Chapter - 1
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
তা হলে এটাই ঠিক হল যে আগামী বছরে দুর্গাপুজো আর উৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে।
আমাদের আকাশ তো জানিয়েই দিয়েছে যে সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনও উৎসব সম্ভব নয়। পর পর পাঁচ বছর দুর্গাপুজোর সময় বৃষ্টি হয়েছে। বাচ্চাকাচ্চাদের আনন্দ মাটি, পুজোর উদ্যোক্তাদের অসুবিধের একশেষ। তার চেয়ে ডিসেম্বর মাসে বাতাস অতি মনোরম, পরীক্ষাটরীক্ষা শেষ, ফসলও তোলা হয়ে যায়, সেই তো উৎসবের উপযুক্ত সময়। আবহাওয়াবিদদেরও মত এই যে, বর্ষাকাল ক্রমশ বিলম্বিত হচ্ছে। তবে সেই বর্ষা আর যাই হোক, ডিসেম্বর মাসকে ছুঁতে পারবে না।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে বলা হয় অকালবোধন। এর সঙ্গে রামায়ণের কাহিনি জড়িত। এ সম্পর্কে ভুল ধারণাও অনেক। একটি বেশ বড় গোছের পুজো কমিটির কর্তাব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, সমুদ্রের বুকে সেতুবন্ধনের সময় রাম দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। বলাই বাহুল্য, তিনি রামায়ণ পড়েননি। এ জন্য তাঁকে বিশেষ দোষও দেওয়া যায় না। অনেকেই তো এখন রামায়ণ পড়েন না। টি ভি সিরিয়াল দেখেন। কোনও সিরিয়ালে এ সব আছে কি না জানি না। বাল্মীকির রামায়ণে এ রকম কিছু নেই। সে মহাকাব্যের রাম সমুদ্রকে শাসন করার জন্য জগৎ কম্পিত করে বজ্রনাদে শর মোচন করেছিলেন, যাতে মহার্ণব একেবারে শুষ্ক হয়ে যায়। তখন স্বয়ং সমুদ্র এসে কৃতাঞ্জলি হয়ে রামকে সেতুবন্ধনের পরামর্শ দেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণেও প্রসঙ্গটি প্রায় একই রকম।
বাল্মীকির সঙ্গে কৃত্তিবাসের প্রধান প্রভেদ রাবণ বধের বৃত্তান্তে। মূল রামায়ণেও যোদ্ধা হিসাবে রাবণের প্রতি খানিকটা অবিচার করা হয়েছে। রামকে সাহায্য করতে এসেছেন অনেক দেবতা ও মহর্ষি। ইন্দ্র পাঠিয়েছিলেন বহু অস্ত্রশস্ত্র সমেত রথ ও সারথি মাতলিকে আর অগস্ত্য মুনি এসে শিখিয়েছিলেন আদিত্যহৃদয় নামে এমনই স্তোত্র, যাতে যুদ্ধে জয় হবেই। রাম স্নান-টান করে শুচি হয়ে সূর্যের উদ্দেশে তিন বার সেই স্তোত্র পাঠ করলেন। রামের পুজো বলতে এইটুকুই। তার পর আর রাবণ বধে বেশি দেরি হয়নি।
কৃত্তিবাস রাবণ বধ পালাটি অনেকখানি বিস্তারিত করেছেন। রাম-রাবণের ঘোর যুদ্ধের সময় রাবণ অম্বিকার স্তব করে পেলেন তাঁর দয়া ও অভয়। আর রাবণের রথে সেই দেবীকে দেখে রাম চরম হতাশ হয়ে ধনুর্বাণ ফেলে দিলেন। এখন উপায়? বাঙালির মতন এখানে রাম খুব কান্নাকাটি করেছেন। তার পর ব্রহ্মার পরামর্শে রাম ‘অকালে শরতে কৈল দেবীর বোধন’। এখানেই সেই একশো আটটি নীল পদ্ম উৎসর্গের কাহিনিও আছে। রাম এখানে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়িয়েও পুজো করলেন। (মহাকবি কৃত্তিবাস সম্ভবত জানতেন না যে, রামায়ণ মহাভারতের আমলে মূর্তি পুজোর কোনও রীতি বা বিধিই ছিল না।)
যাই হোক, সেই দৃষ্টান্তেই প্রতি বছর শরৎকালে মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গার মূর্তি পূজোর প্রবর্তন। এখানে একটা সামান্য প্রশ্ন আছে। শাস্ত্র মতে, শরৎকালে সূর্যের দক্ষিণায়ন, তখন দেবতাদের ঘুমের সময়। রাবণ বধের জন্য রাম বাধ্য হয়ে অসময়ে দেবীর আরাধনা করতে বাধ্য হন। আমরা এখন যে দেবী দুর্গার পুজো করি, তাঁর সঙ্গে তো রাবণ বধের কোনও সম্পর্ক নেই, এই দেবী মহিষাসুরকে বধ করতে উদ্যত এবং তিনি চিরজাগ্রত। সুতরাং এখন তো তাঁর পুজো যে কোনও সময়েই হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলায়, ঋতুও বদলায়, আর উৎসবের সময় বদলাতে পারে না? বাংলার আর একটি বড় উৎসব ঈদ পালিত হয় চান্দ্রমাস অনুযায়ী, সেই উৎসবের তারিখও প্রতি বছরই বদলে যায়।
অনেকের মুখেই এ রকম দাবি শোনা যায়। আগেও অনেক লেখালেখি হয়েছে। এই তো কিছু দিন আগে পত্রান্তরে নন্দদুলাল রায়চৌধুরী নামে এক জন লেখক বিস্তৃত ভাবে লিখেছেন।
পঞ্জিকাকার, বিশিষ্ট পুরোহিতগণ কিংবা বারোয়ারি পুজোর উদ্যোক্তাবৃন্দ কারা এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেবেন, তা অবশ্য আমি জানি না।
পুলিশ কেন আসে না?
সকাল এগারোটা। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুটছে গাড়ি। ছায়া ছায়া দিন, মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। এই মসৃণ রাজপথটি অতি সুগম, শান্তিনিকেতন পৌঁছে যাওয়া যায় সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে। আমাদের দেশে একশো দশ কুড়ি কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলবে, এ কথা কয়েক বছর আগে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।
হঠাৎ গাড়ির গতি কমে এল। তার পর নিশ্চল। সামনে ও শেষে আছে গোটা পঞ্চাশেক। উল্টো দিকটা ফাঁকা। অর্থাৎ দু’দিকের পথই বন্ধ। ক্রমশ শোনা গেল, সামনে এক জায়গায় একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। খুবই মর্মান্তিক। একটি মোটর সাইকেলের ধাক্কায় একজন পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ কেউ বলল বটে যে ঠিক নিহত নয়, আহত, তার সত্যি-মিথ্যে বোঝা দুষ্কর, কারণ, অকুস্থলটি বেশ দূরে। শোনা গেল, কিছু কিছু গাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে সেখানে।
যাদের স্বজন হারিয়েছে, তাদের শোক-দুঃখ থেকে ক্রোধের উদয় হওয়া অতি স্বাভাবিক। বেছে বেছে যে শুধু মোটর সাইকেলই ভাঙা হবে তার কোনও মানে নেই। যাদের গাড়ি নেই, গাড়িওয়ালা লোকদের সম্পর্কে তাদের রাগ বা কিছু একটা থাকতেই পারে। দলে দলে গ্রাম থেকে ছুটে আসছে মানুষ। এ-দিককার কিছু গাড়ির চালক বা যাত্রীও কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। এর পর কী হবে, পুলিশ এসে নিশ্চয়ই পরিষ্কার করে দেবে এই ব্যস্ত রাস্তাটি! হঠাৎ কৌতূহলীরা অনেকে যেন প্রাণভয়ে দৌড়ে ফিরে আসতে লাগল, ও দিকে নাকি ইট-পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলল, গ্রামবাসীরা নাকি এ দিকেই তেড়ে আসছে।
খবরের কাগজে প্রায়ই পড়ি, কোথাও এমন গন্ডগোল হলে পুলিশের খবর পেতে পেতেই নাকি দু’তিন ঘণ্টা কেটে যায়। কিংবা গড়িমসি করে পুলিশ আসে না। দিনের বেলা এমন প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশের খবর না পাওয়ার তো কোনও কারণ নেই। এর মধ্যে নানান গাড়ির নানান রকম প্যাঁ পোঁ শুরু হল, যে যে-দিকে পারছে গাড়ি ঘোরাচ্ছে। আমাদেরও আর এখানে অপেক্ষা করাটা সুবিবেচনার পরিচয় হবে না, এরপর গাড়িতে গাড়িতে ঠোকাঠুকি লাগবে, আমাদের গাড়ির চালক খুব দক্ষতার সঙ্গে গাড়িটি উল্টো দিকে নিয়ে যেতে সমর্থ হল। এখন ছোটখাটো গ্রাম্য রাস্তা ধরে বর্ধমানের দিকে যাওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে।
উল্টো দিকে কিছুটা যাওয়ার পর একটা সেতুর তলা দিয়ে ডান দিকে ঘোরা যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জনা পাঁচেক পুলিশ। সঙ্গে তাদের গাড়ি। এরা এখানে দাঁড়িয়ে কি ভেরেন্ডা ভাজছে? এগিয়ে গিয়ে গন্ডগোলটা থামাচ্ছে না কেন?
কারণটা পরের মুহূর্তেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। ও-দিকে পঞ্চাশ ষাঠ জন উগ্র মেজাজের মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘুরছে, ইট-পাটকেল ছুড়ছে, সেখানে এই পাঁচ জন পুলিশ গিয়ে কী করবে? বেধড়ক মার খাবে। এদের কোমরে রিভলবার আছে বটে, কিন্তু উত্তেজিত জনতার দিকে গুলি চালানো এখন প্রায় নিষিদ্ধই বলতে গেলে। জনতাও তা জেনে গেছে। তাই পুলিশের প্রতি তাদের ভয় বা সমীহ নেই। পুলিশকে ইট মারতে তারা দ্বিধা করে না।
পুলিশ তাই নিরাপদ দূরত্বে ব্রিজের তলায় দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে। বেলা পড়লে খিদের তাড়নায় জনতা এমনিতেই অনেকটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। তার পর যাবে পুলিশ।
তুমি মনস্থির করো
অত্যন্ত অশান্ত, অস্থির আর যার একেবারেই মনস্থির নেই, এটা সেই লেখিকার কবিতার বই। নবনীতা দেব সেন। এই বিদূষী, প্রতিভাময়ী লেখিকাটি সম্পর্কে এক দিন শোনা যাবে, ইনি খুবই অসুস্থ। পরের দিন শোনা যাবে, তিনি আলাস্কায় চলে গেছেন কোনও অভিযানে।
এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই ছোট ছোট, স্ফুলিঙ্গধর্মীয়। শেষ কবিতাটি এ রকম:
তুমি যতো বলো,
‘চিরদিন চিরদিন’
আমি শুনি শুধু
‘আজকেই আজকেই!’
৩. ১১. ২০১০
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
বাংলাদেশে গেলে প্রত্যেক বারই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যার উত্তর আমি জানি না।
আমি সবজান্তা নই, ভাল ছাত্রও ছিলাম না। সুতরাং অনেক প্রশ্নেরই উত্তর আমার না-জানা হতেই পারে কিন্তু এ এক এমন প্রশ্ন, যা শুনলেই অপরাধবোধ হয়।
বাংলাদেশ ঘড়ির দিক থেকে আমাদের চেয়ে আধঘণ্টা এগিয়ে। আমাদের এখানকার অনেক টিভি চ্যানেলে দু’রকম সময় দেওয়া থাকে। কোনও অনুষ্ঠান এখানে সাড়ে ছ’টায় শুরু হলে বাংলাদেশে দেখা যাবে সাতটায়। সত্যিই কি সে সব অনুষ্ঠান দু’দেশে একসঙ্গে দেখা যায়? এটা নিছক বিজ্ঞাপন নয়, সত্যি দেখা যায়। এখানকার কোনও কোনও অনুষ্ঠান বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। এবং শুধু বাংলা নয়, হিন্দি চ্যানেলও পাওয়া যায় কয়েকটি। কিছু কিছু ধারাবাহিক সোপ দেখার নেশা আছে অনেকের। বেশ। কিন্তু বাংলাদেশ টিভি-র কোনও অনুষ্ঠানই কলকাতা কিংবা ভারতের কোথাও দেখা যায় না কেন? কেন এই বৈষম্য। এটাই সেই কঠিন প্রশ্ন।
এ প্রশ্নের উত্তর আমি এখানে অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি। এমনকী দিল্লিতেও। কিন্তু কোথাও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাইনি। আমাদেরই মতন, বাংলাদেশেও একটি সরকারি চ্যানেলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বেসরকারি চ্যানেল রমরমিয়ে চলে। সেগুলি দেখার সুযোগ কেন পাব না আমরা? বেশ কিছু বছর আগে কিন্তু দিব্যি পাওয়া যেত। হুমায়ুন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক দেখার নেশা জন্মে গিয়েছিল অনেকের, আমি জানি। কী করে সে সব বন্ধ হয়ে গেল, কোন কলা-কৌশলে, কার স্বার্থে? অনেকেই বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাবে বাঙালি ও বাংলা দু’ভাগ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হব না। এই কি তার নমুনা? এখন বাংলাদেশের কেউ কেউ যদি উগ্রভাবে দ্বিতীয় প্রশ্ন করে যে, এটা ও-দেশের ওপর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের চেষ্টা। তারই বা উত্তর দেব কী করে?
বই ও পত্র-পত্রিকার বিনিময় নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভারত, বিশেষত পশ্চিমবাংলা থেকে প্রকাশিত যত বেশি সংখ্যক বই ও পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশে যায়, সেই তুলনায় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বই আসে অনেক কম। পত্র-পত্রিকা প্রায় কিছুই আসে না। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য তেমন জটিল নয়। শুধু বিধিনিষেধ নয়, চাহিদারও একটা ব্যাপার আছে। হয়তো তা সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশের কোনও কোনও অতি জনপ্রিয় লেখকের বই পশ্চিমবাংলায় প্রকাশিত হলেও পাঠকদের মধ্যে এখনও তত বেশি আগ্রহের সৃষ্টি হয়নি। আবার এ কথাও ঠিক, পশ্চিমবাংলার কয়েকজন লেখকের রচনা বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সমাদৃত। তবে, ওখানকার কিছু প্রকাশক এ সমস্যার এক সহজ সমাধান করে ফেলেছেন। পশ্চিমবাংলায় সেই সব লেখকের গ্রন্থ প্রকাশ মাত্রই ও-দেশে জাল সংস্করণ বেরিয়ে যায়। তাতে মূল লেখক ও প্রকাশকের ভাগ্যে জোটে লবডঙ্কা। এমনকী কলকাতায় প্রকাশের আগেই ঢাকায় পাওয়া যায় জাল বই। কী করে? হয়, তা-ও হয়।
রক্তকরবী না শক্তকরবী?
সে বারে রবীন্দ্রনাথ সপরিবার গিয়েছেন শিলং। রথী আর প্রতিমা, কন্যা মীরা। মীরার মেয়ে বুড়ি আর রথীদের দত্তক কন্যা পুপে। এবং কাশী থেকে আনানো হয়েছে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ রাণুকে। রাণু অধিকারী, পরবর্তী কালে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়। সে সময় এই উচ্ছল মেয়েটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহ ও সখ্যের সম্পর্ক হয়েছিল। তাঁর সে সময়ের কোনও কোনও রচনায় এর ছায়াও লক্ষ করা যায়।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ একটি নতুন নাটক লিখতে শুরু করেন। প্রাথমিক নাম দেন ‘যক্ষপুরী। প্রধান চরিত্র তিনটি।
রবীন্দ্রনাথ ভাল অভিনেতা ছিলেন। নিজের নাটকে অভিনয় করেছেন বহু বার। নতুন নাটক লেখার সময় নিজের জন্যও একটি চরিত্র নির্মাণ করতেন। ঠাকুর্দা কিংবা বৈরাগীর মতন গায়ক-অভিনেতা হিসাবে তিনি সার্থক। আবার ‘বিসর্জন’ নাটকে তিনি কখনও ‘জয়সিংহ’, কখনও ‘রঘুপতি’র মতন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি ভূমিকায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এই নতুন নাটকে তাঁর ভূমিকা কোনটি। গায়ক বিশু পাগল, না রাজা? বিশু পাগলে নাট্যবস্তু কম, রাজার চরিত্রেই ফুটেছে স্রষ্টার আসল ব্যক্তিত্ব ও কণ্ঠস্বর। আর মুক্তির দূতী নন্দিনীতে পুরোপুরি রাণুর আদল। আর কাহিনির নায়ক রঞ্জন-এর কল্পনা বিশ্বসাহিত্যেই দুর্লভ, সমগ্র নাটকে তার কোনও সংলাপ নেই। তাকে এক মাত্র দেখা যাবে শেষ দৃশ্যে, মৃতদেহ রূপে। এই চরিত্র রচনার সময় কবির মনে লেওনার্ড এলমহার্স্ট নামে ইংরেজ যুবকটির কথা মনে এসেছিল, যে তখন শান্তিনিকেতনের পরিপার্শ্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত এবং রাণুর সঙ্গেও খেলাধুলোতে উৎসাহী। এই নাটক মঞ্চস্থ করার অভিপ্রায় ছিল রবীন্দ্রনাথের, প্রথম দুটো চরিত্র তো ঠিক হয়েই আছে। আর রঞ্জনের চরিত্রে এলমহার্স্ট, ঠিক বাংলা উচ্চারণ করতে পারবেন না, তাই কি তার মুখে একটিও সংলাপ নেই?
তবে রবীন্দ্রনাথ এ নাটক মঞ্চস্থ করে যেতে পারেননি। আমরা যখন এই নাটক পড়ি, তখনই মনে হয়েছিল পাঠ্যনাটক হিসেবে অসাধারণ হলেও অভিনয় জমিয়ে তোলা খুবই শক্ত। তার প্রধান কারণ, প্রায় সব সংলাপই উপমাবহুল, কথ্য ভাষায় যা কৃত্রিম শোনাতে বাধ্য।
কিন্তু আমাদের সেই সংশয় চুরমার করে দিল বহুরূপীর ‘রক্তকরবী’ প্রোডাকশন। এখন তা ইতিহাস। বাংলার পেশাদারি থিয়েটারের প্রায় অবসান ঘটিয়ে সেই শুরু হল গ্রুপ থিয়েটারের জয়যাত্রা। এর পর পঞ্চাশ বছরে আরও কয়েকটি দল ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ করেছে। সেগুলি দেখতে গিয়ে বার বার আমাদের মনে এসেছে বহুরূপীর সেই প্রোডাকশনের সঙ্গে তুলনা। কানে ভেসে আসে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের কণ্ঠস্বর।
সম্প্রতি ‘পূর্ব-পশ্চিম’ দলের ‘রক্তকরবী’ দেখার পর আমার মনে একটা খটকা লেগেছে। বার বার বহুরূপীর সঙ্গে তুলনা করাটা কি ঠিক? সত্যিই কি বহুরূপীর সেই প্রোডাকশন ততটাই সার্থক হয়েছিল, না এ আমাদের নিছক স্মৃতিকাতরতা? শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্র, দু’জনেরই কণ্ঠস্বর ও স্বরক্ষেপণ ছিল অ্যাফেকটেড, অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম, যা অনেকটা আবৃত্তিসুলভ। এ কালের সচেতন অভিনেতারা সেই দুর্বলতা বা বিশেষত্ব থেকে মুক্ত। নন্দিনী রূপে তৃপ্তি মিত্রের তুলনায় চৈতী ঘোষালের আর্তি কি কম অভিঘাত তোলে? সেই ‘রক্তকরবী’তে সর্দারের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন তা আমার মনে নেই। এখানে সৌমিত্র মিত্রের অভিনয় দেখে কোনও প্রতিতুলনা তাই মনে এল না। ভিলেনের ভূমিকায় অতিনাটকীয়তা এবং গর্জনটর্জন বর্জন করা সোজা কথা নয়। এই অভিনেতা চাপা অভিনয়ে এক অসাধারণ আদর্শ স্থাপন করেছেন। জালের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা রাজার সঙ্গে সর্দারের একটা সংঘর্ষের দৃশ্য। যা মূল নাটকে নেই, তা-ও সামান্য ইঙ্গিতে সংযুক্ত করে পরিচালক গৌতম হালদার (এঁর নামের পাশে ‘চলচ্চিত্র’ লেখা থাকে) বেশ সৌকর্যের পরিচয় দিয়েছেন। একটু বাড়াবাড়ি করলেই সবটা মাটি হয়ে যেতে পারত।
মোট কথা, সাধারণ ভাবে আমরা অনেক সময়েই মনে করি যে, আগেকার যা কিছু অনেক ভাল বা উন্নত ছিল (যেমন, আগেকার বাংলায় ছিল গোলা ভরা মাছ, পুকুর ভরা দুধ, গোয়াল ভরা ধান ইত্যাদি) সেই তুলনায় এখনকার সব কিছুই দুর্বল। এটা এক প্রকার অতীতচারী রোগ বিশেষ। যাঁরা পথপ্রদর্শক, তাঁরা যোগ্যতাতেও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ না হতে পারেন, তবু তাঁদের কীর্তি একটুও ন্যূন হয় না। ‘ন্যূন’ কেটে দিয়ে ‘কম’ লিখলেও ক্ষতি কী?
যুগ্মপ্রচেষ্টা
শিবরাম চক্রবর্তী থাকতেন ঠনঠনে কালীবাড়ির কাছে মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে। এক মেসবাড়ির একখানা ছোট ঘরে। দেয়ালভর্তি সব ঠিকানা লেখা। একদিন মাঝরাতে খুঁটখাট আওয়াজে ঘুম ভাঙার পর দেখলেন, ঘরের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি। শিবরাম জিজ্ঞেস করলেন, কে? ছায়ামূর্তি স্মার্টলি উত্তর দিল, আমি একজন চোর স্যর। শিবরাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, চোর তো এখানে কী করছ? সে বলল, কিছু টাকাপয়সা খুঁজছি। শিবরাম বললেন, টাকাপয়সা? দাঁড়াও, দাঁড়াও। আমি উঠছি। তার পর দু’জনে ভাল করে খুঁজব।
১৭. ১১. ২০১০
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
পঞ্জাবের অমৃতসর শহরে, শিখদের অতি পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের কাছেই জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যান। সব শহরেই এ রকম দু’চারটে পার্ক থাকে। জালিয়ানওয়ালাবাগের দৃশ্যত আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই, তবু সারা ভারতের সব মানুষ এই বাগটির নাম জানে। (না, সব মানুষ নয়, শিক্ষিত শ্রেণির কিছু এবং স্থানীয় লোকজন) । তার কারণ, ব্রিটিশ রাজত্বে নানান কুকীর্তির মধ্যে এই উদ্যানে এক দিনের ঘটনা অতি কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে আজও দগদগ করে।
সে ইতিহাস বিস্তৃত ভাবে বলার দরকার নেই, বর্তমানের প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ। সংক্ষেপে এইটুকু বলা যায়, প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বহু পঞ্জাবি সৈনিক ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে প্রাণ দিয়েছে সেই যুদ্ধে। যুদ্ধ চলার সময় ভারতে স্বায়ত্তশাসনের টোপ দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সে সব আর উচ্চারণও করে না শাসকরা। বিক্ষুব্ধ, অশান্ত পঞ্জাবে চলছে ধরপাকড়, গ্রেফতার হয়েছেন গাঁধীজি, অমৃতসরে সব রকম জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে, এপ্রিলের ১৩ তারিখ (১৯১৯ সাল) বৈশাখী পূর্ণিমা, গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসে শহরে, তারা ওই সব ১৪৪ ধারা-টারার কথা জানে না। তারা অনেকেই এসে জড়ো হয়েছে ওই পার্কে, একটা মঞ্চও বাঁধা হয়েছে। পার্কটা এমনই যে বাইরে থেকে দেখা যায় না, দু’পাশের বাড়ির মধ্য দিয়ে একটা সরু প্রবেশপথ, চার দিকে বড় বড় বাড়ি ও দেওয়াল, বেরোবার রাস্তাও ওই একটাই। হঠাৎ এক সময় জেনারেল ডায়ার নামে এক বীরপুঙ্গব তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে এসে ওই পথটা আটকাল। জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার জন্য কোনও সাবধানবাণীও উচ্চারিত হল না, হুকুম দিল গুলি চালাবার। সেই বীভৎস দৃশ্য কল্পনা করাও শক্ত, প্রতিবাদহীন, নিরস্ত্র, নিরীহ মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ তাদের খুন করতে পারে মানুষই? কান্না, আর্ত চিৎকার, হুড়োহুড়ির মধ্যে সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয় ৩৭৯ জনের। আহত কয়েক হাজার। বেসরকারি মতে, মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি। সৈন্যদের বন্দুকের গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল বলেই তারা সবাইকে হত্যা করতে পারেনি।
ব্রিটিশ সরকারের এমন বর্বরতার কাহিনি সারা দেশ জানতে পারেনি, কারণ তখন সমস্ত সংবাদপত্রে কঠোর ভাবে সেন্সরশিপ জারি ছিল। ক্রমশ প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে কিছু কিছু তথ্য নেতাদের কানে আসে। কিন্তু তাঁরা তখনই কোনও প্রতিবাদ আন্দোলন করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কারণ তখন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষমতার দরাদরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
রাজনৈতিক নেতারা আবেগে চালিত হন না। কিন্তু এক কবিকে এই ঘটনা দারুণ ভাবে বিচলিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ তখন গাঁধীজি ও চিত্তরঞ্জন দাশকে এর প্রতিবাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ওঁরা এড়িয়ে যান। এক নিদ্রাহীন রাত্রির পর রবীন্দ্রনাথ নিজেই একক ভাবে জ্বলন্ত ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি চিঠি পাঠান ভারতের বড়লাটকে, তাঁর নাইটহুডও ফিরিয়ে দেন।
হঠাৎ এত দিন পর এই প্রসঙ্গ কেন? এখন রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছর উপলক্ষে নানান অনুষ্ঠান হচ্ছে সারা দেশ জুড়ে। তারই অঙ্গ হিসেবে একটি কবি- সম্মেলনের আয়োজন করা হয় ওই জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানের মধ্যেই ম্যারাপ বেঁধে। সারা দেশ থেকে নানান ভাষার কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন অমিতাভ চৌধুরী। প্রতিবাদ নয়, রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। সাহিত্য অকাদেমির এই পরিকল্পনা খানিকটা অভিনব তো বটেই।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শেষে ফেরার সময় একটা তথ্য দেখে আমি চমকে উঠলাম। সেই বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে, নারকীয় তাণ্ডবের মধ্যে একজন বাঙালিও ছিলেন! তাঁর নাম ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখোপাধ্যায়, গুলি চালনার সময় তিনি কোনওক্রমে মঞ্চটার তলায় ঢুকে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান। পরে তিনি ওই উদ্যানটিতে নিহতদের স্মৃতিরক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রণী হয়েছিলেন। ওঁরই বংশধর সুকুমার মুখোপাধ্যায় এখনও সপরিবার ওই পার্কের প্রবেশপথের ধারেই এক বাড়িতে থাকেন, একতলার একটি ঘরে একটা সংগ্রহশালাও চালাচ্ছেন।
এই সব দেখতে দেখতে আমার এক সঙ্গী সবিস্ময়ে বলে উঠল, বাঙালি কোথায় নেই?
ঠিক। তবে, এই কথাটা শুনলেই আমার মনে হয়, বাঙালি এখন কোথায়?
কবিতা লেখার জন্য কারাগারে
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেটে গেল তেষট্টি বছর। এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কত মানুষ আত্মত্যাগ করেছে, সে সব এখন ইতিহাস। অনেকে ইতিহাসেও স্থান পাননি। আন্দামানের জেলে ১৬০০ রাজবন্দির নাম দেখেছি, তাঁদের ক’জনের কথা লোকে মনে রেখেছে? মনে রাখা স্বাভাবিকও নয়।
কিন্তু কবিতা লেখার জন্য যাদের কারাবরণ করতে হয়েছিল, তাঁদের কথা একেবারে ভুলে যাওয়া অন্তত সাহিত্যজগতের পক্ষে অনুচিত। বাঙালিদের মধ্যে সে রকম ক’জন ছিলেন তার একটি তালিকা প্রস্তুত করার ভার কি কেউ নেবে?
সে রকমই একজনের নাম দয়াল কুমার, এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বিংশ শতাব্দী’ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল এবং ‘১৯০৮ আর ১৯৩১’ শীর্ষক একটি কবিতার জন্য তিনি কারারুদ্ধ হয়েছিলেন তিরিশের দশকে। তার পরেও তিনি কয়েক বার জেল খেটেছেন, এমনকী দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও।
দয়াল কুমার প্রায় সারা জীবনই ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে বিশেষ ভাবে জড়িত। দেশসেবার আদর্শে তিনি প্রথম দিকে ছিলেন গাঁধীজির প্রতি আকৃষ্ট, তারপর সাম্যবাদী আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। চুঁচড়োয় বাড়ি, তিনি ছিলেন সেই অঞ্চলের সকলের পরিচিত দয়ালদা। তাঁর পরিবারটি ছিল সে কালের কমিউনিস্টদের একটি আদর্শ প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্ত্রী মুক্তাও ছিলেন সমাজকর্মী, ছেলেমেয়েদেরও রাজনীতির সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়নি। দারিদ্র ছিল নিত্যসঙ্গী। বিষয় ভোগ কিংবা ক্ষমতার লোভ এই সব মানুষের মধ্যে সামান্যতম স্থানও পেত না, বরং দারিদ্র্য নিয়ে অহংকার ছিল। নজরুল ইসলামের সেই লেখা— ‘হে মহান’— অনেকে জীবন দিয়ে বিশ্বাস করতেন। অভাবের সংসার, অনেকগুলি ছেলেমেয়ে, তবু স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে যখন ভারত সরকার তাঁকে পেনশন ও তাম্রপত্র দিতে চায়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
দয়াল কুমার ছিলেন নজরুল ইসলামের খুব ভক্ত, সে ধারারই কবি। এ কালের দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর রচনাগুলি কতটা স্লোগানধর্মী আর কতটা কাব্যরসসম্পৃক্ত, তা নিয়ে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু এমন মানুষের জীবন অবশ্যই এখনও স্মরণীয়।
এবং অধৃষ্য কুমার
দয়াল কুমারের এক সন্তান তার বাবার আদর্শকেও ছাড়িয়ে নকশালপন্থী নেতা হয়ে ওঠেন সেই ষাট-সত্তরের দশকে। ধরা পড়ে জেলও খেটেছেন। পরিচিতরা অনেকেই তাঁর নাম বলতেন, এখনও বলেন, অদৃশ্য কুমার। শুনলেই মনে হয় ছদ্মনাম। কিংবা কোনও রোমহর্ষক ডিটেকটিভ গল্পের প্রতিনায়ক। তা কিন্তু নয়, কুমার এঁদের পারিবারিক পদবি, প্রথম নামটি অদৃশ্য নয়, অধৃষ্য। সংস্কৃতগন্ধী হলেও এটা একটা বাংলা শব্দ, কেন না বাংলা অভিধানে স্থান পেয়েছে। এর অর্থ, যাকে দমন করা যায় না।
১. ১২. ২০১০
পোশাকের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য পোশাক
ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে বেরিয়ে এক বন্ধু বললেন, চলো, কিছুক্ষণের জন্য আমাদের ক্লাবে গিয়ে বসা যাক। তারপরই, সম্মতির জন্য আমার মুখের দিকে না তাকিয়ে তিনি তাকালেন আমার পায়ের দিকে। এবং উচ্চারণ করলেন একটা আফশোসের শব্দ।
গোটা গরমকালটায় মোজা ও জুতো (শু) পরার অভ্যেস আমার নেই, প্যান্ট-শার্টের সঙ্গে চটি পরলেই চলে যায়। শীতের সময় বা শীতের দেশে গেলে মোজা পরতেই হয়। আমাদের দেশের উচ্চাঙ্গ ক্লাবগুলিতে চটি-পরা পায়ের মানুষদের প্রবেশ নিষেধ। এ ব্যাপারে আমার কয়েক বারই নানান অভিজ্ঞতা হয়েছে।
এক বার এক বন্ধু আমার পায়ের দিকে লক্ষ না করেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এ শহরের এক প্রান্তে একটি বনেদি ক্লাবে। সেখানেও চটি সমস্যা। তার সমাধানেরও ব্যবস্থা আছে সেখানে, মজুত রাখা নানান ধরনের কিছু জুতো। তার থেকে বেছে এক জোড়া আমাকে দেওয়া হল, চটির বদলে পরে নেওয়ার জন্য। আগে যেগুলিকে বলা হত কাবুলি জুতো, এখন তাকেই বলা হয় স্ট্র্যাপ শু। সামনের দিকটা আমার চটিরই মতন, তফাত শুধু গোড়ালি পেঁচিয়ে একটা সরু চামড়ার ফিতে। শুধু এই ফিতেটুকু থাকা না-থাকার জন্য অনেক মান-সম্মান নির্ভর করে। তফাত অতি সূক্ষ্ম, তবে জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই তো আমরা এ সব অনেক সূক্ষ্মতার মর্ম বুঝতে পারি না।
পাজামা-পাঞ্জাবিও বেশ আরামদায়ক পোশাক, প্রায় সারা বছরই, উত্তুরে হাওয়া বইলে তার ওপর একটা সোয়েটার বা আলোয়ান জড়িয়ে নিলেই চলে। কিন্তু এ পোশাকও ক্লাবগুলিতে অচল। ধুতি পাঞ্জাবি কিংবা শেরওয়ানি জাতীয় পোশাকের অন্তর্গত। শেরওয়ানির বিশেষ চল আমাদের এ দিকে নেই, ধুতির ব্যবহারও ক্রমশ কমে আসছে, তবু পাজামা-পাঞ্জাবি আজও ভদ্র পোশাক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। বাংলাদেশে অনেকেই প্যান্টের ওপরে কুর্তা পরেন (আর সবাই বলে কুর্তা, শুধু আমরা এ দিকে কেন পাঞ্জাবি বলি, তা জানি না)! এক বার কয়েকজন বাংলাদেশি বন্ধুকে নিয়ে কী লজ্জাতেই পড়েছিলাম! সকালে একটা অনুষ্ঠানের পর কয়েকজন মিলে গেছি একটা ক্লাবে, পানাহারের জন্য। গেট দিয়ে ঢোকার পরই একজন এসে ফিসফিস করে বাংলাদেশি বন্ধুদের জানিয়ে বললেন, ওঁদের তো এখানে স্থান দেওয়া যাবে না। প্যান্টের ওপর কুর্তা আর চটি। ওঁদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত কবি শামসুর রাহমান এবং জনপ্রিয়তম ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ। মরমে মরে গিয়ে আমাকে বলতেই হল, ঠিক আছে, আমরা চলে যাচ্ছি, ভবিষ্যতে আমিও আর কোনও দিন এ ক্লাবে পা দেব না! তখন ভেতর থেকে এক কর্তাব্যক্তি ছুটে এসে বললেন, আপনাদের মাঠের এক কোণে বসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, তাতে আশা করি অন্য মেম্বাররা আপত্তি করবে না। ভাগ্যিস এই সব কথা শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আহমেদরা শুনতে পাননি!
ক্লাবের ধারণাটি আমরা পেয়েছি সাহেবদের কাছ থেকে। ইংল্যান্ডের নানান ধরনের ক্লাব সম্পর্কে অনেক মজার গল্পও প্রচলিত আছে। অধিকাংশ পুরুষদের উদ্যোগেই গঠিত এই সব ক্লাবে এক কালে নারীদের সদস্য তো করা হতই না, প্রবেশও নিষিদ্ধ ছিল। স্ত্রীদের চোপা এড়াবার জন্য, শান্তিতে মদ্যপান ও তাস খেলার জন্যই পুরুষরা ক্লাবে জমায়েত হতেন। এ ছাড়া ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ছেলে-মেয়েদের বিয়ের কিংবা জীবিকা সংস্থানের আলোচনার জন্যও ক্লাব একটি প্রকৃষ্ট স্থান। লন্ডনের একটি ক্লাবে ব্রেকফাস্টের সময় এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলারও নিয়ম ছিল না। ইংরেজরা আমাদের দেশে এসে ক্লাব স্থাপন করে দেশীয় মানুষদের কঠোর ভাবে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ডগ্স অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস নট অ্যালাউড, এমনও নোটিস থাকত কোথাও কোথাও। গাঁধীজি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, প্রথমবার কলকাতায় আসার সময় তাঁকে একটি ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তখন অবশ্য তিনি মহাত্মা হননি, ব্যারিস্টার। পোশাকে কোনও খুঁত ছিল না, বাধা ছিল গায়ের রং। স্বাধীন দেশে অবশ্য গায়ের রঙের বাধা নেই, তবু অন্য রকম বাধা আছে কিছু কিছু। শিল্পী হুসেন এবং আনন্দশঙ্কর বাধা পেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে কিছু কিছু নিয়ম বদলাচ্ছে, তার প্রতিফলন পড়ছে এখানকার ক্লাবগুলিতেও, তবে বিলম্বিত ভাবে। এই কিছু দিন আগেও কলকাতার অধিকাংশ ক্লাবে স্বাধীন, স্বাবলম্বী, স্বতন্ত্র নারীদের সদস্য হওয়ার অধিকার ছিল না। এখন সে নিয়ম শিথিল হয়েছে, তবে আজও কোনও রমণী প্রেসিডেন্ট হয়েছেন কি? কোনও কোনও ক্লাবে একটা মেন্স রুম থাকে, সেটা কিন্তু পুরুষদের টয়লেট নয়!
পোশাকের ব্যাপারে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্যুট ও টাই। সাহেবদের দেশে টাই-এর ব্যবহার অনেকটা কমে আসছে, এ দেশে ক্রমশ বাড়ছে। ১৫ অগস্ট দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা ভোজসভা হয়। কুর্তা-শেরওয়ানির বদলে স্যুট-টাই পরিহিত অতিথিই অধিকাংশ। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আবদুল কালাম যে বার প্রেসিডেন্ট হলেন, তিনি বলেছিলেন, অগস্ট মাসে দিল্লিতে প্রচণ্ড গরম, তাই টাই পরার দরকার নেই। অনেকেই সে নির্দেশ মানেনি। টিভি’তে দেখা যায়, সংবাদ-পাঠকরা সবাই স্যুট-টাই পরে থাকেন, এমনকী বাংলা চ্যানেলগুলিতেও। এটা বুঝি টিভি-র ড্রেস কোড! বাংলাদেশে অবশ্য পোশাকের ব্যাপারে স্থানীয় রীতি মানিয়ে নিয়েছে টিভি’তে এবং কলকাতার একটি ক্লাবের সহোদরা ঢাকা ক্লাবেও, সেখানে কোনও দিন জামা-কাপড়ের ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন শুনিনি।
ক্লাবগুলি সব প্রাইভেট এবং সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাঁদের নিজস্ব নিয়ম-নীতির ব্যাপারে বাইরের কারও, এমনকী সরকারেরও নাক গলাবার অধিকার নেই। ঠিক কথা, ক্লাবের কোনও মুখপাত্র বলতেই পারেন যে, সেখানকার নিয়ম-কানুন যাঁরা মানতে না চান, তাঁরা আসবেন না, এটাও ঠিক। আবার, কিছু কিছু ব্যক্তি ওই সব ক্লাবের কোনও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেলেও পোশাকের কড়াকড়ির কারণেই ঈষৎ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন, তা-ও দেখেছি।
হাওড়া স্টেশনের কুলি
ট্রেন লেট, ক্যারেজওয়েতে একটা গাড়িতে বসে আছি। দু’পাশের প্ল্যাটফর্মই এখন ট্রেনশূন্য, শুনশান। এক জায়গায় সাত-আট জন কুলি গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে বিশ্রম্ভালাপ করছে। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার মনে একটা প্রশ্ন এল, কত কাল ধরে এদের দেখছি। অবিশ্বাস্য রকম এদের মোট বইবার শক্তি। মাথায় দু-তিনটি ট্রাঙ্ক বা স্যুটকেস, দু’কাঁধে দু’টি ব্যাগ, তার পরেও হাতে একটা কিছু। এত মালপত্র নিয়েও বেঁকে যায় না, দৌড়তে শুরু করে। ছেলেবেলায়, মা-বাবা বলতেন, ওই কুলির পেছন পেছন যা, যেন ভিড়ে হারিয়ে না যায়। দৌড়ের পাল্লায় কুলিদের সমকক্ষ হওয়া খুব শক্ত ছিল। মালপত্র নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমি কখনও দেখিনি। ওরা বেশ বিশ্বস্ত, ঠিক কামরায় উঠে জায়গার ব্যবস্থাও করে দিত, শুধু মজুরির ব্যাপারে খিটিমিটি হত খানিকটা।
এখন ভাবলাম, এই কুলিদের তো বয়েস বেড়েছে আমাদের মতন। আর কত দিন মোট বইতে পারবে? বুড়ো হয়ে গেলে কী করবে? এদের কি কোনও প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে? এই সব অসংগঠিত শ্রমিকদের ইউনিয়ন হয়? এদের কি কোনও পেনশনের ব্যবস্থা হতে পারে? কিছুই জানি না।
একটা ট্রেনের শব্দ হতে এরা উঠে দাঁড়াল। দু-এক জনের কোমরে হাত, মাথার চুল প্রায় সাদা। তবে একটা তফাত বেশ নজরে পড়ে। বিহার-উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা এই সব কুলিদের প্রত্যেকেরই গোঁফ দেখেছি আমাদের ছেলেবেলায়। একজন আমাকে ভর্ৎসনা করে বলেছিল, পুরুষ মানুষদের গোঁফ না থাকলে জওয়ানি কমতি হয়ে যায়! এখন দেখছি, ওদের অর্ধেকেরই সেই শেয়ালের ল্যাজের মতন গোঁফ নেই, একেবারে কামানো! এটা এত দিন বাংলা মুলুকে থাকার খারাপ প্রভাব।
পরের দিনই সংবাদপত্রে দেখলাম, রেল স্টেশনগুলিতে মাথায় মোট বওয়া কুলিদের বদলে রেল-সেবকদের নিয়োগ করা হবে— যারা ট্রলিতে মালপত্র নিয়ে যাবে। অত্যন্ত ভাল প্রস্তাব। অন্যান্য দেশে তো সে রকমই হয়। সেই রেল-সেবকদের বৃদ্ধ বয়েসের জন্য সংস্থানও হতে পারে।
তবু মনটা খচখচ করে, কবে থেকে চালু হতে পারবে এই পরিকল্পনা? হাতে টানা রিকশা এই শহর থেকে একেবারে উঠিয়ে দেওয়ার কথাও তো অনেক দিন থেকেই শুনছি, কিন্তু এখনও সেই সব রিকশা চলছে তো চলছেই। সেই রিকশাওয়ালারাও বা বুড়ো হয়ে গেল কী করে?
শ্রমের প্রকৃত মর্যাদা
কিছু দিন আগে আমরা কয়েক বন্ধু গুজরাত-রাজস্থানের সীমান্ত অঞ্চলে দ্রষ্টব্য স্থানগুলিতে ঘুরছিলাম। ভাড়া করা গাড়ি, ড্রাইভারের বয়েস বাইশ-তেইশের বেশি নয়। এক দিন সন্ধে হয়ে এসেছে। সামনের একটি রাস্তা ধরে গেলে আমাদের রাত্রির আশ্রয়স্থলে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছনো যায়। অন্য একটা ঘুর-পথও আছে, তাতে লেগে যাবে তিন ঘণ্টার বেশি।
ড্রাইভারটি সোজা পথে যেতে রাজি নয়। কেন? ওই রাস্তার একটা গ্রামে ডাকাত থাকে, তাদের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনাতেই তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
গাড়িতে আমরা চারজন পুরুষ মানুষ, সঙ্গে বেশিটাকা-পয়সা বাদামি জিনিসপত্রও কিছু নেই, দু-একজনের পকেটে প্লাস্টিক মানি। ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং ডাকাত দলের মুখোমুখি হবার রোমাঞ্চে আমরা ছেলেটিকে বললাম, চলো, চলো, ডাকাতরা আমাদের ধরলে আমাদের সঙ্গে যা আছে, সব দিয়ে দেব।
ছেলেটি ঘাড় শক্ত করে বলল, না স্যার, যাব না। ডাকাতরা খুব মারবে!
আমরা বললাম, সব কিছু দিয়ে দেব, তা হলে আর মারবে কেন? চলো—। সে বলল, তবু মারবে। ওরা পরিশ্রম না করে কিছু রোজগার করতে চায় না!
১৫. ১২. ২০১০
Chapter - 2
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ
পাথুরিয়াঘাটার প্রখ্যাত প্রয়াত প্রসন্নকুমার ঠাকুরের দৌহিত্র নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের শখ হয়েছিল, তিনি একটা নতুন মঞ্চ নির্মাণ করে থিয়েটার চালাবেন। নিতান্ত ব্যবসার কারণে নয়, উচ্চাঙ্গের নাটকের অভিনয়, যা ইংরেজদের থিয়েটারের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে। এ জন্য তিনি প্রায় নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনলেন গিরিশচন্দ্রকে।
স্টার থিয়েটার গড়ে তোলার জন্য অভিনেত্রী বিনোদিনীকে শরীর বিক্রয় করতে হয়েছিল। সেই বিনোদিনীকেও এক সময় স্টারের সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করতে হয়। আর গিরিশচন্দ্রও এক সময় তাঁর অতি প্রিয় স্টারের জন্য মস্তক বিক্রয় পর্যন্ত করেছিলেন। তাঁকেও বিতাড়িত হতে হয় সেই মঞ্চ থেকে। সে সব কাহিনি এখানে অপ্রাসঙ্গিক। অপমানিত গিরিশচন্দ্র থিয়েটারের জগৎ থেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মঞ্চ-মায়ায় যিনি একবার আবদ্ধ হয়েছেন, তাঁর পক্ষে কি বেশি দিন এই অভিমান টিকিয়ে রাখা সম্ভব? নগেন্দ্রবাবুর প্রস্তাবে তিনি আবার পাদপ্রদীপের সামনে ফিরে আসতে রাজি হলেন। শুধু নাট্যকার হিসেবেই নয়, অনেক কাল পর তিনি আবার ধরাচুড়ো পরে অভিনয়ও করবেন।
ইংরেজদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নাটক চাই। তাই অনেক পরিশ্রমে গিরিশচন্দ্র অনুবাদ করলেন শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ-এর মতো শক্ত নাটক। ভাবানুবাদ নয়, একেবারে সাহেব-মেমদের মতো পোশাক পরে, উপযুক্ত সেটে অনুষ্ঠান। গিরিশচন্দ্র স্বয়ং সাজলেন ম্যাকবেথ। নতুন মঞ্চটির নাম মিনার্ভা। সেখানে ম্যাকবেথের প্রথম অভিনয় হয়েছিল ২৮ জানুয়ারি, ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ।
তার পর তো এতগুলি বছরে মিনার্ভা থিয়েটার অনেক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে গেছে। একবার আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল। তার পরেও জোড়াতালি দিয়ে মাঝে মাঝে চালাবার চেষ্টা হয়েছিল। ইদানীং একেবারেই পোডড়াবাড়ির হাল হয়েছিল। সরকারি উদ্যোগে আবার আমূল সংস্কার করে, পুরনো রূপটি অনেকটা ফিরিয়ে এখন চালু করা হয়েছে। এবং মঞ্চস্থ হচ্ছে শেক্সপিয়রেরই অন্য একটি নাটক, ‘কিং লিয়ার’। প্রধান ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একশো সতেরো বছর পর পুনর্নির্মিত মিনার্ভাকে জীবন্ত করে তোলার জন্য আবার শেক্সপিয়রেরই নাটক মঞ্চস্থ করা উদ্যোক্তাদের পরিকল্পিত কি না তা জানি না। তবে শুনেছি, রাজা লিয়ারের ভূমিকায় অভিনয় করার শখ সৌমিত্রর অনেক দিনের। অনেক কাল আগে অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায়ের অনূদিত রূপটিই খানিকটা মাজা-ঘষা করে নেওয়া হয়েছে।
কেমন হয়েছিল গিরিশচন্দ্রের সেই প্রোডাকশন? সেই সময় তিনি হাঁপানিতে ভুগছিলেন। তবু নাকি তিনি সিংহবিক্রমে দাপাদাপি করেছেন মঞ্চে। দেশীয় অনেক জ্ঞানী-গুণী ম্যাকবেথের প্রভূত প্রশংসা করেছিলেন তো বটেই এমনকী সাহেবদের পত্রিকা ‘দি ইংলিশম্যান’ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, বাঙালির এই প্রশংসনীয় উদ্যম ইংরেজদের মঞ্চের সঙ্গে তুলনীয়।
কিং লিয়ারের এই প্রোডাকশন সম্পর্কে এ কালের ইংলিশম্যানরা কী বলছেন জানি না, তবে আমি বা আমার মতো অনেকেই এমনই অভিভূত যে মনে হয়েছে, দেশ-বিদেশের অন্য অনেক শেক্সপিয়র নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে মিনার্ভার এই অনুষ্ঠানের তুলনা তো অনায়াসেই করা যায়, এমনকী এটি হয়তো উৎকৃষ্টতর। কী অসাধারণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়, কোনও প্রশংসাই যেন যথেষ্ট নয়। এক কালের বাংলা সিনেমার সেই রোম্যান্টিক প্রেমিক, সত্যজিৎ রায় যাঁকে বহু ভাবে ব্যবহার করেছেন, উত্তমকুমারের পাশাপাশি যাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে, অনেক পথ পেরিয়ে এসে সেই সৌমিত্র এখন বাংলা মঞ্চের রাজা। একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ করে যাচ্ছেন, বিভিন্ন আঙ্গিকে। ‘হোমাপাখি’ কিংবা ‘তৃতীয় অঙ্ক, অতএব’-এর তুলনায় কিং লিয়ারের ভূমিকায় তার সম্পূর্ণ অন্য রূপ। দার্ঢ্য ও করুণ রস সমান ভাবে পাশাপাশি। গিরিশচন্দ্র যখন ‘ম্যাকবেথ’ করেন তখন তাঁর বয়স ঊনপঞ্চাশ। এর পর তিনি আর বিশেষ কোনও নতুন নাটকে মঞ্চাবতরণ করেননি। আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স এখন ছিয়াত্তর। তবু তাঁর পরিশ্রম করার কী অসীম ক্ষমতা, কত দিকে ছড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে।
কিং লিয়ার নাটকে অনেক চরিত্র। শুধুমাত্র নায়কের অভিনয় নৈপুণ্যে এমন নাটক সার্থক হতে পারে না। সে কৃতিত্ব পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের। আমরা আগেই লক্ষ করেছি, (যেমন, ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’) মঞ্চে বহু চরিত্রের উপস্থিতি নিখুঁত ভাবে চালনা করায় সুমন বিশেষ দক্ষ। এই নাটকেও এত চরিত্র, ইংরেজ ও ফরাসি সৈন্য সমেত। কোথাও তাদের পোশাক ও পদক্ষেপের ভ্রান্তি চোখে পড়ে না। অন্যান্য অভিনেতাও যথেষ্ট পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। সেটটিও চমৎকার।
এই নাটক দেখার পর এ কথাও অবশ্যই মনে আসে যে, সম্প্রতি যেন বাংলার নাট্যজগতে আবার একটা সোনালি যুগ এসেছে। বছরে একটা দুটোও বাংলা সিনেমা দেখার যোগ্য হয় কি না সন্দেহ। কিন্তু মঞ্চ-নাটকগুলির প্রয়োগ, অভিনয়, শিল্পগুণ অনেক উন্নতমানের। মফস্সলের দলগুলিরও অনেক প্রয়াস অভিনব।
এক সময় বাংলার তুলনায় মহারাষ্ট্রের থিয়েটার আন্দোলন অনেকটা এগিয়ে ছিল। এখন যেন সেখানে খানিকটা ঝিমোনো ভাব এসেছে। বাংলার নাট্যজগৎ এখন বেশ চাঙ্গা। প্রবীণদের মধ্যে নান্দীকারের রুদ্রপ্রসাদ ও স্বাতীলেখা এখনও সমান সক্রিয়। সদ্য প্রয়াত কুমার রায়ের বহুরূপী দলও নতুন নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছে। মারীচ সংবাদ-এর অরুণ মুখোপাধ্যায়কেও দেখা যায় কখনও সখনও। আর বিভাস চক্রবর্তী নিজের দল ছাড়াও অন্য অনেক দলের সার্থক পরিচালক। মেঘনাদ ভট্টাচার্য পরিচালক ও অভিনেতা হিসাবে সার্থক। উষা গঙ্গোপাধ্যায়ের রঙ্গকর্মী-র নতুন নতুন প্রোডাকশন বাংলা বা হিন্দিতে খুবই উল্লেখযোগ্য। ব্রাত্য বসু একই সঙ্গে নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা— এই তিন দিকেই প্রতিভার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। কৌশিক সেনের প্রযোজনার আঙ্গিক ও তাঁর নিজস্ব অভিনয় আমার খুব প্রিয়। রমাপ্রসাদ একজন পাকা অভিনেতা ও সার্থক নাট্য রূপকার। স্কুলের বাচ্চাদের দিয়ে তাঁর একটি নাটকের অভিনয় দেখতে দেখতে আমি চোখের জল সামলাতে পারিনি। (এই লেখার পর হঠাৎ শুনলাম রমাপ্রসাদ বণিক আর নেই, শুনে আবার আমার চোখে জল আসার উপক্রম হল।) ‘পূর্ব পশ্চিম’ নামের নতুন দলটির পর পর প্রকল্পগুলির একটা দেখলে অন্যগুলিও দেখার অদম্য ইচ্ছে হয়। আরও কত দলের ভাল নাটকের নাম শুনি। সময় করে দেখা হয় না বলে আফসোস থেকে যায়। অনেকের কথা উল্লেখ করা হল না, বাদ রয়ে গেল। মোট কথা, এ কথা বেশ জোর দিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে বাংলায় যে বাংলার দু’একটি ব্যাপার নিয়ে গর্ব করতে পারি, তার মধ্যে নাট্য আন্দোলনের স্থান অবশ্যই প্রথমে।
এলেবেলে খেলুড়ে
কৌশিক বসু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। কিছু দিন আগে তিনি আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। এখন ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রকের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম ‘The Retreat of Democracy.’ এর প্রথম অধ্যায়টির নাম ‘Ele bele, The subversion of Democracy.’ এই Ele Bele কিন্তু কোনও ল্যাটিন শব্দ নয়, কথ্য বাংলায় এলেবেলে। প্রসঙ্গটি বেশ মজার। ছেলেবেলায় যখন আমরা কয়েকজন মিলে কোনও খেলা করতাম, তখন অন্তরঙ্গ কয়েকজন খেলার সঙ্গ ছাড়া অন্য কেউ এসে যোগ দিলে কিংবা অন্য কাউকে চাপিয়ে দেওয়া হলে তা আমাদের মোটেও পছন্দ হত না। ধরা যাক, আমাদের কোনও মাসি বেড়াতে এসেছেন তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। গুরুজনেরা বলতেন, সেই ছেলেকেও আমাদের খেলার মধ্যে নিতে হবে। আমরা নিতে বাধ্য হতাম। কিন্তু বন্ধুদের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে যেত—ও আছে বটে, কিন্তু ধর্তব্যের মধ্যে নয়, ও এলেবেলে। তেমনই অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্বের অনেক দেশের মতামত নিয়ে যেখানে নীতি নির্ধারণ করার কথা, সেখানে আসল কলকাঠি নাড়ে কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের একটা ছোট গোষ্ঠী। বাকিরা সবাই এলেবেলে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে আসল খেলুড়ে মাত্র কয়েকটি, এলেবেলের সংখ্যাই অনেক বেশি।
অরণ্যের রাজবাড়ি
‘আমাকে যেমন বলা হলো, তেমনই স্নানের সময় কোমরে গামছা জড়িয়ে খালি পায়ে লাফাতে লাফাতে বাথরুমে ঢুকলাম। এখন হয়েছে কি, বাথরুম থেকে বেরিয়ে কুয়োতলা যাবার পথে একটা তারে ধোওয়া জামাকাপড় মেলা ছিল। আমাকে আসতে দেখেই পিসিমা কোনও কথা না বলে একটি লাঠির ডগা দিয়ে ধোওয়া জামাকাপড়গুলি উঁচু করে, আমার মাথায় যাতে না লাগে সেই রকম করে তুলে ধরলেন।
‘ও হো, স্নান না করে ধোওয়া জামাকাপড় তো ছোঁওয়া চলবে না’— তাই না? আমি হাসতে হাসতে পিসিমাকে এই কথা বলতে পিসিমাও হাসতে হাসতে জবাব দিলেন…’
এই উদ্ধৃতি পাঠ করলে কি একটুও বোঝার উপায় আছে যে, এর লেখক বাংলাভাষী নন, দূর বিদেশি? আসলে ‘অরণ্যের রাজবাড়ি’ নামের গ্রন্থটি রচনা করেছেন জাপানের অধিবাসী শ্ৰীনাওকি নিশিওকা। তিনি জাপানি ভাষারও একজন সুখ্যাত লেখক ও গবেষক। শান্তিনিকেতনে যাওয়া-আসার সূত্রে বাংলা শেখা। এমন স্বচ্ছ, সাবলীল গদ্যে তাঁর রচনা অত্যন্ত উপভোগ্য।
ইদানীং কালে বেলজিয়ান পাদ্রি ফাদার দ্যতিয়েন ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’য় অত্যন্ত রসমাধুর্য পূর্ণ বাংলা গদ্য লিখে আমাদের মুগ্ধ করেছেন। ফাদার দ্যতিয়নকে তাঁর শেষ বয়সে, এ বছরই রবীন্দ্র পুরস্কার দেওয়াটা একটা পুণ্য-কাজ হয়েছে। নাওকি নিশিওকা-র মতো বাংলা গদ্য অনেক বাঙালি লেখকের কাছেই ঈর্ষণীয় মনে হবে। এই বইয়ের পাঁচটি রচনা অনেকটা ছোট গল্প আর ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ। অতি সাধারণ মানুষজনকেও তিনি বড় মায়াময় দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। সত্যি, এটি বাংলা ভাষার একটি ‘অতি’ উল্লেখযোগ্য বই।
২৯. ১২. ২০১০
এক অসাধ্যসাধকের বিস্ময়কর কাহিনি
প্রথমে মনে হয়েছিল, ‘আমি কি ভুল শুনলাম? বারোশো না বারো হাজার? দু’বার জিজ্ঞেস করার পর জানা গেল, সত্যি সত্যিই বারো হাজার। অনেক সময় কোনও সত্যি কথা শুনলেও মুখে একটা অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে ওঠে। সত্যকেও মনে হয় অবাস্তব। — এ কাহিনির সবটাই প্রথমে অবিশ্বাস্য বা অবাস্তব মনে হলেও চমকপ্রদ ভাবে সত্য।
অচ্যুত সামন্ত ছিলেন ওড়িশার একটা গ্রামের গরিব ঘরের ছেলে। অল্প বয়সে পিতৃবিয়োগ হওয়ায় লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটেছিল। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাই কষ্ট করেও চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে পেয়েছিলেন এক কলেজের লেকচারারের চাকরি। এর পর এ রকম অধিকাংশ মানুষের জীবনই ধরাবাঁধা ছকে চলে। শুধু দু’ একজনই ব্যতিক্রম হয়, অচ্যুত সামন্ত সে রকমই একজন। কিছু দিন চাকরি করার পর তিনি ঠিক করলেন, ছেলেবেলায় তাঁর পড়াশোনা চালাতে যে রকম অসুবিধা হয়েছিল, সে রকম অসুবিধাতে এ কালের অনেক ছাত্রও তো পড়ে। তাদের জন্যে কিছু একটা করা দরকার। সম্পূর্ণ একার উদ্যোগে স্কুল-কলেজ গড়ায় মন দিলেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজ পেয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা। সে মর্যাদা পেতে হলে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়। তা-ও হয়ে গেল। সেই কলিঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কিট (KITT) নামে পরিচিত। হল নিজস্ব ভবন। এবং পর পর তৈরি হতে লাগল ডাক্তারি পড়ার জন্য মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি পাঠের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। মাত্র দু’দশকের মধ্যে এক সুবৃহৎ প্রতিষ্ঠান। ভুবনেশ্বরের অদূরে এক বিশাল ক্যাম্পাস, সুদৃশ্য বাড়িগুলি দেখলে চোখ জুড়োয়। মন্দিরময় ভুবনেশ্বরে এ সবই যেন নতুন মন্দির ভাস্কর্য।
এ পর্যন্ত মনে হয়, চমকপ্রদ সাকসেস স্টোরি, কিন্তু অবিশ্বাস্য কিছু নয়। এত সব কিছু গড়ে তোলার জন্য শ্রীসামন্ত কোনও প্রকার সরকারি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হননি। কিছু বন্ধুবান্ধব, শুভার্থী সাহায্য করেছেন এবং প্রধানত নির্ভর করেছেন ব্যাঙ্কের ঋণের উপর। যথাসময়ে ঋণ শোধ দিয়ে তিনি ব্যাঙ্কের বিশ্বাস অর্জন করেছেন।
এরপর সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। উচ্চাঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্থকতা অর্জনের পর শ্রীসামন্ত শুরু করলেন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশাল সায়েন্সেস। সংক্ষেপে কিস (KISS)। এখানে শুধু আদিবাসী সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ। না, বারোশো নয়, বারো হাজার ছাত্রের জন্য হস্টেল। সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পড়াশোনা আর বিনা খরচে খাওয়া। কে জি থেকে পি জি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা। সারা ভারতে আর কোথাও এক সঙ্গে বারো হাজার আদিবাসী সন্তানদের খাওয়া থাকা, লেখাপড়ার ব্যবস্থা, সব বিনা খরচে, না আর কোথাও নেই। এর জন্য যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন তা আসে কোথা থেকে? ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল কলেজ চালিয়ে যথেষ্ট উপার্জন হয় তো বটেই, সেই উপার্জন ব্যয়িত হয় আদিবাসী কল্যাণে।
অচ্যুত সামন্ত তাঁর এই কর্মযজ্ঞের জন্য দেশবিদেশের অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ বছর সিঙ্গাপুরে তাঁকে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ সামাজিক সংগঠক হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে মধ্যবয়সি অচ্যুতবাবু মৃদুভাষী ও অতিশয় ভদ্র। কাজ-পাগল এই মানুষটি বিবাহ এবং সংসার করার সময় পাননি। একা থাকেন ক্যাম্পাসের বাইরে। একটা ছোট ভাড়াবাড়িতে। একলা এত কাজ সামলান, তবু তাঁর ব্যবহারে কোনও টেনশন নেই। এবং বেশ সাহিত্যপ্রীতি আছে। কখনও কবিতা লিখতেন কি না, তা-ই বা কে জানে! এই প্রতিষ্ঠান থেকেই নিয়মিত প্রকাশিত হয় একটি উচ্চাঙ্গের ওড়িয়া সাহিত্য পত্রিকা। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে সাহিত্যপাঠেরও আসর বসে। এবং সে কারণে কখনও তিনি অন্য রাজ্যের, অন্য ভাষার কোনও কবিকেও আমন্ত্রণ জানান।
কামিনী কলঙ্ক
প্রায় দেড়শো বছর আগে এই নামে প্রকাশিত নবীনকালী দেবীর বইটি নিয়ে অনেক আলোচনা ও তর্কবিতর্ক হয়েছিল। তার পর বইটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সম্প্রতি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে এর একটি কপি খুঁজে পেয়ে ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ বুকস নামে এক নবীন প্রকাশক বইটির হুবহু এক সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। নবীনকালী দেবী নামটি ছদ্মনাম কি না, তা ঠিক বোঝা গেল না। লেখিকা নিজেই বলেছেন, যে তিনি এক বারবনিতা। স্বেচ্ছায় কুলত্যাগ করে, বেশ কয়েক বছর অসামাজিক জীবন (তথাকথিত পাপের জীবন) যাপন করে, পরে অনুতাপ করেছেন। কিন্তু খটকা লাগে, বারবনিতার পক্ষে আত্মজীবনী লেখা অসম্ভব কিছু নয়, কিন্তু তাঁরা কি ‘দেবী’ ব্যবহার করতেন নামের সঙ্গে? বিনোদিনী লিখেছেন, ‘দাসী’। নবীনকালী আত্মপরিচয় লিখেছেন এই ভাবে:
শুন শুন সভাজন করি নিবেদন।
সংক্ষেপেতে মম দুঃখ, করিব বর্ণন।।
বারাসত গ্রাম মোর হয় পিতৃধাম
দ্বিজের তনয়া আমি, নবীনাদ্যা নাম।।…
এই লেখিকা অকপটে নিজের জীবনকাহিনি লিখেছেন। তিনি ভালই পড়াশোনা জানতেন, অনেক পুরাণের গল্প-টল্প উল্লেখ করেছেন, শৃঙ্গার রসের বর্ণনা দিতেও দ্বিধা করেননি। এবং যদিও নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি অতি পাপমতি, অধমের শেষ’, তবু এক জায়গায় তর্ক তুলেছেন, পাপ কী, পুণ্য কী, কেন মানুষ পাপ বা অন্যায় কাজে প্রবৃত্ত হয়— তাতে কি বিধাতারও কোনও দায়িত্ব নেই?
একটি অতি মূল্যবান ভূমিকা এবং গ্রন্থটির সারাৎসার লিখেছেন সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে, এক জায়গায় বলা হয়েছে, কামিনী কলঙ্ক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। আবার অন্যত্র এই বইটি নিয়ে বিতর্কের উল্লেখ আছে ১৮৭১ সালে। বাংলা সাহিত্যের উপাদান কিংবা বিচিত্র রসের রচনা সম্পর্কে যাঁরা আগ্রহী, তাদের বইটি সংগ্ৰহযোগ্য মনে হতে পারে।
বিনায়ক সেন
প্রায় প্রতিদিনই গরিব, সাধারণ গ্রামের মানুষের রাজনৈতিক দলাদলির কারণে খুনোখুনির খবর দেখে মন কিছুটা সময় বিবশ হয়ে থাকে। তারপরই মনে পড়ে বিনায়ক সেনের কথা। কিছু কিছু মানুষ অন্য মানুষের প্রাণ হরণ করতে পারে অক্লেশে। আর কিছু বিরল সংখ্যক মানুষ অন্যকে বাঁচাবার জন্য নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যও গ্রাহ্য করে না।
ডাক্তার বিনায়ক সেনের সঙ্গে আমার কখনও পরিচয় হয়নি। তাঁকে আমি কখনও চাক্ষুষও দেখিনি। কিন্তু এর মধ্যে আমি তাকে স্বপ্নে দেখেছি দু’বার। স্বপ্নে কত রকম উদ্ভট ঘটনাই তো ঘটে। দু’বারই এই স্বপ্নে আমি দেখেছি, বিনায়ক সেন মিলিয়ে যাচ্ছেন আমার বাবার চেহারার মধ্যে। ধ্যুত, তিনি আমার পিতৃপ্রতিম হবেন কী করে? আমি নিশ্চয়ই বিনায়ক সেনের চেয়ে অনেক বড়।
এমনকী আমি আমার বাবার চেয়েও বয়োজ্যষ্ঠ। বাবা শেষ নিশ্বাস ফেলেছিলেন মাত্র একান্ন বছর বয়সে। সে বয়স আমি কবেই পেরিয়ে এসেছি।
চক্ষুশূল
ইস্টার্ন বাইপাসে কোনও এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ে প্রায় চব্বিশ পয়েন্টে লেখা আছে ‘উৎকর্ষতা’। সে দিকে চোখ পড়লেই, না রাগ নয়, অনেক কাল রাগ কমে গেছে। এখন মন-খারাপ লাগে। কোনও কোনও সংবাদপত্রে দু’একটি সাহিত্য রচনাতেও ভাষার এই অপব্যবহার চোখে পড়ে।
ইংরেজিতে বানান ভুল কিংবা অপপ্রয়োগ হলেই লজ্জায় আমাদের যেন মাথা কাটা যায়। কিন্তু বাংলায় অশুদ্ধ শব্দের যথেচ্ছাচার চলে। বানানের তো মা-বাপ নেই বলেই মনে হয়। এগুলি নিবারণ করার কি কোনওই উপায় নেই? হোর্ডিংয়ে অশ্লীলতার গন্ধ থাকলেই হইচই হয়। ব্যাকরণের এই ব্যভিচারও কি অশ্লীল নয়?
