছে। আপনার সঙ্গে ছিলেন ডক্টর বেইন্স। মনে পড়ে? এমএনআরআর স্টাডি। ওই পরীক্ষা কী বিষয় নিয়ে ছিল?
ভুরু কুঁচকে ফেললেন ডাক্তার। শকের ভিতর আছেন। একের পর এক প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে মনে। তবে বুঝতে পেরেছেন, সত্যিই তাকে শেষ করতে চাইছে কেউ।
এমএনআরআর? ওটা ছিল… ওটা…
তীব্র গতি তুলেছে অ্যাম্বুলেন্স। চারতলায় উঠে এসে গতি কমল না গাড়ির।
ওটা ছিল… সোভিয়েত কোবরা টেস্টের মতই। এমন টেস্ট, যেটাতে…
ডাক্তারের কথা শুনছে কেভিন, কিন্তু তার ফাঁকে- চট করে পিছনে চাইল। ভীষণ ভয় পেল। অনেক কাছে চলে এসেছে খুনি। হাতে ধারালো ম্যাচেটি! এবার ওর ঘাড়ের উপর নামবে ওটা! কচাৎ করে কাটা পড়বে মাথা!
বাঁচার উপায় নেই!
পালাবে কোথায়?
শ-শ আওয়াজ তুলে নেমে এল ম্যাচেটি। আটকা পড়ল কেভিনের সিটের হেডরেস্টের ফোমের ভিতর।
হেডরেস্টের ভিতরের পুরু রডে লেগে জোরালো ধাতব আওয়াজ তুলেছে ম্যাচেটি। কেভিন টের পেল, ওর ডান কানের আধ ইঞ্চি দূরে থেমেছে ক্ষুরধার ফলা।
হায় যিশু! বিড়বিড় করল কেভিন।
ঘাড়ের কাছে পৌঁছে গেছে বাউন্টি হান্টার। এত বাঁক নেয়া, এত দ্রুত ওঠা, কিন্তু সবকিছুর ভিতর এগিয়ে এসেছে লোকটা!
গাড়ি উঠে এসেছে লেভেল পাঁচ-এ।
সরু হয়ে গেল কেভিনের দুচোখ। দূরে চেয়ে রইল। মরতেই যখন হচ্ছে, তো আর ভয় পেয়ে কী হবে?
দাবিয়ে দিল গ্যাস পেডাল।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাল অ্যাম্বুলেন্স, ঝটকা দিয়ে বাড়ল গতি।
চল্লিশ মাইল বেগে উঠে এল শেষ বাঁকে, আরেকটু হলে কাত হয়ে আছড়ে পড়ত গাড়ি দুচাকার উপর ভর করেছে।
কয়েক মুহূর্তে পৌঁছে গেল প্রকাণ্ড ছাতে।
উপরে একটা গাড়িও নেই–ঘাসহীন ন্যাড়া বিরান প্রান্তরের মত চারপাশ ফাঁকা। অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিং হুইল বনবন করে ঘুরিয়ে নিল কেভিন, আবারও ধুপ করে চার চাকার উপর ভর করল গাড়ি। দ্রুত আরেকদিকে সরছে বলে উল্টো দিকের দেয়ালে আছড়ে পড়ল বাউন্টি হান্টার। কেভিনের হেডরেস্টের ফোমের ভিতর রয়ে গেল তার ম্যাচেটি।
নতুন উদ্যমে গতি তুলছে কেভিন।
গাড়ির নাক তাক করেছে দূরের রেলিং লক্ষ্য করে।
ডক্টর! লাফ দিতে তৈরি থাকুন! গলা উঁচিয়ে বলল কেভিন।
রকেটের মত ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স, কয়েক মুহূর্তে পৌঁছবে রেলিঙে।
ওটা খুবই পলকা। লাথি খেলে খসে পড়তে পারে। সিটে নড়েচড়ে বসল কেভিন। তৈরি থাকুন! এক… দুই… তি…
পিছন থেকে ড্রাইভারের সিটের উপর হামলে পড়ল খুনি। দুই হাতে ধরেছে কেভিন এবং ডাক্তারের ঘাড়। নড়তে দেবে না!
হতভম্ব হয়ে গেল কেভিন।
এবার ওরা বেরুবে কী করে? ঝড়ের মত আসছে রেলিং। গতিরুদ্ধ করা এখন অসম্ভব!
বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা করল কেভিন। চরকির মত ঘুরিয়ে দিল স্টিয়ারিং হুইল। একইসময়ে দাঁড়িয়ে গেল ব্রেক পেডালের উপর।
ছ্যার-ছ্যার আওয়াজ তুলে পিছলে গেল অ্যাম্বুলেন্সের পিছনদিক। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে স্কিডিং।
রেলিং উড়িয়ে দিয়ে নীচে গিয়ে পড়বার কথা অ্যাম্বুলেন্সের, কিন্তু বাঁক-নেয়ার ফাঁকে ব্রেক কষতেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চার চাকা–বন বন করে এক শ আশি ডিগ্রি ঘুরল গাড়ি। দড়াম করে পিছন দিক গিয়ে লাগল রেলিঙে।
হালকা রেলিং উড়িয়ে দিয়ে শূন্যে বেরিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্সের পিছনদিক, ছাতে রয়ে গেছে সামনের সামান্য অংশ। তারপর শুরু হলো পতন। গাড়ির ভিতর থেকে বেরুতে পারেনি কেভিন, ডাক্তার বা বাউন্টি হান্টার।
এবার ষাট ফুট নীচে গিয়ে পড়বে ওরা।
কিন্তু ভাঙা রেলিঙের রডের জালে বাঁধা পড়ল অ্যাম্বুলেন্সের সামনের বাম্পার। ওটাই আটকে রাখল পতন। অবশ্য বেকায়দা ভাবে নামল গাড়ি, ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত ঝুলতে লাগল।
অ্যাম্বুলেন্সের চোখ এখন বেহেস্তের দিকে। খুলে গেছে পিছনে দুই কবাট। প্যাসেঞ্জার সিটে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে আছেন ডাক্তার ওয়াকার। আছেন ভালই, কিন্তু কেভিনের কপাল মন্দ।
গাড়ি রেলিঙে গুতো দিতেই হ্যাচকা টানে কেভিনকে নিজের পাশে নিয়ে এসেছে বাউন্টি হান্টার। পরক্ষণে ছুঁড়ে ফেলেছে পিছন দিকে।
আর অ্যাম্বুলেন্স খাড়া হতেই ফুটবলের মত ডিগবাজি খেয়েছে দুজন।
গাড়ির পিছনের দুই কবাট হাট করা- ওরা দেখেছে, ষাট ফুট নীচে পাকা সিমেন্টের চাতাল।
কেভিন ও দি আফ্রিকান হাতের কাছে যা দেখেছে, খপ করে ধরতে চেয়েছে।
প্রকাণ্ডদেহী লোকটা ধরেছে চাকা লক করা স্ট্রেচার।
দেয়ালের একটা র্যাক ধরেছে কেভিন।
খাড়া অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর ঝুলছে ওরা, সামান্য নীচে হাঁ হয়ে আছে দরজার দুই কবাট। একবার ওদিক দিয়ে পড়লে ভর্তা হয়ে যাবে দুজন।
মনেই হলো না ভয় বলে কিছু আছে বাউন্টি হান্টারের। এখনও ডাক্তারের মাথাটা চাই তার।
একহাতে স্ট্রেচার ধরেছে, অন্যহাত বাড়াল ম্যাচেটি খুলে নিতে। ধারালো অস্ত্রটা এখনও আটকে আছে হেডরেস্টে।
না! চাপা স্বরে বলল কেভিন, র্যাক ধরে উঠছে।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ওর।
একহাতে চাকাওয়ালা স্ট্রেচার ধরেছে, অন্য হাতে খপ করে ম্যাচেটির হাতল ধরল খুনি। হ্যাচকা টানে খুলে নিল অস্ত্রটা।
রক্তচোখে কেভিনকে দেখল লোকটা, মুখে ফুটে উঠল ভয়ঙ্কর অশুভ হাসি। ঠোঁট ফাঁক হতেই হলদে বড়বড় দাঁতগুলো বেরিয়ে এসেছে।
বাই-বাই! চরম আঘাত হানবার জন্য সামান্য কাত হয়ে ম্যাচেটি তুলল খুনি।
তাই? আনমনে বলল কেভিন। ম্যাচেটি ঠিকই দেখেছে।
হাত ঘরিয়ে ম্যাচেটি চালাল বাউন্টি হান্টার। ধারালো ফলা নামছে কেভিনের মাথা লক্ষ্য করে। কিন্তু ওই একইসময়ে পায়ের লাথিতে স্ট্রেচারের চাকার লক খুলে দিল কেভিন।
ফলাফল হলো বিস্ময়কর।
ভারী পাথরের মত, রওনা হলো স্ট্রেচার। মুহূর্তে পেরিয়ে গেল খোলা দরজা, সঙ্গে নিয়ে চলেছে দি আফ্রিকানকে!
বিকট চিৎকার ছাড়ল লোকটা।
ধরে আছে স্ট্রেচারের পায়া। গোল হয়ে উঠেছে রক্তলাল দুই চোখ 1.
দেখতে না দেখতে দূরে চলে গেল সে।
পড়বার সময় উল্টে গেল স্ট্রেচার। আগে মেঝের উপর পড়ল বাউন্টি হান্টার। ভয়ঙ্কর বিশ্রী থ্যাপ আওয়াজ উঠল। ফেটে গেল দেহের সব যন্ত্রপাতি। তবুও বেঁচে রইল সে।
অবশ্য, তা এক মুহূর্তের জন্য।
তখনই তার মাথার উপর নামল ভারী স্ট্রেচার। চিনাবাদামের খোসার মত ফাটল লোকটার করোটি। নানাদিকে ছিটকে গেল তাজা রক্ত ও ধূসর মগজ।
পরের দুমিনিট ব্যস্ত থাকল কেভিন ও ডাক্তার ওয়াকার। খাড়া অ্যাম্বুলেন্সের ভাঙা উইণ্ডশিল্ডের ভিতর দিয়ে উঠল বনেটে। ওখান থেকে রডের জাল ধরে ছাতে।
কিনারায় শুয়ে পড়ল দুজন, হাঁপাচ্ছে বেদম।
একবার নীচে উঁকি দিল কেভিন। সামান্য নীচে ঝুলছে অ্যাম্বুলেন্স। বকবক শুরু করেছেন ডাক্তার। সামলে নিতে পারেননি শক।
ওই টেস্ট… মোটর নিউরন… মোটর নিউরন র্যাপিডিটি অভ রেসপন্স… আমরা দুনিয়ার সেরাদের রেসপন্স টেস্ট করছিলাম। সবধরনের প্রতিক্রিয়া… চোখের দৃষ্টি… মুখের কথা… স্পর্শ করবার গতি… সব রিফ্লেক্স ছিল ওই টেস্টের মূল বিষয়।
প্রায় তিন লাখ লোকের রিফ্লেক্স টেস্ট করি। প্রত্যেকের রিফ্লেক্স আলাদা। তাদের ভিতর সেরা মাত্র কয়েকজন, অন্যরা মন্থর, বা আরও ধীর।
কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলেনি কেন ওই টেস্ট করতে হবে… অবশ্য নানাকিছু আঁচ করে নিয়েছিলাম আমরা। একদল বলছিল, এসব হচ্ছে কমাণ্ডো টিম সিলেকশনের জন্যে। আবার অন্যদল বলছিল, এসব হচ্ছে নতুন এক সিকিউরিটি সিস্টেম তৈরির জন্যে। ওই সিস্টেম দুনিয়া-সেরা… ব্যালেস্টিক মিসাইলের টাচলক-৯ সিকিউরিটি সিস্টেম… তারপর হঠাৎ করেই বন্ধ হলো ওই টেস্ট। বলা হলো ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্স প্রাথমিক প্রজেক্টটি বাতিল ২৪৫
করেছে। আর তাদের জানা হয়ে গেছে…
খচ্! খটাং!
অ্যাম্বুলেন্সের দিকে চেয়ে ছিল কেভিন, মন দিয়ে শুনছিল কথাগুলো, পাশে আওয়াজ পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে চাইল।
হাঁ হয়ে গেল ওর মুখ। পাশে শুয়ে আছেন ডাক্তার ওয়াকার, কিন্তু মাথাটা নেই। ধড়ের গলা থেকে গলগল করে বেরুচ্ছে রক্ত, ছড়িয়ে পড়ছে ছাতে।
মাথাহীন লাশের ওপাশে দাঁড়ানো এক জাপানি অপরূপা, হাতে খাটো সামুরাই তলোয়ার। অন্যহাতে চুলের মুঠো ধরে তুলে রেখেছে ডাক্তারের মাথা।
মাসু হোকামা। বাউন্টি হান্টার। অলসভঙ্গিতে ডাক্তারের মাথা দোলাল সে। হাঁ করে চেয়ে রইল কেভিন।
মসৃণগতিতে খাপে তলোয়ার ভরল মেয়েটি, হোলস্টার থেকে নিল টায়ার এসপিপি মেশিন পিস্তল, লক্ষ্য স্থির করল কেভিনের কপালে।
অস্ত্রের সাইটের উপর দিয়ে কেভিনকে দেখছে। পলক পড়ছে না দুচোখে। চাহনি বরফের মত শীতল। এক সেকেণ্ড পর অদ্ভুতভাবে ভুরু কোঁচকাল রূপসী, থুতনি তাক করল কেভিনের দিকে। রিনরিনে কণ্ঠে বলল, তুমি বোধহয় বাউন্টি হান্টার নও?
না… তিক্ত স্বরে বলল কেভিন। তা নই।
তা হলে দি আফ্রিকানের সঙ্গে লড়ছিলে কেন?
আমার এক বন্ধুর নাম উঠেছে ওই বাউন্টি লিস্টে। আমি ওকে সাহায্য করতে চাই।
আচ্ছা? অবাক হয়েছে যুবতী। এই লোক তোমার বন্ধু?
না, তা নয়, আমার বন্ধু এখন অন্য দেশে।
আর তুমি আফ্রিকানের সঙ্গে লড়েছ বন্ধুর জন্যে?
হুঁ।
ভুরু স্বাভাবিক হলো: মাসুর, সত্যিকারের কৌতূহল নিয়ে বলল, বন্ধু-পাগল, তোমার বন্ধুটির নাম কী?
মাসুদ রানা।
আর তোমার নাম?
কেভিন কনলন।
কেভিন কনলন, আস্তে করে উচ্চারণ করল জাপানি যুবতী। আগে কখনও কারও প্রতি কাউকে এত বিশ্বস্ত হতে দেখিনি।
দেখোনি? বলল কেভিন।
না। মাথা নাড়ল মাসু। তোমার কাছ থেকে বহু কিছু শেখার আছে তোমার বন্ধুর। তুমি রীতিমত প্রেমে ফেলে দিচ্ছ আমাকে। এতে ক্ষতি হবে আমাদের।
তাই?
হ্যাঁ। আস্তে করে মাথা দোলাল তরুণী। তারপরও বাঁচতে দেব তোমাকে। দেখা যাক বন্ধুকে সাহায্য করতে পারো কি না। হয়তো আবারও দেখা হবে আমাদের। তখন পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, কেভিন কনলন, তখন যদি তোমার বন্ধুকে বাঁচাতে চাও, আমি বাধ্য হয়েই তোমাকেও শেষ করব। তখন কোনও সুবিধা পাবে না আমার কাছ থেকে।
অস্ত্রটা হোলস্টারে রেখে দিল মাসু, চরকির মত ঘুরে রওনা হয়ে গেল। ডাক্তারের মাথাটা নিয়ে উঠে পড়ল নিচু ছাতের স্পোর্টস্ কারে।
রওনা হয়ে গেল গাড়ি। হাই স্পিড হোণ্ডার দিকে চেয়ে রইল কেভিন।
ওর চোখ ফিরল ডাক্তারের মুণ্ডহীন ধড়ের উপর।
মাঝ আকাশ থেকে অনল বর্ষণ করছে সূর্য।
দূর থেকে কাছে আসছে পুলিশের গাড়ির সাইরেন। লাশের দিকে চেয়ে গলগল করে বমি শুরু করল কেভিন।
.
লণ্ডনের পশ্চিমে চল্লিশ মাইল দূরে।
পরিত্যক্ত হোয়াইটমোর এয়ারফিল্ড। ব্রিটিশ সময় বিকেল চারটা।
এইমাত্র চোরাই লিঙ্কস কপ্টার নিয়ে পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডে। নামতে শুরু করেছে নিশাত ও খবির।
ওদেরকে এখানেই নামিয়ে দিয়েছিল রঘুপতি।
নিশাত-খবির আশা করেনি এখনও বসে থাকবে রঘুপতি। রোবট জানিয়েছিল, কিছুক্ষণ পর বিজ্ঞানীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ফ্রান্সে যাবে।
কিন্তু ওরা উড়ন্ত কপ্টার থেকে দেখল, পুরনো হ্যাঙারের বাইরে পার্ক করা রয়েছে কালো বিমান। ওটাকে ঘিরে ফেলেছে।
পুলিশের গাড়ি। মাথার উপর জ্বলছে লাল-নীল আলো।
বিমানের পাশেই রানওয়েতে বিষাদ নিয়ে বসে আছে। রঘুপতি, অসহায় চেহারা। ট্রেঞ্চকোট পরা ছয়জন লোক ঘিরে। রেখেছে তাকে। এ ছাড়া লোকগুলোর সঙ্গে রয়েছে ভারী অস্ত্র সজ্জিত এক প্লাটুন রয়াল মেরিন।
কপ্টার নিয়ে আকাশ থেকে নেমে আসতেই আটক করা হলো। নিশাত ও খবিরকে।
ওদের দিকে এগিয়ে এল ট্রেঞ্চকোটদের একজন। বয়সে যুবক সে, হাতে সেলফোন। ওদিকের কারও সঙ্গে কথা বলছে।
উচ্চারণে বোঝা গেল, সে আমেরিকান।
ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা এবং সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত খবির, আমি চার্লস ডেলাস। লণ্ডন অফিসের ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টে আছি। জানতে পেরেছি, আপনারা বিসিআই এজেন্ট মাসুদ রানাকে সহায়তা করছেন। তিনি প্রাণ বাঁচাতে লড়ছেন। আরও জেনেছি, একটি আন্তর্জাতিক বাউন্টি হান্ট চলছে।…আমি কি ঠিক বলেছি?
আস্তে করে মাথা দোলাল নিশাত ও খুবির।
হ্যাঁ… তা ঠিকই বলেছেন, বলল নিশাত।
ইউনাইটেড স্টেটস সরকার এই বাউন্টি হান্ট সম্পর্কে বহু কিছুই জেনেছে। তথ্য যা পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে: আমাদের দেশের জন্য বিসিআই এজেণ্ট মাসুদ রানাকে জীবিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। …আপনারা কি জানেন তিনি এখন কোথায়?
হয়তো জানি, বলল নিশাত, আগে বলুন কেন ওঁকে চাই আপনাদের।
মস্ত কোনও ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছেন আপনারা? টিটকারির সুরে জানতে চাইল খবির।
লালচে হয়ে গেল চার্লস ডেলাক্রসের গাল। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।
আরে বলে ফেলুন, হালকা সুরে বলল নিশাত। আমরা মুখ খোলার আগে আপনাদের পেটের খবর জানতে চাই।
প্লিয, ম্যাম, আমি সামান্য বার্তাবাহক, নরম স্বরে বলল যুবক। পুরো কাহিনি শুনবার ক্লিয়ারেন্স নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাদের কোনও ক্ষতি করে দেয়া বা আটক করবার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে: এক বা একাধিক লোক ওই বাউন্টি হান্টের পিছনে জড়িত। তাদের এমনই ক্ষমতা, ইউনাইটেড স্টেটস অভ আমেরিকাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এর বাইরে কোনও তথ্য আমাকে দেয়া হয়নি। জানিও না তেমন কিছু।
শুধু জানিঃ ইউনাইটেড স্টেটস্ অভ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন আমাকে। নির্দেশের শুরুতেই উনি জানিয়ে দিয়েছেন: আপনারা সাহায্য চাইলে, তা দেব আমরা। মেজর রানাকে জীবিত রাখবার কাজে আসবে, এমন যে-কোনও কিছু চাইলেই দেয়া হবে। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সে ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়েছে। আপনারা প্রয়োজনে অস্ত্র চাইতে পারেন। নির্দেশ অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে তা জোগান দেব। যদি টাকা লাগে, সঙ্গে সঙ্গে হাজির করব। মুখ ফুটে শুধু জানান পরিমাণ। যদি চান এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে কোথাও যাবেন, সঙ্গে সঙ্গে তাই করা হবে।
তা হলে একদিনের জন্য প্রেসিডেন্ট হতে চাই, বিড়বিড় করল খবির।
কী কারণে আপনাকে বিশ্বাস করব আমরা? জানতে চাইল নিশাত।
ওর দিকে সেলফোন বাড়িয়ে দিল ডেলাস। ওটা নিয়ে কানে লাগাল নিশাত।
ওদিকে কে? কী বলবেন শুনি?
ক্যাপ্টেন নিশাত? গম্ভীর কণ্ঠ বলল।
সঙ্গে সঙ্গে ওই কণ্ঠ চিনে ফেলল নিশাত। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট।
এয়ার বেস যিরো নাইন মিশনে ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ওর।
ওই গলা অন্য কারও নয়।
ক্যাপ্টেন নিশাত, বললেন প্রেসিডেন্ট। ইউনাইটেড স্টেটস সরকারের সমস্ত ক্ষমতা আপনি ব্যবহার করতে পারেন। যা লাগবে, শুধু জানিয়ে দিন আণ্ডারসেক্রেটারি ডেলাসকে। যে ভাবে হোক জীবিত রাখতে হবে মেজর রানাকে। …আপাতত মিটিঙে যোগ দেব। পরে আবারও কথা হবে।
খুট করে কেটে গেল, ফোন যোগাযোগ।
তার মানে মস্ত বিপদে পড়িনি, বিড়বিড় করল নিশাত।
ওঁর কথা তো নিজ কানেই শুনলেন, বলত, ডেলাক্রস। এ মুহূর্তে কী চাই আপনাদের?
চোখে চোখে কথা হলো নিশাত ও খবিরের।
খবির, বলল নিশাত, তুমি যাও এঁর সঙ্গে, খুঁজে বের করবে আসলে কী ঘটছে। এদিকে আমি যাব স্যরকে সরিয়ে নিতে।
আস্তে করে মাথা দোলাল খবির।
ঘুরে দাঁড়িয়ে রঘুপতির দিকে চাইল নিশাত। কিন্তু কথা বলল ডেলাসের উদ্দেশে, ওকে চাই আমি। ওর বিমানটাও লাগবে। ভরে দেবেন বিমানের ট্যাঙ্ক। এ ছাড়া ইংল্যাণ্ড ছাড়ার অনুমতিও চাই। আমরা জানি এ মুহূর্তে কোথায় আছেন মাসুদ স্যর। আগে ওঁকে সরিয়ে আনতে হবে।
আমি বোধহয় অনেক দ্রুত ওঁকে সরিয়ে…
হয়তো, ডেলাসকে থামিয়ে দিল নিশাত, কিন্তু আমরা এখনও। আপনাকে বিশ্বাস করি না। রঘুপতিকে দেখাল। ও সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত। তা ছাড়া, ওর বদলে অন্য কেউ এত দ্রুত আমাকে ফ্রান্সে পৌঁছে দিতে পারবে না।
ঠিক আছে, নিজের এক লোকের দিকে চাইল ডেলাস। বিমানে ফিউয়েল পাম্প করো। আকাশ ফাঁকা রাখতে বলো।
খবিরের দিকে ফিরল সে। আর আপনি কী করবেন, সার্জেন্ট?
আপা, আপনার কপাল ভাল থাকুক, বলল খবির। স্যরকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনুন।
তা আমি করব, নিশ্চয়তা দিয়েই বলল নিশাত। পা বাড়াল রঘুপতি ও সুখোই ফাইটার বিমানের দিকে।
পাঁচ মিনিট পর ভরে গেল বিমানের ট্যাঙ্ক। পরের মিনিটে আকাশে উঠল ফাইটার, আফটারবার্নার ব্যবহার করে তীব্র গতি তুলে রওনা হয়ে গেল।
নিশাত ও রঘুপতিকে নিয়ে বিমান উধাও হতেই ডেলাসের দিকে চাইল খবির। আমার একটা ডিভিডি প্লেয়ার লাগবে।
উনিশ
ব্রিটানি-আটলান্টিক উপকূল, ফ্রান্স।
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
বিকেল সাড়ে চারটা।
মেইন ল্যাণ্ড ও দুর্গের মাঝের প্রকাণ্ড পাথুরে সেতু পেরুতে শুরু করেছে তিনজন মানুষ–মাসুদ রানা, কুয়াশা ও তিশা করিম। প্রত্যেকের হাতে একটা করে সাদা মেডিকেল ট্রান্সপোর্ট বক্স।
তিনটে বাক্স মানেই তিনটে ছিন্ন মাথা।
রানা আপাতত দুনিয়ার সেরা কাক্ষিত লোকগুলোর একজন। জানে, ঢুকতে চলেছে ক্ষুধার্ত সিংহের গুহায়। এখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বাউন্টি হান্ট।
মেকআপ করে রানা ও তিশার মুখ সামান্য বদলে দিয়েছে। কুয়াশা
রানা ও তিশার পরনে বাউন্টি হান্টার দল কন্টিনেন্টাল সোলজারদের কালো ব্যাটল ইউনিফর্ম, মাথায় হেলমেট। সবই এসেছে হারকিউলিস বিমান থেকে। নিজেদের অস্ত্র তো আছেই, এ ছাড়া রয়েছে মেটালস্টর্ম রাইফেল। পরিস্থিতি বোঝাবার জন্য চোয়ালে দুটো রক্তাক্ত রুমাল বেঁধেছে রানা। চোখে রে-ব্যান সানগ্লাস। মুখের বেশিরভাগই ঢাকা পড়েছে।
ওর পকেটে রয়েছে কুয়াশার মডিফায়েড পাম পাইলট।
দুর্গের ডোরবেল বাজাল কুয়াশা। আগের মতই ওর পরনে কালো আলখেল্লা! নিচু স্বরে সে বলল, বাক্সগুলো আমার হাতে দিয়ে দাও। অ্যাসেসরের কাছে দেব। সে অপেক্ষা করতে বলবে। তোমাদেরকে। শুনেছি জায়গাটা কারাগারের মত।
কারাগারের মত?
হুঁ। অ্যাসেসর চায় না কোনও বাউন্টি হান্টার তার অফিসে ঢুকুক। নইলে কমপিউটার ব্যবহার করে ফাণ্ড সরিয়ে নিত। কেউ। শুনেছি আগেও এমন হয়েছে। কাজেই নিজেকে রক্ষা করতে ভয়ঙ্কর সব পদ্ধতি ব্যবহার করে অ্যাসেসররা। …আর যার কথা ভাবছি, এ লোক সে হলে তাকে খুনি-পিশাচও বলতে পারো।
আস্তে করে কাধ ঝাঁকাল কুয়াশা। যাই হোক, চোখ রেখো পাম পাইলটের স্ক্রিনে। দেখা যাক কমপিউটার থেকে কী ধরনের তথ্য আসে। হয়তো জানা যাবে কে বা কারা শুরু করেছে এই বাউন্টি হান্ট।
নিজের পকেটে একই ধরনের পাম পাইলট রেখেছে কুয়াশা। ওটা ইফ্রা-রেড ব্যবহার করে ডেটা ট্রান্সফার করে। কোনও তারের সংযোগ লাগে না, কমপিউটারের হার্ডডিস্ক থেকে নিয়ে নিজের মগজে রাখে তথ্য। সোজা কথায়, কুয়াশার যন্ত্র যে কোনও কমপিউটারের ডেটা চুরি করতে পারে। সেজন্য ওটাকে। নিতে হয় কমপিউটারের দশফুটের ভিতর।–
খুলে গেল দুর্গের প্রকাণ্ড কবাট।
সুসজ্জিত পোশাকে দেখা দিল মোসিউ ড্যাবলার।
কাকে চাই, মোসিউরস?
আমি কুয়াশা। অনেকে চেনেন মিস্টার ফগ নামে।
আগেও আপনার নাম শুনেছি… প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। …কী করতে পারি আপনার জন্যে?
বাধ্য হয়ে বাউন্টি হান্ট করছি। টাকার প্রয়োজন সবারই।
তাই?
মোসিউ ড্যাবলার, আমি এবং আমার সঙ্গের দুজন বাউন্টির টাকা নিতেই এসেছি।
নিশ্চয়ই নেবেন, শুকনো স্বরে বলল ড্যাবলার। আপনাদের দুজনের পরনে দেখছি কন্টিনেন্টাল সোলজারদের ছেষট্টি ইউনিটের পোশাক।
এরা ওই ইউনিটেরই লোক, জানাল কুয়াশা। আমাকে সহায়তা করছে।
জানতাম না ডেভিড এন. হেন্ড্রিক নতুন লোক নিয়েছে।
আজকাল ভাল লোক পাওয়া কঠিন, বলল কুয়াশা। হেণ্ডিক ভাগ্যবান লোক।
তা অবশ্য ঠিক, মাথা দোলাল ড্যাবলার। বেশ, আমার সঙ্গে আসুন।
দুর্গের শো-রুমের মত গ্যারাজে এসে ঢুকল সবাই।
দুর্লভ গাড়িগুলো দেখে মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না রানা। কী নেই গ্যারাজে: সারা দুনিয়ার সেরা সব গাড়ি।
সবার আগে হাঁটছে ব্যাঙ্কার ড্যাবলার। সামনে রেখেছে। হ্যাণ্ডকার্ট, ওটার উপর তিনটি সাদা বাক্স।
চমৎকার দুর্গ, মন্তব্য করল কুয়াশা।
সত্যিই দেখার মত, প্রশংসা ঝরল ব্যাঙ্কারের কণ্ঠে।
দুর্গের মালিক কে?
অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এক ভদ্রলোক।
তার নাম জানতে…
দুঃখিত, অনেক সময় আমাকে বাধ্য হয়েই মক্কেলের নাম গোপন করতে হয়। এ ক্ষেত্রেও বলে দেয়া হয়েছে, মুখ বুজে রাখতে হবে।
আচ্ছা। চুপ হয়ে গেল কুয়াশা। কয়েক মুহূর্তে পর জানতে চাইল, সঙ্গে অস্ত্র রাখলে আপত্তি নেই তো?
না, নেই। মনে হলো না চিন্তিত ড্যাবলার। ওই জিনিস। এখানে কাজে আসবে না।
গ্যারাজের শেষে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল ওরা। সামনেই গোলাকার পাথুরে অ্যান্টিরুম। এখান থেকে দূরে হারিয়ে। গেছে সরু সুড়ঙ্গ।
থামল ড্যাবলার। আপনার দুই সঙ্গীকে এখানেই থাকতে হবে, মিস্টার কুয়াশা।
রানা ও তিশার দিকে মাথার ইশারা করল কুয়াশা। ভাববেন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে দরজা বোধহয় লক করে দেয়া হবে।
দেয়াল ঘেঁষা চামড়ার আরামদায়ক কাউচে বসে পড়ল রানা ও তিশা।
মশাল প্রজ্জ্বলিত সরু টানেলে কুয়াশাকে পথ দেখাল ব্যাঙ্কার। আগুনের হলদে আলো পড়ছে চারপাশে।
প্যাসেজওয়ের শেষে পৌঁছে গেল ওরা। সামনে অত্যন্ত দামি আসবাবপত্রে সজ্জিত অফিস। কুয়াশাকে টানেলে রেখে অফিসে ঢুকে পড়ল ব্যাঙ্কার। হাতে রিমোট কন্ট্রোল।
দড়াম! দড়াম! দড়াম!
টানেলের দুদিকে নামল স্টিলের দরজা। টানেলে আটকা পড়ল কুয়াশা। অ্যাণ্টিরুমে বন্দি হয়েছে রানা ও তিশা।
চোখের পাতাও পড়ল না কুয়াশার।
কাটা মাথাগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করেছে ব্যাঙ্কার। এসব কঙ্গোতে সংগ্রহ করেছিল ডেভিড এন. হেন্ড্রিক। আলাল হোসেন, আজিজ আমিন ও চার্লস আর. কোসলোস্কির মাথা। ওগুলোর উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে লেসার স্ক্যান, ডেন্টাল পরীক্ষা, ডিএনএ টেস্ট
দীর্ঘ পাথুরে টানেলে দাঁড়িয়ে আছে কুয়াশা। অপেক্ষা করছে। আপাতত বন্দি।
দেয়ালে ফুটন্ত তেলের নর্দমা চোখে পড়ল তার।
জঘন্য, বিড়বিড় করে বলল।
স্টিলের দরজার বুকে পুরু প্লাস্টিকের জানালা। ওদিক দিয়ে দেখা গেল ড্যাবলারের অফিসের ভেতরের অংশ।
ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে সুইস ব্যাঙ্কার। ডেস্কের ওদিকে মস্ত পিকচার উইণ্ডো। বহুদূর পর্যন্ত চোখে পড়ে আটলান্টিক মহাসাগর। নীলের বিস্তৃতি উদাস করে তোলে মন। নিজের প্রিয় বঙ্গোপসাগরের কথা মনে পড়ল কুয়াশার। কী অদ্ভুত সুন্দর ওর দেশের সাগরটা।
দূরে দেখা গেল দিগন্তের কাছে একের পর এক নেভাল। ভেসেল। ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট… মস্ত এক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারকে ঘিরে রেখেছে। প্রকাণ্ড জাহাজটাকে চিনল কুয়াশা- চার্লস দ্য গল ক্লাস ক্যারিয়ার, নিউক্লিয়ার পাওয়ার্ড।
সাগরে জড় হয়েছে ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ।
ফ্রেঞ্চদের।
.
অ্যাণ্টিরুমে চুপ করে বসে আছে মাসুদ রানা ও তিশা।
সিলিঙের কাছে ছরছর আওয়াজ তুলছে কী যেন। ওদিকে চাইল রানা।
অদ্ভুত চেহারার ছয়টি অ্যান্টেনা, গেঁথে আছে দেয়ালে। দেখে মনে হলো, কোনও ধরনের স্টেরিয়ো স্পিকার।
অবশ্য, রানা বুঝে গেল ওগুলো মাইক্রোওয়েভ এমিটার।
ছিরছির আওয়াজটা আসছে সিকিউরিটি ক্যামেরা থেকে।
আমাদের ওপর চোখ রাখছে, নিচু স্বরে বাংলায় বলল রানা।
দুর্গের দূরের কোনও কামরায় সাদা-কালো মনিটরে রানা ও তিশাকে দেখছে এক লোক গভীর মনোযোগে। বিশেষ করে নজর তার রানার ব্যাণ্ডেজ ও সানগ্লাসের উপর।
.
সমস্ত টেস্ট শেষ করেছে মোসিউ ড্যাবলার। টানেলে বন্দি কুয়াশার দিকে চাইল সে।
মিস্টার কুয়াশা, ইন্টারকমে বলল, কগ্র্যাচুলেশন্স। প্রতিটি মাথা পারফেক্ট স্কোর করেছে। আপনারা পাবেন নিরানব্বই মিলিয়ন ডলার।
রিমোট কন্ট্রোলের বাটন টিপল সে, স্লট থেকে উপরে উঠল তিন দরজা।
ড্যাবলারের অফিসে ঢুকল কুয়াশা। মস্ত ডেস্কের পিছনে বসে পড়ল সুইস ব্যাঙ্কার। ল্যাপটপের কিবোর্ডে টোকা দিতে শুরু করেছে।
হুম, কিবোর্ডে আরও কয়েকটা টোকা দিল, আপনারা বাউন্টির টাকা কোন্ অ্যাকাউন্টে ট্র্যান্সফার করবেন?
আপনার ব্যাঙ্কেই আমার অ্যাকাউন্ট আছে, ওখানে পাঠিয়ে দিন, ওই কমপিউটারের উপর চোখ কুয়াশার। পাম পাইলটের ট্রান্সমিট বাটন টিপে দিল।
দুই কমপিউটারের ভিতর তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়েছে।
.
পাথরের অ্যাণ্টিরুমে পাম পাইলট জেগে উঠেছে, দেখল রানা।
দ্রুত আসছে ডেটা। নাম, সংখ্যা এবং ডায়াগ্রাম ফুটে উঠছে স্ক্রিনে:
সোর্স। ডেলিভারি সিস্টেম। লি-এইচ। অরিজিন। টাগের্ট। টাইম।
ট্যালবট :
সাহাব-৫ টিএন৭টি ৩৫৭০২. ০০০০১. ১১:৪৫
সাহাব-৫ টিএনবি ৩৫৭০২. ০০৪২০ ১১:৪৫
সাহাব-৫ টিএন৭বি ৩৫৭০৩., ০১৩১২. ১২:০০
অ্যামব্আ:
সাহাব-৫ টিএন৭বি ২৬৭৫৩. ২ ফ্লাইট? ১২:০০
একযেকিউটিভ ইটিনেরারি
দ্য প্রোপোযড অর্ডার অফ ট্র্যাভেল ইয অ্যায ফলোয: আসমারা (২৪/০৬), লৌণ্ডা (২৪/০৬), আবুজা (২৭/০৬), নাযামেনা
(২৭/০৬) এবং ব্রুক (২৯/০৬).
০১/০৭- আসমারা (এম্বেসি)
০৩/০৭–লৌণ্ডা (থাকছি ওলিফ্যাণ্টের ভাতিজার ওখানে)
শেষ ডকুমেন্ট চিনল রানা। একটা বাউন্টি লিস্ট।
নাম – দেশ – অর্গানাইযেশন
১ ক্যাপলান এম, স্কট – ইউ.কে. – এসএএস
২. ডওসন কে. রিচার্ড – ইউ.কে. – এমআই-৬
৩. অ্যাটলক, হার্লি – ইউএসএ – ডেল্টা
৪. আমিন, আজিজ – লেবানন – আলকায়েদা
৫. কার্লটন, রবিন – ইউএসএ – মেরিন
৬. চার্লস আর, কোসলোস্কি – ইউ.কে. – এসএএস
অন্যান্য ডকুমেন্ট ডাউনলোড করছে পাম পাইলট, কিন্তু সাবধানে আড়াল তৈরি করে হত্যা তালিকায় চোখ বোলাল রানা।
একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র অন্যতম নেতা কার্ট কে, এবেলহার্ডের কাছ থেকে যে তালিকা পেয়েছিল, তার সঙ্গে এর সামান্য তফাৎ আছে।
কিছু নাম ছাই রঙে হাই লাইট করা। মৃতের জন্য ধূসর রং, ভাবল রানা। মেরুদণ্ড বেয়ে নামল শীতল অনুভূতি। লাশ হয়ে গেছে অনেকেই।
স্কট এম. ক্যাপলান এবং রেমণ্ড কে. এ্যাঞ্জারের নাম ওই। তালিকায় তুলে দিতে পারবে রানা। স্পেন্যায বাউন্টি হান্টাররা, ক্যাপলানকে শেষ করেছে কঙ্গোর খনির ভিতর। আর কার্গো বিমানে নিহত হয়েছেন জেনারেল রেমণ্ড কে. গ্র্যাঞ্জার।
এ তালিকার পনেরোজনের ভিতর এখনও বেঁচেবর্তে আছে মাত্র পাঁচজন।
তালিকায় আরও মনোযোগ দিল রানা। ভীষণ অস্বস্তি মনে, কিন্তু বিষয়টি কী বুঝতে পারছে না… তারপর আরেকটা ডকুমেন্টে অ্যাসেসর শব্দটা চোখে পড়ল। ওই ডকুমেন্ট ওপেন করল রানা। ওটা একটা ই-মেইল:
বিষয়: অ্যাসেসরের কমিশন
অ্যাসেসরের প্রাপ্য কমিশন দেয়া হবে ইন্টারনাল ইলেকট্রনিক ফাণ্ডের মাধ্যমে। অ্যাসেসর টাকা পাবেন স্করপিয়ন-১৫ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের (নং ১২৪-৪৪৪-২৪) মাধ্যমে। প্রতিটি অ্যাসেসমেন্টের জন্য তাঁকে দেয়া হবে ইউএস ৫ মিলিয়ন ডলার। এজিএম-সুইস ব্যাঙ্কের মর্মাসিউ পি. এস. ড্যাবলার অ্যাসেসরের দায়িত্ব নেবেন।
শব্দগুলোর উপর আবারও চোখ বোলাল রানা।
স্করপিয়ন-১৫ প্রাইভেট লিমিটেড, ভাবল। টাকা দেবে ওই কোম্পানি থেকেই। তারাই আয়োজন করেছে বাউন্টি হান্ট। চমৎকার পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠ বলে উঠল, গুড মর্নিং। মুখ তুলে চাইল রানা ও তিশা।
পাথুরে সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়েছে এক হ্যাণ্ডসাম যুবক, এইমাত্র। গ্যারাজ থেকে ঢুকেছে অ্যান্টিরুমে। বয়স পঁচিশ থেকে সাতাশ। পরনে ডিযাইনার জিন্স। টি-শার্টের উপর রালফ লরেন্স শার্ট। অত্যন্ত অভিজাত মনে হলো তাকে।
যুবকের চোখে অস্বাভাবিকতা দেখল রানা।
তার এক চোখের মণি গাঢ় নীল, অন্যটা পচা ডিমের কুসুমের মত হলদেটে।
আমার দুর্গে আপনাদের স্বাগতম, যুবক হাসল। কিন্তু ওই হাসি কেন যেন রানার ভাল লাগল না। মনে হলো, এ লোক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক। জানতে পারি আপনারা কারা?
ক্লিন্ট, জন ক্লিণ্ট, নিজ পরিচয় দিল রানা। ইনি জেসিকা রনসন। মিস্টার ফগের সঙ্গে এসেছি। কয়েকটি বাউন্টি এনেছি। মোসিউ ড্যাবলারের জন্যে।
ও, আচ্ছা… বলল যুবক। রানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। করমর্দনের জন্য।
ডেমিয়েন… ডেমিয়েন ডগলাস। আপনাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে খুব ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। আপনাদের জন্যে কোনও ড্রিঙ্ক বা খাবারের ব্যবস্থা করি? করমর্দনের সময় রানাকে দেখল। মনোযোগ দিয়ে। আপনি চাইলে আমার ব্যক্তিগত ডাক্তার আপনার ব্যাণ্ডেজ পাল্টে দিতে পারে। ক্ষতগুলোও পরিষ্কার করা উচিত।
চট করে সরু টানেল দেখল রানা। চোখ খুঁজছে কুয়াশাকে।
প্লিয, আসুন… সিঁড়ি দেখাল ডগলাস।
কোনও আপত্তি তোলা একেবারেই অনুচিত হবে, উঠে দাঁড়াল রানা ও তিশা। অনুসরণ করল লোকটার।
আগেও আপনাকে দেখেছি, পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে রানা। টিভিতে…
মাঝে মাঝে আমাকে ওই রুপালি পর্দায় মুখ দেখাতে হয়।
আপনি আফ্রিকায় ছিলেন, বলল রানা, গতবছর। একের পর এক ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করছিলেন। খাবারের ফ্যাক্টরি। নাইজেরিয়ায়…
এখন সামান্যতম মিথ্যা বলছে না রানা।
আফ্রিকার কজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করছিল এ লোক। সামনের মস্ত মাঠে ছিল হাজারো শ্রমিক, হাসি-খুশি।
ওরা আবার চলে এসেছে ক্লাসিক সব গাড়ির গ্যারাজে।
আপনার স্মৃতি জোরালো, বলল ডগলাস। ইরিত্রিয়া, চাঁদ, অ্যাঙ্গোলা এবং লিবিয়ায় গিয়েছিলাম। এসব দেশে বসাই নতুন ফুড প্রসেসিং প্লান্ট। কেউ কেউ আজও জানে না পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে ওই আফ্রিকাতেই।
আপনার গাড়ির কালেকশন সত্যিই ঈর্ষণীয়, মন্তব্য করল।
ওগুলোকে খেলনা বলতে পারেন, বলল ডগলাস। সামান্য খেলনা। এর বেশি কিছু নয়।
গ্যারাজের একদিকের শাখা টানেলে ঢুকল ওরা। সুড়ঙ্গের মেঝে কুচকুচে কালো, দুই দেয়াল ধবধবে সাদা।
আমি অবশ্য নানান খেলনা নিয়ে খেলতে ভালবাসি, বলল ডেমিয়েন। মানুষ নিয়ে খেলতেও মজা লাগে। কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ কী করে, তা দেখে খুব উৎসাহিত হই।
কাঠের মস্ত এক দরজার সামনে পৌঁছে গেছে ওরা। দরজার ওদিকে হাসির আওয়াজ। পুরুষ কণ্ঠ। যেন পার্টি চলছে ওদিকে।
আপনি বলছিলেন কঠিন পরিস্থিতির কথা, বলল রানা। গলা শুকিয়ে গেছে। আসলে কী বোঝাতে চাইছেন, ডগলাস?
যেমন ধরুন, পশ্চিমারা বোঝে না কেন ইসলামপন্থীরা বোমা দিয়ে নিজেদেরকে উড়িয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকে পশ্চিমা বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় লড়তে হবে সমানে সমানে। লড়াই যেন হয় ন্যায্য। ফ্রেঞ্চরা দশ কদম দূর থেকে ডুয়েল করত, ইংরেজরাও দূরত্ব দিয়ে জস্টিং করত, আমেরিকার বুনো পশ্চিমের শহরের রাস্তায় মুখোমুখি লড়ত গানশ্লিংগাররা। পশ্চিমা দুনিয়ায় লড়াই জিনিসটা ন্যায় সঙ্গত। কারণ ধরে নেয়া হয়েছে, দুই পক্ষই বিজয়ী হতে চাইবে। এটা সত্যিকারের ন্যায্য চিন্তা।
ডেমিয়েন থেমে যেতেই বলল রানা, কিন্তু আত্মহত্যাকারী বোমাবাজরা অন্যভাবে চিন্তা করে, আপনি বোধহয় তাই বোঝাতে চাইছেন?
ঠিকই ধরেছেন, বলল ডগলাস। বোমাবাজ বিজয়ী হতে চায়। কিন্তু লড়াই তাদের কাছে মূল্যহীন। আরও মস্ত এক লড়াই তাদের সামনে। মানসিক লড়াই ওটা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে মরতে চায় কেই-বা, তবুও এরা শেষ করে নিজ জীবন আশা করে আরও বহু মানুষ কষ্ট পাবে এবং মরবে তার কারণে। আত্মহত্যাকারী বোমাবাজ মনে করে এর মাধ্যমে আত্মিকভাবে বিজয়ী হবে সে।
যখন কোনও পশ্চিমা ছিন্নভিন্ন হচ্ছে বোমার আঘাতে, ধরে নেয়া হচ্ছে, সে যাবে নরকে। নিজ চোখে এসব মানুষকে মরতে দেখেছি। কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছি। ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয়েছে, বা হাঙরের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে কাউকে… আসলে মানুষের সত্যিকারের আতঙ্ক দেখতে ভাল লাগে আমার। যখন বোঝে কীভাবে মরতে চলেছে, তখন মুখে ফোটে দারুণ আতঙ্ক। দারুণ দৃশ্য!
দরজা খুলতে শুরু করেছে ডেমিয়েন ডগলাস। আর তখনই সব বুঝে গেল রানা। সমস্যা ওই মাস্টার লিস্টেই।
হার্লি অ্যাটলক এবং রবিন কার্লটনের নাম ধূসর শেডে। গতকাল সকালে সাইবেরিয়ায় নিহত হয়েছে ওরা। এবং মৃতের তালিকায় তুলে দেয়া হয়েছে ওদের নাম।
অর্থাৎ, টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে!
অথচ সাইবেরিয়ার ওই ওয়্যারহাউস বা বাউন্টি হান্টারদের ধুলোয় মিশে যাওয়ার কথা মিসাইলের আঘাতে!
প্রকাণ্ড দরজা খুলেছে।
ওদিকে মস্ত ডাইনিং রুম।
টেবিল ঘিরে একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র কমপক্ষে বিশজন বাউন্টি হান্টার!
সামনে দামি খাবার, পাশে দুর্লভ সোনালি পানীয়, কাছের অ্যাশট্রেতে সিগারেট বা চুরুট।
টেবিলের একমাথায় ব্যাণ্ডেজে মোড়া ভাঙা নাক নিয়ে নতুন। পোশাকে বসে আছে কার্ট কে. এবেলহার্ড!
ধড়াস্ করে মস্ত লাফ দিল রানার হৃৎপিণ্ড।
আর এ ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখি সাধারণ মানুষের মুখে, বলল ডগলাস। সরু ঠোঁটে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হাসি। স্বাগতম আমার দুর্গে, মেজর মাসুদ রানা!
যা বুঝবার বোঝা হয়ে গেছে।
পরস্পরের দিকে চাইল রানা ও তিশা, পরক্ষণে ঘুরেই ঝেড়ে দৌড় লাগাল।
যেন লেজ আকাশে তুলে উড়ে চলেছে।
পিছনে পড়ে রইল ডাইনিং রুম। করিডোর ধরে তীরের মত ছুটছে রানা ও তিশা। পিছনে শুনল ডগলাসের পেটফাটা হাসির আওয়াজ।
একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র বাউন্টি হান্টাররা লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়েছে, খপ করে তুলে নিয়েছে যার যার অস্ত্র, পরক্ষণে শুরু করল ধাওয়া।
পাঁই-পাঁই করে ভাগছে ওদের সাধের তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার!
দুর্গের মালিক ডেমিয়েন ডগলাসকে ঝোড়ো গতিতে পাশ কাটাল লোকগুলো।
.
এত দামি গাড়ির কোনটা নেব ভাবতে গিয়ে মাথা গরম হচ্ছে, মুখ থেকে ব্যাণ্ডেজ ছুঁড়ে ফেলল রানা।
গ্যারাজের দরজার কাছ থেকে নিচু স্বরে বলল তিশা, যেটা তোমার খুশি। চট করে কাঁধের উপর দিয়ে করিডোরের দিকে চাইল। ধুপধাপ বুটের আওয়াজ আসছে। বড়জোর দশ সেকেণ্ড পাবে, রানা। দ্রুতগতি কোনও গাড়ি নাও।
একসেকিউশন জিটি-২? রুপালি রঙের। খোলা টারগা টপ। ভয়ঙ্কর শক্তিশালী গাড়ি, যেন বুনো মোষ।
না, পছন্দ হলো না, সরে গেল রানা। চলে এল একই গতির র্যালি কারের পাশে। ওটা ইলেকট্রিক ব্লু টার্বো-চার্জ সুবারু ডাব্লিউআরএক্স।
নয় সেকেণ্ড পর গ্যারাজে এসে ঢুকল একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র বাউন্টি হান্টাররা। তখনই দেখল, শো-রুম থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে ডাব্লিউআরএক্স। এরই ভিতর গতি। তুলেছে ষাট মাইল!
শো-রুমের শেষমাথায় গ্যারাজের দরজা খুলছে। মস্ত কবাটের পাশে তিশা, হাতে ডোর ওপেনার রিমোট কন্ট্রোল। ।
গুলি শুরু করল বাউন্টি হান্টাররা।
তখনই পলকের জন্য তিশার পাশে থামল রানার র্যালি কার।
উঠে পড়ো, তিশা!
কুয়াশার কী হবে, রানা?
উনি বুঝবেন আমাদের সমস্যা।
জটিল, কঠিন সমস্যা, বিড়বিড় করল তিশা। সুবীরুর প্যাসেঞ্জার জানালা দিয়ে চড়ুই পাখির মত উড়ে ভিতরে নামল ও।
সামনে দুর্গের দেয়াল ঘেরা উঠান।
গ্যারাজের মুখে স্পেন্যায কোবরা দলের মেজর মিখাইল পেরোনভর্কে দেখতে পেল ওরা।
মস্ত হাঁ করে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সে। পাশে কোবরা ইউনিটের ছয় কমাণ্ডো। একজনের হাতে মেডিকেল ট্রান্সপোর্ট বক্স।
নুড়িপাথরে, ভরা উঠানের আরেকদিকে নেমেছে এমআই-৩৪ হেলিকপ্টার। স্পেন্যায কমাণ্ডোদের পিছনে এখনও বনবন করে ঘুরছে রোটর।
যাহ, সমস্যা আরও বাড়ল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিশা।
.
গ্যারাজের দিক থেকে গুলির আওয়াজ শুনে মোসিউ ড্যাবলারের অফিসে চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল, কুয়াশা।
চট করে চাইল অ্যাণ্টিরুমের দিকে। ওখানে রানা বা তিশা নেই। আবার কী হলো, বিড়বিড় করল কুয়াশা। দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এল অফিস থেকে।
কমপিউটার থেকে চোখ তুলেও চাইল না মোসিউ ড্যাবলার।
.
গ্যারাজের মুখে মেজর মিখাইল পেদরোনভের সামনা-সামনি হয়েছে রানার টার্বো-চার্জড ডাব্লিউআরএক্স।
পরস্পরের চোখে চাইল দুই দেশের দুই পুরুষ।
রাশান মেজরের চোখ থেকে বিদায় নিল বিস্ময়, সেখানে ঠাই নিল ভয়ঙ্কর ঘৃণা।
গতি তোলো, রানা! চাপা স্বরে বলল তিশা।
মেঝের সঙ্গে অ্যাক্সেলারেটার টিপে ধরল রানা।
ঝটকা দিয়ে রওনা হলো র্যালি কার। সৎ করে বেরিয়ে গেল গ্যারাজ থেকে। দুপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ রক্ষা করল স্পেন্যায কমাণ্ডোরা।
তীর গতি তুলে দুর্গের উঠানে বেরোল ডাব্লিউআরএক্স, পিছনে ছিটিয়ে দিচ্ছে নুড়িপাথর। পেরোল প্রকাণ্ড পোর্টকালিস, ড্র-ব্রিজে উঠে চলেছে মেইনল্যাণ্ডের দিকে।
এইমাত্র ভূমিশয্যা থেকে উঠেছে মেজর মিখাইল পেদরোনভ, তখনই দেখল গ্যারাজ থেকে শাশা করে ছিটকে বেরিয়ে গেল। দামি পাঁচটা গাড়ি। পিছু নিয়েছে ডাব্লিউআরএক্স র্যালি কারের।
সামনে লাল ফেরারি, পিছনে রুপালি পোর্শ জিটি-২, এর পর একে একে তিনটি পিউজো র্যালি কার। শেষ তিন গাড়ির পাশে ড্রাগন করপোরেশনের স্পনসরশিপ লোগো।
শালারা! রাগে গরগর করল মেজর পেরোনভ। ওই যে ভাগছে শালার মাসুদ রানা! রওনা হও! রওনা হও! ধরে আনো! একসেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র আগেই শালার মাথাটা চাই। চামড়া ছিলে জ্যান্ত শালার গায়ে লবণ দেব আগে!
এইমাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে তার লোক। তাদের চারজন ছুটল কপ্টারের দিকে।
পিছনে রয়ে গেল পেদরোনভ ও দুই কমাণ্ডে, হাতে ছিন্ন। মাথার বাক্স।
এবার সত্যিই শুরু হয়েছে রানা ও. তিশার পিছনে ধাওয়া। ২৬৭
ওরা পালাবে কোথায়? একাকী, অসহায় কুয়াশার পরিণতি কী হবে?
দুর্গ এবং এই বিরান এলাকায় কেউ তো বন্ধু নয় ওদের!
(দ্বিতীয় খণ্ডে সমাপ্য)
বাউণ্টি হাণ্টার্স ২.১
মাসুদ রানা ৪৩৪ – বাউণ্টি হাণ্টার্স (দ্বিতীয় খণ্ড) – কাজী আনোয়ার হোসেন – সেবা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ২০১৪
রচনা: বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে
এক
যে সরু, সর্পিল, পাহাড়ি সড়ক জন্ম নিয়েছে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন থেকে, তার নাম গ্ৰা খুয়ে দে লা মেখ–বা দ্য গ্রেট ওশান রোড। উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের ওই উপকূলীয় সড়কে প্রচণ্ড গতি তুলে ছুটে চলেছে পলায়নরত মাসুদ রানার র্যালি কার।
একের পর এক পাথুরে ক্লিফের মাথা ছুঁয়ে গেছে পথ। অনেক নীচে প্রকাণ্ড, সুনীল আটলান্টিক; দৃশ্যটা সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর। চুলের কাঁটার মত অসংখ্য বাঁক নিয়েছে রাস্তা, চট করে দেখা যায় না সামনে বা পিছনে কী আছে। দুপাশে কংক্রিটের নিচু গার্ড-ফেন্স, দুদিকে খাড়াভাবে নেমেছে চার শ ফুট পাহাড়। কোথাও কোথাও পাহাড়ের বুকে দীর্ঘ টানেল।
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের আশপাশের চোদ্দ মাইল এলাকার মালিক ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ডেমিয়েন ডগলাস। এখন যে পথে ছুটছে রানা ও তিশার গাড়ি, তাও ডগলাসের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। প্রাইভেট রোড। তার দুজায়গায় মিশেছে দুই শাখা রাস্তা। একটা উঠেছে পাহাড় বেয়ে ডগলাসের ব্যক্তিগত এয়ারস্ট্রিপে। অন্যটা বারবার বাঁক নিয়ে নেমেছে বহু নীচের সাগর-তীরে। ওখানে ডগলাসের মস্ত বোটশেড।
এ মুহূর্তে অপূর্ব সুন্দর সাগর উপকূলীয় সড়কে ঘণ্টায় এক শ আশি কিলোমিটার বেগে ছুটছে রানার ইলেকট্রিক ব্ল ডাব্লিউআর-এক্স র্যালি কার। ইঞ্জিনের গর্জন বলতে সামান্য হুইসস আওয়াজ। এনগেজ করা হয়েছে টার্বো চার্জার। শক্তিশালী অল-হুঁইল-ড্রাইভ সিস্টেমের ফলে উপকূলীয় সড়কের তীক্ষ্ণ সব বাঁক পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি অনায়াসে।
কিন্তু পিছনে আসছে ড্রাগন কর্পোরেশনের একই গতির পাঁচ পাঁচটা সুপার কার। প্রথমে পোর্শ, এরপর ফেরারি, পিছনে তিন পিউজো।
আপনি কোথায়, কুয়াশা, থ্রোট-মাইকে বলল রানা। দুর্গ থেকে বেরিয়েছেন? …আমরা সমস্যার ভেতর আছি।
আসছি, বেশিক্ষণ লাগবে না, জবাবে শান্ত স্বরে জানিয়ে দিল কুয়াশা।
রানা বা তিশা জানে না, কিন্তু ওদের গাড়ির একমাইল পিছনে দুর্গ থেকে ছিটকে বেরিয়েছে আরেকটি গাড়ি–এইমাত্র বিদ্যুদ্বেগে ড্র-ব্রিজ পেরিয়ে এল ওটা।
ল্যামবোরঘিনি ডায়াবলো। ভি-১২। রিয়ার স্পয়লার। নিচু ছাত। অন্য গাড়ির চেয়ে গতি বেশি। কুচকুচে কালো।
স্যাটালাইট রেডিয়ো সিস্টেমে যোগাযোগ করল রানা, আপা! …শুনছেন?
তখনই নিশাতের সাড়া পাওয়া গেল। আমি কাছেই, স্যর!
আমরা এখন দুর্গে নেই, বলল রানা। চলেছি উত্তর দিকের রাস্তা ধরে।
ওখানে কী ঘটল, স্যর?
শুরুতে সবই ঠিক ছিল, কিন্তু একটু পর টের পেলাম উদয় হয়েছে একদল বাউন্টি হান্টার।
ওই দুর্গ উড়িয়ে দেননি কেন? জিজ্ঞেস করল নিশাত, কণ্ঠে কৌতুক।
খুশি হতেন? মৃদু হাসল রানা। সময় পেলাম কই, তা ছাড়া আমরা তো তখন ভেতরেই ছিলাম। …আপনারা কতটা দূরে?
প্রায় পৌঁছে গেছি, বলল নিশাত। সঙ্গে রঘুপতি। কালো শকুনে চেপে আসছি। খবির লণ্ডনে, বাউন্টি হান্টের বিষয়ে তথ্য জোগাড় করবে। …আধঘণ্টার ভেতর আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
তিরিশ মিনিট… বিড়বিড় করল রানা। আমরা কি অতক্ষণ টিকব?
শুনতে পেয়েছে নিশাত, বলল, যেভাবে হোক টিকে থাকুন, স্যর। অনেক কথা বলার আছে।
কম-বেশি পঁচিশটা শব্দে যা বলার বলুন, বলল রানা।
বাউন্টি হান্টের ব্যাপারে সবই জেনে গেছে আমেরিকান সরকার। প্রেসিডেন্ট আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আপনাকে জীবিত রাখার জন্যে যা লাগবে, তা-ই করতে চেয়েছেন। আপনি বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী হয়ে উঠেছেন, স্যর। দুনিয়ার যে কোনও আমেরিকান এম্বেসি বা কনসুলেটে গেলেই নিরাপত্তা পাবেন।
চুলের কাটার মত তীক্ষ্ণ বাঁক নিল রানার ডাব্লিউআরএক্স। সামনে বহু দূর দেখা গেল। উঠে এসেছে ওরা পাহাড়ের কাঁধে।
আঁকাবাঁকা, একের পর এক বাঁক নিয়ে সেই দিগন্ত পর্যন্ত গেছে উপকূলীয় সড়ক। কালো ফিতার মত। মাইলের পর মাইল পাহাড়ের কোলে-কাঁখে চড়ে বা মাথার উপর দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
ইউএস সরকার আমাকে বাঁচাতে চাইছে? মৃদু হাসল রানা, নিশ্চয়ই নিজ স্বার্থেই? ইউএস সরকার অন্য সবার মস্ত ক্ষতি করে দিয়ে নিজেদের ভালর দিকে সবসময় খেয়াল রাখে।
রানা… নিচু স্বরে বলল তিশা। সামনে দেখো।
তিশাকে দেখে নিয়ে পরক্ষণে দূরে চাইল রানা। বিড়বিড় করে বলল, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ভাগ্যদেবী। ড্রাগন কর্পোরেশন। বোধহয় ওদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করেছে!
আধমাইল দূরে ওশান রোডে মিলেছে শাখা রাস্তা। ডানদিকের ওই পথ গেছে পাহাড়ের কাঁধে। ওদিকে রয়েছে। এয়ারস্ট্রিপ। এবং ওদিক থেকেই রওয়ানা হয়েছে দুটো প্রকাণ্ড সেমি-ট্রেইলার রিগ। অবশ্য পিছনে ট্রেইলার নেই। খাড়া ঢাল বেয়ে প্রচণ্ড গতি নিয়ে ঘড়ঘড় আওয়াজে নেমে আসছে রানা ও তিশার গাড়ির দিকে!
ওই দুই রিগের পিছন আকাশে ভাসছে ড্রাগন কর্পো: লেখা আধুনিক বেল জেট রেঞ্জার কপ্টার। এসেছে এয়ারফিল্ডের দিক থেকেই।
ড্রাগন কর্পোরেশনের কেউ রেডিয়ো করেছে, ভাবছে রানা। এয়ারফিল্ডে যা ছিল, সব পাঠিয়ে দিয়েছে ওদেরকে ঠেকাবার জন্য।
মুখোমুখি ধাক্কা দিতে চায় বোধহয়, বলল তিশা।
না, মাথা নাড়ল রানা। ওরা অ্যাক্সিডেন্ট চাইছে না। পথ ব্লক করবে।–এয়ারস্ট্রিপ ও গ্রেট ওশান রোডের সঙ্গমে পৌঁছে গেছে দুই ট্রাক। গতি কমিয়ে বাঁক নিল, থেমে গেল স্কিড করে। গোটা পথ জুড়ে ব্লকেড তৈরি করেছে।
এখন আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
আপা, রেডিয়ো করল রানা, আলাপের সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি পারেন পৌঁছে যান।
পাহাড়ি, আঁকাবাঁকা পথে ছুটছে ডাব্লিউআরএক্স, ক্রমেই কাছে চলে আসছে সেমি-ট্রেইলার রিগদুটো।
কিন্তু রোড ব্লকেডের দুই শ গজ দূরে ক্রিচ-ক্রিচ আওয়াজে ব্রেক কষল রানা। রাস্তার মাঝে থেমে গেল ডাব্লিউআরএক্স।
মুখোমুখি হয়েছে দুই পক্ষ। দুটো রিগ। একটি র্যালি কার। চট করে রিয়ার ভিউ মিররে পিছনদিক দেখল রানা। তুমুল গতি তুলে আসছে পাঁচ সুপার কার।
ওগুলোর পিছনে যেন এদিকে ঝুঁকে এসেছে কালো, গম্ভীর, প্রকাণ্ড পাথুরে দুর্গ। হঠাৎ করেই ওই দুর্গের উঠান থেকে লাফিয়ে আকাশে উঠল দুটো হেলিকপ্টার। চেজ শুরু করল তারাও। পেরোনভের দুই এমআই-৩৪ চপার।
বিপদেই পড়া গেল! বলল তিশা।
জবাবে কিছুই বলল না রানা, ওর চোখ চলে গেল সামনের রাস্তার উপর।
দুই শ গজ দূরে দুই রিগ, ওগুলোর মাথার উপর ড্রাগন কর্পোরেশন লেখা কপ্টার। বামদিকে পাথুরে জমিন নেমেছে চার শ ফুট নীচে। রাস্তা থেকে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে রয়েছে বড় জোর দুই ফুট উঁচু এক কংক্রিট দেয়াল।
ওই দেয়াল, ভাবল রানা।
পিছনের গাড়ি প্রায় পৌঁছে গেছে, চাপা স্বরে বলল তিশা।
আসুক, রানার চোখ কংক্রিটের গার্ড রেইল ফেন্সের উপর। দেয়ালের ওপাশে ঝুলছে ড্রাগন কর্পোরেশনের হেলিকপ্টার। ওটা আছে রাস্তা সমতলে।
কাজটা সম্ভব, বিড়বিড় করল রানা, সরু হয়ে গেছে দুই চোখ।
কী সম্ভব? রানার দিকে ঘুরে চাইল তিশা।
এখনই দেখবে।
অ্যাক্সেলারেটার পেডাল টিপে ধরল রানা। দুই রিগের দিকে ছিটকে রওনা হলো ডাব্লিউআরএক্স র্যালি গাড়ি।
কয়েক সেকেণ্ডে তুমুল গতি তুলল। টার্বো-চার্জার থেকে প্রচণ্ড শক্তি পাচ্ছে চার চাকা। সস্স্স্স্স্! আওয়াজ তুলছে। ইঞ্জিন।
প্রতি ঘণ্টায় ষাট কিলোমিটার… আশি… এক শ.. এক শ বিশ… রাস্তার মাঝের দুই বাধার দিকে ছুটছে ডাব্লিউআরএক্স।
ড্রাগন কর্পোরেশনের দুই রিগের ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে দেখছে, উন্মাদটা করে কী!
পরের সেকেণ্ডে হঠাৎ করেই বামে সরল রানার গাড়ি, চলে গেল কংক্রিটের গার্ড-রেইল ফেন্সের পাশে।
ক্রিচ-ক্রিচ-ক্রিচ-ক্রিচ! আওয়াজে কংক্রিটের গায়ে ঘষা খেল গাড়ি।
বামপাশের দুই চাকা ঘেষ্টে চলেছে কংক্রিটের ব্যারিয়ারে। পরক্ষণে ধুপ আওয়াজে কংক্রিটের উপর চেপে বসল দুই চাকা।
অ্যাসফল্ট ছেড়েছে গাড়ির বামদিক। দেয়ালের উপর দিয়ে ছুটছে দুই চাকা। কাত হয়ে গেছে গাড়ি পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি।
বাঁকা হয়ে সামনের দিক দেখছে রানা ও তিশা।
যথেষ্ট জায়গা কিন্তু নেই, রানা, চেঁচিয়ে উঠল তিশা। আঙুল তুলে দেখাল দেয়ালের খুব কাছে রিগ।
ঠিকই বলেছে তিশা।
আমার কাজ শেষ হয়নি, পাল্টা বলল রানা।
ঝটকা দিয়ে ডানদিকে ঘোরালো স্টিয়ারিং হুইল। ফলাফল হলো তাৎক্ষণিক।
হোঁচট খেল ডাব্লিউআরএক্স, সামনের টায়ার ডানদিকে সরতে শুরু করেছে। ফলে গাড়ির পিছন অংশ সরছে বামে দেয়ালের ওপাশে বেরিয়ে গেল পিছন দিক–অনেক নীচে সাগর ও পাথুরে সৈকত…
কংক্রিটের গার্ড-রেইলের উপর দিয়ে জোরালো ছ্যার-ছ্যার ছ্যার আওয়াজে সরছে গাড়ি। পিছনের দুই চাকা ঝুলছে সাগরের চার শ ফুট উপরে।
গতি প্রচণ্ড, পিছলে চলেছে গাড়ি গার্ড রেইল ফেন্সের উপর ভর করে। সামনের দুই চাকা দেয়ালের এপাশে, পিছনের দুই চাকা সাগরের দিকে। চার চাকার একটাও স্পর্শ করছে না রাস্তা।
দুই হাতে চোখ ঢাকল তিশা।
দেয়ালে আড়াআড়িভাবে পেট রেখে ছুটছে ডাব্লিউআরএক্স। জোরালো খসখস-খস! আওয়াজ তুলছে নীচের অংশ। নানাদিকে ছিটকাচ্ছে লাল-হলুদ আগুনের ফুলকি।
দুই রিগের ড্রাইভার হতবাক হয়ে দেখল, ওদেরকে পাশ কাটাতে শুরু করেছে পাগল লোকটা!
ওদিকে সামান্য জায়গা, বেরুতে পারবে না কোনও গাড়ি।
অথচ অকল্পনীয় দৃশ্য দেখল তারা।
সাগরের দিকে নামছে গাড়ির পিছনের দুই চাকা।
পড়ে যাচ্ছি, রানা! আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল তিশা।
না, চাপা স্বরে বলল রানা।
ঠিকই বলেছে ও।
তখনই গাড়ির পিছনদিক দড়াম করে লাগল ড্রাগন। কর্পোরেশনের কপ্টারের নাকে।
নিচু দেয়ালের পাশেই ঝুলছিল যান্ত্রিক ফড়িং। ওটার নাকে বেদম গুঁতো দিয়ে আবারও রাস্তায় ফিরল ডাব্লিউআরএক্স। কুচকুচে কালো অ্যাসফল্টের সমতল জমিতে ধুপ করে নামল চার চাকা।
আগেই পিছনে পড়েছে দুই ট্রাক, সামনের রাস্তা ফাঁকা।
পরের কয়েক সেকেণ্ডে এক শ কিলোমিটার গতি পেল র্যালি কার।
পিছনে বাঁক নিচ্ছে দুই ট্রেইলার, শত্রুকে অনুসরণ করবে।
এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র মার্সেনারিরা ডেমিয়েন ডগলাসের কাছ থেকে ধার নিয়েছে দুই ইউরোপিয়ান স্পোর্টস কার–লাল ফেরারি ও রুপালি পোর্শ, দুটোরই বিদ্যুদ্গতি।
দুই ট্রেইলারের মাঝ দিয়ে সাঁই করে বুলেটের মত বেরিয়ে এল ফেরারি ও পোর্শ। কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল রানা ও তিশার ঘাড়ের কাছে।
পোর্শের দুই মার্সেনারি কাজে লাগাল ওপেন-এয়ার টারগা ছাতের সুবিধা, একজন উঠে দাঁড়িয়েছে অস্ত্র হাতে, পরক্ষণে গুলিবর্ষণ শুরু করল রানার গাড়ির উপর।
ওদিকে ফেরারির প্যাসেঞ্জার উইণ্ডো দিয়ে কোমর বের করেছে আরেক গানম্যান, সে-ও গুলি করছে রানাদের উদ্দেশে।
একরাশ গুলির আঘাতে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল রানাদের গাড়ির পিছনের কাঁচ। চট করে পিছনে চাইল রানা।
একটা কথা বলবে, রানা? প্রশ্ন করল তিশা।
নিশ্চয়ই–সেটা কী?
