Chapter - 1 - 4
০১. পেখম
আকাশজুড়ে জোনাকিদের বাড়ি
বুকের নীচে পাগলা রাজার ঘোড়া
তখন থেকে সবার সঙ্গে আড়ি
তখন থেকে আমার শহর পোড়া!
ধ্বংস ঘেঁটে তোমায় পেলাম মোহর
তোমার আলোয় বাঁচল আমার প্রাণী
কক্ষ থেকে ছিটকে যেত গ্রহ…
উল্কা তোমার কাচের ফুলদানি!
কেমন ছিল সেসব ধুলোখেলা!
কেমন ছিল সাগরপারের রানি!
এই জীবনের নরম বিকেলবেলায়…
আমরা দু’জন, কেবল দু’জন জানি
আমরা দু’জন, মাত্র দু’জন জানি।
আজ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। কাঁঠালচাঁপার গন্ধ চৌধুরীদের ওই লম্বা পাঁচিল টপকে, ঝুমাদিদের কলতলা ঘুরে, হেমন্তকাকুর সাইকেলের কেরিয়ারে বসে চলে আসছে এই এত দূরে, দীপমালা মানে পেখমের কাছে। আজ হাওয়াও দিচ্ছে খুব। ওই দূরে চ্যাটার্জিপাড়ার দিকের জলট্যাঙ্কের পিছন থেকে হাওয়া ভেসে আসছে। হাওয়া উড়ে আসছে। আর ডুবিয়ে দিচ্ছে পেখমকে। ডুবিয়ে দিচ্ছে সোনাঝুরি নামে এই ছোট্ট মফস্সলটিকে।
পেখম সামনের দিকে তাকাল। জ্যোৎস্নার হলুদ লেগে রয়েছে কাজুর মুখে। কাজুর চোখ দুটো বন্ধ। এতক্ষণ নরম গলায় কবিতাটা বলে এখন চুপ করে আছে। যেন হাওয়ায় তুলোর বীজ উড়িয়ে দিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছ! যেন দূরে, আরও দূরে সেইসব বীজ উড়িয়ে, ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এই জ্যোৎস্নার নীচে ভাসিয়ে দিতে চাইছে অক্ষর!
পেখম কিছু বলল না। তাকিয়েই রইল। এই বাসন্তী লুকোচুরি আলোয় ও তাকিয়ে দেখল কাজুকে। একমাথা কোঁকড়া চুল। নরম ঘাসের মতো দাড়ি-গোঁফ। টানা ভুরুর তলায় বড়-বড় চোখ। বন্ধ। পেখমের বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে। মনে হয় পৃথিবীর আর সব কিছু ভুল। আর সব কিছু বাড়তি! শুধু কাজু সঙ্গে থাকলেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে ও।
পেখম তাকিয়ে রইল চোখ বন্ধ করে বসা কাজুর দিকে। আজ ইলেকট্রিক চলে গিয়েছে। ওদের এই ছোট্ট একতলা পাড়াটা কেমন যেন নিঝুম! কাজু পড়াতে এসেছিল ওকে। কিন্তু ঘরে আলো না থাকায় ওরা উঠে এসেছে ছাদে।
পেখম জানে, মা থাকলে ওকে এমন করে কাজুর সঙ্গে ছাদে আসতে দিত না। কিন্তু মা আজ নেই। শুক্রবার বলে পাঠ শুনতে গিয়েছে। কাছেই শানিপাড়ায় গীতাপাঠ হয় শুক্রবার করে। ‘দ্য লাইফ’-এর কাকিমার সঙ্গে মা যায় সেই পাঠ শুনতে।
‘দ্য লাইফ’ এই সোনাঝুরির সবচেয়ে বড় ওষুধের দোকান। খুব চলে। সারাক্ষণ লোকজন ভরতি থাকে। কাকিমার আসল নাম মিতু।
মিতুকাকিমাদের বাড়িটা পেখমদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে। হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিট মতো লাগে। খুব বড় বাড়ি কাকিমাদের। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ঢালাই লোহার নকশা করা দরজা। মাথার উপর কাগজফুলের কেয়ারি করা।
পেখমের কী ভাল লাগে! মনে হয়, এমন একটা বাড়ি যদি ওদের থাকত!
কিন্তু ওদের এমন বাড়ি হবে কোথা থেকে? ওদের বাড়িটা তো ছোট্ট। একতলা। মাথায় ছাদ থাকলেও গায়ে প্লাস্টার নেই। ঠাকুরদা ভাড়া নিয়েছিল পনেরো বছর আগে। সেই পঞ্চাশ সালে, যখন ওরা সকলে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এসেছিল, তখনই ভাড়া নেওয়া হয়েছিল এই বাড়িটা।
পেখমের আবছা মনে পড়ে। তখন তো ওর মোটে পাঁচ বছর বয়স। তাই প্রতিটি স্মৃতিই কেমন যেন আবছা, ঘষা কাচের ওপারে রাখা কোনও ছবি! ভাল মনে পড়ে না। এই বাড়িতেই ওর জ্ঞান হওয়া, বড় হওয়া। তাই এই বাড়ি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না পেখম। কিন্তু তাও ওই মিতুকাকিমাদের বাড়িটা দেখলে মনে হয়, ইস, এমন যদি একটা বাড়িতে থাকতে পারত!
পেখমের ঠাকুরদা বগলাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় এই অঞ্চলে একটা টেলারিং শপ চালান। ওই দেশ থেকে আসার পর ঠাকুরদা কী করবেন বুঝতে না পেরে শেষে এই দোকানটি নেন। ঠাকুরদার যৌবন কেটেছিল কুমিল্লায়। সেখানেই ঠাকুরদাদের মামার বড় কাপড়ের দোকান আর টেলারিং শপ ছিল। এই দর্জির কাজ সেই মামাদের কাছ থেকেই শিখেছিলেন ঠাকুরদা।
দোকানটার নাম মুখার্জি ব্রাদার্স। তবে শুধু টেলারিং নয়, সঙ্গে চা, চানাচুর, বাদাম, বিস্কিটও রাখা হয়। সোনাঝুরি জায়গাটা বড় নয় খুব। কিন্তু যেহেতু একটা বড় জুটমিল আছে, তাই লোকজনের আনাগোনা খুব। ঠাকুরদার দোকানটা খারাপ চলে না।
পেখমের বাবা চাকরি করে পুলিশে। লোকাল থানার মেজবাবু। লোকজন শ্রদ্ধা-ভক্তি করে বেশ। তবে পেখম বোঝে আসলে এটা ভয়। কেন কে জানে সাধারণ লোকজন পুলিশকে বেশ ভয় খায়। কিন্তু ওই ভয়টুকুই যা আছে। তাতে তো আর পেট ভরে না! পেখম প্রায়ই মাকে গজগজ করতে শোনে। মাইনে তো আর বেশি নয়। তবে পেখম শুনেছে বাবাদের চাকরিতে উপরির বন্দোবস্ত আছে। কিন্তু বাবা ওসব দিকে যায় না। লোকে বলে “সবুজবাবু খুব সৎ।” কথাটা শুনলে বাবা রাগই করে। বাবার কথা হল, “আমি যা কাজ করি, তার জন্য সরকার আমায় টাকা দেয়। আমি কেন উপরি রোজগার করতে যাব? আর এই মাইনে যে পাব, সেটা জেনেই তো কাজে ঢুকেছিলাম!”
পেখম জানে সকলে বাবার মতো ভাবে না। কেন ভাববে? মায়ের ভাষায় সবাই তো আর ‘বোকা’ নয়!
তবে ভাল বাড়িতে থাকতে না পারলেও ওদের অভাব নেই। পেখমের কলেজের মাইনে। টিউশনির খরচ। গানের স্যারের খরচ। এসব চালাতে বাবার অসুবিধে হয় না।
ওদের ছোট্ট বাড়িটায় পেখমদের সঙ্গে ওর ছোটকাকুরাও থাকে। ছোটকাকু মানে তপন মুখার্জি। সবাই কাকুকে রেফারি হিসেবে চেনে। কলকাতার মাঠে ফুটবল খেলায় রেফারি হয় ছোটকাকু, মানে ছোটকা। তবে সেটা করলে তো আর সংসার চলে না। কাছের সোনাঝুরি জুটমিলের ফোরম্যান হিসেবে চাকরি করে ছোটকা।
ছোটকাকিমা জামসেদপুরের মেয়ে। একটু চুপচাপ ধরনের। আর ওদের একমাত্র ছেলে, প্লাবন। প্লাবনকে টেটু বলে ডাকে সবাই। টেটু এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। লেখাপড়ায় ভাল ছেলেটা। আর পেখমের খুব ন্যাওটা।
পেখম নিজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। বি এ। মায়ের ইচ্ছে ছিল না পেখম পড়ুক। কিন্তু পেখম জেদ ধরেছিল। আর তাতে ঠাকুরদাও সায় দিয়েছিলেন।
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “জীবনে লেখাপড়াই আসল। তুই যতদিন পারবি পড়বি।”
মা যতই রাগী হোক, ঠাকুরদার মুখের উপর কথা বলে না। কেউই বলে না। ঠাকুরমা মারা গিয়েছেন কয়েক বছর আগে। কিন্তু তাতে সাময়িকভাবে ভেঙে পড়লেও অল্প দিনেই নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন ঠাকুরদা।
পেখম অবাক হয়েছিল, “তুমি তো খুব শক্ত মনের!”
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “মৃত্যু তো কম দেখলাম না! দেশভাগের সময় কত জনকে মারা যেতে দেখলাম চোখের সামনে। তবে হ্যাঁ, রাণু আমার সবটা ছিল। ও ছিল বলেই এমন বয়সে দেশ, মাটি ছেড়ে এমন বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে বাস করতে পারলাম। এত মনের জোর আর তো কারও দেখলাম না! তাই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু জীবন কি থেমে থাকে? এক শহরের সামনে দিয়ে নদী কি অন্য শহরের দিকে বয়ে যায় না?”
পেখমের খুব ভাল লাগে ঠাকুরদার সঙ্গে গল্প করতে। রাত ন’টায় ঠাকুরদার দোকান বন্ধ হয়। ইন্দবাবু বলে একজন কারিগর আছেন ঠাকুরদার দোকানে। ন’টার সময় ইন্দবাবুই দোকান বন্ধ করেন। তারপর ঠাকুরদাকে চাবি দিয়ে চলে যান।
ঠাকুরদার দোকানটাও কাছে। হেঁটে দশ মিনিটের মতো লাগে। সোয়া ন’টার মধ্যে ঠাকুরদা বাড়ি চলে আসেন। তখন পেখম কিছুক্ষণ এসে বসে ঠাকুরদার কাছে। গল্প করে। ঠাকুরদাও সারা দিনের রোজগার থেকে বাঁচিয়ে এক টাকা করে দেন পেখমকে।
একটা ঘট আছে পেখমের। তামাটে রঙের। মাটির। গতবছর পুজোয় কিনে দিয়েছিল ঠাকুরদা। সেটাতেই ওই বড় কয়েনটা ফেলে দেয়। টাকা জমায় পেখম। কেন জমায় জানে না। কিন্তু ভাল লাগে। আসলে ওর তো তেমন খরচ কিছু নেই। কলেজের মাইনে, ট্রেনের মান্থলি সবটাই বাবা কেটে দেয়। মা বাড়ি থেকে টিফিন করে দেয়। তবে পথে কিছু সমস্যা হলে যাতে অসুবিধে না হয় তাই পাঁচ টাকা করে দেওয়া হয় পেখমকে।
তবে অসুবিধে আর কী হবে? ট্রেনে করে বালিগঞ্জ যেতে চল্লিশ মিনিটের মতো লাগে। সোনাঝুরি স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠে ওরা। চার বোগির ট্রেন। স্টিম ইঞ্জিনে টানে। খুব বেশি ভিড় হয় না। ওর সঙ্গে নয়না বলে আর-একটা মেয়েও যায়। কয়েকটা ছেলেও যায় ট্রেনে। কিন্তু ওদের সঙ্গে কথা বলে না। নয়না বলে মনোজ কুমারের মতো দেখতে একটা ছেলে নাকি তাকায় খুব ওর দিকে। কিন্তু পেখম পাত্তা দেয় না। আসলে কাজু ছাড়া পৃথিবীতে আর কাউকেই তাকানোর মতো ছেলে বলে মনে হয় না ওর।
কাজুর পুরো নাম বেঞ্জামিন কূজন সরকার। ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ওরা। গঙ্গার কাছে সাহেবপাড়ায় থাকে। তবে সাহেবপাড়া মানে বিরাট কোনও ব্যাপার নয়। আগে, যখন ভারত স্বাধীন হয়নি, তখন সোনাঝুরি জুটমিলে বেশ কয়েকজন সাহেব কাজ করত। তারা এখানে থাকত। সেই থেকে জায়গাটার নাম সাহেবপাড়া।
এখন অবশ্য সাহেবরা নেই। তাদের ফেলে যাওয়া অনেকটা জায়গা আর জঙ্গল নিয়ে চারটে বিশাল বড় বড় বাসি দুধ-চা রঙের বাড়ি পড়ে আছে। লোকে বলে জোনাক-বাড়ি! তবে বাড়িগুলো ময়লা, রং না-করা, ইটের পাঁজর বের করা। সেখানে গাদাগাদি করে বেশ কিছু পরিবার থাকে। কাজুও সেখানেই থাকে। দুটো ঘরের সংসার কাজুদের। বাবা, মা, এক ছোট ভাই, এক বোন, মায়ের এক আন্টি আর ঠাকুরমা। পেখম একবার গিয়েছিল কাজুর সঙ্গে ওদের বাড়ি। তবে লুকিয়ে। বাড়িতে জানে না। জানলে মা আর আস্ত রাখবে না।
ক্লাস নাইনে কাজু পড়াতে এসেছিল ওকে। এই সোনাঝুরিতে কাজুর খুব নাম। লেখাপড়ায় খুব ভাল। স্কুল ফাইনালে ফিফ্থ হয়েছিল। খবরের কাগজেও নাম বেরিয়েছিল। সেই থেকে সবাই সমীহ করে চলে কাজুকে।
কাজুর এক বন্ধু আছে, সতু। ভাল ফুটবল খেলে। তার সূত্রেই কাজুর আলাপ হয়েছিল ছোটকার সঙ্গে। বাবা তখন পেখমকে বাড়িতে পড়াবে এমন কাউকে খুঁজছিল। ছোটকার কথায় কাজু রাজি হয়েছিল পেখমকে পড়াতে।
যেদিন প্রথম কাজু এসেছিল পেখমদের বাড়ি, সেই দিনটা ওর আজও মনে আছে!
জানুয়ারি মাস ছিল সেটা। সকালের আলোর ভিতর কেমন যেন একটা পাতলা দুধের সরের মতো কুয়াশা পড়েছিল। পেখমদের ছোট্ট বাড়িটার পাশের পুকুরের জলে তখনও ভাল করে সূর্য এসে দাঁড়ায়নি। পেখম একটা লাল চাদর গায়ে দিয়ে দু’হাতে গরম দুধের গেলাস ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।
কাজু এসেছিল একটা লাল হলুদ ডোরাকাটা মাফলার আর নীল রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে।
ওদের বাড়িতে ঢুকেই একদম পেখমের মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিল কাজু। আর কেন কে জানে, থমকে দাঁড়িয়েছিল। পেখমও গেলাস হাতে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। অমন হালকা দাড়ি। টানা চোখ। অমন শীতের রোদ্দুরের মতো দৃষ্টি! পেখমের বুকের ভেতরে যে কী হয়ে গিয়েছিল, সেও নিজেও বুঝতে পারেনি। শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছিল, আজ থেকে ওর জীবনটা আর শুধু ওর রইল না।
প্রেম ব্যাপারটাকে পেখম ছোট থেকেই খুব ভয় পায়। ওদের অঞ্চলের ঝিকুদা তো কোন একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে পাগলই হয়ে গেল। এখন ঝিকুদাকে দেখা যায় কখনও চক্রবর্তীর চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে, কখনও মামুর ইলেকট্রিকের দোকানের টুলে বা ঘোষ বাইন্ডিং-এর সামনের বারান্দায় একা-একা বসে আছে। কারও সঙ্গে কথা বলে না। কারও দিকে তাকায় না। পেখমের মনে হয় সোনাঝুরির সবাই বোধহয় ঝিকুদার কাছে স্বচ্ছ কাচের তৈরি।
নয়না খুব ডানপিটে ধরনের মেয়ে। ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারে। সাইকেল চালায়। এমনকী, লুকিয়ে সিগারেটও খায়। একদিন তো নয়না গিয়ে ধরেছিল ঝিকুদাকে। বলেছিল, “তুমি এমন ক্যালানের মতো বসে থাকো কেন গো? একটা মেয়ে ছেড়ে গেল বলে? ন্যাকামিটা কি প্র্যাকটিস করে আয়ত্ত করেছ না জন্মগত?”
পেখম পাশেই ছিল নয়নার। ওর তো ভয়ে ঢিপঢিপ করছিল বুক। কী কেলেঙ্কারি করছে মেয়েটা? ও শুনেছে ঝিকুদা নাকি মাঝে মাঝেই মারমুখী হয়ে ওঠে। তাকে এসব কী বলছে নয়না? ঝিকুদা রেগে গিয়ে এবারও যদি কিছু করে?
কিন্তু ঝিকুদা কিছুই করেনি। শুধু পেখমদের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল একটু। তারপর ফুড়ুৎ গলায় বলেছিল, “বিলকিস।”
মা নয়নাকে পছন্দ করে না। মা কাকিমাকে পছন্দ করে না। মা কাজুকেও পছন্দ করে না। মা আসলে সেই মানুষদের মধ্যে পড়ে যার মাথা আর চোখ আতসকাচ দিয়ে তৈরি। সব কিছুকে খুঁটিয়ে না দেখলে মায়ের মন ভরে না। আবার দেখার পর তো আরওই ভরে না! পেখম মাকে ভয় পায় বেশ।
কাজু সেই যে এসেছিল সকালবেলা আর পেখমকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, সেটা ঠিক লক্ষ করেছিল মা। তাই বাবা কাজুকে পড়ানোর জন্য ঠিক করলেও মায়ের মনঃপূত হয়নি ব্যাপারটা।
বাবাকে বলেছিল, “এটা কি ঠিক হল? এমন উঠতি বয়সের একটা ছেলে! পেখমকে দেখেই তো ওর জিভ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল! নিজের মেয়ের রূপ দেখে বোঝো না যে, ওকে সাবধানে রাখতে হবে? আমি কত শাসনে রাখি। আর তুমি সেখানে খাল কেটে কুমির ঢোকালে!”
বাবা বলেছিল, “তুমি পাগল হয়ে গেলে? ও তো বাড়িতেই পড়াতে আসছে। আর কত ভাল ছেলে লেখাপড়ায়! সক্কলে ওর নাম জানে। তুমি সব কিছুতেই এমন কোরো না তো!”
মা বলেছিল, “ভাল হলেই ভাল। না হলে…”
বাবা শুধু বলেছিল, “না হলে আমি তো আছি।”
সেই কাজুর পড়াতে আসার শুরু। সপ্তাহে তিনদিন করে সন্ধের দিকে আসত ও। ছোট্ট ঘরটার বিছানায় বসত পেখম আর লাগোয়া টেবিলের পাশে চেয়ার নিয়ে বসত কাজু। একমনে পড়াত। মা চা দিয়ে যেত। মুড়ি মেখে দিয়ে যেত। কিন্তু খেয়ালই থাকত না ওর। ও শুধু পড়িয়ে যেত। আর পড়াতে-পড়াতে দেশ-বিদেশের কথা বলত। নানা মানুষের গল্প বলত। বলত যুদ্ধের ইতিহাস। বলত দক্ষিণ মেরুর গল্প। অঙ্ক করাতে গেলে ইউক্লিডের সময়কার গল্পও বলত অনায়াসে। আর পেখম রোজ একটু-একটু করে ডুবে যেত। চারিদিকে গোলাপি তুলোর ভিতর কে যেন ওকে ডুবিয়ে দিত আস্তে আস্তে। এক-একটা পড়ানোর দিন শেষ হলে মনের ভিতরে কেমন একটা কষ্ট হত। মনে হত আবার কবে আসবে কাজু! কেন সপ্তাহে মাত্র তিনদিন আসবে? রোজ এলে ক্ষতি কী? তারপর পড়ানোর সময় হলে তো পেখমের বুকের ভিতরটায় কী যেন একটা হত। একই সঙ্গে ভাল লাগা আর ভয়, কষ্ট আর আনন্দ, বন্ধন আর মুক্তির স্বাদ পেত পেখম।
বাল্বের আলোয় চকচক করত কাজুর মুখ। হাত নেড়ে, চুলে হাত ডুবিয়ে ঠিক করতে-করতে কাজু কত কী যে বলত! পেখম বুঝত দু’ঘণ্টার শেষে কাজুর মুখটুকু ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঢোকেনি! এমন করতে-করতে ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজ়াল্ট বেরোল। আর সবাই অবাক হয়ে দেখল পেখম ফেল করতে করতে কোনওমতে পাশ করল!
প্রথম ঝড়টা তুলেছিল মা! এত ভাল ছাত্রী, তার এ কী দশা! এ কেমন করে হল? এই মাস্টার ভাল ছাত্র হতে পারে, কিন্তু পড়াতে পারে না একদম।
রাতে খেতে বসে মা তো চিৎকার করে বলেছিল, “কোথা থেকে ঠাকুরপো একে জোগাড় করে এনেছে! বড় বড় বুলি শুধু! এই পড়ায়? একে তুমি টাকা দিয়ে রেখেছ? কেন রেখেছ? কীসের জন্য? কাল এলে ওকে বিদায় করবে। একদম ধুলোপায়ে বিদেয় করবে। ঠাকুরপো অনেক উপকার করেছে। আর আমার মেয়ের ভবিষ্যতের বারোটা বাজাতে হবে না।”
বাবা রুটির টুকরো ছিঁড়ে চুপ করে বসেছিল। পাশের ঘর থেকে সব শোনা যায়। পেখমের ভয় লাগছিল খুব। ছোটকার নামে মা এসব বলছে! ছোটকা না-হয় নাইট ডিউটিতে গিয়েছে, কিন্তু কাকিমা তো সব শুনতে পাবে!
পেখম একবার বলেছিল, “মা, কাজুদার দোষ নেই। আমিই ফাঁকি দিয়েছি।”
“তুই চুপ কর!” মা ধমক দিয়েছিল খুব, “তোকে বড়দের মধ্যে কথা বলতে বারণ করেছি না?”
বাবা তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। তারপর শান্ত গলায় বলেছিল, “তুমি চুপ করো একটু। আর কথা বাড়িয়ো না। ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল আজকে। ও নিজেই বলেছে আর পড়াবে না।”
আর পড়াবে না! নিজে বলেছে! পেখমের মনে হয়েছিল, কেউ বুঝি ওর বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে দিয়েছে! কী বলছে এসব! এমন হয় নাকি? পড়াবে না বললেই হল! হাত কাঁপছিল পেখমের। ঝাপসা লাগছিল সবকিছু। তবু তার মধ্যেও শুনেছিল, মা অনবরত বলে চলেছে, “আমি সব বুঝি। পড়াবে না! সাধু সাজা! আর তুমি সব শুনলে? কিছু বলতে পারলে না? হুঃ, পুলিশ না ছাই! বললে না কেন যে, শুধু কি চা-মুড়ি ধ্বংস করতে আসত!”
পেখমের চোখে জল এসে গিয়েছিল এবার। এসব কী বলছে মা? কাজু তো কিছুই খায় না! পেখম কতবার বলে বলে খাওয়ায়। আর খাওয়া দেখেই বোঝে এসব কিছুতেই কোনও আগ্রহ নেই ওর। শুধু বই-খাতায় ডুবে থাকে ছেলেটা! কতই-বা বয়স! ইসকুল যেতে-আসতে তো কাজুর বয়সি ছেলেদের দেখে পেখম। সব এক-একটা বখাটে। শুধু সাইকেল নিয়ে চক্কর মারবে। চিঠি ছুড়বে। দেব আনন্দের গান গাইবে! এত বিরক্ত লাগে পেখমের! এরা কী ভাবে? জীবনটা হিন্দি সিনেমা? এরা বোঝে না কোনও মেয়ে এসব অসভ্যতা পছন্দ করে না? কাজুর ওই আনমনা ভাবটাই পেখমকে টানে। ওই যে কোনও কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কিছু না হলেও চলে যায়, এমন ভাবটাই পেখমকে দুর্বল করে দেয়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে ওর দম বন্ধ হয়ে আসে! কাজুকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে।
সেই কাজুকে আসতে বারণ করে দেবে বাবা! তবে ওর কী হবে? নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল পেখমের। এসব কী করল ও? এমন বোকার মতো জিনিসটা বুঝতে পারল না? কাজু যখন পড়াতে আসত, মা তো সারাক্ষণ নানা অছিলায় ঘরে ঢুকত। আড়চোখে দেখত কাজুকে। পেখম বুঝত, মা বিরক্ত হচ্ছে! কেন হচ্ছে সেটাই শুধু বুঝত না। আর তাই তো পেখমের উচিত ছিল আরও ভাল করে পড়া। ওর তো বোঝা উচিত ছিল যে, রেজ়াল্ট খারাপ হলে মা প্রথমেই কাজুর আসা বন্ধ করে দেবে।
সেদিন রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি পেখম। ওর ছোট্ট ঘরটার জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। মশারির ভেতর শুয়ে পেখম এপাশ-ওপাশ করেছিল বহুক্ষণ। তারপর একসময় আর থাকতে না পেরে উঠে বসে খুলে দিয়েছিল জানলা। তাকিয়েছিল বাইরের দিকে। আকাশের দিকে। আর তখনই দেখেছিল জোনাকিদের! বাড়ির পাশের বড় ঝোপের মধ্য থেকে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছিল জোনাকির দল। সবুজাভ আলোয় আশপাশের সব কিছু কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠেছিল। পেখম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সেই দিকে। আকাশের দিকে কেন উড়ে যাচ্ছে জোনাকিরা? কী চায় ওরা? কাদের কাছে পৌঁছতে চায়? আকাশের সব তারাই কি একসময় মাটির এই জোনাকি ছিল?
কতক্ষণ বসেছিল মনে নেই পেখমের। শুধু যখন পুব আকাশে লাল রং লেগেছিল, যখন মাধব বৈরাগী খোল-করতাল নিয়ে বেরিয়েছিল নামগান করতে আর ঠাকুরদার গলায় কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম শুনেছিল, তখন সংবিৎ ফিরেছিল পেখমের। আর তখনই বুঝতে পেরেছিল ওর কী করা উচিত। ঠাকুরদা! এমন বিপদে ঠাকুরদাই ভরসা। বাড়িতে কেউ ঠাকুরদার ওপর কথা বলে না। ঠাকুরদা আছেন বলেই এখনও বিরাট বড় কোনও ঝগড়া হয় না এই বাড়িতে। ঠাকুরদার সামনে কেউ গলা তুলে কথা বলে না।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ঠাকুরদা ভগবানের নাম করেন। তারপর নিজেই ছোট্ট একটা হিটার জ্বালিয়ে চা বানিয়ে নেন। সঙ্গে দুটো পটল বিস্কুট বের করেন ডালডার টিন থেকে। তারপর বারান্দায় বসে খান সময় নিয়ে। খাওয়া শেষ হলে ঠাকুরদা মাফলার জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েন হাঁটতে। পাশের বাড়ির ফুলুদাদুও হাঁটেন ঠাকুরদার সঙ্গে। দু’জনেই একসঙ্গে এই দেশে এসেছিলেন। ফুলুদাদু ঠাকুরদার ছোটবেলার বন্ধু। খুব মজার মানুষ ফুলুদাদু। পেখমের সঙ্গে একদম বন্ধুর মতো মেশেন!
ঠাকুরদা হাঁটতে যাওয়ার সময় মা ওঠে। দরজা জানলা খোলে। তারপর ধীরে ধীরে দিনের কাজ শুরু করে।
পেখম বুঝেছিল ঠাকুরদাকে ধরতে হলে এখনই ধরতে হবে। মা উঠে পড়লে আর হবে না।
নিজের ছোট ঘরের দরজাটা খুলে পা টিপে-টিপে বেরিয়েছিল পেখম। শীতকাল। মেঝে যেন বরফ দিয়ে তৈরি! গায়ে চাদরটাকে ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে ও গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠাকুরদার কাছে।
ঠাকুরদা সবে চা বানিয়ে বড় একটা কাপে ঢালছিলেন। এমন সময় পেখমকে দেখে কেমন যেন অবাকই হয়েছিলেন।
পেখম চুপ করে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সামনে।
“কিছু বলবি?” ঠাকুরদা তাকিয়েছিলেন।
“ঠাকুরদা, তুমি বাবাকে একটু বলবে?”
“আমি?” ঠাকুরদা অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন, “কী হয়েছে তোর? এমন মুখ-চোখ কেন? রেজ়াল্ট খারাপ হয়েছে বলে তোর মনখারাপ? অমন হতেই পারে।”
“কাজুদা আমায় আর পড়াবে না বলেছে!”
“কে?” ঠাকুরদার বুঝতে যেন একটু সময় লেগেছিল।
“আমায় যে পড়ায়। ওই যে ছেলেটা। খুব ভাল স্টুডেন্ট। বলেছে, এমন রেজ়াল্ট করেছি তো, তাই পড়াবে না। তুমি বাবাকে বলবে একটু যে, ও-ই যেন আমায় পড়ায়!”
“কেন?” ঠাকুরদা চায়ে চুমুক দিয়ে সামান্য নাক কুঁচকেছিলেন। তারপর রান্নাঘরের তাক থেকে চিনির কৌটো পেড়ে নিয়ে এসে বলেছিলেন, “কী হয়েছে কী?”
“আমায় অপমান করেছে কাজুদা, মানে ওই ছেলেটা,” পেখম ঠোঁট কামড়ে তাকিয়েছিল ঠাকুরদার দিকে।
ঠাকুরদা কি ওর মিথ্যেটা ধরতে পারলেন?
ঠাকুরদা একচামচ চিনি নিয়ে কাপে গুলতে গুলতে বলেছিলেন, “ছেলেটা নিজেই পড়াবে না বলেছে?”
“হ্যাঁ,” পেখম অভিনয়টা যথাসাধ্য বজায় রেখে বলেছিল, “আমি নাকি বাজে লেখাপড়ায় বলে পড়াবে না! আমি দেখিয়ে দিতে চাই ওকে ঠাকুরদা। তুমি বাবাকে বলো।”
ঠাকুরদা সময় নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বলেছিলেন, “তাই?”
বাইরে থেকে হাওয়া আসছিল। বারান্দার পাশেই বড় পুকুর। শীতের এত ভোরে ঠান্ডা হাওয়ায় শিরশির করছিল পেখমের শরীর। ঘুমও আসছিল। সারারাত জেগে থাকার শোধ তুলছিল শরীর। তাও চোখ টান করে তাকিয়েছিল পেখম। মুখটাকে অপমানের ওজনে ভার করে রেখেছিল!
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “অন্য মাস্টার পড়ালে হবে না?”
“না,” জেদি গলায় বলেছিল পেখম, “ওকেই আমি মজা দেখাব।”
ঠাকুরদা হেসেছিলেন শুধু। আর কিছু বলেননি।
রেজ়াল্ট বেরোনোর পরের ছুটি চলছিল স্কুলে। অন্যদিন হলে বান্ধবীদের বাড়িতে যেত পেখম। কিন্তু সেদিন কোথাও যায়নি। বুকের মধ্যে কেবল ছটফট করছিল একটা কাঠবেড়ালি! কেবলই মনে হচ্ছিল, কী হবে? কাজুকে কি বলবে বাবা? মা কী বলবে? ঠাকুরদা কি বলে দেবে বাবাকে যে, পেখম ওসব বলেছে?
সারা দিন কেমন একটা ম্যাজম্যাজে শরীর নিয়ে কেটেছিল। বুকের ভিতর একটা কষ্ট। মনখারাপ। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। টেটু এসেছিল গল্প করতে, পেখম ওকেও ফিরিয়ে দিয়েছিল। কথা বলেনি। দুপুরে খায়নি ভাল করে। মা এসে কপালে হাত দিয়ে দেখেছিল জ্বর এসেছে কি না। পেখম ওসব খেয়াল করেনি।
তারপর সারা বিকেল চুপ করে ও পুকুরের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। ওই পাড়ে ঘোষদের বাড়ি। অন্য পাশে সর্দারদের বাঁশবাগান। পেখম দেখছিল কীভাবে আকাশের রং পালটে, গাছের পাতাদের রং পালটে, পুকুরের জলের রং পালটে সূর্য ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পশ্চিমের আকাশে। হাওয়া দিচ্ছিল চ্যাটার্জিপাড়ার দিক থেকে। ঝিরিঝিরি নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল ডিসেম্বরের আলো। শীতের বিকেলগুলোয় যে এত মনখারাপ জমা হয়ে থাকে, সেদিনই যেন জানতে পেরেছিল ও! আর এর মধ্যে পেখমের কেবলই মনে পড়ছিল ওই কোঁকড়া চুল, পাতলা খাড়া নাক। মনে পড়ছিল নরম ঘাসের মতো দাড়ি! এত কষ্ট হচ্ছিল যে, নিজের মনটাকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল, বাবা কি শুনবে ঠাকুরদার কথা?
ছোটকার সেদিন ডে শিফট ছিল। রাতে সকলে একসঙ্গেই খেতে বসেছিল ওরা। বাবার মুখ দেখে পেখম বুঝতে পারছিল, কিছু একটা হয়েছে। ও রুটির টুকরোগুলো ছিঁড়ছিল, ডালে ডোবাচ্ছিল, কিন্তু খেতে পারছিল না। মা অবাক হয়েছিল খুব। তাকাচ্ছিল বারবার। এমন তো করে না পেখম। আজ তবে কী হল?
কথাটা শুরু করেছিলেন ঠাকুরদাই। বলেছিলেন, “সাবু, তুই কি ওই মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেছিলি?”
বাবা চট করে একবার তাকিয়ে নিয়েছিল মায়ের দিকে। তারপর আলতো গলায় বলেছিল, “হ্যাঁ বাবা, ওই কাজুকে বলেছি পড়াতে আসতে!”
“কী?” মায়ের গলায় যে-চকোলেট বোমাটা ফেটেছিল সেটার ওপর শেষ মুহূর্তে মা নিজেই বালি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আসলে ঠাকুরদার সামনে কেউ গলা তোলে না! তাও শব্দের গুণ বালিতে ঢাকা পড়েনি খুব একটা! পেখম সন্ত্রস্ত হয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে।
বাবা বলেছিল, “বাবা বললেন, তাই… মানে…”
বাবার ফেলে রাখা অসমাপ্ত বাক্য শেষ করেছিলেন ঠাকুরদা। বলেছিলেন, “সাবুকে আমি বলেছি ওই মাস্টারকে বলতে। দোকানে শুনি আমার নাতনি নাকি খারাপ লেখাপড়ায়। তাই নাকি ওই চ্যাংড়াটা বলে বেড়াচ্ছে ওর দ্বারা কিছু হবে না! আমাদের বাড়ির মেয়েদের লেখাপড়া হবে না? বললেই হল? আমি তাই সাবুকে বলেছি ওকেই পড়াতে বলতে। পেখম ওকে এবার দেখিয়ে দেবে, কার কী হবে আর কী হবে না!”
মায়ের মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল একদম। ঠাকুরদার সামনে কিছু বলতে পারছিল না, কিন্তু আবার সহ্যও করতে পারছিল না। শুধু থালা-বাসনের ঝংকার বেড়ে গিয়েছিল এর পর।
রাতে চাপা গলায় মা বলেছিল, “তোমার আমায় বিয়ে করা উচিত হয়নি। কোনও ক্রীতদাসীকে নিয়ে আসা উচিত ছিল!”
বাবা বলেছিল, “নমি, এমন বোলো না। জানোই তো, বাবার মুখের উপর কিছু বলা যায় না। তা ছাড়া রাস্তায় এসব শুনে বাবার রাগ হয়েছে। সোনাঝুরির মতো ছোট জায়গায় সব কথাই তো ওড়ে! তাই…”
“তুমি দেখো, একদিন কী হয়! সেদিন, সেদিন কিন্তু…” মায়ের কথাগুলো ডুবে গিয়েছিল কান্নায়। পাশের ঘর থেকে পেখম শুনেছিল বাবা বলছে, “আমি তো আছি নমি। তোমার মেয়ের কিছু হতে দেব না। দেখো।”
পরের দিন সকালে দোকানে যাওয়ার আগে পেখমের ঘরে এসেছিলেন ঠাকুরদা। তারপর নিচু স্বরে বলেছিলেন, “দেখিস, আবার কেলেঙ্কারি কিছু বাঁধাস না। মনে রাখিস, আমাদের সমাজ কিন্তু কাজুদের সমাজ নয়।”
“তুমি কী ভাল কবিতা বলো!” পেখম আলতো গলায় বলল।
এবার চোখ খুলল কাজু। তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল, “আমি আস্তে আস্তে জমাচ্ছি, জানো! কবিতা জমাচ্ছি।”
“বই করবে?” পেখম আগ্রহভরে তাকাল কাজুর দিকে।
কাজু দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “তার জন্য টাকা দরকার। আমার নিজের টাকায় বই করা হবে না। তবে কেউ যদি করে… কলকাতায় কেউ যদি…”
পেখম আলতো করে হাতটা ধরল কাজুর। বলল, “ঠিক হবে, দেখো।”
হাতটা সরিয়ে নিল কাজু, “এমন কোরো না পেখম। জানোই তো সব। তোমার কাকিমা নীচে আছেন। বললেন, একটু পরেই চা নিয়ে আসবেন। তা ছাড়া তোমার মা যদি এসে যান…”
পেখম বলল, “ওসব বাদ দাও। আমায় কবিতার বইটার কথা বলো। কতগুলো হয়েছে?”
কাজু বলল, “হয়েছে কিছু। একটা ডায়েরিতে ফ্রেশ করে রাখছি। তোমায় দেখাব একদিন।”
“সত্যি?” পেখম বড়-বড় চোখ করল। দেখল, কাজু আবার তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আজ ভরা পূর্ণিমা। নিকানো আকাশে টলটল করছে আলোভরতি একটা বেলুন! পেখমের কষ্ট হচ্ছে শরীরে। মনে হচ্ছে আর দূরে থাকতে পারছে না কাজুর কাছ থেকে। সেই নাইন থেকে এই সেকেন্ড ইয়ার। কম দিন তো হল না!
পেখমের বলতে ইচ্ছে করেনি, কিন্তু তবু নিজের অজান্তেই যেন বলে ফেলল, “তুমি চাকরির কিছু করলে? আর কতদিন ওইসব পার্টি-টার্টি করবে?”
এবার তাকাল কাজু। যেন কিছুটা সময় নিল শব্দগুলোকে নিজের মনের মধ্যে বসে যেতে দিতে। তারপর বলল, “তুমি যা চাও, তা কি হবে কোনওদিন?”
“কেন হবে না?” পেখমের গলা শক্ত হল এবার, “এমন খারাপ কিছু ভেবো না।”
কাজু বলল, “না হলেও আমার কবিতা থাকবে। তোমায় নিয়ে লেখা সব কবিতা।”
“আমার ওসব চাই না!” পেখম দ্রুত চুপ করিয়ে দিতে চাইল কাজুকে। বলতে চাইল কাজুকেই শুধু চায় ও। আর কিছু নয়। কিন্তু বলতে পারল না। বরং কেমন এক অভিমান এসে বুজিয়ে দিল ওর গলা! কাজু সব সময় কেন এমন মনখারাপের কথা বলে! কেন কাছে এসেও আবার এমন সরে-সরে যায়!
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “যদি আমরা এক হতে নাও পারি, তাও এই সময়গুলো তো আর মিথ্যে নয় পেখম। এই রাত। এই জ্যোৎস্না। এই সব কবিতা তো আর মিথ্যে নয়! যে যার মতো যা খুশি ভাবুক, আমি আমার লেখা তোমার জন্য রেখে যাব। আমার বাদামি ডায়েরির সব লেখা শুধুমাত্র তোমার জন্য রেখে যাব। আমি যদি তোমায় খুঁজে নাও পাই, সেই ডায়েরি তোমায় খুঁজে পাবে পেখম। সেইসব কবিতা তোমায় খুঁজে পাবে। আর এই শব্দগুলোর অর্থ কেবল আমরাই জানব। মাত্র আমরা দু’জন জানব!”
.
০২. মাহির
বুটটা খুলে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দেখল মাহির। পায়ে কী যেন একটা খোঁচা দিচ্ছিল। কাঁকর নয়। থাকলে ঝাড়লেই বেরিয়ে যেত। কিন্তু বেরোয়নি। ও হাত ঢুকিয়ে দেখল। আঃ। কী এটা? আঙুলটা বের করল মাহির। ছোট্ট এক বিন্দু রক্ত ফুটে উঠেছে আঙুলের ডগায়। ভেতরে কি পেরেকটা জেগে উঠল!
বিরক্তিতে মাহিরের মুখটা বেঁকে গেল। আচ্ছা জ্বালাতন তো! এই তো সেদিন বুটটা ঠিক করাল, এর মধ্যেই আবার পেরেক বেরিয়ে এসেছে!
শালা, বুটটাকে বিরক্তিতে পাশে ছুড়ে মারল মাহির। পরশুদিন খেলা আর আজই বুটটা বেগড়বাই করছে! কপাল তো নয়, যেন টালি নালা!
সামনের দিকে তাকিয়ে মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল মাহিরের। সকলে প্র্যাকটিস করছে আর ও বসে বসে ছিঁড়ছে! এখনই পতাদা খিস্তি করবে ওকে এমনভাবে বসে থাকতে দেখলে। বলবে, টিম থেকে লাথি মেরে বের করে দেবে, যদি না পরিশ্রম করে! পরিশ্রম! নিজে বিরাট ভুঁড়ি নিয়ে বাঁশি মুখে পিঁ পিঁ করে হুমদো হয়ে ঘুরবে, আর দূর থেকে চেঁচাবে, সে বেলায় কিছু নয়! ভাটের যত কথা! পরিশ্রম!
পতাদা মানে পতঞ্জলি লাহিড়ি, লেক অ্যাভিনিউ ক্লাবের সেক্রেটারি কাম কোচ। নিজে দীর্ঘদিন কলকাতার মাঠে খেলেছে। তারপর লেক অ্যাভিনিউতে এসেছে। মাহিরকে পতাদাই এই সেকেন্ড ডিভিশন ক্লাবটায় নিয়ে এসেছে বছরদুয়েক হল। কিন্তু তা বলে মাথা কিনে নিয়েছে নাকি?
জার্সি, মোজা, প্যান্ট আর রুটি-কলা, ঘুঘনি-পাঁউরুটি ছাড়া ওদের কিছু দেয় ক্লাব? কিচ্ছু না। তবে অত “পরিশ্রম, পরিশ্রম” করে চেঁচায় কোন মুখে? এই টিম কি আর সেকেন্ড ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন হবে কোনওদিন? কোনওদিন হবে না। তাই বেকার খেটে লাভ কী? তার চেয়ে রিতুদার কথাটা মেনে নিলেই ভাল হবে বোধহয়!
মাহির আবার বুটটা তুলে ভেতরে সাবধানে হাত ঢোকাল। এই তো পেরেকটা। বেশ কিছুটা বেরিয়ে আছে পাশ থেকে। তাই ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে লাগছিল। শালা গিয়ে ছোটনের মুখে ছুড়ে মারবে। এই সারিয়েছে? নিজেকে মুচি বলে কোন মুখে?
টিটি ঠিক বলেছিল। ছোটনকে দেওয়াই ঠিক হয়নি। হাওয়াই চটির স্ট্র্যাপ পালটে পালটে মালটার অভ্যেসটাই বিগড়ে গিয়েছে! বাঁদরের হাতে বন্দুক পড়লে যা হয়, তাই হয়েছে!
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুতোটা সরিয়ে রাখল। এক-একটা ভাল বুটের কী দাম! শুনলে মাথায় জাঙিয়া পরতে ইচ্ছে করে। ওসব কেনার সাধ্য নেই মাহিরের। এই ছাব্বিশ বছর বয়স হয়ে গেল ওর, তাও কিছু কাজ তো জোটাতে পারল না। মায়ের আয়ার চাকরির উপর ভরসা। তার উপর ভাই আছে। ভাইয়ের পিছনেই তো দেদার টাকা যায়! সেখানে কোন মুখে মাকে বলবে, বুটটা আর চলছে না! পরশু ম্যাচে কী পরবে!
মাহির ব্যাগের ভিতর বুটটা ঢুকিয়ে নিল। তারপর প্লাস্টিকে জড়ানো হাওয়াই চটিটা বের করে পায়ে পরে নিল। জার্সি আর প্যান্টটা বাড়ি গিয়ে ছাড়বে।
“কী রে, গুটিয়ে ফেললি?”
মাহির পেছন ফিরে তাকাল। সুমিত দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সুমিত সামান্য হাঁপাচ্ছে। হাতের গ্লাভসটা খুলে বসে পড়ল মাটিতে। তারপর আবার বলল, “পতাদা মাইরি লাল সুতো, নীল সুতো বের করে দিচ্ছে! আমি মাইরি গোলকিপার, আমায় ছ’বার মাঠ চক্কর মারাচ্ছে কেন? আমি অলিম্পিকে দশ হাজার মিটার দৌড়োব নাকি?”
মাহির দেখল, পতাদা বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কুল ডাউন এক্সারসাইজ় শুরু করে দিয়েছে। মানে আজকের মতো প্র্যাকটিস শেষ!
ও বলল, “প্র্যাকটিস তো শেষ।”
“তুই তো আগে থেকেই বসে গেলি। পতাদা দেখেছে কিন্তু। খিস্তি করবে।”
“আমার এইটা,” মাহির রেগে গিয়ে বুড়ো আঙুল দেখাল, “করুক খিস্তি। আমার বুটের হাল খারাপ খুব। কবে থেকে পতাদাকে বলছি, তুমি বুটটা দাও। শোনে কথা?”
সুমিত হাসল, “আরে, দেবে কোথা থেকে? ক্লাবের হাল জানিস না?”
“কেন, স্পনসর?” মাহির তাকাল সুমিতের দিকে।
সুমিত নিজের ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে মাথাটা মুছল। তারপর হাসল।
শীত শেষ হয়ে গিয়েছে কলকাতায়। তবে এখনও সেই গরমটা পড়েনি। ফেব্রুয়ারির এই তৃতীয় সপ্তাহে আকাশটা কেমন যেন ব্লটিং পেপারের মতো হয়ে আছে।
মাহির বলল, “হাসছিস কেন? স্পনসরের কথা যে বলল সেদিন। বলল কুড়ি লাখ টাকা দেবে নাকি তারা?”
“টাকা গাছে ফলে?” সুমিত এবার জল খেল একটু। তারপর বোতলের মুখটা বন্ধ করে বলল, “শোন, ওসব ছেঁদো কথা। গত্তি নেই। আমাদের টিম কি বার্সেলোনা নাকি? সেকেন্ড ডিভিশনের মাঝামাঝি একটা টিম। চ্যাম্পিয়ন হব, সেই দম নেই আমাদের। কে টাকা দেবে? কেনই-বা দেবে?”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না। গত সপ্তাহে ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের সঙ্গে খেলায় জিতেছে ওরা। পরিষ্কার টু-নিল। তারপর মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে পতাদাই স্পনসরের কথাটা বলেছিল।
বলেছিল, “আজকের মতো যদি খেলতে পারিস তবে আর চিন্তা নেই। পরের চারটে ম্যাচ জিতলেই আমরা কিন্তু টপ থ্রি-তে পৌঁছে যাব। একটা সিমেন্টের কোম্পানির সঙ্গে কথা হয়েছে। ওরা বলেছে কুড়ি লাখ টাকা দেবে। ভাবতে পারছিস ব্যাপারটা? তোদেরও কিছুটা দেখতে পারব। সুতরাং, ঢিলে দিবি না। জান লড়িয়ে দে। ফার্স্ট ডিভিশনে উঠতে পারলে ভাবতে পারিস কী হবে?”
সেদিন থেকে কুড়ি লাখ টাকা মাথায় ঘুরছে মাহিরের। মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকাও যদি ক্লাব দেয়, তবেই তো অনেক। ও তো মনে মনে ভেবেই নিয়েছিল সহজে কাউকে ডিফেন্স দিয়ে বল নিয়ে গলতে দেবে না।
“কী রে, কী ভাবছিস?” সুমিত ঠেলল মাহিরকে।
মাহির মাথা নাড়ল, “কিছু না। পতাদা হেবি ঢপবাজ। ধুর, আমি আর খেলব না।”
“কেন?” সুমিত চোখ গোলগোল করল।
মাহির উত্তর দিতে গিয়ে সামলে নিল নিজেকে। প্র্যাকটিস শেষ করে পতাদা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। বাকিরাও যে যার মতো মাঠে ছড়িয়ে বসে আছে।
লেকের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে এখন। আপ বজবজ লোকাল লেক গার্ডেন্স ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বালিগঞ্জের দিকে। আর পাখি উড়ছে। আকাশে ভুরু এঁকে পাখির ঝাঁক হাওড়ার দিকে থেকে উড়ে যাচ্ছে বারুইপুরের দিকে। কেমন একটা মনখারাপ করা আলো যেন ভাসছে। সূর্য নেই, তবু তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে যাওয়া আলোয় দিনটা কেমন যেন নিচু হয়ে এসে মাথায় লাগছে মাহিরের।
ক’টা বাজে? আলো দেখে সময় বলে দিতে পারে মা। ও পারে না। কিন্তু ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করতেও লজ্জা করছে। গতকাল হাত থেকে পড়ে গিয়ে মোবাইলটার পেছনের দিকের ঢাকনাটা খুলে গিয়েছে। কিছুতেই আর আটকাতে পারেনি। পরানদার দোকানেও নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরানদা বলেছে, এমন করে ভেঙেছে আর জোড়া লাগানো যাবে না। গোটা ফেসিয়া পালটাতে হবে। কিন্তু এত পুরনো মডেল, ফেসিয়া পাওয়াও নাকি কঠিন।
পরানদা বলেছিল, “আরে, নতুন ফোন নিয়ে নে। এসমার্ট ফোন। বড় স্কিরিন! ভাল করে ছবি আর ভিডিয়ো দেখতে পাবি।”
শেষের কথাটা বলার সময় চোখ টিপেছিল পরানদা। কিন্তু মাহির ওসব পাত্তা দেয়নি। বড় স্ক্রিন! স্মার্ট ফোন! কে দেবে টাকা? পরানদা? না পরানদার বাপ?
গতকাল থেকে একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে ফোনটাকে পেঁচিয়ে রেখেছে ও, না হলে ব্যাটারিটা পড়ে যেতে পারে। খুব বদখত লাগছে দেখতে। তাই সবার সামনে সেটা বের করতে ইচ্ছে করছে না। লজ্জা করছে।
“কী রে, তুই কুল ডাউনের আগেই বসে পড়লি কেন?” পতাদা এসে কোমরে হাত দিয়ে সামনে দাঁড়াল।
মাহির মাথা তুলে তাকাল। বিরাট বড় ভুঁড়িটার জন্য কেমন একটা লাগছে। গায়ের টি-শার্টটা কোমরের দিকে উঁচু হয়ে আছে। পইতেটা সামান্য বেরিয়ে ঝুলছে। পতাদার মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি। মাথার চুলের আসল রং কলপের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়ায় মাথাটা কেমন যেন দোয়েল পাখির মতো লাগছে।
মাহির এসব দেখতে-দেখতে তাকিয়ে থাকল।
“কী রে শালা?” পতাদা খিঁচিয়ে উঠল, “বয়রা হয়ে গেছিস? উত্তর দে! ডিসিপ্লিন নেই কিছু? শো-কজ় করব?”
মাহিরের মনে হল বাছা-বাছা কিছু গালাগালি দেয়! শো-কজ়! পাজামার বুক পকেট!
কিন্তু নিজেকে সামলাল ও। তারপর বলল, “বুটটা গিয়েছে পতাদা। ছোটনকে দিয়েছিলাম সারাতে। কিন্তু পারেনি ভাল। পেরেক বেরিয়ে গিয়েছে।”
“তো?” পতাদা বলল, “জানিস, আমরা কেমন খেলেছি? পেরেক-ফেরেক কিচ্ছু মানিনি। একবার ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলা ছিল। কৃশানু, বিকাশ, চিমা। কে নেই ওদের টিমে! কিন্তু আমরা যা ফাইট দিয়েছিলাম না! আমারও সেদিন বুটে প্রবলেম ছিল। কিন্তু আমি কি পিছিয়ে এসেছি? আজও সবাই বলে সেই ম্যাচটার কথা।”
মাহিরের মুখটা আপনা থেকেই বেঁকে গেল! পতাদা এত বাতেলা করে না! সবাই জানে, পতাদার মতো ভুলভাল ঢপ কেউ মারে না!
ও বলল, “কিন্তু পতাদা, পা কেটে যাবে। ওই বুটে খেলা যাবে না।”
“তবে?” পতাদা তাকাল, “পরশু ম্যাচ আছে। তুই আমার রাইট ব্যাক। তোকে ভেবেই টিম করেছি। এখন বলছিস বুট খারাপ? আর বুট নেই?”
মাহির মাথা নাড়ল, “পরার মতো নেই। পুরনোটা আছে, কিন্তু স্টাডস গিয়েছে।”
পতাদা চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “ঠিক আছে, কাল আয়, দেখব। কী যে করিস! কত নম্বর পা তোর? দশ?”
মাহির আবার মাথা নাড়ল, “এগারো।”
“এগারো?” পতাদা অবাক হল, “মাইরি! রাবণ নাকি তুই?”
শরীরটা ওর বড়সড়। ছ’ফুট দু’ইঞ্চি লম্বা। চওড়া কাঁধ আর বুক। ভুঁড়ি নেই একটুও। ঢালাই লোহার শরীর। বাদামি চামড়ায় মাছি পিছলে যায়। রেশমি বলত, “তোর সঙ্গে কে প্রেম করবে? চেপে ধরলে আমি মরেই যাব।”
মরে যাবে? রেশমিকে এমনভাবে কেন চেপে ধরবে যে, ও মরে যাবে? রেশমি মরে গেলে ওর কী হবে?
ফরসা, রোগা মেয়ে ছিল রেশমি। একমাথা বাদামি চুল। গালে একটা তিল। ওকে দেখলেই দম বন্ধ হয়ে আসত মাহিরের। রেশমিকে বলতও সেই কথা। শুনে রেশমি হাসত, বলত, “ছেলেগুলোকে চিনি না? বদের বাসা! হিট উঠে গেলে যা খুশি তাই বলে! শুধু শোওয়ার ধান্দা!”
কিন্তু মাহিরের সেসব উদ্দেশ্যই ছিল না। সেই ক্লাস ইলেভেন বয়সটায় রেশমি বললে ও গলফ গ্রিনের টিভি টাওয়ার থেকে ঝাঁপও দিতে পারত।
কিন্তু রেশমি সেসব বুঝল না। ফাগুন মাহাতোর সঙ্গে এক সপ্তমী পুজোর দিন পালিয়ে গেল।
ন’বছর হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আজও মাহিরের ভিতরের জ্বালাটা মরেনি। ও চলে যাওয়ার পর তো পড়াটাও ছেড়ে দিয়েছিল মাহির। সারাক্ষণ ঘর অন্ধকার করে বসে থাকত। খেতে চাইত না। খালি মনে হত বজবজ লোকালে গলা দেয়! মনে মনে দেখত ফাগুন আদর করছে রেশমিকে। সম্ভাব্য সমস্ত রকম আদর যেন মনে মনে দেখতে পেত ও। আর বুকের পাঁজরে আগুন লেগে যেত! সারা শরীর পুড়তে শুরু করত ওর! পাগলের মতো লাগত মাহিরের। মনে হত সাপে কেটেছে ওকে। বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা দেহে। বুঝত, এই বিষ বাকি জীবন বয়ে যাবে ওর শিরায় শিরায়।
সারা জীবন? সত্যি? না, সারা জীবন আর নয়। সত্যি করে বলতে গেলে সেভাবে হয়তো প্রেম আর নেই, কিন্তু কোথায় যেন একটা হেরে যাওয়া আছে। জ্বালাটা যে হারের সেটা বুঝতে পারে এখন। বুকের ভিতরের রাবার গাছ থেকে সারাক্ষণ টপ-টপ করে রস চুঁইয়ে পড়ে! খালি মনে হয় আধবুড়ো ফাগুনের কী ছিল, যা ওর ছিল না? উত্তরটা অবশ্য খুঁজতে হয় না। উত্তরটা ও জানে। টাকা। জমি-ব্যাবসার দালালির টাকা।
টাকাটাই মেরে দিল মাহিরকে। সব কিছুতেই পিছন থেকে টেনে ধরল। সেই রেশমি থেকে এই বুট অবধি। টাকা কিছুতেই এগোতে দেয় না ওকে।
পতাদা চলে যাওয়ার আগে বলল, “কী করিস, একটা বুটও কিনতে পারিস না!”
মাহির উত্তর দিতেও পারত, কিন্তু দিল না। কী হবে মুখ নাড়িয়ে। পতাদা বলবেই। তার চেয়ে একটা নতুন বুট পেলে ভাল হবে।
সুমিত উঠল, “কী রে, তোকে ছেড়ে দেব?”
মাহির মাথা নাড়ল, “না, আমি হেঁটেই চলে যাব। টিটি আসবে জাহাজবাড়ির সামনে।”
সুমিত কাঁধ ঝাঁকাল, “কী যে করিস মাহির! এখনও বলছি এইচএস-টা দিয়ে দে প্রাইভেটে। খেলার পাশে অন্তত এইচএস-টা হয়ে থাকলে সুবিধে পাবি।”
মাহির হাসল। বিষণ্ণ হাসি। সুমিত বুঝবে না। ওকে তাই বলে লাভ নেই। লেখাপড়ায় তো খারাপ ছিল না মাহির। মাধ্যমিকে লেটার ছিল চারটে। স্টার পেয়েছিল। ওদের ওই স্কুল থেকে মাত্র দুটো ছেলে পেয়েছিল স্টার। তার মধ্যে এই মাহির বসু একজন। ইংরেজিতে খুব ভাল ছিল ও। স্যার বলতেন, “মন দিয়ে পড়িস মাহির। জীবনে সব কিছু আমাদের ছেড়ে যায়, কিন্তু অর্জন করা বিদ্যে কখনও ছেড়ে যায় না। এর চেয়ে ভাল বন্ধু আর কেউ নেই।”
স্যারের কথা আজও খুব মনে পড়ে মাহিরের। ইলেভেন থেকে টুয়েলভে ওঠার পরীক্ষায় ইংরেজিতে একশোয় বিরাশি পেয়েছিল মাহির। স্যার নিজে ওকে একটা বই দিয়েছিলেন। ইংরেজিতে লেখা আইনস্টাইনের জীবনী। বইটা আজও আছে মাহিরের কাছে। শুধু বইটাই আছে। আর সব যেন হারিয়ে ফেলেছে ও! রেশমি চলে গিয়েছে, সঙ্গে করে বাকি জীবনটাও নিয়ে গিয়েছে।
সুমিত বলল, “হাসছিস? কিন্তু একদিন এর ফলটা ভুগবি। আমি ঠেকে শিখেছি। আটাশ হল আমারও। যদি বিএসসি-তে ব্যাকটা ক্লিয়ার করে রাখতাম, আজ শালা দাদার লেদের কারখানায় ঘানি ঘোরাতে হত না!”
ওরা মাঠের বাইরের দিকে হাঁটতে লাগল।
বড় রেলিং দিয়ে মাঠটা ঘেরা আছে। সন্ধের ঘোলাটে আলো বিশাল প্লাস্টিকের মতো এসে নামছে শহরের মাথায়। আস্তে-আস্তে সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের আলো জ্বলছে। চিড়িক চিড়িক করে জেগে উঠছে বড়-বড় বিলবোর্ড। গাড়ির ছবি। বড় হাউজ়িং-এর ছবি। বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার প্যাকেজের ছবি। প্রতিদিন মাঠ থেকে বেরোনোর আগে এই বিলবোর্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে মাহির। এত টাকা মানুষ পায় কোথা থেকে? কে দেয় এত টাকা তাদের? ওর মা মাসে আট হাজার মতো পায়। তাতে ওদের তিনজনের চলতে দম ফুরিয়ে যায়! সেখানে এসব কেনে কারা?
মাঠের বাইরে এসে ফুটপাথের উপর স্ট্যান্ড করা মোটরবাইকটার সামনে দাঁড়াল সুমিত। পিছনের ক্যারিয়ারে ব্যাগটা আটকে রেখে বলল, “কী রে, আজ এত ডাউন কেন? বাড়িতে প্রবলেম?”
মাহির উত্তর দিল না। দেখল, মাঠ থেকে বিশু, সঞ্জয়, মইদুল, মনা, সুব্রত, বাবু এক-এক করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ ওকে দেখে হাসছে। কেউ পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। সবার মুখই কেমন যেন ম্লান! কেমন যেন ইস্ত্রি-বিহীন সব হাসি। এখানে কেউ আলো টাঙিয়ে দিয়ে যায়নি!
সুমিত বলল, “এই মাহির, কী হয়েছে তোর? তেমন হলে বলিস আমি তোকে জুতো কেনার টাকা ধার দেব। ভাবছিস কেন?”
মাহির হাসল এবার। সুমিত সেটা দিতেই পারে। যতই বলুক ওর দাদার লেদের কারখানায় ও ঘানি ঠেলছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেছে মাহির। যথেষ্ট ভাল অবস্থা। না হলে কেউ এমন আশি হাজার টাকার বাইক কিনতে পারে? মাহির জানে কারও-কারও দুঃখ নিয়ে বিলাসিতা করার একটা অভ্যেস থাকে। সুমিতেরও তেমন আছে। পড়ত ওর মতো ঘরে! থাকত অমন বস্তিতে! সবার সঙ্গে লড়াই করে জল নিতে হত। মাতালদের চিৎকারের মাঝখানে ঘুমোতে হত। আচমকা মারামারির মধ্যে, বোমাবাজির মধ্যে বাড়ি ফিরতে হত, তখন এসব বাতেলা বেরিয়ে যেত।
মাহির দেখে, সবাই যেন দিলীপ কুমার! ট্র্যাজিক হিরো! সবারই এত্ত বড়-বড় কষ্ট। আর সেই সব সহ্য করে বেঁচে থেকে যেন গোটা পৃথিবীকে উদ্ধার করে দিচ্ছে। মরে যেতে পারলে যেন সবাই বেঁচে যেত। এদিকে পেছনে লঙ্কাপটকা ফাটলে খাটের তলায় গিয়ে লুকোবে সব।
হুঃ! হতে পারে ছাব্বিশ বছর বয়স, কিন্তু জীবন কম দেখল না মাহির। যার বাপ নিজের মাসির সঙ্গে পালায় ছোটবেলায়! যাকে আধখ্যাপা, অসুস্থ একটা ভাই আর ক্লান্ত বিষণ্ণ মাকে টেনে বেড়াতে হয়, সে জানে জীবনের কোন ধানে কী ধরনের চাল হয়।
সুমিত ওকে ভালবাসে। বন্ধু হিসেবেই দেখে। কিন্তু ওর এই টাকা ধার দেওয়ার ভঙ্গিটা ভাল লাগল না মাহিরের। তবে কিছু বলল না ও। আসলে ও কিছুই বলে না। বোঝে, এই পৃথিবীতে কাউকে কিছু বলে কিছু হয় না। যে যা করার সেটাই করে।
সুমিত বাইকে উঠে বলল, “তুই এমন মুখ করে থাকিস না। চিয়ারফুল থাক। পরশু কিন্তু ভাইটাল ম্যাচ। জিততে হবে। জিতলে…”
“জিতলে?” মাহির তাকাল সুমিতের দিকে।
সুমিত বলল, “সুপার ডিভিশনের টিম থেকে স্পটাররা আসবে। অল্প টাকায় ভাল ছেলে খুঁজছে ওরা।”
মাহিরের হাসি পেল। এ আর-এক মিথ্যে কথা। ম্যাচের আগে পতাদা এমন একটা কথা ছড়ায়। আগেও হয়েছে। আসলে কেউই আসে না। কারও খেয়েদেয়ে কাজ নেই ওদের স্পট করতে আসবে। যেন ফুটবলারের অভাব পড়েছে!
ও বলল, “স্পনসরের কথাটা ধরতে পারলি আর এটা পারলি না?”
সুমিত বাইকে বসে স্টার্ট দিয়ে বলল, “এবার আর বুলু দিচ্ছে না। আজ বিকেলে শুনেছি ফোনে কথা বলতে। ওরা আসবে। তুই দেখিস।”
মাহির আর কিছু বলল না। এটাও পতাদার চাল। একে ওকে শুনিয়ে কথা বলার ভান করে। জানে, তা হলে খবর ছড়াবেই। ওসবে আর ভুলছে না মাহির।
সুমিত বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল, “শোন, যদি কাল বুটের ব্যবস্থা না হয় আমি করে দেব। তুই ভাবিস না। শুধু পরশু ইউনিয়নের লেফট আউটটাকে দেখে নিস। মালটার ব্যাপক স্পিড! আর আউট স্টেপে একটা অদ্ভুত ফল্স আছে। কেটে যাস না ভাই।”
সুমিতের বাইক গাড়ির তোড়ে নিমেষের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দূরে ওদের ক্লাবঘরের আলো জলছে। মাহির জানে পতাদার সঙ্গে আরও কয়েকজন আছে ভিতরে। ওরা অনেক রাত অবধি থাকে।
আশপাশে কেউ নেই। এবার ব্যাগের ভিতর থেকে ওর রাবার-ব্যান্ড লাগানো মোবাইলটা বের করল মাহির। বোতাম টিপল। আর সঙ্গে-সঙ্গে জোনাকি রঙের আলো জ্বলে উঠল স্ক্রিনে। প্রায় ছ’টা বাজে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। টিটিও বোধহয় এসে পড়েছে জাহাজবাড়ির সামনে। তবে বাড়িটা এখান থেকে কাছেই। পা চালিয়ে হাঁটলে বড়জোর মিনিটচারেক লাগবে।
মোবাইলটাকে এবার পকেটে ঢোকাল মাহির। তারপর ব্যাগটা কাঁধে ফেলে হাঁটতে লাগল।
এদিকটায় আলো থাকলেও সামান্য আবছায়াও আছে। আসলে চারিদিকে অনেক গাছ। মা বলে এই রাস্তাটায় আগে নাকি আরও অনেক গাছ ছিল। কিন্তু এখন কিছুটা কমেছে। কে জানে! এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না মাহির। এতে তো আর ভাত জুটবে না! শহরটা সুন্দর থাকুক বা কুৎসিত তাতে ওর কী? মানুষরাই যদি ভাল না থাকে তা হলে এসব ওপরের চটকবাজি দিয়ে কী হবে?
পাশ দিয়ে হুসহাস করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। আলতো হাওয়া দিচ্ছে গোলপার্কের দিক থেকে। আচমকা আকাশে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে উঠল। এই রে, বৃষ্টি হবে নাকি?
আকাশের দিকে তাকাল মাহির। বিকেলে তো মেঘ ছিল না! তবে? এবার পা চালাল ও। ভিজলে চলবে না।
সিগনাল টপকে ওই দিকে ফুটপাথে উঠে বাঁ দিকে কিছুটা হাঁটলেই জাহাজবাড়ি। সামনেই টিটি দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখে ‘গুরু’ বলে এগিয়ে এল।
টিটির চেহারাটা স্কেল দিয়ে টানা লাইনের মতো। রোগা। বেঁটে। কালো। শুধু মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কেমন যেন ছোট ঝুলঝাড়ুর মতো দেখতে! আর সব সময় মাথায় একটা হেয়ার ব্যান্ড পরে থাকে। আজও পরে আছে।
টিটি নেশা করে খুব। মানে গাঁজা, চরস, হেরোইন থেকে আঠা, সব ধরনের নেশায় টিটি ক্যাপ্টেন!
মাহির সামান্য হাসল। ভোল্টেজ কমে যাওয়া বাল্বের মতো হাসি। মাথার ভিতরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। মনখারাপের ছোট্ট ধূপ কে যেন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে মনের কোণে!
“কী কাকা, এমন ড্যামেজ চোপা নিয়ে ঘুরছ কেন?” টিটি খ্যালখ্যাল করে হাসল।
মাহির দেখল লিলিপুটের মতো টিটিকে। অনেকটা যেমন মানুষ দোতলার বারান্দা থেকে একতলায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে দেখে, সেভাবে।
টিটি থমকে গেল। বুঝল হাওয়া খারাপ। মাথার ব্যান্ডটাকে ঠিক করে নিয়ে টিটি এবার সংযত গলায় বলল, “কী রে, এমন ডাউন মেরে আছিস কেন?”
মাহির সময় নিল একটু। একটা দীর্ঘশ্বাস আসছিল, সেটাকে মাঝপথে আটকে দিয়ে বলল, “না রে, কিছু না। বল, কী জন্য এখানে ডেকেছিস?”
টিটি ছাড়ল না। কাছে ঘেঁষে এসে বলল, “কী হয়েছে তোর? শালা আজও কি রেশমি এসে ঘাড়ে চেপেছে! শালা, এই জন্য প্রেম মারাতে নেই! আমার কাকা সোজা হিসেব। লাগাও আর ছাড়ো! তলপেটই ঠিক আছে। কেস বুক অবধি গড়িয়েছে কী তোমার মারা গেল।”
মাহির অন্যদিন হলে হাসত। কিন্তু আজ হাসল না। আসলে কোথায় যেন টিটি ঠিক। সব কষ্ট-দুঃখগুলোই যেন একটাই নদীর সঙ্গে বাঁধা। সব জল শেষমেশ সেই নদীতে গিয়েই যেন পড়ে! নিজেকে মনে মনে একটা তাগড়া গালি দিল মাহির। এসব বিলাসিতা ওকে মানায় না। কোথাকার কে একটা মেয়ে, ওকে কাঁচকলা দেখিয়ে আধবুড়োর সঙ্গে পালাল, সেটা নিয়ে ছিরকুটে মেরে পড়ে থাকবে কেন ও? জীবনে কাজ নেই? ওর পাড়ার প্রায় সবাই কিছু না-কিছু করে এখন। কেউ ওর মতো এমন মায়ের ঘাড়ে বসে খায় না! এখন জীবনে সেই দিকেই লক্ষ দিতে হবে ওকে। এই ফুটবল-টল খেলে কিছু যে হবে না সেটা বুঝতে পারছে। বড় চেহারাটাই আছে ওর, স্কিল তেমন নেই। নিজেই বোঝে। কিন্তু কীভাবে যে রোজগার করা যায়! ওই যে বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জীবন, তেমন জীবন কিন্তু ও কল্পনা করে না। ওর একটা সাধারণ জীবন হলেই হয়। প্রতি মাসের শেষের ওই অন্ধকার সপ্তাহটা আর নিতে পারে না ও। খুব কষ্ট হয় ওরকম আধপেটা খেয়ে থাকতে। মায়ের গালাগাল খেতে।
মাহির টিটির দিকে তাকাল। রোগা বেঁটে একটা ছেলে। ওরও তো জীবনটা কষ্টের। কিন্তু কী করে এমন সব সময় টগবগে থাকে কে জানে! কালীঘাটের ওই বড় গলিতে ওর বাড়ি। ইটের গাঁথনি দেওয়া ছোট্ট টালির ঘর। দুটো কামরা। একটায় ও থাকে। অন্যটাতে ওর মা। মায়ের কাছে যখন ক্লায়েন্ট আসে টিটি বাড়ির বাইরে গিয়ে বসে। কী যে জীবন ছেলেটার! তাও কখনও টিটিকে ও গোমড়ামুখে থাকতে দেখে না! সারাক্ষণ হাসে, নেশা করে। ইকিরমিকির কথা বলে।
টিটিদের বাড়িতে বহুবার গিয়েছে মাহির। আসলে ওইখানেই একটা স্কুলে পড়ত তো। যদিও ইলেভেন পাশ করে আর পড়েনি। তবু ক্লাস ফাইভ থেকে ইলেভেন অবধি ওই পাড়াতেই তো গিয়েছে। জানে তো কী পরিবেশে সেখানে মানুষজন থাকে!
টিটিও ওদের সঙ্গে পড়ত। তবে ক্লাস নাইনের পর আর পড়েনি। কিন্তু বন্ধুত্বটা ঠিক টিকে গিয়েছে। টিটির জীবন ওদের বন্ধুত্বের ব্যাপারে কোনওদিন অসুবিধে করেনি। বরং স্কুলে পড়ার সময় তো মাঝে মাঝেই ওদের ওখানে যেত মাহির। আড্ডা মারত। খেলত। ওদের ওখানকার অনেকের সঙ্গে ভাল যোগাযোগ আছে মাহিরের। এখনও কখনও-সখনও মাহির ওখানে যায়, আড্ডা মারে। তবু টিটির মতো কিছুতেই হতে পারে না ও। চেষ্টা করে কষ্ট নামক অতিরিক্ত বোঝাটা নামিয়ে রাখতে। কিন্তু কে যেন সেটাকে ওর শরীরের সঙ্গে সেলাই করে দিয়েছে।
টিটি বলল, “কী রে? শালা, আজকাল তোদের পতাদা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ধ্যান করা শেখাচ্ছে নাকি! মাইরি তোকে বুঝতে পারি না আমি। এক-একদিন এক-এক কিসিমের ক্যালানে হয়ে যাস। এসব আর কতদিন চলবে?”
“কী জন্য এখানে দেখা করতে বলেছিস বল,” মাহির ব্যাগটা কাঁধ বদল করে বলল।
টিটি হাসল। হলুদ কালোর ছোপ-ধরা উঁচু দাঁত। হাসলে বড় মাড়ি দেখা যায়। ও বলল, “রিতুদা ডেকেছে তোকে। আর্জেন্ট কাজ।”
“আমায়?” মাহির অবাক হল সামান্য!
“কেন? তোকে তো আগেও ডেকেছে অনেকবার! তুই তো ঢ্যামনামো মেরে যাসনি। আমি গতসপ্তাহে বলেছিলাম তোর কথা। আসলে কাকিমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কাকিমাকে দেখে কষ্ট হল আমার। আর কত লোকের গু-মুত ঘাঁটবে বল তো! এবার একটু মাকে রেহাই দে। আমি তো আমার মাকে বলেছি। আর বছরখানেক, তারপর ঘরে বাবু বসানো বন্ধ। অনেক হয়েছে শালা। আর না। ছোটবেলা থেকে শালা লাগানোর আওয়াজ আর স্টিম ইঞ্জিনের হেঁচকি শুনে বড় হলাম। আর পোষায় না।”
মাহির বলল, “ঠিক আছে। চুপ কর। কী কাজ বল।”
“আরে শালা, চল না,” এবার টিটি হাত ধরে টানল ওকে, “আগে থাকতেই হাজার প্রশ্ন! রিতুদা এখানকার নেতা। পার্টিতে ঘ্যামা হোল্ড। শালা যত ফ্ল্যাট হয় তার থেকে টাকা আসে। আমাদের পাড়া থেকে টাকা আসে। আরও হাজারটা গলতা আছে টাকা রোজগারের। প্লাস ইট-বালি-পাথর-সিমেন্টের সাপ্লাই থেকে টাকা আসে। এত সোর্স! সব তো আর নিজে দেখাশোনা করতে পারে না। দেখিস না নেতাদের পাশে ক্যালানের মতো মুখ করে বেশ কিছু মানুষ ঝুলে থাকে সবসময়? তুইও থাকবি। আমেরিকায় তো জন্মাসনি যে, কর্পোরেশনের মইয়ের মতো চেহারা বলে বাস্কেটবল খেলতে নিয়ে নেবে! এখানে শালা গতরটার ডিসপ্লে দে। রিতুদার সঙ্গে থাক। পার্টি অফিসে এসে বোস। প্লাস রিতুদা পার্টিতে আরও ওপরে ওঠার ফিকির খুঁজছে। এমনভাবে কিছু উন্নয়ন না ভাটের কী করে পার্টির উপরমহলের চোখে পড়তে চায়। শুধু এমপি-তে পোষাচ্ছে না। মন্ত্রী হতে চায়। কিন্তু সেসব ঘুঁটি সাজাতে গেলে একটা টিম তো চাই। তোকে চায় টিমে। কোনও বেআইনি কাজ নয়। সোজা কাজ। চল।”
মাহির তাকাল টিটির দিকে। এসব ব্যাপারগুলো খুব ভাল বোঝে ও। রিতুদাকেও সামান্য চেনে। বছর পঞ্চাশের মতো বয়স। মোটা। বেঁটে। মাথায় টাক। সারাক্ষণ লজেন্স খায়। কাঁধে সব সময় একটা তোয়ালে থাকে। মাহির দেখেছে, লোকটা শীতকালেও কুলকুল করে ঘামে! ও ভাবে কর্পোরেশনের কল যদি এই লোকটার মতো হত!
এর আগেও রিতুদা ওকে লোক মারফত ডেকে পাঠিয়েছে। কাজ দেবে বলেছে। কিন্তু মা করতে দেয়নি। আর সত্যি বলতে কী, মাহিরেরও ইচ্ছে ছিল না। তাই মা যখন বলেছে, “ওই মোটার কাছে যেতে হবে না। হেন খারাপ কাজ নেই ও করে না! পুলিশের ঘানি ঘোরাতে চাস? না গুলি খেয়ে মরতে চাস? জানিস না ওদের পার্টির ভিতরেই দশখানা পার্টি আছে? ভাগ আছে? জানিস না, রিতুর সবচেয়ে বড় শত্রু মনা পান্ডে? দু’জন দু’জনকে পারলেই দেখে নেয়! আর এসব বলছিস কেন? আমার রোজগারে তোর চলছে না? আর আমি তো কয়েকজনকে বলেছি। হাসপাতালে ওয়ার্ড বয় বা হোটেলে বেয়ারার কাজ ঠিক হয়ে যাবে। তবে খেলে যদি কিছু পাস, তবে তো কথাই নেই! কিন্তু ওর কাছে যাবি না।”
মায়ের কথা থেকে সব বাদ দিয়ে শুধু অসমর্থনটুকু নিজের মনে তুলে নিয়েছিল মাহির। ভেবেছিল মা যখন বারণ করছে, তখন যাবে না। মনা পান্ডের সঙ্গে রিতুদার আকচাআকচি সবাই জানে। ঝিলের মাঠে মাঝে মাঝে বোমাবাজি হয়। পেপারে বেরোয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। কিন্তু রিতুদা বলে অপজ়িশন হামলা করেছিল! সবাই সব জানে, তাও সব অন্ধ হয়ে বসে আছে! মাহির একটা জিনিস খুব বোঝে, টাকার চেয়ে বড় শাসক আর কেউ নেই। এর চেয়ে বড় চাবুক আর কিছু নেই।
মাহির বলল, “তুই এমন করতে গেছিস কেন? মা পছন্দ করে না!”
“ওরে আমার ন্যাকাখোকা! মায়ের কথা শুনে কত চলিস! মনে নেই, একদিন মাল খেয়ে আমাদের পাড়ার প্রতিমাদির ঘরে গিয়েছিলি? ওকে নাকি রেশমির মতো দেখতে! মাকে জিজ্ঞেস করেছিলি? শোন, হাওয়াটা বোঝ মাহির। এমন স্টাইলের নাম নিয়ে ঘুরলেই হবে! ঘটে কিছু থাকবে না? বড়-বড় শিল্পী সাহিত্যিকরা সুযোগ বুঝে পাল তুলে দিয়ে নৌকো বাইছে! আর সেখানে তুই আতাক্যালানে! রিতুদার এই কাজটা ভাল। এক নম্বরি। চল। ভাল দেবে। দু’মাসের মধ্যে বাইক নিয়ে ঘুরবি!” কথাটা বলে পকেট থেকে বিড়ি বের করল টিটি।
মাহির বিরক্ত হয়ে দেখল সেটা। ও কালে-ভদ্রে মদ খায়, কিন্তু কখনওই বিড়ি বা সিগারেট খায় না। গন্ধেই কেমন একটা গা গুলোয় ওর। বিশেষ করে এই বিড়ি জিনিসটা।
ও বিরক্ত হয়ে তাকাল টিটির দিকে। টিটি পাত্তা দিল না। নেশা নিয়ে টিটি কারও কথা শোনে না। বরং বলল, “শোন, আগেও বলেছে রিতুদা। কিন্তু এবারেরটা ভাইটাল। নতুন কাজ। খুব জটিল কাজ। ভাল টিম না হলে চলে না।”
“কী জটিল কাজ?” মাহির ভুরু কোঁচকাল।
“সে আমি কী জানি! কিন্তু রিতুদা যখন বলেছে, তখন জটিল! ব্যস! বেকার জেরা করবি না তো! রিতুদার অনেকদিন তোর উপরে চোখ আছে। জানে তো তুই একসময় ক্যারাটে করতিস।”
“সে তো আগে। লাস্ট দু’বছর তো করি না। আর আমি কি রিতুদার হয়ে মারামারি করব নাকি?” মাহির চোয়াল শক্ত করল।
টিটি সময় নিল একটু। বিড়িতে বড় করে একটা টান দিয়ে গাল ফুলিয়ে ধোঁয়াটাকে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর রাস্তার হলুদ আলোর মুখে ছুড়ে দিল নীলচে মিহি রুমাল! মাহির দেখল ধোঁয়ার ছোট্ট মেঘটাকে। দেখল, পুঁচকি মেঘটা ধীরে-ধীরে ছিঁড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল সন্ধের বাতাসে। নাকটা কুঁচকে গেল মাহিরের। গন্ধটা বড্ড বাজে! যারা রাস্তাঘাটে এসব খায় বা খেতে খেতে হাঁটে, তারা বোঝে না ব্যাপারটা কতটা বিরক্তিকর অন্যদের পক্ষে। অনেক বাতেলা বক্তৃতা করা লোককে দেখেছে মাহির, যারা এইসব সাধারণ অসভ্যতা নিয়ে ভাবে না। আসলে সেই বোধটাই নেই!
“শোন বোকা, যা বলছি কর। আমার আর কী! আমি তো ঢুকে গেছি। তোকে ভালবাসি। তাই বলছি। আর কথাটা শুনতে কী আছে বে? কান দিয়েছে ভগবান, সেটা শালা কাজে লাগাবি না? শোন, রিতুদা বাণী দেবে আর তুই শুনবি। আমাদের কাছে রিতুদার বাণী হল দৈববাণী! আর অত ভাটের নখরামোর কী আছে! রিতুদা বাইক পাঠিয়েছে তোর জন্য। বোঝ রে গান্ডু! চল।”
মাহির অবাক হয়ে গেল! বাইক পাঠিয়েছে রিতুদা! ওর জন্য! সামান্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে টিটির দিকে তাকাল। বলে কী ছেলেটা! ও এত গুরুত্বপূর্ণ হল কবে থেকে!
মাহির এদিক-ওদিক তাকাল। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে একের পর এক। রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের দিকের ফুটপাথে সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনেই মেনকা সিনেমা। সন্ধের শো কি শুরু হল?
এই রাস্তাটায় বড়-বড় গুলমোহর, কিছু রেনট্রি আর অশ্বত্থগাছ রয়েছে। রাস্তার হলুদ আলো এই গাছগুলোয় ধাক্কা খেয়ে ছোট-ছোট ছায়ায় ভেঙে ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। কিন্তু তার ভিতর তো কোনও বাইক নেই! টিটি কী সব হাবিজাবি বলছে!
টিটি বুঝল ব্যাপারটা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করে কানে লাগাল। বলল, “কী বে? কোথায় গেলি? তোর গাঁজা কেনা হয়নি? শালা, গাছ লাগাচ্ছিস নাকি বে!”
মাহিরের মুখটা বিরক্তিতে বেঁকে গেল। বুঝল, বাইক নিয়ে কেউ একটা গাঁজা কিনতে গিয়েছে। এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটা গাঁজার ঠেক আছে। টিটির দৌলতে মাহিরও সেসব চিনে গিয়েছে। ও তাকাল টিটির দিকে।
টিটি ওকে পাত্তা না দিয়ে বলল, “ও, এসে গেছিস? তাই বল। দেরি করিস না।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রিতুদার সামনে ওকে যেতেই হবে! কী আপদ! এমন একটা মানুষ। কিছু বললে, কী করে মুখের ওপর না করবে! আর মা? মাকে কী বলবে? মাহির নিজের মনটাকে শক্ত করল। এটাই ওর সমস্যা, বড্ড বেশি আগাম ভেবে নেয় ও। আগে কী বলে দেখা যাক। তারপর না হয় চিন্তা করবে। আর সৎ কাজ হলে করবে না কেন? মা-ও নিশ্চয় বুঝবে ব্যাপারটা। সারা জীবন আর কত অনিশ্চয়তার ভিতর থাকবে!
“ওই এসে গিয়েছে।”
টিটির গলা শুনে তাকাল মাহির। একটা হলুদ কালো বাইক এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে। যে ছেলেটা চালাচ্ছে, তার মুখটা চেনা। আন্ডারকাট চুল। সামনেটা ব্রোঞ্জের মতো রং। বাইকটা দাঁড় করিয়ে মাটিতে পা রেখে ছেলেটা লুকিং গ্লাসে নিজের চুল ঠিক করছে।
টিটি মাহিরকে ইঙ্গিত করে বাইকের দিকে এগিয়ে গেল।
ছেলেটা সোজা হয়ে বসে এবার তাকাল মাহিরের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে মুখটা হাসিতে ভরে গেল, “আরে! মাহিরদা!”
মাহির অবাক হল। ও ছেলেটার মুখ চেনে। নাম জানে না। কিন্তু ছেলেটা ওকে চেনে!
ছেলেটা বলল, “আমি নকু। মানে নকুলেশ্বর। আমি তোমায় চিনি। তুমি তো হেবি খেলো! গতমাসে ওই কবরডাঙায় খেলতে গিয়েছিলে না? হায়ার করে নিয়ে গেছিল তোমায়! আমার মামার বাড়ি তো ওখানে। আমি দেখেছিলাম। আমার খুব ফুটবল খেলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু…”
মাহির হাসল।
টিটি নকুকে কথা শেষ করতে দিল না। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আর ফ্যাচকাস না! ফুটবল খেলবে! গাঁজার ছিলিম চুষে ফুসফুস কয়লার বস্তা করে ফেলেছে! শালা! শোন, তুই সোজা রিতুদার অফিসে নিয়ে যাবি। এখন দাদা চেম্বারে আছে। আমি পরে যাব।”
মাহির অবাক হল, “তুই যাবি না?”
টিটি আবার সেই শ্যাওলা-ধরা দাঁত দেখিয়ে বলল, “যাব, আগে আমার কাজটা শেষ করি।”
কথাটা শেষ করে নকুর দিকে হাত বাড়াল টিটি। বলল, “দে। রিফার করে রেখেছিস তো?”
নকু হাত বাড়িয়ে একটা প্যাকেট দিল টিটিকে। মাহির মাথা নাড়ল শুধু। গাঁজা ভরা সিগারেট। আর সিগারেটের মাথাটা পাকানো। টিটি নেশা করেই একদিন শেষ হবে!
নকু বাইকটা স্টার্ট করে তাকাল মাহিরের দিকে। বলল, “বোসো দাদা।”
মাহির বলল, “হেলমেট?”
“আরে দূর! ওসবের দরকার নেই। বোসো,” নকু বাইকের হাতল ঘুরিয়ে ভ্রুম ভ্রুম শব্দ তুলে রেস দিল।
মাহির ব্যাগটা সামলে বসল।
টিটি বলল, “মুখটা অমন ক্যালানের মতো করে রাখিস না। হাস। শালা, তোকে কেউ ফাঁসি দিতে নিয়ে যাচ্ছে না! কত ছেলে রিতুদার সঙ্গে চিপকাবার জন্য লাইন দিয়ে পড়ে আছে। সেখানে রিতুদা নিজে তোকে ডাকছে, আর তুই পোঁদ দোলাচ্ছিস! তোর হেবি তেল! যা। ভাল করে কথা বল। কাজ শুরু করে দে। বুঝলি?”
পার্টি অফিসের সামনে বাইকটা থামিয়ে পেছন ফিরে নকু বলল, “মাহিরদা, এই যে। তুমি সোজা ভেতরে চলে যাও। কোনও চাপ নেই!”
মাহির বাইক থেকে নেমে হাসল। তারপর এগিয়ে গেল সামনের দিকে। প্রতাপাদিত্য রোডের উপর একটা নতুন তৈরি মাল্টিস্টোরেডের নীচের তলায় পার্টি-অফিস।
সামনে চওড়া ফুটপাথ। সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বেশ কিছু লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে। তাদের মুখে একটা ‘মার দিয়া’ টাইপের ভাব। এদের মুখ চেনে মাহির। সবক’টাই রিতুদার ল্যাংবোট। সকাল-সন্ধে এখানে বসে থাকে। চা খায়। হ্যা হ্যা করে। রিতুদার সঙ্গে এদিক-ওদিক যায়। আর পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে শেষ মন্তব্যটা করে! দেখলেই জুতো খুলে পেটাতে ইচ্ছে করে মাহিরের। তেল দেওয়াটাও এখন একটা কাজ হিসেবে নিয়ে নিয়েছে বাঙালি! বুদ্ধিজীবী থেকে দুর্বুদ্ধিজীবী সবাই ব্যাপক হারে এটা দিয়ে চলেছে! স্যার বলতেন, “এরা ঘুণপোকা! দেশটাকে এরাই ভেতর থেকে শেষ করছে।” স্যারের কথাগুলো আজও মনে আছে মাহিরের।
মাহির এগিয়ে গেল অফিসের দরজার সামনে। দুটো ছেলে বসে মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছিল। ওর দিকে তাকাল। তারপর চিনতে পেরে হাসল। একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ও এসে গেছ! যাও ভেতরে। দাদা বলেছেন তুমি আসবে।”
অফিসের দরজাটা আসলে একটা রোলিং শাটার। ফলে সামনেটা গোটাটাই খোলা! কিন্তু ভিতরে একটা পার্টিশান দিয়ে তৈরি করা ঘর রয়েছে। রিতুদার চেম্বার!
অফিসের ভিতরে পা দিয়েই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মাহির! আচমকা সামনের ওই চেম্বারটার দরজা খুলে ঝড়ের মতো বেরিয়ে এল একটা মেয়ে। একটা স্লিভলেস কুর্তি, সঙ্গে জিন্স পরা। গলায় একটা স্কার্ফ। মেয়েটার ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে মেয়েটা।
উত্তেজনার বশে মেয়েটা দেখতে পায়নি, চেম্বারের বাইরে একটা পাপোশ রয়েছে। তাতে নিমেষে পা জড়িয়ে গেল মেয়েটার। সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা টেবিল ধরে টাল সামলাল। তবে হাতের ফাইলগুলো ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। মেয়েটা থমকে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
মাহির এগিয়ে গেল। তারপর ধীরে-ধীরে ফাইলগুলো গুছিয়ে তুলে দিল মেয়েটার হাতে। মেয়েটা এখনও ফুঁসছে! কিন্তু ফাইলগুলো পেয়ে সামান্য থমকাল। তারপর চোয়াল শক্ত করে দেখল মাহিরকে।
“থ্যাঙ্কস,” মেয়েটা ছোট্ট করে বলল।
“ইটস অলরাইট!” মাহির মাথা নাড়ল।
মেয়েটা থমকে গেল যেন। চোখে কি সামান্য বিস্ময়! ওকে দেখে কি মনে হয়নি যে, এটুকু ইংরেজি ও জানবে! মনের ভিতরের আত্মসম্মানের ঘরটা ক্রমশ ছোট হয়ে গিয়েছে মাহিরের। জীবনের চাপে পড়েই যেন কীরকম হাওয়া-কমা বেলুনের মতো দিনদিন চুপসে যাচ্ছে সেটা। কিন্তু সেটাতেও একটা ছোট্ট লাল পিঁপড়ে কামড়াল। মেয়েটার চোখ থেকে ছিটকে আসা বিস্ময়ের ভিতরের একটা হুল এসে বিঁধে রইল ওই ঘরে। মাহির মনে মনে ভাবল, মেয়েটা তো জানে না, ইলেভেন থেকে টুয়েল্ভে ওঠার পরীক্ষায় একশোয় ও বিরাশি পেয়েছিল ইংরেজিতে। স্যার বলেছিলেন, “মন দিয়ে পড়! তোর হবে!”
কিছু হয়নি মাহিরের। কিচ্ছু হয়নি! রেশমি আচমকা চলে গিয়ে ওকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। আর সেই নিকষ কালোয় হারিয়ে গিয়েছিল ওর সবটুকু! কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতর নিভে আসা, ছোট হয়ে আসা একটা ঘর এখনও যে রয়ে গিয়েছে, সেটা এই হুলটা না বিঁধলে জানতেই পারত না মাহির!
ও পিছন ফিরে দেখল। মেয়েটা বেরিয়ে যাচ্ছে অফিস থেকে। বাইরে আলতো একটা ধোঁয়াশা! স্ট্রিট লাইটের আলোর ভিতর ভেসে আছে দুধের সরের মতো ধূলিকণা। মেয়েটার ফরসা পিঠের পাশ দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে ব্রেসিয়ারের কালো স্ট্র্যাপ। যেন একটা দাগ! একটা রেখা! যার ওই দিকে দাঁড়িয়ে মেয়েটা এখনও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে মাহিরের দিকে। সেই মাহির! যে একদিন একশোতে বিরাশি পেয়েছিল ইংরেজিতে!
.
০৩. আইকা
এই শহরটাকে পিঁপড়ের বাসার মতো মনে হয় আইকার। এই দশতলার উপর থেকে রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয়, সার বেঁধে পিঁপড়েরা বেরিয়েছে খাবার খুঁজতে। কোনওদিকে যেন নজর নেই! আগ্রহ নেই! শুধু পেটের চুম্বক যেন তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক বিন্দু থেকে আর-এক বিন্দুতে।
আইকা তাকিয়েই থাকে। সামনে খোলা কম্পিউটার, ডায়েরি, পেন, পাশে রাখা চায়ের কাপ— সব কিছু থেকে কীভাবে যেন আলাদা হয়ে যায় ও। একা হয়ে যায়। মনে হয় ও নিজেও তো তাই। পিঁপড়ে! পেটের ভিতর ওরও তো একটা চুম্বক রয়ে গিয়েছে! আর তার প্রবল টানে ও নিজেও তো ঘুরে মরছে!
টুংটুং করে বেজে ওঠা মোবাইলের শব্দে আইকার সংবিৎ ফিরল এবার। স্ক্রিনটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। ও ফোনটা হাতে তুলে দেখল। মেসেজ। সার্ভিস প্রোভাইডারের! মেসেজটা ডিলিট করে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চোখ রাখল আইকা। ফেব্রুয়ারির শেষ এখন। তাতেই কী গরম! নেহাত এসি রয়েছে তাই বাঁচোয়া। ইয়ার এন্ড হতে আর মাসখানেক মতো বাকি। এখনই খুব একটা চাপ নেই কাজের। তাও আইকা কাজ ফেলে রাখে না। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিয়েলটরস’-এর সিনিয়র ম্যানেজার স্টোরস-এর পদটা তো আর কোম্পানি ওর মুখ দেখে দেয়নি! কাজ করে বলেই সব হয়েছে।
জীবনে কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝেনি আইকা। এর জন্য সব ছেড়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ও তো দেখেছে কী হয়েছিল ওদের সঙ্গে! জেঠুরা তো প্রায় কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিল বাড়ি থেকে। ওদের পাওনা দেয়নি। মাকে খুব কষ্ট করতে হয়েছিল। বাবার সামান্য পেনশন আর মায়ের প্রাইমারি স্কুলের চাকরি ভরসা করে যাদবপুরে খুব ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল ওরা! ক্লাস সেভেনে পড়ত তখন। ছোট্ট দুটো ঘর। একটুখানি একটা বেসিন। আবছা অন্ধকার একটা বাথরুম। দু’মিনিট টানা কল খুলে রাখলে বাড়িওয়ালি জেঠিমা দোতলার বারান্দা থেকে মুখ বাড়িয়ে গালাগাল করত। কাপড় কাচলে বলত, “এটা বস্তি নয় যে, এমন আওয়াজ করছ!” কথায়-কথায় জেঠিমা জিরাফের মতো গলা বাড়াত। চিৎকার করত। উঠে যাওয়ার হুমকি দিত। এমনকী, একদিন তো মাকে বেশ্যা পর্যন্ত বলেছিল, ঠিকমতো মেন গেট আটকায়নি বলে। তবে এই শেষ কথাটা মেনে নিতে পারেনি আইকা। তখন ও ক্লাস নাইনে পড়ে। যা ঝগড়া সেদিন ও করেছিল! জেঠিমা তো শেষপর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিল! কোনওদিনই অন্যায় মেনে নিতে পারে না ও। সেদিনও পারেনি। আজও পারে না! সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে কোথায় যেন একটা ভাললাগা এখনও মনে আসে! জেঠিমার ওই ভয় পেয়ে যাওয়া মুখটা এখনও চোরা একটা তৃপ্তি দেয় ওকে। তবে সত্যি বলতে কী, সেসব দিনগুলো আর ভাবতে চায় না আইকা।
কম্পিউটারের দিকে মনোযোগ দিল এবার আইকা। ইনভেন্ট্রির লিস্ট পাঠানো হয়েছে ওকে। এসব ওর আর নিজে না দেখলেও চলে। কিন্তু তাও দেখে ও। স্টোরের লোকজন চুরি করে। সাইটে মাল পাঠানোর সময় দরকারের চেয়ে বেশি মাল নিয়ে যায়, কিন্তু চালান-এ সেটা দেখায় না। তাই আপ টু ডেট ইনভেন্ট্রি লিস্ট মিলিয়ে নিতে হয়। কতটা মাল গেল আর কতটা থাকল দেখে নিতে হয়।
স্টোরের বড়বাবু রমেন মণ্ডল লোকটা ঘোড়েল। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, তেল দিয়ে পালিশ করা চুল, লাল বেদানার মতো দাঁত নিয়ে দরকারের চেয়ে বেশি হেঁ হেঁ করে! এমন হেঁ হেঁ করা মানুষ দেখলে বড্ড রাগ হয় আইকার। উপরের প্লাস্টিকের হাসির তলায় লুকোনো দাঁত-নখগুলো ভালই চিনতে পারে ও। জীবন ওকে এইসব জিনিস চিনিয়ে দিয়েছে।
আগে লোকটার উপর ভরসা করত আইকা। কিন্তু এখন আর করে না। লোকটা যে জিনিস সরায়, সেটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু হাতেনাতে ধরতে পারেনি। কিছু বললেই বলে, ওয়েস্টেজ বেশি। লেবাররা শয়তানি করে। কনস্ট্রাকশানে নানা ঝামেলা। তাই এমন বাড়তি ব্যয় হচ্ছে! আরে বাবা, দিব্যি ভাল ওয়্যার হাউস। লেবারদের খবরও অন্যদের থেকে পায়! সেখান থেকে ওয়েস্টেজ কী করে বেশি হবে?
কিন্তু এসব তো আর মুখের কথায় হয় না। প্রমাণ চাই। তাই আজকাল নিজেই আচমকা মাঝে মাঝে ওয়্যার হাউসে যায় আইকা। মাঝে মাঝে সাইটেও যায়! আর ওকে সামনে দেখলে রমেন এখনও হেঁ হেঁ করে। কিন্তু আজকাল ওই হাসির আড়ালে বসে থাকা শয়তানটাকে চিনতে পারে ও।
আইকার সাড্ন ভিজ়িটের জন্য চুরি কিছুটা কমেছে। ও নিজে গিয়ে সব মালপত্তর মিলিয়ে রমেনবাবুকে দিয়ে ইনভেন্ট্রি লেজারে সই করিয়ে নেয়। লোকটা পাঁকাল মাছের মতো, ঢিলে দিলেই কিছু একটা করে বসবে।
আইকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা আজ কেন কে জানে ছিটকে যাচ্ছে বারবার। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে! একটা ফড়িং ঢুকে গিয়েছে যেন মাথার ভিতর। যতই টেনেটুনে মনটাকে বসানোর চেষ্টা করছে, ততই মনটা কীরকম যেন পিছলে যাচ্ছে! কাজ করতেই ইচ্ছে করছে না। এখানে বসে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। কিছুই ইচ্ছে করছে না। আজ দিনের সব কিছুই ‘না’ দিয়ে তৈরি! কারণ, শুধু মনে পড়ছে আজকের তারিখটার কথা! আজই ওর বিয়ে হয়েছিল না! বিয়ের তারিখটা আজই তো!
“কী রে আইকা? বাড়ি যাবি না?”
মুখ তুলে দূর্বাকে দেখল আইকা। মেয়েটা তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কিন্তু সেটাও বুঝতে আজ সামান্য সময় লাগল ওর। তারপর বলল, “বাড়ি?”
দূর্বা হেসে বলল, “ক্যালানে হয়ে গেলি? ক’টা বাজে দেখেছিস? সওয়া পাঁচটা। আজ তোর নোঈ-এর ওই ব্যাপারটা আছে না? বলেছিলি তো আমায় নিজেই। তোকে তো যেতে হবে।”
আরে, তাই তো! আইকা চমকে উঠল। সব ভুলে যাচ্ছে! কী কাণ্ড! ও চট করে ঘড়ি দেখল। ছ’টায় ছেলের বাড়ির লোকরা আসবে। এখন সওয়া পাঁচটা বাজে। ওর তো মিষ্টি কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা। তিনরকম মিষ্টি আর দু’রকম নোনতা। কী কাণ্ড!
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আইকার। মেয়ে দেখতে এসে এসব গান্ডেপিন্ডে গেলাটা জাস্ট সহ্য করা যায় না। কিন্তু কী করবে! পুটুমাসি পইপই করে বলে দিয়েছে, আইকা যেন মনে করে কিনে নিয়ে যায় এসব। বাড়িতে তেমন কিছু ঝামেলা করছে না!
পুটুমাসি মায়ের বান্ধবী। ওদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। পুটুমাসিরা আগে শ্যামবাজারে থাকত। কিন্তু বছরছয়েক হল ফ্ল্যাট কিনে চলে এসেছে এই ভবানীপুরে। আইকারাও তখনই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল! মা আর পুটুমাসি বলতে গেলে একসঙ্গে যুক্তি করে কিনেছে ফ্ল্যাট দুটো!
আইকার মনে পড়ে গেল আবার। ফ্ল্যাটটা তো কেনাই হত না যদি না ওর জীবনে আজকের দিনটা থাকত!
“মাইরি! কী রে?” দূর্বা এবার এগিয়ে এসে ঠেলল আইকাকে, “এমন স্পেসড আউট হয়ে আছিস কেন?”
“না তো, কই!” আইকা হাসার চেষ্টা করল।
দূর্বা বলল, “আমিও আজ তাড়াতাড়ি কাটব। মায়ের শরীরটা ভাল নয়। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে হবে। ব্রতীন তো নেই কলকাতায়।”
আইকা দূর্বার দিকে তাকিয়ে হাসল। আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। দূর্বা ওর খুব বন্ধু, তাই কিছু বলতেও পারছে না। কিন্তু এক-একদিন থাকে যখন কিছুই ভাল লাগে না। রোদের রং, হাওয়ার ওড়না, আকাশ থেকে নেমে আসা আলো, সবেতেই কেমন একটা মনখারাপ লেগে থাকে যেন। যেন মনে হয় সবই অনর্থক! সবই শূন্য! সব কিছুই কেবল থাকার জন্যই রয়েছে!
আইকা আবার একবার জানালার দিকে তাকাল। আলো নরম হয়ে এসেছে অনেক! শহরের শিরা-ধমনির মতো রাস্তাগুলো অনেকটাই ম্রিয়মাণ। কিন্তু পিঁপড়েরা চলেছে! মনখারাপ আর অন্ধকার ভেঙে তাদের সারি এগিয়ে চলেছে। একসঙ্গে। একাকী।
“কী হয়েছে তোর?” দূর্বা পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল এবার, “এমন মুখ করে আছিস কেন? সত্যি মাইরি! তোকে নিয়ে আর পারি না! আর কত বোঝাব বল তো? ছত্রিশ বছর বয়সটা কি তোর হাওয়ায় হল? আরে বাবা, বর কি কারও মারা যায় না? তবে? এবার একটা বিয়ে কর। কত ছেলে তো লাইন দিয়ে রেখেছে! একজনকে বেছে তারপর বিয়ে করে নে।”
আইকা হাসল। কী বলে মেয়েটা! আসলে সবটা তো আর জানে না। কাউকে বলেও না। কী হবে বলে? পুরনো কথা মাটি খুঁড়ে বের করে আনলে দুর্গন্ধই বেরোবে! এখনকার আপাতশান্ত জীবনটা বিঘ্নিত হবে। তার চেয়ে যা অলক্ষ্যে ও অতীতে রয়েছে, তা অলক্ষ্যেই থাকুক।
দূর্বা বলল, “দেখ আইকা, এভাবে মুখ বুজে থাকলে হবে না। আমার তো চল্লিশ হল। আমি কম ঘাটের জল খাইনি! তোর মতো আমারও ছোট থেকে বাবা নেই। সবটা আমাকে আর মাকে করতে হয়েছে। ব্রতীন আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। ওকেও কিন্তু দেখতে হয় আমাকেই। হতে পারে মাল্টিন্যাশনালের ভিপি, কিন্তু জানিস তো ডান দিকে ফিরলে বাঁ দিকটা ভুলে যায়! আগেই জানতাম ও এমনটাই। মা বলেওছিল, অফিস করে এমন ছেলেকে সামলাতে পারবি তো! কিন্তু আমি দূরের সময়টা দেখেছিলাম। ফিউচার ইজ় মাই কনসার্ন। তাই ওকে বিয়ে করব ঠিক করছি। এখনও বয়স আমাদের দিকে। শরীরে, মনে জোর আছে। কিন্তু সারা জীবনটা তো এমন যাবে না! আঠাশে তোর হাজ়ব্যান্ড চলে গেল। তারপর আট বছর কেটে গিয়েছে বস! এবার কিছু কর। বেকার কষ্ট পেয়ে কী লাভ?”
আইকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাউসটা ধরে নাড়াল সামান্য। তারপর বলল, “তুই এত কথা বলিস কেন?”
“যাঃ শালা!” দূর্বা ওর খোলা চুলটাকে আঙুল দিয়ে কানের পিছনে নিয়ে গিয়ে বলল, “বলছি তোর ভালর জন্য রে!”
আইকা হেসে একবার দ্রুত ইনভেন্ট্রি লিস্টটায় চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বন্ধ করে বলল, “আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু যাকে-তাকে বিয়ে করে নেব? এতটা ডেসপারেট হইনি এখনও।”
দূর্বা হাসল, “যাকে-তাকে কী বলছিস! তোর জন্য যা লাইন, তা পেট্রোলের দাম বাড়ার আগের রাতের পেট্রোল পাম্পকেও হার মানাবে।”
আইকা জানে দূর্বা ইয়ারকি করছে! ও ওরকমটা করে। মেয়েটা খুবই ভাল। পরিশ্রমী। তাই কোম্পানিতে ভাল পোস্টে আছে। আর আইকাকে ভালওবাসে খুব। কিন্তু তা হলেও আইকা ওকেও সবটা বলতে পারেনি! কাউকেই পারেনি কোনওদিন। পারে না। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়া আর তার পরবর্তী জীবনের কষ্ট আর সংগ্রামটাই কোথায় যেন পালটে দিয়েছে ওকে। রাগী, অভিমানী আর জেদি করে দিয়েছে। আর তাই তো আজ ওর জীবনটা এরকম হয়ে গেল! জীবনে টাকা আর স্থিতিশীলতার জন্য একের পর এক যা করেছে, তা ওকে আজ এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। সেই স্কুলজীবন থেকেই ও টিউশনি করত। তারপর কলেজে উঠে পার্টটাইম কাজ করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে। এমনকী মায়ের যখন শরীর খারাপ হল, জীবনবিমার এজেন্ট হিসেবেও কয়েকমাস কাজ করেছিল বাড়তি রোজগারের জন্য। আর অল্পবয়সি, সুন্দরী মেয়ে বলে কম নোংরামো তো ওকে সামলাতে হয়নি! কাজ যেমন হত, তেমন মানুষজন নানা খারাপ কথা, ইঙ্গিত আর প্রস্তাবও দিত। জীবন দোধারী তরোয়ালের মতো। একদিকে ওর বাঁধনগুলো যেমন কেটেছে, তেমন ওকেও কেটেছে অন্য দিকে!
কম্পিউটারটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল আইকা। এবার যেতেই হবে, না হলে পুটুমাসি রাগ করবে। আর সত্যি তো, ছেলের বাড়ির লোকজন এসে যাওয়ার আগেই ওর যাওয়া উচিত। রাঙামেসো আর পুটুমাসি ঠিক সামলাতে পারে না কিছু। তাই আইকাকে থাকতেই হয়।
পুটুমাসি মায়ের ছোটবেলার বন্ধু। তবে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। মায়ের বিয়ের চার বছরের মধ্যে দু’বছরের জন্য বাবার বদলি হয়ে গিয়েছিল মধ্যপ্রদেশ। তখন থেকেই আর যোগাযোগ ছিল না। ফলে ওদের ওই ভয়ংকর সময়টার কথা পুটুমাসিরা জানত না। তবে মায়ের ওই সময় পুটুমাসির কথা মনে থাকলেও মা সেখানে যায়নি। সাহায্য চায়নি। কারও কাছেই যায়নি। দু’জনেই যতটা পেরেছে সব সামলেছিল!
শুভ মারা যাওয়ার পর আবার যোগাযোগ হয়েছিল পুটুমাসির সঙ্গে। এখনও মনে আছে আইকার। শুভর শ্রাদ্ধের চারদিন পর মাকে নিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়েছিল আইকা। পুটুমাসিরাও এসেছিল ব্যাঙ্কে। অ্যাকাউন্ট খুলতে। মা আর পুটুমাসি তো দু’জন দু’জনকে দেখে কিছুক্ষণ নড়তেই পারেনি! কেমন যেন থমকে গিয়েছিল! থমকে গিয়েছিল সময়! তারপর দু’জনে জড়িয়ে ধরেছিল একে অপরকে। আর কী কান্না কী কান্না! মা একদম ছেলেমানুষের মতো আঁকড়ে ধরে কাঁদছিল পুটুমাসিকে। পুটুমাসিও কাঁদছিল। ব্যাঙ্কে লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল গোটা ব্যাপারটা! কেউ কেউ হাসছিলও। সকলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আইকার খুব এমব্যারাসড লাগছিল। মনে হচ্ছিল মা এমন বাড়াবাড়িটা না করলেই পারত। কিন্তু কিছু বলতেও পারেনি। কী বলবে! আসলে এই বহুবছর পরের দেখা হওয়াটার ভিতর যে অনেক অনেক মেঘ জমে ছিল! মানুষকে মাঝে মাঝে কাঁদতেও দিতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তখন। তাকে সান্ত্বনা দিতে নেই। তাকে প্রবোধ দিতে নেই। কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতে নেই। তাকে শুধু কাঁদতে দিতে হয়। আইকা জানে, কান্না আসলে খুব ব্যক্তিগত একটা অভিব্যক্তি। খুব সৎ একটা প্রকাশ। সান্ত্বনার মতো বাহ্যিক আড়ম্বর দিয়ে তাকে সব সময় লঘু করার মানে হয় না।
সেই মায়ের সঙ্গে আবার পুটুমাসির যোগাযোগের শুরু। সেই যোগাযোগ থেকেই একসঙ্গে ফ্ল্যাট কেনাও হয়েছে। আসলে শুভর সঙ্গে বিয়ের পর টাকাপয়সার সব অভাব মিটে গিয়েছিল আইকার। তাই শুভ মারা যাওয়ার পরে পঞ্চান্ন লক্ষ টাকা দিয়ে এই ফ্ল্যাটটা কিনতে ওদের কোনও অসুবিধে হয়নি।
শুভর সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। ইংলিশে এম এ করছিল আইকা। শুভদের ছিল সোনার ব্যাবসা। গোটা কলকাতায় ছ’টা সোনার দোকান ছিল ওদের। শুভ নিজে দেখত দুটো দোকান। তার একটা ছিল কলেজ স্ট্রিটে। সেখানেই একদিন আলাপ হয়েছিল ওর সঙ্গে শুভর। রথের দিন ছিল সেটা। আজও মনে আছে আইকার।
শুভ লম্বা ছিল খুব। গায়ের রং মিশকালো। মোটা গোঁফ, দাড়ি। গম্ভীর মুখ। আইকার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় ছিল শুভ।
একটা ছোট বই কিনতে গিয়েছিল আইকা। আটত্রিশ টাকা দাম ছিল সেটার। সঙ্গে খুচরো ছিল না ওর। আইকা পাঁচশো টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল। দোকানদার লোকটি বিরক্ত হয়েছিল খুব। আইকাও বুঝতে পারছিল যে, বিরক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। এতটা খুচরো সব সময় যে থাকবে তা তো নয়। সেটা ও ভাল করে বলতেও গিয়েছিল। কিন্তু লোকটা শুনছিল না কিছুতেই।
পাশেই একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিল শুভ। হাতে মাটির খুরিতে চা নিয়ে ও যে গোটা ব্যাপারটাই দেখছিল, সেটা বুঝতে পারেনি আইকা!
দোকানদার লোকটাকে কিছুতেই বোঝাতে না পেরে আইকা যখন বইটা না কিনেই চলে আসছিল, ঠিক তখনই এগিয়ে এসেছিল শুভ।
আইকার লজ্জা লাগছিল খুব! এমনিতেই দোকানদারটি ওকে সামান্য হলেও অপমান করেছিল, তারপর একদম অচেনা একজন এমন করে গায়ে পড়ে উপকার করছে দেখে লজ্জাটা যেন বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। কিন্তু বইটাও দরকার ছিল খুব। তাই শুভ টাকাটা খুচরো করে দিতে চাইলে আর আপত্তি করেনি। শুভ বিশেষ কথা বলেনি। শুধু জানতে চেয়েছিল, কী পড়ে আইকা।
আইকা বলেছিল। শান্ত নরম গলায় ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এসেছিল দোকান থেকে। কিন্তু পরের দিন ইউনিভার্সিটি ছুটির পরে দেখেছিল বিদেশি দামি বাইকে হেলান দিয়ে ফুটপাথের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুভ! প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল আইকা। কী করছে লোকটা এখানে? টাইট জিন্স, বুকের একটা বোতাম খোলা সাদা জামা আর বিশাল বড় একটা বিদেশি বাইক! লোকজন রীতিমতো দেখছিল বাইকটা। আইকা কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু শুভ একদম সামনে চলে আসায় এড়াতে পারেনি। সৌজন্যবশত সামান্য হেসেছিল! শুভ ভাবলেশহীন মুখে বলেছিল, “আজও যদি খুচরো লাগে, তাই চলে এলাম!”
ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল আইকা। সামনের কাচে নিজেকে দেখে ছোট করে কাটা চুলগুলো ঠিক করে নিল। তারপর টেবলে রাখা বোতলটা থেকে জল খেল একটু।
“শোন, স্যারের সঙ্গে একবার দেখা করে যাস,” দূর্বা নিজের কিউবের দিকে যেতে-যেতে বলল, “তোকে একবার খুঁজছিলেন।”
“তো এতক্ষণে বলছিস!” আইকার বিরক্ত লাগল, “আমায় বেরোতে হবে! আসল কথা না বলে এসব জ্ঞান তোকে কে দিতে বলেছে! আর উনি বেয়ারা দিয়ে কল করাননি কেন?”
দূর্বা বলল, “আরে, আমি ঘরে গিয়েছিলাম তাই আমাকেই বললেন! জাস্ট দু’মিনিট লাগবে। মনে হয় ঝাড়খণ্ডের ওই প্রজেক্টটা নিয়ে কিছু বলবেন।”
আইকা মাথা নাড়ল বিরক্তিতে। তারপর ঘড়ি দেখল। সেই লেট হবেই! ভাগ্যিস ওর নিজের গাড়ি। সত্যি দূর্বাকে নিয়ে আর পারা যায় না। ও আর অপেক্ষা না করে এগিয়ে গেল স্যারের চেম্বারের দিকে। স্যার মানে ওদের কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার রুপিন মেহতা। দেখা যাক, স্যার কতক্ষণ আটকান।
ওর কিউবিকল থেকে বেরিয়ে একটা টানা লম্বা করিডর। আশপাশের কিউবিকলে এখনও লোকজন কাজ করছে। আইকা সেইদিকে তাকাল না। শুধু ঘড়ি দেখল। দূর্বাটা যেন কী একটা! কাজের কথা না বলে এটা-সেটা নিয়ে বেশি ব্যস্ত! মেয়েটা খুব ভাল। কিন্তু দরকারের চেয়ে বেশি সেন্টিমেন্টাল। এত বেশি সেন্টিমেন্টাল, যে মাঝে মাঝে অফিসেই কেঁদে ফেলে! বিরক্ত লাগে আইকার। নিজের মনের গোপন ভাঁজগুলো নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি ভাল লাগে না ওর। জীবনে যখনই সেন্টিমেন্ট আর কার্যকারিতার মধ্যে বাছবিচার করতে হয়েছে, কার্যকর হবে যেটা ওর পক্ষে, সেটাই সব সময় বেছে নিয়েছে আইকা।
“তুই এমনটা করতে পারলি!”
আচমকা কথাটা মনে পড়ায় থমকে গেল আইকা! ভুরু কুঁচকে গেল ওর। কী হল ব্যাপারটা! হঠাৎ এটা মনে পড়ল কেন! আইকা চোখ বন্ধ করল একটু সময়ের জন্য। হঠাৎ এতদিন পরে এটা মনে পড়ল কেন? সেন্টিমেন্ট-কার্যকারিতা এসব নিয়ে ভাবছে বলেই কি এটা মাথায় এল? কিন্তু সে তো প্রায় উনিশ বছর হয়ে গিয়েছে! সেই স্কুললাইফের ব্যাপার। তবে? বয়স বাড়ছে বলেই কি আচমকা মনে পড়ে গেল ওর কথা?
করিডরের শেষ প্রান্তে রুপিনস্যারের কেবিন। তার আগের এই জায়গাটা স্টেনলেস স্টিলের পাত দিয়ে মোড়া। সামান্য বাঁকাচোরা হলেও প্রতিফলন দেখা যায়।
আইকা মুখ ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে নিল আর-একবার! ছোট করে কাটা চুল। বেবি পিঙ্ক রঙের শার্টের সঙ্গে কালো ট্রাউজ়ার। সারা দিনের ক্লান্তির পরেও দেখতে খারাপ লাগছে না! ভালই তো আছে আইকা! নিজের ফ্ল্যাট। মা। বন্ধুবান্ধব। ঋষি। সব নিয়ে খারাপ নেই তো! তবে?
ঋষির কথা মনে পড়তেই হাসি পেল আইকার। ঋষি আগরওয়াল। আলিপুরে থাকে ছেলেটা। বিশাল বড়লোকের ছেলে। চাল, পেঁয়াজ, ডাল আরও কীসবের ব্যাবসা আছে। মদেরও একটা ব্রুয়ারি আছে। কিন্তু সেসব দিকে ঋষির মন নেই।
ঋষি বিবাহিত। কিন্তু বউয়ের দিকেও মন নেই। আইকা বউয়ের কথা তুললে ঋষি বলে, “আরে, ওটা সমঝোতা। বাবার বিজ়নেস বাড়বে ওতে! পলকের বাবুজির বিশাল কারোবার। তুমি তো বোঝো আইকা। শি ডাজ়নট নো হাউ টু লাভ! হাউ টু ফ্… ইউ নো!”
আইকা হাসে। ঋষি ওর চেয়ে আট বছরের ছোট। অফিসের একটা পার্টিতেই আলাপ হয়েছিল বছরদুয়েক আগে। তারপর থেকেই আঠার মতো লেগে থাকে ওর সঙ্গে!
ঋষির একটা ফ্ল্যাট আছে রাজারহাটে। বেশ বড়। প্রায় তিন হাজার স্কোয়ার ফিট। সেখানে মাঝে মাঝে যায় ওরা। ঋষি পাগলামো করে! শরীর নিয়ে মেতে ওঠে! তারপর বিছানাতেই বসে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করে ওরা। বড় টিভিতে ফিল্ম দেখে। আড্ডা মারে। কিন্তু ওইটুকুই। আর কিছু নয়। শুধু টাইম পাস। কোনও মন নেই। গভীরতা নেই। ফিরে আসার সময় পিছুটান নেই। কিচ্ছু নেই। কেবলমাত্র ফান-টাইম। ব্যস। এটা কতদিন থাকবে, সেটাও ও জানে না।
রুপিন মেহতার কেবিনটা বেশ বড়। চারিদিকে বাদামের খোসার রঙের ফার্নিচার। এককোণে বড় লাউঞ্জার। প্রায় নিঃশব্দে এসি চলছে। বড় একটা টেবলের উলটো দিকে বসে রয়েছেন রুপিন। ছোটখাটো মানুষ। গোলাপি ফরসা গায়ের রং। মাথায় পাট করে আঁচড়ানো চুল। দাড়িগোঁফ কামানো। চোখে রিমলেস চশমা। ঘন ভুরুর আড়ালে আঁশফলের বীজের মতো চোখ! দেখলে বোঝা যায় না লোকটার পঞ্চাশ বছর বয়স!
আইকা ঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই রুপিন চোখ তুলে তাকালেন। তারপর হাত দিয়ে বসতে বললেন সামনের চেয়ারে। আইকার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই রে! বসতে বলছেন! তার মানে দেরি হবে। রুপিন ওর বস। তাঁর সামনে তো আর বিরক্তি দেখাতে পারে না আইকা! তাই যথাসম্ভব ক্যাজ়ুয়াল থেকে আড়চোখে ঘড়িটা আবার দেখল আইকা। আজ নির্ঘাত মা আর পুটুমাসির কাছে ঝাড় খাবে! পাত্রপক্ষ চলে এলে মুশকিল হবে। নোঈও রাগ করবে।
নোঈ পুটুমাসির ছোট মেয়ে। বড় মেয়ে এখানে থাকে না। বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নিউ জার্সিতে থাকে। প্রায় ওর মতোই বয়স। আর সেখানে নোঈ মাত্র ছাব্বিশ! এই বয়সে আজকাল কেউ কারও বিয়ে দেয়! হয়তো দেয়! আইকার মনে হয় এখনও নোঈ বিয়ে করার মতো হয়নি।
আইকার বিরক্ত লাগে। মানুষ যে কী করে না! পুটুমাসিদের কথাবার্তা শুনে তো মনে হয় মনে আলো হাওয়া লেগেছে! কিন্তু তারাও এটা কী করে করছে কে জানে! রাঙামেসোর সঙ্গে আইকার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। তাই নোঈ-র এখন বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে রাঙামেসোকে চেপে ধরেছিল আইকা।
রাঙামেসো মানুষটা ভাল। চুপচাপ ধরনের। ঝগড়াঝাঁটি বা তর্ক পছন্দ করে না। সব প্রায় মেনেই নেয়।
আইকার ভাল লাগে রাঙামেসোকে। সারাদিন হয় বই, নয়তো ল্যাপটপে মুভি নিয়ে বসে থাকে। কাউকে জ্বালায় না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘চা দাও’ বলে চিৎকার করে না। কিন্তু মাঝে মাঝে রাঙামেসোর এই নন-এনগেজিং ধরনটা ভাল লাগে না আইকার। মনে হয়, এভাবে জীবন-বিমুখ হয়ে কী করে থাকে কেউ! পুটুমাসিই যা করার করে, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেয়। রাঙামেসো যেন বাড়ির একটা ফুলদানি!
গত সপ্তাহে নোঈ-র এই বিয়ের সম্বন্ধের কথাটা ওদের বলেছিল পুটুমাসি। সন্ধেবেলাটায় মা পুটুমাসিদের বাড়িতেই থাকে। অফিস থেকে ফিরে আইকাও যায়। কখনও ও খাবার কিনে নিয়ে যায় আবার কখনও পুটুমাসি কিছু খাবার বানায়। সেদিন ও নিজে পিৎজ়া নিয়ে এসেছিল। খাবারটা ভাগ করে দিতে দিতে পুটুমাসিই তুলেছিল কথাটা!
পুটুমাসি বলেছিল, “তোদের একটা খবর দেওয়ার ছিল রেখা।”
আইকা তাকিয়ে দেখেছিল মাকে। মা চায়ের কাপটা হাতে নিয়েছিল সবে। পুটুমাসির কথা শুনে থমকে গিয়েছিল।
পুটুমাসি বলেছিল, “পরের সপ্তাহে নোঈকে দেখতে আসবে।”
“দেখতে আসবে মানে?” মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল পুটুমাসির দিকে।
“মানে বিয়ের জন্য,” হেসেছিল পুটুমাসি, “গত জানুয়ারিতে আমরা একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলাম। ওই মুকুন্দপুরের ওইদিকে। সেখানে ওঁরা দেখেছিলেন নোঈকে। খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই খবর দিয়েছে।”
“নোঈ-র জন্য!” মা বলেছিল, “এখনই বিয়ে দিয়ে দিবি?”
পুটুমাসি সামনের চেয়ারটায় বসে হেসেছিল। তারপর গদগদ মুখে বলেছিল, “হ্যাঁ। ছেলেদের অবস্থা ভাল। ডাক্তার। বাপ-ঠাকুরদাও ডাক্তার। ওদের আগ্রহ খুব। তা ছাড়া নোঈ তো আর কচি খুকি নয়!”
নোঈকে দেখতে ভাল। ফরসা। টিকালো নাক। বড়-বড় চোখ। চশমা পরে। থুতনিতে একটা হালকা টোল আছে। হাসিটাও সুন্দর। ঝকঝকে। পছন্দ হওয়ার মতোই মেয়ে।
মা বলেছিল, “তাও ওর বয়সটা দেখ!”
পুটুমাসি বলেছিল, “ওর মতো বয়সে আমার বড় মেয়ে টটি হয়ে গিয়েছে! ছাব্বিশটা খুব একটা কম বয়সও নয়। ছেলের তেত্রিশ। একদম ঠিক আছে।”
আইকা আর কথা না বলে থাকতে পারেনি। ও পাশে বসে মোবাইল নিয়ে খুটখুট করতে থাকা নোঈকে বলেছিল, “কী রে, তুই কিছু বলছিস না কেন?”
“আমি আর কী বলব!” নোঈ মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলেছিল, “বললে কি মা শুনবে? শুনবে না।”
কথাটা সত্যি। পুটুমাসি কারও কথাই শোনে না। আর রাঙামেসো যেহেতু নির্বাক চলচিত্রের পার্শ্বচরিত্র, তাই পুটুমাসিই সমস্ত ডায়ালগের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।
আইকা ছাড়েনি। বলেছিল, “তুই কারও সঙ্গে প্রেম করিস না?”
নোঈ এবার তাকিয়েছিল আইকার দিকে। বলেছিল, “তোকে কতবার বলব দি? না, করি না।”
“আহা, সত্যিটা বল না।” আইকা চাপ দিয়েছিল।
“ও ওসব করে না। ছোট মেয়ে, কী প্রেম করবে? আর করলে ঠ্যাং ভেঙে দেব না?”
“ছোট মেয়ে?” আইকা চোখ গোল করেছিল, “তা হলে বিয়ে দিচ্ছ কেন?”
“ও তুই বুঝবি না। আমরা বয়সে তোদের চেয়ে বড়। আমরা জানি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল।”
পুটুমাসির গলায় অধৈর্য লক্ষ করেছিল আইকা। মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গিয়েছিল ওর।
এই ব্যাপারটা সহ্য করতে পারে না আইকা। বড় বলেই সব জানে? তাই যদি হত, তা হলে ইতিহাসে এত যুদ্ধবিগ্রহ কেন? এত কোটি-কোটি লোকের এত দুঃখ-দুর্দশা কেন? যা খুশি তাই বললেই হল?
আইকা চোয়াল শক্ত করে কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু মা পাশ থেকে চেপে ধরেছিল হাতটা। মা আইকাকে ভালই চেনে। তাই জানে কখন কোথায় ওকে আটকাতে হয়। না আটকালে আইকার মুখে কিছু আটকায় না।
আইকা শুধু তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। নোঈ একমনে মোবাইলে কাউকে একটা মেসেজ করে যাচ্ছিল। যেন এই ঘরে ও নেই। এই ঘরের সঙ্গে ওর কোনও সম্পর্কই নেই।
আইকা টেবিল থেকে খাবারের একটা প্লেট তুলে ভেতরের ঘরের দিকে গিয়েছিল। রাঙামেসো ভেতরের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল একা।
আইকা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মেসোকে দেখছিল। ঠিক নোঈর ফোটোকপি! বাপ আর মেয়ের এই চুপ করে, একা হয়ে থাকায় কী মিল! ওই ঘরে মেয়ে বসে মোবাইলের মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়েছে। আর এই ঘরে বাবা ল্যাপটপে।
খাবারের প্লেটটা নিয়ে গিয়ে ঠকাস করে টেবিলে রেখেছিল আইকা। মেসো তাকিয়েছিল ওর দিকে। মুখে সামান্য হাসি।
রাগটা মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল আইকার, হাসিটা যেন সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল একদম।
ও দাঁত চেপে বলেছিল, “হাসো যত পারো! মেয়েটা তোমার তো? ঠিক জানো?”
রাঙামেসোর সঙ্গে এভাবেই কথা বলে আইকা। একদম যা মনে হয় বলে। মেসো কিছু মনে করে না। বরং কেন কে জানে প্রশ্রয় দেয়।
মেসো ওর হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিয়েছিল। তারপর বলেছিল, “কী হয়েছে তোর? এত খেপে আছিস কেন?”
আইকা বলেছিল, “নোঈর এই বয়সে বিয়ে দিয়ে দেবে পুটুমাসি! আর তুমি এখানে ল্যাপটপে বিদেশি মিনি সিরিজ় দেখছ!”
“আজ কি বিয়ে হচ্ছে?” মেসো হাসিমুখে তাকিয়েছিল আইকার দিকে।
“মানে?”
“মানে, আজই কি বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে?”
আইকা থমকে গিয়েছিল।
মেসো বলেছিল, “শোন, সারাক্ষণ এত উত্তেজিত থাকিস কেন? এত অস্থির হলে হয়! একটা বাড়ি থেকে নোঈকে পছন্দ করেছে। করুক। দেখতে আসবে। আসুক। বিয়ে তো হচ্ছে না।”
আইকা বলেছিল, “তোমায় দেখে অবাক হয়ে যাই! এত ঠান্ডা থাকো কী করে? পুটুমাসি যেভাবে ছেলের গুণগান করছে, সময় থাকলে নিজেই হয়তো বিয়ে করে নিত!”
মেসো হেসেছিল খুব। তারপর বলেছিল, “শোন, নোঈ যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবে। সে পুটু যাই বলুক।”
আইকা মুখ বেঁকিয়েছিল ইচ্ছে করে। তারপর বলেছিল, “তুমি কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি জানি তোমায়। তুমি ভিতু।”
মেসো ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিয়ে রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। তারপর বলেছিল, “জানিস, পুটুকে ওদের বাড়ির লোকজন আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়নি। হাইলি পলিটিক্যালি কানেক্টেড ছিল ওদের বাড়ি। সব রকম চেষ্টা করেছিল আমাকে আটকাতে। মারতেও চেষ্টা করেছিল।”
“তারপর?” অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আইকা।
মেসো হেসেছিল শান্তভাবে। তারপর বলেছিল, “নোঈ না চাইলে ওর বিয়ে কেউ দিতে পারবে না।”
“আর ইউ ইন আ হারি?” রুপিন ফাইল থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন।
আইকা বাঁ হাতের ঘড়িটা ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল, “একটু স্যার। বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে।”
“ও, ইজ় দ্যাট সো!” রুপিন ফাইলটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “আমি তা হলে ব্যাপারটা ছোট করে বলি। কাল ডিটেলে ডিসকাস করব। কেমন?”
আইকা মাথা নাড়ল। আসলে ক্লান্ত লাগছে ওর। রুপিনের কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। আবার অন্যদিকে বাড়িতে গিয়ে ওইসব পাত্রী দেখার মধ্যেও পড়তে ইচ্ছে করছে না। একবার খ্যাপাটে চিন্তা এল মাথায়। ভাবল সব উচ্ছন্নে যাক! একবার কি ঋষিকে ডেকে নেবে? কিন্তু সেটাও ভাল লাগছে না। ছেলেটা শরীর নিয়ে বড্ড হামলে পড়ে! বিরক্ত লাগে।
“শোনো,” রুপিন বললেন, “এবার আমরা ডিপার্টমেন্টাল কিছু রদবদল করব। ম্যানেজমেন্ট চাইছে যাতে লোকজন স্ট্যাগন্যান্ট না হয়ে পড়ে! সেই জন্য তোমায় আমরা স্টোর থেকে সরিয়ে নিয়ে ফিল্ডে প্লেস করব! আমাদের ডেভেলপমেন্টের জন্য যে জমি বা বাড়ি অ্যাকোয়্যার করতে হয়, সেটার চার্জে তোমায় রাখা হবে।”
“আমায়?” একটু অবাক হল আইকা।
“হ্যাঁ, ইটস আ প্রোমোশন আইকা। ইনক্রিমেন্ট, ফেসিলিটিস, সব পাবে। প্লাস লাস্ট দু’বছর আগে তুমি তো বলেইছিলে তোমায় ফিল্ডে দিতে। এবার সেটা হয়েছে। দিনকে দিন কমপিটিশন বাড়ছে। ফলে টাফ হচ্ছে ল্যান্ড পাওয়া। কোম্পানি তোমার পারফরম্যান্সে খুশি। তাই তুমি এটা দেখো। কেমন? আমি আনঅফিশিয়ালি জানালাম। দু’দিনে ইট উইল বি অফিশিয়াল। তুমি এই দু’দিনে তোমার নেক্সট ম্যান চঞ্চলকে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ো।”
আইকা হাসল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আই উইল।”
“ইউ মে টেক ইয়োর লিভ। আজ এটুকুই।”
রুপিন বাড়তি কথা খুব একটা বলেন না। আজও বললেন না। পেনটা খুলে আবার ডুবে গেলেন ফাইলে। খুব মৃদু স্বরে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল এসি-র গুঞ্জন। স্তব্ধতা।
আইকা ঘরের বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল। আজ ওর প্রোমোশন হল। খুব ভাল খবর। কিন্তু ওর তেমন একটা ভাল লাগছে না কেন? ওর মনটা কেমন যেন সেই নেতিয়েই আছে। মনে হচ্ছে কী হবে এসব নিয়ে? কাজে ডুবে থেকে সব কিছু ভুলে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু সেটা তো হল না। কেন হল না? কাজ কি তা হলে কিছুই ভরাট করতে পারে না?
ফ্ল্যাটের নীচে পার্কিং লটে গাড়িটা রেখে আকাশটা দেখল আইকা। সন্ধে নেমে গিয়েছে। সাড়ে ছ’টা বাজে। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে আজ। যা ট্র্যাফিক! শহরটা আস্তে-আস্তে মজে যাওয়া, শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো হয়ে যাচ্ছে। সব কিছু কেমন যেন থেমে আছে। সঙ্গে কেমন একটা বিজবিজে গরম পড়তে শুরু করেছে! শীতের শেষের এই সময়টা কেমন যেন শুকনো লাগে। আইকার ঠোঁটটা টানছে বেশ।
তবে ভরসা একটাই যে, নোঈকে দেখতে লোকজন এই সবে এসেছে। পুটুমাসি ফোন করেছিল আসার পথে।
গাড়িটার পেছনের সিট থেকে খাবারের বড় প্লাস্টিকগুলো নামিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল আইকা। তারপর রিমোট টিপে লক করে দিল গাড়ি।
“দিদি।”
আইকা ঘুরে দেখল, সুশান্ত। ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। আইকা তাকাল।
“দিদি, একটু দরকার ছিল।”
“কী?”
“শ’তিনেক টাকা লাগবে। মানে, মেয়েটাকে একটু ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।”
“কী হয়েছে?” আইকা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।
সুশান্ত ছেলেটা এই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার। গ্যারেজ-স্পেসের পাশের একটা ঘরে থাকে। সঙ্গে ওর বউ আর বাচ্চা মেয়েও থাকে। মেয়েটা সত্যি খুব ছোট। বছরদেড়েক বয়স। ফরসা। গোলগাল। একমাথা কোঁকড়া চুল। আইকাকে খুব চেনে। দেখলেই হাত বাড়ায়। আইকার কী যে ভাল লাগে! মেয়েটাকে ‘মাগো’ নামে ডাকে আইকা। ছুটির দিনে বেশির ভাগ সময় নিজের কাছেই রাখে মাগোকে।
“জ্বর হয়েছে দিদি।”
“সে কী?” আইকা চোয়াল শক্ত করল, “তুই এখন বলছিস? কখন হয়েছে এটা?”
“বিকেলে দিদি,” সুশান্ত ঢোঁক গিলল।
“আর এখন বলছিস? মাকে বলিসনি কেন? আমায় ফোন করিসনি কেন? তোকে জুতোপেটা করতে হয় জানোয়ার!” আইকা চিৎকার করল। তারপর নিজেই দ্রুত হেঁটে গেল ওর ঘরের দিকে।
দরজাটা আলতো করে টানা ছিল। আইকা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। মাগো শুয়ে রয়েছে বিছানায়। চোখ বন্ধ। চড়াই পাখির ডানা ঝাপটানো শব্দের মতো আলতো শ্বাস পড়ছে।
“মাগো!” হাতের প্যাকেট বিছানায় রেখে আইকা ঝুঁকে পড়ল।
মাগো ঘুমের মধ্যে চোখ খুলল আলতো। হাসল কি? তারপর নরম পালকের মতো হাতটা তুলে আইকার গালে রাখল।
আইকার জল এসে গেল চোখে। আচমকা, কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই জল এসে গেল। গলার কাছটা কেমন যেন দলা পাকিয়ে উঠল। ভীষণ টনসিলের ব্যথা গলা থেকে বুকের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ল।
মাগো চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার। আইকা সামলাল নিজেকে। কোন বন্ধন এটা? ওর কে হয় এই একরত্তি মেয়ে? কেন এমন বুকের ভেতর গোটা সমুদ্র নড়ে ওঠে এমন আলতো হাতের ছোঁয়ায়? নিভৃতে বসে আসলে কে ছোঁয় আইকাকে?
আইকা ব্যাগটা খুলে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে তাকাল সুশান্তর দিকে। তারপর চাপা গলায় বলল, “যা এখুনি। আর ফিরে এসে জানাবি আমায় কী হল।”
লিফ্টে উঠে চোখ বন্ধ করল আইকা। গালটা এখনও শিরশির করছে! মাগোর হাতের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। পালকের মতো হালকা, ঠান্ডা একটা স্পর্শ! গলার কাছটা ব্যথা করছে আইকার। কষ্ট হচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে আর কতদিন এই পিঁপড়ের মতো জীবন? আর কতদিন এভাবে এক গর্ত থেকে আর-এক গর্তে দৌড়ে বেড়াবে ও? কোথায় এর শেষ! প্রতিটা দিনের শেষে কি ওর জন্য কোনওদিন এমন স্পর্শ অপেক্ষা করবে না!
শুভর মুখটা মনে পড়ল ওর। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। শুভকে কি ও সত্যি কোনওদিন ভালবেসেছিল?
ছ’তলার করিডরে বেরিয়ে নিজেকে ঠিক করল আইকা। পুটুমাসি আর ওদের ফ্ল্যাট দুটো পাশাপাশি। কিন্তু আইকা জানে মা পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটেই আছে।
পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটের দরজাটা বেশ সুন্দর। কাঠের ওপর কাস্ট আয়রনের ছোট ছোট মূর্তি বসানো। দরজার ওপরে একটা ছোট্ট উইন্ড-চাইম ঝুলছে। পুটুমাসির ফেং-শুইয়ে খুব ভরসা। আসলে রাঙামেসোর ওপরে ছাড়া পুটুমাসির সব কিছুতেই ভরসা। জ্যোতিষ থেকে শুরু করে ঝাড়ফুঁক— শুনলেই হল, পুটুমাসি ছুটবে! মাকেও ট্যাঁকে করে নিয়ে যায়। রাগ হয় আইকার। মাকে বারণ করে, কিন্তু মা শোনে না। বলে, “পুটু জোর করে, কী করব!” কিন্তু আসল ব্যাপারটা অন্য বলে মনে হয়। আইকার মনে হয়, মা নিজেও ক্রমে-ক্রমে এসবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। শুধু ওর ভয়ে কিছু বলে না।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করে নিল আইকা। ঘরে বাইরের লোকজন রয়েছে। অফিস থেকে তো বিধ্বস্ত হয়ে ফিরেছে! তাও হাত দিয়ে যেটুকু সামাল দেওয়া যায় আর কী।
ডোরবেলটা বাজিয়ে একটু সরে দাঁড়াল আইকা। হাতের প্যাকেটে খাবার আছে। এগুলোকে সাজিয়ে দেওয়াটা ওকেই মনে হয় করতে হবে। এত খাবারের কী দরকার, আইকা বোঝে না! পুটুমাসি এত বাড়াবাড়ি করে না!
সকালে শুনেছিল পুটুমাসি মাকে বলছে, “এমন পাত্র হাতছাড়া করলে হবে না বুঝলি। যেভাবেই হোক একে জামাই করতে হবে! মেয়েসন্তান। কখন যে কী হয়!”
কথাটার মধ্যে এমন একটা দৈন্য ছিল যে, আইকার কেমন যেন গা ঘিনঘিন করছিল! নোঈ খুব ভাল মেয়ে। লেখাপড়াতেও খুব ভাল। এম কম করেছে। চাকরি করছে একটা ফার্মে। ঠিক সময়ে নিজে যখন বুঝবে পছন্দ করে বিয়ে করবে। কিন্তু এই যে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া! এই যে মেয়ে বলে, তার শরীরে আর মনে একটা রেগুলেটর বসিয়ে দেওয়া, এটা ভাবলেই মাথায় আগুন জ্বলে আইকার! বাবা মারা যাওয়ার পর মাকে আর ওকে তো কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি! আর সেটা হয়েছে ওরা দু’জন মেয়ে বলেই।
দিনকে দিন পুটুমাসি কেমন যেন হয়ে উঠছে। এত ডেসপারেশন কীসের? বিয়ে করে কী মোক্ষ লাভ হবে? আর ‘মেয়েসন্তান! কখন কী হয়!’ এসবের মানে কী? যত্তসব রিগ্রেসিভ ধারণা!
আইকার মনে হচ্ছিল, একবার গিয়ে চেপে ধরে পুটুমাসিকে। কিন্তু শেষে মত বদলেছে। মা বলে, “পুটু ওরকম। পাগলি। ছোট থেকেই পাগলি। ওর কথা ধরবি না! ওর মনটা খুব ভাল!”
মনটা খুব ভাল হওয়া যেমন জরুরি, তেমন কথাবার্তাগুলো ঠিক হওয়াও জরুরি। আমাদের দেশে, ‘ওর মন ভাল’ এই দোহাই দিয়ে অনেক লোকের খারাপ ব্যবহারকে পাশ নম্বর দিয়ে চালিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা আছে!
মা এসে দরজাটা খুলে দিল। আইকা ঘরে ঢুকে একটু দাঁড়াল। মা আইকার হাত থেকে খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে বলল, “তুই আজকে না এলেও পারতিস!”
আইকার ভুরু কুঁচকে গেল। মা এমনভাবেই কথা বলে রেগে গেলে।
মা বলল, “যা গিয়ে বোস ওখানে। তিনজন এসেছে। পাত্র আর সঙ্গে দু’জন। ওখানে রাঙাদা আছে। পুটুও আছে। তবে নোঈ এখনও ওদের সামনে যায়নি! তুই গিয়ে বোস। কেমন ছেলে ভগবান জানে! তিন বামুনে কখনও মেয়ে দেখতে আসে!”
আইকা ভাবল একবার বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে নেবে। কিন্তু তারপরেই মত বদলাল। কী হবে? ওর তো বিয়ে নয়!
ও জুতোটা খুলে বসার ঘরের দিকে এগোল।
ঘর থেকে পুটুমাসির গলা পাওয়া যাচ্ছে! ও দেখল সোফায় বসে রয়েছে তিনজন। দু’জনকে পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে আর একজনের মাথার পেছনটা দেখা যাচ্ছে।
আইকা গিয়ে দাঁড়াল ঘরের মধ্যে। পুটুমাসি কিছু বলছিল। কিন্তু এবার থমকাল। তাকাল ওর দিকে। সেই সঙ্গে বাকিরাও তাকাল। আইকা দেখল ওর দিকে পেছন করে বসে ছিল যে-মানুষটি, সেও মাথা ঘোরাল!
আর সঙ্গে-সঙ্গে দূরে, বহুদূরে কোথায় যেন একটা বরফের পাহাড় ভেঙে পড়ল। আর তার শব্দে শরীরের ভেতরটা নড়ে উঠল আইকার!
ও দেখল মাথা ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে উনিশ বছর আগে ফেলে আসা একটা সময়! অতীতে ফেলে আসা এক জীবাশ্ম! ওর মনে হল, ওই বিকেলেই ওর কথা মনে হয়েছিল না!
.
০৪. নিশান
“তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম। তোমার শব্দের মধ্যে আমার মাতৃভাষা। তোমার বুকের নীচে বয়ে চলা জলধারা থেকে জল পান করে আমার মৃতপ্রায় সব হরিণেরা। তুমি ছিলে তাই আমিও আজ দাঁড়িয়ে রয়েছি এই বকুলবীথিতে। তুমি শ্বাস নাও তাই গাছ হাওয়া পায়। মেঘ বয়ে যায় নদী থেকে আকাশের দিকে। তুমি স্নেহের দৃষ্টিতে তাকাও তাই গাছেরা ফুল ফোটায়। মৌমাছি জমিয়ে তোলে বিন্দু বিন্দু মধু। তুমি চোখ মেলে আকাশ দেখো, তাই গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষায় পৌঁছতে পারে প্রকৃতি। তুমি গান গাও তাই পাখি ডাকে, মাঝি নৌকো বায়, শিশুরা মায়ের স্তন্য খুঁজে নেয় আলগোছে। তুমি হাসো, তাই হারানো বন্ধু ফিরে পায় মানুষ। পাথর হয়ে যাওয়া বুক ফাটিয়ে আলোর দিকে হাত বাড়ায় ফুলগাছ। নতুন ভাতের গন্ধে দৃষ্টি ফিরে পায় অন্ধ ভিক্ষুক। তুমি ছিলে তাই সুর পাঠালেন ঈশ্বর। তুমি ছিলে তাই স্তব গেঁথে রাখলেন বৈদিক ঋষি। তুমি ছিলে তাই অন্ধকার আকাশ ভেঙে প্রতিদিন তোমায় দেখবে বলে উঠে আসেন অর্কদেব। আজ তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম। আজ তোমার আনন্দের মধ্যে আমার জীবন্ত হয়ে ওঠা।”
ঘরটা ছোট। আবছায়া। একটুকরো জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়ছে অর্ধেক মুখে। গালের ওপর পড়ে রয়েছে দু’-চারটে অন্যমনস্ক চুলের রেশম। নরম আলোয় দেখা যাচ্ছে চোখ দুটো। বাইরের দিকে, আলোর দিকে তাকিয়ে থাকা পাথর রঙের চোখ দুটো।
মেঘলা প্রায়ই বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে এভাবে। গঙ্গার পাশেই ওদের এই ছোট বাড়ি। ইটের দেওয়াল। মাথার ওপর টালি দেওয়া। মেঘলার বাবা মানিক ভটচাজ পুজোআচ্চা করতেন। এখন আর নেই। মারা গিয়েছেন। মেঘলার এক বড় দাদা রয়েছে। নাম বাদল। কিন্তু বর্তমানে ও জেলে। ওয়াগন ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। দু’বছরের জেল হয়েছে ওর। সারা দিন বাড়িতে মা আর মেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে নিশান যায় ওদের বাড়িতে। এমনিই যায়। কারণ নেই।
ওদের ঘরে গিয়ে চৌকিতে একটু বসে। তেল-মুড়ি মাখা খায়। দু’-চারটে কথা বলে। তারপর উঠে আসে।
বাদল আর নিশান একসঙ্গে পড়ত। কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারির পরে বাদল আর পড়েনি। নিশান যখন কলেজে ভরতি হয়েছিল, তখন বাদল বালুরঘাটে তেলের ডিপোয় কাজ নিয়ে ঢুকে পড়ে!
মেঘলাকে ছোট থেকে চেনে নিশান। মেয়েটা চোখে দেখতে পায় না। মাথাটাও মাঝে মাঝে ভারসাম্য হারায়। তখন মেঘলা খুব চিৎকার করে। হাত-পা ছোড়ে। আঁচড়ে-কামড়ে দেয়। কিন্তু তারপর আবার যখন সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন দেখলে বোঝাই যায় না মেঘলার কোনওদিন কোনও অসুখ ছিল।
নিশান আজ দুটো নারকেল নিয়ে এসেছে। ওদের বাড়িতে চারটে নারকেল গাছ এখনও অবশিষ্ট আছে। বাবা সেখান থেকে নারকেল পাড়িয়েছে আজ দুপুরবেলা। তখনই মা বলেছিল মেঘলাদের বাড়িতে যেন দুটো নারকেল নিয়ে যায়!
সাইকেলের ক্যারিয়ারে দড়ি দিয়ে বেঁধে এনেছে নিশান। কাকিমা অর্থাৎ মেঘলার মা খুশি হয়েছে খুব। বলেছে, নারকেলের যা দাম, কিনে খাওয়ার কথা আর ভাবে না।
সোনাঝুরির একপাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে গঙ্গা। মোহনার কাছাকাছি বলে নদী এখানে বেশ চওড়া, কিন্তু তার গতি বেশ মন্থর।
মেঘলাদের বাড়িটা নদীর একদম পাড়েই। খুব বৃষ্টি হলে, নদীর জল এসে ওদের উঠোন ডুবিয়ে দেয়।
এখানে আসতে খুব ভাল লাগে নিশানের। সবসময় সুন্দর একটা হাওয়া দেয়। ঘর থেকে বসে জাহাজ দেখা যায়। তার সঙ্গে চারপাশ কী নির্জন। কানে বাতাসের শব্দ এসে লাগে।
মেঘলা সারাদিন বাড়িতে বসে থাকে। নিশানের এনে দেওয়া ব্রেইলের কিছু বই পড়ে। নিশান চেষ্টা করছে ওকে কিছু একটা কাজ জোগাড় করে দিতে। মাঝেরহাটের কাছে একটা দৃষ্টিহীন বাচ্চাদের স্কুল আছে। সেখানে মেঘলার একটা চাকরি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে নিশান। জানে না পারবে কি না!
আসলে নিশান সকলের জন্য চেষ্টা করে। বাবা বলে, “শুধু নিজের জন্য কিছু করলি না। অপোগণ্ড একটা!”
নিশান হাসে মনে মনে। নিজের জন্য বলতে কী বোঝায়? টাকা রোজগার? তা টাকা ওদের কম কিছু নেই। সোনাঝুরিতে ওদের বড় তেলকল আছে। জমি আছে। দশ ঘর ভাড়াটে আছে। টাকার অভাব তো হওয়ার নয়। তা হলে কেন বলে বাবা? তেলকলে বসে না বলে? মাস গেলে ঘুরে-ঘুরে ভাড়া তোলে না বলে? হবে হয়তো। এই পৃথিবীতে কেউ টাকা রোজগার না করতে পারলে তাকে সকলে অপোগণ্ড বলে দাগিয়ে দেয়!
নিশান ভাবে এমন অপোগণ্ডই ভাল। কবিতা লেখা, কবিতা-পত্রিকা করা, রাজনীতি করা আর দায়ে-দরকারে মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে ও খারাপ তো নেই।
দরজায় শব্দ হল এবার। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল নিশান। মেঘলা জানলা থেকে মুখ না সরিয়ে বলল, “মা, এসেছে।”
নিশান হাসল নিজের মনে। মেঘলা এমন হঠাৎ হঠাৎ কিছু না দেখেও সঠিক বলে দিতে পারে!
কাকিমা ঘরে ঢুকে ব্যস্ত হয়ে বলল, “তোকে বাবু একটু মুড়ি মেখে দিই? টকঝাল চানাচুর আছে আজ। দেব?”
নিশান বলল, “না কাকিমা, আজ খাব না। দেরি করে খেয়েছি দুপুরে। তারপর কেমন যেন অম্বল হয়ে গিয়েছে।”
“জোয়ান দেব একটু?” কাকিমা উদ্বিগ্ন হল।
নিশান জানে এই উদ্বেগটা লোক দেখানো নয়। কাকিমা সকলের জন্য ভাবে। করেও। পাড়ায় যার যা দরকার তাতেই ছুটে যায়। সাধারণত কোনও বাড়ির ছেলে জেলে গেলে তাদের একঘরে করে রাখা হয় এলাকায়। কিন্তু কাকিমার এই পরোপকার করার স্বভাবের জন্য কেউ ওদের খারাপ চোখে দেখে না। বরং প্রতিবেশীরাও নানাভাবে কাকিমাদের পাশে দাঁড়ায়।
মেঘলা যখন মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে, পাড়ার লোকজনই তো আসে সামলাতে। না হলে কাকিমার একার সাধ্য কী মেঘলাকে সামলায়!
“কী রে বাবু, দেব একটু জোয়ান?”
নিশান বলল, “দাও। আর-একটা কথা, তুমি কি গিয়েছিলে বাদলের কাছে?”
কাকিমা সামনের একটা ছোট্ট তাক থেকে জোয়ানের শিশিটা পাড়ল। তারপর সেটা এনে এগিয়ে দিল নিশানের দিকে। বলল, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম গতকাল।”
নিশান শিশির মুখটা খুলে অল্প একটু জোয়ান ঢেলে নিল হাতে।
“দাও,” নিশান দেখল, বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকেই ওর দিকে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে মেঘলা।
“আবার বাঁ হাত?” কাকিমা সামান্য বকুনি দেওয়ার গলায় বলল, “কতবার বলেছি এমন করে বাঁ হাত বাড়িয়ে দিবি না! বাঁ হাতে কেউ কিছু নেয়! ডান হাতে নিবি।”
মেঘলা শুনল না। বরং বাঁ হাতটা অধৈর্যের সঙ্গে নাড়িয়ে বলল, “দাও, দাও, দাও।”
নিশান আলতো করে হাত ধরল মেঘলার। তারপর জোয়ান ঢেলে দিল হাতের পাতায়।
মেঘলা হাতটা টেনে নিল এবার। তারপর বলল, “খাবারের নাম জোয়ান! আচ্ছা বৃদ্ধ বলেও কি কোনও খাবার হয়?”
কাকিমা এর উত্তর দিল না। বরং আগের কথার খেই ধরে বলল, “আর বলিস না বাবু, ছেলেটা রোগা হয়ে গিয়েছে!”
নিশান কী আর বলবে! ও চুপ করেই থাকল। ও নিজেও কয়েকবার গিয়েছে বাদলকে দেখতে। আলিপুর জেলে আছে। খুবই খারাপ অবস্থা! প্রথমত, দেখা করাটাই ঝক্কির। তারপর ভেতরে ঢুকলেও হাজারটা ঝামেলা। ছোট জালের ওপার থেকে সকলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলাও দুষ্কর।
কাকিমা বলল, “জানিসই তো টাকাপয়সা দিতে হয়। আমাদের তো এই অবস্থা! কোথা থেকে মাসে মাসে ওকে এত টাকা দিই বল তো!”
নিশান দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মাথা নামাল। ও নিজে যে ক’বার গিয়েছে বাদলের সঙ্গে দেখা করতে, বেরিয়ে আসার পর ওর নিজেরই কেমন যেন অসুস্থ লেগেছে। আর ভেবেছে ওসব জায়গায় মানুষ থাকে কী করে! আমাদের দেশের এই জেলগুলোকে সংশোধনাগার বলা হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, মানুষের কতটা সংশোধন হয় এখানে কে জানে।
কাকিমা এবার এসে বসল ওর পাশে, “বাবু, তুই বলেছিলি না, কিছু সেলাইয়ের কাজ জোগাড় করে দিবি? মনে আছে তোর?”
নিশানের মনে পড়ল। সত্যি কয়েকমাস আগে কাকিমাকে এটা বলেছিল বটে। বলেছিল, কাকিমাকে কিছু সেলাইয়ের কাজ জোগাড় করে দেবে।
সোনাঝুরির কাছেই হাকিমপাড়া। বহু পুরনো অঞ্চল ওই হাকিমপাড়া। ওস্তাগরদের পাড়া ওটা। সেখান থেকে সেলাইয়ের কাজ পাওয়া যায়।
নিশানের বন্ধু রহিমদের নিজেদেরই বড় দরজির ব্যাবসা আছে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জামাকাপড় সাপ্লাই করে ওরা। কাপড় আর ডিজ়াইন পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওদের। রহিমরা সেলাই করে ফিনিশড গুডস পাঠিয়ে দেয়।
তাতে বাচ্চাদের জামা থেকে শুরু করে জিন্সের প্যান্ট সব থাকে।
রহিমরা নিজেরা জামাকাপড় সেলাই করলেও জামাকাপড়ের লেবেলগুলো আশপাশ থেকে পার পিস হিসেবে সেলাই করিয়ে নেয়।
ঠিকমতো করতে পারলে মাসে হাজারদুয়েক টাকা রোজগার করাই যায়। নিশান জানে কাকিমাদের কাছে সেটাই বড় ব্যাপার।
কাকিমা বলল, “বুঝিসই তো দিনকাল। তোর কাকুর আর ক’টা টাকা জমানো আছে বল! যদি পাওয়া যেত!”
নিশান হাসল সামান্য। জোয়ানটা চিবিয়ে সামান্য রস গিলে নিয়ে বলল, “তুমি মনে করিয়ে দেবে তো! রহিমকে বললেই হবে। আমি ঠিক ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু চোখের খুব স্ট্রেন হয়। ওটা দেখো। বুঝেশুনে কাজে নেমো!”
কাকিমা হাসল, “আর ওসব ভাবার সময় নেই বাবু। টাকার দরকার রে। বাদলটা যে কী করল! জানি না কী হবে! তুই একটু দেখিস।”
“কী দেখবে?” আচমকা জানলার দিক থেকে মুখ ঘোরাল মেঘলা, “খুব মাগুনে বুড়ি হয়েছ তো! অতই যদি তোমার টানাটানি থাকে রোজ মাছ করো কেন? কেন গন্ধসাবান কেনো? কেন পোস্ত খাও? আর নিজের অপদার্থ ভাইদের হাতে টাকা গোঁজো কেন তুমি? তারা তো সব জুটমিলে কাজ করে। তাও তোমার কাছে এসে নাকে কাঁদে কেন? আর তুমিই-বা তাদের হাতে টাকা দাও কেন? জানো না, তোমার দুই ভাই-ই লম্পট! মাতাল! যার নিজের পায়ের তলায় মাটি নেই, সে কী করে অন্যকে টেনে শক্ত মাটিতে দাঁড় করাতে চায়! নিশানদা এলেই তুমি বারবার বলো এটা চাই, ওটা চাই। আর নাকে কাঁদো। এসব অসহ্য লাগে আমার। বিরক্তিকর লাগে। একদম এসব করবে না।”
কাকিমা চুপ করে গেল আচমকা। নিশানও থমকে গেল। এই মেঘলার বিপদ! কখন যে কী বলে বসবে! কী করবে তার ঠিক নেই। একটু আগে কী বলছিল, আর এখন কী বলছে! ওর লজ্জা লাগল খুব। কাকিমার মুখটা অপমানে কালো হয়ে গিয়েছে। নিশানের মনে হল একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এইসব অবস্থায় বসে থাকাও বিড়ম্বনার।
কাকিমা কোনওমতে বলল, “তুই চুপ করবি!”
“কেন চুপ করব?” এবার ঘুরে বসল মেঘলা, “আমায় চুপ করাতে চাও কেন সবাই মিলে? কী হবে চুপ করিয়ে? আমি চুপ করে থাকলে সত্যিটা কি মিথ্যে হয়ে যাবে? বাবাও তোমায় এই নিয়ে বলত। এগুলো শোনো না কেন? আর নিশানদা কত করবে? তোমার অপদার্থ ছেলেকে সারাজীবন লাই দিয়ে গেলে। লেখাপড়া করল না। বাবা যখন বকত, তুমি বাবার সঙ্গে ঝগড়া করতে। বাবার কাছ থেকে দাদার অন্যায়গুলো লুকিয়ে রাখতে। যখন লেখাপড়া ছেড়ে দিল, তখন কিছু বললে না। তারপর যখন চুরির টাকা এনে তোমার হাতে দিত, তখন বাবাকে বলতে বাবার মুরোদ নেই এত টাকা আনার। আর এখন এসব নাকে কাঁদছ। বাবা মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে।”
“তুই চুপ করবি!” এবার কাকিমাও তেড়ে উঠল, “খুব চোপা হয়েছে না তোর? দিনকে দিন বাড়িতে বসে গিলে-গিলে খুব চোপা হয়েছে? একপয়সা রোজগারের মুরোদ নেই আবার কথা!”
মেঘলা হাসল সামান্য। তারপর বলল, “সেই তো, অন্ধ মেয়ের রোজগারের দিকে তাকিয়ে আছ এখন! কিন্তু কী করব বলো তো? আমায় তো এভাবেই পয়দা করেছ।”
কাকিমা এবার চাপা গলায় চিৎকার করল, “চুপ করবি তুই! এসব কী বলছিস? জানোয়ার হয়ে গিয়েছিস পুরো! তুই চাস আমি মরে যাই?”
মেঘলা, নদীর পাথরের মতো চোখগুলো তুলে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বলল, “তুমি মরে গেলে তো তোমার ভাইদের অসুবিধে হবে। নিজের সোনার চুড়িও তো গতমাসে তোমার নবাবপুত্তুর ছোটভাইকে দিয়েছ। আমি জানি না? আমার চোখ নেই, কিন্তু কান তো আছে! নাকি সেটাও নেই ভাবো?”
“মুখপুড়ি, তোর এতবড় জিভ হয়েছে! আমার জিনিস যাকে খুশি দেব। তোর কী?”
“দাও, সব দিয়ে দাও! আর লোকের কাছে নাকে কাঁদো। ভিক্ষে করো। এরপর আর কাকে-কাকে বলবে আমি দেখব,” মেঘলা আচমকা গলা চড়াল এবার।
“আঃ, মেঘলা!” নিশান আর পারল না। চিৎকার করে উঠল, “চুপ করবি তুই? এসব বলছিস কেন? কাকিমা আমায় আগেই বলেছিলেন তো! আর আমাকেই তো বলছেন! তুই এমন করে অসভ্যতা করছিস কেন রে?”
মেঘলা আবার জানলার দিকে মুখ ফেরাল। নিশান জানে জানলার বাইরে শুধু অন্ধকার এখন। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। গঙ্গায় শুধু দু’-চারটে নৌকো ভাসছে। আর আলো বলতে তাদের গলুইয়ের নীচে জ্বলা আগুন। মাঝিরা রান্না করছে। বাকিটা অন্ধকার। তবু ওই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কী দেখতে চায় একটা মেয়ে? কাকে দেখতে চায় নিজের অমন দৃষ্টি দিয়ে?
নিশানের বকুনি খেয়ে মেঘলা চুপ হয়ে যাওয়ায় ঘরের ভেতরটা আচমকা নিঝুম হয়ে গিয়েছে। নদী থেকে হাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে শুধু। মাথার ওপর পুরনো দিনের ডিসি পাখা শব্দ করে ঘুরে চলেছে। দাঁত-নখ বের করা স্বরযুদ্ধের পরের নিস্তব্ধতা তুচ্ছ শব্দদেরও প্রকট করে দিচ্ছে এখন।
নিশানের খুব অস্বস্তি হল। মনে হল উঠে চলে যায়। মেঘলাটা কীসব বলে না মাঝে মাঝে! হ্যাঁ, সবাই জানে যে, ওর মানসিক অবস্থা আর-পাঁচজনের মতো নয়। কিন্তু সারাক্ষণ তো আর সেসব মনে রাখা যায় না। অভাবের সংসার শুধু তো ভাতের হাঁড়িতে টান দেয় না, মনের ভেতরেও একটা ক্লান্তি আর অসহিষ্ণুতা তৈরি করে! কাকিমার রেগে যাওয়াটা তাই বুঝতে পারে নিশান।
কাকিমার বাপের বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। জলাফটক এই সোনাঝুরি থেকে সাইকেলে মিনিট চল্লিশেক দূরে। কাকিমার ভাইরা সেখানেই থাকে। বাদলের সঙ্গে ওই বাড়িতে কয়েকবার গিয়েওছে নিশান। মাটির বাড়ি। তাও ভাঙাচোরা। কাকিমার দুই ভাই জুটমিলে কাজ করলেও তিন-চারটে করে ছেলেপুলে দু’জনের। তাই ওদের সংসার সারাক্ষণ ঘাটতিতে চলে। ফলে দায়ে-দফায় দিদির কাছে এসে হাত পাতে দু’জনে। কাকিমার মনটা নরম। ফেরাতে পারে না কাউকে।
নিশান বোঝে সমস্যাটা। কিন্তু এটাও ভাবে যে, সারা জীবন যদি কেউ সেভাবে পরিশ্রম না করে কেবল নাকে কেঁদে কিছু পেয়ে যায়, তা হলে একটা সময় পর সেটাই তার অভ্যেসে পরিণত হয়ে যায়।
নিশান ঘড়ি দেখল। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। এবার উঠতে হবে। পার্টি-অফিসে একবার যেতে বলেছে বিজনদা। কীসব দরকার আছে! বিজনদার কথা খুব মানে নিশান।
বিজন সরখেল অকৃতদার মানুষ। ভাঙা রেললাইনের পাশে একাই থাকেই পার্টি-অফিসের পাশের একটা ছোট বাড়িতে। ইট বের করা, মাথার ওপর টালি দেওয়া বাড়িটায় গিয়েছে নিশান। বড় রাস্তা থেকে ভাঙা রেললাইন ধরে হেঁটে যেতে হয় কিছুটা!
চ্যাটার্জিপাড়ায় বিজনদাদের বড় বাড়ি থাকলেও লোকটা কেমন একা সন্ন্যাসীর জীবন কাটায়! খুব অবাক লাগে নিশানের! এমনও কেউ পারে! এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন কেউ আছে, যার কিছু দরকার নেই! বিজনদা নিজেই রান্না করে। সাতষট্টি বছর বয়সেও লোকটা এখনও মজবুত খুব। চোদ্দো বছর বয়স থেকে পার্টির হয়ে কাজ করছে এই অঞ্চলে। সকলে এক ডাকে বিজনদাকে চেনে।
নিশান জানে ওকে নিজের সন্তানের মতোই ভালবাসে বিজনদা। জুটমিলটায় প্রায়ই নানা ঝামেলা লেগে থাকে। এখনও চলছে। ইউনিয়নটা নিশানদের পার্টির দখলে। তাই দায়িত্ব ওদের বেশি। বিরোধীরা তো একটা করে নতুন ইসু তৈরি করতেই থাকে। নিশানদের নেতা তারক চক্রবর্তী। বাবার পরিচিত এই লোকটা। তবে সুবিধের লোক নয়। বিজনদার চেয়ে জুনিয়র হয়েও পার্টিকে ধরে এখানে মগডালে উঠেছে! তবে ও দেখেছে, এই নিয়ে বিজনদার কোনও ক্ষোভ নেই! আর এ-ও দেখেছে, তারকদাও বিজনদার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে যায় না!
“কাকিমা, আমি হাকিমপাড়ার ওদের সঙ্গে কথা বলব। তুমি ভেবো না,” নিশান উঠে দাঁড়াল।
কাকিমা মুখ তুলে তাকাল নিশানের দিকে। চোখে জল টলটল করছে। খারাপ লাগল নিশানের। মেঘলা কী যে করে না!
কাকিমা বলল, “আমি আর কী বলি তোকে? দেখলি তো সব! শুনলি তো! নিজের মেয়ের কাছ থেকে এসব শুনতে হয়। মায়ের পেটের ভাই আমার। এসে এমন করে কথা বলে! ওদের বাচ্চাগুলো খেতে পায় না। সব শুনে কী করে চুপ করে থাকি বল?”
নিশান জোর করে হাসার চেষ্টা করল। পরিস্থিতিটা দমচাপা হয়ে আছে। ও বলল, “আরে, ছাড়ো না। আমি জানি তো। প্লাস মেঘলাকেও তো চিনি। তুমি এসব ভেবো না।”
নিশান এবার মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই, আমি আসি। মাথা ঠান্ডা রাখ। বুঝলি?”
মেঘলা ওর দিকে তাকাল না। কিন্তু তাও ওকেই জিজ্ঞেস করল, “‘তোমার মনখারাপের মধ্যে আমার জন্ম’— এমন লেখা আর লেখো না কেন নিশানদা? কবে পড়ে শুনিয়েছিলে, আমার আজও মনে আছে। তেমন কিছু লেখো না কেন?”
নিশান থমকে গেল। সেই তেইশ-চবিবশ বছর বয়সের লেখা। তখন এসে মাঝে মাঝে মেঘলাকে পড়ে শোনাত ও। এই অংশটা বারবার শুনতে চাইত মেয়েটা। সেটা এখনও মনে আছে দেখে আজ অবাকই হয়েছিল ও।
নিশান হাসল। বলল, “বয়সের সঙ্গে তো চিন্তাও পালটায়, তাই না?”
মেঘলা বলল, “তাও ওরকম লিখো আবার। ওরকমটাই শুনতে ভাল লাগে।”
নিশান “আসি,” বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
জীবনে অনেক কিছু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে কী করে যেন আবছা হয়ে মিলিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অজানা বাঁকে। আজকাল নিশানের যেন মনেও পড়ে না ও এমন লিখত। সেই নিশানটা যেন এই নিশান নয়!
সাইকেলটা রাখা ছিল উঠোনের পাশে। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। তবে রাস্তায় আলো আছে। তার সামান্য ভাঙাচোরা টুকরো এসে পড়েছে এই জায়গাটায়।
সোনাঝুরির মূল টাউনশিপটায় এখন আলোর বন্যা। কিন্তু এমন গলিঘুঁজি বা ব্যাক পকেটের মতো জায়গাগুলোয় এখনও চল্লিশ পাওয়ারের স্ট্রিট বাল্ব ঠিলঠিল করে জ্বলছে!
গেট পেরিয়ে সাইকেলে উঠল নিশান। রাস্তাটা কংক্রিট করা। কিন্তু জায়গায় জায়গায় ভেঙে গিয়েছে। আবছা আলোয় সবটা স্পষ্ট নয়। রাস্তার দু’পাশে ঝোপ। ঝিঁঝি ডেকে চলেছে টানা। মাঝে মাঝে দু’-একটা ছোট বাড়ি আর তার জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা আলোয় পুরো জায়গাটাকেই ভুতুড়ে লাগছে নিশানের। ও সাবধানে প্যাডেল করতে লাগল।
রাস্তাটা সোজা গিয়ে বাঁধের ওপর উঠেছে। তারপর বাঁধটা টপকে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে মূল শহরের ভেতর।
বাঁধ টপকালেই ঘন জনবসতি। বহুব্রীহি ক্লাব। পুরনো গলি। মরচে পড়া বাড়িঘর। আধা ঝিম-ধরা দোকানপাট। আর তারপরেই সোনাঝুরির বড় রাস্তা। ওদের পার্টি অফিস ওই রাস্তা দিয়ে সোজা অনেকটা গিয়ে ভাঙা রেললাইনের পাশে।
বাঁধের ওপর সাইকেল নিয়ে উঠে একটু থমকাল নিশান। আরে, মণীশ আসছে না!
মণীশ ছেলেটা ভাল ফুটবল খেলে। বয়স কম। আঠারো-উনিশ মতো। কলকাতার একটা সেকেন্ড ডিভিশনে খেলছে এখন। তবে নিশান নিশ্চিত, বড় ক্লাবেও ও খেলবে। ছেলেটা একটু রগচটা ধরনের আছে। কিন্তু মনটা ভাল। বিজনদা বেশ কয়েকবার নিশানকে বলেছে, মণীশকে পার্টি অফিসে নিয়ে আসতে। নতুন রক্ত না আনলে তো আর দল বাঁচবে না!
সবাইকে ডেকে-ডেকে পার্টিতে ঢোকানোয় বিশ্বাস করে না নিশান। ভাল লাগে না ওর। ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অবলিগেশনে ফেলে কাউকে কিছু করানোর মানে হয় না। কারণ, তাতে আসল কাজটা হয় না। যেখানে মন, হৃদয় অনুপস্থিত সেখানে সবটাই ফাঁকি।
তাও বিজনদার কথা মেনে চলে বলে, মণীশকে পার্টির কথা বলে নিশান। অফিসে আসতে বলে। কিন্তু ছেলেটা কেমন যেন পাশ কাটিয়ে যায়।
হ্যাঁ, ছেলেটা মণীশই তো! এই আলোছায়ার চেককাটা দৃশ্যের মধ্যেও ছেলেটার হেঁটে আসা দেখে ঠিক চিনতে পেরেছে নিশান!
সাইকেলে বসেই মাটিতে পা দিয়ে সাইকেলটাকে দাঁড় করাল ও। মণীশ কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলতে বলতে আসছে। বাঁ হাতে ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরে মাটির দিকে চোখ রেখে হাঁটছে ছেলেটা।
“এই মণীশ!” গলা তুলে এবার ডাকল নিশান। বাঁধ থেকে নেমে যাওয়ার রাস্তাটা সামনেই। মণীশ ওই দিকে বাঁক নিয়ে নিয়েছিল প্রায়।
আচমকা ডাকে থমকে দাঁড়াল মণীশ। কান থেকে বাঁ হাতটা সামান্য সরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর আবছায়ার ভেতরে নিশানকে দেখতে পেয়ে থমকাল একটু। হাসল। ডান হাত তুলে এগিয়ে এল।
নিশানের সামনে এসে দাঁড়াল মণীশ। ফোনে বলল, “আরে, খেপ খেলবে না কেন? বলছি না একটা ম্যাচের জন্য দেড় হাজার টাকা দেবে। ধান্যকুড়িয়ায় যেতে হবে খেলতে। আমি তোমার কথা বলেছি মাহিরদা। বেকার ভয় পেয়ো না তো। পতাদা জানবে কেমন করে? আগেও দুটো চান্স ছেড়েছ। আর বলব না বলে দিচ্ছি।”
ওদিক থেকে কী উত্তর এল, বুঝতে পারল না নিশান। শুনল, মণীশ বলছে, “দূর বাবা, বলছি কালকের মধ্যে জানাতে হবে! বেকার নকশা মারাচ্ছ কেন? তবে এটাই লাস্ট চান্স। পতাদাকে অতই ভয় পেলে যাও পতাদার পা ধরে বসে থাকো। রাখছি।”
ফোনটা কেটে চার অক্ষরের একটা গালি দিয়ে নিশানের দিকে তাকাল মণীশ। বলল, “এই জন্য শালা লোকের উপকার করতে নেই! বারবার বলি খেপ খ্যালো, টাকা পাবে। টাকার দরকার, কিন্তু পেছনে যত রাজ্যের ভয়! কী না পতাদা নাকি বকবে। বেকার ভুঁড়িওয়ালা একটা পিস! এর আগেও দু’বার কথা দিয়ে আসেনি। আমার শালা ভাল লাগে না। যেচে কিছু করতে গেলে লোকে বিশাল ভাও খায়।”
নিশান হাসল। মণীশের মাথাটা গরম। মুখটাও খুব কিছু ভাল নয়। ছোট-বড় জ্ঞান নেই ওর। গালি দিতে পারলেই যেন বাঁচে। কিন্তু এই এবড়োখেবড়ো ছেলেটার ভেতরে অন্যের জন্য ভাল কিছু করার তাগিদ আছে। বিজনদার চোখ আছে। রগচটা ছেলেটার ভেতরে ভাল মানুষটাকে ঠিক চিনতে পেরেছে।
আসলে চারিদিকে তো কেবল মুখোশ পরা মানুষের ভিড় দ্যাখে নিশান। পাউডার-মাখা হাসি। টিপ-কাজল সাজানো ভালবাসা। ভুরু প্লাক করা বন্ধুত্ব। সকলেই সকলের প্রশংসা করছে। বাঁ হাতে ছোরা লুকিয়ে ডান হাতে পিঠ চাপড়াচ্ছে! কেউ আসলে আর সত্যিকারের ভালবাসছে না কাউকে। শুধু শপিং মলের মতো হাসিখুশি আর আলোময় মুখ নিয়ে একে-অপরের সামনে দাঁড়াচ্ছে। এর ভেতরে এই ধরনের মণীশরা ক্রমশ গুলিয়ে যাচ্ছে, ঢেকে যাচ্ছে।
নিশান বলল, “এত ভাবিস কেন! কে কী করল, না করল, সেই নিয়ে উত্তেজিত হোস কেন তুই?”
“হব না?” মণীশ চোখ বড় করল, “জানো, মাহিরদা আমাদের টিমে খেলে। ডিফেন্স। বিশাল চেহারা। টেকনিক ভাল নয়, কিন্তু ডিফেন্ডার তো, তাই চেহারা দিয়ে পুষিয়ে দেয়। হয় বল যায়, নয়তো ম্যান যায়। দুটো একসঙ্গে যেতে দেয় না। স্টেশন মোড়ের বেণুবীণা ক্লাব আছে না, ওরা ধান্যকুড়িয়ায় খেলতে যাবে। জিতলে এক লাখ টাকা দেবে। বড় রুপোর কাপ দেবে। আরও নানা পুরস্কার আছে। ওরা আমায় কলকাতা থেকে তিনজন এনে দিতে বলেছে। একটা ডিফেন্ডার, একটা হাফ আর একটা স্ট্রাইকার। দেড় হাজার টাকা করে দেবে ম্যাচ পিছু। তাও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে খেলতে হবে। কিন্তু শালা ঢ্যামনামো করছে!”
নিশান হাসল, “তোর কী দরকার পড়েছে? আর প্লেয়ার নেই?”
“আরে বাবা, মাহিরদার বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। একটা অসুস্থ ভাই আছে। মা আয়ার কাজ করে। মাহিরদা বেকার। বাবা তো নেই। নিজেই বলেছিল এসব। শুনলে কষ্ট লাগে না, বলো? পার ম্যাচ দেড় হাজার। যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ফ্রি। আর ফাইনালে জিতলে বোনাস হিসেবে পাঁচ হাজার! লোকের শালা ভাল করতে নেই! এখন বলেছি, বলে পতাদা, মানে আমাদের কোচ, সে নাকি বকবে! ন্যাংটো খোকা আমার!”
“অত রাগ করতে নেই,” নিশান হাসল শব্দ করে, “সবাই একরকম হয় না। কিন্তু এভাবে একজন একজন করে আর কতজনকে হেল্প করবি! নিজে তো আর বাড়ি-বাড়ি এসব করতে পারবি না। মানুষের জন্য কাজ করতে হলে চাই ওয়ার্কফোর্স। চাই সংগঠন। সেটা পেলে তোর মতো ছেলেরা দেশে সোনা ফলাবে!”
মণীশ ভুরু কুঁচকে তাকাল। তারপর বলল, “বিজনবুড়ো তোমায় ছেলেধরা বানিয়েছে, না?”
নিশান হাসল, “শোন, বিজনদা তো ফুটবল-পাগল, তোর খেলা পছন্দ করে। তোকেও খুব পছন্দ করে।”
মণীশ বলল, “পছন্দ করে মানে?”
“ওঃ, তোর খেলা পছন্দ করে। তোর অরগানাইজ়িং যে ক্যাপাসিটি, সেটা পছন্দ করে। গত ডিসেম্বরে রক্তদান শিবির করলি, সরস্বতী পুজোর সময় দুঃস্থ বাচ্চাদের বইখাতা দিলি। বিজনদা সব খেয়াল করেছে।”
“মহা কেলো তো!” মণীশ বলল, “আমি একা করেছি নাকি? আমাদের ক্লাব থেকে করেছে। আমিও ছিলাম। এই মাত্র।”
“যাই হোক, বয়স্ক মানুষ এত করে বলছেন। একদিন আয় না পার্টি অফিসে। কাছেই হুলোর চপের দোকান আছে। ব্যাপক ভেজিটেবল চপ বানায়। খেয়ে যাবি,” নিশান হাসল সামান্য।
মণীশ মোবাইলটা টিপে সময় দেখল, “ওরে বাবা, লেট হয়ে গিয়েছে। সামনে ইলেভেনের পরীক্ষা। দু’-দু’বার গাড্ডা মেরেছি। এবারও যদি মারি, বাপ লাথ মেরে গঙ্গায় ফেলে দেবে। আমি চলি নিশানদা।”
“আমি তোকে ছেড়ে দেব? কেরিয়ারে উঠে বোস।”
“দূর, ওই কেরিয়ারে কে বসবে!” মণীশ বিরক্ত হল, “শোনো, এখন সকলেই বাইক চালায়। পার্টি করে কী ছিঁড়লে? দ্যাখো না, পার্টিতে ঢুকেই গলায় সোনার চেন আর বাইক নিয়ে নেয় সবাই। সে শালা টিপছাপ থেকে এম এ পাশ সবার এক কেস। বাঙালির পাছা এখন সেনসিটিভ হয়ে গিয়েছে! তোমার সাইকেলের কেরিয়ার তার ভাল লাগবে না। আমরা বাইকের নরম গদিতে বসতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বুঝেছ?”
নিশান বলল, “তা হলে তুইও আয়। বাইক হয়ে যাবে তোরও।”
মণীশ আচমকা চোয়াল শক্ত করল। তারপর বলল, “শোনো নিশানদা, কারা তেল দেয় জানো? যাদের ট্যালেন্ট নেই। যাদের নিজেদের ওইখানে জোর নেই। আমার আছে। আমি নিজের রোজগারে বাইক কিনব। গাড়ি কিনব। অপদার্থ তেলখোর, চোর-চোট্টাগুলোকে তেল দিতে যাব না। বাই।”
নিশান জানে মণীশের কথাটা ঠিক। এই তেল দেওয়ার ব্যাপারটা এখন এমন একটা পর্যায় পৌঁছে গিয়েছে যে, ওর মনে হয় অধিকাংশ লোকের বোধহয় তেলের খনি আছে!
মণীশ যেতে গিয়েও থমকে গেল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আচ্ছা নিশানদা, জোনাক-বাড়ির কেসটা কী বলো তো!”
“জোনাক-বাড়ির আবার কী কেস?” নিশান অবাক হল।
“যা! তুমি জানো না? গতকাল বাবা জেঠুকে বলছিল। জোনাক-বাড়ি নাকি বিক্রি হয়ে যাবে! সত্যি?”
“দূর! অত পুরনো একটা ব্যারাক-বাড়ি, অত বড় জায়গা নিয়ে তৈরি! বিক্রি হয়ে যাবে বললেই হল? ওর ভেতরের বাগানে কত গাছ আছে দেখেছিস? প্লাস ওটা আমাদের সোনাঝুরির একটা আইডেন্টিটি!” নিশান পাত্তাই দিল না মণীশের কথার।
“তাই?” মণীশ কাঁধ ঝাঁকাল, “কে জানে! শুনলাম বলে বললাম। তোমরা পার্টির লোক। তোমরা তো জানবে। তবে ওই তারক চক্কোত্তি পারে না এমন কোনও কাজ নেই! পারলে গঙ্গাটাকে বিক্রি করে দেয়! শুনছি সোনাঝুরি জুট মিলটাকেও নাকি হুজ্জতি করে বন্ধ করে দিতে চাইছে। তারপর প্রোমোটারকে বিক্রি করে দেবে। সত্যি?”
চোয়াল শক্ত করল নিশান। কথাটা ও নিজেও শুনেছে। পার্টির ভেতর এটা ওদের বলা হয়েছে যে, জুট মিল তুলে সেখানে নাকি আবাসন হবে। গঙ্গার ধারে বড়-বড় ফ্ল্যাট আর বাংলো হবে। কে জানে! তবে জুট মিল তোলা অত সহজ নয়। ব্রিটিশ আমলের মিল। মালিক গ্রুপ বহু দশক ধরে চালাচ্ছে। এখনও সাড়ে ছ’হাজার শ্রমিক আছে। এ তো আর ফুটে প্লাস্টিক পেতে বসা দোকান নয় যে, হল্লাগাড়ি এসে ইচ্ছেমতো তুলে দেবে!
নিশান বলল, “ওসব কিছু নয়। বেকার কথা। হলে আমরা জানব না? জোনাক-বাড়িতে অত অত বড় বাগান। প্লাস বাড়িটার একটা হেরিটেজ ভ্যালু আছে। বিক্রি করব বললেই হল?”
মণীশ হাসল, “বাগান কই আর! এখন তো জঙ্গল! তবে বিক্রি হয়ে গেলে বেকার হবে কিন্তু। জায়গাটা সুন্দর। যাকগে, কাটি গো। পরে কথা হবে।”
নিশান বাঁধের ধার বেয়ে নামতে থাকা মণীশের উদ্দেশে সামান্য চেঁচিয়ে বলল, “অফিসে কাল-পরশু করে আসিস একবার। ভুলিস না কিন্তু।”
বড়রাস্তায় উঠে ডান দিকে বাঁক নিল নিশান। সন্ধের সময় জায়গাটা বেশ জমজমাট থাকে। দোকানপাটে ভিড় থাকে বেশ। তাই লোকজনের মধ্যে দিয়ে জোরে সাইকেল চালানো মুশকিল।
ওর সামনেই এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে হা-হা হি-হি করতে করতে হাঁটছে। নিশান বুঝল টিউশন থেকে ফিরছে সব। কিন্তু এরা এমন করে হাঁটছে যে, সাইকেল নিয়ে গলে যাওয়ার জায়গা নেই!
টিংটিং করে বেল বাজাল নিশান। কিন্তু কেউ সরার নাম করল না। বিরক্ত লাগল ওর। আচ্ছা মুশকিল! ও ভাবল একবার জায়গা পেলেই সুট করে সাইকেলটা গলিয়ে দেবে।
তার আগেই “নিশান,” বলে একটা মেয়েলি গলার ডাক শুনতে পেল ও। সাইকেলটাকে ব্রেক করে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল নিশান। কেয়াদির গলা! চোয়াল শক্ত করল ও। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়।
কেয়াদি মানে কেয়া বটব্যাল। সোনাঝুরির সবচেয়ে বড় নাচের স্কুলটা কেয়াদিই চালায়। সঙ্গে একটা প্রাইমারি স্কুলও আছে। আর এই অঞ্চল থেকে বেরোনো লিটল ম্যাগ ‘সন্দর্ভ’-ও কেয়াদিই সম্পাদনা করে।
ওই ম্যাগে প্রতি সংখ্যায় লিখতে হয় নিশানকে। তবে এখন মূলত রাজনৈতিক লেখা লেখে ও। কেয়াদি নিশানকে খুব স্নেহ করে। আর তাতেই সমস্যাটা হয়েছে। কারণ, নিশানকে দেখলেই কেয়াদির নানা কাজ করার কথা মনে পড়ে যায়।
চোয়ালটা শক্ত করে নিশান ভাবল, এখন আবার কী করে দিতে হবে ভগবান জানে!
কেয়াদি হন্তদন্ত হয়ে কাছে এল। হাঁটা দেখে হাসি পেল নিশানের। কেয়াদি কেমন একটা আলখাল্লা ধরনের জামার সঙ্গে বড় ঢোলা প্যান্ট পরে। কাঁধে সারাক্ষণ একটা রংবেরঙের ঝোলা থাকে। মাথার কাঁচা-পাকা চুলগুলো একদম কদম ফুলের মতো করে ছাঁটা। কানে ঢাউস দুল। কপালে কালো রম্বস আকৃতির টিপ! ওদের মফস্সলে কেয়াদিকে কেমন মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা প্রাণীর মতো লাগে নিশানের।
কেয়াদির বিয়ে হয়েছিল দু’বার। কিন্তু দু’বারই বিয়ে ভেঙে গিয়েছে। এক মেয়ে আছে। ফলসা। সে বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে।
কেয়াদি বলে, “আমার বাষট্টি বছর বয়স হতে পারে, কিন্তু মনটা এখনও কুড়ি, বুঝলি?”
নিশানের হাসি পায়। মানুষের তো বয়স হবেই! সমস্ত পৃথিবীতে সব মানুষের বয়স বাড়েই। কিন্তু দেখেছে সেটা নিয়ে কত মানুষের মনে কতরকমের জটিলতা। বয়স নিয়ে কিছু মানুষ অযথা ডিফেনসিভ হয়ে পড়ে!
কেয়াদি যখন কথায়-কথায় কুড়ি বছর বয়সের কথা বলে, নিশানের মনে হয়, ও এমন কিছু কুড়ি বছরের ছেলেপুলেকে চেনে, যারা গাম্ভীর্যে দুশো কুড়ি বছর ছুঁয়ে ফেলেছে! বয়স দিয়ে কে কতটা মানসিকভাবে নবীন আর তাজা, সেটা বোঝানোর খুব কিছু দরকার আছে বলে মনে হয় না নিশানের।
কেয়াদি একটু নাচতে-নাচতে হাঁটে। এখনও একরাস্তা লোকের মধ্যে দিয়ে প্রায় নাচের ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলল, “কী রে, তুই কোথায় যাচ্ছিস? ওই বুড়োটার কাছে?”
নিশান হাসি চাপল কোনওমতে। বিজনদাকে কেয়াদি কেন কে জানে, সহ্য করতে পারে না! কথা উঠলেই বলে, “শালা মেনিমুখো! পার্টি করে! লেনিনকে কী উচ্চারণ করত জানিস? লেলিন! আমার বাবার পায়ের কাছে বসে থাকত। আর কাজুদার চামচা হয়ে ঘুরত। সে কিনা এখন সং সেজে ঢং করছে! তুই যাস কেন দেড়েলটার কাছে? যাবি না একদম!”
কেয়াদিরা এই অঞ্চলের পুরনো বাসিন্দা। অনেক কিছু চেনে। আসলে নিশানরা আগে এখানে থাকত না। মুর্শিদাবাদে বাবার ব্যাবসা ছিল। পরে ওরা সোনাঝুরিতে চলে আসে জমিজায়গা কিনে। নিশানের তখন পাঁচ বছর বয়স। দেখতে-দেখতে তারপর চব্বিশ বছর কোথা দিয়ে যে কেটে গেল!
কেয়াদির কাছে সোনাঝুরির কথা শোনে নিশান। পুরনো সোনাঝুরির কথা। শোনে সেই সময়কার স্কুল, গঙ্গার পাড়, জোনাক-বাড়ির কথা। আর শোনে একটা ছেলের কথা। অল্পবয়সি, ফরসা, একমাথা কোঁকড়া চুল আর গালে হালকা দাড়িওয়ালা একটা ছেলের কথা। কেয়াদি তার কথা বলতে গেলেই কেমন আবছাভাবে তাকায় দূরের দিকে। তারপর অস্ফুটে বলে, “সত্যি, অদ্ভুত মানুষ ছিল কাজুদা!”
“কাজুদা? মানে?” প্রথমবার শুনে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নিশান।
কেয়াদি বলেছিল, “সে ছিল একজন। পুরো নাম বেঞ্জামিন কূজন সরকার।”
“কথা কানে যায় না?” কেয়াদি ঝংকার দিয়ে উঠল, “আমায় কেয়াদি বলিস ঠিক আছে, কিন্তু জানবি আমি তোর মায়ের বয়সি। কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিবি।”
নিশান হাসল, “এই বলো বয়স কুড়ি। আবার এই বলছ মায়ের বয়সি! এত কনফিউজ়ড কেন তুমি?”
“আমি কনফিউজ়ড?” কেয়াদি চোখ বড়-বড় করল।
“বিজনদা ঠিকই বলে…” কথাটা অসমাপ্ত রেখে চুপ করে গেল নিশান। বিজনদার নাম শুনলে চিড়বিড় করে ওঠে কেয়াদি। এই চিড়বিড়ানিটা দেখতে খুব মজা পায় ও।
“কী বলে দেড়েলটা? আমায় নিয়ে কথা বলে ও? ওর দাড়ি যদি না ছিঁড়েছি আমি! আমার নাম পালটে দিস!” রাস্তার মধ্যে প্রায় লাফাতে লাগল কেয়াদি।
নিশানের আবার হাসি পেল খুব। অবশ্য তার সঙ্গে হঠাৎ ভালও লাগল। আসলে কুড়ি নয়, কেয়াদির বয়স বড়জোর তেরো। নেহাত কপাল খারাপ, তাই ওই মনটা একটা বাষট্টি বছরের শরীরে আটকে আছে!
“বলো ডাকলে কেন? আমি বিজনদার কাছে যাব। আলুর চপ নিয়ে যাব। বিজনদা রোজ সন্ধেবেলা মুড়ি দিয়ে খায়।”
“রোজ?” কেয়াদি চোখ বড়-বড় করে তাকাল, “বুড়োর রস কম নয়তো! রোজ ওই মোবিলে ভাজা চপগুলো গেলে? মরার ইচ্ছে হয়েছে? হলে বলিস আমি গিয়ে গলা টিপে দিয়ে আসব।”
“আহা, তুমি বলো না, কী কেস? ডাকলে কেন?” নিশান এবার সত্যি অধৈর্য হল। কেয়াদি এত কথা বলে যে, একবার ধরলে ছাড়া পাওয়া মুশকিল।
কেয়াদির যেন মনে পড়ে গেল কথাটা। চট করে একবার হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল, “আরে, তুই আমার সব গুলিয়ে দিস! শোন, এখনই একবার সোনাঝুরি স্টেশনে চলে যা।”
“কী? কেন?” অবাক হল নিশান।
“আরে, ফলসা এসেছে আজ। কাল ওর জন্মদিন না?” কেয়াদি এমন করে বলল, যেন ফলসার জন্মদিনটা পাবলিক হলিডে।
“তোমার মেয়ে এসেছে?” অবাক হল নিশান।
“আসবে না? সেই গতবছর পুজোর পর এই এল। তা, ওর কয়েকজন বান্ধবী এসেছে আমাদের বাড়িতে। থাকবে।”
“ভাল কথা,” নিশান বলল, “তাতে আমি স্টেশনে যাব কেন? ট্রেনের গার্ড আর ড্রাইভাররাও আসবে নাকি?”
“আরে, কথাটা শোন! খালি বাজে বকবক! দেড়েলটার সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও ক্যালানে হয়ে গেছিস।”
“কেয়াদি,” নিশান বলল, “কী সব ভাষা ব্যবহার করো!”
“ওরে আমার নাড়ু!” কেয়াদি চটাস করে একটা চাঁটি মারল নিশানের হাতে, “ছেলেরা বলতে পারে আর আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? শভিনিস্ট পিগ!”
নিশান হেসে বলল, “তা পিগ স্টেশনে গিয়ে কী করবে?”
“ওর একটা বান্ধবীকে নিয়ে আসবি। বেচারি আগে কোনওদিন ট্রেনে করে আসেনি। খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এই সোনাঝুরি জুট মিলটার মালিকের মেয়ে! ট্রেনে-ফেনে চড়ার অভ্যেস নেই। কিন্তু গাড়িতেও আসবে না। ওর ইচ্ছে লোকাল ট্রেনে একবার উঠবে। তুই স্টেশনে গিয়ে ওকে রিসিভ করে রিকশা করে আমাদের বাড়িতে এখনই নিয়ে আয়। ওর ট্রেন আর কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঢুকবে।”
নিশান কিছু বলার আগে কুঁইকুঁই করে ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ও দেখল নোঈ কল করেছে!
নোঈ ওর মাসতুতো বোন। ভবানীপুরে থাকে ওরা। পুটুমাসি আর রাঙামেসো খুব ভালমানুষ! নোঈও খুব ভাল মেয়ে। তবে আজকাল আর সেই ছোটবেলার মতো যোগাযোগটা নেই!
ফোনটা দেখলেও ধরল না নিশান। পরে কলব্যাক করে নেবে।
“আমায় মেয়েটি চিনবে কী করে?”
“আরে, আমি ওকে তোর ছবি মেসেজ করে দিয়েছি। তুই টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়াবি, ও চিনে নেবে,” কেয়াদি ঝরঝর করে একনিশ্বাসে বলে গেল কথাগুলো।
ওকে না জিজ্ঞেস করেই করে দিয়েছে! দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিশান। এই ভয়টাই করেছিল ও। কেয়াদি মানেই একটা না-একটা কাজের ফরমায়েশ!
ও বলল, “আচ্ছা, যাচ্ছি।”
“শোন, তোর ওই পার্টির লেকচার দিবি না মেয়েটাকে। ও ভাল মেয়ে। কত বড়লোক বুঝতে পারছিস?” কেয়াদি সাবধান করে দেওয়ার মতো গলায় বলল।
“ভাল মেয়ে মানে? আমরা কি খারাপ ছেলে?” নিশান ভুরু কোঁচকাল, “এমন মেয়ে, যার কাছে লোকাল ট্রেন চড়াটা অ্যাডভেঞ্চার, তাকে পার্টির কথা বলে আমি কেন বেকার আমার ব্যাটারি খরচ করব!”
“এইসব কথা বলবি না ওকে একদম। বুঝলি?” কেয়াদি সাবধান করে দিল, “ওর নাম রাধিয়া। রাধিয়া মালিক! মনে রাখবি নামটা। এখন যা।”
নিশান সাইকেলটা ঘুরিয়ে উঠে বসল তার ওপর।
কিন্তু প্যাডেল করার আগেই কেয়াদি সাইকেলের হ্যান্ডেলটা চেপে ধরে বলল, “‘লেলিন’ রোজ ওই তেলেভাজা-মুড়ি খায় নাকি? হুলোটা যা তেলে ভাজে, ওতে তো হাতিও মারা যাবে রোজ খেলে!”
নিশান থমকে গেল একটু। কেয়াদি তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। বড়-বড় চোখ স্থির।
নিশান বলল, “ম্যাক্সিমাম দিন। কেন?”
কেয়াদি আলতো করে ছেড়ে দিল সাইকেলের হ্যান্ডেলটা। তারপর বলল, “আত্মহত্যা করবে বলেছিল চল্লিশ বছর আগে। কিন্তু সেটা যে এভাবে রোজ চপ-মুড়ি খেয়ে করবে তা বুঝতে পারিনি তখন।”
Chapter - 5 - 9
০৫. নোঈ
খুব নিচু দিয়ে একটা এরোপ্লেন উড়ে গেল আর নোঈ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার কী বিশাল ছায়া পড়ল বাড়িটার গায়ে! ভাস্কর চক্রবর্তীর একটা কবিতার কথা মনে পড়ে গেল ওর!
নোঈ চশমাটা খুলে আলতো করে কপালের ঘাম মুছল। মার্চের শেষ এখন, কিন্তু মনে হচ্ছে ভরা বৈশাখ চলছে। কালবৈশাখী বলে একটা ব্যাপার ছিল ছোটবেলায়, কিন্তু আজকাল সেসব আর হয় না। কে জানে হয়তো অ্যানালগ সময়ের জিনিস বলে এই ডিজিটাল যুগে আর তার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না!
ঘড়িটা দেখল একবার। সওয়া পাঁচটা বাজে। শ্বেতা বলেছিল পাঁচটায় চলে আসবে। কী যে করে না মেয়েটা! এমনিতেই আজ মেজাজটা গরম হয়ে আছে। তার ওপর যদি ও দেরি করে, তা হলে আর কত মাথা ঠিক রাখা যায়!
নন্দনের সামনের রেলিং-এ হেলান দিয়ে মাথাটা নিচু করে দাঁড়াল নোঈ। ক্লান্ত লাগছে। কারও সঙ্গে রুড ব্যবহার করতে খারাপ লাগে ওর। কাউকে অসম্মান করলে মনে হয় সেটা ওর নিজের অসম্মান। কিন্তু ব্যাপারটা এমন একটা পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে, আর সহ্য করা যাচ্ছিল না।
প্লেনটা চলে গেলেও তার শব্দটা এখনও যেন চারিদিকে রয়ে গিয়েছে। এত নিচু দিয়ে প্লেন যেতে কোনওদিন দেখেনি নোঈ। ও মাঝে মাঝে ভাবে কোনওদিন যদি কোনও প্লেন ভেঙে পড়ে এই শহরটায়! কী সাংঘাতিক ব্যাপারটাই না হবে!
সাইড-ব্যাগটার ভেতর থেকে একটা জলের বোতল বের করল নোঈ। অর্ধেক জল আছে। কিছুটা খেয়ে আবার ব্যাগে ভরে রাখল বোতলটা। তারপর চারপাশে তাকাল। বিকেলের এই সময়টায় বেশ ভিড় থাকে। আজ আবার কী সব অনুষ্ঠান আছে জীবনানন্দ সভাঘরে। ওই দিকে যাওয়ার যে-গেটটা রয়েছে তার সামনে বড়-বড় পোস্টার পড়েছে! গল্পপাঠ না কী যেন হবে। অন্য দিন হলে হয়তো নোঈ যেত, কিন্তু আজ মেজাজটা ভাল নেই। ব্যাগটাও বড্ড ভারী লাগছে। গীতবিতানটা এত মোটা! এটা নিয়ে সারা দিন ঘুরছে ও। অফিসও করেছে। কী, না শ্বেতা ওটা নেবে। শ্বেতার বইটা কোন এক বান্ধবী নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। কাল শ্বেতার গানের প্রোগ্রাম আছে।
আসলে নোঈর আজ একটুও দাঁড়াতে ভাল লাগছে না। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে না। শুধু মনে হচ্ছে বাড়ি গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে এসিটা চালিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিতে। পরপর যা ঘটছে জীবনে, আর নিতে পারছে না! প্রথমে মা, তারপর জয়, তারপর এই চাকরি। কী যে ঝামেলা! চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করল নোঈ। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল সামনে। মায়ের রাগী, গোমড়ামুখ! কী অদ্ভুত! মা কেন এমন করে কে জানে! সবাই বলে ছেলেমানুষি। কিন্তু নোঈ জানে আসলে এটা ইগো, জেদ। মায়ের কথা সবাইকে শুনতে হবে। কেন শুনতে হবে? ভুল বললেও শুনতে হবে! এমন আবদার করার মানে কী? রাগ হয়ে যায় নোঈর। আরে বাবা, তোমার যদি পাত্র অতই পছন্দ হয় তবে তুমি যাও না, বিয়ে করো না! ডাক্তার হলেই তাকে পছন্দ করতে হবে? বিলেতে থাকলেই তার ওপর হামলে পড়তে হবে? আশ্চর্য সাইকোলজি মানুষের! মনের ওপর কি জোর চলে! হয়নি সেই ছেলেটিকে পছন্দ নোঈর। কী করবে? আর ছেলে তো নয়, বড় বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন যেন! আর সারাক্ষণ কত রোজগার করে, কত দামি গাড়ি চড়ে, এসব বলে গেল। এত বাজে লাগছিল নোঈর! নিজের নামটা পর্যন্ত চিবিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, “ডিনো।”
বাবা খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল নাম শুনে। অবাক হয়ে বলেছিল, “ডিনো মানে?”
“আসলে পুরো নামটা নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির। ম্যারিকায় লোকের ডাকতে সমস্যা হয়! তাই ডিনো করে নিয়েছি আমি।”
পাশ থেকে চশমা পরা শান্ত চোখের মানুষটা এবার প্রথম কথা বলেছিল। আলতো গলায় বলেছিল, “ওর ভাল নাম দীনবন্ধু।”
খুব হাসি পেয়ে গিয়েছিল নোঈর। তবে খুব জোর নিজেকে সামলে নিয়েছিল ও। নোঈর হাসি একবার শুরু হলে আর শেষ হতে চায় না।
বাবা বলেছিল, “কিন্তু এটা তো ভাল নাম। দীনবন্ধু মিত্রের লেখা ‘নীল দর্পণ’ পড়েছ?”
ডিনো আবার কায়দা করে বলেছিল, “ডাক্তারি করতে গেলে বাইরের বই খুব-একটা পড়া হয় না! প্লাস ঠাকুরদা নামটা রেখেছিল। খুব ওল্ড ফ্যাশন। আই ডোন্ট লাইক।”
বাবা সামান্য হেসে নরম গলায় বলেছিল, “বিদেশে থাকো। কিন্তু সেখানকার একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ? নাম নিয়ে ওদের অত নতুন-পুরনো বাতিক নেই। যেমন ধরো রিচার্ড নামটা। সেই পুরনো দিনের রাজার নাম। আবার এখনকার হলিউডের অভিনেতার নাম। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে, গৌরনাথ, ঢোলগোবিন্দ, কমলাকান্ত এমন ধারার নামগুলো সব উঠেই গিয়েছে প্রায়!”
ডিনো এর উত্তরে আবার কীসব হাবিজাবি বলছিল। আর নোঈ দেখছিল ওই চশমা পরা শান্ত চোখের মানুষটাকে। ভারী অদ্ভুত নাম মানুষটার। এই ডিনোর জেঠতুতো দাদা এমন, ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল ওর।
মা তারপর খোঁচা দিয়েছিল নোঈকে। চাপা গলায় বলেছিল, “তুই কিছু জিজ্ঞেস করবি না?”
চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলেছিল নোঈ। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার ডেভিড ফিঞ্চার ভাল লাগে? বা তোরনাতোরে?”
“সে কে?” ডিনো ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে।
আবার পাশ থেকে উত্তর এসেছিল, “ভাই খুব-একটা ফিল্ম দেখে না।”
“আরে নোঈ, তুই এখানে?” আচমকা ডাকে চোখ খুলল নোঈ। সামান্য অবাক হল। সামনে নিশান দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফরসা রংটা যেন একটু পুড়ে গিয়েছে এই ক’দিনে। গালে দাড়িও রাখছে।
“তুই-ই বা এখানে কী করছিস নিশানদা?” নোঈ অবাক হল।
“আমাদের পত্রিকার তরফ থেকে জীবনানন্দ সভাঘরে একটা গল্পপাঠের আয়োজন করা হয়েছে আজ। সাড়ে ছ’টায় শুরু হবে। তাই এসেছি আমরা। ওই দেখতে পাচ্ছিস, প্ল্যাকার্ড আর হোর্ডিং পড়েছে,” নিশান বলল।
নোঈ বিরক্ত হয়ে বলল, “এই সবই কর। তোকে একদিন ফোন করেছিলাম। ধরলি না। তারপর একবার কল ব্যাকও করলি না! তুই কেমন যেন হয়ে গেছিস!”