১২. ১. ২০১১
একেবারে একশো ভাগ সত্যি একটি ঘটনা
কয়েক বছর আগের কথা। কুলু-মানালি থেকে ফিরছি দিল্লিতে, সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম একসঙ্গে চার জন মিলে। ফেরার সময় মাত্র তিন জন আর একটি ছোট মাটির পাত্র-ভর্তি ছাই।
সে বারে হিমালয়ের ওই অঞ্চলে বেড়াবার পুরো পরিকল্পনা করেছিল ভাস্কর দত্ত। সে ছিল ক্লাস টু থেকে আমার সারা স্কুলজীবনের বন্ধু, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর একমাত্র কবিতা না লিখেও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কী খেয়ালে চলে গেল লন্ডন, তার পর সেখানেই কাটিয়ে দিল পঁয়তাল্লিশ বছর। পরের দিকে সে বছরে তিন-চার মাস কাটিয়ে যেত কলকাতায়, আমরা প্রতি বছরই বেড়াতে যেতাম কোথাও না কোথাও, এ দেশে এবং বিদেশেও। অনেক বারই আমাদের সঙ্গী হয়েছে ফরাসি দেশের বন্ধু অসীম রায়, কয়েক বার কানাডার দীপ্তেন্দু চক্রবর্তী। এবং স্বাতী, সে তো যে-কোনও ভ্রমণের নামেই এক পায়ে খাড়া।
এই ভ্রমণে ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব নিয়েছিল ভাস্কর, এমনকী সান্ধ্য পানাহারের আড্ডার জন্য আলাদা আলাদা প্যাকেটে চানাচুর, কাজুবাদাম, সালামি, এমনকী মুখশুদ্ধি পর্যন্ত। এবং ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের সরঞ্জাম। বেশ কয়েক জায়গায় উপভোগ্য ঘোরাঘুরির পর অকস্মাৎ মানালির এক হোটেলে সকালবেলা ভাস্কর খুব স্বার্থপরের মতন শেষ নিশ্বাস ফেলে চলে গেল৷ সে তখনও হাঁটছিল, দু’পাশে আমি আর অসীম। এ রকম মৃত্যুতে যে যায়, সে তো ভালই যায়; যারা থাকে, তাদের এতই দুর্ভোগ শুরু হয় যে শোক অনুভবেরও সময় থাকে না। ভাস্করের ব্রিটিশ পাসপোর্ট, তার দেহ বিলেতে পাঠাতে হবে কি না, লন্ডনে রয়েছে তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে, তারাই বা কী চায়, বিহ্বল অবস্থার মধ্যে আমাদের এই সব নিয়েও ব্যস্ত থাকতে হল। যা-ই হোক, ব্রিটিশ হাই কমিশন থেকে জানানো হল যে, এ বিষয়ে পরিবারের মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লন্ডন থেকে ভাস্করের স্ত্রী-সন্তানেরাও জানাল, যে প্রচুর ঝঞ্ঝাট করে দেহ পাঠাবার দরকার নেই। আমরা নেমে এলাম মান্ডি শহরে, সেখানে ভাস্করের এক আত্মীয় অতি উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার, তার ব্যবস্থাপনায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাস্করের দেহ দাহ করা হয়ে গেল। পরদিন সকালে আমরা দিল্লি রওনা হলাম এক মুঠো ছাই নিয়ে।
সুদীর্ঘ পথ, তার মধ্যে অনেকটাই পাহাড়ি রাস্তা, প্রায় দশ ঘণ্টা লেগে যায়। আমরা ফিরছি একটা ভাড়া করা গাড়িতে। সারা পথ আমরা তিন জন প্রায় নিস্তব্ধ, কিছু খেতেও ইচ্ছে করছে না। দু’পাশের মনোরম দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছি যদিও, কিন্তু কিছুই দেখছি না।
দিল্লি শহরের প্রান্তে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেল, আমাদের গন্তব্য ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার, সেখানে ঘর সংরক্ষিত আছে। গাড়ির চালকটি পাহাড় অঞ্চলের মানুষ, দিল্লি শহর চেনেন না, আমরাও পথঘাট ঠিক মালুম করতে পারি না। ঘোরাঘুরি করতে করতে কেটে গেল আরও এক ঘণ্টা। তার পর লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে প্রায় পৌঁছলাম উদ্দিষ্ট স্থানের কাছাকাছি। গাড়ি একটা ছোট রাস্তায় ঢুকতে যাচ্ছে, তখনই ঘটল এক মারাত্মক কাণ্ড। একটা মাঝারি আকারের বিড়াল গুটি-গুটি পায়ে রাস্তা পার হয়ে গেল। ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিলেন গাড়ি।
বেড়াল বিষয়ে গাড়ির ড্রাইভারদের নানারকম কুসংস্কারের কথা শুনেছি। কিন্তু অবস্থার নিশ্চয়ই কোনও প্রতিকারও থাকবে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ড্রাইভার সাহেব, কী হবে এখন? তিনি বললেন, বেড়ালটা যদি ফিরে আসে, কিংবা কোনও ব্রাহ্মণ যদি উল্টো দিক দিয়ে এ রাস্তা পার হয়।
বেড়ালটি কী উদ্দেশ্যে রাস্তা পার হয়েছে তা জানি না। তার কখন ফিরে আসার মর্জি হবে, তাও জানার কোনও উপায় নেই। তবে, ওই ব্রাহ্মণের ব্যাপারটা শুনে, আমি জীবনে যা কখনও করিনি, বুক বাজিয়ে নিজের ব্রাহ্মণত্বের পরিচয় দিয়ে বললাম, তা হলে আমি নামছি। আমিই তো ব্রাহ্মণ।
লোকটি অদ্ভুত বিকৃত মুখ করে নিদারুণ অশ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, কেয়া, আপ ব্রামভণ? বাঙালি কভি ব্রাহ্মভণ হোতা হ্যায়? কভি নেহি! ধোঁকা মত দিজিয়ে।
আমার সত্যিই ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম, রীতিমতন উপাধ্যায় পদবি। কৈশোরে অভিভাবকদের নির্বন্ধে আমার উপনয়নও হয়েছিল, ন্যাড়ামাথায় একটা ছোট্ট টিকিও রাখা ছিল, মাসের পর মাস পৈতে হাতে নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করেছি। বছরখানেকের মধ্যে একদিন গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে পৈতেটা ভেসে যায়। বাড়ির লোকরা নতুন পৈতের জন্য জোরাজুরি করেননি, ওই ব্যাপারটাই চুকে যায়। গায়ত্রী মন্ত্র অবশ্য আজও মুখস্থ আছে।
প্রমাণ দেওয়ার কোনও উপায় নেই, বাঙালিদের সম্পর্কে পাহাড়ি ড্রাইভারের এই মনোভাবের প্রতিবাদ করেই বা কী হবে? গায়ত্রী মন্ত্র বলতে গেলেও সে ড্রাইভারের যে তা বোঝার ক্ষমতা নেই, তা বোঝা যায়।
তা হলে আর কোনও উপায়? একটা সামান্য বিড়ালের জন্য আমাদের এই অসহায় অবস্থা।
ড্রাইভার বলেন, যদি অন্য কোনও লোক কিছু না জেনে এই রাস্তা দিয়ে যায়…
এটাও প্রায় একটা অসম্ভব ব্যাপার। দিল্লির অনেক রাস্তাই জনবিরল, একটু রাত হলে গেলে পায়ে-হাঁটা মানুষ প্রায় দেখাই যায় না।
ড্রাইভারটির কুসংস্কারের তীব্রতা প্রায় বেয়াদপির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখে অসীম একেবারে চুপ। স্বাতী অতি বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠল, তা হলে গাড়ি ঘোরাও, অন্য রাস্তা দিয়েও নিশ্চয়ই যাওয়া যায়।
ড্রাইভার তাতেও রাজি নন। ইঞ্জিন স্টার্ট নিলেই নাকি বিপদ ঘটে যাবে।
কুসংস্কারের এমন তীব্র ঝাঁঝের মুখোমুখি হইনি আগে কখনও। আমাদের মন বিবশ হয়ে আছে, শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত, খিদে না পেলেও তৃষ্ণার্ত, কতক্ষণে একটা বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেব। কিন্তু কোনও উপায় নেই। ড্রাইভারের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলেও তাকে ঠেলে সরিয়ে যে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাব, তাও সম্ভব নয়, কারণ তাতে আমাদের ভদ্রতায় বাধে। গাড়ি থেকে যে নেমে পড়ব, গন্তব্য হাঁটাপথের দূরত্ব নয়। তা ছাড়া, সঙ্গের মালপত্র বহন করে নিয়ে যাবার ক্ষমতা নেই, ফেলে রেখে যাওয়াও চলে না ভরসা করে।
নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম তিন জন। এই হচ্ছে সেই রকম সময়, যখন প্রতি মুহূর্তকে মনে হয় অনন্ত কাল। খালি মনে হতে লাগল, এই সময় ভাস্কর সশরীরে উপস্থিত থাকলে কী ব্যবস্থা নিত। কেউ যদি না আসে, তবে কি সারা রাত আমাদের এই অবস্থায় থাকতে হবে?
কতক্ষণ পর জানি না, দেবদূতের মতন এসে গেল আমাদের উদ্ধারকর্তা। দূর থেকে গান গাইতে গাইতে আসছে এক জন। এলোমেলো পদক্ষেপ দেখে বোঝা যায়, সে বেশ রসস্থ হয়ে আছে। নির্ঘাত সে বলরামের চ্যালা। তাকে কাছাকাছি দেখেই গাড়িতে স্টার্ট দিলেন ড্রাইভার।
এই ঘটনা একেবারে পুরোপুরি একশো ভাগ সত্যি। এত দিন পর আবার মনে পড়ল, তার কারণ, সম্প্রতি অসীম ও দীপ্তেন্দুর সঙ্গে আমি ও স্বাতী পাঁচ দিন ধরে গাড়িতে ঘোরাঘুরি করলাম। কলকাতা থেকে বহরমপুর, সেখান থেকে শান্তিনিকেতন, তার পর দুর্গাপুর, পরের দিন আসানসোল। বিভিন্ন গাড়ি, বিভিন্ন চালক। গ্রামবাংলার পথে অন্তত তিন বার রাস্তায় বেড়াল পার হতে দেখেছি, কোনও ড্রাইভারই তাতে ভ্রুক্ষেপও করেননি। বাঙালিদের মধ্যে খাঁটি ব্রাহ্মণ না থাকতে পারে, বাঙালিরা বিড়াল-ভীতি অন্তত জয় করতে পেরেছে।
গায়ত্রী মন্ত্র
আমাদের ছেলেবেলায় শুনতাম, গায়ত্রী মন্ত্র অতি পবিত্র। একমাত্র ব্রাহ্মণদেরই আছে এই মন্ত্রে অধিকার। অব্রাহ্মণদের কাছে এই মন্ত্র প্রকাশ করাও পাপ। তখন মানে বুঝতাম না। এখন বুঝি সেটা ছিল পুরুতদের ধাপ্পা কিংবা অজ্ঞতার ফল। ওটা তো সূর্যস্তব মাত্র, মন্ত্রও নয়, শ্লোক। ওর মধ্যে গোপনীয়তার কী আছে? এখন তো ওই শ্লোক নিয়ে ঝিং-চ্যাক গানও হয়ে গেছে, যা সবাই শুনতে পারে।
তিন বাঁড়ুজ্যে এবং
বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঁড়ুজ্যে সম্বোধন বাংলা প্রথাসম্মত। কিন্তু বাঙালি লেখকদের পদবি চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, মুখার্জি এমনকী গাঙ্গুলি লেখাও দৃষ্টিকটু, কেমন যেন সাহেব-সাহেব ভাব। এই সব পদবির আগে মিস্টার না দিলে ভাল শোনায় না। অফিস-টফিসে চলে, কিন্তু সাহিত্যে এখনও বেমানান।
বাংলা সাহিত্যের তিন দিকপাল— তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ এবং মানিক, এঁরা তিন বাঁড়ুজ্যে নামেও পরিচিত। এঁদের মধ্যে তারাশঙ্কর ছাড়া আর দু’জন কখনও নাটক লেখেননি, তবু ‘অন্য থিয়েটার’ নাট্য সংস্থা একত্রিশে ডিসেম্বর নাট্যস্বপ্নপ্রকল্প নামে সারা রাত ধরে যে অনুষ্ঠান করে, তার এ বারের বিষয়বস্তু ওই তিন বাঁড়ুজ্যে। ওঁদের সম্পর্কে বক্তৃতার ব্যবস্থা, ওঁদের রচনার নাট্যরূপ উপস্থাপনা। খুবই আকর্ষণীয় ব্যাপার।
এই উপলক্ষে ‘তিন বাঁড়ুজ্যে’ নামে যে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিভাস চক্রবর্তী লিখেছেন, নোবেল পুরস্কার পাবার পূর্ণমাত্রায় যোগ্যতা ছিল এঁদের। একেবারে ঠিক কথা। এটা পড়ে আমার এক অতি প্রিয় লেখকের নাম যোগ করতে ইচ্ছে হল। যখনই আমি কোনও নোবেল পুরস্কার পাওয়া লেখকের বই পড়ি, তখনই আমার মনে পড়ে সতীনাথ ভাদুড়ীর কথা। তার ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’-এর তুল্য বই ভূ-ভারতে এ কালে আর কেউ লিখতে পেরেছেন কি? বহুকাল আগে তুলসীদাস লিখেছিলেন ‘রামচরিত মানস’।
২৬. ১. ২০১১
জেলখানার অভ্যন্তরে এক সন্ধ্যায়
ধরা যাক, আমি একটা জেলখানার মধ্যে আছি। উঁচু পাঁচিল তোলা আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। নানা কারণেই তো মানুষ জেলে যেতে পারে।
কারাগারের এখন আর এক নাম সংশোধনাগার। পাপকে ঘৃণা করো, কিন্তু পাপীকে নয়— এই আপ্তবাক্য অনুসারে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের এখন নানা ধরনের শিক্ষা ও নিজস্ব গুণাবলি প্রকাশের সুযোগ দিয়ে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। বন্দিদের জীবন কিছুটা সুসহ করার জন্য এখন জেলখানার ভেতরটা অনেক খোলামেলা করা হয়েছে, এমনকী এ কথাও জানা গেল যে, কোন রাজ্যের জেলে যেন ছোট ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসেরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। কারাবাস যদি এমন আরামদায়কই হয়, তা শুনে মনে একটা কু-চিন্তাও জাগে। তা হলে তো কোনও এক দিন আমার মতন এক জন সাধারণ মানুষও রাস্তায় বেরিয়ে, যার ওপর রাগ আছে এমন এক জন মানুষের পিঠে হালকা ভাবে (যাতে সে মরে না যায়) একটা ছুরি বসিয়ে দিতেই পারে, যাতে দু-একটা বছর দিব্যি সরকারি খরচে জেলের অভ্যন্তরে ছুটি কাটিয়ে আসা যায়।
না, ঠাট্টা-ইয়ার্কির বিষয় নয়। সংশোধন আগারগুলিতে সত্যিই অনেক ভাল কাজ হচ্ছে। কিছু পেশাদার খুনি আর অসংশোধনীয় বদ চরিত্রদের কথা বাদ দিলে, অধিকাংশ অপরাধীই একটা কুকীর্তি করে ফেলে তাৎক্ষণিক ঝোঁকের মাথায় কিংবা ক্রোধ নামে দ্বিতীয় রিপুর বশে। পরে কৃতকর্মের জন্য তাদের সাজা পেতেই হয়, কিন্তু তার মধ্যেই যদি তাদের অন্তর্গত গুণপনা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়, তা হলে তারা মুক্তি পাওয়ার পর সুস্থ নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। দেখা গেছে, তাদের কেউ কেউ ভাল ছবি আঁকে বা মূর্তি গড়ে, গান গায়, ভাল করে শেখালে শিল্পসম্মত নাটকে অভিনয়ও করে। অলকানন্দা রায়ের উদ্যোগে ও প্রযোজনায় কয়েদিদের ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ বহু প্রশংসিত হয়েছে।
এবং কেউ কেউ গল্প-কবিতাও রচনা করতে পারে। সেগুলির সাহিত্যমূল্য কতখানি, সে বিচারের চেয়েও বড় কথা, ভাষার মাধ্যমে তাদের আত্মপ্রকাশের স্পৃহা। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। এই সব অপটু হাতের রচনাগুলির মধ্যে হঠাৎ কোনও কালজয়ী সৃষ্টির সন্ধান পাওয়া খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। তেমন দৃষ্টান্তও আছে। ফরাসি দেশে জ্যঁ জেনে নামে এক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, কুখ্যাত কয়েদি এমন একটা উপন্যাস লিখে ফেলেন (আওয়ার লেডি অব দা ফ্লাওয়ার্স), যা গোপনে বাইরে পাচার হওয়ার পর ছাপা হলে ফরাসি সাহিত্যে বিপুল আলোড়ন হয়। জ্যঁ পল সার্ত্র এবং অন্যান্য অনেক লেখক ও চিন্তাবিদ সরকারের কাছে এই বন্দির মুক্তির জন্য আবেদন করেন। সার্ত্র এই অসাধারণ লেখকটিকে ‘সন্ত জেনে’ আখ্যা দিয়ে একটা বইও লিখে ফেলেন। মুক্তি পাওয়ার পর জ্যঁ জেনে আরও অনেক নাটক ও উপন্যাস লিখে ফরাসি সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেয়ে যান।
আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে কয়েদিদের রচনা নিয়ে একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হচ্ছে। সেই পত্রিকার উদ্বোধন উপলক্ষে জেলের অভ্যন্তরেই এক সভা। সেখানে উপস্থিত কারামন্ত্রী থেকে শুরু করে আরও দু’চারটি লেখক, শিল্পী, গায়ক এমনকী ইয়ান জ্যাক নামে এক সাহেব লেখক পর্যন্ত। সবাই বক্তৃতায় ভাল ভাল কথা বলছেন, সেটাই স্বাভাবিক। তারই মধ্যে একটি ছোট্ট ঘটনা উপলক্ষেই এই রচনা।
লম্বা হলঘর, শ্রোতারা সবাই এই জেলখানার অধিবাসী। তাদের মধ্যে এক জন, বিশিষ্টদের বক্তৃতার মাঝখানে হাত তুলে বলল, সেও কিছু বলতে চায়। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী তাকেও ডাকা হল মঞ্চে। সেই মুসলমান যুবকটি মাইকের সামনে এসে গভীর অভিমানের সুরে বলল যে, তিন বছর ধরে সে বিনা বিচারে বন্দি হয়ে আছে। তার কী অপরাধ, কিংবা কত দিন শাস্তি হবে সে জানে না। যত বারই তার কেস ওঠে, তত বার জানা যায়, ম্যাজিস্ট্রেট অনুপস্থিত, আবার একটা ডেট পড়ে। এই তিন বছরে তার বাড়ির লোকজন চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। ‘আমাকে আর কত দিন এই অবস্থায় থাকতে হবে?’
সবাই চুপ! কে উত্তর দেবে? কারামন্ত্রীরও এক্তিয়ারের মধ্যে এটা পড়ে না। হায় গণতন্ত্র!
অসমাপ্ত বাঙালির ইতিহাস
‘বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব’ একখানি অতি মূল্যবান গ্রন্থ। পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস, অথচ সুখপাঠ্য। বাংলা ভাষার সম্পদ। কিন্তু আফশোসের বিষয় এই যে, নীহাররঞ্জন রায় শুধু আদিপর্ব রচনা করেছেন, পরবর্তী পর্ব আর লেখেননি৷
বেশ কিছু বছর আগে, এক ভোজসভায় নীহাররঞ্জন রায়ের একেবারে মুখোমুখি পড়ে গিয়ে এক খুদে লেখক বিনীত ভাবে অনুযোগ করেছিল, আপনি আদি পর্বের পর আর কিছু লিখলেন না কেন? বেশ রাশভারী ব্যক্তিত্ব ছিল নীহাররঞ্জনের, কিন্তু তিনি এক সামান্য লেখকের প্রশ্ন নস্যাৎ করে দিলেন না। সস্নেহে বললেন, ব্যাপার কী জানো, এক সময় আমি রাজনৈতিক কারণে জেল খেটেছি, তখন হাতে অনেক সময় ছিল, বইপত্রও পাওয়া যেত, তখনই ওই বইয়ের অনেকখানি লিখে ফেলেছিলাম। তার পর বাইরে বেরিয়ে এসে অন্যান্য কাজে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে আর ও-বিষয়ে লেখার সময় পাইনি।
অসীম সাহস সঞ্চয় করে খুদে লেখকটি তৎক্ষণাৎ বলে ফেলল, তা হলে তো আপনাকে এক্ষুনি আবার জেলে ভরে দেওয়া উচিত, তাতে বাংলা সাহিত্যের অশেষ উপকার হবে।
বলাই বাহুল্য, সে ছোকরার এই প্রস্তাবে কেউ কর্ণপাত করেনি। সে কারণে বাংলা তার বাকি ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল।
বই উদ্বোধন অনুষ্ঠান
আজকাল সারা বছর ধরেই বই উদ্বোধন অনুষ্ঠান হয়। হল ভাড়া করে, কিংবা কোনও প্রকাশ্য জায়গায় চেয়ার-টেবিল পেতে, একটা নতুন বই রাংতায় মুড়ে, ফিতে বেঁধে দেওয়া হয় উদ্বোধকের হাতে। তিনি ফিতের গিঁট খুলতে গিয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েন, কিংবা রাংতাটা সহজে ছিঁড়তে চায় না। যা-ই হোক, আবরণমুক্ত সেই বই উদ্বোধক হাসি-হাসি মুখে উঁচুতে তুলে ধরেন, সামনের কিছু লোক হাততালি দেয়। শুধু উদ্বোধকই নন, আরও দু’তিন জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও টেনে-হিঁচড়ে এনে বসানো হয় মঞ্চের ওপর। কেউই বইটি আগে দেখেননি, তবু সেই বই ও লেখক সম্পর্কে অনেক সুধা-বাক্য উচ্চারণ করেন, তাতে লেখক বা উক্ত বইটির কী উপকার হয়, তার কোনও পরিসংখ্যান নেই অবশ্য।
একটি স্মরণীয় বই-উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ছোট্ট স্মৃতিকথা এখানে লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাই। সত্যজিৎ রায়ের ‘আওয়ার ফিলম্স, দেয়ার ফিলম্স’ নামের বইটির উদ্বোধন অনুষ্ঠান হয়েছিল প্রচুর জনসমাগমে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে৷ উদ্বোধক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রধান অতিথি নীহাররঞ্জন রায়। নীহাররঞ্জন চোস্ত ইংরেজিতে অতিশয় সারগর্ভ বক্তৃতা দিলেন। উদ্বোধক সুনীতিকুমার বাংলায় বললেন, তিনি বইটি আগে পড়েননি, তবে উদ্বোধকরা সবজান্তা হন, তাঁরা যে-কোনও বিষয়ে বক্তৃতা দিতে পারেন। বইটি সিনেমা বিষয়ে, তিনি সারাজীবনে আঙুলে গোনা কয়েকটি মাত্র সিনেমা দেখেছেন এবং শ্রীমান সত্যজিতের একটাও সিনেমা তাঁর দেখা হয়ে ওঠেনি। তাঁর অনেক সুখ্যাতি শুনেছেন। তবে, সত্যজিতের বাবা সুকুমার রায় তার বন্ধু ছিলেন, সেই হিসেবে এখানে বক্তৃতা দেওয়ার যোগ্যতা তাঁর অবশ্যই আছে, সুকুমার রায় বিষয়ে তিনি অনেক কিছু বলতে পারবেন!
দাঁড়াও শমন
বেঁচে রয়েছি অনেক দিন
ভালোবেসেছি কম
আরও ভালোবাসার আগে
ডাকে না যেন যম…
…যমকে ডেকে বলি, ওহে
শুনতে পাচ্ছো যম
কবিতা লেখার জন্য একটা
জীবন বড্ড কম।
প্রবাসী লেখিকা তনুশ্রী ভট্টাচার্যের কাব্যগ্রন্থ ‘ঈশ্বরীর সমান সমান’ থেকে উদ্ধৃত
৯. ২. ২০১১
‘সবাই আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে শপথ নিন’
জীবনে আমি অনেক বক্তৃতা শুনেছি, বেশ কিছু শুনতে বাধ্যও হয়েছি। কিন্তু এমন অভিনব, মর্মস্পর্শী ও মজার বক্তৃতা জীবনে শুনিনি। শোনার পর থেকেই সে অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ছটফট করছি।
বক্তা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। ভারতের যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি, ইনি তাঁদের মধ্যে এক জন। এবং একই সঙ্গে একজন কবি, কবিতার বই আছে। এবং এ দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম।
দিল্লির সাহিত্য অকাদেমির সম্বৎসর বক্তৃতায় তিনিই একমাত্র বক্তা। মঞ্চের ওপর সেই পরিচিত মূর্তি। সাত জন্মে মাথার চুল আঁচড়ান না মনে হয়, পোশাকের পারিপাট্য নেই, কখনও টাই পরেন না। এমনই ভাবভঙ্গি যে, অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসরের কথা মনে পড়ে। বক্তৃতা দেওয়ার আহ্বান জানাবার আগেই তিনি উঠে আসছেন পোডিয়ামের কাছে। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে একজন যখন তাঁর পরিচয় জানাতে গিয়ে নানাবিধ গুণাবলির উল্লেখ করছেন, তখন মাঝে মাঝে হাততালি দিয়ে উঠছেন দর্শকরা, তিনিও একবার হাততালি দিয়ে ফেলে বিহ্বলভাবে তাকাচ্ছেন এ দিক ও দিক!
বক্তৃতার বিষয় হচ্ছে, জ্ঞানের বিশ্বে ভ্রমণ। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সাহিত্য ও দর্শনের কী কী বই তাঁকে প্রভাবিত করেছে সারা জীবন, সেই কথা বলতে লাগলেন। তাঁর মতে, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিক্যাল কলেজেও ভাল ভাল সাহিত্যের বই রাখা উচিত। ছাত্রজীবনের একটা অভিজ্ঞতার কথাও বললেন, যখন তিনি চেন্নাইতে ম্যাড্রাস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, থাকেন হস্টেলে, তখন এক গ্রীষ্মে তাঁদের দেশের বাড়ি রামেশ্বরমে তুমুল ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁর বাবা-মা আছেন সেখানে, তাঁদের কোনও বিপদ হয়েছে কি না সেই উদ্বেগে কালাম তখনই সেখানে যেতে চাইলেন। কিন্তু মাসের শেষ, হাতে একেবারে পয়সা নেই। গাড়িভাড়াই বা জোটাবেন কোথা থেকে? সোজা চলে এলেন মুর মার্কেটে। সেখানে একটা দোকানে নতুন ও পুরনো বই কেনাবেচা হয়। সে দোকানে এসে তিনি একখানা বই বিক্রি করার চেষ্টা করলেন, বইখানির নাম ‘দা থিয়োরি অব ইলাসটিসিটি’। তিনি রেকর্ড নম্বর পেয়েছিলেন বলে এম আই টি-র অধ্যক্ষ তাঁকে বইটি উপহার দিয়েছেন। দামি বই। সেই পঞ্চাশের দশকেই চারশো টাকা। কালামের রামেশ্বরম যেতে ষাট টাকা লাগবে, তা পেলেই তিনি বইটি বিক্রি করে দিতে রাজি। দোকানের মালিক মাথায় টিকিওয়ালা এক প্রৌঢ় ব্রাহ্মণ। তিনি বইটা নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, এ রকম পুরস্কার পাওয়া এত মূল্যবান বই তুমি বিক্রি করছ কেন? এ বই আমি কিনতে পারব না। তার পর কালামের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, তোমার যখন এতই টাকার দরকার, আমি তোমাকে ষাট টাকা দিচ্ছি। পরে কোনও এক সময় টাকাটা জোগাড় করে আমাকে দিয়ে বইটা ফেরত নিয়ে যেও। কালাম বললেন, তিনি সারা জীবনেও সেই ব্যক্তিটির মুখ ভুলতে পারেন না।
বইয়ের কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি বলতে শুরু করলেন একটা অর্জুন গাছের কথা। তাঁর দিল্লির বাড়ির বাগানে দণ্ডায়মান এই গাছটির বয়েস একশো বছরেরও বেশি, কালামের বাবাও একশো তিন বছর বেঁচেছিলেন। শত শত ডালপালা ছড়ানো সেই বিশাল অর্জুন গাছটির সঙ্গে মাঝে মাঝেই তাঁর নানান কথাবার্তা হয় বন্ধুর মতন। গাছ তাঁর অনেক প্রশ্নের উত্তর দেন।
এ সব তো আছেই, তাঁর বক্তৃতার আসল মজা অন্য। তাঁর বক্তব্য শুনতে শুনতে শ্রোতারা এক-এক জায়গায় যেই হাততালি দিচ্ছে, অমনি তিনি বলছেন, কী, এটা ভাল লেগেছে? তা হলে আমি যা বলছি, আমার সঙ্গে সঙ্গে গলা মিলিয়ে সবাই শপথ নাও। বলো, ‘আজ থেকে আমি’…। শ্রোতারা সমস্বরে বলল, আজ থেকে আমি…। ‘এই শপথ করছি যে,’ শ্রোতারাও, এই শপথ করছি যে…। ঠিক বাচ্চাদের নামতা পড়াবার মতন।
শেষ শপথটির কথা না বললেই নয়। সেটা এ রকম:
১) আজ থেকে আমার বাড়িতে অন্তত ২০টি বই নিয়ে একটা লাইব্রেরি চালু করব, যার মধ্যে দশটি বই থাকবে বাচ্চাদের জন্য।
২) আমার মেয়ে আর ছেলে বাড়ির সেই লাইব্রেরির বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলবে অন্তত ২০০টি।
৩) আমার নাতি-নাতনিরা সেই বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলবে অন্তত দু’হাজারে।
৪) আমাদের বাড়ির লাইব্রেরিটিই হবে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি।
৫) আমরা পরিবারের সবাই মিলে সেই লাইব্রেরিতে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় কাটাব!
কালাম আরও জানালেন যে, তামিলনাড়ুর এক বইমেলায় তিনি প্রায় দু’লক্ষ মানুষের এক সমাবেশে শ্রোতাদের এই শপথ পাঠ করিয়েছিলেন। তার পর অনেকেই তক্ষুনি একসঙ্গে কুড়িখানা বই কেনার জন্য ছুটে যায়। বইমেলার অনেক দোকানই খালি হয়ে গেল এর ফলে।
পর দিন দিল্লির বড় বড় সংবাদপত্রের, যাদের বলা হয় ন্যাশনাল নিউজপেপার, কোনওটিতেই এই বক্তৃতার একটি লাইনেরও উল্লেখ আমি দেখিনি। খুনোখুনি, ধর্ষণ, ঘুষ-কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক দলগুলির ঘেষাঘেষি বা লম্বা-লম্বা আত্মপ্রচার, এই সব দরকারি খবরেই সংবাদপত্রগুলির সব পৃষ্ঠা খরচ হয়ে যায়। যে-কোনও প্রাক্তন, এমনকী রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত, তাঁদের বক্তব্য নিয়ে সংবাদমাধ্যম মোটেই মাথা ঘামাতে রাজি নয়।
আকাঙক্ষা ও শিহরন
এই দুটি শব্দ নিয়ে বেশ মুশকিলে পড়েছি। আমাদের শিক্ষা-সংস্কার অনুযায়ী আকাঙ্ক্ষা কিংবা শিহরন দেখলে ভুরু কুঁচকে যাবেই। অথচ এ রকমই তো চলেছে যত্রতত্র। আজকাল প্রুফ পাঠক নামে সম্প্রদায়টি প্রায় বিলীয়মান। অথচ কম্পিউটারও সব বানান জানে না। এই সরলীকরণের যুগে ঙ্ক্ষ-এর মতন তিনতলা শব্দ অনেকেই পছন্দ করতে পারে না। আর শিহরন-এর যে রোমাঞ্চ তা মাত্রাহীন শিহরণ হলেই যেন ভাল হয়। অনেকে ভাবে র-এর পর ণ হওয়াই তো ব্যাকরণ সম্মত। কিন্তু ব্যাকরণে ব্যতিক্রম বলেও একটা কথা আছে, তা-ও মনে রাখতে হয়।
তবে, ব্যতিক্রমেরও তো ব্যতিক্রম থাকে। আকাঙ্ক্ষাকে আকাংখা হিসেবে মেনে নিলেই বা ক্ষতি কী? শিহরনও হোক না শিহরণ। অত খুঁতখুঁতুনি না থাকাই ভাল। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, পবিত্র সরকার, সুভাষ ভট্টাচার্য এবং অশোক মুখোপাধ্যায় প্রমুখরা কী বলেন?
এবং জঙ্ঘা
‘তোমার জঙ্ঘায় রাখি চুম্বনের ফুল’, কিংবা মাখনের মতন জঙঘা আঙুলের স্পর্শে জেগে থাকে’ এই ধরনের কবিতার লাইন দেখলে খটকা লাগে। কবিদ্বয় এখানে কি জঙ্ঘা বলতে ঊরু বোঝাতে চাইছেন? জঙ্ঘা শব্দের একমাত্র অর্থ জানু অর্থাৎ হাঁটু থেকে গুল্ফ পর্যন্ত পায়ের অংশ। সেই অংশটা কি চুম্বনের উপযুক্ত স্থান? পদতলে চুম্বনের কবিপ্রসিদ্ধি আছে। নারীর উরুর সঙ্গে মাখনের উপমা দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু মাঝখানের হাঁটু? হাঁটু থেকে গুল্ফ এই অবয়বটুকু কাব্যে উপেক্ষিতই বলা যায়। অথচ শব্দটি কাব্যময়। কাঞ্চনজঙ্ঘা শব্দটির প্রকৃত উৎস যা-ই হোক, বাংলায় শ্রুতিমধুর এই শব্দটিকে পাহাড়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত বলে মেনে নিতে মন চায় না। তবু, কবিদের যতই আবদার থাক, জঙ্ঘার অর্থ বিস্তার ঘটলে কি হাঁটু থেকে আরও ওপর পর্যন্ত টেনে তোলা সম্ভব হবে?
২৩. ২. ২০১১
Chapter - 3
আমার সংক্ষিপ্ত কেরল দর্শন
এবারে আমার চতুর্থ বার কেরলে আসা। এক সময় প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছি, অরুণাচল ছাড়া সারা ভারতের কোনও রাজ্যই আমার অদেখা নয়। তবে, অনেক বছর অন্তর অন্তর এলে কিছু পরিবর্তন তো চোখে পড়বেই।
কোচি বা কোচিন শহরে এসেছিলাম প্রায় আঠারো বছর আগে। তখন কোচির বদলে এর্নাকুলম নামটাই বেশি পরিচিত ছিল, হাওড়া-কলকাতার মতন দুই সন্নিহিত জনপদ এখন বৃহত্তর কোচি, বিমানবন্দরের নামও তাই। সেখান থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে নগরের দিকে আসতে আসতে মনে হল, রাস্তার তো যথেষ্ট উন্নতি হয়েছেই, দু’দিকে আধুনিক কায়দার অনেক বাড়িঘর, সব মিলিয়ে বেশ একটা পরিচ্ছন্নতার ভাব, কলকাতা শহরে যে-ভাবটা আজও নেই। এখানে যেখানে সেখানে আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়ে না, প্লাস্টিক-পলিথিনের থলি কোথাও ডাঁই করা নেই। একেবারে নেই তা নয়, দু’চারটি আছে এখানে সেখানে, তবে খুবই কম। ভারতের উত্তর বা পূর্ব অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণের দিকে পরিচ্ছন্নতা বোধ অনেক বেশি। তার কারণ, আর্যরা পরিচ্ছন্নতার তেমন ধার ধারে না, সেই তুলনায় অনার্য দ্রাবিড় জাতি অপরিচ্ছন্নতা সহ্য করে না। অমিশ্র আর্যদের উদাহরণ এখন কাবুলিওয়ালারা। তাদের আর যত গুণই থাক, পরিচ্ছন্নতার আদর্শ হিসেবে বোধহয় গণ্য করা যায় না। আমরা বাঙালিরা আর্য-অনার্যের দো-আঁশলা, আমাদের কোনও পরিচ্ছন্নতার আদর্শই নেই। এমনকী, এই বাংলাতেও সাঁওতাল ওরাওঁদের বাড়িঘর, সামান্য কুড়েঘর হলেও ঝকঝকে তকতকে। প্রায় এক ঘণ্টার বেশি যাত্রায় গাড়ি লাফিয়ে উঠল না এক বারও, কোথাও খানাখন্দ নেই, পথের হাড়গোড় বেরিয়ে আসেনি। এর পরেও, কয়েক দিন ধরে অনেক গ্রাম-গঞ্জের রাস্তাতেও ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে আমাকে, সব রাস্তাই হাইওয়ে নয়, তেমন চওড়াও নয়, কিন্তু গৰ্তমুক্ত, মসৃণ। আমাদের দিকেও প্রধান প্রধান রাজপথগুলির বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে, কলকাতা থেকে দুর্গাপুর যাওয়ার পথ যেন বিলেত-আমেরিকার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়, কিন্তু শাখাপথগুলি দিয়ে বাংলার অভ্যন্তরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এই রাস্তায় যারা সাইকেল চালিয়ে যায়, তারা কত বীরপুরুষ। যে-সব রাস্তায় খানাখন্দ বুজিয়ে মেরামত করা হয়েছে, সেই সব রাস্তাও কিছুতেই মসৃণ হয় না। আমরা কি মসৃণতার কথা ভুলেই গিয়েছি?
এখানে এক-একটা মোড়ে লালবাতিতে গাড়ি থামলেই তো জানলায় জানলায় শিশু কোলে মা, কানা-খোঁড়া সাজা অভিনেতারা হানা দেয় না। ভিখিরিরা সব গেল কোথায়? এ রাজ্যের সব ভিখিরিকে কি দিল্লি-কলকাতায় চালান করে দেওয়া হয়েছে নাকি?
আমাকে আসতে হয়েছে একটি বিশেষ কাজ উপলক্ষে। ‘বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে’ গৃহিণীও তৈরি। পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, এমন কথা এ যুগে উচ্চারণ করাও বিপজ্জনক। যে-হেতু সতী শব্দটির কোনও পুংলিঙ্গ নেই, তাই স্ত্রীর সতীত্ব বিষয়ে সামান্য ইঙ্গিতও সংবিধানে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। (স্ত্রীলিঙ্গ, পুংলিঙ্গ এই শ্রুতিকটু শব্দ দু’টি ব্যাকরণ থেকে বাদ দিলে হয় না? স্ত্রীবাচক, পুরুষবাচক বললে ক্ষতি কী?)
স্বাতীও সঙ্গে আসছে জেনে আমার দু’জন প্রবাসী বন্ধু, যারা প্রতি বছরই আসে প্রাক্তন স্বদেশে, সেই অসীম রায় আর দীপ্তেন্দু চক্রবর্তী বলল, তা হলে আমরাও কেরলে বেড়িয়ে আসি। এবং বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়, সদাব্যস্ত বিশিষ্ট আবৃত্তিকার ও থিয়েটার পাগল সৌমিত্র মিত্র এবং তস্য পত্নী মুনমুনও দু’দিন পর এসে উপস্থিত। অর্থাৎ, বেশ একটি পুরুষ্টু দল। তার ফলে হল কী, আমি যখন কোনও সেমিনার কক্ষে বসে রবীন্দ্রনাথের ইংরিজি রচনা বিষয়ে বক্তৃতা শুনতে শুনতে অতিকষ্টে চোখ ভোলা রাখার চেষ্টা করছি ও নিজের কোমরে নিজেই চিমটি কাটছি, তখন ওরা দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে সমুদ্রকিনারে কিংবা ঐতিহাসিক গন্তব্য স্থানগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধের পরের আড্ডায় ওরা সমস্বরে উচ্ছ্বসিত ভাবে জানায় যে, ভ্রমণের পক্ষে কেরল রাজ্যটি অতি উৎকৃষ্ট, যেমন দ্রষ্টব্য ও বিশ্রামের স্থান অনেক, তেমনই যাতায়াত ও থাকার জায়গার সুবন্দোবস্ত আছে, লোকজনের ব্যবহার ভাল, নানা দেশের পর্যটকদের ভিড় কিন্তু কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। তুলনামূলক ভাবে ওরা যখন পশ্চিমবাংলার সমালোচনা করতে থাকে, তখন আমার গোপন দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
আমাদের বাংলাতেও আছে সুন্দরবন ও দার্জিলিং-এর মতন দু’টি বিশ্ববিখ্যাত স্থান। এক কালে আমরাও তো দেখেছি, আমাদের বাংলায় কত হরেক রকমের সাহেব-মেম, আফ্রিকান ও আরবীয়, জার্মানিদের ঘুরে বেড়াতে। এরা প্রত্যেকেই এক-একটি জীবন্ত ফরেন এক্সচেঞ্জ। এখন আর তারা আসে না। হায় দার্জিলিং। কেন রে ভাই, তোরা দার্জিলিংকে আলাদা করার জন্য আত্মধ্বংসী আন্দোলন চালাচ্ছিস? যতই দাবিদাওয়া থাক, পশ্চিমবাংলাকে আবার টুকরো করার প্রস্তাব বাঙালিরা কি কিছুতেই মেনে নেবে? নাঃ। শিলিগুড়ির কাছে দেওয়াল তুলে দিলে গোর্খাল্যান্ডের মানুষ নীচে নামবে কী করে? শুধু পাহাড়ে থাকলে খাওয়া জুটবে?
কেরলের পথঘাটের বহির্দৃশ্যের সঙ্গে আমাদের বাংলার একটা তফাত অতি প্রকট। এখানেও তো নির্বাচন আসন্ন, কিন্তু কোথাও বড় বড় পোস্টার, নেতা-নেত্রীর অবয়বের কাট-আউট কিংবা মাইলের পর মাইল জুড়ে পতাকা লটকানো নেই। কাট-আউটের কালচারটা বোধহয় আমরা তামিলনাড়ু থেকে আমদানি করেছি। আমার কাছে এটা নির্লজ্জতা বলে মনে হয়। কোথাও কোনও মিছিলের জন্য পথ অবরোধের অভিজ্ঞতা আমাদের হয়নি। খবরের কাগজেও কোনও দলীয় সংঘর্ষ, খুনোখুনির সংবাদও তো চোখে পড়ল না। এ আমারই চোখের দোষ নাকি? এ রাজ্যে হিন্দু ও মুসলমান ছাড়া খ্রিস্টধর্মীয়দের সংখ্যাও কুড়ি-বাইশ শতাংশ, মন্দির-মসজিদের তুলনায় সুদৃশ্য গির্জার সংখ্যাই বেশি। তবু ধর্মীয় হানাহানির কলঙ্ক এই রাজ্যে সবচেয়ে কম। ভোটের সময় সম্প্রদায় বিশেষের তোষামুদি ও টানাটানির মতন অগণতান্ত্রিক ব্যাপার এ রাজ্যেও চলে কি না, তা আমরা বাইরে থেকে এসে কী করেই বা বুঝব?
একটা ব্যাপারে পশ্চিমবাংলা এ রাজ্যের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিজনক। খাবারদাবারের দাম এখানে যথেষ্ট বেশি। একটা ডাবের দাম কুড়ি টাকা, বাংলায় দশ টাকা। মাছ প্রচুর। কোচির মাছের বাজার বিখ্যাত, এত রকমের মাছ ও চিংড়ির বৃহৎ আকার খুবই দৃষ্টি-লোভন, কিন্তু দাম শুনলে বুক কেঁপে যায়। তবে, মুনমুন ও স্বাতীর মতে, শহরের বিশাল বিশাল দোকানে শাড়ির দাম কলকাতার তুলনায় অনেক সস্তা। এর সত্যতা, কিংবা শাড়ি বিষয়ে কোনও রকম মত দেওয়ার অধিকার অবশ্য পুরুষদের নেই।
এখানকার অনেক অংশের নামই বদলে গিয়ে আদিতে ফিরে এসেছে। যে অঞ্চলটিকে আমরা আলেপ্পি বলে জানতাম, এখন সেটি আলাপ্পুঝা, সেখানেও ব্যাকওয়াটারে বজরাভ্রমণ একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বিশাল বিশাল সব বজরা, কিন্তু এখন যন্ত্রচালিত, ভেতরে আরামের সব রকম ব্যবস্থা, ঝকঝকে বাথরুম। সারা দিন চলন্ত জলপথ ও দু’পাশের গাছপালার দৃশ্য দেখে মনে পড়ে এক কালের পূর্ববঙ্গের স্বাস্থ্যবতী নদীগুলির কথা, সুন্দরবনের সঙ্গে বেশ মিল আছে। হায়, আমাদের সুন্দরবনে এমন ব্যবস্থা করা যায় না?
বজরার ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ছোট ছোট মাছ ধরার ডিঙিনৌকো, আমাদের দীপ্তেন্দু ও সৌমিত্র অতি মাত্রায় মৎস্যপ্রেমিক, জেলেদের ডেকে ডেকে কেমন মাছ কে ধরেছে, তার খোঁজখবর নেয়। এক জায়গায় সোনার খনি আবিষ্কারের মতন ওরা উল্লাসধ্বনি করে উঠল। একটা ডিঙিতে রয়েছে ছটফটে কই ও মাগুর মাছ। কই মাছ ভারতের অনেক রাজ্যে এবং অনেক অনেক দেশেই পাওয়া যায়, ভিয়েতনাম এবং চিনেও, কিন্তু বঙ্গদেশীয়রা মনে করে, ইলিশের মতন কই-ও বাঙালি-মাছ। হয়তো তার একটা কারণ এই যে, বাঙালিরা কই মাছ (এবং মাগুরও) জ্যান্ত না থাকলে ছোঁয় না, তাই তারাই এই মাছের প্রকৃত স্বাদ পায়, অন্য অনেক জায়গাতেই মৃত কই মাছ বাজারে বিক্রি হয়। এখানকার কইগুলি আকারে যথেষ্ট বড়, হৃষ্টপুষ্ট এবং ভুড়িদাস, অর্থাৎ ডিম ভরা, দাম অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা, দুশো টাকা কিলো। কলকাতার বাজারে পাঁচ-ছশো তো হবেই, মাগুরও সেই রকম। অত্যুৎসাহী যুবকদ্বয় অবিলম্বে মাছ কিনে স্থানীয় লোক ডেকে কাটাকুটি করে ফেলল। আমাদের বজরার পাচকরা পমফ্রেট বা সুরসাই ছাড়া অন্য মাছ রান্না করতে জানে না। সৌমিত্র রান্নাঘর দখল করে কই-ফুলকপির ঝোল ও মাগুর মাছের কালিয়া প্রস্তুত করে ফেলল। এ রকম পরিবেশে, পরিচিত লোভনীয় মাছের ঠিকঠাক রান্নায় যেন স্বাদ অনেক গুণ বেড়ে যায়।
আর একটি অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। ফোর্ট কোচি অঞ্চলে অনেক ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য স্থান আছে, এবং রয়েছে গোটা দু-এক প্রাচীন হিন্দু মন্দির। শুধু হিন্দু ছাড়া কারও সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। এবং হিন্দুদেরও ড্রেস কোড আছে। পুরুষদের গায়ে জামা থাকবে না, এবং ধুতি পরতে হবে। আমরা আর ধুতি পাব কোথায়, আর বিগ্রহ দেখার জন্য তেমন কিছু দারুণ আগ্রহও নেই। মেয়েদের কোনও শর্ত নেই। স্বাতী চলে গেল ভেতরে। মন্দিরের দরজার পরেই দু’পাশে দুটি রোয়াক, তার পর প্রশস্ত চাতাল। তারও খানিক দূরে মূল গর্ভগৃহ। আমরা অনেকক্ষণ হেঁটেছি, আমি আর অসীম ভাবলাম, স্বাতীর অপেক্ষায় সেই রোয়াকে একটু বসি। দু’জনে রোয়াকে সবেমাত্র পশ্চাৎদেশ ঠেকিয়েছি, অমনি দূর থেকে এক তরুণ, বলবান পুরোহিত রে রে করে তেড়ে এসে বলতে লাগল, গেট আউট। গেট আউট। প্রায় গলাধাক্কা দিয়েই আমাদের বার করে দিল। এই বয়সেও কেউ হঠাৎ হঠাৎ এ রকম অপমান করলে মন্দ লাগে না। বেশ হাসিই পায়।
সেই চোখ
বিশিষ্ট শিল্পী ও আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ শ্ৰীমতী দীপালি ভট্টাচার্যের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথের ছবি, চিঠিপত্র ও পাণ্ডুলিপির একটি প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। এক ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত কিছু ছবি এবং আর্ট কলেজের নিজস্ব সংগ্রহের কয়েকটি ছবি ও স্কেচ। এর মধ্যে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এর মধ্যে অনেক ছবি রবীন্দ্রনাথের নিজের আঁকা নয়, জাল। চমকে উঠেছি। এমন কথা আগে কখনও শুনিনি। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নেই, তবু কেউ কেন এ সব কুকর্ম করবেন, তা আমার বুদ্ধির অগোচর। আমি শিল্পবিশেষজ্ঞ নই, এ বিষয়ে একমাত্র মতামত দেওয়ারও অধিকার আমার নেই। যাঁরা পণ্ডিত, তারাই মীমাংসা করবেন। ছবিগুলি দেখতে দেখতে আমার রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য ছবির মতনই লাগছিল। এবং কয়েকটি রমণীর মুখ-আকৃতি দেখে অন্য একটা কথা মনে পড়ল। রবীন্দ্রনাথের আঁকা আরও যত নারীর মুখ দেখেছি, সবগুলির চোখ যেন একই রকম। সেই চোখ, কাদম্বরী দেবীর যে একটি ছবি পাওয়া যায়, তার চোখের যেন আশ্চর্য মিল। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু হয় রবীন্দ্রনাথের তেইশ বছর বয়সে। তার পঁয়তাল্লিশ বছর পরে ছবি আঁকতে বসে কবির সেই পরম প্রীতিময়ী নতুন বউঠানের চোখের কথাই মনে পড়েছে? রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদ্য-মুদ্রিত ‘লিখিনু যে লিপিখানি’ নামে বইটিতেও যেন এ রকমই ইঙ্গিত আছে।
এবং জাল বই
লেখকের বিনা অনুমতিতে, লেখককে সব রকম ভাবে বঞ্চিত করে জাল বই প্রকাশ করার প্রবণতা আছে আমাদের পাশের একটি রাষ্ট্রের। শুধু জাল বই নয়, তার চেয়েও মারাত্মক, এক লেখকের বই অন্য কোনও লেখকের নামে প্রকাশ করা। কিংবা কোনও অক্ষমের লেখা গ্রন্থে এক জন খ্যাতিমান সাহিত্যিকের নাম বসিয়ে দেওয়া। সমরেশ মজুমদার এই দুষ্কর্মের শিকার হয়েছেন। এই ব্যাধি এ বার পশ্চিমবাংলাতেও অনুপ্রবেশ করেছে। এ বারের বইমেলাতে একাধিক জাল বই আমরা অনেকেই চাক্ষুষ করেছি।
এই কুকার্যের একটি নবতম উদাহরণ এ বার টি ভি-র পর্দায়। ‘কেয়াপাতার নৌকো’ এবং ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, দুটিই বাংলা ভাষার বিখ্যাত উপন্যাস। দুটিরই মূল বিষয় দেশভাগজনিত পরিস্থিতি। যথাক্রমে প্রফুল্ল রায় ও অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে, একটি উপন্যাসের কাহিনির মধ্যে অন্য উপন্যাসটির অনেক চরিত্র ও ঘটনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যথেচ্ছ ভাবে। উদাহরণগুলি এতই প্রকট যে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এ রকম ঘটনা প্রফুল্ল রায়ের কাছে যেমন লজ্জার, তেমনই অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মাহত হওয়ার নিশ্চিত কারণ আছে। যাঁরা এই সব করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে শুধু বলতে পারি, ছি ছি ছি।
০৯. ৩. ২০১১
‘আমার হ্যাপি হোলি বলতেই ভাল লাগে’
হরিদাস কর, সে আবার কে হরিদাস পাল?
একটা বেশ বড় গানবাজনার দোকানে একটি যুবক ঢুকে এসে এক বিক্রয় কর্মীর সামনে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনাদের কাছে কি বাই এনি চান্স হরিদাস করের কোনও সিডি আছে?
কর্মটি ভুরু কুঁচকে বলল, হরিদাস কর? কোনও দিন নাম শুনিনি তো!
সে তার পাশের অন্য এক সহকর্মীর দিকে তাকাতেই দ্বিতীয়জন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, নেভার হার্ড দ্যাট, নেই৷ কী করেন তিনি, সেতার-সরোদ বাজান, আবৃত্তি করেন নাকি?
যুবকটি বলল, তিনি একজন গায়ক ছিলেন। অনেক দিন আগেকার।
কর্মীটি বলল, নাঃ! ও রকম কোনও গায়কের নাম আমিও শুনিনি, আমার বাবাও শোনেননি।
যুবকটি কিছুটা হতাশ হয়ে ফিরে যেতে শুরু করল।
তখন এক বিক্রয়কর্মী তার সহকর্মীর দিকে ভুরু নাচিয়ে বলল, হরিদাস কর, সে আবার কোন হরিদাস পাল?
আমি পাশে দাঁড়িয়ে অন্য কিছু কেনা-কাটায় ব্যস্ত ছিলাম, এই মন্তব্যটি শুনে বেশ মজা লাগল। আমাদের ছাত্র বয়েসে বিদ্রুপাত্মক ‘কে হে তুমি হরিদাস পাল?’ এই কথাটা খুব চালু ছিল। এই উৎপ্রেক্ষাটির উৎস কী, তা আমি জানি না। হরিদাস পাল নামে কি কোনও জ্যান্ত লোক ছিলেন? ‘হরি ঘোষের গোয়াল’ কিংবা ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’— এই ধরনের উপ-প্রবাদ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু হরিদাস পাল তা থেকে বঞ্চিত। আমার ধারণা ছিল, এখন আর হরিদাস পালের ব্যাপারটা চালু নেই, কিন্তু এই তো শুনতে পেলাম অনেক দিন পর।
এক দিকের কাউন্টারে বসে থাকেন এক বৃদ্ধ। তিনি এই দোকানটির মালিক কিংবা অতি প্রবীণ ম্যানেজার। তিনি বোধহয় ওই কথোপকথনের কিঞ্চিৎ শুনতে পেয়েছিলেন। প্রস্থানোদ্যত যুবকটিকে ডেকে বললেন, এই যে ভাই শোনো তো!
বাইরে অকালের বৃষ্টি পড়ছে বেশ ঝমঝমিয়ে, দোকানটি তাই এখন খুবই খদ্দের বিরল, আমার পক্ষেও এখন বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়।
বৃদ্ধটি সেই তরুণকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার রেকর্ডের কথা জিজ্ঞেস করছিলে?
সে বলল, আজ্ঞে, হরিদাস কর। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এখন অনেকেই তাঁর নাম জানবে না। তিনি একজন গায়ক ছিলেন।
বৃদ্ধ প্রায় ধমকের সুরে বললেন, গায়ক ছিলেন মানে? অতি অপূর্ব গায়ক, মধুক্ষরা কণ্ঠস্বর যাকে বলে। গত পঁচিশ-তিরিশ বছরের মধ্যে কেউ তার রেকর্ডের কোনও খোঁজখবর করেনি। এক সময় জনপ্রিয় ছিলেন, বোধহয় একখানাই সেভেন্টি এইট কিংবা ফর্টি ফাইভ আর পি এমের রেকর্ড ছিল। তখন গ্রামাফোনের যুগ। রেডিয়োতে তাঁর গান প্রায়ই বাজত। তোমারও তো অল্প বয়েস। তুমি তাঁর নাম জানলে কী করে?
যুবকটি বলল, হরিদাস কর মশাই আমার ঠাকুরদার বন্ধু ছিলেন। আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে আসতেন। আমার অবশ্য সে কথা মনে নেই। দাদু মাঝে মাঝে তাঁর গান গুনগুন করেন। দাদুর বয়েস এখন ঊননব্বই। ক’দিন ধরেই আমাকে বলছেন, হরিদাসের গান শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। যা না, ওর একখানা রেকর্ড কিনে নিয়ে আয়। আমি জানতাম, পাওয়া শক্ত হবে, তবু ওঁর শেষ বয়সের শখ।
বৃদ্ধ বললেন, পাবে না। ও-সব রেকর্ড আর ছাপা হয় না। হরিদাস কর ইজ ফরগটন ফর এভার। উনি কী গান গাইতেন জানো? পদাবলি কীর্তন। তুমি হাতে যে মোবাইল ফোনটা ধরে আছে, তাতে কয়েক মিনিট রেকর্ড করা যায়? আমি ওঁর গান কয়েক লাইন গেয়ে দিচ্ছি, তুমি তোমার দাদুকে শুনিয়ো।
যে-গানের রেকর্ড পাওয়া যায় না, সেই গান দোকানের মালিক নিজে গেয়ে শুনিয়ে দিচ্ছেন, এমন দৃষ্টান্ত ভূ-ভারতে আর কোথাও আছে কি না জানি না। আমি অন্তত তেমন কিছু জানি না।
তিনি গাইলেন—
ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না/ছুঁয়ো না হে কানাই ছুঁয়ো না/ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না নিলাজ কানাই/ আমরা পরের নারী/তুমি কথায় কথায় ছুঁয়ো না হে…
বৃদ্ধের গলা বেশ তৈরি। টপ্পার কাজও ভাল খোলে। দোকানদার না হয়ে তিনি নিজে গায়ক হলেন না কেন, কে জানে। আমার কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।
গানটা হঠাৎ থামিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শুনেছ?
ছেলেটি বলল, অবশ্যই শুনেছি। আমাদের বাড়িতে গান-বাজনার চর্চা আছে।
বৃদ্ধ বললেন, নাম শুনেছ। তাঁর কোনও গান জানো? অমন পদাবলি কীর্তন, আহা একেবারে দেবদত্ত কণ্ঠস্বর। যেমন সুরেলা, তেমন তেজালো, তেমনই মধুর। বয়েসকালে ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের গলা তোমাদের ওই সুচিত্রা মিত্তির আর কণিকা বাড়ুজ্যের চেয়েও মানে, আমি শুনে একেবারে মোহিত হয়ে যেতাম। এমন এক জন গায়িকা, অথচ কত জন আর তাঁকে মনে রেখেছে? কীর্তনের যুগই আর নেই, বুঝলে।
বাঙালির একেবারে নিজস্ব গান বলতে যদি কিছু বোঝায়, তা হচ্ছে এই কীর্তন। অন্য কোনও ভাষায় এমন কীর্তন আর নেই। কীর্তন আর ভজন কিন্তু এক নয়! কোথায় গেলেন রথীন ঘোষ! আর ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়কেই যদি লোকে ভুলে যায়, তা হলে রাধারাণী দেবী, আরও অনেকে… আর ভাবো তো কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কথা, কত বড় গায়ক, শিশির ভাদুড়ীর ‘সীতা’ প্লে-তে গান গেয়ে ফাটিয়েছেন, চোখে ভাল দেখতেন না বলে লোকে আড়ালে নাম দিয়েছিল কানা কেষ্ট। কত গান গেয়েছেন! তার মধ্যে কীর্তনও। ওঁর একটা ভাইপো ওই মান্না দে, খুব নাম করেছে। বেশ ভাল কথা। কিন্তু লোকে কৃষ্ণচন্দ্র দে’কে ভুলে যাবে? ভাবতেই আমার গা রাগে কষ-কষ করে। বাঙালির কত বড় সম্পদ এই কীর্তন, তা বাঙালিরাই অবহেলায় হারাতে বসেছে। সাধে কি বলে, বাঙালি ওই কী যেন, কী যেন, এক আত্মবিস্মৃত জাতি, তাই না?
বৃষ্টি থেমে গেছে, তাই এই আলোচনা যতই চিত্তাকর্ষক হোক, এ বার আমরা কর্তব্যের আহ্বানে চঞ্চল হয়ে উঠি।
বাইরে বেরিয়ে আমি একটুক্ষণ কীর্তনের কথা ভাবলাম। এখনও কেউ কেউ কীর্তন গায় বটে, কিন্তু এই গান সম্পর্কে এ কালের শ্রোতাদের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে গেছে, তাও ঠিক। যদি সে গানের ধারা শুকিয়ে যায়, তা কি আর জোর করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? রবীন্দ্রনাথই তো লিখেছেন, ‘যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর।’ এ কালে বাঙালির নিজস্ব গান বলতে কী বোঝায়? অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রগীতি এমনকী আলাদা ধরনের নজরুলগীতি সত্ত্বেও এবং হালফিলের ব্যান্ডের গান, ফিল্মের গান যতই সাময়িক বুদবুদ তুলুক, বাঙালির সর্বসময়ের, সব ঋতুর, সব উৎসবের আর সবরকম মানসিক অবস্থার, সমস্ত আনন্দ ও দুঃখের প্রতিফলন আছে রবীন্দ্রসংগীতেই। এ এক অবধারিত সত্য। এবং রবীন্দ্রসংগীত নিশ্চিত ভাবে বাঙালিরই নিজস্ব গান। কারণ, যে ব্যক্তি বাংলা ভাষা ভাল জানে না, তার পক্ষে এই গানের সম্পূর্ণ রস গ্রহণও সম্ভব নয়।
জাপানি চরিত্র কথা
সুনামি শব্দটি এসেছে জাপান থেকেই। সেই সুনামিরই বিপুল আঘাতে জাপান এ বার মর্মান্তিক ভাবে বিপর্যস্ত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এত উন্নত হয়েও প্রকৃতির রোষের কাছে পরাজিত হতে হল জাপানকে।
সেই দেশের মানুষের দু’টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দু’টি অ্যাটম বোমার আঘাত খেয়ে এবং অত্যন্ত আপমানজনক শর্তে আত্মসমর্পণ করার পর জাপানের অধিকাংশ অঞ্চলই বিধ্বস্ত। এ দেশ কি আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে? এ প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই অনেকের মনে এসেছিল।
মৃতের স্তূপের পাশে, অবশিষ্ট জনগণের উদ্দেশে দেশের সম্রাট বেতার ভাষণে আবেদন জানিয়ে বললেন, দেশটাকে তো আবার গড়ে তুলতে হবে, তাই আপনাদের সকলের কাছে সাহায্য চাই। আপনারা যার যা জীবিকা, সে কাজে তো লেগে পড়বেন বটেই, তার বাইরেও প্রতিদিন দু’ঘণ্টা কল-কারখানা ও রাস্তাঘাট গড়ায় সাহায্য করার জন্য বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দান করুন। এই আমার অনুরোধ।
এ কালেও জাপানিরা সম্রাটকে দেবতার মতন ভক্তি করে। পর দিন থেকেই সব মানুষ যে-যার অফিস কাছারি, ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ সেরে আরও দু’ঘণ্টা শ্রম দান করতে লাগলেন। এর পর কেটে গেল দু’বছর। সম্রাট আবার এক বেতার ভাষণে দেশবাসীকে জানালেন, আপনাদের সাহায্যে সব কিছুই আবার অনেকটা গড়ে তোলা গেছে। কাল থেকে আর বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দান করতে হবে না। সকলকে ধন্যবাদ।
তা শুনে হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে এসে জানাতে লাগল, না, না, আমরা এখনও দু’ঘণ্টা শ্রমদান চালিয়ে যেতে চাই। ওটা আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে।
আর একবার, জাপানে বৌদ্ধ, সিস্টো, ক্রিশ্চিয়ান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পৃথক ভাবে কোন সংখ্যা কত, তার একটা সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। তার ফলাফল হিসেব করতে গিয়ে দেখা গেল, এই সব ধর্মবিশ্বাসীদের যা যোগফল, তা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি! এটা কী করে সম্ভব? আসলে, অনেক মানুষই জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছেন, আমি বৌদ্ধও বটে, সিস্টোও বটে, কিংবা আমি ক্রিশ্চান এবং বৌদ্ধ দুই-ই। অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে তাঁদের খুঁতখুঁতুনি কিংবা বিভেদ নেই।
হায়, আমরাও যদি লালন ফকিরের মতন বলতে পারতাম, আমরা হিন্দু এবং মুসলমান দুই-ই, কিংবা কোনওটাই নয়!
নতুন ভাষা
দুর্গাপুজোর ভাসানের সময় আমরা হইহই পার্টির মুখে কত বার শুনেছি, দুর্গা মাঈকি জয়! অর্থাৎ এই উল্লাসধ্বনিটি বাংলার বদলে হিন্দিতে বললেই যেন বেশি জোরালো হয়। সেই রকমই কালী মাঈকি জয়। অত্যুৎসাহীরা বলেও ফেলেছে, কার্তিক মাঈকি জয়!
বসন্ত-উৎসবকে বাঙালিরা বলে দোল, হিন্দিতে বলে হোলি। তবু দোলের দিন সকালবেলা রাস্তায় বাঙালি ছেলেরাও চেঁচাত, হোলি হ্যায়, হোলি হ্যায়! এ বারে দোলের দিনে শুনতে পেলাম, বাঙালি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পারস্পরিক সম্ভাষণ, হ্যাপি হোলি! বৈদ্যুতিন মাধ্যমের বাংলা চ্যানেলগুলিতে হ্যাপি হোলির ছড়াছড়ি। শান্তিনিকেতনে এক প্রবীণ ব্যক্তির পায়ে আবির দিয়ে একটি দশ বারো বছরের ছেলে বলল, হ্যাপি হোলি। প্রবীণ ব্যক্তিটি বললেন, খোকা, হ্যাপি হোলির বদলে, শুভ দোল কি শুনতে ভাল নয়? ছেলেটি নির্বিকার ভাবে বলল, দুটো তো একই। আমার হ্যাপি হোলি বলতেই ভাল লাগে। ছেলেটির পাশে দাঁড়ানো তার বাবা-মায়ের গর্বে উদ্ভাসিত মুখও নজরে পড়ার মতন।
কাব্য দ্বন্দ্ব
ভাই রাশিয়া, আমেরিকার বৈজ্ঞানিক ভাইরা আমার…
নিতান্ত বিরক্ত হলে আণবিক মারামারি না হয়ে বরং
জেট প্লেনে তিন টন কাব্য ফেলা হোক পরস্পরের মাটিতে,
তার পর দেখা যাবে কে কাকে হারায়?
(সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত রচিত ‘রাত আড়াইটা থেকে নিজের সঙ্গে কথাবার্তা’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত।)
২৩. ৩. ২০১১
হায় চিঠি, তোমার দিন গিয়াছে!
একখানা চিঠির খাম খুলতে গিয়ে আমার একটা আঙুল ছড়ে গেল। বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরিয়ে আসছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘হায় লাঠি, তোমার দিন গিয়াছে’র সঙ্গে গলা মিলিয়ে এখন অনায়াসে বলা যেতে পারে, হায় চিঠি, তোমার দিন গিয়াছে। আদালতের হুকুমনামা, ইনকাম ট্যাক্সের ঠান্ডা নির্দেশ কিংবা ক্লাব কমিটির নোটিস ইত্যাদি এখনও চিঠির আকারে ডাকবাক্সে আসে বটে, কিন্তু সে সবই ইংরেজিতে, যন্ত্র মুদ্রিত। কিন্তু হাতে-লেখা ব্যক্তিগত চিঠি উধাও হতে হতে এখন প্রায় ইতিহাসের সামগ্রী হয়ে উঠেছে। তা হলে চিঠিরও তো একটা ইতিহাস লেখা দরকার।
আগেকার দিনে তো আর সাধারণ লোকে চিঠিফিটি লিখত না, চিঠি লিখতেন শুধু রাজা-বাদশাহরা তাঁদের প্রতিপক্ষদের, দূত সেই চিঠি বহন করে নিয়ে যেত। পোস্ট অফিস স্থাপনের আগে চিঠি যাতায়াতে অন্য কোনও উপায় ছিল না। আমরা ক্লাস সিক্সের ইতিহাস বইতে পড়েছি, সম্রাট হুমায়ূনকে সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন যে শের শাহ, তিনি অনেক রাস্তা বানিয়েছিলেন এবং তিনিই প্রথম ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন। (এ বিষয়ে তারাপদ রায়ের রসিকতা, শের শাহের আগে কি ঘোড়ারা ডাকত না?) যত দূর জানি, ইংরেজরাই বড় বড় শহরে, এমনকী অনেক গ্রামেও পোস্ট অফিস বসায়। গ্রামের একটা ছোট্ট পোস্ট অফিস নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা চমৎকার গল্প আছে, ‘পোস্টমাস্টার’। সেই তরুণ পোস্টমাস্টারবাবুটিকে নাকি রবীন্দ্রনাথ স্বচক্ষে দেখেছিলেন। সেই গল্প যাঁরা পড়েননি, তাঁরাও দেখেছেন সত্যজিৎ রায়ের হিরের টুকরোর মতন ফিল্মটি। এক গ্রাম থেকে দূর দূর গ্রামে চিঠি যেত কী করে? গাড়ি-টাড়ি তো ছিলই না, গাড়ি চলার মতো রাস্তাও ছিল না, ঘোড়াও সহজলভ্য নয়, চিঠি ও সেই সঙ্গে মানি অর্ডার ইত্যাদি বস্তায় বেঁধে ঘাড়ে করে দৌড়ে দৌড়ে নিয়ে যেত যে মানুষটি, তাদের নাম ডাকহরকরা, ইংরেজিতে রানার। তেমন একজন রানারকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। আর সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই গান বাংলার শ্রেষ্ঠ গানগুলির অন্যতম। ইতিহাস লিখতে গেলে সমসাময়িক কবিতা, সাহিত্য গল্পের উল্লেখ করাই এ কাজের রীতি। চিঠি এলেও গ্রামে অনেককে অসুবিধেয় পড়তে হত। আজ থেকে একশো বছর আগেও অধিকাংশ গ্রামেই তো সবাই নিরক্ষর। সুতরাং খুঁজে পেতে অন্য গ্রামের কোনও স্কুলের শিক্ষক কিংবা স্বয়ং পোস্টমাস্টারকে দিয়ে সে চিঠি পড়িয়ে নিতে হত। প্রবাসী স্বামী তাঁর স্ত্রীকে চিঠি লিখলেও তাতে গোপনীয়তা রক্ষার কোনও প্রশ্নই ছিল না। নিখিল সরকার (শ্রীপান্থ) একটা গ্রামের কথা লিখেছিলেন, যে গ্রামে মাত্র একজনেরই একটা চশমা ছিল। অন্য যে বয়স্ক লোকরা মোটামুটি পড়তে জানতেন তাঁরা কোনও চিঠি পেলে উক্ত ব্যক্তির কাছেই ছুটে আসতেন চশমা ধার করার জন্য।
যাই হোক, চিঠির ইতিহাস রচনা করা আমার সাধ্যাতীত। সে কাজ অন্য কেউ করবেন। আমার মনে আসছে কিছু আশকথা পাশকথা। কবি ব্যোদলেয়ার তাঁর মাকে এক দিনে ছ’লাখ চিঠি লিখেছিলেন। আমাদের লর্ড কার্জন নাকি তাঁর স্ত্রীকে একদিনে একটি একশো পাতার চিঠি লিখেছিলেন। আমেরিকার এক কবি পল এঙ্গেল বছরে চার হাজার চিঠি লিখতেন। তাঁর বিপরীত স্বভাবের কবি অ্যালেন গিনসবার্গও চিঠি লেখায় কম যেতেন না। চিঠি লেখায় গদ্য লেখকদের চেয়ে কবিদের প্রাধান্যর কথা জানা যায়।
অন্য অনেক কিছুর মতন আমাদের বাংলায় চিঠি লেখার সম্রাট অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। কত হাজার চিঠি যে তিনি লিখেছেন! এখনও নিশ্চয়ই আরও অনেক চিঠি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। সে সবই তো পত্র-সাহিত্য। খুব সম্ভবত তিনি এক সময়ে সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর তরুণী ভাইঝি, উচ্চশিক্ষিতা ইন্দিরাকে। বাংলা সাহিত্যে সে সব চিঠির স্থান চিরকালীন। কোনও রহস্যময় কারণে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় সেই সব পত্রগুচ্ছের অনেক অংশই কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই জন্যই বইটির নাম ছিন্নপত্র। রবীন্দ্রনাথের রচনায় কাঁচি চালানোর সাহস হয়েছিল কার? সেই জন্যই সমালোচক অজিত চক্রবর্তী মন্তব্য করেছিলেন, ছিন্নপত্র গ্রন্থটির সর্বাঙ্গ হইতে রক্ত ঝরিতেছে!
সব পত্রের সার প্রেমপত্র। এখনকার ছেলেমেয়েরা কল্পনাও করতে পারবে না, মাত্র পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও প্রেমিকার কাছে কোনও প্রেমিকের চিঠি পাঠানো কত শক্ত ছিল। ডাকে পাঠানো ছিল বেশ বিপজ্জনক। অধিকাংশ বাড়িতেই মেয়েদের নামে কোনও চিঠি এলে দাদা এবং কাকাস্থানীয় তার আগেই সেটা খুলে ফেলতেন, কোনও অনাত্মীয় পুরুষের লেখা এবং তাতে বিন্দুমাত্র আবেগের বাষ্প থাকলেই সারা বাড়িতে হুলস্থুল পড়ে যেত। অনেক সময় মেয়েটিকেও বেশ লাঞ্ছনাও সহ্য করতে হত। একটি মেয়ে ডাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল তার প্রেমিক অর্থাৎ এখনকার ভাষায় বয়ফ্রেন্ডকে। সে চিঠি ছেলেটির হাতে পৌঁছল না। কিন্তু তার পর থেকে সে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে গেলে সাড়া পায় না। রাস্তায় দৈবাৎ তার মুখোমুখি (দৈবাৎ কিংবা ওঁৎ পেতে পথের মোড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর) হলে মেয়েটি বিনা বাক্যব্যয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। ছেলেটির হতবুদ্ধি অবস্থা। আসলে হয়েছে কী, মেয়েটির চিঠি ছেলেটির বাবা-মা খুলে পড়েছে। তার পর ছেলেকে ঘুণাক্ষরেও কিছু না জানিয়ে বাবা নিজেই একটা চিঠি লিখেছেন এই মর্মে, ‘মা, তোমার কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, তুমি আমার ছেলেকে ছাড়িয়া দাও। এই বয়সে এমন মেলামেশা করিলে পড়াশোনায় মতি থাকে না। ইদানীং দেখিতেছি, আমাদের পুত্রও ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঠিক মতো খাওয়াদাওয়াতেও মন নাই। তোমার প্রতি আমি আমাদের পুত্রকে ভিক্ষা চাহিতেছি,’ ইত্যাদি।
তা বলে কি প্রেমিক প্রেমিকার চিটি লেখালেখি থেমে থাকত? তারা নানা কৌশল বার করত, তার মধ্যে একটি হচ্ছে, কোথাও দেখা হলে, কোনও কথাবার্তা না বলে চট করে হাতে হাতে চিঠি বদলাবদলি করত। ছেলেটি চিঠিপত্র তক্ষুনি লুকিয়ে ফেলত পকেটে। আর মেয়েটি? তাদের পোশাকে তো পকেট থাকে না, আর কল্পনা করতে এখনও রোমাঞ্চ হয়, সে চিঠিটি কয়েক ভাঁজ করে রেখে দিত তার ব্লাউজের মধ্যে। দুই কোমল বুকের মাঝখানে। স্তন শব্দটির একটি অর্থ, যা শব্দ করে যৌবনের আগমনবার্তা জানায় সেই স্থানটি এক সদ্যযুবার দুরুদুরু বক্ষে লেখা চিঠিরই তো যোগ্যতম স্থান।
এক প্রবীণ লেখক একদিন গোপন কথার ছলে আমাকে বলেছিলেন যে, তাঁর প্রথম যৌবনে তিনি এক সদ্য পঞ্চদশী থেকে পূর্ণিমায় পৌছনো মেয়েকে ওই রকম চকিত কৌশলে রাশি রাশি চিঠি লিখেছেন। প্রায় পাঁচশো তো হবেই। উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবেগের আতিশয্যে চিঠির পর চিঠি লিখে যাওয়া। এই পরিণত বয়সে পৌঁছে তাঁর মনে হয়, সেগুলি কি সত্যি সত্যি প্রেমপত্র ছিল? নাকি সেই বয়সে গদ্য লেখায় হাত পাকাবার প্রয়াস?