কোথায় শিখেছ এই ড্রাইভিং? বিশেষ কোনও স্কুলে?
আমার আপন চাচার কাছে প্রথম সবক নিয়েছিলাম। কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে চাইল রানা। উনি যৌবনে অফেন্সিভ ড্রাইভিং স্কুল নামে একটা প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন ব্রিটেনে। একেবারেই চলেনি স্কুল। কিছুদিন হলিউডের স্টান্ট ড্রাইভারও ছিলেন। কিশোর বয়সে আমাকে শেখান গাড়ি চালনার নানা কৌশল।
জোরালো টাশ-টাশ-টাশ-টাশ! আওয়াজ শুরু হয়েছে।
রাস্তার বিটুমেন চিবিয়ে তুলছে একসারি বুলেট, এসে লাগছে ড্রাইভিং দরজার পাশে। পরের সেকেণ্ডে মাথার উপর দিয়ে গেল দ্রুতগতি এমআই-৩৪ কপ্টার।
ওটাতে করে এসেছে কোবরা বাউন্টি হান্টাররা।
দু সেকেণ্ড পর ক্লিফের পাশ দিয়ে ডানে বাঁক নিল রাস্তা। পিছু নিয়েছে কপ্টার, ওটার বুলেট বর্ষণ এড়াতে আরেকদিকে সরে গেল রানা।
তখনই বিকট আওয়াজ শুনল।
রাস্তার ডানদিকে লাফিয়ে উঠেছে ক্লিফের পাথুরে দেয়াল। নানাদিকে ছিটকে গেল ছোট-বড় পাথর ও কাঁকড়। এক সেকেণ্ড আগে ওই জায়গা পেরিয়ে এসেছে রানার র্যালি কার।
চট করে ওদিকে চাইল রানা, পরক্ষণে খুঁজতে চাইল ওই প্রবল বিস্ফোরণের উৎস।
এবার দেখতে পেল। আশ্চর্য! বিড়বিড় করল।
উপকূলের দিকে আসছে এক রণতরী। সরে এসেছে দিগন্তের কাছে জড় হওয়া নেভাল ভেসেলগুলো থেকে।
ওই রণতরী ফ্রান্সের তুরভিল-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার। নাকের কাছে শক্তিশালী ৩.৯ ইঞ্চির কামান। প্রতিটা গোলা উগরে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভলকে উঠছে কামানের মুখ থেকে ধূসর ধোঁয়া। কয়েক সেকেণ্ড পর পর থরথর করে বুক কাঁপিয়ে দেয়া বিকট বুম! বুম! বুম! আওয়াজ আসছে।
মাত্র এক সেকেণ্ড পর ভয়ঙ্কর আওয়াজ আবারও শুনল রানা।
বুম!
বুম!
বুম!
পাশের ক্লিফে এবং রাস্তার উপর নামছে একের পর এক শেল। ঝরঝর করে গাড়ির উপর পড়ছে ছোট পাথর ও কাকর। তীরগতি তুলে ছুটছে রানা। লাফিয়ে আকাশে উঠল সামনের অ্যাসফল্ট ও কাকর। ওই জায়গায় দেখা গেল গভীর গর্ত। গোলা বর্ষণের মাধ্যমে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে পথের অর্ধেক।
রাস্তায় গোলা নামতেই তৈরি হয়েছে মস্ত গর্ত। তীব্রগতি গাড়ি সরিয়ে নিয়ে সামনের বিপদ এড়িয়ে গেল রানা। আকাশ থেকে ঝরঝর করে পড়ছে নুড়ি পাথর, ধুলো ও কাকর। তারই ভিতর দিয়ে ওপাশে ছিটকে বেরিয়ে গেল গাড়ি। চট করে একবার পিছনে চাইল রানা। রাস্তায় তৈরি হয়েছে প্রায় গোলাকার গর্ত। অনেক নীচের সাগরের দিকে নেমেছে। একপাশ।
গ্রেট ওশান রোডের ডানে ও বায়ে নামছে একের পর এক শেল। আঁকাবাঁকা পথে এগুতে শুরু করেছে রানা। সামনে জন্ম নিচ্ছে মস্ত সব গর্ত, আর সেগুলোর কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ওর গাড়ি।
রানার পিছনের আকাশে ঝুলছে ড্রাগন কর্পোরেশনের কপ্টার। ওটাও ডেস্ট্রয়ারের গোলা এড়াতে ব্যস্ত।
কিন্তু কোবরা কমাণ্ডোদের দুই এমআই-৩৪ কপ্টার কোনও কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছে না। রানার পিছু নেয়া বন্ধ না করে ব্যবহার করছে পাশের কামান। একের পর এক গোলা পড়ছে। রাস্তার বুকে।
ঠিক তখনই আরেকটি বাঁক পেরোল রানা। সামনে পড়ল পাহাড়ের বুকে টানেল। দেরি না করে উচ্চতা বাড়াতে লাগল। দুই রাশান কপ্টার, পেরিয়ে গেল পাহাড়। ওগুলোকে আর দেখা গেল না।
টানেলে ঢুকেই রানা ও তিশা টের পেল, হঠাৎ করেই নেমেছে নীরবতা।
কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্য।
ওদের পিছনে পৌঁছে গেছে ড্রাগন কর্পোরেশনের দুই স্পোর্টস্ কার–ফেরারি ও পোর্শ–বিকট গর্জন ছাড়ছে দুই ইঞ্জিন। দুই গাড়ির গানাররা গুলি করছে ওদের গাড়ি লক্ষ্য করে।
টানেলের বামে সাগরের দিকে সরে গেল রানা। তখনই টের পেল, এটা আসলে টানেল নয়। বামদিকে পাথরের দেয়ালের মাঝে ফাঁকা সব জায়গা। সামান্য দূরে দূরে সরু কিছু কলাম ধরে রেখেছে দেয়ালকে। ঝড়ের গতিতে কলামগুলো পিছনে পড়ছে। ড্রাইভিং সিট থেকে ঝাপসা দেখা গেল ওদিকে অনেক নীচে সাগর।
তথ্যটা মাত্র মগজে ঢুকেছে রানার, এমন সময় দেখল দ্রুতগতি কলামগুলোর ওদিকে হাজির হয়েছে কোবরা কমাণ্ডোদের কপ্টার। খোলা টানেলের ভিতর গুলি করছে।
রাস্তার বিটুমেন খুবলে তুলছে বুলেট, খটাখট বিধছে রানার গাড়ির গায়ে, লাগছে গিয়ে টানেলের ওদিকের দেয়ালে।
দেরি না করে সরতে লাগল রানা, গাড়ি চলে গেল। ডানদিকের দেয়ালের পাশে। কমে গেছে গতি।
তখনই এল পিছনের দুই স্পোর্টস্ কার। পিছন থেকে বেদম গুঁতো দিল পোর্শ। বাম থেকে চেপে আসতে চাইল ফেরারি। খুশি মনে গুলি করছে দুই গাড়ির দুই কমাণ্ডো।
ডাব্লিউআরএক্সের ভিতর ভ্রমরের আওয়াজ তুলল একরাশ গুলি। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল রানার পাশের কাঁচ।
এবং টানেলের শেষে দেখা দিল ভয়ঙ্কর এক আকৃতি। রাস্তা থেকে সামান্য উপরে ভাসছে কোবরা ইউনিটের দ্বিতীয়। এমআই-৩৪ কপ্টার। পুরো তৈরি, বাগিয়ে রেখেছে পাশের মিসাইল পড। এবার আসবে মৃত্যুবাহী মিসাইল!
হতাশ ভঙ্গিতে সিটে হেলান দিল তিশা। কোনও আশার বাণী শোনাতে পারল না রানা। কপ্টারের মিসাইল পড়গুলো থেকে হঠাৎ করেই ছিটকে বেরোল, মিসাইল। পিছনে ছিটিয়ে দিল হলদে আগুন। কিন্তু তখনই বিস্ফোরিত হলো ওই কপ্টার। ফরাসিদের ডেস্ট্রয়ার থেকে এসে পড়েছে শেল। ওই একই সময়ে বিস্ফোরিত হলো এমআই-৩৪-এর মিসাইল। পড় থেকে মাত্র বেরুতে শুরু করেছিল।
ভয়ঙ্কর শক্তিশালী নেভাল শেল উড়িয়ে দিয়েছে কোবরা কপ্টার, ছিটকে চলে গেল ওটা রাস্তার আরেক পাশে। ওখানেই থামল, পরক্ষণে অ্যালিউমিনিয়ামের ক্যানের মত খসে পড়ল সরাসরি চার শ ফুট নীচে। জেনেশুনে টার্গেট করা হয়নি কপ্টারকে, বুঝে গেছে রানা। ওটা চলে এসেছিল আসলে গোলার গতিপথের উপর।
যাক, একটা গেল… স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তিশা।
একবার ওকে দেখে নিয়ে ড্রাইভিঙে মনোযোগ দিল রানা। টানেল থেকে ছিটকে বেরোল ডাব্লিউআরএক্স, ঝড়ের গতিতে পেরিয়ে গেল এমআই-৩৪ কপ্টারের পতনের জায়গাটা। এখনও ওকে কোণঠাসা করে রেখেছে ড্রাগন কর্পোরেশনের দুই গাড়ি।
পাথুরে দেয়ালের পাশ দিয়ে তুমুল গতি তুলে ছুটছে রানা।
দেখতে না দেখতে কয়েক শ ফুট পেরিয়ে গেল তিন গাড়ি, তারপর রানা, দেখল সামনে হাঁ করা আরেকটা টানেল। ওটা আছে বড়জোর দুই শ গজ দূরে।
দড়াম!
রানার গাড়ির বামপাশে চেপে এল ফেরারি, পাথুরে দেয়ালের দিকে ঠেলছে।
দুই হাতে খপ করে স্টিয়ারিং ধরল রানা। পিছন থেকে গুতো দিচ্ছে পোর্শ। রানা প্রথমে বুঝল না কী কারণে ওকে ঠেলছে এরা। পরক্ষণে টের পেল।
টানেলের আর্চওয়ের ডানদিকে রয়েছে পাথুরে দেয়াল।
ওদিকে ঠেলছে ফেরারি ও পোর্শের খুনিগুলো। রানা যে গতিতে ছুটছে, সোজা গিয়ে বিধ্বস্ত হবে আর্চওয়ের পাশে।
হিসাব কষে ফেলল রানা। হাতে আছে বড়জোর পাঁচ সেকেণ্ড!
এবার? রানা? ভয় পেয়েছে তিশা।
দেখো না! ড্রাইভিঙের ফাঁকে বলল রানা।
আর চার সেকেণ্ড… সরু রাস্তা ধরে ছুটছে তিন রেসিং কার। তিন সেকেণ্ড… ডানদিকের পাথুরে দেয়ালের দিকে ঠেলছে ফেরারি।
জেদি, একগুঁয়ে বাচ্চার মত জায়গা ছাড়তে চাইছে না রানা। শক্ত হাতে ধরে আছে স্টিয়ারিং হুইল।
আর্চওয়ের একটু আগে পৌঁছেই প্রবল ঘষা খেয়ে উপরে উঠল ডাব্লিউআরএক্সের ডানদিকের দুই চাকা।
পিছন থেকে ভয়ঙ্কর গুতো দিল পোর্শে।
এবার? আশা ছেড়ে দিয়েছে তিশা।
আর এক সেকেণ্ড, তারপর…
যেন উল্টো ওদের দিকে বিদ্যুদ্বেগে আসছে আর্চওয়ে।
ঠিক আছে, এইবার! নিচু স্বরে বলল রানা।
তখনই কাজে নামল।
এবার আর্চওয়ের মুখে বিধ্বস্ত হবে গাড়ি। কিন্তু ফেরারিকে ডানদিকের দেয়ালে ওকে চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ করে দিল রানা।
পরক্ষণে দেয়ালে ষাট ডিগ্রি কাত হলো ডাব্লিউআরএক্স, দেয়াল বেয়ে উঠছে ডানদিকের দুই চাকা।
সময় যেন ধীর হয়ে গেল। তখনই অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় ঘটনাটা ঘটল…
আর্চওয়ের পাঁচ গজ আগে ছিটকে দেয়ালে উঠেছে রানার ইলেকট্রিক ব্লু র্যালি কার….
পর সেকেণ্ডে শূন্যে গড়ান দিল ওটা…
ছাত নীচে, মেঝে আকাশে। পাশেই ছুটছে নিচু ছাতের ফেরারি। ওটার উপর নামল রানার গাড়ি।
মুহূর্তের জন্য ফেরারির পিঠে পিঠ রেখে স্থির থাকল ডাব্লিউআরএক্স। আকাশের দিকে তাক করেছে ঘুরন্ত চাকা।
পরক্ষণে গড়ান দিয়ে নিরাপদে ধপ করে নামল টানেলে। চলে এসেছে সাগরের দিকে। লাল রঙের সুপার কারের পাশেই ছিটকে বেরোল টানেল থেকে। এখন ডানদিকে ফেরারি।
কিন্তু পোর্শের ড্রাইভার বা গানম্যানের কপাল মন্দ।
রানার লেজেই ছিল ওরা, ভেবেছিল একেবারে শেষসময়ে সরে যাবে। কিন্তু পোর্শের ডাইভার ভাবতেও পারেনি রানার গাড়ি শূন্যে পাক খেয়ে আবারও রাস্তায় নামবে সিধে হয়ে। মাত্র এক সেকেণ্ড ওদিকে চেয়েছে সে, কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
আর্চওয়ের দেয়ালে ভয়ঙ্কর গতি নিয়ে আছড়ে পড়েছে। পোর্শ। ফলে তৈরি হয়েছে মস্ত আগুনের গোলা।
কপাল নিয়ে এসেছে ফেরারির ড্রাইভার ও গানম্যান। কিন্তু ফুরিয়ে গেল ওই সামান্য ভাগ্য।
এখন বামদিকে রানা, উল্টো ডানদিকের দেয়ালের দিকে ঠেলছে ফেরারিকে।
পাশের গাড়ির ডাইভারের চেয়ে ঢের দক্ষ ও। গুতো দিল ফেরারির সামনের দিকে। ফলে হঠাৎ করেই তীক্ষ্ণ বাঁক নিল ওটা, প্রচণ্ড বেগে লাগল টানেলের ডান দেয়ালে। বিধ্বস্ত হয়েই উল্টে ছিটকে পড়ল খেলনার মত। থামল না, স্থির হলো গিয়ে বামদিকের দেয়ালে লেগে। ভোতা ধুপ আওয়াজ তুলে স্থির হলো পিঠের উপর ভর করে। তার আগেই লাশ হয়ে গেছে যাত্রীরা।
টানেল থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল রানা ও তিশার গাড়ি, আর তখনই পাশে পৌঁছে গেল কোবরা বাউন্টি হান্টারদের এমআই-৩৪।
প্রচণ্ড গতি তুলে পাহাড়ের কাঁধে ছুটছে গাড়ি, পাশেই কপ্টার। ডানদিকের ডোরওয়ে খুলে যেতেই দেখা গেল এক স্নাইপারকে। এক ঝাঁক গুলি ছুঁড়ল সে।
টের পেল রানা, যতই দ্রুত চলুক গাড়ি, ওই সামরিক কপ্টার দ্বিগুণ গতি তুলতে পারবে। পাশে থাকছে অনায়াসে।
তিশা! তাড়া দেয়ার সুরে বলল রানা, ওই কপ্টার সরাতে হবে! স্নাইপারকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করো!
খুশি মনে! বলল তিশা, গতি কমাও!
অ্যাক্সেলারেটারের উপর চাপ সরতেই গতি কমল, ডাব্লিউআরএক্সের, আর সেই সুযোগে বাইরের দিকে ডেযার্ট ঈগল পিস্তল তাক করল তিশা।
পর পর দুটো গুলি ছুঁড়ল ও। দুটোই লক্ষ্যভেদ করেছে।
কপ্টারের দরজায় হোঁচট খেয়ে নীচে পড়তে লাগল স্নাইপার।
কিন্তু কোমরে পুরু নাইলনের দড়ি। চল্লিশ ফুট পড়বার পর ঝটকা খেয়ে থামল লাশ।
দুর্দান্ত লক্ষ্যভেদ, প্রশংসা করল রানা।
পাল্টা চেঁচিয়ে উঠল তিশা, রানা! সামনে দেখো! আরেকটা শাখা রাস্তা! সত্যিই, দুভাগে ভাগ হয়েছে সামনের পথ। একটা গেছে। নীচের দিকে। ডানদিকেরটা মূল গ্রেট ওশান রোড।
বামে যাব, না ডানে, ভাবল রানা। সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হলো ওর জন্য।
ডানদিকের রাস্তার উপর বিস্ফোরিত হয়েছে ডেস্ট্রয়ারের গোলা।
বামে যাওয়াই উচিত।
ক্রিঁচ-ক্রিঁচ আওয়াজ তুলে বাঁক নিল রানার ডাব্লিউআরএক্স। আপত্তি তুলছে চাকাগুলো। রওনা হয়ে গেল ওরা নীচের দিকে। যাওয়া রাস্তা ধরে।
পিছু নিল এমআই-৩৪
দুই
রানা ও তিশার গাড়ির কয়েক শ গজ পিছনে গ্রেট ওশান রোডে তুমুল গতি তুলে ছুটছে কুয়াশার কুচকুচে কালো ল্যামবোরঘিনি ডায়ালো।
রানার গাড়ি ঠেকাতে যে ব্লকেড তৈরি করেছিল দুই সেমি ট্রেইলার, সে-দুটো এখন সামনে। আরও দূরে দুর্গ থেকে ছিনতাই করা ড্রাগন কর্পোরেশনের অন্য তিন পিউজো র্যালি কার।
খুব দ্রুত কমে আসছে দূরত্ব। পিউজো র্যালি কারগুলোর পঞ্চাশ গজ সামনে রাস্তার বাঁকে পৌঁছে গেছে রানার নীল ডাব্লিউআরএক্স।
কিন্তু ওটার উপর হামলে পড়েছে অবশিষ্ট কোবরা এমআই ৩৪ কপ্টার।
বামে সাগরের দিকে চাইল কুয়াশা, তেড়ে আসছে ডেস্ট্রয়ার। মুহূর্তের জন্য দেখা গেল পাখির মত দুই আকৃতি, সোজা আসছে উপকূলীয় রোড লক্ষ্য করে।
চট করে বুঝে গেল কুয়াশা, ওই দুই ফাইটার জেট এসেছে দিগন্তের কাছে বসে থাকা ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থেকে।
সর্বনাশ, বিড়বিড় করল কুয়াশা। গোটা ফ্রেঞ্চ সরকারকে যেন কিনে নিয়েছে ওই ডেমিয়েন লোকটা!
আবারও ঘুরে চাইল সামনে। মোড়ের বামদিকের রাস্তা ধরে নেমে চলেছে রানার গাড়ি, পাহাড়ের কোলে হারিয়ে গেল।
তখনই রানার শত্রুদেরকে অদ্ভুত একটি কাজ করতে দেখল কুয়াশা।
দুভাগে ভাগ হয়ে গেল তারা।
শাখা রাস্তায় রানার পিছু নিল ড্রাগন কর্পোরেশনের একটিমাত্র পিউজো। অন্যদুটো বিস্ফোরণে তৈরি মস্ত এক গর্ত পাশ কাটিয়ে চলে গেল ডানদিকের রাস্তা ধরে।
কয়েক মুহূর্ত পর মোড়ে পৌঁছে গেল দুই ট্রেইলার, ওগুলোও বাঁক নিল বামদিকে। পাহাড় বেয়ে নামছে ঝড়ের গতিতে। হিসাব কষেই এ কাজ করা হয়েছে, ভাবল কুয়াশা।
কোনও পরিকল্পনা আছে তাদের।
কুয়াশা নিজেও পৌঁছে গেল মোড়ে, এবং দ্বিধা না করেই রওনা হয়ে গেল বামের রাস্তায়।
প্রচণ্ড গতি তুলছে ল্যামবোরঘিনি ডায়াবলো।
.
নীচের বোটহাউসের দিকে সস্স্স্ আওয়াজ তুলে ছুটছে রানা ও তিশার ডাব্লিউআরএক্স গাড়ি। ঝড়ের বেগে পেরিয়ে যাচ্ছে অন্ধ সব তীক্ষ্ণ বাঁক।
গতি আরও তুলছে রানা, এমনসময় পিছন থেকে এল বৃষ্টির ফোঁটার মত অসংখ্য বুলেট। খটাখট লাগছে গাড়ির পিছনে ও আশপাশের পাথরের দেয়ালে। এসব গুলি আসছে উড়ে আসা এমআই-৩৪ কপ্টার থেকে। ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সাইড মাউন্টেড মেশিনগানদুটো।
এখনও শিথিলভাবে ঝুলছে কপ্টারের মৃত স্নাইপার, একবার এদিক আবার ওদিক সরছে লাশ। কখনও কখনও ধুপ করে নামছে রাস্তার উপর। রক্তের দাগ রয়ে যাচ্ছে কালো অ্যাসফন্টে।
পিছন থেকে গুলি করছে হলদে পিউজোর প্যাসেঞ্জার। জানালা দিয়ে কোমর বের করে দিয়েছে, হাতে টায়ার।
.
সামনে গুলি চলছে, এবং মাত্র দু শ গজ পিছনে পৌঁছে গেছে। কুয়াশা- তুমুল গতি তুলছে ল্যামবোরঘিনি ডায়াবলো।
এসএর মত বাঁকে সহজেই দুই সেমি-ট্রেইলারকে পাশ কাটাল কুয়াশা। দুই ড্রাইভার দেখল, ল্যামবোরঘিনির পিছনে পড়েছে ওরা।
পরের মুহূর্তে হলদে পিউজোর পিছনে পৌঁছল কুয়াশা। ডানদিক দিয়ে পাশ কাটাতে চাইল। কিন্তু এঁকেবেঁকে এগুতে শুরু করেছে পিউজো, পথ ছাড়বে না। বামপাশ দিয়ে বেরোতে চাইল কুয়াশা, মেঝের সঙ্গে টিপে ধরল অ্যাক্সেলারেটার। ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়েছে। অনেক নীচে সাগর। রাস্তার ওদিকে সরেই বিদ্যুদ্বেগে ওভারটেক করল পিউজোকে।
ডাইভার শুধু দেখল, বামপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল কালো এক রকেট–আর তখনই ড্রাইভারের জানালা দিয়ে ভিতরে পড়ল এম-৬৭ গ্রেনেড। ঠক-ঠক আওয়াজ তুলে মেঝের উপর স্থির হলো বোমা।
এইমাত্র তীরের মত ছিটকে চলে গেছে ল্যামবোরঘিনি, আর পরের সেকেণ্ডে বিস্ফোরিত হলো হলদে পিউজো। চারপাশে ছিটিয়ে গেল লাল-হলুদ আগুন। সামনের বাঁকে পৌঁছে গেল জ্বলন্ত পিউজো, গার্ড রেইল ফেন্স ভেঙে ছিটকে পড়ল অনেক নীচের সাগরে।
রানার ডাব্লিউআরএক্সের বিশগজ পিছনে পৌঁছেছে কুয়াশা। মাথার উপর ভাসছে এমআই-৩৪ কপ্টার।
রানার সামনে দীর্ঘ রাস্তা, শেষমাথায় অন্ধকার টানেল। ওটার মাধ্যমে পৌঁছুবে প্রকাণ্ড বোটশেডে।
রানা, রেডিয়ো করল কুয়াশা। পিছনে গুলি কোরো না। আমি ল্যামবোরঘিনির ভিতর!
কালো ল্যামবোরঘিনি? অবাক হইনি, বলল রানা। খুশি হলাম পৌঁছে গেছেন। কিছু ভেবেছেন হেলিকপ্টারের ব্যাপারে?
চারপাশ দেখতে শুরু করেছে কুয়াশা।
রানা ডাব্লিউআরএক্স নিয়ে সামনে, দ্রুত আসছে টানেল। গাড়ির উপর আকাশে ছুটছে এমআই-৩৪ কপ্টার। মৃত স্নাইপার ঝুলছে দড়ি থেকে। মাঝে মাঝে ধুপধাপ পড়ছে অ্যাসফল্ট রাস্তার উপর। ওই লাশ ডায়াবলোর ঠিক সামনে।
কপ্টার… স্নাইপার… টানেল… ভাবতে শুরু করেছে কুয়াশা। এখন শুধু দরকার এস্কেপ ভেহিকেল।
রিয়ার ভিউ মিররে চাইল কুয়াশা। চোখ পড়ল ট্রাকের গ্রিলের উপর। ওটা ম্যাক রিগ লম্বা নাক ঘড়ঘড় আওয়াজ
তুলে নেমে আসছে পিছনের রাস্তায়।
অনেক ধন্যবাদ, মনে মনে বলল কুয়াশা। কপ্টার নিয়ে ভাবতে হবে না তোমার, রানা, জানিয়ে দিল।
ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ল ল্যামবোরঘিনি, পৌঁছে গেল এমআই-৩৪ কপ্টারের পেটের নীচে। এখন আর ওকে দেখতে পাবে না যান্ত্রিক ফড়িং থেকে। ধুপ আওয়াজ তুলে ঝুলন্ত স্নাইপারের লাশে গুঁতো দিল ল্যামবোরঘিনি। জোর ধাক্কা খেয়ে বনেটের উপর উঠে এল লাশ। পরের মুহূর্তে এসে ঢুকল ডায়াবলোর খোলা টারগা ছাতের কারণে গাড়ির ভিতর।
দেরি না করে আলখেল্লার পকেট থেকে হ্যাণ্ডকাফ নিল কুয়াশা। একদিকের কড়া আটকে দিল মৃত স্নাইপারের সেফটি হার্নেসে, অন্যটা আটকা পড়ল ল্যামবোরঘিনির স্টিয়ারিং হুইলে।
ক্রুজ কন্ট্রোল বাটন টিপল কুয়াশা, ছিটকে উঠে দাঁড়াল সিটে, পরক্ষণে বেরিয়ে এল টারগা ছাতে।
একইসময়ে ল্যামবোরঘিনির পিছনে পৌঁছে গেল প্রকাণ্ড ম্যাক রিগ, ভয়ঙ্কর গুতো দিল গাড়ির পিছনে।
কিন্তু ওই ধাক্কার জন্য তৈরি ছিল কুয়াশা, দুই গাড়ি ছোঁয়া ছুঁই করতেই মহাব্যস্ত হয়ে উঠল, ও। মুহূর্তে পেরোল। ল্যামবোরঘিনির পিছনের চ্যাপ্টা অংশ। হাতে উঠে এসেছে পিস্তল, গুলি শুরু করল ম্যাক রিগের উইণ্ডশিল্ড লক্ষ্য করে।
কপালে গুলি খেয়ে অক্কা পেল ড্রাইভার। ততক্ষণে ল্যামবোরঘিনি পেরিয়ে এসেছে কুয়াশা। লাফ দিয়ে উঠল ম্যাক রিগের দীর্ঘ নাকে।
পরের সেকেণ্ডে ট্রাকের ভাঙা উইণ্ডশিল্ড গলে বসে পড়ল কুয়াশা ড্রাইভিং সিটে। সামনের দৃশ্য পরিষ্কার দেখল। বুঝে গেছে কী ঘটতে চলেছে।
পাহাড়ি টানেলে তীর বেগে ঢুকল রানার ডাব্লিউআরএক্স।
কোবরা কপ্টারের পাইলট ভালই জানে তাকে টানেল এড়িয়ে যেতে হবে। পাহাড় পেরিয়ে আবারও শত্রুকে ধরতে হবে সামনে গিয়ে। উচ্চতা বাড়াতে চাইল পাইলট, কিন্তু সম্ভব হলো না। আবারও চেষ্টা করল, ফলাফল আগের মতই হতাশাজনক।
উঠতে পারছে না হালকা এমআই-৩৪। নোঙর হিসেবে কাজ করছে ছুটন্ত ল্যামবোরঘিনি। দুসেকেণ্ড পর পাইলট বুঝল, কী হতে চলেছে। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
ড্রাইভারহীন ল্যামবোরঘিনি তুমুল বেগে গিয়ে ঢুকল টানেলের ভিতর। আর টানেলের উপর দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল এমআই-৩৪ কপ্টার। আতঙ্কে বিস্ফারিত হলো পাইলটের দুই চোখ। কপ্টারের সঙ্গে রয়ে গেছে স্নাইপারের দড়ি!
ওটা হ্যাচকা টানে হিড়হিড় করে নিয়ে চলেছে ওর কপ্টারকে!
তখনই ঘুরে গেল ল্যামবোরঘিনির স্টিয়ারিং হুইল। প্রচণ্ড গতি নিয়ে একপাশের দেয়ালে বিধ্বস্ত হলো গাড়ি। তার আগেই জোর টান খেয়ে পাহাড়ের বুকে আছড়ে পড়েছে এমআই-৩৪। বিস্ফোরিত হলো কপ্টার, বলের মত মস্ত আগুনের গোলা উঠে গেল আকাশে। ঝরঝর করে পাহাড় থেকে পড়তে লাগল আগুন ও আবর্জনা।
এসব পাত্তা না দিয়ে ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলে ম্যাক রিগ নিয়ে টানেলে ঢুকে পড়ল বাঙালি বৈজ্ঞানিক, পাশ কাটিয়ে গেল। পরিত্যক্ত, জ্বলন্ত ল্যামবোরঘিনি।
.
টানেলের শেষমাথা পেরিয়ে ঝড়ের মত বেরোলো রানার গাড়ি। আবারও উঠতে শুরু করেছে পাহাড়ি পথে।
তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েই দেখল খাড়াভাবে উঠে গেছে রাস্তা। একটু পর পর একের পর এক বাক। সামনে কী আছে দেখা যায় না। জানে না, রাস্তার অনেক উপরে দ্য গ্রেট ওশান রোডে খাপ পেতে আছে দুই হলদে পিউজো।
রানার পিছু না নিয়েও সংক্ষিপ্ত পথে ওখানে পৌঁছেছে তারা। এখন তীর গতি তুলে ফিরতি পথে আসছে।
গতি হ্রাস না করলে মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে দু পক্ষের।
স্পিড বাড়িয়ে চলেছে রানা নিজেও, পাহাড় বেয়ে উঠছে। পিছনে দুই যান্ত্রিক দানব–একটা কুয়াশার দীর্ঘ নাকওয়ালা ম্যাক রিগ, অন্যটা নাক থ্যাবড়ানো কেনওঅর্থ।
বিদ্বেগে অন্ধ এক বাঁক পেরোল রানার ডাব্লিইআরএক্স, আর তখনই অচিন্ত্যনীয় প্রতিরোধের মুখে পড়ল।
বাঁকের সামনে ভ্রমরের মত ভাসছে ফাইটার জেট বিমান!
ওটার নাক তাক করা নীচের দিকে। ডানা থেকে চেয়ে আছে। অনেক কটা মিসাইল!
ওই বিমান চট করে চিনল রানা।
ড্যাসল্ট মিরাজ ২০০০এনটিআই। হ্যারিয়ার জাম্প জেটের মতই। সাধারণ মিরাজ ২০০০এন থেকে বদলে নেয়া হয়েছে। এ জিনিস থাকে শুধু ফরাসিদের সবচেয়ে বড় এবং নতুন সব এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে। বিমানটা দেখতেও প্রায় হ্যারিয়ারের মতই, পেট মোটা, কুঁজো, আর দুজনের ককপিটের দুপাশে সেমি সারকুলার এয়ার ইনটেক।
লেসারের মত ট্রেসার বুলেট উগলে দিল মিরাজ।
রানার গাড়ির চারপাশে এসে বিঁধছে গুলি।
মেঝের সঙ্গে অ্যাক্সেলারেটার টিপে ধরল রানা, তীব্র গতিতে পেরিয়ে গেল ভাসমান বিমানকে।
কিন্তু ভারী ওজন নিয়ে আকাশে ঘুরে গেল মিরাজ, এবং বুলেটের ঝড় পিছু নিল রানাদের।
আরেকটা বাঁক পেরিয়ে গেল ডাব্লিউআরএক্স। বেশ কয়েকটা ট্রেসার বুলেট লাগল পিছনের বাম্পারে।
তিশা! চাপা স্বরে বলল রানা, স্টিয়ারিং হুইল নাও!
পাশ থেকে ড্রাইভিং সিটে চলে এল তিশা।
এদিকে রানা খুঁজে নিল কমব্যাট ওয়েবিং থেকে বিশেষ কিছু বুলেট। ওগুলোর চিবুকে কমলা রঙের ব্যাণ্ড।
ষাঁড়ও বলে ওগুলোর আঘাতে থামে?
ফাইটার বিমান ঠেকাতে পারে?
ডেযার্ট ঈগল পিস্তলের ম্যাগাষিনে বুলেট ভরতে শুরু করেছে রানা। কাজটা শেষ করেছে, এমনসময় সামনের রাস্তায় দেখা দিল দ্বিতীয় মিরাজ বিমান। ওটার মেশিনগান ছুঁড়ছে গুলি। নলের মুখ থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে লাল আগুন।
কিন্তু রানা এখন তৈরি।
সরে গেছে প্যাসেঞ্জার সিটে, জানালা দিয়ে বের করে দিল। কোমর, বিমানের দিকে তাক করল ডেযার্ট ঈগল পিস্তল।
গাড়ির সামনের রাস্তা কামড়ে তুলছে মিরাজের বুলেট। ওই একইসময়ে গুলি করল রানা ভাসমান বিমানের দিকে। বু! বুম্! বুম! আওয়াজ তুলছে ডের্ট ঈগল।
প্রতিটা গুলি বিধল বিমানের দুপাশের এয়ার ইনটেকের ভিতর। একইসময়ে ঝাঁঝরা হলো ডাব্লিউআরএক্সের উইণ্ডশিল্ড।
একমুহূর্ত পর বোঝা গেল বাঙালি বৈজ্ঞানিকের গ্যাস এক্সপ্যাণ্ডিং বুলেট আসলে কী দুর্দান্ত জিনিস।
মিরাজের ইনটেক ফ্যানে প্রথম বুলেট বিধতেই চারপাশে ছিটকে গেছে গ্যাস; চুরচুর করে দিয়েছে ফ্যানের ব্লেডগুলো। ফলে জ্যাম হয়েছে বিমানের ইঞ্জিন। আর তখনই অনায়াসে জেট ইঞ্জিনের ভিতর ঢুকেছে অন্য সব গুলি। ফলাফল খুবই খারাপ: বিমানের ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হাইলি ভলাটাইল ফিউয়েল ইনজেকশন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মাত্র দুটো বুলেট লাগল ছয় শ মিলিয়ন ডলারের ফ্রেঞ্চ বিমানের বারোটা বাজাতে।
খেপে উঠল ইঞ্জিনগুলো, উন্মাদের মত বনবন করে পাক খেল বিমান, চারপাশে ছিটিয়ে দিল ট্রেসার বুলেট পরক্ষণে বিকট বুম! আওয়াজ হলো। অসংখ্য টুকরো হলো ফ্রেঞ্চ ফাইটার। ঝরঝর করে নেমে এল তরল জ্বলন্ত তেল। বিমানের ভাঙাচোরা কাঠামো ধুপ করে নামল রানার পঞ্চাশ গজ দূরের রাস্তায়।
জানালা থেকে পিছিয়ে প্যাসেঞ্জার সিটে বসল রানা, আর তখনই…
দেখল ড্রাইভিং সিট থেকে ছিটকে গেছে তিশা।
কাঁধে ভয়ঙ্কর ক্ষত, বেরুতে শুরু করেছে রক্তের স্রোত। ড্রাইভিং সিটের দুই ইঞ্চি জায়গা উড়ে গেছে বুলেটের আঘাতে, ওখানে ছিল তিশার কাধ।
ঝট করে পা বাড়িয়ে ব্রেক পেডাল টিপে ধরল রানা, প্রায় তখনই থামল গাড়ি বিধ্বস্ত মিরাজের সামান্য আগে।
তিশা, অসহায় শোনাল রানার কণ্ঠ, খুব ব্যথা?
চোখের ভারী পাতা খুলল তিশা। গুঙিয়ে উঠল, ব্যথা…. রানা… খুব…
গাড়ি থেকে বেরিয়ে তিশার দরজার পাশে চলে এল রানা। খুলে ফেলল দরজা। দুহাতে তুলে নিল তিশাকে। রেডিয়ো করল, কুয়াশা! আপনি কোথায়?
প্রথম রিগে। পিছনে আসছে আরেকটা। তুমি কোথায়… না, দেখতে পেয়েছি।
তিশা আহত। ওকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
বেশ, আমি থামলেই চট করে তুলে দেবে ট্রাকে, বলল কুয়াশা। ঠিক পিছনেই থাকবে অন্য ট্রাক।
এবার কুয়াশাকে দেখল রানা, পাহাড়ি পথে উঠে আসছে। ম্যাক রিগ নিয়ে। ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলছে ইঞ্জিন। গতি দ্রুত।
ব্রেকের বিশ্রী কিচকিচ আওয়াজ তুলে ডাব্লিউআরএক্সের পাশে থামল ট্রাক।
ঝট করে দরজা খুলে দিল কুয়াশা।
তিশাকে ক্যাবে তুলে দিল রানা। দড়াম করে দরজা বন্ধ করতে না করতেই রওনা হলো কুয়াশা ট্রাক নিয়ে। পিছনের বাঁকে দেখা দিয়েছে নাক বোঁচা কেনওঅর্থ রিগ। পূর্ণ গতি। বিকট গর্জন ছাড়ছে ইঞ্জিন।
মিরাজ বিমানের ধ্বংসস্তূপ মাড়িয়ে রওনা হলো কুয়াশার ম্যাক রিগ। গতি মাত্র তুলছে। দ্বিতীয় রিগ এল সব এলোমেলো করে দিয়ে, নানাদিকে ছিটিয়ে পড়ল অবশিষ্ট মিরাজ বিমান। প্রচণ্ড গতি কেনওঅর্থের, ভয়ঙ্করভাবে গুঁতো দিল কুয়াশার ম্যাক রিগের পিছনে।
বিশ মাইল বেগে চলেছে ম্যাক রিগ, ধাক্কা খেয়ে চমকে গেল রানা, কুয়াশা এবং তিশা।
ফুট বোর্ডে দাঁড়িয়ে আছে রানা।
একইসময়ে বলল কুয়াশা এবং ও, সামনে থেকে আসছে। আরও দুই র্যালি কার!
পরস্পরের দিকে চাইল ওরা। যেন নিজেকে দেখছে আয়নায়।
ওর কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করল কুয়াশা।
ফাইটার বিমানের মেশিনগান থেকে গুলি লেগেছে, বলল রানা।
ও, চুপ হয়ে গেল কুয়াশা।
পাহাড় বেয়ে উঠছে দুই ট্রাক। একস্ট স্ট্যাগ থেকে ভলকে ভলকে বেরুচ্ছে কালো ধোঁয়া।
তখনই দেখা দিল দুই হলদে পিউজো র্যালি কার।
চওড়া বাঁক ঘুরে বেরিয়ে এসেছে।
তীরের মত নেমে আসছে পাহাড়ি পথে। ওই একই পথে সগর্জনে উঠছে রানা ও কুয়াশার ট্রাক।
দুই গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দুই গানম্যান পাশের জানালা দিয়ে বের করে দিয়েছে কোমর। হাতে একে-৪৭ রাইফেল।
ডালে বসা পাখির মত খতম হবে গুলি শুরু করল দুই গানম্যান, আর তখনই ডানদিকের গাড়ি উড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল কুয়াশার ট্রাক। ড্রাগন কর্পোরেশনের দ্বিতীয় পিউজো তীরের মত সরে গেল আরেকদিকে। চেপে বসল পাহাড়ে। হোঁচট খেয়ে থামল কয়েক মুহূর্ত পর। ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলে হলদে পিউজোকে পেরিয়ে গেল দ্রুতগামী দুই ট্রাক।
পাহাড়ের মাথায় উঠে এল ম্যাক রিগ, সামনে আবারও সমতল মেইন রোড। দুই রাস্তার সঙ্গমে পৌঁছে গেছে ট্রাক।
কিন্তু পিছনে লেগে আছে নাক-থ্যাবড়া কেনওঅর্থ ট্রাক। ওটার পিছু নিয়েছে অবশিষ্ট হলদে পিউজো। নতুন উদ্যমে শুরু হলো ধাওয়া। অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তা পেয়ে ছিটকে সামনে বাড়ল র্যালি কার, কিন্তু তখনই বিস্ফোরিত হলো রাস্তার সঙ্গমস্থল। বিকট আওয়াজে কানে ঝিঁঝি লাগল। চারপাশে ছিটকে উঠেছে ধুলোর মেঘ। ফ্রেঞ্চ ডেস্ট্রয়ার থেকে এসে পড়েছে গোলা।
একটা বাঁক পেরিয়ে এল দুই প্রকাণ্ড রিগ। বামে অনেক নীচে সুনীল সাগর। সামনে পাহাড়ের কোলে আরেকটা টানেল। সুড়ঙ্গ গেঁথে আছে পাহাড়ের বুকে, ডানদিকে বাঁক নিয়েছে। আগের টানেলগুলোর চেয়ে দীর্ঘ।
গর্জন ছাড়তে ছাড়তে নব্বই মাইল বেগে টানেলে ঢুকে পড়ল কুয়াশার ট্রাক। আর তখনই কেনওঅর্থের পাশে পৌঁছে গেল হলদে পিউজো। প্যাসেঞ্জার জানালা দিয়ে শরীর বের করে গুলি ছুঁড়ছে গানম্যান। একরাশ গুলি এল ম্যাক রিগের পিছনের চাকা লক্ষ্য করে।
বিস্ফোরিত হলো ম্যাকের পিছনের চাকাগুলো।
ধাপ-ধাপ আওয়াজে রাস্তা চাপড়াতে শুরু করেছে ফাটা রাবার। পিছন দিকটা মাছের লেজের মত এপাশ-ওপাশ ঝাঁপটে চলেছে।
মস্ত রিগের পিছন দিক পিছলে সরে যেতে লাগল একপাশে।
এদিকে সুযোগ পেয়ে এগুতে শুরু করেছে কেনওঅর্থ রিগ।
আমাদের পাশে পৌঁছে যাচ্ছে! সতর্ক করল রানা।
বদ্ধ টানেলের ভিতর ম্যাক রিগের ডানদিকে হাজির হলো নাক বোঁচা কেনওঅর্থ রিগ।
ব্যবস্থা নিচ্ছি, বলল কুয়াশা। তুমি হুইল ধরো!
ড্রাইভারের সিট ছেড়ে উঠে পড়েছে বিজ্ঞানী, ছুটে ঢুকে পড়ল ম্যাকের স্লিপিং কম্পার্টমেন্টে। রিগের পিছনের সমতল ট্রেইলার কানেকশন সেকশনের জানালা দিয়ে পর পর দুবার গুলি করল। পরের মুহূর্তে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল ঝোড়ো হাওয়ার ভিতর।
বাঁকা টানেলে পাশাপাশি ছুটছে দুই প্রকাণ্ড রিগ।
সাঁই-সাঁই করে পিছিয়ে চলেছে সাগরের দিকের কলামগুলো।
ড্রাইভিঙের মাঝে আহত তিশার দিকে চাইল রানা। ভয়ঙ্করভাবে আহত হয়েছে বেচারি। কাছেই কোথাও জোরালো বুমবুম আওয়াজ শোনা গেল।
ঝট করে বামে চাইল রানা। অস্পষ্ট সব কলামের ওপাশে হাজির হয়েছে দ্বিতীয় মিরাজ ফাইটার। গুলি করছে ওদের ট্রাক লক্ষ্য করেই।
পরিস্থিতি খুবই খারাপ, মনে মনে বলল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর ডানদিকে পাশাপাশি চলল কেনওঅর্থ রিগ। ক্যাবের ভিতর ড্রাগন কর্পোরেশনের দুই লোক। ম্যাক রিগ পাশে পেয়েই নিজেদের ট্রাকের বামের দরজা খুলল গানম্যান।
এবার উঠে আসবে শত্রুর ট্রাকে।
লোকটার দিকে ডেবার্ট ঈগল পিস্তল তুলল রানা, টিপে দিল ট্রিগার।
ক্লিক!
চেম্বারে গুলি নেই।
দুই ট্রাকের মাঝের সামান্য জায়গাটা লাফিয়ে পেরিয়ে এল ড্রাগন কর্পোরেশনের গানম্যান, ধুপ করে নামল প্যাসেঞ্জার নামবার সিঁড়ির ধাপে। জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল রাইফেলের নল, এবার গুলি করবে…
ওই একইসময়ে উরুর খাপ থেকে ম্যাগহুক নিয়েছে রানা, যন্ত্রটা তাক করেই টিপে দিল ট্রিগার।
ফুযযযয… আওয়াজ তুলল ম্যাগহুক।
ফায়ার করেনি ম্যাগনেটিক বাল্ব। দুর্বল ফিসফিস আওয়াজ, শেষ হয়ে গেছে প্রপালশন গ্যাস।
একে-৪৭-এর মাযলের দিকে চেয়ে গলা শুকিয়ে গেল রানার।
বুঝে গেছে, এবার লাশ হবে তিশা আর ও।
সবই বুঝতে পেরেছে ড্রাগন কর্পোরেশনের গানম্যান, মুখে ফুটে উঠল টিটকারির হাসি। তর্জনী দিয়ে আস্তে করে দাবিয়ে দিল ট্রিগার।
ওই একইসময়ে কেনওঅর্থ ট্রাক বামে চেপে আসতেই সত্যিকারের প্যানকেক হলো লোকটা। দুই ট্রাকে এত জোরে গুঁতো লেগেছে, মুহূর্তের জন্য রাস্তা ছেড়ে শূন্যে উঠল চাকাগুলো।
চেপ্টে যাওয়া মশার মত হয়ে গেল গানম্যানের দেহ, বিস্ফোরিত হয়েছে সারাশরীর থেকে রক্ত। পিরিচের মত হয়ে গেল লোকটার দুই চোখ, খসে পড়ল ট্রাক থেকে নীচের রাস্তায়। চাপা পড়ল ট্রাকের পিছনের চাকার তলে।
আর লোকটা সরে যেতেই রানা দেখল, এখন কেনওঅর্থ ড্রাইভ করছে নতুন এক লোক–কুয়াশা!
ড্রাগন কর্পোরেশনের গানম্যান কেনওঅর্থ থেকে ম্যাক রিগের দরজার ফুটবোর্ডে নেমে আসতেই, তার ট্রাকের উল্টো দিকে পৌঁছে গেছে কুয়াশা–ম্যাক রিগের পিছনের সেকশন পেরিয়ে হাজির হয়েছে কেনওঅর্থ রিগের ডানদিকের দরজায়।
বাঁকা টানেলে পাশাপাশি ছুটছে দুই প্রকাণ্ড দানব। পিছনে আসছে শেষ হলুদ পিউজো।
রানার ম্যাক রিগ ভীষণ দুলছে এদিক-ওদিক, নানাদিকে পিছলে চলেছে পিছনের চাকা।
রেডিয়ো করল রানা, কুয়াশা, ট্রাক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। তৈরি থাকুন, আমরা আপনারটায় উঠছি।–
ঠিক আছে, সরে আসছি, বলল কুয়াশা। আগে তিশাকে পাঠাও।
ম্যাক রিগের একেবারে পাশে চলে এল কেনওঅর্থ।
সিটবেল্ট ব্যবহার করে স্টিয়ারিং হুইল স্থির রাখল রানা, লাথি দিয়ে খুলল প্যাসেঞ্জার দরজা দুহাতে তুলে সাবধানে সরাতে শুরু করেছে তিশাকে।
ওই একইসময়ে ড্রাইভারের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দিল কুয়াশা।
কিন্তু তখনই এল একরাশ গুলি।
খটাখট লাগছে দুই ট্রাকের বডিতে।
পিছনের পিউজোর লোকগুলো লক্ষ্যস্থির করতে পারেনি।
নিরাপদেই তিশাকে কুয়াশার ট্রাকের প্যাসেঞ্জার সিটে তুলে দিল রানা।
তিশা নিরাপদ বুঝে যেতেই নিজেও মাঝের দূরত্ব পেরুতে চাইল রানা। কিন্তু দিগন্ত থেকে এল কমপক্ষে কয়েক শ গুলি। কুয়াশার ট্রাকে উঠবার সুযোগ নেই, আসছে অসংখ্য বুলেট।
ঝট করে সামনে চাইল রানা। বুঝতে দেরি হলো না কোথা থেকে এল এত গুলি।
বাঁকা টানেলের শেষে বাতাসে ভাসছে দ্বিতীয় মিরাজ ২০০০এম-১১ ফাইটার। ব্যস্ত হয়ে উঠেছে ছয় ব্যারেলের মিনি গান। নলগুলো থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে কমলা আগুন।
চোখের সামনে সসসস্ আওয়াজ তোলা ট্রেসার রাউণ্ডগুলো দেখল রানা। এবার সব গুলি আসছে ওর দিকেই। ম্যাক রিগের ধাতব গ্রিলে লেগে ঠনঠনঠন আওয়াজ তুলছে উত্তপ্ত বুলেট সারি।
মুহূর্তে আগুন ধরল ম্যাকের ইঞ্জিনে। চারপাশে ছিটকে গেল হাইড্রলিক ফ্লুইড। এক সেকেণ্ড পর উইণ্ডশিল্ডের ওপাশে কিছুই দেখা গেল না। দুই পায়ে ব্রেক পেডাল চেপে ধরল রানা। কিন্তু তখনই বুঝল, ওই ব্রেক এখন অতীতের জিনিস। স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাতে চাইল। সামান্য নড়ল ওটা। চাপা শ্বাস ফেলল রানা, বিড়বিড় করে বলল, দাঁড়া, ফাইটার বিমান, আমি যদি শেষ হই, তোকেও সঙ্গে নিয়ে যাব।
পাশে কেনওঅর্থ রিগ রেখে নিতম্ব নাচাতে নাচাতে চলেছে রানার ম্যাক রিগ।
ওটার উপর বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে মিরাজের পাইলট। থামছে না শত শত বুলেটের বৃষ্টি।
টানেলের শেষে পৌঁছে গেছে দুই ট্রাক। বাধ্য হয়ে তার ট্রাক নিয়ে সরে গেল কুয়াশা। বাকের শেষে এসে ডানদিকে সরছে সে, কিন্তু রানার ম্যাক রিগ একই পথে চলেছে। বনেটের উপর দাউ দাউ আগুন। ছিন্নভিন্ন হয়েছে পিছনের চাকা। এখন আর বাঁক নেবে না ওই ট্রাক। সোজা চলেছে তুমুল গতি তুলে।
বুঝে গেল রানা, এবার কী ঘটতে চলেছে। এবং সেটা ঠেকাতে কিছুই করতে পারবে না ও। আস্তে করে শ্বাস নিল রানা। মেনে নিয়েছে পরাজয়।
বাঁক নিল না ওর ট্রাক, সোজা উড়িয়ে দিল গার্ড রেইল ফেন্স, ছিটকে বেরিয়ে গেল বিকেলের রোদে। শূন্যে ভাসতে শুরু করেছে ট্রাক। সরাসরি চলেছে ভাসমান মিরাজ ফাইটার বিমানের দিকে।
ছুঁড়ে মারলে যেভাবে আকাশে ওঠে ঢিল, ঠিক সেভাবে নাক আকাশে তুলেছে ম্যাক রিগ, বনবন করে ঘুরছে চাকা, পিছনে রেখে যাচ্ছে জ্বলন্ত বনেটের কালো ধোঁয়া। কিন্তু নীচের দিকে নাক তাক করবার আগেই সজোরে গুঁতো দিল মিরাজ বিমানের নাকে। ভয়ঙ্কর ধাক্কা খেয়ে মস্ত হোঁচট খেল বিমান, আর ওটার উপর চেপে বসল মস্ত ট্রাক।
ভীষণভাবে দুলতে লাগল লাথি খাওয়া মিরাজ–পরক্ষণে বিকট আওয়াজে বিস্ফোরিত হলো। চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া আগুনের গোলা ভেসে উঠল নীল আকাশে।
পরক্ষণে নীচে রওনা হলো আগুনের গোলক, নামছে সোজা চার শ ফুট নীচের সাগরে। নাকে করে নিয়ে চলেছে আহত ম্যাক রিগকে।
কয়েক সেকেণ্ড পর বিপুল আওয়াজ তুলে সাগরের ঢেউয়ের ভিতর ঝপাস করে নামল সবই।
রানার কাছে সামান্যতম দড়িও ছিল না, আর বিকল ছিল ম্যাগহুক, আটকা পড়েছিল বিধ্বস্ত দুই যন্ত্র দানবের মাঝে।
সবই দেখেছে কুয়াশা ও তিশা। পাহাড়ের কাঁধে তীরের মত ছুটছে ওদের কেনওঅর্থ।
ডুকরে কেঁদে উঠল তিশা: রানা… রানা…
নিজ চোখে দেখেছে, রানাকে নিয়ে দেয়াল ভেঙে ছিটকে পড়েছে ম্যাক রিগ। গুঁতো দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে মিরাজ বিমানকে। তখনই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হলো। ভাঙাচোরা বিমান ও ট্রাক নেমে গেল চার শ ফুট নীচে। কয়েক সেকেণ্ড পর ঝপাস্ করে সাগরে পড়ল সবই।
না, ওই বিস্ফোরণ এবং পতনের পর বাঁচবার উপায় থাকে কারও।
আয়ত দুই চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে তিশার। না… না… আল্লা… না… মুখ নিচু করে নিল ও, নীরবে কাঁদছে।
ওর সাহস ছিল মস্ত পুরুষ সিংহের মত, চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কুয়াশা। দ্রুত ভাবতে শুরু করেছে। এখন প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই ভয়ানক বিপদ থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
তখনই শাঁ করে ওর ট্রাক পেরিয়ে গেল শেষ পিউজো। চমকে গিয়ে সামনের রাস্তা দেখল কুয়াশা। ওদিকে রয়েছে অস্বাভাবিক একটি স্থাপনা। দেখতে ছোট কোনও দুর্গের মতই। ওটার ভিতর দিয়ে গেছে রাস্তা।
পাথুরে কোনও খুদে দুর্গ, ছাতে হাঙরের দাঁতের মত খোঁচা খোঁচা ব্যাটলমেন্ট।
জিনিসটা আসলে দোতলা গেটহাউস। বোধহয় ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের সমানই বয়স ওটার।
স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, ডেমিয়েনের সম্পত্তির শেষ সীমানা ওটাই।
গেটওয়ের শেষে শক্তপোক্ত ড্র-ব্রিজ। দৈর্ঘ্যে হবে বিশ ফুট। ওটা সরিয়ে নিলে ওদিকের রাস্তার সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে। আপাতত পেতে রাখা আছে ড্র-ব্রিজ। কিন্তু গেটহাউসে পৌঁছে গেল পিউজো।
ওটা থেকে ছিটকে নামল এক লোক, ঝেড়ে দৌড় দিল দালানের ভিতর। কয়েক সেকেণ্ড পর কুয়াশা লক্ষ্য করল, ধীরে ধীরে উপরে উঠছে ড্র-ব্রিজ।
না… চাপা স্বরে বলল কুয়াশা। টিপে ধরল অ্যাক্সেলারেটার।
বিকট গর্জন ছাড়ল কেনওঅর্থ রিগ, গতি বাড়ছে। ঝড়ের গতিতে কাছে চলে আসছে মেডিইভেল গেটহাউস। লোহার পুরু দুই শিকলে ভর করে উঠে আসছে ড্র-ব্রিজ। খুবই কঠিন হবে সঠিক সময়ে ওটা পেরিরে যাওয়া। বিদ্যুদ্বেগে ছুটছে প্রকাণ্ড ট্রাক। ধীরে ধীরে এক ফুট এক ফুট করে উঠছে ড্র-ব্রিজ। এরই ভিতর উঠে এসেছে তিন ফুট। পিউজোর অন্য লোকটা গুলি শুরু করেছে ট্রাক লক্ষ্য করে। আর মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে ট্রাক। মাথা নিচু করে নিল কুয়াশা।
তখনই ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল উইণ্ডশিল্ড। তীরের মত আসছে ড্র-ব্রিজ…
সগর্জনে গেটহাউসে পৌঁছে গেল ট্রাক, ছিটকে পিছিয়ে গেল। এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র লোক…
তুমুল গতি নিয়ে র্যাম্পের মত সেতুর উপর উঠল ট্রাক.. গতি ঘণ্টায় কমপক্ষে এক শ মাইল। সেতুর শেষমাথায় পৌঁছে আকাশে ছিটকে ভেসে উঠল ট্রাক, মুহূর্তে পেরিয়ে গেল মাঝের শূন্যতা, তারপর আবারও জোরালো ধপ আওয়াজ তুলে নামল চাকা।
আবারও ফিরেছে ট্রাক শক্ত জমির উপর।
পর পর তিনবার লাফিয়ে উঠল রিগ, তারপর ওটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারল কুয়াশা।
ফোঁস করে আটকে রাখা শ্বাস ছাড়ল। তখনই বিস্ফোরিত হলো ট্রাকের সামনের রাস্তা। যেন তৈরি হয়েছে মাশরুমের মেঘ।
এইমাত্র ওখানে নেমেছে ডেস্ট্রয়ারের গোলা।
কষে ব্রেক করল কুয়াশা। পিছলে যেতে শুরু করেছে ট্রাক। তীক্ষ্ণ বাঁক নিচ্ছে। কয়েক সেকেণ্ড পর থামল গহ্বরের মত এক নতুন গর্তের পারে।
চট করে তিশার দিকে চাইল কুয়াশা, পুরোপুরি হতাশ।
বাস্পায়িত হয়েছে ওদের সামনের পথ। ওখানে মস্ত গভীর গর্ত। তিরিশ ফুট দূরে আবারও শুরু হয়েছে রাস্তা।
ফাঁদে পড়েছে ওরা। দুপাশে খাড়া পাহাড়। পিছনে এবং সামনে খাড়া গহ্বর।
এমনসময় হাজির হলো ড্রাগন কর্পোরেশন কপ্টার। এতক্ষণ নিরাপদ দূরত্ব থেকে সবই দেখছিল তারা।
ট্রাকের পাশে এসে ভাসতে লাগল কপ্টার। হেলমেট রেডিয়ো ব্যবহার করে হুমকি দিল পাইলট:
খবরদার! নেমে এসো ট্রাক থেকে!
তিন
ইংল্যাণ্ড।
অক্টোবর ১৪। ইউনাইটেড স্টেটস্ এম্বেসি, লণ্ডন। বিকেল সাড়ে চারটা।
…তাদের মতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে, তার মাধ্যমে বেশিদূর এগুতে পারবে না আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্ব। ম্যাজেস্টিক-১২ সেপ্টেম্বর এগারোতে হামলা করেনি বা করায়নি, কিন্তু এর ফলে যে সুবিধা পাওয়া গেছে, তা পূর্ণভাবেই ভোগ করছে তারা…
.
টিভির পর্দায় যে লোক বলে চলেছে, সে মোসাদের মৃত এজেন্ট
ডেনিস ই, ম্যাকিন। আজ খুন হয়েছে কুইন্স টাওয়ারের ছাতে।
গভীর মনোযোগে টিভি দেখছে খবির। ওর পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্টেটস ডিপার্টমেন্টের চার্লস ডেলাস।
ডেস্কের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য ডকুমেন্ট।
সবই ম্যাজেস্টিক-১২ এবং বাউন্টি হান্ট সম্পর্কে জোগাড় করেছিল ডেনিস ই, ম্যাকিন।
ডকুমেন্টগুলো আবারও পড়তে শুরু করেছে খবির। বেশ কিছু ছবিও আছে।
একটায় দেখা যাচ্ছে, এক ইকোনোমিক সামিটে লিমাযিন থেকে নামছে একদল লোক।
গোপনে কান পাতা হয়েছে ফোনে, পাতা ভরা তার বর্ণনা। চুরি করা হয়েছে ইউএসএ-র নিরাপত্তা বিভাগের ফাইল।
দুটো ডকুমেন্ট হাপিস হয়েছে ভয়ঙ্কর কুখ্যাত ফ্রেঞ্চ সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা ডিজিএসই থেকে। প্রথম ডোশিয়েতে। উল্লেখ করা হয়েছে, ছয়মাস আগে বিশ্ব-সেরা কজন ব্যবসায়ীকে একটি ডিনারে আমন্ত্রণ জানান ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট।
দ্বিতীয় ডকুমেন্ট নিউক্লিয়ার বোমার মতই। কয়েক দিন আগে ডিজিএসই বন্দি করেছে টেরোরিস্ট অর্গানাইযেশন গ্লোবাল জিহাদের চব্বিশজন জঙ্গীকে, তারা একটা ট্যাঙ্কার বিমান ব্যবহার করে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল আইফেল টাওয়ার। গ্লোবাল জিহাদ আল-কায়দার মতই, গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাইছে ইসলামি জঙ্গীবাদ।
ডকুমেন্টটা পড়তে শুরু করে নিচু সুরে শিস বাজাল খবির। গ্লোবাল জিহাদের টেরোরিস্টদের সঙ্গে বন্দি হয়েছিল দলের অন্যতম নেতা শাহেদ করিম। সাধারণত বড় কোনও ইসলামি নেতা ধরা পড়লে দুনিয়া জুড়ে হই-হই শুরু হয়। কিন্তু, শাহেদ করিমকে গোপনে আটকে রাখে ফ্রেঞ্চ কর্তৃপক্ষ।
মার্জিনে মন্তব্য লিখেছে ডেনিস ই, ম্যাকিন: এদের সবাইকে ডিজিএসই-র ব্রেস্ট হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোনও বিচারের ব্যবস্থা করা হয়নি। খবরের কাগজে কিছুই উল্লেখ ছিল না। ওই চব্বিশজনকে আর কখনও দেখাও যায়নি। লিযার্ড/নোয়ায প্রজেক্টের সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে। …ফরাসিরা কি এম-১২ কাউন্সিলের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে? এ বিষয়ে বিশদ খোঁজ নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসাবে কাজ করছে মোসাদের ডিভিডি ডিস্ক। দুজন বয়স্ক এজেন্ট ইন্টারোগেট করছে ম্যাকিনকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
ম্যাকিন লোকটা যেন ডিনামাইটের উপর বসে ছিল। প্রথমেই সে ব্যাখ্যা দিয়েছে, আসলে ম্যাজেস্টিক-১২ কী।
ম্যাকিনের তৈরি ফাইলের তালিকা অনুযায়ী ওই কাউন্সিলেরচেয়ারম্যান ফ্রান্সিস ওলিফ্যান্ট। মিলিটারি ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। বয়স সত্তর। ওলিফ্যান্ট-রোজ ইণ্ডাস্ট্রিজের প্রধান। ডিফেন্স কন্ট্রাক্টর। হিউ এবং ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের মত মিলিটারি এয়ারক্রাফটের জন্য স্পেয়ার পার্টস তৈরি করে ও-আর ইণ্ডাস্ট্রিজ। ভিয়েতনাম বা ডের্ট স্টর্ম যুদ্ধে হাজার হাজার কোটি ডলার মুনাফা করেছে তার কর্পোরেশন।
ভাইস-চেয়ারম্যান মস্ত ব্যবসায়ী ওয়েণ্ডেল রোচ, দুনিয়া খ্যাত গ্রিক কন্টেইনার শিপিং ম্যাগনেট।
র্যানডলফ কিলিয়ান, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বিনিয়োগকারী।
ডিন ম্যাকেনকোর্ট, বিশ্বের সেরা এবং বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সেভেন সি-র হর্তাকর্তা।
ডেমিয়েন ডগলাস এম-১২ কাউন্সিলের সদস্য। চেয়ারম্যান এবং সিইও ড্রাগন কর্পোরেশন। এসব কোম্পানি প্রচুর মিসাইল ও রণতরী তৈরি করে।
আরও কজন বিপুল ক্ষমতাশালী লোকের নাম আছে। ম্যাকিনের ওই তালিকায়।
খুচরা জিনিস বিক্রি করে মস্ত বড়লোক হয়েছে, এমন কয়েকজনের নাম ওই তালিকায় নেই। হলিডে ইন রিসোর্টের পরিবারের কেউ, জাপানি ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, হোণ্ডা বা ফ্রেঞ্চ কসমেটিক্স কোম্পানির লিলি মাখসাখের নাম অনুপস্থিত।
অথচ সুন্দরী মহিলা লিলি মাখসাখের নাম সবাই জানে, সে আছে বিশ্বের প্রথম দশজন ধনীর তালিকায়।
মেজর ডেনিস ই, ম্যাকিন টিভির পর্দায় জানিয়ে চলেছে: এম-১২ কাউন্সিলের বারোজনের ওই তালিকার সবাই বিপুল সম্পত্তি করেছে একটিমাত্র বিষয়কে পুঁজি করে।
নিচু স্বরে কথা বলছে ম্যাকিন:
এরা হাজার হাজার কোটি ডলার মুনাফা করেছে একটিমাত্র বিষয়কে সম্বল করে। তা হচ্ছে যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে র্যান্ড কিলিয়ান প্রতিষ্ঠা করেন একটি লৌহ রাজ্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধ কতটা অপরিহার্য তা নিয়ে প্রচুর বক্তৃতা দেন ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ফ্রান্সিস এলিফ্যান্ট ষাট দশকে। যুদ্ধ করতে চাইলে দরকার বিপুল তেল এবং লোহা। তৈরি করা হয়েছে হাজার হাজার রণতরী, হেলিকপ্টার, অস্ত্র, বোমা, ফার্মাসিটিক্যালস ইত্যাদি দরকারী জিনিস। মস্ত ব্যবসা আরও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে তুলতে হলে চাই দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ। আসলে যুদ্ধই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবসা।
বলে চলেছে ম্যাকিন:
খেয়াল করুন, কীভাবে ঠেকাবার চেষ্টা করা হচ্ছে ইসলামি জঙ্গীবাদ। গত দশ বছরে আফগানিস্তানের পাহাড়ে কমপক্ষে বিশ হাজার বোমা ফেলেছে ইউএসএ। ফলে কী হয়েছে? কোনও সেতু, সাপ্লাই রুট, বা মিলিটারি নার্ভ সেন্টার বিনষ্ট হয়নি। কিন্তু যখনই ফেলা হয়েছে বিশ হাজার বোমা, তখনই নতুন বোমার চাহিদা তৈরি হয়েছে। তার মানেই, আমেরিকার সরকার কিনতে বাধ্য হয়েছে নতুন বোমা। আফগানিস্তানের পর কী হলো? অবাক কাণ্ড, খুঁজে পাওয়া গেল নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এবার আবারও ইরাক।
পর্দায় ভেসে উঠেছে আরেকটা কাট:
এসব ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের ক্ষমতা বা প্রভাবকে ছোট করে দেখবেন না। তারাই জন্ম দেয় প্রেসিডেন্টদেরকে। আবার তারাই ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয় পছন্দ না হলে। বিল ক্লিন্টনের ইমপিচমেন্ট থেকে শুরু করে প্রাক্তন কেজিবি এজেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনকে রাশার ক্ষমতায় পৌঁছে দেয়া–এসবই করেছে ম্যাজেস্টিক-১২। তারাই ঠিক করেছে এরপর ক্ষমতায় কে বসবে, এবং কতক্ষণ থাকবে। এরা সরাসরি প্রেসিডেন্টদের ক্যাম্পেইনে টাকা লগ্নি করেনি, কিন্তু ইচ্ছে করলেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিতে পারে।
ম্যাজেস্টিক-১২ যোগাযোগ রেখেছে দুনিয়ার সেরা সব ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির কর্তাদের সঙ্গে। প্রাক্তন সিআইএ-র ডিরেক্টর ছিলেন ফ্রান্সিস এলিফ্যাণ্টের ব্যবসায়ীক পার্টনার। এমআই-৬-এর প্রধান ওয়েলে রোচের শালা। ডেমিয়েন ডগলাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে ডিজিএসই-র ডিরেক্টর।
আসলে, হাসল মৃত ডেনিস ই, ম্যাকিন, কোনও দেশের বড় নেতাদের নাড়ির খবর বেশি জানবে কারা? সন্দেহ কী ওই দেশেরই ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস!