“আরে, সরি সরি!” নিশান হেসে কান ধরল, “খুব ভুল হয়ে গিয়েছে রে! আসলে সেদিন কেয়াদির পাল্লায় পড়ে সব গুলিয়ে গিয়েছিল।”
কেয়াদি কে, সেটা জানে নোঈ। দেখেছে সোনাঝুরিতে। তবে খুব আলাপ নেই। ওই মুখ-চেনা টাইপ আর কী।
নোঈ আবার ঘড়ি দেখল। শ্বেতার মোবাইলটা কাল বাস থেকে চুরি হয়ে গিয়েছে। তাই ওকে যে ফোন করে তাড়া দেবে, তারও উপায় নেই। খুব বিরক্ত লাগছে নোঈর, কিন্তু কিছু করার নেই। আজ বাড়িতে গিয়ে মা যে কী বলবে, সেটাই দেখার। একে তো বিয়ে করবে না বলে গত পরশু ঘোষণা করার পর থেকে মা রেগে আগুন হয়ে আছে! তার ওপর আজ অফিসের ব্যাপারটা শুনলে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, স্বয়ং ভগবানও জানেন না!
“তোর নাকি বিয়ে?” আচমকা প্রশ্নটা করল নিশান।
“কী?” সামান্য থতমত খেয়ে গেল নোঈ।
“আরে বিয়ে, বিয়ে। তোর। তাই?” নিশান হাসল, “ভাল ডাক্তার নাকি! বিয়ের পর আমেরিকায় চলে যাবি শুনলাম! সত্যি?”
নোঈর মুখটা নিমেষে লাল হয়ে গেল। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন পাল্লা দিয়ে দৌড়ে মাথায় গিয়ে জমা হল। ও চোয়াল শক্ত করে তাকাল।
“যাঃ বাবা, খচে যাচ্ছিস কেন? মাসিমণি তো মাকে বলেছে। ছেলে নাকি বলেছে বছর পাঁচেকের মধ্যে প্লেন কিনবে? তাই?”
“সব তো জানিস, তাও আমার মাথা খাচ্ছিস কেন?” নোঈ এবার চিড়বিড় করে উঠল!
“বাপ রে! প্লেন কেন কিনবে বল তো? রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভয় লাগে? আকাশ দিয়ে ফাঁকায় ফাঁকায় যাবে বলে?” নিশান খিকখিক করে হাসল।
“আমি বিয়েটা করছি না,” নোঈ কোনওমতে রাগটাকে গিলে বলল।
“সে কী? কেন?” নিশান চুপ করে গেল এবার।
নোঈ ঠোঁট টিপে মাথা নিচু করল।
“বাদ দে,” নিশান হেসে বলল, “এই বয়সে বিয়ে করবি কী! মাস্টার্স করেছিস। চাকরি করছিস। গ্রেট গোয়িং। আগে নিজের কেরিয়ার সেট কর।”
“কে কাকে বলে দ্যাখো!”
নোঈ দেখল নিশানের পেছনে কেয়াদি উঁকি দিচ্ছে!
কেয়াদি সামনে এসে বিরক্ত মুখে বললেন, “এই নিশান, তোকে তখন থেকে ফোন করছি, কী করছিস তুই?”
“আমায়? ফোন?” পকেট থেকে ফোনটা বের করে জিভ কাটল নিশান, “ওহো, সরি। সাইলেন্ট করা ছিল। কী হয়েছে?”
কেয়াদি বলল, “অনুষ্ঠান শুরু করার আগে কাজ থাকে না? এখানে গপালে হবে? চল।”
নিশান হাসল, “আসলে বোনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তো!”
কেয়াদি নোঈকে দেখল। হাসল সামান্য। কিন্তু নোঈ বুঝল সেটা নিছক ভদ্রতা।
কেয়াদি বলল, “চল নিশান। কোথা থেকে একটা গোঁয়ার-গোবিন্দকে ধরে এনেছিস! প্রতি পদে সবার সঙ্গে ঝগড়া করছে।”
“আরে মণীশ, একটু মাথাগরম ছেলে। ঠিক আছে চলো আসছি।”
“আয় তাড়াতাড়ি,” কেয়াদি দাঁড়াল না আর। আবার চলে গেল সভাঘরের দিকে।
নিশান হাসল নোঈর দিকে তাকিয়ে। তারপর বলল, “মাসিমণি ঝামেলা করছে? শোন, নিজের যা ভাল মনে হবে করবি! মাসিমণিরা অন্য জেনারেশন। আমাদের বুঝবে না। সিকিয়রিটির কনসেপ্টটা আমাদের কাছে যা, ওদের কাছে তা নয়। প্লাস ইগো তো আছেই!”
নোঈ কিছু বলল না। আসলে নোঈ চট করে নিজের কথা কাউকে বলতে পারে না। শ্বেতা ওর খুব ভাল বান্ধবী বলে তাও কিছুটা বলে। যদিও নিশান ওর মাসতুতো দাদা। ভাল ছেলে। কিন্তু সেই কানেকশনটা তো নেই। তাই ওকে আর কী বলবে! মা এমন করে যে, অপমান লাগে নোঈর। মেয়ের কষ্ট হতে পারে, খারাপ লাগতে পারে, সে নিয়ে মাথাব্যথা নেই! লোকে কী ভাববে! কে কী বলবে! কীসে আরও প্রেস্টিজ বাড়বে এই নিয়ে ভেবে সব সময় মাথা খারাপ করে!
নিশান মাথা নেড়ে এবার বলল, “আমি আসি। এলে পারতিস। ভাল লাগত তোর!”
নিশান চলে যাওয়ার পর ঘড়িটা আবার দেখল নোঈ। আধঘণ্টা হয়ে গেল। শ্বেতা কি আসবে না? তবে কি বাড়ি চলে যাবে? বাড়ি গিয়ে কী বলবে? কাল থেকে আর অফিস নেই! মা তো আরও চেপে ধরবে। বিয়ের জন্য পাগল করে দেবে। ও যে ডিনোকে বিয়ে করতে পারবে না, সেটা মা এখনও ছেলের বাড়িতে জানায়নি! মা আইকাদিদের বলেছে যে, সব মেয়েরাই নাকি ওরকম বলে। কিন্তু মা ঠিক নোঈকে কনভিন্স করে ছাড়বে!
কনভিন্স! কীসের কনভিন্স! এটা কি কেউ ধূপকাঠি বিক্রি করতে এসেছে নাকি? ছেলে জ্বলে অনেকক্ষণ বেশি! ছেলের গন্ধ ভাল! ধোঁয়া ডাইরেক্ট ভগবানের নাকে হিট করে! কনভিন্স! বোকার মতো কথা! নোঈর মাথাগরম কি সাধে হয়!
নোঈ কাজ করতে চায়। আজ কাজটা ছেড়ে এসেছে বটে, কিন্তু তার মানে তো আর ঘরে বসে থাকবে না। আবার কাজ খুঁজবে। সঙ্গে ব্যাঙ্কিং-এর পরীক্ষাও দেবে। কিছু একটা তো ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু কাজ ওকে করতেই হবে।
মনটা খারাপ হয়ে আছে। মাস চারেক হল চাকরিটা করছিল নোঈ। ভালই ছিল প্রথম মাস আড়াই। তারপর শেফালি বলে অ্যাকাউন্টসের হেড এমন পেছনে লাগতে শুরু করল! নোঈর তৈরি করা স্প্রেড শিটে নিজে ইচ্ছে করে ভুল ডেটা বসিয়ে বসের কাছে ঝাড় খাওয়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে খারাপ ব্যবহার তো ছিলই! আর নিতে পারছিল না নোঈ। অফিস যাওয়ার নামে আতঙ্ক হয়ে যাচ্ছিল। রাতে ঘুমোতে পারছিল না। শুনছিল, শেফালিদির নিজের কোন এক ক্যান্ডিডেট রয়েছে, তাকে পুশ করার জন্য নোঈকে এমনভাবে হ্যারাস করছে মহিলাটি।
আর, আজ তো চরম জায়গায় পৌঁছেছিল ব্যাপারটা! সকলের সামনে এমন করে বলল শেফালিদি যে, আর নিতে পারেনি নোঈ। ও নাকি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছে! ওর নাকি অন্য মতলব আছে! কীভাবে কেউ এসব বলতে পারে! মানুষ এত নীচে নামতে পারে! কী মিন করেছে শেফালিদি?
“সরি, সরি নোঈ। অনেক লেট হয়ে গিয়েছে,” শ্বেতা হাঁপাতে-হাঁপাতে ওর পেছনের দিক থেকে এসে দাঁড়াল সামনে।
নোঈ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল শ্বেতার দিকে।
শ্বেতা বলল, “আরে, আমার দোষ নেই। মেট্রোয় আসছিলাম। রবীন্দ্র সরোবরে একজন সুইসাইড করেছে। তাই ট্রেন বন্ধ ছিল। এটা কি সত্যি রে যে, ওই স্টেশনে ভূত আছে?”
নোঈ বিরক্ত হয়ে বলল, “ববির সঙ্গে প্রেম করছিলি, না? তোকে কতবার বলেছি, ছেলেটা সুবিধের নয়! শুনবি না তো সেই কথা!”
“মাইরি বলছি,” শ্বেতা হাসল, “ওই জন্য লেট হয়নি। আমি সত্যি মেট্রোয় ছিলাম। তুই বিশ্বাস কর। আচ্ছা যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করিস সুইসাইড হয়েছে কি না। তবে হ্যাঁ, ববি সঙ্গে ছিল।”
নোঈ চোয়াল শক্ত করল। এই ছেলেটাকে ভাল লাগে না নোঈর। চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়, সোজা পথের নয়। তা ছাড়া হোয়াটস অ্যাপে একদিন নোঈকে প্রোপোজ়ও করেছে। বলেছে, নোঈকে নাকি সারাক্ষণ চোখে হারায়! নোঈ সেদিন ভাল করে ঝেড়েছিল ওকে। শ্বেতা কত ভালবাসে ছেলেটাকে, আর সে কিনা ওকে প্রোপোজ় করছে!
পরে অবশ্য ববি বলেছিল, নেশা করেছিল বলে ভুলভাল বলেছে। আসলে ও কিছুই মিন করেনি। বেশি মদ খেয়ে ফেললে নাকি ও এমন ভুলভাল করে ফেলে।
তারপর থেকে দেখেছে, ওকে দেখলে ববি অদ্ভুতভাবে তাকায়। কিছু একটা বক্তব্য দৃষ্টি দিয়ে পাঠাতে চায়। গোটা ব্যাপারটায় মাথা খুব গরম হয়ে যায় নোঈর। মানুষ মানুষকে কী করে এমন ঠকাতে পারে! শ্বেতাকে যদি ববির পছন্দ না হয়, তবে কেন শুধু শুধু মেয়েটার সঙ্গে ঘোরে? এমনকী, ওদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। শ্বেতা ববি ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কিন্তু ববি শ্বেতা ছাড়া আর সব কিছু বুঝতে চায়।
ববির ওকে প্রোপোজ় করার ব্যাপারটা শ্বেতাকে বলেনি নোঈ। বললে শ্বেতার সঙ্গে ওর সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। কারণ, নোঈ নিশ্চিত ববি এর পরিবর্তে এমন কিছু শ্বেতাকে বলবে যে, পুরো ব্যাপারটাই পালটে যাবে। আর সত্যি বলতে কী, শ্বেতা ওর প্রিয়তম বন্ধু হলেও একটা সীমার পর ওর জীবনে আর ঢোকে না নোঈ। আসলে ছোট থেকেই নোঈ এটা বাবার কাছ থেকে শিখেছে। বাবার মতো এমন চুপচাপ মানুষ ও কোনওদিন দেখেনি! নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কখনও নোঈ দেখেনি মানুষটা অন্যের ব্যাপারে যেচে নাক গলিয়েছে বা কিছু বলেছে। বাবাকে দেখে নির্জন পাহাড়ি নদীর পাড়ের কাঠের বাড়ি মনে হয়! খুব ভাল লাগে ওর। মা তো সারা জীবন বুঝলই না বাবাকে। শুধু রাগ আর অভিমান করে গেল।
“কী রে, কী ভাবছিস?” শ্বেতা সামান্য ঠেলা দিল নোঈকে।
নোঈ বলল, “কিছু না।” তারপর ব্যাগ থেকে গীতবিতানটা বের করে দিয়ে বলল, “এই নে। এটা ধর।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, জানু!” শ্বেতা নোঈকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেল একটা।
নোঈ বলল, “থাক আর ন্যাকামো করতে হবে না। এতক্ষণ ওয়েট করালি বেকার! আমার এমনিতেই আজ মনটা ভাল নেই।”
“কী হয়েছে?” শ্বেতা এবার সিরিয়াস মুখ করে তাকাল।
নোঈ চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছল একটু। তারপর সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে বলল, “চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছি।”
“সে কী রে? পাগল নাকি? এই তো কয়েক মাস হল জয়েন করলি!” শ্বেতা চোখ গোলগোল করে তাকাল ওর দিকে।
“পাগল কেন হব? আর সহ্য করা যাচ্ছিল না,” নোঈ চশমাটা পরে নিল আবার। বলল, “ওই অ্যাটমসফিয়ারে কাজ করা যায় না।”
“কী হয়েছে রে? একদম ছেড়েই দিলি? সত্যি?” শ্বেতা মাথা নাড়ল।
“আরে, আমার স্প্রেড শিটগুলো শেফালিদি ট্যাম্পার করে বসের কাছে সাবমিট করছিল। বারবার করছিল। আজ আমি আর শেফালিদিকে কিছু না বলে সোজা বসকে গিয়ে সাবমিট করেছি আমার কাজগুলো। ব্যস, শেফালিদি কী রেগে গেল! যা খুশি বলতে শুরু করল। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছি নাকি আমি! আমি নাকি অন্য কিছু চাই! আরও কীসব ইঙ্গিত করল। আই জাস্ট ফ্লিপড। ছেড়ে দিয়েছি। দু’মাসের নোটিশ দিতে হয়। দিয়ে এসেছি। বলেছি টাকাপয়সা যেন আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। আমি আর যাচ্ছি না ওই নরকে!”
শ্বেতা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “ঠিক আছে, আর মাথাগরম করিস না। তুই এত ভাল লেখাপড়ায়। ঠিক অন্য চাকরি পেয়ে যাবি আবার।”
নোঈ মাথা নাড়ল, “অপমানটা ভুলতে পারছি না। অসভ্যতা আমি পছন্দ করি না জানিস তো! শেফালিদির নাকি নিজের কোন এক ক্যান্ডিডেট আছে। ঠিক আছে, এখন তাকে ঢোকাক আমার জায়গায়। আমার অত টাকার দরকার নেই। সব সহ্য করে পড়ে থাকা আমার দ্বারা হবে না।”
শ্বেতা ঘড়ি দেখল। মুখে-চোখে স্পষ্ট যে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
নোঈ বলল, “তোর রিহার্সাল আছে না? তুই তা হলে আয়।”
“কিন্তু তুই এমন করে একা… মানে তোকে এভাবে আমি একা ছেড়ে যাই কী করে?”
“তো কী হয়েছে? আমি এখন বাড়ি যাব। নিড আ শাওয়ার,” নোঈ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শ্বেতা চট করে ঘড়ি দেখল আবার। তারপর বলল, “ঠিক বলছিস তো? কোনও প্রবলেম নেই তো?”
নোঈ হাসল। অনেকক্ষণ পর হাসল। নিজেরই অবাক লাগল নোঈর। তারপর বলল, “কোনও প্রবলেম নেই। তুই আয়। আমিও যাব।”
শ্বেতা বলল, “কাল তোদের বাড়ি যাব। আর-একটা কথা তোকে বলা হয়নি। আমি কয়েকমাসের জন্য একটা স্কলারশিপ পেয়ে চণ্ডীগড় চলে যাচ্ছি!”
“তাই?” নোঈ অবাক হল।
“হ্যাঁ। আজ এসেছে চিঠিটা। তবে এখন আর এই নিয়ে কিছু বলছি না। পরে ফোনে বলব। আমার দিনটা ভাল আজ। মনটা কী ভাল ছিল! কিন্তু এখন আমার কী খারাপ লাগছে! তোর দিনটা আজ এমন গেল!”
নোঈ জানে শ্বেতার সত্যি খারাপ লাগছে। খুব ভাল মেয়েটা। সত্যি ওর জন্য চিন্তা করে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে, ওর মেজাজ খারাপ আছে বলে এখন শ্বেতাকে ওর জন্য বেবি সিটিং করতে হবে।
শ্বেতার সঙ্গে নোঈ নিজেও বেরোল নন্দন চত্বর থেকে। শ্বেতা কবে চণ্ডীগড় যাবে, কোথায় থাকবে, এই নিয়ে টুকটাক কথা হল কিছু। কিন্তু নোঈ বুঝল, ও এসব কথা বললেও মনের ভিতরটা ওর এমন হয়ে আছে যে, কিছুই আসলে ভাল লাগছে না। কোনও কথা ঠিক গাঁথছে না মনে। এই যে শ্বেতা ওর এত বান্ধবী, সে চলে যাবে শুনেও তেমন হেলদোল হচ্ছে না। কেন কে জানে! আচ্ছা, নোঈ কি বড্ড স্বার্থপর!
বড়রাস্তায় গিয়েই বাস পেয়ে গেল শ্বেতা। বাসে উঠে পিছনে ফিরে একবার হাত নাড়ল মেয়েটা। নোঈ হাসল একটু। তারপর বাসটা বেরিয়ে গেলে ও রাস্তা পার হয়ে নিল।
গলাটা আবার শুকিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে জলের বোতল আছে নোঈর, কিন্তু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেতে ইচ্ছে করছে ওর। মোড়ের কাছে ডান দিকে একটা দোকান আছে। শ্বেতার সঙ্গে মাঝে মাঝে ওখান থেকে কোল্ড ড্রিঙ্ক খায় নোঈ।
সামনে সামান্য ভিড়। তাদের কাটিয়ে বড় ক্লাবটার সামনে দিয়ে এগোল মোড়ের দিকে। কোল্ড ড্রিঙ্কটা খেয়ে রবীন্দ্রসদন থেকে মেট্রো ধরে নেবে। মার্চের শেষ এখন। গরম পড়েছে বেশ। কুর্তির ভেতর দিয়ে সরু ঘামের রেখা শিরদাঁড়া দিয়ে নামছে। এক-এক ফোঁটা জল। নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন। ওর মতো!
দীর্ঘশ্বাস পড়ল নোঈর। আজ হঠাৎ নিজেকে খুব একা লাগছে ওর। মনে হচ্ছে আসলে ওর কেউ নেই। কেউ কোনওদিন ছিল না। এখন বাড়িতে ঢুকতেও ইচ্ছে করছে না। আবার রাস্তাতেও থাকতে ভাল লাগছে না। কী যে করে নোঈ! ও আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য ডুবে গেলেও তার মনখারাপ করা একটা আলো লেগে রয়েছে মেঘে। যেন আলতা মোছা তুলো ছড়িয়ে আছে আকাশময়! কলকাতার আকাশটা এমন ধূসর কেন কে জানে! নীল রঙের আকাশ শেষ কবে কলকাতায় দেখেছে মনে করতে পারে না নোঈ!
মোড়ের কাছটায় ভিড় হয়ে আছে। লোকজন রাস্তা পার হবে বলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুটো উসকোখুসকো পাগল বসে রয়েছে দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে। তার পাশে ভাজাভুজির দোকান আর একটা পান-কোল্ড ড্রিঙ্কসের দোকান। ফুটপাথটার যেন দমবন্ধ অবস্থা।
নোঈ মাঝে মাঝে ভাবে এই শহরে যে ওদের নানারকম ট্যাক্স দিতে হয় সেটার কতটা লাভ পায় ওরা! অর্ধেকের বেশি ফুটপাথে হয় হকার বসে রয়েছে নয়তো মানুষজন বসবাস করছে! গত পাঁচ-ছ’বছরে ফুটপাথে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা যেন তিনগুণ বেড়ে গিয়েছে! স্টোভে, উনুনে বা ইট দিয়ে তৈরি উনুনে রান্না, রেলিং-এ মেলে রাখা জামাকাপড়, চাটাই পেতে শুয়ে পড়া, প্লাস্টিকের পুঁটলিতে জড়ো করে রাখা জামাকাপড়, ছড়িয়ে রাখা তরকারির খোসা, ভাতের ফ্যান, টলমল করে হাঁটা ছোট ছোট বাচ্চা, মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকা মানুষ! এরা কারা? কোথা থেকে আসে? আগেই-বা ছিল কোথায়? এই নিয়ে আর বেশি ভাবতে চায় না নোঈ। মাথার ভিতরটা কেমন করে!
নোঈ সাইড-ব্যাগটাকে সামনে করে নিয়ে এসে দাঁড়াল দোকানটার সামনে। একজন বয়স্ক বিহারি মানুষ দোকানটা চালান। নোঈর মুখ চেনা। তার পাশে আজ একটা অল্পবয়সি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স্ক মানুষটাকে হাতে-হাতে সাহায্য করছে।
নোঈ কোন কোল্ডড্রিঙ্কটা চায়, সেটা বলল।
দোকানে আরও দু’-তিনজন দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ঘুরে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈ পাত্তা দিল না। ও জানে রাস্তায় বেরোলে লোকজন দ্যাখে ওকে। কেন দ্যাখে সেটাও জানে। শ্বেতা বলে, “তোকে যা দেখতে ইজ়ি সিনেমায় চান্স পেতে পারিস। এমন মাখনের মতো গায়ের রং ভগবান যদি আমায় দিত! কী চাকরি-বাকরি করে জীবনটা নষ্ট করছিস! ববিকে বলব? ওর ফিল্ম লাইনে যোগাযোগ আছে।”
কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলটা নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল নোঈ! দুশো এমএল-এর ছোট্ট বোতল। তবে খুব ঠান্ডা। দু’হাত দিয়ে বোতলটা প্রাণপণে চেপে তার সমস্ত শীতলতা নিজের শরীর আর মনের মধ্যে শুষে নেওয়ার চেষ্টা করল নোঈ!
খালি বোতলটা নিয়ে এগিয়ে গেল নোঈ। নতুন মেয়েটা হাত বাড়িয়ে নিল বোতলটা। বলল, “দশ রুপায়া।”
নোঈ ব্যাগটা খুলে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিল।
“ছুট্টা নেহি হ্যায়,” মেয়েটা বিরক্ত হল একটু।
“আমার কাছেও নেই,” নোঈ সহজ গলায় বলল।
“আরে, দশ টাকার জিনিস নিয়ে কেউ পঞ্চাশ টাকা দেয়!” মেয়েটার ভাঙা বাংলায় এবার আরও বেশি ঝাঁজ!
“আরে, নেই আমার কাছে!” নোঈও বিরক্ত হল সামান্য।
“ওই তো আমি দেখতে পাচ্ছি,” মেয়েটা গলা বাড়িয়ে হাত দিয়ে নোঈর ব্যাগটা দেখাল, “ওই তো দশটাকার একটা নোট! ঝুট কাহে বোল রহি হো?”
“মানে?” নোঈর মাথাটা আচমকা গরম হয়ে গেল, “লাগবে না ব্যালেন্স।”
নোঈ আর কথা না বলে হাঁটা দিল। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে। সবাই অবাক। পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বাকি টাকা ফেরত নিচ্ছে না!
নোঈর মাথা ঝাঁঝাঁ করছে! মেয়েটা বলে, ও মিথ্যেবাদী! এত লোকের সামনে!
“দিদিজি, দিদিজি, সুনিয়ে পিলিজ, দিদিজি…” বয়স্ক মানুষটি কোনওমতে এসে নোঈর পাশে দাঁড়ালেন। নোঈ তাকাল ওঁর দিকে।
“পিলিজ দিদিজি, গুসসা না হোইয়ে। ছোটি লড়কি। বুঝতে পারেনি! আমি দিচ্ছি আপনাকে চেঞ্জ। পিলিজ মাফ কর দিজিয়ে!” বয়স্ক মানুষটি আন্তরিকভাবে বললেন কথাগুলো।
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ল। মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়াল একটু। মাথা নাড়ল অল্প। তারপর বলল, “সরি।”
“নেহি দিদিজি। আপ সরি না বোলিয়ে,” বয়স্ক মানুষটি এবার হাফশার্টের বুকপকেট থেকে দুটো কুড়ি টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিলেন নোঈর দিকে। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেহাতি ভাষায় কিছু একটা বললেন।
নোঈ দেখল মেয়েটা চোয়াল শক্ত করে ওই ভাষাতেই কী একটা উত্তর দিল।
আশপাশের লোকজন আরও একটু ঘিরে এসেছে যেন। যথেষ্ট হয়েছে। নোঈ ভাবল এবার ওর এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আর সত্যি বলতে কী মেয়েটা তো ভুল কিছু বলেনি! সত্যি তো ওর ব্যাগে একটা দশ টাকার নোট আছে। কিন্তু সেটা তো খরচ করা যায় না! হতে পারে নোটটা দশ টাকার। কিন্তু এর মূল্য তো আর দশ টাকা নয়! এই নোটটা অমূল্য। কারণ জয় ওকে দিয়েছিল এটা। জয় মানে জয়ব্রত ঘোষাল। সেই থার্ড ইয়ারে, হাজরা মোড়ে। সেই পান-কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকানের সামনে। শীতের এক সন্ধেবেলা। নোঈ বলেছিল, কোল্ড ড্রিঙ্ক খাবে। শীতে কোল্ড ড্রিঙ্ক! জয় বিরক্ত হয়েছিল বেশ! তারপর পকেট থেকে এই দশ টাকার নোটটা বের করে দিয়ে বলেছিল, “এটা দিয়ে কিনে নে। আমার টাইম নেই। আমি আসি।”
জয়ের চলে যাওয়া চুপচাপ ছলছলে চোখে দেখেছিল নোঈ। ও কোল্ড ড্রিঙ্ক খায়নি সেদিন। শুধু নোটটা মুঠো করে ধরে ভিড় ফুটপাথে একা দাঁড়িয়ে ছিল! সেই থেকে এটা ওর কাছে থাকে সারাক্ষণ। আর আজ কী করে এই নোটটা দিয়ে দেবে নোঈ! জয়ের এটুকুই যে শুধু রয়ে গিয়েছে ওর কাছে!
নোঈ বলল, “দেখুন, আমায় যেতে হবে। থ্যাঙ্ক ইউ।”
বয়স্ক লোকটি বললেন, “ওকে ক্ষমা করে দেবেন, দিদিজি!”
নোঈ মাথা নেড়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মেয়েটার জন্য এবার একটু খারাপ লাগছে ওর। আসলে এটাই হয় নোঈর। রাগের পর কেমন একটা খারাপ লাগা আসে। আসলে মেয়েটার তো দোষ নেই! ও তো ঠিকই দেখেছে নোটটা! কিন্তু এটা তো কোনওদিন দিতে পারবে না ও। কাউকেই দিতে পারবে না।
আচমকা জয়ের মুখটা ভেসে উঠল সামনে। রোগা, ফরসা, চাপদাড়ি আর চশমা। চশমার আড়ালে একজোড়া বাদামি রঙের চোখ। নোঈর দেখলে মনে হত, ওই চোখের ভেতরে কিছু একটা আছে, না হলে কেন এমন ওলট-পালট হয়ে যেত ওর মনটা! শুধুই ওলট-পালট হয়ে যেত! সবটাই কি অতীত এখন? ওই চোখটা মনে পড়লে কি এখনও কিছু হয় না? ভরা কলকাতাটা কি এখনও আচমকা শূন্য হয়ে যায় না?
নোঈ দীর্ঘশ্বাস চেপে ভাবল, না আর অতটা শূন্য হয়ে যায় না। জয়ের ওই শেষ কথাগুলো শোনার পর আর কিছু হয়ে যায় না। আসলে একটা-একটা করে ইট গেঁথে তুলে জয়ের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে নোঈ। যে-কষ্ট আর মানসিক অত্যাচার জয় ওকে করেছে, সেটাতে আর ফিরে যেতে পারবে না ও। তার চেয়ে এমন হয়ে থাকাই ভাল।
রবীন্দ্রসদন মেট্রোয় ঢোকার মুখটায় খুব ভিড়। বিকেল শেষ হচ্ছে, কিন্তু নোঈ লক্ষ করেছে, বিকেল শেষ হওয়ার পর থেকেই কলকাতা যেন নতুন করে জেগে ওঠে। অফিস বা কলেজ ফেরতা মানুষের মধ্যে সুন্দর করে সাজগোজ করে ঘুরতে বেরোনো মানুষও মিশে থাকে। এই শহরে আবহাওয়া আজকাল আর বোঝা যায় না। শুধু যুবক-যুবতীদের পোশাকটাই বলে দেয়, কী ঋতু ফিসফিস করছে বাতাসে!
রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে মেট্রোর সিঁড়িতে পা দিল নোঈ। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারল না।
“নোঈ,” পেছন থেকে আসা ডাকটা থমকে দিল ওকে। ও পেছনে ঘুরল। দি!
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ে এক ধাপ নেমে এল সিঁড়ি থেকে। তারপর পথ না আটকে রাস্তার একপাশে সরে গিয়ে বলল, “দি তুই? এখানে?”
আইকা কপালে এসে পড়া চুলটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “বাড়ি যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ,” নোঈ মাথা নাড়ল।
“চল আমার সঙ্গে,” আইকা নোঈর হাত ধরে টান মেরে ওকে রাস্তায় নামিয়ে আনল।
“আরে, আমি বাড়ি যাব। অফিস থেকে আসছি। নিড আ শাওয়ার দি। তুই কি গাড়ি এনেছিস?”
“না, গাড়ি আনিনি আজ। আর আমিও বাড়ি যাব। চল না!” আইকা হাত ধরে টানল, “এই ক্লাবে এসেছিলাম দু’মিনিটের জন্য। একজনকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল। ওই পারে গাড়িতে আমার বন্ধু বসে আছে। ও পৌঁছে দেবে। চল।”
নোঈ ভুরু কোঁচকাল। আইকার বন্ধু তো ও যাবে কেন তার গাড়িতে? চেনে না জানে না! কেন যাবে? বোকা বোকা ব্যাপার!
ও বলল, “না, আমি মেট্রোতেই যাব।”
“আচ্ছা ঢ্যাঁটা মেয়ে!” আইকা কপট রাগে চোখ পাকাল, “হাত ধরে টানছি, এবার না গেলে কান ধরে টানব তোকে। চল। পাকামো সব সময়!”
“তুই যে কী করিস না!” নোঈ হাসল, “ঠিক আছে চল। এইটুকু পথ তাও আবার গাড়িতে!”
আইকা কথার উত্তর না দিয়ে রাস্তার গাড়ির জটের মধ্যে দিয়ে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে নোঈকে নিয়ে পথ পার হয়ে গেল।
রাস্তার এই পারটায় যেন আরও ভিড়। মেট্রো স্টেশনের আড়ালে খাবারের দোকান আছে এদিকে। মানুষ তার উপর যেভাবে ভেঙে পড়েছে, নোঈ ভাবল কলকাতায় কি এতদিন দুর্ভিক্ষ চলছিল?
এই পাশের ফুটপাথ আর রাস্তাটা মোড়ের কাছে বেশ অপরিষ্কার! খাবারের অবশিষ্ট, রোলের ছেঁড়া কাগজ, পচা ফল, পানের পিক! নোংরা দেখলে গা গুলিয়ে ওঠে নোঈর। ও দেখল আইকা অম্লানবদনে সেই সব টপকে মানুষের ভিড়ের ভিতর দিয়ে তরতর করে এগিয়ে গেল।
এই পারে এসেই নোঈর হাত ছেড়ে দিয়েছিল আইকা। তাই নোঈ পিছিয়ে পড়ল একটু। তারপর সময় নিয়ে নোংরা বাঁচিয়ে এগিয়ে গেল গাঢ় নীল রঙের একটা গাড়ির সামনে দাঁড়ানো আইকার দিকে।
“এত পুতুপুতু কেন তোর?” আইকা ভুরু কোঁচকাল, “এই শহরে বড় হয়েছিস না?”
নোঈ কিছু না বলে হাসল। আসলে সব কিছুর তো উত্তর হয় না! তবে অবাক লাগল দেখে যে, আইকা এমন উচ্ছ্বসিত! সাধারণত আইকা একটু গম্ভীর ধরনের মেয়ে। সে এমন স্কুলের মেয়েদের মতো তড়বড় করছে দেখে, কেমন একটা লাগল নোঈর! কিন্তু কিছু বলল না। আইকাকে ভাল লাগে ওর। খুব ভাল লাগে এমনটা নয়, কিন্তু ভালই লাগে। আসলে আইকার জীবনটা খুব-একটা আনন্দের নয়। তাই ভাল লাগার চেয়ে একটা চাপা সহানুভুতি কাজ করে নোঈর। মনে হয়, মেয়েটা দুঃখী! আর দুঃখী মানুষদের জন্য কোথায় যেন একটা খারাপ-লাগা কাজ করে ওর।
“কী রে! কী ভাবছিস? আজকাল কী হয়েছে তোর? এখন তুই শিয়োর প্রেমে পড়েছিস কারও, না?” আইকা হাসল।
“ধুৎ!” খানিকটা জোর করেই পালটা হেসে উত্তর দিল নোঈ।
মানুষজনের এই ধরনের ইয়ারকিগুলো খুব বোকা বোকা লাগে নোঈর। সামান্য অন্যমনস্ক লাগলেই হয় বলে, কী রে কবিতা লিখবি! নয়তো এই, প্রেমে পড়েছিস! এত স্টিরিয়টাইপ! মানুষ যেন এমনি অন্যমনস্ক হতে পারে না! যেন তার আনমনা হতে এমনি এমনি ইচ্ছে করতে নেই!
“শোন না,” আইকা হাত ধরল ওর, “একটা সারপ্রাইজ় দেব তোকে।”
“আমায়!” নোঈ অবাক হল। তবে সত্যি বলতে কী একটুও আগ্রহ বোধ করল না। আজ চাকরি ছেড়ে এসেছে। অশান্তি হয়েছে অফিসে। ওদিকে বাড়িতেও মায়ের সঙ্গে ঝামেলা চলছে! এখন কি আর ওর এই সব সারপ্রাইজ় দেখে আনন্দে ডগমগ হওয়ার সময় আছে!
“আয়।”
আইকা হাত ধরে ওকে আবার টেনে এনে দাঁড় করাল ওই গাড়িটার পাশে। নোঈ দেখল নীল গাড়িটার কাচটা টিন্টেড। আইকা হাত ঘুরিয়ে গাড়িটার কাচটা নামানোর ইঙ্গিত করল।
সামান্য সময় নিল গাড়ির ভিতরে বসা মানুষটা। তারপর মসৃণভাবে নেমে এল গাড়ির কাচ। শহরের মাথা থেকে প্রায় বিদায় নেওয়া শেষবেলার আলো তার আবছা রং নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল গাড়ির গায়ে, তার ভিতরে। নোঈ দেখল মানুষটাকে। আর খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও মনে হল, ওর পায়ের তলার মাটি একটু কাঁপল!
আবার কি ভূমিকম্প হল? না মনের ভুল! নোঈ একবার তাকিয়েই কেন জানে না চোখটা সরিয়ে নিল মানুষটার দিক থেকে। বুকের ভিতর কেমন একটা অস্বস্তি হল ওর। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই আইকার সারপ্রাইজ়? ও যত এইসব এড়াতে চাইছে, তত কেন জীবন এমন সব ঘটনা ও মানুষ এনে সামনে রাখছে ওর! মায়ের সঙ্গে যে জন্য বিবাদ হচ্ছে সেই কারণটাই ওর সামনে! কেন বারবার ঈশ্বর ওকে এমন বিপদে ফেলেন? এমন সংকটের সামনে এনে দাঁড় করান?
“কী রে, খুব চমকে গিয়েছিস, না?” আইকা হাসল, “তোর উড বি হাজ়ব্যান্ডের দাদা। চিনতে পারছিস?”
উড বি হাজ়ব্যান্ড! কথাটা কট করে কানে লাগল নোঈর। এসব কী বলছে আইকা! উড বি হাজ়ব্যান্ড মানে? ও তো সেই ডাক্তার ছেলেটিকে বিয়েই করবে না। তবে! এসব কী বলছে আইকা!
“আঃ দি! কী সব বলছিস তুই!” নোঈ দাঁত চেপে বলল কথাগুলো, “কার বিয়ে? কে উড বি হাজ়ব্যান্ড?”
“তোর রে। ন্যাকা খুকি আমার!” আইকা হইহই করে হেসে গাড়ির ভিতরে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলি, কেমন লজ্জা পাচ্ছে! এখনও বিয়ে হয়নি, তাতেই এত লজ্জা! গাছে না উঠতেই এক কাঁদি!”
মানুষটা এবার গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল। নোঈ আজ যেন ভাল করে দেখল মানুষটাকে। গম-রঙা মানুষটার দোহারা চেহারা। পাঁচ ফুট দশ-এগারো ইঞ্চির মতো উচ্চতা। সামান্য ঢেউ খেলানো চুল, গোঁফ। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। মুখে হাসি থাকলেও কোথাও যেন একটা বিষণ্ণতাও আছে। ওই ডাক্তার পাত্রের সঙ্গে ওকে দেখতে এসেছিল এই মানুষটা। কিন্তু সেদিন ভাল করে তাকায়নি নোঈ। বিরক্তিতে সেদিন ভাল করে মুখই তোলেনি ও। সেদিন সবকিছু আর সকলকে অসহ্য লাগছিল। নিজেকে পথের উপর উপুড় করে বিক্রি করা সবজির মতো মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সকলে চোখ দিয়ে টিপে-টুপে ওজন করে দেখছে ও কতটা চলতে পারে। ওকে নিজেদের সংসারে নিলে লাভ হবে না ক্ষতি। কী ভীষণ অপমানজনক আর বর্বর এই প্রথা! আমাদের দেশে যৌনতা নিয়ে এত ছুঁতমার্গ, কিন্তু আসলে গভীরভাবে ভেবে দেখলে দেখা যাবে, আমাদের নানা রিচুয়াল আর সামাজিক আচার আসলে কোথায় যেন একটা জাতির অবদমিত যৌনতাকেই বড্ড বেশি করে ফুটিয়ে তোলে।
আজ কিন্তু মানুষটাকে দেখে নোঈর অস্বস্তি হলেও তার তলায় কোথায় একটা ভালও লাগছে। কেউ-কেউ থাকে যাদের দেখলে পাহাড়ের কথা মনে পড়ে। সূর্যাস্তের সময় পাহাড়ের নীল রঙের মধ্যে জেগে থাকা নির্জনতার কথা মনে পড়ে। এই মানুষটাকে দেখেও সেটাই মনে হচ্ছে নোঈর। মনে হচ্ছে, এই ভিড়ে হিজিবিজি হওয়া এক্সাইড মোড়েও মানুষটা কেমন যেন একলা, কেমন যেন নির্জন! নোঈর খারাপ লাগল এই ভেবে যে, এই মানুষটার সঙ্গে ওর এমন একটা পরিস্থিতিতে দেখা হল!
“এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে?” আইকা হি হি করে হাসল এবার।
“কী করছিস! উনি হয়তো এমব্যারাসড হচ্ছেন!”
মানুষটার গলাটা হালকা, নরম। নোঈ মুখ তুলে তাকাল। আর আবার কয়েক লক্ষ মাইল দূরের কিছুর টানে পৃথিবী নড়ে উঠল যেন। কী হচ্ছে এসব! নোঈ ধমক দিল নিজেকে।
আইকা বলল, “কেন, তোর ভাইয়ের সঙ্গেই তো বিয়ে হবে ওর, বললে লজ্জা কী!”
মানুষটা হাসল সামান্য। তারপর আইকাকে বলল, “আচ্ছা, তুই থাম,” তারপর নোঈর দিকে তাকিয়ে আলতো গলায় বলল, “সেদিন ভাল করে আলাপ হয়নি। তাই হয়তো আপনি আমার নামটা মিস করে গিয়েছেন। আমার নাম…”
নোঈ মুখ তুলল। দূরের মহাজাগতিক বস্তুটি নড়ছে। তরঙ্গ ভেসে আসছে শূন্যতা ভেদ করে। এ হতে পারে না। এমন অবিবেচক হতে পারে না নোঈ। প্রত্যেকটা শুরুর আগে একটা শুরু থাকে। যেমন থাকে, প্রত্যেকটা শেষের পরে আর-একটা শেষ। তাই সেই শুরুর আগের শুরুটা হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। নোঈ এতটা বোকা, সেন্টিমেন্টাল হতে পারে না। হতে পারে না আর সেইসব কিছু, যেগুলোকে ও নিজেই সারা জীবন হেয় করে এসেছে, ছোট করে এসেছে! ওই কম্পনকে ও সামলে দেবে রূঢ়তা দিয়ে। ভরিয়ে দেবে নিষ্ক্রিয় কিছু শব্দ দিয়ে।
মানুষটার কথা শেষ হওয়ার আগেই নোঈ তাই ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি জানি। মনে আছে। আর আমি নোঈ, অ্যাজ় ইউ নো। আর শুনুন, দি জানে না। শি ইজ় মিসইন্টারপ্রেটিং মাই সাইলেন্স। অ্যাকচুয়ালি অল অফ দেম আর! কিন্তু আপনি ভুল কিছু ভেবে নেবেন না। আমি আপনার ভাইকে বিয়ে করছি না। বুঝলেন মিস্টার পুশকিন চক্রবর্তী?”
.
০৬.কাজু
গাছ থেকে পাতাটা ঘুরে-ঘুরে পড়ছে! নদীর দিক থেকে আসা হাওয়া পাতাটাকে আলতো করে ধরে নামিয়ে আনছে মাটির দিকে। বিকেলের রোদ নরম হয়ে আসছে এবার। শীতের ছোট বেলা গুটিয়ে নিচ্ছে পৃথিবী। মনখারাপ রঙের একটা আলো ধীরে-ধীরে নেমে আসছে সোনাঝুরির বুকে! আর কিছু পরেই চটকলে ভোঁ পড়বে। গঙ্গার পাড়ে নৌকোর আনাগোনা বেড়ে যাবে। জলে মেটে সিঁদুর গুলে দিয়ে সূর্য ধীরে-ধীরে তলিয়ে যাবে পাতালে!
এমন সময়টা বুকের ভেতর কেমন যেন করে কাজুর। মনে হয়, কত কিছু যে করার ছিল, কিন্তু কিছুই করা হল না। মনে হয়, হাজার বছর কেটে গিয়েছে, ও এখানেই এমন পাথরের মতো বসে রয়েছে। কত কবিতা লেখা বাকি রইল। কত দেশ দেখা বাকি রইল। কত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাকি রইল। কত কী বাকি রয়ে গেল। ওর বয়স ছাব্বিশ। বন্ধুরা বলে সারা জীবনটা পড়ে রয়েছে সামনে। কিন্তু কাজু জানে পড়ে নেই, সময় নেই ওর হাতে। কেন কে জানে ছোট থেকেই ওর কেবলই মনে হয় ওর সময় কম! যা করতে হবে, তাড়াতাড়ি করতে হবে। যা লিখতে হবে, তাড়াতাড়ি লিখতে হবে। যেখানে-যেখানে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। মনে হয় ওর জীবনও ওই শীতের ঝরে পড়া পাতার মতো। হাওয়ায় ভেসে ধীরে-ধীরে মাটির বুকে নেমে আসছে। একবার ভূমি স্পর্শ করলেই সব স্তব্ধ হয়ে যাবে। তাই এই ভেসে থাকার সময়টুকুই হাতে রয়েছে ওর। যা কিছু করার করে নিতে হবে এই সময়টার মধ্যেই।
ভাল করে গায়ের চাদরটা জড়িয়ে নিয়ে বসল কাজু। গত রাত থেকে জ্বর এসেছে। ভেবেছিল ওষুধ না খেলেও কমে যাবে। কিন্তু কমছে না। বাবা বলেছে স্বপনডাক্তারকে যেন সন্ধেবেলা গিয়ে দেখিয়ে নেয়।
ডাক্তার দেখাতে বিরক্ত লাগে কাজুর। ওই স্বপন ডাক্তারকে দেখালেই একটা কাচের কর্ক আঁটা বোতলে লাল মিক্সচার দেয়। বোতলের গায়ে আবার কাগজের খাঁজকাঁটা দাগ দেওয়া। এক চামচ পেটে পড়লে মনে হয় ঊর্ধ্বতন দশ পুরুষের মুখ তেতো হয়ে গেল! কাজুর বিরক্ত লাগে।
তার চেয়ে মজুমদার-ডাক্তার ভাল। রোগা-পাতলা। প্রায় বুকের কাছে প্যান্ট পরে। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। একটা নড়বড়ে টেবিলে রাখা হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স, নরম আলোর হারিকেন আর মান্ধাতার আমলের চেয়ারে নিজে বসেন মানুষটা। পাশেই একটা লম্বা বেঞ্চ। রোগী এসে বসে সেখানে।
খুব একটা ভিড় হয় না মজুমদার-ডাক্তারের কাছে। কাজু যাতায়াতের পথে দেখে, মানুষটা একমনে বই পড়ছেন। কবিতার বই!
নয়না এই মজুমদার-ডাক্তারের মেয়ে। বাবার মতো মোটেই শান্তশিষ্ট নয়। বরং খুব দস্যি। নয়নাকে ভয় লাগে কাজুর। পেখমের প্রাণের বন্ধু নয়না। তাই পেখমকে বলতে পারে না যে, নয়না ওর দিকে অন্যভাবে তাকায়। একা দেখা হলেই অদ্ভুত সব কথা বলে। কথা বলতে-বলতে হাত ছোঁয়! হাসে। কাছে এগিয়ে আসে। ভয় লাগে কাজুর। খুব ভয় লাগে। পেখম যদি জানতে পারে! যদি ভুল বোঝে! পেখম ওর কাছ থেকে সরে গেলে ওর যে কী হবে!
নদী থেকে আসা হাওয়ায় শিরশির করে উঠল কাজুর শরীর। আস্তে আস্তে জুটমিল থেকে লোকজন বেরোচ্ছে। সাইকেল বাড়ছে সোনাঝুরির রাস্তায়। এই বড় বাড়িটার সামনের গেট ছুঁয়ে চটকলে যাওয়ার রাস্তা।
কাজু মাঝে মাঝে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে। বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি। চারটে বড়-বড় ব্লক। আসলে বাড়িটা বহু পুরনো। তখন মাত্র একটা ব্লক ছিল। সে সময় এখানে পর্তুগিজ সারেংরা থাকত। তাদের কাছ থেকেই পরে ব্রিটিশরা এই জায়গা কেনে। জুটমিল বানায়। বাড়িটার একটা ব্লক থেকে চারটে ব্লক করে। তারপর থাকতে শুরু করে। পরে বিশের দশকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে এই মিল, এই বাড়ি আর আশপাশের জায়গা কিনে নেয় মালিক গ্রুপ। তারপর থেকে তারাই এর অধিকর্তা।
প্রায় দেড়শো বছর বয়স বাড়িটার। এখন গাদাগাদি করে অনেকে থাকে। জুটমিলের বহু হিন্দিভাষী মানুষ থাকে এই বাড়িতে। আরও নানা মানুষজন থাকে। কাজুরাও অনেকে থাকে দুটো ঘর নিয়ে। সবাই মিলে হাঁসফাঁস করে দুটো কামরায়! তাই ছাদের ওপর প্রায় ভেঙে যাওয়া একটা ঘরে কাজু বেশির ভাগ সময় কাটায়। এমনকী, গরমকালে তো সেখানে ঘুমিয়েও পড়ে রাতে।
চারটে বাড়িই তিনতলা। কিন্তু পুরনো দিনের বাড়ি বলে সেটাকে ছ’তলা মনে হয়। ছাদটাও গড়ের মাঠের মতো। তবে সন্ধের পর বিশেষ কেউ যায় না। আর ওই চিলেকোঠায় তো কেউ যায়ই না।
কিন্তু আজ শরীর ভাল নেই, তাই ছাদে আর ওঠেনি কাজু। বরং এই বড় উঠোনটায় এসে বসেছে। আর দেখছে বিকেল কেমন শামুকের মতো এগিয়ে চলেছে আরও গাঢ় বিকেল ছুঁয়ে সন্ধের গুহায়!
কাজু দেখল, ওদের ওই বড় গেট পেরিয়েই মানুষজন আসছে ভেতরে।
“কা বাবুয়া, বুখার আভি উতরা নহি?” যাদবকাকা সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়াল।
সত্যনারায়ণ যাদব ছাপরার মানুষ। চটকলে ফোরম্যানের কাজ করে। ইউনিয়নের নেতাও। ওদের পার্টিরই লোক। প্রৌঢ় মানুষটি বড় ভালবাসে কাজুকে।
কাজু বলল, “না, কমেনি। যাব সন্ধেবেলা মজুমদার-ডাক্তারের কাছে!”
“ও দ্যাট ওল্ড হ্যাগ!” পাশের ইজ়িচেয়ার থেকে সিগারেটে বড় টান দিয়ে কথাগুলো বলল আন্টি বাডু।
যাদবকাকা ঠোঁট টিপে হেসে কাজুর দিকে চোখের ইশারা করল। কাজুও হাসল মুখ টিপে।
কাজুরা ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তবে বাবার দিকে থেকে ওরা বাঙালি হলেও ওর মা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। মায়ের দিকে আর কেউ বেঁচে নেই শুধু এই আন্টি ছাড়া। কাজুর মাকে ছোট থেকে এই আন্টিই মানুষ করেছিল নিজের কাছে রেখে। তাই এখন এই বৃদ্ধ বয়সে আন্টি থাকে ওদের কাছে। আসলে কোথাও যাওয়ার নেই মহিলার!
আন্টির মনটা ভাল হলেও মুখ খুব খড়খড়ে। কাজু এই নিয়ে কিছু বললেই বলে, “হবই তো রাফ! কোন সময় পার করে এসেছি জানিস? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোরা পল্টনদের ক্লাবে ওয়েট্রেস ছিলাম। যদি না মুখ চালাতাম তবে আমায় এখানে দেখতে পেতিস না! কোনও অন্ধকার গলিতে পচে-গলে মরতে হত! মুখের জোর ছিল বলে ওই ছ’বছর বয়সের বনি, মানে তোর মাকে নিয়ে বাঁচতে পেরেছি! অন্ধকার আর তোরা কী দেখলি!”
আন্টির বয়স এখন প্রায় পঁয়ষট্টি। সারাদিন খুটখুট করে সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করে আর মাঝে মাঝে বিকেলে এই ইজ়ি চেয়ারটায় বসে সিগারেট খায়! ওদের মফস্সলে মেয়েরা সিগারেট খায় না। তাই নতুন মানুষজন এখনও আন্টিকে ওইভাবে আধশোয়া হয়ে সিগারেট খেতে দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ে। ফিসফাস করে। হাওয়ায় ওড়া কথা কানে আসে কাজুর। শোনে, আন্টি নাকি অন্য ধরনের মহিলা!
গোটা ব্যাপারটায় হাসি পেলেও সমাজের মানুষজনের মানসিক অন্ধকারটা বোঝে কাজু! ওদের এই বাড়িতেই কয়েকটা ঘরে রাতের বেলায় অশান্তি হয়। রেল লাইনের পাশের ঝুপড়ি থেকে বাংলা মদ খেয়ে এসে হল্লা করে কেউ! কেউ আবার নিজের স্ত্রীকে পেটায়, অকথ্য গালিগালাজ করে! সেসব নিয়ে কিন্তু কারও মাথাব্যথা নেই! সবাই যে যার ঘরের খিল আটকে থাকে। কাজু কয়েকবার বলতে গিয়েছে বটে এই নিয়ে, কিন্তু বাবা-মা এখন কাজুকে যেতেও দেয় না! বাবা বলে, “তোর ওপর জগতের ভার নেই। সব সমস্যা মেটাতে তুই আসিসনি। তুই মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার নোস যে, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বলে বেরিয়ে পড়বি। চেপে বসে থাক।”
নিজের ঘরে বসে কাজুর একটা অসহায় রাগ হয়। মনে হয় কিছুই কি করার নেই ওর? কিছুই কি করতে পারে না?
আন্টি হাতের সিগারেটটা মাটিতে নিবিয়ে টোকা মেরে পাশের একটা জঞ্জাল রাখার জায়গায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “তুই কেন যাবি ওই জোচ্চোরটার কাছে! ও ডাক্তার?”
কাজু হাসল, “আন্টি, তুমি এমন বলো কেন? কত ভাল লোক জানো? কবিতা পড়ে!”
“মাই ফুট, কবিতা পড়ে! তা হলে তোদের কফি হাউসে গিয়ে বনের মোষ তাড়াক! এখানে ওরকম ম্যাদামারা চেম্বার খোলার কী আছে!” আন্টি তার বড় শরীরটা নিয়ে কোনওক্রমে সোজা হল। ইজ়ি চেয়ারটাও প্রাণপণে ক্যাঁচকোচ শব্দ করে প্রতিবাদ জানাতে চাইল। কিন্তু আন্টি পাত্তা দিল না একটুও। বরং বলল, “দ্যাট ম্যান ইজ় নাথিং। বলে আমায় সিগারেট ছেড়ে দিতে। না হলে শ্বাসের কষ্ট কমবে না। তবে তোর ওষুধ খাব কেন রে মর্কট! সিগারেট ছাড়লে তো এমনিই ভাল থাকব। তোর ওষুধে জোর নেই তাই ছাড়তে বলিস। ওটার কাছে যাবি না কাজু!”
কাজু বলল, “কিন্তু আমার তো কমে!”
“মোটেই কমে না!” আন্টি এবার কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল, “ওটা প্লাসিবো এফেক্ট। মিছরির দানায় অ্যালকোহল ঢেলে রোগ কমাচ্ছে! তুই স্বপনডাক্তারের কাছে যা।’
আন্টি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টলমল পায়ে কিছুটা বেসামাল হল। কাজু উঠে গিয়ে ধরল চট করে। আন্টি নিজেকে সামলাল। তারপর কাজুর হাতটা ধরে তাপ মাপল। কপালেও হাত চেপে দেখল কতটা গরম। তারপর বলল, “এ কী রে! জ্বর তো আছে! এই ঠান্ডা হাওয়ায় বসে কী করছিস? যা ঘরে যা।”
“আমি ঠিক আছি,” কাজু হাসল, “তুমি আস্তে আস্তে যাও। দোতলায় উঠতে পারবে, না আমি ধরব?”
আন্টি পাত্তা না দিয়ে তাকাল যাদবকাকার দিকে। তারপর বলল, “আর তুমি আবার পার্টি-পলিটিক্স খুলে বোসো না। ওকে রেস্ট নিতে দাও।”
যাদবকাকা হাসল। আন্টি বিরক্ত হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মূল বাড়ির দিকে।
কাজু আবার বসল বাঁধানো রকটায়। আজ কিচ্ছু ভাল লাগছে না। পেখমকে পড়াতে যাওয়াও নেই। ওরা থাকবে না। কলকাতায় যাবে সবাই মিলে। প্রথম-প্রথম ও গুটিয়ে থাকত, কিন্তু এখন পেখমকে না দেখলে মনখারাপ করে ওর। কেমন সব আবছা লাগে! বুকের ভেতরে যে কষ্টের একটা ছোট্ট চোরাকুঠুরি থাকে, প্রেমে না পড়লে বোধহয় মানুষ জানতে পারে না! কাজু ভাবে কুঠুরিটা থাকলেও কষ্ট, আবার না থাকলেও শূন্যতা। ভাবে, মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। যা মনে করলে কষ্ট হয়, তাই সে বারবার মনে করে। গলায় কাঁটা ফুটলে যেমন বারবার ঢোঁক গিলতে চায়, ঠিক তেমন। কষ্টের তলায় কি সত্যি পূর্ণতার ফল্গুনদী বয়? কষ্ট পাওয়াটাকে কি আমরা সত্যি মহান কিছু হিসেবে দেখি? আমরা কি কষ্টের আগুনে পুড়ে নিজের ভিতরের খাদগুলো গলিয়ে ফেলতে চাই? বিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা কি সকলের মনের অবচেতনে কাজ করে?
পেখমকে না দেখলে আজকাল কেমন একটা ভয়ও যেন গ্রাস করে ওকে। কাকিমা, মানে পেখমের মা ওকে পছন্দ করে না। প্রথম দিন থেকেই সেটা ও বোঝে। যদিও কাকু খুব ভাল মানুষ। পুলিশে চাকরি করেন বলে বাড়িতে বিশেষ থাকেন না। আর পেখমের ঠাকুরদা তো খুবই ভাল! এই মানুষটার জন্যই যে ও পেখমের কাছে যেতে পারছে, সেটা পেখমের থেকেই জেনেছে কাজু! কিন্তু ওই বাড়িতে ঢুকলেই ও বোঝে কোথায় যেন দুটো চোখ ওকে সারাক্ষণ লক্ষ রাখছে! খুব অস্বস্তি লাগে! তাই যতক্ষণ থাকে মাথা নিচু করে থাকে। নিজের মতো পড়িয়ে চলে আসে।
তবে পেখমের সঙ্গে ওর দেখা হয় সোনাঝুরির কোনও না-কোনও লুকোনো ভাঁজে। তাও সামান্য সময়ের জন্য। আর প্রতিদিন দেখা করে ফেরার পরে মনের ভিতর তৈরি হওয়া কুয়োটা যেন আরও গভীর হয়ে পড়ে! যেন কুয়োর ভিতর থেকে অতৃপ্ত আত্মারা সব দু’হাত তুলে জল প্রার্থনা করে! প্রতিদিন পেখমের কাছ থেকে সরে আসার সময় শরীরের আর মনের ভিতর কী যেন ছিঁড়ে পড়ে যায়! যন্ত্রণায় ছটফট করে কাজু! ভাবে, কবে পেখমকে সারা জীবনের মতো করে পাবে ও!
“সচমে বুখার ইতনা হ্যায়?” যাদবকাকা সামনে এসে কপালে হাত দিল এবার। তারপর বসে পড়ল পাশে, “আসলে তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিল কাজু।”
কাজু সরে বসল একটু। যাদবকাকা সোজা মিল থেকে আসছে। শরীর থেকে ঝাঁজালো ঘামের নোনতা গন্ধের সঙ্গে খইনির গন্ধও আসছে। খারাপ গন্ধ সহ্য করতে পারে না কাজু। আর এখন তো শরীর খারাপ, তাই আরও গা গুলোচ্ছে!
যাদবকাকা এসব ভ্রূক্ষেপ করল না। বরং আরও ঝুঁকে পড়ে বলল, “তুই খবর জানিস?”
“কী?” কাজু যতটা সম্ভব কম শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল।
যাদবকাকা বলল, “রাশিয়া থেকে বিরাট অর্ডার পেয়েছি আমরা। প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকার অর্ডার। বুঝলি? কিন্তু সেখানে ইন্সপেকশন ক্লজ় আছে। লেট সাপ্লাইয়ের জন্য পেনাল্টি ক্লজ় আছে। অর্ডার পাওয়ার পর ম্যানেজমেন্ট আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। বলেছিল ঠিক সময়ের মধ্যে আমরা যদি মাল ডেলিভারি করে দিতে পারি ফাইভ পারসেন্ট করে ইনটেনসিভ দেবে।”
কাজু বলল, “ইনসেনটিভ!”
“ও একহি বাত হ্যায়,” কথাটাকে মাছির মতো হাত নেড়ে সরাল যাদবকাকা, “কিন্তু প্রোডাকশন ঝাড় খেয়েছে। মালিকের ছেলে দু’নম্বরি পাট দিয়ে বেশ কিছু মাল তৈরি করতে বলেছিল। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফেঁসে! এখন মালিক বলছে আমাদের নাকি দোষ! বলছে পার্টি যদি টাকা কাটে, তবে আমাদের থেকে মালিকও কেটে নেবে। তার যুক্তি হল, লাভ হলে যদি ফাইভ পারসেন্ট বেশি টাকা আমরা নেব বলে মেনে নিই, তবে লোকসান হলেও তার দায়ের একটা অংশ আমাদের বইতে হবে। ব্যাটা মানছেই না যে, যা হয়েছে ওর লালচি ছেলের জন্য হয়েছে!”
কাজু শুনল চুপ করে। তারপর বলল, “গোপেনদা জানে?”
গোপেন শাসমল এই অঞ্চলের এমএলএ। তা ছাড়া এই জুটমিলটার ব্যাপার-স্যাপারগুলো গোপেনদাই দেখে। যদিও কাজুদের বিরোধী পার্টির লোক গোপেন, কিন্তু কাজুকে বিশেষ স্নেহ করে। মতবিরোধ থাকলেও কাজুর কথার গুরুত্ব দেয়!
“সেই জন্যই তো তোকে বলছি কাজু!” যাদবকাকা দু’হাত দিয়ে ধরল কাজুর হাত। বলল, “তুই একবার বল দাদাকে। আমরা ওর দুশমন তো! আমাদের মিলের ইউনিয়ন ওরা এখনও দখল করতে পারেনি। তাই খুন্নস আছে লোকটার। তুই একবার ওকে বল। তোকে তো অন্যভাবে দেখে। জানিস তো মালিকদের সঙ্গে ওর দহরম-মহরম খুব। ওরা ইউনিয়নে ক্ষমতায় না থাকলেও মালিক ওর কথা ফেলবে না।”
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। যাদবকাকার হাতটা খরখরে বালি-কাগজের মতো। মুখটা তেতো লাগছে। মাথাটাও ব্যথা করছে বেশ। নদীর দিক থেকে আসা হাওয়ায় শীতটা যেন শিরদাঁড়াতেও অনুভব করতে পারছে। শরীরখারাপের মধ্যে আর এইসব ভাল লাগছে না। কিন্তু ও জানে ভাল না লাগলেও এটা ওকে করতে হবে। যেভাবেই হোক করতে হবে। অনেক মানুষের ন্যায্য পাওনা জড়িয়ে আছে এতে! মরালিটির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। আসলে টাকা এসে গেলেই ও দেখেছে মরালিটিগুলো কেমন যেন পেছনের দিকে চলে যায়, ভিড়ে হারিয়ে যায়। মানুষ মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলে এই রুপোর ঝনৎকারের সামনে! তাই ভাল না লাগলেও এই নিয়ে গোপেনের সঙ্গে কথা বলতে হবে ওকে। আজ না হলেও দু’-এক দিনের মধ্যেই বলতে হবে। কাজু জানে এতে হয়তো সোনাঝুরিতে ওদের পার্টির মাথা বিমলদা রাগ করবে, কিন্তু বিমলদা এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। মালিকপক্ষের সঙ্গে বিমলদার সম্পর্কটা আদায়-কাঁচকলায়। যাদবকাকা ঠিকই বলেছে, গোপেনদার দল এখনও ইউনিয়নের দখল নিতে না পারলেও গোপেনদার সঙ্গে মালিকের খাতির খুব! তাই ও জানে, কিছু করতে পারলে গোপেনই পারবে। কাজু বোঝে সব বিষয়ে মাথা গরম করলে হয় না। কিছু জিনিস বুদ্ধি করেও বের করতে হয়।
“আরে, তুই শুনছিস কি?” যাদবকাকা বলল, “জানি, তোর কষ্ট হচ্ছে শরীর খারাপ নিয়ে এসব শুনতে। কিন্তু আজই এই নিয়ে একদফা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। তু জরা দেখ কাজু। ঝামেলা হতে পারে বড়। যদি মাল ইন্সপেকশনে আটকে যায়, বা সেখানে বেরিয়ে গেলেও ডেলিভারির পরে যদি বেশির ভাগ মাল ফেঁসে যায়, তা হলে পার্টি শেষ টোয়েন্টি পারসেন্ট টাকা আটকে দেবে! মালিকরা তো লাভ বের করে নিয়েছে! কিন্তু ওই আটকে যাওয়া টাকার ছুতোয় আমাদের মাইনে আটকে যাবে। বিশাল অসুবিধে হয়ে যাবে। বাবু তু জরা দেখ।”
কাজু তাকাল সামনের দিকে। আলো নরম হয়ে এসেছে। হাওয়ার ভেতরের শীতটাও বাড়ল যেন। ও যাদবকাকার মুখের দিকে তাকাল। লোকটাকে কেমন ভাঙাচোরা লাগছে আজকে। সারাদিন কাজের পর এখন এইসব নিয়ে ভাবছে। না নিজের জন্য শুধু নয়, সকলের জন্য। মালিকের ছেলেটি গন্ডগোলের। সবাই জানে। মালিক নিজেও জানে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না!
গায়ের চাদরটা ভাল করে আবার জড়িয়ে নিল কাজু। তারপর ধীর গলায় বলল, “আমি দেখব যাদবকাকা। তুমি চিন্তা কোরো না। লক আউট করব বললেই তো করা যায় না। আমি কথা বলব গোপেনকাকার সঙ্গে। আজ সন্ধেবেলা যাব মজুমদার-ডাক্তারের কাছে। ফেরার পথে গোপেনকাকার বাড়ি হয়ে আসব। দেখি, কী বলেন কাকা। কেমন?”
যাদবকাকা উঠল। পকেট থেকে খয়েরি রঙের একটা রুমাল বের করে মুখটা মুছল। তারপর হাসল, “আরে, সুস্থ হয়ে যা আগে। পহলে বুখার তো উতর যায়ে! তারপর দেখিস। আজ যেতে হবে না।”
কাজু নিজেও উঠল। ঘরে যাবে। আর বসবে না। সন্ধে হয়ে যাবে একটু পরে। মশা আসতে শুরু করেছে। এখনই কয়েকটা কানের কাছে পিনপিন করছে। যাদবকাকার মাথার উপর মুকুটের মতো ঘন হয়ে এসেছে কয়েকটা। ও দেখল যাদবকাকা বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছে।
বাড়ির চারটে ব্লকের সাউথ ব্লকে থাকে যাদবকাকা। তিন তলায়। আর নর্থ ব্লকের দোতলায় থাকে কাজুরা। তবে এটাকে যদি থাকা বলে!
আগেকার দিনের বাড়ি। কড়িবরগা দেওয়া সিলিং উঁচু হলেও ঘরগুলো খুব একটা বড় নয়। ইয়া মোটা মোটা দেওয়াল। তবে ড্যাম্প ধরা। ঘরে ঢোকার দরজাগুলো বেশ ছোট। ঘরে কুলুঙ্গি আছে দুটো। ইলেকট্রিকের কানেকশান আছে। তবে মরা মানুষের চোখের মতো টিমটিম করে বাল্ব। একটা ডিসি পাখা ওই সিলিং থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝুলে থাকে। চৌকো বাক্সের মতো রেগুলেটরের খটখটে সুইচ দিয়ে তাকে যতই তাড়া লাগাও না কেন, সে কিছুতেই তার গদাইলশকরি চাল ছেড়ে এগোয় না। এখন শীত তাই রক্ষে। গরমকালে, রাতে এত জনের সঙ্গে এই ঘরটায় শোওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। কাচের ভাঙা স্কাইলাইটটাও সব গরম হাওয়া বের করতে পারে না। বইয়ে পড়া গ্যাস চেম্বারের কথা মনে পড়ে কাজুর। তাই সেই গরমের রাতগুলোর বেশির ভাগ সময়টা ও চিলেকোঠার ওই আধাখেঁচড়া ঘরটায় ঘুমোয়।
জ্বরটা আছে। গায়ে-হাত-পায়ে বেশ ব্যথাও রয়েছে। বিশেষ করে ঘাড়টা বেশ ব্যথা। সাড়ে ছ’টার আগে মজুমদার-ডাক্তার বসে না। কাজু ভাবল, সতু থাকলে সাইকেল করে নিয়ে যেত। কিন্তু ব্যাটা সেই যে নর্থ বেঙ্গল গিয়েছে তো গিয়েছেই! পার্টির কাজেই গিয়েছে। কবে আসবে কে জানে!
দু’বার চিঠি লিখেছিল কাজু। উত্তর পায়নি। বিমলদা বলেছে, ওখানে লোকজনকে একত্রিত করতে উদয়াস্ত খাটতে হচ্ছে সতুকে। তাই সময় পাচ্ছে না।
সতু ডাকাবুকো ছেলে। ভয়ডর বলে কিছু নেই। ওই চা-বাগানের মতো জায়গায় মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সংগঠন তৈরি করার কাজ রীতিমতো কঠিন আর ঝুঁকিপূর্ণ! তাও সতু নিজেই আগ বাড়িয়ে নিয়েছে কাজটা। কেন কে জানে সতুর মধ্যে একটা মারদাঙ্গা মনোভাব আছে। ও কথায়-কথায় বলে এভাবে ন্যাকা-ন্যাকা ভাবে কিছু হবে না। বাস্তিলের পতনও ন্যাকা ন্যাকা কথায় হয়নি, জারদের উৎখাত করাও ন্যাকা ন্যাকা কথায় হয়নি। সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া নাকি এই পচে যাওয়া, নর্দমার মতো পৃথিবীটার মুক্তির উপায় নেই। চারিদিকে পাঁক জমে সবটাই নাকি স্তব্ধ আর নিস্পন্দ হয়ে গিয়েছে। একে খুঁচিয়ে দূর না করতে পারলে হবে না!
হিংসার পথ ভাল লাগে না কাজুর। মানুষ মারতে হবে সমাজ বাঁচাতে গেলে! মানুষ ছাড়া সমাজ হয় নাকি? খারাপ লোকদের প্রান্তিক মানুষে পরিণত করতে হবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে। মানুষের মনে সুচিন্তার বীজ বুনতে হবে শিক্ষার মাধ্যমে। তা হলে মানুষ নিজেই আবর্জনাদের সরিয়ে দেবে, গুরুত্বহীন করে দেবে। তার জন্য রক্তারক্তি করার কোনও দরকার পড়বে না।
সতু প্রাণের বন্ধু কাজুর। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে দু’জনের মতের মিল হয় না। তবে সতু সেটা নিয়ে কখনও মাথাগরম করে না। বরং বলে, “তুই বুঝবি একদিন। আমার কথার গুরুত্ব বুঝবি। তুই যা বলছিস সেটা থিয়োরি! আসল ক্ষেত্রে কিন্তু এমন সহজ নয় ব্যাপারটা। মানুষকে নিয়ে কাজ। তাদের ইচ্ছে, লোভ, সেয়ানাগিরি, ধান্দাবাজি, ভয়, ইনসিকিয়রিটি, কপটতা, বোকামো এগুলোকে কনসিডার করতে হবে না? এই ফ্যাক্টরগুলোই থিয়রি আর প্র্যাকটিক্যাল পৃথিবীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়! তবে এটা জানবি, মানুষ কিন্তু তৈরি হচ্ছে তলায়-তলায়। বিপ্লবের দিন ঘনিয়ে আসছে ভাই!”
“কাজুদা,” পিছন থেকে পরিচিত গলার ডাক পেয়ে থমকে গেল কাজু। গলাটা বিজনের। চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলে। কিন্তু এখনই পার্টির কাজে ঢুকে পড়েছে! এটা ভাল লাগে না কাজুর। আগে একটু লেখাপড়া করুক, তারপর না হয় ঢুকবে! কিন্তু বিমলদা সেটা মানে না। বলে, “আরে, নতুন অবস্থাতেই ধরতে হবে। ওদের বোঝাতে হবে আসল ব্যাপারটা কী! এই বয়সে ডেডিকেশান, মরালিটি, ফোর্সফুলনেস বেশি থাকে। করাপ্ট হওয়ার আগেই ওদের বোঝাতে হবে জীবনটা আসলে কী! দেশ ও দশের উন্নতি কীসে হবে!”
ফোর্সফুলনেস জিনিসটা কী, কাজু জানে না। বিমলদার কথার পিঠে কী বলবে বুঝতেও পারে না। বিমলদা কারও কথা শোনার মানুষই নয়! তবে ব্যক্তিগতভাবে বিজনকে সময় পেলেই বোঝায় কাজু। বলে লেখাপড়াটা মন দিয়ে করতে। এসবের জন্য তো সারা জীবন পড়ে রয়েছে! কাজু বোঝে বিজন খুব ভালবাসে ওকে। লোকজন আড়ালে বিজনকে ওর চামচা বলেও ডাকে। কিন্তু সেসব ও পাত্তা দেয় না! বড় বাড়ির ছেলে বিজন। টাকাপয়সার অভাব নেই। কিন্তু এই উঠতি বয়সেও কত সাধারণভাবে থাকে। এসব ছেলে নিজের জন্য আসেনি পৃথিবীতে, কাজু বোঝে। তাই ও চায় আরও পড়ুক ছেলেটা। আরও জানুক। বাকিদের শক্ত মাটিতে তুলতে হলে আগে নিজেকে শক্ত মাটিতে দাঁড় করাক।
কাজু পেছন ফিরল। আর সঙ্গে-সঙ্গে থমকে গেল একটু। বিজনের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে নয়না। চোয়াল শক্ত করল কাজু। মেয়েটা আজও এসেছে! আজকাল ওর আসা যেন বেড়ে গিয়েছে খুব! কথাটা ঘুরিয়ে ও একবার বলেছিল পেখমকে। পেখম পাত্তা দেয়নি। বলেছিল, “ও পাগলি। তা ছাড়া আমায় তো মা যেতে দেয় না তোমার কাছে। লুকিয়ে দেখা করি কী কষ্ট করে জানোই তো! ওই তো তোমার খবর এনে দেয় আমায়। ও আমার সবচেয়ে ভাল বান্ধবী। আসলে বোনই বলতে পারো।”
পেখমের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কাজু! এত বিশ্বাস আর ভালবাসা অন্যের জন্য যার থাকে সে মানুষটা যে কতটা ভাল, কতটা এই পৃথিবীর জন্য প্রয়োজনীয়, সেটা পেখম নিজেই জানে না। নয়না যে সহজ মন নিয়ে আসে না কাজুর কাছে সেটা কিছুতেই স্পষ্টভাবে পেখমকে বলতে পারে না কাজু। ও জানে কিছুতেই কাজুর এই কথাটা বিশ্বাস করবে না পেখম।
কাজু থমকাল একটু। তারপর পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল ওদের দিকে। শাড়ির ওপর একটা পঞ্চো পরে রয়েছে নয়না। টানটান করে বাঁধা চুল। কপালের একপাশে চাঁদের আকারের ছোট্ট একটা কাটা দাগ। ধারালো ছুরির মতো মুখ নয়নার। চিনেমাটির প্লেটের মতো চকচকে মুখের চামড়া। খাঁজ কাটা ওপরের ঠোঁটে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস!
কাজু সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, নয়নার হাতে একটা কাচের বয়াম।
“তোমার জ্বর কি বাড়ল কাজুদা?” বিজন ছটফটে গলায় জিজ্ঞেস করল।
কাজু বলল, “ওই আর কী। তা তোরা?”
বিজন কিছু বলার আগেই নয়না বলল, “তোমার জ্বর হয়েছে আমায় বিজন বলল। আমায় তো খবর পাঠাতে পারতে একটা!”
কাজু বলল, “এটা কোনও বলার মতো খবর! সোনাঝুরিতে কত লোকের জ্বর হয়, তোকে সবটা সবাই জানাবে?”
নয়নার চোখের দৃষ্টি কড়া হল। ও রাগের গলায় বলল, “সবাই আর তুমি এক? এই বোঝো? আর বাবার কাছে যাওনি কেন?”
কাজু ঢোঁক গিলল সামান্য। নয়নাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। ও বলল, “তোর হাতে কী?”
নয়নার মুখটা সামান্য নরম হল যেন। ও গম্ভীর গলায় বলল, “আমার আজ জন্মদিন। তাই এতে বাড়িতে তৈরি পিঠে আছে। তোমার জন্য মা পাঠাল।”
কাজু হেসে ফেলল, “গত দু’সপ্তাহ আগেও তো তোর জন্মদিন ছিল! আজ আবার জন্মদিন! ভাল তো বেশ!”
নয়না ভুরু কুঁচকে বলল, “তাতে তোমার কী?” তারপর বিজনের দিকে কাচের বয়ামটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কাকিমার হাতে দিয়ে আয় একছুটে। যা।”
বিজন বয়ামটা নিয়ে দৌড়ে গেল।
নয়না তাকাল কাজুর দিকে। কাজুর শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন যেন এক ফোঁটা বিদ্যুৎ গড়িয়ে গেল। কাছে না এসেও একটা মেয়ে এমন করে শুধুমাত্র তাকিয়ে কাছে চলে আসতে পারে!
নয়না বলল, “তোমার জন্য আমার রোজ-রোজ জন্মদিন হতে পারে কাজুদা।”
“এসব কী বলছিস?” কাজু চোয়াল শক্ত করল। আজ মেয়েটা এমন খোলাখুলি বলছে কেন? এমন করে পুরো ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলছে কেন?
নয়না বলল, “কেন, কানে শুনতে পাচ্ছ না কী বলছি? এতদিন যা চুপচাপ বোঝাতে চেয়েছি, সেটা তো আর বোঝোনি! এবার তাই স্পষ্ট করে বলছি।”
“এমন বলিস না নয়না। তুই তো জানিস সবটা।”
“কী জানি আমি?” নয়না ফোঁস করে উঠল, “পেখম সুন্দরী, কিন্তু আমিও কি সুন্দরী নই! ও তোমার জন্য সব ছাড়তে পারবে ভেবেছ? ওর মাকে দেখেছ? লেডি হিটলার। তোমায় ঘেন্না করে। মায়ের বিরুদ্ধে যাবে ভেবেছ ও? কোনওদিন না। আর সেখানে আমি সব পারি তোমার জন্য। সব।”
কাজুর বুকের ভেতর কষ্ট হচ্ছে। এসব কেন বলছে নয়না? সুন্দর ব্যাপারটাকে কেন এমন নষ্ট করে দিচ্ছে? ও কি জানে না যে, পেখম ছাড়া আর কেউ কাজুর মনে থাকতে পারে না! পেখম ছাড়া ওর জীবন শূন্য! তা হলে এসব কেন বলছে?
কাজু অসহায়ভাবে তাকাল নয়নার দিকে। কী করে বোঝায় ও মেয়েটাকে!
নয়না বড়-বড় চোখগুলো স্থিরভাবে জ্বেলে রেখেছে কাজুর চোখের সামনে।
কাজু বলল, “প্লিজ় নয়না। এমন করিস না।”
“আমায় ‘তুমি’ করে বলো না কেন কাজুদা?” নয়না চোয়াল শক্ত করল, “আমি কি মেয়ে নই?”
“নয়না, নয়না… তোকে আমি কী করে বোঝাই…” কাজু মাথা নাড়ল।
নয়না বলল, “আমার দিদির সঙ্গে তো তোমার আলাপ আছে কাজুদা। আমার চেয়ে কত বছরের বড় জানো তো! পাঁচ বছরের। আমি যখন সাত বছরের ছিলাম, ওর একটা সুন্দর পুতুল ছিল। আমারও ওটা ভাল লাগত। কিন্তু ওটা আমায় ধরতে দিত না ও। জানো, আমি কী করেছিলাম? আমি…”
“শোন,” কাজু মাঝপথে থামিয়ে দিল নয়নাকে, বলল, “আমি কিন্তু পুতুল নই। মানুষ কিন্তু পুতুল নয়।”
হাসল নয়না। অবজ্ঞার হাসি। তারপর বলল, “এত পড়ে এই জানলে! কাজুদা, আমরা সবাই পুতুল। শুধু নিজেরা বুঝি না। একদিন তুমিও বুঝতে পারবে। একদিন ওই গল্পের শেষটা তোমায় শোনাব। কেমন?”
.
০৭. রাধিয়া
কেরদানি দেখানোটা যে বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে, সেটা এখন খুব বুঝতে পারছে রাধিয়া। মধুদাকে গাড়ি দিয়ে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়াটা যে কী ভীষণ ভুল হয়ে গিয়েছে! এখন কী করবে? চারিদিকে এখন চৈত্র-সেলের ভিড়। মানুষের মাথা মানুষে খাচ্ছে! তার মধ্যে কী করে খুঁজে পাবে ও কাঁকুলিয়া রোডের বাড়িটা? বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে চারিদিকে ফুল স্টপের মতো ছড়ানো মানুষের মাথাগুলোর দিকে টেন্সড হয়ে তাকিয়ে রইল রাধিয়া।
মোবাইলটার কি এখনই বন্ধ হওয়ার ছিল! আর কপাল এমন যে, পাওয়ার ব্যাঙ্কটাও আনেনি সঙ্গে করে। কী করবে এখন ও! পলি, জয়তী, বুদা আর রাখি তো বলেইছিল ওদের সঙ্গে যেতে, কিন্তু কী যে মাথায় ভুত চাপল রাধিয়ার? নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করছে ওর! শুনেছে ফার্ন রোড দিয়ে ঢুকে কোথা দিয়ে যেন কাঁকুলিয়া রোড যাওয়া যায়। কিন্তু কোথা দিয়ে যাওয়া যায় সেটা ঠিক জানে না।
সুম্পার জন্মদিন আজ। ইউনিভার্সিটির বন্ধু সুম্পা। খুব ঘনিষ্ঠ কিছু নয়। তবে বন্ধু। তাই নেমন্তন্ন করছে। আগে তো আসেনি। তাই কীভাবে যাবে জানতে চাইলে সুম্পা বলেছিল, “তোকে বলে লাভ আছে? গড়িয়াহাট ক্রস করে বিজন সেতুর দিকে এগোলে দেখবি ফার্ন রোডের সিগনাল পড়বে। ওখানে এসে ফোন করবি আমায়। আমি তোদের মধুদাকে বলে দেব! নানা রাস্তায় ওয়ান ওয়ে থাকে। মধুদা বুঝতে পারবে।”
সবই ঠিক ছিল। কিন্তু আজ দিনটাই এমন যে, কী আর বলবে!
ইউনিভার্সিটি বন্ধ আজ। তাই কোথাও যাওয়ার ছিল না সকালে। মা তো বলেছিল এখানেও আসতে হবে না। কিন্তু মায়ের কথা শোনেনি রাধিয়া। মায়ের তো সবকিছুতেই আপত্তি। ওর ইউনিভার্সিটিতে আপত্তি। বন্ধুদের নিয়ে আপত্তি। ওর নিজেকে সাধারণভাবে রাখা নিয়ে আপত্তি। আর কত কিছু শুনবে!
তা ছাড়া আলিপুর থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছের কাঁকুলিয়া রোড কী আর এমন দূর!
মা তবু জেদ করেছিল। বলেছিল, “বাবা জানলে কিন্তু রাগ করবে! এমন করিস না রাধি।”
“কেন রাগ করবে?” রাধিয়া তর্ক ছাড়েনি, “সেই যে আমি লোকাল ট্রেনে করে সোনাঝুরি গেলাম, তাতে বাবা রাগ করল? তুমিই তো রাগ করছিলে! বাবা মোটেও রাগ করে না। তুমিই শুধু বাবার নামে মিথ্যে মিথ্যে রাগ করার কথা বলো!”
“আমি মিথ্যে বলি?” মা খুব রেগে গিয়েছিল, “আসুক তোর বাবা। আমি বলব তার মেয়ের গুণপনা! ইউনিভার্সিটিতে পড়ে এই শিখছে! তখনই বলেছিলাম ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিতে। এখানে জংলিদের সঙ্গে থেকে থেকে সব ম্যানার্স নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমাদের স্টেটাসের একটা ফ্যামিলিকে দেখা, যে এভাবে তোর মতো থাকে! তোর বাবা কী নিয়ে এত ব্যস্ত কে জানে যে, এইদিকে নজর দেয় না! মেয়েটা কি আমার একার!”
মা এই বলে, বাবাকে ওর নামে বলবে। এই বলে, বাবা সময় দেয় না। মা যে কী চায়! ওদের বিশাল বড় ব্যাবসা। সেদিকে বাবার সময় না দিলে চলবে? বাবা অনেক সময় নানা টুরে যায়। সেটা তো ব্যাবসার জন্যই না কি? শুধু তো আর সোনাঝুরির জুটমিল নয়, ওদের কাপড়ের ব্যাবসা আছে। রাইস মিল আছে। ফুড প্রোডাক্টের ব্যাবসা আছে। এখন বাবা একটা অন্য ব্যাবসা শুরু করবে। এত কিছু যে-মানুষটা করে, তার কি অন্যদিকে মন দেওয়ার সময় আছে? মা এত তলিয়ে ভাবে না।
রাধিয়া ঘড়ি দেখে বলেছিল, “তুমি আমার ওপর রাগ করে টাইম নষ্ট করছ কেন? তোমায় না পার্লারে যেতে হবে!”
“অ্যাঁ!” মা এবার চমকে উঠে তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে, “তাই তো! বুজু তো গাড়িটা এখনও বের করল না! কী যে করে না!”
হাসি পেয়ে গিয়েছিল রাধিয়ার। বুজু হল মায়ের রাইটহ্যান্ড। মায়ের সব কাজ বুজু করে দেয়। এমনকী, মায়ের গাড়িটাও বুজুই চালায়। সবাই একটু থমকে যায় বটে মহিলা গাড়িচালক দেখে। কিন্তু বুজুর মজা লাগে! বলে, “জানো রাধি, আমার যা মজা লাগে না! সব বাড়ির ড্রাইভাররা তো পুরুষ। তাই আমায় দেখে সবাই চমকে যায়!”
তবে রাধিয়ার মনে হয় ঠিকই আছে। বুজুর গাড়ি চালানোর হাত খুব ভাল। ওদের চারটে গাড়ি। একটা বাবা চড়ে অফিস যায়। একটা ও ব্যবহার করে। এই এসইউভিটা মা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে আর একটা ছোট হ্যাচব্যাক আছে সেটা বাড়ির জন্য!
রাধিয়া মায়ের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে বলেছিল, “যাও দ্যাখো, কী হল।”
মা নিজেকে সামলে নিয়েছিল দ্রুত। বাদামি চুলগুলো সামলাতে-সামলাতে বলেছিল, “কথা ঘোরাচ্ছিস! আজকাল কী হচ্ছে তোর! যত্তসব আজেবাজে জায়গায় যাওয়া! আমাদের সঙ্গে ক্লাবে যাওয়ার বেলায় তো আগ্রহ দেখি না! কার মতো হয়েছিস তুই?”
রাধিয়া প্রায় বলে ফেলছিল কার মতো। কিন্তু তারপর সামলে নিয়েছিল নিজেকে। বলেছিল, “বাবা, ঠাকুমা আমায় কিছু বলে না। কিন্তু তুমি এমন করো কেন?”
মা তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে। তারপর বলেছিল, “কারণ, আমি তোর মা বলে। তোর জন্য চিন্তা হয় না আমার!”
“কীসের চিন্তা মা!” রাধিয়া অবাক হয়েছিল।
“কীসের চিন্তা বুঝিস না! আগে মা হ, তারপর বুঝবি!” মায়ের চোখে জল এসে গিয়েছিল আচমকা।
“মা,” রাধিয়া এসে মায়ের হাতটা ধরেছিল, “কী যে করো না তুমি! এই রাগছ! এই কাঁদছ! কীভাবে এত মুড শিফট হয় তোমার? কোনও মানে আছে এর?”
“ছাড়!” মা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে সাবধানে চোখের জলটা চেপে-চেপে মুছেছিল। রাধিয়া দেখেছিল মায়ের বড়, সুন্দর চোখদুটো ছলছল করছে। তবে যত্ন করে করা মেকআপ একটুও নষ্ট হয়নি।
মায়ের বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও দশ বছর কম মনে হয়। রাধিয়ার বান্ধবীরা বলে, “তোর মা বলে কিন্তু বিশ্বাসই হয় না!”
কথাটা ঠিক। কিন্তু বাবাকে সেই তুলনায় বুড়ো লাগে বেশ। যদিও বাবা-মায়ের বয়সের তেমন খুব একটা তফাত নেই।
মা বলে, “প্রথম থেকেই তোর বাবা অমন বুড়োটে। সারাক্ষণ খালি ব্যাবসা আর ব্যাবসা! বাড়ির বাইরে থাকতে পারলেই যেন বেঁচে যায়!”
রাধিয়ার হাসি পায়। মা এমন করে বলে যেন কত অনিচ্ছের সঙ্গে মা বিয়ে করেছিল বাবাকে!
“মা, কী কথা হচ্ছিল আর তুমি কোনদিকে নিয়ে গেলে কথাটা! এর কোনও মানে আছে? আমি যাবই সুম্পার জন্মদিনে… যাবই, ব্যস!” রাধিয়া রাগের গলায় বলেছিল এবার।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে। তারপর বলেছিল, “ঠিক আছে মধুদাকে নিয়ে যাবি। আর বেশি দেরি করবি না। আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরবি। কেমন?”
মধুদা বাড়ির সবচেয়ে পুরনো ড্রাইভার। বাবার কথায় সবচেয়ে বিশ্বস্ত। তাই বাবা মধুদার ওপর ভার দিয়েছে রাধিয়াকে সব জায়গায় নিয়ে আসা, নিয়ে যাওয়া করার জন্য।
এই বাড়িতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল মধুদার। একরকম এই বাড়ির লোকের মতোই হয়ে গিয়েছে। গাড়ি চালানো ছাড়াও নানারকম কাজকর্ম করে দেয়। বিশেষ করে ঠাকুরমার সমস্ত কেনাকাটা মধুদাই করে।
বুজু এসে পড়েছিল এরপর। মা বলেছিল, “মধুদাকে ডেকে দে তো। আমি যাওয়ার আগে বলে যাব, রাধিয়াকে যেন ঠিক সময়ে ফিরিয়ে আনে। ওর কোনও কথা যেন না শোনে।”
“মধুদা?” বুজু সামান্য থমকেছিল। ঠোঁট চেটে কী যেন একটা বলবে বলে ইতস্তত করছিল।
“হ্যাঁ। নামটা প্রথম শুনলি?” মা বিরক্ত হয়েছিল এবার।
মায়ের মাথা একটু গরম। চট করে রেগে ওঠে। বুজু খুব ভাল করে জানে সেটা। তাই মায়ের রেগে ওঠায় বুজু আর-একটু থমকে গিয়েছিল।
“কী হল, বল।”
বুজু বলেছিল, “আসলে শুনলাম মধুদার বউয়ের শরীরটা ভাল নেই। আজ বিকেলে ডাক্তার দেখানোর কথা। আজ রাধির কলেজ নেই তো, তাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে। তাই… মানে…”
“তোকে আমায় মানে বোঝাতে বলেছি!” মা আচমকা চেঁচিয়ে উঠেছিল, “সবাই এখানে কাজ করতে এসেছে না অজুহাত দিতে এসেছে! ডাক মধুদাকে। আমি কথা বলছি।”
বুজু মাথা নিচু করে চলে গিয়েছিল।
“মা, আরে আমি বাচ্চা নাকি! ওলা ধরে চলে যাব। নো প্রবলেম। কেন মধুদাকে ডাকছ!”
মা তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি। বাড়িটা আমায় চালাতে হয়। এদের আমায় সামলাতে হয়। মধুদা পুরনো লোক হতে পারে। কিন্তু চাকরি করে। একটা মাইনে পায়। তার এই সময়টা আমরা কিনেছি। বউকে নিয়ে ডাক্তার কবে দেখাবে সেটা ওর বলা উচিত ছিল। নিজের খুশিমতো এমনটা ও করতে পারে না। সেটা ওকে বলে দেওয়া দরকার।”
ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে আবার মাথার ওপরের সুইচটা টিপল রাধিয়া। নাঃ। সেই কালো স্ক্রিন! চোয়াল শক্ত করল রাধিয়া। আজ দিনটাই কেমন যেন। তার ওপর রাসবিহারীর দিকটায় আকাশটা কালো হয়ে এসেছে। প্রথম এপ্রিলের সাংঘাতিক গরম ভেদ করে তবে কি এবার বৃষ্টি আসবে? শহর কি শেষ চৈত্রে এসে প্রথম মাথা পেতে নেবে কালবৈশাখীকে!
রাধিয়া অসহায়ের মতো একবার আকাশ আর একবার সামনে ছড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়টাকে দেখল। এই কি ব্যূহ! এটা ভেদ করে ও যাবে কী করে?
বিকেল সাড়ে পাঁচটার গড়িয়াহাটা মানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটা। তার মধ্যে সব দোকানদার ‘সেল’ ঝুলিয়ে ক্রমাগত চিৎকার করে চলেছে কার জিনিসপত্র কত সস্তা। কে কত ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। এর মধ্যে কীভাবে সুম্পার বাড়ি পৌঁছবে ও! এর চেয়ে মাঝসমুদ্রে রবারের ডিঙিতে ভাসাও বোধহয় ভাল ছিল।
রাধিয়া ভাবল মধুদার কথা শুনলেই ভাল হত। মধুদা তো বলেছিল ওর অসুবিধে হবে না। মধুদার বউ না হয় ডাক্তারের চেম্বারে একটু অপেক্ষা করবে।
কিন্তু রাধিয়ার একটুও ভাল লাগছিল না। আসলে মা এমন বিচ্ছিরিভাবে মধুদাকে বকাবকি করেছিল যে, রাধিয়ার কেমন যেন অপরাধবোধ হচ্ছিল একটা।
এটা হয় রাধিয়ার। কেউ কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে, ওর নিজের কেমন একটা অপরাধবোধহয়। রাধিয়া কিছু বলেইনি। ও কোনওভাবে হয়তো সেই ঘটনাতে যুক্তও নয়। তবু ওর মনের ভেতরটা কেমন করে! কেমন যে করে সেটা ঠিক নিজের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে করে কিছু একটা। বকুনি খাওয়া, মনখারাপ করে, ম্লান মুখে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মন, কিছু একটা করে ভাল করার চেষ্টা করে রাধিয়া। পলি বলে, “বড্ড বাড়াবাড়ি করিস তুই রাধি।”
তা হবেও-বা বাড়াবাড়ি। কিন্তু রাধিয়া কী করবে! ওর তো এমনটাই মনে হয়। জোর করে কিছু করবে কী করে ও!
গাড়িতে উঠে সামনের আয়নায় মধুদার মুখটা অর্ধেক দেখতে পাচ্ছিল রাধিয়া। কেমন একটা ঘষা কাচের মতো চোখ। লম্বাটে ঝুলে পড়া মুখ। কাঁচা-পাকা ভুরুগুলো কেমন যেন কষ্টে কুঁকড়ে গিয়েছে।
আলিপুর জেলের সামনেটা পেরোনোর সময় রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, “ক’টায় শিখামাসির ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মধুদা?”
“শিখার?” মধুদা মুখ না ফিরিয়েই ক্লান্ত গলায় বলেছিল, “সোয়া ছ’টা।”
“কোথায়?”
“ওই প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের ওখানে একটা পলিক্লিনিকে। কেন গো রাধিদিদি?”
রাধিয়া গাড়ির ড্যাশবোর্ডে লাগানো ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলেছিল, “তুমি আমায় রাসবিহারীতে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাও। তারপর সব কাজ মিটিয়ে আমায় আবার পিক আপ করে নেবে কাঁকুলিয়া থেকে।”
“সে কী!” এবার মধুদা একটু সময়ের জন্য পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল। তারপর আবার সামনে তাকিয়ে বলেছিল, “এ হয় না রাধিদিদি। ম্যাডাম জানলে রাগ করবে।”
“আরে দূর, জানলে তো করবে!” রাধিয়া এগিয়ে বসে বলেছিল, “মধুদা, আমি যা বলছি শোনো। আমায় নামাও। আমি ঠিক চলে যাব। তুমি কাজ সেরে আবার এসো। কেউ জানতে পারবে না।”
মধুদা বলেছিল, “তুমি চেপে বোসো দেখি। আমি পরে শিখাকে নিয়ে যাব।”
“আঃ,” রাধিয়া বলেছিল, “তোমরা কেউ আমার কথা শোনো না কেন? আমি কি বাচ্চা আছি নাকি এখনও? আমি মোটেও খুকি নই। রাস্তাঘাটে ভিড় বাস বা অটো দেখে মোটেও ভয় পাই না আমি।”
মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আতঙ্ক নিয়ে রাস্তায় উপচে পড়া বাস আর হেলে পড়া গাড়ির মধ্যে দিয়ে মাথা নিচু করে ছোটা অটোগুলোকে দেখল রাধিয়া! এগুলোয় উঠবে কী করে ও! ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছে রাধিয়ার। ও বুঝল যে, আসলে আমরা অনেক কথাই তাৎক্ষণিকভাবে বলে ফেলি। অনেক কথাই বলি নিজেদের মাপ আর ধারণক্ষমতা না বুঝে। কিছুটা আবেগ আর কিছুটা নিজের মনের মধ্যে অবচেতনায় বহন করা নায়ক বা নায়িকার প্রোজেকশনের পাল্লায় পড়ে আমরা এমন কাজ করে ফেলি। যাতে, পরে নিজেরই মনে হয় এমনটা না করলেই ভাল হত!
মধুদা রাসবিহারীতে ছাড়েনি ওকে। কিন্তু রাধিয়ার দেওয়া চাপে বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে ওকে ছেড়ে মধুদা গাড়িটা ডান দিকে টার্ন করে বেরিয়ে গিয়েছে সাদার্ন অ্যাভেনিউয়ের দিকে। বলে গিয়েছে, আটটার মধ্যে ঠিক পৌঁছে যাবে কাঁকুলিয়া রোডে।
কলেজটার সামনের দেওয়াল ঘেঁষে শাড়ির দোকান। উলটোদিকে সার দিয়ে বসে রয়েছে মেহেন্দি এঁকে দেওয়ার ছেলেরা। তবে শুধু ছেলে নয়, কিছু মেয়েকেও দেখল রাধিয়া। তারা কাস্টমারদের হাতে মেহেন্দি পরাচ্ছে।
ভিড়ের চাপে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না ও। কলেজের পাশেই ছোটখাটো একটা মল। সেখান থেকেও গলগল করে মানুষ বেরোচ্ছে!
এ কী বেকায়দায় পড়ল রাধিয়া! এখন ও কী করবে! মোবাইলটা বন্ধ। আর সত্যি বলতে কী সুম্পার নম্বরটাও মুখস্থ নেই। এই হয়েছে এক বিপদ। এখন মোবাইলে সব নাম লেখা থাকে বলে কারও নম্বর মুখস্থ থাকে না। দরকার পড়ে না তো!
“দিদি, পরবেন নাকি? ও দিদি?”
একটা তীক্ষ্ণ মেয়েলি গলার ডাকে সামনে তাকাল রাধিয়া। লাল কুর্তি আর জিন্স পরে একটা মেয়ে বসে রয়েছে সামনের মেহেন্দি স্টলটায়। মেয়েটার বয়স ওরই মতো। চোয়াল নড়ছে মেয়েটার। বোঝা যাচ্ছে পানমশলা খাচ্ছে। খয়েরি রঙের চুলগুলো গোছা করে বাঁধা। ওর স্টলের সামনে চারটে সিট। চারটেই ভরতি।
রাধিয়া বলল, “কী বলছেন?”
মেয়েটা খরখরে গলায় বলল, “মেহেন্দি পরবেন?”
“আমি? না তো!” রাধিয়া মাথা নাড়ল।
“তো, বেকার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বিজ়নেসের সময়! সরে যান! তখন থেকে জ্যাম করে রেখেছেন সামনেটা!” মেয়েটা ঝাঁজিয়ে উঠল।
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। ভালমানুষি দেখিয়ে মধুদাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই তো নিজের বিপদ ডেকে এনেছে। সেই সোনাঝুরিতে একা লোকাল ট্রেনে করে যাওয়ার যে-অ্যাডভেঞ্চার ছিল, সেটার তুলনায় এই ভিড় ও মানুষের স্রোত ভেঙে কাঁকুলিয়া রোড পৌঁছনো অনেক কঠিন।
“কী হল? কথা কানে যাচ্ছে না!” মেয়েটা এবার বেশ রেগে উঠল, “দোকানের সামনে থেকে সরুন। এভাবে দাঁড়ালে আমাদের অসুবিধে হচ্ছে!”
রাধিয়া ঘাবড়ে গেল এবার। মেয়েটার গলার তীক্ষ্ণতা বড্ড বেশি। আশপাশের সবাই মুখ ফিরিয়ে তাকাচ্ছে। সকলের চোখেই বিরক্তি। আসলে সকলেই আজকাল সবসময় বিরক্ত হয়ে থাকে। সকলেই খুব ব্যস্ত। সকলের কার সঙ্গে যেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কারা যেন সকলের জন্য অপেক্ষা করে আছে। সকলেই যেন এক মঞ্চ থেকে নেমে আর-এক মঞ্চে উঠবে। সকলেই সেলেব্রিটি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সকলের পাঁচশো বন্ধু। সকলের ছবিতে শ’য়ে-শ’য়ে লাইক। সকলেই অটোগ্রাফ দেবে বলে উদ্গ্রীব, কিন্তু অটোগ্রাফ নেওয়ার লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সকলেই বিরক্ত। যেমন এই মেয়েটি।
রাধিয়া দ্বিধা নিয়ে বলল, “আমি কাঁকুলিয়া রোড যাব কী করে বলতে পারেন?”
মেয়েটা হয়তো আরও খারাপ কিছু বলত এবার, কিন্তু রাধিয়ার কথার ভঙ্গি আর গলার স্বর দেখে থমকে গেল। বুঝল কিছু একটা। তারপর বলল, “এ তো কাছেই। আপনাকে সামনে যেতে হবে। রাস্তায় নেমে দাঁড়ান। একটা অটো ধরুন। গড়িয়াহাটার অটো নয়, বালিগঞ্জের অটো ধরবেন। তারপর ফার্ন রোডের মোড়ে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। ভেতর দিয়ে হেঁটে কাছেই। বুঝলেন?”
“থ্যাঙ্ক ইউ,” রাধিয়া নরম করে বলল।
তারপর ব্যাগটাকে সামলে মেহেন্দি পরানোর দুটো স্টলের মাঝখানের জায়গা দিয়ে রাস্তায় নামল। যেতে যখন হবেই তখন সত্যি এরকম ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থেকে তো আর লাভ নেই।
রাস্তায় লোক গিজগিজ করছে। পুজোর আগেও এমন অবস্থা হয়। কিন্তু সত্যি বলতে কী, রাধিয়া এভাবে ফুটপাথে ঘুরে-ঘুরে বাজার করে না। তাই এই ভিড়টা ওকে ঠেলতে হয় না!
রাধিয়া ডান দিকে তাকাল। বাস, ট্রাম, গাড়ি সব ধেয়ে আসছে। কিন্তু সব ক’টাই তো ভরতি। তবে? রাধিয়া কিছু ভাবার আগেই আচমকা চিৎকার শুনল একটা। খোনা গলা। পুরুষের। সকলের মতো রাধিয়াও চমকে পেছনে তাকাল।
একটা লোক। বেঁটে। কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল। ছাই রঙের হাফহাতা শার্ট আর গোড়ালির ওপর অবধি গোটানো একটা আধময়লা প্যান্ট। কাঁধে পেটমোটা একটা ঝোলা। লোকটার গায়ের রং পুড়ে ইটের মতো হয়ে গিয়েছে। গাল দুটো তোবড়ানো। থুতনিতে সাত দিনের না-কাটা কাঁচাপাকা দাড়ি। শুধু লোকটার বড় কালো চোখ দুটো উজ্জ্বল! লোকটা একটু লেংচে হাঁটছে। তার মধ্যেও মুখে হাসি আর হাতে-ধরা গোছা পাতলা চটি বই। লোকটা বইগুলো হাতপাখার মতো করে নাড়াচ্ছে!
রাধিয়া দেখল লোকটাকে। তারপর শুনল, লোকটা চেঁচিয়ে বলছে, “মানুষ ফুরিয়ে যায় আর থেকে যায় তার কথা। তার নিজের কথা, তার মনের ভেতর জমা হওয়া কথা। ইতিহাস সাক্ষী আছে, মানুষ লিখতে পছন্দ করে। স্টোন ট্যাবলেট, মাটির ট্যাবলেট, মোমের ট্যাবলেট থেকে শুরু করে নীল নদের পাশে পাওয়া প্যাপিরাস ছুঁয়ে, পার্চমেন্ট স্পর্শ করে আধুনিক কাগজ হয়ে এখন ইলেকট্রনিক ট্যাবলেটে মানুষ লিখে যাচ্ছে ক্রমাগত! সারা জীবন ধরে লিখেই যাচ্ছে সে! সেই আদিম ট্যাবলেটকে জড়ো করে রাখা থেকে প্যাপিরাসকে গুটিয়ে স্ক্রোল বানানো থেকে মানুষ চিরকাল চেয়েছে তার নিজের কথাকে যত্ন করে ধরে রাখতে! হেরোডোটাস বলেছেন, ফোনেশিয়ানরা এই প্যাপিরাস আর লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে এসেছিল প্রাচীন গ্রিসে। সেই তার জয়যাত্রার সূচনা। প্যাপিরাস হয়ে কাঠের পাতলা ‘ব্যাম্বু বুক’ হয়ে আমাদের তালপাতার পুঁথি ছুঁয়ে, গুটেনবার্গের ছাপাখানা অবধি পৌঁছে এ জিনিস মানুষের সভ্যতা ও তার উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। এ সেই জিনিস, যা মানুষকে বাড়তে দিয়েছে, জানতে দিয়েছে, ছড়িয়ে পড়তে দিয়েছে! সেই জিনিস, যে মানুষের একলা সময়ের বন্ধু। দূর সফরের সঙ্গী। পালা-পার্বণে উপহার। প্রেমপত্র বহন করার মাধ্যম। সাজিয়ে রাখার অহংকার। সেই জিনিস, যা প্রাচীনকাল থেকে প্রতিটি বিজ্ঞানী আর দার্শনিকের মনের আলো। সেই জিনিস, যা এখনকার পৃথিবীতে আমাদের রোজকার সঙ্গী। আমি আজ এই সেলের বাজারে মানুষের উপকারের জন্য আবার একবার নিয়ে এসেছি তাকে। কমপিউটারের যুগে যা আজও অপরিহার্য। আমাদের সংস্কৃতির যা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি নিয়ে এসেছি সেই জিনিস যা ওল্ড ইংলিশে ‘বক’, স্লাভিক ভাষায় ‘বাকভা’, চিনেভাষায় ‘শু’, আরবিতে ‘কিতাব’, আরমেনিয়ানে ‘গির্ক’, ফরাসিতে ‘লিভ্রা’, স্পেনীয় ভাষায় ‘লিব্রো’ আর আমাদের মাতৃভাষায় বই। সুধীজন, বেজুবান, কদরদান ও ফ্যান অফ শাহরুখ খান। নিয়ে যান, নিয়ে যান, নিয়ে যান। বাচ্চাদের গ্রামার শেখানোর, ফ্লুয়েন্টলি ইংরেজি বলার জন্য এই সেলের বাজারে আমার বই। শুধু গায়ের পোশাক নয়, নিয়ে যান মনের আশ্রয়। আমার এই চারটে বই একসঙ্গে মাত্র কুড়ি টাকায়। স্পেশ্যাল অফার। কুড়িয়ে নিন কুড়িকে। আর নিজেকে অংশ করে তুলুন মহান হেরোডোটাস থেকে কোপারনিকাস হয়ে ইবনবতুতা, শেক্সপিয়র, মিলটন, কিটস, নিউটন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, জয়েস, মিলার হয়ে এখনকার হকিং, কামু আর পামুকের। গর্ববোধ করুন তাদের সঙ্গে আপনার মিল থাকার বিন্দুর। গর্ববোধ করুন যে, আপনিও এই সব মহান মানুষের মতোই বই হাতে তুলে নিয়েছেন। আর তাই সেই সু্যোগ হাতছাড়া না করে, নিয়ে নিন আমার আনা স্পেশ্যাল শিক্ষার মাধ্যম। চারটে বই। একসঙ্গে মাত্র কুড়ি! কুড়ি টাকা! খরচা কম, চর্চা বেশি। কাকা কথা হবে না!”
রাধিয়া হাঁ হয়ে গেল। একটানা কথাগুলো বলে লোকটা থমকাল একটু। হাঁপাচ্ছে! রাধিয়া দেখল আশপাশের ভিড়টা কেমন যেন থমকে গিয়েছিল এই সময়টায়। তারপর লোকটা থামতেই কেমন চটরপটর হাততালি আর হাসির ছররা উঠল চারিদিকে। লোকটা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন গ্রহণ করল। তারপর উপস্থিত সকলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল বই বিক্রি করার জন্য।
রাধিয়া এরকম কাউকে কখনও দেখেনি। এভাবে যে কেউ বই বিক্রি করতে পারে ভাবতেও পারেনি। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। বেঁটে, সামান্য-খুঁড়িয়ে-হাঁটা একটা মানুষ। গায়ে ময়লা জামাকাপড়। কাঁধে ঝোলা। হাতে একগোছা বই। বোঝা যাচ্ছে যে, ঝোলাটা বইতে কষ্ট হচ্ছে। তবু হাসিমুখে লোকটা যাচ্ছে সকলের কাছে। অধিকাংশই কিনছে না। কিন্তু লোকটার মুখের হাসিটা অমলিন। এমন করেও বেঁচে থাকে লোকে! এই মিনিটদশেক এখানে দাঁড়িয়েই কত কিছু যেন শিখে গেল রাধিয়া! ‘হ্যাপি প্রিন্স’-এর মতো বাবার ছোটবেলার পরি যেন আজ এই সময়টুকুতেই কিছুটা স্বাদ পেল আসল পৃথিবীর। এই মানুষটারও তো বাড়িতে বউ আছে নিশ্চয়। ছেলেমেয়ে? তাও আছে। তাদের ইচ্ছে, আহ্লাদ আর আনন্দগুলো লোকটা এই সামান্য বই বিক্রি করে মেটাতে পারে। এই চারদিকে উপচে পড়া পণ্যের ভেতরে এইসব মানুষগুলো কীভাবে এমন শান্ত মুখে থাকে! এদের লোভ নেই? ইচ্ছে নেই? এদের বাচ্চাদের জীবনে সেল বা পুজোয় নতুন জামা নেই?
“দাদা,” রাধিয়া লোকটাকে ডাকল।
লোকটা সামান্য খুঁড়িয়ে এগিয়ে এল ওর দিকে।
“আমায় একটা সেট দিন!”
লোকটা ভুরু তুলল। তারপর হেসে বলল, “শিয়োর ম্যাডাম।”
কাঁধে ঝোলানো নীল তাপ্পিমারা ঝোলার ভেতর থেকে বের করে আনল একটা প্লাস্টিক। তারপর তাতে ভরে দিল বইগুলো, “এই যে ম্যাডাম।”
রাধিয়া একটা একশো টাকার নোট দিল লোকটাকে।
লোকটা বলল, “এই রে! খুচরো নেই?”
রাধিয়া বলল, “না তো!”
“আচ্ছা, দাঁড়ান, দেখি ওরা দিতে পারে কি না!” লোকটা ফুটপাথের ধারে এগিয়ে গেল মেহেন্দির দোকানের দিকে।
রাধিয়া পিছিয়ে এল দু’পা। তারপর রাস্তার দিকে তাকাল। একটা অটো এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। পেছনের সিট থেকে নামল দু’জন। কালো, রোগা, মাথায় ঝাঁকড়া চুলোগুলো হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো। অটোচালকটি চিৎকার করছে, “বালিগঞ্জ, বালিগঞ্জ।”
রাধিয়া দ্রুত এগোল। একজন মোটামতো ভদ্রমহিলাকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল অটোর ভেতরে। ভদ্রমহিলা রাগতস্বরে কিছু একটা বললেন। কিন্তু রাধিয়া পাত্তা দিল না। ও বসামাত্রই ওর পাশে এসে বসে পড়ল একজন বয়স্ক লোক। গাড়ি ভরতি। অটোচালকটি আর দেরি না করে ছেড়ে দিল গাড়ি।
“ম্যাডাম…”
চারদিকের চিৎকার, গাড়ির হর্ন আর অটোর আওয়াজের মধ্যে আবছাভাবে “দিদি!” ডাকটা শুনতে পেল রাধিয়া। ও হাসল শুধু। তারপর সামনের অটোচালকটিকে বলল, “ভাই ফার্ন রোডে নামব। ভাড়া কত?”
ভাড়া বলে অটোচালকটি বলল, “ভাড়া হাতে রাখুন, দিদি…” তারপর সামনের সিটে ওর পাশে বসে থাকা লম্বাচওড়া ছেলেটাকে বলল, “তুই মাইরি নকশা করেই গেলি! দ্যাখ, রিতুদা আমায় অটো কিনে দিল। পারমিট নেই, তাও দাবড়ে বিজ়নেস করছি। কারও বাপ শালা কিছু করতে পারবে না। জানিস তো আমি এটা ভাড়ায় দিই, আবার কখনও-কখনও নিজেও চালাই! মাল্লু আসে কাকা! সেখানে তোকে এত করে বলল, তুই দু’-একদিন গিয়ে আবার বসে গেলি। মাইরি, রিতুদা খচে গেলে কিন্তু বিলা কেস হয়ে যাবে। একটু বোঝ মাহির!”
রাধিয়া দেখল বড়সড় চেহারার ছেলেটা কিছু বলল না। বরং চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল।
গাড়িটা এসে গড়িয়াহাটার সিগনালে দাঁড়িয়েছে। চালকটি পেছনে ফিরে সকলের কাছ থেকে ভাড়া নিল। তারপর যাকে যার মতো খুচরো ফেরত দিয়ে আবার বড় চেহারার ছেলেটার দিকে তাকাল, “তুই মাইরি ক্যালানে না শয়তান, কে জানে! রিতুদা কালকেও বলল আমায়। বলল, ওকে নিয়ে আয়, কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশনে চান্স করিয়ে দেব। আর তুই…”
“ফার্স্ট ডিভিশনে!” এবার ছেলেটা ঘুরে তাকাল।
সামনে সিগনাল খুলে গিয়েছে! গাড়িটা স্টার্ট করে চালকটি বলল, “তবে তোকে কী বলছি! চল ভাই। আর কতদিন তোদের পতাদার ভুঁড়ি দেখে দিন কাটাবি! চল।”
“ফার্স্ট ডিভিশনে! সত্যি!”
“শালা, আমি কি ঢপ দিচ্ছি? আর রিতুদা কি ঢপ দেয়? চল আজকেই। দাদা হেব্বি খুশি হবে।”
রাধিয়ার ইচ্ছে করছে না এসব শুনতে। বরং ফার্ন রোডে নেমে কীভাবে কাঁকুলিয়া রোডে যাবে সেই নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় আছে!
অটোটাও বাস আর গাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের লোক উপচে এসে পড়েছে রাস্তায়। মানুষজন প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তা পার হচ্ছে! রাধিয়ার বাঁ দিকের লোকটি বড্ড ঘেঁষে বসেছে রাধিয়ার দিকে। লোকটার শরীর থেকে নোনতা একটা গন্ধ হাওয়ার সঙ্গে এসে ঢুকছে। ওঃ, গা গুলোচ্ছে রাধিয়ার।
“দিদি, ফার্ন রোড,” লাল সিগন্যালের সামনে ফুটপাথ ঘেঁষে অটোটা দাঁড় করাল চালকটি।
রাধিয়া পাশের লোকটিকে বলল, “এক্সকিউজ় মি।”
লোকটা তাকাল রাধিয়ার দিকে। তারপর নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। রাধিয়া নিজেকে যতটা পারল সংকুচিত করে নেমে পড়ল। কিন্তু তাও লোকটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নোনতা গন্ধটা আবার নাকে এল। ইস! রাধিয়া বাজে গন্ধ একদম নিতে পারে না। ও কোনওমতে নিজেকে সামলে দাঁড়াল ফুটপাথ ঘেঁষে।
“রাধি!” আচমকা চিৎকারে রাধিয়া চমকে পেছনে তাকাল। আরে, এই তো বুদা আর পলি! ওঃ! প্রচণ্ড ভিড়, গরম আর ঘিঞ্জি কলকাতা ভিজিয়ে যেন বৃষ্টি নামাল রাধিয়ার মনে!
পলি আর বুদা এসে দাঁড়াল ওর সামনে।
“তুই, অটোয়! কোক কি পেপসির ক্যানে বিক্রি হচ্ছে নাকি রে?”
রাধিয়া কিছু না বলে হাসল।
পলি হয়তো আরও কিছু বলত, কিন্তু রাধিয়ার পেছনে কাউকে দেখে যেন থমকে গেল। রাধিয়া পেছনে ফিরল। অটোটা সিগনালে দাঁড়িয়ে। পলি তাকিয়ে রয়েছে অটোর সামনের সিটে বসা ছেলেটার দিকে। ছেলেটাও তাকিয়ে দেখছে পলিকে। ছেলেটার মুখে একটা হাসি আসবে কি আসবে না ধরনের দ্বন্দ্ব নিয়ে লুকোচুরি খেলছে।
পলি কিন্তু হাসছে না। রাধিয়া অবাক হল। ছেলেটা এবার হাসল, কিন্তু হাসিটা সম্পূর্ণ হল না। কারণ, সিগনাল পেয়ে অটোটা দ্রুত ছিটকে বেরিয়ে গেল সামনে!
রাধিয়া তাকাল পলির দিকে, “তুই ছেলেটাকে চিনিস?”
পলি নাক টানল। তারপর বলল, “চিনি মানে দু’বার কথা হয়েছে। প্রতাপাদিত্য রোডে রিতুদা বলে এক পার্টি নেতার কাছে গেছি তো কয়েকবার। ওই আমাদের ‘ব্রোঞ্জ ইয়ারস’-এর জন্য একটা বাড়ির তদবির করতে। সেখানে দু’-তিনবার দেখা হয়েছে। তবে বেশি না। জাস্ট কয়েকটা সেনটেন্স। তাও লাস্ট কয়েকবার দেখিনি।”
বুদা বলল, “দেখে তো ভাল বাড়ির মনে হয় না!”
রাধিয়া বলল, “আবার শুরু করলি! মানুষকে ওভাবে চেনা যায়? কী মেয়ে রে তুই! আবার রাজনীতি করিস!”
বুদা হাসল, “তুই শালা এত ফেদার-টাচ টাইপ কেন বল তো? দেখে যা মনে হল বললাম। কী বল পলি?”
পলি রুমাল দিয়ে চেপে ঠোঁটটা মুছল। তারপর কী মনে পড়ায় ডানদিকে হাত দিয়ে ব্লাউজ়ের পাশ দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া ব্রেসিয়ারের স্ট্র্যাপটা ব্লাউজ়ের ভেতরে গুঁজে দিয়ে নিজের মনে সামান্য হাসল। তারপর বলল, “চল তাড়াতাড়ি। সুম্পা রাগ করবে! বাকিরা বোধহয় এসে গেল।”
রাধিয়া বলল, “অনেকটা নাকি রে? মানে অনেকটা হাঁটতে হবে?”
বুদা বলল, “তা তো একটু হবে রূপাঞ্জেল! টাওয়ারে থাকতে-থাকতে তোমার অভ্যেস খারাপ হয়ে গিয়েছে সোনা। তবে তুই পারবি। এই সেলের ভিড়ের গড়িয়াহাট ঠেলে যখন অটোয় চড়ে এসেছিস, তখন এটুকু হাঁটা তো নস্যি জানেমন!”
রাস্তাটা পার হয়ে ফার্ন রোডে ঢুকল ওরা। রাস্তার ওপর সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। গোলপার্কের দিক থেকে আসছে অধিকাংশ গাড়ি। ফুটপাথের ওপরে হকার বসে আর লোকজন থাকতে শুরু করায় এমনিতেই তো হাঁটার জায়গা আর নেই কলকাতায়। তারপর রাস্তাজোড়া গাড়ি! রাধিয়া বারবার পিছিয়ে পড়ছে। ডান দিকে বাঁ দিকে জামা-কাপড়ের দোকানের সঙ্গে রংচটা সোনার দোকান, পুরনো বইয়ের দোকান, স্টেশনারি দোকান। পলি আর বুদা কিছুটা এগিয়ে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ছে আর এগিয়ে আসতে বলছে রাধিয়াকে।
রাধিয়ার অসহায় লাগছে খুব। এত দোকানপাটের মধ্যে ফুটপাথে হাঁটার সরু জায়গা। তার মধ্যে কলকাতার লোকজনের তো বেশ একটা গদাইলশকরি চাল আছেই! তাই তাদের রাস্তা জুড়ে ‘একদিন ঠিক পৌঁছব’ ধরনের হাঁটা ঠেলে এগোতে পারছে না ও।
ব্যাপারটা বেশ কয়েকবার দেখে বুদা পিছিয়ে এসে হাত ধরল রাধিয়ার। বলল, “শালা, এমন করে হাঁটলে সুম্পার নেক্সট ইয়ার বার্থডে-তে পৌঁছব। ধাক্কা মেরে, খিস্তি করে পথ বের করতে হয় এখানে। এরা সব দুর্যোধন। বিনা রণে সূচ্যগ্র মেদিনীও দেবে না, বুঝলি?”
বলেই রাধিয়ার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে আশপাশের লোকজনকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে, গুঁতিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর গলির আরও ভেতরে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় গিয়ে শ্বাস নিল ওরা।
বুদা হাতটা ছেড়ে বলল, “রাধিয়া, তুই বিদেশে বিয়ে করে চলে যাস। এখানে থাকিস না। নির্ঘাত মারা পড়বি!”
পলি বলল, “দেশটার কী অবস্থা বল তো! কেউ কোনও নিয়ম মানে না। পুলিশ প্রশাসনের লোকজনের কি চোখ নেই?”
বুদা হাসল, “খোঁকি শ্বশুরবাড়ি যাবিস-এর সময় নেই খেন্তিপিসি! সকলের চোখ আছে। তার চেয়েও বেশি আছে মাথা। তুই ভোট দিস? এরা দেয়। এরাই রিয়েল পাওয়ার। এদের চটালে চট নিয়ে বসতে হবে রাস্তায়, সেটা নেতারা জানে। তাই ‘লুটেপুটে যা খুশি করো’-র লাইসেন্স এদের দেওয়া হয়েছে। তুই নালিশ করতে গেলে বলবে, একটু অ্যাডজাস্ট করে নিন না! নিজের জীবনে বেহায়াপনাটা জাস্ট অ্যাড করে নিতে পারলে আর এখন বাঁচতে অসুবিধে হবে না। ফলে কানে তুলো, পিঠে কুলো। বুঝলে খুকুমণি!”
রাধিয়া দেখল, কথাগুলো হাসতে-হাসতে বললেও বুদার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। বুদা ইউনিভার্সিটিতে প্রথমদিকে পলিটিক্স করত। এখন আর করে না। কিন্তু একটু র্যাডিকাল পলিটিক্সে ওর আগ্রহ আছে। সেটা মাঝে মাঝে কথায় ফুটে বেরোয়।
পলি বলল, “এটা একটা দিক। কিন্তু গরিব মানুষগুলোর কথা ভাববি না? এরা যাবে কোথায়?”
“স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন গেল, কলকাতা কতটুকু বাড়ল রে! আর-একটা সিটি তৈরি হল না কেন, যে কিছুটা এই শহরের ভার নিতে পারবে! রাজারহাটের কথা বলবি না, ওটা এখনও কিছুই করতে পারেনি। শালা হেরিটেজ নষ্ট করে, সারা শহরটায় গিজগিজে লোক বসিয়ে, মোচ্ছব আর পুজো করে গোটা সমাজটা ভোগে গেল! আর সব সেই ভোগ খাবে বলে পাতা হাতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব সমান! শালা…” দু’ অক্ষরেই থেমে গেল বুদা।
রাধিয়া বুঝল কারণটা। সুম্পাদের বাড়ি এসে গিয়েছে!
বাড়িটা দেখেই ভাল লেগে গেল রাধিয়ার। বেশ পুরনো। আগেকার সেই লাল ইটের তৈরি। আর্চ বসানো, রংবেরঙের কাচের জানলা-দরজা। সামনে একটু বাগান। ছাদে ছোট-ছোট কয়েকটা মূর্তিও দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। বাড়ি মাথায় লেখা আছে ‘বসু ভিলা’।
রাধিয়া দেখল লোহার গেটের ওপরটা একটা তারজালির আর্চ করা আছে। আর তাতে লতিয়ে উঠে একটা ফ্রেমের মতো করে আছে বোগেনভেলিয়া গাছ। তাতে গোলাপি কাগজফুল হাওয়ায় নড়ছে। আকাশের দিকে তাকাল রাধিয়া। রাসবিহারীর দিকের মেঘটা কাঁকুলিয়া অবধি ঢেকে ফেলেছে! হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঠান্ডা শিরশিরে ভাব একটা। বোঝা যাচ্ছে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে নিশ্চিত। গরমে ক্লান্ত আর বিরক্ত শহরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে আসছে কালবৈশাখী।
বেল বাজাতে হল না। দরজাটা খোলাই ছিল। দরজার গোড়ায় জুতোর সাম্রাজ্য দেখে রাধিয়া বুঝল বেশ কিছু মানুষজন ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে। ওর একটু অস্বস্তি হল। সুম্পার সঙ্গেই ওর যা জানাশোনা। ওদের বাড়ির আর কাউকেই তো ও চেনে না!
দরজা দিয়ে ঢুকেই লম্বা টানা বারান্দা। সেখানে জুতো খুলতে-খুলতেই সুম্পা বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ঝিলমিল করে বলে উঠল, “কী রে! তোদের কাণ্ডজ্ঞান নেই? এখন ক’টা বাজে! আসতে বলেছিলাম সেই চারটের সময়! দেখ তো, কত লোকে এসে গিয়েছে! জয়তী আর রাখি তো এখনও এল না। কী যে করিস না তোরা! দেখ, কত গান আর কবিতা হয়ে গেল এর মধ্যে! রাধিয়া, তুই গান গাইবি বলেছিলি। চল।”
রাধিয়া জুতো খুলে ঠিকমতো দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই সুম্পা ওকে হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল।
ঘরটা বড়। না রাধিয়ার বাড়ির তুলনায় নয়, কিন্তু বড়ই। উঁচু সিলিং। বড় তিনটে সোফা ঘরটার কিছুটা ভরে রেখেছে। রাধিয়া দেখল, অন্যান্য আসবাব পেছনে সরিয়ে মেঝেতেই বেশ সাদা ফরাস পেতে দেওয়া হয়েছে। রাধিয়া সকলের দিকে তাকাল। সকলের বয়সই ওর মতো। কিন্তু তার মধ্যেই চোখ আটকে গেল একজনের ওপর। আরে নিশান!
ডিমের কুসুম রঙের পাঞ্জাবি পরে বসে রয়েছে নিশান। রাধিয়ার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। মুখে মিটিমিটি হাসি।
রাধিয়া অপ্রস্তুত হল একটু। কেন হল সেটা নিজেই বুঝতে পারল না। সেদিন সোনাঝুরি স্টেশনে এই ছেলেটা নিতে এসেছিল ওকে। তারপর স্টেশন থেকে একটা রিকশায় উঠিয়ে রিকশার পেছন-পেছন ফলসাদের বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়েছিল! না, তেমন কথা বলেনি ওর সঙ্গে। শুধু ফলসাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় হেসেছিল একটু। সামান্য হাওয়ায় নিশানের গা থেকে গন্ধ ভেসে এসেছিল খানিক। কী সুন্দর মিষ্টি কর্পূরের গন্ধ! কী পারফিউম ওটা! না, রাধিয়া জিজ্ঞেস করতে পারেনি। ও শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছিল, ফলসাদের বাড়ির সামনের আধো-আলো আধো-অন্ধকার রাস্তা ধরে একটা সাইকেল মিলিয়ে যাচ্ছে আবছা ঝিমঝিম অন্ধকারে।
তারপর কয়েকদিন কখনও সন্ধেবেলা, আবার কখনও রাত্রিবেলা, আচমকাই হাওয়ার সঙ্গে মিশে, হাওয়ায় ভেসে-ভেসে ওর কাছে ফিরে আসছিল গন্ধটা। আর রাধিয়া যেন দেখতে পাচ্ছিল, একটা সাইকেল আধো অন্ধকারে ডুবে, ভেসে মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায়! শুধু ছোট্ট প্রজাপতির মতো হাওয়ায় উড়ছে আলতো হলুদ একটা পাঞ্জাবি!
সেদিনের পরে নিশানকে আজ এই দেখল ও। কী বলবে এখন রাধিয়া! প্রায় জনাপঁচিশেক ছেলেমেয়ের মধ্যে পেছনের দিকে বসে রয়েছে নিশান। সোজা তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। ও কেন তাকাচ্ছে অমন করে! আর রাধিয়ারই-বা ওর দিকে কেন বারবার চোখ পড়ে যাচ্ছে!
সুম্পা রাধিয়ার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ফরাসের একদিকে রেখে, সামনে তাকিয়ে বলল, “দিস ইজ় রাধিয়া, পলি অ্যান্ড বুদা…” তারপর হেসে ভিড়ের দিকে হাত দেখিয়ে রাধিয়াদের বলল, “আর শোন, দিস ইজ় এভরিবডি।”
পলি রাধিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “সুম্পার দাদা বিখ্যাত আঁতেল, জানিস তো! এরা বোধহয় ওর সেই কবি-সাহিত্যিক বন্ধুরা।”
“কী রে ফিসফিস করছিস?” সুম্পা পলিকে সামান্য ধাক্কা দিল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাধিয়া খুব ভাল গান গায়। এখন ও গান গেয়ে শোনাবে। আমায় বলেছিল, আজ ও গান গাইবে।”
“গান?” রাধিয়া একটু চমকে গেল, “আমি কবে বললাম রে?”
সামনের সারি থেকে রোগা, বেঁটে, চশমাপরা একজন বলে উঠল, “কেন, না বললে কি শোনানো যায় না? আমার প্যাঁও তো কিছু না বললেও শোনায়!”
“আবার শুরু করেছিস, স্মরণ!” পাশ থেকে একটা ছেলে বলে উঠল, “সবসময় প্যাঁও! শালা প্যাঁওটা কে রে? একদিনও তো দেখলাম না!”
সুম্পা দ্বিতীয় ছেলেটাকে বলল, “শোন জিৎ, স্মরণের কোনও প্যাঁও নেই। ও ঢপ মারে!”
“প্যাঁও নেই?” স্মরণ সোজা হয়ে বসে একটু উত্তেজিত হল, “আরে, প্যাঁও আমার প্রেমিকা। কতবার বলেছি তোদের! তবে সবার সঙ্গে মেশে না। তোদের সঙ্গে মিশবে না। আর তোর সঙ্গে তো মিশবেই না। যারা বিদেশে থাকে তাদের সঙ্গে মেশে না, তাই আসে না।”
জিৎ বলল, “তোর সঙ্গেও তো মেশে না! তাই ঢপ মারিস!”
ঝগড়াটা বাড়ত। কিন্তু সুম্পা হাত তুলে বলল, “কেক কাটার আগে রাধিয়া গান গাইবে। কেউ ঝগড়া করবে না কেমন!”
“ওরে, তুই এই বুড়ো বয়সে কেকও কাটবি!” স্মরণ মোটা চশমার পেছনে চোখগুলো গোল করল, “তবে আমায় এক পিস এক্সট্রা দিয়ে দিস তো। প্যাঁওকে দেব।”
“আবার শালা…” জিৎ লাফিয়ে উঠতে গিয়েছিল। কিন্তু সুম্পা সামনে এগিয়ে জিৎকে চেপে বসিয়ে বলল, “চুপ সবাই। রাধিয়া গান গাইবে। কেমন?”
রাধিয়া দেখল, ঘরের সবাই তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে! আজ শাড়ি পরে এসেছে রাধিয়া। ও আঁচল দিয়ে ঠোঁটের ওপরের ঘামের ফুলস্টপগুলো মুছল চেপে-চেপে। তারপর তাকাল সবার দিকে। আসলে ঠিক সবাই নয়, একজনের দিকে। নিশানের দিকে। কেন তাকাল! রাধিয়া জানে না। শুধু মনে হল, আবার সেই মিষ্টি কর্পূরের গন্ধটা ফিরে এল।
রাধিয়া চোখ বন্ধ করে সময় নিল একটু। ভিড় থেকে, কোলাহল আর হুল্লোড় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিল। দ্রুত শ্বাসকে সংযত করল। শরীরকে নমনীয় করে নিল। তারপর তাকাল। বলল, “গান নয়। আমি একটা কবিতা বলব। আমার ঠাকুরমা মাঝে মাঝে বলে এই কবিতাটা। না, আমায় বলে না। নিজের মনে, একা বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কখনও কখনও বলে, আমি আড়াল থেকে শুনেছি। আমি সেটা বলব।”
পলি আর বুদা বসে পড়েছে ফরাসে। সুম্পা বসেছে একটা সোফার চওড়া হাতলের ওপর। স্মরণ মোটা চশমার ওপার থেকে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। জিৎ পাশের একটা ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে দেখছে ওকে। পেছন থেকে নিশানও অপলকভাবে দেখছে। ঘরের সবাই তাকিয়ে রয়েছে রাধিয়ার দিকে।
রাধিয়া আর-একটু সময় নিল। ঘরের ভেতর ফ্যানের গুঞ্জন ছাড়া আর কিছু নেই!
রাধিয়া এবার সেই গুঞ্জন ভেঙে তুলো-খসে-পড়া আওয়াজে বলল:
“আকাশ জুড়ে জোনাকিদের বাড়ি
বুকের নীচে পাগলা রাজার ঘোড়া
তখন থেকে সবার সঙ্গে আড়ি
তখন থেকে আমার শহর পোড়া!
ধ্বংস ঘেঁটে তোমায় পেলাম মোহর
তোমার আলোয় বাঁচল আমার প্রাণী
কক্ষ থেকে ছিটকে যেত গ্রহ…
উল্কা তোমার কাচের ফুলদানি!
কেমন ছিল সেসব ধুলোখেলা!
কেমন ছিল সাগরপারের রানি!
এই জীবনের নরম বিকেলবেলায়…
আমরা দু’জন, কেবল দু’জন জানি
আমরা দু’জন, মাত্র দু’জন জানি।”
.
০৮. পুশকিন
কলকাতায় বরফ পড়ে না কেন? সাদা তুলোর মতো, নরম, হালকা বরফ কেন নেমে আসে না কলকাতায়? ভিক্টোরিয়ার পরির পাখনায় বেশ বরফ জমে থাকবে! শহিদ মিনারের মাথায় জমে থাকবে সাদা ফেনার মতো বরফ! মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়েই মানুষজনের পা ডুবে যাবে ফুটপাথের পাশে জমে থাকা বরফে! ট্র্যাফিক পুলিশের হেলমেটের মাথায়, স্কুলফেরতা বাচ্চাদের পিঠের ব্যাগের ওপর, সবুজ-হলুদ অটোর ছাদে বা সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের গাছপালার গায়ে চুড়ো করে জমে থাকবে বরফ! লাল নীল ক্রেয়নের মতো উলের জামাকাপড় পরে মানুষজন জমা হবে রাস্তায়! আর আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করবে ছোট্ট বাচ্চার গালের মতো তুলতুলে বরফকুচি! ইস, কলকাতায় বরফ পড়লে কী ভালই যে হত! কেন যে বরফ পড়ে না! যা-যা হলে ভাল হয়, ভাল হত, কেন যে সেসব কিছু হয় না!
জানলায় দাঁড়িয়ে দূরে আকাশের গায়ে জমতে থাকা পেশিবহুল বাইসনের মতো মেঘগুলো দেখে ছোটবেলার মতো আবার এইসব মনে পড়ল পুশকিনের।
এপ্রিলের শেষ হতে চলল, কলকাতা আলকাতরার মতো ফুটছে। সবাই চাইছে একটা অন্তত কালবৈশাখী আসুক। মাসের প্রথমদিকে একদিন একটু বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর আবার সেই এক আগুন! এক যন্ত্রণা!
এত লোকের ডাকেই কিনা কে জানে, আজ পশ্চিম দিকটায় বেশ মেঘ করেছে! জঙ্গল থেকে ছাড়া পেয়ে একপাল বাইসন যেন ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে শহরের দিকে! শেষমেশ কি আসবে তারা? মানুষ কি আজ বৃষ্টি পাবে?
পুশকিন জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে সামনের দিকে তাকাল। এত ওপর থেকে কলকাতার আকাশটাকে অদ্ভুত লাগে। রাজারহাট এমনিতেই বেশ ফাঁকা। আকাশের বিস্তার এখানে বেশি। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতেও আকাশ চোখে পড়ে। তাই এখানে অফিস হওয়ায় মনে মনে বেশ খুশিই পুশকিন। এই ক’মাসে রাজারহাটকে ভালবেসে ফেলেছে ও। কিন্তু আজ যেন একটু বেশি ভালবাসা পাচ্ছে ওর! এমন বাইসন যে এখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবে, আগে বুঝতে পারেনি।
“শালা, কাচের গন্ধ শুঁকছিস নাকি?”
আপনের গলা পেয়ে পেছনে ফিরে তাকাল পুশকিন। দরজাটা অর্ধেক খুলে মাথা বের করে আছে আপন। মুখে একটা সিগারেট। এই ছেলেটা কথা শোনে না। অফিসের মধ্যে স্মোক করা বারণ। কিন্তু ও কিছুতেই শুনবে না। আজ আবার বস আসছে। আপন একটা কেলেঙ্কারি না করে থামবে না!
“কী রে, এমন মুখ করে তাকিয়ে আছিস কেন?” আপন হাসল।
পুশকিন বলল, “তোকে বলেছি না নক না করে ঘরে ঢুকবি না? আর মুখে সিগারেট কেন? তোকে কতবার বলব?”
আপন দাঁত বের করে হাসল। তারপর সিগারেটটা ঠোঁট থেকে হাতে নিয়ে বলল, “টেনশনে সিগারেট না খেয়ে থাকতে পারছি না। বস আসছে। শালা কোন-কোন অ্যাঙ্গেল থেকে বাঁশ দেবে কে জানে!”
“ভয়ের কী আছে? বস ওরকম নাকি?” পুশকিন জানলার কাছ থেকে সরে এসে চেয়ারে বসে বলল, “প্লাস, কাজ তো ভালই হচ্ছে, অ্যাটলান্টিস সি ফুডের টেক ওভারটা তো মসৃণভাবেই হল। তুই বেকার এত টেনশন করছিস কেন কে জানে!”
“আরে, তুই তো ভালই কাজ করেছিস। কিন্তু আমি সোনাঝুরি নিয়ে কী ঝুলে আছি জানিস না। শালা তারক চক্কোত্তি মাইরি হারামি দ্য গ্রেট! যা ঝোলাচ্ছে না!” আপন হাতের সিগারেটটা একবার টেনে মুখটা বিকৃত করল। তারপর কোথায় ফেলবে বুঝতে না পেরে সটান এসে পুশকিনের চেয়ারের পেছনের জানলাটা এক হ্যাঁচকায় খুলে নীচের দিকে ছুড়ে দিল!
“আরে! কী করলি কী এটা?” পুশকিন চেয়ারে ঘুরে অবাক হয়ে তাকাল।
“বেশ করলাম,” আপন নাক টেনে পুশকিনের উলটো দিকে রাখা দুটো চেয়ারের একটায় বসে বলল, “শালা, আমার নাড়িভুঁড়ি সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে টেনশনে, আর ও আমায় ম্যানার্স শেখাচ্ছে!”
পুশকিন কিছু বলতে গিয়েও বলল না। লাভ নেই। সেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকে তো দেখছে ও আপনকে। নিজে যা ভাল বোঝে করে। কারও কথা শোনে না। এমনকী, পুশকিনকেও পাত্তা দেয় না। কিন্তু বিপদে পড়লেই পুশকিনের কাছে আসে। আগেও এমনটাই হত। আসলে কিছু জিনিস সারা জীবনেও পালটায় না।
আপন বলল, “আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো! মানে তোর ওই সি ফুড কোম্পানি টেকওভারের পাশে আমার শালা এমন ল্যাজেগোবরে দশাটা আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠছে। প্লাস, বস তোকে তো পছন্দও করে।”
“ব্যাপারটা ওভাবে দেখছিস কেন?” পুশকিন বলল, “এসব ব্যাপারে কি তুলনা চলে? আর পছন্দ করে মানে! তুই সেই সবসময় এমন করে ভাবিস কেন?”
আপন উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা পেছন দিকে ঠেলে বলল, “তোমার আর কী গুরু! ঝাড়া হাত-পা। আমার মতো এক পিস বউ গলায় ঝুললে বুঝতে। সারাক্ষণ তার সারা পৃথিবীর জিনিসপত্তর চাই! আমার তো পেছনে ইংরেজি বাজনা বাজার উপক্রম! শালা, ভালই ছিলাম নয়ডায়। বেশি মাইনে, কলকাতায় থাকব, এসবের লোভে এখানে এসেই ডুবেছি! আমি তো রোজ ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, ভগবান আমার বউ যেন অন্যের প্রেমে পড়ে! শালা বউটাও এক পিস! আমায় ছেড়ে নড়বে না! ভাগ্যবানের বউ পালায় জানিস তো?”
কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
পুশকিন তাকিয়ে রইল আপনের চলে যাওয়ার দিকে। ওর ফেলে রাখা শূন্য চেয়ারটার দিকে। স্মিতা মারা গিয়েছে প্রায় চার বছর! কিন্তু তাও আজও ওর বুকের মাঝখানে, প্রকাণ্ড হলঘরের ভেতর এমন একটা ভাঙা পুতুল কেন বসে থাকে? উসকোখুসকো, জামা ছেঁড়া, রং লেপটে যাওয়া একটা পুতুল আজও কেন বসে থাকে এমন আনমনে? কেন ও পুতুলটাকে মন থেকে বের করে দিতে পারে না? কেন সব কিছু করার পরও ওর মনে হয় হেরে গিয়েছে ও? কেন নিজেকে এমন প্রকাণ্ড ব্যর্থ এক কচ্ছপের মতো লাগে পুশকিনের? কেন পারে না পুরনো পুশকিনটাকে বের করে আনতে? কেন মনে হয়, স্মিতাকে আসলে বুঝতে ভুল হয়েছিল! কেন মনে হয় ওর দোষে আজ স্মিতা নেই! সেই রাতে ও যদি অমন অবস্থায় না থাকত তা হলে… তা হলে যে কী, সেটা আজও বুঝতে পারে না পুশকিন। ওদের সম্পর্কটা কেমন একটা অন্ধ গলিতে ঢুকে গিয়েছিল যেন! থাকার উপায় নেই, পালানোর পথ নেই! যেন ডেড লক! আর সেটা ভেঙে দিতেই যেন এসেছিল মৃত্যু!
স্মিতা যা করেছিল তার পিছনে কি কোনও যুক্তি আছে? জানে না পুশকিন। কী এমন হয়েছিল যে, স্মিতা অমন করল? কাজ না করলে জীবন চলবে কী করে! আর স্মিতাই-বা ওকে নিজের কাছে তা হলে ডেকেছিল কেন?
স্মিতার হয়তো চার মাসের প্রেম ছিল, কিন্তু পুশকিনের তো আর তা নয়। সাড়ে তিন বছর ধরে স্মিতাকে ভালবেসেছিল ও!
এমবিএ করে তখন সবে একটা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছে। জীবনের প্রথম চাকরি। মনে মনে খুব সিরিয়াস ছিল পুশকিন। চার মাসের ট্রেনিং-এ ভেবেছিল কোনওদিকে তাকাবে না। জীবনে ভালভাবে দাঁড়াতেই হবে। কাজ শিখতে হবে। ওদের কোম্পানির সল্ট লেক অফিসে ট্রেনিং হত। ক্যান্টিনটা ছিল এক তলায়। লাঞ্চের সময় ওখানেই খেতে যেতে হবে জানত।
কিন্তু সেদিনই ক্যান্টিনে কী একটা ঝামেলা ছিল। তাই অফিস থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী খাবে সেটাই ভাবছিল পুশকিন।
অফিসের সামনে বেশ কয়েকটা দোকান ছিল। কিন্তু তাদের দেখে খুব একটা ভক্তি আসছিল না। খাবার নিয়ে একটা সময় বেশ পিটপিট করত পুশকিন। তাই কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু খিদে বড় বালাই। তাই এদিক-ওদিক দেখে, অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ও।
স্যান্ডউইচ! নিজের মনকে মেরে, এক প্লেট স্যান্ডউইচ নিয়ে সকলের কাছ থেকে দূরে একটা বড় গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পুশকিন।
সেদিন মেঘ ছিল আকাশে। গাছের ছায়া আরও একটু বেশি ছায়াময় ছিল যেন। উলটো ফুটের বিশাল বড় বিল্ডিংটা দেখে সেটাকে রাক্ষস মনে হচ্ছিল পুশকিনের। মনে হচ্ছিল একটু পরেই এটা সামনে ছড়ানো মানুষগুলোকে আবার গিলে নেবে! হাতে ধরা স্যান্ডউইচের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পুশকিনের নিজেকেও তেমনই একটা খাবার মনে হয়েছিল।
আর ঠিক তখনই কান্নার শব্দটা ভেসে এসেছিল গাছের অন্যদিক থেকে।
ক্লিংক্লিং করে সামনে রাখা ইন্টারকমটা বেজে উঠল এবার। পুশকিন তাকাল। এখন আবার কার ফোন এল! চশমাটা চোখ থেকে খুলে রেখে রিসিভারটা তুলল পুশকিন, “হ্যালো।”
“স্যার, আপনার সঙ্গে আইকা নামে একজন দেখা করতে এসেছেন। মিসেস আইকা বাসু।”
“আইকা!” অবাক হল পুশকিন। ওর আবার কী দরকার পড়ল!
“হ্যাঁ স্যার। শুড আই সেন্ড হার আপ?”
“না,” পুশকিন বলল, “আমি আসছি। ওকে একটু অপেক্ষা করতে বলুন।”
ফোনটা রেখে উঠল পুশকিন। আজ বস আসবেন, আর আজকেই মেয়েটা এল! আর আসবি তো আয় এমন সময়! প্লাস, একটা ফোন তো করবে! এমন হুট করে কেউ কাজের জায়গায় আসে!
পুশকিন নিজের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। করিডর নির্জন। আসলে এই রাজ্যে ওদের এই অফিসটা নতুন। মাসপাঁচেক হয়েছে। এখনও রিক্রুট চলছে। তাই জনাদশেক কর্মী আর দু’জন রিসেপশনিস্ট আছে। আরও কিছু ছেলেমেয়ে দরকার। সি-ফুড কোম্পানিটার মেরামত আর সঙ্গে সেটাকে আবার সচল করতে হলে, বিদেশে মার্কেট ধরতে হলে আরও লোক লাগবে। আর পাশাপাশি তো আরও নানা সেক্টরে কাজ চলছে! তাই লোকজন নিতেই হবে। সেই কাজ নিয়ে আলোচনা করতেই দিল্লি থেকে বস আসছেন।
আপনের ঘরের ঘষা কাচের দরজা বন্ধ। ভালই হয়েছে। ওকে দেখলেই আবার এসে হাবিজাবি কথা শুরু করবে। আপনের সব কথাতেই একটা সূক্ষ্ম হুল টের পায় পুশকিন! কেন কে জানে! পুশকিন ভদ্রতাবশত কিছু বলতে পারে না, কিন্তু মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত লাগে! ওর কোথায় যেন পুশকিনকে নিয়ে সমস্যা আছে!
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কল-বাটনটা টিপে ঘড়ি দেখল পুশকিন। সাড়ে চারটে বাজে। বস আসবেন পাঁচটা নাগাদ। কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছেন উনি, নিজের কী একটা কাজ সেরে তারপর আসবেন।
টুং শব্দে লিফটের দরজাটা খুলে গেল। বারো তলার ওপরে অফিস ওদের। তবে নীচে একটা রিসেপশন-স্পেস নেওয়া আছে।। সামনের দু’বছরের ভেতরে অফিস স্পেস আরও বাড়াতে হবে।
একতলার বোতামটা টিপে লিফটের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল পুশকিন। লিফটটা ফাঁকা। নরম হলুদ আলোয় ভরতি। এই আলোটাকে কেমন একটা জ্যোৎস্নার মতো লাগে পুশকিনের। মনে হয় এই বুঝি মেঘ এসে মুছে দেবে আলোটুকু!
ছ’তলায় এসে লিফটটা থামল। দরজা খুলতেই স্মরণকে দেখতে পেল পুশকিন। বেঁটে রোগা। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ মতো। ছেলেটা মাসখানেক হল ওদের কোম্পানিতে জয়েন করেছে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তবে বললে নানা চিঠি-চাপাটিও করে দেয়। কোনও কাজে ‘না’ বলে না। আসলে ওর এখনও কোনও নির্দিষ্ট কাজ নেই।
তবে ছেলেটা যেন কেমন। কখনও মাথার চুল আঁচড়াতে দেখল না ছেলেটাকে! জামাটাও কেমন যেন এলোমেলো। হাজারবার বলেও শু পরাতে পারেনি কেউ। সারাক্ষণ একটা সবুজ রঙের স্নিকার পরে থাকে।
লিফটের ভেতরে পুশকিনকে দেখে একটু থমকাল স্মরণ। তারপর কাঁচুমাচু হয়ে একপাশে দাঁড়াল।
“তুমি ফিফথ ফ্লোরে কী করছ নিজের টেব্ল ছেড়ে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল।
“স্যার ওই মানে…” স্মরণ মাথা চুলকোল।
“ওই মানে?” পুশকিনের হাসি পেলেও নিজেকে সংযত করল ও। মাথার চুল এবার পুরো ঘেঁটে গিয়েছে ছেলেটার।
স্মরণ বলল, “স্যার, মানে পারসোনাল একটু।”
পুশকিন কড়া চোখে তাকাল স্মরণের দিকে, “অফিস টাইমে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছ নিজের সিট ছেড়ে! আবার জিজ্ঞেস করলে বলছ পারসোনাল?”
স্মরণ জিভ কেটে বলল, “সরি স্যার। মা কালী বলছি, অন্যায় কিছু করিনি!”
“হোয়াট!” পুশকিন কী বলবে ভেবে পেল না! প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছে ওর। কিন্তু কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হয়ে তো আর এভাবে হাসা যায় না!
লিফটটা এসে থামল গ্রাউন্ড ফ্লোরে। পুশকিন বাইরে বেরোল। স্মরণও বেরিয়েছে ওর সঙ্গে।
পুশকিন আবার বলল, “এসব কী বলছ! নিজের সিট ছেড়ে কী করছ তুমি? ফিফথ ফ্লোরে তো অন্য একটা কোম্পানির অফিস। সেখানে কী করছিলে?”
“বললে রাগ করবেন না তো স্যার?” স্মরণের মুখটা কেমন যেন ভয়ে শুকিয়ে গেল।
“আশ্চর্য তো!” পুশকিন ঠোঁট কামড়ে কড়া চোখে তাকাল, “ডু ইউ থিঙ্ক দিস ইজ় ফানি? আজ বস আসছেন, জানো তো! আর সেখানে উনি হিসেব দেখতে চাইলে দেখাতে পারবে? সব আপ টু ডেট আছে তো? না হলে কিন্তু তোমার বিপদ আছে। এখনও পারমানেন্ট হওনি!”
“প্যাঁও, স্যার।”
“হোয়াট?” পুশকিন থমকে গেল, “প্যাঁও মানে?”
“একটা মেয়ে, স্যার। আমার ইয়ে স্যার। ওই ছ’তলার অফিসটায় এসেছিল স্যার।”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না।
স্মরণ বলল, “স্যার, আসলে আমি কাজ করছিলাম। প্যাঁও এল। তাই আমায় ডাকল আর কী! আর আমি…”
“ওকে, ওকে…” পুশকিন হাত তুলে থামাল স্মরণকে, “আই ডোন্ট ওয়ন্ট এনি ডিটেল অফ ইয়োর পারসোনাল লাইফ! নীচে এসেছ কেন? সিটে যাও।”
“স্যার, একটা কথা স্যার!” স্মরণ এখনও আমতা-আমতা করে যাচ্ছে!
“কী?” পুশকিন জিজ্ঞেস করল।
“সোনাঝুরিতে যে-প্রজেক্টের কাজ হচ্ছে, সেই টিমে আমায় নেবেন স্যার? আমার তো তেমন কাজ নেই। আমি স্যার তার ফাঁকে এখন যেটা করছি সেটাও করে দেব। কাইন্ডলি যদি আমায়…”
“সোনাঝুরির কাজটা তো এখন আপন দেখছে। আমি তো দেখছি না! ওকে বলো।”
“উনি স্যার খ্যাঁকখ্যাঁক করেন!” স্মরণ ব্যাজার মুখে বলল, “কিছু বলতে গেলেই এমন করেন যেন, আমি ওঁর টিফিন চুরি করে খেয়েছি!”
“কী সব বলছ!” পুশকিন হাসল এবার। আস্ত পাগল একটা ছেলে!
“সত্যি স্যার। অন গড!”
“ঠিক আছে। আমি মনে রাখব। এখন নিজের জায়গায় যাও। নীচে এলে কেন?” পুশকিন কথা শেষ করতে চাইল!
“স্যার, একটু কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়েই চলে যাচ্ছি!” স্মরণ আর না দাঁড়িয়ে হনহন করে বিল্ডিং-এর বাইরে হাঁটা লাগাল।
পুশকিনের হাসি পেল। প্যাঁও! এটা কোনও নাম! ছেলেটা ইয়ারকি মারল না তো!
পাশে বড়-বড় কাচের জানলার দিকে তাকাল পুশকিন। আকাশের রং পালটে গিয়েছে আরও! বাইসনরা আরও কাছে চলে এসেছে শহরের! তবে কি আজ সত্যি বৃষ্টি আসবে?
লিফট থেকে নেমে ওদের রিসেপশন স্পেসটা কয়েক পা দূরে। কাছাকাছি পৌঁছতেই পুশকিন দেখল সামনে রাখা চেয়ারে আইকা বসে আছে। দিন এতটা গড়িয়ে গিয়েছে, তাও সাজগোজ এখনও নিখুঁত। ছোট করে কাটা চুল এখনও পাট করে আঁচড়ানো!
মার্বেলের মেঝেতে পুশকিনের জুতোর শব্দ পেয়ে মুখ তুলে তাকাল আইকা। তারপর হেসে উঠে দাঁড়াল।
“তুই!” চশমাটা খুলে পকেটে রেখে বলল পুশকিন।
“কেন আসতে নেই?” আইকা হেসে চুলটা অকারণে হাত দিয়ে ঠিক করল।
“হ্যাঁ, মানে…” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না, “আসলে আজ একটু ব্যস্ত আছি। দিল্লি থেকে বস আসছে। তাই সবাই একটু বেশি অ্যালার্ট আর কী!”
“ওহো! তবে তো অসুবিধে করে ফেললাম!” আইকার মুখে কেমন একটা অপরাধীর ছাপ।
খারাপ লাগল পুশকিনের। ও কোনও বিষয়ে কাউকে খুব একটা বারণ করতে পারে না। খবর না দিয়ে চলে আসাতে ওর অসুবিধে হল জেনে আইকা যে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে, সেটায় কেন যেন খারাপ লাগল ওর।
ও বলল, “আরে, আধঘণ্টা তো কথা বলাই যেতে পারে!”
আইকা সামান্য হাসল। কিন্তু তাও দ্বিধার ভাবটা কাটছে না ওর।
“চল, ক্যাফেতে যাই। ডোন্ট লুক সো গ্লুমি। ইট ডাজ়ন্ট সুট ইউ!” পুশকিন আলতো করে হাসল।
এই বিল্ডিংটা বেশ বড়। পেছনের দিকে একটা ক্যাফে আছে। চা, কফি ছাড়াও টুকটাক খাবার পাওয়া যায়। পুশকিন নিজে চা বা কফি কিছু খায় না। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে আসে এই ক্যাফেতে। এরা একটা দারুণ আঙুরের শরবত বানায়।
ক্যাফেতে ছোট-ছোট কয়েকটা চেয়ার-টেবিল আছে। তবে এখন তার একটায় মাত্র দু’জন মেয়ে বসে রয়েছে। বাকি চেয়ার-টেবিলগুলো ফাঁকা।
জানলার কাছে একটা চেয়ার দেখে বসে পড়ল পুশকিন। হাতের ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে সামনের চেয়ারটা টেনে বসল আইকাও।
“কফি?” পুশকিন জিজ্ঞেস করল।
“তুই তো খাস না। তুই কী খাবি?” আইকা ভুরু তুলে তাকাল পুশকিনের দিকে।
“গ্রেপ জুস। আর তোর কফি বলি?”
আইকা মাথা নাড়ল।
পুশকিন “চাচা” বলে কাউন্টারের লোকটিকে ডেকে একটা গ্রেপ জুস আর কফি দিতে বলে গুছিয়ে বসল এবার।
“বল।”
আইকা নাক টানল, “এই এসেছিলাম কাছের একটা কোম্পানিতে, ‘কোডি স্টিল’। আমরা একটা বড় সেমিনার করছি। তাই এসেছিলাম ওদের জেনারেল ম্যানেজারকে নেমন্তন্ন করতে। মানে, ওঁকে তো আর যাকে-তাকে দিয়ে নেমন্তন্নের কার্ড পাঠানো যায় না! কাজটা শেষ করে ভাবলাম, তুই সেদিন বলেছিলি এখানে আছিস। তাই টুক মাই চান্স। বুঝতে পারিনি তুই বিজ়ি! সরি।”
“আরে, তা নয়,” পুশকিন হাসল, “এই অফিসটা গোটাটাই আমায় আর আপনকে দেখতে হয়। আমরা এই রিজিয়নে নতুন। উই হ্যাভ টু হ্যাভ আ গুড হোল্ড অন দ্য রিজিয়ন। তাই একটা কাজের চাপ আছে। দিল্লির হেড কোয়ার্টার থেকে চাপ দেয়। বাদ দে। তারপর? কী খবর বল।”
আইকা কিছু বলতে গিয়েও থমকাল। কাউন্টারের বয়স্ক মানুষটি এসে ওদের সামনে কফি আর একটা শরবতের গেলাস রেখে গেল।
আইকা ব্যাগ থেকে একটা ওয়াইপ বের করে হাত মুছল। তারপর কাপটা টেনে নিয়ে বলল, “আসলে তোকে এত বছর পরে আচমকা দেখে এত ভাল লাগছে! মাঝে তো পুরো হারিয়ে গিয়েছিলি! তোর সঙ্গে সেই বিকেলের পরে এই দেখা হচ্ছে। মেসেজ করলে রিপ্লাই দিস না কেন রে?”
পুশকিন গেলাসে সামান্য চুমুক দিয়ে শুনল কথাগুলো। আইকা এমন এলোমেলো কথা বলছে কেন! আসলে কী বলতে চাইছে, সেটা ঠিক বুঝতে পারছে না! ও তাকিয়ে রইল।
“আমার এত খারাপ লাগছে! কী বলব তোকে!” আইকা কাপের মুখটায় আঙুল বোলাতে লাগল এবার।
“খারাপ? কেন?” পুশকিনের এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল আইকা কি স্কুলের সেই কথাটা তুলছে নাকি!
“খারাপ লাগবে না? কী বলছিস?” আইকা ঠোঁট কামড়ে তাকাল।
পুশকিন ক্যাফের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা দেখল একবার। আইকা কী শুরু করল এসব!
“কী ব্যাপার বল তো!” পুশকিন গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে তাকাল আইকার দিকে।
আইকা কিছু বলতে গিয়েও কেমন যেন থমকে গেল। তারপর আচমকা হাত বাড়িয়ে পুশকিনের ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা আঙুরের পাল্প মুছে নিল আঙুল দিয়ে। তারপর সেটা মুখে ঢুকিয়ে খেয়ে নিল। বলল, “ইয়াম!”
পুশকিনের ধক করে উঠল বুকটা। এটা কী করল আইকা! এর মানে কী! ও চট করে দেখে নিল আশপাশটা। দূরের টেবলে বসা দুটো মেয়ে কি দেখল এটা!
আইকা হাসল, “কফি না বলে আমিও শরবতটা খেতে পারতাম মনে হচ্ছে।”
পুশকিনের এবার বিরক্তি লাগছে। কী চায় আইকা? ও এল কেন? পাঁচটা বাজে প্রায়। এই আইকার মধ্যে যেন স্কুলের রাগী, অহংকারী সেই মেয়েটা আর নেই।
“তুই কিছু বলবি?” পুশকিন আর থাকতে না পেরে বলল এবার।
“ও হ্যাঁ, মানে… আসলে তোকে দেখতে ইচ্ছে করল!” আইকা তাকাল পুশকিনের দিকে।
পুশকিন হাসল সামান্য। অস্বস্তি হচ্ছে ওর। কিন্তু কী বলবে! আইকা দেখতে খুবই সুন্দরী। রূপচর্চার ফলে সেটা আরও খুলেছে। এমন একটা মেয়ে এসব বললে যে-কোনও ছেলেরই মনে নানা রঙের এলইডি জ্বলতে পারে। কিন্তু পুশকিনের জ্বলল না। এই আইকাকে ও চেনে। স্কুলে এমন কাজ করেছিল যে, এখনও ওর মন তেতো হয়ে আছে। নেহাত অভদ্রতা করতে পারে না তাই কিছু বলছে না!
পুশকিন উঠে দাঁড়াল, “তোর কীসে খারাপ লাগল যখন বললি না, তখন আমি আজ আসি রে। বস যে-কোনও সময় ঢুকবেন।”
হা-হা করে এবার হেসে উঠল আইকা, “ভয় পেয়ে গেলি! এখনও ভিতুই আছিস! কিচ্ছু পালটাসনি তুই পুশকিন।”
পুশকিন হাসল। যদিও এতে হাসির কী আছে বুঝল না। ও হাত তুলে চাচার দিকে ইঙ্গিত করল।
আইকা বলল, “দামটা?”
“আমার খাতা চলে এখানে। ডোন্ট ওয়ারি।”
ক্যাফের বাইরে এসে আইকা ঘড়ি দেখল। বলল, “যা বলছিলাম। আসলে নোঈ যে এমন করে তোর ওই খুড়তুতো ভাইকে বাতিল করে দেবে, আমরা বুঝতে পারিনি। তাই খারাপ লাগছে আমার।”
“এতে খারাপ লাগার কী আছে?” পুশকিন বলল, “ওর জীবন, ও যেটা ভাল বুঝবে সেটাই করবে। প্লাস ডিনো বিদেশে ফিরে গিয়েছে। এটা এমন কিছু ব্যাপার নয়।”
“আসলে মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি আমরা। একটা চাকরি করত। সেটা ছেড়ে দিয়েছে। কাজ খুঁজছে। পাচ্ছে না। ওর মা বিয়ে দেবে বলে উঠে-পড়ে লেগেছে, কিন্তু সেটাও করবে না। কাকু আমায় বলছিল যদি…”
“নোঈ কী পাশ করেছে? মানে কোয়ালিফিকেশন কী! আমাদের এখানে রিক্রুটমেন্ট চলছে। ইফ শি ইজ় ইন্টারেস্টেড, তা হলে…”
পুশকিনকে কথা শেষ করতে দিল না আইকা। প্রায় ছোঁ মেরে ওর মুখ থেকে কথাটা তুলে নিয়ে বলল, “আরে, নিশ্চয়ই ইন্টারেস্টেড হবে।”
“দেখ, ওকে আগে বল,” পুশকিন সাবধানি গলায় বলল, “নোঈকে আগে বলে দ্যাখ। ইউ ডোন্ট কমিট। প্লাস ভবানীপুর থেকে রাজারহাট আসবে কি না, সেটাও একটা ব্যাপার। আমায় দু’দিনের মধ্যে জানা, তা হলেই হবে,” পুশকিন ঘড়ি দেখল আর দেরি করা যাবে না।
আইকা হাসল, “আমি জানাচ্ছি। খুব ভাল হবে এটা। তোদের বাড়িতে আপত্তি হবে না তো?”
“মানে?” পুশকিন ভুরু তুলল, “বাড়িতে আপত্তি কেন? অফিস আর বাড়ি তো আলাদা। আর বিয়ের কথা মানেই তো বিয়ে নয়। এসব ভাবিস না। যদি ইন্টারেস্টেড হয় আসতে বলিস। কেমন?”
“যদি বলছিস কেন?” আইকা তাও যেন ছাড়ছে না!
“সেদিন গাড়িতে উঠতে বলেছিলি, ও কি উঠল!” হাসল পুশকিন, “দ্যাখ, যদি আসে।”
আইকা বলল, “আজ তবে আসি। আমি আবার আসতে পারি তো?”
“তুই?” পুশকিন সামান্য থমকাল। এর আগের দিন রাস্তায় আচমকা দেখা হয়ে গিয়েছিল বলে লিফট দিয়েছিল গাড়িতে। কিন্তু আবার আসবে? পুশকিন সামান্য ঘাবড়ে গিয়েছিল। দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। তারপর কোনওমতে মাথা নেড়ে বলেছিল, “শিয়োর।”
আইকা সামান্য এগিয়ে এল কাছে। তারপর আলতো করে হাতটা ধরল ওর। বলল, “স্কুল অনেকদিন আগে শেষ হয়ে গিয়েছে পুশকিন। সেই আইকাটা আর নেই কিন্তু।”
এই বিল্ডিংটার নীচের তলাটা বেশ ফাঁকা থাকে। বড়-বড় থাম। উঁচু সিলিং! থমথমে লম্বা সাদা দেওয়াল— গোটা জায়গাটাকে যেন আরও নির্জন করে দেয়!
আইকা পায়ের জুতোর আওয়াজ তুলে চলে গেল। আর সেই খটখট আওয়াজ যেন ছোট ছোট ফুটো করে দিল নিস্তব্ধতার আলখাল্লায়!
পুশকিন চুলের ভেতর হাত ডোবাল। বাইরে ছিল ভাল ছিল। কলকাতায় এসেই আবার চুঁইয়ে-চুঁইয়ে অতীত এসে ঢুকছে ওর জীবনে! বাবা ঠিকই বলেছে, “পালিয়ে বাঁচতে পারবি না বাবু।”
বাবার কথা মনে পড়তেই ঘড়ি দেখল পুশকিন। আজ বাবার ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার কথা, গিয়েছে কি!
বাবা রাসবিহারী মোড়ের কাছে ওদের বড় বাড়িতে থাকে ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে। সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ওপর রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের কাছে ওর ফ্ল্যাটে থাকে না।
এটা পুশকিনের একটা কষ্টের জায়গা। বাড়ির অমতে স্মিতাকে বিয়ে করেছিল পুশকিন। সবাই বাধা দিয়েছিল। মা তো সাংঘাতিক অসুস্থ হয়েও পড়েছিল। কিন্তু তাও পুশকিন কারও কথা শোনেনি! স্মিতা এমন করে টেনেছিল ওকে! আর সে সময় পুশকিনের মনে হয়েছিল, স্মিতাকে ও কথা দিয়েছে বিয়ে করবে! প্রেমের চেয়েও কথা রাখাটা জরুরি!
কিন্তু বুঝতে পারেনি একটা কথা রাখতে গিয়ে জীবনের অন্যদিকটা নষ্ট হয়ে যাবে! ওর বিয়ের চার মাসের মধ্যে মা মারা গিয়েছিল!
এখনও বিকেলটার কথা মনে আছে পুশকিনের। তখনও প্যারিসে পোস্টিং হয়নি ওর। কলকাতাতেই ছিল। অফিসে বসের ঘরে মিটিং হচ্ছিল সেদিন। নতুন চাকরি। পুশকিন সারাক্ষণ তটস্থ থাকত সেই সময়।
মার্কেটিং চিফ একটা গ্রাফ নিয়ে কথা বলছিলেন, এমন সময় পুশকিনের পকেটের মোবাইলটা তারস্বরে বেজে উঠেছিল। ঘরের সবাই খুব বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে। পুশকিনের মনে হচ্ছিল ন’তলার ওপর থেকে ঝাঁপ মারে রাস্তায়। ফোনটা বের করে সুইচ অফ করতে গিয়েও থমকে গিয়েছিল একদম! স্ক্রিনে দেখেছিল বাবার মোবাইল থেকে কলটা এসেছে!
নিস্তব্ধ ঘরের মাঝখানে বিরক্ত মুখের বেশ কয়েকজন মানুষকে তোয়াক্কা না করেই খ্যানখ্যান করে বাজছিল ফোনটা! কিন্তু বাবা ফোন করল কেন? পুশকিন ফোনের ‘রিজেক্ট’ বোতামটা টিপতে পারছিল না।
বিয়ের আগে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারপর একবারই বাড়িতে গিয়েছিল পুশকিন। কিন্তু কিছুতেই ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি ওর ভাই আর কাকারা। বাবা দোতলার বারান্দা থেকে সেদিন দাঁড়িয়ে দেখেছিল সবাই মিলে পুশকিনকে কীভাবে বাড়ির দরজা থেকে দূর করে দিয়েছিল! ভাই যখন ওর কলার ধরে ওকে ধাক্কা মেরে বাড়ির দরজা থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলছিল, বাবা কী অদ্ভুত নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখছিল ওকে! ভাইয়ের সেই ধাক্কা, কাকাদের গালাগালি ওকে কষ্ট দেয়নি! কিন্তু বাবার ওই ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকাটা ভেতরে-ভেতরে একদম মেরে ফেলেছিল ওকে।
সেই বাবা নিজে ফোন করেছে! কেন? হঠাৎ কী হল? ফোনটা হাত-পা ছুড়ে একগুঁয়ে বাচ্চার মতো চিৎকার করে চলছিল!
আচমকা বস শান্ত গলায় বলেছিল, “টেক ইট আউটসাইড। ইট মাস্ট বি ইমপর্ট্যান্ট!”
ঘরের কাচের দরজাটা ঠেলে বাইরে এসে ফোনটা ধরেছিল পুশকিন।
বাবা শান্ত গলায় বলেছিল, “তোমার মা আর নেই। আজ একটু আগে দেহ রেখেছেন। উনি শেষ মুহূর্তেও চাননি তোমায় খবর দিতে। কিন্তু আমি মনে করি, কোনও কিছুই মৃত্যুর চেয়ে বেশি নয়, বড় নয়। যা কিছু মনোমালিন্য তার থেকে মৃত্যুকে দূরে রাখাই ভাল। পারলে কেওড়াতলায় এসো।”
সেদিন অনেক রাতে শ্মশানে একটা সিঁড়িতে একা বসেছিল পুশকিন! ওদের অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছিল। কিন্তু কেউই কথা বলছিল না ওর সঙ্গে। বরং এমন একটা ভাব নিয়ে ঘুরছিল যাতে পুশকিনের মনে হচ্ছিল, মায়ের মৃত্যুর জন্য ওই দায়ী!
মায়ের মুখাগ্নিটা পর্যন্ত করেছিল ভাই। দূরে অপরিচিতের মতো দাঁড়িয়ে পুশকিন দেখেছিল মা চলে যাচ্ছে সারা জীবনের মতো! সেই ছোটবেলায় মুখ ধুইয়ে আঁচল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেওয়া মা। সেই পক্সের সময় সারা রাত জেগে বসে থাকা মা। এক মনখারাপের দুপুরে পাশে এসে মাথায় হাত রাখা মা। চলে যাচ্ছে। ওর মনে হচ্ছিল, বাবা, ভাই আর এত আত্মীয়স্বজন কী করে জানবে মা ওর কতটা ছিল! একটা মেয়েকে বাড়ির অমতে বিয়ে করেছে বলে ওকে এমন করে সবাই দাগ কেটে বাইরের লোক করে দিল। মা-ও বুঝল না পুশকিনকে।
সেদিন শেষরাতে বাড়ি ফিরেছিল পুশকিন। স্মিতা জেগে বসেছিল বসার ঘরে। এতক্ষণের কান্নাটা স্মিতাকে দেখে কেমন যেন বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। মাটিতে বসে স্মিতার কোলে মুখ গুঁজে দিয়েছিল পুশকিন। বন্ধ চোখের অন্ধকারে দেখেছিল মা ধীরে-ধীরে মিশে যাচ্ছে আগুনের সঙ্গে!
স্মিতা মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে বলেছিল, “কাঁদে না সোনা। আমি তো আছি।”
কেউ থাকে না। ভাই থাকে না। বন্ধু থাকে না। বাবা থাকে না। মা থাকে না। স্ত্রী থাকে না। প্রেমও থাকে না। নিস্তব্ধতা আর একাকিত্ব তার কালো আলখাল্লা দিয়ে ঢেকে দেয় মাথা-নিচু মানুষের জীবন।
লিফট থেকে বেরিয়ে অফিসে পা রাখল পুশকিন।
“কোথায় ছিলে গুরু? বস এসে গিয়েছে!” আপন হাতে একটা ফাইল নিয়ে এগিয়ে এল সামনের একটা কিউবিকলের ভেতর থেকে।
এই কিউবগুলোর সবটায় লোকজন নেই। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিতে লোকজন বাড়লে এই মৌমাছির খোপগুলো ভরে উঠবে।
পুশকিন কিছু না বলে বসের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ভারী কাচের দরজার বেশির ভাগটাই ফ্রস্টেড। তার ফাঁক দিয়েও বসের ভ্যানিটি ব্যাগটা দেখা যাচ্ছে।
“স্যার,” আচমকা কানের কাছে ফিসফিস করে একটা গলা পেল পুশকিন। সামান্য চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল ও। স্মরণ এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বেঁটে, রোগা পাতলা ছেলেটার চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে আছে এখনও। সঙ্গে জামাটাও অর্ধেক গোঁজা আর বাকি অর্ধেক বেরিয়ে রয়েছে প্যান্টের বাইরে।
পুশকিনের আবার হাসি পেল। এমন কাকতাড়ুয়া হয়ে আছে কেন ছেলেটা! আর ফিসফিস করেই-বা কথা বলছে কেন?
হাসি চেপে পুশকিন গম্ভীরভাবেই বলল, “কী হয়েছে?”
“স্যার বস, মেয়ে?” স্মরণের চোখগুলো গোলগোল হয়ে আছে।
“হ্যাঁ, কেন? কী হয়েছে?”
স্মরণ বলল, “না মানে, হিন্দি সিনেমায়, বাংলা সিনেমায় যে দেখায় বস মানে ছেলে?”
“বস মানে ছেলে? তাই নাকি?” পুশকিন আর না হেসে পারল না!
আপন একটু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। এবার ও বলল, “শালা, এই জ্ঞান বসের সামনে ফলাস না স্মরণ। আর এখন কাট এখান থেকে। ডাকলে আসবি, না হলে আসবি না। বস কিন্তু খুব রাগী।”
স্মরণ কী বুঝল কে জানে! নিজের খোপের দিকে যেতে-যেতে মাথা নেড়ে বলল, “বস শব্দের জেন্ডারটা না জানা গেলেও এটা জানা গেল যে, বস খুব ডেঞ্জার!”
আপন পাশে এসে দাঁড়াল পুশকিনের। বলল, “যা রিক্রুট করেছ না গুরু, জানলে ইন্ডিয়ান ফুটবল টিমের সিলেক্টার বানিয়ে দেবে।”
পুশকিন বলল, “ছেলেটা কাজ করে মন দিয়ে। সিনসিয়ার। অনেস্ট। একটু খ্যাপাটে। কিন্তু তাতে কাজের ক্ষতি তো হচ্ছে না।”
আপন বলল, “শালা, বরাবর দেখছি তোর ট্যান টাইপের জিনিসই বেশি ভাল লাগে। নিজেও তো শালা তার-কাটা!”
পুশকিন হাসল। আপনের কথায় ও কিছু মনে করে না। আপন ওর পুরনো বন্ধু বটে, কিন্তু ও বোঝে আপন সারা জীবন ওর মধ্যে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকেই দেখে এসেছে!
পুশকিনের কারও সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। ওর কেবল এক ক্লান্তি আছে। মনের মধ্যে সহস্র বছরের জমে থাকা এক ঘুম আছে। ওর মাঝে মাঝে মনে হয় একদিন সব ছেড়ে ও দূরে কোনও ঠান্ডা পাহাড়ি শহরে চলে যাবে। সেখানে নির্জন একটি ঘরে বসে দেখবে আকাশ থেকে নেমে আসা ক্যান্ডিফ্লসের মতো তুষারের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে এক ছোট্ট নিশ্চুপ জনপদ।
আচমকা আকাশ ফাটিয়ে কড়কড় করে মেঘ ডেকে উঠল। কাচের বড় জানলাগুলোর দিকে তাকাল পুশকিন। বাইসনের দল এসে গিয়েছে। তাদের খুরের ধুলোয় চারদিক অন্ধকার! কতদিন বৃষ্টি হয় না! আজ কি হবে?
“স্যার, আপনাদের ম্যাডাম ডাকছেন।”
কাচের দরজা ঠেলে হাবু বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে।
আপন হাত দিয়ে সামনে ঠেলে দিল পুশকিনকে, “এগো, চল। শালা আজ আমার বাম্বু ডট কম হবে শিয়োর।”
কাচের দরজা ঠেলে দু’জনেই অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকল।
বস বড় কাচের টেবিলের অন্য পারে বসে মন দিয়ে সামনে খুলে রাখা কিছু কাগজ দেখছেন। ওদের দিকে না তাকিয়েই হাত নেড়ে বসতে বললেন।
এই ঘরটা বন্ধই থাকে, বস এলেই শুধু ঝাড়পোঁছ করে খোলা হয়। মিসেস মালভিকা আইয়ার কড়া হলেও মানুষ ভাল। সিনসিয়ারিটি না দেখলে যেমন রেগে যান খুব, তেমনই ভাল কাজের প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করেন না কখনও।
গত আড়াই বছর হল এই কোম্পানিতে জয়েন করেছে পুশকিন। সেখানেই কাজের সূত্রে দেখেছে, ঢিলেমি একদম পছন্দ করেন না বস।
এই যে কলকাতায় ওকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, সেখানেও ওকে বলা হয়েছে যে কোম্পানির কাজ এই অঞ্চলে পুশকিন আর আপনের পারফরম্যান্সের ওপরেই নির্ভর করবে। সেখানে যেন কেউ গাফিলতি না দেখায়!
বসের বয়স চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। মাথার চুল বড়। কিন্তু কাঁচায় পাকায় মেশানো। পরনের শাড়িটা যে খুব দামি, সেটা আর বলে দিতে হবে না।
“সো জেন্টলমেন, তোমাদের খবর কী?” বস সামনের কাগজটা সরিয়ে ওদের দিকে তাকালেন।
পুশকিন জানে এর উত্তর দিতে নেই। বসের কোনও ইন্টারেস্ট নেই ওদের ব্যাপারে। উনি কেরলের মানুষ হলেও দীর্ঘদিন কলকাতায় লেখাপড়া করেছেন বলে বাংলাটা ভালই বলেন।
আপন হাতে ধরা ফাইলটা টেবিলে রেখে সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, “ম্যাম, উই হ্যাভ সাম গ্লিচেস ইন দ্যাট সোনাঝুরি প্রজেক্ট। আ পারসন… তারক চক্রবর্তী ইজ ক্রিয়েটিং হ্যাভক ট্রাবল। সো…”
“তুমি এসব তো ই মেলেও জানিয়েছ লাস্ট উইকে। তার পর দশ দিন কেটে গিয়েছে, এখনও একই গল্প দিয়ে যাচ্ছ! নতুন কী প্রগ্রেস হল?”
“ম্যাম, আসলে তারক লোকটি খুব ঝামেলা করছে। কিছুতেই নিজের জায়গা থেকে সরছে না! জুট মিলটা কিছুতেই রিভাইভ করতে দিতে চাইছে না! আর দিলেও ওর ডিম্যান্ড আছে কিছু! আমি মানে…”
বস হাত তুলে আপনকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, “একটা লোকের জন্য তবে কি সবটা আটকে যাবে? জুট মিল টেক ওভার করে সেটাকে চালানো, ওই বড় বাড়িটা নিয়ে সেটাকে রিসর্ট করে তোলা। পাশের নদীতে লাক্সারি ফেরি টুরিজ়ম! সব কি তবে আমরা ডিসকার্ড করে দেব? আপন আই মাস্ট সে ইউ আর নট গুড এনাফ।”
“না ম্যাম, আপনি বিশ্বাস করুন, ব্যাপারটা তা নয়। যে কেউ ওখানে গেলে এমন ফেঁসে যাবে! আমি দেখি তারককে যদি অন্যভাবে কিছু করে বাগে আনা যায়,” আপন হাত মুঠো করে চোখ সরু করে একটা গভীর কিছু করতে চলেছে এমন ভাব দেখাল।
“ডোন্ট মেক ফেসেস। সেভেন্টিজ়ের হিন্দি মুভিজ়ের ভিলেনরা এমন মুখ করত। ওসব ড্রামা বাদ দাও আপন,” বস বিরক্ত হয়ে তাকালেন আপনের দিকে। তারপর পুশকিনকে লক্ষ করে বললেন, “তোমার সি-ফুডের ব্যাপারটা তো ভালই এগিয়েছে। এক কাজ করো, গিভ দ্যাট টু আওয়ার ড্রামাকুইন আপন। তুমি সোনাঝুরির প্রজেক্টটা হাতে নাও। আজ থেকে ওটা তোমার আন্ডারে। ভাল কয়েকজন ছেলেমেয়ে রিক্রুট করো। দেন গো ফর ইট। তারক না কে, তাকে বাইপাস করে টক টু মালিকস। ওদের তো সম্পত্তি! দ্যাখো, ওরা কী বলে। টেল দেম আওয়ার প্ল্যান্স। আমরা শুধু বিজ়নেস করি তা নয়, ডেভেলপমেন্টও আমাদের মাধ্যমে হয়। সেটা ওদের বলো। সোনাঝুরি উইল ব্লুম লাইক এনিথিং!”
“আমি পারব ম্যাম!” ঘ্যানঘ্যানে বাচ্চার মতো আপন মাঝখানে লাফিয়ে পড়ে বলল।
“অনেক পেরেছ। আর নয়। পেপার্স পুশকিনকে হ্যান্ডওভার করে দাও। সি ফুডের প্রোডাকশন, সেল্স, প্রোমোশনটা তুমি দ্যাখো,” বস কথাটা শেষ করে পুশকিনকে বললেন, “গেট ইট ডান। আমার ওপরও চাপ আছে। ডোন্ট ডিস্যাপয়েন্ট মি। সোনাঝুরির কাজটা ইমপর্ট্যান্ট। রাশিয়া, ইউএস, ব্রিটেন প্লাস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ এনভায়রনমেন্ট-এর ব্যাপারে খুব কশাস! ওখানে জুট আর জুটের প্রোডাক্ট ইজ় ইন হাই ডিম্যান্ড। প্লাস ওই হেরিটেজ বিল্ডিংটাও আমাদের দরকার। ফ্যান্টাস্টিক রিসর্ট হবে। বিদেশ থেকে কত ডেলিগেটস আসবে জানো? পুশকিন, তুমি শুরু করে দাও।”
পুশকিন কিছু বলার আগে আপন আবার কথার মাঝে ঢুকে পড়ল, “ম্যাম, ওই রাক্ষসের মতো বাড়িটা আমি দেখেছি। ওটাকে সারাতে গেলে অনেক খরচ হয়ে যাবে। তার চেয়ে ওটাকে ভেঙে যদি…”
“শাট আপ!” বস চুপ করিয়ে দিলেন আপনকে। তারপর বললেন, “রাক্ষস-বাড়ি কী কথা! জানো না এভাবে কথা আমি পছন্দ করি না! পুশকিন, তুমি জানো বাড়িটা সম্বন্ধে?”
“জানি ম্যাম। আমি কাল থেকেই পারস্যু করছি ব্যাপারটা!”
“জানিস?” আপন ব্যঙ্গের গলায় বলল, “কী করে জানলি?”
পুশকিন তাকাল আপনের দিকে। তারপর বসের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “ছোটবেলায় আমার বাবা-ঠাকুরদারা সোনাঝুরিতে থাকত। আমিও খুব ছোট বয়সে থাকতাম। গঙ্গার পাশে আমাদের স্কুল ছিল ম্যাম। সোনাঝুরি নার্সারি অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেন স্কুল। যাতায়াতের পথে ওই বিশাল বাড়িটার গেটটা আমরা দেখতাম। বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা বিশাল চারটে বাড়ি! ওখানের লোকজন বলে জোনাক-বাড়ি!”
বস তাকালেন পুশকিনের দিকে। তারপর কেটে-কেটে বললেন, “হ্যাঁ, ওই বাড়িটাই, আমাদের ওই বাড়িটাও চাই। টেক নেসেসারি মেজ়ারস্।”
.
০৯. আইকা
বড় আয়নাটায় নিজেকে দেখল আইকা। সামান্য মোটা হয়ে গিয়েছে কি? কোমরের দু’পাশে কি লাভ হ্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে? পেটেও কি চর্বি জমছে? বুকদুটো কি নেমে আসছে নীচে?
হাফ-টার্নে ঘুরে কাঁধের পেছনের দিকটা দেখল আইকা। স্ট্রেচ মার্কস দেখা যাচ্ছে কি? শরীরে সময় তার থাবা বসাবেই। কিন্তু সেটা এতদিন আটকে রাখতে পেরেছিল আইকা। এবার কি তা হলে সেই প্রতিরোধ ভাঙার সময় হল?
গত সপ্তাহে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছে আইকা। এমনি সব ঠিক থাকলেও সুগার লেভেল সামান্য বাড়তির দিকে। ডাক্তার বলেছেন, যেন সতর্ক থাকে আইকা। তা থাকে ও। নিজেকে যতটা সম্ভব যত্ন করে। কিন্তু তাও আজ কেন মনে হচ্ছে যে, শরীর ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে? কেন মনে হচ্ছে জীবন পালটে যাচ্ছে ওর?
কোমরে আর বুকের ওপরে দাঁতের দাগ হয়ে গিয়েছে। ঋষি এমন করে কামড়ে দিয়েছে! ব্যথা করছে বেশ! আইকার এসব মারামারি, আঁচড়ানো, কামড়ানো ভাল লাগে না একটুও! আর ঋষি ঠিক উলটো! মারবে, কামড়াবে, হাত-পা বেঁধে রাখবে!
আইকা রাগ করে, বলে, “এত পর্নো দেখো না। ওসব ওদের শুটিং-এ ঠিক আছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে ওসব নোংরামো ভাল লাগে না!”
ঋষি হাসে, বলে, “ডার্টি সেক্স ইজ় দ্য রাইট কাইন্ড অফ সেক্স ডিয়ার!”
বিরক্ত লাগছে আইকার। আজকাল ঋষির ওপর খুব বিরক্ত লাগে। আগে যাও-বা আড্ডা হত, ইদানীং সেটাও হয় না। শুধু কোন কোম্পানির শেয়ার উঠল, কোন কোম্পানির শেয়ার পড়ল! অসহ্য বোরিং সব তথ্য! আর সেটা শেষ হলেই মারামারি করে সেক্স! আইকার মনে হচ্ছে একটা সীমারেখা টানতে হবে এবার। ঋষিকে ঝেড়ে ফেলার সময় এসে গিয়েছে! কিন্তু এখনই এসব মনে হচ্ছে কেন? ঋষি কি সত্যি বাড়াবাড়ি করে ফেলছে, নাকি ওর মনটা অন্যদিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে!
আজ সেক্স করার সময় আবছায়া ঘরে যখনই চোখ বন্ধ করছিল, বারবার ওই মুখটা ভেসে উঠছিল কেন? কেন ওই মুখটাকে মনে করে বারবার ও ঋষিকে আঁকড়ে ধরছিল? কীসের জন্য ওই রাজারহাটের অফিস-ফেরতা বৃষ্টির গন্ধটা স্মৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল?
ঋষির কাছে আসার আগে একটা মজা ছিল, কিন্তু এখন কেমন যেন একটা ঋষির মনরক্ষার দায় হয়ে পড়েছে। তারপর এমন করে আঁচড়ে, কামড়ে ওকে যন্ত্রণা দেওয়াটা আর নিতে পারছে না।
রাজারহাটের এই ফ্ল্যাটের বাথরুমটা বেশ বড়। ফ্রস্টেড কাচের বাক্সের মধ্যে দারুণ সুন্দর শাওয়ার লাগানো আছে। শুধু মাথার ওপর থেকেই নয়, নানা জায়গা থেকে জল এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরে।
সাদা বড় শ্বেতপাথরের বাথটাবও রয়েছে এক পাশে। পাথুরে বেসিনের পাশের কাবার্ডে নানারকম বাথসল্ট আর কোলন। ঋষি খুব যত্ন করে সাজিয়েছে বাথরুমটা।
এই বাথরুমে এলেই আইকার মনে পড়ে যায় ওদের সেই যাদবপুরের ভাড়াবাড়ির বাথরুমের কথা! অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘর। দুর্বল চল্লিশ পাওয়ারের হলদেটে বাল্ব। শ্যাওলা-পড়া মেঝে। এক কোণে রাখা ভাঙা টিনের বালতি। প্লাস্টিকের, তলা সাদা হয়ে যাওয়া মগ। একপাশে টাঙানো একটা নাইলনের দড়ি। বড়জোর একজন মানুষ দাঁড়িয়ে স্নান করতে পারে। আইকার যে কী কষ্ট হত! দেওয়ালের ঝুল, আরশোলার ওড়াউড়ি আর জাল পেতে বসে থাকা ডোরাকাটা মাকড়সা দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত আইকা! শুধু ভাবত জীবনে যদি কোনওদিন ভাল করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তা হলে যে-বাড়িটা করবে সেখানে সুন্দর একটা বাথরুম তৈরি করবে ও।
ভবানীপুরে ওদের বাথরুমটা সুন্দর করে সাজিয়েছে আইকা। কিন্তু ঋষির এই বাথরুমের মতো নয় সেটা।
কাচের ঘরে ঢুকে শাওয়ারটা খুলে দিয়ে আইকা ভাবল, ঋষির সঙ্গে দেখা না হলে ওর কোনও আফশোস থাকবে না, শুধু এই বাথরুমটার জন্য ওর মনখারাপ করবে মাঝে মাঝে!
গায়ে জল পড়ামাত্র কেমন পিঠের চিড়চিড়ে জ্বলুনিটাও আরও বেড়ে গেল যেন! আইকার মাথাটা গরম হয়ে গেল আরও! ঋষিটা একটা জানোয়ার! আইকার অবাক লাগছে, কী করে ও এই দেড়বছর ঋষিকে সহ্য করল!
শাওয়ারের তলায় চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল আইকা। সারা দিনের কাজের পর এখানে এসে ঋষিকে সহ্য করে এখন শরীরটা কেমন যেন ছেড়ে দিচ্ছে। ঘুম এসে জড়িয়ে যাচ্ছে চোখে। মনে হচ্ছে জলের তলায় দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ে!
মে মাসের কলকাতা বাইরে জ্বলছে! সন্ধেবেলাতেও কেমন একটা গরম ভাপ যেন! এ বছর একটা মাত্র কালবৈশাখী হয়েছে। তারপরে আর মেঘের ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছে না আকাশে! ধুলোমাখা একটা শহর ক্রমশ আরও ধুলোটে আর আবছায়া হয়ে যাচ্ছে যেন!
সেই সব থেকে দূরে এই জলের তলায় শরীর আস্তে-আস্তে কেমন যেন নিভে আসছে আইকার।
“উই হ্যাভ টু বি ভিজিলেন্ট আইকা,” আজ রুপিন বলছিলেন ওকে, “যেভাবে কমপিটিশন বাড়ছে, উই হ্যাভ টু বি ভিজিলেন্ট। রিয়েল এস্টেট একটা অদ্ভুত ব্যাবসা! মানুষ তার অনেক সাধ আর পরিশ্রম এখানে ইনভেস্ট করে। ইটস নট ওনলি অ্যাবাউট মানি। প্লাস এত রাজনৈতিক ইন্টারফেয়ারেন্স! এভরিবডি ওয়ান্টস হিজ় পিস অফ কেক উইদাউট এনি এফর্ট! লাস্ট ইয়ার আমাদের বিজ়নেস ডিপ করেছে খানিকটা। এমনিতেই রিসেশন আর ডিমনিটাইজ়েশন আমাদের থমকে দিয়েছিল কিছুটা। তাই সামনে উই হ্যাভ আ স্টিপ ক্লাইম্ব! ব্যাবসা বাড়াতেই হবে। নো আদার ওয়ে। ম্যানেজমেন্ট তোমার ওপর ভরসা করছে। এই কাজে নানা ফাইনান্সারও ইন্টারেস্টেড। সোনাঝুরির প্রজেক্টটা কিন্তু হট প্রপার্টি। অনেকের নজর আছে ওতে। ইউ মাস্ট স্টেপ অন দ্য গ্যাস! গঙ্গার পাশে অত সুন্দর জায়গা! ওই বড় বাড়ি প্লাস আশপাশের জমিগুলো নিয়ে নিতে পারলে আমাদের বিজনেস বুস্ট হবে। বুঝলে?”
আইকা এর সবটাই জানে। রুপিন তাও কেন যে এসব বারবার বলেন কে জানে! সোনাঝুরি জায়গাটা গঙ্গার বাঁকের পাশে। সুন্দর ছিমছাম একটা মফস্সল। এখানে হাউজ়িং হলে খুব ভাল হবে, সেটা জানে আইকা। কলকাতা থেকে মাত্র চোদ্দো-পনেরো কিলোমিটার দূরত্ব। তার সঙ্গে নদীটাকেও ব্যবহার করার একটা ভাবনা আছে ওদের মাথায়। আমাদের এখানে এত রাস্তা কম। গাড়ি, ট্রেন আর মেট্রোর ওপর এমন বিশাল চাপ! কিন্তু একটা এত বড় নদী পড়ে আছে সেটাকে আমরা কাজে লাগাই না সেভাবে! কেন কে জানে! হ্যাঁ, স্থানীয়ভাবে কিছু লঞ্চ, স্টিমার আর ভটভটি চলে বটে, কিন্তু সেটা দরকারের তুলনায় খুব কম। জলপথে কি অনেকটা জুড়ে ফেরি চালানো যায় না?
রুপিন মানুষটা ভাল। ঠিক টিপিকাল বস নন। বরং অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেন। কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য কখনও বকাবকি করেন না।
আইকা জানে এই প্রজেক্টটা ওর ওপরে ওঠার সিঁড়িও। এটাকে যদি ক্র্যাক করতে পারে, তা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রজেক্ট-এর জন্য হয়তো ওর নামটা উঠবে।
স্নান সেরে বেরিয়ে আইকা দেখল ঋষি জামাকাপড় পরে নিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল সেট করছে। চুল ঋষির একটা অবসেশন। কতরকমের স্প্রে আর জেল যে লাগায়!
ওকে আয়না দিয়ে দেখে ঋষি ঘুরে দাঁড়াল, “লুকিং হট ইন টাওয়েল!”
আইকা বিরক্ত গলায় বলল, “সারাক্ষণ এসব ভাল লাগে না আমার। তুমি কি ম্যানিয়াক?”
ঋষি থমকে গেল, “তাওয়া গরম হ্যায় কেয়া?”
আইকা নিজের ব্যাগ আর জামাটা তুলে পাশের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, “শাট আপ।”
পাশের ঘরটাও বড়। কিন্তু ফ্ল্যাট বেশির ভাগ সময় খালি থাকে বলে এই ঘরে তেমন কিছু আসবাব নেই। শুধু একটা দেওয়ালজোড়া আলমারি আর তাতে লাগানো আয়না রয়েছে।
দ্রুত জামাকাপড় পরে নিল আইকা। তারপর ব্যাগ থেকে চিরুনি বের করে চুলটা আঁচড়ে নিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। একটা লিপস্টিক বের করে হালকা করে বুলিয়ে নিল ঠোঁটের ওপর। নিজেকে সামান্য দেখে নিল, তারপর ঋষির ঘরের দিকে এগোল।
ঋষি বিছানায় বসে গাড়ির চাবিটা ঘোরাচ্ছিল হাতে। ওকে দেখে উঠে দাঁড়াল, “তুমি এতক্ষণ ধরে স্নান করো কেন?”
“আমার ইচ্ছে!” আইকার যেন সহ্য হচ্ছে না ঋষিকে। ওর নিজের এমন রূঢ় ব্যবহার নিজের কাছেই কেমন যেন আশ্চর্য লাগছে।
ঋষি ভুরু কুঁচকে বলল, “কী হয়েছে? আরে, তোমার এই স্নানের জন্য পাপার কাছে আমায় ঝাড় খেতে হল। বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল আগেই। পলকের বাবা-মা আজ আসবে ডিনারে। তারা শালা, এক ঘণ্টা আগেই এসে গিয়েছে। এখন পাপা আমার জান খাচ্ছে! সল্ট লেক থেকে বুয়াদের তুলে নিয়ে যেতে হবে আমায়। আই অ্যাম অলরেডি সো লেট!”
আইকা বলল, “তাতে আমি কী করব! তোমায় আমি বলেছিলাম, আজ এখানে আসব? অফিসের পরে তুমিই তো আমায় জোর করে নিয়ে এলে। আমার গাড়িটা পর্যন্ত আনতে দিলে না! ইফ ইউ কান্ট কন্ট্রোল দ্যাট টাইনি থিং অফ ইয়োর্স, হোয়াট দ্য ফাক ক্যান আই ডু?”
“টাইনি?” ঋষি অবাক হয়ে নিজের প্যান্টের দিকে তাকাল।
“নয়তো কী! আর মুখ খুলিয়ো না,” আইকা বিরক্ত হল, “পলক কি এমনি তোমার সঙ্গে বেড শেয়ার করে না!”
ঋষি থতমত খেয়ে কী বলবে বুঝতে পারল না কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “আরে, এসব কথা বলছ কেন? বুঝতে পারছ না, আমার দেরি হয়ে গিয়েছে?”
“ডোন্ট ইয়েল!” আইকার মনে হল হাতের ব্যাগটা ছুড়ে মারে ঋষির মুখে। ও বলল, “চলো এখন।”
ঋষি ঘড়ি দেখল একবার। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগাতে-লাগাতে বলল, “শিট, আই অ্যাম সো লেট। আইকা, আমি তোমায় কিন্তু ভবানীপুরে ড্রপ করতে পারব না। তুমি একটা অ্যাপ-ক্যাব ধরে নাও।”
“মানে?” আইকা ভুরু কুঁচকে তাকাল, “এখন সাড়ে আটটা বাজে। এই সময়ে রাজারহাট থেকে আমি ট্যাক্সি করে বাড়ি যাব?”
“হ্যাঁ, যাবে,” ঋষি বিরক্ত হল, “আরে, আমার বাম্বু হয়ে গিয়েছে পুরো। আমাদের নতুন পেপার মিলে পলকের বাবাও ইনভেস্ট করবে। পাপা চায় আজকেই কথা ফাইনাল করে নিতে। আমায় প্রেজ়েন্ট থাকতে হবে। পলক যদি কিছু ট্রাবল ক্রিয়েট করে, অল উইল বি লস্ট! আমি পারব না তোমায় পৌঁছে দিতে।”
আইকা আর কথা বাড়াল না। লিফটে করে নেমে সোজা বড়রাস্তার দিকে হাঁটা দিল। ঋষি দেখেও কিছু বলল না। গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার জন্য উলটো পথে চলে গেল ও।
আইকা বড়রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল একটু। রাগে গা-হাত-পা জ্বলছে! আর কোনওদিন একবার ঋষি আসতে বলুক! বাপের সঙ্গে ওর শ্বশুরেরও বিয়ে দেখিয়ে ছাড়বে!
রাজারহাট এখন অনেক জমজমাট। মোবাইল দিয়ে গাড়ি বুক করতে অসুবিধে হল না ওর। কাছেই ছিল গাড়িটা। এসে পড়ল মিনিটপাঁচেকের মধ্যে। শেয়ারের গাড়ি। পেছনের সিটে দু’জন বসে রয়েছে। গাড়ির ভেতরের অন্ধকারে স্পষ্ট করে মুখ দেখতে পেল না আইকা। কিন্তু বুঝল, খুব কিছু ভাল ঘরের নয়। জানলার দিকে বসে থাকা ছেলেটার মাথায় আবার একটা ব্যান্ড! রোগা-পাতলা চেহারায় ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে ব্যান্ডটা দেখতে কেমন যেন লাগছে! আইকা গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল। ওর পাশে বসা ছেলেটার চেহারাটা বেশ বড়সড়। ও বসতেই ছেলেটা যথাসম্ভব সংকুচিত হয়ে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করলে আইকা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। এই দিকটা এখনও মূল শহরের তুলনায় ফাঁকা। তবে বছরপাঁচেকের মধ্যে একদম পালটে যাবে সবকিছু।
গাড়ির এসি চলছে। আইকার কেমন যেন ঘুম-ঘুম পাচ্ছে! সারাদিন অফিসের পরে ওর ঋষির সঙ্গে এখানে আসা ঠিক হয়নি।
আইকা ঘুম কাটাতে মোবাইলটা বের করে দেখল। নোঈকে একটা মেসেজ করেছিল, এখনও ‘সিন’ হয়নি। মেয়েটা গিয়েছিল কি? আজ তো যাওয়ার কথা ছিল। নোঈকে বিশ্বাস নেই। যা জেদি মেয়ে! সামান্য কিছু হলেই গোঁজ হয়ে থাকে মাঝে মাঝে! কী যে করবে বোঝা যায় না।
পুশকিনের কাজ়িনের সঙ্গে বিয়েটা ভেস্তে দিল! কেন দিল কে জানে! প্রেম-টেম যে নোঈর নেই, সেটা জানে আইকা। আগে একটা ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলেটা নিজে ওকে ছেড়ে গিয়েছে। নোঈ দীর্ঘদিন এই নিয়ে ডিপ্রেসড ছিল। এখন তাও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়। আসলে এই ব্যাপারগুলো ঠিক ভাল করে বোঝে না আইকা।
শুভর সঙ্গে ওর বিয়েটা শুভর দিক থেকে প্রেমে পড়ে হলেও, ওর কাছে সেটা ছিল একটা সুরক্ষিত জীবনের হাতছানি। থাকতে-থাকতে একটা মায়া আর ভাললাগা জন্মালেও সেই যে সর্বগ্রাসী প্রেম, সেটা কিন্তু হয়নি। আর আইকা যেমন, ওর প্রেমে গন্ডগোল হলে, তার জন্য মনখারাপ করে না থেকে সেটা কী করে সমাধান করা যায় সেটার দিকেই ওর বেশি ঝোঁক থাকত। এসব লবঙ্গলতিকা হয়ে ফুল স্পিডে ডিপ্রেশন চালিয়ে যাওয়ার মেয়ে ও নয়।
নোঈকে ও পছন্দ করলেও নোঈর এই জিনিসটা ওর ভাল লাগে না! কিছু-কিছু মানুষ আছে প্রেমের জন্য বড্ড হেদায়! জীবনে যেন আর কিছু নেই!
পুশকিনের সঙ্গে কথা বলে আসার সেই দিনেই রাতে নোঈদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল আইকা।
পুটুমাসি টিভি দেখছিল। রাঙামেসো যথারীতি নিজের ঘরে ল্যাপটপে বিদেশি ফিল্ম নিয়ে বসেছিল।
আইকা ঘরে ঢুকেই পুটুমাসিকে বলেছিল, “নোঈ কোথায় গো? ওর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
পুটুমাসি টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলেছিল, “ওর ঘরে আছে, যা না।”
“না, ওকে ডাকো,” আইকা ইচ্ছে করে টিভিটা আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল।
“আরে,” পুটুমাসি ছটফট করে উঠে বলেছিল, “আরে, ঝগড়াটা দেখতে দে ভাল করে, সর!”
“ডাকো নোঈকে,” আইকা বলেছিল, “আর অত ঝগড়া দেখার ইচ্ছে হলে আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
নোঈকে ডাকতে হয়নি।
“কী রে দি? কিছু বলবি?” নোঈ হাতে মোবাইলটা নিয়ে নিজেই বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে।
নোঈর চোখে বেশ হাই পাওয়ারের চশমা। আইকা কতবার বলেছে সেটা পালটে কন্ট্যাক্ট করে নিতে, কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই নেবে না। এত সুন্দর দেখতে নোঈকে, কিন্তু একটুও সাজে না। শুধু মাঝে মাঝে টিপ পরে। তাও সামান্য ওপরে। এখন আবার এই ফ্যাশনটা ফিরে এসেছে!
শাড়ি পরেছিল নোঈ। আর কপালে একটা অনুস্বরের মতো দেখতে আঁকা টিপ!
“এই ফিরলি নাকি?” জিজ্ঞেস করেছিল আইকা।
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ, শ্বেতার বাড়িতে একটা নেমন্তন্ন ছিল। ও চণ্ডীগড় থেকে এসেছে সাতদিনের জন্য। কিছু বলবি দি?”
আইকা কিছু বলার আগেই পুটুমাসি বলেছিল, “তোরা আমায় দেখতেই দিলি না সিরিয়ালটা! শাশুড়িটা বউয়ের রান্না করা খাবারে সব লঙ্কার গুঁড়ো মিশিয়ে দিল লুকিয়ে। এবার কী যে হবে!”
“ধ্যাত্তেরি!” আইকা রিমোট তুলে টিপে বন্ধ করে দিয়েছিল টিভিটা! বলেছিল, “অফিস থেকে এসেছি দরকারি কথা বলতে! সেখানে এসব চালিয়ে রেখেছে!”
নোঈ সোফায় বসে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “কী হয়েছে দি?”
“তোর চাকরির কথা বলতে এসেছি আমি,” আইকা সময় নিয়ে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। মেয়েটা কারও থেকে কিছু নেয় না। এই কথাটায় কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতে পারছিল না।
নোঈ কিছু বলেনি। বড়-বড় চোখ করে তাকিয়েছিল আইকার দিকে। পুটুমাসির মুখে বরং আগ্রহ ছিল বেশি।
আইকা বলেছিল, “আমি আজ গিয়েছিলাম পুশকিনদের অফিসে। ওরা বিশাল বড় কোম্পানি! মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্ট! রিকো গ্রুপ! কলকাতায় সদ্য অফিস খুলেছে। প্রজেক্টের কাজ করে। রিক্রুট করছে। আমি তোর কথা বলেছি। পুশকিন বলল তোর সিভিটা পাঠাতে।”
“পুশকিন কে?” পুটুমাসি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
আইকা বলেছিল, “তুমি কিছু মনে রাখতে পারো না কেন গো? সেই যে ডিনো না কে এসেছিল না নোঈকে দেখতে, ওর সেই দাদা!”
পুটুমাসি থমকে গিয়েছিল একটু। তারপর ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠেছিল, “না না, একদম নয়। নোঈ ওদের সঙ্গে যা করেছে তাতে কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে ওদের সামনে? সম্ভব নয়!”
“আরে,” আইকা বিরক্ত মুখে বলেছিল, “কেন সম্ভব নয়? চাকরি করতে অসুবিধে কোথায়? আর বিয়ের সম্বন্ধ না-ই হতে পারে! তাতে কি জীবন আটকে থাকবে?”