শুনে আমি কোনও মন্তব্য করিনি। আমার মনে হয়েছিল, লেখকদের জীবনের প্রস্তুতিপর্বের সব কথা বোধহয় অন্যদের না জানানোই ভাল। সম্ভবত, ওই লেখকের সেই সময়কার জীবনে নারীর প্রতি ও গদ্য রচনার প্রতি মোহ একসঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল।
প্রেমপত্র সম্পর্কে আমার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। এখন তো তার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তবে মাঝে মাঝে আমি নানা ধরনের চিঠি পাই। তার কিছু তো এখনকার ভাষায় এস এম এস। অধিকাংশই কাজের কথা, ইংরেজিতে। আর কিছু রোমান অক্ষরে বাংলা ভাষায়। হ্যাঁ, বাংলা ভাষাই বটে, কিন্তু দু’বার তিন বার না পড়লে মানে বোঝা যায় না।
আর ডাকেও কিছু চিঠি আসে এখনও। তা সবই কার্ড কিংবা ছাপানো বিজ্ঞপ্তি কিংবা সভা-সমিতির খবর। কোনও এক দুর্বোধ্য কারণে এখন আঠা কিংবা গঁদের ব্যবহার উঠেই গেছে। সে সব চিঠিই স্টেপল করা থাকে। এমনকী সরকারি চিঠি পর্যন্ত। তা খুলতে গেলে আঙুল তো ছড়ে যেতেই পারে। যেমন, আজ সকালেই আমার আঙুলে রক্তের ফোঁটা। এখন আমাকে ডেটল বা কিছু অ্যান্টিসেপটিক লোশন খুঁজতে হবে। এই হল এ যুগে পত্রপ্রাপ্তির পুরস্কার।
লেখক ও চিকিৎসক
এক মধ্যবয়সী লেখকের হৃদপিণ্ডে কিছুটা খোঁচা লেগেছে, গেলেন এক নামকরা ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারটি সব পরীক্ষা-টরিক্ষা করে দেখার পর গম্ভীর মুখে বললেন, হয়েছে কিছু, তবে এখনও ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সাবধানে চললে… ওষুধপত্র লিখে দিচ্ছি, খাদ্য-অখাদ্যের একটা চার্ট, আর মৃদু ব্যায়াম…। তার পর তিনি রোগীর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললেন, দেখুন, আপনাদের মতন লেখক লেখিকাদের তো আমি চিনি। দু’পেগ, বুঝলেন, এখন থেকে দু’পেগের বেশি ড্রিঙ্ক করা চলবে না, মনে থাকে যেন—
লেখকটি কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, দেখুন, জীবনে আমি এক ফোঁটাও ড্রিঙ্ক করিনি। তবে কি এখন থেকে রোজ দু’পেগ ড্রিঙ্ক করার অভ্যাস করতে হবে?
প্রতিটি ঝগড়ার পর
প্রতিটি ঝগড়ার পর বাথরুম তোকে মনে পড়ে
প্রতিটি সঙ্গম শেষে বাথরুম তোকে মনে পড়ে
লাল সাদা বাথরুমে ঝরে পড়ে জলের শুশ্রুষা
ওগো জল, শান্তি আনো রোদে পোড়া শরীরে আমার…
প্রতিটি নির্জন শোকে বাথরুম তোকে মনে পড়ে
প্রতিটি নিস্ফলা ক্রোধে বাথরুম তোকে মনে পড়ে
এইখানে ঋতুস্রাব, এইখানে ঋতুরঙ্গ নাচ
অঙ্গে অঙ্গে কী হিল্লোল, গ্রীষ্ম বর্ষা শীত ও শরৎ…
প্রতিটি গোপন পাপে বাথরুম তোকে মনে পড়ে
প্রতিদিন অপমানে বাথরুম তোকে মনে পড়ে…
(‘বাথরুম’, আংশিক, মল্লিকা সেনগুপ্ত)
৬. ৪. ২০১১
আমাদের মা-বাবার প্রতি একটি ‘প্রণাম’
ছেলেটির ডাক নাম ডন। তার দুরন্তপনা ছিল আমাদের পাড়ায় অতি বিখ্যাত। চারতলা বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে সে সচরাচর নামত না। পাশের রেলিংয়ে চড়ে ঘোড়সওয়ারের মতোই সড়াৎ করে নেমে যেত এক এক তলা। একবার সে ঘুড়ি ধরার জন্য ছাদের প্যাপেটে নেমে হাঁটছিল, রাস্তায় লোক থেমে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে দেখছিল তাকে। সে বারে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি বটে, কিন্তু বেশ কয়েক বার এখানে সেখানে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়েছিল। ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়ে সেলাই করতে হয়েছে। এক বার সাতটা সেলাই। হাতে ধরে কালিপটকা ফাটাতে গিয়ে হাত ঝলসে গেল। আর একটি অসাধারণ কাণ্ড সে করেছিল, এক বার এক জন বেদে সাপখেলা দেখাতে এসেছিল আমাদের বাড়ির সামনে একটা রাস্তায়। হঠাৎ ডন তার ঝাঁপি থেকে একটা সাপ তুলে নিয়ে দে দৌড়। দর্শকরা ভয়ে ছিটকে সরে গিয়েছিল। সাপুড়েটি হা হা করে বলে উঠেছিল, ওই সাপটির নাকি বিষদাঁত ভাঙা হয়নি।
অনেক ছেলেই বাচ্চা বয়সে দুষ্ট থাকে। ডন ছিল দুষ্টুদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। নিত্যনতুন গল্প শোনা যেত তার দুরন্তপনার। ইস্কুলেও সে প্রায়ই ডুব মারত। বাবা-মায়ের বেশি বয়সের একমাত্র সন্তান। তাই বোধহয় বেশি আদর ও প্রশ্রয়ে তার মাথা খাওয়া হচ্ছিল।
এই ধরনের ছেলে প্রাপ্তবয়সে কী হতে পারে? ঠিক মতন লেখাপড়া না শিখে মাস্তান কিংবা গুন্ডাজাতীয় কিছু হওয়াই স্বাভাবিক। অথবা সে একজন অসাধারণ মানুষও হয়ে উঠতে পারে। ডনের যখন তেরো-চোদ্দো বছর বয়স, তখন তার বাবা রমেনবাবু চাকরিতে বদলি হয়ে সপরিবার দিল্লি চলে যান। তখনই আমরা ভেবেছিলাম, এ ছেলে দিল্লির পাড়া প্রতিবেশীদের জ্বালিয়ে খাবে।
তার পর আর ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রইল না। কিন্তু ডন সম্পর্কে আমার কৌতূহল রয়েই গেল। অমন একটা চরিত্রের ছেলেকে, বিশেষত তার ওই সাপ চুরি করার ঘটনার জন্য, ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
সাত-আট বছর পর রমেনবাবুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা এক মেট্রো স্টেশনে। আমি প্রথমে তাঁকে চিনতে পারিনি। তিনিই আমাকে ডাকলেন। ট্রেনে উঠে পাশাপাশি বসে যাওয়ার সময় অনেক গল্প হল। চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর তিনি কলকাতায় ফিরে এসেছেন। ফ্ল্যাট ভাড়া করেছেন যোধপুর পার্কে। কথায় কথায় তাঁর ছেলের প্রসঙ্গ এসে গেল। চাপা গর্বের সঙ্গে তিনি জানালেন যে, দিল্লিতে গিয়ে ডনের চরিত্রে একটা দারুণ পরিবর্তন এসেছিল। পড়াশোনায় সে দারুণ মনোযোগী হয়ে উঠে আই সি এস ই-তে ভাল রেজাল্ট করে এবং সহজেই দিল্লির আই আই টি-তে চান্স পেয়ে যায়। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সে সেকেন্ড হয়েছে। এখন সে কোথায়? উত্তর তো অবধারিত, অবশ্যই আমেরিকায়। টেক্সাসের অস্টিন শহরে সে এর মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স করে ভাল চাকরি করছে। সে একটা হিরের টুকরো ছেলে। প্রত্যেক উইক-এন্ডে টেলিফোনে বাবা- মায়ের খবরাখবর নেয়। এর মধ্যে তার মায়ের এক বার হাঁটুর অপারেশন হয়েছে। তার সব খরচ ছেলে পাঠিয়েছে। ডন নামে সেই সাঙ্ঘাতিক দুষ্টু ছেলেটির এ হেন রূপান্তর খানিকটা চমকপ্রদ তো বটেই। তবে অসাধারণ কিছু নয়।
এরও বছর তিনেক পর এক দিন রমেনবাবু এলেন আমাদের বাড়িতে। তাঁর ছেলের বিয়ে। তাই পুরনো পাড়ার কিছু মানুষকে নেমন্তন্ন করতে চান। সন্তানের সাফল্য-কাহিনি অন্যদের জানাতে পারাটাই তো আসল সুখ। আমি সাধারণত বিয়ের নেমন্তন্ন এড়িয়ে যাই। রমেনবাবু পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। প্রাপ্তবয়স্ক ডনকেও এক বার চোখের দেখার ইচ্ছেও আমার ছিল।
খুব ছোটবেলায় যারা শান্তশিষ্ট থাকে, বড় হয়ে তারা খ্যাপা ষাঁড়ের মতন হয়ে যেতে পারে। আর বাচ্চাবয়সে যারা খুব দস্যিপনা করে, পরিণত বয়সে তারা হয় সভ্য ভদ্র। আমাদের ডন সেই থিয়োরির এক জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। কোথায় সেই দুঃসাহসী, কারও কথা-না-মানা কিশোর, সে এখন সুঠাম যুবক, অত্যন্ত বিনীত ও নম্র। অনেক দিন কলকাতা-ছাড়া বলে তার মুখের ভাষা বেশি পরিমাণে ইংরেজি মিশ্রিত। তার মনোনীত পাত্রীটি এক গুজরাতি কন্যা। সে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে এল। ডন তার বাবা-মায়ের মুখ এক উজ্জ্বল আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে।
রমেনবাবুর সঙ্গে আমার মাঝে মধ্যে আরও দেখা হয়েছে। খবর শুনেছি, ডন ইতিমধ্যে দুটি সন্তানের জনক। দু’বছর অন্তর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে। তবে আগের বারে সে কলকাতায় চার দিনের বেশি কাটাতে পারেনি। কারণ, আমদাবাদে তার শ্বশুরবাড়িতে শ্যালিকার বিয়ের উৎসব ছিল।
কয়েক দিন আগে খবরের কাগজে দেখলাম রমেনবাবুর নাম। তিনি মাঝারি ধরনের সরকারি অফিসার ছিলেন। এই ধরনের মানুষের সংবাদপত্রে নাম ওঠার যোগ্যতা থাকে না, যদি না খুন হন কিংবা অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়। রমেনবাবুর মৃতদেহ তার প্রতিবেশীরা দু’দিন বাদে দরজা ভেঙে দেখতে পান। মেঝেতে হামাগুড়ির ভঙ্গিতে। খুব সম্ভবত তিনি মৃত্যুযন্ত্রণায় খাট থেকে নেমে দরজা খুলতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইনি আমার সেই চেনা রমেনবাবু ঠিকই, সর্বাধিকারী, পদবি মিলে গেছে, যোধপুর পার্কের ঠিকানা। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল এক বছর আট মাস আগে। তখন বিদেশ থেকে তাদের পুত্র এসে শ্রাদ্ধ-শান্তি করে গিয়েছিল। সেই থেকে তিনি একেবারে একা। তার পর এই কাহিনিতে নতুনত্ব কিছু নেই। ডনের মতন আরও হাজার হাজার ছেলেমেয়ে যদি মেধাবী হয়, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় ভাল রেজাল্ট করে, তা হলেই নানান বিদেশ তাদের হাতছানি দেয়। সেখানকার বাতাস তাদের উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়। এক দিন বিমানে চেপে তারা পশ্চিমের আকাশে একটা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়। বুকভরা কত রকম প্রত্যাশা নিয়ে দেশে থেকে যান তাদের বাবা-মা। প্রথম প্রথম ওই প্রবাসী সন্তানেরা দেশে ফিরে আসতে চায়। স্বদেশে উপযুক্ত সুযোগের অভাব কিংবা নানান কার্যকারণে সেই সব সংকল্প ক্রমশ পিছিয়ে যায়। ও দেশে তাদের ছেলেমেয়ে জন্মে গেলে সে সম্ভাবনা ক্রমশ সুদূরপরাহত হয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ জোর করে ফিরেও আসে৷
এই সন্তানেরা অধিকাংশই কিন্তু অকৃতজ্ঞ বা বাবা-মায়ের সম্পর্কে উদাসীন নয়। তারা টেলিফোনে নিয়মিত খোঁজখবর নেয়। মাঝে মাঝে দেশে আসে, প্রয়োজনে টাকা পাঠায়। শুধু একটা জিনিস তারা দিতে পারে না, বৃদ্ধবয়সে যা খুবই প্রয়োজনীয়, নিকট জনের সঙ্গ। নিঃসঙ্গতা অনেক কঠিন রোগের চেয়েও মারাত্মক। শুদু দু’জন বুড়োবুড়ি থাকলেও তাদের মধ্যে নিত্য খটাখটি হয়। যদি এক জন আগে চলে যায়, তা হলে অন্য জন সেই খটাখটি করতে পারে না বলেই আরও কষ্ট পায়।
একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা ভারতে প্রবীণ-প্রবীণা, যাঁদের বলা হয় সিনিয়র সিটিজেন, তাদের সংখ্যা ৮১ লক্ষ। এঁদের মধ্যে আবার শতকরা ৩০ জনই সম্পূর্ণ একা। সম্ভবত শহর ও শহরতলিতেই এই পরিসংখ্যান গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিলে এঁদের সংখ্যা নিশ্চিত আরও বেশি হবে। কলকাতা শহরেও এঁদের সংখ্যা প্রচুর। তবে কলকাতা শহরে এমন একটা কিছু আছে, যা অন্য শহরে নেই। ‘দ্য বেঙ্গল’ নামে একটি সংস্থা কলকাতা পুলিশের সহযোগিতায় এই প্রবীণ-প্রবীণাদের জন্য গড়ে তুলেছে একটি সাহায্য কেন্দ্র। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রণাম। কলকাতা পুলিশের নামে কিছু কিছু অভিযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু তারা কয়েকটি সেবামূলক সামাজিক কাজও করে। যেমন, তারা পথশিশুদের জন্য অন্তত চোদ্দোটি ইস্কুল নিয়মিত চালায়। এই প্রণাম-এর ব্যাপারেও কলকাতা পুলিশের সক্রিয় সহযোগিতা বেশ আন্তরিক।
বালিগঞ্জ থানার প্রাঙ্গণে একটা জায়গা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গড়ে উঠেছে প্রণাম-এর সহযোগিতা কেন্দ্র। সেখানে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য নিযুক্ত রয়েছেন বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত কর্মী। অর্থাৎ দিন বা রাতের যে কোনও সময়ে কোনও প্রবীণ-প্রবীণা আর্ত বা বিপন্ন হয়ে পড়লে ওই কেন্দ্রে ফোন করলেই সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য পাবেন। কেন্দ্রের কর্মী টেলিফোনে বিপদের কারণটি জেনে নিয়ে স্থানীয় শাখায় খবর দেবেন। সেখান থেকে পুলিশ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে সেই বাড়িতে। গুরুতর অসুস্থতার ব্যাপার হলে পাঠানো হবে অ্যাম্বুল্যান্স। প্রণাম-এর নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্স তো আছেই, অন্য বেশ কয়েকটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ব্যবস্থা করা আছে।
কলকাতার ৪৮টি থানার মধ্যে ওই পরিষেবা পরিব্যাপ্ত। প্রত্যেক থানাতেই এক জন সহকারী সাব ইন্সপেক্টর ও দু’জন হোমগার্ডকে এই ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিরিশটি হাসপাতালের সঙ্গে প্রণামের ব্যবস্থাপনা আছে। এঁরা কোনও অসুস্থ মানুষকে পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে করা হবে চিকিৎসার ব্যবস্থা। চিকিৎসা ছাড়াও বাড়ি বা সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলাতেও পড়তে হয় কখনও কখনও। সম্পত্তির লোভে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের উৎপীড়ন করার তো লোকের অভাব হয় না। সে রকম সঙ্কটে বিশিষ্ট আইনজীবীরা বিনা খরচে ব্যবস্থা দিতে পারেন।
কিংবা কোনও সমস্যাই নেই তেমন, তবু গভীর রাতে হঠাৎ ভয় পেয়ে অথবা বিষণ্ণ হয়ে পড়তে পারেন, তখন কথা বলার একজন সঙ্গীর জন্য মন আঁকুপাঁকু করে। সে রকম সময়েও সহায়তা কেন্দ্রের মহিলা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন ফোনে।
প্রণাম-এর সমস্ত পরিষেবাই বিনামূল্যে। সরাসরি কাউকে অর্থ সাহায্য করা হয় না। যাঁরা সেবা পাচ্ছেন, তাঁদের কারও বাড়ি থেকে কোনও দানও গ্রহণ করা হয় না। প্রত্যেক থানা থেকে প্রবীণ-প্রবীণাদের সদস্য করার জন্য ফর্ম পূরণ করার ব্যবস্থা আছে। এই উদ্যোগ যখন শুরু হয়, তখন যে দু’জন ফর্ম পূরণ করে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন, তাঁদের একজন সুচিত্রা সেন, অন্যজন জ্যোতি বসু। এখন সদস্য সংখ্যা ৩৩১৩ জন। সদস্যরা হাসপাতালে বিশেষ ডিসকাউন্ড পেতে পারেন। কয়েকটি ওষুধের দোকানেও কম দামে ওষুধ। বেশ কিছু শিল্পী লেখক, গায়ক, অভিনয় জগতের মানুষ এবং পুলিশ কমিশনার ও কয়েকজন কর্তাব্যক্তি প্রণামের সঙ্গে জড়িত।
শুধু রোগভোগ আর সমস্যা নিয়েই তো জীবন নয়। এই প্রবীণ-প্রবীণার পারস্পরিক মেলামেশারও ব্যবস্থা আছে। যেমন, মাঝে মাঝেই হয় পিকনিক, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ক্রিকেটের ওয়ার্ল্ড কাপের সময় সাহায্য কেন্দ্রের পাশে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখারও সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। সকলকেই জন্মদিনে পাঠানো হয় শুভেচ্ছা কার্ড। বিজয়া দশমী বা পয়লা বৈশাখে পাঠানো হয় মিষ্টি। সেই মিষ্টি এই বয়স্ক-বয়স্করা খেয়ে নেন বটে, তারপরই মৃদু অভিযোগের সুরে বলেন, এই বয়সে মিষ্টি… নোনতা পাঠালেই ভাল হত!
প্রণাম-এর ফোন নং
(০৩৩-)২৪১৯০৭৪০
ই মেল আই ডি -mail@ pranam.in
দুই বুদ্ধ
লাফিং বুদ্ধ, এই মূর্তির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। এর ঠিক বিপরীতে কী হতে পারে? গৌতম গম্ভীর!
২০. ৪, ২০১১
যুধিষ্ঠির ক’টা মিথ্যে বলেছিলেন?
অনেকেরই ধারণা যুধিষ্ঠির সারা জীবনে মাত্র আধখানা মিথ্যে কথা বলেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবরা বিপক্ষে তাদের অস্ত্রগুরু দ্রোণের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছিলেন না। যুদ্ধ শুরুর আগে যুধিষ্ঠির অন্যান্য গুরুজনের কাছে এবং দ্রোণের কাছেও গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার সঙ্গে যুদ্ধে কী করে জয়ী হব? দ্রোণ বলেছিলেন, মানুষ অর্থের দাস। কৌরবরা আমাকে এত দিন অর্থ দিয়ে খাইয়ে-পরিয়ে রেখেছে তাই আমি তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করছি। আমি যতক্ষণ রথারূঢ় হয়ে ধনুর্বাণ নিয়ে যুদ্ধ করি, তখন আমাকে বধ করতে পারে, এমন লোক তো দেখি না। তবে হঠাৎ যদি কোনও দুঃসংবাদ পেয়ে আমি অস্ত্র ত্যাগ করি, তা হলে…
যুদ্ধের পঞ্চদশ দিনে দ্রোণের প্রবল প্রতাপে প্রচুর সৈন্যক্ষয় হচ্ছে দেখে যুধিষ্ঠিররা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কৃষ্ণ তখন বললেন, ধনুর্বাণ হাতে থাকলে এ ব্রাহ্মণকে তো দেবতারাও জয় করতে পারবেন না। সুতরাং ধর্মের পথে যুদ্ধ না-করে অন্য পথ ভাবো। দ্রোণ পুত্রস্নেহে অন্ধ। (দ্রোণের ছেলে অশ্বত্থামার স্বভাবচরিত্র মোটেই ভাল ছিল না)। সেই পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনলে ওঁর আর যুদ্ধে মতি হবে না। সুতরাং কেউ ওঁর কাছে গিয়ে অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে দিক। কৃষ্ণের এই অসৎ প্রস্তাব একমাত্র অর্জুন পছন্দ করেননি। যুধিষ্ঠির মোটামুটি নিমরাজি হয়ে গেলেন।
তখন ভীম বিরুদ্ধ পক্ষের এক রাজার অশ্বত্থামা নামে একটা হাতি ছিল, গদার আঘাতে সেটাকে মেরে ফেলে দ্রোণের কাছাকাছি গিয়ে লজ্জিত ভাবে বললেন, অশ্বত্থামা হত। তা শুনে দ্রোণ এক বার কেঁপে উঠেও ভাবলেন, ওই ভীমটাকে মোটেই বিশ্বাস করা যায় না। অশ্বত্থামাকে তিনি অনেক সাংঘাতিক অস্ত্র ব্যবহার শিখিয়েছেন, তাকে হারানো মোটেই সহজ নয়। তবু পিতৃহৃদয় সন্তানের অমঙ্গলের আশঙ্কায় অস্থির হবে তো বটেই। খবরটার সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আসল খবরটা কী বলো তো। সবাই জানত, ত্রিলোকের ঐশ্বর্যের লোভেও যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যে কথা বলতে পারেন না। কিন্তু কৃষ্ণ এবং অন্যান্যদের প্ররোচনায় যুধিষ্ঠির যুদ্ধ জয়ের আশায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘অশ্বত্থামা হতঃ’। তার পর খুব নিচু গলায় ‘ইতি কুঞ্জরঃ অর্থাৎ ওই নামের হাতি। কথাটা মিথ্যে নয়, কিন্তু ওই যে পরের অংশটা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে ফিসফিসিয়ে বলা, যাতে দ্রোণ শুনতে না পান, তাতেই যুধিষ্ঠিরের জীবনে মিথ্যা বলার পাপ স্পর্শ হল। তার পর ধৃষ্টদ্যুম্ন কী নৃশংস ভাবে অস্ত্রহীন দ্রোণের গলা কেটে ফেললেন, সে প্রসঙ্গ আর টানার দরকার নেই।
কিন্তু যুধিষ্ঠির তো আরও অনেক মিথ্যে বলেছেন, তা আমরা খেয়াল করি না। কেন, দ্বাদশ বৎসর অরণ্যবাসের পর একবৎসর অজ্ঞাতবাসের সময় কী হয়েছিল? পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্রৌপদী ছদ্মবেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন মৎস্যদেশে। বিরাট রাজার অধীনে। সেখানে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, তিনি ব্রাহ্মণ। তাঁর নাম কঙ্ক। তিনি পাশাখেলায় খুব দক্ষ। সেই পরিচয়ে তিনি রাজার কাছে চাকরি চান। কঙ্ক সেজে এক বছর তো তাঁকে ঝুরি ঝুরি মিথ্যে কথা বলতে হয়েছে। এর আগেও, দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় যুধিষ্ঠির নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ হিসেবে। রামায়ণের শ্রীরামচন্দ্র মিথ্যে কথা বলেননি? (তাঁকে অনেকেই বিষ্ণুর অবতার হিসেবে পুজো করে। বাল্মীকির মূল রচনায় অবশ্য সে পরিচয় নেই, সেখানে তিনি দোষগুণে ভরা এক মানবিক চরিত্রের রাজা।) শ্রীরামচন্দ্রের সবচেয়ে নিষ্ঠুর মিথ্যেটির উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে।
যুদ্ধবিগ্রহ শেষ হয়ে গেছে। দেশে ফিরে এসে রামচন্দ্র ভরতের কাছ থেকে রাজ্যভার নিয়ে নিয়েছেন, এর পর সুখে প্রমোদেই থাকার কথা। সীতার গর্ভলক্ষণও দেখা গেছে। এরই মধ্যে রাম এক দিন তাঁর সভাসদদের কাছে শুনলেন যে, রাজ্যের কিছু প্রজা সীতার চরিত্র নিয়ে আবার গুজুর গুজুর ফুসুর ফাসুর শুরু করেছে। সব দেশেই এমন কিছু মানুষ তো থাকেই যারা নানা রকম কেচ্ছা কেলেঙ্কারি নিয়ে কথা বলতে ভালবাসে। রাম এ রকম তুচ্ছ ব্যাপার সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতে পারতেন কিংবা সীতা যে এক বার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন, সে কথা ভাল ভাবে জানিয়ে দিতে পারতেন, তার বদলে রাম নিজেই ফুঁসে উঠলেন। (সম্ভবত রামের নিজেরই মনের মধ্যে ছিল সন্দেহের কীট।) এর ঠিক আগের দিনই সীতা আব্দার করে বলেছিলেন, অনেক দিন অরণ্য-প্রকৃতি দেখা হয়নি, এক দিন একটু বেড়াতে গেলে হয় না? সেই কথার সূত্রে রাম সীতাকে লক্ষ্মণের সঙ্গে অরণ্যে ও গঙ্গাতীরের ঋষিদের আশ্রম দেখতে পাঠালেন। সীতা তো ভ্রমণের আনন্দে বেশ উচ্ছল। প্রথম রাত্রি কাটল এক ঋষির আশ্রমে। দ্বিতীয় দিনে গঙ্গায় স্নান করার কথা। সেখানে পৌঁছে লক্ষ্মণ হঠাৎ হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলেন। খুবই অবাক হয়ে সীতা সরল ভাবে প্রশ্ন করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? ‘দাদাকে দু’দিন দেখিনি তাই কষ্ট হচ্ছে।’ আমারও মন তাঁর জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। এই তো এই রাতটা কাটলেই আমরা অযোধ্যা ফিরে যাব।
অতিকষ্টে কান্না থামিয়ে লক্ষ্মণ সীতার পায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেবী, এ কথা জানাতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। রাম আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেননি। আপনাকে এই বনেই রেখে যেতে বলেছেন।
মানুষ প্রধানত মিথ্যে কথা বলে কেন? ১) নিজের ছোট কিংবা বড় রকম স্বার্থের কারণে, ২) অপরের ক্ষতি করার জন্য, ৩) নিছক কৌতুকে। এর মধ্যে তৃতীয়টাই অনেকটা নির্দোষ এবং উপভোগ্য। সাহিত্যিক-শিল্পীরাও অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয় নেন, সেই মিথ্যার অন্য নাম কল্পনা। এই কল্পনার বিস্তার না থাকলে কোনও শিল্পই সার্থক হয় না।
বনবাসের সময় শূর্পণখা এসে রামচন্দ্রের সঙ্গে প্রেম করার বায়না ধরেছিল। রাম বলেছিলেন, দেখো, আমি বিবাহিত, আমার স্ত্রীও সঙ্গে রয়েছেন। আমি আর তোমার সঙ্গে কী করে প্রেম করি বলো? বরং ওই যে আমার ছোটভাই, সে এখনও অবিবাহিত, তুমি ওর সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করে দেখো। লক্ষ্মণের যে ঊর্মিলা নামে একটি সুন্দরী স্ত্রী দেশে রয়ে গেছে, তা আমরা সবাই জানি। রামের এই মিথ্যেটা কৌতুকের। তবে কৌতুকেরও একটা সীমারেখা টানা দরকার। সেই সীমা লঙ্ঘন করলে অনেক সময় প্রচুর অনভিপ্রেত, সাংঘাতিক ঘটনাও ঘটতে পারে। সে রকম উদাহরণও অজস্র। শ্রীকৃষ্ণের সাঙ্গোপাঙ্গরা এক বার এক ঋষির সঙ্গে কৌতুক করতে গিয়ে সেই ঋষির অভিশাপে যদুবংশের ধ্বংস ডেকে এনেছিল।
কথায় বলে, প্রেম ও রণে মিথ্যে কথা বলায় দোষ নেই। প্রেম তো নিভৃত ব্যাপার। সে সব মিথ্যে অন্যদের জানবার কথা নয়। যুদ্ধের সময় যে অজস্র মিথ্যের ফুলঝুরি ছড়ায় তা কে না জানে। আমাদের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ দেখার বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই। তবে ভোটযুদ্ধ দেখেছি অনেক বার। তাতে যে কত রকম উদ্ভট মিথ্যে শুনতে পাওয়া যায়। এই যুদ্ধে প্রথম দুটি কারণেই মিথ্যে ছোড়াছুড়ি হয়। কৌতুকের কোনও স্থান থাকে না। একেবারে যে থাকে না, তা-ও বলা যায় না। যেমন কেউ যদি বলেন, যে রামবাবুকে তিনি রাতারতি শ্যামবাবু বানিয়ে দেবেন, তবে সেটা কৌতুক ছাড়া আর কী! কেউ কেউ আবার এটাকে সত্যি বলে বিশ্বাসও করে ফেলে!
একটি চমৎকার মিথ্যে
বাট্রান্ড রাসেলের আত্মজীবনীতে এই চমৎকার মিথ্যেটির কথা আছে। রাসেলের এক বন্ধু নাকি কখনও মিথ্যে কথা বলতেন না। তাঁকে এক দিন জিজ্ঞাসা করা হল, আচ্ছা টম, (অন্য নামও হতে পারে, আমার হাতের কাছে বইটি নেই) তুমি কোনও অবস্থাতেই, কোনও কারণে মিথ্যে কথা বলো না, এ কথাটা কি সত্যি?
টম মাথা নেড়ে বলেছিলেন, না।
এটাই সারা জীবনে টমের একমাত্র মিথ্যে কথা।
একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা
অভিষেক বসুকে আমি চিনতাম না। তাঁকে জানা এবং তার কাজ দেখার পর আমার মনে হল, এ রকম অভিজ্ঞতায় জীবন ধন্য হয়।
সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘টোড়াই চরিত মানস’ নামে উপন্যাসটি আমার খুবই প্রিয়। বিশ্বসাহিত্যেই এ উপন্যাসের তুলনা খুব কম। উইলিয়াম ফকনারের মতন লেখকও এমন আঞ্চলিক ভাষার উপন্যাস লিখতে পারলে নিশ্চিত গর্ব বোধ করতেন। এমন একটি উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়া এবং মঞ্চস্থ করা সম্ভব, তা আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি। কারণ, উপন্যাসটি পূর্ণিয়া জেলার তাৎমাটুলি ও ধাঙড় বস্তির প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে। তাদের মধ্যে ঢোঁড়াই নামে এক পিতৃপরিত্যক্ত বালকের বেড়ে ওঠার কাহিনি। লেখক খানিকটা ঠেট হিন্দির সঙ্গে বাংলা মিশিয়ে, অনেক ফুটনোট দিয়ে সে কাহিনি লিখেছেন। কতখানি পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে এ কাজ করা যায় তা ধারণা করাই শক্ত। বাংলা নাটককে ভালবাসা আর বাংলা নাটকের সমৃদ্ধির জন্যই এই উদ্যোগ সার্থক।
যে হেতু আমি নোটঙ্কি নামের এই দলটির আগে কোনও অভিনয় দেখিনি, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চিনি না, তাই আমার মনে হচ্ছিল, এরা সবাই ‘টোড়াই চরিত মানস’-এর একেবারে জীবন্ত সব চরিত্র। এতই বিশ্বাসযোগ্য। সম্প্রতি গিরিশ মঞ্চে আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এই নাট্যানুষ্ঠান দেখেছি।
নাটকটির মাঝে মাঝে লেখকের চরিত্র এনে কাহিনির সূত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেটা উপযুক্তই হয়েছে। কিন্তু লেখকের মুখের সংলাপ সম্পর্কে আর একটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। সতীনাথ যে ধরনের মানুষ, তিনি নিজের রচনা সম্পর্কে কোনও রকম অতিশয়োক্তি সহ্য করতেন না বোধহয়। গান গেয়েছেন কৌশলকিশোর বর্মা, সিপাহি মাহাতো মুন্না সাহু আর সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁদের এবং প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে, বিশেষ করে ঢোঁড়াইয়ের নতুন বউয়ের ভূমিকায় মেয়েটি, এবং মূক সাধু, সকলকে আমার অভিনন্দন। যারা এই নাটকটি এখনও দেখেনি, তাদের সম্পর্কে আমার দুঃখ হয়।
৪, ৫, ২০১১
Chapter - 4
আমাদের সেন্টু যদি সে রকম কিছু হয়, হতেও তো পারে, হোক না
আমাদের চেনা এক কবি তার গ্রাম থেকে একটি ছেলেকে এক দিন নিয়ে এল আমাদের বাড়িতে। শ্যামলা রং, বেশ রোগা ও ঢ্যাঙা মতন, মুখে এখনও লেগে আছে কৈশোরের লাবণ্য, লাজুক ভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কবিটি জানাল যে, ছেলেটি পিতৃহীন, থাকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। যদি তাকে আশ্রয় দিই, সে সবরকম কাজ করতে রাজি। ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা, জামাকাপড় কাচা, কুটনো কোটা। তবে রান্না জানে না, আর যে-কোনও কাজ।
আমার স্ত্রী একজন কাজের লোক খুঁজছিলেন, তাকে বেশ উৎসাহিত দেখালেও আমি প্রথমে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটির বয়েস কত? কেন না, যতই আমাদের প্রয়োজন থাক কিংবা সহানুভূতিসম্পন্ন হই না কেন, কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক বালককে আমি বাড়ির কাজে লাগাতে একেবারে রাজি নই। চাইল্ড লেবার-এর আমি ঘোর বিরোধী।
কবিটি জানাল যে, ওর বয়েস অন্তত উনিশ-কুড়ি তো হবেই। প্রমাণও আছে। বছর তিনেক আগে ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেছে। কিছু দিন ও এক বাস কন্ডাক্টরের অ্যাসিস্টেন্টের কাজ করেছিল। ওই যে-সব ছোকরা বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে চ্যাঁচায়, বারাসত-বসিরহাট, মুহম্মদবাজার, বনগাঁ, চলে আসুন, চলে আসুন। খালি গাড়ি ইত্যাদি। ছেলে বড় মুখচোরা, ওই চাকরি তার পোষায়নি, তাই এখানে শুধু খাওয়া পরা চায়, এক্ষুনি কিছু মাইনে দেওয়ারও দরকার নেই…
মাধ্যমিক পাশ শুনেই খটকা লাগে। সে ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজার কাজ করবে, যাতে তার লেখাপড়া শেখাটার কোনও ভূমিকা থাকবে না। সেটা ভাবতে ভাল লাগে না মোটেই। তবে মাধ্যমিক পাশ করলে অন্য কী জীবিকাই বা হতে পারে? মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এ বারে দশ লক্ষও ছাড়িয়ে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই উচ্চশিক্ষার পথে যেতে পারে না। যে-বৃহৎ সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী পড়ে থাকে, তারা শেষ পর্যন্ত কী করে? কাগজে মাঝে মাঝে পড়ি, কোনও দিনমজুর কিংবা ভাগচাষির ছেলে কিংবা পরিচারিকার মেয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও অনমনীয় জেদে পড়াশুনো করে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করে। তারা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। আমি প্রায়ই ভেবেছি, তারা কি সত্যি আরও চার-পাঁচ বছর ওই অবস্থার মধ্যে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে? তাদের মধ্যে সত্যি সত্যি ক’জন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়? সে রকম কোনও পরিসংখ্যান দেখিনি। কোনও বস্তির ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, তা-ও এ পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার।
ছেলেটি রয়ে গেল আমাদের বাড়িতে। ছেলেটি সত্যিই বড় লাজুক আর বিনীত। কথাই বলতে চায় না। তবে যে কোনও কাজের কথা বললে খুব মন দিয়ে করে। তার নাম সেন্টু। পুরো নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলে, আমাকে সেন্টু বলেই ডাকবেন। পুরো নাম বা পদবি থাকবে না এ কখনও হয়? মাধ্যমিকের সার্টিফিকেটে তো নাম থাকবেই। কয়েক দিন পরই স্বাতীর মনে হল, এ ছেলেটি বোধহয় মুসলমান। তাকে সরাসরি এ কথা জিজ্ঞেস করায় সে অস্বীকার করতে পারল না। এই জন্যই তার এত কিন্তু কিন্তু ভাব? স্বাতী তাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল, আমাদের পরিবারে আমরা লালন ফকিরের ভাবশিষ্য, হিন্দু-মুসলমান নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। খাওয়াদাওয়ার আলাদা কোনও বাছবিচার নেই। সে যেন ও সব নিয়ে একটুও চিন্তা না করে। তার যদি নমাজ পড়ার অভ্যেস থাকে, তা-ও পড়তে পারে। তবু একটা কথা উহ্য রইল। এটা তো ফ্ল্যাটবাড়ি, অনেক কাজের লোক, তাদের কাছে সেন্টুর এই পরিচয়টা নিজে থেকে জাহির করার দরকার নেই। কে কী রকম ভাবে নেয়, কে জানে!
হিন্দুদের মধ্যে এখনও কতকগুলো অদ্ভুত সংস্কার আছে। এখন ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটা শহর অঞ্চলে অনেকটা কমেছে ঠিকই। হিন্দু পরিবারে গাড়ির ড্রাইভার মুসলমান হতে পারে। ছেলেমেয়ের সহপাঠী কিংবা সহপাঠিনী মুসলমান হলেও সমান ভাবে আড্ডা দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু রান্নাঘরে কোনও মুসলমানের হস্তক্ষেপ আজও মানা হয় না। মুসলমান পরিবারেও হিন্দুদের সম্পর্কে এ রকম সংস্কার আছে কী? আমি বাংলাদেশে অবস্থাপন্ন পরিবারে হিন্দু ড্রাইভার দেখেছি, কাজের লোক বা কর্মচারীও হিন্দু দেখেছি। কিন্তু রান্নাঘর বিষয়ে কিছু জানি না। আসলে একেবারে গরিবদের মধ্যে কোনও জাতের বিচার থাকে না। খুব উচ্চশ্রেণির ধনীরাও এ সব তফাত অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। যত ঝামেলা মধ্যবিত্তদের নিয়ে। শুধু অবস্থায় নয়, মধ্যবিত্ত মানসিকতায়।
সেন্টু নামের এই ছেলেটি মুসলমান বলেই গ্রামে কোনও কাজ পায়নি, এই শস্তা সেন্টিমেন্টে আমি বিশ্বাস করি না। মুসলমানরা সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে কিছু কিছু অংশে পিছিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু ওর মতন আরও লক্ষ লক্ষ বর্ণহিন্দু বা নিম্নবর্গীয় হিন্দু ছেলেমেয়ে কিছুটা লেখাপড়া শিখেও যে কোনও কাজ পায় না, তা-ও তো নির্মম সত্য। জনসংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, সেই তুলনায় কাজ তো বাড়ছে না মোটেই। যাঁরা অবিলম্বে কয়েক লক্ষ বেকারকে চাকরির আশ্বাস দিচ্ছেন, সে সব তো মিথ্যে স্তোকবাক্য, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এ প্রসঙ্গে আর একটা কথাও মনে আসে। যথেষ্ট কাজ তৈরি হয়নি তো বটে, শ্রমের মর্যাদাও তো তৈরি হয়নি। এক জন চাষির ছেলে, জেলের মেয়ে, তাঁতির সন্তান লেখাপড়া শিখেও সেই পারিবারিক পেশায় নিযুক্ত থাকতে পারবে না কেন? এখনও সমাজের অনেকেরই ধারণা, শিক্ষা পাওয়া মানেই বাবুশ্রেণির চাকরি অর্জনের অধিকার এক্তিয়ারে চলে আসা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে মেথর আছে, নাপিত আছে, ঘরবাড়ি ধোওয়া মোছার জন্যও লোক পাওয়া যায়, এবং তারা সবাই কিছুটা লেখাপড়া জানে। আমি এক বার বিদেশে এক সাহেব অধ্যাপকের বাড়িতে কিছু দিন ছিলাম। সকাল থেকে অধ্যাপক তাঁর নিজের ঘরে বসে লেখাপড়া করেন, আমিও অন্য একটি ঘরে নিজের কাজ করি। আর একজন কাঠের মিস্তিরি একটি বারান্দা সারাবার কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুপুরে অধ্যাপক উঠে এসে সেই মিস্তিরিকে ডেকে বলেন, এসো জর্জ, আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ খেয়ে নাও। মিস্ত্রিটি যন্ত্রপাতি রেখে আমাদের সঙ্গে খাওয়ার টেবিলে যোগ দেন। আমরা নিজেরাই স্যান্ডউইচ বানিয়ে বিয়ার সহযোগে তা খেতে খেতে নানা কথার মধ্যে পুলিৎজার প্রাইজের প্রসঙ্গ এসে যায়। মিস্তিরি মহাশয় জানান যে, সদ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় লেখিকার বইটি তাঁর পড়া হয়ে গেছে। আর এক বার এক জন কলের মিস্তিরির সঙ্গে আলাপ করে জেনেছিলাম যে, তিনি আগে ছিলেন নিউক্লিয়ার্স ফিজিক্সের অধ্যাপক। সে চাকরি ছেড়ে এ পেশায় এসেছেন। কারণ, এতে উপার্জন বেশি। কোনও কাজই যে নিচু বা অসম্মানের নয়, এ উপলব্ধি আমাদের সমাজে কবে আসবে! মিস্তিরি কিংবা কাজের লোকের সঙ্গে আমরা খাওয়ার টেবিলে কবে একসঙ্গে বসতে শিখব? (একমাত্র শান্তিনিকেতনে ‘সুবর্ণরেখা’র ইন্দ্রনাথ মজুমদারের বাড়িতে এর ব্যতিক্রম দেখেছি। সেখানে কাজের মেয়ে, রান্নার মেয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে খায়)।
সেন্টু বেশ ভালই মানিয়ে নিয়েছিল আমাদের বাড়ির সঙ্গে। যে কোনও কাজের নির্দেশ দিলে সে ঠিকঠাক করে যায়। সে তাড়াতাড়ি কিছু করতে পারে না। নিখুঁত হওয়ার দিকেই তার ঝোঁক। ফ্ল্যাটবাড়ির অন্য কারও সঙ্গে সে মেশে না। টিভি দেখারও আগ্রহ নেই তার। একটু সময় পেলেই সে এক কোণে বসে বই পড়ে। মা ষষ্ঠীর কৃপায় আমাদের বাড়িতে তো বইয়ের অভাব নেই। তা পডুক না সে। যত ইচ্ছে। এক বার তাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেও তার কোনও রকম চিত্তচাঞ্চল্য বোঝা যায়নি।
আমাদের ফ্ল্যাটের মধ্যেই সে বিছানা পেতে রাত্তিরে শুয়ে থাকত। এক দিন সকালে দেখা গেল, বিছানাটা পাতাই আছে, সেন্টু নেই। এ রকম কখনও হয় না। আমরা জাগবার আগেই সে বিছানা গুটিয়ে রাখে। তারপর চোখে পড়ল, খাওয়ার টেবিলে নুনদানি চাপা দেওয়া একটা চিঠি। আমাকে ও স্বাতীকে সে মেসো ও মাসি সম্বোধন করে লিখছে যে, আমাদের কাছে সে খুবই ভাল ব্যবহার পেয়েছে, সে জন্য সে কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখানে তার মন টিকছে না। সে গ্রামেই ফিরে যেতে চায়। তাই সে বিদায় নিচ্ছে।
গোটা গোটা হাতের লেখা, একটি মাত্র বানান ভুল। নিজের জামাপ্যান্টের পুঁটুলি ছাড়া সে আর কিছুই নিয়ে যায়নি। এমনকী ভাঙা মাসের কয়েক দিনের মাইনেও তো তার প্রাপ্য ছিল, তা-ও চায়নি। যদিও সে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তবু প্রথমেই মনে হয়, আমাদের কোনও ব্যবহারে সে আঘাত পায়নি তো? অনেক ভেবেও সে রকম কিছু মনে পড়ল না। এত বড় বাড়ির অন্য কেউ কি তাকে টিপ্পনি কেটে খোঁচা মেরেছে? সে রকম কিছুও জানা গেল না। অবশ্য এমন হতেই পারে, গ্রাম্য প্রকৃতির মধ্যে সে মানুষ। শহরের এই খাঁচার মতন ফ্ল্যাটবাড়ি তার সহ্য হয়নি। তবে, জীবিকার তাড়নাতেই তো গ্রামের ছেলেরা শহরে আসে। এখন কাজ ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেলে, তার যে সমস্যা ছিল, তা মিটবে কী করে? যদি সে আরও বিপদে পড়ে? বেশ কয়েক দিন সেই ছেলেটির লাজুক মুখটি বার বার মনে পড়ে।
প্রথম জীবনে অতি নগণ্য কাজ, যেমন চায়ের দোকানে বেয়ারা কিংবা গুদামে কুলির কাজ করে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ, হয়তো দশ লক্ষে এক জন, পরবর্তী জীবনে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। যেমন, গানের জগতের সম্রাট ভীমসেন জোশীও তো কিছু দিনের জন্য অভিনেতা পাহাড়ী সান্যালের বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সে কথা স্বীকার করতেও তিনি লজ্জাবোধ করেননি। আমাদের এই সেন্টু যদি সে রকম কিছু হয়, হতেও তো পারে, হোক না।
বাচ্চাদের জন্য ধাঁধা
ছয় থেকে ন’বছরের কোনও বাচ্চা ছেলে বা মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে হবে, জুতোর কোম্পানি আছে, বাটা। সেই বাটা ইংরেজিতে বানান করো তো?
খুব সহজ, সে সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে। বি এ টি এ।
তার পর জিজ্ঞেস করতে হবে, হয়ে গেছে?
সে বলবে, হ্যাঁ, হয়ে গেছে।
ও মা, তোমার বিয়ে-টিয়ে হয়ে গেছে? কবে হল?
১৮. ৫. ২০১১
আমার অতি সংক্ষিপ্ত চিন ভ্রমণ
প্রথম বার আমি চিন দেশে গিয়েছিলাম ঠিক একুশ বছর আগে। আমার সঙ্গী ছিলেন প্রসিদ্ধ হিন্দি লেখক কমলেশ্বর। সাংহাই শহরে পৌঁছে আমরা দ্বিতীয় দিনেই গিয়েছিলাম একটা কাঁচাবাজার দেখতে। যে-কোনও দেশে গেলেই আমার বাজার দেখার শখ হয়, কিছু কেনাকাটির জন্য নয়, বাজারের সম্ভার দেখলেই সে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য অনেকটা টের পাওয়া যায়। এর কিছু দিন আগে মস্কোর একটা বাজার দেখে খুব নিরাশ হয়েছিলাম। সেখানে কিছু বিট-গাজর আর আলু ছাড়া অন্যান্য শাক-তরিতরকারি কিছুই নেই। বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় গিয়ে দেখেছি, একটা মাংসের দোকানের সামনে বিরাট লম্বা লাইন। আমার পথপ্রদর্শক সখেদ বলেছিলেন, এর অর্ধেক লোকই শেষ পর্যন্ত পৌঁছবে না, খালি হাতে ফিরে যাবে। অর্থাৎ, তখনই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির পতনের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে।
সেই তুলনায় সাংহাইয়ের বাজার ছিল বেশ সমৃদ্ধ। তরিতরকারি ও নানা রকম মাছ-মাংসের অভাব নেই। ইঁদুরের মাংসও দেখেছি। আসল চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাজারের বাইরে। সেখানে রয়েছে খাঁচার পর খাঁচা ভর্তি ব্যাঙ। আর একটা জালের খাঁচায় জড়াজড়ি করে আছে গোটা পঞ্চাশেক সাপ। চিনেরা যে সাপ খায়, তা তো জানিই। আমিও দু’একবার খেয়েছি। সেই সাপ বিক্রির পদ্ধতিটা দেখার মতো। কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। সুন্দরী সুন্দরী মহিলারা এসেছে সাপ কিনতে। (আচ্ছা, পুরুষেরা কি আর বাজার করতে আসে না? কিন্তু আমার চোখ যে সুন্দরী মহিলাদের দিকেই আকৃষ্ট হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক)! এক মহিলা খাঁচার মধ্যে বিশেষ একটা সাপের দিকে আঙুল দেখাল, দোকানদার একটা চিমটে দিয়ে খোঁচা মারতেই সাপটা ফেঁস করে ফণা তুলতে লাগল। এ রকম দু’চারটে সাপের স্বাস্থ্য দেখার পর একটা তার পছন্দ হল, দোকানদার তখন একটা সাঁড়াশি দিয়ে সাপটার মুণ্ডু চেপে ধরে বাইরে টেনে এনে একটা বড় ছুরি দিয়ে ঘ্যাচাং করে কেটে ফেলল মুণ্ডুটা। বাকিটা চামড়া ছাড়িয়ে কুচ কুচ করে টুকরো করে দেওয়া হল ব্যাগে। এখন তো সেটা মাছের মতন, বিষ থাকার কোনও প্রশ্নই নেই৷ সাপ খেতে অনেকটা বান মাছের মতনই মনে হয়েছে আমার।
যাই হোক হঠাৎ আমার চোখ পড়ল পাশের একটা খাঁচায়। তার মধ্যে রয়েছে বেশ স্বাস্থ্যবান, গাবলু-গুবলু চেহারার গোটা পাঁচেক বেড়াল। প্রথমটায় আমি বুঝতে পারিনি, তার পর খটকা লাগতেই আমি আমার সঙ্গিনী দোভাষিণীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা কি বেড়ালও খাও নাকি? সে আমার দিকে ফিরে গভীর বিস্ময়-ভরা নয়নে বলেছিল, সে কি, তোমরা বেড়াল খাও না? বেড়াল তো ডেলিকেসি! আমার মনে হল, সর্বনাশ, তা হলে বোধহয় আমাকেও এর মধ্যে বেড়ালের মাংস খাইয়ে দিয়েছে। দোভাষীরাও ইংরিজি এত কম জানে যে রেস্তোরাঁর টেবিলে যখন অনেক রকম খাদ্য আসে, তখন বেশ কয়েকটার নাম ওরা বুঝিয়ে বলতে পারে না। আমি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, আমি শুধু কুকুর আর বাঁদর খাব না, কারণ কুকুর আমরা বাড়িতে পুষি, আর বাঁদর আমাদের পূর্বপুরুষের বংশ, এ ছাড়া আর সব কিছুই আমি স্বাদ নিয়ে দেখতে পারি। তখন অবশ্য বেড়ালের কথা আমার মনে পড়েনি।
সে বারে চিনের বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাটে কুকুর-বিড়াল, ষাঁড় কিংবা পাখি-টাকি কিছুই চোখে পড়েনি। কারণ, শুনেছি চিনেরা এ সবই খেয়ে ফেলে, পোকা-মাকড় পর্যন্ত। তবে আরশোলা খাওয়াটা বোধহয় নিছক গুজব।
এ বারে, এই মে মাসে, ২০১১ চিন সফরের সময় আমার অন্য সঙ্গী সাত জনের কেউই আগে এ দেশে আসেননি। দ্রষ্টব্য স্থানগুলি তাঁরা তো ঘুরে দেখছেনই। আমি ভাবলাম, অভিনব অভিজ্ঞতার জন্য ওঁদের সাংহাইয়ের সাপের বাজারটা দেখিয়ে আনি। এ যাত্রা আমাদের দোভাষী ও সঙ্গীর সংখ্যা তিনজন। তাদের ইংরিজি জ্ঞান আগের থেকে একটু ভাল। আমি তাদের ওই বাজারের কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন বলল, কোনও বাজারে তো সাপ বিক্রি হয় না! আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাজারে বিক্রি হয় না। তা হলে তোমরা খাওয়ার জন্য সাপ পাও কোথা থেকে? অল্পবয়সি একটি মেয়ে সাপ খাওয়ার কথা শুনে খুবই বিস্মিত। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক পুরুষটি বললেন, এক কালে খাওয়া হত, এখন বন্ধ হয়ে গেছে। আর ব্যাঙ? তা-ও খুব কম দোকানে পাওয়া যায়। পরিবেশ রক্ষার কারণে ও-সব খাদ্য নিষিদ্ধ। কথাবার্তায় যা বুঝলাম, সাপ-ব্যাঙ-কুকুর-বেড়াল-পোকামাকড় খাওয়ার অভ্যেস এরা ত্যাগ করেছে। আধুনিক চিনা নারী-পুরুষের পোশাক ও পোশাকের ফ্যাশন, হাবভাব (ইংরিজি ভাষা বাদ দিয়ে) পুরোপুরি পশ্চিমী দেশগুলির মতন, কিংবা তার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ চিনেরা আর চিনে থাকছে না, সাহেব হয়ে যাচ্ছে। শিগ্গিরই তারা ইংরিজিও শিখে নেবে।
আমার বেশি অবাক লাগল এই ভেবে যে, একটা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা হঠাৎ ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, অর্থনৈতিক উন্নতিও হতে পারে ধাঁ-ধাঁ করে। কিন্তু সামাজিক পরিবর্তন কি পনেরো-কুড়ি বছরে এতখানি হওয়া সম্ভব? আমরা যাদের দেখলাম, তারা খাদ্য-অভ্যেস একেবারে বদলে ফেলেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁয় যে-সব খাবার পাওয়া যায়, তা রান্নার পদ্ধতির জন্য অবশ্যই চাইনিজ ফুড, কিন্তু খাদ্যবস্তুগুলোর সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকার খাদ্যের কোনও তফাত নেই। মাংস বলতে এখন শুয়োর-গরু-ভেড়া ও হাঁস-মুরগি, মাছ নানা রকম এবং চিংড়ি সুলভ। লোকের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। বিয়ার তো ছিলই। রেড ওয়াইনও অষ্ট্রেলিয়া-ফ্রান্স ব্রাজিলের মতন না হলেও বেশ ভাল। হুইস্কি-রাম বিশেষ কেউ খায় না। ওদের জাতীয় পানীয় মাওতাই। মদ্যপান বিষয়ে চিনে শুচিবাই আগেও ছিল না, এখনও নেই। চিনের বড় শহরগুলিতে চোখ ধাঁধানো হর্ম্যসারি দেখলে তাক লেগে যায়। এবং প্রশস্ত রাস্তা ও পরিচ্ছন্নতা… অনেকে বলতে শুরু করেছেন, আর দশ বছরের মধ্যে চিন ছাড়িয়ে যাবে আমেরিকাকে। একদলীয় সরকার এখনও কিছু কিছু অনুশাসন জারি রেখেছে। রাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করলে কারাদণ্ড হয়। এ বারের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপক তো এখনও জেল খাটছেন। তবু কমিউনিজমের লাল রং অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে বোঝা যায়। লাল ঝান্ডা দেখাই যায় না। নিষিদ্ধ নগরীর সামনে ছাড়া আর কোথাও মাও জে দং কিংবা অন্য কোনও নেতার ছবি চোখে পড়ল না। দু’-একটা ছোট গল্পে লোকাল কমিটির দাদাগিরি নিয়ে বিদ্রুপ-মশকরাও পড়ে ফেললাম। যাই হোক, সবচেয়ে দর্শনীয়, চিনের রাস্তায় রাস্তায় ফুলের বাহার। সত্যি অপূর্ব। ফরাসি দেশেও এত ফুলের সজ্জা নেই। ভারতে বুঝি এত ফুল ফোটে না?
বেজিং-এ বঙ্গ ভাষা
সেই একুশ বছর আগে গোটা সফরে একজনও বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়নি। সে বারে ভ্রমণ ছিল অনেকটা ঘেরাটোপের মধ্যে। বাংলা শুনেছিলাম একবারই। বেজিং-এ, বেশ নাটকীয় ভাবে। এক সন্ধেবেলা বেজিং-এর সরকারি লেখক সংস্থার সঙ্গে আমাদের আলাপচারিতার ব্যবস্থা হয়েছিল। আমি, কমলেশ্বর ছাড়া আর সবাই চিনে লেখক। এর আগে ভারত সরকারের রাষ্ট্রদূত আমাদের ডেকে অনুরোধ করেছিলেন যে, আমরা যেন তিয়েনানমেন স্কোয়ারের ঘটনা নিয়ে কোনও প্রশ্ন না করি কোথাও। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই বেজিং-এর ওই বিশাল পার্কে ছাত্রবিদ্রোহ দমন করার জন্য সামরিক বাহিনী ট্যাঙ্ক এনে, গুলি চালিয়ে নৃশংস ভাবে সে বিদ্রোহ দমন করে। চিন সরকার সেই ভয়াবহ কাহিনি যাতে সারা বিশ্বে না ছড়ায়, তার জন্য বিশেষ তৎপর। সেই লেখক সংস্থার মিটিং-এ ওই প্রসঙ্গ একেবারে বাদ। আমরা শান্তি ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিষয়ে মিষ্টি মিষ্টি কৃত্রিম কথা চালিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ ও দিক থেকে একটি চিনে মেয়ে উঠে এসে আমার কাছ ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে পরিষ্কার বাংলায় বলল, জানেন তো, তিয়েনানমেন স্কোয়ারে অন্তত তিন হাজার ছেলেমেয়ের মৃতদেহ পড়ে ছিল। আরও কত যে নিরুদ্দেশ। সরকার সব চেপে দিচ্ছে। কত যে মা-বাবা কাঁদছে…। মেয়েটি শান্তিনিকেতনে ছিল, ভাল বাংলা জানে, তার কথা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারছে না ঠিকই। তবু আমার মনে হয়েছিল, যদি ওর বডি ল্যাঙ্গোয়েজে বোঝা যায় যে ও কোনও রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলছে? তাই তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই আমি বলেছিলাম, চুপ, চুপ।
এ বারে শুনলাম অনেক বাংলা কথা। ভারতীয় দূতাবাসের সংস্কৃতি কেন্দ্রে একটি আলোচনাসভায় যত শ্রোতা উপস্থিত, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাভাষী! ভারতীয় বাঙালিরা তো আছেনই, তা ছাড়াও ছিলেন অনেক বাংলাদেশি। আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দূতাবাসের কয়েকজন প্রতিনিধি। আমি বিদেশে যেখানেই যাই, বাংলাদেশিদের দেখে খুব আত্মীয়তা অনুভব করি। আমাদের কলকাতা অফিসে টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক সহকর্মী চিত্রলেখা বসুও এখন তো চিনের একটি ইংরেজি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তার দেখা পাওয়া মানে যাকে বলে প্লেজান্ট সারপ্রাইজ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার স্থায়ী চিনা প্রতিনিধিও একজন বাঙালি। শৈবাল দাশগুপ্ত। সেই দম্পতির সঙ্গে আড্ডা হল এক সন্ধ্যায়। একটি হাস্যমুখী চিনা মেয়ে আমারই লেখা একটি বই সই করতে এনে বলল, লিখুন, আমার নাম সুস্মিতা। আমি হকচকিয়ে যেতেই সে বলল, না, তার বাবা-মা কেউই বাঙালি নয়। সে নিজেই এই নাম নিয়েছে। তার আসল নাম ইউকুই ইয়াঙ্গ। সে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ায়। (কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়না/ফরেন ল্যাঙ্গোয়েজ কলেজ/ডিপার্টমেন্ট অব এশিয়ান অ্যান্ড আফ্রিকান ল্যাঙ্গোয়েজেস)। আমি সেই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি বাংলা পড়াও, তোমার ক্লাসে বাংলার ছাত্র-ছাত্রী হয়? সে বেশ ফুরফুরিয়ে হেসে বলল, হ্যাঁ, হয়। ভালই। আরও দু’জন চিনে মধ্যবয়সি ভদ্রলোক রাত্তিরে হোটেলে দেখা করতে এলেন আমার সঙ্গে। তাঁরা বেশ সহজ বাংলা বলেন। বাংলা পড়তেও পারেন। এবং কী আশ্চর্যের কথা, আমার মতন একজন সামান্য লেখকেরও কয়েকটা বই তাঁরা পড়ে ফেলেছেন। তারা কর্মসূত্রে বাংলাদেশে থেকেছেন অনেক দিন। বাংলা ভাষা শিখেছেন সেখানেই। সেই রাত্রে শুয়ে শুয়ে আমার মনে হল, যদি একুশে ফেব্রুয়ারি, বাহান্ন সালে ঢাকায় গুলি চালনা না ঘটত, যদি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম না হত, তা হলে কি আমরা বাংলা ভাষার গৌরবের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরতে পারতাম? পশ্চিমবাংলায় আমাদের হাত মাঝে মাঝে কম্পমান। বাংলাদেশিদেরই মুষ্টি অনেক দৃঢ়।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যিনি গবেষণা করছেন, যাঁকে গত বছর কলকাতায় বাংলা অ্যাকাডেমিতে সম্মান জানানো হয়েছিল, তিনি এখনও রবীন্দ্র রচনাবলি অনুবাদে ব্যাপৃত। আগের বারও দেখেছি, এ বারেও শুনলাম, সব লেখকই রবীন্দ্রনাথের কোনও না কোনও কবিতা পড়েছেন, একজন জানালেন যে, চিনের উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই রবীন্দ্রনাথের নাম জানে। (চিনে শিক্ষিতের হার শতকরা আটানব্বই)। পশ্চিমী দেশগুলিতে রবীন্দ্রনাথের এমন পরিচিতি এখন আর নেই। অনেক আধুনিক লেখক রবীন্দ্রনাথের নামই জানে না। সেই তুলনায় চিনা সাহিত্যের কতটুকু আমরা জানি? চিনা ভাষায় আধুনিক সাহিত্যের পথিকৃৎ লু সুন-এর লেখা আমরা ক’জন পড়েছি? আমাদের সঙ্গে অন্য ভাষার যে ক’জন লেখক ছিলেন,তাদের মধ্যে অর্ধেক লু সুন-এর নামও শোনেনি। কনফুসিয়াস? তিনি কি লেখক না দার্শনিক না গুরু? দু-চারটে বাণী হয়তো কেউ কেউ দেখে থাকবেন। মাও জে দং-এর কবিতা এবং লাল বই এক সময় বাংলার তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। এখনকার মাওবাদীরা তাও পড়েন কি না জানি না!
আমি কলকাতায় থাকি শুনে একজন চিনা লেখিকা বললেন, কলকাতা? সে তো বিশ্বের প্রধান দশটির মধ্যে একটি। তাই না? আমি জোর করে হেসে বললাম, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে তা ছিল ঠিকই, এখন আর তা নেই।
দীর্ঘশ্বাস চেপে মনে মনে বললাম, এখন তো কলকাতা প্রায় একটা মফস্সল শহর হয়ে গেছে।
একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ
মে মাসের ন’তারিখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে দিল্লির সমস্ত জাতীয় ইংরেজি সংবাদপত্রে একটি খবর বেরিয়েছে, সেটির অনুবাদ করে দিচ্ছি:
‘তিরুবনন্তপুরম: আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কেরলের সমস্ত স্কুলের ছাত্রদের মালয়ালম ভাষা আবশ্যিক ভাবে শিক্ষা করতে হবে। নতুন রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ। রাজ্যের এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং কাউন্সিলের সুপারিশক্রমে এই নির্দেশ জারি হয়েছে। একটি সরকারি প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে যে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য ডি পি আই-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
আর পশ্চিম বাংলায়?
১. ৬. ২০১১
শান্তিনিকেতনে নৌকাডুবি আর ঝড়ের রাত্রে বুলবুলি
শান্তিনিকেতনের বাড়িটির সামনের বারান্দাটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। যখনই আসি, এখানেই বেতের চেয়ারে বসে বেশির ভাগ সময় কাটাই। এমনকী এই চরম গরমেও। সামনে খানিকটা বাগান, ডান পাশে একটা পুকুর, সেটা নানা রকম গাছপালা, তার মধ্যে তিনটে বড় বড় তালগাছই প্রধান দ্রষ্টব্য। সামনের সরু রাস্তা দিয়ে সাইকেলই যায় বেশি, ইদানীং দু’-এক বছর দেখছি মোটর বাইকের সংখ্যা বেড়েছে, গাড়ি কদাচিৎ। অধিকাংশ সময় নিস্তব্ধতাই এখানকার রাজা। শব্দ শূন্যতায় কান জুড়োবার জন্যই তো প্রধানত এখানে আসা।
আজকাল প্রকৃতি দেখার প্রতিবন্ধক অনেক তার, নানা রকম তার। এ বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে একটা তার বেশ নিচু হয়ে চলে গেছে রাস্তার দিকে। ওটার নাম কেব্ল। প্রথম দিন এসে একটুক্ষণ বারান্দায় বসবার পরেই দেখি সেই তারের ওপর বসে আছে একটা বুলবুলি পাখি। কিন্তু এ পাখি তো মানুষের এত কাছাকাছি আসে না! শান্তিনিকেতনে কাক প্রায় নেই। শালিক আর চডুই মানুষের কাছাকাছি ঘুরঘুর করে, বুলবুলি আর ঘুঘুরা দূরত্ব বজায় রাখে। এই বুলবুলিটা এক-এক বার উড়ে যাচ্ছে, এক মিনিট দু’মিনিট বাদে আবার এসে বসছে, তাকিয়ে থাকছে আমার দিকে। ব্যাপারটা বেশ আশ্চর্যের না? আমরা যেমন পাখি দেখি, এই পাখিটাও কি মানুষ দেখছে? মানুষদের ব্যবহার রকম-সকম স্টাডি করছে?
সকাল থেকে বিকেল হতে বুঝতে পারলাম পাখিটার ও-রকম ব্যবহারের আসল কারণ। বারান্দার বাঁ পাশে একটা লতানে গাছ উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত। খুব হালকা নীল রঙের পাতলা পাপড়ির ফুল হয়। গাছটার নাম জানি না। স্থানীয় কেউ কেউ বলে পেঁয়াজ-রসুন গাছ। সত্যিই সেই ফুলে একটু একটু পেঁয়াজ-পেঁয়াজ গন্ধ। একতলা ছাড়িয়ে ওপরে ওঠার জায়গায় গাছটা বেশ ঝুপড়ি হয়ে গেছে, সেইখানে বাসা বেঁধেছে বুলবুলিটা। অর্থাৎ, ও যে প্রায় সর্বক্ষণ এখানে বসে থাকছে, তা আসলে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পাহারা দিচ্ছে ওর বাসা। মানুষের বাড়ির ঘুলঘুলিতে চডুই পাখিরাই সাধারণত বাসা বাঁধত, এ কালের বাড়িতে ঘুলঘুলি থাকেই না, চডুই সংখ্যা হু-হু করে কমে আসছে। শালিক পাখির বাসাও দেখেছি। কিন্তু দালান-কোঠায় বুলবুলির বাসা? এর একটাই কারণ থাকতে পারে, এ বাড়ি তো দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে থাকে, এ বারান্দায় কেউ বসে না। আমরাই তো এ বার এলাম দু’মাস বাদে। বুলবুলিটা সেই জন্যই এই নির্জন বারান্দার কোণটা নিরাপদ মনে করেছে। ছোট ছোট পাখিদের বাসার সমস্যা গরিব মানুষদের চেয়ে কম নয়। গোপন ঝোপ-ঝাড় খুঁজতে হয়, কারণ প্রকাশ্যে বড় গাছের ওপর বাসা বাঁধলে, বড় বড় পাখিরা অর্থাৎ কাক-চিল ওদের ডিম বা ছানা ঠুকরে খেয়ে ফেলে। মানুষকে তো আরও বেশি ভয়। পাখিটা বোধহয় ভাবছে, এরা আবার কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল।
বুলবুলিটা কি আমাকে চিনতে পেরেছে? এই পাখিটার আর কতই বা বয়েস। কিন্তু পূর্বপুরুষদের অনেক স্মৃতি জিন-বাহিত হয়ে নাকি চলে আসে, যাকে বলে রেস মেমরি। বহুকাল আগে আমি একটা বুলবুলি পাখির প্রতি অত্যন্ত নৃশংস অন্যায় করেছিলাম। তখন আমার বয়েস এগারো-বারো বছর, পূর্ব বাংলার এক গ্রামে ইজের পরে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতাম মাঠে-ঘাটে। এক দুপুরে এক বেত গাছের ঝোপে হঠাৎ আবিষ্কার করেছিলাম একটা বুলবুলির বাসা, তাতে দুটো ডিম। টপ করে তুলে নিয়েছিলাম ডিম দুটো। একটা বুলবুলি কোথা থেকে এসে আমার মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে উড়ছিল, আমি ধরার চেষ্টা করলাম সেটাকেও। ওই বয়েসের ছেলেরা সাধারণত নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়। তারা ফড়িং-এর পাখা ছিঁড়ে ফেলে, বেড়ালের ল্যাজে তারাবাজি বেঁধে দেয়, খেলার সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে খিমচে মারে। যৌন চেতনা, ঠিক মতো জাগার আগে মানুষের মনে স্নেহ, দয়া, মায়া আরও অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতিও জাগে না। মেয়েদের ওই চেতনা অনেকটা আগে-আগেই জাগে বলে ছেলেদের তুলনায় তারা অনেক নরম সরম হয়।
অর্ধেকটা শতাব্দী কেটে গেছে, এখনও সেই দু’টি বুলবুলির ডিম নষ্ট করার অপরাধবোধ স্পষ্ট আমার মনে দগদগ করে। জীবন আমাকে মাঝে মাঝে যে শাস্তি দিয়েছে, তা বোধহয় এই পাপেই। এখন আমি এই বুলবুলির বাসা রক্ষা করার জন্য বদ্ধপরিকর। কিন্তু আমি যে ওর বাসা পাহারা দেবার জন্যই বসে আছি, তা তো ও বুঝবে না। ও আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে তারে বসে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে আসে। এই সময়কার বাতাস যেন মায়ের আদরের মতন। মায়ের আদর কেমন, তা কি এই বয়েসে আমার মনে আছে নাকি? এ হল কবি-প্রসিদ্ধি, উপমায় বেশ চলে। অন্ধকার একটু গাঢ় হতেই জোনাকি উড়তে শুরু করে, এবং দু-একটা আমাকে জড় পদার্থ মনে করে গা বেয়েও উঠতে থাকে। এই একটা আশ্চর্য পতঙ্গ, প্রকৃতি একমাত্র একেই একটুখানি আলো দিয়েছে, কিন্তু তাতে ওর কী লাভ? আলোটা ওর পেছনে! তাতে অন্ধকারে ও তো কিছুই দেখতে পাবে না, বরং টিকটিকি বা অন্য পতঙ্গভুকরা ওকে খেয়ে ফেলতে পারবে। বেচারাদের আত্মরক্ষার কোনও উপায় দেওয়া হয়নি, এ কী ভুল প্রকৃতির! একটা গান মনে পড়ল, ‘কী সুখে ওই ডানা দু’টি মেলেছ, ও জোনাকি!’ যিনি এই গান লিখেছেন, তিনি নিশ্চয়ই জোনাকি দেখেননি। এর জীবন তো সুখের নয়ই, তা ছাড়া ওইটুকু প্রাণীর অতি ফিনফিনে দু’টি পাখনাকে ডানা বলা যায়? তারপরই মনে হল, আমি কি পাগল নাকি? এ গান তো রবীন্দ্রনাথের, তিনি জোনাকি দেখেননি। তার শান্তিনিকেতনে বসেই তো আমি দেখছি। অত বড় কবি, তিনি ইচ্ছে করলে মাটির মূর্তিতেও ডানা বসিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিতে পারেন। …বারো বছর বয়েস হলে আমি নিশ্চয়ই আমার গা-বেয়ে ওঠা জোনাকিটাকে টিপে ধরতাম। এখন আমি নিথর মূর্তির মতন বসে থাকি, যাতে ওর কোনও অসুবিধে না হয়।
সকালবেলা স্বাতী পাখিদের বিস্কুট খাওয়ায়। হাঁসেরাই দল বেঁধে এসে কাড়াকাড়ি করে সব খেয়ে নেয়, (হাঁসেরা নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করে বটে, কিন্তু কখনও মারামারি করে না) কয়েকটা শালিকও চতুর ভাবে পাশ থেকে দু-এক টুকরো সরিয়ে নেয়। কিন্তু তারের ওপর বসে থাকা বুলবুলিটির এ ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই। বাৎসল্যের টান সম্ভবত তার ক্ষুধা-তৃষ্ণাও ভুলিয়ে দিয়েছে।
দু’দিন ধরে গরম একেবারে সহ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। একটু বেলা বাড়লেই বাতাসের উষ্ণ হল্কা ঝাপটা মারে চোখে-মুখে। বারান্দায় আর বসা যায় না। স্বাতী বলল, একটা সিনেমা দেখতে গেলে হয় না? এখানে ‘নৌকাডুবি’ চলছে। প্রস্তাবটিতে প্রথমে উৎসাহ বোধ করি না, হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অভ্যেস আমার চলেই গেছে প্রায়, থিয়েটার দেখতে যাই, কারণ থিয়েটার বাড়িতে বসে দেখা যায় না, সিনেমা দেখা যেতে পারে। তা ছাড়া ‘নৌকাডুবি’… রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছরের উৎসব চলছে। এখন কোনও বেসুরো কথা বলা উচিত নয়, তবে এটুকু তো বলা যেতেই পারে যে ‘নৌকাডুবি’ রবীন্দ্রসাহিত্যে আমার প্রিয় রচনাগুলির অন্যতম নয়। তার পরেই মনে হল, সিনেমা হল তো বাতানুকুল, এই হাঁসফাঁস করা গরমে দু’ঘণ্টা তো অন্তত ঠান্ডা-ঠান্ডা জায়গায় কাটানো যাবে। ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি একেবারে অখাদ্য হওয়ার কথা নয়। যদি তেমন হয়ও তা হলে চোখ বুজে ঘুমিয়ে কাটানো যেতে পারে আরামে।
ফিল্মটি শুরু হওয়ার পরই দারুণ চমক লাগল। এর শান্ত, গভীর রস মনকে এমন ভাবে স্পর্শ করল, তা দু’চক্ষু জুড়ে রইল আগ্রহ ও প্রত্যাশা। কাহিনি এগিয়ে আনা হয়েছে বেশ কিছু বছর। এ ছবিতে রবীন্দ্রনাথও একটি অপ্রত্যক্ষ চরিত্র, নায়িকা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। কাহিনির স্রষ্টাকে নিয়ে এ ধরনের খেলায় যে একটা স্নিগ্ধ কৌতুক থাকে, তা আমার খুব পছন্দ। ক্রমশ এর চিত্রভাষার সংযম আর গল্পের বুনন মুগ্ধ করে রাখে, কোথায় ঘুম আর কোথায় ঠান্ডার আরাম, সে সব মনেই পড়ল না। গানগুলি একটানা পরিবেশনের বদলে সিচুয়েশন অনুযায়ী কেটে-কেটে ব্যবহার করা সুপ্রযুক্ত হয়েছে। পিরিয়ড পিস রচনায় ঋতুপর্ণের কৃতিত্ব আগেও প্রমাণিত ‘চোখের বালি’তে। আমার মনে হল, ফিল্ম হিসেবে নৌকাডুবি অবশ্যই ঋতুপর্ণের শ্রেষ্ঠ দু-তিনটি ছবির অন্যতম। কাহিনিটি সম্পর্কে অনেকের অন্য মত থাকতে পারে, কিন্তু সেটা ফিল্মের বিচার নয়। ভাগ্যিস এই গরমে শান্তিনিকেতনে এসেছিলাম, তাই বড় পর্দায় এমন একটি চমৎকার ছবি দেখার সৌভাগ্য হল।
ছবিটি সম্পর্কে একটি হালকা অভিযোগ, সকলেরই অভিনয় উচ্চাঙ্গের হলেও কয়েকটি চরিত্রের কথা বলার ভঙ্গি ঋতুপর্ণের মতন। একটা চরিত্রে তার কণ্ঠস্বর ডাব তা বোঝাই যায়। কিন্তু অন্য কেউ কেউ যেন ঋতুপর্ণ যেমন ভাবে শিখিয়েছে, সেই ভাবেই সংলাপগুলি বলেছে। ঋতুপর্ণ এর পর থেকে প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে নির্দেশ দাও। আর একটি কথাও মনে পড়ল, সেটা ব্যক্তিগত। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় এ ছবিতে নায়িকার বাবার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছে। অনেক দিন আগে, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র ফিল্মে সে ছিল এক রাগী, জেদি যুবক। এখন সে বৃদ্ধের ভূমিকায়, আর প্রতিদ্বন্দ্বী’র লেখকও এক সময় ছিল এক বাউন্ডুলে তরুণ, এখন সে এক-পা এক-পা করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠে।
চিত্রনাট্যের বাঁধুনি যদি ঠিক থাকে, তা হলে প্রত্যেকের অভিনয়ই উঁচু তারে বাঁধা থাকে। এ ছবি দেখতে দেখতে সেটা আবার বোঝা গেল।
নৌকাডুবি উপন্যাসের প্রধান নায়ক হচ্ছে ঝড়। সিনেমা হল থেকে বাইরে বেরিয়েই দেখি ঝড় উঠেছে। ছবিটি দেখে ভাল লাগার রেশ কাটার আগেই এই ঝড় দেখে একটা আশঙ্কায় আমার বুক কেঁপে উঠল। এত গরমের পর ঝড় তো ভালই, তার পর বৃষ্টি হোক বা না-হোক, বাতাস বেশ কোমল হয় কিছুক্ষণ অন্তত। কিন্তু আমার মনে হল, নৌকাডুবির চরিত্র চারটির মতন যদি বুলবুলি পাখিটার সংসারও তছনছ হয়ে যায়? এর আগের একটি ঝড়ে ওই বাগানের দু’টি গাছ উপড়ে পড়েছে, কয়েকটা ফুলের চারা বিনষ্ট হয়েছে। গত কালই জোর হাওয়া ওঠার সময় বুলবুলিটাকে ছটফট করতে দেখেছি। কত রকম ঝাঞ্ঝাটের মধ্যে এদের সংসার চালাতে হয়! ঝড় ক্রমশই প্রবল হচ্ছে, ধুলোয়-ধুলোয় চতুর্দিক প্রায়ান্ধকার। আমার সত্যি ভয় হতে লাগল। বাড়ি ফেরার আগেই যদি ঝড়ের তাণ্ডবে নানান অঘটন ঘটে যায়।
ইচ্ছে হল প্রার্থনা জানাতে। দূর ছাই, কার কাছে প্রার্থনা জানাব? ভগবান-টগবান তো বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি প্রথম যৌবনে। দেব-দেবীরাও সব সুন্দর পুতুল। তা হলে? প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা জানাব ঝড় থামাবার জন্য? আমি যদি প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা জানাতে শুরু করি, তা হলে প্রমাণ হয়ে যাবে যে আমার মগজও তরল হতে শুরু করেছে। আমি বুলবুলিটাকেই উদ্দেশ্য করে মনে মনে বলতে লাগলাম, বেঁচে থাকো বুলবুলি, বেঁচে থাকো। বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো। তখনও সমস্ত আকাশ বিদ্যুৎ চমকে ফালা-ফালা করার পর কোথাও প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল।
জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝড় এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকে না। আমরা বাড়ি পৌঁছোবার একটু আগেই বাতাস শান্ত হয়ে টিপি-টিপি বৃষ্টি নামল। না, ক্ষতি হয়নি, বারান্দার পাশে লতানে গাছের ঝোপে বুলবুলির বাসাটা ঠিকঠাক আছে। জায়গাটা নির্বাচনের কৃতিত্ব আছে পাখিটার। ওখানে ঝড়ের ঝাপ্টা বেশি লাগে না, তা ঠিক। তবু, আমারই প্রার্থনার জন্য ওর সংসার অক্ষুণ্ণ রইল, এই ভেবে আমি কি মনে মনে আত্মশ্লাঘা করতে পারি না?