টিভির পর্দায় গম্ভীর হয়ে গেল ম্যাকিন।
ম্যাজেস্টিক-১২ বিশ্বের সবকিছুর চেয়ে ঢের বেশি ভালবাসে বড় ধরনের যুদ্ধকে। আসলে এসব যুদ্ধই অকল্পনীয় বড়লোক করে তুলেছে তাদেরকে। আর যে যুদ্ধ বাধেইনি, সেই না-লড়াই করা যুদ্ধে, অর্থাৎ ইউএস ও সোভিয়েতদের কোল্ড ওঅরের ফলে অন্যসব বড়লোকের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে এরা।
পরবর্তীতে ডেযার্ট স্টর্ম, বসনিয়া, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক যুদ্ধ… কিন্তু এরা সোনার খনি পেয়েছিল কোল্ড ওঅরের সময়। তখনই আমস্ রেস শুরু করে আমেরিকা ও রাশা, ফলে প্রচ্ছন্নভাবে লড়াই বাধে দুই দেশের। লাখ লাখ মানুষ মরতে থাকে কোরিয়া ও ভিয়েতনামের যুদ্ধে। আর ওই কোল্ড ওঅরের সুবিধা নিয়ে হাজার হাজার কোটি ডলার মুনাফা করে ম্যাজেস্টিক-১২।
কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। উনিশ শ একানব্বই সালে সর্বনাশ হলো তাদের। পতন হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের।
ফাটল-ধরা বাঁধের মত ভেঙে পড়ল বার্লিন প্রাচীর। সাধারণ আমেরিকান ভোক্তাদের মনে হলো, উপভোগ করা উচিত জীবনটা। তাদের মত করেই নানা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে লাগল দুনিয়ার আর সব দেশের মানুষ। এতে খুবই উপকৃত হলো সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তারা মস্ত বড়লোকদের তালিকায় জায়গা করে নিতে লাগল। বিশ্বের নানাদিকে ছড়িয়ে গেল তাদের পণ্য। এর ফলে দুনিয়া-সেরা ধনীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আমেরিকার মিলিটারি ম্যানুফ্যাকচাররা বুঝল, তারা হারাতে শুরু করেছে ব্যবসা। তাদের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা করতে লাগল খুচরা পণ্যের ব্যবসায়ীরা। নাইকি, কোকা-কোলা, মাইক্রোসফট… বা ইউরোপিয়ান কোম্পানি বিএমডাব্লিউ বা লরেল… তারাই বাজার। দখল করতে লাগল।
কাজেই মহাচিন্তিত হয়ে উঠল ম্যাজেস্টিক-১২-র সদস্যরা। বুঝে গেল, যেভাবে হোক নতুন করে ফিরে পেতে হবে নিজেদের সাম্রাজ্য।
সামনের ফাইল থেকে আরেকটা ডকুমেন্ট নিল ম্যাকিন। ওটা তুলে ধরল ক্যামেরার দিকে।
…এটা নতুন এক কোল্ড ওঅরের খসড়া।
হাতের উপর চোখ নামিয়ে আনল খবির, ওই ডকুমেন্ট এখন। ওর হাতেই।
দ্রুত পড়তে শুরু করল খবির।
ওখানে লেখা:
সোর্স শিপ ডেলিভারি সিস্টেম ডাব্লিউএইচ অরিজিন টার্গেট টাইম
লোটাস শাহাব-এস টিএনবি ৫৬০১.০১ ০০০০১.৬৪ ১১.৪৫
লোটাস শাহাব-এস টিএনবি ৫০০০২.০০ ৫২৩১.০০ ১১.৪৫
সেইম ৩৫৭০১.২০ ০৪২১-০১ ১১.৪৫
সেইম ৫০০২.০০ ৪৯০০.২৪ ১১.৪৫
সেইম ৩৫৭০১-২০১২৩১৩-১৫ ১১.৪৫
সেইম ৫০০০২ ৫৩৫৮.৭৪ ১১.৪৫
কর্পোরেশন সেইম ২৮৭৪৪-০৫ ২৬৭৪৩-১৭ ১২.০০
কর্পোরেশন সেইম ৪১০৫-৫৪ ৪১০৩.৬৪ ১২.০০
সেইম ২এ৭৪৩-০৪ ২৬২৪১-০৪ ১২.০০
সেইম ৪১০৫-৫এস ৩৬৩৬-৬০ ১২.০০
রুবল টেপও-ডং-২ এন-৮ এনএফএল ৩২২২২-বি ২৩২২২-৬৯ ১২.১৫
রুবল টেপও-ডং-২ এন-৮ এনএফএল ৩৭৪৪-৭৬৩৭৪৫-৬৫ ১২.১৫
সেইম ২৩২২২-৬৩ ২৪২৩০-৫০ ১২.১৫
সেইম ৩৭৩৪-৭৫ ৩৪৩৩-০২ ১২.১৫
সেইম ২৩১৫৭-০৬ ২৩১৫৬.৫০ ১২.১৫
সেইম ৩৭৪৫-৭৪ ৪১৩১-৫১ ১২.১৫
হোপ সেইম ১১১০০-০১ ১১৬২২১.৬০ ১২.১৫
হোপ সেইম ২৩২৭-০১৪০০১-০০ ১২.১৫
সেইম ১১১০০-০১১১৪৪৫-৭০ ১২.৩০
সেইম ২৩২৮-০০ ২২৪৩-২৮ ১২.৩০
ডলফিন শাহাব-এস টিএনবি ০৭৭২৫-০৫২৩২৭-০১ ১২.৪৫
ডলফিন শাহাব-এস টিএনবি ২৩২৭.০১২৯৫৮.০৬ ১২.৪৫
সেইম ০৭০৪০৪৪ ০৭৩৩২-৬১ ১২.৪৫
সেইম ২৩২৭-০০৩২৩০-৫১ ১২.৪৫
………………
একের পর এক নাম ও সংখ্যা দেখছে খবির। প্রথমে আগামাথা কিছুই বুঝল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠল। চিনে ফেলল দুটো নাম:
শাহাব-৫ এবং টেপও-ডং-২।
দুই দেশের বিখ্যাত দুই লং-রেঞ্জ ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল।
শাহাব-৫ তৈরি করেছে ইরান। এবং উত্তর কোরিয়া তৈরি করেছে টেপও-ডং-২।
একবার আল-কায়েদা গ্লোবাল জিহাদের মত সন্ত্রাসী সংগঠন নিউক্লিয়ার বোমাবাহী মিসাইল পেলে প্রথমেই পশ্চিমাদের বড় সব শহরে ফেলবে। ফলাফল হবে ভয়ঙ্কর। পাল্টা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পশ্চিমারা তাদের আণবিক বোমাবাহী মিসাইল ফেলবে এশিয়ার ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর রাজধানীর উপর।
সন্ত্রাসীরা এসব মিসাইলে নিউক্লিয়ার বোমা, রেখেছে।
টিএন-৭বি বা এনএফএল।
নোটেশনের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, টিএন-৭বি ও এন-৮ নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড।
টিএন-৭বি ফরাসীদের আণবিক ওয়ারহেড। উত্তর কোরিয়ার আণবিক ওয়ারহেড এন-৮।
বাংলাদেশ আর্মির কমিশণ্ড অফিসার পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য কিছুদিন পর পরীক্ষা দেবে খবির, কাজেই নানা অস্ত্র ও বোমা বিষয়ে লেখাপড়া করছে, নইলে ওর মাথার উপর দিয়ে। যেত এসব।
অন্য চিন্তা এল ওর মনে। এই তালিকা কোনও সন্ত্রাসী সংগঠনের নয়। এটা তৈরি করেছে ম্যাজেস্টিক-১২। তখনই চক্কর দিয়ে উঠল খবিরের মাথা।
এমন কী হতে পারে, গোপনে টেরোরিস্ট অর্গানাইযেশনের নাম ভাঙিয়ে দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে চাইছে ম্যাজেস্টিক ১২?
চট করে প্য বাটন টিপে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল ম্যাকিনের কথা।
বলে চলেছে ইজরায়েলি এজেন্ট:
নতুন এক শীতল লড়াই শুরু হয়েছে টেরোরিযমের বিরুদ্ধে।
আর ইউএস-এর দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ তৈরি করতে চাইছে ম্যাজেস্টিক-১২। ওই দুই প্রজেক্ট: লিযার্ড এবং নোয়ায শিপ। নোয়ায শিপগুলো আসলে লঞ্চ ভেসেল। কেউ বুঝবে না ওগুলো কন্টেইনার শিপ বা সুপারট্যাঙ্কার নয়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ছদ্মবেশী মিসাইল লঞ্চিং রণতরী। সুপারট্যাঙ্কারগুলো তৈরি করেছে ওয়েণ্ডেল রোচের শিপিং গ্রুপ। এদিকে এসব জাহাজের মিসাইল লঞ্চ সিস্টেম তৈরি করেছে ভার্জিনিয়ার নরফোক ও গুয়ামের ড্রাগন কর্পোরেশনের প্লান্টগুলো। স্বাভাবিক চেহারার সুপারট্যাঙ্কার ও কন্টেইনার শিপ–দুনিয়ার যে-কোনও সাধারণ বন্দরে অপেক্ষা করবে। কারও নজর পড়বে না ওগুলোর উপর। ইউএস সরকার এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছে: নোয়ায শিপ।
এদিকে লিয়ার্ড প্রজেক্ট আরও ভয়ঙ্কর। আগে কখনও ইউনাইটেড স্টেটস এত বিপজ্জনক প্রজেক্ট হাতে নেয়নি। কাজ করা হয়েছে মিসাইলগুলোর ভিতর। আপনারা আগেই জেনেছেন, ডকুমেন্টের ওই মিসাইলগুলো আসলে সম্পূর্ণ শাহাব বা টেপও-ডং নয়।
ওগুলো আসলে ইউএস-এর তৈরি ক্লোন মিসাইল। নিশ্চয়ই জানেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মিসাইলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রতিটির ব্যক্তিগত চলনবলন আলাদা। ফ্লাইট সিগনেচার, কন্ট্রেইল ওয়েক ইত্যাদি। এমন কী আঘাত হানবার পরেও সেসব বৈশিষ্ট্য রয়ে যায়। আর এটাই এক্সপ্লয়েট করবে লিয়ার্ড প্রজেক্ট। ইউএস-এর সবচেয়ে কালো প্রজেক্ট ওটি। সরকার নিজেই তৈরি করছে নকল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল। এবং এসব মিসাইলের বৈশিষ্ট্য হবে অন্য কোনও দেশের মিসাইলের মত।
ক্লোন মিসাইল।
কিন্তু লিয়ার্ড প্রজেক্ট শুধু ইরানিয়ান শাহাব বা উত্তর কোরিয়ার টেপও-ডং-এ সীমাবদ্ধ নেই। ভারতীয় অগ্নি-২, পাকিস্তানী ঘৌরি-২, তাইওয়ানিজ স্কাই হর্স, ইউকের ট্রাইডেন্ট ১১ ডি-৫, ফ্রেঞ্চ এম-৫, ইজরায়েলি জেরিকো ২বি এবং রাশান এসএস-১৮ মিসাইলকে অনুকরণ করে তৈরি করা হয়েছে ইউএস-এর এসব মিসাইল।
এগুলো নানামুখী যুদ্ধ সৃষ্টির জন্যে। আক্রান্ত দেশ ভাববে অমুক দেশ হামলা করেছে তাদের উপর। অর্থাৎ ইউএসএ কোনও দেশের ঘাড়ে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চাইলে নকল কোনও মিসাইল ফেলবে। দোষ হবে অন্য দেশের।
লিয়ার্ড প্রজেক্টের পুরো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল ড্রাগন কর্পোরেশনকে। আর নকল সুপারট্যাঙ্কার ও কন্টেইনার শিপগুলো তৈরি করেছে ওয়েণ্ডেল রোচের কর্পোরেশন। এবং সেকারণেই দুনিয়া জুড়ে ভয়ঙ্কর প্রলয় ঘটতে পারে। দুই প্রজেক্টের দুই কন্ট্রাক্টার কোম্পানিরই মালিক, এম-১২-র সদস্যরা।
এবং অক্টোবরের পনেরো তারিখে সকাল পৌনে বারোটার সময় বৃষ্টির মত পড়বে নিউক্লিয়ার মিসাইল। আগে কখনও এমন দেখেনি মানুষ। সব কোঅর্ডিনেট করা। নিখুঁত। পনেরো মিনিটের ব্যবধানে একের পর এক মিসাইল পড়বে। গোটা দুনিয়ার মিডিয়া একটা খবর জানাতে না জানাতেই নতুন মিসাইল হিটের খবর আসতে থাকবে। দুনিয়ার মস্ত সব শহর ধ্বংসস্তূপ হবে। লণ্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, বার্লিন… ভয়ঙ্কর গোলমাল বাধবে। আতঙ্কিত হয়ে উঠবে সবাই। ভাবতে থাকবে: এর পর না জানি কোন শহর ধ্বংস হবে!
আর মিসাইলের বৃষ্টি শেষ হলে, তদন্তকারী অফিসাররা বুঝতে শুরু করবে মিসাইলগুলোর ক্যারেকটারিস্টিক ও ব্লাস্ট সিগনেচার। সমস্ত বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যাবে, এসব মিসাইল ছিল ইরান ও উত্তর কোরিয়ার।
টেরোরিস্ট দেশের মিসাইল।
ঘৃণা ভরে ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে পরিত্যাগ করবে বেশিরভাগ দেশ। আর স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশের জনগণ আতঙ্ক কাটিয়ে খেপে উঠবে। ফলাফল: জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে তুমুলভাবে নামবে শক্তিশালী দেশগুলো। গত কয়েক বছর ধরেই ওই লড়াই চলছে। এবং কমপক্ষে আগামী পঞ্চাশ বছর চলবে ভয়ঙ্কর লড়াই। শুরু হবে নতুন কোল্ড ওঅর। ব্যস্ত হয়ে উঠবে মিলিটারি ইণ্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সগুলো। আগে কখনও এত অস্ত্র লাগেনি কোনও দেশের। এবং নানাধরনের অস্ত্র তৈরির মাধ্যমে ম্যাজেস্টিক-১২ শত-সহস্র বিলিয়ন ডলার মুনাফা করবে।
খবিরের মনে হলো, ঘুরছে ওর মাথা। এসব কী শুনছে ও? ছদ্মবেশী সুপারট্যাঙ্কার। ক্লোন মিসাইল। সবই তৈরি করেছে আমেরিকান সরকার। প্রয়োজনে সর্বনাশ করে দেবে যে-কোনও দেশের। নকল মিসাইল ফেলে দুই দেশের ভিতর যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে।
আপাতত এসব হয়তো করবে না আমেরিকান সরকার, কিন্তু ক্লোন মিসাইল প্রস্তুতকারীরা বা ম্যাজেস্টিক-১২-র সদস্যরা তাদের প্রয়োজনে এখনই নতুন কোনও যুদ্ধ বাধাতে চাইছে।
নিউ ইয়র্ক, লণ্ডন, প্যারিস, বার্লিন….
ক্ষতিগ্রস্ত এসব দেশের সেনাবাহিনী ছাড়বে কেন, তারাও পাল্টা হামলা করবে শত্রুদেশে। মরবে কোটি কোটি মানুষ।
আবারও তালিকায় মনোযোগ দিল খবির। সংখ্যাগুলো কো-অর্ডিনেট।
দুধরনের কো-অর্ডিনেট। লঞ্চ করা হবে জাহাজ থেকে। আর পড়বে গিয়ে নির্দেশিত শহরে।
এবার নোয়ায শিপ প্রজেক্টের সুপারট্যাঙ্কারগুলোর নাম পড়ল খবির। লোটাস, কর্পোরেশন, রুবল, হোপ এবং ডলফিন। এসব জাহাজ ব্যবহার করে নতুন বিশ্ব সৃষ্টি করতে চাইছে ম্যাজেস্টিক-১২।
খবির ভাবল, এসবের সঙ্গে মাসুদ স্যর বা অন্য কয়েকজনের সম্পর্ক কী?
তাদেরকে মেরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে কেন?
কীসের জন্য বাউন্টি হান্ট?
আগামীকাল দুপুরের আগেই কেন তাদেরকে শেষ করতে হবে?
ম্যাকিনের একটা কথা মনে পড়ল ওর। কুইন্স টাওয়ারের ছাতে বৃষ্টির ভিতর লোকটা বলেছিল:
সবই রিফ্লেক্সের ব্যাপার। বলতে পারেন সুপারফাস্ট রিফ্লেক্স। ওই তালিকার নয়জন দুনিয়া সেরা। অনায়াসে পাশ করবে সি স্নেক টেস্ট। এরা ডিসআর্ম করতে পারবে টাচলক-৯। আর ওটাই হচ্ছে ম্যাজেস্টিক-১২-র পরিকল্পনা। ওই পরিকল্পনা কাজে লাগাতে হলে আগে ওই লোকগুলোকে শেষ করতে হবে…
টাচলক-৯ মিসাইল সিকিউরিটি সিস্টেম। হা, ওটাই ম্যাজেস্টিক-১২-র মূল পরিকল্পনা। টাচলক-৯… ভাবছে খবির। সামনে পড়ে থাকা ফোল্ডারগুলো ঘাটতে শুরু করেছে। খুঁজছে টাচলক-৯ বিষয়ে তথ্য। বেশিক্ষণ লাগল না ফাইলটা পেতে।
বড় করে মলাটে লেখা:
ড্রাগন কর্পোরেশন- পেটেন্টেড টাচলক
সিকিউরিটি সিস্টেম
ডকুমেন্টগুলো ড্রাগন কর্পোরেশন এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অভ। ডিফেন্সের। প্রথম ডকুমেন্টের মলাটে লেখা:
টপ সিক্রেট
খবির মলাট সরিয়ে প্রথম পাতার প্যারাগ্রাফে চোখ বোলাল।
ডিসআর্ম সিস্টেম-টাচলক-৯
এ ধরনের ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক অস্ত্রের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। লিযার্ড সিরিজের মিসাইলে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ড্রাগন কর্পোরেশনের পেটেন্টেড টাচলক-৯ ডিসআর্ম সিস্টেম। বর্তমান বিশ্বে। সবচেয়ে নিরাপদ অ্যান্টি-ট্যামপার মেকানিম এটি। অভিনব তিনটি নিরাপত্তামূলক প্রোটোকল ব্যবহার করবে টাচলক-৯। একইসময়ে তিনটি নির্দিষ্ট সিকিউয়েন্স ব্যবহৃত না হলে প্রোটোকল অনুযায়ী সিস্টেম (বা ডি অ্যাকটিভেশন) চালু করা সম্ভব হবে না।
এই সিস্টেমের মূল কাজ সমাধা করবে দ্বিতীয় প্রোটোকল। এটি প্রতিষ্ঠিত প্যাটার্ন রেকগনিশন প্রিন্সিপালের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি (হেনেস অ্যাণ্ড সিম্পসন, এমআইটি ১৯৯৪, ১৯৯৭, ২০০১), ফলে এ সিস্টেম কারও চেনা থাকলে, এবং প্রচুর প্র্যাকটিস থাকলে, শুধু তখনই চাহিদা অনুযায়ী কেউ সিকিউয়েন্স প্যাটার্ন পূরণ করতে পারবে। এই সিস্টেম কারও অচেনা হলে, এবং তার মোটর-নিউরাল রিফ্লেক্স অস্বাভাবিক দ্রুত না হলে কেউ-ই এই সিস্টেমকে বশ করতে পারবে না (ওপি. সিইটি. জেফ ওয়াকার এবং ফ্রেড বেইন্স, ইউএসএএমআরএমসি, ন্যাটো এমএনআর আর স্টাডি)।
এসব প্রিন্সিপাল অনুযায়ী, ফিল্ড টেস্ট-এ দেখা গেছে, কর্তৃপক্ষ নয় এমন কেউ টাচলক-৯ ব্যবহার করতে চাইলে এই সিস্টেম থাকে প্রায় ৯৯.৯৫% নিরাপদ। অন্য যে-কোনও মিলিটারি সিকিউরিটি সিস্টেম ব্যবহারে এতটা সাফল্য পাওয়া যায়নি।
প্রোটোকল সমূহ:
টাচলক-৯ ইউনিটের তিনটি প্রোটোকল:
১। প্রক্সিমিটি কর্তৃপক্ষ নন এমন কেউ টাচলক-৯ ইউনিট আর্মিং/ডিসআর্মিং করতে চাইতে পারে, কাজেই এই ইউনিট ডেলিভারি সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি। প্রথম প্রোটোকল ডেলিভারি সিস্টেমের প্রক্সিমিটি। লিয়ার্ড মিসাইলের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটের ষাট (৬০) ফুট দূর থেকে চালু করা সম্ভব হবে টাচলক-৯।
২। লাইট-সেন্সর রেসপন্স ইউনিট: একবার ষাট ফুটের ভিতর ওই ইউনিট নিয়ে গেলে, তখনই শুধু ওয়ায়ারলেস মডেমের মাধ্যমে ডিসআর্ম সিস্টেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে ড্রাগন কর্পোরেশনের অত্যাধুনিক লাইট-সেন্সর ইন্টারফেস কাজ শুরু করবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী জরুরি দায়িত্ব পালন করবে প্যাটার্ন রিকগনিশন সিস্টেম। (দেখুন ন্যাটো এমএনআরআর রিসার্চ প্রোগ্রাম রেজাল্ট, ইউএসএএমআর এমসি।)
৩। সিকিউরিটি কোড: ডিসআর্ম বা ওভাররিড কোড বন্ধ করতে হলে এন্ট্রি ব্যবহার করতে হবে।
শেষ লাইনে হাতে লিখেছে ডেনিস ই. ম্যাকিন:
ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড নির্দিষ্ট করা হয়েছে জেনারেল রেমণ্ড কে, গ্র্যাঞ্জারের মাধ্যমে। নতুন তথ্য অনুযায়ী ওই মার্সেন প্রাইম সংখ্যা এখনও জানা সম্ভব হয়নি।
প্রোটোকল সেকশনে সংযুক্ত করা হয়েছে আরেকটি পৃষ্ঠা। ওটা মোসাদের ইন্টারসেপ্ট করা টেলিফোন ট্র্যান্সক্রিপ্ট:
ট্র্যান্স লগ: বি-২-৩০০২-৮৭৯
ডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৫১৬ আওয়ার্স ই.এস.টি.
রেক ফ্রম: ড্রাগন কর্পো, নরফোক, ভিএ, ইউএসএ
কাটসা: ডেনিস ই. ম্যাকিন (৪৪৩-৭৬০২)।
ভয়েস ওয়ান (জেংকিন্স, আর.জে. ড্রাগন চিফ অভ ইঞ্জিনিয়ারিং): স্যর, ডি.ও.ডি ইন্সপেকশন রিপোর্ট ভাল। আমাদের অগ্রগতি দেখে তারা খুবই খুশি। বিশেষ প্রশংসা করেছে টাচলক-৯ পরীক্ষা করে। যিশু, এরা যেন নতুন খেলনা পাওয়া বাচ্চা হয়ে উঠেছিল। বারবার কোড ভাঙতে চেয়েছে।
ভয়েস টু (ডেমিয়েন ডগলাস, ড্রাগন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও সিইও): খুবই খুশি হলাম, জেংকিন্স। এক্সেলেন্ট। আর কিছু?
ভয়েস ওয়ান (জেংকিন্স); এরা জানতে চেয়েছে পরেরবার কখন ইন্সপেকশন করবে। ডি.ও.ডি. পরবর্তী তারিখ চাইছে।
ভয়েস টু (ডেমিয়েন ডগলাস): অক্টোবর মাসের পনেরো তারিখ হলে কেমন হয়? আমাদের প্রজেক্টের কয়েকজন পার্টনার সময়টা পেলে খুশি হবে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল খবির।
তার মানে কোনও কারণে ওই তারিখকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অক্টোবরের পনেরো। অর্থাৎ আগামীকাল।
ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্সের ইন্সপেক্টররা হাজির হবে ডেমিয়েন ডগলাসের ইন্সটলেশন প্লান্টে।
পরের ডকুমেন্ট পড়তে শুরু করেছে খবির। এবং ঠিক তখন। হঠাৎ করেই বুঝল, কেন শুরু হয়েছে বাউন্টি হান্ট।
সব ডকুমেন্টের ভিতর এই সামান্য নথি, কিছুই নয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওটা ড্রাগন কর্পোরেশনের একটি ইন্টারনাল ই-মেইল:
ফ্রম: আর. জে.
টু: অল ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ, প্রজেক্ট সি-০৫১
ডেট: অক্টোবর ১, ৮:৪৫ পি.এম.
সাবজেক্ট: নেক্সট ডি.ও.ডি, ইন্সপেকশন
লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলমেন, আপনাদেরকে জানাই আমার কৃতজ্ঞতা। আমাদের ছয়মাসের পরিশ্রম পণ্ড হয়নি। খুব ভালভাবেই শেষ হয়েছে ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্স কমিটির ইন্সপেকশন। আপনারা প্রচণ্ড পরিশ্রম। করেছেন, তাই সবাইকে জানাই ধন্যবাদ।
ডি.ও.ডি.-র তারা মুগ্ধ হয়েছেন আমাদের অগ্রগতি দেখে। হতবাক হয়েছেন আমাদের টেকনোলজিকাল উন্নতি দেখে।
এবং বহু সাধনার পর শেষ হয়ে এসেছে আমাদের কাজ। অক্টোবরের ১৫ তারিখে নরফোক ইন্সটলেশন প্লান্টে শেষ ইন্সপেশনের জন্য দুপুর বারোটার সময় জড় হব আমরা। অবশ্য সবাইকে জায়গা করে দেয়া সম্ভব নয়। আপনাদের পক্ষ থেকে হাজির হবেন প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের প্রধান। এ ইন্সপেশনের এক সপ্তাহ আগে থেকেই কঠোর সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের ভিতর দিয়ে যেতে হবে।
আর.জে.
টনক নড়ে গেছে খবিরের।
আগামীকাল অক্টোবরের ১৫।
ড্রাগন কর্পোরেশনের ভার্জিনিয়ার নরফোক-এ মিসাইল নির্মাণ ফ্যাসিলিটিতে ইন্সপেশনে যাবে আমেরিকার নিরাপত্তা বিভাগের অফিসাররা।
তখনই টের পাবে, ওই প্লান্টে কিছু বদলে গেছে। পাল্টে নেয়া হয়েছে কিছু মিসাইল। বা কিছু মিসাইল কম থাকবে। বা আরও কিছু। তখনই আমেরিকার সরকার খুঁজতে বাধ্য হবে। মাসুদ স্যরকে। কারণ গোটা দুনিয়ায় তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি টাচলক সিস্টেম ডিসআর্ম করতে পারেন।
এমন মানুষ, যার রিফ্লেক্স টাইফুনের মত। ওই তালিকা। ওখানে স্যরের মত আরও কয়েকজন আছে।
আরেকটা চিন্তা ঢুকেছে খবিরের মগজে। যে কারণেই হোক, ডেমিয়েন ডগলাস এবং ম্যাজেস্টিক-১২ চাইছে আমেরিকার সরকার আগামীকাল ইন্সপেকশন করুক। কারণটা কী, বুঝতে পারছে না ও। কিন্তু ওই লোকগুলোর পরিকল্পনার একটা অংশ ওই ইন্সপেকশন।
আরেকটি বিষয় আরও পরিষ্কারভাবে বুঝল খবির।
ওই বাউন্টি হান্ট বোধহয় সতর্ক করে দেয়ার জন্য। এম-১২ সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সঙ্গে লাগতে এসো না।
এখন ওসব বাদ যাক।
আগামীকাল দুপুর বারোটার আগেই আমেরিকার সরকার। হাড়ে হাড়ে টের পাবে, মস্ত কোনও গোলমাল আছে ড্রাগন কর্পোরেশনের নরফোক প্লান্টে। লিযার্ড মিসাইল বদলে গেছে। বা উল্টোপাল্টা করছে নোয়ায লঞ্চ শিপগুলো। আর ওই পরিবর্তন ম্যাজেস্টিক-১২ কাউন্সিলের প্রয়োজন। নইলে হয়তো শুরুই হবে না নতুন কোল্ড ওঅর।
আমাদের দ্রুতগতি বিমান লাগবে, গম্ভীর সুরে বলল খবির। ঘুরে চাইল চার্লস ডেলাসের দিকে। আপনাদের দেশের নিরাপত্তা বিভাগে যোগাযোগ করুন। বলবেন, যেন আগেই শুরু হয় নোয়ায-লিয়ার্ড ইন্সপেকশন। গুয়ামের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সতর্ক করুন। তদন্ত করা হোক ড্রাগন কর্পোরেশনের সব প্লান্টে।
তাই করা হবে, কথা দিল ডেলাস।
নানান সংখ্যার লঞ্চ লিস্ট আবারও দেখল খবির। ওখানে রয়েছে লঞ্চ সাইটের জিপিএস কো-অর্ডিনেট এবং টার্গেট। খুঁজে বের করুন কোথা থেকে এসব মিসাইল উৎক্ষেপ করবে। আর ওগুলো পড়বেই বা কোথায়।
নিজেই দেরি না করে সামনের কমপিউটারে জিপিএস প্লটিং প্রোগ্রাম চালু করল খবির। স্যাটালাইট রেডিয়োতে বলল, স্যর! আমি খবির! ভয়ঙ্কর খারাপ খবর আছে…
চার
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের কাছেই।
ব্রিটানির উপকূল, দ্য রিপাবলিক অভ ফ্রান্স।
অক্টোবরের, ১৪। বিকেল সাড়ে পাঁচটা।
একটু আগে কুয়াশা ও তিশার ট্রাকের সামনে ঝুলছিল ড্রাগন কর্পো লেখা কপ্টার। এখন দুই বন্দিকে নিয়ে পাহাড়ের উপর দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। ওই কপ্টার ফোট্রেস
দো শ্যাটিয়নে ফিরিয়ে নিচ্ছে কুয়াশা ও আহত তিশাকে।
পাহাড়ের পায়ের কাছে সাগরের গভীর অংশে ভাসছে একজন। একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওই কপ্টারের দিকে।
মাসুদ রানা।
জ্বলন্ত ম্যাগ রিগ রাস্তা ছাড়তেই গিয়ে লাগল ভাসমান মিরাজ ফাইটারের নাকে, কিন্তু তখন ওখানে ছিল না রানা।
রাস্তা থেকে ট্রাকের চাকা সরতেই ড্রাইভারের দিকের দরজা। খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মুহূর্তের জন্য ওর মাথার উপর দিয়ে গেছে ট্রাক।
তারপর ফাইটারে গিয়ে লাগল ইয়াজদাহা রিগ। তখনই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হলো। আওয়াজে তালা লেগে গেল কানে। চারপাশে ছিটকে গেল ভাঙাচোরা, পোড়া ধাতব টুকরো।
ওই বিস্ফোরণের তিরিশ ফুট নীচেই ছিল রানা। সাঁই-সাই করে পড়ছে, আর তখনই দেখল, উপরে কমলা আগুনের গোলা। তিশা বা কুয়াশা ওর পতন দেখেনি। ট্রাক থেকে খসে পড়বার সময় নিজেকে সত্যিকারের বুলেট মনে হয়েছে রানার।
প্রথমে ভেবেছিল ম্যাকহুক ব্যবহার করবে। পরক্ষণে মনে পড়ল, ওটার প্রপেল্যান্ট শেষ।
পড়তে লাগল ও, কিন্তু তখনও ট্রাকের গতিবেগের কারণে একপাশে ছিটকে যাচ্ছে। পাশ কাটিয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর। গতি প্রচণ্ড। নীচে দেখল সাগরের অসংখ্য ঢেউ। তীরের মত উঠে আসছে সব। এত উপর থেকে সাগরে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ফেটে চুরচুর হবে দেহ। ব্যাপারটা অনেক উপর থেকে টমেটো ছেড়ে দেয়ার মতই।
কিছু তো করো! নিজেকে ধমক দিয়েছে রানা।
মন উল্টো বলল: গাধা! আমি আবার কী করব!
তখনই মনে পড়ল ওর…
বুকের ওয়েবিঙের রিপকর্ডে হ্যাচকা টান দিল ও।
ওই রিপকর্ড ছিল পিঠে ঝুলে থাকা অ্যাটাক প্যারাশুটের। হারকিউলিস বিমানে উঠবার পর থেকেই ওটা সঙ্গে ছিল। জিনিসটা এতই চ্যাপ্টা, ভুলেই গিয়েছিল ওটার অস্তিত্ব।
ফটাশ আওয়াজ তুলে মাথার উপর ছাতার মত খুলে গেল। অ্যাটাক প্যারাশুট, তখনও আশি ফুট নীচে সাগর।
প্যারাশুট পুরোপুরি মন্থর করল না রানার পতন।
তবে নিরাপদেই নামল সাগরে। ঝপাস্ করে পড়েই তলিয়ে গেল। পরের কয়েক সেকেণ্ডে খুলে ফেলল প্যারাশুটের দড়ি দড়া। নেমে চলেছে নীল পানির ভিতর। চল্লিশ ফুট উপরে বিস্ফোরিত হয়েছে পানি। মস্ত সব বুদ্বুদ তৈরি হলো।
আগেই প্রাণপণে সরতে শুরু করেছে রানা।
কয়েক মুহূর্ত পর নেমে এল ভারী ম্যাক রিগ ও ভাঙা মিরাজের কাঠামো। ধাতব অংশগুলো তখনও আগুনের মত গরম, ফেস-ফেস আওয়াজ তুলছে। রানাকে পাশ কাটিয়ে নেমে গেল অনেক গভীরে। তার আগেই নিভে গেছে সব জ্বালা।
পঁয়তাল্লিশ সেকেণ্ড পর পাহাড়ের সামান্য দূরে ভেসে উঠল রানা। দেখল, সাগরের একটা জায়গা জুড়ে ফাইটার বিমানের অংশ এবং তেল জ্বলছে।
সাবধানে নিজেকে লুকিয়ে রাখল রানা, নানা আবর্জনার ভিতর ভাসছে। দুই মিনিট পর দেখল, পাহাড়ের মাথা টপকে ফিরতি পথ ধরেছে কপ্টার, চলেছে দুর্গের দিকে।
তিশা আর কুয়াশা পালাতে পেরেছে? ভাবল রানা, নাকি বন্দি ওরা কপ্টারের ভেতর?
তিশা! প্রায় ফিসফিস করে থ্রোট মাইকে বলল রানা। আমি বেঁচে আছি। তুমি কোথায়?
জবাবে মৃদু কাশি শুনল রানা। ওদের পুরনো কৌশল। আপাতত কথা বলতে পারবে না তিশা। ওকে বন্দি করা হয়েছে।
একের জন্য হ্যাঁ, দুইয়ের জন্য না–তুমি কি একটু আগে দেখা ড্রাগন কর্পোরেশনের কপ্টারে?
খুক করে কাশির আওয়াজ এল।
তুমি কি ভয়ঙ্করভাবে আহত?
কাশির আওয়াজ। সত্যি গুরুতর আহত?
অস্পষ্ট দুবার কাশি।
কাঠের মত শুকিয়ে গেল রানার গলা।
তোমার সঙ্গে কুয়াশা আছেন?
ছোট্ট কাশি।
ওরা কি তোমাদেরকে দুর্গে নিয়ে যাচ্ছে?
মৃদু কাশি।
ওখানে অপেক্ষা করবে, আমি পৌঁছে যাব।
তীরের দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করবে, তার আগে চারপাশ দেখে নিতে চাইল রানা। ধক্ করে উঠল ওর হৃৎপিণ্ড। মাত্র দু শ গজ দূরে এসে থেমেছে ফ্রেঞ্চ ডেস্ট্রয়ার।
এইমাত্র একদিকের ডেক থেকে সাগরে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে ছোট প্যাট্রল বোট। ওটার নিচ ডেকে কমপক্ষে বারোজন লোক।
সাগরে নামতেই বৈঠা মেরে রওনা হয়ে গেল বোট
আসছে ঠিক ওর দিকেই। চুপ করে ভেসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই।
নিশ্চয়ই অ্যান্টার্কটিকার ওই সাবমেরিন দুর্ঘটনার কথা ভুলে গেছে ওরা, মনে মনে বলল রানা। পরক্ষণে চোখ রাঙানি দিল নিজেকে। তুই হলে কখনও ভুলতি, ব্যাটা?
তখনই কানের ভিতর কথা বলে উঠল ইয়ারপিস।
স্যর! আমি খবির! ভয়ঙ্কর খারাপ খবর আছে!
সন্দেহ কী, মনে মনে বলল রানা। হ্যাঁ, খবির, বলো।
কথা শুনতে পারবেন? সময় লাগবে।
সময় সংক্ষিপ্ত। আটলান্টিকের ঢেউয়ের মাঝে উঠছে নামছে রানা। বলতে যখন চাও, সংক্ষেপে বলো। চোখ রেখেছে বোটের উপর। ওটা মাত্র দেড় শ গজ দূরে। দুঃখের কথা, এবার পৃথিবী ত্যাগ করছি।
নিশ্চয়ই যাবেন, স্যর… তওবা-তওবা! কী হয়েছে, স্যর?
বাদ দাও। কী বলবে বলো।
এখন জেনেছি কেন আপনাকে মেরে ফেলতে চাইছে।
খবির, রেডিয়ো প্যাঁচ করো। তিশা আর কুয়াশাও কথাগুলো। শুনুক। যদিও ওরা কথা বলতে পারবে না।
রেডিয়োর নির্দিষ্ট বাটন টিপে নিল খবির।
সংক্ষেপে বলল সুপারট্যাঙ্কার ও লিয়ার্ড ক্লোন মিসাইলের কথা। নতুন করে কোল্ড ওঅর তৈরি করতে চাইছে এম-১২। বড় শহরগুলোর উপর মিসাইল ফেলবে তারা। টাচলক-৯ সিস্টেম সম্পর্কে বলল, ওটা দিয়ে মিসাইল ডিসআর্ম করতে পারবে ওই তালিকার কয়েকজন। নতুন করে ইউএস ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড বসিয়েছেন জেনারেল এ্যাঞ্জার। ম্যাকিন বলেছে, ওটা মার্সেন প্রাইম সংখ্যা।
কথাগুলো শুনে ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা। মার্সেন প্রাইম… এসব সংখ্যা তো… ওর চোখে ভেসে উঠল জেনারেল এ্যাঞ্জারের ছিন্ন মাথা। ভদ্রলোককে ড্রাগ দিয়েছিল ব্রিটিশ এজেন্টরা। ঠিক কথাই বলছিলেন লিযার্ড প্রজেক্ট সম্পর্কে। আর নোয়ায শিপ.. দুটোই জড়িত প্রজেক্ট। জাহাজ আর মিসাইল মিলে… সব ছদ্মবেশী মারণাস্ত্র। প্রতি সপ্তাহে বদলে নেয়া হবে ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড়। এ মুহূর্তে ওটা সেভেন্থ মার্সেন…
বিমানে ড্রাগ দেয়া জেনারেলের কথা শুনে রানা ভেবেছিল, ভদ্রলোক নেশার ভিতর আবোল-তাবোল বলছেন মার্সেনারিদের বিষয়ে।
তা নয়।
সত্যি কথাই বলছিলেন জেনারেল।
মাত্র বলতে শুরু করেছিলেন সংখ্যা।
খবির সংক্ষেপে সব বলছে, আর একইসময়ে কমপিউটারে লঞ্চ লিস্ট থেকে জিপিএস কো-অর্ডিনেন্টস্ অনুযায়ী টার্গেট কী তা খুঁজতে শুরু করেছে চার্লস ডেলাস। এক সেকেণ্ড পর বলল, আমি প্রথম তিনটা জাহাজের কো-অর্ডিনেটস্ পেয়ে গেছি। পরের লাইনের সংখ্যাগুলো টার্গেট করা শহর।
প্রিন্টআউট বের করে খবিরের হাতে ধরিয়ে দিল সে। কাগজে হাইলাইট করা হয়েছে নির্দিষ্ট সব জায়গার নাম।
চট করে কাগজে চোখ বোলাল খবির। বলল, স্যর, প্রথম জাহাজ ইংলিশ চ্যানেলে। শারবার্গের কাছে। একটু দূরে নরম্যাণ্ডি সৈকত। ওই জাহাজ থেকে লণ্ডন, প্যারিস ও বার্লিনের উপর মিসাইল ফেলা হবে। পরের দুই জাহাজ থেকে মিসাইল পড়বে নিউ ইয়র্ক ও স্যান ফ্রান্সিসকোতে। প্রতিটি জাহাজ কয়েকটা করে শহর উড়িয়ে দেবে।
চুপ করে আছে রানা। এক শ গজ দূরে পৌঁছে গেছে প্যাট্রল বোট।
মনোযোগ দিয়ে কথা শোনো, খবির, বলল রানা। তখনই। নিচু ঢেউ ছলাৎ করে লাগল ওর মুখে। থু-থু করে লবণাক্ত পানিঃ মুখ থেকে ফেলল রানা। এসব জাহাজের বারোটা বাজিয়ে দিতে। পারে সাবমেরিন। যদি তলিয়েই যায় জাহাজ, একটা মিসাইলও। লঞ্চ করতে পারবে না। আমেরিকানদের জানাও, নোয়ায শিপ প্রজেক্টের প্রতিটি জাহাজের জিপিএস লোকেশন লাগবে, তারপর অ্যাটাক সাবমেরিন দিয়ে নিজেদের জাহাজ ডুবিয়ে দিক ওরা।
আলাপে যোগ দিল ডেলাস, এতে কাজ হতে পারে। কিন্তু সব ট্যাঙ্কার ভোবাতে পারব না আমরা।
সেক্ষেত্রে জাহাজে উঠতে হবে। সাইলোর ভেতর ডিসআর্ম করতে হবে মিসাইল। শুনলাম, ডিসঅর্ডার হিসেবে লাইট সিগনাল রেসপন্স ইউনিট ব্যবহার করা হবে। ইউনিটের স্ক্রিনে ভেসে উঠবে ডিসআর্ম প্রোগ্রামের–তথ্য। ষাট ফুটের ভেতর পৌঁছাতে হবে, নইলে কাজ করবে না মিসাইলের কন্ট্রোল কন্সেল। একইসময়ে সব জায়গায় উপস্থিত হওয়া অসম্ভব। বুঝতেই পারছেন, প্রতিটি জাহাজে উঠতে হবে আপনাদের সৈনিকদের। মিসাইলের সঙ্গে আমার স্যাটালাইট কানেকশন থাকতে হবে।
স্যর,-প্রতিটি জাহাজে উঠতে হবে? জানতে চাইল খবির।
হ্যাঁ, খবির। সাবমেরিন জাহাজগুলোকে ডুবিয়ে দিতে না পারলে, প্রতিটি নোয়ায শিপেই উঠতে হবে। মিসাইলের কলোলের ষাট ফুটের ভিতর যেতে হবে। কলোলের স্যাটালাইট আপলিঙ্ক আমার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আর তখনই আমি টাচলক ইউনিট ব্যবহার করে সবকটা মিসাইল থামিয়ে দিতে পারব।
খাইছে, স্যর! বলল খবির। তো আমি কী করব এখন?
আরেকটা ঢেউ ডুবিয়ে দিল রানাকে। ভেসে উঠেই বলল ও, আগে প্রথম তিন জাহাজ ঠেকাও। প্রথমে যাবে নিউ ইয়র্কে, খবির। আর মিস্টার ডেলাসকে বলো মানচিত্রে এসব জাহাজের অবস্থান স্থির করুন। প্রথম জাহাজ আছে ইংলিশ চ্যানেলে। ফ্রান্সের নরম্যাণ্ডি সৈকতগুলোর কাছেই শারবার্গ। কেভিন কনলনের সঙ্গে যোগাযোগ করো। ওকে স্যান ফ্রান্সিসকোতে পাঠাও। এমন লোক চাই, যারা এসব ট্যাঙ্কার। ভাল করে চেনে। যদি বাঁচি, আমি নিজেই ইংলিশ চ্যানেলের জাহাজে উঠব। আরেকটা কথা, খবির, কেভিনের কাছে জিজ্ঞেস করবে, সেভেন্থ মার্সেন প্রাইম নাম্বার কী। যদি না জানে, যেন জেনে নেয়।
আর শেষ কথা, আগামীকাল বারোটার আগেই যেন ড্রাগন কর্পোরেশনের মিসাইল তৈরির কারখানায় হাজির হয় ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্সের ইন্সপেক্টররা। জানতে চাই ওখানে কী ঘটল।
আগেই ওই কাজ করতে বলে দিয়েছি, বলল খবির।
গুড।
আপনি এখন কী করবেন, স্যর?
রানার মাথার পাশে এসে থেমেছে ফ্রেঞ্চ প্যাট্রল বোট। রক্তচোখে ওকে দেখছে নাবিকরা। বাগিয়ে ধরেছে ফ্যামাস অ্যাসল্ট রাইফেল।
এখনও খুন করেনি, নিচু স্বরে বলল রানা। বোধহয় কথা বলতে চাইছে কেউ। তার মানে, এখনই মরব না। দেখা যাক।
কী হয়। …আউট, রানা।
অস্ত্রের মুখে বোটে তুলে নেয়া হলো ভেজা বেড়ালের মত চুপসে যাওয়া মাসুদ রানাকে।
.
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির হেডকোয়ার্টার।
সাব-লেভেল থ্রি। পেন্টাগন। অক্টোবর ১৪। রাত সাড়ে দশটা।
এইমাত্র অফিসে ফিরেছে কেভিন কনলন। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, পরনে নোংরা পোশাক। এতই খারাপ লাগছে শরীর, মন চাইছে। গলা ছেড়ে কাঁদতে। দুপাশে দুই কঠোর চেহারার পুলিশ।
পুলিশ-স্টেশনে ওর বস জন ওয়ার্নের মতই আরেক গাধা অফিসার ওকে আটকে রেখে বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তার ধারণা, কেভিনই একের পর এক খুন করছে বীভৎসভাবে। জিজ্ঞাসাবাদের আগে ব্যাটা বসিয়ে রেখেছে চারঘণ্টা। এবং পরে অসংখ্য প্রশ্নের জবাবে পেট থেকে বেরয়নি কিছুই ওর। কেভিন বলতে পারত, চাকরি করে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির হেড কোয়ার্টারে। কিন্তু কিছুই বলেনি। মনে ছিল ভীষণ ভয়, এরাই হয়তো খুনি বা বাউন্টি হান্টার এবার হয়তো শেষ করে দেবে ওকে। অনেক পরে ভাবল, হতাশ হয়ে ছেড়ে দেবে অফিসার। কিন্তু গাধাটা যখন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আগামীকাল কোর্টে খুনি হিসাবে ওকেই চালান দিতে চাইল, বাধ্য হয়ে অফিসের ঠিকানা এবং ফোন নম্বর দিয়েছে। এর আধঘণ্টা পর গম্ভীর দুই পুলিশের পাহারায় ওকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে পেন্টাগনের এই অফিসে।
কেভিনের জন্যই অপেক্ষা করছিল জন ওয়ার্ন, রাগে গরগর করছে মনে মনে। অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে তার। কিন্তু মেরিয়ান রয়ে গেছে কনলনের খবর পাওয়ার জন্য, কাজেই… এখন পাশে দাঁড়িয়ে আছে রূপসী মেয়েটি।
কনলন! গর্জে উঠল ওয়ার্ন, শুনি, কোন চুলায় গিয়েছিলে!
এবার আজকের মত ছুটি নেব, নিচু স্বরে বলল কনলন।
তা তো নেবেই, বাঁকা হাসল ওয়ার্ন। কিন্তু তার আগে
কিছু কথার জবাব দিতে হবে। পেন্টাগনের সিকিউরিটি রেগুলেশনের ৪০২ এবং ৪০৩ আইনের আওতায় নিয়ম ভাঙার কারণে…
বড্ড ক্লান্ত কনলন, হতাশ হয়ে মেনে নিল এবার তাকে ঝাড়া হবে জঘন্য ভাষায়। ওয়ার্ন লোকটা আস্ত ডাকাত। আর সামনে কোনও সুন্দরী মেয়ে থাকলে তো…
…এবং এরপর ঘাড় ধরে বের করে দেয়া হবে তোমাকে এই অফিস থেকে। আর চাকরি থাকছে না তোমার। এবার হাড়ে হাড়ে টের পাবে, বিশেষ কেউ নও তুমি। …তোমার গায়ে টোকা দেয়া যাবে না, তাই ভেবেছ! তোমার মত কাপুরুষ… চট করে মেরিয়ানের দিকে দেখে নিল ওয়ার্ন। একদিন এ সুযোগ পাবে ভেবে নিরানন্দ জীবন পার করছিল সে। হ্যাঁ, তোমার মত কাপুরুষরাই এ দেশের মস্ত ক্ষতি করছে। আর যারা আমার মত দেশের জন্য লড়াই করতে ভয় পায় না, যারা শক্ত হাতে ধরতে জানে অস্ত্র, নিজ জীবন দিয়ে দিতে পারে…
কথাটা শেষ করতে পারল না সে।
কারণ তখনই ঝড়ের মত অফিসে এসে ঢুকল বারোজনের রেকনেসেন্স মেরিনদের একটি দল। পরনে পূর্ণ ব্যাটল ড্রেস, হাতে ভারী অস্ত্র –কোল্ট কমাণ্ডো অ্যাসল্ট রাইফেল, এমপি-৭, চোখে খুনির দৃষ্টি।
বিস্ফারিত হলো কেভিন কনলনের দুই চোখ।
মেরিনদের নেতা দাঁড়িয়ে পড়ল ঘরের মাঝে। কঠোর সুরে বলল, আমি মেজর স্কট মোসলে, ইউনাইটেড স্টেটস্ অভ মেরিন কর্পস। কেভিন কনলনকে খুঁজছি।
মস্ত ঢোক গিলল কেভিন।
হাঁ হয়ে গেছে সুন্দরী মেরিয়ান। কী অপরাধ করেছে আপাত নিরীহ কেভিন? মনটা দমে গেল ওর। সত্যি পছন্দ করতে শুরু করেছিল ভদ্র এই যুবককে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে…
ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে, ওয়ার্ন। কী হয়েছে, স্যর? মিহি সুরে বলল, কী করেছে এই কালপ্রিট?
ওয়ার্নের সামনে থামল মেজর। বিশালদেহী লোক সে। সারা দেহে পোক্ত পেশি। ব্যাটল ড্রেসে তাকে আজকালকার সিনেমার সব রোবটের মত দেখাচ্ছে।
তুমি বোধহয় জন ওয়ার্ন? বলল সে, আমার কাছে নির্দেশ এসেছে স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। ভয়ঙ্কর এক আন্তর্জাতিক দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। আর সেকারণে মিস্টার কনলন এ মুহূর্তে দেশের চার নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি
আমাকে বলে দেয়া হয়েছে, দরকার পড়লে জীবন দিয়েও তাকে রক্ষা করতে হবে। এখনই এস্কোর্ট করে নিয়ে যাব ওঁকে। কাজেই, মিস্টার ওয়ার্ন, সামনে থেকে সরে যাও।
হতবাক হয়ে ছাগলের মত ঘোলাটে চোখে চেয়ে রইল ওয়ার্ন। একেবারেই ভেঙে চুর-চুর হয়ে গেল বুকটা। হাড় শয়তান কেভিন কনলনকে বাদ দিয়ে এখন আর ওর প্রতি আগ্রহ দেখাবে মেরিয়ান?
মুগ্ধ চোখে কেভিনের দিকে চেয়ে আছে মেরিয়ান।
অবাক চোখে নোংরা পোশাক পরা যুবককে দেখছে মেজর।
ইতস্তত, করল কনলন, কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে করবে না, বুঝতে পারছে না। আজ দুপুর থেকে যা শুরু হয়েছে!
মিস্টার কনলন, বলল মেজর মোসলে, মিস্টার রানার তরফ থেকে এক বাংলাদেশি সার্জেন্ট আমাকে পাঠিয়েছে। জানিয়েছে, আবারও আপনার বিশেষ সাহায্য প্রয়োজন মিস্টার রানার। আমার কথা বিশ্বাস না করলে…
রেডিয়ো বাড়িয়ে দিল মেজর।
ওটা নিল কেভিন।
ওয়ায়ারলেস যন্ত্রটা থেকে কথা বলে উঠল সার্জেন্ট খবির।
আধঘণ্টা পর চার্টার্ড এক এগযেকিউটিভ জেট বিমানে উঠল কনলন।
প্রায় সুপারসনিক গতি তুলে রওনা হলো বিমান স্যান ফ্রান্সিসকো শহর লক্ষ্য করে।
এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে ওকে ব্রিফ করেছে খবির। খুলে বলেছে কী কারণে কেভিনের সহায়তা মাসুদ রানার প্রয়োজন। আরেকটা বিষয় জানতে চেয়েছে: কী আসলে সেভেন্থ মার্সেন প্রাইম নাম্বার।
সেভেন্থ মার্সেন নাম্বার? বলেছে কনলন, ওটা বের করতে কলম লাগবে, কয়েকটা কাগজও। আর… ও, একটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর।
এ মুহূর্তে প্যাসেঞ্জার কেবিনে বসে মাথা খাটাতে শুরু করেছে ও। খসখস করে লিখছে প্যাডে। গভীর মনোযোগ। খেয়ালই নেই দেশের আরেক প্রান্ত লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে একা।
অবশ্য একা বললে চরম মিথ্যা হবে, ওর দেখভাল ও পাহারার কাজে রয়েছে ইউএস মেরিন কর্পসের বারোজনের চৌকস একটি দল।
পাঁচ
হোয়াইট হাউস।
ওয়াশিংটন, ইউএসএ। অক্টোবর ১৫। সকাল সোয়া নয়টা। অনেক লোকের গুনগুন হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে। নানাদিকে ছুটছে এইড।
সিকিয়োর ফোনে কথা বলছেন মস্ত সব জেনারেল ও অ্যাডমিরালরা।
প্রত্যেকের মুখে একটু পর পর নোয়ায শিপ, লিয়ার্ড প্রজেক্ট এবং মাসুদ রানার নাম উচ্চারিত হচ্ছে।
কিন্তু কেউ হদিস দিতে পারছে না বিসিআই-এর এজেন্ট মাসুদ রানা কোথায়।
নেভির এক অ্যাডমিরালের আগে হনহন করে হেঁটে মস্ত রুমে ঢুকলেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর কানে ফোন রেখে পিছনে হাঁটছেন অ্যাডমিরাল রনসন।
মিস্টার প্রেসিডেন্ট, নিচু স্বরে বললেন, গতকালই চার্লস ডেলাক্রুসের সঙ্গে কথা হয়েছে। মিস্টার রানা বলেছিল অ্যাটাক সাবমেরিন ব্যবহার করতে। কিন্তু আমরা তার সঙ্গে একমত নই। কোথাকার কোন্ ভেতো বাঙালি বলবে, আর আমরা তার কথায় নাচতে থাকব… স্যর, আপনি নিশ্চই চান না ইউএস নেভি ওই লোকের সামান্য অঙ্গুলি নির্দেশে…
আহ, অ্যাডমিরাল, ধমকের সুরে বললেন প্রেসিডেন্ট। আগেই এসব আমাকে জানানো হয়নি কেন?
আপনি তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন, স্যর। মেজর রানা যা বলেছেন, তাই করুন, বললেন প্রেসিডেন্ট। উনি যা চান, তাই যেন করা হয়। যদি বলেন সাবমেরিন পাঠাতে, তাই করবেন। যদি বলেন, নর্থ কোরিয়াকে ব্লক করতে হবে, আমরা তাই করব। ভেবেছিলাম আগেই এসব বুঝতে পেরেছেন আপনারা! মাসুদ রানার প্রতিটি কথার বিরুদ্ধে আমার কান ভাঙাচ্ছেন আপনারা! অথচ আপনাদের মাথায় ঢুকছে না, ওই একটি লোকের কাঁধে ভর করে চলছে বর্তমান সভ্যতা! তাকে চিনি, বিশ্বাসও করি। নিজের জীবন সঁপে দিতে পারি তাঁর হাতে নিশ্চিন্তে। তিনি, যে নিউক্লিয়ার বোমা ফেলতে বলেননি, এতেই আপনাদের খুশি থাকা উচিত। অক্ষরে অক্ষরে ভদ্রলোকের কথা মত কাজ করুন, পরে আমাকে পরামর্শ দেবেন। এ মুহূর্তে ডিপ্লয় করুন আমাদের প্রতিটি অ্যাটাক সাবমেরিন।
.
ড্রাগন কর্পোরেশন শিপবিল্ডিং অ্যাণ্ড মিসাইল অ্যাটাচমেন্ট প্লান্ট, নরফোক, ভার্জিনিয়া।
অক্টোবর ১৫। সকাল নয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিট।
এ মুহূর্তে ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্সের ইন্সপেক্টরদের ঘিরে রেখেছে ইউনাইটেড স্টেটস মেরিনের দুটো দল। নোয়ায শিপ ও লির্ড জয়েন্ট প্রজেক্ট বিষয়ক ভার্জিনিয়ার নরফোক প্লান্টের দিকে চলেছে সবাই।
কিছুক্ষণ পর পৌঁছে গেল সবাই ড্রাগন কর্পোরেশনের আকাশ ছোঁয়া প্রকাণ্ড সব দালানের সামনে। মস্ত জায়গা নিয়ে ওই প্লান্ট। একের পর এক দালান। একটার সঙ্গে আরেকটা সংযুক্ত। রয়েছে বিশাল সাতটি ড্রাই-ডক। আকাশের নাক তুলেছে অসংখ্য ক্রেন।
এই প্লান্টেই তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক মিসাইল সিস্টেম। ইউএস নেভাল ছদ্মবেশী ভেসেলে বসিয়ে দেয়া হয়েছে সেসব মিসাইল। কখনও কখনও নিজেরাও মস্ত সব জাহাজ তৈরি করে এখানে ড্রাগন কর্পোরেশন।
এ মুহূর্তে একটি ড্রাই-ডকে চুপ করে বসে আছে মস্ত এক সুপারট্যাঙ্কার। ওটাকে প্রায় ঘিরে রেখেছে একের পর এক ক্রেন। ওগুলো অনেক উপরের আকাশে উঠেছে।
অবাক কাণ্ড, সাড়ে নয়টার বেশি বাজে, কিন্তু কোথাও নেই কেউ।
ঝড়ের মত প্লান্টে ঢুকল মেরিনরা। বাধা এল না কোথাও থেকে। গোলাগুলি নেই, লড়াই হওয়ারও সম্ভাবনাও নেই। কয়েক মিনিটের ভিতর প্লান্ট সিকিয়োর বলে ঘোষণা দেয়া হলো।
রেডিয়োতে মেরিন কমাণ্ডার জানাল: আপনারা ডি.ও.ডি.-র ছেলেরা আসতে পারেন। কিন্তু আগেই সতর্ক করছি, ভিতরের পরিস্থিতি মোটেও ভাল নয়!
গন্ধটা দম আটকে দেয়ার মতই। একেবারে পচে গেছে মানুষের লাশ।
জমাট বাঁধা থকথকে রক্ত ও লাশগুলোর ক্ষতের উপর ভনভন করে উড়ছে হাজারে হাজারে রক্ত-মাংস লোভী মাছি।
প্রধান অফিস এলাকায় বয়ে গেছে রক্তের স্রোত, দেয়ালে ছিট-ছিট খয়েরি দাগ। বেঞ্চগুলোর উপর কাদার মত রক্ত গড়িয়ে নেমেছে স্টেয়ারকেস বেয়ে, তৈরি করেছে বীভৎস লালচে স্ট্যালাকটাইটিস।
ড্রাগন কর্পোরেশনের কর্মীদের কপাল ভাল, ইন্সপেকশন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই তাদেরকে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছিল। সিকিউরিটি লকডাউন করা হয়েছিল বলেই তাদেরকে করুণভাবে মরতে হয়নি।
কোম্পানির সিনিয়র সব ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপার্টমেন্ট প্রধানদের কপাল মন্দ। পাশাপাশি পড়ে আছে মেইন ল্যাবের সামনে, ছাড়া হয়নি কাউকে। এক এক করে হত্যা করা হয়েছে। মৃতদেহগুলোর পিছনের দেয়ালে ছলাৎ করে লেগেছে রক্ত।
গত একসপ্তাহ ধরে মহাআরামে লাশ খেয়েছে অসংখ্য ইঁদুর।
অন্যান্য লাশ থেকে দূরে পাঁচটি মৃতদেহ। তারা ড্রাগন কর্পোরেশনের লোক নয়।
এমন নয় যে ড্রাগন কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা লড়াই ছাড়াই মরেছে। তাদের সিকিউরিটি ফোর্স আগন্তুকদের কজনকে শেষ করেছে।
এই পাঁচ লাশ পড়ে আছে প্লান্টের নানা জায়গায়। পাশেই তাদের একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল।
পরনে কালো মিলিটারি পোশাক। মাথায় আরবী কালো হাওলি বা বিড়ে।
প্রত্যেকের কাঁধে বিশেষ ডাবল-সিমিটার টাটু। ওটা ব্যবহার করে টেরোরিস্ট অর্গানাইযেশন গ্লোবাল জিহাদ।
কিছুক্ষণের ভিতর ক্ষতি অ্যাসেস করল ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টররা। তাদেরকে সহায়তা করল এফবিআই ও আইএসএস–এর এজেন্টরা।
গুয়ামের ড্রাগন প্যাসেফিক প্লান্টে ইন্সপেকশন করতে যাওয়া দ্বিতীয় টিম থেকে ফোন এল। একইরকম ম্যাসাকার করা হয়েছে ওখানেও।
এ খবর পাওয়ার পর বিশেষ একটি সিকিয়োর ফোনে হোয়াইট হাউসের এইডের সঙ্গে যোগাযোগ করল ডি.ও.ডি.-র এক সিনিয়র ইন্সপেক্টর।
খবর খুব খারাপ, স্যর, বলল সে, নরফোকে আমরা পনেরোটা লাশ পেয়েছি। নয়জন ইঞ্জিনিয়ার, ছয়জন সিকিউরিটি স্টাফ। শত্রু খতম হয়েছে পাঁচজন। সবাই টেরোরিস্ট। লাশের ফরেনসিক থেকে বোঝা গেছে, এরা মারা গেছে ছয়দিন আগে। ঠিক কখন খুন হয়েছে, বুঝবার উপায় নেই। একই ঘটনা ঘটেছে। গুয়ামে। অবশ্য মাত্র একজন টেরোরিস্ট মরেছে।
নরফোকের পাঁচ টেরোরিস্টকে আইডেন্টিফাই করেছে এফবিআই। এরা গ্লোবাল জিহাদের লোক। তাদের একজন ওই সংগঠনের কাতলা, নাম শাহেদ করিম। কিন্তু এসবের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে, স্যর: এই হত্যাকাণ্ডে আরও অনেক টেরোরিস্ট জড়িত ছিল। নরফোকের প্লান্ট থেকে হারিয়ে গেছে তিনটি সুপার-ট্যাঙ্কার। গুয়াম থেকে গেছে দুটো।…এবং, স্যর, এসব সুপার-ট্যাঙ্কারের সঙ্গে উধাও হয়েছে লিয়ার্ড প্রজেক্টের মিসাইলও।
.
এইমাত্র ফ্রেঞ্চ উপকূলীয় এয়ারস্পেসে ভেসে উঠেছে একটি কুচকুচে কালো ফাইটার বিমান।
গতকাল সন্ধ্যায় হাজির হয়েছে পাহাড়ি এলাকায়। একটু আগেও লুকিয়ে ছিল দুই পাহাড়ের মাঝের সংকীর্ণ উপত্যকায়। ঝোঁপঝাড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল ওটাকে।
বিকেল তিনটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
মন্থরগতিতে ভ্রমরের মত উপকূলীয় দুর্গ শ্যাটিয়নের দিকে চলেছে কালো বিমান।
রঘুপতি, বলল নিশাত, হঠাৎ কোথায় চললে? আমরা কিন্তু এখনও মাসুদ স্যর বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।
তা ঠিক।
তা হলে কোথায় চলেছি?
জরুরি কাজে। জানবেন, কিন্তু পরে।
বিরক্ত হলো নিশাত। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে এবার কথাটা পাড়ল, একটা কথা জানতে চাই তোমার কাছে।
বলুন।
তোমার মত, এত ভাল রোবট ভয়ঙ্কর ওই বিজ্ঞানীর সঙ্গে কেন? গতরাতে খবিরের সঙ্গে কথা বলে, এবং পরে ইন্টারনেট ঘেঁটে জানলাম অসংখ্য মানুষ মেরেছে কুয়াশা।
মানুষটা তিনি মোটেও খারাপ নন, নিচু স্বরে বলল রঘুপতি। মনে হলো না এসব কথা শিখিয়ে দেয়া, চিন্তা-ভাবনা করেই বলেছে।
কোন দিক দিয়ে ভাল?
কখনও কখনও খুন করেন বটে, কিন্তু তার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ থাকে। ধরুন না কয়েক বছর আগের ওই সুদানের ঘটনা। আল-কায়দার ওপর হামলা করতে গেল আমেরিকান ডেল্টা ইউনিট। বোধহয় আমেরিকান আর্মিতে তাদের গুপ্তচর ছিল, আগেই সরে পড়েছিল আল-কায়দার সবাই। ওই ওয়্যারহাউসে কাউকে না পেয়ে খেপে গেল ডেল্টা ফোর্স। এক মাইল দূরে ছিল বসের গবেষণাগার, ওটা ধ্বংস করে দিল।
কখনও কারও সঙ্গে সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতা করেননি বস। ডেল্টা ইউনিট তাঁকে বন্দি করে নিয়ে গেল পোর্ট সুদানের এক পরিত্যক্ত লাইটহাউসে। কপ্টারে সিআইএ-র লোক ছিল। সে ইন্টারোগেট করল: বসের নতুন জেনেটিক গবেষণার সব তথ্য চাই তার।
তিনি যখন কিছুই বললেন না, মেরে ফেলতে চাইল তাঁকে।
বাঁচল কী করে তোমার বস?
ওঁকে কপ্টার থেকে নামিয়ে লাইটহাউসে নিয়ে গিয়েছিল ওরা। আগেই কৌশলে হ্যাণ্ডকাফ খুলে ফেলেছিলেন বস। কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈনিকের অস্ত্র কেড়ে নেন। তাঁকে ঠেকাবার আগেই ডেল্টা ফোর্সের ওই তেরোজনকে হত্যা করেন। বন্দি করতে চেয়েছিলেন সিআইএ-এর লোকটাকে। কিন্তু পাল্টা গুলি করতে গিয়ে মরল সে। অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করেননি বস।
খুব সংক্ষেপে বললে, জানাল নিশাত। এরপর কী হলো?
ওই লোকগুলোকে হত্যার জন্য দায়ী করা হলো বসকে। তার মাথার উপর পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বাউন্টি ঘোষণা করল আমেরিকান সরকার। পরে একটা স্কোয়াড পাঠানো হলো বসকে শেষ করতে। তাদের একজনও আর ফিরতে পারেনি।
চুপ হয়ে গেছে রঘুপতি।
কথা বাড়াল নিশাত।
নীচে পাহাড়ি রাস্তা। এখানে-ওখানে মস্ত সব গর্ত। পথের শেষে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
চিন্তায় ডুবে গেছে নিশাত।
গতকাল সন্ধ্যা থেকে বারবার যোগাযোগ করতে চেয়েও মাসুদ স্যরের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
.
ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার।
সামান্য দূরে উপকূল। ১৫ অক্টোবর।
বিকাল তিনটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
গতকাল উপকূলীয় সাগর থেকে প্যাট্রল বোটে তুলে নেয়ার পর রানাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফ্রেঞ্চ ডেস্ট্রয়ারে। ওখান থেকে ওকে নিয়ে রওনা হলো প্রকাণ্ড এক নেভাল পিউমা কপ্টার। পৌঁছে দিল চার্লস দ্য গল ক্লাস এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে।
ফ্লাইট ডেকে কপ্টার অবতরণ করতেই নীচে নামতে লাগল এলিভেটার। পৌঁছে গেল নীচের একটা ডেকে। রানা দেখল। সারি সারি অসংখ্য মিরাজ ফাইটার, অ্যান্টি সাবমেরিন বিমান, ফিউয়েল ট্রাক ও জিপগাড়ি।
ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে নামাতেই এগিয়ে এল চারজন সিনিয়র ফ্রেঞ্চ অফিশিয়াল।
তাদের একজন নেভির অ্যাডমিরাল। দ্বিতীয়জন আর্মির জেনারেল। তৃতীয়জন এয়ারফোর্সের কমোডর। চতুর্থ লোকটার পরনে ধূসর সুট।
তার নির্দেশেই রানার ডান বাহুতে কী যেন ড্রাগ পুশ করল এক সেকেণ্ড কমাণ্ডার।
তখনই ভীষণ ঘুম পেল রানার, পরক্ষণে লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর।
আমাদের জন্য আরও তথ্য আসছে, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব ওর, মিলিটারির তিন উচ্চপদস্থ অফিসারকে জানাল ধূসর সুট।
কফিনের মত বদ্ধ এক কুঠুরিতে নিয়ে আটকে রাখা হলো। অচেতন রানাকে।
আবার যখন চেতনা ফিরল ওর, চুপ করে পড়ে রইল। চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করে চারপাশ দেখল। মিটমিট করে জ্বলছে হলদে বাল।
দুই হাত পিঠে হ্যাণ্ডকাফে আটকানো। রানা টের পেল, হাতে ঘড়ি আছে। অনেক কসরত করে ঘড়ি দেখল। ফ্রেঞ্চ স্থানীয় সময় অনুযায়ী এখন দুপুর একটা। পেটে প্রচণ্ড খিদে। গলা ও বুক শুকনো কাঠের মত খটখটে। ছিঁড়ে পড়বে যেন মাথা, প্রচণ্ড ব্যথা।
একবার গিয়ে দরজা পরখ করেছে, ওই ভারী লোহার কবাট ভাঙবার সাধ্য ওর নেই।
ফিরে এসে চুপচাপ শুয়ে থাকল রানা।
অনেকক্ষণ পর খটাং আওয়াজ তুলে খুলে গেল দরজা। ভিতরে এসে ঢুকল চারজন সশস্ত্র নাবিক। হ্যাচকা টানে তুলে নেয়া হলো রানাকে, ধাক্কা দিয়ে বের করে আনা হলো কফিন থেকে।
সরু করিডোরে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল ওকে। সিলিঙে টিমটিমে হলদে আলো।
দুমিনিট পর চওড়া প্যাসেওয়েতে পড়ল ওরা। রানার দুপাশে দুজন, পিছনে দুজন। আবারও সেই প্রকাণ্ড হল ঘরে হাজির হলো ওরা।
আগের মতই অসংখ্য মিরাজ ফাইটার, অ্যান্টি সাবমেরিন বিমান, ফিউয়েল ট্রাক ও জিপগাড়ি।
হাজির হয়েছে সেই চার অফিশিয়াল।
অবশ্য রানার চার প্রহরী ছাড়াও এখন বাড়তি দুজন গার্ড অস্ত্র হাতে তৈরি।
চারপাশ দেখে নিল রানা। এটা মেইন্টেন্যান্স হ্যাঙার। কোথাও পারসোনেলদের দেখা গেল না।
অদ্ভুত থমথম করছে মস্ত ঘর।
নীরবতা ভাঙল আর্মির জেনারেল, তা হলে তুমি সত্যিই বিসিআই-এর মাসুদ রানা। অ্যান্টার্কটিকায় একা শেষ করেছিলে আমার সেরা প্যারাট্রুপারদের।
অ্যাডমিরাল বলল, ওই দুঃখজনক দুর্ঘটনার সময় গোটা সাবমেরিন হারিয়েছি। আজও ওটাকে খুঁজে পাইনি আমরা।
শালারা কিচ্ছু ভোলেনি, ভাবল রানা। দ্বিগুণ হলো ওর মাথার ব্যথা।
ধূসর সুট পরা লোকটা সামনে বাড়ল। অত্যন্ত চৌকস সে। নিখুঁত উচ্চারণে ফ্রেঞ্চ বলে। ব্যাটাকে খুবই বিপজ্জনক মনে হলো রানার।
মোসিউ রানা, আমার নাম প্লেসি মোহনি, এসেছি ডিরেক জেনাখালে দে লা সিকিউখিতি এক্সেতেখিয়েখ থেকে।
ডিজিএসই বা বহির্বিশ্ব নিরাপত্তা ডিরেক্টরেট জেনারেল, ভাবল রানা। আমেরিকানদের আইএসএস-এর মতই, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর সংগঠন। মোসাদের কথা বাদ দিলে দুনিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ওটা।
গলা এমনিতেই শুকিয়ে আছে, ঢোক গিলতে গিয়ে রানা টের পেল জিভও শুকিয়ে গেছে।
মিস্টার মোহনি, বলুন তো ব্যাপারটা কী? কর্কশ স্বর বেরোল ওর কণ্ঠ থেকে। ফ্রান্স তা হলে ম্যাজেস্টিক-১২ কাউন্সিলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে? নাকি শুধু ডেমিয়েন ডগলাসের সঙ্গে?