পুটুমাসি বলেছিল, “আমাদের একটা মানসম্মান নেই নাকি? চাকরি দেবে বললেই যেতে হবে?”
“চাকরি দেবে বলেনি। বলেছে যোগাযোগ করতে!” আইকার মাথা গরম হচ্ছিল, “তুমি এসব কেন কমপ্লিকেটেড করছ? কাজ তো রে বাবা!”
“না, ও যাবে না,” পুটুমাসি গোমড়ামুখে বলেছিল, “সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস না? আমাদের এতে অসম্মান হবে। নোঈ যাবে না।”
“আরে, যুক্তিটা কী?” আইকা কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
পৃথিবীতে গোঁয়ারতুমির মতো অসুখ কমই আছে! ইগো আর গোঁয়ারতুমির জন্য সারা পৃথিবীর আজ এই অবস্থা!
“আমি বলেছি যাবে না, সেটাই শেষ কথা,” পুটুমাসি বুকের কাছে হাতদুটো আড়াআড়িভাবে জড়ো করে এমন একটা ভঙ্গি করেছিল, যার অর্থ হল এর পর আর কথা চলে না!
“দি আমায় ই-মেল আইডিটা দিস, আমি সিভি পাঠিয়ে দেব,” নোঈ শান্ত গলায় বলেছিল।
“কী?” পুটুমাসি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, “তুই… তুই ওখানে চাকরি করবি? মানে ওদের ওখানে…”
“ওদের ওখানে মানে?” নোঈ ঠান্ডা চোখে তাকিয়েছিল পুটুমাসির দিকে, “অফিসটা কি ওই ডিনোদের নাকি? পুশকিন নিজেও চাকরি করে। আমার করতে অসুবিধে কোথায়!”
পুটুমাসি কিছুক্ষণ নোঈর দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনে বলেছিল, “ঠিকই তো। আমি আর কে হই? যেমন বাপ তেমন মেয়ে! আমি তো দাসীবাঁদি হয়ে থাকার জন্যই এসেছি এই বাড়িতে! যা পারিস কর, কিন্তু পরে কিছু হলে আমার কাছে কাঁদতে আসবি না!”
আইকা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল পুটুমাসিকে। আর ভাবছিল পরে কী হতে পারে? পুটুমাসি কী হবে বলে ভয় পাচ্ছে?
আইকা ই-মেল আইডি দিয়েছিল নোঈকে। তারপর পুশকিনের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে বলেছিল, “সিভিটা পাঠিয়ে একটা মেসেজ করে দিবি। ও ইন্টারভিউয়ে ডেকে নেবে।”
পুটুমাসি শেষ চেষ্টা করার মতো করে বলেছিল, “আবার একবার ভেবে দেখ, আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাবে কিন্তু।”
নোঈ শুধু ছোট্ট করে বলেছিল, “এত দুর্বল ঘাড় হলে তো মুশকিল!”
আচমকা মুঠোর মধ্যে থাকা মোবাইলটা কেঁপে উঠল। আইকা চমকে উঠল। ও কি ঘুমিয়ে পড়েছিল! কতটা এল গাড়ি? সামান্য সোজা হয়ে বসল আইকা। আবছায়া গাড়ির ভেতরে সামান্য একটু সময় আইকার কেমন যেন লাগল। মাথাটা যেন পুরো ফাঁকা হয়ে গিয়েছে!
ও আলগোছে পাশে তাকাল একবার। ছেলেদুটো নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় কথা বলছে। এবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে সায়েন্স সিটি চিনতে পারল আইকা। মানে সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল ও!
ফোনটা এখনও মুঠোর ভেতর কাঁপছে! আইকা দেখল স্ক্রিনটা। অচেনা নাম্বার! এখন কে ফোন করল?
ও ফোনটা ধরে কানের কাছে নিল। আলতো গলায় বলল, “কে বলছেন?”
“আমি তারকবাবুর কাছ থেকে বলছিলাম,” ও পাশের গলাটা খরখরে। সামান্য রূঢ়।
“পার্ডন,” নিজের অজান্তেই আইকার ভুরু কুঁচকে গেল। আজকাল কী যে হয়েছে! বেশির ভাগ মানুষ কেমন একটা বিরক্তি আর রাগ মেশানো গলায় কথা বলে! সবার যেন প্রচুর তাড়া! সবার প্রচুর কাজ! সবাই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে, এমন একটা ভাব। আইকার মনে হয়, আসলে কি সবাই একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগে? তাই কি বাইরে এমন একটা বর্ম পরে থাকে?
“কী?” লোকটা থমকে গেল এক মুহূর্ত।
আইকা বুঝল ইংরেজিটা বুঝতে পারেনি।
তারপর আবার বলল, “আরে, আমি সোনাঝুরির তারক চক্রবর্তীর অফিস থেকে বলছি। স্যারকে আপনি ফোন করেছিলেন না কাজের ব্যাপারে, তাই স্যার বললেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন,” আইকা এবার নড়েচড়ে বসল। আরে, লোকটা সোনাঝুরি থেকে ফোন করেছে! ওই প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলতে সত্যিই তারক চক্রবর্তীকে কয়েকদিন আগে ফোন করেছিল আইকা। কিন্তু ভদ্রলোক কথা বলতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, ঠিক সময়ে ডেকে নেওয়া হবে। আইকা বুঝতে পারেনি কতদিনে ঠিক সময় হবে!
এখন ভাবল লোকটা ভুলে যায়নি।
লোকটা বলল, “স্যার বললেন, আপনি পরশুদিন একবার আসবেন। এই সকাল দশটার দিকে।”
“ঠিকানাটা একটু বলবেন?”
“ঠিকানা?” লোকটা হাসল, “আরে, স্টেশনে নেমে যে-কোনও রিকশাওয়ালাকে বলবেন তারক চক্রবর্তীর অফিসে যাব, নিয়ে যাবে। আর গাড়িতে এলে সোনাঝুরি ব্রিজের কাছে এসে একই কথা যে-কাউকে জিজ্ঞেস করবেন। সোনাঝুরিতে থাকতে হলে তারক চক্রবর্তীর অফিসটা চিনতে হয়। বুঝলেন? দেরি করবেন না। স্যারের হেভি কাজ থাকে। নমস্কার।”
ফোনটা কেটে চুপ করে বসে রইল আইকা। গাড়ি জ্যামে থামতে-থামতে এখন বালিগঞ্জ স্টেশন পেরিয়ে গড়ি়য়াহাট মোড়ের দিকে দৌড়োচ্ছে।
রুপিনকে কি একবার ফোন করে জানাবে? রাত হয়ে গিয়েছে। যদিও রুপিন একাই থাকেন। আলিপুরে কোথাও একটা ফ্ল্যাট আছে। কিন্তু তাও এমন সময় কি ফোন করে জানানোটা ঠিক হবে?
নাঃ, কাল অফিসেই জানাবে। মত বদলে বাইরের দিকে তাকাল আইকা। গড়িয়াহাটের সিগন্যালটা আজ খোলা আছে। তাই জ্যাম পেরিয়ে গাড়ি রাসবিহারীর দিকে যাচ্ছে। তবে দ্রুত যেতে পারছে না। সিগনালটা পেরিয়েই অটোস্ট্যান্ড। সেখানে এমন করে গাড়িগুলো জটলা পাকাচ্ছে, বিরক্ত লাগছে আইকার! নিজের গাড়িটা আনলে কত সুবিধে হত! ঋষিটাকে আর জাস্ট নিতে পারছে না ও! আইকা ভবানীপুর যাবে। ছেলেগুলোও নিশ্চয় সামনে কোথাও নামবে।
বাইরের দিকে চোখ থাকলেও এবার ছেলেগুলোর কথা কানে আসতে লাগল ওর।
জানলার দিকে বসা মাথায় ব্যান্ড পরা ছেলেটা চাপা গলা বলল, “তুই শালা গান্ডুই রয়ে গেলি। তোকে রিতুদা বলল একটা মেশিন রাখতে, তুই সতীপনা করতে শুরু করে দিলি। আরে, দাদার কথা শোন, পেলেয়ার কোটায় ভাল জাগায় ঢুকিয়ে দেবে। রিতুদা তোর ওপর ভরসা করে মাহির। এমন উদো হয়ে থাকিস না।”
মাহির বলে ছেলেটা যে আড়চোখে আইকাকে দেখল একবার, সেটা খুব ভাল বুঝতে পারল ও।
মাহির এবার চাপা গলায় বলল, “তোকে বলেছি না, এমন জায়গায় মুখ সামলে কথা বলবি! এত গালাগালি দিস কেন? তোর লজ্জা নেই, আমার আছে। এদিকে আমার মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছে! জানিস তো ভাইটার কী হাল! ডাক্তার বলেছে ডায়ালিসিস করতে হবে। এক-একদিন কত করে টাকা লাগবে বুঝতে পারছিস? আমরা কোথায় যাব বল তো?”
“আঃ,” অন্য ছেলেটা বলল, “সামনে টাকার আলমারি নাচছে, সেখানে ঢ্যামনামো করছিস কেন? তোর ভাই পটল তুললে সতীপনা করিস একা-একা।”
মাহির বলল, “পতাদা বলল, আর-একটা ট্রায়াল আসছে। সেটায় নামকরা সব কোম্পানি আসবে। চাকরি হতেও পারে রে, টিটি।”
“তোর ওই বা…” টিটি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “পতাদার পাছায় তিনটে লাথ মারা উচিত। ঢপবাজ বুড়ো। শালা। রিতুদাকে বল মাহির। হাতের লক্ষ্মী বুঝলি! এই যে কাজটায় এলাম। পেমেন্ট নিলাম। এই যে এসি গাড়িতে ফিরছি, সেটা কি রিতুদা না থাকলে হত! শালা বাসে ধাক্কা খেয়ে ঘামের গন্ধ শুঁকে ঢিকিরঢিকির করে ফিরতে হত! বোঝ রে গা…” টিটি আবার নিজেকে সামলে নিল।
“স্যার, আপনারা কোথায় নামবেন?” সামনের দিক থেকে ড্রাইভারটি মুখ না ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“রাসবিহারীর সিগন্যাল তো খোলা আছে, ওই রাইট টার্ন নিয়ে হাজরার দিকে ঘুরিয়ে বাঁ দিক করে নামিয়ে দিন,” টিটি বলল।
ড্রাইভার সিগন্যাল পার করে ওদের নামিয়ে দিল। ওরা নামবে বলে আইকাকেও নেমে দাঁড়াতে হল। আইকা শুনল ওই টিটি বলে ছেলেটা চাপা গলায় বলছে, “কী বলল শুনলি? স্যার! শালা খিস্তি দিয়ে ছাড়া আর কেউ কোনওদিন কিছু বলে ডেকেছে আমাদের? এটাও রিতুদার জন্য।”
ফ্ল্যাটের সামনে যখন পৌঁছল আইকা, সাড়ে ন’টা বেজে গিয়েছে। গেটের কাছে সুশান্ত মাগোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাগো আইকাকে দেখামাত্র হাত বাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ল! আইকা হেসে কোলে তুলে নিল ওকে।
সুশান্ত বলল, “দিদি, আপনি এই এলেন। ফ্রেশ হয়ে নিন, তারপর ওকে আমি দিয়ে আসব আপনার কাছে!”
আইকা মাগোকে কোলে করে লিফটের দিকে এগোতে-এগোতে বলল, “চড় খাবি বুড়োবয়সে?”
লিফটের মধ্যে আইকা মাগোর সঙ্গে একটু খেলে নিল। মেয়েটা খিলখিল করে খুব হাসে। আইকার কাঁধের ব্যাগের মধ্যে ঝুঁকে পড়ে খোঁজে আজ আইকা কী নিয়ে এসেছে ওর জন্য।
আইকা রোজ মাগোর জন্য কিছু না-কিছু নিয়ে আসে। আজও ট্যাক্সি থেকে নেমে মিল্ক চকোলেট নিয়ে এসেছে। মাগো ব্যাগের চেন খুলতে চেষ্টা করছে দেখে আইকা নিজেই সেটা বের করে দিল। মেয়েটা সেটা নিয়েই হেসে উঠল আবার!
আইকা জানে মাগো এটা একা খাবে না। প্যাকেট খুলে নিজের হাতে আইকাকে খাইয়ে দেবে কিছুটা। ওইটুকু সময়ের জন্য সারাদিন আইকা অপেক্ষা করে। খুব খারাপ কাটা দিনও ওইটুকু সময়ের ছোঁয়ায় কতবার যে ভাল হয়ে উঠেছে!
আইকা নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যাওয়ার সময় আচমকা থমকে দাঁড়াল। আরে, পুটুমাসিদের ফ্ল্যাটের দরজা সামান্য খোলা কেন?
পাশের ফ্ল্যাট, সামনে দিয়েই যেতে হয়। আইকা একবার বেলটা বাজিয়ে দরজাটা সম্পূর্ণ ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, আজ বসার ঘরে রাঙামেসোও বসে আছে। টিভি বন্ধ। কেমন একটা খুশি-খুশি হাওয়া খেলছে ঘরে।
ওকে দেখেই মেসো হাসল। বলল, “তুই আবার কবে থেকে বেল বাজিয়ে ভেতরে আসতে শিখলি!”
আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ও অবাক হয়ে দেখল পুটুমাসি আর নোঈর মাঝখানে সোফায় বসে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে পুশকিন।
Chapter - 10 - 14
১০. কাজু
ঘোষ বাইন্ডিং-এর সামনের কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চটায় বসে রয়েছে ঝিকু। একমাথা কাঁচা-পাকা চুল। কালো-সাদায় জড়িয়ে যাওয়া গোঁফদাড়ি। চোখ দুটো হলদেটে। বেঞ্চটায় উবু হয়ে বসে এদিক-ওদিক দেখছে। রাস্তার উলটো দিক থেকে মানুষটাকে দেখল কাজু। সতু পাশে দাঁড়িয়ে বিড়ি কিনছে দোয়ারিদের দোকান থেকে। বিড়ি আর মৌরি লজেন্স। কাজু নেশা করে না কোনও। সতুকেও বকে এইসব বিড়ি-সিগারেট খায় বলে। কিন্তু সতু তো আর শোনার ছেলে নয়, বরং বিড়ি খেলে সমাজের কী উপকার হতে পারে, সেটা ওকে সবিস্তারে বলে দেয়। এও যে একটা কুটির শিল্প এবং এটাকেও যে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, সেটা নানাভাবে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
কাজু মানতে চায় না। কিন্তু মনে মনে এটাও বোঝে, ও যেমন মানতে চাইছে না তেমন সতুও মানতে চাইছে না ওর কথা। আসলে জীবনে একটা সময়ের পরে কেউ কারও কথাই মানতে চায় না। ইগো, লজিকের চেয়ে বড় হয়ে যায়। আজকাল তাই আর কিছু বলে না সতুকে। কিন্তু সতু বোঝে। তাই বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার সময় কাজুর সঙ্গে নরম করে কথা বলে।
কাজু তাকাল ঝিকুর দিকে। মানুষটা কেমন হয়ে গিয়েছে! ছোটবেলায় দেখত এই লোকটাই কী ফিটফাট হয়ে মিল-এ যাচ্ছে চাকরি করতে। কিন্তু তারপর যে কী হল!
কেউ বলে প্রেমে পড়ে ঝিকুর এমন অবস্থা হয়েছে। কেউ বলে ওর ভাইরা ওকে খাবারে ওষুধ মিশিয়ে পাগল করে দিয়েছে। কেউ আবার বলে, ও নাকি পরি দেখেছিল জোনাক-বাড়ির পেছনের গঙ্গায়!
যাই হোক না কেন, মানুষটা এমন একটা বাতিল অঙ্ক-খাতার মতো পড়ে আছে, দেখতে খুব খারাপ লাগে ওর। কষ্ট হয়। মনে হয় কিছু করে। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারে না।
গতকাল পেখমকে দেখে হঠাৎ ঝিকুর কথা মনে পড়েছিল কাজুর।
পেখম এসেছিল হস্টেলের মাঠে। সোনাঝুরির এই দিকটা খুব সুন্দর। মিলের লোকজনের জন্য যেমন কিছু কোয়ার্টার্স আছে, তেমনই হস্টেলও রয়েছে। হস্টেলের পেছনেই খাবারের মেস। হৃষীকেশদা রান্না করে মেসে। দুপুরে আর রাতে বেশ ভিড় থাকে। কিন্তু বিকেলের দিকটায় হস্টেলের পেছনের মাঠটা খুব নির্জন আর শুনশান হয়ে থাকে।
ওদিকটায় বেশ কিছু সার দেওয়া পামগাছ আছে। আর আছে বট-অশ্বত্থের ভিড়। এদের ছায়ায় জায়গাটায় কেমন একটা একা-একা ভাব তৈরি হয়।
পেখমকে ও বলেছিল ওইখানে আসতে। পেখম খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোয় না এখন। ওর মা সারাক্ষণ ওকে চোখে-চোখে রাখে। এমনকী পারলে, ওর সঙ্গে কলেজেও যায়!
সতু বলে, “তুই শালা সোনাঝুরিতে দেখা করিস কেন ওর সঙ্গে? কলকাতায় দেখা করতে পারিস না?”
কলকাতায় পেখমের সঙ্গে দেখা করে কাজু, কিন্তু সেটা খুব অল্প কয়েকবারই হয়েছে। আসলে নয়না থাকে পেখমের সঙ্গে। নয়না কলেজ না গেলে ওদের দেখা হয়। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, নয়না কেমন যেন পেখমের সঙ্গে সেঁটে থাকে, একটুও জায়গা দেয় না ওদের।
নয়নারা এখন নেই এখানে। পুরী বেড়াতে গিয়েছে। নয়নার জ্যাঠার একটা ফোটো স্টুডিয়ো আছে স্টেশনের কাছে। ওর জেঠতুতো দাদা সেটা চালায়। তার কাছ থেকেই জেনেছে যে, সাত দিনের জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছে নয়না।
পেখম এসেছিল বিকেলের দিকে। একটা পামগাছের নীচে অপেক্ষা করছিল কাজু। নরম ঘাসের ওপর শুয়ে একটা বইয়ের পাতা উলটোচ্ছিল। তখনই শাড়ির খসখস শুনতে পেয়েছিল ও।
পেখম কোনও সেন্ট ব্যবহার করে না, কিন্তু তাও ও কাছে এলেই কাজু কী অদ্ভুত একটা নরম চন্দন মেশানো কর্পূরের গন্ধ পায়! কেন পায়? কোথা থেকে এই গন্ধ ভেসে আসে কে জানে!
আর শুধু কাছে এলেই নয়, ঘুম ভেঙে উঠে বসা মাঝরাতে, একাকী দুপুরের মনখারাপে বা ভোররাতের স্বপ্নের মধ্যেও এই অদ্ভুত নরম একটা গন্ধ জোনাকির মতো একা পিটপিট করে বুকের মাঝে! ওর অন্ধকার জীবনে কেমন অদ্ভুত সবুজ-হলুদ এক আলো জ্বালিয়ে দেয়! সেই আলোটুকুতেই যেন কাজু দেখতে পায় নিজেকে। ওর মনে হয় জোনাকির আলোর গন্ধ কি এমন চন্দন মেশানো কর্পূরের মতো হয়?
গতকাল ঘাসে শুয়ে বইয়ের দিকে চোখ থাকলেও সেই গন্ধটা আচমকা ভেসে এসেছিল বিকেলের রোদে। আর কাজু না তাকিয়েও বুঝতে পারছিল কে এসে দাঁড়িয়েছে মাথার কাছে।
লেবু-হলুদ শাড়ি আর ঘন সবুজ ব্লাউজ় পরেছিল পেখম। গায়ে পাতলা একটা চাদর জড়ানো।
উঠে বসেছিল কাজু। বইটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রেখেছিল পাশের ঝোলায়। বুকের ভেতরে তিতির পাখি কাঁপছিল কাজুর! পেখমকে দেখলেই এমন একটা কাঁপন টের পায় ও।
পেখম বসেছিল ঘাসে। শীতের মফস্সলে বিকেল নামছিল ধীরে। আকাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া সূর্য দিগন্তের দিকে যেতে-যেতে আরও কমলা হয়ে উঠছিল যেন। আর হাওয়া আসছিল। শেষ শীতের দিক থেকে বসন্তের দিকে যেতে-যেতে হাওয়া সোনাঝুরি ছুঁয়ে যাচ্ছিল একটু-একটু করে। কাজুর মনে হচ্ছিল এই বিকেলটা যেন সারা জীবন ধরে চলে।
“বলো!” পেখমের স্বরে অজস্র প্রজাপতি ছড়িয়ে গিয়েছিল সোনাঝুরির হাওয়ায়।
কাজু তাকিয়ে ছিল সেই সব প্রজাপতির দিকে। কথা বলতে পারছিল না একটুও। মনে হচ্ছিল ওর গলার আওয়াজ পেলেই সব প্রজাপতি মিলিয়ে যাবে নিমেষে।
“আরে! খালি তাকিয়ে থাকে!” পেখম সামান্য লজ্জা পেয়ে আলতো করে চিমটি কেটেছিল কাজুর হাতে।
কাজু হেসেছিল। কথা, শব্দ, বাক্য মাঝে মাঝে অর্থহীন হয়ে যায়। মাঝে মাঝে দৃষ্টিপাতের চেয়ে সহজ কথোপকথন আর কিছু হয় না।
“আচ্ছা, আমি তবে আসি,” সামান্য বিরক্ত হয়ে পেখম উঠে যাচ্ছিল।
এবার ওর হাতটা ধরেছিল কাজু। বলেছিল, “ছটফট করছ কেন?”
পেখম বলেছিল, “মা রাগ করছিল খুব। বলছিল, কোথায় যাচ্ছি? কলেজ নেই কিছু নেই, তাও কেন বেরোচ্ছি। জানোই তো! আর তুমি তো কাল আসতেই বাড়িতে। কেন আজ ডাকলে?”
কাজু হেসেছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, “আচ্ছা, এমনি ডাকা যায় না?”
পেখম মাথা নিচু করে নিয়েছিল। বলেছিল, “যায় তো। কিন্তু মা… মা খুব রাগ করে… আমার ভয় করে, যদি তোমায় আর আমাদের বাড়ি যেতে না দেয়! তাই আমি সাবধানে থাকি। আমার ইচ্ছে-টিচ্ছেয় তো মা তেমন আমল দেয় না কখনও!”
কাজু মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। ওই মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলে যাওয়া পেখমের কথাগুলো আসলে কথা নয়! এসব ধ্বনি আসলে প্রজাপতিদের জন্ম দেয়!
কাজুর এমনি পেখমকে দেখতে ইচ্ছে করছিল বলে ও বিজনকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল। ও জানে পেখমের বাড়িতে এসব অসুবিধে আছে। কিন্তু তাও আজ এমন একটা কষ্ট হচ্ছিল যে, ইচ্ছে করছিল এই নির্জনে দেখা করতে।
পেখম আবার বলেছিল, “ঠিক আছে দেখা তো হল, এবার আমি আসি?”
কাজু হেসেছিল, “কেন? আর-একটু বোসো। আশপাশে কে আছে যে, দেখে ফেলবে?”
“মিল ছুটি হলেই কাতারে-কাতারে লোক বেরিয়ে আসবে। তখন? মিল ছুটির সময় হয়ে গেল তো!”
কাজু হেসে বলেছিল, “দেখলে কী হবে? বাড়িতে বলে দেবে?”
পেখম নামিয়ে নিয়েছিল মাথা। বলেছিল, “গতকালও মা খুব অশান্তি করেছে। ছোটকাকিমার বাপের বাড়ি জামশেদপুর। সেখান থেকে কে যেন একটা সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে। ছেলে ডাক্তার। আমি ‘না’ বলেছি বলে মা গতকাল খুব রাগ করছিল। আমার আজ বাইরে থাকাটা মা ভাল মনে নেবে না। তাই বলছি দেখা তো হল… আর কী-ই বা এত দেখো! এলাম তো! কী হল এতে!”
কাজু তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। বুকের ভেতর অসংখ্য তিতির এসে ডানা ঝাপটাচ্ছিল! ওই মুখ নিচু করে বসে থাকা পেখম। ওই ছোট্ট গোলাপি পাপড়ির মতো ঠোঁট! কমলা আলো লেগে সামান্য রাঙা হয়ে ওঠা গাল কোথায় যেন মেরে ফেলছিল ওকে! প্রেম এমন নিঃশব্দে এসে মেরে ফেলে যে, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না কখন সে আর নেই!
“কী দেখি? কেন পাগল হই? কী হল এতে?” কাজু হাসল। চোখ বন্ধ করল খানিক তারপর বলল:
“Come to the orchard in Spring.
There is light and wine, and sweethearts
in the pomegranate flowers.
If you do not come, these do not matter.
If you do come, these do not matter.”
পেখম কিছু না বলে শুধু ছলছলে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। আর দূরে বসেও সেই কর্পূর-চন্দনের গন্ধটা আবার পেয়েছিল কাজু!
পেখম আর-একটু সময় বসেছিল। তবে কথা বলেনি একবারও। শুধু কমলা বিকেল গাঢ় হয়ে উঠছিল পেখমকে নিজের কাছে পেয়ে।
একসময় পেখম উঠে চলে গিয়েছিল নিঃশব্দে। কিন্তু আসলে নিঃশব্দে নয়। যাওয়ার আগে পেখম একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। আর কাজু আবার স্পর্শ পেয়েছিল। শব্দের অতীত এক স্পর্শ! হাজার-হাজার বছর ধরে যা গ্রন্থিবিহীনভাবে বেঁধে রেখেছে প্রেম-বদ্ধ নারী-পুরুষকে!
কাজু ঘাসে মোড়া মাটিতে বসে দেখছিল পেখম চলে যাচ্ছে। লাল-সাদা কোয়ার্টার্সের ফাঁক দিয়ে মাথা নিচু করে ওই চলে যাচ্ছে পেখম। বিকেলের আলো আকাশ থেকে চুঁইয়ে নেমে আসছে আর যেন ক্রমশ সেই আলোর মধ্যে মিশে যাচ্ছে ও!
আর তিতির উড়ছিল! বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে সারা মফস্সল জুড়ে তিতির উড়ছিল যেন! কাজু বুঝতে পারছিল, এই মেয়েটি ছাড়া ওর জীবনের আর কোনও অর্থ নেই। ভাবছিল পেখম যদি চলে যায়, তা হলে কি ওকেও ওরকম ঝিকুদার মতো রাস্তার পাশে বসে সব কিছুর এককথায় উত্তর দিতে হবে? বলতে হবে, “বিলকিস!”
“কী রে কী দেখছিস? ঝিকুদা বৈজয়ন্তীমালা নাকি?”
সতুর কথায় মুখ ফিরিয়ে তাকাল কাজু। বিড়িটা দু’আঙুলে ধরে মুখ তুলে ধোঁয়া ছাড়ল ও। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল, “এই নে তোর মৌরি লজেন।”
মৌরি লজেন্স হাতে নিয়ে হাসল কাজু। বলল, “মানুষটাকে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয় জানিস সতু। ভেবে দেখ, লোকটার কেউ নেই! কোথাও যাওয়ার নেই, ওর কোথাও থেকে ফেরার নেই। কেউ আসবে না ওর কাছে। ও যে কারও কাছে যাবে, তেমন কেউ নেই! সারা জীবন এই স্টেশন রোড, সোনাঝুরির বড় রাস্তা, গঙ্গার পাশের চৌধুরীদের পোড়োবাড়ির মধ্যে বসে থেকে থেকে সব শেষ হয়ে যাবে ওর!”
“শালা,” সতু ছিক করে থুতু ফেলল। তারপর বলল, “আলট্রা-ন্যাকা হয়ে যাচ্ছিস দিন-কে-দিন! শালা, তোদের এই যে লাউগাছের মতো ন্যাতপেতে মন, এটা এই যুদ্ধের বাজারে মেনটেন করিস কী করে?”
“বা রে, লোকটাকে দেখে কষ্ট হবে না?” অবাক হল কাজু।
“ওর তো বোধ নেই! খিদে পেলে খায়, হাগু পেলে হাগে, ঘুম পেলে ঘুমোয়। যে-কোনও প্রাণীর মতো হয়ে গিয়েছে! কিন্তু যেসব মানুষ সব বোধ নিয়েও দিনের পর দিন কষ্ট করছে, নিজের বাচ্চাদের মুখে ভাত তুলে দিতে পারছে না, তাদের কথা ভাব। জোতদার, দালাল, পুঁজির পুঁজ জমে যাওয়া, হাতে গোনা কিছু মানুষ, যাদের জন্য সৎ, গরিব মানুষগুলো সারা জীবন সার্ফদের মতো অত্যাচারিত হয়ে গেল, তাদের কথা ভেবে তোর মনখারাপ হয় না?” সতু স্ট্রিট কর্নার করার ঢঙে বলল, “আমি তো গিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গে। দেখে এলাম! ওদিকে ভিয়েতনামে যে-রেজ়িস্ট্যান্স চলছে, তেমন একটা যদি এখানে আমরা গড়ে তুলতে পারি, শালাদের মুতিয়ে ছেড়ে দেব! তোর ওই ন্যাকা প্রেম আর পাগলদের দেখে আহা-উহু-ই শালা বাঙালিদের শেষ করে দিল!”
কাজু কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারল না। বিজন আর পরিতোষ সাইকেল করে এসে থামল ওদের সামনে।
বিজন বলল, “আরে, তোমরা এখানে কী করছ? বিমলদা তোমাদের জন্য ওয়েট করছে তো!”
কাজু, বিজনের সাইকেলের সামনে বসা ছেলেটাকে দেখল। পরিতোষ। প্রায় বিজনের মতোই বয়স। ভাল ছেলে! ক্লাসে ফার্স্ট হয়। সোনাঝুরিতে ওর নাম আছে। কিন্তু বিজনের সঙ্গে ছেলেটা ঘুরছে কেন? বিজনটা নিজে লেখাপড়া করে না। এই বয়স থেকেই খালি পার্টি আর পার্টি! সেখানে পরিতোষের মতো ছেলেরা কেন ঘুরবে ওদের সঙ্গে?
কাজু এই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু আজ এত বিরক্ত লাগল যে বলল, “পরিতোষ, তুই কী করছিস বিজনের সঙ্গে?”
পরিতোষ ছেলেটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! আসলে সোনাঝুরিতে কাজুর খুব নামডাক। সেখানে সেই মানুষটা এমন করে ওর সঙ্গে নিজে থেকে কথা বলছে বলেই বোধহয় কিছুটা ঘাবড়ে গেল।
পরিতোষ বলল, “না, মানে… ইয়ে…”
“আরে, আমি বলছি,” বিজন বলল, “আমি ওকে বলেছি আমার সঙ্গে বিমলদার কাছে যেতে। সারাক্ষণ বই মুখে বসে থাকে! আরে বাবা দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কি কম আছে? যা কম আছে, তা হল প্রকৃত মানুষ। সেটা হতে হবে না? আমি ওকে বলেছি ট্রটস্কি পড়তে! গোর্কি পড়তে! তুমি বলো কাজুদা, গোর্কি গ্রেটেস্ট রাশিয়ান নভেলিস্ট না? ওর সমান আর কেউ আছে?”
কাজুর মনে হল, বিজনের কানটা পেঁচিয়ে ধরে। এত বাড়তি কথা বলে ছেলেটা! আর পরিতোষের সামনে জ্ঞান ফলাচ্ছে!
কাজু বলল, “আলেকজান্দার পুশকিন কি বানের জলে ভেসে এসেছে?”
“পুশ…” ঘাবড়ে গেল বিজন। পরিতোষের সামনে বিদ্যে জাহির করছিল ভালই, কিন্তু এই নামটা আর কমন পড়েনি!
কাজু বলেছিল, “ওকে মডার্ন রাশিয়ান লিটারেচারের জনক বলা হয়। কেন বলা হয় বড় হয়ে পড়বি। বুঝলি?”
পরিতোষ বলল, “পুশকিন! অদ্ভুত নাম তো!”
বিজন চোখ ঘুরিয়ে বলল, “নে পরিতোষ, তোর নামের খাতায় লিখে রাখ নামটা। পরে বাচ্চা হলে নাম রাখিস! হুঁ! পুশকিন! বিমলদা বলেছে, গোর্কি বেস্ট!”
সতু বলল, “শালা, মারব কানের গোড়ায়। ডেঁপোমি সব সময়।”
বিজন বলল, “সে মেরো পরে। আগে চলো চক্রবর্তীর চায়ের দোকানে। বিমলদা অপেক্ষা করছে।”
রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটা বেশ বড়। চক্রবর্তীকাকু আর কাকুর দুই ছেলে সারাদিন চা, ডিম টোস্ট, ভেজিটেবল চপ, ঘুঘনি, এসব বানিয়ে যায়। সোনাঝুরির কফি হাউস এই দোকানটা।
বিমলদাকে যদি কেউ পার্টি অফিসে না পায়, তা হলে এই দোকানটাতে পাবেই। বিমলদা মানুষটা বিয়ে করেনি। সারাক্ষণ পার্টির কাজে ঘোরে। একটা কাপড়ের ঝোলা সারাক্ষণ কাঁধে থাকে। তাতে রেড বুক থেকে সহজ হোমিওপ্যাথি শিক্ষা, সব থাকে! ঝোলাটা সব সময় হরিণ গিলে ফেলা অজগরের মতো ফুলে থাকে! সোনাঝুরির সবাই জানে বিমলদার মতো সন্ন্যাসী হয় না। কিন্তু কাছের লোকজন জানে বিমলদা কতটা বদমেজাজি মানুষ। কখন যে রেগে যাবে, কেউ জানে না।
এখন তেমনই কাজুদের দেখেই মানুষটা রেগে গেল। হাতের আধখাওয়া চায়ের গেলাসটা এমন ঠক করে টেবিলে রাখল যে, বাকি চা-টা চলকে পড়ে গেল টেবিলে!
কাজু একটু ঘাবড়ে গেল।
বিমল স্থান-কাল-পাত্র ভুলে চিৎকার করে উঠল, “শুয়ার, তুই হিরো হয়েছিস? তোকে বলেছি না, যে যাবি না গোপেনের কাছে। সেখানে গিয়েছিলি কেন তুই?”
কাজু থমকে গেল! দেখল সতুও ওর দিকে কেমন একটা চোখে তাকিয়ে রয়েছে!
কাজু সময় নিল একটু। এখানে মাথাগরম করলে বা ঘাবড়ে গেলে হবে না।
ও বলল, “আমি তো এমনি-এমনি যাইনি বিমলদা। আপনি বলেছেন যে, আপনি জুটমিলের ওই কাজের ঝামেলার ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন না। মালিক যদি মিল লকআউট করে দেয়, তারপর আপনি আন্দোলনে যাবেন। কিন্তু লক আউট করে দেওয়ার পর আর কতদিন খালি পেটে ওয়ার্কাররা আন্দোলন করবে? কতবার আর ওদের ওপর দিয়ে আমরা আমাদের পার্টির মাহাত্ম্য বোঝাব? আমি চাই শ্রমিকদের যাতে সুরাহা হয়। গোপেনদা যদি মালিককে বুঝিয়ে শ্রমিকদের ইনসেনটিভটা দেখে বা অন্তত কাজের কোথায় প্রবলেম হচ্ছে, কোথায় প্রোডাকশন মার খাচ্ছে, সেটা নিয়ে যদি শ্রমিকদের সঙ্গে বসে একবার! তাই… এ ছাড়া গোপেনদার সঙ্গে তো দেখা হয়নি আমার। তা হলে? এত রাগ করার কী আছে! পার্টি করছি তো মানুষের হকটা তাদের দেওয়ার জন্য। সেটা যদি দেওয়া যায় সেটাই তো আসল!”
“গান্ডু তুই? নাকি গোপেনের এজেন্ট?” বিমলদা দাঁতে দাঁত ঘষল, “এটা বুঝিস না যে, প্রবলেমটা যদি গোপেন সলভ করে দেয়, তা হলে আমাদের পার্টির কী হাল হবে? মাসকয়েক বাদে মজদুর ইউনিয়নের ভোট। আর কেউ আমাদের ভোট দেবে? আর গোপেনের সঙ্গে মালিকের ভালই আঁতাত আছে। ওরা যদি ইউনিয়নের দখল নেয়, তা হলে কী ভেবেছিস, শ্রমিকদের খুব সুরাহা হবে? ছাগল তুই? এমন দাড়ি রেখে কলির কেষ্ট সেজে ঘুরে কচি মেয়েদের মাথা আর বুক খেয়ে বেড়াচ্ছিস বেড়া, আমাদের পার্টির পেছনে কাঠি করতে এলে কিন্তু মেরে রেখে দেব একদম!”
“মানে?” কাজুর মাথায় আচমকা রক্ত চলকে উঠল, “কী বলছেন এসব? এমন নোংরা কথা বলছেন কেন?”
কাজু দেখল বিমলদার চিৎকারে আশপাশের টেবল থেকে সবাই ঘুরে তাকাচ্ছে! কী লজ্জার ব্যাপার!
“বেশ করেছি, বলেছি!” বিমলদা চেঁচাল, “খুব র্যালা নিয়ে ঘোরা হচ্ছে, না? রক্ত দিয়ে এই পার্টিকে সোনাঝুরিতে এই জায়গায় নিয়ে এসেছি আমি। তুমি হিরো সাজবে বলে সেটাকে আমি নষ্ট করব ভেবেছ? নাকি আমায় ল্যাং মেরে নিজে আমার জায়গাটা নিবি? কী ভেবেছিস, এই সব কেতাবি ঢ্যামনামি করে লোকের সামনে ভাল হবি? নেতা হবি? শালা, পাছায় লাথ মেরে তোকে বের করে দেব পার্টি থেকে!”
কাজু চোয়াল শক্ত করে বলল, “ইতরের মতো কথা বলবেন না। পার্টি কারও সম্পত্তি নয়। মানুষের যাতে ভাল হয় আমি সেটাই করব। তাতে পার্টির হাইকম্যান্ড আমায় কিছু বললে তাদের উত্তর আমি দেব। আপনার খেউড়কে আমি পাত্তা দিচ্ছি না।”
বিমলদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “শালা, খুব তেল হয়েছে, না? বিপ্লবী হবে? যদি আর-একবার তুই গোপেনের কাছে গিয়েছিস তো পার্টি থেকে তোকে লাথ মেরে বের করে দেব হারামজাদা!”
কাজু চোয়াল শক্ত করে একবার বিমলদাকে দেখল, আর-একবার তাকাল সতুর দিকে। দেখল, সতু মাথা নিচু করে একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কাজু আর না-দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এল দোকান থেকে। দোকানের বাইরে সাইকেল নিয়ে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিজন। পরিতোষ নেই। নিশ্চয় চলে গিয়েছে।
কাজুর মাথা দিয়ে মনে হল আগুন বেরোচ্ছে! আরে, ও কি আর সাধ করে গিয়েছিল নাকি গোপেনদার কাছে?
এই বিমলদাই তো বলেছিল, “এখন এসব করা যাবে না। আমরা আবেদন-নিবেদন করতে যাব কেন? আমরা আন্দোলন করব। কেন শুধু-শুধু মালিকের জুতো চাটতে যাব? দিক না বন্ধ করে মিল! আন্দোলনের জোর আমরা দেখিয়ে দেব। মালিকের কাছে গিয়ে মাথা নত আমি করতে পারব না।”
‘আমি’! এই আমিটাতেই আপত্তি কাজুর। যেখানে মানুষের হয়ে কাজ করার কথা সেখানে ‘আমি’ আসবে কেন? এত ইগো কীসের? কীসের এত অহং?
কাজু চোয়াল শক্ত করল। গোপেনদা কিছুদিনের জন্য দিল্লি গিয়েছে। সেখান থেকে ফিরলে ও আবার যাবে। এতজন শ্রমিকের রুজির ব্যাপার! সেখানে সামনের ইউনিয়নের ভোটে কে কী সুবিধে নেবে, সেটা পরে দেখা যাবে। আর বিমলদা যদি ওকে পার্টি থেকে বের করার ষড়যন্ত্র করে, তবে ও নিজেই পার্টি থেকে বেরিয়ে যাবে। মানুষের হয়ে কাজ করতে কোনও পার্টি না হলেও ওর চলবে!
“কাজু, কাজু! এই কাজু…” আচমকা একটা ডাকে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মুখ তুলে দেখল কাকিমা! মানে পেখমের মা! কেন কে জানে কাজুর শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল! কাকিমা তো এভাবে ওকে কখনও রাস্তায় ডাকে না! তা হলে!
কাকিমা কাছে এসে বলল, “কী হল? এতবার ডাকছি, শুনছ না যে বড়!”
“ডাকছেন?” কাজু কী বলবে বুঝতে পারল না। আসলে মাথা এমন গুলিয়ে আছে যে… ও খুব অন্যমনস্ক ছিল। তাই শুনতে পায়নি।
“হ্যাঁ,” কাকিমার গলাটা বেশ গম্ভীর!
কাজু এবার ভাল করে দেখল। কাকিমার হাতে একটা ঠোঙা। কাকিমা তো সচরাচর বাজারে বেরোন না!
“কিছু বলবেন?” কাজু নিজের গলাটা যথাসাধ্য নরম করার চেষ্টা করল।
কাকিমা কোনওরকম ভণিতা না করে বলল, “তুমি হস্টেলের পেছনের মাঠে পেখমকে ডেকে পাঠিয়েছিলে?”
কাজু ঘাবড়ে গেল। এটা কী হল? কাকিমা এটা জানল কী করে?
কাকিমা বলল, “তুমি এটা ঘোরতর অন্যায় করেছ। কিছুদিন আগে আমি বাড়ি ছিলাম না, তুমি পেখমের সঙ্গে লোডশেডিং-এ আমাদের ছাদে গিয়ে বসেছিলে। এতটা বাড়াবাড়ি না করলেই কি নয়? আমাদের সমাজ আর তোমাদের সমাজ এক নয়। এটা বোঝো না?”
কাজু কী বলবে ভেবে পেল না। ও তাকিয়ে রইল শুধু।
কাকিমা বলল, “আমার মেয়ে, তাই আমাকেই তার ভালমন্দ দেখতে হবে। ভাল বিয়ের সম্বন্ধ আসছে ওর। আমি চাই না ওর বদনাম হোক। তুমি আর আমাদের বাড়িতে এসো না। পেখমের সঙ্গে আর বন্ধুত্ব রেখো না। বুঝলে? এই আমি বলে দিলাম। আশা করি ভদ্রলোকের ছেলে তুমি, আমার কথা রাখবে!”
বন্দুকের গুলির মতো কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে কাকিমা চলে গেলেও কাজু নড়তে পারল না। দুপুরের মফস্সল ওর সামনে টলমল করতে লাগল। মাথার ওপরের আকাশটা যেন একবাটি গরম ডালের মতো ফুটছে! শীতের শহরতলি থেকে শিরশিরে হাওয়া যেন তার চাদর গুটিয়ে নিয়েছে ক্রমশ! যেন আর কিছু নেই চারপাশে! শুধু একখণ্ড নির্জন মৃত নগরের পথে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাজু! পেখমের সামনে ও আর যাবে না? পেখমের বিয়ে হয়ে যাবে? ও অন্য কারও হয়ে যাবে? এও সম্ভব! পেখম আছে বলেই তো ওর এই চারপাশের দম বন্ধ করা পৃথিবীটা তুচ্ছ! আর পেখম না থাকলে তো সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে যাবে!
কাজু এদিক-ওদিক তাকাল। কাউকেই যেন ঠিক চিনতে পারছে না ও। শুধু লোকজনের ভেতর থেকে ওর দিকে এগিয়ে আসা ঝিকুদাকে চিনতে পারল।
ঝিকুদা মাথা নাড়তে-নাড়তে কাজুর পাশ দিয়ে যেতে-যেতে ওর দিকে তাকাল একবার। তারপর ফিক করে একটু হেসে দিয়ে বলল, “বিলকিস! সব শালা বিলকিস!”
.
১১. নোঈ
বেসিনের কলটা খুলে চোখেমুখে ভাল করে জল দিল নোঈ। মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করছে! এভাবে যে জয়ের সামনে পড়ে যাবে, ভাবতে পারেনি ও। জীবনে যা চায় না সেটাই কেন এসে পড়ে ওর সামনে? মনেপ্রাণে তো চেয়েছিল যে, জয়ের সামনে যেন ওকে পড়তে না হয় আর কোনওদিন! কিন্তু ঠিক সেটাই হল! জয় যে এই অফিসেই চাকরি করছে, সেটা তো আর জানত না ও। জয় বলেনি। কিন্তু সেভাবে দেখতে হলে জয় কিছুই বলেনি ওকে। কোনওদিনই কিছু বলেনি। নোঈই যা খবর নেওয়ার নিয়েছে। যা উতলা হওয়ার হয়েছে। কষ্ট পাওয়ার পেয়েছে। জয় সেসব খুব একটা পাত্তা দেয়নি। সেই কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকেই এমন। জয় যে কী চায়, কাকে চায়, সেটা জয় নিজেই জানে না। কলেজে পড়ার সময়ে ওর চেয়ে চার বছরের বড় এক মহিলার সঙ্গে জয়ের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু সেটাও সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে জয় আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেনি। বা করলেও সেটা জানতে পারেনি নোঈ।
কলেজের প্রথম দিন থেকে নোঈর ভাল লাগত জয়কে। মানে কিছু-কিছু জিনিস হয় না, মানুষ বোঝে যে এতে বিপদ বাড়বে কিন্তু তাও এড়াতে পারে না? এটাও সেরকমই ছিল। অনেকটা মাধ্যাকর্ষণ বলের মতো। কিন্তু দীর্ঘদিন সেটা জয়কে জানতে দেয়নি ও। শুধু সংগ্রহ করে গিয়েছে। জয়ের দেওয়া লজেন্সের র্যাপার, জ়েরক্সের বিল, ফেরত নিতে ভুলে যাওয়া ক্ষয়ে যাওয়া উড পেন্সিল, রাবার ব্যান্ড, বাসের টিকিট, খাতার লেখার লুজ় পৃষ্ঠা, আরও কত কী! ওই যে দশ টাকার নোট! ওটাও তো জয়েরই দেওয়া।
কিন্তু সেসব পেছনে ফেলে এবার এগিয়ে যেতে চায় নোঈ। নতুন করে দাঁড়াতে চায় জীবনে! কিন্তু পারছে কই? এখানে জয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা কি খুব জরুরি ছিল?
আয়নায় নিজের দিকে তাকাল নোঈ। ফরসা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে! কপালে অনুস্বর-এর মতো করে আঁকা টিপটা জলের ঝাপটায় মুছে গিয়েছে কিছুটা। চোখদুটোও লাল হয়েছে বেশ! নোঈ বুঝতে পারছে শরীর বেয়ে একটা কান্না উঠে আসার চেষ্টা করছে!
নোঈর মনে হয় কান্না যেন কোনও পর্বতারোহী। শরীরের অদৃশ্য কোটর থেকে তুষার-কুড়ুল, কাঁটাওয়ালা জুতো শরীরে গেঁথে উঠে আসে চোখের কাছে। এই বেসিনের সামনে দাঁড়িয়েও নোঈ বুঝতে পারল অদৃশ্য কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে সেই মানুষটি। নিজের শরীরে তার কাঁটাওয়ালা জুতো, বরফের কুড়ুলের আঘাত বুঝতে পারল।
নোঈ চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত করল। না, এখানে আর কান্নাকাটি করা যাবে না। খুব বাজে একটা ব্যাপার হয়ে যাবে।
ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে নিজের মুখটা ভাল করে মুছল নোঈ। পাশে রাখা চশমাটা পরল। তারপর পেছন ফিরে বেরিয়ে এল লু থেকে।
পার্ক স্ট্রিটের এই অফিসটা বিজ্ঞাপনের। ওদের কোম্পানির কিছু বিজ্ঞাপনের কাজ এই প্রোমোট নামে কোম্পানিটিকে দেওয়া হয়েছে! সোদপুরের কাছে একটি আর বারাসতের কাছে দুটি, মোট তিনটে হাউজ়িং প্রোজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু শুধু বাড়িঘর তৈরি করলেই তো হবে না, তার সঙ্গে বিজ্ঞাপন দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ!
অফিসে আপন এই কাজটা দেখছে। নোঈকে আপনই পাঠিয়েছে এখানে। আসলে প্রোমোট-এর লোকজন বলেছিল, ওরাই গিয়ে দিয়ে আসবে কিছু পেপার। কিন্তু আপন বারণ করেছে। বলেছে ওদের অফিস থেকেই লোক যাবে।
নোঈকে আপন বলেছিল, “তুমি পেপারগুলো নিয়ে আসবে। সঙ্গে ওদের মার্কেটিং-এ যে-ছেলেটা আছে, তাকে বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে। ওটা কিন্তু ইমপর্ট্যান্ট। কাজ নেওয়ার সময় এসে ‘স্যার’, ‘স্যার’ করছিল, এখন একে-ওকে পাঠিয়ে পাশ কাটানোর ধান্দা। বলবে আপ্রুভালটা আমি দেব। ওই ছেলেটি যেন এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়।”
তখন তো আর নোঈ বুঝতে পারেনি এই মার্কেটিং-এর ছেলেটি আর কেউ নয়, জয়! নোঈ দেখেছে ও যা এড়িয়ে যেতে চায়, তাই এসে আছড়ে পড়ে ওর জীবনে। এই যে চাকরিটা, সেটাও কি আর ও চেয়েছিল! বরং ডিনোদের সঙ্গে আর যাতে দেখা না হয় সেটাই চেয়েছিল। বা আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল, পুশকিনের সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সেটাই চেয়েছিল। কেন কে জানে, পুশকিনকে দেখলেই কেমন একটা নাগরদোলা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো ফিলিং হয় নোঈর! কেন এমন হয়, কে জানে! আর সত্যি বলতে কী, কারণটা নিয়ে নিজেকে বেশি খোঁচাখুচি করতে চায় না নোঈ। মোদ্দা কথা পুশকিনের মুখোমুখি আর যেন না হতে হয়, সেটাই মনেপ্রাণে চেয়ে এসেছিল। তাই সেদিন আইকা কথাটা বলার পরে নোঈ থমকে গিয়েছিল একদম। কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারেনি। শুধু অবাক হয়ে ভাবছিল, আবার সেই কাণ্ডটাই ঘটল!
মা আপত্তি জানিয়েছিল এই কাজের ব্যাপারে। সব ব্যাপারেই মায়ের নিজস্ব লজিক থাকে। এই ব্যাপারেও আছে। আইকা বোঝানোর চেষ্টা করছিল মাকে যে, জীবনে এসব ভাবলে বা দেখলে চলে না। কিন্তু মা কিছুতেই মানছিল না। আর নোঈ সেই তর্কের ফাঁকে নিজে সময় নিচ্ছিল। নিজেকে প্রস্তুত করছিল। নিজেকে বোঝাচ্ছিল যে, সব কিছু থেকে জীবনে পালানো যায় না। ও যত পালাতে চাইবে তত সমস্ত অপ্রিয়, অস্বস্তিকর জিনিস আরও বেশি করে ছুটে আসবে ওর কাছে।
তাই শেষে নিজেই বলেছিল, সিভিটা দেবে।
পরের দিন সকালে ই মেলে সিভি পাঠিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত লাগছিল ওর। কেবলই মনে হচ্ছিল কাজটা হয়ে যাবে। পুশকিনের মুখটা মনে পড়ছিল। ওই এলোমেলো করে তাকিয়ে থাকা। চশমার ওপারের চোখ। ওই মাথা নামিয়ে সামান্য হাসি। তা ছাড়া ওর দিকে পুশকিনের তাকানোর মধ্যে একটা কেমন যেন ব্যাপার আছে। না, কোনও খারাপ কিছু নয়, কিন্তু কিছু আছে একটা। তাই তো ওই চোখের দিকে তাকালে নোঈর মনে হয় প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকা নাগরদোলা থেকে ছিটকে পড়ছে ও!
ডাকটা এসেছিল তার চারদিনের মাথায়। ছোট্ট এক লাইনের একটা ই মেল। ওর ইন্টারভিউয়ের তারিখ আর সময় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল ই মেল-এ।
মা তো প্রথম থেকেই গজগজ করছিল, কিন্তু তাও মনে একটু আশা ছিল যে, নোঈকে হয়তো ইন্টারভিউয়ে ডাকবে না। কিন্তু ওই ই মেলটা আসার পরে মা যেন খেপে উঠেছিল একদম।
সারাদিন নোঈকে বুঝিয়ে সফল না হয়ে রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে বাবাকে নিয়ে পড়েছিল।
বাবা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, “ইন্টারভিউয়ে গাড়ি নিয়ে যাবি কি? না ক্যাব ডেকে নিবি? অত দূর!”
মা ভাত দিচ্ছিল। বাবার এই একটা কথাতেই মা হাত থেকে ভাতের হাতাটা শব্দ করে টেবলে রেখে বলেছিল, “নাও, আরও মাথা খাও মেয়ের! এত আহ্লাদ করার কী আছে মেয়েকে? আদর দিয়ে তো মাথায় তুলে ফেলেছ! দেশে কি আর কোম্পানি নেই? সেখানে কি আর কেউ চাকরি পায় না? ওই কোম্পানিতেই ওকে কাজ করতে হবে?”
বাবা শান্ত গলায় বলেছিল, “তুমি ওকে কেন ওর মতো করে ডিসিশন নিতে বাধা দিচ্ছ? ও যদি নিজের মতো করে ঠিক-ভুল না শেখে, সারা জীবন তো কষ্ট পাবে! আমরা তো আর সারা জীবন ওকে গার্ড করে ঘুরে বেড়াব না!”
মা রাগে ফুঁসছিল, “সারাক্ষণ তোমার শুধু তত্ত্বকথা। আমেরিকার ছেলেটিকে না করার সময় মনে ছিল না যে, এটা একটা ভুল ডিসিশন নেওয়া হচ্ছে! আর এখন ওর দাদার কোম্পানিতে চাকরি করবে!”
বাবা আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার। চিৎকার করে বলেছিল, “এনাফ! আমি সেদিন থেকে শুনছি এসব নিয়ে তুমি অশান্তি করছ! কেন করছ এমন? ওই ছেলেটাকে বিয়ে করেনি তো কী হয়েছে? কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাতে? সব কিছুর একটা লিমিট আছে! তোমার আমেরিকায় থাকা জামাই হলে কি সমাজে মান বাড়বে? মেয়ের পছন্দ নয় যাকে, তার সঙ্গে সে থাকবে কেমন করে? ওর ইচ্ছে হয়েছে এখানে কাজ করার ও করবে! আমি কিছু বলি না মানে এই নয় যে, অন্যায় দেখেও কিছু বলব না! এই নিয়ে আর যদি কোনও কথা হয়, তবে আমি কিন্তু আর চুপ করে থাকব না।”
বাবা আর ভাত না খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল শব্দ করে। নোঈর খারাপ লাগছিল খুব। ওর খিদে পেয়েছিল, কিন্তু এসব দেখে ওরও আর খাবার মুখে তুলতে ইচ্ছে করছিল না। আস্তে করে প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে ও নিজেও উঠে গিয়েছিল।
মা বসেছিল একা। পাথরের মতো। নোঈর কষ্ট হচ্ছিল মায়ের জন্য। কিন্তু ও জানত মাকে এই সময়ে কিছু বললে আর রক্ষে থাকবে না!
আসলে বাবা সংসারের কোনও কিছুতে থাকে না। নিজের কাজ আর হবি নিয়েই থাকে। সেই মানুষটা যে এমন করে রেগে যেতে পারে সেটা নোঈ বুঝতে পারেনি। কোনওদিন বাবাকে রাগতে দেখেনি নোঈ। তাই ওর নিজেরও খুব খারাপ লেগেছিল। মনে হচ্ছিল ওর জন্য বাড়িতে একটা বাজে পরিস্থিতি তৈরি হল!
তবে পরের দিন ঘুম থেকে উঠে নোঈ অবাক হয়ে দেখেছিল যে বাড়ির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। বাবা আবার নিজের কাজে। মা আবার রোজকার মতো এই রাগছে, এই হাসছে!
ও অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে!
বাবা মুচকি হেসে ওর পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, “কাল রাতে আমার জামা টেনে ছিঁড়ে দিয়েছে রাগের চোটে। আমায় বালিশ দিয়ে খুব মেরেছে! তারপর কেঁদে শান্ত হয়েছে! জানিস তো তোর মাকে। পাগলি! আমি কোনওদিন তো বকিনি তাই খুব অভিমান হয়েছিল। তবে তোকে আর কিছু বলবে না। তোর যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই কর।”
নিজেদের গাড়ি নেয়নি নোঈ। মোবাইল থেকে গাড়ি বুক করে নিয়েছিল। ভেবেছিল চাকরি পেলে তখন ভেবে দেখবে রোজ কী করে যাবে!
অফিসটা দেখে বেশ ভাল লেগেছিল নোঈর। বেশ বড়। অনেক উঁচুতে! আর, একদিকের কাচের দেওয়াল দিয়ে বহুদূর দিগন্ত দেখা যায়। বিকেল বলে ওই দৃশ্যটা যেন আরও সুন্দর লাগছিল। গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা রিসেপশন পেরিয়ে ওকে ওপরে পাঠানো হয়েছিল। সেখানেও আর-একটা রিসেপশন। গদি-আঁটা চেয়ার। কয়েকটা গাছ। সামনে টেবিলে জলের গেলাস। আর, একটা যেন চুপচাপ শীত-শীত ভাব! কেউ শ্বাস নিলেও শব্দ শোনা যায় এমন নিস্তব্ধতা! রিসেপশনে বসে সামান্য টেনশন হচ্ছিল ওর। কেন হচ্ছিল কে জানে! ইন্টারভিউ বলে, নাকি পুশকিনের সামনে যেতে হচ্ছে বলে!
প্রায় দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পরে ওকে ডাকা হয়েছিল একটা ঘরে। উঠে দাঁড়িয়ে পাশের কাচে একবার নিজেকে দেখে নিয়েছিল নোঈ। তারপর এগিয়ে গিয়েছিল।
“আরে, কোথায় তুমি?” লু থেকে বেরিয়েই সামনে স্মরণকে দেখল নোঈ। সেই সামান্য এলোমেলো চুল, জামাটা ঠিকমতো গোঁজা নয়, পায়ে স্নিকার! নোঈ মাথা নাড়ল। এই ছেলেটাকে বলে লাভ নেই! সেই একইরকম ভাবে থাকবে।
অফিসে গিয়ে প্রথম দিনেই স্মরণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নোঈর। এমন একটা ছেলে কী করে এই সংস্থায় কাজ করে! এমন ছন্নছাড়া, উসকোখুসকো একটা ছেলেকে কেউ কিছু বলে না!
বলে, আপন বলে। ও সুযোগ পেলেই ঝাড়ে স্মরণকে। কিন্তু ছেলেটা কী দিয়ে তৈরি কে জানে! গায়ে যেন কিছুই লাগে না! আপন যখন খারাপভাবে ওকে বলে, স্মরণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বকাঝকা শেষ হয়ে গেলে নিজেই বলে, “আমি তবে যাই স্যার?”
আপন লোকটাকে প্রথম দিন দেখেই ভাল লাগেনি নোঈর। ইন্টারভিউ দিতে ঢুকেই আপনের মুখে এমন কিছু একটা দেখেছিল নোঈ যেটা ওর ভাল লাগেনি একদম! আর পাশে বসা পুশকিন ওর দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসেছিল মাত্র!
আপন সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বলেছিল, “সিট।”
নোঈ বসার পরে মাথা ঝুঁকিয়ে “গুড আফটারনুন” বললেও আপন উত্তর দেয়নি।
পুশকিন পালটা উইশ করে বলেছিল, “আমরা তোমার সিভি দেখেছি। সাপোর্টিং ডকুমেন্টসও দেখেছি। তুমি আগে যে-কোম্পানিতে কাজ করতে সেটার রেফারেন্সও দেখলাম। তবে একটা কথা, আমাদের এখানে কিন্তু অ্যাকাউন্টসে তেমন করে ভেকেন্সি নেই! তোমার তো মার্কেটিং-এ একটা ডিপ্লোমা আছে। প্রজেক্ট ওরিয়েন্টেড কাজ করতে অসুবিধে নেই তো?”
নোঈ কিছু বলার আগেই, আপন বলেছিল, “আরে, আপত্তি থাকলে এখানে কাজ করা যাবে না। সিম্পল। তা পুশকিন, তুই তো মোটামুটি ঠিক করেই রেখেছিস যে ওকে নিবি, তা এটা বসকে বলেছিস তো?”
আপনের কথার মধ্যে কেমন একটা খোঁচা ছিল। কিন্তু পুশকিন উত্তেজিত না হয়ে স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “না বলে, ওঁর সঙ্গে কনসাল্ট না করে কি আমি কাজ করছি নাকি?”
আপন কেমন একটা চোখে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। তারপর বলেছিল, “প্রজেক্টের কাজ কিন্তু কঠিন। এমনও হতে পারে অন সাইট গেলে সেখানে রাতে থাকতে হতে পারে। লেবারদের মধ্যে থাকা… হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দ্য সিচুয়েশন। তখন কিন্তু ট্যানট্রাম সহ্য করা হবে না। আর-একটা কথা, এখন প্রবেশনারি পিরিয়ড থাকবে ছ’মাস, এরপর তোমার জব ইভ্যালুয়েশন হবে, তারপর পারমানেন্ট। এটা যেন মনে থাকে।”
আপনের কথার ধরন মোটেও ভাল লাগছিল না নোঈর। কিন্তু পুশকিনের মুখে একটা সহজ হাসি ছিল। কোথায় যেন নিরুচ্চারে ভরসা দিচ্ছিল ওকে।
“ওকে স্যার,” নোঈ মাথা নেড়েছিল।
“ক্যান ইউ জয়েন টুমরো?” জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিন।
“শিয়োর স্যার,” নোঈ উঠে দাঁড়িয়েছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় যেন আবছাভাবে আপনের মৃদু গলা শুনতে পেয়েছিল নোঈ। শুনেছিল আপন বলছে, “কেমন ননির পুতুলের মতো চেহারা! দেখ, কতদিন টেকে!”
সেদিন ইন্টারভিউ সেরে কয়েকটা পেপারে সই করতে-করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পুশকিন নিজেই বলেছিল যে, ও গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দেবে ওকে। নোঈ আপত্তি করেছিল, কিন্তু পুশকিন খুব একটা পাত্তা দেয়নি।
ফেরার পথে গাড়িতে পুশকিন প্রায় কথাই বলেনি। সামান্য একটু “হুঁ, হাঁ” করেছে। সামনের সিটে পুশকিনের পাশে বসে নোঈর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। এই গাড়িটায় একদিন উঠতে চায়নি ও। আর আজ এই গাড়িতেই ওকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। সত্যি, জীবন অদ্ভুত! কোন বাঁক থেকে সে যে মানুষকে কোন বাঁকে এনে ফেলে!
শুধু পাড়ার মুখে যখন নোঈ নেমে যেতে চেয়েছিল, তখন পুশকিন বলেছিল, “কেন? আমি ফ্ল্যাটের নীচ অবধি ছেড়ে দিচ্ছি। প্রবলেম আছে?”
নোঈ কী বলবে বুঝতে না পেরে ফস করে বলে ফেলেছিল, “মানে… মা একটু… আসলে…”
হেসেছিল পুশকিন, “উনি চান না তুমি আমাদের কোম্পানিতে জব করো, তাই না? ডিনোর সঙ্গের ব্যাপারটা ওঁর খুব একটা ভাল লাগেনি বোধহয়। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সঙ্গে, চলো। লেটস সর্ট ইট আউট। প্লাস, তোমার বাবাকে আমার চমৎকার লেগেছে।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কেউ নিজে থেকে ওদের বাড়ি যেতে চাইছে! তাকে তো আর না বলা যায় না! আর অবাক হয়ে যাচ্ছিল দেখে যে, মনের মধ্যে অস্বস্তির সঙ্গে কেমন একটা ভাল লাগাও আসছিল নোঈর। পুশকিন বেশ সহজ-সরল মানুষ! জটিলতা যেন ঠিক পছন্দ নয় ওর!
বাড়িতে দরজা খুলেই মা পুশকিনকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল বেশ। নোঈর মাকে নিয়ে ভয় ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখেছিল মা হেসে, নরম ভাবেই কথা বলছে পুশকিনের সঙ্গে।
তবে পুশকিন বসেনি বেশিক্ষণ। আইকা মাগোকে কোলে করে ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। নোঈর কেমন যেন একটা লেগেছিল। আইকা ঘরে ঢুকতেই কি পুশকিন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল? কেন?
পুশকিন উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “আমি তা হলে আসি।”
মা এবার সামান্য হেসে বলেছিল, “আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব! আপনাদের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মীয়তা হতে পারত কিন্তু নোঈটা এমন…”
“ও ঠিক করেছে!” পুশকিন হেসে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে, “ডিনো ইজ় নো ম্যাচ ফর হার। বিদেশে থাকে মানেই যে, সে সাংঘাতিক, সেটা কিন্তু ভাববেন না।”
“কিন্তু তাও…”
মাকে কথাটা শেষ না করতে দিয়ে পুশকিন বলেছিল, “আর নোঈ নিজের যোগ্যতাতেই চাকরিটা পেয়েছে! আমার কথায় নয় কিন্তু! আমাদের বস, তিনি নিজেও সব রিক্রুটের ব্যাপারে সিভি স্ক্রুটিনি করেন! আপনি মনে কোনও দ্বিধা রাখবেন না।”
“তুমি এতক্ষণ বাথরুমে কী করছিলে?” স্মরণ গোলগোল চোখ করে তাকাল ওর দিকে। এমনিতেই ছেলেটার চোখগুলো গোল্লা ধরনের। তার ওপর আবার ওরকম করে তাকিয়ে আছে! ছেলেটা সত্যি অদ্ভুত, একটা মেয়েকে যে এমন প্রশ্ন করতে নেই, সেটাও জানে না।
নোঈ কিছু না বলে হাসল।
স্মরণ বলল, “সে কী! হাসি প্র্যাকটিস করছিলে নাকি? আরে, ওই জয় রয় ডাকছে আমাদের। চলো।”
আবার জয়ের কথা ওঠায় নোঈর বুকের ভেতর যেন দশ কেজির বাটখারা আছড়ে পড়ল। আসলে ও রিসেপশনে বসে দূর থেকে জয়কে দেখেছিল। এবার যে একদম সামনে থেকে ফেস করতে হবে, সেটা ভাবলেই পেটের ভেতরে কেমন যেন পাক দিচ্ছে! তবু মনে মনে নিজেকে শক্ত করল নোঈ।
স্মরণ বলল, “তুমি মাঝে মাঝে পজ় মোডে চলে যাচ্ছ কেন আজ? আসার সময় তো ভালই ছিলে! তেমন হলে তুমি বোসো, আমি গিয়ে ওই কথাটা বলে আসছি। জাস্ট তো একটা লাইন। আপনস্যারের সঙ্গে দেখা করতে বলতে হবে। আমি বলে আসছি।”
স্মরণ নোঈর উত্তরের অপেক্ষা না করে এগোতে গেল। কিন্তু নোঈ স্মরণকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল, “না। আমিই যাব। এটা কাজ। আমায় ঠিক থাকতে হবেই।”
“মানে?” স্মরণ চোখ গোলগোল করে তাকাল আবার, “কোনও কেস আছে নাকি? এমন করে বলছ কেন?”
নোঈ নিজেকে ঠিক করল। তারপর জোর করে হাসল। আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
জয়ের কিউবটা রিসেপশন থেকে সামান্য দূরে। পেছন থেকে জয়কে দেখে নোঈর বুকটা কেঁপে গেল আবার। জয় বড় চুল রেখেছে। পাশ থেকে দাড়ির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চোখে চশমা। মাথা নিচু করে জয় কিছু একটা করছে।
নোঈ একবার আড়চোখে স্মরণকে দেখে নিল। ছেলেটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কী খুঁজছে কে জানে!
“এক্সকিউজ় মি!” নোঈ সাবধানে ডাকল।
জয় না তাকিয়েই প্রথমে “ইয়া,” বলে তারপর মুখ তুলে নোঈকে দেখে চমকে গেল!
“তু…” জয় কেমন যেন ঘাবড়ে গেল!
নোঈ দ্রুত স্মরণকে হাত দিয়ে টেনে সামনে এনে বলল, “আমরা এসেছিলাম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে। আপন বাসু আমাদের পাঠিয়েছেন। আর্টওয়ার্কের হার্ড কপিটা নেব। আর উনি আপনাকে একটা কথা বলতে বলেছেন।”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে নোঈ চোয়াল শক্ত করল। ও যতই চাইছে না, কিন্তু তবু ওর চোখ বারবার খুঁটিয়ে দেখছে জয়কে। চশমার ফ্রেমটা নতুন। শার্টের মাঝের বোতামটা অর্ধেক লাগানো। দাড়িটা ট্রিম করা। লম্বা চুলে বার্গেন্ডি কালার। নাকের ব্রিজের পাশে সেই তিল। কানের লতির নীচে একটা ছোট্ট জড়ুল। আঃ! কী করছে কী ও! আচ্ছা জয় কি বুঝতে পারছে এটা? ওকে কি হ্যাংলা ভাবছে?
জয়ও নিজেকে সামলাল। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন করে বলল, “বাবা, তুই এভাবে আমায় আপনি-আজ্ঞে করছিস কেন? আমি তোর ভাশুর নাকি?”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না।
স্মরণ বলল, “আপনারা একে অপরকে চেনেন?”
“চিনি মানে?” জয় হাসল, “চিনি, গুড়, সুগার, সুগার ফ্রি সব।”
নোঈ বলল, “এটা অফিস ম্যাটার। আমাদের কিছু প্রোটোকল মেনটেন করা উচিত।”
জয় হাসল, “দূর, কী যে বলিস! আমরা এখানে অত আপটাইট নই। তা তোদের আপন কী বলেছেন?”
নোঈ বলল, “স্যার বলেছেন আপনাকে একবার দেখা করতে। মানে ইন পার্সন।”
“অ,” মাথা নাড়ল জয়, “এই কেস। বুঝেছি। তা আর্টওয়ার্ক পেয়েছিস তো?”
স্মরণ বলল, “হ্যাঁ, ওই রিসেপশনে রাখা আছে, বেরোনোর সময় নিয়ে যাব। আপনি কিন্তু একবার গিয়ে দেখাটা করবেন। স্যার বলেছেন এটা আর্জেন্ট।”
“কফি খাবি?” জয় মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে হাসল।
নোঈর মনে হল বুকের কোনও এক সূদর খাতে ঝুপঝুপ করে নদীর পাড় ভেঙে পড়ল। নোঈ জানে হাসির সঙ্গে টোল জেগে উঠেছে। কিন্তু দাড়ি বলে বোঝা যাচ্ছে না।
“না, আমাদের যেতে হবে,” নোঈ মাথা নামিয়ে নিল, “আপনি শুধু একবার দেখা করে নেবেন, থ্যাঙ্কস।”
“আরে, তুই এমন করছিস কেন বল তো?” জয় এবার যেন সামান্য বিরক্ত হল, “আপনি-আপনি করছিস কেন? তোর এসব ওভার রি-অ্যাকশন আমার ভাল লাগে না!”
নোঈ আর পারল না। শুধু চাপা গলায় বলল, “ভাল যে লাগে না সেটা জানি। বাই।”
মে মাসের আঠারো তারিখ আজ। আকাশ থেকে কেউ যেন গলন্ত লাভা ঢেলে দিচ্ছে কলকাতার মাথায়। নোঈ আকাশের দিকে তাকাল। এই রংচটা নীল বেডকভারটা কবে থেকে যে টাঙানো আছে মাথার ওপর! ওর মনে হল পাখিরা যে রোস্ট হয়ে মাটিতে টুপটুপ করে খসে পড়ছে না, সেটাই অনেক ভাগ্যের।
পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় বেশ ভিড়। স্মরণ হাতে আর্টওয়ার্কের বড় ফোল্ডারটা নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আজ আর রাজারহাটের অফিসে যেতে হবে না। এই বিকেল সোয়া চারটের সময় অতদূরে গেলে পৌঁছতেই ছ’টা বেজে যাবে।
স্মরণ বলল, “আইসক্রিম তেষ্টা পেয়েছে, খাবে?”
“কী?” হাসল নোঈ।
স্মরণ বলল, “বলছি, আইসক্রিম খাবে? সামনেই হবি সেন্টার। খাবে?”
নোঈ বলল, “না, আমি ঠিক মানে…”
স্মরণ বলল, “আরে বাবা, আমি তোমায় এমনি খেতে বললাম। আমার অন্য উদ্দেশ্য নেই! তুমি যা ভালনারেবল স্টেটে আছ, তাই… প্যাঁও রেগে গেলে বা মনখারাপ করলেই আমি ওকে আইসক্রিম খাইয়ে দিই।”
“কে?” নোঈ বুঝতে পারল না ঠিক!
“আরে প্যাঁও! আমার প্রেমিকা!” স্মরণ বলল, “দারুণ সুন্দর দেখতে প্যাঁওকে। ছোট্ট মুকুট কপাল। এইটুকু ঠোঁট। জাপানি পার্লের মতো দাঁত। থুতনিতে একটা আলতো ডিপ্রেশন আছে। নাকের দু’পাশে ছোট্ট ফুলস্টপের মতো দুটো তিল। থুতনিতেও আর-একটা। আর হাতের আঙুলগুলো যা দারুণ না! ওঃ!”
স্মরণ বর্ণনা দিতে-দিতে নিজেই খুশি হয়ে উঠল। বলল, “তবে একটা ব্যাপার, প্যাঁও খুব রাগী কিন্তু। সিংহ লগ্ন তো! মানে আমার সিংহী আর কী। আমায় খুব বকে। মাঝে মাঝে তাড়িয়েও দেয়। পরে আবার কাছে ডাকে। মেয়ে নয়, পুরো মুডের স্পেকট্রাম। কতরকমের মেজাজ চাই? সব রকম দেখিয়ে দেবে। আসলে ও গান গায় তো খুব সুন্দর, তাই রাগটা একটু বেশি!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। ওর মনটা মোটেই ভাল লাগছে না। বরং সেই নাম-না-জানা কোটর থেকে আবার পর্বতারোহীটি বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার মধ্যে স্মরণের এই সব কথা ভাল লাগছে না মোটেই।
স্মরণ বলল, “জয়ের জন্য তুমি বাথরুমে ঢুকে কান্নাকাটি করছিলে?”
“কী?” আচমকা এমন একটা কথায় নোঈ বেশ হকচকিয়ে গেল।
স্মরণ বলল, “ও তোমায় ‘তুই’ করে কথা বলছিল। এমন ভাব করছিল, যেন সব কিছু ঠিক আছে, আর তুমি ঠিক উলটোভাবে ওর সঙ্গে একটা আরোপিত দূরত্ব দেখাচ্ছিলে। স্ট্রেস দিচ্ছিলে ‘আপনি’ শব্দটার ওপর। ওর ওই ক্যাজ়ুয়াল বিহেভিয়ার আর তোমার অতিরিক্ত চোয়াল শক্ত করে ওর সঙ্গে দূরত্ব রাখার চেষ্টা তো একটা জিনিসই স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়।”
“কী বুঝিয়ে দেয়?” নোঈ ভুরু কুঁচকে তাকাল।
স্মরণ হেসে বলল, “এটাই বোঝায় যে, ও মোটেই ক্যাজ়ুয়াল নয়। অকোয়ার্ড সিচুয়েশানে পড়ে সেখান থেকে নিজের মুখ রক্ষা করছে। আর তুমি কিছুতেই ওকে সেই সিচুয়েশন থেকে বেরোতে দিতে চাও না। ওকে একটা গিল্ট দিয়ে কোণঠাসা করতে চাও।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। এভাবে যে কেউ কলিগের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে পারে, ও ভাবতেই পারে না! কিন্তু স্মরণের এসব বোধ আছে বলে মনে হয় না!
স্মরণ আবার বলল, “ওই অনুস্বরের মতো টিপ মুছে ফেলে যখন বাথরুম থেকে বেরোলে, বুঝলাম কিছু কেস হয়েছে। তারপর জয়বাবুকে দেখে তো নিশ্চিত হলাম কী কেস।”
নোঈ আর নিতে পারল না। সামান্য গম্ভীর গলায় বলল, “প্লিজ়। তোমার মনে হচ্ছে না যে, তুমি বড্ড বেশি জাজমেন্টাল হয়ে যাচ্ছ?”
স্মরণ বলল, “দূর! এগুলো তো মনে এল বলে বললাম। সারাক্ষণ তোমরা ফেসবুকে সেলফি দেবে, কী করছ তার স্টেটাস দেবে। কেমন ফিল করছ তা বলবে। আর কেউ একটু কিছু বললেই এমন ভাব দেখাবে, যেন সবার মনের ভেতর একটা করে নিউক্লিয়ার বোমার লঞ্চ কোড লুকোনো আছে! সেটা জানার চেষ্টা চলছে। তোমার যা হয়েছে সেটা কমন ব্যাপার। এটাকে এত গুরুত্ব দিয়ো না। যাই হোক, তুমি যখন বাথরুমে ছিলে আমায় ফোন করেছিলেন পুশকিনস্যার। বলছিলেন, কাজ শেষ হলে একবার রাসেল স্ট্রিটের ওখানে যেতে। উনি আসবেন। আমি বলেছি আমায় ডালহৌসি যেতে হবে। তুমি চলে যাবে। এখান থেকে একটু হেঁটে গেলেই পেয়ে যাবে অফিসটা। দেখবে, একটা পুরনো চাইনিজ় লন্ড্রি আছে। তার পাশেই।”
নোঈ বলল, “ঠিক আছে। তুমি তা হলে কাল ওই আর্টওয়ার্কটা নিয়ে যেয়ো মনে করে। আমি আসছি।”
স্মরণ হেসে বুড়ো আঙুল তুলে ওকে দেখিয়ে পা চালিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেল।
নোঈ দাঁড়াল একটু। এই পার্ক স্ট্রিটে আসতে নোঈর ভাল লাগে খুব। কেমন একটা পুরনো অভিজাত কলকাতা যেন আজও বেঁচে আছে এই পার্ক স্ট্রিটে। এই চওড়া রাস্তা। পুরনো ধাঁচের বাড়িঘর। কাঠের প্যানেলওয়ালা রেস্তরাঁ। সব মিলিয়ে সময়টা কেমন যেন কলোনিয়ান ক্যালকাটায় ফিরে যায়!
“দিদি, একটা চুইং গাম কিনবেন?” আচমকা সামনে একটা খয়াটে চেহারার লোক এসে দাঁড়াল।
লোকটাকে ভাল করে দেখল নোঈ। কালো, রোগা। কানে একটা ছোট্ট পাথরের দুল। গায়ের ডোরাকাটা গেঞ্জিটা কতদিন যে কাচে না কে জানে! লোকটার গা থেকে সস্তা মদের গন্ধ আসছে।
“দিদি, পিলিজ। খিদে পেয়েছে। দুটো পড়ে আছে চুইংগাম। পিলিজ!” লোকটা কেমন যেন এগিয়ে আসছে নোঈর দিকে। নোঈ ভয় পেয়ে গেল।
“এই ভাগ, ভাগ এখান থেকে!”
নোঈ সামান্য ঘাবড়ে গেল। দেখল পেছন থেকে এসে লোকটাকে কড়া ধমক দিল জয়।
লোকটা গুটিয়ে গেল কিছুটা।
জয় আবার বলল, “ভাগ বলছি না! পাতা খাবি এখন বসে আর বলছিস খিদে পেয়েছে! ভাগ!”
লোকটা চোয়াল শক্ত করে একবার দেখল জয়কে, তারপর মাথা নামিয়ে চলে গেল।
নোঈ তাকাল জয়ের দিকে। ও কী করছে এখানে?
জয় বলল, “আমি সিগারেট খেতে নীচে নেমেছি। তোর জন্য নয়।”
নোঈ মাথা নিচু করে নিল। চলে যেতে হবে ওকে এখান থেকে। পুশকিন ডেকেছে। কিন্তু যেতে পারছে না। জয় এত কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর গায়ের সেই ‘হট ওয়াটার’ পারফিউমের সঙ্গে তামাক মেশানো গন্ধ! সেই বিকেলবেলা! নোঈর গায়ে নিজের অজান্তেই কাঁটা দিয়ে উঠল। জীবন খুব নিষ্ঠুর। সব কিছু সাজিয়ে সামনে মেলে ধরেও এমন একটা ফাঁক রেখে দেয় যে, জীবনটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে!
নোঈ চোয়াল শক্ত করে বলল, “এভাবে গায়ে পড়ে অপমান করছিস কেন? আমি কি বলেছি, তুই আমার জন্য নীচে নেমে এসেছিস?”
জয় হাসল। বলল, “দেখ, এভাবে যে দেখা হবে, সেটা তো আমরা জানতাম না। কিন্তু কোয়াইট ফ্র্যাঙ্কলি, আর দেখা না হলেই বোধহয় ভাল হবে। নেক্সট টাইম তুই আসিস না।”
“মানে?” নোঈর বিরক্ত লাগল, “আমি চাকরি করি। সেই কাজে দরকার পড়লে আবার আসব।”
জয় মাথা নাড়ল। হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিভিয়ে বলল, “চাকরি? হাঃ হাঃ! তোদের আবার চাকরি! টাইম পাস বল? শখ। আর আসবি মানে? মানে আবার সেই… ওঃ… অনেক তো হল নোঈ, এবার ছাড়। আর কতদিন? এটা প্রেম না, ইগো আর অবসেশন! প্লাস আমি চেষ্টা করছি, বিদেশে চাকরির কথা হচ্ছে। বাই বাই ক্যালকাটা। বুঝলি?”
জয় হেসে ওদের যা কিছু সম্পর্ক আর বিচ্ছেদ ছিল সব আকাশে ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। ঢুকে গেল বড় বাড়িটার মধ্যে। আর নোঈর মনে হল গোটা পার্ক স্ট্রিটটা যেন জয়ের সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল ওর সামনে থেকে! ওর মনে হল সামনের রাস্তাটা কেমন যেন টলছে! মনে হল, আসলে পাখি নয়, ওর নিজের ঝলসানো মাংস টুপটুপ করে খসে পড়ছে আকাশ থেকে! মনে হল এই গ্রীষ্মের যেন কোনও শেষ নেই। এক অক্লান্ত আগুন, যুগের পর যুগ ধরে, ঝলসে, পুড়িয়ে দিয়ে যাবে সবকিছু। আর সব শেষে মাটিতে পড়ে থাকবে ওই পিষে ফেলা সিগারেটের মতো কিছু আধপোড়া মানুষ আর তাদের নরম, একাকী ইচ্ছেগুলো।
নোঈ দেখল ওই চুইংগাম বিক্রেতা ছেলেটা আবার ফিরে আসছে। ও ব্যাগ খুলল এবার। কিছু কার্ড, কাগজ আর কয়েকটা একশো টাকার নোটের পাশে চারটে দশ টাকার নোট দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে একটা সেই পুরনো পাঁজর ওর।
নোঈ চোখ বন্ধ করে হাত বাড়াল। দেখা যাক কোন নোটটা হাতে ওঠে। যদি সেই নোটটা ওঠে, তবে সেটাই দিয়ে দেবে। আজ আর কোনও পিছুটান রাখবে না।
হাতে পাতলা কাগজগুলো ঠেকল নোঈর। ও চিন্তা না করে তুলে নিল একটা। কী উঠল হাতে? ও কী চায়? কোন নোটটা উঠুক? এখনও, আজকের পরেও কি ওর মনে হবে ‘রেখে দিই’ ওই কাগজের টুকরোটা?
আবার মদের গন্ধ নাকে আসছে। ঘ্যানঘ্যানে গলাটা শোনা যাচ্ছে। নোঈ নিজেকে প্রস্তুত করল। তারপর চোখ খুলে তাকাল হাতের নোটটার দিকে!
.
১২. রাধিয়া
উত্তর কলকাতাটাকে কেমন একটা বাতিল চিলেকোঠার মতো লাগে রাধিয়ার। ঘিঞ্জি রাস্তা, রংচটা বৃদ্ধ বাড়িঘর, ধুলোমাখা রুগ্ণ গাছ, ছেঁড়া পোস্টার, বেখেয়ালি হকার। সব নিয়ে মনে হয় বাতিল আর অতিরিক্ত জিনিসপত্র কে যেন দলামোচড়া করে ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা ঘরের ভেতরে! কেন এমন করে রাখা হয়েছে শহরটাকে? কেন এমন একটা শহর চলে যায় দখলদারদের হাতে?
রাধিয়ার মনে সারাক্ষণ এমন নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কাকে কী বলবে?
আজ ইউনিভার্সিটিতে পলি আর বুদা এসেছে, বাকিরা কেউ আসেনি। ক্লাসও তেমন ছিল না। তাই ভেবেছিল বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু পলি তো ছাড়ার পাত্রী নয়।
বলেছে, “এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে কী করবি? আমার সঙ্গে চল। ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’-এ নিয়ে যাব চল তোকে। কতদিন যেতে বলেছি, তুই তো শুনবি না!”
কলেজ স্ট্রিটটা আজ যেন উপচে পড়ছে! সামনে জামাইষষ্ঠী, কিন্তু তাতে কী? আজকাল তো আর মানুষজন কেউ কাউকে খুব একটা বই-টই উপহার দেয় না! বই পড়াকে লোকে হয় অবজ্ঞার চোখে দেখে, নয়তো ভাবে শো অফ করছে! তাই পালাপার্বণে বইয়ের বাজারে ভিড় দেখলে খুব আশ্চর্য হয় রাধিয়া!
মধুদা গাড়িটা পার্ক করেছে সেই সূর্য সেন স্ট্রিটে বিখ্যাত শরবতের দোকানটার কাছে। এখানে থেকে ওই অবধি হেঁটে যেতে বেশ কসরত করতে হবে।
তবে তার আগে একটা কাজ আছে। ঠাকুরমা বলেছে কয়েকটা বইয়ের অর্ডার দিয়ে আসতে। কোন এক স্কুলে দিতে হবে। এসবের জন্য মধুদা আছে। বাবার অফিসের লোকজন আছে। কিন্তু ঠাকুরমা রাধিয়ার ওপরই জোর দেয় এসব করার জন্য। বলে, “তোর আপত্তি কোথায়? অত পুতুপুতু করে থাকতে হবে না। তুই কানাইয়ের দোকানে গিয়ে আমার নাম করে অর্ডার দিয়ে আসবি। অন্য লোক গিয়ে ডেলিভারি নিয়ে আসবে। বুঝলি?”
ঠাকুরমা অদ্ভুত মানুষ। ওদের বাড়িতে থাকলেও কেমন একা-একাই থাকে। বড় বাড়ি বলে অসুবিধেও হয় না। আসলে এইসব বাড়িঘর, নানারকমের ব্যাবসাপত্র, এই সবকিছু ঠাকুরমার নামেই। তবে বাবাও মালিক গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। আর রোজকার ব্যাবসা বাবাই দেখে!
ঠাকুরমা বলে, “এত নানা ধরনের ব্যাবসা, আমার আর ভাল লাগে না। সত্যি, বিষয় বিষ! জানিস রাধি, আমি শ্বশুরঠাকুরকে বলেছিলাম যে, আমার নামে এসব দিয়ে যাবেন না। কিন্তু উনি শোনেননি। নিজের ছেলের চেয়ে আমাকে বেশি বিশ্বাস করতেন। লোকটা শেষজীবনে কেমন পালটে গিয়েছিলেন। সেই রাগ বা তেজ, কিছুই ছিল না।”
রাধিয়ার এসব শুনতে ভাল লাগে না। ওদের যে অনেক টাকা সেটা ও জানে। কিন্তু কী-কী ব্যাবসা আছে, কোথায়-কোথায় কী আছে সেসব নিয়ে ওর আগ্রহ নেই।
ঠাকুরমা যদিও বলে এসব একটু জেনে নিতে, কিন্তু রাধিয়া কিছুতেই কিছু শুনতে চায় না। কিছুদিন আগে ওই যে রাধিয়া সোনাঝুরিতে গেল, সেখানেও ওদের একটা জুটমিল আছে। ঠাকুরমা সোনাঝুরির কথা শুনে শুধু বলেছিল, “তুই যাচ্ছিস? যা। আমি যে কত বছর যাইনি!”
রাধিয়ার অবাক লেগেছিল, “কেন যাওনি ঠাকুমা? খুব তো কিছু দূর নয়। আর আমাদের তো একটা মিল আছে। তা হলে?”
ঠাকুরমা বলেছিল, “ওদিকে আর যাব না আমি। যে-জীবন ওখানে ফেলে এসেছি, সেই জীবন কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেয়নি আমায়।”
“কিন্তু ওখানে অনেক সম্পত্তি আছে না তোমার নামে?”
“শ্বশুরমশাই খুব ভালবাসতেন আমায়। তাই কিছু জিনিস আমার নামে করে গিয়েছেন। কিন্তু নামে করা মানেই তো সেটা আমার নয়! আমার আর কিছুই নয়। শুধু প্রশ্ন ছাড়া আমার আর কিছু নেই,” ঠাকুরমা আর কিছু না বলে চুপ করে গিয়েছিল।
“সোনাঝুরির কথা তুমি কিছু বলতে চাও না কেন ঠাকুমা?”
“কিছু বলার নেই রে রাধি। সেই জীবনটাই নেই তো আর কী বলব!”
রাধিয়া বোঝে না ব্যাপারটা কী। সোনাঝুরির প্রসঙ্গ উঠলেই এমন ম্রিয়মাণভাবে কেন কথা বলে ঠাকুরমা! তবে এই নিয়ে বেশি প্রশ্ন করে না ও। কাউকে কোনও ব্যাপারে জোর করা ওর পছন্দ নয়।
ঠাকুরমার দানধ্যানের হাত খুব। নিজের শ্বশুরমশাইয়ের নামে একটা বৃত্তি চালু করছে। বিভিন্ন অনাথাশ্রমে বার্ষিক একটা টাকা দেয়। আরও নানা কিছু করে। পলিদের এই ওল্ড এজ হোমটাতেও প্রতিমাসে একটা করে টাকা পাঠায় ঠাকুরমা।
ঠাকুরমা বলে, “ভগবান অনেক দিয়েছেন। আমি না হয় তার থেকে একটু দিলাম। তাতে আমার তো কমছে না!”
আজ যে এই বইয়ের অর্ডার দেওয়ার ব্যাপার আছে, সেটাও এমন একটা কাজের অঙ্গ।
রাধিয়া আপত্তি করেনি। ওর এসব ছোটখাটো কাজ ভালই লাগে। মা সারাক্ষণ ওকে আগলে রাখে। তুলোয় মুড়ে রাখে। কিন্তু রাধিয়ার সেটা ভাল লাগে না। ওরও ইচ্ছে করে আর-পাঁচজনের মতো ঘুরতে। কিন্তু পারে না। সারাক্ষণ গাড়ি করে ঘোরা! এসিতে বসে থাকতে-থাকতে মাঝে মাঝে ভুলে যায় কলকাতায় কোন ঋতু চলছে!
মায়ের কথা হল বাইরে এত পলিউশন, তোর স্কিন আর চুল খারাপ হয়ে যাবে। আরে বাবা, মানুষ কি শুধু রূপটুকু নাকি? ওর অন্য বান্ধবীরা কেমন প্রজাপতির মতো স্বাধীনভাবে উড়ে-ঘুরে বেড়ায়!
মায়ের তো কলকাতাতেও ওকে পড়তে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। ওর দুই মামা ইংল্যান্ডে থাকে। মা খুব জেদ ধরেছিল রাধিয়াকে ওখানে পড়তে পাঠাবে। কিন্তু রাধিয়াও জেদ করে যায়নি। আর শুধু রাধিয়াই নয়। ঠাকুরমাও রাধিয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আসলে ঠাকুরমাকে টপকে ওদের বাড়িতে কিছু হয় না। মা এই নিয়ে বাবার কাছে অনুযোগ করে। বলে, “আমরা এত বড় হলাম, তাও ওঁর কথামতো কেন আমায় চলতে হবে? আমার মেয়ে, তাকে আমি আমার ইচ্ছেমতো পড়াতেও পারব না! ওই দেশে গিয়ে পড়লে ওর কেরিয়ার কত ভাল হত!”
বাবা বেশি কথার মানুষ নয়। সঙ্গে কিছুটা রাগীও আছে। মায়ের এক কথা বারবার বলায় বলেছিল, “ওর যেখানে ভাল লাগবে পড়বে। তুমি এই নিয়ে আর অশান্তি কোরো না। আর রাধি তো নিজেই এখানে থাকতে চায়!”
রাধিয়া বোঝে কেন এমন বলে মা। আসলে মায়ের নিজের ইচ্ছে ছিল বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া করার। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সেটা আর হয়নি। তবে ঠাকুরমা বা বাবা নিষেধ করেনি লেখাপড়া করতে। কিন্তু মায়ের খুব অভিমান হয়েছিল নিজের বাবা-মায়ের ওপর। তাই নিজেই আর পড়েনি।
মা ওকে বলে, “তোকে তো আমি বিয়ে করতে বলব না। তুই ইচ্ছে হলে বিয়ে করবি, না হলে করবি না। কিন্তু লেখাপড়া থামাবি না।”
মায়ের মধ্যে ওর মনে হয়, দুটো মানুষ আছে। একটা মানুষ কেমন যেন স্নব, অহংকারী। আর আর-একজন বুকের ভেতরে চাপা পড়ে যাওয়া মনখারাপ করা এক মানুষ। মাঝে মাঝে মাকে ঠিক বুঝতে পারে না ও।
“তুই কি রাস্তা ক্রস করবি? নাকি মোটামুটি রাত অবধি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকার প্ল্যান আছে তোর?”
পলির কথায় পাশে তাকাল রাধিয়া।
“হ্যাঁ, এই তো!” রাধিয়া হাসল।
পলি বলল, “তাড়াতাড়ি চল। আমায় হোমে ছ’টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। তারপর স্যারের বাড়ি যাব!”
“যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি। অমন তাড়া দিচ্ছিস কেন?” রাধিয়া হাসল, “আর রোজ স্যারের বাড়ি যাস কেন? রোজ পড়া থাকে?”
“কাজ থাকে, পড়া, নোটস… সে অনেক ব্যাপার, আমার কথা ছাড়, তুই চল,” পলি ওকে তাড়া দিল।
“তুই আজকাল মাঝে মাঝে কী চিন্তা করিস রে? অন্যমনস্ক হয়ে যাস হঠাৎ-হঠাৎ! কী হয়েছে তোর? জিতেনের ভাগ্য খুলল নাকি?” বুদা পাশ থেকে ফুট কাটল।
“খালি বাজে কথা,” রাধিয়া বিরক্ত হল, “কী সব বলিস না!”
জিতেন ওদের সঙ্গেই ইংরেজিতে এমএ করছে। আর সেই প্রথম থেকেই রাধিয়ার পেছনে পড়ে আছে। ইউনিভার্সিটির আর কারও জানতে বাকি নেই যে, জিতেন রাধিয়ার জন্য পাগল!
রাধিয়ার বিরক্ত লাগে এসব। এমন গায়ে-পড়া মানুষ দেখলে মনে হয় পালিয়ে যায়। জিতেন আবার বিশ্ব-আঁতেল! কীসব ম্যাগাজ়িন বের করে! ঘাড় অবধি লম্বা চুল রাখে ছেলেটা। মাঝে মাঝে আবার খোঁপাও করে। সারাক্ষণ রংবেরঙের পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে থাকে। কাঁধে একটা তাপ্পিমারা ঝোলা। স্নান করে কি না কে জানে! সারাক্ষণ সিগারেট জ্বলছে মুখে। দেখলেই ঘেন্না লাগে রাধিয়ার। আর মুখে সব সময় বড়-বড় কথা। জয়েস, কাফকা, বোর্হেস, লোরকা, কাম্যু, ইয়োসা… আরও কত কী নাম! এদিকে নিজেরা যা লেখে, সেসব ওদের ওই ধরাচুড়ো পরা গ্রুপটা ছাড়া আর কেউ বোঝে কি না কেউ জানে না। ভান দেখলেই গা-পিত্তি জ্বলে রাধিয়ার। ওর মনে হয় যারা অযোগ্য কিন্তু লোভী, তারাই ঘ্যাম আর ভান নিয়ে ঘোরে।
কফি হাউসটা বাঁ দিকে রেখে প্রথম বাঁ হাতের রাস্তাটা শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট। সেই রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই কানাইদার দোকান।
গল্পের বইটই এই মানুষটার কাছ থেকেই কেনে রাধিয়া। কানাইদা খুব ভাল মানুষ। সারাক্ষণ পান মুখে থাকে। রাজ্যের বাংলা বইয়ের নাম আর পাবলিশার্সের নাম মুখস্থ!
কানাইদা একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর বসে হাতপাখার হাওয়া খাচ্ছিল। কানাইদার দুই ছেলেই মূলত দোকান দেখে এখন।
রাস্তার ওপরেই দোকান। বেশ ভিড়। দাঁড়ানোর জায়গা নেই। তাও রাধিয়া দু’জন মানুষকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল কানাইদার সামনে।
কানাইদার হাতপাখা থেমে গেল। এক গাল হেসে বলল, “আরে, কেমন আছ? অনেকদিন আসোনি!”
রাধিয়া হাসল। তারপর ব্যাগের ভিতর থেকে চার ভাঁজ করা কাগজ বের করে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এখানে দুশোটা বই আছে। ঠাকুমা যেমন পাঠায় আর কী। কালকে এলে কি পাওয়া যাবে?”
কানাইদা কাগজটা হাতে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে বাইফোকাল চশমার তলা দিয়ে দেখল। তারপর বলল, “আচ্ছা, হয়ে যাবে। তোমাদের যে লোক আসবে তাকে বোলো আসার আগে একবার যেন আমায় ফোন করে নেয়। আসলে রাস্তার ওপরে তো এভাবে এত বই রাখা যায় না! তাই অন্য জায়গায় রেখে দেব। উনি এলে তখন দিয়ে দেব।”
“কিছু টাকা দিয়ে যাব?”
কানাইদা হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “না গো দিদিমণি, যখন নেবে তখন দিয়ো।”
রাধিয়া আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পলি পাশ থেকে খোঁচা মারল। মেয়েটা খুব তাড়া দিচ্ছে আজ!
রাধিয়া হাসল কানাইদার দিকে তাকিয়ে তারপর বলল, “আমি তা হলে আসি?”
“গাড়ি কোথায় রেখেছ?” কানাইদা জিজ্ঞেস করলেন।
“ওই সামনেই… আসছি…” রাধিয়া হেসে পেছন ফিরল।
এই রাস্তাটা আরওই ঘিঞ্জি! তার মধ্যে একটা ঠেলাওয়ালা তার বিরাট বড় ঠেলা ঢুকিয়ে দিয়ে রাস্তার মুখটা বন্ধ করে দিয়েছে প্রায়।
বুদা বিরক্ত হয়ে বলল, “নাও ঠেলার জন্য এখন ঠেলা বোঝো!”
রাধিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ও দেখতে পেল ছেলেটাকে। রোগা-পাতলা, বেঁটে, এক মাথা উসকোখুসকো চুল। চোখে চশমা। শার্টটা অর্ধেক গোঁজা আর অর্ধেক বের করা।
আরে, এই ছেলেটাকে দেখেছিল না সুম্পার জন্মদিনে! কী যেন নাম! হ্যাঁ মনে পড়েছে। স্মরণ।
কিন্তু ছেলেটা করছে কী? রাধিয়া দেখল, বড় ঠেলাটার পেছনের দিকটা ধরে টানছে স্মরণ। ওর মনে হল, এই ভিড়টা থেকে ঠেলাটাকে বের করার জন্য এমন করছে ছেলেটা। এবার একটা মেয়েকে দেখল ও। ফরসা। কাটা-কাটা মুখ চোখ। চশমা পরা। একটা জিন্স আর সাদা কালো ডোরাকাটা একটা গোল গলা টি-শার্ট পরে রয়েছে মেয়েটা। আর স্মরণকে দু’হাত দিয়ে টেনে সরানোর চেষ্টা করছে ও।
পলি বলল, “ওই দেখ কোন মক্কেল! কী করছে মালটা?”
রাধিয়া দেখল বুদা হাসছে। আর সত্যি বলতে কী, আরও নানা লোকজন হাসছে।
রাধিয়ার খারাপ লাগল। সবাই ঠেলাওয়ালাটাকে গালাগালি করছে। কিন্তু সে বেচারা রুজির জন্য বেরিয়েছে। আর শুধু ঠেলাওয়ালার দোষ নয় মোটেই। রাস্তাটাকেই সবাই মিলে এমন করে রেখেছে যে, জট পাকিয়ে গিয়েছে। আর বেচারা স্মরণ সেই জট খোলার চেষ্টা করছে বলে সবাই ওকে দেখে হাসছে।
মাঝে মাঝে এইসব দেখে মনখারাপ হয়ে যায় রাধিয়ার। যে কোনও কিছু করার চেষ্টা করে তাকে নিয়েই পৃথিবীতে হাসাহাসি হয়। এখন যেমন হল।
ও দ্রুত এগোল। মানুষের ফাঁকফোকর দিয়ে গলে, দোকানের সিঁড়িতে উঠে, কাঠের টুল টপকে ও গিয়ে পৌঁছল ওদের সামনে।
“স্মরণ, কী করছ?”
স্মরণ ফিরে তাকাল। নাক থেকে পিছলে চশমাটা নেমে এসেছে নীচে। ও চশমাটা তুলে নাক কুঁচকে সেটাকে সেট করে বলল, “আরে রাধিয়া! দেখছ না কী কেস! এভাবে কেউ এখানে ঠেলা ঢোকায়! এটাকে বের না করে দিলে গোটা রাস্তাটা দাঁড়িয়ে যাবে!”
“ছাড়ো, ছাড়ো বলছি! ছাড়ো তুমি…” পাশ থেকে মেয়েটা আলতো করে এবার থাপ্পড় মারল স্মরণের কাঁধে।
স্মরণ তাও ছাড়ল না। তবে রাধিয়াকে এগিয়ে যেতে দেখেই বোধহয় এবার আরও কিছু মানুষজন মজা দেখা বাদ দিয়ে এসে হাত লাগাল। তার ফলে ঠেলাটা সোজা হয়ে এগিয়ে যেতে পারল। আর জট খুলে রাস্তাও স্বাভাবিক হয়ে গেল।
পলি আর বুদা এসে দাঁড়াল রাধিয়ার পেছনে। ওদের দেখে স্মরণ হাসল, “আরে, তোমরা সবাই এসেছ! দারুণ তো!”
জয়তী আর রাখি আসেনি। কিন্তু সেটা আর বলল না রাধিয়া।
ও শুধু বলল, “আমাদের তো ইউনিভার্সিটি এখানে। তোমরা? বই কিনতে?”
“আরে না, না,” স্মরণ হাসল, “কিছু স্টেশনারি কিনতে এসেছি। আমাদের আপনস্যার পাঠালেন। আর স্যারের কিছু বইও কিনতে হবে। যাই হোক, আলাপ করিয়ে দিই। ও আমাদের অফিসেই আছে। নাম নোঈ।”
নোঈ হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝোঁকাল। এবার মেয়েটাকে আরও ভাল করে দেখল রাধিয়া। খুব সুন্দর দেখতে। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন করতে পারে এমন স্কিন! এই বিকেলের ধুলোটে আলোতেও মুখটা ঝলমল করছে।
“আমি রাধিয়া।”
আশপাশ থেকে ভ্যান, গাড়ি, লোকজন ক্রমাগত ওদের ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে।
স্মরণ বিরক্ত হয়ে বলল, “এটা এমন একটা জায়গা যে, শান্তিতে হাঁটতেও পারবে না কেউ! তা সেদিনের পরে তো আর দেখাও হল না তোমাদের সঙ্গে!”
রাধিয়া বুঝল স্মরণের তেমন কোনও কথা নেই বলার। ও পলির দিকে তাকাল।
এসব অবস্থায় পলি সোজাসাপটা কথা বলতে পারে ভাল।
পলি বুঝল ইঙ্গিতটা। ও বলল, “ঠিক আছে স্মরণ, আমরা তা হলে আসি। আসলে উই আর ইন আ হারি।”
“তাই?” স্মরণ হাসল। যেন পলি খুব হাসির কথা বলেছে, “আমার কোনও তাড়া নেই। বসের পারসোনাল কাজে এসেছি। তোমরা মুড়ি খাবে? কলেজ স্কোয়ারে মাখে একজন। ওই দিকটায় বসে। খাবে?”
“আঃ,” নোঈ বলল, “ওদের তাড়া আছে স্মরণ!”
“ও আচ্ছা,” স্মরণ মাথা নাড়ল, “কিন্তু মুড়ি খেতে আর কতক্ষণ টাইম লাগবে?”
বুদা জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্যাঁও কেমন আছে?”
“প্যাঁও দারুণ আছে,” স্মরণ আবার নতুন উদ্যমে শুরু করল, “আজ সন্ধেবেলাতেই দেখা হবে আমাদের। ও আসলে গান শেখে তো! ওই বেহালা চৌরাস্তার কাছে গান শিখতে আসে। আমি না গেলে খুব রাগ করে। মানে, ওখান থেকে ওকে পিক আপ করে বাড়িতে দিয়ে আসতে হয় আমায়! আসলে…”
“বাই স্মরণ,” পলি হাত নেড়ে বুদা আর রাধিয়াকে টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল।
স্মরণ থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। রাধিয়া যেতে-যেতে শুনল নোঈ চাপা গলায় স্মরণকে বলছে, “তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই? সব জায়গায় প্যাঁও প্যাঁও! যেন হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে! তুমি কি পাগল?”
ওদের গাড়িটা বেশ বড়। সরু রাস্তা ধরে আমহার্স্ট স্ট্রিটে বেরোনো অবধি গাড়িটা শামুকের মতো চলল। আশপাশের লোকজন যে বিরক্ত হচ্ছে, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল রাধিয়া। বড় আর সুন্দর গাড়ি দেখলেই রাস্তার লোকজন খেপে যায়। এটা দেখেছে রাধিয়া। আমাদের আশপাশটা হিংসুটেদের নিয়ে তৈরি।
বুদা গাড়ির সামনে বসেছে। ও মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আচ্ছা, সুম্পাদের বাড়িতে সেই ছেলেটা ছিল না? সেই যে রে তোর সঙ্গে আলাদা হয়ে কথা বলছিল খাবারের সময়। কী যেন নাম!”
“নিশান!” রাধিয়া ছোট্ট করে বলল।
বুদা বলল, “রাইট। গতকাল ওকে দেখলাম নন্দনে। একটা ফিল্ম দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম ওকে। সঙ্গে একজন বেশ বয়স্ক মহিলা ছিলেন। ছোট করে কাটা চুল। সামান্য উইয়ার্ড ড্রেস করেছিলেন। সো আই সেড, হাই!”
পলি বলল, “ছেলেটা বেশ। দেখতে অনেকটা ক্রিকেটার মণীশ পাণ্ডের মতো, না?”
বুদা বলল, “কী একটা লিটল ম্যাগের জন্য এসেছিল বলল। আরে, আমি তো নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না! ও এদিকে আমায় ডেকে কথা বলছে! আই ফেল্ট সো অকোয়ার্ড!”
রাধিয়া চুপ করে রইল। ছেলেটা বুদার সঙ্গে কথা বলেছে! ওর কথা জিজ্ঞেস করেনি? কথাটা মনে হতেই নিজেকে ধমক দিল রাধিয়া। এসব কী ভাবছে ও! কেন জিজ্ঞেস করবে ওর কথা! একদিন স্টেশন থেকে নিয়ে একটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল আর একদিন একটা নেমন্তন্নে দেখা হয়ে টুকটাক একটু কথা বলেছিল। তাতে তেমন তো আর পরিচয় হয়নি যে, ওর কথা জিজ্ঞেস করবে! তবে একটা দীর্ঘশ্বাস মনে মনে চাপল রাধিয়া, ছেলেটার পারফিউমটা খুব সুন্দর! কথাটা মনে পড়তেই চোখ বুজে এল। আর ওর সামনে ভেসে উঠল সেই আধো অন্ধকারে জড়িয়ে থাকা একটা গলি। তার ভেতর দিয়ে ডুবে ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে একটা সাইকেল। আর সেই হলুদ পাঞ্জাবিটা হালকা হাওয়ায় উড়ছে প্রজাপতির মতো।
“তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল জানিস?” বুদা এবার পিছন ফিরে তাকাল রাধিয়ার দিকে।
রাধিয়া সামান্য হাসল। ওর জানতে ইচ্ছে করছে কী জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু ও জানে বেশি কৌতূহল দেখালে পলি আর বুদা ওকে খুব জ্বালাবে!
বুদা বলল, “নিশান বলল, ‘আপনার সেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বান্ধবী কেমন আছেন?’ তোকে এমন করে বলল কেন রে?”
রাধিয়ার ভুরু কুঁচকে গেল! এ আবার কেমন কথা! ও এর উত্তরে কিছু না বলে সামনে বসা মধুদাকে বলল, “ওই কালীঘাট ট্রাম ডিপো হয়ে যেয়ো তো মধুদা। পলি আর বুদা নামবে।”
“কেন, তুই নামবি না?” পলি পাশ থেকে অবাক হল।
“না রে,” ছোট করে বলল রাধিয়া, “আমার বাড়িতে একটু কাজ আছে। আসলে ঠাকুমাকে নিয়ে একটু বেরোব। ঠাকুমা বলেছিল, আমি ভুলে গেছি একদম।”
“যা,” পলি মাথা নাড়ল, “আমি জানি তুই মিথ্যে বলছিস। এত ঘরকুনো কেন রে তুই?”
“না রে, সত্যি বলছি,” রাধিয়া বলল, “ঠাকুমা একবার দোকানে যাবে জুতো কিনতে। আমাকেও যেতে হবে!”
“ও,” পলি চুপ করে গেল।
আচমকা গাড়িটা কেমন যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। গাড়ির কাচ তোলা। গুনগুন করে এসি চলছে। গাড়িটা টিপু সুলতান মসজিদের সামনের সিগনালে এসে দাঁড়িয়েছে!
বিকেল এবার ক্রমশ নরম হয়ে আসছে। সামনে গাড়ি আর বাস এমন করে গিঁট পাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে আর জীবনেও এই গিঁট খুলবে না!
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধিয়া। আর তখনই চমকে উঠল! আরে ওটা কে? বাবা না!
রাধিয়া ভাল করে ঘুরে বসল এবার। সত্যি দেখছে তো? বাবা-ই তো? হ্যাঁ, ঠিক। বাবা-ই! একটা সাদা সেডানের পেছনে বসে রয়েছে বাবা। কালো টি-শার্ট পরে আছে। আর পাশে ওটা কে? একজন মহিলা! ছোট করে, প্রায় ন্যাড়ার মতো করে কাটা চুল। শার্প ফিচার! বাবা মহিলার দিকে ফিরে কথা বলছে। কিন্তু বাবা এই শেষ বিকেলে কী করে কলকাতায় থাকতে পারে? বাবা তো বলেছে যে, ব্যাবসার কাজে নাগপুর গেছে। গত কালকেই তো বেরোল। তা হলে?
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। ও সিগনালের দিকে তাকাল। এখনও লাল। ওঃ, কিছুতেই সিগনালটা খুলছে না! মনখারাপের সঙ্গে কেমন একটা টেনশনও হচ্ছে ওর। মধুদা যদি দেখে ফেলে! কী হবে তা হলে! কী লজ্জা, কী লজ্জা!
এসির মধ্যে বসেও নিমেষে ঘেমে গেল রাধিয়া! মুখ-চোখ ভয় আর কষ্টে লাল হয়ে গেল! বাবা মিথ্যে বলে এমন করে বাড়ির বাইরে আছে কেন? ওই মহিলাই-বা কে? বাবাকে সারাক্ষণ গম্ভীর দেখে! কিন্তু ওই গাড়িতে বসে বাবা তো রীতিমতো হাসছে! আশপাশে কিছু খেয়ালই করছে না। দু’জন মানুষকে দেখলে বোঝা যায় তাদের সম্পর্কের ধাঁচটা কী। এখানে বাবাকে ‘মোর ইগার’ লাগছে! মহিলাটি তো শান্ত মুখে বসে আছে। চোয়াল শক্ত করে রইল রাধিয়া। মনে মনে ঠাকুরকে ডাকতে থাকল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়াস ধড়াস করছে! এসব কতদিন ধরে চলছে? বাবা যে কাজে নেই সেটা তো স্পষ্টই। কাজে থাকলে আউট স্টেশন যাওয়ার নাম করে কলকাতায় থাকত না। এসব তো মা, ঠাকুমা জানে না। জানলে কী হবে! বাবা কি ওদের ছেড়ে চলে যাবে! আর মা? মা কী করবে?
“কী হয়েছে রে রাধি?” পলি পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।
রাধিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল। ও ঘাড় না ঘুরিয়েও চোখের আড় দিয়ে দেখার চেষ্টা করল গাড়িটা কোথায়। নাঃ, গাড়িটা পিছিয়ে আছে। সামনের বড় দুটো বাস গড়িমসি করছে স্টার্ট নিতে। ও মনে মনে বলল, গাড়িটা আরও পিছিয়ে যাক।
ও মধুদাকে বলল, “জোরে চালাও মধুদা। আমায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে।”
“হোয়াটস রং?” পলি এবার রাধিয়ার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল।
সামান্য হেসে মাথা নাড়াল রাধিয়া। ওর এত কষ্ট হচ্ছে যে, মনে হচ্ছে বুকের পাঁজরগুলো ইমপ্লোড করবে এখনই! মনে হচ্ছে কেউ ওকে জলে ডুবিয়ে দিয়েছে! এটা কী দেখল ও? এত বছর তা হলে যে বাবা ওদের সঙ্গে আছে, সেটা অভিনয়? নাকি… নাকি অন্য কোনও গল্প আছে? মানে ও যা ভাবছে, সেটা ঠিক নয়। মানে… কী মানে? রাধিয়ার হাত-পা ঘেমে উঠেছে। এটা বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেলে সাংঘাতিক ব্যাপার হবে। তাই কাউকেই বলা যাবে না। কিন্তু ওকে তো জানতে হবে ব্যাপারটা কী! না জানলে ও নিজে শান্তি পাবে না। বাবাকে যে মুখোমুখি জিজ্ঞেস করবে, সেটাও ওর দ্বারা হবে না। বাবা এমন রাগী আর এমন করে নিজের রাগটা প্রকাশ করে যে, সেটার সামনে দাঁড়ানো ওর পক্ষে কঠিন।
এমন সুন্দর একটা বিকেল এক নিমেষে কী করে নষ্ট হয়ে গেল! সত্যি কোনও দিক দিয়েই জীবনে নিশ্চয়তা নেই। গাড়িটা যখন গিয়ে সিগনালে দাঁড়াল, তখনও কি ও বুঝতে পেরেছিল সামনে, এক মুহূর্ত পরে কী আসতে চলেছে ওর জীবনে?
পলি আরও কিছু জিজ্ঞেস করেছিল। বুদাও সামনের সিট থেকে পেছন ফিরে কিছু বলছিল। কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকছে না রাধিয়ার। সারা শরীরে যেন লক্ষ লক্ষ ঝিঁঝি পোকা ডাকছে ওর! ব্যাপারটা কী! ওকে জানতেই হবে। কিন্তু কীভাবে জানবে?
কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছে গাড়ি থেকে বুদা আর পলি নেমে গেল। অন্য সময় হলে পলি হয়তো জোর করেই রাধিয়াকে টেনে নামাত। কিন্তু আচমকা রাধিয়ার পরিবর্তন দেখে আজ আর কিছু বলল না। শুধু বুদা একবার বলল, “আমি তোকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আসব?”
“আয়াম ওকে,” রাধিয়া ছোট্ট করে বলে গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিল।
রাধিয়া খুবই শান্ত ধরনের। কখনও কারও সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করে না। কিন্তু আজ কিছুতেই রাধিয়া নিজেকে সামলাতে পারছে না। কেবলই মনে হচ্ছে এটা কী দেখল ও!
কালীঘাট ট্রাম ডিপো থেকে আলিপুর খুব কিছু দূর নয়। কিন্তু যেহেতু অফিস ছুটি হয়েছে এখন, লোকজন গিজগিজ করছে কলকাতায়, তাই গাড়িটা গোঁত্তা খেতে-খেতে চলছে। কিন্তু রাধিয়ার কিছুই যেন মনে আসছে না।
আকাশে আলো কমে এসেছে বেশ। বাড়ি ফেরার তাড়ার মাঝে শহরের চোখে-মুখে কেমন যেন একটা মনমরা ভাব। ভিড়ে নুইয়ে যাওয়া বাস, বদমেজাজি অটোর যেখানে-সেখানে নাক গলানো আর মোটরবাইকের ছোঁকছোঁক। অন্যদিন এসব দেখে রাধিয়া, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ওর সামনের শহরটাকে কে যেন একটা ধূসর জলরং করে দিয়েছে!
জাজেস কোর্টের সামনে দিয়ে গাড়িটা ডান দিকে বাঁক নিল। হর্টিকালচার ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে ওদের বাড়ি।
মধুদা গাড়িটাকে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে হর্ন দিল। আর তার শব্দে কেঁপে উঠল রাধিয়া। বাড়ি চলে এসেছে। আরে গালে কী? হাত দিয়ে দেখল রাধিয়া। জল। ও কাঁদছে। কিন্তু মাথা তো পুরো খালি হয়ে ছিল। তা হলে চোখে জল এল কেন? চিরদিন মনে মনে বাবাকে একটু বেশি ভালবেসেছে বলেই কি আজ এমন একটা শূন্যতা এসে ঢুকে পড়েছে ওর মধ্যে!
গেটটা খুলে দেওয়ায় গাড়িটা ঢুকে গেল ভেতরে।
পাথর বিছানো রাস্তায় ধীরে-ধীরে গাড়িটা থামল পোর্টিকোর তলায়। মধুদা নেমে দরজা খুলে দেওয়ার আগেই ও নিজে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। অন্যদিন বাড়িতে ঢোকার আগে মধুদাকে ‘আসছি’ বলে। কিন্তু আজ সেটাও বেরিয়ে গিয়েছে মাথা থেকে।
চারটে শ্বেতপাথরের ধাপ পেরিয়ে বড় হলঘরটায় ঢুকল রাধিয়া। ওর মন খুব অস্থির হয়ে আছে। সোজা স্নান করবে ও। অন্য কোনওদিকে তাকাবে না।
বড় হলঘরের একপাশ থেকে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলার দিকে। রাধিয়া প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল।
“রাধিদি,” পেছন থেকে বুজু ডাকল ওকে।
রাধিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। মাথা রীতিমতো টলছে ওর। সব কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। গাড়ির ভেতর বসে থাকা খুব ছোট করে কাটা চুলের মহিলার মুখটা বারবার মনে পড়ছে ওর। কেন মনে পড়ছে? কেন আমরা যা ভুলতে চাই তাই বারবার মনে পড়ে? কেন খারাপ লাগাগুলো বস্তায় ভরে পার করে দেওয়া বিড়ালের মতো আবার ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে আমাদের কাছে? কেন বারবার খারাপ দৃশ্য বিরক্তিকর বিজ্ঞাপনের মতো মনের মধ্যে ভেসে ওঠে? আমাদের মন, কিন্তু আমাদেরই পোষ মানতে চায় না। কেন? কষ্টের মধ্যে জীবনের কোন মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে? কী শেখাতে চায় সে আমাদের?
রাধিয়ার মনে হচ্ছে ও যেন এক অদৃশ্য জালে পেঁচিয়ে গিয়েছে। এই বাড়ি, এই বাবা-মা, এই সম্পর্ক। সব কিছুই যেন হাওয়ার তৈরি মনে হচ্ছে ওর।
“রাধিদি,” বুজু আবার ডাকল।
“ক-কী?” রাধিয়া কোনওরকমে পেছনে ঘুরল।
বুজু বলল, “দু’জন এসেছেন ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে। এই এলেন। ঠাকুমা তো পুজোয় বসেছে, আমি গেলে বকবে এখন। তুমি যদি একবার বলে…”
রাধিয়া সিঁড়ির ওপর থেকে বসার ঘরে দূরে বসে থাকা দু’জনের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর।
বুজু বলল, “একজন বললেন তোমায় চেনেন। ওই দূরে বসে আছেন। নাম বললেন…”
“আমি পারব না,” রাধিয়া কথাটা ছুড়ে দিয়ে কোনওরকমে দোতলায় নিজের ঘরের কাছে গেল। পেছন থেকে বুজু কিছু বলছিল, কিন্তু সেসব কথা কেমন যেন হাওয়ায় ভেসে গেল এদিক-ওদিক।
ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে কাঠের পাল্লায় মাথা দিয়ে দাঁড়াল রাধিয়া। এবার কী করবে ও? মায়ের সামনে যাবে কেমন করে? কার কাছে গিয়ে বলবে এসব কথা! এমন অবস্থায় কি অন্য কিছু মাথায় ঢোকে! বুজুদি কি ওকে দেখে বুঝতে পারেনি ওর মনের মধ্যে কী চলছে! সেখানে কারা এসেছে সেই নিয়ে… আচমকা থমকে গেল রাধিয়া। বুজু কী বলল? দু’জন এসেছে নীচে আর তার মধ্যে একজন ওকে চেনে? আর নামটা? নামটা যেন কী বলল? রাধিয়া দুদ্দাড় করে চলে এলেও বুজুর কথার একটা খণ্ড কী করে যেন কানে ঢুকে পড়েছে ওর।
হতভম্বের মতো ঘরের অন্যদিকে রাখা বিশাল বড় আয়নায় নিজেকে দেখল রাধিয়া! এমন একটা দিনে কে এল ওদের বাড়িতে! বুজু যে নামটা বলল, সেই কি এসেছে? নিশান কি এসেছে আজ ওদের বাড়ি?
.
১৩. মাহির
কোথাও একটা ট্রান্সফরমার বার্স্ট করেছে! সারা পাড়া ডুবে আছে রোঁয়াওঠা ফুটো কম্বলের মতো অন্ধকারের তলায়।
বোচনদার দোকানে একটা ব্যাটারির লাইট জ্বলছে। সামনের ধোপা বাড়িতেও হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছে! পরানদার দোকানে জ্বলছে ইমার্জেন্সি ছোট টিউব। এ ছাড়া আশপাশের বাড়ি থেকে ছিটকে আসা মোমবাতির আলোর কুচি ভেসে আছে দূরে।
আকাশে মেঘ করে আছে বেশ। জুনের আট তারিখ আজ। বর্ষা আসার কথা। কিন্তু আকাশে মেঘটুকুই করে আছে শুধু, বৃষ্টির দেখা নেই।
ক’দিন খুব ভ্যাপসা গরম পড়েছে। ওদের নিচু সিলিং-এর টালির বাড়িটা পুরো ফার্নেস হয়ে আছে যেন। ভাইয়ের এত কষ্ট হচ্ছে!
ওদের পাড়ায় বেশির ভাগই টালির বাড়ি। কিন্তু আজকাল দেখছে অনেকেই এসি লাগিয়ে নিচ্ছে। কোথা থেকে টাকা পায় এরা? এসি লাগায় কী করে? ওর তো নিজের হাতখরচ তুলতে কালঘাম ছুটে যায়!
কিটব্যাগটা এক কাঁধ থেকে অন্য কাঁধে নিল। আজ ম্যাচ ছিল। ড্র হয়েছে। সেকেন্ড ডিভিশনে এখন ওরা চতুর্থ হয়ে আছে। আজ ভালই খেলেছে মাহির। শুধু ম্যাচ শেষের একটু আগে ওদের ন’নম্বরটা এমন করে পা চালাল! শিন বোনের কাছে বেশ লেগেছে। কালশিটে পড়ে গিয়েছে।
মাহির শেষমুহূর্তে পা-টা সরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু তাতে খুব লাভ হয়নি কিছু।
ম্যাচের পরে মাঠের ধারে বসে কালশিটে পড়া জায়গাটা দেখছিল মাহির। বুট খুলে রেখেছিল পাশে। সুমিত টাকা না ধার দিলে এটা কিনতেই পারত না। দেখেছিল, পতাদা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
মাহিরের মাথাটাই গরম হয়ে গিয়েছিল। এই এসে গিয়েছে ঢপবাজ! সারাক্ষণ বাতেলা! স্পনসর! রিক্রুট! শালা যেন নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি! আর এমন মাথার ওপর এসে দাঁড়ানোর কী হয়েছে? বুকে উঠে পড়বে নাকি?
পতাদা বলেছিল, “কী করিস? পা-টা সরাতে পারলি না? চোট খেয়ে গেলি? পরের ম্যাচে নামতে পারবি তো?”
“পরের ম্যাচ তো সামনের সপ্তাহে,” বিরক্তিটাকে লুকিয়ে কোনওমতে বলেছিল মাহির।
পতাদা মাথা নেড়ে বলেছিল, “তোদের ফিটনেস এত কম! আমাদের সময়ে আমরা যা ফিট ছিলাম না! দুটো-তিনটে ভল্ট মারা কোনও ব্যাপারই ছিল না! একবার সেই মজিদ বাসকারের পা থেকে এমন করে বল কেড়ে নিয়েছিলাম যে, মজিদ পরে বলেছিল আমায়, এমন স্ট্যান্ডার্ডের প্লেয়ার ও খুব বেশি দেখেনি!”
মাহির কী বলবে বুঝতে না পেরে পতাদার পেছনে বসা সুমিতকে দেখছিল। সুমিত মাটিতে শুয়ে পেটে হাত চেপে হাসছিল! পতাদা যে মারাদোনার নাম করেনি, এটা ওদের চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য!
মাহিরের হাসি পাচ্ছিল না। পায়ের ব্যথা, বাড়িতে টেনশন, এসবের মাঝে এইসব আলুছালু কথা ভাল লাগছিল না ওর!
ও বলেছিল, “তোমার ক্লাবের স্পনসরের কী হল? সেই সিমেন্ট কোম্পানি আসবে না? আমরা তো জান-প্রাণ দিয়ে খেলছি। সেই বারো নম্বর থেকে চারে উঠে এলাম। প্লাস যারা ট্রায়াল দেখতে এসেছিল, তারা কই? এভাবে আর কতদিন যাবে পতাদা?”
পতাদা ভুঁড়িটাকে জামা দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে বলেছিল, “আরে, আসবে, হবে। এখনই অস্থির হলে চলবে? ফুটবল হল তপস্যা। সেখানে ফলের আশা করতে নেই। ধর্মকথায় পড়িসনি?”
মাহির মাথা নেড়ে উঠে পড়েছিল। একে বলে লাভ নেই। শালা, গোটা জীবনটা বেকার হয়ে গেল! এই ছাব্বিশেই মনে হয় ছেচল্লিশ হয়ে গিয়েছে ওর! সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হয় আজ কেন ঘুম ভাঙল? মনে হয়, আজকের দিনটা ও বাঁচবে কেন?
ওদের পাড়ায় ওর বয়সি ছেলেদের দেখে মাহির! সারাক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে। নানারকম স্টাইলে মাথার চুল কাটা। হাতে-পায়ে ট্যাটু। চোখে সন্ধেবেলাতেও সানগ্লাস! সারাক্ষণ হ্যা-হ্যা করে চলেছে।
ওর মাঝে মাঝে রাগ হয়। কেন ও এমন হতে পারে না? এমন হতে পারলে কী যে ভাল হত! স্যার বলতেন, “অগভীর মানুষ অমানুষের মতো!”
এটা সত্যি না মিথ্যে জানে না মাহির, শুধু এটুকু মনে হয়, সেটা হতে পারলে ও হয়তো বেঁচে যেত। নিজের গভীরতায় মানুষ অধিকাংশ সময় নিজেই ডুবে মরে!
পতাদা আরও কিছু বলেছিল। কিন্তু সেসব আর ভাল করে শোনেনি! কী হবে শুনে? পেট ভরবে?
আজ সুমিত ওকে বাইকের পেছনে বসিয়ে লিফট দিয়েছিল। ময়দান থেকে বেরিয়ে হরিশ মুখার্জি দিয়ে ফিরছিল ওরা।
নিজের কথা অন্যকে বলতে খারাপ লাগে মাহিরের। কিন্তু একটা-একটা করে দিন চলে যাচ্ছে, এদিকে কিছুই হচ্ছে না! প্রতিটা দিন যেন ইটের মতো ওকে গেঁথে ফেলছে দেওয়ালের সঙ্গে!
বাইকের পেছনে বসে ও সুমিতকে বলেছিল, “আমার কোনও কাজকর্ম হতে পারে রে?”
মাথা না ঘুরিয়েই সুমিত বলেছিল, “কী কাজ করতে চাস?”
“যা বলবি,” মাহির বলেছিল, “আমার যা হোক একটা কাজ পেলেই হবে। তোর দাদার ফ্যাক্টরিতে কিছু একটা করে দে ভাই। ঝাঁট-টাট দিতে হলেও আমার আপত্তি নেই!”
“কী সব বলছিস তুই?” সুমিত অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছিল যেন!
“বাড়িতে খুব ঝামেলা রে। মানে টাকাপয়সার এমন অবস্থা! ভাইটা… ভাইটার কিডনির অসুখ ধরা পড়েছে। খালি ঘুরে-ঘুরে জ্বর আসছিল। ডাক্তার পরীক্ষা করতে দিয়েছিল নানারকম। সেখানেই ধরা পড়েছে। কিডনি কাজ করছে না। ডায়ালিসিস করাতে হবে। তারপর সম্ভব হলে কিডনি বদলাতে হবে।”
“সে কী রে!” সুমিতের গলা শুনে মাহির বুঝতে পেরেছিল যে ও সত্যি চমকে গিয়েছে!
সুমিত বলেছিল, “এসব কবে হল? বলিসনি তো!”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “সারাক্ষণ আর কত খারাপ কথা বলি বল তো!”
সুমিত বলেছিল, “আমি দাদাকে বলছি। আমার এত খারাপ লাগছে শুনে! অন্য কোনও কাজ পাচ্ছিস না?”
সামনে বাঁকটা ঘুরলেই বাঁ হাতে মাহিরের বাড়ি। আজকাল বাড়িতে ফিরতে কষ্ট হয় ওর। ভাইটাও এমনিতেই স্বাভাবিক নয়। তারপর এমন অসুস্থ! পা ফুলে যাচ্ছে! চোখ-মুখ ফুলে যাচ্ছে! চোখে দেখা যায় না!
মায়ের আয়ার কাজ থাকে। সংসারের মূল রোজগার সেটাই। তাই মাকে তো বেরোতেই হয়। পাশের বাড়ির তুয়াদি ভাইয়ের কাছে থাকে।
তুয়াদি সেলাইয়ের কাজ করে। বিয়ে করেনি। প্রায় পঁয়ত্রিশ হল। আর বিয়ে করবে বলে মনেও হয় না। তুয়াদির একটা পা আর-একটা পায়ের চেয়ে সামান্য ছোট। দেখতে সুন্দর হলেও ওই কারণে তুয়াদির বিয়ে হয়নি।
তুয়াদি মুখরা খুব। কিন্তু ভাইকে ভালবাসে। তাই ভাইয়ের শরীর খারাপের কথা শুনে নিজেই বলেছিল যে, মা যতক্ষণ থাকবে না, ও ভাইয়ের কাছে থাকবে!
তুয়াদির ব্যপারাটা ঠিক বোঝে না মাহির। একদিকে মাহিরকে বকাঝকা করে। এই যে ফুটবল খেলে! এই যে এখনও ভাল করে কাজকর্ম পায়নি, এটা নিয়ে তুয়াদি খুব কথা শোনায়। আবার অন্যদিকে কেমন করে যেন তাকায়। গায়ে হাত দেয়। বুকে হাত বোলায়! আচমকা নিজের ভরাট বুকটা চেপে ধরে মাহিরের শরীরের সঙ্গে!
মাহিরের রাগ হয়। কিন্তু কিছু বলে না! এসব নিয়ে বলা যায় না কিছু। আর সত্যি বলতে কী, আজকাল কাউকেই কিছু বলতেও আর ইচ্ছে করে না ওর। কারও সঙ্গে দরকারের চেয়ে একটা বেশি শব্দও খরচ করতে ইচ্ছে করে না। যে যা বলে মেনে নেয়।
এখনও তুয়াদি ভাইয়ের কাছে আছে। আজ মায়ের দুটো দশটার কাজ। আসতে দেরি হবে। তুয়াদি আবার ওকে একা পেয়ে গালাগাল দেবে সেভাবে কাজের চেষ্টা করছে না বলে। নাকি অন্য কিছু করবে, জানে না!
মাহিরের আবার সুমিতের কথাটা মনে পড়ল। কাজ কি একদম পাচ্ছে না? পাচ্ছে, কিন্তু সেটা কেমন কাজ মাহির ভাল করে জানে!
রিতুদা ওকে আজকাল প্রায়ই ডেকে পাঠায়। সব সময় না গেলেও মাঝে মাঝে তো যেতেই হয়। তখন খুচখাচ কাজ করে দিতে বলে ওকে।
এই তো কিছুদিন আগে টিটির সঙ্গে ওকে রাজারহাটের ওদিকে যেতে হয়েছিল। একটা পেমেন্ট আনার ব্যাপার ছিল।
রিতুদা নিজেই ডেকে বলেছিল টিটির সঙ্গে যেতে।
মাহিরের ভাল লাগছিল না। কিন্তু ও বোঝে, রিতুদার মতো মানুষেরা ‘না’ শব্দটা শুনতে পছন্দ করে না।
তাও মাহির অনিচ্ছার গলায় বলেছিল, “দাদা, আমার তো আজ বিকেলে প্র্যাকটিস আছে… তাই…”
“তাতে কী?” রিতুদা হেসেছিল খুব। পান-খাওয়া দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছিল। কাঁধ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে বলেছিল, “ওই তো বালের খেলা তোদের! তার আবার প্র্যাকটিস! এতদিন খেলে কী করলি মাহির? আমাদের দেশে ইনডিভিজুয়াল স্পোর্টস ছাড়া কেউ কোনও কিছুতে সাকসেস পাবে না। ক্রিকেট টিম গেম হলেও দ্যাখ, ইন্ডিভিজুয়াল কিন্তু আসলে। এত চুকলিবাজি! এত পলিটিক্স! সেখানে ফুটবল! নিম্নমধ্যবিত্তদের খেলা! ছাড়, আজ যাবি টিটির সঙ্গে। আমার বাকি ছেলেপুলেরা আজ নেই। তুই যাবি, টাকাটা নিবি, তারপর মোবাইলে গাড়ি বুক করে চলে আসবি। ক্লিন কাজ। লাফড়া নেই। বুঝলি?”
টিটি বসেছিল ঘরের এক কোণে। ও বলেছিল, “হ্যাঁ রিতুদা, কোনও চাপ নেই। ও যাবে। আমরা ঠিক নিয়ে আসব!”
মাহির অনিচ্ছার সঙ্গে রাজি হয়েছিল।
রিতুদা একটা পাঁচশো টাকার নোট ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, “ধর এটা। আর-একটা জিনিস।”
কথাটা শেষ না করে রিতুদা পাশের ড্রয়ার টেনে তাতে হাত ঢুকিয়েছিল। তারপর হাতটা বের করে এনে টেবিলে রেখেছিল একটা খাপ। তার থেকে পিস্তলের বাঁটটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল মাহির! ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে গিয়েছিল! এসব কী!
“অনেক টাকা… এটা রাখ, চালিয়েছিস কোনওদিন?” রিতুদা এমন করে জিজ্ঞেস করছিল যেন স্কুলপাঠ্যে এসব শেখানো হয়।
“না, না,” মাহির আঁতকে উঠেছিল, “এসব… প্লিজ় না…”
“যাঃ শালা! সতীপনা করছিস কেন? প্যান্টে মুতে দিলি নাকি যন্ত্র দেখে?”
“এর দরকার নেই রিতুদা, আমি এমনি নিয়ে আসব,” মাহির নিজেকে শান্ত করে কেটে-কেটে বলেছিল কথাগুলো।
রিতুদা তাকিয়েছিল মাহিরের দিকে। তারপর বলেছিল, “ডাইনোসর থেকে ম্যামথ থেকে সেবর টুথড টাইগার, সবাই এত শক্তিশালী হয়েও কেন বল তো পৃথিবী থেকে হাপিশ হয়ে গেল? কারণ, কেউ ওরা সময়ের সঙ্গে নিজেদের পালটাতে পারেনি। কেউ পারেনি। মানুষ এই একমাত্র একটা কারণে নিজেকে এত ভয়ংকর জন্তু আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে সারা পৃথিবীকে কবজা করেছে। নিজেকে পালটাতে শেখ মাহির। না হলে জাস্ট হাওয়া হয়ে যাবি। বুঝলি!”
কাজটাতে গিয়েছিল মাহির। কোনও অসুবিধে হয়নি। ক্যাশ গুনে হিসেব মিলিয়ে টাকা নিয়ে ফেরার গাড়ি ধরেছিল।
টিটি ওর নতুন কেনা ফোন থেকে বুক করেছিল একটা গাড়ি। শেয়ারের গাড়ি। তারপর সারাটা পথ পুটুরপুটুর করে রিতুদার গুণকীর্তন করতে-করতে এসেছে! ওঃ, এত বিরক্ত লাগছিল মাহিরের!
মাঝপথে একজন খুব সুন্দরী স্টাইলিশ দেখতে ভদ্রমহিলা উঠেছিল গাড়িতে। মাহির সংকুচিত হয়ে বসেছিল। মেয়েদের দেখলেই কেমন যেন নার্ভাস হয়ে যায় ও। আসলে রেশমি চলে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েদের ব্যাপারে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে মাহির!
টিটিকে চাপা গলায় সাবধান করেছিল, টিটি যাতে গালাগালি না দেয়! কিন্তু টিটি কি আর ওর কথা শোনার ছেলে! এমন সব কথা বলছিল যে, কান লাল হয়ে গিয়েছিল মাহিরের। তবে কাজ সেরে ফেরার পর রিতুদা আরও পাঁচশো হাতে দিয়েছিল ওর। এবার আর আপত্তি করেনি মাহির। বুঝতে পারছিল, আপত্তি করে লাভ নেই।
দরজায় টোকা দেওয়ার একটু পরে তুয়াদি এসে খুলে দিল দরজাটা। লোডশেডিং-এর জন্য ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। ভাই পাশের খাটে চুপ করে শুয়ে আছে। দেওয়ালের দিকে মুখ। ঘুমোচ্ছে বোধহয়। পাশে রাখা হাতপাখা দেখে মাহির বুঝল তুয়াদি ভাইকে হাওয়া করছিল।
ওদের দুটো ঘর। এই ঘরটা বড়। পাশের ছোট ঘরে মাহির থাকে। সেখানে একটা চৌকি আছে। আর একটা আলনা। চৌকিটা একটু উঁচু। তার তলায় লোহার ট্রাঙ্কে মাহিরের জিনিসপত্র থাকে। বারবার ট্রাঙ্ক খুলে জিনিস বের করতে হয়। খুব অসুবিধে হয় মাহিরের। কিন্তু উপায় নেই।
বড় ঘরে ঢুকে একপাশে চটিটা খুলে রাখল। তারপর কিটব্যাগটা টিনের ভাঁজ করা চেয়ারের মাথায় ব্যালেন্স করে বসিয়ে তুয়াদিকে জিজ্ঞেস করল, “কারেন্ট কখন গেল তুয়াদি?”
তুয়াদি সেটার উত্তর না দিয়ে বলল, “তোর মোবাইল খারাপ?”
“কেন?” অবাক হল মাহির।
“আরে, ওই টিটিটা এসেছিল। তোকে নাকি মোবাইলে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না!” তুয়াদির গলায় হালকা বিরক্তি।
আসলে তুয়াদি টিটিকে পছন্দ করে না। কারণ, টিটি একবার মদ খেয়ে এসে তুয়াদিকে প্রপোজ় করে বসেছিল!
তুয়াদি এত রেগে গিয়েছিল যে, পায়ের চটি খুলে ছুড়ে মেরেছিল টিটিকে।
টিটির তাতে অবশ্য হেলদোল খুব কিছু হয়নি! টিটির নেশা কেটে যাওয়ার পরে মাহির খুব বকেছিল টিটিকে। বলেছিল, “এটা কী করেছিস তুই? এমন অসভ্যতা কেউ করে? কত বড় বল তো তোর চেয়ে?”
টিটি হেসে বলেছিল, “আরে, খচে যাচ্ছিস কেন? বড় তো কী হয়েছে! আজকাল ম্যাক্সিমাম ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বড়ই হয়! এতে তো অসুবিধে নেই। প্লাস ভাবলাম, বিয়ে-টিয়ে করেনি। বয়স বয়ে যাচ্ছে। ওসবের ইচ্ছে-ফিচ্ছে তো সবারই হয়। ওরও নিশ্চয় হয়। তাই আমি… মানে এটা সোশ্যাল ওয়ার্ক বলতে পারিস! আমার থোবড়টা আমির খানের মতো না হলেও ফিলিংস-এ আমি কিন্তু দিলীপ কুমার! তাই ওর কষ্টের কথা ভেবে…”
মাহির জানে টিটির সঙ্গে কথা বলা বৃথা!
“কী রে, কী বলছি?” তুয়াদি এসে ধাক্কা দিল।
“না গো, আসলে,” মাহির ঢোঁক গিলল, “আমার মোবাইলটা গেছে। এতদিন গার্টার বেঁধে কাজ চালাচ্ছিলাম। কিন্তু আজ আর কিছুতেই কাজ করছে না!”
“অপদার্থ একটা!” তুয়াদি দাঁতে দাঁত ঘষল।
মাহির মনে মনে বলল, নাও, শুরু হল আজকে! তুয়াদির ক্রিটিকাল অ্যাপ্রিশিয়েশান চালু!
তুয়াদি বলল, “এমন গাবুরের মতো চেহারা, কিন্তু একটা অপদার্থ! এখন তোর রেশমি কোথায়? যার জন্য সব ছেড়ে ক্যালানে হলি সে কোথায়! আমাদের বস্তিতে কেউ তোর মতো লেখাপড়ায় ছিল? ছিল না… শালা, একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে… আমি তোকে নিয়ে যে কী করব!”
“তুয়াদি, ভাই ঘুমোচ্ছে!” মাহির আর কীভাবে তুয়াদিকে চুপ করাবে ভেবে পেল না।
তুয়াদি অনেক কষ্টে নিজেকে আটকাল। আঁচল দিয়ে মুখের ঘামটা মুছে আচমকা এগিয়ে এসে প্যান্টের চেনের কাছটা খপ করে চেপে ধরে বলল, “তোর চেহারাটা এমন, কিন্তু ভেতরটা এমন ম্যাদামারা কেন? তোর সব যন্ত্রপাতি ঠিক আছে তো?”
এসব কী বলছে তুয়াদি! মাহির চমকে উঠে পিছিয়ে এল। দেখল, তুয়াদি কেমন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে ওর দিকে!
তুয়াদি চোয়াল শক্ত করে বলল, “একদিন দেখব তোর সব ঠিক আছে কি না। কতদিন পালিয়ে থাকবি! এখন আর না বসে ওই রিতুদার অফিসে যা একবার। ডেকেছে। টিটি সেই কথাটাই বলতে এসেছিল।”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না! এটা কী বলল তুয়াদি! কী করল! দিনকে দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে সব মানুষজন!
তুয়াদি বলল, “কী হল যা। দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? যা।”
মাহির আর কথা বাড়াল না। আবার বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। খিদে পেয়েছে ওর। আগে খেলার শেষে ওদের ক্লাব থেকে খাওয়াত। এখন সেটাও কয়েকটা ম্যাচ হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সুমিত বলেছিল রোল খাওয়ার কথা। কিন্তু বারণ করেছিল মাহির। এর আগেও দু’দিন রোল আর মোমো খাইয়েছে সুমিত। রোজ-রোজ একজনের কাছ থেকে খাওয়া যায় নাকি?
কিন্তু এখন পেটের ভেতর বেজি ঘুরছে মনে হচ্ছে। কেমন একটা চাপ লাগছে। কিন্তু পকেটে পড়ে আছে আঠারো টাকা। দু’টাকার মুড়ি আর একটু বাদাম খাওয়া যেতে পারে। মা এখনও মাইনে পায়নি এই মাসের।
মাহিরের মাঝে মাঝে মনে হয় বোমার মতো ও যদি ফেটে পড়তে পারত! শরীরে এত বারুদ জমে আছে! এত যন্ত্রণা ঠেসে ভরা আছে! তাই মনে হয় মাথাসমেত গোটা শরীরটা ফেটে পড়লে বেঁচে যেত ও। মনে হয় তা হলে হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেত।
আগে ভগবানে বিশ্বাস ছিল না মাহিরের। মনে হত ওসব দুর্বল মানুষের লাঠি! ভণ্ডদের ব্যাবসা করার হাতিয়ার! কিন্তু আজকাল কেবলই মনে হয় কেউ একটা তো আছে! না, সে ছেলে না মেয়ে সেটা জানে না, কিন্তু আছে তো কেউ!
যেদিন ভাইয়ের রোগটা ধরা পড়ল, সেদিন রাতে নিজের ওই খুপরিমতো ঘরের জানলার পাশে শুয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল মাহির। ছোট টালির একতলা বাড়ি পাশাপাশি গাদাগাদি করে আছে। তাই জানলা থেকে এখনও আকাশ দেখা যায়।
সেই ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল মাহির। সামান্য কিছু জেদি তারা ওই ধুলোর চাদর ভেদ করেও যে-সামান্য আলো পাঠাচ্ছিল, সেই আলোর দিকে তাকিয়ে মাহিরের মনে হয়েছিল, ভগবান নিশ্চয়ই আছে! এই ছাব্বিশ বছরের জীবনেই এমন নানা কষ্ট, যন্ত্রণা আর কঠিন সময় কখনও এমনি-এমনি হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর পেছনে কারও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা আছে। কথাটা ভেবে ওই অন্ধকারে, ওই বিপদের সময়ও হাসি পেয়েছিল মাহিরের। মনে হয়েছিল, মানুষ কিছু পেয়ে বা কোনও বিপদ থেকে বেরিয়ে এসে ভগবানের উপস্থিতিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু ওর জীবনে অসাফল্য, কষ্ট আর খারাপ হওয়ার পর ওর ঈশ্বরবিশ্বাস এল!
এখনও রাস্তায় বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল মাহির। লালচে হয়ে আছে আকাশ। তাই আগের চেয়ে অন্ধকার কিছুটা হলেও কেটেছে। ওদের অঞ্চলের লাগোয়া একটা বিহারি বস্তি আছে। এই আধো-অন্ধকারে কয়েকটা বাচ্চা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এলোমেলোভাবে। দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ি ঘিরে ওরই বয়সি কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিরক্তি লাগল মাহিরের। সবাই জানে ওই ছেলেগুলো মদ আর গাঁজা খায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু কারও কোনও হুঁশ নেই। প্লাস্টিকের বোতলে জলের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা মদ সকলের সামনেই খায়। হল্লা করে। কেউ কিছু বলে না ওদের। আসলে কে কী বলবে, এই ছেলেগুলোর মাথার ওপর রিতুদার হাত আছে!
ওর বাড়ি থেকে রিতুদার অফিস খুব কিছু দূর নয়। মাহির ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল। খিদেটা চাগাড় দিচ্ছে ভালই। শরীরটাও বুজে আসছে ক্লান্তিতে! এখন কার ভাল লাগে এইসব লোকের সামনে যেতে! মা-ও জানলে রাগ করবে। মা কিছুতেই ওকে রিতুদার কাছে যেতে দেয় না। বলে, “একবেলা না খেয়ে থাকব, কিন্তু তুই যাবি না!” কিন্তু একবেলা না খেয়ে থাকা এক জিনিস, আর ভাইয়ের চিকিৎসা আর-এক জিনিস। টাকা খুব দরকার এখন ওদের।
মাহির আকাশের দিকে তাকাল। সেই জন কি সত্যি বসে, দাঁড়িয়ে বা শুয়ে আছে আকাশের ওপারে? ওকে কি দেখতে পাচ্ছে? কেন শুধু ওকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ পায় মানুষটি? ওর জীবনে ভাল কিছু কি হতে পারে না? এমন কিছু কি ঘটতে পারে না, যার ফলে ওর মনে হবে সামান্য হলেও ওরও বেঁচে থাকার একটা মানে আছে? একটা কারণ আছে?
অফিসের বাইরে একটু দূরে টিটি দাঁড়িয়েছিল। আবছায়া হলেও মাহিরের চিনতে ভুল হল না। ওরকম ঝাঁকড়া চুল আর পাঁকাটির মতো শরীর কলকাতায় আর কারও আছে কি না সন্দেহ!
টিটিও দেখেছে ওকে, “ওই মাহির!” হাত তুলে ওর কাছে প্রায় দৌড়ে এল ছেলেটা। তারপর ওর হাত ধরে বলল, “শালা, তুই কী করছিস? তোকে ফোন করলে পাওয়া যায় না কেন?”
“জানিস না, খেলা ছিল আজ আমার?”
মাহির দেখল টিটির হাতে একটা রোল। সবে দু’-এক কামড় খেয়েছে।
টিটি বলল, “তোর ওই বেকার খেলা! আর খেলছিস তুই, তো ফোনটা অফ করে রেখেছিস কেন?”
মাহির সময় নিল একটু তারপর টিটির হাত থেকে রোলটা নিয়ে নিল আচমকা। কামড় মেরে বলল, “ফোনটা ভোগের বাসি হয়েছে! পরানদাকে দেখাব একবার।”
টিটি প্যান্টে হাত মুছে বলল, “শালা, হবে না? সিপাহি বিদ্রোহের সময়কার ফোন! একটা নতুন মোবাইল কিনে ফেল আমার মতো।”
“বোকার মতো কথা বলিস না!” মুখভরতি খাবার নিয়ে কোনওমতে বলল মাহির।
টিটি হাসল, “তোর খিদে পেয়েছে?”
মাহির রোলটা শেষ করে বলল, “আচ্ছা, মানুষ অন্য জিনিস এতগুলো করে খায়, কিন্তু কোল্ড ড্রিঙ্ক এক বোতল আর রোল একটা খায় কেন?”
“সে আমি কী জানি!” টিটি বলল, “তোকে ফোন করতে-করতে দিমাগ ঘেঁটে গিয়েছে আমার! ওদিকে নকুর শালা এক লোচা হয়েছে।”
নকু! মাহিরের সামান্য সময় লাগল ব্যাপারটা মনে করতে। ও, সেই ছেলেটা। বাইকে করে ওকে একদিন নিয়ে এসেছিল। সামনের চুলটা ব্রোঞ্জ রঙে রাঙানো!
“কী হল আবার?”
টিটি বলল, “আরে, নকুর এক আধপাগলা দাদা আছে। বই বিক্রি করে। তাকে আজ পুলিশে ধরেছে। লেক মার্কেটে বই নিয়ে ঘুরছিল। কে একটা লোক নাকি বই কিনে কম পয়সা দিয়েছে। তাকে কলার ধরে মেরেছে পাগলাটা! কাছেই পুলিশ ছিল, মালটাকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়েছে। জানিস, লেখাপড়া করা মানুষ, কিন্তু মাথাটা মায়ের ভোগে পুরো! এইমাত্র ফোন করল নকু। রিতুদাকে বলতে হবে।”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না!
“যাক গে,” টিটি বলল, “চল। রিতুদা একটা কাজ দেবে তোকে। একজন এসেছে।”
ওই রোলটা খেয়ে খিদেটা যেন আরও চাগাড় দিয়ে উঠল। খিদে পেলে মাহিরের কষ্ট হয় খুব। ওর মনে হল আশপাশের গাছপালাগুলোকে ধরে ধরে খেয়ে নেয়! কিন্তু তারপরেই মনে হল, ভাই কি কিছু খেয়েছে! ওর তো খাবারের এখন খুব কড়াকড়ি। সব কিছু তো খেতে পারে না। মা রান্না করে রেখে যায়, কিন্তু তুয়াদি কি দিয়েছে খাবার?
“আর দাঁড়াস না, চল…” টিটি মাহিরকে ঠেলল।
আশপাশের অন্ধকারের মধ্যে রিতুদার অফিসটা যেন বিয়েবাড়ির প্যান্ডেল! দুটো ইনভার্টার আছে অফিসে। বেশ বড়। এসিও চলে। তবে এসিটা আছে রিতুদার ঘরে।
সত্যি বলতে কী, এইসব দেখে তাক লেগে যায় মাহিরের। ক্লাস নাইন পাশ রিতুদা। আগে ট্যাক্সি চালাত। সেখান থেকে কী করে যে আজ এই জায়গায় এল কে জানে! চারিদিকে এত মানুষের এত সাফল্য দেখে খুব অবাক হয় মাহির। কী করে লোকজন টাকা রোজগার করে ও জানে না। কোন পথে হাঁটলে বাধ্য ছেলের মতো টাকাপয়সা ঢোকে পকেটে?
অফিসের ভেতরে ঢুকল মাহির। আজও কয়েকজন বসে আছে। তবে বাইরে গুমোট বলে, আজ ভেতরে ফ্যানের তলায় বসে রয়েছে লোকজন।
মাহিরের বড়সড় চেহারাটা সবাই চেনে। সবাই জানে রিতুদা বিশেষ পছন্দ করে মাহিরকে। লোকজন একটু খাতিরের চোখে তাকাল মাহিরের দিকে। মাহির পাত্তা দিল না। এগুলোকে দেখলে গা জ্বলে! কাজের কাজ কিছু নেই শুধু বসে বসে বিনে পয়সায় চা-মুড়ি খাওয়ার ধান্দা! ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু নিজেদের মাতব্বর ভাবা!
মাহির রিতুদার চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করল।
“আয়,” রিতুদার গলা পেল মাহির।
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল ও। আর সঙ্গে-সঙ্গে শরীর জুড়িয়ে গেল যেন। চেম্বারের ভেতরটা কী ঠান্ডা! নিজের অজান্তেই চোখ যেন বুজে এল মাহিরের। কিন্তু তারপর চোখ খুলেই কেমন একটা ধাক্কা লাগল! আরে বাবা, সামনে কে বসে রয়েছে! সেই মেয়েটা!
মাহিরের গলা শুকিয়ে গেল নিমেষে। মেয়েটা ওকে মাথা ঘু্রিয়ে দেখল। মেয়েটাকে দেখেছিল বেশ কিছুদিন আগে গড়িয়াহাটার কাছে। টিটির অটোয় বসে ছিল ও। আর মেয়েটা আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায়! মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়েছিল। মাহিরের মনে হয়েছিল মেয়েটা চিনতে পেরেছে নিশ্চয়ই। তাই দোনোমোনো করে, সামান্য হেসেছিল মাহির। আর অবাক হয়ে দেখেছিল মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল। এত অপমান লেগেছিল ওর! মনে হচ্ছিল চলন্ত অটো থেকে লাফ মেরে মাটির তলায় ঢুকে যায়!
মনের ভেতরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল যেন! নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করছিল। পাশে বসা টিটিকে নিচু স্বরে বলেছিল কথাটা, “শালা, আমায় চিনল না!”
টিটি হলদে দাঁত বের করে বলেছিল, “কেন চিনবে? শালা, কুম্ভকর্ণের নাতির মতো বিলা জিয়োগ্রাফি! বার্নিশ করা মেয়েদের দিকে হিড়িক দিতে গিয়েছে! আবার অভিমান হচ্ছে! শোন, আমাদের মতো মালেদের কাছে অভিমান মানে অমিতাভ-জয়ার সিনেমা। বুঝেছিস?”
“তুই থাকিস কোথায়?” রিতুদার গলায় বিরক্তি টের পেল মাহির।
মাহির বলল, “খেলা ছিল রিতুদা।”
“তো, ফোনটা অফ রেখেছিলি কেন?”
এবার মাহির কিছু বলার আগেই টিটি বলল, “ওর মোবাইলটা ভোগের বাসি হয়েছে রিতুদা।”
সামনে একটি মেয়ে বসে রয়েছে। টিটির এমন ভাষায় রিতুদা বিরক্ত হল, “তুই এসেছিস কেন ভেতরে? বাইরে যা। ডেকেছি মাহিরকে, তুই এসে কী করছিস?”
টিটি থতমত খেল, “না মানে… রিতুদা ওই ইয়ে… নকুর দাদার ওই…”
রিতুদা চোয়াল শক্ত করে তাকাল টিটির দিকে, “বাইরে পানু আছে, ওকে বল। সব আমি করব? বেরো এখন ঘর থেকে।”
টিটি আর সময় নষ্ট না করে হেসে বেরিয়ে গেল। মাহির অবাক হল। ভাবল, এটাই হল স্ট্রেংথ! সবার সামনে খিস্তি খেয়েও পাবলিক ধন্য হয়ে যাচ্ছে!
রিতুদা সময় নষ্ট না করে মাহিরকে বলল, “শোন, ইনি হচ্ছেন পলি দে। নানা সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে আছেন। তার মধ্যে একটা হল, ওল্ড এজ হোম। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছে ওঁদের হোম। কিছু ফিনানশিয়াল এড লাগবে ওঁদের। আমার তো যাওয়ার সময় নেই। তাই তুই যাবি ওঁদের ওখানে। সব দেখে আসবি।”
“আমি?” মাহির ঘাবড়ে গেল।
“পারবি না? শুনেছি তুই টুয়েলভ অবধি পড়েছিস। ইংরেজিতে ভাল ছিলি। আমার কাছে যেগুলো আছে সব টিটিএমপি!”
“মানে?” মাহির অবাক হল। দেখল, পলিও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“মানে টেনে-টুনে মাধ্যমিক পাশ। তাই তুই যাবি। বুঝলি?”
মাহির মাথা নাড়ল।
“ওর সঙ্গে কথা বলে নে কবে যাবি। গিয়ে সব দেখে এসে আমায় রিপোর্ট করবি। ভরসা করছি মাহির, ডোবাবি না!” শেষের কথাগুলো সামান্য শক্ত গলায় বলল রিতুদা।
মাহির পলির দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি বলুন কবে…”
“এখানে নয়, বাইরে গিয়ে কথা বলবি,” রিতুদা মাহিরকে এককথায় চুপ করিয়ে দিয়ে তাকাল পলির দিকে, “আপনি কাইন্ডলি একটু বাইরে গিয়ে বসবেন প্লিজ়? ওর সঙ্গে একটু কথা আছে আমার। সেরে নিয়ে ও বাইরে আপনার সঙ্গে কথা বলবে।”
“শিয়োর,” পলি মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা নিজের ফাইলটা গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। শুধু যাওয়ার আগে সামান্য হাসল মাহিরের দিকে তাকিয়ে।
মাহির মাথা নামিয়ে নিল। সেই বিকেল। ভিড়ে ঝুঁকে যাওয়া গড়িয়াহাট আর একটা মেয়ের গম্ভীরভাবে মাথা নামিয়ে নেওয়া আবার মনে পড়ে গেল ওর।
মাহিরের মাথা নামিয়ে নেওয়ায় পলির ভুরুটা সামান্য কুঁচকে গেল।
পলি বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরটাকে অসম্ভব রকম নিস্তব্ধ মনে হল মাহিরের। শুধু এসির গুঞ্জন। ও দেখল রিতুদা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। একদৃষ্টে।
মাহির কী করবে বুঝতে পারল না।
রিতুদা বলল, “তোর ভাইয়ের ডায়ালিসিস দরকার? কিডনি গেছে?”
মাহির মাথা নাড়ল শুধু।
রিতুদা মাথায় হাত বোলাল। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, “আমার একটা ভাই ছিল, জানিস। কথা বলতে পারত না। খুব ভালবাসত আমায়। আমি তেমন কিছু করতাম না তখন। বাবা তো অসুস্থ ছিল। মা লোকের বাড়িতে রান্না করত। ভাইয়ের টাইফয়েড হয়েছিল। সেটার ভাল করে চিকিৎসা করাতে পারিনি। এগারো দিনের মাথায় ভাইটা চলে গিয়েছিল। আজ আমার কী নেই বল! নেই, ভাইটা নেই আমার! তোর টাকার দরকার মাহির। আমার কাজের দরকার। যেসব ছেলে আমার আছে তাদের দিয়ে সবকিছু হবে না। প্লাস মনা পান্ডের কাছেও কেউ-কেউ যায়। তুই প্লেয়ার। প্লেয়াররা দু’মুখো হয় না বলে আমার বিশ্বাস। একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তোর আছে। তুই কাজ কর আমার কাছে। মারামারি করতে বলছি না। মাসে-মাসে টাকা পাবি। ভাইয়ের চিকিৎসা যাতে কম টাকায় হয় আমি দেখব। কী বলিস?”
মাহির তাকাল রিতুদার দিকে। ভাবল বলবে কি না। তারপর মনস্থির করে সব সংকোচ ঝেড়ে বলল, “আসলে মা রাগ করে। পার্টির কাজে রিস্ক। তাই… একটা প্লেয়ার কোটায় চাকরি পেলে সুবিধে হয়। বা যদি ফার্স্ট ডিভিশনে একটা চান্স…”
“ভাইটাকে হারাতে চাস? সোনাঝুরিতে হাউজ়িং-এর প্রসপেক্ট খুব ভাল। অত জায়গা! সঙ্গে আমাদের পার্টিরও ইন্টারেস্ট আছে। ওখানে তারক চক্রবর্তী বলে আমাদের একজন আছে। কিন্তু খুব ঘোড়েল জিনিস। আমায় বলা হয়েছে ওর ওপর নজর রাখতে। আমি যাব মাঝে মাঝে, কিন্তু আমি চাই তুই ব্যাপারটায় থাক। এটা আমার লাস্ট অফার। জোর করছি না। লজিকাল হতে বলছি। আর কিন্তু আমি ডাকব না। আবার ভরসা করছি তোর ওপর।”
“আমার ওপর?” মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না।
আগে খিদের জন্য পেটটা কেমন করছিল, এখন টেনশনে করছে। ও কী করবে? কোথায় জড়িয়ে পড়ছে? টেনশন কি খিদের মতোই কিছু!
রিতুদা বলল, “দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় এর চেয়ে বড় প্রজেক্ট নেই। অনেক টাকার ব্যাপার। ওখানে একটা বাড়ি আছে। বিশাল বড়। জুটমিল, বড় জায়গা, প্লাস ওই বাড়ি। নানা কোম্পানি যাচ্ছে। চড়চড় করে দাম বাড়ছে। তারকের পোয়াবারো। তাই আমায় ওটা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বুঝতে পারছিস? এই নে।”
মাহির দেখল রিতুদা টেবিলে ওর সামনে কয়েকটা পাঁচশো টাকার নোট রাখল।
“কী হল, নে!”
স্যার বলতেন, “সততার চেয়ে বড় কিছু হয় না মাহির। আর সততা আসে মনের শুদ্ধ ইচ্ছে থেকে। মন যাতে সায় দেয় না সেটা না করাই ভাল। আমাদের অজ্ঞাত মন, জ্ঞাত মনের চেয়ে শক্তিশালী! তাই তার ইশারা মানতে হয়। জানবি, কোনও কিছুর জন্য সততা বিসর্জন দেওয়া যায় না!”
স্যার মারা গিয়েছেন। কিন্তু আসলে স্যার এখনও বেঁচে আছেন মাহিরের মনের মধ্যে। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই মুখ বাড়ান। কিন্তু স্যার, আপনি কি দেখতে পান আমার ঘরটা? আমার মাকে? স্যার, আপনি কি জানেন আমার ভাইয়ের কী হয়েছে? কত টাকা লাগবে ভাইকে বাঁচাতে? ওই স্টার, লেটার এসব পাওয়া আমার খুব ভুল হয়ে গিয়েছে স্যার! ইংরেজিতে ওই নাম্বারটা পাওয়াও ঠিক হয়নি একদম। যারা এসব পায়নি, যারা নিজেদের বিজ্ঞাপন করতে পারে, হ্যাংলার মতো নিজেদের ঢাক পেটাতে দ্বিধা করে না, যারা পয়সা আর ক্ষমতা ছাড়া কিছু বোঝে না, তাদের মতো হতে পারলে খুব ভাল হত স্যার! আমার মাকে এই রাত অবধি আয়ার কাজ করতে হত না। আমার ভাইকে বাঁচাতে পারব কি না এই নিয়ে এত ভাবতে হত না। বন্ধুত্বের আড়ে অন্যের এঁটো খাবার খেয়ে খিদে মেটাতে হত না!
স্যার, আমাদের মতো যাদের কেউ ভালবাসেনি, যাদের মনে এত-এত সেন্টিমেন্ট, এত লজ্জা, যারা অভিমান করে আর কিছু করলই না জীবনে, তাদের ইংরেজিতে একাশি পাওয়া ঠিক নয়। তাদের আপনার মতো স্যার পাওয়াও মস্ত বড় ভুল। আপনি আমার মনের মধ্যে বসে এবার থেকে যতই চিৎকার করুন স্যার, আমি আপনার কথা আর শুনছি না। কিছুতেই আর আপনার কথায় কান দিচ্ছি না।
রিতুদার দিকে তাকাল মাহির। মোটা মানুষটা হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। সামনে, এসি থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়ছে নতুন পাঁচশো টাকার কয়েকটা নোট!
মাহিরের মনে পড়ল নিজের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা সেই আকাশটাকে। ধুলোটে আকাশ। জেদি কিছু তারা মুখ বাড়িয়ে রেখেছে! জীবনও কি এমন? জেদি মানুষরাই কি তবে এই আবছা পৃথিবীর ধূলি-মলিন চাদর ছিঁড়ে মুখ দেখাতে পারে? আর ওই অনেক ওপরের সেই অলক্ষ্যে বসে থাকা মানুষ, সে কি দেখছে মাহিরকে? ফড়িঙের মতো সে-ই কি ফড়ফড় করে উড়ছে সামনে?
মাহির চোয়াল শক্ত করল। তারপর হাত বাড়াল এক জীবন থেকে অন্য একটা জীবনের দিকে।
.
১৪. পেখম
শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয় থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল পেখম। বিকেল শেষ হচ্ছে সোনাঝুরিতে। এই রাস্তা ধরে সামনে গেলে গঙ্গার ঘাট। সেখানে নৌকো লেগেছে নিশ্চয়। পিলপিল করে মানুষ আসছে।
অধিকাংশই নিম্নবিত্ত মানুষ। রুজির জন্য গঙ্গার ওই পারে যায়। ওই পারে ইটখোলা আছে কিছু। একটা কটন মিলও আছে।
পেখম একটু সরে দাঁড়াল। রিকশা যাচ্ছে। সাইকেলও। ঘাটের পাশে সাইকেল রাখার একটা বড় জায়গা রয়েছে। ও জানে আর-একটু পরেই আবার সব ফাঁকা হয়ে যাবে।
ও আকাশের দিকে তাকাল। ওই ওপরে একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। ঠাকুরদা বলেন একটা তারা দেখে ঘরে ঢুকতে নেই। অমঙ্গল হয়।
পেখম এদিক-ওদিক তাকাল, আর-একটা তারা যদি চোখে পড়ে! কিন্তু না, আর কিছু ফোটেনি এখনও। একটা মাত্র তারা মিতুকাকিমার নাকছাবির মতো জ্বলজ্বল করছে আকাশে!
পশ্চিমে মেঘ ঘনাচ্ছে! বৃষ্টি হবে কি? এই শীতের শেষটায় মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। মা বলে এতে নাকি পুণ্য হয় খুব!
কীসের যে ভাল, কীসের যে পুণ্য, পেখম বুঝতে পারে না। আশপাশে আর কী ভাল হতে পারে। ওর তো সারাক্ষণ মনমেজাজ খারাপ হয়ে থাকে আজকাল। সারাক্ষণ মনে হয় বুকের ভেতর কে যেন পাথর বেঁধে রেখেছে। শরীরে যেন ঝিঁঝি পোকা ডাকে। একটা এমন বড় জঙ্গল যে শরীরের ভেতর ঘাপটি মেরে ছিল, সেটা এতদিন বুঝতেই পারেনি। পড়ায় মন বসে না। রাতে ঘুম হয় না ভাল। ভাল করে খেতে ইচ্ছে করে না। সাজতে ইচ্ছে করে না। বাড়িতেও আজকাল কারও সঙ্গে কথাই বলে না পেখম। ইচ্ছেই করে না।
টেটু এসে মাঝে মাঝে জ্বালায়। কেন চুপ করে আছে, সেই নিয়ে খোঁচায়। কিন্তু সামান্য হেসে দু’-একটা কথা বলে টেটুকে কাটিয়ে দেয় পেখম। এই কুড়ি বছর বয়সেই মনে হয় অনেকটা ক্লান্তি এসে গিলে নিয়েছে ওকে!
মা যে কাজুকে সরাসরি রাস্তায় ধরে ডেকে ওকে পড়াতে আসতে বারণ করে দেবে, সেটা ভাবতে পারেনি পেখম!
“কী রে, বললাম দোকানের ভেতরে দাঁড়াতে! না শুনে বাইরে এসে কী করছিস?”
নয়নার কথায় ওর দিকে ফিরল পেখম। আজ একটা পঞ্চো পরে আছে নয়না। শাড়ির ওপর ক্রুশের কাজ করা পঞ্চো। সুন্দর দেখতে। পুরী থেকে কিনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয়, পেখমের জন্যও এমন একটা কিনে এনেছে!
পেখম নিতে চায়নি। ও কিছু দিতে পারে না নয়নাকে। কখনও কিছু দিতে পারে না। সেখানে কী করে ওর কাছ থেকে এটা-ওটা নেবে ও?
কিন্তু নয়না শোনেনি কথা। আসলে নয়না কারও কথাই শোনে না। এত জেদি একটা মেয়ে যে, বলার নয়!
নয়না বলেছিল, “তুই নিবি না তো? ঠিক আছে আমারটাও তা হলে জ্বালিয়ে দেব। তোরটা আমারটা একসঙ্গে জ্বালিয়ে দেব। খুব দেমাক হয়েছে তোর, না? সব ঘুচিয়ে দেব একবারে!”
পেখম নয়নার সঙ্গে জেদ করে পেরে ওঠে না। আসলে কারও সঙ্গেই ও ঠিক জেদাজেদি করে পেরে ওঠে না। পারলে কি আর মা এমন করে কাজুকে আসতে বারণ করে দিতে পারত!
তাই নিয়েছিল পঞ্চো। কিন্তু আজকাল কিছুই যেমন ভাল লাগে না, কিছুতেই যেমন মন নেই, তেমন ওই পোশাকটাও পড়েই রয়েছে বাড়িতে।
“কী হল তোর? এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কেউ মরে গিয়েছে নাকি?” নয়না ঠেলল ওকে।
পেখমের মনে হল বলে, হ্যাঁ, মরে গিয়েছে! পেখম মরে গিয়েছে!
নয়না আবার বলল, “কাজুদাকে কাকিমা বাড়িতে আসতে বারণ করেছে, তো কী হয়েছে? আচ্ছা, সব কিছুতে মেলোড্রামা না করলে তোর হয় না, না? আমি দেখেছি, যারাই প্রেম করে তাদেরই নানারকম ঝামেলা থাকে। আর ফ্র্যাঙ্কলি, কাকিমা ঠিকই করেছেন।”
“কী বললি?” পেখম ঘুরে তাকাল নয়নার দিকে। এটা কী বলল নয়না?
নয়না বলল, “ঠিক বলেছি। কাজুদা কে এমন যে, এভাবে হেদিয়ে মরছিস? কলেজে পড়িস, ওই বাংলা পড়ানোর জন্য কাজুদার দরকার হয় নাকি? কাকিমা ঠিক করেছেন। আর ভেবে দেখ, কোথায় তোরা আর কোথায় কাজুদা! কাজুদাদের ফ্যামিলি দেখেছিস? ওদের জোনাক-বাড়িতে গিয়ে দেখেছিস? কী চাস তুই এই সম্পর্ক থেকে? প্রেম প্রেম করে মাথা খারাপ করিস? আর কিছু নেই জীবনে? এমন করছিস যেন কী না কী হয়ে গিয়েছে!”
পেখম মাথা নিচু করে নিল। নয়নার গলায় অবিকল মায়ের গলাটা শুনতে পেল ও! সেদিন মা ঠিক এমন করেই বলেছিল।
পেখম ঘরে বসে হারিকেনের আলোয় পড়ছিল সন্ধেবেলা। মা ঘরে ঢুকে পাশে মুড়ির বাটি রেখে দিয়ে বলেছিল, “খেয়ে নে। আর, একটা কথা। কাজুকে আমি আসতে বারণ করে দিয়েছি। মাসে পনেরো টাকা করে আর দিতে পারব না।”
“মানে?” পেখম প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি, “কী বলছ মা?”
মা শাড়ির আঁচলে হাত মুছে বলেছিল, “বলছি, ওই কলির কেষ্টটিকে আমি আসতে বারণ করে দিয়েছি। কী করবে ও এসে? বেকার টাকার শ্রাদ্ধ! আর এই নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে দরবার করবি না। আমি বাবাকেও বলে দিয়েছি, উনি যেন এ ব্যাপারে আর কোনও কথা না বলেন।”
পেখমের গা-হাত-পা কাঁপছিল। এটা কী করেছে মা? এটা কেন করেছে? কাজুর টাকার দরকার। আর সেখানে ওর মা কাজুকে আসতে বারণ করে দিয়েছে!
মা বলেছিল, “প্রেম করা বের করছি তোর! ওই মাকাল ফল একটা! চাকরি-বাকরির নাম নেই! পার্টি করে। আমাদের কুল গোত্রের কেউ নয়। সেখানে প্রেম! পেখম, তোকে বলে দিচ্ছি, আর যদি ওর সঙ্গে দেখা করিস, তবে দেখিস কী হয়!”
পেখম কিছু বলতেই পারছিল না। মাথা নিচু করে বসেছিল ওই হলুদ আলোর বলয়ের পাশে। চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। পেখম ঝগড়া করতে পারে না। চিৎকার করতে পারে না। কাজু বলে, পেখম এক্সপ্লোড করে না, ইমপ্লোড করে!
এখানেও তাই হচ্ছিল। ভেতরে-ভেতরে যেন ভেঙে পড়ছিল ও। তুবড়ে যাচ্ছিল। আর মাইলের পর মাইল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল জনপদ! বুকের ভেতর জ্বালা করছিল পেখমের। কয়েক হাজার মোম যেন একসঙ্গে পুড়ে যাচ্ছিল নিমেষে! আর তার গলন্ত ফোঁটা টপটপ করে খসে পড়ছিল খুলে রাখা বইয়ে, কাঠের টেবিলে!
মা পায়ের শব্দ তুলে এগিয়ে এসে তুলে ধরেছিল ওর মুখ। ঝাঁজালো গলায় বলেছিল, “এত বাড় বেড়ে গেছিস? এত নোংরা হয়ে গেছিস? এই বয়সেই এত! আর এমন মরাকান্না জুড়েছিস কেন? কে মারা গিয়েছে তোর?”
পেখম মাকে বোঝাতে পারে না, মানুষ বেশির ভাগ সময় অন্যের মৃত্যুতে কাঁদে না! কাঁদে নিজের মৃত্যুশোকে!
নয়না হাত তুলে একটা রিকশা দাঁড় করাল। তারপর নিজে তাতে উঠে পেখমের হাত ধরে টেনে তুলল।
পেখম বসতেই রিকশাটা চলতে শুরু করল।
নয়না বলল, “আমি দাদার দোকানে নেমে যাব। একটা কাজ আছে। তুই বাড়ি চলে যাস। আমি পরে দোকান থেকে তোর বাড়িতে যাব, কেমন?”
দাদা মানে পেখমের জ্যাঠার ছেলে। বারুদা। স্টেশন-রোডের ওপর ফোটোর দোকান আছে বারুদার। সোনাঝুরিতে বারুদার দোকানটাই একমাত্র ফোটো তোলার জায়গা। স্টুডিয়োকে এখানকার লোকজন ফোটোর দোকানই বলে।
নয়নার নতুন শখ হয়েছে ফোটো তোলা শিখবে। বারুদার দোকানে পেখমও গিয়েছে। দুটো ক্যামেরা আছে বারুদার। একটা রোলেইফ্লেক্স, আর-একটা পাজটাস। রোলেইফ্লেক্সটা দেখেছে পেখম। কেমন একটা ছোট বাক্সের মতো ক্যামেরা। মাথার ওপর একটা ঢাকনা খোলা যায়। তারপর সেটা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে হয় ভেতরে। অদ্ভুত লাগে পেখমের। বাইরের ছবি উলটো হয়ে যেন জলের ওপর ভেসে থাকে ক্যামেরার মধ্যে। বারুদা তো ছবিও তুলে দিয়েছে ওর। সাদা-কালো বড় ছবি। পেছনে স্টুডিয়োর দেওয়ালে আঁকা ঝরনা, পাহাড় আর নানা গাছ।
নয়না বলে, বারুদার দোকান দারুণ চলছে। অনেকে নাকি আসে ছবি তোলাতে। বিয়ের ছবিই নাকি বেশি। ও বলে, “ভাল করে শিখে নিই, তারপর দেখবি তোর বিয়ের ছবি আমিই তুলে দেব।”
স্টেশন রোড ধরে রিকশা চলেছে। শীতের শেষ। আশপাশের গাছেদের গায়ে খুব বেশি পাতা নেই আর। সবে সরস্বতী পুজো শেষ হয়েছে। সোনাঝুরিতে অনেক সরস্বতী পুজো হয়। কিন্তু সব ছোট-ছোট। রাস্তার ওপরে কয়েকটা প্যান্ডেল দেখতে পাচ্ছে ও। এখনও খোলা হয়নি।
তারই একটার সামনে ঝিকুদাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল পেখম। মলিন পোশাক, এলোমেলো চুল-দাড়ি। শূন্য প্যান্ডেলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ঝিকুদা।
পেখমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল দৃশ্যটা দেখে। এটাই তো ঝিকুদার জীবনের সত্যি! মেলা ভেঙে যাওয়া, প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পরের শূন্য প্যান্ডেল। এমনটাই তো বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝিকুদা! ওকেও কি এমন শুনশান একটা ম্যারাপবাঁধা শূন্যতা বুকে করে বেড়াতে হবে? মানুষের জীবনে এমন কেন হয়? যাকে সে চায়, তাকে না পেলে এমন ভেঙে যায় কেন সব? সব কিছু অর্থহীন হয়ে পড়ে কেন? কেন মনে হয় এক-একটা দিনের ওজন বিশাল পাথরের মতো? কেন মনে হয় সেই পাথর রোজ ঠেলে তুলতে হচ্ছে পাহাড়ের মাথায়? ভাঙা মানুষ কি আসলে সিসিফাস?
“ওই দেখ বিলকিস!” হিহি করে হাসল নয়না, “শালাটা প্রেম করে মায়ের ভোগে গেছে! ভাইরাও লাথি মেরে বের করে দিয়েছে!”
“তুই হাসছিস!” পেখম অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল নয়নার দিকে। আগে তো মেয়েটা এমন ছিল না! আজকাল কী হয়েছে ওর! কেমন যেন মুখের ভাষা! আর কেমন একটা চাপা হিংস্রতা কাজ করে কথাবার্তায়! মাঝে মাঝে এই নয়নাকে চিনতে পারে না ও।
“দেখ পেখম,” নয়না বলল, “জীবনে কেউ তোকে প্লেটে সাজিয়ে কিছু দেবে না। সব কিছুর একটা দাম দিতে হয়। বিনেপয়সায় কিছু হবে না। ঝিকুদার যা গল্প আমি শুনেছি, তাতে লোকটা ক্যালানে ছাড়া আর কিছু নয়।”
পেখম আর কথা বাড়াল না। ও একটা জিনিস আজকাল বুঝতে পারে— জীবনটা বীজগণিত বা পাটিগণিত নয়! লোককে বুঝিয়ে লাভ হয় না। যে যেটা ভাল মনে করে, সেটাই করে।
“কী হল, চুপ করে আছিস কেন?” নয়না খোঁচা দিল, “দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস তুই! কী হয়েছে তোর? কাজুদার কথা বাদ দে। কাকিমা বারণ করল আর ব্যস, সেও লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল! বোঝ, মানুষ কেমন বোঝ!”
কথাটা যে ঠিক নয়, সেটা জানে পেখম। কারণ, মায়ের ওই কথার পরে একদিন সোনাঝুরি পাম্প হাউসের পাশে কাজুর সঙ্গে দেখা করেছিল পেখম। মা বেরোতে দিচ্ছিল না। কিন্তু বিজনের সঙ্গে যাচ্ছে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল ও।
পাম্প হাউসের মাঠটা শেষ বিকেলে নির্জন থাকে। বিজনকে দিয়ে আগেই কাজুর কাছে খবর পাঠিয়েছিল ও। কাজু এসে অপেক্ষা করছিল পাম্প হাউসের কাছে।
বিজন ছেলেটার বয়স খুব বেশি না হলেও পরিণত অনেক। পেখমকে বলেছিল, “পেখমদি তুমি যাও, আমি ওই সামনের সিনেমা হলের কাছে তেলেভাজার দোকানে আছি। কথা হয়ে গেলে এসো ওখানে।”
পাম্প হাউসের কাছে পেখমকে ছেড়ে দিয়ে বিজন ওই চপের দোকানের দিকে চলে গিয়েছিল।
সেদিন কাজু কেমন যেন একটু গম্ভীর হয়ে ছিল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আশপাশে খোলা মাঠ পেরিয়ে শীত শেষের হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছিল ওর চুল।
“কেন ডেকেছ?” কাজু দূরের দিকে তাকিয়েই মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
“কেন মানে? তুমি জানো না কেন? আগে সপ্তাহে একদিন দেখা হত তোমার সঙ্গে আর এখন… এখন কী করে দেখা করব?”
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “পেখম আমাদের সম্পর্ক নিয়ে সবার যখন এত আপত্তি তখন আর কী হবে?”
“মানে?” পেখম স্থান কাল ভুলে এগিয়ে গিয়ে কাজুর হাত ধরে টান মেরেছিল, “এটা কী বলছ তুমি? কার মা-বাবা এসব মেনে নেয়? সবাই প্রথমে আপত্তি করে। পরে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কাজু এবার তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। হাওয়া এসে মিশে যাচ্ছিল ওর চুলে। ওর কোঁকড়া চুলগুলো নেমে আসছিল কপালে। পেখম বলেছিল, “সামনের বছর আমি পাশ করে যাব। তারপর একটা চাকরি দেখে নেব ঠিক। তুমিও কিছু চেষ্টা কোরো। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই তো আমাদের সমাজে দরকার। সেটা আমাদের থাকলে দেখবে, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। আমরা নিজেদের মতো করে সংসার করব।”
কাজু বলেছিল, “আমার পরিবার? তাদের কী হবে? তাদের তো ছেড়ে আমি যেতে পারব না! আর তোমার বাবা মা…”
“ছাড়তে বলছি না তো! আমরা থাকব একসঙ্গে। আর আমার বাবা-মা কড়া মানুষ। কিন্তু খারাপ নয়। ওরা ঠিক মেনে নেবে।”
কাজু কিছু না বলে হেসেছিল, “জীবন কি উত্তম কুমারের সিনেমা, পেখম?”
পেখম এগিয়ে গিয়ে কাজুর বুকের কাছে দাঁড়িয়েছিল। হাওয়া এসে আরও যেন মিশিয়ে দিচ্ছিল ওদের। অদ্ভুত এক সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিল পেখম। ও মুখ তুলে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। ওই বড়-বড় চোখ। বাদামি মণি। নরম পশমের মতো দাড়ি। পেখম যেন অতল এক কুয়োয় পড়ে যাচ্ছিল! বুকের ভেতরে কেমন একটা করছিল! মনে হচ্ছিল হাজার হাজার হরিণ দৌড়ে যাচ্ছে ওর শরীর দিয়ে! মনে হচ্ছিল কোথায় যেন ঝনঝন করে রুপোর বাসন পড়ে যাচ্ছে হাত ফসকে!
কাজু আচমকা সরে গিয়েছিল, তারপর হাত দিয়ে পেখমকেও সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আমার সামনে অনেক দায়িত্ব পেখম। অনেক-অনেক দায়িত্ব। অনেক কাজ। তা ছাড়া এভাবে হয় না। এত হোস্টিলিটি তোমার মায়ের! তোমার বাবা-মায়ের একটা মানও তো রয়েছে। আমার মনে হয় এভাবে কিছু করতেও নেই। তুমি এসো এখন।”
মাথা ঘুরিয়ে আবার ঝিকুদাকে দেখল পেখম। ঝিকুদা এখনও তাকিয়ে রয়েছে ফাঁকা প্যান্ডেলের দিকে। আসলে ঝিকুদা নয়, যেন নিজেকেই দেখল ও!
নয়না বলল, “সোজা হয়ে বোস। আর মুখের ওরকম জিয়োগ্রাফি চেঞ্জ কর। তোকে তো যা বলার বলেই দিয়েছে কাজুদা। আর ভাবিস না। তোকে এত সুন্দর দেখতে! সোনাঝুরির প্রায় সবাই তোর পেছনে লাইন দেবে বলে ইট হাতে ঘুরছে! আর সেখানে এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছিস?”
পেখম কিছু বলল না। এই নয়নাকে ওর কাজুর সঙ্গে দেখা হওয়া আর কথা হওয়ার ব্যাপারটা বলাই ভুল হয়েছে। ও ভেবেছিল নয়না কিছু উপায় করবে। কিন্তু নয়না যেন পাত্তাই দিচ্ছে না। পেখমের মনে হল, এভাবে সবার বিরুদ্ধে একা কী করবে ও?
বারুদার স্টুডিয়োর সামনে নেমে গেল নয়না। বলল, “আমার প্যাকেটগুলো তুই নিয়ে যা তো! আমি সাতটা নাগাদ আসব তোদের বাড়ি।”
প্যাকেটগুলো নিয়ে মাথা নাড়ল পেখম। কিছু জামাকাপড় কিনেছে নয়না। কেন কিনেছে কে জানে! মাঝে মাঝেই এসব কেনে ও। জিনিসপত্র কেনাটা ওর বাতিক। ওর বাবা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। পশার খুব বেশি নয়। কিন্তু নয়নার দাদা খুব ভাল চাকরি করে মার্চেন্ট নেভিতে। অনেক টাকা রোজগার করে। বোনের সব শখআহ্লাদ দাদাই মেটায়।
বাড়ির সামনে রিকশা ছেড়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকল পেখম। আজ সদর দরজা খোলা। কোলাপসিবল গেটটাও পুরো হাট করা। কী ব্যাপার! একটু যেন অবাকই হল ও। সেভাবে ওদের সদর বন্ধ করা না হলেও কোলাপসিবল গেটটা টানাই থাকে। আজ সেটা খোলা কেন?
গেট দিয়ে ঢুকে থমকে গেল পেখম। সামনের লম্বা করিডরের এক পাশে খুলে রাখা জুতো দেখে বুঝল মিতুকাকিমা এসেছে!
কাকিমা সাধারণত সন্ধেবেলা সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ আসে। এমন ছ’টার সময় তো আসে না! আর এলেও চুপচাপ কথা হয় মায়ের সঙ্গে। এভাবে জোরে-জোরে হাসি-ঠাট্টা তো কোনওদিন শোনেনি!
জুতোটা খুলে নিজের ছোট ঘরের দিকে গেল পেখম। হাতের কাগজের প্যাকেটগুলো রেখে গায়ের পাতলা চাদরটা খুলে রাখল। একটু পরে পড়তে বসবে। মানে, পড়ার চেষ্টা করবে আর কী। আজকাল কিছুতেই পড়ায় মন বসে না! তাও বসে, চেষ্টা করে।
পেখমের ঘরের জানলার সামনেই অনেকটা ঝোপের মতো। তারপরই পুকুর। সর্দারদের পুকুর।
ওর ঘরে একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। কিন্তু বাইরেটা বেশ অন্ধকার। পুকুরের ওই পাড়ে কলাবাগান। তার আড়ালে একটা বাড়ি আছে। সেখানে অন্যদিন আলো থাকে। কিন্তু আজ ওই বাড়িতেও আলো জ্বলছে না।
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল পেখম। কীসের যে টান অন্ধকারের, ও বোঝে না! কিন্তু এমন করে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে ওর। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায় ক্রমশ। অন্ধকার যেন ধীরে-ধীরে গুলে যেতে থাকে ওর মধ্যে। ওর সব মনখারাপ কেমন যেন আলোহীনতার সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
আর তখনই ওদের চোখে পড়ল পেখমের। দুটো-চারটে করে অন্ধকারের পরদা সরিয়ে উঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ওরা। জোনাকিরা। সবুজ-হলুদ আলো জ্বেলে সামনের ঝোপ থেকে লাজুক মুখে বেরিয়ে আসছে জোনাকিরা। যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে তারা! যেন মনের না-মেটা ইচ্ছের আলোবিন্দু! যেন সন্ধে নামক নারীর ফেলে যাওয়া টিপ!
পেখম তাকিয়ে রইল ওই আলোর বিন্দুর দিকে। ওর মনে পড়ে গেল কাজুর কথা। এমনই এক সন্ধেবেলা কাজু জোনাকি দেখে বলেছিল:
‘অন্ধ আমার জীবন জুড়ে রাত্রি একা নামে
তোমার বাড়ির মাথায় এসে কাদের আকাশ থামে?
কাদের শহর চমকে ওঠে তোমার ধ্রুবতারায়
কোথায় কারা ভিজল, যখন বৃষ্টি তোমার পাড়া
সাজিয়ে তোলে বর্ষাতি আর একলা বকুল দিয়ে?
তোমার মুখের হলুদ আভা নিজের পিঠে নিয়ে
বন্ধু নামের বিন্দু যেন আলোর মতো ভাসে
তোমার কথা ভাবলে আমার জোনাক মনে আসে!
“দিদি, তুই এসে গেছিস?”
পেখম সামান্য চমকে উঠল টেটুর ডাকে। ও চট করে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিল। তারপর নিজেকে সামলে তাকাল টেটুর দিকে।
টেটু কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল এবার, “তুই কাঁদছিস দিদি?”
“কই, না তো!” পেখম হাসার চেষ্টা করল।
টেটু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল পেখমের দিকে। তারপর বলল, “আমি জানি তুই কাঁদছিস। আমি কি বুঝি না? আমিও বড় হয়েছি।”
পেখম হাত বাড়িয়ে ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, খুব বড় হয়েছিস! রাতে একা বাথরুমে যেতে ভয় পায়, আবার বড় হয়েছে!”
টেটু বলল, “আরে, সে তো সবাই ভয় পায়। তাতে কেউ ছোট হয়ে যায় নাকি? এই যে জেঠু পুলিশে আছে। সেই জেঠুও তো ভয় পায় পাগলা কুকুর দেখলে। আমার বাবা যে বাবা, বাবা তো ভয় পায় মাসের শেষ এলে। আর আমার মা, সেদিন আচমকা ঘুম ভেঙে শুনি মা বাবাকে ফিসফিস করে বলছে, ‘এমন শুধু-শুধু কোরো না, আচমকা কিছু হয়ে গেলে… আমার ভয় লাগে।’ তা হলে?”
এই সেরেছে! টেটু কীসব বলছে! পেখম উঠে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরল। ছেলেটা এখনও বাচ্চাই আছে। বলল, “কী বলবি বল।”
“জেমা ওই ঘরে ডাকছে তোকে। খুব দরকার বলল।”
“মা ডাকছে?” অবাক হল পেখম।
“চল, দেখ না কীসব হচ্ছে তোকে নিয়ে…” টেটু আর না দাঁড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল!
ওকে নিয়ে! ওকে নিয়ে আবার কী হচ্ছে! পেখম ধীরে-ধীরে মায়ের ঘরের দিকে গেল।
পেখম দেখল ঘরে মা, মিতুকাকিমা, ছোটকাকিমা ছাড়াও বাবা রয়েছে আজ।
ও জানে আজ বাবার অফ ডে। কিন্তু অফ থাকলে তো বাবা দোকানে যায়। আজ যায়নি?
“আয় আয়,” পেখমকে ডেকে ধরে নিয়ে নিজের পাশে মোড়ায় বসাল ছোটকাকিমা। পেখম বুঝতে পারল না কী হয়েছে। এভাবে ওকে ধরে-ধরে বসাচ্ছে কেন?
পেখম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে।
মায়ের মুখটা ঝলমল করছে। মা হাসছে। কতদিন পরে মা হাসছে। আর বাবা? বাবা কেমন যেন একটা মুখ করে বসে রয়েছে! ব্যাপারটা কী?
মিতুকাকিমা নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে পেখমের পাশের টুলে বসল। তারপর বলল, “এভাবে পাগলির মতো থাকিস কেন? একটু সাজগোজ করতে পারিস না?”
“কেন?” পেখম অবাক হয়ে তাকাল মিতুকাকিমার দিকে।
ছোটকাকিমা বলল, “সাজগোজ না করেই তো এই! আর সাজলে কী যে হবে!”
“তা ঠিক…” মিতুকাকিমা হাসল, “এমনি-এমনি কি আর এটা হয়েছে?”
“কী হয়েছে?” পেখম বুঝতে পারল না।
মা ঝলমল করে বলল, “মিতুদি তোর বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে!”
“আমার? বিয়ের?” পেখমের মনে হল কেউ যেন ঠাস করে ওকে একটা চড় মেরেছে!
মিতুকাকিমা ওর হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, তোর। জানিস, কে তোকে বিয়ে করতে চেয়েছে?”
পেখম কিছু না বলে তাকিয়ে রইল মিতুকাকিমার মুখের দিকে।
মিতুকাকিমা হেসে বলল, “সুদর্শন মালিকের ছেলে সুজিত মালিক। ওই জুট মিলের মালিক, ওই জোনাক-বাড়ির মালিক। বুঝতে পারছিস?”
পেখম স্থির হয়ে গেল নিমেষে। মিতুকাকিমার মুখটাও মায়ের মতো হয়ে উঠছে ক্রমশ। ঘরের আলোয় কাকিমার ছোট্ট নাকছাবিটা চকচক করছে। পেখমের সামনে থেকে সব কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। শুধু চোখের মধ্যে যেন বিঁধে আছে ওই নাকছাবিটা। একলা তারার মতো নাকছাবিটা। পেখম মনে মনে আরও অনেক তারা খুঁজল। কিন্তু আর তারা নেই। আর কোনও তারা নেই। শুধু ওই একটা তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে।
পেখমের মনে পড়ল, একটা তারা দেখে ঘরে ফিরতে নেই। অমঙ্গল হয়। পেখম বুঝল ঠাকুরদা ঠিকই বলেন।
Chapter - 15 to 19
১৫. নিশান
ট্রেন থেকে নেমে ঘড়িটা দেখল নিশান। সাড়ে ছ’টা বাজে। রাতে স্টেশনে যতটা আলো থাকার কথা ততটা আলো নেই। তার ওপর মানুষ নামলেও তার গায়ের জামাকাপড় নামতে পারবে না ধরনের ভিড় এই ট্রেনটায়! এইভাবে কি কাগজ কিনে আনা যায়? কেয়াদিকে বলেছিল, “এমন করে কেন জেদ করছ! কলেজ স্ট্রিটে ডিটিপি করে সেখানেই ছাপতে দিয়ে দাও না। কেন শুধু-শুধু গাধার খাটনি খাটাচ্ছ?”
কেয়াদি কানের বড়-বড় ঝোলা দুল নাড়িয়ে উত্তর দিয়েছিল, “গাধাকে মানুষের মতো খাটাব নাকি? যা বলছি, কর। খালি তর্ক! পার্টি করা মানুষগুলোকে এই জন্য দু’চক্ষে দেখতে পারি না আমি। আর হবি নাই-বা কেন! ওই দেড়েলটার সঙ্গে মিশে-মিশে তুই গেছিস!”
কেয়াদির পত্রিকার নাম ‘সন্দর্ভ’। বছরে তিনটে করে বের করে। এটা বর্ষা সংখ্যা। কেয়াদি পত্রিকাটা সোনাঝুরি থেকেই ছাপাতে চায়। এখানে কম্পোজ় করে, এখানেই ছাপিয়ে, বাঁধাই করে বের করতে চায়।
ডবল ডিমাই সাইজ়ের কাগজ। সঙ্গে কভারের জন্যও মোটা ধরনের কাগজ। এই সব বয়ে আনা চাট্টিখানি কথা নাকি? পথ বেশ অনেকটা। কলেজ স্ট্রিট থেকে শিয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে এই সোনাঝুরি। অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে নিশানের।
সোনাঝুরিকে কলকাতার সঙ্গে আরও দ্রুত মেলানোর জন্য একটা ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাটের হাল খুব খারাপ, তাই ইচ্ছে থাকলেও ট্যাক্সি করে নিয়ে আসা যায়নি কাগজগুলো।
নিশান একা যায়নি। কারণ, এত কাগজ আনা ওর একার পক্ষে সম্ভব নয়। মণীশকে নিয়ে গিয়েছিল সঙ্গে করে। মণীশের এসব কাজ করা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু কেয়াদির সঙ্গে বেশ ঝগড়া করে ছেলেটা।
নিশান কাগজের বান্ডিলগুলো একপাশে রেখে দাঁড়াল। স্টেশনে খুব ভিড়। রাস্তার অবস্থা খারাপ বলে প্রায় সকলেই ট্রেনেই যাতায়াত করে আজকাল। সারাটা পথ এই মালপত্তর নিয়ে ট্রেনে ওঠায় লোকের বিরক্তি আর গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে নিশানকে। এখনও কাগজ নিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখতে গিয়ে নিশান গালাগালি খেয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। ও এদিক-ওদিক তাকাল। ভিড়টা কমে গেলে বেরোবে। মণীশ ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে।
সাতটার সময় ওর একটা কাজ আছে। ও ঠিক করছে কাগজগুলো দিয়ে মণীশকে রিকশা করে কেয়াদির বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। স্টেশনে ওর সাইকেল রাখা আছে। তাই ও আর রিকশায় যাবে না।
সোনাঝুরি আর মফস্সল নেই। কলকাতার কাছে বলে শহরের ভাবভঙ্গি খুব দ্রুত এসে ছুঁয়ে দিয়েছে ওদের ছোট শহরটাকে।
নিশান ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখল। হা-ক্লান্ত মানুষজন কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। পাখি আর মানুষে কী মিল!
“কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?” মণীশের গলায় বিরক্তি।
নিশান বলল, “ভিড়টা বেরিয়ে যাক। এত পেপার নিয়ে যাওয়া যায় নাকি?”
মণীশ নাক দিয়ে একটা বিরক্তির শব্দ করল, “শালা, ঘরের খেয়ে যতসব বনের মোষের পেছনে হাওয়া দেওয়া!”
নিশান হাসল, “কেন? কী হল?”
“লিটল ম্যাগ। সব ব্যাঙের জিনিসপত্র! কেয়াদিদার এত টাকা যখন, তখন গরিবদের বিলিয়ে দিলেই তো পারে! বেকার এসব করার কী মানে?”
নিশান হাসল আবার, “আরে, আবার দিদা বলছিস? কেয়াদি শুনলে হেভি খচে যাবে।”
“তো, তাতে আমার বয়ে গেল! অত বুড়ি একজন, দিদা বলব না তো কি দিদি বলব?”
নিশান বলল, “তুই এমন রেগে থাকিস কেন সারাক্ষণ? কীসের এত রাগ বল তো তোর?”
মণীশ আবার নাক দিয়ে বিরক্তির শব্দ করল, “এ পৃথিবীতে না রেগে মানুষ থাকে কেমন করে সেটাই তো আমি বুঝি না! কী আছে যাতে মাথা ঠান্ডা থাকবে? ট্রেনে করে আসতে গিয়ে দেখলে তো মানুষজন কেমন হয়ে গিয়েছে? সব শালা খেঁকি কুত্তা!”
“কিন্তু এর মধ্যেই তো বাঁচতে হবে। রাগ করলে হবে? কুল থাক। অত রেগে যাস না। চল এগোই…” নিশান হেসে পিঠে হাত রাখল ওর।
ভিড়টা কমে গিয়েছে। টিকিট-ঘরের পাশ দিয়ে নেমে গিয়েছে রাস্তা। একটা পাড়ার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, আর অন্যটা চলে গিয়েছে বড়রাস্তার দিকে। ওই বড়রাস্তার মোড়েই রিকশা-স্ট্যান্ড। আর স্টেশনের পাশে সাইকেলের গ্যারেজ।
নিশানকে দেখে সাইকেল-গ্যারেজের পিন্টু বলল, “কী দাদা, ওই দিকে যাচ্ছ? সাইকেল নেবে না?”
নিশান হেসে বলল, “আসছি দাঁড়া।”
পথটা খুবই এবড়োখেবড়ো। আলো নেই। রাস্তার একদিকে রেলের পুরনো কিছু কোয়ার্টার আর অন্যদিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা দরমার বেড়ার দোকান। ওই দোকানের আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে পথ। সামান্য অন্যমনস্ক হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে!
নিশান ছোট থেকেই এই রাস্তাটাকে এমন দেখছে। কখনও ঠিক করা হয় না। কেন হয় না কে জানে! মানুষজন এই নিয়ে কিছু বলেও না। নিশান বোঝে আসলে ওরা সবাই আজকাল সেফ খেলতে শিখে গিয়েছে। আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নামক ঘরে বসে বিপ্লব করার মতো একটা মাধ্যম এসে যাওয়ায় ড্রয়িংরুম-বিপ্লবীর সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, আসল কাজের কাজ কিছু হয় না। আর এমন চললে আর হবেও না।
ট্রেনের যাত্রীরা চলে যাওয়ায়, মাত্র একটাই রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার ওই পারে অটো স্ট্যান্ডও রয়েছে। সেখানে ঠেসাঠেসি করে লোক নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নেওয়ার নিয়মের কেউ তোয়াক্কা করে না!
কেয়াদির বাড়ি চ্যাটার্জিপাড়ার ভেতরে। অটো নামিয়ে দেবে বড়রাস্তায়। সেখান থেকে হেঁটে প্রায় পনেরো মিনিট লাগবে। তাই রিকশাই ভাল। একদম বাড়ির দরজায় গিয়ে নামবে।
মণীশ রিকশায় উঠে বলল, “কেয়াদিদার কাছ থেকে কি আমি টাকা নিয়ে নেব? মানে রিকশা ভাড়া থেকে আজকের যাতায়াতের খরচ? তুমি চাইবে বলে তো মনে হয় না!”
“আরে, একদম ওসব বলবি না,” নিশান তাড়াতাড়ি বলল, “আমি সেটা ঠিক কথা বলে নেব। আর ক’টাই-বা টাকা! ওসব নিয়ে ভাববি না তুই একদম। আর শোন, লক্ষ্মীভাইটি আমার, সামনে দিদা বলিস না। জানিস তো কেমন রাগী।”
মণীশ ভুরু কুঁচকে বলল, “আশ্চর্য তো! এসব কমপ্লেক্স কেন বলো তো? ডাক্তার দেখায় না কেন? দিদার বয়সি মহিলাকে দিদি বলব কেন? বয়স তো হবেই। সেটা লুকোনোর কী আছে? ডেবিট কার্ডের পিন নাম্বার নাকি?”
“ওরে ভাই রে, একটা কথা অনন্ত তর্ক না করে মেনে নে বাবু!” নিশান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে রিকশাওয়ালাকে ভাড়াটা দিয়ে মণীশকে বলল, “কাল একবার আসিস বিজনদার ওখানে। কথা হবে।”
“আবার?” মণীশ মালপত্তর পায়ের কাছে রাখল। তারপর ভুরু কুঁচকে বলল, “আবার ছেলে ধরা শুরু করেছ? তোমায় বলেছি না এসব বলবে না আমায়! তোমাদের পার্টিতে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই!”
নিশান রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? প্যাডেল মারো। যাও।”
রিকশাটা চলতে শুরু করল। মণীশ পেছন ঘুরে রিকশার পাশ দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “এভাবে কিছু হবে না। এভাবে র্যানডাম ছেলে ধরে লাভ নেই। এই সমাজের একটা টোটাল ওভারহলিং দরকার। সেটা তোমার ওই বিজনদাদুকে দিয়ে হবে না। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হওয়ার দিন গেছে নিশানদা। বিপ্লব এখন ব্যাবসাজীবী, পরজীবী, বুদ্ধিজীবী আর সেলফিজীবীদের বাপের মাল। বুঝলে?”
নিশান হাসল। আশপাশের লোকজন দেখছে। পাশের পানের দোকানের বিহারি লোকটি নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল, “পাগলা গয়া ক্যা ছোঁড়া?”
নিশান মাথা নাড়ল। মণীশ ভুল কিছু বলছে না। কিন্তু চারিদিকে সব দেখেশুনে খুব মনখারাপ লাগে নিশানের। মানুষের মূল্যবোধ বলে ব্যাপারটাই আর নেই। অবশ্য থাকবেই-বা কী করে? বোধেরই কোনও মুল্য নেই আর! কী করে যে সবটাই এমন টাকা আর শো অফ-এর পৃথিবী হয়ে গেল কে জানে!
নিশান পেছনে ফিরল। সাইকেলটা নিতে হবে। সাতটায় দেখা করতে বলা হয়েছে ওকে। তারক চক্রবর্তীর অফিসে যেতে হবে। কেন ডেকেছে কে জানে!
“নিশান!” আচমকা পেছন থেকে ডাকে থমকে দাঁড়াল ও। চেনা লাগছে গলাটা। ও ঘুরল। আরে, বাদল!
নিশান দেখল মেঘলা আর কাকিমাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে বাদল।
নিশান হেসে এগিয়ে গেল, “তুই! কেমন আছিস?”
বাদল কিছু বলার আগেই মেঘলা বলল, “তুমি কে? কে অধিকার দিয়েছে এসব জিজ্ঞেস করার? আমরা কেমন আছি জেনে কী করবে তুমি?”
নিশান হাসল। মেঘলাটা খুব অভিমানী। আসলে বেশ কিছুদিন ওদের বাড়ি যাওয়া হয়নি। নানা কাজে আটকে গেছে। তাই মেয়েটা রেগে গেছে খুব!
ও মেঘলার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে একটা কালো সানগ্লাস। চিনতে পারল নিশান। এটা ওরই কিনে দেওয়া। বাইরে বেরোলে এটা চোখে দেয় মেঘলা।
নিশান হেসে মেঘলার মাথায় হাত দিল, “তুই জানিস না, আমি কে?”