রমণীর মন, সখা…
একটি বিরাট প্রশ্নের আজও উত্তর মেলেনি। আমি নিজে তিরিশ বছর ধরে নারীর অন্তরাত্মা নিয়ে গবেষণা করেও যার উত্তর খুঁজে পাইনি, সেটি হচ্ছে ‘একটি নারী কী চায়?’
—সিগমুন্ড ফ্রয়েড
১৫. ৬, ২০১১
এখনও ফর্সা, স্লিম, প্রকৃত সুন্দরী পাত্রী চাই!
খবরের কাগজের যে পৃষ্ঠা কিংবা পৃষ্ঠাগুলি আমি জীবনে কখনও পড়িনি কিংবা পড়ার দরকার হয়নি, তা হল পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনের পাতা। খুদে খুদে অক্ষর, সাংকেতিক ভাষায় লেখা ওই সব বিজ্ঞাপনে কখনও চোখ পড়ে গেলেও চোখ সরিয়ে নিয়েছি। মাত্র কয়েক দিন আগে এক বর্ষার বিকেলে মুড়ি-তেলেভাজা খাওয়ার জন্য টেবিলের উপর খবরের কাগজ পাতা হয়েছে, ঢেলে দেওয়া হয়েছে মুড়ি, বেগুনি এখনও ভাজা শেষ হয়নি, আমি আবার কাঁচালঙ্কার অর্ডার দিয়েছি, চোখের সামনে ছাপা অক্ষর থাকলে তাতে অলস ভাবে চোখ বোলাতেই হয়। সেই ছড়ানো দু’পাতা ভর্তি সবই পাত্র-পাত্রী সংবাদ। কয়েকটি পড়ার পর আমার সমস্ত শরীরে যেন একটা ঝাঁকুনি লাগল। এ সব আমি কাদের কথা পড়ছি? এই দেশ সম্পর্কে আমি এতই অজ্ঞ? এই সমাজে যে এত অসংখ্য জাতপাত ভেদ আছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।
আমরা সমাজে যে একটা ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে ঘোরাফেরা করি, সেখানে এখন প্রায় কেউ জাতপাত নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু তার বাইরের সমাজটা যে একেবারে শুদ্ধ হয়ে যায়নি, সে সম্পর্কেও ধারণা আছে। কিন্তু তা মোটা দাগের ধারণা। যেমন, বামুন, কায়েত, বৈদ্য-শূদ্র, আর ও-দিকে হিন্দু-মুসলমানের প্রভেদ। কিন্তু পূ: ব: কায়স্থ, সিংহ, সৌকালিন, দেবারি, কন্যারাশি, কলিস্থ দো: গহ, com. eng 31/5’4 পাত্রের জন্য স্বজাতীয় পাত্রী চাই। এর মানে কী? খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে অনেক পয়সা খরচ হয় আজকাল, তাই বক্তব্য যত দূর সংক্ষেপ করার জন্য নানা রকম সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। সেটা স্বাভাবিক। এ বিজ্ঞাপন যারা দেয় এবং যারা পড়ে তারা নিশ্চয়ই সংকেতগুলো বোঝে। আমাদের মতো অনধিকারীদের দুর্বোধ্য মনে হবে। যেমন উল্লিখিত বিজ্ঞাপনটির কলিস্থ দো গৃহ, অনেক চিন্তা করে এর অর্থ বের করলাম। খোদ কলকাতায় দোতলা বাড়ির মালিক। কেন? কিন্তু একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পাত্র এতই জাত মানে যে শুধুই কায়স্থ পাত্রী হলে হবে না। গোত্ৰটোত্র সব মেলাতে হবে! সৌকালিন একটা গোত্রের নাম আমি জানি, কন্যারাশিও শুনেছি, কিন্তু দেবারিটা কী ব্যাপার? অন্য কয়েকটা বিজ্ঞাপন পড়ে বুঝলাম, ‘গণ’ বলে একটা ব্যাপার আছে। নরগণ, দেবগণ ইত্যাদি। আমার এতখানি বয়স হল, সত্যি এই ব্যাপারটা এত দিন জানা ছিল না। তা হলে ‘দেবারি’ ব্যাপারটাও বোঝা গেল, দেবগণ নরগণ-এর মতো রাক্ষসগণও হয়। কিন্তু রাক্ষসটা দেখতে খারাপ লাগে, তাই দেবারি হয়ে গেল। কেউ কেউ সঠিক অর্থ না বুঝে বানান ভুল করে দেবারীও লিখেছে।
অন্তত শতকরা আশি ভাগ বিজ্ঞাপন পূ: ব: কিংবা প: ব: দিয়ে শুরু। দেশ ভাগ হয়ে গেছে চৌষট্টি বছর আগে, পূর্ববঙ্গ নামে এখন কোনও স্থানই নেই, এখনকার ছেলেমেয়েরা বাপ-ঠাকুর্দার সেই দেশ চর্মচক্ষে দেখেইনি। তবু বিজ্ঞাপনে এর উল্লেখের অর্থ হল, যে সব পরিবারের ইস্টবেঙ্গল অরিজিন, সে রকম পরিবারের সঙ্গেই বৈবাহিক সম্পর্ক পাতাতে চায় বিজ্ঞাপনদাতা। আর প: ব: থাকা মান বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তারা খাঁটি পশ্চিমবঙ্গীয়, বাঙাল বাড়ির পাত্র বা পাত্রী চায় না। অর্থাৎ শুধু জাতের মিল থাকলেই হবে না। বাঙাল-ঘটির ভেদাভেদ এখনও রয়ে গেছে পুরোমাত্রায়। একটি বিজ্ঞাপনে দেখলাম, পাত্রী শুধুমাত্র মেদিনীপুরের হওয়া আবশ্যক। কিছু কিছু শব্দের অর্থ আমি অনেক চেষ্টা করেও বুঝিনি। যেমন, ‘ফর্সা সুন্দরী, সু-উপায়ী মাঙ্গলিক সুপাত্র কাম্য’। মাঝখানে কমা টমা কিছু নেই। সুউপায়ী কে? পাত্র না পাত্রী? আর মাঙ্গলিক কোন অর্থবোধক? অন্য একটি বিজ্ঞাপনে ‘কায়স্থ, আলিম্বান গোত্র’ এ রকম গোত্র হয়? ছাপার ভুল? শুদ্ধ রূপটাই বা কী হতে পারে? ‘পূ: ব: ব্রাহ্মণ, নরগণ, মকর, O+’ কী ব্লাড গ্রুপ? মকর কী? প: ব: তন্তুবায় (gen) দেবারি ধনু’, gen-এর মানে বুঝলাম না, আর ধনু? আমি সরল ভাবে আমার অক্ষমতার কথা জানাচ্ছি, হয়তো অনেকেই এ সব বোঝে ও জানে।
কবি তারাপদ রায়ের প্রচুর সরস গল্পের স্টক ছিল। সে আমাদের বলত যে সে নিয়মিত পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপন পড়ে, নিজের জন্য নয় বা তার বউয়ের জন্যও নয়, কারণ সে মাঝে মাঝে এর মধ্যে অনেক মজার গল্পের সন্ধান পায়। যেমন, সে বলেছিল, একটি বিজ্ঞাপন, ‘গরিব বি এ প্লাকড, কোনও ভদ্র পরিবারে বিবাহ করিয়া ভাইয়ের মতো থাকিতে চাই।’ আর একটি ‘পাত্রী সুদর্শনা, বি এড, গৃহকর্মনিপুণা শুধু একটু গোঁফ আছে।’ এবং আর একটিতে পাত্রের যোগ্যতা, ‘গভ: ইঞ্জি: দৈনিক সাড়ে তিন যোগের বেসি না।’ এ সব সত্যি না তারাপদ রায় কল্পিত, তা আবশ্য জানি না। আমরা কোলের সামনে পৃষ্ঠাগুলিতে এ রকম কোনও মজার কাহিনি নেই। শুধু একজন পাত্র লিখেছেন, মাথায় টাক আছে। আর একটি বিজ্ঞাপনের করুন কাহিনির আভাস, ফর্সা, স্লিম, IT-তে কর্মরতা, নামমাত্র বিবাহে সাড়ে তিন মাসের ডিভোর্সি।’ এটুকু পড়লেই আহা রে বলতে ইচ্ছে করে ।
আমাদের গল্প উপন্যাসে প্রেমের ঘটনার ছড়াছড়ি। কিন্তু এখনও জনসাধারণের অধিকাংশই প্রেম-ট্রেম নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিংবা অল্প বয়সে ও সব একটু হলেও তার সঙ্গে বিয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। বিয়ে হয় বাবা-মা ,আত্মীয়স্বজনের উদ্যোগে অথবা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে। ওই সব প্রেম কিংবা ছেলেমেয়ের বিয়ের সিদ্বান্তে বিয়ে কিংবা বিয়ে ভাঙা একটা বিশেষ ক্ষুদ্র শ্রেণির ব্যাপার। জাত গোত্র মিলিয়ে বিয়ে এখনও পর্যন্ত নিরাপদ। বড় শহরে হয়তো কেউ ও নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু দেশ মানে তো শুধু শহর নয়। অন্য জাতের ছেলেকে বা মেয়েকে বিয়ে করলে বাবা-মা নিজেদের হাতে ছেলে বা মেয়েকে কিংবা দু’জনকেই খুন করে। এমন তো প্রায়ই শোনা যায়। গ্রামাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান ছেলে মেয়ের বিয়ে হলে তাদের প্রাণের ভয়ে পালাতে হয়। এমনকী কলকাতা শহরেও তো কিছু কাল আগে রিজওয়ানুর নামে একটি সুদর্শন শিক্ষিত মুসলমান ছেলে প্রিয়ঙ্কা নামে মাড়োয়ারি কন্যাকে বিয়ে করার ফলে কী ভয়ঙ্কর কাণ্ডই হল। এ ধরনের ঘটনা যখন খবরের কাগজে পড়ি, তখনই আমার মনে হয়, আমরা এখনও প্রকৃত সভ্য হইনি।
আমার ধারণা ছিল, পণপ্রথা যেমন বেআইনি হয়ে গেছে, সে রকম এই সব বিজ্ঞাপনে ফর্সা কালোর উল্লেখ করা নিষিদ্ধ। কী ভুল, কী ভুল সেই ধারণা। পণপ্রথাও যেমন আড়াল দিয়ে অনেকটাই চলে, তেমনই বিজ্ঞাপনে ফর্সা পাত্রী চাওয়া হয় নির্লজ্জভাবে।
আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের আমরা কত নিন্দে করেছি, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে আফ্রিকার অন্য কয়েকটি রাজ্যে শ্বেতাঙ্গরা বহু কাল অত্যাচার করার পর এখন হার মেনে কৃষ্ণাঙ্গদের শাসন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। আর ভারতে আমরা এখনও প্রকাশ্যে ফর্সা মেয়ে চাইছি। পাত্রী পক্ষের বিজ্ঞাপনে একটিও ফর্সা ছেলে চাওয়া হয়নি। বরং নিজেদের পরিচয়ে অনেক ক্ষেত্রে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে উ: শ্যা: অর্থাৎ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। পাত্রপক্ষের বিজ্ঞাপনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফর্সা, রঙের দাবি আবশ্যিক। একটি বিজ্ঞাপনে দেখলাম, সদর্প ঘোষণা: ‘ফর্সা প্রকৃত সুন্দরী ছাড়া যোগাযোগের আবশ্যকতা নাই’। প্রকৃত সুন্দরী কাকে বলে? চল্লিশ শতাব্দী ধরে কবির দল তার সংজ্ঞা গুনে চলেছে আর বাংলার পাত্রপক্ষ তা জানে। মেয়েদের শরীরের গড়ন সম্পর্কে স্লিম কথাটি প্রায় সর্বত্র। অথচ বাংলায় ‘তন্বী’ একটা কী সুন্দর শব্দ আছে। বাংলা কাগজে কেউ কেউ ইংরেজি বিজ্ঞাপন দেয়। ‘E B Brahmin bride 27, fair, beautiful…’ আমার ধারণা ছিল ব্রাইড শব্দটার অর্থ বিবাহ-উৎসবের দিনে কোনও রমণী, বিয়ের আগে কিংবা পরে কী করতে ব্রাইড বলে? কনে শব্দটা যেমন বিয়ের রাতে তো শুধু কনেও এখন বোধহয় অর্থের ব্যাপ্তি ঘটেছে।
শতকরা আশিটি বিজ্ঞাপনেও জাতপাতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মিল খোঁজা হয়েছে। একটি বিজ্ঞাপনে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে পাত্রীকে হতে হবে নিরামিষভোজী। আর একটি বিজ্ঞাপনে খুবই আশ্চর্যজনক ভাবে দাবি করা হয়েছে, মা-বাবা-ভাই-বোন থাকা আবশ্যিক। এই সব বিজ্ঞাপন থেকে সমাজচিত্রের কিছু কিছু পরিবর্তনও নিরীক্ষণ করা যেতে পারে। কিছু কিছু বিজ্ঞাপনদাতা প্রগতিশীল হচ্ছেন, জানিয়ে দিচ্ছেন অসবর্ণে আপত্তি নাই। কেউ কেউ বলছেন স/অ চলতে পারে। অর্থাৎ সবর্ণ বা অসবর্ণ। একটি বিজ্ঞাপনে দেখলাম, ‘স/উ: অ’-এর মানে প্রথমে বুঝতে না পেরে অনেক গবেষণা করে বার করতে হল, সবর্ণ অথবা উচ্চ অসবর্ণে আপত্তি নাই। উচ্চ অসবর্ণ কী জিনিস, তা আমার বুদ্ধির অগম্য।
বস্তুতপক্ষে এই যে গোত্র, বর্ণ ইত্যাদি সবই আসলে ভাবের ঘরে চুরি। হাজার হাজার বছর ধরে এগুলি অবিকৃত বা শুদ্ধ আছে না ছাই। টাকা থাকলেও ইচ্ছে মতো জাত কেনা যায়। বিশ্বামিত্র নাকি তপস্যার জোরে ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। এ যুগে তপস্যা-টপস্যা লাগে না। যদি অধ্যাবসায় থাকে, সৎ বা অসৎ পথে বহু অর্থ উপার্জন করা যায়, তা হলে যে কোনও জাতি ধর্মকে সে তুচ্ছ করে দিতে পারে।
কিছু কিছু মুসলমান পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনেও রয়েছে দেখলাম, ইসলামে এত জাতপাতের বিভেদ নেই। কিন্তু প্রতিটি বিজ্ঞাপনেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পাত্র বা পাত্রী সুন্নি মুসলিম এবং তারা সুন্নি পাত্র পাত্রীই চায়। আমাদের এ অঞ্চলে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম নেই বললেই চলে। তবু এই সতর্কতা।
একটি প্রায় বিপ্লবী বিজ্ঞাপন উদ্ধৃত করে আপাতত শেষ করা যেতে পারে। ‘প: ব: ব্রাহ্মণ (নাস্তিক) ৩০/৫’7” চার্টার্ড অ্যাকা: ৭৫,০০০। একমাত্র সন্তান। কোনও দাবি নাই। শিক্ষিতা সুন্দরী ফর্সা ও কেবলমাত্র রেজিস্ট্রি বিবাহে আগ্রহী।’ নাস্তিক হলে কী করে ব্রাহ্মণ বলে পরিচয় দেওয়া যায়, জানি না। সে প্রশ্ন তুলছিও না। এই বিজ্ঞাপনকে প্রায় বিপ্লবী বলার কারণ, ফর্সা শব্দটি বাদ দিলেই ঠিক মানানসই হত। আমি নিজে ঝিরকুট্টি কালো। আমার বউ কালো ছাতা ব্যবহার করলে মিশে যাব বলে আমার পরিবারের সকলেই ঝড়ের আগে মেঘবর্ণ। তাই কালোদের প্রতি আমার দুর্বলতা তো থাকবেই!
তারাপদ রায় উবাচ
সম্রাট শের শাহ প্রথম ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন। তার আগে ঘোড়ারা বুঝি ডাকত না?
২৯. ৬. ২০১১
আমাদের শহরের পাশে প্রিয় নদীটি
এক সময় বরিশাল জেলা সম্পর্কে এই রসিকতাটি প্রচলিত ছিল। বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বানান করে বাংলা শিখছে কয়ে হ্রস্বউ, কয়ে হ্রস্বউ, র=কুকুর, ম, হ-য়ে হ্রস্বই, মূর্ধন্য ষ=মহিষ, ব-য়ে হ্রস্বই, ড-এ শূন্য ড়’য় আকার, ল=ম্যাকুর! অর্থাৎ বরিশালে বিড়ালকে বলে মেকুর। বানান আর ছাপার অক্ষরে যা-ই থাক, ওরা মেকুর বলবেই। এটা হঠাৎ মনে পড়ল। তার কারণ কলকাতা শহরের পাশ দিয়ে যে নদীটি বয়ে চলেছে, তার নাম কী? সেই নদীটির নাম এক হিসেবে বিশ্ববিখ্যাতও বটে। সব শিশুই যে নদীর নাম জানে, সে নদীর নাম দিয়ে কত কবিতা লেখা হয়, অনেক লোকে এখনও গঙ্গাস্নানে যায় পুণ্য অর্জনের জন্য। গঙ্গাসাগর সঙ্গমে প্রতি বছর বিরাট মেলা হয়। অথচ অনেক জায়গায় ছাপার অক্ষরে সে নদীর নাম হয়ে থাকে হুগলি নদী। মুখে কোনও লোকই হুগলি বলে না। অথচ ম্যাপে কেন গঙ্গার নাম থাকে না? এমনকী গঙ্গার উপর কোনও সেতু বানাতে গেলে তার দায়িত্ব নেয় ‘হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশন’।
কোথা থেকে এল এই হুগলি নাম? বলাই বাহুল্য, ইংরেজ আমলে গঙ্গা নামটি মুছে দিয়ে একটি মাত্র জেলার নামে এই নদীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কেন এই অদ্ভুত কাজটি করা হয়েছিল, তা ইংরেজরাই জানে। কিংবা তারাও এখন ভুলে গেছে। মহাভারতে এই নদী সম্পর্কে চমৎকার একটি গল্প আছে। গঙ্গাদেবী সগর রাজার ছেলেদের (মাত্র ষাট হাজার) উদ্ধার করার জন্য নেমে এসেছিলেন স্বর্গ থেকে। তাঁর প্রবল বেগ সামলানোর ক্ষমতা ধরিত্রীর ছিল না। তাই স্বয়ং মহাদেব দু’পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নদীকে মাথায় ধারণ করেছিলেন। ছোটবেলায় জগদীশচন্দ্র বসুর চমৎকার একটা লেখা পড়েছিলাম। যাতে এই প্রশ্ন, নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? কুলুকুলু ধ্বনিতে তার উত্তর পাওয়া যেত, মহাদেবের জটা হইতে। এই কাহিনির জন্যই বহু হিন্দু এখনও গঙ্গার জল অতি পবিত্র মনে করে।
শাসক ইংরেজরা এ দেশের অনেক নগর, নদী, পর্বতের নাম ইচ্ছে মতন বদল করেছে। উচ্চারণ বিকৃতিতেও ইংরেজরা ছিল ওস্তাদ। গঙ্গা শব্দটা উচ্চারণ করা কি খুব শক্ত? তবু ইংরেজরা বলত, গ্যাঞ্জেস। সারা ভারতেই এ নদীর নাম গঙ্গা হিসেবেই প্রসিদ্ধ, ভারতের বাইরেও গঙ্গা বা গ্যাঞ্জেস নামটি পরিচিত, শুধু বঙ্গ প্রদেশেই হয়ে গেল হুগলি। তা কি বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বেষের কারণে? নইলে এর যুক্তির মাথামুণ্ডু পাওয়া খুবই দুষ্কর। প্রাকৃতিক ভাবেও ভারতের অন্যতম এই প্রধান নদীটি বাংলার সীমান্তে এসে দু’ভাগ হয়ে গেছে, পূর্ববঙ্গে (অধুনা বাংলাদেশে) একটি ধারার নাম পদ্মা, এখনও সেই নামই আছে, অন্য ভাগটির একটি পৌরাণিক নাম (বেশি ব্যবহৃত নয়) ভাগীরথী, আর হুগলি নিছকই ইংরেজদের স্বকপোল কল্পিত? নাকি পাঠান-মোগল আমলে এই উটকো নাম দেওয়া হয়েছিল?
কিছুটা দেরি হলেও অনেক নগর, নদী, পর্বতের ইংরেজদের দেওয়া বিকৃত নামের পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। মুম্বই, চেন্নাইয়ের মতন ক্যালকাটার বদলে কলকাতা নামটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। কোনও মানচিত্রে, এমনকী স্বদেশি-বিদেশি বিমান সংস্থাগুলিতেও এখন ক্যালকাটার বদলে কলকাতা এসে গেছে স্বাভাবিক ভাবে। কলকাতা শহরের নানান পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, এখন আমাদের প্রিয় নদীটির আসল নামটিকে কি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা যায় না?
আমার গঙ্গা স্মৃতি
ছেলেবেলায় প্রায় আট-ন’মাস আমি ছিলাম কাশীতে। মা-ভাইবোনদের সঙ্গে (কিংবা আমার বোন বোধহয় তখনও জন্মায়নি), বাবা থাকতেন কলকাতায়। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ মধ্যগগনে। আমার সেই কাশীবাসের যে কয়েকটি স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে, ছোট্ট মাটির খুড়িতে মাত্র দু’পয়সায় বিশ্বনাথের গলিতে রাবড়ি কেনা। আর একটি হচ্ছে দশাশ্বমেধ ঘাটে প্রতি বিকেলে কথক ঠাকুরদের মুখে রামায়ণের গল্প শোনা। বিভিন্ন কথক ঠাকুর খানিকটা দূরে দূরে আলাদা আলাদা গল্প শোনাতেন। আমার মনে আছে রামায়ণের কথা। আমার একটি উপন্যাসে কাশীর সামাজিক ছবি ফুটিয়ে তুলতে আমার সেই বাল্যস্মৃতি অনেকটা কাজে লেগেছিল।
কথক ঠাকুরেরা যে সব পৌরাণিক কাহিনি শোনাতেন, তা কিন্তু ঠিক পাঠ নয়। কথক ঠাকুরেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কখনও নেচে নেচে রামায়ণ মহাভারতের গল্প খানিকটা অভিনয় করে মূল কাহিনির সঙ্গে নিজেরাও কিছু জুড়ে দিতেন। কোনও কোনও ঘটনার ব্যাখ্যাও করতেন। যেমন, সীতা হরণের সময় রাবণ সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধরে সবলে সীতাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে উড়ে যাচ্ছেন আকাশপথে। সেই দৃশ্য নাটকীয় ভাবে বর্ণনা করার পর কথক ঠাকুর বলতেন, হে রাবণ, তুমি যে সীতাকে হরণ করলে, তা এমন কিছু দোষের নয়, রাজারা তো এ রকম করেই থাকেন। নারী ও বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। কিন্তু তুমি নিজের পৌরুষ প্রদর্শনের বদলে সন্ন্যাসী সাজলে কেন? এই যে কাণ্ডটি তুমি করলে, তার ফলে কী হল জানো, সেই থেকে লোকে সাধু সন্ন্যাসীদের অবিশ্বাস করতে লাগল। ছি ছি রাবণ রাজা!
আমার তখন ন’দশ বছর বয়স। পথের পাঁচালীর অপুও এই বয়সে কাশীতে ছিল। সেই নিজের চোখের চেয়েও বড় বড় চোখ মেলে সব কিছু দেখা, নতুন নতুন মানুষের কথা মনে গেঁথে রাখাই চলতে থাকে। আমার অন্য দুটি ভাই আরও ছোট। তাদের রামায়ণ মহাভারত সম্পর্কে তখনও আগ্রহী হওয়ার কথা নয়। তারা এ দিক ও দিক খেলে বেড়ায়। শেষ বিকেলে দশাশ্বমেধ ঘাট লোকে লোকারণ্য। কাছেই বাঙালিটোলা। তাই বাংলা কথাই শোনা যায় বেশি। মায়ের পাশে বসে আমি গোগ্রাসে রামায়ণ গিলতাম।
ডিসেম্বর মাস। কলকাতার বাঙালিদের কাছে কাশীর শীত খুব বেশিই মনে হয়। আমি অলেস্টারের উপর (কথাটা ঠিক কি না, তা আজও জানি না) চাদর জড়িয়ে নিতাম। এই সময় কাশীতে বেড়াতেও আসেন অনেকে। তাদের সঙ্গে নানা রকম শৌখিন শীতের পোশাক। এক দিন খুব মন দিয়ে রামায়ণের গল্প দ্বিতীয় বার শুনছি, হঠাৎ একটু দূরে হই হই রব উঠল। গঙ্গার সিঁড়ির শেষ ধাপে এক দল লোক জড়ো হয়েছে। আওয়াজ আসছে সেখান থেকে। পৌরাণিক গল্পের চেয়েও বাস্তব নাটকের প্রতি বেশি আগ্রহে ছুটে গেলাম সেই দিকে।
তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেখানে গিয়ে বোঝা গেল, লোকেদের চিৎকারের মর্ম, একটা বাচ্চা ছেলে হঠাৎ জলে পড়ে গেছে। কিন্তু তাকে বাঁচাবার জন্য কেউ জলে নামছে না। কারণ বোধহয় সকলেরই গায়ে অনেক পোশাক, পায়ে মোজা। সেই বয়সেই আমি নিজেকে খুব ভাল সাঁতারু মনে করতাম। এতগুলি লোকের সামনে আমার সাঁতার কৃতিত্ব দেখাবার লোভেই সম্ভবত আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম গঙ্গায়। প্রায় ডুবন্ত বাচ্চাটির দুটি মুঠি করা হাত দেখা যাচ্ছে দু’এক বার। আমি কোনও রকমে তার হাত ধরে ফেলে টেনে আনলাম ঘাটে। তখন দেখা গেল, সে আমারই ছোট ভাই বাচ্চু।
কথকতার আসরে আমার মা এই ঘটনা শুনেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য।
আরও একটু স্মৃতি
বাঙালিটোলায় একটা সরু গলির মধ্যে একটা বাড়ির তিনতলায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম আমরা। বাবা কলকাতায়, মা নিতান্তই এক যুবতী। সুতরাং পরিবারের কর্তা তখন আমিই। বাজার-টাজার করার ভার আমার ওপর। আমাদের এক পিসিমা ও পিসেমশাই থাকতেন ওই বাঙালিটোলায়। সেই সূত্রেই আমাদের কাশী যাওয়া। কিন্তু আত্মীয়তার সেই সম্পর্ক আমাদের পক্ষে তেমন ভরসার কিংবা সুখকর হয়নি।
এক দুপুরে ছাদে ঘুড়িটুড়ি উড়িয়ে ঘর্মাক্ত অবস্থায় নীচে নেমে দেখি, আমার মায়ের সামনে এক শীর্ণ চেহারার মহিলা বসে আছেন এবং কথা বলতে বলত আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। মা চোখের ইঙ্গিত করলেন, যাতে আমি সেখানে না থাকি।
পরে মায়ের কাছে ছেঁড়া ছেঁড়া বিবরণ শুনে এবং পারিপার্শ্বিক কিছু কিছু চরিত্র দেখে আমি ঘটনাটি জুড়েছি। নিছক ঘটনা নয়, এক টুকরো ইতিহাস।
পাড়াপ্রতিবেশীদের মুখে আমাদের এই নবাগত পরিবারটির পদবি শুনে তিনি আলাপ করতে এসেছেন। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল যে আমাদের মতো পূর্ববঙ্গের একই গ্রামের, একই পল্লি থেকে তিনিও এসেছেন এখানে। আটচল্লিশ বছর আগে। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ন’বছর বয়সে। মাত্র দেড় বছর পরে বৈধব্য। তার এগারো মাস পরেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কাশীতে। তারপর আর কোনও দিন বাংলায় ফিরে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সালতারিখের খুঁটিনাটি সব তাঁর মুখস্থ আছে এখনও।
সে কালে বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের বালবিধবাদের বিড়াল পার করার মতো কাশী বা বৃন্দাবনে যে পাঠিয়ে দেওয়া হত, তা অনেক বইতে পড়েছি। তারই একটি জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আমার নিজের চোখে দেখা। সে সময় বারাণসীর রাস্তায় কিংবা ঘাটে বিধবাদের প্রাচুর্য ছিল খুবই। তার তাৎপর্য সে সময় বুঝিনি। সেই মহিলাকে আমরা অন্নদামা বলতাম। তিনি মাঝে মাঝে আসতেন আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করতে। তাঁর সঙ্গে লতায়পাতায় আমাদের কী একটা আত্মীয়তাও বেরিয়ে পড়ল।
এই বিধবাদের গ্রাম থেকে গোপনে বিদায় করে দিয়ে কিছু মাসোহারা পাঠানো হত, দশ টাকা বা পনেরো টাকা। পরিবার থেকে ওই টাকাটা আসত, তারপর জিনিসপত্রের দাম অনেক বাড়লেও মাসোহারা আর বাড়ত না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর টাকা আসাই বন্ধ হয়ে যেত। কী করে বেঁচে থাকতেন এঁরা? শেষ পর্যন্ত এঁদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে যে পেশাটিকে গ্রহণ করতেন তাতে আমি কিছুতেই নৈতিকতার প্রশ্ন তুলতে রাজি নই।
হিসেব অনুযায়ী অন্নদামা’র বয়স ষাটের কাছাকাছি হওয়ার কথা। এই বয়সের কোনও রমণী এ যুগে সিনেমার নায়িকা হয়। কিন্তু অন্নদামাকে দেখাত অশীতিপর বৃদ্ধার মতো। হাঁটতেন একটু খুঁড়িয়ে। জীবনের কাছ থেকে তিনি অবজ্ঞা ও লাঞ্ছনা ছাড়া কিছুই পাননি। তবু ভারী মধুর ছিল তাঁর ব্যবহার। আমাদের কাছ থেকে তিনি কোনও রকম সাহায্য নিতে চাইতেন না। বরং আটচল্লিশ বছর আগে ছেড়ে আসা তাঁর গ্রামের নতুন বউ আমার মা, তাঁকে আশীর্বাদস্বরূপ কিছু দিতে পারছেন না, সে জন্য তাঁর সে কী আফশোস।
আমি আজও স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। কিন্তু বহু বছর আগে দেখা অন্নদামাকে আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে। আর তখনই মনে হয়, এই সব নারীর জন্য একটা বিশেষ স্বর্গ অবশ্যই থাকা উচিত।
১৩. ৭. ২০১১
Chapter - 5
গ্রন্থব্যবসায় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
ঠিক সাহিত্য নয়, গ্রন্থব্যবসার জগতে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে রইল অবশ্যই হ্যারি পটার কাহিনি। লেখিকা শ্রীমতী রাউলিং মোট সাতখানা উপন্যাস লিখেছেন হ্যারি ও জাদুগল্প নিয়ে, তা নিয়ে ফিল্ম হয়েছে আটখানি। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ, পার্ট টু’ এই নামে অষ্টম ছবিটি শুরু হয়ে গেল এই জুলাই মাসের ১৫ তারিখে। শ্রীমতী রাউলিং ঘোষণাই করে দিয়েছেন যে তিনি হ্যারির সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আর কোনও বই লিখবেন না। অর্থাৎ, এ বিষয়ে আর কোনও উপন্যাস বেরুবে না, আর কোনও চলচ্চিত্রও প্রকাশিত হবে না। একটা অধ্যায়ের শেষ হল। অবশ্য, সেই বইগুলি ও চলচ্চিত্রক’টির জনপ্রিয়তা আরও কত দিন চলবে কে জানে!
আর জনপ্রিয়তা মানে, ব্যাখ্যাহীন, বিস্ময়কর ব্যাপার। সাতখানা বইয়ের প্রত্যেকটি সমান জনপ্রিয় আর প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক দিক থেকে অসম্ভব সার্থক। এই যে ‘ডেথলি হ্যালোজ পার্ট টু’ ফিল্মটি, তার প্রথম সপ্তাহেই বিক্রির পরিমাণ দেখে প্রযোজক ওয়ার্নার ব্রাদার্স-এর চক্ষু চড়কগাছ। আশাতীত তো বটেই, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বিক্রির সর্বোচ্চ রেকর্ড। হলিউডেও এমন কখনও হয়নি আগে। কী এর জাদু?
বারো বছর আগেও শ্রীমতী রাউলিং ছিলেন এক বিবাহবিচ্ছিন্না ব্রিটিশ মহিলা, একটি সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসার, লেখিকা হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, তার পর একটা পাণ্ডুলিপি, যাকে বলে, লেগে গেল। আমরা বাংলায় যাকে বলি গাঁজাখুরি গল্প, হ্যারি পটার নামে এক কিশোর ও জাদুবিদ্যা শেখাবার কলেজের গল্প। ঠিক তা-ই, তবু সেই অবান্তর, উদ্ভট কাহিনি নিয়েই কী করে বাচ্চা পাঠকদের মধ্যে এমন অসম্ভব উন্মাদনা সৃষ্টি করল, তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে বটে, কিন্তু সদুত্তর আজও পাওয়া যায়নি। এটা যেন সত্যিই ম্যাজিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী। আর শ্রীমতী রাউলিং এখন পৃথিবীর যে-কোনও দেশের রানির চেয়েও ধনী।
কোন বই হঠাৎ অসংখ্য পাঠকের মন জয় করে নেবে, তাও যেন এক দুর্বোধ্য ম্যাজিক। হঠাৎ কোনও এক অজ্ঞাতকুলশীল লেখক বা লেখিকার বই বেস্টসেলার লিস্টের প্রথমে এসে যায়। তারপর তা নিয়ে কত রকম গল্প ও প্রচার চলে। আজকাল বইয়ের ক্রেতা ও পাঠক কমে যাচ্ছে, এ রকম শুনতে শুনতেও দেখতে পাই, মার্কিন দেশে বিশেষ কোনও বইয়ের প্রথম প্রকাশের দিনেই তিন লক্ষ বিক্রি। এখন তো আবার ইলেকট্রনিক বই বা ই-বুক এসে গেছে। বাংলায় অবশ্য এ সব এখনও কল্পনার অতীত। আমাদের যে বেস্টসেলার লিস্ট প্রকাশিত হয়, তাতে কোন বই সপ্তাহে কতগুলি বিক্রি হলে এই লিস্টে স্থান পাবার যোগ্যতা পায়, তা কখনও জানানো হয় না। আনন্দবাজারে যে বেস্টসেলার সাপ্তাহিক তালিকা বেরোয়, তাতে বছরের পর বছর শীর্ষস্থানে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং সত্যজিৎ রায়ের নাম স্থায়ী হয়ে আছে। অন্যান্য লেখকদের নাম মাঝে মাঝে বদলাবদলি হয়। এটা বাংলায় প্রয়াত লেখকের পক্ষে খুবই গৌরবের কথা, কিন্তু জীবিত লেখকদের পক্ষে তেমন সম্মানের নয়। তবে, শরৎচন্দ্রের নাম আর থাকে না বলে একটু খটকা লাগে। আর জন্মের দেড়শো বছর উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত রকম উৎসব-আয়োজন চলছে, তবু রবীন্দ্রনাথের বই কি তেমন বিক্রি হচ্ছে না? যদিও রবীন্দ্ররচনার প্রকাশের অধিকার এখন মুক্ত। তবে, দুই বাংলার লেখকদের সংযুক্ত তালিকা প্রকাশের রেওয়াজ আমাদের নেই, হয়তো ঠিক সংখ্যা জানারও অসুবিধে আছে। যদি থাকত, তা হলে নিশ্চিত বাংলাদেশের হুমায়ুন আহমেদের নাম শীর্ষ তালিকায় দেখা যেত মাসের পর মাস। আমি শুনেছি, হুমায়ুন আহমেদের এক-একটি উপন্যাস দু’মাসে পঁচিশ হাজার কপির সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। পশ্চিমবাংলায় তেমন কোনও লেখক আছেন কি?
বেস্টসেলার প্রসঙ্গে আর একটি প্রায় অবিশ্বাস্য কাহিনি শোনাতে চাই। স্টিগ লারসন নামটি আমাদের দেশে তেমন সুপরিচিত নয়। ইনি ছিলেন এক জন সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদী। কাজ করতেন সুইডেনের একটি সংবাদ সংস্থায়, তাও ডিজাইনার হিসেবে, আর এক্সপো নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন চালাতেন। সুইডেনে একটি নাতসিপন্থী উগ্র দল মাঝে মাঝে মাথা তোলে, লারসন তাদের বিরোধিতা করতেন সব সময়। লেখক হিসেবে কেউ তাঁকে কখনও তেমন গুরুত্ব দেয়নি। হঠাৎ কী খেয়াল হল, লারসেন রহস্য-কাহিনি লিখতে শুরু করলেন, লিখলেন পর পর তিনখানা। একখানাও ছাপার আগে তিনখানা উপন্যাস লেখা কিছুটা অভিনব তো বটেই, তার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার এই যে, প্রথম উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি প্রেসে জমা দেবার পর, সেটি পুস্তক অবস্থায় না দেখেই মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়েসে তিনি আচমকা মারা গেলেন। এবং সেই বই ‘দ্য গার্ল উইথ দ্য ড্রাগন ট্যাটু’ প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে গেল। সুইডেনে তো বটেই, বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদেও। মৃত্যুর সঙ্গে জনপ্রিয়তার কি কোনও সম্পর্ক আছে? অনেক সময় লেখকের মৃত্যুর কথা রটিয়ে দিলে তাঁর সম্পর্কে পাঠকদের আগ্রহ জাগতে পারে। যেমন একবার ঘটেছিল বাংলায়। বিনয় মুখোপাধ্যায় নামে একজন সাংবাদিক এক সময় যাযাবর ছদ্মনামে ‘দৃষ্টিপাত’ নামে একটি বই লেখেন এবং সে বইয়ের ভূমিকায় লেখা ছিল যে লেখক মৃত, যদিও তিনি বহাল তবিয়তে দিব্যি বেঁচে। পঞ্চাশের দশকে সে বই এমনই জনপ্রিয় হয় যে, লোকে দোকানের সামনে লম্বা লাইন দিয়ে সে বই কিনেছিল। পরে রহস্য ফাঁস হয়ে গিয়েছিল, যাযাবর আরও বেশ কয়েকটা বই লিখেছেন, কিন্তু সে জনপ্রিয়তা আর পায়নি।
লারসন অবশ্য সত্যি সত্যি মৃত, বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০০৪ সালে। তারপর তাঁর উপন্যাসটির জনপ্রিয়তা কোন তুঙ্গে পৌঁছেছে, তার একটা হিসেব দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। মূল রচনা ও অনুবাদ মিলিয়ে এই বই বিক্রি হয়েছে পঞ্চাশ মিলিয়ন কপি৷ পাঁচ কোটি বই? এবং এখনও সমান জনপ্রিয়তা।
‘দ্য গার্ল উইথ দ্য ড্রাগন ট্যাটু’ উপন্যাস আমি পড়ে দেখেছি। সুবিধে লাগেনি, কেন এত জনপ্রিয়তা, তাও বুঝতে পারিনি। খটোমটো সুইডিশ নাম ও জায়গা, ও দেশের ব্যাঙ্কিং অর্থনীতি, শেয়ার বাজার সম্পর্কে এত খুঁটিনাটি আছে যে রহস্য-কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও আমি আগ্রহ ধরে রাখতে পারিনি। সে যা-ই হোক, আমার ভাল না লাগলেও লক্ষ লক্ষ পাঠকের তো লাগছে।
এই জনপ্রিয়তা নিয়েও এখন তৈরি হয়েছে এক জটিল সমস্যা। এত বই বিক্রির রয়ালটি তো অনেক টাকা। সে টাকা কে পাবে? লারসন বিয়ে করেননি, কিন্তু টানা বত্রিশ বছর ধরে তাঁর এক বান্ধবী ছিল, তাঁর নাম ইভা গেব্রিয়েলসন। এই ইভা তাঁর সহকর্মী, অনেক ব্যাপারে সাহায্য করেছেন, সহধর্মিণীই, শুধু বিবাহপ্রথায় বিশ্বাসী নন বলে রেজিষ্ট্রি করেননি। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন কোনও নারী ও পুরুষ, এক সঙ্গে অনেক দিন বাস করলে তাঁরা পরস্পরের সম্পত্তিরও অংশীদার হন। কিন্তু সুইডেনে সে রকম কোনও আইন নেই। তার ফলে লারসেনের বাবা ও ভাই এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য। ইভাকে বঞ্চিত করা নিশ্চিত অমানবিক হলেও আইন হচ্ছে আইন। মামলা চলছে, এর মধ্যে ইভাও একটা বই লিখে ফেলেছেন, সেটার নাম ‘স্টিগ লারসেন এবং আমার সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের জানাতে চাই।’ সে বইটিও বেস্টসেলার।
২৭. ৭. ২০১১
নবান্ন উৎসবের কথা, বহু দিন পরে
দাদা, আপনার কি মনে আছে, পোলটা পেরিয়ে একটুখানি গেলেই একটা বাজার ছিল। আমরা বলতাম, বাবুর বাজার।
হ্যাঁ, মনে আছে। খালের ওপর (আমরা মনে করতাম নদী) কাঠের ব্রিজ, তার ডান দিক বা বাঁ দিকে বাজার।
আপনি সেখানে কখনও বাজার করেছেন?
না রে, আমি তখন বেশ ছোট, বড়জোর ছ’সাত বছর বয়েস, তবে বাবার সঙ্গে গেছি কয়েকবার।
সেখানকার কোনও স্মৃতি আছে?
খুব সামান্য। এক দিন বাবা একটা লেপ কিনলেন, (ওখানে বলত ল্যাপ) তাঁর মায়ের জন্য। কাঁথা গায়ে তাঁর শীত করত। টুকটুকে লাল রঙের লেপ, সেটার কথা মনে থাকার কারণ, আমার ঠাকুমার পাশে শুয়ে আমিও সেই লেপ গায়ে দিয়েছি কিছু দিন।
আর কিছু?
এক দিন মাছের বাজারে ইলিশ মাছ কেনা। তোমরা শুনলে অবাক হবে, সে বাজারে কোনও মাছই ওজনদরে বিক্রি হত না। ছোট মাছ, যেমন পুঁটি, খলসে, বেলে, ট্যাংরা— এই সব বিক্রি হত ভাগা দিয়ে। দু’পয়সা চার পয়সা ভাগা; কই মাছ এক সঙ্গে চারটেকে বলা হত হালি, অথবা কুড়িটা এক সঙ্গে। মজার ব্যাপার, এটা আমি পরে শুনেছি, কোনও কোনও জেলায় মুখে বলা হত এক কুড়ি কিন্তু দিত বত্রিশটা৷ আর বড় মাছ, যেমন রুই বা ইলিশের দাম ঠিক করা হত তার আকৃতি দেখে। বাবা এক জোড়া ইলিশ কিনেছিলেন। কত দাম দিয়েছিলেন জানি না, যত দূর মনে হয়, দু’আনা বা তিন আনার বেশি নয়। তখন ষোলো আনায় এক টাকা।
আমরা অত শস্তা মাছ দেখি নাই, তবে এক টাকায় অনেক কিছু কেনা যেত।
ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, সেই বাজারেরই পিছন দিকে একটা পাঠশালা ছিল না?
আমরা পাঠশালা দেখি নাই, তবে একটা প্রাথমিক স্কুল আছিল। পরে সেইটা বড় স্কুলের সঙ্গে মিলে যায়।
এখন বোধহয় কোনও গ্রামেই পাঠশালা নেই, প্রাইমারি স্কুল দিয়ে শুরু। আমি কিন্তু পাঠশালায় পড়েছি। খড়ের চালের ঘর, মেঝেতে চট পেতে বসা, সঙ্গে শুধু স্লেট পেন্সিল। নামতা পড়া হত চেঁচিয়ে। সেই নামতা এখনও আমার মনে আছে। তাই সাত চোদ্দং আটানব্বই চট করে বলে দিতে পারি। আমি কলকাতার পাঠশালাতেও পড়েছি, দর্জিপাড়ায় ‘যদু পণ্ডিতের পাঠশালা’, সেটা বেশ বড় পাকা বাড়িতে। এখন নাম বদলে ফেলেছে কি না জানি না।
দাদা, ‘কালা রায়ের বাগ’ কিংবা রায় বাগানের কথা আপনার মনে পড়ে?
নাঃ।
ওটা ছিল এক বিশাল জঙ্গল, গভীর, দিনের বেলাতেও পাশ দিয়ে যেতে আমাদের গা ছমছম করত ছোটবেলায়। (আপনার ছোটবেলার অনেক পরে), মাঝে মাঝে সেখানে নাকি বাঘও (ওখানে বলত বড় শিয়াল) এসে পড়ত। চোর-ডাকাতের ভয়ও ছিল।
না ভাই, সে জঙ্গলের কথা আমার মনে নেই। তবে, সুন্দরবন থেকে বেশ দূরে হলেও মাঝে মাঝে ওই দিককার গ্রামে দু’একটা বাঘ ছিটকে চলে আসত, গল্প শুনেছি। আর এক রকম প্রাণী ছিল বাঘডাসা, আর গুলবাঘার কথাও শুনেছি, সেটা নাকি পুরোপুরি বাঘ নয়। আর শিয়াল আর সাপ ছিল অজস্র। তোমাদের গ্রামে এখনও কি তেমন গভীর জঙ্গল আছে?
তোমাদের গ্রাম কেন বলছেন? আপনারও গ্রাম নয়? আপনার জন্মস্থান—।
তা ঠিক, তা ঠিক।
দাদা, মাইজ পাড়ার কথা আপনার মাঝে মাঝে মনে পড়ে না?
ঠিক মাঝে মাঝে মাঝে না হলেও, বহু বছর তো হয়ে গেল, তবু হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায়। যখন মনে পড়ে, তখন স্মৃতি একেবারে জ্বলজ্বল করে। সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাই। সেখানে অত গাছপালা আছে এখনও?
না, না মানুষ বাড়ছে না? সব সাফ করে দিচ্ছে। যে সব গাছের এখন মালিকানা নাই… আপনাদের বাড়ির সামনের জম্ভুরা গাছটা (বাতাবি লেবু) কঙ্কালসার অবস্থা আমি দেখছি, তাও শেষ পর্যন্ত গেছে। যে-সব জঙ্গলে ছোট বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে পলাপলি খেলেছি, সে-সব আজ অদৃশ্য।
জম্বুরা গাছের আয়ু কত দিন হয়, জানি না, ষাট-সত্তর বছর আগের কথা। তবে বটগাছটা, ইস্কুল যাবার পথে, খুবই বিশাল ছিল, কত কোটর, কত ডালপালা, তার নীচে এক ধারে হিন্দুদের একটা ছোটখাটো শ্মশানও ছিল। তাই একটু ভয়ের ব্যপারও ছিল।
দুঃখের বিষয়, সে গাছটাও নাই, কেটে ফেলেছে। আমি দেখেছি ছোট বয়সে, সত্যি খুব বড় গাছ ছিল সেটা, তবে বট না, অশ্বত্থ।
ওই গাছে তক্ষক ছিল। ঠিক সাত বার ডাকত, আমরা গুনতাম, ভয়ও পেতাম।
সে ডাক আমরাও শুনেছি। আমরা ওটাকে তক্ষক বলতাম না, বলতাম ঠক্কর। আর জানতাম যে ওরা দূর থেকে মানুষের শরীরের রক্ত শুষে নেয়। তাই আগে থেকে বুকে ছ্যাপ (থুতু) ছিটিয়ে নিতাম।
আসলে তক্ষক সাপই নয়, বড় আকারের গিরগিটি, বিষ-টিষ নেই। মহাভারতে তক্ষক সাপ একটা বড় চরিত্র, তাই নাম শুনলেই ভয় জাগত।
দাদা, আপনি হয়তো ব্যস্ত ছিলেন, আপনাকে ফোনে বিরক্ত করলাম কি না জানি না। আজ সকালে ঘুম ভেঙেই দেখি, আমার জানলার বাইরের গাছটা সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে, ঝলমল করছে রোদ, সেখানে দুটো পাখি এসে বসেছে। অর্থাৎ, এ দেশে বসন্ত এসে গেল। কানাডার প্রচণ্ড ঠান্ডাতেও পাখি দুটো বেঁচে ছিল কী করে তাই ভাবি। একটুক্ষণ ভাবতে ভাবতেই আমার দৃষ্টি ও মন চলে গেল বহু দূরে, পূর্ব গোলার্ধে, আমাদের গ্রামে। এখানে থাকি, প্রায়ই মন চলে যায় সেখানে। সেই মাটির পথ, বৃষ্টিভেজা গাছপালা, কত রকম পাখি, আমার খুব ইচ্ছে হল সেই গ্রামের স্মৃতির ছবি আপনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি।
রাজ্জাক, আমার জন্ম তো তোমারও আগে। দেশভাগের আগে আর পরে তো ওই সব গ্রামের ছবি অনেক বদলে যাবেই। জনগোষ্ঠীর প্যাটার্ন পাল্টে গেছে। আমি যে-সব বাড়িতে যে-সব মানুষ দেখেছি, সেখানে এখন অন্য মানুষ। এই তো যেটা জতু গাঙ্গুলির বাড়ি বলে পরিচিত ছিল, এখন সেটা হাওলাদার বাড়ি। এটাই স্বাভাবিক।
দাদা, হিন্দু-মুসলমান, ধোপা-নাপিত, বামুন-কায়েত, কামার-কুমোর, মুচি-ডোম-জেলে মিলে এক সময় মাইজপাড়া জমজম করত, আমি খুব ছোট বয়েসে অল্প অল্প দেখেছি সে-সব। তারপর কত মানুষ চলে গেল, আমার খেলার সঙ্গীরা, অনেক শূন্য বাড়ি হাহাকার করে, কেমন যেন নিরানন্দ ভাব।
তুমিও তো সে গ্রামে আর থাকে না।
থাকতে পারলাম না। ফিরে গেছি বার বার, আবার চলে আসতেও বাধ্য হয়েছি, তবু কেন বুক জুড়ে রয়েছে সেই গ্রাম। দাদা, একটা প্রশ্ন করি, আমার দেখা মতে, আপনাদের যেখানে বাড়ি ছিল, সেখানে ছিল তিনটি পরিবার। চৌধুরি, চ্যাটার্জি আর ব্যানার্জি, কেউ তো গাঙ্গুলিদের কথা বলেনি, কোনও বাড়িও দেখিনি। আমরা শুধু চৌধুরিদের দেখেছি, অন্য কোনও বাড়িতে কেউ ছিল না। সে বাড়ির এক জন আমাদের মতন বাচ্চাদের পড়াতেন। তাঁকে আমরা বলতাম ছদ্রি স্যার।
বললাম না, তোমার আর আমার স্মৃতির ছবি অন্য রকম হবেই। তুমি শুধু দেখেছ চৌধুরিদের, ওই পল্লিটি বামুনপাড়া বলে পরিচিত ছিল। একটা বড় চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণের চার পাশে চারটি বাড়ি, প্রধান বাড়িটিই চৌধুরিদের, তাঁরা বেশ অবস্থাপন্ন। এর ঠিক উল্টো দিকেই নগেন চাটুজ্জ্যের মস্ত বড় পরিবার, সেই পরিবারের এক জনকে আমরা ডাকতাম চুনীকাকা, পঞ্চাশ সালে তিনি খুন হন, কলকাতায় বসে শুনেছি, তার পরেই পরিবারটি ছত্রভঙ্গ হয়ে দেশত্যাগী হয়। আর দু’দিকে ছিল দু’টি ব্যানার্জি ও চ্যাটার্জি বাড়ি, এঁদের সম্পর্কে আমার স্মৃতি অতি সামান্য। তোমরা গাঙ্গুলিবাড়ির নাম শোনোনি, তার কারণ বুঝতে পারছ, এই পরিবারগুলির মধ্যে গাঙ্গুলিরাই ছিল সবচেয়ে এলেবেলে, সবচেয়ে গরিব। তাদের সামনের দিকে স্থান হয়নি, পিছনের এক কোণে… আমার জ্যাঠামশাই থাকতেন, তিনি চলেও আসেন আগে।
বুঝেছি, ওইখানে একটা মস্ত পুকুর ছিল, এখন অনেকটাই মজে গেছে, পাট চাষ হয়।
অ্যাঁ? পুকুরটা আমার খুব প্রিয় ছিল। ওখানে আমি সাঁতার শিখেছি। প্রায়ই দুপুরে এসে বসে থাকতাম, জলের দিকে তাকিয়ে। কী যেন একটা দেখার আশায়।
অ্যাঁ? পুকুরটা আমার খুব প্রিয় ছিল। ওখানে আমি সাঁতার শিখেছি। প্রায়ই দুপুরে এসে বসে থাকতাম, জলের দিকে তাকিয়ে। কী যেন একটা দেখার আশায়।
চৌধুরিবাবু মারা যাবার পর তাঁর স্ত্রী দু’টি কন্যা নিয়ে আর থাকতে সাহস পেলেন না। তখন কিন্তু ‘বাংলাদেশ’-এর জন্ম হয়ে গেছে। উনি প্রতি বছর আমাদের নবান্ন খাওয়ার দাওয়াত (নেমন্তন্ন) দিতেন। সকালবেলা দৌড়ে গিয়ে চৌধুরি স্যারের স্ত্রীর গলা শোনা যেত, আয়, আয়, কাক, আয়, আয়, কো-কো-কো।
রাজ্জাক, তুমি আমাকে কত দিন পর নবান্নের কথা মনে করিয়ে দিলে। সেই কা কা ডাকা, সেই নতুন চালের গন্ধময় পায়েস।
টেলিফোনে অনেকক্ষণ ধরে এই সব কথা বলছে যে দু’জন, তাদের বিষয়, পৃথিবীর প্রায় উল্টো দিকে, সাড়ে চোদ্দো হাজার মাইল দূরের এক অতি সাধারণ গ্রাম। রাজ্জাক থাকে মনট্রিয়ল শহরে, আমি কার্য-কারণবশত কয়েক দিনের জন্য বোস্টন শহরে।
আমি তো কখনও কোথায়, কোন মাটিতে আমার জন্ম, তা নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিইনি। তবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কেন এই স্মৃতিচর্চা? আর রাজ্জাক হাওলাদার ছিল এক জন মুক্তিযোদ্ধা, তার ছ’ভাইয়ের মধ্যে পাঁচ ভাই-ই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। রাজ্জাকের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, দূর বিদেশে বসে বাংলার মাটির জন্য বুকে ব্যথা হয় তার।
১০. ৮. ২০১১
ইলিশ, ইলিশ হায় রে ইলিশ!
আজ সকালে আমি গেলাম বাজারে। ইলিশের সন্ধানে। বুদ্ধদেব বসু, কবিতা লিখেছেন, ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’ ইলিশ মাছ নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে ইলিশের ছড়াছড়ি। সৈয়দ মুজতবা আলি বর্ণিত সেই গল্পটি নিশ্চয়ই অনেকেই জানেন। তবু সংক্ষেপে আবার বললে ক্ষতি নেই। এটি বিখ্যাত সম্রাট মুহম্মদ-বিন তুঘলক সম্পর্কে। ইতিহাসে যাঁকে পাগলা রাজাও বলা হয়। সেই তুঘলক গেছেন গুজরাটে বিদ্রোহীদের দমন করার উদ্দেশ্য নিয়ে। এমনকী জলাভূমিতে নৌকায় চেপে তাদের তাড়া করতেও সম্রাটের খুব উৎসাহ। তারই মধ্যে এক বিকেলে হঠাৎ একটা মাছ লাফিয়ে উঠে পড়ল নৌকার উপর। ঝকঝকে সাদা রং, তার গড়নটি চমৎকার। মাছটি দেখে সম্রাট খুবই কৌতূহলী হয়ে পড়লেন। এটা কী মাছ, কেউ জানে না। তুঘলক বললেন, এটাকে এক্ষুনি কেটেকুটে রান্না করে দাও। আমি খেয়ে দেখব। তা শুনে মন্ত্রী ও পারিষদরা আঁতকে উঠলেন। তারা সম্রাটকে অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করলেন যে, এই মাছ বিষাক্ত কি না তা তাঁর জানা নেই, তা ছাড়া এখন রোজার মাস চলছে, সুতরাং এখন এই মাছ সম্রাটের মুখে ছোঁয়ানোই উচিত নয়। জেদি সম্রাট কারও উপদেশ গ্রাহ্য করলেন না। তাঁর আদেশে তিনি সেই মাছ রান্না করালেন এবং খেলেন। খুব সম্ভবত অনেকটাই খেয়ে ফেললেন। তার পর তাঁর পেট ছেড়ে দিল, এবং সেই কারণেই কি না কে জানে, কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু হল তার। এর পর মুজতবা আলির মন্তব্য এই: সেই অচেনা মাছটি ইলিশই ছিল। এবং ইলিশ খেয়ে যখন সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে, তখন নিশ্চিত তিনি বেহস্তে গেছেন।
এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে আমায় কেউ প্রশ্ন করবেন না, প্লিজ। তবে গুজরাটে ইলিশ পাওয়া যায় ঠিকই। তার নাম পাল্লা। পৃথিবীর বহু দেশেই ইলিশ পাওয়া যায় বিভিন্ন নামে। ইলিশ সমুদ্রের মাছ। এক সময় নদীতে নদীতে ঝাঁক বেঁধে ঢোকে ডিম পাড়ার জন্য। স্যামন মাছেরও এই স্বভাব। তবু বাঙালিদের ধারণা, বাংলার নদীর ইলিশ রূপে, গুণে, স্বাদে, গন্ধে শ্রেষ্ঠ। আমেরিকার ইলিশের নাম শ্যাড।
রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছর উপলক্ষে কত রকম নতুন নতুন গবেষণাপত্র বেরোচ্ছে। ‘রবীন্দ্রনাথ ও মাছ’ এই বিষয়ে কেউ কিছু প্রকাশ করেছেন কি না, তা আমার চোখে পড়েনি। রবীন্দ্রনাথের ইলিশ-প্রীতি সম্পর্কে কোনও তথ্য আমার জানা নেই। তবে পদ্মার ওপর বোটে অনেক দিন চেপেছেন, মাঝে মাঝে কি ইলিশ চেখে দেখেননি?
স্বামী বিবেকানন্দর ইলিশ-প্রীতি বিশ্ববিখ্যাত। স্বামীজির বুকের উপর আড়াআড়ি রাখা দু’হাত ও বীরত্বব্যঞ্জক চেহারা বহু পরিচিত হলেও তাঁর স্বাস্থ্য কিন্তু তেমন ভাল ছিল না। শেষের কয়েক বছর নানা রকম ব্যাধিতে ভুগেছেন। তিনি ছিলেন ভোজনরসিক। অনেক সময় চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা গ্রাহ্য করতেন না। একবার পূর্ববঙ্গে গিয়ে স্টিমারে ঘুরতে ঘুরতে ইলিশ মাছ ধরা দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। চোখের সামনে এত টাটকা ইলিশ! তিনি তাঁর সঙ্গী কানাইকে তক্ষুনি আদেশ দিলেন, গোটা কতক ইলিশ কিনে ফেলতে। ওঁদের দলে রয়েছেন মোট সাত জন। তাই কানাই তিনটি বা চারটি বেশ বড় ইলিশ কিনতে চাইলে স্বামীজি তাঁকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, আমরা ক’জন মিলে খাব আর স্টিমারের খালাসি-মাঝিমল্লারা চেয়ে দেখবে?
কিনে ফেলা হল ষোলোটি ইলিশ। কত দামে? এক একটি চার পয়সা, তাই মোট এক টাকা! এটা গাল-গল্প নয়, বিবেকানন্দর প্রামাণ্য জীবনীতে এই দামের উল্লেখ আছে।
আর এক দিন, তখন স্বামীজির শরীর বেশ খারাপ। একটা যাই যাই রব উঠে গেছে। প্রায়ই তিনি বলেন, তাঁকে শিগগিরই চলে যেতে হবে। তিনি চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচবেন না। একদিন তিনি উপোস করেছেন, পর দিন পরমহংসদেবের ঘরে বসে ধ্যান করলেন প্রায় তিন ঘণ্টা। তার পরই তাঁর খুব খিদে পেয়ে গেল। তিনি ঠিক করলেন, আজ তিনি ভাত মাছ, তরকারি সব খাবেন। পুরোপুরি ঝাল ও মশলা দিয়ে। তখন গঙ্গায় ইলিশ মাছ ধরা হল, প্রেমানন্দ স্বামী সেই মাছ কিনছেন খবর পেয়ে বিবেকানন্দ সেখানে উপস্থিত হয়ে কিনলেন সেই টাটকা ইলিশ। সে দিন বেলুড় মঠে লোকজন বেশি নেই। তাই তিনি প্রেমানন্দকে বললেন, শুধু ঝোল নয়, গোটাকতক মাছ ভাজা করতে বলল, ভাজা ইলিশের স্বাদই অপূর্ব। আর একটু মাছের টক করতেও বলে দিও।
সে দিন তিনি খেলেন ইলিশ মাছের তেল দিয়ে ভাত, ডাল দিয়ে ভাজা মাছ, ঝোলে তেমন ঝাল হয়নি বলে কাঁচালঙ্কা ডলে নিলেন। শেষ পাতে মাছের অম্বল। সেই সব খেয়ে তাঁর শরীরে এমনই শক্তি এল যে, লাইব্রেরি ঘরে এসে কয়েকটি ছাত্রকে পড়াতে লাগলেন পাণিনির ব্যাকরণের মতো নিরস ও শক্ত বিষয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেক দিন পর হাঁটতেও বেরোলেন। অনেক ব্যাপারেই তাঁর প্রবল উৎসাহ। অনেক গল্প করলেন অন্যদের সঙ্গে।
সেই রাত্রেই তাঁর মৃত্যু হল।
কোনও মৃত্যুর সঙ্গে ইলিশ ভক্ষণের নিশ্চয়ই কোনও সম্পর্ক নেই। আসল কথা হচ্ছে, খুব ভাল জিনিস একসঙ্গে বেশি আহার করতে নেই। বাঙালদের অভ্যাস আছে। তারা তবু অনেকটা খেয়ে নিতে পারে। বিবেকানন্দ বাঙাল ছিলেন না। তাই সহ্য করতে পারেননি। আবার ভক্তদের মতে, তিনি পুণ্যাত্মা মানুষ, ওই রাতেই তাঁর চলে যাওয়ার কথা ছিল, যাওয়ার আগে বেশ তৃপ্তি করে ইলিশের সব রকম স্বাদ নিয়ে গেলেন।
ইলিশ বিষয়ে আমার আরও অনেক কিছুই লেখার আছে, কিন্তু আজকাল অনেকেই আর পুরনো কথা শুনতে চায় না। আমি অনেক দিন বাজারে যাইনি, এ বছর শুনছি ইলিশের দাম নাকি ছ’শো সাতশো টাকা। অবিশ্বাস্য মনে হয়। নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখতে গেলাম।
এত দিন পরে বাজারে গেলেও তরকারিওয়ালি, ডিমওয়ালি, আলু-পেঁয়াজের দোকানদার অনেকেই আমাকে চিনতে পেরে, উঠে এসে আপনজনের মতো জিজ্ঞেস করে, দাদা অনেক দিন দেখিনি তোমায়, শরীর ভাল আছে তো? আজকাল আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই বিশেষ দেখা হয় না। এঁদের গলায় সেই আত্মীয়তার স্পর্শ পেয়ে মনটা নরম হয়ে যায়।
মাছের বাজারে যাওয়ার আগে, তরি-তরকারির বাজার দেখে চমকে উঠি। এত বৃষ্টি ও বন্যার কারণে নিশ্চয়ই অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সাধারণ তরকারিরই আগুন দাম। গরিব মানুষরা মাছ-মাংস বেশি দাম দিয়ে কিনতে পারে না। এখন খাবেও না। কিন্তু তরকারি না পেলে কী খেয়ে বাঁচবে? বেগুন যাট টাকা, কচুর শাক কুড়ি টাকা।
মাছের বাজারেও জমজমাট ভাবটা নেই। সাপ্লাই কম, অনেক দোকান খালি। ইলিশ আছে বটে, সবই বাংলাদেশের। এককালে ডায়মন্ডহারবার, কোলাঘাট, বাগবাজার ঘাটের ইলিশের খুব সুনাম ছিল। সে সব নাম আর কেউ করে না। এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের উপর নির্ভরতা। এই বাজারে যে সব ইলিশ রয়েছে, তা ছোট ছোট, বরফ দেওয়া, অনেকটা স্থল পথ পার হয়ে তারা এসেছে। বরফ তো দিতেই হবে।
আসল ইলিশের স্বাদ দেড় কিলো থেকে পৌনে দু’কিলোতে। আমরা বাল্যকাল থেকে ইলিশের সমঝদার। আমার মতন এমন মানুষ খুব কমই আছে, যে জ্যান্ত ইলিশকে লাফাতে দেখেছে। ছোট ইলিশ কখনও খেতাম না, আর বরফের ইলিশ তো ছুঁয়ে দেখারও প্রশ্ন ছিল না। কার্য-কারণবশত এ বছর এক দিনও ইলিশ খাইনি। একটুক্ষণ দোলাচলে রইলাম, দুধের স্বাদ যেমন ঘোলে মেটে না, তেমনই খাঁটি ইলিশের স্বাদের সঙ্গে অন্য কিছুর সমঝোতা চলে না। বরং না খাওয়াই ভাল। আমি চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে আমার পরিচিত মাছওয়ালাটি বলল, দাঁড়ান স্যার, আপনার জন্য আমি কাঁচা মাছ এনে দিচ্ছি।
কঁচা মাছ কাকে বলে তা আমি জানি। বরফ ছাড়া। টাটকা। কোনও কারণে এই মাছ এরা আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
সে যে দু-তিনটে মাছ নিয়ে এল, তাদেরও ওজন এক একটি এক কিলো একশো মাত্র। তবে গড়ন ও গায়ের রং দেখে বোঝা যায়, ভাল জাতের। কাঁচা মাছের দাম বেশি। সাতশো টাকা কিলো। শুনে পিলে চমকে যাওয়ার কথাটা অনেক দিন পর মনে পড়ল।
ফেরার পথে আমার কিন্তু বেশি মন খারাপ হল। বেগুনের দাম ষাট টাকা শুনে। তবু মানুষ বেঁচে আছে। মানুষ বেঁচে থাকবে।
একটি বিস্মৃত কাহিনি
অনেক কাল আগে, স্বাধীনতা ও দেশ বিভাগের আগে, এক কলকাতার বাবু গিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে বেড়াতে। একটি গ্রাম্য কিশোরের সঙ্গে ভাব জমাবার উদ্দেশ্যে তিনি জিজ্ঞেস করলেন খোকা, আজ কী দিয়ে ভাত খেলি রে দুপুরে?