বুঝলাম না কী বোঝাতে চাইছেন, হালকা সুরে কথাটা উড়িয়ে দিল মোহনি। আমরা শুধু জানি, মোসিউ ডগলাস আমাদের জন্যে, অর্থাৎ ফ্রান্সের জন্যে চমৎকার ট্যাকটিকাল অ্যাডভানটেজ তৈরি করেছেন। তাঁর সংগঠনকে বাহাবা না দিয়ে পারছি না আমরা।
আমাকে ধরে এনেছেন কেন?
আমি খুশি হব তোমার হৃৎপিণ্ড উপড়ে নিতে পারলে, বলল আর্মি জেনারেল।
আর ওটা তোমার লাশের সামনে দাঁড়িয়ে চিবিয়ে খাব আমি, বলল অ্যাডমিরাল।
আমি কিন্তু আপনাদের মত নই, অনেক প্র্যাকটিকাল, শান্ত স্বরে বলল মোহনি। পরেও আপনারা যার যার ইচ্ছে পূরণ করতে পারবেন। তার আগে আমার কিছু প্রশ্ন আছে ওর কাছে। জানতে চাই মোসিউ ডগলাসের পরিকল্পনা পুরো ফুলপ্রুফ কি না।
পাশের বেঞ্চে ব্রিফকেস রাখল সে। ওটা খুলতেই দেখা গেল ছোট ধাতব ইউনিট। জিনিসটা হার্ড বাউণ্ড বইয়ের সমান হবে।
কোনও মিনি-কমপিউটার, ভাবল রানা। যন্ত্রটার মাঝে দুটো স্ক্রিন। উপরের অংশে বড় স্ক্রিন। নীচের স্ক্রিন ছোট এবং ডানদিকে।
উপরের স্ক্রিনে একের পর এক লাল ও সাদা গোলাকার কী যেন। জ্বলজ্বল করছে।
নীচের ছোট স্ক্রিনে দশ ডিজিটের কি-প্যাড। আধুনিক সব টেলিফোনেই ওই জিনিস থাকে।
মেজর রানা, বলল মোহনি, জিনিসটা দেখছেন? এটাই টাচলক-৯ সিকিউরিটি সিস্টেম। আমরা জানতে চাই আপনি এটা ডিসআর্ম করতে পারেন কি না।
ছয়
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
ব্রিটানির উপকূল, ফ্রান্স। ১৫ অক্টোবর। বিকাল চারটা।
প্রায়ান্ধকার পাতাল ঘরে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছে আহত তিশাকে। টান খেয়ে আরও ছিঁড়ে গেছে কাঁধের জখম। নতুন
করে ক্ষত থেকে পড়ছে রক্ত। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তিশার। প্রায়। অচেতন, ঘোরের ভিতর দেখল চারপাশে গোলাকার পাথুরে দেয়াল। সাগরের পানিতে ডুবে গেছে মেঝে। ঘরের গভীর অংশে সাঁতার কাটছে দশফুটি দুই হাঙর।
কয়েক মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারাল তিশা। চেতনা ফিরল খটাৎ আওয়াজ পেয়ে।
গিলোটিনের গর্দান রাখবার কাঠের তাকিয়ার উপর নেমেছে কাঠের আড়া, ওটা কঠিনভাবে চেপে ধরেছে ওর গ্রীবা। কাঠের তাকিয়া আড়তদারের ক্যাশবাক্সের আকৃতির, তবে বড়।
বিন্দুমাত্র মাথা নাড়াতে পারল না তিশা।
খটাং আওয়াজে গিলোটিনের লক আটকে দিল এক সশস্ত্র লোক।
আগে কখনও একে দেখেনি তিশা। মাথার চুলগুলো গাজর রঙের। চোখদুটো যেন কূপ, চাহনি মৃতের। চেহারাটা ক্ষুধার্ত ইঁদুরের মুখের মত।
কেন যেন শিউরে উঠল তিশা ভয়ে। মনে পড়ল রানার কথা। এখন যদি মস্ত মনের মানুষটা থাকত, যেমন করে হোক ওকে সরিয়ে নিত এখান থেকে।
চোখ তুলে উঁচু গিলোটিনের দিকে চাইল। বারো ফুট উপরে ঝুলছে ক্ষুরধার ব্লেড।
জ্বরের ঘোরে মুখ বিকৃত করল তিশা। ব্যথা। ভয়ঙ্কর। আগুনের মত জ্বলছে বুক ও কাঁধের ক্ষত। বোধহয় ভিতরে রয়ে গেছে ট্রেসার বুলেট। হাঁটু গেড়ে বসতেও কষ্ট হচ্ছে এখন।
ওই ইঁদুর-মুখের পাশে আরেক বাউন্টি হান্টার–কার্ট কে. এবেলহার্ডের বামহাত। সাইকোটিক এক্স রয়াল মেরিন। নাম ফিলিপ। একটু আগে কে যেন তাকে ওই নামে ডেকেছে। লোকটার হাতে শটায়ার-এইউজি অ্যাসল্ট রাইফেল। মাযল তাক করেছে ওর মাথা বরাবর।
লোকটার পরনে বিঘুঁটে কালো আলখেল্লা। যেন শেষ নেই পকেটের, ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে নানান অদ্ভুত ডিভাইস।
এমন কী পনি বটল ও মাউন্টেনিয়ারিং পিটন পর্যন্ত। সেগুলোর ভিতর আছে।
ওই আলখেল্লা কুয়াশার। মুখ তুলে চাইল তিশা। দেখতে পেল বৈজ্ঞানিককে।
পনেরো ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাগরের পানিতে দুই ইঞ্চি তলিয়ে গেছে পাথরের ওই মঞ্চের মেঝে। চোখ বুজে আছে বিজ্ঞানী। সানগ্লাস নেই। কূপের কারুকাজ করা পাথুরে দেয়ালে আটকে রাখা হয়েছে তাকে। দুই হাত শিকল দিয়ে বাঁধা। নল কাটা বন্দুকের দুই হোলস্টার এখন ফাঁকা।
উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠেছে জলমগ্ন ডানজনে।
গমগম করে উঠল একটা পুরুষ কণ্ঠ:
ঘুরতে ঘুরতে দূর থেকে দূরে সরছে বাজপাখি, আর শুনতে পেল না তার মালিকের কণ্ঠ। সবই যেন সরছে, কিছুই থাকছে না কেন্দ্রে। তারপর রইল শুধু বিশ্ব জুড়ে চরম অরাজকতা। …আমার ভুল না হয়ে থাকলে ওটা লিখেছেন ইয়েটস্।
দর্শকদের, ব্যালকনিতে হাজির হয়েছে ডেমিয়েন ডগলাস। পাশে বাউন্টি হান্টার কার্ট কে, এবেলহার্ড।
শার্ক পিটের দিকে চাইল ডগলাস, ভঙ্গি দেখে মনে হলো কলোসিয়াম থেকে দেখছেন কোনও রোমান সম্রাট। তার চোখ স্থির হলো তিশার উপর। বেচারি আছে কূপের পঞ্চাশ গজ দূরে।
অরাজকতা শুরু হয়েছে গোটা দুনিয়া জুড়ে, লেফটেন্যান্ট তিশা করিম, আবৃতির সুরে বলল ডেমিয়েন। বলতে বাধ্য হচ্ছি, তাতে আমি খুবই খুশি। …তুমি খুশি নও?
দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করছে তিশা, চাপা স্বরে বলল, না।
ডানজনের ভিতর প্রতিটি শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
তিশা করিম খুশি নয়, বলল ডেমিয়েন। চাইল কুয়াশার দিকে। কী বলব আপনাকে কুখ্যাত বৈজ্ঞানিক, না বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক? আপনার কাজ অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। আমার। আপনি এই চমৎকার মানুষ-শিকার বন্ধ করতে চেয়েছেন। বারবার রক্ষা করেছেন মাসুদ রানাকে। যদিও জানেন, এর ফলাফল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর: চরম শাস্তি দেয়া হবে আপনাকে।
চুপ করে আছে কুয়াশা, চেয়ে রইল বিলিয়োনেয়ারের চোখে।
বুঝতে পারছি কাউন্সিলের প্ল্যানে বাধা দিতে চাইছে কেউ, বলল ডেমিয়েন। মাসুদ রানাকে রক্ষা করতে কে টাকা দিচ্ছে আপনাকে, কুয়াশা?
চুপ রইল কুয়াশা। মনে পড়েছে ওর প্রেমিকা লিলি মাখসাখের কথা। কথাটা ও-ই প্রথমে তুলেছিল, প্যারিসে।
প্রতি তিনটে কথায় অন্তত একবার যার নাম তোমার মুখে আসে, সেই মাসুদ রানাকে খতম করে দিচ্ছে ম্যাজেস্টিক-১২। তারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী। তুমি চাইলে তোমার প্রিয়। রানাকে সতর্ক করতে পারো।
লিলি ভাল করেই জানে কুয়াশার জন্য কী-ই না করেছে। মাসুদ রানা। তুলে নেয়া হয়েছে পুলিশের হুলিয়া, বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে বিপুল টাকা দেয়া হয়েছে গবেষণাগার তৈরির জন্য। এখন আর পলাতক আসামী নয় কুয়াশা।
লিলির মুখে কথাটা শোনার পর সেদিন থেকেই খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে কুয়াশা।
আপনি কিন্তু নিজের সর্বনাশ করছেন, চেহারায় হাসি হাসি ভাব ফুটিয়ে কুয়াশার দিকে চাইল ডেমিয়েন। ভেবে দেখুন, আমি যখন প্লয়ার্স দিয়ে হ্যাচকা টানে আপনার জিভটা ছিঁড়ে নেব, আফসোস করবেন আগেই মুখ খোলেননি কেন।
স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কুয়াশা। কথা বলল না।
দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে নিয়ে বলল তিশা, আমরা। তোমাদের সব প্ল্যান জানি, শয়তানের চেলা। তোমরা নতুন করে কোল্ড ওঅর তৈরি করতে চাইছ। আসলে পারবে না। প্রতিটি দেশের সরকার জেনে যাবে সব। আমরা এরই ভেতর আমেরিকান সরকারকে সবই জানিয়েছি।
নাক দিয়ে ঘোঁৎ আওয়াজ করল ডেমিয়েন।
মাই ডিয়ার লেফটেন্যান্ট তিশা, তুমি কি সত্যিই মনে করো। আমি কোনও সরকারকে ভয় পাই? প্রতিটি দেশের সরকার মানেই পেট-মোটা মাঝবয়সী একদল চোর-চোট্টার ক্লাব। নিজেদের লাল ফিতার বাঁধনে আটকা পড়েছে। গরীব দেশের সরকারের কথা বাদই দিই, পশ্চিমা সরকারগুলোরও একই অবস্থা সেখানে ঢুকে পড়েছে লোভী একদল অপদার্থ। উঁচু পদে যাওয়ার জন্যে কামড়া-কামড়ি করছে নর্দমার ইঁদুরের মত। সবারই চাই প্রেসিডেনশিয়াল বিমান, প্রাইম মিনিস্ট্রিয়াল। অফিস… ইত্যাদি। একটা আচ্ছন্নতার ভেতর আছে এরা।–আর নতুন এই কোল্ড ওঅর, নিচু হয়ে গেল ডেমিয়েনের কণ্ঠ, এই প্ল্যান আসলে কাউন্সিলের মূল প্ল্যান নয়, ওটা আমার সৃষ্টি আমার প্ল্যানে রয়েছে সত্যিকারের দূরদৃষ্টি।
ইয়েটস-এর কবিতার কথাই ভাবো, লেফটেন্যান্ট–সেই বাজপাখির মালিকের কথা, যে কিনা আর বাজপাখিটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। ভাবো এমন এক দেশের কথা, যে দেশ ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র কোনওভাবেই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। যেন নিজস্ব চিন্তা রয়েছে এসব অস্ত্রের। আঁচ করতে পারো ওগুলো কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে? ওদের সৃষ্টিকর্তার চেয়ে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে ওরা। স্বাধীন হয়ে গেছে।
এবার ভাবো ইউএস ডিফেন্স ইণ্ডাস্ট্রির কথা। এ ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে। কী ঘটবে যদি তাদের কর্তৃপক্ষের কথা কানে না। তোলে মিসাইল নির্মাতারা? যদি মিলিটারি ইণ্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স ঠিক করে তারা আর ইউনাইটেড স্টেটস্ সরকারকে চায় না?
আপনারা ভাবছেন দখল করে নেবেন আমেরিকা? অবাক সুরে বলল তিশা।
কেন নয়? বাধা দেবে কে? হেসে উঠল ডেমিয়েন।
রানার মত আরও অনেকে বাধা দেবে, জোর দিয়ে বলল তিশা।
তোমরা ভাবছ বর্তমান দুনিয়াটাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে? ডগলাসের ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হলো। আমরা যেখানে। আমেরিকাকেই পাত্তা দিচ্ছি না, সেখানে গরীব দেশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কজন কী করবে? আগামীকাল থেকে আমাদের পা চাটতে শুরু করবে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটা দেশ। আগে থেকেই পা চাটছে অনেকে। …আর তুমি বলছ মাসুদ রানার কথা। হ্যাঁ, আমাদের মিউঁচুয়াল ফ্রেণ্ড। …গুণ আছে তার, কি বলো? তুমি কি জানো, কাউন্সিল বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে তার বিষয়ে? লিস্টে তার নাম রাখা হয়েছে সেই কারণেই। মিথ্যা কথা বলে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল সাইবেরিয়ায়, এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যাতে সহজেই ফাঁদে পা দেয় তোমার হিরো। বলতে বাধ্য হচ্ছি, কাউন্সিলের ওই কাঁচা প্ল্যান কাজে আসেনি।
অন্য সব প্ল্যানও বানচাল হবে।
কিন্তু তোমার প্রেমিক এখনও বেঁচে আছে, তিশার কথায় কান না দিয়ে বলল ডেমিয়েন। এটা বড় একটা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
এত ব্যথার ভিতরও হঠাৎ স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় বুক ভরে গেল তিশার। ডেমিয়েন ডগলাসের দিকে চাইল। পরক্ষণে হিমশীতল স্রোত নামল মেরুদণ্ড বেয়ে। লোকটার চোখে কী যেন, আগে কখনও এমন ভয় লাগেনি ওর।
ডেমিয়েন ডগলাসের ওই দৃষ্টি কুয়াশাও দেখেছে, চমকে গেছে। মস্ত কোনও ক্ষতি করতে তৈরি হয়েছে লোকটা!
সোজা হয়ে দাঁড়াল কুয়াশা, শিকল আটকে রেখেছে দুই হাত। বুঝতে পারছে, ছিঁড়তে পারবে না গায়ের জোরে।
এখন কথা হচ্ছে, শুরু করল ডেমিয়েন, সাধারণ কোনও গল্প-কাহিনিতে আমার মত ভয়ঙ্কর ভিলেন বন্দি করে রাখত নায়কের প্রেমিকা লেফটেন্যান্ট তিশা করিমকে। নইলে কীভাবে বাগে পাবে নায়ককে? আর এ কথাই গতকাল থেকে ভাবছিল আমাদের কার্ট কে. এবেলহার্ড।
কিন্তু? বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল তিশা।
কিন্তু এই সিনেমার ভিলেন সাধারণ নয়, বলল ডেমিয়েন।
চুপ হয়ে গেছে সে। কঠোর চোখ দেখছে তিশাকে।
এটাই তফাৎ সাধারণ ভিলেনের সঙ্গে আমার, বলল ডেমিয়েন, আমি বাড়তি কিছু করতে চাই। নইলে মাসুদ রানা গর্ত থেকে বেরোবে কেন? যেন তার মনে হয় কাউন্সিলের প্ল্যানের পিছনে না দৌড়ে আমার পিছনে আসা অনেক জরুরি। …মিস্টার কোভাক!
ঠিক তখনই দেখা দিল ইঁদুর-মুখো কোভাক, খপ করে ধরল
সে গিলোটিনের রিলিজ লিভার।
ভয় পেল তিশা। চোখে আতঙ্কিত দৃষ্টি। ও বাঁচতে চায়। সারাটা জীবন পাশে থাকতে চায় রানার।
কুয়াশার চোখে চোখ পড়ল ওর। চাপা স্বরে বলল, মিস্টার কুয়াশা, যদি বেরিয়ে যেতে পারেন, আমার হয়ে একটা কথা বলবেন রানাকে? তিশার কণ্ঠ কাতর।
তা কী? শুকনো গলায় জানতে চাইল কুয়াশা।
বলবেন, আমি ওকে হ্যাঁ বলতাম।
আরেকবার ডেমিয়েনের দিকে চাইল কোভাক।
এবার টান দাও লিভারে, নির্দেশ দিল ডগলাস।
খবরদার, ডগলাস, কুকুরের বাচ্চা! গর্জে উঠল কুয়াশা, খুন হয়ে যাবি তুই আমার হাতে!
থমকে গেল ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। পরক্ষণে হাসল। তাই, কুয়াশা? কীভাবে মারবে আমাকে?
এবার কোভাককে নির্দেশ দেবে সে। বারো ফুট উপর থেকে রওনা হবে ক্ষুরধার ব্লেড। বিদ্যুদ্বেগে নামবে তিশার মরাল গ্রীবা লক্ষ্য করে।
কাঠের তাকিয়ায় জোরালো থাক্ আওয়াজ হবে! গিলোটিনের পায়ের কাছে খসে পড়বে মস্তকহীন তিশার দেহ।
আচ্ছা, কুয়াশা, কেন ভাবছ আমার ক্ষতি করতে পারবে? হাত তুলে কোভাককে থামতে ইশারা করল ডগলাস।
তিশা মনের চোখে দেখল, কাটা গলা থেকে জলপ্রপাতের মত ছিটকে বেরোচ্ছে রক্ত। ভিজে যাচ্ছে পাথরের মঞ্চ, ওই স্রোত নামছে মঞ্চের নীচে সাগরের পানিতে। চোখ বুজে ফেলল ও।
কারণ, আমি প্রতিশোধ নেব, গম্ভীর কণ্ঠে বলল কুয়াশা। আমার হাত থেকে রক্ষা নেই তোর।
গিলোটিনের লিভারে হাত রেখে ডগলাসের দিকে চাইল কোভাক। তার ভাবতেই ভাল লাগছে, সুন্দরী মেয়েটির মাথা থেকে ধড় আলাদা হলেই পানিতে মিশবে রক্ত। আগ্রহী হয়ে ছুটে আসবে দুই হাঙর। তীরের মত দুটো ধূসর ছায়া ওরা, হাজির হয়েছে গিলোটিনের মঞ্চের কাছেই।
আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমার, বলে উঠল ডগলাস। পারলে নিজেকে বাঁচাও!
শিকল ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে কুয়াশা, চেয়ে আছে ডগলাসের দিকে।
কোভাক! ধমকের সুরে ডাকল ডগলাস, আপাতত গিলোটিনের কাজ বন্ধ। জরুরি কাজ দেব তোমাকে, আমার অফিসে এসো। …আর হান্টার, চোখে মাযল ঠেকিয়ে নরকে পাঠিয়ে দাও কুয়াশাকে।
ডগলাসের দিকে চেয়ে আছে তিশা। ভাবছে, লোকটা বদ্ধ উন্মাদ, বড় দ্রুত পাল্টে নেয় সিদ্ধান্ত।
চোখে পড়ছে উজ্জ্বল আলো, কিন্তু সামান্যতম ব্যথা পাত্তা না দিয়েই ঘুরে চাইল কুয়াশা ডগলাসের দিকে। রাগে গনগন করছে সুদর্শন মুখ।
ডেমিয়েন ডগলাসের মৃত মাছের মত ঘোলা চোখে শীতল দৃষ্টি। মুখ যেন কোনও মুখোশ। ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্যালকনির দরজা পেরিয়ে চলে গেল নিজ অফিসের দিকে।
ইঁদুরের মুখের মত চেহারার কোভাক পিছু নিল একান্ত বাধ্য পোষা কুকুরের মত। গিলোটিনের পিছন দিকের লোহার দরজা খুলে উধাও হলো।
একইসময়ে হঠাৎ করেই কুয়াশার দিকে এগুতে লাগল ফিলিপ হান্টার, এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-এর খুনি। হাতে রুপালি রেমিংটন শটগান, পরনে কুয়াশার কালো আলখেল্লা। পকেট ভরা নানান ডিভাইস।
ব্যালকনি থেকে হাত নেড়ে বলল কার্ট কে. এবেলহার্ড, গাধাটার চোখে মাযল ঠেকিয়ে গুলি করতে বলেছে, তারপর খাইয়ে দেবে হাঙর দিয়ে।
ইয়েস, স্যর, বলল হান্টার। আর কচি মালটা?
চাইলে রক্তাক্ত মেয়েটাকে ভোগ করতে পারো, পরে ওকে কূপের ভেতর ছেড়ে দিয়ো।
ইয়েস, স্যর। খুশিতে সবকটা দাঁত বেরিয়ে গেল।
কুয়াশা হত্যা এবং এরপর রূপসী মেয়েটিকে ধর্ষণের দৃশ্য দেখবার জন্য অপেক্ষায় রইল রেকণ্ডো কার্ট কে. এবেলহার্ড।
গিলোটিনের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া সরু সেতু পেরুতে শুরু করেছে বিশালদেহী হান্টার, কয়েক সেকেণ্ড পর পৌঁছে গেল কুয়াশার দেয়াল ঘেঁষা মঞ্চে। প্রতি পদক্ষেপে ছলাৎ ছলাৎ করে লাফিয়ে উঠছে সাগরের অগভীর পানি।
আসছে আততায়ী, চোখ কুঁচকে আশপাশ দেখে নিল কুয়াশা।
কোনও সুযোগ নেই বাঁচবার। চোখে দেখছে না বললেই চলে। দুই হাত শিকলে বাঁধা। অনেক কাছে চলে এসেছে খুনি।
ঝড়ের মত ভাবছে কুয়াশা, নীচের ঠোঁট এত জোরে কামড়ে ধরেছে, রক্ত বেরিয়ে গেল। কয়েক সেকেণ্ড পর রক্ত মেশানো থুতু ফেলল দূরে।
ছয়ফুট দূরে থামল ফিলিপ হান্টার। রেঞ্জের বাইরে রয়ে গেছে। কিছুই করতে পারবে না কুয়াশা। দুই পা দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে ধরা অসম্ভব। লাথি দেয়াও সম্ভব নয় অণ্ডকোষে।
কুয়াশার রুপালি রেমিংটন তুলল হান্টার, শিকারের চোখের দিকে মাযল তাক করেছে। অবিশ্বাস্য চিকন পিনপিনে কণ্ঠে বলল, আমি শুনেছিলাম তুমি বিজ্ঞানের জাদুকর। কোথায়? কিছুই তো করতে পারলে না!
আমি কে তা বুঝবে, থুতনি দিয়ে হান্টারের পায়ের দিকে দেখাল কুয়াশা।
ভুরু কুঁচকে ফেলল ফিলিপ হান্টার।
নিজের পায়ের দিকে চাইল। পানির ভিতর ওর বুটের পাশেই হাজির হয়েছে এক টাইগার শার্ক। এইমাত্র ওখানে রক্ত ভরা থুতু ফেলেছে কুয়াশা।
বাঙালি বৈজ্ঞানিক যা আশা করেছিল, ঠিক তাই হলো।
আরে… দশ ফুটি হাঙরের কাছ থেকে সরে যাওয়ার জন্য দুই পা সরে এল লোকটা।
আর পড়ল তার চেয়েও বিপজ্জনক আরেক শিকারির আওতার ভিতর।
পরক্ষণে দশ নম্বর সাইক্লোনের বিপুল বেগের হাওয়ার মত নড়ে উঠল কুয়াশা। ৯১
চাবুকের মত উপরে ঝটকা দিয়ে উঠল ওর দেহ, পরক্ষণে পিছন থেকে দুই পায়ে পেঁচিয়ে ধরল হান্টারের বুকের পাঁজর। উরুর চাপ আরও বাড়ল, কুয়াশা শুনতে পেল বিশ্রী মড়াৎ-মড়াৎ মড়াৎ আওয়াজ। মটমট ভাঙছে লোকটার পাঁজরের হাড়।
প্রচণ্ড ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল ফিলিপ হান্টার, ছটফট করছে। অজগরের ভয়ঙ্কর বাঁধনের ভিতর।
তাকে নিজের কাছে সরিয়ে আনল কুয়াশা। ওর চাই ডিভাইস ভরা আলখেল্লা। পরক্ষণে একহাতে পকেট থেকে তুলে নিল মাউন্টেনিয়ারিং পিটন, ওটা বিধিয়ে দিল বামহাতের শিকলের উপর, ঝট করে খুলে দিল রিলিজ। প্রচণ্ড শক্তিশালী স্প্রিং ঠং আওয়াজ তুলে বিস্তৃত করল পিটনকে…
সঙ্গে সঙ্গে মড়াৎ করে ভাঙল পুরনো লোহার শিকলের আঙটা, মুহূর্তে খুলে গেল বামহাত।
উপরের ব্যালকনি থেকে সবই দেখছে কার্ট কে. এবেলহার্ড। অস্ত্র ঘোরাল সে কুয়াশার দিকে। কিন্তু দুই পায়ের জোরে নিজের আগে হান্টারকে রাখল বৈজ্ঞানিক।
তা ছাড়া, ফিলিপের কাছ থেকে আরও কিছু পাওয়ার আছে ওর।
মুক্ত বামহাতে দ্বিতীয় জিনিসটা তুলে নিল আলখেল্লার পকেট থেকে।
জিনিসটা খুদে ব্লো-টর্চের পাউচ।
ঝটকা দিয়ে থলে থেকে ব্লো-টর্চ নিল কুয়াশা, পরক্ষণে টিপে দিল ট্রিগার। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে জিনিসটা কাজে নামল ফিলিপ হান্টারের পিঠে।
জেগে উঠেছে মিনি ব্লো-টর্চ, ছিটকে বেরোল সুপারহিটেড নীল শিখা।
চিকন কিন্তু বিকট সুরে আর্তনাদ ছাড়ল ফিলিপ হান্টার।
গজালের মত নীল শিখা সহজেই পড়পড় করে ঢুকেছে তার দেহে, দুই সেকেণ্ড পর বেরিয়ে গেল দেহের সামনের দিক দিয়ে–যেন জ্বলজ্বলে তলোয়ার।
ফ্যাকাসে সাদা মখে হতবাক হয়ে গেছে মতপ্রায় বাউন্টি হান্টার, আস্তে করে এলিয়ে পড়ল কুয়াশার বুকে।
তুমি না খুব মজা করবে? চাপা স্বরে বলল বৈজ্ঞানিক। আরও ভালভাবে বাগিয়ে ধরেছে ব্লো-টর্চ। পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে লোকটার দেহের অভ্যন্তর।
কয়েক সেকেণ্ড পর একেবারে শিথিল হয়ে গেল হান্টার।
তাকে পড়ে যেতে দিয়ে একইসময়ে টান দিয়ে ফিতাহীন আলখেল্লা খুলে নিল কুয়াশা। পরক্ষণে পিটন ব্যবহার করল ডানহাতের শিকলের উপর। মটাৎ করে ভাঙল আঙটা।
ফিলিপ হান্টার ধুপ করে পড়তেই ব্যালকনি থেকে কুয়াশাকে দেখতে পেয়েছে এবেলহার্ড। অস্ত্রের মাযল তাক করল সে কুয়াশার বুকে।
কিন্তু বাঙালি বৈজ্ঞানিক এখন পুরো মুক্ত।
মৃত হান্টারের লাশের ওপাশে ক্ষিপ্ত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল কুয়াশা। সামনের মৃতদেহে বিধল একের পর এক গুলি।
কয়েক সেকেণ্ডে আলখেল্লা পরে নিল কুয়াশা, লাফিয়ে উঠেই রক্তে ভরা পানিতে টাইগার শার্কের নাকের কাছে ছুঁড়ে ফেলল লাশ। পরক্ষণে এবেলহার্ডকে হতবাক করে তুলে নিল রেমিংটন শটগান।
ভয়ঙ্কর শক্তিশালী গুলি লাগল এবেলহার্ডের মাথার পাশের দেয়ালে। ছিটকে গিয়ে পিছনে ঝাঁপিয়ে পড়ল, লোকটা।
দৌড়াতে শুরু করেছে কুয়াশা। গুলি করছে উপরের ব্যালকনি লক্ষ্য করে।
রেলিঙের ওপাশে লুকিয়ে পড়েছে এবেলহার্ড। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে গিলোটিনের কাছে পৌঁছে গেল কুয়াশা। দুটো গুলি পাঠাল ব্যালকনি লক্ষ্য করে, পরমুহূর্তে রেমিংটন নামিয়ে রেখেই দুই হাতে ধরল কাঠের তাকিয়ার উপরের অংশ।
অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়ে মড়মড় করে ভেঙে ফেলল তিশার গ্রীবার উপরের কাঠের আড়া।
তিশা, পিছু নাও! চাপা স্বরে বলল বৈজ্ঞানিক। ভয় নেই!
কূপ ও মেঝের গভীর অংশে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পানি।
ঘুরছে হাঙর।
ফিলিপ হান্টারের লাশ পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এক হাঙর, মস্ত সব কামড়ে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে মৃতদেহ। আর তর সইল দ্বিতীয় হাঙরের, সে-ও যোগ দিল উৎসবে।
তিশা আর ছুটতে পারছে না।
দৌড়ের ফাঁকে থেমে ওকে কাঁধে তুলে নিল কুয়াশা। দেখল, আবারও ব্যালকনির রেলিঙের ওপাশে উঠছে এবেলহার্ডের মাথা।
একহাতে রেমিংটন থেকে পর পর দুটো গুলি পাঠিয়ে দিল কুয়াশা ব্যালকনির দিকে।
কানের কাছে গুলির জোরালো ভ্রমর গুঞ্জন শুনে আবারও লুকিয়ে পড়ল লোকটা।
তিশাকে নিয়ে গভীর পুলের পাশে পৌঁছে গেছে কুয়াশা। দেরি না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল পানির ভিতর।
ক্ষত-বিক্ষত লাশ নিয়ে টানাটানি করছে দুই হাঙর। রক্তাক্ত ফেনা নানাদিকে ছিটকাচ্ছে।
পেরিয়ে গেল কয়েক মিনিট, তারপর থামল হাঙরের দাপাদাপি। আবারও শান্ত হলো পানি।
কোথাও দেখা গেল না কুয়াশা বা তিশাকে।
ভয়ঙ্কর ডানজন বা মৃত্যু-কূপে নেই ওরা।
ছয় মিনিট পর আহত তিশাকে নিয়ে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের বাইরের সাগরে খেপা ঢেউয়ের মাঝে ভেসে উঠল কুয়াশা। বাম কাঁধে তিশা, ডানহাতে পনি-বটল। ওটা থেকে অক্সিজেন দিয়েছে তিশাকে, নিজেও শ্বাস নিয়েছে।
দুর্গের নীচের শার্ক পিট থেকে গেছে দীর্ঘ প্যাসেজ, শেষে বেরিয়েছে ভোলা সাগরে। ওই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সাগর-সমতলে উঠে আসতে ওই মিনি স্কুবা বটল ব্যবহার করেছে কুয়াশা।
ডানজনের কূপে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে ডান কব্জির নির্দিষ্ট এক জায়গায় টোকা দিয়েছে। পরে আবারও ছোট্ট অপারেশন করে খুদে মাইক্রোচিপস নতুন করে অ্যাকটিভেট করবে।
সাগর-সমতলে ভেসে ওঠার পর পরই কুয়াশা দেখল, মাথার ওপর নেমে আসছে কুচকুচে কালো সুখোই এস-৩৭ ফাইটার বিমান। ওটার থ্রাস্টারের কারণে খেপে উঠেছে চারপাশের সাগর।
কয়েক সেকেণ্ড পর বিমান থেকে নীচে পড়ল হানেস।
খুলে গেছে বিমানের বম, বে।
একমিনিট পেরোবার আগেই তিশাকে নিয়ে বিমানের পেটে উঠল কুয়াশা।
আপনি ঠিক আছেন, বস? জানতে চাইল রঘুপতি। নতুন সানগ্লাস বাড়িয়ে দিল কুয়াশার দিকে।
ওটা নাকের উপর বসিয়ে নিল কুয়াশা, আস্তে করে মেঝেতে শুইয়ে দিল তিশাকে। জবাব দিল না রঘুপতির কথার, অবশ্য সামান্য মাথা দোলাল।
ককপিট থেকে বেরিয়ে এসেছে নিশাত, চমকে গেছে আহত তিশাকে দেখে, বসে পড়ল ওর পাশে।
তিশা!
আমি ঠিক আছি, আপা, দুর্বল স্বরে বলল তিশা। রানা… রানা… ও কোথায়?
রঘুপতি, রানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছ? জানতে চাইল কুয়াশা। মাইক্রোডট রেখেছিলাম পাম পাইলটে। ওই গুড়ো লাগার কথা ওর হাতে।
অনেক আগেই তাকে পেয়েছি, বস, বলল রঘুপতি। সে আছে উপকূল থেকে সামান্য দূরে এক ফ্রেঞ্চএয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে। কথা বলিনি।
মনে মনে বলল নিশাত, রঘুপতি শালাকে বলেছিলাম, তুমি ভাল রোবট, তা মোটেও না–ভাল না কচু! শালা আগেই মুখ খুললে দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পেতাম।
তিশার ক্ষত পরীক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল নিশাত।
বিমানে ফার্স্ট এইড বক্স আছে, আপাতত তিশার পাশেই থাকুন, চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করুন, নিশাতকে বলল কুয়াশা। চাপা শ্বাস ফেলে বলল, এবার রানাকে বের করে আনতে হবে ওই জাহাজ থেকে।
সাত
উপকূল থেকে সামান্য দূরের আটলান্টিক মহাসাগর।
ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ব্রিঁয়া পওলাস।
হ্যাঙারের পাশের এক স্টিলের ছোট ঘরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে রানাকে। পিছনে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেছে দরজা।
একটা টেবিল ও চেয়ার ছাড়া কিছুই নেই ঘরে।
রানা এখনও জানে না, টেবিলে প্লেসি মোহনির টাচলক-৯ ডিসআর্মিং ইউনিট। পাশেই উজ্জ্বল, লাল বাতি জ্বেলে বসে আছে। ফসফরাস গ্রেনেড।
ঘরের এক কোণে কালো কাঁচের ওপাশে ক্যামেরার ঝিরঝির আওয়াজ শুনল রানা।
মেজর মাসুদ রানা, স্পিকারে ভেসে এল ডিজিএসই-এর এজেন্টের কণ্ঠ, এটা খুব সহজ পরীক্ষা। আপনার সামনের টেবিলে যে ফরফরাস গ্রেনেড, তাঁর সঙ্গে শর্টওয়েভ রেডিয়োর মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে টাচলক ইউনিট। গ্রেনেডটা ডিসআর্ম করতে হলে ব্যবহার করতে হবে ওই টাচলক ইউনিট। পরীক্ষার শেষে পৌঁছলে আপনি ডিসআর্ম কোড ব্যবহার করবেন। কোড: ১২২। মাত্র একমিনিট পর বিস্ফোরিত হবে গ্রেনেড। …এবার আপনার সময় শুরু হচ্ছে… আর আছে ঊনষাট সেকেণ্ড!
ঝট করে মেঝে ছেড়ে চেয়ারে গিয়ে বসল রানা, সারা গায়ে ব্যথা। কাছ থেকে দেখতে শুরু করেছে টাচলক-৯ ইউনিট।
জিনিসটা দুই ভাগে ভাগ করা; বামদিকে রয়েছে ছোট ছোট আটটি বৃত্তাকার লাল আলোর খোপ, আর ডানদিকে একই সমান পঁচিশটা সাদা আলোর খোপ। লাল বা সাদা যে-কোনও খোপে জ্বলে উঠবে আলো, এবং পরমুহূর্তে নিভে যাবে। রানার কাজ: নিভে যাওয়ার আগেই আলোকিত খোপ আঙুল দিয়ে স্পর্শ করা। এই প্যানেলের নীচে রয়েছে অনিয়মিতভাবে সংখ্যা লেখা বারোটি চাবি। বাতি ছোঁয়ার কাজে সফল হলে ওখানে কোড টিপতে হবে। স্ক্রিনে সঠিক কোড লেখা হলেই ডিজআর্ম হবে গ্রেনেড।
মেইন স্ক্রিন ভরে উঠছে সাদা ও লাল বৃত্তে বামে লাল, ডানদিকে সাদা। নীচের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে বার্তা:
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি); স্যাটিসফাইড.
ইনিশিয়েট সেকেণ্ড প্রটোকল।
এবার মেইন স্ক্রিনে দপদপ করতে শুরু করেছে সাদা বৃত্ত–প্রতিটি বৃত্ত মুহূর্তের জন্য টিপটিপ করছে। প্রতিবার সামান্য। সময়ের জন্য। ধীর গতিতে র্যাম সিকিউয়েন্স চলছে:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
ফেইল ডিসআর্ম অ্যাটেম্পট।
রেকর্ডেড।
থ্রি ফেইল্ড ডিসআর্ম অ্যাটেম্পট উইল
রেজাল্ট ইন ডিফল্ট ডেটোনেশন।
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
রি-অ্যাকটিভেটেড।
আশ্চর্য তো! স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করল রানা।
আর পঞ্চাশ সেকেণ্ড, মেজর, জানিয়ে দিল মোহনি। নিয়ম মেনে সঠিক সময়ে ওই গোল বাতিগুলো স্পর্শ করুন।
বুঝলাম।
আবারও জ্বলতে শুরু করেছে সাদা বৃত্ত। একের পর এক।
চল্লিশ সেকেণ্ড…
দ্রুত হতে শুরু করেছে সাদা বৃত্তের সিকিউযেন্স। বৃত্তের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চলছে রানার আঙুলগুলো। স্ক্রিনে একটি করে বৃত্ত স্পর্শ করছে।
হঠাৎ করেই বামদিকের ডিসপ্লেতে জ্বলজ্বল করে উঠল। একটা লাল বৃত্ত।
ওটার জন্য তৈরি ছিল না রানা। কিন্তু স্পর্শ করেছে সঠিক সময়ে। আগের মতই জুলতে এবং নিভতে লাগল সাদা বৃত্ত, গতি বাড়ছে আরও। ওগুলোর সঙ্গে বেড়ে গেল রানার আঙুল
নড়বার গতি।)
ত্রিশ সেকেণ্ড… ভালই তো করছেন, মেজর।
জ্বলে উঠেছে আরেকটা লাল বৃত্ত। এবার অনেক দেরি করে ফেলেছে রানা। জোরালো বিপ আওয়াজ ছাড়ল স্ক্রিন:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
ফেইল্ড ডিসআর্ম অ্যাটেম্পট রেকর্ডেড।
থ্রি ফেইল্ড ডিসআর্ম অ্যাটেম্পটস্ উইল
রেজাল্ট ইন ডিফল্ট ডেটোনেশন।
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
রি-অ্যাকটিভেটেড।
ধুশশালা! বিড়বিড় করল রানা। চট করে দেখে নিল টেবিলে পড়ে থাকা গ্রেনেড। তারপর ভুলে গেল ওটার কথা।
আবারও সাদা বত্ত জলতে-নিভতে শুরু করেছে। শেষ বা তৃতীয়বারের জন্য চালু হয়েছে সিকিউয়েন্স।
পঁচিশ সেকেণ্ড বাকি…
কিন্তু এবার পুরোপুরি তৈরি রানা, জানা হয়ে গেছে কী করতে হবে। স্ক্রিনের উপর নাচতে লাগল ওর আঙুল। এক একটা সাদা বৃত্ত জন্ম নিতেই চট করে স্পর্শ করছে। একইভাবে আঙুল নাচতে লাগল লাল বৃত্তের উপর।
দশ সেকেণ্ড… নয়…
এবার ঝড়ের গতিতে জ্বলতে লাগল বৃত্ত। মুহূর্তে জ্বলছে লাল বৃত্ত, পরক্ষণে আবার যে-কোনও সাদা বৃত্ত- কি-বোর্ডে টাইপ করবার মত করে দ্রুত চলছে রানার আঙুল। তারই ফাঁকে ভাবল, পরীক্ষা চলছে আমার রিফ্লেক্সের।
আট… সাত…
ডিসপ্লে থেকে চোখ সরাল না রানা। নেচে চলেছে ওর আঙুল। ডান চোখে এসে পড়ল এক ফোঁটা ঘাম।
ছয়… পাঁচ…
নেচে চলেছে জ্বলন্ত সব বৃত্ত।
সাদা-লাল-সাদা-সাদা-লাল-সাদা…
চার… তিন…
স্ক্রিনে লাফিয়ে উঠল একটা মেসেজ:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন);
স্যাটিসফায়েড।
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
অ্যাকটিভ।
প্লিয এণ্টার অথোরাইড
ডিসআর্ম কোড।
দুই…
কিপ্যাডে বিদ্যুদ্বেগে টাইপ করল রানা, টিপে দিল এণ্টার।
ছোট স্ক্রিনে ভেসে উঠল সংখ্যা।
এক….
একইসময়ে রানা টের পেল, কাজ হয়েছে
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
স্যাটিসফায়েড।
ডিভাইস ডিসআর্মড।
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা, হেলান দিয়ে বসল চেয়ারে।
কিন্তু আচমকা খুলে গেছে দরজা, ঘরে এসে ঢুকল প্লেসি মোহনি। হাততালি দিল বাচ্চাদের মত করে।
বাহ্, সাবাশ মেজর রানা! বাহ! ভেরি গুড!
মোহনির পিছনে ঘরে এসে ঢুকেছে দুই গণ্ডারের মত নেভাল কমাণ্ডো, দাঁড়িয়ে গেল রানার দুই পাশে।
খুশি মনে হাসল, মোহনি। সত্যিই চমত্তত হয়েছি। থ্যাঙ্ক ইউ, মেজর। আমরা ম্যাজেস্টিক-১২-র দাবি সম্পর্কে নিশ্চিত। হলাম। প্রশংসা না করে পারছি না এই ডিসআর্ম সিস্টেমের। সন্দেহ কী, ওটা ভবিষ্যতে বহুবছর নানান কাজে ব্যবহার করবে রিপাবলিক অভ ফ্রান্স। সত্যিই দুঃখজনক যে আপনাকে শেষ করে দিতে হবে। বয়েজ, মেজর রানাকে আবারও হ্যাঙারে নিয়ে যাও। ওঁকে ঝুলিয়ে দেবে অন্যজনের পাশে।
পাঁচ মিনিট পেরোবার আগেই হ্যাঙারের ভেতর মেঝে থেকে তিন ফুট উপরে ভেসে উঠল মাসুদ রানা। ফোর্কলিফটের লিফটিং প্রঙের দুই আড়ার উপর বাঁধা দুই পা। দুই কব্জির দুই হ্যাণ্ডকাফ আটকে দেয়া হয়েছে ভেহিকেলের ভার্টিকাল স্টিল রানারের সঙ্গে।
ব্রিঁয়া পওলাস এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের নির্জন মেইন হ্যাঙার বে-র এক কোণে পার্ক করা হয়েছে এই ফোর্কলিফট। সামনে বেশ কয়েকটা রাফায়েল ফাইটার জেটের : একস্ট। একটা ফাইটারের সামনে অর্ধচন্দ্রের মত করে চেয়ার ফেলা হয়েছে, সেখানে বসেছে তিন ফ্রেঞ্চ মিলিটারি অফিসার ও ডিজিএসই এজেন্ট।
রানাকে পাহারা দেয়া এক গার্ডকে খুশি খুশি স্বরে বলল প্লেসি মোহনি, যাও, নিয়ে এসো ব্রিটিশ গুপ্তচরটাকে।
পাশের দেয়ালে একটা বাটন টিপল লোকটা, আর তখনই উপরের দিকে উঠতে লাগল দেয়াল। বাস্তবে ওটা প্রকাও একটা স্টিলের দরজা। ওখান দিয়ে বেরোয় ফাইটার বিমান।
ওদিকটা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার।
আঁধার থেকে বেরিয়ে এল দ্বিতীয় ফোর্কলিফট। ওটার লিফটিং প্রঙে বন্দি আরেক লোক।
ঠিক রানার মত করেই ক্রুসিফাই করা হয়েছে তাকেও। তফাৎ, এ লোকের ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার করা হয়েছে।
মুখ-হাত রক্তাক্ত, শুকনো রক্তে খয়েরি, হয়ে গেছে শার্ট। বুকের উপর নেমে এসেছে মানুষটার থুতনি।
আপনি হয়তো ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের এজেন্ট রিচার্ড কে, ডওসনকে চেনেন না, মেজর রানা, বলল মোহনি।
ডওসন, ভাবল রানা।
সে এমআই-৬-এর লোক। বাউন্টি হান্ট তালিকার ভিতর ছিল। ধরে আনা হয়েছে।
গত কিছুদিন ধরে এম-১২-র বিষয়ে তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে উঠেছিল ডওসন, বলল মোহনি। আমরা জানতে পেরেছি, গত দুবছর ধরে এম-১২-র চেয়ারম্যান ফ্রান্সিস ওলিফ্যাণ্টের কর্পোরেশনের ভিতর ঢুকে কাজ করছিল। কিন্তু ডওসন যেমন নজর রেখেছিল ওলিফ্যাণ্টের ওপর, ঠিক সেভাবেই তাকে খেয়াল করছিলাম আমরা।
গতকাল ডওসন আমাদেরকে দিয়েছে চমৎকার কিছু তথ্য, যেগুলো না পেলেই চলত না। আমাদের জানিয়েছে, এম-১২-র। এক তরুণ সদস্যের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিল ফ্রান্সিস ওলিফ্যান্ট। আর সে সদস্য আবার আমাদের বন্ধু ডেমিয়েন। ডগলাস।
ডওসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্রান্সিস ওলিফ্যান্ট বারকয়েক বলেছে, ওই ছোকরা ডগলাস বিরক্ত করছে নতুন করে প্ল্যান। করার জন্য।
এদিকে ডেমিয়েন ডগলাস মনে করছে ম্যাজেস্টিক-১২-র প্ল্যান যথেষ্ট দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নয়। আপনার তদন্ত অনুযায়ী, মেজর রানা, কী মনে হয়, নতুন করে প্ল্যান করা উচিত?
ডেমিয়েন ডগলাস আপনাদের বন্ধু মানুষ, শুকনো গলায় বলল রানা। তাকেই না হয় জিজ্ঞেস করুন।
দ্য রিপাবলিক অভ ফ্রান্সের কোনও বন্ধু নেই।
কারণটা বুঝতে পারছি।
সহকারী রয়েছে আমাদের, বলল মোহনি। কিন্তু শত্রুদের মত করেই তাদের ওপরেও নজর রাখা হয়।
আপনি ডগলাসকে বিশ্বাস করেন না, মন্তব্য করল রানা।
এক সেকেণ্ডের জন্যেও না।
অথচ তাকে রক্ষা করছেন, যা খুশি করতে দিচ্ছেন–কেন?
যতক্ষণ আমাদের স্বার্থ এক, অসুবিধা কী? …কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমাদের স্বার্থ আলাদা হতে শুরু করেছে।
আপনারা এখন ভাবছেন, ও নাচাতে শুরু করেছে, বলল রানা।
ঠিকই বলেছেন।
চুপ করে পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে রানা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ম্যাজেস্টিক-১২-র লিযার্ড মিসাইল তাক করা হয়েছে প্যারিসের দিকেও।
হ্যাঁ। তা আমরা জানি। এ জন্যে তৈরি ছিলাম। আমাদের দেশ খোঁজখবর রেখেছে ম্যাজেস্টিক-১২-র বিষয়ে। আর সে কারণেই গ্লোবাল জিহাদের টেরোরিস্টদের লাশ জোগাড় করে দিয়েছি আমরা। মিসাইলের আঘাতে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমেরিকা, জার্মানি ও ব্রিটেন। শেষে থাকবে পশ্চিমা সুপার পাওয়ার বলতে শুধু ফ্রান্স। তখনই সবাই জানবে, আমাদের এই দেশ ঠেকিয়েছে বদমাশদেরকে।
মিসমার হবে নিউ ইয়র্ক, বার্লিন এবং লণ্ডন, কিন্তু কিছুই হবে না প্যারিসের। এবং ফ্রান্স একমাত্র দেশ, যে ঠেকাবে টেরোরিস্ট মিসাইল।
সেপ্টেম্বর এগারোর পর পাল্টা হামলা করতে তিন মাস। সময় লেগেছে আমেরিকার। একবার ভাবুন কমপক্ষে পাঁচটা মস্ত শহর নিশ্চিহ্ন হলে ওরা কেমন হতবাক হবে? কিন্তু এসব ভয়ঙ্কর হামলা থেকে নিরাপদ থাকবে ফ্রান্স। পশ্চিমা একমাত্র রাষ্ট্র, যেটা ঝড়ের মত কাজ করবে। একমাত্র দেশ, যা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী- যার কিছুই হয়নি। আর এ কারণে ফ্রান্স হয়ে উঠবে নতুন কোল্ড ওঅরে সত্যিকারের বিশ্বনেতা।
মেজর রানা, ম্যাজেস্টিক-১২-র আমাদের বন্ধুরা আশা করছে এসব থেকে বিপুল টাকা পাবে। তাদের কাছে টাকা মানেই ক্ষমতা। কিন্তু দ্য রিপাবলিক অভ ফ্রান্স ওই ধরনের ক্ষমতা চায় না। আরও অনেক গুরুতুপূর্ণ জিনিস আশা করে ফ্রান্স। আমরা বদলে দেব বিশ্বের ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লা। আমরা দুনিয়া চালাতে চাই।
বিংশ শতাব্দী ছিল আমেরিকার। সে সময়ে একের পর এক দেশ দেউলিয়া হয়েছে। আর একুশ শতাব্দী হবে ফ্রান্সের।
তিন সেনাপতি, এবং ডিজিএসই-র এজেন্টের দিকে চেয়ে রইল রানা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, আপনারা স্রেফ সুখস্বপ্ন দেখছেন।
ব্রিফকেস থেকে কয়েকটা ছবি বের করল মোহনি, ভাসমান রানাকে দেখাল।
আলাপ চলুক। এসব ছবি মোসিউ ডগলাসের। গতবছর আফ্রিকায় তোলা হয়েছে।
খবরের কাগজের ছবি: আফ্রিকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডেমিয়েন ডগলাস। একের পর এক ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করছে। হাত নাড়ছে উল্লসিত জনতা।
সে যে কত ভাল, তা দেখাতে ওই টুর করে, বলল মোহনি। আর ওই ট্যুরে দেশগুলোর বড় নেতাদের সঙ্গে দেখা করে। স্ট্র্যাটেজিকালি সিগনিফিকেন্ট আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোর ডিফেন্স মিনিস্টারদের সঙ্গেও মিটিং হয়। এসব রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে: নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া, চাঁদ, অ্যাঙ্গোলা, ইয়েমেন এবং লিবিয়া।
চুপ করে আছে রানা।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল মোহনি, তারপর বলল, গত বারো ঘণ্টার ভিতর নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া, চাঁদ, ইয়েমেন এবং অ্যাঙ্গোলার এয়ারফোর্স আকাশে তুলেছে তাদের সমস্ত যুদ্ধ বিমান। সব নেমে এসেছে লিবিয়ার পুবের এক এয়ারফিল্ডে। এসব দেশের এয়ারফোর্স বড় নয়। কিন্তু একইসঙ্গে আকাশে উঠলে ওই এরিয়াল আর্মাড়াকে তাচ্ছিল্য করবে না কোনও দেশ। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মেজর রানা, ওরা ওখানে কী করছে?
ভাবতে শুরু করেছে রানা।
মেজর রানা?
জবাব দিল না রানা।
কানের ভিতর শুনল ডেমিয়েন ডগলাসের কথা: কেউ কেউ আজও জানে না পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে ওই আফ্রিকায়।
আফ্রিকা…
মেজর রানা? তাগাদার সুরে বলল মোহনি।
চোখ পিটপিট করল রানা। এক সেকেণ্ড পর দ্বিধা নিয়ে বলল, আমি আসলেই জানি না, কী করতে চায় ওরা।
এই একই কথা বলেছেন মোসিউ ডওসন, বলল মোহনি। সম্ভবনা রয়েছে, আপনারা সত্যি কথাই বলছেন। আবার এমনও হতে পারে, আপনাদেরকে একটু উৎসাহিত করা উচিত। তাতে হয়তো…
ডওসনের ফোর্কলিফটের ড্রাইভারকে ইশারা করল সে।
দেরি না করে ইঞ্জিন চালু করল ড্রাইভার। কয়েক ফুট বামে। সরে গেল। উঁচু করে তুলেছে ফোর্কলিফটের প্রং-দুটো। ঠিক সামনে রাফায়াল ফাইটার জেটের থ্রাস্টার। লাফ দিয়ে সিট ছাড়ল ড্রাইভার, গাড়ি থেকে নেমে ঝেড়ে দৌড় শুরু করেছে।
কারণটা কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝল রানা।
রোওওওঅ্যাঅ্যাঅ্যার! আওয়াজে জেগে উঠেছে ফাইটার বিমানের ইঞ্জিন। ককপিটের ভিতর এক ফ্রেঞ্চ পাইলটকে দেখল রানা।
বিকট আওয়াজ শুনে বুক থেকে থুতনি তুলল ডওসন, দেখল ঠিক সামনে রাফায়াল ফাইটারের রিয়ার থ্রাস্টার। সামান্যতম পাত্তা দিল না। অনেক বেশি ক্লান্ত, মরে যেতেও আপত্তি নেই এখন। এত শক্তিও নেই যে হাতের বাঁধন ছিড়বার চেষ্টা করবে।
ককপিটের লোকটার দিকে ইশারা করল মোহনি। লোকটা চালু করল বিমানের থ্রাস্টার কন্ট্রোল। আচমকা রাফায়াল যুদ্ধ-বিমানের পিছনের থ্রাস্টার থেকে ছিটকে বেরোল অবিশ্বাস্য সাদা আগুনের জিভ। গপ করে গিলে নিল ডওসনকে।
ভয়ঙ্কর তাপ উড়িয়ে দিতে চাইল বিধ্বস্ত এজেন্টকে। উত্তপ্ত হাওয়া ছিটকে লাগতেই মুহূর্তে ছাই হলো তার চুল। ঝলসে গেল চোখ-মুখ। এক সেকেণ্ডের দশভাগ সময়ে পুরো কাবাব হয়ে গেল শরীর। মাংস পোড়া গন্ধ নাকে আসতেই বমি পেল রানার।
কয়েক সেকেণ্ড পর বন্ধ হলো ফাইটার বিমানের ইঞ্জিন। থমথম করতে লাগল হ্যাঙার।
ডওসন হয়ে গেছে চারটে ঝলসানো টুকরো, ঝুলছে ফোর্কলিফটের প্রংগুলো থেকে।
ঢোক গিলতে চেষ্টা করল রানা। জিভ শুকনো।
ওর দিকে ঘুরল মোহনি। এবার স্মৃতিচারণ সহজ হবে, তাই না?
ডেমিয়েন বা আফ্রিকার দেশ সম্পর্কে কিছুই জানি না, শুকনো স্বরে আবারও বলল রানা। ওই লোক বা ওসব দেশ কী। করছে আমার জানার কথা নয়। প্রথমবারের মত এসব শুনছি।
তা হলে আপনাকে আর দরকার নেই আমাদের, বলল। মোহনি। এবার অ্যাডমিরাল ও জেনারেলের উপভোগের সময়। তারা আপনার আনন্দময় মৃত্যু দেখতে চান।
রানার ফোর্কলিফটের ড্রাইভারের দিকে মাথার ইশারা করল। মোহনি। সামনে বাড়ল ভেহিকেল। থামল পোড়া ডওসনের ফোর্কলিফটের পাশে। রাফায়াল ফাইটারের দ্বিতীয় রিয়ার গ্লাস্টারের ঠিক সামনে থেমেছে।
থ্রাস্টারের কুচকুচে কালো গভীর গহ্বর দেখল রানা।
জেনারেল? বয়স্ক আর্মি অফিসারের দিকে চাইল মোহনি। রানার কারণে অ্যান্টার্কটিকায় গোটা প্যারাট্রুপার ইউনিট হারিয়েছে ওই লোক। চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারেন, জেনারেল।
আনন্দের সঙ্গে।
চেয়ার ছাড়ল জেনারেল, মই বেয়ে গিয়ে উঠল রাফায়ালের ককপিটে। রানার উপর থাকল তার চোখ।
ককপিটে ঝুঁকল সে, হাত বাড়িয়ে দিল ফ্লাইট স্টিকের দিকে। বুড়ো আঙুল চলে গেল আফটারবার্ন সুইচের সামনে।
গুড বাই, মেজর রানা, স্বাভাবিক স্বরে বলল মোহনি। আপনাকে ছাড়াই দুনিয়াকে চলতে হবে। ভাল থাকুন।
জেনারেলের বুড়ো আঙুল চেপে বসল বার্ন সুইচের উপর।
কিন্তু তখনই হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ হলো মেইন হ্যাঙারের উপরে।
বাজতে শুরু করেছে ক্ল্যাক্সোন।
গোটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার জুড়ে দপ করে জ্বলে উঠল ওয়ার্নিং লাল ইমার্জেন্সি বাতি।
বার্নার সুইচে চাপ না দিয়ে ঘুরে চাইল জেনারেল।
হঠাৎ ছুটতে ছুটতে এসে নেভির অ্যাডমিরালের সামনে থামল এক এনসাইন। স্যর! আমাদের ওপর হামলা করা। হয়েছে!
কী? গর্জে উঠল অ্যাডমিরাল। কারা হামলা করল?
মনে হয়, স্যর, একটা রাশান ফাইটার!
রাশান ফাইটার? বল কী! ভুলে গেছ, এটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার! কে আসবে লড়তে? আবার বলছ একটামাত্র ফাইটার বিমান!
.
ব্রিঁয়া পওলাসের ফ্লাইট ডেকের উপর ভাসছে কুয়াশার কালো শকুন, বৃষ্টির মত চারপাশে ছুঁড়ছে বুলেট, পার্ক করা একের পর এক ফাইটার বিধ্বস্ত হচ্ছে মিসাইলের আঘাতে।
এইমাত্র সুখোই যুদ্ধ-বিমানের ডানার নীচ থেকে ছিটকে বেরিয়েছে চারটে মিসাইল, ওগুলো খুঁজে নিল চারটা টার্গেট।
ডেকে বসে থাকা এক রাফায়াল ফাইটার উড়ে গেল মিসাইলের আঘাতে। একইসময়ে ছিন্নভিন্ন হলো দুটো অ্যাণ্ড এয়ারক্রাফট মিসাইল স্টেশন। চতুর্থ মিসাইল সাঁৎ করে ঢুকল মেইন হ্যাঙার বে-র ভিতর। বিধ্বস্ত হলো এক অ্যাওয়াক্স বিমান, নানাদিকে ছিটকে গেল অংশগুলো।
কালো শকুনের ককপিটে জাদু দেখাতে শুরু করেছে রঘুপতি।
ওর পিছনে গানারের সিটে কুয়াশা, রিভলভিং চেয়ারে বিমানের তিন শ ষাট ডিগ্রি দেখছে। একের পর এক টার্গেট উড়ে যাচ্ছে বুলেট বা মিসাইলের আঘাতে।
নিশাত! তৈরি? জানতে চাইল কুয়াশা।
ককপিটের পিছনে কনভার্টেড বম বে-তে এসে দাঁড়িয়েছে নিশাত। কড়া ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে তিশাকে। নিশাতের সঙ্গে এখন এমপি-৭, এম-১৬, ডের্ট ঈগল পিস্তল এবং একটা রকেট লঞ্চার প্যাক। ওটা ছিল বাউন্টি হান্টার পোলিশের। শেষ অস্ত্রটা ঝুলিয়ে নিয়েছে পিঠে।
আমি তৈরি।
তা হলে যান!
খুলে গেল বম বে-র দরজা, ম্যাগহুকের দড়ি ধরে সড়াৎ করে নেমে এল নিশাত।
ওদিকে ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের কন্ট্রোল টাওয়ারে হৈ-চৈ শুরু হয়েছে।
রেডিয়ো মাইকে গলা ছেড়ে চিৎকার করছে কমিউনিকেশন টেকনিশিয়ানরা। তথ্য দিচ্ছে ক্যাপ্টেনকে।
আমাদের রেইডারের নীচেই ছিল!
কোনও ধরনের স্টেলথ মেকানিম…
ফ্লাইট ডেকে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট স্টেশনগুলোর উপর মিসাইল…
দেরি না করে ক্যাটাপুল ব্যবহার করে ফাইটার…
স্যর! লোপা থেকে বলছে পরিষ্কার দেখছে…
ফায়ার করতে বলো!
ক্যারিয়ারের গ্রুপের একটা ডেস্ট্রয়ার থেকে নির্দেশমত রওনা হলো অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল সোজা এল কালো শকুন লক্ষ্য করে।
গম্ভীর মুখে জানতে চাইল কুয়াশা, রঘুপতি, পোলিশের বিমানের নষ্ট ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেযারগুলো ঠিক করেছ?
নিশ্চয়ই, বস!
প্রচণ্ড গতি নিয়ে কালো ফাইটারের দিকে আসছে মিসাইল। কিন্তু একেবারে কাছে চলে আসতেই কাজ শুরু করল। শকুনের ইলেকট্রনিক জ্যামিং শিল্ড। নাক ঘুরিয়ে নিল মিসাইল, ছুটল আরেকদিকে। লাগল গিয়ে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের। বাইরের দিকের খোলে।
এস্কোর্টস! সিয ফায়ার! সিয ফায়ার! গলা ফাটাল জাহাজের ক্যাপ্টেন। ওই বিমান অনেক কাছে! ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্ট! খুঁজে বের করো ওটা কী ধরনের জ্যামিং করছে। নিউট্রালাইয করো! ফাইটার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হবে ওই বিমানকে।
.
রাফায়াল ফাইটারের পিছনে থ্রাস্টারের সামনে এখনও ক্রুসিফাই হয়ে ঝুলছে রানা।
হঠাৎ করেই কাত হলো প্রকাণ্ড জাহাজ। ওটার উপর আঘাত হানছে একের পর এক মিসাইল।
ফ্রেঞ্চ সেনাপতিরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে রেডিয়ো নিয়ে। উপযুক্ত জবাব চাই তাদের।
অবশ্য, রাফায়াল বিমানের ককপিটে রয়ে গেছে আর্মির জেনারেল। চমক কেটে যেতেই জ্বলন্ত চোখে চাইল রানার। দিকে। ঠিক করেছে, ছাড়বে না এই সুযোগ।
আবারও আফটারবার্ন সুইচের দিকে হাত চলে গেল তার। খপ করে ধরল কন্ট্রোল স্টিক। আর একইসময়ে একটা বুলেট ঢুকল তার মগজে। ককপিটের চারপাশে ছিটকে গেল ধূসর জেলি।
এত হৈ-চৈয়ের মাঝে কেউ খেয়াল করেনি ওপেন এয়ার স্টারবোর্ড এলিভেটারের ফাঁকা জায়গা দিয়ে মাকড়সার মত করে নেমে এসেছে এক ছায়ামূর্তি।
বাংলাদেশ আর্মির ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা।
একহাতে এমপি-৭, অন্যহাতে এম-১৬। ঝড়ের মত ঢুকে পড়েছে হ্যাঙার বে-র ভিতর। ছুটছে রানাকে লক্ষ্য করে। যেন প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে স্বয়ং দেবী মা-কালী।
রানাকে পাহারা বাদ দিয়েছে ফ্রেঞ্চ স্কোয়াড, সরে গেল ভেহিকেল ও বিমানের কাছ থেকে। ঠেকাবে নিশাতকে।
কিন্তু ভীষণ প্রলয়ের মত এসেছে নিশাত, গর্জে উঠল দুহাতের অস্ত্র। বামে, ডানে, মাঝের লোকগুলো ছিটকে পড়ল গুলি খেয়ে।
বামের দুই গুলি শেষ করে দিয়েছে দুই প্যারাট্রুপারের জীবন। মুখে গুলি খেয়েছে তারা। পিস্তলের মত করে এম-১৬ ডানদিকে তাক করেছে নিশাত, ওর পর পর তিনটে বুলেট ছিটকে ফেলল তিন কমাণ্ডোকে।
রাফায়াল বিমানের ডানা থেকে গুলি করল এক প্যারাট্রুপার। ওই একইসময়ে সমারসল্ট করে আরেক দিকে সরে গেছে নিশাত। তারই ফাঁকে ওর গুলি ঝাঁঝরা করল লোকটার বুক গলা।
হুলুস্থূলের ভিতর দুটো স্মোক গ্রেনেড ছুঁড়ল নিশাত, সত্যিকার প্রতিশোধ-পরায়ণ প্রেতাত্মার মত ছিটকে আগে বাড়ছে।
ধূম্রজালের ভিতর গুলি খেয়ে ধুপ-ধাপ মেঝেতে পড়ল চার ফ্রেঞ্চ প্যারাট্রুপার। নিশাতের পরবর্তী গুলিতে অক্কা পেল অ্যাডমিরাল। ডিজিএসই-র এজেন্ট হঠাৎ বুঝল, পাঁচ ব্লেডের শুরিকেন বিঁধেছে তার অ্যাডামস অ্যাপলে। খুব কষ্ট পেয়ে মরতে হবে তাকে।
পরের কয়েক সেকেণ্ডে রানাকে ঝুলিয়ে রাখা ফোর্কলিফটের পাশে পৌঁছে গেল নিশাত।
কী খবর, ভাইডি?
সুস্থ হয়ে গেলাম আপনাকে দেখে, আপা, হাসতে চাইল রানা। তিশার খবর জানেন?
বেঁচে আছে। আপনার বন্ধু উদ্ধার করে এনেছেন, ওকে দুর্গের ভেতর থেকে।
কুয়াশার কাছ থেকে নেয়া দুটো পিটন ব্যবহার করে রানার হ্যাণ্ডকাফ ফাটিয়ে ফেলল নিশাত। পরের সেকেণ্ডে মেঝেতে নামল রানা।
তবে নিশাত ওকে অস্ত্র দেয়ার আগেই প্লেসি মোহনির দেহের পাশে পৌঁছে গেল ও। মৃতপ্রায় এজেন্টের পাশ থেকে খপ করে তুলে নিল কী যেন। আবার চলে, এল নিশাতের পাশে। এবার ওর হাতে এমপি-৭ এবং ডেযার্ট ঈগল পিস্তল গুঁজে দিতে ভুল করল না নিশাত।
আসুন ব্যাটাদের আচ্ছারকম সর্বনাশ করি, বাচ্চাদের মত করে বলল ক্যাপ্টেন।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই হেসে ফেলল রানা। খেয়াল করেছে নিশাতের পিঠে আরপিজি।
আপা, আপনার কথা ফেলতে পারি? ঘুরেই একটু দূরের জিপের দিকে দৌড় দিল রানা।
.
এদিকে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে টু-বাই-টু ক্যাটাপুল্ট লঞ্চিং শুরু হয়েছে। চারটা স্টেট-অভ-দ্য-আর্ট রাফায়াল ফাইটার ছুটতে শুরু করেছে রানওয়ে ধরে। মুহূর্তে ছিটকে উঠল আকাশে।
সামান্য গিয়েই আবারও ঘুরল ওগুলো, ভয়ঙ্কর ফর্মেশন তৈরি করে ফিরতে লাগল ভাসমান কালো শকুনকে লক্ষ্য করে।
ওরা আসছে, বস্! সতর্ক করল রঘুপতি।
দেখেছি।
রিভলভিং সিটে ঘুরে গেল কুয়াশা, টিপতে শুরু করেছে। ট্রিগার। ভঙ্গিটা অনেকটা ভিডিয়ো গেম নিয়ে ব্যস্ত কচি ছেলেদের মত।
তীরের মত ওদের দিকে আসছে দুই রাফায়াল ফাইটার, দপদপ করে জ্বলতে লাগল কামানের মুখ।
কালো শকুনের চারপাশ দিয়ে ছুটছে অসংখ্য কমলা রঙের গুলি। আওয়াজ তুলছে হু-হুঁস। বাতাসে গড়াতে শুরু করে সরে গেল রাশান বিমান। রিভলভিং বেলি মাউন্টেড গান দিয়ে উল্টো গুলি করছে কুয়াশা। একপলকের জন্য তিশার কথা ভাবল। অচেতন মেয়েটিকে আরামদায়ক কম্বলে মুড়িয়ে ভাল করে বেঁধে রেখেছে ওরা, কোনওদিকে ছিটকে গিয়ে আহত হবে না।
কালো শকুনের মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল প্রথম দুই বিমান, রইল শুধু দুই সনিক বুম। আসলে মনোযোগ সরিয়ে দিতে চেয়েছে তারা। আসল শো শুরু হলো এবার।
সাগরের ঢেউ ছুঁয়ে এল অন্য দুই ফাইটার, যেন তো দেবে কালো শকুনের পিছনে।
এখনও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের স্টারবোর্ড এলিভেটারের উপর ভাসছে কুয়াশার ফাইটার। চরকির মত ঘুরে গেল ওটা, মুখোমুখি হলো নতুন দুই বিমানের।
ধ্যাৎ! কাউন্টারমের স্ক্রিনে চেয়ে আছে রঘুপতি। ওরা আমাদের জ্যামিং ফ্রিকোয়েন্সির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। …বারবার অন/অফ করছে। এবার আর মিসাইল জ্যাম করতে পারব না।
নতুন দুই রাফায়াল ফাইটার থেকে দুটো করে মিসাইল ছোঁড়া হলো।
মিসাইল লক্ষ্য করে কামান দাগতে শুরু করেছে কুয়াশা। ফেলে দিল দুটো মিসাইল, কিন্তু তোপ এড়িয়ে আসছে অন্য দুই মিসাইল। প্রথমে নীচে নেমে গেল ওগুলো, তারপর আবারও উঠে এল শকুন লক্ষ্য করে।
রঘুপতি…
সগর্জনে কুয়াশাদের বিমানের দিকে আসছে মিসাইল। খেয়াল করে দেখছে রঘুপতি, একেবারে শেষসময়ে বুঝল কী করা উচিত।
বিদ্যুদ্বেগে আসছে মিসাইলদুটো, এবার এসে লাগবে কালো। শকুনের বুকে…
কিন্তু কালো শকুনকে আরেক দিকে সরাল রঘুপতি, সৎ কবে ঢুকে পড়ল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের স্টারবোর্ডের প্রকাণ্ড এলিভেটারের দরজা দিয়ে। ভাসতে ভাসতে জাহাজের মেইন হ্যাঙারে ঢুকে পড়েছে রঘুপতি।
ডেস্ট্রয়ার সোপার মিসাইলের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ডিটেকশন সিস্টেম ছিল না, নিজেদের এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে আঘাত হেনেছে, কিন্তু ফাইটার বিমানের মিসাইল তা নয়, জাহাজ এড়িয়ে দূর-সাগরে গিয়ে ডুবে গেল ওগুলো। ওখানে তৈরি হলো মস্ত দুটো ফোয়ারা।
এদিকে ক্যারিয়ারের টাওয়ারে রেইডার অপারেটার হতবাক হয়ে চেয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। পরক্ষণে রেডিয়ো মাইকে চেঁচিয়ে উঠল: হারামজাদা কোথায় গেল?