“না জানি না,” মেঘলা রেগে গিয়ে মাথা সরিয়ে নিল, “কে তুমি? অচেনা মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছ? লম্পট! মলেস্টেশানের চার্জ আনব তোমার নামে।”
“কীসব বলছিস তুই পাগলের মতো?” বাদল মৃদু স্বরে ধমক দিল মেঘলাকে।
নিশান হেসে বলল, “আরে বলুক না ও, পাগলি তো! আমার আসলে কাজ ছিল রে মেঘলা। খুব কাজ। জানিস তো সোনাঝুরিতে কী হচ্ছে! সেই নিয়ে ব্যস্ত আছি।”
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল, “আমি কিচ্ছু জানি না, জানতেও চাই না। তুমি বাজে ছেলে। দাদা যে বাড়িতে ফিরল, সেটাও কি জানো? আমরা কে হই তোমার? দয়ার পাত্র তো শুধু!”
নিশান চুপ করে গেল। আসলে বাদল যে জেল থেকে ছাড়া পাবে সেটা শুনেছিল, কিন্তু সত্যি বলতে কী ভুলে গিয়েছিল একদম। সোনাঝুরিতে ওই জোনাক-বাড়িসহ জুট মিলের বিক্রির ব্যাপারে একটা ঝামেলা পেকে উঠেছে। সেটা নিয়ে বেশ কিছুদিন হল বেশ ব্যস্ততা বেড়েছে ওর। সেই নিয়ে নানা জায়গায় যেতে হচ্ছে!
কথাটা মনে পড়তেই নিশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল! সামনে ভেসে উঠল একটা দোলনা। শূন্য একটা দোলনা। বারান্দায় একা একা দুলছে।
বাদল এগিয়ে এসে বলল, “তুই বেশ রোগা হয়ে গেছিস নিশান। খাওয়া-দাওয়া করছিস না?”
নিশান হাসল। বাদল ওর চেয়ে সামান্য বড়। তাই দাদা-টাদা বলে না কখনও। বাদলের চেহারাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে বেশ। চুল উঠে গিয়েছে। পেকেও গিয়েছে। মুখটা পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছে একদম। দেখে মনে হচ্ছে এই ক’দিনে দশ বছর বয়স বেড়ে গিয়েছে ওর!
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। বাদলকে তো আর ওর শরীর নিয়ে কিছু বলা যায় না। কারণ, তা হলেই জেলের অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এসে পড়বে।
ও বলল, “আমার কথা বাদ দে। তোরা গেছিলি কোথায়?”
বাদল মাথার চুলে হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুলগুলোকে ঠিক করে নিল একটু। তারপর বলল, “মেঘলাকে নিয়ে গেছিলাম ডাক্তারের কাছে। ওই চোখটা দেখানোর ছিল।”
“তো পজ়িটিভ কিছু হল?” নিশান জিজ্ঞেস করল।
“পজ়িটিভ মানে,” বাদল দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “সাউথে নিয়ে যেতে বলছে। অনেক টাকার ব্যাপার। আমার এখন যা পরিস্থিতি…”
নিশান মাথা নামিয়ে নিল। সত্যি, টাকাটা কোথায় পাবে ওরা?
বাদল এগিয়ে এসে হাত ধরল নিশানের, “তুই কিছু করতে পারবি আমার জন্য? কোনও কাজকম্ম দেখে দিতে পারিস? আমি জানি ব্যাপারটা সোজা নয়। জেল থেকে এসেছি শুনলে কেউ বিশেষ কাজ দেবে না। তাও তুই দেখিস একটু। আমি যা করেছি আগে করেছি। আর কোনও খারাপ কাজে যাব না রে। একটা কাজ দেখে দিস ভাই। খুব অসুবিধেয় আছি।”
কথা বলতে-বলতে বাদলের গলা ধরে এল। চোখে জলও এসে গেল যেন। খারাপ লাগল নিশানের। একসময় ওর কাছের বন্ধু ছিল বাদল। ওকে এই অবস্থায় দেখতে ভাল লাগছে না। তা ছাড়া মানুষ তো ভুল করেই। কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল ভুলটা রিপিট না করা। বাদলকে দেখেই বুঝতে পারছে, অতীত নিয়ে বাদল খুব অনুতপ্ত। কিন্তু নিশান কাজ দেবে কী করে? ও নিজেই কাজ করে না। বাবাকে বলতে পারে, কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে গালাগালি খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাবার সঙ্গে ওর পটে না একদম। নিশান বুঝতে পারল না কী বলবে।
কাকিমা মেঘলার হাত ধরে এগিয়ে এল এবার, “নিশান, তুই এসব ভাবিস না তো আর। আমার ছেলে, মেয়ে দুটোই তোকে দেখলে খালি মাগুনে মানুষের মতো কথা বলে। অবশ্য আমিও আগে এমন বলতাম! ভাল কথা, তোকে বলা হয়নি, রহিম আমার অর্ডার বাড়িয়ে দিয়েছে। ও লোক দিয়ে মাল নিয়ে যায়। শুনলাম তুই নাকি বলে দিয়েছিস!”
নিশান হাসল। যাক, কাকিমা অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছে। মেঘলার রাগ, বাদলের হাহাকার, ওকে কেমন যেন কোণঠাসা করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ও শ্বাস নিতে পারছে না!
নিশান বলল, “হ্যাঁ, রহিমদাকে বলেছিলাম যেন ব্যাপারটা একটু দেখে নেয়।”
বাদল আবার বলল, “তুই খুব হেল্প করেছিস আমি জানি। তোর ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। শুধু দেখিস ভাই, যদি কোনও কাজ দেখে দিতে পারিস।”
নিশান হেসে বলল, “তুই এভাবে বলছিস কেন? আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়ই।”
“আমরা তা হলে আসি। কেমন?” বাদল হাসল।
“আয়।”
“তুইও আসিস বাড়িতে। জানি তুই ব্যস্ত, কিন্তু তার মধ্যেও আসিস প্লিজ়!” বাদলের গলা ধরে এল আবার।
নিশান হেসে মাথা নাড়ল। দেখল, যাওয়ার আগে মেঘলা আন্দাজে ওর দিকে হাত নাড়ল।
রাস্তা পার করে বাদলরা অটোয় উঠল এবার। নিশান ঘড়ি দেখল, পৌনে সাতটা বেজে গিয়েছে। আর দেরি করলে তারকদা রাগ করবে খুব।
আবার স্টেশনের টিকিট-ঘরের দিকে হাঁটা দিল নিশান। সাইকেলটা নিতে হবে গ্যারেজ থেকে। আকাশের দিকে তাকাল ও। মেঘ করে আছে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভাল লাগছে নিশানের। যা গরম পড়েছে! আর পারছে না!
আর-একটা ট্রেন আসবে। গেট পড়ছে, শুনতে পেল নিশান। তাড়াতাড়ি এবার বেরোতে হবে। না হলে খুব মুশকিল আছে। রাস্তায় সাইকেল চালানো দায় হয়ে যাবে ভিড়ের চোটে।
পিন্টুকে সাইকেল রাখার ভাড়া মিটিয়ে পাড়ার ভেতরের পথ ধরল নিশান। আগে এই রাস্তাগুলোয় ইট পাতা ছিল। বর্ষাকালে পিচিক পিচিক করে কাদা উঠত। খুব অসুবিধে হত। এখন সব রাস্তাগুলো কংক্রিটের হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে কোথাও চলটা উঠে গিয়েছে বটে, কিন্তু তাতেও খুব কিছু অসুবিধে হয় না।
আগে যখন ওরা স্টেশনের ওই পারে থাকত, এই পথ দিয়ে নিশান স্কুলে যেত। এখনও চোখ বন্ধ করে সব বলে দিতে পারে ও। একটা বড় কাঁঠাল গাছের পাশের ভাঙাচোরা বাড়িতে একটা বুড়ো পাগল থাকত। জানলা দিয়ে মুখ বের করে বসে থাকত থুত্থুড়ে বুড়োটা। মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকদের দিকে তাকিয়ে পুঁচকি একটা হাসি দিয়ে বলত, “বিলকিস!”
তখন ওই ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ত নিশান। ওর খুব কষ্ট লাগত বুড়োটাকে দেখে। এখনও মনে আছে, শনিবার দিন হাফছুটি হত বলে টিফিন খেত না ও। বুড়োটার জন্য বাঁচিয়ে নিয়ে আসত। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আলতো গলায় ডাকত, “বিলকিসদাদু, ও বিলকিসদাদু।”
বুড়োটা আসত। ফোকলা জানলা দিয়ে হাত বের করে বলত, “দে, বিলকিস দে।”
নিশান টিফিনটা বাড়িয়ে দিত। বুড়োটা টিফিনবাক্স থেকেই খাবার খেত। তারপর বাক্সটা ফেরত দিত নিশানকে।
খাবার খাওয়ার সময় বুড়ো কত কী যে বলত! এখনও কিছু কিছু মনে আছে নিশানের। বুড়ো বলত, “শালা, বিলকিস করেছ কী বিলকিস করে দেবে।” বলত, “শালা লাইফটা পুরো বিলকিস হয়ে গেল!” বলত, “কত বারণ করলাম, কিন্তু শুনলে তো আর মালটার অমন বিলকিসের হাল হত না!”
নিশানের সঙ্গে ওর স্কুলের দু’-তিনজন বন্ধুবান্ধবও থাকত। ওরাও নিশানের দেখাদেখি খাবার দিত। হাসত। মজা করত।
সেই বুড়ো একদিন ট্রেনে কাটা পড়ল। স্কুল যাওয়ার পথে তারপর থেকে ওই ফোকলা জানলাটা দেখলে কেমন একটা মনখারাপ করত নিশানের।
আজ সন্ধের অন্ধকারে ওই জায়গাটা পার হতে-হতে বাড়িটার দিকে তাকাল নিশান। বাড়িটা প্রায় ধসে পড়ার মতো অবস্থায়! সারা গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বট আর অশ্বত্থ জড়িয়ে ধরেছে বাড়িটাকে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে ছিটকে আসা আলোয় এই বাড়িটাকে রুগ্ণ রাক্ষসের মাথার মতো মনে হচ্ছে।
নিশান ভাবল, সময় কেমন দ্রুত চলে যায়! চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় এই তো সেদিন স্কুল যাওয়ার আগে কেমন মায়ের সঙ্গে খেলা করত নিশান! দৌড়ে বেড়াত পেয়ারা গাছের চারপাশে। রোদ এসে গাছের ডালে লেগে ছিটকে কুচি কুচি হয়ে ছড়িয়ে পড়ত উঠোনে। বাবা বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই ‘বাবু’ বলে ডাকত ওকে। হাতে দিত খেলনা জিপগাড়ি। নিবেদনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিহিদানা। সকাল দুপুরের দিকে গড়ালে ভীষণ ট্যারা ভগবান নাপিত আসত তার অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস নিয়ে। উঠোনে বসে ঠাকুরদার চুলে কাটত। কুচকুচ শব্দ ছড়িয়ে যেত পাড়ার হাওয়ায়। ওর মনে হল, এই তো সেদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকত এগারো-বারো বছরের নিশান। স্কুলফেরতা পুকুর-বাগানের ঝোপ থেকে রঙ্গন ফুল তুলে মধু খেত। দেখত, একলা টুনটুনি পাখি অস্থিরভাবে লাফিয়ে চলেছে। দামুদার আচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকত সারাটা সপ্তাহ। আর তারপর সৌমিদি, লালিদিদের বাড়ির ওদিকে সূর্য নেমে গেলে বুঝত, আজ আর রোগা বৈষ্ণবদাদু আসবে না এ পাড়ায়। তখন কী সুন্দর হাওয়া আসত। আর তাতে ডুবে, ভেসে এই সব দেখতে দেখতে নিশান ভাবত কী মজারই না এই জীবন! ভাবত, হে ভগবান, এ জীবন যেন শেষ না হয়! আর আজ দ্যাখো, সবটাই কেমন ওই বাড়িটার মতো বাতিল হয়ে গিয়েছে! ইরেজ়ার দিয়ে ঘষে কে যেন মুছে দিয়েছে সব ছবি! শুধু খাতার পাতায় পড়ে আছে পেনসিলের মনমরা গভীর দাগ!
রাস্তাটা এখান থেকে ডান দিকে বেঁকে গিয়েছে। সামনে জামতলা আছে একটা। চারটে বিরাট বড় জাম গাছ। আগে জায়গাটা খোলা থাকত। কিন্তু এখন একটা মন্দির হওয়ায় চাতালের মতো জায়গাটাকে করোগেটেড টিনের শেড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আগে, গরমকালে রাস্তাটা জাম পড়ে বেগুনি হয়ে থাকত।
এইসব জায়গা দিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে হারিয়ে যাওয়া সোনাঝুরির কথা খুব মনে পড়ে নিশানের। সেখানে এই যে চটকল বিক্রি করে দেওয়া হবে, জোনাক-বাড়িসহ বিশাল জায়গাটা বিক্রি করে বড় ফ্ল্যাট উঠবে, গলফ কোর্স হবে, আরও কত কী হবে! কিন্তু এটা ঠিক মানতে পারে না ও। কষ্ট হয়।
সেই কারণেই তো সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান। বিজনদার সঙ্গে পরামর্শ করেই গিয়েছিল!
আসলে ওদের পার্টির হয়ে বিজনদা যতই আত্মত্যাগ করুক না কেন, এখন তারক চক্রবর্তীই সোনাঝুরির শেষ কথা। কলকাতায় পার্টির হাইকম্যান্ডের সঙ্গে তারকদার নাকি খুব দহরম-মহরম। সেই তারক চক্রবর্তী নাকি চায় এসব কর্মকাণ্ড এখানে হোক। শুনছে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জুট মিলটাতেও খুব গোলমাল বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে!
পার্টির ভেতরে থেকে কিছু করা যাবে না সেটা ওরা বুঝেছে। বিজনদাকে কেউ সামনে অসম্মান না করলেও পাত্তাও খুব একটা দেয় না।
বিজনদার পরামর্শেই নিশান আর কেয়াদি মিলে ‘সেভ সোনাঝুরি’ নামে একটা মঞ্চ করেছে। আর নিশান দেখেছে, বেশ কয়েকজন মানুষ এসে যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে।
প্রতিসপ্তাহে একটা করে মিটিং আয়োজন করছে ওরা। বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছে। একটা পিটিশন তৈরি করেছে। সকলের সই নিয়ে সরকারের কাছে যাওয়ার ইচ্ছেও আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, কতদূর কী হবে সেটা জানে না ও। এখনকার অর্গানাইজ়ড ওয়েলথের কাছে এসব প্রতিরোধ-টোধ তেমন কাজে দেয় না। তাও নিশান চেষ্টা করছে। আর সেই চেষ্টার ফলশ্রুতি হিসেবেই জুনের প্রথম দিকে সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান।
যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিজনদা বলেছিল, “মিলের আর জোনাক-বাড়ির যারা মালিক, একবার তাদের বাড়িতে যা। অফিস-টফিস নয়। সোজা বাড়িতে একদম। নিজেদের কথাটা বল।”
“বাবা! একদম সোজা বাড়িতে?” নিশান একটু অবাক হয়েছিল।
“হ্যাঁ, তাতে কী? আমি ঠিকানা দিচ্ছি। সকলের ওপরে যিনি আছেন, উনি একজন ভদ্রমহিলা, দীপমালা দেবী। গিয়ে কথা বল। দেখ কী হয়, আমার মনে হয় উনি আর-পাঁচজনের মতো নন।”
“কী করে তুমি সেটা বুঝলে? আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। সে না হয় যাব। কিন্তু তুমি যাবে না?” নিশান তাকিয়েছিল বিজনদার দিকে।
বিজনদা চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল জানলায়। ধু ধু দুপুরের দিকে চোখ রেখে বলেছিল, “না, আমি যাব না।”
“কেন? তুমি চলো। জোর হবে। বয়সের তো একটা ওয়েট আছে না কি?”
বিজনদা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর ওর দিকে ঘুরে বলেছিল, “সব কিছু তোকে জানতে হবে না। যা বলছি কর। আর-একটা কথা। আমার নাম বলবি না কিন্তু। এটা মনে থাকে যেন। বিজন সরখেল নামটা উচ্চারণ করবি না।”
গিয়েছিল নিশান। সঙ্গে বুচা বলে একটা ছেলেও ছিল। বুচা ওদের পাড়ায় থাকে। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে যায়। তা ছাড়া ‘সেভ সোনাঝুরি’ প্রোজেক্টেও ওর সঙ্গে আছে।
আলিপুরে বিশাল বাড়ি দীপমালা দেবীর। উঁচু পাঁচিল। পেল্লায় লোহার দরজা। বাড়ির ভেতরে বিশাল লন। একপাশে সুইমিং পুল। দেখে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল নিশানের!
প্রথমে দরোয়ান ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। কিন্তু সোনাঝুরি থেকে এসেছে, খুব জরুরি দরকার বলায় ভেতর থেকে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল।
বসার ঘরটায় ঢুকেই তাক লেগে গিয়েছিল নিশানের! একটা ছোটখাটো ফুটবল মাঠ যেন! ঘরের একপাশ দিয়ে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরে। ঠিক হিন্দি সিনেমায় এমন দেখা যায়।
একজন মহিলা ওদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসেছিল। তারপর সোফা দেখিয়ে বলেছিল বসতে।
বুচা তো চোখ গোলগোল করে এদিক-ওদিক দেখছিল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলেছিল, “এ কোথায় আনলে গুরু? আমি যা জামাকাপড় পরে এসেছি, মাটিতে বসব কি?”
নিশান বলেছিল, “চুপ কর। কীসব হাবিজাবি বলছিস?”
বুচা বলেছিল, “আমায় এরা দত্তক নেবে? শালা ডাল, রুটি আর চারাপোনা গিলে-গিলে পেট যোগেন সর্দারের পুকুর হয়ে গিয়েছে! এরা এত টাকা কী করে রোজগার করে গো?”
“তোর কি টাকার দরকার?”
হেসেছিল বুচা, “মাইরি নিশানদা। যা কমিক করো না তুমি! শাহরুখ খানকে জিজ্ঞেস করো, দেখবে ওরও টাকার দরকার। আমার শালা বিড়ি চুষে-চুষে গালে পাঁচশো চাল ধরার মতো গর্ত হয়ে গেল! আর বলে কিনা, টাকার দরকার আছে!”
নিশান কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারেনি। আচমকা সিঁড়ির কাছে একটা গলা পেয়েছিল। যে-মহিলাটি ওদের বসতে বলেছিল, সে কথা বলছিল আর-একজনের সঙ্গে। সেখানে নিশান নিজের নামটাও শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু অন্যজন কিছু না শুনে তরতর করে উঠে গিয়েছিল সিঁড়ি বেয়ে।
আর পেছন থেকে হলেও মেয়েটাকে দেখে চমকে গিয়েছিল নিশান। রাধিয়া!
নিশানের বুকের রক্ত যেন চলকে উঠেছিল মাথা পর্যন্ত! ও ভূতে পাওয়া মানুষের মতো উঠে এগিয়ে গিয়েছিল সিঁড়ির দিকে। দেখেছিল, মেয়েটা ক্ষণিকের জন্য যেন থমকে দাঁড়াল। কিন্তু তারপরেই আবার উঠে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বাড়ির ভেতরে।
সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল নিশান। জিজ্ঞেস করেছিল, “রাধিয়া না?”
মহিলাটি বলেছিল, “হ্যাঁ। আপনি চেনেন?”
নিশান বলেছিল, “হ্যাঁ তো। খুব ভাল করে চিনি।”
কিন্তু আর কথা হওয়ার আগেই ওপর থেকে একজন বয়স্ক ভৃত্যস্থানীয় মানুষ খবর নিয়ে এসেছিল, আজ দেখা হবে না দীপমালাদেবীর সঙ্গে। হঠাৎ খুব জরুরি কাজ এসে পড়েছে। ম্যাডাম দুঃখিত।
নিশান কিছু মনে করেনি। সত্যিই তো, ও তো আর আগে থেকে সময় নিয়ে আসেনি। এমন করে এলে দেখা হওয়া মুশকিল।
তবে আসার আগে মহিলার হাতে একটা চিরকুটে নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে এসেছিল। বলেছিল, “এটা রাধিয়াকে দেবেন প্লিজ়। আমি নিশান, বললেই হবে।”
মোবাইল নাম্বার দিয়ে এসেছে নিশান। কিন্তু রাধিয়ার ফোন আসেনি।
তারক চক্রবর্তীর বাড়ির নীচের তলাতেই অফিস। বাইরে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে গুজগুজ করছে। একটা বড় আলো জ্বলছে গেটের কাছে। বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলে একটা উঠোনমতো। সেখানেও কয়েকজন লোক প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বসে আছে আর কয়েকজন বসে পাশের বারান্দায় ওঠার সিঁড়ির মুখে।
এই লোকগুলোর আসলে কী কাজ কে জানে! সিনেমার এক্সট্রার মতো সারাক্ষণ তারকের পেছন-পেছন ঘুরে বেড়ায়। অনেকটা সেই পুরনো দিনের হিন্দি ছবির গাঁও-ওয়ালোর মতো। এমন ‘নন-প্রোডাক্টিভ মাস’ বোধহয় এই তৃতীয় বিশ্বেই সম্ভব!
নিশান দেখল ওদের। অনেককেই চেনে ও। কিন্তু আজ কেমন যেন সবাইকে একরকম লাগল ওর। সেই ছুঁচোর মতো মুখ করে বসে থাকা মানুষ! তারক চক্রবর্তী কখন কী ছুড়ে দেবে সেটা কুড়োবে বলে যেন বসে আছে!
বাড়িতে ঢোকার কোলাপসিব্ল গেটের কাছে মোতি দাঁড়িয়ে ছিল। মোতিলাল শর্মা তারকের ডান হাত। অবশ্য শুধু ডান হাত নয়— নাক, কান, চোখ, পা সবই বলা যায়!
লোকটাকে দেখলে আচমকা নানা পটেকরের কথা মনে পড়ে যায়। নিশান মাঝে মাঝে ওকে মজা করে ‘নানা’ বলেও ডাকে।
মোতি পান খায় খুব। কথা বলার সময় মুখটাকে সামান্য আকাশের দিকে তুলে বাটির মতো হাঁ করে কথা বলে। স্বরের ভেতরে কেমন একটা সামান্য তরল শব্দের মতো আওয়াজ পাওয়া যায়!
নিশান মোতিকে দেখে হাসল।
মোতি মুখটা তুলে সামান্য কলকল শব্দ মিশিয়ে বলল, “এত দেরি করলি? দাদা বসে আছে। তাড়াতাড়ি যা।”
দেরি? ঘড়ি দেখল নিশান। সাতটা পাঁচ বাজে। আশ্চর্য! ও কথা না বাড়িয়ে ঢুকে গেল ঘরে।
তারকের বাড়িটা আগে একতলা ছিল। কিন্তু পরপর দু’বার ভোটে জিতে সোনাঝুরির কিছু হোক না হোক, তারকের বাড়িটা তিনতলা হয়েছে। বাড়ির পেছনে বসবাস করা পুরনো মানুষদের হটিয়ে তাদের জমি কিনে নিয়েছে। সেখানেও একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং বানানো হচ্ছে। সবাই সব জানে, কিন্তু কারও কিছু করার নেই! নিশান মাঝে মাঝে ভাবে, আজকাল মানুষ বোধহয় এইসব কারণেই ইনসেনসিটিভ হয়ে গেছে! সব জায়গায় দুর্নীতি আর নোংরামো দেখে দেখে মানুষের মন আর বোধ দুটোই ভোঁতা হয়ে গেছে। এমন একটা মেনে নেওয়া, হচ্ছে-হবে ধরনের সমাজ তৈরি হয়েছে যে, মানুষ আজকাল রাস্তায় পড়ে মরে যাচ্ছে দেখলেও কেউ এসে দাঁড়ায় না তার পাশে! যারা এইসব ছবি খবরের কাগজে দেখে হা-হুতাশ করে, নিশান জানে, তারাও এমন অবস্থায় পড়লে পাশ কাটিয়ে, গা বাঁচিয়েই পালাবে!
তারকের অফিসরুমটা বেশ বড়। কাচের দরজা দিয়ে সামনেটা ঢাকা। ভেতরে এসি চলছে।
তারক দু’হাত দিয়ে ধরে ট্যাবটা নিয়ে কী একটা দেখছিল। ওকে দেখে সেটা রেখে হাসল। তারকের বয়স পঞ্চাশের মতো। মাথায় বড় টাক। মোটা কাঁচাপাকা গোঁফ। কপালে সব সময় কমলা তিলক কাটা থাকে।
নিশান বসে তাকাল তারকের দিকে। তারক সময় নিয়ে পাশের ড্রয়ার খুলে একটা বইয়ের মতো দেখতে স্টিলের কৌটো বের করল। সেটা খুলে একচিমটে জরদা মুখে পুরে চিবোল চোখ বন্ধ করে। তারপর চোখ খুলে শান্ত গলায় বলল, “শুয়োরের বাচ্চা, সোনাঝুরিতে বিপ্লব মারাচ্ছ? আলিপুর অবধি গিয়ে দরবার করার তাল ছিল? কী ভেবেছিস আমি জানব না? তোদের খেদিয়ে দিয়েছে কেন জানিস? আমি ফোন করে বলেছিলাম তোদের যেন পাত্তা না দেয়। কী ভেবেছিস? আমি ঘাস কেটে বেড়াই! তোকে আর তোর ওই বিজনকে না পোঁদে বাঁশ দিয়ে গঙ্গার পাড়ে টাঙিয়ে রাখব! এই প্রোজেক্ট হবে। যে-কোনও মূল্যে হবে। দেখি তোর কোন বাপ আটকায়! বেশি পেঁয়াজি করলে জোনাক-বাড়ির পেছনে পুঁতে দিয়ে কংক্রিট করে দেব। কেমন! এবার ফোট শুয়োর! শালা বিপ্লবী! বোকা…”
নিশানকে কেউ যেন পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে চেয়ারের সঙ্গে। এসির মধ্যে বসেও কুলকুল করে ঘামছে ও! কান লাল হয়ে গিয়েছে! এসব কী শুনল ও! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে যেন! তারকের চেহারাটা কেমন যেন কাঁপছে। শান্ত গলায় কেউ এমন করে বলতে পারে?
নিশান কোনওমতে উঠল। পা টলছে ওর! হাত কাঁপছে! একটা রাগ লাভার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা শরীরে! নিশানের মনে হচ্ছে এই সময়ই হয়তো মানুষ বোমার মতো ফেটে পড়ে!
ও আর-একবার তাকাল তারকের দিকে। তারক নির্লিপ্তভাবে জরদা চিবোচ্ছে। নিশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। ও জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। শুনল কড়কড় করে বাজ পড়ল একটা। নিশান সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সেই তীব্র বিদ্যুৎ টেনে নিল নিজের ভেতরে। তারপর টলতে-টলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
.
১৬. পুশকিন
বাথরুম থেকেই ফোনের রিংটা শুনতে পাচ্ছিল পুশকিন। কিন্তু জল গায়ে বেরোতে পারেনি তখন। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে শুনছিল ক্রিরিরিরিং ক্রিরিরিরিং শব্দ। পুরনো দিনের টেলিফোন। বড়, কালো রিসিভার। গোল ডায়াল। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে হয়। বাবা এটাকে রেখে দিয়েছে। বাবার পুরনো জিনিসের প্রতি কীসের এত মায়া কে জানে! নিজে ইঞ্জিনিয়ার হয়েও টেকনোলজির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ওদের মাইক্রোওয়েভ পর্যন্ত কিনতে দেয়নি। শেষে ভাইয়ের বউ এসে কিনেছে। বাবা যে তাতে খুশি হয়েছে তা নয়। কিন্তু কিছু বলেনি।
মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা অনেক চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির দোতলাতেই থাকে বেশির ভাগ সময়। খুব দরকার না পড়লে নীচে নামে না।
স্মিতাকে বাড়ির অমতে বিয়ে করার জন্য সবাই বয়কট করেছিল পুশকিনকে। ভাই তো ওকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছিল বাড়ি থেকে! কিন্তু এখন যেহেতু স্মিতা আর নেই এই পৃথিবীতে, তাই আবার পুশকিনকে নিজের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাবা আর ভাই। পুরনো কথা সবাই ভুলে যেতে চাইছে। চাইছে পুশকিনও ভুলে যাক!
পুশকিন সবটাই বোঝে। ও নিজেও বাবার কাছে আসতে চায়। কিন্তু কোথায় যেন আটকায়। কিছুতেই ভুলতে পারে না মায়ের মৃত্যুর জন্য ওকেই দায়ী করেছিল বাবা! ভুলতে পারে না মায়ের দাহকার্যের সময় ওকে দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল! পুশকিনের সবটাই তো ছিল মা। সেখান থেকেই ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হল!
তবে ভেতরে-ভেতরে যাই মনে হোক না কেন, পুশকিন বাইরে কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। ও নিয়মিত বাবার খবর নেয়। এই বাড়িতে আসে। এমনকী, ওর খুড়তুতো ভাই দীনবন্ধু যখন এসেছিল, তখনও পুশকিন ওর সম্বন্ধ দেখতে গিয়েছিল কয়েক জায়গায়।
গতকাল বাবার জ্বরের খবর পেয়ে এই বাড়িতে এসেছিল ও। জুলাইয়ের প্রথম এখন। কলকাতা জুড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। গতকাল সন্ধে থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি আজ এই সকালবেলাতেও হচ্ছে। কমেনি একটুও। জানলা দিয়ে পুশকিন দেখছে, সারা আকাশে গোলা পায়রার ডানার রঙের মেঘ। পাড়ার রাস্তা ডুবে গিয়েছে জলের তলায়। উলটোদিকের রাজাদের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকা পরিবারের দুটো বাচ্চা নীল-হলুদ রেনকোট পরে প্লাস্টিকের খেলনা-নৌকো ভাসাচ্ছে রাস্তার জমে থাকা জলে। পুশকিনের দেখে মজা লেগেছে। ওদের সময় ওরা কাগজের নৌকা ভাসাত।
ওদের এই রাসবিহারীর বাড়িটা বেশ পুরনো। উঁচু সিলিং। লাল মেঝে। বাথরুমে পাথরের বাথটব। বাবা পুরনো দোতলা বাড়িই কিনেছিল। পরে ভাল করে সারিয়ে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বাড়িতে এলে ভাল লাগে পুশকিনের। বাইরে যতই গরম হোক না কেন, মোটা দেওয়ালের জন্য সব সময় ঠান্ডা থাকে বাড়ির ভেতরটা।
আজ ভাইরা গিয়েছে মধ্যমগ্রাম। ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। কী একটা নেমন্তন্ন আছে। পুশকিনকেও বলেছিল যেতে। কিন্তু একটাই ছুটির দিন, তার ওপর এমন ওয়েদার। কার ভাল লাগে! তাই ও পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া বাবার কাল জ্বর ছিল। এমন মানুষকে শুধু কাজের লোকেদের ভরসায় রেখে ও যায় কী করে?
গতকাল রাত প্রায় দশটায় এ বাড়িতে এসেছিল পুশকিন। আজকাল অফিসে কাজের চাপ খুব বেড়ে গিয়েছে। সোনাঝুরির প্রজেক্টই শুধু নয়, আপনকে দেওয়া সেই ‘সি ফুড’ কোম্পানির কাজটাতেও ওকে মাথা দিতে হচ্ছে। আপন যদিও গোটা ব্যাপারটা দেখছে, তাও যেহেতু ডিলটা হয়েছিল পুশকিনের হাত দিয়ে, তাই এখনও আপনকে কিছু-কিছু জায়গায় দেখিয়ে দিতে হচ্ছে পুশকিনকে।
ওদের অফিস দু’দিন ছুটি থাকার কথা, কিন্তু পুশকিন শনিবারেও কাজ করে। আসলে ওর মনে হয়, বাড়িতে বসে থেকে কী করবে ও! কে আছে ওর জীবনে? তার চেয়ে অফিসে গেলে, কাজের মধ্যে থাকলে পুরনো কথা ওকে আর চেপে ধরবে না। আসলে ভাল করে ভেবে দেখলে পুশকিনই কোথায় যেন পুরনো কথাদের ছাড়তে পারে না! ও বোঝে, যতদিন ও নিজেকে সরিয়ে নেবে না অতীত থেকে অতীতও ওকে ছাড়বে না!
কিন্তু বললেই তো আর সরে আসা যায় না! মনের মধ্যে তো আর অন-অফ সুইচ নেই! কী করে ও ভুলবে সেই রাতটার কথা! নিজের ঘরের বাইরে এসে দেখা সেই দৃশ্যটির কথা! যাই করুক না কেন, ওটা জীবনেও ভুলতে পারবে না পুশকিন। শুধু প্রতিদিন নানা কাজের মধ্যে ডুবে ভুলে থাকার ভান করে যাবে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে এসে দাঁড়াল পুশকিন। টানা বৃষ্টির জন্য গরমটা আর নেই। বরং ওদের বাড়ির ভেতরে তো বেশ ঠান্ডাই লাগছে।
এই ঘরটা পুশকিনের। ও চলে যাওয়ার পরেও এমনই করে রাখা হয়েছিল। ভাইয়ের কাছে শুনেছে, মা এই ঘরে কাউকে শুতে দিত না।
ঘরটা বেশ বড়। একপাশে ওর বিছানা। আলমারি। অন্যপাশে বড় আয়না আর তার পাশে চেয়ার টেবিল। ঘরের মাঝে বেশ বড় ফাঁকা লাল মেঝে রয়ে গিয়েছে। পুশকিনের এমন ফাঁকা মেঝে খুব ভাল লাগে। মাটিতে বসার মতো, শোওয়ার মতো আরাম ও আর কিছুতে পায় না।
পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে তোয়ালেটা বাথরুমে মেলে দিয়ে এল পুশকিন। তারপর চুলটা আঁচড়ে নিল। কানের পাশে দুটো, তিনটে করে চুল সাদা হয়েছে। এই ছত্রিশেই বয়স গুটিগুটি এসে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। ও চোখ বন্ধ করল। ক্লান্ত লাগছে পুশকিনের। কেন ক্লান্ত লাগছে কে জানে। কাল রাতে তো বেশিক্ষণ জাগেনি! তা হলে? ঘুমের মধ্যে যদিও বেশ আজেবাজে স্বপ্ন দেখছে। তাই কি ভাল ঘুম হয়নি?
টেবিলে মোবাইলটা রাখা আছে উলটো করে। ও সেটাকে তুলে নিল। দেখল একটা মিস্ড কল। স্মরণ কল করেছিল। কেন কে জানে! আজ আর ভাল লাগছে না কথা বলতে।
ওদের বাড়িতে টুকুদি রান্না করে। আজ পুশকিন বলেছে খিচুড়ি করতে। সঙ্গে বেগুনি, আলুভাজা আর ইলিশমাছ ভাজা।
ও ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজে। সকালে পাঁউরুটি খেয়েছে দু’পিস। এখনও খুব একটা খিদে পায়নি ওর। আর-একটু পরে খাবে!
ও ভাবল একবার দোতলায় যাবে। বাবা কী করছে দেখবে। সকালে দেখেছে বাবার জ্বর নেই। ইজ়িচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল বাবা। বাড়িতে ছ’টা কাগজ রাখা হয়। বাবা খবরের কাগজ পড়তে খুব ভালবাসে। আর ভালবাসে ফুটবল। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ইউনিভার্সিটি ব্লু ছিল। পরে কয়েকবছর কলকাতার বড় দলেও খেলেছে। এখনও লেকে হাঁটতে গিয়ে বাচ্চারা ফুটবল খেলছে দেখলে বাবা দাঁড়িয়ে পড়ে।
ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল পুশকিন। আর ঠিক তখনই টেলিফোনটা বেজে উঠল আবার। সেই ঝনঝন শব্দ। অবাক হল পুশকিন, কেন ফোন ধরছে না কেউ! কানুদা বাবার সব কাজ করে দেয়। কানুদা কি নেই? কিংবা সকালবেলায় বাড়ির ঠিকে কাজ করে যে মনুদি? আর টুকুদিই-বা কই? কেউ ফোনটা ধরছে না কেন?
পুশকিন এগিয়ে এসে ফোনটা ধরল, “হ্যালো…”
“পরিতোষ আছে?” ওপারের গলাটা বেশ বয়স্ক লাগল।
চট করে চিন্তা করে নিল পুশকিন। বাবা আজকাল খুব বিরক্ত হয় ফোনটোন এলে। বলে, “আর আমার এসব ভাল লাগে না। সারা জীবন অনেক কাজ করেছি। আর পারছি না আমি।”
পুশকিন একবার ভাবল কাটিয়ে দেয় মিথ্যে বলে। এমনিতেই বাবার শরীরটা ভাল নেই। ফোন এসেছে শুনলে আবার রাগ করবে। কিন্তু লোকটার গলার ভেতরে এমন একটা ব্যাপার আছে যে, লোকটাকে মিথ্যে বলতে পারল না পুশকিন।
ও জিজ্ঞেস করল, “কে বলছেন কাইন্ডলি বলবেন? বাবা ওপরে আছে।”
“আমি বিজন সরখেল,” লোকটা সময় নিল একটু, “ও ওপরে? ওকে কি নীচে নামতে হবে? মানে, তেমন হলে না হয়…”
“আপনি একটু ধরুন, আমি বলে দিচ্ছি।”
পুশকিন রিসিভারটা টেবিলের ওপরে রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে গেল। দোতলাটাও বেশ বড়। একপাশে টানা একটা বারান্দা আছে। বাবাকে ঘরে দেখতে পেল না পুশকিন! আরে, গেল কোথায় সবাই! তারপরেই কী একটা মনে হওয়ায় বারান্দার দিকে গেল ও। দেখল হ্যাঁ, যা ভেবেছে ঠিক তাই। বাড়ির তিনজন কাজের লোককে নিয়ে বাবা ওখানে দাঁড়িয়ে। আর শুধু দাঁড়িয়েই নেই, তিনজনকেই বকছে বাবা!
পুশকিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনল ব্যাপারটা। বারান্দার একদিকে পাখির খাঁচা করেছে বাবা। নানারকম পাখি আছে সেখানে। বাবা সবাইকে বকছে, কারণ বৃষ্টির জল লেগে পাখিদের নাকি জ্বর হবে! কেন ঠিকমতো খাঁচাটা ঢাকা দেওয়া হয়নি!
পুশকিনের হাসি পেল। পাখিরা কি বর্ষাকালে ছাতা নিয়ে উড়ে বেড়ায়! নাকি রেনকোট পরে? বাবা মাঝে মাঝে এমন ছেলেমানুষি কাণ্ড করে না!
“বাবা,” পুশকিন ডাকল এবার।
বাবা মাঝপথে কথা থামিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল পুশকিনের দিকে, “কী হল? দেখছিস না আমি কাজ করছি?”
পুশকিন হাসল, “তোমার ফোন এসেছে।”
“আমার?” বাবা অবাক হল।
“হ্যাঁ, ঘরে এসো। আর তোমার না জ্বর! এখানে বৃষ্টির মধ্যে কী করছ? আবার যদি জ্বরটা বাড়ে?”
বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আবার ফোন করল এখন! আর আমার জ্বরটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। ওদের জ্বর হলে কী হবে?”
“তুমি এসো, ফোনটা ধরো…” পুশকিন পাখিদের নিয়ে আর কথা বাড়াল না।
“বলে দে আমি নেই, আমি এখন যেতে পারব না!” বাবা বিরক্ত হল।
পুশকিন তাও বলল, “বিজন সরখেল নামে একজন।”
বাবা এবার ঘুরে দাঁড়াল, “কে?”
পুশকিন নামটা বলল আবার। দেখল, বাবার মুখটা পালটে গেল যেন। সেই বিরক্তি আর নেই।
বাবা আর কথা বাড়াল না। দ্রুতপায়ে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে গেল। নীচের ফোনের সঙ্গে ওপরের ফোনের একটা প্যারালাল লাইন করা আছে। ফলে নীচে ফোন এলে ওপর থেকেও ধরা যায়।
পুশকিন বাবার পেছন-পেছন গেল ঘরের দিকে। দেখল, বাবা ফোনটা তুলে কেমন একটা বিহ্বল গলায় বলল, “বিজন! এতদিন পরে!”
পুশকিন আর দাঁড়াল না। বাবার ব্যক্তিগত ফোন। ও কেন থাকবে!
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পুশকিন। রিসিভারটা ক্রেডেলে তুলে রাখল। কানুদারা এখনও ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পাখিদের কিছুতেই জ্বর আসা চলবে না!
পুশকিন নিজের মনেই হাসল। বাবা এমনিতে গম্ভীর খুব। কিন্তু বাবার ভেতরে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। সে মাঝে মাঝে মানুষটার দখল নেয়!
সামনের গোটা দিনটার দিকে তাকাল পুশকিন। কিছু না করার ফাঁকা একটা দিন। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় কলকাতায় চলে এসেছিল ওরা। তখন এই পাড়ায় আরও অনেক পুরনো বাড়ি ছিল। কলকাতায় নতুন বলে তখনও তেমন বন্ধুবান্ধব হয়নি ওর! এমন বৃষ্টির দিনে ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত ও আর ভাই। চুপচাপ বৃষ্টি দেখত। ওদের পাড়ায় কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে অনেক। বৃষ্টির জলে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে আরও বেশি সবুজ মনে হত ওর। দেখত, কয়েকটা বাড়ি পরে শাক্য বলে যে শান্ত ছেলেটা থাকত, সে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফুটবল খেলছে বৃষ্টিতে।
পুশকিনের ইচ্ছে হত খেলতে। কিন্তু নিজে থেকে যেতে পারত না। পরে অবশ্য শাক্যর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওর। আর শুধু শাক্যই নয়, ওর অন্য বন্ধুরা, পুষ্পল, আয়ানের সঙ্গেও খুব ভাল আলাপ হয়ে গিয়েছিল। আর-একটা ছেলেও আসত। সামান্য চুপচাপ। মনমরা। কিন্তু ফুটবলটা খারাপ খেলত না। ওই ছেলেটার সঙ্গেই পরে সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল পুশকিনের। ছেলেটার নামটা একটু অদ্ভুত। অন্তরীপ। অন্তরীপ মুখার্জি। ওরা সবাই রীপ বলে ডাকত ওকে!
সব ছিঁড়ে, ছিটিয়ে গিয়েছে! মুক্তোর মালা হাত থেকে পড়ে গড়িয়ে চলে গিয়েছে চতুর্দিকে! পুশকিন নিজে পড়াশোনা করতে কলকাতার বাইরে চলে যাওয়ার পরে আর যোগাযোগ থাকেনি কারও সঙ্গে। তবে এই বাড়িতে এলেই ওদের কথা মনে পড়ে পুশকিনের। মনে পড়ে দূরের ওই নীলাঞ্জনাদির বাড়ির কথা। এক ড্রপে যার বাড়ির দেওয়ালে লাগলে চার রান হত। আর সোজা বাড়ির মধ্যে বল মারলে ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যেত।
পুশকিন কোনওদিন ওভাবে বল মারেনি। তাও নিজের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, ও আউট হয়ে গিয়েছে! স্মিতা ওকে আউট করে দিয়ে চলে গিয়েছে। যে মেয়েটা ওকে বলত, “আমি তো আছি সোনা।” সে কী করে এমনটা হয়ে গিয়েছিল? তবে কি অভিনয় করত? তা হলে কেন ওকে বিয়ে করতে রাজি হল? পুশকিন তো জোর করেনি। ভালবেসেছিল বলে বিয়ে করতে চেয়েছিল। তখন কেন ‘না’ করল না!
স্মিতা মারা গিয়ে ওর বুকের মধ্যে একটা বৃশ্চিক ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে। পুশকিন জানে এর হুল থেকে কিছুতেই নিস্তার নেই ওর। সারা জীবন শিরায় এই বিষ বয়ে বেড়াতে হবে ওকে।
পুশকিন নিজের ঘরের দিকে এগোল। রান্না হয়নি এখনও। কাজও নেই। কিছু পড়া যায় কি না দেখবে। ওর সব বই এখনও টেবিলের ওপর রাখা আছে। ভাইরা চলে আসবে বিকেলের মধ্যে। তারপর পুশকিন বেরিয়ে যাবে।
কিন্তু নিজের ঘরে যাওয়ার আগেই বেলটা বাজল হঠাৎ। কে এল আবার এখন? সবাই ওপরে আছে। তাই পুশকিন নিজেই সদর দরজার দিকে গেল।
পুরনো কাঠের দরজা। মাথার ওপর লম্বা পেতলের ছিটকিনি। পুশকিন ছিটকিনি নামিয়ে দরজাটা খুলল। আর খুলেই অবাক হয়ে গেল। আরে, নোঈ! ও কী করছে এখানে?
মাথায় নীল-গোলাপি ছাতা। পরনে নীল-সাদার ফুলছাপ চুড়িদার। কপালে সেই অনুস্বর টিপ। পুশকিন নিজের অজান্তেই দু’মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে ফেলল। বুকের মধ্যে আচমকা একটা কষ্ট হল পুশকিনের। এমন একটা বৃষ্টি দিয়ে তৈরি মেয়েকে দেখেই কি কষ্টটা হল? কেন হল?
জোর করে নিজের দৃষ্টি নোঈর থেকে সরিয়ে পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “তুমি? এখানে?”
নোঈ লজ্জা পেয়ে গেল। নিমেষে রাঙা হয়ে উঠল ওর মুখ। সেটা কি পুশকিনের প্রশ্নে, না ওর তাকিয়ে থাকার জন্য ঠিক বুঝতে পারল না পুশকিন।
নোঈ বলল, “সরি স্যার। আমি আসতে চাইনি। কিন্তু স্মরণ ফোন করে এমন করে বলল যে, আসতে বাধ্য হলাম!”
এই রে! স্মরণ আবার কী বলল? এই ছেলেটাকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল! কর্পোরেটে চাকরি করে, কিন্তু কোনও প্রোটোকল মানে না! স্মরণের অনুরোধেই সোনাঝুরির কাজে ওকে নিজের সঙ্গে রেখেছে পুশকিন। কিন্তু ছেলেটার এত উৎসাহ বেশি! পুশকিন ওর অনেক ওপরের বস। তার বাড়িতে এভাবে আসা যায় নাকি? এটা তো ঠিক নয়!
নোঈ বলল, “ও সকাল থেকে নাকি আপনাকে ফোন করছে। আপনি ধরেননি। ও নিজে সোনাঝুরি গিয়েছে। সেখানে কীসব দরকার আছে নাকি ওর। আমায় বলল আপনার কাছে আসতে। আমি স্যার আপনার বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। কিন্তু স্মরণ…”
“আচ্ছা আচ্ছা,” পুশকিন সরে দাঁড়িয়ে বলল, “ভেতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা বলে দেবে নাকি?”
নোঈ ইতস্তত করল একটু। ছাতাটা বন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকাল। পুশকিন হেসে নিজেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল ছাতাটা। বলল, “এসো ভেতরে।”
দরজা দিয়ে ঢুকে একটা বড় জায়গা। একপাশে মিটার-বক্স। তার পাশে বড় একটা শু-র্যাক। লম্বা দেওয়ালে কয়েকটা হুক লাগানো। ছাতাটার হাতল থেকে ঝোলা দড়িটা একটা হুকে ঝুলিয়ে দিল পুশকিন। ছাতা ঝোলানোর জন্যই এমন ব্যবস্থা। আর ছাতার তলায় জল ঝরে পড়ার জন্য বালতিও রাখা। বাবার সব দিকে দৃষ্টি।
নোঈ জুতোর র্যাকের পাশে জুতোটা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। পুশকিন বুঝতে পারছে মেয়েটা খুব সংকোচ করছে!
পুশকিন বলল, “এসো আমার সঙ্গে। এই বৃষ্টির মধ্যে এমন করে এলে! খুব সাংঘাতিক কিছু দরকার নাকি? আর স্মরণকে আজ কে বলেছে সোনাঝুরি যেতে। ওকে তো আমি কাল যেতে বললাম।”
“আমি সরি স্যার,” নোঈ বলল, “আমি নিজেও জানি না। ও কী যেন বলছিল, গঙ্গায় নাকি বৃষ্টি দেখবে। কোনওদিন দেখেনি। তাই নাকি গিয়েছিল। কিন্তু গিয়ে কীসব কাজও করেছে!”
কথা বলতে-বলতে ওরা বসার ঘরে এল। বসার ঘরটাও বড়। একটা সোফা সেট ছাড়াও ডিভান আছে। কাচের দুটো আলমারিতে নানারকমের ডাই কাস্ট গাড়ি রাখা। মাথার ওপর একটা ঝাড়ও আছে!
নিজে একটা সিঙ্গল সোফায় বসে পুশকিন নোঈকে সামনের একটা সোফা দেখিয়ে বলল, “এটা অফিস নয়, বাড়ি। পুশকিনদা বলতে পারো আমায়। আমার সারাক্ষণ অত প্রোটোকল ভাল লাগে না।”
নোঈ সোফায় বসে হাসল। মেয়েটা এখনও জড়সড় হয়ে আছে!
পুশকিন আবার বলল, “আমার এই বাড়িতে এলে কী করে?”
নোঈ বলল, “বাসে। ভবানীপুর থেকে তো বেশি দূর নয়।”
“না, না, মানে,” পুশকিন হাসল, “মানে, ঠিকানা পেলে কী করে?”
“আমি জানতাম না। স্মরণ নাকি এইচ আর থেকে নিয়ে নিয়েছিল। ইমার্জেন্সিতে লাগতে পারে বলে!” নোঈ হাতের রুমাল দিয়ে আলতো করে মুখ আর মাথাটা মোছার চেষ্টা করল। যতই ছাতা থাক, জলের ছাট লেগেছে!
পুশকিন বলল, “একটা তোয়ালে দেব?”
“না স্যার, মানে…” হেসে ফেলল নোঈ, “না লাগবে না, খুব কিছু লাগেনি।”
পুশকিন হাসল। আর কী বলবে বুঝতে পারল না। মেয়েটাকে স্মরণ এখানে আসতে বলেছে কেন? কী এমন কথা যে, এক্ষুনি বলতে হবে?
পুশকিন কিছু বলার আগেই দরজার কাছ থেকে “বাবু,” বলে ডাক শুনল একটা। পুশকিন তাকাল। বাবা এসেছে! আরে, বাবা নীচে এসেছে? কী ব্যাপার?
পুশকিন উঠে দাঁড়াল। বাবা ঘরে এসে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈও উঠে দাঁড়িয়েছে।
পুশকিনি বলল, “বাবা, ও নোঈ। আমাদের কোম্পানিতে নতুন জয়েন করেছে।”
নোঈ কী করবে বুঝতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে গেল! বাবা নোঈর হাত ধরে বলল, “আরে আরে, করো কী? এখনকার ছেলে-মেয়েরা কেউ নমস্কার করে নাকি?”
নোঈ বলল, “আমি করি।”
বাবা হাসল, নোঈকে বসতে বলে পাশে বসল। বলল, “তোমার নামটা আনইউজ়ুয়াল! ভাল বেশ। নোঈ! এই যে সেলফ নিগেশান। এটা খুব ভাল। আমি নোঈ। সাউন্ডস লাইক আমি নই। আমরা যে কেউ নই সেটা আমরা ভুলে যাই! চারিদিকে যা হচ্ছে! সবাই নিজেকে এত বেশি ইমপর্ট্যান্ট ভাবছে যে, গোটা পৃথিবীটাই কেমন যেন হয়ে গিয়েছে! সবাই ভাবছে সেই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র! আরে বাবা, মহাবিশ্বের কোনও কেন্দ্রই তো নেই!”
পুশকিন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। বাবা তো এত কথা বলে না। তা হলে আজ কী হল? আচ্ছা, বাবার কি মনে আছে যে, দীনবন্ধুর সঙ্গে এই মেয়েটার বিয়ের কথা হয়েছিল? নিশ্চয় মনে নেই!
নোঈ হাসি-হাসি মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাবা বলল, “আমাদের ছোটবেলায় এমনটা ছিল না কিন্তু।”
পুশকিনের এই ব্যাপারটা ভাল লাগে না। সব বয়স্ক মানুষ এই একটা কথাই বলে! আমাদের সময়! ওদের সময়ে যেন সব ভাল ছিল আর এখন সব খারাপ হয়ে গিয়েছে! আরে বাবা এই খারাপ সময়টা তো এসেছে আগেকার মানুষগুলোর বদান্যতাতেই। কিন্তু পুশকিন কারও সঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে তর্ক করে না। ও জানে তর্ক করে কিছু হবে না। মনখারাপ হবে শুধু।
বাবা বলল, “আমাদের সময়ে সব ভাল ছিল তা নয়, কিন্তু মানুষের মনে ভাল কিছু করার একটা চেষ্টা কিন্তু ছিল। নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। এখন সেই ইচ্ছেটাই নেই। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো এত বেশি জীবনে ঢুকে পড়েছে যে, মানুষ নিজেকে বিশাল হনু ভেবে ফেলেছে। আমাদের সময়ে একটা ঘড়ি পেলে আমরা বর্তে যেতাম। আর আজ দেখি কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকার ফোন কোনও ব্যাপার নয়। আর প্রায় সবার গলায় একটা করে ডিজিটাল ক্যামেরা ঝুলছে! সবাই রঘু রাই! অল ফ্যাশন, নো সাবস্ট্যান্স!”
নোঈ বলল, “আসলে জিনিসের দাম কমেছে। মানুষ রোজগারও বেশি করছে। আর…”
“কনজ়িউমারিজ়ম!” বাবা মাথা নাড়াল, “আমার এক পুরনো বন্ধু একটু আগে ফোন করেছিল। অনেক পুরনো বন্ধু! বহুকাল যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু আজ হঠাৎ ফোন করল। বিজন সরখেল। সোনাঝুরিতে থাকে।”
সোনাঝুরি? নামটা শুনে পুশকিন নড়ে বসল। আরে, ভদ্রলোক সোনাঝুরি থেকে ফোন করেছিলেন? ও চট করে একবার নোঈর দিকে তাকাল। দেখল, নোঈও ওকে দেখে নিল একবার।
বাবা বলল, “বিজন সোনাঝুরিতেই আছে এখনও। পার্টি করে। বিয়ে-শাদি করেনি! অনেক কথা হল। সেই সূত্র ধরেই মনে পড়ল সব কথা।”
“পার্টি করে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল বাবার দিকে, “আগে বলোনি তো!”
“বললে কী করতিস?” বাবা ভুরু কুঁচকে বলল, “বিজন আমাদের সময়ের সোনাঝুরি আর এখনকার সোনাঝুরি নিয়ে কথা বলছিল। শুনলাম, জোনাক-বাড়ি নাকি বিক্রি হয়ে যাবে! বাবু, তোর জোনাক-বাড়ি মনে আছে?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “আছে! আর, কথাটা সত্যি। ওই বাড়ি, জুটমিল সব বিক্রি হয়ে যাবে। কয়েকজন চেষ্টা করছে কেনার। আমাদের কোম্পানিও আছে সেই দলে!”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে নিল। তারপর বলল, “জোনাক- বাড়ি সোনাঝুরির একটা বিশেষ জায়গা ছিল। অত বড় কম্পাউন্ড! চারটে বিরাট-বিরাট বাড়ি! কত গাছ! দেবদারু, শিরীষ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া আরও কত কী। আর রাতে জানিস কী দেখা যেত? জোনাকি। কত যে জোনাকি ছিল ওই বাড়িটার পেছনের ওই গাছপালায়, ঝোপঝাড়ে! আমরা যেতাম মাঝে মাঝে ওই জোনাকি দেখতে। হলদেটে সবুজ আলো। কী অদ্ভুত পোকা! আমাদের দেখতে কী যে ভাল লাগত! আমরা মানে আমি আর বিজন। জোনাকি থেকেই তো বাড়িটার নাম জোনাক-বাড়ি। আসলে কাজুদার কাছে মাঝে মাঝে যেত বিজন, আমিও যেতাম। তবে কাজুদা কখনও কখনও অল্পস্বল্প ধমক দিত আমায়। বিজনের সঙ্গে মিশতে বারণ করত। তাও যেতাম। কাজুদার কাছে যেতে খুব ভাল লাগত। ওদের বাড়ির ছাদে বসে আমরা দেখতাম ওই জোনাকিদের। কাজুদা বলত, ওদের বাড়িটা আসলে জোনাকিদের বাড়ি। নোঈ, তুমি কি জোনাকি দেখেছ?”
নোঈ মাথা নাড়ল, “আমার মামার বাড়ি বর্ধমানে। সেখানে দেখেছি। কলকাতার দেখিনি!”
বাবা বলল, “Although the night is damp, / The little firefly ventures out, / And slowly lights his lamp.”
নোঈ বলল, “এটা কার লেখা? দারুণ তো!”
বাবা মাথা নাড়ল, “কার লেখা আর মনে নেই। পড়েছিলাম। ভুলে গেছি। আসলে বিজন এমন আচমকা ফোন করল যে, হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল সব। কাজুদার মতো মানুষ তো আর দেখলাম না!”
“কাজুদা কে?” নোঈ জিজ্ঞেস করল।
বাবা হাসল। কেমন একটা ম্রিয়মাণ হাসি। তারপর বলল, “বেঞ্জামিন কূজন সরকার। সোনাঝুরির কাজুদা!”
“তিনি এখন কোথায়?” নোঈ তাকাল বাবার দিকে। বাবার নাম বলাটা শুনেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটা যেমন-তেমন কেউ ছিল না!
বাবা হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল। এমন ভাব করল যেন শুনতেই পায়নি প্রশ্নটা। বাবা বলল, “দুপুরে এসেছ, না খেয়ে যাবে না বলে দিলাম। আমি ওপরে গেলাম। দেখি, পাখিগুলোকে কী করল ওরা!”
নোঈ তাড়াতাড়ি বলল, “আমি কিন্তু বাড়ি গিয়ে খাব। মানে…”
বাবা ঘুরে তাকাল। এবার গলাটা সামান্য শক্ত করে বলল, “আমি কিন্তু রাগী মানুষ নোঈ। আমার কথা কেউ না শুনলে খুব রেগে যাই। বাড়িতে ফোন করে বলে দাও, তুমি আজ এখানে খাবে দুপুরে। খিচুড়ি, ইলিশভাজা। তোমরা কি বাঙাল না ঘটি?”
নোঈ সামান্য অপ্রস্তুত হল। পুশকিন ব্যাপারটা দেখেও কিছু বলল না। মজাই লাগছে ওর। আর সত্যি বলতে কী, ভালও লাগছে। বাবাকে কারও সঙ্গে এমন করে কথা বলতে দেখেনি কোনওদিন। আর নোঈ সামনে থাকলে কেন কে জানে ওর মন ভাল থাকে। অন্ধকারগুলো ওকে ঘিরে রাখে না। নোঈ যেন আস্তে-আস্তে ওর জীবনের স্কাইলাইট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা তো ঠিক হচ্ছে না। ওর চেয়ে অনেক ছোট মেয়েটা। এখনও নোঈর গোটা জীবন পড়ে। আর সেখানে পুশকিনের একটা অতীত আছে। দম বন্ধ করে দেওয়া অতীত। তাই বেশি কিছু ভাবে না পুশকিন। আসলে ভাবনা এলেও এড়িয়ে যায়। মনে বসতে দেয় না।
কিন্তু আজ এই বৃষ্টির শহরে, আচমকা নোঈকে দেখে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। নোঈর বড় চোখ, অদ্ভুত সুন্দর হাসি, নাকের ভাঁজ, সামান্য টোলপড়া থুতনি… পুশকিনকে নরম মাটির মধ্যে বসিয়ে দিচ্ছে। ভাললাগা চোরাবালির মতো নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে ওকে। মনে হচ্ছে আজ তো ডুবে যাওয়ারই দিন।
“কী হল বলো…” বাবা আবার বলল।
কিন্তু এবার নোঈ কিছু বলার আগেই পেছন থেকে একটা গলা পেল পুশকিন।
“আমরা উডেন বাঙাল স্যার। বাবা কুমিল্লা। মা ঢাকা।”
পুশকিন কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলল। স্মরণ এসে গিয়েছে। কিন্তু ঘরে ঢুকল কী করে?
বাবা সামান্য চমকে গিয়ে পেছনে তাকাল, “তুমি কে? কী করে ঢুকে পড়লে?”
স্মরণ বলল, “স্যার, আমি স্মরণ। পুশকিনস্যারের কোম্পানিতেই কাজ করি। মেন গেট খুলে একজন বাইরে কিছু জিনিস ফেলছিলেন। সেই ফাঁকে ঢুকে পড়েছি।”
পুশকিন বলল, “এসো এই ঘরে।”
স্মরণ বাবাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল। বলল, “আমি ছাতাটা ওই বাইরে রেখে এসেছি!”
বাবা হাসল স্মরণের কথা বলার ভঙ্গিতে। তারপর বলল, “তুমিও খেয়ে যাবে। তোমরা কথা বলো, আমি উপরে যাই।”
নোঈ আচমকা এগিয়ে গেল বাবার দিকে তারপর বলল, “আমি একটা শর্তে খেতে পারি।”
“শর্ত?” বাবা অবাক হল।
নোঈ বলল, “হ্যাঁ, আপনাকে আমাদের সঙ্গে বসে খেতে হবে!”
বাবা অবাক হল, “কিন্তু আমি তো একা খাই… মানে…”
নোঈ সামান্য হেসে বলল, “না হলে আমি খাব না। আমি কিন্তু বাঙালবাড়ির মেয়ে। গোঁ খুব বেশি! আর মুখরাও!”
বাবা এবার হেসে ফেলল, নোঈর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কখন খাবে আমায় বোলো, আমি তোমার সঙ্গেই বসে খাব!”
বাবা চলে যাওয়ার পরে পুশকিন তাকাল স্মরণের দিকে। স্মরণ নোঈর পাশে বসে পড়েছে।
পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার তোমার? আজ এভাবে হঠাৎ?”
স্মরণ বলল, “স্যার, এমন ওয়েদারে প্যাঁও চাইল নদীর ধারে বৃষ্টি দেখবে! তাই ওকে নিয়ে সোনাঝুরি গিয়েছিলাম। তো, গিয়েছি যখন একবার দেখা করলাম স্থানীয় পলিটিকাল পার্টির লোকজনের সঙ্গে। সেখানে কথায়-কথায় জানতে পারলাম উনি আপনার বাবাকে চেনেন। বিজন সরখেল লোকটির নাম। আমি তখন আপনার এই বাড়ির নাম্বার ওঁকে দিলাম আর কী। বললেন আপনার বাবাকে ফোন করবেন। বহুদিন নাকি যোগাযোগ নেই।”
পুশকিনের এবার পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। ও জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার পেলে কী করে?”
“অফিস থেকে স্যার। এইচআর থেকে। আপনার টিমে আছি, এটা না জানলে ইমার্জেন্সিতে কী করে আপনাকে পাব?” স্মরণ এমন করে বলল যেন এটাই স্বাভাবিক। তারপর একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। দেখলাম তুলছেন না। তখন নোঈকে বললাম আপনার কাছে আসতে। ও আপনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর এখানে এসেছে!”
নোঈ বলল, “পুশকিনদা, আপনাকে একটা কথা আমার বলা হয়নি।”
পুশকিন দেখল নোঈ ওকে এভাবে ডাকায় স্মরণ সামান্য চোখ গোল করেও আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল!
পুশকিন পাত্তা দিল না। ও নোঈকে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“আমার এক কাজ়িন থাকে সোনাঝুরিতে। এটা আপনাকে জানানো হয়নি।”
“তো কী হয়েছে! সোনাঝুরিতে অনেকেই থাকে!” পুশকিন এবার স্মরণের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী বলতে চাও?”
“স্যার, আর-একটা পার্টি কিন্তু ওই প্রজেক্টের জন্য খুব উঠে পড়ে লেগেছে! আমি খবর পেলাম। বিজনবাবুর ওখান থেকে আমি তারক চক্রবর্তীর কাছে গিয়েছিলাম। তারকবাবু ছিলেন না। মোতিবাবু বলে একজনের সঙ্গে কথা হল। তাকে লাইন করে এসেছি। সে-ই বলল, আর-একটা কোম্পানি থেকে একজন এর মধ্যে একবার মিটিং করে এসেছে তারকবাবুর সঙ্গে।”
নোঈ মাঝপথে বলল, “আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, গোটা সম্পত্তিটা মালিক গ্রুপের। আমরা তাদের চেয়ে কেন বেশি লোকাল পলিটিকাল পার্টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি?”
পুশকিন হাসল। মেঘলা দিনের আলো ঘরের পরদা ছুঁয়ে আলতো ভাবে এসে পড়েছে নোঈর গালে। ফ্যানের হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছে ওর। কথা বলতে-বলতে নোঈ হাত দিয়ে চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে কানের পেছনে।
“কারণ চটকল, তাদের ইউনিয়ন। লোকাল ঝামেলা। এসব কে সামলাবে?” স্মরণ যেন সামান্য বিরক্ত হল নোঈর এমন বাচ্চাদের মতো প্রশ্নে!
পুশকিন বলল, “ব্যাপারটা কী? কে যোগাযোগ করছে ওদের সঙ্গে?”
“যোগাযোগ শুধু নয় স্যার। সঙ্গে নানা কিছু দেওয়ার কথাও সে গিয়ে বলে এসেছে। আমাদেরও তাড়াতাড়ি যেতে হবে ওঁর ওখানে।”
পুশকিন এবার সামান্য অধৈর্য হল, “আরে, কে গিয়েছে বলবে তো!”
স্মরণ থমকাল একটু। তারপর বলল, “হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিয়েলটরস-এর রিপ্রেজ়েন্টেটিভ। আইকা বাসু।”
.
১৭. পেখম
মেয়ে দেখতে আসবে বলে তার জন্য কেউ কোনওদিন মার্কেটিং করেছে বলে তো পেখম শোনেনি! এটা কী রে বাবা! বিয়ে যে হবে তারই তো নিশ্চয়তা নেই। সেখানে মার্কেটিং!
পেখমের অদ্ভুত লাগে। মিতুকাকিমার যে কীসের এত উৎসাহ কে জানে! পেখমের তো মনে হচ্ছে মরে যায়! সারাক্ষণ মনে হয় শরীরে ঝিঁঝি ডাকছে! হাত-পা কেমন যেন অবশ লাগে। খেতে ইচ্ছে করে না। ঘুমোতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় এভাবে কেন বাঁচতে হবে ওকে? কী দোষ করেছে ও?
আকাশের দিকে তাকাল পেখম। রাতের আকাশে ঝকঝক করছে তারা। মনে হচ্ছে মাথার ওপরের অসংখ্য ফুটো দিয়ে অন্য কোনও এক জগৎ থেকে ছিটকে আসছে আলো! আকাশের দিকে তাকিয়ে পেখমের মনে হচ্ছে আকাশের ওপারের যে পৃথিবী, সেখানকার জোনাকিদের আলো কি নীল রঙের!
“কী রে, কী দেখছিস বাইরে দাঁড়িয়ে? দোকানে আয়।”
মিতুকাকিমার ডাকে পেছনে ফিরল পেখম। মিতুকাকিমার চোখেমুখে কেমন একটা তাড়াহুড়ো! যেন খুব দরকারি কোনও কাজে দেরি হয়ে গিয়েছে পেখমের জন্য।
এই জায়গাটার নাম সারেংনগর। সোনাঝুরি থেকে পাঁচ-ছ’ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু দোকানবাজার বেশ জমজমাট। পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরো বাজার সবটাই এখানে। তা ছাড়া জামাকাপড়ের বড় দোকানও এখানেই আছে।
পেখম কলকাতার কলেজে পড়তে যায়। সেখানে কিন্তু কেউ মার্কেটিং বলে না, বলে শপিং! আরও অনেক কিছু বলে না, যা মফস্সলের লোকজন অনায়াসে বলে দেয়। কলকাতাকে দেখতে ভাল লাগে পেখমের, কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কোথায় যেন কী একটা কম আছে। কী যে কম আছে সেটা নিজেও বুঝতে পারে না। কিন্তু মনে হয় যে কিছু কম আছে, কী একটা যেন মিলছে না।
জামাকাপড়ের দিকে খুব একটা মন নেই পেখমের। যেমন-তেমন শাড়িতেও চলে যায় ওর। শুধু একটা ব্যাপার খুব টানে ওকে। পারফিউম। সুন্দর গন্ধের মতো ভাল ওর অন্য কিছু লাগে না।
ঠাকুরদা কলকাতা থেকে যখন দোকানের মাল আনতে যায়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট বোতলে সুগন্ধী কিনে আনে পেখমের জন্য। কাজুরও গন্ধ কী পছন্দ! ওদের দু’জনের মধ্যে যে কী মিল!
“কী রে! হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস?” মিতুকাকিমা বিরক্ত হল আবার, “দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
পেখম বলল, “তোমরা দ্যাখো না। আমায় ডাকছ কেন? তোমরা যেটা পছন্দ করবে সেটাই তো হবে!”
মিতুকাকিমা হাসল, “কেন, তোর পছন্দ নেই বুঝি!”
পেখম চোয়াল শক্ত করল সামান্য। তারপর বলল, “আমার আবার পছন্দ!”
“এভাবে বলছিস কেন? এই বয়সেই সাত বুড়ির এক বুড়ির মতো কথা!” মিতুকাকিমা রাগ করল সামান্য।
পেখম নির্লিপ্তভাবে তাকাল মিতুকাকিমার দিকে। মানুষ নিজের মতোই ভাবে অন্যদের। ভাবে, তার যাতে খুশি অন্যরাও তাতেই খুশি হবে। তার যা চাই অন্যরাও সেটা পেতে চাইবে। তার যা পছন্দ, অন্য মানুষজনের পছন্দও একইরকম হবে। মিতুকাকিমাদের মতো হতে পারলে বেঁচে যেত পেখম। মনের মধ্যে এত কিছু ‘ফিলিং’ এসেই যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সেদিনের পর থেকে তো ভাল করে খেতেই পারছে না পেখম। খালি কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ লাগছে, বাবাও কিছু বলছে না। মা যেমন খুশি বলছে, করছে। এমনকী, বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্যও অস্থির হয়ে উঠেছে। পেখমের বিয়ের কথা হচ্ছে, কিন্তু ওকে কেউ কিছু বলছে না। এ কি পুতুলখেলা নাকি? আর বাবা! বাবাই-বা এমন করে কী করে!
সেই রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনি পেখম। খালি জল এসে যাচ্ছিল চোখে। শেষরাতের দিকে নিজের বিছানায় উঠে বসেছিল ও। কী করবে বুঝতে পারছিল না। চোখ বন্ধ করলেই কাজুর মুখটা মনে পড়ছিল। চোখ দুটো মনে পড়ছিল। খালি মনে হচ্ছিল, কাজু তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কিছু যেন বলতে চাইছে!
পেখমের মনে হয়, ও কেন আর পাঁচজনের মতো হতে পারে না! কেন এত কিছু অনুভব করে! ও বোঝে, যে যত বেশি ফিল করে তার জীবনে কষ্ট তত বেশি। ও ভাবে এত বড়লোকের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে, তাও ও খুশি হতে পারছে না কেন? খুশি হতে পারলে তো জীবন সহজ হয়ে যেত। আমাদের অনুভুতিগুলো কি আসলে আমাদের জীবনকে জটিল করে দেয়?
ভোরের দিকে বাইরের ঘরে শব্দ হয়েছিল। পেখম বুঝতে পেরেছিল ঠাকুরদা উঠে পড়েছেন ঘুম থেকে। ও বিছানা থেকে উঠে পায়ে-পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের সামনে। দেখেছিল, ঘরের কোনায় রাখা হিটার জ্বালিয়ে ঠাকুরদা চা চাপিয়েছেন। পাশে পটল বিস্কিটের টিনটা খোলা।
সারা রাত না আসা কান্নাটা আচমকা বুকের মাটি ফুঁড়ে যেন উঠে এসেছিল এবার! দরজার কাঠে মাথা রেখে সামান্য ফুঁপিয়ে উঠেছিল পেখম।
ঠাকুরদা ঘুরে তাকিয়েছিলেন। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন খুব, “কী রে! ঘুমোসনি?”
ঠাকুরদার প্রশ্ন শুনে আরওই যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি পেখম। এবার মাটিতে বসে পড়ে কান্নায় টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ও।
“কী হয়েছে পেখম? কী হয়েছে মা?” ঠাকুরদা এসে নিজেও বসে পড়েছিলেন মাটিতে। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হল তোর পাগলি? কাঁদছিস কেন?”
পেখম ঠাকুরদার কোলে মাথা রেখে ঝুঁকে পড়েছিল সামনে।
ঠাকুরদা ওকে ধরে তুলেছিলেন মাটি থেকে। বলেছিলেন, “ঠান্ডা লেগে যাবে। এখানে বোস।”
ঠাকুরদার চৌকিটা বেশ বড়। তার এক পাশে জড়সড় হয়ে বসেছিল পেখম। সামান্য দূরে রাগী বাচ্চা সাপের মতো হিসহিস করছিল হিটারের ওপরে বসানো জলের বাটিটা।
পেখম কিছুতেই যেন নিজেকে আটকাতে পারছিল না।
ঠাকুরদা আবার মাথায় হাত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “সামলা নিজেকে। এভাবে কাঁদতে নেই। কান্নাকাটি করে কার কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে? এভাবে হয় না।”
পেখম নিজেকে সামলেছিল অনেক কষ্টে। তারপর কোনওমতে বলেছিল, “মা আমায় বিয়ে দিয়ে দিতে চায় জোর করে! বাবাও বলল না কিছু। এখন আমি…”
ঠাকুরদা চুপ করে তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে। ওর অসমাপ্ত কথা সামান্য তুলোবীজের মতো ঘুরছিল ভোররাতের শহরতলির হাওয়ায়, ওদের মধ্যবিত্ত বাড়ির শেষ শীতের নিস্তব্ধতায়। আর-একটা অদ্ভুত বোঝা-না-বোঝার মতো না-বলা কুয়াশা এসে ধীরে-ধীরে ঘিরে ধরছিল পেখমকে। এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা আসছিল ওর।
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “জানিস পেখম, আমার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লায়। বহরিয়া গ্রামে। ছোট ঠাকুরবাড়ি বলা হত আমাদের বাড়িটাকে। বাড়ি থেকে স্কুল ছিল বেশ কিছুটা দূরে। আমরা সবাই মিলে হেঁটে যেতাম সেখানে। শুকনার মাঠ পেরিয়ে, ঢালিবাবুদের পুকুর পার করে, রহিমসাহেবের বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে আমরা যেতাম। আর বাঁশবাগানের পরেই ছিল কটন মিল। সাহেবদের কটন মিল! মিলের পাশেই ছিল বিশাল বড় বাংলো। ফ্লেচারসাহেবের বাংলো। ফ্লেচারসাহেব ছিলেন কটন মিলের বড়সাহেব। আর বাংলোটাও ছিল দারুণ সুন্দর! সাহেবের চার ছেলেমেয়ে ছিল। বড় তিনটে ছেলে আর ছোটটা মেয়ে। মেয়েটা ছোট হলেও কিন্তু খুব কিছু ছোট ছিল না। এই ধর চোদ্দো-পনেরোর মতো। হালকা গোলাপি ফ্রক, আর নীল রিবন দিয়ে চুল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত বারান্দায়। কখনও-বা ওদের বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে বিশাল-বিশাল ঝাউগাছের তলায় পোষা কুকুরের সঙ্গে ছুটোছুটি করত। আমি আর বলাই যেতাম ওই পথ দিয়ে। আমাদের তখন পনেরো-ষোলো বছর বয়স। বলাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত মেয়েটার দিকে। ওদের বাড়ির এক বেয়ারার কাছ থেকে বলাই জেনেছিল মেয়েটার নাম। এলিজ়াবেথ। লিজ়ি বলেই ডাকত সবাই।
“বলাই ভালবেসে ফেলেছিল মেয়েটাকে। কিছুই না, এমনি মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল। বলতে যায়নি কিছু। চিঠি দেয়নি। খবর পাঠায়নি। কিছুই না। শুধু ওই পথ দিয়ে যেতে-যেতে বলাই তাকিয়ে থাকত ওই বড় বাংলোটার দিকে। রোজ যে লিজ়ি বাইরে আসত, তা নয় কিন্তু। তবু বলাই তাকিয়ে থাকত। এমনকী, ব্যাপারটা এমন জায়গায় গেল, যে বিকেলবেলাও বলাই চলে যেত ফ্লেচারসাহেবের বাংলোর সামনে। একটা বড় শিরীষ গাছ ছিল রাস্তার উলটোদিকে। তার ছায়ায় বসে থাকত। পরে সন্ধেবেলা আমায় এসে বলত লিজ়ি নাকি ওর দিকে তাকায়। হাসে।
“শেষে ফ্লেচারসাহেবদের চলে যাওয়ার সময় হল। সেই খবর পেয়ে তো একদম খেপে গেল বলাই! ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল ও। কিন্তু লেখাপড়া গোল্লায় গেল। সারাক্ষণ খ্যাপার মতো ঘুরে বেড়াত। খেত না, স্কুলে যেত না। এমনকী, শুনলাম সাহেবের বাংলোতেও ঢোকার চেষ্টা করেছে কয়েকবার!
“তারপর এল সেই দিন। আমরা দেখলাম কটন মিলের নতুন সাহেব এসে গিয়েছে। ফ্লেচারদের সব বাক্স-প্যাঁটরা গোছানো শেষ। পরের দিন ভোরে বেরিয়ে যাবে। আর সেই রাতেই ঘটল ঘটনাটা। বলাই লুকিয়ে ঢুকে পড়ল ওদের বাড়ি। আর শুধু বাড়ি নয়, একদম লিজ়ির ঘরের ভেতর! আর বলাই তো চোর নয়, সাবধানও হয়নি। তাই ধরাও পড়ে গেল। কী মারটাই না মেরেছিল! থানা-পুলিশ, নানা খারাপ অভিযোগ, সব কিছু দেওয়া হল। আমাদের সকলের চোখের সামনে ছেলেটা শেষ হয়ে গেল! শুনেছিলাম, বলাই নাকি বলেছিল, ‘লিজ়িকে জিজ্ঞেস করুন, ও আমায় চেনে। আমায় দেখে ও হাসে।’ কিন্তু লিজ়ি অস্বীকার করেছিল সব!”
ঠাকুরদা বলে যাচ্ছিলেন, “জেল থেকে বেরিয়ে কেমন পাগলাটে হয়ে গিয়েছিল বলাই। ওই শিরীষ গাছের তলায় বসে থাকত। ওর মা ছিল না ছোট থেকেই। এই সবের পর-পরই বাবাও মারা যায়। দাদারা এই সুযোগটাই নিয়েছিল। পাগল ভাইকে বের করে দিয়েছিল বাসা থেকে। আমাদের ছোট্ট বহরিয়া গ্রামে ঘুরে বেড়াত বলাই। রাতের জ্যোৎস্নায় একা-একা চিৎকার করত। আর বলত, ‘প্রেম করিস না, ভালবাসিস না। ভালবাসা নরক! আমি সেই নরকের শয়তান!”’
ঠাকুরদা টানা গল্পটা বলে থেমেছিলেন। তারপর তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে।
পেখম কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে ছিল পালটা! ভাবছিল, কেন এই গল্পটা ওকে বললেন ঠাকুরদা! ঠাকুরদা যেন ওর মনের কথাই বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন, “আমি যেটুকু জীবন দেখেছি, তাতে প্রেম খুব কিছু কাজের জিনিস নয় রে মা! কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেয় না। তা ছাড়া সমাজের নিজস্ব একটা রেল লাইন আছে। জীবনে সুরক্ষার একটা ব্যাপার আছে। প্রেম কিন্তু সব কিছু সামলে দিতে পারবে না পেখম!”
পেখমের চোখে জল এসে গিয়েছিল আবার। ঠাকুরদা এমন বলছেন! ও এত ভরসা নিয়ে এল ঠাকুরদার কাছে, সেখানে ঠাকুরদা ওকে এমন করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন!
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমি বলাইকে দেখেছি। ঝিকুকে দেখেছি। তুই পাগলি এসবে ঢুকিস না।”
পেখম কাঁপা গলায় বলেছিল, “আমি পারছি না ঠাকুরদা। আমি কাজুকে ছাড়া…”
ঠাকুরদা উঠে গিয়ে হিটারটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “একদিন আজকের কথা ভাবলে হাসি পাবে তোর। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পেখম। উদ্বাস্তু বলে আরও জানি টাকাপয়সার মূল্য। তোর মাকে আমি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না রে। জীবনের সব কিছুর একটা মাত্রা আছে। এই ব্যাপারটা আমার মাত্রার বাইরে। আমায় তুই ক্ষমা করে দিস মা!”
পেখম যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল শুধু।
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমার প্রথমেই ভুল হয়েছিল কাজুকে এই বাড়িতে পড়ানোর জন্য বলা। স্নেহ নিম্নগামী। তোর প্রতি সেই স্নেহের বশবর্তী হয়ে আমি যা করার করেছিলাম। বুঝিনি তুই ক্রমশ এতটা মায়ায় জড়িয়ে যাবি! আমার ভুল হয়ে গিয়েছে মা। আমায় ক্ষমা করিস!”
পেখম ধীরে-ধীরে ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। ঠাকুরদাকে তো ও স্পষ্ট করে কিছুই বলল না, তার আগেই ঠাকুরদা ওকে এসব বলে দিলেন! কেন? কী করে বুঝলেন সব ঠাকুরদা? মা কি কিছু বলে রেখেছে?
নিজের ঘরে ফিরে এসে পাথরের মূর্তির মতো জানলার দিকে তাকিয়ে বসেছিল পেখম। সারা শরীরে কেমন একটা অসাড় ভাব আসছিল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেও আসলে দেখছিল না কিছু। শুধু বুঝতে পারছিল খুব ধীরে একটা মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে ওর। বুঝতে পারছিল প্রেম আসলে স্বপ্ন দেখার মতো একটা ব্যাপার। যে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সে-ই জানে। যারা এর মধ্যে থাকে তারাই জানে। সেই দু’জন জানে। মাত্র দু’জন জানে।
“তোর কী হয়েছে বল তো?” মিতুকাকিমা পেখমের থুতনি ধরে ওর দিকে ফেরাল।
পেখম কষ্ট করে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না কিছুতেই।
মিতুকাকিমা বলল, “তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর মা, কাকিমা তোকে ডাকছে।”
আচমকা মাথাটা গরম হয়ে গেল পেখমের। আচ্ছা নাছোড়বান্দা মহিলা তো! বলছে যে, ওর ভাল লাগছে না! সেখানে এভাবে টানাটানি কেন? সব বিষয়ে কি এমন করে ওকে বাধ্য করা হবে? একটু দোকানের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানেও মায়ের আপত্তি! কী করবে ও দোকানে ঢুকে! যে-পাত্রের সামনে ওর বসারই ইচ্ছে নেই, সেখানে শাড়ি দেখে কী করবে? তা ছাড়া যদি ও দেখেও শাড়ি, কিছু পছন্দও করে, তা হলেও কি মা সেটা কিনে দেবে ওকে? এই যে বাবা-মায়েদের একটা ভাব থাকে, আমরা তোমায় স্বাধীনতা দিচ্ছি, কিন্তু সবটাই তো আসলে মিথ্যে! বাবা-মায়েরা সবটাই নিজেদের মর্জিমতো করিয়ে নেয়। সেটা ভাল লাগে না পেখমের। কাজু বলে জীবনের সব কিছুতে রাজনীতি আছে। পাওয়ার স্ট্রাগ্ল আছে। দিন কে দিন সেটাই সত্যি মনে হচ্ছে ওর। বুঝতে পারছে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের ভেতরেও একটা ক্ষমতার, অন্যকে বশ্যতা স্বীকার করানোর দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে!
“কী রে?” মিতুকাকিমা আবার বলল।
পেখম আচমকা এবার ঘুরে দাঁড়াল মিতুকাকিমার মুখোমুখি। তারপর শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “আমি কি অন্য ভাষায় কথা বলছি কাকিমা? যাব না আমি। ভাল লাগছে না। তুমি মাকে বলো, আমি যাব না ভেতরে।”
কাকিমা থতমত খেয়ে গেল একদম। কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। মুখ লাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঠোঁট নাড়াল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরিয়ে এল না। তারপর নিজের মনে মাথা নেড়ে ঢুকে গেল দোকানে।
পেখমের খারাপ লাগল। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। মা যা শুরু করেছে, আর কিছু সহ্য করতে পারছে না। ও জানে এই যে মিতুকাকিমাকে এরকম বলল, এতে ওর বিপদ বাড়বে বাড়িতে। কিন্তু আর নিতে পারছে না ও। মানতে পারছে না কিছু। বাড়িতে ওকে খেতে-পরতে দেয় বলে কি ওর ওপর বাবা-মা এমন জুলুম করতে পারে! আর বাবা! বাবা এটা মানছে কী করে? পেখম বাবার সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাবা কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে। কিছুতেই সামনে আসছে না, কথা বলছে না। পেখম বুঝতে পারছে না, কী হতে যাচ্ছে সামনে। এমনকী, গত এক সপ্তাহ কলেজেও যেতে দেয়নি মা। মায়ের কথা হল ছেলের বাড়ি থেকে এসে কথা বলে যাক, তারপর সব হবে।
এই ব্যাপারটাতেই আপত্তি আছে পেখমের। এত বছরের ওর জীবন, ওর পড়াশোনা, সবটা আটকে যাবে কোথাকার কে এক হরিদাস পালের জন্য। এটা কি হতে পারে। আর বাবাই-বা এমন করে এইসব অন্যায় কথা মেনে নিচ্ছে কেন?
পাগল-পাগল লাগছে পেখমের। মাথার ভেতর ঘিলু ফুটছে! মনে হচ্ছে এমন করে তো চলতে পারে না! বাড়ি থেকে একা বেরোতে দেওয়াই হচ্ছে না ওকে। কাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না কিছুতেই। কাজুকে যে এসব বলবে তারও উপায় নেই। নয়নাও আসছে না কেন বুঝতে পারছে না। পেখমের মনে হচ্ছে সবাই মিলে ওকে চারিদিক থেকে বেঁধে রেখেছে!
“পেখমদি, তুমি এখানে?” আচমকা একটা চেনা গলা পেয়ে ঘুরে তাকাল ও। আরে, বিজন এখানে কী করছে এই সন্ধেবেলা?
গত ক’দিনের ভেতর পেখমের এই প্রথম ভাল লাগল। মনে হল যেন বন্ধুর মুখ দেখল শ্মশানের মধ্যে! একরত্তি একটা ছেলে, যাকে সেভাবে কোনওদিন পাত্তা দেয়নি, আজ তাকে দেখেই মনে হল সমুদ্রে ভাসমান একখণ্ড কাঠ!
পেখম বলল, “এই দোকানে এসেছি। তুই এখানে বিজু? কী ব্যাপার?”
“আরে, বোলো না, আমাদের একটা পার্টির মিটিং আছে। তাই এসেছি কাজুদার সঙ্গে।”
“কাজুদা এসেছে!” পেখম না চাইতেও কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে! সারা গায়ে কদম ফুটে উঠল যেন!
“হ্যাঁ তো,” বিজন বলল, “আমায় তো আসতে দিতেই চায় না। শেষে আমি জোর করে এলাম। আসলে আমাদের পার্টির ব্যাপার তো। আমি দূরে থাকি কেমন করে! বিমলদা বলেছেন আমাদের আরও তৈরি হতে হবে! না হলে…”
“কাজুদা কই রে?” পেখম এদিক-ওদিক তাকাল।
এই জায়গাটায় বেশ ভিড়। তা ছাড়া আজ শুক্রবার। আশপাশের কারখানাগুলোর উইকলি পেমেন্টের দিন। মানুষজন বাজারহাট করে আজ। তাই ভিড়ে জায়গাটা গিঁট পাকিয়ে আছে সামনে। সন্ধে ঘন হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে লোকজন আরও বাড়ছে!
“এইখানেই তো কোথায় ছিল!” বিজন ঘুরে ভিড়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
পেখম সামান্য এগিয়ে গেল রাস্তার দিকে। এত লোক! তার মধ্যে কোথায় আছে কাজু! ও দ্রুত পৃষ্ঠা ওলটানোর মতো করে মানুষের মুখগুলোকে পালটে দেখতে লাগল। কাজু কই? দেখা পেলে দ্রুত যাবে ওর কাছে। কাজুকে যে বলতে হবে সব কিছু। ওর সঙ্গে কী হচ্ছে, সেটা যে জানাতেই হবে।
বিজন আরও কিছু বলত, কিন্তু কিছু একটা দেখে থমকে গেল। পেখম বুঝল ওর পেছনে কাউকে দেখেছে বিজন। ও মুখ ঘোরাল। দেখল মা বেরিয়ে এসেছে দোকান থেকে। মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে রাগে।
“তুই… তুই… মিতুকে কী বলেছিস?” মা যেন কাঁপছে! যেন ভুলে গিয়েছে ওরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে!
মা আবার বলল, “এত বাড় বেড়েছিস? এতটা বাড়? ভেতরে চল। চল ভেতরে। মিতুর কাছে ক্ষমা চাইবি চল!” মা এগিয়ে এসে পেখমের হাতটা ধরতে গেল। আর ঠিক তখনই পেখম শুনতে পেল বিজন যেন অস্ফুটে বলল, “কাজুদা!”
পেখম কথাটা শোনামাত্রই মায়ের বাড়ানো হাত থেকে সরিয়ে নিল নিজের হাত। তারপর এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল রাস্তার ওই পারের দিকে। দেখল ভিড়ের ভেতর সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কাজু।
পেখমের যে কী হল, ও নিজেও যেন বুঝতে পারল না। মায়ের রাগ, মানুষের ভিড়, সব কিছু যেন নিমেষে মুছে গেল ওর সামনে থেকে! ওপাশ দিয়ে আসা রিকশার সারিকে তুচ্ছ করে দৌড়ে গেল অন্য পারে।
“কাজুদা!” পেখম আর্তনাদের মতো করে ডাকল।
কাজু সামান্য চমকে তাকাল ওর দিকে।
“কাজুদা আমি… আমি তোমায়…”
পেখমের সমস্ত কথা একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল যেন। কিন্তু কোনও কিছু ঠিকমতো বলার আগেই দেখল কাজু কেমন যেন শক্ত হয়ে গিয়েছে।
কাজু স্থির চোখে একবার পেখমকে দেখল। তারপর দ্রুত সাইকেলে উঠে পড়ল। পেখমকে কিছু বলতে না দিয়ে ভিড়ের ভেতর সাইকেলের বেল বাজাতে-বাজাতে যতটা দ্রুত সম্ভব অদৃশ্য হয়ে গেল।
পেখম তাকিয়ে রইল ভিড়ের দিকে। কাজু কথা বলল না ওর সঙ্গে! এভাবে চলে গেল! কেন গেল? কী চায় কাজু? কী শুনেছে ও যে, এমন করে চলে গেল?
চারদিকের ভিড় আর হট্টগোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল পেখম। আর অবাক হয়ে দেখল, ওর সামনে থেকে আস্তে-আস্তে ঝাপসা হয়ে মুছে যেতে শুরু করেছে মানুষজন, গাড়িঘোড়া, দোকান-বাজারসমেত সকল দৃশ্যপট!
এক নির্জন, জনহীন প্রান্তরে যেন দাঁড়িয়ে রইল পেখম। যেন দেখতে পেল বহু বছর আগের এক গ্রামে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এক তরুণ। বলছে প্রেম নেই! আর প্রেম নেই কোথাও!
.
১৮. মাহির
“আমি আজ আপনাদের সামনে ইতিহাস থেকে উঠে আসা এমন এক জিনিস বিক্রি করতে এসেছি, যার বয়স চার হাজার বছরের বেশি! রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সিন্ধুসভ্যতার খননকার্যে উঠে এসেছিল অসাধারণ এই বস্তুটি। আর কী তার ইতিহাস! মহামতি সম্রাট অশোক থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার হয়ে তৈমুর লং, তারপর সেই বংশের জাহাঙ্গির হয়ে টিপু সুলতান থেকে নেপোলিয়নের হাত ঘুরে সেটি এসেছে বাচ্চা হিটলারের হাতে। আর সেখানেই থেমে থাকেনি, বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক ও নেত্রীর ছোট বয়সের একমাত্র সঙ্গী ছিল বস্তুটি। তাদের সেই শিশু অবস্থার মনন নির্মাণের সঙ্গী ছিল এটি। মাটি, পাথর, কাঠ, ব্রোঞ্জ পেরিয়ে কাচ হয়ে এখন প্লাস্টিক ও পলিমারে এসে থেমেছে বস্তুটি। ইতিহাসের ছোট্ট এটিল্লার মতো আপনার বাচ্চারও মনখারাপের, একাকিত্বের আর ভালবাসার সঙ্গী এই বস্তু। চিলেকোঠায় আটকে থাকা অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের সেইসব দিনগুলোয় তার পাশে এই বস্তুটি যেমন ছিল, তেমনই আপনার সন্তানেরও নিভৃত সময়ের সঙ্গী হওয়ার সমস্ত যোগ্যতাই আছে তার। প্রাচীন সময় থেকে বর্তমান সময়ে আসার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে জাতিধর্ম নির্বিশেষে শিশু-কিশোরদের একমাত্র সঙ্গী এই বস্তুটিকে আজ এই বনগাঁ লোকালে আমি আপনাদের সামনে এনে হাজির করেছি। এর মাধ্যমে আপনি আপনার স্নেহের সন্তানের হাতে শুধু মনোরঞ্জনের বস্তুই তুলে দিচ্ছেন না, তুলে দিচ্ছেন হামুরাবি থেকে বর্তমান সময় অবধি বয়ে আসা এক ঐতিহ্যের অংশকে। তাই আমার ঝোলার স্টক থাকতে-থাকতে আপনারা সংগ্রহ করে নিন ‘ডায়মন্ড টয়েজ়’-এর একমাত্র খেলনা ব্যাঙে বাজায় কত্তাল! সম্রাট আকবর যেমন তাঁর প্রিয় সেখুবাবার হাতে তুলে দিতেন, তেমন আপনিও আপনার সন্তানের হাতে তুলে দিন সিন্ধু নদ থেকে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া এক ইতিহাসের টুকরো! এই ব্যাঙ, যা বিজ্ঞানের বইয়ে বুফো মেলানোস্টিকটাস নামে আপনাদের জ্বালিয়ে এসেছে, তাকে একবার আপন করে নিয়ে নিজেকে ও নিজের প্রিয় সন্তানকে করে তুলুন ইতিহাসের অংশ! আর কেউ আপনাকে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে এমন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেবে না। তাই দেরি না করে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে ইতিহাসে নাম ওঠাতে তৎপর হন।”
মাহির হাঁ হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। দুপুরের বনগাঁ লোকাল। গাড়ি দুর্গানগর ছেড়ে গিয়েছে। ভিড় যা ছিল মোটামুটি নেমে গিয়েছে মধ্যমগ্রাম স্টেশনে। এখন যারা আছে, সব বসেই আছে। সেখানে এই লোকটি সুর করে একটানা বলে গেল এসব! এসব কী?
লোকটাকে দেখল মাহির। বেঁটে, শুকনো চেহারা। সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে। জামাকাপড়ও ময়লা। কাঁধে একটা ঝোলা। তাপ্পিমারা। আর হাতে প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা। একটা সবুজ রঙের ব্যাঙ। ব্যাঙের সামনের পা দুটোতে করতাল লাগানো। খেলনার নীচের একটা ‘ইউ’-আকৃতির লিভারে চাপ দিলে ব্যাঙের পা দুটো তালির মতো করে কর্তালটা বাজায়!
খুবই সাধারণ খেলনা। মাহির বহুবার দেখেছে। কিন্তু সেটাকে যে কেউ এভাবে বিক্রি করতে পারে, সেটা ওর চিন্তাতেও ছিল না!
মাহির দেখল সবাই লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ-কেউ হাসছেও। কিন্তু লোকটার তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বলেই চলেছে এসব জড়ানো-প্যাঁচানো কথা!
মাহির শুনল একজন তো বেশ চেঁচিয়েই বলল, “মালটাকে ট্রেন কাত করে ফেলে দে তো!”
কিন্তু লোকটা পাত্তাও দিল না! সে কর্তাল বাজাতে-বাজাতে এসব বলে চলেছে!
“মালটা এখানেও এসে জুটেছে?” পাশ থেকে টিটি চাপা গলায় বলল।
“মানে?” মাহির তাকাল টিটির দিকে।
“আরে, নকুর সেই পাগলা দাদাটা! বলেছিলাম না, লেক মার্কেটে একজনকে কেলিয়েছে বলে পুলিশ ধরেছিল! রিতুদা তারপর ছাড়ায়। সে মাল দেখছি বই ছেড়ে এখন খেলনা ধরেছে।”
মাহির অবাক হল। লোকটা যা বলছে সেটা কতদূর সত্যি তা জানার মতো বিদ্যে ওর নেই, কিন্তু লোকটা নিজে এত কিছু জানল কী করে? আর সামান্য একটা খেলনা কেউ যে এমন করে বিক্রি করতে পারে, সেটাই তো ভাবতে পারে না ও!
লোকজন হাসাহাসি করলেও মাহির দেখল চারজন কিনল খেলনাটা!
“এই যে ভাই, এদিকে আসবেন তো!” পাশ থেকে তুয়াদি হাত তুলে ডাকল খেলনাওয়ালাটাকে।
মাহির ঘাবড়ে গেল। তুয়াদির আবার কী হল? ও এসব কিনছে কেন?
মাহির চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হল তুয়াদি? তুমি কী করছ?”
তুয়াদি বিরক্ত হয়ে তাকাল, “খেলনা কিনব। কেন? তোর আপত্তি আছে?”
মাহির চুপ করে গেল। ও কেন আপত্তি করবে! ও আপত্তি করার কে! কিন্তু তুয়াদি নিজে বিয়ে করেনি। ভাইদের সংসারে থাকলেও আলাদাই খায়। তা হলে কার জন্য কিনবে এসব? তুয়াদি সেলাই করে ভালই রোজগার করছে এখন! কে এক লোক নাকি জামাকাপড় এক্সপোর্ট করে এমন কিছু ছোট কোম্পানির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। তারা ভালই কাজ দিচ্ছে। এমনকী, সেদিন তো মাহিরকে বলছিল রিতুদাকে বলে একটা ঘর দেখে দিতে। গেঞ্জির ফ্যাক্টরি দেবে।
“গেঞ্জি!” মাহির খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল, “তুমি ফ্যাক্টরি দেবে? বিক্রি করবে কোথায়?”
“তোর জেনে কাজ কী! আমার নিশ্চয় কানেকশন আছে! আমি তো ছাগল নই যে, এমনি-এমনি জায়গা দেখছি!”
মাহির আর কথা বাড়ায়নি। আসলে আজকাল কী হয়েছে তুয়াদির কে জানে! আগে তো এমন করত না! কয়েকমাস যাবৎ ওর সঙ্গে দেখা হলেই কেমন একটা ঝাঁজি মেরে কথা বলে। চিমটি কেটে উত্তর দেয়। যেন পছন্দ করছে না। আবার নিজের যা কাজ ওকেই ডেকে করায়। মাহির কথা না বললে রাগ করে। ওর গায়ে আচমকা হাত দেয়। এসব কী করছে তুয়াদি? কিছুই বোঝে না মাহির। ও যথাসম্ভব এড়িয়ে থাকে।
কিন্তু মা রাগ করে। বলে, “তুয়া আছে, তাই তোর ভাইটা বেঁচে আছে। আমি কাজে বেরোই। তুইও টইটই করে বেড়াস। তুয়া না থাকলে তোর ভাইকে কে দেখবে? ও যা বলে করে দিবি। আমায় যেন আর বলতে না হয়!”
মা আজকাল সারাক্ষণ রেগে থাকে। ভাইয়ের জন্য যে মায়ের দুশ্চিন্তা হয় সেটা ও বোঝে। কিন্তু তার সঙ্গে ও যে রিতুদার হয়ে এটা-ওটা কাজ করছে সেটা মা মানতে পারে না। ভাইয়ের ডায়ালিসিস শুরু হয়েছে। রিতুদাই বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তাই মা খুলে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে মায়ের একটা আশঙ্কা আছে যে, মাহির খারাপ পথে চলে যাচ্ছে!
রিতুদা কিন্তু মাহিরকে কোনও খারাপ কাজে পাঠায় না। নানা ব্যাবসা আছে রিতুদার। সে সব জায়গায় টাকা কালেকশনের কাজটা করতে হয় ওকে। কেউ দিতে দেরি করলে একটু কড়াভাবে বলতে হয়। সেটা অবশ্য পারে না ও। মাহির কাউকেই কড়াভাবে কিছু বলতে পারে না। সেই কাজটা করে দেয় টিটি।
মাঝখানে টিটি যে নিজের অটোটা চালাত, সেটা আর চালায় না। ভাড়ায় একটা লোক চালায় এখন। মাস গেলে একটা টাকা নেয় টিটি। ওরা বলে বাতচিৎ। টিটি নিজে এখন রিতুদার কাছেই সারাক্ষণ কাজ করছে।
টিটি ওকে বলেছে, “দ্যাখো কাকা, তুমি হলে হাওয়া-ভরা মাল! শরীরটাই বড়। মুখ খুললে একদম ন্যাদাবোদা, চার অক্ষরের বোকা! কেউ টাকা না দিলে বা লেবাররা ট্রাবল করলে তোকে কিছু বলতে হবে না। আমি যা ফাটাবার ফাটাব। তুই শুধু বিশাল চেহারাটা নিয়ে ভুরু কুঁচকে, রাগী মুখ করে তাকিয়ে থাকবি! সাইলেন্ট সিনেমা হয়ে থাকবি কিন্তু। বুঝলি! একদম দাতা কর্ণের মতো মুখ খুলবি না! বুঝেছিস?”
মাহির কথা শোনে টিটির। মুখ খোলে না। চোখমুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে!
“ক’টা দেব দিদি?” লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!
“দুটো,” তুয়াদি কুড়ি টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল সামনে।
লোকটা দুটো খেলনা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে দিল। তারপর এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট আসছে সামনে।
“নে ঢুকিয়ে রাখ,” তুয়াদি মাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিল প্যাকেটটা।
হাতের ব্যাগটায় খেলনাটা ঢুকিয়ে ব্যাগটা কোলের ওপর নিল মাহির। এতে সাড়ে ছ’লাখ টাকা আছে। বারাসতের একটা পার্টির কাছ থেকে কালেকশন। কীসের কালেকশন সেটা জানে না মাহির।
রিতুদা গতকাল ডেকেছিল মাহিরকে। বলেছিল, “কাল সকালে বারাসত চলে যাবি। টিটি আর তুই। পেমেন্ট আছে একটা। নিয়ে আসবি। ক্যাশে দেবে। ফলে সেভাবে আনবি। মনে থাকে যেন!”
“ঠিক আছে রিতুদা,” মাথা নেড়েছিল মাহির।
“আর শোন,” রিতুদা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, “ব্যাগটা তোর কাছে রাখবি, টিটির হাতে দিবি না। গাড়ি করে চলে আসিস।”
কিন্তু গাড়ি করতে পারেনি মাহির। বারাসতে কী একটা ঝামেলা হয়েছে। রাস্তা অবরোধ। তাই গাড়ি করা যায়নি। তার ওপর আবার তুয়াদি এসে জুড়ে বসেছে! কী যে জ্বালা!
টাকা কালেকশন করে কোনও গাড়ি না পেয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বারাসত স্টেশনে এসেছিল মাহিররা। ভয় লাগছিল ওর। সঙ্গে এতগুলো টাকা। কিছু হয়ে গেলে রিতুদা আস্ত রাখবে না।
টিটি বলেছিল, “রিতুদাকে একটা ফোন করে জানাবি যে, এখানে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না?”
“না!” মাহির মাথা নেড়ে বলেছিল, “রিতুদা টেনশন করবে। তার চেয়ে ট্রেনে বেরিয়ে যাই চল।”
স্টেশনে লোকের মাথা লোকে খাচ্ছিল! মাহিরের আরও ভয় লাগছিল দেখে। এত লোক! কী যে ভিড় হবে ট্রেনে! আর ব্যাগটা যদি ছিনতাই হয়ে যায়!
আকাশের দিকে তাকিয়েছিল মাহির! মেঘ করছে আবার। জুলাই মাস। ভরা বর্ষা চলছে। এখন বৃষ্টি এলেই মুশকিল হবে, ভেবেছিল মাহির।
“এত ভিড়ে ট্রেনে ওঠা খতরনাক হয়ে যাবে কাকা!” টিটি বলেছিল, “তার চেয়ে কয়েকটা ট্রেন ছেড়ে দিই চল। খিদেও লেগেছে। কিছু সাঁটিয়ে নিই চল।”
চারটে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল ওরা। স্টেশনেই একটা দোকান থেকে পরোটা আর আলুর তরকারি খেয়েছে এর ফাঁকে। মাহির খেলাধুলো করে, তাই এমন তেলজবজবে খাবার ও খেতে চায় না। কিন্তু উপায় নেই। খিদে বড় বালাই। তা ছাড়া আজকাল খেলাটা কেমন যেন জীবন থেকে আস্তে-আস্তে সরে যাচ্ছে ওর। সাতাশ হতে চলল, এখনও সেকেন্ড ডিভিশনে পড়ে আছে। বড় ক্লাবে ডাকে না। ট্রায়াল হয় না। পতাদার ঢপবাজি শুনে-শুনে কান পচে গেছে। মাহির ক্রমশ বুঝতে পারছে যে, আমাদের দেশে লোকে বিদেশি ফুটবল দেখে আর ক্রিকেট খেলে। এখানে কিছু হওয়া যায় না ফুটবল খেলে।
খাবার খেতে-খেতে এ সবই সাতপাঁচ ভাবছিল আর ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ একটা আলতো করে থাপ্পড় মেরেছিল পিঠে! ও খাবারের প্লেট হাতে ঘুরে দেখেছিল, তুয়াদি!
“কী রে, ব্যাগটাকে ওরকম প্রেমিকার মতো জড়িয়ে বসে আছিস কেন?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।
এই কামরার শেষ সিট এটা। টানা লম্বা। সাতজন বসতে পারে। কিন্তু ন’জন বসেছে! সব জায়গাতেই এমন অবস্থা! অটোয় কলকাতার একটু কোণের দিকে গেলেই উপচে পড়া মানুষ তুলে নেওয়া হয়। জেলাগুলোয় ট্রেকার চলে, নাকি আঠার বিজ্ঞাপনের সেই মানুষঠাসা গাড়ি চলে কে জানে! বাসে লোক ঝুলছে! মেট্রোতেও মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করা যায় না! দূরপাল্লার ট্রেনে পর্যন্ত রিজ়ার্ভ সিটকে বাপের সম্পত্তি ভেবে ঠেসে বসে যায় সব। ভাগ্যিস প্লেনে ঝুলে যাওয়া যায় না! গেলে পাইলটকে যে ক’জন মানুষকে কোলে বসিয়ে নিয়ে যেতে হত কে জানে! মাহির বোঝে, গোটা দেশ তেঁতুল পাতার কনসেপ্টে চলছে!
তুয়াদি একদম লেপটে বসেছে মাহিরের সঙ্গে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর। আজকাল তুয়াদির যে কী হয়েছে! নানা অছিলায় মাহিরের গায়ে হাত দেয়! এত বিরক্ত লাগে ওর! কিন্তু কিছু বলতে পারে না। ও জানে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু-শুধু ওকেই ভুল বুঝবে!
এখনও ভাল লাগছে না মাহিরের। তুয়াদির বুকটা ওর ডান দিকের কনুইতে লাগছে। ও টিটির দিকে সরে যেতে চাইছে, কিন্তু জায়গা নেই বলে পারছে না। আর ওর মনে হচ্ছে, তুয়াদি যেন ইচ্ছে করে ওর কনুইতে নিজের শরীরটা ঘষছে!
“কী রে বল, কী আছে তোর ব্যাগে? এখানে কী করতে এসেছিলি?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।
টিটি অন্য সময় ফটফট করে, কিন্তু আজ চুপ। তুয়াদিকে খুব ভাল করে চেনে টিটি। আর ভয় পায়। সেই প্রপোজ় করতে গিয়ে মার খেতে-খেতে বেঁচে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনও ভোলেনি! তুয়াদি টিটিকে দেখলেই নানাভাবে কথা শোনায়! আজও স্টেশনে বলেছিল, “এই মর্কটটার সঙ্গে এসব গিলছিস? ওর সাপের বিষও হজম হয়ে যায়। কিন্তু তুই? ভাইটা অসুস্থ হয়েছে, এবার কি তুই হবি?”
তাই টিটি একটু সরে-সরে থাকছে। তুয়াদির সঙ্গে যাতে কথা না হয় এমন করে মুখ ঘুরিয়ে রাখছে।
মাহির বলল, “না, আমার কিছু সার্টিফিকেট আছে। সেই কাজেই এসেছিলাম এখানে…”
“সেই কাজে মানে? কী কাজে?” তুয়াদি আরও চেপে এল মাহিরের কাছে।
হালকা সেন্ট আর পাউডার মেশানো একটা গন্ধ পাচ্ছে মাহির। কানের পেছনে দেখছে পাউডার লেগে আছে একটু। কেন জানে না, মাহিরের ইচ্ছে করছে উঠে চলে যেতে!
“কী কাজে এসেছিস বল। আজ রবিবার, আজও কাজ!” তুয়াদি মাহিরের থাইতে হাত দিয়ে ঠেলল।
মাহির কুঁকড়ে গেল একদম। বলল, “হ্যাঁ, ওই একটা চাকরির জন্য। এখন আর রবিবার মানেই সব ছুটি এমন নয়। ইন্টারভিউ ছিল একটা তাই…”
“কীসের কাজ?” তুয়াদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“এমনি ইয়ে…” মাহির দ্রুত মনে মনে কথা বানাতে শুরু করল। কী বলা যায়! রিতুদার কাজে এসেছে সেটা বলা যাবে না। তা হলে আরও নানা প্রশ্ন করবে তুয়াদি। রিতুদাকে সবাই ভয় করে, তেলিয়ে চলে! কিন্তু পেছন ঘুরলেই গুন্ডা বলে। তুয়াদিও সেই দলেই। তাই সবারই রিতুদার কাজকর্ম নিয়ে কৌতূহল আছে!
মাহির বলল, “ওই ওরা বাংলাদেশে কিছু জিনিস এক্সপোর্ট করে। তাই মানে…”
“তো নিজে আসতিস, এই মর্কটটাকে আনলি কেন?” তুয়াদি টিটিকে দেখিয়ে জোরে-জোরেই বলল।
অন্য কেউ হলে টিটি এসব কথার বিনিময়ে গালাগালি দিয়ে তার বাপের শ্রাদ্ধ করে দিত। কিন্তু তুয়াদিকে যমের মতো ভয় করে ও। টিটি তুয়াদির কথায় হি হি করে একটা হাসি দিল। পরিস্থিতি ম্যানেজ করার হাসি।
তুয়াদি বলল, “আর দাঁত দেখাতে হবে না। ওগুলো এমনিতেই দেখা যায়!”
মাহির দেখল ব্যাপারটা অন্যদিকে যাচ্ছে। ও বলল, “তুমি এখানে… মানে…”
“কেন তুই জানিস না? বারাসতে আমার মাসির বাড়ি। তাই এসেছিলাম। কাকিমাকে তো বলে এসেছি। তোকেও তো বলেছিলাম।”
“ও হ্যাঁ তা ঠিক। আসলে ভুলে গিয়েছি আর কী!”
মাহির দেখল দমদম জংশন ঢুকছে। ও তাকাল টিটির দিকে। কী করবে বুঝতে পারল না। মেট্রোয় গেলে তো গেটে চেক করে আজকাল। সেখানে যদি ধরা পড়ে যায়! এই নিয়ে টিটিকে বলেওছিল আগে। ও ভেবেছিল শিয়ালদায় নেমে সাউথ সেকশনের ট্রেন ধরবে বা ট্যাক্সি করে নেবে!
টিটিও ওর দিকে তাকাল। মানে কী করবি?
তুয়াদি উঠে দাঁড়াল এবার, “চল নামবি। এখান থেকে মেট্রো করে রবীন্দ্র সরোবর চলে যাব। তাড়াতাড়ি হবে।”
“আমরা ভাবছিলাম,” মাহির তোতলাতে লাগল, “মানে… শিয়ালদা গিয়ে…”
“চল!” তুয়াদি মাহিরের হাত ধরে টানাটানি শুরু করল।
মাহির বাধ্য হয়ে উঠল সিট থেকে। তুয়াদিকে বিশ্বাস নেই। সিন ক্রিয়েট করতে লজ্জা পায় না!
মেট্রোর টিকিট কাউন্টারের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল মাহির। কী সুন্দর বাঁশি বাজছে! ও দেখল একজন বৃদ্ধ বাঁশিওয়ালা সাইডব্যাগে অনেকগুলো বাঁশি নিয়ে বড় গেটের এক পাশে দাঁড়িয়ে। কী অদ্ভুত বাঁশি বাজান মানুষটি!
তুয়াদিও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর এগিয়ে গেল বাঁশিওয়ালার দিকে। মাহির আর গেল না। তুয়াদির এই এক অভ্যেস। সারাক্ষণ কিছু না-কিছু কিনতেই থাকে! ও দেখল তুয়াদি বাঁশি কিনল একটা। মানুষটার সঙ্গে কথাও বলল একটু।
টিটি পাশে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, “শালা, এই মালটা জুটে ঝাড় হয়ে গেল তো! এখন মেট্রোয় যদি আটকায়! আমার যা চেহারা, ক্রিমিনাল বলে ধরে নিয়ে কেলিয়ে লাট করে দেবে! তোকেও হাম্পু কম দেবে না! তুই শালা উঠলি কেন?”
মাহির কিছু বলার আগেই তুয়াদি ফিরে এল, “তোরা কি ক্যালানে? টিকিটের লাইনে দাঁড়াসনি কেন? যা টিকিট কাট আগে!” বলেই একটা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল টিটির দিকে।
টিটি আর কথা বাড়াল না। টিকিটের লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তুয়াদি তাকাল মাহিরের দিকে। তারপর আলতো করে ওর কনুইয়ের ওপরটা ধরে বলল, “এত ভাল চেহারা তোর। পুলিশে যাস না কেন?”
মাহির কী বলবে ভেবে পেল না।
তুয়াদি আবার বলল, “ফুটবলে কিছু হবে না। আমি যে-কারখানাটা করব সেখানে আমার সঙ্গে কাজ করবি? আমার তো লোক লাগবেই! তুই বেশ ম্যানেজারি করবি। আমার লোক তুই। তোকে তো বিশ্বাস করি আমি।”
মাহির কথাটা শুনে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল! সেদিন পলিও এমন একটা কথা বলেছিল না ওকে!
পলি! নামটা মনে পড়লেই ওর মনে হয় নিউ মার্কেটের ফুলের বাজারে দাঁড়িয়ে আছে ও! এমন একটা মেয়ে এই কলকাতায় ছিল! পলির কথা মনে পড়লে ভেতরে-ভেতরে গলে যায় মাহির। বড়-বড় বাদামি চোখ। অমন টিকালো নাক! এসব মেয়েকে ভগবান কেন পাঠায় ওর সামনে! ও নিজেদের ওই ছোট্ট নোনাধরা ঘরে, চৌকির ওপর শুয়ে রাতে পলির কথা ভাবে। কোলবালিশ জড়িয়ে মনে মনে আদর করে পলিকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বোঝে পলির কথাই মনে পড়ছে। বোঝে এখন উঠে দাঁড়ানো যাবে না সবার সামনে!
ওল্ড এজ হোমটার নাম ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছের গ্রিক চার্চের পাশের গলি দিয়ে কিছুটা গেলে বাঁ দিকে একটা রাস্তা ঢুকেছে। সেই রাস্তার ওপর একটা দোতলা বাড়িতে এই ওল্ড এজ হোমটা বানানো হয়েছে।
রিতুদা বলেছিল ওকে যেতে। পলির সঙ্গে কথা বলে এক শনিবার বিকেলে গিয়েছিল মাহির। টিটি যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মাহির যেতে দেয়নি।
টিটি বলেছিল, “কেন, আমায় নিবি না কেন?”
মাহির গম্ভীরভাবে বলেছিল, “রিতুদা আমায় একাই যেতে বলেছে। তোকে নিলে রাগ করবে!”
টিটি সরু চোখে তাকিয়ে গাঁজার পুরিয়া বানাতে-বানাতে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে বলে আমায় কাটিয়ে দিচ্ছ! আমি কি দেখিনি ভেবেছ? সেদিন এসেছিল রিতুদার অফিসে। শালা কারেন্ট অফ-এ মনে হচ্ছিল পাড়ায় সার্চলাইট ঘুরছে! এমন জিনিসের কাছে এক-একা যেতে চাও! আচ্ছা যাও। আমার শালা ব্রিজের পাশের লতুবউদিই ঠিক আছে।”
হোমটার দুটো তলায় তিরিশ জনের মতো থাকেন। সবারই বেশ বয়স হয়েছে। এটা মহিলাদের হোম। পলির সঙ্গে সব ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল মাহির। কীভাবে সবাই থাকেন, কী খান, কোথায় বসে গল্প করেন সবাই, কোথায় রান্না হয়— সবটা দেখছিল।
পলি বুঝিয়ে-বুঝিয়ে দিচ্ছিল নানা জিনিস। আর মাহির মাথা নাড়ছিল খুব। মানে খুব বুঝতে পারছে আর কী, এমন একটা ভাব। কিন্তু আসলে তেমন কিছুই মাথায় ঢুকছিল না! পলির মতো মেয়েদের এত কাছে কোনওদিন আসেনি মাহির।
ওর তো বয়েজ় স্কুল ছিল। তাও সব তেমনই ছাত্র! যেমন তাদের আচার-ব্যবহার তেমন মুখের ভাষা! মেয়েরা চিরকাল ছিল নেপচুন-প্লুটোর বাসিন্দা! তার ওপর মাহির ছিল লাজুক। তাই আরওই কিছু হয়নি!
শুধু স্কুল যাতায়াতের পথে ও বড়-বড় স্কুলের নীল বর্ডার দেওয়া হলুদ বাসগুলো দেখত, দেখত সেই বাসের জানলায় নেপচুন আর প্লুটোর মেয়েরা বসে আছে। দেখলেই যেন মনে হত, এদের কাছে যাওয়া মানা। এদের ভাষা, খাবার, পোশাক সব আলাদা। একদমই ওদের পৃথিবীর মতো নয়।
সেই নেপচুন থেকে পলি যেন নেমে এসেছিল মাহিরের পাশে! হাসলেও যেন ঝকঝকে দাঁতে বিজ্ঞাপনের তিরিশ সেকেন্ড ঝলসে উঠছে! পাশে দাঁড়ালে কী দারুণ সেন্টের… মানে ইয়ে, পারফিউমের গন্ধ! হাত নেড়ে কথা বলার সময় আঙুলগুলো দেখছিল মাহির। নখটাও কি স্কেল দিয়ে মেপে কেটেছে! নেলপলিশ না পরেও কী করে এমন হালকা গোলাপি হয় নখগুলো? সাজেনি একটুও, কিন্তু তাও কেমন যেন ইন্টিরিয়ার ডিজ়াইনার দিয়ে সাজানো একটা মেয়ে! মাহিরের মাথা সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ও শুধু স্প্রিং-এর ঘাড়ওয়ালা পুতুলের মতো মাথা নাড়ছিল! বুঝতে পারছিল, ওর বারোটা বেজে গিয়েছে! ওই মেঘের ওপারের লোকটা কাঙালকে শুধু শাকের খেতের সামনে দাঁড় করায়নি, গড়িয়াহাট বাজারের রমরমে সবজির দোকানগুলোর সামনে মাটির সঙ্গে পুঁতে দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে!
সব ঘুরে দেখার পরে গেটের কাছে এসে ওরা দাঁড়িয়েছিল। পলি বলেছিল, “ওই সামনে যে-মাঠটা দেখলেন, ওটা আমাদের ছিল। একটা ক্লাব ইদানীং দখল করে নিয়েছে। ওটা যদি খালি করিয়ে দিতেন একটু, তা হলে বাড়ি আর মাঠটা নিয়ে পাঁচিল তুলে দিতাম আমরা। বয়স্ক মানুষগুলোর একটু হাঁটার জায়গা হত। আর-একটা উইংও খুলতে পারতাম। বেশির ভাগ মানুষ তো এই বয়স্কদের ফুরিয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে যাওয়া ব্যাটারি মনে করে! জীবনে মানুষ তো গুডনেসের পেনশন পায় না!”
মাহির যত না কথা শুনছিল, তার চেয়ে বেশি দেখছিল পলিকে। এমন একটা মেয়ে এসব করে! শুনেছে মাস্টার ডিগ্রিও করছে! এত কিছু সামলায় কী করে? ওর তো একটুতেই সব কিছু জড়িয়ে, গিঁট পাকিয়ে যায়!
পলি কথা বলতে-বলতে নিজের অজান্তেই আলতো করে ছুঁয়েছিল মাহিরের হাতটা। বলেছিল, “আমরা নিজেরা টাকাপয়সা নিই না। তাই যদি রিতুদাকে একটু বলেন ব্যাপারটা। প্লিজ়!”
মাহিরের মনে হয়েছিল, ওর হাতে থাকলে সারা ভারতবর্ষের বাজেট এই হোমের পেছনে দিয়ে দেয়! কিন্তু ওর হাতে তো কুড়ি টাকার মিষ্টি কিনে দেওয়ারও ক্ষমতা নেই!
মাহির বলেছিল, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব, কথা দিলাম।”
কথা দিল? শেষের দুটো শব্দ বলেই মনে হয়েছিল, এই রে! বেশি বলে ফেললাম কী? মেয়েটা কি ওর হ্যাংলামো বুঝে ফেলল? শুনেছে মেয়েরা নাকি খুব বুঝতে পারে এসব জিনিস। মাহির মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। নিজের সস্তার জামা, রং নিভে আসা প্যান্ট, চল্টা ওঠা স্নিকার্স দেখে মনে হচ্ছিল, ওর নিজেরই তো ত্রাণ আর সাহায্য দরকার। এখানে ও কিনা এসব নিয়ে আর্জি শুনছে!
“আপনি চেষ্টা করলেই হবে, আমি জানি আপনি চেষ্টা করবেন, আমি ভরসা করছি আপনার ওপর… বিশ্বাস করছি,” পলি কথাটা বলে আকাশজোড়া বড়-বড় চোখ তুলে তাকিয়েছিল মাহিরের দিকে। আর মাহির বুঝেছিল এমন আকাশ আছে বলেই মানুষের মাঝে মাঝে পাখি হতে ইচ্ছে করে!
রিতুদা ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছিল পঁচিশ সেকেন্ডে। বলেছিল, “আরে, মেয়েটা মাথা খেয়ে নেয় একদম! তাই তোকে পাঠিয়েছিলাম। ও পরে দেখব। এখন সোনাঝুরির দিকে মন দে। শালা ওখানে টাকার বৃষ্টি শুরু হল বলে! শোন, আমাদের দেশে আসল রেন ওয়াটার হারভেস্টিং হোক আর নাই হোক, টাকার বৃষ্টি হলে সেই হারভেস্টিং-এর জন্য লোক সবসময় রেডি থাকে!”
“আমি কিন্তু দেখলাম রিতুদা, ওদের ফান্ডের দরকার। কত বয়স্ক মহিলারা থাকেন! প্লাস ওদের ওখানে একটা ক্লাব জবরদখল করে…” মাহির উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল একটু।
রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর হেসে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে দেখলে অনেকেই পিছলে যায় খোকা। কিন্তু কাজের সময় আলুবাজি নয়! প্রফেশনাল ফিল্ডে আলুবাজি করেছ কি গেছ! এখন আমাদের সোনাঝুরিতে মন দিতে হবে, কেমন?”
মেট্রো থেকে রবীন্দ্র সরোবরে নেমে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মাহির। রবিবার বলেই কি না কে জানে, ট্রেনে কী ভিড়! দমদমে এত ভিড় যে, গেটে কোনও চেকিং হয়নি আজ। ট্রেনটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা কোনওমতে দৌড়ে উঠেছিল কামরায়। এসি রেক পায়নি, তাই সারাক্ষণ বিকট শব্দ আর গরমে সেদ্ধ হতে হতে এসেছে। তুয়াদি লেডিজ় সিটে জায়গা পেয়ে গিয়েছিল বলে আর সারাটা রাস্তা গায়ের ওপর পড়েনি ওর।
ট্রেন থেকে নামার সময় একদম ওর পেছনে এসে লেপটে ছিল গায়ের সঙ্গে। কিন্তু সেটা ভিড়ের ঠেলায় না ইচ্ছে করে, তা জানে না মাহির। আর সত্যি বলতে কী, জানতেও চায় না। বেকার এসব জিনিস নিয়ে মাথা ভরতি করে নিলে আর বাঁচা যাবে না।
টিটি যতীন দাস পার্কেই নেমে গিয়েছে। কী একটা কাজ আছে নাকি ওর! তাই এখন স্টেশন থেকে তুয়াদি আর মাহির বেরোল।
রবীন্দ্র সরোবর স্টেশন থেকে ওর বাড়ি হেঁটে দশ মিনিট। কিন্তু রাস্তায় বেরোতে গিয়ে থমকে গেল মাহির। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এদিকে ও ছাতা আনেনি। ভাগ্যিস টাকাগুলো প্লাস্টিকে মোড়া আছে! আর দু’হাজার টাকার নোট বলে বিশাল কিছু জায়গাও নিচ্ছে না।
পাশে একটা লোক এসে দাঁড়াল এবার। না, ঠিক লোক নয়। একটা ছেলে। সামান্য এলোমেলো চুল। চোখে চশমা। জামাটা অর্ধেক গোঁজা। এক হাত দিয়ে বোতাম টিপে ছাতা খুলে কানে ধরা ফোনে বলল, “আরে, কাল আমি অফিসে গিয়ে বলব। এখন সময় নেই। প্যাঁও ওয়েট করছে। আমি রাখি। কেমন?”
প্যাঁও! মাহিরের হাসি পেল। দেখল, ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ানো একটা বাসে উঠে পড়ল। মাহির ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে। ভাবল, টাকাগুলো যখন প্লাস্টিকে মোড়া আছে, ও হেঁটেই বেরিয়ে যাবে। একবার বাড়ি হয়ে তারপর রিতুদার অফিসে যাবে। টাকাগুলো দিতে হবে যে।
কথাটা তুয়াদিকে বলতে, তুয়াদি ওকে ছাড়ল না। বলল, “একই জায়গায় যাব যখন, অমন নাটক করার কী আছে? দিন কে দিন ঢ্যামনা হয়ে যাচ্ছিস তুই!”
সামনেই সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখান থেকে রিকশা পেয়ে গেল ওরা। নিজের ব্যাগের সঙ্গে তুয়াদির ব্যাগটাও ধরেছে মাহির। সামনে প্লাস্টিক ফেলা। তুয়াদি যেন কোলের ওপর উঠে আসছে ক্রমে!
মাহিরের দম আটকে আসছে! ও রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল। তুয়াদি আজকাল এমন করছে কেন! ছোট থেকে চেনে তুয়াদিকে। এমন তো করে না!
পাশ দিয়ে হুস-হুস শব্দে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে! রবিবার কলকাতার দোকানপাট বেশির ভাগই বন্ধ থাকে। রাস্তায় লোকজনও কম।
তুয়াদি বলল, “তুই অমন করে মুখ ফিরিয়ে আছিস কেন?”
“না, এমনি,” মাহির বিরক্তিটা আর লুকোতে পারল না।
“খুব তেজ হয়েছে, না? রাগ দেখাচ্ছিস কেন?” বলেই মাহিরের থাইয়ের ওপরের দিকটায় একটা চিমটি কাটল জোরে।
মাহির দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করল। চোয়াল শক্ত করে বলল, “কী করছ তুমি?”
তুয়াদি দাঁত ঘষে বলল, “বুঝতে পারছিস না?”
মাহির হতভম্ব হয়ে গেল একদম। কী বলবে বুঝতে পারল না।
তুয়াদি বলল, “আমি মানুষ নই! আমার ইচ্ছে করে না! অনেকদিন ভাল হয়ে থেকেছি, আর নয়। তোর ভাইকে কেন দেখি আমি? বুঝিস না? আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই আর!”
“তুমি তো ভাইকে ভালবাসো নিজের সন্তানের মতো,” মাহির কোনওমতে বলল কথাগুলো!
“শুধু কি সেটাই কারণ ভেবেছিস! আমার বুঝি ইচ্ছে নেই! বিয়ে হয়নি বলে তো আর শরীর মরে যায়নি!” তুয়াদি যেন ফুঁসছে! মাহিরের পা খামচে ধরেছে! তুয়াদি বলল, “আমায় যদি না দিস, আর তোর ভাইকে দেখব না।”
“রিকশাওয়ালা শুনছে! প্লিজ়!” মাহির কাতর গলায় বলল।
তুয়াদি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত করল। বলল, “দাদাদের কাছে আমি বেগার খাটব! তোর ভাইকে দেখব! সারাক্ষণ সেলাইয়ের কাজ করব! কেন রে? আমার আহ্লাদ নেই? আমার প্রেম-টেম দরকার নেই, কিন্তু ওইটা আমি চাই! তুই ওটা দিবি। ব্যস! আর কিছু শুনব না আমি।”
রিকশা এসে গিয়েছে ওদের বাড়ির সামনে। তুয়াদি নিজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দুড়দাড় করে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে!
মাহির কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছে। এই তো সব ঠিক ছিল। সেখানে তুয়াদির কী হল হঠাৎ! এমন করে এসব কী বলল! তুয়াদি ওর চেয়ে অনেক বড়। সে এমন কথা ওকে বলল কী করে?
মাথা কাজ করছে না মাহিরের। ও কোনওমতে বাড়ির দিকে এগোল।
বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট ঢাকা দেওয়া বারান্দা। তার এক কোণে জুতো খুলল ও। তারপর অন্যমনস্কভাবে ঘরে ঢুকল। সামনের দরজা খোলাই থাকে মা ঘরে থাকলে। তাই ভাবল ঢুকে হয়তো মাকে দেখবে।
কিন্তু ঘরে পা দিয়েই চমকে উঠল মাহির।
“এই যে! কোথায় থাকেন আপনি? ফোন করে করে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল! নট রিচেব্ল, নট রিচেব্ল বলছে! রিচের বাইরে কী করেন সারাক্ষণ! আপনার টিকির দেখা নেই কেন? সেই যে কথা দিলেন, তার কী হল?”
মাহির দেখল ওর মা আর ভাই বসে আছে বিছানায়। আর ওদের পাশে একটা দামি লেডিজ় ব্যাগ রাখা। আর ব্যাগের মালকিন সামনে দাঁড়িয়ে ধমক দিয়ে চলেছে ওকে।
ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাইরে কোনও মহাকাশযান দেখল না তো! তা হলে নেপচুন থেকে মেয়েটা এল কী করে ওর এই লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া, নোনাধরা ঘরে!
মেয়েটা এখনও রাগত স্বরে কিছু বলে যাচ্ছে। মা আর ভাই বসে অবাক হয়ে শুনছে মেয়েটার কথা। কিন্তু মাহির কিচ্ছু শুনছে না। কোনও কথাই ঢুকছে না ওর কানে।
ওর শুধু মনে হচ্ছে, মেয়েটা কি একটা সরল সত্যি বুঝতে পারছে না? নেপচুনের নেটওয়ার্ক থেকে এই নোনাধরা পৃথিবীর নেটওয়ার্ক কি কেউ ধরতে পারে?
.
১৯. রাধিয়া
কাল রাধিয়ার জন্মদিন। বাড়িতে বেশ বড় পার্টির আয়োজন হয়েছে। এসব ভাল লাগে না ওর। কিন্তু ওর কোন ভাল লাগাটার মূল্য আছে যে, এটারও মূল্য থাকবে? মা এসব পছন্দ করে, তাই হবে! কী হয় এসব করে ও জানে না। একটা রেস্তরাঁ ভাড়া করা হয়েছে পার্ক স্ট্রিটে। বেশ কয়েকজন নামী মানুষকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে। ওকেও মা বলেছে ওর বান্ধবীদের নেমন্তন্ন করতে। অবাক হয়ে যায় রাধিয়া। মা কী করে এমন বোকা হয়ে থাকতে পারে? বাবা কী করে চলেছে, সেটা কি মা জানে না?
সেই বিকেলটার পর থেকে রাধিয়ার আজকাল আর কিছু ভাল লাগছে না। কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না। আসলে কাকে বলবে বুঝতে পারছে না। এই বিষয়ে ওকে কে সাহায্য করতে পারে? মাকে বললে বিশাল একটা গোলমাল হবে ও জানে। ঠাকুরমার বয়স হয়েছে। তা ছাড়া ঠাকুরমা খুব গম্ভীর। বিশেষ কথাবার্তা বলে না কারও সঙ্গে। তা হলে বাকি কে রইল? বুদা? পলি? জয়তী? এদের কি বলা যায়? কিন্তু একটা ব্যাপার মনে মনে জানে রাধিয়া। ওর আসলে বন্ধু বলে কেউ নেই সেভাবে। একটা গ্রুপে থাকে বটে, কিন্তু সেখানেও কাউকেই ঠিক নিজের করে ভাবতে পারে না রাধিয়া। কেউ ওকে ঠিক বোঝে না। তবে এই না-বোঝার ব্যাপারটা বোধহয় পৃথিবীর সব মানুষেরই সমস্যা।
আসলে পলি, জয়তী বা বুদা এরা সকলে ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বললেও, একটা জিনিস রাধিয়া বোঝে, ওদের যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা ভাল, এটা নিয়ে অনেকেরই একটা প্রচ্ছন্ন হিংসে বা বিরক্তি আছে!
সোনাঝুরিতে একবার লোকাল ট্রেনে করে গিয়েছিল রাধিয়া। সেটা নিয়েও বান্ধবীদের মধ্যে ওকে নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছিল! যেন এটা একটা খেয়াল ওর! একটা শখ! যেন নতুন কিছু খেলনা! আসলে রাধিয়ারও যে নিজের মতো থাকতে ইচ্ছে করে, এই পৃথিবীটাকে ওর নিজের মতো করে দেখতে ইচ্ছে করে, সেটার যেন কোনও মূল্য নেই! সবটাই ওকে অন্যের ঠিক করে দেওয়া প্যারামিটার অনুযায়ী করতে হবে।
বান্ধবীদের খ্যাপানোতে ও তেমন কিছু মনে করে না। কিন্তু একটা জিনিস বোঝে, ওকে সিরিয়াসলি কেউ নেয় না।
এই যে বাবার ব্যাপারটার পর প্রায় সপ্তাহদুয়েক ও কোলাপস করে গিয়েছিল, সেটা নিয়ে এখন ভাল করে ভাবলে রাধিয়া বুঝতে পারে, আসলে বিশ্বাস ভাঙার সঙ্গে-সঙ্গে ওর মনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করছিল। ঠাকুরমা আর বাবার নামেই ওদের এত সম্পত্তি ও ব্যাবসা। তাই বাবা উলটোপালটা কোনও সম্পর্কে আটকে পড়লে তার প্রভাব পড়বে ওদের জীবনেও। যেটাকে খুব নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ মনে হচ্ছে, আসলে সেটা খুব একটা নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ থাকবে না। এখনও কাউকে কিছু বলেনি, কিন্তু ও ক্রমশ বুঝতে পারছে, জীবনে বারবার যখনই নিরাপত্তার ওপর কোনও অনিশ্চয়তা আসবে, তখনই এমন করে ভেঙে পড়বে ও। তাই নিজের নিরাপত্তার দিকটা নিজেকেই দেখতে হবে। ও জানে শেষমেশ সবটাই হয়তো ওরই হবে! কিন্তু ভবিষ্যৎ কে দেখেছে?
“কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোকে আমরা খুঁজছি!”
পলির ডাকে মুখ তুলে তাকাল রাধিয়া। সারা দুপুর বৃষ্টির পরে এখন আকাশ কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যেন। তার ঢাল বেয়ে সূর্য ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে! মেঘে মেঘে ছিন্নভিন্ন আকাশে এক বাক্স ক্রেয়ন কে যেন ইচ্ছেমতো ঘষে দিয়েছে! কলেজ স্ট্রিটের এই জায়গাটায় দাঁড়ালে এটুকুই আকাশ দেখা যায়। বাকিটা তো, রাধিয়ার মনে হয়, যেন অগোছালো একটা ঘর! মনখারাপ থাকলেই রাস্তার এই জায়গায় এসে দাঁড়ায় ও। পাশেই ফিরোজভাইয়ের বইয়ের দোকান। ফিরোজ চেনে রাধিয়াকে। নিজের টুলটাকে এগিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। কিন্তু রাধিয়া বসতে চায় না। বসে পড়লে আকাশটাকে এই কোণ থেকে দেখা যায় না!
পলি আজ জিন্স আর হাতকাটা কুর্তি পরে এসেছে। ঢেউ খেলানো চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে মাথার ওপর টেনে আটকানো। মুখে একটা হন্তদন্ত ভাব।
“কেন?” নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল রাধিয়া।
“আশ্চর্য!” পলি বিরক্ত হল, “আজকাল এত আতা হয়ে গিয়েছিস! বাংলা অ্যাকাডেমিতে যাবি না? ভুলে গেলি?”
ও তাই তো! রাধিয়ার মনে পড়ে গেল। সুম্পার দাদাদের কীসব অনুষ্ঠান আছে। সেখানে আবার পলিদের ওই ওল্ড এজ হোমের নামটাও জড়িয়ে আছে! সে জন্য সুম্পা আর পলি দু’জনেই ওকে যেতে বলেছে। রাধিয়া প্রথমে ভেবেছিল যাবে না। কিন্তু এখন মন পালটেছে। বাড়ি গিয়েই-বা কী করবে? মা কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে মেতে আছে। আর বাবার আজকেও কী এক কাজ আছে, আমদাবাদ যেতে হবে বলে সকালে বেরিয়ে গিয়েছে। গতকাল রাতে বাবার সঙ্গে মায়ের চাপা ঝগড়া শুনেছিল রাধিয়া। আসলে ওর ঘরটা দোতলার কোণে। ঘর থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা করিডর পেরিয়ে দোতলার টেরাসে যাওয়া যায়। রাতে মাঝে মাঝে সেই টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটে রাধিয়া। ভাল লাগে ওর।
গতকাল রাতের বৃষ্টির পরে মেঘ কেটে চাঁদ বেরিয়েছিল আকাশে। সারাক্ষণ এসি-তে থাকতে-থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল রাধিয়া। এমনিতেই ওই ঘটনাটার পরে আজকাল ঘুম আসতে চায় না ওর। গতকালও তাই হয়েছিল। ও ভেবেছিল টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটবে একটু। বৃষ্টির পরে চাঁদ উঠলে আকাশটা একদম অন্যরকম লাগে।
টেরাসে যাওয়ার বড় কাচের দরজাটা বাবা-মায়ের ঘরের সামনেই। রাধিয়া দরজার হাতলে হাত দিয়ে পাল্লাটা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মায়ের চাপা গলার চিৎকারটা শুনতে পেয়েছিল ও! একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিল রাধিয়া। মা খুব সচেতন থাকে এমন চিৎকার-চেঁচামেচি করার ব্যাপার নিয়ে। কারণ, ওদের বাড়িতে কাজের লোকজন আছে অনেক। মা চায় না ব্যক্তিগত কোনও ব্যাপার সেই সব লোকের আলোচনার বিষয় হোক!
তাই রাধিয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল! মায়ের এমন গলা তো আগে শোনেনি! যদিও রাত একটা বেজে গিয়েছিল। পুরো বাড়ি শুনশান ছিল, কিন্তু তাও মায়ের এমন গলা শুনে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল রাধিয়া। ওর নিমেষের জন্য মনে হয়েছিল, তবে কি মা জেনে গেল সবটা! তা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! ও জানে এমনভাবে আড়ি পাতা খুবই অনুচিত কাজ, কিন্তু জীবন নিজে তো সবসময় উচিত আর অনুচিত ভেবে চলে না! তাই তাকে সামলাতে মাঝে মাঝে মানুষই এমন অনুচিত কাজ করে ফেলে। রাধিয়াও তেমনই ঠিক হচ্ছে না জেনেও দাঁড়িয়ে পড়েছিল দরজার সামনে। খুব লজ্জা করছিল আর খারাপও লাগছিল। কিন্তু কেমন একটা জান্তব প্রবৃত্তি যেন তাড়া করছিল ওকে! ক্রেভিং হচ্ছিল, কী কথা হয় জানার জন্য। ভয়ের মধ্যেও যে একরকমের থ্রিল থাকে সেটা বেশ বুঝতে পারছিল!
মা বলেছিল, “এটা এখন বলছ? এই মাঝরাতে বলছ? পরশু মেয়ের জন্মদিন আর আজ বলছ?”
বাবার গলাটা আস্তে ভেসে আসছিল। রাধিয়া শুনেছিল, বাবা বলছে, “আমি কি জানতাম যে, এমন এমার্জেন্সি হবে! আর তেইশ বছর হচ্ছে মেয়ের। খুকি নয়। তোমার কী দরকার আছে, এমনভাবে পার্টি দেওয়ার? কোনও মানে হয়!”
“আমার একমাত্র মেয়ে না? আর টাকার তো অভাব আছে বলে জানি না আমাদের। তা হলে মেয়েটার জন্য যদি একটু খরচ করি আপত্তি কোথায়?”
“আমি কি টাকার কথা বললাম?” বাবার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট টের পেয়েছিল রাধিয়া।
বাবা বলেছিল, “আমি কি সেটা বলেছি? বলছি এমন শো অফ করার কী আছে?”
“কথা ঘুরিয়ো না,” মায়ের গলা শুনেই রাধিয়া বুঝতে পারছিল, মা খুব কষ্ট করে নিজেকে সংযত রাখছে! মা বলেছিল, “তুমি কেন থাকবে না পার্টিতে? কী এমন রাজকার্য পড়ে গেল?”
“রাজকার্য?” বাবা হেসেছিল। ব্যঙ্গের হাসি। বলেছিল, “তোমায় বললেই বুঝবে? বাজে প্রশ্ন করছ কেন? কী মনে হয়, এত বড় বিজ়নেস এমনি চলছে? মা-তো তিনতলায় নিজের ঘরে বসে থাকে। বোর্ডের ডাইরেক্টরদের কে ফেস করে? এত সব কাজ কে সামলাবে? বাড়িতে বসে মেয়ের সঙ্গে কেক কাটলে কি আমার চলবে?”
মা বলেছিল, “আজকাল খুব ট্যুর বেড়ে গেছে তোমার! কী এমন কাজ যে, একদিন দেরি করে গেলে হবে না?”
“জার্মানি থেকে ডেলিগেটসরা আসবে। তাদের তুমি বোলো যে, মেয়ের জন্মদিন, আপনারা পরে আসবেন! কথা বলো এমন!”
“তাও এটা তুমি ঠিক করোনি!” মা কোথাও হেরে যাচ্ছিল যেন। যেন বুঝতে পারছিল বাবা যা বলছে, তা সত্যি হয়েও কোথায় যেন সত্যি নয়! কিছু যে একটা গোলমাল আছে, মায়ের মন যেন বুঝতে পারছিল! রাধিয়ার খালি মনে হচ্ছিল দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলে দেয়, ও কী দেখেছে! বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ওদের মিথ্যে কথা বলে কার কাছে যায়? জিজ্ঞেস করে, কার জন্য কাজকর্ম আর মেয়ের জন্মদিন সব উপেক্ষা করে থাকে! কতদিন ধরে চলছে এসব? কত দিন ধরে সবাইকে এমন করে বোকা বানাচ্ছে বাবা?
কিন্তু রাধিয়া পারে না। কিছুতেই কঠিন কথা কাউকে বলতে পারে না। ঠাকুরমা ওকে বলে, “মনের কথাটা বলতে হয় রাধি। তোর ইচ্ছেটা স্পষ্ট করে বলবি। যা মনে হয় কাউকে অপমান না করে সহজভাবে বলবি। জানবি কেউ তোর মনের মধ্যে ঢুকে কিছু জেনে নেবে না!”
টেরাসে আর যেতে পারেনি রাধিয়া। ঘরেই ফিরে এসেছিল। কেমন একটা খালি-খালি লাগছিল শরীরটা। মনে হচ্ছিল, কয়েক লক্ষ ঝিঁঝিপোকা এসে ঢুকে পড়েছিল ওর শরীরে! বাবা আবার যাবে? কার কাছে যায় বাবা? কী করে সেখানে? ওর মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। খালি মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব ভেঙে গেল! সব নষ্ট হয়ে গেল! আর খুব বেশি করে যেন মনে হচ্ছিল, ওর নিজের কোনও দাঁড়ানোর জায়গা নেই। এত সম্পত্তি, এত ব্যাবসা, এত কিছু আসলে যেন তাসের ঘর! বুঝতে পারছিল মানুষের নিজের অর্জন করা জিনিস ছাড়া তাকে আর কেউ সঙ্গ দেয় না, সাহস দেয় না, ভরসা দেয় না।
“তুই যাবি, না যাবি না? তখন থেকে খুব পাঁয়তারা করছিস!” পলি বিরক্ত হল।
রাধিয়া হাসল জোর করে। আসলে একটুও হাসি পাচ্ছে না। খালি মনে হচ্ছে বাবা কী করছে? কোথায় গিয়েছে? কার সঙ্গে আছে এখন?
“হাসলে হবে?” পলি বিরক্ত হল, “আরে চল। এখানে দাঁড়িয়ে কীসের শোভা দেখছিস? ওই দেখ মেঘ করছে আবার। চল।”
সূর্য সেন স্ট্রিটের পাশে গাড়িটা রাখা আছে। এদিকটা এখন ওয়ান ওয়ে। সব গাড়ি উত্তর দিকে চলেছে। মধুদাকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে আসতে বললে দেরি হয়ে যাবে। তার চেয়ে হেঁটে চলে যাওয়া অনেক সুবিধেজনক।
“চল,” বাকিদের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় নামল রাধিয়া।
গাড়ি আসছে হু হু করে। রাস্তা পার হওয়াই সমস্যা। একটা হাওয়া দিচ্ছে আজ। বেশ সুন্দর হাওয়া। গাছ থেকে পাতা আর হলুদ-হলুদ ফুল উড়ে আসছে! আশপাশের দোকানদাররা চিৎকার করছে। লোকজন কেউ ব্যস্ত হয়ে হাঁটছে, আবার কেউ দাঁড়িয়ে অলসভাবে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। কেউ হাসছে, আবার কেউ মনমরা! অদ্ভুত এক শেড কার্ড এই শহর!
সূর্য সেন স্ট্রিটে রোদ নেই। বাঁ দিকে সার-সার দোকান। ডান দিকেও তাই। ওই বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে বেশ জটলা। ওখানে মাঝে মাঝে ওরা কচুরি খেতে আসে। কী ভিড়, কী ভিড়! বুদা তো বলে, “শালা, এভাবে টেনশন নিয়ে লেখাপড়া করে কী হয়! ইংরেজি নিয়ে ঘষে যাচ্ছি! তার চেয়ে এমন একটা কচুরির দোকান করলে তো কাজ হয়!”
আজও দোকানটায় বেশ ভিড়। বসার জায়গা নেই। একটু পাশে আর-একটা দোকান। পরোটা, কাবাব আর রোলের। এসব জিনিস খুব একটা খায় না রাধিয়া। এই নিয়েও ওকে বান্ধবীরা খ্যাপায়।
রাধিয়া পেছন দিকে তাকাল। পলি, বুদা আর জয়তী আসছে পেছনে। সবাই ওর গাড়ি করেই যাবে।
কবিতা পাঠ, গান, গল্প পাঠ এসব হবে। রাধিয়ার যেতে ইচ্ছে করছে না একদম! কিন্তু সবসময় তো আর নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা যায় না! সকলের মধ্যে থাকতে হলে সকলের মতো করেও থাকতে হয়!
“এই রাধি,” পেছন থেকে বুদা এসে কাঁধটা জড়িয়ে ধরল, “কী হয়েছে?”
“কী হবে?” বুদার হাতটা সরিয়ে দিল রাধিয়া।
“আজকাল কেমন যেন হয়ে থাকিস! কেসটা কী তোর?”
“কিছু না তো!” রাধিয়া হাসার চেষ্টা করল!
বুদা বলল, “আরে, কিছু তো হয়েইছে। তোকে কি আজ থেকে দেখছি নাকি? কী হয়েছে? প্রেমে পড়েছিস?”
“কী?” রাধিয়া বিরক্ত হল, “হঠাৎ এমন মনে হওয়ার মানে?”
“আরে, প্রেমে পড়লেই মানুষ এমন করে। দেখিস না? কেমন একটা ক্যালানে টাইপ হয়ে যায়! শালা, প্রেম হল ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো! বহুত ভোগায়!”
রাধিয়া বলল, “না, প্রেমে পড়িনি। কেউ চুপচাপ হয়ে গেলেই কি তাকে প্রেমে পড়তে হবে? তার কি আর কিছু চিন্তা থাকতে পারে না? জানবি সবার জীবনে তার-তার মতো করে ক্রাইসিস থাকে। সে সব নিয়ে কথা না বলাই ভাল।”
“রাগছিস কেন?” বুদা হেসে সামান্য ধাক্কা মারল রাধিয়াকে। বলল, “কাল তো বার্থ ডে। কী নিবি বল?”
“কী আবার নেব?” রাধিয়া ভুরু কুঁচকে তাকাল, “জানিস না আমরা কোনও গিফট অ্যাকসেপ্ট করি না! জাস্ট চলে আসবি সন্ধে ছ’টার মধ্যে!”
“দূর, সে তো এমনি লোকেদের জন্য,” বুদা নাছোড় গলায় বলল, “আমরা সেসব শুনব কেন? আমরা তো কিছু দেবই!”
“মার খাবি,” রাধিয়া হাসল, “কিছু আনবি না।”
বুদা এদিক-ওদিক দেখে চট করে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “ওই সব নিবি?”
“মানে? কীসব?”
“আরে, অ্যাডাল্ট টয়! নিবি?” বুদা তাকাল।
“কী?” অবাক হয়ে গেল রাধিয়া।
“ভাইব্রেটর, ডিলডো। বুঝিস না! আজকাল এখানেও পাওয়া যায়। আমার একটা আছে। তোর শিয়োর নেই। নিবি?”
“কীসব বাজে কথা বলছিস?” নিমেষে কান লাল হয়ে গেল রাধিয়ার।
“লজ্জা পাচ্ছিস কেন?” বুদা ঠোঁট কামড়ে তাকাল ওর দিকে, “উই অলসো হ্যাভ নিডস। ডোন্ট ইউ? আর এসব বানানো হয় কেন? মেয়েদের সেক্সুয়ালিটি বহু-বহু শতক ডিপ্রেসড ছিল। আর কতদিন? আর এটা তো ন্যাচারাল ব্যাপার। এটাকে নিয়ে এমন একটা ট্যাবু বানানোর কী আছে কে জানে! আমাদের দেশে শালা জাত-পাত-ধর্ম নিয়ে সারাক্ষণ মারামারি চলছে আর যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গ এখনও গেল না। ডিজিটাল ইন্ডিয়া স্লোগানেই হয়েছে। আসলে মধ্যযুগ কাটেনি।”
“বাপ রে!” রাধিয়া বলল, “এমন বড় বক্তৃতা শিখলি কোথা থেকে? পলিটিক্স তো করিস না!”
বুদা বলল, “শিখতে হয় না। যা চলছে চারদিকে, সেই দেখে আপনা থেকেই বুকের ভেতর সব গজিয়ে ওঠে!”
রাধিয়া বাঁ দিকে ঘুরল এবার। সামনেই বিখ্যাত শরবতের দোকান। সামনেই ওদের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছে। মধুদা গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। রাধিয়াকে দেখেই মধুদা মোবাইলটা বুকপকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘুরে ড্রাইভার ওঠার দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বুদা গিয়ে উঠল সামনে। পেছনে জয়তী, পলি আর রাধিয়া বসল। মধুদা জানত ওরা কোথায় যাবে। সকালে ইউনিভার্সিটি আসার সময়ই বলে রেখেছিল রাধিয়া।
রাস্তায় সাংঘাতিক জ্যাম। এই গলিটা সরু। তার মধ্যে রাজ্যের গাড়ি এসে পার্ক করে। বাঁ দিকে ফুটপাথ বলে কিছু নেই আর। সব দোকানে ভরতি। অবশ্য কলকাতায় ফুটপাথ জিনিসটা আর আছেই-বা কোথায়! কেনার চেয়ে বিক্রি করার লোক এখন বেশি!
মিনিট দশেকের চেষ্টায় গাড়িটা বড়রাস্তায় বের করতে পারল মধুদা। এবার বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের দিকে এগোচ্ছে গাড়ি। রাস্তার ভিড় থাকলেও খুব একটা আটকাচ্ছে না।
রাধিয়া দেখল মেঘ ঘনাচ্ছে আবার। আকাশ কালো হতে শুরু করেছে। হতেই পারে। বর্ষাকাল। আগস্টের শুরু সবে। তা ছাড়া এবার নাকি বৃষ্টি কম হয়েছে। আবহাওয়ার যা অবস্থা, তাতে আর কী-ই বা হতে পারে! রাধিয়ার মনে হয় মানুষ নিজেই নিজের ঘরে আগুন লাগাচ্ছে আর নিজেই বলছে কী গরম!
“তা তুই কি রেজ়াল্ট বেরোনোর পরেই বেরিয়ে যাবি?” জয়তী অন্যপাশ থেকে ঝুঁকে তাকাল রাধিয়ার দিকে।
“মানে?” পলি অবাক হল।
রাধিয়া দেখল বুদাও সামনের সিট থেকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে।
রাধিয়া সময় নিল। কিছুদিন আগে ক্যান্টিনে বসে এই কথাটা জয়তীকে বলেছিল রাধিয়া। বলেছিল, কথাটা যেন গোপন রাখে। এখনই কাউকে বলার দরকার নেই। আসলে, পলি আর বুদা সব কিছু নিয়েই বড্ড হইচই করে!
“কী রে? কেসটা কী?” পলি খোঁচা দিল।
রাধিয়া হাসল, “তেমন কিছু না। ওই জাস্ট একটা ব্যাপার। বাবা বলেছিল। তাই…”
“আশ্চর্য! এত ধানাইপানাই করছিস কেন? বিয়ে করবি নাকি?” বুদা সামনের সিটে বসে ছটফট করল, “বেরিয়ে যাবি মানে? স্যাটেলাইট তো নোস যে, ইসরো তোকে লঞ্চ করে পৃথিবী থেকে বের করে দেবে! যাবিটা কোথায়?”
“ওই বাবা বলছিল আমেরিকায় পাঠাবে। ম্যানেজমেন্ট পড়তে! তাই…”
“ও বাবা!” পলি বলল, “এটা বলিসনি কেন?”
“আমি যাব কি না, তার ঠিক নেই। তাই…” রাধিয়া কথা শেষ না করে চুপ করে গেল।
বুদা বলল, “যাবি না কেন? তোদের যা পয়সা তাতে তো সারা জীবন তোকে ওখানে রেখেই পড়ানো উচিত ছিল!”
রাধিয়া চুপ করে গেল। এইসব নিয়ে কী আর কথা বলবে! এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সেই এইচএস-এর পর থেকে বাড়িতে এই নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরমার সমর্থন পেয়েছে বলে এখনও ও এই শহরে রয়ে গিয়েছে। মা এই নিয়ে মাঝে মাঝেই ওকে খোঁটা দেয়। বলে, “ঠাকুমার রক্ত গায়ে আছে তো, তাই এমন হয়েছিস! মিডলক্লাসনেস একটা ডিজ়িজ়! এখানে ইংলিশ নিয়ে না পড়ে বাইরে গিয়ে পড়তিস! তা নয়, এখানে টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে।”
বাবাও সেদিন খেতে বসে আচমকা এই প্রসঙ্গটা তুলেছিল। এমনিতেই আজকাল বাবার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না রাধিয়ার। আসলে বড় হওয়ার পর বাবাকে খুব একটা কোনওদিনই পায়নি রাধিয়া। ছোটবেলার সেই “আমার পরি!” বলে ওকে জড়িয়ে ধরা মানুষটা যেন আর নেই! তাই সেভাবে খুব একটা সহজ নয় ও বাবার কাছে। আর এখন তো বাবাকে দেখলে ওর রীতিমতো বিকর্ষণ হয়। কেবলই মনে হয় বাবা ওদের ঠকাচ্ছে।
বাবা বলেছিল, “রাধি, তোকে স্টেটসে পাঠিয়ে দেব মাস্টার্স কমপ্লিট হলে। আমি কথা বলে রেখেছি। সামনের অক্টোবরে যাব যখন, সব দেখে-শুনে আসব। আর এখানে নয়। আমাদের বিজ়নেসে তোকে তো জয়েন করতে হবে। সো ইউ নিড টু লার্ন ফ্রম দ্য বেস্ট। আমাদের ইচ্ছে আছে দুবাইতেও কিছু এক্সপ্যানশনের। ফলে উই নিড অ্যান এব্ল ম্যানেজমেন্ট! সো গিয়ার আপ। প্রিপেয়ার ফর কামিং ব্যাটল্স।”
রাধিয়া কিছু বলেনি। ও জানে বাবার মুখের ওপর হ্যাঁ বা না বলে কোনও লাভ নেই। ঠাকুরমা থাকলে তাও কিছুটা বাফার পাওয়া যেত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ঠাকুরমা কেমন যেন আরও চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছে না রাধিয়া। রহস্যকাহিনি পড়তে ভাল, কিন্তু জীবনে রহস্য এসে ঢুকলে খুব সমস্যা হয়। বিশ্বাসটা নড়ে গেলে মানুষের সব বিষয়েই সন্দেহ হয়। এখন যেমন ওর মনে হচ্ছে। ওর কোথাও মনে হচ্ছে, বাবা ওকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে চাইছে! ও আছে বলে বোধহয় বাবার কিছু ব্যাপারে অসুবিধে হচ্ছে!
রাধিয়া সোজা হয়ে বসল। বাবার ব্যাপারটা মাথার ভেতর ঘুণপোকার মতো কাটছে ওকে। কাউকে না বলতে পারলে মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাবে! কিন্তু বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না। কাকে বলা যায়। ও বান্ধবীদের দেখল আর-একবার। নাঃ, এদের বলা যাবে না!
জয়তী বলল, “তোর কত সুবিধে রাধি। আমাদের মতো নয়। আমার মা তো এখনই বিয়ে দেবে বলে পাগল করে দিচ্ছে! রৌদ্রকে কতবার বলছি তাড়াতাড়ি কিছু করো! কিন্তু ও পাত্তাই দিচ্ছে না! আমিও যদি কিছু পড়তে চলে যেতে পারতাম!”
“তা বারণ করছে কে?” বুদা বিরক্ত গলায় বলল, “এমন করছিস! যা না কম্পিটিটিভ একজ়ামে বোস। চান্স নে। আমাদের তো বাপের জোর নেই! নিজের জোরেই যা করার করতে হবে!”
কথাটা আচমকা থাপ্পড়ের মতো এসে লাগল রাধিয়ার গালে! ও চমকে উঠে তাকাল বুদার দিকে! এটা কী বলল বুদা? ইচ্ছে করে বলল? মানে এসব কথা তা হলে ওর মনের মধ্যে ঘোরে! পড়াশোনায় রাধিয়া ওদের সবার চেয়ে ভাল! ইউনিভার্সিটিতে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকে। সেখানে বুদা এটা বলতে পারল! রাধিয়া পালটা কিছু বলতে পারে না বলেই কি সবাই ওকে এমন করে বলে?
আচমকা রাধিয়ার চোখে জল এসে গেল! ও ঠোঁট কামড়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। ভিক্টোরিয়ার ইস্ট গেটের সামনে দিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে গাড়ি। পরির মাথায় যেন মেঘ নেমে এসেছে! বাইরে গাছপালা দেখে বোঝা যাচ্ছে হাওয়া দিচ্ছে খুব। রাধিয়ার মনে হল, এত হাওয়া, পরিটা যদি ডানা মেলে উড়ে যায়!
জয়তী বলল, “বুদা, এটা ঠিক বলছিস না।”
“কেন?” বুদা হাসল, “সত্যি কথা বললাম তো! তোদেরও মনে হয় এটা, কিন্তু ভালমানুষির প্রিটেনশন নিয়ে থাকিস। আমি সোজা মেয়ে, যা ভাবি বলে দিই!”
“ও পরীক্ষা দিলেও চান্স পেয়ে যেত,” পলি কথাটা বলে আলতো করে রাধিয়ার হাতে চাপ দিল!
“কিন্তু সেটা কি দেবে? নিজে কি ওকে কিছু করতে হবে? আমার বাবা ব্যাঙ্কে আছে! পলি তোর বাবার শাড়ির ব্যাবসা। জয়তীর বাবা অলরেডি রিটায়ার্ড! আমাদের সবাইকে নিজের দমে কিছু করতে হবে! আমাদের মুখে তো সোনার চামচ নেই!”
রাধিয়া ভাবল কিছু বলে। বুদা সব ঠিক বলছে না। পলিদের অবস্থাও খুব ভাল। হ্যাঁ, ওদের মতো নয়, কিন্তু শাড়ির ব্যাবসাটা বেশ বড়! জয়তীরাও উচ্চ-মধ্যবিত্ত। কিন্তু তারপর মত বদলাল। এই পৃথিবীতে যারা এমন ঋণাত্মক কথা ভাবে আর বলে তাদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই! একটা বয়সের পর কারও মত ঝগড়া করে পালটানো যায় না। নিজে তো রাধিয়া জানে ও কেমন! ও কী চায়! সেটাই আসল। বাকি পৃথিবী যা বলে বলুক! ও আর-একবার পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে পরিটাকে দেখল। উড়ে যাবে কি?
অ্যাকাডেমির সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে গেল মধুদা। পার্কিং-এর জায়গা খুঁজতে হবে।
জায়গাটায় ভিড় হয়ে আছে। নানা খাবারের দোকান ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। ওরা হাঁটতে-হাঁটতে সামনের দিকে এগোল। রাধিয়া দেখল বুদা আর পলি এখনও তর্ক করে যাচ্ছে।
জয়তী ওর পাশে এসে চাপা গলায় বলল, “সরি রাধি, স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে! ইচ্ছে করে বলিনি! বুঝতে পারিনি এটা বুদা ইসু করে তুলবে! বুদার মনে এই ছিল আমি জানতাম না! আজকাল সারাক্ষণ ওর মুড শিফট করে!”
নন্দন চত্বরে ঢুকে ওরা এগিয়ে গেল বাংলা অ্যাকাডেমির গেটের দিকে। এখানেও বেশ ভিড়। বুদারা বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, দু’জনেই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে! আশ্চর্য লাগল রাধিয়ার! দু’জনে এই বিষয়টা নিয়ে এভাবে ঝগড়া করছে কেন?
রাধিয়াও এবার এগিয়ে গেল। অ্যাকাডেমির গেটের সামনে বড় করে ফ্লেক্স লাগানো আছে। এই অনুষ্ঠানেই এসেছে ওরা। কিন্তু সেদিকে দু’জনের কারওই হুঁশ নেই! গেটের সামনে দাঁড়িয়েই পলি আর বুদা উত্তেজিত হয়ে কথা বলে চলেছে!
রাধিয়া গিয়ে এবার দাঁড়াল দু’জনের মাঝখানে। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে! লোকজন বিনে পয়সায় সার্কাস দেখতে পারলে আর কিছু চায় না!
“তোরা থামবি?” রাধিয়া পলির দিকে তাকাল প্রথমে, “বুদা আমায় বলেছে! ওর নিশ্চয় কিছু খারাপ লেগেছে তাই এমন বলেছে! তুই চুপ কর।”
পলি কিছু বলতে গেল, কিন্তু রাধিয়া ওর কথা পাত্তা না দিয়ে এবার বুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো! কেমন? তোরা চুপ কর।”
বুদা উত্তেজিত মুখ নিয়ে একবার পলির দিকে তাকাল আর-একবার রাধিয়াকে দেখল। তারপর আচমকা কিছু না বলে দুমদাম করে চলে গেল বড় রাস্তার দিকে।
“আরে!” রাধিয়া আটকাতে গেল। কিন্তু এবার জয়তী হাত টেনে ধরল ওর। বলল, “ছাড়! জানিস তো বুদাটা খেপি। মাথা ঠান্ডা হলে নিজেই আসবে!”
রাধিয়ার মনমেজাজ এমনিতেই ভাল নেই। বুদার এভাবে চলে যাওয়াতে ওর মন আরও খারাপ হয়ে গেল। মানুষ কেন এমন করে কে জানে! ও তাকিয়ে দেখল বুদা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল!
“আরে, বুদা চলে গেল দেখলাম!” সুম্পা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল এবার, “পলি তোর হোমের টাকা তোলারও ব্যাপার আছে কিন্তু। সেখানে এখন আসছিস তুই?”
জয়তী বলল, “ও বুদার রাগ হয়েছে! ছাড়!”
সুম্পা পলির হাত ধরে বলল, “আয় তোরা। লোকজন অল্প-অল্প করে আসছে! আর রাধিয়া তোর সঙ্গে একজন একটু কথা বলতে চায়!”
ওরা অ্যাকাডেমির সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল সবাই।
রাধিয়া অবাক হয়ে বলল, “আমার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ, ও…” সুম্পা হাত দিয়ে সামনে দেখাল!
রাধিয়া চোখ তুলে তাকাল! আর সঙ্গে-সঙ্গে চমকে স্থির হয়ে গেল একদম! নিশান! তাই তো! ও তো সুম্পার দাদার বন্ধু!
“তুই কথা বলে ওপরে আয়!” সুম্পা বাকিদের টানতে-টানতে সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল!
নিশান সামান্য হাসিমুখে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। রাধিয়ার কেমন যেন অস্বস্তি হল! কিন্তু আবার কেমন একটা ভালও লাগল! হাওয়ায় নিশানের চুলগুলো উড়ছে। মেরুন পাঞ্জাবিটাও হেমন্তের জং-ধরা প্রজাপতির মতো উড়ছে!
নিজের শাড়ির আঁচলটা সামলে রাখল রাধিয়া। কেন এমন নার্ভাস লাগছে ওর! কান কেন গরম হয়ে যাচ্ছে! নিশানের খয়েরি চোখের মণির দিকে তাকাতে পারছে না কেন? এত হাওয়াতেও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াটা কি স্বাভাবিক!
নিশান হাসল সামান্য। সময় নিল একটু। তারপর নরম গলায় বলল, “আমার একটু দরকার ছিল আপনার সঙ্গে! জরুরি দরকার!”
রাধিয়া কিছু বলার আগেই হাওয়ার বেগ বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতার সঙ্গে ফুলের পাপড়ি উড়ে এল দিগ্বিদিক থেকে! মানুষজন সামান্য থমকে গেল যেন! তাদের কথা যেন থেমে গেল সামান্য সময়ের জন্য। কলকাতা যেন জামার ওপরের বোতামটা খুলে একটু হেলিয়ে বসল! আর কোথা থেকে একটা ঝড়ের কুটো উড়ে এসে আটকে গেল রাধিয়ার গালে! রাধিয়া বিহ্বল হয়ে দেখল নিশান সামান্য ঝুঁকে ওর গালের ওপর থেকে সরিয়ে দিল ঝড়ের কুটোটা! ওই সামান্য স্পর্শ! ওই সামান্যতম কাছে আসা! সামান্য ঝড়ের অছিলায় ওইটুকু নিভৃত মুহূর্ত আচমকা কী যে ওলটপালট করে দিল বুকের ভেতর, বুঝতে পারল না রাধিয়া! ও থমকে গেল এক মুহূর্ত! তারপর মাথা নিচু করে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে!
“আরে, কী হল?” নিশান এগিয়ে এল আরও কাছে! হাওয়ার জোর বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতা পাক খেয়ে উঠল রাধিয়ার মনের শূন্যতায়! ফুলের পাপড়ি আর ধুলোর ইশারা এসে জড়িয়ে গেল ঘাড়ে, গলায়! শেষ আলোর আবির এসে গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ওর গালে! রাধিয়া বুঝতে পারল না কিছু। শুধু হু হু করে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে লাগল ওর! যেন আবছা শুনতে পেল একটা উদ্বিগ্ন গলা বলছে, “কী হল? রাধিয়া, কী হল আপনার?”
রাধিয়া মাথা নামিয়ে মুখ ঢাকল হাতে। পাতায় জমে উঠতে লাগল ফোঁটা ফোঁটা হীরকখণ্ড। ও কথা বলতে পারল না কোনও। ওর মনে হল, কথা তো পরিমিত! তার সাধ্য সামান্য! সে কী করে বলবে কেন আচমকা পাহাড় ফাটিয়ে ঝরনা বেরিয়ে আসে! কী করে বলবে, কোন মুহূর্তে গুটি কেটে উড়ে যায় প্রজাপতি! কেন অমন সূর্য লেগে বরফ থেকে ছিটকে ওঠে আলোর ক্রেয়ন!
রাধিয়া মাথা নামিয়ে, চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। আর দেখল এতদিন পরে পাগল হাওয়ার টানে, নিচু হয়ে আসা মেঘ কেটে কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে বহু-বহু বছর স্তব্ধ হয়ে থাকা ব্রোঞ্জের পরি!
Chapter - 20 - 24
২০. আইকা
সিগনাল থেকে বাঁ দিকে ঘুরতেই হু হু করে হাওয়া ঢুকে এল ট্যাক্সির জানলা দিয়ে। আইকার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল নিমেষে। আরামে চোখও বুজে এল! যা ভ্যাপসা গরম পড়েছে! ভাদ্র মাসের এই এক সমস্যা! বৃষ্টি বন্ধ হলেই চারদিক থেকে যেন কেউ গরম বাষ্প ছাড়তে শুরু করে! ঘাম হলে খুব কষ্ট হয় আইকার। ঘাম জিনিসটা কিছুতেই নিতে পারে না! আর আজকাল এসি-তে থাকতে-থাকতে অভ্যেসটাই খারাপ হয়ে গেছে! কিছুতেই সামান্য গরমও সহ্য হয় না! এই যে হলুদ ট্যাক্সিতে বসে আছে, এতেও খুব কষ্ট হচ্ছে ওর!
আজ নিজে ড্রাইভ করতে ইচ্ছে করছিল না। ভেবেছিল ভাড়া করে নেবে গাড়ি। তাই বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ও দেখছিল কোনও অ্যাপ ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে কি না। কিন্তু কোনও গাড়ি নেই। আজকাল ছুটি হলেই দেখেছে গোটা শহরটা কেমন যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে রাস্তায় আর শপিং মলে। আজকাল শপিং করাটাও একটা এন্টারটেনমেন্ট! সারাক্ষণ কিছুতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায় যেন মানুষ! এসব কি একাকিত্বের লক্ষণ? কিন্তু আজকাল তো চারিদিকে এত রকমের যোগাযোগের উপায়! আইকার মনে হয়, এই বাড়াবাড়িটাই বিপদের কারণ। দরকারের চেয়ে বেশি জিনিস কোনওদিনও ভাল নয়। বেশি যোগাযোগের ভিড়ে সত্যিকারের সম্পর্ক হারিয়ে যাচ্ছে। কথা হারিয়ে যাচ্ছে। নানারকমের হলুদ গোল্লাওয়ালা মুখ জানিয়ে দেবার চেষ্টা করছে হাসি, কষ্ট আর মনখারাপ! বুড়ো আঙুলের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে! আইকার মাঝে মাঝে মনে হয় এমন চলতে থাকলে কয়েকহাজার বছর পরে কি আস্তে-আস্তে মানুষের হাতের বাকি আঙুল সব লুপ্তপ্রায় হয়ে যাবে!
“দিদি সামনে নামবেন কি? না, এইখানে রাখব?”
ট্যাক্সিওয়ালার ডাকে হুঁশ ফিরল আইকার। ও তাকাল সামনে। বাঁদিকে বাঁক নিয়ে গাড়িটা মলের মূল ফটকের উলটো ফুটপাথে দাঁড়িয়েছে।
“ব্যস এখানেই,” আইকা টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল, “কত হয়েছে?”
ভাড়া মিটিয়ে রাস্তায় নেমে এদিক-ওদিক তাকাল আইকা। গাড়ির স্রোত চলেছে। ও ঘড়ি দেখল। ছ’টা বাজে। আকাশে আলো আছে এখনও। ও ওপরের দিকে তাকাল। পাখিদের একটা রেখা ওই ওপর দিয়ে উড়তে-উড়তে বেরিয়ে যাচ্ছে!
রুপিন কি এসে পড়েছেন! আইকা এপার থেকেই ওপারের মলের সামনের বড় বাঁধানো জায়গাটা দেখল। কোথায়! চোখে তো পড়ছে না! এদিকে পৌনে সাতটা নাগাদ এখানেই আর-একটা কাজ আছে। তারক চক্রবর্তী আসবে দেখা করতে!
আজ শনিবার বলে ছুটি ছিল আইকার। ভেবেছিল বাড়িতেই থাকবে। নিজের আলমারিটা একটু গোছাবে। তারপর পার্লারে যাবে। বেশ কিছুদিন হল পার্লারে যাওয়া হয়নি। আইব্রো করাটা খুব জরুরি। তা ছাড়া চুলটাও কাটবে। কিন্তু তারক চক্রবর্তী যে এমন করে দেখা করতে চাইবে, সেটা বুঝতে পারেনি।
গতকাল বিকেলে লোকটা নিজে ফোন করেছিল আইকাকে। আসলে এর আগে আইকা গিয়ে দু’বার দেখা করে এসেছে সোনাঝুরিতে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, কাজের কাজ কিছু হয়নি! তারক শুধু কথা দিয়ে মেপে গেছে ওকে। এমনকী এমনও ইঙ্গিত করেছে যে, আইকা মেয়ে হয়ে কেন এমন ঝামেলার কাজে ঢুকছে!
লোকটা যে অশিক্ষিত আর নোংরা, সেটা কথা আর চোখমুখ দেখেই বুঝেছে! কথা বলার সময় সমানে আইকার বুকের দিকে তাকাচ্ছিল ও। এটা নতুন কিছু নয়। অনেক ছেলেই এমন করে। তবে সেটা অসতর্ক ভাবে বা লুকিয়ে-চুরিয়ে। কিন্তু এই লোকটা এমন করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল যে, আইকা শেষমেশ বড় ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়ে বুকটা আড়াল করে বসতে বাধ্য হয়েছিল! তাতে তারক বলেছিল, “আরে, শীত করছে নাকি! তবে এসিটা বন্ধ করে দিই!”
আইকার বিরক্তি আর ফ্রাস্ট্রেশন বাড়ছিল। ভাবছিল, দু’-দু’বার দেখা হয়ে গেল, কিন্তু লোকটা কিছুই বলছে না! যেন অপেক্ষা করছে! যেন দেখছে, আরও কেউ খেলায় নামবে কি না! যত বেশি পার্টি এই সোনাঝুরির জমি, বাড়ি আর জুট মিলের দিকে হাত বাড়াবে তত বেশি করে তারকের লাভ! দরকষাকষিটা আরও ভাল হবে আর কী!
সেই দুটো দিন আইকার বেকার গিয়েছে! ওই ভীষণ খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে অতটা যাওয়ার কোনও ফলই হয়নি! ও বুঝতে পারছিল তারক ওকে লেজে খেলাচ্ছে মাত্র!
তারক শুধু ওকে বলেছিল, “আপনি আসছেন, কথা বলছেন আমার খারাপ লাগছে না! সুন্দরীদের সান্নিধ্য কে না চায়! কিন্তু আমায় একটু হিন্ট দিন তো, আমার জন্য কী ভেবেছেন? মানে, আমায় কতটা যোগ্য মনে করছেন, সেটা আমায় জানতে হবে তো!”
অফিস থেকে বলে দেওয়া একটা ডিল তারককে অফার করে এসেছে আইকা। তারক কিছু বলেনি, শুধু হেসেছে!
জুট মিল, পাশের বিস্তীর্ণ জায়গা আর জোনাক-বাড়ি গোটাটাই মালিক গ্রুপের। ওদের সঙ্গেও কথা বলছে আইকা। এমনকী রুপিন নিজেও বলছে। মুশকিলটা হল, কিছুতেই আসল মানুষটার নাগাল পাচ্ছে না ওরা। ডিরেক্টররা বলেছেন যে, চেয়ারপার্সনই কিন্তু শেষ ‘কল’-টা নেবেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই দেখা করছেন না! আইকা জানে ব্যাপারটা সহজ নয়। কারণ, এ এক বিরাট কর্মকাণ্ড। বোর্ডের লোকজন তো বলছেন, মিলের অবস্থা ভাল নয়। তাই তাঁরা সবটাই ছেড়ে দিতে চান! কিন্তু আসল জায়গা থেকে এখনও নাকি কিছু সেভাবে বলা হয়নি! চেয়ারপার্সন এখনও নাকি কোনও সিদ্ধান্ত নেননি!
আইকার অবাক লেগেছিল। একটা কোম্পানি, তারা তাদের জায়গা বিক্রি করে দেবে, তাতে তারক চক্রবর্তীকে কেন যোগাযোগ করতে হবে! রুপিনকে সেই কথাটা জিজ্ঞেসও করেছিল আইকা!
রুপিন সব শুনে হেসেছিলেন খুব। বলেছিলেন, “তুমি এমন বাচ্চা কেন আইকা! আমরা একটা মিল কিনে সেটা বন্ধ করে দেব। কত লোকের চাকরি যাবে বলো তো? তা ছাড়া ওই জমিতে জবরদখল করে হলেও বেশ কিছু লোক দোকান, বাড়ি করে রয়েছে! মাস ইভাকুয়েশন হলে তার একটা ব্যাকল্যাশ আসবে না? সেটা সামলাবে কে? প্লাস আরও নানা ঝামেলা আছে! পলিটিক্যাল পার্টির হেল্প তো লাগবেই! অ্যান্ড হিয়ার তারক চক্রবর্তী কাম্স ইনটু প্লে!”
সেই তারক চক্রবর্তী আচমকা গতকাল ফোন করেছিল।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে স্নান সেরে সবে মাগোকে নিয়ে বসেছিল আইকা। মাগোর জন্য একটা জামা কিনে এনেছিল। সেটাই পরিয়ে দেখবে ভেবেছিল। কিন্তু তখনই ফোনটা এসেছিল।
বিরক্তই হয়েছিল আইকা। সারাদিন অফিসে নানা ঝামেলা থাকে। তারপর কাজের শেষে আবার ফোন এলে খুব রাগ হয়!
ফোনটা তুলে নম্বরটা দেখেছিল। চিনতে পারেনি আইকা। একটা ল্যান্ড লাইনের নম্বর! সামান্য দ্বিধা নিয়ে ধরেছিল কলটা।
“ম্যাডাম, আমি তারক বলছি।”
আইকা থমকে গিয়েছিল। লোকটা নিজে ফোন করল! কেন? ব্যাপার কী?
“বলুন?” আইকা যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও অনাগ্রহী গলায় বলেছিল।
তারক সময় নিয়েছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, “কাল একবার কথা বা দেখা হতে পারে?”
“কথা না দেখা?”
সামান্য ভেবে তারক বলেছিল, “দেখা। মুখ না দেখলে আমি আবার কথা বলতে পারি না! এই যে আপনার সঙ্গে কথা বলছি, আমার অস্বস্তি হচ্ছে! কারণ, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।”
লোকটার কথার সঙ্গে একটা শোঁ শোঁ শ্বাসের শব্দ পাচ্ছিল ও। কেমন যেন বিরক্ত লাগছিল। ও বলেছিল, “কাল আমার ছুটি। আমি সোমবার দেখা করব?”
“আরে, আপনাকে দেখা করতে আসতে হবে না আমার কাছে। আমিই যাব আপনাদের ওদিকে! দেখুন, এখানে আমায় সবাই চেনে। কে এল, কে গেল সবাই নজর করে। বন্ধু আর অনুগত সেজে সবাই ঘুরে বেড়ায় আমার চারিদিকে। কিন্তু তাই বলে কেউ তো আর বন্ধু নয়। আমায় পদে-পদে সব দেখে চলতে হয়। তাই আমিই যাব কাল। এই ধরুন বারোটা নাগাদ! পার্টির দপ্তরে কাজ আছে আমার। সেটা চুকিয়ে যাব। কোথায় বসবেন, আপনি ঠিক করবেন। আমি পৌঁছে যাব। আর আমি কিন্তু নেমন্তন্ন করলাম। আশা করি আমায় না করবেন না!”
মাগো অস্থির হচ্ছিল আইকার কোলে। বারবার মোবাইলটা ধরে টানাটানি করছিল। নিজের ভাষায় কীসব ইকির-মিকির বলে যাচ্ছিল!
আইকা ছোট কথায় কাজ সারতে চাইছিল। ও বলেছিল, “ঠিক আছে। সকালে আমি আপনাকে ফোন করে নেব। আমায় আমার বসের সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে!”
“আরে, আপনার বেবি আছে? কথা শুনছি?” তারক অবাক হয়েছিল যেন!
“মানে?” চমকে গিয়েছিল আইকা!
“ওই যে শুনছি!” হেসেছিল তারক, “আপনাকে দেখলে কিন্তু ইয়ে বোঝা যায় না যে… মানে এমন ফি… মানে নিজেকে ধরে রেখেছেন!”
আইকা আর উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “কাল সকালে আমি আপনাকে জানাচ্ছি। গুড নাইট।”
তারক গুড নাইট বলার আগেই ফোনটা কেটে দিয়েছিল আইকা। কেমন গা ঘিনঘিন করছিল! লোকটার চোখে কেমন একটা আঠা আছে! ফোনে কথা বললেও লোকটার দৃষ্টি যেন ওকে নোংরা করছিল!
আইকা কথার কথা হিসেবে বলেছিল যে, বসকে ফোন করবে! কিন্তু আসলে তার তো দরকারই নেই! রুপিন আইকাকে একটা পর্যায় অবধি ছাড় দিয়েই রেখেছেন। এসব সিদ্ধান্তর জন্য ওকে কারও সঙ্গে কথা বলতে হবে না।
সকালে আলমারি গোছানো, পার্লার যাওয়া সব বাতিল করে দিয়েছিল আইকা। তারপর তারককে ফোন করেছিল। কিন্তু তারক ফোন ধরেনি! অবাক হয়ে গিয়েছিল আইকা! নিজেই তো বলল দেখা করার কথা। আর এখন রিং হয়ে যাচ্ছে! তাও ফোন ধরছে না! এ কেমন অসভ্যতা!
সারা দুপুর কেটে গিয়েছিল। শেষে আইকা খেয়ে নিয়েছিল। তারপর বেলা সাড়ে তিনটের সময় এসেছিল তারকের ফোনটা! খুব দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিল, পার্টি অফিসে এমন কাজে আটকে পড়েছিল যে, ফোনটা ধরতে পারেনি। সন্ধে ছ’টার পরেই একমাত্র ও দেখা করতে পারবে।
আইকা কথা বাড়ায়নি! ও বলেছিল সন্ধে সাড়ে ছ’টার সময় রাজডাঙার কাছের মলটায় দেখা করতে পারবে ও! তারক এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল!
কিন্তু রুপিন কই? আইকা দু’দিক দেখল। গাড়ি এসেই যাচ্ছে ক্রমাগত! রাস্তা যে পার হবে তার উপায় নেই! আজকাল দূরের জিনিস দেখতে একটু সমস্যা হচ্ছে ওর! পাওয়ার বাড়ল নাকি? ও একবার মোবাইলটা দেখল। রুপিনকে কি একবার ফোন করবে? তারপরই মত পালটাল! ছ’টায় দেখা করার কথা। একটু দেখে নিয়ে তারপর ফোন করবে। এত সামান্যতে অধৈর্য হলে হবে না।
এই মলটা নতুন হয়েছে। বেশ বড়। আইকার ভালই লাগে এইসব জায়গায় আসতে। শপিং করতে খুব ভালবাসে ও। ছোটবেলার না পাওয়া সব কিছু এখন মনে হয় কেনে। মনে হয়, জীবন যা-যা করতে দেয়নি ওকে, সেইসব করে! শুভ ওকে কোনও কিছু করতে বারণ করেনি কোনওদিন। কিছু কিনতে, কোথাও যেতে বারণ করেনি। কিন্তু নিজেই যে অমন চট করে চলে যাবে, সেটা বুঝতে পারেনি আইকা! শুভ বারণ না করলেও ও বেহিসেবি কাজ বা খরচ করত না! কিন্তু শুভ মারা যাওয়ার পর, আইকার মধ্যে থেকে যেন আর-একটা আইকা বেরিয়ে এসেছে। শুভ মারা গিয়ে যেন ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে এই জীবন কতটা ভঙ্গুর! কতটা অনিশ্চিত! ওই ঘটনাটা যেন ওকে শিখিয়েছে যা আছে, যতটুকু আছে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার মানে হয় না। জীবনকে কৃপণের মতো খরচ করা আর জীবনকে বাজে খরচ করার মধ্যে কোনও তফাত নেই। মনের সামান্য ইচ্ছেগুলোকে মেরে ফেলার কোনও মানে হয় না। আগের চেয়ে আইকা তাই নিজেকে মেলে ধরেছে অনেকখানি! শুভ যে বলত, কার্পে ডিয়েম, সেটার মানে বুঝতে পেরেছে এখন।
সামনের রাস্তায় গাড়ি একটু কমে এসেছে এবার। সিগনালটা বন্ধ হয়েছে নিশ্চয়! এই সুযোগে সামান্য হেঁটে আর দৌড়ে রাস্তা পার হল আইকা।
মলের সামনেটা কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো। সেখানেও লোকজন দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এখানে হাওয়া আরও বেশি! হাওয়ায় সব যেন লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে! আইকা মাথার চুলগুলোকে সামলে সিঁড়ির ধাপ ভেঙে উঠে লম্বা বাঁধানো চত্বরে দাঁড়াল।
আকাশের নীল কমে এসেছে আরও। আশপাশটা আলোয় ঝলমল করছে। আইকা আবার দেখল চারদিকে। আর এবার দেখতে পেল রুপিনকে। একটা মেরুন টি-শার্ট আর নীল জিন্স পরে গাড়ি থেকে নামছেন। গায়ের ফরসা রঙের সঙ্গে অমন টি-শার্টটা যেন সবার মধ্যে আরও বেশি করে চোখে পড়ছে! রুপিনকে কোনওদিন এমন ইনফরমাল জামা কাপড়ে দেখেনি আইকা। তাই অদ্ভুত লাগল। আর যেন এই প্রথম খেয়াল করল রুপিনকে দেখতে বেশ ভাল! অনেকটা জর্জ ক্লুনির মতো।
রাস্তা থেকেই রুপিন হাত তুললেন। হাসলেন আইকাকে দেখে! আইকাও হাসল। আসলে ওর একটু অস্বস্তি হচ্ছে। রুপিনের সঙ্গে এভাবে আগে কখনও তো বাইরে দেখা করেনি! তাই কেমন একটা লাগছে!
আজ ওই সাড়ে তিনটের সময় তারকের সঙ্গে কথা বলার পর রুপিনকে ফোন করেছিল আইকা। না করলেও হত, কিন্তু তাও মনে হয়েছিল রুপিনকে একটু জানিয়ে রাখা ভাল!
দু’বার রিং হতেই ফোনটা ধরেছিলেন রুপিন।
“স্যার, আমি এক মিনিট কথা বলতে পারি?” আইকা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
“শিয়োর, বলো,” রুপিন নরম গলায় বলেছিলেন।
আইকা সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে তারকের সঙ্গে হওয়া কথার মূল বিষয়টা বলেছিল।
রুপিন সবটা শুনে সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিলেন, “নিশ্চয় দেখা করবে। আর ও যখন নিজে থেকে যোগাযোগ করছে, নিশ্চয় কিছু বক্তব্য আছে। জাস্ট ডোন্ট কমিট এনিথিং। তুমি শুধু শুনবে! কেমন?”
“থ্যাঙ্কস স্যার,” আইকা ভেবেছিল রেখে দেবে।
“আইকা,” রুপিনের গলায় সামান্য দ্বিধা শুনেছিল ও।
“স্যার?”
“মে আই টেক সাম অফ ইয়োর টাইম! মানে, ইটস ইমপর্ট্যান্ট। আই নিড সাম হেল্প,” রুপিনের প্রতিটা কথায় দ্বিধা ঝরে পড়ছিল।
“স্যার, ডোন্ট হেজ়িটেট, প্লিজ় বলুন,” আইকা যতটা সম্ভব আশ্বস্ত করেছিল রুপিনকে।
রুপিন সামান্য লাজুক গলায় বলেছিলেন, “আসলে আমার বোনের কাল টোয়েন্টি ফিফ্থ ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি! আই নিড টু পিক আপ সাম গিফট ফর হার! মানে জুয়েলারি নয়। সাম নাইস ওয়ান্স। বাট আই কান্ট জ়িরো-ইন টু সামথিং স্পেসিফিক। তাই আজ মানে… ইফ ইউ লেন্ড মি সাম অফ ইয়োর টাইম… দেন… তোমার কনভিনিয়েন্ট টাইম বোলো, আই উইল বি দেয়ার!”
“স্যার, কোনও অসুবিধেই নেই,” রুপিনের এমন ইতস্তত ভাব দেখে খুব হাসি পেয়ে গিয়েছিল আইকার, “আমি তো ওই মলে যাবই। তো আপনি যদি ছ’টার সময় আসতে পারেন। তা হলে মনে হয় কেনা হয়ে যাবে।”
“সো কাইন্ড অফ ইউ,” রুপিন যেন স্বস্তি পেয়েছিলেন, “প্লিজ় ডোন্ট মাইন্ড। আসলে আমি এসব করিনি তো কোনওদিন।”
আইকা যেন মনে মনে দেখতে পাচ্ছিল রুপিনের ফরসা মুখটা কেমন যেন লাল হয়ে উঠছে!
“হাই আইকা!” রুপিন সামনে এসে দাঁড়ালেন, “আয়াম সরি, ইউ হ্যাড টু ওয়েট! স্যাটারডে করে আজকাল চারদিকে এত জ্যাম হয়! সরি।”
“স্যার প্লিজ়!” আইকা হাসল।
“ইউ ক্যান কল মি রুপিন! আমরা তো অফিসে নেই আর! আই ডোন্ট লাইক প্রোটোকলস!”
আইকার লজ্জা লাগল হঠাৎ। এমন করে রুপিন বললেন, যেন নাম ধরে ডাকাটা কোনও ব্যাপার নয়!
ও পাশ কাটিয়ে বলল, “চলুন স্যার। ভেতরে যাওয়া যাক!”
রুপিন শুনে হাসলেন একটু। নিজের মনে মাথা নাড়ালেন। তারপর মলের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
আইকাও রুপিনের পেছনে-পেছনে এগোতে গেল। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে কাকে যেন দেখে একটু থমকে গেল। ও মুখ ফেরাল। একটা ছেলে। বেশ লম্বা। ভাল চেহারা। একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্যদিকে তাকিয়ে।
আইকার কেমন যেন লাগল। ছেলেটা এখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও ওর মনে হল, ছেলেটা একটু আগে ওকেই দেখছিল! খুব চেনা লাগল ছেলেটাকে। কিন্তু মনে করতে পারল না। কে এটা? মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর!
“আর ইউ কামিং?” রুপিন পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন।
আইকা হেসে এগিয়ে গেল।
মলের ভেতরে ঢুকে ভাল লাগল আইকার। ঠান্ডা! চারিদিকে লোকজন থাকলেও তাতে খুব কিছু অসুবিধে হচ্ছে না! বরং ভালই লাগছে। এই মলগুলো কেমন ঝকঝক করে! কিন্তু যে-মানুষগুলো এই মলে আসে তারাই কলকাতার অবস্থা কী খারাপ করে রেখেছে! যেন দুটো আলাদা ডাইমেনশন! নয়তো যেন মানসিক রোগে ভুগছে সবাই। একের মধ্যে দু’রকম বিপরীত মানুষ ঢুকে বসে আছে!
“স্যার, আপনি কী কিনতে চান?” আইকা তাকাল রুপিনের দিকে।
রুপিন অসহায়ের মতো তাকালেন আইকার দিকে। মাথা নেড়ে হাত ছড়িয়ে বললেন, “নো ক্লু! আমি জানি না বোন কী পছন্দ করে! আর শুধু বোন নয়, আমার বোনাইয়ের জন্যও কিছু কিনতে চাই। পারফিউম দেব না। কারণ, আই অ্যাম আ বিট সুপারস্টিশাস! আদার দ্যান দ্যাট ইউ চুজ়।”
আইকা ইতস্তত করল। রুপিন বলছেন বটে, কিন্তু কত বাজেট সেটা বলছেন না! তা হলে কী করে কিনবে ও?
ও রুপিনের দিকে তাকিয়ে হাসল। রুপিন যেন বুঝতে পারলেন কিছু! বললেন, “অ্যারাউন্ড ফিফটি থাউজ়্যান্ড ইজ় মাই লিমিট টুডে।”
বাপ রে! আইকা মনে মনে চমকে উঠল! পঞ্চাশ হাজার টাকার গিফট! সোনা দেবেন না এদিকে!
ও ঠোঁট কামড়ে তাকাল রুপিনের দিকে। তারপর বলল, “রিস্ট ওয়াচ!”
“গ্রেট চয়েস!” সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়লেন রুপিন, “রিস্ট ওয়াচ জিনিসটা খুব তাড়াতাড়ি একটা অ্যান্টিক ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে! এটা ভাল বলেছ! লেটস্ বাই দেন!”
এসকালেটার বেয়ে ওরা ওপরে উঠে গেল। ঘড়ির দোকানটা আলোয় ঝলমল করছে! আইকা ভাবল এরা কত টাকা ইলেকট্রিক বিল দেয়! তারপরেই হাসি পেয়ে গেল। এখনও মাঝে মাঝে ওর মনের ভেতরে যাদবপুরের কলোনির একটা ঘরে বড় হওয়া মেয়েটা বেরিয়ে পড়ে। মেঘ করে আসা বর্ষাকালে লেখাপড়া করবে বলে দিনের বেলায় একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যাকে বাড়িওয়ালি জেঠিমার কাছে গালাগালি খেতে হত!
ওরা দোকানে ঢুকতেই খুব সাজগোজ করা একটা মেয়ে এগিয়ে এল ওদের দিকে। মেয়েটা একটা টপ আর স্কার্ট পরে আছে। মুখে আচ্ছা করে রং লেপেছে! গায়ের রং যে কারও এমন অদ্ভুত কমলা হতে পারে না, সেটা মেকআপ করার সময় মেয়েটার মনে ছিল না!
আইকা দেখল মেয়েটার ডান হাতের অনামিকায় একটা রুপোয় বাঁধানো পলার আংটি। আর বাঁ হাতের বাহুতে টপের ফাঁক দিয়ে লাল কারে বাঁধা শিকড় উঁকি মারছে!
মেয়েটা কায়দা করে ইংরেজি বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু উচ্চারণের জন্য সেটা আমেরিকান ইংরিজি না হয়ে অদ্ভুত একটা উচ্চারণ হচ্ছে!
আইকার কষ্ট হল মেয়েটাকে দেখে। কোন বাড়ির মেয়ে! কত বয়স হবে? এই বাইশ-তেইশ। নিজেকে ছাপিয়ে ও স্মার্ট আর ঝকঝকে হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এমন কষ্টের সঙ্গে ও নিজেও পরিচিত।
আইকা বাংলায় বলল, “আমরা ঘড়ি দেখতে এসেছি। ফর কাপ্ল। মাঝবয়সি কাপ্লদের জন্য!”
বাংলা শুনে মেয়েটাও যেন স্বস্তি পেল একটু। হাসল। তারপর এগিয়ে নিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে!
ঘড়ি পছন্দ করতে আইকার মিনিট কুড়ি সময় লাগল। রুপিন যেটা দেখছিলেন সেটাই খুব ভাল বলে কিনতে চাইছিলেন। কিন্তু আইকা সেটা হতে দেয়নি! বরং দু’বার তো একটু বকেইছে রুপিনকে। বলেছে, “স্যার, প্লিজ় ইউ স্টে আউট অফ দিস!”
আইকা দেখেছে যে, এতে রুপিন রাগ তো করেনইনি, বরং হেসেছেন খুব! দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে পিছিয়ে গিয়েছেন!
দুটো ঘড়ি ছাপ্পান্ন হাজার টাকা! আইকা মনে মনে আবার চমকাল! সময় দামি জানত! কিন্তু এমন দামি না হলেও বোধহয় চলত!
রুপিন নিজেই এগিয়ে গেলেন ক্যাশের দিকে। আইকা এই সময়ের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে আরও কয়েকটা ঘড়ি দেখল। বেশ ঘড়িগুলো। কিন্তু বড্ড দাম! আইকা নিজে ঘড়ি পরে না আর। মোবাইলেই তো দেখা হয়ে যায় সময়।
“লেটস গো,” রুপিন হাতে প্যাকেট নিয়ে এসে দাঁড়ালেন পাশে।
দোকানের বাইরে এসে দাঁড়তেই পিংপিং করে আইকার মোবাইলটা বেজে উঠল। ওই বোধহয় এসে পড়েছে!
আইকা দেখল মোবাইলটা। ঠিক ধরেছে। ও রুপিনের দিকে তাকাল। তারপর ফোনটা ধরে বলল, “ইয়েস। ও, এসে গিয়েছেন? কোথায়? ও আচ্ছা। আমি আসছি তা হলে। ফাইভ মিনিটস।”
ফোনটা কেটে রুপিনের দিকে তাকাল আইকা। বলল, “স্যার, আই নিড টু লিভ। তারক চক্রবর্তী এসে গিয়েছেন।”
রুপিন মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যাব তোমার সঙ্গে?”
“না স্যার, আই ক্যান ম্যানেজ। আপনাকে দেখলে হি উইল বিকাম মোর গ্রিডি। মানে আই থিঙ্ক হি ইজ় হিয়ার টু ইনটিমেট হিজ় প্রাইস টুডে।”
রুপিন চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “ওকে। শিয়োর!”
“আমি আসছি স্যার। আই উইল লেট ইউ নো!”
আইকা পা বাড়াতে গেল। কিন্তু পারল না। রুপিন হাত তুলে আটকালেন ওকে। তারপর হাতের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে ওর হাতে দিয়ে বললেন, “দিস ইজ় ফর ইউ। আর একদম আরগু করবে না। টেক দিস অ্যান্ড প্রসিড টুওয়ার্ডস দ্য মিটিং! বাই।”
গোটা ব্যাপারটা এমন করে ঘটে গেল যে, আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে দেখল, রুপিন দ্রুত হেঁটে এসকালেটর বেয়ে নেমে গেলেন নীচে।
একটা ঘড়ির বাক্স! এটা কখন কিনলেন রুপিন! ও যখন অন্যমনস্ক হয়ে ঘড়ি দেখছিল তখন? ও কী করবে? ঘড়ি তো পরে না! কিন্তু ফেরত দেওয়াটাও তো ভাল দেখাবে না! তা হলে? আইকা মাথা নাড়ল নিজের মনে। লজ্জা করছে খুব। অপ্রস্তুত লাগছে খুব! এটা কী হল? এভাবে গিফট করলেন কেন রুপিন? আইকা তো এটা চায়নি! আশাও করেনি! এভাবে ধন্যবাদ জানানোর কী দরকার ছিল! আইকার তো ভালই লাগছিল এই শপিংটা করতে। কিন্তু আর কিছু করার নেই। কাঁধের বড় ব্যাগে বাক্সটা ভরে সামনের দিকে এগিয়ে গেল আইকা।
এসকালেটার দিয়ে উঠে খাবারের জায়গা। একপাশে বাচ্চাদের খেলাধুলোর দোকান। কফি শপ। আইসক্রিমের কাউন্টার। সিনেমা হলও আছে। কিন্তু সেই দিকে না গিয়ে অন্যদিকে এগোল আইকা। সামনে ঝলমলে একটা জায়গা। এই রেস্তরাঁর কথাই বলেছে তারক।
কাচের দরজার সামনে একটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। আইকা যেতেই মাথা নেড়ে ওকে অভিবাদন করল। তারপর খুব ভদ্রভাবে বলল, “উই আর কমপ্লিটলি অকুপায়েড ম্যাম। প্লিজ় রাইট ডাউন ইয়োর নেম। উই উইল কল ইউ!”
আইকা বলল, “কিন্তু আমি যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, সে ভেতরে আছে!”
“সরি ম্যাম,” মেয়েটি সামান্য হেসে বলল, “ইউ হ্যাভ টু ওয়েট…”
“আরে!” আইকা বলল, “ব্যাপারটা বুঝুন। একজন এসেছেন! আমি দেখা করতে এসেছি তাঁর সঙ্গে!”
“সরি ম্যাম, ইউ হ্যাভ টু ওয়েট!” হাসি-হাসি মুখ থাকলেও মেয়েটার গলায় জেদ।
“কী বে?” আচমকা রেস্তরাঁর ভেতর থেকে তারক বেরিয়ে এল।
মেয়েটি ঘাবড়ে গেল বেশ। তারকের অমন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। কপালে কমলা রঙের তিলক। গলায় উত্তরীয়। পায়ে সাদা স্নিকার্স। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে লোকটি কী করে বা কীসের সঙ্গে যুক্ত।
আইকা দেখল, বাইরে থেকেও তিন-চারজন ছেলে এগিয়ে এল। চোয়াড়ে ধরনের চেহারা তাদের। মুখ দেখলেই বোঝা যায় নেতাদের পেছনের চামচা এগুলো। তারক ভেতরে থাকলেও এরা বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইকার বিরক্ত লাগে এই শ্রেণির লোকজনকে দেখলে। একা কিছু করার যোগ্যতা বা ক্ষমতা নেই! নেতাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে গুন্ডামি আর ধমক-ধামক দেওয়া শুধু! আইকা মাঝে মাঝে ভাবে আসলে কিছুই পালটায়নি। আগে বর্গিরা যুদ্ধের সময় ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করত আর বাকি সময় লুঠতরাজ করত, এখনও এরা ভোটের সময় পার্টিগুলোর হয়ে ‘খাটাখাটনি’ করে, তারপর নানাভাবে তোলাবাজি আর গুন্ডামি করে বেড়ায়! ইতিহাসে, জামাকাপড় আর মুকুটের রংই পালটায় শুধু, মানুষগুলো একইরকম থেকে যায়।
তারক গলার উত্তরীয়টা মাফলারের মতো করে গলায় পেঁচিয়ে বলল, “ওকে আটকাচ্ছ কেন? আমার গেস্ট না?”
মেয়েটি শুকনো মুখে বলল, “আমি স্যার ওঁকে বলছিলাম… একটা তো রুল আছে!”
এবার রেস্তরাঁর ভেতর থেকে একজন ম্যানেজার গোছের লোক বেরিয়ে এল হন্তদন্ত হয়ে। তারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “হোয়াটস দ্য ইনকনভিনিয়েন্স স্যার?”
“বাঞ্চোত!” তারক ঠোঁট কামড়ে লোকটার দিকে তাকাল, “বাঙালির পো হয়ে ইংরেজি মারাচ্ছ? রুল? রুলের গুঁতো খেয়েছ? তোদের গোটা হোটেল পেছনে দিয়ে দেব শুয়োরের বাচ্চা! ম্যাডাম আমার গেস্ট। বলে কিনা ঢুকতে দেবে না! নিয়ম দেখাচ্ছে! আমার মটকা তেতে গেলে না কেলিয়ে দাঁত খুলে নেব!”
ম্যানেজারটি হাসছিল। কিন্তু দাঁত খুলে নেওয়ার আশঙ্কাতেই কি না কে জানে, দ্রুত বেরিয়ে থাকা দাঁতগুলো ঢুকিয়ে নিল!
তারক দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আমায় চেনো না চাঁদু! পোঙাপাকামো করেছ কী, পোঙা ভেঙে বাড়ির দেওয়ালে ডেকরেশন করে দেব! আসুন ম্যাডাম।”
আইকা দেখল ম্যানেজারটি মাথা ঝুঁকিয়ে আইকাকে ভেতরে যাওয়ার জন্য বিগলিত হয়ে হাত দেখাল।
তারক কটমট করে তাকাল ম্যানেজারটির দিকে। তারপর বলল, “আর ঢ্যামনামো করতে হবে না! আমার জন্য একটা নিট পাঠা!”
রেস্তরাঁর ভেতরে সবাই গন্ডগোলে থমকে ছিল। এবার ওরা ঢুকতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল!
তারক নিজের টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে পাশের টেবিলে বসা একটা ইয়া মোটা, ফরসা লোকের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী কাকা, ভাল টাইট দিয়েছি না? শালা ইংরেজি মারাচ্ছে! বাড়িতে উবু হয়ে বসে হাগে, আবার ইংরেজি মারায়! বেশি ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করলেই পোঙা ভেঙে বাড়ির দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেব। কেমন? তুমি খাও।”
লোকটা দ্রুত তারকের মধুর বাক্যে সম্মতি জানিয়ে গোগ্রাসে নিজের খাবার শেষ করতে লাগল। আইকা বুঝল লোকটা আর পাশের টেবলে বসে থাকার কোনওরকম রিস্ক নিতে চাইছে না!
তারকের টেবিলে একটা বিয়ারের মাগ। সামনে চিকেনের দু’-তিন রকম প্লেট। লোকটা যে ড্রিঙ্ক করে আছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল!
“ম্যাডাম, আপনি কী নেবেন? আমি খাওয়াব!”
আইকা দেখল, এ এমন অবস্থায় আছে যে, এর সঙ্গে বেশি কথা বাড়ানো মুশকিল! ও বলল, “আজ আমার উপোস! তাই খাব না কিছু!”
“উ…” তারকের চোখ গোল হয়ে গেল, “আপনারা উপোস করেন!”
“কেন?” আইকা তাকাল অবাক হয়ে!
তারক ফিক করে হাসল! লোকটার নেশা হয়ে গেছে কি! কেমন একটা ব্যবহার করছে!
তারক সামনে রাখা বিয়ারের মাগটা তুলে লম্বা চুমুক দিয়ে শব্দ করে ঢেকুর তুলল! পাশের টেবলের সেই মোটা লোকটি সামান্য অসন্তুষ্ট হয়ে তাকাল।
তারক আবার ঘুরল লোকটার দিকে, “কী হল, কাকা? তুমি ঢেকুর তোলো না? দেখে তো মনে হচ্ছে ঢেকুর ছাড়াও নানা শব্দ বের করো শরীর থেকে! অমন তাকিয়ো না, মটকা তাতছে কিন্তু!”