ছেলেটি বলল, কলমি শাক আর দুইখান মাছ ভাজা দিয়া দুগ্গা (কিছু) ভাত খাইলাম। তার পর মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাইলাম। তার পর পুঁটিমাছ আর তেঁতুলের চুকা (টক) অম্বল।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, সে কী রে, তোরা ডাল খাসনি?
ছেলেটি ততোধিক অবাক হয়ে বলল, কত্তা, আমরা কি বড়লোক যে ডাইল খাব?
২৪. ৮. ২০১১
দুই বিখ্যাত বন্ধুর বিচ্ছেদ কাহিনি
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চমৎকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অনেক দিন। শেষের দিকে তা একেবারে বিষিয়ে যায়। এই বন্ধুবিচ্ছেদের কথা অনেকে জানে। কিন্তু প্রথম দিকের অনেক ঘটনা, যাতে দেখা যায় দু’জন বড় লেখকের মধ্যে গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কাহিনি, তা অনুধাবন করলে এই প্রশ্ন জাগবেই, কেন সে সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল, কেন এমন একটা অত্যন্ত কুরুচিকর কাণ্ড ঘটল? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর সম্ভবত আজও পাওয়া যায়নি।
এর কারণ কি শুধু ঈর্ষা? দু’জন সমসাময়িক লেখকের মধ্যে বন্ধুত্ব যেমন হয়, তেমনই ঈর্ষার সম্পর্কও স্থাপিত হতে পারে। সেটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। লেখকরা স্পর্শকাতর প্রাণী। যে কোনও শিল্পীই তাই। প্রায় একই বয়সী অন্য কোনও লেখকের সার্থকতা এবং খ্যাতি বেশি হয়ে যাচ্ছে দেখে আর একজন লেখকের মন ঈর্ষায় জ্বলে, কিন্তু তিনি সেই জ্বালা মনে মনেই চেপে রাখেন। এমনকী সেই ঈর্ষার জ্বালায় তার সৃষ্টি আরও বিকশিত হতে পারে কিন্তু প্রকাশ্যে সেই ঈর্ষার নগ্নরূপ দেখানো কি কোনও লেখককে মানায়?
আপাতদৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষা করার কোনও কারণই নেই দ্বিজেন্দ্রলালের। তাঁর জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। তাঁর সুনাম বাংলার বাইরে ছড়ায়নি। দু’জনেই কবি। দু’জনেই গান সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথও নাটক লেখেন, কিন্তু নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল অনেক বেশি জনপ্রিয়। দু’জনেই অভিজাত পরিবারের সন্তান।
রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে ঈর্ষা বা বিদ্বেষের সামান্যতম উপাদানও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ কখনও নিন্দুকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাননি। কোনও আক্রমণেরই তিনি প্রতি আক্রমণ-অস্ত্র শানাননি। তা বলে কি তিনি আঘাত পেতেন না? সামান্যতম আক্রমণেই তিনি আহত হতেন। তিনি লিখেছেন, কটাক্ষ যতই ক্ষুদ্র হউক, তাহারও বিদ্ধ করিবার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই সব আঘাতের কথা তিনি অতি সন্তর্পণে গোপন রেখেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল যখন থেকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, তখনও একাধিক বার রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রশংসা করেছেন।
প্রথম জীবনে ঠাকুরবাড়ির অনেকের সঙ্গেই দ্বিজেন্দ্রলালের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি বিলেত থেকে ফিরে আসার পর দ্বিজেন্দ্রলাল (তখন তিনি পরিচিত ছিলেন দ্বিজুবাবু হিসাবে, যেমন রবিবাবু)। কিছু দিন আবগারি বিভাগের পরিদর্শকের কাজ করেছেন। সেই সুবাদে তাঁর একটি বজরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের বজরায় গিয়ে অনেক সময় কাটিয়েছেন। এ বজরাটি একেবারে কলকাতার গঙ্গায়। দ্বিজুবাবু প্রায়ই কয়েকজন বন্ধু নিয়ে এই বজরায় সান্ধ্য বিহার করতেন। সেই আড্ডায় প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন রবিবাবু। দু’জনেই পর পর গান গাইতেন।
রবীন্দ্রনাথ নিজে দ্বিজেন্দ্রলালের একাধিক গ্রন্থের সমালোচনা করেছেন। তার মধ্যে ‘মন্দ্র’ নামে কাব্যগ্রন্থটির এত প্রশংসা করেছেন, যাকে বলা যায় অতিশয়োক্তির চূড়ান্ত। দ্বিজেন্দ্রলালের কবিতা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের লেখা পাঠ্যপুস্তক শান্তিনিকেতনে পড়াবার জন্য সুপারিশ করেছেন। এ সবের উত্তরে দ্বিজেন্দ্রলাল শুরু করেছেন প্রকাশ্যে বিষোদগার।
একাধিক প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি যে দুটি অভিযোগ এনেছেন, তা হল দুর্বোধ্যতা এবং অশ্লীলতা। দ্বিজেন্দ্রলালের মতে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা অস্পষ্ট এবং অস্বচ্ছ। তাই তার মধ্যে চিন্তার গভীরতা নেই। আর তাঁর কবিতার নীতিহীনতা দিয়ে তিনি কলুষিত করছেন এই সমাজকে। দুই কবির মধ্যে নীতিগত বিরুদ্ধ মত থাকতেই পারে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের সেই প্রতিবাদের ভাষাই যে কুৎসিত। তাঁহার ‘তুমি যেও না এখনই’ ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ ইত্যাদি গান লম্পট বা অভিসারিকার গান।’ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝে মাঝে ছোট ভাইয়ের কবিতা আবৃত্তি করেন, সেটা নাকি তিনি ভাইয়ের কবিতা অ্যাডভার্টাইজ করার ভার নিয়েছেন বলে। ঠাকুরবাড়িতে যে নাটকের অভিনয় হয়, সেগুলোও নাকি আত্মবিজ্ঞাপন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার দ্বিজেন্দ্র-কৃত যে সমালোচনা তা বাংলা সাহিত্যে একটি শ্রেষ্ঠ হাউলারের মতন। এই কবিতা একেবারে অর্থশূন্য ও স্ববিরোধী তো বটেই, এটা যে কত অবাস্তব তার প্রমাণ ‘কৃষক আউস ধান কাটিতেছেন বর্ষাকালে, শ্রাবণ মাসে। বর্ষাকালে ধান কেহই কাটে না, বর্ষাকালে ধান্য রোপণ করে। ধান তিন প্রকার, ১) হৈমন্তিক, তাহাই কৃষকের আসল ধান্য— কাটে হেমন্তকালে, অগ্রহায়ণ মাসে; ২) আউস (নিজে খাইবার জন্যই প্রায় করে) কাটে শরৎকালে, ভাদ্র মাসে; ৩) বোরো (উড়িষ্যা অঞ্চলেই অধিক হয়) কাটে গ্রীষ্মকালে, বৈশাখ মাসে। …ক্ষেত্রখানি তবে একটি দ্বীপ। তবে এ চর জমি। এ রূপ জমিতে ধান করে না। এ সব জমি শ্রাবণ ভাদ্র মাসে ডুবিয়া থাকে…।
এ সমালোচনায় দ্বিজেন্দ্রলালকে একজন কৃষি বিশেষক হিসাবে অবশ্যই গণ্য করা যায়। কাব্যবোদ্ধা হিসাবে বোধহয় ততটা যায় না।
মনুষ্য চরিত্রে এ রকম একটি দিক আছে যে, তোমাকে যদি কেউ অনবরত আঘাত করে, বিদ্রুপ ও গঞ্জনা দেয়, তুমি যদি তার প্রতিবাদ না কর, চুপ করে সব সহ্য করে যাও, তা হলে আঘাতকারীর রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে, সে একটা কিছু চরম আঘাত হানতে চায়। দ্বিজেন্দ্রলালের ক্ষেত্রেও তাই হল, তিনি তাঁর প্রাক্তন বন্ধুর বিরুদ্ধে আরও কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়ে একটি নাটিকা লিখে ফেললেন এবং স্টার থিয়েটারে সেটি অভিনয়েরও ব্যবস্থা হল। ( ‘আনন্দ বিদায়’ নামে সেই প্রহসনটি আমি পড়িনি। পড়ে দেখার খুবই ইচ্ছে আছে। তবে এখন খুবই দুর্লভ।) সেটা ১৯১২ সালের নভেম্বর মাস, তখন রবীন্দ্রনাথের তুলনায় দ্বিজেন্দ্রলালের খ্যাতি, অর্থ-উপার্জন কিছুই কম ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তখন গড়ে উঠেছিল বেশ বড় একটি অনুরাগীমণ্ডলী। দ্বিজেন্দ্রলালের তেমন ভক্তমণ্ডলী ছিল না। এক একজন লেখককে ঘিরেই এ সব হয়। সব লেখকের ক্ষেত্রে হয় না। দ্বিজেন্দ্রলালের পক্ষেও কিছু মানুষ ছিলেন অবশ্যই, তবে তাঁরা যতটা রবীন্দ্রবিরোধী তার চেয়ে বেশি দ্বিজেন্দ্রভক্ত কি না তাতে সন্দেহ আছে।
‘আনন্দ বিদায়’-এর প্রথম রাত্রির অভিনয় তো বন্ধ করে দিতে হয়ই, নাট্যকারকে স্টার কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার খাতিরে পিছনের দরজা দিয়ে বার করে দিতে বাধ্য হন। সে নাটক আর দ্বিতীয় বার মঞ্চস্থ হয়নি।
দ্বিজেন্দ্রলালের সেই রুচিহীন কাজের জন্য তাঁর বেশ অপযশ হয়। এমনকী দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকারও এর জন্য তাঁকে নিন্দে করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের ছেলে দিলীপকুমার যাঁকে রবীন্দ্রনাথ খুবই স্নেহ করতেন, তিনিও বাবার এই কাজকে সমর্থন করতে পারেননি পরবর্তী কালে। দ্বিজেন্দ্রলাল যিনি এক এক সময় রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি বলে মেনে নিয়েছেন, আবার তাঁরই ওপর বার বার কেন এমন আঘাত হানতে উদ্যত হয়েছেন, তা যেন এক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মতন। ‘আনন্দ বিদায়’-এর পর দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তিনি খুব বিমর্ষ হয়ে থাকতেন। যদিও লিখিত ভাবে কিছু জানাননি। মাত্র এক বছর পরেই এই শক্তিশালী নাট্যকার ও সঙ্গীতস্রষ্টার অকালপ্রয়াণ ঘটে। এখানে একটা অত্যন্ত কৌতূহলজনক ঘটনারও উল্লেখ করা যেতে পারে। দ্বিজেন্দ্রলালের মাথায় নাকি বাজ পড়েছিল একদিন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন যে, দ্বিজেন্দ্রলাল একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রতি একটি চিঠি লেখায় ব্যস্ত ছিলেন, একটু পরেই তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হয়। স্ত্রীলোকেরা তাঁর মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢালতে থাকেন, তাতে সব কাগজপত্র ভিজে যায়। একটি চিঠিতে শুধু রবীন্দ্রনাথের নামটি পড়া যাচ্ছিল। তাতেই অনুমান করা যায় যে, দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সব বিবাদ মিটিয়ে আবার পুনর্মিলনের আশাই ব্যক্ত করেছিলেন।
এত দিন পর আমরা এই সব ঘটনাকেই ইতিহাসের অন্তর্গত করে দিয়ে দু’জনেরই গুণমুগ্ধ হতে পারি। রবীন্দ্রনাথের এত বড় প্রতিভার পাশেও কী অনবদ্য গান সৃষ্টি করে গেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল। তাতে তাঁর নিজস্বতা স্পষ্ট। তার ‘সাজাহান’ নাটক তো আজও অভিনীত হয়। আর দু’বছর পর তাঁরও জন্মের দেড়শো বছর পূর্ণ হবে। তখন যেন সেই উপলক্ষটি আমরা সমারোহে উদ্যাপন করতে ভুলে না যাই।
যৌবন বয়সে যখন দু’জনের মধ্যে খুবই সৌহার্দ্য ছিল, তখন দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর কোনও পরিচিত ব্যক্তির জন্য চাকরির উমেদারি করে একটি কৌতুকপূর্ণ চিঠি লিখেছিলেন। তখনকার দিনে অনেক এ ধরনের চিঠি কবিতায় লেখা হত। চিঠিটি এ রকম:
শুনছি নাকি মশায়ের কাছে
অনেক চাকরি খালি আছে—
দশ-বিশ টাকা মাত্র মাইনে
দু’একটা কি আমরা পাইনে?
ইন্দ্রভূষণ সান্যাল নাম
আগ্ৰাকুন্তা গ্রাম ধাম
—চাপড়া গ্রামের অপর পাড়ে
এক্কেবারে নদীর ধারে।
নাইবা থাকুক টাকা কৌড়ি
—চেহারাটা লম্বা চৌড়ি
কুলীন ব্রাহ্মণ, মোটা পৈতে
ইংরাজিটাও পারে কৈতে…
তথ্যসূত্র: তাপস ভৌমিক সম্পাদিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিভিন্ন ভারতীয় ব্যক্তিত্ব’ নামে সংকলন গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত স্মৃতিকণা চক্রবর্তী রচিত নিবন্ধ।
৭. ৯. ২০১১
ও দেবী তোর কেমন পা, ধুলা লাগে না
গল্পটা আমাকে বলেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা রবি ঘোষ। সেটা ষাটের দশকের কথা, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতাপ সারা দুনিয়ায় অপ্রতিহত, মস্কো থেকে নাটক ও চলচ্চিত্র জগতের দুই কেষ্ট-বিষ্টু পুডভকিন আর চেরকাশভ ভারত সফরে এসে পৌঁছেছেন কলকাতায়। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা এখানকার দু’একটি থিয়েটার দেখতে চাইবেন। তখন কলকাতার মঞ্চ একটা সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে, উত্তর কলকাতার পেশাদারি থিয়েটারগুলি ভাঙনের মুখে, গ্রুপ থিয়েটারগুলির অভ্যুত্থান ঠিক মতন শুরু হয়নি। গিরিশ যুগের পরবর্তী মঞ্চসম্রাট শিশিরকুমারের তখন বেশ দৈন্য দশা, ভাঙা মঞ্চ, ছেঁড়া-খোঁড়া সেট নিয়ে তিনি তাঁর কয়েকটি শেষ অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং এক সন্ধ্যায় তাঁর একটি নাটক দেখতে নিয়ে যাওয়া হল ওই দুই প্রখ্যাত রাশিয়ানকে। যাবার পথে সরকারি অফিসাররা ওঁদের শিশিরকুমারের পূর্ব গৌরবের সব কাহিনি শোনাতে ছাড়লেন না। তারপর নাটক তো শুরু হল, এমন কিছু আহামরি তো নয়ই, বরং লজ্জার ব্যাপার। কিন্তু দ্বিতীয় দৃশ্যে যে-ই শিশিরকুমার ঢুকলেন, তখন ওঁদের একজন পাশ ফিরে এক সরকারি অফিসারকে বললেন, তোমরা যে লেজেন্ডারি অভিনেতার কথা বলছিলে, ইনি তো তিনি, তাই না? সরকারি অফিসারটি বললেন, হ্যাঁ, ইনিই শিশিরকুমার, কিন্তু আপনি কী করে চিনলেন? চেরকাশভ বা পুডভকিন বললেন, সত্যিকারের বড় অভিনেতারা মঞ্চে পা দিলেই বোঝা যায়, যত ছোট ভূমিকাই হোক, তাঁরা মুহূর্তে মঞ্চ অধিকার করে নেন। তাঁর সারা শরীরেই থাকে অভিনয়।
এই গল্পের কথক রবি ঘোষ, যিনি নিজেই ছিলেন এ রকম একজন অভিনেতা। আমি তাঁর মঞ্চ অভিনয় বিশেষ দেখিনি। কত এলেবেলে সিনেমায় তিনি ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, তবু তাঁকে দেখামাত্র বোঝা যেত, কত বড় অভিনেতা তিনি, আন্তর্জাতিক মানে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এখন আফশোস হয়, রবি ঘোষকে তাঁর যোগ্যতার সঠিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, কোনও গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে বড় কোনও ভূমিকাও পাননি। তবে সত্যজিৎ রায় তাঁকে খুব পছন্দ করতেন।
রবি ঘোষ কথিত এই কাহিনিটি আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল মিনার্ভা রেপার্টারি থিয়েটারের দ্বিতীয় মঞ্চ উপস্থাপনা দেবী সর্পমস্তা দেখতে দেখতে। কথক আর লোকেন্দ্র এই দুই ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য, তাঁকে আমি চিনি না, আগে কোনও অভিনয়ও দেখিনি। তবু মনে হল, এই ছেলেটির মঞ্চ উপস্থিতিতেই খানিকটা জাদু আছে, এ এক জাত অভিনেতা। তা বলে তাকে আমি শিশির ভাদুড়ির তুল্য মোটেও বলতে চাইছি না, এমন কথা লিখলে সে নিজেই সম্ভবত লজ্জায় মরে যাবে। আমি এমন কিছু নাট্যবোদ্ধাও নই, তবে রবি ঘোষের কাহিনিটা অকস্মাৎ মনে পড়েছিল, এ কথাও ঠিক।
স্টার থিয়েটারের নব্য রূপ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে তেমন কোনও নাট্য প্রযোজনার খবর শুনিনি। কিন্তু প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনার্ভা থিয়েটারের পুনর্জীবন পাওয়ার পর যে কাজ করছেন, তা সগৌরবে মঞ্চের ইতিহাসে স্থান পাবে। এর আগে সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কিং লিয়ার দেখে যে মুগ্ধতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি, তার রেশ এখনও রয়ে গেছে। এ বারে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় উপস্থাপিত করেছেন সম্পূর্ণ অন্য ধরনের এক নাট্য প্রযোজনা, একেবারে দেশজ, গ্রামীণ সংস্কৃতির শিল্প রূপ।
অনেক বাঙালির মধ্যে এমন একটা হীনমন্যতার ভাব দেখি যেন, কলকাতা তথা বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি জগতে ইদানীং নতুন কিছুই ঘটছে না। অন্যান্য ভারতীয়দের সামনে তাদের কাঁচুমাচু ভাব দেখে আমার আশ্চর্য লাগে। এখন বরং বাংলায় গর্ব করার মতন অনেক কিছু হচ্ছে। ফিরে এসেছে বাংলা সিনেমা। গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ কয়েকজন প্রবীণ তো রীতিমতন সক্রিয় বটেই, তা ছাড়া এক ঝাঁক নতুন তরুণ-তরুণী অভিনব বিষয়বস্তু নিয়ে, নতুন আঙ্গিকে, কম খরচে চমৎকার সার্থক সব সিনেমা বানাচ্ছেন। এবং মুম্বই মার্কা ফিল্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে বাংলার দর্শক দেখতে আসছেন সেই সব ছবি। ‘ইচ্ছে’র মতন বিখ্যাত নায়ক-নায়িকা বর্জিত ফিল্ম চলছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ।
আর থিয়েটারে এখন সারা ভারতেই বাংলার জয়-জয়কার। এই শিল্পে এক সময় বাংলার প্রধান প্রতিযোগী ছিল মহারাষ্ট্রের থিয়েটার। এখন সেখানে চলছে কিছুটা ঝিমোনা ভাব। আর বাংলার মঞ্চে গ্রুপ থিয়েটারের একটার পর একটা প্রযোজনা আন্তর্জাতিক স্তরের। রুদ্রপ্রসাদ আর স্বাতীলেখা আজও অক্লান্ত ও সৃষ্টিশীল। তার প্রমাণ অজ্ঞাতবাস আর মাধবী; বিভাস চক্রবর্তী নিজেকে বদলাচ্ছেন বার বার, সম্প্রতি তাঁর পরিচালনায় ‘হ্যামলেট’ পৃথিবীর বহু পরিচালকের কাছেই চ্যালেঞ্জস্বরূপ। বিভাসও সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেকসপিয়রের রচনাকে জীবন্ত ও তাৎপর্যময় করে তুলেছেন এবং নামভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এই অভিনেতাটিকে যত দেখছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। (হ্যামলেটের বাংলা অনুবাদের ভাষায় ব্যঞ্জনার অভাব আর শুরুতে হিন্দি গান আর শেষ দৃশ্যে গোলাগুলি চালিয়ে হ্যামলেটকে যে ভাবে ‘কলকাতা হ্যামলেট’ করা হয়েছে, তা ব্যক্তিগত ভাবে আমি পছন্দ করতে পারিনি।)
ব্রাত্য বসুর কৃষ্ণ গহ্বর আর রুদ্ধসঙ্গীত আমাদের থিয়েটারের গৌরব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু দিন আগে নাটুয়া নামে একটি দলের ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’-এর মঞ্চরূপ দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি, এও কি সম্ভব? ‘ফুরুৎ’ নামের একটা নাটককেও স্মৃতিতে স্থায়ী স্থান দিয়ে রেখেছি। এ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি মঞ্চ-নাটক নতুন নতুন বিষয়বস্তুতে সফল। সব আমার দেখা হয়ে ওঠে না, তা আমারই ক্ষতি। নান্দীকার, পূর্ব-পশ্চিমের মতন দল আয়োজন করছে নাট্য উৎসব। মঞ্চ এখন জমজমাট।
মনোজ মিত্রের নাটক খানিকটা সিজিল মিছিল করে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত করেছেন দেবী সর্পমস্তা। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংখ্যা চব্বিশ, শুনলাম তাদের মধ্যে মাত্র চার জন সুমনের প্রযোজনায় অংশ নিয়েছেন, বাকি সবাই একেবারে নতুন। নানান জেলা থেকে আনা হয়েছে তাদের একেবারে আনকোরা অবস্থায়, তাদের শেখানো হয়েছে নাচ-গান এবং অবশ্যই অভিনয়, পাঁচ মাস ধরে টানা রিহার্সাল। তার ফল যে এমন চমকপ্রদ হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। নাটকের আঙ্গিক খানিকটা অপেরা-ধর্মী, কাহিনি এগিয়েছে নাচ ও গানে, অর্থাৎ মঞ্চে উপস্থিত সবাইকে নাচ শিখতে হয়েছে, মাঝে মাঝে বেশ উদ্দাম নৃত্য। অধিকাংশ গানই সমবেত, খুবই সাবলীল। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, সব নতুন নতুন ছেলেমেয়ের অভিনয়ে অপূর্ব সৃষ্টি।
এই নাটকের কাহিনি বর্ণনা করার কোনও প্রয়োজন নেই। প্রায় দুশো বছর আগেকার পটভূমিকায় একটি উপকথার জীবন্ত রূপ। যেহেতু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চিনি না, তাই মনে হয় প্রত্যেকেই ওই সব সত্যিকারের চরিত্র। অবশ্য এর জন্য অনেকটা কৃতিত্ব পরিচালক দেবেশের। প্রধান ভূমিকায় অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে আমার মনে হল, চব্বিশ জনেরই নাম লেখা উচিত। কারণ এরা সবাই মিলেই তো প্রাণের ছন্দ আর টগবগে ভাব ফুটিয়ে তুলেছে।
নাটকটি দেখেছি বিভোর হয়ে। শেষ হওয়ার পর বেরুবার সময় আমি গুনগুন করছি, এর মূল গান, ‘ও দেবী তোর কেমন পা, ধুলা লাগে না।’ আমার সঙ্গে যে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন বাইরে এসে বললেন, এটা আবার দেখতে হবে। ঠিক কথা, নাচে-গানে মাতিয়ে দেওয়ার এমন নাটক বার বার দেখা যায়।
রক্ত গড়িয়ে ধানের খেতে
বারুইপুরের দিকে একটি সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু ছেলে-মেয়েকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, যাদের রক্ত এইচ আই ভি পজিটিভ। বাচ্চা থেকে কিশোর-কিশোরী, বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই, তাদের মুখে চোখে রয়েছে কৈশোরের লাবণ্য, তারা একটা নাটক করতেও শিখেছে।
তাদের বাবা-মা এই বিষ দিয়েছে, ওরা কিছু জানেই না। এইচ আই ভি পজিটিভ মানেই কিন্তু এডস্ রোগাক্রান্ত নয়। এখন তাদের জীবন স্বাভাবিক, অন্য বাচ্চাদের মতনই, তবে তাদের ভবিষ্যতে ওই মারাত্মক রোগের সম্ভাবনা খুবই প্রবল।
এই ছেলেমেয়েগুলিকে যখন এখানে আনা হয়েছিল, তখন স্থানীয় কিছু লোক আপত্তি জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য, এই ছেলেমেয়েরা যে জল ব্যবহার করবে, তার খানিকটা গড়িয়ে গড়িয়ে ধান খেতে গিয়ে পড়বে, তার ফলে সেই খেতের ফসলে এই রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়বে। এই হচ্ছে এডস্ রোগ সম্পর্কে আমজনতার জ্ঞানের নমুনা। কথাটা শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছিল, জল নয়, যেন রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির নাম অফার। তার পরিচালক কল্লোল ঘোষ এমনিই আর পাঁচ জন মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, উত্তর কলকাতায় বাড়ি, স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসার পথে দেখত রেল লাইনে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ট্রেন থেকে কয়লা চুরির কাজ করে, অনেক সময় খুব ঝুঁকি নেয়, দু’একজন মারাও যায়। এ সব দৃশ্য তো আমরাও দেখি কিংবা এই সব কাহিনি শুনি, কিন্তু গা করি না। কিন্তু কল্লোলের মনে হয়েছিল, ওদের জন্য কিছু একটা করলে হয় না? দু’একজন বন্ধুর সাহায্য নিয়ে সে শুরু করল একটা ছোটখাটো স্কুল। তারপর সল্ট লেকে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেবা প্রতিষ্ঠান।
এখন কল্লোল এক জন মধ্যবয়সী, প্রাণবন্ত মানুষ। নিছক মনের জোরে তাঁর প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক বড় করে ফেলেছেন। বারুইপুরের কাছে নিজস্ব জমি-বাড়িতে আছে অনাথ ছেলেমেয়েদের জন্য আবাস, শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার ব্যবস্থা এবং ওই এইচ আই ভি পজিটিভ বাচ্চাদের স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে নানা রকম ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গাটি, কল্লোলের সঙ্গে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। টাকাপয়সা তুলতে হয় নানান জায়গা থেকে, একটি ইতালিয়ান প্রতিষ্ঠানও সাহায্য করে। সেয়জু নামে এক বাংলা-প্রেমিক ইতালিয়ানকে চেনেন এই শহরের অনেকেই, এক সময় তিনি গৌতম ঘোষের সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছিলেন, সেই সেয়জু মাঝে মাঝে কলকাতায় এসে এই প্রতিষ্ঠানে কিছু সময় কাটিয়ে যান। এখন কল্লোলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কানাডা-প্রবাসী দীপ্তেন্দু চক্রবর্তীও।
কোথাও কোনও বাচ্চা বিপদে পড়েছে শুনলে কল্লোল তাকে তুলে নিয়ে আসেন। মাত্র কয়েকদিন আগে, হাওড়ায় দুই মহিলা, সম্পূর্ণ উন্মাদ, তাদের বাচ্চাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল। এখন সেই শিশু দুটি আছে অফার-এর আশ্রয়ে। ওরা বেঁচে যাবে। দুই বাচ্চাকে এখানকার মহিলা কর্মীরা কোলে নিয়ে নিয়ে ঘুরছেন, বাচ্চা দুটির কী সুন্দর মুখ আর টলটলে চোখ, আমার এক একবার ইচ্ছে করে ওদের এক জনকে কোলে নিয়ে আদর করতে। কিন্তু নিই না, বরং দূরে সরে যাই। মায়ায় জড়িয়ে পড়তে আমার ভয় করে। ওরা বেঁচে থাক।
২১. ৯. ২০১১
Chapter - 6
প্রথম বার প্রথম শোনা গানের রোমাঞ্চ স্মৃতি
একটা যোলো-সতেরো বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে একতলা আর দোতলার সিঁড়ির মাঝখানে। দোতলায় থাকেন বাড়ির মালিক পরিবার, একতলায় দু’ঘর ভাড়াটে। উত্তর কলকাতায়। ওপর তলায় রেডিয়ো আছে। ট্রানজিস্টর রেডিয়ো আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত রেডিয়ো ছিল বেশ দামি জিনিস, আর্থিক সচ্ছলতার চিহ্নই ছিল বাড়িতে রেডিয়ো ও টেলিফোন থাকা। রেডিয়োর জন্য ছাদে টাঙানো থাকত এরিয়াল, অর্থাৎ দূর থেকেই বোঝা যেত, কোন বাড়িতে আছে রেডিয়ো। তখন রেডিয়ো ছিল দু’রকম, একটিতে স্থানীয় অনুষ্ঠান শোনা যেত, আর একটি অল ওয়েভ, সেটি বেশ সুদৃশ্য একটা যন্ত্র, দেখলেই বেশ ভক্তিশ্রদ্ধা হয়, তাতে দেশবিদেশের অনুষ্ঠান ধরা যায়।
ওপর তলায় রেডিয়ো বাজছে, ভাড়াটেদের ছেলেটির যখন তখন সেখানে যাবার অধিকার নেই, তাই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, সদ্য সন্ধেবেলায় গান শুনছে। শুনছে মানে কি, প্রবল তৃষ্ণার্তের মতন সে সেই সংগীতসুধা পান করছে। সেই বয়েসে, এক-একটি রবীন্দ্রসংগীত প্রথম বার শোনার যে অভিজ্ঞতা, তার যে রোমাঞ্চ, তা অন্য কেউ বুঝবে না। গান গাইছিলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক তরুণী, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালবাসায় ভোলাব’। বিশেষত প্রেমের গানে তাঁর সমস্ত মর্ম যেন নিবেদিত হয়। রেডিয়োর মালিকপক্ষের কেউ গানটার মাঝখানে পট করে বন্ধ করে দিল। ছেলেটির মনে হল, তার বুকে যেন কেউ হঠাৎ গুলি করেছে। সে সত্যি সত্যি এক আহত কিশোরের মতন সেই প্রায়ান্ধকার সিঁড়িতে বসে রইল কিছুক্ষণ।
বলাই বাহুল্য, সেই কিশোরটিই আমি। গানটা মাঝপথে বন্ধ করে দিয়ে বাড়িওয়ালারা আসলে আমার বেশ উপকারই করেছিলেন। গানটা আমার বুকের মধ্যে সারা জীবনের মতো একেবারে গেঁথে যায়, পরের তিন-চার দিন আমি সব সময় গানটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি নিঃশব্দে গেয়েছি, আর ‘জানবে না কেউ কোন তুফানে’র পরের লাইনগুলি শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি।
তখন গান শোনার দুটি উপায়। রেডিয়ো অথবা গ্রামোফোন। রেকর্ড প্রথার কত বিবর্তন ঘটে গেল এর মধ্যে। আমাদের বাল্যকালে, গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে গ্রামোফোন ছিল এক আশ্চর্য বস্তু। তারা মনে করত, চোঙের মধ্য দিয়ে সত্যি সত্যি কেউ গান গায়। গ্রামে থাকার সময় শিশুকালে আমারও দু’এক বার এ রকম ধন্দ লেগেছিল। তখন রেকর্ড ছিল, আটাত্তর আর পি এম, তাতে এক পিঠে একখানা গান। তার পর পঁয়তাল্লিশ আর পি এম, তাতে গান দু’খানা। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এ সব রেকর্ডই শুনেছেন, তাঁর একটা গান আছে, ‘বান্ধবীকে গান শোনাতে ডাকতে হয় সতীশকে/হৃদয়খানা ঘুরে মরে গ্রামাফোনের ডিস্কে…’। আমাদের যৌবনকালেই বেরোল লং প্লেয়িং রেকর্ড, একসঙ্গে অনেক গান। তখন মনে হয়েছিল এ যেন উন্নতির পরাকাষ্ঠা। আমাদের বাড়িতে গ্রামোফোন ছিল না, অন্য কোনও বাড়িতে ওই একখানা লং প্লেয়িং রেকর্ড হাতে নিলেই রোমাঞ্চ হত। এখন সেই সব রেকর্ড রাস্তায় ফেলে দিলেও নেওয়ার লোক নেই, কারণ বাজাবার যন্ত্র যদি বা কারও বাড়িতে থেকেও থাকে, কিন্তু পিন পাওয়া যায় না। কিছু দিন ওই রেকর্ড ভেঙে বাচ্চাদের খেলনা বানানো হয়েছে।
তার পর এল ক্যাসেট প্লেয়ার। তখনই গান শোনার সুযোগ এসে গেল আমজনতার কাছে। ওই যন্ত্র বা ক্যাসেটের দাম মধ্যবিত্তের সাধের মধ্যে। তখনই বাংলা গান অনেকের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে। তার আগে রবীন্দ্রসংগীতের একটা সম্মানের জায়গা ছিল ঠিকই, উচ্চ বিদ্বজ্জন মহলে এ গান শোনা বা শেখার চল ছিল, কিন্তু মোটেই জনপ্রিয় ছিল না। বরং অনেকে বলত রবীন্দ্রসংগীত ন্যাকা-ন্যাকা গান, কোনও এক জন বিশিষ্ট গায়ক সম্পর্কে বলা হত, ওঁর গান শুনলেই ঘুম পেয়ে যায়, উনিও তো গাইতে গাইতে ঘুমিয়ে পড়েন!
ক্যাসেট প্লেয়ার প্রচলনের কিছু দিনের মধ্যেই এসে গেল একটা অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার, টু-ইন ওয়ান, অর্থাৎ একই যন্ত্রে ইচ্ছে মতন রেডিয়ো শোনা, অথবা ক্যাসেটে পছন্দ মতন গান। এই সময় আমার একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা হয়। আমি আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তখন উদ্দেশ্যহীন ভাবে মেদিনীপুরের গ্রামে গ্রামে ঘুরছিলাম। মেদিনীপুরের প্রায় কোনও বাড়িতেই বাথরুম বা টয়লেটের বালাই নেই, এমনকী মোটামুটি সম্পন্ন পরিবারেও পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে ওই কর্মটি সারতে যায় মাঠে-ঘাটে নদীর ধারে। (আহা, এখন হয়তো অনেক বাড়িতে হয়েছে মেদিনীপুরেও, তখন ছিল না।)
মহিলারা যেতেন ভোর হওয়ার আগে বা সন্ধ্যায়, আর পুরুষরা যখন তখন ঝোপঝাড়ের আড়াল খুঁজে বসে পড়তেন, কাছাকাছি কোনও মানুষের পায়ের আওয়াজ পেলে গলা খাঁকারি দিতেন। (শক্তি ও রকম গলা খাঁকারির আওয়াজ শুনে এক জনকে বলেছিল, কী গলায় আটকে গেল নাকি?) কয়েকটি গ্রামে দেখেছি এ ব্যবস্থার পরিবর্তন। কোনও ব্যক্তি উক্ত প্রয়োজনীয় কাজটি সারতে মাঠে যাওয়ার সময় এক হাতে নিতেন জলভর্তি গাডু, অন্য হাতে একটি ক্যাসেট প্লেয়ার বা টু-ইন ওয়ান! ঝোপের আড়ালে গান বাজলেই বোঝা যাবে যে ও দিকে যাওয়া চলবে না।
এখন ও-সব ক্যাসেট প্লেয়ারটেয়ারও বাতিল হয়ে গেছে। এসে গেছে সি ডি কিংবা ডি ভি ডি-র যুগ। (এদের পুরো নাম যে কী, তা আমি জানি না। ইদানীং অ্যাব্রিভিয়েশনের উৎপাত খুব বেড়েছে, এ বি সি ডি; আই জে কে এল; কিংবা ডব্লু এক্স ওয়াই জেড বলতে যে কী বোঝায়, তা মানুষ জানবে কী করে?) টি ভি এসে রেডিয়ো’কে কোণঠাসা করে দিয়েছে, ডি ভি ডি খুবই সস্তা, অনেক জায়গায় কোনও কিছুর সঙ্গে বিনা পয়সাতেও পাওয়া যায়। গান শুনতে চাইলে এখন আর সুযোগের অভাব নেই।
ধান ভানতে শিবের গীতের মতন আমার প্রথম একটি রবীন্দ্রসংগীত শোনার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একটা ছোটখাটো ইতিহাস চলে এল। আমি মনে করছিলাম, আমার এক একটি রবীন্দ্রসংগীত শোনার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা। সেই গান পরে অনেক বার শুনেছি, কিন্তু প্রথম বারের স্মৃতি মনের মধ্যে অতি উজ্জ্বল ভাবে জাগরুক।
সুহৃদ রুদ্র আর পরিমল চন্দ নামে দুই ভদ্রলোক ষাটের দশকে শুরু করলেন নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসংগীত উৎসব (নামটা ঠিক মনে নেই), সেটা আমাদের শহরের সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এখন চতুর্দিকে গানবাজনার এত রমরমা, তাই সেই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব হয়তো ঠিক বোঝা যাবে না, সারা বছর আমরা সেই উৎসবের জন্য উৎসুক হয়ে থাকতাম। প্রথম দিকে এই অনুষ্ঠান হত মহাজাতি সদনে, আমরা তরুণ কবির দল গিয়ে ভিড় জমাতাম সেখানে। কত বড় বড় গায়িকা-গায়করা আসতেন, তার মধ্যেও এক বার একটি বারো-তেরো বছরের বাচ্চা মেয়ের গান আর সবাইকে ভুলিয়ে দিল। ‘হ্যাদে গো নন্দরাণী, আমাদের শ্যামকে ছেড়ে দাও’ গেয়েছিল ঋতু গুহঠাকুরতা, সেই দিনটিতে শোনা সেই গানটি আজও কানে বাজে। পরবর্তী কালে এই গায়িকার সঙ্গে বিখ্যাত লেখক বুদ্ধদেব গুহ-র বিবাহ হওয়ার পর ঋতু শুধু তাঁর পদবিটি সংক্ষিপ্ত করে ফেলেন।
দেবব্রত বিশ্বাস কাজ করতেন একটা ইনশিয়োরেন্স কোম্পানিতে। আমার বাবার প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার জন্য হিন্দুস্থান বিল্ডিংয়ের অফিসে গিয়ে তাঁকে অনেক বারই দেখেছি। বিভিন্ন কাউন্টারে ঘুরে ঘুরে রশিদে সই করতেন। আবার অন্য সময়ে তাঁকে দেখেছি মোটরবাইক চালিয়ে ঘুরতে, তখন তাঁকে বেশ বীরপুরুষ মনে হত। (মোটরসাইকেল আরোহী সবার মধ্যেই বেশ একটা হিরো-হিরো ভাব এসে যায়।) আবার, কোনও কোনও সকালে তাঁকে দেখা যেত একটা লুঙ্গি আর গেরুয়া ফতুয়া পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মুখভর্তি পান, তাঁকে চেনার কোনও উপায়ই থাকত না। এক দিন সকালে এক জন যুবতী একা একা ওই অঞ্চলে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেল। এ রকম অনেকেই গাড়ি চালাতে শিখে নেয়, কিন্তু গাড়ির কলকব্জা বিষয়ে প্রায় কিছুই জানে না। হুডটা খুলে তিনি অসহায় ভাবে এ দিক ও দিক তাকাচ্ছেন, দেবব্রত বিশ্বাস কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী হইসে? মহিলাটি খানিকটা অসহিষ্ণু ভাবে বলেন, যা-ই হোক না কেন, তুমি কি মেকানিক? দেবব্রত বললেন, দেখি চেষ্টা কইরা। তিনি একটুক্ষণ খুঁট-খুঁট করলেন, খুব সম্ভবত একটা প্লাগ খুলে গিয়েছিল, তিনি সেটা জুড়ে দিতেই ইঞ্জিন আবার প্রাণ ফিরে পেল। দেবব্রত বিশ্বাসের ওই তো সামান্য পোশাক, চেহারাও অনিন্দ্যকান্তি বলা যায় না, তাই মহিলাটি তাঁকে ধন্যবাদ জানাবার প্রয়োজন বোধ না করে একটি দশ টাকার নোট এগিয়ে দিলেন। আর তখনকার রবীন্দ্রসংগীতের সবচেয়ে বিখ্যাত পুরুষ গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস সেই দশ টাকা নিয়ে বললেন, নমস্কার মা জননী! এর কয়েক সপ্তাহ পরে সেই মহিলা গেলেন দেবব্রত বিশ্বাসের গানের ইস্কুলে ভর্তি হতে। সেখানে সেই গেরুয়া ফতুয়া পরা মেকানিকটিকে দেখে তাঁর ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা।
দেবব্রত বিশ্বাসের গান শোনা সহজ ছিল। তিনি মাঠে ময়দানে বামপন্থীদের জনসভায় গান গাইতেন। তবে সে সব গান দেশাত্মবোধক কিংবা প্রতিবাদের গান। এক বার মনুমেন্টের পাদদেশে এক সভায় তিনি হঠাৎ গাইলেন, আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী। উদাত্ত গলায় সে কী অসাধারণ গান, প্রথম বার শুনেছি বলে আমার সারা গায়ে শিহরন হয়েছিল।
দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে সন্তোষকুমার ঘোষের মনোমালিন্যের কথা অনেকে জানে। এখনকার ‘রুদ্ধসংগীত’ নাটকেও সে প্রসঙ্গ এসেছে। রবীন্দ্রসংগীতে যন্ত্রসংগীতের ব্যবহার এবং ইচ্ছেমতন লয় কমানো-বাড়ানো নিয়ে সন্তোষকুমারের সঙ্গে মতভেদ হয়েছিল, ক্রমে তা তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল। কোনও গানের আসরে দেবব্রত বিশ্বাস ঘোষণা করতেন, এখানে কি সন্তোষকুমার ঘোষ মশাই আছেন নাকি? থাকলে আমি গান করুম না।
আমি তখন সন্তোষকুমার ঘোষের সাক্ষাৎ অধীনে আনন্দবাজারের কর্মী। তবু আমি সন্তোষকুমারের কোনও শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সমর্থন করতে পারিনি, আমাদের ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় সন্তোষকুমারের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। কিন্তু এত দিন পর আমার মনে হচ্ছে, লোকে ওই ঘটনার কথা জানে, কিন্তু সন্তোষকুমারের প্রকৃত পরিচয় বোধহয় জানে না বা ভুলে গেছে। সন্তোষকুমার ছিলেন এক বিচিত্র মানুষ। ছোটখাটো চেহারা, ছটফটে, অসাধারণ স্মৃতিশক্তিধর এবং মাঝে মাঝে বদমেজাজি। ‘কিনু গোয়ালার গলি’ কিংবা ‘শ্রীচরণেষু মা-কে’র মতন উপন্যাস এবং বেশ কিছু অসাধারণ ছোট গল্পের স্রষ্টা এই সন্তোষকুমার তাঁর লেখকসত্তা প্রায় বিসর্জন দিয়েছিলেন খবরের কাগজের জন্য। মাঝে মাঝেই সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত তিনি থাকতেন আনন্দবাজার অফিসে, একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রের (হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড) নিউজ এডিটর। ভূ-ভারতে এমন দৃষ্টান্ত বোধহয় আর নেই। অত পরিশ্রম ও মেধার বিনিময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আনন্দবাজারের সর্বেসর্বা, প্রভূত ক্ষমতাবান। সে যা-ই হোক, সন্তোষকুমারের একটা অন্য পরিচয় অনেকের জানা নেই। গলায় একটুও সুর নেই, কিন্তু তীব্র ভাবে ভালবাসতেন গান, বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত। অন্তত হাজার খানেক গান তার মুখস্থ। কেউ কোনও গান ভুল গাইলে তাঁর গায়ে যেন ফোসকা পড়ত। কেউ স্বরলিপি থেকে একটুও সরে গেলে তিনি ধরে ফেলতেন। রবীন্দ্রসংগীতের শব্দ-ব্যবহার নিয়ে তিনি আমাকে একটা বই লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন, আমি সে কাজ পারিনি। এমন ব্যস্ত এক জন মানুষ, তিনি দিনের অনেকটা সময় কাটাতেন রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে। দেবব্রত বিশ্বাসকে যিনি সমালোচনায় আক্রমণ করেছিলেন, সেই সন্তোষকুমার আনন্দবাজারের উচ্চ পদাধিকারী হিসেবে নন, রবীন্দ্রসংগীতের এক জন ভক্ত ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে। দু’জনে মতভেদ তো হতেই পারে। তবে, সন্তোষকুমার কিছুটা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন তা-ও ঠিক।
দেবব্রত বিশ্বাসের এক ছাত্রীর নাম আমিনা বিবি। ওটা তার আসল নাম নয়। অতি লাজুক সে। ক্লাসের মধ্যে দেবব্রত তাঁকে একলা কোনও একটা গান গাইতে বললেই মাথা ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে বলত, আমি না, আমি না। তাই দেবব্রত তার ওই নাম দিয়েছিলেন। ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার সখ্য হয়। সেই কারণে তার গান শেখারও ক্ষতি হয়। সে যা-ই হোক, তখন একসঙ্গে দু’জনে ঘোরাঘুরি চলছে, এক সন্ধেবেলা আমার অনেক অনুরোধে সে একটা গান শোনাতে রাজি হল নিচু গলায়। আশ্চর্য ব্যাপার, রবীন্দ্রসংগীতের ছাত্রী, কিন্তু আমাকে সে শোনাল একটি অতুলপ্রসাদের গান; ‘শ্রাবণ ঝুলাতে বাদল রাতে/তোরা আয় গো কে দুলিবি আয়।’
তখন আমাদের দু’জনেরই শরীর ও মন ফুর্তিময়, তবু এই গানটায় কেমন একটা করুণ সুর আছে না? ওই গানটি সে দিনই আমার প্রথম শোনা। ওতে একটি লাইন আছে, ‘ওগো সুখী দুখী, দাঁড়া মুখোমুখি।’ আমাদের বিয়ের অত আগেই স্বাতী কি করে বুঝেছিল যে, সারা জীবনে আমাদের মাঝে মাঝেই সুখী-দুখী হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে?
৫. ১০. ২০১১
‘আমাদের’ শব্দটির যে অর্থ অভিধানে নেই
সদ্য অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বইমেলায় অন্যান্যদের সঙ্গে এক জায়গায় বসে আছি। একজন কিছুটা মলিন পোশাকের মাঝবয়সের মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। সে আসলে কিছু বলতে চায় অথচ বলতে পারছে না বুঝে, আমি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে ভুরু নাচালাম। সে প্রায় সারা শরীর মুচড়িয়ে অতি বিনীত ভাবে বলল, স্যর, যদি কিছু মনে না-করেন, আপনার সঙ্গে তো অনেকের চেনাশোনা, সিরাজগঞ্জ থেকে কেউ এসেছে কি না, আপনি দয়া করে জেনে দেবেন?
বাংলাদেশের এই বইমেলায় গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় সে দেশের বেশ কিছু প্রকাশক বইয়ের সম্ভার সাজিয়ে বসেছেন। সেখানে লেখক, প্রকাশক, ক্রেতা ও পাঠকদেরই সমাবেশ। দূতাবাসের কোনও অফিসারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব ভাবছি, যদি তিনি কোনও খোঁজ দিতে পারেন। তাঁর মধ্যেই লোকটি আবার বলল, স্যর, আমার নাম গোবিন্দচন্দ্র মণ্ডল। আমি আসছি উলুবেড়িয়া থেকে। আমাদের বাড়ি ছিল সিরাজগঞ্জের কাছেই বেলকুচি গ্রামে। ওখানে যমুনা নদী আছে জানেন তো? সেই নদীর ধারে। যদি কেউ আমাদের সেই গ্রামের কোনও খবর দিতে পারে—
এ বার আমি জিজ্ঞেস করলাম, গোবিন্দবাবু, আপনি বেলকুচি ছেড়ে এসেছেন কত বছর আগে?
তা সতেরো-আঠারো বছর আগে। সেখানে আমার অনেক বন্ধু ছিল।
এ একটা আশ্চর্য টান। যার ব্যাখ্যা পাওয়া খুব শক্ত। সতেরো আঠারো বছর আগে যে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে গেছে, সেখানকার কোনও মানুষের দেখা পাওয়া কিংবা সেখানকার খবর জানার জন্য এমন আকুলিবিকুলি। গোবিন্দচন্দ্র উলুবেড়িয়া থেকে চলে এসেছেন, বই কেনার জন্য নয়, হয়তো তার তেমন সামর্থ্যও নেই। তবু এসেছেন বাংলাদেশের মানুষজনের মধ্যে পূর্ব স্মৃতি ঝালিয়ে নিতে।
প্রখ্যাত লেখক শাহরিয়ার কবির এসেছেন এই উপলক্ষে। আরও অনেক বিদগ্ধজন ভাষণ দিচ্ছেন, এখানকার অনেকের কথাতেই মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির স্মৃতি। পবিত্র সরকার কিংবা পঙ্কজ সাহা তো সেই সময় ভাল ভাবেই যুক্ত ছিলেন। এমনকী সত্যম রায়চৌধুরী, তখন বয়স পাঁচ বছর। সেই শিশু-মনেও কী ভাবে দাগ কেটে গিয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধ। তবে আমাকে বেশি আকর্ষণ করছে দু-এক জন চেনা-অচেনা মানুষের টুকটাক কথা।
মিন্টুকে আমি বহু দিন চিনি। অনেক কাল আগে বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। আমাকে সে মাঝে মাঝে শুঁটকি মাছ রান্না করে দিয়ে যায়। আমি ঝাল ভালবাসি বটে, শুঁটকি মাছ ঝাল না-হলে জমেও না। কিন্তু এক বার তাঁর বউ এমন ঝাল দিয়েছিল যে লাফিয়ে উঠে আমার মাথাটা ঘরের ছাদে ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই মিন্টু এই বইমেলায় এক যুবককে সঙ্গে করে এনে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, দাদা, ইনি বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে নতুন এসেছেন। তার পরই সে ঝলমলে মুখে বলল, দাদা, ইনি আমাদের চিটাগাঙের মানুষ।
এই ‘আমাদের’ শব্দটিই কৌতূহল জাগায়। গোবিন্দচন্দ্রও বলল, আমাদের সেই গ্রাম। এই ‘আমাদের’ শব্দের মধ্যে কোনও অধিকারবোধ নেই। আছে এক ধরনের মায়া, কোনও অভিধানেই এর অর্থ পাওয়া যায় না।
কিছু কিছু সম্পর্কের মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই। দেশ ভাগ নেই। ইতিহাস নেই। আছে শুধু মানবিকতার স্পর্শ!
রাজ্জাক হাওলাদারের কথা আমি আগেই লিখেছি। কলকাতার নাগরিক হয়েও জন্মভূমির গ্রাম সর্বক্ষণ তাঁর মন জুড়ে আছে। সে গ্রামে বাচ্চা বয়সে সে হিন্দু বালকদের সঙ্গে খেলা করত। তারা সবাই কার্যকারণবশত চলে এসেছে ভারতে। রাজ্জাকের প্রিয় শখ কলকাতায় এসে সেই সব বন্ধুবান্ধবকে খুঁজে বের করা। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজ্জাক উত্তর কলকাতার কোথাও ছিল ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। তাই এই শহরটা সে মোটামুটি চেনে। একজনের সন্ধান পেলে তাঁর কাছ থেকে অন্য আর একজনের কথা জানা যায়। এ ভাবে খুঁজতে খুঁজতে সে যাদবপুরে পেয়ে গেল তার অতি ঘনিষ্ঠ এক বাল্যবন্ধুকে। মাইজপাড়া গ্রামে তাদের ছিল পাউরুটি বিস্কুটের কারখানা। মোটামুটি সচ্ছল অবস্থা। সে কারখানা তো ধ্বংস হয়ে গেছে। শরণার্থী হয়ে এখানে এসে বন্ধুটি বেশ দুর্দশায় পড়েছে। এক সময় নিজস্ব কারখানা ছিল। এখন যাদবপুরের একটি বিস্কুট কারখানায় সে ঠিকে শ্রমিকের কাজ করে। টিনের চালের যে বাড়িতে সে থাকে সপরিবার, তারও খুব ভগ্ন দশা। রাজ্জাক অন্য কাউকে কিছু না-জানিয়ে নিজে কিছু কিছু অর্থ দিয়ে সেই বাড়িটাকে বাসযোগ্য করে দিয়েছে।
মুসলমানদের জন্যই তো জন্মস্থানের বাড়িঘর ছেড়ে চলে এসেছিল এক হিন্দু। সেই গ্রামেরই এক মুসলমান এসে এখানে বানিয়ে দিল তার বাড়ি। দেশ বিভাগের ইতিহাসে লেখা থাকবে কি সেই সব কাহিনি? রাজ্জাক কিন্তু মোটেই তেমন ধনী ব্যক্তি নয়।
আর একটি মর্মস্পর্শী কাহিনি জেনেছি সম্প্রতি। কালা হাওলাদার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিশিষ্ট ভদ্র ও বিদগ্ধ মানুষ। তাঁর দিদির বয়স পঁচাত্তর। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে ভর্তি হন মেলবোর্ন হাসপাতালে। কোমায় চলে যান। সে অবস্থার পর আর কিছু আশা করা যায় না। কিন্তু অত্যাশ্চর্য ভাবে তাঁর জ্ঞান ফিরে এল এবং দিদি তাঁর ভাইকে বললেন, ছেলেবেলায় আমি সরস্বতীর সঙ্গে খেলতাম, তোরা তার খোঁজ দিতে পারবি? সরস্বতী নামে একটি বালিকা মাদারিপুর থেকে ভারতে চলে আসে ৬২ বছর আগে। কোথায় তাঁর খোঁজ পাওয়া যাবে? কিন্তু এত বছর পরেও কঠিন রোগশয্যায় এক প্রবীণার মনে পড়েছে তাঁর কথা। বড় বোনের এই ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে ভাইয়েরা নানা সূত্রে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। মাদারিপুরের বাদামতলা সিনেমা হলের মালিক এক সুধীরবাবুর নাতনি সৌমীর সঙ্গে কালা হাওলাদারের দেখা হয়েছিল নাইরোবিতে, সে যদি জানে কিছু। যাই হোক, অনেক অনুসন্ধানে জানা গেল, সেই মহিলা এখনও বেঁচে আছেন। থাকেন হাওড়ায়। কালা হাওলাদারের বড় বোনকে এ খবরটি দিতেই তাঁর চক্ষু সজল হয়ে উঠল।
দু’জনের কি আর দেখা হবে না? বয়সের ভার তো আছেই, তা ছাড়া দূরত্ব। কোথায় মেলবোর্ন, কোথায় হাওড়া। তবু এ যুগে অনেক কিছুই সম্ভব। হাওড়ায় সরস্বতীদেবীর কাছে একটি ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হল। তার পর স্কাইপে দুই বৃদ্ধা মুখোমুখি কথা বলতে লাগলেন। বাষট্টি বছর পর।
গভীর বন্ধুত্বের কাহিনি
আমি এক সময় এরিখ মারিয়া রেমার্ক-এর একটি স্মরণীয় মন্তব্য পড়েছিলাম। এ কালের এই জার্মান ঔপন্যাসিকের কয়েকটি উপন্যাস যেমন, ‘তিন বন্ধু’, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ‘ফেরার পথ’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলি আমাদের খুবই প্রিয় ছিল। মধ্যজীবনে তিনি জার্মানি ছেড়ে হলিউডে এসে বসতি করেন।
এক বার তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি ইহুদিদের পছন্দ করেন?
রেমার্ক বললেন, না।
আপনি কি জার্মানদের পছন্দ করেন?
না।
আপনি কি আমেরিকানদের পছন্দ করেন?
না।
তা হলে আপনি…
আমি পছন্দ করি আমার বন্ধুদের। যারা পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যেই আছে।
প্রসঙ্গত বলি, রেমার্কের ওই যে তিনটি উপন্যাসের নাম করলাম, প্রত্যেকটিরই বিষয়বস্তু গাঢ় বন্ধুত্ব। তিন বন্ধু-র অনবদ্য অনুবাদ করেছিলেন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সে বই আমি একাধিক বার তো পড়েছি, যত বার পড়েছি, কান্না সংবরণ করতে পারিনি৷ অল কোয়ায়েট-এর সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছিলেন মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। কিশোর বয়সে ওই বই যে পড়েনি, তাকে আমি দুর্ভাগা মনে করি। ‘দা রোডব্যাক’-এর বাংলা অনুবাদ আছে কি না আমার জানা নেই। তুলনামূলক ভাবে এই তিনটির মধ্যে সেটিই বোধহয় শ্রেষ্ঠ। এখন ওই বইগুলি পাওয়া যায় কি না কিংবা ওই সব বন্ধুত্বের কাহিনি এখনকার পাঠকদের পছন্দ হয় কি না, সে সম্পর্কেও আমি অবহিত নই।
জীবনের জয়ধ্বনি
কথাটা এই জন্য বলছি আরও—
যা জীবন, তাকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কী করে বাঁচাবে, যদি অতর্কিতে মৃত্যু দেয় হানা।
যা মৃত্যু, তা হলে তাকে মারো।
তা হলে নতুন করে জীবনের জয়ধ্বনি দাও
যা মারে মৃত্যুকে, সেই উদ্বোধনী সংগীত শোনাও।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(এবার মৃত্যুকে মারো)
১৯. ১০. ২০১১
বাঙালিরা তখন গদ্যে কথা বলে, গদ্য লিখতে জানে না
ভদ্রলোক কাজ করতেন একটা জুতো তৈরির দোকানে। কিছু দিন পর বিয়ে করলেন মালিকের শ্যালিকাকে। আর কয়েক বছর পর সেই কোম্পানির মালিকের মৃত্যু হওয়ায় তিনিই হয়ে গেলেন মালিক। কয়েক বছরের মধ্যেই এই দম্পতির পর পর সাতটি ছেলেমেয়ে জন্মায়। সাতটি সন্তানের পিতা এই জুতো দোকানের মালিকটির ভবিষ্যৎ জীবন সাধারণ ভাবে এক নির্ধারিত পথেই যাওয়ার কথা। তা হয়নি, নাটকীয় ভাবে তাঁর জীবন মোড় নিয়েছে অন্য দিকে।
ভদ্রলোকের নাম উইলিয়াম কেরি। বংশানুক্রমে বসবাস ইংল্যান্ডের নর্দামটনশায়ারের একটি গ্রামে। আমাদের দেশের পণ্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে এই নামটি বিশেষ পরিচিত। সাধারণ সাহিত্য পাঠকের কাছে নামটি শোনা শোনা, বিশেষ কিছু জানা নেই, আর আমজনতার কাছে একেবারেই অপরিচিত।
জুতো কোম্পানির এই মালিকটির ছিল ভাষা শেখার বিশেষ ক্ষমতা এবং ধর্ম আন্দোলনের দিকে দারুণ ঝোঁক। ব্যবসা চালাতে চালাতেই তিনি শিখে নিলেন হিব্রু, ইতালিয়ান, ডাচ, ফ্রেঞ্চ আর গ্রিক ভাষা। তাঁর এ রকম পাণ্ডিত্য কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যে তাঁকে একটি স্কুলে পড়াবার জন্যও আহ্বান জানানো হল। তখন তাঁর বয়স চব্বিশ। এরই মধ্যে তিনি নিয়মিত গির্জায় গিয়ে ভাষণ দিতেন। কেরি ও তাঁর কিছু বন্ধুবান্ধবের ধারণা হল, সারা পৃথিবীর মানুষকেই খ্রিস্টধর্মের পবিত্র আলোকের মধ্যে নিয়ে এসে দীক্ষা দেওয়া উচিত। এবং তাদের বাইবেল পড়াতে হবে। এই নিয়ে তখন মিশনারিদের মধ্যে প্রায় একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। বাইবেলে (ম্যাথিউ ২৮:১৮-২০) প্রভু যিশুর এ রকম একটা নির্দেশ আছে যে, সারা বিশ্বের মানুষই যাতে তাঁর অনুসরণ করে সে জন্য চেষ্টা করা উচিত।
ইউরোপে ওক গাছের কাঠ দিয়ে মজবুত জাহাজ বানানো যায়। সে সব জাহাজ সমুদ্রে ঝড়বৃষ্টিতে ডোবে না। সেই জাহাজ নিয়ে ষোলো সতেরো আঠারো শতাব্দীতে ইউরোপের অনেক দেশের ভাগ্যান্বেষী, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, রাজপ্রতিনিধি এবং বোম্বেটের দল ছড়িয়ে পড়ল বিশেষত প্রাচ্য দেশগুলির দিকে। সে ইতিহাস অনেকেরই জানা। আঠারো শতকে ভারতে এক অদ্ভুত অবস্থা। পরাক্রান্ত মুঘল শক্তি তখন একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রাদেশিক নবাব ও রাজারা মাথাচাড়া দিলেও তাদের কোনও শৃঙ্খলাবদ্ধ, শক্তিশালী সেনাবাহিনী নেই। ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ বণিকরা কিছু দিন নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করল, তার পর প্রধান হয়ে উঠল ইংরেজরাই। আজও আমাদের লজ্জার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় যে, পলাশির যুদ্ধে সুবে বাংলার নবাব ইংল্যান্ডের রানির সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হননি, তিনি পরাজিত হয়েছিলেন নিতান্তই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ভাড়াটে সৈন্য ও তাদের সেনাপতি ক্লাইভের কূটবুদ্ধি ও রণকৌশলের কাছে।
তলোয়ার ও বন্দুকের সাহায্যে এক একটা রাজ্য জয়ের পরই আসেন ধর্মপ্রচারকরা। সব দেশেই এ রকম ঘটেছে। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই প্রচুর ধর্মপ্রচারক ছড়িয়ে পড়েন পৃথিবীর নানান দেশে। আফ্রিকায় গিয়ে তো তাঁরা দেখলেন দারুণ সুযোগ। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে কোনও সঙঘবদ্ধ ধর্ম নেই, তারা নানা রকম টোটেম ও ট্যাবুতে বিশ্বাসী। এদের খ্রিস্টধর্মের আওতায় আনা অনেক সহজ। পশ্চিম এশিয়ায় সে সুবিধা হল না। কারণ, ইসলাম একটা দৃঢ় সঙঘবদ্ধ শক্তি, সামরিক ভাবে তারা ইউরোপিয়ানদের কাছে হারতে শুরু করেছে বটে, কিন্তু ধর্মত্যাগ করতে একেবারেই রাজি নয়। ভারতে এসে তারা প্রথম দিকে একটা ধাঁধার সম্মুখীন হল। এত বড় দেশটার মানুষদের মধ্যে একতাবোধ নেই। অস্ত্রবল নেই। সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ম নেই। কিন্তু রয়েছে এক প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বেশির ভাগ মানুষ অজ্ঞাতসারেই সেই ঐতিহ্যের অনুসরণ করে। এই ভারতের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু। রাষ্ট্রশক্তি মুসলমানদের হাতে। এবং অধিকাংশ হিন্দুই জানে না, হিন্দু ধর্মটা আসলে কী? এই হিন্দু ধর্মের কোনও কেন্দ্রীয় শক্তি নেই, নীতিনির্ধারক নেই, বহু শতাব্দীর অবক্ষয়ে এই ধর্মের মধ্যে কতকগুলি কুৎসিত রীতিনীতি ঢুকে গেছে। যেমন, কঠোর জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা এবং অন্য ধর্মের কোনও মানুষকেই এই ধর্মে গ্রহণ না-করার অনমনীয় সংস্কার। জন্মগত ভাবে ছাড়া কেউ হিন্দু হতে পারে না। কিন্তু এই ধর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সব পথ খোলা। তথাকথিত উচ্চশ্রেণির অত্যাচারে বহু হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়েছে। তা হলে তো তারা খ্রিস্টান হতেও পারে। এই ধারণা থেকেই দলে দলে খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের এই দেশে আগমন।
উইলিয়াম কেরিও ঠিক করলেন, তিনি ছোট্ট গণ্ডি ছেড়ে বৃহত্তর জগতে এই ধর্ম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। তিনি ব্যাপটিস্ট আন্দোলনের অন্তর্গত ছিলেন। এবং এদের একটা ঘোষিত নীতিই হচ্ছে, ‘প্রোপাগেশন অব দ্য গসপেল অ্যামংস্ট দ্য হিদেন’। ভারতে অসংখ্য হিদেন, তাই জুতোর ব্যবসাট্যবসা সব গুটিয়ে কেরি সপরিবার আসতে চাইলেন ভারতে। তাঁর স্ত্রী কিছুতেই রাজি নন। তাঁর নাম ডরোথি। তিনি একেবারেই লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাননি (বিয়ের খাতায় টিপসই দিয়েছিলেন) এবং ভারত সম্পর্কে নানা রকম অলীক ভয়ের গল্প শুনেছেন। তা ছাড়া তিনি তখন গর্ভবতী। তাঁর স্বামী জাহাজের টিকিট কেটে ফেলেছেন। নানা কারণে সে জাহাজে আর যাওয়া গেল না। কয়েক মাস দেরি হয়ে গেল। এর মধ্যে এক পুত্রসন্তান প্রসব করলেন ডরোথি। সেই নবজাতক সমেত অন্য পুত্রকন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে কেরি সাগরে ভেসে পড়লেন এবং পৌঁছলেন কলকাতা বন্দরে।
এখানে এসে কেরি দেখলেন, এখানকার কোনও মানুষই, অর্থাৎ নেটিভরা, তাঁর কথা বুঝতে পারে না। অতি অল্পসংখ্যক মানুষের যৎসামান্য ইংরেজি জ্ঞান আছে। সুতরাং কেরি বাংলা শিখতে শুরু করলেন। কিছু একটা জীবিকাও তো চাই৷ তাই এক বন্ধুর অনুরোধে এক নীলের কারখানায় ম্যানেজার হয়ে সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন মেদিনীপুর। সেখানে ছিলেন ছ’বছর। নীলকর সাহেবদের অনেক অত্যাচারের গল্প শোনা যায়। কেরি ম্যানেজার হিসেবে কী রকম ছিলেন আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, তার মধ্যে তিনি যথেষ্ট বাংলা শিখে নিউ টেস্টামেন্ট-এর অনুবাদ করে ফেলেছেন (অবশ্যই কোনও মুন্সির সাহায্য নিয়ে)। এর মধ্যে তাঁর একটি পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়। এবং তাঁর স্ত্রী ডরোথি বাকি জীবনের জন্য বন্ধ উন্মাদ হয়ে যান।
কলকাতায় দলে দলে মিশনারি এসে ভিড় করছে, তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পছন্দ হয়নি। তারা এ দেশে এসেছে ব্যবসা করতে। ধর্ম প্রচারের নামে কোনও হাঙ্গামা তারা চায় না। তাই ধর্মপ্রচারকরা অনেকেই চলে গেলেন শ্রীরামপুর শহরে। সেটা ডেনমার্ক সরকারের অধীনে। এবং তাদের রাজা এদের সাহায্য করতে উৎসাহী। উইলিয়াম কেরি এদের সঙ্গে শ্রীরামপুরে এসে যোগ দিলেন ১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি।
সময়টার কথা মনে রাখা দরকার। বিদ্যাসাগর তখনও জন্মাননি। রামমোহন কেরির চেয়ে এগারো বছরের ছোট। তিনি তাঁর উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছু কাজ তখনও শুরু করেননি। বাঙালিরা তখন বাংলা ভাষায় কথা বলে বটে, কিন্তু, কিছু চিঠিপত্রের কথা বাদ দিলে, গদ্য ভাষা লিখতে জানে না। ছাপাখানা এসে গেছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে ছাপার মতো বিশেষ কিছু নেই, পুরনো কালের কবিতা ছাড়া। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক ভাষাতেই গদ্য ভাষা সংহত হয়ে রচিত হচ্ছে গল্প-উপন্যাস। বাংলায় তা লেখার মতো কেউ নেই। বাংলা সাহিত্যকে হাঁটি হাঁটি পা পা করাবার জন্য সাগরপার থেকে এক জন সাহেবকে আনতে হল।
শ্রীরামপুরে কেরি একটা ছোটখাটো প্রেস স্থাপন করেছিলেন এবং নানা ভাষায় বাইবেল ছাপিয়ে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে তিনি সংস্কৃত শিখছেন, ওড়িয়া ভাষা শিখছেন, সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য তিনি রামমোহনেরও আগে প্রকাশ্যে আবেদন জানাচ্ছেন। ছ’বছর বাদে তাঁর উন্মাদ স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি বিয়ে করে ফেললেন আর এক বার। কিন্তু কেরির পুরো জীবনী রচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়।
কেরি এক সময় একটা বই রচনা করে ছাপালেন নিজেদের প্রেসে। বইটির নাম ‘ইতিহাসমালা’। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, বইটি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত হয়নি। এর মধ্যে ধর্মের কোনও নামগন্ধ নেই। ‘ইতিহাসমালা’ কোনও ইতিহাসের বইও না। এতে আছে অনেকগুলি ছোট ছোট গল্প। অধিকাংশই লোককাহিনি। যা সাধারণত লোকের মুখে মুখে ছড়ায়। কেরি একজন ধর্মপ্রচারক তো বটেই, তবু তিনি নিছক এই গল্পের বই ছাপলেন কেন? বাংলা গদ্যের একটা স্পষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য? (তিনি নিশ্চিত তাঁর মুন্সি রামরাম বসুর যথেষ্ট সাহায্য নিয়েছিলেন, কিন্তু কেরিও এই বারো চোদ্দো বছরের মধ্যে অনেকখানি বাংলা শিখে ফেলেছেন, যার ফলে তিনি ইংরেজি-বাংলা অভিধানও রচনা করবেন আরও কিছু দিন পর)। ‘ইতিহাসমালা’ই বাংলা ভাষার অন্যতম প্রথম গদ্য গল্পের বই। কিন্তু বইটি ছাপা হওয়ার পরই একটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটল। বইটি প্রস্তুত হওয়ার পর বাইরে ছাড়বার আগেই আগুন লেগে প্রেস ও গুদামের অনেকখানি ধ্বংস হয়ে যায়। বিশেষ করে ইতিহাসমালার পুরো স্টক শেষ। কেউ কেউ অবশ্য ইঙ্গিত করেছেন যে, আগুন এমনি এমনি লাগেনি, এই বইয়ের কিছু কিছু গল্পে নীতিবাগীশদের আপত্তি ছিল, তাদের কারও নির্দেশে বইগুলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তার ফলে বাংলা সাহিত্যর গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য হওয়ার মতো এই বইটির কথা কেউ জানতেই পারল না। লং সাহেবের বাংলা মুদ্রিত গ্রন্থের তালিকায় এই বইয়ের নাম নেই। এমনকী কেরি সাহেবের রচনাবলিতেও এই বইয়ের নাম স্থান পায়নি। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বই রচিত হল, তার পরই হারিয়ে গেল। এমনকী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস যাঁরা রচনা করেছেন তারাও অনেকে এই বইয়ের নাম জানতেন না।
কিন্তু আগুনেও নাকি সব কিছু দগ্ধ হয় না। ইতিহাসমালার দু’চার কপি কোনও ক্রমে বেঁচে যায়। সেই রকম একটি কপি কোথা থেকে খুঁজে পেয়ে প্রথম মুদ্রণের একশো ষাট বছর পরে ফাদার দ্যতিয়েন এর একটি সটীক সংস্করণ প্রকাশ করেন। দ্যতিয়েন তো বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অতি আপনজন। এবং এটা তাঁর একটা বিরাট কাজ। তবে কিছু দিনের মধ্যেই বইটি অপ্রাপ্তির অন্ধকারে চলে যায়। আবার প্রায় চার দশক বাদে এর একটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছে ‘গাঙচিল’। সম্প্রতি এই বই সম্পর্কে লিখেছেন ভাষাবিদ চিন্ময় গুহ এবং রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অননুকরণীয় স্টাইলে বইটির ভাষা ও গল্পগুলির বিস্তৃত বয়ান রচনা করেছে। তার পর আমার আর নতুন কী লেখার থাকতে পারে?