কী? …আবারও বলো…
ওটা কোথায়? জানতে চাইল ক্যাপ্টেন। ওরা কোথায়?
স্যর, আমাদের জাহাজের ভেতর!
ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের গুহার মত প্রকাণ্ড হ্যাঙারে ভাসছে কালো শকুন।
চমৎকার, রঘুপতি! প্রশংসা না করে পারল না কুয়াশা। গুলি পাঠাতে শুরু করেছে পার্ক করা ফাইটার বিমান লক্ষ্য করে। বিধ্বস্ত হচ্ছে হেলিকপ্টার ও ট্রাক।
যেন কারও লিভিং রুমে আটকা পড়েছে মস্ত কোনও পাখি, হ্যাঙারের সামনে বাড়ছে কালো শকুন। ওটার ইঞ্জিনের ঝোড়ো হাওয়া আস্ত সব ফিউয়েল ট্রাক উল্টে ফেলছে দেয়ালের উপর।
চারপাশের সবকিছু ধ্বংস করতেই এসেছে রাশান ফাইটার। একবার ছাতে সামান্য ঘষা খেল পিছনের উঁচু ডানা।
রেডিয়োতে বলে উঠল কুয়াশা, নিশাত! আপনি কোথায়?
.
হ্যাঙারের পিছন লক্ষ্য করে ছুটছে একটি জিপ, গতি তুলেছে কমপক্ষে এক শ কিলোমিটার, এড়িয়ে যাচ্ছে উল্টে পড়া বিমান ও ট্রাককে। স্টিয়ারিং হুইলে নিশাত সুলতানা, পিছনের সিটে কুঁজো হয়ে বসেছে রানা।
হ্যাঙার বে-র প্রায় শেষে পৌঁছেছি, স্যর! বলল নিশাত, উড়িয়ে দেয়ার মত কিছু পেলেন?
আপনি রানাকে পেয়েছেন? জানতে চাইল কুয়াশা।
হ্যাঁ।
আমরা কি আপনাদেরকে তুলে নেব?
রানার দিকে চাইল নিশাত। ওর দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে রানা, আরপিজির প্যাক ঘটছে।
আবারও বলছি, আপনাদেরকে তুলে নেব? দ্বিতীয়বার জানতে চাইল কুয়াশা।
না, এখনই নয়! গলা উঁচিয়ে বলল রানা। আপা, কুয়াশাকে বেরিয়ে যেতে বলুন। দুই মিনিট পর নরক হয়ে উঠবে চারপাশ। এ জাহাজের কাছ থেকে যেন অনেক সরে যায়। আমাদের দেখা হবে বাইরে।
শুনলাম, কয়েক মুহূর্ত পর বলল কুয়াশা। ঘুরে চাইল রঘুপতির দিকে। রঘুপতি, বেরিয়ে যাও হ্যাঙার থেকে!
ইয়েস, বস্, বলল রোবট। কিন্তু… হ্যাঙার বে-র আরেক প্রান্তে দ্বিতীয় ওপেন এয়ার এলিভেটার চোখে পড়েছে।
সামনে বাড়ল সুখোই, পিছনে তৈরি হলো ঝড়। আর সব শব্দ ছাপিয়ে উঠেছে, ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ। কয়েক সেকেণ্ড পর পোর্ট সাইডের এলিভেটারের মাধ্যমে বেরিয়ে এল ওরা কাঁচা সোনার মত রোদে। আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই।
.
দ্রুতগামী জিপের পিছনে আরপিজি প্যাক ঘটছে রানা। একপাশে রকেট লঞ্চার, এ ছাড়া রয়েছে নানান এক্সপ্লোসিভ টিপড় রকেট চার্জ।
এক সেকেণ্ড পর যেটা খুঁজছিল, পেয়ে গেল রানা। ওটা কুখ্যাত সোভিয়েত পি-৬১ প্যালাডিয়াম চার্জ।
প্যালাডিয়াম চার্জের বাইরের খোলস প্যালাডিয়াম ধাতু দিয়েই তৈরি, কিন্তু ভিতরে রয়েছে এনহ্যান্সড় হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড এবং ওটার একমাত্র কাজ সিভিলিয়ান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট ধ্বংস করা।
নিউক্লিয়ার অস্ত্রের কোর-এ কমপক্ষে ৯০% এনহ্যান্স ইউরেনিয়াম থাকে। সিভিলিয়ান পাওয়ার প্লান্টের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের কোর-এ রাখা হয় মাত্র ৫% ইউরেনিয়াম। এদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার্ড এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের রিঅ্যাক্টরে থাকে ৫০% ইউরেনিয়াম। ফলে সিভিলিয়ান পাওয়ার প্লান্ট বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার্ড এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের রিঅ্যাক্টর থেকে নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশন হয় না। অবশ্য লিক করতে পারে রেডিয়েশন–যেমন হয়েছিল চেরনোবিলে–ছাতির মত আকাশে ওঠে না ওই জিনিস।
প্রতি সেকেণ্ড বেরোতে থাকে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন–ভয়ঙ্কর ফ্লেমেবল গ্যাস–ওটা ঠেকাতে ব্যবহার করা হয় রেকমবাইনার। ওটা বিপজ্জনক হাইড্রোজেন (H)কে রূপান্তরিত করে নিরাপদ (H2O)তে।
কিন্তু প্যালাডিয়ামের সঙ্গে হাইড্রোজেন মিশলে তৈরি হয় উল্টো প্রতিক্রিয়া। বহুগুণ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে হাইড্রোজেন। সৃষ্টি হয় বিপুল পরিমাণে দাহ্য গ্যাস। ওটার সঙ্গে প্যালাডিয়াম মিশতে থাকলেই জন্ম নেবে ভয়ঙ্কর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড।
দুই স্তরে কাজ করে পি-৬১ চার্জ ডেটোনেটর।
প্রাথমিক বিস্ফোরণ ঘটতেই মিশে যায় প্যালাডিয়াম ও হাইড্রোজেন, বিপুল পরিমাণে বাড়তে থাকে গ্যাস। এবং বোমার দ্বিতীয় স্তরে ওই গ্যাস ও অ্যাসিড জ্বলে ওঠে।
– ফলাফল প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ। নিউক্লিয়ার ব্লাস্টের মত অতটা ভয়ঙ্কর নয়, তবে দুনিয়ার আর সব বোমার চেয়ে শক্তিশালী। পি-৬১ চার্জ সহজেই ফাটিয়ে দিতে পারে যে কোনও এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের রিইনফোর্সড় পুরু খোল।
ওদিকে চলুন, আপা! ওই যে রিঅ্যাক্টরের এগস্ট ভেন্ট!
হ্যাঙার বে-র শেষে প্রকাণ্ড দুই সিলিখ্রিকাল ভেণ্ট দেখল নিশাত। ভেন্টের উপরাংশে ঘুরছে মস্ত ফ্যান, জাহাজের পিছন দিয়ে বের করে দিচ্ছে বাড়তি হাইড্রোজেন।
হ্যাঙার বে পেরোতে শুরু করেছে দ্রুতগামী জিপ, পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত সব ফাইটার বিমানকে।
জিপের পিছনে উঠে দাঁড়িয়েছে রানা, কাঁধে উপর তুলে নিল। আরপিজি, তাক করল এগস্ট চিমনির বিশালাকার ফ্যানে।
আমি ফায়ার করার পর, আপা, ছুটবেন উপরে যাওয়ার র্যাম্প লক্ষ্য করে! বড়জোর তিরিশ সেকেণ্ড, তারই ভেতর প্রথম স্তরের রিঅ্যাকশন শেষে শুরু হবে দ্বিতীয় স্তর! মনে রাখবেন, তিরিশ সেকেণ্ডের মধ্যে জাহাজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে!
ঠিক আছে!
লঞ্চারের সাইটের মাধ্যমে টার্গেট স্থির করল রানা। নিপাত যাক রিপাবলিক অভ ফ্রান্স, মনে মনে বলল।
টিপে দিল ট্রিগার।
দুপ আওয়াজ ছাড়ল লঞ্চার। হ্যাঙারের উপরের অংশের দিকে রওনা হয়ে গেল প্যালাডিয়াম টিপড় আরপিজি। তীরের মত চলেছে, পিছনে রেখে যাচ্ছে সরল রেখার ধোঁয়ার লেজ।
ডানদিকের এগস্ট ভেল্টের ফ্যান উড়িয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকল প্যালাডিয়াম চার্জ, নীচের দিকে রওনা হয়ে হারিয়ে গেল। উত্তাপ খুঁজছে ওটা।
আরপিজি রওনা হতেই অ্যাক্সেলারেটার–মেঝেতে টিপে ধরেছে নিশাত, চরকির মত জিপ ঘুরিয়ে নিয়েই উঠতে লাগল সুড়ঙ্গের মত র্যাম্প বেয়ে। খাড়া এ পথ উপরের ডেকে যাওয়ার।
বারবার বাঁক নিয়ে ঘোরানো পথে ঝড়ের গতিতে র্যাম্প বেয়ে উঠছে জিপ
তীক্ষ আওয়াজ তুলে পিছলে যেতে চাইছে চাকা। তারই ভিতর এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের পেটের অভ্যন্তর থেকে শুনতে পেল ওরা চাপা বুম্ আওয়াজ।
টার্গেটে লেগেছে প্যালাডিয়াম চার্জ।
স্টপওয়াচ চালু করল রানা।
০০.০১…
০০.০২…
.
ব্রিঁয়া পওলাসের আকাশে চার রাফায়াল ফাইটারের সঙ্গে ডগফাইটে ব্যস্ত কালো শকুন। বাতাসে শোঁ-শোঁ আওয়াজ তুলে বারবার বাক নিচ্ছে। তারই ফাঁকে মিসাইল ছুঁড়ে উড়িয়ে দিল এক রাফায়াল ফাইটার। ওটাই ছিল কালো শকুনের শেষ মিসাইল।
কঙ্গেল থেকে তীক্ষ্ণ বীইইইপ! আওয়াজ পেল রঘুপতি। নিচু স্বরে বলল, ওরা পুরো বুজে দিয়েছে আমাদের কাউন্টারমের ফ্রিকোয়েন্সি! শেষ হয়ে গেছে মিসাইল শিল্ড!
তখনই ওদের বিমানের পিছু নিল এক রাফায়াল ফাইটার। সাগরের উপর দিয়ে ঝড়ের গতিতে চলেছে দুই বিমান। সুখোই এর লেজের কাছে পৌঁছে গেছে রাফায়াল, ছুঁড়ছে কমলা রঙের ট্রেসার।
কালো শকুন ছুটছে তুমুল গতি তুলে, তারই ভিতর রিভলভিং গানার সিটে ঘুরে বসল কুয়াশা। টিপে ধরেছে ট্রিগার, ব্যবহার করছে বিমানের পেটের নীচের রিভলভিং গান। এক ঝাঁক গুলি ঝাঁঝরা করে দিল ফ্রেঞ্চ ফাইটারের ককপিট। ছিটকে উড়ে গেল ওটার ক্যানোপি। তার আগেই লাশ হয়ে গেছে পাইলট। নাক নিচু করে সাগরে গিয়ে পড়ল যুদ্ধ-বিমান। বিস্ফোরিত হলো বিপুল পানি, সঙ্গে বিকট আওয়াজ।
বস্! হঠাৎ বলল রঘুপতি, সামনের দিকের অস্ত্র লাগবে! এখনই!
সিটসহ ঘুরে গেল কুয়াশা, দেখল এইমাত্র পড়ে যাওয়া রাফায়ালের পিছনে ছিল আরও দুটো ফ্রেঞ্চ ফাইটার!
এবার মিসাইল লঞ্চ করবে রাফায়াল ফাইটার..
এক সেকেণ্ড পর কুয়াশা দেখল, বিমানের ডানা থেকে রওনা হয়েছে ধোঁয়ার দুটো আঙুল, সোজা আসছে কালো শকুনকে লক্ষ্য করে।
আকাশে গড়াতে শুরু করেছে রঘুপতি, ব্যবহার করল। সেকেণ্ডারি কাউন্টারমেযার: ওই সিস্টেমকে বলা হয় প্লামা স্টেলথ। আসলে আইয়োনাইড় গ্যাসের পার্টিকেল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় বিমান। ওটা ছোট একটা মেঘ যেন।
অনেক কাছে এসেও বিভ্রান্ত হলো দুই মিসাইল, ভি-এর মত দুদিকে রওনা হলো আইয়োন মেঘ দেখে। সুখোই থেকে ছিটকে সরছে মিসাইল, এক সেকেণ্ড পর দেখা গেল প্রথমটা প্রচণ্ড গতি নিয়ে নামল সাগরে। দ্বিতীয়টা ঘুরে গেল আকাশে, ছুটতে লাগল।
এখনও ছুটে আসছে দুই রাফায়াল ফাইটার, তাদের সঙ্গে কলিশন কোর্সে রয়ে গেছে কুয়াশার ব্রিমান।
ঝট করে ঘুরেই গুলিবর্ষণ শুরু করল কুয়াশা।
উড়ে গেল একটা রাফায়াল বিমানে বামদিকের ডানা। এক সেকেণ্ড পর বিকট আওয়াজ তুলে দুই বিমানকে বিদ্যুদ্বেগে। পিছনে ফেলল রঘুপতি।
অবশিষ্ট রইল একটি মাত্র রাফায়াল ফাইটার, কিন্তু সেটাও টিকল না। কুয়াশার বিমান ওটাকে পেরোবার পর পরই নিজের মিসাইলের আঘাতে দুই টুকরো হলো ফ্রেঞ্চ বিমান। ওই শেষ মিসাইল সুখোই-এর প্লামা স্টেলথ মেকানিমকে এড়িয়ে গিয়েছিল, কাছেই আরেকটা বিমান দেখে বিন্দুমাত্র ভুল করেনি।
শেষ বিস্ফোরণ দেখবার জন্য ঘরে, চাইল কয়াশা ও রঘুপতি। কিন্তু এমনসময় ভারী বুম্! আওয়াজ পেল ওরা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের দিক থেকে।
.
গতি আরও বাড়ান, আপা! রানা চেয়ে আছে স্টপওয়াচের দিকে।
০০.০৯…
০০.১০…
বিদ্যুদ্বেগে র্যাম্প বেয়ে উঠছে জিপ।
হঠাৎই পোর্টে ত্রিশ ডিগ্রি কাত হয়ে গেল প্রকাণ্ড জাহাজ।
যেতে থাকুন, আপা! তাড়া দিল রানা।
প্যালাডিয়াম চার্জের প্রথম আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাইড্রোজেন রেকমবাইনার। ওই আওয়াজ গম্ভীর।
তার মানে ক্যারিয়ারের কুলিং টাওয়ারে বিপুল ড্রাইড্রোজেন। তৈরি হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে তুমুল গতি তুলে। ঠিক ত্রিশ সেকেণ্ড পর প্যালাডিয়াম চার্জ ডেটোনেট করবে, আগুন ধরিয়ে দেবে। হাইড্রোজেনে। ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের।
০০.১১…
০০.১২…
র্যাম্প বেয়ে উঠে সোনালী রোদে বেরিয়ে এল জিপ, কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল।
হুলুস্থূল চলছে ফ্লাইট ডেকে।
ধোঁয়া উঠছে বিধ্বস্ত বিমান থেকে, একই অবস্থা অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানগুলোর। মারা পড়েছে বেশ কয়েকজন নাবিক। নাকের উপর ভর করে কুর্নিশ দিচ্ছে এক রাফায়াল ফাইটার–ভেঙে গেছে সামনের হুইল। ওটার কারণে ব্রিঁয়া পওলাসের দ্বিতীয় টেকঅফ রানওয়ে কাজে আসবে না। ওই বিমান টেকঅফ করতে রওনা হয়েছিল, এমন সময় কালো শকুনের মিসাইল ওটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
চট করে পরিস্থিতি বুঝে নিল রানা।
আপা! কুর্ণিশ করা বিমানের দিকে চলুন! উড়বে না তো! পাল্টা চেঁচাল নিশাত।
০০.১৫…
০০.১৬…
হুলুস্থূলের ভিতর ভাঙা বিমানের পাশে পৌঁছে গেল জিপ। নিশাত ঠিকই বলেছে, সামনের হুইল ভেঙে পড়ায় আর উড়তে পারবে না ওই বিমান।
০০.১৭…
০০.১৮…
আমি ওই বিমান ওড়াতে চাই না, বলল রানা, এটা ওড়াতে চাই।
লাফ দিয়ে জিপ থেকে নামল ও, উবু হয়ে তুলে নিল ক্যাটাপুল্ট হুক। বিধ্বস্ত বিমানের সামনের হুইলের সঙ্গে যুক্ত ছিল ওটা। ট্র্যাপেযেইডাল ক্যাটাপুল্ট হুক, বাষ্পচালিত ক্যাটাপুল্ট নয়। এই জিনিস ফ্লাইট ডেকের শুরু থেকে গুলতির মত ছুঁড়তে হয়। নব্বই মিটার ব্যবহার করে বিমান আকাশে তুলে দেয়।
রানা দেরি না করে ক্যাটাপুল্ট হুক আটকে দিল জিপের সামনের অ্যাক্সেলে, হুকের অন্য অংশ গেল ডেক ক্যাটাপুল্টে।
০০.১৯…
০০.২০…
স্যর, আপনি কি ঠাট্টা করছেন? জিপের সামনের রানওয়ে দেখছে নিশাত। রানওয়ে ফুরিয়ে গেছে বো-র শেষে। তারপর বহু দূরে দিগন্ত। ফ্লাইট ডেকে পেতে রাখা হয়েছে ক্যাটাপুল্টের রেইল। যেন দুই রেল লাইন। শেষে খাড়া হয়ে উঠেছে। রানওয়ে।
০০.২১…
০০.২২…
নিশাতের পাশে লাফ দিয়ে জিপে উঠল রানা।
গিয়ার নিউট্রাল করুন, সিট বেল্ট বেঁধে নিন, বলল রানা।
০০.২৩…
০০.২৪…
খপ করে তুলে সিট বেল্ট আটকে নিল নিশাত। একই কাজ করেছে রানা।
০০.২৫…
এমপি-৭ বের করেছে রানা, মাযল তাক করল ক্যাটাপুল্ট কন্ট্রোলের উপর। কালো শকুনের হামলা হওয়ার পর পরিত্যক্ত হয়েছে এদিকটা।
০০.২৬…
মাত্র একবার ট্রিগার টিপল রানা।
০০.২৭…
পরক্ষণে সাঁৎ আওয়াজ হলো।
রানার গুলি লাগতেই লঞ্চ লিভার ছেড়ে দিল ক্যাটাপুল্টকে। জীবনে প্রথমবারের মত অত ভয়ঙ্কর গতি পেল ওই জিপ।
নব্বই মিটার পেরোবে মাত্র ২.২ সেকেণ্ডে।
সিটে গেঁথে গেল নিশাত ও রানা। টের পেল, কোটরের ভিতর ঢুকে যেতে চাইছে চোখ।
অবিশ্বাস্য গতি তুলে রানওয়ে পেরোতে শুরু করেছে জিপ। চারপাশ ঝাপসা দেখল ওরা। জিপের সামনের দুই চাকা ফাটল পঞ্চাশ মিটার পেরোতেই।
তবুও রকেটের মত চলল গাড়ি, যেন ছিটকে বেরিয়ে এসেছে কামানের ব্যারেলের ভিতর থেকে গোলা–ভয়ঙ্কর গতি তুলে দিয়েছে ক্যাটাপুল্ট।
ফাইটার জেটের মত অত গতি পেল না জিপ, ফাইটার তার নিজের থ্রাস্টারও ব্যবহার করে।
রানা ও নিশাত আকাশে উড়ে যাওয়ার জন্য আগ্রহী নয়।
ওরা শুধু এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে বিস্ফোরণ হওয়ার আগেই পিতৃপ্রদত্ত প্রাণ নিয়ে নেমে যেতে চাইছে।
রানওয়ের শেষে পৌঁছে গেছে জিপ। ছিটকে উঠল আকাশের দিকে। সাঁই-সাঁই করে চলেছে বাতাস কেটে। নাক আকাশে, বনবন করে ঘুরছে চাকা। আর ওদের পিছনে ফেটে পড়ল গোটা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার!
কোথাও কোনও আগুন রইল না। রইল না কোনও ধোঁয়ার মেঘ। এসবের বদলে ভয়ঙ্কর বিকট এক আওয়াজ হলো: বুমমমম! থরথর করে কাঁপতে লাগল চারপাশ। চমকে উঠেছে যেন গোটা সাগর।
বাইরের দিকে ছিটকে গেল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের খোল–জ্বলন্ত হাইড্রোজনের বিপুল ধাক্কা খেয়ে প্রসারিত হলো প্রতিটি ইস্পাতের দেয়াল- যেন টিভি পর্দার ইনক্রেডিবল হাক, বেরিয়ে আসছে পোশাক ছিঁড়ে।
বিশাল নক্ষত্র বিস্ফোরণের মত করে আকাশে ছিটকে উঠল লাখ লাখ রিভেট। একমাইল দূরে পৌঁছে গেল, পরবর্তী এক মিনিট ধরে টুপটাপ সাগরে পড়ল। একটু আগে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের পিছন ডেক থেকে আকাশে উঠেছিল এক কপ্টার, রিভেট-বর্ষণে ঝাঁঝরা হয়ে গেল ওটা মাঝ আকাশে।
প্রকাণ্ড জাহাজের আস্ত সব স্টিলের পাত গিয়ে লাগল কাছের ডেস্ট্রয়ারগুলোর পাশে। তুবড়ে দিল জাহাজের একদিক, চুরমার হলো ব্রিজের জানালার সব কাঁচ।
ব্রিঁয়া পওলাসের সবচেয়ে ক্ষতি হলো পিছনদিকে। ওখানেই ছিল বিস্ফোরণের এপিসেন্টার কুলিং ভেণ্ট। জাহাজের পাত ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতেই ওখানে তৈরি হয়েছে মস্ত খোড়ল। হুড়মুড় করে ওই গর্ত দিয়ে ভিতরে ঢুকতে লাগল আটলান্টিক মহাসাগরের নীল ঢেউ।
ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় এবং সেরা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। ব্রিঁয়া পওলাস অনানুষ্ঠানিকভাবে ডুবতে লাগল চোখের সামনে।
মস্ত জাহাজের বো থেকে আকাশে উঠেছে রানা ও নিশাতের জিপ, বাতাস চিরে ছুটেছে বহুদূর লক্ষ্য করে। ডাঙায় চলা একটা জিপ গাড়ির পক্ষে যতদূর ওড়া সম্ভব উড়ে নামতে শুরু করল, নীচে। আগেই সিটবেল্ট খুলে ফেলেছে রানা ও নিশাত, পানিতে পড়ার ঠিক পাঁচ সেকেণ্ড আগেই দুজন দুদিকে লাফ দিল। জাহাজের ফ্লাইট ডেক থেকে পুরো পঁচিশ মিটার নীচে সাগর। কিন্তু ওরা লাফিয়ে পড়েছে বিশফুট ওপর থেকে। দুই সেকেণ্ড পর ঝুপ করে সাগরে নামল রানা ও নিশাত। বেকায়দাভাবে পড়ে ব্যথা পেল, ওদের বুট আগে নেমেছে। পানিতে, তীরের মত নেমে যেতে লাগল ওরা। এক সেকেণ্ড পর আবছা ভাবে শুনতে পেল বিকট আওয়াজ। ওদের পিছনে বিস্ফোরিত হয়েছে জাহাজ, চারপাশে বুলেটের মত ছিটকে গেছে লক্ষ লক্ষ নাট-বল্ট-রিভেট।
দ্রুত ডুবছে বিশাল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। আগে ডুবল পিছন দিক। দেখবার মতই দৃশ্য। যারা বেঁচে রইল, ছুটল লাইফ বোট সাগরে নামাতে। কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল ডেক থেকে সাগরে। কয়েক সেকেণ্ড পর যেন লেজের উপর দাঁড়িয়ে গেল মস্ত জাহাজ, আকাশে তুলেছে বো। এরই ভিতর তলিয়ে গেছে। পিছনদিক।
ওটার দিকে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল ফ্রেঞ্চ ক্যারিয়ার গ্রুপের অন্যান্য জাহাজের সবাই।
কেউ ভাবতে পারেনি এ ধরনের ফুলস্কেল ওঅর চলবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও দেশ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হারায়নি।
হতবাক হয়েছে বলেই হয়তো প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি হলো ফ্রেঞ্চদের। ওই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের একমিনিট পর আটলান্টিকের ঢেউয়ের দশফুট উপরে নেমে এল কালো এক রাশান ফাইটার, হার্নেসে করে বিক্ষুব্ধ পানি থেকে চটপট তুলে নিল দুজন মানুষকে বম বে-তে।
ওই দুজনকে তুলে নিয়েই আবারও আকাশ চিরে ছুটতে লাগল সুখোই ফাইটার, পিছন থেকে চেয়ে রইল ব্রিঁয়া পওলাস। এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার গ্রুপের আর সব জাহাজ।
বম বে-তে এসে ঢুকল কুয়াশা। মেঝেতে শুয়ে ছিল নিশাত, বৈজ্ঞানিককে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল।
অচেতন তিশার দিকে চাইল রানা, ওর জ্ঞান ফেরেনি?
ঘুমের কড়া ওষুধ দিয়েছি, বলল নিশাত, ক্ষত ড্রেসিং করেছি। গুরুতর আঘাত, কিন্তু এখনও ইনফেকশন হয়নি।
প্রথমে লণ্ডনে যাব, সিদ্ধান্ত নিল রানা, তিশার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
কালো শকুন এলিজাবেথ হসপিটালের সামনে নামতে পারে, বলল কুয়াশা। রেডিয়ো করে রানা এজেন্সির ছেলেদের জানিয়ে দাও ওখানে থাকতে। ওরা হসপিটালে ভর্তি করবে মেয়েটিকে।
কুয়াশার দিকে চাইল রানা। ঠিক আছে। এরপর ইংলিশ চ্যানেলের দিকে কোর্স স্থির করবে রঘুপতি। ওখানেই শারবার্গে রয়েছে প্রথম নোয়ায শিপ।
আস্তে করে মাথা দোলাল কুয়াশা, আবারও গিয়ে ঢুকল ককপিটে। বেড়ে গেল সুখোই ফাইটার বিমানের গতি, চলেছে। লণ্ডনের দিকে।
আট
আপার নিউ ইয়র্ক বে, ইউএসএ।
অক্টোবর ১৫। সকাল এগারোটা পঁচিশ।
চোদ্দ মিনিট আগে জেএফকে এয়ারপোর্টের টারমাক স্পর্শ করেছে ব্ল্যাকবার্ড ফাইটার জেট বিমান। আর এই মুহূর্তে মেরিন কর্পসের সিএইচ-৫৩ই সুপার স্ট্যালিয়ন হেলিকপ্টারে বসে আছে হোসেন আরাফাত খবির। স্ট্যাচু অভ লিবার্টির উপর দিয়ে উড়ে চলেছে কপ্টার আপার নিউ ইয়র্ক বে লক্ষ্য করে। পিছনে নিউ, ইয়র্কের বিস্তৃত পর্বতের মত স্টিল ও কাঁচের তৈরি প্রকৃতি।
কপ্টারের হোল্ডে খবিরের পাশে বসেছে পুরো সশস্ত্র বারোজন রেকন্যাসেন্স মেরিন।
ওই প্লান্টে টেরোরিস্টদেরকে পেয়েছেন আপনারা? চিৎকার করে মাইকে জানতে চাইল খবির, খানিকটা বিস্মিত। কথা বলছে ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্স টিমের দলনেতা এরিক হাডসনের সঙ্গে। তারা অভিযান করেছিল ড্রাগন প্লান্টে।
হ্যাঁ, তারা ছিল। সবাই গ্লোবাল জিহাদের লোক। তাদের। সঙ্গে শাহেদ করিমও ছিল। ওখানে ভয়ঙ্কর লড়াই হয়েছে।
গ্লোবাল জিহাদ, বিড়বিড় করল খবির। পরক্ষণে বলল, কিন্তু এসব তো ঠিক মিলছে না… চুপ হয়ে গেল ও।
হঠাৎ করেই বুঝতে শুরু করেছে সব। দোষ দেয়ার জন্য কাউকে দরকার ম্যাজেস্টিক-১২-র।
দোষ দিতে হলে টেরোরিস্ট অর্গানাইযেশনের চেয়ে ভাল। প্রার্থী আর কারা হতে পারে?
ড্রাগন কর্পোরেশন কী-ই বা করবে, যদি গ্লোবাল জিহাদের টেরোরিস্টরা তাদের মিসাইল ও জাহাজ ছিনতাই করে?
কিন্তু সত্যিকারের গ্লোবাল জিহাদ টেরোরিস্টদের পাবে কী করে ম্যাজেস্টিক-১২?
ফ্রান্স, বিড়বিড় করল খবির। ওরা জোগাড় করে দিয়েছে।
পাশেই বসেছে মেরিনদের নেতা ডেভিড, কথাগুলো শুনতে পেয়েছে। জিজ্ঞেস করল, খবির, আসলে এসব কী হচ্ছে? ভয়ে সিটিয়ে গেছে সবাই। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টেরোরিস্ট অ্যাটাক আসছে। আমাদের নিজেদের মিসাইল ফেলবে ওরা আমাদেরই ওপর।
কাজটা টেরোরিস্টদের নয়, ডেভিড, বলল খবির। এসবই চলছে ব্যবসা বড় করার জন্যে। বিশ্বাস করুন, প্লান্টে লড়াই শুরু হওয়ার আগেই মারা পড়েছে ওসব টেরোরিস্ট। ম্যাজেস্টিক ১২-কে গোপনে সহায়তা দিয়েছে ফ্রেঞ্চ সিক্রেট সার্ভিস। লাশ পৌঁছে দিয়েছে। এর এদিক ওদিক হয়নি।
স্ট্যাটেন আইল্যাণ্ডের কাছে নোঙর ফেলা কন্টেইনার শিপ ও সুপারট্যাঙ্কারগুলোর দিকে চাইল খবির। মাল বোঝাই সব জাহাজ, অপেক্ষা করছে হাডসন ও ইস্ট রিভারে ঢুকবার জন্য।
নোয়ায শিপ প্রজেক্টের কারণে এখন যে-কোনও জাহাজ হতে পারে মিসাইল লঞ্চ ভেসেল।
আমরা জানব কী করে কোন্ জাহাজটা? জানতে চাইল পাইলট।
জিপিএস কোঅর্ডিনেট ২৮৭৪৪-০৫-৪১০৫-৫৪ অনুযায়ী গেলেই ওখানে জাহাজটা পাব, বলল খবির।
সংখ্যাগুলো জেনে নিয়ে ডায়াল অ্যাডজাস্ট করে নিল পাইলট, জিপিএস লোকেটার অনুযায়ী এগুতে শুরু করেছে।
শতবারের মত পাম কমপিউটারে লঞ্চ লিস্ট দেখল খবির। মাসুদ রানার সঙ্গে কথা বলবার সময় নোয়ায শিপের জিপিএস লোকেশন বের করেছিল চার্লস ডেলাস।
কাজটা শেষে ওরা ম্যাপে তুলে নেয় কোথায় রয়েছে জাহাজগুলো।
আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির শহরগুলোর উপর নিউক্লিয়ার টিপৃড় মিসাইল ফেলবে তিনটা জাহাজ। এ ছাড়া, আরও রয়েছে দুটো নোয়ায শিপ। একটা আরব সাগরে। ইণ্ডিয়া ও পাকিস্তানের উপর ফেলবে মিসাইল। অন্যটা তাইওয়ান স্ট্রেইটে। বেইজিং ও হংকঙে ফেলবে টেপও-ডং আইসিবিএম।
আল্লা… ফিসফিস করল খবির। পরক্ষণে স্যাটালাইট মাইকে যোগাযোগ করতে চাইল: কনলন? আপনি কোথায়? পশ্চিমে কী ঘটছে?
.
প্রশান্ত মহাসাগর।
স্যান ফ্রান্সিসকো বে থেকে দুই মাইল দূরে। স্থানীয় সময় সকাল আটটা পঁচিশ মিনিট।
নিজেও একটা সুপার স্ট্যালিয়ন কপ্টারে বসে উড়ে চলেছে। কেভিন কনলন, তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে মেরিন রেকন টিম। থরথর করে কাঁপছে কেভিনের দুই হাঁটু, এ ছাড়া চেহারা দেখে বুঝবার উপায় নেই ও ভীত।
ওর মাথার চেয়ে দেড়গুণ বড় হেলমেট পরেছে, আর যে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরিয়ে দেয়া হয়েছে ওকে, ওটা দ্বিগুণ আকারের। কোলের উপর রেখেছে রিয়াল টাইম স্যাটালাইট আপলিঙ্ক ইউনিট। বিশালদেহী সব মেরিনদের মাঝে নিজেকে ওর বাচ্চা ছেলে মনে হচ্ছে।
এ মুহূর্তে প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ ছুঁয়ে ছুটে চলেছে সুপার স্ট্যালিয়ন। সামান্য দূরে স্যান ফ্রান্সিসকো উপকূলে নোঙর ফেলেছে একটি সুপারট্যাঙ্কার।
হাই, খবির, নতুন থ্রোট মাইকে গলা ছাড়ল কেভিন। আমরা পৌঁছে গেছি ওই সুপারট্যাঙ্কারের কাছে। মস্ত জাহাজ। যেমন হওয়ার কথা, ঠিক তেমনই। মিলে গেছে জিপিএস কো অর্ডিনেটুস পজিশন। সুপারট্যাঙ্কারের নাম এমভি রুবল, রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে ভার্জিনিয়ার নরফোকে। ওটার মালিক ড্রাগন শিপিং কোম্পানি, ড্রাগন কর্পোরেশনের সাবসিডিয়ারি।
হাঁটু কাঁপা থামলে ভাল হতো, ভাবল কেভিন।
আর বের করেছি আপনার মার্সেন প্রাইম, নতুন তথ্য দিল। ম্যান, সত্যিই দারুণ জিনিস ম্যাথমেটিক্সের মার্সেন নাম্বার। আজ পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র কিছু। এদের কোনও কোনওটা দুই মিলিয়ন ডিজিটের। খুবই রেয়ার প্রাইম নাম্বার। নির্দিষ্ট ফরমুলা অনুযায়ী পাওয়া যায়। মার্সেন প্রাইম = ২^p – ১ যেখানে p হচ্ছে প্রাইম সংখ্যা। কিন্তু উত্তরও হতে হবে প্রাইম সংখ্যা। তিন সংখ্যা হচ্ছে প্রথম মার্সেন প্রাইম। কারণ ২২-১ = ৩। ২ এবং ৩ আসলে প্রাইম সংখ্যা। কত ছোট সংখ্যা থেকে শুরু হয়েছে, বুঝতে পারছেন? কিন্তু শেষে কোথায় ঠেকবে কেউ জানে না। সপ্তম মার্সেন প্রাইম ৪,৩১,১২,৬০৯। ওটার বেস প্রাইম সংখ্যা বুঝতে পারছেন, ২^১৯ – ১ = ৪,৩১,১২,৬০৯, তার মানে প্রাইম…
উত্তর তা হলে ৪৩…
৪,৩১,১২,৬০৯, আবারও বলল কেভিন। এবার ধীরে ধীরে উচ্চারণ করছে।
দাঁড়ান লিখে নিই, বলল খবির। আপনি দুটো করে সংখ্যা বলতে থাকুন। ওদিকের কথা শুনে খসখস করে প্যাডে সংখ্যা লিখতে শুরু করেছে ও।
কয়েক মুহূর্ত পর উম্, হ্যাঁ, আর নেই, হতাশ স্বরে বলল কেভিন।
কিছুক্ষণ আগে স্যরের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসেও এ কথা জানিয়ে দিয়েছি, বলল খবির, ওই সংখ্যাগুলো স্যরকে জানিয়ে দেব। অনেক ধন্যবাদ, কেভিন।
সিগনাল কেটে গেল।
নিজের বিশ্বাসঘাতক দুই পায়ের দিকে চাইল কেভিন।
এ ধরনের কাজে যাওয়ার সময় এমনই হয়, মিস্টার কনলন, কেভিনের কম্পমান দুই হাঁটু দেখিয়ে সান্ত্বনা দিল মেরিনদের নেতা স্কট মোসলে। কিন্তু মিস্টার রানা যখন আপনাকে বিশ্বাস করেন, তার মানেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনি সক্ষম।
এ কথা বললেন, তাই ধন্যবাদ, বিড়বিড় করল কেভিন।
সগর্জনে সুপারট্যাঙ্কারের দিকে ছুটছে সুপার স্ট্যালিয়ন কপ্টার।
.
ইংলিশ চ্যানেল।
অক্টোবর ১৫। ফ্রান্স উপকূল।
বিকেল পাঁচটা পঁচিশ মিনিট। ইউএস ই.এস.টি. সকাল এগারোটা পঁচিশ মিনিট।
এই একটু আগে লণ্ডনের এলিজাবেথ হাসপাতালের লনে নেমেছিল কালো শকুন। তিশাকে বুঝে নিয়েছে রানা এজেন্সির ছেলেরা। দেরি হয়নি হাসপাতালের কেবিন পেতে।
সময় নষ্ট না করেই আবারও ইংলিশ চ্যানেলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে রানা, কুয়াশা, নিশাত ও রঘুপতি।
এ মুহূর্তে ভাবছে রানাঃ এর শেষ কোথায়? বাউন্টি হান্টারদের দিয়ে শুরু। না, তারও আগে পনেরোজনের মৃত্যু চেয়েছে ম্যাজেস্টিক-১২। এদের কারণে মারা পড়েছে বহু মানুষ। এখন মস্ত বিপদে পড়েছে গোটা দুনিয়া। আরও ঘোট পাকিয়েছে ডেমিয়েন ডগলাস। পুরো দুনিয়ার ক্ষমতা চাই তার।
দূর সাগরে চোখ রেখেছে কুয়াশা, নিশাত ও রোবট রঘুপতি, চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল রানার। আবারও রেডিয়ো করেছে খবির।
সব তথ্য পাঠিয়ে দিচ্ছি, স্যর, সময় নষ্ট না করেই বলল সার্জেন্ট।
টিপ আওয়াজ তুলল রানার পাম পাইলট: স্ক্রিনে ভেসে উঠল খবিরের প্লট করা সমস্ত নোয়ায শিপের হিসাব। চোখ বিস্ফারিত হলো রানার। আরব সাগর… তাইওয়ান স্ট্রেইটস্…
আর আপনার জন্যে সেভেন্থ মার্সেন সংখ্যা বের করেছে কেভিন কনলন, বলল খবির। ওটা ৪,৩১,১২,৬০৯। ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল আবারও।
বাম তালুতে সাবধানে সংখ্যা লিখে নিল রানা, তারপর বলল, ৪,৩১,১২,৬০৯, ঠিক আছে, খবির?
কে জানে, স্যর, হতাশ স্বরে বলল সার্জেন্ট।
কেভিনকে বোলো, এসব শেষে ওর সঙ্গে দেখা করব। …রানা আউট।
চ্যানেল পাল্টে নিল রানা, প্যাঁচ করল লণ্ডনের ইউএস এম্বেসিতে। মিস্টার ডেলাক্রুস, আপনাদের সাবমেরিনের কী খবর?
কিছুক্ষণ আগে লণ্ডনে ডেলাসের সঙ্গে কথা হয়েছে। রেডিয়োতে।
তাতে শ্বাস ফেলে স্বস্তি পেয়েছে ভদ্রলোক। যোগাযোগ করে ওয়াশিংটনে জানিয়ে দিয়েছে, মাসুদ রানা সুস্থ আছেন।
আমার কাছে ভাল-খারাপ, দুধরনেরই খবর আছে, বলল। ডেলাস।
ভাল খবর আগে দিন।
ভাল খবর হচ্ছে, আমাদের লস এঞ্জেলেস-ক্লাস অ্যাটাক সাবগুলো আছে আরব সাগর ও তাইওয়ান স্ট্রেইটে। প্রয়োজন পড়লে সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চ-বোটগুলোকে ডুবিয়ে দেবে।
এবার খারাপ সংবাদ?
আর খারাপ সংবাদ হচ্ছে: সঠিক সময়ে অন্য তিন লঞ্চ বোট, মানে নিউ ইয়র্ক, স্যান ফ্রান্সিসকো এবং ইংলিশ চ্যানেলের জাহাজ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে না আমাদের সাবমেরিন। এরা অনেক আগেই উৎক্ষেপ করবে মিসাইল। খবির আর কনলনকে গিয়ে উঠতে হবে ওই দুই জাহাজে, ডিসআর্ম করতে হবে মিসাইল।
বুঝলাম, বলল রানা।
পেয়ে গেছি! নিচু স্বরে বলল রঘুপতি। খেপা সাগরে নোঙর করা এক সুপারট্যাঙ্কারের দিকে আঙুল তাক করেছে। এদিক ওদিক দুলছে মস্ত জাহাজ।
হাওয়া ছেড়েছে বেশ। কাত হয়ে উৎক্ষিপ্ত বর্শার মত নামছে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা। ধূসর আকাশ চিরে দিল গাঢ় নীল বিদ্যুৎ ঝিলিক। খেপে উঠেছে সাগর। এদিক-ওদিক দুলছে প্রকাণ্ড জাহাজ। শক্তিশালী ফ্লাডলাইটে ভাসছে প্রকাণ্ড ডেক। ফ্রান্সের উপকূলে ওই জাহাজের মত মাল খালাস করবার জন্য অপেক্ষা করছে আরও অনেক জাহাজ।
ট্র্যান্সপণ্ডার সিগনাল আইডেনটিফাই করে বুঝেছি, ওটাই এমভি লোটাস, জিপিএস লোকেশনও মিলে গেছে।
গুড ওঅর্ক, রঘুপতি, বলল রানা। মিস্টার ডেলাস, আপনার সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ। এবার কাজে নামতে হবে আমাদেরকে।
কুয়াশা ও নিশাতের দিকে ঘুরে চাইল রানা। ধরে নিতে পারি ওরা বাধা দেবে। সেক্ষেত্রে গোলাগুলি হবে। এটা প্রথম জাহাজ, এটার মিসাইল ঠেকাতে পারলে দূর থেকেও অন্য জাহাজের মিসাইল ডিসআর্ম করতে পারব। কারও কোনও প্রশ্ন?
আমার কোনও প্রশ্ন নেই, বলল কুয়াশা।
দিন শেষে সব ভাল হোক, মন্তব্য করল নিশাত।
তা হলে তৈরি হয়ে নিন, আপা। আমরা জাহাজে নামছি, গম্ভীর সুরে বলল রানা।
বাউণ্টি হাণ্টার্স ২.২
নয়
ইংলিশ চ্যানেল।
স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। নিউ ইয়র্ক সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে এগারোটা।
মস্ত শকুনের মতই সুপারট্যাঙ্কারের ডেকের দশফুট উপরে নেমে এল সুখোই ফাইটার বিমান; ভাসতে লাগল ভ্রমরের মত। উজ্জ্বল ফ্লাডলাইটে ওটাকে মনে হলো ভয়ঙ্কর টেরোডাকটিল।
খুলে গেল কালো শকুনের বম বে, রেপেল করে ডেকে নেমে এল তিন মূর্তি: মাসুদ রানা, কুয়াশা ও নিশাত সুলতানা।
প্রত্যেকে সশস্ত্র। হাতে এমপি-৭, গ্লক পিস্তল অথবা দোনলা পার্ডি শটগান। এসবই পাওয়া গেছে পোল্যাণ্ডের হাউন্টি হান্টার পোলিশের বিমানের হোল্ডে। রঘুপতির বাম পা-র উরু খুলে রানা ও নিশাতের জন্য দুটো ভেস্ট বের করে দিয়েছে কুয়াশা। ভেস্টদুটোর পকেট ভরা নানান যন্ত্রপাতি ও অস্ত্র।
এমভি লোটাসের দীর্ঘ ফোরহেড-এ নেমেছে ওরা, সামনেই কন্ট্রোল টাওয়ার। বিকট আওয়াজ তুলে ওদের মাথার উপর থেকে বৃষ্টিভেজা আকাশে হারিয়ে গেল কালো শকুন।
পরের সেকেণ্ডে ওদের চারপাশে ফুলকি তুলল অসংখ্য। বুলেট।
কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করছে দুই স্নাইপার।
.
নিউ ইয়র্ক বে, ইস্ট কোস্ট, আমেরিকা।
আটলান্টিকের আরেকপ্রান্তে একইসময়ে সুপারট্যাঙ্কার এমভি করপোরেশনে ঝটিকা হামলা করেছে খবির এবং মেরিন যোদ্ধারা।
রানাদের মতই, যিপলাইন ব্যবহার করে কপ্টার থেকে নেমে এসেছে সুপারট্যাঙ্কারের ফোরডেকে।
রানার দলের মত করেই ভারী গুলিবর্ষণের মুখে পড়ল ওরা।
কিন্তু রানাদের মত আঁধার ও বৃষ্টির কারণে সুবিধা পাওয়ার উপায় নেই খবিরদের। সকাল সাড়ে এগারোটা। কটকটে রোদে কুঁচকে যাচ্ছে চোখের পাতা।
করপোরেশনের ব্রিজে অপেক্ষা করছিল দুই স্নাইপার, খবিররা দড়ির শেষে নেমে আসবার আগেই গুলি শুরু করেছে তারা।
সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়েছে দুই মেরিন, মৃত। ধুপ করে ডেকে পড়েই পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করল খবির।
.
স্যান ফ্রান্সিসকো, ওয়েস্ট কোস্ট, ইউএসএ।
পশ্চিম উপকূলে সুপারট্যাঙ্কার এমভি রুবল দখল করতে ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ছে কেভিন কনলনের সঙ্গী মেরিনরা।
কন্ট্রোল টাওয়ারের দুই স্নাইপারের তরফ থেকে পাল্টা গুলি আসেনি।
আগেই স্কট মোসলের সৈনিকরা বুঝে গিয়েছিল অ্যাম্বুশ হবে।
সুপার স্ট্যালিয়নের দরজা থেকেই দলের ক্র্যাক শুটার গেঁথে ফেলেছে দুই শত্ৰু স্নাইপারকে।
সুপারট্যাঙ্কারের কন্ট্রোল টাওয়ারের ছাতে ধুপধাপ নেমে এসেছে সবাই। কেভিনকে মাঝে আগলে রেখে ঝটিকা হামলা শুরু করেছে মেরিনরা।
জাহাজের হাই ভিজিবিলিটি ব্রিজ উইণ্ডোর পাশে স্নাইপারদের লাশ পেল ওরা।
দুই স্নাইপার কৃষ্ণ বর্ণের। পরনে আফ্রিকার খাকি মিলিটারি ফ্যাটিগ।
লাশদুটোর কাঁধের ইনসিগনিয়া অবাক করল মোসলেকে। আসলে হচ্ছেটা কী?
দুই স্নাইপারের পোশাকে যে ব্যাজ রয়েছে, তা ইরিত্রিয়ান আর্মির।
.
ইংলিশ চ্যানেল।
ঝলসে উঠেছে বিদ্যুচ্চমক। সুপারট্যাঙ্কারের খোলে এসে পড়ছে প্রকাণ্ড সব ঢেউ। মাঝে মাঝেই সৎ করে নীল-হলুদ বজ্র নেমে আসছে সাগরের বুকে, সেই সঙ্গে বিকট গর্জন। ফোরডেকে লেগে পিছলে নানাদিকে ছুটছে অসংখ্য বুলেট।
এমভি লোটাসের ব্রিজ লক্ষ্য করে গুলি করছে কুয়াশা ও নিশাত, মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে গেঁথেও ফেলল দুই স্নাইপারকে।
আগেই বোঝা উচিত ছিল জাহাজে গার্ড রাখবে ডেমিয়েন ডগলাস, অন্য দুজনের পাশে ছুটবার ফাঁকে বলল রানা। ফোরডেক পেরিয়ে কন্ট্রোল টাওয়ারের দরজা লক্ষ্য করে ছুটছে।
গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল নিশাত, এরা কারা? কাদের পাহারা দিতে পাঠিয়েছে?
টাওয়ারের দিকে ছুটতে গিয়ে ওরা পেয়ে গেল একটা অ্যাক্সেস হ্যাচ, ওটা খুলল রানা। চমকে গেল কানফাটা অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজে। হ্যাঁচের পাশেই দীর্ঘ মই, নেমেছে জাহাজের বিশাল মিসাইল হোল্ডে।
মইয়ের শেষে কী ঘটছে দেখে আগ্রহী হয়ে উঠল রানা ও কুয়াশা।
গোলাগুলি চলছে ওখানেই।
অবাক চোখে রানা ও কুয়াশা দেখল, কালো পোশাক পরা একদল কমাণ্ডো লড়ছে। হাতে উযি এবং এম-১৬ রাইফেল। নিখুঁত মুভমেন্ট। গুলি করছে অচেনা একদল শত্রুকে লক্ষ্য করে।
আবারও হ্যাচ আটকে দিল রানা। চাপা স্বরে বলল, আমরা। বোধহয় অন্যের লড়াইয়ে নাক গলাতে যাচ্ছিলাম।
নীচে কী দেখলেন, স্যর? চেঁচিয়ে জানতে চাইল নিশাত।
আমরা এই সুপারট্যাঙ্কারে প্রথম পার্টি নই, বলল রানা।
অ্যাঁ? তা হলে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ছে নীচে ওরা কারা?
চোখে চোখে কুয়াশার সঙ্গে কথা হলো রানার। খুব কম এলিট ইউনিট আজও উযি ব্যবহার করে, বলল কুয়াশা। ওরা ইজরায়েলি ফোর্স।
আমিও একমত, বলল রানা।
আপনারা একটু খুলে বলবেন, আসলে কী হচ্ছে, রেগেই গেল নিশাত। বৃষ্টির ভিতর নকল পা ঠুকল ডেকে।
আমার ধারণা, বলল রানা, আমাদের আগে এমন এক লোক এসে জাহাজে উঠেছে, যার ক্ষমতা আছে টাচলক সিকিউরিটি সিস্টেম ডিসআর্ম করার। সে ইজরায়েলি এয়ার ফোর্সের আব্রাম অ্যামনন। সঙ্গে এসেছে ইজরায়েলের সেরা ট্রপ–সায়ারেত তিযামহিম।
আজকের দিনটাই অদ্ভুত, বিরক্ত হয়ে বলল নিশাত। আজিব, এমন কী ইজায়েলিরাও আজকে আমাদের পক্ষে লড়ছে! এরপর কী যে হবে, স্যর! প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল ওর কণ্ঠ।
চট করে ঘড়ি দেখে নিল রানা। পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। নিউ ইয়র্কে এগারোটা পঁয়ত্রিশ মিনিট।
আর মাত্র দশ মিনিট পর লঞ্চ করা হবে নিউক্লিয়ার মিসাইল।
নীচে খুনাখুনি করুক ইজরায়েলিরা, অ্যামনন মিসাইল ডিসআর্ম করে হিরো হলে আমার কোনও আপত্তি নেই, মৃদু হাসল রানা। আমাদের কাজ এখন টাওয়ারে যাওয়া। ওই স্নাইপারদের দেখতে চাই। জানতে চাই তারা কারা, কাদের বিরুদ্ধে লড়ছি। দরকার পড়লে গিয়ে সাহায্য করব অ্যামননের দলকে।
কয়েক সেকেণ্ডে টাওয়ারের সামনে পৌঁছে গেল ওরা, মাত্র দরজা খুলেছে রানা, এমনসময় চোখ ধাঁধানো আলো পড়ল ওদের উপর। মাথার উপরে সার্চলাইট জ্বেলেছে হেলিকপ্টার।
ঝট করে ঘুরে চাইল রানা, মুখে এসে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। যাহ, মুশকিল, বিড়বিড় করে বলল।
এক শ গজ দূরে সুপারট্যাঙ্কারের ফোরডেকে অত্যুজ্বল সাদা আলো নিয়ে নামছে চোরাই মাল, অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার।
এক সেকেণ্ড পর ডেকে নেমে এল ওটা।
লাফ দিয়ে কপ্টার থেকে ডেকে নামল তিনজন লোক, পরনে রাশান ব্যাটল-ড্রেস ইউনিফর্ম, হাতে স্করপিয়ন মেশিন পিস্তল…
স্পেত্ৰ্যায কোবরা ইউনিটের মিখাইল পেদরোনভ, এবং তার দলের অবশিষ্ট দুই সদস্য।
ধ্যাৎ, ভুলে গিয়েছিলাম, নিচু স্বরে বলল কুয়াশা। এখনও পুরস্কার আছে তোমার মাথার ওপর, রানা। ওই যে মিখাইল পেরোনভ।
ঝটপট কন্ট্রোল টাওয়ারে ঢুকে পড়ল ওরা। বেশ কয়েকটা মইয়ের মত ধাপ পেরিয়ে ব্রিজে উঠে এল।
রানা চট করে দেখল ঘডি; পাঁচটা ছত্রিশ মিনিট।
কানে কনলনের কণ্ঠ শুনল: মেজর, স্যান ফ্রান্সিসকোর সুপারট্যাঙ্কার দখল করে নিয়েছি আমরা। চার স্নাইপার ছিল, পরনে ইরিত্রিয়ান আর্মির ইউনিফর্ম। আর…
দুই স্নাইপারের লাশের পাশে পৌঁছে গেছে রানা, কিছুই শুনছে না।
এই দুজন আফ্রিকান সৈনিক। কমাণ্ডো। খাকি ফ্যাটিগ।
কালো হেলমেট।
কাঁধে একটা ক্রেস্ট। কিন্তু ওটা ইরিত্রিয়ার ক্রেস্ট নয়।
এদের ক্রেস্ট নাইজেরিয়ান আর্মির এলিট কমাণ্ডো ইউনিট প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের।
আফ্রিকার অসংখ্য গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়েছে নাইজেরিয়ান প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড, তাদের খুনি হওয়ার ট্রেনিং দিয়েছিল সিআইএ। শুধু যে অন্য দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল তাই নয়, নাইজেরিয়ান নাগরিকদের বিরুদ্ধেই নামিয়ে দিয়েছিল। ল্যাগোস ও আবুজা-র মানুষ আজও প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডদের চেনে আরেকটি নামে: দ্য ডেথ স্কোয়াড।
এরাই ডেমিয়েন ডগলাসের প্রোটেকশন টিম। ব্রিজে ছিল এই দুজন স্নাইপার। ডেকের নীচে রয়েছে আরও সৈনিক, পাহারা দিচ্ছে মিসাইল সাইলো। হোল্ডে এখন এদের বিরুদ্ধেই লড়ছে ইজরায়েলিরা।
কেভিন, তুমি বলেছিলে ওই লোকগুলো ছিল ইরিত্রিয়ান।
ঠিকই শুনেছেন।
নাইজেরিয়ান নয়?
না। আমার সঙ্গী মেরিনরা তাই বলেছে। ইনসিগনিয়া ইরিত্রিয়ানই ছিল।
ইরিত্রিয়া… ভাবছে রানা।
স্যর, ডাকল নিশাত। খুলে ফেলেছে স্টোররুমের দরজা।
ছোট ঘরের মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে চারটে বডি ব্যাগ। ঝটপট একটার যিপার টেনে খুলল নিশাত। কুঁচকে গেল নাক। মরা লাশের গা থেকে পচা গন্ধ আসছে। লোকগুলো গ্লোবাল জিহাদের টেরোরিস্ট।
এবার বুঝলাম, বলল রানা। ওদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে দোষ।
স্যাটালাইট মাইক চালু করল ও।
কেভিন, তোমার সঙ্গের মেরিনদের সতর্ক থাকতে বলো। জাহাজের মেইন হোল্ডে আরও আফ্রিকান সৈনিক থাকবে। তারা সাইলো পাহারা দিচ্ছে। সরি, কেভিন, লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ওই সৈনিকদের পেরিয়ে তোমার স্যাটালাইট আপলিঙ্ক নিয়ে যেতে হবে মিসাইলের কন্ট্রোল কন্সেলের ষাট ফুটের ভেতর, নইলে আমি কিছুই ডিসআর্ম করতে পারব না।
বুঝলাম, বলল কেভিন। হারিয়ে গেল সিগনাল।
আমাদের হাতে সামান্য সময়, বলল নিশাত। কুয়াশার পাশে ব্রিজের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখ খুঁজছে। পেরোনভকে। কুয়াশার কাছে জানতে চাইল, লোকটাকে দেখছেন?
না। ইঁদুরটা গর্তে ঢুকেছে, বলল কুয়াশা। ওর টার্গেট হয়তো অ্যাব্রাম অ্যামনন।
হঠাৎ কানের ভিতর জোরালো স্বরে বলে উঠল রঘুপতি: বস, মিস্টার রানা, নতুন কন্ট্যাক্ট পেয়েছি, দ্রুত আসছে আপনাদের সুপারট্যাঙ্কারের দিকে। কোনও ধরনের বড় কাটার। দেখে মনে হচ্ছে ফ্রেঞ্চ কোস্ট গার্ড।
জানালার সামনে পৌঁছে গেল রানা, দূরে দেখতে পেল বড়সড় সাদা একটা জাহাজ। ওটা আসছে স্টারবোর্ডের দিকে।
ভীষণ শুকিয়ে গেছে গলা, টের পেল রানা।
ইজরায়েলি টুপ, নাইজেরিয়ান ডেথ স্কোয়াড, রাশান বাউন্টি হান্টার–এসব তথ্য হজম করেই ভাবছিল এরপর কী করবে, এখন হাজির হচ্ছে ফ্রেঞ্চ মেরিটাইম পুলিশ!
না, ওটা কোস্ট গার্ডদের জাহাজ নয়, নাইট ভিশন বিনকিউলারে চোখ রেখেছে কুয়াশা।
পরিষ্কার দেখছে বড়সড় কাটার জাহাজটা মস্ত বড় ঢেউ চিরে আসছে- বোটা ছুরির মত চোখা, দীর্ঘ ফোরডেকে কামান, হুইল হাউসটা কাঁচে ঘেরা। হুইলহাউসের জানালার কাঁচে ছলকে লেগেছে রক্ত।
হুইলের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র লোক।
ওই জাহাজ নিয়ে আসছে ডেভিড এন. হেন্ড্রিক, বলল কুয়াশা।
চট করে রানা আরেকবার ঘড়ি দেখল। পাঁচটা আটত্রিশ। সাত মিনিট পর লঞ্চ করা হবে মিসাইল।
আরও বাউন্টি হান্টার, বিড়বিড় করল রানা। পরক্ষণে বলল, রঘুপতি, ওদেরকে ঠেকাতে পারবে?
না, মিস্টার রানা। আমার কোনও মিসাইল অবশিষ্ট নেই।
বুঝলাম, ঝড়ের গতিতে ভাবতে শুরু করেছে রানা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ঠিক আছে, রঘুপতি, আগের ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী কাজ করো। আমরা যদি সঠিক সময়ে মিসাইল ডিসআর্ম করতে না পারি, তোমার সাহায্য নিয়ে সরে যেতে হবে।
জী, মিস্টার রানা।
ঘুরে দাঁড়াল রানা। ভাবছে, কিন্তু বুঝে উঠছে না কী করবে।
সব ঘটতে শুরু করেছে বড় দ্রুত। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে পরিস্থিতি। ডিসআর্ম করতে হবে মিসাইল, জাহাজে উঠেছে ইজরায়েলিরা, নাইজেরিয়ান ট্রপস, হাজির হয়েছে রাশান আর ব্রিটিশ বাউন্টি হান্টাররা…
ভাবো, রানা! ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো! মনে মনে বলল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর মনস্থির করল। নিজেকে জিজ্ঞেস করল, এসবের ভেতর দিয়ে কী পেতে চাও তুমি? …পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের আগেই মিসাইল ডিসআর্ম করতে চাই। আর সবকিছু জাহান্নামে যাক!
ব্রিজের পিছনে এলিভেটারের উপর চোখ পড়ল ওর।
আমরা হোল্ডে নামছি, সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। চট করে দেখে নিল ঘড়ি: পাঁচটা উনচল্লিশ।
দশ
নিউ ইয়র্ক বে।
স্থানীয় সময় এগারোটা ঊনচল্লিশ মিনিট।
ঝকমকে রোদেলা সকালে সুপারট্যাঙ্কারের ফোরডেকে ডাইভ দিয়ে কাভার নিল খবির ও তার সঙ্গীরা।
হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পড়ল খবির ডেক হ্যাঁচের উপর। ওখান থেকে নামল দীর্ঘ মই বেয়ে।
নীচে প্রায় অন্ধকার। খবিরের পিছনে আসছে মেরিন এস্কোর্ট। মেঝেতে নেমে এসেই চট করে চারপাশ দেখে নিল খবির।
প্রকাণ্ড গুহার মত হোল্ড। জায়গাটা দৈর্ঘ্যে হবে কমপক্ষে তিন শ গজ। অন্ধকারে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে চুরুট আকৃতির মিসাইল সাইলোগুলো। যেন মস্ত সব পিলার ধরে রেখেছে ছাত।
একেবারে শেষ সাইলোর সামনে ব্যারিকেড তৈরি করেছে সশস্ত্র একদল কৃষ্ণ বর্ণের আফ্রিকান কমাণ্ডো। ব্যারিকেড মজবুত করবার জন্য ব্যবহার করেছে স্টিলের ক্রেট ও ফোর্ক-লিফট।
.
ইংলিশ চ্যানেল।
পাঁচটা ঊনচল্লিশ।
এলিভেটারের দরজা খুলে যেতেই দেখা গেল সুপারট্যাঙ্কারের মেইন হোন্ড।
অস্ত্র বাগিয়ে বদ্ধ খুপরি থেকে বেরিয়ে এল রানা, কুয়াশা ও নিশাত।
মিসাইল হোল্ড অবিশ্বাস্য রকমের প্রকাণ্ড পর পর তিনটা ফুটবল মাঠ জুড়ে দিলেও জায়গা রয়ে যাবে। জাহাজের ফোরডেকের নীচে সামনের অর্ধেক জায়গা জুড়ে লিযার্ড মিসাইলের সাইলো: হাই রিএনফোর্সড় টাইটেনিয়াম সিলিণ্ডার। ভিতরে রয়েছে মানব সৃষ্ট সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র।
এবং জাহাজের সামনের দিকে চলছে তুমুল লড়াই।
শেষ দুই মিসাইল সাইলোর সামনে বাঙ্কার করেছে নাইজেরিয়ান কমাণ্ডোরা। কাভার করছে মিসাইল কন্ট্রোল কন্সোল–ডেক থেকে দশফুট উপরে স্টিলের স্ট্রাট দিয়ে তৈরি উঁচু প্ল্যাটফর্ম। মিসাইল ডিসআর্ম করতে হলে ওই জায়গার ষাট ফুটের ভিতর পৌঁছুতে হবে রানাকে।
খুবই মজবুত ব্যারিকেড করেছে নাইজেরিয়ানরা। ঝড়ের মত গুলি করছে মেশিনগান ব্যবহার করে, দরকার পড়লে ইজরায়েলি হামলাকারীদের উদ্দেশে গ্রেনেডও ছুঁড়ছে।
বুলেট ও গ্রেনেড লাগছে সাইলোর গায়ে, কিছুই হচ্ছে না পুরু টাইটেনিয়ামের।
ওই রণক্ষেত্র এবং রানার মাঝে রয়েছে অসংখ্য জিনিস: শিপিং কন্টেইনার, মিসাইল স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদি। এমন কী দুটো হলদে মিনি-সাবমেরিনও দেখল রানা। সিলিং ক্যাটওয়াক থেকে নেমে আসা শেকলে ঝুলছে ও-দুটো।
চিনতে পারল রানা।
মডিফায়েড এএসডিএস।
অ্যাডভান্সড় সিল ডেলিভারি সিস্টেম। সঙ্গে কাঁচের গম্বুজের মত হেমিস্ফেয়ারিক ককপিট। অগভীর সাগরে নামে, স্যাবোটাজ করা হয়নি তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বা ব্যালেস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের খোল পরীক্ষা করে ইউএস নেভি। নোয়ায শিপ-লিয়ার্ড প্রজেক্টে ব্যবহার করবার জন্য ওগুলো তৈরি করা হয়েছে।
চট করে ঘড়ি দেখে নিল রানা।
পাঁচটা চল্লিশ মিনিট।
একবার ইশারা করল রানা। ছুটতে শুরু করেছে। কুয়াশা ও নিশাত ওর পাশেই চলল। কুঁজো হয়ে খরগোশের মত ছুটছে ওরা। নানান সাপ্লাই জিনিসের ভিতর দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে। চোখ রেখেছে যুদ্ধের উপর।
একইসময়ে জানের তোয়াক্কা না করে আক্রমণাত্মক হামলা শুরু করল ইজরায়েলিরা।
ডানদিক দিয়ে এগুচ্ছে তাদের কয়েকজন। নাইজেরিয়ানদের গুলি আকর্ষণ করছে। এই সুযোগে বামদিকের লোকগুলো শত্রু ব্যারিকেড লক্ষ্য করে পরপর তিনটে রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেড ছুঁড়ল।
মিসাইল হোল্ডের আকাশে ছুটে গেল গ্রেনেডগুলো… লেজে সাদা ধোঁয়ার মেঘ। একইসঙ্গে গেল তিন বোমা, লাগল নাইজেরিয়ান ব্যারিকেডে।
ফলাফল হলো নদীর পোক্ত বাঁধ ভেঙে পড়বার মতই।
ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের আঘাতে পলকা পুতুলের মত বাতাসে ভেসে উঠল নাইজেরিয়ান কমাণ্ডোরা। আর্তচিৎকার করছে কয়েকজন। অন্যরা পুড়ে খাক হয়ে গেছে।
ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ল ইজরায়েলিরা, কোনও দয়া না দেখিয়ে খুন করতে লাগল নাইজেরিয়ান কমাণ্ডোদেরকে। গুলি করা হচ্ছে আহতদের মাথায় মাল ঠেকিয়ে।
ওই একইসময়ে হোল্ডের স্টারবোর্ডের দেয়ালে গুড়গুড় আওয়াজ তুলে খুলে যেতে লাগল প্রকাণ্ড স্টিলের একটা লোডিং ডোর। ওটাকে উপরে তুলছে রানারগুলো।
জোরালো ধুম্ আওয়াজ তুলে পুরো খুলে গেল মস্ত কবাট। আর সাগরের দিক থেকে ঠেলে দেয়া হলো স্টিলের বোর্ডিং প্লাঙ্ক। ষোড়শ শতাব্দীর জলদস্যুরা এভাবেই গ্যালিয়নে উঠে আসত।
চোরাই কোস্ট গার্ড জাহাজ থেকে বুটের ধুপধাপ আওয়াজ তুলে হোল্ডে এসে ঢুকল কন্টিনেন্টাল সোলজার বাউন্টি হান্টার দলের ৬৬ নম্বর ইউনিটের সদস্যরা। হাতের মেটালস্টর্ম রাইফেলগুলো আগুন উগলে দিতে শুরু করেছে।
চেয়ে আছে রানা: ৬৬ নম্বর ইউনিটের বাউন্টি হান্টাররা সংখ্যায় কমপক্ষে বিশজন, তাদের গুলিবর্ষণের সামনে কচুকাটা হতে লাগল ইজরায়েলি সায়ারেত তিযামহিমের সদস্যরা। এইমাত্র মিসাইল কন্ট্রোল কন্সেল দখল করেছিল তারা।
উঁচু কঙ্গেল প্ল্যাটফর্মের সামনে ছোট অর্ধচন্দ্র তৈরি করল লোকগুলো, প্রত্যেকে চেয়ে আছে জাহাজের পিছনদিক লক্ষ্য করে, যন্ত্রের মত গুলি করছে উযি ও এম-১৬ রাইফেল দিয়ে ৬৬ ইউনিটকে লক্ষ্য করে।
দুঃসাহসী লোকগুলোর দেয়া নিরাপত্তা নিয়ে স্টিলের প্ল্যাটফর্ম বেয়ে উঠে গেল এক লোক।
রানা ধারণা করল, এ লোকই আব্রাম অ্যামনন। সোজা কন্সেলের সামনে চলে গেল সে, হাতের ব্রিফকেস থেকে বের করল টাচলক-৯ ডিসআর্ম ইউনিট।
হারামজাদা ইজরায়েলিরা, তিক্ত স্বরে বলল নিশাত। আর সব তো চুরি করেই, এমন কী অন্য দেশের টেকনোলজিও হজম করে ফেলে।
যা করছে করুক, বলল রানা। দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশের হয়ে কাজ করছে এখন। আমরা রক্ষা করতে চাইব সায়ারেত তিযামহিমের সদস্যদেরকে। ওরা নজর রাখবে অ্যামননের ওপর।
আরেকবার হাতঘড়ি দেখল রানা।
পাঁচটা একচল্লিশ মিনিট।
ও একটা মিসাইল সাইলোর আড়াল থেকে উঁকি দিল রানা। ল্যাপটপের মত করেই টাচলক ইউনিট কোলে নিয়েছে অ্যাব্রাম অ্যামনন, স্ক্রিন থেকে বেরুচ্ছে আলো। টাচস্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে লোকটা। ডানহাতের আঙুলগুলো নেড়েচেড়ে নিল। বুঝতে পারছে, যে-কোনও সময়ে শুরু হবে ডিসআম সিকিউয়েন্স।
মিসাইল সিস্টেম ডিসআর্ম করবে অ্যামনন, ভাবল রানা। সামান্যতম হিংসাও এল না, ওর মনে। ভাবছে, সেক্ষেত্রে কোনও ঝামেলা ছাড়াই সরে যাব।
পরক্ষণে চমকে গেল রানা। দেখল, মিসাইল হোল্ডের উপর রাফটারে অ্যামননের কন্সেল প্ল্যাটফর্মের পিছনে হাজির হয়েছে তিন ছায়ামূর্তি।
এদেরকে দেখতে পায়নি সায়ারেত তিমহিমের সদস্যরা। ডেভিড এন. হেন্ড্রিকের দলের দিকে গুলি পাঠাতে ব্যস্ত।
না… ফিসফিস করল রানা। না… না…
• যিপলাইন ব্যবহার করে মাকড়সার মত নেমে এল ওই তিন ছায়ামূর্তি, গতি অবিশ্বাস্য।
পেপেরোনভ এবং তার কোবরা কমাত্তোরা।
জাহাজের ফোরডেকে বো-র কাছের এক হ্যাচ ব্যবহার করে নেমে এসেছে।
কাভার থেকে ছিটকে সরল রানা, গোলাগুলির আওয়াজের ভিতর অনর্থক, তবুও গলা ফাটিয়ে চেঁচাল, তোমার পিছনে দেখো!