“প্লিজ়,” আইকা এবার না বলে পারল না, “একটু কন্ট্রোল করুন। এমন করবেন না। আমার এমব্যারাসিং লাগছে!”
তারক থমকে গেল এবার। তারপর হাসল। বলল, “আচ্ছা, বাদ দিন। আসলে আপনাদের মতো মোমপালিশ করা মেয়েরা এমন উপোস করে, আমি জানতাম না!”
মোমপালিশ! কথাটা কট করে কানে লাগল আইকার। কিন্তু ও কিছু বলল না। তারক যে পুরো নেশাগ্রস্ত, সেটা বোঝাই যাচ্ছে!
আইকা জিজ্ঞেস করল, “আপনি ডাকলেন কেন? যদি কাইন্ডলি বলেন! আমার একটা কাজ আছে!”
“ইয়েস!” তারক একটা চিকেন তুলে মুখে দিয়ে তাকাল আইকার দিকে। তারপর বলল, “আপনাদের সোনাঝুরির জায়গা, মিল, জোনাক-বাড়ি চাই। ওখানে অনেক লোক থাকে। আপনারা সব নিয়ে সেই লোকগুলোকে উৎখাত করবেন! বিশাল প্রজেক্ট বানাবেন! ভাল। কিন্তু সেটা করতে গেলে বহু গরিবের বহুত কষ্ট হবে। তাই না?”
আইকা তাকিয়ে রইল।
তারক বলল, “আপনারা চান যাতে ঝামেলা না হয়। চান, যাতে কেউ প্রতিবাদ না করে! তাই তো? সেটার জন্যই তো আমার কাছে গিয়েছিলেন! ঠিক আছে। জানেন তো আরও একটা পার্টি ঘুরঘুর করছে। পুশকিন চক্রবর্তী। সেও দেখা করতে চাইছে। অফিস থেকে একটা ছেলেকেও পাঠিয়েছে কয়েকবার। জানেন তো?”
এসব জানে আইকা। কিন্তু এটাই তো স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিজের জায়গায়। কিন্তু কাজটা কাজই। এটা ও জানে যে, পুশকিনদের কোম্পানি ‘রিকো গ্রুপ’-ও এই একই লক্ষ্যে এগোচ্ছে!
আইকা বলল, “আপনি কেন ডেকেছেন যদি বলেন।”
তারক বলল, “আমার দুটো মেয়ে! বউ নেই। বহু আগে এক ছোঁড়ার সঙ্গে পালিয়েছিল! আমি জানেন, বউকে খোঁজার চেষ্টা করিনি। যে নিজের ইচ্ছেয় চলে যায় তাকে জোর করে লাভ নেই! আমার বউয়ের যদি অন্য কাউকে পছন্দ হয়, তবে আর কী করা যাবে! কিন্তু একটা জিনিস হয়েছে তারপর থেকে। আমি আমার মেয়েদের ব্যাপারে খুব ইনসিকিয়র্ড হয়ে পড়েছি! ওদের ভবিষ্যৎও তো আমাকেই দেখতে হবে। তাই চারটে থ্রি বিএইচকে ফ্ল্যাট, প্রেফারেবলি নদীর পাশে। আর দেড় কোটি টাকা! আমার মেয়েদের জন্য এটাই এনাফ হবে।”
আইকা ভেতরে-ভেতরে চমকে উঠলেও বাইরে দেখাল না। বলল, “ঠিক আছে মিস্টার চক্রবর্তী। আমি অফিসে জানিয়ে দেব। তারপর জানাব কী করতে পারছি!”
তারক তাকিয়ে হাসল। বলল, “জানাবেন! পুশকিন কিন্তু আরও বেশি দিতে রাজি! কিন্তু আপনি এসেছেন আগে। দু’বার দেখা করেছেন। তাই আপনার চান্স আগে! আমি লোভী নই। প্র্যাকটিকাল। আসুন!”
তারক আর কথা না বাড়িয়ে হাতজোড় করে হাসল।
আইকা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। এত টাকা! চারটে ফ্ল্যাট! নদীর পাশে! পাগল নাকি?
ও চারিদিকে তাকাল। লোকজন এখনও তারককে দেখছে! নিজেদের মধ্যে কীসব বলাবলি করছে! কিন্তু তারকের কিছু খারাপ লাগছে বলে তো মনে হচ্ছে না! পাত্তাই দিচ্ছে না!
আইকা এগিয়ে গেল দরজার দিকে। কিন্তু হঠাৎ কী একটা মনে হল ওর! ওটা কে?
আইকা দ্রুত মাথা তুলল। রেস্তরাঁর দেওয়ালটা পুরো কাচের। বাইরের সব দেখা যাচ্ছে! আর সেখানেই ছেলেটাকে দেখল ও। আবার!
সেই লম্বামতো। বড় চেহারা। জিন্স আর সস্তার টি-শার্ট পরা! ছেলেটা স্থিরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! বেশ কিছুটা দূরে হলেও আইকার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না!
শরীরের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল ওর। ছেলেটা কি ওকে ফলো করছে? কেন করছে? কে ছেলেটা? কী চায়?
আচমকা মনে পড়ে গেল ওর। আরে, এ তো সেই ছেলে! ঋষির বাড়ি থেকে একদিন শেয়ার গাড়িতে করে ফেরার সময়ে দেখেছিল। সঙ্গে একটা রোগা করে ছেলেও ছিল! ছেলেটা কী করছে এখানে! কী চায়? ওকেই কি ফলো করছে? নাকি এমনি এসেছে! বুঝতে পারছে না আইকা। কিন্তু কেন কে জানে গোটা ব্যাপারটা ভালও লাগছে না! খালি মনে হচ্ছে সামনে কোনও বিপদ আসতে চলেছে! যাদবপুর কলোনির সেই ভিতু মেয়েটা যেন আবার গুটিগুটি করে এসে মনের দখল নিচ্ছে ওর।
.
২১. কাজু
আজ হাওয়া দিচ্ছে খুব। গঙ্গার দিক থেকে অদ্ভুত একটা হাওয়া এসে যেন পাউডারের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সোনাঝুরির আকাশে বাতাসে! এই অন্ধকারে বসে হাওয়ায় ডুবে যেতে যেতে কী ভাল যে লাগছে কাজুর! উঠতে ইচ্ছে করছে না।
জোনাক-বাড়ির এই বাগানের দিকটা অন্ধকার থাকে। বিশাল কম্পাউন্ডের এই দিকটায় বিশেষ কেউ আসে-টাসে না। চারটে বিশাল বড়-বড় বাড়ির ব্লকের পরে একটা রাস্তা কিছুটা এসেছে এই বাগানের মধ্যে। তবে নামে বাগান হলেও পরিচর্যার অভাবে এটা এখন কেমন একটা জঙ্গলের আকার নিয়েছে। সামনেই বাউন্ডারি ওয়াল। তবে তার কিছুটা বেশ ভাঙা। কিন্তু যেহেতু এদিকে কেউ আসে না, তাই এটা সারানোও হয় না। তবে সারাবেই-বা কে?
আসলে জোনাক-বাড়িতে যারা থাকে, তারা কেউই এটা সারাবে না। ইচ্ছে থাকলেও তাদের সেই সামর্থ্য নেই। আর এই বাড়িটা সুদর্শন মালিকদের। যারা থাকে তাদের অধিকাংশ লোকই জুটমিলে কাজ করে। বাকিরা ভাড়া দিয়ে থাকে। তবে সেটাও খুব বেশি নয়। তাই মালিকরাও কেউ এটা সারানোর গরজ করে না।
“কী ভাবছিস কী?” সতু কনুই দিয়ে খোঁচা দিল।
কাজু মাথা নাড়ল। তারপর সামান্য শব্দ করে হাসল, “না, এই বাড়িটার কথা ভাবছিলাম! ভাগের মা গঙ্গা পায় না অবস্থা বাড়ির! অনেক জায়গা রিপেয়ার করা দরকার!”
“ছাড় তো!” সতু হাসল, “কী সব ভাবিস! তার চেয়ে সামনে দেখ! কী সুন্দর না!”
কাজু কথা না বলে তাকিয়ে রইল। সামনে অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু জোনাকি জ্বলছে। অনেক জোনাকি। বাড়িটার চারিদিকে এত জোনাকি জ্বলে থাকে যে, অদ্ভুত লাগে কাজুর! মনে হল আকাশ থেকে হাজার-হাজার তারা নেমে এসেছে মাটিতে!
ছোটবেলায় ও কাচের বয়ামে জোনাকিদের ধরে রাখত। সারাদিন বয়ামটাকে ও ঢেকে রাখত কাপড় দিয়ে। তারপর ছাদের ওপরের ভাঙা ঘরে গিয়ে সন্ধের অন্ধকারে বয়ামটার কাপড় সরিয়ে দিত! আর দেখত, অপার্থিব এক সবুজ-হলুদ আলো! ঘরের দেওয়ালে কেমন জলের মতো সেই আলোর ঢেউ খেলত! ওর মনে হত কোনও দূর আর অজানা সমুদ্রের তলায় যেন বসে রয়েছে ও! বয়ামের চারপাশে হাত ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখত ও। হাতে আলোর টুকরো ছড়িয়ে থাকত! কিন্তু ধরা যেত না! বাবাও মাঝে মাঝে ওর পাশে বসে দেখত এই সব আলোর জাদু! আর বলত, “মানুষের কিছু-কিছু ইচ্ছেরা এমন হয় জানিস! এই জোনাকিদের আলোর মতো। দেখা যায়, কিন্তু হাতের মুঠোয় ধরা যায় না! তাদের শুধু দূর থেকে দেখেই যেতে হয়!”
তখন বাবা কী বলছে না-বুঝলেও আজ বড় হওয়ার পরে এই সব কিছু বুঝতে পারে কাজু। বুঝতে পারে কোন কষ্ট আর হতাশা থেকে বাবা ওকে এইসব কথা বলত!
“তোদের এই বাড়িটাকে জোনাক-বাড়ি বলে, কিছু খারাপ বলে না। শালা ভারতের সমস্ত জোনাকি কি এখানেই এসে জমেছে?” সতু চিনেবাদামের ঠোঙার মুখটা খুলে হাতে ঢালল।
কাজু কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু।
সতু বলল, “শালা, সারাক্ষণ এমন করে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়বি, কিন্তু তাও পেখমের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিবি না! শালা, তোকে বোঝা ভার। ভালই যদি বাসিস তা হলে এমন করছিস কেন বে?”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। ও চাইছিল না এই প্রসঙ্গটা উঠুক। কিন্তু এই সতুব্যাটা ভুল সময়ে ভুল কথা তুলবেই!
ও বলল, “এই নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছে না!”
“কেন?” সতু ছাড়ল না, “সেদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল পেখমের পাঁচ মিনিটের জন্য। মেয়েটার মুখ-চোখ বসে গিয়েছে! কেমন অসুস্থ লাগল। আমি কথা বললাম। ও শুধু হুঁ হাঁ করে গেল গোটা সময়। শেষে আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম যে, কাজুর সঙ্গে দেখা হয়? তাতে মেয়েটা সবার সামনে যা কাঁদল! তুই শালা মানুষ!”
কাজু সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চে এবার ঘুরে বসল, “এটা আগে বলিসনি তো!”
“কী বলব?” সতু পাশ ফিরে তাকাল।
“এই যে পেখমের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছিল, এটা বলিসনি তো!”
“বললে কী করতিস? সেদিন মেয়েটা নিজে তোর সঙ্গে কথা বলতে এল, তুই কথা বললি? বললি না। সাইকেলে উঠে চলে গেলি! তারপর মেয়েটার সঙ্গে সব কথা, সম্পর্ক শেষ করে দিলি! আর বলছিস আমি তোকে বলিনি কেন!”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। বুকের ভেতরে কেমন একটা দমচাপা কষ্ট হচ্ছে ওর। পেখমের কথা উঠলেই এমনটা হয়!
কেবলই মনে হয়, মেয়েটা এই পৃথিবীতে থাকবে কিন্তু ওর হবে না! ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকবে না! অন্যের হয়ে যাবে মেয়েটা! অন্যের জন্য চিন্তা করবে! অন্যের সঙ্গে সময় কাটাবে! অন্যের সন্তান ধারণ করবে! অন্যের শরীরের গন্ধ মিশে থাকবে ওর শ্বাসে! যাকে কাজু সব দিয়ে ভালবাসল, সে এটা কী করে করতে পারল ওর সঙ্গে?
“কী হয়েছে তোর কাজু! আমার সঙ্গে কিচ্ছু দেখা হয়নি পেখমের! আমি জাস্ট দেখলাম তোর রিঅ্যাকশন!” সতু আলতো ঠেলল ওকে, “দেখ ভাই আমি ধর তক্তা মার পেরেক টাইপের ছেলে! রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকি। কিন্তু এটুকু আমিও বুঝি যে, মেয়েটা তোকে পাগলের মতো ভালবাসে! আর তুই নিজেই বলেছিস একদিন মেয়েটা এসেছিল তোর কাছে, তুই ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিস! তারপর সেদিন সন্ধেবেলা তোর কাছে আবার এল, তুই ওকে দেখতে পাসনি এমন ভাব করে চলে গেলি! তোর দাবিটা কী? মেয়েটা কী করেছে?”
“ও বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে,” কাজু ছোট করে বলল।
ছোট একটা বাক্য। কিন্তু বলতে গিয়ে কাজুর মনে হল বুক থেকে জিভ অবধি সবটা পুড়ে গিয়েছে ওর! কেমন একটা শূন্যতা টের পাচ্ছে যেন ও! কাজু বুঝল, কিছু বলে দেওয়া আর মনে মনে বিশ্বাস করার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে।
“বিয়ে?” সতু আকাশ থেকে পড়ল যেন, “সে কী রে? এটা তো জানি না! কার সঙ্গে বিয়ে? কে বলল তোকে?”
“কার সঙ্গে বিয়ে?” নামটা মুখে আনতেও কেমন যেন মনে হল ভেতরে-ভেতরে একটা বিস্ফোরণে শেষ হয়ে যাবে কাজু।
ও ঢোঁক গিলে নিজেকে সামলাল। গলার কাছে তীব্র একটা ব্যথা হচ্ছে।
কাজু মিথ্যে করে বলল, “জানি না। তবে হচ্ছে জানি। এটা আমায় অন্যের মুখ থেকে শুনতে হল সতু! যাকে সব দিয়ে ভালবাসলাম সে একবারও বলল না!”
“কে বলেছে তোকে? তুই শিয়োর?” সতুর গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, ও এটা বিশ্বাস করতে পারছে না!
“বাদ দে,” কাজু আবার সামনের দিকে তাকাল, “এসব আর বলিস না। প্লিজ়!”
সতু আরও কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। সত্যি, কিছু সময় কথা বলা যায় না!
কাজু সামনের অন্ধকারে জোনাকিদের দিকে তাকিয়ে রইল। গাছে, ঝোপে যেন অসংখ্য আলোর বিন্দু জ্বলে আছে। যেন দূর থেকে দেখা আলো-জ্বলা বাড়ির জানলা! যেন প্রতিটা আলোর পেছনে কোনও না-কোনও গল্প লুকিয়ে আছে!
সতু এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, “বাদ দে। তা, গোপেনদার সঙ্গে তোর কথা হল? বিমলদা তো ঝাড় দিল খুব। গোপেনদা কিছু বলল?
কাজু মাথা নাড়ল, “কেউ কিছু করবে না রে। গোপেনদা তো দেখাই করছে না আর! ওদিকে বিমলদা ওইসব বলল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম গোপেনদা ঠিক হেল্প করবে। কিন্তু সব শালা এক!”
“কেন করবে?” সতু বাদামটা শেষ করে এবার পকেট থেকে বিড়ি বের করল একটা, “তুই শালা সত্যযুগে পড়ে আছিস, কিন্তু এখন কলিযুগ ভাই। গোপেনদা যেই বুঝেছে যে, ফ্যাক্টরিতে গোলমাল হলে ওদের লাভ, সঙ্গে-সঙ্গে কাটাচ্ছে তোকে। গাছে ফল পাকতে দিচ্ছে। বিমলদা যেই শ্রমিক স্বার্থ দেখতে ব্যর্থ হবে, গোপেনদা টুক করে খেয়ে নেবে ফলটা!”
“আমি বুঝতে পারছি সতু,” কাজু মাথা নাড়ল, “অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু তা বলে তো আমি বসে থাকতে পারি না! যাদবকাকাদের সঙ্গে আজও সকালে কথা হল মিলের ইউনিয়ন রুমে। সবাই খুব আপসেট। আর ভয়ও পেয়ে গিয়েছে। এমনিতেই মিল থেকে মাইনে ইরেগুলার হয়ে গিয়েছে! এখন যদি অন্যভাবেও ন্যায্য পারিশ্রমিকে হাত পড়ে, তবে তো লোকগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে রাস্তায় বসবে! ওদিকে মালের শিপমেন্ট এগিয়ে আসছে। আর যা কোয়ালিটি দিয়েছে মালিকের ছেলে, তাতে মাল রিজেক্ট হওয়ার চান্স বেশি। সেই ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নাকি টাকা কেটে নেবে! এটা কোন দেশি কথা? এর একটা বিহিত করতে হবে না?”
সতু এতক্ষণ বিড়ি ধরায়নি। এবার দাঁত দিয়ে বিড়িটা চেপে ফস করে দেশলাই জ্বালাল। কাজুর নাক কুঁচকে গেল। এই গন্ধটা কী যে খারাপ লাগে ওর!
সতু বিড়ি টেনে কিছুক্ষণ ধোঁয়াটা ধরে রাখল বুকের ভেতর। তারপর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নীলচে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “কী করে বিহিত করবি?”
কাজু মাথা নাড়ল। তারপর কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। অন্ধকারে ঘড়ির কাঁটার সবুজ ফসফরাস চকচক করছে! ও বলল, “যে-কোনও সময় বিজন এসে পড়বে। ও খবরটা আনবে লোকটা কখন অফিসার্স ক্লাবে আসে। খবরটা পেলেই আমি গিয়ে দেখা করব আজ।”
“অফিসার্স ক্লাব? মানে?” সতু অবাক হয়ে তাকাল, “কার সঙ্গে দেখা করবি তুই?”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। আবার বুক থেকে জিভ অবধি পুড়ে যাচ্ছে ওর! কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে পাঁজরগুলো গুঁড়িয়ে যাবে!
“কী হল বল!” সতু ঠেলল ওকে।
“বলছি, কিন্তু কাউকে বলবি না।”
“শালা, আমি তোর কোন কথাটা কাকে বলতে গিয়েছি রে? ফালতু কথা বলছিস!” সতু রেগে গেল সামান্য। হাতের বিড়িটা মাটিতে ফেলে হাওয়াই চটি দিয়ে পিষে দিল। যেন বিড়িটা নয়, কাজুকেই পিষল!
কাজু দম নিল একটু। তারপর বলল, “গোড়া ঘরের সঙ্গে দেখা করব আজ, খোদ মালিকের সঙ্গে দেখা করব। সুদর্শন মালিক! বুঝলি?”
“শালা…” সতু হাঁ করে তাকিয়ে রইল কাজুর দিকে। কী বলবে বুঝতে পারল না!
“শোন, বিমলদা, গোপেনদা, সবাই সাইড করছে। এভাবে কিছু হওয়ার নয়। সবাই যে যার ইগো আর ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত! তা হলে আর ইউনিয়ন করে শ্রমিক স্বার্থ দেখব বলে ঢ্যামনামো করা কেন? আমি সতু, নিজের আখের গোছানোর জন্য রাজনীতি করি না। জানি সব জায়গায় আজকাল নিজের আখেরটাই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে! কিন্তু আমি নিজে যেটা কনডেম করি, সেটাই আবার নিজে কী করে করি! আর করবই-বা কেন? সৎ কাজ করার জন্য যখন দেখবি লোকজন বাহবা দিচ্ছে বা সাবধান করে দিচ্ছে, জানবি তখন সমাজ আর দেশের ঘোর দুর্দিন!”
সতু সময় নিল একটু। তারপর বলল, “এখন যা সিচুয়েশন তোর ব্যক্তিগত লাইফে, সেখানে এই সুদর্শন মালিকের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটাকে পারসোনালি নিয়ে নিস না। মানে ওর ছেলের সঙ্গে তো…”
সতু জানত। তবে ওকে জিজ্ঞেস করল কেন? কিন্তু এটা নিয়ে আর কথা বাড়াতে ভাল লাগছে না ওর। ওই নামটাই আর শুনতে ইচ্ছে করছে না। কাজু সামনের দিকে তাকাল। অন্ধকারে জোনাকিরা আলো জ্বালিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোট-ছোট প্রদীপ যেন। অদ্ভুত এক আভা ছড়িয়ে আছে। কিন্তু অন্ধকার কি তাও কাটছে!
ও বলল, “সবটাই পার্সোনাল সতু। জানবি, জীবনে প্রফেশনাল বলে কিছু নেই। পারসোনালি লোকটা কেমন, সেটাই ইমপর্ট্যান্ট।”
“কিন্তু…”
সতু আরও কিছু বলত, তবে তার আগেই, পেছনে একটা শব্দ শোনা গেল। কারও একটা হেঁটে আসার শব্দ! কাজু উঠে ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকার হলেও আবছায়ায় মানুষটার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। ও বুঝল বিজন আসছে!
“কাজুদা,” বিজন সামনে এসে দাঁড়াল। সামান্য হাঁপাচ্ছে ছেলেটা।
“কী রে এসেছে?”
“এসেছে, এই মিনিটদশেক হল… আমি ঢুকতে দেখেই তোমার কাছে এসেছি, সাইকেল আছে আমার, চলো…” বিজন নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে বলল।
“চল,” কাজু এবার সতুর দিকে ঘুরল, “তুই যাবি?”
সতু মাথা নাড়ল, “না, আমার কাজ আছে অন্য। আর তুইও যাস না। শোন, একটা জিনিস ভাব। সুদর্শনের ছেলে যা করছে, সেটা কি লোকটা নিজে জানে না মনে হয়? যাদবকাকা না কে, তার কথায় অত গুরুত্ব দিস না। তুই যে ডাইরেক্ট এসব করছিস, জানলে কিন্তু বিমলদা খচে যাবে! আমাদের রেজিমেন্টেড পার্টি। ঘোড়া টপকে ঘাস খেতে যাস না! বিপদে পড়বি কিন্তু কাজু।”
কাজু বলল, “এই তোর বিপ্লব! ভাগ শালা। চল বিজন।”
সাইকেলটা দাঁড় করানো ছিল জোনাক-বাড়ির মেন গেটের পাশে।
কাজু দেখল পরিতোষ সাইকেল পাহারা দিচ্ছে। কাজু বিরক্ত হল। ছেলেটা কথা শোনে না তো!
ও বলল, “তুই কী করছিস এখানে? তোকে বলেছি না যে, এমন করবি না? তুই ভাল ছেলে। পড়াশোনা কর। এসব করছিস কেন এখন? সবাই এক কাজ করলে মুশকিল! যে যেটা পারে, তার সেটাই করা উচিত! বিজনটা আর কিছু করবে না বলে ঠিক করে নিয়েছে। ওকে বললেও শোনে না। কিন্তু তুই এসবে আসিস না পরিতোষ। বাড়ি যা।”
পরিতোষ কী বলবে বুঝতে পারল না। বিজনের দিকে তাকাল।
“যা বলছি!” এবার জোরে ধমক দিল কাজু। তারপর সাইকেলে উঠে বিজনকে বলল, “তুইও কাট।”
বিজন মাথা নাড়ল জোরে, “আমি যাব তোমার সঙ্গে। একা যাবে কেন তুমি? আর এমন হাওয়াই চটি পরে তোমায় ওই ক্লাবে ঢুকতে দেবে?”
কাজু আর উত্তর দিল না কথার। সাইকেল চালিয়ে দিল। এই বয়সি ছেলেগুলো খুব ডেঁপো হয়! ঢুকতে দেবে কি দেবে না সেটা ওর ব্যাপার! সব কিছু না জেনেই কি ও আর এভাবে দেখা করার কথা ভেবেছে!
সোনাঝুরির মেন রোডে আলো লাগানো হয়েছে। সোজা রাস্তাটা একটা ব্রিজ থেকে নেমে দু’কিলোমিটারের মতো গিয়ে সোনাঝুরি বয়েজ় স্কুলে শেষ হয়েছে।
রাস্তাটা নির্জন। দু’পাশে বড়-বড় গাছ। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, রেন-ট্রি আর পাম গাছ! তার মাঝখানে ছড়ানো মাঠের মধ্যে জুটমিলের কোয়ার্টার, সিনেমা হল, পাম্প হাউজ়, মেস আর ক্যান্টিন!
যদিও রাস্তার আলো ওই মাঠের দূর অবধি পৌঁছয় না, তাই সবটাই কেমন যেন ধোঁয়াটে, অন্ধকার! রহস্যকাহিনির মতো। সাইকেল চালাতে-চালাতে আচমকা কাজুর মনে হল, এই যে এসব করছে ও, তাতে কি সত্যি কিছু হবে! নাকি কিছু হতে পারে! কোনও কিছুর জন্য পরিশ্রম করলেই কি সেটা মানুষ পায়! তা হলে তো সেই হিসেবে দেখলে, পেখমকেও ওর পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হল?
নয়না যখন বলল যে, পেখমের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, পেখম খুব খুশি, তখন তো এই কথাটাই মনে হয়েছিল ওর। মনে হয়েছিল, এই জীবনে সৎভাবে কিছু পাওয়া যায় না! মন দিয়ে চাইলেও কিছু পাওয়া যায় না। ও ভেবেছিল, আজ যদি ও ভাল চাকরি করত, অনেক টাকা রোজগার করত, তা হলে কি এভাবে ওকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারত পেখম! ও তো কোনওদিন লুকোয়নি যে, ও কী! জীবনে কী চায়! তখন তো পেখমের এসবই ভাল লাগত। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে সে সবই খেলাচ্ছল। তাই তো সেদিন পেখম যখন ওকে ডাকছিল ও শোনেনি। কী শুনবে? একরাশ বানানো কথা? নিজেকে অসহায় দেখানোর একপ্রস্থ নাটক! ও নিজে তো যায়নি পেখমের কাছে! পেখমই তো আগ্রহ দেখিয়েছিল! আর এখন…
আঃ, এসব কী ভাবছে! আজকাল সব কথাই কেন এমন করে বাঁক নিয়ে পেখমের কথায় এসে মেশে! সব কিছুই কেন এসে মেশে এমন একটা হাহাকারে! কাজু তো এমন নয়। ওর তো সামনে কত কিছু করার আছে। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কত কী করার আছে। তা হলে এমন কেন করছে? কে না কে একটা মেয়ে, তার জন্য এমন করছে কেন? বেশি গল্পের বই পড়ার ফল কি? এসব ন্যাকামো তো ওর ছিল না কোনওদিন! তা হলে? নিজের ওপর ঘেন্না হল ওর। এতেই এত হতচকিত হয়ে গেল ও! একটা অল্পবয়সি মেয়ের পুতুলখেলা নিয়ে এতটা কষ্ট পেয়ে গেল! তা হলে ও জীবনে যে-পথ বেছেছে সেখানে কী করবে? সেখানে তো পদে-পদে বিপদ আর কষ্ট! সামনে আধো আলো আর আধো অন্ধকার ঢাকা পথের দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করল কাজু। আর এসব নিয়ে কোনওদিন ভাববে না। পেখমের কথা মনে এলে জোর করে মনটা ঘুরিয়ে দেবে অন্য দিকে। ও ভুলে যাবে এমন কোনও একটা মেয়ে এসেছিল ওর জীবনে।
অফিসার্স ক্লাবটা নদীর একপাশে। বেশ বড় আর পুরনো ক্লাব। ব্রিটিশদের তৈরি করা। ঢোকার মুখে বড় গেট। বাগান। তারপর কাঠ আর সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা ক্লাব। অনেকটা প্যাগোডার আকৃতি। পেছনে একটা লম্বা জেটির মতো আছে, যেটা গঙ্গা অবধি টানা চলে গিয়েছে।
সাইকেলটা গেটের একপাশে রেখে দিল কাজু। গেটে আজ কেউ নেই। তবে গেট দিয়ে ঢুকেই ডান দিকের গুমটি ঘরে দু’জন দারোয়ান বসে রয়েছে। বাল্ব জ্বলছে। মাধবকাকাকে দেখা যাচ্ছে। এই ক্লাবের সিনিয়র গেটকিপার। খুব ভাল করে চেনে কাজু। মাধবকাকার দুই নাতনিকে ও এক সময় পড়িয়েছে!
“মাধবকাকা!” গেট দিয়ে ঢুকে সামান্য গলা তুলে ডাকল কাজু।
মাধবকাকা বেরিয়ে এল গুমটি থেকে। সামান্য সময়ের জন্য থমকে গেলেও তারপর খুশি হয়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল কাজুকে!
“আরে মাস্টার তুমি? এখানে? কী ব্যাপার?”
কাজু হাসল, “একটু ভেতরে যাব। একজনের সঙ্গে দরকার আছে। কিন্তু…” বলে নিজের জামাকাপড় আর পায়ের দিকে দেখাল।
মাধবকাকা দেখল সেটা, তারপর মাথা নেড়ে হাসল, “আর্জেন্ট মনে হচ্ছে!”
কাজু কিছু না বলে হাসল।
“যাও, কিছু হবে না, আজ ক্লাব ফাঁকা আছে…” মাধবকাকা হাসল।
কাজু মাথা নেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
মোরামের বাঁকা রাস্তা। দু’পাশে পুরনো ধাঁচের বাতিস্তম্ভ। সবেতেই কলোনিয়াল ছাপ স্পষ্ট। রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে কাঠের রেলিং দেওয়া বড় বারান্দায়। সেখানে কয়েকজন মানুষ বসে মদ্যপান করছে।
সুদর্শন মালিককে কয়েকবার দেখেছে কাজু। ও চেনে মানুষটকে। মোটা চেহারা। খুব ফরসা। আর দু’কানে বড়-বড় লোম আছে!
কাজুকে খুঁজতে হল না। সুদর্শনকে বারান্দার এককোণেই পেয়ে গেল কাজু। একাই বসে রয়েছে মানুষটা। সামনের টেবলে কাচের গেলাস। সঙ্গে মাংসজাতীয় খাবার।
কাজু একটু ইতস্তত করল। তারপর মনটা শক্ত করে এগিয়ে গেল সামনে।
“মিস্টার মালিক?”
সুদর্শন গেলাসটা তুলে চুমুক দিতে যাচ্ছিল। আচমকা ডাকে থমকে গেল। তারপর তাকাল।
এবার কাছ থেকে ভাল করে মানুষটাকে দেখল কাজু। আয়েশি চেহারা। চোখের কোলে ছোট-ছোট থলি। মাথায় পাতলা চুল। জোড়া ভুরু। আর কানের লোমগুলো শজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে আছে। লোকটা জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে।
কাজু বলল, “আমার আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে। ইমপর্ট্যান্ট দরকার। কথা বলা যাবে?”
সুদর্শন চুমুক দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রাখল সামনে। তারপর হাসল। পকেট থেকে রুমাল বের করে নাক মুছে বলল, “তোমরা আমাকে একটুও একা ছাড়বে না, না?”
“দেখুন,” কাজু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল। ও জানে, ওর বয়সটা একটা সমস্যা। কেউ তেমন সিরিয়াসভাবে ওকে নেয় না! তাই ও নিজের গলাটা ভারিক্কি করার চেষ্টা করল, “আমি যে-কাজে এসেছি, তাতে অনেক মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তাই বলছি, আমার কথাটা শুনুন।”
সুদর্শন হাসল এবার। একটা মাংসের টুকরো মুখে পুরে চিবোতে-চিবোতে বলল, “ঠিক আছে। বোসো কাজুবাবু। কথাটা শুনি।”
কাজু থমকে গেল একদম! কাজুবাবু! মানে সুদর্শন ওর নাম জানে! ওকে চেনে? কিন্তু ও তো কোনওদিন সুদর্শনের সামনে যায়নি। প্রথাগতভাবে আলাপ করেনি! তা হলে?
“অত ঘাবড়ানোর কিছু হয়নি!” সুদর্শন এবার খিকখিক করে হাসল, “আমার পেছনে যে আছোলা বাঁশ দেওয়ার জন্য ঘুরছে, তাকে আমি চিনব না! তা ছাড়া, আমার বাড়ির হবু বউমার লাভারকেই-বা না চিনে থাকি কী করে?”
কাজুর পা দুটো দুর্বল লাগল আচমকা! লোকটা ওর সম্বন্ধে এত কিছু জানে! কিন্তু কী করে? ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর ঘাম দিচ্ছে বেশ। বুঝল, মনের মধ্যে জমিয়ে তোলা সাহসটা কোন এক অদৃশ্য ফুটো দিয়ে গলে যাচ্ছে! কাজুর মনে হল লোকটা ওকে কথা শুরুর আগেই দু’গোল দিয়ে দিয়েছে!
ও চোয়াল শক্ত করে নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করল। তারপর চেয়ারটা টেনে বসল সামনে। খেলা শুরুর আগে হার মানার কোনও মানে নেই।
.
২২. নোঈ
ভাঙা গাড়িটার মাথায় এমন করে ফুলগুলো ছড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে কে যেন নরম সবুজ রং মাখিয়ে দিয়েছে। কী ফুল এটা! কেমন একটা অদ্ভুত মিষ্টি ঝিমধরা গন্ধ! নোঈর মনে হল ওর শরীরের সমস্ত রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে গন্ধটা। বিকেল-শেষের বৃষ্টির পরে, সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে ফুলের গন্ধটা অন্য একটা আলো পেয়েছে!
নোঈ দাঁড়িয়ে পড়ল। ভাল করে দেখল গাড়িটাকে। ভাঙা, পুরনো একটা গাড়ি। সামনের লাইট নেই। জং ধরা দরজা। বনেটের সামনেটা কেমন একটু তুবড়েও আছে! তার ওপর ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলো দেখে কী অদ্ভুত লাগল নোঈর! নিঝুম পাড়া। বড় গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা একলা গাড়ি। মাথায় গুঁড়োফুল। ওর মনেই হচ্ছে না এটা কলকাতা।
“খুব সুরিয়াল একটা ব্যাপার না?” পাশ থেকে স্মরণ নরম গলায় বলল।
নোঈ সেই কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী ফুল?”
“এটা?” স্মরণ সামনে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির বনেটের ওপর থেকে একমুঠো ফুল তুলে নিয়ে ওর হাতে রেখে বলল, “ছাতিম! এই বড় গাছটা দ্যাখো। ছাতিম গাছ! কেমন মেলে রাখা একটা ছাতার মতো, না? এই ফুলের গন্ধ খুব স্ট্রং হয়।”
নোঈ ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল। সত্যি, অদ্ভুত দেখতে একটা গাছ! ও গাছপালা খুব একটা চেনে না। কলকাতা শহরের দক্ষিণে গাছপালা উত্তরের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে কোনওদিন এই নিয়ে নোঈ ভাবেনি। কিন্তু আজ এই ফুলগুলো দেখে ওর মনে হল, গাছপালা সম্বন্ধে ও কত কম জানে!
স্মরণ বলল, “ভাবো একবার, এই শহরের দক্ষিণে একসময় ঘন জঙ্গল ছিল! দেখবে মাঝে মাঝে বড় আর বুড়ো কিছু গাছ তুমি দেখতে পাবে কলকাতায়! যেমন ধরো, টালিগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের সামনের যে-ক্রসিং। যেখান থেকে একটা রাস্তা লেক হয়ে গোলপার্কের দিকে বেঁকে গেছে, সেখানে একটা বটগাছ আছে! তারপর গল্ফ গ্রিনের কাছে আছে। লেকেও আছে। কত পুরনো আর বড় সব গাছ! দেখলেই আমার গা ছমছম করে! চোখ বন্ধ করে আমি ভাবি বহু পুরনো সময়ে এই দিকের কলকাতাটা কেমন ছিল! তুমি ভাবো না?”
নোঈ হাসল। মাথা নাড়ল।
স্মরণ চোখ বড় করল। বলল, “প্যাঁও-ও ভাবে না! কেন কে জানে!”
নোঈ হাতের মুঠোয় ধরা ফুলগুলো নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকল। কী অদ্ভুত গন্ধ! ঝিম হয়ে আসে শরীর!
স্মরণ বলল, “এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? আমার বাড়ি যাবে না?”
নোঈ হাসল। কথাটা ঠিক। স্মরণের বাড়ি যাবে বলেই ও এসেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম রবিবার আজ। কিন্তু ওর ছুটি ছিল না। অফিসের কাজে সোনাঝুরি গিয়েছিল। হেড অফিস থেকে বেশ একটা কড়া করে চিঠি এসেছে অফিসে। এতদিন হয়ে গেল, তাও কেন কোনও প্রগ্রেস হয়নি?
কিন্তু নোঈ জানে এতে পুশকিনের কোনও দোষ নেই। আসলে কারও দোষ নেই। মালিক গ্রুপের সম্পত্তি। গোটাটা নিয়ে তারাই ঢিমেতালে এগোচ্ছে। ওদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, আপাতত শুধু মিল ও তার আশপাশের জায়গা বিক্রি করা হবে। জোনাক-বাড়ি এখন বিক্রি করা হবে না।
কিন্তু ওদের কোম্পানির কাছে, জোনাক-বাড়ি ছাড়া জায়গাটার তেমন মূল্য নেই। সোনাঝুরির সবচেয়ে ভাল আর সুন্দর জায়গায় ওই বড় বাড়িটা রয়েছে! ওদের কোম্পানির উদ্দেশ্য তো শুধু ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করা নয়। মিলটাকে বাঁচিয়ে আরও ভালভাবে ব্যাবসা করতে চায় ওরা! আগামীর পৃথিবীতে প্যাকিং-এ ইকো ফ্রেন্ডলি প্যাকেজ হিসেবে জুট খুব প্রয়োজনীয় একটা ভূমিকা পালন করবে। প্লাস্টিকের চেয়ে জুট প্যাকিং-এর দাম বেশি হলেও, জুটের প্যাকিং অনেক টেকসই ও বহুবার ব্যবহার করা যায়। তার সঙ্গে এটা অরগ্যানিক, তাই বায়োডিগ্রেডেবল। সামনের দূষণমুক্ত পৃথিবীতে তাই জুট খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস।
এইসব দিক ভেবেই এই ফ্যাক্টরিকে আবার ভালভাবে চাঙ্গা করে তুলতে চায় ওদের কোম্পানি। কিন্তু সেটা করলেই শুধু হবে না। বিদেশ থেকে লোকজন এসে যাতে ভালভাবে থাকতে পারে এখানে, সেটাও দেখতে হবে। সেই সঙ্গে একটা ট্যুরিজ়মও ডেভেলপ করা যাবে জোনাক-বাড়ি আর ওর পাশের নদীকে কেন্দ্র করে। শুধু মিলটা নিলে তা হবে না।
নোঈর অবাক লেগেছিল। আইকাদিদের কোম্পানি কিন্তু সব কিনে, ভেঙে ফেলে তাতে বাড়িই করবে। তা হলে ওদের ‘রিকো গ্রুপ’-ই বা সেটা করবে না কেন?
কথাটা একদিন অফিসের পরে ও জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিনকে। পুশকিন হেসেছিল কথাটা শুনে। তারপর বলেছিল, “জলসাঘর দেখেছ? সত্যজিৎ রায়ের সেই ছবি?”
“হ্যাঁ, কেন?” নোঈ বুঝতে পারেনি হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন কেন?
পুশকিন বলেছিল, “আমাদের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল। আমাদের ভিশনটা কিন্তু শুধু পয়সা রোজগার করা নয়! সঙ্গে নানা কিছু ডেভেলপ করা। মিলটা রিভাইভ করলে শ্রমিকদের সুরাহা হবে। জোনাক-বাড়িটাকে ফাইভ স্টার হোটেল করে তার পাশের বিশাল বড় জায়গায় থিম পার্ক করে সেখানে ট্যুরিজ়ম ডেভেলপ করলে, সোনাঝুরির অন্য লোকজনও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। আমাদের কোম্পানির প্রেস্টিজ কিন্তু শুধু লাভ করে তৈরি হয়নি। মানুষের ওয়েলফেয়ারটাও আমাদের ভিশনের একটা লক্ষ্য।”
“কিন্তু জলসাঘর কেন বললেন বুঝলাম না।”
পুশকিন হেসে বলেছিল, “ছবি বিশ্বাসের সেই ক্যারেকটারটা, মানে সেই পড়তি জমিদার কী বলেছিল মনে আছে? ওরা পারবে না, কারণ জানো? রক্ত! অনেক মানুষ আছে যারা ওঁচা টাইপ! সারাক্ষণ হাত পেতে থাকে, কাঁদুনি গেয়ে বেড়ায়। কিছু পাওয়ার জন্য ছোঁক ছোঁক করে সব সময়! তেমন কিছু কোম্পানিও আছে এরকম! তাদের কাছে টাকা রোজগারটাই আসল। ক্লাস নয়! এটাই সেই রক্ত! এখনকার ভাষায় ডিএনএ! কারও-কারও রক্তে অমন থাকে। আমাদের কোম্পানির ডিএনএ-টা অমন ছোটলোকদের মতো নয়! বুঝলে? তাই হোমওয়ার্ড-এর লোকজন যা করবে আমরা তা পারব না। আমাদের ইন্টারন্যাশনাল রেপুটেশন আছে। ইউএন-এ আমাদের কথা ওঠে! আমরা ওঁচা কাজ করতে পারি না!”
“কী হল?” স্মরণ নোঈর ব্যাগটা ধরে টানল।
নোঈ লক্ষ করেছে, স্মরণ কখনও ওর গায়ে হাত দেয় না। ও মাঝে মাঝে স্মরণের পিঠে থাপ্পড় মারে, চিমটি কাটে, কান ধরে টানে। কিন্তু স্মরণ কখনও ওর গায়ে হাত দেয় না!
কোলিগ হলেও স্মরণ ওর বন্ধুর মতোই হয়ে গেছে। ও জানে ওর এমন মারধরে স্মরণ কিছু মনে করে না।
নোঈ বলল, “যাচ্ছি। আসলে এমন ফুল আমি আগে দেখিনি। তাই…”
স্মরণ বলল, “আজ তারক চক্কোত্তির কথায় কি তুমি একটু আপসেট?”
নোঈ হাসল। মাথা নেড়ে বলল, “কেন এমন মনে হল?”
স্মরণ বলল, “পুশকিনস্যার যে কেন লোকটার সঙ্গে নিজে দেখা করছে না সেটা বুঝতে পারছি না!”
নোঈ ভাবল, বলে রক্ত, রক্ত, কিন্তু বলল না। বরং হাসল।
স্মরণ নিজেই উত্তর দিল নিজের প্রশ্নের। বলল, “আসলে গোড়া ঘরই যখন ঠিক করতে পারছে না কী করবে, জোনাক-বাড়ি বিক্রি করবে কি করবে না, সেখানে বেকার তারক চক্কোত্তিকে ভাও দিয়ে কী হবে, তাই না?”
নোঈ কিছু বলার আগেই ফোনটা বেজে উঠল ওর। ও ব্যাগ থেকে বের করল মোবাইলটা। আরে, শ্বেতা ফোন করেছে! মেয়েটার বাড়িতে সেই যে নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছিল, তারপর থেকে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চণ্ডীগড় গিয়ে কেমন যেন ভুলে গিয়েছে। সেই মেয়ে হঠাৎ ফোন করল! তাও আবার কলকাতার নাম্বার থেকে? কেন? কী ব্যাপার! ও কি ফিরে এসেছে?
ফোনটা ধরল নোঈ, “আরে, কী খবর তোর?”
শ্বেতা ওদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফোনের মধ্যে দিয়ে। বলল, “আমার কী খবর! বাজে মেয়ে। আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড সেটা ভুলে গিয়েছিস, না?”
নোঈ বলতেই পারত যে, ও বেশ কয়েকবার হোয়াটসঅ্যাপে ওকে পিং করেছে। ই-মেল করেছে। কিন্তু শ্বেতাই ওকে কোনওরকম পাত্তা দেয়নি! উত্তর দেয়নি। কিন্তু এখন সেটা বলল না। ও একটা জিনিস বুঝতে পারছে। জীবনে একটা সময়ের পরে বন্ধুত্বগুলো সব পালটে-পালটে যায়। সেটা নিয়ে সেন্টিমেন্টাল হওয়ার বা মনখারাপ করার কোনও কারণ ও দেখে না। আর সত্যি বলতে কী, এই চাকরিতে জয়েন করে কাজের মধ্যে ডুবে ও ভাল আছে! পুরনো জীবনটা ওকে যে-কষ্ট দিয়েছিল, সেটা আর সহ্য করতে হচ্ছে না!
নোঈ শব্দ করে হাসল। তর্কে যেতে ইচ্ছে করছে না। শ্বেতা নিজের দায়টা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যদি খুশি হয় হোক!
“শোন,” শ্বেতা বলল, “আমার সামনে বিয়ে। সেই জন্য নেমন্তন্ন করতে এসেছিলাম তোদের বাড়িতে। শুনলাম তুই অফিসের কাজে বেরিয়েছিস! আমি নেমন্তন্ন করে বেরিয়ে এসেছি। বাব্বা সানডেতেও কাজ! কী করছিস রে!”
শ্বেতার বিয়ে! সেটা ও এখন জানতে পারছে! ওকে কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করতে এসেছে মেয়েটা! এসব কী! ওর সঙ্গে এমন সম্পর্ক তো ছিল না! নোঈর খারাপ লাগল বেশ। কিন্তু সেটা ও প্রকাশ করল না। কারণ, ও শ্বেতার গলা শুনে বুঝতে পারছে ওর খারাপ লাগল কি ভাল লাগল, তাতে শ্বেতার কিছু যায় আসে না!
“দারুণ!” নোঈ হাসল, “কার সঙ্গে?”
“কেন তুই জানিস না?” শ্বেতার গলাটা কেমন যেন পালটে গেল এবার।
“মানে… ওই ববি?” নোঈ সাবধানে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” শ্বেতা সামান্য থামল, তারপর বাঁকা গলায় বলল, “তোর গা জ্বলে গেল, তাই না?”
“মানে?” নোঈ শ্বেতার গলায় শ্লেষ শুনে কেমন যেন থমকে গেল।
শ্বেতা বলল, “তুই আমার সঙ্গে যা করেছিস, তারপর আমার উচিত ছিল তোকে নেমন্তন্ন না করা!”
“মানে?” নোঈ ঘাবড়ে গেল, “কী বলছিস তুই?”
শ্বেতা বলল, “আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে তুই এটা করতে পেরেছিলি? কেন তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি ভেবে দেখেছিস কখনও? জয় বেঁচে গেছে তোকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে!”
“তুই কী বলছিস?” নোঈ স্থান কাল ভুলে চিৎকার করে উঠল। দেখল, স্মরণ হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে ওকে!
শ্বেতা বলল, “ববি বলেছে আমায়, তুই ওর পেছনে পড়েছিলি!”
“কী!” নোঈ বিহ্বল হয়ে গেল। এটা কী বলছে শ্বেতা!
শ্বেতা বলল, “ববি বলেছে আমায়! ছিঃ। আমি আজ আসতেও চাইনি। ববিই আমায় আসতে বলেছে তোদের বাড়ি। নেমন্তন্ন করতে বলেছে।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। হাত-পা কাঁপছে ওর, চোখ জ্বালা করছে। ববি এসব বলেছে! এ তো বিনা মেঘে বজ্রপাত! এমনও হয়! এতদিন দেখা নেই, যোগাযোগ নেই, সেটা এই কারণে! ববি এমন করে মন বিষিয়ে দিয়েছে শ্বেতার! ববি ওকে কী বলেছিল, শ্বেতা কষ্ট পাবে বলেই শ্বেতার সামনে নোঈ তা কোনওদিন বলেনি। সেখানে ববি এমনটা করতে পারল! কেন করল এমন!
নোঈ বলল, “যা বললি, ভুল বললি। এটাই শুধু বলব। আর একটা কথাও আমি বলব না এ বিষয়ে। আমায় ছোট থেকে এই চিনলি! আর কিছু বলার নেই। আমার হোয়াট্সঅ্যাপে এখনও কিন্তু ববির মেসেজ সেভ করা আছে। চাইলে স্ক্রিন শট পাঠাতে পারি। বাট ক্যান ইউ হ্যান্ডেল দ্যাট? বাই।”
ফোনটা কেটে চোয়াল শক্ত করল নোঈ। চোখের জ্বালাভাবটা আর নেই। বদলে একটা রাগ মাথার ভেতরে পাক খাচ্ছে! স্মরণ ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমার বাড়ি যাবে তা হলে?”
“কেন যাব না?” ফুঁসে উঠল নোঈ, “তোমরা কী ভাবো আমাকে?”
“আমরা?” স্মরণ কী বলবে বুঝতে পারল না।
“নয়তো কী? কেন মনে হল যাব না? কীসের জন্য মনে হল? আমি কি বলেছি যাব না? আমার কথার দাম নেই?” নোঈ ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে থামল।
স্মরণ সময় নিল একটু। তারপর আচমকা ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, “ঘ্যামা লাগছিল কিন্তু! খচে গেলে মাইরি, ডোন্ট মাইন্ড, দারুণ লাগে তোমায়! যে-মেয়েটা ফোন করেছিল তাকে যা ঝাড়লে… সামনে থাকলে বোধহয় কেলিয়েই দিতে, না? এমন একটা ব্র্যান্ডের ঝাঁটা আর ঝাড়ন মার্কেটে আনলে হয় না? ‘নোঈ ঝাড়ন’!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। ছেলেটা এমন করে বলল যে, এত রাগের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল ওর। ও মাথা নাড়ল, তারপর বলল, “শ্বেতা আমার ছোটবেলার বন্ধু। তারপরও ও এমন কথা বলে কী করে? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আমায় এমন করে বলল? বলে ওর বয়ফ্রেন্ডকে আমি নাকি ভাঙিয়ে নিতে চেয়েছি! ভাবতে পারো?”
স্মরণ ভাঙা গাড়িটার গায়ে হেলান দিল এবার। আর-এক মুঠো ফুল হাতে তুলে নিয়ে বলল, “এই দ্যাখো, ঝরা ফুল। গাছ কি আর একে নিজের ফুল ভাবে? ভাবে না! তুমিও ওকে বন্ধু ভেবো না। মানুষের সম্পর্কগুলো এমনই হয়। তারা আসে ঝরে পড়ার জন্যই। এমন করে মনখারাপ করার মানে নেই নোঈ।”
“তোমার সঙ্গে হলে তুমি এমন ফিলজ়ফিকাল হতে পারতে?” নোঈ সোজা তাকাল স্মরণের দিকে।
স্মরণ হাসল। বলল, “আচ্ছা, আমার কথা বাদ দাও। আমি বেশি বকবক করি। প্যাঁও তো তাই রেগে যায় আমার ওপর। শোনো, একটা কথা বলি, মায়ের সামনে কিন্তু প্যাঁও-এর কথা বোলো না। মা এসব জানে না কিন্তু।”
নোঈ রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল, “তুই একটা… সরি… মানে তুমি একটা পাগল।”
“তুইটাই তো ভাল!” স্মরণ হাসল, “আমিও তুই বলি। চল, বাড়ি চল।”
পাড়াটা ছোট। ফাঁকা। পুরনো বাড়িঘর চারিদিকে। কেমন একটা রংচটা ধরনের। কেমন যেন ছোট, মাথা নিচু আর লাজুক! দেখলেই মায়া হয়, এমন।
রাস্তার দু’পাশে বেশ বড়-বড় গাছ। ফুল হয়ে আছে। বড়রাস্তা থেকে বেশ ভেতর দিকে পাড়াটা।
স্মরণ হাঁটতে-হাঁটতে আশপাশের গাছগুলো দেখাচ্ছে আর বলছে কোন গাছটার কী নাম। নোঈ এসব জেনে কী করবে, কে জানে! কিন্তু স্মরণের উৎসাহ দেখে ভাল লাগছে।
ও আশপাশের বাড়ি-ঘরগুলো দেখতে-দেখতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এত গাছ চেনো কী করে?”
স্মরণ বলল, “আরে, আমার বাবা বোটানিস্ট ছিল। সারাক্ষণ গাছপালা নিয়ে থাকত। আমাদের বাড়িটা একতলা, ছোট। কিন্তু দেখবে কতরকমের গাছপালা আছে। বাবার লাগানো সব। এখন যদিও খুব একটা যত্ন করা হয় না। জঙ্গল মতো হয়ে গেছে। তাও মা কাটতে দেয় না।”
নোঈ তাকাল স্মরণের দিকে। ছেলেটা হাসিমুখেই কথা বলছে। কিন্তু তাও কথাগুলোর তলায় একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে!
স্মরণদের বাড়িটা সত্যি ছোট। একটা মুঠোর মধ্যে যেন ধরা যায়। কিন্তু কী মিষ্টি লাগল নোঈর। পাহাড়ি এলাকায় কাঠের ছোট বাড়ি যেমন হয় অনেকটা সেই ধাঁচের বাড়ি, কিন্তু ইট-সিমেন্টের! আর সামনে কত গাছপালা!
স্মরণ বলল, “বাবা কিনেছিল জায়গাটা। নিজেরা ছোটবেলায় চিরকাল খুব ঘিঞ্জি, পুরনো বাড়িতে কষ্ট করে ছিল বলে, নিজে জায়গা কিনে বাড়ি করতে চেয়েছিল! তাই ছোট্ট এই বাড়ি তৈরি করে বাকি জায়গায় গাছ লাগিয়েছিল। ছোট থেকেই বাবা গাছ খুব ভালবাসে! পরিবেশটা ভাল না? তোমায় এই যে জোর করে নিয়ে এলাম, ভাল লাগল না এটা? এখানে একদিন তোমায় জোনাকি দেখাব! দেখবে আমাদের শহরেও কত জোনাকি আছে!”
জোনাকি? এখানে! স্মরণটা পাগল নাকি? নোঈ হাসল।
সোনাঝুরি থেকে এসে নোঈ ভেবেছিল বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু স্মরণই ওকে বলেছিল ওর বাড়িতে আসতে। কেন বাড়িতে আসতে বলেছিল, সেটা বলেনি। কিন্তু জোর করেছিল একরকম। নোঈ প্রথমে একটু আপত্তি করলেও পরে মেনে নিয়েছিল। সবে বিকেল। কী করবে এখন বাড়ি গিয়ে! আজকাল বাড়িতে মা সারাক্ষণ বলে, “বিয়ে কর, বিয়ে কর!” আর আজ তো শ্বেতা এসে ওর বিয়ের কার্ড দিয়ে গেছে। সঙ্গে আরও কী-কী বলে গেছে ভগবান জানে! শ্বেতা যেরকম মুডে ছিল, কিছু বলে গেছে তো নিশ্চিত। তাই ও ভালই করেছে বাড়ি না গিয়ে।
আজ দিনটাই ভাল নয়। একটু আগে শ্বেতার সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেল। তার আগে সোনাঝুরিতে গিয়ে তারক চক্রবর্তীর অসভ্যতার সামনে পড়তে হয়েছিল। এক-একটা দিন যায় যাতে কিছুই ঠিকঠাক হয় না। নিজেকেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে নোঈর। ওকে তো বারণ করেছিল পুশকিন ওখানে যেতে। কিন্তু ও নিজেই জোর করে গিয়েছিল। পুশকিনের কথা শুনলেই হত।
হেডঅফিস থেকে ওইরকম কড়া চিঠি পাওয়ার পরে পুশকিন বেশ চিন্তিত ছিল ক’দিন। সেটা দেখে ভাল লাগেনি নোঈর। পুশকিন ওকে এই চাকরিটা পেতে সাহায্য করেছে, সেটা ভাল করেই ও জানে। সেখানে লোকটাকে হেডঅফিস থেকে একরকম শোকজ় করা হয়েছে দেখে ওর খারাপ লাগছিল।
গত পরশু নিজের চেম্বারে বসে ছিল পুশকিন। তখন দরজা নক করে ঘরে ঢুকেছিল নোঈ।
“কিছু বলবে?” পুশকিন তাকিয়েছিল ওর দিকে। সামনে একগাদা কাগজ খোলা ছিল। পুশকিনকে কেমন এলোমেলো লাগছিল নোঈর। মনে হচ্ছিল গালটা ধরে চুল আঁচড়ে দেয়!
“একটা কথা ছিল, স্যার,” নোঈ সাবধানে বলেছিল কথাটা।
এলোমেলো হলেও পুশকিনকে অন্যদিনের চেয়ে বেশ গম্ভীর লাগছিল! একটা পেপারওয়েট নিয়ে নিজের মনে আস্তে-আস্তে ঘোরাচ্ছিল পুশকিন। “বলো, বসে বলো…” সামনের চেয়ারের দিকে হাত তুলে দেখিয়েছিল পুশকিন।
নোঈ বসে ঠোঁটটা চেটে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে। এলোমেলো চুল, আলগা টাই! ও খেয়াল করেছিল সন্ধেবেলায় পুশকিনের গালটা কেমন গাঢ় নীল হয়ে যায় দাড়ির জন্য! নোঈ দেখেছে পুশকিনের দাড়ি বেশ ঘন।
“ইয়েস!”
“আসলে স্যার, আমি ভাবছিলাম সানডে আমি সোনাঝুরি যাব। তারক চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলতে। স্মরণ গিয়ে সেই যে খবর নিয়ে এসেছিল তারপর তো আমরা আর সেভাবে ফলো আপ করিনি। তাই ভাবছিলাম আমি যাব।”
“গিয়ে?”
“গিয়ে লোকটাকে বোঝাব যে, আমরাও ইন্টারেস্টেড। আইকাদিরাই শুধু ইন্টারেস্টেড, সেকথা ভাবা তো ঠিক নয়!” নোঈ চশমাটা ঠিক করেছিল।
পুশকিন বলেছিল, “লোকটা ঘুষ চায়। জানো, ঘুষ দেওয়া কতটা বিপজ্জনক! না আমি মরালিটির কথা বলছি না। বলছি প্র্যাকটিকাল ব্যাপার। লোকটা ক্যাশ চাইবে। সঙ্গে ফ্ল্যাটও চাইবে। কিন্তু আমরা সেটা দেব কী করে? ট্যাক্সে দেখাব কী করে এত টাকা! আর লোকটাকে সেটা দিলেই যে কাজ হবে, এমনটাও তো নয়! প্লাস আর-একটা সমস্যা আছে!”
“কী সমস্যা?”
“যার জিনিস সেই তো বিক্রি করবে না! তা হলে?”
“তাও স্যার। আমাদের দিক থেকে একটা রিপ্রেজ়েন্টেশন হয়ে থাকা ভাল,” নোঈ সোজা তাকিয়েছিল, “আপনি আমার জন্য এত করেছেন, আমি এটুকু চেষ্টা করব না!”
“আরে!” এবার পুশকিন সোজা হয়ে বসেছিল। হেসেওছিল সামান্য, “বাচ্চা মেয়ের মতো হয়ে গেল না কথাটা? আমি কী করেছি? কিচ্ছু না! তুমি নিজের যোগ্যতায় কাজ পেয়েছ! আর এটা কর্পোরেট সেক্টর! ডোন্ট মেক ইট পারসোনাল।”
নোঈ একগুঁয়ে বাচ্চার মতো বলেছিল, “আমি যাব স্যার, প্লিজ় হ্যাঁ বলুন!”
“আচ্ছা মেয়ে তো! আমি অন্য প্ল্যান ভাবছি।”
“প্লিজ়!” নোঈ তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে।
একটা জিনিস নোঈ বোঝে, পুশকিন ওকে পছন্দ করে। না, এটা ও ভাবতে চায় না। কিন্তু তাও ভেবে ফেলে মাঝে মাঝে। মেয়ে হিসেবে নিজের ইনস্টিংক্টটাকে তো আর অস্বীকার করতে পারে না!
পুশকিনের ওর দিকে তাকানো, হাসি, ওকে ইন্ডাল্জ করা, সবেতেই একটা ভাললাগা মিশে আছে, সেটা বুঝতে পারে নোঈ। আর এটাও বোঝে, পুশকিন সেটা লুকোনোর চেষ্টা করে। অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করে!
নোঈর খারাপ লাগে না, বা সত্যি করে বললে বলা উচিত ভাল লাগে ব্যাপারটা। আর দিনে-দিনে সুড়ঙ্গ কাটার মতো ভাললাগাটা যেন আরও গভীর হচ্ছে! নিজেকে এই নিয়ে বুঝিয়েছে নোঈ। বলেছে এসব ঠিক নয়। কত বড় ওর চেয়ে পুশকিন! একবার বিয়ে হয়ে গেছে! বাড়িতে সবাই অন্যভাবে ওকে চেনে।
কিন্তু মনের আর-একটা দিক ছোট্ট খোঁচা মেরে বলেছে, এসব তো মিডল ক্লাস মেন্টালিটি। কাউকে ভাল লাগলে বয়সের কী কাজ সেখানে! নোঈ বোঝে আমাদের মনের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, যা আমাদের জটিলতার দিকেই টানে! ও বোঝে জটিলতার একটা আলাদা মাধ্যাকর্ষণ আছে! একটা অদ্ভুত চোরা নেশা আছে! যা কিছু ‘ফ্রাউন্ড আপন’, মানুষ সেটার দিকেই কেন কে জানে বেঁকে যায়! ও নিজেও সেই বাঁকের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। টান টের পাচ্ছে! আর অনেকটা সেই টানই ওকে পুশকিনের ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বলে ওর চোরা মনটা বুঝতে পারছিল!
পুশকিন বলেছিল, “স্মরণকে নিয়ে যেয়ো। একা যেয়ো না। আর ডোন্ট এক্সপেক্ট এনি ওভারটাইম। কেমন?”
নোঈ ঘর থেকে বেরোনোর আগে চশমাটা ঠিক করে তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে, তারপর কেটে-কেটে বলেছিল, “আই অ্যাম নট এক্সপেক্টিং এনিথিং।”
“তুমি… মানে তুই এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি?” স্মরণ আবার ব্যাগ ধরে টানল ওকে।
নোঈ বলল, “যাচ্ছি, যাচ্ছি, দাঁড়া। আগে বাগানটা দেখি ভাল করে।”
স্মরণ চোখ গোল করে বলল, “দূর, বাগান আর নেই। জঙ্গল হয়ে গেছে। দেখছিস না কী হয়ে আছে? আমি আর সময় পাই না পরিষ্কার করার। আগে এক মালিকাকু আসত। কিন্তু মাসে তিন হাজার টাকা আর অ্যাফোর্ড করতে পারি না রে। প্লাস ওই যে বললাম, মা কিছু কাটতেও দেয় না!”
ঘন সবুজের একটা গন্ধ থাকে। এই গাছপালার মধ্যে দাঁড়িয়ে সেটা পেল নোঈ। আর কেন কে জানে হঠাৎ পুশকিনের কথা মনে পড়ল। পুশকিন এমনই একটা পারফিউম ব্যবহার করে। কেমন একটা ঘন জঙ্গল মাখা গন্ধ! আজকাল মাঝে মাঝে এই গন্ধটা পায় নোঈ। রাতে নিজের ঘরে বসে, স্নান সেরে বেরোনোর পরে বা আচমকা বৃষ্টি এলে কী করে যেন এই গন্ধটা পায় ও। কেমন একটা করে ওর শরীর। কাঁটা দিয়ে ওঠে! বুকের কাছটা কেমন একটা ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। ও ভাবে এটা কী করে হল! জয় চলে যাওয়ার পরে তো ভেবেছিল আর কোনওদিন কারও জন্য এমন কিছু মনে হবে না ওর। কিন্তু সেখানে এমন হল কী করে? কোন ফাঁক দিয়ে এমন ছোট্ট এই গাছটা বেরোল মাটি ভেদ করে! ওর এও মনে হয়, এটা কোনও রিবাউন্ড নয় তো!
আসলে পুশকিন খুব শান্ত, চুপচাপ ধরনের। রাগ করে না। ভাল করে কথা বলে। আর কেমন একটা একা-একলা মানুষ যেন! পুশকিনকে দেখলে মনে হয়, সব কিছু করছে, কিন্তু তাও যেন কিছু করছে না! সব কিছুতে আছে, কিন্তু যেন কোনও কিছুতেই নেই! এমন একটা মানুষের দিকে কেন টান অনুভব করছে নোঈ! আজকাল পুশকিনের সামনে গেলে ও সচেতন হয়ে পড়ে। মানুষটা কিছুতেই যেন ওর মনের ভাব বুঝতে না পারে!
বাগানের মধ্যে দিয়ে ছোট নুড়ি ফেলা রাস্তা চলে গেছে বাড়ির দিকে। সেই পথে এগোল নোঈ।
বিকেল শেষ হয়ে আসছে। মেঘও করছে আবার। বৃষ্টি নামবে মনে হয়! নুড়িপথ থেকে দু’ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে বারান্দায়। নোঈ বারান্দায় উঠে দেখল দুটো বেতের মোড়া রাখা আছে। সবটাই কেমন একটা ঘন সবুজ ছায়া দিয়ে ঢাকা! বারান্দায় একজন বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে ঝোলানো টবের অর্কিডগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন।
“মা, এই যে নোঈ!” স্মরণ বলল।
“আরে, এসো,” ভদ্রমহিলা পেছন ফিরে হেসে এগিয়ে এলেন।
নোঈ এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল, “কাকিমা, আমি নোঈ!”
“আরে, প্রণাম করতে হবে না!” কাকিমা হাসলেন। নোঈর থুতনি ধরে আলতো করে চুমু খেলেন। বললেন, “বাব্বা, কী সুন্দর দেখতে তোমায়!”
নোঈ লজ্জা পেয়ে গেল। এভাবে কেউ বললে লজ্জা তো করবেই! ও বলল, “সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয় কাকিমা… এসব তো আর কারও হাতে থাকে না!”
স্মরণ বলল, “ঘরে চলো। নোঈর মেজাজ আজ হেভি খারাপ! দুটো ঝামেলা করে এসেছে! বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে আরও রেগে যাবে!”
“ভ্যাট,” নোঈ আলতো করে একটা চড় মারল স্মরণকে, “খালি বাজে কথা!”
স্মরণ চোখ বড় বড় করে বলল, “দেখছ তো, এখনই মারধর শুরু করেছে আমায়। এবার তোমাকেও মারবে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে!”
“তবে রে,” নোঈ ব্যাগটা তুলল, “সারাক্ষণ খালি বাজে কথা!”
কাকিমা নোঈর হাত ধরে বললেন, “চলো, ঘরে চলো। আমাদের ছোট বাড়ি। একটু অসুবিধে হবে!”
স্মরণ বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কেন অসুবিধে হবে? আমাদের এখানে কি ও থাকতে আসছে নাকি! কথা বলো একটা এমন!”
নোঈ হাসল। কিন্তু শহরের মধ্যে এমন একটা বাগানঘেরা বাড়িতে থাকতে পারলে ওর খারাপ লাগত না! ওদের ভবানীপুরের ফ্ল্যাট যেন কেমন কাটাকুটি খেলার ঘরের মতো!
ঘরে ঢুকেই বসার জায়গা। মাটিতে পাতা মোটা গদি। কুশন দিয়ে সাজানো! বারান্দাতেই জুতো খুলে রেখেছিল নোঈ। এবার গদিতে বসে পড়ল। দেখল, স্মরণ ওইখানে ওর পাশে না বসে সামনের একটা ছোট চৌকোমতো গদিতে বসল।
নোঈ মাথা ঘুরিয়ে দেখল ঘরটা। চারিদিকে শুধু বই রাখা! আর নানান মাপের ছোটবড় গাড়ির মডেল সাজানো!
নোঈ জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কার গাড়ি?”
“কেন? আমার!” স্মরণ এমন করে বলল, যেন নোঈ বোকার মতো জিজ্ঞেস করেছে!
“এই বয়সে গাড়ি? কী করিস? খেলিস?”
“খেলব কেন? জমাই! ভিন্টেজ কার্স। দারুণ। সব স্কেল ডাউন ডাই কাস্ট মডেল। পুরো অরিজিনালের মতো!”
নোঈ হাসল, “পাগল কি গাছে ফলে?”
স্মরণ পালটা বলল, “না, ভবানীপুরে ফলে!”
“কেন, আমি কী করলাম?” নোঈ অবাক হল।
“অন্যের অফিসে গিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদে, আবার জিজ্ঞেস করছিস!”
“ভাল হবে না কিন্তু স্মরণ!” নোঈ আবার ব্যাগ তুলল।
“আঃ, বাবু তুই চুপ করবি! নোঈ, তুমি কিছু মনে কোরো না ওর কথায়! আর এমন গাড়ি কিনে কত টাকা যে নষ্ট করে!” কাকিমা মাথা নাড়লেন, “যাই হোক, তোমরা কথা বলো। আমি খাবার নিয়ে আসি।”
“খাবার!” নোঈ অপ্রস্তুত হল, “খাবার কেন?”
“আরে, খাবার কেন মানে? তারক চক্কোত্তি তোমার… ইয়ে তোর মাথা ঘেঁটে দিয়েছে নাকি? নাকি ওই বান্ধবী দিল!” স্মরণ হইহই করে উঠল, “তুমি আনো তো মা!”
কাকিমা চলে যেতেই নোঈ চাপা গলায় বলল, “এভাবে খাওয়া-দাওয়া কেন? আর খালি তারক চক্রবর্তীর কথা তুলছিস কেন?”
“কারণ,” স্মরণ এবার সিরিয়াস গলায় বলল, “লোকটাকে আমি মাথা থেকে বের করতে পারছি না! কেমন করে তাকাচ্ছিল মনে আছে? জানোয়ার পুরো!”
নোঈ চোয়াল শক্ত করল। স্মরণ ঠিক বলেছে! লোকটার যে বাজে দৃষ্টি, লোকটাকে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছিল! এই সব লোকগুলো কেমন একটা ধাঁচের হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন!
লোকটার সামনে বসতেই নোঈর অস্বস্তি লেগেছিল। লোকটা সোজা ওর বুকের দিকে তাকিয়েছিল। আজ জিন্স আর একটা নীল সাদার ডোরাকাটা গোল গলার টিশার্ট পরেছে নোঈ!
ও ব্যাগটাকে বুকে জড়িয়ে বসেছিল।
তারক লোকটার বড়সড় চেহারা। মাথায় বিশাল টাক। কপালে তিলক কাটা। একটা স্টিলের বইয়ের মতো দেখতে কৌটো খুলে জরদা খেয়েছিল সময় নিয়ে। কিন্তু গোটা সময়টা চোখ সরায়নি নোঈর দিক থেকে!
জরদা মুখে পুরে হাতটা চেয়ারের হাতলে রাখা একটা তোয়ালেতে মুছে তারক বলেছিল, “আপনি চাকরি করেন কেন? আপনার তো ফিল্মে নামা উচিত! নিদেনপক্ষে সিরিয়াল! বলেন তো, আমি বলে দিই কাউকে। আমার চেনাজানা আছে।”
স্মরণ মাঝখান থেকে বলেছিল, “আসলে আমরা এসেছিলাম ওই জুট মিল আর…”
“জানি, জানি,” খেঁকিয়ে উঠেছিল তারক, “দেখছ কথা বলছি, অত নাক গলানোর কী আছে!”
নোঈ চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “আমরা ওই কাজেই এসেছিলাম তারকবাবু, পুরো কাজটা…”
তারক এবার হেলান দিয়ে বসেছিল, “ও আপনার বুঝি ফিল্মে নামার ইচ্ছে নেই! ঠিক আছে, তা হলে আর কী বলি?”
“ওই মিলের আর জোনাক-বাড়ির ব্যাপারটা…” নোঈ চেষ্টা করেছিল আবার।
এবার আর আপনি নয়, সোজা তুমিতে নেমে এসেছিল তারক। ঝুঁকে পড়ে বলেছিল, “তোমাদের মতো বাচ্চাদের সঙ্গে আমি এই নিয়ে কথা বলব? তোমাদের ওই পুশকিনবাবু কই? আমি খবর রাখি না ভেবেছ? অন্য যারা কাজ নেবে তারা রেসপন্সিবল লোকজনদের পাঠাচ্ছে! আর তোমাদের অফিস এসব নভিসদের পাঠাচ্ছে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে! আমার মান-সম্মান নেই?”
স্মরণ বলেছিল, “আমি আগেই এসেছিলাম। মোতিবাবুর সঙ্গে কথা বলে গিয়েছি। কিন্তু, মানে একটা গাইডলাইন না পেলে…”
“কীসের গাইডলাইন!” তারক বলেছিল, “গান্ডু নাকি তুমি? এখানে রেট বাঁধা! বুঝেছ? আর সেটা না জেনে এলে আমি কী করতে পারি। প্লাস বড় কাউকে পাঠাও! তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে কলেজ থেকে রিইউনিয়নের চাঁদা চাইতে এসেছ!”
“আপনি একবার কথাটা শুনুন,” নোঈ বলার চেষ্টা করেছিল।
“তুমি তো পার্ট করবে না সিনেমায়, তবে আর কী শুনব। এমন চেহারা নিয়ে এসব বাজে কোম্পানিতে কাজ করছ! কোনও মানে হয়?”
“প্লিজ়, মিস্টার চক্রবর্তী এভাবে বলবেন না,” নোঈ উঠে দাঁড়িয়েছিল।
“তবে কীভাবে বলব? আমার একটা সম্মান নেই? যার-তার সঙ্গে আমি কথা বলব বলে মনে হয়?” তারক চোয়াল শক্ত করেছিল, “সামনের উইকের মধ্যে তোমাদের অফিসের বড় কেউ এসে যোগাযোগ না করলে দেখব তোমরা কী করে এখানে কাজ করো! নাও, এখন কাটো! শালা…”
অপমানে নোঈর মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। এতটা ইতর কেউ কী করে হতে পারে! স্মরণ কিছু বলতে গিয়েছিল। কিন্তু নোঈ স্মরণের হাত ধরে টেনে ওকে ঘর থেকে বের করে এনেছিল! এসব মানুষের সামনে কিছু বলার মানে হয় না! রাগে কষ্টে জল এসে গিয়েছিল ওর চোখে!
স্মরণ বাইরে বেরিয়ে বলেছিল, “কাঁদছ কেন? এভাবে কাঁদতে নেই! বড়রা কাঁদে না!”
“কী হল? এখনও মুড অফ!” স্মরণ সাবধানে জিজ্ঞেস করল!
নোঈ বলল, “জানিস তো আমার এক কাজ়িন দাদা ওখানেই থাকে। নিশান। ও সোনাঝুরিতে পলিটিক্যালি অ্যাক্টিভ। কিন্তু ওকে আমি কিছু বলি না, কারণ ও নিজে এইসব আবাসনের বিরুদ্ধে! কীসব নাকি কমিটি করছে সোনাঝুরিকে বাঁচাবে বলে! তাই ওকে বলেও লাভ হবে না। বরং হিতে বিপরীত হবে!”
স্মরণ বলল, “আমি চিনি ওকে! ম্যাগাজ়িন সূত্রে আলাপ। আর শোন, কাউকে বলার দরকার নেই! নিশান যদিও আমাদের ভুল বুঝছে, তাও এখনই কিছু বলার দরকার নেই। আমরা তো আর সব কিছু ধ্বংস করতে চাইছি না হোমওয়ার্ড বাউন্ডের মতো! আমাদের ভিশনটা আলাদা। তবে নিশান কিছু শুনবে না জানি। ডোন্ট মাইন্ড। ও ভাল ছেলে, কিন্তু হেভি গোঁয়ার! যাকগে। এখন আর মাথা খারাপ করিস না। যা হবে দেখা যাবে। এখন তো লুচি খা! মা যা আলুর দম বানায় না! আর নারকেলের মিষ্টিও বানিয়েছে। ঘ্যামা!”
নোঈ হাসল সামান্য। মাথা নাড়ল, “আর লুচি! আসলে কী জানিস, এক-একটা দিন এমন যায়! আজ আমার খারাপ লাগার দিন!”
স্মরণ দ্রুত একবার রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “প্যাঁও-ও এমন বলে। সত্যি এমন এক-একটা দিন যায়।”
“প্যাঁওকে বাড়িতে আনিসনি এখনও?” নোঈ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
“বাড়িতে?” স্মরণ হেসে বলল, “সবকিছু অত সহজ নয়! আসলে…”
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই টিং টং শব্দে ডোরবেলটা বেজে উঠল! স্মরণ চমকে উঠল একটু, “এখন আবার কে!”
নোঈ দেখল কাকিমাও রান্নাঘর থেকে মুখ বের করে উঁকি মারছেন।
স্মরণ উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। নোঈ বসেই দেখতে পেল লোকটাকে।
আসলে লোক নয়, একটা ছেলে। বেশ লম্বা। ভাল চেহারা! একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরা। পায়ে সাধারণ একটা চটি।
স্মরণ চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাইছেন?”
ছেলেটা নরম গলায় বলল, “আপনাদেরই চাইছি।”
“আমাদের? মানে?” স্মরণ যে সামান্য ঘাবড়ে গেছে, সেটা ওর গলার স্বরেই বুঝতে পারল।
ছেলেটা বলল, “আমি আপনাদের কাছে বলতে পারেন একজনের হয়ে এসেছি। সোনাঝুরির কাজের ব্যাপারে এসেছি!”
“সোনাঝুরি?” নোঈ এবার উঠে গিয়ে দাঁড়াল স্মরণের পাশে!
ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ। দরকারি কাজ। একটু যদি শোনেন আপনাদের ক্ষতি হবে না।”
নোঈ অবাক হল, “কোথা থেকে আসছেন? কে আপনি?”
ছেলেটা সময় নিল একটু। তারপর নরম স্বরে বলল, “আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি। আমার নাম মাহির।”
.
২৩. নিশান
বৃষ্টিতে আজ চারিদিক আবছা হয়ে আছে। পাঁচ হাত দূরের জিনিসও এখন দেখা যাচ্ছে না! তাও সাইকেল চালাতে বেশ মজা লাগছে নিশানের।
বর্ষাকাল খুব পছন্দ ওর! কেমন একটা ঘন রং হয়ে যায় সব কিছুর। জল যেন সমস্ত পৃথিবীর ভেতর থেকে একটা ডার্কার শেড বের করে আনে।
বাঁধের রাস্তাটায় উঠে সাইকেল চালানোই দায় হয়ে উঠছে। ও গায়ে মোটা বর্ষাতি পরে থাকলেও মুখটা তো খোলা। মুখ বেয়ে গলার কাছ অবধি জল চলে যাচ্ছে। বারবার চোখ আর ভুরুর ওপর থেকে জল সরাতে হচ্ছে। অন্য কেউ হলে এই বৃষ্টিতে নিশান আসত না, কিন্তু মেঘলার জন্মদিন আজ! না এলে পাগলিটা খুব রাগ করবে। কষ্টও পাবে! মেঘলার প্রতি একটা অদ্ভুত মায়া আছে নিশানের।
নিশান সাইকেল থেকে নেমে পড়ল এবার। বৃষ্টির আলপিন তেরছাভাবে এসে মুখে ফুটছে। এভাবে সাইকেল চালানো যায় না!
সাইকেল হাঁটিয়ে-হাঁটিয়ে নিশান এগোতে লাগল সামনের দিকে। বর্ষাতির তলায় পিঠে ব্যাগ আছে ওর। মেঘলার জন্য উপহার আছে ওতে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মা বারণ করছিল আসতে। কিন্তু নিশান শোনেনি। আসলে নিশান কারও কথাই খুব একটা শোনে না। আজকাল বাবাও তাই কথা বলা একরকম বন্ধ করে দিয়েছে। খুব দরকার না পড়লে বাবা আর নিশান দু’জন দু’জনকে এড়িয়েই চলে। কারণ, কথা হলেই ঝগড়া হয়। এই যেমন গতকাল রাতেই খেতে বসে হয়েছে একচোট।
অন্য দিন বাবা দশটার মধ্যে খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে নিশান দেখেছিল খাওয়ার ঘরে মায়ের সঙ্গে বাবাও বসে রয়েছে!
নিশানের এমনিতে বাড়ি ফিরতে রাত এগারোটা হয়। কিন্তু গতকাল আরও রাত হয়ে গিয়েছিল। ওরা যে একটা মঞ্চ তৈরি করেছে, ‘সেভ সোনাঝুরি’, তার কিছু লিফলেট আর ব্যানার তৈরির কাজ ছিল। বাড়িতে ঢুকে অত রাতে বাবাকে বসে থাকতে দেখে ও অবাকই হয়েছিল।
ও ঘরে ঢুকতেই মা বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “এইমাত্র এল ছেলেটা, এখনই কিছু বোলো না।”
“এখন বলব না?” বাবা যে খুব রেগে আছে, সেটা গলার আওয়াজ শুনেই বুঝে গিয়েছিল নিশান।
ও আর নিজের ঘরের দিকে না গিয়ে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসে তাকিয়েছিল বাবার দিকে। যা শোনার এখনই শুনে নেওয়া ভাল!
নিশান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার হার্টের সমস্যা, এই রাত বারোটার সময় জেগে আছ কেন?”
বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “আমি মরি কি বাঁচি, তাতে তোর আগ্রহ আছে?”
“কী হয়েছে?” নিশান টেবিলে আঙুল দিয়ে দাগ কাটতে-কাটতে বলেছিল, “এমন করে বলছ কেন?”
বাবা উত্তেজিত গলায় বলেছিল, “তুই কী পেয়েছিস? এভাবে কি তোর জীবন যাবে? আমার ব্যাবসাটা কার জন্য করেছি? আর কতদিন এভাবে সমাজসেবা চলবে?”
“কী হয়েছে বলবে তো?” নিশান বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা শুধু ওর নিজেদের ব্যাবসায় মন না দেওয়ায় আটকে নেই। অন্য কিছু ঘটেছে!
বাবা উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার, “সোনাঝুরি কি তোর একার জায়গা! যে যা করছে করুক, তুই কেন তার মধ্যে নাক গলাচ্ছিস? যাদের জুটমিল, যাদের জোনাক-বাড়ি তাদের ভাবতে দে না। তুই কেন এর মধ্যে থাকছিস? নিজের বড়মামার রক্তটা পেয়েছিস?”
“আরে, কী হল!” নিশান অবাক হয়ে গিয়েছিল। বড়মামা মানে সত্যেন মিত্র। নকশালের সময় খুন হয়ে গিয়েছিলেন। সোনাঝুরিতে সতু বললে একসময় সবাই চিনত। সতুমামার গল্পই শুধু ও শুনেছে। কারণ, চার ভাই আর দু’বোনের মধ্যে মা সবচেয়ে ছোট। সতুমামা যখন মারা যান তখন মা অনেক ছোট ছিল! কিন্তু পরিবারের মধ্যে এখনও সতুমামার কথা আলোচনা হয়। বলা হয়, কীভাবে সতু রাজনীতিতে ঢুকে নিজের জীবন নষ্ট করে ফেলেছিল!
কিন্তু সেই সতুমামার কথা বাবা তুলল কেন? নিশান এবার সামান্য শক্ত গলায় বলেছিল, “কী হয়েছে বলো তো! কেউ কিছু বলেছে তোমায়?”
“কেন, বললে কী করবি? তাদের গলা কাটবি?” বাবা পায়চারি করতে-করতে তাকিয়েছিল নিশানের দিকে।
“কে কী বলেছে তোমায়? আমি কী করব, সেটা কি অন্য লোকে ঠিক করে দেবে?”
“মরতে চাস তুই?” বাবা সামনে এসে আচমকা চিৎকার করে উঠেছিল।
“বাবা আস্তে!” নিশান চাপা গলায় বলেছিল, “অনেক রাত হয়েছে। আশপাশের লোকজন শুনতে পাবে। কী হয়েছে তোমার?”
“তুই ওই তারক গুন্ডার সঙ্গে লাগতে গিয়েছিস? তোকে তো মেরে পুঁতে দেবে! আমায় আজ শয়তানটা ধরেছিল রাস্তায়। নিজের গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল আমায় দেখে। বলে, নিজের ছেলেকে সামলান। উন্নয়নে বাধা দিলে ওকে কিন্তু আর খুঁজে পাওয়া যাবে না! কে বলেছে তোকে উন্নয়নে বাধা দিতে? নিজেকে কী ভাবিস তুই?
নিশান তাকিয়েছিল বাবার দিকে। ফরসা মানুষ, লাল হয়ে গিয়েছে! কাঁপছে থরথর করে। ও বুঝতে পারছিল খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে বাবা! ওরও ভয় হয়েছিল। বাবার না আবার শরীর খারাপ করে!
নিশান বলেছিল, “তুমি ভয় পেয়ো না বাবা। কিছু হবে না। এভাবে কেউ এসে আমাদের হেরিটেজ নষ্ট করবে! মিল বন্ধ করে দিয়ে যাবে! এটা হতে পারে না। এতগুলো লোকের কী হবে? আর তার ওপর লোকটা তো দালালি করে মোটা টাকা কামাবে। এতগুলো মানুষকে শেষ করে ও নিজে টাকা রোজগার করবে? জানোয়ার ছাড়া এমন কেউ করে? এটা আমার সামনে দিয়ে হবে, আর আমি কিছু বলব না?”
“না, বলবি না! কে বলতে বলেছে তোকে এসব কথা!” বাবা গলা নামায়নি একটুও, “আমি চাই না তুই এসব করিস। আজ তারক এভাবে বলছে। কাল যদি কিছু করে? রাতবিরেতে বাড়ি ফিরিস তুই। কিছু হলে আমার আর তোর মায়ের কী হবে? নিজের কথাটাই শুধু ভাবছিস?”
নিশান সোজা তাকিয়েছিল বাবার দিকে। তারপর বলেছিল, “আর, মানুষগুলোর কী হবে? কঠিন সময়ে সবাই যদি পালায় তবে দাঁড়াবেটা কে? কেন সবকিছু আমাদের মুখ বুজে মেনে নিতে হবে? উন্নয়নের নামে কেউ যদি মানুষের ক্ষতি করে! নিজের পকেট ভরে! সেসব মেনে নিতে হবে? কেউ কিছু না বললে তো এবার বাকি সোনাঝুরিটাও নিলাম করে দেবে এই লোকগুলো! কারখানা বন্ধ করে হাউজ়িং হচ্ছে! বড় লোকেদের ইনভেস্টমেন্টের জায়গা এইসব ফ্ল্যাট। ক’জন থাকবে এখানে এসে? সব কিনে ফেলে রাখবে। বছরে কয়েকদিন আসবে মাত্র। আর ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা কী করবে? কোন কাজ করবে? মাঠের ঘাস কাটবে? দরোয়ানের পোশাক পরে সামান্য মাইনে নেবে? আর নিজের কথা কি সত্যি আমিই শুধু ভাবছি বাবা?”
“তুই… তুই… আমায় জ্ঞান দিচ্ছিস? তুই…” বাবা কথা খুঁজে না পেয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। তারপর মাকে উদ্দেশ করে বলেছিল, “তোমার ছেলেকে এসব করতে বারণ করে দাও। আমি কিন্তু এসব বরদাস্ত করব না। কেউ রাস্তায় সবার সামনে আমায় অপমান করবে, এসব কিন্তু আমি মেনে নেব না বলে দিলাম!”
বাবা দুদ্দাড় করে পা দাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিল। নিশান কী বলবে বুঝতে পারছিল না। নিঝুম রাত যেন আরও চেপে বসছিল চারিদিকে। দূরে ঝিঁঝি ডাকছিল। পাশের পুকুর থেকে কোলাব্যাঙের আওয়াজ রাতটাকে আরও যেন নিশুত করে দিচ্ছিল!
মা বলেছিল, “তুই এমন কেন? আমাদের কথা একবারও তোর মনে পড়ে না!”
নিশান বলেছিল, “কেন, বাবা তো বলেই গেল। সতুমামার রক্ত! মা, আর ভাল লাগছে না। খিদে পেয়েছে। বিজনদার সঙ্গে সেই মুড়ি আর তেলেভাজা খেয়েছিলাম কখন। খেতে দেবে?”
মা খেতে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সারাটা সময় গজগজ করে গিয়েছিল!
আজও সারাক্ষণ মা, বাবার কথাগুলোকেই নানাভাবে বলে যাচ্ছিল। নিশান খুব-একটা গা করেনি। বরং নিজের ঘরে বসে রাধিয়ার সঙ্গে মেসেজে কথা বলছিল!
মা ভেবেছিল গতকালের বকুনির পরে হয়তো নিশানের সুমতি হয়েছে, তাই বেরোয়নি সকালে। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে, দুপুরে এই বাদলার মধ্যে বেরিয়ে যাবে ও!
রাধিয়াও ওকে বারণ করছিল এই ঝড়বৃষ্টিতে বেরোতে, কিন্তু আজ রাধিয়ার কথাও শোনেনি! রাধিয়া কি তাতে রেগে গেছে! কে জানে! রাধিয়া ওকে ভুল বুঝলে বা রেগে গেলে খুব খারাপ লাগবে নিশানের।
বাঁধের ওপর থেকে রাস্তাটা নেমে গেছে ঢালু হয়ে। রাস্তার দু’দিকে ঘন ঝোপঝাড়! তার মধ্য দিয়ে মেঘলাদের বাড়িটা দেখতে পাচ্ছে নিশান।
সাইকেলটা ঠেলতে-ঠেলতে ও বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ছড়ানো উঠোনে জল থইথই করছে! জায়গা দেখে, সামনের বড় চাঁপাগাছের পাশে সাইকেলটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে বারান্দায় উঠল ও।
“কে?” মেঘলার গলা পেল নিশান।
“আমি রে!” নিশান গায়ের বর্ষাতিটা খুলে জল ঝেড়ে বারান্দার পাশে একটা কাঠের ছোট আংটায় ঝুলিয়ে দিল। তারপর হাত দিয়ে মাথা আর গায়ের সামান্য জলের কুচি সরিয়ে দিয়ে দাঁড়াল ঘরের সামনে! পাপোশটা সরে গেছে। সেটা পা দিয়ে টেনে তাতে পা মুছে ও ঘরে ঢুকল। সামান্য ঠান্ডা লাগছে!
“কী রে, কাকিমা নেই?”
“আমি আছি, এতে হবে না?” মেঘলার গলায় রাগ।
“আরে!” নিশান হাসল। পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে রাখল বিছানায়। তারপর বসল মেঘলার পাশে।
“কী আরে!” মেঘলা অভিমানী গলায় বলল, “খালি এর কথা, ওর কথা! আজকাল তো আসোও না! কেন এমন হয়ে গেলে তুমি নিশানদা!”
“আমি আবার কী হলাম!” নিশান ব্যাগের চেন খুলে একটা বড় প্যাকেট বের করল। তারপর ব্যাগটা নামিয়ে রাখল মাটিতে।
রাধিয়ার সঙ্গে গিয়ে কিনেছে এটা। একটা জামা আছে এতে। সঙ্গে ভাল একটা মিউজিক সিস্টেম!
“এই যে আর আসো না! আমি কেমন আছি আর জানতে চাও না। আজ মা জোর করে নেমন্তন্ন করল বলেই তো এলে, তাই না? না হলে কি আসতে?”
“কী হয়েছে তোর মেঘলা?” নিশান ওর দিকে ঘুরে বসল, “কী বলছিস? আজ তোর জন্মদিন না! এমন মনখারাপের কথা কেউ বলে? এমন করিস না। এই দ্যাখ তো, আমি যদি তোর কথা না ভাবি, তা হলে এই ওয়েদারে কেন আসব জল-কাদা ভেঙে? এই দেখ কী এনেছি তোর জন্য!”
“লাগবে না যাও, কিচ্ছু লাগবে না আমার! তুমি ভিক্ষে দিতে এসেছ?” মেঘলা আচমকা ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে এগোতে গেল দরজার দিকে। কিন্তু ওর পায়ের কাছে রাখা নিশানের রাখা ব্যাগটায় বাধা পেয়ে নিজে টাল সামলাতে পারল না।
নিশান দ্রুত প্যাকেটটা বিছানায় রেখে ধরে ফেলল মেঘলাকে। মেয়েটা আর-একটু হলেই পড়ে যেত মাটিতে!
মেঘলা ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেল একটু। নিশান ওকে নিজের বুকের কাছে ধরে রেখেছে। ও-ও নিশানের পাঞ্জাবির বুকের কাছটা ধরে রয়েছে খামচে।
নিশান দেখল মেঘলার চোখে জল।
“আরে, তুই কাঁদছিস?”
নিশান হেসে ব্যাপারটাকে হালকা করতে গেল। কিন্তু আচমকা মেঘলা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর দু’হাতে নিশানকে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে নিল নিজের দিকে। আর নিখুঁত আন্দাজে নিশানের ঠোঁটটায় চেপে ধরল ওর ঠোঁট!
নিশান হতভম্ব হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য! এটা কী হচ্ছে? মেঘলা হঠাৎ এটা কী করছে? তারপরেই ওর হুঁশ ফিরল। মেঘলাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল জোরে। কিন্তু পারল না। বরং মেঘলা যেন আরও ঘন হয়ে, আরও জোরে চেপে ধরল ওকে!
মেঘলার গরম জিভ ওর ঠোঁট ফাঁক করে মুখের ভেতরে ঢুকতে চাইছে! মেঘলা দুটো হাত দিয়ে নিজের সঙ্গে পিষে ফেলতে চাইছে নিশানকে! নিশান কী করবে বুঝতে পারল না। মেঘলা যেন নিশানের সমস্ত সত্তাকে নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিতে চাইছে নিজের মধ্যে। কামড়ে ধরছে ওর ঠোঁট! নিজের বুক দুটো চেপে ঘষছে নিশানের বুকের সঙ্গে!
“আঃ!” ব্যথায় চিৎকার করে এবার নিশান গায়ের জোরে মেঘলাকে ঠেলে সরিয়ে দিল। মেঘলা সরল বটে, কিন্তু তাতে খুব একটা দূরে ছিটকে গেল না। বরং আবার সামনে ঝুঁকে দু’বারের চেষ্টায় চেপে ধরল নিশানের হাত। তারপর সটান নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে বলল, “আমি কি কিছু কম? নিশানদা, আমি চোখে দেখি না বলে আমার কি কিছু নেই! আমি কি কিছু দিতে পারি না তোমায়?”
নিশান এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ছিটকে গেল পেছনে। বলল, “কী করছিস তুই? পাগল হয়ে গেলি নাকি?”
“কেন, পাগল কেন? বাড়িতে মা নেই। দাদাও না। আমার ইচ্ছে করে না তোমায় আদর করতে! তুমি বোঝো না! আমিও তো মানুষ না কি! আমার চোখ নেই বলে কি ইচ্ছে থাকতে নেই!” মেঘলার গলার স্বর রাগ থেকে আচমকা কান্নায় ডুবে গেল এবার। ও দু’হাতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল বিছানায়!
নিশান কী করবে বুঝতে পারল না। মেয়েটা বিছানায় শুয়ে উপুড় হয়ে কাঁদছে। ফুলে-ফুলে উঠছে পিঠটা। ওর কী করা উচিত? পাশে বসে মাথায় হাত দেবে? তাতে যদি আবার রাগ করে? বা যদি আবার ওরকম করে?
নিশানের ঠোঁটটা এখনও ব্যথা হয়ে আছে! মনটা কেমন খাদে-পড়ে-যাওয়া বাসের মতো উলটে আছে! মনে হচ্ছে দৌড়ে পালিয়ে যায় এখান থেকে! কিন্তু সেটা যে সম্ভব নয়, বুঝতে পারছে। মেয়েটা এমন করল কেন!
এই জটিল প্রেম-ভালবাসা-যৌনতাগুলো সব কিছু নষ্ট করে দেয়। যার সঙ্গে মনের সম্পর্ক আছে তাকে আদর করতে নিশানের অসুবিধে হয় না। কিন্তু এভাবে যাকে ওই চোখে কোনওদিনও দেখেনি, যাকে ওইভাবে ভাবেনি, তার সঙ্গে কী করে ও এমন একটা সম্পর্কে জড়ায়! ও জানে এমন মানুষজন আছে যারা মন-টন বোঝে না! শরীর হলেই তাদের হয়। কিন্তু নিশান সে দলে পড়ে না। বরং ওর এখন খুব কষ্টও হচ্ছে! ও মনে মনে রাধিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সেখানে অন্য একটা মেয়ে ওকে এভাবে ধরে ফেলল! ঠোঁটে কামড়ে ধরল! এতে কোথাও কি রাধিয়ার বিশ্বাসটা ভাঙল ও!
নিশান জানে এভাবে হয়তো এখনকার ছেলেমেয়েরা কেউ ভাবে না। কিন্তু ও কী করবে! সবার ভ্যালু সিস্টেম তো একরকম নয়! ওর এইসব ব্যাপারে খুব একটা পিউরিটান মনোভাব আছে। কেন আছে জানে না। এখন ওর বারবার রাধিয়ার মুখটা মনে পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, রাধিয়াকেও তো কিছু বলেনি ও। এখনও ওর মনের ইচ্ছেটা, ফিলিংসটা নিয়ে কিছু বলেনি! শুধু বন্ধুত্বটুকু হয়ে আছে! তাও নিজের মনের কাছে কী করে মিথ্যে বলে নিশান!
নিশান নিজের মনকে শক্ত করল। তারপর ধীরে-ধীরে বসল বিছানার একপাশে। বলল, “এমন করতে নেই মেঘলা। এভাবে বলতে নেই!”
“কেন?” মেঘলা উঠে বসল এবার। পাথরের মতো চোখ দুটো থিরথির করে কাঁপছে, “কেন হয় না নিশানদা? আমি অন্ধ বলে?”
“না রে পাগলি না,” মেঘলার গলায় এমন একটা অসহায়তা ছিল যে, নিশানের চোখে জল এসে গেল, “আমি তোকে ওভাবে দেখি না রে! তোকে সেই ছোট থেকে দেখছি। আর তুই… তুই এমন কেন করলি?”
“আমি তোমায় ভালবাসি নিশানদা। বোঝো না কেন তুমি? আমি তোমায়… সব দিতে চাই নিশানদা…”
“কী বলছিস তুই?” নিশান মেঘলার গলার ওপর গলা তুলে ওকে চুপ করিয়ে দিতে চাইল।
মেঘলা নিজেকে সংযত করল এবার। তারপর বলল, “আমি জানি আমার এই অবস্থার জন্য কোনওদিন তুমি আমায় ভালবাসতে পারবে না। ছেলেরা মুখেই বড়-বড় কথা বলে, কিন্তু আসলে সবাই বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো বউ আর প্রেমিকা চায়! তোমারও নিশ্চয়ই তেমন কোনও প্রেমিকা আছে! তাই না? কিন্তু আমি তো তোমায় ভালবাসি, আমি থাকব তোমার জন্য। কখনও যদি তোমার মনে হয়, তুমি এসো। আমি আমার সবটা তোমায় দেব। না, পরিবর্তে কিছু চাই না।”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। আসলে কিছু বলার নেই ওর। মেঘলা মনে মনে এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছে যে, ওকে কিছু বলার কোনও মানে নেই এখন। যে সত্যিকারের প্রেমে পড়ে তার কাছে জীবনের, বাস্তবের, ঠিক-ভুলের পারসেপশনগুলো বদলে যায়। তার যুক্তি, বুদ্ধি, তথাকথিত রোজকার পৃথিবীর যুক্তি, বুদ্ধির সঙ্গে খাপ খায় না আর!
“কী চাস না রে?”
আচমকা পেছন থেকে কাকিমার গলা পেয়ে নিশান চমকে উঠল। ওর মনে হল হৃৎপিণ্ডটা বোধহয় এবার মুখ দিয়ে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
“কী রে! কী বলছিস তুই?” কাকিমা ঘরে ঢুকল। নিশান দেখল কাকিমার সঙ্গে বাদলও এসে ঘরে ঢুকেছে!
মেঘলা চোখ মুছে বলল, “বলছি, আমার কিছু চাই না নিশানদার কাছ থেকে। নিজে আসে না, আর আজ এসেছে গিফট নিয়ে! মানুষের চেয়ে জিনিস দামি নাকি? তাই বলেছি এসব যেন নিয়ে যায়!”
“আরে…” নিশান অপ্রস্তুতভাবে হাসল। মেয়েটা কথাটা ঠিক ঘুরিয়ে দিল তো! ও বলল, “তাই কি হয় নাকি? ওভাবে হয় না। আমি নিয়ে এসেছি, তোকে নিতেই হবে! আমি তোকে ভালবেসে…”
“ছাড়ো তো!” মেঘলা রাগে গরগর করে উঠল, “ভালবেসে… বাজে কথা যত!”
“আহা, তুই ওকে অমন করে কথা বলছিস কেন?” কাকিমা শাসনের গলায় বলল, “চল ও ঘরে। স্নান করে নিবি, চল।”
মেঘলা উঠল বিছানা থেকে, তারপর আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে-ধীরে চলে গেল পাশের ঘরে।
নিশান যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ যা হল সেটা কি সত্যি হয়েছিল? মেঘলা এমন করবে বুঝতে পারেনি! এরপর থেকে এখানে আসার আগে ওকে ভেবে দেখতে হবে!
“কী এনেছিস এটা?” বাদল ঝুঁকে বিছানায় রাখা গিফটের প্যাকেটটা তুলে নিল হাতে।
“ওই আর কী…” নিশান হাসার চেষ্টা করল, “তা কোথায় গিয়েছিলি তোরা?”
“কাছেই। পাড়ার এক দাদু। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হল। আমায় ডাকল। শুনে মা-ও গেল। মা, কাকাবাবু বলে ডাকত। আরে দেখ না, অ্যাম্বুলেন্স আসতে চাইছিল না। আমাকে তাই ডেকেছিল।”
“তোকে? কেন?” নিশান অবাক হল।
বাদল হাসল, “আরে, তুই জানিস না? তুই তো আর কিছু কাজ দেখে দিলি না। তাই আমি গিয়ে ধরলাম তারকদাকে। আমি এখন তারকদার সঙ্গে আছি। সেই কারণেই ডেকেছিল আমায়। তো, দাদুর ওখানে গিয়ে আমি নিজেই ফোন করলাম তারকদার ওই রাইট হ্যান্ড মোতিদাকে। ব্যস, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হয়ে গেল। তা, তুই খেয়ে যাবি তো? একটু বোস, আমি আসছি।”
নিশানের উত্তর না শুনেই বেরিয়ে গেল বাদল। নিশান ঘড়ি দেখল। দেড়টা বাজে। একটা ফোন আসার কথা আছে। মণীশটা ঠিকমতো কাজটা করছে তো! চিন্তা হল ওর। ছেলেটাকে ব্যাপারটা বলে কোনও ভুল করেনি তো! নিশান নিজেকে ঠিক করতে চোখ বন্ধ করল। আর সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা।
সেদিন ঝড় উঠেছিল খুব। নন্দন চত্বরে হাওয়ায় কুটো উড়ছিল ভীষণ! একটা ঝড়ের কুটো এসে লেপটে গিয়েছিল রাধিয়ার গালে। এমন তো করে না নিশান! কিন্তু সেদিন কী যে হয়েছিল ওর! আচমকা হাত বাড়িয়ে রাধিয়ার গালে লেপটে থাকা ঝড়ের কুটো সরিয়ে দিয়েছিল ও। আর অবাক হয়ে দেখেছিল রাধিয়া মাথা নামিয়ে ঝরঝর করে কাঁদছে!
“আরে, কী হল?” নিশান আর-একটু কাছে এগিয়ে গিয়েছিল।
রাধিয়া সময় নিয়েছিল। আর সেই সু্যোগে ঝড়টাও যেন আছড়ে পড়েছিল কলকাতায়। সবাই এদিক-ওদিক দৌড়োচ্ছিল মাথা বাঁচাতে। নিশানও রাধিয়ার হাতটা ধরে সামান্য দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা ছাউনির তলায়।
“কী হয়েছে তোমার?” নিশান যেন কীসের এক অদৃশ্য জোরে তুমি করে বলে ফেলেছিল কথাটা।
“আমার… আমার…” রাধিয়া কথা বলতে পারছিল না ভাল করে। হাওয়া এসে উড়িয়ে নিচ্ছিল ওর চুল। জলের ছিটে এসে হিরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছিল ওর চুলে, মুখে।
“আমি কিছু হেল্প করতে পারি?” নিশানের ঠোঁট শুকিয়ে আসছিল। বুকের ভেতর কেমন যেন এক ঘূর্ণি শুরু হয়েছিল। ওর মনে হচ্ছিল রাধিয়াকে জড়িয়ে ধরে, সবার কাছ থেকে, সব কিছু থেকে লুকিয়ে রাখে!
রাধিয়া নিজেকে সামলেছিল এরপর। হাতে ধরা রুমালটা দিয়ে চোখ আর নাক মুছেছিল আলতো করে। তারপর বলেছিল, “আই অ্যাম সরি।”
“কিছু হয়েছে কি? আমায় বলতে পারো,” আশ্বাসের গলায় বলেছিল নিশান।
“পারি?” দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল রাধিয়া, “আসলে… মানে…”
“তবে থাক। ব্যক্তিগত কিছু হলে লেট ইট বি,” নিশান হেসে পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করেছিল।
“আসলে,” রাধিয়া ঠোঁট কামড়ে ভেবেছিল একটু, “আমার কাউকে এই ব্যাপারটা নিয়ে বলার নেই। কিন্তু… আমি কি তোমায় বিশ্বাস করতে পারি?”
নিশান এবার চওড়া করে হেসেছিল, “শোনো, বিশ্বাস ব্যাপারটা সেই ছবি বিশ্বাসের আমলেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই ওটা ভেবো না। আমি এমন কিছু করব না যাতে তোমার ক্ষতি হয়। ইচ্ছে হলে বলতে পারো আমায়।”
নিশান কথা বলার সময় রাধিয়ার চোখ থেকে চোখ সরাচ্ছিল না একটুও। দেখছিল ওর ‘তুমি’ বলাটা রাধিয়া ভালভাবেই নিয়েছে। আর নিজেও ‘তুমি’ করেই কথা বলছে!
“আমার বাবা… মানে কী করে বলি,” রাধিয়া ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলেছিল, “আমি এটা কী করে তোমায় বলতে পারছি, জানি না। কিন্তু ইচ্ছে করছে বলতে…”
নিশান কিছু না বলে এবার আলতো করে রাধিয়ার হাতটা ধরে সামান্য চাপ দিয়েছিল। নিজের ব্যবহারে ও নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। এসব কী করে করছে ও! একটা অর্ধেক চেনা মেয়ের হাত ধরছে ও!
রাধিয়া বলেছিল, “বাবা আমাদের না বলে আজকাল কোথায় যেন যায়! মানে… আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। বিজ়নেসের কাজে কলকাতার বাইরে যাবে বলে কলকাতার মধ্যেই ঘোরাফেরা করে! কেন জানি না। কিন্তু আমার খুব ভয় করে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। মাকে বা ঠাকুমাকে বলা যাবে না!”
নিশান বলেছিল, “আমি কি খোঁজখবর করব?”
“তুমি?” রাধিয়া কেঁপে গিয়েছিল সামান্য, “কিন্তু…”
“না, কিছু ফেভার আমি চাইব না। তোমার ঠাকুমার সঙ্গে আমার দেখা করা দরকার। কিন্তু সেটাও আমি তোমায় করিয়ে দিতে বলব না। তুমি চাইলে আমি খবর নিতে পারি।”
রাধিয়া মাথা নামিয়ে নিয়েছিল, “ছিঃ! ছিঃ! আমি কী বললাম!”
“ডোন্ট ওয়ারি, কেউ জানবে না। আই প্রমিস। আমি খবর নেব।”
রাধিয়া এবার নিশানের হাতটা ধরেছিল। বলেছিল, “আমি ভুলব না, তুমি আমার জন্য কী করলে!”
“এখনও তো কিছু করিনি! আগে করি!” নিশান হেসেছিল।
রাধিয়া বলেছিল, “এই যে কিছু করবে বললে এটাই বা কে বলে? আই অ্যাম গ্রেটফুল।”
“প্লিজ়, এভাবে বোলো না। তোমার জন্য কিছু করতে পারলে আমার ভাল লাগবে!”
“কেন?” রাধিয়া প্রশ্নটা করে তাকিয়েছিল নিশানের দিকে।
নিশান হেসেছিল শুধু। তারপর শান্ত গলায় বলেছিল, “ঝড় থেমে গেছে, দ্যাখো!”
“না, আমার উত্তর চাই,” রাধিয়া চোখ সরায়নি, “কেন?”
নিশান মাথা নেড়ে হেসেছিল নিজের মনে, তারপর বলেছিল, “বলব একদিন, কেমন?”
“তুমি শালা নিজে ক্যাল খাবে! আমাকেও ক্যাল খাওয়াবে!” কথাটা শুনে চিড়বিড় করে উঠেছিল মণীশ।
“আরে, তুই জাস্ট একটু খবর নিবি!” নিশান কথাটা বলে হেসেছিল।
সোনাঝুরির বটতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। সেদিনের অনুষ্ঠানের পরে সোনাঝুরিতে ফিরে মণীশের সঙ্গে দরকারি কথা আছে বলে নিশান ওকে দাঁড় করিয়েছিল বটতলায়!
“মাইরি, সুপ্রতীক মালিক কি বাচ্চা ছেলে নাকি যে, আমি খবর নেব? শালা, গাড়ি করে বেড়ায় সারাক্ষণ। আমি কী করে পারব?” ছায়া-ছায়া অন্ধকারে মণীশকে কেমন ছটফটে লাগছিল।
“না, না, পারবি। তোর তো বিশাল জানাশোনা। একটু দেখ না, কোথায় যায় লোকটা। বুঝতে পারছিস না আমাদের আন্দোলনের জন্য এটা দরকার। লোকটা কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, সেটা জানা দরকার আমার।”
“আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়া একটা বাচ্চা ছেলে, আমায় তুমি এসব বলছ?” কথাটা শেষ করে হেসেছিল মণীশ।
“শালা, তিনবার ফেল করে তো এবার স্কুল ছেড়ে দিলি! আবার বাচ্চা ছেলে কী রে? দেখ না ভাই, প্লিজ়!” নিশান হাত ধরেছিল ওর।
আসলে নিশানের নিজের তো সময় হবে না। তাই মণীশকে বলেছিল। ও জানে মণীশ ছেলেটা করিতকর্মা। তা ছাড়া নিশানের কথা শোনে মণীশ। আর ওকে তো আসল কথা বলেনি। বলেছে এই সোনাঝুরির ব্যাপারে সুপ্রতীক মালিক কী করছে সেটা জানা দরকার। আর মণীশ ব্যাপারটা খেয়েও গেছে!
মণীশ শুধু বলেছিল, “তুমি কি মালটার সঙ্গে দেখা করতে চাও নাকি?”
সময় নিয়েছিল নিশান। তারপর বলেছিল, “হ্যাঁ চাই। দেখা করতে চাই আমি। শুধু গতিবিধিটা একটু দেখিস, কেমন!”
“শালা, তোমার যত্তসব আনতাবড়ি কাজ! খবর নিয়ে কী ছিঁড়বে কে জানে! বেকার সব! ঠিক আছে আমি জানাব,” মণীশ আর দাঁড়ায়নি। বটতলার পাতলা অন্ধকার ফুটো করে চলে গিয়েছিল বাড়ির দিকে।
আর, তারপর খবর পেয়েছে নিশান। মণীশ ঠিক খবর জোগাড় করে এনেছে। আর সেটা খুব একটা সুখবর নয়। ও জানে না ব্যাপারটা কী করে বলবে রাধিয়াকে!
“কী রে, একা-একা বসে কী করছিস? আমি ভাবলাম মায়ের সঙ্গে কথা বলবি,” বাদল ঘরে ঢুকে হাসল।
নিশানও হাসল বাদলের দিকে তাকিয়ে। বলল, “না এমনি।”
বাদল চট করে একবার অন্য ঘরের দিকে দেখল। তারপর একটা মোড়া টেনে এনে ওর পাশে বসে বলল, “তোকে একটা কথা বলার ছিল। আর্জেন্ট।”
নিশান অবাক হল। বাদলের চেহারায় পুরনো চাকচিক্য ফিরে এসেছে। ঘরবাড়িতেও একটা শ্রী এসেছে। বোঝা যাচ্ছে যে, তারক চক্রবর্তীর কাছ থেকে খারাপ কিছু পাচ্ছে না ও। কিন্তু এই লোকটার সঙ্গে কেন কাজ করছে বাদল? ওর বাদলের জন্য চিন্তা হচ্ছে।
“বল,” নিশান ছোট করে বলল।
বাদল ওর হাতটা ধরল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তুই কথাটা কিন্তু ভুলভাবে ধরবি না নিশান। তুই আমার বন্ধু, আমি চাই না তোর কোনও ক্ষতি হোক। তাই বলছি। তুই এই ‘সেভ সোনাঝুরি’ না কী একটা অর্গানাইজ়েশন করেছিস, সেটা বন্ধ কর। শুনছি সামনে তোদের নানা প্রোগ্রাম আছে? মিছিল, ধরনা, আরও কীসব! করিস না ভাই এসব। বন্ধ কর। না হলে বিপদ হবে!”
“তারকদা বলেছে এসব তোকে আমায় বলতে?” নিশান শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
“না রে পাগল!” বাদল বলল, “আমি শুনেছি। মানে, কানে এসেছে আমার। তোর ওপর কিন্তু খার আছে তারকদার। ভাই, তুই এসব করিস না। বিপদ হয়ে যাবে! আমার উপায় নেই, আমায় রোজগার করতে হবে। কিন্তু তুই এমন করিস না। তারকদা ভাল লোক নয়। জানিস তো এই প্রোজেক্টে কয়েক কোটি টাকা কামাবে ও। সেটাতে কেউ বাধা দিলে কী হবে বুঝতে পারছিস? পার্টির কথাও নাকি লোকটা শুনছে না! মোতিদা সেদিন বলছিল আমায়। তুই একটু রয়ে-সয়ে থাকিস।”
নিশান কিছু বলার আগেই পকেটের ফোনটা বেজে উঠল ওর। এখন আবার কে? ও পকেট থেকে বের করল মোবাইলটা। মণীশ! এখন মণীশ কল করছে কেন?
“বল,” মোবাইলটা কানে লাগাল নিশান।
“তুমি কোথায়?” মণীশ দ্রুত জিজ্ঞেস করল।
“কেন? আমি বাদলের বাড়িতে। কী হয়েছে?”
“আধঘণ্টার মধ্যে তারকদার বাড়ির সামনে আসতে পারবে? খুব জরুরি দরকার।”
মণীশের গলা শুনে নিশান বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
“কেন? আমি নেমন্তন্নে এসেছি…”
“সুপ্রতীক মালিক এসেছে একা। তারকদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে! তুমি বলেছিলে না, লোকটার সঙ্গে কথা বলবে! আজ চান্স। চলে এসো। একাই লোকটা গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছে। এই ওয়েদারে সবার চোখের আড়ালে আসতে পারবে বলেই বোধহয় এসেছে। জানি না কী কেস! কিন্তু কিছু কেলো তো আছে গুরু। চলে এসো। আমি এখানেই আছি।”
কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিল মণীশ। নিশান বুঝতে পারল না কী করবে! এখানে দুপুরে খাবে। কাকিমা সারাদিন ধরে রান্না করেছে। এখন চলে গেলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে!
“খুব আর্জেন্ট দরকার নাকি?” বাদল তাকাল ওর দিকে।
নিশান মাথা নাড়ল। বাদলকে বলা যাবে না কী ব্যাপার। কারণ, ওর যা প্ল্যান সেটা তারকের ভাল লাগবে না জানলে।
নিশান বলল, “হ্যাঁ রে, খুব আর্জেন্ট। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছতে হবে।”
বাদল মুখ নিচু করে চিন্তা করল। তারপর বলল, “এক ঘণ্টার মধ্যে আসতে পারবি? আমি মাকে ম্যানেজ করে নিচ্ছি। তুই ঘুরে আয়!”
“কিন্তু…” নিশান ইতস্তত করল।
বাদল হাসল, “আরে, কাজ আগে। প্লাস এমন হুড়োহুড়ি করে কেউ নেমন্তন্ন খায়! তুই সেরে আয় কাজটা। আমি মা আর মেঘলাকে সামলে নেব। শুধু মাথায় রাখিস, তুই না এলে কিন্তু আমরা কেউ খাব না! কেমন? বোনটা আমার কষ্ট পাবে!”
নিশান হাসল। বলল, “ব্যাগটা থাক। আমি ঘুরে আসছি তা হলে চট করে।”
আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় টাঙানো বর্ষাতিটা তুলে নিয়ে সাইকেলের দিকে এগিয়ে গেল। উঠোনে জল আরও বাড়ছে। চাঁপাগাছের ওপরের ডালপালা কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছে!
বাইরে বেরিয়ে নিশানের মনে হল বৃষ্টিটা বোধহয় আরও ঝেঁপে নামল ওকে দেখে! বাধা, সবেতেই যেন বাধা পাচ্ছে! কেন কে জানে, নিশানের মনে হল, সামনেও খুব কিছু সহজ দিন আসছে না!
.
২৪. পুশকিন
আজ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। দূর পাহাড়ের ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো হাওয়ায় দুলছে খুব। ফাঁকা মাঠের মাঝে একলা সিঁথির মতো রাস্তা পড়ে রয়েছে। আর সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা লোক। পরনে হাতকাটা ফতুয়া আর ধুতি। লোকটা বাঁশি বাজাতে-বাজাতে হেঁটে যাচ্ছে দূর পাহাড়ের দিকে। আশপাশে কেউ নেই। শুধু দূরে একটা বাড়ি, তার জানলায় বসে রয়েছে কেউ। আর সে দেখছে এই পথিককে। হাওয়ায় চুল উড়ছে মানুষটির। ফতুয়ার কোণ উড়ছে। আর সে একাকী হেঁটে যাচ্ছে নির্জন এই পথে, দূর পাহাড়ের দিকে। বাঁশির সুরটা স্পষ্ট। আর কী ভীষণ চেনা! রাতের হাওয়ায় ভেসে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ছে। আর ছুঁয়ে দিচ্ছে দূর সেই বাড়ির জানলায় বসে থাকা ছেলেটিকে। পাশে প্রদীপের মৃদু আলো। ছেলেটি বসে দেখছে দূর রাত্রির বুক দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক একলা মানুষকে।
“বাবু,” ছেলেটিকে কে যেন ডাকল এবার। ছেলেটি পাশ ফিরল। আর চোখ মেলে তাকাল পুশকিন!
“বাবু, ঘুমিয়ে পড়েছিস?” বাবা ডাকছে! পুশকিন বুঝতে পারল না প্রথমে! কোথায় ও! সেই সাদা সিঁথির মতো একলা রাস্তাটা কোথায়! পথিক! সেই পথিকই-বা কই!
“কী রে, শুনছিস?” বাবা সামান্য ঠেলল এবার ওকে!
পুশকিন যেন প্যারাসুটে চেপে ধীরে-ধীরে নেমে এল মাটিতে!
ও এবার ভাল করে দেখল। বাবা দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথার কাছে। সিল্কের লুঙ্গি আর গায়ে একটা ফতুয়া। ও ধীরে-ধীরে উঠে বসল। আজ কী দিন? কী বার! গুলিয়ে যাচ্ছে যেন সব!
“কী রে, শরীর খারাপ করছে এখনও?” বাবার মুখে উদ্বেগ!
পুশকিন মাথাটা ঝাঁকাল। চোখটা লেগে আসছে। ক্লান্ত লাগছে। বালিশের দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ার লোভ হচ্ছে!
ক’টা বাজে? দেওয়ালে পুরনো দিনের একটা ঘড়ি টাঙানো আছে। দেখল, সাড়ে সাতটা বাজে। সন্ধে হয়ে গেছে তবে? কতক্ষণ ঘুমোল ও?
“কী রে, শরীর খারাপ নাকি?” বাবা আবার জিজ্ঞেস করল।
“না, না,” পুশকিন আশ্বস্ত করল বাবাকে, “আসলে দু’রাত ঘুমোইনি তো… তাই…”
বাবা মাথা নাড়ল, “কী লাভ এমন কাজ করে! ক্রীতদাস প্রথা চলছে নাকি! যাকগে, তুই রেডি হয়ে নে, লোকজন আসতে শুরু করবে!”
এবার মাথাটা পরিষ্কার হল পুশকিনের। তাই তো! আজ তো রাতে বাড়িতে লোকজন খায়। বাবা অনেককে নেমন্তন্ন করে। আজ অষ্টমী যে! দুর্গাষ্টমী!
গত দু’রাত ঘুমোয়নি পুশকিন। অফিসের একটা বিশেষ কাজে খুব ব্যস্ত ছিল। ওদের দিল্লি হেড কোয়ার্টার থেকে পুশকিনকে একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে একটা নতুন ফ্যাক্টরি হচ্ছে। তার কিছু টেকনিকাল ইভ্যালুয়েশন ছিল। পুশকিনের কাছে সেইসব পেপার পাঠানো হয়েছিল দেখে দেওয়ার জন্য। প্রায় সাড়ে ছ’শো পাতার পিডিএফ ফাইল। দুটো দিন আর দুটো রাত লেগে গিয়েছে পুশকিনের।
পুজো বলে এখানে অফিস ছুটি। কিন্তু ও একা এই দু’দিন অফিসে গেছে। অফিস করেছে! কাজটা খুব জরুরি ছিল। যে-কোম্পানি এই প্রোজেক্টে ইনভেস্ট করছে রিকো গ্রুপের সঙ্গে, তাদের প্রতিনিধিরা কাল আসবে বুদাপেস্টে। মিটিং আছে রিকো গ্রুপের লোকজনদের সঙ্গে। ব্যাপারটা খুবই জরুরি বলে বস দিল্লি থেকে ওকে নিজে ফোন করে বলেছিলেন কাজটা করে দিতে। পুশকিন আপত্তি করেনি। পুজো-টুজো নিয়ে ওর কোনও মাথাব্যথা নেই।
টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা কাজ করে আজ সকালে অফিস থেকে বেরোনোর সময় ওর মাথা টলছিল। মনে হচ্ছিল যে-কোনও সময় পড়ে যাবে মাটিতে। কীভাবে যে তাও গাড়ি চালিয়ে এখানে এসেছে, এখন ভাবতেও অবাক লাগছে ওর!
বাবা আগেই বলে দিয়েছিল, পুজোর চারটে দিন ও যেন নিজের ফ্ল্যাটে না থেকে বাড়িতে এসে ওঠে! তাই আজ অফিস থেকে সোজা বাড়িতেই এসেছে পুশকিন।
ও বুঝতে পারছে আস্তে-আস্তে বাড়ির সঙ্গে ওর যোগাযোগ আবার সহজ হয়ে আসছে। বুঝতে পারছে, বাবা চাইছে ও আবার এখানে ফিরে আসুক।
পুশকিন বাবাকে বলল, “আমি ঠিক আছি। একটু ফ্রেশ হয়ে নিই।”
বাবা বিরক্ত মুখে তাকাল ওর দিকে! বলল, “সেই দেড়টার সময় ঘুমিয়েছিস! না ডাকলে তো এখনও উঠতিস না! কী হবে এমন কাজ করে যেখানে এভাবে গোরুর মতো খাটতে হয়!”
পুশকিন হাসল। বাবাকে বুঝিয়ে লাভ নেই।
বাবা আবার বলল, “তুই ফ্রেশ হয়ে নে। লোকজন এসে পড়বে! আর ওই মেয়েটা, নোঈ, ওকে একবার ফোন করে মনে করিয়ে দে যেন আসে।”
“মানে!” পুশকিন অবাক হল! এই কথাটায় ঘুমের যে সামান্য কুঁচিকাচা পড়েছিল চোখের কোণে, এক ধাক্কায় উধাও হয়ে গেল! ও বলল, “নোঈ মানে? ওকে তুমি আসতে বলেছ নাকি?”
“হ্যাঁ, আমি ফোন করেছিলাম মহালয়ার দিন। বলল তো নিশ্চয় আসবে। আর আমি স্পেশ্যালি বলেছিলাম, তোকে যেন না বলে!”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না। বাবা মাঝে মাঝে এমন সব কাণ্ড করে! কে বলেছে বাবাকে এটা করতে? যত বয়স বাড়ছে, ছেলেমানুষিগুলোও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে!
ও বলল, “তুমি ওকে বলেছ কেন? আরে, ও আমার অফিসে চাকরি করে! একটা প্রোটোকল বলেও তো ব্যাপার আছে, নাকি? বললেই হল এভাবে বাড়িতে আসতে!”
বাবা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর বলল, “আমার বাড়ি, আমি যাকে খুশি ডাকব, তাতে তোর কী!”
পুশকিন মাথা নাড়ল। বাবা আগে এমন ছিল না। দিন কে দিন কী যে হয়ে যাচ্ছে!
বাবা আবার বলল, “ফ্রেশ হ,’ ওই বুঝি কেউ এল!”
কলিং বেলটা পুশকিনও শুনতে পেয়েছিল। ও আর কিছু বলল না। বাবা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে!
ওর মনে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বাবা আবার নোঈকে কেন ডাকতে গেল! মেয়েটার সামনে গেলে আজকাল কেমন একটা লাগে ওর! কেমন একটা মনখারাপ আর মন ভাল নামের দুটো রং যেন মিলেমিশে যায় একসঙ্গে! মনে হয় পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে, পাইন আর দেবদারু গাছের জঙ্গল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একলা এক মনমরা টয় ট্রেন উঠে যাচ্ছে মেঘেদের ছাড়িয়ে! উঠে যাচ্ছে নাম-না-জানা কোনও নির্জন কাঠের স্টেশনের দিকে!
কী করে যে এর থেকে পালাবে, কিছুতেই বুঝতে পারে না ও। ও শুধু নিজেকে বোঝায় মেয়েটা, ওর চেয়ে অনেক ছোট। মেয়েটার একটা জীবন আছে! কোম্পানিতে কাজ করতে এসেছে মেয়েটা। বোঝায়, এসব অপ্রীতিকর চিন্তাভাবনা যেন কিছুতেই ওর মনে আর জায়গা না করতে পারে।
এমনিতেই অফিসের কারণে বেশ চাপে আছে পুশকিন। সোনাঝুরির কাজটা কেমন যেন আটকে আছে! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না! শুধু মিল কেনার কথা ওরা ভাবছে না। জোনাক-বাড়ি না পেলে শুধু মিল ওরা কিনতে চায় না। এখন ম্যানেজমেন্ট চাইছে পুশকিন যে করেই হোক ওই বাড়ির ব্যাপারটা যেন মিটিয়ে দেয়। মালিকদের বলে যে করেই হোক জোনাক-বাড়িটা জোগাড় করে। বিদেশে নাকি এই গোটা প্রজেক্টের জন্য নানা ইনভেস্টরের কাছ থেকে কোম্পানি টাকা তুলতে শুরু করেছে। সেখানে এখন কাজ না হলে যে-পরিমাণ পেনাল্টি রিকো গ্রুপকে দিতে হবে, সেটা কোম্পানির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই যে করেই হোক জুট মিল, জমি আর গোটা জোনাক-বাড়ি, সবটাই চাই ওদের। সেই কারণেই চতুর্থীর দিন সোজা গিয়ে দীপমালা দেবীর সঙ্গে দেখা করেছিল ও।
মাথাটা টিপটিপ করছে পুশকিনের। আরও ঘুম দরকার ছিল। বাবা কেন যে ঘুমটা ভাঙাল! লোকজন এলে আসবে, তাতে ও কী করবে? ওর লোকজন ভাল লাগে না! দেখা হলেই সব এমন-এমন প্রশ্ন করে! বিশেষ করে স্মিতার সঙ্গে বিয়ের বিষয়টা নিয়ে লোকজন এখনও এমন সব প্রশ্ন করে যে, মাথা ঠিক রাখা যায় না! পৃথিবীতে আত্মীয়স্বজনদের কাজই বোধহয় মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলা, তাদের মুখ ম্লান করে দেওয়া!
স্মিতার মুখটা মনে পড়তেই কেমন একটা লাগল। আবার মনে পড়ে গেল সেই রাতটা। প্রেম করেই তো বিয়ে করেছিল ওরা। কিন্তু কোথায় ফাঁক থাকল! কী করে ফাঁকটা তৈরি হল? স্মিতা কী করে করতে পারল অমনটা! আর সেটা করেছিল বলেই কি সেই রাতে পুশকিন…
মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে ঠিক করল পুশকিন। অতীত এক অতলান্ত খাদের মতো ওকে সারাক্ষণ টানে। একবার সেই দিকে ঝুঁকে পড়লে ও গড়িয়ে, তলিয়ে যাবে সেই খাদে!
ও চোখ বন্ধ করল একবার। ঘুমের আঠা ফিরে আসছে আবার! চোখের পাতা আটকে যেতে চাইছে। ও দেখল এক দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। একলা এক পথিক বাঁশি বাজাতে বাজাতে আপনমনে হেঁটে চলেছে! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পুশকিনের। এই স্বপ্নটা কী অদ্ভুত!
ছোটবেলায় একটা কবিতা পড়েছিল পুশকিন। রবি ঠাকুরের ‘ফাল্গুন’! শুধু শেষের কয়েকটা লাইন মাথার মধ্যে সারাক্ষণ আজকাল পাক খায়। নিজের মনেই কখনও কখনও ও গুনগুন করে, “খেয়াঘাটে ওঠে গান / অশ্বত্থতলে, / পান্থ বাজায়ে বাঁশি / আনমনে চলে। / ধায় সে বংশীরব / বহুদূর গাঁয়, / জনহীন প্রান্তর / পার হয়ে যায়। / দূরে কোন শয্যায় একা কোন ছেলে / বংশীর ধ্বনি শুনে / ভাবে চোখ মেলে— / যেন কোন যাত্রী সে, / রাত্রি অগাধ, / জ্যোৎস্নাসমুদ্রের/ তরী যেন চাঁদ। / চলে যায় চাঁদে চ’ড়ে / সারা রাত ধরি, / মেঘেদের ঘাটে ঘাটে/ ছুঁয়ে যায় তরী।”
আজ স্বপ্নে এটাই যেন ফিরে এসেছিল। ছোটবেলায় এই কবিতাটার পাশে একটা ছবি ছিল। বাচ্চা একটা ছেলে, আধশোয়া হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আর দূরে, বহু দূরে এক পথিক বাঁশি বাজাতে-বাজাতে চলেছে মাঠের মধ্যে দিয়ে! আর সবকিছুর ওপর নিটোল চাঁদ তার জ্যোৎস্নার ওড়না মেলে বসে রয়েছে!
আজ স্বপ্নে সেই ছবিটাই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল! খুব অবাক লাগছে পুশকিনের! সেই কবেকার ছোটবেলায় সাত-আট বছর বয়সের পুশকিন যে-ছবিটা দেখেছিল, আজ সেটাই জীবন্ত হয়ে উঠল! বুকের মধ্যে কেমন একটা ‘পেয়ে হারালাম’ ধরনের শূন্যতা টের পাচ্ছে আজ। সেই কবিতাটা পড়ার সময় মা, ঠাকুরদা, পিসেমশাই, পিসি আরও কত-কত মানুষ ঘিরে থাকত ওর জীবন। পুশকিনের নিজেকে মনে হত ওই বাচ্চা ছেলেটার মতো। মনে হত, ও নিজেই জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখছে জ্যোৎস্নার রাত্রে ফাঁকা মাঠ দিয়ে দূরে কোনও এক বাঁশিওয়ালা আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে! তার মনখারাপ করা সুর ভেসে আছে আকাশে! আর আজ এত বছর পরে, এতটা পথ হেঁটে আসতে-আসতে মনে হয় কখন যেন সেই বাচ্চা ছেলেটা থেকে ও একলা, নির্জন পথে হেঁটে যাওয়া সেই বাঁশিওয়ালায় পরিণত হয়েছে। জীবন এক অদ্ভুত জাদুকর! নিজের অজান্তেই সে মানুষকে পালটে দেয়। তার অবস্থান বদলে দেয়।
নাঃ, মাথাটা কেমন করছে! একে ভাল করে ঘুম হয়নি, তারপর এসব চিন্তাভাবনা! পুশকিন আর দেরি করল না। উঠে পড়ল। নোঈ কি সত্যি আসবে নাকি? বুকের মধ্যে আবার খচ করে উঠল! বাবা যে কী করে!
বাথরুমে গিয়ে সময় নিয়ে চোখেমুখে জল দিল পুশকিন। তারপর কী মনে হওয়ায় স্নান করল ভাল করে।
স্নান সেরে তোয়ালে পরে ঘরে এল পুশকিন। পাজামা-পাঞ্জাবি আছে আলমারিতে। ও বের করল সেটা। ডিমের কুসুম রঙের পাঞ্জাবির সঙ্গে সাদা পাজামা পরে নিল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউমটা তুলে নিল। নীল রঙের বোতল। ঠান্ডা জলের মতো আরামদায়ক।
“জেজে, আমায় লাগিয়ে দেবে না!”
কোমরের কাছ থেকে শব্দটা এল। পুশকিন তাকাল। কুটু এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। কুটু ভাইয়ের ছেলে। বছরচারেক বয়স। একমাথা গোল্লা পাকানো চুল। ছোট্ট লাল ঠোঁট আর বড়-বড় চোখ!
পুশকিন দেখল বাইরে বেরোনোর জামাকাপড় পরে কুটু তৈরি! বুঝল, ভাইরা ঘুরতে বেরোবে। ঠাকুর দেখতে বেরোবে। বাবা এই নিয়ে একটু রাগ করছিল, কিন্তু ভাইকে বাবা জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে না। ভাই সাফ বলে দিয়েছে যে, লোকজন আসবে আসুক, ওরা একটু ঘুরে দশটার মধ্যে বাড়ি চলে আসবে!
কথাটা সত্যি। অষ্টমীর দিন মানুষ ঘুরবে না তো কি লোকের বাড়িতে এসে রাতে খাবে? বাবাকে কে বোঝাবে! বললেই বলবে, “আগে তো সবাই আসত। এত বায়নাক্কা দেখাত না। এখন তোরা কেমন সব হয়ে গেছিস!”
আরে, আগেকার দিনে মানুষ অন্যরকম ছিল। এখন আর-এক রকম হয়ে গেছে। সব পালটাচ্ছে, মানুষ পালটাবে না! চারিদিকে জনসংখ্যা কী হারে বাড়ছে! মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য আরও আক্রমণাত্মক হতে হচ্ছে এখন! নিজের ইচ্ছেটাই সেখানে সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্টের জন্য প্রাধান্য পাচ্ছে। মনের ধাঁচটাই যে পালটে গিয়েছে! সেই মনটা কি আর আগের মতো কাজ করবে! তার প্রভাব তো অন্য কাজেও পড়বে!
“এই নে, হাত তোল…” পুশকিন কুটুর দিকে ঝুঁকল।
“হ্যান্ডস আপ?” কুটু চোখ বড়-বড় করে হাত তুলল মাথার ওপরে!
পারফিউম লাগিয়ে দিয়ে নিজের গায়েও স্প্রে করল পুশকিন।
“জেজে, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো না! মা বলছিল তোমায় বলতে। যাবে? আজ সাউথের ঠাকুর দেখব।”
“না কুটুবাবু, আজ তো যেতে পারব না। বাড়িতে লোকজন আসবে! সবাই চলে গেলে লোকজন রাগ করবে তো। কাল যাব, কেমন?” পুশকিন হাসল।
কুটু গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, “লোক রাগ করবে, না জন রাগবে?”
হাসল পুশকিন, বলল, “দু’জনেই রাগ করবে! তাই আমাকে থাকতে হবে বাড়িতে!”
কুটু বলল, “দাদু বলল, আন্টি এসে গেছে, তোমায় যেন বলি!”
“আন্টি! মানে?”
কুটু হাসল। সব বুঝে গেছে এমন করে চোখ ঘুরিয়ে বলল, “ওই যে বিউটিফুল বিউটিফুল আন্টি! আমায় চকোলেট দিল একটা ইয়াব্বড় প্যাকেটে।”
পুশকিন বলল, “বেশি খেয়ো না! দাঁতে পোকা হবে!”
কুটু বলল, “ভালবেসে কেউ দিলে নিতে হয়। আর পোকা! সে না হয় একটু হোক!”
পুশকিন ড্রেসিং ইউনিটের সামনে রাখা ঘড়িটা তুলে হাতে পরল। তারপর মোবাইলটা পকেটে নিয়ে কুটুর হাত ধরে ঘরের বাইরে বেরোল। আন্টি মানে নিশ্চয়ই নোঈ!
ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখল ভাইরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুটু পুশকিনের হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে ওর মায়ের হাত ধরল।
ভাই বলল, “এলাম দাদা। চলে আসব তাড়াতাড়ি। বাবাকে বলিস যেন এই নিয়ে রাগ না করে!”
পুশকিন হাসল। রাগ! নাঃ, বাবার রাগ কমে গেছে!
ভাইরা বেরিয়ে গেলে ও ভাবল বসার ঘরে যাবে। নোঈ যদি সত্যি এসে থাকে তবে ওর যাওয়া দরকার! কিন্তু ঠিক তখনই পকেটের ফোনটা বাজল। ও বের করে দেখল। স্মরণ। এ সময় ছেলেটা ফোন করল!
“বলো!” পুশকিন ফোনটা কানে লাগাল।
“স্যার, সরি স্যার, এমন সময় ফোন করার জন্য, কিন্তু ওই মাহির বলে ছেলেটা আবার ফোন করেছিল!”
পুশকিন বলল, “তুমি বলো পুজো কেটে যাক, আমি ব্যাপারটা দেখছি!”
“আমি বলেছি স্যার। ও বলছে একাদশীর দিন ফিক্স করবে মিটিং? রিতুবাবু নাকি একটু ইমপেশেন্ট হয়ে পড়েছেন!”
“লক্ষ্মীপুজোর পরে করতে বলো। তার আগে হবে না। অফিসের একটা অন্য কাজ নিয়ে আমি একটু ব্যস্ত আছি!”
“ওকে স্যার। সরি, এমন সময় ফোন করলাম! আমি রাখছি।”
পুশকিন হেসে বলল, “তুমি ঘুরতে বেরোওনি?”
“বেরিয়েছি স্যার! প্যাঁওয়ের সঙ্গে বেরিয়েছি। আমি রাখছি তা হলে। হ্যাপি পূজা স্যার।”
ফোনটা কেটে সিলিং-এর দিকে তাকাল পুশকিন। সোনাঝুরির ব্যাপারটায় এটা একটা নতুন দিক। কী চায় রিতু বলে লোকটি? পলিটিকাল পার্টির লোক। কী ধান্দা আছে বুঝতে পারছে না। কিন্তু লোকটার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কারণ, চারিদিক দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা থেকে মনে হচ্ছে কাজটা বোধহয় ফসকে যাবে এবার! সেদিন দীপমালাদেবীর সঙ্গে দেখা করেও তো কোনও পথ খুলতে পারেনি!
কলকাতায় ক্যামাক স্ট্রিটে মালিক গ্রুপের বড় অফিস। সেখানে মাসে একদিন দীপমালাদেবী আসেন। এই খবরটা মালিক গ্রুপের ভেতর থেকেই বের করেছিল পুশকিন। সেই মতো একজনকে ম্যানেজ করে দীপমালাদেবীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল পুশকিন। লোকটি বলেছিল, ম্যাডাম এক ঘণ্টার মতো থাকেন। ও যেন দেরি না করে!
ঠিক বিকেল চারটের সময় পৌঁছে গিয়েছিল পুশকিন।
দীপমালাদেবীর ঘরটা বেশ বড়। কাঠের প্যানেল দেওয়া। পুশকিন ঢুকতেই উনি থমকে গিয়েছিলেন সামান্য। তারপর সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বলেছিলেন। পুশকিন অবাক হয়ে দেখেছিল, এই বয়সেও কী সুন্দরী আছেন উনি!
“বলুন,” দীপমালাদেবী সোজা পুশকিনের দিকে তাকিয়েছিলেন। কোনও ভণিতা করেননি।
পুশকিন বসে আর সময় নষ্ট করেনি। বলেছিল, “আমি ম্যাম কী কারণে এসেছি সেটা সরাসরি বলি?”
দীপমালাদেবী বলেছিলেন, “জুটমিল আর জমি আমি বিক্রি করতে রাজি। কিন্তু ওই জোনাক-বাড়ি আমি বিক্রি করব না।”
“ম্যাম, আপনি আমাদের প্রোপোজ়ালটা যদি কাইন্ডলি পড়ে দেখতেন! অন্যরা সব কিছু ডেমলিশ করে সেখানে হাউজ়িং করবে। আমরা ম্যাম জুটমিলটাকে রিভাইভ করব। জোনাক-বাড়িটাকে রেস্টোর করে সেখানে ফাইভ স্টার হোটেল বানাব। একটা ট্যুরিজ়ম পার্ক হবে! সামনে গঙ্গাটাকেও ইউজ় করব। জোনাক-বাড়িটা পিভটাল ফর আওয়ার প্ল্যান!”
“মিস্টার চক্রবর্তী, আমি সব শুনলাম, কিন্তু আমি পারব না ওটা দিতে। এটা টাকাপয়সার ব্যাপার নয়, আমার পারসোনাল ব্যাপার! প্লিজ়, আমায় আর রিকোয়েস্ট করবেন না! থ্যাঙ্ক ইউ।”
“কোনও উপায় নেই ম্যাম? মানে, কোনও উপায়?” পুশকিন মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করেছিল।
দীপমালাদেবী হেসেছিলেন শুধু।
ছোট্ট একটা হাসি। কিন্তু দীপমালাদেবীর হাসির মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যাতে করে পুশকিনের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই ভদ্রমহিলাকে কনভিন্স করা কারও কম্ম নয়! ও হাল ছেড়ে দিয়ে, “সরি ম্যাম!” বলে সামান্য হেসে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
“মিস্টার চক্রবর্তী, আমি জানি আপনাদের প্ল্যানটা ভাল। কিন্তু জানবেন সব কিছু তো আর বিজ়নেস নয়। আপনি জানতে চাইলেন না, কোনও উপায় আছে কি না? আছে, একটা উপায়! আমি একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। সেটা আমায় এনে দিন। ওই বাড়িও আমি দিয়ে দেব।”
“কী প্রশ্ন ম্যাম?” পুশকিন সামান্য আলো দেখতে পেয়েছিল যেন!
দীপমালাদেবী বিষণ্ণভাবে হেসে বলেছিলেন, “সেটা আপনাকেই জানতে হবে। প্রশ্ন আর উত্তর দুটোই আপনাকে জানতে হবে। কেমন? খুঁজে পেলে, আসবেন।”
এ কেমন ধাঁধা? প্রশ্ন জানলে তবে তো উত্তর খোঁজা যায়! কিন্তু এখানে তো প্রশ্নটাও জানতে হবে!
সেদিন থেকে এই একটা ব্যাপারই পুশকিনকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে সারাক্ষণ। প্রশ্নটা কী!
পুশকিন ভাবল, এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই। ও নিজের মনে মাথা নেড়ে বসার ঘরের দিকে গেল। বাইরের প্যাসেজে কয়েকজোড়া জুতো দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে তিনটে মেয়েদের।
ও বসার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘন নীল পরদা উড়ছে। তার আড়ালে দাঁড়িয়ে পুশকিন শুনল গান ভেসে আসছে ঘরের ভেতর থেকে। পরদাটা সামান্য সরিয়ে ও দেখল, কয়েকজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে বসে চোখ বন্ধ করে, ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’ গাইছে নোঈ! থমকে গেল পুশকিন। আজ শাড়ি পড়েছে নোঈ! খুব সুন্দর সাতরঙের শাড়ি একটা। কপালে অনুস্বরের মতো নীল টিপ। চোখ বন্ধ ওর। আর গানের তালে মাথা নাড়ানোর সঙ্গে অল্প-অল্প করে কানের সামান্য ঝোলা দুলটা নড়ছে। পুশকিনের গলা শুকিয়ে গেল! আবার বুকের ভেতরে একটা ছোট্ট টয় ট্রেন যেন পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছে! কোথায় যাচ্ছে এই টয় ট্রেন? মেঘ পার হয়ে কোথায় গিয়ে থামবে এটা? ছোট্ট কাঠের স্টেশনে?
বাবা আর বাবার দুই বন্ধু ও তাঁদের স্ত্রী বসে রয়েছেন নোঈকে ঘিরে। গানের সঙ্গে তাঁরাও মাথা নাড়ছেন।
পুশকিনের মনে হল, ও ফিরে যায় নিজের ঘরে। এই দৃশ্যে কেন কে জানে হঠাৎ ওর নিজেকে বড্ড বেমানান লাগছে।
কিন্তু নড়তে পারল না পুশকিন। ওই পরদার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল গোটা গানটার সুর ধরে-ধরে। মনে হল, গানটা যেন না থামে। টয়-ট্রেনের স্টেশন যেন না আসে কোনওদিন!
“আরে, তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস?” গান থামার পরে বাবা গলা তুলে বলল কথাটা!
পুশকিন লজ্জা পেয়ে গেল। বাবা এমন করে বলে সবার সামনে! ও অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। ও ঘরে ঢোকামাত্র নোঈ উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। কিন্তু পুশকিন দেখল বাবা নোঈকে হাত ধরে চেপে বসিয়ে দিল, উঠতে দিল না!
বাবা বলল, “ও কী, উঠছ কেন? কোন গুরুঠাকুর ও? নাকি তোমাদের স্কুলের প্রিন্সিপাল? বসে থাকো!”
সবাই সোফায় বসেছিল। ও এসে সবার থেকে একটু দূরত্ব রেখে একটা চেয়ারে বসল।
বাবা বলল, “শুনলি কেমন গাইল? তোর মা গাইত এই গানটা। মনে পড়ে তোর?”
পুশকিন হাসল। হ্যাঁ, মনে পড়ে ওর। সবটাই মনে পড়ে। কিন্তু মনে করতে চায় না আর। ওর অতীতটা কেমন যেন রং লেপটে যাওয়া ছবির মতো! সবই আছে, কিন্তু যেন কিছুই নেই!
“আমি তোকে বলেছিলাম না, নোঈকে ফোন করে ডাকতে, কিন্তু ডাকতে হয়নি। শি ইজ় মাই গুড গার্ল! দেখ, নিজেই চলে এসেছে! আর কী এনেছে দেখ!” বাবা টেবলের ওপর রাখা একটা প্যাকেটের দিকে আঙুল দেখাল।
পুশকিন এতক্ষণ লক্ষ করেনি। এবার দেখল। একটা বড় প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতর থেকে একটা ক্যাসেরোল উঁকি দিচ্ছে।
বাবা সেটা বের করল এবার। বেশ বড় একটা ক্যাসেরোল। প্যাঁচ ঘুরিয়ে খুলে ফেলল ঢাকনাটা। আর সঙ্গে-সঙ্গে মাছের গন্ধ পেল পুশকিন। দেখল ক্যাসেরোল ভর্তি ফিশ-ফ্রাই!
নিজে থেকেই ভুরু কুঁচকে গেল ওর।
বাবা সেটা দেখে বলল, “তুই ভুরু কোঁচকাচ্ছিস কেন? আমার জন্য এনেছে! নিজে ভেজেছে। বুঝলি!”
আশপাশের সবাই মাথা নেড়ে প্রশংসা করা শুরু করল। দু’জন তো হাত বাড়িয়ে তুলে নিল দুটো!
পুশকিন দেখল নোঈ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। বাবা আরও কিছু বলত, কিন্তু পরদা সরিয়ে এবার একসঙ্গে প্রায় দশজন ঢুকে এল ঘরে! পুশকিন প্রমাদ গুনল। কোন্নগর থেকে মায়ের মামারা এসে পড়েছে। এবার চিৎকার আর হইচই হবে! কানুদা নিশ্চয় দরজা আজ খুলেই রেখেছে, তাই কলিং বেল শোনা যায়নি!
বাবা সবার সঙ্গে নোঈর পরিচয় করিয়ে দিল। সামান্য দু’-চারটে কথার পরে পুশকিন উঠে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোল। এখানে আর বসে থাকা সম্ভব নয় ওর পক্ষে!
“শুনছেন!” বাইরের বড় করিডরটায় এসে পেছন থেকে ডাক শুনে থমকে গেল পুশকিন। ঘুরে দেখল নোঈ এসে দাঁড়িয়েছে।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন আমায় ফেলে?” নোঈ মুখ ভার করে জিজ্ঞেস করল।
“তোমায় ফেলে?” পুশকিন অবাক হল।
“নয়তো কী! আমি কি আপনাদের বাড়ির লোকেদের চিনি? আপনি আমায় ফেলে হুট করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কেন? আপনি ওখানে বসতে পারলেন না? আপনার ওই বড়মামা কী মজার গল্প বলছেন। আপনি বসলেন না কেন! আর আমায় এভাবে ফেলে চলে এলেন কেন?
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না। কথা খুঁজে পাচ্ছে না যেন। নোঈকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন? ও যে ভাল করে তাকাতেও পারছে না। তাকালেই মনে হচ্ছে নোঈ সবকিছু বুঝে যাবে।
ও মাথা নামিয়ে বলল, “আমি আসলে এখন নিজের ঘরে যাচ্ছি। একটু টায়ার্ড।”
“আমি আসব আপনার সঙ্গে? আমি তো কাউকে চিনি না!” নোঈ অসহায় মুখ করে তাকাল।
পুশকিন হাসল শুধু।
পুশকিনের ঘরের দরজার কাছে থমকে দাঁড়াল নোঈ। তারপর একটু সময় নিয়ে চারিদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখল সবকিছু। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখানেই ছোটবেলা কাটিয়েছেন?”
পুশকিন হাসল আবার।
“আপনি কি রাগ করেছেন, আমি এসেছি বলে?” নোঈ এসে বিছানায় পুশকিনের পাশে বসে পড়ল। পুশকিন একটু কেঁপে গেল। বসার দুটো চেয়ার কি নোঈ মিস করল!
পুশকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল নোঈর দিকে। কী বলবে একে? কী বলতে পারে ও। এক হাতের মধ্যে মেয়েটা বসে রয়েছে। ঘরের আলো যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ! কী অদ্ভুত একটা সুগন্ধ প্রজাপতির মতো ছোট-ছোট ডানা মেলে উড়ছে চারিদিকে! কষ্ট হচ্ছে পুশকিনের। মনে হচ্ছে, দৌড়ে পালিয়ে যায়। মনে হচ্ছে কুটুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে চলে গেলেই ভাল হত।
“কী হল? আমি কি চলে যাব?” নোঈ আচমকা উঠে দাঁড়াল।
“আরে!” পুশকিন অবাক হয়ে গেল।
“ঠিক আছে। আমারই ভুল হয়েছিল। আমি আসছি…” নোঈ দরজার দিকে এগোতে গেল।
পুশকিন কিছু না ভেবেই নোঈ যাতে না যায় সেই জন্য হাতটা ধরে টানল ওকে। নোঈ আর না চলে গিয়ে ওর দিকে ঘুরে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুশকিন দেখল নোঈর চশমার কাচে এক ফোঁটা, দু’ফোঁটা করে জল জমছে! কাঁদছে! পুশকিন মাথা ঝুঁকিয়ে ওর মুখটা দেখল।
চশমার আড়ালে নোঈর চোখ দুটো ছলছল করছে। পুশকিনের কী যে হল হঠাৎ ও নিজেও বুঝতে পারল না। কীসের যে টান ওকে কুহকের মতো ডাকল, ধরতেই পারল না। অনেকটা যেন নিজের অজান্তেই ও বাঁ হাত দিয়ে নোঈর কোমরটা জড়িয়ে ধরল আচমকা। ডান হাত দিয়ে খুলে নিল ওর চশমা! তারপর নোঈকে নিজের আরও কাছে টেনে ওর ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল নিজের ঠোঁট!
ছোট্ট ট্রেন চলেছে পাহাড়ের কারনিশ ঘেঁষে! পাইন বনের পাশ দিয়ে, লাল-নীল ফুল সাজানো বাড়ির উঠোন ছুঁয়ে ট্রেন এগিয়ে চলেছে ওপরের দিকে। মেঘ এসে জড়িয়ে যাচ্ছে তার চিমনিতে। জানলা দিয়ে ঢুকে এসে মেঘ থেমে থাকছে কাচের গায়ে। লাইনের পাশের জংলি গোলাপ নাড়িয়ে, সাদা ঘাস ফুল ঘেঁটে, হলুদ টোপর ফুলের শিশির ছিটকে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। ওই দূরে বরফের পাহাড়ে সূর্য এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর পরমুহূর্তে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে! মেঘের রহস্য এসে ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে পথের নির্জন বাঁক! লাল-কমলা-সবুজ-নীল মাফলার জড়িয়ে হেঁটে যাওয়া বাচ্চাদের ছাড়িয়ে, শীর্ণ লাজুক পাহাড়ি ঝোরাকে টপকে, লেপচা গ্রামের এলাচের গন্ধ বুকের মধ্যে নিয়ে ওই চলে যাচ্ছে ট্রেন। ছোট্ট টয় ট্রেন। এই জীবনের সমস্ত কষ্ট, যন্ত্রণা আর মনখারাপ থেকে দূরে, অনেক দূরে সে নিয়ে যাচ্ছে পুশকিনকে।
নোঈকে ছেড়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল পুশকিন। ওর শরীর কাঁপছে থরথর করে! এটা কী করে ফেলল ও! ও কি পাগল হয়ে গিয়েছে নাকি? এমন কেউ করে? নোঈ ওর সাব-অর্ডিনেট। এটা তো সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট! এটা কী করল ও! নোঈ কী ভাবছে ওকে? কতটা ছোটলোক ভাবল? ছিঃ ছিঃ! নিজের গায়ে থুতু দিচ্ছে ইচ্ছে করল পুশকিনের। লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না ও।
পুশকিন চোখ বন্ধ করেই ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। মাথা নিচু করে রাখল।
নোঈ সময় নিল একটু। তারপর পুশকিনের পাশে বসে নিজের চশমাটা নিয়ে চোখে দিয়ে বলল, “কী হল? এমন করছেন কেন পুশকিনদা?”
“আমি… আমি খুব সরি…” পুশকিন কীভাবে বলবে বুঝতে পারল না! লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে ও। মাঝে মাঝে মানুষকে ভূতে পায়! ও দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।
নোঈ আলতো করে পিঠে হাত দিল পুশকিনের। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “আমি খারাপ কিছু মনে করিনি, পুশকিনদা। এই আপনাকে ছুঁয়ে বলছি।”
পুশকিন মাথা তুলতে পারল না। কিন্তু বুঝল নোঈর একটা হাত ওর পিঠে আর অন্য হাতটা আলতো করে ধরে রেখেছে ওর আঙুল।
পুশকিনের আবার ইচ্ছে করল নোঈকে চুমু খেতে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে ধমক দিল ও। এসব কী ভাবছে ও! কেন ভাবছে! ছিঃ, ছিঃ! অমানুষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ!
নোঈ আবার বলল, “আমার দিকে তাকান। তাকান!”
পুশকিন চোয়াল শক্ত করে মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। দেখল, নোঈ সোজা তাকিয়ে রয়েছে ওর চোখের দিকে।
পুশকিন বলল, “আমি জানি না, আমার কী হয়েছে। আমি সরি নোঈ! তুমি আমার বিরুদ্ধে কোনও স্টেপ নিতে চাইলে নিতে পারো!”
“পাগল আপনি?” নোঈ হাসল এবার, “স্মরণের চেয়েও আপনি বেশি পাগল। বললাম তো আমি কিছু মনে করিনি। শুধু একটা প্রশ্ন।”
“কী?” পুশকিন টালুমালু চোখে তাকিয়ে রইল নোঈর দিকে।
নোঈ ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইল একটু, তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী আফটার শেভ ইউজ় করেন আপনি?”
“বাবু…”
পুশকিন কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে বাবার গলা পেল। ও নোঈর পাশ থেকে ছিটকে উঠে গিয়ে একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, ওর এমন করে সরে যাওয়া দেখে নোঈ মুখে হাত দিয়ে হাসছে। পুশকিন ইঙ্গিতে ওকে চুপ করতে বলল। নোঈ চোখ বড় করল একটু, তারপর ইশারায় দেখাল পুশকিনের ঠোঁটে কিছু লেগে আছে।
বাবা পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। পুশকিন দ্রুত পাশে রাখা ড্রেসিং ইউনিটের আয়নার দিকে ঘুরল। দেখল নিজেকে। নোঈ ঠিক বলেছে। ওপরের ঠোঁটে একটু লিপস্টিকের দাগ লেগে রয়েছে! ও দ্রুত পাঞ্জাবির হাতায় সেটা মুছে নিল।
বাবা বলল, “কী করছিস এখানে? আমি সবাইকে বললাম নোঈ কী দারুণ গান গাইল! সবাই শুনতে চাইছে ওর গান। আর তুই ওকে এখানে নিয়ে বসে অফিসের কথা বলছিস নাকি?”
পুশকিন কিছু বলার আগেই নোঈ বলল, “হ্যাঁ তো। সোনাঝুরির ওই প্রোজেক্টটা নিয়ে পুশকিনদা খুব বিব্রত। সেই নিয়েই বলছিলেন। জুটমিলের সঙ্গে জোনাক-বাড়ি কেনার জন্য তো দীপমালা মালিকের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন কিছুদিন আগে। কিন্তু…”
“দীপমালা!”
পুশকিন দেখল বাবা কেমন যেন হয়ে গেল হঠাৎ।
“হ্যাঁ,” পুশকিন নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করল, “উনি বললেন, ওই বাড়ির সঙ্গে কী একটা প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। সেটার উত্তর দিতে পারলে বাড়িটা দেবেন। না হলে নয়। ভাবুন, বিজ়নেস ডিল এটা। তার মধ্যে কেউ এমন করে? এটা কি খেলা নাকি?”
বাবা বসে পড়ল চেয়ারে। বাবাকে কেমন যেন হতভম্ব লাগছে।
“কী হয়েছে তোমার?” পুশকিন অবাক হল এবার, “আমি ছোটবেলায় সোনাঝুরিতে থাকতাম। কিন্তু অত ছোট ছিলাম তো! সেভাবে মনে নেই সব ঠিকমতো। আচ্ছা বাবা, তুমি তো ছোটবেলায় সোনাঝুরিতে থাকতে। জোনাক-বাড়ির কি কোনও গল্প আছে?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “তুই পেখমদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিস, আমায় বলিসনি তো!”
পুশকিন অবাক হল। অফিসের কথা ও কাউকেই বলে না। বাবাকেই বা বলবে কেন?
“পেখম কে?” নোঈ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল!
বাবা কেমন বিষণ্ণ গলায় বলল, “দীপমালা হল পেখমদির ভাল নাম। আর জোনাক-বাড়ি! হ্যাঁ, তাতে তো প্রশ্ন আছেই! কিন্তু আমি সেটা বলতে পারব না। বাবু, তুই সোনাঝুরিতে যা।”
“গিয়ে?” পুশকিন অবাক হল।
বাবা স্থির চোখে তাকাল পুশকিনের দিকে। তারপর বলল, “গিয়ে বিজনের সঙ্গে দেখা কর। বিজন সরখেল। জোনাক-বাড়ি সম্বন্ধে কিছু জানতে হলে ওই লোকটাই পারবে বলতে। পেখমদির গল্পটা বিজনই সবচেয়ে ভাল জানে!”
Chapter - 25 - 29
২৫. কাজু
ঘুমের শেষে কী লেগে থাকে? অন্ধকার? আর অন্ধকারের শেষে? অন্ধকারের শেষেই কি হাহাকার লেগে থাকে? আকাশ-পাতাল গ্রাস করে নেওয়া হাহাকার!
আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই কথাটাই মনে এল কাজুর। নিজেকে কেমন যেন ভিখিরি মনে হল। মনে হল এভাবে কাউকে কাছে টেনে তারপর দূরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়! ও বেশি রোজগার করে না বলেই কি আজ এই ভাবে ওকে দূরে সরিয়ে দিতে পারল পেখম! যতই ওদের সমাজ আলাদা হোক না কেন, আজ যদি সুদর্শন মালিকের মতো বাবা থাকত ওর, যদি সম্পত্তি থাকত, তা হলে কি ওর সঙ্গে এমন করতে পারত পেখম বা ওর বাড়ির লোকেরা?
চোখটা জ্বালা করছে কাজুর। ও সহজে কাঁদে না, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে বুকের ভেতরে জাহাজ উলটে গেছে! আর চারদিক থেকে জলের তোড় এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে!
জোনাক-বাড়ির বড় গেটের পাশের ভেঙে যাওয়া ছোট কংক্রিটের পিলারটায় একটু ভর দিয়ে দাঁড়াল কাজু। মন ঠিক না থাকলে কিছুই ঠিক থাকে না! এই রাতের অন্ধকারে সবটাই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ওর!
আজ সন্ধে থেকে হাওয়া দিচ্ছে খুব। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কে জানে বৃষ্টি হবে কি না!
চ্যাটার্জিপাড়ায় আজ টিউশন ছিল কাজুর। ক্লাস টেনের দুটো ছেলে পড়ে ওর কাছে। পড়াতে বসেই শুনছিল বাজ পড়ছে। জানলা দিয়ে দেখেছিল বিদ্যুতে-বিদ্যুতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে আকাশ! বৃষ্টি হবে কি? ও ভেবেছিল ছাতা সঙ্গে নেই, ফেরার পথে ভিজে যাবে একেবারে। কিন্তু বৃষ্টি আসেনি এখনও।
কাজু আবার আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ করে আছে মাথার ওপরে। তারাদের দেখা যাচ্ছে না! এত হাওয়া যে, চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভাল লাগছে, কিন্তু শুধু শরীরে আটকে যাচ্ছে ভাললাগাটুকু। মনের কাছে পৌঁছতে পারছে না সেটা। এখনও চোখের সামনে ভাসছে ছোট গলি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দামি গাড়িটা। আজ তবে পেখমদের বাড়িতে এসেছিল মালিকরা। কথা কি ঠিক হয়ে গেল? কবে ঠিক হল দিন? ওর মৃত্যুদিন?
“কী রে, শরীর খারাপ?” যাদবকাকা এসে পেছন থেকে হাত দিল কাজুর পিঠে।
কাজু পেছনে ফিরল। আধো অন্ধকারে যাদবকাকাকে কেমন ভুতুড়ে লাগছে! জোনাক-বাড়ির গেটের সামনে একটা লাইটপোস্ট আছে। সেখানে খুব দুর্বল আলো জ্বলে একটা। আলোর মাথায় কালচে একটা শেড। হাওয়ায় আলোটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে!
“কী রে কাজু!” যাদবকাকা এবার সামনে এসে দাঁড়াল।
কাজু ঝাঁজালো গন্ধ পেল ঘামের। সারা দিন মিল-এ কাজ করে যাদবকাকা। বিমলদা বলে, এই যে-গন্ধ আমাদের খারাপ লাগে, আসলে তা পরিশ্রমের গন্ধ। গরিবদের মধ্যে কাজ করতে হলে অনেক কিছু মেনে নিতে হবে। বুঝতে হবে যে, জীবনের আসল গন্ধ আর স্পর্শগুলো এমনই হয়। আমরা মেকি জিনিসপত্র দিয়ে ঢেকে রাখি সব। আসলে জীবনের গন্ধ এমনই। ঝাঁজালো, কটু। ঠিক এই গরিব অসহায় মানুষগুলোর রোজকার বেঁচে থাকার মতো!
কাজু নিজেকে ঠিক করল। ওর ইচ্ছে করছে না কারও সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু ও শিখেছে যে, নিজের ইচ্ছের চেয়ে বৃহত্তর মানুষের স্বার্থ বড়। নিজের ইচ্ছেকে অমানুষ ছাড়া আর কেউ বড় করে দেখে না!
“বলো যাদবকাকা,” কাজু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সামনে তাকাল।
“আমাদের ব্যাপারটা দেখলি কিছু? আর তো সময় নেই! মালের লাস্ট ব্যাচ তৈরি হচ্ছে। আর দিনদশেকের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে। তুই জ়রা দেখ বাবু। তুঝে পতা হ্যায় না হামলোগোকা ক্যায়া হোগা! শুনলাম তুই গিয়েছিলিস মালিকের সঙ্গে কথা করতে। কিছু পজ়িটিভ হল?”
কাজু ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকাল। মনে পড়ে গেল ক্লাবের সেই সন্ধেটার কথা।
সুদর্শন মালিক লোকটা কেমন ঠান্ডা চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মুখে লেগেছিল পাতলা চিক কাগজের মতো একটা হাসি।
“বলো কাজুবাবু, তোমার কী আর্জি?”
আর্জি! কথাটা কানে কট করে লেগেছিল কাজুর। আর্জি মানে? ও কি রাজার দরবারে এসেছে নাকি? ওর মনে হয়েছিল, পা থেকে চটি খুলে লাগিয়ে দেয় লোকটার মুখে! কোনও-কোনও মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস পেয়ে গেলে এমন জানোয়ার হয়ে যায়! তার ছোট-ছোট কথার মধ্যে দিয়ে উপচে ওঠে পশুত্ব! সবাইকে নিজের অধীনে ভাবা বা সবাই তার কাছে কিছু প্রার্থনা করতে আসে, এরকম ভাবা তো একরকম পশুত্বই বটে!
“আর্জি মানে?” কাজু ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
সুদর্শন সামনে রাখা গেলাস থেকে হালকা সরষের তেলের রঙের মদে চুমুক দিয়ে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। সামান্য হেসে বলেছিল, “আরে মিস্টার ট্রেড ইউনিয়ন! এমন রাগ করলে চলে! নাও, কাজু খাও,” সামনে রাখা তিন-চার রকমের খাবার থেকে কাজুর প্লেটটা ওর দিকে ঠেলে এগিয়ে দিয়েছিল সুদর্শন।
“আমি আপনার সঙ্গে দরকারি কথা বলতে এসেছি। আপনার ফ্যাক্টরি নিয়ে।”
“সন্ধেবেলা বসে একটু রিল্যাক্স করব, সেটাও করতে দেবে না! সারাক্ষণ কি কাজের কথা ভাল লাগে!” সুদর্শন মাথা নেড়েছিল। বোঝাতে চাইছিল যে, বিরক্ত হচ্ছে।
“এটা ভাললাগা বা মন্দলাগা নয়। এটা অনেক মানুষের জীবন। আপনি নাকি বলেছেন মালের কোয়ালিটি খারাপ হলে, পার্টি যদি পেনাল্টি করে, তা হলে সেই টাকার একটা ভাগ আপনি শ্রমিকদের কাছ থেকে কেটে নেবেন!”
“আমার ফ্যাক্টরির ব্যাপার তোমায় কেন বলব?” সুদর্শন এবার গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।
“কারণ, আমায় না বললে আপনার ফ্যাক্টরিতে গন্ডগোল হবে! বুঝলেন?” লোকটার ঔদ্ধত্য দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি কাজু, “শ্রমিকের ঘাম আর রক্ত পিষে আপনার পকেট ভরে, তারা যদি উঠে দাঁড়ায় কী হবে জানেন?”
“আরে! তাই! ওভাবে আমার পকেট ভরে!” সুদর্শন হেসেছিল শব্দ করে, “এমন হট হেড নিয়ে তুমি প্রেম করো কী করে? তবে শুনেছি তুমিই আমার বউমার পেছনে ঘোরো। ও তোমায় পাত্তা দেয় না। সত্যি?”
কাজু চোয়াল শক্ত করে সামলেছিল নিজেকে। তারপর বলেছিল, “আমি যেটা বলছি সেটা বলুন। আপনি কি জানেন যে, আপনার ছেলে সুজিত ইনফিরিয়র কোয়ালিটির র-মেটিরিয়াল দিয়ে জিনিস বানাচ্ছে! সেটা ফেল করার চান্স নাইনটি পারসেন্ট! আপনাদের বাজে জিনিসের দায় শ্রমিকরা নেবে কেন?”
সুদর্শন হেসেছিল। কিন্তু হাসির পেছনে যে বিষ লুকিয়ে আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি কাজুর।
সুদর্শন বলেছিল, “আমার ছেলে! আমার ফ্যাক্টরি! তুমিই বলছ যে সবটা আমার, আর তারপর এটা বলতে চাইছ যে, আমি কিছু জানি না! তুমি কে হে ছোকরা? টিপে ধরলে মরে যাবে! বয়স কত? আমায় জ্ঞান দিতে এসেছ? তোমাদের বিমল জানে যে, তুমি এসেছ আমার কাছে? গোপেন জানে? শোনো, আমার ফ্যাক্টরি এটা। আমার বাপ-ঠাকুরদার রক্ত-জল-করা পরিশ্রম আছে এতে! সেটা নিয়ে তোমার মতো নো ওয়ান-এর জ্ঞান আমি শুনব না। দাড়ি রাখলেই বুঝি ইন্টেলেকচুয়াল হয়ে ঢপের জ্ঞান দেওয়া যায়! শ্রমিক স্বার্থ! কোনওদিন এক পয়সা রোজগার করে দেখেছ? বিদেশ থেকে কাজ আনতে কী করতে হয় জানো? এতগুলো লোকের মাস মাইনে কোথা থেকে আসে জানো? সবাই কাজে ঢোকার সময় তাদের কন্ট্র্যাক্ট লেটার দেখে নিয়েছিল কি না জানো? আমি কি কাউকে পায়ে দড়ি দিয়ে রেখেছি? ইচ্ছে না হলে চাকরি ছেড়ে দিক! শালা, খালি বক্তৃতা! বাতেলাবাজি! আর চটি পরে এই ক্লাবে ঢুকেছ? ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার আগে কেটে পড়ো। আর-একটা কথা, দীপমালার সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে হবে। সুজিত যা চায় আমি ওকে সেটা দিই। দীপমালাকে ও চেয়েছে। আমার ফ্যাক্টরি বা দীপমালা দুটোর পেছনেই ঘুরঘুর করা বন্ধ করো। না হলে তোমাদের গোটা গুষ্টিকে পাছায় লাথি মেরে বের করে দেব জোনাক-বাড়ি থেকে। আর বিশেষ করে তোমায় খুঁজে পাওয়া যাবে না! মনে থাকবে?”
গোটা কথাটা চোয়াল শক্ত করে শুনেছিল কাজু। তারপর বলেছিল, “যা করতে পারেন করে নিন! কিন্তু জানবেন যদি স্ট্রাইক হয়, তা হলে মালও কিন্তু ডেলিভারি হবে না। পড়ে থাকবে ফ্যাক্টরিতে। ডেলিভারি না হলে পয়সাও পাবেন না। মাসের পর মাস টাকা ঝুলে থাকবে। লেট ক্লজ়ে পড়ে বড় পেনাল্টি খাবেন। আর পড়ে থাকতে থাকতে ব্যাচ খারাপ হয়ে যাবে। তা হলে পার্টি তো আর সেই খারাপ মাল নেবে না। তখন পুরো লস! আর মনে রাখবেন, আমরা এও জানি যে, পার্টির এই মাল আর্জেন্টলি দরকার বলে অন্য কোনও অজুহাত বা ক্যালামিটি ক্লজ় অর্ডারে নেই বা তারা মানবেও না। ফলে সাবধান। ভাববেন না আমায় ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে!”
“তুই যাবি না ঘাড় ধরে তোকে বের করব শুয়োরের বাচ্চা!” আচমকা টেবিল থাবড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল সুদর্শন।
কাজু দেখেছিল আশপাশে যারা যা কাজ করছিল, সব থামিয়ে চুপ করে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
কাজুও উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার। তারপর বলেছিল, “জাত চিনিয়ে দিলেন তো নিজের! যা বললাম মাথায় থাকে যেন। শ্রমিকদের কোনও ক্ষতি হবে না সেটা ইন রাইটিং দেবেন আপনি সাত দিনের মধ্যে। না হলে শ্রমিকদের রক্ত জল করে বের করা পয়সায় ফুটানি করা বের করে দেব।”
“কাজু, কী রে, কী কথা হল? বললি না?” যাদবকাকার মুখটা এই আলো-আঁধারিতে কেমন অদ্ভুত লাগছে! আলোটা নড়ছে হাওয়ায়। মুখের ওপরে পড়া ছায়াটাও কেমন নড়ছে!
কাজু বলল, “আমি আলটিমেটাম দিয়ে এসেছি। সাত দিন। তিন দিন কেটে গেছে। আরও চার দিন বাকি। তারপর আমরা স্ট্রাইকে যাব।”
“স্ট্রাইক!” যাদবকাকা কেমন যেন ঘাবড়ে গেল, “এ বাবু, ইয়ে তো গড়বড় হয়ে যাবে!”
“কিছু গড়বড় হবে না। ডেলিভারি ডেটের দু’মাস পরে আর মাল নেবে না পার্টি। আমি ইউনিয়ন রুমে অর্ডারের ডুপ্লিকেট কপি দেখেছি। কারণ, পার্টিকেও তো ব্যাবসা চালাতে হবে! কতদিন আর ওরা বসে থাকবে মাল ডেলিভারি না পেয়ে! শোনো, তোমরা ভয় পাবে না। দু’মাস ধরে রাখবে স্ট্রাইক। মালিক কী, মালিকের ঘাড় মাথা নোয়াবে! এত টাকার অর্ডার! ও শুধু লিখে দেবে যে, মালের ডিফেক্টের জন্য যদি পেনাল্টি কাটে, তা হলে তোমাদের মাইনে বা ওভারটাইমে হাত পড়বে না। ব্যস! চাকরির প্রাথমিক শর্ত তো এটাই ছিল। সেটাই ওরা মানছে না। তাই দাওয়াই হিসেবে স্ট্রাইক। দু’মাস শুধু ধরে রেখো। এক মাসের মধ্যে দেখবে লেজ গুটিয়ে সুদর্শন মালিক আসছে সমঝোতা করতে। মাল ক্যানসেল হয়ে গেলে বাজার থেকে যে-টাকা উঠিয়েছে, সেটা দেবে কী করে? তোমরা একদম ভয় পাবে না।”
যাদবকাকা এবার যেন বুঝল। নিজের মনে কিছু ভেবে নিয়ে বলল, “কিন্তু বিমলদা যদি আপত্তি করে?”
“বিমলদা তোমাদের টাকা দেবে? সংসার চালাবে? তোমাদের যা সমস্যা সেটা মেটাতে কি লোকটা কিছু করছে! আমার তো মনে হয় সুদর্শন ওকেও খাইয়ে রেখেছে। তুমি কাল বা পরশু মিটিং ডাকো। আমি কথা বলব। তুমিও তো ওদের নেতা, না কি? বিমলদা দু’পাতা বই পড়েছে। ইংরেজি জানে। তার মানে এই নয় যে, শ্রমিক স্বার্থ তোমার চেয়ে বেশি দেখবে। তুমি চাকরি করো মিলে। তোমার ফ্যামিলি আছে। ওর সেই সব আছে কিছু? আর আমায় কিছু বললে? আমি ভয় পাই না যাদবকাকা। আমার হারানোর কিছু নেই। তুমি একটা মিটিং ডাকো।”
“কী যে বলছিস!” যাদবকাকা পিঠে হাত দিল ওর, “ঘরমে সবহি তো হ্যায়।”
কাজু চোয়াল শক্ত করল। চোখ জ্বালা করছে ওর। বুকের ভেতর জাহাজ উলটে গেছে আজ। চারিদিক থেকে জলের চাপ বাড়ছে। আধো আবছায়া গলিজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিদেশি গাড়িটা ওকে যেতে দিচ্ছে না! পৃথিবীতে কেউ কোনওদিন বুঝতে পারবে না, সব থেকেও কখন মানুষের কিছু থাকে না!
যাদবকাকা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। বলল, “তু ঠান্ডা রাখ বাবু। আমি দেখছি। পরশু গেটে মিটিং ডাকছি একটা। এখন তুই ঘর যা। মৌসম খুব খারাপ। ঘর যা।”
যাদবকাকা চলে যাওয়ার সামান্য পরে কাজুও এগোল। মনটা এমন খারাপ করছে যে, কিচ্ছু ভাল লাগছে না। ভেবেছিল পার্টি অফিসে যাবে, কিন্তু ওই গাড়িটা পেখমদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখার পর থেকে সবকিছু অর্থহীন লাগছে ওর!
সুজিত কি এসেছে পেখমের সঙ্গে দেখা করতে? ওরা কি কথা বলছে এখন? কী কথা বলছে? দৃশ্যটা মনে করতেই বুকের মধ্যে কে যেন মাটি খুঁড়ে পারদ ঢেলে দিল! আর মাইলের পর মাইল মরে যেতে লাগল গাছ। নষ্ট হয়ে যেতে লাগল মাটি। বিষ এসে মিশে যেতে লাগল জলে।
কাজু শুনেছে, আজকাল নাকি পেখম কলেজেও যাচ্ছে না। বিজন বলছিল সেদিন। ও পেখমদের বাড়িতে গিয়েছিল। পেখমের মা আর কাকিমা বিজনকে দেখাই করতে দেয়নি! বলেছে, ক’দিন দেখা করা যাবে না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজেদের ঘরের দরজায় দাঁড়াল কাজু। কিন্তু ভেতরে ঢুকল না। বাড়িতে ও পারতপক্ষে ঢোকে না আজকাল। রাতে খেতে আর শুতেই আসে। অসুস্থ বাবা ওকে দেখলেই খিটখিট করে! শুধু আন্টি বাডু যা ওর হয়ে কথা বলে। তা ছাড়া মা, ভাই, বোন। ভাল করে বসারই জায়গা হয় না!
ও দেখল, ছোটভাইটা পড়ছে মাটিতে বসে। বোন চৌকিতে বসে রয়েছে। ভেতরের ঘর থেকে আন্টি বাডু ছাড়াও কার যেন গলার আওয়াজ আসছে। কাজুর মনে হল এখন ওকে একা থাকতে হবে। ঘরে ঢুকতে পারবে না কিছুতেই।
বাড়িতে কারও সঙ্গেই যেন কথা বলার নেই! ও যেন অতিথি! সংসারে টিউশনের টাকা দেওয়াটা ওর কাজ। ব্যস, ওইটুকুই যেন সম্পর্ক! আগে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তাও কথা হত। পড়াশোনায় খুব ভাল ছেলেটা। গাছ বলতে পাগল। সারাক্ষণ ওই নিয়েই কথা বলে যেত। কিন্তু আজকাল তাও হয় না। নিজের বুকের ভেতর বিষের একটা নদী তৈরি হয়েছে কাজুর। সেই ঘূর্ণিতেই ডুবে মরেছে ও! আর মৃত মানুষের সঙ্গে কার আর কথা হয়! যোগাযোগ হয়!
ও পেছন ফিরে সিঁড়ির দিকে এগোল। ছাদে যাবে। ওই একটাই জায়গা আছে, যেখানে ও ছাড়া আর বিশেষ কেউ যায় না। ওই নির্জনতাটা খুব ভাল লাগে কাজুর! ছাদ থেকে পেছনের বড় বাগানটা দেখা যায়। আর বাগান ছাড়িয়ে দেখা যায় সামান্য দূরের গঙ্গা!
ছাদে পা দিতেই হাওয়া যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল ওকে। একটা ঘর আছে ছাদে। ভাঙা জিনিসে ভরতি! ও মাঝে মাঝে যায় সেখানে। কিন্তু আজ ভাল লাগছে না।
ও পায়ে-পায়ে ছাদের পেছনের দিকে গেল। এই জায়গা থেকেই বাগান দেখা যায়।
ছাদের পাঁচিলটা বেশ চওড়া। নিচু। ইচ্ছে করলে বসাও যায়। কিছুটা দূরে-দূরে পাঁচিলের ওপর সিমেন্টের ঘটের মতো ডিজ়াইন করা। বাড়িটা অনেক পুরনো, তাই বেশ কিছু ঘট ভেঙে গেছে। রাতের অন্ধকারে ওই ঘটগুলোকে কেমন যেন ভাঙাচোরা মুখের মানুষ মনে হচ্ছে!
কাজু পাঁচিলে বসে চারিদিকে তাকাল। দূরে ছড়িয়ে থাকা আরও তিনটে ব্লক দেখা যাচ্ছে। সব কেমন নিঝুম। শুধু নীচের বড় বাগানটায় সবুজ-হলুদ আলো জ্বেলে পিটপিট করে জেগে আছে জোনাকিরা।
কাজুর মনে হল, আজ থেকে অনেকদিন পরে একদিন এইসব বাগান, বাড়ি কিছুই থাকবে না। এইসব বিক্রি হয়ে যাবে। এখানে হয়তো নতুন বাড়ি উঠবে। কেউ আর হয়তো মনেও রাখবে না কাজুকে। পেখম চলে যাবে কোথায়। ও-ও কি আর মনে রাখবে এসব? মনে রাখবে, একটা ছেলে ছিল, যে সবটা দিয়ে ভালবেসেছিল ওকে। মনে রাখবে অন্ধকারে জোনাকিদের এই বাড়িটাকে। মনে রাখবে সেইসব জ্যোৎস্না। সেইসব বিকেলের মাঠ। নদীর ধার। সেইসব মুহূর্ত, যা ছিল শুধু ওদের। যা শুধু ওরা দু’জন জানত।
সব হারিয়ে যায়। ভালবাসা হারিয়ে যায়। বিশ্বাস হারিয়ে যায়। কথা হারিয়ে যায়। সময়ের দুর্লঙ্ঘ্য খাদে তলিয়ে যায় স্মৃতি। সোনাঝুরির এই হাওয়ায়, এই আলোয়, এই অন্ধকারে অমোঘ নিয়মে একদিন হারিয়ে যাবে কাজুও। কেউ ওকে মনে রাখবে না। পেখম ওকে মনে রাখবে না আর।
জীবনের অনিত্যতার চেয়েও এই শেষের কথাটুকু, ‘পেখম ওকে আর মনে রাখবে না’, এটা মনে হতেই কী যেন একটা হয়ে গেল কাজুর! আর বহুক্ষণ উলটে থাকা জাহাজটার কাঠামো ফাটিয়ে হু হু করে ঢুকে এল জল! আর সেই জলের তোড়ে এই সন্ধের অন্ধকারে, হাওয়ায় কোথায় যেন ভেসে, তলিয়ে গেল কাজু! মনে হল ওর ভেতর থেকে কে যেন সত্যিকারের কাজুকে ছিঁড়ে, খুলে নিয়ে গেছে! আর যেন কোনও জোর নেই ওর। শরীরে কোনও শক্তি অবশিষ্ট নেই। কাজু বিহ্বল হয়ে একবার নিঃশেষ অন্ধকারের দিকে তাকাল, তারপর হাঁটু ভাঁজ করে সিমেন্টের মেঝেতে মুখে গুঁজে শব্দ করে কেঁদে উঠল।
হাওয়া যেন আরও জোরে বইছে। আকাশ ফেটে যাচ্ছে বিদ্যুতে। কিন্তু কাজুর হুঁশ নেই কোনও। আসলে আমাদের কষ্টগুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যেন ছোট্ট আলমারিতে ঠেসে ভরে রাখা জিনিসপত্র। আলমারি খুলে একটা বের করতে গেলেই হুড়মুড় করে সব নেমে আসে।
কাজুরও সব কিছু এই সন্ধেতেই যেন মনে পড়তে লাগল। ও কিছুতেই আটকাতে পারছে না নিজেকে। ছাদের মেঝেতে যেন কেউ ওকে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে। কয়েকহাজার বছরের আটকে থাকা জল যেন আজ দখল নিয়েছে ওর। কাজুর মাথা থেকে সবকিছু মুছে যাচ্ছে সেই জলের স্রোতে।
“কাজুদা!” নরম একটা হাত এসে কাজুর মাথায় আলতো করে স্পর্শ করল হঠাৎ।
কাজুর যেন মনে হল কেউ একটা এসেছে। কেউ একটা ওকে ডাকছে। কিন্তু জলের তলায় ডুবে যাওয়া মানুষের মতো বুঝতে পারল না কোথা থেকে এই শব্দ আসছে। কেউ কি সত্যি ডাকছে? নাকি আসলে কেউ ডাকছে না! কেউ আসেইনি! সবটাই ওর ভ্রম! কারণ, এই পৃথিবী তো নিজের দরকারেই কাজুকে ব্যবহার করে গেছে। দরকার যখন শেষ, তখন কেন কেউ আসবে ওর কাছে!
“কাজুদা, কী হল? ওঠো! উঠে বোসো!” দুটো হাত এবার কাজুকে শক্ত করে ধরে ছাদের মেঝেতে বসিয়ে দিল!
কে এল? কে এটা? কাজু আবছা চোখে তাকাল সামনে। জলের পরদা ভেদ করে দৃষ্টি যেতে পারছে না। সব কেমন লেপটে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চমকাল আকাশ ফাটিয়ে। আর তার আলোয় জলের ওপার থেকে মুখটা এবার বুঝতে পারল কাজু। নয়না!
নয়না এখানে এখন কী করছে? কাজু নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারছে না। নিজের শরীরের ওপর, মনের ওপর যেন নিজেরই জোর নেই ওর!
“কী হয়েছে কাজুদা, কী হয়েছে? আমি নীচে ছিলাম আন্টির কাছে। জানলাম এসেছ। তাই আমি ছাদে এলাম… তুমি কাঁদছ কেন?”
কাজু কথা বলতে পারছে না। মাটিতে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আছে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে পাহাড়ি ঝোরার মতো!
নয়না এগিয়ে এসে আচমকা কাজুকে টেনে নিল বুকের কাছে। জোরে ধরে রাখল। কাজুর কী হল কে জানে, একটা আশ্রয় পেয়েই বোধহয় দু’হাত দিয়ে ও নিজেও পেঁচিয়ে ধরল নয়নার কোমর।
“কী হয়েছে কাজুদা!” নয়নার গলা ভারী হয়ে এল। কাজুকে যেন আরও শক্ত করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
কাজুর কান্না কমে এসেছে। কিন্তু তার দমক মাঝে মাঝে তরঙ্গ ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা শরীরে! ও বুঝল নয়না ওকে জড়িয়ে ধরেছে শক্ত করে আর নিজের বুক দুটো ঘষছে কাজুর বুকের সঙ্গে! ওর গলায়, ঘাড়ে মুখ ঘষছে নিজের।
“কাজুদা!” নয়নার গলায় অদ্ভুত এক শ্বাস এসে জড়িয়ে দিচ্ছে কথাগুলো। কাজুর চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে কাজুর মুখটাকে আঁকড়ে ধরছে নিজের বুকের কাছে। শাড়ি সরে যাচ্ছে। ছোট ছোট ঢেউ-এর মধ্যে যেন কাজুকে ডুবিয়ে মারতে চাইছে ও।
কাজু নিজেকে ছাড়ানোর কথা ভাবল একবার। কিন্তু তারপর বুঝল নয়নার শরীরের স্পর্শে ও নিজেও কেমন শক্ত হয়ে উঠছে! এটা কী হচ্ছে! এমন হচ্ছে কেন! কীভাবে এ সম্ভব! কিছু বোঝার আগেই এবার নয়না এই আধো-অন্ধকারে, এই মন্থনের মধ্যে আচমকা হাত দিয়ে স্পর্শ করল ওর কাঠিন্য!
কাজু মুখ তুলে তাকাল নয়নার দিকে। নয়না দ্বিধাহীনভাবে কামড়ে ধরল কাজুর ঠোঁট। ওর জিভ কাজুর জিভ স্পর্শ করেছে। জিভ কামড়ে ধরেছে। কাজু বাধা দিচ্ছে না। বরং নয়নার জিভকে যেন খুঁজতে দিচ্ছে কিছু। যেন নয়নার সঙ্গে ও নিজেও খুঁজছে নিজেকে। চোখের জলের নুনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ঘাম, লালা। নয়না সবুজ শক্ত লতার মতো ক্রমশ দখল নিয়ে নিচ্ছে কাজুর। ওর শাড়ি সরে যাচ্ছে! ব্লাউজ় নেমে যাচ্ছে! কাজু যেন তলিয়ে যাচ্ছে গোলকধাঁধায়! নয়নার জিভে নারকেলের স্বাদ। ও কাজুর একটা হাত নিয়ে নিজের খোলা বুকের ওপর চেপে ধরেছে! মুখটা চেপে ধরছে কঠিন হয়ে ওঠা বৃন্তে! কাজুর চারিদিকে কেমন ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। নয়না ক্রমশ উঠে আসছে ওর শরীরের ওপর। ওর প্যান্টের হুক খুলে দিচ্ছে। বোতাম টান মেরে ছিঁড়ে দিচ্ছে! আর অস্ফুটে বলছে, “তুমি আমার কাজুদা! তুমি শুধু আমার!”
কাজু কার? নয়নার? পেখমের? নাকি কাজু নিজের? কিছুই বুঝতে পারছে না ও। শুধু এক প্রবল স্রোত ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিষাদ থেকে গোলকধাঁধায়। কাজু বুঝতে পারছে এটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আটকাতেও পারছে না নিজেকে। নয়না ওর কোলের ওপর বসে পড়েছে। শাড়ি উঠে গেছে ঊরু অবধি। দুটো পা দিয়ে সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরেছে ওকে। ব্লাউজ়ের সামনেটা সম্পূর্ণ খুলে ফেলেছে কখন। কাজুর মুখটা চেপে ধরছে শরীরে। কাজু বুঝল ওর প্রতিরোধ শেষ হয়ে আসছে। মনে হল, কেনই-বা প্রতিরোধ করবে? কীসের জন্য করবে? কে আছে ওর? সেই মেয়েটা কি একবারও ভাবল ওর কথা? অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা বড় গাড়ি যখন ওর পথ বন্ধ করে দিয়েইছে, তখন অন্য পথে যেতে কে আটকাবে ওকে!
আবছা চোখে নয়নার দিকে তাকাল কাজু। বুঝল, মেয়েটা আর নিজের মধ্যে নেই। পাগলের মতো ওকে নিজের সঙ্গে বেঁধে ফেলতে চাইছে। নয়নার ভেতরের আদিম নারী তার পুরুষকে খুঁজে চলেছে যেন। সমস্ত ভালবাসা আর আকুতি যেন এসে জ্বলে উঠেছে আজ নয়নার মধ্যে।
কাজু ছিন্নভিন্ন আকাশ থেকে নেমে আসা সাদা-গোলাপি আলোয় নয়নাকে দেখল। তীক্ষ্ণ কাচের মতো মুখ। কপালে কাটা দাগ। বড়-বড় চোখ! মুখে বিন্দু-বিন্দু ঘামের ফোঁটা। কাজুকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়ে এখন থরথর করে কাঁপছে! মনে হচ্ছে যে-কোনও সময় ভেঙে যাবে মেয়েটা!
কাজু নিজেও ভাঙতে চায় আজ। এই কাজুটাকে ভেঙে বের করে আনতে চায় অন্য একটা কাজুকে। যে-কাজু ভালবাসে না। যে-কাজু কষ্ট পায় না। যে-কাজু শুধু শরীর বোঝে। যে-কাজু জানে, বিষ বুকে নিয়েও কীভাবে বেঁচে থাকা যায়।
ও নিজেকে আর আটকাল না। নয়নাকে আঁকড়ে ধরে কামড়ে ধরল ওর ঠোঁট! তারপর কোলে উঠিয়ে শুইয়ে দিল মেঝেতে। আর বর্শার মতো, বল্লমের মতো নিজে নেমে আসতে লাগল নয়নার শরীরে! আসতেই লাগল ক্রমাগত!
আর ওই ছাদ থেকে নীচে দূরের বাগানে জ্বলে-নিভে-জ্বলে, আলো আর অন্ধকারকে, ঠিক আর ভুলকে, প্রেম আর অপ্রেমকে, আলো আর পতঙ্গকে একাকার করে দিতে লাগল আলোকবিন্দুর মতো জোনাকিরা!
.
২৬. আইকা
যেন পিঁপড়ে! যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা খেলনা! যেন ছিঁড়ে গড়িয়ে যাওয়া পুঁতির মালা! ওপর থেকে রাস্তার মানুষজনকে অদ্ভুত দেখতে লাগছে! স্কুল ছুটি হয়েছে। দুটো বড় বাস ততটাও বড় নয়, তাও গলিতে ব্যাক করাতে গিয়ে কেমন একটা ছত্রভঙ্গ অবস্থার সৃষ্টি করেছে চারিদিকে! লোকজনের মধ্যে কাজ শেষের মন্থরতা। পুজোর ছুটির পরের আলস্য। অনিচ্ছে। সামনের দিকে তাকাল এবার ও। কেমন একটা রক্তহীন আকাশ এই সব কিছুর মাথায় টাঙানো আছে যেন। যেন কাচের, নির্লিপ্ত চোখ নিয়ে এই শহর তাকিয়ে আছে অগণন মানুষের দিকে। আচ্ছা, এই শহরটা কি ক্রমে-ক্রমে শেষ হয়ে যাচ্ছে! মারা যাচ্ছে!
ছ’তলার ওপর থেকে শহরটার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা মায়া হল আইকার। আজ সকাল থেকেই মেঘ করে ছিল। আর এখন এই বিকেলের দিকে সেটা যেন জাঁকিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন ঘন প্যাস্টেল ঘষে আকাশের রংটাকে আরও গাঢ় করে দিচ্ছে!
আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে আইকা। মাকে চোখের ডাক্তার দেখানোর ছিল। বাবার একজন পুরনো বন্ধু আছে। ফিরোজকাকু। আই স্পেশ্যালিস্ট। বরাবর মা তাকেই দেখায়। ওদের বিপদের সময় যে দু’-একজন ওদের সামান্য হলেও সাহায্য করেছে তাদের মধ্যে ফিরোজকাকু অন্যতম।
ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সে বসে ফিরোজকাকু। ছ’তলার ওপর চেম্বার। ভিড় হয় বেশ। সবাইকে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে হয়। কিন্তু আইকাদের সেসব করতে হয় না।
গত কয়েকদিন ধরেই মায়ের চোখে জল পড়ছিল। মাথাব্যথা করছিল। আইকা বারবার বলছিল, যেন ডাক্তার দেখিয়ে নেয়। মা যথারীতি পাত্তা দেয়নি। কিন্তু কাল রাতে ব্যথাটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তাই আজ আসতেই হয়েছে।
সকালে মা নিজেই বলেছিল, “ফিরোজদাকে একবার ফোন কর বুড়ি, আজ একবার যাব।”
সপ্তাহের মাঝখানে এমন হুট করে বললেই কি অফিস থেকে ছুটি করতে পারবে? মনে মনে খানিকটা বিরক্ত হয়েছিল আইকা। সেই কবে থেকে বলে যাচ্ছে মাকে, ডাক্তার দেখাও। কিন্তু মা শুনলে তো! আর এখন যখন শিরে সংক্রান্তি, ডাক্তার দেখাতে হবে এখনই!
আইকা বিরক্তি না-লুকিয়ে বলেছিল, “আমি তো আগেই বলেছিলাম, দেখিয়ে নাও। শুনলে না তো! আজ বুধবার। প্লাস অক্টোবর মাসের শেষ হতে চলল। এই সময় কী করে অফিস কামাই করব! জানো না, মাসের শেষে অফিস থেকে টাইম ম্যানেজ করতে আমার মুশকিল হয়!”
মা টোস্টারে পাঁউরুটি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তোর আজকাল সবেতেই এমন বিরক্তি কেন রে? এত রাগ কীসের তোর? সারাক্ষণ সবাইকে মুখ নেড়ে যাচ্ছিস! আর, শরীর খারাপ কি মাসের শুরু, সপ্তাহের ছুটির দিন দেখে হবে?”
আইকা স্নান করে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল সে সময়। মায়ের কথা শুনে চিরুনি হাতে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল খাওয়ার ঘরের দরজায়। বলেছিল, “কতদিন ধরে তোমায় আমি বলছি ডাক্তার দেখাও! শুনছ আমার কথা? তুমি নিজের দোষটা দ্যাখো না কখনও!”
“এতদিন তো আমার খুব-একটা অসুবিধে হয়নি। শুধু-শুধু টাকা খরচ করে কী হবে? এখন হল তাই বললাম।”
মায়ের কিছু-কিছু যুক্তি কিছুতেই বুঝতে পারে না আইকা। মায়ের মনের কোনও একটা অংশে এখনও সেই যাদবপুর কলোনির বাড়িটা আটকে আছে! সারাক্ষণ এত টাকার চিন্তা করে কী করে কে জানে! মাকে কতবার বলেছে আইকা যে, এখন আর এসব ভাবার দরকার নেই। কিন্তু কে কার কথা শোনে! সারাক্ষণ পাই-পয়সার হিসেব করে যাচ্ছে!
আইকা বলেছিল, “আবার শুরু করলে তো! কতদিন বলেছি যে, এমন করে কথা বলবে না! আমাদের অভাব আছে কিছু? নিজে তো ভগবানে বিশ্বাস করো, জানো না, সারাক্ষণ নেই-নেই করে গলা শুকোলে ভগবান এক সময়ে সব কিছু কেড়ে নেয়!”
“গলা কোথায় শুকোচ্ছি?” মা বিরক্ত হয়ে পাঁউরুটিতে জ্যাম লাগাতে-লাগাতে বলেছিল, “বাস্তব কথা বলছি। তুই ভুলে গিয়েছিস, আমি যাইনি। পুরনো দিন ভুলে যেতে নেই। মাটিতে পা রেখে চলতে হয় আমাদের, বুঝেছিস!”
“মা!” আইকার মনে হচ্ছিল দেওয়ালে মাথা ঠোকে নিজের। মাকে কিছু বলা মানে নিজের মেজাজ খারাপ করা। ও ড্রেসিং ইউনিটের সামনে চিরুনিটা রেখে, খাওয়ার ঘরের বেসিনে হাত ধুয়েছিল। তারপর টেবিলে বসে জ্যাম-টোস্ট খেতে-খেতে ফোনটা নিয়ে কল করেছিল ফিরোজকাকুকে। চারটের সময় আসতে বলেছিল ফিরোজকাকু। আইকা চেষ্টা করেছিল ওটা ছ’টা করার। কিন্তু ফিরোজকাকু বলেছিল, ছ’টায় তো সল্ট লেকে চেম্বার আছে।
ফোনটা রেখে চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল আইকা। মনে মনে বিরক্ত লাগছিল এত! কিন্তু বুঝতে পারছিল মাকে নিয়ে যেতেই হবে। গতকাল রাতে মা কষ্ট পেয়েছে খুব।
টোস্ট শেষ করে ডিমের পোচটা টেনে নিয়ে ও বলেছিল, “তুমি সাড়ে তিনটের সময় রেডি হয়ে থেকো।”
“তোকে আসতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব!” মা মুখ গোঁজ করে বসে ছিল সামনের চেয়ারে!
আইকা বলেছিল, “আচ্ছা মা, একটা কথা বলো তো, সব কিছুতেই এত এফর্ট দিতে হয় কেন আমাকে? যাই করতে যাই, কেউ না-কেউ কিছু না-কিছু একটা ফ্যাকড়া বের করে ফেলে! সারাক্ষণ কি আমি লোকজনকে কনভিন্স করে যাব নাকি এটা করে দাও, ওটা করে দাও! আমার নিজেরও তো একটা ভাল লাগা খারাপ লাগা আছে না কি? কোনও কাজ সহজে হয় না কেন! সবাই সব কিছুতে এত ব্যাগড়া দেয় কেন!”
“আমি ব্যাগড়া দিচ্ছি?” মায়ের ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল, “তুই এভাবে কথা বলিস কেন আমার সঙ্গে? তোকে নিয়ে যেতে হবে না! আমি একা যেতে পারব না ভেবেছিস?”
আইকার মনে হচ্ছিল খাবার ছেড়ে উঠে যায়! মা সকাল-সকাল কী শুরু করেছে!
মা বলেছিল, “শোন, আমার জন্য তোকে কিছু করতে হবে না। সত্যি, এই তো ছিল আমার কপালে। যাকে বুক দিয়ে আগলে বড় করলাম এখন তার লাথি-ঝ্যাঁটা খেতে হবে!”
“মা,” আইকা কী বলবে বুঝতে পারছিল না, “কীসব বলছ! তোমাকে বলেছি না ওই সিরিয়ালগুলো দেখা বন্ধ করো! একদম ওদের মতো বিহেভ করছ তুমি!”
“বেশ করেছি, তোকে চিন্তা করতে হবে না!” মা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।
খাবার শেষ করে উঠে মুখ ধুয়ে মায়ের সামনে দাঁড়িয়েছিল আইকা। মাকে ভাল করে চেনে ও। জানে, এমন সময়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে লাভ হয় না। মা একদম বাচ্চাদের মতো!
ও মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, “ঠিক আছে, আর রাগ করতে হবে না। সাড়ে তিনটের সময়ে রেডি থেকো।”
“না, তোকে কিছু করতে হবে না আমার জন্য!”
মায়ের গলা শুনে আইকা বুঝেছিল এই কাঁদল বলে! ও আলতো করে ঝুঁকে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল। বলেছিল, “এমন কোরে না মা। আমি আসব ঠিক সময়ে। তোমার এত অভিমান কেন! আমি কি নিয়ে যাব না বলেছি?”
মা আর কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। শব্দ শুনে বুঝেছিল মা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
সময় দিয়েছিল আইকা। ও জানে মাকে এমন সময় আটকালে বিপদ। তাতে হিতে বিপরীত হবে! আইকা শুধু মাকে ধরে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। কিছুক্ষণ পরে মা চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, “তুই অফিসে যা। দেরি হয়ে যাবে। পরে আবার বলবি আমার জন্য দেরি হয়েছে!”
আইকা অসহায়ভাবে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। বুঝতে পারছিল কিছু-কিছু খেলায় ওর হার অনিবার্য!
অফিস যাওয়ার ড্রেস করে, ব্যাগটা নিয়ে বেরোনোর আগে তাও একবার শেষ চেষ্টা করেছিল ও। মা বসার ঘরে বসে খবরের কাগজটা উলটোচ্ছিল! ও বলেছিল, “মা, এখন রাগ করছ করো, আমি কিন্তু আসব ঠিক সাড়ে তিনটের সময়! রেডি হয়ে থাকবে বলে দিলাম।”
মা তাকিয়েছিল খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে, তারপর বলেছিল, “আমি বুঝতে পারছি, তুই এমন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছিস কেন!”
“মানে?” আইকা বুঝতে পারছিল না মা আবার নতুন কী থিয়োরি বের করছে। ও দরজার কাছে গিয়ে থমকে গিয়েছিল।
মা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে বলেছিল, “তোর একটা বিয়ে দিতে হবে এবার। তোর একটা সঙ্গী দরকার। বুঝতে পারছি, এই জন্য তুই এমন খিটখিটে হয়ে গিয়েছিস!”
বিয়ে! সঙ্গী! কী বলবে বুঝতে পারছিল না আইকা! ও খিটখিটে হয়ে গেছে। আর সত্যি যদি হয়েও যায়, তার মানে কি ওকে বিয়ে দিতে হবে? এটা কোনও সমাধান নাকি? কেউ খিটখিট করলে তাকে বিয়ে দিতে হবে? সেই যুক্তিতে তো মাকেও বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত!
মা বলেছিল, “বিয়ে হলে তোর ঢ্যাঁটামো ঠিক হয়ে যাবে! তখন দেখব কোথায় থাকে তোর এত গুমর!”
আইকা চুপ করে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। ভাবছিল, মা ঠিক কেন ওকে বিয়ে দিতে চাইছে! ওর একজন সঙ্গী হবে বলে, নাকি ওকে শাস্তি দেবে বলে! ওর তথাকথিত গুমর ভাঙবে বলে!
মা বলেছিল, “আমি দেখছি কী করা যায়।”
আইকা আর কথা বাড়ায়নি! দরজাটা টেনে বেরিয়ে এসেছিল। কিছু বললে বিপদ বাড়ত। মা যে মুডে ছিল তাতে বলা যায় না তখনই হয়তো পাত্র দেখতে বেরিয়ে যেত!
অফিসের দিকে যেতে-যেতে আইকার হাসি পেয়েছিল মায়ের কথা ভেবে! মধ্যবিত্ত বাঙালিদের একটা মজা আছে। কিছু হলেই দুটো অপশন দিয়ে দেয়। হয় বলে, কোথাও থেকে ঘুরে আয়! নয়তো বলে, একটা বিয়ে করে নে! আইকার মনে হয় এখন সারা বিশ্বের যা অবস্থা, তাতে এদের হাতে ক্ষমতা দিলে এরা সারা পৃথিবীকে হয় ঘুরতে পাঠিয়ে দিত, নয়তো বিয়ে দিয়ে দিত!
ঘড়ি দেখল আইকা। পাঁচটা বাজতে যায় প্রায়। মা কী করছে ভেতরে কে জানে। যতক্ষণ চোখ দেখানো হচ্ছিল আইকা ভেতরেই ছিল। কী ড্রপ দিতে হবে, কী টেস্ট করাতে হবে সব ও জেনে নিয়েছে। কিন্তু তারপরেই মা বলেছিল, “বুড়ি, তুই বাইরে যা তো, ফিরোজদার সঙ্গে আমার কথা আছে!”
বাইরে! অবাক হয়ে গিয়েছিল আইকা। বাইরে যাবে কেন ও! মা আবার কী বলবে ফিরোজকাকুকে! ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে।
মা চোখ বড় করে ইশারা করেছিল। যার মানে, কথা শোন, বাইরে যা!
সেই বাইরে এসেও প্রায় চল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। চেম্বারে আরও জনাপাঁচেক পেশেন্ট বসে রয়েছে। তারাও উসখুস করছে। আইকার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে! ওর কী যে বাজে লাগছে! তাই তো চেম্বার ছেড়ে বাইরে এই করিডরটায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই বিল্ডিংটার একদিকের দেওয়াল পুরো কাচের। তাই রাস্তা দেখা যায়। উঁচু জায়গা থেকে রাস্তা দেখতে বেশ মজা লাগে আইকার! অফিসেও নিজের ডেস্ক থেকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। ছোটবেলায় ওরা ঝুলন সাজাত। উঁচু থেকে কলকাতার দিকে তাকিয়ে ওর মনে হয় তেমনই কোন এক ঝুলনের শহরে এসে পড়েছে! পার্থক্য একটাই যে, এরা সব সচল!
“কী রে, তুই এখানে! সরি আসতে দেরি হয়ে গেল!”
দূর্বার গলা পেয়ে পেছনের দিকে ফিরল আইকা। একটা জিন্স আর ডেনিমের শার্ট পরেছে আজ দূর্বা। মাথার চুলগুলো খোলা। মুখে সারাক্ষণের মতো এখনও হাসি।
আইকা হাসল। লেট করাটা দূর্বার কাছে কোনও ব্যাপার নয়! আইকা এতে অভ্যস্ত। ও দেখল পাশে গোলগাল ফরসা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। চিনতে পারল ও। ব্রতীন।
দূর্বা আজ অফিসে আসেনি। আইকা জানত ও আসবে না। সামনেই বিয়ে ওদের। নভেম্বরের আঠারো তারিখ। তাই আজ শপিং-এ বেরিয়েছে। আইকার সঙ্গে ব্রতীনের আগে দেখা হয়নি। শুধু ছবিতে দেখেছে!