তবু যে আমি এ সম্পর্কে লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তার অন্য একটা কারণ আছে। উইলিয়াম কেরির জীবনীর কিছু উপাদান জানার জন্য আমি উইকিপিডিয়ার শরণ নিতে গিয়ে যেমন হতবাক, তেমনই বিষণ্ণ বোধ করেছি। কেরি তাঁর জীবনের চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর এই বাংলা মুলুকেই কাটিয়েছেন এবং এখানেই দেহ রেখেছেন। কিন্তু এই বহুভাষাবিদ পণ্ডিতটির খ্যাতি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি বিশ্ববিখ্যাত। পৃথিবীর নানান দেশে তাঁর সম্মানে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর নাম যুক্ত। যেমন, উইলিয়াম কেরি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন পাসাডেনা, ক্যালিফোর্নিয়া, তেমনই ভ্যানকুভার, ব্রিটিশ কলম্বিয়া, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এমনকী বাংলাদেশের চট্টগ্রামে উইলিয়াম কেরি অ্যাকাডেমি। আর আমাদের কলকাতায়? কোনও অভিযোগ নয়, অতি লজ্জায় একা মাথা নত করে বসে থাকি।
বাধ্যতামূলক পাঠ
আমি খুব ভালই জানি, যাঁরা অনুগ্রহ করে আমার রচনাটি পড়বেন বা অলস ভাবে চোখ বুলোবেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় কেউই ইতিহাসমালা বইটি সংগ্রহ করে পড়ে দেখার আগ্রহ দেখাবেন না। এ রকম হতেই পারে, তাই আমি জোর করে ওই বইটির দু’তিন লাইন গদ্যের নমুনা তাঁদের পড়াবই পড়াব। ‘হাঁড়ি ভাঙ্গে, রাণী হাসে’, এটা একটা সাঙ্ঘাতিক গল্প। নীতিবাগীশদের এ রকম গল্পেই গায়ে কাঁটা দিতে পারে।
‘এক রাজা ছিলেন। তাঁহার রাণীর মন্ত্রির সঙ্গে অত্যন্তিকী প্রীতি ছিল। এক দিবস মন্ত্রী রাণীকে কহিল, “হে রাণি, আমারদের গোপনভাবে এ প্রীতি রাজা জ্ঞাত হইলে, প্রাণে বধিবেন। অতএব চল, এ স্থান হইতে দেশান্তরে যাই। অদ্য নিশাভাগে এই নগরের অন্তে পুষ্করিণীর তটে বৃক্ষের মূলে…: ইত্যাদি।
ছাপাখানার ভুলচুক
রাজ্জাক হাওলাদার সম্পর্কে ছাপা হয়েছে, ইনি ‘কলকাতার নাগরিক’। সে আবার হয় নাকি? উনি কানাডার নাগরিক। জন্ম বাংলাদেশে।
মাদারিপুরের বাদামতলার সিনেমা হলের মালিকের নাম সুধীরবাবু নয়, তিনি অতি সজ্জন সুনীলবাবু, সুনীলচন্দ্র ঘোষ।
পুডভকিন আর চেরকাশভের সঙ্গে শিশিরকুমার ভাদুড়ির দেখা হয়েছিল ঠিকই, ষাটের দশকের বদলে পঞ্চাশের দশকে।
২. ১১. ২০১১
লেখনী পুস্তিকা ভার্যা পরহস্তং গতা গতাঃ!
প্রথমে ভার্যার কথাই বলা যাক। আমার স্ত্রী যদি এক্ষণে অপর কোনও পুরুষের হাত ধরে, আমাকে টা টা বাই বাই বলে ড্যাং ড্যাং করে চলে যায়, তা হলে আমার তো বাধা দেওয়ার কোনও উপায় নেই। এটা নারীস্বাধীনতার যুগ। আমি নিজেও তো কট্টর নারীবাদী। এমতাবস্থায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে হাসি হাসি মুখে বলতে হবে, সুখে থেকো। ভাল থেকো!
এ রকম উদারতা দেখাতে গেলেও অনেক সময় উল্টো বিপত্তি হতে পারে। ওপরের এই চিত্রনাট্যটা যদি আমার স্ত্রীকে শোনাই, তা হলে তিনি নির্ঘাত চক্ষু গাঢ় করে বলবেন, ও তুমি বুঝি চাও, আমি অন্য কারওর সঙ্গে চলে যাই? তা হলে তুমি বাঁচো। আমাকে তোমার আর সহ্য হচ্ছে না, না? সে কথা আগে বললেই পারতে? ঠিক আছে, আমি কালই…
অগত্যা তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য আমাকে কালিম্পঙের টিকিট কাটতে হয়।
মোট কথা, নারীবাদী আন্দোলনের অগ্রগতির একটা দিক হচ্ছে, এক শ্রেণির পুরুষকে এখন বেশ ভয়ে ভয়েই থাকতে হয়, যাতে কোনও কথার একটুও ভুল ব্যাখ্যা না করা যায়।
উপরোক্ত অর্বাচীন সংস্কৃত শ্লোকটির মধ্যে এখন লেখনীর ব্যাপারটা অবান্তর হয়ে গেছে। কলম নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়, এখন কলম হয়ে গেছে অত্যন্ত সস্তা। হস্তান্তর হচ্ছে অনবরতই। পার্কার, শেফার্স এবং আরও সব দামি কলমের দিন গিয়েছে।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বাবা আমাকে একটা শেফার্স কলম উপহার দিয়েছিলেন। দিন সাতেকের মধ্যেই ট্রামে সেই কলমটা এক পকেটমার অদৃশ্য করে দেয়। ঘটনাটা আমার মনে আছে। আমার কলমটি মেরে দিয়েও খুশি না-হয়ে পকেটমারটি আবার হাত চালাচালি শুরু করে এবং ধরা পড়ে যায়। তখন তাকে ট্রাম থেকে নামিয়ে কিছু লোক, যাদের বলে পাবলিক, তারা পেটাতে শুরু করে। চোরাই কোনও জিনিস অবশ্য তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তা কোন জাদুবলে সে তার কোনও সঙ্গীর কাছে চালান করে দিয়েছে। তার মার খাওয়া দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিল খুব এবং সেই পাবলিকের কাছে ব্যর্থ অনুরোধ করেছিলাম, ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন। পকেটমারটি অবশ্য দিব্যি মার খেয়ে যাচ্ছিল। পরে শুনেছি ওরা মার খাওয়ার ট্রেনিং নেয়। নিশ্বাস বন্ধ করে কী সব যোগব্যায়ামের সাহায্যে ব্যথা-বেদনা সহ্য করে। তাই মার খেতে খেতে আধমরা হয়ে গেলেও একটু পরে দৌড়ে পালিয়ে যায়। তখনকার পাবলিক চড়চাপড় মেরে বড়জোর আধমরা করে দিত। একেবারে প্রাণে মারত না।
তার পর থেকে আমি আর কখনও দামি কলম ব্যবহার করিনি। এক টাকা, দু’টাকার ডটপেনই যথেষ্ট। পকেটমার বেচারাদের নিশ্চয়ই এখন খুব দুর্দিন। কারওর পকেটেই দামি কলম থাকে না, মানিব্যাগে টাকার বদলে প্লাস্টিক কার্ড, মেয়েদের গায়ে সোনার গয়নার বদলে প্লাস্টিক জুয়েলারি।
এই চুরি বা না-বলে নেওয়া কিংবা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও না-দেওয়া, এ সব বিষয়ে অনেক গল্প আছে। মার্ক টোয়েনের বাড়ির মেঝেতে একগাদা বই ছড়ানো দেখে এক বন্ধু বিস্ময় প্রকাশ করলে মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, কী করব, যেভাবে এই বইগুলি এখানে এসেছে, সে ভাবে তো কোনও আলমারি আসতে পারে না।
সম্প্রতি বই চুরির ব্যাপারে আমার এমনই এক অভিনব অভিজ্ঞতা হল। যা সবাইকে জানাবার মতো।
গত সপ্তাহে আমি আফ্রিকার ঘানায় গিয়েছিলাম একটা বইমেলা উপলক্ষে। এক দুপুরে হোটেলের ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখি, আমার বিছানার কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। পুরোপুরি কৃষ্ণাঙ্গ। অল্পবয়সি যুবক। প্রথমে কোনও আততায়ীর কথাই মনে পড়ে এবং ভয়ে বুক তো কাঁপবেই।
ছেলেটি অবশ্য খুব বিনীত ভাবে বলল, (এখানে সবাই ইংরেজি বলে) স্যার, আমি আপনার ঘর পরিষ্কার করি। দু’দিন ধরে দেখছি আপনার বিছানার উপর একটা বই ওল্টানো রয়েছে। আমি একটু একটু পড়তে শুরু করি। বিষয়টি এমনই আকর্ষণীয় যে, ছাড়তেই পারছিলাম না। কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞেস না-করে তো নিতে পারি না। আপনি এই বইটা আমাকে দেবেন?
আমি বললাম, বইটা তোমাকে কী করে দিই বলো তো? আমার যে পড়া হয়নি।
সে বলল, বইটা কোথায় পাওয়া যায়? আপনি কোথা থেকে কিনেছেন?
আমি বললাম কোথায় পাওয়া যায়, তা তো আমি জানি না। কারণ, বইটি আমি কিনিনি। এ বইয়ের লেখক আমাকে উপহার দিয়েছেন।
সে বলল, কেন উপহার দিয়েছেন? তুমিও লেখক?
আমি বললাম, তা ছোটখাটো একজন লেখক আমাকে বলাই যায়।
সে বলল, একজন লেখক তোমাকে বই উপহার দিয়েছেন, তা হলে তোমার লেখা একটা বই আমাকে উপহার দাও।
আমি বললাম, তা দিতে পারি। কিন্তু তুমিও কি লেখক?
সে বলল, না। আমি এখনও কিছু লিখিনি। তবে ভবিষ্যতে লিখতে পারি।
এমন সরল আবেদন আমি কোনও গৃহ পরিচারকের কাছ থেকে আগে শুনিনি।
এ বার বইটি সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলি। বইটির নাম ‘আমা’। এক কালে এখানে যে দাস ব্যবসা চলত, উপন্যাসের আকারে সেই ইতিহাস। এক হিসেবে এই উপন্যাসেও আছে নারীস্বাধীনতার বীজ, প্রধান চরিত্র একটি নারী। অসহ্য অত্যাচার, ধর্ষণ, হাত-পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থাতেও সে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, পালাবার চেষ্টা করেছে বার বার। বইটি পড়তে পড়তে একটা প্রশ্ন মনে আসে, যারা এই দাস ব্যবসায় জড়িত (শুধু শ্বেতাঙ্গ নয়, এদের মধ্যে কালো মানুষও আছে) তারা নিজের জাতের বাইরে অন্য মানুষদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। যখন তখন চাবুক মারে। মেয়েদের প্রকাশ্যে বিবস্ত্র ও ধর্ষণ করতে পারে। আজ এরা তো স্ত্রী-পুত্র নিয়ে দিব্যি সংসার করে। যে-সব ঘটনার কথা পড়ে আমরা শিউরে উঠি, তাতে এদের বিবেকে একটুও দাগ কাটবে না? তা হলে কি সভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটেছে, দয়া, মায়া, সহানুভূতি সব সে কালের ব্যাপার? একটু পরেই আমার মনে পড়ে, না তা তো নয়। প্রায় ছাব্বিশশো বছর আগে জন্মেছিলেন গৌতম বুদ্ধ। তিনি করুণার প্রতিমূর্তি এবং তিনি একা নন, তাঁর শান্তি-নীতির অনুবর্তী হয়েছিলেন কোটি কোটি মানুষ। দু’হাজার বছর আগে যিশু খ্রিস্টও শুনিয়েছিলেন শান্তির বাণী। আবার তাঁর অনুগামীদের অনেকে লিপ্ত হয়েছিলেন দাস ব্যবসায়। ইতিহাসে দুটো ধারাই চলেছে পাশাপাশি। নিষ্ঠুরতা ও করুণা। চেঙ্গিস খান এক লক্ষ বন্দির মুণ্ডু কাটার হুকুম দিয়েছিলেন। হিটলার একটা জাতিকেই না নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পৃথিবীতে এখন দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ। কিন্তু এখনও কি বহু মানুষকে দাস বানাবার প্রক্রিয়া চলছে না?
দু’দিন বাদে আমি ছেলেটিকে ডেকে বললাম, বইটা আমার পড়া হয়ে গেছে। তুমি এখন নিতে পারো।
সে বলল, ধন্যবাদ স্যর। আমি এর মধ্যেই এক কপি কিনে নিয়েছি।
আর একটি বইয়ের কথা
শ্রীজয়ন্ত চক্রবর্তীকে আমি চিনি না। পরিচিতিতে জানলাম, তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন ফেলো৷ ডি ভি সি-তে কর্মরত অবস্থায় তিনি বাংলায় এম এ পাশ করেন। সংস্কৃত শিখেছেন। হিন্দিতেও কিছু গবেষণা করেছেন এবং তাঁর এক সময় শখ হয় ব্রাহ্মী লিপি পাঠ করার। সেই শখ থেকে গভীর চর্চা করে ব্রাহ্মী লিপি থেকে আরও নানা লিপির বিবর্তনে কী ভাবে বাংলা লিপির উদ্ভব হল, সেই বিষয়ে তিনি একটি চটি বইও লিখে ফেলেছেন। ‘ব্রাহ্মী থেকে বাংলা’। এর বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম কিংবা যাচাই করার মতো বিদ্যেবুদ্ধি আমার নেই। তবে শ্রীঅমলেন্দু দে-র মতো প্রখ্যাত পণ্ডিত এঁর কাজের প্রশংসা করেছেন।
বইটি খুবই দীন ভাবে ছাপা। ভেতরে যে সব হস্তলিপি, তা প্রায় পড়াই যায় না। কোনও বড় প্রকাশক এ রকম বই সম্পর্কে আগ্রহী নয়। এটা প্রকাশ করেছে, সঞ্চয়ন প্রকাশন। ১২১/এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট, কলকাতা-৯। বিজ্ঞান ও ভাষা সংস্কৃতিকে যাঁরা মেলাতে পারেন, তাঁরা আমাদের অবশ্যই শ্রদ্ধেয়।
১৬. ১১. ২০১১
দু’জন অবিস্মরণীয় মানুষের কথা
তখন আমি দিনের বেলা আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করি, আর সন্ধের সময় আমাদের নিজস্ব পত্রিকার দফতরে সম্পাদক সেজে বসি৷ তখন আমাদের পত্রিকাটি লিটল ম্যাগাজিনের অবয়ব ছেড়ে একটা পুরোদস্তুর মাসিক হওয়ার চেষ্টা করছে এবং প্রেসের মালিক গণেশচাঁদ দে’র সৌজন্যে বিনা পয়সায় একটা ঘর পেয়ে রীতিমতন দফতরও খোলা হয়েছে। একদিন দেখি, একটু দূরের একটা চেয়ারে একজন ব্যক্তি নিঃশব্দে বসে আছেন, অন্য লোকেরা আসছে যাচ্ছে, কাজ ও স্বার্থের কথা বলছে, তিনি আসলে কিছুই বলছেন না।
তাঁর বয়স আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। পুরোদস্তুর স্যুট পরা। মাথাটি কেশ-বিরল, তাঁর ঠোঁটের এক কোণে লেগে আছে একটুখানি সফিসটিকেটেড হাসি। এই সফিসটিকেটেড হাসি ব্যাপারটা বোঝানো শক্ত, সঞ্জীবচন্দ্র (বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা) যে প্রসন্নতাব্যঞ্জক ওষ্ঠের কথা বলেছেন, ঠিক তা নয়, বিদ্রুপ বা সবজান্তা ভাব মোটেই নয়, কারওর কারওর ওই হাসিটি থাকে কথা না-বলার সময়। অন্য কেউ চেষ্টা করলেও ওই হাসি ফোটাতে পারে না। সত্যজিৎ রায়ের ওই হাসিটি ছিল, আর দেখেছি কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও চিত্রপরিচালক তপন সিংহের ওষ্ঠে। এক সময় আমি ওই ভদ্রলোকের দিকে ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কিছু বলবেন?
তিনি একটা হাত একটু তুলে মৃদু গলায় বললেন, না, না, আমি কিছু লিখি না, কিছু ছাপাতেও আসিনি। শুধু দেখতে এসেছি।
পত্রিকা অফিসে কেউ শুধু দেখতে আসে না। দেখার কী আছে? বরং এ রকম কারওর উপস্থিতিটাই অস্বস্তিকর।
আরও কিছু পরে যখন কাজকর্ম সেরে আমি উঠব উঠব করছি, তখন তিনি কাছে এসে বললেন, আমার নাম কল্যাণ চৌধুরী। অতি সাধারণ মানুষ। অন্য পরিচয় দেওয়ার মতো কিছুই নেই।
যাঁদের ঠোঁটে ওই রকম হাসি থাকে, তাঁরা কোনও ক্রমেই সাধারণ মানুষ হতে পারেন না। এঁর কথা শুনেও বোঝা গেল, তিনি রীতিমতো শিক্ষিত এবং বিদগ্ধ ব্যক্তি।।
তারপর তিনি বললেন, আমার একটাই অনুরোধ, আপনার তো কাজ শেষ। আপনি আমার সঙ্গে এক জায়গায় গিয়ে কিছু পানাহার করবেন?
অদ্ভুত প্রস্তাব। যাঁকে জীবনে প্রথম দেখছি, যাঁর সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, তাঁর সঙ্গে আমি পানাহার করতে যাব কেন?
আমি খানিক উদ্ধত ভাবেই বললাম, না, আমার অন্য কাজ আছে। এর দু’তিন বাদে তিনি আবার এলেন। এবং ওই একই প্রস্তাব। এবং আমার প্রত্যাখ্যান।
আমার চরিত্রের একটা প্রধান দোষ, আমি তিন বারের বেশি না বলতে পারি না। চতুর্থ বারে মনে হল, দেখাই যাক না, একবার চুকিয়ে ফেলা যাক। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন গ্লোব সিনেমার অন্দরে একটা রেস্তোরাঁয়। সেখানে একটা টেবিলে আগে থেকেই বসে আছেন দুই ব্যক্তি। বেশ বৃদ্ধই বলা যায়। একজন হাত তুলে ডাকলেন, এই কল্যাণ…
কল্যাণ চৌধুরী তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন। আমি শুনে বেশ বিস্মিতই হলাম যে, ওই দুই ব্যক্তিই আন্দামানে জেল খেটেছেন আঠাশ বছর। একবার অনশন করেছিলেন একচল্লিশ দিন। কথায় কথায় ওঁরা জানালেন যে, কল্যাণ চৌধুরী মাঝে মাঝেই ওঁদের ডেকে এনে খাওয়ান। আন্দামানের অন্য বন্দিদের মধ্যেও যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদেরও খুঁজে খুঁজে।
কয়েক দিন পর জানতে পারলাম যে, কল্যাণ চৌধুরীর এটাই বিচিত্র শখ। পরাধীন আমলে যাঁরা ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের স্ত্রী-পুত্রদের মধ্যে যাঁরা খুব অসহায় অবস্থায় আছেন, তাঁদের বেশ কয়েকজনকে নিয়মিত অর্থ সাহায্যও করেন তিনি। রাষ্ট্র যাদের জন্য কোনও সাহায্যের ব্যবস্থা করেনি, ভগৎ সিংহের পরিবারের কয়েক জনকেও তিনি মানি অর্ডারে টাকা পাঠান। বছরে একবার ওদের সবাইকে তিনি কলকাতায় ট্রেন ভাড়া দিয়ে এনে একটা উৎসব করেন।
এর মধ্যে কল্যাণ চৌধুরী আমার কল্যাণদা। তিনি চায়েরপেটির ব্যবসা করেন এবং ইংরেজি সাহিত্য থেকে মাঝে মাঝেই লাগসই উদ্ধৃতি দেন। তিনি কোনও প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত নন, কোনও রকম প্রচার চান না, শুধু নিজের শখে এই সব কাণ্ড করেন। তিনি সব সময় কথা বলেন নিচু গলায়, মাঝে মাঝে কুটুস কুটুস করে এক একটা রসিকতা করেন। বেশ রসে-বশে মানুষ।
এর মধ্যে আমরা বুধসন্ধ্যা নামে একটা ক্লাবের পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু জায়গা পাওয়া যাবে কোথায়? কল্যাণদার থিয়েটার রোডের একটা বড় বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট কিনে রাখা ছিল। মাঝে মাঝে তাঁর অতিথিরা এসে থাকেন সেখানে। কল্যাণদা সেই ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিলেন আমাদের। ও রকম ফ্ল্যাটের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। অন্তত বিদ্যুতের বিলটা আমরা দিতে চেয়েছিলাম। কল্যাণদা সেই মৃদু হাসি দিয়ে হাত নেড়েছিলেন। সেখানে আমাদের ‘মুক্তধারা’ নাটকের রিহার্সাল শুরু হল। কল্যাণদা অভিনয় করবেনই না, কোনও কমিটিতেও থাকবেন না। তবু রিহার্সালের সময় আমাদের জন্য নানা রকম খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসেন। এক সময় তিনি একজন গোয়ান কুককে ধরে এনে আমাদের এমন সব খাবার তৈরি করে খাওয়াতে লাগলেন, সে সবের আমরা নামও শুনিনি। আমি একদিন বলেছিলাম, কল্যাণদা করছেন কী? এইসব খাবার খাইয়ে আমাদের অভ্যেস খারাপ করে দিচ্ছেন। কিন্তু উত্তরে তাঁর মুখে সেই মৃদু হাসি।
বুধসন্ধ্যার গোড়ার দিকে নাটকের বিভিন্ন ভূমিকায় রিহার্সাল দিতেন সাগরময় ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সমরেশ বসু, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত, প্রমুখ আরও অনেকে। সংগীত পরিচালক সুবিনয় রায়। খুব নক্ষত্র সমাবেশ। একদিন কল্যাণদা সাগরদার কাছে গিয়ে বললেন, আপনার স্ত্রীর নাম কি আরতি? মানিকতলায় থাকতেন? সাগরদা বললেন, হ্যাঁ তাই তো জানি, বিয়ের আগে মানিকতলায়। কল্যাণদা বললেন, আমিও তখন মানিকতলায় থাকতাম। সুন্দরী হিসেবে আরতিকে সবাই চিনত ওই অঞ্চলে। সাগরদা শেষ প্রৌঢ়ত্বের মুখে লাজুকতার দায় নিয়ে চুপ করে রইলেন। কল্যাণদা বললেন, আমার সঙ্গে আরতির ভালই পরিচয় ছিল। পাশাপাশি বাড়ি তো, ছাদেও গল্প হত মাঝে মাঝে।
সম্পাদক সাগরময় ঘোষ আমার দিকে ফিরে নিচু গলায় বললেন, কী সুনীল, এতে কি একটা ছোট গল্প হতে পারে? না, উপন্যাস?
বুধসন্ধ্যার অনেক আগে আর একটা নাট্যদলের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। কয়েক বছরের জন্য এই ‘হরবোলা’ দলটি বেশ নাম করেছিল। জানি না, নাট্যদলের ইতিহাসে হরবোলার নাম থাকবে কি না।
নাট্য পরিচালক ছিলেন কমলকুমার মজুমদার। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে রিহার্সালের আগে গলা সাধতে হবে। গান গাইতে পারুক বা না পারুক। সেই জন্য আসতেন সন্তোষ রায়, যিনি ফৈয়াজ খানের সাক্ষাৎ শিষ্য। আর অন্য গানের জন্য কবি ও গায়ক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, যিনি আই পি টি টি-র উদ্বোধনী গান ‘এসো মুক্ত করো মুক্ত করো’র স্রষ্টা। আমরা বাচ্চা ছেলের মতো সন্তোষ রায়ের সামনে বসে সরগম লিখতাম আর জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র যাঁর ডাকনাম ছিল বটুকদা, তাঁর কাছে শিখতাম, ‘জয় তব বিচিত্র আনন্দ, হে কবি’। আমরা ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ ও ‘মুক্তধারা’ এই দুটি নাটক মুখস্থ করেছিলাম। এক একটা নাটকের রিহার্সাল হত প্রায় এক বছর ধরে। আসল আকর্ষণ ছিল রিহার্সাল। সেই রিহার্সালই আমার জীবনে খুব বড় প্রভাব ফেলেছে। কিছুক্ষণ রিহার্সাল, তার পরেই আড্ডা, তুমুল আড্ডা। কমলকুমার ছিলেন গল্পের খনি আর তাঁর সঙ্গে টক্কর দিতেন বটুকদা। আর কখনও প্রসঙ্গ উঠলে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীদের জীবনের মজার মজার কাহিনি শোনাতেন সন্তোষদা। আর সাহিত্য বিষয়ে গালগল্প শুরু হলে সেখানে ঢুকে পড়তেন দিলীপকুমার গুপ্ত। যিনি ডি কে নামেই অনেকের কাছে পরিচিত।
আমাদের এই নাট্যদলটিল মেরুদণ্ড ছিলেন এই ডি কে। তিনি ডি জে কিমার নামে একটি বিলিতি প্রচার সংস্থার ম্যানেজার। সেখানে তিনি সত্যজিৎ রায়কে চাকরি দিয়েছিলেন। অন্য দিকে, তিনি তখনকার দিনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা সিগনেট প্রেসের কর্ণধার। তিনি বাংলা প্রকাশন জগতে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন। মলাট, ছাপা, কাগজ নির্বাচন, বাঁধাই এমনকী পুস্তানি পর্যন্ত সব দিকে ছিল তাঁর তীক্ষ দৃষ্টি। জ্ঞানও ছিল নিশ্চয়ই, নইলে অন্যরা তাঁর কথা মেনে নেবেই বা কেন। আর প্রতি বছরই সর্বভারতীয় মুদ্রণ শিল্প প্রতিযোগিতায় সিগনেট প্রেস জিতে আনত অনেকগুলি পুরস্কার।
ডি কে ছিলেন খুবই ব্যস্ত মানুষ। ডি জে কিমার এবং সিগনেট প্রেস দুটিই তখন সাফল্যের তুঙ্গে। শুনেছি, এক একদিন তিনি রাত দুটো পর্যন্ত কাজ করে তাঁরপর স্নান করে খেতে বসতেন। অথচ প্রতি শনি রবিবার নাটকের রিহার্সালের সময় তিনি অন্য সব কাজ ভুলে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তিনি উচ্চশিক্ষিত মানুষ। শুনেছি তাঁর প্রাইভেট টিউটর ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। বিদেশি সাহিত্যেও তাঁর অগাধ জ্ঞান। ওই আড্ডাতেই আমি প্রথম ফ্রানৎস কাফকার নাম শুনি৷ ডি কে শুনিয়েছিলেন সম্পূর্ণ মেটামরফসিস গল্পটি।
সন্ধে ছ’টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চলত এই রিহার্সাল ও আড্ডা। এর মধ্যে বারে বারে আসত সুদৃশ্য কাপে চা। প্রচুর নোনতা ও মিষ্টি খাদ্যদ্রব্য। ডি কে নিজে সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে এক একদিন একটি দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আনতেন এবং তার গুণাগুণ বর্ণনা করতেন। এই আড্ডায় ধূমপান নিষিদ্ধ ছিল না। তখনকার দিনে পঞ্চাশটি গোল্ড ফ্লেক সিগারেটের টিন পাওয়া যেত। সে রকম দু’তিনটে টিন ছড়ানো থাকত আসরের মাঝখানে। আমি তখনও ধূমপান শুরু করিনি। আমার বন্ধুরা কেউ কেউ একটার বদলে পাঁচ ছ’টা তুলে নিত। এই নাটকে ডি কে-র কোনও ভূমিকা নেই। কোথাও তাঁর নাম থাকবে না। তবু তাঁর প্রবল উৎসাহ। আড্ডার শেষে যাদের বাড়ি হাওড়ায় কিংবা দূরে তাদের প্রত্যেককে তিনি দিয়ে দিতেন ট্যাক্সিভাড়া। কমলকুমারও আমাদের কয়েক জনকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে দিতেন শ্যামবাজার। মাঝে মাঝে তিনি সন্তোষদা, বটুকদা, কমলদার পকেটে গোপনে এক একটা খাম ভরে দিতেন। তাতে কী থাকত আমাদের জানার কথা নয়।
এলগিন রোডে, ওঁদের বাড়ির সামনে ছিল অনেকটা মাঠ, সেখানে এক ডেকরেটর মঞ্চ বেঁধে দিয়েছিলেন। শেষের দিকে প্রায় এক মাস আমরা সেই মঞ্চে রিহার্সাল দিয়েছি। তার পর চার দিন ধরে প্রচুর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটক। তখন বুঝিনি, এখন বুঝতে পারি, প্রচুর খরচ করেছিলেন ডি কে।
তিনি ছিলেন সেই ধরনের মানুষ, যাঁরা নতুন কিছু উদ্ভাবনায় যতটা উৎসাহী, তার লাভক্ষতির দিকটা চিন্তাও করেন না। সিগনেট প্রেসের সাফল্য যখন তুঙ্গে, তখনই তার পতনও শুরু হয়ে যায়।
বাংলা কবিতাকে প্রকাশনা জগতে ডি কে-ই প্রথম সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শুধু জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথই তো নয়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও নরেশ গুহ-র মতো তরুণ কবির বইও প্রকাশ করতেন। তখন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ অতিশয় বেস্ট সেলার। যেমন সুন্দর ছাপা তেমন সুন্দর শ্বেতচন্দন মাখা প্রচ্ছদ। চার টাকা দাম। বিজ্ঞাপনে দেওয়া হল যে এক বছরে ছিয়ানব্বই হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।
ডি কে-র শ্যালক বুড্ঢা যে হেতু আমার বিশেষ বন্ধু, তাই আমি ওদের কিছু কিছু ভেতরের কথা জানতাম। শুনেছিলাম, চার টাকা দামের ওই বইয়ের প্রোডাকশন কস্ট সাড়ে পাঁচ টাকা। অর্থাৎ যত বেশি বিক্রি হবে তত বেশি ক্ষতি। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ পাঠকরা ছুঁতেও ভয় পায়।
এই দু’জন মানুষের কথা লিখতে ইচ্ছে হল একটাই কারণে। এঁরা কেউ কিন্তু জমিদার বা বড় ব্যবসায়ীর মতো ধনী ছিলেন না। উচ্চ মধ্যবিত্ত বলা যায়। ডি কে তো শেষ পর্যন্ত বিষয়সম্পত্তি কিছুই রেখে যাননি শুনেছি। এখনও তো বাঙালিদের মধ্যে ওঁদের তুলনায় কিছু ধনী ব্যক্তি আছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের কেউ কেউ কি নেহাত শখে কিংবা খেয়ালিপনায় অল্প বয়সি কবি শিল্পী, নাট্যদলের সঙ্গে মিশে অকাতরে অকারণে অর্থ ব্যয় করতে পারেন না? না কি যুগের হাওয়াই এখন অন্য রকম?
৩০. ১১. ২০১১
Chapter - 7
কী অপূর্ব সুন্দর কাটানো একটি সন্ধ্যা
অনুষ্ঠানসূচিতে দেখলাম, দ্বিতীয়ার্ধে রয়েছে একটি বাচ্চাদের নাটক। আমাদের মতন যাদের মাঝে মাঝে মঞ্চে উঠতে হয় এবং বক্তৃতার নামে কিছু এলোমেলো কথা বললেই চলে, তারা এই ধরনের অনুষ্ঠানের প্রথম অংশ শেষ হলেই নানান ছুতো দেখিয়ে সরে পড়ে। আমিও। তবু কেন আমি সে দিনের ‘সায়ক’-এর অনুষ্ঠানে রয়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত?
বয়েস হয়েছে তো, এখন ছোটদের সংস্পর্শ বেশি ভাল লাগে। হয়তো মানুষ ওই সব শিশুর মধ্যে নিজের শৈশব খোঁজে। একটা ব্যাপার দেখা যায়, মানুষ তার ছেলেমেয়েদের প্রতি যতটা স্নেহ দিতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি স্নেহপ্রবণ হয় নাতিনাতনিদের প্রতি। ছেলেমেয়েদের তবু মাঝে মাঝে শাসন করতে হয়, নাতিনাতনিদের বেলায় সে প্রশ্ন সেই, শুধু আদর আর প্রশ্রয়।
আমাদের বাড়িতে কোনও শিশু নেই। কয়েক দিন আগে আমাদের ছেলে সপরিবার এসে ঝটিকা সফরের পর ফিরে চলে গেছে প্রবাসে, এখন আমাদের ফ্ল্যাট আগের চেয়ে তিন গুণ ফাঁকা। তাই বাৎসল্যরসের টানেই আমি বসে রইলাম দর্শক আসনে। এখন স্কুল ছুটির পর ছাত্রছাত্রীদের উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগে, এমনকি টিভি-র বিজ্ঞাপনে কোনও শিশুশিল্পী থাকলেই আগ্রহের সঙ্গে দেখি। খবরের কাগজে যখন জানা যায়, কোনও বাচ্চা ছেলে বা মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ চাইছে বদমাসরা, তখন ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে ওই বদমাসগুলোকে…ইচ্ছে তো হয় অনেক কিছুই, কিন্তু আমার আর সাধ্য কতখানি।
নাটক শুরু হওয়ার আগে একটা তথ্য জেনে আশ্চর্য হলাম, ‘সায়ক’-এর ছোটদের বিভাগে ছয় থেকে যোলো বছরের প্রায় চল্লিশটি ছেলেমেয়ে নাটকের ট্রেনিং নেয়। রুদ্রপ্রসাদদের নান্দীকার-এও এ রকম বিভাগ আছে অনেক দিন, অন্য বড় বড় নাটকের দলেও এ সব ব্যবস্থা আছে কি না জানি না। তার মানে কি এই যে, এখন অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের নাটক-অভিনয় শিক্ষা করার জন্য পাঠাচ্ছেন। আমাদের বাল্যকালে তো এটা অকল্পনীয় ছিল। বাবা-মায়েরা সন্তানদের শুধু বলতেন, পড়, পড়, ফার্স্ট-সেকেন্ড হ! উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের বড়জোর কিছুদিনের জন্য সাঁতারের ক্লাসে নিয়ে যাওয়া হত। কিন্তু নাটক শেখা? এর সঙ্গে কি জীবিকার যোগ আছে? নাট্যজগতে দু’-চার জনই বিখ্যাত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেও অনিশ্চয়তার ব্যাপার। আসলে এই সব ছেলেমেয়ে প্রায় সবাই জীবিকার জন্য অন্য পড়াশুনো চালিয়ে যাবে নিশ্চয়ই, তবে এই স্বল্পকালীন নাট্যশিক্ষাও অবশ্যই কাজে লেগে যাবে। বাকি জীবনে তাদের নাটকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, তারা শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে শিখবে, নাটকের পাত্রপাত্রীদের সমতুল্য অনেক চরিত্রেরও দেখা মিলবে।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। কোল ইন্ডিয়ার একটা অনুষ্ঠানে একবার গিয়েছিলাম মধ্যপ্রদেশে। খাতিরযত্নের অভাব নেই, ঠিকঠাক চলছে সবই। দ্বিতীয় দিনে শুনলাম, সেই সংস্থার সর্বোচ্চ পদাধিকারী একজন বাঙালি, তিনি আমাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারে আসবেন, অতি ব্যস্ত তিনি, সময় মাত্র পনেরো মিনিট, আমরা যারা আমন্ত্রিত, তারা যেন নির্দিষ্ট সময়ে এক জায়গায় বসে থাকি। যথা সময়ে তিনি এলেন, অত বড় অফিসাররা বাঙালি না পাঞ্জাবি, তাতে কিছু আসে যায় না, তাঁদের মুখে লেগে থাকে নকল গাম্ভীর্য, কথা বলেন একটু ভুরু তুলে, এবং আর সবাই যেন তাঁর অধস্তন কর্মচারী। এই ধরনের বড় অফিসারদের সামনে পাঁচ মিনিটের বেশি বসে থাকতে আমার চুলকুনি হয়, সিগারেট টানার অছিলায় উঠে যাচ্ছিলাম, একজন ফিসফিস করে আমার কানে কানে বললেন, জানেন তো, ইনি এক সময় বহুরূপীতে অভিনয় করতেন। তা শুনে আমার কৌতুহল হল, আমি ফিরে গিয়ে সব প্রোটোকল ভেঙে তাঁর সামনে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ মশাই, আপনি নাকি এক সময় বাংলা নাটকে অভিনয় করতেন? সে সব কোনও নাটকের কথা মনে আছে?
তিনি তক্ষুনি কোনও উত্তর না দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক-দেড় মিনিট। তাঁর মুখ থেকে মিলিয়ে যেতে লাগল নকল-কঠোর ভাব, তিনি টাই খুলে ফেললেন, তারপর চমৎকার উদাত্ত গলায় উচ্চারণ করতে লাগলেন বিসর্জন নাটকে জয়সিংহের সংলাপ। তখন আর তাঁকে শুধু অফিসার নয়, একজন সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে হতে লাগল।
‘সায়ক’-এর এই কিশোর-নাট্যটির নাম মানিকচাঁদ। সুপরিচিত নাট্যকার চন্দন সেন এটা লিখে দিয়েছেন। ঠিক রূপকথা নয়, আবার বাস্তব কাহিনিও নয়, দুইয়ের সংমিশ্রণ বলা যায়। অভিনেতাদের মধ্যে একজনও অভিজ্ঞ, বয়স্ক নেই, সবাই শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছনো। মেঘনাদ ভট্টাচার্য কী দারুণ যত্নে এদের শিখিয়েছেন, কেউ একটুও ভুলভাল করল না, বরং যথাযথ আবেগ ফুটিয়ে তুলল। আমি আশা করছিলাম, কেউ একজন পার্ট ভুলে গিয়ে আমাদের আরও আনন্দ দেবে। না, তা হল না, এরা সবাই যেন বাচ্চা প্রফেশনাল! এদের নাচ ও গান শিখিয়েছেন কবীর সেন বরাট আর শুভেন্দু মাইতি, এ সব নাটক নাচগান ছাড়া জমে না।
প্রথম বার একটা নাটক দেখতে দেখতে মনে হয়, সব চরিত্রের অভিনেতারাই একেবারে মানানসই। ঠিক যেন খুঁজে খুঁজে জোগাড় করে আনা হয়েছে। বড়দের নাটকে এ রকম হয় না, তখন তো বেশ কয়েকজন চেনাই থাকে, আর তাই আমরা মনে করি, এই এই ভূমিকায় এই এই অভিনেতা মঞ্চে এসেছেন। কয়েক বছর আগে রমাপ্রসাদ বণিকের ‘একলা পাগল’ নামে অসাধারণ নাটকটি একটি স্কুলের ছেলেমেয়েদের দিয়ে অভিনয় উপস্থাপনা দেখেছিলাম। সেখানে একটি পাঞ্জাবি চরিত্রের মেয়েটিকে মনে হয়েছিল অবশ্যই পাঞ্জাবি, কিছু কিছু বাংলা কথা শিখেছে। পরে দেখি, সে এক লাজুক বাঙালি মেয়ে। এ সবই পরিচালকের কৃতিত্ব।
এই নাটকেও শিহরন জাগানো অনেক মুহূর্ত আছে। মূল চরিত্র মানিকচাঁদের ভূমিকায় যে ছেলেটি অভিনয় করছে, তার বর্ণনায় আছে, তার মাথাভর্তি সোনালি চুল, আর গায়ের রং খুব ফর্সা। সোনালি চুলটা কোনও সমস্যা নয়, কিন্তু বেশি পাউডার ঘষেও সত্যিকারের ফর্সা হওয়া যায় না। এই মানিকচাঁদ সত্যি সত্যি খুব ফর্সা, কী সুন্দর, সরল তেজের সঙ্গে সে অভিনয় করে গেল, দেখতে দেখতে আর সময়জ্ঞান রইল না আমার। কী অপূর্ব সুন্দর কাটল যে এই সন্ধেটা।
নাটকটা শেষ হতেই একটি যুবতী আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, সুনীলকাকা, আমায় চিনতে পারছ না?
আমি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই সে বলল, আমি মতি নন্দীর ছোট মেয়ে, আমার ছেলে আজ অভিনয় করেছে।
মতি নন্দীর তিন মেয়েই খুব ফর্সা, ওদের মায়ের মতন, ওদের ছেলেমেয়েরাও সে রকমই হবে।
কোন ভূমিকায় অভিনয় করেছে তোমার ছেলে?
ওই যে, নায়ক, মানিকচাঁদ।
মতি নন্দী আমার বিশিষ্ট বন্ধু ছিল, তার নাতি তো আমারও নাতির মতন। তার প্রতি আমার কিছুটা পক্ষপাতিত্ব তো থাকতেই পারে। কিন্তু তার পরিচয় না জেনেই তো আমি আগেই মানিকচাঁদের ভূমিকায় দীপচাঁদকে ফার্স্ট করে দিয়েছি।
অমুক ওয়েডস ওমুক
এখন যাকে বলে বিয়ের সিজন। পাড়ায় পাড়ায় সুসজ্জিত বিয়েবাড়িগুলোর বাইরে ফুলের অক্ষরে লেখা থাকে ‘সঞ্জয় ওয়েডস বনলতা’, ‘বিমান ওয়েডস নয়না’ ইত্যাদি। দেখলেই বিরক্তিতে আমার নাক কুঁচকে যায়। না, ইংরিজি ভাষার জন্য নয়, যার যা ইচ্ছে তা তো লিখতেই পারে, আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক নির্বুদ্ধিতার এই উদাহরণ এ যুগেও দেখলে আমারও নাক কুঁচকোবার অধিকার থাকবেই। আজও শুধু ছেলেরাই বিয়ে করে। আর মেয়েদের বিয়ে হয়! তাদের সমান অধিকার নেই।
এরই মধ্যে এক বিয়েবাড়ির বাইরে লেখা ‘সুরেলা-রাহুলের শুভ বিবাহ’, তা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।
১৪. ১২. ২০১১
সবচেয়ে দীর্ঘ এক মিনিট, তার চিন্তা
এখন নানা কারণেই মাঝে মাঝে শোকপ্রস্তাব নিতে হয়। একজন কেউ এক মিনিট নীরবতা পালনের প্রস্তাব করেন, সবাই উঠে দাঁড়ায়, সামনের দিকে হাত, দৃষ্টি মাটির দিকে। পৃথিবীতে এ রকম লম্বা এক মিনিট আছে কি না সন্দেহ। অনেকেই আড় চোখে বার বার ঘড়ি দেখে নেয়।
এই এক মিনিটে মানুষ কী ভাবে? ঘোষণা করা হয় যে সদ্য মৃত একজন বা কয়েক জনের পরলোকগত আত্মার শান্তির উদ্দেশে…আমার মুশকিল হচ্ছে, আমি তো পরলোকে বিশ্বাস করি না। পরজন্ম বলে কিছু নেই। স্বর্গ-টর্গ সবই সুমধুর কল্পনা মাত্র। এই পৃথিবীতে শেষ নিশ্বাস ফেলা মানেই চরম শেষ, সে আর কোথাও নেই। আত্মার অস্তিত্বেও আমি বিশ্বাস হারিয়েছি অনেক কাল আগে। আত্মাও মুনি-ঋষি, দার্শনিকদের মনগড়া একটা ব্যাপার, মৃত্যুর পর মানুষের শরীর থেকে কিছুই বেরিয়ে যায় না। ঈশ্বরের অস্তিত্বও স্বীকার করার কোনও কারণ নেই, বিগ ব্যাং ঘটেছে প্রাকৃতিক কারণে, তার আগে সময়েরও অস্তিত্ব ছিল না, সময়ও ছিল না? কী সাঙঘাতিক কথা!
অনেকের হৃদয়ে ভক্তি ও বিশ্বাসে একজন ঈশ্বর আছেন, যিনি শুধুমাত্র এই ছোটখাটো পৃথিবীটা চালান, যিনি পেটের অসুখ সারিয়ে দেন, পরীক্ষায় পাশ করান, যাঁর নামে কান্নাকাটি করে বহু মানুষ বিপদে বা দুঃখের দিনে সান্ত্বনা পায়। এই ঈশ্বরের অধীনে একটা চমৎকার স্বর্গ আছে, নরকও আছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সব ধর্মেই তো আলাদা আলাদা ঈশ্বর, অথচ ধর্মগুলি একেশ্বরবাদী। সেই একাধিক ঈশ্বর স্বর্গে বসে নিজেদের মধ্যে কখনও বিবাদ করেন কি না জানি না, তবে পৃথিবীতে তাঁদের ভক্তরা বীভৎস হানাহানি করেছে বহুবার। এখন মহাকাশের মানচিত্র যতটা পাওয়া গেছে, তাতে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে আলাদা করে রাখার কোনও উপায় নেই। পৃথিবীটা একটা অতি সামান্য গ্রহ, সূর্যও নিতান্তই এক ছোটখাটো নক্ষত্র, আরও কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে এই মহাবিশ্বে, তাদের মধ্যে বড়সড় যে-কোনও একটিই একশোটা পৃথিবীর সমান, একই জন্মলগ্নের পর এরা ছুটছে আবার পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সে ছবি দেখলে খানিকটা আতঙ্কই হয়, এত লক্ষ কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের জন্ম হল কেন, কী উদ্দেশ্যে? তারা কি ছুটে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে? মাঝে মাঝে রাক্ষসের মতন ব্ল্যাক হোল, যারা কাছাকাছি কোনও গ্রহ-তারকা পেলে কপাত করে গিলে ফেলে, এমনকী আলোর রশ্মিরও নিস্তার নেই। গ্রহ-নক্ষত্র ছাড়াও অনেক বড় বড় ঢেলা ঘুরে বেড়াচ্ছে মহাকাশে। তাদের কয়েকটা যদি ছুটে এসে আছড়ে পড়ে এই পৃথিবীতে, তা হলেই আমাদের লীলাখেলা শেষ, কোনও ঈশ্বরই আমাদের বাঁচাতে পারবেন না বোধহয়। একবার তো হয়েছিলও তা-ই, যখন পৃথিবীতে ডায়নোসরের মতো বিদঘুটে বড় আকারের প্রাণীরা রাজত্ব করত, এক ঝাঁক উল্কার আঘাতেই তারা সব শেষ। ডায়নোসরদের কোনও ঈশ্বর ছিলেন না সম্ভবত।
সভাপতি বললেন, এক মিনিট শেষ, আপনারা বসুন। এই এক মিনিটের মধ্যে আমি এত সব ভেবে ফেললাম?
কোনও কোনও শোকপ্রস্তাবের সময় দেখেছি, যিনি প্রস্তাবক, তিনি এক মিনিট নীরবতার কথা বললেও নিজেই অধৈর্য হয়ে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড হতেই ইঙ্গিত করেন যে, সময় পূর্ণ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, ওই সব শোক প্রস্তাবক পনেরো সেকেন্ড সময় চুরি করে নেন। যাঁরা শোকপ্রস্তাবে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাঁরা কি ওই সুদীর্ঘ ষাট সেকেন্ড শুধু মৃতদের আত্মার শান্তির কথাই ভাবেন, না কি এ সব নেহাতই এক বিলিত প্রথার অনুকরণ! আমার দৃঢ় ধারণা, ওই সময় অনেক সাহেবের মাথাতেও অনেক কুচিন্তা (অন্য যে-কোনও চিন্তাই কুচিন্তা) এসে যায়।
কলেজজীবন থেকেই আমি নাস্তিক। কী করে হলাম, তা জানি না। সম্ভবত ধর্মের নামে দাঙ্গা ও রক্তপাত দেখেই। সত্যি কথা বলতে কি, প্রত্যেকটা ধর্মই বেশ কিছুটা ভণ্ডামির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হিন্দুরা মূর্তি পুজো করে বলে খ্রিস্টানরা কত গালাগালি দিয়ে গেল, কিন্তু তারাও তো গির্জায় গিয়ে যিশু কিংবা মেরি-র মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালায়, অনেকে সেখানে প্রার্থনা করে, কাঁদে। মূর্তিপূজার সঙ্গে এর কী তফাত? ইসলাম অতি উচ্চাঙ্গের ধর্ম, সেখানে কোনও মূর্তি কিংবা ছবিরও স্থান নেই। খ্রিস্টধর্মে যেমন যিশু-মেরি ছাড়াও অনেক সন্তের মূর্তি গির্জাগুলিতে শোভা পায় (ক্যাথলিকদের কথাই বলছি, পৃথিবীতে এখনও তাদেরই সংখ্যাধিক্য), ইসলামে স্বয়ং পয়গম্বর ছাড়া আর কোনও সন্ত নেই। আল্লা নিরাকার। আমার মাথায় অনেক দিন ধরেই একটা প্রশ্ন ঘোরে, বিশ্বের কোটি কোটি ইসলামধর্মী প্রার্থনার সময় কি শুধু সেই নিরাকারের কথাই কল্পনা করে? তাই যদি হয়, তবে তার জন্য কী দারুণ চিত্তশুদ্ধি দরকার!
আমার এক শুভার্থী বন্ধু এক বার বলেছিল, তুই খামোখা নাস্তিক হতে গেলি কেন? প্রত্যেক ধর্মেই কত উৎসব হয়, তুই কোনও উৎসবের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারিস না। নাস্তিকরা নিঃসঙ্গ। যেহেতু এটা কোনও ধর্ম নয়, তাই এদের মিলিত হওয়ার কোনও জায়গাও নেই।
আমি তাকে বলেছি, কোনও ধর্ম কিংবা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হয়েও, এবং জ্ঞানত কারও কোনও ক্ষতি না করেও তো পৌনে একটা শতাব্দীরও কিছু বেশি বছর তো দিব্যি কাটিয়ে গেলাম এই পৃথিবীতে। কোনও অসুবিধে তো হল না। অবিশ্বাসীদেরও পূর্ণ জীবন কাটাবার অধিকার আছে। আর অবিশ্বাসী হলেও উৎসবে যোগ দিতে তো কোনও বাধা নেই। ক্রিসমাসের সময় কত হুল্লোড়ে যোগ দিয়েছি এক সময়, একবার মধ্যরাতের পর সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম, কী সুন্দর ভাবগম্ভীর দৃশ্য দেখেছি। আর ঈদের সময় মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে গেছি বিরিয়ানি আস্বাদের লোভে। সবাইকে ঈদ মুবারক বলেছি। হিন্দুদের অনেক ধর্মীয় উৎসবে এখন ধর্ম প্রায় বিলীন হয়ে উৎসবটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে নিজেকে মিশিয়ে দিতে কোনও বাধা নেই তো?
আমার কোনও ধর্মেই বিশ্বাস নেই বলে আমি অপর কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেওয়ার কথা চিন্তাও করি না। ধর্মের ধ্বজাধারীরা যখন পারস্পরিক হানাহানিতেমেতে ওঠে, শিশুদেরও বাদ দেয় না, তখন যে ধর্মেরই হোক, নিহত জননী ও শিশুদের জন্য বড় কষ্ট হয়, বড় কষ্ট হয়। কোনও ধর্মেই এ রকম নির্দেশ নেই, অতি তুচ্ছ কারণে কিংবা জেদের বশে জীবনের এ কী অপচয়!
নাস্তিকেরা নিঃসঙ্গ শুধু নয়, তাদের নিজস্ব তেমন কোনও সাহিত্য নেই, সংগীত নেই। রাশিয়া কিংবা চিনের কথা জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে ধর্ম ও ঈশ্বরবিশ্বাসীরা কত উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রচনা করেছেন, কত গান, সে সবই আমি উপভোগ করি। কোনও কোনও গান শুনতে শুনতে হঠাৎ আমার চোখে জল এসে যায়। তখন আমার স্ত্রী সকৌতুকে আমার দিকে তাকালে তাঁকে বলি, কান্নার মতন আনন্দের আর কী আছে, বলো!
অল্প বয়েসে মনে হত, পৃথিবীতে যদি একটা ধর্ম থাকত, যার নাম ভালবাসা, তা হলে তো এখানেই স্বর্গ রচিত হতে পারত। এখন মনে হয়, তা হলে ভালবাসার কতই না কদৰ্থ হত। যাক, ভালবাসা নিয়ে বেশি হই চই করার দরকার নেই। ভালবাসা যত নিভৃতে রাখা যায় ততই ভাল।
আমার বিজ্ঞান-জ্ঞান যৎসামান্য, তবে কৌতূহল অনন্ত। সহজ করে লেখা মহাকাশবিজ্ঞানের বইগুলি আগ্রহের সঙ্গে পড়ি। একটা মজার ব্যাপার এই যে, ইদানীং অনেক বিজ্ঞানীর বইয়ের নামেই ‘গড’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়। তাতে নাকি পাঠকদের কৌতূহল চাঙ্গা হয়, বই ভাল বিকোয়। আমার হাতের কাছেই দু’টি বই রয়েছে, রিচার্ড ডকিনস-এর ‘দ্য গড ডিলিউশন’ আর পল ডেভিস-এর ‘গড অ্যান্ড দ্য নিউ ফিজিক্স’। এমনকী হিক্স বোসন নামে অঙ্ক থেকে জাত যে কণিকাটির বাস্তব অস্তিত্ব আছে কি নেই, তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে, যেন মজা করেই তার নাম দেওয়া হয়েছে পার্টিকল!
অনেক কাল আগে ব্রেখটের একটি ছোট কবিতা পড়েছিলাম। এটা একবার পড়লে মুখস্থ হয়ে যায়— জানুয়ারি টেন/সিক্সটিন টেন/গালিলেয়ো গালিলি/ অ্যাবলিশেষ হেভেন!
২৮. ১২. ২০১১
নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?
মানুষটি এমনই সুপুরষ গৌরবর্ণ, সুগঠিত শরীর, মাথাভর্তি সোনালি চুল, স্বপ্নময় চক্ষু দুটি মাঝে মাঝে ঝকমক করে ওঠে, এই মানুষটিকে অপ্সরারা যখন তখন ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, তাঁর স্ত্রী হেমবতীর পাহারাদারিতেই সেটা সম্ভব হয়নি।
কে ওই রূপবান পুরুষ?
নাম বললে অধিকাংশ বাঙালিই চিনতে পারবেন না। কিংবা বলা যায়, খুব অল্পসংখ্যক বাঙালি যাঁরা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা-টবেষণা করেন, তাঁরা চিনবেন। এঁর নাম কুয়েমপু, কর্নাটকের এক অত্যন্ত বিখ্যাত কবি। গড়পড়তা বাঙালি পাঠক এঁকে চিনবেন কী করে, তাঁরা তো ভারতের অন্যান্য ভাষায় কী লেখা হচ্ছে, তা জানতেও চান না। অনুবাদে তাঁরা ফরাসি, জার্মান, রুশ সাহিত্য পাঠ করেন। কিন্তু কোনও আগ্রহ নেই অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সাহিত্যে।
না না, আমি পাঠকদের মোটেই বকাবকি করার জন্য এ লেখা শুরু করিনি। বাঙালি পাঠকদের যে মরাঠি, গুজরাতি বা তামিল সাহিত্য পড়তেই হবে, এ রকম মাথার দিব্যি কে দিয়েছে! পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই নির্বাচন করার ব্যাপারে প্রত্যেক পাঠকই স্বাধীন। তাঁরা উচ্চাঙ্গ সাহিত্য কিংবা বাজার-চলতি কুসাহিত্য, যা খুশি পড়তে পারেন, তা ছাড়া, অতগুলি ভারতীয় ভাষার কোন কোনটা তাঁরা পড়বেন? না, সম্ভব নয়। তবে, হঠাৎ অন্য ভাষার এক জন বড় কবি সম্পর্কে কিছুটা জেনে ফেললেও ক্ষতি নেই।
কুয়েমপু ছদ্মনামেই লিখেছেন। ইংরেজি বানানে Kuvempu, তবে তাঁর ভক্তদের মুখে শুনেছি, মাঝখানের ভি উচ্চারিত হয় না। ইনি কর্নাটকে কন্নড় ভাষায় একজন মহাকবি হিসাবে গণ্য। যদিও ওই ভাষায় আরও অনেক বড় বড় কবি আছেন। তবু কুয়েমপুর প্রসঙ্গ তোলার উপলক্ষ এই যে, বাংলার সঙ্গে তাঁর বেশ সম্পর্ক ছিল।
প্রথম কথা, ইনি আগাগোড়া রবীন্দ্রভক্ত। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করেন। শান্তিনিকেতনের আদর্শে তিনি তাঁর গ্রামের বসতবাড়িটাও একটা আশ্রমের মতন করে বানিয়ে ফেলেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই কবির প্রধান অমিল, রবীন্দ্রনাথ যেমন বিশ্বের বহু দেশে ঘুরেছেন অক্লান্ত ভাবে, কর্নাটকের এই কবি একেবারেই ভ্রমণবিলাসী ছিলেন না। বরং ঘরকুনোই বলা যায়। লেখাপড়া শিখেছেন মহীশূর কলেজে। তারপর সেই কলেজেই চাকরি। ক্রমশ বিভাগীয় প্রধান এবং শেষ পর্যন্ত উপাচার্য। বাড়ি আর কলেজ, এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাঁর জীবন। কর্নাটকই তাঁর স্বর্গ। বন্ধুবান্ধবরা ঠেলেঠুলেও তাঁকে বাইরে পাঠাতে পারেন না। তিনি যে বার জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন, সে বারও দিল্লি যেতে চাননি। তবে ১৯২৯ সালে কুয়েমপু কলকাতায় আসেন স্বামী সিদ্ধেশ্বরানন্দের অনুগামী হয়ে।
সে বারে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়েছিল কি না, তার কোনও বিবরণ পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ তখন দেশে ছিলেন কি না, তাই বা কে জানে। কুয়েমপু অবশ্য এসেছিলেন অন্য একটি উদ্দেশ্যে। তিনি বেলুড় এবং দক্ষিণেশ্বরে যান এবং তখনকার রামকৃষ্ণ মিশনের সভাপতি স্বামী শিবানন্দের কাছে দীক্ষা নেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আজীবন।
তিনি পুরস্কার এবং সম্মান পেয়েছেন অজস্র। তার মধ্যে আছে জ্ঞানপীঠ ও ভারতরত্ন। তিনি লিখেছেনও প্রচুর। কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশু সাহিত্য এবং দুটি জীবনীগ্রন্থ: স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা: ‘রামায়ণ দর্শন’। সেই বিপুলাকার গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে বটে, কিন্তু আমার তা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। তবে, ওই বইটি সম্পর্কে আলোচনায় একটা মজার ঘটনা জানলাম। সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতন তিনি রামকেও অগ্নিপরীক্ষা করিয়েছেন।
একজন লেখক সম্পর্কে শুধু আলোচনা পড়ে ফেলা ঠিক নয়, তাঁর রচনার কিঞ্চিৎ স্বাদও পাওয়া উচিত। তাঁর বহু লেখাই ইংরেজিতে অনূদিত। আমি এয়ারপোর্টে বসে তাঁর একটি ছোট কবিতার দ্রুত অনুবাদ করে দিচ্ছি:
একটি রাস্তা— খুব সাধারণ
যখন সন্ধে এসে আকাশকে রঙে ছেয়ে দেয়
(মরুভূমি যেমন উপহার দেয় মরূদ্যান)
দেখুন এই সাধারণ রাস্তাটাকে
সোজা চলে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে।
অন্য সময় এই রাস্তাটা
নোংরা, ছাইভস্মে ঢাকা
দুদিকেই সারি সারি টেলিগ্রাফের পোল
যেন একটা কুৎসিত মুখে গর্বের চিহ্ন।
কয়েকটা ইতস্তত বাড়ি, অতি সাধারণ
কোথাও কোনও সুন্দরের চিহ্ন নেই
রাস্তাটা উঁচু হয়ে গেছে পশ্চিম দিকে
তাও পরিকল্পনাহীন, এলোমেলো
কিন্তু যেই সন্ধে নেমে আসে
(একটা বেড়াল হয়ে যায় বাঘ)
দেখো, দেখো, এই অতি সাধারণ রাস্তাটা
চলে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে।
বিমানবন্দরে অলস চিন্তা
কর্নাটকের মানুষ তাদের ভাষাকে খুব ভালবাসে৷ রাজ্য পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রে কন্নড় ভাষার প্রয়োগ হয়। বেঙ্গালুরুর অতি আধুনিক, অতি সুদৃশ্য বিমানবন্দরে বসে কফি খেতে খেতে দেখতে পাচ্ছি, সমস্ত লিখিত নির্দেশিকাতেই ইংরেজি হিন্দির সঙ্গে কন্নড় ভাষাও স্থান করে নিয়েছে।
বাইরে অলস ভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল। আমাদের কলকাতায় তো খুব শিগগিরই সম্পূর্ণ আধুনিক এবং বেশ বড় আকারের বিমানবন্দরের উদ্বোধন হবে। সেখানে কি একটাও বাংলা অক্ষর থাকবে?
সন্দেহ হচ্ছে কেন? মনে কেন কুডাক ডাকছে!
কাউকে তো দাবি জানাতে হবে। সবাই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার অপব্যবহার দেখি, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। তাই আমি আবার এই প্রশ্ন তুলছি:
কলকাতার নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?
২৫. ১. ২০১২
ব্রিজের নীচে, সময় ওদের ছোঁয় না
জীবনের এতগুলি বছর কেটে গেল, এখন মাঝে মাঝেই মনে হয়, কিছু কিছু ব্যাপার চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলেছি। জীবনে আর সে সব ফিরে আসবে না।
যেমন, দুর্গা, দুর্গা।
বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারেই ছেলেমেয়েদের স্কুল ও কলেজ জীবনের মধ্যে একটা স্পষ্ট ভাগ থাকে। যেন দুটো আলাদা মানুষের জীবন। অনেক সময়ই দেখা যায়, শৈশব-কৈশোরে যে লাজুক ও মুখচোরা, পরবর্তী জীবনে সেই-ই হয়ে ওঠে, বিখ্যাত জননেতা এবং সুবক্তা। আসল কথা হল, স্কুল বয়সটার অনেকখানিই থাকে নিজের পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ (কল্পনায় অবশ্য দুর্গম গিরি থেকে কান্তার মরু সবই ঘুরে আসা যেতে পারে) আর কলেজ জীবনে পাওয়া যায় বাইরের বাস্তব পৃথিবী। একা বাড়ি থেকে বেরোবার স্বাধীনতা। সেটাই অনেকখানি।
আমি যখন একখানা মাত্র খাতা হাতে নিয়ে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে যেতে শুরু করি, হাফ প্যান্টের বদলে ট্রাউজার্স, শার্টের কয়েকটা বোতাম খোলা, তখন মা প্রায় প্রতিদিনই আমার সঙ্গে সঙ্গে আসতেন সদর দরজা পর্যন্ত। দু’বার দুর্গা দুর্গা বলে একটা হাত রাখতেন আমার পিঠে কিংবা বাহুতে। তখন ব্যাপারটার কোনও গুরুত্বই ছিল না আমার কাছে। মনে হত মায়ের আদিখ্যেতা। আমি তো সে বয়সে ইচ্ছে করে চলন্ত বাসে লাফিয়ে উঠি। এক একদিন কলেজ যাওয়ার নাম করে অন্য কোথাও চলে যাই।
দুর্গা এখনও আছেন। কিন্তু মায়ের সেই উৎকণ্ঠা, প্রার্থনা, স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠস্বর আর কখনও শুনতে পাব না। আর পিঠে কিংবা বাহুতে আলতো করে হাত রাখা।
এখনকার ছেলেমেয়েরা যখন প্রথম প্রথম একা বাড়ির বাইরে যেতে শুরু করে, তখন কী বলে তাদের মা? কিংবা কিছুই বলে না?
অবশ্য এখনকার ছেলেমেয়েরা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি সপ্রতিভ।
কিছু কিছু মাছও নাকি হারিয়ে যাচ্ছে চিরকালের মতো। বন্ধুদের মুখে প্রায়ই শুনি খলসে মাছের কথা। আজকাল আর দেখাই পাওয়া যায় না। খলসে মাছ কোনও দিনই খাদ্য হিসাবে আমার প্রিয় ছিল না। কাঁটাগুলো বড্ড ধারালো। খাওয়ার চেয়েও দেখার পক্ষে বেশি ভাল। জলের মধ্যে থাকার সময় নানা রঙের ঝিলিক দেয়, তখন মনে হয় অ্যাকোরিয়ামে পোষা মাছ হিসেবেই খলসেকে বেশি মানায়। হঠাৎ এই মাছটা অদৃশ্য হয়ে গেল কেন?
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে কই মাছের কথা। কই মাছ খলসে মাছের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আগে কথায় বলা হত, কই-খলসে। শহরের চেনাশোনা লোকেরা বিশ্বাসই করতে চায় না যে কই মাছ মাঝে মাঝে ডাঙায় হেঁটে বেড়ায়। খালি হাতেই ধরা যায়, আমি নিজেই রাস্তা থেকে কই মাছ ধরেছি, দু’বার। যখন খুব মেঘ ডাকে, বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে, তখন পুকুরের কই মাছ জল থেকে উঠে আসে ডাঙায়। কানকোতে ভর দিয়ে কোথায় যেন যেতে চায়। যাঁরা কখনও গ্রামে যাননি, তাঁরা এই কথা শুনে প্রবল অবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, ধ্যাৎ বাজে কথা। মেঘের গর্জনে আর কোনও মাছের কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না, শুধু কই মাছ কেন উঠে আসবে জল থেকে? সত্যি কথা বলতে কী, এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। তবে স্বচক্ষে এই ব্যাপারটা আমি দেখেছি। আশা করি, গ্রামে-গঞ্জে কই মাছ এখনও তাদের এই স্বভাবটা বজায় রেখেছে।
সময় দেখার জন্য একটা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই মনে পড়ল, পেন্ডুলাম দেওয়া ঘড়িও হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো। আগে দেওয়াল ঘড়ি মানেই পেন্ডুলামের টক টক শব্দ। এই শব্দটার মজা এই যে, যখন একলা বসে কোনও কিছু চিন্তা করছি, তখন শোনা যেত বেশ প্রকট ভাবে। আর যখন একসঙ্গে কয়েক জন মিলে গল্পগুজব করছি, তখনও শব্দটা চলছে ঠিকই, কিন্তু শোনা যায় না। এক কালের কত কবিতায়-গল্পে এই টক টক আওয়াজের উল্লেখ থাকত। সময় যে এগিয়ে চলেছে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। যে সময় ধনী-নির্ধন কারওকে গ্রাহ্য করে না। এখন আর পেন্ডুলাম নেই। শব্দও নেই, সময় বয়ে যায় নিঃশব্দে।
এ সবই বলা যায়, অলস জল্পনা। এ রকম কিছু কিছু পরিবর্তন তো হবেই। তাতে জীবনের কী আসে যায়।
উল্টোডাঙার এই ব্রিজটার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেক বারই তলার দিকে আমার চোখ চলে যায়। সেখানে অনেকখানি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো জায়গা। সেখানে একটা পরিবার থাকে। তা তো থাকতেই পারে। ওপরে আচ্ছাদন আছে। কিন্তু মজার কথা এই যে, বহু বছর ধরে আমি একই পরিবারকে দেখছি ওখানে। রুখু দাড়িওয়ালা একজন মাঝবয়সি স্বামী। তার চ্যাপ্টা চেহারার স্ত্রী। নানা বয়সের গোটা তিনেক ছেলেমেয়ে। এদের বয়স বাড়ে না। এরা কাগজ কুড়োয় না ভিক্ষে করে, কিংবা ছিঁচকে চুরিতে হাত পাকায় তা আমি জানি না। দুপুরের দিকে এলে দেখতে পাই, ইটের উনুনে, মাটির হাঁড়িতে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। এক এক বার আমার ইচ্ছে হয়েছে, ওদের পাশে বসে ওই খিচুড়ির স্বাদ নিতে। তবে এ রকম অনেক ইচ্ছেই তো হয় আমাদের। সত্যি সত্যি যাওয়া হয়ে ওঠে না।
ব্রিজের বাঁ পাশে একটা পরিত্যক্ত তেল কল পড়েছিল অনেক দিন। বেশ গাছ টাছ গজিয়ে গেছে। এ বারেই দেখলাম সেখানে একটা বহুতল বাড়ি উঠছে, পাঁচ ছ’তলার কনস্ট্রাকশনও হয়ে গেছে। আর ব্রিজের নীচে সেই একই পরিবার রয়ে গেছে বহু বছর ধরে। সময় ওদের ছোঁয় না।
আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী
অসমিয়াভাষীদের মধ্যে ভট্টাচার্য অনেক আছেন, তাঁরা কিন্তু বাঙালি নন। যেমন দাস কিংবা দত্ত। অসমিয়াভাষীদের মধ্যে ধীরেন ভট্টাচার্য ছিলেন প্রখ্যাত লেখক এবং সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি। হীরেন ভট্টাচার্যও সেই ভাষার প্রধান কবি হিসেবে গণ্য। হীরেন ভট্টাচার্যের মাতৃভাষা অসমিয়া। তিনি বাংলাও বেশ ভাল জানেন। তিনি সম্প্রতি একটা কাজ করেছেন, সেটা একটা চমৎকার ব্যতিক্রম। তিনি নিজের কিছু কবিতা নিজেই অনুবাদ করেছেন বাংলায়। বইও প্রকাশিত হয়েছে ‘শিশির থেকে পাতা অব্দি’। এমন সাবলীল অনুবাদ আমি খুব কমই পড়েছি। যেমন:
আস্তে আস্তে চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো
বাতাসে এক এক করে ঝরে পড়ছে গানের পাপড়ি,
গান আমার প্রিয় পৃথিবীর সুরেলা উপহার।
আজ হঠাৎ অতিথি হয়ে আসা এক টুকরো মেঘ
অলীক হাতে ঢেকে ধরেছে তারা— বোঝা এক বুক-আকাশ
বাঘের চোখের মতো তারাগুলো…
৮. ২. ২০১২
আমি বলতে গেলে গ্রন্থাগারেরই সন্তান
বরানগরের মিলনী নামে একটি পাঠাগারের আজ বিশেষ আনন্দের দিন। তাদের নিজস্ব ভবনের একতলার ওপরে দোতলায় একটি ঘর খোলা হয়েছে, তার উদ্বোধন হবে। ষাট-সত্তর বছর আগে এই পল্লির কয়েকজন আদর্শবাদী মানুষ প্রচুর যত্ন ও পরিশ্রমে যে গ্রন্থাগারটি চালু করেছিলেন, (প্রথম দিকে স্থানাভাবে কারও গ্যারেজে) তাঁরা আজ আর কেউ ইহলোকে নেই, কিন্তু গ্রন্থাগারটি বেঁচে আছে। পরবর্তী প্রজন্মের আরও কয়েকজন সেই আদর্শ ও দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে ভাগ করে নিয়েছেন এবং গ্রন্থাগারটি সচল রেখেছেন। এখন নিজস্ব দোতলা ভবন তো সমৃদ্ধিরই দিকে।
সত্যিই কি তাই?
শুধু বরানগর কেন, টালিগঞ্জ কিংবা বেলেঘাটায়, ডায়মন্ড হারবার কিংবা ব্যারাকপুরে, অথবা আরও দূরে অনেক মফস্সল শহরে, এমনকী কোনও কোনও গ্রামেও ছড়িয়ে আছে এ রকম বেসরকারি ছোট-বড় গ্রন্থাগার। স্বাধীনতার ঠিক আগে বা পরে বাঙালিদের মধ্যে গ্রন্থাগার-আন্দোলনের প্রতি একটা ঝোঁক দেখা যায়। তখন কোনও রকম সরকারি সাহায্যের সম্ভাবনা ছিল না, কিছু কিছু মানুষ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভাবে নিজেদের পাড়ায় পাড়ায় এ-রকম লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন, তাদের কোনওটি এখন সুবর্ণজয়ন্তী কিংবা হীরকজয়ন্তী পালন করছে, তা আমরা জানি। তবে সে রকম কিছু লাইব্রেরির মৃত্যু ঘটেছে কিংবা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কি না তা আমরা জানি না, সে রকম কোনও পরিসংখ্যান আছে কি?