রানার কথাটা শুনতে পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাল অ্যামননকে রক্ষা করা কমাণ্ডোরা।
গুলি এল রানাকে লক্ষ্য করেই।
এমন কী অ্যামননও মুখ তুলে চাইল। আবারও মনোযোগ দিতে গেল ডিসআর্ম সিকিউয়েন্স-এ।
যেভাবে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল রানা, তার তিনগুণ গতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ও সাইলোর পিছনে। পরক্ষণে কাঁকড়ার মত চার হাত-পা ব্যবহার করে আবারও উঁকি দিল ওদিকে।
ওই একইসময়ে উঁচু প্ল্যাটফর্মে ব্যস্ত অ্যামননের কয়েক গজ পিছনে আস্তে করে নেমে এল তিন কোবরা কমাণ্ডো।
চেয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারল না রানা, হতবাক। ইজরায়েলিরা গুলি পাঠাচ্ছে এদিকে। অস্ত্রের মাযলে দপদপ করছে আগুন। নিঃশব্দে সামনে বাড়ল মিখাইল পেদরোনভ, কোমরের খাপ থেকে নিয়েছে কসাক ফাইটিং সোর্ড, এক সেকেণ্ড পর অ্যামননের ঘাড়ের পিছনে নেমে এল ক্ষুরধার তলোয়ার।
ওই মুহূর্তে বাউন্টি লিস্টের শেষতম জীবিত শিকার উঠল মাসুদ রানা। পৃথিবীর একমাত্র মানুষ, যে ডিসআর্ম করতে পারবে টাচলক-৯ মিসাইল সিকিউরিটি সিস্টেম।
অ্যামননের কাঁধ থেকে খসে পড়ল মাথা, তখনও ডিসআর্ম সিকিউয়েন্স চালুই করতে পারেনি।
ঢোক গিলল রানা, ব্যাঙের ডাকের মত শোনাল ওর কণ্ঠ: এবার?
সায়ারেত তিমহিমের এক সদস্য ঘাড় ফিরিয়ে চাইল, পরক্ষণে মস্ত হাঁ করল সে। এইমাত্র ধুপ করে কন্সেলের সামনের মেঝেতে পড়েছে মুণ্ডুহীন অ্যামননের ধড়। কলকল করে গড়াতে শুরু করেছে তাজা রক্ত। ইজরায়েলি কমাণ্ডো দেখল, এক লোক রাকস্যাকে পুরে ফেলেছে অ্যামননের মাথা। পরক্ষণে রিট্রাক্টবল যিপলাইন ব্যবহার করে সাঁই করে উঠে গেল হ্যাঁচের দিকে।
টাশ টাশ আওয়াজ তুলল দুটো অস্ত্র। অন্য দুই কোবরা কমাণ্ডে গুলি করছে ইজরায়েলি ট্রুপারদের মুখের উপর। ওই একইসময়ে ৬৬ ইউনিটের হেণ্ডিকের লোক উল্টো দিক থেকে উড়িয়ে দিল আরও দুই সায়ারেত তিযামহিম সদস্যকে।
দুদিক থেকে গুলির মুখে পড়ে অসহায় হয়ে গেল ইজরায়েলিরা। তাদের শত্রুরা প্রফেশনাল বাউন্টি হান্টার।
সায়ারেত তিযামহিম সদস্যদের অবশিষ্ট কয়েকজন খেয়াল করেছে অ্যামননের লাশ ফেলে উপরে রওনা হয়েছে কোবরা কমাণ্ডোরা। দ্বিধার ভিতর পড়ে এবং হেণ্ডিকের দলের তুমুল গোলাগুলিতে ফর্মেশন নষ্ট হয়ে গেল ইজরায়েলিদের।
কচুকাটা হলো তারা।
দেখতে না দেখতে তাদের সামনে পৌঁছে গেল ৬৬ ইউনিট। আহতদেরকেও ছাড়া হলো না, কয়েক সেকেণ্ডে শেষ হয়ে গেল ইজরায়েলি ফোর্সের শেষ সৈনিকও।
সাইলোর আড়াল থেকে চেয়ে আছে রানা। চট করে দেখে নিল ঘড়ি।
পাঁচটা বেয়াল্লিশ মিনিট।
ব্যারিকেডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেভিড এন. হেন্ড্রিক। তার ভাবচক্কর অন্যরকম হয়ে উঠল। যেন শত্ৰু ব্লকেড জয় করেছে এক জেনারেল। সিলিঙের দিকে আঙুল তাক করল সে। ওদিক দিয়েই রিট্রাক্টেবল যিপলাইন ব্যবহার করে বেরিয়ে গেছে। মিখাইল পেদরোনভ এবং তার দুই সঙ্গী। সঙ্গে নিয়ে গেছে মহামূল্যবান অ্যামননের মাথা।
.
কোবরা কমাণ্ডোরা পৌঁছে গেছে সিলিঙের কাছে, পাশেই চওড়া একটা কার্গো হ্যাচ।
হ্যাচ দিয়ে বেরিয়ে বৃষ্টি ভিতর ফোরডেকে পৌঁছে গেল পেরোনভের দুই সঙ্গী, একজনের হাতে কাটা মাথার ব্যাগ। দুই সেকেণ্ড পর টেনে তুলতে চাইল নেতাকে।
তখনই মেশিনগানের শতখানেক গুলি খেয়ে ঝাঁঝরা হলো। ভয়ঙ্কর ঝুঁকি খেয়েছে, ছিটকে বেরোতে লাগল রক্তের ঝর্না।
৬৬ ইউনিটের একটি উপদল বৃষ্টির ভিতর অপেক্ষা করছিল। এমন হতে পারে তা আগেই ধারণা করেছিল ডেভিড এন. হেন্ড্রিক, আগে ভাগেই ফোরডেকে রেখেছে দ্বিতীয় টিম।
অ্যামননের মাথার ব্যাগ পড়েছে ডেকে, কাটা পড়া ঘুড়ির পিছনে ছুটন্ত বাচ্চা ছেলেদের মত ছুটে এল ৬৬ ইউনিটের সাব টিম। সামনের লোকটা খপ করে তুলে নিল সাধের ধন।
শত্রুরা সংখ্যায় অনেক বেশি, একাকী পেরোনভ লুকিয়ে পড়ল ফ্লোর লাইনের নীচে। শরীরে দোল দিয়ে পৌঁছে গেল কাছের ক্যাটওয়াকে। অনেক নীচে মিসাইল হোল্ড। কয়েক সেকেণ্ডে ছায়ার ভিতর মিলিয়ে গেল সে।
.
মিসাইল হোল্ডের পরিস্থিতি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে রানার কাছে।
মাত্র তিন মিনিট বাকি, এরপর রওনা হবে নিউক্লিয়ার মিসাইল। আব্রাম অ্যামনন শেষ, কন্ট্রোল কন্সেল দখল করে নিয়েছে হেণ্ডিকের লোক। সংখ্যায় বিশজন। সঙ্গে মেটালস্টর্ম। রাইফেল!
এদের মনোযোগ সরিয়ে দিতে হবে, ভাবছে রানা। কুয়াশার দিকে চাইল। রঘুপতির সঙ্গে যোগাযোগ করুন। মাত্র ওই একটা উপায়ই আছে।
থ্রোট মাইকে বলল কুয়াশা, রঘুপতি। বি প্ল্যানের কী অবস্থা?
বস, আপনাদের কাছেরটা পেয়েছি। বিশাল আকার। এক শ গজ সামনে আছি। ইঞ্জিন ঠিকভাবেই চলছে। তাক করেছি ঠিক আপনাদের দিকেই।
এগারো
ঝোড়ো হাওয়ার ভিতর এমভি লোটাসের এক শ গজ দূরে পৌঁছে গেছে আরেকটি বিশাল জাহাজ, এখন ওটার হেলমে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুয়াশার রোবট রঘুপতি।
শারবার্গে কার্গো নামাবার জন্য চ্যানেলে অপেক্ষা করছিল এক লাখ দশ হাজার টনি কন্টেইনার শিপ–এমভি হ্যারিয়েটা। অলস গতিতে চলছিল ইঞ্জিন। তখনই ফোরডেকে নেমে এল কালো শকুন নিয়ে রঘুপতি।
এখন জাহাজে রঘুপতি ছাড়া কেউ নেই। সেইলিং ক্রুরা বুদ্ধিমান লোক, অস্ত্র হাতে দেখেছে ভয়ঙ্কর লোকটাকে, এমন এক লোক, যে ইচ্ছা করলে যেদিকে খুশি, চরকির মত মাথা ঘোরাতে পারে! এরপর আর দেরি করেনি ক্রুরা, ঝটপট লাইফবোট সাগরে নামিয়ে পালিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে দুটো এম-১৬ রাইফেল হাতে ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছে রঘুপতি।
এবার কী করতে হবে, বস? জানতে চাইল রেডিয়োতে।
পরিস্থিতি বুঝে নিতে চাইছে রানা।
মিসাইল ডিসআর্ম করতে না পারলে রঘুপতিকে ব্যবহার করাই ছিল শেষ উপায়। ডুবিয়ে দিতে হবে সুপারট্যাঙ্কার, তা হলে মিসাইল লঞ্চ করতে পারবে না ম্যাজেস্টিক-১২। কিন্তু সেক্ষেত্রে অন্য জাহাজগুলোর মিসাইল ঠেকাতে পারবে না ওরা।
চট করে একবার কন্ট্রোল কন্সেলের দিকে চাইল রানা। পরক্ষণে দেখল ব্যারিকেড। মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশির করে নেমে গেল শীতল একটা অনুভূতি।
সরাসরি ওর দিকেই চেয়ে আছে ডেভিড এন. হেন্ড্রিক। ওকে দেখে ফেলেছে লোকটা।
চওড়া হাসি দিল শয়তানটা।
রঘুপতি, বলল রানা, গুঁতো দাও!
ঘড়ি দেখিয়ে চলেছে: ১৭:৪২:০৫…
ব্যারিকেড়ের পিছন থেকে ছিটকে এল হেণ্ডিকের লোক, ছুটতে শুরু করেছে রানাদেরকে লক্ষ্য করে। আড়াল নিচ্ছে মিসাইল সাইলোর মাঝে। দপদপে. আগুন বেরোচ্ছে মেটালস্টর্ম রাইফেলের মাযল থেকে।
রানার ইশারায় রওনা হলো নিশাত ও কুয়াশা। পৌঁছে গেল স্টারবোর্ডের খোলা কার্গো ডোরের পাশে। কাছেই একটা লাইফবোট।
উঠে পড়ন! গুলির আওয়াজের উপর দিয়ে বলল রানা।
একইসঙ্গে লাফ দিয়ে লাইফবোটে উঠল ওরা। উঠে বসেই গুলি শুরু করল শত্রুদের লক্ষ্য করে।
অনেক কাছে চলে এসেছে ৬৬ ইউনিটের লোক। যন্ত্রের মত গুলি করছে রানা, কুয়াশা ও নিশাত। রঘুপতি আসা পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হবে। ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে বাউন্টি হান্টাররা।
রঘুপতি, গম্ভীর সুরে ডাকল কুয়াশা। কোথায়…
আর তখনই অবিশ্বাস্যভাবে হাজির হলো রঘুপতি।
যে বিকট মড়মড় আওয়াজ শুরু হলো, তাতে মনে হলো। ভেঙে পড়ছে গোটা পৃথিবী।
ওই আওয়াজের পর পরই ধাতুর সঙ্গে ধাতুর জোর সংঘর্ষের শব্দ শুরু হলো।
তালা লেগে গেল কানে।
ভয়ঙ্কর ধাক্কা খেয়েছে প্রকাণ্ড দুই জাহাজ। লাফিয়ে উঠেছে। ইংলিশ চ্যানেলের এদিকের সাগর। ঝমঝম বৃষ্টির ভিতর দৃশ্যটা অকল্পনীয় মনে হলো রানার।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুটো একহাজার ফুট দীর্ঘ জাহাজ ধাক্কা দিয়েছে একে অপরকে। একেকটার ওজন এক লাখ টনেরও বেশি।
সুপারট্যাঙ্কার এমভি ললাটাসের পোর্টে গুতো দিয়েছে রঘুপতির চোরাই জাহাজ এমভি হ্যারিয়েটা। ছুরির মত ইস্পাত কাটছে চোখা বো। যেন মস্ত ব্যাটারিং র্যাম।
কুঁচকে ভিতরে ঢুকল লোটাসের প্লেট। মাঝে তৈরি হলো বড় বড় ফাটল। লাফিয়ে জাহাজে ঢুকল সাগর।
ঘুষি খাওয়া বক্সারের মতই থরথর করে কাঁপছে সুপারট্যাঙ্কার এমভি লোটাস। দুলতে শুরু করেছে ভীষণভাবে।
প্রথম প্রচণ্ড ধাক্কায় ভয়ঙ্করভাবে কাত হয়েছে স্টারবোর্ডে, হুড়মুড় করে জাহাজে ঢুকল সাগরের পানি। পরক্ষণে নাটকীয়ভাবে পোর্টে কাত হলো এমভি লোটাস, যেন হুমড়ি খেয়ে পড়বে সাগরের বুকে। ডুবতে শুরু করেছে জাহাজ।
এমভি লোটাসের মিসাইল হোল্ডে যা ঘটছে, দেখলে হাঁ হয়ে যেতেন নুহ নবী।
বজ্রপাতের আওয়াজ চলছে জাহাজের ভিতর।
এমন কী রানাও বোঝেনি কেমন ভয়ানক হবে সংঘর্ষ। এখন চোখের সামনে দেখল, পোর্টের দেয়াল চিরে ছোরার মত পড়পড় করে ঢুকছে হ্যারিয়েটার চোখা বো।
প্রচণ্ড চাপ খেয়ে কাত হয়ে গেছে গোটা স্টারবোর্ড।
ছিটকে পড়েছে সবাই।
আচমকা প্রকাণ্ড সব ফাটল গলে ভিতরে ঢুকল সাগরের বিপুল পানি।
জোয়ারের দশফুটি ঢেউ ঢুকছে জাহাজে। মুহূর্তে তলিয়ে গেল বেশ কজন ৬৬ ইউনিটের বাউন্টি হান্টার। ঢেউয়ের চাপড় খেয়ে ভেসে উঠল আস্ত ফোর্কলিফট, কার্গো কন্টেইনার এবং মিসাইল পার্টস্।
হুড়মুড় করে রানাদের লাইফবোটের তলে পৌঁছল সাগরের ঢেউ। মাউন্ট থেকে বোটকে তুলে নিল অনায়াসেই। একইসময়ে ডেভিট থেকে বোট খুলে দিল রানা, চাল করল ইঞ্জিন।
কয়েক সেকেণ্ডে তলিয়ে গেল হোল্ডের মেঝে, দ্রুত বাড়ছে। পানির গভীরতা।
বিপুল পানি ঢুকেছে বলে পোর্টে গড়িয়ে গেল জাহাজ। ক্রমেই বাড়ছে ইস্পাতের প্লেটের ফাটল। তিরিশ ডিগ্রি কাত হলো এমভি ললাটাস।
পানি কেটে রওনা হয়েছে রানাদের মোটোরাইযড লাইফ বোট। আরও কাত হতে শুরু করেছে চারপাশের হোল্ড।
ঘড়ি অনুযায়ী: ১৭:৪২:২৯।
পোর্টের দিকে চেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য দেখল রানা।
এখনও এমভি লোটাসের বুকে গেঁথে আছে এমভি হ্যারিয়েটা–গলগল করে পেটে পুরছে সুপারট্যাঙ্কার প্রচুর পানি। বামে কাত হয়ে ভাসছে। যেন তার স্তনে মুখ গুঁজেছে। হ্যারিয়েটা। এ পেটের ভিতর পানির পরিমাণ আরও বাড়তেই হ্যারিয়েটার বো-টাকে সাগরে চুবিয়ে দিল এমভি লোটাস। কয়েক মুহূর্ত পর নিজেরই বেশিরভাগ অংশ তলিয়ে গেল, জেগে রইল শুধু দীর্ঘ ফোরডেক ও ব্রিজ টাওয়ার। হেলে পড়েছে তিরিশ ডিগ্রি।
ঢেউয়ের নীচে তলিয়ে গেছে হ্যারিয়েটার বো।
কাউকে বলতে হয়নি কী করতে হবে, নিজেই বুঝে গেছে। রঘুপতি। ব্রিজ থেকে বেরিয়ে ফোরডেকে ছিটকে গিয়ে উঠল কালো শকুনের ককপিটে। কয়েক সেকেণ্ড পর বৃষ্টি ঝরা আকাশে উঠল জেট বিমান।
.
পানিভরা লোটাসের হোল্ডে গতি তুলেছে রানাদের লাইফবোট।
১৭:৪৩:৩০…
হেলে পড়া মিসাইল সাইলো এড়িয়ে উচ্ছল ঢেউয়ের ভিতর দিয়ে তীরের মত ছুটছে রানাদের বোট। পিছনদিকে বসেছে কুয়াশা ও নিশাত, গুলি করছে ভাসমান শত্রুদের লক্ষ্য করে।
রানার মনে হলো, বিদ্যুদ্বেগে স্পিডবোট নিয়ে অর্ধ নিমজ্জিত
জঙ্গলে দূরে কোথাও চলেছে।
দুই জাহাজে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের পর ডেভিড এন. হেন্ড্রিক এবং তার বেশিরভাগ লোক সরে গেছে হোল্ডের স্টারবোর্ডে ওদিকটা উঁচু। এখনও তলিয়ে যায়নি।
সরাসরি মিসাইল হোল্ডের কন্ট্রোল কন্সেলের দিকে ছুটছে। রানাদের লাইফবোট।
১৭:৪৩:৪৭… ১৭:৪৩:৪৮… ১৭:৪৩:৪৯…
অশান্ত পানিতে বাঁক নিল রানার বোট, পিছনে বসে শত্রুদের দিকে গুলির পর গুলি ছুঁড়ছে কুয়াশা ও নিশাত। পানিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে অস্ত্র তাক করতে পারছে না ৬৬ ইউনিটের কয়েকজন, মারা পড়ছে গুলি খেয়ে।
পিছনে লাশ রেখে এগিয়ে চলেছে রানাদের লাইফবোট।
উঁচু কন্ট্রোল কন্সেলের পাশে পৌঁছে গেল ওরা। হেলে দাঁড়িয়ে আছে ওয়ায়ার ফ্রেমের কন্ট্রোল কন্সেল। পানি-সমতল থেকে মাত্র একফুট উপরে।
আমাকে কাভার দিন! চেঁচিয়ে জানাল রানা। লাইফবোটের ডেক থেকে দেখল কন্সেলের আভাময় ডিসপ্লে স্ক্রিন। লাল সংখ্যা টিকটিক করে নীচে নামছে। প্রতি সেকেণ্ডের জন্য এক শ মিলিসেকেণ্ড দেখিয়ে চলেছে।
মিসাইল লঞ্চিঙের জন্য চলছে কাউন্টডাউন:
০০:০১:০৯.৮৭…
০০:০১:১০.৮৬…
০০:০১:০৯.৮৫…
সময় পেরিয়ে চলেছে বিদ্যুদ্বেগে।
ফ্রেঞ্চ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে মৃত ডিজিএসই এজেন্টের কাছ থেকে পাওয়া টাচলক-৯ ইউনিট পকেট থেকে বের করল রানা—ওটা ছিল ভেস্টে ওয়াটারপ্রুফ পাউচের ভিতর।
আবারও আলোর মুখ দেখল ওই ডিসপ্লে।
বিঁপ আওয়াজ তুলে স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেসেজ:
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি): স্যাটিসফাইড.
ইনিশিয়েট সেকেণ্ড প্রটোকল।
আগের মতই দেখা দিল সাদা বৃত্ত, টিপটিপ করতে শুরু করেছে।
প্রতিটি বৃত্ত স্পর্শ করছে রানা।
০০:০১:০২…
০০:০১:০১…
০০:০১:০০…
হঠাৎ করেই বেদম হোঁচট খেল এমভি লোটাস। পুরো সুপারট্যাঙ্কার ভাসছে এমভি হ্যারিয়েটার বো-র উপর ভর করে। পিছলে নেমে যেতে শুরু করেছে এই জাহাজ!
প্রস্তুত ছিল না বলে একটা সাদা বৃত্ত স্পর্শ করতে পারল না রানা।
বিপ আওয়াজ ছাড়ল ইউনিট:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
ফেইল ডিসআর্ম অ্যাটেম্পট।
রেকর্ডেড।
থ্রি ফেইল্ড ডিসআর্ম অ্যাটেম্পট উইল
রেজাল্ট ইন ডিফল্ট ডেটোনেশন।
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
রি-অ্যাকটিভেটেড।
কাউণ্ট ডাউনের দিকে চেয়ে ঢোক গিলল রানা।
নতুন উদ্যমে কাজে নামল। ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে সুপারট্যাঙ্কার এমভি লোটাস। রানা টের পেল, ওর বুটের পাশে চাপড় দিচ্ছে সাগরের ঢেউ।
.
টাচলক-৯ ইউনিটের স্ক্রিনে আঙুল স্পর্শ করছে রানা, ওদিকে স্টারবোর্ডের উঁচু জায়গায় ৬৬ ইউনিটের লোকদের লক্ষ্য করে গুলি করছে কুয়াশা।
এক পশলা গুলি ওদিকে পাঠাবার পর হঠাৎ দৃশ্যটা দেখল ও, চমকে গিয়ে বলল, এহ-হে!
কী হলো? পাশ থেকে জানতে চাইল নিশাত।
এবার যে-কোনও সময়ে তলিয়ে যাবে স্টারবোর্ডের কার্গো ডোর, বলল কুয়াশা।
ঠিকই বলেছে।
বামদিকে এমভি লোটাস কাত হয়ে পড়ায় স্টারবোর্ডের প্রকাণ্ড কার্গো ডোরওয়ে এতক্ষণ পানি-সমতল থেকে উপরে ছিল।
কিন্তু উচ্চতা বাড়ছে পানির, এবার তলিয়ে যাবে ওই দরজা। তার বড় কারণ, ওদিক থেকেই হুড়মুড় করে হোল্ডে ঢুকবে সাগরের বিপুল পানি। টুপ করে ডুববে জাহাজ।
মিস্টার কুয়াশা! সতর্ক করল নিশাত। ডানদিক দেখুন! বিড়বিড় করে কাকে যেন অভিশাপ দিল কুয়াশা।
ডানদিকে হেন্ড্রিকের ছয়জন বাউন্টি হান্টার পানি ছেড়ে উঠে পড়েছে দুই মোটোরাইযড লাইফবোটে।
সোজা রওনা হয়ে গেল কুয়াশাদের লক্ষ্য করে।
রানা! গলা ছাড়ল কুয়াশা, তোমার কাজ শেষ হলো?
প্রায়… পাল্টা চেঁচাল রানা। চোখ স্ক্রিনে।
০০:০০:৫২…
০০:০০:৫১…
০০:০০:৫০…
স্টারবোর্ডের নিমজ্জিত এলাকায় সরে গেল ৬৬ ইউনিটের দুই লাইফবোট, তুলে নিল ডেভিড এন, হেণ্ডিক এবং অবশিষ্ট লোকদের।
সবমিলে ষোলোজন তারা।
রানা এবং মিসাইল কন্ট্রোল কন্সেল লক্ষ্য করে তেড়ে এল দুই বোট।
নতুন উদ্যমে গুলি ছুঁড়তে লাগল কুয়াশা ও নিশাত।
পানির উপর দিয়ে রাজহংসীর মত তরতর করে আসছে ৬৬ ইউনিটের দুই লাইফবোট। এড়িয়ে যাচ্ছে হেলে যাওয়া মিসাইল সাইলো। গুলি করছে শত্রুদের উদ্দেশে।
.
এদিকে নিজ জগতে ডুবে আছে রানা। ঝড়ের মত স্পর্শ করছে। সাদা ও লাল বৃত্ত।
০০:০০:৪২…
০০:০০:৪১…
০০:০০:৪০…
হঠাৎই শেষ সাদা বৃত্ত স্পর্শ করল রানা, বদলে গেল স্ক্রিনের দৃশ্য:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
স্যাটিসফায়েড।
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
অ্যাকটিভ।
প্লিয এণ্টার অথোরাইযড
ডিসআর্ম কোড।
ঠিক আছে, বিড়বিড় করল রানা। ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড চাইছে ওর কাছে। সপ্তম মার্সেন প্রাইম এখনও ওর তালুতে লেখা: ৪,৩১,১২,৬০৯।
সংখ্যাগুলো টাচলক ইউনিটের নিউম্যারিকাল কিপ্যাডে তুলে দিতে লাগল রানা। এমনসময় হঠাৎ করেই ওকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল পায়ের নীচের ডেক!
বিপ!
জোরালোভাবে আপত্তি তুলল স্ক্রিন:
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি): ফেইলড.
অল প্রোটোকলস রি-অ্যাকটিভেটেড.
আরেহ! ঝট করে ঘুরে কুয়াশার দিকে চাইল রানা। মিসাইল কঙ্গেল থেকে তীরের মত বোট সরিয়ে নিয়েছে বৈজ্ঞানিক। স্টার্নে ৬৬ ইউনিটের দুই বোট লক্ষ্য করে গুলি করতে ব্যস্ত নিশাত।
মিসাইল সাইলোগুলোর মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটছে। রানাদের বোট।
দুঃখিত, রানা, গম্ভীর কণ্ঠে বলল কুয়াশা। উপায় ছিল না। ওখানে থাকলে এতক্ষণে মারা পড়তাম আমরা।
বুঝেছি! রাগ সামলে নিতে চাইল রানা। কিন্তু আবারও ওই কন্সেলের ষাট ফুটের ভেতর যেতে হবে! অথচ হাতে দশ সেকেণ্ড আছে কি না কে জানে! কমপক্ষে পঁচিশ সেকেণ্ড লাগবে রেসপন্স প্যাটার্ন কমপ্লিট করতে!
ওদের দ্রুতগামী বোটের চারপাশের পানি ছলকে ডুব দিচ্ছে। অসংখ্য বুলেট।
০০:০০:৩৬…।
০০:০০:৩৫…
০০:০০:৩৪…
হঠাৎ করেই টোকা খাওয়া, ক্যারামের গুটির মত আরেকদিকে রওনা হলো কুয়াশা, তারই ফাঁকে বলল, কতটা কাছে যেতে হবে তোমাকে?
ষাট ফুট!
ঠিক আছে!
ওদের কানের পাশ দিয়ে শোঁ-শোঁ আওয়াজে বেরিয়ে যাচ্ছে বুলেট। মিসাইল সাইলোর গায়ে লেগে ছিটকে যাচ্ছে বিঈং শব্দে।
বোট ঘুরিয়ে নিয়েছে কুয়াশা, তৈরি করছে বড় বৃত্ত। আবারও ফিরছে ইস্পাতের দ্বীপ লক্ষ্য করে। দূরে দেখা গেল কন্ট্রোল কন্সেল। সাইলোর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে চলেছে বোট।
০০:০০:২৮…
০০:০০:২৭…
০০:০০:২৬…
আবারও বিপ আওয়াজ ছাড়ল রানার স্ক্রিন:
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি); স্যাটিসফাইড,
ইনিশিয়েট সেকেণ্ড প্রটোকল।
শুরু হয়েছে লাইট-রেসপন্স ডিসপ্লে।
এবার স্ক্রিন স্পর্শ করতে হবে রানাকে। পিছনে লেগে আছে ৬৬ ইউনিটের দুই বোট। বৃষ্টির মত পিছনে গুলি করছে নিশাত।
একহাতে বোট চালাচ্ছে কুয়াশা, অন্যহাতের অস্ত্র থেকে গুলি করছে। মনে রেখেছে, কন্ট্রোল কন্সেলের ষাট ফুটের ভিতর থাকতে হবে।
০০:০০:১৭…
০০:০০:১৬…
০০:০০:১৫…
কিন্তু কুয়াশা বৃত্ত তৈরি করছে দেখেই বুঝে গেছে হেণ্ড্রিকের দুই লাইফবোটের পাইলট। তারা ফাঁদে ফেলতে চাইল শত্রু বোটকে।
বৃত্তের উল্টো দিক লক্ষ্য করে রওনা হয়ে গেছে একটা বোট, অন্যটা সোজা তেড়ে এল রানাদের দিকে।
বর্তমান পরিস্থিতি কী জানেও না রানা, ঝড়ের মত চলছে। ওর আঙুল।
সাদা-লাল-সাদা-সাদা…
টিপটিপ আওয়াজ তুলছে স্ক্রিন।
০০:০০:১২…
০০:০০:১১…
০০:০০:১০…
৬৬ ইউনিটের প্ল্যান বুঝেছে কুয়াশা। এগিয়ে আসা বোটের ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে গুলি শুরু করল ও।
টাশশ! টাশশ! টাশশ!
তিনটা গুলি মোটেও লক্ষ্যভেদ করতে পারল না।
০০:০০:০৯…
০০:০০:০৮…
০০:০০:০৭…
ঝড়ের মত চলছে রানার আঙুল। বাম থেকে ডানে, ডান থেকে বামে স্পর্শ করছে বৃত্ত।
তেড়ে আসা বোটের এক লোককে গেঁথে ফেলেছে নিশাত। কিন্তু তখনই আহত বাঘের মত গর্জন ছাড়ল ও। উত্তপ্ত বুলেট বিঁধেছে ওর কাঁধে।
০০:০০:০৬…
০০:০০:০৫…
০০:০০:০৪…
মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে রানাদের বোটের সঙ্গে দ্বিতীয় শত্ৰুবোটের। এখনও ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে গুলি করছে। কুয়াশা।
টাশ! টাশ! টাশ! টাশ!
মিস… মিস… মিস… লেগেছে!
০০:০০:০৩….
স্টিয়ারিং হুইলের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ড্রাইভার, মৃত। বাঁক নিয়ে আরেকদিকে রওনা হয়েছে ওই বোট। কুয়াশা কন্সেলের ষাট ফুটের ভিতর রাখছে নিজের বোটকে।
০০:০০:০২…
০০:০০:০১…
রানার আঙুলের নড়াচড়া সামান্য বদলে গেল। বৃত্ত স্পর্শ না। করে টাইপ করছে…
০০:০০:০০
কুয়াশা বুঝে গেল, দেরি হয়ে গেছে ওদের।
অবশ্য কন্সেলে থেমে গেছে কাউন্টডাউন:
০০:০০:০৭।
ঠিকই যিরো পর্যন্ত গুণেছে ঘড়ি। কিন্তু আগেই ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড এন্ট্রি করেছে রানা।
স্ক্রিনে এখন লেখা:
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি): স্যাটিসফাইড,
অথোররাইযড ডিসআর্ম কোড
এন্টার্ড. মিসাইল লঞ্চ অ্যাবোর্টেড,
মস্ত স্বস্তির শ্বাস ফেলল রানা। কোনও মিসাইল রওনা হয়নি। লণ্ডন, প্যারিস ও বার্লিন নিরাপদ।
কিন্তু এদিকে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে স্টারবোর্ডের প্রকাণ্ড দরজা!
জোরালো হুউউসস্! আওয়াজ ছাড়ল দরজা। যেন হাজার হাজার অজগর শ্বাস ফেলল কানের ভিতর।
ফ্লাডগেটের মত কাজ করছে ওই মস্ত দরজা, লাফিয়ে ভিতরে ঢুকল বিপুল পানি, যেন আস্ত সাগর ঢুকে এল ভিতরে।
রানাদের দিকে তেড়ে এল উঁচু জলপ্রাচীর। বানের মত আসছে। এবার গিলে ফেলবে সবাইকে।
ফলাফল হবে ভয়ঙ্কর।
শরীর মুচড়ে সোজা হলো গোটা সুপারট্যাঙ্কার। স্টারবোর্ডে প্রচুর পানি ঢুকতেই ঝটকা দিয়ে সিধে হয়েছে জাহাজ। পোর্টসাইড ও স্টারবোর্ড–দুপাশ দিয়েই ঢুকছে সাগর।
জাহাজ সিধে হতেই আরেকটা প্রতিক্রিয়া দেখা দিল: হ্যারিয়েটার বো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সুপারট্যাঙ্কার। কিন্তু ওই জাহাজের বো ভাসিয়ে রেখেছিল এমভি লোটাসকে, এবার আর কোনও অবলম্বন রইল না সুপারট্যাঙ্কারের।
ইংলিশ চ্যানেলের গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল এমভি লোটাস।
মিসাইল হোল্ডে লাইফবোটে বসে হাজারো আওয়াজ শুনল রানা, কুয়াশা ও নিশাত কানে তালা লেগে গেল। হোল্ডে বজ্রের মত গর্জন ছাড়ছে যেন জলপ্রপাত। বিকট প্রতিধ্বনি শুরু হলো ফাঁকা জাহাজের ভিতর। ঢেউ আছড়ে পড়ছে স্টিলের দেয়ালে। হোল্ডের পানিতে তৈরি হচ্ছে ঘূর্ণি।
অকল্পনীয়ভাবে বাড়ছে পানির উচ্চতা। রানার মনে হলো, ওদের মাথার উপর নেমে আসছে সিলিং।
কয়েক সেকেণ্ডে প্রকাণ্ড মিসাইল সাইলোর মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে গেল ওদের বোট। বিশফুট উপরে ছাত থেকে ঝুলছে স্টিলের ক্যাটওয়াক।
এদিকে স্টারবোর্ডের দরজা তলিয়ে যেতেই ধাওয়া বাদ দিয়ে কাছের মই লক্ষ্য করে রওনা হয়েছে ডেভিড এন. হেন্ড্রিক এবং তার লোক, উঠবে হোল্ডের ছাতে।
যোগ্য লোক, মন্তব্য করল কুয়াশা, হেন্ড্রিক ফোরডেকে উঠতে চাইছে। কাভার করবে প্রতিটি হ্যাচ। অপেক্ষা করবে। আমরা বেরুলেই… অথচ আমাদেরকে ওই পথে যেতেই হবে।
হয়তো অন্য পথে বেরোতে পারব, বলল রানা। এই মুহূর্তে প্রথম কাজ: জাহাজ থেকে সরে যাওয়া। নিরাপদ কোথাও থেমে ডিসআর্ম করব আমেরিকার শহরের দিকে তাক করা মিসাইল।
পকেট থেকে পাম পাইলট বের করল রানা, দেখে নেবে। কোন নোয়ায শিপ থেকে মিসাইল লঞ্চ করা হবে।
আগে যেসব ডকুমেন্ট দেখেছিল, সেগুলো আবারও বের করল পাম পাইলটের স্ক্রিনে।
বেছে নিতে চাইল সংক্ষিপ্ত লঞ্চ লিস্ট।
কিন্তু বেরোল বিস্তারিত তালিকা।
পরিচিত তিন জাহাজ ও জিপিএস লোকেশন দেখল রানা।
তালিকায় লেখা:
সোর্স শিপ – ডেলিভারি সিস্টেম – ডাব্লিউএইচ – অরিজিন টার্গেট – টাইম।
লোটাস শাহাব-এস টিএনবি ৫৬০১.০১ ০০০০১.৬৪ ৫০০০২.০০ ৫২৩১.০০ ১১.৪৫
সেইম ৩৫৭০১.২০ ০৪২১-০১, ৫০০২.০০ ৪৯০০.২৪ ১১.১৫
সেইম ৩৫৭০১-২০১২৩১৩-১৫ ৫০০০২ ৫৩৫৮.৭৪ ১১.৪৫
কর্পোরেশন সেইম ২৮৭৪৪-০৫ ২৬৭৪৩-১৭ ৪১০৫-৫৪ ৪১০৩.৬৪ ১২.০০
সেইম ২এ৭৪৩-০৪ ২৬২৪১-০৪ ৪১০৫-৫এস ৩৬৩৬-৬০ ১২.০০
রুবল টেপও-ডং-২ এন-৮ এনএফএল ৩২২২২-বি৩ ২৩২২২-৬৯ ৩৭৪৪-৭৬ ৩৭৪৫-৬৫ ১২.১৫
সেইম ২৩২২২-৬৩ ২৪২৩০-৫০ ৩৭৩৪-৭৫ ৩৪৩৩-০২ ১২.১৫
সেইম ২৩১৫৭-০৬ ২৩১৫৬.৫০ ৩৭৪৫-৭৪ ৪১৩১-৫১. ১২.১৫
হোপ স্কাই হর্স-৩ ডাব্লিউ ৮৮ ১১১০০-০১ ১১৬২২১.৬০ ২৩২৭-০১ ৪০০১-০০ ১২.১৫ (টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (বেইজিং)
সেইম ১১১০০-০১১১৪৪৫-৭০ ২৩২৮-০০ ২২৪৩-২৮ ১২.৩০
(টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (হংকং)
ডলফিন ঘৌরি-১১ ০৭৭২৫-০৫ ২৩২৭-০১ ২৩২৭.০১২৯৫৮.০৬ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (নিউ দিল্পি)
অগ্নি-১১ ০৭০৪০৪৪ ০৭৩৩২-৬১ ২৩২৭-০০ ৩২৩০-৫১ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (ইসলামাবাদ)
পরবর্তী জাহাজ এমভি করপোরেশন। দুপুর বারোটার সময় ২৮৭৪৪-০৫, ৪১০৫-৫৪ জিপিএস কো-অর্ডিনেট থেকে আকাশে উঠবে মিসাইল।
জাহাজটা আছে নিউ ইয়র্কের উপকূলে, মনে পড়ল রানার। কিন্তু কী যেন সমস্যা আছে এ তালিকায়, খেয়াল করে আগে দেখেনি।
না, এটা খবিরের পাঠানো আগের সেই তালিকা নয়।
বদলে গেছে কিছু।
স্কিনে আরেকটা তালিকা আনল রানা।
এই তালিকায় যোগ করা হয়েছে জাহাজের নতুন মিসাইলের নাম। লঞ্চ করা হবে কয়েক ধরনের ব্যালেস্টিক মিসাইল। কোনও কোনওটা কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পর রওনা হবে।
আরেকটা তফাৎ রয়েছে।
তাইওয়ানি এবং ইজরায়েলি মিসাইলে যোগ করা হয়েছে। আমেরিকান নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ডাব্লিউ ৮৮…
পাশের পানিতে একপশলা বুলেট নামতেই চমকে গেল রানা মুখ তুলল, সিলিঙে ওঠা এক মইয়ের পাশে বোট এনেছে। কুয়াশা। কিছুক্ষণ আগেও ওই ছাত ছিল আশি ফুট উপরে। এখন বড়জোর সতেরো ফুট উপরে ছাত। দ্রুত বাড়ছে পানির উচ্চতা।
কিন্তু ক্যাটওয়াকের ষাট গজ দূরে দুদিক থেকে তেড়ে আসছে চারজনের ৬৬ ইউনিটের দুটো দল। সিলিঙের হ্যাচ খুলে আবারও নেমে এসেছে তারা, গুলি করতে করতে তেড়ে আসছে। রানাদের বোটের চারপাশের গার্ডারে বিঈং! বিঈং! শব্দে ছিটকে আরেকদিকে ছুটছে বুলেট।
ডেকে উঠব সেজন্য অপেক্ষা করেনি, তোমার মাথা পাওয়ার জন্যে ধাওয়া করছে, বলল কুয়াশা।
মই বেয়ে উঠুন, স্যর, তাড়া দিল নিশাত। হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিল রানাকে। কমপিউটার পরে দেখবেন!
রানা মই বেয়ে উঠতে শুরু করতেই নিজের দেহ দিয়ে কাভার করল নিশাত। গুলি লাগতে দেবে না রানার গায়ে।
রানার পর পর মই বেয়ে উঠতে লাগল নিশাত। পিছনে কুয়াশা। একহাতে উঠছে ওরা, অন্যহাতে গুলি করছে শত্রু লক্ষ্য করে। উঠে পড়ল ওরা ক্যাটওয়াকে। চারপাশে অসংখ্য ফুলকি তৈরি করে ছিটকে যাচ্ছে বুলেট।
ক্যাটওয়াকে কাভারিং পজিশন পেয়ে গেল নিশাত। ওর দিকে পিঠ রেখে শত্রুদের দিকে গুলি ছুঁড়ল কুয়াশা ও রানা।
চারপাশে বিঈং! বিঈং! আওয়াজ।
নানাদিকে ছিটকে যাচ্ছে বুলেট।
স্টার্নের দিক থেকে ছুটে আসা ৬৬ ইউনিটের লোক লক্ষ্য করে গুলি করছে রানা ও কুয়াশা, কিন্তু হঠাৎ করেই ফুরিয়ে গেল রানার অস্ত্রের ম্যাগাযিন।
আসলেই কোথাও যেতে চাও, রানা? গুলির আওয়াজের উপর দিয়ে বলল কয়াশা।
হ্যাঁ, চাই, বলল রানা। এমন কোথাও, যেখানে স্থির হয়ে বসে ডিসআর্ম করতে পারি সব মিসাইল।
তা হলে আগে এই পোড়া জাহাজের মরণফাঁদ থেকে বেরুতে হবে। এদিকে দেখো! হঠাৎ করেই ডানদিকে ঘুরেই ছুট লাগাল কুয়াশা। ক্যাটওয়াকের টি-জাংশনে ছোট এক মেইনটেন্যান্স শ্যাক পেরিয়ে গেল। সামনেই দুই হলদে রঙের মিনি-সাবমেরিন। ছাত থেকে শিকলে ঝুলছে ওদুটো।
ক্যাটওয়াকের মতই এখন আর অনেক উপরে নেই সাবমেরিন দুটো। পানি-সমতল থেকে ষোলো ফুট উপরে। দুই সাবমেরিনকে উপর থেকে ঘিরেছে ঢাকনি। ৬৬ ইউনিটের খুনিদের কাছ থেকে অনেকটা কাভার দিচ্ছে রানাদেরকে ওই ঢাকনি।
পিছলে নানাদিকে ছুটছে বুলেট।
রানা দেখল, মিনি-সাবের দিকে এগুতে চাইল নিশাত, কিন্তু পারল না। বাধা হয়ে দাঁড়াল অসংখ্য বুলেট।
মেইনটেন্যান্স শ্যাকের ভিতর ঢুকে আড়াল নিল নিশাত।
ও আর এদিকে আসতে পারবে না, মনটা ভীষণ ছোট হয়ে গেল রানার। আপা! থ্রোট মাইকে ডাকল।
ভাইডি, চলে যাও, রেডিয়োতে বলল নিশাত।
মেটালস্টর্ম বুলেট ঝাঁঝরা করতে শুরু করেছে শ্যাক।
নিশ্চয়ই চোখের আড়ালে সরে যেতে চাইছে নিশাত, ভাবল রানা। নিশ্চয়ই গুলি লেগেছে।
না, আবারও দরজায় দেখা দিল নিশাত। ঝড়ের মত গুলি করছে, পর পর দুই বাউন্টি হান্টারকে নরকে পাঠিয়ে দিল। রানা! আমি চলে যেতে বলেছি! ধমকের সুরে বলল রেডিয়োতে।
না, আপা, আপনাকে ফেলে যাব না! পাল্টা জানাল রানা।
খবরদার! বলছি যাও! আরেক দফা গুলি ছুঁড়ল নিশাত। আগেই লুকিয়ে পড়েছে ৬৬ ইউনিটের লোক।
সম্ভব না, আপা!
যাও, ভাইডি, ভেজা স্বরে বলল নিশাত। আমার মত বুড়ি মেয়েলোকের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লাখ লাখ মানুষকে বাঁচানো। শ্যাকের ভিতর থেকে রানার দিকে চেয়ে আছে নিশাত। তোমাকে বাঁচতে হবে, ভাইডি! আমার কাজ আমাকে করতে দাও! যাও, আর দেরি কোরো না, যাও! যাও! যাও!
রানা কিছু বলবার বা করবার আগেই দেখল, ভয়ানক সাহস নিয়ে আত্মহত্যার পথে পা বাড়াল নিশাত।
জানালার সামনে সিধে হয়ে দাঁড়াল ছয় ফুটি নিশাত, বিকট এক হুঙ্কার ছেড়ে দুহাতের দুই অস্ত্র থেকে গুলি শুরু করল দুদিকের ৬৬ ইউনিট সদস্যদের লক্ষ্য করে।
নিজেদের অবস্থানে থমকে গেল লোকগুলো। এ ধরনের সাহসিকতার সঙ্গে পরিচিত নয়। তাদের সামনের লোকটা ঝাঁঝরা হয়ে গেল বুলেটের আঘাতে। বুক থেকে ছিটকে বেরোল ঝর্নার মত রক্ত। রানা ও কুয়াশাকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে নিশাত।
রানা, জলদি! ধমকের সুরে বলল কুয়াশা, টিপে দিয়েছে। সাবের উপরের হ্যাচ বাটন। সড়াৎ করে খুলে গেল গোল হ্যাচ। নিশাতের আত্মত্যাগকে কিছুতেই বৃথা হতে দিয়ো না!
পা গলিয়ে হ্যাঁচে ঢুকতে গিয়েও নিশাতের দিকে চাইল রানা, টের পেল ভিজে গেছে চোখের পাতা।
দুদিক থেকে তুমুল গুলির তোড়ে পিছাতে হচ্ছে নিশাতকে।
বিদায়, আপা, বিড়বিড় করল রানা।
মেটালস্টর্ম রাইফেলের অসংখ্য বুলেট বুকে নিয়ে ছিটকে পড়ল নিশাত। বুলেটের আঘাতে কুঁকড়ে যাচ্ছে চেস্ট আর্মার। তবুও ঝট করে উঠে বসল ও, টলছে ভীষণ, আর গুলি করতে পারল না। হাঁ হয়ে গেল মুখ, হঠাৎই ফাঁকা হয়ে গেল দৃষ্টি ধুপ করে পড়ল মেঝেতে।
আগ্নেয়াস্ত্রের ধোঁয়া ও উড়ন্ত কাঁচের ভিতর পড়ে রইল বাংলাদেশ আর্মির ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা।
শ্যাকের জানালা দিয়ে আর ওকে দেখতে পেল না রানা।
৬৬ ইউনিটের দুই দল তোক শেষ করে দিয়েছে মস্ত সাহসী এক নরম মনের মেয়েকে, যে কি না রানার দলের সবার দেখভাল করত দক্ষ নার্সের মত করে।
একইসময়ে মেইনটেন্যান্স শ্যাক লক্ষ্য করে রকেট লঞ্চ করল ৬৬ ইউনিটের দুই দল।
নিশাতের ছোট্ট ঘরে গিয়ে নামল দুই রকেট। বুম্! আওয়াজ তুলল দুই বোমা। চারদিকে ছিটকে গেল চার দেয়াল। বিস্ফোরিত হয়েছে সবই। রইল শুধু মসৃণ মেঝে। চোদ্দ ফুট নীচে কলকল করে বাড়ছে পানি।
সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল রানা, কিন্তু ঠেলে ওকে ভিতরে পাঠাল কুয়াশা।
না, রানা! আমাদেরকে যেতে হবে! গুলির আওয়াজের উপর দিয়ে শোনা গেল ওর কড়া স্বর।
আরেক ধাক্কায় রানাকে সাবমেরিনে ঢুকিয়ে দিল কুয়াশা কিন্তু সাবমেরিনের মেঝেতে পা স্পর্শ করবার আগেই রানা। দেখল, সরাসরি ওর মুখ লক্ষ্য করে আসছে তলোয়ারের ক্ষুরধার ফলা।
হতবাক রানার রিফ্লেক্স কাজ করল।
ঝট করে খালি এইচঅ্যাণ্ডএইচ পিস্তল তুলে ঠেকাতে চাইল তলোয়ার। জোরালো ঠং আওয়াজ উঠল ইস্পাতে ইস্পাতে। ওর পিস্তলের ট্রিগার গার্ডে লেগেছে ফলা, গলার এক ইঞ্চি দূরে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাশান মেজর মিখাইল পেদবরানভ! হাতে খাটো ফলার কসাক তলোয়ার। চোখ ভরা ঘৃণা।
ভুল জায়গায় লুকাতে এসেছ, দাঁতে দাঁত চেপে বলল মেজর।
রানা নড়ে উঠবার আগেই দেয়ালের দুটো বাটন টিপে দিল সে।
প্রথমটা ইন্টারনাল হ্যাচ বাটন। হুউশ আওয়াজ তুলে বন্ধ হয়ে গেল স্টিলের দরজা দ্বিতীয় সুইচ এএসডিএস রিলিজ বাটন। রানা টের পেল, হঠাৎ খালি হয়ে গেছে ওর তলপেট।
শিকল থেকে খসে পড়েছে মিনি-সাবমেরিন। চোদ্দ ফুট উপর থেকে পড়তেই চারপাশে ছিটকে গেল পানি।
কী ব্যাপার! অবাক সুরে বলল কুয়াশা। কী হচ্ছে?
মাত্র এক সেকেণ্ড আগে রানাকে ঠেলে হলদে সাবমেরিনে ভরছিল ও, দেখল বন্ধ হয়ে গেছে হ্যাচ, পরক্ষণে গোটা জলযান ধুপ করে গিয়ে পড়ল পানির ভিতর!
কুয়াশার চারপাশের গার্ডারে লেগে পিছলে যাচ্ছে ৬৬ ইউনিটের হাইপারচার্জড বলেট।
মেইনটেন্যান্স শ্যাক পেরিয়ে ছুটছে লোকগুলো ওর দিকেই। উঠে পড়ল সাবমেরিন ক্যাটওয়াকে।
বাধ্য হয়ে একমাত্র কাজটিই করল কুয়াশা। ডাইভ দিয়ে। পড়ল দ্বিতীয় সাবমেরিনের গায়ে। ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে বুলেট চারপাশ দিয়ে।
.
প্রাণ বাঁচাতে লড়ছে রানা ও পেরোনভ।
কোনও নিয়ম মানছে না কেউ। এখন কাজে আসবে না কোনও কৌশল। রাস্তার ছেলেদের মারামারির মতই লড়াই চলছে।
মিনি-সাবমেরিনের বদ্ধ জায়গায় গড়াগড়ি খাচ্ছে ওরা, লাথি দিচ্ছে, ঘুষি মারছে পরস্পরের অণ্ডকোষ লক্ষ্য করে।
রানার হাতের অস্ত্র খালি, কিন্তু পেরোনভের কসাক তলোয়ার অন্য জিনিস।
সেকারণেই সাবমেরিন পানিতে পড়তেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে রানা। পেরোনভের কব্জির উপর নামিয়ে এনেছে পিস্তলের বাঁট।
রাশান তার তলোয়ার ছেড়ে দিতেই শুরু হয়েছে কুস্তি।
আগুন জ্বলছে রানার হৃদয়ে, এইমাত্র হারিয়ে বসেছে তার প্রিয় আপাকে। ভয়ঙ্কর জেদ কাজ করছে ওর মনে।
এদিকে খুন করতে ভালবাসে সাইকোপ্যাথ পেরোনভ।
একে অপরকে ছিটকে ফেলছে সাবমেরিনের দেয়ালে। মনে বিষ, প্রতিটি আঘাতে রক্ত বের করছে শত্রুর।
এক ঘুষিতে পেরোনভের চোয়ালের হাড় ভেঙে দিল রানা।
রানার নাকের হাড় ভাঙল পেরোনভ। তার আরেকটা ঘুষি খসিয়ে দিল ওর ইয়ারপিস।
নিখুঁতভাবে রানাকে ট্যাকল করল পেদরোনভ, ছিটকে ফেলল সাবমেরিনের কন্ট্রোল প্যানেলের উপর।
চাপ পড়েছে কোনও বাটনে, সঙ্গে সঙ্গে ডুবতে লাগল মিনি সাব।
ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেল থেকে নিজেকে সরিয়ে আনল রানা, তারই ফাঁকে দেখল ব্যালাস্ট বাটন অন হয়েছে।
গভীরে রওনা হয়েছে এএসডিএস।
হঠাৎ করেই পানির নীচে ডুব দিল সাবমেরিন। দুদিকের দুই হেমিস্ফেয়ারিক গম্বুজ দিয়ে রানা দেখল, তলিয়ে গেছে গোটা মিসাইল হোন্ড।
চারপাশ বড় নীরব। যেদিকে চোখ যায়, শুধু গাঢ় নীল।
জাহাজের মেঝে, মিসাইল সাইলো, মৃতদেহ–সবই সাগরের নীচে।
স্টারবোর্ডে কাত হয়েছে এমভি লোটাস। কমপক্ষে বিশ ডিগ্রি হেলে পড়েছে মেঝে।
সাবের মেঝে থেকে তলোয়ার কুড়িয়ে নিয়েছে পেদরোনভ। ধীর গতিতে নেমে চলেছে মিনি-সাবমেরিন। আবারও পরস্পরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। একপাশ থেকে তলোয়ার চালিয়েছে রাশান মেজর।
তলোয়ার নেমে আসবার সময় খপ করে পেরোনভের কব্জি ধরে ফেলল রানা।
ভোঁতা আওয়াজ শুনল ওরা। মিসাইল হোল্ডের মেঝেতে নেমেছে এএসডিএস। জাহাজের হেলে পড়া মেঝেতে নেমে স্টারবোর্ডের কার্গো দরজার দিকে রওনা হয়েছে সাবমেরিন।
বাঁকা হয়ে গেল রানার দুনিয়া।
বেকায়দাভাবে সাবমেরিন রওনা হতেই পা পিছলে ভারসাম্য হারাল রানা ও পেরোনভ, পড়ে গেল মেঝেতে।
এমভি লোটাসের ডোরওয়েতে পৌঁছে গেছে সাবমেরিন। পরক্ষণে খসে পড়ল খোলা সাগরে।
ছোট্ট হলদে সাবমেরিন নামতে লাগল সাগর-তল লক্ষ্য করে। নীচে ইংলিশ চ্যানেলের কালো জল, মাথার উপর এমভি লোটাস।
মাথার উপরে যেন প্রকাণ্ড কোনও মহাকাশযান।
অথবা মস্ত নীল তিমি, চাপা দেবে সামান্য কোনও পোকাকে!
ধীরে নামছে সুপারট্যাঙ্কার। কিন্তু ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক ভরা, ফলে এক্সপ্রেস এলিভেটারের মতই নেমে চলেছে মিনি-সাবমেরিন।
আরও কিছু ঘটছে। খাড়াভাবে নামতে লাগল হলদে সাবমেরিন।
ইংলিশ চ্যানেলের গড় গভীরতা এক শ বিশ মিটার। অবশ্য, এখানে শারবার্গের সাগরের গভীরতা মাত্র এক শ মিটার। এই সামান্য দূরত্ব পেরোতে বেশিক্ষণ লাগবে না খুদে সাবমেরিনের।
প্রায়ান্ধকার পরিবেশে লড়ছে রানা ও পেরোনভ। মিনি সাবের ইট্রুমেন্ট প্যানেল থেকে আসছে নীলচে ভুতুড়ে আলো।
শালা, তোকে খুন করব, তারপর কেটে নেব তোর মাথা! গর্জে উঠল পেরোনভ। রানার হাত থেকে ঝটকা দিয়ে ছুটিয়ে নিতে চাইছে তলোয়ার ধরা হাতের কব্জি।
এখন পর্যন্ত মোটামুটিভাবে স্ট্যাণ্ডার্ড মুভ নিয়েছে দুজন। কিন্তু এবার মেরিনদের বলা দ্য লেকটার মুভব্যবহার করতে চাইল পেরোনভ। সভ্য মানুষ ওভাবে লড়ে না।
বড় বড় দাঁত দিয়ে রানার গাল কামড়ে ধরতে চাইল সে।
চমকে গিয়ে ঝট করে মুখ পিছিয়ে নিল রানা। এ সুযোগটাই আশা করছিল পেদরোনভ–ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল তলোয়ারের কব্জি। সাঁই করে তলোয়ার চালাল রানার ঘাড় লক্ষ্য করে। কিন্তু ঠিক তখনই সাগরের তলে পৌঁছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সাবমেরিন। ধুপ করে মেঝের উপর আছাড় খেল দুজন।
বিদ্যুদ্বেগে উঠে দাঁড়াল ওরা।
লাফিয়ে সামনে বাড়ল পেরোনভ, একপাশ থেকে চালিয়েছে তলোয়ার। ওই একইসময়ে সামনে বেড়েছে রানা, ঢুকে পড়েছে পেদরোনভের দুর্গে। ইউটিলিটি ভেস্ট থেকে ধাতব কী যেন নিয়েছে, ঝট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে রাশানের মুখের ভিতর!
অবাক হওয়ারও সময় পেল না মিখাইল পেরোনভ, মাত্র বুঝতে শুরু করেছে, দ্বিধা না করেই কাছে চলে এসেছে শত্রু।
মাউন্টেনিয়ারিং পিটন অ্যাক্টিভেট করল রানা। চট করে সরিয়ে নিল নিজের মুখ। দৃশ্যটা দেখতে চায় না।
জোরালো স্ন্যাপ! আওয়াজ তুলল পিটন। ভয়ঙ্কর ঝটকা দিয়ে খুলে গেল কাঁকড়ার পায়ের মত দাঁড়া। পেয়েও গেল আঁকড়ে ধরবার মত জায়গা–গেঁথে গেল পেদরোনভের উপর এবং নীচের চোয়ালে।
কী ঘটল, ভালভাবে দেখল না রানা, কিন্তু শুনল পরিষ্কার।
অসুস্থকর কড়াৎ আওয়াজ তুলে বুকের দিকে নামল পেরোনভের নীচের চোয়াল। কিন্তু ওটার এতটা নীচে আসবার কথা নয়।
ঘুরে রানা দেখল, ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়েছে পেরোনভের মুখের। খুলে গেছে নীচের চোয়াল, ভেঙেও গেছে। উপরের চোয়ালে আরও বেশি ক্ষতি করেছে পিটন। কয়েকটা দাঁড়া আঁচড় কেটেছে পেরোনভের মগজে।
হঠাৎ করেই থমকে গেছে লোকটা, থরথর করে কাঁপছে। গোটা দেহ।
দুহাঁটুর উপর ভর দিয়ে ধুপ করে বসে পড়ল রাশান মেজর।
অনায়াসেই তার তলোয়ারটা নিল রানা, সিধে হয়ে দাঁড়াল শত্রুর সামনে।
পিটপিট করে ওকে দেখছে পেদরোনভ।
রানার ক্ষিপ্ত মন চাইল কেটে নেবে মেজরের মাথা। ওই। কাজই করে লোকটা অন্যদের প্রতি।
কিন্তু তলোয়ার তুলল না রানা।
বুঝে গেছে, চাইলেও এ কাজ করতে পারবে না।
দুহাঁটুর উপর ভর করে টলছে পেদরোনভ, আরও কয়েক সেকেণ্ড ওভাবে বসে রইল, তারপর দড়াম করে মুখ থুবড়ে পড়ল মেঝেতে। মস্ত হাঁ করা মুখ থেকে গলগল করে বেরোল রক্ত।
লড়াই শেষ।
আবারও খুলে যাওয়া ইয়ারপিস কানে আটকে নিল রানা। শুনল কুয়াশার কণ্ঠ, রানা! সাড়া দাও! তুমি কি বেঁচে আছ?
হ্যাঁ, জবাব দিল রানা। সাগরের নীচে। আপনি কোথায়?
অন্য সাবমেরিনে। তোমার সাবমেরিনের বাইরের বাতি। জ্বালো।
তাই করল রানা।
সর্বনাশ! বিড়বিড় করল কুয়াশা।
কী হয়েছে? জানতে চাইল রানা।
জবাব দিল না কুয়াশা, পাল্টা জানতে চাইল, সাবমেরিনে পাওয়ার আছে?
ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেলে কয়েকটি বাটন টিপল রানা। চালু হলো না ইঞ্জিন। অক্সিজেন আছে, কিন্তু প্রপালশানের উপায় নেই। কেন, আপনি নেমে আসতে পারবেন না? হয়তো সরিয়ে নিতে পারবেন আমাকে?
ঠিক সময়ে পৌঁছুতে পারব না।
ঠিক সময় মানে? সমস্যা কী?
বিশাল… আ… সমস্যা…
সমস্যাটা কী খুলে বলুন।
উপরের দিকে তাকাও।
সাবমেরিনের গম্বুজের ভিতর দিয়ে উপরে চাইল রানা।
এবার সব পরিষ্কার দেখল।
নেমে আসছে প্রকাণ্ড সুপারট্যাঙ্কারের খোল!
যেন চাঁদের মস্ত এক টুকরো!
সোজা আসছে ওর দিকেই!
ঢোক গিলল রানা। বুঝে গেছে, ওর সাবমেরিনের উপর চেপে বসবে এক লক্ষ দশ হাজার টনি সুপারট্যাঙ্কার।
এতই বড়, নেমে আসবার সময় সাগরে তৈরি করছে। কম্পন।
র-র-র-র-র-র-র শব্দটা ভীষণ ভীতিকর।
আগে কখনও এই দৃশ্য দেখিনি, বিড়বিড় করল রানা। চট করে মাইকে বলল, কুয়াশা?
ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারব না, হতাশ স্বরে বলল বৈজ্ঞানিক।
ডানে-বামে চাইল রানা।
কোনও উপায় খুঁজতে হবে। সাঁতার কেটে জাহাজের আওতা থেকে বেরোতে পারবে না। ওই মাল এক হাজার ফুট লম্বা, চওড়ায় দুই শ ফুট।
এবার চিড়ে চ্যাপ্টা হবে ও!
বাঁচবার উপায় নেই! কিন্তু মৃত্যুর আগে একটা কাজ করতে পারে। সেটা হবে মস্ত একটা অর্জন।
ইংলিশ চ্যানেলের তলে স্যাটালাইট মাইক চালু করল রানা।
খবির! নিউ ইয়র্কে তোমার অবস্থা কী?
দখল করে নিয়েছি করপোরেশন। মারা পড়েছে শত্রুরা। এখন আমাদের হাতে কন্ট্রোল কন্সেল। ওটার সঙ্গে স্যাটালাইট আপলিঙ্ক যোগ করে দিয়েছি। এখন এগারোটা বায়ান্ন। ডিসআর্ম করার জন্য আট মিনিট পাবেন, স্যর।
উপরে চাইল রানা। নেমে আসছে সুপারট্যাঙ্কার। প্রায় নীরব এক মস্ত দানব। যে গতিতে নামছে, একমিনিট পেরোবার আগেই সাগর-তলে পৌঁছবে।
তোমার হাতে আট মিনিট, খবির, কিন্তু আমার হাতে সময় নেই, শান্ত স্বরে বলল রানা। এখনই ডিসআর্ম করতে হবে মিসাইল।
দেরি করল না রানা, ওয়ারটারপ্রুফ পাউচ থেকে বের করল টাচলক-৯ ইউনিট, ওটার সঙ্গে যুক্ত করল স্যাটালাইট আপলিঙ্ক।
চালু হয়ে গেছে ইউনিট:
স্যাট-লিঙ্ক: কানেক্ট করপোরেশন-০৫-আপলিঙ্ক
কানেকশন মেড।
অ্যাকটিভেট রিমোট সিস্টেম।
মিসাইল লঞ্চ সিকিউয়েন্স ইন প্রগ্রেস।
প্রেস এন্টার টু ইনিশিয়েট ডিসআর্ম সিকিউয়েন্স।
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি) স্যাটিসফায়েড।
ইনিশিয়েট সেকেণ্ড প্রটোকল।
.
নিউ ইয়র্কের জাহাজের মিসাইল কন্ট্রোল কন্সেলের লাল ও সাদা বৃত্ত দেখা দিল রানার স্ক্রিনে।
চট করে একবার উপরে চাইল রানা। নীল সাগর চিরে নামছে প্রকাণ্ড এমভি লোটাস জাহাজ।
দ্বিতীয়বার ওদিকে চাইল না রানা, চালু করল ডিসআর্ম সিকিউয়েন্স।
নেমে আসবার গতি বেড়েছে সুপারট্যাঙ্কারের… আগের চেয়ে দ্রুত আঙুল চলছে রানার। আশি ফুট উপরে সুপারট্যাঙ্কার।
দপ করে জ্বলে উঠল একটা লাল বৃত্ত, ওটা স্পর্শ করল রানা।
এখন সত্তর ফুট উপরে এমভি লোটাস…
ষাট..
চারপাশের সাগরে সুপারট্যাঙ্কার থেকে ছড়িয়ে পড়ছে জোরালো রররমমমমমম! আওয়াজ।
পঞ্চাশ ফুট… চল্লিশ…
শেষ লাল বৃত্ত স্পর্শ করল রানা। টিপটিপ করে জ্বলে উঠল ডিসপ্লে:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
স্যাটিসফায়েড।
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
অ্যাকটিভ।
প্লিয এণ্টার অথোরাইযড ডিসআর্ম কোড।
ত্রিশফুট, তারপর চেপে বসবে এমভি লোটাস!
ছোট্ট সাবমেরিনের চারপাশের পানি কালচে হয়ে উঠেছে। উপর থেকে ছায়া ফেলেছে মস্ত জাহাজ।
রানা ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড এন্ট্রি করল:
৪,৩১,১২,৬০৯
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
স্যাটিসফায়েড।
অথোরাইযড ডিসআর্ম কোড এন্টার্ড
মিসাইল লঞ্চ অ্যাবোর্টেড।
মৃদু হাসল রানা। ভাবল, সবই শেষ হয় একসময়। সবই। দুঃখই বা কীসের? সাধ্যের বাইরে কিছুই তো আর করা যায় না।
ওর মনটা চাইল চোখ বুজে অপেক্ষা করবে। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেয়ে রইল নেমে আসা মস্ত জাহাজের দিকে।
মনে পড়ল সোহানার অপূর্ব হাসি। মিষ্টি হাসত রেবেকা সাউল, ওকে বা সুলতাকে ফেরাতে পেরেছে ও? তিশা? সুস্থ হয়ে উঠবে, কখনও ভাববে ওর কথা। আগেই বিদায় নিল নিশাত আপা। জীবনটা দিয়েই দিল ওর জন্যে। …আচ্ছা, যখন শুনবে রানা আর নেই, চোখ ভিজে যাবে কট্টর বুড়োর? সোহেল বোধহয় চাকরি ছেড়ে দেবে। গিল্টি মিয়া যখন জানবে ও নেই, বুক চাপড়ে হাউমাউ করে কাঁদবে। আর রাঙার মা… এবার আর পীরের দরবারে যাবে না কিছুতেই। আর কখনও না।…রানা এজেন্সির দায়িত্ব বুঝে নেবে কেউ। কিছুই থেমে থাকে না কারও জন্যে।
আরও মিসাইল থাকলে অন্য কেউ ঠেকাবে ওগুলোকে।
মায়াভরা এই পৃথিবীটা সত্যি সুন্দর ছিল, ভাবল রানা। এবং খুব হঠাৎ করেই বিদায় নিতে হচ্ছে ওকে।
বড়জোর বিশ সেকেণ্ড? সত্যিই বড় দ্রুত নেমে এল সুপারট্যাঙ্কার। থরথর করে কাঁপতে লাগল সাগরতল। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল বিকট বুম! আওয়াজ। নানাদিকে ছিটকে গেল বালির মেঘ। কিন্তু তখন সাবমেরিনের ভিতর নেই রানা।
এমভি লোটাস বিশফুট উপরে পৌঁছতেই চারপাশে আরও কালো ছায়া ফেলল জাহাজটা। নিজের চিন্তায় ডুবে ছিল রানা। তখনই শুনল এএসডিএসের গায়ে ভোতা ধাতব আওয়াজ।
ঝট করে ওদিকে চাইল রানা। অবাক হলো খুব, ওর ছোট্ট সাবমেরিনের ধাতব দেহে আটকে গেছে একটা ম্যাগহুক। ওটার দড়ি জাহাজের খোলের ওপাশে।
কানের ভিতর ধমকে উঠল কুয়াশা: রানা! জলদি! বেরোও!