দূর্বা আজ একটা কাজের ব্যাপারে অফিসে ওকে ফোন করেছিল। কিন্তু যেই জেনেছিল যে, ও মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দেখাতে যাবে, সঙ্গে-সঙ্গে বলেছিল, “আমি যাব তোর সঙ্গে দেখা করতে। আমরা আজ গড়িয়াহাটেই যাব শপিং করার জন্য। তুই ক’টায় কোথায় থাকবি বল, আমি দেখা করতে যাব!”
আইকা অবাক হয়েছিল। বলেছিল, “আরে, আমরা তো ডাক্তার দেখাতে আসব।”
“তাও,” দূর্বা জেদ করেছিল, “আমরা যাব। অফিশিয়ালি তো যাবই তোর বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে, কিন্তু তার আগে এমনিও যাব আজ। পাঁচ মিনিট। প্লিজ়!”
দূর্বাটা পাগলি আছে। ওকে আটকানো যায় না। অগত্যা আইকা রাজি হয়ে গিয়েছিল।
আইকা ব্রতীনকে দেখল। ফরসা গোলগাল ছেলেটার মুখ লাল হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দূর্বা ঘুরিয়ে মেরেছে বেচারাকে।
দূর্বা বলল, “এই হল ব্রতীন।”
“হাই,” ব্রতীন হাত বাড়াল।
আইকা আলতো করে ব্রতীনের বাড়ানো হাতটা ধরল। হাসল একটু।
ব্রতীন বলল, “এভাবে এখানে দেখা করাটা একটু অকোয়ার্ড। আমরা একদিন কোথাও আড্ডা মারব, কেমন!”
আইকা মাথা নেড়ে হাসল। কিন্তু সম্পূর্ণ মনটা এখানেও দিতে পারছে না। মা কী করছে এখনও চেম্বারে! একটা করে মিনিট কাটছে আর ওর অস্বস্তি বাড়ছে!
দূর্বা এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে বলল, “অফিসে নাকি তুই আজ ঝামেলা করেছিস! আমায় রাণুদি ফোন করে বলল। এটাই নাকি আজকের হট টপিক! কেন রে? ঝগড়া করেছিস কেন?”
আইকা মাথা নাড়ল। রানুদি ওদের পারচেজ় দেখে। কিন্তু আসলে অফিসের রিপোর্টার! কিছু হল কী, চারদিকে ফোন করে খবর দিতে শুরু করবে! আজ দূর্বা অফিসে আসেনি— ওকে ফোন করে এসব বলার কী মানে!
এতক্ষণ অফিসের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিল না আইকা। মন থেকে একরকম জোর করেই সরিয়ে রেখেছিল। আবার দূর্বা সেটা মনে করিয়ে দিল!
আজ সকালে অফিসে যেতেই তারক চক্রবর্তীর কাছ থেকে মোতি নামে লোকটি ফোন করেছিল। আইকা নিজে তখন ঠিকমতো বসেওনি চেয়ারে। লোকটি মোবাইলে ফোন করে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছিল।
আইকা বাধা দিয়েছিল। এভাবে হুট করে কথা হয় নাকি! ওর সকালে একটু কাজ ছিল। ভেবেছিল সেটা সেরে ফোন করবে! তাই ফোনটা ধরে বলেছিল, “আমি আপনাকে মিনিটদশেক পরে ফোন করছি। আমি জাস্ট অফিসে ঢুকলাম।”
“মিনিট দশেক!” মোতি লোকটি খিকখিক করে হেসেছিল, “আরে ম্যাডাম, এক মিনিটের জন্য মানুষের জীবনে কত কী ঘটে যায়! এক সেকেন্ডের জন্য কত কী ঘটে যায়! সেখানে দশ মিনিট! তারকদাকে কী পেয়েছেন? উনি আপনার জন্য দশ মিনিট ওয়েট করবেন ভাবছেন?”
আইকা অবাক হয়েছিল, “উনি কথা বলতে চান?”
এবার ফোনে তারকের গলাই পেয়েছিল আইকা।
লোকটা ফোনের মধ্যেই অসভ্যের মতো একটা বিশাল ঢেকুর তুলে বলেছিল, “কী ম্যাডাম, সব ভুলে গেলেন যে! শুনলাম আপনাদের জিএম মালিকদের সঙ্গে ডাইরেক্ট যোগাযোগ করছেন! তা করুন, কিন্তু আমায় টপকে কিছু হবে না। জানবেন মালিকরাই আমায় বলেছে এতে নাক গলাতে। কারণ, এখানে অলরেডি আপনাদের এই সব কিছু কিনে ভেঙে ফেলে বাড়িঘর তৈরি করার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে! ফলে ঘোড়া টপকে ঘাস খেতে যাবেন না! পেছনে বাঁশ হয়ে যাবে!”
আইকা থমকে গিয়েছিল সামান্য। ব্যাপারটা কী? ও তারকের প্রস্তাব রুপিনকে জানিয়ে দিয়েছে মাসদুয়েক আগে। কিন্তু এর মধ্যে আর এই নিয়ে তেমন কোনও কথা হয়নি। আইকাকেও বালির দিকে একটা প্রজেক্টের ফিজ়িবিলিটি রিপোর্ট তৈরি করার কাজ দেওয়া হয়েছে! তারকের কথায় আবার নড়েচড়ে বসেছিল আইকা। এর মধ্যে মালিকদের সঙ্গে রুপিন কথা বলেছেন! সেটা তো ও জানে না!
তারক আবার ঢেকুর তুলেছিল একটা। তারপর জল খেয়েছিল। লোকটার এটিকেট বা ভদ্রতা বোধটাই নেই! সবই কেমন একটা হাটুরে রংবাজি যেন! সারাক্ষণ অন্যকে মাটিতে পিষে, তার মাথায় পা তুলে দিয়ে কথা বলা।
আইকা বলেছিল, “আমি আসলে অন্য কাজে ছিলাম, আমি খবর নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছি!”
“অন্য কাজ!” খ্যাকখ্যাক করে হেসেছিল তারক, “মাইরি! আমি প্রথম থেকেই জানি মেয়েছেলে দিয়ে কোনও কাজ হয় না!”
“মানে?” আইকা নিজেকে আর সামলাতে পারেনি! এটা কেমন ধরনের অসভ্যতা!
“মানে, মেয়েছেলে দিয়ে দু’-চাররকম কাজের বাইরে আর কোনও কাজ হয় না। আপনি দেখুন, কতদিন ধরে এই কাজটা নিয়ে ল্যাদ চালাচ্ছেন! আমায় তো মালিকরা বলল এসব ঢ্যামনা কোম্পানি দিয়ে হবে না। অন্য পার্টি দেখতে। শালা, আজকাল সব আমাদেরই করে দিতে হয়!”
“প্লিজ় এভাবে কথা বলবেন না,” আইকা শক্ত গলায় বলেছিল “আমি খবর নিয়ে জানাব বললাম তো!”
“ম্যাডাম, আমার মুখ আমি যেমন খুশি বলব! কোটি-কোটি টাকার ব্যাপার। ছেলেখেলা নয় এটা। প্রপার্টির সব কাগজ তো আপনারা সার্চ করে দেখেইছেন যে, সব ওকে আছে। তবে! এত লেট কীসের!”
“দেখুন, এত কোটি টাকা বলেই সব কিছু ভেবে কাজ করতে হয় আমাদের,” আইকা নিজের মেজাজটাকে খুব কষ্ট করে সামলে রেখেছিল।
তারক বলেছিল, “আমি আপনাকে স্পেশ্যাল পছন্দ করি বলে জানিয়ে রাখলাম এসব। আর বেশি কিন্তু লেট করবেন না। কেমন! মটকা আবার তাতছে আমার! রাখছি! আমি আর ফোনও করব না।”
ফোনটা কেটে মাথা নিচু করে বসেছিল আইকা। লোকটা কী সাংঘাতিক অসভ্য সেটাই ভাবছিল! ওকে কোন সাহসে বলে যে, ‘স্পেশ্যাল পছন্দ করে!’ আর মেয়েছেলে! এভাবে কেউ কোনওদিন ওর সঙ্গে কথা বলেনি! লোকটার স্পর্ধা দেখে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল ওর।
আইকা আর অপেক্ষা না করে উঠে সোজা রুপিনের ঘরের দিকে গিয়েছিল।
সবার আগে রুপিন অফিসে আসেন। এমনকী, ব্রেকফাস্টটাও অফিসেই করেন মানুষটা।
করিডর পেরিয়ে সোজা দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আইকা। তারপর হাতল ধরে ঘুরিয়ে দরজা ঠেলে খুলে বলেছিল, “মে আই কাম ইন!” স্যার কথাটা ইচ্ছে করেই বাদ রেখেছিল আইকা।
রুপিন মাথা নিচু করে কিছু একটা পড়ছিলেন। ওর কথায় মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন। তারপর সামান্য হেসে বলেছিলেন, “কাম কাম। প্লিজ় হ্যাভ আ সিট। আমি তোমাকেই ডাকব ভাবছিলাম। আই নিড আনাদার ফেভার!”
আইকা কিছু শোনার মতো অবস্থায় ছিল না! ও সোজা গিয়ে টেবিলে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল।
রুপিন বুঝেছিলেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। বইটা ভাঁজ করে রেখে তাকিয়েছিলেন আইকার দিকে, “কী হয়েছে?”
“আমি স্যার চাকরি ছেড়ে দেব, আই ওয়ান্ট টু রিজ়াইন!” কোনও ভণিতা না করে আইকা সরাসরি বলেছিল কথাটা।
“আরে!” রুপিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন, “হোয়াট হ্যাপেন্ড! এসব কী বলছ?”
“আমি স্যার অসম্মান নিয়ে চাকরি করতে পারব না। আমার যা প্রোফাইল, জব পেতে আমার অসুবিধে হবে না। আমি আর এখানে কাজ করতে পারব না।”
রুপিনের চেম্বারের এসিটা কুড়িতে করা থাকে। বেশ ঠান্ডাই লাগে অন্য সময়। কিন্তু আজ আইকার ঘাম দিচ্ছিল। মাথায় আসছিল না কিছু। শুধু পিন আটকে যাওয়া গ্রামোফোনের মতো ঘসঘস করে তারকের কথাগুলোই ঘুরেফিরে বাজছিল কানে। বুঝতে পারছিল না, ও চেঁচিয়ে কথা বলছে!
রুপিন চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে উঠে এসেছিলেন আইকার পাশে। তারপর আইকার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বলেছিলেন, “প্লিজ়, মাথা ঠান্ডা করো! এভাবে চিৎকার কোরো না। কী হয়েছে আমায় বলো।”
“আস্ক মি হোয়াট ডিডন্ট হ্যাপেন! আমি স্যার চাকরি করি বলে কেউ খারাপ কথা বলবে, সেটা আমায় সহ্য করতে হবে? যে-প্রজেক্টে আমি কাজ করছি সেখানে কী হচ্ছে, তার ইনফো আমার থেকে উইথহেল্ড করে রাখা হবে? এটা কেমন ওয়ার্ক কালচার! আমায় তারক চক্রবর্তী ফোনে ইনসাল্টিং কথাবার্তা বলছে কেন! আমি জানি না, কিন্তু রিসেন্টলি নাকি আপনি মালিকদের সঙ্গে গিয়ে নিজে কথা বলেছেন। আমায় প্রজেক্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেখানে, আমি জানি না এসব হচ্ছে। একটা লুম্পেনের কাছ থেকে আমায় জানতে হচ্ছে! তার টিটকিরি শুনতে হচ্ছে! আই ওয়ান্ট টু কুইট।”
রুপিন নিজে সামনের একটা চেয়ার টেনে বসে পড়েছিলেন এবার। তারপর আর-একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়েছিলেন আইকার দিকে।
“সিট।”
আইকা কথাগুলো এমন তোড়ের সঙ্গে বলেছিল যে, নিজেই হাঁপিয়ে গিয়েছিল। ও কথা না বাড়িয়ে চেয়ারটা টেনে বসে পড়েছিল।
রুপিন শান্ত গলায় বলেছিলেন, “আমি তোমার সিনিয়র। এভাবে কেউ সিনিয়রের সঙ্গে কথা বলে! একে ইনসাবরডিনেশন বলে, জানো তো?”
“সরি স্যার, কিন্তু আমায় ফিল্ডে নেমে কাজ করতে হয়। আপনি জানেন, তারক চক্রবর্তীদের মতো গুনস্দের সঙ্গে কীভাবে কাজ করি? তারা আমায় বাজে কথা বলছে। তার কাছ থেকে জানছি, আপনি মালিকদের সঙ্গে একা কথা বলে এসেছেন।”
রুপিন মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। কারণ, আই ওয়াজ় টোল্ড টু। আমাকেও ডাইরেক্টরদের জবাব দিতে হয়। আর তুমি তো বালির প্রজেক্টটা দেখছ আপাতত।”
“সোনাঝুরি আমার প্রজেক্ট। সেখান থেকে আমায় কি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? কেন আমায় জানানো হচ্ছে না? আমায় সাইড লাইন কেন করা হচ্ছে? এটা আমার কেরিয়ারকে সাবোটাজ করা নয়?”
“হোয়াট আর ইউ সেয়িং!” রুপিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন আইকার দিকে, “ডু ইউ বিলিভ আই, অফ অল পারসন, উইল ডু দ্যাট! সিরিয়াসলি!”
আইকা থমকে গিয়েছিল এবার।
রুপিন মাথা নিচু করে বসেছিলেন সামান্য সময়, তারপর বলেছিলেন, “সারা অফিস শুনল যে, ইউ আর শাউটিং অ্যাট মি!”
আইকা কিছু না বলে ভুরু কুঁচকে বসেছিল। তারকের কথাগুলো তখনও কানের মধ্যে ঘুরেফিরে বাজছিল ওর।
রুপিন বলেছিলেন, “এতদিন হয়ে গেল এই কাজে কোনও প্রগ্রেস নেই। আমাদের ফাইনান্সাররা ইন্টারেস্ট হারাচ্ছেন। চারদিকেই বিজ়নেসের অবস্থা ভাল নয়। সোনাঝুরি যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে যে-ফ্লাইওভারটা করার কথা ছিল, সেটা ঝুলে আছে। হাফ ডান হয়ে পড়ে আছে। কবে হবে ঠিক নেই। এখানে এত দামি ফ্ল্যাট যে কিনবে, সে কি ওই ভাঙা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করবে! লোকজনের ইন্টারেস্ট কমছে। তাই আমরা আবার রি-থিঙ্ক করছি। বাড়িঘর বানালেই তো হল না! তারপর ভূতের শহরের মতো ওটা পড়ে থাকবে। কেউ কিনবে না। সেটা কি ভাল হবে? বিজ়নেস ইজ় লাইক পলিটিক্স। এখানে কোনও ইন্টারেস্টই পারমানেন্ট নয়। সবটাই ক্রমাগত ইভ্যালুয়েট করতে হয়। ডায়নামিক্স পালটায় উইথ ইচ ডে। তার চেয়ে বালির দিকে আমাদের কাজটা হচ্ছে। কোন্নগরেও গঙ্গার ধারে আমরা অনেকটা জমি পেয়েছি। তাই আমরা ভাবছি।”
আইকা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, “এসব আমায় বলেননি কেন? আমার গোটা চেষ্টাটাই তো বৃথা হয়ে গেল! আমি তো এমনও বন্দোবস্ত করেছিলাম যে, অন্য কোম্পানি কী টাকা দিয়ে জায়গা কিনবে, মানে কত কোট করবে সেটাও জেনে নেব।”
“লিস্ন আইকা, লিস্ন, আমাদের ম্যানেজমেন্টে চেঞ্জ এসেছে, এটা তো জানো। আমি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম আমরা যে মিলটা ডেমলিশ করে বাড়ি করব, সেটা ওদের ভাল লাগছে না। প্লাস এখানকার পার্টির এক মাথা আমার সঙ্গে কথা বলেছে। রিতু না কী যেন নাম। আমাকে বলা হয়েছে, সরকার চায় না জুটমিল বন্ধ হয়ে যাক। সামনে ভোট আসছে। তাই গোটা ইকোয়েশনটাই পালটে গেছে। তারক যদি…”
কিন্তু এবার রুপিনকে থামিয়ে দিয়েছিল আইকা, “আপনি জানেন কী ভাষায় লোকটা কথা বলেছে! বলেছে, আমায় নাকি ওর পছন্দ তাই আমায় এসব বলছে! হি ইভন ইউজ়ড স্ল্যাং ওয়ার্ডস!”
“স্ল্যাং!” রুপিন মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন।
“আমি, আমি…” আইকার আচমকা জল এসে গিয়েছিল চোখে! তারকের বলা কথাগুলো সময়ের সঙ্গে যেন আরও কঠিন আর তীক্ষ্ণ হয়ে ফিরে এসেছিল ওর মনে। আইকা নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিল, ও কেন এমন কেঁদে ফেলল রুপিনের সামনে!
আইকা মাথা নিচু করে বসেছিল। কোলের ওপর টপটপ করে জল পড়ছিল ওর চোখ থেকে!
“আরে, কাঁদছ!” রুপিন কী করবেন যেন বুঝতে পারছিলেন না! তারপর নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আইকা সেটা না নিয়ে হাত দিয়ে চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল, “সরি স্যার! আই লস্ট কন্ট্রোল। কিন্তু আপনি যদি চান, আমি রিজ়াইন করতে পারি!”
রুপিন বলেছিলেন, “তুমি নিজের ডেস্কে যাও। বালির কাজটা শেষ করো। আমি সোনাঝুরি নিয়ে হেড অফিসে কথা বলছি। দেখি, তারা শেষমেশ কী ডিসিশন নেয়। তবে একটাই কথা, যা পরিস্থিতি তাতে অন্য যারাই এতে ইনভেস্ট করবে, তাদের প্রফিট বের করতে মুশকিল হবে খুব! আর ওয়াশ ইয়োর আইজ়! কোহল স্মাজ করে গেছে!”
ঘর থেকে বেরিয়ে আইকা দেখেছিল, সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওর এত লজ্জা লেগেছিল! মনে হচ্ছিল একটুও পালটায়নি ও। স্কুলেও এমন দুমদাম কাণ্ড করত!
আইকা নিজের সিটে না ফিরে লু-তে গিয়েছিল। আর হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই মনে পড়েছিল স্কুলের ওই ঘটনাটায় পুশকিন কেমন কষ্ট পেয়েছিল!
পুশকিন! নামটা মনে পড়তেই কেমন একটা লেগেছিল আইকার! ওদের রিকো গ্রুপ-ও তো ওই প্রজেক্টে আছে! কিন্তু ওদের প্রপোজ়াল আলাদা। তবে এই নিয়ে পুশকিন বা নোঈর সঙ্গে কোনও কথা বলেনি আইকা। কারণ, সেটা তো এথিকাল নয়। কাজ কাজের জায়গায় আর নিজের সম্পর্ক নিজের জায়গায়।
“স্যারের ঘরে চিৎকার করলি, স্যার কিছু বলেননি?” দূর্বা তাকাল ওর দিকে।
আইকার অপ্রস্তুত লাগল। এর কী জবাব দেবে? ও যেটা করেছে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু তখন এমন মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল! সকালে মায়ের সঙ্গে ঝামেলার পরে ও এমনিতেই খুব উত্তেজিত হয়েছিল, তাই তারকের কথাটা আর নিতে পারেনি। রুপিনের ঘরে গিয়ে অমন একটা সিন ক্রিয়েট করে ফেলেছে।
আইকা জানে রুপিন কিছুই বলেননি ওকে। বরং বোঝার চেষ্টা করেছেন কেন আইকা এমন করল। কিন্তু সেটা তো আর অন্য কলিগরা বুঝবে না! বরং সেটা জানলে নানা জলঘোলা হবে। রুপিনের অথরিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সেটা আইকা হতে দিতে পারে না।
ও বলল, “না, আমায় শো কজ় করেছেন। আসলে আমারই ভুল। তাই…”
দূর্বা চোখ বড়-বড় করে শুনল কথাটা। তারপর বলল, “দূর, তোকে কিছু বলবেন না।”
“কেন?” অবাক হয়ে তাকাল আইকা।
“ন্যাকা খুকু আমার! জানে না!” দূর্বা চোখ টিপে বলল, “মালটা তোর প্রেমে পড়ছে তো!”
“মাইরি… তুই না…” আইকা হেসে পাশে দাঁড়ানো ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এর সঙ্গে প্রেম করছ কী করে? আর বিয়েও করবে! মানুষ পায়ে কুড়ুল মারে! তুমি যে কুড়ুলে পা মেরে বসেছ!”
“এই, আমার বিয়েতে ভাংচি দিচ্ছিস কেন রে?” দূর্বা আলতো করে চিমটি কাটল আইকার হাতে।
আইকা আরও কিছু বলত, কিন্তু তার আগেই দেখল বড় কাচের দরজা ঠেলে মা বেরিয়ে এল এবার।
“কাকিমা!” দূর্বা এমন করে মায়ের দিকে দৌড়ে গেল, যেন কতদিন পরে হারানো কিছু ফিরে পেয়েছে!
আইকা দেখল ব্যাপারটা। আসলে এসব বোঝে ও। কেউ যখন খুব খুশি থাকে, তখন সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি রি-অ্যাকশন দিয়ে ফেলে।
মায়ের সামনে গিয়ে দূর্বা হাত ধরে টানল ব্রতীনকে। তারপর বলল, “কাকিমা, এই যে ব্রতীন। ওর সঙ্গেই…”
শূন্যস্থান বলে তো পৃথিবীতে কিছু থাকে না। তাই এটাও থাকল না। মা ঠিক বুঝে নিয়ে হাসল। ব্রতীন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে মা “থাক, থাক,” বলেও প্রণামটা নিল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আইকার দিকে।
আইকা মায়ের তাকানোটা বোঝে। এটাও বুঝল। আর তখনই ওর মনে হল, ফিরোজকাকুর সঙ্গে কী নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করেছে মা।
মা দূর্বার সঙ্গে কথা বলল সামান্য। আইকার মনে হল মা খুব একটা কথা বলতে চাইছে না। অন্যের মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আইকা একা রয়ে গেল, সেটা কোথাও মাকে মনে মনে খারাপ লাগা দিচ্ছে।
দূর্বা কী বুঝল কে জানে। বলল, “ঠিক আছে রে, আমরা আসি। আসলে ভাবলাম, এখানেই যখন আছিস একবার ব্রতীনকে দেখিয়ে নিয়ে যাই। তাই তোকে ফোন করেছিলাম। আমি নেক্সট উইক নাগাদ তোদের ফ্ল্যাটে যাব নেমন্তন্ন করতে, কেমন!”
আইকা দেখল ব্রতীন বিশেষ কথাই বলল না। সারাক্ষণ দূর্বার পেছনে-পেছনে ঘুরে গেল। এমনকী, যাওয়ার সময়ও গুড বয়ের মতো দূর্বার পেছন-পেছন লিফটে করে নেমে গেল।
আইকা ভেবেছিল ওরাও একসঙ্গে যাবে, কিন্তু দেখল মা এগোচ্ছে না। অর্থাৎ মা ওদের সঙ্গে এক লিফটে নামতে চায় না।
“এবার চল,” মা এগিয়ে এসে দাঁড়াল আইকার সামনে।
“কী হয়েছে তোমার?” আইকা জিজ্ঞেস করল।
মা লিফটের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “হাঁটুর বয়সি ছেলেকে বিয়ে করছে! সেটা আবার নেচে-নেচে সবাইকে দেখাচ্ছে! বেহায়াপনার কোনও মানে হয়?”
“মা!” আইকা বিরক্ত হল। এসব কী বলছে মা!
মা কিছু না বলে লিফটের কল বাটনটা টিপল।
অক্টোবরের শেষ এখন। গরম খুব। আজকাল শহরে এত গরম পড়ে! আসলে এটাই স্বাভাবিক। এত পলিউশন! এত মানুষ! গরমের আর দোষ কী!
লবিতে বেশ গরম লাগছে। আইকা বুঝতে পারছে শরীরের ভাঁজে ঘাম জমা হচ্ছে। নীচে গিয়ে একটা গাড়ি ধরতে পারলে এখন বাঁচে। গাড়িটা আজ আনেনি। এখানে একটা বড় স্কুল আছে। ভিড় থাকে বেশ রাস্তায়। গাড়ি পার্ক করা খুব ঝামেলা।
লিফট দিয়ে নামতে-নামতে মা বলল, “তবে এলেম আছে মেয়েটার। তোর তো তাও নেই! কিন্তু তোকে ওর চেয়ে কত ভাল দেখতে! সেখানে তুই কিছুই করতে পারলি না। আজকাল বিধবাদের বিয়ে হয় যখন-তখন। সেখানে তুই গাধাই রয়ে গেলি।”
“মা, কী বলছ তুমি!”
মা নাক দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, “কেবলি একটা। একটা কিছু যদি পারিস!”
আইকা জানে কথাটা ঠিক নয়। বহু পুরুষ ওকে পছন্দ করে, ওর দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ও কাউকে পাত্তা দেয় না। ঋষিকে যা একটু পাত্তা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে।
বহুদিন পরে পুশকিনকে দেখে মনে একটা নরম ভাব এসেছিল ওর। কিন্তু ক্রমশ বুঝেছে যে, পুশকিন ওর সামনে এলেই কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়। কেমন যেন পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। ব্যাপারটায় বেশ অপমান হয়েছে আইকার। তাই আজকাল পুশকিনের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখে ও। আইকার কাছে সম্মানের চেয়ে বড় কিছু হয় না।
আইকা মোবাইলের অ্যাপ থেকে একটা গাড়ি ডেকে নিয়েছিল লিফট থেকে নামতে-নামতেই। নীচে নেমে গাড়িকে ফোন করে আইকা বলল ওরা কোথায় আছে।
রাস্তায় বেশ ভিড়। স্টুডেন্ট আর তাদের বাবা-মায়েরা ছানা কাটার মতো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। কিন্তু বড় বাস দুটো আর নেই। বেরিয়ে গিয়েছে নিজের-নিজের স্টুডেন্ট তুলে নিয়ে।
মা কেমন একটা রাগী মুখ করে আছে। দূর্বাকে দেখার পর থেকেই মা কেমন যেন হয়ে গেছে। আইকা কথা বাড়াল না। আজ দিনটা ভাল নয়। সবার সঙ্গে ওর ঝামেলা লাগছে!
আইকা অ্যাপে দেখল, গাড়িটা প্রায় এসে গেছে দেখাচ্ছে। ও ডান দিকে তাকাল। আর দেখতে পেল গাড়িটাকে। সাদা একটা হাচব্যাক। গাড়িটা কাছে আসতেই হাত তুলে সেটাকে থামাল আইকা। তারপর দরজা খুলে মাকে উঠতে বলল। মা গাড়িতে উঠে ড্রাইভারের পেছনে বসল। আইকা কাঁধের ব্যাগটাকে সিটের ওপর রেখে নিজেও এবার উঠতে গেল। কিন্তু আচমকা কী একটা চোখে পড়ায় থমকে গেল ও।
নোঈ না? আইকা একটু দূরে উলটো দিকের ফুটপাথে তাকাল। সত্যি তো! ওই তো নোঈ! লোকজনের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। কী করছে ও? তারপর সামান্য দৃষ্টি ঘুরিয়ে গাড়িটা দেখতে পেল আইকা। নীল রঙের হাচব্যাক। টিন্টেড গ্লাস। দেখল, গাড়িটা পার্ক করে সেটা থেকে নামল পুশকিন। এখানে কাজে এসেছে ওরা।
আইকা থামল এক মুহূর্ত। নোঈরা ওকে দেখতে পাচ্ছে না। এদিকে ওদের খেয়ালই নেই। ও দেখল, নোঈ হাসছে খুব। পুশকিন কিছু বলছে আর নোঈ হাসছে। সামনে একটা রেস্তরাঁ। সেইদিকে এগোল ওরা দু’জনে। কিন্তু ঢুকল না। পুশকিন দাঁড়িয়ে গেল রেস্তরাঁর দরজার সামনে। আর নোঈ আচমকা এগিয়ে গিয়ে পুশকিনের গাল থেকে লেগে থাকা কিছু একটা সরিয়ে দিল!
এক মুহূর্ত। নোঈ আর পুশকিন কাছে এল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু ওইটুকু সময়ের জন্যই কী যে হল, বুঝতে পারল না আইকা। মনে হল সামান্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ তৈরি হল। আর তা ওই পার থেকে ছিটকে এসে গেঁথে ফেলল আইকাকে।
এভাবে পুশকিনের গালে হাত দিল কেন নোঈ? পুশকিন না ওর বস? তার সঙ্গে কী করে এমন করে নোঈ? আর পুশকিন সেটা হতে দিল? কেন? নোঈ কি ভুলে গেছে পুশকিনের সঙ্গে ওর কী করে আলাপ? ভুলে গেছে পুশকিন ওর চেয়ে কত বড়। চোয়াল শক্ত করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল আইকা। তারপর কেন কে জানে ওর হঠাৎ কষ্ট হল খুব। মনে হল মা ঠিক বলেছে। ও একটা কেবলি! ওর কেউ নেই। নিজের বলতে কিছু নেই। আইকার আচমকা মনে পড়ে গেল সকালের একটা কথা। আচ্ছা, রুপিন ওকে কেন খুঁজছিলেন? কীসের দরকার ছিল ওর সঙ্গে! ওর মনে হল রুপিনের কাছ থেকে ওর জানাই হল না রুপিন কী ব্যাপারে ওর সাহায্য চাইছিলেন। আচমকা রুপিনের মুখটা সামনে ভেসে উঠল আইকার। মনে হল জর্জ ক্লুনি তাকিয়ে রয়েছেন ওর দিকে! মনে পড়ল দূর্বার রুপিনকে নিয়ে বলা কথাটা। সত্যি আর মিথ্যেগুলো কেমন যেন গুলিয়ে গেল ওর। যেন বুঝতেই পারছে না কোনটা বিশ্বাস করবে আর কোনটা বিশ্বাস করবে না। গাড়ির কাচে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল আইকা। বিকেলের নরম হয়ে আসা আলোয় মনে হল, এই মেয়েটাকে ও আর চেনে না!
.
২৭. নিশান
নার্সিং হোমটা চার তলা, বড়। বেশ সাজানো-গোছানো। খুব আধুনিক দেখতে। নিশান গেটের সামনে এসে একটু থমকে দাঁড়াল। বিকেল চারটে থেকে ছ’টা অবধি ভিজ়িটিং আওয়ার্স। ও দেখল নীচের লবিতে বেশ ভিড়। আজ রবিবার। এই দিন বাচ্চাদেরও নিয়ে আসা যায়। কিছু কুচোকাঁচা নার্সিং হোমের লবিকে হোটেলের লবি ভেবে দৌড়োদৌড়ি করছে।
নিশান এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর দেখতে পেল মেয়েটাকে। ওই তো ফলসা বসে রয়েছে। কেয়াদির মেয়ে ফলসা। এখন বেঙ্গালুরুতে থাকে। মায়ের অপারেশন হয়েছে বলে এসেছে।
কেয়াদির দু’বার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দুটোই ভেঙে গেছে। প্রথম বিয়ে থেকে কোনও সন্তান হয়নি। ফলসা কেয়াদির দ্বিতীয় পক্ষের মেয়ে। ফলসার বাবার সঙ্গে সেভাবে আর যোগাযোগ নেই কেয়াদির। ভদ্রলোক এখন ফ্রান্সে থাকেন। সেখানে একজন আলজিরিয়ান মহিলাকে বিয়ে করেছেন।
ফলসাকে ভাল করেই চেনে নিশান। এখন নিয়মিত আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু তাও দেখা হলে ভালই কথাবার্তা হয়।
নার্সিং হোমের লবিটার একটা দিক কাচের দেওয়াল দেওয়া। সেখানে কিছু সিট লাইন দিয়ে বসানো আছে। কোণের দিকে টবে রাখা একটা বড় পাতাবাহার গাছ। তার পাশের সিটে বসে রয়েছে ফলসা।
সামনে ছড়ানো মানুষদের কাটিয়ে ফলসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিশান। মেয়েটা গত চারদিন আগে এসেছে এখানে। গত দু’দিন আগে কেয়াদির অপারেশন ছিল। ইউটেরাস বাদ গেছে। কেন, কী হয়েছে সেসব আর ডিটেলে শোনেনি নিশান। মেয়েদের ব্যাপার এসব, ও কী আর শুনবে!
“বাব্বা, এই তোর আসার সময় হল?” ফলসা চোখ বড় করে উঠে দাঁড়াল।
নিশান হাসল। বলল, “কেন, দেখা করার সময় তো এখনই।”
“সেটা মাকে গিয়ে বলিস। সকাল থেকে বলছে নিশান কই! ডাক্তার বলছেন বেশি কথা বলবেন না, কিন্তু জানিস তো মা কারও কথা শোনার পাত্রী নয়। সে ডাক্তারকেই ধমক-চমক দিয়ে একশা করে রাখছে! নার্সরা মায়ের জ্বালায় অস্থির হয়ে গেছে!”
নিশান হাসল। কেয়াদি কেমন সে ভাল করেই জানে। ওকেই কি কম বকুনি দেয়? দেখা হলেই শাসন!
ও জিজ্ঞেস করল, “এখন তো সাড়ে চারটে বাজে। তুই নীচে কেন?”
ফলসা হাসল। সামান্য লজ্জাও পেল যেন। বলল, “না মানে, আমার হবু শ্বশুর আর শাশুড়ি গেছেন ওপরে। মায়ের কাছে আছেন ওঁরা। প্লাস তুই আসবি। তাই আমি তোকে রিসিভ করতে নীচে আছি।”
“আমায় রিসিভ করতে?” নিশান হাসল, “মাইরি! তুই শিয়োর যে, তুই কেয়াদির মেয়ে!”
“মারব শালা! ওপরে চল,” ফলসা হাতের মুঠো পাকিয়ে বলল।
“দ্যাটস মোর লাইক ইট! তা, কতজন দেখা করতে পারে একসঙ্গে?”
“সেভাবে কিছু রেসট্রিকশন এখানে নেই। প্লাস কেবিন নেওয়া হয়েছে। তুই চল না!”
নিশান ঘড়ি দেখল। তারপর দরজার দিকে তাকাল। এখনও এল না তো! বলেছিল চলে আসবে। দেরি হচ্ছে কেন? একবার কি ফোন করবে? নাঃ, সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। নিজে থেকে এতটা উতলা হওয়া ওর মানায় না।
“আরে, আসবে আসবে, অত ভাবছিস কেন? আমাকেও ফোন করেছিল রাধিয়া। বলেছে আসতে একটু লেট হবে। কিন্তু আসবে। হাঁপিয়ে মরে যাস না!” ফলসা চোখ টিপল।
নিশান ভুরু কুঁচকে বলল, “তোর মা কিন্তু এখানে ভরতি। শরীর খারাপ। একটু সিরিয়াস হ ফলসা।”
“ইস, জ্ঞান দিচ্ছে! নিজে হেদিয়ে মরছে! আমি জানি না ভেবেছিস?”
“আমরা ভাল বন্ধু,” নিশান গম্ভীর গলায় বলল।
“ওইসব ঢপবাজি কাকু ‘সেভ সোনাঝুরি’-র লোকেদের দেবেন! আমরা ভাল বন্ধু!” ফলসা ওকে নকল করে বলল, “যেন বিরাট কোহলি! শালা মারব কানের গোড়ায়!”
“আরে! আর কনফিউশন নেই!” নিশান আশপাশে দেখল, “মা-মেয়ে পুরো সমান। বেঙ্গালুরুতে থাকিস কী করে! সেখানে থেকে তো একটুও উন্নতি হয়নি দেখছি তোর!”
“উনি আমার বন্ধুর সঙ্গে প্রেম করবেন আর আমরা কিছু বললেই দোষ!” ফলসা আলতো করে মারল নিশানের হাতে।
নিশান হাসল। দেখল, আশপাশ থেকে কয়েকজন তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কেউ সামান্য হাসছে আবার কেউ খুব বিরক্ত মুখ করে বোঝাতে চাইছে এইসব করার জায়গা এটা নয়!
ফলসা কনুই দিয়ে আলতো করে মারল নিশানকে, “প্রপোজ় করেছিস?”
“ভাগ!” নিশান সামান্য লাল হয়ে গেল নিজের অজান্তেই। সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল ওর! নিজেরই অবাক লাগল।
“এখনও বলিসনি? আমায় তো রাধিয়া বলে তোর কথা। তুই কত ভাল। কত হেল্পফুল! প্রথম থেকেই নাকি ওর মনে হয়েছে, তোকে সব কথা বলা যায়! এটসেট্রা এটসেট্রা। তাও তুই প্রপোজ় করিসনি? কেন?”
“আচ্ছা, আমি কেয়াদিকে দেখতে এসেছি। এখানে এসব কথা না বললেই নয়? কেয়াদি এমন অসুস্থ! সেখানে তুই কী শুরু করলি!” নিশান এবার সিরিয়াস গলায় বলল।
“মা অসুস্থ ছিল, আর নেই। অপারেশন ভাল হয়েছে। সেটা হিল হতে যা সময় নেবে। ব্যস, আর কিছু নয়। বুঝলি? এখন উত্তর দে।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় দাঁড়াল নিশানরা। করিডর চলে গেছে দু’দিকে। সামনে একটা কাউন্টার। দু’জন নার্স বসে রয়েছে। পাশের লম্বা বেঞ্চে দু’জন ওয়ার্ড বয় বসে মোবাইল নিয়ে কীসব গুজগুজ করছে।
নিশান এদিক-ওদিক তাকাল। কোনদিকে যেতে হবে!
ফলসা নাছোড়বান্দা গলায় বলল, “কী রে বল! তারপর যাব। আগে বল, তুই এখনও কিছু বলিসনি কেন?”
নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভুলে গেছি বলতে! খুশি!”
“মারব এবার, বল!” ফলসা ঠোঁট কামড়ে হাত মুঠো করে ঘুসি পাকাল আবার!
নিশান বলল, “আমি বাস্তবের পৃথিবীতে থাকি ফলসা। ও মালিক গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র মেয়ে। আর আমি? আমার জীবন কেমন তুই জানিস না? আমাদের খাওয়া পরার অভাব নেই। কিন্তু আমরা তো মধ্যবিত্ত। সেখানে ওরা… এটা তো সিনেমা নয় রে বাবা! প্লাস আমার জীবন কেমন সেটা আমি জানি। ধরাবাঁধা কাজে আমি থাকি না। জানি আমাকে আমাদের ব্যাবসা দেখতে হবে একসময়। কিন্তু পাশাপাশি আমি মানুষের জন্য যে-কাজ করি, সেটাও তো করতে চাই। ওকে আমি কী বলব বল?”
“ওকে তোর ভাল লাগে সেটা বলবি!”
“পাগল নাকি! তারপর না করে দিক! তখন তো যোগাযোগটাও যাবে!”
“ও না করবে না,” ফলসা এমন করে বলল, নিশানের মনে হল গড়িয়াহাটে বোধহয় জ্যোতিষের চেম্বার খুলেছে মেয়েটা।
“তোকে বলেছে?” নিশান হাসল।
“সব কিছু বলতে হয় না। আমি নিজে মেয়ে না? আমি বুঝি!”
নিশান ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই মেয়ে? শিয়োর জানিস?”
“শালা, চল!” ফলসা এবার নিশানকে ধাক্কা দিয়ে ডান দিকের করিডরে এগিয়ে গেল নিজে।
মোটামুটি চওড়া করিডর। দু’পাশে ঘর। মাথার ওপর নরম আলো। মেঝেও ঝকঝক করছে। নরম মাখনরঙা দেওয়াল। এদিকটা যে কেবিন, বুঝতে পারল নিশান। ফলসা গিয়ে থামল একদম শেষের ঘরটায়। করিডরটা সেখান থেকে ডান দিকে বেঁকে গেছে। অপারেশন থিয়েটার ওইদিকে। সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ড দেখে বুঝল নিশান।
কেবিনের ভেতরে সোজা ঢুকে গেল ফলসা। কিন্তু নিশান একটু ইতস্তত করল। ভেতরে দু’জন বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, এবার তাঁরা বেরিয়ে যাবেন। নিশানের মনে হল, এটা কেয়াদিদের খুব ব্যক্তিগত একটা মুহূর্ত। ওর বোধহয় একটু বাইরেই থাকা উচিত!
“তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? কাছে আয়!”
কেয়াদির গলাটা ক্লান্ত লাগলেও দাপট যে একই রকম আছে, সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না নিশানের। ও হেসে এবার ঘরে ঢুকল।
ঘরটা বেশ বড়। একপাশের দেওয়ালের গোটাটা জুড়েই জানলা। তাতে লম্বা ব্লাইন্ডস লাগানো। জানলা থেকে বিছানার মাঝখানেও বেশ কিছুটা ফাঁক। সেখানে চার জন বসতে পারে এমন সোফা রাখা আছে। বিছানার এদিকেও দুটো চামড়ায় বাঁধানো টুল রয়েছে। নিশান গিয়ে সোফায় বসল।
কেয়াদি বয়স্ক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “ও খুব ভাল ছেলে। এই সময়ে সবাই যখন নিজের কেরিয়ার আর নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিজের কথা না ভেবে ও মানুষের জন্য কাজ করে।”
ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে। খুব গদগদ হয়ে এসে নিশানের হাত ধরে ঝাঁকালেন! বললেন, “আমার ছেলেও তো তাই করে। মানুষের হয়ে কাজ করে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার!”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না।
ভদ্রলোক এবার কেয়াদির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা তা হলে আসি। আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। কেমন?”
কেয়াদি মাথা নাড়ল শুধু। ভদ্রমহিলা ফলসার মাথায় হাত বুলিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর দু’জনে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নিশান বলল, “ফলসা, তুই গেলি না ওঁদের সঙ্গে? একটু এগিয়ে দিতিস।”
ফলসা বলল, “কেন? আমার বাড়িতে এসেছিল নাকি ওরা? মাকে দেখতে এসেছে। নিজেরাই ঠিক বেরিয়ে যাবে।”
কেয়াদির খাটটা ভেঙে আধশোয়া করা আছে। কেয়াদিকে সারাক্ষণ মেক আপ করা অবস্থায় দেখেছে নিশান। এখন কেমন যেন লাগছে। বয়সটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে!
কেয়াদি বলল, “তুই কী দেখে এই ফ্যামিলির ছেলেকে বিয়ে করবি ভাবলি রে ফলসা! এসে থেকে সারাক্ষণ টাকার কথা বলে গেল। যেন আর কিছু নেই এই পৃথিবীতে! এত টাকার গরম কেন! এসব তো ছোটলোক আর হাড়হাভাতেদের থাকে!”
ফলসা বলল, “মা, প্রণীত এমন নয়। তুমি ওকে দেখলে বুঝতে পারতে। সিঙ্গাপুর থেকে নেক্সট মান্থে তো আসছে। দেখবে।”
কেয়াদি মাথা নেড়ে নিশানের দিকে তাকাল, “তুই আজ এলি! আগে এলি না কেন রে? অপারেশন টেবিলে যদি মরে যেতাম তা হলে? আর তো দেখা হত না। আজ এসেছিস কেন?”
“কেয়াদি তুমি এমন কথা বোলো না! আসলে কাল আমাদের একটা ডেমনস্ট্রেশন ছিল। মিছিল। অবস্থান। সেই নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম!”
কেয়াদি ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “ও বাবা, তুই সত্যি এসব করছিস এখনও!”
নিশান সোজা হয়ে বসল, “হ্যাঁ, কেয়াদি। তুমি-আমি মিলেই তো সব শুরু করেছিলাম। তুমি শরীর খারাপের জন্য সরে গেলে। কিন্তু আমাকে তো করতেই হবে। উপায় কী বলো? গরিব লোকগুলোর হয়ে কে কথা বলবে? ওদের বাড়ি, দোকান সব ভেঙে দেবে। মিল বন্ধ করে দেবে। ওরা যাবে কোথায়? কলকাতার ফুটপাথে? যেখানে অলরেডি কয়েকহাজার লোক এসে বসে পড়েছে! ওদের কথা কে বলবে কেয়াদি?”
কেয়াদি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বিকেলের নরম, সুখী কলকাতা। শীত আসার আগের অভিমানী কলকাতা। নিশান দেখল, হঠাৎ যেন কেয়াদি নেই এখানে! যেন চলে গেছে অন্য কোথাও!
নিশান অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল, “কী হল কেয়াদি?”
কেয়াদি কেমন একটা আবছা গলায় বলল, “আমি তখন অনেক ছোট, জানিস। এত কিছু বুঝি না। কিন্তু বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম ফ্যাক্টরি গেটে। এমনি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কাজুদা কথা বলছিল বলে বাবা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমি সাইকেলের সামনে বসে শুনছিলাম। এরকমই বলত কাজুদা। আর সবাই শুনত। কী সুন্দর দেখতে ছিল! মাথাভরতি কোঁকড়া চুল। হালকা দাড়ি। আমার শরীরে তখনও নারীভাব আসেনি, কিন্তু তাও কেমন একটা ভাললাগা আসত!”
“কাজুদা কে কেয়াদি? অনেকে নাম বলে। কিন্তু আর কিছু বলে না!” নিশান অবাক হল।
কেয়াদি আচমকা আবার ফিরে এল এই নার্সিং হোমের কেবিনে। বলল, “তা, মালিকদের সঙ্গে কথা হল? পেখমদির ছেলের সঙ্গে?”
নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির দিনের কথা। মণীশের কথা শুনে ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল নিশান।
তারকের সঙ্গে কথা বলে সুপ্রতীক সবে নিজের গাড়িতে উঠেছিল। তুখোড় বৃষ্টির ভেতরেও দূর থেকে সেটা দেখেছিল নিশান। এবড়োখেবড়ো রাস্তার পরোয়া না করে ও সাইকেল চালিয়ে দিয়েছিল জোরে। তারপর একদম বড় গাড়িটার সামনে তেরছা করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সাইকেলটা।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করেও থতমত খেয়ে আবার বন্ধ করে দিয়েছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সুপ্রতীক জানলার কাচ নামিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, “মরার ইচ্ছে হয়েছে? গাধা!”
সাইকেলটা কোনওমতে স্ট্যান্ড করিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল নিশান। তারপর মুখের জল হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলে বলেছিল, “আমার আপনার সঙ্গে খুব জরুরি দরকার আছে!”
“আমার সঙ্গে?” সুপ্রতীক অবাক হয়ে গিয়েছিল এবার।
নিশান বলেছিল, “আমি ‘সেভ সোনাঝুরি’ থেকে আসছি। আপনারা এভাবে সব কিছু বিক্রি করে সোনাঝুরিকে ধ্বংস করতে পারেন না! এটা অন্যায়! হাজার-হাজার মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে এতে। আপনাদের মূলধন আছে বটে, কিন্তু এত মানুষের সহযোগিতা ছাড়া আজ আপনারা এই জায়গায় পৌঁছতে পারতেন না। সেখানে তাদের সব কিছু এভাবে শেষ করে দিচ্ছেন কোন অধিকারে?”
“বাপ রে!” সুপ্রতীক হেসেছিল নিশানের কথা শুনে, “এই বৃষ্টিতে এভাবে কেউ আসে? এটা কি ভাই সিনেমা নাকি? সাউথের ফিল্ম দ্যাখো বুঝি খুব! এটা কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেটানোর কাজ? ঠিক আছে। আমি কথা শুনব। মিট মি। একদিন এসো আমাদের কাছে, অফিসে। সোনাঝুরি আমারও খুব প্রিয়। আমার মা এখানকারই মেয়ে। তুমি এসো। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজো না। ঠান্ডা লেগে যাবে। কেমন?”
নিশান রাগ করতে চাইছিল। কিন্তু সুপ্রতীক এমন করে কথা বলছিল যে, বুঝতে পারছিল না কী করবে। রাধিয়ার কথার সঙ্গে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না মানুষটাকে।
সুপ্রতীক বলেছিল, “আমিও এভাবে বিক্রির বিপক্ষে। কিন্তু… যাক গে। তুমি এসো একদিন। আমার কার্ড রাখো। অফিসে এসে বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাও। কেমন?”
নিশান ভেজা কার্ড হাতে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়েছিল। কী ভেবে এসেছিল আর কী হল! লোকটাকে খুব করে বলবে বলে যে সারাটা পথ রিহার্সাল দিয়ে এল তার সবটাই মাঠে মারা গেল যে!
কিন্তু সেই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। দু’বার ওদের অফিসে গিয়েছে নিশান। কিন্তু সেখানে সুপ্রতীকের দেখা পায়নি। বারবার ওকে ফিরে আসতে হয়েছে।
“কী রে, চুপ করে কেন, কী হয়েছে বল!” কেয়াদি জিজ্ঞেস করল।
নিশান বলল, “তোমায় তো বলেছিলাম আগে। ভুলে গেছ? আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাজের কথা হয়নি। তাই আমি আর ওয়েট করছি না। গতকাল থেকে ফুল ফ্লেজেড ডেমনস্ট্রেশন শুরু করেছি। আর রেয়াত নেই!”
কেয়াদি হাত বাড়াল। পাশেই একটা বে়ডসাইড টেবিল। সেখানে একটা ক্রিম রাখা আছে।
ফলসা এগিয়ে গিয়ে ক্রিমটা নিল। তারপর কেয়াদির মুখে মাখিয়ে দিল সময় নিয়ে।
বাঁ হাতে স্যালাইন চলছে। হাতটা বেশ ফুলে আছে। কেয়াদির যে কষ্ট হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে নিশান। কিন্তু তাও কেয়াদি কথা বলেই চলেছে।
কেয়াদি বলল, “যা করবি, বুঝে করবি। কেমন? আন্দোলন মানুষের কাজের জন্য। নিজের রোম্যান্স ফুলফিল করার জন্য নয়।”
নিশান ভাবল বলে আন্দোলন ওর কাছে নিছক রোম্যান্স নয়। কিন্তু তার আগেই পকেটের মোবাইলটা নড়ে উঠল। নার্সিং হোমে এসেছে বলে ও রিংটোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল!
“হ্যালো, বলো। হ্যাঁ, উপরে চলে এসো। করিডর… হ্যাঁ, ডান দিকের… লাস্ট কেবিন। এসো।”
“কে আসছে রে?” কেয়াদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“আসছে একজন!” নিশান মুচকি হাসল।
“রাধিয়া?” ফলসা ভুরু নাচিয়ে হাসল।
“তোর এক ভাঙা রেকর্ড! দেখ না কে আসছে।”
নিশানের কথা শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরে দরজায় শব্দ হল একটা।
“এসো,” নিশান যেহেতু দরজার দিকে তাকিয়ে বসেছিল, ও দেখতে পেল মানুষটাকে। ফলসা পেছনে ফিরল আর কেয়াদি বাঁ দিকে তাকাল। আর তাকিয়েই কেয়াদি কেমন যেন স্থির হয়ে গেল।
নিশান হেসে উঠে গিয়ে হাত ধরল মানুষটার। বলল, “এসো বিজনদা।”
বিজনদা খুব সংকুচিত হয়ে দাঁড়াল একপাশে। একমুখ দাড়ি। ঢোলা পাজামা। রংচটা কুসুমরঙের পাঞ্জাবি। পায়ে রাবারের একটা চটি। পাকা চুলগুলো এলোমেলো!
ফলসা বুঝতে পারল না কে লোকটা। ও তাকিয়ে রইল।
কেয়াদি নিজের অবাক হয়ে যাওয়া ভাবটা কাটিয়ে এবার কড়া গলায় বলল, “এ কী! তুমি? এখানে কী করছ?”
বিজনদা হাসল। তারপর স্বভাবগত দ্বিধা নিয়ে বলল, “না মানে, নিশানের কাছে শুনলাম তোমার অপারেশন হয়েছে। তাই…”
“আমি কি চিড়িয়াখানার জিনিস নাকি?” কেয়াদি রাগে গরগর করছে একদম।
বিজনদাকে একটা টুল এগিয়ে দিল ফলসা। ও বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে!
কেয়াদি বলল, “খবরদার বসবে না তুমি। বেরিয়ে যাও।”
বিজনদা হাসল, “আরে, সে তো যাব। কিন্তু আছ কেমন?”
“তাতে তোমার কী?” কেয়াদি চোখ পাকাল।
বিজনদা এবার ফলসার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমার মায়ের পুরনো শত্রু। তাই আমায় দেখে এমন করছে। তা, তোমার মা নিয়ম মানছে তো?”
ফলসা হাসল, “নিয়ম? মা কি কারও কথা শোনে?”
বিজন এবার এগিয়ে গেল কেয়াদির দিকে। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট বই বের করে রাখল সামনে। বলল, “এই যে বিনয় মজুমদারের কবিতার বই। তুমি পড়তে ভালবাসতে। আর কী আনব বুঝতে পারলাম না।”
কেয়াদি মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। নিশান দেখল কেয়াদির মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ দুটো ছলছল করছে। ও বুঝল এখানে আর ওর বা ফলসার থাকা ঠিক হবে না!
নিশান উঠে দাঁড়িয়ে ফলসাকে বলল, “চল তো বাইরে একটু। কেয়াদিরা কথা বলুক।”
ফলসা বুঝল যে, কিছু একটা ব্যাপার আছে। ও আর দ্বিধা করল না। অবাক হয়ে একবার দেখল দু’জনকে, তারপর বেরিয়ে এল।
নিশান ঘরের বাইরে যেতে যেতে শুনল কেয়াদি বলছে, “সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসতে পারছ না!”
বিজনদা বলল, “তুমি যে বেরিয়ে যেতে বললে!”
“আমি কিছু বললেই সেটা শুনতে হবে? তোমার নিজের বিবেচনা নেই? সারা জীবন এমন থাকবে? আমি একবার না করেছিলাম বলেই…”
ঘরের বাইরে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল নিশান।
ফলসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নিশানের দিকে। তারপর ওর মুখে আস্তে-আস্তে ফুটে উঠল হাসি। বলল, “ও আচ্ছা। এই বিজন… মায়ের ফরেস্ট গাম্প!”
নিশান হাসল। কী বলবে বুঝতে পারল না। কিন্তু একটা জিনিস দেখে ভাল লাগল যে, ফলসা ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি নিয়েছে। এই নিয়ে কোনও বাঁকা কথা বলেনি। বিজনদাকে দেখলে তো আর কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। কিন্তু কেয়াদি ওইটুকু সময়ের মধ্যে এমন করল যে, ফলসা বুঝতে পেরে গিয়েছে।
নিশান বলল, “প্রেম বেকার জিনিস রে ফলসা। তুইও কেন যে প্রেমে পড়লি!”
“ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার গুরু, না পড়ে উপায় আছে?” ফলসা হাসল।
নিশান চোখ বড়-বড় করল।
ফলসা বলল, “দেখ ভাই, আমার সোজা কথা। শুধু প্রেম মারিয়ে জীবন যাবে না। মাল্লু চাই মাল্লু। ম্যাক্সিমাম মেয়েরই তাই। দেখবি, এমনি সাধারণ ভাল ভদ্র ছেলেদের মেয়েরা দয়ার পাত্রর মতো ট্রিট করে। কিন্তু অনেক টাকা, ভাল চাকরি, বড় গাড়ি থাক, মেয়েরা ঠিক সব ঝামেলা সহ্য করে নিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে চলবে!”
“ভাগ, কী বাজে কথা! একটা মেয়ে হয়ে এসব বলছিস তুই?” নিশান অবাক হল।
“আমি জানি তাই বললাম। সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে দেখবি। ম্যাক্সিমাম মেয়েরা এমন। সবাই নয়। কিন্তু ম্যাক্সিমাম। ভাল ভদ্র ছেলে হলে হবে না। আরও চাই আমাদের। সবাই আমরা মনে মনে এলিজাবেথ বেনেট। ডারসিকে দেখে লিজি যতটা না প্রেমে পড়েছিল, সেই প্রেম আরও দশগুণ হয়ে উঠেছিল পেম্বারলির সেই সম্পত্তি দেখে! সেই নাইটিন্থ সেঞ্চুরিতে লিখে গিয়েছিলেন জেন অস্টেন, অবস্থা কিচ্ছু পালটায়নি খোকা!” ফলসা হি হি করে হাসল, “মা এই বিজন লোকটিকে তাড়িয়ে দিয়েছিল কেন? বিশাল রেস্তদার বাপের ছেলে হলে তাড়াত? তাড়াত না! এখন অভিমান দেখাচ্ছে! হাউ কনভিনিয়েন্ট! আর দেখবি, তোর বিজনদাও সেটা গিলে নেবে। গলে যাবে। শোন, আমরা মেয়েরা অনেক প্র্যাকটিক্যাল। তোদের মতো অমন মূর্খ নই। আমরা চাইল্ড বিয়ার করি! আমাদের সফটওয়্যারটাই এমন হয় যে, মেটকে সব দিক থেকে এব্ল হতে হবে। না হলে বেবি সামলাবে কী করে? শুধু প্রেমের খঞ্জনি বাজালেই হবে? জীবন কি হাওয়ায় চলবে?”
নিশান মাথা নেড়ে বলল, “পরের বার ‘সেভ সোনাঝুরি’-র যে-মিটিংটা আছে সেটাতে তুই কিছু বলবি?”
কিছু বলার আগেই এবার ফলসার মোবাইলটা বাজল। মোবাইলটা বের করে নামটা দেখে সেটা নিশানের দিকে ফেরাল ফলসা। তারপর ভুরু নাচিয়ে হাসল। নিশান দেখল কলারের নাম। রাধিয়া!
“হ্যাঁ রে, বল। ও আচ্ছা। না, না, ঠিক আছে, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি… না, না, ইটস ওকে। আরে বাবা, ঠিক আছে! কোনও প্রবলেম নেই। রাখলাম রে,” ফোনটা কেটে ফলসা ভুরু কুঁচকে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী হল রে?” নিশান অবাক হল।
“তোকে রাধিয়া নীচে ডাকছে। গলাটা বেশ টেনস্ড লাগছে ওর। বলল, আজ আসতে পারবে না। কীসব কাজ আছে। খুব জরুরি। তোকে একবার নীচে ডেকেছে। গাড়িতে ওয়েট করছে ও। পাঁচ মিনিটের জন্য ডেকেছে। যা দেখা করে আয়।”
নিশানের অবাক লাগল খুব। এ আবার কেমনতরো কথা! এখানে আসার কথা ছিল কিন্তু আসবে না! নীচে এসেও গাড়ি থেকে নামবে না! কী হয়েছে? বিপদ হল নাকি কিছু?
নিশান আর সময় নষ্ট না করে নীচে নেমে এল।
রোদ নেই আর এখন। বরং একটা মনমরা আলো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। নীচের লবিতে ভিড় বেড়েছে আরও। বাচ্চাদের ছোটাছুটি দেখে মনে হচ্ছে কোনও স্কুলের অনুষ্ঠান হচ্ছে!
ও যতটা সম্ভব দ্রুত মানুষজন কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। আর বেরিয়েই থমকে গেল একদম। আরে, সেই বড় গাড়িটা! সুপ্রতীক মালিকের গাড়ি! রাধিয়া কি আজ এটা করে এসেছে?
ও দ্বিধার সঙ্গে গাড়ির দিকে এগোল। দেখল, ওকে দেখেই হয়তো রাধিয়া গাড়ির দরজা খুলে নামল। অন্যদিন রাধিয়া ওকে দেখে হাসে। আজ কিন্তু মুখটা বেশ সিরিয়াস। কিছুটা ভীতও!
নিশান এগিয়ে গিয়ে রাধিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গেল। কিন্তু তার আগেই রাধিয়া চোখের ইশারায় গাড়ির মধ্যে দেখাল। নিশান তাকাল। কে আছে গাড়িতে। ও সামান্য ঝুঁকে গাড়ির ভেতরটা দেখল এবার। আর চমকে উঠল সঙ্গে-সঙ্গে। দেখল, গাড়ির মধ্যে বসে রয়েছে সুপ্রতীক মালিক!
“কাম কাম! কাম ইনসাইড! সামনের সিটে বোসো…” সুপ্রতীক নিশানকে হাত দিয়ে দেখাল।
নিশান ঘুরে গিয়ে সামনের সিটে উঠল। দেখল, ও ওঠামাত্র ড্রাইভারটি নেমে গেল গাড়ি থেকে। বুঝল, এদের সব কিছু বলা থাকে! রাধিয়াও পেছনের সিটে নিজের বাবার পাশে গিয়ে বসেছে।
সুপ্রতীক হাসল নিশানকে দেখে। তারপর রাধিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আই ওয়াজ় আমেজ়ড টু নো দ্যাট ইউ টু আর ফ্রেন্ডস! দারুণ ব্যাপার! আমি আজ আচমকা জানলাম ব্যাপারটা। তুমি আগে বলোনি কেন যে, আমার মেয়েকে চেনো!”
নিশান ভাল করে দেখল সুপ্রতীকের মুখটা। কী বলতে চাইছে মানুষটা? এইসব কথার পেছনে অভিসন্ধি কী? ও দেখল, রাধিয়া মাথা নামিয়ে বসে রয়েছে!
সুপ্রতিক হাসল, “যাক, ভালই হল এটা। রাধির ফ্রেন্ড মানে সে আমার কাছেও স্পেশ্যাল!”
নিশান হাসার চেষ্টা করল। রাধিয়া এই লোকটা সম্বন্ধে ওকে বলেছিল কিছু কথা। নিশান নিজে বলেছিল খবর নিয়ে জানাবে। কিন্তু ও যা জেনেছে, সেটা এখনও রাধিয়াকে বলতে পারেনি। কীভাবে যে বলবে, সেটাই বুঝতে পারছে না। আর আজ সেই লোকটার সামনেই এসে পড়েছে।
সুপ্রতীক বলল, “সেদিন তো অনেক কথা বলছিলে, আজ এত চুপ কেন? তুমি তো আমার কাছে এলে না!”
নিশান নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করল মনে মনে। বলল, “আমি কিন্তু গিয়েছিলাম। একবার না, দু’বার। কিন্তু আমাকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি নাকি দেখা করতে চাননি!”
“আমি? চাইনি?” সুপ্রতীক আকাশ থেকে পড়ল যেন। একবার রাধিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল, “কী বলছে রে! আমার অফিস থেকে এমন বলল! স্ট্রেঞ্জ!”
নিশান কিছু না বলে সামান্য হাসল।
সুপ্রতীক বলল, “আর সেই রাগে তুমি কাল মিছিল-মিটিং করলে!”
নিশান অবাক হল না। এটা তো জানবেই সুপ্রতীক। কাল জমায়েত হয়েছিল ভাল। সোনাঝুরির মানুষজন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই যোগ দিয়েছিল মিছিলে। খবরটা যে সুপ্রতীকের কানে পৌঁছবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সুপ্রতীক আবার বলল, “আচ্ছা, যা হয়েছে ভুলে যাও। তারক আমায় বলল, তোমায় নাকি শিক্ষা দেবে। কিন্তু আমি ওকে বলে দেব তোমায় যেন কিছু না করে। আমার মেয়ের বন্ধু তুমি। আমার বাড়ির লোকই তো হলে প্রায়। তাই আমি যেমন তোমার দিকটা দেখছি, তুমিও আমার কাছের লোক হিসেবে আমার দিকটা দেখবে নিশ্চয়! দ্যাখো, এইসব মিটিং, মিছিল, ডেমনস্ট্রেশন ব্যাড প্রেস অ্যাট্রাক্ট করে। আমরা একটা বিরাট ভেঞ্চার নিচ্ছি। সেখানে প্রেস নেগেটিভ লিখলে কেউ কি আর আসবে এখানে? তাই আমি তোমায় বলছি, এসব কোরো না। আমার মেয়ের বন্ধু তুমি। আমার একটা দায়িত্ব আছে তোমার প্রতি। তাই তুমি এসব থামিয়ে দাও। আমি তোমায় দেখব। ভালভাবে দেখব। কেমন?”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। ওকে দেখবে মানে?
সুপ্রতীক আবার বলল, “আমাদের বাড়িতে এসো। রাধিয়া হ্যাজ় সো লিট্ল ফ্রেন্ডস। জীবনে বন্ধু খুব দরকার মাই ডিয়ার! আমাকেও বন্ধু করে নাও, দেখবে দারুণ হবে! শুধু আমার ব্যাপারটা একটু ভাবো। ওভাবে লোক জুটিয়ে হুজ্জুতি কোরো না। কেমন?”
নিশান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকল। দেখল, রাধিয়া মুখ নামিয়ে বসে আছে। ফরসা মেয়েটা লাল হয়ে গেছে লজ্জায়!
“তো, সেই কথাই রইল। তোমার পাওনা তুমি পেয়ে যাবে। কেমন? আর, একদিন লাঞ্চ করো আমাদের সঙ্গে। ওকে! ঠিক আছে? এখন এসো। আমাদের যেতে হবে!” সুপ্রতীক ঝুঁকে পড়ে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল।
নিশান নেমে গেল গাড়ি থেকে। ড্রাইভারটি গাড়িতে উঠে পড়ল আবার। স্টার্টও দিয়ে দিল। নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। সারা শরীরের রক্ত যেন ফুটছে ওর! ওকে কিনতে চাইছে লোকটা! এত টাকার গরম হয়ে গিয়েছে! মানুষকে আর মানুষই মনে করছে না! ওর মনে হল রাস্তা থেকে একটা আধলা ইট তুলে গাড়িটার পেছনের কাচে ছুড়ে মারে!
কিন্তু কিছু না করে নিশান গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। দেখল, গাড়িটা গড়িয়ে চলে যাচ্ছে সামনের দিকে। আর জানলার কাচ নামিয়ে মাথা বের করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে রাধিয়া। নিশান দেখল, বিকেলের শেষ আলোর মধ্যে মোমবাতির শিখার মতো রাধিয়ার মুখে টলটল করছে লজ্জা আর কষ্ট।
.
২৮. পেখম
আর দু’সপ্তাহ, মাত্র দু’সপ্তাহ! তার মধ্যেই বিয়ে হয়ে যাবে ওর! এই ঘর, এই বাড়ি, বাড়ির সামনের রাস্তা, বড় পুকুর, বাঁশবন, আর পেছনের ওই ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা জোনাকিদের ছেড়ে ওকে চলে যেতে হবে। কেন হবে? কীসের জন্য হবে? কে এই সুজিত মালিক? কবে দেখল ওকে? কোথা থেকে দেখল? এই কি রাহুর দৃষ্টি? ওর গোটা জীবনকে কেন গ্রাস করে নিল এইভাবে? কী অপরাধ করেছে ও?
ঘুমোতে পারে না পেখম! খেতে পারে না! এক অদ্ভুত বিষাদ ঘন মেঘের মতো ঝুলে থাকে মনের ওপরে! কিছু ভাল লাগে না ওর। কেউ সাহায্য করার নেই ওকে। মা নয়, ঠাকুরদা নয়, এমনকী বাবাও নয়।
বাবাও কেমন যেন চুপ করে গেছে আজকাল। বাবাকে সবচেয়ে ভালবাসে পেখম। কিন্তু সেই মানুষটা যে এমন চুপ করে যাবে, সেটা ভাবতে পারেনি ও।
শাড়ির আঁচলটাকে চেপে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগল পেখম। সন্ধে নেমেছে সবে। তবে হাওয়া দিচ্ছে খুব। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সারাক্ষণ। যেন আজ সব কিছু এলোমেলো করে দেবে এই হাওয়া!
পাড়ার ভেতরের রাস্তাটা ইটের। মাঝে মাঝে ভাঙা। তাড়াতাড়ি হাঁটা খুব অসুবিধের। কিন্তু তাও যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটতে চেষ্টা করল পেখম। ন’টার আগে বাড়ি ফিরতে হবে ওকে। মা আজ মিতুকাকিমার সঙ্গে পাঠ শুনতে গিয়েছে। বাবাকে অনেক করে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নয়নার কাছে যাবে বলে। ন’টার মধ্যে না ফিরতে পারলে মা আস্ত রাখবে না। বাবা বারবার এটাই বলছিল ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়।
পেখম আহত হয়ে তাকিয়েছিল বাবার দিকে। এভাবে কেন বাবা গুটিয়ে যাচ্ছে মায়ের সামনে? যে-বাবা ওকে আগলে রাখত, সে কী করে সরে যাচ্ছে ওর কাছ থেকে!
পেখম বলেছিল, “বাবা, তুমি এমন করে বলছ? আমায় আর একটুও ভালবাসো না, না?”
বাবা চেয়ারে বসে একটা কাগজ দেখছিল। ওর কথায় অসহায়ের মতো মুখ করে তাকিয়েছিল। বলেছিল, “কেন রে মা? এমন বলছিস কেন?”
পেখম তাকিয়েছিল বাবার দিকে। ঘরের বাল্ব জ্বলছিল। তার আলোয় বাবাকে কেমন তামাটে আর ভেঙে পড়া লাগছিল। যেন বাবা আর পারছে না এই জীবন বইতে!
পেখম বলেছিল, “আমার সঙ্গে যা হচ্ছে, তা তুমি মেনে নিচ্ছ কী করে বাবা?”
বাবা বলেছিল, “কী হচ্ছে মা? আমি সাধারণ একজন কর্মচারী। কত টাকাই-বা পাই বল! সেখানে এমন বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসছে, আমি না বলব কোন সাহসে? আমি কি এত ভাল ঘরে তোর বিয়ে দিতে পারব কোনওদিন?”
“আমি তো তা চাইনি বাবা,” পেখমের গলায় অভিমান জমা হয়ে উঠছিল, “আমি কি বলেছি কোনওদিন আমায় বড়লোক বাড়িতে বিয়ে দাও?”
“কিন্তু আমি তো জানি রে মা,” বাবা মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, “সারা জীবন তুই কিছু চাসনি বলেই তো আমার আরও খারাপ লেগেছে। আমি তো কিছুই করতে পারিনি, পারি না। সবাই কত কিছু করে নিজের সন্তানদের জন্য! আমার কি ইচ্ছে করে না আমার মেয়ে ভাল করে থাকুক? জীবনে আরও অনেকটা পথ যাবি তুই, তখন বুঝবি টাকার গুরুত্ব কতটা!”
“টাকাটাই সব বাবা?” পেখমের গলা দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল যেন। এতদিন ধরে চেপে থাকা সব কষ্ট আর যন্ত্রণা আজ মায়ের অনুপস্থিতিতে বেরিয়ে এসেছিল বাবার সামনে।
“সব না হলেও অনেকটা, অনেক-অনেকটা রে মা!” বাবা যেন নুইয়ে পড়েছিল আরও। বাবাকে আরও বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল। কেমন একটা খয়াটে লাগছিল যেন। যেন এইসব কথা আসলে বাবার মনের কথা নয়। কেউ যেন জোর করে বলিয়ে নিচ্ছিল বাবাকে দিয়ে!
বাবা বলেছিল, “আমি যা কোনওদিনও দিতে পারিনি তোকে, সেই সব কিছু তুই পাবি এখানে রে মা।”
“আমি তা চাইনি বাবা, আমি মরে যাব এখানে বিয়ে হলে!” পেখম অসহায়ের মতো তাকিয়েছিল বাবার দিকে।
বাবা উঠে এসেছিল এবার। ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “তুই এভাবে বলিস না। জানিস, তোর যখন ছ’বছর বয়স, একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলি তুই। ডাক্তাররা কিছুই করতে পারছিল না। শেষে মানিকতলার এক ডাক্তার, অনেক বয়স তার, সে সারিয়ে তুলেছিল তোকে। টানা দু’মাস ভুগেছিলি। আমার যে কী গেছিল, সে আমিই জানি। আমার যে কতটা কষ্ট হয় তোর জন্য, কতটা অসহায় লাগে তোর বিপদ হলে তুই জানবি না! তোকে আমরা হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিচ্ছি না! মালিকরা নিজে এসেছে। সেদিন দেখলি তো সুজিতের মা আর সুজিত দু’জনেই এল। কত কিছু নিয়ে এল। তোকে পাশে বসিয়ে কত আদর করল ওর মা। তোর আজ যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, সেটা কিন্তু কাল আর থাকবে না। এমন করে ভাবিস না।”
“কিন্তু আমি যে ভাল থাকব না বাবা! এটা কেন তোমরা বুঝছ না?” পেখম শেষ চেষ্টার মতো করে বলেছিল, “আমার মন বলে কিছু নেই? জোর করে আমার ওপর এসব চাপিয়ে দিচ্ছ কেন তোমরা?”
বাবা বলেছিল, “কারণ, তুই এখনও নিজের ভাল বুঝতে শিখিসনি মা। আর এসব বলেই সময় নষ্ট করবি? বললি যে বেরোবি!”
পেখম বুঝতে পারছিল, বাবা কথা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাই নিজেই ওকে বাইরে যাওয়ার কথা বলছে। ও বুঝতে পারছিল, আসলে মায়ের কথা বা ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাবা যাবে না। বাবা যেতে পারবে না। বাবা মাকে এতটাই ভালবাসে যে, সেখানে পেখমও তুচ্ছ!
ও আর কথা বাড়ায়নি। শুধু এটা বুঝেছিল, যা করতে হবে ওকে নিজেকেই করতে হবে। কেউ কিছু করে দেবে না ওর জন্য!
হাতঘড়িটা দেখল পেখম। ছোট ঘড়ি। নতুন। ডায়ালে অক্ষরগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। সুজিতের মা এটা দিয়ে গেছেন। ওঁরা এসেছিলেন কিছুদিন আগে। বিশাল বড় গাড়িটা ওদের ছোট পাড়ায় যেন আঁটছিল না। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়েছিল গাড়িটা।
সবার মাঝে পুতুলের মতো বসেছিল পেখম। ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বসেছিলেন সুজিতের মা। তখনই এই ঘড়িটা পরিয়ে দিয়েছিলেন উনি।
আজকের আগে এই ঘড়িটা পেখম হাতে দেয়নি। কিন্তু আজ উপায় ছিল না। ও যে ঘড়িটা পরত সেটা মা কাজের দিদিকে দিয়ে দিয়েছে। পেখম আপত্তি করলেও শোনেনি। পেখম বুঝতে পেরেছিল, মা জোর করে এসব করছে! নানাভাবে পেখমকে কোণঠাসা করে ঠেলে দিচ্ছে মালিকদের দিকে।
পৌনে সাতটা বাজে এখন। এখান থেকে চ্যাটার্জিপাড়া হেঁটে যেতে দশ মিনিটের মতো লাগবে। বিজনদের বাড়িতে আজ কেউ নেই। সেখানে আজ দেখা করবে ও কাজুর সঙ্গে।
কাজু প্রথমে রাজি হয়নি। বিজনকে বলেছিল দেখা করতে পারবে না। কিন্তু বিজন খুব জোর করেছে।
বিজনকে মা ঢুকতে দেয় না আর বাড়িতে। তাই ঠাকুরদার দোকানে বিজনকে একদিন ধরেছিল পেখম। একমাত্র ওইখানে গেলেই মা কিছু বলে না।
পেখম বলেছিল, “তোকে যে করেই হোক একবার কাজুদাকে রাজি করাতেই হবে বিজু। আমার জীবন-মরণ সমস্যা। তুই একটু দেখ ভাই। এটা খুব দরকারি।”
বিজন সেই কাজটা করেছে। দোকানেই গতকাল পেখমের সঙ্গে দেখা করে বলে গেছে আজ সন্ধেবেলা ওদের বাড়িতে আসবে কাজুদা। বাড়িতে কেউ নেই। সবাই রাত দশটা নাগাদ ফিরবে। তার মধ্যে যেন দেখা করে নেয় ওরা।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে খুব। রাস্তাটাও নির্জন। সামান্য ভয়-ভয় করছে পেখমের, কিন্তু তাও ও যাচ্ছে। ফেরার পথে না হয় বড়রাস্তা ঘুরে রিকশা করে চলে আসবে।
কিন্তু হাঁটার পক্ষে পাড়ার ভেতরের রাস্তাটাই সবচেয়ে ভাল।
কাজু কি আসবে? এই যে চারদিকে মিথ্যে বলে এতটা ঝুঁকি নিয়ে এল, সেটা কি ঠিক করল? কাজু তো কথাই বলতে চাইছে না ওর সঙ্গে। আর ছোটকার কাছে এও শুনেছে যে, কিছুদিন আগে ফ্যাক্টরি গেটে নাকি বিশাল মিটিং হয়েছে। কাজু নাকি ফ্যাক্টরি স্ট্রাইক করার কথা বলছে!
সবাই মিলে রাতের খাবার খাচ্ছিল একসঙ্গে। ছোটকা তখনই কথাটা তোলে। আগে ছোটকা জুট মিলের ফোরম্যান ছিল। কিন্তু গত একমাস হল, ছোটকার প্রোমোশন হয়েছে। মালিকরা ছোটকাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোডাকশন ম্যানেজার করে দিয়েছে। এসব যে কেন হচ্ছে, সেটা ভালই বুঝতে পারছে পেখম। এমনকী, এটাও শুনছে, মালিকদের হাত নাকি এতটাই লম্বা যে, ওরা বাবাকে এই থানার বড়বাবু করার জন্যও সরকারের কাছে কলকাঠি নাড়ছে! কোন কথা কতটা সত্যি পেখম জানে না। কিন্তু এটা বোঝে যে, ওদের গোটা পরিবারকে গ্রাস করে ফেলছে মালিকরা!
ছোটকা বলেছিল, “জানো বউদি, ওই কাজু সেদিন ফ্যাক্টরি গেটে মিটিং করেছে। সবাইকে উসকাচ্ছে, যাতে সবাই স্ট্রাইক করে। আমাদের বিপাকে ফেলতে চাইছে, জানো! কী বদ ছেলে ভাবতে পারছ? নিজে তো করিস টিউশনি। রোজগার করার মুরোদ তো নেই একফোঁটা। সেখানে তুই অন্যদের ভাত মারবি? মালিকদের একটা ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে কিছু যাবে-আসবে না। ওদের অনেক ফ্যাক্টরি আছে, ব্যাবসা আছে। কিন্তু এখানে গরিব লোকগুলোর কী হবে ভাবতে পেরেছে?”
মা রুটি দিচ্ছিল বাবাকে। সেটা মাঝপথে থামিয়ে বলেছিল, “তবেই বোঝো কেমন জানোয়ার ছেলে! আর একেই কিনা বাড়িতে ঢুকিয়েছিলে তুমি! আমার মেয়ের মাথা খেতে চেয়েছিল! ভাবতে পারো! কী ভাগ্যে আপদ নেমেছে ঘাড় থেকে!”
ছোটকা মাথা নেড়ে বলেছিল, “আমি বুঝতে পারিনি যে, শয়তানটা এতদূর যাবে। আমাদের মিলের ক্ষতি করতে চায়। কীসের রাগ এত সেটা কি আর জানি না! দাড়ি রাখলেই ভাবে সব চে গেভারা হয়ে যাবে!”
পেখম অবাক হয়ে যাচ্ছিল। এসব কী বলছে ওরা! কাজু এমন নয় সেটা ওর চেয়ে ভাল আর কে জানে! আর এই ছোটকাই তো কয়েকমাস আগে মালিকদের গালাগালি করত। বলত মাইনে ভাল নয়। ওভারটাইম নিয়ে কারচুপি করে। লোকজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তারা আজ ভাল হয়ে গেল! এই মিল এখন ছোটকার ‘আমাদের মিল’ হয়ে গেল!
মানুষ এতটা লোভী আর নীচ হতে পারে! এই বাড়িতে জন্মেছিল বলে ওর আজকাল ঘেন্না হয়। ঠাকুরদাও কেমন যেন হয়ে গেছেন। সব কিছু থেকে যেন দূরে থাকেন আজকাল। বাড়িটা যেন আর পেখমের বাড়ি নেই। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, ব্লেড চালিয়ে নিজের মুখটা ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এই রূপ দেখেই তো সুজিত ভুলেছিল। এই রূপের জন্যই তো এত কিছু। তা হলে এটাকে শেষ করে দিলেই তো আপদ চুকে যায়।
আবার চমকে উঠল বিদ্যুৎ। সামনে ভটচাজ গলির মোড়। আর-একটু গেলেই চ্যাটার্জিপাড়া। বিজনদের বাড়ি। সত্যি আসবে তো কাজু? কতদিন দেখেনি! ওর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল আচমকা। চোখে জল এসে গেল। কাজুর মুখটা মনে পড়লেই ওর বুকের মধ্যে কেমন একটা করে। মনে হয় সব ছেড়ে চলে যায় কাজুর কাছে। ওদের ওই দু’কামরার ঘরেই ও থাকবে। মাটিতে শোবে। আধপেটা খেয়ে থাকবে। কাজু যেভাবে রাখবে, সেভাবে থাকবে। নিজেও দরকার হলে কাজ করবে। কিন্তু কাজুকে ছেড়ে কিছুতেই থাকতে পারবে না। ও আকাশের দিকে তাকাল। লালচে আকাশে কালো-কালো ছায়ার মতো গাছেরা মাথা নাড়াচ্ছে। সামনের বড় বটগাছটাও আজ এই হাওয়ার রাতে সব ভুলে যেন পাগল হয়ে উঠেছে! এমন রাতে কি কাজু আসবে না? কাজু কি এতটা ভুল বুঝল ওকে? এতটা পর করে দিল! জানে না কি যে, ওর বাড়ির লোকজন কেমন! কীভাবে সবাই মিলে ওকে আটকে রাখে! কষ্ট দেয়! এতটা ভুল কী করে বুঝল কাজু!
“আরে পেখম, তুই?”
পেখম চমকে গেল খুব। আবছায়ায় আচমকা এভাবে ডেকে ওঠায় প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি কে এটা। তারপর দেখল ফুলুদাদু। ফুলুদাদুরা ওদের বাড়ির পাশে থাকে। ঠাকুরদার খুব বন্ধু। সেই ছোটবেলার বন্ধু যাকে বলে। এক সঙ্গেই দু’জনের পরিবার পার্টিশানের পরে এসেছিল এই সোনাঝুরিতে। ফুলুদাদুদের এখনও কিছু আত্মীয়স্বজন রয়ে গিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে। ফুলুদাদু সেখানেই গিয়েছিল।
পেখম কী বলবে বুঝতে পারল না। ফুলুদাদু পূর্ব পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছে।
ফুলুদাদু বলল, “তুই এখন কোথায় যাচ্ছিস?”
পেখম ইতস্তত করে বলল, “এক বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছি। কিছু বই দরকার।”
ফুলুদাদু সহজ-সরল মানুষ, বেশি প্যাঁচঘোঁচ বোঝে না! বলল, “ও, ঠিক আছে। আমি বগলার কাছে যাচ্ছি এখন। তোদের দোকানে যাব।”
পেখম বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে বোলো না। মাকে তো জানো! জানলে… সামনে বিয়ে তো আমার!”
“তাই নাকি? বিয়ে?” ফুলুদাদু হাসল, “দারুণ খবর তো! ঠিক আছে তুই এখন যা, আমি কাউকে কিছু বলছি না…” ফুলুদাদু মাথায় হাত রাখল ওর।
পেখম হাসল। তারপর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। তবে ফুলুদাদু ভাল মানুষ, কিছু বলবে না।
পেখম ঘড়ি দেখল আবার। কাজু আসবে সাতটার সময়ে। বিজনদের বাড়িটা ঠিক চেনে না পেখম। বিজন বলেছে ও চ্যাটার্জিপাড়ার মোড়ে এসে সেখান থেকে নিয়ে যাবে পেখমকে। বলেছিল, “তুমি ভেবো না পেখমদি। আমি চলে আসব। তবে একটা কথা, তুমি নয়নাদিকে কিন্তু এসব কিছু বোলো না।”
“মানে?” পেখম বুঝতে পারেনি কী বলতে চাইছে বিজন।
“মানেটা খুব সহজ, নয়নাদিকে আমার ভরসা হয় না আজকাল। কেয়া সেদিন বলছিল, নয়নাদির কাছে নাকি ও কাজুদার ছবি দেখেছে!”
কেয়াকে চেনে পেখম। বিজনের স্যারের মেয়ে। ন’-দশ বছর বয়স। ছোট্ট একরত্তি একদম। কিন্তু কী পাকা, কী পাকা! সারাক্ষণ বিজনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। ওদের সঙ্গে আবার নয়নার খুব ভাল সম্পর্ক!
“কাজুদার ছবি দেখেছে, তো? তাতে কী হল? তুই জানিস না, আজকাল নয়না সারাক্ষণ ছবি তুলে বেড়ায়! তাতে কী হল?” পেখম আমল দেয়নি কথাটার।
বিজন ঠাকুরদার দোকানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। পেখমের প্রশ্নে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ও সরে এসেছিল এক কোণে। তারপর বলেছিল, “আরে, কেয়া বলে, নয়না নাকি কাজুদার লাভে পড়েছে!”
“মারব এক চড়!” পেখমের রাগ হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ, “ওইটুকু মেয়ে! এসব কে বলেছে ওকে? এত পাকা কী করে হয় ও?”
বিজন ঘাবড়ে গিয়েছিল সামান্য। রক্ষণাত্মক হয়ে বলেছিল, “না, না, রাগ কোরো না পেখমদি। আমি যা শুনেছি বললাম। তুমি কিছু মনে কোরো না।”
নয়না পেখমের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। এইসব বিজনের মতো পাকা ছেলেগুলো কী করে বলে এমন কথা? নয়নাকে ও বলে না, এমন কথা নেই। সেখানে বিজন এসব বলে কী করে?
নয়নার কাছ থেকে কিছু লুকোয় না পেখম। আজও কিছু লুকোয়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ও সোজা গিয়েছিল নয়নার কাছে।
নয়নাদের বাড়িটা সামান্য দূরে। চারিদিকে বাগান দিয়ে ঘেরা। ওর বাবা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। বাড়ির সামনে ডিসপেন্সারি। পেখম দেখেছিল আজ নয়নার বাবার কাছে ভিড় বেশ। অন্যদিনের মতো ফাঁকা নেই দোকান। পেখম ওই দিকে না গিয়ে সোজা দরজার কড়া নেড়েছিল।
সামান্য সময় পরে নয়না নিজেই এসে দরজা খুলে দিয়েছিল। পেখম দেখেছিল নয়না চুল বাঁধছে ফিতে দিয়ে। ওকে দেখে বেশ অবাকই হয়ে গিয়েছিল। চোখ বড়-বড় করে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই এখানে? কাকু-কাকিমা জানে? তোর না বাড়ি থেকে বেরোনো বারণ?”
পেখম এদিক-ওদিক দেখে নয়নাকে হাত ধরে টেনে বের করে এনেছিল ঘরের বাইরে। তারপর সতর্ক গলায় বলেছিল, “শোন না, আমি কাজুদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। বাড়িতে বলেছি তোর কাছে এসেছি। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সেটাই বলিস কিন্তু।”
“কিন্তু তোর তো বিয়ে! সেখানে এখন কাজুদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস কেন? দেখ, ঝামেলা হয়ে যাবে কিন্তু জানাজানি হলে। কাজুদাকে গুলি মার। সামনে কত ভাল জীবন তোর। এসব করিস না পেখম।”
পেখম আহত হয়ে তাকিয়েছিল নয়নার দিকে, “তুইও ওদের মতো কথা বলছিস! তুই জানিস না আমার আর কাজুদার প্রেম কতটা খাঁটি। তা হলে? তোকে যা বললাম, সেটা শুধু মাথায় রাখিস!”
নয়না খপ করে হাত ধরেছিল পেখমের। তারপর সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি তোকে খুব ভালবাসি পেখম। কিন্তু কিছু জিনিস আছে যেগুলো ভালবাসার চেয়েও জরুরি। তুই যা করছিস তাতে কারও ভাল হবে না।”
“আমি জানি আমি কী করছি। তোকে যেটা বললাম সেটা বুঝেছিস তো?” পেখম নয়নার হাতটা আঁকড়ে ধরে বলেছিল, “একটু সাহায্য কর নয়না। আমার যে আর কেউ নেই… কাকে আমি বলব বল!”
আবছা হয়ে আসা আলোয় নয়না তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর ধীরে-ধীরে কেটে-কেটে বলেছিল, “কাজুদা তোর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হল? আর, কোথায় যাচ্ছিস তুই দেখা করতে?”
“বিজনদের বাড়ি। চ্যাটার্জিপাড়ায়। বাড়ি আজ ফাঁকা ওদের। যাব আর আসব। তুই প্লিজ় আমার কথাটা রাখিস!”
কথা শেষ করে আর দাঁড়ায়নি পেখম। আসলে ওর আর দাঁড়ানোর সময় ছিল না।
“আমার বাড়িটা সামনেই, তাড়াতাড়ি চলো। কাজুদা এসে গেছে।” চ্যাটার্জিপাড়ার মোড়েই দাঁড়িয়েছিল বিজন। পেখমকে দেখে নিজেই এগিয়ে এল।
বিজনদের বাড়িটা সত্যি মোড়ের কাছে। বাড়িটা বেশ বড়। ইটের। মাথায় টিন দেওয়া। বাড়ির সামনে একটা উঠোন। তুলসী-মঞ্চ। আর বাড়ির চারদিকে প্রচুর গাছপালা। বিজনদের টাকাপয়সা থাকলেও সেটা কিন্তু বাহ্যিক আড়ম্বরে দেখা যায় না। বোঝাও যায় না।
বিজন বলল, “বাড়ির পেছনের দিকে চলে যাও। ওখানে একটা বাগান আছে। কাজুদা আছে ওখানে দাঁড়িয়ে। আমি বাড়ির সামনে আছি। মানে, ঘরগুলো বন্ধ করে দিয়ে গেছে তো… আমি পাশে মামার বাড়িতে দুপুরে খেয়েছি। তাই…”
পেখম আর শুনল না। অত শোনার মতো মনের অবস্থা ওর নেই। হাত-পা কাঁপছে ওর। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কতদিন পরে কাজুর সামনে দাঁড়াবে গিয়ে! কী বলবে কাজু! কথা বলবে তো নাকি…
কাজু দাঁড়িয়েছিল একা। চারদিকে ঘন গাছপালার মধ্যে কেমন একা আর দুঃখী লাগছিল কাজুকে। আবছায়া হলেও পেখমের মনে হল কাজু বেশ রোগা হয়ে গেছে।
পেখম এগিয়ে গেল এবার। পা কাঁপছে ওর! বুকের মধ্যে যেন চটকলের ভোঁ পড়েছে! কতদিন পর কাজুর কাছে ও এল! এভাবে সম্পূর্ণ নির্জনে কতদিন পরে দেখা করল দু’জন!
ওর পায়ের আওয়াজ পেয়ে কাজু মুখ তুলে তাকাল এবার। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন ডেকেছ?”
“কাজুদা, আমি… আমায় জোর করে…” পেখমের গলা আচমকা ডুবে গেল জলের তলায়। কোন এক অজানা সমুদ্র থেকে চোরাস্রোত এসে হঠাৎই যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল পেখমকে। কষ্টের সঙ্গে এক চূড়ান্ত অভিমান এসে দখল নিল ওর মনের! এত ভালবাসার পরেও ওকে বলতে হবে কেন ডেকেছে? কেন দেখা করতে চাইছে? কাজু কি একদম ভুলে গেল ওকে? সবটাই ভুলে গেল এই কদিনে! পেখম আর কোনও কথা না বলে মুখ নামিয়ে নিল।
কাজু চোয়াল শক্ত করে বলল, “জোর করে কাউকে কিছু করানো যায় না। এটা নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নয়!”
পেখমের ইচ্ছে হল বলে, এটা তার চেয়েও বেশি। এখানে শরীরে মারে না, মনে মারে। এই ক্যাম্পে মনে মেরে শেষ করে দেওয়া হয় মানুষকে।
কাজু এগিয়ে এল এবার সামান্য। বলল, “এভাবে কান্নাকাটি করার কিছু নেই। বিয়ে করো। সুখী থাকো। আর কী বলব! তবে তোমার হয়তো মনে নেই এই সম্পর্কটা তুমি নিজেই শুরু করেছিলে। আমি প্রথম থেকেই বলেছিলাম, এতে অসুবিধে হবে। তুমি শোনোনি কিছু। আর দ্যাখো, আজ তোমার কথা না শোনার খেসারত দিতে হচ্ছে আমায়। ভালবেসে আমার কী হল দ্যাখো পেখম। আমার আর তোমার কী সম্পর্ক সেটা তো কেবল আমরা জানতাম। সেটা কতটা গভীর সেটা তো আমরা বুঝতাম কেবল। আর, সেখানে তুমি এমন করলে! আমার সব কিছু তো নষ্ট হয়েই গিয়েছে। আর কেন ডাকলে আমায়? কী বলতে চাও আর?”
কাজুর গলার হাহাকার যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে মেঘ ডেকে উঠল যেন তার উত্তরে! ডাইনির চুলের মতো আঁকাবাঁকা বিদ্যুৎরেখা নিমেষে ছড়িয়ে গেল আকাশময়! পেখম মুখ তুলে সেই আলোয় দেখল কাজুকে। দেখল, কাজুর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কাঁদছে!
পেখম আর নিজেকে আটকাতে পারল না। কীসের এই টান ও নিজেও বুঝতে পারল না। শুধু দেখল, এক অমোঘ আকর্ষণ ওকে যেন টেনে এনে ছুড়ে ফেলল কাজুর বুকের ওপরে।
পেখম সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজুকে জড়িয়ে ধরল। ওর মনে হল লতানো গাছের মতো ওর মন আর শরীর থেকে অসংখ্য আকর্ষ যেন বেরিয়ে এসে কাজুকে মিশিয়ে দিতে শুরু করেছে ওর সঙ্গে!
“পেখম আমি… আমি ভাল নই পেখম… আমি এর মধ্যে… আমি…” ওই বন্ধনের মধ্যেও কাজু যেন কিছু বলতে চাইল।
কিন্তু কাজুকে আর কিছু বলতে দিল না পেখম। মুখ তুলে কাজুর ঠোঁটদুটো কামড়ে ধরল ও। কাজুও যেন সামান্য দ্বিধা করল প্রথমে, তারপর ওর নিজেরও সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল এবার। নরম পাখির মতো পেখমকে প্রায় তুলে নিল মাটি থেকে। তারপর নিজের সমস্ত না পাওয়া দিয়ে পেখমের ভালবাসা শুষে নিতে লাগল ও।
আকাশে মেঘ ডাকল আবারও। হাওয়ার জোর বাড়ল। ক্ষণে-ক্ষণে ছিটকে উঠল বিদ্যুৎ। পেখম আর কাজু ক্রমশ তলিয়ে যেতে লাগল এক নরম অন্ধকারে। পৃথিবীর সমস্ত হিংসা, লোভ আর বিচ্ছেদ থেকে দু’জনকে আড়াল করে দিতে শুরু করল এই বাগান, এই গাছপালা, এই অন্ধকার। পেখম বুঝল আজকে, এতদিনে ও সম্পূর্ণ কাজুর হয়ে গেল। বুঝল সারা জীবনের মতো কাজুর সুবাস জমা হয়ে গেল ওর শরীরে। জমা হয়ে গেল ভালবাসা আর নির্ভরতা। পেখম বুঝল, এই বন্ধন থেকে ওর আর মুক্তি নেই। এই বন্ধন ওকে সারা জীবন বাঁচিয়ে রাখবে।
.
২৯. রাধিয়া
এই গাড়িটায় সান রুফ আছে। গাড়ির মাথার একটা চৌকোমতো অংশ কাটা। তাতে কাচ লাগানো রয়েছে। ব্যাপারটা খুব ভাল লাগে রাধিয়ার। ও পেছনের সিটে বসে মাঝে মাঝে মাথাটা ওপর দিকে তুলে ওই চৌকো জানলাটা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওদের গাড়ির ওই কাচটা ফোটোক্রোম্যাটিক। দিনে যেমন গভীর কালো রং হয়ে যায়, তেমনই রাতে আবার স্বচ্ছ সাদা হয়ে যায়। ফলে গাড়ির মধ্যে বসেই আকাশ দেখতে পারে ও।
আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভাল লাগছে খুব। নভেম্বরের শেষ, তাই আকাশে মেঘের চিহ্ন নেই। শহর হলেও সামান্য কিছু জেদি নক্ষত্র দূষণের মাস্তানির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে। বাইরে গরম হলেও গাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। ছোটবেলায় ঠাকুরমার সঙ্গে টেরাসে বসে আকাশ দেখত ও। ঠাকুরমা গল্প বলত ওকে। রূপকথার গল্প। রাজা, রানি, রাজকুমার, রাজকুমারী আর দুষ্টু ড্রাগনের গল্প। আর সেই গল্প শুনতে-শুনতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রাধিয়ার মনে হত আকাশ থেকেও কি এমন কোনও ড্রাগন হাঁ করে ওকে গিলে নিতে নেমে আসবে নীচে? এখন মনে পড়লে হাসি পায় রাধিয়ার। ছোটবেলার অনেক কিছুই, দেখেছে, বড় হলে আর পাওয়া যায় না!
মধুদা গাড়ি চালাচ্ছে। বিবেকানন্দ পার্কের পাশের গলিতে একটা রেস্তরাঁয় যাচ্ছে রাধিয়া। নেমন্তন্ন আছে আজ। পলি নেমন্তন্ন করছে! ও যে ওল্ড এজ হোমটা চালায়, সেটা নাকি বড় একটা গ্র্যান্ট পেয়েছে। সেই জন্য ও আজ বন্ধুদের খাওয়াবে!
পলি মেয়েটা অদ্ভুত। খুব বড় মনের! রাধিয়া জানে যে এই ওল্ড এজ হোমটার হয়ে কাজ করার জন্য পলি নিজে কোনও টাকা পায় না। এই যে গ্র্যান্টটা পেয়েছে সেটা থেকে এক কানাকড়িও ও পাবে না। তাও মেয়েটা কী খুশি!
রাধিয়ারও এমন হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারে না। কীসের যে এক ভয় ওকে চেপে ধরে কে জানে! কিছুতেই নিজের মন খুলে ও কিছু করতে পারে না। সারাক্ষণ কেমন যেন মাথা নিচু করে থাকে! অন্যায্য কেউ কিছু বললেও প্রতিবাদ করতে পারে না। উচিত কথা বলে দিতে পারে না। শুধু রাগ হয়, চাপা একটা কষ্ট হয় মনে মনে। বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ অনুভব করে ও। উলটো দিকে একটা ভয় এসে আঁকড়ে ধরে ওকে। ভাবে, উচিত কথা বললে যদি খুব অশান্তি হয়! তার চেয়ে বাবা এই চুপ করে থাকাই ভাল!
এই তো আজকেই বেরোনোর আগে মা রাগ করছিল।
মা বলছিল, “এখন কোথায় যাচ্ছিস তুই? আবার সেই ভুলভাল বন্ধুদের কাছে যাচ্ছিস? তোর কি একটুও স্টেটাস-জ্ঞান নেই! আমি আর তোর বাবা কোথায় যাই, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করি! আর তুই! কতবার বলেছি আমাদের সঙ্গে পার্টিতে চল, ক্লাবে চল। সেখানে কত ব্রাইট ছেলেমেয়েরা আসে। তাদের সঙ্গে ঘোর। না, সেসব তো করবি না! সারাক্ষণ পেটি কিছু ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মাখামাখি। আমি তোর বাবাকে তখনই বলেছিলাম মেয়েকে লন্ডনে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু তার কি আমার কথা শোনার সময় আছে! একদম ঠাকুমার রক্ত পেয়েছিস তুই! যত ছোটলোকদের সঙ্গে মেলামেশা!”
ছোটলোক! রাধিয়ার রাগ হয়ে গিয়েছিল। ও বলেছিল, “ওরা খুব ভাল মা!”
“কীসের ভাল? আমি দেখিনি! যেমন ড্রেসিং সেন্স, তেমন চেহারা সব! কী করে তুই ওদের টলারেট করিস?”
রাধিয়া কিছু না বলে পার্স খুলে দেখছিল কত টাকা আছে ব্যাগে। কার্ডগুলো সব ঠিক আছে কি না।
মা বুজুকে ডেকে বলেছিল, “বুজু আমি বেরোব। ক্লাবে যাব। সুপ্রতীকও চলে যাবে ওখানে। আমার ড্রেস রেডি কর!” তারপর রাধিয়ার দিকে ফিরেছিল, “আমাদের সঙ্গেও তো যেতে পারতিস। ইউ ক্যান মিট নিউ ফ্রেন্ডস দেয়ার। সুশীল নিয়োগীর ছেলে এসেছে স্টেটস থেকে। আমি ছবি দেখেছি। একদম রণবীর কপূরের মতো দেখতে! ও তোর সঙ্গে মিট করতে চায়। ফেসবুকে তোকে দেখেছে। সুশীলের ওয়াইফ নীতা আমায় বলছিল। সেখানে না গিয়ে কোন না কোন পলি কী এক হোম চালায়, তার সঙ্গে কোন একটা বাজে রেস্তরাঁয় খেতে যাবি! সত্যি!”
রাধিয়া কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়েছিল। মায়ের আগে এমন মনোভাব ছিল না। কিন্তু ইদানীং কী হয়েছে মায়ের কে জানে! সারাক্ষণ এসব বলে চলেছে!
গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে সিগন্যালে। পরের সিগনালটাই ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক। সেখান থেকে ডান দিকে বাঁক নিতে হবে।
রাধিয়া পাশে তাকাল। একটা বড় হাসপাতাল। সামনে অনেক মানুষ। পাশে একটা মন্দিরও রয়েছে। সেখানে একটা লোককে দেখে সোজা হয়ে বসল রাধিয়া। আরে, সেই বইওয়ালাটা না! ও ভাল করে তাকাল। ফুটপাথে আজকাল এত দোকানপাট হয়ে গেছে যে, ভাল করে কিছু দেখার উপায় নেই। তবু পথচলতি মানুষ আর দোকানের ফাঁক দিয়ে লোকটাকে দেখল রাধিয়া। হ্যাঁ, ঠিক, সেই বইওয়ালাটাই। তবে হাতে বই নেই। তার বদলে খেলনা বিক্রি করছে! আর তার সামনে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু মুখটা স্পষ্ট হচ্ছে না! ছেলেটাকে খুব চেনা লাগছে রাধিয়ার। ওর মনে হল গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যায়। লোকটা খেলনা বিক্রি করছে যখন, সেখানেও নিশ্চয় অমন কিছুটা একটা স্পিচ দেবে! মনে পড়তেই হাসি পেয়ে গেল রাধিয়ার। কত অদ্ভুত মানুষ যে আছে! রাধিয়ার এমন মানুষজন দেখতে খুব মজা লাগে। ও সমাজের যে-স্তরে থাকে সেখানে সব কিছু বড়ই সাজানো-গোছানো। মাটির অনেকটা ওপরে। ফলে নানা ধরনের লোকের সঙ্গে সেখানে দেখা হওয়ার সুযোগ হয় না। সেখানে সব কিছুই কেমন যেন স্কেল দিয়ে মাপা। কাগজ দিয়ে মলাট দেওয়া। রাধিয়া ভাবতেই পারে না, ওর বাবা রাস্তায় বসা লোকের কাছ থেকে কুলের আচার কিনবে ওর জন্য। ভাবতেই পারে না ট্রামে করে ওকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। স্টেশনে ফটাস জল খাবে। এসব গল্প যখন বন্ধুদের থেকে শোনে, রাধিয়ার লোভ হয় খুব। মনে হয়, এমনটা কেন ওর সঙ্গে হল না!
ঠাকুরমা বলে, ভাবতে নেই। কী হল না, ভাবতে নেই। কী হল সেটা দেখলে জীবন অনেক ভাল হয়ে যায়। এই যে ওদের টাকার অভাব নেই, নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা নেই, এই যে ও যা চায় কিনতে পারে, খেতে পারে, বিদেশে হলিডে কাটাতে যেতে পারে, সেসব ক’টা লোকের কপালে জোটে! যে-লোকটা লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে ওঠার আগে সারা দিনের ক্লান্তি আর তেষ্টা কমাতে ওই স্টেশনের ফটাস জল খায়, সে তো মনে মনে রাধিয়ার মতো এমন একটা জীবনই চায়। ঠাকুরমা বলে, “আমার বাবা বলতেন নিরাপত্তা খুব দরকারি। তুই সেটা পেয়েছিস রাধি।”
রাধিয়ার জানতে ইচ্ছে করে, ঠাকুরমাও তো নিরাপত্তা পেয়েছে, তা হলে ঠাকুরমা এমন গম্ভীর আর চুপচাপ কেন? কেন ঠাকুরমাকে দেখলে মনে হয় এখানে থেকেও মানুষটা এখানে নেই! সব আছে কিন্তু আসলে যেন কিছুই নেই! নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ঠাকুরমার বাবা বলেছিলেন, কিন্তু রাধিয়ার জানতে ইচ্ছে করে ঠাকুরমার নিজের এই নিয়ে কী মত!
রাধিয়া ভাবল, একবার মধুদাকে বলে যে, ও গাড়ি থেকে নামতে চায়। কিন্তু তার আগেই একটা বাস এসে গাড়িটার বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মধুদাও ঠিক তখনই সামনের সিগন্যালটা খোলা পেয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।
রাধিয়া একবার পেছনের দিকে তাকাল। না, দেখা যাচ্ছে না কিছু! নিজের মনে মাথা নেড়ে হাতঘড়িটা দেখল রাধিয়া। প্রায় আটটা বাজে। ডিনারের নেমন্তন্ন আজ। কারও নেমন্তন্নে খালি হাতে যায় না রাধিয়া। পলির জন্য একটা পার্স কিনেছে।
মনের মধ্যে সামান্য হলেও একটা কাঁটা ফুটে আছে ওর। বুদা আসবে। সেই যে বুদা ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল, তারপর থেকে আর ওদের কথা হয়নি। ইউনিভার্সিটিতে বুদা আসছে না মাসখানেক। জয়তীর কাছে ও শুনেছে, বুদা নাকি কোথাও একটা গেছে। কেউ ঠিক বলতে পারছে না বুদার কী হল। তবে সেই জন্য কেউ বুদার বাড়িতে যায়নি খবর নিতে। কেউ যদি যোগাযোগ না রাখতে চায়, তা হলে কেন কেউ তাকে বিরক্ত করবে!
কিন্তু বুদা যোগাযোগ করেছে। গতকাল পলি ফোন করেছিল রাধিয়াকে আজ রেস্তরাঁয় আসতে বলার জন্য। তখনই বলেছে যে, বুদা ফোন করে পলির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।
রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, “কেমন আছে বুদা? কী খবর ওর?”
পলি বলেছিল, “কী জানি কী খবর! তবে বলল আমাদের সবার সঙ্গে ওর দরকার আছে কী একটা, তাই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি আর কথা বাড়াইনি বুঝলি। আজকে নেমন্তন্ন করে ডেকেছি। বলেছি সবাই আসবে, তুইও আয়।”
“আসবে?” রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল।
“বলল তো আসবে,” পলি বলেছিল, “দেখ, আমাদের তো ওকে নিয়ে কোনও প্রবলেম হয়নি। ও নিজেই আচমকা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই আমি আসতে বলব না কেন! ঠিক না?”
“ঠিকই তো,” সামান্য হেসেছিল রাধিয়া। তবে বাইরে হাসলেও মনের মধ্যে সামান্য একটা কাঁটা ফুটেছিল ওর। বুদা এসে আবার কী বলবে কে জানে!
পলি ফোন রাখার আগে বলেছিল, “আটটার মধ্যে চলে আসবি পজ়িটিভলি! যদি দেরি করেছ না…”
এই রাস্তাটার নাম পণ্ডিতিয়া রোড এক্সটেনশন। রাস্তাটা বেশ সরু। তার মধ্যে একদিকে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের বড় গাড়িটা নিয়ে মধুদা বেশ নাকাল হচ্ছে!
সামনেই একটা নতুন তৈরি হওয়া বাড়ি। তার আগেই বাঁ হাতে একটা রাস্তা ঢুকে গিয়েছে! মধুদা গাড়িটাকে সামনে ফুটপাথের পাশ ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে বলল, “গাড়িটা ওই রাস্তায় ঢুকবে না। তাই…”
রাধিয়া বলল, “ঠিক আছে মধুদা। তুমি এখানেই দাঁড়াও। আর এটা রাখো। বিকেলে কিছু যে খাওনি সেটা আমি জানি।”
একটা একশো টাকার নোট মধুদার দিকে বাড়িয়ে দিল রাধিয়া। মধুদা দ্বিধার সঙ্গে টাকাটা নিল। আজ মধুদার কী হয়েছে কে জানে! কেমন একটা মনমরা ভাব। অন্যদিন কত কথা বলে! আজ কেমন যেন নুয়ে আছে!
গাড়ি থেকে বেরিয়ে জানলায় ঝুঁকে দাঁড়াল রাধিয়া, “তোমার কী হয়েছে মধুদা? শরীর খারাপ?”
“না, না” মধুদা জোর করে মাথা নাড়ল।
“বাড়িতে সব ঠিক আছে? শিখামাসি ঠিক আছে?”
“সবাই ঠিক আছে,” মধুদা আবার জোর করে হাসল।
রাধিয়া আর কথা বাড়াল না। বুঝতে পারছে মধুদা বলতে চাইছে না। মানুষের ব্যক্তিগত কথা থাকতেই পারে। ও গলিতে ঢুকে গেল।
খুব গরম আর এখন নেই। রাতের দিকটায় সামান্য চিনচিনে ঠান্ডা পড়ে। মুখে পিপারমিন্ট লজেন্স রাখার মতো একটা ঠান্ডা। এইদিকের রাস্তায় বড়-বড় হলুদ সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প লাগানো রয়েছে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় আলোর গায়ে লাগানো কাচের ঢাকনায় অসংখ্য মৃত পোকা জমে কালো হয়ে আছে! ফলে আলোর মধ্যেও কেমন যেন একটা বাদামি আভা! রাস্তাগুলোয় কেমন একটা ছমছমে রং!
অনেক ফুল পড়ে আছে পথে। চারপাশে বেশ গাছ। লোকজনও কম। দক্ষিণ কলকাতাটা বেশ সুন্দর। বিশেষ করে লেকের আশপাশটা। একা-একা হাঁটতে ইচ্ছে করে রাধিয়ার।
রেস্তরাঁটা গলির ওই মাথায়। ডান হাতে। রাস্তা থেকে এক ধাপ উঠে। রাধিয়া দেখল, সামনে দিয়ে একটা ড্রেন গেছে। তার ওপর চেকার্ড প্লেট পাতা। সেখানে পা দিয়ে উঠে গেল রাধিয়া। রেস্তরাঁটার সামনে সরু বাঁশের কাজ করা একটা ডিজ়াইন রয়েছে। পাশেই কাচের পাল্লাওয়ালা দরজা। একজন গেটকিপার দাঁড়িয়েছিল। রাধিয়াকে দেখে সে মাথা ঝুঁকিয়ে “গুড ইভনিং!” বলে পাল্লাটা খুলে ধরল।
রাধিয়া ভেতরে ঢুকে একটু থমকে গেল! রেস্তরাঁটা ছোট। দেখেই বোঝা যায় পুরনো বাড়ির নীচের তলাটা নিয়ে সেটাকে ঠিকঠাক করে এটা করা হয়েছে।
গোটা রেস্তরাঁটা লাল আর কালো রং দিয়ে সাজানো। অল্প আলোয় সবটাই বেশ মায়াময় লাগছে। আজ সপ্তাহের মাঝখান বলেই কি না কে জানে, এখানে ভিড় নেই একদম।
একজন ওয়েটার এগিয়ে এল এবার। ছেলেটা ইয়ং। রোগা। মুখে হাসি লেগে রয়েছে। রাধিয়া ছোট করে বলল ও কেন এসেছে। ছেলেটা রাধিয়াকে সামনের দিকে আসতে বলল।
এদিকটায় দুটো ভাগে চেয়ার-টেবিল সাজানো আছে। ছেলেটা রাধিয়াকে নিয়ে এই জায়গাটা পেরিয়ে ডান দিকে ঘুরল। আর তখনই দেখল সবাইকে। রাধিয়া নিমেষের জন্য থমকে গেল।
এদিকে একটা বড় জায়গা। সেখানে তিনটে টেবিলকে জোড়া দিয়ে রাখা আছে। আর সেগুলো গোল করে ঘিরে বসে রয়েছে সবাই। কিন্তু সবার মধ্যে রাধিয়ার চোখ পড়ল নিশানের দিকে। ওকেও বলেছে পলি! এটা জানত না তো! কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে ওর মন পালটা প্রশ্ন করল, জানলে কী করত? আসত না? নাকি আসত? ওর মনে পড়ে গেল নিশানের সঙ্গে সেদিন ওই নার্সিং হোমে কী হয়েছিল! মনে মনে সংকুচিত হয়ে গেল হঠাৎ। আর নিজেরই রাগ হল নিজের এই দুর্বলতার জন্য!
কেয়াআন্টিকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল সেদিন। ফলসা এসেছিল বেঙ্গালুরু থেকে। রাধিয়া জানত যে, নিশান যাবে। ও তাই যেতে চেয়েছিল। যত দিন যাচ্ছে, নিশানের কাছাকাছি থাকতে, ওর কথা শুনতে ইচ্ছে করছে রাধিয়ার। এটা কতটা সিরিয়াস ও জানে না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, এমন ইচ্ছেটা বেড়েই চলেছে। নিশানই এমন একজন যাকে, কেন ও জানে না, ওর মনের সবচেয়ে অস্বস্তিজনক কথাটা জানাতে পেরেছে! নিশান বলেছিল, বাবার ব্যাপারটার খবর নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা আশা করে না রাধিয়া। ওর নিশানকে ভাল লাগে মানেই নিশানেরও যে ভাল লাগবে, তা তো নয়। ভাললাগা ব্যাপারটার মজা বা সাজা হল এই যে, কখনওই তা দু’জনের মধ্যে একই বেগে কাজ করে না! ফলে নিশান যে ওকে ওই কথাটা বলেছিল, সেটা ও ধরেনি। সেদিন খুব মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আর ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল রাধিয়া, তাই হয়তো বলে ফেলেছিল ওই কথাটা। আর ওর মনে হয় নিশানও ওকে সান্ত্বনা দিতেই ওরকম একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু পরে, মাথা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরে নিজের কাজের জন্য ওর কেমন একটা লেগেছে! নিশানকে বলতে পারার মধ্যে যেমন একটা আপনজনের ভাব আছে, তেমন এই ঘটনাটার মধ্যে ওর নিজের চারিত্রিক ইমব্যালেন্স আর দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে!
তাও নিশান আসবে শুনে ওর মনে হয়েছিল একবার যায়। নিশানের সঙ্গে একবার দেখা করে!
তেমন ভেবে রেডি হয়ে নিয়েছিল। মধুদাকে বলেছিল গাড়ি বের করতে। কিন্তু তারপর বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়েও মনে পড়েছিল, আরে, মোবাইলটা তো ফেলে এসেছে বসার ঘরে।
আর এটাতেই বিপদটা হয়েছিল। মোবাইলটা নিতে গিয়ে দেখেছিল বাবা ওর মোবাইল খুলে দেখছে!
“কী রে! তুই দাঁড়িয়ে পড়লি যে, আয়!” পলি ওকে হাত তুলে ডাকল।
রাধিয়া অপ্রস্তুতের মতো হেসে এগিয়ে গেল। বাকিদেরও দেখল এবার। পলির পাশে একটা ছেলে বসে রয়েছে। বসে থাকলেও বোঝা যাচ্ছে ছেলেটার চেহারা ভাল। ছেলেটাকে চেনা মনে হল ওর। আর বুদাও এসেছে। এ কী! বুদার এ কী হয়েছে! আর বুদার পাশে এটা কে!
সুম্পা বসেছিল নিশানের পাশে। রাধিয়াকে দেখে উঠে গিয়ে জয়তীর পাশে বসল।
বলল, “নে, তোর জায়গা ছেড়ে দিলাম। বোস।”
রাধিয়া দেখল সবাই হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে যেন! রাধিয়া কী করবে বুঝতে না পেরে বসল নিশানের পাশেই। এই নিয়ে কথা বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না।
ও দেখল আজও নিশান সেই কুসুম রঙের পাঞ্জাবি পরে এসেছে। পাশে বসতেই খুব সুন্দর একটা গন্ধ পেল ও। কিন্তু নিশানের দিকে তাকাতে পারছে না! সেদিন গাড়ির মধ্যের ঘটনাটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে!
পলি বলল, “তোকে আলাপ করিয়ে দিই। ও হল মাহির। আমাদের ওল্ড এজ হোমের যে-ফান্ড আমরা পেয়েছি সেটা ওর জন্য। রিতুদা নামে একজন পলিটিক্যাল লিডার আছে। এমপি। মাহির সেই রিতুদাকে বলে এটা করিয়ে দিয়েছে। আর মাহির, ও হল রাধিয়া। তোমায় তো ওর কথা বলেইছি!”
রাধিয়া হেসে মাথা নাড়াল। মাহিরকে দেখল এবার ভাল করে। ছেলেটাকে চেনা লাগছে ওর। বোঝা যাচ্ছে যে, ছেলেটার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। এখানে এসে খুব একটা শান্তিতে নেই। কিন্তু হাসিটা সুন্দর। বাচ্চাদের মতো! একটা ডিসআর্মিং ব্যাপার আছে!
“আর, বুদার ব্যাপারটা শুনেছিস তো?” জয়তী এবার মাঝখান থেকে কথা বলল।
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। বুদা ঠিকমতো তাকাচ্ছে না ওর দিকে। ওর মাথায় সিঁদুর দেখে বেশ ঘাবড়েই গেছে রাধিয়া! বিয়েটা করল কখন ও? আর ওদের একবারও জানাল না? এটা কেমন ব্যাপার!
বুদা তাকাল সকলের দিকে। তারপর বলল, “তোরা এমন করে আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন? আমি বললাম তো, এভাবে বিয়ে করতে আমি বাধ্য হয়েছি!”
জয়তী বলল, “ঠিক আছে। আমরা কি কিছু বলেছি? বলিনি।”
বুদা আবার বলল, “তোরাও তো খবর নিসনি আমার! নিয়েছিস? কী রে রাধি, নিয়েছিস?”
“আরে! তুই রাধিকে বলছিস কেন?” জয়তী বিরক্ত হল এবার, “ওর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিলি ভুলে গিয়েছিস? আর আমরা সবাই তোকে ফোন করেছি। মেসেজ করেছি! একটারও কিন্তু রিপ্লাই দিসনি। তোর কী হয়েছে? এমন বিটার হয়ে আছিস কেন?”
এবার ওর পাশে বসা ছেলেটা কথা বলল, “আসলে বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে টেনশন ছিল খুব। এখনও আছে। তাই হয়তো বুদা একটু অ্যাজিটেটেড হয়ে আছে!”
“কেন, কীসের টেনশন! বুদা যে প্রেম করত, আমরা তাই তো জানি না!” পলি অবাক হয়ে তাকাল।
“প্লিজ়,” নিশান আচমকা কথা বলে উঠল মাঝে, “আমি ঠিক তোমাদের গ্রুপের তো নই। সুম্পার দাদার বন্ধু। প্লাস ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ছিলাম। তাই আমার সামনে তোমরা এসব না বললেই বোধহয় ভাল। বুদা মে ফিল ডিসকমফর্ট!”
“না, না” বুদা উত্তেজিত হয়ে উঠল সামান্য, “আমি কিছু অন্যায় করিনি যে, ওরকম ফিল করব। আমি বলছি সায়ন।”
সায়ন! ছেলেটার নাম তা হলে সায়ন! রাধিয়া বুঝতে পারছে না ওর সামনে কী হচ্ছে! বুদা কাউকে না বলে বিয়ে করেছে। সেটা বুদার ডিসিশন। সেটা নিয়ে এমন করছে কেন ও!
সায়ন বলল, “প্লিজ় বুদা, আজ আমরা এসেছি সেলিব্রেট করতে! ডোন্ট স্পয়েল ইট!”
“তুই চুপ কর,” সায়নকে ধমকে বুদা এবার তাকাল ওদের দিকে, “কেন তোদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি জানিস? কারণ… কারণ, আমি সায়নকে যে বিয়ে করেছি, ও আমার দূর সম্পর্কের হলেও মাসতুতো দাদা! বুঝেছিস? আমার বাবা-মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমরা এখন নাকতলার কাছে একটা বাড়িতে আছি। একটা রুম। ইউনিভার্সিটিতে আর যাব না। সায়ন বেহালা বাজায়। ক্লাবে। তাও রোজ কাজ পায় না। আমি টিউশনি করি! আমাদের বাড়ির কেউ আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। বুঝলি এবার কেন যোগাযোগ রাখিনি কারও সঙ্গে? বুঝলি?”
কথা শেষ করে আচমকা বুদা টেবিলে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে! রাধিয়া ঘাবড়ে গেল। আর শুধু রাধিয়াই নয়, সবাই থতমত খেয়ে গেল। সায়ন বুদার পিঠে হাত রাখল আলতো করে। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “সরি।”
“কী হয়েছে?” পেছন দিক থেকে একটা প্রশ্ন এল এবার।
রাধিয়া তাকিয়ে দেখল স্মরণ। আর ঠিক তখনই চিনতে পারল। আরে, সেই ফুটপাথে এই ছেলেটাই তো দাঁড়িয়ে ছিল ওই খেলনাওয়ালার সঙ্গে! এই তো সেই শার্ট! তাই দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা চেনা লাগছিল।
রাধিয়া দেখল, স্মরণ অবাক মুখ করে বুদাকে দেখছে।
“কিছু না,” জয়তী বুদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “পাগলি একটা! চুপ কর। মাথা তোল। এত ওয়ার্কড আপ হয়ে থাকিস কেন? আমরা তোর বন্ধু না? আমরা কেন তোকে জাজ করতে যাব? এসব করিস না। পাগলি নাকি তুই! মুখ তোল।”
জয়তীর কথায় বুদা মুখ তুলল। পলি নিজের ব্যাগ থেকে একটা টিসু বের করে গিয়ে দিল বুদার দিকে। বুদা সেটা নিয়ে চোখ মুছল। তারপর সামান্য সময় নিল। সামনে রাখা গেলাসটা থেকে জল খেল একটু। তারপর ভেজা গলায় বলল, “সবাই আমাদের বয়কট করেছে! আমি ভাবলাম তোরাও… সরি রাধি। আমি তোর সঙ্গে খুব খারাপ বিহেভ করেছি। আই ওয়াজ সো টেন্সড!”
স্মরণ এসে বসল রাধিয়ার পাশে। তারপর কাঁধের ঝোলা থেকে প্রায় আট-দশটা নানা রকমের খেলনা বের করে রাখল সামনে। সবই খুব সাধারণ, সস্তা খেলনা। ভেঁপু, গাড়ি, খেলনা মোবাইল ধরনের। সবাই অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।
স্মরণ সামনে চলা কান্নাকাটি পাত্তা না দিয়ে বলল, “একটা লোক খেলনা বিক্রি করছিল। যা স্পিচ দিল না, শাহরুখ খান ফেল! তাই কিনে নিলাম। যে যেটা খুশি নিয়ে নাও। শুধু এটা আমি নেব!” বলে একটা ছোট পুতুল তুলে নিল। বলল, “আমি এটা প্যাঁওকে দেব।”
পলি ছড়ানো খেলনা থেকে প্লাস্টিকের মোবাইলটা তুলে নিয়ে বলল, “এই যে স্মরণ, এখানে নিশানও আছে কিন্তু। তোমাদের এগেনস্টে প্রোটেস্ট করছে ও। কিন্তু সেই নিয়ে এখানে কোনও কথা হবে না। বুঝেছ?”
স্মরণ হাত তুলে বলল, “আমি কেন বলতে যাব। যে যার কাজ করছে। শুধু এটাই বলব যে, নিশানভাই, আমরা কিন্তু মিলটা চালাতে চাই। জোনাক-বাড়ি ভাঙতে চাই না। কিন্তু সেই নিয়ে আমি কিছু বলবই না!”
নিশান হাসল, “সবাই ওই বলেই ঢোকে তারপর আসল রং দেখায়।”
“কিন্তু আমরা তা নই। আমাদের আসল নকল, সবটাই একটা রং। কিন্তু আমি তো এই নিয়ে কিছু বলবই না!” স্মরণ এমন করে বলল কথাটা যে, হেসে ফেলল সবাই।
রাধিয়া দেখল, স্মরণ কথা বলার সময় সামান্য হাসল মাহিরের দিকে তাকিয়ে। আর মাহিরও ফিরিয়ে দিল সেই হাসি। কী হল! রাধিয়া কি ভুল দেখল? দু’জন দু’জনকে চেনে কি? তা হলে কেন এখানে সেটা লুকিয়ে গেল!
টেবিল ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলো এবার ধীরে-ধীরে সহজ হয়ে এল। পলিই দায়িত্ব নিয়ে খাবারের আর ড্রিঙ্কের অর্ডার করে দিল। আস্তে-আস্তে সবাই ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কথাও শুরু করে দিল।
রাধিয়া চোয়াল শক্ত করল। পাশে বসে থাকলেও নিশান এখনও কথা বলেনি ওর সঙ্গে। রাধিয়ার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু যা হয়েছে, সেটা তো ওর জন্যই হয়েছে!
রাধিয়া সবার কান আর দৃষ্টি বাঁচিয়ে নিচু গলায় বলল, “আমি সরি!”
নিশান হাসল সামান্য, “কেন?”
রাধিয়া বলল, “ইউ নো ইট। তাই জন্য তো তুমি আর আমায় মেসেজ বা ফোন কিছুই করো না!”
নিশান হাসল, “সেই জন্য নয়।”
রাধিয়া সামান্য অভিমানী গলায় বলল, “তবে কী জন্য?”
নিশান হাসল শুধু, কিছু বলল না।
রাধিয়া আবার বলল, “সেদিন বাবা আমার মোবাইলে তোমার কিছু মেসেজ দেখে আমায় চেপে ধরেছিল। আমি তো মোবাইলে কোনও সিকিয়রিটি রাখি না! বাবা এমন করে বলেছিল যে, আমি বাধ্য হয়ে বলেছিলাম তোমার কথা। বাবা সব শুনেছিল মন দিয়ে। তারপর বলল, তোমায় চেনে। যখন আমার বন্ধু হও, তা হলে যেন মিট করাই। আমি তখন বললাম যে, আজই তো দেখা হবে। তখন বাবা ইনসিস্ট করল, আমি যেন তখনই তোমার সঙ্গে দেখা করাই। খুব নাকি দরকার তোমার সঙ্গে! আমার বাবা খুব পারসুয়েসিভ। আমি খুব ভয় পাই বাবাকে। তাই আমি না করতে পারিনি। আই ওয়াজ় সো টেন্সড। ফলসার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারলাম না! কেয়াআন্টির নার্সিং হোমের সামনে দিয়ে ঘুরে গেলাম। আয়াম সো কাওয়ার্ড! কিন্তু বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারিনি বাবা এমনটা করবে। তোমায় যে এভাবে অপমান করবে, আই সোয়্যার, আমি বুঝতে পারিনি। পারলে আমি এমন করতাম না। নিয়ে যেতাম না বাবাকে!”
“কী রে, তোরা এমন নিচু গলায় কী কথা বলছিস?” সুম্পা টেবিলের অন্যদিক থেকে খিকখিক করে হাসল।
রাধিয়া লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেল।
নিশান বলল, “প্রাইভেট কথা। তোমাদের শুনতে হবে না!”
“তবে তো আমি শুনবই। আমিও শিখে নিয়ে প্যাঁওকে বলব! প্যাঁও খালি বলে আমি নাকি কোনও প্রাইভেট কথাই বলতে পারি না। সব কিছু নাকি পাবলিক হয়ে যায়! বাই দ্য ওয়ে পলি, প্যাঁওয়ের জন্য একটা খাবার প্যাক করে দেবে। ও চাইনিজ় খুব ভালবাসে। দেবে?”
পলি ভুরু কুঁচকে বলল, “ইস, কী করে বলছে দ্যাখো! আচ্ছা, সত্যি প্যাঁও বলে কেউ আছে?”
“কী বলে!” স্মরণ এমন করে বলল যেন আগ্রায় তাজমহল আছে কি না সেই নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ও বলল, “প্যাঁও দারুণ মেয়ে! ছোট্ট মুকুট কপাল। মুক্তোর মতো দাঁত। হাত-পা যা সুন্দর না! থুতনিতে সামান্য একটা টোল আছে। নাকে দু’পাশে দুটো ছোট্ট-ছোট্ট তিল। আর রঙ্গন ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট! যা দেখতে না! তবে হ্যাঁ। খুব রাগী। সারাক্ষণ রেগে থাকে আমার ওপর। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কী ঝাড় দেয় আমায়! বলে, ‘স্মরণ সরকার, বেশি বাড় বাড়বি না!’ আমিও তাই বাড়ি না বেশি। দেখছিস না আমার হাইটটাও কেমন কম করে রেখেছি! প্যাঁও-এর কথা আমি অমান্য করি না কখনও। ও যখন বলে, ‘দূরে থাক, দূরে থাক।’ আমি দূরে থাকি। যা বলে তাই করি। বুঝলি। আই লাভ হার এনাফ টু লেট হার গো। বুঝেছ!”
রাধিয়া দেখল ওর সঙ্গে টেবিলের সবাই চুপ করে গেছে। ওর হাসি পেল খুব।
“খালি হাবিজাবি…” নিস্তব্ধতা ভেঙে পলিই প্রথম কথা বলল। কিন্তু শেষ করতে পারল না বাক্যটা।
“রাধি!” বলে একটা চেনা গলার চিৎকার চাবুকের মতো সপাং করে আছড়ে পড়ল সবার মাঝে!
রাধিয়ার হাতে একটা ফ্রেশ লাইমের গেলাস ছিল। ও এত ঘাবড়ে গেল যে, হাত থেকে কিছুটা পানীয় চলকে ওর জামায় পড়ে গেল। ও দ্রুত ঘুরল। আর সঙ্গে-সঙ্গে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর! বাবা! এখানে বাবা কী করছে!
বাবা হনহন করে এসে রাধিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কী করছ এখানে তুমি? হাউ ক্যান ইউ মিঙ্গল উইথ পিপ্ল লাইক দিজ়! কাম, কাম উইথ মি!”
“বাবা,” রাধিয়া উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল।
“শাট আপ!” বাবা ফেটে পড়ল যেন, “চলো! আর কোনওদিন যদি এই প্যারাসাইটটার সঙ্গে আমি তোমায় দেখেছি তবে দেখো কী করি!”
বাবা যে নিশানকে বলছে, সেটা বুঝতে কারও বাকি রইল না।
নিশান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কী বললেন?”
“ইউ স্লাইমি ফাক, কে বলেছে তোমায় কথা বলতে!” বাবা ঘুরে দাঁড়াল নিশানের দিকে, “আমি ভাল করে গাড়িতে ডেকে কথা বলেছিলাম, ভাল লাগেনি, না? আজও তুই মিছিল করেছিস? তোর হুলিগানরা ফ্যাক্টরি গেটে ইট ছুড়েছে! আমি দেখাচ্ছি মজা! তারপর আবার আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিস! ইউ আর ব্লাডি ফিনিশড!”
নিশান বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলুন।”
রাধিয়ার হাত-পা কাঁপছে। ওর মনে হচ্ছে, যে-কোন সময়ে ও পড়ে যাবে মাটিতে। রেস্তরাঁর লোকজন এগিয়ে এসেছে।
ম্যানেজার গোছের লোকটি বলল, “স্যার, প্লিজ় ডোন্ট ক্রিয়েট আ সিন।”
“শাট দ্য ফাক আপ ইউ বাস্টার্ড!” বাবা এবার লোকটির দিকে ঘুরল, “তোদের এই রেস্তরাঁ আমি এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কিনব। রাধিয়া চলো। চলো!”
বাবা আর না দাঁড়িয়ে রাধিয়াকে টানতে-টানতে এগোতে লাগল। রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। নিশান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে এখনও।
বাবা বলল, “ভাগ্যিস, মধু আমায় খবর দিল যে, জানোয়ারটা এখানে আছে! আই টোল্ড হিম টু কিপ অ্যান আই অন ইউ।”
রাধিয়া টলতে-টলতে বাবার সঙ্গে এগোতে লাগল। ওর চোখের সামনে সব কিছু কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে! মধুদা বাবাকে খবর দিয়েছে! মধুদা এমন করল! তাই আজ মধুদা… কিছু আর ভাবতে পারছে না রাধিয়া।
ও দেখল নিশানও এগিয়ে আসছে।
বাবা শেষবারের মতো পিছনে ঘুরল। বলল, “তোকে দেখ জানোয়ার কী করি আমি! দেখ! জাস্ট ফাকিং ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!”
নিশানও গলা তুলল এবার। তারপর রাধিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই জন্য। এই জন্য আমি ফোন করিনি তোমায়! আমি জানতাম তোমার বাবা কী ধরনের মানুষ! বুঝলে!”
রাস্তায় হলুদ আলোর মধ্যে আরও বেশি করে বাদামি ছোপ পড়েছে যেন। সব কিছু কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে চারদিকে। চাপ-চাপ অন্ধকার ক্রমে মুড়ে নিচ্ছে চারিদিক। মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলোর গায়ে যেন জমে উঠছে বীভৎস পোকা! পচা গলা টিকটিকি আর ইঁদুর যেন ছড়িয়ে আছে চারিদিকে! সামনের বাড়িগুলোর গায়ে অজস্র ফাটল। রাক্ষসের মুখের মতো হাঁ করে সব দাঁড়িয়ে রয়েছে সার-সার! জলের ওপর থেকে ভেসে আসা হাওয়ায় যেন সোরা আর গন্ধকের ঘ্রাণ। রাস্তার পিচ যেন হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরছে ওর পা। এ আর কোনও সুন্দর শহর নয়। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা!
রাধিয়া টলমলে পায়ে গাড়ির দিকে এগোল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, গাড়িটা নেই ওর সামনে। বরং বিশাল বড় একটা ড্রাগন যেন ওকে গিলে নেবে বলে মুখ খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে! সে তার অস্থির ডানা ঝাপটাচ্ছে! লেজের আছড়ানিতে ফাটিয়ে দিচ্ছে মাটি! চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরোচ্ছে তার! রাধিয়া বুঝল ছোটবেলার কিছু জিনিস অন্যভাবে হলেও ঠিক বেঁচে থাকে বড়দের এই পৃথিবীতে!
Chapter - 30 - 34
৩০. মাহির
ও যতবার ভালবাসতে যায়, জীবন ওকে হারিয়ে দেয়। আচ্ছা ও কি মানুষ না জ়িম্বাবোয়ে ক্রিকেট টিম! কিছুতেই কিছু করতে পারে না! সারাক্ষণ ‘হেরো’ লেখা একটা অদৃশ্য জামা যেন পরে থাকে ও। হাজার চেষ্টাতেও সেটা খুলতে পারে না।
আবছা অন্ধকার হয়ে আছে ঘরটা। সন্ধে হয়েছে কিছু আগে। তার ওপর ঘরের আলোও নেভানো। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না মাহির। এই ঘরে ও আসে মাঝে মাঝে, কিন্তু তাই বলে অন্ধকারে সব ঠিকমতো বুঝে নেবে তেমন পরিচিতও নয়।
বিছানায় উঠে বসে পায়ের কাছে হাতড়ে প্যান্টটা খুঁজল মাহির। কোথায় যে ফেলেছে বুঝতে পারছে না। বিছানাতেই তো রেখেছিল, কিন্তু এখন পাচ্ছে না কেন! মহা মুশকিল তো।
মাহির ভাল করে হাতড়ে দেখতে চাইল।
“কী হল? কী করছিস?” অন্ধকারের মধ্যে তুয়াদির গলা পেল মাহির।
“আমায় যেতে হবে তুয়াদি। আজ রিতুদা ফিরেছে দিল্লি থেকে। সেই দুপুরে ফিরেছে। আমার দেখা করতে যাওয়ার কথা। খুব আর্জেন্ট কাজ আছে! একজন আসবে। তাই…” মাহির এবার বিছানার পাশে রাখা টেবিলের দিকে ফিরল। সেই রাবার ব্যান্ড বাঁধা মোবাইলটা রাখা আছে। পরান সারিয়ে দিয়েছে আবার। তবে কতদিন চলবে কে জানে। মাহির ভাবল, মোবাইলটার স্ক্রিনের সামান্য সাদা আলোয় যদি খুঁজে পাওয়া যায়।
“তাই কী?” আবছায়ার মধ্যে তুয়াদি মাহিরের হাতটা ধরল, “আমার আবার ইচ্ছে করছে।”
“তুয়াদি, মাইরি এমন কোরো না, এটা খুব অন্যায় কিন্তু! এভাবে জোর করে…” মাহির অনেক কষ্টে রাগটা আটকাল।
“জোর করে কী?” তুয়াদি যেন আরও সরে এল গা ঘেঁষে!
তুয়াদির গায়ে যে কিছু নেই সেটা বুঝতে পারল মাহির।
তুয়াদি হেসে বলল, “ঢ্যামনামো দেখলে গা জ্বলে যায়! সতীপনা! আমি তোকে রেপ করি নাকি?”
ও হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলে রাখা মোবাইলটা দু’বারের চেষ্টায় তুলল। মাথার কাছটা টিপে আলো জ্বালাল। হাত ঘুরিয়ে দেখল বিছানাটা। দেখল, এক কোণে ছোট প্যান্টটা গুটিয়ে পড়ে আছে। এবার মেঝেতে দেখল। হ্যাঁ, জিন্সটা পড়ে আছে মাটিতে। ও হাত বাড়িয়ে ছোট প্যান্টটা নিল। তারপর মোবাইলটা বিছানায় রেখে পরে নিল প্যান্টটা।
“প্লিজ় তুয়াদি!” মাহির খাটের স্ট্যান্ডে ঝোলানো নিজের টি-শার্টটা পেড়ে মাথায় গলিয়ে নিয়ে বলল, “তোমার মনে যে এসব আছে, আমি আগে বুঝতে পারিনি। আমার ভাই তোমায় ভালবাসে। মা তোমার কাছে ওকে রেখে যায়। এর পরিবর্তে তুমি আমায় এসব করাও। এটা তো ব্ল্যাকমেল!”
“বেশ করব!” তুয়াদি আচমকা ফুঁসে উঠল, “আমি কি বাড়তি নাকি? আমার জীবন নেই! ইচ্ছে নেই! দাদারা একঘরে করে রাখবে! তোর ভাইকে দেখতে হবে। কেন রে? আমি দাসখত লিখে দিয়ে এসেছি নাকি? আমি যখন তোদের জন্য করব, তোকেও আমার জন্য করতে হবে। আমার বিয়ে হবে না বলে আমি কি সুখ পাব না? ঢ্যামনামো করবি না। যখন ডাকব আসবি। না হলে আবার এমন করব!”
ডিসেম্বরের দশ তারিখ এখন। ঠান্ডা পড়েছে সামান্য। মাহির মাথা নাড়ল নিজের মনে। তারপর টেবিলে রাখা জগের জল খেল। বলল, “এমন কোরো না তুয়াদি। আমরা বিপদে পড়েছি বলে তার সু্যোগ নেবে?”
“তোরা আমার সুযোগ নিচ্ছিস না?” তুয়াদি চাদরটা জড়িয়ে নিল শরীরে, “আমায় একা মেয়েমানুষ পেয়ে তোরা আমায় খাটিয়ে নিচ্ছিস না? আর, আমি তোর সঙ্গে কী খারাপ করেছি? আমার শরীরটা খারাপ? তোর যেমন ভাল লাগে সেভাবে আদর করি না? তা হলে?”
আদর করে তুয়াদি! একবার মাহিরকে পেলে ছিঁড়ে খাবার মতো করে! কিন্তু মাহির কি আর এখানে থাকে তখন! আবছা ঘরে চোখ বন্ধ করে ও পলির কথা ভাবে। পলির চোখ। ওর টিকোলো নাক। ওই মাখনের মতো ঘাড়ে ভেঙে পড়া চুলের গুচ্ছ। ভাবে, কাঁধের ওপর কেটে বসা ব্রেসিয়ারের কালো স্ট্র্যাপ। তুয়াদি যাই করুক না কেন, পলির কথা না মনে করলে মাহিরের কিছুই হয় না!
কিন্তু সেটা তো আর তুয়াদি জানে না। মাহির বোঝে যৌনতা হল সবচেয়ে বড় মিথ্যের জায়গা! কেউ যখন কারও সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়, দু’জনের কেউই জানে না সত্যি সে কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে!
কিন্তু মাহির নিরুপায়। তুয়াদি ওকে এমন করে ফাঁসিয়ে রেখেছে!
গত চারদিন তুয়াদি যায়নি ওদের বাড়িতে। ভাইকে একা রেখে মা তো আর যেতে পারে না কাজে। তাই মাহিরকেই থাকতে হয়েছিল বাড়িতে। পার্টি অফিসে আর যেতে পারেনি। ব্যাপারটা ভালভাবে নেয়নি রিতুদা। দিল্লিতে থাকলেও এখানকার সব খবর নেয় মানুষটা। কিছুই নজর এড়ায় না।
আজ রিতুদা দুপুরে ফিরবে দিল্লি থেকে। মাহির জানত। তাই মাকে দুপুরে ফোন করেছিল, “মা, আমি তো অনেকটা সময় থাকলাম। এবার তুমি যদি আজ একটু ছুটি করে চলে আসতে পারো, আমি অফিসে যেতে পারি!”
প্রথমে রিতুদার ব্যাপারটা মা ভাল মনে না নিলেও এখন আর কিছু বলে না। মাহিরকে মাস গেলে রিতুদা এখন হাজারদশেক টাকা দেয় হাতে। তা ছাড়া এদিক-ওদিক থেকে আরও তিন-চার হাজার চলে আসে। ভাইয়ের ডায়ালিসিসও অনেকটা কম টাকায় হয়ে যাচ্ছে। মা এখন শান্তই থাকে। মাহির একটা জিনিস বোঝে। টাকাপয়সা হল মশা মারার স্প্রে-র মতো। লোকজন ভনভন করলে ছড়িয়ে দাও, সব চুপ করে যাবে।
কিন্তু আজ মা মাহিরের কথায় কান দেয়নি। উলটে বলেছিল, “আমি আসতে পারব না বিকেলের আগে। তুই যেমন তুয়াকে অপমান করেছিস, তেমন এখন বোঝ!”
অপমান! মাহির আর কথা বাড়ায়নি। আসলে অপমান আর কই! একদিন তুয়াদির ঘরে তুয়াদি ওর ওপর জোরজবরদস্তি করেছিল। সেটাকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল মাহির। যদিও সফল হয়নি। নিজেই একসময় কেমন যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল। সেটা অপমান হল নাকি! তুয়াদি যা চেয়েছিল, তাই তো পেয়েছে। তা হলে? শুধু চলে আসার আগে মাহির বলেছিল, “দ্যাখো, আমি যদি আর তোমার কাছে আসি!”
মা সেদিন ফিরে এসেছিল বিকেলবেলা। আর দরজার কাছে জুতো খুলতে-খুলতেই শুরু করে দিয়েছিল চিৎকার!
ভাই ঘুমিয়েছিল। মায়ের চিৎকারে ভাই উঠে বসেছিল ধড়মড় করে। মাহির নিজে ঘাবড়ে গিয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে।
মা বলছিল, “জানোয়ার ছেলে। আমায় মুখে রক্ত তুলে খাটতে হয় আর তুই এসব করছিস! আমি ফোন করেছিলাম তুয়াকে। ও বলেছে, তুই ওকে অপমান করেছিস। তাই আর আসবে না। শুয়োর, কোন সাহসে অপমান করিস তুই ওকে? জানিস না ও কী করে? তোদের রাবণের গুষ্টি টানতে-টানতে আমি মরলাম আর তুই যাকে-তাকে যা খুশি তাই বলে সাহেবগিরি দেখাবি! যা তুয়ার কাছে। ওকে পা ধরে নিয়ে আয় এখানে!”
মাহির মোবাইলটা পকেটে ভরল। তারপর চারিদিকে দেখে নিল কিছু পড়ে রইল কি না।
তুয়াদি হাসল ওকে দেখে। তারপর বলল, “পরের দিন কন্ডোম কিনে আনবি। আমি ওই পিল-টিল খেতে পারব না। একটা বড় প্যাকেট কিনে এনে দিবি। আমি রেখে দেব। আর বউদিকে বলিস আমি কাল যাব তোদের বাড়ি। যেন চিন্তা না করে!”
মাহির কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী সাংঘাতিক একটা ফাঁদে আটকে যাচ্ছে! কাউকে এসব বলতে পারবে না। কিন্তু সহ্যও করতে পারছে না! এর থেকে বেরোবে কী করে? ও ঘর থেকে বাইরে যাবে বলে পা বাড়াল।
তুয়াদি বলল, “পাশের গলিটা দিয়ে যাবি। না হলে দুই বউদি দেখতে পাবে। আবার খিস্তি শুরু করবে ঢেমনি মাগিগুলো!”
দাদাদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকলেও তুয়াদির ঘরটা একেবারে আলাদা। ঢোকার পথও আলাদা। তাই এখানে এলে চট করে কারও চোখে পড়ে না।
তুয়াদি বলল, “আমি মেয়ে বলে কি আমার সেক্স করতে ইচ্ছে করতে পারে না? আমার তোকে ভাল লাগে। অনেকদিন থেকেই লাগে। এটা তুই বুঝিস না? আমি জানি আমাদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক সামাজিকভাবে হয়তো হতে পারে না। কিন্তু যেটুকু পাওয়ার চান্স আছে, সেটা আমার চাই। তার জন্য আঙুল বাঁকাতে হলে বাঁকাবই!”
মাহির আর দাঁড়াল না। ওর সারা শরীর কেমন করছে। যৌনতার একটা টান আছেই। কিন্তু একবার সেটা শেষ হয়ে গেলে তার যে কী তীব্র বিরাগ, সেটা বুঝতে পারছে মাহির। আর শুধু তা নয়, ওর মনের মধ্যে একটা তীব্র অপরাধবোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই শরীর নিয়ে ও কীভাবে যাবে পলির কাছে!
পলি। নামটা মনে করলেই শরীরের ভেতরে যেন কেউ কর্পূর ভরে দেয় মাহিরের। কেন এত ভাল লাগে ওর পলিকে! কী স্মার্ট আর খোলা মনের মেয়ে! কী উদ্যোগী! শুনেছে ওই ওল্ড এজ হোমটার সঙ্গে অনেকে যুক্ত! কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তো শুধু পলিকেই দেখে একা হাতে সব সামলাতে।
রিতুদাকেও ভাল বলতে হবে। এককথার মানুষ! প্রথমে টালবাহানা করলেও পরে ঠিক ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কুড়ি লাখ টাকার একটা ফান্ড দিয়েছে ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’-কে! তবে মাহির জানে, এমনি-এমনি তো আর সেটা হয়নি।
ভাল করে দেখে, কাগজ তৈরি করে রিতুদাকে যেদিন ও সব কথা বলেছিল, যেদিন পলির তৈরি রিপোর্টটা দিয়েছিল, রিতুদা কিছু দেখেনি। শুধু বলেছিল, “ক্লাব জায়গা দখল করে রেখেছে সেটা তুলতে সময় লাগবে। ওদের ছেলেরা আমার খাস লোক। কিন্তু তার বদলে আমি ওদের একটা ফান্ড দিয়ে দিচ্ছি। আপাতত সেটা দিয়েই তুই হিরো হ, বুঝলি! শুধু আমার নামটা যেন লিখে দেয় সামনে, সেটা দেখবি। আর ভাই, আমি তোমার হিরো হওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তোমাকেও তো কিছু করতে হবে। তাই না?”
সামান্য ভয় পেয়ে গিয়েছিল মাহির। সেদিন রাত হয়ে গিয়েছিল অনেক। পার্টি অফিস ফাঁকা ছিল। বাইরে দরজার কাছে চারটে ফড়ে বসে শুধু আড্ডা দিচ্ছিল।
রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মাথার ঘাম মুছতে-মুছতে বলেছিল, “কয়েকটা ভেড়ি আছে। ওই গঙ্গানগর ছাড়িয়ে। বেশ কয়েকমাস হল ওরা টাকাপয়সা দিচ্ছে না। কথাও শুনছে না। তুই জাস্ট যাবি। মানে, তুই আর টিটি। তোরা দু’জন অপেক্ষাকৃত নতুন, তাই তোদের কেউ আটকাবে না। যোগেন বসাক বলে একটা লোক আছে। ও-ই সব কন্ট্রোল করে। জাস্ট গিয়ে মালটাকে উদোম কেলিয়ে দিবি। আনখাই মারবি আর কী! তুই তো ক্যারাটে জানিস। ওকে ‘মা’ বলতে দিবি না। জাস্ট মেরে বেরিয়ে আসবি। চেনা লোক গেলে আগে থেকেই যোগেন সাইডিং হয়ে যাবে। আর আসার আগে ওর কানের গোড়ায় এটা ধরবি। বলবি টাকা না পৌঁছলে বাড়িসুদ্ধু জ্বালিয়ে দেওয়া হবে! এই নে এটা রাখ।”
কথা শেষ করে রিতুদা পাশের ড্রয়ার থেকে একটা পিস্তল বের করে রেখেছিল সামনে। বলেছিল, “এটা সেভেন এম এম। মুঙ্গেরি মাল। ভাল। এটা রাখ। না, চালাতে হবে না। শুধু বের করে দেখাবি।”
“মুঙ্গেরি!” মাহিরের চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছিল বাইরে! কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কী করা উচিত ওর! হাত কাঁপছিল মাহিরের। কান লাল হয়ে গিয়েছিল। মায়ের মুখ মনে পড়ছিল।
রিতুদা ওকে দেখে হেসেছিল। তারপর সামনে রাখা বোতল থেকে জল খেয়ে বলেছিল, “আগেও একবার এমন করে কাঁপছিলি। সেই একই ঢ্যামনামো আর করবি না। নে, তোল ওটা। কিছু হবে না। ইউজ় করতে হবে না। জাস্ট দেখাবি। এটা হল ঠাকুরের সেই ফোঁস। বুঝলি?”
মাহির বুঝতে পারছিল, কুড়ি লাখ টাকা অনুদান আসলে একটা ফাঁদ। ও কী করবে বুঝতে পারছিল না। এ কোন পথে এগোচ্ছে ও!
রিতুদা ওকে দেখেছিল ভাল করে। তারপর পাশে রাখা একটা প্যাকেট থেকে লজেন্স বের করে মুখে পুরে বলেছিল, “শোন, এটা তোকে করতে হবে। ওখানে কেউ ঢুকতে পারছে না। যোগেন আমার সব ছেলেপিলেকে চেনে। তোকে আর টিটিকে এখনও চেনে না। লাস্ট ন’মাস একটা টাকাও ও ঠেকায়নি। জানবি সব কিছুর দাম আছে। ওই যে পলির ফরসা চামড়া দেখে পিছলে গিয়েছিস তুই, তার তো একটা দাম দিতে হবে বাবু! তোল ওটা। ইউজ় করবি না। জাস্ট রাখবি। কিছু হলে আমি তো আছি।”
পিস্তলটা নিয়ে বাড়িতে এসে কোথায় যে রাখবে, বুঝতে পারছিল না মাহির। অনেক ভেবে খেলার কিট ব্যাগে একটা তোয়ালে জড়িয়ে রেখে দিয়েছিল। সেদিন মাহির বুঝেছিল সত্যিকারের জীবনে হিরো হওয়ার দাম কী! বুঝেছিল, এই পৃথিবীতে বিনে পয়সায় দূষিত হাওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না!
যোগেন লোকটা দুবলা-পাতলা। পাঁচ ফুট দু’ইঞ্চি হাইট। সামনের একটা দাঁত নেই। দেখলে কেউ ভাবতেই পারবে না এই ভাঙাচোরা টাইপের লোকটার এমন প্রতাপ!
গঙ্গানগর জায়গাটার চারিদিকে মাছের ভেড়ি। আসল কাজে যাওয়ার আগে একদিন টিটি বাইক নিয়ে ঘুরে এসেছিল ওখান থেকে। তারপর রাতে বাড়িতে এসেছিল মাহিরের।
ও তখন সবে খাবার খেয়ে বাসন মেজে সাজিয়ে রাখছিল রান্নাঘরে। টিটি এসে বাইরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওকে।
মা বিরক্ত হয়েছিল খুব। বলেছিল, “ওই মর্কটটা এখন এসেছে কেন এখানে?”
“কাজ আছে,” মাহির আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে।
মা বিরক্ত গলায় বলেছিল, “রাত বাড়লে কাজ বাড়ে যদি, তবে সেখানে গন্ডগোল হবেই!”
এসব বাজে কথা। আজকাল রাত আর দিনের পার্থক্য নেই! সারাক্ষণ মানুষজন ফাটিয়ে কাজ করে যাচ্ছে! স্যার বলতেন, “কাজের সময় হয় না। কাজ হল ঈশ্বর মাহির। অলস মানুষ আর খারাপ মানুষে জানবি কোনও পার্থক্য নেই!”
মাহির অলস নয় মোটেই। কিন্তু ও কি খারাপ হয়ে যাচ্ছে না! সেদিন টিটির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগে স্যারের মুখটা খুব মনে পড়েছিল মাহিরের। কেন কে জানে কষ্ট হয়েছিল খুব। মনে হচ্ছিল স্যারকে ধোঁকা দিচ্ছে কি মাহির!
“শোন, রাস্তা ইস্মুদ। আমি দেখে এসেছি। খবরও নিয়ে এসেছি। লোকটা রোজ বিকেলবেলা একা হাঁটতে বেরোয়। দু’জনে যাব। পুঁচকে মাল। তোর ব্যাক পকেটে এঁটে যাবে। তুলে ঝোপের ধারে নিয়ে গিয়ে ঠুসে দেব, ব্যস। ইজ়ি কাজ।”
মাহির চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “ধরা পড়ে গেলে!”
“দুর! ভাটের কথা বলিস না। কোন শালাটা ধরবে আমাদের?” টিটি বিরক্ত হয়ে মাথার ব্যান্ডটা ঠিক করেছিল, “শালা, ওখানকার বহুত পাবলিক খেপে আছে ওর ওপর। আমি পালানোর পথ দেখে এসেছি। ভাবিস না।”
মাহির তাও তাকিয়েছিল টিটির দিকে।
টিটি ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, “শালা, গরিব হয়ে তো দেখলি কেমন লাগে! এবার এসব পেঁয়াজি ছাড়! তোর ওই স্যার আর বেঁচে নেই মাহির। তোর ভাই আর মা কিন্তু বেঁচে আছে!”
কাজটা করতে অসুবিধে হয়নি মাহিরের। শুধু প্রথম লাথিটা মারার আগে কেন কে জানে, লোকটার সামনের দাঁতটা দেখে মনে হয়েছিল, ওর বাবার সামনের দাঁতটাও এমন ভাঙা ছিল না?
আর নিজের ঘরে গেল না মাহির। ভেবেছিল স্নান করবে। কিন্তু সময় নেই। পলি আসবে আজ। টালিগঞ্জ থানার সামনে আসবে বলেছে। কী দরকার মেয়েটার জানে না। কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলেছে মাহির যেন পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও দেখা করে ওর সঙ্গে!
এইভাবে পলির কাছে যেতে মন থেকে সাড়া পাচ্ছে না মাহির। কিন্তু সাড়ে ছ’টায় মেয়েটা আসবে বলেছে, তাই আর সময় নেই।
এমনিতেই সারা জীবন মেয়েদের খুব একটা সান্নিধ্য পায়নি মাহির। ওর বয়েজ় স্কুলের জীবনে সেভাবে সু্যোগ হয়নি। প্রাইভেটেও কারও কাছে পড়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। তাই দূর থেকে মেয়েদের দেখত। সেই জন্যই কি না কে জানে, রেশমিকে দেখে মাথা পুরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। মনে হয়েছিল এই মেয়েটা যেন ওর সঙ্গে কথা বলে, পাত্তা দেয়। এই মেয়েটাকে ছাড়া আর থাকবে কী করে? ওর তুচ্ছ আর যন্ত্রণার জীবনে রেশমিই ছিল একমাত্র জানলা! নিজের সবটা দিয়ে মেয়েটাকে ভালবেসেছিল মাহির। কিছু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেনি। কিন্তু সেই মেয়েটা ওকে দায়ে-দফায় নানাভাবে ব্যবহার করে শেষপর্যন্ত ছেড়ে চলে গেল নিজের চেয়ে অনেক বড় একটা লোকের সঙ্গে! কেন? না লোকটার টাকা বেশি বলে!
মাহির সেদিন থেকে বুঝেছিল, টাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওর যদি অনেক টাকা থাকত, রেশমি কি ওকে ছেড়ে যেত!
একটা সর্বস্ব-খোয়ানো প্রেম চলে গেলে যা হয়, মাহিরের তাই হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে কঙ্কালের শহর বুকে নিয়ে ঘুরছিল ও। মনে হত আর কোনওদিন কাউকে ওর ভাল লাগবে না। কিন্তু পলিকে দেখে সব আবার গুলিয়ে গিয়েছে মাহিরের। এমন কোনও মেয়ের সান্নিধ্য তো পায়নি কোনওদিন! সেখানে পলি ওদের বাড়িতে এসেছে ওকে খুঁজতে! ওকে নিয়ে ঘুরেছে। ওকে মেসেজ করে। ও তো ভাবতেই পারছে না! একদিন রাস্তা পার হওয়ার সময় তো ওর হাতটাও ধরেছিল!
আজকাল ভোরবেলা অর্ধেক ঘুমের মধ্যে প্রায় রোজ পলিকে দেখে ও। নিজের পাশের কোলবালিশটা মনে মনে পলির সঙ্গে পালটে নেয়! নিজেকে কোলবালিশের সঙ্গে গেঁথে দিতে-দিতে কল্পনা করে পলি ভালবাসায়, আরামে ওকে আঁকড়ে ধরে আছে কাবুলি বিড়ালের মতো!
সেই পলি যদি ডাকে, তা হলে ও না গিয়ে থাকবে কেমন করে!
রাস্তায় বোঁচাদার পানের দোকানের সামনে টিটি দাঁড়িয়েছিল। ওকে দেখে বাইকে স্টার্ট দিয়ে বলল, “শালা, থাকিস কোথায়? ফোন করছি পাচ্ছি না? যা এক পিস মোবাইল রেখেছিস না! বাবরের আমলের! অর্ধেক সময়ে তো পাওয়াই যায় না। রিতুদা দুপুরে ঢুকে তোকে খুঁজছে। খচে আছে কিন্তু। তুই চল তাড়াতাড়ি।”
মাহির দেখল টিটিকে। মাথায় ব্যান্ডটা ছাড়া বাকি সব কিছু পালটে গেছে ওর। এখন আর অটোর কথা বলে না। রিতুদার দাক্ষিণ্যে টাকা লেগেছে ওর গায়ে! ভাল জামা, জিন্স। জুতোটাও বেশ দামি মনে হচ্ছে! গলায় একটা সোনার চেন দেখল আজ! লোডশেডিং-এ রাংতার মতো চকচক করছে টিটি।
“ক্যালানে হয়ে গেলি নাকি? কানে কথা যাচ্ছে না? রিতুদার মটকা গরম হয়ে আছে। বিশে, পগা আর নুলো লাগিয়েছে যে, তুই আজকাল আর নিয়মিত অফিসে আসিস না। তোর নাকি পাখনা গজিয়েছে! মাগিবাজির অলিম্পিকে নাকি সোনা জিতেছিস! রিতুদা বলছে তোকে যে-কাজ দিয়েছিল, সেটাও নাকি ঠিকমতো করিসনি! শালা, তুই মরবি আর আমাকেও ক্যাওড়াতলায় চালান করবি! চল তাড়াতাড়ি!”
“আমার একটা কাজ আছে,” মাহির গম্ভীর গলায় বলল।
“কা…” শব্দটা মাঝপথে থামিয়ে টিটি তাকিয়ে রইল, “শালা, আবার পলি!”
“পাঁচ মিনিট। প্লিজ়,” মাহির বলল, “টালিগঞ্জ থানার সামনে আসবে। পাঁচ মিনিট জাস্ট।”
“তুই মাইরি আবার রেশমি পার্ট টু করছিস নাকি?” টিটি সন্দেহের চোখে তাকাল, “তোর লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন কিছুই তো ভাল ঠেকছে না!”
মাহির ওর বাইকের পেছনে উঠে পড়ল। পুরনো বাইক! স্প্রিংগুলো সামান্য ককিয়ে উঠল মাহিরের চাপে।
ও বলল, “একবার ঘুরে চল প্লিজ়। আর্জেন্ট!”
টিটি নিজের মনে মাথা নাড়ল, “প্যান্টে আগুন লাগলে শালা সবার সবকিছু আর্জেন্ট হয়।”
মাতৃভবন হাসপাতালের সামনে দিয়ে না গিয়ে সামান্য ঘুরে থানার দিকে এগোল টিটি। মাহিরের ভাল লাগল। টিটি যতই ওকে বকাবকি করুক, আসলে ছেলেটা ওকে ভালবাসে খুব। হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে পার্টি অফিসের মোড়টা পড়ে, তাই চিনুদার গ্যারেজের রাস্তাটা ধরেছে টিটি।
রিতুদা রেগে আছে! মনে মনে ভয় করছে মাহিরের। কিন্তু পলির সঙ্গে দেখা না করে ও যেতে পারবে না। আর রিতুদার কাজ তো ও করে দিয়েছে। তারক চক্রবর্তী। আইকা। নোঈ। সব তো খবর রাখছে। তা হলে কেন রেগে আছে রিতুদা! রিতুদার কাজে তো ওরা ‘না’ করে না! তা হলে!
যোগেনের ব্যাপারটার পরে রিতুদা মাহিরকে বেশ নির্ভর করতে শুরু করেছে। এতে অবশ্য নানা লোকের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু রিতুদা জানে কাকে কীভাবে রাখতে হয়।
যোগেনের ব্যাপারটা মিটিয়ে আসার সপ্তাহখানেক পরে আবার রাতে, সবাই চলে যাওয়ার পরে রিতুদা ডেকেছিল মাহিরকে। বলেছিল, “ওই যন্ত্রটা নিয়ে আসিস।”
রিতুদার টেবিলে গিয়ে পিস্তলটা রেখেছিল মাহির। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল ও। এটা খুব ভয়ের একটা জিনিস। তারপর মা যদি দেখে ফেলত তবে তো হয়ে গিয়েছিল!
রিতুদা বসতে বলেছিল ওকে। পিস্তলটা নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে বলেছিল, “তোর জন্য একটা কাজ আছে।”
“কাজ!” আবার কাজ! আবার কাউকে পেটাতে হবে নাকি! মাহিরের মুখটা তেতো হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। শেষপর্যন্ত ও ভাড়া করা গুন্ডা হয়ে গেল! কোথায় ভাবত কানাভারোর মতো ডিফেন্ডার হবে, তা না পুরো মাস্তান বানিয়ে দিল জীবন!
“ভয় নেই,” রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে একটা লজেন্স বের করেছিল পকেট থেকে। বলেছিল, “এবার আর মারামারি করতে হবে না। শোন, সোনাঝুরিতে বড় প্রজেক্ট আসছে। কিন্তু সেখানে আমাদেরই পার্টির তারক চক্রবর্তী বলে এক নেতা আছে। মালটা খুব সেয়ানা। সে বিশাল হাঁ করে বসে আছে! আমাদের কাছে খবর এসেছে যে, সেই জন্য ঝামেলা হতে পারে। তা ছাড়া আমাদের পার্টিরও নাম খারাপ হচ্ছে ওখানে। তাই আমায় বলা হয়েছে ওর ওপর নজর রাখতে। তুই একটু খবর নে যে, আসলে কেসটা কী। সত্যি কি তারক অমন হাঁ করে বসে আছে? নাকি অন্য গল্প আছে এর মধ্যে?”
কথা শেষ করে রিতুদা তাকিয়েছিল ওর দিকে, “এটা পারবি তো? আর শোন, তোর জন্য একটা জিনিস আছে।”
জিনিস! কী জিনিস সেটা বুঝতে পারেনি মাহির। দেখেছিল, রিতুদা একটা কাঠের বাক্স বের করে সামনে রেখেছিল। তারপর সেটার ঢাকনা খুলে বাড়িয়ে দিয়েছিল সামনে, “এটা রাখ। নাইন এম এম চাইনিজ় মাল। চারবার ফুল ম্যাগাজ়িন ফায়ার করলেও গরম হয় না। হাতে ফাটার চান্স নেই। আর যখন-তখন লক হয়েও যায় না। বুঝেছিস? পার পিস কত জানিস? পঞ্চান্ন! রাখ এটা। চালাবি না দরকার না পড়লে। জাস্ট দেখাবি। ওই ফোঁস!”
মাহির নিরুপায় হয়ে তাকিয়েছিল পিস্তলটার দিকে। রিতুদা বলেছে, তখন আর কী করে না করবে! একবার যখন খেলায় ঢুকেই পড়েছে, পিছিয়ে আসবে কী করে! ওর মাস-মাইনের টাকা। ভাইয়ের চিকিৎসা সবটাই তো মাথায় রাখতে হবে।
তোয়ালে মুড়ে আবার আগের মতো লুকিয়ে রেখেছিল জিনিসটা।
কিন্তু ওর মনে হয়েছিল এই কাজটা আগের চেয়ে সহজ।
সোনাঝুরি জায়গাটা বেশ। সুন্দর সাজানো একমুঠো মফস্সল। পাশ দিয়ে গঙ্গা বয়ে গিয়েছে। আর এই ছোট্ট জায়গায় তারক চক্রবর্তী একটা বিশাল বড় নাম! সবাই যে ভয় পায় তারককে, সেটা বুঝেছিল মাহির। আর এও জেনেছিল প্রাথমিকভাবে তিন-চারটে পার্টি থাকলেও এখন এই জমি, জুটমিল আর বড় ওই জোনাক-বাড়িটা কেনার দৌড়ে দু’জন অবশিষ্ট আছে। বাকিরা তারকের হাঁ মুখ দেখে গন্ডগোলের আভাস পেয়ে সরে পড়েছে। রিতুদার খবর যে ভুল নয় সেটা বুঝতে পেরেছিল।
আরও কিছুদিন খবর নেওয়ার পরে ও জানতে পেরেছিল, তারক ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিটেলর্স’ নামে একটা সংস্থার সঙ্গে কলকাতায় গোপন মিটিং করবে।
মাহির জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য মোতিবাবু? আমায় বুলু দিচ্ছেন না তো?”
সোনাঝুরিতে গিয়ে এই মোতি নামে লোকটাকেই ধরেছিল মাহির। নরমে-গরমে বুঝিয়ে দিয়েছিল ও কার কাছ থেকে আসছে। বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওর মাথায় পার্টির হাত আছে। ওকে সাহায্য না করলে বিপদ আছে।
মোতি বোকা লোক নয়। রিতুদার নাম জানে। ক্ষমতাও বোঝে! তা ছাড়া এই সব লাইনে কেউ কারও হয় না। তাই নিজের আখের গোছাতে, রিতুদার গুড বুকে থাকতে চেয়ে মোতি বলেছিল, ও ঠিক খবর দেবে। শুধু সময়মতো ওকে যেন মনে রাখে রিতুদা!
মোতি বলেছিল, “আরে মাহিরভাই, আমি কেন সেধে ঢপ মারতে যাব? বলেইছি ফুল কো-অপারেশন করব। আপনি চলে যান রাজডাঙার পাশের নতুন বড় মলটায়। বিকেলে। তারকদা কথা বলবে একজনের সঙ্গে। ওই জমির কেসটা নিয়ে টাকাপয়সার কথা বলবে একটা রেস্তরাঁয় বসে। যান, দেখুন কী হয়!”
পরানদা লোকটার মোবাইল রিপেয়ারিং-এর দোকান আছে পাড়ায়। ভাল বাড়ির ছেলে। অবস্থার গতিকে এখন জীবন পড়তির দিকে। কিন্তু এখনও একটা বনেদিয়ানা আছে চেহারায়। বেশ মোটা গোলগাল চেহারা। টকটকে ফরসা রং। সারাক্ষণ পান খায়। দেখলে অনেকেই মারোয়াড়ি ভেবে হিন্দিতে কথা বলে!
সেদিন পরানদাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল মাহির। ও যে এখন রিতুদার সঙ্গে আছে, সেটা মোটামুটি জেনে গিয়েছে সবাই। আগে মাহির এটা কাউকে জানাত না। কিন্তু এটা বুঝেছে যে, এ বাজারে কিছুই ঢাকা থাকে না। সব বেরিয়ে পড়ে। তাই এই ব্যাপারটা ও আর লুকোয়নি। তাতে অবশ্য লাভই হয়েছে। এখন কাউকে কিছু বললে আর না করে না।
ও পরানদাকে বলেছিল, “তুমি আজ আমার সঙ্গে যাবে একটা মলে। কাজ আছে। রিতুদার কাজ। ভাল জামাকাপড় পরে নেবে, কেমন! একজন লোক আছে। তার পাশে বসবে। খাবে। আর শুনবে কী বলে। এটা ইমপর্ট্যান্ট কিন্তু।”
ঠিক তারক এসেছিল সেই মলে। একজন ভদ্রমহিলাও এসেছিল দেখা করতে। পরানদা পাশের টেবলে বসেছিল। কাস্টমার সেজে খাচ্ছিল বসে। রেস্তরাঁর বাইরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে মাহির দেখছিল তারক পরানদাকে কিছু বলছে। ও হাসছিল মনে মনে! তারক তো জানে না, পাশে কে বসে রয়েছে!
যে-মহিলাটি দেখা করতে এসেছিল, তাকেও খুব চেনা লাগছিল ওর। কিন্তু মনে করতে পারছিল না। আর সত্যি বলতে কী, ওসবে মনও ছিল না মাহিরের। তারকের দিকেই চোখ ছিল ওর।
কাজ শেষ করে পরানদাকে সোজা রিতুদার কাছে নিয়ে গিয়েছিল মাহির। পাশের টেবিলে বসে পরানদা যা শুনেছে সব বলে দিয়েছিল গড়গড় করে!
রিতুদা খুশি হয়েছিল খুব। কিন্তু চিন্তিতও দেখাচ্ছিল। পরানদা চলে যাওয়ার পর সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল মাহির, “কী হয়েছে রিতুদা? আপনি কিছু আশঙ্কা করছেন?”
রিতুদা বলেছিল, “কী জানিস তো, অন্য সব কিছুর মতো আমাদের পার্টিতেও নানা দল, উপদল, কাঠিবাজি আছে। তারকের সঙ্গে পার্টির কিছু নেতার র্যাপো ভাল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ওই অঞ্চলে তারক একটা ফ্যাক্টর। তাই সরাসরি ওকে কিছু করা যাবে না। হাইকম্যান্ডকে বললেও, তারা সব শুনেও সবসময় কিছু করে না। প্লাস তারক তো আর সব টাকা একা গিলবে না! ভাগ করবে। তাই… ভাবছি!”
“ওই দেখ, দাঁড়িয়ে আছে!” থানার সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে টিটি সামনের দিকে হাত তুলল।
টিটির বাইকটার এমন আওয়াজ যে, না তাকিয়ে উপায় নেই। মাহির দেখল পলি ওদের দেখেছে!
মাহির সময় নষ্ট না করে বাইক থেকে নেমে এগিয়ে গেল পলির দিকে। পলি হাতঘড়িটা দেখে বিরক্ত মুখে বলল, “সাড়ে ছ’মিনিট লেট! আমার বুঝি সময়ের দাম নেই! ওদিকে স্যার গাড়িতে ওয়েট করছেন!”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না। আমতা-আমতা করে বলল, “আমি আসলে বুঝতে পারিনি। মানে…”
পলি হঠাৎ এগিয়ে এসে বলল, “আরে, গালে কী হয়েছে? এমন লাল কেন?”
সর্বনাশ! তুয়াদি কামড়ে দিয়েছে আজ! এটা ভুলে গিয়েছিল মাহির।
ও বলল, “আর বোলো না, ভাই মাঝে মাঝে এমন করে! আঁচড়ে দিয়েছে!”
“ও!” পলি আলতো করে ছুঁল ওর গালটা। মাহিরের মনে হল খোলা ইলেকট্রিকের তারে হাত লেগে গিয়েছে ওর।
পলি বলল, “যাকগে। তোমার মোবাইলটা এখনও তুমি ফেললে না! আমি কতবার ফোন করছি পাচ্ছি না! কী টিটি, বন্ধুকে একটা নতুন মোবাইল কিনতে বলতে পারো না?”
টিটি হাসল। অপ্রস্তুত মুখে হেঁ হেঁ করল একটু। মাহির বুঝল, পলির আলো লেগে টিটিও অন্ধ হয়ে গিয়েছে!
মাহির আস্তে করে বলল, “অন্য গ্রহের নেটওয়ার্ক আমার মোবাইলে ধরে না!”
“মানে?” পলি ভুরু কুঁচকে তাকাল, “অন্য গ্রহ মানে কী? আমি এলিয়েন নাকি?”
মাহির কিছু না বলে হাসল শুধু।
পলি বলল, “দাও, তোমার মোবাইলটা। দেখি!”
“আমার মোবাইল?” এবার একটু ঘাবড়ে গেল মাহির। এই রে, ওটা বের করতে হবে! ওই ঘষা, রংচটা, রাবার ব্যান্ড লাগানো মোবাইলটা! ওটা তো ওর কাঙালপনার সাইনবোর্ড! সেটা দেখে কী করবে পলি?
“না তো কী? দেবে, নাকি আমি প্যান্টের পকেট থেকে বের করে নেব?”
“আরে,” হেসে মোবাইলটা বের করে দিল মাহির। পেছন ফিরে একবার টিটিকেও দেখে নিল। দেখল, টিটি শান্ত ছেলের মতো চুপ করে আছে।
পলি মোবাইলটা নিয়ে দেখল ভাল করে। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল, “এই নাও। এটা তোমার।”
“আমার?” মাহির অবাক হয়ে তাকাল।
“হ্যাঁ। মোবাইল আছে। দ্যাখো। আর এই মান্ধাতার আমলের জিনিসটাকে আজকেই ছুড়ে ফেলে দেবে। তোমার লজ্জা লাগে না!”
লজ্জা! মাহির মাথা নিচু করে নিল। লজ্জা জিনিসটা আর আসে না ওর। সবাই তো ওর জীবনের কঙ্কাল দেখে ফেলেছে। সেখানে আর লজ্জা পেয়ে কী করবে। আচমকা চোখে জল এসে গেল ওর। এমন তো কেউ কোনওদিন করেনি ওর জন্য!
পলি বলল, “কী হল নাও! অত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? এটা দিতেই ডেকেছিলাম।”
সংকোচের সঙ্গে মোবাইলটা নিল মাহির। চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সামলাল। ইস! তুয়াদির সঙ্গে শুয়ে এখানে এসেছে ও! পলিকে মিথ্যেও বলল দাগের ব্যাপারে। আর সেখানে মেয়েটা ওকে এসব দিচ্ছে! ও কী পাষণ্ড! শয়তান! পলিকে ঠকাচ্ছে ও!
মাহির হাসার চেষ্টা করল, “সেদিন তো আমায় রেস্তরাঁয় খাওয়ালে। আবার আজ এটা…”
“প্লিজ়, ন্যাকামো করবে না,” পলি বলল, “আর সেদিন যা হল!”
তা ঠিক! মাহিরের মনে পড়ে গেল। কী কাণ্ড! ওই লোকটা সবার সামনে মেয়েটাকে কীভাবে নিয়ে গেল!
“নিশান ঠিক আছে? সেদিন তো না খেয়ে চলে গেল!” মাহির জিজ্ঞেস করল।
“জানি না,” পলি হাতঘড়ি দেখে বলল, “খুব বাজে করেছে রাধির বাবা! এত টাকা লোকটার, কিন্তু ম্যানার্স জানে না! যাকগে। আমি যাই। কাজ আছে আমার।”
মাহির আর আটকাল না। এই নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সেদিন ওখানে স্মরণ বলে সেই ছেলেটাও এসেছিল। কিন্তু সবার সামনে কেউই কাউকে চেনা দেয়নি। ভালই হয়েছে। সবাইকে তো আর সব কিছু জানিয়ে লাভ নেই!
মাহির থানায় লাগানো ঘড়িটা দেখল। রাস্তা থেকে দেখা যায়। ওর নিজেরও দেরি হচ্ছে। রিতুদার পারা চড়ছে ওদিকে। ও মাথা নাড়ল।
দেখল, পলি প্রায় দৌড়ে চলে গেল একটু দূরে দাঁড় করানো একটা গাড়ির দিকে। গাড়িটা বেশ বড়। ধূসর রঙের। গাড়িতে উঠে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওর দিকে হাত নাড়ল পলি। তারপর বেরিয়ে গেল।
মাহির এসে বসল বাইকে। টিটি বলল, “শালা, তুই তো কামাল করে দিয়েছিস! পুরো ক্যাচ কট কট একদম! এই জিনিসকে তুলে ফেলেছিস! কিন্তু সামলে ভাই। বড়লোকের মেয়ে। আমাদের কুত্তার পেট। ঘি হজম হবে তো?”
“ভাগ! চল অফিসে!”
মাহির কথাটা মুখে বললেও মনে মনে ভাল লাগছে খুব। কেমন একটা হালকা লাগছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে বেলুনের মতো আকাশে উড়ে যাবে না তো! পলি ওকে গিফট দিল! ওর গাল ছুঁয়ে দিল! নিজের এই সাধারণ খোলসটা ছেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল ওর। এই খোলসটা ভাল লাগে না মাহিরের। এটাকে লোকে ব্যবহার করে। নিংড়ে নেয়। এটা ছেড়ে একটা ভাল, পরিষ্কার মানুষ হতে ইচ্ছে করছে আজ। ইচ্ছে করছে সেই ছেলেটা হতে যাকে স্যার ভালবাসতেন। মনে মনে ঠিক করল আবার সেই ছেলেটা হতে হবে ওকে। পলির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে খুঁজে বের করতে হবে মাহিরকে!
“অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ভাল কথা, ওই ছেলেটা আর মেয়েটার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেছিলি?”
মাহির ঠোঁট কামড়াল। স্মরণ আর নোঈ। ওরা এখনও কেন যোগাযোগ করেনি কে জানে!
তারককে পালটা দিতে রিতুদা বলেছিল, “অন্য গ্রুপটা, মানে ‘রিকো গ্রুপ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ কর। ওরা মাল্টিন্যাশনাল। ওদের আউটলুক অন্যরকম। ওরা অত ঘুষ দেবে না। আর ওরা জুটমিলটাকে রিভাইভ করাতে চায় শুনলাম। শালা, ওদের কাজটা করিয়ে দিতে পারলে, আমার প্রেস্টিজ বাড়বে। হাইকম্যান্ড জানবে এই বাজারে আমি নতুন করে কর্মসংস্থান করছি। আমার লিফট হবে। তোদেরও হবে। পরের ভোটে একটা পদ আমার পাকা হয়ে যাবে। বুঝলি! তুই ওদের আমার সঙ্গে দেখা করতে বল। তারক নিশ্চয় এর মধ্যে ওদের ভড়কাতে শুরু করেছে। আর না করলেও করবে। তার আগেই আমাকে ঢুকে পড়তে হবে। বুঝলি কিছু?”
স্মরণ আর নোঈ যে ‘রিকো’-য় আছে সেই খবরটা নিয়েছিল মাহির। মোতিই বলেছিল ওকে। ও বুঝতে পেরেছিল এই গ্রুপটা বিশাল বড়, ওদের মাথাদের কাছে ঘেঁষা সহজ হবে না। তাই ওই স্মরণ আর নোঈকে টার্গেট করেই কাজ শুরু করতে হবে।
সোনাঝুরিতে একদিন গিয়েছিল ওই দু’জন। সেখান থেকে ওদের ফলো করেছিল মাহির। তারপর সুযোগ বুঝে স্মরণের বাড়িতে গিয়েছিল!
রিতুদা থমথমে মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঘরে চারজন ছিল, কিন্তু মাহির ঢোকামাত্র সবাই বেরিয়ে গিয়েছে! ও কয়েকজনের মুখে হালকা হাসিও দেখেছে। মানে, আজ হবে মাহিরের!
ডিসেম্বরের এই সময়ে কলকাতায় গরম নেই বিশেষ। তাও রিতুদা কুলকুল করে ঘামছে!
মাহিরের গলা শুকিয়ে গিয়েছে। একটু আগে যে-ভাললাগা ছিল, সেটার জায়গায় ভয় এসে ঢুকে পড়েছে মনে।
মাহির মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“জানিস মাহির, আমার না হাই প্রেশার আছে। রাগ খুব বেশি তো! আমার মা, অনেক বয়স এখন, তাও সপ্তাহে একদিন উপোস করে আমার শরীরের জন্য। কারণ, ছোটবেলায় এক সন্ন্যাসী মাকে বলেছিল, আমার নাকি এমন রাগ যে, মাথার শিরা ছিঁড়ে মরে যেতে পারি! কিন্তু মা এটা জানে না যে, আমি মরার আগে আরও গোটাকয়েক জানোয়ারকে নিয়ে মরব।”
“রিতুদা, আমার ভাইয়ের খুব শরীর খারাপ ছিল। মায়ের কাজ থাকে তো, তাই…”
“তো আমার কী ছেঁড়া যাবে তাতে! শুয়োরের বাচ্চা! খালি অজুহাত! যখন টাকা দিই হাত পেতে নিস না! আর কাজের বেলায় ঢ্যামনামো! আমি কলকাতায় নেই বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ!”
“কিন্তু…”
“চোপ বাঞ্চোত!” হাতের কাছে থাকা কাচের পেপার ওয়েটটা আচমকা ছুড়ে মারল রিতুদা!
কোনওমতে মাথা নিচু করে নিজেকে বাঁচাল মাহির। শব্দে বুঝল পেছনে রাখা একটা ছবি চুরমার হয়ে গিয়েছে! রিতুদা উঠে দাঁড়িয়েছে! চোখ লাল। সারা শরীর কাঁপছে। মাহির ভয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
রিতুদা এগিয়ে এসে চুলের মুঠিটা ধরল শক্ত করে। বলল, “ভাইয়ের মতো ভালবাসি বলে কিন্তু পার পাবি না! তুই জানিস, আজ সকালে তারক এসে আমার অফিসে বলে গেছে আমি নাকি কিছু করতে পারব না। ওই নাকি ঠিক করবে কে জমি পাবে ওখানে। আমায় সবাই বলছে তুই বেকার, ফালতু। আমি তোর ওপর ভরসা করেছিলাম। রিকোর কেউ এখনও এল না। কেন? কেন এমন হল? মাহির তোকে রাস্তা থেকে তুলেছি, আবার রাস্তায় ফেলে দিতে আমার সময় লাগবে না। ভাইকে নিয়ে কী করবি? নিজে কী করবি? তোর মায়ের কাজ যাতে বন্ধ হয় সেটাও দেখব। বল কী চাস? থানার সামনে দাঁড়িয়ে মাগিবাজি করবি, না কাজ করবি? বল মাহির, বল…”
হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে রইল মাহির, কাচের দরজা দিয়ে কিছু মুখ উঁকি মারছে। কারা যেন কিছু বলছে! কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছে না! ভাইয়ের মুখটা ভাসছে শুধু। মায়ের মুখটা ভাসছে! রিতুদা যদি সত্যি ক্ষতি করে দেয়! কী করবে ও? ঘন হচ্ছে ডিসেম্বরের সন্ধে। আর তার অন্ধকার ধীরে-ধীরে রক্তে মিশে যাচ্ছে মাহিরের। স্যার যে ছেলেটার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, সেই ছেলেটা আরও যেন গেঁথে যাচ্ছে মাটির গভীরে! একটা ধূসর গাড়ি চলে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে। সেই অন্য গ্রহ থেকে আসা মেয়েটা হাত নাড়ছে ওকে দেখে! চলে যাচ্ছে? মেয়েটা কি চলে যাচ্ছে! মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা, বশ্যতা মেনে নেওয়া এই ছেলেটার থেকে কি দূরে চলে যাচ্ছে মেয়েটা!
রিতুদা চুলের মুঠি ধরে রেখেছে। টান লাগছে! টান লাগছে খুব! শিকড় উপড়ে যাওয়ার আগে এমন টান আর যন্ত্রণাই কি অনুভব করে গাছ!
.
৩১. নোঈ
এত টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না নোঈর। একটা বাড়ির জন্য এই প্রজেক্টটা আটকে যাবে! এর কোনও মানে হয়! ও বিরক্ত হয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
আজ চাঁদ উঠেছে আকাশে। চকচকে কাচের বুদ্বুদের মতো চাঁদ! মনে হচ্ছে কে যেন কলকাতার মাথায় একটা চিনে লণ্ঠন জ্বালিয়ে রেখেছে! সুন্দর লাগছে খুব। কিন্তু তাও কিছু ভাল লাগছে না নোঈর। অফিসে আজ ভাল সময় যায়নি ওর।
দিল্লি থেকে বস এসেছেন আজ। আর সবাই মিলে একটা মিটিং হয়েছে। তাতে পুশকিন আর ওর টিমকে বেশ বকাবকি করা হয়েছে! মনটা একদম ভাল নেই।
“তুমি জানলাটা বন্ধ করে নাও, ঠান্ডা লাগবে!” পুশকিন পাশ থেকে বলল।
গাড়ি হু হু করে ছুটছে বাইপাস দিয়ে। আজ রাত হয়ে যাওয়ায় গাড়ি ড্রপ দিচ্ছে ওদের। পুশকিন গাড়ি আনেনি আজ। তাই একসঙ্গেই ফিরছে! সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে রয়েছে স্মরণ। গাড়িতে ওঠার পর থেকে এই প্রথম কথা বলল পুশকিন। আসলে সবটাই কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে!
নোঈ তাকাল। পুশকিন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। গাড়ির আবছায়ার ভেতরে পুশকিনের মুখটা কেমন যেন লাগছে। এমন বিষণ্ণ পুশকিনকে ও কোনওদিন দেখেনি।
নোঈ সামনের দিকে তাকাল। স্মরণ রাস্তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ও সময় নিল একটু তারপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে ধরল পুশকিনের হাত। ছেলে হিসেবে পুশকিনের হাতটা খুব নরম। নোঈ হাতটায় চাপ দিল সামান্য!
পুশকিন তাকিয়ে হাসল অল্প। তারপর আবার বলল, “কাচটা তুলে দাও। নতুন ঠান্ডা পড়েছে। এটা ভাল নয়। সর্দি লেগে যাবে!”
নোঈ পুশকিনের আঙুলের মধ্যে নিজের আঙুলগুলো জড়িয়ে রাখল কিছুক্ষণ। দেখল পুশকিন সাড়া দিচ্ছে না! নোঈ তাকাল পুশকিনের দিকে। আবছায়া হলেও দু’জনে দু’জনের চোখ দেখতে পাচ্ছে!
নোঈ নীরবে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে! পুশকিন সামান্য মাথা নাড়ল শুধু!
“স্যার,” স্মরণ আচমকা পেছনে ফিরল।
নোঈ নিজের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল।
“বলো,” পুশকিন তাকাল স্মরণের দিকে।
“একটা কথা বলব?”
পুশকিন হাসল। আজ সারাদিনে বোধহয় এই প্রথম, ভাবল নোঈ।
স্মরণ প্রায় ঘুরে বসে বলল, “মহিলা এমন ঢ্যাঁটা কেন?”
“কোন মহিলা?” পুশকিন অবাক হল।
“ওই দীপমালাদেবী! দাবিটা কি ওঁর? আমরা যা প্রস্তাব দিচ্ছি সেটা তো ভাল। ওদের জুট মিলের অবস্থা ভাল নয়। ওরা লায়াবিলিটিটা ঝেড়ে ফেলছে না কেন?”
“জুট মিল নিয়ে তো সমস্যা নেই,” পুশকিন বলল, “ওঁর সমস্যা তো বাড়িটা। জোনাক বাড়িটা!”
স্মরণ চশমাটা ঠেলে ওপরে তুলে বলল, “কিন্তু সেটাই বা কেন! দিয়ে দিলে তো ল্যাটা চুকে যায়!”
পুশকিন হাসল, “কেউ-কেউ হয়তো ল্যাটা চোকাতে চায় না! আজ বস তো সবার সামনেই কনফারেন্সরুমে দীপমালাদেবীকে কল করলেন। শুনলে তো কী বললেন উনি।”
“ওই তো, প্রশ্নটা জেনে তার উত্তরটা জানতে হবে। ইজ় দিস আ জোক!” স্মরণ মাথা নেড়ে সোজা হয়ে বসল।
পুশকিন আর কিছু বলল না। আবার বাইরের দিকে তাকাল।
স্মরণ আবার পেছনের দিকে ঘুরল, “স্যার।”
“কী হল?” পুশকিন আবার হাসল সামান্য।
নোঈ অবাক হয়ে যায়! স্মরণটা যেন ক্লাস সিক্সে পড়া একটা ছেলে! সারাক্ষণ ছটফট করছে! সুস্থির হয়ে বসতে পারে না এক মুহূর্তের জন্যও!
“একটা কথা বলব?”
নোঈ বলল, “সোজা হয়ে বোস না। সারাক্ষণ বকবক করে যাচ্ছিস! কী কথা বলতে চাস তুই?”
স্মরণ নোঈর কাছে ধাতানি খেয়ে হাসল। কিন্তু চুপ করল না। উলটে বলল, “আপনস্যার আপনাকে হিংসে করে কেন?”
“এই! কী সব বাজে কথা বলছিস!” নোঈ আবার কড়া গলায় শাসন করার চেষ্টা করল স্মরণকে।
স্মরণ বলল, “স্যার, এখন তো অফিস টাইম নয়। আমি আনঅফিশিয়ালি বলছি। কিন্তু কেন স্যার?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “ওসব কিছু নয়। ও তোমার ভুল ধারণা!”
“স্যার, দেখছিলেন, যখন কনফারেন্স রুমে বস আপনাকে বকছিলেন তখন উনি কী খুশি হচ্ছিলেন! আমাকে তো চাপা গলায় বললেন, এরপর তোমার হবে। নাও, অ্যাকাউন্টস থেকে আরও নাচতে-নাচতে গিয়ে ফিল্ডে নামো!”
“তাই?” পুশকিন হাসল।
স্মরণ বলল, “হ্যাঁ। আমি সত্যি বলছি। এমনকী, কনফারেন্স আরম্ভ হওয়ার আগেও তো নোঈকে কী সব বলছিল। কী রে নোঈ, বল!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। এভাবে কি এসব কথা বলা উচিত?
আসলে বস এলেই অফিসে একটা টেন্সড অবস্থার সৃষ্টি হয়। ওদের নানা রিপোর্ট জমা দেওয়ার থাকে। নোঈরও ছিল। তাই সেটা নিয়ে দুপুর থেকে ব্যস্ত ছিল ও।
আপন আর পুশকিনের চেম্বার আলাদা। নোঈদের বসার জায়গাটা আবার অন্য ঘরে। সেখানে নিজের কিউবিকলে বসে জব রিপোর্টটা শেষবারের মতো দেখছিল নোঈ। তখনই আপন এসে দাঁড়িয়েছিল ওর পেছনে।
“কী করছ দেখি!” আচমকা আপন পেছন থেকে নোঈর ঘাড়ের ওপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
“স্যার,” নোঈ একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। চাকা লাগানো চেয়ারটা ঠেলে ও পিছিয়ে গিয়েছিল কিছুটা।
আপন বলেছিল, “এসব করে আর লাভ কী! ইফ ইউ রাইড অন আ সিঙ্কিং শিপ, ইউ আর বাউন্ড টু গো ডাউন উইথ ইট।”
“সরি স্যার, মানে?” নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আপনের দিকে।
আপন হেসে একটু ছড়িয়ে বসেছিল পাশের একটা খালি চেয়ারে। এই কিউবগুলো তিন দিকে ঘেরা। আপন একটা ফাইল তুলে নিয়েছিল টেবিল থেকে। সেটা উলটে-পালটে দেখেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, “লাইফ কখনও একরকম যায় না! ইটস আ সাইক্ল। একদিন বস আমার কাছ থেকে প্রোজেক্ট নিয়ে দিয়েছিলেন পুশকিনকে। আর আজ দ্য টেব্ল হ্যাজ় টার্নড। আমার কাছে ভেতরের খবর আছে। ওকে যে শোকজ় করা হয়েছিল, সেটার স্যাটিসফ্যাক্টরি রিপোর্ট ও দিতে পারেনি। কোম্পানি ইজ় নট হ্যাপি। হ্যাঁ, ওই বুদাপেস্টের কাজটায় কন্ট্রিবিউট করেছে বটে, কিন্তু সেটা তো সহজ কাজ ছিল। ও পাগলা স্মরণটাকে দিলে সেও করে দিত। আসল ব্যাপার ছিল এই মালিক জুটের কাজটা। আর পুশকিন হ্যাজ় ব্রট আবাউট হিজ় ডুম। আরে, একজন এজেড লেডিকে কনভিন্স করতে পারে না! ঘণ্টা কাজ পারে! আমাকে তো সেভাবে সেই চান্সই দেওয়া হল না! শোনো, আজ বস আমাদের নিয়ে কনফারেন্সে বসবেন। তোমাকেও জিজ্ঞেস করবেন কেন প্রজেক্টটা এত মাস ডিলে হয়ে আছে। কোন পয়েন্টে আটকে আছে? তুমি জাস্ট বলবে, এটা হয়েছে পুশকিনের জন্য। বস পুশকিনকে পছন্দ করেন। তাই এখনও বেঁচে আছে মালটা। কিন্তু বোর্ড অব ডাইরেকটর্স বসকেও ঝাড় দিয়েছেন। ফলে শি ইজ় ইন ডিপ শিট অলসো। তাই এবারের মিটিংটা খুব ইমপর্ট্যান্ট কিন্তু। তুমি বলবে যে, পুশকিন তোমাদের এনাফ কাজ করতে দিচ্ছে না। বলবে, ‘হোমওয়ার্ড বাউন্ড’-এর আইকা বাসুর সঙ্গে ওর শেডি ডিল হয়েছে। সেটা তুমি জেনেছ। আমরা ডিলে করালে ওরা প্রজেক্টটা পেয়ে যাবে। তাতে পুশকিনের পকেট ভারী হবে।”
“কী বলছেন স্যার?” নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আপনের দিকে।
আপন ওর ছোট কুতকুতে চোখ দুটো বুজিয়ে খিকখিক করে হেসে বলেছিল, “তুমি বাচ্চা মেয়ে। এসব বুঝবে না। বস নিজেকে বাঁচাতে একটা স্কেপগোট খুঁজছে। গিভ হার ওয়ান! ভেতর থেকে খবর পেয়েছি, আমায় এই প্রজেক্টটা দেওয়া হবে এর পর। তুমি আমার হয়ে কাজ করবে। তাই বলছি, নাউ ইজ় দ্য টাইম টু জাম্প শিপস!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কী বলছে কী আপন! এমন করতে কী করে বলতে পারে!
আপন এদিক-ওদিক দেখে চেয়ারটা গড়িয়ে নিয়ে এসেছিল সামনে। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল, “শোনো, পরিস্থিতির সুযোগ নিতে শেখো। আমি জানি তোমার চাকরিটাতে ও হেল্প করেছে। কিন্তু কাজ আর পলিটিক্সে কেউ বন্ধু নেই। সবটাই টেম্পোরারি। নেল হিম। দিস ইজ় দ্য টাইম। না হলে কিন্তু ও সব ব্লেম তোমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে। আগেও এমন হয়েছে। ও সাংঘাতিক ছেলে! এমনকী, এও শোনা যায়, ও নাকি নিজের বউকে খুন করেছিল!”
“কী? কী বলছেন এসব?” নোঈ ঘাবড়ে গিয়েছিল খুব।
আপন বলেছিল, “হ্যাঁ। বাইরে ছিল তখন। আগের রাতেও যে-মেয়েটা সুস্থ থাকে, সে কী করে এক রাতের মধ্যে মারা যায়? শালা, টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করেছিল ব্যাপারটা। প্লাস ওর এক কাকা আর তার ছেলে মানে ওর খুড়তুতো ভাই আছে— ডাক্তার। তারাও কীসব ম্যানেজ করেছিল শুনেছি। হি ইজ় ইভ্ল। পিয়োর ইভ্ল। ওকে আমি ছোট থেকে চিনি। তুমি কী ভাবো, বস ওকে এমন প্রেফার করে কেন?”
“কেন?” নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
আপন টাইয়ের নটটা আলগা করে নাক টেনে হেসেছিল। হালকা গোলাপি শার্টের হাতাটা গুটিয়ে বলেছিল, “বসের সঙ্গে ওর…” বলে চোখ টিপেছিল, “বস যখন এখানে আসে। হি ভিজ়িটস হার! আর… ইউ নো! আমি আর কী বলি!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। ও তাকিয়েছিল অবাক হয়ে। এসব আপন কী বলছে। ওকেই-বা বলছে কেন?
আপন পকেট থেকে একটা চুয়িংগাম বের করেছিল এবার। সময় নিয়ে র্যাপারটা খুলে মুখে দিয়েছিল সেটা। তারপর কোণে রাখা একটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে সেই র্যাপারটা ফেলে দিয়ে বলেছিল, “তুমি বাচ্চা মেয়ে, তাই এতদিন বলিনি। কিন্তু তোমার কেরিয়ার ইজ় অ্যাট স্টেক। তাই বলছি। লাইফ হল সি-স-র মতো। একদিকে ডুবলে আর-একদিক ওঠে! তোমার টাইম এখন ওঠার। ডোন্ট ওয়েস্ট ইট। আজ তোমার দিন। সেভ ইয়োরসেলফ। প্লাস এই প্রোজেক্টটা নেক্সট আমার কাছে আসছে। তাই আমার টিমে তুমি থাকতে চাইলে এটা কোরো। আমি এমন কাউকে টিমে রাখব না, যে আমার কথা শোনে না। বুঝেছ?”
আপন চলে যাওয়ার আগে হেসেছিল। বলেছিল, “আমার কথা শোনো। আখেরে লাভ হবে। পুশকিন কিছু দেবে না তোমায়। বুঝেছ?”
বিশ্ববাংলার সিগন্যালে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এত রাত হলেও ট্র্যাফিক ভালই আছে। ডান দিকে বিশাল হোটেল দুটো রূপকথার রাজপ্রসাদের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে!
নোঈ জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। ওর ছোটবেলার কলকাতাটা যেন হারিয়ে গিয়েছে কোথায়! এই কলকাতাকে মাঝে মাঝে চিনতে পারে না নোঈ। একদিকে আকাশে গেঁথে যাওয়া বিশাল বাড়ি। মাফলারের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া ফ্লাইওভার। বিয়েবাড়ির মতো ঝলমলানো শপিং মল। খাবারের দোকান। রেস্তরাঁ। এসি বাস। মোবাইলের সাহায্যে বাড়ির ভেতর ডেকে নেওয়া গাড়ি। সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল। দামি লিফট আর এসি বসানো স্কুল। আর তার পাশে রাস্তায় স্তূপ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষ। বগবগে কালো ধোঁয়া বমি করতে-করতে যাওয়া টেম্পো। নোংরা দেওয়াল। ধুলোজমা পুরনো বাড়ি। বারান্দায় বসে থাকা মোটা চশমা আর খাটো পাজামা পরা জং ধরা মানুষ। জায়গায় জায়গায় পুঁজের মতো জমে থাকা অটোর লাইন। নোঈ মাঝে মাঝে বোঝে না আসল কলকাতা কোনটা! এই চকমেলানো শহরটা নাকি ওই ফুটপাথের ময়লা ন্যাংটো বাচ্চা ঘোরা শহরটা!
“কী রে, মাঝে মাঝে কী হয় তোর?” স্মরণ সামনে থেকে জিজ্ঞেস করল।
নোঈ হাসল সামনে তাকিয়ে, “কিছু না। এই ভাবছিলাম!”
“কী ভাবছিলি?” স্মরণ আরও ভাল করে ঘুরে বসার চেষ্টা করল আবার, কিন্তু সিট বেল্টের জন্য পারল না ঠিকমতো।
“এই যে, তোকে প্যাঁও স্ট্যান্ড করে কী করে?”
“মানে?” স্মরণ গম্ভীর হয়ে গেল, “আরে, প্যাঁও আমার মতো ডিভোটেড লাভার পাবে না কোথাও। জানিস, প্যাঁও যখন টিউশনে যেত আমি ওর জন্য গাছের তলায় সাড়ে চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার মোবাইল ছিল না তো! সবাই হাসত আমায় দেখে। কিন্তু আমি পাত্তা দিতাম না। সাড়ে চার ঘণ্টা। তারপর ও পরীক্ষা দিয়ে বেরোলে আমি ফ্রুট জুস নিয়ে রেডি থাকতাম। চাইনিজ় খেতে ভালবাসত। আমি টিউশন করতাম তো, সেই টাকা জমিয়ে ওকে চাইনিজ় খাওয়াতাম। ওই যে ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের একটা রেস্তরাঁ আছে না! সেই সিঁড়ি উঠে গেছে সোজা। সেইটায়। মেঘমল্লার থেকে অটো ধরত প্যাঁও। ওর সঙ্গে অটোর লাইনে দাঁড়াতাম আমি। নোট জ়েরক্স করে দিতাম। এমনকী, একবার ওর জুতো ছিঁড়ে গেল। আমি স্যারের বাড়ি থেকে খবরের কাগজ নিয়ে সেটা প্যাক করে রাসবিহারী মোড়ের মুচির কাছ থেকে সেটাও সারিয়ে এনেছিলাম। নানা লোকে আওয়াজ দিয়েছিল। স্যারও আওয়াজ দিয়েছিলেন খুব। কিন্তু প্যাঁওয়ের জন্য সব করতে পারি আমি।”
পুশকিন সব শুনে বলল, “তুমি ওর আয়ামাসি না প্রেমিক, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!”
স্মরণ একটা কথাতেই এমন ভোঁতা হয়ে গেল যে, নোঈ খিলখিল করে হেসে উঠল। আর ঠিক তখনই স্মরণের পকেটের ফোনটা বেজে উঠল শব্দ করে।
স্মরণ, পুশকিনের কথার ধাক্কা সামলে উঠে ফোনটা ধরতে সময় নিল একটু।
পুশকিন তাকাল নোঈর দিকে। তারপর চাপা গলায় বলল, “দ্যাটস মোর লাইক আ গুড গার্ল! ইউ শুড স্মাইল মোর। আজ অফিসে যা হল ভুলে যাও। এসব হয়। আমরা ঠিক ক্র্যাক করব কাজটা। ডোন্ট ওয়ারি!”
“স্যার,” ফোনটা রেখে স্মরণ সামলে ঘুরল আবার, “ওই মাহির ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছিল কী হল কাজের। মানে, রিতুদা জিজ্ঞেস করছে। আমি বলেছি কাল বলব।”
মাহির! নোঈ অবাক হল। ছেলেটা অদ্ভুত বেশ। সেদিন আচমকা ওকে স্মরণদের বাড়িতে দেখে তো ঘাবড়েই গিয়েছিল!
ছেলেটা খুব লম্বা। ভাল চেহারা! একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরা। পায়ে সাধারণ একটা চটি!
স্মরণ চশমাটা ঠিক করে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কাকে চাইছেন?”
ছেলেটা নরম গলাতেই বলেছিল, “আপনাদেরই চাইছি।”
“আমাদের? মানে?” স্মরণ যে অবাক হয়েছে খুব, সেটা ওর গলার স্বরেই বুঝতে পেরেছিল নোঈ।
ছেলেটা বলেছিল, “বলতে পারেন আমি আপনাদের কাছে একজনের হয়ে এসেছি। সোনাঝুরির কাজের ব্যাপারে এসেছি!”
“সোনাঝুরি?” নোঈ এবার উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্মরণের পাশে!
ছেলেটা বলেছিল, “হ্যাঁ। দরকারি কাজ। একটু যদি শোনেন আপনাদের ক্ষতি হবে না।”
নোঈ অবাক হয়েছিল, “কে আপনি?”
ছেলেটা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর নরম স্বরে বলেছিল, “আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি! আমার নাম মাহির।”
স্মরণ দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল, “আসুন।”
ছেলেটা সময় নিয়ে পায়ের জুতোটা খুলে বারান্দার একপাশে সরিয়ে রেখেছিল। তারপর ঢুকে এসেছিল ঘরে।
“বসুন,” স্মরণ হাত দিয়ে একটা গদির দিকে দেখিয়েছিল।
মাহির যে নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ি থেকে আসছে, ওর জামাকাপড় আর মুখচোখের ভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল নোঈ। বয়সও বেশি নয়। ওর কৌতূহল হয়েছিল, কী বলতে চায় ছেলেটা?
মাহির চারিদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখেছিল একটু। তারপর হেসে বলেছিল, “আমার বয়স দেখে আপনারা হয়তো আমার কথা সিরিয়াসলি নেবেন না, কিন্তু আমি রিতুদার কাছ থেকে আসছি। রিতুদা কে চেনেন তো? এমপি মানে…”
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ, নাম জানি। বলুন।”
মাহির বলেছিল, “আমি আপনাদের বেশি সময় নেব না। ছোট করে একটা কথা জানাতে চাই। আমরা জানি যে, সোনাঝুরির কাজটা নিয়ে তারক চক্রবর্তী আপনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু চাইছে। লোকটা খুবই বাজে আর বদ। আমাদের পার্টির নাম ও খারাপ করছে। এখন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়ন। সেখানে আমরা কোনও কম্প্রোমাইজ় করব না। রিতুদা আপনাদের কোম্পানির কথা জানেন। খুব বড় আপনাদের কোম্পানি। তাই আপনাদের সাহায্য করতে চান। আমি জানি, আপনারা দু’জন কাজটা ফলো করছেন। তাই আপনাদের বললাম। এই রিতুদার কার্ড। আপনাদের বসকে বলবেন রিতুদা কথা বলতে চেয়েছেন। রিতুদার কিন্তু কোনও স্বার্থ নেই। আমাদের রাজ্যের ভাল করতে চান রিতুদা। তারকের মতো লোকদের জন্য আমাদের রাজ্যের মানুষের কোনও ক্ষতি রিতুদা হতে দেবেন না!”
ছেলেটা একটা কার্ড এগিয়ে দিয়েছিল। নোঈ কার্ডটা নিয়ে দেখেছিল ভাল করে। ছেলেটা সত্যি কথাই যে বলছে বুঝেছিল!