আমি বলতে গেলে গ্রন্থাগারেরই সন্তান।
শৈশবে-কৈশোরেই বই পড়ার তীব্র নেশা জন্মেছিল, কিন্তু নতুন বই পাব কোথায়? সুতরাং পাড়ার লাইব্রেরিই ভরসা। (কিছু কিছু বই চুরিও করেছি অবশ্য। কোনও নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলেই আমি ইঁদুরের মতন এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াতাম, কোথাও কোনও বই পড়ে থাকতে দেখলেই চট করে তুলে জামার তলায় পেটে গুঁজে নিতাম। কোনও দিন ধরা পড়িনি অবশ্য। তবে দু’-একবার এমন অবস্থা হয়েছে, যা নিয়ে অনায়াসেই হাসির গল্প লেখা যায়। কোন কোন বাড়ি থেকে আমি কী কী বিখ্যাত বই হাপিশ করেছি, তার কিছু কিছু এখনও আমার মনে আছে, কিন্তু এত কাল পরে তার স্বীকারোক্তি দেওয়ারও কোনও মানে হয় না)।
আমাদের শৈশবে শিশুসাহিত্য খুব বেশি ছিল না, তাই একখানা বই-ই পড়তাম তিন-চার বার। তার পর খিদের জ্বালায় উইপোকার মতন বড়দের বইও খেতে শুরু করলাম। আমার মায়ের ছিল বই পড়ার প্রচণ্ড নেশা, পাড়ার লাইব্রেরির মেম্বার, কিন্তু নিজে তো যেতেন না, তাঁর হয়ে বই আনার দায়িত্ব ছিল আমার। মা রান্না করতে বসেও বই পড়তেন, কোনও দিন অবশ্য কোনও রান্নায় নুন বেশি বা কম হয়নি। মা যখন একখানা বই পড়তেন, সেই সময় অন্য বইটি কৌশল করে আমি পড়ে নিতাম। তখন অনেক লোক বলত, এখনও কেউ কেউ বলে যে, ছোটরা বড়দের বই পড়লে চরিত্র খারাপ হয়ে যায়, কিংবা বখে যায়। এই সব কথার জ্বলন্ত প্রতিবাদ আমি নিজে। গোঁফ গজাবার আগেই আমি শত শত গল্পের বই, তার মধ্যে ‘চিতা বহ্নিমান’ কিংবা ‘অথৈ জলে’র মতন বইও ছিল, কিন্তু তার জন্য আমার চরিত্র খারাপ কিংবা বখে যাবার মতন কিছুই হয়নি। আমার আর যত দোষই থাক, এ রকম কোনও অভিযোগ কখনও শুনিনি।
পাড়ার লাইব্রেরিটি ছোট থেকে ক্রমশ বড় হচ্ছিল, কয়েকজন পাড়ার মানুষের নিষ্ঠায়। তাঁদের মধ্যে একজন মানুষের কথা আমার বিশেষ ভাবে মনে আছে। পুরো নাম জানি না, সবাই ডাকত, মিত্তিরদা, ছোট্টখাট্টো চেহারার ছটফটে মানুষটি। আমি যে-দিনই যেতাম, তাঁকে দেখেছি। উপস্থিত প্রত্যেকের সঙ্গে ডেকে-ডেকে বাড়ির খবর নিতেন। শুনেছি, তিনি রোজ বিকেলে তালা খোলার সময় থেকে রাত ন’টায় তালা বন্ধ করা পর্যন্ত নিজে থাকতেন। কোনও সদস্য বই নিয়ে আট-দশ দিনের মধ্যে ফেরত না দিলে সোজা চলে যেতেন তার বাড়ি। তিনি কিন্তু লাইব্রেরিয়ান ছিলেন না, কোনও বিশেষ বিভাগের ভার ছিল না তাঁর ওপর, বরং অভিভাবকের মতন। কোনও হঠাৎ ছুটি উপলক্ষে লাইব্রেরি বন্ধ রাখার প্রস্তাব করলে তিনি প্রতিবাদ জানাতেন। পরবর্তী কালে আমি ভেবেছি, ওঁর নিজের বাড়ি-ঘর, সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, তবু প্রতিদিন সন্ধেটা যে ব্যয় করতেন লাইব্রেরিতে এসে, তা কীসের টানে? এর উত্তর পাওয়া সহজ নয়।
এই মিত্তিরদার মতন অন্যান্য পাড়ার লাইব্রেরিতেও এরকম নিষ্ঠাবান এক-এক জন মানুষ থাকতেন, যাঁদের জন্য লাইব্রেরি বেঁচে থেকেছে। শুধু বাঁচা নয়, গ্রন্থাগারের আয়তন বেড়েছে, পাকা বাড়ি হয়েছে এখন। তবু সত্যিকারের উন্নতি হয়েছে কি?
অনেক জায়গাতেই শুনতে পাই, বইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, টাকা পয়সার সমস্যাও অনেকটা মিটেছে, সরকারি সাহায্যও পাওয়া যায়, কিন্তু কমে যাচ্ছে সদস্য-সংখ্যা। অনেক লাইব্রেরিতে এখন ভিড় নেই, দুপুর-বিকেল খাঁ-খাঁ করে, সন্ধেবেলাতেও লাইব্রেরিতে যাওয়ার চেয়ে বাড়িতে টিভি দেখার আকর্ষণ বেশি। ছোট ছোট লাইব্রেরিতে যদি এই অবস্থা হয়, তা হলে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেও কি কমে যাচ্ছে পাঠকের সংখ্যা?
ওই মিত্তিরদার কাছে আমি একদিন ধমক খেয়েছিলাম। মায়ের জন্য রোজ দু’টি উপন্যাস নিয়ে যাবার কথা, একদিন তার মধ্যে ‘শেষের কবিতা’ নামে একটি বই দেখে আমি বলেছিলাম, না না, কবিতার বই চাই না, কবিতার বই চলবে না। সে কথা শুনে মিত্তিরদা বলেছিলেন, রবি ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’র যে নাম শোনেনি, তার কান ধরে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। কান ধর, কান ধর।
তিনি আমাকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিয়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। ক্লাস সিক্সের ছেলের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের ওই উপন্যাস সম্পর্কে না-জানা কি অমার্জনীয় অপরাধ?
বাড়ি ফিরেই ‘শেষের কবিতা’ খুলে বসি। আমার জীবনে সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের কোনও উপন্যাস পাঠ। ও রকম ধমক খাবার জন্যেই বোধহয় সেই পাঠের স্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে।
২২. ২. ২০১২
Chapter - 8
স্বপ্ন দেখা এবং আমার ভয়ে কেঁপে ওঠা
কেশবচন্দ্র সেনের মেয়ে সুনীতির সঙ্গে কোচবিহারের রাজকুমারের বিয়ে উপলক্ষে বাংলার সমাজে আর সাংস্কৃতিক জগতে যে প্রবল আলোড়ন চলেছিল, তা অনেকেই জানেন। কবে, বিয়ের রাতে এবং নববধূ হিসেবে রাজপ্রাসাদে গিয়ে সুনীতি কী অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট। শেষ জীবনে সুনীতিদেবী একটা আত্মজীবনী লিখেছিলেন ইংরেজিতে। তার থেকে অনেক তথ্য জানা যায়।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত ব্রাহ্ম ধর্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র কেশবচন্দ্র। শিক্ষিত, মুক্তচিন্তার অধিকারী এবং উদ্যমী পুরুষ। সেই সময় হিন্দু ধর্ম নানা রকম কুসংস্কার, কদাচার ও কুপ্রথায় জর্জরিত। রূপকার্থে বলা যায়, হিন্দুত্বের গা থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। সেই সময় ব্রাহ্মরা নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মরা যদিও বলতেন যে, তাঁদের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁরা নতুন এক ধর্মে দীক্ষিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হিন্দুধর্মেরই এক পরিচ্ছন্ন ও সুসংস্কৃত রূপ।
একেশ্বরবাদ কিন্তু হিন্দু ধর্মেও একেবারে অপরিচিত নয়। ব্রাহ্ম ধর্ম যদি প্রবল ভাবে প্রচারিত হত, সাধারণ মানুষকে সহজ ভাবে আকৃষ্ট করা যেত, তা হলে সেই সময়কার ইতিহাস অন্য রকম হত।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই নব্য ধর্ম হয়ে রইল ওপরতলার মানুষদের ব্যাপার, এলিটিস্ট। খ্রিস্টানরা তাদের গৃহভৃত্য কিংবা ক্রীতদাসদেরও নিজেদের ধর্মে টেনে আনত। মুসলমানরা, যে হেতু তাদের ধর্মে বর্ণভেদ নেই, অস্পৃশ্যতা নেই, তাই সমস্যাদীর্ণ হিন্দু সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষ শূদ্র এবং অন্যান্যরা বামুন কায়েতদের অত্যাচারে ও অপমানে অস্থির হয়ে দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। আর হিন্দু ধর্মে নতুন কাউকে আহ্বান তো নেই-ই, নিজেদের ধর্ম থেকে বহু মানুষকে ঠেলে বার করে দিয়েছে, সামান্যতম কারণে।
আরও দুঃখের কথা, নতুন ব্রাহ্ম ধার্মিকরা নিজেদের দৃঢ় ভাবে সংগঠিত করার আগেই দলাদলি আর বিচ্ছেদ শুরু করে দেয়। দেবেন্দ্রনাথের তুলনায় কেশবচন্দ্র অনেক আধুনিক চিন্তাধারার অধিকারী। দু’জনের মধ্যে মতভেদ শুরু হয়। এক সময় আদি ব্রাহ্ম সমাজ থেকে সদলবল বেরিয়ে এলেন কেশবচন্দ্র। নিজে আলাদা দল গড়লেন, ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ। এক থেকে হল দুই, আর কিছু কালের মধ্যেই এই সমাজ তিন টুকরো হয়ে যাবে। দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে কেশবচন্দ্রের এই বিরোধের অনেক কারণ আছে। আত্মজীবনীতে সুনীতি লিখেছেন, অন্যতম কারণ— দলের মধ্যে তাঁর বাবার বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে মহর্ষি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। (মহাপুরুষদেরও ঈর্ষা হয়?)
কেশবচন্দ্র তাঁর নতুন দল নিয়ে অনেক সমাজ-সংস্কারে ব্রতী হন। বিশেষত, নারীদের মুক্তির ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগ বিশেষ প্রশংসনীয়। তখনকার দিনে আট, ন’বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। লেখাপড়া শেখার বিশেষ সুযোগ ছিল না। বাকি জীবন অন্তঃপুরে বন্দিনী হয়ে থাকাই ছিল তাদের নিয়তি। এর মধ্যে আবার বিধবা হয়ে গেলে তো তাদের উপর অত্যাচার এবং নিষ্ঠুরতার কোনও সীমা থাকত না।
কেশবচন্দ্র নারীদের শিক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বাল্যবিবাহ রোধ করতে না-পারলে এই শিক্ষাও অর্থহীন। মেয়েদের বিয়ের বয়স হওয়া উচিত অন্তত চোদ্দো বছর আর ছেলেদের আঠারো। দলবল সমেত কেশবচন্দ্রের আন্দোলনের ফলেই সরকার বিয়ের এই বয়সের সীমা মেনে নিয়ে বিবাহ বিষয়ে একটা আইন জারি করে। লোকের মুখে মুখে তার নাম হয়ে যায় তিন আইন। এটা কেশবচন্দ্রেরই জয়।
কিন্তু এর পর কী হল? কোচবিহারের রাজবাড়ি থেকে যুবরাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে কেশবচন্দ্রের বড় মেয়ে সুনীতির বিয়ের প্রস্তাব এল। কিন্তু সুনীতি তখনও চোদ্দো বছরে পৌঁছাননি। আর নৃপেন্দ্রনারায়ণেরও বয়স আঠারোর কম। তবু কেশবচন্দ্র এই বিয়ের প্রস্তাব মেনে নিলেন।
প্রথমে সবাই হতবাক হয়েছিল। বিয়ের বয়সের সীমা নিয়ে কেশবচন্দ্র যে আন্দোলন করেছিলেন, নিজেই তা ভাঙতে রাজি হয়ে গেলেন? বাংলার সমাজে এটা একটা দারুণ আলোচনা ও নিন্দামন্দের প্রধান বিষয় হয়ে উঠল। কেশবচন্দ্র রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য এত দুর্বল হয়ে গেলেন কেন?
রাজপরিবার থেকে আরও দাবি জানানো হল যে, বিয়ের অনুষ্ঠান হবে হিন্দু মতে। এবং কেশবচন্দ্র নিজে কন্যা সম্প্রদান করতে পারবেন না। কারণ, তিনি এর আগে বিলেতে গিয়েছিলেন, সে জন্য জাতিচ্যুত। হিন্দু পুরোহিতরা এসে এই বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন।
আসলে এই অভিনব বিয়ের প্রস্তাবের পিছনে ছিল ইংরেজ সরকারের কারসাজি। কোচবিহার তখনও পুরোপুরি ইংরেজদের অধীন না-হলেও রাজপরিবারের অনেক বিষয়েই কলকাঠি নাড়েন ইংরেজ প্রতিনিধিরা। তাঁদের ইচ্ছা ছিল, নৃপেন্দ্রনারায়ণকে তাঁরা বিলেতে ঘুরিয়ে আনবেন। আর রাজকুমারের স্ত্রী কিছুটা ইংরেজি জানবে। এবং বড় বড় রাজপুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারবে।
তখন কেশবচন্দ্রের পরিবারের মেয়েরাই ছিল প্রগতিশীল। পাত্রপক্ষ যা চাইবে তাই শুনতে হবে। এর প্রতিবাদ করার সুযোগ কেশবচন্দ্রের নেই। শুধু তিনি চাইলেন রাজপরিবার থেকে একটা ঘোষণা যে, নৃপেন্দ্রনারায়ণ এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং বহুবিবাহের বিরোধী। নৃপেন্দ্রনারায়ণ বিলেত যাবেন বলেই এই বিয়ের ব্যবস্থা দ্রুত সেরে ফেলতে হবে।
এই উপলক্ষে কেশবচন্দ্র বার বার অপমানিত হয়েছিলেন এবং মেনেও নিয়েছিলেন।
বিয়ের রাত্তিরেও নানা রকম মতবিরোধ হয়েছিল। বিয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সুনীতির মা চাইছিলেন, বিয়ের অনুষ্ঠান ছাঁটাই করে সংক্ষিপ্ত ভাবে যেন কিছু ব্রাহ্ম প্রথাও অনুসৃত হয়। আর রাজমাতা ধরে বসে রইলেন যে, বিয়ে হবে। পুরোপুরি হিন্দু মতে। হিন্দু মতে না-হলে তা সিদ্ধ হবে না। সুনীতিও মহারানির মর্যাদা পাবেন না। এবং সুনীতির মাকে বেশ অপমানজনক ভাষায় এ সব শুনতে হল।
এই তর্কাতর্কিতে বিয়ের সব অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেল। বিয়ের সব আলোর রোশনাই ও সাজসজ্জা, সব বন্ধ হয়ে গেল। সুনীতির লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার উপক্রম হল। বাংলার সমাজে লগ্নভ্রষ্টা কুমারীদের যে কত রকম অপমান ও নির্যাতন সইতে হয়, তা অনেকেই জানেন।
পরে রাত তিনটের সময় আর একটা লগ্ন ছিল। রাজকুমার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে ডেকে তোলা হল। কেশবচন্দ্রকে নিয়ে আসা হল বিবাহবাসরে। কেশবচন্দ্র সবই মেনে নিলেন। নমো নমো করে বিয়ে হয়ে গেল। এর পরেও কোচবিহারের রাজবাড়িতে সুনীতিকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে।
তিনি যখন গর্ভবতী হন, তখনই জেনে গিয়েছিলেন পুত্রসন্তান না-জন্মালে সে রানিকে অপয়া মনে করা হয়। তার প্রতি আকারে-ইঙ্গিতে প্রচুর বিদ্রুপ বর্ষিত হয়। কিন্তু সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা তো জানার কোনও উপায় ছিল না। শেষের দিকে একটা মাস সুনীতির নিদারুণ উৎকণ্ঠার মধ্যে কেটেছিল। সুখের বিষয়, সুনীতির প্রথম সন্তানটি তো ছেলেই হয়।
এ দিকে কেশবচন্দ্র সেনের এই কাণ্ডের পর, ব্রাহ্ম ধর্মের তরুণ নেতারা খুবই আহত বোধ করেন। আবার এই সমাজ ভেঙে তৃতীয় একটি দল তৈরি করেন শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ। সেটার নাম দেওয়া হয় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ। অর্থাৎ এক প্রজন্মের মধ্যেই ব্রাহ্মদের দল তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এদের নিয়ে সুদূরপ্রসারী কোনও ব্যবস্থার প্রবর্তন করার সম্ভাবনা ছিল না।
সুনীতির ইংরেজি আত্মজীবনীটি আমি এখনও পড়ার সুযোগ পাইনি। তবে ‘বলাকা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় চিত্ররেখা গুপ্ত ওই বইটি সম্পর্কে একটি বিস্তৃত প্রবন্ধ লিখেছেন। তার থেকে আমি অনেক কিছু জেনেছি।
ধনঞ্জয় ঘোষালের সম্পাদনায় ‘বলাকা’ একটি বিশেষ ধরনের পত্রিকা। গল্প-উপন্যাসের পরিবর্তে কোনও একটি বিষয়ের উপর মূল্যবান লেখা আমি এই পত্রিকায় দেখেছি। যেমন, এই সংখ্যার বিষয় ‘নবচেতনায় বঙ্গনারী’। এই সংখ্যাটি নারীস্বাধীনতা বা নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের অবশ্য সংগ্রহযোগ্য।
‘কোরক’ পত্রিকাটিও প্রতি সংখ্যার বিষয় ভিত্তিক। তাদের নতুন সংখ্যাটির বিষয়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, তাঁর রচনা ও জীবন। বাংলা ভাষার এখনকার প্রবীণতম কবি নীরেন্দ্রনাথ আজও সৃষ্টিশীল।
স্বপ্ন দেখে আমার ভয়
এই লেখাটি লেখার পর রাত্তিরে আমি বেশ বড় আকারের একটা স্বপ্ন দেখলাম। রাস্তায় একটা মিছিল বেরিয়েছে, তা এগিয়ে আসছে আমারই বাড়ির দিকে। সেই মিছিলে একজনও পুরুষ নেই, সবই নারী। কাছাকাছি আসার পর তাদের স্লোগান শুনে আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম। এরা বলছে, আগামী পাঁচ বছর কোনও পুরুষ লেখকের কোনও কিছু লেখার অধিকার থাকবে না। সকলের কলম কেড়ে নেওয়া হবে। মিছিলে বেশ কয়েকটি পরিচিত মুখও দেখলাম।
আমি নীচে নেমে গিয়ে সেই মিছিলের সামনে দু’হাত তুলে বললাম, পুরুষদের লেখা বন্ধ? অনেক পুরুষই তো নারীস্বাধীনতার বিষয়ে লেখে। আমি নিজেকে একজন কট্টর নারীবাদী বলে মনে করি। লেখা বন্ধ হয়ে গেলে আমি বাঁচব কী নিয়ে?
৭. ৩. ২০১২
কবিতা থেকে নাটক, এক সুদীর্ঘ যাত্রা
বরিশাল শহর ছেড়ে ঠিক স্বাধীনতার বছরেই কলকাতায় চলে আসে একটি চোদ্দো বছরের ছেলে রোগা লাজুক, দারুণ রকমের বই-পড়ুয়া। তখনই হয়তো বোঝা যায়নি যে, এই ছেলেটি বাংলা সাহিত্যের জন্য বলিপ্রদত্ত। সারা জীবন সে বাংলা সাহিত্যের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। কবিতা লেখা থেকে শুরু, সিটি কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ার সময় সে একটা ছোটখাটো কবিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তখন কৃত্তিবাস পত্রিকাকে ঘিরে এই গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। মোহিত চট্টোপাধ্যায় চলে আসে তার সামনের সারিতে। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘গোলাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ তাকে বিশেষ খ্যাতিমান করে তোলে।
ছাত্রজীবন শেষ করার পর কবিদের কোনও না কোনও জীবিকা নিতেই হয়। দায়িত্ব নিতে হয় সংসারের। অধিকাংশ কবিই স্কুল বা কলেজে পড়াবার খোঁজে, কেউ বা ঢুকে পড়ে সংবাদপত্রের অলিন্দে। সংবাদপত্র অনেক সময় গিলে ফেলে কবিকে। শিক্ষকতা বা অধ্যাপনাও অনেক সময় কবিকে করে তোলে গদ্যময়। সারা জীবন সাহিত্যকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা খুব শক্ত ব্যাপার। কিন্তু মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের তো উপায়ও নেই, ইচ্ছে করলেও সে সাহিত্য থেকে সরে যেতে পারবে না।
অধ্যাপনার কাজের মধ্যেও কবিতা লিখতে লিখতে সে এক সময় ঝুঁকে পড়ে নাটকের দিকে। তার প্রথম নাটক, ‘কণ্ঠনালীতে সূর্য’। এক সময় সে কবিতা খুব কম লিখে নাট্য রচনাতেই মনোযোগ দেয় বেশি। সেই সময় তার কবি বন্ধুরা অনেকেই আফসোস করে বলত, বাংলা কাব্যজগৎ একজন প্রতিভাবান কবিকে হারাল। আমিও সে রকমই ভেবেছিলাম। পরে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের এই রূপান্তর তার ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও অন্য দিকে এক বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য আনে।
সেই ষাট সত্তরের দশকে বাংলা নাটকের অবস্থা কী ছিল? উত্তর কলকাতার পেশাদারি নাট্যদলগুলো টিমটিম করছে কিংবা ভেঙে পড়ছে। আর অন্য দিকে, বিপুল উদ্দীপনায় শুরু হয়েছে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন। নতুন আঙ্গিক, আধুনিক চিন্তাধারা, বিষয় অনুযায়ী মঞ্চসজ্জা, অতি-নাটকীয় কিংবা গলাকাঁপানো অভিনয় ধারার পুরো পরিবর্তন। কিন্তু কী নাটক তারা মঞ্চস্থ করছে। হয় রবীন্দ্রনাথ অথবা কোনও প্রকাশিত উপন্যাসের নাট্যরূপ। অথবা কোনও বিদেশি নাটকের ভাবানুবাদ। তৃতীয়টাই বেশি।
এক সময় বের্টোল্ট ব্রেখটের দুটি নাটক একই সঙ্গে মঞ্চস্থ করছিল দুটি দল। মৌলিক বাংলা নাটক কোথায়? শিশিরকুমার ভাদুড়ী মাঝে মাঝে হাহাকার করতেন, নতুন সার্থক বাংলা নাটক তিনি পেলেন না। অতিশয় দুর্বল কিছু নাটকে তাঁর অভিনয়-প্রতিভা নষ্ট হয়েছে।
বিদেশি নাটককে বাংলার ঘরে আনা দোষের কিছু নয়। তাতে আমাদের নাট্যজগৎই সমৃদ্ধ হয়। তবে একটাও মৌলিক নাটকের দেখা নেই। শুধু নির্ভর করতে হবে বিদেশি নাটকের উপর? এ রকম অবস্থা লজ্জাজনক নয়? এই সময় মোহিত চট্টোপাধ্যায় একটার পর একটা নাটক লিখতে শুরু করে। তার প্রথম দিকের কয়েকটি নাটকের সংলাপে একটু বেশি বেশি কাব্যিক ভাব থাকলেও অচিরেই সে নতুন ভাষা আয়ত্ত করে। তার নাটকগুলো মঞ্চে সাফল্য পায়। নাট্যকার হিসেবে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের সাফল্য যত না ব্যক্তিগত, তার চেয়েও বেশি ছিল বাংলার নাট্যজগতে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন যোগ্য নাট্যকারকে পাওয়া।
অবশ্য শুধু মোহিত নন, প্রায় এক সময়ে নাট্য রচনা শুরু করেন বাদল সরকার, মনোজ মিত্র, রমাপ্রসাদ বণিক, ব্রাত্য বসু এবং আরও কয়েকজন। এখন দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা যায়, বাংলা নাটকের দৈন্যদশা কেটে গেছে। আমরা বেশ কিছু সার্থক, স্মরণীয় বাংলা মৌলিক নাটক পেয়েছি।
মোহিতের নাটকের সংখ্যা একশোর এদিক-ওদিক। বিষয় বৈচিত্রেও উপভোগ্য। তার সাম্প্রতিকতম নাটকটির নাম— তথাগত। ‘রঙ্গপট’ প্রযোজিত এই নাটকটি দেখতে যাওয়ার আগে মনে আশঙ্কা ছিল, মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ব না তো? মহাপুরুষদের জীবন আলেখ্য নিয়ে এই সংশয় থাকতেই পারে। কারণ, ঘটনাগুলো আমাদের জানা। গৌতম বুদ্ধের জীবনীতে তেমন কোনও টানাপড়েন নেই, উচ্চকণ্ঠ নেই, রোমান্টিক দৃশ্যের অবতারণার সুযোগ নেই। এখানেই মোহিতের প্রধান কৃতিত্ব এই যে, এমন একটি শান্ত রসের নাটকেও আমাদের মনোযোগ একবারও বিচলিত হয়নি। বুদ্ধের ভূমিকায় ডাক্তার তপনজ্যোতি দাস একই সঙ্গে সংযমী ও দৃঢ়। অন্যরাও বিশ্বাসযোগ্য। শেষ দৃশ্যটি অবিস্মরণীয়।
মোহিত এখন বেশ অসুস্থ। সে নাকি বলেছে, এত পরিশ্রম করে এ রকম পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা তার ইহজীবনে আর সম্ভব হবে না। এই শেষ নাটকটিই তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক। তিনি অবিলম্বে সুস্থ হয়ে উঠুন, এ রকম আশা করা যেতেই পারে। তার চেয়েও বড় কথা, এমন কঠিন রোগকেও সহ্য করে শক্তি অর্জন করা।
মোহিতের কবিতার এক টুকরো নিদর্শন:
বুকের ওপর একটা খবরের কাগজ পড়ে আছে
লোকটি খবরের কাগজ চাপা পড়ে মরে যায়নি তো?
কাগজের চেয়ে খবরের ওজন কোটিগুণ ভারি!
অথচ গল্পের একটা ফল দেখুন
একটা কথা পর্যন্ত না বলে ধীরে ধীরে রসে ভরে ওঠে।
ভালোবাসা পেলেই না সুন্দর সহজ হাঁটা
ইচ্ছা সুখের ছায়া পড়বে
বুকের মধ্যে গোপন পাখি ডানা মেলে
বাইরে আসবে। মুঠোর মধ্যে আয়না ধরো।
দু’হাত মেলে বাতাস ধরো—উড়ে যাবে।
(কমল সাহা রচিত ‘হৃদয়ের থেকে ভালো বাসভূমি নেই’ গ্রন্থ থেকে কিছু তথ্য সংগৃহীত।)
২১. ৩. ২০১২
দুটি বিস্ময়: অ-সাধারণ অভিজ্ঞতা
যত দূর মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর একটি নিবন্ধে লিটল ম্যাগাজিন-এর উল্লেখ আর কিছুটা পরিচিতি ছিল। তার আগেও অনেক ছোট ছোট সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হত, কিন্তু সেগুলির কোনও ডাক-নাম ছিল না। এখন লিটল ম্যাগাজিন বহুলপ্রচারিত। অ-ব্যবসায়িক, সাহিত্য নিয়ে অনেক পরীক্ষা, নিরীক্ষা, অপরিচিত প্রতিভাবানদের তুলে ধরা, এই সবই এ ধরনের পত্রিকার চরিত্র। ম্যাগাজিনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা একটা প্রয়োজনীয় কাজ হতেই পারে। আমি অবশ্য এ দায়িত্ব নিতে পারব না, বেশ পরিশ্রমসাধ্য এ কাজের যোগ্যতাও আমার নেই, অন্য কেউ নেবেন আশা করি।
লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে প্রকাশিত রচনার সমীক্ষা ছাড়াও এই সব পত্রিকা কারা প্রকাশ করে, পয়সা পায় কোথা থেকে, কেন কয়েক বছরের মধ্যেই এ রকম অনেক পত্রিকাই বন্ধ হয়ে যায়, হারিয়ে যায়, এ সব জানাও খুব জরুরি। প্রত্যেক পত্রিকার পিছনেই থাকে একটা ছোটখাটো গোষ্ঠী। কয়েকজন বন্ধু এবং সম-মনস্ক ছেলেমেয়ে সাহিত্যজগতে নতুন কিছু সৃষ্টির তাগিদেই একটা পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। তারা চাঁদা করে প্রেসের খরচ মেটায়। পত্রিকা প্রকাশের দিনটিতে তাদের সে কী উন্মাদনা। কয়েক সংখ্যা বেরোবার পরই এই গোষ্ঠীতে ভাঙন ধরে, ব্যক্তিত্ব বা আমিত্ব নিয়ে সংঘর্ষ হয়, বন্ধ হয়ে যায় চাঁদা দেওয়া, পত্রিকাটির অবস্থা টলমল করে। শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘এক দশকে সঙ্ঘ ভেঙে যায়’, বাংলা লিটল ম্যাগাজিনে এই ভাঙাভাঙির জন্য দশ বছরও লাগে না। অনেক উচ্চমানের লিটল ম্যাগাজিন চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
কোনও কোনও লিটল ম্যাগাজিনের জেদি সম্পাদক বন্ধুবান্ধবদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও একাই পত্রিকা চালিয়ে যায় আরও কয়েকটা সংখ্যা। কোথা থেকে অর্থের সংস্থান হয়, তা অনুমান করাও শক্ত। আমি নিজেও কৃত্তিবাস পত্রিকা চালাতে গিয়ে কিছু দিনের জন্য একা হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমি বেকার, টিউশনি করে প্রেসের ধার মেটাবার চেষ্টা করেছি, তাও পুরোপুরি মেটাতে পারিনি। বেশি ধার হয়ে গেলে প্রেস বদল করতাম। আগের প্রেসের ছায়াও মাড়াতাম না। ধরা যাক, সেই প্রেসটি মৌলালির মোড়ে, সেই মৌলালি আমার পক্ষে নিষিদ্ধ এলাকা হয়ে যায়। তবে এ কথাও বলতে হয়, অনেক প্রেসের মালিক এই সব লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি সহৃদয় কোমল। এ পর্যন্ত কোনও লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি মামলা বা হামলা করেনি কেউ।
আমার লেখালেখির শুরু লিটল ম্যাগাজিন থেকেই। এখন অবশ্য অনেক পত্রিকায় লেখা দিতে পারি না। কিন্তু পড়ি। বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনের মান অনেক উন্নত। শুধু গল্প-কবিতা নয়, এই সব পত্র-পত্রিকায় অনেক মূল্যবান প্রবন্ধ থাকে, যা বহুলপ্রচারিত পত্রিকায় পাওয়া যায় না। কিছু কিছু পত্রিকা হাতে নিয়ে আমি মুগ্ধ হই, হঠাৎ কোনও পত্রিকা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। সে রকম একটা পত্রিকা সম্পর্কে দু’চার কথা।
‘অমিত্রাক্ষর’ নামের পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় মেদিনীপুর থেকে। ‘সাহিত্য ও গবেষণামূলক নির্বাচিত বিষয়ের খেয়ালি ষাণ্মাসিক’, সম্পাদক অচিন্ত্য মারিক। এই সংখ্যাটি পুরোপুরি চড়াই পাখি বিষয়ে। চড়াই পাখির সংখ্যাও দ্রুত কমে যাচ্ছে, সারা পৃথিবীতেই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। চড়াই একটা ঘরোয়া পাখি। বড় বড় গাছে বাসা না-বেঁধে তারা মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। এ কালের বাড়িতে ঘুলঘুলি থাকে না, চওড়া, ঢাকা বারান্দা থাকে না, তা হলে তারা বাসা বাঁধবে কোথায়? বাইরে গাছে এই ছোট্ট সুন্দর পাখিটি বাসা বাঁধলে কাক শালিকরা এসে উৎপাত করবে। ডিম খেয়ে নেবে। পোকামাকড় মারার জন্য এখন প্রচুর কীটনাশক বিষ ছড়ানো হয়, সেই বিষাক্তপোকামাকড় খাওয়ার ফলে চড়াই পাখিদের নির্ঘাত মৃত্যু। এমনকী এখন মোবাইল ফোনের সংখ্যা এত বেশি বাড়ছে তাদের তরঙ্গের ম্যাগনেটিক এফেক্টেও এদের ছোট প্রাণ টিকে থাকতে পারছে না। পৃথিবীতে কত রকম চড়াই আছে, তার সচিত্র বিবরণ এবং বাইবেল থেকে শুরু করে সালিম আলির রচনায় চড়াই পাখির উল্লেখও সংগৃহীত হয়েছে এই সংখ্যায়।
গ্রামাঞ্চলে তবু এখনও কিন্তু চড়াই দেখা যায়। কিন্তু বড় বড় শহরে মানুষের সব থেকে চেনা এই পাখিটি একেবারে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
রচনাগুণে এই পত্রিকাটি বিশেষ সমৃদ্ধ তো বটেই, তা ছাড়াও আমি মুগ্ধ হয়েছি এই সংখ্যাটির নির্মাণকুশলতা দেখে। অনেক রকমের ছবি, প্রতিটি পৃষ্ঠার লে-আউটও অনবদ্য। শহরের অনেক বড় পত্রিকাকেও অঙ্গসজ্জায় হার মানিয়ে দেবে।
অমিত্রাক্ষর পত্রিকা ও তার সম্পাদককে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাই।
‘ইটসি বিটসি’ মানে কী?
আমি নাট্যবিশারদ বা নাট্যসমালোচক নই। নাটক দেখতে ভালবাসি। দর্শক হিসাবে আমার তিন রকম অভিজ্ঞতা হয়। কিছু কিছু নাটক দেখে মন ভরে যায়। সময়টা বেশ ভাল কাটে। দু’একটি নাটক বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে ও প্রয়োগে এবং অভিনয়ে এতই উচ্চাঙ্গের যে বাইরে এসে অনেকের সঙ্গে সেই নাটকটি নিয়ে অনেকক্ষণ মত বিনিময় করা যায় আর দৈবাৎ দু’একটি নাটক (এ দেশে বা বিদেশে) দেখতে দেখতে মুগ্ধতার চেয়েও বিস্ময়বোধ বাড়তে থাকে। বেশ ভাল কিংবা ততটা সাথর্ক নয়, এই বিচারও মনে আসে না।
এই তৃতীয় ধরনের অনুভূতির নাটক ইটসি বিটসি। এই শিরোনামের মানে যে জানতেই হবে, তার কোনও মানে নেই। এখন গ্রুপ থিয়েটারের বেশ কয়েকটি নাটকই সার্থক, গর্ব করার মতো। তবে সে সব নাটকের কাহিনিতে একটা ধারাবাহিকতা থাকে কিন্তু নাটকটির প্রথম কয়েকটি দৃশ্য দেখার পরই মনে প্রশ্ন জাগে যে, সত্যিই কি কলকাতার কোনও মঞ্চে এ রকম নাটক দর্শকদের চক্ষু ও কর্ণ টেনে রাখতে পারে? এ নাটকে দৃশ্যের পর দৃশ্যের কোনও পারস্পর্য নেই। এর গঠন অনেকটা বিমূর্ত ধরনের।
বিমূর্ত আঙ্গিকের নাটক মঞ্চস্থ করা বেশ ঝুঁকিবহুল। কারণ, মঞ্চ ও অভিনয় দেখে মুগ্ধ হলেও দর্শকবৃন্দ কাহিনিটি অনুসরণ করতে চায়, নচেৎ এক সময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে।
আশ্চর্য ব্যাপার, এ নাটকে সে রকম কিছু ঘটেনি, বরং মাঝে মাঝেই দর্শকদের উষ্ণ সমর্থনের প্রমাণ পাওয়া গেছে হাত চাপুড়িতে।
যে হেতু এ নাটকে টানা কোনও কাহিনি নেই, তাই গল্পের চুম্বক দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মূল চরিত্র, দুই ভাই, বড় ভাইটি খানিকটা পাগলাটে প্রতিভাবান, রাজনীতির দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিদীর্ণ, আর ছোট ভাইটি চতুর, সমসাময়িক ব্যবস্থায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে চায়।
বড় ভাইয়ের ভূমিকায় গৌতম হালদার অভিনয় সাফল্যে তাঁর জীবনে আর একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আর অন্য ভাইয়ের ভূমিকায় স্বল্প পরিচিত চিরঞ্জীব বসু, সে-ই নাট্যকার। তার সাবলীল অভিনয় এবং এ রকম একটি নাটক রচনায় যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে সে জন্য তাকে বিশেষ সাধুবাদ জানাতে হয়।
হাতে খড়ি নামে নতুন সংস্থার প্রযোজনায় এবং দেবাশিস ঘোষ দস্তিদারের পরিচালনায় এই নাটকটি সত্যিই অসাধারণ।
নাটকটিতে রাজনীতির কিছু কিছু স্পর্শ আছে। তার চেয়েও বেশি আছে মানব-সম্পর্কের অন্দরমহলের কথা। সেখানেও মাতিয়ে দিয়েছে দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত।
এ নাটক অবিস্মরণীয়।
৪. ৪. ২০১২
ও বিদ্যাসাগর, আমার পাঁচ গণ্ডা পয়সা দরকার…
এক সময় উচ্চবিত্ত বাঙালিরা, এমনকী কিছু মধ্যবিত্ত বাঙালিও প্রতি বছর অন্তত একবার হাওয়া বদল করার জন্য পশ্চিমে যেতেন। এখনকার হিসেবে বেশি দূর নয়, ঘাটশিলা, মধুপুর, শিমুলতলা ইত্যাদি জায়গায় কিছুদিন মুক্তজীবন যাপন করতেন। হাওয়া বদলের ধারণাটা সাহেবদের কাছ থেকে পাওয়া। একই জায়গায় বছরের পর বছর থেকে গেলে শরীর ঠিক থাকে না, তাই অন্য কোথাও গিয়ে, সেখানকার হাওয়া গায়ে লাগিয়ে এলে শরীর নতুন বল পায়, আয়ুও নাকি বেড়ে যায়। যে-জন্য সাহেবরা ছুটি পেলেই ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়ে, এমনকী উইক-এন্ডেও তাদের পাওয়া যায় না। প্রথম দিকের শিক্ষিত বাঙালিরা অনেক বিষয়েই ইংরেজদের অনুকরণ করতে চাইতেন, বাংলার বাতাস থেকে কিছু দূরের কোনও জায়গায় অন্য রকম বাতাস উপভোগ করে আসতেন, কিছু কিছু ধনাঢ্য পরিবার ওই সব শহরে একটা বাড়িও রাখতেন, বেশ বড় ও সুদর্শনীয়। ওই সব অঞ্চলকে কেন ‘পশ্চিম’ বলা হত, তা আমি এখনও জানি না, ওই সব শখের বাড়ির অধিকাংশ এখন জরাজীর্ণ, প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতন অথবা হস্তান্তর হয়ে গেছে। সেই সব বিত্তশালী পরিবারের কেউ কেউ এখনও হাওয়া বদলাতে যায়, তবে বিহার বা উত্তরপ্রদেশে নয়, তারা যায় প্রকৃত পশ্চিমে, অর্থাৎ ইউরোপ, আমেরিকায়।
ছোট ছোট পাহাড় বা যেখানে সেখানে খানিকটা জঙ্গল, এ রকম স্থানই বাঙালিদের বেশি পছন্দ ছিল। শহর ছাড়াও কোনও গ্রামাঞ্চলে এ রকম পরিবেশ পেলে সেখানেও বাড়ি বানিয়ে রাখত বাঙালিরা। এই রকমই একটি আকর্ষণীয় অঞ্চলের নাম বাঙালি উচ্চারণে কার্মাটা। আসল নাম কর্মাটাঁড়। অর্থাৎ কর্মা নামে একজন সাঁওতাল মাঝির টান। মানে উঁচু জায়গা যা বন্যাতে কখনও ডোবে না। সেইখানে রেল স্টেশনের পাশেই একটা বাড়ি কিনেছিলেন কিংবা নির্মাণ করিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এ তথ্য অনেকেই জানেন। বিদ্যাসাগরের শেষ জীবন মোটেই সুখে কাটেনি। সেই যে উত্তরপাড়ায় একটা বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে মিস কম্পেস্টারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তার বগি গাড়িটি উলটে যায়। ছিটকে বিদ্যাসাগর মাটিতে পড়ে গিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান। তারপর এক মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু আঘাতের পরিণাম তাঁর শরীরকে ছাড়েনি। তার ফলেই তাঁর আয়ু ফুরিয়ে যেতে থাকে। তা ছাড়াও কিছু কিছু বন্ধু স্থানীয় মানুষ এবং যাঁদের তিনি অনেক উপকার করেছেন, তাদের কয়েকজনের দুর্ব্যবহারে তিনি মর্মাহত হন। তাঁর জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রামের কিছু ব্যক্তির অকৃতজ্ঞতার কারণে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, জীবনে আর কখনও তিনি সেই গ্রামে পা দেবেন না। কর্মাটাঁড়ের অধিকাংশ মানুষই সাঁওতাল, তাদের সরল ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বিদ্যাসাগর বাকি জীবনটা সেখানেই কাটাবেন ঠিক করেছিলেন। তা অবশ্য হয়নি। মাঝে মাঝেই তাঁকে কলকাতায় আসতে হয়েছে। মৃত্যুও হয় এই শহরেই।
তার পর কর্মাটাঁড়ের বাড়িটার অবস্থা কী হল? পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে পিতার মোটেই সুসম্পর্ক ছিল না। বিদ্যাসাগর তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পিতার মৃত্যুর পরেই নারায়ণচন্দ্র সেই বাড়ি ও সম্পত্তি বিক্রি করে দেয় কলকাতার এক মল্লিক পরিবারের কাছে। তারা বাড়িটি এমনিই ফেলে রাখে। বিহারের বাঙালি সমিতি সেখানে বিদ্যাসাগরের স্মৃতিরক্ষার জন্য উদ্যোগী হয়ে মল্লিক পরিবারের কাছ থেকে কিনে নেয় চব্বিশ হাজার টাকাতে। সেখানে এই সমিতি একটি মেয়েদের স্কুল চালু করে। (অনেকের মতে বিধবা বিবাহের আইনি স্বীকৃতি আদায় করাই বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের প্রধান কীর্তি। আমার মতে, মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিদ্যাসাগরের অনলস পরিশ্রমের কীর্তিও অন্য কিছুর থেকে কম নয়।)
এখন কর্মাটাঁড়ের নাম বিদ্যাসাগর। রেল স্টেশনটিরও ওই নাম। বিহার বাঙালি সমিতি সেই স্থানে অনেক সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে সব কাজে অর্থ অকুলান নয়। পত্রান্তরে কলকাতার এক ডাক্তার প্রশান্তকুমার মল্লিক, যিনি সদ্য ওখানে কয়েক দিন কাটিয়ে এসেছেন, তাঁর একটি চিঠি পড়ে জানা গেল, অর্থাভাব সত্ত্বেও কী সব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার মনে পড়ল, কর্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর নামে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি অনবদ্য লেখা পড়েছিলাম অনেক দিন আগে। সেটা আর একবার পড়ার ইচ্ছা হল।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিদ্যাসাগরের অন্যতম সার্থক শিষ্য। তিনি লখনউয়ের এক কলেজে সংস্কৃত পড়াবার আমন্ত্রণ পান। যাওয়ার সময়ে তিনি মাঝপথে কর্মাটাঁড় নেমে পড়েন। সেখানে দু’দিন থেকে তিনি দেখে নেন, তাঁর গুরুর প্রতিটি দিনযাপনের চিত্র। সাঁওতালদের মধ্যে উপযুক্ত চিকিৎসার খুব অভাব। বিদ্যাসাগর তাদের হোমিওপ্যাথির ওষুধ দেন। কোনও গুরুতর রোগীর বাড়িতে গিয়েও সেবা করেন। সারা দিন তিনি ব্যস্ত। এর মধ্যে মজার ব্যাপার এই, সকাল বেলাতেই একজন সাঁওতাল এসে বলল, ও বিদ্যাসাগর, আমার পাঁচ গণ্ডা পয়সার খুব দরকার। তুই আমার এই পাঁচটা ভুট্টা নিয়ে পয়সা দে। বিদ্যাসাগর ভুট্টা নিয়ে তাকে পয়সা দিলেন। তার পর সারা সকাল ধরেই আরও কয়েক জন সাঁওতাল কিছু ভুট্টার বদলে পয়সা চাইতে লাগল। দরদামের কোনও প্রশ্ন নেই। যে যা চায় তাই দিতে লাগলেন বিদ্যাসাগর। ক্রমে ভুট্টার পাহাড় জমে গেল। বিকেলের দিকে একদল এসে বলল, খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দে না। তখন শুকনো কাঠ আর পাতাটাতায় আগুন জ্বালা হল, বিদ্যাসাগর তাদের সেই সব ভুট্টা বিলিয়ে দিলেন। তারা মহানন্দে যার যতটা খুশি সেই ভুট্টা পুড়িয়ে খেতে লাগল।
যাঁরা বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষার কর্মকাণ্ডে কিছু আর্থিক সাহায্য করতে চান, তাঁরা বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন, বিহার-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
পাপ না পুণ্যফল
বিদ্যাসাগর মশাই আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দু’জনেই মৃত্যুর পরে স্বর্গে গেছেন। স্বর্গে তো কামনা বাসনা মেটাবার কোনও সীমারেখা নেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী একদিন একটা বাগানের মধ্যে যেতে যেতে দেখলেন, এক জায়গায় বিদ্যাসাগর মশাই বসে আছেন। তার কোলে বসেছে বিশ্ববিখ্যাত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো। তা দেখেই হরপ্রসাদ মুখ লুকিয়ে অন্য দিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বিদ্যাসাগর হেঁকে বললেন, এই হরো, যাচ্ছিস কোথায়, এ দিকে আয়।
হরপ্রসাদ বললেন, গুরুদেব, আপনি সারা জীবন কত পরিশ্রম করেছেন। কত মানুষকে অর্থ সাহায্য দিয়ে বাঁচিয়েছেন। সেই পুণ্যফলে আপনি স্বর্গে এসে এমন রূপসীকে পেয়েছেন। এখানে থাকা উচিত নয়।
বিদ্যাসাগর হরপ্রসাদের পেটে চিমটি কেটে বললেন, আজও তোর বুদ্ধিশুদ্ধি হল না। বুঝিস না, এটা আমার পুণ্যফল না, এই মেয়েটির পাপের শাস্তি।
১৮. ৪. ২০১২
ভালবেসে মিটল না সাধ, জীবন এত ছোট
কেমন আছো, মণিদা?
আরেঃ! তুই এসেছিস, পথ ভুলে নাকি?
এই দিকে এক জায়গায় একটা কাজ ছিল। কাজটা তাড়াতাড়ি মিটে গেল, তাই ভাবলাম একবার তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই।
মানে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই তুই বাড়ি থেকে বেরোসনি, এ দিকে তোকে আসতে হয়েছিল বলেই…
তাই। হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে আমার আসতে ইচ্ছা করে না। আবার তোমার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয়নি সে জন্যও…
বেশ! বোস বোস, আমার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধব নিজেদের সময় নষ্ট করে আমাকে দেখতে আসবে, এসে গজল্লা করবে, সেটা আমার মোটেই ভাল লাগে না। নার্সিংহোমে থাকাটা বেশ পছন্দ হয়েছে আমার, খুব নিরিবিলি…
কত বড় নার্সিংহোম, কত মানুষের আসা যাওয়া, তুমি বলছ নিরিবিলি?
কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিলে আর কিছুই টের পাওয়া যায় না। জানলা দিয়ে দেখি, একটা পার্কের মধ্যে একটা সরোবর। ঠিক একই জায়গায় রোজ বসে থাকে দুটি বক। মাঝে মাঝে দু’জন নার্স আসে আমাকে খাওয়াতে টাওয়াতে। কী সুন্দর তাদের ব্যবহার।
তোমাকে এখন বেশ ভালই দেখাচ্ছে, চোখ-মুখ বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
ভাল দেখাচ্ছে, তাই না? চলে যাওয়ার আগে চেহারাটা দুর্বল, প্যাঁকাটে, কিম্ভূতকিমাকার করার কোনও মানে হয় না।
চলে যাওয়া… মানে… তুমি নার্সিংহোম থেকে কবে ছুটি পাচ্ছ?
যে কোনও দিন। আমি ইচ্ছা করলে এক্ষুনি। এখানে আমার আর চিকিৎসার কিছু নেই। চলে যাওয়া মানে একেবারেই চলে যাওয়া।
এ কী বলছ মণিদা। আমরা তো জানি যে তুমি—
চিরযুবা, তাই না? বয়স আমাকে ছুঁতে পারে না। আমাকে ওই সব টক্ দিস না। আমার আয়ু আর মাত্র দু’মাস। শোন, এ দেশের ডাক্তাররা ক্রিটিকাল রোগীর কাছে আসল অবস্থাটার কথা লুকিয়ে যায়। অনেক দেশে রোগীদের পুরো সত্যটা জানিয়ে দেয়, তাতে তাদের মনের জোর বাড়তে পারে। এখানে একজন তরুণ ডাক্তার, সদ্য বিলেত থেকে ফিরেছে। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমার আয়ু আর কত দিন, সত্যি করে বলুন তো ভাই। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, দু’মাস থেকে ছ’মাস। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে আপনাকে সাহায্য করার মতো আর কিছু নেই। সে কথা শুনে আমার বেশ ভাল লাগল। আমার বয়স তো কম হল না। জীবনকে যথেষ্ট উপভোগ করেছি। এখন চলে গেলে কেউ অকালমৃত্যু বলবে না। যেতে তো হবেই। তবে একটা কী আফসোস রয়ে গেল, জানিস? ভেবেছিলাম, আমার জীবৎকালেই দেখে যেতে পারব যে ধর্ম নিয়ে মানুষের মূর্খতা, পাগলামি, অসভ্যতা, নিষ্ঠুরতা একেবারে শেষ হয়ে যাবে। ধর্ম নিয়ে মানুষের পরিচয় হবে না। কিন্তু তা তো হলই না, বরং যেন দিন দিন বাড়ছে। এমনকী বহু শিক্ষিত মানুষও….
শিক্ষিত তুমি কাদের বলবে মণিদা? যাদের মনের মধ্যে কোনও যুক্তিবোধ তৈরি হয়নি, যাদের মনের মধ্যে ভালবাসা শুকিয়ে গেছে, তাদের কিছু কেতাবি পড়াশোনার জন্যই শিক্ষিত বলা যায়? হিন্দু-মুসলমান, ইহুদি আর আরবের মুসলমান, খ্রিস্টান আর বৌদ্ধরা যখন তখন মারামারি করার জন্য তৈরি হয়ে আছে।
ধর্ম কথাটার সঠিক মানে কী, বল তো নীলু?
সঠিক কোনও মানে এখন নেই। কিংবা থাকলে এখন কেউ মানে না। পুরনো বাঁধাধরা বিশ্বাসকেই আগলে রেখেছে। মজার কথা কী জানো মণিদা, প্রত্যেক ধর্মেই একজন করে আলাদা ঈশ্বর আছে। খ্রিস্টান, ইসলাম, হিন্দু মুনি-ঋষিদের পরম ব্রহ্ম। এদের কারওর সঙ্গে অন্যদের কোনও মিল নেই। তবু এরা মনে করে নিজের নিজের ধর্মের ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। এই বিশ্বাসের মধ্যে যে একটা চরম ছেলেমানুষি আছে, তা এই সব সম্প্রদায়ের শিক্ষিত লোকরাও বোঝে না? কিংবা বুঝেও ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় নিজের নিজের ধর্মের ঢাক পেটায়।
থাক, বাদ দে ও সব কথা। আমাদের কাশ্মীর সমস্যাও কোনও দিন মিটবে না। ইজরায়েল ও আরব দেশগুলির শত্রুতাও চলবে অনন্তকাল। আমার আর একটা আফসোস কী জানিস, ভেবেছিলাম আমি বেঁচে থাকতে থাকতেই দেখে যাব, আমাদের পৃথিবীর মতো এই মহাবিশ্বের আরও কোনও গ্রহে মানুষ কিংবা আর কোনও জ্যান্ত প্রাণী আছে কি না? বিজ্ঞানের এত উন্নতি হয়েছে, তবু এ পর্যন্ত কিছুই জানা গেল না।
এই মহাবিশ্বটা বড্ড বড়।
ঠিক বলেছিস, বিচ্ছিরি রকমের বড়। কত যে ছোট গ্রহ নক্ষত্র রয়েছে। তা আজও আমরা গুনে শেষ করতে পারিনি। আমাদের কল্পনাও এখানে হার মেনে যায়। এই পৃথিবীতে মানুষ ও কত সুন্দর প্রকৃতি রয়েছে। বিশ্বের আর কোথাও তা নেই। পৃথিবীর এই সৌভাগ্য হল কেন? আমরা খালি চোখে যত তারাকে ঝিকমিক করতে দেখি তার মধ্যে বেশ কিছু তারাই আর বেঁচে নেই। তবু তাদের আমরা দেখি। কারণ, তাদের আলো এখানে এসে পৌঁছতে বহু সহস্রাব্দ লেগে যায়। তার মানে, একটা জিনিস নেই, তবু তাকে আমরা দেখি, এটা একটা মজার ব্যাপার না?
মণিদা, তোমাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে, আমাদের সবাইকেই যেতে হবে তা নিয়ে কি তোমার মনে…
আমি মৃত্যুকে ভয় পাই কি না জানতে চাইছিস? ঠিক ভয় নয়। তবে, আমি তো জানি, চলে যাওয়ার ব্যাপার কিছু নেই। মানুষের শেষ নিশ্বাস ফেলা মানেই সব কিছু শেষ। পরজন্ম ফরজন্ম বলে কিছু নেই, ও সব রূপকথা। মানুষের আত্মা বলেও কিছু নেই। ঈশ্বরের অস্তিত্বের মতো ওটাও একটা গুজব। যে হেতু এ সব আমি নিশ্চিত ভাবে জানি, তাই শেষ নিশ্বাস ফেলাটা যত দূর সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা যায়, সে রকম ইচ্ছা তো হবেই। ভয় নয়, তবু সব মানুষেরই এ রকম আকাঙক্ষা থাকে। অনেকে আবার আত্মহত্যাও করে। তারাও মূর্খ, কিংবা আমি তাদের বুঝি না। ক’টা বাজল রে? এ বার বোধহয় আমার যাওয়ার সময় হয়েছে।
আমিও এবার উঠব। তোমার ছবিগুলোর জন্য তোমাকে অনেকেই মনে রাখবে।
মনে রাখুক বা না রাখুক, তাতে আমার বয়েই গেল। আমি তো তা জানতে পারছি না। হ্যাঁ রে, রবীন্দ্রনাথ নাকি আড়াই হাজার ছবি এঁকে গেছেন?
সে রকমই তো একটা হিসেব পাওয়া যায়।
অত লেখালেখি, কত গান, কত মিটিং তাঁর মধ্যে এত ছবি এঁকে গেছেন? কী অসাধারণ মানুষ! আমি তো এঁকেছি মাত্র দুশো আড়াইশো। ওঁর চোখে আমি একটা শিশু।
রবীন্দ্রনাথ অনেক ছোট ছবি, কাগজের উপর অনেক স্কেচ রেখে গেছেন, সেই সব মিলিয়ে আড়াই হাজার। রবীন্দ্রনাথ গ্রেট তো বটেই, কিন্তু তাঁর সঙ্গে তোমার তুলনাটা ঠিক নয়। তুমি এঁকেছ ক্যানভাসে, বেশির ভাগই অয়েলের কাজ। রবীন্দ্রনাথ তেল রং নিয়ে কিছু কাজ করেছেন কি না, তা আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তোমার ছবি তো বিদেশেও বিক্রি হয়েছে।
শোন, তোরা যারা ছবি আঁকার প্রক্রিয়াটা ঠিক জানিস না, তারা বুঝবি না, এখন তেল রঙের বদলে অ্যাক্রিলিকে অনেকেই কাজ করে। তাতে অনেকটা সময় বাঁচে। অ্যাক্রিলিক তাড়াতাড়ি শুকোয়। আমার কোনও ছবিই ঠিক যেন পারফেকশনে পৌঁছয়নি। তুই উঠছিস? ঠিক আছে আবার দেখা হবে কি না জানি না।
হ্যাঁ, দেখা হবে। তুমি এই নার্সিংহোমে থাক কিংবা বাড়িতে। আমি তার কাছাকাছি একটা কাজের ছুতোয় তোমার কাছে আসব।
শোন, আমি ধর্ম কিংবা মহাকাশ নিয়ে যা বলেছি, তা অতি সাধারণ কথা। আসলে ক্ষোভ কী জানিস, এখন আমার প্রায়ই মনে হয়, জীবন এত ছোট কেন? ভালবাসার সাধ তো মিটল না। এ বিষয়ে বোধ হয় তারাশঙ্করবাবুর একটা লেখা আছে। আমি কিছু মানুষের ভালবাসা পেয়েছি ঠিকই, তবু যেন এখন এক সময় বুকের মধ্যে খাঁ খাঁ করে। একা থাকলেই মনে মনে বলতে থাকি, ভালবেসে মিটল না সাধ, ভালবেসে মিটল না সাধ, মিটল না সাধ…
৯. ৫. ২০১২
Chapter - 9
অরসিকের প্রতি রস নিবেদন, ললাটে লিখো না, এই মিনতি
একটা গাছের ওপরের দিকে যদি কিছু ফল ফলে থাকে, তা হলে একজন লম্বা মানুষ হাত বাড়ালেই সেই ফল ছিঁড়ে নিতে পারে। কিন্তু একজন বেঁটে-বাঁটকুলও যদি সেই চেষ্টা করে, তা হলে তা দেখে লোকে হাসবে। সেই রকম, আমি একজন মূঢ় মানুষ হয়েও যদি কবি হিসাবে খ্যাতি পাওয়ার জন্য লালায়িত হই, তা হলে লোকের কাছে হাস্যাস্পদ হব।
এটা বিনয়-বচনের এক চরম উদাহরণ। কারণ, এ কথা যিনি বলছেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং কবি কালিদাস। ‘রঘুবংশ’ রচনার আগে তিনি এ কথা লিখেছিলেন। মূল সংস্কৃতে অবশ্য মূঢ় মানুষের বদলে রয়েছে ‘মন্দঃ কবিযশঃ প্রার্থী’। বাংলায় ‘মন্দ’কথাটার অন্য অর্থ হয়ে যায়। এখন আর ‘রঘুবংশ’ ক’জনই বা পড়ে। তবু ‘মন্দ কবি যশ প্রার্থী’ এক কালে ব্যবহার করতেন বাংলার কিছু কিছু কবি। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও বাংলা গদ্য রচনায় মাঝে মাঝেই ব্যবহৃত হত সংস্কৃত শব্দ বা প্রবাদ। পাঠকদের তা বুঝতে অসুবিধা হত না। কারণ, তখনও স্কুলে সংস্কৃত শিক্ষা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। আমি নিজেও সংস্কৃত পড়েছি। ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে। অবশ্য খুব একটা ইচ্ছের জোর ছিল না, তার কারণ, এই ভাষা শিক্ষার পদ্ধতিটা ছিল নীরস আর কৃত্রিম। প্রথমেই শব্দরূপ আর ধাতুরূপ মুখস্থ করতে হত। (নরঃ, নরৌ, নরাঃ ইত্যাদি) তবু যেটুকু শিখেছিলাম তা আজও কাজে লাগে।
অনেক প্রবাদের পশ্চাতেই থাকে একটা করে গল্প। পুরোটা লেখার দরকার হত না, একটা ছোট শব্দেই বাকিটা বোঝা যেত। যেমন, কাউকে জোর করে গলাধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বোঝাতে শুধু লেখা হত, প্রহারেণ ধনঞ্জয়ঃ। এর পিছনে গল্পটা কী? এক সময় চার লাইনের পুরো শ্লোকটিই আমার মুখস্থ ছিল। হঠাৎ কিছু দিন আগে একটা লাইন হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিছুতেই আর মনে পড়ে না। কোনও জানা জিনিস স্মৃতি থেকে পালিয়ে গেলে খুবই অস্বস্তি হয়। কোথায় খুঁজে পাব, তা জানি না। মানুষের স্মৃতি খুবই দুর্বোধ্য আচরণ করে। খুব প্রয়োজনীয় কোনও বিষয় স্মৃতি থেকে পিছলে চলে যায়। আবার কোনও এলেবেলে কথা মনে গেঁথে থাকে। যা যা হারিয়ে যায়, তাঁর মধ্যে দু’একটি আবার ফিরেও আসে। যেমন, আজ সকালেই সেই হারিয়ে যাওয়া পঙ্ক্তিটি মগজে কেন যে ফিরে এল কে জানে?
গল্পটা এই, এক বাড়িতে চারটি কন্যার স্বামীই ঘরজামাই। খায়দায়, আরাম করে, কিছুতেই যেতে চায় না। জোর করে তো তাড়িয়ে দেওয়া যায় না, জামাই বলে কথা। এদের মধ্যে যার নাম হরি, সে এক দিন খেতে বসে দেখল, তার পাতে ঘি দেওয়া হয়নি। তাতে অপমানিত বোধ করে সে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেল (হবিৰ্বিনা হরির্যাতি)। তার পর একদিন মাধব নামে জামাই দেখল, খাওয়ার জন্য তার আসন পেতে দেওয়া হয়নি, তখন সে-ও সরে পড়ল (বিনা পীঠেন মাধবঃ) পরের জামাই পুণ্ডরীকাক্ষ দেখল, তার ভাতে কাঁকর (কদনৈঃ পুণ্ডরীকাক্ষঃ)। শেষ জামাইটি আর কিছুতেই যেতে চায় না। কোনও অপমানই সে গায়ে মাখে না। তারপর এক দিন তার শালারা তাকে মারধর শুরু করতে সে পালাতে বাধ্য হল (প্রহারেণ ধনঞ্জয়ঃ)।
যস্মিন দেশে যদাচারঃ— একটা বহুব্যবহৃত উৎপ্রেক্ষা। অর্থাৎ যে দেশে যা আচারবিচার তা মেনে চলতে হয়। এর পিছনে কোনও কাহিনি নেই। কিন্তু রয়েছে এক বিচিত্র তালিকা। যেমন, মগধ দেশে মদ্যপানে কোনও দোষ নেই। কলিঙ্গে অন্ন বিচার আর যৌন বিচার নেই। ওড্র দেশে (এখন এর নাম অন্য কিন্তু সেটা আমি উল্লেখ করতে চাই না) ভ্রাতৃবধূ উপভোগে দোষ নেই। গৌড়ে মাছ খাওয়ার দোষ নেই। আর দ্রাবিড় দেশে মামাতো বোনকে বিয়ে করা যায়।
অনেক প্রবাদই কবি কালিদাসের নামে চলে। সেগুলির ঐতিহাসিক সত্যতা কতখানি, তা বলা শক্ত। এক দিন কবি যাচ্ছেন রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভায় যোগ দিতে। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় তাঁর স্ত্রী বললেন, বাড়িতে কিন্তু চাল বাড়ন্ত, ও বেলা আমরা কী খাব, তার ঠিক নেই। বাড়িতে চাল নেই, টাকাপয়সাও নেই কালিদাসের কাছে। তবু রাজার ডাকে যেতে তো হবেই। বৈঠক চলছে অনেকক্ষণ, রাজা বিক্রমাদিত্য লক্ষ করলেন কালিদাস অন্য দিনের মতো হাস্যকৌতুকে যোগ দিচ্ছেন না। কবিতার লাইনও বলছেন না। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমার কী হয়েছে কবি?
কবি বললেন, দারিদ্র হচ্ছে ছাই দিয়ে ঢাকা আগুনের মতো। তাতে গুণের স্ফুরণ হয় না। অন্নচিন্তায় কাতর হলে কবিতা আসবে কী করে? ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা কাতরে কবিতা কৃতঃ।’ পৃথিবীর নানা ভাষার অনেক কবিই কখনও না কখনও এ রকম কথা উচ্চারণ করেছেন। ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’, চমৎকারা শব্দটির ব্যবহার অত্যাশ্চর্যজনক।
‘ন যযৌ ন তস্থৌ’— এই ব্যাপারটা বোঝাবার জন্য কোনও বাংলা শব্দ নেই। দেবী পার্বতী যখন মহাদেবকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার কল্পনায় গভীর তপস্যায় নিমগ্ন, তখন স্বয়ং শিব ছদ্মবেশে এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। এবং খুব শিব-নিন্দা করতে লাগলেন। পার্বতী তখন কানে হাত চাপা দিয়ে সে স্থান থেকে সরে যেতে চাইলেন। মহাদেবও ছদ্মবেশ খুলে দাঁড়ালেন তাঁর পথ রোধ করে। তখন পার্বতীর কী অবস্থা, তিনি যাওয়ার জন্য যে পা তুলেছিলেন, দাঁড়িয়ে রইলেন সেই ভাবে। এই সময়ের বর্ণনা দিতে কালিদাস লিখেছেন, নদী যখন কোনও পাহাড়ের কাছে গিয়ে আটকে যায়, তখন সে এগোতেও পারে না, আবার স্থির হয়েও থাকতে পারে না। পার্বতীর অবস্থা সে রকম, ন যযৌ ন তস্থৌ!
একটি প্রবাদ আমার ছেলেবেলা থেকেই প্রিয়। কোন অজ্ঞাত কবি এ রকম একটি মোক্ষম উক্তি করেছিলেন তা জানি না। ‘শিরসি মা লিখ’ পড়লেই সেটা মনে পড়ে যায়। কবি বিধাতাকে অনুরোধ জানিয়ে বলছেন, তুমি আমাকে যত রকম দুঃখ দিতে চাও, দাও। কিন্তু কোনও বেরসিকের কাছে রসের নিবেদন করার যে দুঃখ, তা আমার কপালে লিখো না, লিখো না। ‘অরসিকেযু রসস্য নিবেদনং শিরসি মা লিখ, মা লিখ।’
২৩. ৫. ২০১২
যে সব প্রশ্নের কিছুতেই উত্তর খুঁজে পাই না
কয়েকটি ব্যাপারে আমার মনের মধ্যে খটকা রয়ে গেছে, কিছুতেই তার উত্তর খুঁজে পাই না। কোনও রকম যুক্তি দিয়েও তা মেলানো যায় না।
প্রথমেই ধরা যাক, একজন শিক্ষিত মানুষ আর একজন অশিক্ষিত মানুষের মুখের ভাব আলাদা হয় কেন? এখানে আমি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কিংবা উপকার বিষয়ে প্রবন্ধ ফাঁদতে বসিনি, কিংবা প্রকৃত শিক্ষা কাকে বলে, কিংবা পুঁথিগত শিক্ষার চেয়েও যারা নিরক্ষর হলেও, যারা জীবন ও প্রকৃতি থেকে উচ্চাঙ্গের পাঠ নিতে সক্ষম, তাদেরও শিক্ষিত বলা যাবে কি না, এই সব গূঢ় প্রশ্ন তুলতে চাই না। খুবই সাদামাঠা ভাবে, যারা স্কুল-কলেজে মাঝারি ধরনের শিক্ষা পেয়েছে, তাদের তুলনায় যারা এই শিক্ষার সুযোগ পায়নি কিংবা নেয়নি, তাদের মুখভঙ্গির কেন তফাত হয়ে যায়, তা নিয়েই খটকা। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন একজনও নিরক্ষর মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, কিন্তু আমাদের দেশে এ রকম মানুষের সংখ্যা বিপুল। তাদের দেখলেই আমরা বুঝতে পারি। দু’চারটে ক্ষেত্রে ভুল হতেই পারে, তা ব্যতিক্রম হিসেবেই গণ্য। কী ভাবে আমরা এটা বুঝতে পারি, তার কোনও যুক্তি আমরা খুঁজে পাই না।
গ্রামের মানুষ আর শহুরে মানুষের মধ্যে এই তফাত? গ্রামের মানুষের মধ্যেই শিক্ষাহীনদের সংখ্যা বেশি, এটাও তো ঠিক। কিন্তু আজকাল গ্রামাঞ্চলে যেখানে শিক্ষার সুযোগ আছে, সেখানে অনেক ছেলেমেয়েই আগ্রহের সঙ্গে পড়তে যায়। কিশোরী মেয়েরা অল্পবয়সে বিয়ের বদলে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে, প্রায়ই তো এ রকম শোনা যাচ্ছে। আবার, গ্রাম থেকে জীবিকার খোঁজে যে-সব নিরক্ষর মানুষ শহরে আসে, শহরেই বহু বছর থেকে যায়, স্কুল-টুলে যাওয়ার সুযোগ নিতে পারে না, তাদেরও তো শুধু শহুরে হওয়ার সুবাদেই মুখের ছাঁদ বদলায় না। আমি এ রকম দু’চার জনকে চিনি। আবার গ্রামে বসেই যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাদেরও মুখের ছাপ বদলে যায়।
শিক্ষা মানুষকে কী দেয়? আত্মবিশ্বাস? না, আমি এটা মানতে রাজি নই। অনেক শিক্ষিত মানুষকেই দেখেছি, অস্থির ও দুর্বল চিত্ত। এদের অনেকেই জ্যোতিষীদের কাছে যায়। শিক্ষা মানুষকে বৃহত্তর জগৎসংসারের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেয় বলেই এ রকম পরিবর্তন ঘটে? ধনী কিংবা দরিদ্র, শহুরে বা গ্রাম্য, প্রত্যেক শিশুরই জন্মের পর কয়েক বছর মুখের ভাব একই রকম থাকে, তার পর তাদের মধ্যে যারা স্কুলে পড়তে যেতে শুরু করে, তাদের মুখের চামড়াও আস্তে আস্তে বদলে যায়, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? না!
ভাষা কিংবা ধর্ম বিশ্বাসের জন্যও কি মানুষের মুখচ্ছবি নানা রকম হতে পারে? শিশুদের কোনও ভাষা বা ধর্মবোধ থাকে না, সে সব আস্তে আস্তে অর্জন করতে হয়। সে জন্য তাদের পোশাক কিংবা ভাষারও পরিবর্তন হয়, কিংবা শারীরিক চিহ্ন, যেমন হিন্দু মাথায় টিকি কিংবা মুসলমানদের গোঁফবিহীন দাড়ি। এখন অবশ্য অনেক ধর্মীয় মানুষের ওই সব চিহ্ন আর থাকে না, পোশাকও একই রকম, দূর থেকে তাদের মুখের ভাষা না শুনেও, শুধু দেখে কী ভাবে বলা যাবে যে তারা কোন ধর্মের আশ্রিত? কোনও যুক্তি নেই, তবু এক-এক সময় বোঝা যায় কিন্তু।
টিভি’তে অন্য এক ভাষার ধারাবাহিক দেখতে দেখতে আমার স্ত্রী ওর নায়িকা সম্পর্কে বলেছিলেন, ওই মেয়েটাকে খুব বাঙালি-বাঙালি দেখতে!
এই বাঙালি-বাঙালি ব্যাপারটা কী? কিছু কাল আগেও বাঙালি হিন্দু রমণীদের শাড়ি পরার ধরন এবং ঘোমটা ছিল মুসলমান রমণীদের চেয়েও বেশ আলাদা, আর বাঙালি বাবুদের কোঁচা দোলানো ধুতি। কিন্তু এখন তো তা ঘুচে-মুচে গেছে। বিশেষ কোনও অনুষ্ঠান ছাড়া কাজের জীবনে হিন্দু ও মুসলমানের পোশাকের তফাত থাকে না, তাদের মুখের ভাষা না-শুনেও দূর থেকে তাদের চিহ্নিত করার কোনও উপায় থাকে না, তবু মাঝে মাঝে চেনা যায়ও ঠিক।
এর মধ্যে চেক রিপাবলিকের প্রাগ (প্রাহা) শহরে বইমেলা উপলক্ষে ভারতীয় লেখকদের একটি প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে আমাকে যেতে হয়েছিল। কয়েকটি সেমিনারে দর্শক বা শ্রোতা খুবই কম। কারণ, কোনও ভারতীয় ভাষার বোঝার তো কোনও প্রশ্নই নেই, অনেকেই ইংরিজিও জানে না, দোভাষীর মাধ্যমেও জমে না। আমাদের দোভাষিনীর ইংরেজি জ্ঞানও বেশ কম। অনুষ্ঠানের মধ্যপথে চার-পাঁচ জনের একটি দল এসে পেছন দিকে বসল। এখন পৃথিবীর সব দেশে কিছু না কিছু বাঙালি থাকে। এখানে এ পর্যন্ত কোনও বাঙালির সঙ্গেই যোগাযোগ হয়নি। ওই দলটির মধ্যে এক জন যুবককে দেখেই মনে হল, এ নিশ্চয়ই বাঙালি।
কী করে মনে হল? গায়ের রং দেখে বলা যায় যে সাহেব নয়, তবে ভারতের যে-কোনও রাজ্যের বা বাংলাদেশের বা পাকিস্তানের বা শ্রীলঙ্কার হতে পারে। সাধারণ প্যান্ট-শার্ট পরা। আলাদা কোনও রকম বৈশিষ্ট্যই নেই। নিজের মনকেই জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী করে ওকে বাঙালি ঠাওরালে? মন বলল, মনে তো হল। তার আমি কী করব? যুক্তিহীন বিশ্বাস আমি কোনও কালেই পছন্দ করি না, তাই নিজের মনের সঙ্গেই তর্কাতর্কি শুরু হল।
অনুষ্ঠানের শেষে সেই পাঁচ জন নারী-পুরুষের দল এগিয়ে এল মঞ্চের দিকে। যুবকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দাদা, আপনি…। সে শুধু নয়, পাঁচ জনই বাঙালি। যুবকটি বাংলাদেশি, তাঁর নাম মামুন। সে এই শহরে একটা রেস্তোরাঁ চালায়। সেখানে আজ সন্ধেয় আমাদের আমন্ত্রণ।
তবু, কিছুতেই আমার খটকা মিটল না। কেন আমি তাকে বাঙালি বলে ধরে নিলাম? আগে থেকেই!