ঝড়ের গতিতে কাজে নামল রানা। মাত্র একবার দম নিল, পরক্ষণে টিপে দিল হ্যাচ বাটন।
হ্যাচ খুলতেই হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকল পানি। মাত্র দু সেকেণ্ড লাগল সাবমেরিন পুরে যেতে। মুহূর্তে বেরিয়ে এল রানা, খপ করে ম্যাকহুকের দড়ি ধরে দুটো টান দিল।
ওই একইসময়ে দড়ির অপরপ্রান্তে হুকের ডিম্যাগনেটাইয সুইচ টিপে দিয়েছে কুয়াশা। লঞ্চার বিদ্যুদ্বেগে টানতে লাগল দড়ি। সাগরের তলে রওনা হলো রানা। ওর মাথার একটু উপরে নামছে সুপারট্যাঙ্কার। মাত্র তিনফুট নীচে ঝড়ের গতিতে সরসর করে পিছিয়ে চলেছে বালির এবড়োখেবড়ো প্রান্তর।
পাঁচ সেকেণ্ড পর জাহাজের তলা দিয়ে বেরিয়ে গেল রানা। ওর দুপায়ের আধ ফুট পিছনে ইংলিশ চ্যানেল কাঁপিয়ে নেমে এল সুপারট্যাঙ্কার। প্রচণ্ড আওয়াজে কানের তালু ঝনঝন করে উঠল ওর। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল বিপুল বালি, সেই মেঘের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলল রানা।
মেঘের ওদিকে ওর জন্য অপেক্ষা করছে কুয়াশা, বসে আছে দ্বিতীয় এএসডিএস-এর হ্যাঁচে। একহাতে নতুন পনি বটল। অন্যহাতে তিশার ম্যাগহুক।
রানা পৌঁছতেই ওর হাতে পনি বটল ধরিয়ে দিল কুয়াশা। বড় করে দুবার দম নিল রানা।
দশ সেকেণ্ড পেরোবার আগেই মিনি-সাবে ঢুকল ওরা। নতুন করে সাব রিপ্রেশারাই করল কুয়াশা। বের করে দিল বাড়তি পানি।
কিছুক্ষণ পর বিক্ষুব্ধ, বৃষ্টিস্নাত ইংলিশ চ্যানেলে ভেসে উঠল দুই দুঃসাহসী বাঙালি যুবকের হলদে সাবমেরিন। মস্ত সব ঢেউ ডুবিয়ে দিতে চাইল ওদেরকে। তখনই সাবের উপর পড়ল অত্যুজ্জ্বল হ্যালোজেন স্পটলাইট। মাত্র দশফুট উপরে কালো শকুন নিয়ে নেমে এসেছে রঘুপতি।
বারো
স্থানীয় সময়: সন্ধ্যা ছয়টা পাঁচ মিনিট
এখন আমেরিকার ই.এস.টি, বারোটা পাঁচ মিনিট।
ইংলিশ চ্যানেলের আকাশে দক্ষিণ দিক লক্ষ্য করে বিদ্যুদ্বেগে ছুটছে কুয়াশার কালো শকুন।
চুপচুপে ভেজা পোশাকে গানারের সিটে বসে পড়েছে কুয়াশা। রানা অবশ্য পায়চারি করছে বিমানের বম বে-তে। বের করেছে মডিফায়েড পাম পাইলট। বাকি রয়ে গেছে এখনও কিছু কাজ।
আবারও মিসাইল উৎক্ষেপের তালিকা বের করেছে। তিন তালিকা তুলনা করে দেখবে।
আগের দুই তালিকার প্রথম তিন জাহাজ ঠিকই আছে। কিন্তু পাল্টে গেছে শেষের জাহাজগুলোর মিসাইল।
সোর্স শিপ – ডেলিভারি সিস্টেম – ডাব্লিউএইচ – অরিজিন টার্গেট – টাইম
হোপ স্কাই হর্স-৩ ডাব্লিউ ৮৮ ১১১০০-০১ ১১৬২২১.৬০ ২৩২৭-০১ ৪০০১-০০ ১২.১৫ (টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (বেইজিং)
সেইম ১১১০০-০১ ১১৪৪৫-৭০ ২৩২৮-০০ ২২৪৩-২৮ ১২.৩০
(টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (হংকং)
ডলফিন ঘৌরি-২ ০৭৭২৫-০৫ ২৩২৭-০১ ১৮৫ ২৩২৭.০১ ২৯৫৮.০৬ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (নিউ দিল্লি)
অগ্নি-২ ০৭০৪০.৪৪ ০৭৩৩২-৬১ ২৩২৭-০০ ৩২৩০-৫১ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (ইসলামাবাদ)
জ্যাকিউলিন জেরিকো-২বি ডাব্লিউ-৮৮ ০৪৪০২.২৪ ০৪১৪৫,০৯ ১৬৫০.৪৯ ২১৩০.০১ ১৪.০০
শেষের জাহাজটা আগে ছিলই না।
প্রথম দুজাহাজের জিপিএস লোকেশন কী আগেই জানিয়েছে। খবির।
সোর্স – শিপ – ডেলিভারি সিস্টেম – ডাব্লিউএইচ – অরিজিন – টার্গেট – টাইম
হোপ স্কাই হর্স-৩ ডাব্লিউ ৮৮ ১১১০০-০১ ১১৬২২১.৬০ ২৩২৭-০১ ৪০০১-০০ ১২.১৫
(টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (বেইজিং)
সেইম ১১১০০-০১ ১১৪৪৫-৭০ ২৩২৮-০০ ২২৪৩-২৮ ১২.৩০
(টাইওয়ান স্ট্রেইটস) (হংকং)
ডলফিন ঘৌরি-২ ০৭৭২৫-০৫ ২৩২৭-০১ ২৩২৭.০১ ২৯৫৮.০৬ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (নিউ দিল্লি)
অগ্নি-২ ০৭০৪০.৪৪ ০৭৩৩২-৬১ ২৩২৭-০০ ৩২৩০-৫১ ১২.৪৫
(অ্যারাবিয়ান সি) (ইসলামাবাদ)
রানা টের পেল, হঠাৎ করেই গোটা পরিস্থিতির নতুন ডিমেনশন এনে দিয়েছে এ তালিকা।
এমভি হোপ জাহাজ থেকে বেইজিং ও হংকঙের উপর যে মিসাইল ফেলা হবে, ওগুলো তাইওয়ানের স্কাই হর্স আইসিবিএম এর ক্লোন। বোমা হিসাবে থাকছে আমেরিকান ওয়ারহেড।
এদিকে এমভি ডলফিন থেকে নিউ দিল্লির উপর যে মিসাইল ফেলবে, ওটা পাকিস্তানি ঘৌরি-২ নিউক্লিয়ার মিসাইলের ক্লোন। আবার একই জাহাজ ইসলামাবাদে ফেলবে ভারতীয় অগ্নি-২-এর ক্লোন নিউক্লিয়ার মিসাইল।
সর্বনাশ… বিড়বিড় করল রানা।
তাইওয়ানিরা নিউক্লিয়ার স্ট্রাইক করলে পাল্টা কী ব্যবস্থা। নেবে চিন?
স্রেফ উড়িয়ে দেবে ওই ছোট দ্বীপ।
ভারত এবং পাকিস্তান পরস্পরের রাজধানীর উপর আণবিক বোমা ফেললে?
ভুরু কুঁচকে গেল রানার। ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশও
রানা বুঝল না কেন খবিরের দেয়া তালিকার সঙ্গে এই তালিকা মিলছে না।
গভীরভাবে ভাবতে চাইল রানা।
কোথা থেকে এই তালিকা পেয়েছে খবির?
মোসাদ এজেন্ট ডেনিস ই, ম্যাকিনের কাছ থেকে। সে লোক বেশ কয়েক মাস চেষ্টা করে পেয়েছিল ম্যাজেস্টিক-১২-র কাছ থেকে।
আর নতুন এই তালিকা আমি পেয়েছি কোথা থেকে? অতীত নিয়ে ভাবতে চাইল রানা।
ও… হ্যাঁ… কয়েক মুহূর্ত পর বলল।
মনে পড়েছে।
তখন তিশার পাশে ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নের পাথুরে অ্যান্টি রুমে বসে ছিল। আর কুয়াশা ছিল মোসিউ ড্যাবলারের অফিসে। হ্যাঁক করছিল লোকটার কমপিউটার।
হোল্ডের দরজা থেকে রানা জানতে চাইল, কুয়াশা, আপনি যখন ড্যাবলারের সঙ্গে দুর্গে ছিলেন, সে কি একবারও বলেছে ওই অফিস কার?
কাঁধ ঝাঁকাল কুয়াশা। হ্যাঁ। বলেছিল ওই অফিস তার নয়। ওটা দুর্গের মালিকের।
ডেমিয়েন ডগলাস?
হ্যাঁ, কেন?
সবই বুঝতে পেরেছে রানা।
ওই অফিসে আরও একটা কমপিউটার চালু ছিল। কোনও ড্রয়ারে, বা সাইড টেবিলে। আপনি নিজেই বলেছিলেন, আপনার পাম পাইলট যে-কোনও কমপিউটারের হার্ড ডিস্ক থেকে ডকুমেন্ট হ্যাঁক করে। ওই কমপিউটার ছিল ডেমিয়েন ডগলাসের।
তাতে সমস্যা কী?
পাম পাইলটের স্ক্রিন উঁচু করে নতুন তালিকা দেখাল রানা। এটা ম্যাজেস্টিক-১২-র প্ল্যান নয়। তারা গোটা দুনিয়া জুড়ে কোল্ড, ওঅর তৈরি করতে চেয়েছিল। টেরোরিস্ট মিসাইল আঘাত হানবে। সেগুলো হবে শাহাব বা টেপও-ডং-২। এজন্যেই গ্লোবাল জিহাদের টেরোরিস্টদের লাশ রেখেছিল ড্রাগন প্লান্টে। একই কাজ করে সুপারট্যাঙ্কারে, যাতে সবাই বোঝে, টেরোরিস্টরা চুরি করেছে নোয়ায শিপ।
কিন্তু এই তালিকা অন্যকিছু। ডগলাসের কোম্পানি একেবারে আলাদা লির্ড মিসাইল বসিয়েছে নোয়ায শিপে ওগুলোর কথা জানে না ম্যাজেস্টিক-১২। টেরোরিযমের উপর গ্লোবাল ওঅর নয়, তার চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় ডেমিয়েন। দুনিয়ার প্রতিটি শক্তিশালী দেশে পড়বে মিসাইল। আর দোষ পড়বে শত্রু দেশের।
পশ্চিমাদের উপর পড়বে টেরোরিস্টদের মিসাইল। ভারত আর পাকিস্তান একে অপরের উপর আণবিক বোমা ফেলবে। চিনের শহরে পড়বে তাইওয়ানিদের মিসাইল।
আস্তে করে মাথা নাড়ল রানা।
বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছে ডেমিয়েন ডগলাস। এটা এম-১২ র প্ল্যান নয়। ডগলাসের প্ল্যান এটা। এর ফলে কোনও কোল্ড ওঅর শুরু হবে না। অন্য কিছু হবে। গোটা দুনিয়া জুড়ে মহাযুদ্ধ বাধবে। শৃঙ্খলা বলতে দুনিয়ায় কিছুই থাকবে না।
তার মানে তুমি বলছ, বড়লোক সংঘের সবাইকে বোকা। বানিয়ে নিজেই যা করার করবে ডেমিয়েন ডগলাস? জানতে চাইল কুয়াশা।
ঠিক তা-ই বলছি, বলল রানা। ওর মনে পড়ল ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নে ডেমিয়েনের বলা কথাটা: কেউ কেউ আজও জানে না। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে ওই আফ্রিকায়।
ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে আফ্রিকায়, বলল রানা, প্রতিটি জাহাজে ছিল আফ্রিকান কমাণ্ডো। ইরিত্রিয়ান বা নাইজেরিয়ান। চট করে পাম পাইলটের স্ক্রিনে নতুন ডকুমেন্ট আনল রানা।
আগেই বোঝা উচিত ছিল আমার!
স্ক্রিনে লেখা:
একযেকিউটিভ ইটিনেরারি
দ্য প্রোপোযড অর্ডার অফ ট্র্যাভেল ইয অ্যায ফলোয: আসমারা (২৪/০৬), লৌণ্ডা (২৪/০৬), আবুজা (২৭/০৬), নাযামেনা (২৭/০৬) এবং ব্রুক (২৯/০৬).
০১/০৭ –আসমারা (এম্বেসি)
০৩/০৭–লৌণ্ডা (থাকছি ওলিফ্যাণ্টের ভাতিজার ওখানে)
গতবছর আফ্রিকায় যাওয়ার সময় এই যাত্রা তালিকা করেছিল ডেমিয়েন ডগলাস।
আসমারা: ইরিত্রিয়ার রাজধানী।
লৌণ্ডা: অ্যাঙ্গোলার রাজধানী।
আবুজা: নাইজেরিয়া।
নাযামেনাঃ চাঁদ।
তব্রুক লিবিয়ার সবচেয়ে বড় এয়ারফোর্স বেস।
ডেমিয়েন ডগলাস গিয়ে ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করছিল না। আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
কীসের সেটা?
যদি দুনিয়ার শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের ভিতর যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, বলল রানা, একবার ভেবেছেন দুনিয়ার অন্যান্য এলাকায় কী ঘটবে?
পুরনো গায়ের ঝাল মেটাবে অনেক দেশ, বলল কুয়াশা। নতুন করে শুরু হবে এথনিক ক্লিনসিং। সার্বরা খুন করবে ক্রোয়েটদের। রাশানরা শেষ করবে চেচেনদেরকে। কুর্দদের জবাই করবে ইরাক ও তুরস্ক। সুযোগসন্ধানীরা সুবিধা আদায় করবে। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চেষ্টা করেছিল জাপান। অন্যদেশের উপর হামলা করবে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাশালী দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এলাকা দখল করবে। আমাদের বাংলাদেশের মত গরীব দেশকে পায়ের নীচে পিষে ফেলবে শক্তিশালী দেশ। আস্তে করে মাথা নাড়ল বৈজ্ঞানিক। চারপাশে শুরু হবে ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা।
আবারও জাহাজের তালিকা স্ক্রিনে আনল রানা।
শেষ এন্ট্রির উপর চোখ পড়তেই নতুন করে মনোযোগ দিল।
জ্যাকিউলিন জেরিকো-২বি ডাব্লিউ-৮৮ ০৪৪০২.২৪ ০৪১৪৫,০৯ ১৬৫০.৪৯ ২১৩০.০১ ১৪.০০
জেরিকো-২৮ ক্লোন মিসাইল, ভাবল রানা। ওটা লং-রেঞ্জ ব্যালেস্টিক মিসাইল। ইজরায়েলের। ওই মিসাইলে থাকবে আমেরিকার ডাব্লিউ-৮৮ ওয়ারহেড।
ওটার টার্গেট কী?
খবিরের আইপি-র ম্যাপ ব্যবহার করল রানা, প্লট করল। জিপিএস কোঅর্ডিনেট।
ম্যাপ অনুযায়ী টার্গেট খুঁজতে শুরু করেছে রানার আঙুল। পেয়েও গেল।
সর্বনাশ… বিড়বিড় করে বলল।
শেষ ক্লোন মিসাইল ইজরায়েলিদের, নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড আমেরিকার তৈরি টার্গেট সৌদি আরব।
মিসাইল আঘাত হানবে মক্কার কাবাঘরের ওপর। ম্যাপ দেখছে কুয়াশা। হঠাৎ করেই নীরবতা নেমেছে বিমানের ককপিটে।
আমেরিকার বোমা মাথায় নিয়ে মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র শহরে হামলা করবে ইজরায়েলিদের মিসাইল।
আজই হজ। লাখে লাখে মুসলিম জড় হয়েছে মক্কায়। ইচ্ছা করেই নির্দিষ্ট এই তারিখে আণবিক বোমা ফেলছে। ডেমিয়েন ডগলাস।
মক্কা উড়ে যাওয়ার পর পরই আগুন জ্বলে উঠবে গোটা দুনিয়া জুড়ে। কোনও দেশে নিরাপদ থাকবে না কোনও মানুষ।
আণবিক হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই চরম প্রতিশোধ নিতে চাইবে গোটা বিশ্বের মুসলমান।
এরপর যে মহাযুদ্ধ, তা আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিটি মুসলিম দেশের।
ওটাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কিছুদিনের ভিতর ধ্বংস হবে গোটা মানব-সভ্যতা।
আজই হজ, কুয়াশা, বলল রানা। হিসাব কষেই এই দিনটাকে বেছে নিয়েছে ডেমিয়েন ডগলাস।
কোথা থেকে মিসাইল ফেলবে? জানতে চাইল কুয়াশা।
জিপিএস কো-অর্ডিনেটস অনুযায়ী শেষ লিযার্ড মিসাইলের লঞ্চ লোকেশন প্লট করল রানা। কুঁচকে উঠল ভুরু।
ওটা কোনও জাহাজ থেকে নয়, বলল। স্থলভূমি থেকে। ইয়েমেনের ভেতর জায়গাটা।
ইয়েমেন? রানার দিকে চাইল কুয়াশা। সৌদি আরবের দক্ষিণের দেশ। মক্কা থেকে সামান্য দূরেই।
ইয়েমেন… ভাবতে শুরু করেছে রানা। ইয়েমেন…
আমেরিকান সেনাবাহিনী ওকে সাইবেরিয়ায় পাঠানোর আগে ব্রিফ করেছিল। তখন শুনেছিল ইয়েমেনের কথা।
ইয়েমেনে আছে ক্রাস্ক-৮ ক্লোন মিসাইল, অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলল রানা, কোল্ড ওঅরের সময় পাবলো-৯-এর ফ্যাসিলিটির মতই বেশকিছু দেশে ল্যাণ্ড বেইযড আইসিবিএম ফ্যাসিলিটি করেছিল সোভিয়েতরা। ক্লায়েন্ট দেশ ছিল সিরিয়া, সুদান ও ইয়েমেন।
ঝড়ের মত ভাবছে রানা।
পাবলো-৯ শহরটা কিনে নিয়েছে স্করপিয়ন শিপিং কোম্পানি লিমিটেড। ওটা ডেমিয়েন ডগলাসের। ড্রাগন করপোরেশনের সাবসিডিয়ারি।
রানা চেয়ে আছে কুয়াশার দিকে। আমাদের বোধহয় দক্ষিণ পুব লক্ষ্য করে রওনা হয়ে যাওয়া উচিত।
আস্তে করে মাথা দোলাল কুয়াশা। এবং ব্যবহার করা উচিত আফটারবার্নার। …রঘুপতি?
প্রথমবারের মত দ্বিধা দেখা দিল রোববাটের চেহারায়। বস, একটা কথা… আমরা পূর্ণগতি তুললেও দুঘণ্টার ভেতর ইয়েমেনে পৌঁছতে পারব না। ছয় হাজার কিলোমিটার পেরোতে হবে। কাজেই দরকার পড়বে কমপক্ষে চার ঘণ্টা সময়। তা ছাড়া, আফটারবার্নার ব্যবহার করলে যে অকটেন লাগবে, তাতে আমরা বড়জোর ফ্রেঞ্চ আল্পস পর্যন্ত যেতে পারব।
ফিউয়েল নিয়ে ভাবতে হবে না, বলল রানা, আকাশেই ফিউয়েলিঙের ব্যবস্থা করতে পারব। তা ছাড়া, আমরা সুখোই ফাইটার জেট নিয়ে ইয়েমেনে যাচ্ছি না।
আপনারা যা বলেন, বলল রঘুপতি। কাত করে নিল বিমান, রওনা হলো দক্ষিণ-পুব লক্ষ্য করে। চালু করেছে আফটারবার্নার।
স্যাটালাইট মাইকে যোগাযোগ করতে চাইল রানাঃ মিস্টার ডেলাস, আপনি কি এখনও লাইনে আছেন?
জী, সংক্ষিপ্ত জবাব এল লণ্ডন থেকে।
একটা কোম্পানির কী কী অ্যাসেট আছে জানতে চাই। ওটার নাম স্করপিয়ন শিপিং কোম্পানি। ইয়েমেনে ওদের স্থাবর কী আছে, জানা দরকার। বিশেষ করে ওটা যদি হয় পুরনো। সোভিয়েত মিসাইল সাইট।
আরও দুটো ব্যাপারে সাহায্য চাই। প্রথম কথা, ইউরোপের। এক্সপ্রেস প্যাসেজ লাগবে আমার। এ ছাড়া কয়েকবার মিড এয়ার রিফিউয়েলিং দরকার পড়বে। আপনাকে আমাদের ট্র্যান্সপণ্ডার সিগনাল পাঠিয়ে দেব।
জী। আর দ্বিতীয় কাজটি?
আমার জন্যে বিশেষ দুটো আমেরিকান বিমানে ফিউয়েল ভরে রাখবেন। ওই দুই বিমান এখন আছে ইটালির মিলানের অ্যারোস্টাডিয়া ইটালিয়া এয়ারশোতে।
পরের তিরিশ মিনিট ঝড়ের গতিতে কেটে গেল।
দুনিয়ার প্রায় সমস্ত দেশের সরকারের নির্দেশে দেরি না করেই কাজে নামল নানাধরনের সশস্ত্রবাহিনী।
তেরো
আরব সাগর।
ভারত উপকূল থেকে সামান্য দূরে। অক্টোবর ১৫।
স্থানীয় সময় রাত নয়টা পাঁচ মিনিট। ও ইউএসএ, ই.এস.টি. দুপুর বারোটা পাঁচ মিনিট।
প্রায় শান্ত ভারত মহাসাগরে ভাসছে সুপারট্যাঙ্কার এমভি ডলফিন। যেন চেয়ে আছে ভারত ও পাকিস্তানের উপকূলের দিকে। উৎক্ষেপ করতে তৈরি পেটে রাখা মিসাইল নিয়ে।
জাহাজের কেউ জানল না, দুই মাইল পিছনে তেড়ে আসছে
একটা লস অ্যাঞ্জেলেস-ক্লাস অ্যাটাক সাবমেরিন।
স্বাভাবিক কারণেই জাহাজের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে সাবমেরিনকে দেখতে পেল না আফ্রিকান কমাণ্ডোরা। এবং যখন পিছনে পৌঁছে গেল সাবমেরিন, জাহাজের রেডার সঙ্কেত দিল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
একইসময়ে এমভি ডলফিনে লাগল দুটো মার্ক-৭৮ টর্পেডো। ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে তলি খসে গেল জাহাজের, একমিনিটও লাগল না ডুবে যেতে।
.
তাইওয়ান স্ট্রেইটস।
চিন ও তাইওয়ানের মাঝের আন্তর্জাতিক জলসীমা। স্থানীয় সময় রাত একটা দশ মিনিট।
অক্টোবর ১৫। আমেরিকার ই.এস.টি, বারোটা দশ মিনিট। অক্টোবর ১৪।
ভারতীয় মহাসাগরে এমভি ডলফিনের কপালে যা ঘটেছে, ঠিক তাই হলো এমভি হোপ-এর।
তাইওয়ান স্ট্রেইটের সি লেনে নিশ্চিন্তে খাপ পেতে বসে ছিল। জাহাজটা। দূরে দুটো সুপারট্যাঙ্কার এবং একটি ফ্রেইটার। এমন সময় এমভি হোপের তলি খসিয়ে দিল ওয়ায়ার-গাইডেড দুটো আমেরিকান মার্ক-৪৮ টর্পেডো।
অন্য জাহাজের কয়েকজন রাতের প্রহরী কর্তৃপক্ষকে জানাল; দিগন্তে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের আগুন দেখেছে তারা। সেই সঙ্গে বিকট আওয়াজ।
রেডিয়ো করা হলো এমভি হোপকে। কিন্তু জবাব দিল না কেউ। জাহাজটা যেখানে ছিল, সেখানে কোনও জাহাজ খুঁজে পাওয়া গেল না।
এমভি হোপ অদৃশ্য হয়েছে।
যে সাবমেরিন ওটাকে ডুবিয়ে দিয়েছে, তাকে কেউ দেখেনি। পরবর্তীতে মার্কিন সরকার জোর গলায় বলবে, ওই এলাকায় তাদের কোনও সাবমেরিনই ছিল না।
.
ওয়েস্ট কোস্ট, ইউএসএ।
সান ফ্রান্সিসকোর সামান্য দূরের সাগর। অক্টোবর ১৫। স্থানীয় সময় সকাল নয়টা বারো মিনিট। নিউ ইয়র্কে দুপুর বারোটা বারো মিনিট।
নোয়ায শিপ এমভি রুবল নামের সুপারট্যাঙ্কারের হোল্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছে বারোজন ইউনাইটেড স্টেটস মেরিন, একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে একডজন আফ্রিকান কমাণ্ডোর লাশ। এইমাত্র জাহাজের মিসাইল কন্ট্রোল কন্সেলের সঙ্গে স্যাটালাইট আপলিঙ্ক যুক্ত করেছে কেভিন কনলন।
পুরো এক সেকেণ্ডও লাগল না ওই সিগনাল রানার কাছে কালো শকুনে পৌঁছুতে। ও রয়েছে ফ্রান্সের আকাশে, চলেছে। ইতালি লক্ষ্য করে।
রানা টাচলক সিস্টেম ব্যবহার করে দূর থেকে মিসাইল ডিসআর্ম করছে, এই সময়টা কন্সেলের সামনেই থাকল কেভিন। নিজের দেহ দিয়ে আড়াল করল আপলিঙ্ক। দুই ইরিত্রিয়ান কমাণ্ডো ধরা পড়েনি, এখনও আড়াল থেকে গুলি করছে। একটু পর পরই গ্রেনেড আসছে তাদের তরফ থেকে।
ভয়ে থরথর করে কাঁপছে কেভিন। আশপাশ দিয়ে ছুটছে বুলেট। একটু দূরে গ্রেনেড ফাটল। কন্সেল আড়াল করেই রাখল কেভিন।
অবশ্য, দুই মিনিট পেরোবার আগেই মেরিনদের হাতে মারা পড়ল দুই ইরিত্রিয়ান কমাণ্ডো।
তার ষোলো সেকেণ্ড পর কালো শকুনে বসে এমভি রুবলের লঞ্চ সিস্টেম অ্যাবোর্ট করে দিল রানা। কাজটা শেষ হতেই মস্ত শ্বাস নিয়েই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল কেভিন কনলন।
.
অ্যারোস্টাডিয়া এয়ারফিল্ড।
মিলান, ইটালি। অক্টোবর ১৫। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাতটা। নিউ ইয়র্কে দুপুর একটা।
অ্যারোস্টাডিয়া এয়ারফিল্ডের রানওয়েতে সরাসরি তুমুল হাওয়া ফেলছে শক্তিশালী সব রেট্রোস, ভাসতে ভাসতে টারমাকে নেমে এল কুয়াশার কালো শকুন।
এরই ভিতর আঁধার নামতে শুরু করেছে উত্তর ইটালি জুড়ে, অবশ্য এয়ার শো-তে গত পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ওভারটাইম করছে ইউএস এয়ার ফোর্সের কন্টিনজেন্ট। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে কঠোর নির্দেশ দেয়া এসেছে, ফিউলিং করতে হবে বিশেষ দুই এয়ারোপ্লেনের।
দেখবার মত মস্ত বি-৫২ বোমারু বিমানের এক শ গজ দূরে রানওয়েতে নেমেছে রাশান সুখোই ফাইটার বিমান।
প্রকাণ্ড বোমারু বিমানের দুই ডানা থেকে ঝুলছে বুলেট আকৃতির দুই কালো বিমান, যেন বড় আকারের দুই মিসাইল।
ওগুলো আসলে মিসাইল নয়: এক্স-১৬ বিমান।
অনেকেই ভাবেন, মাক থ্রির বেশি গতি তোলা অসম্ভব। দুনিয়ার সবচেয়ে দ্রুতগামী বিমান এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড।
কথাটা প্রায় ঠিকই।
কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর গতি সহজেই অতিক্রম করেছে একটি বিমান। সত্যি বলতে, ওটার গতি কয়েক গুণ বেশি। ঘণ্টায় সাত হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করতে সক্ষম ওটা। মাক সিক্সের চাইতেও বেশি। অবশ্য, অপারেশনাল স্ট্যাটাস দেয়া হয়নি ওই বিমানকে।
বিমানটি নাসার তৈরি। নাম: এক্স-১৬।
বেশিরভাগ বিমান ব্যবহার করে জেট ইঞ্জিন, কিন্তু সীমাবদ্ধতা রয়েছে জেটের। ওই জেট কাজে লাগিয়েই মাক থ্রি গতি পেয়েছে এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড।
কিন্তু এক্স-১৬ অন্য জিনিস। ওটাকে চালায় রকেট। মুভিং পার্ট বলতে গেলে কিছুই নেই। সলিড হাইড্রোজেন ফিউয়েল জ্বেলে বিদ্যুদ্বেগে ছোটে। জেট বিমানের মত নয়, বরং মিসাইলের মত কাজ করে ওই বিমান। যারা চোখে দেখেছে, তারা বলেছে, ওটা আসলে একটা মিসাইলই, ওটার ভিতর স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখা হয় পাইলটকে।
আজ পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে মোট পাঁচটি এক্স-১৬। এখন। তাদের দুটোকে অ্যারোস্টাডিয়া ইটালিয়া এয়ারশোতে দেখছে। রানা। কয়েক দিন পর ওই দুই বিমানের প্রদর্শনী হবে।
কালো শকুন থেকে নেমে টারমাক পেরোতে শুরু করল রানা। পাশেই রইল কুয়াশা ও রঘুপতি।
বি-৫২ বোমারু বিমানের ডানা থেকে ঝুলছে দুই এক্স-১৬। কাছ থেকে দেখল রানা।
বড় বিমান নয় এক্স-১৬। দেখতে কুৎসিতই বলা চলে। সুন্দর করবার চেষ্টাই করা হয়নি, ডিযাইন করা হয়েছে বাতাস চিরে অকল্পনীয় গতিতে ছুটে যাওয়ার জন্য।
টেইলফিনে বাঁকা অক্ষরে লেখা: নাসা।
দুই কালো বিমানের নীচে লেখা: ইউএস এয়ার ফোর্স।
ওদের সামনে এসে পরিচিত হলেন দুই কর্নেল।
একজন আমেরিকান, অন্যজন ইটালিয়ান।
মেজর রানা, বললেন আমেরিকান কর্নেল, আপনার জন্য এক্স-১৬ তৈরি। পুরো ফিউয়েল ভরা হয়েছে। যে-কোনও সময়ে রওনা হতে পারেন। কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে। গতকাল আমাদের এক পাইলট ট্রেনিঙের সময় দুর্ঘটনায় পড়ে পাঁজরের হাড় ভেঙেছে। ওর যা অবস্থা, ধারণা করছি, এই বিমানে উঠে জি। ফোর্স সহ্য করা অসম্ভব।
এটা বড় সমস্যা নয়, বলল রানা। এমনিতেও নিজের পাইলট সঙ্গে নিতাম। রঘুপতির দিকে চাইল ও। তুমি মাক সিক্স সহ্য করতে পারবে?
সামান্য মাথা দোলাল রঘুপতি, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
আমরা ন্যাশনাল রেকনেসেন্স অফিস থেকে কিছু স্যাটালাইট রেইডার স্ক্যান পেয়েছি, বললেন আমেরিকান কর্নেল। আপনারা যাওয়ার পথে বিপদে পড়তে পারেন।
ক্লিপবোর্ডের মত ছোট পোর্টেবল ভিউস্ক্রিন রানার দিকে। এগিয়ে দিলেন তিনি।
দক্ষিণ-পুব মেডিটারেনিয়ান এলাকার ইনফ্রা-রেড ছবি। চেনা। গেল সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর।
একটা ছবি অনেক উপর থেকে তোলা। অন্যটা যুম করা হয়েছে।
প্রথম ইমেজে রানা দেখল, সুয়েজ খাল এলাকায় লাল অসংখ্য বিন্দু ভাসছে মেঘের মত।
দ্বিতীয় স্যাটালাইট ছবিতে পরিষ্কার দেখা গেল চারপাশ। লাল মেঘ আসলে দেড় শ বিন্দু।
বিন্দুগুলো কীসের? জানতে চাইল কুয়াশা।
জবাব দিতে হলো না কর্নেলকে।
বুঝে গেছে রানা। বলল, ওগুলো বিমান। ফাইটার জেট। কমপক্ষে পাঁচটি আফ্রিকান দেশের। ফ্রেঞ্চরা আগেই জেনেছিল ওগুলো আকাশে উঠেছে, কিন্তু বুঝতে পারেনি কেন উঠল। কারণটা এখন জানি। আফ্রিকার পাঁচটা শক্তিশালী দেশের প্রধানরা আশা করছে, এবার বদলে যাবে পৃথিবীর ক্ষমতার বলয়। এরা চায় না আমরা মক্কার দিকে যাওয়া মিসাইলটা ঠেকিয়ে দিই। ওই মিসাইল ডেমিয়েন ডগলাসের রক্ষা-কবজ। আকাশে ওঠা বিমানগুলো পাহারা দেবে শেষ মিসাইলটাকে। ওটার দিকে কাউকে যেতে দেবে না।
মাত্র তিন মিনিট পর রানওয়ে ধরে ভয়ঙ্কর গর্জন ছাড়তে ছাড়তে রওনা হলো বি-৫২। ডানার দুদিকের বাইরের অংশে ঝুলছে দুই এক্স-১৬।
ডানদিকের এক্স-১৬-র ককপিটে রঘুপতির পিছনে বসেছে মাসুদ রানা। ছোট জায়গায় প্রায় কুঁকড়ে আছে রোবট। অন্য বিমানে নাসার পাইলটের পিছনের সিটে কুয়াশা।
ইউটিলিটি ভেস্টে স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকে নিয়েছে রানা টাচলক ৯ ডিসআর্ম ইউনিট। কোমরে ঝুলছে নানান অস্ত্রের পাউচ।
ওরা যে পরিকল্পনা করেছে, তা প্রায় অসম্ভব।
যেহেতু রানা ছাড়া কেউ লির্ড মিসাইল ডিসআর্ম করতে পারবে না, তাই স্ক্রাস্ক-৮ ক্লোন মিসাইলের খুব কাছে যেতে হবে ওর্কে। পাশে তখন থাকবে কুয়াশা।
বাধা আসবে নানাদিক থেকে। হামলা করতে পারে আফ্রিকান কমাণ্ডো দল। এটা মাথায় রেখে এডেন থেকে একদল মেরিনকে পাঠাতে বলেছে রানা। অবশ্য, তারা সঠিক সময়ে পৌঁছুতে পারবে কি না, তার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
লণ্ডন থেকে যোগাযোগ করল চার্লস ডেলাস।
মিস্টার রানা, যা চেয়েছিলেন, বোধহয় পেয়েছি, বলল। ইয়েমেনের মরুভূমির চার হাজার একর জমি কিনে নিয়েছে। স্করপিয়ন শিপিং কোম্পানি। জায়গাটা এডেন থেকে দুই শ মাইল। দক্ষিণ-পশ্চিমে, লোহিত সাগরের মুখে। পুরনো সোভিয়েত সাবমেরিন রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি ছিল। আমাদের স্যাটালাইটের ছবি আশি দশকের। কিন্তু মনে হচ্ছে, ওখানে কয়েকটা প্রকাণ্ড ওয়্যারহাউস আছে। এ ছাড়া…
ওটাই, বলল রানা। কোঅর্ডিনেটস্ পাঠান।
তাই করল চার্লস ডেলাস।
বিমানের ট্রিপ কমপিউটারে সংখ্যাগুলো তুলে দিল রানা।
দক্ষিণ ইয়েমেন পর্যন্ত যেতে হলে পেরোতে হবে পাঁচ হাজার ছয় শ বিশ কিলোমিটার।
সাত হাজার কিলোমিটার গতিবেগে এক্স-১৬-র লাগবে আটচল্লিশ মিনিটের মত।
একঘণ্টা পর মক্কার উদ্দেশে রওনা হবে আইসিবিএম।
হাতে বাড়তি সময় নেই।
তুমি তৈরি, রঘুপতি? বলল রানা।
আপনি যখন বলবেন, জবাব দিল ভদ্র রোবট।
কিছুক্ষণ পর এক্স-১৬ বিমানকে ছেড়ে দেয়ার উচ্চতায় পৌঁছে। বি-৫২ বোমারু বিমানের পাইলট বলল; দই এক্স-১৬-কে জানাচ্ছি, এইমাত্র মেডিটারেনিয়ানে ইউএসএস আব্রাহাম থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। আপনাদের অ্যাটাক রুটে শুধু ওই জাহাজই আছে। প্রতিটি বিমান আকাশে তুলছে তারা। এফ-১৪ এবং এফ/এ-১৮। আপনি বোধহয় এই মুহূর্তে সত্যিই খুব। গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, মিস্টার রানা। ফ্লাইট সিস্টেম চেক করছি। একমিনিট পর আপনাদেরকে রিলিয দেব।
পাইলটের সিগনাল কেটে গেল।
রানা এবং রঘুপতির কানে এল কুয়াশার কথা, নিচু স্বরে বলল ও, রঘুপতি, তুমিই পৃথিবীর সেরা পাইলট। মাথায় রাখবে, আমাকে যেন অপমানিত হতে না হয়। নীচ দিয়ে ছুটে যাবে। প্রয়োজনীয় তথ্য তোমার চিপসে আছে।
জী, বস, আছে, বলল রঘুপতি। প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ।
আর, রানা… ডাকল কুয়াশা।
বলুন?
আমার বন্ধু রঘুপতিকে নিয়ে ফিরে এসো, তাই চাই।
চেষ্টার ত্রুটি করব না।
আবারও বলে উঠল বি-৫২ বোমারু বিমানের পাইলট, ফ্লাইট সিস্টেম চেক কমপ্লিট। এবার লঞ্চ করব। রিলিযের জন্য তৈরি থাকুন। আমার গণনা শেষ হলেই… পচ… চার…
সরাসরি সামনে চাইল রানা, বড় করে দম নিল।
থ্রি…
শক্তহাতে কন্ট্রোল স্টিক ধরল রঘুপতি।
টু…
বিমানের আরেক ডানার প্রান্তে ঝুলছে রানাদের বিমান, ওদিকে চাইল কুয়াশা।
ওয়ান… মার্ক!
ধাতব ক্লাঙ্ক-ক্লাঙ্ক! আওয়াজ উঠল।
বি-৫২ বোমারু বিমানের ডানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে দুই এক্স-১৬।
আকাশের বুকে বি-৫২ বিমান থেকে নেমে গেল দুই এক্স ১৬, তখনই বলে উঠল রঘুপতি, এনগেজ করছি রকেট থ্রাস্টার… এখন!
থ্রাস্টার কন্ট্রোল বাটন টিপল রঘুপতি।
সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল এক্স-১৬ বিমানের টেইল কোন্। পুরো এক শফুট পিছনে গেল আফটারবার্নারের জ্বলজ্বলে সাদা আগুন।
আগে কখনও এমন ভয়ঙ্কর ঝুঁকি খায়নি রানা। পেরেকের মত গেঁথে গেল পুরু গদির সিটে।
আকাশ চিরে রওনা হয়েছে এক্স-১৬। বিকট কড়কড় আওয়াজ তুলছে সনিক বুম। যেন চামড়া ছিলে নেবে আকাশের। একটানা গর্জন ছাড়ছে, বিমানের রকেট। মেডিটারেনিয়ানের চারপাশের সব জায়গা থেকে শোনা গেল ওই গম্ভীর আওয়াজ।
দক্ষিণ-পুব লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে দুই এক্স-১৬। সামনে পড়বে সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর। আরও কিছু দূর গেলেই পরিত্যক্ত ইয়েমেনের সাবমেরিন ফ্যাসিলিটি। ওখান থেকে রওনা হবে লির্ড মিসাইল, উড়িয়ে দেবে পবিত্র শহর মক্কা। ২০৩
অবশ্য, তার আগেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে মানব-সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মিশ্র এরিয়াল আর্মাডা।
পুরো বিশমিনিট পর দূরে দেখা গেল উড়ন্ত বিমান বহর।
ওরা আমাদের জন্যে তৈরি, নিচু স্বরে বলল রঘুপতি। কমলা আকাশে অসংখ্য পোকার মত উড়ছে ওগুলো। একের পর এক স্কোয়াড্রন। আফ্রিকার পাঁচটি দেশের। ফাইটার বিমান। মিশরের উপকূলে যেন ভাসমান প্রাচীর। পাহারা দিচ্ছে সুয়েজ খাল। এরিয়াল আর্মাডায় নানান ধরনের ফাইটার বিমান রয়েছে।
পুরনো বিমান, নতুন বিমান, নীল বিমান, লাল বিমান–মিসাইল বহন করতে পারে এমন সব উড়োজাহাজই উঠেছে। আকাশে। এসব বিমান কেনা হয়েছে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রচুর ব্যবহারের পর তাদের আয়ু যখন প্রায় শেষ, তখন বিক্রি করে দিয়েছে এদের কাছে কম দামে।
সুখোই এসইউ-১৭–তৈরি করা হয়েছিল উনিশ শ ছিষটি সালে। অনেক আগেই রাশান সেনাবাহিনী বাতিল করেছে।
মিগ-২৫ ফক্সব্যাট- আশির দশকে আধুনিক বিমান তৈরি হওয়ার পর ওটা পরিত্যাগ করে রাশান এয়ার ফোর্স।
মিরাজ ভি/৫০- ওই জিনিস শত শত বিক্রি করেছে ফরাসিরা। কিনেছিল লিবিয়া, যায়ার ও ইরাক।
ভাসমান আর্মাডার ভিতর রয়েছে আক্রমণাত্মক চেক বিমান এল-৫৯ অ্যালট্রেস। আফ্রিকার দেশগুলোর এয়ার ফোর্সে খুব জনপ্রিয়।
এফ-২২ র্যাপ্টার বা এফ-১৫ই ফাইটারের মত আধুনিক নয়। ওগুলো, কিন্তু আধুনিক সব বিমানের মতই ওগুলোরও রয়েছে। এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল। সেগুলো আধুনিক। সাইডওয়াইত্তার, ফিনিক্স, রাশান আর-৬০টি ইত্যাদি। সবই বিক্রি হয় রোমানিয়া ও ইউক্রেনের চোরাই অস্ত্র বাজারে। বিপুল টাকার কারণে নতুন ফাইটার কেনা কঠিন, কিন্তু দেশগুলো সহজেই ডজন ডজন ভাল মিসাইল কিনতে পারে।
সামনে চেয়ে ভাবছে রানা, আর যাই হোক, এরা অসংখ্য।
সবচেয়ে ইকুইপড় দশটা এফ-২২ ফাইটার বিমানও এই ভাসমান আর্মাডার কাছে কিছুই নয়। টেকনোলজি কোনও কাজেই আসবে না।
তোমার কি মনে হয়, রঘুপতি?
আমাদের এই বিমান লড়াই করার জন্যে তৈরি করা হয়নি, মিস্টার রানা, নিরপেক্ষ কণ্ঠে বলল রোবট।
গতির জন্য তৈরি। এই জিনিস যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, আমাদেরকে অনেক নীচ দিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে যেতে হবে। আজ পর্যন্ত কোনও পাইলট এই কাজ করেনি। ওদের ছোঁড়া মিসাইলকে পিছনে ফেলতে হবে।
মিসাইল পিছু নেবে, বাহ, নতুন অভিজ্ঞতা হবে! মনে মনে বলল রানা।
আমাদের কাছে অস্ত্র বলতে সামান্য সিঙ্গল ব্যারেলের একটা বন্দুক, আবারও বলল রঘুপতি। নাকের কাছে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বোধহয় ডেকোরেশনের জন্যেই।
তখনই নতুন কণ্ঠ শুনল রানা।
দুই এক্স-১৬, আমি ইউএসএস আব্রাহাম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের ক্যাপ্টেন জন গ্রাহাম। আপনারা আমাদের স্কোপে এসে পড়েছেন। এন রুটে পাবেন দ্য স্কেলিটন স্কোয়াড। তারা বাধা দেবে শত্রুদেরকে। এদিকে পাঁচটা প্রাউলার বিমান আকাশে তুলেছি আমরা। এক শ মাইল জুড়ে ইলেকট্রনিক জ্যামিং করবে আপনাদের জন্যে। সমস্যা মাত্র শুরু হয়েছে, জেন্টলমেন। কিন্তু আশাকরি আমরা আকাশে একটা সুইয়ের ফুটো তৈরি করতে পারব। ওটার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে যাবেন আপনারা। চুপ হয়ে গেলেন ভদ্রলোক, কয়েক মুহূর্ত পর বললেন, ও, আরেকটা কথা, মিস্টার রানা, পরিস্থিতি সম্পর্কে সবই রিপোর্ট করেছি প্রেসিডেন্টকে। গুড লাক। আমরা আপনাদের পিছনে আছি, স্যর।
ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন, বলল রানা। রোবটের দিকে চাইল। রঘুপতি, এবার সর্বোচ্চ গতি তোলো।
কোনও মন্তব্য করল না রঘুপতি।
পরক্ষণে ঝাঁকি খেল রানা।
এক লাফে গতি উঠল ঘণ্টায় সাত হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ, প্রতি সেকেণ্ডে গতি দুহাজার মিটার। সুপারসনিক গতির সাতগুণ বেশি।
শত্রু বিমানের প্রাচীরের দিকে ছুটতে গিয়ে আকাশ চিরে দিল দুই এক্স-১৬।
আফ্রিকার বিমানগুলোর বিশ মাইলের ভিতর পৌঁছে যেতেই আর্মাডা থেকে নানান ধরনের মিসাইল ছোঁড়া হলো। সংখ্যায় চল্লিশটারও বেশি। লেজে ধোঁয়া নিয়ে ছুটে এল রানাদের দিকে।
কিন্তু প্রথম মিসাইল ছাড়া রাশান মিগ-২৫ ফক্সব্যাট হঠাৎ করেই বিস্ফোরিত হলো কমলা আগুনের ভিতর।
প্রায় একইসময়ে বিস্ফোরিত হলো ছয়টি আফ্রিকান ফাইটার। এআইএম-১২০ অ্যাম্ৰাম এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল উড়িয়ে দিল অগ্রসরমান বিশটি মিসাইল। আকাশে তৈরি হলো আগুনের গোলক। লেজে করোটি ও হাতের হাড়ের চিহ্ন আঁকা আমেরিকার এফ-১৪ ফাইটার নেমে পড়েছে আফ্রিকার আর্মাডার বিরুদ্ধে।
ইউএসএস আব্রাহাম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের স্কেলিটন স্কোয়াড মানেই এক ডজন এফ-১৪ টমক্যাট, পিছনে ক্ষিপ্রগতি এফ/এ-১৮ হর্নেট।
হঠাৎ করেই শুরু হলো সভ্যতার সবচেয়ে আধুনিক এরিয়াল ডগফাইট।
বাঁক নিয়ে আফ্রিকান বিমান বহরের তলা দিয়ে ছুটে চলল দুই এক্স-১৬ বিমান। সামনের আকাশে আগুনের বিস্ফোরণ দেখলেই আরও নীচে নামছে ওদুটো, এড়িয়ে চলেছে শত্রুদেরকে। ডাইভ। দিতে শুরু করেছে বোমারু ফাইটার। বিদ্যুতি মিসাইল ও ট্রেসার বুলেট ছাড়ছে।–সান্ধ্যকালীন কমলা আকাশে খেপে উঠেছে যেন অসংখ্য ফাইটার বিমান, লড়ছে প্রাণপণে। মিগ, মিরাজ, টমক্যাট, হর্নেট- একপাশ থেকে আরেক পাশে গড়িয়ে চলেছে আকাশে, শত্রুবিমান লক্ষ্য করে হামলা করছে। বিস্ফোরিত হচ্ছে বিমান।
এক পর্যায়ে আকাশের দিকে পেট তুলে উল্টে গেল রানার এক্স-১৬। বিদ্যুদ্বেগে পেরিয়ে গেল একটি আফ্রিকান ফাইটার বিমানকে। কিন্তু সামনেই পড়ল আরেকটি যায়ারিয়ান ফাইটার নাকে নাকে বাড়ি লাগবে, এমনসময় বিস্ফোরিত হলো আফ্রিকান বিমান। নীচ থেকে এসেছে অ্যাম্ৰাম মিসাইল। বিস্ফোরণের আগুনের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে গেল রানার এক্স-১৬। ডানা ও ককপিটের উপর অংশে লাগল জ্বলন্ত ধাতু। রঘুপতির দিকের ককপিটে ছলাৎ করে লাগল শত্রুবিমানের মৃত পাইলটের তাজা রক্ত।
রকেট বিমান লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল এল, কিন্তু গতি কমল না রানাদের বিমানের।
এক্স-১৬ বিমানের কাছে এসেই উন্মাদ হয়ে উঠছে মিসাইল, ছিটকে যাচ্ছে নানাদিকে। মনে হলো অদৃশ্য কোনও বুদ্বুদ ঘিরে রেখেছে দুই বিমানকে।
কথাটা মিথ্যা নয়।
ইউএস নেভির ইএ-৬বি প্রাউলার ওই কাজই করছে। এক্স ১৬ থেকে দশমাইল দূরে ব্যবহার করছে ডিরেকশনাল এএন/ এএলকিউ-৯৯এফ ইলেকট্রনিক জ্যামিং পড।
শক্তপোক্ত প্রাউলার বিমানের পাইলটরা ভাল করেই জানে, সুপারফাস্ট এক্স-১৬ বিমানের সঙ্গে গতি তুলে এগুতে পারবে না। কাজেই একের পর এক বিমান সামনে রেখেছে তারা, জ্যাম করছে সিগনাল। মিসাইল, কামানের গোলা ও ট্রেসার বুলেট থেকে পাহারা দিচ্ছে রকেট বিমানকে। সামনের প্রাউলার বিমানগুলো যেন র্যালি রানারের মত দৌড়ের উপর আছে।
এক্স-১৬, আমি প্রাউলার লিডার, নতুন কণ্ঠ শুনল রানা হেডসেটে। আমরা আপনাদেরকে ক্যানেল পর্যন্ত পাহারা দিতে পারব। কিন্তু আমাদের গতি কম বলে পরে আর কোনও সাহায্য করতে পারব না। তখন থেকে যা করার আপনাদেরকেই করতে হবে।
ধন্যবাদ, আমাদের জন্যে যথেষ্ট করেছেন, বলল রানা।
সামনে দেখুন, মিস্টার রানা, নির্লিপ্ত স্বরে বলল রঘুপতি।
প্রাউলার বিমানের লং রেঞ্জ ইলেকট্রনিক প্রোটেকশনের কথা মাথায় রেখে নতুন স্ট্রাটেজি নিয়েছে আফ্রিকান ফাইটার বহর।
ক্যামিকাজি ডাইভ শুরু হলো এক্স-১৬ লক্ষ্য করে।
মিসাইলের হোমিং সিস্টেম গুবলেট করে দিতে বা হালকা ট্রেসার বুলেট সরিয়ে দিতে পারে ইলেকট্রনিক কাউন্টারম্যের, কিন্তু আত্মঘাতী বিমানকে বাধা দেবার সাধ্য তার নেই।
দুই এক্স-১৬ লক্ষ্য করে ডাইভ দিল ছয়টি ফাইটার জেট। আকাশ চিরে দিল বিকট তীক্ষ্ণ আওয়াজ। ছুটবার সময় ট্রেসার বুলেট ছুঁড়ছে বিমানগুলো।
পরস্পর থেকে সরে গেল দুই এক্স-১৬।
ডানদিকে বাঁক নিয়েই ডাইভ দিল রঘুপতি, ওদিকে অন্য এক্স-১৬ কাত হলো ডানদিকে একফুট সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল ডাইভ বমার। কিন্তু তার আগেই একটা ক্যাজিকামি বিমানের ট্রেসার বুলেট লাগল ক্যানোপিতে। অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেট। যাওয়ার পথে ফুটো করে দিয়ে গেল কুয়াশার পাইলটের মগজ।
বিমানের ককপিটের চারপাশে ছিটকে লেগেছে মগজ।
আকাশে গড়াতে শুরু করল কুয়াশার এক্স-১৬, নিয়ন্ত্রণহীন। চলেছে পুব লক্ষ্য করে।
সিট থেকে সামনে চলে এল কুয়াশা, দ্রুতহাতে সিটবেল্ট খুলে পিছনে সরিয়ে দিল পাইলটের লাশ। নিজে বসল কন্ট্রোলের সামনে। ভূমধ্যসাগরে আছড়ে পড়বার আগেই সিধা করতে চাইল বিমান।
ঝড়ের গতিতে উঠে আসছে সাগর। গতি আরও বাড়ল। তারপর… বিকট আওয়াজ উঠল: বুম!
.
অদ্ভুত বিমান নিয়ে সাগরের কাছে নেমে এসেছে রানা ও রঘুপতি, মাত্র বিশফুট নীচে অসংখ্য ঢেউ। লাফিয়ে উঠছে সাদা পানি গিযারের মত।
একইসময়ে পিছনের সাগরে নামল বেশ কয়েকটা মিসাইল।
সামনে সুয়েজ খাল, জানাল রঘুপতি।
বিশ মাইল দূরে সুয়েজ খালের মুখ। আধুনিক সি লেনের শুরুতেই দুপাশে রয়েছে দুটো মস্ত পিলার, ওদিকে লোহিত সাগর।
পুরো এলাকা জুড়ে আকাশে উড়ছে অসংখ্য জেট বিমান। বামে যাও, রঘুপতি, দূরে চেয়ে আছে রানা। নির্দেশ পালন করতে দেরি করেনি রোবট।
পাশ কাটিয়ে পিছনে পড়ল দুই চেক এল-৫৯এস। সোজা সাগরে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
রানার দুপাশে এখন শুধু সুয়েজ খাল।
সামনে প্রাউলার থেকে আর কোনও ইলেকট্রনিক নিরাপত্তা পাওয়া যাবে না।
বিদ্যুদ্বেগে সুয়েজ খাল পেরোতে শুরু করেছে রানার এক্স-১৬। পানির তিরিশ ফুট উপর দিয়ে ছুটছে। এড়িয়ে চলেছে। নোঙর করা জাহাজগুলোকে। অনেক উপরে এরিয়াল আর্মাডা।
ব্লকেড পর্যন্ত পৌঁছে গেছে রানা।
কিন্তু আফ্রিকার একটা ফাইটার বিমানের পাইলট কীভাবে যেন জোগাড় করেছে আমেরিকার তৈরি দুই ফিনিক্স মিসাইল, ওগুলোকে লঞ্চ করল সে।
খালের মত অগভীর সাগর চ্যানেলে ছুটে চলেছে এক্স-১৬।
ওটার চেয়েও গতি বেশি দুই মিসাইলের।
একইসময়ে আত্মহত্যার জন্য দুই ফাইটার ঝাঁপ দিল রানার এক্স-১৬ লক্ষ্য করে। কাঁচির ফলার মত দুদিক থেকে নামছে। লুডোর গুটির মত বিমান গড়িয়ে দিল রোবট রঘুপতি।
মাত্র পাঁচ ইঞ্চি দূর দিয়ে সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল দুই বিমান। সোজা গিয়ে পড়ল খালের বালিময় পারে। ছিটকে উঠল বালি ও আগুন।
রানাদের এক্স-১৬ বিমানের লেজের কাছে পৌঁছে গেল দুই ফিনিক্স মিসাইল। অবাক চোখে রানা দেখল, মিসাইলের গায়ে স্ট্যানসিল করা: এক্সএআইএম-৫৫এ-রবার্টস্ মিসাইল সিস্টেম।
রঘুপতি… গলা ফাটাল রানা।
দেখেছি, মিস্টার রানা, পাল্টা বলল রঘুপতি।
কী করবে?
এলো বলে! স্বাভাবিক স্বরে বলল রঘুপতি। আমিও তৈরি।
হঠাৎ করেই ডানদিকে বাঁক নিতে লাগল রঘুপতি, চলেছে খালের পার ধরে, তৈরি করছে মস্ত একটা বৃত্ত।
আবারও রওনা হয়ে গেল ভূমধ্যসাগর লক্ষ্য করে। পিছু নিল দুই মিসাইল। একইসময়ে প্রায়-বৃত্ত তৈরি করল ওগুলো। জি ফোর্স পাত্তা দিচ্ছে না।
উপকূল পাহারা দিচ্ছে আফ্রিকান আর্মাডা। এদিকে রয়েছে সবমিলে ছয়টি ফাইটার। সেগুলোর পাইলটরা দেখল, মস্ত একটা বৃত্ত তৈরি করে আবারও ওদের দিকেই ফিরছে এক্স-১৬।
আকাশ পাহারা দিতে চাইল পাইলটরা। ভাবছে, আজকের দিনটা আসলে তাদের।
ভুল ধারণা।
একদল মৌমাছির মত ভাসছে তারা, আর তাদের মাঝ দিয়ে বুলেটের মত গেল এক্স-১৬। ওটার দুই পাশে মাত্র দশ ফুট দূরে রইল দুই আফ্রিকান মিগ।
আর তখনই পৌঁছে গেল দুই ফিনিক্স মিসাইল।
বুম! বুম!
হাজার টুকরো হলো দুই মিগ। মস্ত এক বৃত্ত তৈরি করে। আবারও সুয়েজের সরু খালে ফিরল এক্স-১৬। আকাশ চিরে চলেছে দক্ষিণ-পুব লক্ষ্য করে।
কিন্তু বৃত্ত তৈরি করতে গিয়ে দু শ কিলোমিটার ঘুরতে হয়েছে এক্স-১৬-কে। সেসময় তার সেরা মিসাইল লঞ্চ করেছে এক আফ্রিকান বিমান। আমেরিকার চোরাই এআইএম-১২০ অ্যাম্ৰাম মিসাইল ওটা, দুনিয়া সেরা।
রানার এক্স-১৬ বিমানের পিছু নিয়েছে অ্যাম্ৰাম। ক্ষুধার্ত হাঙরের মত মাঝের দূরত্ব পার করছে ওটা।
ওটাকে পিছনে ফেলতে পারছি না, বলল রঘুপতি। কতক্ষণ পিছনে তাড়া করবে? নিশ্চয়ই এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেবে? ফিউয়েল শেষ হলে…
না, হাল ছাড়বে না, তিক্ত স্বরে বলল রানা। ওটা অ্যাম্ৰাম! দিন-রাত ধাওয়া করবে! আর টার্গেটকে নাগালে পেলেই…
এ ধরনের বিমানের পিছু তো নেয়নি। পুরো গ্রুটল খুলে দিচ্ছি।
ইয়ারপিসে ওরা শুনতে পেল অন্য একটা কণ্ঠ।
চার্লস ডেলাক্স। মনে হলো মরমে মরছে লোকটা।
ইয়ে, মিস্টার রানা, খারাপ খবর আছে।
বলুন?
আমাদের স্যাটালাইট এইমাত্র আইসিবিএম-এর লঞ্চ সিগনেচার ধরেছে। ওটা রওনা হয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে। ক্যারেকটেরিস্টিক থেকে ধারণা করা হচ্ছে জেরিকো-২বি ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল। সোজা চলেছে মক্কার উত্তর অংশ লক্ষ্য করে। মিস্টার রানা, ডেমিয়েন ডগলাস জানে আমরা পিছু নিয়েছি। কাজেই আগেই লঞ্চ করেছে মিসাইল।
হতবাক হয়ে আকাশের দিকে চাইল রানা। পরক্ষণে বলল, এত কাছে এসে পিছাব না আমরা।
জবাবে চুপ করে রইল চার্লস ডেলাস।
বুকের স্ট্র্যাপে আটকে রাখা অস্ত্রগুলো দেখল রানা। ওগুলো ব্যবহার করতে চেয়েছিল। উড়িয়ে দিত মিসাইল। কিন্তু কিছুই এখন কাজে আসবে না। আস্তে করে হাতে নিল টাচলক-৯ ডিসআর্ম ইউনিট। আস্তে করে মাথা দোলাল।
পরক্ষণে চমকে গেল।
দ্বিতীয়বার দেখল টাচলক-৯ ইউনিট।
মিস্টার ডেলাস, আপনি কি মিসাইলের সিগনালের টেলিমেট্রি জানেন?
হ্যাঁ।
তথ্যটা পাঠিয়ে দিন।
বেশ।
কয়েক মুহূর্ত পর বিপ আওয়াজ তুলল রানার ট্রিপ কমপিউটার। স্ক্রিনে দেখা দিয়েছে মানচিত্র। একটা জ্বলন্ত তীর দেখিয়ে চলেছে লির্ড মিসাইলকে, ছুটে চলেছে মক্কা শহরের উত্তরাংশ লক্ষ্য করে।
কমপিউটারকে নিজের ট্রান্সপত্তার সিগনাল দিল রানা। স্ক্রিনে। দেখা দিল দ্বিতীয় আইকন। ওটা চলেছে দক্ষিণ লক্ষ্য করে।
স্ক্রিনে ফুটে উঠল ফ্লাইট ডেটা: সিগনাল আইডি, এয়ারস্পিড, অল্টিচ্যুড ইত্যাদি।
ওকে প্রায় অঙ্ক কষতেই হলো না।
ছবিটা পরিষ্কার।
চোদ্দ
মক্কা শহর লক্ষ্য করে দুদিক থেকে চলেছে দুই এয়ারক্রাফট এক্স-১৬ ও লির্ড মিসাইল। আমেরিকান স্যাটালাইটের অটোমেটেড রিকগনিশন সিস্টেম নিশ্চিত করেছে, দুই রকেটের একটা জেরিকো-২বি ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল।
প্রায় একই গতি নিয়ে ছুটে চলেছে দুই এয়ারক্রাফট। মক্কা শহরের দুদিক থেকে আসছে ওগুলো।
রঘুপতি, নিচু স্বরে ডাকল রানা।
জী?
আমরা আর ইয়েমেনে যাব না।
আমিও তাই ধারণা করছি, স্যর, বলল রঘুপতি। এবার কী করবেন?
কমপিউটারের বাটন টিপতে শুরু করেছে রানা। দ্রুত অঙ্ক কষছে। ও যেকাজ করতে চাইছে, তা প্রায় অসম্ভব।
এখনও মক্কা শহর থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে ওরা।
ওদের টার্গেট সময়:
আটটা তিরিশ মিনিট।
লিয়ার্ড মিসাইলের বিষয়ে ক্যালকুলেশন শেষ করল রানা।
ওই মিসাইল সামান্য দূরে থাকবে।
টার্গেট টাইম:
৯:০১…
৯:০০…
৮:৫৯…
ভাল, মনে মনে বলল রানা। ওরা বাড়তি তিরিশ সেকেণ্ড পাবে। ওই সময়ে মক্কার আকাশে ঘুরে আবারও মিসাইলের পিছু নিতে পারবে।
ঝুঁকিটা টের পেয়ে গম্ভীর হয়ে গেল রানা। বুকে আটকে নেয়া টাচলক-৯ ইউনিট চট করে দেখল। ফিসফিস করে বলল, মাত্র ষাট ফুট। রঘুপতির দিকে চাইল। রঘুপতি, কখনও কোনও মিসাইলের পিছু নিয়েছ?
টার্গেট টাইম:
৬:০০…
৫:৫৯…
৫:৫৮…
ক্রমেই নেমে আসছে আঁধার। বুলেটের গতি নিয়ে ছুটে চলেছে রানার এক্স-১৬, পিছনে আসছে অ্যাম্ৰাম মিসাইল।
স্যর, আপনি কি চান আমি মিসাইলের পাশে পৌঁছে যাই? জানতে চাইল রঘুপতি।
হ্যাঁ, তাই চাই। সেক্ষেত্রে আশাকরি আইসিবিএম ডিসআর্ম করতে পারব। সেজন্য ষাট ফুটের ভেতর পৌঁছাতে হবে।
কিন্তু মাক সিক্স গতি নিয়ে মিসাইলের পাশে বিমান চালাতে পারে না কেউ।
তুমি হয়তো পারবে। যেখানে বসে আছে, সেখান থেকে রোবটের মুখে হাসি দেখল রানা।
আপনি আসলে কী চান, স্যর?
আইসিবিএম অনেক উপরে ওঠে, তারপর নেমে আসে টার্গেট লক্ষ্য করে, বলল রানা। এই মুহূর্তে লির্ড মিসাইল আছে সাতাশ হাজার ফুট উচ্চতায়। মক্কার উপর পৌঁছে যাওয়ার পরেও ওই উচ্চতায় থাকবে, তারপর দেবে ডাইভ। মাক সিক্স গতির কারণে টার্গেটে পৌঁছুতে ওটার লাগবে বড়জোর পাঁচ সেকেণ্ড। কিন্তু ওটাকে ডিসআর্ম করতে হলে কমপক্ষে পঁচিশ সেকেণ্ড লাগবে আমার। কাজেই ওই মিসাইলের পাশে থাকতে হবে সাতাশ হাজার ফুট উচ্চতায়। ওটা একবার নাক নিচু করলে সব শেষ। তার আগেই মিসাইলের পাশে পৌঁছাতে হবে তোমাকে–পারবে?
আশা করি পারব, স্বাভাবিক স্বরে বলল রঘুপতি। জানেন, স্যর, আপনি প্রায় আমার বসের মতই। উনিও ভাবেন আমি সব কিছু পারি। আর আমার ব্রেন চিপস্ বলছে, এই কাজ আমি ঠিকই পারব।
টার্গেট টাইম:
২:০১…
২:০০…
১:৫৯…
আকাশ চিরে ছুটে চলেছে এক্স-১৬ বিমান। পিছনে আসছে অ্যাম্ৰাম মিসাইল।
লোহিত সাগর পেরোতে শুরু করে উচ্চতা বাড়াতে লাগল রঘুপতি। কয়েক সেকেণ্ডে পৌঁছে গেল সাতাশ হাজার ফুট উপরে।
এইমাত্র পিছনে পড়ল মক্কা, জানাল রঘুপতি। এবার ঘুরে ফিরতি পথ ধরব। চোখ রাখুন সামনে। কিছুক্ষণ পর দেখবেন
আসছে লিযার্ড মিসাইল।
বামে বাঁক নিচ্ছে রঘুপতি, বিদ্যুদ্বেগে আকাশ পিছনে ফেলছে রকেট বিমান। মস্ত অর্ধবৃত্ত তৈরি করছে। সেটা শেষ হলে পৌঁছে যাওয়ার কথা নিউক্লিয়ার মিসাইলের পাশে। একইসঙ্গে ছুটবে। মক্কা শহর লক্ষ্য করে। ২১৫
কিন্তু এক্স-১৬ হঠাৎ করেই কোর্স পাল্টে নেয়ায় অনেক কাছে পৌঁছে গেল অ্যাম্ৰাম মিসাইল। এক্স-১৬ লক্ষ্য করে ক্ষিপ্ত বাঘের মত আসছে ওটা। এখন আছে মাত্র এক শ মিটার পিছনে, ক্রমেই এগিয়ে আসছে।
টার্গেট টাইম:
১:২০…
১:১৯…
১:১৮…
ওই যে আপনার নিউক্লিয়ার মিসাইল, ঠিক সামনে, হঠাৎ করেই বলল রঘুপতি।
জি ফোর্সের ঝক্কির ভিতর রঘুপতির কাঁধের উপর দিয়ে চোখ সরু করে দূরে চাইল রানা।
আরবের আকাশে নেমে এসেছে সন্ধ্যা। পশ্চিম ও মধ্য গগনে সামান্য কমলা রং। কয়েক সেকেণ্ড পর পরিষ্কারভাবে মিসাইলটা দেখল রানা। প্রকাণ্ড ওটা। তুমুল গতি নিয়ে চলেছে আকাশ চিরে।
সায়েন্স ফিকশন সিনেমার স্পেসশিপের মতই দেখতে ইজরায়েলি আইসিবিএম জেরিকো-২বি। তেলতেলে দেহ নিয়ে ছুটছে মক্কা শহর লক্ষ্য করে।
মস্ত টিউবের মত। সত্তর ফুট দৈর্ঘ্যের চকচকে চুরুট। বর্শার মত ফুটো করছে আকাশ। লেজে জ্বলজ্বল করছে ম্যাগনেসিয়ামের ভয়ঙ্কর আগুন। পিছনে দীর্ঘ ধোঁয়ার রেখা। ওই ধোঁয়া অজগরের মত পাক খেয়ে দূর-দিগন্তে হারিয়ে গেছে ইয়েমেনের আকাশে।
বিকট গর্জন ছাড়ছে মিসাইল।
একটানা বুউউউউউউম! আওয়াজ তুলছে। নিজেও বিকট আওয়াজ ছাড়ছে এক্স-১৬, শেষ করে এনেছে অর্ধবৃত্ত।
পিছনে লেগে আছে পিন আকৃতির অ্যাম্ৰাম মিসাইল। টার্গেট টাইম:
১:০০…
০:৫৯…
০:৫৮…
আর বড়জোর কয়েক সেকেণ্ড, তারপর…
অর্ধবৃত্ত তৈরি করেই তীরের মত জেরিকো-২বি মিসাইলের কাছে পৌঁছে গেল রানার এক্স-১৬।
আকাশ চিরে ছুটছে লির্ড মিসাইল ও রকেট বিমান। কিন্তু এখনও পাশাপাশি হয়নি দুই এয়ারক্রাফট।
আইসিবিএম-এর সামান্য বামে পিছনে ছুটছে রানার বিমান। এ দূর দিগন্তে ঘন কালো ধোঁয়া ছুঁড়ছে আইসিবিএম।
টার্গেট টাইম:
০:৫০…
০:৪৯…
০:৪৮…
মিসাইলের চেয়ে সামান্য বেশি গতি রকেট বিমানের। পৌঁছে গেল পাশে। চারপাশে রইল শুধু ভয়ঙ্কর গর্জন। ওই আওয়াজ সুপারসনিক গতির কারণে। একটানা চলছে: বুউউউউউ!
টার্গেট টাইম:
০:৪০…
০:৩৯…
০:৩৮…
আরও কাছে নিয়ে যাও, রঘুপতি, গলা ছাড়ল রানা।
সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ পালন করল রোবট।
এক্স-১৬ পৌঁছে গেল মিসাইলের লেজের কাছে। বিকট আওয়াজ ছাড়ছে আইসিবিএম-এর টেইল কোন্।
কোনও সাড়া দিল না টাচলক-৯ ইউনিট। এখনও মিসাইলের সিপিইউ-এর কাছে পৌঁছতে পারেনি।
তিলতিল করে সামনে বাড়ল এক্স-১৬। ধীরে ধীরে পিছনে পড়ছে মিসাইলের পিছন দিক।
আরও কাছে যাও! নির্দেশ দিল রানা।
টার্গেট টাইম:
০:৩৪…
০:৩৩…
০:৩২,
ককপিট ক্যানোপি থেকে নীচে মক্কা শহরের হরেক রঙের বাতি দেখল রানা।
নীচে শুরু হয়েছে ঘন বসতি।
টার্গেট টাইম:
০:২৮…
০:২৭…
০:২৬…
মিসাইলের পেটের কাছে পৌঁছে গেল এক্স-১৬। আর তখনই বি আওয়াজ তুলল ডিমআর্ম ইউনিট। স্ক্রিনে দেখা দিল:
ফার্স্ট প্রটোকল (প্রক্সিমিটি): স্যাটিসফাইড,
ইনিশিয়েট সেকেণ্ড প্রটোকল।
এবার… বিড়বিড় করল রানা। চট করে একবার দেখে নিল আইসিবিএম।
রিফ্লেক্স প্যাটার্নের সিকিউয়েন্স শুরু করেছে ডিসআর্ম ইউনিট। টাচস্ক্রিনে আঙুল স্পর্শ করতে লাগল রানা। আকাশে সুপারসনিক আওয়াজ তুলে ছুটছে দুই এয়ারক্রাফট।
গতি ঘণ্টায় প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার। আর তখনই শুরু হলো সর্বনাশের! এক্স-১৬ বিমানের খুব কাছে পৌঁছে গেল অ্যাম্ৰাম মিসাইল।
স্কোপে চেয়ে আছে রঘুপতি। শান্ত স্বরে বলল, স্যর… আর মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, তারপর…
আগের কাজ আগে শেষ করি, চাপা স্বরে বলল রানা। পুরো মনোযোগ দিয়েছে রিফ্লেক্স রেসপন্স টেস্টে।
টার্গেট টাইম:
০:১৯…
০:১৮…
০:১৭…
এক্স-১৬ বিমানের লেজের আগুনের কাছে পৌঁছে গেছে। অ্যাম্ৰাম মিসাইল।
লিথাল রেঞ্জে প্রায় পৌঁছে গেছে, শান্ত স্বরে বলল রঘুপতি। আম্রামের জন্য লিথাল রেঞ্জ বিশ গজ।
এরপর আঘাত হানতে হয় না মিসাইলকে। কাছে বিস্ফোরিত হওয়াই যথেষ্ট।
আপনি পাঁচ সেকেণ্ড পাবেন, স্যর, উদাস সুরে বলল রঘুপতি।
আমার এত সময় নেই, কাজের ফাঁকে বলল রানা। চোখ সরল না স্ক্রিন থেকে। ঝড়ের বেগে চলছে আঙুল।
টার্গেট টাইম:
০:১৬…
০:১৫…
০:১৪…
আমি কিন্তু, স্যর, চাইলেও সরে যেতে পারি না, করুণ শোনাল রঘুপতির কণ্ঠ। নইলে ষাট ফুটের চেয়ে দূরে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে।…দুই সেকেণ্ড!
টাচস্ক্রিন স্পর্শ করছে রানা।
টার্গেট টাইম:
০:১৩…
০:১২…
আর এক সেকেণ্ড, স্যর।
লিথাল রেঞ্জে পৌঁছে গেল অ্যাম্ৰাম মিসাইল।
এক্স-১৬ বিমানের টেইলপাইপের বিশ গজ দূরে ওটা।
অনেক দেরি হয়ে গেল, স্যর, করুণ সুরে বলল রঘুপতি।
মনে হয় না, নতুন একটা কণ্ঠ বলল ওদের ইয়ারপিসে।
সুপারসনিক ঝোড়ো গতির ভিতর রানার এক্স-১৬ বিমানের পাশে হাজির হয়েছে কালো কী যেন। ঝট করে সরে গেল ওটা, পিছনে টেনে নিয়ে চলেছে অ্যাম্ৰাম মিসাইল
পরক্ষণে ওটার লেজে লাগল অ্যাম্ৰাম।
আকাশে ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই সিটে ঘুরে বসল রঘুপতি। তার চোখ পড়ল অর্ধেক হয়ে যাওয়া একটা এক্স-১৬ বিমানের উপর। ছিটকে নীচে রওনা হয়েছে ধ্বংসাবশেষ। পিছন দিক বাম্পায়িত হয়েছে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে।
আমার আর থেকে কী লাভ… রানা শুনল রোবটের করুণ হাহাকার। স্যর বুঝি আর নেই!