রিতেশ আইচ। ছোট করে রিতুদা। নোঈ কেন, লোকটার নাম সবাই জানে। কেউ মুখে না বললেও এটা ঘটনা যে, রিতুদা আগে পাতি গুন্ডা ছিল। সেই হিসেবেই তার নাম আর পরিচিতি। পরে পার্টির টিকিটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে। মনা পান্ডে বলে আর-একজন নেতা কাম মস্তানের সঙ্গে তার খুব ঝামেলা। মাঝে মাঝে পেপারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের খবর পাওয়া যায়। এখন সেই লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে! এসব দালাল টাইপের লোকজন কেন ঢুকে পড়ে মাঝখানে! মাথা যখন গলিয়েছে তখন কিছু তো একটা দাবি আছেই। কিন্তু নোঈ বুঝেছিল এই ছেলেটি দূতমাত্র। একে এটুকুই বলা হয়েছিল।
স্মরণ সব শুনে চুপ করে ছিল একটু। তারপর বলেছিল, “আমরা জুনিয়র। অফিসে গিয়ে বলব আপনার কথা। আমাদের হাতে তো কিছু নেই!”
মাহির উঠে দাঁড়িয়েছিল। ছেলেটার হাইট ভাল। শরীরটাও পেটানো। নোঈর মনে হয়েছিল ব্যায়াম-ট্যায়াম করে নিশ্চয় ছেলেটা। স্পোর্টসম্যান টাইপ।
মাহির বলেছিল, “আপনারা সিরিয়াসলি কথাটা ভাবুন। অফিসে গিয়ে বলুন। রিতুদা কিন্তু সিরিয়াস এই ব্যাপারে! আমি তা হলে রিতুদাকে বলছি যে, আপনারা যোগাযোগ করছেন। কেমন! আপনাদেরই কিন্তু লাভ। মনে রাখবেন! আসছি।”
পুশকিন নাক টানল। জ্যাকেটের চেনটা গলা অবধি টেনে দিয়ে বলল, “আবার কেন ফোন করছে! আমি তো গিয়েছিলাম রিতুদার সঙ্গে কথা বলতে। বলেছি, সময়মতো নিশ্চয় জানাব। এরা কেউ একটা কথা বুঝতে পারছে না যে, আমার হাতে কিছু নেই। বসও বুঝতে পারছেন না, পলিটিক্যাল পার্টির লোকজনও বুঝতে পারছে না। আরে, দীপমালাদেবী যদি এমন জেদ ধরে বসে থাকেন যে, বাড়ি বিক্রি করবেন না, তা হলে আমি কী করতে পারি!”
নোঈ বলল, “আমি তো শুনলাম ‘মুছাল গ্রুপ’ নামে একটা কোম্পানি নাকি ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে। পেপারে পড়ছিলাম। তারা আবার জোনাক-বাড়ি ছাড়াই কিনবে বলছে সব কিছু। আপনি কিছু জানেন?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “আমি শুনেছি, কিন্তু শিয়োর নই। আসলে আমাদের যে-ভিশনটা আছে ওই জায়গা নিয়ে, সেটা কিন্তু ইউনিক। আমাদের কোম্পানির প্রেস্টিজ বাড়ত এতে। কাউকে আপরুট না করে সব কিছু ঠিক করে সেখানে আবার নতুন করে সিটি বিল্ডিং ইজ় আ বিগ জব। জোনাক-বাড়ি তো প্রায় দশ বছর হল ডেজ়ার্টেড। তাও কেন যে ওই মহিলা সেটা ছাড়তে চাইছেন না! এটা আমার কাছে একটা মিস্ট্রি কিন্তু!”
স্মরণ যেন কিছু বলতে গিয়েও আচমকা চুপ করে গেল বলে মনে হল নোঈর। কী ব্যাপার! এমন হল কেন! সেদিন স্মরণদের বাড়িতেও এমন হয়েছিল না!
নোঈর মনে পড়ল ব্যাপারটা।
মাহির চলে যাওয়ার পরে কাকিমা খাবার নিয়ে এসেছিলেন। সাদা ফোলা লুচি, লাল-কমলা আলুর দম। আর নারকেল ছাঁচের মিষ্টি।
লুচি থেকে দারুণ ঘিয়ের গন্ধ বেরোচ্ছিল। নোঈ খুব সাবধানে খায়। কিন্তু সেদিন ভাবছিল আজ আর অত ভাববে না।
কাকিমা ছ’টা করে লুচি দিয়েছিলেন। সেটাই শুধু কমিয়েছিল নোঈ।
কাকিমা ওর পাশে বসে থুতনি ধরে বলেছিলেন, “খুব মেপে যে খাও বোঝা যাচ্ছে। এমন সুন্দর স্কিন আমি দেখিনি কোনওদিন।”
লজ্জা পেয়ে নোঈ মুখ নামিয়ে নিয়েছিল।
কাকিমা আবার বলেছিলেন, “স্মরণটা পাগল, জানো তো! বাড়িতে থাকলে সারাক্ষণ লেখে আর পড়ে। আমার সঙ্গে কথাই বলে না! তোমরা নাকি সোনাঝুরিতে কাজ করবে? তাই?”
নোঈ বলেছিল, “হ্যাঁ। ওই একটা জুট মিল…”
“আর জোনাক-বাড়ি?” কাকিমা কেমন অদ্ভুত মুখে বলে উঠেছিল, “বিয়ের পর ওর বাবার সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম সোনাঝুরিতে। জোনাক-বাড়িও দেখি। আসলে…”
“মা কী বলছ! আলুর দমে আলুর ভেতরে মশলা ঢোকেনি। বলেছি না আলুটা রান্নার আগে কয়েকটা ফুটো করে দেবে।”
নোঈ বলেছিল, “কোথায়! ঠিকই তো আছে! তা কাকিমা, আপনি কী বলছিলেন?”
কাকিমা আবার শুরু করেছিল, “আসলে ওর বাবা তো…”
“বাবা বোটানিস্ট ছিলেন,” স্মরণ আবার ওর মাকে বাধা দিয়ে বলেছিল, “বাবা-মা’র লাভ ম্যারেজ হয়েছিল। মায়ের বাড়িতে বাবাকে মেনে নেয়নি। মা সবাইকে এই গল্প শোনায়। প্রেম করার চেয়েও প্রেমের গল্প শোনানোতে কিন্তু অনেক বেশি স্যাটিসফ্যাকশন আছে। তাই না?”
সেদিন বেশ অনেকক্ষণ ওদের বাড়িতে ছিল নোঈ। দেখেছিল, মাকে আর ওই বিষয় নিয়ে কিছু বলতেই দেয়নি স্মরণ।
গাড়িটা গড়িয়াহাট টপকাল। ঘড়ি দেখল নোঈ। প্রায় দশটা বাজে। আজ দেরি হয়ে গেছে খুব। বাড়িতে অবশ্য ফোন করে দিয়েছিল! কিন্তু এত দেরি হবে ভাবতে পারেনি ও। বস এত সময় নিয়ে নিয়েছিলেন!
বস খুব রাগী আর স্পষ্ট কথার মানুষ। আপন যেমন বলেছিল, তেমন কিন্তু কোনও কিছু হয়নি। বস ইন্ডিভিজ়ুয়ালি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। শুধু মূল ব্যাপারটা শুনে নিজেই ওই রুম থেকে ফোনের স্পিকার অন করে কল করেছিলেন দীপমালাদেবীকে।
কিন্তু ভদ্রমহিলা খুব ঠান্ডা গলায় বসকেও একই কথা বলে দিয়েছেন, “আমি আপাতত এই বাড়ি বিক্রি করব না। আমার ছেলে না বুঝে প্রথমে এটা ডিলে রেখেছিল। আমি জানি আপনারা সেইভাবেই ডসিয়ার আর প্রেজ়েন্টেশন তৈরি করেছেন। কিন্তু সরি। আমি একটা উত্তর খুঁজছি। সেটা না পাওয়া অবধি আমি অপারগ।”
ওদের কনফারেন্স রুমটা বেশ বড়। দীপমালাদেবীর গলাটা নরম শোনালেও তার দৃঢ়তা নিয়ে কারও মনেই কোনও সংশয় ছিল না।
বস বলেছিলেন, “আমাদের ব্যাপারটা একবার ভাবুন। আমাদের প্রজেক্টে সামাজিক উপকারও হবে। সোনাঝুরি উইল বি ইমেন্সলি বেনিফিটেড।”
দীপমালাদেবী যেন হেসেছিলেন সামান্য। তারপর বলেছিলেন, “আপনাদের পুশকিন ছেলেটা খুব পুশ করছে ব্যাপারটা নিয়ে। আমায় অনেকবার কনভিন্স করার চেষ্টা করেছে! কিন্তু আমি ওকে যা বলার বলেছি। আর সোনাঝুরি! সোনাঝুরি মরল কী বাঁচল আই ডোন্ট কেয়ার!”
পুশকিন যে কাজটা নিয়ে খুব খাটছে, সেটা দীপমালাদেবীর কথাতেই বস বুঝে গিয়েছিলেন। নোঈ আড়চোখে তাকিয়েছিল আপনের দিকে। দেখেছিল, প্ল্যান আর আশা সবেতেই ছাই পড়ছে দেখে কেমন যেন চোয়াল ঝুলে গিয়েছিল লোকটার।
বস ফোনটা শেষ করে চুপ করে বসেছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর ওদের বসতে বলে চলে গেছিলেন নিজের চেম্বারে।
সবাই এই ঘরে চুপচাপ বসেছিল। নোঈ বুঝতে পারছিল যে, টেনশনের একটা চোরাস্রোত বইছে। এখানে কোনও কথা বলা ঠিক হবে না।
স্মরণ জলের বোতল থেকে জল খেয়ে হাত দিয়ে নিজের চুল ঠিক করার চেষ্টা করেছিল।
পুশকিন এর ভেতরেও হালকা গলায় বলেছিল, “ছেড়ে দাও, ও ঠিক হবে না!”
বস ফিরে এসেছিলেন দশ মিনিট পরে। তারপর পুশকিনের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “লাস্টলি আর-একবার ট্রাই করি! আমি বোর্ড থেকে আরও দু’-আড়াই মাস টাইম নিয়ে এসেছি। তার মধ্যে কি তুমি ব্যাপারটা করতে পারবে?”
“আমি পারব ম্যাম,” আপন এবার নিজের নাকটা গলিয়ে দিয়েছিল।
“তোমায় জিজ্ঞেস করেছি? নিজের কাজটা কি পারো? ফলতার কাজটাও তো ড্র্যাগ করতে শুরু করেছে। সো স্টে আউট অফ ইট!”
“আমি পারব ম্যাম,” পুশকিন সোজা তাকিয়েছিল বসের দিকে।
সামনে খোলা ট্যাবের ওপর আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে বস বলেছিলেন, “ইউ বেটার ডু সামথিং। সামনে তোমাকে আর-একটা প্রজেক্টে আমরা ডিপ্লয় করব। বাট এটা আপাতত টপ প্রায়োরিটি। ইউজ় এভরি মেথড। লিভ নো স্টোন আনটার্নড। তুমি জানো হোয়াট মে কাম হ্যান্ডি!”
স্মরণ নেমে গিয়েছে রাসবিহারীতে। কী একটা নাকি কাজ আছে! কী কাজ আর নোঈ জিজ্ঞেস করেনি। করলেই হয়তো বলবে প্যাঁওয়ের জন্য কিছু কিনতে হবে!
বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড়াল। নোঈর খারাপ লাগছে। ও পুশকিনকে বলেছিল যে, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে পুশকিন আগে নেমে যাক। গাড়ি তো আছে, ও চলে যেতে পারবে। কিন্তু পুশকিন শোনেনি ওর কথা। তবে বাকি পথটা কথাও বলেনি তেমন। এমনকী, একবারও নোঈর হাতটাও ধরার চেষ্টা করেনি। গাড়ি তো ফাঁকা, তা হলে কেন!
নোঈর খারাপ লাগছে। পুশকিন কেন এমন দূরে-দূরে থাকছে! তা হলে কেন সেদিন চুমু খেয়েছিল! সেটা কি তা হলে একটা ফ্লিটিং ফিলিং! একটা ইমপাল্স! ছেলেরা কি এমনই হয়? এমন স্বার্থপর, শরীরসর্বস্ব? পুশকিনের ইচ্ছে করছিল বলেই কি কাছে এসেছিল? এতে নোঈর যে খারাপ লাগতে পারে, সেটা কি একবারও ভাবেনি?
আচমকা মনের মধ্যে কেমন একটা অভিমান জন্মাচ্ছে নোঈর। মনে হচ্ছে, ও তো বারবার কাছে যাচ্ছে। কেয়ার দেখাচ্ছে। পুশকিন কেন এমন দূরে ভেসে ভেসে আছে!
নোঈ সারাটা পথ আর কথাই বলেনি। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। একবার মনে পড়েছিল আপনের কথাগুলো। ও জানে আপন জেলাস। তাই এসব নোংরামো করেছে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য এখন মনে হল, এসব যদি সত্যি হয়!
গাড়ি থেকে নেমে আর পিছন দিকে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছিল নোঈ।
“কী হল?” ডাকল পুশকিন।
নোঈ মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
পুশকিন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে নোঈর জ্যাকেটটা ঠিক করে দিয়ে চাপা গলায় বলল, “গাড়িতে ড্রাইভার আছে। অমন রাগ করে না।”
“গাড়িতে আছে, সব জায়গায় থাকে না কিন্তু!” নোঈ বলতে চায়নি, কথাটা কেমন যেন বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।
“আই লাইক ইউ সো মাচ, গার্ল। ইউ আর সো প্রিটি! আর এত ভাল তুমি! ইট ইজ় হার্ড টু রেজ়িস্ট। কিন্তু তুমি আমার চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট। অ্যান্ড আই হ্যাভ আ পাস্ট নোঈ। তোমায় কী যে বলি! আমি… ”
আলতো কুয়াশা পড়ছে শহরে। ফিনফিনে একটা ওড়না কে যেন আস্তে-আস্তে নামিয়ে আনছে কলকাতার মাথায়। চারিদিক যেন পুরনো বাংলা ছবির মতো সাদা-কালো হয়ে আছে। নোঈ তাকাল পুশকিনের দিকে। আলোছায়ায় কেমন যেন রহস্যময় লাগছে ওকে। ছোট্ট ঠোঁট। টিকালো নাক। হাসলে সামান্য টোল পড়ে এমন গাল। নোঈর মনে হল ও আলাদা থাকতে পারছে না যেন।
নিজেকে অনেক কষ্টে আটকাল ও। তারপর ফিসফিস করে বলল, “সবার একটা পাস্ট থাকে। আয়্যাম নট ইন্টারেস্টেড ইন দ্যাট! শুনুন, এই প্রজেক্টের পরে যেখানে যাবেন, আমায় নিয়ে যাবেন। আমি একা থাকব না কলকাতায়!”
পুশকিন হাসল।
নোঈ আবার বলল, “আর-একটা কথা। আমার বাড়ির সামনে এটা। এখানে এই আফটার শেভটা মেখে আমার এত কাছে আসবেন না। বুঝলেন? আমি আসি।”
আর অপেক্ষা না করে, নোঈ প্রায় দৌড়ে ঢুকে গেল ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে। কিন্তু মনে মনে যেন দেখতে পেল, আলতো কুয়াশার মধ্যে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুশকিন। আলো-ছায়ায় ওর কিছুটা দেখা যাচ্ছে। কিছুটা দেখা যাচ্ছে না!
বাড়িতে ঢুকে ব্যাগটা নিজের ঘরের বিছানায় ছুড়ে রাখল নোঈ। তারপর বাথরুমে ঢুকে গিজারের সুইচটা অন করে দিল। রাত হলেও, স্নান না করলে আজ অসুবিধে হবে ওর।
ও দেখল ওকে দরজা খুলে দিয়ে বাবা আজ বসার ঘরেই বসল। আশ্চর্য হল নোঈ। বাবা এখানে কেন? নিজের ঘরে থাকে তো এমন সময়! খুব একটা বেরোয় না।
“নোঈ, শোন,” মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ডাকল এবার।
নোঈ ভেবেছিল মুখটা একটু ধুয়ে তারপর স্নান করতে যাবে। কিন্তু মা এমন করে ডাকল যে, ও থমকে গেল। মায়ের গলার ভেতরে আজ কিছু একটা আছে। অশান্তির গন্ধ পাচ্ছে ও! সারা দিন পরে নোঈর আর ভাল লাগছে না এসব। আজ আবার কী শুরু করবে মা!
“বলো,” মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নোঈ।
“তুই শেষপর্যন্ত ওই দোজবরের সঙ্গে ঘুরছিস!”
“কী? মানে?” নোঈ তাকাল অবাক হয়ে। কী বলছে মা!
“ওই পুশকিন। ওর বউ তো মারা গিয়েছে। জানিস না? তোর চেয়ে কত বড়! তার সঙ্গে তুই… এত রাত করে তোকে বাড়ি ছাড়তে আসছে। মাথায় মাথা ঠেকিয়ে কী এত গুজগুজ করছিলি, হ্যাঁ? আমাদের এই পাড়ায় থাকতে দিবি না? মানসম্মান কিছুই কি রাখবি না?”
“কী বলছ!”
মা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সেই জন্য তোকে চাকরি দিয়েছে! কচি মেয়েদের মাথা খেতে ভাল লাগে! আর তুই! তুইও তার সঙ্গে হোটেল-রেস্তরাঁ করে বেড়াচ্ছিস!”
“মানে? আরে, যা খুশি তাই বলে যাচ্ছ!” কী বলবে বুঝতে পারল না নোঈ।
“কেন কিছুদিন আগে তুই ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসের ওখানে ওর সঙ্গে একটা রেস্তরাঁয় যাসনি? বিকেলে? তুই কি ভাবিস কলকাতায় সবাই অন্ধ? কেউ কিছু দেখে না?”
নোঈ দেখল বাবা চুপ করে বসে আছে। মায়ের রাগ যেন বাড়ছে আরও।
মা বলল, “তোর দিদি সম্বন্ধ পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। এবার তোকে বিয়ে দিয়ে দেবই। অনেক হয়েছে চাকরি। আর করতে হবে না কাজ। কাজের নাম করে কী হচ্ছে যেন বুঝতে পারছি না!”
“কে বলেছে তোমায় এসব?” নোঈ চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করল।
“যে বলেছে, সে দেখেই বলেছে। কাক চোখ বন্ধ করে গু খেয়ে ভাবে কেউ দেখছে না। কিন্তু সবাই দেখে। তোকেও দেখেছে। ছিঃ, তুই এভাবে আমাদের মুখে চুনকালি মাখাচ্ছিস! শেষে একটা আধবুড়ো…”
নোঈর সারা গা-হাত-পা কাঁপছে রাগে। বিকেল। রেস্তরাঁ। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনস। ওকে কে দেখেছে ও জানে। ভিড়-রাস্তার অন্য ফুটে কিছুটা দূরে ছিল নোঈ। কিন্তু তাও ওর চোখ এড়ায়নি। মা বলে যাচ্ছে এখনও, কিন্তু ওর আর কিছু মাথায় ঢুকছে না। কান লাল হয়ে গিয়েছে নোঈর। বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে! আর ওর চোখের সামনে ভাসছে সেই বিকেলটা। ভাসছে, রাস্তা টপকে একটু দূরে একটা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আইকা।
.
৩২. পুশকিন
সেদিন মেঘ ছিল আকাশে। গাছের ছায়া আরও একটু বেশি ছায়াময় ছিল যেন। উলটো ফুটের বিশাল বড় বিল্ডিংটাকে রাক্ষস মনে হচ্ছিল পুশকিনের। মনে হচ্ছিল একটু পরেই এটা সামনে ছড়ানো মানুষগুলোকে আবার গিলে নেবে! হাতে ধরা স্যান্ডউইচের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পুশকিনের নিজেকেও তেমনই একটা খাবার মনে হয়েছিল।
আর ঠিক তখনই কান্নার শব্দটা ভেসে এসেছিল গাছের অন্যদিক থেকে। কে কাঁদছে এভাবে? পুশকিন ডান দিকে তাকিয়েছিল। রাস্তার এই দিকটায় সারি-সারি পাম গাছ। তার মাঝে কয়েকটা সবুজ রঙের বেঞ্চ পাতা ছিল। পুশকিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে পাশের বেঞ্চটা গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। কান্নার আওয়াজ শুনে পুশকিন দু’পা পিছিয়ে গিয়ে উঁকি দিয়েছিল। আর প্রথম দেখেছিল ওকে। স্মিতাকে।
হাতে একটা স্কার্ফ। তাতে মুখ গুঁজে কাঁদছে স্মিতা। পিঠ ফুলে-ফুলে উঠছিল ওর। পাশের বেঞ্চে রাখা খাবারের প্লেটটা পড়ে ছিল অবহেলায়। কী করা উচিত এখন? পুশকিন তাকিয়েছিল। তাকিয়েই ছিল। স্মিতা মুখ তুলেছিল কিছু সময় পরে। আর থমকে গিয়েছিল পুশকিন। এ মেয়ে এমন করে কাঁদছে! ওর মনে হয়েছিল মাখন থেকে ছুরি দিয়ে কেটে মেয়েটার মুখ বের করে এনেছেন ভগবান! পুশকিন হাঁ করে তাকিয়েছিল স্মিতার দিকে। এমন খাড়া আপ-টার্ন নাক! এমন বড়-বড় চোখ! চোখের পাতা! এমন গায়ের রং! এমন মেয়েরা কাঁদলে তো পৃথিবীতে ন্যায়বিচার বলে আর কিছু থাকবে না!
পুশকিন কী করবে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু কিছু একটা করতে ওর ইচ্ছে করছিল খুব। এভাবে কারও দিকে অসভ্যের মতো তাকিয়ে থাকতে নেই ও জানে। কিন্তু তাও নিজেকে কিছুতেই আটকাতে পারছিল না। তাকিয়েই ছিল স্মিতার দিকে। এই ক’দিন আসছে এই অফিসে, কিন্তু এই মেয়েটাকে তো আগে দেখেনি! রাক্ষস কোন কুঠুরিতে আটকে রেখেছিল একে!
স্মিতা এবার ঘুরে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মেয়েটার ঠোঁটের ওপর একটা তিল আছে। পুশকিনের মনে হয়েছিল মাটির মধ্যে যেন আরও কয়েক ফুট গেঁথে গেল ও!
স্মিতা কিছু না বলে তাকিয়েছিল সোজা। মেঘ ছিঁড়ে একটা রোদের স্তম্ভ যেন নেমে এসেছিল স্মিতার দিকে। স্পটলাইট! পুশকিন বুঝতে পারছিল, ওর জীবনটা আজকে, এই দিন থেকে পালটে গেল একদম।
স্মিতা কিছু জিজ্ঞেস করার মতো অবস্থায় ছিল না। শুধু কষ্টে নুইয়ে আসা চোখ নিয়ে ও তাকিয়েই ছিল। সব পুরুষের বুকের ভেতরে ছোটবেলা থেকে যে-ছদ্মবেশী রাজপুত্রটা বসে থাকে, যে কোনও একদিন কাল্পনিক দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচাতে চায় রাজকুমারীকে, সেই রাজপুত্রটা বেরিয়ে এসেছিল পুশকিনের বুকের ভেতর থেকে। তবে কোমর থেকে তরোয়াল বের করে নিয়ে নয়, বাঁ হাতে ধরা ছোট জলের বোতলটা বাড়িয়ে স্মিতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল পুশকিন।
স্মিতা সময় নিয়েছিল সামান্য। তারপর হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল জলের বোতলটা। কোনও কথা বলতে পারছিল না পুশকিন। ও শুধু তাকিয়ে ছিল। স্মিতা সময় নিয়ে ধীরে-ধীরে জল দিয়েছিল চোখে-মুখে। তারপর ফিরিয়ে দিয়েছিল বোতলটা। পুশকিন যন্ত্রচালিতের মতো বোতলটা ফেরত নিয়েছিল। তারপর অন্য হাতের স্যান্ডউইচটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
স্মিতা তাকিয়ে ছিল সামান্য সময়। চোখে বিস্ময়। কিন্তু তারপর পুশকিনকে চমকে দিয়ে হাত বাড়িয়ে নিয়েছিল স্যান্ডউইচটাও। পুশকিন আর কিছু না বলে পায়ে-পায়ে গিয়ে বসে পড়েছিল পাশে।
সেই শুরু। তারপর তিনবছর স্মিতার সঙ্গে ঘুরেছিল ও। স্মিতা সমস্ত কথা বলত পুশকিনকে। ওর বাবার ছোটবেলায় মারা যাওয়ার কথা। তার কাকাকে মায়ের বিয়ে করার কথা। স্কুলের কথা। প্রথম প্রেমের কথা। বলেছিল ওর সমস্ত কান্নার কথাও। পরে একদিন, বেঞ্চে বসে সেই কান্নার কথাটা বলতে গিয়ে স্মিতা বলেছিল, “তমাল আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ছ’বছরের রিলেশন ছিল আমাদের। সেখানে আমায় ছেড়ে ও অন্য একজনকে বিয়ে করে নিল! বাবা মারা যাওয়ার পরে, আমার মা আমার কাকাকে বিয়ে করেছে শুনে, ওদের বাড়ির লোকজন ওকে সরে আসতে বলেছিল আমার কাছ থেকে। ওর মা আর বাবা খুব অশান্তি করেছে সেই ব্যাপারে। তাই তমাল আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। একবারও আমার কথা ভাবেনি। আমি যে ওকে ছাড়া থাকতে পারব না, তাও মনে রাখেনি। যেসব কথা দিয়েছিল, প্রমিস করেছিল সব ভুলে গিয়েছিল নিমেষে।”
এইসব কথা প্রায়ই বলত স্মিতা। পুশকিনের কষ্ট হত খুব। মনে হত, কে যেন বুকের মধ্যে বসে মাটি কোপাচ্ছে! কিন্তু তাও ও শুনত। স্মিতা যে ওর কাছে আসছে, ওর পাশে বসছে, ওকে ব্যক্তিগত কথা বলছে সেসব ভেবেই নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু সত্যি কি আর খুশি হত? হত না। বরং ক্রমে বুকের মধ্যে বিষ জমছিল ওর। মনে হচ্ছিল রক্তের মধ্যে মিশে যাওয়া এই বিষ ওকে পাগল করে দেবে!
তাই একদিন ও ঠিক করে নিয়েছিল, আর নয়। আর স্মিতার কাছ থেকে তমালের কথা শুনবে না। বরং স্মিতার সঙ্গে আর কথাই বলবে না। সামনে থেকেও যে-মেয়েটা ওর হবে না কোনওদিন, তার ওপর মায়া বাড়িয়ে কী লাভ! মানুষ নিজেকে যদি সুখ দিতে না-ও পারে, নিজেকে কষ্ট দেওয়ারও কোনও মানে হয় না।
স্মিতা চাকরি করত ওই বিল্ডিং-এরই অন্য একটা সফ্টওয়্যার ফার্মে। টিফিনে দেখা করত ওরা। আর ছুটির পরে একসঙ্গে ফিরত।
এই সিদ্ধান্তের পরের দিন আর টিফিনে পুশকিন গেল না বাইরে। ছুটির পরও ফিরল না একসঙ্গে। একদিনটা তারপর দু’দিন হল। দু’দিনটা চারদিন। আর চারদিন ঘুরে গেল এক সপ্তাহে। পুশকিন আর সামনেই যেত না স্মিতার।
তারপর একদিন কলকাতায় বৃষ্টি হল খুব। সবকিছু ডুবে গেল চারিদিকে। শুধু দ্বীপের মতো জেগে রইল অফিসের কাছের একটা বাসস্টপ আর ফুটপাথ।
তারই একটায় দাঁড়িয়ে সেদিন পুশকিন চেষ্টা করছিল কী করে বাড়ি ফেরা যায়। সন্ধে হয়ে এসেছিল প্রায়। অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল! আকাশে কাকের পালকের মতো রঙের মেঘ এসে জমছিল ক্রমে। সারা দিনের কাজের পর পুশকিনের আর কিছু ভাল লাগছিল না। স্মিতার কাছ থেকে সরে এলেও মনে মনে যে সরে আসতে পারেনি, সেটা বুঝতে পারছিল প্রতিমুহূর্তে। শূন্যতাও যে এমন ধারালো হয়, সেটা ভাবতে পারেনি কোনওদিন। সারাক্ষণ কেমন একটা অনিচ্ছে আর বিষাদ যেন মুড়ে ছিল ওকে। দম দেওয়া পুতুলের মতো ঘুরতে-ঘুরতে সেদিন ওই ছোট্ট দ্বীপের মতো বাসস্টপে দাঁড়িয়ে, ওরকম ঝিমধরা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে কেমন অপ্রয়োজনীয় আর ফালতু মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পুতুলের দম এবার ফুরিয়ে এল প্রায়! আর চলতে পারবে না। আর তখনই জল কেটে একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে।
কোমর অবধি জল ছিটকে এসেছিল পুশকিনের। খুব বিরক্ত হয়েছিল ও। ভেবেছিল কিছু বলবে। কিন্তু তার আগেই পেছনের দরজার কাচটা নামিয়ে বেরিয়ে এসেছিল একটা মুখ। স্মিতা! বলেছিল, “আর বাহাদুরি না দেখিয়ে উঠে এসো গাড়িতে।”
পুশকিন দ্বিধা নিয়ে তাকিয়েছিল। কেন কে জানে, আচমকা এক আকাশ মেঘের মতো অভিমান এসে ভিড় করেছিল ওর মনে।
“কী হল, এসো!” স্মিতা এবার ধমক দিয়েছিল। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তাকাচ্ছিল ওদের দিকে। অফিসের দু’-চারটে পরিচিত মুখও ছিল সেই বাসস্টপে। তারাও তাকাচ্ছিল। তবে সেই সব লোকজন বেশি দেখছিল স্মিতাকেই। মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল পুশকিনের। হিংসের সবুজ দৈত্য কামড় দিয়েছিল ওর বুকে।
যদিও মনের ভেতরে দুটো পুশকিনের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। একজনের যেমন হিংসে হচ্ছিল, তেমন আর-একজনের মনে হচ্ছিল, পুশকিন না এর থেকে সরে আসতে চাইছে! তা হলে! তা ছাড়া স্মিতা তো সারাক্ষণ ‘তমাল, তমাল’ করে কানের মধ্যে তমালগাছের জঙ্গল তুলে দিল! তা হলে কে ওকে দেখছে, কে দেখছে না তাতে পুশকিনের কী এসে গেল!
মানুষের মাঝে মাঝে কীসে যে কী এসে যায় তার উত্তর মানুষের নিজের কাছেও থাকে না!
“কী হল? নেমন্তন্নের কার্ড ছাপাতে হবে?” স্মিতা ধমক দিয়েছিল এবার।
পুশকিন আর কিছু না ভেবে, মনের মধ্যে পাকিয়ে ওঠা ঝগড়াটাকে মুলতুবি রেখে উঠে পড়েছিল গাড়িতে। আর তখনই আবার বৃষ্টি নেমেছিল ঝেঁপে!
গাড়িটা চলছিল বৃষ্টিতে আবছা একটা শহরের মধ্য দিয়ে। চারদিকের কাচ তোলা ছিল। সামনে বৃদ্ধ চালক একমনে তাকিয়ে ছিল পথের দিকে। পুরনো ওয়াইপারের ঘটঘট শব্দ আর ট্যাক্সির চালে ঝামরে পরা পিটার-প্যাটারের মধ্যে পুশকিন বসেছিল মাথা নিচু করে।
স্মিতা ওর কাঁধ ধরে জোর করে ঘুরিয়েছিল নিজের দিকে। তারপর রাগের গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে তোমার? আমায় এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? আমি কী করেছি? বলো। কী হয়েছে আজ বলতেই হবে!”
পুশকিন তাও মাথা নিচু করে বসেছিল। কিছু বলছিল না।
স্মিতা এবার ওর থুতনি ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়েছিল জোর করে, “কী হল, বলো? এমন করছ কেন?”
পুশকিন এবার তাকিয়েছিল স্মিতার দিকে। বুকের ভেতরে কেমন একটা বেলুন ফুলছিল যেন। আটকে আসছিল দম। কষ্ট হচ্ছিল ওর। মনে হচ্ছিল বেলুনের সঙ্গে ও নিজেও হয়তো বোমার মতো ফেটে পড়বে! ওর গা ঘেঁষে বসেছিল স্মিতা। পারফিউমের ছোট ছোট ফুল ঝরে পড়ছিল স্মিতার প্রতিটা নিশ্বাসের সঙ্গে। ক্রমশ অবশ হয়ে আসছিল পুশকিন। বুঝতে পারছিল এমন ঘূর্ণিতে ও পড়ে গিয়েছে, যেখান থেকে ওর বেরোনোর আর কোনও উপায় নেই!
“আচ্ছা, আর কিচ্ছু বলতে হবে না,” স্মিতা আচমকা ঘুরে বসেছিল।
পুশকিন ছিটকে উঠেছিল। ওর বুকের ভেতরের চুপ করে থাকা ছেলেটা এবার চাপা পড়া পিঁপড়ের মতো হাত-পা ছুড়ছিল। এ কী হল! স্মিতা রাগ করল নাকি! ঘাবড়ে গিয়েছিল পুশকিন। বেশি টেনে ফেলেছে কি নিজের মনখারাপটা? কাঙালের মতো করে উঠেছিল মনটা! আর নিজেকে আটকাতে পারেনি পুশকিন। মাথা নিচু করে বলেছিল, “বলছি তো! অত রাগ করো কেন?”
“স্যার, পরের স্টেশনটায় নামব,” স্মরণের কথায় ফিরে তাকাল পুশকিন। ওর সিটের উলটোদিকে বসে রয়েছে স্মরণ। আর স্মরণের পাশে বসে আছে নোঈ।
দুপুরের ট্রেন। ভিড় নেই তেমন। শিয়ালদহ থেকে বসার জায়গা পেয়ে গিয়েছিল ওরা। পুশকিন ঘড়ি দেখল। প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। গাড়িতে এলে কি আরও তাড়াতাড়ি হত না!
স্মরণ দেখল, পুশকিন ঘড়ি দেখছে। ও বলল, “ট্রেনে তাড়াতাড়ি হল স্যার। সোনাঝুরির যাওয়ার রাস্তায় ফ্লাইওভার হচ্ছে। ওটা স্যার এখন আর রাস্তা নেই। ছোট গাড়ি গেলে উলটে যাবে নির্ঘাত। কী সাংঘাতিক যে অবস্থা! গাড়িগুলো পুরো র্যাফটিং-এর মতো করে দুলতে-দুলতে যায়। হয় আপনার শিরদাঁড়া পৌঁছবে নয়তো আপনার কোমর পৌঁছবে! দুটো কিছুতেই এক সঙ্গে পৌঁছবে না। তাই বললাম ট্রেনে চলুন।”
ট্রেনে যেতে অসুবিধে নেই পুশকিনের। বরং ভালই লাগছে। শীতের দুপুর। মফস্সলের ছোট ছোট স্টেশন। ট্রেনে ওঠা নানা ধরনের হকার। লজেন্সওয়ালা, বাদামওয়ালা, হজমের গুলি বিক্রেতা। কতদিন পরে এদের দেখছে পুশকিন! হ্যাঁ, এখানে ট্রেনগুলো একটু নোংরা, যেসব মানুষ ওঠে, তাদের অনেকেরই হাইজিন ভাল নয়। কিন্তু তাও বেশ লাগছে পুশকিনের। শিয়ালদা থেকে কুড়ি কিলোমিটার যাওয়ার পরেই কেমন যেন শহরটা ফুরিয়ে গেছে। বেশ বড় বড় ধানখেত। দিঘি। কলাবন। পুকুর ঘিরে ভিড় করে আসা তালবাগান। কতদিন পরে এসব দেখছে পুশকিন! জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে। এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল। শীতের রোদ কমলা রাংতার মতো ছড়িয়ে আছে জানলার পাশে। মাঝে মাঝে বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। খড়-ছাওয়া মাটির বাড়ি। টিনের ছাদওয়ালা ইটের বাড়ি। ফাঁকা খেতে ক্রিকেট খেলছে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে। কোথাও মাইক বাজছে। রাস্তার ওপর লেবেল ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে আছে টেম্পো, ম্যাটাডোর, সাইকেল। নানা পাখি উড়ছে। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে পাশের মেঠো পথ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে ছোট মেয়ে। আর এইসব ছাড়িয়ে ঝমঝম করে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন। রেলগাড়ি। পুশকিনের আবার নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে!
“স্যার, নেমে রিকশা নিয়ে নেব। ওঁর অফিসটা একটু দূরে,” স্মরণ বলল।
পুশকিন বলল, “তুমি এত চিন্তা করছ কেন? ঠিকই সব হবে। ডোন্ট ওয়ারি।”
স্মরণ হাসল। পুশকিন দেখল, নোঈ চুপ করেই আছে। বেশ শব্দ হচ্ছে ট্রেনের। ধাতব ঝমঝমের ওপর গলা তুলে কোনও কথা বলাই মুশকিল। তাই নোঈ হয়তো চুপ করে আছে। কিন্তু পুশকিনের মনে হল আরও কিছু ব্যাপার ঘটেছে। আজ সকাল থেকেই মেয়েটা কেমন চুপচাপ। কথা কম বলছে। তবে পুশকিনও ঘাঁটাচ্ছে না। আন্দাজ করছে বাড়িতে কোনও ঝামেলা হয়েছে। মানে, সেই সম্ভাবনাই তো বেশি। সেদিন আইকা এসে যা বলে গিয়েছে, তাতে অন্তত সেটাই মনে হচ্ছে পুশকিনের।
বহুদিন পরে আইকাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল পুশকিন। আইকা নিজের গাড়ি নিয়েই এসেছিল ওর ফ্ল্যাটে। পুশকিন ভেবেছিল, হঠাৎ কেন এল মেয়েটা! কোনও দরকার আছে কি? তা ছাড়া এখানে তো আগে আসেনি? তা হলে আইকা জানল কী করে এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা? ও তো নিজে বলেনি কোনওদিন!
“ভেতরে আসতে বলবি না?” আইকা তাকিয়েছিল পুশকিনের দিকে।
পুশকিন সদ্য অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক পালটে ল্যাপটপটা নিয়ে বসেছিল। বুদাপেস্টের কাজটার কিছু কারেকশন ছিল। সেটা শেষ করে দু’দিনের মধ্যে জমা দিতে হত, তাই টেনশন ছিল একটু।
নিজের অজান্তেই হাতঘড়ির দিকে চোখ চলে গিয়েছিল পুশকিনের। রাত ন’টার সময়ে এখানে কী করছে মেয়েটা!
ও সরে দাঁড়িয়েছিল দরজা থেকে। আইকা ঘরে ঢুকেছিল। হাতব্যাগটা সোফার ওপর রেখে সময় নিয়ে ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল গোটা ঘরটা।
প্রায় আড়াই হাজার স্কোয়ার-ফিটের ফ্ল্যাট। বসার ঘরটাও বেশ বড়। পুশকিন ছিমছাম জিনিস পছন্দ করে। তাই ঘরটাকেও সেইভাবেই সাজিয়েছে। একটা ছোট টেবিল ল্যাম্প জ্বলছিল শুধু ওর কাজ করার জায়গাটায়। তার কমলা রঙের আলো কেমন যেন ছড়িয়ে, মিশে যাচ্ছিল মেরুন অন্ধকারে।
আইকা একটা সিঙ্গল সোফায় বসেছিল। তারপর বলেছিল, “কী রে, বোস। তুই নিজের বাড়িতেই আছিস।”
পুশকিন হেসেছিল সামান্য। দু’পা এগিয়ে বসেছিল সামনের একটা চেয়ারে। বলেছিল, “তুই হঠাৎ এমন আন-অ্যানাউন্সড?”
“আমি কোথাকার রাজা যে, আসার আগে সবাইকে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলে আসতে হবে? জানি তুই বিরক্ত হচ্ছিস। কিন্তু আমি কাজেই এসেছি!”
“বিরক্ত হব কেন?” পুশকিন হেসেছিল আবার।
“শোন, আমি কি কিছুই বুঝি না! ফালতু ঢং করিস না। আমি জানি ক্লাস টুয়েলভের সেই ব্যাপারটা তুই ভুলতে পারিসনি। কিন্তু এটা একবারও ভেবে দেখিসনি যে, আমারও বয়স তখন কত কম ছিল! আমারও ভুল হতে পারে। একটা ব্যাপারের জন্য এখনও এতটা হেট্রেড কেন পুশকিন?”
“হেট্রেড!” ভুরু তুলেছিল পুশকিন, “হেট ইজ় আ স্ট্রং ওয়ার্ড! সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।”
“তা হলে? হোয়াই ডু ইউ অলওয়েজ় রান আওয়ে ফ্রম মি?”
“আমি কারও কাছ থেকে পালাই না আইকা। আমি এমনই। কী করব বল। সবার কাছ থেকে সরে থাকি আমি। আয়্যাম আ লোনার আই গেস। আই লাইক টু স্টে আওয়ে।”
“এত অসামাজিক! কিন্তু সবার সঙ্গে তো নয়!”
“অসামাজিক হলে অসামাজিক! আর সবার সঙ্গে নয় মানে?” পুশকিন হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠেছিল। আইকার কথাটা কোনদিকে বাঁক নিচ্ছে!
“মানে তুই ভাল করেই জানিস!” আইকা ভুরু কুঁচকে অস্থির হয়েছিল সামান্য।
পুশকিন কথা ঘোরানোর জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “কফি খাবি?”
“না, তুই বোস!” আইকা ওর হাত ধরে আবার টেনে বসিয়ে দিয়েছিল, “তুই কী করছিস পুশকিন? যা করছিস ভেবে করছিস তো?”
“মিনিং হোয়াট?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “কী বলতে চাইছিস সোজা করে বল।”
“আবার ঢং করছিস! আগে তো এত ঢং করতিস না? আজকাল কী হয়েছে তোর?” আইকা মাথা নেড়েছিল বিরক্তিতে।
“আমি জানি না। এসব বলতে এসেছিস এত রাতে! আমার কিন্তু কাজ আছে।”
“সোনাঝুরি তো? আমাদের কম্পিটিটর ছিলি তোরা। এত লেট হয়ে গেল প্রজেক্ট যে, আমাদের কোম্পানি বোধহয় আর করবে না কাজটা। তুই তো ইনচার্জ, না?” আইকা জিজ্ঞেস করেছিল।
“প্লিজ় উই শুড নট ডিসকাস জব হিয়ার!”
“আমি তোর ওপর স্পায়িং করতে আসিনি। এসেছি তোকে বলতে যে, মাথায় রাখিস, নোঈর বয়সটা তোর চেয়ে অনেক কম।”
“আরে!” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না, “এসব কী বলছিস তুই?”
“শোন, নোঈ খুব সুন্দরী, যে-কোনও ছেলের মাথা ঘুরে যাবেই। তোরও গেছে। প্লাস তুই তো একা। কাছে থাকিস ওর। ফলে…”
“ওয়েট, ওয়েট,” পুশকিন সামনের দিকে ঝুঁকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল আইকার দিকে, “তোর ব্যাপারটা কী? আমি কী করেছি?”
“নোঈর সঙ্গে তুই ইনভলভড নোস? আমি কিন্তু নিজে তোদের দু’জনকে দেখেছি দূর থেকে। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনসের একটা রেস্তরাঁয় ঢুকছিলি।”
“এখনও একটা ছেলে আর একটা মেয়ে কোথাও গেলে লোকে এই চোখে দেখে সেটাকে!” পুশকিন হাত নেড়ে ব্যাপারটাকে সহজ করার চেষ্টা করেছিল।
“আমায় বোকা পেয়েছিস? বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখে কি কিছু বোঝা যায় না?”
হেসে ফেলেছিল পুশকিন। আজকাল সবাই এসব কথা কোথা থেকে শেখে কে জানে! বডি ল্যাঙ্গোয়েজ! গত দশ বছরে বাঙালি এত নতুন শব্দ শিখে ফেলেছে যে, তার চোটে চোখে অন্ধকার দেখছে! এটাও তার একটা।
পুশকিন উঠে সামনে খোলা জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। লেকের ওদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল। বাইরের অন্ধকারের মধ্যে টিপটিপ আলো জ্বেলে যাচ্ছিল সার সার গাড়ি।
“উঠে গেলি কেন?” আইকা নিজেও উঠে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে, “তোর ভাল লাগে নোঈকে? সোজা উত্তর দিবি। আমি সেদিন দেখেছি, নোঈ কীভাবে তোর গাল থেকে কী একটা সরিয়ে দিয়েছিল। দূরে, গাড়িতে আমি আর মা ছিলাম। নোঈ কারও সঙ্গে এমন করে না। কারও কাছে যায় না। আমি ওকে চিনি। ওর যে তোকে পছন্দ, আমি বুঝতে পারছি। না হলে ও কখনও ওর বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে না!”
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারেনি প্রথমে। তারপর বলেছিল, “দেখ, তোকে একটা কথা বলি। আমার জীবনটা সহজ নয়। আমার অতীতটাও নয়। আমি জানি সেটা। আর তাই…”
“তুই কি নোঈকে পছন্দ করিস? সোজা বল। ঘোরাবি না কথা। এই সব বেকার অতীত-টতিত বলবি না। হ্যাঁ কি না বল!” আইকা পুশকিনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কেমন যেন কোণঠাসা করে দিয়েছিল।
পুশকিন সময় নিয়েছিল। আইকার দিকে তাকিয়ে ঘরের নরম আলোর মধ্যে ওর মনের ভাবটা বোঝার চেষ্টা করছিল। কেন এমন রাতে এল আইকা? কী চায় আসলে? এমন করে জেরা করছে কেন?
পুশকিনের হঠাৎ মনে হয়েছিল, এসব কী ভাবছে ও! জীবনে সহজভাবে সত্যিটা বলে দিলে তো আর কোনও ঝামেলাই থাকে না। ও কেন সেখানে এত মাপজোক করছে! কেন এটা-ওটা ভাবছে! আজও তো অনেস্টি ইজ় দ্য বেস্ট পলিসি। সত্যি বললে তো কোনও ল্যাঠাই থাকে না।
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “হ্যাঁ, নোঈকে আমার পছন্দ।”
আইকা স্থির হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বলেছিল, “কতদূর এগিয়েছে? মানে…”
“না। কাম অন! কী ভাবছিস তুই আমাকে!” পুশকিন বিরক্ত হয়েছিল।
আইকা বলেছিল, “আজকাল তো প্রেম আর ওসব আলাদা আলাদা। আমরাও ইউরোপিয়ান হয়ে গিয়েছি! তাই… আসলে কী জানিস দু’জনকে দেখলে বোঝা যায় যে, তারা কতটা ইন্টিমেট হয়েছে। তাই…”
“তুই এসব বলতে এসেছিস?”
আইকা থেমেছিল সামান্য সময়। যেন কিছুটা নিজের সঙ্গেই মনে মনে একটা তর্ক চলছিল ওর।
পুশকিন বলেছিল, “দেখ, আমি এমন কিছু করব না যাতে নোঈর ক্ষতি হয়। কাকু-কাকিমাকে বলিস এসব কিছু নয়। আমাদের তো কাউকে না কাউকে মনে মনে ভাল লাগেই। কিন্তু আমাদের তো বুঝতেও হয়, কী সম্ভব আর কী সম্ভব নয়। আমি জানি কী সম্ভব নয়। আমি এমন কিছু করব না, যাতে কারও ক্ষতি বা সম্মানহানি হয়!”
আইকা মন দিয়ে শুনেছিল কথাটা। তারপর বলেছিল, “আমি জানি। তাই তোকে সরাসরি এসে ধরলাম। আসলে নোঈ মনে হচ্ছে সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে। তবে শুধু এটা নয়…আসলে… আর-একটা কথা। আমার নিজের কথা। আমি যে কাউকে জিজ্ঞেস করব… তেমন কেউ নেই। তাই সেটা বুঝতে পারছি না। আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।”
পুশকিন অবাক হয়ে গিয়েছিল। আইকা সমস্যায় পড়ে ওর কাছে এসেছে কেন! তেমন তো কিছু বন্ধুত্ব নেই ওদের। মানে, পুশকিনের দিক থেকে তো নেই অন্তত। কিন্তু কেউ যদি এভাবে কিছু বলতে চায়, তা হলে মানুষ আর কী করবে! পুশকিন জানে, কারও কথা শোনাটাও খুব দরকার। মানুষ যত এগোচ্ছে, যত যোগাযোগের টেকনোলজি বাড়ছে, তত দ্বীপের মতো হয়ে যাচ্ছে মানুষ— টাওয়ার অব ব্যাবেল যেন! আইকার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খারাপ লেগেছিল পুশকিনের। মেয়েটার জীবনটা তো খুব কিছু সুখের নয়!
ও বলেছিল, “দাঁড়া, আগে কফি করি একটু!”
কফি করার সময় আইকা ওর ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখেছিল। তারপর রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “নিজেদের অত বড় বাড়ি। থাকিস না কেন রে ওখানে?”
হেসেছিল পুশকিন। বলেছিল, “আসলে অড আওয়ার্সে জব। তাই বাড়ির লোকের যাতে অসুবিধে না হয় সেজন্য। প্লাস আমার একাই ভাল লাগে।”
আইকা রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছিল এবার। ফ্রিজটা খুলে দেখেছিল ভেতরে কী আছে! বলেছিল, “সব তো দারুণ পরিষ্কার আর সাজানো দেখছি! আমারও একাই ভাল লাগে। শুভ মারা যাওয়ার পরে এতগুলো বছর তো একাই… তাই… আমারও ভাল লাগে এরকম। আর সেইজন্য বুঝতে পারছি না কী করব।”
“কেসটা কী?” কফির একটা বড় মাগ আইকার দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিন।
আইকা কফিটায় একটা চুমুক দিয়ে বলেছিল, “আমায় একজন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, জানিস?”
সোনাঝুরি স্টেশনটা মাঝারি মাপের। চারটে প্ল্যাটফর্ম। ওদের ট্রেন তিন নম্বরে ঢুকেছে। লোকজন কম এখন। কয়েকটা কুকুর এখানে-ওখানে ঘোরাফেরা করছে। একটা পাগল বসে রয়েছে সিমেন্টের সিটের ওপর। পুশকিনের বেশ লাগল। প্ল্যাটফর্মের শেষে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে। কিতকিত।
ওরা লেভেল ক্রসিং-এর দিকে হাঁটতে লাগল। এদিকটা বেশ ঘিঞ্জি। একটা মিষ্টির দোকান আছে। ট্রেন এসেছিল বলে লেভেল ক্রসিং-এর গেট পড়েছিল। এবার সেটা খোলায় গাড়ি সাইকেল, রিকশা, অটো সব মাতালের মতো টলতে-টলতে চলছে। সেইসব বাঁচিয়ে ওরা এগোতে লাগল।
স্মরণ বলল, “আপনারা স্যার আসুন, আমি আগে গিয়ে দুটো রিকশা দেখছি। আর ওখানে গিয়ে বলবেন না রিতুদার কথা। প্লিজ়।”
রিতুদা! হ্যাঁ তার সঙ্গে তো দেখা করেছে পুশকিন। আর দেখেছে লোকটার খাঁই তারকের মতো নয়। সামান্য সময় কথা হলেও, রিতুদা কিন্তু বারবার বলেছে, জুট মিলটা যে আবার নতুন উদ্যমে ওরা চালু করতে চায় সেটা পার্টির হাইকম্যান্ডের ভাল লেগেছে। বলেছে, ‘রিকো গ্রুপ’-এর চিন্তা নেই। তারককে ভয় পেতে হবে না।
এই লোকটা নাকি গুন্ডা ছিল। চোখমুখ দেখলে মনে হয় সেই পদার্থ এখনও রয়ে গিয়েছে ভিতরে। কিন্তু ওর সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেছিল। বলেছিল, কোনও কিছু দরকার হলে যেন বলে। রিতুদার ঘরের বাইরে একটা ছেলেকে দেখেছিল পুশকিন। লম্বা-চওড়া। পেটানো স্বাস্থ্য। কিন্তু মুখটায় একটা অদ্ভুত ইনোসেন্স আছে। দেখেছিল, স্মরণের সঙ্গে ছেলেটা হেসে কথা বলছে খুব। পরে জেনেছিল, এই ছেলেটাই যোগাযোগ করেছিল স্মরণদের সঙ্গে। নাম, মাহির।
পুশকিন আবার একবার নোঈকে দেখল। গম্ভীর। মাটির দিকে মুখ নামানো।
ও আলতো করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আজ?”
নোঈ কিছু না বলে তাকাল শুধু।
পুশকিন বলল, “এমন মুখ কেন?”
“আপনি তা হলে লক্ষ করেছেন?” নোঈর গলায় কেমন একটা রাগ।
“কী হয়েছে?” পুশকিন হেসে ব্যাপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করল।
“আমার আজ খুব ঝগড়া হবে!” নোঈ মুখটা শক্ত করে বলল।
“সে কী, কেন? কার সঙ্গে?” পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারল না।
নোঈ সামান্য থমকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল পুশকিনের দিকে। তারপর বলল, “আপনার সঙ্গে।”
“আমার সঙ্গে? আমি কী করলাম?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল নোঈর দিকে। এ কী বলে মেয়েটা!
পুশকিন আবার বলল, “ওই দ্যাখো, চুপ করে আছে! কী হয়েছে বলবে তো!”
নোঈ তাও কিছু বলল না। সামনে কিছু লোকজন থাকায় ওরা আস্তে হাঁটছে। পুশকিন বুঝতে পারল না ব্যাপারটা কী হয়েছে।
ও বলল, “ঠিক আছে, আমি যা করেছি তা ভুল হয়েছে। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে।”
“না, একদম এসব বলবেন না। সারাটা পথ একবারও আমার দিকে ভাল করে তাকিয়েছেন? একবারও আমার সঙ্গে… আমাকেই কেন বারবার কাছে যেতে হবে? কেন? যাকগে, আমি এখন আর কোনও কথা বলব না স্যার। তা হলে উলটোপালটা কিছু বলে ফেলব! তাই…”
হাঁটতে-হাঁটতে ওরা রিকশা স্ট্যান্ডের কাছে চলে এসেছে। পুশকিন দেখল স্মরণ একটা রিকশায় উঠে ওদের পেছনের রিকশাটায় উঠতে বলছে। পুশকিন কী করবে বুঝতে পারল না। দেখল, নোঈ নিজের কথাটা শেষ না করে স্মরণের পাশে উঠে বসল।
স্মরণ ঘাবড়ে গেল একটু। নোঈ গম্ভীর গলায় বলল, “সরে বোস। আর জামা এমন অর্ধেক গুঁজে রাখিস কেন? ঠিকমতো পরতে পারিস না!”
স্মরণ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “যাঃ শালা, আমি কী করলাম!”
পুশকিন আর কথা বাড়াল না। নোঈ রাগী খুব। জেদও আছে প্রচণ্ড। দেখলে শান্তশিষ্ট মনে হয়, কিন্তু পুশকিন দেখেছে শান্ত মেয়েগুলোই বেশি রাগী হয়! যেমন ছিল স্মিতা। শান্ত কিন্তু রাগী। আচমকা আবার স্মিতার কথা মনে পড়ে গেল পুশকিনের!
সেই গাড়ির ভেতরে স্মিতার পাশে বসে আচমকা ঘাম দিয়েছিল পুশকিনের। কেন কে জানে, নিজেকে আটকাতে পারছিল না ও। যে- কথাটা বলা উচিত নয় সেটাই যেন বেরিয়ে আসতে চাইছিল মুখ দিয়ে! পুশকিন জানত যে, স্মিতার তমালকে ভাল লাগে। তমাল ওকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে স্মিতা সারাক্ষণ ফরম্যালিনে ডুবে থাকা মৃত পায়রার মতো হয়ে থাকে। তবু কেন কে জানে, সেই বৃষ্টির ভেতরে নিজেকে আটকাতে পারেনি পুশকিন। কিছুতেই আটকাতে পারেনি। কে যেন ওর শরীরের ভেতর থেকে কথাগুলো বের করে এনেছিল।
পুশকিন বলেছিল, “আমি তোমার সামনে আসছি না কারণ, এলেই আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি জানি এই কষ্টের শেষ নেই। সমাধান নেই। তাই সরে আছি।”
“কেন?” স্মিতা পুশকিনের চোখে নিজের চোখ গেঁথে রেখেছিল একদম।
পুশকিন একবার আড়চোখে সামনে বসা ড্রাইভারকে দেখেছিল। কারও সামনে এত ব্যক্তিগত কথা ও বলে কী করে! আর স্মিতাই-বা কেন জিজ্ঞেস করছে! ওর এখন যা হাল তা দেখে কি বুঝতে পারছে না? কিন্তু মেয়েরা এমনই করে। হ্যাঁ করুক আর না করুক, সবটা শোনা তাদের চাই-ই চাই।
পুশকিন অস্থির হয়ে গিয়েছিল খুব। তারপর আর নিজেকে না আটকে বলেছিল, “আমার তোমাকে এত ভাল লাগে যে, সামনে এলে মনে হয় আমি জলের তলায় ডুবে যাচ্ছি! আমার… সব গুলিয়ে যায়! কিন্তু… আমি জানি তমাল তোমার সব। তাই নিজেকে কেন কষ্ট দেব ভেবে… মানে…”
“হ্যাঁ, তমাল আমার সব, ওকে আমার নিজের মনে হয়,” স্মিতা বলেছিল শান্ত গলায়।
পুশকিনের মনে হয়েছিল কেউ বোধহয় ওর শরীরে গরম লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়েছে! কিছু জিনিস মনে মনে ভেবে নেওয়া আর সেটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার মধ্যে এক আকাশ পার্থক্য আছে। মনে মনে কিছু ভাবার মধ্যে এক শতাংশ হলেও আশা থাকে। সেলফ নেগেশন থাকে। কিন্তু একবার কেউ সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে বলে দিলে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়!
পুশকিন জানত, তমালকে ভালবাসে স্মিতা। কিন্তু যেই সেটা স্মিতা বলে দিয়েছিল ওর সব কিছু কেমন যেন দলা পাকিয়ে গিয়েছিল।
প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ছ’মাস লেগেছিল পুশকিনের। স্মিতা কিন্তু তাও যোগাযোগ রাখত ওর সঙ্গে। নিজে থেকে কথা বলত। খাবার নিয়ে আসত। শপিং-এ ধরে নিয়ে যেত জোর করে।
আর পুশকিন নিজেও বুঝতে পারছিল যে, ও তো আর অন্য কাউকে ভালবাসতে পারবে না। তাই স্মিতার সঙ্গ পাচ্ছে ভেবে ধীরে ধীরে মেনেও নিয়েছিল সব। পুশকিনের নিজেরই অবাক লাগত মাঝে মাঝে। অন্যের জীবনে কিছু হলে, মানুষ কত জ্ঞান দেয়! কিন্তু নিজের জীবনে শুধুমাত্র যাকে পছন্দ করে, তার কাছাকাছি থাকবে বলে মানুষকে যে মেনে নিতে হয় কত জিনিস!
পুশকিন কেন ওর সঙ্গে ঘোরে, ওর সব কথা মেনে নেয় সবটাই জানত স্মিতা। এমনকী, কখনও-কখনও সামান্য দুর্বল হয়ে পুশকিন বলেও দিত ওর মনের কথা। তখন স্মিতা রাগ করত। বলত, “একই কথা বারবার বলো কেন?” কিন্তু পরেই আবার পুশকিন চলে গেলে সেই নিয়েও অভিমান দেখাত।
বাড়িতেও স্মিতার কথা ক্রমে জেনে যায় সবাই। মা রাগ করতে থাকে স্মিতার পারিবারিক অবস্থা শুনে। বাবাও বোঝানোর চেষ্টা করে ওকে। কিন্তু পুশকিনকে যেন ভূতে পেয়েছিল! এ যেন এক কুহক! যেন নিশিডাক! রাতে ঘুমের মধ্যে ও দেখত স্মিতা ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেখত, কোন এক নাম না-জানা পুরুষের সঙ্গে পাহাড়ি কোনও এক শহরে বসে আছে ও। ঘুম ভেঙে একা অন্ধকারে বসে থাকত পুশকিন। কাঁদত বালিশে মুখ গুঁজে। মনে হত কেউ যেন ওর শরীরের চামড়া ধীরে-ধীরে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কাছে গেলে কষ্ট। আবার দূরে সরে থাকাও সম্ভব নয়। এক অদ্ভুত চোরাবালি যেন! ডুবে যাওয়ার মধ্যে এমন মৃত্যুভয় আর বাঁচার আনন্দ একসঙ্গে আগে কোনওদিন অনুভব করেনি ও!
তারপর একদিন মা খুব রাগারাগি করেছিল। সারা দিন না খেয়ে, চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুলে নিয়েছিল একেবারে! আর তার এক সপ্তাহের মধ্যেই জোর করে বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল কয়েকটা। আত্মীয়স্বজনরা জেনে গিয়েছিল সব। সবাই মিলে পুশকিনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, এই স্মিতা কেন ওর জন্য খারাপ। যে সাড়ে তিন বছর কোনও ছেলেকে এভাবে ঝুলিয়ে রাখে, কাছে আসতে দেয় না, কিন্তু দূরেও যেতে দেয় না, যে অন্যের ভালবাসার সুযোগ নেয়, সে ভালমানুষ হতে পারে না। হয় সে শয়তান, নয়তো অসুস্থ। আর কোনওটাই সাংসারিক জীবনে কাম্য নয়। তাই সবাই মিলে একযোগে পুশকিনকে বোঝাতে শুরু করেছিল— ও যেন এসব ভুলে যায়।
মাসদুয়েক পরে এক রাতে পুশকিন আবার ওরকম কষ্টের স্বপ্ন দেখেছিল একটা। চোখে জল নিয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসেছিল একা। সব যেন কেমন গুলিয়ে গেছিল ওর। মনে হয়েছিল মাথাটা এবার ঠিক ফেটে যাবে। ভেতর থেকে কী যেন একটা ভেঙে, মরে, পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছিল পুশকিন। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো সেই মাঝরাতে ছাদে উঠে গিয়েছিল ও। ভাবছিল, আর কী হবে বেঁচে থেকে! কার জন্য বাঁচবে! ছাদের পাঁচিলের ওপর উঠেও পড়েছিল! পায়ের তলায় শূন্যতা। মাথার ওপর অপার অসীম কালো। শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিল পুশকিন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে পেছন থেকে কে যেন জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। এক হ্যাঁচকায় টেনে নামিয়ে এনেছিল ছাদের মেঝেতে। পুশকিনের গায়ে জোর ছিল না কোনও। কুঁকড়ে, নরম হয়ে ও মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল একদম। ধীরে-ধীরে জ্ঞান হারানোর সময়ে ওর দৃশ্যের মধ্যে, ফোঁটা-ফোঁটা জলের মতো এসে জমেছিল ভাই, বাবা, কানুদা, টুকুদি, মাসি, কাকা, মা…
পরের দিন দুপুরে ঘুম ভেঙেছিল পুশকিনের। দেখেছিল, মা বসে রয়েছে। ওকে চোখ খুলতে দেখে মা বলেছিল, “এই বয়সে তোর বাবাকে তোর জন্য ছাদে উঠতে হয়! তোকে টেনে নামাতে হয় পাঁচিল থেকে! তুই এমন হয়ে গিয়েছিস! শোন, আগে আমায় মেরে তারপর তুই মরবি। এটা মাথায় রাখিস। তাই তোর তাড়া থাকলে বল, আমি এখনই মরছি!”
এখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল পুশকিন। তারপর মুম্বইয়ে চাকরি নিয়েছিল। স্মিতার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। মা, বাবা, ভাই সবাই খুশি ছিল খুব। পুশকিন নিজেকে বুঝিয়েছিল, এই জীবনে সব কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। না-পাওয়াটাও মেনে নিতে হয়। যত পছন্দেরই হোক না কেন কেউ, মানুষকে একসময় মেনে নিতে হয় যে, সে হেরে গেছে। মেনে নিতে হয় এই সম্পর্ক, এই জীবন এইটুকুই ছিল। আর কিছু এর কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া রুবিগুলির মতো, প্রিয় ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে যাওয়ার মতো, সেই সবচেয়ে পছন্দের জামাটার ছোট হয়ে যাওয়ার মতো, মেনে নিতে হয়, সব শেষ! আর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো আমরা পাই এই ধরনের মেনে নেওয়া থেকেই। এই ধরনের সরে আসা থেকেই।
মুম্বই যাওয়ার আগের দিন কয়েকটা জিনিস কিনতে বেরিয়েছিল পুশকিন। সেসব কিনে দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল ওর। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে পারেনি। গলির মুখের আবছায়ায় একটা পরিচিত অবয়ব দেখে কেমন যেন বিদ্যুতের ছ্যাঁকা লেগেছিল পুশকিনের। স্মিতা! এখানে কী করছে?
স্মিতা ওকে দেখে প্রায় দৌড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। পা কাঁপছিল পুশকিনের। বুকে কেমন গিঁট পড়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল মাটিতে পড়ে যাবে। এমন আচমকা কেউ কাছে আসে! এ তো খুনের চেষ্টা!
স্মিতা সোজা তাকিয়েছিল ওর দিকে। এদিক-ওদিক থেকে ছিটকে আসা আলোর টুকরো এসে বিঁধেছিল স্মিতার মুখে।
“তুমি চলে যাচ্ছ?” স্মিতা কেমন একটা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
পুশকিন কী বলবে বুঝতে পারছিল না। তাও মনের তলায় পড়ে থাকা কয়েকটা শব্দ কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে নিয়ে ও বলেছিল, “হ্যাঁ, কালকে। মুম্বই।”
“কেন?” স্মিতা কিছুতেই চোখ সরাচ্ছিল না।
পুশকিনের কথাও আটকে গিয়েছিল যেন। তাও জোর করে অস্ফুটে বলেছিল, “মানে… তুমি তো জানো…”
“না বলো,” স্মিতা জেদের গলায় বলেছিল।
সেই, এক ব্যাপার! পুশকিনের মনে হয়েছিল এখনও বলতে হবে! এত কিছুর পরেও বলতে হবে! থাক তবে, আর কিছু বলে কাজ নেই। অনেক হয়েছে। তাই ও আর কিছু বলেনি। মাথা নামিয়ে স্মিতার পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল।
স্মিতা আচমকা ওকে চেপে ধরেছিল দু’হাত দিয়ে, তারপর অদ্ভুত ঝরা পাতার গলায় বলেছিল, “কেন যোগাযোগ করো না তুমি? আমি পারছি না তোমায় ছাড়া থাকতে। আমি মরে যাব। বুঝতে পারছ? মরে যাব আমি। তুমি যাবে না, আমায় ছেড়ে কখনও যাবে না। বুঝেছ?”
পুশকিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। স্মিতাই তো এটা? কী বলছে ও? এও সম্ভব নাকি?
স্মিতা বলেছিল, “আমি এই ক’দিনে বুঝতে পেরেছি, আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারব না। কিছুতেই না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমায় বিয়ে করবে?”
সেদিন থেকে দু’সপ্তাহের মাথায় স্মিতাকে বিয়ে করেছিল পুশকিন। ওর বাড়ির কেউ আসেনি। সবাই ছি ছি করেছিল। মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাও কোনও কিছু ওকে আটকাতে পারেনি।
ফুলশয্যার রাতে, পুশকিন স্মিতাকে দু’হাত দিয়ে ধরে বলেছিল, “তুমি আমার সামান্য জীবনে এক পরি!”
স্মিতাও পুশকিনকে আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া আমি মরে যাব। আমায় ছেড়ে যাবে না তো?”
জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল সেটা। পুশকিনের ভেতরের আদিম পুরুষটা যেন জিতে গিয়েছিল সেদিন। স্মিতার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে পুশকিন ভেবেছিল, তমালকে স্মিতার জীবন থেকে ঠিক সরিয়ে দিতে পেরেছে ও।
কিন্তু জীবন সমুদ্রের মতো। কোনও কিছুই তাতে হারায় না। একদিন না একদিন কোনও না কোনও বালুতটে সেই হারানো জিনিসটাকেই ঠিক আছড়ে এনে ফেলে জীবন। বোঝায়, কোনও খেলাই শেষ হওয়ার আগে শেষ নয়।
রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ওরা দেখল জায়গাটাকে। ভাঙা রেললাইন চলে গিয়েছে একটা। চারিদিকে কেমন ঝোপজঙ্গল হয়ে আছে। একপাশ দিয়ে সরু রাস্তা। কয়েকটা গাছের ডালপালা সেই রাস্তার কিছুটা দখল নিতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। ওরা সেই পথে এগিয়ে গেল।
একজন বয়স্ক লোক বাড়ির সামনে রোদে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। ওদের দেখে মুখ তুলে তাকালেন। তারপর স্মরণকে দেখে চিনতে পারলেন ঠিক, “আরে তুমি?”
স্মরণ হেসে এগিয়ে গেল, “হ্যাঁ স্যার, আমি। আর এই আমার সঙ্গে…”
পুশকিন স্মরণকে কাঁধে হাত দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। তারপর নিজে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল মানুষটাকে।
ভদ্রলোক ঘাবড়ে গেলেন সামান্য। বললেন, “কে বাবা! তোমায় তো ঠিক…”
“একদম চেনা যাচ্ছে না, বিজনকাকু! লোকে যে বলে, আমাকে আমার বাবার মতো দেখতে!”
বিজন স্তব্ধ হয়ে গেলেন একদম। যেন মোমের মূর্তি! যেন লাভায় আটকে যাওয়া প্রজাপতি! যেন বহুবছর পর হারানো সম্পদ ফেরত পাওয়া মানুষ!
বিজন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “পরি… পরি…”
পুশকিন জানে পরি বলে কিছু হয় না। শুধু কিছু মানুষ আছে, যারা সারা জীবনেও এই সত্যিটা বিশ্বাস করে না। সারা জীবন তারা নিজেদের ক্রমাগত ঠকিয়ে যায়।
.
৩৩. পেখম
ঘুম নেমেছে অন্ধ তারার চোখে
পুকুরঘেরা ঝাপসা গাছের সারি
হাত ছুঁয়ে কে বৃষ্টি দিয়ে গেল!
মেঘলা, তোমার বকুল হতে পারি!
ফুল হবে? সেই সাধ্য ছিল কারও?
আমরা এখন সব খেলাতে হারি…
তবুও জেনো তোমার দিকে চেয়ে
সাজিয়ে রাখি জোনাকিদের বাড়ি
লেখাটা আর-একবার পড়ল পেখম, তারপর কাজুর ডায়েরিটা বন্ধ করে ঝোলার মধ্যে ভরে নিল। এই লেখাটা বেশ পছন্দ ওর। আজ অন্য জিনিসপত্রের সঙ্গে ডায়েরিটা গুছিয়ে নেওয়ার আগে কেন কে জানে লেখাটা আর-একবার পড়তে ইচ্ছে হল! সত্যি কি কাজু ওর জন্য সাজিয়ে রাখবে এমন একটা জোনাক-রঙা বাড়ি?
ডায়েরিটা ঢুকিয়ে পেখম দেখে নিল চারিদিক। আর কি কিছু পড়ে রইল! নাঃ, আর কিছু পড়ে নেই। কিন্তু আসলে তো সবটাই পড়ে রইল! এই ঘর, এই চৌকি। ছোট কাঠের কারুকাজ করা ফ্রেমে বাঁধানো আয়না। দরজার কড়ায় ঝোলানো চুলের কালো ফিতে। ওই টেবিল। জড়ো করা বই। খবর কাগজের কাটিং। ঝরনা কলম। লাল কালি, সবুজ কালি। ঠাকুরদার এনে দেওয়া সেই আকাশি রঙের পেনসিল। কুমকুম টিপের বাক্স। ঠাকুরমার রুপোর পাউডার কেস। জমানো দেশলাইয়ের খোল। ইনফ্যান্ট স্কুলের প্রথম ইংরেজি বই। সব, সব তো রয়েই গেল! ওই জানলা, তার পাশে বাবু হয়ে বসে জোনাকি দেখা। মায়ের গায়ের গন্ধে ডুবে ঘুমিয়ে পড়া। বাবার পিঠে চড়ে ঘোড়া ছোটানোর আনন্দে খিলখিল শব্দে উড়ে যাওয়া। আর কাকুর সঙ্গে বসে, লোডশেডিং-এর আকাশে তারা দেখার সেই ছোট্ট পেখম, সব তো রয়েই গেল এখানে। এই ঘরে, এই বাড়িতে। ওই ছোট্ট কাপড়ের ঝোলা ব্যাগে এতগুলো বছর আর এত এত স্মৃতি কি ভরে নিয়ে যাওয়া যায়!
পেখম উঠল। আজ ওর শেষদিন এই বাড়িতে। কাল থেকে নতুন পথ, নতুন জীবন, নতুন সব কিছু। কাল কাজু আর ও চলে যাবে এই সোনাঝুরি ছেড়ে।
কেউ তো ওদের বুঝল না। কেউ তো জানতে চাইল না ওদের কী সম্পর্ক। সবাই শুধু পাঁচিল তুলেই গেল। সবাই দূরে সরিয়ে রাখতে চাইল ওদের। ভেঙে দিতে চাইল সব কিছু। কিন্তু জীবনটা ওদের। আর কারও নয়। তাই এভাবে নিজেদের জীবন অন্য কারও কাছে দিয়ে যাবে না ওরা।
আজ বৃষ্টি পড়ছে খুব। নিম্নচাপের বৃষ্টি। ক’দিন ভোগাবে। ঠাকুরদা আজ দোকানে যাননি। ফুলুদাদুর সঙ্গে নিজের ঘরে বসে দাবা খেলছেন। বাড়িতে মা আর কাকিমা মিলে বিয়ের কীসব ফর্দ করছে। বাবা ছিল। কিন্তু কী একটা কাজে বেরিয়ে গিয়েছে।
পেখম গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা ওর কাঠের আলমারিতে তুলে রাখল। এটা মায়ের হাতে পড়লে বিপদ আছে। তবে একটাই বাঁচোয়া, ও যেহেতু আর বাইরে বেরোয় না, তাই মা-ও ওর ঘরে এসে কিছু হাতড়ায় না।
পেখম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আর-একবার ঘরের ভেতরটা দেখল। কাল রাতে সবার নজর এড়িয়ে বেরিয়ে যাবে ও। তাই আজ রাতটুকুই এই ঘরে ওর শেষ রাত। কীসের যে বন্ধন! কেন যে এত কষ্ট হচ্ছে ওর! এই সব ছেড়ে চলে যেতে হবে! কেন মা মেনে নেবে না কাজুকে? কেন বাড়ির লোকেরা কাজুকে পছন্দ করবে না? কেন ওর ইচ্ছেমতো তৈরি হবে না ওর জীবন? ও কি ক্রীতদাসী নাকি? মা, বাবা খেতে-পরতে দেয় বলে ওর ইচ্ছে আর জীবন কিনে নিয়েছে নাকি? কাজু ভাল লেখাপড়া জানে। পেখম নিজেও পড়াশোনা করে। তা হলে দু’জনে চাকরি করে কেন একযোগে সংসার চালাতে পারবে না? পেখম জানে এসব প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যাবে সারা জীবন। এগুলোর উত্তর ওদের বাড়ির লোকদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না।
পেখম কাকুদের ঘরে গেল। টেটু পড়ছে। পেছন থেকে ওকে দেখা যাচ্ছে। মাথা নিচু করে পড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। দেখে আচমকা কেন কে জানে আবার চোখে জল এল ওর। টেটু যখন হয়েছিল, ওর মনে আছে, সারা দিন ওর সামনে বসে থাকত পেখম। বলত, “আমার ভাই!” টেটুও ওকেই সবচেয়ে বেশি চিনত যেন। পেখম না এসে বসলে খেতেই চাইত না। পেখমের কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়িয়ে থাকত সারাক্ষণ। সেই ভাইকেও ছেড়ে চলে যেতে হবে!
নিজেকে শক্ত করল ও। এভাবে দুর্বল হলে হবে না। পৃথিবীতে দুর্বলদের জায়গা নেই। তুমি নরম হয়েছ কী লোকে সেটা তোমার অক্ষমতা, দুর্বলতা ভেবে তোমায় চেপে মাটিতে পুঁতে দেবে।
পেখম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে এগিয়ে গেল টেটুর কাছে। আলতো করে ওর মাথায় হাত দিল।
টেটু কী একটা লিখছিল। ঘুরে তাকাল, “আরে দিদি, তুই!”
“এমনি এলাম তোকে দেখতে। কী পড়ছিস?” পেখম সামান্য ঝুঁকে খাতাটা দেখল।
“আরে, দেখ না, ট্রানস্লেশন করতে দিয়েছেন স্যার। এসব কঠিন-কঠিন ইংরেজি আমি পারি? বলেছেন ডিকশনারি যেন না দেখি। আমি কি ভগবান যে, ডিকশনারি না দেখে নিজে থেকে সব মানে জেনে যাব!”
পেখম হাসল, “আরে, তুই দেখ। কে বারণ করেছে? এখানে তো আর কেউ দেখতে আসবে না!”
টেটু তাকাল পেখমের দিকে। তারপর বলল, “নাঃ, থাক। স্যারকে কথা দিয়েছি, আমি এমন কিছু করব না। কথার তো একটা দাম আছে, তাই না দিদি?”
পেখম হাসল। ঠিকই তো! কথারই তো দাম! মানুষের আর তো কিছু নেই কথা ছাড়া! অধিকাংশ মানুষ বোঝে না এটা। কিন্তু কেউ না বুঝলেই তো আর সেটা ভুল হয়ে যাবে না! ওর আশ্চর্য লাগল, টেটুর মতো ছোট ছেলে এসব জানে, কিন্তু বড়রা জানে না!
টেটু হাতের কলমটা বন্ধ করে ঘুরে বসল। তারপর চেয়ার সরিয়ে ওর দিকে ঘুরে বসল। বলল, “দিদি, একটা কথা বলব?”
“কী?” পেখম অবাক হল। টেটু তো এমন করে সিরিয়াস হয়ে কিছু বলে না কখনও।
টেটু দরজার দিকে তাকাল একবার। তারপর গলা নামিয়ে বলল, “কাজুদা তো খুব ভাল ছেলে। কিন্তু বড়রা বুঝতে চাইছে না। এটাই তো প্রবলেম, তাই না?”
পেখম অবাক হয়ে গেল। টেটু এসব কী বলছে! ও এসব কথা জানল কী করে! এই কয়েকদিন আগেও তো বাচ্চা বাচ্চা ছিল! এমন বড় হয়ে গেল কী করে!
পেখম চোখ বড় করে বলল, “তুই এসব কথা জানলি কী করে? কে বলল তোকে এসব কথা?”
টেটু মাথা নেড়ে বলল, “দিদি, আমি ক্লাস নাইন। কত বড় হয়ে গিয়েছি বল তো! বিজনের বয়সি আমি। বিজন এখন থেকেই পার্টি করে! আর আমি এটা জানব না!”
পেখম কী বলবে বুঝতে পারল না। কয়েকদিন আগেও তো কেমন ছোট্টটি ছিল যেন! কী হল টেটুর!
টেটু বলল, “তুই দিদি বড্ড ন্যাতপ্যাতে। কাজুদা আর তোর প্রেমই তো হবে। তোরা সোনাঝুরির বেস্ট দেখতে। এমনই তো হওয়ার কথা।”
“চুপ কর! তুই এত পেকেছিস!”
“আরে! পাকার কী আছে!” টেটু হাসল, “আমি আরও অনেক কিছু জানি। বড় হচ্ছি না! বাবা যে মাকে রাতে মাঝে মাঝে আদর করে সেটাও শুনি! আগে বুঝতাম না মায়ের কীসের ভয় করে, এখন বুঝি। আমায় ক্লাসের একজন বলেছে। মানে, শিখিয়ে দিয়েছে। জানিস, আমার শুনতে লজ্জা লাগে। কিন্তু বাবার লজ্জা নেই!”
“চুপ, চুপ একদম!” পেখম এবার টেটুর মুখটা চেপে ধরল।
টেটু ওর হাতটা জোর করে সরিয়ে দিয়ে বলল, “কাজুদার ভাই আছে না? ওই যে বাচ্চা ছেলেটা। ক্লাস ফাইভে পড়ে আমাদের স্কুলে। ও আমায় বলছিল কাজুদা নাকি বাড়িতে মনমরা হয়ে থাকে। ছেলেটার খুব গাছের বাতিক, জানিস! ওইটুকু ছেলে সারাক্ষণ গাছপালা নিয়ে পড়ে আছে! আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা বলে।”
পেখম বলল, “তুই এসব বলবি না আর। তুই এখনও অনেক ছোট। একদম এসব বলবি না!”
টেটু মাথা নেড়ে বলল, “তুই বুঝতে পারছিস না দিদি! আমাদের বাড়ির লোকগুলো খুব খারাপ। সবার এত লোভ! এই যে মালিকরা বাবাকে প্রোমোশন দিল। জেঠুর প্রোমোশন নিয়েও নাকি ওপরমহলে কথা বলবে। এই যে সবাইকে এসে এটা-ওটা দিয়ে যায়, সেসব দেখেই সবার মাথা ঘুরে গেছে! আমার খুব লজ্জা লাগে, যখন আমাদের বাড়ির লোকজন হ্যাংলাপনা করে। মনে হয়, আমার বাবা এমন! মা এমন! জেঠিমা এমন! স্যার বলেন, লোভ করতে নেই। এটা আমি জানি, বড়রা জানে না? তুই এক কাজ কর না!”
“কী কাজ?” পেখম অবাক হল।
টেটু আর-একবার দরজার দিকে তাকাল। তারপর গলাটা আরও খাদে নামিয়ে বলল, “তুই আর কাজুদা পালিয়ে যাচ্ছিস না কেন? তোরা পালিয়ে যা। দু’দিন ঝামেলা হবে, চিৎকার-চেঁচামেচি হবে। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। তখন আবার আসবি তোরা। ততদিনে কাজুদা একটা চাকরি ঠিক পেয়ে যাবে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন পালিয়ে যা দিদি। বাঁচতে চাইলে পালিয়ে যা!”
পেখম স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল টেটুর দিকে। কী বলল এটা ও? বিজন কি কিছু বলে দিয়েছে? কাল রাতে কাজু আর ও যে পালিয়ে যাচ্ছে, সেটা একমাত্র বিজন জানে। টেটুর সঙ্গে বিজনের কথা হয়। তবে খুব কিছু বন্ধুত্ব নেই!
পেখম সতর্ক হল। জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ এটা বললি কেন?”
টেটু বলল, “আমি হলে তো তাই করতাম। তাই বললাম আর কী! প্লাস আমার নিজের একটা প্ল্যান আছে। যত তাড়াতাড়ি পারি এদের সবাইকে ছেড়ে পালাব আমি। আমাদের বাড়ির লোকেরা সবাই কেমন যেন। শুধু জেঠু আর ঠাকুরদা এমন নয়। বাকিরা এত লোভী!”
“টেটু!” পেখম ধমক দিল এবার, “বড়দের সম্বন্ধে এমন কথা বলতে আছে?”
টেটু হাসল, “বড়রা আর কতদিন বল তো বয়সের সুবিধে নিয়ে যা খুশি তাই করবে আর সম্মান ডিমান্ড করবে! এর একটা শেষ থাকা দরকার, না! আমি এই নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, জানিস!”
“ঠিক আছে। চুপ করে এখন পড়। এ ক’দিনে এত পেকে গেছিস জানতাম না!” পেখম জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। এতক্ষণ বৃষ্টি পড়ছিল, কিন্তু শব্দ শুনে বুঝল, এবার ধরেছে।
টেটু টেবিল থেকে কলমটা তুলে প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলল। তারপর বলল, “ভাল কথা বলছি দিদি। আর মাত্র সাতদিন বাকি আছে। বিয়ের কার্ড দেওয়াও প্রায় শেষ। ভেবে দেখিস কিন্তু।”
পেখম আর না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এল। ঠাকুরদার ঘরে উঁকি দিল একবার। দেখল, ঠাকুরদা আর ফুলুদাদুর কোনওদিকে মন নেই। ও তাও দরজায় দাঁড়াল একটু। আজ মনে হচ্ছে সব কিছু আরও ভাল করে নিজের মনের মধ্যে নিয়ে নেয়। সব ছবি, সব মুহূর্ত বুকের মধ্যে জমা করে নেয়। আর এমন রাত, এমন সন্ধে তো পাবে না। মনখারাপ আর ভয় করছে পেখমের। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতটা যখন এগিয়ে গেছে তখন আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই। কাজু ওকে এইসব বলেছিল আগেই। বলেছিল, কী কী ছাড়তে হবে। কাদের ছাড়তে হবে। কিন্তু তাও কথা শোনেনি পেখম। কাজুকে ছেড়ে ওর পক্ষে থাকা সম্ভব নয়!
বিজনদের বাড়ির সেই বাগানে কাজুর বুকের সঙ্গে লেপটে থেকে পেখম বলেছিল, “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
কাজু বলেছিল, “হ্যাঁ, পাচ্ছি।”
“কীসের ভয়? সব ছেড়ে যেতে বলছি বলে?” পেখমের গলায় অভিমান এসে জমা হয়েছিল।
কাজু বলেছিল, “পেখম, জীবন তো থেমে থাকে না। তোমার হয়তো পরে আমাকে আর ভাল লাগবে না। হয়তো জানবে আমি এমন কিছু করেছি জীবনে, যাতে আমায় ঘেন্না করতে শুরু করবে!”
“মানে?” পেখম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে!
কাজু ইতস্তত করেছিল। কেমন একটা দ্বিধার ভাব ছিল ওর স্বরে। যেন কিছু আটকে আছে ওর মনে। এমনটা করতে কাজুকে কোনওদিন দেখেনি ও।
কাজু সময় নিয়েছিল একটু। তারপর বলেছিল, “মানে, মনখারাপের সময় তো মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। তখন সে যে কী করে ফেলে! কী বলে ফেলে! তাই…”
“থাক, মনখারাপের সময়ের কথা আমি আর শুনতে চাই না। অনেক মনখারাপ হয়েছে। আর না। আর শুনব না।”
“কিন্তু সেসব শোনা দরকার। সেসব আমি…”
“না, না, না। আমি শুনব না। যা হয়েছে, হয়ে গেছে… আমি সেসব শুনবই না!” জেদি গলায় বলেছিল পেখম, “এবার হল তো? আর ভয় নেই তো কিছু নিয়ে?”
কাজু এবার তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। সামান্য হেসে বলেছিল, “না। ভয় আমার আছে। তোমাকে নিয়ে আছে!”
“আমাকে নিয়ে!” পেখম অবাক হয়ে তাকিয়ে বলেছিল, “আমি তোমার সঙ্গে গাছের তলাতেও থাকতে পারি!”
“হা হা,” কাজু হেসে বলেছিল, “সেটা নয় পেখম। দ্যাখো, জীবনের এই মুহূর্তে তুমি যতটা প্রেম অনুভব করছ, এমনটা তো আর সারা জীবন থাকবে না! অভ্যেস, সব কিছুর মতো প্রেমকেও ভোঁতা করে দেয়। তখন যদি তোমার মনে হয় আমার সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে ভুল করেছিলে! বাবাকে যে এত ভালবাসো, তাকে কষ্ট দিয়ে ভুল করেছিলে! তখন! আমার তো তুমি ছাড়া আর কিছু নেই পেখম! তুমি সেইসব ভেবে যদি পরে আমায় দূরে ঠেলে দাও! তাই ভয় লাগছে আমার।”
পেখম কাজুর মাথাটা ধরে নামিয়ে এনেছিল ওর দিকে। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে কাজুর সমস্ত ভয়, দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব শুষে নিয়েছিল। কাজুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “খালি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে একই কথা বলছ! এসব নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না, কেমন!”
তারপর ওরা ঠিক করেছিল দিন।
কাজু বলেছিল, “গেট মিটিং আছে আর-একটা। মালিকরা তো আগের কথা শুনল না! তাই মিটিংটা এবার আরও বড় করে করতে হবে। আমি জানি মালিকরা সেটা বানচাল করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি সেটা ম্যানেজ করব। পুলিশ, গুন্ডা যাই আসুক। তুমি ভয় পাবে না। আমি ঠিক সেফলি বেরিয়ে যাব। তারপর…”
“তোমার কিছু হবে না তো?”
পেখমের মাথায় হাত বুলিয়ে কাজু বলেছিল, “আমি বলছি তো। আমি আসব তোমার কাছে।”
পেখম নিজের গলা থেকে কালো কারে ঝোলানো রুপোর চৌকো লকেটওয়ালা হারটা খুলে হাতে দিয়েছিল কাজুর। বলেছিল, “এটা তুমি সঙ্গে রাখবে। কেমন?”
“কিছু বলবি?” ঠাকুরদা পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন হঠাৎ।
পেখম হাসল। তারপর পায়ে-পায়ে ঢুকে এল ঘরে। বলল, “একটা কথা বলবে?”
“গজের প্যাঁচে পড়েছে মন্ত্রী! পরে বললে হবে?” ঠাকুরদা আবার দাবার বোর্ডের দিকে মুখ ফেরালেন।
পেখম বলল, “না, এখনই বলো।”
ঠাকুরদা হাসলেন, “তুই সত্যি পাগলি! বল।”
“আচ্ছা ঠাকুরদা, তোমার ছোটবেলার সব বন্ধুর নাম মনে আছে? তাদের জীবনের সব কিছু মনে আছে? ফুলুদাদু ছাড়া বলছি।”
ঠাকুরদা অবাক হয়ে তাকালেন, “আর কি মনে থাকে? আমার আশি হল। স্মৃতি তো ফিকে হবেই। তাই না?”
“তা হলে, বলাই বলে সেই বন্ধুর এত কিছু মনে আছে কেমন করে?”
ঠাকুরদা থমকে গেলেন। কী বলবেন যেন বুঝতে পারলেন না।
ফুলুদাদু বলল, “বগলা, তুই ওকে বলাইয়ের গল্প করেছিস? ওঃ, কী ছেলে ছিল! না?”
পেখম বলল, “তুমি ওকে ভুলতে পারোনি। কারণ, বলাই কাউকে ওরকম পাগলের মতো ভালবেসেছিল বলেই, তাই না! ওরকম তো দেখা যায় না! সবাই তো নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। মুখে প্রেম বললেও আসল সময় এলে কিছু করতে পারে না, ভয় পায়। একটা সেফ জীবন চায়। তাই না? কিন্তু বলাই তা চায়নি। আর দ্যাখো, তাই সবাই ফিকে হয়ে গেলেও ওর কথা তুমি মনে রেখে দিয়েছ! ভোলোনি! ও কষ্ট পেয়েছিল, ওর কিছু হয়নি। কিন্তু তোমরা কেউ যা পারোনি ও কিন্তু সেটাই পেরেছিল। তাই তোমরা ওকে ভুলতে পারোনি। আমরা বাঙালিরা, উত্তম-সুচিত্রা দেখে গদগদ হই। চোখের জল ফেলি। কিন্তু নিজের বাড়ির কেউ কিছু করলে এমন করি কেন?”
ঠাকুরদা এবার উঠে এলেন। পেখমের মাথায় হাত দিলেন আলতো করে। তারপর মৃদু গলায় বললেন, “সামনে বিয়ে। আর এসব মনে রাখিস না।”
“তুমি ভুলতে পেরেছ বলাইকে? সেটা তো তাও তোমার বন্ধুর জীবন ছিল, আর এটা তো আমার নিজের জীবন। কী করে ভুলি?”
ঠাকুরদা কিছু না বলে মাথা নিচু করে বসে পড়লেন আবার। পেখম হাসল। ঠাকুরদা ওকে খুব ভালবাসেন, কিন্তু ও এটাও বোঝে যে, ঠাকুরদা কোথায় যেন বদ্ধ!
পেখমের কষ্ট শুধু বাবাকে নিয়ে। ও বুঝতে পারে বাবার এসব কিছু ভাল লাগছে না। কিন্তু মাকে বাবা বেশ ভয় পায়। মায়ের কথা বাবা কাটে না। মা এমন রাগী! এমন ঝামেলা করে যে, বাবা খুব সমঝে চলে মাকে।
গতকাল রাতেও তো মা বাবাকে বলেছিল, “এদিকে আমরা সব আয়োজন করছি। কিন্তু তারপর যদি তোমার গুণধর মেয়ে কোনও ঝামেলা করে! বা ওই পাজি ছেলেটা যদি কিছু করে তখন কিন্তু…”
বাবা বিছানায় বসে একটা বই পড়ছিল। মায়ের কথা শুনে বলেছিল, “আমি তো বলেছি, আমি আছি। চিন্তা কোরো না!”
মা রাগের সঙ্গে বলেছিল, “কীসের পুলিশ তুমি কে জানে! দেখি কী করো তুমি!”
পেখম হাসল নিজের মনে। কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। না বাবা, না মা। সবাই দেখবে শুধু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। ও ভাবল একবার মায়েদের ঘরে যাবে। কিন্তু তারপরেই মত পালটাল। না যাবে না। গেলেই বিয়ে নিয়ে গালগল্প শুরু করে দেবে। ভাল লাগে না এসব কথা ওর। মা বোঝে না যে, ওর এসব ভাল লাগে না। মালিকরা যত পয়সাওয়ালা লোকই হোক না কেন, তাতে ওর আগ্রহ নেই কোনও।
পেখম আবার নিজের ঘরের দিকে ফিরল। কিন্তু তার আগেই ছোটকার গলা শুনতে পেল মেন গেটের কাছে।
“বউদি, বউদি! বাবা!”
ছোটকার গলার ভেতর এমন কিছু একটা ছিল যে, পেখম দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল ঠাকুরদা, ফুলুদাদু, মা আর ছোটকাকিমা বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
ছোটকা এসে দাঁড়াল ওদের বারান্দায়। ছোটকা হাঁপাচ্ছে। হাতে ধরা সাইকেলের চাবিটা নিয়ে অস্থিরভাবে একবার মুঠো খুলছে আর মুঠো বন্ধ করছে!
“কী হয়েছে?” ঠাকুরদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
ছোটকা বলল, “আরে, ফ্যাক্টরি গেটে খুব ঝামেলা হয়েছে। কাজু জানোয়ারটা লোক নিয়ে গোলমাল পাকিয়েছে। আমাদের প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজন জানোই তো, কাজ না করার ছুতো পেলেই হল। বোমা পড়েছে প্রচুর! পুলিশ এসেছে! দাদাও গেছে।”
বোমা! পুলিশ! পেখমের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল নিমেষে! কাজু কেমন আছে? ও ঠিক আছে কি? ওর কিছু হয়নি তো?
মা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর কাজু! পুলিশ ধরেছে ওকে!”
ছোটকা বলল, “ও শয়তানের বাচ্চা। সবাইকে খেপিয়ে দিয়ে নিজে কেটে পড়েছে! কোথায় গেছে কে জানে! তবে জানোয়ারটা পালিয়ে যাবে কোথায়! চারদিকে আমাদের লোক! একবার হাতে পেলে না!”
পেখম তাকিয়ে রইল সবার দিকে। কেমন যেন অচেনা মানুষ মনে হচ্ছে সবাইকে। মনে হচ্ছে এরা কারা ঢুকে এসেছে ওদের বাড়িতে! সবার মধ্যে এমন তীব্র নৃশংসতা আগে দেখেনি ও! সবাই যেন কাজুকে পেলেই মেরে দেবে! এ যেন এক চক্রব্যূহ! এ যেন প্রবল মৃত্যুর আয়োজন! কী করে মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে পারে! পেখমের মনে হল কাজু আটকে পড়েছে একরাশ লোভী আর স্বার্থান্ধ মানুষের মধ্যে!
পেখম চোখ বন্ধ করল। ওর মনে পড়ে গেল প্রথম দিন কাজুকে দেখার সেই মুহূর্তটা।
জানুয়ারি মাস ছিল সেটা। সকালের আলোর ভেতর কেমন একটা পাতলা দুধের সরের মতো কুয়াশা পড়েছিল। পেখমদের ছোট্ট বাড়িটার পাশের পুকুরের জলে তখনও ভাল করে সূর্য এসে দাঁড়ায়নি। পেখম একটা লাল চাদর গায়ে দিয়ে দু’হাতে দুধের গ্লাস ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। কাজু এসেছিল একটা লাল-হলুদ ডোরা-কাটা মাফলার আর নীল রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে।
রোদের ঢালু মিনারের ভেতর সোনাকুচির মতো ধুলো উড়ছিল। তার মধ্যে কাজুর হালকা দাড়ি আর টানা-টানা চোখ কেমন যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা মানুষের মতো লেগেছিল পেখমের। পেখম যেন বুঝেছিল আজ থেকে ওর জীবনের আর-একটা দিক খুলে গেল। সেদিকে আর কেউ নেই কাজু ছাড়া!
পেখম চোখ খুলল। বাইরের শব্দ শুনে বুঝল, বৃষ্টি শুরু হল আবার! আর সেই জলে ধুয়ে যেতে লাগল সব সম্পর্কের টান, সব বন্ধন! মুছে যেতে লাগল আকাশের তারা, ঘোড়ার খুরের শব্দ, মায়ের গায়ের ঘুম-পাড়ানি গন্ধ! নিভে যেতে লাগল মাইলের পর মাইল জোনাকির আলো!
পেখম বুঝল, কাল এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় বাবা ছাড়া আর কারও জন্য মনখারাপ করবে না ওর! বুঝল, ওর জীবনে আজকের পর থেকে কাজু ছাড়া আর কেউ রইল না!
.
৩৪. মাহির
ছোট্ট ভাঁজে মণীশ আর রাজাকে কাটিয়ে এগিয়ে আসছে ছেলেটা। মাঠের ডান দিক থেকে আড়াআড়িভাবে বল নিয়ে ঢুকে আসছে ভেতরের দিকে। ছেলেটা রোগা, মাঝারি হাইট! হরিণের মতো দৌড়োচ্ছে! বলটাকে একবার ডান পায়ে আর-একবার বাঁ পায়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে ছোট ছোট লাফে। এবার রাইট ব্যাক ঝাঁপি পাশ থেকে দৌড়ে এল আটকাবে বলে। কিন্তু একটা ছোট্ট টোকায় বলটাকে ঝাঁপির পায়ের ওপর দিয়ে তুলে দিয়ে ছেলেটা বেরিয়ে গেল। সামনে শুধু মাহির একা। বিকেলের রোদ তেরছা করে এসে পড়েছে স্টেডিয়ামের পাশে ঘিরে থাকা দেবদারু গাছগুলোর মাথায়। হাওয়া দিচ্ছে আজ! লেকের দিক থেকে আসা হাওয়ায় ছেলেটার জার্সি উড়ছে পতাকার মতো! মাহির দেখল পতাদা চিৎকার করছে সাইড লাইন থেকে। বিশাল ভুঁড়িটা টি-শার্টের নীচ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। পইতেটা দেখা যাচ্ছে। মাহির তাকাল একবার। ছেলেটা সামনে এসে পড়েছে প্রায়! গ্যালারির সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। রেফারি ঘড়ি দেখছে। যে-কোনও সময়ে শেষ হয়ে যাবে খেলা। মাহির জানে গোল খেয়ে গেলেই সব শেষ! আর ফিরে আসার উপায় নেই। ওকে টপকে গেলে পেছনে শুধু সুমিত। ছেলেটা বলটা আবার বাঁ পা থেকে ডান পায়ে নিল। আড়চোখে দেখে নিল পেছনে কেউ আসছে কি না! পেছনে দশ মিটারের মধ্যে কেউ নেই! ছেলেটা এগিয়ে আসছে। মাহির তাকিয়ে আছে। হাওয়ার জোর বাড়ল আর-একটু। দেবদারু গাছের মাথা থেকে রোদ সরে যাচ্ছে আরও। গ্যালারির লোকগুলো কীসব যেন বলছে! আবছা শব্দ সব। মাহিরের আর কিছু মাথায় নেই। শুধু দুটো পা দেখছে ও। বলটার ওপর ঘুরছে দুটো পা! ছেলেটা এগিয়ে এল আরও। মাহিরও এগোল। ছেলেটা বাঁ পা দিয়ে ভাঁজ মারতে গেল। মাহির ডান দিকের পায়ের ওপর ট্যাকল করবে বলে চার্জ করল। বলটা সামান্য লাফিয়ে ঘুরে গিয়ে লাগল ওর বুটের ডগায়। বলটা ছিটকে গেল! কোথাও ঝনঝন করে শব্দ হল একটা। আর চোখ খুলে উঠে বসল মাহির।
ছেলেটা কি কাটিয়ে যেতে পারল? গোলটা কি হল? নাকি ও ক্লিয়ার করে দিতে পারল বলটাকে! কিছু বুঝতে পারছে না ও। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে। বুকের ভেতরটা কেমন একটা করছে! খেলার আর কত বাকি ছিল! মাহির দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। এই ডিসেম্বরের শীতেও ঘেমে গেছে একদম! ওর মনে হচ্ছে সত্যি মাঠের মধ্যেই ও ছিল! এত জীবন্ত হয় স্বপ্ন!
মাহির ধাতস্থ হতে সময় নিল একটু। আজ বাড়িতে একা আছে ও। শরীরটা ভাল নেই। মা ভাইকে নিয়ে গেছে ডায়ালিসিস করাতে। ওর সামান্য জ্বর, তাই আজ আর ও যায়নি রিতুদার কাছে। তবে আর কোনওদিন যাবে কি না, সেটাও ভেবে দেখছে এই সু্যোগে। রিতুদা ওকে যে-পথে নামাতে চাইছে সেটা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। মা ঠিকই বলেছিল, এরা অজগর সাপের মতো। সম্পূর্ণ গিলে নিতে চায়!
মাহির হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের আলোটা জ্বালাল। সন্ধে হয়ে গেছে। ভাই আর মায়ের আসতে দেরি আছে এখনও। এই দিনগুলোয় মায়ের আসতে প্রায় রাত দশটা বাজে। ও মোবাইলটা তুলল। নতুন মোবাইল। সাবধানে ব্যবহার করে মাহির। পলি দিয়েছে এটা। এর মূল্যই আলাদা! সওয়া ছ’টা বাজে। কাল পঁচিশে ডিসেম্বর। ছুটি। আজ রাস্তাঘাটে তাই ভিড় বেশ। মাহিরের মনে হল, যতই শরীর খারাপ লাগুক, ওর আজ মায়ের সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল!
বিছানা থেকে মাটিতে পা ঝুলিয়ে বসল মাহির। মেঝেটা ঠান্ডা হয়ে আছে। পুরনো বাড়ির ভাঙা লাল মেঝে। মাটিতে একটা গেলাস পড়ে আছে। বিছানার পাশে প্লাস্টিকের টুলের ওপর রাখা ছিল গেলাসটা। ঘুমের মধ্যে পা ছুড়েছিল ও, তাই মেঝেতে টুলসমেত ওটা উলটে পড়ে গেছে। এটারই কি আওয়াজ হয়েছে?
মাহির উঠে গেলাসটা তুলল। প্লাস্টিকের টুলটাও সোজা করে ঘরের এক কোণে সরিয়ে রাখল। শোওয়ার আগে জ্বর কমানোর ওষুধ খেয়েছিল। কাজ দিয়েছে। ঘাম হচ্ছে। এখন শরীরটাও অত খারাপ লাগছে না। বরং খিদে পাচ্ছে। দুপুরে আজ বিশেষ কিছু খেতে পারেনি! ডাক্তার দেখিয়েছিল গতকাল। সে কতগুলো কী ওষুধ দিয়েছে কে জানে, গা বমি-বমি করছিল খাওয়ার পরে! এখন অবশ্য তেমন কিছু লাগছে না।
মাহির এবার সুইচবোর্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে টিউবলাইটটা জ্বালাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশের নরম আলোর সুইচটা বন্ধ করে দিল। এই ডিমলাইটটা নতুন লাগিয়েছে ও। একটা জ্যোৎস্নার মতো আলো হয় জ্বালালে! ভাল লাগে মাহিরের।
মাঝে মাঝে জীবনকে বোঝে না মাহির। স্যার বলতেন, “বুঝবি, বাঁচতে-বাঁচতে শিখবি, শিখতে-শিখতে বুঝবি!” কিন্তু তাও বোঝে না মাহির। জীবনের মানে কী! এই পৃথিবীতে যা করতে ভাল লাগে মানুষের তা করা উচিত নয়! যেমন তেল-ঝালের খাবার খাওয়া, কাজ না করে আড্ডা দেওয়া, অবৈধভাবে কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। এই সব কিছুর মধ্যে যে একটা মজা আছে সেটা আসলে নিষিদ্ধ! কারণ, এতে নাকি পরে কষ্ট পেতে হবে। আর যা করতে ভাল লাগে না, যা করা কঠিন, যেমন পরিশ্রম, একাগ্রচিত্তে ফলের চিন্তা না করে কাজ করে যাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি, সেসব নাকি ভাল খুব! ভবিষ্যতে কোনও একদিন নাকি এর সুফল পাওয়া যাবে। এইসব ভাবলে আজকাল মাঝে মাঝে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যায় ওর। ঠিক ভুল সব গুলিয়ে যায়। কী করা উচিত সেটাও বুঝতে পারে না। আর তখনই পলির কথা ভাবে মাহির। পলি যেন ওর জীবনের মানেবই হয়ে গিয়েছে। পলির কথা ভাবলে ওর নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে যায়। ঠিক আর উচিতটা সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজের ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরটায় এল মাহির। মা যাওয়ার আগে বিছানা গুছিয়ে গিয়েছে। ভাই এসে শুয়ে পড়বে। এই দিনটায় শরীরের ওপর খুব ধকল যায়। ভাই জেগে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ।
ভাইয়ের বালিশটার দিকে তাকাল মাহির। কষ্ট হল দেখে। জড়পদার্থের মতো হয়ে গিয়েছে ভাই! ডাক্তাররা বলছেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার কিডনিটা রিপ্লেস করে দেওয়া দরকার। মায়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছে কিডনি। কিন্তু সেটা করতে গেলেও তো খরচ আছে। তা ছাড়া মায়ের ওপর যা ধকল যাবে, তাতে মা কি নিজে আর কাজ করতে পারবে? মাহিরের ওপরেই তো সব দায়িত্ব এসে জড়ো হবে। মাহির কী করবে তখন? এই ইলেভেন পাশ নিয়ে তো চাকরি পাবে না। খেলার দিকটাতেও আজকাল যায় না আর। ওই দিকেও যে অন্ধকার, সেটা বুঝে গেছে। তা হলে পড়ে রইল কে, রিতুদা? সেই রিতুদার কাছেই কি যেতে হবে শেষ পর্যন্ত? কী করবে ও?
গত পরশু মেজাজ খারাপ ছিল খুব। জ্বর-জ্বর লাগছিল বিকেল থেকে। কিছু ভাল লাগছিল না। তাই লালপাড়ার পাশের পেট্রোল পাম্পে গিয়ে বসেছিল ও।
পাম্পের কোণে একটা জায়গা আছে। সামান্য আবছা অন্ধকার। সেখানে নিমগাছের তলায় ভাঙা বেঞ্চে বসেছিল। টিটি ছিল সঙ্গে।
ওকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে টিটি বলেছিল, “তুই এমন বিলা হয়ে আছিস কেন রে?”
মাহির প্রথমে উত্তর দেয়নি। টিটি জোরাজুরি করায় বলেছিল, “আমার আজকাল কিছু ভাল লাগে না জানিস! কিচ্ছু ভাল লাগে না। মনে হয়, কী করছি এই জীবনটা নিয়ে? কেন এসব করছি? শালা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি একদম। খেলাটাও ভেস্তে গেল। রিতুদা হারামি শালা, ফার্স্ট ডিভিশনে নাকি চান্স দেবে! তোর কথা শোনাও ভুল হয়েছে! শালা, কী করি! এত কনফিউজ়ড লাগে! জীবনে কী করব, আমি বুঝি না!”
টিটি শুনে হেসেছিল নিজের মনে। তারপর পকেট থেকে একটা গাঁজাভরা সিগারেট বের করে নাকের কাছে ধরে শুঁকেছিল। তারপর দেশলাই বের করে বলেছিল, “প্রেমে পড়েছিস মনে হচ্ছে! পলির?”
ধরা পড়ে গিয়ে সামান্য তুত্লে ছিল মাহির। বলেছিল, “না… মানে… আসলে…”
“ব্যস ব্যস! বুঝে গেছি! শালা তোদের এই প্রেম জিনিসটা বেকার। দেখ, তোর মতো মালকেও কীসব আন্টুবান্টু বকাচ্ছে! শালা, ঘোড়া রোগ পুষিস না। আমাদের প্রেম করতে নেই। খুব হিট উঠলে লাগিয়ে আসবি আসল জায়গা থেকে। এসব প্রেম মারাস না। পলিকে দেখেছিস! ফাইভ স্টার হোটেল টাইপ। শোন, ও হল ঘি! তোর কুত্তার পেটে হজম হবে না!”
“বাজে কথা বলিস না,” মাহির রেগে গেছিল, “আমায় রেস্তরাঁয় বন্ধুদের কাছে নিয়ে গিয়েছে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বারো হাজার টাকার মোবাইল কিনে দিয়েছে! এমনি-এমনি! ওর মনে কিছু নেই বলছিস! জানিস, আমার হাত ধরে কথা বলে!”
টিটি হাতের সিগারেটটা না ধরিয়ে দেশলাইটা রেখে দিয়েছিল পকেটে। হয়তো মনে পড়ে গেছিল, ওরা পেট্রোল পাম্পের পাশে বসে আছে। টিটি এরপর তাকিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল, “ভালই আছিস। আসলে কী জানিস, তোর পেট এখন ভরতি। তাই এসব নিয়ে ভাবছিস। অস্তিত্ব নিয়ে ন্যাকড়াপনা করছিস! জীবনে ওসব না ভেবে কাজ কর, কাজ। দেখবি, ওসব মাথায় আসবে না। কাজে ডুবে থাকলে আর কিছু মনে হবে না। শালা, আমায় খিস্তি করছে! মনে আছে, একদিন আমার এঁটো রোল কেমন খেয়েছিলিস! খিদের কথা ভুলে যাস না মাহির। জীবন এমন পোঁদে লাথাবে না! ওসব পলি-ফলি ভুলে যা! শালা প্রেম মারাচ্ছে! যেন সলমন খানের ছবি!”
খিদেটা পাচ্ছে ভালই। মাহির জানে বাড়িতে কোথায় বিস্কুট রাখা থাকে। ও রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির পেছন দিকে একচিলতে বারান্দার পাশে ছোট্ট রান্নাঘর। মা যতটা পারে গুছিয়ে রাখে। মাহির খুট করে রান্নাঘরের আলোটা জ্বালাল।
হলুদ বাল্ব। রান্নার তেল-কালিতে কেমন জং ধরা লোহার মতো হয়ে গেছে। অসুস্থ লাগছে দেখতে। ছায়া ছায়া আলো পড়েছে।
হলুদ টিনটা দেখতে পেল ও। একটা তাকের ওপর রাখা আছে। হাত বাড়িয়ে টিনটা নিল মাহির। তারপর নাড়াল। কিন্তু শব্দ হল না কোনও। কী হল? বিস্কুট নেই? মাহির টিনটা খুলে ভেতরে হাত ঢোকাল। আঙুলের ডগায় বিস্কুটের গুঁড়ো লাগল। কিন্তু বিস্কুট নেই!
টিনের কৌটোটা বন্ধ করে আবার জায়গায় রেখে দিল ও। তারপর এদিক-ওদিক দেখল। নাঃ, কিছু নেই! অন্য সময় একটু মুড়ি থাকে, আজ সেটাও পেল না।
খিদে পেলে পাগল-পাগল লাগে মাহিরের। এখনও লাগছে। যেহেতু দুপুরে ঠিকমতো খায়নি, এখন যেন তাই দ্বিগুণ খিদে পেয়েছে।
রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে আবার ঘরে ফিরে এল মাহির। দেওয়ালে ঝোলানো কিটব্যাগটা নামাল। তারপর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা প্লাস্টিক বের করে আনল। এখানে সামান্য একটু টাকা ও সরিয়ে রাখে। মা এটাতে হাত দেয় না।
মাসের শেষ, বাড়িতে বিশেষ টাকাপয়সা নেই এখন। যা ছিল মা নিয়ে গেছে। টেবিলের ওপরে রাখা ওর মানিব্যাগে কিছু খুচরো পড়ে আছে।
কিটব্যাগের ভেতরে হাত দিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটটা বের করে আনল মাহির। হাতে তোয়ালে মোড়া পিস্তল ঠেকল। শরীরটা কেমন যেন করে উঠল! এটার কথা আজ ভুলেই গিয়েছিল। নাঃ, এটা আর রাখবে না। রিতুদার সঙ্গে যখন কাজ আর করবে না তখন এটা ফেরত দিয়ে দেবে। আর যাই হোক, গুন্ডা হবে না ও। দরকার হলে কুলিগিরি করে খাবে, কিন্তু ওই কাজ করতে পারবে না।
প্লাস্টিকের প্যাকেটে পাঁচশো টাকার মতো সরানো আছে। মা এটা জানে না। মাহির প্যাকেট থেকে একশো টাকা বের করল।
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েকটা পা গেলেই অশোকদার দোকান। রোল, চাউমিন, মাছের চপ বিকেল থেকেই বিক্রি হতে শুরু করে।
টাকাটা হাতে করে ভাবল মাহির। এক প্লেট এগ চাউ তিরিশ টাকা নেয়। সেটা কি খাওয়া ঠিক হবে? মায়ের আজ কত টাকা খরচ হবে কে জানে! হুট করে এখন খাবারের পেছনে এতটা টাকা খরচ করা ঠিক হবে না। কিন্তু পেটের মধ্যে একটা জ্যান্ত তিমি ঢুকে পড়েছে!
পাশে অবশ্য সতুয়ার দোকানও আছে। বিহারি ছেলে সতুয়া। সবাই ভুজিয়াওয়ালা বলে ওকে। ওর কাছ থেকে দশ টাকার মুড়িমাখা কিনে খেলেও হয়। যদিও মন চাইছে অশোকদার দোকানের রোল বা চাউ, কিন্তু ওই সেই ব্যাপার— যা ভাল লাগে, ইচ্ছে করে, তার সুদূরপ্রসারী ফল খারাপ হয়! পলির জিপিএস ওকে পথ দেখাচ্ছে আবার।
সতুয়ার দোকানেই যাবে ঠিক করল মাহির।
ও এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে ঘরের কোণে রাখা হাওয়াই চটিটা পরতে গেল। আর ঠিক তখনই পাল্লা ঠেলে ঘরে ঢুকে এল তুয়াদি।
এই সেরেছে! মাহির চোয়াল শক্ত করল। ও দ্রুত টাকাটা প্যান্টের পকেটে গুঁজে ফেলল। আর আসার সময় পেল না!
ও গম্ভীর হয়ে বলল, “মা নেই। ভাইকে নিয়ে গিয়েছে।”
“আমি জানি,” তুয়াদি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে পাল্লা দুটো ভেজিয়ে দিল।
কী বিপদ! আজ আবার! মাহিরের মুখটা তেতো হয়ে গেল নিমেষে। পেটের তিমিটাও যেন তুয়াদিকে দেখে ঝিমিয়ে পড়ল।
ও বলল, “আমার জ্বর তুয়াদি… আজ মানে…”
“শালা!” তুয়াদি নাইটির ওপরে চাপানো কার্ডিগানের হাতাটা গুটিয়ে এগিয়ে এল, “আমায় কী মনে হয় তোর! আমি সারাক্ষণ তোর সঙ্গে শোব বলে ঘুরি নাকি?”
ঘাবড়ে গেল মাহির, “না মানে… আমি তা বলিনি…”
তুয়াদি এগিয়ে এসে ভুরু কুঁচকে বলল, “তোকে আমার খুব ভাল লাগে। তাই সেক্স করতে চাই। না হলে সেক্স করার লোক কি আমার কম আছে! আমি তোর চেয়ে অনেক বড়। এটা বিদেশ হলে না হয় বিয়ে করতে বলতাম। কিন্তু এখানে তো আর তা হবে না। তাই… যাক গে!” তুয়াদি থামল। তারপর হাত বাড়িয়ে কপালটা ধরে দেখল। বলল, “বউদির কাছে শুনেছিলাম, তোর জ্বর। তাই এসেছি। জানি আজ ডায়ালিসিসের দিন। বুঝলি?”
মাহির দেখল তুয়াদিকে। এমন করে প্রেমের কথা বলল যেন দোকানে মাছ কিনতে গিয়েছে! ওর চোখে পড়ল তুয়াদির হাতটা। আঙুলগুলো খয়া-খয়া। হাতে অর্ধেক নেলপলিশ, গালে মেচেতা আসবে-আসবে করছে। নাইটির ওপর দিয়ে ভুঁড়ি বোঝা যাচ্ছে। দেখেই কেমন লাগল মাহিরের। ও কী করে এর সঙ্গে শোয়! নিজের অজান্তেই পলির পাশে তুয়াদিকে রেখে একটা তুলনা করে ফেলল মনে মনে! রেস্তরাঁয় পলির পাশ ঘেঁষে বসেছিল মাহির। কী সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিল! আর হাতের সঙ্গে হাতের ঘষা লাগছিল ওর। এমন লাগছিল মাহিরের, ভাল লাগার সঙ্গে যৌনতাও টের পাচ্ছিল ও! মনে হচ্ছিল, কোনওদিন কি ও পলিকে আদর করতে পারবে? তুয়াদি যখন জোর করে, যখন ওকে বিছানায় চেপে ধরে ওর ওপর বসে, মাহির চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে পলিকে কল্পনা করতে থাকে। না হলে ও জানে এই যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই রেহাই পাবে না!
“কী হল?” তুয়াদি তাকাল ওর দিকে, “এমন মুখ করছিস কেন?”
“কিছু না, আমি বেরোব,” মাহির ছোট কথায় কাজ সারতে চাইল।
তুয়াদি কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “তোর কি আমাকে বেশ্যা মনে হয়! জানিস, আমি তোর সঙ্গে ছাড়া আর কারও সঙ্গে শুই না। আমায় দেখলেই অমন বিলা চোপা করে থাকিস কেন! শোন, তোকে আগে বলেছিলাম না, একটা ছোটখাটো সেলাইয়ের জায়গা দেখেছি আমি। কাজ আছে। জনাদশেক মেয়ের সঙ্গে কথাও বলেছি। আমি একা পারব না। তুই আমার সঙ্গে কাজ করতে পারিস। ফিফটি-ফিফটি পার্টনার। করবি?”
মাহির চুপ করে গেল। আগেও একবার এমন কথা বলেছিল তুয়াদি। তা হলে কি সত্যি কাজটা এবার শুরু করবে? আর ওকে কাজ করতে বলছে কেন! মাহির তো জানে না কী কাজ। জানে না এর ভবিষ্যৎ কেমন। কিন্তু ওর মনে হল রিতুদার কাছ থেকে বেরোনোর এটাও একটা পথ হতে পারে। তবে তুয়াদি বলেই ভয় হয়। ওখানে আটকে গেলে পলির কাছে ও যাবে কী করে?
পলিকে ছাড়া আজকাল আর কিছু ভাবতে পারে না মাহির! জানে, পলিদের সঙ্গে ওর অবস্থার অনেক ফারাক। কিন্তু পলি কেমন মেয়ে সেটা তো জানে। যে সমাজসেবামূলক কাজ করে এত, সে কি আর-পাঁচজনের মতো হবে! তা ছাড়া, এই যে পলি ওকে নিয়ে বেরোয়, এই যে ওকে গিফ্ট দিল, ওকে মাঝে মাঝে রাতে মেসেজ করে, তার মধ্যে কি ন্যূনতম কোনও সংকেত বা ইঙ্গিত নেই? আছে। পলির চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে মাহির। সে টিটি যাই বলুক। ও তো জানে পলির সঙ্গে ওর কেমন সম্পর্ক!
ও তুয়াদিকে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য বলল, “আমি দেখি। এখনও কিছু বলতে পারছি না।”
তুয়াদি তাকাল ওর দিকে। তারপর মুখটা নামিয়ে নিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমায় সবাই এমন করে দূরে ঠেলে দেয় কেন বল তো? আমি কি মানুষ নই? মা-বাবা নেই আমার। দাদারা অমন করে! তোকে ভাল লাগে আমার। তোর চেয়ে বয়সে বড় আমি, কিন্তু কী করব! ভাল লাগা কি ওভাবে বয়স দেখে আসে! তুই আমার সঙ্গে এমন করলে আমার খুব খারাপ লাগে! ঠিক আছে, তোকে করতে হবে না কাজ। আমার কাছে আসতেও হবে না। আমি তোর ভাইকে যেমন দেখছি দেখব। কেমন? আমি নিজে থেকে তোর কাছে আসি বলে কি আমার মানসম্মান নেই!”
আচমকা এমন কথায় অবাক হল মাহির। সত্যি বলছে তুয়াদি? নাকি এটাও ইয়ারকি! মানে, সত্যি ওকে আর তুয়াদিকে খুশি করতে হবে না!
তুয়াদি বলল, “যা, আজ থেকে ছেড়ে দিলাম তোকে। আর কিছু করতে হবে না। আমি একা, একাই ভাল। তোকে আর জড়াব না। আমি আসি।”
মাহিরের কথার অপেক্ষা না করে তুয়াদি দরজা খুলে বেরিয়ে গেল!
মাহির কী বলবে কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও একটা হাঁপ ছাড়ল যেন! মনে হল বুকের ওপর থেকে বোঝা নামল! হঠাৎ হালকা লাগল মাহিরের। প্রথমে রিতুদা, তারপর তুয়াদি। এক-এক করে এইসব ভুলভাল মানুষগুলোকে কাটিয়ে দিচ্ছে ও। এটা ভাল ব্যাপার। পলির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে ও। মাহির ঠিক করল, জ্বরটা ছাড়লে আবার প্র্যাকটিসে যাবে। পতাদাকে ঠিক হাতে-পায়ে ধরে ম্যানেজ করে নেবে। মন দিয়ে ফুটবলটা খেলবে। স্পোর্টসম্যান ও, এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। পড়াশোনায় পারেনি, কিন্তু খেলাটায় পারতেই হবে ওকে। পলির জন্য নিজেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হবে। ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যাপারটাও দেখবে। কিছু একটা তো করবেই! কিন্তু আর এসব নয়। মানুষ হওয়ার সময় এসেছে! ও মাথা তুলে দেখল, টিকটিকিটা আরশোলাটাকে ধাওয়া করছে এখনও, কিন্তু বাগে আনতে পারছে না! চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মাহিরের। জীবন ওকে খাওয়ার জন্য হাঁ করে রয়েছে! কিন্তু ও সেটা হতে দেবে না। ডিফেন্ডার হয়ে খেলতে-খেলতে ও কেমন যেন গুটিয়ে ছিল এতদিন! বহুত হয়েছে ডিফেন্সিভ, আর নয়! এবার উলটো মার দেওয়ার সময় এসেছে।
নিজের ভেতরে কেমন একটা উদ্দীপনা আসছে মাহিরের। মনে হচ্ছে সব শালাকে একাই দেখে নিতে পারবে। শুধু পলি যেন পাশে থাকে। ও দেওয়ালে ঝোলানো মা কালীর ফোটোর দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। এসব কোনওদিন করে না মাহির। কিন্তু আজ মনে হল একবার স্মরণ করে! মনের মধ্যে একটা জোর পেল ও। ভাল কিছু করার জোর। মানুষের মতো কিছু করার জোর।
টাকাটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরোল মাহির। কিন্তু দরজায় তালা দিল না। টেনে দিল শুধু। এখানে সবাই চেনে ওকে। তা ছাড়া এখন বাড়ির সামনে সব পাড়ার ছেলেরা রয়েছে। ক্যারম বোর্ড পেতে খেলছে। মাহিরকে সবাই সমীহ করে চলে।
সতুয়ার দোকানটা তিন-চারটে বাড়ি পরে। মাহির দেখল বেশ ভিড় আছে। ও দাঁড়াল একপাশে। বয়স্ক মানুষ এসেছে কয়েকজন। তার মধ্যে পরানদাকেও দেখল।
পরানদা কিছু না বলে হাসল।
মাহির জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক আছে?”
পরানদা বলল, “হ্যাঁ। আর তোর অমন কিছু হয় না? সেদিন শালা ব্যাপক সাঁটিয়েছিলাম! আর হয় না?”
মাহির হাসল, “হলে জানাব। তুমি মুড়ি নাও। সতুয়া হাত বাড়িয়ে রয়েছে।”
পরানদা ঘুরে মুড়ি নিল এবার। তারপর হাত নেড়ে বেরিয়ে গেল।
“দশ টাকার মুড়ি মেখে দে, তেল কম দিবি, আর দুটো কাঁচালঙ্কা…” চার-পাঁচজনের মাথার ওপর দিয়ে নোটটা সামনে বাড়িয়ে দিল মাহির।
“আরও দশ টাকার দিস আলাদা করে,” মাহির পাশ থেকে গলা পেল একটা। মুখ ঘুরিয়ে দেখল টিটি এসে বাইকটা দাঁড় করিয়েছে পাশে।
“তুই?” মাহির অবাক হল।
“কেন? আসতে পারি না?”
মাহির হাসল, “তোর না আজ বিরাটি থেকে কীসব পেপার দিয়ে আসার কথা ছিল! যাসনি?”
“গেছিলাম। হয়ে গিয়েছে কাজ। রিতুদার কাছে পেপার দিয়ে এসেছি। পার্টি অফিসে শুনলাম তোর ওপর নাকি রিতুদা খচে আছে! তুই যাচ্ছিস না! ফোন তুলছিস না! আমি বললাম ওর জ্বর হয়েছে। কিন্তু মানছে না কেউ। কী করছিস মাহির? নিজের পেছনে নিজে আছোলা দিচ্ছিস! কেন? আগেও একবার এমন করেছিলি মনে আছে? মনে আছে রিতুদা কেলিয়েছিল তোকে!”
সতুয়া মুড়ির দুটো ঠোঙা বাড়িয়ে দিল। দুটোর টাকা দিয়ে ব্যালেন্স ফেরত নিল মাহির। টিটি নিজের টাকাটা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু মাহির দিতে দিল না।
মুড়ির ঠোঙা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াল দু’জনে। ঝিমধরা একটা সন্ধে নামছে। আজ ধোঁয়াশা বেশ। স্ট্রিট লাইটগুলো কেমন আবছা হয়ে আছে। যেন চুনগোলা জলের মধ্যে মাছের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। মানুষজনকে কেমন জলরঙে আঁকা মনে হচ্ছে।
টিটি বাইকে বসে ঠোঙাটা খুলল। তারপর মুড়ি হাতে ঢেলে খেতে-খেতে বলল, “তোর কেসটা কী? কী হয়েছে তোর?”
মুড়ি মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ চিবোল মাহির। সেই তিমিমাছটা কোথায় যে পালাল! তুয়াদির সঙ্গে কথা বলার পরে ওর খিদে-টিদে পাচ্ছে না একদম! তাও জোর করেই খেল।
“শালা, কালা নাকি? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” টিটি বিরক্ত হল, “এটা কি শালা প্রেমের গল্প হচ্ছে! তুই মাঝে মাঝে এমন করবি আর আমি সেখান থেকে তোকে মানাতে আসব! আমায় শালা হিরো পেয়েছ?”
“আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি,” মাহির বলল গম্ভীর গলায়।
“কী? থার্ড আম্পায়ার হয়ে গেলি নাকি?” টিটি বাইক থেকে নেমে দাঁত দিয়ে ঠোঙাটাকে কামড়ে ধরে বাইকটাকে স্ট্যান্ড করাল। তারপর ঠোঙাটা হাতে নিয়ে বলল, “আবার কী ভূত ঢুকল মাথায়? দাবিটা কী তোর?”
“আমি কি গুন্ডা? আমায় কী ভাবিস তোরা?” মাহির অর্ধেক মুড়ি খেয়ে ঠোঙাটা দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে রাখা একটা ভ্যাটের দিকে।
“না, গুন্ডা নয়। কিন্তু আমাদের সবারই কিছু কাজ আছে। তোরও আছে। এসব বলছিস কেন?”
মাহির কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিল।
“তা কী করবি ঠিক করেছিস?” টিটিও আর খেল না। কিন্তু ও ফেলল না ঠোঙাটা। বাইকের ডিকিতে রেখে দিল।
“আমি আবার ফুটবল শুরু করব। ট্রায়াল দেব বড় ক্লাবে। আমি ওটাই পারি। ওটাই করব। পলি যে-বাড়ির মেয়ে ওর সঙ্গে ভবিষ্যৎ দেখতে গেলে এসব করলে হবে না। প্লাস প্রাইভেটে এইচএস-টা দিয়ে দেব। অনেক ছোটলোকপনা হয়েছে। আর না।”
“ওয়াহ্ বেটা! আমরা এখন ছোটলোক! তোর সঙ্গে সারা জীবন থাকলাম আর এখন আমরা ছোটলোক! আর তোর ভাই? তার চিকিৎসা? সেটার কী হবে?”
মাহির চোয়াল শক্ত করে তাকাল টিটির দিকে। ছেলেটা সারা জীবন ওকে পেছনে টেনে গেল। কিছুতেই এগোতে দিল না। টিটি কি ওর সত্যি বন্ধু! পলির সঙ্গে ওর কিছু একটা হতে পারে জানার পর থেকেই টিটি কেন ওকে সারাক্ষণ এমন করে নেগেটিভ কথা বলে! ওকে কেন এই পাঁক থেকে বেরোতে দিতে চায় না!
মাহির চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি ঠিক করে নিয়েছি। পলির জন্য আমি সব পারি! আমি পরের দিন ওকে বলে দেব আমার মনের কথা। আমায় ভাল হতেই হবে।”
“শালা, এটা কে রে!” টিটি বিরক্ত হল, “এটা কি মানুষ না অন্য কিছু! কী শালা, সব মাথায় উঠে গেল নাকি? ভাইয়ের কথা ভাব। ওর চিকিৎসার কী হবে!”
মাহির উত্তর দিল না। এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন দিয়ে ও নিজেকে আটকে রাখবে না। এই প্রশ্নটা ওকে সামনে আলোর দিকে এগোতে দিচ্ছে না। ভাই! ভাইয়ের কী হবে! আরে বাবা, আগে নিজের কী হবে সেটা কি দেখবে না! আর ঠিক কিছু একটা হয়ে যাবে। তেমন হলে পলিকে বলবে। ওর চেনাশোনা অনেক। ও কিছু করে দিতে পারবে নিশ্চয়ই। পলি যে ওকে পছন্দ করে, সেটা তো মাহির জানে।
“জানি না শালা কী করছিস!” টিটি মাথা নাড়ল, “পুরো ঝাড় কেস হয়ে গেছিস! প্রেম শালা বহুত বেকার জিনিস! ভাল উঠছিলি। কামাচ্ছিলি। সেখানে… এসব কঠিন কাজে মাথা গলাচ্ছিস! কেন কে জানে!”
মাহির বলল, “কঠিন কাজ কেন কঠিন জানিস? সেটা ঠিক বলে। ভাল বলে। যে-কোনও কঠিন জিনিস ভাল হয়। ঠিক হয়। সহজে ভাল কিছু করা যায় না টিটি। এটা বুঝিস না তোরা! আমার বয়স আছে এখনও। আমি ভাল কিছু করতে পারি। আমি গুন্ডা নই।”
টিটি তাকাল ওর দিকে। তারপর বাইকে চড়ে বসল। স্ট্যান্ড থেকে বাইকটা নামিয়ে বলল, “ভাইয়ের কথাটা ভাবিস। কে দেবে তোকে ছ’লাখ টাকা! স্বপ্ন আর বাস্তবটা এক নয়। পেছনে যখন পড়বে না, তখন পলি-টলি সব বেরিয়ে যাবে! পেট বড় বালাই গুরু! তুই প্রেমে পড়ে সব ভুলে গেছিস। শোন মাহির, আমি আছি। দরকারে বলবি। আমরা ছোটবেলার বন্ধু, তুই ভুলে যাচ্ছিস। কিন্তু আমি ভুলছি না।”
টিটি আর না দাঁড়িয়ে বাইক ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল।
মাহির দেখল তাকিয়ে। ধোঁয়াশার মধ্যে ধীরে-ধীরে মিশে গেল টিটি। টিটি ওর বন্ধু, কিন্তু শুধু সেটা নিয়ে জীবন চলবে না। জীবনে ওপরে উঠতে গেলে পিছুটান ছাড়তে হয়। কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। পলির সঙ্গে কাল ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলবে মাহির। পলি নিশ্চয় সাহায্য করবে।
ও পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল। মাকে কি একবার ফোন করবে? রাতের খাবারটা তা হলে নিয়ে নেবে সামনে থেকে। জুঁইদি সন্ধে থেকে রুটি-তড়কা নিয়ে বসে। কিনে নিলেই হবে।
কিন্তু তারপর আর ফোন করল না। টিটির কথাটা মনে পড়ল আবার। পেট বড় বালাই! রিতুদাও এমন বলেছিল না!
এই ডিসেম্বরেও যে কেউ এমন ঘামতে পারে রিতুদাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না মাহির। সেদিনও একটা তোয়ালে দিয়ে বারবার করে মাথা আর মুখ মুছছিল লোকটা। মাহির গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সামনে। ওকে দেখে একটা লজেন্স ছুড়ে দিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল, “কী রে, আজকাল কী হয়েছে তোর! ভালই তো কাজ করছিলি। ক’দিন এমন ড্যাম্প মেরে আছিস কেন!”
মাহির কিছু না বলে চুপ করেছিল। রিতুদা ওকে সেই যে চুল ধরে এই ঘরে মেরেছিল, সেটা ভুলতে পারেনি। সেদিন কোথায় যেন কী একটা উপড়ে গিয়েছিল। নিজেকে এত ছোট আর তুচ্ছ মনে হয়েছিল যে, তারপর থেকে ওর মনটা কেমন হয়ে গিয়েছে যেন। এত ছোট কেউ কাউকে করতে পারে! হ্যাঁ, তারপর ও কাজ করছিল, কিন্তু সেটা করতে হয় বলে! রিতুদা কী করে ওকে অমন অপমান করতে পারল!
ও বলেছিল, “কিছু বলবেন দাদা!”
“হ্যাঁ, তাই তো ডাকলাম। সোনাঝুরির কেস পেকে গিয়েছে খুব। ফাইনাল স্টেজ বলতে পারিস। পার্টি হাইকম্যান্ড থেকে আমাকে বলা হয়েছে যা ঠিক হবে তাই করতে! শোন, তুই এখন থেকে ওইদিকে যাবি। বিজন সরখেল বলে একটা লোক আছে। ওর ওপর তারক চক্রবর্তীর লোকজন হামলা করতে পারে। তুই বিজনকে গার্ড দিবি। যন্তর রাখবি সঙ্গে। এটা ইমপর্ট্যান্ট। কিছু হলে চালিয়ে দিবি। শালা, আমি বুঝে নেব বাকিটা। তারকের খুব পেঁয়াজি বেড়েছে। হাইকম্যান্ডের কাছে আমার নামে নালিশ করেছে! সেখানেও দু’-একটা বুড়ো ঢ্যামনা আছে যারা কাট মানি খায় তারকের কাছ থেকে। তাদের জন্য হাইকম্যান্ড থেকে সরাসরি কিছু করা যাবে না তারকের ওপর। তাই আমায় বলা হয়েছে ব্যাপারটা দেখতে। সোনাঝুরিতে প্রোজেক্ট হতেই হবে। না হলে চাপ আছে। আমাদের সরকারের প্রেস্টিজ ওটা। প্লাস অত শ্রমিক! সামনে ভোট আসছে। বুঝতে পারছিস তো! বিজনের যেন কিছু না হয়।”
মাহিরের কী হয়েছিল কে জানে! আচমকা কী যেন একটা ছিঁড়ে গিয়েছিল ভেতর থেকে। ও বলেছিল, “আমি গুন্ডামো করতে পারব না রিতুদা।”
“কী?” রিতুদা প্রথমে বুঝতে পারেনি।
“আমি বন্দুক-পিস্তল নিয়ে ওসব করতে পারব না রিতুদা। আমি ভদ্রবাড়ির ছেলে। আমায় আপনি গুন্ডা পেয়েছেন নাকি?”
“শালা, কী বলছিস তুই! ব্যাপারটা মেটা অবধি তুই বিজনকে চোখে-চোখে রাখবি। এর জন্য এককালীন দু’লাখ দেওয়া হবে তোকে। প্লাস যা টাকা পাস, তা তো পাবিই। তোর ভাইয়ের কেসটাও আমরা সাল্টে দেব। এত টাকা কোনওদিন বাপের জন্মে দেখেছিস!”
“আমি পারব না, রিতুদা। আমি গুন্ডা নই। আমি প্লেয়ার। আপনি বলেছিলেন আমার ফার্স্ট ডিভিশন টিমে চান্স করিয়ে দেবেন, কিন্তু কিছুই তো হল না! আমি তো পাতি গুন্ডা হয়ে গেলাম!”
“শোন, আমাদের সবার কাজ থাকে পৃথিবীতে। যেটা যার কাজ, তাকেই মানায়। তুই নিজেও জানিস যে, তুই ঢপের প্লেয়ার! ওটাতে তুই কোনওদিন কিছু করতে পারবি না। যাতে পারবি সেই কাজ দিচ্ছি! এটা তোর কাজ। টাকা পাবি ভাল। টাকা দরকার মাহির। পেটের টান শালা বড়-বড় বাতেলার পেছনে দিয়ে দেয়! যা বললাম কর। ভাল হবে,” রিতুদা উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আবার ঘামছিল গলগল করে। মাথার দু’পাশের শিরা ফুলে উঠেছিল।
দেখে ভয় লাগছিল মাহিরের। ওর মনে হচ্ছিল আবার যদি কিছু ছুড়ে মারে! আবার যদি এসে চুলের মুঠি ধরে! বুঝতে পারছিল এখানে বলে-কয়ে কিছু হবে না। তার চেয়ে সময় নিয়ে নিক কদিন। সুযোগ বুঝে ‘না’ বলে দেবে ফোনে। সব জায়গায় গায়ের জোর চলে না।
মাহির বলেছিল, “আমি একটু ভেবে নিই রিতুদা।”
“ভেবে নিই মানে?” রিতুদা খেপে গিয়েছিল, “শালা, তোকে ভাবতে বলেছি জানোয়ার! ভাবতে হলে ভাইয়ের কথা ভাব। তার অসুখের কথা ভাব। টাকা লাগবে না?”
মাহির চুপ করে গিয়েছিল। সবাই ওর এই একটা বিন্দুতে চাপ দেয়! একটাই বিন্দু, ভাই! পৃথিবী কেন সারাক্ষণ দুর্বল জায়গায় আঘাত করে! রিতুদারও তো ভাই ছিল। তা হলে? ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবন এমন একটা ভাই দিয়ে আসলে ওকেই পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছে!
“যা, কাল এসে ডিটেলটা বুঝে নিস। জানবি পেট বড় বালাই। শালা, সব কাপ্তেনি পেছন দিয়ে বেরোবে! এখন ফোট। কাল আসবি।”
বাড়ির দিকে এগোল মাহির। শীতের সন্ধে গাঢ় হয়ে আসছে। ধোঁয়াশার মনখারাপ চেপে আসছে চারিদিকে। সামনের পথ অজানা, কিন্তু তবু এগোতে হবে মাহিরকে। জীবনে দাঁড়াতে হলে শুধু অভিযোগ করলে হয় না। কাজ করতে হয়।
দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকল মাহির। আর ঢুকেই ঘাবড়ে গেল! আরে, পলি! দরজার দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে আছে পলি। দরজা ভেজানো ছিল বলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। কী করছে ও? আসার কথা তো ছিল না! তা হলে!
বুকের ভেতরটা কেমন করছে মাহিরের। তিমিমাছটা আবার জেগে উঠেছে, তবে এবার তার অন্য রকম দাবি! ফাঁকা ঘর। নির্জন বাড়ি! ওরা দু’জন। মাহির কোনওদিন তো ভাবতেই পারেনি এভাবে ও পলিকে পাবে! দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল মাহির। এমন সুযোগ আর পাবে না। ও আজকেই ওর কথাটা বলে দেবে পলিকে।
ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল মাহির। ওর ঘরে ঢোকার শব্দে পেছনে ফিরল পলি! সঙ্গে সঙ্গে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল মাহিরের। দেখল, পলির হাতে চকচক করছে পিস্তল! পাশের বিছানায় কিটব্যাগটা খোলা। তোয়ালেটা পড়ে আছে এক কোণে।
মাহিরের মনে হল পেট থেকে লাফ দিয়ে তিমি এবার বেরিয়ে আসবে বাইরে! পলির হাতে এটা এল কী করে? ইস, ব্যাগটা বেখেয়ালে কেন রেখে গিয়েছিল বিছানায়! পলি কী ভাবল ওকে! এখন কী হবে? কী করে ও পলিকে বোঝাবে যে আসলে ও খারাপ নয়! আসলে এটা রিতুদার! আসলে, পলির জন্য ও সব ছাড়তে পারে! আসলে… আসলে… আসলে…
মাহির লাভায় আটকে যাওয়া মানুষের মতো তাকিয়ে থাকল পলির দিকে। পলি ওর দিকে তাকিয়েই আছে। হাতের পিস্তলটা কাঁপছে সামান্য।
মাহির কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “পলি আমি… এটা আমার। মানে আমার না…”
পলি তাকিয়েই আছে!
মাহির বলল, “রিতুদা রাখতে দিয়েছে। আসলে নানা ঝামেলা হয় তো! তাই… আমি ছেড়ে দিয়েছি রিতুদাকে। ওই পার্টি ছেড়ে দিয়েছি। প্লিজ়… পলি প্লিজ়…”
পলি পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল ওর দিকে। তারপর পিস্তলটা তুলে এক চোখ টিপে তাক করার মতো করে বলল, “ঢিঁচক্যাঁওও!”
মাহির তাকিয়ে রইল। দেখল পলি হাসছে। যেন মজা পেয়েছে খুব! কেন হাসছে পলি! রেগে গিয়ে হাসছে কি? অবজ্ঞা করে হাসছে? ওকে কি নরকের কীট ভাবছে? ভাবছে, এ কেমন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে যাচ্ছে! কেন হাসছে পলি! কী বলতে চায় ও এই হাসি দিয়ে!
মাহির আবার অস্ফুটে বলল, “প্লিজ়…”
পলি পিস্তলটা ঘুরিয়ে দেখল ভাল করে। মুখে এখনও হাসি। তারপর জিনিসটা বিছানায় রেখে দিয়ে বলল, “এমন জিনিস ঘরে রেখে দরজা ভেজিয়ে বাইরে গেছিলে! জানো, আমি পিস্তল আগে কাছ থেকে দেখিনি। হাতে নিয়ে এই প্রথম দেখলাম! কী ভারী! চালাও কী করে?”
“আমি চালাই না,” মাহিরের মনে হল পলির সামনে কী করলে ও বুঝবে যে, মাহির সত্যি কথা বলছে! বুকের ভেতরে কেমন একটা করছে ওর। মনে হচ্ছে এত কাছে এসে সব এভাবে শেষ হয়ে যাবে! নিজেকে মনে মনে গালি দিল! ওর বোকামোর জন্য হল এটা! এমন করে কেউ কিটব্যাগটা রেখে যায় সামনে! সব যে নষ্ট হতে বসেছে! এখন কী করবে মাহির!
পলি হেসে বলল, “সে আমি বুঝতে পারছি। যাক বাবা…”
যাক বাবা? মানে? কে যাবে? কোথায় যাবে? বাবাই-বা আসে কোথা থেকে এর ভেতরে! পলি কী বলতে চাইছে! টেনশনে মাহিরের মনে হল, এক্ষুনি ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে!
পলি বলল, “তোমায় দিয়ে হবে…”
ওকে দিয়ে হবে? মাহিরের মাথায় ঢুকছে না কিছু। কী বলছে পলি? ও বলল, “পলি আমি অমন নই। ওটা আমার নয়। বিশ্বাস করো। আমি আসলে…”
পলি এগিয়ে এসে কাছে দাঁড়াল মাহিরের। তারপর আচমকা হাত দুটো নিজের হাতে শক্ত করে ধরল। বলল, “পারলে তুমিই পারবে। আমায় প্লিজ় হেল্প করো মাহির। আয়্যাম ইন ট্রাবল।”
ট্রাবল! মাহির তাকিয়ে রইল পলির দিকে। ঘরের আলো যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। পলি ওর এত কাছে! সুন্দর গন্ধ আসছে পলির শরীর থেকে। কেমন একটা লাগছে মাহিরের। কেমন ঘোর এসে যাচ্ছে। ও যেন চোখ খুলে রাখতে পারছে না। পলির কোমরটা পেঁচিয়ে নিজের দিকে টেনে নিতে ইচ্ছে করছে ওর। ওর শরীর আর মন যেন ওর কথা শুনছে না!
পলি বলল, “আমার স্যারের স্ত্রী আমায় খুব ভয় দেখাচ্ছে। আমার জীবন শেষ করে দেবে বলছে। লোক পাঠিয়েছিল আমার বাড়িতে। ও চায় স্যারকে আমি ছেড়ে দিই। বলে আমার বয়সি মেয়ে আছে স্যারের। কিন্তু আমি স্যারকে ছাড়া থাকব কী করে? তুমি বলো মাহির, প্রেম কি বয়স, অবস্থা, ন্যায়-অন্যায় বোঝে! বোঝে না। আমিই-বা কী করে বুঝব! স্যারকে ছাড়া আমি মরে যাব। তুমি স্যারের বউকে বা ওর গুন্ডাদের কিছু বলো। রিতুদাকে বলো যেন আমায় হেল্প করেন। তুমি পারবে। এই… এই পিস্তলটা নিয়ে ওদের সামনে একটু নাচাবে। ওরা ঠিক তোমার কথা শুনবে। আমায় প্লিজ় হেল্প করো। যা টাকা লাগবে আমি দেব। প্লিজ় মাহির… গুন্ডাদের গুন্ডারাই শায়েস্তা করতে পারে… আর কেউ পারে না। প্লিজ়…”
পলি এগিয়ে আসছে আরও। আরও কীসব বলছে। জড়িয়ে যাচ্ছে পলির কথা। পলি গালে হাত দিচ্ছে মাহিরের। কীসব বলছে। কিন্তু মাহিরের কিছু মাথায় ঢুকছে না। পলি ওর স্যারকে ভালবাসে! পলি অন্যকে ভালবাসে! আর গুন্ডা! গুন্ডা শায়েস্তা করতে পারবে গুন্ডাকে! কে গুন্ডা? মাহির? মাহিরকে পলি গুন্ডা ভাবে! তাই এসেছে নিজের নোংরামো ঢাকার জন্য! পিঠ বাঁচানোর জন্য!
পলিকে দেখল মাহির। কিন্তু মনে হল রোগা সেই ফুটবলারটা এগিয়ে আসছে। বলের ওপর ঘুরছে ওর পা। কাটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাবে ওকে জীবন। জীবন! এটা জীবন! পলি টাকা দিতে চাইছে ওকে! ও কি গুন্ডা! ওকে দেখে লোকে ভয় পায়! তাই কি সতুয়া সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে ওকে আগে মুড়ি দিয়ে দিল! এটা কী হচ্ছে! সবাই কীভাবে দেখছে! ওকে টাকা দিলে ও শায়েস্তা করে দেবে লোকজনকে!
পকেটে ফোনটা নড়ছে। কে ফোন করছে! কেন ফোন করছে একটা গুন্ডাকে! পলির সুন্দর মুখটা ভেদ করে বেরিয়ে আসছে বীভৎস একটা মুখ! পলি টাকা দিতে চাইছে। বলছে, ওরা তো নিয়ে থাকে। নিয়ে থাকে? মাহির নেবে?
যন্ত্রের মতো পকেট থেকে ফোনটা বের করল মাহির। রিসিভ করে কানে লাগাল। রিতুদা। রিতুদা কীসব বলছে। রাগ করছে। কেন মাহির জানাচ্ছে না সেই নিয়ে রাগ করছে। সামনে পলি কীসব বলছে। ছেলেটা বল নিয়ে চলে এল প্রায়। ওকে কাটিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছে। বিকেলের রোদ অনেকটা সরে গেছে দেবদারুর মাথা থেকে। পতাদাকে আর দেখতে পাচ্ছে না। শুধু চিৎকার ভেসে আসছে। কারা যেন হল্লা করছে খুব। আর ভাই শুয়ে আছে। ওর চিররুগ্ণ, অসহায় ভাই আজ দাঁড়িয়েছে গোলে, সুমিতের জায়গায়। ছেলেটা মাহিরকে টপকে গেলেই ভাইকে একা পাবে। ভাইকে কি একা ছেড়ে দেবে মাহির! ঘুমের মধ্যে যে ভাই ওকে খোঁজে, ওর নাম ধরে ডাকে, তাকে একা ছেড়ে দেবে! কী করে দেবে! নিজের ভাইকে কী করে একা ছাড়বে মাহির!
ও হাত তুলে থামাল পলিকে। তারপর ফোনে রিতুদাকে বলল, “আমি রাজি রিতুদা। টাকাটা একটু বাড়িয়ো। ভাইটার অপারেশন সামনে। কেমন?”
তারপর ফোনটা রেখে তাকাল পলির দিকে। পলি তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কাঁধের ওপর কেটে বসা ব্রেসিয়ারের কালো স্ট্র্যাপটা দেখা যাচ্ছে! সেইদিকে ভাল করে তাকাল মাহির। গুন্ডা তো ও! গুন্ডারা এমন করতেই পারে! ও হাত দিয়ে স্ট্র্যাপটা ধরে জামার তলায় গুঁজে দিল। তারপর বলল, “দু’লাখ লাগবে। কাজ হয়ে যাবে। একপয়সা কম নয়। রাজি হলে বলো। না হলে ফোটো!”
সন্ধে গাঢ় হয়ে এল কলকাতায়। সামনে ধোঁয়াশা। মনে মনে ভাইয়ের দিকে তাকাল মাহির। তারপর সেই আবছা, ধোঁয়া ঢাকা পথের দিকে এগিয়ে গেল, একা!
Chapter - 35 - 39
৩৫. রাধিয়া
পরিটা ঘোরে না। কতদিন ঘোরে না এই পরি? জানে না রাধিয়া। শুধু এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে, মেঘের দিকে তাকিয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে পরি! ভিক্টোরিয়ার চূড়ায় রোদ এসে লেগেছে এখন। কমলালেবু রঙের সূর্য শীতের কলকাতার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার আগে নিজের শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেলোফেনের মতো আলো লেগে রয়েছে মেমোরিয়ালের চূড়ায়, ক্যাথিড্রালের গথিক থামে, ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়ানো উঁচু বাড়িটির গালে। পরির ডানাও ভিজে আছে সেই রোদে। পরিটার জন্য কষ্ট হয় রাধিয়ার। ও জানে পরি হয়ে থাকার যন্ত্রণা।
ছোটবেলায় বাবা পরি বলে ডাকত ওকে! সাদা ফ্রিল দেওয়া ফ্রক, মাথায় সাদা হেয়ার ব্যান্ড পরা ছবি যে ওর কত আছে। বাবার কোলে রাধিয়া। বাবার কাঁধে রাধিয়া। বাবা খুব খুশি হয়ে হাসছে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।
এইসব ছবি এখন ডিজিটাল ফ্রেমে ট্রান্সফার করানো হয়েছে। রাতে, একা-একা সেই ছবি দেখে ও। বাবার সঙ্গে লেপটে থাকার সেই বয়সটার কথা ভাবে। ভাবে সেই মেয়েটা কোথায় গেল! ঠিক কোন দিন থেকে মেয়েটার হাত ছেড়ে দিল বাবা। রাধিয়ার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কষ্ট হয়। ওদের বিশাল বড় বাড়িটা কেমন দৈত্যের কেল্লা মনে হয়। মনে হয় এই গোলকধাঁধায় আটকে গেছে, হারিয়ে গেছে ও। ওই পরির মতো নিরুপায় হয়ে থেমে আছে। মানুষ হয়ে বেঁচে ওঠা যেন আর হল না রাধিয়ার।
রাধিয়া জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে দেখল। ভাড়া করা গাড়িতে বসে আছে ও। চৌরঙ্গি আর ক্যাথিড্রাল রোডের ক্রসিংটায় আছে ওর গাড়ি। নন্দন চত্বরে যাবে ও। নিশান আসবে। নিশানের সঙ্গে দেখা করাটা খুব দরকার। সেদিনের পর থেকে আর নিশানের সঙ্গে দেখা হয়নি। পরপর দু’দিন যা অসভ্যতা করল বাবা! কীভাবে যে নিশানের কাছ থেকে ক্ষমা চাইবে বুঝতে পারছে না।
আজ বড়দিন! ইউনিভার্সিটি ছুটি। তাও বেরিয়েছিল রাধিয়া। জয়তীর বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল ওর। আসলে ঠিক নেমন্তন্ন নয়। জয়তীকে ও বলেছিল, মাকে যেন ফোন করে জয়তী। বলে, নেমন্তন্ন আছে। সেদিনের পরে ওকে সারাক্ষণ চোখে-চোখে রাখা হয়েছে! ইউনিভার্সিটি যাওয়া আর আসা। তাও গাড়িতে মধুদার সঙ্গে বুজুকেও পাঠানো হয়। মাঝে মাঝে এত দম বন্ধ লাগে! বাবা এমন বাড়াবাড়ি করছে কেন, কে জানে!
মাকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল রাধিয়া। বলেছিল, “এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? এমন কতদিন চলবে মা? আমি তো মানুষ না কি!”
মা রাগ দেখিয়ে বলেছিল, “যতদিন না সোনাঝুরির কাজটার কিছু ব্যবস্থা হয় ততদিন! আর কোন মুখে কথা বলিস তুই? লজ্জা করে না! অমন একটা ছেলের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে বসেছিলি! ছিঃ ছিঃ! এভাবেই থাকতে হবে তোকে। তোর বাবাকে এইজন্য আমি বলেছিলাম, মেয়েকে এখানে রেখো না। বিদেশে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু আমার কথা আর তোর বাবা শুনেছে কবে! মেয়ে যা বলবে, সেটাই যেন সব! নাও এখন ভোগো! তোকে বলে দিলাম, এভাবে অসভ্যতা আমরা সহ্য করব না। এটা মাথায় থাকে যেন।”
রাধিয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল অবাক হয়ে। মা এভাবে বলতে পারে কী করে? বাবা যে কী করে বেড়াচ্ছে, সেটা যদি একবার জানতে পারে, তখন ও দেখবে মায়ের এই সব কথা কোথায় যায়! কিন্তু রাধিয়া এখনও স্পষ্ট করে জানে না বাবা ঠিক কী করছে। ওদের ব্যাবসার কাজে বাইরে যাচ্ছে বলে আসলে কোথায় যাচ্ছে। নিশানের সঙ্গে এই নিয়ে আর কথাই হয়নি সেভাবে। আসলে সেদিন ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছিল ওই সব কথা। কিন্তু তারপর থেকে নিশান এই নিয়ে ওকে কিছু বলেনি। আর রাধিয়াও স্বভাবগত লজ্জা আর দ্বিধায় ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি।
জয়তী ওর শেখানো কথামতো মাকে ফোন করেছিল গতকাল। মা প্রথমে গাঁইগুঁই করেছিল বটে, কিন্তু মুখের ওপর না করতে পারেনি। মায়ের এই ব্যাপারটা জানে রাধিয়া। মায়ের রাগ-টাগগুলো সব ঘরের ভেতরে, ওর সামনে। বাইরের লোকের সামনে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে না। তাই জয়তীকে দু’-একবার না করেও শেষে হ্যাঁ করে দিয়েছিল।
মা আজ রাধিয়াকে বলেছিল, “আমাদের সঙ্গে রাতে ক্লাবে যাবি না বলেই কি বান্ধবীকে দিয়ে এমন একটা ফোন করালি?”
রাধিয়া গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “এসব আমায় না জিজ্ঞেস করে জয়তীকে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতে! ঠিক আছে জয়তীর মায়ের সঙ্গে না হয় আবার ফোন করে কথা বলো।”
মা আর কথা বাড়ায়নি। শুধু বলেছিল, “কিন্তু আজ তো মধুদা ছুটি নিয়েছে। আর বুজু আমায় নিয়ে পার্লারে যাবে। ঠিক আছে, ছোট হ্যাচব্যাকটা নিয়ে তপনকে না হয় বলব তোকে পৌঁছে দিতে।”
“আমি গাড়ি বুক করে নেব মোবাইল থেকে। আমায় কী ভাবো মা? কী ভাবো আমায়?” রাগে ছটফট করে উঠেছিল রাধিয়া, “একটা দিন। আমি নিশানের সঙ্গে দেখা করব না, হয়েছে? এমন কোরো না সবাই মিলে! আমি মরে যাব এবার!”
মা আর কথা বাড়ায়নি। শুধু বলেছিল, “তোর বাবা এখন নেই। আজ সন্ধেবেলা ফিরবে। তারপর আমরা ক্লাবে যাব। তার আগে ঢুকে পড়বি কিন্তু!”
বাবা গতপরশু আবার বাইরে গিয়েছে। বাবা বাইরে গেলেই কেমন একটা লাগে রাধিয়ার। কেমন একটা মনখারাপ হয়। কষ্ট হয় বুকের মধ্যে। মায়ের জন্য খারাপও লাগে। মনে হয় মায়ের কাছে গোটা ব্যাপারটা লুকিয়ে ও খুব খারাপ কাজ করছে। কিন্তু আসল কথাটা যতক্ষণ না ও নিজে ঠিকঠাকমতো জানতে পারছে, ততক্ষণ তো কিছু বলতেও পারছে না। এখন এমনি বললে মা পাত্তাই দেবে না। মা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে বাবাকে। কিন্তু তাও ওর অপরাধবোধ হয়। মনে হয়, বাবা যে ওদের মিথ্যে বলছে সেটা ওর লুকিয়ে রাখা উচিত হচ্ছে না।
জয়তীর বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে রাধিয়া। মাকে বললেও, আসলে ও নিশানের সঙ্গেই দেখা করতে চায়। যে-ছেলেটাকে ওর এত ভাল লাগে, আর ছেলেটাও যা ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে বুঝেছে নিশানেরও ওর ওপর দুর্বলতা আছে। সে কী করে একবারও ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে না! ওর ফোন তো কেড়ে নেয়নি কেউ! নিশানের মনের ভাব পড়তে কি তা হলে ভুল হয়েছিল! সব এমন ছন্নছাড়া কেন ওর জীবনে! কিছুই কি রাধিয়া গুছিয়ে করতে পারে না! অনেকটা রাগ আর জেদ থেকে আজ সকালে নিশানকে মেসেজ করেছিল রাধিয়া। লিখেছিল, ‘আমি দেখা করতে চাই।’
সামান্য সময় পরে নিশান উত্তরে লিখেছিল, ‘একা? না বাবা সমেত!’
রাগে গা জ্বলে গিয়েছিল রাধিয়ার। কী সাহস! ওকে চিমটি কেটে কথা বলছে! ও লিখে পাঠিয়েছিল, ‘একা। একাই। পাঁচটা, নন্দন।’
নিশান একটা ছোট্ট ‘ওকে,’ লিখে পাঠিয়েছিল শুধু!
জয়তীদের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় একবার মনে হয়েছিল নিশানকে ফোন করে কনফার্ম করবে কি না। কিন্তু শেষে করেনি। কথার দাম নিশ্চয় আছে ছেলেটার। আর যদি না থাকে তা হলে তো হয়েই গেল। কেন কে জানে সেদিনের পর থেকে নিশানের ওপর কেমন যেন একটা অভিমান জমেছে ওর মনে। সবার সামনে থেকে বাবা ওরকম করে ওকে নিয়ে গেল, সেখানে নিশান কিছু বললই না প্রায়! আর শেষে বলল কিনা, বাবা এরকম বলে ওকে ফোন করে না। বাবা-মা কেমন হবে তার ওপর কি সন্তানের হাত থাকে? তা হলে সেই কথা বলে ওকে অপমান করার কী মানে! আজ তাই তো ডেকেছে ওকে। আর কবে সময় পাবে জানে না। কিন্তু আজ নিশানকে জিজ্ঞেস করবেই ওর ওইসব কথার মানে। কেন নিশান এমন! সব জেনেও কেন এমন করেছে ওর সঙ্গে! ও কাউকে কিছু বলে না বলে সবাই ওকে ভিতু আর টেক্ন ফর গ্র্যান্টেড করে নিয়েছে! এটা আর যেন আজকাল সহ্য হয় না। সেদিন যেভাবে বাবা ওকে টানতে-টানতে নিয়ে এল, নিশান তো তারপর একবারও কিছু জিজ্ঞেস করল না যে, ও কেমন আছে! এমন একটা ছেলেকে দেখে ক্ষণিকের দুর্বলতায় রাধিয়া বাবার ব্যাপারটা বলে দিল? তবে কি ও ভুল করেছে! আজ নিশানের সঙ্গে দেখা করে এটাই নিজের কাছে পরিষ্কার করে নেবে ও। তাই মনে মনে তৈরি হওয়া অভিমান আর রাগটাকে রাধিয়া বাঁচিয়ে রাখছে। এটা কাজে লাগবে পরে।
বেরোনোর মুখে জয়তী বলেছিল, “নিশানের সঙ্গে দেখা করছিস, বাড়িতে জানলে কিন্তু বিশাল ঝামেলা হবে আবার!”
রাধিয়া হেসেছিল সামান্য, “হলে হবে। কিন্তু জানার উপায় নেই।”
জয়তী হেসেছিল। তারপর ওর হাতটা ধরে বলেছিল, “প্রেমে পড়েছিস না, ছেলেটার?”
“ভাগ!” রাধিয়া নিজের অজান্তেই লাল হয়ে উঠেছিল।
“ইঃ! খালি ঢপ! মুখ সঙ্গে-সঙ্গে লাল হয়ে উঠল, আর বলে কিনা পড়েনি! কিন্তু যা করবি ভেবে করবি।”
রাধিয়া তাকিয়েছিল জয়তীর দিকে। মেয়েটা খুব ভাল। ওকে খুব ভালবাসে। এই যে মিথ্যে করে নেমন্তন্নের কথাটা বলল, তাতে জয়তী সত্যি ওকে বাড়িতে ডেকে দুপুরে খাইয়েছে। ওর বাবা, মা, বোন কত গল্প করেছে। গান করেছে। এত ভাল লেগেছে রাধিয়ার। ওর তো নিজের বাড়িতে যেতেই ইচ্ছে করছিল না। কী সুন্দর ওদের বাড়িটা। পুরনো দিনের উঁচু সিলিং। মোটা ভারিক্কি দেওয়াল। লাল মেঝে। বিশাল বড় সেগুন কাঠের দরজা। লম্বা পেতলের ছিটকিনি। কাচের স্কাইলাইট। চওড়া বারান্দা। নিচু ধাপের সিঁড়ি। কেমন একটা পুরনো সুন্দর কলকাতা যেন থমকে আছে জয়তীদের বাড়িতে। বাইরের, রাস্তার সব পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন চৌকো কলকাতা তৈরির চেষ্টাটা এখানে ঢুকতে পারেনি এখনও। এর তুলনায় ওদের বাড়িটা কেমন যেন গোমড়া আর মনখারাপ রঙের! ওদের বিত্তের তো অভাব নেই, কিন্তু চিত্তের অভাব বড় প্রকট।
রাধিয়া বলেছিল, “আমি কিছু করব না রে। আমি একটা-দুটো প্রশ্ন করব। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো বিশ্বাসের আর ভরসার। সেটাই জিজ্ঞেস করব।”
জয়তী বলেছিল, “দেখ রাধি, তোদের অনেক টাকা। সেটা একটা যেমন সুবিধে তেমন অসুবিধেও। তুই অন্য বড়লোক বাড়ির মেয়ের মতো নোস। তুই খুব ডাউন টু আর্থ! খুব সাধারণভাবে থাকিস, জীবন কাটাস। কিন্তু তোকে যারা দেখছে, তারা সেভাবে সবাই দেখবে না ব্যাপারটা। তাই তাদের রিজ়ার্ভেশন থাকা স্বাভাবিক। একটা সামান্য কথা বলতে গেলে তাদের দশবার ভাবাটা স্বাভাবিক, তাই না? তাই বলছি নিশান চাইলেও নানা ফ্যাক্টর আছে কিন্তু এর মধ্যে! সবসময় মানুষ যা বলতে চায়, তা কিন্তু বলে উঠতে পারে না। এটা মাথায় রাখিস।”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে ওই ওপরে দরজার কাছে দাঁড়ানো জয়তীকে দেখে খুব ভাল লাগছিল ওর। কতদিন পরে কেউ ওকে সুন্দর করে বুঝিয়ে কথা বলল! ওর পাশে দাঁড়াল!
মনটা কেমন যেন নরম হয়ে আসছিল। মোবাইলে গাড়ি বুক করে নিয়েছিল জয়তীদের বাড়িতে থাকতেই। কিন্তু গাড়িতে উঠেও জয়তীদের বাড়িতে থেকে যেতে ইচ্ছে করছিল! কী আর হবে— ভেবে নিজেকে আবার কেমন যেন গুটিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই আবার সচেতন হয়ে নিজেকে ঠিক করেছিল রাধিয়া। ওর এই নরম হয়ে যাওয়াটাই লোকে ভুল ভাবে নেয়। ওকে দুর্বল ভাবে। নিশানকে আজ ছাড়বে না ও কিছুতেই। মানুষের ভরসা নিয়ে, ইমোশন খেলা করাটা আজকাল যেন একটা ফ্যাশন হয়ে গিয়েছে সবার। এটাকে ওর সঙ্গে হতে দেবে না আর।
ক্যাথিড্রাল রোড দিয়ে গাড়িটা এগোচ্ছে। ডান দিকে ভিক্টোরিয়ার ইস্ট গেট। বাঁ দিকে বড় ক্যাথিড্রাল। আজ বড়দিন। রাস্তায় লোক থিকথিক করছে। ক্যাথিড্রালের সামনে গেট করা হয়েছে। আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। মানুষজনের সারি-সারি হাসি মুখ! এটা ভাল লাগে রাধিয়ার। পৃথিবীতে এত কিছু ভয়াবহ আর কষ্টের ব্যাপার ঘটে চলছে, তাও মানুষ কিন্তু সামান্য সুযোগ পেলেই সব ভুলে আনন্দ করতে চায়। এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রবণতা। তা হলে মানুষ এমন কাজ কেন করে, যাতে তার আর আশপাশের সবার কষ্ট বাড়তেই থাকে! নাকি মানুষ নিজের আনন্দটাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যের কথা ভুলে যায়! তা হলে কি আনন্দ আর কষ্ট আলাদা কিছু নয়! দুটোর মধ্যের বিভাজন রেখা কি তবে অস্পষ্ট! একটা কি আর-একটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত!
রাধিয়ার প্রশ্ন প্রচুর, কিন্তু উত্তরগুলো যেন সব স্পষ্ট নয়। ঠাকুরমার কাছে মাঝে মাঝে এইসব নিয়ে প্রশ্ন করে রাধিয়া। ঠাকুরমা সাধ্যমতো উত্তর দেয়। কিন্তু সোনাঝুরির ওই জুট মিল, জায়গা আর বাড়ি বিক্রি নিয়ে ঠাকুরমা কয়েকমাস যাবৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে আছে। চাপাগলায় দু’-একবার বাবার সঙ্গে ঠাকুরমার এই নিয়ে অশান্তি হতেও শুনেছে ও। তবে কী কথা হয়েছে, শোনেনি। রাধিয়ার সামনে বাবা, ঠাকুরমার সঙ্গে এই নিয়ে কিছু বলে না। ঠাকুরমাও, ও দেখেছে বাবার ব্যাপারে মাথা গলায় না। ছেলে বড় হয়ে গেছে বলে বাবার সংসারের কিছুতেই থাকে না।
শুধু সেদিন রেস্তরাঁ থেকে ফেরার পরে বাবা যখন খুব চিৎকার করছিল, ঠাকুরমা ওপর থেকে নেমে এসে বলেছিল, “রাধি, আমার কাছে চলে আয়!”
সেদিন রাতে ঠাকুরমার কাছেই ছিল রাধি। চিরকাল ঠাকুরমাকে গম্ভীর, কম-কথা-বলা মানুষ হিসেবে দেখেছে রাধিয়া। মাঝে মাঝে অফিস যাওয়া ছাড়া অধিকাংশ সময় বাড়িতে, নিজের মনেই থাকতে দেখেছে। শুধু সেদিন দেখেছিল অনেক রাত অবধি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল ঠাকুরমা। নরম গলায় বলেছিল, “যার জন্য এমন কষ্ট পাচ্ছিস, সে কি জানে?”
ঠাকুরমার ছোটবেলার কথা কিছু জানে না রাধিয়া। ঠাকুরমাই বলে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, “আমি আর অতীত নিয়ে ভাবি না।”
তবে মাঝে মাঝে নিজের বাবার কথা বলে। ঠাকুরমার বাবা পুলিশ ছিল। সেটা জানে ও। খুব শান্ত আর নরম মনের মানুষ ছিল। ঠাকুরমার ঘরে ছবি দেখেছে রাধিয়া। আর কারও কোনও ছবি ও দেখেনি। বাবা ছাড়া আর কারও কথা ঠাকুরমা বলে না। শুধু শুনেছে, কানাডায় ঠাকুরমার এক ভাই থাকে। ঠাকুরমা বলে, “খুব ভাল ছেলে ছিল টেটু!”
কেউ জানে না কারও কথা! এই পৃথিবী এক ‘সলিটারি প্রিজ়ন’! ও শুধু বলেছিল, “তুমি বুঝবে না ঠাকুমা! ইটস কমপ্লিকেটেড! যদি কাউকে ভালবাসতে, তা হলে বুঝতে!”
ঠাকুরমা তাকিয়েছিল ওর দিকে। নরম হলুদ টেব্ল ল্যাম্প জ্বলছিল ঘরে। তার ওপরে ঢাকা দেওয়া ঝালরকাটা নকশার আলোছায়া ছড়িয়ে ছিল দেওয়ালে। রাধিয়া দেখেছিল, ওর কথা শুনে ঠাকুরমা যেন কিছু বলতে গিয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর বলেনি। রাধিয়া মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কী বলতে চাইছিলে?”
ঠাকুরমা বলেছিল, “কিছু না রে। আমার আর কিছু বলার নেই!”
আজও পরিটাকে যতক্ষণ পারা যায় দেখল রাধিয়া। রোদে ভিজে আছে বলেই কি ওই ডানা নিয়ে উড়ে যেতে পারে না! ওর মনে হল, আচ্ছা পরিটা কি ওকে দেখতে পেল?
নন্দনের সামনে গাড়িটাকে ভাড়া মিটিয়ে ছেড়ে দিল রাধিয়া। বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। এখানেও ভিড় খুব। ও ধীর পায়ে সামনের দিকে এগোল। লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে রয়েছে! এখানে এলে কতরকমের যে মানুষ দেখা যায়! তার ওপর আজ উৎসবের দিন বলে লোকজন আরও বেশি। সিনেমা হলের সামনে বেশ ভিড়। গাছের গোড়ার বাঁধানো বসার জায়গায় বসে আছে ছেলেমেয়েরা। এই ভিড়ে কীভাবে খুঁজবে নিশানকে! রাগের মাথায় টেক্সট তো করে দিয়েছে, কিন্তু এটা বলেনি কোথায় দাঁড়াবে।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে একটা চেনা মুখ দেখতে পেল রাধিয়া। আরে, সেই মেয়েটা না! সেই সুন্দর দেখতে, চশমা পরা মেয়েটা! কপালে অনুস্বরের মতো করে টিপ পরে। ঝকঝকে হাসি। সেই পাগল-পাগল স্মরণ বলে ছেলেটা থাকে সঙ্গে। কলেজ স্ট্রিটে দেখা হয়েছিল। মেয়েটাকে দেখে এক মুহূর্ত কেমন যেন থমকে গেল রাধিয়া। কী হয়েছে মেয়েটার? এমন গোমড়ামুখ কেন? সামনে দাঁড়ানো একটা ছেলে। চাপ দাড়ি। ছেলেটা কিছু বলছে। আর মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। দেখেই রাধিয়া বুঝল যে, কিছু একটা হয়েছে। রাধিয়া তাই আর সামনে এগোল না। কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে ঢোকা ঠিক নয়। তাও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল রাধিয়া। মেয়েটার নাম যেন কী… ও, নোঈ! মেয়েটার মুখটা এমন গম্ভীর কেন? ছেলেটাকে আবার ভাল করে দেখল রাধিয়া। প্রাণপণে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে ছেলেটা। মাঝে মাঝে হাতজোড় করে কিছু বলার চেষ্টাও করছে। কিন্তু নোঈ মাথা নামিয়ে গম্ভীর হয়ে আছে। কী যে ব্যাপার বুঝল না রাধিয়া।
“হাই!” পাশ থেকে নিশানের গলা পেল এবার। রাধিয়া ঘুরে তাকাল।
নিশান ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল নোঈকে। তারপর চোখের ইশারায় রাধিয়াকে সরে আসতে বলল।
রাধিয়া ওর সঙ্গে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল। নিশান দেখল একবার। না, এখান থেকে আর নোঈকে দেখা যাচ্ছে না। রাধিয়া অবাক হল। ওর মাসতুতো না কী যেন বোন হয় না?
নিশান বোধহয় বুঝতে পারল রাধিয়ার মনের কথা। বলল, “নোঈর এক্স বয়ফ্রেন্ড ওই ছেলেটা। আজ দেখা করতে এসেছে। জয় নাম। ওদের সামনে তাই আর গেলাম না। আগে আমার দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে। আমাদের ওর সামনে যাওয়া উচিত নয়।”
“উচিত নয়?” রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে।
নিশান পাশের একটা গাছের গায়ে হাত দিয়ে পা-টা ক্রস করে দাঁড়াল। নীল পাঞ্জাবির ওপর হাতকাটা সাদা রঙের জহরকোট পরে এসেছে আজ নিশান। গালের দাড়িটাও সুন্দর করে কাটা। অদ্ভুত ঠান্ডা আর মিষ্টি গন্ধের একটা পারফিউমও মেখেছে। পায়ের জুতোটাও নতুন। এমন সাজগোজ করতে নিশানকে ও দেখেনি কোনওদিন। কাটা-কাটা চোখমুখে একটা শান্ত ভাব। রাধিয়া দেখেছে আশপাশের কয়েকটা মেয়ে ঘুরে-ঘুরে দেখছে নিশানকে। বিরক্ত লাগছে রাধিয়ার। কী অসভ্য সব মেয়েগুলো! এভাবে দেখার কী আছে! বুকের ভেতর ওর পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে যেন। কিন্তু নিশানের হাসি-হাসি মুখ দেখে তো বোঝা যাচ্ছে যে, ও ব্যাপারটায় মজা পাচ্ছে বেশ। ছেলেরা কি এমনই হয়? নির্লজ্জ? ফ্লার্ট করেই তাদের আনন্দ! মেয়েদের মতো ভাল কেন বাসতে পারে না ছেলেরা! শুধু নিজেদের দর যাচাই করাই কি ওদের কাজ! নিশান ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে কেন? রাধিয়ার মনে হল নিশানের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয়। এই ছেলের নিশ্চয় অনেক মেয়েবন্ধু। ফলসা তো বলেছে নিশানের নাকি হেভি ডিমান্ড। ডিমান্ড! ছিঃ, কেমন চিপ লাগে শুনলে। কিন্তু নিশানের নিশ্চয় খুব আরাম হয় এসব শুনে। ডিমান্ড! পেট্রল নাকি? মানুষ কত সহজে নিজেকে কমোডিটি করে দিতে পারে! কেন এসেছে ও এখানে নিশানের সঙ্গে কথা বলতে! এমন ছেলে ওর খবর নেয় না বলে কেন হেদিয়ে মরছে ও! মায়ের কাছে মিথ্যে বলে, জয়তীকে অনুরোধ করে কীসের জন্য রাস্তায় বেরিয়েছে! কীসের জন্য দাঁড়িয়েছে এখানে! বাবা সাতটার মধ্যে ফিরবে। তার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে আবার অশান্তি হবে। কেন এসব অশান্তি নেবে ও! কার জন্য! এই সামনের ছেলেটার জন্য! যে ও মরল কি বাঁচল তার খবর রাখে না!
আচমকা মনের ভেতরটা কেমন হয়ে গেল রাধিয়ার। ও বলল, “ওকে বাই। আমি আসছি!”
নিশান সোজা হয়ে দাঁড়াল, “আরে!”
রাধিয়া চোয়াল শক্ত করে বলল, “হ্যাঁ, আমি বাড়ি যাব।”
নিশান এগিয়ে এল এক পা। তারপর আচমকা হাতটা ধরল ওর, “কী হয়েছে রাধি… ইয়ে রাধিয়া!”
রাধিয়া মুখ নামিয়ে নিল। কোনও কারণ ছাড়াই আচমকা চোখে জল এসে গেল ওর। নিশানের হাতটা গরম। ওর ঠান্ডা আঙুলগুলোর যেন ইচ্ছে হল সেই উত্তাপের সমস্তটাই শুষে নেয় শরীরের মধ্যে।
নিশান নরম গলায় বলল, “তোমার জ্বর হয়েছিল কয়েকদিন আগে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটাও কেটে গিয়েছিল। এর মাঝে দুটো গল্পের বই তুমি পড়েছ। দু’রাত না খেয়ে থেকেছ। আর… আর… আর তোমার মায়ের জন্মদিন ছিল চারদিন আগে। ঠিক না?”
রাধিয়া চমকে উঠে তাকিয়ে রইল নিশানের দিকে। ভুলে গেল চোখের কোণে এখনও জল চিকচিক করছে। কী করে এসব জানল নিশান! এসব তো ওর জানার কথা নয়। সেদিনের পর থেকে তো আর যোগাযোগই নেই! তা হলে! কী বলবে বুঝে পেল না রাধিয়া।
নিশান পকেট থেকে রুমাল বের করল একটা। তারপর আরও কাছে সরে এসে আলতো হাতে চেপে-চেপে চোখটা মুছিয়ে দিল রাধিয়ার। রাধিয়া ভুলে গেল আশপাশে লোকজন আছে। ভুলে গেল, তারা ওকে দেখছে। ও নিশানের হাতটা চেপে ধরল ওর গালে। অস্ফুটে শুধু বলল, “কেন? কেন?”
নিশান হাসল। তারপর নরম গলায় ফিসফিস করে বলল, “ভালবাসি তো, তাই…”
“মিথ্যে কথা!” ভাল লাগায়, অভিমানে গলা ভারী হয়ে এল রাধিয়ার, “সব মিথ্যে। আমার খবর নাওনি তুমি। আমি মরে গেছি কি বেঁচে আছি, জানতে চাওনি। যা বলেছে বাবা বলেছে। আমি কি বলেছি? আমি তো তোমার কাছে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি… তুমি চেয়েছ আমার ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি কি জানি না? আমি জানি। আমাদের বাড়ি গিয়েছিলে তুমি। ঠাকুমা তো যার-তার সঙ্গে দেখা করে না। সোনাঝুরির আন্দোলন নিয়ে তুমি দেখা করতে গিয়েছিলে। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছ ওখানে পৌঁছতে। আমার জন্য মোটেও নয়। কোনওদিনও নয়… আমি জানি…”
“তাই? তা হলে জয়তীর কাছ থেকে আমি নিয়মিত কেন খবর রাখতাম তোমার? কেন জানতে চেয়েছি তুমি কী করছ? কেমন আছ?”
“জয়তী!” রাধিয়া অবাক হয়ে মুখ তুলল। দেখল, ঠান্ডা হাওয়ায় নিশানের মাথার চুলগুলো উড়ছে অদ্ভুতভাবে!
“না হলে এসব জানলাম কী করে! ওকে আমি বলতে বারণ করেছিলাম, আজ যে ওদের বাড়ি গিয়েছিলে তাও আমি জানি,” নিশান হাসল।
রাধিয়া তাও বলল, “মিথ্যে কথা… আমার ঠাকুরমার জন্য, ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য…”
“না রাধি,” নিশান রাধিয়ার হাতটা চেপে ধরল জোরে, “আমি তোমায় ভালবাসি। তাই তো যাইনি ওঁর কাছে। অফিসে পিটিশন জমা দিয়েছি। কিন্তু নিজে যাইনি। গেলে তো তুমি ভাবতে তোমায় ব্যবহার করছি। আমরা সোনাঝুরিকে বাঁচাব। বেলাগাম বাড়িঘর করে সব ধ্বংস করতে দেব না। কিন্তু তার মানে এই নয়, তার জন্য তোমায় ব্যবহার করব!”
রাধিয়া তাকাল এবার। দেখল, নিশানও তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
নিশান বলল, “আমি তোমাকে ভালবাসি, তাই কষ্ট দিতে চাই না। আমি যোগাযোগ করলে তোমার বাড়িতে অশান্তি হয়। প্লাস আমাদের স্টেটাসে অনেক অমিল। তোমার বাবা আমায় সহ্য করতে পারেন না। আমার জন্য তোমায় কষ্টই পেতে হবে। তাই আমি…”
“তোমায় কে ভাবতে বলেছে এত কথা! কেন ভাবছ? আমার তোমায় ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয়। সেটা ভাবলে না! যেটা আসল সেটা না ভেবে এসব কী বাজে কথা নিয়ে পড়ে আছ তুমি!”
“বাজে নয়,” নিশান সিরিয়াস মুখ করে তাকাল এবার। বলল, “আমি চাই না তোমায় কষ্ট দিতে। চাই না তোমার মনখারাপ হোক! প্লিজ় আন্ডারস্ট্যান্ড! তাই তো… তাই তো…” নিশান যেন নিজেকে অনেক কষ্টে আটকাল।
রাধিয়া তাকাল নিশানের দিকে, “তাই আমার বাবার সম্বন্ধে খবর পেয়েও আমায় দাওনি, তাই না!”
নিশান মাথা নামিয়ে নিল। রাধিয়া নিশানের থুতনিটা ধরে মুখটা তুলল। কাটা-কাটা স্বরে বলল, “আমায় বলো! আমার জানা দরকার। আমায় যদি সত্যি ভালবাসো, তা হলে আমায় বলো তুমি!”
পরির গায়ে হাজার দাগের ফাটল। ডানা খুলে পড়ে যাচ্ছে। পায়ের তলার মাটি আলগা খুব। বাবার সেই ছোট্টবেলার পরি আজ টলমল করছে।
কোনওমতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল রাধিয়া। নন্দন থেকে গাড়িতে করে বাড়ির সামনে অবধি নিশান এসেছিল। তাই হয়তো আসতে পেরেছে ও। না হলে আসতে পারত না! এটা কী শুনল ও! এও সম্ভব! বাবা এমন! কিন্তু ওরা আগে কেউ জানতে পারেনি! মা-ও জানতে পারেনি! কিন্তু মায়ের তো জানা উচিত! ও আর ভাবতে পারছে না! নিজের বাবা-মাকে নিয়ে কেউ এসব ভাবতে পারে!
নিশান ওকে বাড়ির গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, “জোর করে এসব না শুনলেই পারতে। কী হবে শুনে! আমাদের বাবা-মায়েরাও তো মানুষ। তাদেরও নিজের জীবন আর ইচ্ছে থাকে। সন্তান হওয়া মানেই তো দাসখত লিখে দেয়নি কেউ। তাই না!”
নিশান হয়তো ঠিকই বলছিল, কিন্তু রাধিয়ার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। এখনও ঢুকছে না। এই বাড়ি-ঘর সব কেমন যেন লাগছে ওর! ও নিজের ঘরে যাবে বলে কোনওমতে বসার ঘরের পাশ দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গেল। এখন কারও সঙ্গে কথা বলবে না ও, কথা বলতে পারবে না। আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকবে শুধু।
“রাধি!” আচমকা চিৎকার করে বাবা বেরিয়ে এল বসার ঘরের দরজা দিয়ে। তারপর কোনও কথা না বলে রাধিয়ার হাত ধরে এক টানে ওকে নিয়ে এল ঘরের মধ্যে। রাধিয়া থতমত খেয়ে গেল। শরীর এমনিতেই দুর্বল লাগছে। তাই টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল একটা সোফার ওপর।
“হাউ ডেয়ার ইউ! তুই ওই শুয়োরটার সঙ্গে এসেছিস বাড়ি অবধি! আমি কলকাতায় ছিলাম না ভেবে যা খুশি তাই করবি? জানোয়ার! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! আমি তোকে বলেছিলাম না, যাবি না। মিশবি না। জানিস না, ও একটা লিচ! একটা প্যারাসাইট! আমাদের কাজকে সাবোটাজ করছে! তা হলে! কেন গেছিলি! ইউ ডার্টি হোর! খুব রস হয়েছে! এই বয়সেই ছেলে চাই! আজ তোকে…” বাবা আচমকা কোমর থেকে বেল্ট খুলে নিল। চিৎকার করে বলল, “আজ তোকে দেখাব আমার কথা না শোনার ফল! আজ…”
বাবা পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল সামনে!
“বুম্বা!” পেছন থেকে আসা ঠাকুরমার গলার স্বরে বাবা থমকে গেল, “কী করছিস কী তুই! এত বড় মেয়েকে এভাবে কেউ মারতে যায়! কী করছিস কী? আর বউমা, তুমি দাঁড়িয়ে দেখছ! মেয়েটাকে মেরে ফেলবে, চাও!”
ঠাকুরমা এসে দাঁড়াল রাধিয়া আর বাবার মাঝখানে, “অমানুষ হয়ে গেছিস!”
বাবা রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। হাতের বেল্টটা পাশে রাখা একটা চেয়ারে আছড়ে বলল, “শি ইজ় আ বিচ! আ ডার্টি হোর! ওর নোংরা ছেলে পছন্দ! আমাদের শত্রুর সঙ্গে পিরিত করছে! বাইরে বেরোতে তোকে বারণ করেছিলাম না! আজ তোকে শেষ করে ফেলব আমি… আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! আজ…”
বাবা ঠাকুরমাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এল এবার! ভয়ের চোটে কুঁকড়ে গেল রাধিয়া। বাবা বেল্টটা চালাল! সপাং করে রাধিয়ার কোমরের কাছে এসে লাগল ওটা। চড়াৎ করে শব্দ হল একটা। শাড়ির ওপর দিয়ে লাগলেও রাধিয়ার মনে হল শরীরের চামড়া ফেটে গেল একদম। একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা ওর এতক্ষণের নিস্তব্ধতাকে এক ধাক্কায় টুকরো-টুকরো করে দিল। শরীরের আগেও মনের যন্ত্রণাটা এবার বোমার মতো ফেটে পড়ল যেন।
রাধিয়া চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”
বাবা এই চিৎকারে থমকে গেল এবার!
রাধিয়া শরীরের সব জড়তা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল এবার। আচমকা একটা রাগ দলা পাকাচ্ছে ওর শরীরে। মনে হচ্ছে এবার ফেটে পড়বে বোমার মতো। ও বুঝতে পারছে পরির খোলস ভেঙে পড়ছে। ডানা খসে গেছে। বুঝতে পারছে পায়ের তলার বাঁধন আরও আলগা এখন।
রাধিয়া সোজা তাকাল বাবার দিকে। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “তুমি কেন আমাদের মিথ্যে বলো যে, অফিসের ট্যুরে যাচ্ছ? আসলে তো বাচ্চা ছেলেদের সঙ্গে রাত কাটাতে যাও! একজন মহিলা আছে। শানায়া দত্তা। সে তোমায় আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে সাপ্লাই করে! তাদের নিয়ে তো তুমি… তুমি… ছিঃ বাবা, ছিঃ!”
বাবা কী বলবে বুঝতে পারল না হাতের বেল্টটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল!
রাধিয়া এগিয়ে গেল বাবার দিকে এবার। চোয়াল শক্ত করে বলল, “এবারও গিয়েছিলে। শঙ্করপুরে ছিলে দু’রাত। সঙ্গে দুটো ছেলে ছিল। একজনের নাম প্রাণেশ আর-একজনের নাম মোহিত। দু’জনেই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কোথায় থাকে সেটাও কি বলব!”
রাধিয়া এবার মায়ের দিকে তাকাল। দেখল, মা পাথরের মূর্তি যেন। কিছুই যেন বুঝতে পারছে না, কী ঘটছে সামনে। ঠাকুরমা বসে আছে চেয়ারে। মাথা নিচু।
রাধিয়া এগিয়ে গিয়ে বাবার হাত থেকে সহজেই বেল্টটা নিয়ে নিল। তারপর বলল, “বেল্ট হাতে নিলেই সব সত্যি হয়ে যায় না। নিশান খারাপ, কেননা তোমার স্বার্থে লাগছে বলে, তাই তো! কিন্তু সে তো অনেক মানুষের কথা ভাবছে। আর তুমি নিজে কী? নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় তোমার? আমার সঙ্গে তুমি এমন করতে পারলে? আমায় ছোটবেলায় পরি বলতে না? তাই কি আমায় চূড়ায় তুলে মূর্তির মতো করে রেখেছিলে? অচল, অপদার্থ ধরনের মানুষ করে রেখেছিলে?”
রাধিয়া ফুঁসছে! আচমকা কোথা থেকে পরি ভেঙে সারা জীবন খুঁজে যাওয়া মানুষটা বেরিয়ে এসেছে যেন! ও যেন দেখতে পাচ্ছে ওর পায়ের তলায় টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে পরি। ছড়িয়ে আছে তার ডানা। রাধিয়া বুঝতে পারছে, আর ওকে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না এই রোদ-জল-কাদার নোংরা পৃথিবীতে! মানুষ যতদূর যায়, পরিরা যেতে পারে না ততদূর!
রাধিয়া দেখল, বাবা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। মা মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে। ঠাকুরমা শুধু তাকিয়ে আছে ওর দিকে!
রাধিয়া বলল, “আমায় আজ মারলে বাবা! নোংরা গালি দিলে! কেন? কারণ, তোমার কথা শুনিনি বলে? তোমার স্বার্থে লেগেছে বলে! এতদিন তা হলে মা’র সঙ্গে, আমার সঙ্গে যা করলে, তার কী শাস্তি হবে বাবা? লিচটা কে? প্যারাসাইটটা কে? কে অন্যের ভালবাসা আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে? তাদের শুষে বেঁচে থাকে?”
“প্লিজ়…” বাবা হাতজোড় করে তাকাল রাধিয়ার দিকে, “প্লিজ় রাধি… আমি… প্লিজ়…”
রাধিয়া তাকাল বাবার দিকে। তারপর বলল, “মাকে বলো। আমাকে নয়। মায়ের সঙ্গে যা করেছ, তার ক্ষমা হয় কি না, সেটা মা ঠিক করবে। আমায় এসব বোলো না। মানুষ হওয়ার ইচ্ছে থাকলে জীবনের যে-কোনও অবস্থা থেকে সেই চেষ্টা শুরু করা যায়। কিন্তু তুমি মানুষ হতে পারবে কি? হাতে বেল্ট আর মনে ঘৃণা নিয়ে সেটা হওয়া কিন্তু মুশকিল!”
বাবা মাটিতে মুখ গুঁজে দিয়েছে এবার। রাধিয়া মায়ের দিকে তাকাল। দেখল, মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপটপ করে।
রাধিয়া মাথা নাড়ল, হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, “এই আমাদের বাড়ি! আমাদের সংসার! সত্যি!”
কথা শেষ করে রাধিয়া হালকা পায়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আসলে ঠিক ঘর নয়, এই জেলখানার মতো বাড়িটা থেকে আজ যেন বেরিয়ে এল ও। নিজেকে হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কত বছরের পুরনো পাথর যেন সরে গিয়েছে। যেন খুলে গিয়েছে কত বন্ধমুখ নদী। আজ আকাশে ভেসে যেতে পারে ও। স্রোত হতে পারে নদীতে। জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বনটা খুঁজে পেয়েছে ও। রাধিয়া বুঝল আসলে মানুষও পরির মতো উড়তে পারে। যেখানে খুশি হারিয়ে যেতে পারে। ছুঁয়ে দিতে পারে আকাশের সর্বোচ্চ বিন্দু। তবে তার জন্য ডানার দরকার হয় না। যেটা দরকার হয়, সেটাই ও খুঁজে পেয়েছে আজ। আজ রাধিয়া খুঁজে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস। সত্যি কথা বলার, সত্যিকে সামনে থেকে দেখার সাহস!
ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে একবার পেছনে ঘুরল রাধিয়া। দেখল, মায়ের সামনে নতজানু হয়ে বসে রয়েছে সুপ্রতীক মালিক! ওর বাবা!
.
৩৬. আইকা
I will be home for Christmas
You can plan on me
Please have snow and mistletoe
And presents on the tree
Christmas Eve will find me
Where the love light gleams
I’ll be home for Christmas
If only in my dreams…
গানটা বাজছে। নিচু স্বরে ভরাট গলায় গানটা বেজেই চলেছে। বড়দিনের রাত গভীর হচ্ছে ক্রমশ। ওদের পাড়াটা নিঝুম হয়ে আসছে। দূরে টিভি চলছে কোথাও। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ছিটকে আসছে এখান-ওখান থেকে। জানলার পাশে বসে সামনের শূন্য রাস্তা আর দু’পাশের নির্জন পাতাহীন গাছেদের দেখছে আইকা!
শীত এক অদ্ভুত সময়। সব কিছু ঝরিয়ে, হারিয়ে পৃথিবীকে শূন্য করে দেওয়ার সময়। শীত মানুষকে বোঝায় কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। যা তোমার আছে, তা ক্ষণিকের জন্য আছে। হাতের মুঠো শক্ত করে রাখলেও তুমি তাকে কিছুতেই চিরদিন ধরে রাখতে পারবে না। সে ছেড়ে যাবেই। চলে যাবেই। শূন্য হবেই সব। এ খেলা ভাঙবেই একদিন। শীত খেলা ভাঙার সময়। মানুষকে একা করে দেওয়ার সময়!
আজ ঠান্ডা পড়েছে বেশ। ঠান্ডায় আইকার কষ্ট হয়। ছোট থেকেই শীতকাতুরে ও। সেই যাদবপুরের বাড়ির কথা আজ আবার মনে পড়ছে আইকার। সেই ছোট ড্যাম্প ঘর। চৌকি। ফাটল মেঝে দিয়ে বেরিয়ে আসা বিছে। শীত খুব ভয়ের সময় ছিল ওর কাছে। পাশেই পুকুর ছিল একটা। ভাঙা জানলার পাল্লা দিয়ে রাতে ঠান্ডা ভেজা হাওয়া আসত। মা খবরের কাগজ কেটে আটকে রাখত সেই ভাঙা জানলার গায়ে। মা নিজে শুত সেই জানলার দিকটায়। আর কম্বলের তলায় মায়ের গায়ের ওম নিয়ে শুয়ে থাকত আইকা। মনে হত পৃথিবীতে এর চেয়ে সুরক্ষিত জায়গা আর নেই।
এই ফ্ল্যাটটা বড়। মায়ের নিজের ঘর আছে এখানে। সে ঘরে বিছানার পাশে কাচের জানলা। সামনে ঝোলানো বড় ভারী পরদা। মোটা লেপ। মা ওখানে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আইকার আজ ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে শুতে। আবার সেই ছোটবেলার মতো মায়ের কোল ঘেঁষে, মায়ের ওম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।
আইকা সামনে রাখা ডিজিটাল টেব্ল ক্লকটা দেখল। রাত সাড়ে দশটা বাজে। মা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। ঘুমের ওষুধ খায় একটা করে, তাই আইকাই বলে দেরি না করতে। কিন্তু আইকার ঘুম আসে না। এমনিতেই আজ বড়দিন। তারপর কাল রবিবার। তবে এখন থেকে তো ওর সবটাই রবিবার। কারণ, আর তো অফিস নেই ওর। গতকাল ই-মেলে রেজ়িগনেশন পাঠিয়ে দিয়েছে।
রুপিন নেই, গুজরাত গিয়েছেন নিজের বাড়িতে। আবার নিউ ইয়ারে ফিরবেন। কিন্তু ততদিন অবধি আর অপেক্ষা করেনি আইকা। গত পরশু রুপিন বেরিয়ে গেছিলেন আর গতকালই নিজের কাজ ছাড়ার কথা ও ই-মেলে জানিয়ে দিয়েছে রুপিনকে। রুপিন নিশ্চয় পেয়েছেন চিঠিটা। কিন্তু এখনও কোনও রিপ্লাই করেননি। ফোন করেননি। আইকাকে জিজ্ঞেস করেননি কিছু। রুপিন নিশ্চয় রেগে আছেন। সোমবার দিনই হয়তো রেজ়িগনেশন লেটার যে অ্যাকসেপ্ট করে নেওয়া হয়েছে, সেটা জানিয়ে দেওয়া হবে। রুপিনের সামনে হয়তো আর যেতে হবে না আইকাকে।
আইকা চোয়াল শক্ত করল। ছেলেরা সব একরকম হয়। নিজেদের ইচ্ছে ছাড়া, মতলব ছাড়া আর কিছু বোঝে না। ও আজও কেমন বোকা রয়ে গেল। আজও মানুষকে চিনতে পারল না। আজও সব কথাই ও ফেসভ্যালুতে নেয়। নিজের বোকামির জন্য নিজের গালেই থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে আইকার। কী করে এমন ভুলটা করল ও!
মাকে সেই চোখের ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার কিছুদিন পরে রুপিন এক বিকেলে, ছুটির পরে আইকাকে ডেকেছিলেন নিজের ঘরে। আইকা তখন বেরিয়ে যাচ্ছিল অফিস থেকে। এমন সময় ডাক পেয়ে কিছুটা অবাকই হয়েছিল আইকা! আর সত্যি বলতে কী, মনে মনে একটু বিরক্তও হয়েছিল। তাও গিয়েছিল ঘরে।
রুপিন দাঁড়িয়ে ছিলেন জানলার কাছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আইকা নক করে ঘরে ঢোকার পরে রুপিন বসতে বলেছিলেন ওকে। তারপর হেসে বলেছিলেন, “তোমার শো কজ়ের রিপ্লাই আমি পেয়েছি!”
“এই জন্য ডাকলেন!”
“না, না,” হেসেছিলেন রুপিন, “আমি কিছুদিন আগে বলেছিলাম না যে, আই নিড আ হেল্প! সেই জন্য ডেকেছি।”
হ্যাঁ, তাই তো! আইকার মনে পড়েছিল। সেই যেদিন ও অফিসে রাগারাগি করল, সেদিন রুপিন তো বলেছিলেন, কী একটা হেল্প লাগবে।
আইকা বলেছিল, “ও হ্যাঁ। আই রিমেমবার।”
রুপিন সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিলেন, “আমরা তিন ভাই। আয়্যাম দ্য এল্ডেস্ট। আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে, রেণুকা, এই ডিসেম্বরের সাতাশ তারিখ এক বছরে পড়বে। আমি ওকে কিছু দিতে চাই, লাইক গোল্ড। বাট আই ডোন্ট নো এনিথিং আবাউট গোল্ড অর অরনামেন্টস। আমি জানি, আয়্যাম আস্কিং টু মাচ। বাট কুড ইউ হেল্প মি ওয়ান লাস্ট টাইম! প্লিজ়!”
আইকার হাসি পেয়েছিল রুপিনকে দেখে। অন্য বসেরা হুকুম করে নিজেদের কাজকর্ম করিয়ে নেয় অধস্তনদের দিয়ে। সেখানে রুপিন এমন করে বলেন যেন আইকা উলটে বকুনি দেবে!
আইকা হেসে বলেছিল, “হ্যাঁ, শিয়োর। এতে না করার কী আছে! কবে যাবেন?”
“নেক্সট সানডে! আর…” রুপিন আবার থমকেছিলেন। কিছু একটা যে বলতে চাইছিলেন সেটা বুঝতে পারছিল আইকা।
ও বলেছিল, “বলুন।”
রুপিন হেসে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “নাঃ, সানডে বলব। সানডে। আবাউট ফোর ইন দ্য আফটারনুন! ঠিক হবে তো? কোথায় সেটা আমি জানাব তোমায়।”
রবিবার ঠিক চারটের সময় বালিগঞ্জ ফাঁড়ির আগে একটা বড় সোনার দোকানের সামনে পৌঁছে গেছিল আইকা। সেদিন সকালেই রুপিন জানিয়ে দিয়েছিলেন কোথায় দেখা করতে হবে।
দোকানটা বড়। সামনের দিকটা ঘষা কাচের। সেখানেই দরজা ঠেলে ঢুকেছিল ওরা।
আইকা কিছু বলার আগেই রুপিন বলেছিলেন, “আমার বাজেট ধরো এক লাখ। মানে, এর কমে তো আর ভাল কিছু হয় না। এতেও হয়তো হয় না। কিন্তু তাও…”
বেশি সময় নেয়নি আইকা। মিনিট পনেরোর মধ্যেই একটা হার পছন্দ করে দিয়েছিল। বলেছিল, “এক বছরের বাচ্চা তো, কিন্তু এটা সারা জীবন রাখতে পারবে। তাই না?”
হারটা খুব পছন্দ হয়েছিল রুপিনের। বলেছিলেন, “এই জন্য তোমায় বলি। ইউ আর ফ্যান্টাসটিক!”
দোকানের বাইরে এসে আইকা নিজের গাড়ির কাছে গিয়েছিল। রুপিন পেছন-পেছন গিয়েছিলেন ওর। বলেছিলেন, “আই নিড টু টক টু ইউ! একটা রেস্টুরেন্টে বসি? আমার গাড়িটা থাক এখানে। আমি কি তোমার গাড়িতে আসতে পারি!”
আইকা অবাক হয়েছিল। রুপিন এমন তো আগে বলেননি! কিছু কি সমস্যা হয়েছে! ও গাড়িতে উঠে পাশের দরজাটা খুলে দিয়েছিল। রুপিন যে রেস্তরাঁর কথা বলেছিলেন, সেটা কাছেই।
গাড়িটা রেস্তরাঁর পাশে রেখে ওরা ঢুকেছিল ভেতরে। সার দেওয়া চেয়ার-টেবল। অধিকাংশই ফাঁকা। একপাশে বার। দেখেই বোঝা যায় পুরনো কলকাতার ছাপ এখানে রয়ে গেছে। রুপিন সবার কাছ থেকে সরে একটা কোণের দিকে বসেছিলেন।
আইকার খাবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাধ্য হয়ে সামান্য স্ন্যাক্স বলেছিল। রুপিনকে দেখে বেশ অবাক লাগছিল ওর। কান লাল হয়ে আছে মানুষটার। বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁচাপাকা চুলগুলো ঠিক করছিলেন! জর্জ ক্লুনি এত চিন্তিত কেন, সেটা বুঝতে পারছিল না আইকা!
আইকা একচুমুক জল খেয়ে সামনে রাখা টিসু দিয়ে চেপে-চেপে ঠোঁটটা মুছে বলেছিল, “বলুন স্যার!”
“রুপিন, ইউ মে কল মি রুপিন। আমরা অফিসে নেই। প্রোটোকল মেনটেন করতে হবে না।”
আইকা এমন এলোমেলো অবস্থায় কোনওদিন দেখেনি রুপিনকে। ওর মনে হয়েছিল কিছু একটা হয়েছে নির্ঘাত।
“কী হয়েছে আপনার?” আইকা তাকিয়েছিল রুপিনের দিকে।
রুপিন সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিলেন, “আইকা, আমার কলেজ লাইফ থেকে প্রায় অনেকটা সময় কাটে ইংল্যান্ডে। সেখানে সোনম নামে একটা পঞ্জাবি মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছিল। উই ওয়্যার ইন লাভ। কিন্তু আমার বাড়ি মানেনি। ওর বাড়িও মানেনি! সোনমও আমার সঙ্গে ইলোপ করতে চায়নি। আই ওয়জ় ডিভাস্টেটেড! আমি কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসি! আমার নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়ে পড়ে। ইট টুক মি টু ইয়ার্স টু রিকভার! রেজ়াল্ট ভাল ছিল। বিদেশে জব এক্সপিরিয়েন্স ছিল, আমার চাকরি পেতে অসুবিধে হয়নি। কিন্তু আর বিয়ে করিনি। আমার দুই ভাই বিয়ে করেছে। দে আর সেটলড! এখন এই বয়সে সবাই আমার বিয়ে দিতে চায়। আই অ্যাম অলমোস্ট ফিফটি। কিন্তু কেউ কথা শুনছে না।”
আইকা বলেছিল, “ফিফটি তো কী হয়েছে? এখন এসব কেউ মানে?”
“আসলে তা নয়, আমি বিয়ে করতে চাইলে…” রুপিন থমকে গিয়েছিলেন একটু, “তোমায় চাইব। আমি তোমায় পছন্দ করি। তোমায় বিয়ে করতে চাই! ওঃ! আই হ্যাভ সেড দ্যাট!”
আইকা ঘাবড়ে গিয়েছিল। রুপিনকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনও বিশাল কঠিন কাজ করে ফেলেছেন! মানুষটার মুখ-চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল একদম!
আইকা নিজেও কী বলবে বুঝতে পারছিল না। রুপিন! ওকে বিয়ে করতে চায়! কিন্তু কেন! এটা কী করে সম্ভব!
আইকা আমতা-আমতা করে বলেছিল, “আমায়? কেন?”
“কারণ, আই লাইক ইউ আ লট! আমি জানি আমার বয়স বেশি। তোমার ‘হ্যাঁ’ বলার চান্স কম। কিন্তু তাও আমার যা মনে হয় বললাম। আমি সিরিয়াস এই ব্যাপারে। না, এখনই কিছু বলতে হবে না। আমি জোরও করব না। তুমি যদি ‘না’ বলো, আমি মেনে নেব। আই টোটালি আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়োর সিচুয়েশন। তাই ডোন্ট সোয়েট অন ইট। টেক ইয়োর টাইম, তারপর জানিয়ো।”
সে দিনের পর রুপিন এই নিয়ে একবারও কিছু বলেননি। আইকাও কিছু উত্তর দেয়নি। কী বলবে ও! কাকে বলবে! দূর্বাকে বলার প্রশ্ন নেই, কারণ এক অফিস। মাকে বলারও মানে হয় না। মা শুনে যে কী প্রতিক্রিয়া দেবে সেটা মা নিজেও জানে না। তাই কিছু বুঝতে না পেরে ও ভেবেছিল পুশকিনের কাছে একবার যাবে!
পুশকিন। সেই স্কুলজীবনের লাজুক মনমরা পুশকিন। ক্লাস ইলেভেনে নতুন স্কুলে ভরতি হয়ে প্রথম পুশকিনকে দেখেছিল আইকা। সেই আইকা অনেক গম্ভীর, চাপা আর রাগী ছিল। এমন একটা বলয় দিয়ে নিজেকে ঘিরে রাখত যে, কাউকে কাছে আসতে দিত না! কিন্তু নিজের অজান্তেই সেই ঘেরাটোপ ভেঙে কী করে যেন পুশকিনকে ভাল লাগতে শুরু করেছিল ওর!
ওদের সঙ্গে রিয়া বলে একটা মেয়ে পড়ত। একটু গায়ে-পড়া ধরনের ছিল মেয়েটা। ছেলেদের সঙ্গে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াত। কথায়-কথায় পুশকিনের গায়ে হাত দিত। ঢলে পড়ত। দেখে কী যে রাগ হত আইকার! কিন্তু কিছু বলতে পারত না।
এমন করে ক্লাস টুয়েলভে একদিন সেই রিয়া একটা চিঠি দেখিয়েছিল। ফোর্থ পিরিয়ডের ইংরেজি ক্লাসের পরে টিফিন ছিল। সেই সময় রিয়া চিঠি বের করে দেখিয়েছিল সবাইকে। বলেছিল, “দেখ। লাভ লেটার! কে লিখেছে বল তো?”
সেটা মোবাইলের সময় ছিল না। তখনও টাকায় চারটে ফুচকা পাওয়া যেত, নীল-হলুদ কাগজে চিঠি আসত! কালো ঢাউস টেলিফোন যে সব বাড়িতে থাকত, তাদের বড়লোক বলা হত। সে সময় ছেলে আর মেয়েদের মাঝে একটা অদৃশ্য রেখা ভেসে থাকত সারাক্ষণ। সে সময় সেই রেখা টপকে মাঝে মাঝে কিছু কাগজ উড়ে আসত, যাকে উত্তেজিত টিনএজরা বলত, ‘লাভ লেটার!’
“তোকে অফার করেছে? কে রে?” রিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল পাশে বসা সুদীপা।
সেই সময় প্রোপোজ করাকে বলা হত ‘অফার’ করা!
রিয়া সবার সামনে লটারির ফার্স্ট প্রাইজ় দেখানোর মতো করে দেখিয়েছিল সেই চিঠিটা, তারপর বলেছিল, “তলায় নাম নেই তো কী হয়েছে? হাতের লেখা দেখে চিনতে পারছিস না? এত সুন্দর হাতের লেখা আমাদের ক্লাসে কার আছে?”
“পুশকিন!” সমবেতভাবে গুঞ্জন উঠেছিল। আর আইকার মনে হয়েছিল, কে যেন ওর বুকে ছুরি বসিয়ে দিল! পুশকিন! পুশকিন রিয়াকে ‘অফার’ করেছে! লাভ লেটার দিয়েছে! এত সাহস! এত বাজে ছেলে! আইকার মনে হয়েছিল কে যেন শিরার ভেতর বিষ ভরে দিয়েছিল ওর! যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠেছিল ও। দাঁতে দাঁত চেপে মনে হয়েছিল, পুশকিনকে এর জন্য শাস্তি পেতে হবে।
টিফিনের পরের ক্লাস ছিল হেডস্যারের! আইকা আর সময় নষ্ট করেনি, রিয়ার ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে সোজা স্যারের টেবিলে গিয়ে বলেছিল, “স্যার, পুশকিন মেয়েদের এই সব লিখছে! নাম নেই তলায়, কিন্তু হাতের লেখা মিলিয়ে নেবেন!”
সারা ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল! রিয়া কী বলবে বুঝতে না পেরে বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়েছিল। আর সেকেন্ড বেঞ্চে বসা পুশকিন ফ্যালফ্যাল করে দেখেছিল আইকা ওর দিকে বিরক্তি আর ঘেন্না নিয়ে তাকিয়ে আছে!
দু’সপ্তাহ সাসপেন্ড ছিল পুশকিন। বাবাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সারা স্কুলে ঢিঢি পড়ে গিয়েছিল। সবাই বলেছিল, আইকার সাহস আছে! এসব নোংরামোর একটা শেষ হওয়া দরকার!
শুধু রিয়া একদিন স্কুল ছুটির পরে ওর কাছে এসে বলেছিল, “এটা কী করেছিস তুই! চিঠিটা পুশকিন লিখলেও নিজের জন্য লেখেনি। শোভনের জন্য লিখে দিয়েছিল! শোভন ভালবাসে আমাকে। ও বলেছে আমায়। আর তুই সবটা না জেনে… এটা কী করলি তুই!”
আইকার অবাক লেগেছিল! পুশকিন তা হলে এটা বলেনি কেন! শোভনের নাম তো বলতেই পারত! কিন্তু তাও বলেনি! কেন? বন্ধুকে বাঁচাতে! লয়ালটি!
বুকের ভেতর কেমন একটা কষ্ট হয়েছিল আইকার! বুঝতে পেরেছিল হিংসের চোটে বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে ওর! পুশকিনের দিকে দূর থেকে তাকিয়ে থাকত আইকা! দেখত কেমন একা হয়ে গিয়েছে ছেলেটা! রাতে শুয়ে পুশকিনের মুখটা মনে পড়লে কান্না পেত আইকার! এত কষ্ট হত যে মনে হত, এর থেকে কী করে নিস্তার পাবে! কে বাঁচাবে ওকে এই খারাপ লাগা থেকে! যাকে ও ভালবাসল তার ক্ষতি করে দিল! কেমন মানুষ ও!
এক বৃষ্টির দিনে লাইব্রেরির পাশের দেবদারু গাছের নীচে পুশকিনকে ধরেছিল আইকা! একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিল পুশকিন। মাথায় ছাউনি ছিল বলে বৃষ্টি লাগছিল না ওর গায়ে! সামান্য হেঁটে, সামান্য ছুটে পুশকিনের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আইকা। পুশকিন মুখ তুলে ওকে দেখে কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়েছিল! কী করবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল!
আইকা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর বলেছিল, “আমি সরি পুশকিন। আমি বুঝতে পারিনি। আসলে আমি…”
পুশকিন হাত তুলে থামিয়েছিল ওকে। তারপর বলেছিল, “কিন্তু কেন? কেন এমন করলি তুই! আমি রিয়াকে পছন্দ করি না! আমি তো… আমি… তুই এমনটা করতে পারলি! আমার জীবনে কত বড় দাগ পড়ে গেল বল তো!”
আইকাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে সেই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে চলে গেছিল পুশকিন! আর কোনওদিন কথা বলেনি ওর সঙ্গে!
তারপর কতবার ভেবেছে আইকা, পুশকিন কী বলতে গিয়ে বলল না! ওর কাকে পছন্দ ছিল! অসমাপ্ত বাক্যের শেষে কে দাঁড়িয়েছিল!
পুশকিনের রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, সেই রাতে পুরনো সব কথা এক নিমেষে মনে পড়ে গিয়েছিল! সেই পুশকিন ওর সামনে দাঁড়িয়ে! কফি করছে! আজও পুশকিনের কথা ভাবলে ওর মনের মধ্যে কী একটা যেন হয়! কিন্তু আইকা সেই বয়সে পৌঁছে গিয়েছে যেখানে ও বুঝতে পারে, সব হওয়াগুলোর পরিণতি নেই! কিছু মনে হওয়া একলা, নির্জন! তাদের কোনও বন্ধু নেই!
রুপিনের কথাটা সেই রাতে পুশকিনকে বলেছিল আইকা। বলেছিল, “আমি এখনও কিছু বলিনি জানিস! কী করব বুঝতে পারছি না!”
পুশকিন বলেছিল, “লোকটা ভাল হলে হ্যাঁ করে দে। কিন্তু কী কেস বল তো? আমার নোঈকে পছন্দ, তোর বসের তোকে পছন্দ! ব্যাপারটা কী? দেখবি, যখন তোর সঙ্গে অদ্ভুত কিছু ঘটবে, তখনই আশপাশে সিমিলার ইনসিডেন্টস চোখে পড়বে তোর! এটা অদ্ভুত একটা কোইন্সিডেন্স! তাই না?”
“কিন্তু কী করব বল!” আইকা জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিনকে।
পুশকিন হেসে বলেছিল, “তোকে কে ভালবাসে জানবি, সেটাই বেশি ইমপর্ট্যান্ট। লোকটা তোকে ভালবাসলে গো ফর ইট। তোর একটা কম্প্যানিয়ান তো হবে। ওটাও খুব দরকার।”
আইকা হেসেছিল। তারপর আর বেশিক্ষণ বসেনি। শুধু চলে আসার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “পুশকিন, তোর সেই দেবদারু গাছের তলায় বৃষ্টির দিনটা মনে আছে?”
পুশকিন থমকে গিয়েছিল। কিছু না বলে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
আইকা সামান্য হেসে বলেছিল, “আমার মনে আছে। আচ্ছা, সেদিন একটা সেনটেন্স শুরু করেও শেষ করিসনি। রিয়াকে তোর পছন্দ ছিল না তুই বলেছিলি। কিন্তু কাকে পছন্দ ছিল তবে? সেটা বলতে গিয়েও বলিসনি।”
পুশকিন হেসে বলেছিল, “আর মনে নেই। কতদিন আগের কথা। প্লাস সেদিন এত বৃষ্টি হয়েছিল যে, সব ধুয়ে সাফ হয়ে গেছে। সেই পুশকিনটা ধুয়েমুছে পৃথিবী থেকে মিলিয়ে গেছে রে আইকা! সে বা তার ইচ্ছেগুলোও আর নেই!”
নিঃশব্দে সামনে রাখা মোবাইলটা কড়কড় করে নড়ে উঠল। এখন কে ফোন করল, রুপিন? আচমকা রুপিনের নামটা মনে আসতেই নিজের লজ্জা লাগল আইকার। ও কি মনে মনে আশা করছে যে, ওর ই-মেল পেয়ে রুপিন ওকে ফোন করবেন? কেন করবেন? রুপিনকে ও উত্তর দেয়নি কিছু। একরকম ইগনোরই করেছে! তারপর রুপিনের অনুপস্থিতিতে ই-মেলে রেজিগনেশন পাঠিয়েছে! ও নিজেও তো রুপিনকে ফোন করতে পারত। ওর রাগের কথা, কষ্টের কথা বলতে পারত। তা তো করেনি! তা হলে রুপিন কেন ফোন করবেন? কিন্তু যদি করতেন? আইকার মনটা আবার না-মেলা অঙ্কের মতো হয়ে গেল। ও ফোনটা তুলল। আরে নোঈ! এখন! মেয়েটা তো ওর সঙ্গে কথা বলছে না! ওর ওপর রেগে আছে! তা হলে এমন সময় ফোন করল কেন!
আইকা চিন্তা করল একটু। তারপর ফোনটা ধরল, “বল।”
“দরজা খোল দি। আমার তোর সঙ্গে কথা আছে। বেল বাজালাম না। কারণ, মাসির ঘুম ভেঙে যাবে। খোল।”
আইকা ফোনটা রেখে দিল। বুঝতে পারল না ব্যাপারটা কী! হঠাৎ নোঈ কী বলতে চায়!
আইকার মনে পড়ল কিছুদিন আগে নোঈ আচমকা ওকে লিফটের সামনে ধরেছিল! ওদের অফিসের টাইমিং-এর জন্য আজকাল খুব একটা দেখা হয় না। তাই নোঈকে দেখে ভাল লেগেছিল আইকার।
বলেছিল, “কী রে? কেমন আছিস? পাত্তাই নেই তোর!”
নোঈ গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “কেমন আছি জানিস না দি? মায়ের কাছে যখন গিয়ে লাগিয়েছিস আমি আর পুশকিনদা কোনও রেস্তরাঁয় ঢুকছি, তখন জানিস না মা কেমন রাখতে পারে আমায়!”
“মানে?” নোঈর এমন ব্যবহারে খুব ঘাবড়ে গেছিল আইকা! নোঈ এমনিতে চুপচাপ থাকে। ব্যবহার খুব ভাল। সে এমন করে ওর সঙ্গে কথা বলছে কেন! ওর মনে হয়েছিল পুশকিন কি ওই রাতে ওর কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা বলেছে নোঈকে? কিন্তু পুশকিন সেটা বলার মতো ছেলে নয়! আর পুটুমাসির সঙ্গে তো নোঈকে নিয়ে কোনও কথাই হয়নি! তা হলে! পুটুমাসি কী বলেছে! নোঈ এমন করে কথা বলছে কেন!
নোঈ বলেছিল, “যা বলার আমাকে বললেই পারতিস! মায়ের কাছে গিয়ে এসব বলার কী ছিল! আর, আমি তো বড় হয়েছি। কার সঙ্গে কোথায় যাব সেটা কেউ ঠিক করে দেবে কেন?”
“কী বলছিস তুই নোঈ?” আইকা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
নোঈ আর লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সিঁড়ির দিকে যেতে-যেতে বলেছিল, “এভাবে কারও পেছনে স্পাইয়ের মতো নজর রাখার কোনও মানে হয় না। এতটা চিপ তো তুই ছিলি না দি! আই পিটি ইউ।”
আইকার খারাপ লেগেছিল খুব। নোঈ এমন করে বলল! ও স্পাইগিরি করেছে! ওর নামে পুটুমাসির কাছে লাগিয়েছে! এসব কী করে বলল ও? পুটুমাসি কি এসব বলেছে ওকে? কষ্টে আর অপমানে আইকার ভেতরটা কেমন গুটিয়ে গিয়েছিল। নোঈকে কত ভালবাসে ও! ওর জন্য পুশকিনের কাছে গিয়েছে বলতে যে, পুশকিন কী ভাবছে। নোঈ যেন কোনও কষ্ট পুশকিনের কাছ থেকে না পায়। আর সেখানে নোঈ ওর সঙ্গে এমন করল! আইকার একবার মনে হয়েছিল পুটুমাসির কাছে যায়। কিন্তু মত পালটেছিল। কেন যাবে? ও যা করেনি, সেটা ওকে কেন গিয়ে প্রমাণ করতে হবে? না, ও যাবে না। তার জন্য যদি ওর সঙ্গে কেউ কথা না বলে, না বলুক! নোঈ কোনওদিন যদি ভুল বুঝতে পারে, তা হলে কথা হবে, না হলে হবে না। ওর আর সেই বয়স নেই যে, জনে-জনে গিয়ে ওকে লোকের ভুল ভাঙাতে হবে।
কিন্তু আজ নোঈ কী বলতে চায়! আরও খারাপ কিছু বলবে নাকি?
আইকা চেয়ার থেকে উঠে চটিটা গলাল পায়ে। বেশ ঠান্ডা আজ। কট্সউলের ওভারকোট পরেও ঠান্ডা লাগছে!
ও দরজার সামনে গিয়ে ‘কি-হোল’-এ চোখ রাখল। দেখল, নোঈ দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো চুড়ো করে বাঁধা। চোখে চশমা।
দরজাটা খুলে আইকা দাঁড়াল। নোঈ কী বলতে চায়?
নোঈ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আইকার দিকে। তারপর আচমকা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আইকাকে!
ঘটনার আকস্মিকতায় আইকা আর-একটু হলে পড়ে যাচ্ছিল! কিন্তু দরজার ফ্রেমটা ধরে নিজেকে সামলাল।
ও বুঝল নোঈ ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে! নোঈর শরীরটা কাঁপছে থরথর করে!
“কী হল? নোঈ? আরে নোঈ… কী হয়েছে তোর? এই দ্যাখো পাগলামি করে! কী হয়েছে বলবি তো?” আইকা নোঈকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে এল। তারপর কোনওরকমে দরজাটা বন্ধ করল। নোঈ কিছুতেই ছাড়ছে না ওকে। কেমন বাচ্চাদের মতো আঁকড়ে ধরে আছে!
ও এবার জোর করে নোঈকে ছাড়াল। সোজা করে দাঁড় করাল। নোঈর চশমা বেঁকে গেছে। সারা মুখ লেপটে আছে কান্নায়। নোঈ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে!
আইকা জোর করে থুতনিটা ধরে মুখ তুলল ওর, “কী হয়েছে?”
নোঈ কাঁপছে। হেঁচকি তুলছে। তার মধ্যেও বলল, “আমি… সরি দি… আমি না জেনে… আসলে মাসি বলেছে মাকে… আমাকে আর পুশকিনদাকে… মানে…”
আইকা বুঝল এবার। সেদিন নোঈ আর পুশকিনকে রেস্তরাঁয় ঢুকতে শুধু ও নিজেই দেখেনি। মা-ও দেখেছিল। আর মা সেই ঘটনাটা পুটুমাসিকে বলেছে। কোনও মানে আছে! মা আইকাকে পুরো ব্যাপারটাই চেপে গিয়েছে। জানে, আইকা জানলে বকবে।
আইকার হাসি পেল হঠাৎ। নোঈটা খুব ছেলেমানুষ। এই রাগ করছে! এই কাঁদছে! কী যে করছে ঠিক নেই। পুটুমাসিও পারে! নিশ্চয় খুব আজেবাজে কথা বলেছে!
আইকা নোঈকে দু’হাতে ধরে বলল, “ও! এখন কান্নাকাটি করে ম্যানেজ করা হচ্ছে? এবার যদি আমি বকি? কান মুলে দিই তা হলে? তখন কী হবে?”
নোঈ আইকার হাতটা ধরে নিজের গালে থাপ্পড় মারার চেষ্টা করল। বলল, “আমায় মার তুই, আমায় মার…”
“আবার এসব করে!” আইকা হাসি চেপে নিজের গলাটা কড়া করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। হেসেই ফেলল, “পাগলি একটা! এমন কেউ করে? আরে, তোর ভুল হয়েছে সেটা বুঝতে পেরেছিস, এনাফ। আর কিছু বলতে হবে না!”
নোঈ চশমা খুলে জামার হাতায় চোখ আর গাল মুছল। এখনও মেয়েটা হেঁচকি তুলছে অল্প। আইকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সত্যি কী বলে ক্ষমা চাইব জানি না। আজ দিনটা আমার কাছে খুব ইমপর্ট্যান্ট, জানিস দি। আজ আমায় ডিসাইড করতে হবে আমি জীবনে কোন দিকে, কার দিকে যাব। আর আজ মায়ের কাছে এটাও জানলাম যে, তুই কিছু বলিসনি। আমি যে কী খারাপ বিহেভ করেছি তোর সঙ্গে!”
“আমার সঙ্গেই তো করেছিস। আমায় নিজের ভাবিস বলেই তো করেছিস। তা হলে! এখন এসব রাখ।”
নোঈ চোখ মুছে বলল, “মা বলল, তুই নাকি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস কাল। সত্যি?”
আইকা হাসল। খবরটা ঠিক পেয়ে গিয়েছে! মায়ের পেটে যদি কিছু খবর থাকে! ও বলল, “হ্যাঁ রে। ভাল লাগছিল না। ম্যানেজমেন্ট এমন একটা ডিসিশন নিল!”
“কেন?” নোঈ চোখ মুছল। কথার ভেতর এখনও একটা হালকা কাঁপন আছে কান্নার।
“আরে, ওই সোনাঝুরির প্রজেক্টটা আর আমরা করছি না। আমায় আবার ফিল্ড থেকে সরিয়ে গোডাউনে দিয়ে দিয়েছে। মুখে কিছু বলেনি, কিন্তু ভাবটা এই যে, আমার জন্য প্রজেক্টটা হয়নি। আরে, মালিকরাই ডিসাইড করতে পারছে না তো আমি কী করতে পারি! কিন্তু ওরা কথাই শোনেনি। এটা তো ইনসাল্ট! আমি তাই ছেড়ে দিয়েছি। আমার কাছে দু’-একটা অফার আছে। দেখি।”
“কিন্তু একটা কাজ পেয়ে ছাড়লে হত না! আর এভাবে হঠাৎ…”
আইকা বলল, “তুইও তো হঠাৎ ছেড়েছিলি, মনে আছে? কিছু জিনিস ইমপালসে করতে হয়! না হলে…”
আইকা কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই আচমকা ডোরবেলটা টিংটং টিংটং করে কয়েকবার বেজে উঠল। শুনেই বোঝা যাচ্ছে কারও খুব তাড়া আছে।
আইকা বিরক্ত হল। কে এমন করে বেল বাজাচ্ছে! ভেতরের ঘরে মা ঘুমোচ্ছে, উঠে পড়লে মায়ের শরীর খারাপ করবে।
ও নোঈকে ছেড়ে দ্রুত গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। দেখল, ভীত-সন্ত্রস্ত মুখে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফ্ল্যাটের দারোয়ান সুশান্তর স্ত্রী, মালতী।
আইকার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মাগোর কিছু হয়েছে কি? সুশান্ত পা ভেঙে বসে আছে। তাই মালতী হয়তো ওর কাছে এসেছে।
“কী হয়েছে রে?” আইকার গলা কেঁপে গেল।
“বিটিয়ার, মাথা… মাথা ফেটে গেছে…” মালতি কেঁদে ফেলল কথা বলতে গিয়ে।
“সে কী!” আইকা চিৎকার করে উঠল। তারপর বুঝল এখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন-উত্তর খেলে লাভ নেই। ও দ্রুত ঘরের ভেতরে গিয়ে মোবাইল আর টাকার ব্যাগটা নিল। তারপর গাড়ির চাবিটা নিতে গিয়ে থমকে গেল। আরে, গাড়িটা তো দু’দিন আগে গ্যারাজে দিয়েছে ঠিক করতে। ক্লাচটা কাজ করছিল না বলে। এখন কী হবে?
নোঈ নিজেকে সামলে নিয়েছে এসবের মধ্যে। ও বলল, “একটা অ্যাপ ক্যাব ডেকে নেব। নীচে চল তুই।”
আইকা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। মাকে জাগানোর মানে হয় না। ঘুমোক। ও ঘরের চাবিটা দরজার পাশের টেবিলটা থেকে তুলে বাইরে পরার জুতোটা গলিয়ে নিল পায়ে। জামাকাপড় পালটানোর সময় আর নেই।
আইকা আর নোঈ দরজাটা টেনে দ্রুত বেরোল। মালতী আগেই লিফটের কল-সুইচ টিপে লিফটটাকে ওপরে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল।
আইকা লিফটে উঠে নোঈর দিকে নিজের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিল, “দ্রুত একটা গাড়ি বুক কর।”
লিফট নীচে নামতেই আইকা ছিটকে বেরোল।
সুশান্ত বসে ছিল মেয়েকে ধরে। মাগো কাঁদছে। সুশান্ত মাথার কাছে একটা গামছা চেপে ধরেছে। লাল হয়ে গেছে সবুজ গামছা!
আইকার শরীরটা কেমন করে উঠল। মাগো ছটফট করছে। ওকে দেখে জল এসে গেল আইকার চোখে। ও কী করবে বুঝতে পারল না।
“দি, একটাও গাড়ি নেই। আজ বড়দিন না! কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছে না! শেয়ারও বলছে পনেরো মিনিট লাগবে!” নোঈ টেন্সড গলায় বলল।
“তা হলে?” আইকার কেমন লাগল শরীরটা। এবার কী করবে ও। কাছের যে পলিক্লিনিক আছে সেটা প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এখন এই ছোট বাচ্চাকে নিয়ে ও যাবে কী করে?
এমনিতেই আইকা রক্ত দেখতে পারে না। সেখানে এখন কী হবে? ফ্ল্যাটের অন্য কারও হেল্প নেবে? কিন্তু তারা কি এখন হেল্প করবে?
আচমকা ফ্ল্যাটের মেন দরজার কাছে একটা গাড়ির হর্ন শুনতে পেল আইকা। এত রাতে কে এল? যেই হোক গাড়িটা যদি পাওয়া যায়?
আইকা দ্রুত সুশান্তর ছোট ঘরটা থেকে বেরিয়ে মূল ফটকের কাছে এল আর এসেই থমকে গেল একদম! দেখল, সাদা একটা ভাড়া করা সেডান থেকে নামছেন রুপিন!
আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ও থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রুপিন! এখানে! এখন! কেন?
“স্যার প্লিজ়, গাড়িটা ছাড়বেন না!” নোঈ পাশ থেকে দৌড়ে গেল রুপিনের দিকে।
রুপিন, আইকা আর ওর পাশে নোঈকে দেখেই বুঝেছেন যে, কিছু একটা হয়েছে! সঙ্গে-সঙ্গে গাড়িওয়ালাকে জানলা দিয়ে বললেন, গাড়িটা লাগবে আরও।
আইকা দেখল, নোঈ ওই অবস্থায় মাগোকে নিয়ে এল। মালতীও এসেছে সঙ্গে। সুশান্ত খোঁড়াতে-খোঁড়াতে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। আইকা নিজেকে ঠিক করল।
মালতী উঠেছে গাড়িতে। মাগোকে ওর কোলে দিল নোঈ।
“তুই থাক এখানে। আর, এই নে আমার ফ্ল্যাটের চাবি, আমরা যাচ্ছি!” আইকা চাবিটা নোঈর হাতে দিয়ে মালতীর পাশে উঠে বসল।
নোঈ একবার দেখল রুপিনকে। ও অবাক হয়ে তাকাল। স্বাভাবিক। ও তো বুঝতে পারছে না কে লোকটা। কেন এভাবে এলেন! কেন কিছু না জেনে গাড়িটাকে দাঁড়াতে বললেন!
আইকা নোঈর দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল, “আমার বস!”
রুপিন সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশে বসতে-বসতে আইকার মতো একই সুরে বললেন, “এক্স বস!”
মাগো ঘুমোচ্ছে এখন। বাচ্চাদের ওয়ার্ডে মাগো আর মালতীকে রাখা হয়েছে আজ রাতের মতো। মাথায় লেগেছে, তাই একটু অবজ়ার্ভ না করে তো আর ছাড়তে পারে না!
আইকা দেখে এসেছে মাগোকে। চারটে সেলাই পড়েছে। এখন ঘুমোচ্ছে। মালতীও ওর পাশেই শুয়ে।
রিসেপশনে এসে দাঁড়াল আইকা। কাচের রিসেপশন। দেখা যাচ্ছে বাইরেটা। সামনে বড় রাস্তা শুনশান। রিসেপশনেও একজন বসে ঝিমোচ্ছে। ও মোবাইলটা দেখল। আড়াইটে বাজে।
রুপিন কোথায়! এখানেই তো ছিলেন। গেলেন কোথায়! এদিক-ওদিক তাকাল আইকা। আর তখনই দেখতে পেল রুপিনকে। রাস্তার ওপার থেকে আসছেন মানুষটা। কী করছে কী লোকটা! আইকা রিসেপশনের কাচের দরজা খুলে বেরোল রাস্তায়। দেখল, রুপিন হাতে দুটো মাটির খুরি নিয়ে আসছেন!
আইকা এগিয়ে গেল কাছে। রুপিনের সঙ্গে কথাই বলা হয়নি একটুও। সময়ই পায়নি। ও বলল, “স্যার, আপনি! এখানে এভাবে! সরি, এতক্ষণ কথাই বলতে পারিনি!”
রুপিন হাসলেন। আইকার হাতে একটা চায়ের খুরি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আর স্যার কেন? তুমি তো রিজ়াইন করেছ। ওরা হয়তো রেজিগনেশন নিয়েও নেবে। ফলে টেকনিকালি আমি তোমার স্যার নই আর।”
“তা হলে এখানে কেন?”
রুপিন চায়ে চুমুক দিলেন একটা, নাক কুঁচকে বললেন, “মিষ্টি বেশি! কিন্তু এত রাতে যে পেলাম এই অনেক! তাই না!”
আইকা দেখল রুপিন হাসছেন।
“কী হল?” আইকা বিরক্ত হল এবার, “কী জিজ্ঞেস করছি?”
“সোনম বলত আমার উদ্যোগের অভাব আছে, জানো! তাই আমার দ্বারা কিছু হবে না! তাই ভাবলাম অনেক হয়েছে। যার জন্য মনখারাপ করছে সে কেন রিজ়াইন করল, একবার জেনে আসি।”
“মনখারাপ!” আইকা অবাক হল, “আর, ফোনও তো করা যেত। তাই না!”
রুপিন বললেন, “ফোন করলে মজা কই! প্লাস তোমার মাগোর কী হত! আর…”
“আর?” আইকা তাকাল এবার রুপিনের দিকে।
“আর, আমার কী হত আইকা! আমার যে খুব মনখারাপ করছিল তোমার জন্য। চাকরি ছেড়ে দিলে তো আর দেখতে পাব না তোমায়! তাই… ভাবলাম… শেষবার একবার দেখে আসি। আমি জানি আমার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। এসব ছেলেমানুষি করার আর বয়স নেই। কিন্তু তুমি বলো তো, আমরা কি সত্যি কোনওদিন বড় হই! এখনও তো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, স্কুলে যাওয়ার আগে মা আমার ভাত মেখে দিচ্ছে। এখনও তো পাহাড় দেখলে সেই কুড়ি বছর বয়সের মতো মনের মধ্যেটা কেমন করে। এখনও তোমার কথা মনে পড়লে আর সব কিছু বেকার, ফালতু মনে হয়। মনে হয় সদ্য কলেজে ওঠা আমিটা আবার কষ্ট পাচ্ছে। আমরা কি সত্যি কোনওদিনও বড় হই! বড় হওয়ার অভিনয় করতে করতে আমরা শেষমেশ সেটাকেই বিশ্বাস করতে শুরু করি মাত্র! আসলে আমরা বড় হই না। আমি জানি তুমি হয়তো বিরক্ত হচ্ছ। কিন্তু তাও আমায় ফিরিয়ে দিলেও এটা তো মনে রাখবে যে, একটা লোক এসেছিল তোমার জন্য সারা ভারতবর্ষ টপকে!”
আইকা কী বলবে বুঝতে পারল না। স্ট্রিট বাল্বের আলো এসে পড়েছে রুপিনের সাদা-কালো চুলে! ফরসা চামড়ায় আলো পিছলে যাচ্ছে! রুপিন হাসছেন ওকে দেখে। আর পুশকিনের কথা মনে পড়ছে আইকার— আমাদের যারা ভালবাসে, তাদেরও একবার সুযোগ দিতে হয়! তাদেরও একবার বলতে হয়, ‘রাজি!’
আইকা ঠোঁট কামড়ে তাকাল রাস্তার দিকে, শীতে, কুয়াশার তলায় কুঁকড়ে যাওয়া কলকাতার দিকে। শীত সত্যি কি শুধু সব কিছু নষ্টই করে দেয়? সব কিছু শেষ করে একা চণ্ডালের মতো জেগে থাকে ধ্বংসের মাঝে? নাকি শীত গত সময়ের ব্যবহৃত আবর্জনা সরিয়ে পৃথিবীকে নতুন করে বাঁচার জায়গা করে দেয়? আসলে শীত সেই জীবন তৈরি করে দেয়, যেখানে নতুন স্কুলের জামায় আবার ধুলো-মাটি লাগে। নতুন ব্ল্যাকবোর্ডে আবার শুরু থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অঙ্ক, বিজ্ঞান আর নতুন দিনের বেঁচে থাকা। শীত আসলে সেই টবের মাটি তৈরি করে দেয় যাতে, আবার আগামী গ্রীষ্মের সন্ধের আবছায়ায় জেগে ওঠে বেলফুলের সুবাস। শীত মানুষকে নতুন শুরুর কথা বলে। পৃথিবীর দুর্লভ ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ আবার সামনে এনে দেয়। সুযোগ দেয় আগের ভুল শুধরে নেওয়ার, আবার নতুন করে ভাল থাকার। শীত সব বাধা আর খসে-পড়া গত পৃথিবীর অতিরিক্ত যা কিছু সমস্ত সরিয়ে মানুষকে দেয় আর-একবার চেষ্টা করার সুযোগ। জীবনে ফিরে আসার সু্যোগ।
আইকা দেখল, রুপিন তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। মুখে সামান্য হাসি। হয়তো হেরে যাওয়ার হাসি। রুপিন কি হেরে যাবেন? আইকার মনে হল তা হলে তো সেই মানুষগুলোও হেরে যাবে যারা কষ্ট পেয়েও, সব ভুলে আবার বিশ্বাস করেছিল। আবার হাত বাড়িয়েছিল। আবার চেষ্টা করেছিল। আইকা ভাবল রুপিন হেরে গেলে ও নিজেও তো হেরে যাবে।
আইকা এগিয়ে গেল এবার। রুপিনের চায়ের খুরিটা নিয়ে ফেলে দিয়ে হাত ধরল ওঁর। তারপর নরম গলায় বলল, “এসব খেতে হবে না। আর ভেতরে চলুন। ঠান্ডা লেগে যাবে। এই শীতটা ভাল নয়।”
রুপিনও আইকার হাতটা চেপে ধরলেন এবার। সামান্য হাসলেন। তারপর বললেন, “শীতের চেয়ে আর ভাল কিছু হতেই পারে না আইকা! ইট ব্রিংস পিপল হোম!”
.
৩৭. কাজু
প্রথম বোমাটা কে মেরেছিল সেটা ঠিক বুঝতে পারেনি কাজু। ফ্যাক্টরি গেটের সামনের কাঁঠালচাঁপা গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে মাইকে কথা বলছিল সতু। সামনে প্রায় হাজারদেড়েক লোক জটলা করছিল। সব শ্রমিক আসেনি। কিন্তু যা এসেছিল তাই অনেক। শেষ বিকেলের দিকে কথা ছিল কাজুও কিছু বলবে। কিন্তু ঠিক তখনই প্রথম বোমাটা পড়েছিল।
বোমার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কাজু দেখেছিল, ওর সামনের দুটো লোক হঠাৎ কেমন যেন দম শেষ হওয়া পুতুলের মতো টলে পড়ে গেল মাটিতে। মানুষজন দৌড়োদৌড়ি শুরু করে দিয়েছিল। চিৎকার, পুলিশের লাঠিচার্জ আর যন্ত্রণায় কাতরানো মানুষের ভিড়ে কিছুক্ষণের জন্য কেমন যেন দিশাহারা লাগছিল কাজুর। এই ভিড়ে তো বিজনও আছে। ওকে বারণ করা সত্ত্বেও তো এসেছিল। কাজুর মনে হয়েছিল বিজন কই! কোথায় গেল ছেলেটা! ওর যদি কিছু হয়ে যায়! বোমা পড়ছিল আরও। মানুষের আতঙ্ক বাড়ছিল সঙ্গে সঙ্গে। পুলিশ লাঠি নিয়ে নেমে পড়েছিল। কারা বোমা মারছে? কেন মারছে? ওরা তো শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত করছিল। ওদের অসহায়তা আর দাবির কথা বলছিল। সুদর্শন মালিক তো ওদের কোনও কথাই শুনছে না। তাই তো ওরা বাধ্য হয়ে জমায়েত করেছিল। সেখানে হঠাৎ বোমা পড়ল কেন! কারা ফাটাল? এইভাবে কি আন্দোলন ভেস্তে দেওয়া যাবে! না দেওয়া যায়?
কাজু ভিড় থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়েছিল। কোথায় গেল বিজন! এই ভিড়ের মধ্যে দৌড়োদৌড়ির চাপে পড়ে বিজনের কিছু হয়ে গেলে ও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।
আর ঠিক তখনই দূরে একটা বটগাছের আড়ালে বিজনকে দেখেছিল ও। সতু ছিল কাজুর পাশে।
কাজু সতুকে বলেছিল, “তুই যাদবকাকা আর বাকিদের মিলের গলির পাশ দিয়ে বের করে দে। আমি বিজনকে নিয়ে যাচ্ছি!”
“পালা কাজু!” সতুর গলা কাঁপছিল উত্তেজনায়, “ওরা তোকে পেলে কিন্তু বিপদ হবে। তুই পালা!”
আলো কমে সন্ধে হয়ে আসছিল। মানুষের অস্থিরতা বাড়ছিল আরও। আর বোমা পড়ছিল। কাজু দেখেছিল ফ্যাক্টরির পাঁচিল টপকে বোমাগুলো এসে পড়ছিল এদিকে। এ কী! মালিকরা তবে বোমা ফেলছে! ওদের পোষা গুন্ডারা এসব করছে! আর সেখানে পুলিশ তা হলে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর লাঠি চালাচ্ছিল কেন? কাজুর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল। ও বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা কী হচ্ছে! আস্তে-আস্তে পুলিশ বাড়ছিল সংখ্যায়। এরপর বিজনকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
আচমকা ফ্যাক্টরির গেট খুলে গিয়েছিল এবার। আর কাজু সন্ত্রস্ত হয়ে দেখেছিল, দশ-বারোজন লোক বেরিয়ে আসছে। হাতে রড, চপার আর সাইকেলের চেন! পরিস্থিতি যে কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা আঁচ করে কাজু আর দাঁড়ায়নি। ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে, মানুষজন পার হয়ে দৌড়েছিল বটগাছটা লক্ষ করে। আর তখনই বৃষ্টি নেমেছিল ফোঁটা-ফোঁটা। কাজু প্রাণপণে দৌড়েছিল বিজনের দিকে।
বটগাছের কাছে পৌঁছে কাজু দেখেছিল গেট থেকে বেরিয়ে আসা গুন্ডারা এদিকেই ধেয়ে আসছে! ওদের লক্ষ্য স্পষ্ট!
“কাজুদা, সাইকেল!” বিজন কাজুর হাত টেনে নিয়ে এসেছিল পাশের ঝোপটার দিকে। বলেছিল, “সতুদা বলেছিল সাইকেলটা এখানে লুকিয়ে রাখতে। বলেছিল এমন ঝামেলা হতে পারে। তুমি, তুমি চলো কাজুদা। আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
সতু কোথায় গেল! যাদবদাদের নিয়ে ঠিকমতো পালাতে পারল তো! বিমলদা বলেছিল আসবে কিন্তু এল না তো!
আর-একটা বোমা এসে পড়েছিল কাছাকাছি। স্প্লিন্টার এসে লেগেছিল পাশের গাছে! হতভম্ব ভাবটা কিছুটা কেটেছিল।
“কাজুদা, ওরা তোমায় মারবে… পালাও!” বিজন ওর হাত ধরে টান মেরেছিল জোরে।
আর অপেক্ষা করেনি কাজু। দ্রুত সাইকেলটা টেনে নিয়ে উঠে পড়েছিল! বিজন লাফিয়ে পেছনের ক্যারিয়ারে বসেছিল। কাজু প্রাণপণে চালিয়ে দিয়েছিল সাইকেল!
পেছনে তেড়ে আসছিল লোকজন। বোমার শব্দ আসছিল। চিৎকার, গালিগালাজ আরও কী সব যে ভেসে আসছিল! কাজু কোনও দিকে না তাকিয়ে সাইকেল চালিয়ে দিয়েছিল গঙ্গার দিকে। নিজের জন্য খারাপ লাগছিল। এভাবে পালিয়ে এল ও! এভাবে চলে এল! সবাইকে ফেলে রেখে পালিয়ে এল! ওর ডাকেই তো আজকের গেট মিটিং হয়েছিল। বিমলদা তো করতে চায়নি। রাগ করেছিল। বলেছিল, “আবার তুই পাকামো শুরু করেছিস?”
পার্টি অফিসে বসে কথা বলছিল বিমলদা। সামনে রাখা চা-টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হুঁশ ছিল না বিমলদার। খুব রেগে গিয়েছিল, “তোকে কে বলেছে এসব করতে? আমি বারণ করিনি? মালিকরা যদি বন্ধ করে দেয় কারখানা, তা হলে শ্রমিকদের কী হবে? গোপেনরা বলবে, আমরা কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি, বলবে আমরা শ্রমিক স্বার্থ দেখি না। সামনে ইউনিয়নের ভোট। সেখানে এসব বলে গোপেনরা প্রচার চালাবে। আমাদের অসুবিধে দেখবি না? তোকে আগেও একবার বলেছিলাম না?”
কাজু শুধু বলেছিল, “আমি শ্রমিকদের কথা ভেবেই এটা করেছি। যাদবকাকারাও আমাদের সঙ্গে আছে। আর আমরা তো স্ট্রাইক করছি না। জানাচ্ছি আমাদের কথা। সেটা আমাদের অধিকার বিমলদা। এটা কেউ কাড়তে পারবে না। আপনিও না। আমরা খারাপ বা ঋণাত্মক কিছু করছি না কিন্তু। আমি চাই আপনিও আসুন মিটিং-এ। আমরা ওদের পাশে আছি জানলে ওদের মনোবল বাড়বে। আর আপনি খালি ভোট নিয়ে চিন্তিত, সেটাও সফল হবে।”
পার্টি-অফিস তো আর চায়ের দোকান নয়। সেখানে বিমলদার একটা ইমেজ আছে। আর কাজুকে ভালবাসে এমন কর্মীর সংখ্যাও কম নয়!
বিমলদা কাজুর কথাটা গিলে নিয়েছিল যেন! তেতো গলায় বলেছিল, “ঠিক আছে, যাব না হয়। কিন্তু স্ট্রাইক বা কাজ বন্ধ করার কথা বলে উসকাবি না কাউকে! এটা যেন মনে থাকে!”
“মানুষের কথা বলা, তাদের অধিকার পাইয়ে দেওয়াটা কি উসকানো বিমলদা? আপনি দলের মাথা হয়ে এসব কী বলছেন?” কাজুর অবাক লেগেছিল খুব।
বিমলদা তাকিয়ে দেখেছিল কাজুর দিকে। তারপর চিবিয়ে-চিবিয়ে নিচু স্বরে, আশপাশের কেউ যেন শুনতে না পায় এমনভাবে বলেছিল, “শুয়োর, আমার অফিসে দাঁড়িয়ে আমায় জ্ঞান! তোর ব্যবস্থা হচ্ছে!”
কাজু হেসেছিল। তারপর সবাই যাতে শুনতে পায় এমন গলায় বলেছিল, “আপনার অফিস? সে কী! আপনি তাই ভাবেন নাকি? আর আমাদের কী ভাবেন, আপনার কর্মচারী? এটা পার্টির অফিস। আপনি কর্মী, আমরাও কর্মী। আপনি সিনিয়র। সম্মান সেটুকুই। তার বেশি নয়। আর যাতে আমরা আপনাকে সম্মান করতে পারি সেটা দেখার দায়িত্বও আপনার। জানবেন, আমরা বয়সে নবীন। আগামী পৃথিবী কিন্তু আমাদেরই হাতে।”
“কাজুদা, ক’টা বাজে!” বিজনের গলায় এখনও সতর্কতা!
কাজু ঘড়িটা দেখল। এখানটা বেশ অন্ধকার। তাও ঘড়ির কাঁটা জ্বলজ্বল করছে! সওয়া আটটা বাজে।
কাজু বলল, “চল, আমরা যাই। অনেকক্ষণ হল। মনে হয় সব ঠান্ডা হয়েছে।”
বিজন মাথা নাড়ল, “না, না, পাগল হয়েছ তুমি? পুলিশ তোমায় পেলেই ধরবে! জানো না এটা? আমি বাচ্চা ছেলে হয়েও জানি! আর তুমি বলছ, চল?”
কাজু চুপ করে গেল। পেখমের কাছে কি এই খবরটা পৌঁছেছে? নিশ্চয় পৌঁছেছে। ওর ছোটকা তো এখন জুটমিলের ম্যানেজার। আগে কাজুকে কী পছন্দ করতেন, কিন্তু এখন দেখা হলে এমন মুখ করেন! তা ছাড়া সবুজকাকু তো এসেছিলেন ফোর্স নিয়ে। আচ্ছা পেখমদের কী বলছে ওরা কাজুর নামে? কাজু গোলমাল পাকিয়েছে! কাজুর জন্যই এই গোলমাল হয়েছে! মিলের ভেতর থেকে যে বোমা মারা হয়েছে, সেটা কি ওরা জানে? মিলের ভেতর থেকে যে গুন্ডা লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে ওদের ওপর, সেটাও কি জানে? কাজু জানে, পেখম কিছুই বিশ্বাস করবে না।
কাজু মনে মনে এমনিতেই মরে আছে। নয়নার সঙ্গে সেই রাতে কী যে হয়েছিল! পেখমের বিশ্বাসই তো ভেঙেছে। কিন্তু সেটা বলতে আর পারল কই পেখমকে! ও তো বলতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা শুনতেই চাইল না। কী করে যে এর প্রায়শ্চিত্ত করবে কাজু! কতদিন এই অপরাধ সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকবে ওর বুকের ওপর! কিন্তু তাই বলে তো পেখমকে ও ছেড়ে দিতে পারে না! মানুষের জীবনের না-বলা কথা হয়েই না হয় থেকে যাবে এই ঘটনাটা। অমীমাংসিত অপরাধের মতো।
ও আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টি আর হচ্ছে না। তবে আকাশ লাল হয়ে আছে। চৌধুরীদের পোড়োবাড়ির ঝোপে ওরা বসে রয়েছে এখন। গঙ্গার বাঁধের পাড়ে এই বিশাল খণ্ডহর ধরনের বাড়িটা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত। কেউ আসে না এদিকে। সাপখোপের ভয় থাকলেও তাই এদিকে এসেছে কাজু!
বিজন বলল, “কাল তোমার যাওয়া আছে, মনে আছে তো!”
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে তো আছে। কিন্তু আজ ব্যাপারটা এমন হয়ে যাবে, সেটা বুঝতে পারেনি। ওর প্ল্যান ছিল আজকে গেট মিটিংটা করে দিয়ে ও বাকি ব্যাপারটা সতুকে বুঝিয়ে দেবে। তারপর কাল বেরিয়ে যাবে পেখমের সঙ্গে। হাজারিবাগের কাছে আন্টিবাডুর এক বান্ধবী থাকে। সেখানেই যাবে আপাতত। এই যে ওরা চলে যাচ্ছে, সেটা বাড়িতে জানিয়েছে কাজু। বাবা, মা আর আন্টিকে জানিয়েছে। বাবা-মা আপত্তি করলেও আন্টি বলেছে, “ঠিক আছে। তোর লাইফ। ইউ হ্যাভ এভরি রাইট টু ডিসাইড। আমাদের কিছু বললে আমরা দেখে নেব। বলব আমরা জানি না।”
মা যদিও ভয় পাচ্ছে খুব, কিন্তু কাজু বুঝিয়েছে। বাবাও সব ভেবে শেষমেশ বলেছে, “ওর যাতে আনন্দ, সেটাই ও করুক!”
কিন্তু মুশকিল হল এখানে এভাবে যে সব গন্ডগোল হয়ে যাবে, সেটা বুঝতে পারেনি কাজু। এখানে কতক্ষণ বসে থাকবে ও? খবরও পাচ্ছে না কী হয়েছে!
এই বাড়ির সীমানা পার হয়ে বাঁধের ওপরের কাঁচা পথ। তারপরেই নদী। সেদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে।
কাজু কাঁধের ঝোলাটার ভেতর হাত ঢোকাল। ডায়েরিটা আছে। সঙ্গে পেখমের দেওয়া কার-বাঁধা রুপোর লকেটটাও। সেটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরল ও।
বিজন বলল, “সতুদা কি জানে তুমি আর পেখমদি কাল…”
“না, জানে না। ওকে আমি বলেছি বাড়ির কাজে আমি কয়েকদিনের জন্য মেদিনীপুর যাচ্ছি। বাইরের লোকেদের মধ্যে তুই জানিস শুধু।”
আসলে মুক্তার সিংহের ট্যাক্সিটা বিজনই ঠিক করে রেখেছে। সেটা করেই ওরা হাওড়া চলে যাবে। মুক্তার অল্পবয়সি ছেলে। একুশ-বাইশ বছর বয়স। কলকাতায় ট্যাক্সি চালায়। বিজনের সঙ্গে ভাল ভাব আছে।
বিজনের বয়স হয়তো অল্প, কিন্তু এই বয়সেই খুব কাজের ছেলে। কত লোকের সঙ্গে যে আলাপ! সবার দায়ে-দফায় গিয়ে হাজির হয়। তাই সবাই ভালওবাসে। কাজু জানে, ভবিষ্যতে বিজন অনেক বড় হবে।
কাজু বলল, “তুই এবার আয় বিজন। আর থাকিস না এখানে। তোর বাড়িতেও লোকজন চিন্তা করবে!”
বিজন কী একটা ভাবল। বলল, “ঠিক বলেছ। আমি বেরোচ্ছি। সাইকেলটা নিয়ে যাচ্ছি। বাইরের পরিস্থিতি কী একবার দেখি। ঘণ্টাখানেক পরে আমি আসছি আবার। খবর নিয়ে আসছি। তুমি কিন্তু এখান থেকে নড়বে না, আমি খবর নিয়ে এসে যদি সব ঠিক আছে দেখি, তা হলে বেরোবে। আর তেমন হলে সতুদা, যাদবকাকাকে বলব আজ রাতের মতো তোমায় কোথাও থাকার জায়গা করে দিতে!”
কাজু আবছায়ায় বিজনের দিকে তাকাল। ছেলেটা অনেক করছে ওর জন্য। বলল, “সাবধানে যাবি। আর রিস্ক নিবি না। কেমন? বাইরে কী পরিস্থিতি কেউ জানে না। আর নিজে না এসে সতুকেও আসতে বলতে পারিস। আর পারলে পেখমকে একটা খবর দিস যে, আমি ঠিক আছি। আচ্ছা আয় এবার।”
আবছায়া অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে কাজুর। ও দেখল, বিজন ওর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। তারপর সামনে রাখা সাইকেলটা নিয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। চারিদিকে ঝিঁঝি আর রাতপাখির আচমকা চিৎকারের মাঝে কিটকিট করে সাইকেলের চেনের শব্দ আর ঘাসপাতার ওপর বিজনের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল কিছুক্ষণ। তারপর আবার সবকিছু যেন কেউ ঢেকে দিল স্তব্ধতার কালো নরম কাপড় দিয়ে।
আকাশের দিকে তাকাল কাজু। লালচে রং ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। মেঘলা হয়ে আছে। কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে বিষণ্ণতা। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে। এবার ঘাড় ঘোরাল কাজু। একটু দূরে জোনাক-বাড়ির পেছনের দিকে বড়-বড় গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। চৌধুরীদের এই জায়গার কোনাকুনি গেলে জোনাক-বাড়ির পেছন দিকের একটা অংশ পড়ে। কিন্তু জায়গাটা এতটাই জঙ্গলে ঢাকা যে, যাওয়া সম্ভব নয় কারও পক্ষে।
কাজু জানে এখন কিছু করার নেই। বাড়িতে যে যাবে, সেটাও সুরক্ষিত নয়। সত্যি যদি ওকে পুলিশ খোঁজে, তা হলে বাড়িতেও ওরা হানা দেবে। আর, একবার ধরা পড়লে খুব মুশকিল। পেখমের সঙ্গে যাওয়াটাই আর হবে না। পেখম যে অন্য কারও হয়ে যাবে, এটা ভাবতেই পারে না কাজু। এটা মনে করলেই কেমন একটা করে শরীরে! মনে হয় এক্ষুনি সাংঘাতিক কিছু একটা হয়ে যাবে। কেমন কান্না পায়। পেখম এই পৃথিবীতে থাকবে আর ওর হবে না, এটা হয় নাকি! তাই কোনও ঝুঁকি ও নেবে না। বিজন বা সতু এসে বাইরের ‘সব ঠিক আছে’ ধরনের খবর দিলে তবে বেরোবে।
সামনে তাকিয়ে রইল কাজু। দেখল, জোনাকি উড়ছে। ঝিরঝির আলো জ্বালিয়ে জোনাকিরা উড়ছে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে! মনে মনে গুনল কাজু। প্রায় কুড়িটা জোনাকি। ও ভাবল, ওদের জোনাক-বাড়িতে তো আরও আছে! এমন ঠান্ডা সুন্দর আলো আর কোথাও দেখেনি ও। হঠাৎ নয়নার কথা মনে পড়ল কাজুর!
অদ্ভুত মেয়ে নয়না। সেদিন সন্ধেবেলা একটা কাচের বোতল নিয়ে এসেছিল ওদের বাড়িতে। কী আবদার, না জোনাকি ধরবে!
কাজুর সেদিন পড়ানো ছিল না। ভেবেছিল, একবার পার্টি-অফিসে যাবে। সেই মতো মুড়ি-চানাচুর খেয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু যেতে পারেনি। গেটের কাছে দেখা হয়েছিল নয়নার সঙ্গে!
নয়না! সেই ছাদের ওপর আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনাটার পরে নয়নার কথা ভাবলেই কেমন একটা অপরাধবোধ এসে ঘিরে ধরে কাজুকে। মনে হয়, পেখমের ওপর রাগটা এভাবে বেরোল ওর মধ্য দিয়ে। কেন ওভাবে নয়নাকে ধরল ও। এটা তো পেখমকে ঠকানো হল। ব্যাপারটা যতটা সম্ভব মন থেকে ভুলে যেতে চায় কাজু। কিন্তু নয়না মাঝে মাঝে ওর কাছে এসে কিছুতেই ভুলতে দেয় না ওকে কিছু।
সেদিনও জোনাক-বাড়ির গেটের কাছে নয়না এসে পথ আটকেছিল কাজুর। এই সময়টা তেমন লোকজন থাকে না ওখানে। নয়না সোজা এসে কাজুর জামার কলারটা ধরে টেনে ঠোঁট রেখেছিল ঠোঁটে! কাজু ঘাবড়ে গেছিল। কী করছে কী মেয়েটা! কেউ দেখে ফেললে! এখানে কেউ নেই ঠিক আছে, কিন্তু বাড়ির জানলায় তো কেউ থাকতেই পারে।
নয়নাকে ও ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল।
নয়না হেসে বলেছিল, “কী হল? লজ্জা লাগছে? কেউ দেখে ফেলবে? সেদিন যেভাবে বুকে কামড়ে দিলে মনে আছে? এখনও নীল হয়ে আছে! জানো?”
“তুই চুপ কর। ওটা ভুল হয়ে গেছে আমার। আর হবে না। প্লিজ়, ওটা ভুলে যা,” কাজু কাতর স্বরে বলেছিল।
“ভুল! অতক্ষণ ধরে ভুল!” নয়না চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “ও, পেখম সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা করার পরে এসব এখন ভুল লাগছে তোমার?”
কাজু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। নয়না কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না। কাম আর প্রেম তো এক নয়। ওটা একটা দুর্ঘটনা। ওটা কাজুর কাছে জীবন নয়।
নয়না ওর হাতে ধরা কাচের বোতলটা দেখিয়ে বলেছিল, “এতে জোনাকি ধরব বলে এসেছিলাম কাজুদা। কিন্তু এখন দেখছি তোমায় ধরতে হবে। সেই তোমায় একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে?”
“কোন কথা?” কাজু অবাক হয়েছিল।
নয়না তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। তারপর বলেছিল, “তুমি আমার সব কথা ভুলে যাও, না কাজুদা?”
কাজু কী বলবে বুঝতে পারেনি। আসলে ওর মাথার ওপর অনেক চাপ। এসব মনে রাখবে কী করে! আর নয়নার সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে মরমে মরে গেছে ও। তাই সচেতনভাবে ও নয়নার কথা মনে আনতে চায় না।
নয়না বলেছিল, “আমার দিদির একটা পুতুল ছিল। খুব সুন্দর। সেটা আমায় ধরতে দিত না। তখন সাত বছর বয়স আমার। আমি বলতাম একবার শুধু ধরব। কোলে নেব। কিন্তু কিছুতেই দিদি আমার কথা শুনত না। একদিন লুকিয়ে কোলে নিয়েছিলাম বলে দিদি আমায় মেরেছিল খুব। মায়ের কাছে মিথ্যে নালিশ করিয়ে আমায় মারও খাইয়েছিল। মা খুব ভালবাসে দিদিকে।”
কাজু কী করবে বুঝতে পারছিল না। নয়না কেন এসব বলছে ওকে? কী বলতে চায় আসলে?
নয়না বলেছিল, “একদিন বিকেলে দিদি ছিল না বাড়িতে। আমি সেই সুযোগে পুতুলটাকে মায়ের উনুনে গুঁজে দিয়েছিলাম। উনুনটা আঁচে বসিয়েছিল মা। আমি পুতুলটা নিয়ে সোজা গুঁজে দিয়েছিলাম উনুনের তলায়। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল সব। দিদি এসে খুব কেঁদেছিল। মা এমন মেরেছিল আমায় যে, মাথা কেটে রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই দাগ আজও আছে। কিন্তু জানো কাজুদা, আমি খুব কিছু কাঁদিনি। রাতে শুয়ে দেখেছিলাম, মা আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মায়ের চোখে জল। আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘দিদি আবার এমন করলে আমিও কিন্তু এমনই করব!’ কাজুদা বুঝলে কিছু? আমি কিন্তু এমনই করব। মনে থাকে যেন।”
কাজু কী বলবে বুঝতে পারছিল না। হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল সব। নয়নার চুল উড়ছিল। আধো-অন্ধকারে কেমন লাগছিল নয়নাকে।
“আমার বুকে মুখ দিয়েছ তুমি কাজুদা। তুমি আমার। পেখমের নও। দাগ আছে এখনও। চিহ্ন। তুমি যে আমার, তার চিহ্ন!” নয়না কথাটা বলে হেসে হাত ধরেছিল কাজুর, “চলো, জোনাকি ধরে দেবে আমায়। আমি আমার কাছে রাখব তোমার জোনাকিদের।”
কাজু বলেছিল, “যা তোর নয়, তা কিছুতেই তোর নয়। এটা মনে রাখিস নয়না। জোর করে এসব হয় না। আমার জোনাকি তোর নয়। পেখমের।”
জোনাকিরা উড়ছে সামনে। কুড়িটা জোনাকি। কাজুর অদ্ভুত লাগছে। বিন্দু-বিন্দু তারা যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে! মা ছোটবেলায় বলত, জোনাকিরা নাকি পরি! ছোট-ছোট পরি। ওদের কাছে ভাল মনে কিছু চাইলে ওরা ঠিক দেয়।
এখন মনে পড়লে হাসি পায় কাজুর। পরি! পরি বলে কিছু হয় না পৃথিবীতে। কিন্তু তাও মায়ের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে ওর। মনে হচ্ছে বলে, ওর জীবনের সব কষ্ট দূর করে দেয় যেন পরিরা। সব বাধা কাটিয়ে পেখম যেন আসে ওর জীবনে। কাজুর মাঝে মাঝে মনে হয়, বড় হওয়ার সবচেয়ে মুশকিল হল লজিক তৈরি হওয়া। এই জল-কাদা, মনখারাপ-করা আধো-অন্ধকার পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে বাচ্চাদের মতো সরল মনের বিশ্বাসের খুব দরকার। রূপকথার খুব দরকার।
আচমকা সামনের দিকে কীসের একটা শব্দ হল। কীসের শব্দ এটা! কাজু সচকিত হয়ে নড়েচড়ে বসল। ঘড়ি দেখল একবার। বিজন গিয়েছে আধঘণ্টার মতো হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি ফিরে এল ও!
“কাজু, কাজু! তু হ্যায় কেয়া!”
সামনে থেকে যাদবকাকার গলার স্বর শোনা গেল।
কাজু হাঁপ ছাড়ল। যাক যাদবকাকা। ও নিজের জায়গা থেকে উঠে শব্দ লক্ষ করে এগিয়ে গেল কিছুটা। লালচে মেঘ থেকে ছিটকে আসা আবছায়া আলোয় দেখতে পেল ও মানুষটাকে। যাদবকাকার হাতে একটা টর্চ।
“এই যে আমি!” কাজু সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“ওঃ!” যাদবকাকা আশ্বস্ত হল, “আরে, মেরেকো ডর লগ রাহা থা! বিজনের কাছ থেকে শুনলাম তুই এখানে আছিস। যাক। তু চল অব।”
কাজু জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”
“আরে, বাওয়াল হয়ে গেছে! বোমায় দু’জন স্পট ডেড। পুলিশ কাউকে ধরতে পারেনি এখনও। তুই যেহেতু মিটিং ডেকেছিলি তোকেও খুঁজছে। তাই এখানে থাকা সেফ নয়।”
“যাবটা কোথায়?” কাজুর গলা কেঁপে গেল। দু’জন মারা গেছে। পুলিশ খুঁজছে। এবার কী হবে? কাল যে ওর পেখমের সঙ্গে যাওয়ার কথা!
“আরে, সে নিয়ে চিন্তা করিস না। আজ রাতটা গা-ঢাকা দিয়ে থাক। কাল গোপেনদা আর বিমলদাকে বলে একটা রফা করা যাবে। কিন্তু আজ বাইরে আসিস না। মেথরপট্টির পেছনে পবনের বাড়িতে আজ থাকবি। এখান থেকে এখন চল। মশা কামড়ালে ম্যালেরিয়া হবেই। তব অর এক মুসিবত। চল।”
কাজু কাঁধের ব্যাগটাকে সামলে নিয়ে যাদবকাকার সঙ্গে বেরিয়ে এল চৌধুরীদের জায়গা থেকে। চারপাশে অন্ধকার। পথ দেখাচ্ছে ওই ছোট্ট একরত্তি একটা টর্চ। যাদবকাকা হনহন করে হাঁটছে। কাজুও যাচ্ছে, কিন্তু হাওয়াই চটিটা বিকেলে দৌড়োনোর সময় কিছুটা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাই খুব একটা জোরে হাঁটতে পারছে না।
“যাদবকাকা, আস্তে!” কাজু বলল।
ওরা বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছে। সামনে পথের বাঁক দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে যাদবকাকা। কাজু যতটা সম্ভব জোরে সেই বাঁকের দিকে এগোল। ওই তো পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সামনে বড় একটা গাছ আবছায়ার মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ডাল বেশ নিচু। কাজু মাথা ঝুঁকিয়ে গাছের ডালটা এড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
থাড করে একটা ভোঁতা শব্দ হল হঠাৎ! কাজু থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর মনে হল ওর মাথার ভেতরে যেন বোমা ফাটল! ও বুঝল মাথার ডান দিক দিয়ে গরম কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে। সামনের দৃশ্য আবছায়া হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কাজু কথা বলতে পারছে না। মাথার ব্যথাটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। হাত কাঁপছে ওর। পা অবশ হয়ে আসছে। গরম স্রোত ক্রমশ ভিজিয়ে দিচ্ছে জামা। কী হল এটা? কেউ কি মারল? নাকি মাথায় গাছের ডালটা লাগল? এটা কী? কাজু মাথায় হাত দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে আবার থাড করে আর-একবার বোমা ফাটল ওর মুখের ওপর! কাজু ঘুরে পড়ে গেল মাটিতে!
নাকটা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গিয়েছে! মুখে নোনতা স্বাদের রক্ত! সামনের দৃশ্য প্রায় আবছা! একটা চোখ দিয়ে কিছুটা দেখা যাচ্ছে আর অন্য চোখের সামনে শুধু মেঘ!
তবু সেই আধখোলা চোখ দিয়ে কাজু দেখতে পেল পাঁচ-ছ’টা আলোর রেখা। টর্চ। কয়েকজোড়া পা।
শুনল কে যেন বলছে, “শাবাস যাদবসাহাব! একদম পারফেক্ট আছে!”
যাদবকাকা! কাজুর মাথা নিভে আসছে দ্রুত! তবু জোর করে নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছে ও। যাদবকাকা ওকে এভাবে… দৃশ্য গুলিয়ে যাচ্ছে। পাগুলো ঘিরে ধরছে ওকে। টর্চের আলো এসে পড়ছে ওর ওপর।
কার একটা গলা, “শেষ করে দে এবার! শালার পুড়কি ছিল খুব! মার বাঞ্চোতকে!”
কাজু হাত তুলল। কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু এবার ধারালো কিছু এসে লাগল ওর কাঁধে! মনে হল, শরীর ছিঁড়ে গেল একদম! আঃ, কী যন্ত্রণা! এবার গোটা শরীর নিভে আসছে দ্রুত!
কাজু অস্ফুটে বলল, “মা… মা… পেখম…”
“শুয়োর! আমার বউয়ের নাম নিচ্ছে! শালাকে…”
কথা শেষ হওয়ার আগে আর-একটা কিছু এসে পিঠ থেকে কাজুর শরীর ভেদ করে ওকে গেঁথে দিল মাটির সঙ্গে। কাজু একবার ওপরের দিকে তাকাল। সারা শরীরে আর কিছু নেই! শুধু মাথাটা যেন নড়ছে! আবছাভাবে একবার সামনে তাকাল ও।
“শেষ হয়েছে?” চেনা একটা গলা কানে এল কাজুর। ও কোনওমতে তাকাল। টর্চের আলো এসে পড়েছে লোকটার মুখের একপাশে। আলোছায়ায় লোকটা তাকিয়ে আছে কাজুর দিকে। কাজু স্থির হয়ে গেল একেবারে! এ কাকে দেখল ও! তারপর অবসন্নভাবে মুখ গুঁজল মাটিতে। আবছাভাবে একটা ধাতব শব্দ পেল ও। তারপর আর-একটা শব্দ এল…
আর জোনাকিরা উড়ছে। সব অন্ধকার চিরে বেরিয়ে আসছে অনেক-অনেক জোনাকি! ওদের ছোট্ট মফস্সলের মাথার ওপর উড়ছে তারা। আর সেই আলোয় মাকে দেখতে পেল কাজু। দেখল, ছোট ভাইটা গাছ লাগাচ্ছে। আন্টিবাডু ইজিচেয়ারে বসে হেসে কথা বলছে কোন একটা ছেলের সঙ্গে যেন। আর সে মুখ ফেরাতেই চিনতে পারল। বিজন! তুই এখানে! কে যেন হাসল এর উত্তরে। আর পেছন ফিরল কাজু। দেখল ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে পেখম। আজ আবার জোনাকিদের আলো জ্যোৎস্নার মতো ভাসিয়ে নিচ্ছে চরাচর। কাঠালচাঁপার গন্ধ চৌধুরীদের লম্বা পাঁচিল টপকে, ঝুমাদিদের কলতলা ঘুরে, হেমন্তকাকুর সাইকেলের কেরিয়ারে বসে চলে আসছে এই এত দূরে! চ্যাটার্জিপাড়ার জলট্যাঙ্কির পেছন থেকে হাওয়া ভেসে আসছে আজ। হাওয়া ডুবিয়ে দিচ্ছে এই ছোট্ট মফস্সলটাকে। কাজু দেখছে পেখমকে। পেখম হাসছে। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে ওর দিকে। আর এই অন্ধকার নদীবাঁধে শুয়ে কাজু শেষবারের মতো সেই স্পর্শ অনুভব করল। শেষ জোনাকিটা নিভে যাওয়ার আগে সেই ছোঁয়াচটুকু ধরে রইল কাজু। অস্ফুট হাওয়ার স্বরে এই নদী, এই হাওয়া, এই রাত্রি আর পৃথিবীর নিভে-যাওয়া সমস্ত জোনাকিদের কানে কানে বলল, “আমরা দু’জন, মাত্র দু’জন…”
.
৩৮. নোঈ
ডিসেম্বরেও এমন মেঘ করে! মনে হচ্ছে কলকাতা যেন বাইসনের পেটের তলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে! জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল নোঈ।
ডিসেম্বরের প্রায় শেষ এখন। নতুন বছর চলে এল প্রায়। শহরের চারিদিকে ছুটির আমেজ। তার ওপর রবিবারের দুপুর। শীত, মেঘ আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এমন দিনে গল্পের বই নিয়ে লেপের তলায় শুয়ে থাকার চেয়ে আর কী ভাল হতে পারে! গতবছর শীতের নোঈ হলে সেটাই করত ও! কিন্তু এই শীতের নোঈ অন্য, আলাদা।
ও নিজেকে একবার দেখে নিল আয়নায়। আজ জিনস আর উলেন টপ পরেছে। সঙ্গে মাফলার। নোঈর ঠান্ডা কম। মা বলে, আগের জন্মে নাকি ও পেঙ্গুইন ছিল! হতেও পারে। কিন্তু ঠান্ডা ব্যাপারটা খুব ভাল লাগে নোঈর।
শুধু বৃষ্টিটাই যা গোলমাল পাকাল আজ।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোল নোঈ। মা বসে রয়েছে বাইরের ঘরে। টিভিতে কী একটা সিরিয়াল দেখছে! বাবা যে নিজের ঘরে সেটা আর বলে দিতে হবে না।
মা তাকাল নোঈর দিকে। মুখটা হাসি-হাসি! বলল, “যাক, রেডি তা হলে? গাড়ি বুক করেছিস তো? আর এ কী! এভাবে কেউ হবু শাশুড়ির সামনে যায়!”
“প্লিজ় মা!” নোঈ মাথা নাড়ল, “কে হবু শাশুড়ি?”
মা উঠে এসে ওর জামাটা টেনে ঠিক করতে করতে বলল, “অবশ্য এখনকার ব্যাপারই আলাদা। আর যা বাজে ওয়েদার! অন্য কেউ হলে আমি যেতে না বলতাম। হ্যাঁরে, ও কবে যেন আমেরিকা যাচ্ছে?”
“জানুয়ারির দশ তারিখ,” নোঈ মায়ের হাতটা সরিয়ে দিল।
মা সামান্য বিরক্ত হল, “কী হল, এমন করছিস কেন! উলের টপটা একটু ঠিক করে দিচ্ছি। পেছনের দিকটা কেমন হয়ে আছে। শোন, টেরাবাঁকা উত্তর দিবি না। আর, একটা জিনিস জিজ্ঞেস করবি, আমরা কবে যাব ওদের বাড়ি?”
“তোমরা?” নোঈ অবাক হল, “পারো বটে বাবা!”
“কত ভাল ছেলে!” মা নোঈর মাথায় হাত দিয়ে চুলটা ঠিক করার চেষ্টা করল, “যখন তুই নিজে মা হবি, তখন বুঝতে পারবি কী জ্বালা আর চিন্তা।”
নোঈ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে এখনই আমি বুঝতে পারছি।”
মা ছোট্ট করে একটা চড় মারল নোঈর হাতে। হেসে বলল, “খালি আজেবাজে কথা! আমার খুব নিশ্চিন্ত লাগছে আজ জানিস। আমি আইকাদেরও বলেছি। ওরা তো খুব খুশি শুনে। শুধু আইকা কেমন যেন অবাক হল! যাক বাবা, ওই লোকটার ভূত যে তোর মাথা থেকে নেমেছে এই অনেক! আমার যা চিন্তা হচ্ছিল! আমি তোর বাবাকে বলেছি, আমার মেয়ে যখন, তখন ও কোনও ভুল করতে পারে না। তোর দিদিরা আছে আমেরিকায়। তুইও যাবি! ভালই হবে, কাছাকাছি থাকবি দু’জনে। আমরা আর ক’দিন বল! নিজেদের লোকই কাজে আসে জীবনে।”
মা এত কেন কথা বলে কে জানে! নোঈ মায়ের কাছ থেকে সরে গেল একটু।
মা বলল, “টিপ পরলি না? তোকে টিপ পরলে এত সুন্দর দেখায়! পর না!”
“মা,” নোঈ মাথা নাড়ল, “আমি ঠিক আছি। প্লিজ় এবার আমি যাই? দেড়টা বাজে। ওরা বলেছিল দুটোর মধ্যে যেতে!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। আর, লজ্জা করে খাবি না। সকালে মাত্র দুটো টোস্ট আর জুস খেয়েছিস একটু। আচ্ছা, ওরা কবে বিয়ের ডেট ঠিক করতে চায় বলে তোর মনে হয়? জানুয়ারিতে যদি ছেলে আমেরিকা যায়, ছ’মাসের মধ্যে আসতে পারবে বলে তো মনে হয় না, না? নেক্সট ইয়ারের শেষে কি তবে ওরা ভাবছে? নাকি শ্রাবণ মাসে?” মা চিন্তিতভাবে তাকাল নোঈর দিকে!
নোঈ আর কথা বাড়াল না। মায়ের মনোলগ চলতেই থাকবে। ও বেশ বুঝতে পারছে, মা পারলে ওর সঙ্গে যায়।
পায়ে এতক্ষণ ঘরের চটি ছিল। সেটা কার্পেটের পাশে খুলে রাখল নোঈ। স্নিকারটা মা বের করে রেখেছে আগেই। ও সোফায় বসে মোজা আর জুতো পরে নিল।
মা এবার বড় ঢাউস ছাতাটা বের করে দিল, “এটা নিয়ে যা। ওই ফ্যান্সি ছোট ছাতা নিতে হবে না। ভিজে যাবি।”
এটা ছাতা না পোল ভল্টের পোল, সেটা বুঝতে পারে না নোঈ। ইয়া বড়। সামলানোই দায়। খুব ঝড়ের ভেতর এই ছাতা নিয়ে হাঁটলে আকাশে উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল!
নোঈ বলল, “এটা নিয়ে যেতে হবে? এটা আমার চেয়ে বড়। এটা নিয়ে অসুবিধে হবে।”
মা বলল, “না, এটা নিয়ে যা। ভিজলে জ্বর আসবে। কথা শোন। সব কিছুতে তর্ক করবি না। সব কিছু নিয়ে তর্ক করতে নেই। আমরা কোনওদিন বাবা-মায়ের মুখের ওপর কোনও কথা বলিনি আর তোদের কী চোপা, কী চোপা!”
নোঈ মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল। ওর আটপৌরে, রাগী, জেদি আর ছেলেমানুষ মা। সারাক্ষণ সংসারের জন্য ভাবে। কাজ করে। সবাইকে নিজের মতো করে ঠিক রাখতে চায়। সারা জীবন এর বাইরে আর কিছু ভাবলই না। মায়ের দিকে তাকিয়ে আচমকা কেমন একটা কষ্ট হল ওর। মনে হল মা গোটা জীবন তো দিয়ে দিল ওদের জন্য। নিজে তো কিছুই করল না। মা ভাল গান জানত। ভাল নাচতে পারত। ফিজ়িক্সে অনার্স নিয়ে ভাল নম্বর পেয়েছিল। চাকরি করতে পারত অনায়াসে। কিন্তু করল না। অনেকে মাকে হাউস ওয়াইফ বলে মনে মনে একটু খাটো করে দেখে। কিন্তু সারা জীবন একদিনও তো নিজের কাজ থেকে ছুটি নিল না মা। সারা জীবন সারাক্ষণ এই মানুষটা অন্যের জন্য করে গেল।
নোঈ আচমকা এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল মাকে। তারপর গালে জোরে চুমু খেল একটা।
মা ঘাবড়ে গেল সামান্য, “কী হল হঠাৎ?”
নোঈ হাসল, বলল, “এমনি। আগেকার দিনে তোমরা বাবা-মাকে প্রণাম করতে না? এখন আমরা তার বদলে চুমু খাই, বুঝলে?”
মা ভুরু কুঁচকে তাকাতে গিয়েও হাসল। ওর হাতে একটা দু’হাজার টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলল, “ভাল মিষ্টি কিনে নিবি লেক মার্কেটের ওই নতুন বড় দোকানটা থেকে।”
“আরে!” নোঈ অবাক হল, “টাকা দিচ্ছ কেন?”
মা বলল, “এটা দিতে হয়। নে। ব্যাগে ঢোকা!”
নোঈ টাকাটা ব্যাগে ভরে বলল, “মা তুমি আমায় খুব ভালবাসো, না?”
“তোর কী মনে হয়?”
“আমি যাতে ভাল থাকব সেটা তুমি চাও?”
মা অবাক হল, “এসব বলছিস কেন?”
নোঈ বলল, “এমনি বলছি। আমি আসি এখন।”
নোঈ আর অপেক্ষা না করে বাবার ঘরে উঁকি মারল, “আমি আসছি বাবা।”
বাবা তাকাল। হেসে মাথা নাড়ল শুধু। মা দরজা অবধি এগিয়ে এল ওর সঙ্গে! বলল, “পাগলামি করবি না কিন্তু। সাবধানে যাস।”
লিফটে নামতে-নামতে মোবাইলে গাড়িটা বুক করে নিল নোঈ। কাছেই আছে। দু’মিনিট দেখাচ্ছে।
নোঈ একবার সুশান্তর ঘরের দিকে এগোল। একবার দেখে যাবে মাগোকে। সেদিন রাতে যা হয়েছিল! নোঈর তো হাত-পা কাঁপছিল থরথর করে। ভাগ্যিস আইকাদির বস এসে গেছিলেন।
নোঈ গিয়ে দরজায় দাঁড়াল। মালতী বসে আছে মাটিতে। রান্না করছে কিছু একটা। সুশান্ত বিছানায় বসে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে আছে। মাগোর মাথায় ব্যান্ডেজ। কিন্তু মুখে হাসি। সুশান্তর গলার লকেটটা ধরে খেলছে!
“সুশান্তদা, কেমন আছে মাগো?”
সুশান্ত তাকাল। মালতীও ঘুরে তাকাল নোঈর দিকে। মাগো নোঈর গলা চেনে। ও চারটে দাঁত দেখিয়ে খিলখিল করে হেসে, ঠেলে আসতে চাইল ওর কাছে।
নোঈ চোখ বড়-বড় করে মাগোর দিকে তাকিয়ে বলল, “খালি দুষ্টুমি! চুপ করে থাকো। আমি ফিরে এসে কোলে নেব।”
সুশান্তদা হাসল। মাগোকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল, “এখন ভাল আছে দিদি।”
“গুড,” নোঈ হাসল, “আমি আসি।”
রাস্তায় বেরিয়ে এক মিনিট দাঁড়াতে হল নোঈকে। গাড়ি এসে গেল তার মধ্যেই।
রাস্তা ভিজে আছে বেশ। ছিপছিপে বৃষ্টি হচ্ছে। খুব খারাপ লাগছে না নোঈর। শুধু একটা অস্বস্তি হচ্ছে। এই যে ও যাচ্ছে, এটা কি ঠিক হচ্ছে! শ্বেতার সঙ্গে কথা বলার সময় গোটা ব্যাপারটা কাটিয়ে দিলে পারত না!
কিছুদিন আগে অফিস থেকে ফেরার সময় শ্বেতাকে দেখেছিল, দাঁড়িয়ে আছে ওদের বাড়ির গলির মুখে। কেমন ভয় পেয়ে গিয়েছিল নোঈ। এ কী চেহারা হয়েছে মেয়েটার! সেই যে শেষ কথা হয়েছিল তারপর আর শ্বেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি নোঈ। কেন ও গাল বাড়িয়ে চড় খেতে যাবে? তাই বিয়েতেও যায়নি।
নোঈ শ্বেতাকে দেখে থমকে গিয়েছিল। কী করবে বুঝতে পারছিল না। শ্বেতাও থমকে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর প্রায় দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছিল নোঈকে।
নোঈ বুঝতে পারছিল কিছু একটা হয়েছে। ও বলেছিল, “কী হয়েছে তোর! এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঘরে চল!”
সেদিন বাবা আর মা ছিল না। একটা অনুষ্ঠানে বেরিয়েছিল। বাড়ি ফাঁকাই ছিল। ঘরে ঢুকে জুতো খুলতে-খুলতেই নোঈকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল শ্বেতা। নোঈ কিছু বলেনি। কাঁদতে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে মনের ময়লা দূর করতে হলে কান্নাটা দরকার।
কিছু পরে শ্বেতা সামলেছিল নিজেকে। নোঈর আনা জল খেয়ে ধাতস্থ হয়েছিল।
নোঈ শান্ত গলায় বলেছিল, “কী হয়েছে তোর?”
শ্বেতা বলেছিল, “আমায় ক্ষমা করে দে নোঈ। আমি তোকে খুব বাজে কথা বলেছিলাম। আমি বুঝিনি যে, ববি একটা জানোয়ার! আমি… আমি…”
“আরে, আবার কাঁদছিস?” নোঈ শক্ত করে ধরেছিল শ্বেতাকে।
শ্বেতা অনেক কষ্টে আটকেছিল নিজেকে। বলেছিল, “বিয়ের সাত দিনের মধ্যে ঝামেলা শুরু করেছিল জানিস! আর গতকাল আমি ছিলাম না। বাড়ি ফিরে দেখি অন্য মেয়ে নিয়ে শুয়ে আছে! আর সেটা বলেছি বলে আমায়… আমায় লাথি মেরেছে! আমি… আমার জীবনটা…”
নোঈ তাকিয়েছিল শ্বেতার দিকে। কষ্ট হয়েছিল ওর। মেয়েটা যেন টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে! নোঈ ভেবেছিল, কেন এমন হয়? শ্বেতা তো ভালইবেসেছিল। তা হলে এমন করে কষ্ট পাচ্ছে কেন! অধিকাংশ মানুষ আসলে ভালবাসতে চায়, কিন্তু সেটার জন্য যে-একাগ্রতা, ডেডিকেশন আর সততার দরকার হয় সেটা তাদের থাকে না। দু’মিনিটের চাউমিন খেতে খেতে সব কিছুই আসলে দু’মিনিটের কনসেপ্টের মতো হয়ে গেছে।
“তুই ঠিক বলেছিলি নোঈ। আমি ওকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছি! আমি আর থাকব না ওর সঙ্গে। আগে তো সম্মান। তারপর প্রেম ভালবাসা!”
নোঈ কিছু না বলে চুপ করে তাকিয়েছিল শ্বেতার দিকে।
শ্বেতা আবার বলেছিল, “তবে জয় খুব হেল্প করেছে আমায়! আজ গেছিলাম ওর কাছে। আমার চাকরি দরকার। তাই ওর কথা মনে হয়েছিল।”
জয়! নোঈ চমকে উঠেছিল আবার ওর কথা কেন!
“জয় খুব ভাল ছেলে!” শ্বেতা বলেছিল, “ও বলেছে আমায় কাজ দেখে দেবে। তবে ওর একটা ফেভার চাই। বন্ধুর কাছ থেকে বন্ধুর মতো। তাই আমি তোর কাছে এসেছি।”
“আমার কাছে!” অবাক হয়েছিল নোঈ। কেমন একটা ভয়ও করছিল।
শ্বেতা বলেছিল, “জয় তোর সঙ্গে দেখা করতে চায়। একবার দেখা কর। প্লিজ়। বড়দিনের বিকেলে নন্দনে। আমাদের ইউজ়ুয়াল জায়গায়। প্লিজ়।”
নোঈ অবাক হয়ে গিয়েছিল, “আমার সঙ্গে? কেন?”
শ্বেতা বলেছিল, “আমি ডিটেল জানি না। আই গেস হি ইজ় রিপেন্টেড। তুই প্লিজ় একবার যাস। এটা আমার জন্য করিস। আমার কাজটা খুব দরকার। আমি আর ববির সঙ্গে থাকতে পারব না।”
নোঈ চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞেস করেছিল, “শ্বেতা, তোকে কি জয় বলেছে যে, এটা না করে দিলে তোর কাজ হবে না? মানে সাম কাইন্ড অব বার্টার?”
শ্বেতা থমকে গেছিল, “না, মানে তা ঠিক নয়। কিন্তু হি ইজ হেল্পিং মি আউট! আমিও কিছু করতে চাই। প্লাস তুই ওকে ভালবাসিস। আমি জানি সেটা। তাই প্লিজ়।”
নোঈ বলেছিল, “প্রেমের চেয়ে সম্মান বড়, কথাটা তুই একটু আগে বললি না?”
শ্বেতা বলেছিল, “প্লিজ় জানু। প্লিজ়। আমার জন্য। আমার জীবনটা তো শেষ। আমি যে সময় নিয়ে কিছু কাজ খুঁজব তার উপায় নেই। আমি… আমি প্রেগন্যান্ট!”
“ফাক!” নোঈ নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছিল, “আর ইউ নাটস? কী করেছিস?”
“আমার চাকরিটা খুব দরকার। আমি জেদ করে বিয়ে করেছিলাম ববিকে। বাড়িতেও তাই কিছু বলতে পারছি না। জয় আমার ইমিডিয়েট হোপ! প্লিজ়।”
আবার সেই জয়! আবার সেই টেনশন! টানাপোড়েন! কান্নাকাটি! মনখারাপ! নোঈ শ্বেতাকে দেখছিল।
শ্বেতা আশা নিয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে। মানুষ কী অদ্ভুত! এই শ্বেতা সেদিন ওকে খারাপ কথা বলছিল আর আজ যেই নিজের দরকার পড়েছে সঙ্গে-সঙ্গে এসে প্রায় পায়ে ধরছে! এরা কি বন্ধু! বন্ধু বলে কি আদৌ কিছু হয়?
নোঈ বলেছিল, “ঠিক আছে। যাব।”
শ্বেতা আবার জড়িয়ে ধরেছিল ওকে, “মাই বেস্টেস্ট জানু!”
হাজরা মোড় বেশ ফাঁকা আজ। বৃষ্টির বিকেলে সবাই কেমন একটা নেতিয়ে গেছে। কেমন একটা আড়মোড়া ভাঙা ভাব সবার মধ্যে। নোঈ ঘাড় ঘুরিয়ে সেই দোকানটা দেখার চেষ্টা করল। পান, কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকান। এখানেই জয় ওকে দশ টাকার নোটটা দিয়েছিল না! অন্য সময় এটা দেখলে বুকের ভেতরে কেমন একটা মোচড় মেরে উঠত। কিন্তু আজ যেন কিছুই হল না। নোঈ ইচ্ছে করে দেখছিল দোকানটাকে। যদি কিছু মনে হয়! কিন্তু না। আর-পাঁচটা দোকানের মতোই লাগল! বৃষ্টি ভেজা, নীল প্লাস্টিক টাঙানো, কোল্ড ড্রিঙ্কের ফ্রিজ দাঁড় করানো যে-কোনও একটা দোকান যেন!
নোঈর মনে পড়ল, সেদিন জয়কে নন্দন চত্বরে দেখেও ঠিক এমনটাই মনে হয়েছিল। ঠান্ডা, নিঃসাড় আর সাধারণ।
জয় এসেছিল ঠিক সময়ে। দেরি করেনি। এমনিতেই উৎসবের দিন ছিল সেটা। চারিদিকে লোকের ভিড়ও ছিল খুব। তার মধ্যে ওদের দেখা করার জায়গা, সেই বড় গাছটার নীচে দাঁড়িয়েছিল নোঈ। জয়কে দেখতে পেয়েছিল দূর থেকে।
আর-একজনকেও দেখেছিল। নিশান। নীল পাঞ্জাবির ওপরে হাতকাটা সাদা কোট পরেছিল নিশান। এমন সাজগোজ করতে সেভাবে নিশানকে দেখেনি ও। নিশান কাছে আসেনি। দূর থেকে হাত দেখিয়ে হেসে এগিয়ে গিয়েছিল অন্যদিকে। নোঈ কিছু বলেনি। ওর বলার মতো মনের অবস্থা ছিল না।
“হাই!” জয় এসে হাসিমুখে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। জয়কে স্মার্ট লাগছিল। যত্ন করে রাখা দাড়িতে সাজানো মুখে একটা চকচকে ভাব ছিল, “শুড উই সিট সামহোয়্যার? কাছেই ওই ময়দানের দিকে যেতে একটা ওল্ড ক্যালকাটা টাইপ চাইনিজ় রেস্তরাঁ আছে। বেশ গ্রিজ়ি ফরবিডন টাইপ অফ ফুড পাওয়া যায়। ওল্ড ওয়ার্ল্ড চার্ম। যাবে?”
জয় এত কথা কেন বলছিল বুঝতে পারছিল না নোঈ। ও বলেছিল, “কী বলবে বলো। আমার তাড়া আছে।”
নোঈর স্বরে এমন কিছু একটা ছিল যে, জয় একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল। ও বলেছিল, “না মানে… আমি আসলে তোমার সঙ্গে খুব রুড বিহেভ করেছিলাম। তাই… মা বলছে বিয়ের কথা। আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি নেক্সট জ্যান-এ। তাই… মানে, মাকে বলেছি নোঈ বলে একটা মেয়ে আছে। আমায় খুব ভালবাসে। আমার জন্য পাগল। মা তো জানোই খুব রাগী। অর্থোডক্স! কিন্তু আমি যেহেতু চলে যাচ্ছি, তাই এবার একটু নরম হয়েছে। বলছে তোমার সঙ্গে একবার দেখা করবে। নেক্সট সানডে বাইরে আমরা তিন জনে লাঞ্চ করি চলো।”
নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। তারপর বলেছিল, “লাস্ট টাইম কী বলেছিলে তোমাদের অফিসে মনে আছে? মনে আছে কী ভাবে তাড়িয়েছিলে! আর এখন তোমার মা ডাকছেন!”
জয় হাত জোড় করে ঝুঁকে পড়েছিল, “প্লিজ় নোঈ! আয়্যাম সরি! প্লিজ়। আমি বুঝতে পেরেছি আমারও তোমাকেই পছন্দ। আমার তোমার কথাই মনে পড়ে। প্লিজ় আন্ডারস্ট্যান্ড! আমি মাকেও বলেছি নোঈ খুব ভাল মেয়ে। একবার দেখা করো। আমি বলেছি নোঈ আমার কথা ফেলবে না। প্লিজ়।”
নোঈ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করেছিল। সবাই ‘সরি’! সারাক্ষণ সবাই কিছু করে ফেলেই বলে ‘সরি’! আরে বাবা, ‘সরি’ বলতে হবে এমন কাজ করা কেন? শ্বেতা সরি! জয় সরি! আর কে কে সরি কে জানে!
“প্লিইইইজ়!” জয় বলেছিল, “এবার না বললে কিন্তু আমি মাটিতে বসে পড়ব হাঁটু গেড়ে! সামনের রবিবার। প্লিজ়।”
জয়ের দিকে তাকিয়েছিল নোঈ। ওর কিছু মনে হচ্ছিল না। মৃত সম্পর্ক যেন। জয় আরও কিছু বলছিল। কিন্তু কানে ঢুকছিল না কোনও কথা। বরং আচমকা ওর পুশকিনের মুখটা মনে পড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল দূর থেকে পুশকিন যেন তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
“ঠিক আছে, যাব,” নোঈ আর কথা বাড়ায়নি। ও ভাবছিল জয়ের সামনে থেকে ওকে সরে যেতে হবে এক্ষুনি!
জয় খুশিতে হাত ধরতে চেয়েছিল ওর। নোঈ সরে গিয়েছিল। বলেছিল, “জানিয়ে দিয়ো কোথায়, কখন।” ওর শরীরের ভেতরে আগুন জ্বলছিল যেন! মনে হচ্ছিল জয়কে ছিঁড়ে রুটির টুকরোর মতো ছড়িয়ে দেয় পথে! মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছিল নোঈ। পরের রবিবারের জন্য।
রাতে খেতে বসে নোঈ জয়ের কথা গুছিয়ে বলেছিল মা আর বাবাকে। মা শুনে প্রথমে কোনও কথা বলেনি। তারপর কী যে নাচানাচি শুরু করেছিল! বলেছিল, “একদম ঠিক করেছিস। অবশ্যই যাবি রবিবার। যাক বাবা, ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন আমার দিকে। পুশিদি আমাকে যেদিন থেকে বলেছিল যে, তোকে আর ওই লোকটাকে একসঙ্গে দেখেছে, আমার তো রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। আমি ঠাকুরের কাছে খুব কাঁদতাম। তোর যেন মতি ফেরে। যাক, ঠাকুর মুখ তুলে তাকিয়েছেন!”
পুশিদি! মানে আইকাদির মা,ওই ম্যান্ডেভিলার রেস্তরাঁর কথা বলেছিল মাকে। আর ও কিনা সেই নিয়ে আইকাকে আজেবাজে কথা বলেছে! লজ্জা আর খারাপ লাগায় নোঈ চুপসে গিয়েছিল একদম। শুধু মনে হচ্ছিল এবার কী করবে ও? কীভাবে আইকাকে বলবে?
নোঈ মায়ের কথা শেষ করার হওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করেনি। সোজা মেসেজ করেছিল আইকাকে। ওর নিজের ‘সরি’ বলার সময়ও যে এসেছে বুঝতে পারছিল।
লেক মার্কেটে গাড়ি দাঁড় করায়নি নোঈ। সোজা নজরুল মঞ্চের উলটোদিকের বড় রেস্তরাঁর সামনে গিয়ে গাড়ি থেকে নামল। এটার কথাই জানিয়েছিল জয়। ও চোয়াল শক্ত করে ঠিক করেছিল নিজেকে। জয় দিনের পর দিন ওকে কষ্ট দিয়েছে। এখন সেই জয় কী বলে ও দেখবে।
রেস্তরাঁটা যে বড়, বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। চওড়া ফুটপাথের সামনে একটা বেঞ্চ রাখা। আর ঢোকার দরজার পাশে ডেস্ক নিয়ে একজন দাঁড়িয়ে।
নোঈ সামনে যাওয়ামাত্র লোকটা এগিয়ে এসে দরজা খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করল। নোঈ ভেতরে ঢুকল। ঝলমল করছে চারিদিক। ঢুকেই বাঁ দিকে রিসেপশন। সেখান থেকে ওকে সবাই স্বাগত জানাতে শুরু করেছে। এতজন একসঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছে! নোঈর মজা লাগল। খুব ঝকঝকে করে সাজানো জায়গাটা। সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে। সিলিং-এ হলুদ আলো। দেওয়ালে বিটন উড প্যানেল। কোণে কোণে গাছ রাখা। সিঁড়ির প্রথম ল্যান্ডিং-এর পাশে একটা বসার জায়গা। নোঈ ওর সামনে দাঁড়ানো একজন হস্টেসকে বলল, “আই হ্যাভ বিন ইনভাইটেড। আ ইয়ং ম্যান উইথ…”
নোঈকে সবটা বলতেও হল না। একটি মেয়ে “দিস ওয়ে ম্যাম,” বলে ওকে ওপরের দিকে নিয়ে গেল।
ওপরে বসার জায়গাটা আরও বড়। দু’পাশে মাখন রঙের সোফা। গ্লাস টপ টেবিল।
“হিয়ার!” দূর থেকে জয় হাত তুলে ডাকল নোঈকে।
আর ঠিক তখনই আবার পুশকিনের কথা মনে পড়ল ওর। কেন মনে পড়ল? এই রাস্তার ওপরেই সামান্য দূরে পুশকিনের ফ্ল্যাট। তাই কি মনে পড়ল? এখানে যে আসবে সেটা পুশকিনকে জানায়নি ও। কেন জানায়নি? জয়ের কথা পুশকিন জানে, কিন্তু আজ যে জয়ের সঙ্গে ও দেখা করছে, এখানে আসছে, এসব জানে না।
আজও সকালে পুশকিনকে ফোন করেছিল নোঈ। জেনেছে আজ আর বাবার কাছে যাবে না পুশকিন। নিজের ফ্ল্যাটেই থাকবে। অফিসের অন্য একটা প্রজেক্টের কাজ আছে। তারই ইভ্যালুয়েশন করতে হবে।
নোঈ কথা বাড়ায়নি আর। কারণ, কেন যেন মনে হচ্ছিল, আর-একটু কথা বললেই আজকের এই ব্যাপারটা ও বলে ফেলবে!
পুশকিনের ওপর যে খুব চাপ যাচ্ছে সেটা ও জানে। বস খুব ভরসা করেন পুশকিনকে। সোনাঝুরির কাজটাও যেন একটা সুতোয় ঝুলছে। বিজনবাবু রাজি হয়েছেন দীপমালাদেবীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে। কিন্তু দীপমালাদেবী এখনও সময় দেননি। অফিস থেকে ওরা জেনেছে, ওঁর ছেলে সুপ্রতীকের নাকি শরীর ভাল নেই। দীপমালাদেবী সেই নিয়ে ব্যস্ত।
পুশকিনের ব্যাপারটা বোঝে না নোঈ। এই চাপেও কেমন যেন ছাড়া-ছাড়া থাকে। সারাক্ষণ, দেখলে মনে হয়, লোকটা যেন এই পৃথিবীতে ছুটি কাটাতে এসেছে। কোথাও যাওয়ার নেই। কোনও তাড়া নেই। সারাক্ষণ ইজ়ি।
সেদিন বিজনবাবু পুশকিনকে দেখে কী যে খুশি হয়েছিলেন! কত গল্প করেছিলেন পুশকিনের বাবার আর ওঁর নিজের ছেলেবেলার। সেই পুরনো সোনাঝুরি। পুরনো জোনাক-বাড়ি। সতুদা। বিমলদা। অজানা কত নাম। কত স্মৃতি।
সব শুনে পুশকিন বলেছিল, “কাকু, আমি এসেছি আপনার হেল্প নিতে। বাবা বলেছে আমাদের সমস্যার সমাধান একমাত্র আপনি করতে পারবেন।”
বিজন বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, “আমি? মানে?”
“মানে, দীপমালাদেবীর সঙ্গে আপনাকে একবার কথা বলতে হবে।”
“পেখমদি!” বিজন যেন চমকে উঠেছিলেন, “ওরে বাবা, আমি! পেখমদির তো মনে হয় আমাকে মনেও নেই! চিনতেও পারবে না!”
“প্লিজ় কাকু। আপনাকে একবার কথা বলতেই হবে। বাবা বলল, পারলে আপনি ওঁকে জোনাক-বাড়ি বিক্রি করতে বলতে পারবেন।”
বিজন মাথা নিচু করে নিয়েছিলেন। নোঈর মনে হয়েছিল, লোকটা হঠাৎ যেন এখান থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! যেন এখানে নেই!
“কাকু, প্লিজ়…”
পুশকিন সবিস্তারে বলেছিল ওদের প্ল্যানের কথা। কী-কী ওরা করতে চায়, ওদের লক্ষ্য কী, ওদের লাভের পাশাপাশি সোনাঝুরিরও কী লাভ হবে, সব বলেছিল বিজনকে। এমনকী এটাও বলেছিল যে, একটা প্রফেশন্যাল ব্যাপার নিয়ে দীপমালাদেবী ছেলেমানুষের মতো করছেন। কী প্রশ্ন, কী উত্তর এসব বলছেন।
পুশকিন বলেছিল, “বাবা বলল, আপনি দীপমালাদেবীকে চিনতেন। আপনাকে নাকি খুব স্নেহও করতেন। তাই আপনি একটু যদি বলেন। প্লিজ়!”
বিজন মাথা নিচু করে বসেছিলেন বেশ কিছুটা সময়। তারপর তাকিয়েছিলেন পুশকিনের দিকে। বলেছিলেন, “ঠিক আছে! কিন্তু কী জানো, সেই সময়টা অন্যরকম ছিল। মানুষগুলো, তাদের মূল্যবোধ সব অন্যরকম ছিল। এখনকার দৃষ্টিতে তাদের দেখলে হবে না। তোমাদের মতে যা প্রফেশনাল, তাই হয়তো অন্যের কাছে পারসোনাল,” সামান্য থেমেছিলেন বিজন। তারপর কিছুটা যেন স্বগতোক্তির মতো করে বলেছিলেন, “তা ছাড়া আমিও ক্লান্ত। শরীর ভাল নেই। ক’দিন আর থাকব কে জানে! তাই আমিও বলে দিতে চাই কিছু। আমি আর বইতে পারছি না।”
“মানে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
স্মরণ বলেছিল, “কী বইতে পারছেন না জেঠু? কার কথা বলছেন আপনি? সেই…”
বিজন স্মরণকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “তোমরা যোগাযোগ করো। আমি যাব। কথা বলব। পেখমদিরও তো একটা অধিকার আছে।”
নোঈ বসার পরে জয় হাসল শব্দ করে। নোঈ একঝলকে দেখে নিল চারপাশ। চেয়ার-টেবিল ছাড়াও কাচের জানলা দিয়ে বাইরের মেঘলা বৃষ্টির শহরটা দেখা যাচ্ছে।
জয় নিজের হাসির রেশ ধরে বলল, “মা বলছিল, তুমি আসবে না। আমি বললাম আসবেই। নোঈ আমার কথা ফেলতে পারে না। ঠিক কি না?”
নোঈ হাসল।
জয় আবার বলল, “ফর্মালি কি আলাপ করাব?”
নোঈ মাথা নাড়ল, “কাকিমা, আমি নোঈ। জয় বলেছিল বলে আজ এলাম। আপনি নাকি দেখা করতে চেয়েছিলেন!”
কাকিমা গম্ভীর মুখে তাকালেন। তারপর কোনওরকম ভূমিকা না করে সরাসরি বললেন, “তুমি জয়কে পছন্দ করো? খুব ফলো করতে শুনলাম। কান্নাকাটি করতে নাকি! জয় বলছিল, নোঈ ওকে খুব ভালবাসে। তাই?”
নোঈ চোয়াল শক্ত করে জয়ের দিকে তাকাল। এসব বলেছে জয়! ওর সম্বন্ধে এসব কথা বাড়িতে বলেছে!
জয় সামান্য অপ্রস্তুত হলেও দ্রুত সেটাকে সামলে নিল। বলল, “মা ওসব ছাড়ো। পুরনো কথা আর ভেবে কী হবে! লেটস অর্ডার সাম ফুড!”
কাকিমা হাত তুলে চুপ করতে বললেন জয়কে। তারপর নোঈর দিকে তাকিয়ে বললেন, “জানো বোধহয় তোমার পরেও জয়ের একটা রিলেশন ছিল। একজন ডিভোর্সি মহিলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। তার মেয়েও আছে। মহিলা তো খুব চেপে ধরেছিল ওকে বিয়ে করবে বলে। আমরা ব্যাপারটাকে সামলাই। আর ঠিক করি ওর বিয়ে দিয়ে দেব। তখন জয় বলল, তোমার কথা!”
“হ্যাঁ, স্বাভাবিক তো,” জয় হাসল, “তাকেই বিয়ে করা উচিত যে তোমায় ভালবাসে! তুমি তাকে ভালবাসো কি না, সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। তাই না!”
কাকিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমায় দেখতে তো ঠিকঠাক। এখন তোমার বাড়ির লোকেরা কেমন সেটাও দেখতে হবে। বিয়ে তো আর প্রেম নয় যে, লেকে বসে গুজুরগুজুর করে এলাম দু’ঘণ্টা!”
“মা,” জয় কাকিমাকে থামাল, “আরে, নোঈ তো আছে। তুমি এসব কথা পরে বোলো! এখন কিছু অর্ডার করি।”
“প্লিজ়,” নোঈ হাত তুলে থামাল জয়কে। এবার আর নিতে পারছে না। সেই নন্দনের বিকেলটা থেকে নিজে সামলে রেখেছিল, আর জাস্ট পারছে না। ও বলল, “আমি কিন্তু এখানে খেতে আসিনি। আমি এসেছি তোমার মায়ের সামনে তোমাকে কিছু কথা বলতে!”
“মানে?” অবাক হয়ে জয় তাকাল ওর দিকে।
নোঈ বলল, “মানে, আমি তোমায় বিয়ে করব এটা ভাবলে কী করে? আমি ভালবাসতাম তোমায় একসময়। কিন্তু তুমি এমন ব্যবহার করেছ যে, আমার মধ্যে আর ভালবাসার কিছু অবশিষ্ট নেই!”
“কী বলছ?” জয় তাকাল ওর দিকে।
“মানেটা তো সহজ। আমি এটাই বলতে এসেছিলাম। আর তো কোনও কারণে আসিনি। লাঞ্চ আমি এখানে করব না।”
জয় থতমত খেয়ে গেল একদম, “কী বলছ কী? আরে, মাকে আনলাম, মা বলল…”
নোঈ বলল, “নিজেকে অত বড় কিছু ভাবার কী আছে! আমি তোমার জন্য মরতাম! তোমার জন্য আমি মরিনি। দিব্যি আছি। কাকিমা সরি। কিন্তু ও আমাকে যে কী অপমান করেছে সেটা আপনি জানেন না! যখন ইচ্ছে দূরে ঠেলবে যখন ইচ্ছে কাছে টানবে, আমি কি পুতুল কাকিমা? সেটা তো ঠিক নয়। সেটাই বলতে এলাম আজকে। জয়ের মানসিক সমস্যা আছে কি না আমি জানি না। কিন্তু আচমকা ওর এমন কেন যে মনে হল, ওই জানে! আমার কিন্তু এসব মনে হচ্ছে না। আমি আসি। জয়, হ্যাভ আ নাইস লাইফ।”
রেস্তরাঁর বাইরে বেরিয়ে নোঈ হাঁপ ছাড়ল। সারা শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে! নিজেকে এতক্ষণ কী করে যে ও সংযত রেখেছিল ও-ই জানে! সকাল থেকে এই সময়টা নিয়ে ও টেনশনে ছিল। মাকেও কিছু বলেনি। কাউকেই কিছু বলেনি। ওর বহুদিনের ইচ্ছে ছিল যে, একবার যদি সু্যোগমতো পেত, তা হলে জয়কে ঠিক মজা দেখিয়ে ছাড়ত। ও ভাবতেই পারেনি এমনটা হতে পারে। এভাবে সুযোগটা আসতে পারে ওর সামনে। জয় বারবার ওকে দূরে ছুড়ে ফেলেছে! একবার করলে মানা যায়, মানুষ ভুল করল। কিন্তু বারবার যদি কেউ করে, তা হলে তো সেটা সে জেনেবুঝে করছে বলেই ধরতে হবে! আর জেনেবুঝে কেউ ওর সঙ্গে এমন করে যাবে, আর নোঈ তাকে ছেড়ে দেবে! আগে জয়ের দেওয়া দশ টাকাটা চিকলেট কিনে খরচ করেছিল, আর আজ গোটা জয়কেই জীবন থেকে খরচ করে ফেলে দিল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে এখনও। টিপটিপ করে পড়েই চলেছে। কিন্তু ছাতা খুলতে একটুও ইচ্ছে করছে না। বরং আজ ভিজতে ইচ্ছে করছে। মন খুলে সেই ছোটবেলার মতো করে ভিজতে ইচ্ছে করছে। আর ইচ্ছে করছে পুশকিনকে দেখতে। সেই সকাল থেকে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেটা এখন যেন আরও ফুটে বেরোচ্ছে। যেন আর কিছুতেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে না নোঈ। এখান থেকে সামান্য কিছু দূরত্বে নিজের ফ্ল্যাটে এখন বসে আছে পুশকিন। আর কী এক অদৃশ্য টান সেখানে নিয়ে যেতে চাইছে নোঈকে!
বহুদিনের চাপা রাগ আর অপমান আজ সরে গেল ওর বুক থেকে। মায়ের সামনে নিজের স্বরূপ প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার পর জয় যেভাবে তাকিয়েছিল ওর দিকে, সেটা মনে পড়তেই আনন্দটা বেশি হচ্ছে। জয়ের ভেতরের ফাঁপা মানুষটা আজ বেরিয়ে এসেছে!
নোঈ হাত বাড়িয়ে একটা হলুদ ট্যাক্সিকে দাঁড় করাল। গাড়িটা দাঁড়াতেই দরজা খুলে উঠে পড়ল ও। বলল, “রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের কাছে।”
“আরে, এটুকু কেউ যায় নাকি?” বয়স্ক লোকটা অবাক হয়ে তাকাল নোঈর দিকে।
নোঈ আর কথা না বাড়িয়ে ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বলল, “এবার চলুন!”
ট্যাক্সিওয়ালা বৃদ্ধ মানুষ। নোঈর হাতের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হেসে বলল, “মা, আমার মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আমার বয়স এখন প্রায় ষাট। এই পঞ্চাশ টাকাটা না হলেও আমার চলবে। যা ভাড়া তাই দিয়ো। কেমন?”
নোঈ বলল, “সরি কাকু। আমি সেটা মিন করিনি। আমি খুব তাড়ায় আছি। খুব।”
লোকটা হেসে গাড়ি স্টার্ট করল।
ডোরবেলটা বাজিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না নোঈ। বহু বছরের অপমানের জবাব আজ দিতে পেরেছে। বাবা বলে, যেমন গাছ লাগাবে, তেমন ফল পাবে। আজ জয় বুঝতে পারছে এর মানে। পুশকিনকে না দেখলে ও বুঝতে পারত না, আসলে মানুষ কেমন হয়। সত্যিকারের ভালমানুষ কেমন হয়।
দরজটা খুলে পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈ আর অপেক্ষা না করে হাতের ছাতাটা মাটিতে ফেলে দিয়ে প্রায় লাফিয়ে জড়িয়ে ধরল পুশকিনকে।
“আরে!” পুশকিন থমকে গেল।
নোঈ পুশকিনকে কথা বলতে দিল না একটুও। নিজের ঠোঁট চেপে ধরল ঠোঁটে! হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল ওর পিঠ!
শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রায় মিনিটখানেক পর নোঈ ছাড়ল পুশকিনকে!
পুশকিন মাটি থেকে ছাতাটা তুলল। এদিক-ওদিক একবার দেখল। তারপর বন্ধ করে দিল দরজাটা। ছাতাটা হেলিয়ে রাখল এক পাশে।
নোঈ উজ্জ্বলভাবে হেসে পুশকিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আজ জয়কে যা দিয়েছি না!”
“নোঈ!” পুশকিন হাত তুলে পিছিয়ে এল।
নোঈ থমকে গেল। পুশকিনের মুখচোখ এমন কেন? কী হয়েছে? বাইরের সমস্ত মেঘ যেন এসে জমেছে পুশকিনের ভেতরে!
“কী হয়েছে? আপনি এমন করে সরে যাচ্ছেন কেন? আপনি আমায় পছন্দ করেন না? ভালবাসেন না?” নোঈ তাকাল পুশকিনের দিকে! আচমকা চোখ জ্বালা করছে ওর! পুশকিন এমন করছে কেন?
পুশকিন তাকাল নোঈর দিকে। তারপর বলল, “তোমায় একটা খবর বলার ছিল।”
“কী?” প্রশ্ন করতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল নোঈর।
পুশকিন সময় নিল। তারপর বলল, “আমায় বুদাপেস্ট চলে যেতে হচ্ছে। জানুয়ারির ছ’তারিখ।”
“কী?” নোঈ কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
পুশকিন বলল, “প্রজেক্টটা থ্রু হয়ে গিয়েছে! তাই…”
পুশকিন বলে চলল আরও কথা। কিন্তু কিছুই যেন ঢুকছে না কানে! সব পার করে পুশকিনের দিকে তাকিয়েই রইল নোঈ। মেঘ আরও ঘনিয়ে এল কলকাতায়! বৃষ্টির জোরও বাড়ল কি? নোঈ জানতে পারল না কিছু। শুধু ধীরে-ধীরে আবছা হয়ে গেল এই ঘর, এই দুপুর, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুশকিন! মনে হল সব কিছু কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেল! শেষ হয়ে গেল! আর কিছুই যেন অবশিষ্ট রইল না নোঈর জীবনে!
ভালবেসেছে ও পুশকিনকে। নিজের ভেবেছে। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়েছে। স্পর্শের মধ্য দিয়েই কি তবে পুশকিনের ভেতরের মেঘ এসে বৃষ্টি হয়ে নামল নোঈর চোখে? ভালবাসলে কি এভাবেই পরস্পরের রোদ আর ছায়াগুলো জড়িয়ে যায়? মাটি আর শিকড় জড়িয়ে যায়? এভাবেই কি মেঘ আর বৃষ্টি বদল হয়ে যায় পরস্পর? নোঈ জানে না। শুধু জানে আজ ঘোর বৃষ্টির দিন! নোঈর এক জীবন থেকে অন্য জীবন শুরু হওয়ার দিন!
নোঈ চশমা খুলে চোখ মুছল এবার। তারপর তাকাল সোজা। এগিয়ে গিয়ে বলল, “বারবার তুমি পালিয়ে যেতে, সরে যেতে পারো না। ভালবাসলে তার দায়িত্বও নিতে হবে তোমায়। জানবে, মেয়েদেরও ইচ্ছে আর চাওয়ার দাম আছে পুশকিনদা। অধিকার আছে। আমি সেটাই চাইছি। আজ তুমি তোমার নিজেকে আমায় দাও। তোমার সবটা আমায় দাও।”
ঘষা কাচে বৃষ্টি এসে টোকা মারছে। বাইরে গাছেরা মাথা নাড়ছে হাওয়ায়। মেঘ নেমে আসছে শহরের দিকে। নোঈ এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে পড়ল পুশকিনের সঙ্গে। আর এই আবছা মনেও বুঝল, আজ আবার সেই আফটার শেভটা মেখেছে পুশকিন!
.
৩৯. নিশান
আলো-আলো অন্ধকার। অন্ধকার-অন্ধকার আলো। ঝাপসা চৌকো আলো। সরে-সরে যাচ্ছে… মাথার ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছে মেঘলা একটা করিডরের ছাদ। ঠান্ডা! আর কী গরম! অন্ধকার অন্ধকার যন্ত্রণা! অবশ হয়ে যাওয়া দৃষ্টি! কোথায় যাচ্ছে নিশান? কোথায় এখন ও? চোখ বুজে আসছে। মাথা ফাঁকা! শুধু দূর আকাশে যেন চিল উড়ছে একটা। আকাশ-আকাশ আলো। কারা ঝুঁকে পড়ছে সেই আকাশ থেকে? কাদের মুখ এগুলো? ফোঁটা ফোঁটা মুখ। চেনা লাগছে। তাও মনে পড়ছে না। চোখ বুজে আসছে নিশানের। ক্লান্ত লাগছে। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে যেন। ডাকছে, সিঁড়িগুলো ডাকছে নিশানকে। ওকে যেতে হবে। দূরে যেতে হবে। একা। নিশান সিঁড়িতে পা রাখল এবার। আর, কে যেন ডাকল পেছনে! মুখ তুলে দেখল নিশান। মা! মা এসে দাঁড়িয়েছে! অন্ধকারে ছোট্ট আলোর মতো মা! কী বলছ তুমি, মা?
“নিশান আজ তোকে বেরোতেই হবে? এই ঠান্ডায়, এমন বৃষ্টিতে… বেরোতেই হবে?”
নিশান সোয়েটারটা পরে নিল। তারপর আলনার পাশে ঝোলানো রেনকোটটা তুলে নিয়ে গায়ে চাপাল। বলল, “মা, বিজনদা ডেকেছে। সেই সকালে যেতে বলেছিল। কিন্তু যেতে পারিনি। আর, ক’টা বাজে এখন? সবে রাত ন’টা। কিছুই রাত হয়নি।”
মা মুখ ভার করে বলল, “আমার কথা একদিন শুনলে কী হয়! আজ তোর বাবার জন্মদিন। আমি বিরিয়ানি বানিয়েছি। তোর বেরোনো মানে তো মাঝরাতের আগে ঢুকবি না! ততক্ষণে তো ঠান্ডা হয়ে যাবে সব!”
নিশান রেনকোটের চেনটা গলা অবধি টেনে বলল, “মা, তুমি বড্ড ভেবে নাও। আমি তাড়াতাড়ি ফিরব। ডোন্ট ওয়ারি।”
“তা হলে বাড়িতে এলি কেন?” মা রাগের বলায় জিজ্ঞেস করল।
নিশান হাসল। বলল, “আরে, কলকাতায় গিয়েছিলাম পত্রিকার আর্টওয়ার্কটা নিয়ে আসতে। সেটা নিয়ে এই বৃষ্টিতে ঘুরব নাকি? তাই তো রাখতে এলাম। আমি চলে আসব ঠিক সময়ে। ডোন্ট ওয়ারি!” নিশান মায়ের গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে হেসে বারান্দায় এল। সাইকেল আর নেবে না। বড়রাস্তা থেকে একটা রিকশা নিয়ে নেবে। কেন বিজনদা ওকে ডাকল কে জানে!
মা বলল, “মাথাটা ভাল করে ঢাকা দে। পরে আবার ফ্যাঁচফ্যাঁচ করবি!”
রাস্তাটা পিছল বেশ। পাড়ার ভেতরের রাস্তাগুলো কংক্রিট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মাঝে মাঝে কিছু-কিছু জায়গা ভাঙা। জল জমে আছে। নিশান খুব সাবধানে হাঁটতে লাগল।
দূরের লাইটপোস্টের হলুদ আলো কেমন একটা সেপিয়া রং লেপে দিয়েছে সব কিছুর ওপর। ওদের পাড়াটা একটু পুরনো। বাড়িঘরগুলো কেমন বয়স্ক আর থমথমে। এই শীতের বৃষ্টিতে গোটা তল্লাটটাই কেমন কুঁকড়ে রয়েছে যেন।
নিশান সরু রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে বড়রাস্তায় উঠল। এটা স্টেশন রোড। এই আবহাওয়ার জন্য আজ এই রাস্তাটাও ফাঁকা। ও এদিক-ওদিক তাকাল। কিছু নেই। সাধারণত রিকশা থাকেই। কিন্তু আজ নেই। তবে কি হাঁটবে? অনেকটা পথ! আর এখন বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়াও দিচ্ছে! কাছেই গঙ্গা, তাই জলের ওপর থেকে ভেসে আসা হাওয়াটা বেশ ঠান্ডা। হাড় অবধি পৌঁছে যাচ্ছে! নিশানের একটু শীত বেশি। তাই ওর কষ্ট হচ্ছে বেশ। ও হাত দুটো ঘষে মুখের কাছে এনে গরম ভাপ দিল। বিজনদা কী বলবে? হঠাৎ এভাবে ডাকল কেন?
পকেটে আচমকা নড়ে উঠল ফোনটা। এখন আবার কে ফোন করল! এই বৃষ্টিতে কথা বলবে কী করে! নিশান একটা শেডের তলায় সরে গিয়ে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে দেখল নামটা। আরে রাধিয়া! নিশান হাসল নিজের মনে। এই ফোনটা আবহাওয়া নিরপেক্ষ।
“হ্যাঁ রাধি!” নিশান কানে লাগাল ফোনটা।
“বাড়ি পৌঁছে গেছ?” রাধিয়ার গলায় সামান্য উদ্বেগ।
“হ্যাঁ, পৌঁছে আবার বেরিয়ে পড়েছি। কেন?”
“কেন মানে?” রাধিয়ার গলায় রাগ টের পেল নিশান, “বলেছি না বাড়ি ঢুকে আমায় একবার মেসেজ করে দেবে!”
তা ঠিক। আজকেও রাধিয়ার সঙ্গে দেখা করেছিল নিশান। চলে আসার আগে মেয়েটা বলেছিল এই কথাটা!
কলেজ স্ট্রিট থেকে আর্টওয়ার্কটা নিয়ে রবীন্দ্র সরোবর লেকে গিয়েছিল নিশান। রাধিয়া বলেছিল দেখা করতে চায় ও। সেই বড়দিনের পরে আর দেখা হয়নি।
লেকে আজ ভিড় ছিল না। বেশ ফাঁকাই ছিল। পদ্মপুকুরটা পার হয়ে মাথায় ছাউনিওয়ালা একটা সিটে বসেছিল দু’জন! রাধিয়া একদম নিশানের গায়ের সঙ্গে লেগে বসেছিল। নিশানের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে জড়িয়েছিল লতানো গাছের মতো।
রাধিয়ার শরীর থেকে কী অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ যে আসছিল! নিশানের মনে হচ্ছিল সবটাই কেমন যেন অবাস্তব! রাজকুমারী আর রাখালের গল্প! এই মেয়েটা কেন ওকে ভালবাসল? কতদিন ভালবাসতে পারবে? যদি পরে ওকে ছেড়ে চলে যায়, তা হলে নিশান কী করবে?
রাধিয়াকে ও জিজ্ঞেস করেছিল, “বলো, কী বলবে?”
“কিছু না তো!” রাধিয়া সামনে, জলের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল!
“মানে?” নিশান হেসেছিল, “কিছু বলবে না তো ডাকলে কেন?”
“এমনি, ইচ্ছে হল!” রাধিয়া ওর কাঁধে মাথা রেখেছিল, “দেখতে ইচ্ছে করছিল। তোমায় ধরতে ইচ্ছে করছিল।”
“তাই?” নিশান হেসেছিল। আসলে ওর এত ভাল লাগছিল যে, বিশ্বাস হচ্ছিল না রাধিয়ার মতো মেয়ে ওকে ভালবাসে!
“খুব ভাও খাচ্ছ না?” রাধিয়া কুট করে চিমটি কেটেছিল নিশানের হাতে, “মেয়েদের কী মনে হয়!”
“যাঃ” হেসেছিল নিশান, “কিছুই মনে হয় না! কী আবার মনে হবে?”
রাধিয়া সোজা হয়ে বসেছিল, “কিছু মনে হয় না মানে? শভিনিস্ট পিগ নাকি তুমি?”
নিশান সামান্য ঘুরে বসেছিল, “ও এবার বুঝেছি! পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে ডেকেছ! আমি ঝগড়া করতে পারি না!”
“নাঃ, পারে না!” রাধিয়া মুখ বেঁকিয়েছিল সামান্য, “আমাদের কোম্পানির সঙ্গে ঝগড়া করছ না! ওইসব আন্দোলন অ্যান্ড অল।”
“আচ্ছা আচ্ছা!” হাত তুলে দিয়েছিল নিশান।
রাধিয়া বলেছিল, “আমিও পারি! আমার এখন সাহস বেড়ে গিয়েছে। কাউকেই ছাড়ি না উচিত কথা বলতে!”
নিশান চুপ করে ছিল। আসলে ও জানে রাধিয়ার বাড়িতে কী হয়েছে। ঘটনার দিন রাতে রাধিয়াই ওকে ফোন করে জানিয়েছিল সব কিছু। নিশানের মনে এই নিয়ে একটা খারাপ লাগা আছে। আসলে ও বলতে চায়নি ব্যাপারটা। কিন্তু বাধ্য হয়েছিল বলতে। সেদিন রাধিয়া এমন করে ওকে চেপে ধরেছিল যে, ও বাধ্য হয়েছিল। আর শুধু তাই নয়। ওর মনে হয়েছিল, একটা লোক বাড়িতে তার স্ত্রী ও মেয়েকে কিছুতেই ঠকাতে পারে না। তার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন যা খুশি হতেই পারে। ওটা মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দ, কিন্তু সে কখনওই নিজের স্ত্রী বা মেয়েকে ধোঁকা দিতে পারে না। আসলে একটা জিনিস আজকাল খুব দেখতে পায় নিশান। মানুষের মধ্যে লয়ালটি আর ডিভোশন কমে যাচ্ছে। এই সব সোশ্যাল সাইটের জন্যই হোক বা কমিউনিকেশনের বাড়বাড়ন্তর জন্যই হোক, মানুষকে সে অপশন ভেবে ফেলছে! লোকের একটা রিলেশনে টিকছে না বেশিদিন! সারাক্ষণ তাদের ‘কী নেই কী নেই’-টা যেন বেড়ে গেছে। প্রেম ব্যাপারটা চলে গিয়ে কেমন যেন ইগো মাসাজ, লোকের মনোযোগ পাওয়া, এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। সবাই যেন নায়ক হবে, নায়িকা হবে! সবাইকে ঘিরে গ্রহ-তারা ঘুরতে হবে! উল্কাপাত হতে হবে! নিজের ইচ্ছেটাই যেন বড়! অন্যের যে খারাপ লাগছে, কষ্ট হচ্ছে, সে ব্যাপারে কারও কোনও হুঁশ নেই!
সুপ্রতীকের সম্বন্ধে মণীশ খবরটা নিয়ে এসেছিল। প্রথমে বিশ্বাস করেনি নিশান। কিন্তু তারপর মণীশ এমন-এমন ঘনিষ্ঠ ছবি দেখিয়েছে যে, আর কিছু বলতে পারেনি নিশান।
রাধিয়া কথাটা শুনে প্রথমে কেমন যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল! বলেছিল, “কী বলছ তুমি?”
নিশান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিল রাধিয়ার দিকে। তারপর মোবাইল খুলে দেখিয়েছিল ছবিগুলো।
রাধিয়া প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ভাল করে কথাও বলতে পারছিল না। শুধু কোনওমতে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী করে পেলে ছবিগুলো?”
নিশান বলেছিল, “মণীশ। এই দুটো ছেলের একজনের সঙ্গে ভাব জমিয়ে এগুলো নিয়ে এনেছে তার থেকে।”
রাধিয়াকে সেদিন একা ছাড়েনি নিশান। পৌঁছে দিয়ে এসেছিল ওদের বাড়ি অবধি।
“ছবিগুলো কি আছে না ডিলিট করে দিয়েছ!” রাধিয়া জিজ্ঞেস করেছিল দ্বিধার সঙ্গে!
“নেই, দ্যাখো!” নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিয়েছিল নিশান।
রাধিয়া নিয়ে ইতঃস্তত করেছিল সামান্য।
নিশান বলেছিল, “আমার মোবাইলে কিছু নেই। আমার গোপন কিছু নেই রাধি। তুমি দ্যাখো।”
“না থাক, আই বিলিভ ইউ,” রাধিয়া ফেরত দিয়ে দিয়েছিল মোবাইলটা!
নিশান মোবাইলটা খুলে ওকে দেখিয়েছিল। বলেছিল, “আমি চাই তুমি দ্যাখো।”
নিশানকে জড়িয়ে ধরেছিল রাধিয়া। কিছু বলেনি। শুধু জড়িয়ে ধরে রেখেছিল অনেকক্ষণ। তারপর মুখ তুলে বলেছিল, “আমায় ছেড়ে যাবে না তো!”
নিশান পালটা বলেছিল, “তুমি হয়তো চলে যাবে!”
রাধিয়া বড় করে তাকিয়েছিল নিশানের দিকে। তারপর বলেছিল, “গিয়ে দ্যাখো, মেরে ফেলব! সেই পরিটা নেই আর। এখন আমি রক্তমাংসের রাগী, বাজে কথা বলা, পালটা মার দেওয়া মানুষ! মনে থাকে যেন!”
বৃষ্টিটা বাড়ল আরও। গায়ে জলের ছিটে এসে লাগছে।
নিশান বলল, “এই ফোন করব ভাবছিলাম। আসলে খুব দরকারি একটা কাজে বেরিয়েছি! আমি রাতে ফিরে ফোন করি?”
রাধিয়া বলল, “এত তাড়া কীসের? কার কাছে যাচ্ছ যে, এত তাড়া?”
“আরে!” নিশান শব্দ করে হাসল, “কী যে বলো না! বিজনদার কাছে যাচ্ছি। খুব বৃষ্টি পড়ছে। কী এক ডিপ্রেশন হয়েছে কে জানে!”
“ঠিক আছে,” রাধিয়া হাসল সামান্য, “ফিরে রাতে মিস্ড কল দিয়ো। কথা হবে।”
নিশানও হেসে বলল, “এই রাখাল ছেলে ফোনের খরচ চালাতে পারে রাজকুমারী! ফোনই করব!”
“দাঁড়াও কাছে পাই, তারপর দেখছি তোমায়!” রাধিয়া গরগর করল রাগে।
কথা শেষ করে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল নিশান। একটাও রিকশা নেই। তা হলে কি হেঁটেই যাবে! সারা শরীর যদিও রেনকোটে ঢাকা, তাও, হাঁটা বেশ মুশকিল এমন বৃষ্টিতে!
আচমকা একটা গাড়ি শব্দ করে, জল ছিটিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল। সামান্য ঘাবড়ে গেল নিশান! পিছিয়ে এল দু’পা! তারপরেই বড় এসইউভি গাড়িটাকে চিনতে পারল ও। তারক চক্রবর্তীর গাড়ি।
তারক সামনে, ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল। কাচটা নামিয়ে বলল, “কী রে, এখানে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কোথায় যাবি?”
নিশান ইতস্তত করল। এটা কি বলা ঠিক হবে? কিন্তু তারপর ভাবল ও তো কোনও ভুল করছে না। বলবে না-ই বা কেন!
বলল, “বিজনদার কাছে যাব!”
“অ! ভীমরতির কাছে! চলে আয়, নামিয়ে দিয়ে যাব। আমার বাড়ির রাস্তাতেই পড়বে।”
নিশান ভাবল এক মুহূর্ত। যাবে? এই লোকটাকে সহ্য করতে পারে না! কিন্তু এখন উপায়ই-বা কী! নিশান এগিয়ে গিয়ে গাড়ির মাঝের দরজা খুলে উঠে পড়ল।
তারক বলল, “শালা, রেনকোটের জল সব ভাসিয়ে নিল। মোতি, কাল আর গাড়ি ধুতে হবে না বুঝলি!”
মোতি বসেছিল সবার পেছনে! এই কথার জবাবে শুধু হাসল।
গাড়ি চলছে আবার। রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। এত বড় গাড়ি, তাও দুলছে নৌকোর মতো! গাড়ির ভেতরে বেশ সুন্দর একটা গন্ধ। খুব লো ভলিউমে গান বাজছে। গাড়িতে তারক, ড্রাইভার আর মোতি ছাড়া শুধু নিশান বসে রয়েছে।
তারক সামনের দিকে তাকিয়েই বলল, “শালা, তুই আমাদের ব্যাবসা গোটাবি মনে হচ্ছে! তোকে বললাম, ওই সব না করতে। গেল তো একটা পার্টি পালিয়ে! আইকা বলে একটা মেয়ে আসত। শালা জ্বলতি জওয়ানি টাইপ! সেও কাটল! তুই গান্ডু আমার অনেক টাকার লোকসান করালি! মেয়েটাকে যে পটাব, সেটাও হতে দিলি না! আমার সঙ্গে তোর কোন জন্মের শত্রুতা আছে বল তো!” কথাটা শেষ করে হা হা করে হাসল তারক।
নিশান চোয়াল শক্ত করে বসে রইল। মনে মনে বলল, প্রতিটা জন্মের!
ও বৃষ্টি-ঘষা জানলা দিয়ে দেখল গাড়ি মল্লিকবাজার পেরোচ্ছে। এর পরে মজদুর ইউনিয়নের গলি, তারপরে ভাঙা রেললাইন। ব্যস, ওই ভাঙা লাইন ধরে ডান দিকে একটু গেলেই গেলেই ওদের পার্টি অফিসের পাশে বিজনদার আস্তানা।
বিজনদাদের বেশ বড় বাড়ি আছে চ্যাটার্জিপাড়ায়। কিন্তু সব ছেড়ে লোকটা কেন যে এইখানে থাকে!
তারক বলল, “শোন নিশান। দাড়ি রাখলেই কেউ বিপ্লবী হয় না! পেছনে অন্য দম লাগে। লেকে বসে মাগিবাজি করবি, আবার গেটে দাঁড়িয়ে বিপ্লব মারাবি! হয় না! শুনলাম দু’দিন পরে আবার তোদের ওই ঢ্যামনামি আছে! এসব করিস না বাবু। ভাল কথায় বলছি। কাজ হতে দে। তুইও কেকের ভাগ পাবি। প্লাস মালিকের মেয়ের সঙ্গে তো লটঘট শুরুই করেছিস! কেন বেকার উঙ্গলি করছিস! চেপে যা!”
নিশান দেখল আর চুপ করে থাকা যায় না! ও বলল, “আমার পারসোনাল লাইফে আমি কী করছি, সেটা আপনাদের দেখার কথা নয়! আর কেউ গোটা সোনাঝুরিকে নিজের সম্পত্তি বলে বিক্রি করে দেবে, সেটা হয় নাকি? খারাপ কাজ হলে প্রতিবাদ হবে!”
তারক কেমন যেন হঠাৎ চুপ করে গেল। আর বাকি পথটা কিছু বলল না। নিশান বুঝল ওর কথাটা একদম মোক্ষম জায়গায় গিয়ে লেগেছে!
গাড়িটা ওকে নামিয়ে দিল ভাঙা রেললাইনের কাছে। এদিকটা আরও নির্জন। কেমন একটা ছমছমে ভাব আছে। লাইনটা দিয়ে অনেক আগে জুটমিলে কাঁচা মাল নিয়ে আসত গুডস ট্রেন। কিন্তু দীর্ঘদিন আর মালগাড়ি না চলায় ভেঙে গেছে জায়গায় জায়গায়। লাইনের পাশে সরু রাস্তা। সামান্য নোংরা। ঝোপঝাড় পাশ থেকে এসে রাস্তাটাকে আরও সরু করে দিয়েছে।
পার্টি অফিসে ঢোকার সামনে বড় চওড়া রাস্তা আছে। কিন্তু বিজনদার বাড়িটা যেহেতু পার্টি অফিসের পেছন দিকে, তাই এই পথেই যেতে হয়।
রাস্তাটা চেনা নিশানের। তাই অন্ধকার হলেও খুব কিছু অসুবিধে হল না। সামান্য দূরে বিজনদার বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে।
দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল নিশান। একটু সময় নিয়ে বিজনদা দরজা খুলে দিল। নিশান ঘরের সামনের বারান্দায় ঢুকে একপাশে সরে দাঁড়াল। সারা শরীর দিয়ে জল ঝরছে। ও দ্রুত রেনকোটটা খুলে বারান্দার পাশের তারে ঝুলিয়ে দিল। দেখল, বিজনদা কার সঙ্গে যেন কথা বলছে ফোনে। তারই মধ্যে ওকে হাত দিয়ে ঘরে আসতে ইশারা করল বিজনদা।
নিশান ঘরে ঢুকে একটা টুলে বসল। রেনকোট থাকলেও সামান্য জল চুঁইয়ে ঢুকেছে ভেতরে। প্যান্টের নীচ আর কলারের কাছটা ভিজেছে একটু। বিজনদা এসে বসল সামনে চৌকিতে। শুনল ফোনে বলছে, “হ্যাঁ, গলায় মাফলার আছে। পায়ে মোজাও পরেছি। না, না, চোখের ওষুধ ফুরোয়নি, আছে এখনও। আর তেলেভাজা রোজ খাচ্ছি না বাবা! আরে, বিরক্ত হলাম কোথায়! কী বলে! না, না, বিরক্ত হইনি। কী মুশকিল… এমনি মানে… আরে, এত রাগ করো কেন! শরীর এখনও উইক কিন্তু। এভাবে কেউ ফোনে চেঁচায়! মানে… চেঁচায়! মানে কথা বলে! সব উলটো ধরো কেন? আর রাতে রুটি আর ফুলকপির তরকারি করেছি। না, না, তোমায় পাঠাতে হবে না কিছু! মাঝে মাঝেই তো পাঠাও। কী বিপদ! আমি সত্যি বলছি! আর শোনো, নিশান এসেছে। একটু কাজ আছে ওর সঙ্গে। পরে তোমায় আবার কল করব। মানে, হ্যাঁ, তুমিই তো করো, আমি তো বিশেষ কল করি না… ঠিক আছে বাবা, তুমিই কোরো। এখন রাখি। কেমন?”
ছোট্ট ফোনটা কেটে সামনে থাকা বালিশের তলায় রেখে মাথা নাড়ল বিজনদা। হাসল নিজের মনে, “পাগলি!”
“কেয়াদি?” নিশানও হাসল।
“আর কে! এখনও একই রকম আছে! কে বলবে বয়স হয়েছে!” বিজনদা হাসল।
নিশান মাথা নাড়ল নিজের মনে। দেখল, বিজনদার গলায় মাফলার নেই, পায়েও মোজা নেই।
বিজনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সারা জীবন পাগলামি করে গেল। আমায় ভালবাসত। কিন্তু সব ছেড়ে আমায় ওকে নিয়ে নাকি বিদেশে যেতে হবে! সেটা করলাম না বলে রাগে দুম করে অন্যকে বিয়ে করে নিল! নিজের জীবনটা নিয়ে কীসব করল! ও পাগলি, ওকে কেউ বুঝতে পারবে ও ভেবেছিল? সেদিন নার্সিং হোমে ও কাঁদছিল। তোরা তো কেউ ছিলি না। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দেখি কান্না বেড়ে গেল আরও! আমার এত কষ্ট লাগছিল!”
নিশান তাকাল বিজনদার দিকে। তারপর চোখ বুলিয়ে ঘরটাকে দেখল। খুব ছিমছাম ঘর। একটা আলমারি। একটা আলনা। কাঠের একটা চেয়ার-টেবিল আর এই চৌকি। ব্যস।
ও জিজ্ঞেস করল, “এই জন্য তুমি বিয়ে করলে না বিজনদা?”
বিজন হাসল, “আমায় কে বিয়ে করবে! আমার চালচুলো নেই! পার্টি করি সারাক্ষণ। দূর! তবে কী জানিস, কেয়াকে দেখার পরে আর কাউকে ভালও লাগেনি।”
নিশান হেসে বলল, “স্বাভাবিক তো। পাগল আর পাগলি! ভাল হত কিন্তু।”
বিজনদা হাসল। বলল, “তবে রে। আমি তোর জ্যাঠার বয়সি! আমায় দাদা বলিস ঠিক আছে। কিন্তু এসব কী কথা?”
নিশান হেসে বলল, “খুব খারাপ লাগছে কি! তোমরা এই বয়সে কিন্তু কাঁপিয়ে দিচ্ছ! আবার পুরনো দিন আসবে ফিরে।”
বিজনদা এবার হাসল। তবে বিষণ্ণভাবে। বলল, “না রে নিশান, যা যায় তা আর আসে না। আমাদের সেই সময়টা অদ্ভুত ছিল। পরিতোষ, আমি, পেখমদি, কাজুদা। সে এক অন্য সময়।”
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না।
বিজনদা বালিশের ওপর রাখা ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করল একটু। তারপর মাথা নাড়ল, “সব কেমন হয়ে গেল রে! কেমন যেন হয়ে গেল!”
“তুমি আমায় কিছু বলতে?” নিশান জিজ্ঞেস করল, “আসলে বাড়িতে ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি! তাই…”
“তুই চাস সোনাঝুরি আবার আগের মতো হোক? চাস?” বিজনদা ফোনটা রেখে প্রশ্ন করল।
নিশান অবাক হয়ে তাকাল বিজনদার দিকে, “হ্যাঁ চাই। কিন্তু পুঁজিপতিদের…”
“বাজে কথা রাখ! জুট মিলের অবস্থা জানিস? যে-কোনও দিন বন্ধ হয়ে যাবে। জোনাক-বাড়িটা দেখেছিস? কেমন হয়ে গেছে। তুই চাস না এগুলোর সংস্কার হোক? চাস না? কেন ঝামেলা করছিস?” বিজনদা মাথা নাড়ল, “এমন করিস না বাবু। তুই তো বুঝদার ছেলে। কী হয়েছে তোর? কে বলেছে তোকে সব ভেঙে বাড়ি হয়ে যাবে? শোন, সেই কোম্পানিটা আর এই কাজে নেই। ওরা সরে গিয়েছে। রিকো গ্রুপের প্ল্যান এমন নয়। আমি জানি সবটা। ওরা এসেছিল আমার কাছে।”
নিশান বলল, “আর তুমি বিশ্বাস করলে? ওরা যে সবকিছু নেওয়ার পরে অন্য কিছু করবে না সেটা হতে পারে তো!”
“না, হবে না,” বিজনদা বলল, “ওরা একটা অ্যাডভাইসরি বোর্ড তৈরি করবে। আমায় থাকতে বলেছে। আমি বলেছি তোকেও রাখতে। আমরা দেখব ওরা যা প্ল্যান এখন বলছে, সেটাই যেন ইমপ্লিমেন্টেড হয়। ওদের ব্রোশার-লিফলেট সব তৈরি। তুই একটু ব্যাপারটা ভাব। পরে যদি ভুলভাল কিছু করতে যায়, সে না হয় আমরা তখন কাজ করতে দেব না! কিন্তু এভাবে তুই উন্নয়নকে আটকাতে যাস না। মিলটা বড় হবে। জোনাক-বাড়িতে ভাল হোটেল আর পার্ক হবে। সোনাঝুরির অর্থনৈতিক লেভেলটা বাড়বে। তুই একটু ভাব।”
“কিন্তু যদি না হয়?” নিশান ভুরু কুঁচকে বলল।
“এটা তোর যুক্তি তো? আচ্ছা, কয়েকদিন পরে আমি যাব মালিকদের ওখানে। তুইও চল। নিজে দেখে বুঝে নে। কিন্তু গোঁয়ারতুমি করিস না! সব কিছু পালটায় নিশান। আজ ধর ওরা চলে গেল। তারপর যদি সামনের বছর মিল বন্ধ হয়ে যায়, দেখবি আজ তোর কথায় যারা নাচছে, তারাই তখন তোকে গালি দেবে! এটা একবার ভাব। রাজনীতি মানে কিন্তু এখনকার কথা নয় শুধু, ভবিষ্যৎ দেখতে না শিখলে কিছু হবে না।”
নিশান মাথা হেঁট করে বসে রইল।
বিজনদা চৌকি থেকে উঠে এসে ওর পাশে দাঁড়াল, “আমি জানি এতদিন পরে হঠাৎ যদি তুই উলটো কথা বলিস ওরা ভাববে, তোর কোনও ভেস্টেড ইন্টারেস্ট আছে। তাই বলছি ওদের মধ্য থেকেও কেউ-কেউ চলুক। আমি যেটা তোকে বললাম, তুই সেটা বল ওদের। সব খোলাখুলি হোক। আমি কি তারক নাকি যে, টাকা খাব এই জন্য!”
“না না, তা বলিনি বিজনদা!” নিশান বিজনদার হাতটা ধরল।
“শোন তোকে হ্যাঁ-না করতে হবে না, তুই একবার চল আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে যারা আছে তাদেরও কেউ যাক। ব্যাপারটা বোঝ। জেদ করে থাকিস না।”
নিশান উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, “আমি একটু ভাবি বিজনদা। মানে, সত্যি ভাবি। যারা আছে তাদেরও বলি। দেখা যাক তারা কী বলে।”
বিজনদা বলল, “দরকার হলে তাদের আমার কাছে নিয়ে আসবি। কিন্তু এভাবে সব বন্ধ করে দিস না। দরজা-জানলা খোলা রাখবি নিশান। ওটা ইমপর্ট্যান্ট। বুঝলি!”
নিশান হাসল। বিজনদার কথাগুলো খারাপ লাগছে না ওর। কিন্তু এটাও সত্যি যে, ও একার হাতে কিছু করতে পারবে না। দেখা যাক, কী হয়!
বারান্দায় এসে ও রেনকোটটা পরল আবার। তারপর খুব শিগগিরি জানাবে বলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।
বৃষ্টি কমেছে। কিন্তু একেবারে থেমে যায়নি। আবার বড়রাস্তার দিকে হাঁটা দিল নিশান। সাড়ে দশটা বাজে প্রায়। রাস্তায় লোক দেখতে পাচ্ছে না। পাশে ভাঙা রেল লাইনের মাঝে বেশ জল জমে গিয়েছে। ও সরু রাস্তা দিয়ে এগোতে লাগল। মা খুব রাগ করছে নিশ্চয়। বাবাও এসে গেছে এতক্ষণে। হঠাৎ বাবা-মায়ের জন্য খারাপ লাগল নিশানের। সত্যি ও বাড়িতে সময় দেয় না। এটা ঠিক নয়। বিজনদার কথাটা শুনে বুঝল যে, এটা কাল সকালে শুনলেও চলত। আসলে বিজনদার বয়স হয়েছে, তাই হয়তো আজকাল সবকিছুতেই একটা তাড়া লাগায়। বয়স হলে কি মানুষ এমন হয়ে যায়? আচ্ছা, নিশানও কি এমন হয়ে যাবে? রাধিয়া কেমন হবে?
রাধিয়ার কথা মাথায় আসতেই মনটা ভাল হয়ে গেল নিশানের। মেয়েটা সত্যি ভালবাসে ওকে! সত্যি…
“নিশান!” পেছন থেকে কে যেন ডাকল।
নিশান দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে তাকাল পেছনে। চেনা গলা। কে ডাকছে এই অন্ধকারে!
“নিশান!”
লোকটা কাছে আসতে বুঝতে পারল নিশান। আরে বাদল! ও এখন এখানে কী করছে?
“তুই!” নিশান অবাক হল।
“হ্যাঁ রে আমি!”
নিশানের নাক কুঁচকে গেল। বাদলের মুখ থেকে তীব্র মদের গন্ধ বেরোচ্ছে!
“কী বল? কী হয়েছে তোর?” নিশান অবাক হল।
বাদল এসে দাঁড়াল সামনে। আর ঠিক তখনই বৃষ্টিটা জোরে নামল আবার। নিশান আকাশের দিকে তাকাল। নিকষ কালো একটা অন্ধকার কড়াই যেন উলটে আছে মাথার ওপরে!
বাদল জড়ানো গলায় বলল, “আজ তোদের দেখলাম। তোকে আর মালিকের মেয়েকে। হেভি মাল তুলেছিস! ব্যাপক! তা লাগিয়েছিস নাকি এর মধ্যে?”
“কী বলছিস তুই?” নিশান চোয়াল শক্ত করল।
“আমি বললে দোষ হয়ে গেল?” বাদল আর-একটু কাছে এল, “তারকদা বলেছিল, মালটাকে নজরে রাখবি। দেখলাম, শালা লক্কা পায়রা হয়ে আকাশে লাট খাচ্ছে! আর… আর মাঝখান থেকে আমার বোনটাকে… শুয়োরের বাচ্চা…”
“কী বললি? মেঘলাকে আমি কী?” নিশানের মাথায় আগুন লেগে গেল।
“শালা, আমার বোনকে ধরিসনি তুই? চুমু খাসনি? হারামি মাগিবাজ শালা!”
“তবে রে…” নিশান আর মাথার ঠিক রাখতে পারল না। আচমকা এগিয়ে গিয়ে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল বাদলের গালে।
“আমার গায়ে হাত দিলি! আমার বোনকে খেয়ে এখন… শালা, তারকদা ঠিক বলেছে। তোর শালা বাঁচার অধিকার নেই! সব তোর বাপের সম্পত্তি, না? আজ তুই গেছিস!” আচমকা দু’পা পিছিয়ে গেল বাদল। তারপর কোমর থেকে কালোমতো কী একটা বের করল। অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়ায় এবার জিনিসটা দেখতে পেল নিশান। একটা ওয়ান শটার পিস্তল!
“কী করছিস বাদল! ওটা ঢোকা!” নিশান চিৎকার করে উঠল। কিন্তু ভারী বৃষ্টির তলায় চাপা পড়ে গেল ওর গলার আওয়াজ।
“আমার বোন কেঁদেছে! তোর জন্য কেঁদেছে! তারকদা ঠিক বলেছে, দে শালাকে ঠুকে! শালা, আজ তুই গেলি! আজ…”
কথা শেষ করতে পারল না বাদল, আচমকা পেছন থেকে একটা ভারী পায়ের শব্দ এল দ্রুত। বাদল ঘাবড়ে গেল বেশ। ও পেছনে ফেরার আগেই অন্ধকার থেকে কেউ একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপরে! আচমকা ধাক্কায় পড়ে যেতে-যেতে শেষমুহূর্তে বাদল ওয়ান শটারের ট্রিগারটা টিপে দিল।
চাপা, টায়ার ফাটার মতো শব্দ হল একটা। আর কেমন যেন ধাক্কা লাগল নিশানের। ও টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। লোহার রেল লাইনের একটা কোণ ভোঁতা শব্দ করে লাগল মাথার পাশে। নিশানের মনে হল কেউ যেন দু’হাত দিয়ে টেনে ওর মাথা আর শরীরটা আলাদা করে দিতে চাইল! ও চোখ মেলে দেখতে চাইল। কিন্তু পারল না। পেটে কী অসহ্য যন্ত্রণা!
বৃষ্টি নেমে আসছে দ্রুত। সামনে আবছায়ায় কারা যেন ধস্তাধস্তি করছে! যন্ত্রণাটা বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। আর শরীর নিভে আসছে ক্রমশ। অন্ধকার নেমে আসছে… কাছে কীসের যেন শব্দ। কে যেন চিৎকার করল… ধাতুতে ঘষা খেল ধাতু। আর সব কিছু নিভে এল ক্রমশ। শুধু বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়তে লাগল। একাকী বিরামহীন বৃষ্টি।
তারপর আবার চোখ মেলল নিশান। কোথায় ও! কতক্ষণ কেটে গেছে!
আলো-আলো অন্ধকার। অন্ধকার-অন্ধকার আলো। ঝাপসা চৌকো আলো। সরে-সরে যাচ্ছে… মাথার ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছে মেঘলা একটা করিডরের ছাদ। ঠান্ডা। আর কী গরম! অন্ধকার অন্ধকার যন্ত্রণা। অবশ হয়ে যাওয়া দৃষ্টি। কোথায় যাচ্ছে নিশান! কোথায় এখন ও! চোখ বুজে আসছে। মাথা ফাঁকা। শুধু দূর আকাশে যেন চিল উড়ছে একটা। আকাশ-আকাশ আলো। কারা ঝুঁকে পড়ছে সেই আকাশ থেকে? কাদের মুখ এগুলো? ফোঁটা ফোঁটা মুখ। চেনা লাগছে। তাও মনে পড়ছে না। চোখ বুজে আসছে নিশানের। ক্লান্ত লাগছে। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে যেন। ডাকছে, সিঁড়িগুলো ডাকছে নিশানকে। ওকে যেতে হবে। দূরে যেতে হবে। একা। নিশান সিঁড়িতে পা রাখল এবার। আর, কে যেন ডাকল পেছনে! মুখ তুলে দেখল নিশান। মা! মা এসে দাঁড়িয়েছে! অন্ধকারে ছোট্ট আলোর মতো মা! কী বলছ তুমি, মা?
“বাবু, বাবু!” মা ডাকছে? ছোটবেলা থেকে মা ডাকছে ওকে? উঠোনের পেয়ারা গাছের পাশে এসে পড়েছে কত রোদ! আর নিশান ঘুরছে সেই রোদে। ছোট্ট লাল সাইকেল। ও ঘুরছে। আর মা আচারের বয়াম দিচ্ছে রোদে। ওদের ছোট্ট কুকুরটা ঘুরছে সাইকেলের পেছনে। আর মা ডাকছে ওকে। খেতে ডাকছে। দূরে গান বাজছে একটা। কিশোর কুমারের গান। ভগবান নাপিত এসে বসে পড়েছে দাদুর চুল কাটতে। আর বাবা বাজার হাতে ঢুকছে। কোথায় বাবা? তুমি কোথায় ছিলে? আর মা? কই মা? রোদের বয়াম পড়ে আছে। পেয়ারা গাছের পাশে কুচি-কুচি রোদ পড়ে আছে। আর তুমি মা, তুমি কোথায় গেলে? মা… সাইকেল থেকে উঠে পড়ছে নিশান…
আর কারা যেন হাত ধরল ওর। শুইয়ে দিল। আলো-আলো অন্ধকার। মাথার ওপর চৌকো আলোর কাটাকুটি। কোথায় এসেছে ও? এখানে মা আছে? মা… আবার সেই সব কিছু মুড়ে দিল অন্ধকার!
“বাবু, বাবু,” নিশান চোখ খুলল এবার। কে ডাকছে? আলো এসে লাগছে চোখে। কে এসে দাঁড়িয়েছে? চোখ কুঁচকে তাকাল নিশান। আঃ, মাথায় লাগছে। চোখে লাগছে খুব। নিশান চোখ বন্ধ করে নিল আবার।
কে যেন হাত দিল মাথায়। এবার আস্তে-আস্তে চোখ খুলল নিশান। সকালের রোদ এসে পড়ছে ঘরে। মানুষের মাথার ধূসর সোনালি আউট লাইন দেখা যাচ্ছে। এবার ভাল করে দেখল। ও নার্সিং হোমে। মা দাঁড়িয়ে আছে মাথার কাছে। বাবাও আছে পাশে। আর… আর ওই তো বিজনদা, কেয়াদি। আরে মণীশ, নোঈও এসেছে! পাশে কে? সেই অদ্ভুত চুলের স্মরণ না? আর সেই লম্বা ছেলেটা! সেও! সে কী করে এখানে এল! কী যেন নাম! কোথায় যেন দেখেছিল… সেই… সেই রেস্তরাঁ! মাহির!
আর ও… ও কোথায়? নিশান মুখ ঘোরাল। আর দেখল মায়ের পেছনে চেয়ারে বসে রয়েছে রাধিয়া। চুল অবিন্যস্ত। চোখ লাল।
নিশান হাসার চেষ্টা করল। পারল না। মাথায় লাগছে! পেটেও কী ব্যথা! যন্ত্রণা! ঘুম আসছে ওর। ক্লান্ত লাগছে। ও মাথা ঘোরাল। দেখল বাবা গিয়ে মাথায় হাত দিয়েছে রাধিয়ার! মা ধরে আছে রাধিয়ার একটা হাত! এসব কার জীবন? কার সংসার? ওর? এরা ওর লোক! চোখ বুজে আসছে নিশানের। মাথা নিভে আসছে আবার। কিন্তু অদ্ভুত একটা আনন্দ হচ্ছে ওর। এসব কি সত্যি? ওরা কি সত্যি এসেছে? নাকি স্বপ্ন দেখছে! নিশান আবার চোখ খোলার চেষ্টা করল। কী আলো! ব্যথা লাগছে চোখে! বাবা? বাবা কই! এই তো ছিল রাধিয়ার পাশে! কিন্তু এখন? এখন কই? তবে কি স্বপ্ন দেখছে নিশান! ভাল একটা পৃথিবীর স্বপ্ন! সবাই মিলে বেঁচে থাকার পৃথিবীর একটা স্বপ্ন!
নিশান চোখ বন্ধ করে মাথাটা পাশ ফেরাল আবার। তারপর ঘুমের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল অনেক দূরের একটা উঠোনে। দেখল, পেয়ারা গাছের পাশে রোদ এসে পড়েছে আবার। আবার মা আচারের বয়াম রাখছে রোদে। বাবা এই বাজার নিয়ে ঢুকল। আর ভীষণ ট্যারা ভগবান নাপিত দাদুর চুল কাটছে বসে। ঘুমের মধ্যে সামান্য হাসল নিশান। তারপর এগিয়ে গেল মায়ের কাছে।
মা ঘুমন্ত নিশানের দিকে তাকিয়ে আলতো গলায় সবাইকে বলল, “তোমরা চলো এখন। ও ঘুমোক। রাধিয়া, তুমি এখানে থাকো শুধু। কেমন?”
Chapter - 40
৪০. পুশকিন
অন্য কোনও নদীর পাশে দাঁড়িয়ে ওঠে ঘুম
গাছের পাতায় শেষ হল প্রায় বাদামি মরসুম
কাঁধের ঝোলা, রুপোর লকেট, ফেরত আসা খাম
শূন্য আমার বুকপকেটে তোমাকে রাখলাম
তুমিও রেখো আমার তারা, নৌকোবেলার ছই
এই জন্মের অনেক আগেই আমরা কিছু হই
ভাবতে আমার ভালই লাগে! ভাবতে জীবন শেষ…
তোমার থেকে দূরের বলেই, দিন যেন দরবেশ
ভিক্ষে আমার রাজার মোহর, অন্ন সোনার ক্ষীর!
আমার হয়ে তোমার কাছে থাকুক জোনাকি…
গাড়ির সামনে বসে স্মরণ গোটা লেখাটা সময় ধরে বলে গেল।
বিকেল নামছে এখন। বাইপাসে গাড়িরা হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিনের ডিপ্রেশনের পরে, আকাশ ভরে রোদ উঠেছে কলকাতায়। ঠান্ডাটাও পড়েছে তার সঙ্গে। নতুন বছরের উৎসবের আমেজ শহরের চোখে-মুখে লেগে রয়েছে এখনও! আর, এই সময়ে ওকে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে! পুশকিনের হাসি পেল। জীবন এক অদ্ভুত জার্নি! যখনই ওর মনে হয়েছে যে, গন্তব্য পেয়ে গিয়েছে তখনই জীবন এক মোচড়ে সব উলটে-পালটে দিয়েছে। আবার এমন জায়গায় এনে ফেলেছে যেখান থেকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছে ওকে।
আজ সন্ধের ফ্লাইটে দিল্লি যাচ্ছে পুশকিন। তারপর সেখান থেকে কাল বুদাপেস্ট। হাঙ্গেরির এক অদ্ভুত সুন্দর শহর। সেখানে দু’বছরের জন্য চলে যেতে হচ্ছে পুশকিনকে।
স্মরণ পেছন ফিরে বলল, “ডায়েরিটার সব লেখা আর পড়ার মতো নেই। কিন্তু চার-পাঁচটা পাতা যা পড়া যাচ্ছে, তার মধ্যে এটা আমার বেশ লেগেছে। তাই না রে নোঈ?”
পুশকিন কিছু না বলে হাসল। দেখল পাশে বসা নোঈর মুখ থমথমে। স্মরণের কথাটা যেন শুনলই না!
স্মরণ বুঝল, ওর এখন কথা বলা বিশেষ ঠিক হবে না। ও সামনে ঘুরে নিজের মনে শুধু বলল, “যাঃ শালা! সব মেয়েই কেমন প্যাঁওয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে!” তারপর কোলে রাখা ব্যাগ থেকে একটা ইয়ারফোন বের করে মোবাইলের সঙ্গে লাগিয়ে কানে গুঁজে নিল।
পুশকিন আলতো করে নোঈর হাতটা ধরল এবার। নোঈ তাকাল মুখ তুলে। ফরসা মুখটা গোলাপি হয়ে আছে। চোখ দুটো বেশ লাল।
পুশকিন আলতো গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এমন মুখ করে আছ কেন?”
নোঈ কিছু না বলে তাকিয়েই রইল।
পুশকিন হাসল, “কী পাগলি দ্যাখো! এমন কেউ করে? কিছু তো বলো! সেই বাড়ি থেকে বেরোনোর পর একটাও কথা বলোনি! কী হয়েছে?”
নোঈ মাথা নামিয়ে নিয়ে বলল, “আমি কী আর বলব! আপনি তো ছেড়েই চলে যাচ্ছেন! দু’বছরের জন্য। তা হলে? আর কিছু কি বলার থাকতে পারে? আমি জানি লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ টেকে না। আমার তাই কিছু বলার নেই।”
পুশকিন হাসল।
“আপনি হাসছেন?” নোঈ আহত চোখে তাকাল ওর দিকে, “আপনার কাছে হয়তো সহজ এটা, কিন্তু আমার কাছে মোটেও সহজ নয়।”
পুশকিন নোঈর হাতে অল্প চাপ দিল। তারপর বলল, “দেখাই যাক না কী হয়।”
নোঈ চোয়াল শক্ত করে বলল, “কী দেখার আছে এর মধ্যে! আপনি চলে গেছেন আমাকে ছেড়ে। এন্ড অফ স্টোরি।”
পুশকিন মাথা নামিয়ে নিল। নোঈকে কী বলবে ও? আর তো বলার কিছু বাকি নেই। সব তো জানা-বোঝা হয়ে গেছে।
“আর শুনুন,” নোঈ আবার ডাকল।
পুশকিন মুখ তুলে তাকাল আবার।
“ওই ব্যাপারে আপনার কোনও দোষ নেই। ছিলও না। আর নেইও! শুধু-শুধু নিজেকে আর টরমেন্ট করবেন না!”
পুশকিন হাসল। স্মিতার ব্যাপারে ওর দোষ ছিল কি ছিল না, সেটা নিয়ে আজও ওর সংশয় আছে। এটা কাউকে বলেনি আজ পর্যন্ত। কিন্তু নোঈকে বলেছে! নোঈকে সব কিছু বলতে পারে ও!
বাড়ির অমতে স্মিতাকে বিয়ে করেছিল পুশকিন। বাড়ি থেকে একরকম বের করেই দেওয়া হয়েছিল ওকে। তবে তাতে কষ্ট পেলেও ভেঙে পড়েনি পুশকিন। মা মারা যাওয়ার কিছু সময় পরে চাকরি নিয়ে প্যারিস চলে গিয়েছিল ও। স্মিতার সঙ্গে কী ভাল কেটে ছিল প্রথম দুটো বছর। তারপর কাজের চাপ বাড়তে লাগল। স্মিতার সঙ্গে সময় কাটানোটা কমতে লাগল একটু-একটু করে। আর জীবনের ঠিক এই জায়গায় স্মিতার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল তমালের।
স্মিতা যে ওর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছে, সেটা কিছুদিন পরে বুঝতে পেরেছিল পুশকিন। ফোন সারাক্ষণ কানে। সব সময় অন্যমনস্ক। কাছে আসতে চাইছে না। খিটখিট করছে।
পুশকিন তাই সোজা একদিন ধরেছিল ওকে। জিজ্ঞেস করেছিল, কী এমন হয়েছে যে স্মিতা এমন করছে? কিন্তু উত্তর পায়নি। কথা কাটিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল স্মিতা। বলেছিল না, কিছুই হয়নি। সবই ঠিক আছে।
মিথ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, বেশিদিন চাপা থাকে না। এটাও থাকেনি। এক শুক্রবার অফিস ফেরার পথে তমাল আর স্মিতাকে একটা রোড সাইড ক্যাফেতে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল পুশকিন। সারা পৃথিবী ভুলে দু’জন দু’জনকে আঁকড়ে ধরে চুমু খাচ্ছিল!
পুশকিন নড়তে পারেনি। বিশ্বাস করতে পারেনি। এটা কী দেখছে ও চোখের সামনে? এটা সত্যি স্মিতা তো? আর তমাল এখানে কী করছে! স্মিতাই বিয়ের আগে ওকে তমালের ছবি দেখিয়েছিল। তাই তমালকে চিনতে ওর অসুবিধে হয়নি।
পুশকিন কী করবে বুঝতে পারছিল না। বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল ওদের সামনে। স্মিতা চুম্বনের আবেশে প্রথমে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। তারপর পুশকিনকে চিনতে পেরে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল। তমালও উঠে দাঁড়িয়েছিল স্মিতার পাশ থেকে। তারপর আর একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ওখান থেকে।
স্মিতা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। থরথর করে কাঁপছিল শুধু। মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছিল। ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে আর কিছুই বলতে পারছিল না।
পুশকিন শুধু বলেছিল, “তোমায় এই অবস্থায় রেখে ও দৌড়ে চলে গেল! পালিয়ে গেল!”
পরের দু’সপ্তাহ কী করে কেটেছিল, সেটা আর স্পষ্ট মনেও নেই পুশকিনের। সব কেমন ঘষা কাচ দিয়ে ঢাকা যেন। পুশকিন অফিস যায়নি। কারও ফোন ধরেনি। কিছু করেনি। শুধু নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখে মদ খেয়ে গেছিল। সারা জীবন যে-মানুষটা মাত্র দুই বা তিনবার মদ ছুঁয়েছিল, সে ওই দু’সপ্তাহের গোটাটাই ডুবেছিল অ্যালকোহলে। স্মিতা কিছু বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শোনেনি পুশকিন, কিচ্ছু শোনেনি।
ও তো সরেই গেছিল। সামনেও তো যায়নি। তা হলে কেন ওকে জোর করে নিজের জীবনে নিয়ে এসেছিল স্মিতা! ও স্মিতার জন্য সব ছেড়েছে। কারও কথার কোনও গুরুত্ব দেয়নি। সেখানে স্মিতা এটা করতে পারল? এই কি প্রেম? এই ভালবাসা? মানুষ কেন অন্যের ইমোশন নিয়ে, জীবন নিয়ে খেলে? কী পায় খেলে? বাবা মায়েরা কি এদের ছোটবেলায় পুতুল কিনে দেয়নি, খেলনা কিনে দেয়নি যে, বড় হয়ে মানুষকে নিয়ে খেলে সেই অভাব পূর্ণ করতে হবে?
কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল পুশকিন। যেন কুয়াশার কোনও শহরে চলে গিয়েছিল। আর তেমনই একটা আবছা রাতে আচমকা কী যেন পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়েছিল ও। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি। মাথা টলছিল। কিছু স্পষ্ট হচ্ছিল না পুশকিনের কাছে। মনে হয়েছিল সত্যি কিছু শুনেছিল কি? মনের ভুল নয় তো? তাই সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল আবার।
তারপর অনেক রাতে ঘুম ভেঙেছিল। নেশা কাটলেও টলমল করছিল মাথা। মনে হচ্ছিল নৌকোয় ভেসে আছে যেন। ও কোনওরকমে ঘর থেকে বেরিয়েছিল বাথরুম যাবে বলে। আর তখনই দেখেছিল ব্যাপারটা।
দেখেছিল, রান্নাঘরের সামনে পড়ে আছে স্মিতা। মুখ-চোখ নীল! স্থির! এটা কী হল? ও প্রায় দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছিল স্মিতার সামনে। স্মিতার ঠোঁটে পাঁউরুটির গুঁড়ো লেগে ছিল। পাশে পড়েছিল আধখাওয়া একটা রুটি।
কী হয়েছে বুঝতে পারছিল না পুশকিন। ও দ্রুত মোবাইল নিয়ে ওয়ান ওয়ান টু নম্বরে ডায়াল করেছিল। মেডিক্যাল সার্ভিস চেয়েছিল। আর, কী করবে বুঝতে পারছিল না। সাধ্যমতো স্মিতার গলার কাছে, হাতে, পালস পাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পাচ্ছিল না। কেমন একটা লাগছিল পুশকিনের। কী হল এটা? ও এদিক-ওদিক দেখছিল। কী খেল স্মিতা? কী করে হল এমন? আর তখনই চোখ পড়েছিল একটা আধখোলা কৌটোয়। গায়ে কোনও লেবেল নেই। ও দ্রুত ভেতরের আঠালো জিনিসটা আঙুলে তুলে মুখে দিয়েছিল। পি নাট বাটার। পাশেই আর-একটা প্যাকেট খোলা ছিল। প্রন চিপ্স। আরে, বাদাম আর চিংড়িতে তো স্মিতার ভয়ংকর অ্যালার্জি! ও এ দুটো খেয়েছে কেন? ও তো জানত এটা খেলে খুব শরীর খারাপ করে! তা হলে? লেবেল ছিল না বলে বুঝতে পারেনি! স্মিতার অ্যালার্জি হলে শরীরের ভেতরে হয়! বাইরে বিশেষ লক্ষণ দেখা যায় না! আর এই ব্যাপারটা যে মারাত্মক, সেটা তো ডাক্তার বলে দিয়েছিল বারবার!
ইমার্জেন্সি মেডিকাল সার্ভিসের লোকজন এসেছিল। ওরা বের করে নিয়ে যাচ্ছিল স্মিতাকে। পুশকিন কী করবে বুঝতে পারছিল না! ওকে ওরা প্রশ্ন করছিল নানারকম। কী হয়েছে? কী করে হয়েছে? সব জানতে চাইছিল। কিন্তু স্পষ্ট করে উত্তর দিতে পারছিল না পুশকিন। ওরাও বুঝতে পারছিল যে, ও সুস্থ নেই!
অ্যাম্বুলেন্সে বসে স্মিতার দিকে তাকিয়েছিল পুশকিন। নিথর দেহ! ওরা নানারকমভাবে চেষ্টা করছিল। কিন্তু স্মিতার সাড় ছিল না কোনও। হাতটা কেমন ঠান্ডা। মুখটা নীলচে। পুশকিনের চোখ ঝাপসা হয়ে গেছিল। কী করল এটা স্মিতা! ও কি বুঝতে পারেনি? ও কি নিজেও মানসিক চাপে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল? পুশকিন কি দায়ী এর জন্য? সেই শব্দটা তা হলে সত্যি শুনেছিল! সেটা তা হলে স্মিতার পড়ে যাওয়ার শব্দ ছিল! স্মিতা তো ওর ঘরে আসত না। কিন্তু ওই অবস্থায় একবারও কি ওকে বলতে পারত না যে, শরীর খারাপ লাগছে! কেন এমন করল স্মিতা? কীসের জন্য এমনটা হল? পুশকিন কেন শব্দটা শুনে বেরিয়ে গেল না একবার?
পুশকিন গাড়ির মেঝের মধ্যে বসে স্মিতার হাতে মুখ গুঁজে দিয়েছিল। দু’সপ্তাহের জমে থাকা কান্না যেন সব বেরিয়ে আসছিল হু হু করে। নিজেকে আটকাতে পারছিল না পুশকিন। গাড়িতে থাকা প্যারামেডিকরা ওকে জাপটে ধরে সরিয়ে নিতে চাইছিল। কিন্তু পুশকিন কিছুতেই ছাড়ছিল না স্মিতার হাত। মনের মধ্যে ভেসে আসছিল সেই প্রথম দিন বেঞ্চে বসে থাকা স্মিতা! একসঙ্গে বাড়ি ফেরা স্মিতা! সেই ভারী বৃষ্টির মধ্যে গাড়ির মধ্যে ওর পাশে বসে থাকা স্মিতা! যার জন্য সব ছাড়ল, সে যদি এমন করে চলে যায় তা হলে আর কী থাকে মানুষের? নিজেকে শূন্য, একাকী আর ভাঙা মনে হচ্ছিল ওর।
স্মিতা যে মারা গেছে, সেটা মেনে নিতে অনেকদিন লেগেছিল পুশকিনের! চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছিল। কারও সঙ্গে মিশত না। কথা বলত না। যোগাযোগ রাখত না। কেমন একটা একলা মানুষ হয়ে গিয়েছিল ও। শুধু মনে হত, ওর জন্যই কি মারা গেল স্মিতা! ও-ই কি মেরে ফেলল মেয়েটাকে? যে ওর সঙ্গে থেকে খুশি নয়, তাকে তো ছেড়ে দেওয়াই ভাল। কিন্তু ও অমন ব্যবহার করেছিল বলেই কি স্মিতা মেনে নিতে পারেনি? কিছু বুঝত না পুশকিন। মাথা পুরো সাদা হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে মনে হত মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে একা।
পাক্কা এক বছর এমন একলা হয়ে ছিল পুশকিন। তারপর ধীরে-ধীরে নিজেকে সামলেছিল। নিজের দিকে তাকিয়েছিল। কাজ খুঁজে, ইন্টারভিউ দিয়ে আবার চাকরি পেয়েছিল একটা। বিদেশের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে এসেছিল। আবার নতুন করে জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিল।
বাবা আর ভাইও ক্রমে ওকে নিজেদের জীবনে মেনে নিতে, ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। ছেড়ে যাওয়া, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সংসারের লোকজন আবার কাছে আসতে শুরু করেছিল। ধীরে হলেও সময় কাটছিল। আর তারপর গতবছর ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা থেকে এসেছিল ওর ভাই। দীনবন্ধু। তার মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা হয়েছিল। বাবা জোর করেই পুশকিনকে পাঠিয়েছিল ডিনোর সঙ্গে। পুশকিনের ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু, তাও গেছিল ও। ভেবেছিল, অনেক নিজের ইচ্ছেয় চলা হয়েছে। আর নয়। ওর মনে হয়েছিল এবার অন্যদের কথাও কিছু শোনা উচিত।
তবে বাবার কথা শোনাটা খারাপ কিছু হয়নি। ডিনোর জন্য পাত্রী দেখতে গিয়ে থমকে গিয়েছিল পুশকিন। নোঈ এসে বসেছিল ওদের সামনে। গম্ভীর মুখ। মাথা নিচু। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এভাবে এসে বসতে হচ্ছে বলে মোটেও খুশি নয়।
ডিনো কথা বলতে শুরু করাতে মুখ তুলে তাকিয়েছিল মেয়েটা। আর পুশকিন দেখেছিল কী বিশাল চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল জীবন!
পুশকিনের একটা অদ্ভুত ভাললাগা আসছিল হঠাৎ! এতদিন পরে আবার সব কিছু ভাল লাগছিল ওর। কেন কে জানে মনে হচ্ছিল জীবনের আসলে মানে আছে এখনও। এখনও কিছু ফুরিয়ে যায়নি। নতুন করে সত্যি যে শুরু করা যেতে পারে সেটা নিজের কাছে ক্রমশ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছিল।
কিন্তু পাশাপাশি নিজেকে আটকাচ্ছিলও পুশকিন। কীসের জন্য এরকম মনে হচ্ছে, এই কারণটা কিছুতেই মনের মধ্যে আসতে দিতে চাইছিল না। কিন্তু আমাদের মন বড্ড একরোখা। গোঁয়ার। কিছুতেই সে লুকোনো জিনিসকে লুকিয়ে থাকতে দেয় না। ঘাড় ধরে বের করে আনে। তাই আইকা যেদিন রবীন্দ্র সদন মেট্রোর সামনে ওর সঙ্গে আবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল নোঈর, সেদিনই পুশকিন বুঝেছিল জল বিপদসীমা পার করেছে!
কিন্তু ইচ্ছেই কি সব? আমাদের চাওয়াগুলোই কি সব? ওর জীবনের সঙ্গে এভাবে মিশলে নোঈর কোনও ক্ষতি হবে না তো! আর জয় বলে ছেলেটি ওর চেয়ে কমবয়সি। তাকে একসময় খুব ভালবাসত নোঈ। সে যদি আবার তমালের মতো ফিরে আসে? আবার ওকে যদি দেখতে হয় সেই ক্যাফের মতো দৃশ্য? তা হলে? ভয় হয় পুশকিনের। কষ্ট পেতে এখন বড় ভয় করে। তার চেয়ে একাই তো ভাল। নোঈ যদি ওকে কষ্ট দেয় সেটা আর ও নিতে পারবে না।
“আমি জানি আপনি আমায় খারাপ মেয়ে ভাবেন!” নোঈ গম্ভীরভাবে বলল।
পুশকিন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সামান্য। নোঈর কথায় ওর দিকে তাকাল।
নোঈ আবারও বলল, “আপনার মনে হয় যে, আমি জয়কে ভালবাসতাম সে এখন কী করে আপনাকে… কিন্তু মানুষ তো ভুল করে! আমি জানি স্মিতার ব্যাপারের পর আপনার পক্ষে কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু পুশকিনদা, আমায় ভরসা করা যেত। এভাবে না চলে গেলেও পারতেন।”
পুশকিন হাসল, “আমি কি নিজের ইচ্ছেয় চলে যাচ্ছি? আমার তো কাজ। বস বললেন তাই… আর তো কোনও কারণ নেই!”
“মিথ্যে কথা! এখানে এত কাজ এখন। আপনি একবার বললে বস আপনাকে বারণ করতেন? আপনি ইচ্ছে করে… সেদিন দুপুরে আমি নিজে থেকে আপনার কাছে এলাম বলে আপনি এমন করে চলে গেলেন!”
“না নোঈ! কী বলছ!” পুশকিন নোঈর হাতে হাত রাখল।
নোঈ হাতটা সরিয়ে নিল। রাগের গলায় বলল, “সোনাঝুরির এত কাজ কে সামলাবে এখন?”
“কেন? তুমি আছ, স্মরণ আছে। আর মেনলি তো কাগজপত্র। সেটা তো আমাদের ল ডিপার্টমেন্ট সামলে নেবে। তারপর প্রজেক্টের লোকজন চলে আসবে দিল্লি থেকে! এত টেনশন করছ কেন! প্লাস আমি তো আছি। স্কাইপ আছে। ডোন্ট ওয়ারি।”
“না আপনি নেই! আমায় ছেড়ে চলে গেছেন আপনি!” নোঈর গলায় অভিমান।
পুশকিন বলল, “ওরকম বলে না। কিছু হয়নি তেমন। আর তোমরা ঠিক পারবে। শুধু বিজনকাকুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। ওদের নিয়ে যে বোর্ডটা তৈরি হয়েছে সেটার সঙ্গে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়।”
নোঈ মাথা নাড়ল, “আচ্ছা। বিজনবাবুর সঙ্গে আমি ঠিক যোগাযোগ রাখব। তবে আপনি নেই শুনলে খুব কষ্ট পাবেন। আপনার কথাতেই কিন্তু উনি গিয়েছিলেন দীপমালাদেবীর কাছে।”
কথাটা সত্যি। বিজনকে পুশকিন বুঝিয়েছিল যে, ওদের গ্রুপের কাজ শুধু ব্যাবসা করা নয়। পাবলিক ওয়েলফেয়ারও এদের একটা লক্ষ্য। বিজন ঠান্ডা মাথার মানুষ। সব শুনে রাজি হয়েছিলেন যেতে।
তবে নিজেরই যেন দ্বিধা ছিল। বলেছিলেন, “পরি বলল বটে, কিন্তু পেখমদি আমার কথা শুনবে?”
দীপমালাদেবীর সময় পেতে একটু অসুবিধে হয়েছিল। তাঁর সেক্রেটারি কিছুতেই সময় দিতে চাইছিল না। বলছিল, উনি আসছেন না। কী নাকি ব্যক্তিগত কাজে আটকে আছেন। কিন্তু পুশকিন অনেক বলে-কয়ে আধঘণ্টা মতো সময় বের করেছিল।
বিজন শেষমুহূর্তে একটু দোনোমনা করছিলেন। যাওয়ার দু’দিন আগে এক সকালে ফোনে বলেছিলেন, ওঁর খুব কাছের একটি ছেলের গুলি লেগেছে। ওঁর বাড়ির কাছেই। নিশান নাম। খবরটা শুনে চমকে গিয়েছিল পুশকিন। আরে, এ তো নোঈর কাজ়িন! ও সঙ্গে-সঙ্গে ফোন করেছিল নোঈকে। নোঈ বলেছিল, ও নাকি নার্সিং হোমেই আছে।
তবে নিশানের তেমন কিছু হয়নি। পেট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে গুলি। আর পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেছে। বাদল নামে ওরই এক বন্ধু নাকি গুলিটা করেছিল। ছেলেটা ধরা পড়েছে।
নোঈ সেদিন রাতে ফোন করেছিল ওকে। বলেছিল, “ওদের পার্টির মধ্যের গোলমাল। সবাই সন্দেহ করছে, তারক চক্রবর্তী এই কাণ্ডটা করিয়েছে। কিন্তু বাদল বলে যে ধরা পড়েছে, সে কিছু বলছে না! আর জানেন পুশকিনদা, কে বাঁচিয়েছে নিশানদাকে? মাহির। সেই লম্বা-চওড়া ছেলেটি। যে এসেছিল আমাদের কাছে। ও নাকি বিজনদার যাতে ক্ষতি না হয়, সেটা দেখার জন্য ওখানে ছিল। রিতুদা ওকে পাঠিয়েছিল। ভাবুন! কাকে বাঁচাতে গিয়ে কাকে বাঁচাল! আমার তো হাত-পা কাঁপছে এখনও! বাদল নাকি নিশানদার পুরনো বন্ধু। এই বন্ধু!”
বিজনকে পরের দিন ফোন করেছিল পুশকিন। আর অন্যদিকের কোনও কথা শোনার আগেই নিজে বলেছিল, “কাকু, যারা এমনটা করল, আপনি চান তারা আবার কোনও পার্টিকে ঢুকিয়ে দিক? দীপমালাদেবীর সঙ্গে আপনার দেখা হওয়া খুব দরকার। ওঁকে আপনি একটু বলুন। আমি ওঁর সময় নিয়ে নিয়েছি।”
কাঠের ঘর বলেই বোধহয় এই শীতেও গরম ছিল ঘরটা। স্মরণ আর নোঈকে ভেতরে নিয়ে যায়নি পুশকিন। বিজন আর ও শুধু গিয়েছিল।
বিকেল নামছিল তখন কলকাতায়। কাচের জানলা দিয়ে মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টি দেখা যাচ্ছিল। ডিপ্রেশন কাটছিল না কিছুতেই। ঘরে আলো জ্বলছিল। আর তাতে এই বয়সেও দীপমালাদেবীকে মোমের মূর্তির মতো লাগছিল ঠিক। এখনও কী করে কেউ এত সুন্দর থাকে! সোনালি রিমলেস চশমা আর কাঁচায়-পাকায় ঢেউ খেলানো চুল। দেখলেই কেমন একটা দম আটকে আসে! মনে হয় এঁর সামনে কথা বলবে কী করে!
ওরা কাছে গিয়ে দাঁড়াতে, দীপমালাদেবী হাত দিয়ে ওদের বসতে বলেছিলেন।
বড় মেহগনি কাঠের টেবিল। দুটো নরম গেস্ট চেয়ার। ঘরে আসবাব খুব কম। টেবলেও একটা ইন্টারকম আর দুটো পেন ছাড়া ঠাকুরের ফোটো ছিল মাত্র। সবেতেই কেমন একটা পরিমিতির ছাপ। কেমন একটা নির্জনতা।
ওরা বসার পরে, পুশকিনের দিকে তাকিয়ে দীপমালাদেবী বলেছিলেন, “আপনি এখনও হাল ছাড়েননি। আমি তো বলেছি, মিলটা নিন। পাশের জমিও নিন। কিন্তু ওই বাড়ি পরিত্যক্ত হলেও আমি এখন দেব না। আমার উত্তর না পেলে আমি দেব না।”
পুশকিন হেসেছিল। তারপর বলেছিল, “সেই জন্যই আমি এসেছি ম্যাম। উনি…”
কিন্তু পুশকিনকে হাত দিয়ে থামিয়েছিলেন বিজন। তারপর সোজা তাকিয়েছিলেন দীপমালাদেবীর দিকে। বলেছিলেন, “আমায় একটুও চিনতে পারলে না পেখমদি? আমি সত্যি এত বুড়ো আর দূরের হয়ে গিয়েছি!”
দীপমালাদেবী থমকে গিয়েছিলেন একদম। সোজা হয়ে বসে তাকিয়েছিলেন সামনে। মুখটা কেমন যেন লাল হয়ে গিয়েছিল আচমকা! চোখের দৃষ্টি পালটে গিয়েছিল নিমেষে! এই বয়স্ক মানুষটাকে ছিঁড়ে কবেকার পুরনো দীপমালা বেরিয়ে আসতে চাইছিল যেন!
বিজন বলেছিলেন, “শুধু কি তোমরা দু’জনই জানতে? আমি কি একটুও কিছু জানতাম না পেখমদি!”
দীপমালাদেবী যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছিলেন। পলক পড়ছিল না চোখের। শুধু অস্ফুটে বলেছিলেন, “বিজন! বিজু!”
বিজন বলেছিলেন, “কাজুদা চলে যাওয়ার পর তুমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে। কিন্তু আমি কী করেছিলাম পেখমদি? আমার কী অন্যায় ছিল? আমি তো কিছু করিনি! আমি তো তোমার সঙ্গে কতবার যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম। দাদুর দোকানে গেলাম। তোমাদের বাড়ি সামনে গেলাম। একবারও তুমি আমায় ডাকলে না। কথা বললে না। আমি তো দেখেছিলাম, সেই মেঘলা রাতে কী হয়েছিল। আমি তো ফিরে-ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমি নিরুপায় হয়ে দেখেছিলাম সবটা। আর আমার পাশে বসে সবটা দেখেছিল আর-একজন। ঝিকুদা।”
দীপমালাদেবী কথা বলতে পারছিলেন না। থরথর করে কাঁপছিলেন।
বিজন উঠে গিয়ে দীপমালাদেবীর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে হাতটা ধরেছিলেন। বলেছিলেন, “তুমি আমার কথাও শুনতে চাওনি। জানতে ইচ্ছে করেনি, কী হল মানুষটার? তোমায় মানুষটা তো ভালবাসত খুব পেখমদি!”
“ইচ্ছে করেছিল তো রে বিজন। কিন্তু মা, কাকিমা, ছোটকা… আমায় কীভাবে ঘরে আটকে রেখেছিল সেটা জানিস না। ওরা বলল কাজুদা বোমা মেরেছে। দু’জন মারা গেছে বোমায়। কাজুদা বোমা মারবে? এটা হয়?”
পুশকিন দেখেছিল দীপমালাদেবী কাঁদছেন! যেন ভুলেই গিয়েছিলেন পুশকিন বসে রয়েছে সামনে!
বিজন বলেছিলেন, “যাদবকাকা বিক্রি হয়ে গিয়েছিল পেখমদি। আমি তো আর জানতাম না! আমি তাই বলে দিয়েছিলাম, কোথায় আছে কাজুদা। বদমাশটা বলে দিয়েছিল ওদের। আর ওরা… আমার মনে কেমন একটা কুডাক দিয়েছিল জানো! তাই ফিরে গিয়েছিলাম। আর দেখেছিলাম… আমি দৌড়ে যেতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ঝিকুদা যেতে দেয়নি। শুধু বলেছিল, আমাকেও বিলকিস করে দেবে। আমি আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই… আজও!” মাথা নিচু বিজনের চোখ দিয়ে জল পড়ছিল টপটপ করে।
দীপমালাদেবী কোনও কথা বলছিলেন না।
বিজন আবার বলেছিলেন, “আমি সব দেখেছি পেখমদি… সব… কে-কে ছিল… কী হল, সব!”
“ওরা মেরে ফেলেছিল কাজুদাকে! আর জানিস আমায় বলেছিল, গা-ঢাকা দিয়েছে ও! মানুষ মেরে নাকি গা ঢাকা দিয়েছে! কিন্তু আমি জানি তা নয়। জানি তা হতেই পারে না,” দীপমালাদেবী অসহায়ের মতো তাকিয়েছিলেন বিজনের দিকে।
“পারে না-ই তো পেখমদি। আমি দেখেছি ওদের। ওরা মেরে তুলে নিয়ে গেল। লাশটা কোথায় গুম করে দিল। নদীতে ভাসাল না পুঁতে দিল… কে জানে! আর যাদবকাকা কাজুদার সাইড ব্যাগটা মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিল জোনাক-বাড়ির পেছনের জঙ্গলে।”
দীপমালাদেবী তাকিয়েছিলেন বিজনের দিকে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামছিল! কোনওমতে বিজনের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, “কেন এটা হল বিজু, কেন হল রে? কী ক্ষতি করেছিল লোকটা? আমি না হয় সরে আসতাম! আমি না হয়…”
“নয়নাদি!” মাথা নামিয়ে নিয়েছিলেন বিজন।
পুশকিন বুঝতে পারছিল না এসব কী হচ্ছে! কীসের গল্প শুনছে ও! কাজু, নয়না, ঝিকু এরা কারা?
বিজন বলেছিলেন, “তোমায় আর কাজুদাকে সেদিন আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে দেখে ফেলেছিল নয়নাদি। তুমি ওকে বলেছিলে না যে, কাজুদার সঙ্গে দেখা করতে যাবে। ও নিজেও এসেছিল অন্য পথে। আর দেখেছিল সব। বাজ পড়ছিল মনে আছে সেদিন? খুব ঝোড়ো আবহাওয়া ছিল। নয়না তোমাদের ছবি তুলেছিল। ওই বাজের আলো। আবছা কাঁপা ছবি… তারপর দেখিয়েছিল…”
“নয়না!” দীপমালাদেবী অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়েছিলেন, “কাকে?”
বিজন ঠোঁট কামড়ে সময় নিয়েছিলেন একটু। তারপর বলেছিল, “তোমার হাজ়ব্যান্ড এমনিতেই তো রেগে ছিল জুট মিল নিয়ে। তোমার শ্বশুরমশাইও। তার সঙ্গে এমন একটা ছবি! তাই…”
দীপমালাদেবী তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছিলেন বিজনের দিকে, “কী তাই? নয়না সুজিতকে ছবি দেখিয়েছিল? সুজিতকে?”
বিজন কিছু না বলে মাথা নামিয়ে নিয়েছিলেন।
“বল বিজু! আজ আমায় বল। চুপ করে থাকিস না! আমি এতগুলো বছর ভেবেছি কী হল লোকটার। ওই লোক মানুষ মারবে? নয়না সুজিতকে পেল কোথায় যে, ছবি দেখাবে? বল আমায়!” দীপমালাদেবী বিজনকে ধরে ঝাঁকিয়েছিলেন।
বিজন মাথা নামিয়ে বলেছিল, “শুনতে পারবে তো?”
“পারব, বল!” দীপমালাদেবী চশমাটা খুলে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিলেন বিজনের দিকে।
বিজন সময় নিয়েছিলেন আরও। পুশকিন বুঝতে পারছিল এই গল্পের মধ্যে ও সম্পূর্ণ অনাহূত। বুঝতে পারছিল, আজ এমন কিছু বেরিয়ে আসছে যা টাকা, পয়সা, জায়গা, জমি, সম্পত্তির চেয়ে দীপমালাদেবীর কাছে অনেক দামি!
বিজন ঢোঁক গিলে বলেছিলেন, “নয়নাদি ছবিটা দেখিয়েছিল তোমার বাবাকে। সবুজজেঠুকে।”
“কী!” দীপমালাদেবীর হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল চশমা, “বাবা! আমার বাবা!”
বিজন বলেছিলেন, “কাজুদা মারা যাওয়ার পরে নয়নাদি কেমন যেন পাগলি-পাগলি হয়ে গিয়েছিল। নিজেই তো বলেছিল আমায়। বলেছিল এটা হবে বুঝতে পারেনি। সবুজজেঠু, তোমার হাজ়ব্যান্ড, সবার মোটিভগুলো এক হয়ে গিয়েছিল শেষে। তাই আর ওরা বাঁচতে দেয়নি কাজুদাকে। কিন্তু ভাবো পেখমদি, ছেলেটার দোষটা কী ছিল? তোমায় ভালবেসেছিল আর যাদবকাকাদের বাঁচাতে চেয়েছিল! এই তো! ভাল কাজ করলে বুঝি এই হয়!”
দীপমালাদেবী ধীরে-ধীরে মাথা নামিয়ে ফেলেছিলেন। কথা বলতে পারছিলেন না। টপটপ করে জল পড়ছিল টেবিলে।
“পেখমদি! পেখমদি!” বিজন ঝুঁকে পড়েছিলেন। দীপমালাদেবী বিজনের শরীরে ভর দিয়ে, বিজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন! বাচ্চাদের মতো কাঁদছিলেন!
বিজন পুশকিনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “বাইরে খবর দে পুশকিন। পেখমদি বাড়ি যাবে। আজ আর কথা নয়।”
পুশকিনের নিজেকে কেমন যেন বাচ্চা ছেলে মনে হচ্ছিল! ও দ্রুত বাইরে গিয়ে জানিয়েছিল দীপমালাদেবীর শরীর ভাল লাগছে না। গাড়ির ব্যবস্থা করতে। শোনামাত্র লোকজন ঢুকে এসেছিল ঘরে। কিন্তু দীপমালাদেবী আর কারও সঙ্গে কথা বলেননি। বিজন দীপমালাদেবীকে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
দু’দিন পরে মালিক গ্রুপ থেকে ডাক এসেছিল পুশকিনের। সে সময় অফিসে বেরোনোর তোড়জোড় করছিল ও। কিন্তু জরুরি তলব বলে রাজারহাট না গিয়ে মালিক গ্রুপের অফিসে দৌড়েছিল। দেখেছিল, অল্পবয়সি একটা মেয়ে বসে আছে দীপমালাদেবীর ঘরে।
নামটা জেনেছিল পুশকিন। রাধিয়া মালিক।
রাধিয়া বলেছিল, “এই যে সব পেপার্স। তবে একটা কথা। বিজনদাদুকে নিয়ে আমি যাব জোনাক-বাড়িতে। একটা জায়গা খুঁড়তে হবে। কী একটা নাকি পাওয়া যাবে মাটির তলায়। আপনারা কি যাবেন?”
মেয়েটা বাচ্চা। কিন্তু খুব ভদ্র আর স্মার্ট। পুশকিনের মনে হয়েছিল এমন একটা মেয়ে এই বয়স থেকে অফিসে আসতে শুরু করল!
রাধিয়া বলেছিল, “দেখবেন, যেমন প্রমিস করেছেন, তেমন যেন কাজ হয়। মিল যেন বন্ধ না হয়। এর জন্য অন্য একজন মানুষকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।”
পুশকিনরা গিয়েছিল জোনাক-বাড়িতে। স্মরণ আর পুশকিন, সঙ্গে রিতুদাও ছিল সেদিন। আর সবাইকে অবাক করে সঙ্গে গিয়েছিলেন দীপমালাদেবী!
জোনাক-বাড়ির পেছনে বিজনের কথামতো খোঁড়া হয়েছিল মাটি। বেশ অনেকটা খোঁড়ার পর পাওয়া গিয়েছিল রাবারের পাতলা শিটে জড়ানো বাঁধানো একটা খাতার খুব ঝুরঝুরে কিছু অংশ আর একটা লকেট। চৌকো রুপোর লকেট। খাতার যে সামান্য দু’-চারটে পাতা পড়া যাচ্ছিল, স্মরণ সেই অংশগুলোর ছবি তুলে নিয়েছিল। পুশকিন অবাক হয়ে দেখেছিল অন্যদিনের চেয়ে স্মরণ সেদিন চুপ করেছিল একদম। মোবাইলে ফোটো তোলার সময় ছেলেটার মুখ-চোখ কেমন যেন লাল হয়ে গিয়েছিল!
ডায়েরির সামান্যটুকু আর হারটা বিজন দিয়েছিলেন দীপমালাদেবীকে। রাধিয়া বসেছিল পাশে।
দীপমালাদেবী ধীর গলায় বলেছিলেন, “এই বাড়িতে একসময় আমি আসতাম। প্রচুর জোনাকি উড়ত এখানে। অদ্ভুত একটা আলো ভেসে থাকত হাওয়ায়। এখানে মাঝে মাঝে বসে থাকত কাজুদা। ওর সাইকেল ছিল একটা। আমাদের বাড়িতে সেই সাইকেল নিয়ে যেত। যেদিন আমাদের বাড়িতে প্রথম আসে, আমি একটা লাল চাদর গায়ে দিয়ে দু’হাতে দুধের গেলাস ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাজুদা এসেছিল একটা লাল-হলুদ ডোরাকাটা মাফলার আর নীল রঙের ফুলহাতা সোয়েটার পরে। রোদের ঢালু মিনারের ভেতর সোনাকুচির মতো ধুলো উড়ছিল। তার মধ্যে কাজুদার হালকা দাড়ি আর টানা-টানা চোখ কেমন যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা মানুষের মতো লেগেছিল আমার। প্রেম হওয়ার পরে, আমি বলেছিলাম আমার সঙ্গে যেন পালিয়ে যায়। কাজুদা প্রথমে যেতে চায়নি। কিন্তু তারপর সেই গেল… একা… সবার আড়ালে! পুশকিন, এই বাড়িটাকে ভাল করে সারিয়ে তুলো। কোনও অযত্ন যেন না হয়! অনেক ভরসা করে এটা দিলাম কিন্তু তোমার দায়িত্বে। মনে রেখো, সোনাঝুরির সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা একসময় এখানে থাকত। এখানে থাকতেন বেঞ্জামিন কূজন সরকার।”
এয়ারপোর্টের সামনে গাড়িটা দাঁড়াতেই স্মরণ পেছনে ঘুরে বলল, “স্যার, আপনারা বসুন। আমরা লাগেজ নামাই। দু’জনে বসুন, কেমন?” বলেই পাশের ড্রাইভারকে একরকম ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে নিয়ে গেল গাড়ির বাইরে।
পুশকিন বুঝতে পারল, কেন! হাসি পেল ওর। দেখল পেছনের ডিকি উঠে গেছে। তার আড়ালে স্মরণ আর ড্রাইভার দাঁড়িয়ে!
নোঈ এখনও মুখ ভার করে আছে।
ও বলল, “আমার প্রায় সাঁইত্রিশ বছর বয়স। এটা মাথায় আছে তো?”
“আমারও ছাব্বিশ। আমি বাচ্চা নই। আর হঠাৎ বয়স দিয়ে কী হবে? আপনি চলে যাচ্ছেন যান!”
পুশকিন হাসল এবার। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে হাতে দিল নোঈর। বলল, “এটা খোলো। আমার সামনে এখনই প্যাকেটটা খোলো।”
নোঈ অবাক হল সামান্য। কিন্তু কিছু বলল না। ও যত্ন করে প্যাকিংটা বাঁচিয়ে খুলল প্যাকেটটা। আর খুলেই অবাক হয়ে গেল। আরে, এটা কী!
নোঈ দেখল, কাচের স্বচ্ছ গোলক। তার মধ্যে অদ্ভুত দেখতে একটা প্লাস্টিকের পোকা। ও অবাক হয়ে তাকাল, “কী এটা?”
পুশকিন হাত বাড়িয়ে গোলকটার তলার একটা বোতাম টিপে দিল। আর নোঈ দেখল, পোকাটার নীচের দিকে জ্বলে উঠল হলদে-সবুজ নরম এক আলো। সেই আলোয় ভরে গেল নোঈর করতল।
“জোনাকি!” নোঈ অবাক হয়ে তাকাল পুশকিনের দিকে!
পুশকিন বলল, “আমার হয়ে তোমার কাছে থাকুক জোনাকি।”
নোঈ তাকিয়ে রইল পুশকিনের দিকে। তাকিয়েই রইল। ওর চোখে জল এসে গেল প্রায়।
পুশকিন আলতো করে কাছে টানল নোঈকে। তারপর নরম বলল, “এই রাস্তায়, এই শহরে, এই রোদে, হাওয়ায় তোমার গন্ধ লেগে আছে নোঈ! আমি তোমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে থাকতে পারব না! আমি…”
নোঈ আর কথা শেষ করতে দিল না। পুশকিনের জামাটা খামচে ধরে কাছে টেনে আনল। তারপর ঠোঁটে চেপে ধরল ঠোঁট। জিভ দিয়ে স্পর্শ করল জিভ। এবং সমস্ত রোদ আর মেঘ একসঙ্গে পালটাপালটি করে নিল সেই ছোঁয়ায়! পালটাপালটি করে নিল গ্রহ, তারা, উল্কা আর গোটা সৌরমণ্ডল! তারপর পুশকিনের গলার কাছে মুখ গুঁজে বলল, “আমি মরে যাব!”
গাড়ি থেকে নেমে পুশকিন দেখল একটা ট্রলি নিয়ে এসে তাতে সব লাগেজ তুলে দিয়েছে স্মরণ। ও হাসল ছেলেটাকে দেখে। সেই একই রয়ে গেল। সেই আধগোঁজা জামা, না-আঁচড়ানো চুল! টেরিকটের প্যান্টের সঙ্গে সবুজ স্নিকার! নাক থেকে বারবার নেমে যাওয়া চশমা!
ও হাত বাড়িয়ে ধরল স্মরণের হাত। বলল, “পরের বার যখন আসব, প্যাঁওকে দেখব কিন্তু!”
স্মরণ হেসে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “কী জানি! প্যাঁও যা রাগী! কে জানে কী করবে!”
নোঈ একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ লাল। পুশকিন হাসল শুধু। তারপর দু’জনের দিকে হাত নেড়ে এগিয়ে গেল গেটের দিকে।
গেটের কাছে গিয়ে সামনে দাঁড়ানো বন্দুক হাতে সিকিয়রিটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, “জাস্ট আ সেকেন্ড,” বলে লাগেজের ট্রলিটা এক পাশে রেখে আবার দৌড়ে ফিরে এল গাড়ির কাছে।
দেখল, ওকে এভাবে আসতে দেখে স্মরণ আর নোঈ একটু ঘাবড়ে গিয়েছে!
স্মরণ তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস, “কী হয়েছে স্যার?”
পুশকিন হাত তুলে ওকে থামিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ভুরু কুঁচকে বলল, “তোমাদের একটা কথা বলা হয়নি। আচ্ছা, তোমাদের পাসপোর্ট আছে?”
“মানে?” স্মরণ ঘাবড়ে গিয়ে তাকাল।
“মানে পাসপোর্ট! দেশের বাইরে যায়… সেই পাসপোর্ট! আছে?”
নোঈ আর স্মরণ মাথা নাড়ল একসঙ্গে!
পুশকিন চিন্তিত মুখে বলল, “ও আছে! আচ্ছা!”
“কেন?” নোঈ অবাক হল।
পুশকিন সময় নিল একটু। তারপর বলল, “না, আসলে, বুদাপেস্টের কাজের জন্য বস আমায় টিম ঠিক করতে বলেছিলেন। তো আমি তোমাদের নাম বলেছি। বস রাজি। দু’মাসের মধ্যে এখানকার পেপারওয়ার্ক শেষ করে এই প্রজেক্টটা কনস্ট্রাকশন টিমকে হ্যান্ডওভার করে দিয়ে তোমাদের চলে আসতে হবে ওখানে। বাড়িতে সেভাবে বলে দাও। আর স্মরণ, নো প্যাঁও এক্সকিউজ় দিস টাইম। মনে থাকবে?”
নোঈ থমকে গেল যেন। তারপর সব ভুলে আচমকা “শয়তান!” বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুশকিনের ওপর!
নোঈর দু’হাতের মধ্যে ডুবে যেতে-যেতে পুশকিন শুনল স্মরণ বলছে, “নাঃ, সব মেয়ে প্যাঁওয়ের মতো নয়। প্যাঁও হলে জড়িয়ে ধরত না, কামড়ে দিত!”
তারও বেশ কিছু সময় পরে প্লেনের জানলায় বসে বাইরের দিকে তাকাল পুশকিন। সবে মাটি ছেড়ে আকাশে উঠেছে ওরা। আর নীচে ছোট-ছোট বাড়িঘরের মধ্যে দেখা যাচ্ছে তাদের আলো। অসংখ্য ছোট-ছোট আলো। যেন জোনাকি!
পুশকিন ভাবল, এই তো আসল জোনাকিদের বাড়ি! অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলে থাকার জেদ আছে যার, সেই জোনাকিদের বাড়ি! জানলার কাচে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল পুশকিন। আর দেখতে পেল বহু দশকের ওপার থেকে কোন এক জোনাকি যেন আলো জ্বেলেছিল। আর সেই আলোটুকু বুকে নিয়ে আজও এক বৃদ্ধা বেঁচে আছেন!
এই আলোটুকুই মানুষের সম্বল। অন্ধকারে তার পথ দেখানোর প্রদীপ। তার বিশ্বাস… তার বেঁচে থাকা… অন্ধকারের মুখে ছুড়ে দেওয়া তার সাহস। এই আলোই তার ধ্রুবতারা। এই আলোই তার জোনাকি। এই আলোই আসলে তার জীবন।
.
তারপর
“আর তারপর আমি নিয়ে এসেছি পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এক ইতিহাসের অংশ! বলা হয় এটির প্রচলন হয়েছিল চিনদেশে! পাঁচ হাজার বছর আগের চিনদেশে! সে সময় ফারাওরা রাজত্ব করছে ইজিপ্টে! ভারতের উত্তর-পশ্চিমে মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পা ছড়িয়ে দিয়েছে নিজের ডালপালা। ব্যাবিলনে, অ্যাসেরিয়ায় জমজমাট শহর। আর ইউরোপের মানুষ বাস করছে গুহায়! হ্যাঁ বন্ধুরা, আমি নিয়ে এসেছি তখনকার এক ঐতিহাসিক পানীয়! আচমকা আবিষ্কৃত এই পানীয়টি চিনের সম্রাট থেকে প্রবাহিত হয়ে অতীশ দীপঙ্করের পেয়ালা ছুঁয়ে এসে পৌঁছেছে মহারানি ভিক্টোরিয়ার প্রাতরাশের টেবিলে। আমি সেই পানীয় নিয়ে এসেছি যা বন্ধুত্বের হাইফেন, আড্ডার সূত্রধর, একাকী মানুষের অপেক্ষার সঙ্গী, অবহেলিত বৃদ্ধ-বৃদ্ধার শেষ সকালের প্রাতরাশ, ঠিকে ঝিয়ের মাইনের বাইরের আহ্লাদ, ছোট বাচ্চার বড়দের মতো হয়ে ওঠার চাবিকাঠি, বিকেলের মাথা ধরার ওষুধ, ভিনদেশি রেল স্টেশনের উত্তাপ, ট্র্যাফিক পুলিশের ‘আঃ’, অফিসের করিডরে পিএনপিসি-র অনুপান, স্ট্রাগলার ছেলেটার সারা দুপুরের খিদে মারার উপায়! ইতিহাস থেকে নেমে আসা এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী পানীয়টি আজ আমি এনেছি আপনাদের জন্য। এই হরি সামন্তর চা আসলে চা নয়, এক তরল ইতিহাসের সাক্ষী। এমন সুযোগ হারালে আপনাকে ইতিহাস ক্ষমা করবে না! মাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে আপনি নাম লেখান ইতিহাসে! এ সুযোগ হারাবেন না! এখনই আসুন, পান করুন, পান করান— চা!”
নীচ থেকে আসা এই ভাষণ শুনে অবাক হয়ে গেল নোঈ। ছাদে পাশে বসা স্মরণের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা কে? কোথা থেকে পাড়ায় ধরে আনলি?”
স্মরণ হাসল, “আগে খেলনা বিক্রি করত। এখন চা ধরেছে। তাও পাড়ায়-পাড়ায় মাইক নিয়ে। নিশ্চয় কোনও মিউজ়িয়াম ভেঙে বেরিয়ে আসা পাবলিক!”
নোঈ হাসল সামান্য। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথা ঘুরিয়ে বলল, “পুশকিনদার প্লেন উড়ে গেছে, না রে?”
স্মরণ বলল, “কীভাবে যাবে? যা বেঁধে রেখেছিস!”
“দূর, বল না!”
“হ্যাঁ রে…” স্মরণ আকাশের দিকে হাত তুলল, “ওই দেখ!”
নোঈ দেখল সন্ধের গাঢ় নীল আকাশের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা প্লেন। ছোট-ছোট আলো জ্বলছে তার শরীরে! ও অস্ফুটে বলল, “জোনাকি!”
“সামনেও, ওই দেখ ওই দূরের বড়-বড় বাড়িগুলো দেখ!” স্মরণ হাত তুলল, “আমাদের চারিদিকেও দেখ কেমন জোনাকিদের বাড়ি! ছোট-ছোট আলো। তার তলায় ঢেকে থাকা কত গল্প! জীবন! আমার জেঠুও এমন জোনাকিদের বাড়িতে থাকত, জানিস। কিন্তু কেউ থাকতে দিল না!”
“তোর জেঠু? মানে?” নোঈ তাকাল অবাক হয়ে।
“হ্যাঁ, আমার জেঠু। বাবার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। বাবার বড়দা। বেঞ্জামিন কূজন সরকার। যার গল্প শুনলি, সেই কাজুদা!”
নোঈ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল স্মরণের দিকে! বলল, “তোর নাম তো স্মরণ সরকার! তাই না?”
স্মরণ হাসল, “আমার পুরো নাম বেঞ্জামিন স্মরণ সরকার! জেঠুর নামে নাম রেখেছিল বাবা! আর দেখ জেঠুর মতো আমরাও জোনাক বাড়িতেই থাকি! তাই না?”
নোঈ হাসল। তারপর হাতের পাতায় ধরা পুশকিনের দেওয়া জোনাকিটা তুলে ধরল সামনে! করতল ভরিয়ে জোনাকি জ্বলছে। নোঈ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। এমনই আকাশ দিয়ে ওর প্রিয় মানুষ কোনও এক আলোর যানে চেপে পাড়ি দিচ্ছে বহু দূরের দেশে। নোঈ দেখল, সন্ধে নেমে আসছে মাথার ওপর। জ্বলে উঠছে তারা। দেখল, দূরের বাড়িঘরের জানলায়-জানলায় জ্বলে উঠছে সার-সার টিপটিপে আলো। ওসব কাদের গল্পের আলো? কাদের জীবনের ফুলকি? কারা ভালবাসায়, বেদনায় সাজিয়েছে এই সব আলোর সংসার? সমস্ত ভালবাসা দিয়ে, বুকে করে, কারা ঝড়বাদলে আগলে রাখছে এই সব আলোর ফোঁটা? এই সব বাড়িঘর— এসব কাদের বাসস্থান! কারা থাকে এখানে? কারা ক্রমাগত মরে গিয়েও বেঁচে ওঠে আবার! ভালবাসে আবার! বিশ্বাস করে আবার! আবার ঝুলন সাজায়! এ কাদের ঝুলন-শহর? কাদের এই বাড়ি? এ কি সত্যি জোনাকিদের বাড়ি?
—