ওই বিমান ছিল কুয়াশার এক্স-১৬।
পাইলট মারা যাওয়ার পরও রানার বিমানের পিছু নিয়ে এসেছে এতদূর, রানাদের বিমান দুবার বাঁক নেয়ার সুযোগ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল খুব কাছে। কিন্তু এইমাত্র রানার বিমানকে অ্যাম্রাম থেকে বাঁচাতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছে কুয়াশা।
আকাশ থেকে খসে পড়ছে দুটুকরো হয়ে যাওয়া বিমান।
কিন্তু হঠাৎ ধ্বংসাবশেষ থেকে ছিটকে বেরোল একটা প্যারাশুট।
টার্গেট টাইম:
০:১১…
০:১০…
বলতে গেলে বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনেইনি রানা। পুরো মনোযোগ দিয়েছে টাচস্ক্রিনের রিফ্লেক্স প্যাটার্নে।
সাদা… লাল… সাদা… সাদা… লাল…
টার্গেট টাইম:
০:০৯…
ওটা খাড়া ভাবে নামতে শুরু করছে, স্যর, দুঃখিত সুরে বলল রঘুপতি।
হঠাৎ করেই কোর্স পাল্টে নিল মিসাইল। খাড়াভাবে নামছে মক্কা শহর লক্ষ্য করে।
এক্স-১৬ বিমানের কন্ট্রোল স্টিক নাড়ল রঘুপতি। অনুসরণ করছে মিসাইলের। খাড়াভাবে পিছু নিল মিসাইলের, পাশেই থাকছে।
টাচস্ক্রিন থেকে চোখ সরাল না রানা। ঝড়ের মত চলছে। আঙুল।
টার্গেট টাইম:
০:০৮.
দুটো বুলেটের মত পৃথিবী লক্ষ্য করে নামছে মিসাইল ও এক্স-১৬।
০:০৭…
মক্কার বাতি ছুটে আসছে ওদের দিকে।
টার্গেট টাইম:
০:০৬…
নেচে চলেছে রানার আঙুল।
বিপ আওয়াজ তুলল টাচলক-৯ ইউনিট:
সেকেণ্ড প্রটোকল (রেসপন্স প্যাটার্ন):
স্যাটিসফায়েড।
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি):
অ্যাকটিভ।
প্লিয এণ্টার অথোরাইযড ডিসআর্ম কোড।
টার্গেট টাইম:
০:০৫…
বিদ্যুদ্বেগে ইউনিভার্সাল ডিসআর্ম কোড এন্ট্রি করল রানা সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে ফুটে উঠল:
থার্ড প্রটোকল (কোড এন্ট্রি): স্যাটিসফাইড।
অথোরাইযড ডিসআর্ম কোড
এন্টার্ড।
মিসাইল লঞ্চ অ্যাবোর্টেড।
পরক্ষণে যা ঘটল সেজন্য রানা তৈরি ছিল না।
মক্কা শহরের সুউচ্চ মিনারগুলোর অনেক উপরের আকাশে সুপারসনিক গতি নিয়ে ছুটতে গিয়ে সেলফ ডেস্ট্রাক্ট মেকানিম কাজ করল লির্ড মিসাইলের সিপিইউ-এর ভিতর। বিস্ফোরিত হলো মিসাইল। মস্ত পটকা যেন, চারপাশে ছিটকে গেল আগুনের লাল ফুলকি।
সবই এত দ্রুত ঘটল, হাওয়ায় ভর করে টুকরোগুলো পৌঁছল শত মাইল দূরে। পরবর্তীতে জেরিকো-২বি মিসাইলের নানান টুকরো মিলবে বহু দূরের মরুভূমিতে।
কিন্তু ভিন্ন পরিণতি হলো, লির্ড মিসাইলের বিস্ফোরণের ফলে পুরো নিয়ন্ত্রণ হারাল রঘুপতি। রকেটের মত নামতে লাগল বিমান।
কন্ট্রোল স্টিক হাতে সত্যিকারের বীরের মতই লড়ল রঘুপতি, কিন্তু বিমানের কাছ থেকে কোনও সুবিধা আদায় করতে পারল না। অবশ্য একটা কাজ রঘুপতি করতে পারল।
ঘন বসতিপূর্ণ মক্কা শহরের বুকে বিধ্বস্ত হলো না এক্স-১৬।
কয়েক সেকেণ্ড পর আকাশ থেকে উল্কার মত ছিটকে পড়ল বিমান মরুভূমির ভিতর। খাড়াভাবে নেমেছে, থরথর করে কাঁপিয়ে দিল জমিন। পঞ্চাশ মাইল দূর থেকেও সে কম্পন টের পেল সবাই।
আঁধার মরুভূমির আকাশ সাদা হয়ে উঠল বিস্ফোরণের ফলে।
অনেক চেষ্টা করেও মাক থ্রি-র চেয়ে গতি কমাতে পারেনি রঘুপতি।
বালিতে নেমেই বিস্ফোরিত হয়েছে এক্স-১৬। মস্ত আগুনের গোলা জন্ম নিল। কারও বাঁচবার সাধ্য নেই ওই বিস্ফোরণের পর।
ওই সংঘর্ষের মাত্র দুই সেকেণ্ড আগে অবশ্য বিমান থেকে ছিটকে আকাশে উঠেছে দুই ইজেকশন সিট স্বর্গের দিকে। ওই দুই সিটে রয়েছে মাসুদ রানা ও রঘুপতি।
প্যারাশুটে ভর করে ধীরে ধীরে মরুভূমির মেঝেতে নামল দুই ইজেকশন সিট।
একমাইল দূরে মস্ত গর্ত তৈরি করেছে এক্স-১৬।
ইজেকশন সিট নামবার পরেও রানা নড়ল না। নিজের সিট রেন্ট খুলে নেমে পড়ল রঘুপতি, কাছে গিয়ে অসহায়ভাবে রানার দিকে চেয়ে রইল সে।
প্রচণ্ড গতি সুপারসনিক ইজেকশনের কারণে জ্ঞান হারিয়েছে রানা।
কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেল, তারপর জেগে উঠল রানা। টের পেল, মুখে বিন্দু বিন্দু রক্ত। বেদম ব্যথা শুরু হয়েছে মাথা জুড়ে। ছিঁড়ে পড়তে চাইছে দুই চোখ। প্রচণ্ড গতি ইজেকশনের কারণে এই ব্যথা স্বাভাবিক।
ফ্লাইট সিটে বসে চারপাশে ছায়ামূর্তি দেখল রানা। কারা যেন আনবাকল করছে ওর সিটবেল্ট।
কণ্ঠস্বর শুনল: শুয়োরের বাচ্চা ওই গতি সহ্য করে নামল কী করে?
বাদ দাও, শালাকে শেষ করে দাও। যে-কোনও সময়ে মেরিনরা আসবে।
আবছা চেতনার ভিতর ইংরেজি শুনছে রানা। উচ্চারণ আমেরিকানদের মতই। সন্দেহ জন্ম নিল রানার মনে।
অবশ লাগছে, তখনই নড়তে পারল না। একটা ছোরা কেটে দিল ওর সিটবেল্ট।
রানা আবছা দেখল, ঝুঁকে এসেছে এক পশ্চিমা লোক। পরনে মিলিটারি পোশাক। এক মুহূর্ত পর টের পেল, ওটা ইউএস স্পেশাল ফোর্স ডেল্টা ডিটাচমেন্টের পোশাক।
মেজর রানা, নিচু স্বরে বলল সে।
অস্পষ্ট শুনল রানা। মাথা খাটাতে ইচ্ছে করছে না ওর।
সবই ঠিক আছে, মেজর রানা। আপনি এখন নিরাপদ। আমরা ডেল্টা ফোর্স। আপনার পাশেই আছি। আমরা আপনার বন্ধুকেও তুলে এনেছি। কয়েক মিনিট পর পৌঁছে যাবেন তিনি।
আপনারা… থেমে গেল রানা, কয়েক মুহূর্ত পর বলল, আপনারা কারা? কোথা থেকে এসেছেন?
ডেল্টা ফোর্সের লোকটা হাসল। কিন্তু সেই হাসি বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আমার নাম জন উইলসন। ডেল্টা ফোর্সে আছি। এসেছি এডেন থেকে। কিন্তু ভাববেন না, মেজর। আমরা আপনার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
ডানবাহুর মাংসে কী যেন বিঁধেছে, টের পেল রানা। পরক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
স্বপ্ন দেখছে রানা।
ফ্লাইট সিট থেকে ওকে তুলে নেয়া হয়েছে। কে যেন দুই হাতে আটকে দিল ফ্লেক্স-কাফ। ওকে তুলে দেয়া হলো একটা প্রাইভেট লিয়ার জেট বিমানে। রওনা হয়ে গেল আকাশযান, রানওয়ে থেকে লাফিয়ে উঠে গেল আকাশে।
আবছাভাবে শুনল কার যেন কণ্ঠ।
জন উইলসন বলছে: …তখনই ফোন দিল আইএসএস-এর পরিচিত ওই লোক। সবার খবর তার জানা, আগে আইসিসিতে ছিল। দেখতে ভয়ঙ্কর কুৎসিত। যেন আস্ত ইঁদুর। নাম কোভাক। ব্র্যাড কোভাক। ইঁদুর বলেই ডাকে সবাই।
হঁদুর সবই জানে। ও জানত, আমি এডেনে আছি। আমাকে জানিয়েছে, মাসুদ রানার মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার। বলেছিল ইয়েমেনের উদ্দেশে রওনা হয়েছে রানা। আরও বলেছে, আমি যদি আগ্রহী হই, আমার জন্য বিশ্বাসী কয়েকজনকে জোগাড় করে দেবে সে।
জানিয়েছে, মাসুদ রানার সঙ্গে থাকবে বিজ্ঞানী কুয়াশা। তার মাথার ওপরেও পুরস্কার ঘোষণা করেছে আমেরিকান সরকার। পাঁচ মিলিয়ন ডলার। আরে ভাই, আমি তো বিনা। পয়সায় কুয়াশাকে তুলে দিচ্ছিলাম আপনাদের হাতে। আপনারা যখন বলছেন পাঁচ মিলিয়ন ডলার বাড়তি দেবেন, তো খুবই ভাল কথা। অপেক্ষা করুন। আমরা পৌঁছে যাব।
.
বিমান উড়ে চলেছে। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রানা।
কখন যেন ভাঙল ঘুম। খুব অস্বস্তি লাগল। এখনও ওর পরনে ইউটিলিটি ভেস্ট। কিন্তু পকেট থেকে সব অস্ত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শুধু রয়ে গেছে মুড়িয়ে রাখা একটা সোভিয়েত কেমিকেল বডি ব্যাগ। ওটা কোনও অস্ত্রই না। কোনও কাজে আসবে না।
নড়ে উঠে চোখ মেলল রানা। কুয়াশা আর রঘুপতিকে দেখতে পেল। তাদের কব্জিতে ফ্লেক্স-কাফ। পিছনের সারির সিটে ওরা। পাহারা দিচ্ছে ডেল্টা ফোর্সের সেন্ট্রিরা। চোখ বুজে বসে আছে। রঘুপতি। কিন্তু কুয়াশার চোখ খোলা। রানাকে নড়ে উঠতে দেখেছে। আবারও চোখ বুজল রানা। বড় ঘুম, বড্ড ঘুম।
আবারও ঘুমিয়ে পড়ল রানা। আবার কখন যেন জেগে গেল।
জানালা দিয়ে দেখল, রাতের কালো আকাশ নেই এখন, ফ্যাকাসে নীল রং ধরেছে।
ভোর হচ্ছে।
আবারও পুরুষ কণ্ঠ শুনল রানা।
আমরা ওদেরকে কোথায় নেব?
একটা দুর্গে, বলল জন উইলসন। ওটা ফ্রান্সে।
পনেরো
ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
ব্রিটানির উপকূল, ফ্রান্স।
ষোলো অক্টোবর।
সকাল সাতটা।
সাগর এবং পাহাড়ি এলাকায় ঝমঝম করে নেমেছে বৃষ্টি। তারই মাঝে ডেমিয়েন ডগলাসের ব্যক্তিগত এয়ারস্ট্রিপে নেমে এল রানাকে নিয়ে জেট বিমান।
বন্দি রানা, কুয়াশা ও রঘুপতিকে তুলে দেয়া হলো একটা কাভার্ড ট্রাকে। ওদের পাহারায় থাকল ডেল্টা ফোর্সের পাঁচ সৈনিক নিয়ে জন উইলসন। পাহাড়ি পথে ছুটে চলল গাড়ি। গত দুদিন আগে এই রাস্তা ধরেই গিয়েছিল রানা, তিশা ও কুয়াশা।
পথের শেষে প্রকাণ্ড কালো দুর্গ, ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন।
কিছুক্ষণ পর মূল স্থলভাগ পেরিয়ে গেল ট্রাক, উঠে পড়ল মস্ত ড্র-ব্রিজে। এই পথেই পৌঁছুতে হবে দুর্গে।
তুমুল বৃষ্টি চলছে, সেই সঙ্গে বজ্রপাত। বারবার নীল আলোয় চমকে উঠছে ধূসর আকাশ।
ট্রাকে আসবার পথে সংক্ষেপে, জন উইলসনের বিষয়ে জানিয়েছে কুয়াশা রানাকে। তার ভাই হত্যা করতে চেয়েছিল কুয়াশাকে, পাল্টা খুন হয়ে যায়। তখন থেকে ওকে খুঁজছে জন উইলসন।
উইলসন বাউন্টি হান্টার নয়, বলেছে কুয়াশা। বাউন্টি হান্টিঙের প্রথম নিয়মই ভেঙেছে সে।
কী নিয়ম সেটা? জানতে চেয়েছে রানা।
যদি জীবিত বা মৃত কাউকে নিয়ে যেতে বলা হয়, তা হলে বাউন্টি হান্টাররা লোকটাকে জীবিত রাখে না, বলেছে কুয়াশা।
লাশ কখনও কোনও ক্ষতি করতে পারে না।
এইমাত্র নুড়িপাথর ভরা উঠানে ঢুকল কাভার্ড ট্রাক। কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল দুর্গের পাশে।
ধাক্কা দিয়ে ট্রাক থেকে নামানো হলো রানা, কুয়াশা ও রঘুপতিকে। অস্ত্র হাতে ওদেরকে কাভার করল উইলসন এবং তার লোক।
সবার জন্য অপেক্ষা করছিল ব্যাঙ্কার মোসিউ ড্যাবলার।
দাঁড়িয়ে আছে ক্লাসিক গাড়ির গ্যারাজের গেটে। বরাবরের মতই পরনে নিখুঁত সুট।
তার পাশেই কার্ট কে. এবেলহার্ড। তার সঙ্গে রয়েছে। এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-এর দশজন বাউন্টি হান্টার। এরা ডেমিয়েন ডগলাসের প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স হিসাবে কাজ করছে।
মেজর উইলসন, খুশির সুরে বলল ড্যাবলার। ওয়েলকাম টু ফোট্রেস দো শ্যাটিয়ন। আমরা আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। দয়া করে আমার সঙ্গে আসুন।
গ্যারাজের পথ দেখাল সে। শেষমাথায় কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল অ্যান্টি-রুমে। আগেও এখানে এসেছে, মনে পড়ল রানার। অবশ্য, এবার আগের সুড়ঙ্গ ব্যবহার না করে পাথরের একটা দরজার সামনে দাঁড়াল ড্যাবলার। চারপাশ পরিত্যক্ত মনে হলো রানার কাছে। দরজা খুলে যেতেই সরু একটা পেঁচানো মেডিইভেল স্টেয়ারকেস শুরু হলো।
পাশের দেয়ালে একটু দূরে দূরে জ্বলছে মশাল। ঘুরে ঘুরে অনেক নীচে নেমেছে সিঁড়ি। রেলিং নেই। কিছুক্ষণ নেমে যাওয়ার পর ওরা বুঝল, ঢুকে গেছে দুর্গের অনেক গভীরে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে নামবার পর সামনে পড়ল পাথরের গায়ে পরু এক লোহার দরজা।
গোপন সুইচ টিপল ড্যাবলার। গুড়গুড় আওয়াজ তুলে সিলিঙের দিকে উঠল দরজা। একপাশে সরে দাঁড়াল ড্যাবলার, হাতের ইশারা করল। প্রথমে বন্দিদেরকে নিয়ে ঢুকতে হবে উইলসন এবং তার লোকদেরকে।
দলের সবাইকে নিয়ে দরজা পেরিয়ে গেল উইলসন। সামনে রেখেছে রানা, কুয়াশা ও রঘুপতিকে।
এপাশে মস্ত একটা গোল জলাশয় দেখল রানা। কূপের মত, কিন্তু বিশাল আকারের।
কৃপের দেয়ালের উপর অংশে ছলকে লাগছে সাগরের ঢেউ।
কূপের নানা জায়গায় পাথুরে মঞ্চ।
নীচের সাগরে ঘুরছে দুটো টাইগার শার্ক। রানা বুঝে গেল, এটাই সেই ডানজন। এখানেই বন্দি হয়েছিল কুয়াশা ও তিশা।
একপাশে একটা বারো ফুটি গিলোটিন দেখল রানা। এটাই কুয়াশার কাছ থেকে শোনা সেই শার্ক পিট।
ওদের পিছনে সিলিং থেকে নেমে পাথুরে মেঝের খাঁজে আটকে গেছে স্টিলের দরজা।
বুদ্ধিমানের মতই বাইরে রয়ে গেছে ড্যাবলার। শার্ক পিটে রানাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরেকজন। লোকটার চুল গাজরের রঙের। মুখটা ইঁদুরের মত চোখা।
হাই, কোভাক, বলল উইলসন। সামনে বেড়ে হ্যাণ্ডশেক করল।
হাত মিলিয়ে সরে দাঁড়াল কোভাক, রানার দিকে চাইল। নির্বিকার চেহারা।
তা হলে তুমিই বিসিআই-এর মাসুদ রানা, বলল। নানা সমস্যা করেছ। তোমার সাইবেরিয়ার মিশন গুছিয়ে দিতে অনেক সময় দিয়েছি। পরিবেশ তৈরি করেছি। এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-এর মার্সেনারিদের পাঠিয়েছি। অ্যাটলক আর রবিন কার্লটনকে ওখানে পাঠিয়েছি তোমাকে ফাঁদে ফেলবার জন্যে। তারপর তোমার কমিউনিকেশন বন্ধ করেছি। হার্লি অ্যাটলক আর রবিন কার্লটন ভাল যোদ্ধা ছিল না, কিন্তু তুমি অন্যকিছু। বেঁচেই থাকলে।
কিন্তু এবার বেশিক্ষণ বাঁচবে না। পালাতেও পারবে না। মরতেই হবে। রানাকে পাকড়ে ধরা ডেল্টা সৈনিকের দিকে চাইল কোভাক। ওকে তোলো গিলোটিনে।
জন উইলসনের দুই সৈনিক ধাক্কা দিয়ে রানাকে নিয়ে গেল গিলোটিনের সামনে। ঘাড় ধরে বসিয়ে দেয়া হলো বন্দিকে। ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিল নতুন কাঠের আড়া। হামাগুড়ির ভঙ্গিতে বসতে হয়েছে রানাকে। পিঠে ফ্লেক্স-কাফে আটকানো
না! ডানজনের আরেকপ্রান্ত থেকে ধমকে উঠল একটা কণ্ঠ।
ওদিকে ঘুরে চাইল সবাই। পিটের অনেকটা উপরে ব্যালকনি, ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ডেমিয়েন ডগলাস।
পাশে এবেলহার্ড এবং তার দশ বাউন্টি হান্টার। আবারও উদয় হয়েছে মোসিউ ড্যাবলার।
ওর চোখ যেন থাকে গিলোটিনের ব্লেডের ওপর, বলল ডেমিয়েন। দেখুক কীভাবে নামে ক্ষুর।
নির্দেশ পালন করল ডেল্টা ফোর্সের দুই সৈনিক।
ক্ষুরধার ব্লেডের দিকে চোখ রানার। বারো ফুট উপরে কাঠের ফ্রেমে গিলোটিন, আয়নার মত চকচক করছে।
বাংলাদেশি মেজর, বলল ডেমিয়েন, নিজ বুদ্ধি এবং যোগ্যতায় বর্তমানের সভ্যতা রক্ষা করেছ। লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে গেল, যাদেরকে তুমি চেনোও না। তারাও শোনেনি তোমার নাম। সত্যিই তুমি মস্ত হিরো। কিন্তু তোমার বিজয় কয়েক দিনের জন্যে। কারণ আমি বেঁচে থাকছি। শাসন করব এই গোটা দুনিয়াকে। তোমার সময় ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু আমার সময় মাত্র শুরু। এবার বুঝবে হিরো হতে গেলে কী ধরনের ক্ষতি মেনে নিতে হয়। মিস্টার কোভাক, ব্লেড নামিয়ে দাও ওর গলার উপর। তারপর গুলি করে আঁঝরা করবে হিরো মাসুদ রানাকে। এরপর…
ডেমিয়েন! ডানজনের ভিতর গমগম করে উঠল রানার কণ্ঠ।
সবাই থমকে গেল।
শান্ত, শীতল কণ্ঠে রানা বলল, আমি তোমাকে শেষ করব।
শীতল হাসল ডেমিয়েন ডগলাস। এই জীবনে নয়, মেজর। কোভাক, ব্লেড!
গিলোটিনের পাশে পৌঁছে গেছে ইঁদুর মুখে কোভাক। রানার দিকে চাইল, তারপর খপ করে ধরল লোহার লিভার।
ওই একইসময়ে কুয়াশার মাথা লক্ষ্য করে কোল্ট ৪৫ রিভলভার তুলল জন উইলসন।
নরকে দেখা হবে, মাসুদ রানা, বলল কোভাক।
পরক্ষণে টান দিল লিভারে, খুলে দিয়েছে ব্লেড। সরসর করে নেমে এল ইস্পাতের চকচকে পাত। কিছুই করবার নেই রানার, চুপ করে চেয়ে রইল।
ওর গলা লক্ষ্য করে নামছে ব্লেড। শেষ পর্যায়ে আস্তে করে চোখ বুজল রানা। পরক্ষণে আওয়াজ উঠল: ঠং। রানার মৃত্যু এভাবে এল না। কোনও ব্যথাই টের পেল না ও। আবারও চোখ মেলল।
ওর গলা থেকে মাত্র একফুট উপরে থেমে গেছে গিলোটিনের ব্লেড। ওটাকে আটকে দিয়েছে একটা পাঁচ ব্লেডের শুরিকেন। গভীরভাবে গেঁথে গেছে কাঠের ফ্রেমে। আর নামতে দিচ্ছে না। ইস্পাতের পাত।
এইমাত্র ছোঁড়া হয়েছে শুরিকেন, কাঠে গেঁথে এখনও থরথর করে কাঁপছে পাত।
একইভাবে রক্ষা করা হয়েছে কুয়াশাকে। শুরিকেন ছিটকে যাওয়ার পর মুহূর্তে একটা বুলেট বিঁধেছে জন উইলসনের ডান কব্জিতে। ছিটকে পড়েছে রিভলভার পানিতে। লোকটার কব্জির ক্ষত থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে রক্ত।
ঘুরে চাইল রানা। অবাক হয়ে দেখল, শার্ক পিটের পানি। থেকে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর এক মূর্তি।
পরনে ধূসর ইউনিফর্ম, মুখে স্কুবা গিয়ার একহাতে শুরিকেন ছুঁড়ছে, অন্য হাতে গর্জন ছাড়ছে অস্ত্র।
ওই কালিমূর্তি যেন স্বয়ং মৃত্যুদূত। নিশাত সুলতানা। নিশাত আপা।
পানি-সমতল ভেঙে ছিটকে উঠেছে সে, এ মুহূর্তে দুই হাতে এম-৭ মেশিন পিস্তল। গুলি করছে ঝড়ের গতিতে। দুই গুলি খেয়ে ছিটকে পড়ল দুই ডেল্টা সৈনিক, মৃত।
চারপাশে নড়তে শুরু করেছে সবাই।
নিশাতের হঠাৎ আগমনে কুয়াশা ও রঘুপতি টের পেয়েছে, এখন ওদের উপর কারও চোখ নেই। সবাই দেখছে রানাকে।
লাফিয়ে উঠে দুপা-র তলা দিয়ে দুহাত ঘুরিয়ে আনল। কুয়াশা ও রঘুপতি। সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে হাতের প্লাস্টিকের ফ্লেক্স-কাফ।
নির্দেশনা লাগল না নিশাত সুলতানার। দুই গুলিতে উড়িয়ে দিল কুয়াশা ও রঘুপতির হ্যাণ্ড-কাফ। মুহূর্তে মুক্ত হয়ে গেল কুয়াশা ও রঘুপতি।
উপরের ব্যালকনিতে নিজ লোকদের কাজে নামতে ইশারা করল কার্ট কে. এবেলহার্ড। চারজনকে পাঠাল ব্যালকনি থেকে নীচের পিট লক্ষ্য করে। অন্য ছয়জনকে নিয়ে ব্যালকনির পিছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সে। করিডোরে থেমেই বের করল এম-১৬। পাহারা দিয়ে ডানজন থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে ডেমিয়েন ডগলাসকে।
এদিকে ডেল্টা ফোর্সের মৃত এক লোকের পাশে পড়ে থাকা। কোল্ট কমাণ্ডো রাইফেল তুলে নিল কুয়াশা। এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-এর চার লোক ব্যালকনি থেকে নামছে, তাদের উদ্দেশে গুলি পাঠাল ও।
কুয়াশার পাশে রঘুপতি এখনও নিরস্ত্র, কয়েক লাফে সামনে বেড়েই থাবা মারল এক ডেল্টা সৈনিকের নাকে। লোকটার মগজে গেঁথে গেল নাকের হাড়। ধুপ করে পড়ল লাশ।
রঘুপতি! নির্দেশ দিল কুয়াশা। রানাকে সরিয়ে নাও!
ঝড়ের গতিতে গিলোটিনের দিকে ছুটল রোবট।
গোলাগুলি শুরু হওয়ায় গিলোটিনের পাশে লুকিয়ে পড়েছে কোভাক, সামান্য দূরেই রানা।
মুহূর্তের জন্য গোলাগুলি থেমেছে বুঝেই গিলোটিনের ফ্রেম। থেকে শুরিকেন খুলে নিতে চাইল কোভাক।
এবার ব্লেড নামবে রানার গলা লক্ষ্য করে। খপ করে শুরিকেন ধরল লোকটা। কিন্তু তখনই মারাত্মক উল্টো এক চড় খেয়ে ছিটকে পড়ল সে।
পাথুরে মঞ্চের কিনারায় পড়েছে। খেয়াল করল, ওর চোখে চোখ রেখে পানি থেকে চেয়ে আছে একটা টাইগার শার্ক। শক খাওয়া লোকের মত ছিটকে উঠে দাঁড়াল কোভাক।
ওদিকে রানার পাশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রঘুপতি, ওকে কাভার দিচ্ছে রাইফেল হাতে কুয়াশা। প্রতিটি গুলি অব্যর্থ।
হ্যাচকা টানে গিলোটিনের কাঠের আড়া তুলে ফেলল। রঘুপতি, মুক্ত করে দিল রানাকে।
কুয়াশার এক গুলি ছিঁড়ে দিল রানার ফ্লেক্স-কাফ। আর তখনই হঠাৎ করেই রানাকে পিছনে সরিয়ে দিল রঘুপতি। নিজে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে সামনে।
পরক্ষণে এক রাশ গুলি ঝাঁঝরা করে দিল রঘুপতির বুক। ছিটকে বেরোল নীল রক্ত, ওর প্রাণশক্তি।
কুপের একটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে গুলি করছে উইলসন। ডান কব্জি রক্তাক্ত, অন্যহাতে কোল্ট কমাণ্ডো রাইফেল। বারবার টিপছে ট্রিগার।
না! হাহাকার করে উঠল কুয়াশা। ধ্বংস হতে দেখছে নিজ সৃষ্টি।
উইলসনের দিকে অস্ত্র ঘোরাল কুয়াশা, কিন্তু ফুরিয়ে গেছে ওর রাইফেলের ম্যাগাযিন।
নিজেই ছিটকে রওনা হলো কুয়াশা, এক সেকেণ্ড পর ডাইভ দিয়ে পড়ল উইলসনের দুই পায়ে। ভয়ঙ্কর ট্যাকল করেছে। হুড়মুড় পরে হাঙরের কূপে ঝুপ করে পড়ল দুজন।
গিলোটিন থেকে মুক্ত হয়েই ঘুরে চাইল রানা, টলতে টলতে ইস্পাতের দরজার দিকে চলেছে কোভাক। ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে শার্ক পিট থেকে।
রানা ছুট লাগাল তার পিছনে। কিন্তু জ্যাকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোল বের করেছে লোকটা।
সরসর করে উপরে উঠল দরজা। তাড়া খাওয়া কুকুরের মত ছুটল কোভাক।
ঝড়ের গতিতে পিছু নিয়েছে রানাও, তারই ফাঁকে গ্রেট মাইকে বলল, আপা!
কাছেই এক মঞ্চের পিলারের আড়াল নিয়েছে নিশাত সুলতানা, পিস্তল হাতে গুলি করছে দুই ডেল্টা সৈনিককে লক্ষ্য করে। তারই ফাঁকে শুনেছে রানার ডাক।
গুলি পাঠাল কোভাকের উদ্দেশে। কিন্তু লাগল না গুলি।
অবশ্য একটি দিয়ে বেরোবার সাহস হারাল লোকটা, কাভার নিল একটা পাথুরে মঞ্চের।
নিশাতের গুলির কারণে বাড়তি সুবিধা পেল না রানা।
উল্টো বাড়তি সুবিধা পেল নিশাতের দিকে গুলি পাঠানো ডেল্টা সৈনিকরা।
এক রাশ গুলি বিধল নিশাতের বুকে।
ওর বুকে রয়েছে বুলেট প্রুফ ফ্লেক ভেস্ট। ঝাঁকি খেয়ে পিছিয়ে গেল ও। একের পর এক বুলেট লাগছে বুকে।
ছিটকে পিছিয়ে গেল নিশাত, এবং সে সুযোগে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করতে চাইল এক ডেল্টা সৈনিক। রাইফেল তাক করেছে নিশাতের মাথা লক্ষ্য করে।
কিন্তু তখনই ঝপাস্ করে পানিতে পড়ল নিশাত। মাথার উপর দিয়ে গেল অন্তত বিশটা গুলি।
মুহূর্তের জন্য নীরবতা নামল ডানজনে।
এক সেকেণ্ড পর ভেসে উঠল নিশাত, বুলেট উগরে দিল দুহাতের পিস্তল।
ওর দিকেই গুলি করছে ডেল্টা সৈনিকরা। কিন্তু তখনই মুখে-বুকে বুলেট খেয়ে ছিটকে পড়ল তারা।
সন্তুষ্টির হাসি হাসল নিশাত। আর তখনই টের পেল, অতিরিক্তি নড়ছে চারপাশের পানি।
ঝট করে ঘুরে গেল নিশাত… দেখল মস্ত একটা ঢেউ তেড়ে আসছে ওকে লক্ষ্য করে। উঁচু হয়ে উঠেছে টাইগার শার্কের ডর্সাল ফিন।
সর্বনাশ! ফিসফিস করল নিশাত। মাছের খাবার হতে চাই! পিস্তল তুলেই গুলি শুরু করল ও হাঙর লক্ষ্য করে।
গতি কমছে না হাঙরের।
গুলি লাগছে, কিন্তু ঢেউয়ের ভিতর দিয়ে মস্ত চোয়াল হাঁ করে আসছে ওটা।
টাশশ! টাশশ! আওয়াজ তুলছে পিস্তল। গতি কমল না হাঙরের।
পানিতে ফেনা তৈরি করেছে, আরও মস্ত হাঁ করেছে ছুটে এল নিশাতের পা লক্ষ্য করে!
চোয়ালে খপ করে পুরে ফেলল একটা পা। পরক্ষণে চিবাতে লাগল নিশাতের বাম পা।
সামান্যতম ব্যথা লাগল না নিশাতের। ওই নকল পা টাইটেনিয়ামের তৈরি। মুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল হাঙরের দুটো দাঁত।
খা-না! টাইগার শার্কের মগজ লক্ষ্য করে পিস্তল তুলল নিশাত।
টাশশ করে উঠল পিস্তল।
পানির ভিতর মস্ত একটা ঝাঁকি খেল হাঙর, ছিটকে পিছিয়ে গেল। এখনও পা চোয়ালের ভিতর। এক সেকেণ্ড পর ভেসে উঠল ওটার লাশ। এখনও মুখের ভিতর নিশাতের, পা। শেষ। মুহূর্তেও শিকার ছাড়তে চায়নি।
বেদম এক লাথি দিয়ে হাঙরের লাশ সরিয়ে দিল নিশাত, ছাড়িয়ে নিল পা। লাফ দিয়ে উঠে এল ডানজনে, অনেক কাজ পড়ে আছে ওর।
হাঙরের সঙ্গে যখন লড়াই করছে নিশাত, সেই একই সময়ে কোভাকের পিছু নিয়েছে রানা। এবং ধরেও ফেলেছে তাকে। চার ফুট দূর থেকে ডাইভ দিয়ে চলে গেল রানা দরজার কাছে।
আইএসএস এজেণ্ট লাথি দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল রানাকে। কিন্তু হাঁটুর পাশে ধাক্কা দিয়ে ভারসাম্য নষ্ট করে দিল রানা ওর। পরমুহূর্তে লাফিয়ে উঠেই ঘুষি বসাল রানা লোকটার চোয়ালে। ছিটকে পড়ল সে দেয়ালে। আর বেরোতে পারবে না ডানজন থেকে। সিধে হয়ে দাঁড়াবার আগেই তার চোয়ালে নামল রানার ভয়ঙ্কর ঘুষি। ভাঙা নাক থেকে ছিটকে বেরোল রক্ত
রানার পর পর দুই ঘুষি ভেঙে দিল কোভাকের চোয়াল। সুযোগই পেল না লোকটা, তাকে দুই হাতে মাথার উপর তুলে নিল রানা, পরক্ষণে ছুঁড়ে ফেলল গিলোটিনের তক্তার উপর। ধড়মড় করে উঠে পালাতে চাইল কোভাক।
গিলোটিন ব্যবহার করবি, না? ঝড়ের মত সামনে বেড়েছে রানা, খপ করে শুরিকেন ধরেই টান দিয়ে সরিয়ে নিল ফ্রেম থেকে।
নাহ! আর্তনাদ করে উঠল কোভাক। এখনও সরতে পারেনি গিলোটিনের তলা থেকে। নাহ!
তখনই খটাৎ আওয়াজে তার গর্দানের উপর নামল গিলোটিনের ব্লেড।
গলা থেকে ছিটকে আরেকদিকে রওনা হলো কোভাকের মুণ্ডু, যেন ফুটবল। এখনও দেখছে, পিটপিট করছে দুই চোখ। কয়েক সেকেণ্ড পর শিথিল হলো গালের পেশি। দৃষ্টিতে রয়ে গেছে ভয়।
গিলোটিনের দশ গজ দূরে হাঙরের পুলে ভেসে উঠেছে কুয়াশা, এখনও লড়ছে জন উইলসনের বিরুদ্ধে।
ডেল্টা ট্রেনিং কাজে লাগাতে চাইছে উইলসন, কিন্তু সুবিধা করতে পারছে না। পরস্পরের মুখ ও বুক লক্ষ্য করে ঘুষি মারছে। দুজন। জাপানি এক মস্ত গুরুর কাছে খালি হাতের লড়াই শিখেছে কুয়াশা। অনায়াসেই উইলসনের ঘুষি বা চপ এড়িয়ে যাচ্ছে। দুজনই জানে, এই লড়াই শেষে বাঁচবে মাত্র একজন।
পানির ভিতর মুখোমুখি হয়ে হঠাৎ করেই ভেসে উঠল দুজন। কিন্তু ছোট্ট একটা পিস্তল দেখা দিয়েছে উইলসনের হাতে। ওটার মাযল ঠেকিয়ে দিল কুয়াশার থুতনিতে।
জিতে গেছে সে লড়াইয়ে।
জানতাম তুই পালাতে পারবি না, কুয়াশা! দাঁতে দাঁত চেপে বলল উইলসন। এবার আমার ভাই স্বর্গে ভাল থাকবে!
কখনও পালাতে চাইনি, পাল্টা বলল কুয়াশা।
তাই? দাঁতে দাঁত পিষল উইলসন।
হ্যাঁ! হঠাৎ করেই কাঁধের ভয়ঙ্কর শক্তি ব্যবহার করে উইলসনকে ঘুরিয়ে দিল কুয়াশা। ওদিক দিয়ে ছুটে আসছে দ্বিতীয় টাইগার শার্ক!
পূর্ণ গতি নিয়ে উইলসনের বুকে গুঁতো দিল দশফুটি হাঙর। এক খাবলা মাংস তুলল বুক থেকে। আরাম করে চিবাতে শুরু করেছে। পরের খাবলা মাংস নিল পাঁজর থেকে। কুয়াশার পাঁচ ইঞ্চি দূরে আরাম করে ভেজে ব্যস্ত হাঙর। উইলসনের হাতের রক্তের লোভনীয় গন্ধেই ছুটে এসেছে। পাত্তাই দিল না কুয়াশাকে।
বিকট চিৎকার জুড়েছে জন উইলসন। তাকে জীবন্ত খেয়ে ফেলছে মস্ত হাঙর!
লাফ দিয়ে কূপের পারে উঠে এল কুয়াশা। একবার দেখল রক্তাক্ত ফেনার ভিতর এখনও পাগলের মত হাত নাড়ছে লোকটা। এক সেকেণ্ড পর তলিয়ে গেল।
রানার দিকে রওনা হয়ে গেল কুয়াশা।
ওদের দেখা হলো গিলোটিনের পিছনে
এইমাত্র রঘুপতিকে ওখানে সরিয়ে নিয়েছে রানা। ডানজনে কূপের ওদিকে এখনও রয়ে গেছে চার ডেল্টা সৈনিক, গুলি করছে ওদেরকে লক্ষ্য। কয়েকটা অস্ত্র জোগাড় করেছে রানা। দুটো কোল্ট কমাণ্ডো। অ্যাসল্ট রাইফেল, একটা এমপি-৭, কুয়াশার এইচঅ্যাণ্ডএইচ ৯এমএম পিস্তল এবং বৈজ্ঞানিকের ইকুইপমেন্ট ভরা ইউটিলিটি ভেস্ট। শেষের জিনিসটা এসেছে এক মৃত ডেল্টা সৈনিকের কাছ থেকে।
ওদের পাশে পৌঁছে গেল নিশাত।
শেষবার আপনাকে দেখেছি এমভি লোটাস সুপারট্যাঙ্কারের মেইনটেন্যান্স শ্যাকে নিশাতকে বলল কয়াশা। তখন হেণ্ডিকের। লোক আরপিজি ছুঁড়ল। কোথায় লুকিয়েছিলেন? মেঝে তো ছিল পরিষ্কার।
মেঝে দিয়ে কী হবে? বলল নিশাত। ওই শ্যাক ঝুলছিল হোল্ডের ছাত থেকে। ছাতে আবার একটা হ্যাচ ছিল। সোজা। উঠে গেছি ওখানে। আর তারপর তো কচুর গোটা জাহাজ…
আপনি কী করে জানলেন আমরা এখানে থাকব? জানতে চাইল কুয়াশা।
ভেস্ট থেকে ওয়াটারপ্রুফ পাউচ বের করল নিশাত, ওটা থেকে নিল পাম পাইলট। আপনার কাছে দারুণ সব মজার খেলনা আছে, মিস্টার কুয়াশা। আর… রানার দিকে চাইল নিশাত। স্যরের হাত ভরা আছে মাইক্রোডটে।
আপনাকে ফিরে পেয়ে ভাল লাগছে, বলল রানা।
গিলোটিনে ঠং করে লাগল এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র বাউন্টি হান্টারদের গুলি।
চট করে ঘুরে চাইল রানা। মাত্র দশগজ দূরে খোলা দরজা।
আমি চললাম ডেমিয়েন ডগলাসের পিছনে, বলল রানা।
আপা, আপনি রঘুপতির পাশে থাকুন। শেষ করে আসবেন শত্রুদেরকে। কুয়াশা, আপনি আমার সঙ্গে যেতে চান?
একবার রঘুপতিকে দেখল কুয়াশা, তারপর বলল, আমি। তোমার সঙ্গে যাব।
রানার পরনে এখনও কুয়াশার দেয়া ইউটিলিটি ভেস্ট। একটা রাইফেল কুয়াশাকে দিল রানা। এ ছাড়া ৯মএম পিস্তল এবং নানা কিছু ভরা ভেস্ট। নিন, আপনার কাজে আসবে। চলুন রওনা হয়ে যাই। আপা, আপনি আমাদেরকে কাভার দেবেন।
অস্ত্র ঘুরিয়ে নিল নিশাত, এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউর লোকগুলোকে লক্ষ্য করে কাভার ফায়ার শুরু করল।
দরজার দিকে ছুট দিল রানা। ওর পিছনে কুয়াশা। অবশ্য তার আগে নিশাতের কাছ থেকে কী যেন নিয়েছে।
ওটা দিয়ে কী করবেন, মিস্টার কুয়াশা? পিছন থেকে জানতে চাইল নিশাত।
রানার পিছনে পাথুরে ডোরওয়ে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল কুয়াশা, মন বলছে কাজে আসবে।
দেয়ালের ব্র্যাকেটে রাখা মশালের লালচে আলোয় ঝড়ের গতিতে প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল দুজন নিজেদের কাজে খুবই দক্ষ। একে অপরকে কাভার দিচ্ছে। মাঝে মাঝেই ঝলসে উঠছে কোল্ট কমাণ্ডো অ্যাসল্ট রাইফেলের মাযল।
সুযোগই পেল না এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-র ছয় মার্সেনারি।
রানা আগেই ধারণা করেছিল এবেলহার্ড এদিকে রাখবে তার লোকদেরকে।
স্টেয়ারওয়েলের তিনটি ধাপে দুজন করে রেখেছে সে। গুলি করছে দেয়ালের অ্যালকোভ থেকে।
ঝড়ের গতিতে উঠতে থাকা দুই যোদ্ধার গুলির তোড়ে উড়ে গেল দুই মার্সেনারি। লাশ হয়ে পড়ে রইল সিঁড়ির ধাপে।
পরের ল্যাণ্ডিঙের দুই মার্সেনারি কিছুই শোনেনি। বাঁকের ওদিক থেকে এল দুটো শুরিকেন, বুমেরাঙের মত আঘাত হানল দুই সৈনিকের কপালে। কেটে ঢুকে গেল মগজে, সেখানেও কয়েক পাক ঘোরার পর থামল।
তৃতীয় ধাপের দুই মার্সেনারি সতর্ক। তারা একটা ফাঁদ পেঠেছে।
স্টেয়ারওয়েলের উপরে সুড়ঙ্গে অপেক্ষা করছে। পিছনে অ্যান্টি-রুম। ওদিক দিয়ে যাওয়া যায় ফুটন্ত তেলের সুড়ঙ্গে। শেষমাথায় ডেমিয়েন ডগলাসের অফিসে অপেক্ষা করছে কার্ট কে. এবেলহার্ড। পাহারা দিচ্ছে ডগলাস ও ড্যাবলারকে।
স্টেয়ারওয়েলের উপরে পৌঁছে থামল রানা ও কুয়াশা। উঁকি দিতেই দেখল সুড়ঙ্গে দুই মার্সেনারি। এদেরকে শেষ করতে পারলে অন্যদেরকে কোণঠাসা করতে পারবে।
এবার ব্যস্ত হয়ে উঠল রানা। আগের জায়গায় রয়ে গেল কুয়াশা।
ঝড়ের মত অ্যান্টি-রুম পেরোল রানা, গুলি করছে সুড়ঙ্গের দুই মার্সেনারিকে লক্ষ্য করে।
পাল্টা গুলি পাঠাল তারাও।
রানা, না! পিছন থেকে সতর্ক করতে চাইল কুয়াশা। ওটা একটা ফাঁ…
অনেক দেরি হয়ে গেছে ওর।
অ্যান্টি-রুমের তিনদিকে ইস্পাতের দরজা নেমে এল সড়সড় করে। চতুর্থ দরজা আটকে দিল স্টেয়ারওয়েলের দিক। এখন আর অ্যান্টি-রুম থেকে সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারবে না কুয়াশা।
বিকট আওয়াজে নেমেছে ইস্পাতের দরজা।
আলাদা হয়ে গেছে রানা ও কুয়াশা।
সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছে রানা। সামনের মেঝেতে পড়ে আছে। দুই মার্সেনারি। একজন মারা গেছে, অন্যজন গুঙিয়ে চলেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায়, বাঁচবে না।
অ্যান্টি-রুমে রয়ে গেল কুয়াশা। বদ্ধ সুড়ঙ্গে থমকে দাঁড়াল রানা।
স্পিকারে ডেমিয়েনের কণ্ঠ শুনল: মেজর রানা, খুশি হয়েছি। তোমাকে চিনতে পেরে। কুয়াশার দক্ষতাও দেখলাম। তবে এবার বিদায় নিতে হবে তোমাদের দুজনকেই।–অ্যান্টি-রুমে চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল কুয়াশা। সিলিঙের দিকে চোখ যেতেই দেখল, ওখানে পাথুরে দেয়ালে গেঁথে দেয়া হয়েছে ছয়টি মাইক্রোওয়েভ এমিটার।
সর্বনাশ! ফিসফিস করল কুয়াশা।
কিন্তু এখন খেলা শেষ, স্পিকারে গমগম করছে। ডেমিয়েনের কণ্ঠ, এবার ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়ে বিদায় নেবে তোমরা।
নিজের অফিসে প্লাস্টিকের ছোট জানালা দিয়ে ওদিকে চাইল ডেমিয়েন। সামনে ফুটন্ত তেলের সুড়ঙ্গ। ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মাসুদ রানা, বন্দি।
গুডবাই, জেন্টলমেন।
টেবিল থেকে রিমোট কন্ট্রোল তুলে নিয়ে দুটো বাটন টিপল ডগলাস। দুই বুবি ট্র্যাপ চেম্বারে চালু হয়েছে দুই মরণ ফাঁদ।
কুয়াশার অ্যান্টি-রুমে গুনগুন করে উঠল মাইক্রোওয়েভ এমিটার। ওদিকে রানার সুড়ঙ্গের নালা দিয়ে নামতে শুরু করেছে ফুটন্ত তেল।
প্রথমে অ্যান্টি-রুমে ভ্রমর গুঞ্জন শুনল ডেমিয়েন ডগলাস। তখনই গুলির আওয়াজ শুরু হলো।
আগেও কেউ কেউ এমন চেষ্টা করেছে।
বেরিয়ে যেতে চেয়েছে অ্যান্টি-রুম থেকে। কিন্তু ইস্পাতের দরজার কারণে কিছুই করবার থাকে না। গুলি করে উড়িয়ে দেয়া যায় না মাইক্রোওয়েভ এমিটার, গেঁথে দেয়া হয়েছে রিইনফোর্সড পাথুরে দেয়ালে।
ডেমিয়েন ডগলাসের জানালার ওপাশে বিস্ফোরণের আওয়াজ চলছে। সুড়ঙ্গে নামছে ফুটন্ত হলদে তেল। ওদিকে আর রানাকে দেখতে পেল না ডগলাস।
দেখবার দরকার পড়ে না। তার জানা আছে এখন কী ঘটছে।
গোটা সুড়ঙ্গে নামছে স্প্রে করা আগুন গরম তেল। মাসুদ রানার বিকট আর্তনাদ শুনল ডেমিয়েন।
অবশ্য, দুই মিনিট পরেই মিলিয়ে গেল কুয়াশা ও রানার আর্তনাদ। আর গোলাগুলির আওয়াজ নেই। নিশ্চিন্ত হয়ে স্টিলের দরজা খুলে দিল ডেমিয়েন ডগলাস।
আর তখনই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল।
টানেলের মেঝেতে পড়ে আছে এগযেকিউশন সলিউশন ফর ইউ-এ দুই মার্সেনারি, পুড়ে গেছে। তাদের একজনের দুই হাত আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে আকাশে উঠেছে। ভয়ঙ্কর কষ্ট পেয়ে মরেছে লোকটা। আড়াল চেয়েছিল ফুটন্ত তেল থেকে।
কিন্তু সুড়ঙ্গের কোথাও মাসুদ রানাকে দেখা গেল না।
অবশ্য টানেলের শেষে অ্যান্টি-রুমের দরজার কাছে কালো। মানব দেহ আকৃতির কী যেন।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
জিনিসটা একটা কালো পলিমার-প্লাস্টিক বডি ব্যাগ। মার্কোভ টাইপ-৩। সোভিয়েতরা বহু যত্ন নিয়ে তৈরি করেছিল। রানার ভেস্ট থেকে সবই কেড়ে নিয়েছিল জন উইলসন, রয়ে গিয়েছিল মাত্র একটা জিনিস–ওই ব্যাগ যে-কোনও কেমিকেল কন্টামিনেশন ঠেকাতে পারে। আরও একটা কাজ পারে, অনায়াসেই ঠেকিয়ে দেয় ফুটন্ত তেল!
বডি ব্যাগের যিপার টেনে খুলল রানা, ভোজবাজির মত বেরিয়ে এল এম-৭ মেশিন পিস্তল হাতে।
ওর প্রথম গুলিতে ডেমিয়েন, ডগলাসের হাত থেকে উড়াল দিল রিমোট কন্ট্রোল। খোলাই থাকল টানেলের দরজা।
দ্বিতীয় গুলিতে উড়ে গেল ডেমিয়েন ডগলাসের বাম কান। রানার হাতে অস্ত্র দেখেই ডোরফ্রেমের আড়াল নিয়েছে লোকটা।
এক সেকেণ্ড দেরি হলে উড়ে যেতে কপাল।
সরু টানেলে ঝড়ের গতিতে সামনে বাড়ল রানা, হাতে উদ্যত এমপি-৭।
অফিসের ডোরওয়ে থেকে পাল্টা গুলি পাঠাল কার্ট কে. এবেলহার্ড।
দুজনের তুমুল গোলাগুলিতে টানেলের কলামে লেগে পাথরের কুচি নানাদিকে ছুটল।
এবেলহার্ডের পিছনের সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত। প্যানোরামিক উইণ্ডো ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল।
দুজনই আড়াল নিয়েছে। এখন মূল কথা: আগে শেষ হবে কার গুলি? রানার, না এবেলহার্ডের? আগেই ফুরিয়ে গেল রানার অস্ত্রের গুলি। অফিসের ডোরওয়ে এখনও দশ ফুট দূরে।
পাথুরে সরু এক কলামের আড়ালে সরে গেল রানা। ভালভাবে লুকাতে পারেনি।
হাসল কার্ট কে, এবেলহার্ড। এবার রানাকে বাগে পেয়েছে সে।
কিন্তু তখনই আবারও এবেলহার্ডের দিকে এল একরাশ গুলি। বুলেট আসছে রানার পিছনে টানেলের শেষে অ্যান্টি-রুম থেকে।
অবাক হয়েছে রানা, ঘুরে চাইল ওদিকে।
সুড়ঙ্গে ঢুকেছে কুয়াশা, ঝড়ের মত আসছে। আগুন ঝরছে। কোল্ট কমাণ্ডো অ্যাসল্ট রাইফেলের মাযল থেকে।
অ্যান্টি-রুমের দিকে চোখ গেল রানার।
মেঝেতে পড়ে আছে ডজনখানেক ৯এমএম গুলির খোসা। মাইক্রোওয়েভ এমিটার ঠেকাতে গুলি করেছে কুয়াশা।
কিন্তু ওই খোসাগুলো সাধারণ বুলেটের নয়। খোসার উপর অংশে কমলা রঙের ব্যাণ্ড।
সাধারণ বুলেটে কিছুই হতো না। অ্যান্টি-রুমের মাইক্রোওয়েভ এমিটারের, কিন্তু কুয়াশার গ্যাস-এক্সপ্যাণ্ডিং বুল স্টপার অন্য জিনিস।
কুয়াশা গুলি করছে বুঝতেই আর দেরি করল না রানা, রওনা হয়ে গেল অফিস লক্ষ্য করে।
গুলির মুখে পিছাতে হচ্ছে এবেলহার্ডকে। কয়েক সেকেণ্ড পর ফুরিয়ে গেল তার গুলির ম্যাগাযিন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, ফুরিয়ে গেছে কুয়াশার গুলিও।
তীরের মত গিয়ে অফিসে ঢুকল রানা। ওর ডানহাতি পর পর দুটো ঘুষি নামল এবেলহার্ডের ভাঙা নাকে।
ব্যথায় আহত বাঘের মত গর্জন ছাড়ল লোকটা। রানার সঙ্গে শুরু হয়ে গেল হ্যাণ্ড-টু-হ্যাণ্ড কমব্যাট।
একপক্ষে বাংলাদেশ আর্মির প্রাক্তন মেজর, অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্ধর্ষ রেকণ্ডো।
পরস্পরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। কিন্তু এ সুযোগে সামনে বাড়ল ব্যাঙ্কার ড্যাবলার, হাতের আস্তিন থেকে বের করেছে চকচকে ছোরা। লাফিয়ে গিয়ে রানার পিঠে ফলা বিধিয়ে দিতে চাইল সে।
রানার মেরুদণ্ডের এক ইঞ্চি দূরে পৌঁছে গেল ক্ষুরধার ফলা। কিন্তু তখনই লোকটার কব্জির উপর ভয়ঙ্কর চাপ এল। কাত হয়ে অবাক চোখে কুয়াশার চোখে চাইল ড্যাবলার।
তুমি দেখছি কোনও আইনই মানো না, বলল কুয়াশা। চাপ বাড়ছে হাতের। কিন্তু অন্য আস্তিন থেকে আরেকটা ছোরা বের করেই কুয়াশার ঊরুতে গেঁথে দিল ড্যাবলার। আবারও ছোরা তুলল সে, বিদ্যুদ্বেগে চালাল শত্রুর বুক লক্ষ্য করে।
সামান্য ছুঁয়েছে ছুরির ফলা, তাতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল কুয়াশার প্রশস্ত বুক থেকে। এ লোককে অবজ্ঞা করা যায় না। পিছিয়ে গেল কুয়াশা। আগের চেয়ে অনেক সতর্ক। এত ধারাল ছোরা আগে দেখেনি।
ব্যাঙ্কারের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন মাপা।
সুইস গার্ডসে ছিলে, না ড্যাবলার? পরবর্তী হামলা ঠেকাতে প্রস্তুতি নিল কুয়াশা। জানতাম না। ভাল।
আমার যে ব্যবসা, সতর্ক থাকতে হয়, বাঁকা হাসল। ড্যাবলার।
দরজার কাছে একে অপরকে কাবু করতে চাইছে রানা ও এবেলহার্ড।
রানার চেয়ে আকারে বড় এবেলহার্ড, শক্তিও বেশি। তার। চেয়ে বড় কথা, তার ট্রেনিংও একই মাপের।
বিদ্যুদ্বেগে সরছে রানা। এড়িয়ে যাচ্ছে মারাত্মক সব ঘুষি।
কিন্তু গত কয়েক দিনের পরিশ্রম, এক্স-১৬ বিমান ক্র্যাশের ধকল, তারপর ফ্রান্সে ওকে ধরে আনা–সব মিলে ও অত্যন্ত ক্লান্ত।
ওর একটা ঘুষি অনায়াসে এড়িয়ে গেল এবেলহার্ড, পরক্ষণে এক ঘুষিতে রানার নাকের হাড় গেঁথে দিতে চাইল মগজে। ওই এক আঘাতেই মারা পড়বে শত্রু। ২৪৫
শেষসময়ে টলতে টলতে পিছিয়ে গেল রানা। বুঝে গেছে ভারসাম্য রাখতে পারবে না, কিন্তু পড়ে যাওয়ার আগে গায়ের জোরে ঘুষি বসিয়ে দিল এবেলহার্ডের অ্যাডাম্স্ অ্যাপলের উপর।
পরক্ষণে হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ল দুজন।
দরজার চৌকাঠে পড়েছে এবেলহার্ড, হাপরের মত হাঁপিয়ে চলেছে। তারই পাশে ডোরফ্রেমে পিঠ ঠেকিয়ে বসল রানা।
গোঙানোর মাঝে বুটের খাপ থেকে ওয়ারলক হান্টিং নাইফ। বের করল এবেলহার্ড।
দেরি করে হয়ে গেছে তোমার, চাপা স্বরে বলল রানা।
বিস্ময়ের ব্যাপার: ওর হাতে কোনও অস্ত্র নেই।
তার চেয়েও ভাল কিছু পেয়েছে।
ওর হাতে এখন ডেমিয়েন ডগলাসের রিমোট।
রবিন আর অ্যাটলকের হয়ে এটা দিলাম তোমাকে, রিমোটের বাটন টিপে দিল রানা।
ছাত থেকে সড়াৎ করে নামল ইস্পাতের ভারী দরজা। খটাৎ আওয়াজে নামল এবেলহার্ডের মাথার উপর। লোকটা ঝুঁকি খেয়ে পাথুরে মেঝেতে সটান হলো। দরজা চেপে বসেছে মাথার উপর। ফটাক! আওয়াজ তুলে ফেটে গেল লোকটার করোটি, নানাদিকে ছিটকে গেল ধূসর মগজ ও টকটকে লাল রক্ত।
কার্ট কে. এবেলহার্ড মারা যাওয়ায় ঘুরে চাইল রানা। ঝট করে তুলে নিল লোকটার ছোরা।
যার জন্য এসেছে, তাকে দেখল ডেস্কের পিছনে।
বাইরে ভয়ঙ্কর বাজ পড়ল। আকাশ চিরে দিল নীল বিদ্যুৎ। পিছনের জানালা দিয়ে ঝরঝর করে ভিতরে পড়ছে বৃষ্টি।
চুপ করে রানাকে দেখছে ডেমিয়েন ডগলাস, ডেস্কের আড়াল থেকে তুলল ডানহাত। ভয়ঙ্কর-দর্শন মাউযার পিস্তলটা দেখাল। ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের দুই চোখের মণি হাসছে। একটা পচা ডিমের মত, অন্যটা নীল।
ওই একইসময়ে ড্যাবলারকে বাগে পেল কুয়াশা। ঝট করে সরে গেল বামদিকে। ওর দেহের পাশ দিয়ে পিছনের কাঠের প্যানেলে বিধল ড্যাবলারের ছোরা। পরক্ষণে দুই হাতে লোকটাকে মাথার উপর তুলে নিল কুয়াশা। ভয়ঙ্করভাবে আছড়ে ফেলল। মেঝেতে পড়ে ঠাস্ আওয়াজ তুলল ড্যাবলারের মাথা। দু টুকরো হয়ে গেছে করোটি। মাত্র একবার ঝাঁকি দিয়েই স্থির হলো। প্রায় একইসময়ে ভেস্ট থেকে ব্লো টর্চ বের করেছে কুয়াশা, নীল আগুন জ্বেলে নিয়েই ওটা ছুঁড়ে দিল ডেমিয়েন। ডগলাসের উদ্দেশে।
চট করে ব্লো টর্চের গতিপথ থেকে সরে গেল বিলিয়োনেয়ার।
তোদের মাফ নেই, চাপা স্বরে বলল। পিস্তলের মাযল তাক করল রানার নাকে। ট্রিগারে চেপে বসছে তর্জনী।
গত কয়েকদিনের বেদম পরিশ্রমে ফুরিয়ে গেছে রানার শক্তি। ভেঙে আসছে শরীর। কিন্তু হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে এবেলহার্ডের ছোরাটা ছুঁড়ল ডেমিয়েনের বুক লক্ষ্য করে।
ছোরার পিছনে ঝড়ের গতিতে ছুটতে শুরু করেছে রানা। যে-কোনও সময়ে বুকে বা মাথায় বিধবে বুলেট।
ছুটবার ফাঁকে হঠাৎই থেমে গেল রানা। এইমাত্র ফুটো হয়ে গেছে লোকটার বুক ও গলা! পিস্তলের ট্রিগার টেপার সময়ও পায়নি বিলিয়োনেয়ার।
ডেমিয়েনের বুকে বিঁধেছে রানার ছোরা এবং কুয়াশার শুরিকেন দুটুকরো করে দিয়েছে তার পিস্তল ধরা হাত। ঝটকা দিয়ে পিছিয়ে গেল ডেমিয়েন, বুঝল না এত ব্যথা কীসের। আরও এক পা পিছাল অজান্তে, তারপর উধাও হলো ভাঙা প্যানোরামিক উইণ্ডোর ওপাশে।
বিকট আর্তচিৎকার ভেসে এল নীচ থেকে।
দ্রুত পায়ে জানালার সামনে পৌঁছে গেল রানা। দুর্গ থেকে চার শ ফুট নীচে খলখল করছে আটলান্টিক মহাসাগর। ইতোমধ্যেই অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়েছে ডেমিয়েন। সরু একটা তাকে নামল প্রথমে। ওখান থেকে মাথাটা ফাটিয়ে নিয়ে ছিটকে পড়ল নীচের সাগরে। মুহূর্তে ঢেউয়ের তলে টুপ করে ডুবে গেল ভাঙাচোরা মূর্তিটা।
জানালায় রানার পাশে এসে দাঁড়াল কুয়াশা। একটা কথাও বলল না ওরা। চেয়ে রইল নীচের সাগরের দিকে। এত উপর থেকে পড়লে কেউ বাঁচে না। ডেমিয়েন ডগলাসও নেই।
.
দশ মিনিট পর দিগন্তে মেঘের আড়াল থেকে মুখ তুলল সোনালি সূর্য। সেই আলোয় ফোট্রেস দো শ্যাটিয়নে আসা-যাওয়ার পথে দেখা দিল একটা অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি। তুমুল গতি। স্টিয়ারিং হুইলের পিছনে কুয়াশা। পাশেই রানা। পিছন সিটে নিশাত সুলতানা ও রঘুপতি। দুর্গের এয়ারফিল্ড লক্ষ্য করে চলেছে গাড়ি।
একপেশে সংক্ষিপ্ত লড়াই হলো এয়ারফিল্ডে। দুই পাইলটের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হলো ড্রাগন কর্পোরেশনের একটা হেলিকপ্টার। আরোহীদেরকে নিয়ে সূর্যের দিকে রওনা হয়ে গেল ওটা।
ষোলো
পরের এক সপ্তাহে দুনিয়া জুড়ে বেশকিছু অস্বাভাবিক দুর্ঘটনা ঘটল।
ইটালির মিলানে অ্যারোস্টাডিয়া ইটালি এয়ারশোতে চুরি হলো। এক হ্যাঙার থেকে চুরি গেল একটা ফাইটার বিমান।
নামকরা ইউএস এক্স-১৬ রকেট বিমান ওই শো-তে দেখানো সম্ভব হয়নি। তার উপর এখন এ ধরনের চুরি! ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখল না জনসাধারণ।
সাক্ষ্য দিল কেউ কেউ, কালো ওই বিমান সরাসরি আকাশে উঠেছিল। দেখতে ছিল রাশান সুখোই এস-৩৭ অ্যাটাক ফাইটার বিমানের মতই। অবশ্য, কর্তৃপক্ষ জোর গলায় বলল, তাদের
শো-তে এ ধরনের কোনও বিমানই ছিল না।
অক্টোবরের ষোলো তারিখে আমেরিকার কয়েকজন জেনারেল ও অ্যাডমিরালকে গ্রেফতার করা হলো। উধাও হয়ে গেল কয়েকজন কর্নেল ও মেজর।
পরবর্তী তিন দিনে খুন হলো বেশ কয়েকটি বাউন্টি হান্টিং সংগঠনের বাছা বাছা কিছু লোক। লড়তে গিয়ে করুণভাবে মারা গেল ডেভিড এন. হেণ্ডিক ও তার ইউনিটের সবাই। গা ঢাকা দিল বাউন্টি হান্টার পোলিশ ও জাপানি ললনা মাসু হোকামা।
এদিকে দুনিয়ার সেরা বড়লোক পরিবারগুলোয় নেমে এল খুবই দুঃখজনক সব মৃত্যু।
দুর্ঘটনার কারণে নানাভাবে মরল বিত্তবান লোকগুলো।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সাফারিতে গিয়ে উধাও হলো ফ্রান্সিস ওলিফ্যান্ট। তার গোটা প্রাইভেট হান্টিং পার্টির কেউ ফিরল না।
তারই চারদিন পর হার্ট অ্যাটাকে ঘুমের ভিতর মারা গেল গ্রিক শিপিং ম্যাগনেট ওয়েণ্ডেল রোচ।
অ্যাসপেন লজে উপপত্নীর বাড়িতে মৃত পাওয়া গেল র্যানডলফ কিলিয়ানকে।
কাউন্ট্রি ম্যানশনে খুন হলো ডিন ম্যাকেনকোর্ট।
নিউ ইয়র্কের হেডকোয়ার্টারের সামনে ফার্মাসিউটিক্যাল টাইকুনকে পিষে দিল এক ট্রাক। পরে আর ট্রাক বা ড্রাইভারের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।
উত্তরাধিকারীরা তাদের সাম্রাজ্য বুঝে নিল। বরাবরের মতই চলতে থাকল পৃথিবী। কিন্তু ওসব দুর্ঘটনার কারণে গোপন একটা মেমো পাঠানো হলো ইউএসএ-র প্রেসিডেন্টের কাছে।
কাগজে শুধু লেখা ছিল:
স্যর, সব কাজ শেষ। ম্যাজেস্টিক-১২ এখন আর নেই।
.
চিরহরিৎ মায়াময় বাংলাদেশ।
রাজধানী ঢাকা থেকে সামান্য দূরে, আশুলিয়া।
অক্টোবরের তেইশ তারিখ। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা। জঙ্গলমত জায়গায় সুন্দর একটি ছোট্ট বাড়ি ওটা। নিশাতের বাবার।
সামনের ফুলের বাগানে হরেক ফুল ফুটেছে, চারপাশ মৌ মৌ করছে মিষ্টি সুবাসে।
কাঠের চেয়ার নিয়ে বাগানে এসে বসেছে কয়েকজন। চলছে নানান গল্প।
বাগানের ডানদিকে কয়লার আগুনে চড়িয়ে দেয়া হয়েছে আস্ত খাসি, কাবাব তৈরি হচ্ছে। আরেক চুল্লিতে ঝলসাচ্ছে নানরুটি।
নিশাত সুলতানার বাবা আজকের বাবুর্চি, খুশিমনে নিজের কাজে ব্যস্ত।
অতিথিদের সঙ্গে রয়েছে এক সাদা চামড়ার যুবক।
তাকে খুলে বলা হয়েছে কীভাবে রানা, নিশাত, তিশা ও খবির জড়িয়ে গিয়েছিল বাউন্টি হান্টে। আর কীভাবেই বা ওদেরকে বারবার রক্ষা করেছে বৈজ্ঞানিক কুয়াশা।
সব শোনার পর নিজ কাহিনি সংক্ষেপে বলল শ্বেতাঙ্গ যুবক। তার নাম কেভিন কনলন।
একপর্যায়ে বলল, আমেরিকান সরকার: মৃত্যু-হুঁলিয়া তুলে নিয়েছে কুয়াশার মাথার ওপর থেকে। এখন ইচ্ছে করলেই ও দেশে যেতে পারবেন তিনি।
উনি তা চান, তাই ভাবছেন? হাসল নিশাত। নামের মতই কুয়াশায় ঢেকে রাখতে চান নিজেকে।
সবাই গল্প করছে, কিন্তু হঠাৎ করেই চেয়ার ছাড়ল রানা। তিশা, আমি একটু ঘুরে আসি।
আস্তে করে মাথা দোলাল তিশা। আগেই বলেছে, জীবনেও বাঁধতে চাইবে না রানাকে সংসারের জালে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয় তিশা বাংলাদেশ আর্মি থেকে ওকে ছুটি দেয়া হয়েছে।
নিশাত ও খবিরও ছুটি পেয়েছিল। কিন্তু আগামীকাল যোগ দিতে হবে অফিসে।
কোথায় যাবেন, স্যর? পিছন থেকে জানতে চাইল খবির। আগেও ন্যাওটা ছিল রানার, এখন আরও বেশি হয়েছে। আমি সঙ্গে আসব?
না, লাগবে না। একটু হেঁটে আসি। বাগান পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল রানা। অস্পষ্ট, করুণ এক সুর শুনেই রওনা হয়েছে।
বিশগজ যাওয়ার পর ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। আস্তে আস্তে হাঁটছে। এ বুঝে গেছে, এই সাঁঝে কে বাজাচ্ছে সরোদে রহস্যময় মধুর। রাগ শিবরঞ্জনী।
মস্ত শিল্পী ওই মানুষ। অদ্ভুত কষ্ট বুকে। যেন হারিয়ে বসেছে প্রেয়সীকে। আর কখনও দেখা হবে না।
পনেরো গজ যাওয়ার পর জঙ্গলের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেল। রানা। সামনে হাওড়ের মত জলভূমি।
মাঝারি একটা লঞ্চ ভাসছে বিশ ফুট দূরে। কোনও আলো নেই ডেকে। আকাশ জুড়ে আঁধার নামছে। চারপাশ কেমন কুয়াশাময়। বড় মায়া নিয়ে বাজছে সরোদ। চুপ করে বেদনাময় সুর শুনছে রানা, কিছুক্ষণ পর বাতি জ্বলে উঠল লঞ্চের ডেকে।
সরসর আওয়াজ শুনল রানা।
স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মত কিছু ঘিরে ফেলছে ওই লঞ্চকে।
কুয়াশা? গলা চড়িয়ে ডাকল রানা। কেমন আছেন আপনি?
ভাল, তুমিও ভাল থেকো, জবাবে গমগম করে উঠল পুরুষ। কণ্ঠ। হয়তো আবারও দেখা হবে আমার বা তোমার কোনও বিপদে।
ডুবে যেতে লাগল লঞ্চ।
বিজ্ঞানীর অদ্ভুত জলযানের দিকে চুপ করে চেয়ে রইল। রানা।
মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে তলিয়ে গেল লঞ্চ।
ওখানে রইল শুধু কয়েকটা ঢেউ।
পানিতে তৈরি হলো স্রোত।
একটু পর অবাক করা লঞ্চের কোনও চিহ্নই রইল না।
তুমি সত্যি রহস্যময়, কুয়াশা, বিড়বিড় করল রানা। ঘুরে হাঁটতে লাগল নিশাতদের বাগানবাড়ি লক্ষ্য করে।
***