অতৃপ্তি এবং আগুন
শুনেছি, না শুধু শুনিনি, কৃষ্ণনগরবাসী বিখ্যাত গবেষক সুধীর চক্রবর্তীর একটি লেখায় পড়েছি, অমিয়নাথ সান্যাল তাঁর বাড়ির উঠোনে তাঁর রচিত গ্রন্থের স্তূপে নিজেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। অমিয়নাথ সান্যাল আমার খুব প্রিয় লেখক, তাঁর একটি বই পড়ে আমি তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, যদিও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি কখনও। বইটির নাম ‘স্মৃতির অতলে’। উচ্চাঙ্গ সংগীতের কয়েক জন অসাধারণ শিল্পী ও ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী রচনা বাংলায় আগে কখনও লেখা হয়নি। আমি নিজে এই বই কয়েকটি কিনে কিনে বন্ধুদের উপহার দিয়েছি। কোন ক্ষোভে, কোন মর্মযাতনায় তিনি সেই রচনা আগুনে পুড়িয়ে দিলেন, তা জানি না। অবশ্য অনুমান করা শক্ত নয়।
সম্প্রতি ‘চরাচর সারে’ নামে একটি বই আমার হাতে এল। এর শেষ মলাটে লেখা আছে যে, এই লেখক দিবাকর ভট্টাচার্য তাঁর উত্তরাধিকারীদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সমস্ত লেখাপত্তর যেন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ছেলে রঞ্জন ভট্টাচার্য একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক, তিনি বাবার নির্দেশ মানেননি। বারোটি গল্প নিয়ে একটি সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে সদ্য। বইটি একবার আদ্যোপান্ত পড়া শেষ করে আবার পড়তে ইচ্ছে হয়েছে আমার, এমনই অসাধারণ সেই সব রচনা। যেমন ভাষাজ্ঞান, তেমনই চিন্তার গভীরতা। রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, তাঁর স্ত্রী— এই সব চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে।
তাঁর আসল নাম হরেরাম ভট্টাচার্য, জয়নগর মজিলপুরে জন্ম, উচ্চশিক্ষিত, সারা জীবনই প্রায় অধ্যাপনা করেছেন অর্থনীতিতে। ভাগ্যিস আগুন তাঁর রচনাগুলি ছুঁতে পারেনি। তাঁর অন্য রচনাও অবিলম্বে প্রকাশ হওয়া উচিত।
৬. ৬. ২০১২
সোনার জিভ, দুই চোখের মণিতে হিরে
গভীর নিশুতি রাত। চতুর্দিক নিস্তব্ধ। যেন সারা শহরের মানুষকে কোনও মন্ত্রবলে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এখন কৃষ্ণপক্ষ, আকাশেও কোনও আলো নেই। একটা গাছ থেকে খসে-পড়া দুটি শুকনো পাতা, মাটিতে এ দিক ও দিক ঘুরঘুর করছে, শোনা যাচ্ছে সামান্য খরখর শব্দ, দিনের বেলায় এই শব্দ শোনাই যেত না, এখন মনে হচ্ছে বেশ জোরালো। এমনও মনে হতেই পারে যে এরা যেন জীবন্ত, কেউ দেখছে না বলেই এরা যেন খেলাধুলো কিংবা নাচে মেতে আছে।
সারা দিনের তুলনায় রাত্রির শহরের যেন কোনও মিলই নেই। দিনের বেলা অতি ব্যস্ত রাস্তা গাড়ি-ঘোড়া, মানুষের দৌড়াদৌড়ির শব্দে কানে তালা লাগিয়ে দেয়। এমনকী সুমধুর নিস্তব্ধতা আর অনাবিল মৃদু বাতাস।
এই রাস্তায় কিছু খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে, বোধহয় পাইপ-টাইপ কিছু বসানোর ব্যাপার। এখনও শেষ হয়নি। একটা জায়গায় কিছু ত্রিপলের স্তূপ উঁচু হয়ে আছে, মনে হয় দরকারি মালপত্তর কিংবা মেশিন টেশিন ঢাকা দেওয়া আছে। হঠাৎ দেখা গেল, সেই স্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছে খুব সতর্ক ভাবে তিন জন মানুষ। আঠেরো থেকে তিরিশের মতো বয়স। চকচকে খালি গা, হাতে কী সব রয়েছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
এরা কারা?
আমাদের দেশের রাত্রিকে চারটে প্রহরে ভাগ করা হয়। এ বিষয়ে একটা হিন্দি ছড়া আছে। ‘পহেলা প্রহরমে সব কোই জাগে/দুসরা প্রহরমে ভোগী।’ অর্থাৎ রাত ন’টা দশটা পর্যন্ত প্রথম প্রহর। তখন মোটামুটি সবাই জেগেই থাকে। আর দ্বিতীয় প্রহরে মোটামুটি রাত সাড়ে বারোটা একটা। তখন প্রায় সবাই বিছানায় চলে যায়। তখন স্বামী স্ত্রী কিংবা যে কোনও নারী পুরুষের যৌনক্রিয়া বেশ ভাল জমে। তার পর ‘তিসরা প্রহরমে চৌরা জাগে/চৌঠা প্রহরমে যোগী।’
তৃতীয় প্রহরে শুধু চোর নয়, ডাকাত, খুনে, ধর্ষক, নারী পাচারকারী আর এই ধরনের মানুষজনদের কাজকর্ম শুরু হয়। মোটামুটি রাত দেড়টা থেকে চারটে। এখন রাত তিনটে। এই তিন জন লোক সেই তৃতীয় প্রহরের জীব।
দেওয়াল ঘেঁষে খুব সাবধানে এই তিন জন এগোতে লাগল সামনের দিকে। একটু পরেই ডান দিকে একটা বেশ পুরনো আমলের কালী মন্দির। অনেকেই বলে, এই রক্ষেকালী খুব জাগ্রত দেবী। এঁর পুজো দিলে মামলার জয়, সন্তানপ্রাপ্তি, সর্বরোগ-হর মাদুলি ইত্যাদি পাওয়া যায়। সারা দিন এখানে ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে। সামনের গেট বন্ধ হয় রাত দশটায়। আবার খোলে সকাল ছ’টায়। একজন মাত্র সেবাইত থাকে ভিতরে।
এই তিনজন প্রথমেই খুলে ফেলল গেটের তালা। এরা তালা খোলায় এক্সপার্ট। একটা গাবদা গোছের তালা তো এদের পক্ষে নস্যি। মন্দিরটার চার পাশে এরা এক পাক ঘুরতেই দেখা গেল সামনের চাতালটায় বসে আছেন সেই সেবাইত। ইনি কর্তব্যে অবহেলা করেন না। বিছানা পেতে শুতে যান না, সারা রাত বসে থাকেন ওই চেয়ারে। বসে থাকতে থাকতে যদি ঘুম এসে যায়, তাতে ইনি কী করবেন! এরা আগে থেকেই খবর নিয়েছে যে সেবাইত মহাশয়ের ঘুম খুব গাঢ়। এখন ওঁর গলায় একটা টিকটিকি ছুড়ে দিলেও ইনি জাগবেন না। তবু সাবধানের মার নেই। একজন কাছে গিয়ে ওঁর নাকে একটা ক্লোরোফর্ম ভেজানো ন্যাকড়া চেপে ধরল। এখন তিন চার ঘণ্টার জন্য নিশ্চিন্তি।
সারা মন্দির তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তেমন কোনও দামি জিনিস পাওয়া গেল না। এক দিনের প্রণামী বাবদ রয়েছে হাজার তিনেক টাকা। তাতে কি পড়তা পোষায়? তাও খুচরোই বেশি। আজকাল ওই সব খুচরো দোকানদাররা নিতে চায় না। ভিখিরিরাও প্রত্যাখান করে। মায়ের মাথায় একটা মুকুট, ভাল করে দেখলেই বোঝা যায়, আসল সোনা নয়, ঝুটো।
নিরাশ হতে হতে একজন চোর মূর্তির পিছন দিকে গিয়ে একটা ব্যাপার আবিষ্কার করে ফেলল। সেখানে রয়েছে আর একটা দরজা। সেটা খুলতেই দেখা গেল, সেখানে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট কালী মূর্তি। সেটার দিকে তাকাতেই প্রথমে চোখ ঝলমলিয়ে যায়। একে বলে গর্ভগৃহ। এখানে খুব কম মানুষেরই প্রবেশের অধিকার থাকে।
এখানে কোনও কিছুই নকল নয়। মাথায় সত্যিকারের সোনার মুকুট। গায়ের কিছু অলংকারও আসল। চোখ দুটি সোনার পাতের। মাঝখানে হিরে বসানো। জিভটাও সোনার। একমাত্র ধনী ভক্তরাই এখানে মায়ের পুজো দিতে পারে। নতুন নতুন গয়না গড়িয়ে দেয়। হিন্দু ধর্মে তো আছেই, যে যত বেশি পয়সা খরচ করতে পারে সে তত বেশি পুণ্য অর্জন করে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই মূল কালীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ওই তিন চোর কী করবে? ধরা যাক, এটা একটা ছোট গল্প। এর পর কী ঘটতে পারে? চোর তিনটে কি পটাপট মায়ের মূর্তি থেকে মূল্যবান গয়না খুলে নেবে? খুবলে নেবে চোখ দুটো? শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কিংবা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এর পর কী করতেন? এঁরা দু’জনেই আমার সমসাময়িক। আমি এঁদের দুজনেরই ভক্ত। এই দু’জনেই কালজয়ী লেখক তো বটেই, তা ছাড়াও তাঁরা গভীর ভাবে ধর্ম বিশ্বাসী। কয়েকটি ছিঁচকে চোর তাদের নোংরা হাতে জাগ্রত দেবী মূর্তির অঙ্গ স্পর্শ করবে, তা কি তাঁরা মেনে নিতেন? নিশ্চয়ই তাঁরা এখান থেকে গল্পের গতি ঘুরিয়ে দিতেন অন্য দিকে। কী ভাবে তাঁরা তা করতেন, তা আমি জানব কী করে? ওঁদের মতো কল্পনাশক্তি কিংবা ভাষাজ্ঞানও আমার নেই।
আমার অবস্থা খানিকটা শোচনীয়। আমার নাস্তিকতার কথা অনেকেই জেনে গেছে। কিন্তু আমি নাস্তিকতা প্রচারের জন্যও কোনও চেষ্টা করি না। একমাত্র আমার স্ত্রী ছাড়া আর কারও সঙ্গে তর্কও করি না এ বিষয়ে। আমার অবস্থান, কমলকুমার মজুমদারের গল্পের সেই ছোট ভাইটির মতন। যদিও আমি বুট জুতো পরে রান্নাঘরে খাওয়ার কথা ভাবি না। কিংবা কেউ কোনও পুজোর প্রসাদ দিলে তা থেকে পচা কলার টুকরো বেছে ফেলে দিয়ে বাকিটা বিনা আপত্তিতে খেয়ে ফেলি। কেউ যদি আমাকে এই বিষয়ে একটা গল্প লেখার জন্য অনুরোধ করতেন, আমি হাত জোড় করে বলতাম, ক্ষমা করবেন। এ বিষয়ে কিছু লেখার ক্ষমতা আমার নেই।
তবু খবরের কাগজে তো মাঝে মাঝেই মন্দির থেকে দেবদেবীর গয়না চুরির ঘটনা পড়ি। কিন্তু যারা ধরা পড়ে, তাদের নাম তো থাকে না। হিন্দু চোরদের পক্ষে এ কাজ কি সম্ভব? তারা এতটাই নির্ভীক আর নাস্তিক হয়ে গেছে? তবে কি এরা সবাই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ? বাল্যকাল থেকেই যাদের মনে মূর্তি পুজো নিয়ে আবেগ তৈরি হয়নি, তাদের পক্ষে এই সব হিন্দু দেবদেবী সম্পর্কে ভয় বা ভক্তিসঞ্চারের সম্ভাবনাও থাকে না।
অন্য সম্প্রদায় বলতে যদি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের বোঝায়, তা হলে নাম-টামের উল্লেখ না-করাই ভাল। তাতে আবার অন্য ঝঞ্জাট সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ আইনে তাদের বিচার হওয়াই উচিত।
২০. ৬. ২০১২
শেক্সপিয়ার, বিবেকানন্দ এবং মহাভারত
আমার লেখার টেবিলের ঠিক সামনের দেওয়ালের র্যাকে কয়েকখানা বইয়ের মধ্যে রয়েছে একখণ্ডে শেক্সপিয়ারের সমগ্র রচনাবলি। তার মানে অবশ্য এই নয় যে আমি ওই বইটি মাঝে মাঝে পড়ি। অত শখ আমার নেই। এই সব বই সাজিয়ে রাখলেই ভাল দেখায়, মাঝে মাঝে শুধু ধুলো ঝাড়তে হয়।
কয়েক দিন আগে এক সকালে মনে হল, সেই বইটি নামিয়ে ম্যাকবেথ নাটকটিতে একবার চোখ বুলিয়ে নেব নাকি? কারণ, সে দিন সন্ধেবেলায় স্বপ্নসন্ধানী দলের প্রযোজনায়, কৌশিক সেনের পরিচালনা ও অভিনয়ে ম্যাকবেথ নাটকটি দেখতে যাওয়ার কথা। বইটির দিকে হাত বাড়িয়েও থেমে গেলাম। মনে হল, থাক দরকার নেই।
ম্যাকবেথের গল্প তো সবাই জানে। অনেক কাল আগে আমি মূল নাটকটি পড়েওছি কোনও কারণে, কিন্তু এখন অনেক কিছুই মনে নেই, অনেক চরিত্র ও সংলাপ, এখন বই পড়ার বদলে মঞ্চরূপ দেখলে নতুনের মতনই মনে হবে। সব শিল্প-সাহিত্যেই যে মৃদু সাসপেন্স থাকে তা-ও উপভোগ করা যাবে।
সেই গিরিশবাবুর আমল থেকেই শেক্সপিয়ার বাংলা রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত। প্রধান প্রধান নাটকগুলির একাধিক অনুবাদ করেছেন অনেক বিশিষ্ট লেখক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক গৃহশিক্ষকের আদেশে ম্যাকবেথ অনুবাদ করতে শুরু করেছিলেন। প্রত্যেক দিন কয়েক পাতা করতেই হবে। যে দিন রবীন্দ্রনাথ ফাঁকি দিতে চাইতেন, সে দিন তাঁকে ঘরে আটকে রাখা হত। কয়েক পাতা অন্তত অনুবাদ না-দেখাতে পারলে তাঁকে ছাড়া হত না।
রবীন্দ্রনাথ পুরো নাটকটির অনুবাদ শেষ করতে পেরেছিলেন কি না, সে আমরা জানি না। কারণ সেটা পাওয়া যায়নি। তবে সেই অনুবাদের কয়েকটি পৃষ্ঠা সেই কিশোর কবি শোনাতে গিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর মশাইকে। বিদ্যাসাগর সে সম্পর্কে কী মতামত দিয়েছিলেন, তাঁর কোনও রেকর্ড নেই। (সেই সময় রবীন্দ্রনাথ অন্য এক শিক্ষকের প্ররোচনায় সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করেছিলেন কালিদাসের নাটক কুমারসম্ভব। ওই বয়সে একই সঙ্গে দুটি ভাষার দুটি ক্লাসিক রচনার অনুবাদে ব্যাপৃত হওয়ার মতো অসাধারণ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনও ভাষায় আছে কি?)
সৌভাগ্যবশত আমার সিটটা মৃণাল সেনের ঠিক পাশেই। ওঁর কত বয়স তা বোঝাই যায় না। তিনি এখনও নিয়মিত নতুন নতুন নাটক বা তরুণ পরিচালকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ফিল্ম আর রুচিসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসেন। স্মৃতিশক্তি এখনও বিস্ময়কর। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় তাঁর কাছে রয়েছে অনেক গল্পের ঝুড়ি। ম্যাকবেথ কে কে অনুবাদ করেছেন, সেই সব আলোচনা করতে করতে মৃণালদা বললেন, তাঁদের যৌবনকালে বঙ্গবাসী কলেজের এক অধ্যাপক (নাম উল্লেখ করছি না আমি) ম্যাকবেথের অনুবাদ করেছিলেন। মূল নাটকের এক জায়গায় ছিল ও হরর, হরর, হরর। (ম্যাকবেথের উক্তি) তার অনুবাদ ছিল ত্রাস, ত্রাস, ত্রাস। এর সমালোচনায় ইংরেজি স্টেটসম্যান পত্রিকা (এক সময় এই পত্রিকাটিকে বাঙালিরা বেশ ভক্তিশ্রদ্ধা করত) লিখেছিল, ট্র্যাশ, ট্র্যাশ, ট্র্যাশ।
এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, কোনও রকম উপলক্ষ নেই, কোনও কিছু উদ্যাপনের দায় নেই, তবু কলকাতার রঙ্গমঞ্চে পুরোপুরি আধিপত্য করতে এসেছেন শেক্সপিয়ার। সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়ে সমৃদ্ধ কিং লিয়র। বিভাস চক্রবর্তীর সুদক্ষ পরিচালনায় আর সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণীয় অভিনয় এবং নতুন আঙ্গিকে হ্যামলেট। এই কৌশিক সেনের দলের ম্যাকবেথ। এ ছাড়াও রোমিও জুলিয়েট, মিড সামার নাইটস ড্রিম, অ্যাজ ইউ লাইক ইট-এর মতন আরও কয়েকটি নাটকেরও বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। সত্যিই, হঠাৎ এত শেক্সপিয়ার কেন? ধন্য শেক্সপিয়ার।
কৌশিক সেনের অভিনয় প্রতিভার আমি অনেক দিন থেকেই ভক্ত। কয়েক দশক আগে ‘স্লুথ’ নামে একটি ইংরেজি নাটক খুব জনপ্রিয় হয়েছিল ইংল্যান্ড-আমেরিকায়। তাতে দু’জন মাত্র অভিনেতা তিনটি চরিত্রে এক রুদ্ধশ্বাস রহস্য- কাহিনি জমিয়ে দিতেন। বাংলায় টিকটিকি নামে তার রূপান্তর মঞ্চস্থ হয়েছিল। তাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতন অভিজ্ঞ ও দক্ষ অভিনেতার সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়েছিলেন কৌশিক সেন এক তরুণ। আমি বিদেশে মূল ইংরেজি নাটকটি দেখেছি। আর কলকাতায় টিকটিকি। আমার মতে বাংলা নাটকটির রূপান্তর কোনও অংশেই কৃতিত্বে কম নয়, হয়তো বেশি। এর পর কৌশিকের দলের ‘মুখোমুখি বসিবার’ নামে ব্রাত্য বসুর নাটকটিতে অন্য রকম স্বাদ পেয়েছি। এখন তো কৌশিক থিয়েটার আর সিনেমায় সমান ভাবে সার্থকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।
কৌশিক সেনের মুখশ্রী ও কণ্ঠস্বরে বেশ নরম ও মায়াময় ভাব আছে। সম্ভবত সে জন্যই তাঁকে অন্তর্মুখী চরিত্রেই বেশ মানায়। সেই ইমেজটা বদলাবার জন্যই কি কৌশিক সেন ম্যাকবেথের মতন এক কঠোর রুক্ষ চরিত্রে নেমেছেন? তাতেও তিনি সার্থক হয়েছেন অবশ্যই। তবে দ্বিধাদীর্ণ ম্যাকবেথের দাপাদাপির মধ্যেও মাঝে মাঝে হঠাৎ সেই কোমল, মায়াময় রূপটি উঁকি মেরেছে।
বাংলায় ম্যাকবেথের নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। ইদানীং কালে তিনি নাট্যকার হিসেবে সুপরিচিত। এতেও তাঁর সংলাপগুলি বেশ স্বচ্ছন্দ। মুশকিল হচ্ছে, এই যে ম্যাকবেথ নাটকটিই বেশ নাটকীয়। সর্বক্ষণ টান টান হয়ে দেখতে হয়। এক এক দৃশ্যে মঞ্চে অনেক মানুষের উপস্থিতি এবং এ কালের ফিজিক্যাল অ্যাকটিং-এর মান্যতায় দৌড়াদৌড়িও অনেক আছে। এত সব চরিত্রের অভিনয়ে কোথাও কারও পদঙ্খলন ঘটেনি। উচ্চারণও নিখুঁত। এতে পরিচালকের পরিশ্রম ও সার্থকতারই পরিচয় পাওয়া যায়। লেডি ম্যাকবেথ সমেত অন্যান্য প্রধান চরিত্রগুলিও যথাযথ। স্বপ্নসন্ধানীর পরিবেশনায় এই ম্যাকবেথ সাম্প্রতিক কালের এক বিশেষ উল্লেখযোগ্য নাটক হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত।
অতঃপর বিবেকানন্দ
রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শত বছরের উদ্যাপন সদ্য শেষ হল। এ বারে তাঁর থেকে দেড় দু’বছরের ছোট স্বামী বিবেকানন্দ এসে পড়লেন। তাঁকে কেন্দ্র করে নানান উৎসবের মধ্যে নাটকের স্থান থাকাও স্বাভাবিক। এর মধ্যেই দুটি নাটক দেখার সৌভাগ্য হল আমার। তার একটি চন্দন সেনের পরিচালনায় ‘যুগনায়ক’ অন্যটি গণকৃষ্টির প্রযোজনায় উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিলে।’ এর পরিচালক ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়।
বিবেকানন্দর জীবন নিয়ে নাটক রচনা খুব ঝুঁকিবহুল। সেই মহাপুরুষের অগণিত ভক্তদের শ্যেন দৃষ্টির কথা মনে রাখতেই হয়। কোনও রোমান্সের দৃশ্যের প্রশ্নই ওঠে না। নরেন দত্তর স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে রূপান্তর ছাড়া আর কোনও নাটকীয় ঘটনাই নেই। যত দূর সম্ভব না-ছুঁই পানিতে মাছ ধরতেই হয় এবং তা বক্তৃতাবহুল হতে বাধ্য।
‘যুগনায়ক’-এ কৈশোরের নরেন আর বিশ্ববিখ্যাত বিবেকানন্দর ভূমিকায় আছেন দু’জন অভিনেতা। আর ‘বিলে’ নাটকে আরও বাচ্চা বয়সের নরেন আর স্বামী বিবেকানন্দকে মুখোমুখি আনা হয়েছে বারবার। তাদের কাল্পনিক সংলাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অনেক ঘটনার। প্রথম দিকে যুগ্ম নাট্যকার মানস দাশগুপ্ত ও চন্দন সেনের এই পরিকল্পনা অভিনব মনে হয়েছে। শেষের দিকে তা খানিকটা কৃত্রিমতায় আক্রান্ত।
দ্বিতীয় নাটকটিতে বিবেকানন্দর ভূমিকায় আছেন দেবশঙ্কর হালদার। এই প্রতিভাবান অভিনেতার যে কোনও নাটক দেখার জন্যই আমি উন্মুখ হয়ে থাকি। কিন্তু এই নাটকে দেবশঙ্কর বিশেষ কোনও সুযোগ পাননি, যেন একমেটে মূর্তি, তাতে রং লাগেনি। যুগনায়ক নাটকে বিবেকানন্দর ধর্মীয় ভূমিকার চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর সমাজ সংস্কারকের পরিচয়। তাতে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন শান্তিলাল। দুটি নাটকই অবশ্য দ্রষ্টব্য।
এবং মহাভারত
এখনকার গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো সংস্থা বহুরূপী। ছেলেবেলা থেকেই এই দলের নাটক দেখছি নিয়মিত। এখন শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, সবিতাব্রত দত্ত, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কুমার রায় নেই। তবু কয়েক জন নিষ্ঠাবান নাট্যপ্রেমিকের উদ্যোগে দল ভেঙে যায়নি, বরং নতুন নতুন নাটকের প্রযোজনায় এগিয়ে চলেছে। আমারই ভাগ্যদোষে গত কয়েক বছর বহুরূপীর কোনও নাটক আমার দেখা হয়নি। কয়েক দিন আগে হঠাৎ এই দলের নতুন নাটক ‘নানা ফুলের মালা’ দেখার সুযোগ এসে গেল।
নবীন নাট্যকার অলখ মুখোপাধ্যায়ের এই নাটকের পরিচালক দেবেশ রায় চৌধুরী, বিষয়বস্তু মহাভারতের একটি অংশের নতুন ইন্টারপ্রিটেশন। এতে দুর্যোধনকে নিছক ভিলেনই সাজানো হয়নি। নানা রকম ফুলের মালা একটি প্রতীক। সেই মালাটি বার বার কণ্ঠবদল করেছে।
দুর্যোধনের বক্তব্য এই যে, নানান রাজ্য মিলিয়ে এই দেশ। সেই সব রাজ্যের আলাদা আলাদা ভাষা, আলাদা সংস্কৃতি, সেই সব নষ্ট না-করে, সামগ্রিক ভাবে দেশ গড়ে ওঠে। তিনি তাই চেয়েছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির যে রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলেন তাতেই বোঝা যায়, পাণ্ডবরা সাম্রাজ্যবাদী।
আমি নিজেকে এক জন ছোটখাটো মহাভারত বিশেষজ্ঞ মনে করি। (অবশ্যই আত্মশ্লাঘা ছাড়া আর কিছুই নয়। নাটকে বার বার দেশ শব্দটি উচ্চারিত শুনে আমার মনে হয়েছে, মহাভারতের সময়ে কেউ কি দেশ শব্দটি জানত? দেশাত্মবোধ সম্পর্কে কারওর কোনও ধারণা ছিল?
সে যেই হোক, ভিন্ন মত তো হতেই পারে। সামগ্রিক দৃশ্যগুলিতে এবং সু-অভিনয়ে নাটকটি বেশ উপভোগ্য। বহুরূপী তাদের পূর্ব সুনাম অক্ষুন্ন রেখেছে।
৪. ৭. ২০১২
এ রাজ্যের পাহাড়ে বাংলা ভাষা থাকবে না?
এমন মানুষ কি আছে কোথাও, যে মাঝে মাঝে নিজের মনের সঙ্গে কথা বলে না? সেই সব অনেক কথাই নিজের স্ত্রী বা স্বামীকে কিংবা মাকে, খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও বলা যায় না প্রকাশ্য উচ্চারণে। সে সব কথাই মনের মধ্যে গোপন থেকে যায়।
আমি তো যখন-তখন মনের সঙ্গে কথা বলি। কখনও মনের মধ্যেই একটা তর্কযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অনেক চিন্তাই নিছক একমুখী হয় না। নানান শাখায় বিভক্ত হয়ে গোলমাল পাকায়। তারপর ঘুম আসে, তারপর স্বপ্নের মধ্যে এসে যায় অন্য একটা জীবন। স্বপ্নের কথা থাক, সেই সব মনে মনে কথার কয়েকটা টুকরো আজ প্রকাশ্যে লিখিত ভাবে রেখে যাওয়ার ইচ্ছা হল। অবশ্যই একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে। লিখছি এই জন্য যে, আমি যা ভাবি, তা অন্য মানুষরাও কি সেই বিষয় নিয়ে ভাবে, এটা জানতে খুব কৌতূহল হয়। যেমন, বাঙালিরা কি আবার একটা বঙ্গভঙ্গ চায়? উনিশশো পাঁচ সালে ইংরেজরা একবার বাংলাদেশকে ভাঙতে চেয়েছিল। তার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথম ও শেষ বার রাস্তায় নেমে, খালি পায়ে হেঁটে মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। কয়েক বছর পর ইংরেজরা সেই বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়েছিল। আবার সাতচল্লিশে, এ দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ইংরেজরা যাকে বলে পার্টিং কিক হিসেবে বাংলা ও পঞ্জাবকে ভাগ করে দিয়ে যায়। অবশ্য সে-সময়ের এ-রাজ্যের বাঙালিদের এবং সর্বভারতীয় নেতাদের অদূরদর্শিতা বা মূর্খতাও অনেকটা দায়ী। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথকে তা দেখে যেতে হয়নি। তিনি তার আগেই চলে গিয়ে বেশ করেছিলেন।
সেই দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গের ক্ষত কিন্তু এখনও মিলিয়ে যায়নি, বরং দগদগ করে। আমাদের এখনকার অনেক সমস্যার মূলেই আছে সেই বঙ্গভঙ্গ। এখন কি আমরা আবার এই পশ্চিমবাংলা থেকে খানিকটা করে অংশ কেটে নিয়ে গোর্খাল্যান্ড কিংবা কামতাপুরী গড়ার প্রস্তাব মেনে নেব? তার আগেই আমি চলে যেতে চাই। তার বেশি দেরি নেইও বোধহয়। কোথায় চলে যাব? বিস্মৃতির অনন্ত অন্ধকারে?
একটা রাজ্যের আয়তন যত ছোট হয়ে যায়, ততই সর্বভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সে রাজ্যের গুরুত্বও কমতে থাকে। তা তো সবাই জানে। স্বাধীনতার আগে অখণ্ড বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সংস্কৃতি-সাহিত্যে বাংলার স্থান ছিল অনেক উঁচুতে। এখন তা হু হু করে নীচে নেমে যাচ্ছে। এখনই ভারতের অনেক অংশে বিশেষত উত্তর ভারতে, হতমান বাঙালিদের নিয়ে অনেক ঠাট্টা তামাশা হয়। যাক, এ কথাটা তো খুবই সত্যি যে, পাহাড় অঞ্চলের উন্নতির উদ্যোগ অন্যান্য জায়গার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কাছাকাছি বেশ কিছু অঞ্চলকে আমরা সমতলবাসীরা ভেবেছি অপূর্ব মায়াময় বেড়াবার জায়গা এবং আরও আরও অনেক কিছু। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের নানান সমস্যা নিয়ে আমাদের কোনও সরকারও বিশেষ মাথা ঘামায়নি। তিরিশ চল্লিশ বছর আগে দার্জিলিঙের পানীয় জলের অভাবের কথা শুনেছি। এখনও তা শোনা যায়। যাতায়াত ব্যবস্থারও তেমন কিছু উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে পাহাড় জেগেছে, সেখানে তৈরি হয়েছে স্থানীয় দল, তারা অনেক রকম দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন প্রবল ভাবে শুরু করেছে। এবং প্রথম প্রথম এই ধরনের আন্দোলন বেশি বিশ্রী ও হিংস্র হয়। তাই খুনোখুনি ও কথায় কথায় বন্ধ। ক্রমশ এই আন্দোলনের নেতৃবর্গ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, এই পদ্ধতিতে কোনও দাবি আদায় করা যায় না। আমরা পাহাড়ের নানান দাবির অনেকগুলিরই সমর্থক। শুধু একটি ছাড়া। পশ্চিমবাংলার মানচিত্রের কিছু কিছু অংশ ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা রাজ্য গড়া যাবে না। কিছুতেই না। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন পেলে তাঁরা নিজেরাই অনেক দাবি মিটিয়ে ফেলতে পারবেন।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝেই পাহাড় অঞ্চলে যাচ্ছেন, ওখানকার নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাতে যুদ্ধং দেহি ভাবটা নেই। বেশ একটা খোলামেলা ভাব তৈরি হয়েছে। সেটা বেশ ভাল ব্যাপার। মুখ্যমন্ত্রীর এই চঞ্চলতার সঙ্গে দৃঢ়তার মিশ্রিত ব্যবহার সত্যিই খুব প্রশংসা করার মতো। পাহাড়ের নেতারা অনেকেই মুখ্যমন্ত্রীর এই কূটনীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না। তাঁরা তাঁদের বাঘনখ লুকিয়ে রাখছেন এবং কিছু কিছু গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ মুখ্যমন্ত্রীকে মনে করছেন তাঁদের আপনজন। তবে মাঝে মাঝেই পাহাড়ি নেতাদের কেউ কেউ বলে ফেলছেন, গোর্খাল্যান্ডের দাবি তাঁরা আপাতত মুলতুবি রাখছেন বটে, কিন্তু সেই মূল দাবি থেকে একটুও সরছেন না। এই উক্তির একটা গূঢ় অর্থ এই হতে পারে যে, মুলতুবির এ-সময় তাঁরা ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করে নিচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ি নেতাদের সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলেন? কোনও সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে দেখলাম, বৃহৎ জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী প্রথম কয়েকটা বাক্য বলেন, নেপালি ভাষায়। সেটা তো খুবই চমৎকার, সব মানুষই নিজেদের মাতৃভাষা অন্য কোনও ভাষাভাষীর মুখে শুনলে খুশি হয়। এক সময় সাহেবরাও যেমন কিছু কিছু বাংলা শিখে নিতেন। তারপর মুখ্যমন্ত্রী মূল বক্তৃতা দেন কোন ভাষায়? কোনও প্রতিবেদনেই আমি তার উল্লেখ দেখিনি। হিন্দি না ইংরাজিতে? বাংলা বললে তো ওরা প্রায় কেউই বুঝবে না। কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যদি নিজের রাজ্যেরই কিছু নাগরিকের সামনে নিজের ভাষায় কথা বলতে না-পারেন, সেটাকে আমি শুধু দুর্ভাগ্যজনক বলে মানতে রাজি নই, তা অত্যন্ত গ্লানিজনক।
দূরদর্শনের অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে দেখি, পাহাড়ের বিশিষ্ট নেতারা সরকার পক্ষের বিভিন্ন মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলছেন হিন্দিতে কিংবা ইংরেজিতে। তাঁরা একটাও বাংলা শব্দ উচ্চারণ করেন না। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁদের এত বিরাগ কেন? আমরা জানি না, এই সব নেতা কি এই প্রজন্মেই নেপাল থেকে এসেছেন, না কয়েক পুরুষ ধরে আছেন এখানে, তাঁরা ভূমিপুত্র? যদি এই জন্মেই নেপাল থেকে এসে থাকেন, তবে তাঁদের কোনও দাবিতেই কর্ণপাত করা উচিত নয়। আর যদি জন্ম, কর্ম এখানেই হয়ে তাকে, তা হলে তাঁরা এতদিনে একটুও বাংলা শেখেননি? ভাইচুং ভুটিয়া এখানে খেলতে এসে দিব্যি বাংলা বলেন। এমনকী সাংমা যিনি রাষ্ট্রপতির পদের অন্যতম প্রার্থী, তিনি কিছু বছর কলকাতায় ছিলেন বলে কিছু কিছু বাংলা বলার চেষ্টা করেন। আর দার্জিলিঙের নেপালিরা এক বর্ণও বাংলা জানবেন না?
বেশ কিছু বছর আগে এক দিন দার্জিলিঙের নেপালি ভাষার এক সাহিত্যিক আক্ষেপের সঙ্গে আমাকে বলেছিলেন, আমি স্কুলে বাংলা পড়েছি, তাই আমি রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে পারি। বাংলা ভাষায় যে অনেক বিশ্বমানের রচনা আছে, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এখনকার নেপালি ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে বাংলা পড়ে না। তাই তারা বাংলা সাহিত্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য আপনারাই দায়ী। এখনকার পাহাড়ি অঞ্চলের স্কুলগুলিতে বাংলা পড়া লেখা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে কলকাতার কিছু কিছু স্কুলে বাংলা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় আছে, তা জানি।
সেই জন্য আমরা এ রাজ্যের সব স্কুলে অন্তত ক্লাস এইট পর্যন্ত বাংলা পাঠকে আবশ্যিক করার জন্য এক সময় আন্দোলন করেছি। বাংলা ভাষার অনেক প্রসিদ্ধ লেখক ও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে কিছু কিছু পথ আমিও হেঁটেছি এই দাবি নিয়ে বিভিন্ন মিছিলে। ভারতের অনেক রাজ্যেই এই ব্যবস্থা আছে। মহারাষ্ট্রের সব স্কুলে মরাঠি ভাষাকে অন্যতম বিষয় হিসাবে নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই প্রসঙ্গ নিয়ে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছি। মুম্বই শহরের গুজরাতিরা যে একটা শক্তিশালী গোষ্ঠী, তা সবাই জানে। এঁদের দ্বারা পরিচালিত কিছু কিছু স্কুলে মরাঠি ভাষার বদলে গুজরাতি ভাষা পাঠ্য। তা নিয়ে মহারাষ্ট্রে সরকারের সঙ্গে এই সব স্কুলের কর্তৃপক্ষের অনেক রকম মামলা মোকদ্দমা হয়। শেষ পর্যন্ত তা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের রায় মহারাষ্ট্রের সরকারের পক্ষেই যায়। রায় দিয়ে বিচারক মন্তব্য করেছিলেন, কোনও রাজ্যে যদি অন্য রাজ্য থেকে কেউ এসে চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য থাকতে চান, তা হলে তাঁদের এবং তাঁদের ছেলেমেয়েদেরও সেই রাজ্যের ভাষা শিক্ষা করা আবশ্যকীয় হওয়া উচিত। নইলে তাঁরা সেই রাজ্যের প্রধান ভাষাগোষ্ঠীর মানুষজনের সঙ্গে সাবলীল ভাবে মেলামেশা করতে পারবেন না।
আমরা পশ্চিম বাংলায় এই নীতি প্রবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছি। কিছু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও গেছি দাবিপত্র নিয়ে। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বুঝেছি, তাঁরা কেউই নীতিগত ভাবে এর বিরোধী নন, তাঁরাও বাংলা সাহিত্যকে ভালবাসেন। তবু কেন যে, তাঁরা ইতস্তত করছিলেন, এই নীতি কার্যকর করতে পারেননি, তা আজও আমার বোধগম্য নয়।
রাজ্যে এখন নতুন সরকার এসেছে। তারা বাংলা ভাষা প্রচারের জন্য এই শিক্ষা নীতি স্কুলে প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে পারে না? এই নিয়ে যদি আন্দোলন করতে হয়, তবে সে দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে। আমাদের অনেকেরই এখন অন্তরালে চলে যাওয়ার সময় এসে গেছে।
১৮. ৭. ২০১২
Chapter - 10
বিবেক মানে কী? তা কি কোনও বায়বীয় বস্তু?
সম্প্রতি গুয়াহাটিতে একটি অতি কুৎসিত ঘটনা ঘটেছে। তখন বেশি রাত নয়, মাত্র সাড়ে ন’টা, রাস্তায় লোকজনের চলাচল থামেনি, তারই মধ্যে একটি দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন অত্যাচার শুরু করে গুটি কয়েক পেঁচি মাতাল। পথচারীরা দাঁড়িয়ে পড়ে সেই দৃশ্য দেখে, আরও কয়েক লক্ষ মানুষ সেই বাস্তব দৃশ্যটি দেখতে পায় টিভি-র সম্প্রচারে, প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে। সাধারণত এ-ধরনের ছবি প্রায়ই দেখা যায় ইদানীংকার অনেক সিনেমায়, বলাই বাহুল্য সে সব সাজানো। এ ঘটনা দেখানো হয়েছে, যাকে বলে ‘লাইভ’, অত্যাচারিত মেয়েটির মুখ স্পষ্ট, সে কোন স্কুলে পড়ে, তার নাম, এ সবও জানানো হয়েছে। কি করে তা সম্ভব হল? সেখানে দৈবাৎ উপস্থিত ছিলেন একজন দক্ষ ফোটোগ্রাফার, তিনি ভিডিয়ো ক্যামেরায় পুরো দৃশ্যটি তুলে রাখেন, যাতে ওই সব নিপীড়নকারীর বাঁদারামি এবং মেয়েটির অসহায় কান্না আর বাঁচার চেষ্টা, সবই ফুটে ওঠে নিপুণ ভাবে। একজন ফোটোগ্রাফারের পক্ষে এটা খুবই কৃতিত্বের ব্যাপার। নিউজ ফোটোগ্রাফি হিসেবে খুবই বিরল দৃষ্টান্ত। তবু এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হইচই শুরু হয়, ক্যামেরাম্যানটির পক্ষে আর বিপক্ষে শুরু হয় তর্কাতর্কি। ক্যামেরাম্যানটির বক্তব্য ছিল এই যে, এই ছবি থেকে অত্যাচারীদের মুখ চেনা অনেক সহজ হবে, তাদের শাস্তির পথও সুগম হবে। অন্য পক্ষের বক্তব্য, একজন ক্যামেরাম্যান তো শুধুই ফোটো-জার্নালিস্ট নন, তিনি তো একজন দায়িত্বশীল নাগরিকও বটে। ততক্ষণ ধরে ওই ছবি তোলায় ব্যস্ত না থেকে, তিনি কি মেয়েটিকে বাঁচাবার কিছু চেষ্টাও করতে পারতেন না? তিনি তো একা ছিলেন না, সেখানে অন্যান্য দর্শকও উপস্থিত ছিলেন।
এই উপলক্ষে আমার মনে পড়ল আর একটি ঘটনা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জাপানে। সে দেশের অর্থমন্ত্রী এক দিন তাঁর এক বান্ধবীকে নিয়ে লাঞ্চ খেতে এসেছিলেন এক নামকরা রেস্তোরাঁয়। সে সব দিনে পৃথিবীর কোনও দেশেই মন্ত্রী বা সরকারি ক্ষমতাবানদের জন্য এত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাহুল্য ছিল না। তাঁরা অনেক স্বাধীন ভাবে রাস্তাঘাটে বেরুতে পারতেন। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে নাইট শো-এ সিনেমা দেখার পর পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন, এ দৃশ্যও তো আমরা দেখেছি। যাই হোক, সে দিন সেই রেস্তোরাঁয় অকস্মাৎ দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল খোলা তলোয়ার হাতে এক আততায়ী। সে সোজা দৌড়ে এসে অর্থমন্ত্রীর পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিল। সেই গমগমে আহারালয়ে অন্য সবাই ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল। অর্থমন্ত্রীর পাশের টেবিলেই বসে ছিলেন এক বিখ্যাত সংবাদপত্রের ফোটোগ্রাফার, তিনিও আততায়ীটি ঢোকার সময়ই দেখতে পেয়েছিলেন, ইনস্টিঙ্কট-এর বশেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে তিনি তুলে ফেললেন সেই হত্যাদৃশ্য।
এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যমের শিরোমণিদের সুপারিশে সেই ফোটোগ্রাফারকে দেওয়া হয় বছরের শ্রেষ্ঠ ফোটো জার্নালিস্টের সম্মান। এবং আগামী দু’বছরের জন্য কোনও পত্র-পত্রিকায় তাঁর ছবি নিষিদ্ধ হয়ে যায় এই শাস্তি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, ছবি তোলার বদলে ফোটোগ্রাফারটি যদি তাঁর ক্যামেরাটি ছুড়ে দিতেন সেই আততায়ীর দিকে, তা হলেও হয়তো সেই অর্থমন্ত্রীর প্রাণ বাঁচানো যেত।
আর একটি ঘটনাও জেনেছিল পৃথিবীর সব দেশের মানুষ। প্রায় দু’দশক আগের কথা। সেটা আবার মনে করিয়ে দিলেন শ্রীমতী অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায় নামে এক সাংবাদিক। আমেরিকার বিখ্যাত ফোটোগ্রাফার কেভিন কার্টার গিয়েছিলেন সুদান। এই দুর্ভাগা দেশটায় যে কত কাল ধরে দুর্ভিক্ষের মতন অবস্থা আর আত্ম-হানাহানি চলছে তার ঠিক নেই, প্রতি বছরই এর জন্য বহু মানুষ মরে।
মাঠের মধ্যে পড়ে আছে একটি কঙ্কালসার শিশু। অনাহারে, অবহেলায় সে প্রায় মুমূর্ষ। আকাশে উড়ছে অনেক শকুন। শকুনরা সাধারণত মৃত প্রাণীদের মাংস খায়, এই শকুনগুলো কি ছেলেটির মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে ধৈর্য ধরে, না কি নেমে আসবে আগেই? অদূরে একটা ঝোপের মধ্যে ক্যামেরা বাগিয়ে অপেক্ষা করছেন কেভিন কার্টার। অনেক সময় কোনও বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার জন্য ফোটোগ্রাফারদের অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকী দিনের পর দিন।
বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে আকাশ থেকে নেমে এল কয়েকটা শকুন, গুটি গুটি পায়ে তারা এগোল শিশুটির দিকে। সে তখনও বেঁচে আছে।
শকুনরা এক জীবন্ত শিশুর মাংস খুবলে খুবলে খাচ্ছে, এ রকম ছবি আগে কে দেখেছে? এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য কেভিন পান পুলিৎজার পুরস্কার। তবু বহু মানুষের প্রশ্নের বাণ বিদ্ধ করেছে তাঁকে। তিনি কি শুধুই একজন ফোটোগ্রাফার? একজন বিবেকসম্পন্ন মানুষ নন? ছবি তোলার বদলে ছেলেটিকে তুলে, কিছুটা স্নেহ, কিছুটা সেবা, কিছু খাদ্য ও ওষুধের ব্যবস্থা করলে সে হয়তো বেঁচে যেত। মানবিকতা সেটা দাবি করে। সম্ভবত সেই সব প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত হয়েই কেভিন আত্মহত্যা করেন এক বছর পর।
এই পর্যন্ত লিখে হঠাৎ আমার মনেও একটা প্রশ্ন জাগল, এই রে, আমাদের এখানকার বহু সংবাদ-ফোটোগ্রাফার আছেন। কেউ যদি হঠাৎ আমার এই লেখাটি পড়ে ফেলেন, তা হলে কি মনে করবেন যে আমি ফোটোগ্রাফার প্রজাতিকে হেয় করার জন্যই এ সব লিখছি? তা কিন্তু মোটেই ঠিক নয়। এটা একেবারেই সত্যি। আমি যত জন সংবাদ-ফোটোগ্রাফারের কাজকর্ম দেখেছি কিংবা ব্যক্তিগত ভাবে চিনি, তাঁদের কারওর মধ্যেই মানবিকতার বিন্দুমাত্র অভাব দেখিনি। বরং বেশ কয়েক জনই কিছু কিছু সেবার কাজেও যুক্ত। আমাকে আসলে জ্বালাতন করছে ‘বিবেক’ শব্দটি।
বিবেক জিনিসটা ঠিক কী? ইংরাজিতে বলে, কনশ্যেন্স, সেটারও স্পষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। মানুষে-মানুষে কি এই বিবেক বোধ আলাদা হতে পারে? আমরা যৌবনবেলায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের একটা লাইন আউড়ে বেশ আনন্দ পেতাম। ‘শরীর, শরীর, তোমার মন নাই কুসুম?’ বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হয় যে, শরীরের বাস্তবতা বড্ড বেশি প্রকট, আর মন খানিকটা উড়ু-উড়ু ব্যাপার। সেই মন আর বিবেক বোধ কি এক হতে পারে? কিংবা বিবেক কি শুধু মঙ্গলচিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত? একেবারে বিবেকবর্জিত কোনও মানুষ টিকে থাকতে পারে? যে সব মানুষ বা রাজনৈতিক দলের নেতা ট্রেন লাইন উড়িয়ে দিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলতে চায়, তাদের কারও কি বিবেক নামে বায়বীয় বস্তুটির কোনও অস্তিত্ব থাকে না? এই শব্দটি নিয়ে আরও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
‘নুন চা’ এবং পাহাড় অঞ্চলে বাংলা
‘নুন চা’ নামে বিমল লামা রচিত একটি ছোট উপন্যাস আমিও পড়েছি, আর সেই লেখকের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছি। লেখাটি আমায় খুবই আকৃষ্ট করেছে। নেপালি ভাষাতেও এ রকম কোনও গ্রন্থ রচিত হলে তা আমাদের গর্বের বিষয় হতে পারে। উপন্যাসটির ভাষা ও চরিত্রের রেখাচিত্রগুলির সংলাপ এমনই নিপুণ যে, আমার মনে এখনও একটা খটকা রয়ে গেছে, লেখক কি সত্যিই আমাদের পাহাড় অঞ্চলের নেপালি, না কি কোনও বাঙালি লেখকের ছদ্মনাম?
এ বিষয়ে আমার চেয়ে অনেক ভাল বুঝবেন দেবেশ রায়। তাঁর বসতবাটি ওই অঞ্চলেই এবং গোটা উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘ দিনের। তাঁর অনেক উপন্যাসে তা প্রতিফলিত হয়েছে। তিস্তাপারের বৃত্তান্ত এখন ক্লাসিকের পর্যায়ভুক্ত। দেবেশ রায় আমার অনেক কালের পরিচিত এবং বন্ধু। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ পরীক্ষাটা একসঙ্গে দিয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য যে, সেই পরীক্ষার ফলাফলে দেবেশের স্থান ছিল একেবারে শীর্ষস্থানে, আর আমি একেবারে নীচের সারিতে কোনও মতে ঝুলে ছিলাম। এর পর দেবেশ রায় কৃতিত্বের সঙ্গে অধ্যাপনা করেছেন অনেক বছর, সাহিত্য রচনাতেও পেয়েছেন প্রভূত খ্যাতি, মাঝে মাঝে রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও তাঁকে ভূমিকা নিতে দেখা যায়। আমি এর কাছাকাছিও পৌঁছতে পারিনি। পাহাড় অঞ্চলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখন বাংলা ভাষা শিক্ষার সুযোগ পায় কি না, সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই। দেবেশই তা ভাল জানবেন। আমি প্রত্যেক মানুষেরই নিজের মাতৃভাষা অধিকার রক্ষার ও প্রসারের চেষ্টা সমর্থন করি। এরাজ্যে নেপালি, উর্দু বা সাঁওতালি ভাষার শিক্ষার সুযোগ থাকার পক্ষপাতী। কৈশোর বয়েসে দু’তিনটে ভাষা শিক্ষা মোটেই শক্ত কিছু নয়। সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা শুধু মহারাষ্ট্রের জন্যই নয়, প্রত্যেক রাজ্যের স্কুলে সেই রাজ্যের মূল ভাষার শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। আমি সেই নীতি পশ্চিমবঙ্গেও প্রয়োগের দাবি করি। দেবেশ রায়ও তা-ই চান জেনে খুব আনন্দ হল।
১. ৮. ২০১২
শিশিরকুমার ভাদুড়ির হাহাকার
একটা নাট্যশালা
ঋণের দায়ে শ্রীরঙ্গম ছাড়তে হল শিশিরকুমার ভাদুড়িকে। শুধু অভিনয় নয়, এখানে একটা ঘরে তিনি মাঝে মাঝে রাত কাটাতেন। আদালতের ডিক্রি নিয়ে সেই বাড়ির মালিক এক দুপুরে শিশিরকুমারকে বিতাড়িত করার ব্যবস্থা করলেন, তাঁকে বার করে দেওয়া হল রাস্তায়, তাঁর ব্যবহৃত অনেক জিনিস, যেমন তাঁর জামা-কাপড়, জুতো। এই দৃশ্য দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমা তো স্বাভাবিক। শিশিরকুমার আগে বাংলা রঙ্গমঞ্চের সম্রাট বলে গণ্য হতেন।
শিশিরকুমার মঞ্চ থেকে সব সংস্রব কাটিয়ে থাকতে লাগলেন বরানগরের এক বাড়িতে। তখনও বরানগর ছিল কলকাতা থেকে দূরে, নিরিবিলি মফস্সল। অত্যন্ত অহংকারী পুরুষ তিনি, কারও কাছ থেকে কোনও রকম সাহায্য নিতে রাজি নন। এক সময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন, সে সবই ঐতিহাসিক নাটক কিংবা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নাট্যরূপ, সবই নাটক হিসেবে খুব দুর্বল। তিনি সব সময়ই চাইতেন নতুন, সাহিত্য গুণসম্পন্ন রচনা। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি নাটক খুব যত্ন নিয়ে মঞ্চস্থ করেছিলেন, দর্শক জোটেনি, শিশিরকুমারকে ক্ষতিস্বীকার করতে হয়েছে প্রত্যেক বার। একটি রবীন্দ্ৰনাটক সাড়ম্বরে উদ্বোধন করার দিনে মোট দর্শকের সংখ্যা ছিল ছ’জন। তিনি চাইতেন লাভ-ক্ষতির হিসেব না করে এমন একটি জাতীয় থিয়েটার কেন্দ্র, যেখানে হবে নতুন নতুন সত্যিকারের নাটক চর্চা, নতুন নট-নটীদের ট্রেনিং দিয়ে গড়ে তোলা। অনেক দেশেই সরকার এ রকম প্রতিষ্ঠান চালাবার দায়িত্ব নেয়। আমাদের দেশে পরাধীন আমলে সরকার এ নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নাও হতে পারে। তার পর দেশ স্বাধীন হল, তখনও শিশিরকুমার তাঁর এই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার সে রকম উদ্যোগই নেয়নি।
নিজস্ব রঙ্গমঞ্চ আর পাননি জীবনে। আগে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে কয়েকবার এ বিষয়ে আলোচনাও করেছেন শিশিরকুমার। বিধানচন্দ্র রায়ের আর যত গুণই থাকুক ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে খুব উৎসাহী ছিলেন, এ দাবিটা করা যায় না বোধ হয়। এর মধ্যে ভারত সরকার ঘোষণা করল যে পদ্মভূষণ খেতাব দেওয়া হবে শিশিরকুমারকে। সে চিঠি পেয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন, এ যেন গরু মেরে জুতো দান!
সারা ভারতে খুব সম্ভবত শিশিরকুমারই এই সরকারি খেতাব নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এই সব ঘটনা অনেকেরই জানা। ওই সময় আমি থাকতাম উত্তর কলকাতায়, মঞ্চে শিশির ভাদুড়ির শেষ দু’তিনটি নাটক দেখেছি, রাস্তাতেও তাঁকে দেখেছি কয়েকবার। অহংকারী শিশিরকুমার নিজের দুর্বলতার কোনও রকম চিহ্ন রাখতেন না। কিন্তু ওর মধ্যে নিশ্চিত একটা হাহাকার ছিল। সেটা আমি সেই কৈশোরে বুঝতে পারিনি, তবে সেই স্মৃতি রয়ে গেছে প্রায় অম্লান। শিশিরকুমারের মৃত্যুর অনেকদিন পরে টের পেয়েছি সেই হাহাকারের। স্বাধীনতার এত দিন পরেও কি গড়ে উঠেছে কোনও জাতীয় নাট্যশালা? একটা নাট্যশালা চালাতে কত টাকা আর লাগে? প্রত্যেক সরকারের আমলেই কত দিকে কত টাকা বাজে খরচ হয়। তবে শুনেছি, নান্দীকারের রুদ্রপ্রসাদ, আরও কোনও কোনও দল নিজেদের উদ্যোগে পথশিশু কিংবা বস্তির ছেলে-মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে কিছুটা সুস্থ জীবনের স্বাদ দিতে পেরেছেন। অলকানন্দা রায় জেলখানার কয়েদিদের নিয়ে নাচ-গান-নাটকের শিক্ষার মধ্য দিয়ে যে আশ্চর্য কাজ করেছেন, তা অভূতপূর্ব তো বটেই এবং তা অবিস্মরণীয়। আমাদের নাট্যজগৎ-এর মান এখন বেশ উঁচুতে, তা নিয়ে আমরা অবশ্যই গর্ব করতে পারি।
মিনার্ভা থিয়েটার বহুদিন বন্ধ থাকার পর এখন সারিয়ে-সুরিয়ে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়েছে। যত দূর মনে হচ্ছে, এর মালিকানা এখন রাজ্য সরকারের, তা হলে এটাকেই এখন কি জাতীয় নাট্যশালা হিসেবে গণ্য করা যায়? অন্তত মিনি জাতীয় নাট্যশালা। এবং এরই মধ্যে এ থেকে একটি চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছে, যার নাম মিনার্ভা রেপার্টরি থিয়েটার। এরই মধ্যে পাদপ্রদীপের সামনে এসেছে তিনটি নাটকের উপস্থাপনা, তিনটিই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার, প্রতিটি দেখেই আমি মুগ্ধ। প্রথমটি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় সমৃদ্ধ শেকসপিয়ার অবলম্বনে রাজা লিয়ার। তার পর মনোজ মিত্রের নাটক, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় দেবী সর্পমস্তা (যেটা আমার বার বার দেখার ইচ্ছে হয়) আর তৃতীয়টি অতি সম্প্রতি ডি এল রায়ের বহু-চর্চিত নাটক চন্দ্রগুপ্ত। এটা এমন কিছু আহা মরি নাটক নয়, কৃত্রিমতা প্রচুর, তবু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মের দেড়শো বছর পালন উপলক্ষে তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য তাঁর একটি নাটক নির্বাচন করা ঠিকই আছে। এর সঙ্গে অবশ্য জি পি দেশপাণ্ডের একটি নাটকের কিছু দৃশ্য মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চন্দ্রগুপ্ত নাটকের ত্রুটিগুলি অনেকটাই ঢেকে দিয়েছেন পরিচালক কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। তিনি এনেছেন গতি, যার ফলে দর্শকদের কেউই কয়েক চুমুক ঘুমিয়ে নেবার সুযোগ পাবেন না। এই কৌশিক চট্টোপাধ্যায় থাকেন কৃষ্ণনগরে। কলকাতার কোনও নাট্য দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও তিনি অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এই নাটকের নির্দেশনায়। দুর্বল নাটকের মঞ্চ-সাফল্য আনা খুবই কঠিন কাজ, কৌশিক সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেকটাই জয়ী হয়েছেন।
দেবী সর্পমস্তা দেখতে গিয়ে শুনেছিলাম, প্রায় সব কুশীলবকেই আনা হয়েছে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে। তাদের কেউ কেউ আগে কখনও মঞ্চে ওঠেনি। কয়েক মাস তাদের এখানেই রেখে দিয়ে তাদের নাচ-গান-অভিনয় শেখানো হয়েছে, তাদের সার্থকতার প্রধান নিদর্শন, মঞ্চে তাদের সাবলীল বিচরণ। যারা সদ্য সদ্য গান বা নাচ শিখেছে, তাদের কোথাও তাল কাটেনি।
চন্দ্রগুপ্ত দেখতে গিয়েও শুনলাম, এই নাটকেও প্রায় কোনও খ্যাতিমান নেই, সেই আগের দলের ছেলে-মেয়েরাই এ নাটকে অংশগ্রহণ করেছে। দু’টি বিপরীতধর্মী নাটক, চরিত্র বদল করা কম কঠিন নয়। আমি চেষ্টা করছিলাম, আগের নাটকে যারা খুব ভাল অভিনয় করেছিল, তাদের এই নাটকে চেনা যায় কি না। পোশাক-পরিচ্ছদ অন্য রকম, সংলাপও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, তা হলে আর চিনব কী করে? এই নাটকের রাজা নন্দ অনেকটা ভিলেন ধরনের, আর তার উপস্থিতিও অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং নন্দও শুধু সাদা বা কালো নয়, অনেকটা সিরিও কমিক ধরনের, এবং সে নাচতে পারে, গাইতেও পারে, তার অভিনয় অন্যদের ছাপিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ এক সময় আবিষ্কার করলাম, আরে! এ তো দেবী সর্পমস্তার প্রধান চরিত্রটি। এর নাম অনির্বাণ ভট্টাচার্য। আমি এর মধ্যেই ওর ভক্ত হয়ে উঠেছি, আমার দৃঢ় ধারণা, এই ছেলেটি আরও অনেক নাটকে ফাটাবে। চাণক্যের মতন কঠিন চরিত্রের অভিনেতা অধিকারী কৌশিকও ছিল আগের নাটকে। আর অনেককে চিনতে পারলাম না, তবে সবারই অভিনয় বেশ স্বচ্ছন্দ।
একটা ছোট কথা। কোনও নাটকের পটভূমি হয় কয়েক শতাব্দী আগের কোনও ঘটনা, তা হলে তাদের ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে এক বার না এক বার দু’জনের তলোয়ারের লড়াই থাকে। বিদেশের নাটকের এই সব অভিনেতাদের বেশ কিছু দিন ফেনসিং শিখতে হয়, যেমন আমরা দেখেছি হ্যামলেটের ভূমিকায় লরেন্স অলিভিয়ারকে। আমাদের বাংলা থিয়েটার বা সিনেমায় এ রকম লড়াইয়ের দৃশ্য থাকলে অভিনেতারা ওসব শেখা-টেখার জন্য সময় দিতে চায় না, একটুখানি ঠুকুস-ঠাকুস করেই পরের দৃশ্যে চলে যায়। এই নাটকেও রাজা নন্দ আর চন্দ্রগুপ্তের একটা তলোয়ারে লড়াইয়ের দৃশ্য আছে। আমি সবিস্ময়ে দেখলাম, এই নাটকে দুই তলোয়ারধারীর লড়াই খুবই বাস্তবসম্মত, নাচের কোরিওগ্রাফির মতন পদক্ষেপ নিখুঁত। যেন রোনাল্ড কোলম্যান আর ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস, জুনিয়ার।
মিনার্ভা রেপার্টরির সভাপতি ব্রাত্য বসু। সে সত্যিকারের এক ক্ষমতাবান নাট্যকার আর অভিনেতা হিসেবেও দুর্দান্ত, অতি সম্প্রতি মুক্তধারা চলচ্চিত্রে তার অভিনয় বহুদিন মনে রাখার মতন। এখন সে এই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী। এই দফতরের মন্ত্রীর কাজ অনেক বেশি আর ঝঞ্ঝাটও হয় প্রত্যেক দিন। তবু ব্রাত্যকে আমরা অনুরোধ করব, মন্ত্রিত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও যেন তার থিয়েটার-সংসর্গ অটুট থাকে। এই রেপার্টরি আরও অনেক নতুন উদ্যোগ নিতে পারে। এবং রাজনৈতিক দলাদলি ও পক্ষপাতিত্ব যেন এই ধরনের কাজ ছিন্নভিন্ন করে না দেয়।
আবির দিয়ে রাঙাও তাকে
ঘাতক এত রক্তধারায় খুঁজছ কাকে?
আবীর দিয়ে রাঙাও দেখি সভ্যতাকে।
(নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুমিও জ্বরের মতো এসো’ কাব্যগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত)
১৫. ৮. ২০১২
ভারতীয় পুরুষদের লিবিডো কি বেড়ে গেল, না…
নিউ ইয়র্কের অদূরে, নিউ জার্সি রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক বাঙালি বা বাংলাভাষীর বাস। এদের কয়েকটি ক্লাবও আছে। মাঝে মাঝে এরা নানান উৎসবের আয়োজন করে। সে রকমই একটা উৎসব উপলক্ষে আমি উপস্থিত ছিলাম সেখানে। একটা বিশাল স্কুলবাড়ির প্রাঙ্গণে চলছে গান-বাজনা ও নানা রকম গয়নাগাটির প্রদর্শনী। আমরা কয়েকজন ভেতরের একটা ঘরে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে চুল ছেঁড়াছেঁড়ি চালাচ্ছি, আসলে সেটা একটা আড্ডা। এক সময় আমাকে টয়লেটে যেতে হল, সেখানে গিয়েই আমার আক্কেল গুড়ুম। এখানে আক্কেল গুড়ুম ঠিক খাটে কি না তা জানি না, তবে বহু দিন পরে এত বেশি অবাক হয়েছি।
ও দেশের নানান জায়গায় থাকে এক ধরনের মেশিন, তাতে কিছু পয়সা দিয়ে একটা ছবি দেখে টিপলেই বেরিয়ে আসে একটা না একটা কেক বা পেস্ট্রি, আরও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, এমনকী ঠান্ডা পানীয়ের বোতল। এখানে হিসিখানার মধ্যেও রয়েছে সে রকম একটা ছোটখাটো মেশিন, তাতে লেখা রয়েছে, পাঁচ বা দশ পয়সা দিলে পাওয়া যাবে একটি কনডোম। ইস্কুলের এলাকার মধ্যে কনডোম বিক্রির ব্যবস্থা? ফিরে এসে সেই আড্ডায় আমার বিস্ময়ের কথা জানাতেই একজন মহিলা, যিনি বহু কাল ধরে ও দেশে আছেন, তিনি একটুও বিচলিত না হয়ে বললেন, হ্যাঁ, বেশ কিছু দিন আগে থেকেই এটা চালু হয়েছে। এ ছাড়া উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কিছুটা সাহায্য করার আর তো কোনও উপায় নেই।
সাহায্য? উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা নানা রকম খেলা করতে শুরু করে, তার মধ্যে আছে শারীরিক খেলাও। এতে বাধা দেবার যে কোনও চেষ্টা করলে কোনও সুফলও পাওয়া যাবে না, ওরা মানবেই না। অভিভাবকরা প্রায় অনেকেই, ছেলে বা মেয়েকে শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবেন না, সেটা নাকি ওদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
এই ছেলেমেয়েদের শারীরিক মিলনের জন্য হন্যে হয়ে জায়গা খুঁজতে হয়। সে রকম সুযোগ অগাধ। প্রকাশ্য চুম্বন নিয়ে মাথাই ঘামায় না কেউ। যে কোনও ঘাস জন্মানো জায়গায় দু’টি শরীর প্রায় এক হয়ে যায়, গড়াগড়ি দেয়, সে দিকে ফিরেও তাকায় না কেউ। সাময়িক উত্তেজনায় ছেলে ও মেয়েটি একেবারে চরমে চলে যায়, তাতে যদি কোনও মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তখনই শুরু হয় নানা রকম বিপদের ছায়াপাত। ছেলেটি কোনও দায়িত্ব না নিয়ে সরে পড়তে পারে। মেয়েটি তো তা করতে পারে না। এমনকী গর্ভপাতের ব্যবস্থা থাকলেও একটা সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে তাতে রাজি হতে না-ও পারে। তখনও তার শ্বশুরবাড়ি বলতে কিছু নেই, কারণ তার তো বিয়েই হয়নি। তার বাবা-মা’ও এই অবস্থায় তাকে কাছে টেনে নিতে চায় না, তা হলে সে এক শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যাবে, কী ভাবে বাঁচবে। এক বছর আগেও যে মেয়েটিকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, সাহসিনী অবস্থায় দেখেছি, সে এখন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রাস্তার ধারে বসে অসহায় অবস্থায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রাস্তার ধারে ঝোপেঝাড়ে যে মাঝে মধ্যেই কোনও সদ্য শিশুর কান্নার আওয়াজ শোনা যায়, তা-ও নিশ্চিত ভাবেই এই রকম অবস্থারই একটি দুঃখজনক, কালো দিক। সেই জন্যই শিশুটিকে বাঁচানো ও তার মানে সুস্থ জীবনে ফেরাবার জন্য ওদের সামনে দুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে কনডোম।
এ রকম ঘটনা দেখলেই যে আমরা এত বিস্মিত হই, ভেতরে ফুসফুস করে প্রতিবাদ, তার কারণ কী? আসল কারণ, আমাদের নৈতিক আপত্তি। আমাদের মধ্যে এক এক জনের এক এক রকম বিশ্বাস থাকতে পারে, কিংবা কোনও কিছুতেই বিশ্বাস না থাকতে পারে, কিন্তু যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা এখনও কিছুটা রক্ষণশীল। কেননা, প্রকৃতিদেবী যিনি আমাদের ঘাড় ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাচ্ছেন, তাঁর বিচারে তো এই সব ছেলেমেয়ের যৌন স্বাধীনতার দাবির মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। মেয়েদের বোধহয় দশ-এগারো বছরে আর ছেলেদের সতেরো-আঠারো বছরে যৌন চেতনা এসে যায়, আর প্রথম প্রথম তা যেন বেশ অশান্ত থাকে। প্রকৃতি তখন ওদের বলতে থাকে, সন্তান উৎপাদন বাড়াও, যত পারো বাড়াও। তবু আমরা যে অনেকেই কিছুটা সংযত থাকি, সন্তান-সম্ভাবনা জমিয়ে রাখি ভবিষ্যতের জন্য, তার কারণ মোটেই বিজ্ঞানসম্মত নয়, সামাজিক, আর সেই সামাজিকতার নানান ধারা আমরা নিজেরাই তৈরি করে রেখেছি। বিয়ে নামে কৃত্রিম ব্যবস্থাটাও রয়েছে এর মধ্যে। বিয়ের প্রথার মূল উদ্দেশ্য দু’টি। নিজের পরিবারের ধারাবাহিক অগ্রগতি রক্ষা করা। (পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা, অর্থাৎ ছেলেরাই বংশ রক্ষা করবে, এটা সম্পূর্ণ একটা ভুল ধারণা চলে আসছে বহু দিন ধরে; মেয়েরাও বংশ রক্ষা করে যেতে পারে অবশ্যই।) আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে বিষয়সম্পত্তির সুষ্ঠু ভাগাভাগি। যাতে সব কিছু চিলুবিলু না হয়ে যায়। যদিও তা হচ্ছে এখনও। ভাইয়ে ভাইয়ে বা আত্মীয়স্বজনের ঝগড়া ও মারামারি নিয়েই তো লেখা হয়েছে পৃথিবীর আদি সব মহাকাব্য। এখন নাকি ধর্ষণ-টর্ষণের ঘটনা খুব বেড়ে গিয়েছে। হঠাৎ ভারতীয় পুরুষদের লিবিডো বেশি বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠল নাকি? কারও কারও মতে, অরাজক অবস্থায় পড়লেই এই সব অন্যায় কর্ম বেড়ে যায়, শুধু ধর্ষণ নয়, তার সঙ্গে খুনটুনও সমান তালে চলে। আবার অন্য মতে, এর অনেকগুলিই সত্যি নয়। বিরোধীদের সাজানো গল্প। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম সেগুলো রগরগে ভাবে প্রকাশ করে। এই রকম মিথ্যে দিয়ে উত্তেজিত করে তোলা হয় সাধারণ মানুষকে। আগেও এরকম ধর্ষণের ঘটনা ঘটত, কিন্তু সব প্রকাশের সুযোগ থাকত না। এখন নাকি সাংবাদিকরা টাকা খেয়ে, কিংবা নিজেরা টাকা দিয়ে অনেক কিছু মিথ্যে সাজায়। এই নিয়ে আমরা মনে মনে অনেক কথাই বলি, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না।
এই এক জীবনে আমরা কত রকম চমকপ্রদ ঘটনাই না দেখলাম। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বীর্য-ব্যাঙ্ক। এখন যে কোনও রমণীই কোনও পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে না এসেও সন্তানের জননী হতে পারে। ওই ব্যাঙ্ক থেকে কোনও অজ্ঞাতনামা পুরুষের বীর্য কিনে আনবে। তাঁর পরে প্রক্রিয়াগুলোও আর তেমন কিছু জটিল নয়।
বেশ তো চলছিল, এরই মধ্যে আর একটি গোলমেলে খবর পাওয়া গেল বিজ্ঞানীদের মহল থেকে। একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে যে, ভারতীয় পুরুষদের ( হ্যাঁ, বিশেষ করে ভারতীয় পুরুষদের) বীর্যে কিছু কিছু দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। নানা কারণে। তার মধ্যে অন্যতম রেডিয়েশন-এর বিস্তার। এই দুর্বল বীর্য নিয়ে তাদের সন্তানের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যাবে, কিংবা তারা দুর্বল সন্তানের জন্ম দেবে। সংখ্যাটা অবশ্য এখনও খুব বেশি নয়, শতকরা দুটি মাত্র। কিন্তু আমরা তো অনবরতই দেখছি, এই ধরনের ঘটনা কখনও কমে , বাড়তেই থাকে। তা হলে কি অদূর ভবিষ্যতে, কিংবা দূর ভবিষ্যতে এই অবস্থা বাড়তে বাড়তে এমন একটা চূড়ান্ত অবস্থায় আসতে পারে, যখন ভারতীয় পুরুষদের সন্তানের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা একেবারে চলে যাবে? কোনও পুরুষই যদি আর না থাকে, তা হলে নারীবাদীরাই বা আন্দোলন করবে কার বিরুদ্ধে? এরই মধ্যে একটামাত্র আশার কথা এই যে, এই অবস্থা থেকে অনেক আগেই আমি কেটে পড়তে পারব পৃথিবী থেকে।
কোথায় বাস্তব, কোথায় কল্পনা
একটি বছর পাঁচেকের শিশুকে নানান গল্প শোনায় তাঁর মা। ভূত-প্রেত বা যুদ্ধ-বিগ্রহের গল্প এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে মা, যাতে ছোটবেলা থেকেই তার ছেলে ওই সব কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু বাচ্চাদের গল্পে কোথাও না কোথাও দৈত্য-দানো, রূপকথার কাহিনি এসে পড়ে। ছেলেটি সে রকম কোনও ছবির দিকে আঙুল দেখালে মা তখন সেই গল্প শোনাতে বাধ্য হলেও বার বার বোঝাতে থাকে যে এই সব আসলে কোথাও নেই। ডানাওয়ালা পক্ষীরাজ ঘোড়া, কিংবা দৈত্য-রাক্ষসদের সঙ্গে ভীমের লড়াই, এ সবই কল্পনা, মানুষের ইমাজিনেশন। এক সময় ওরা তিন জনে মিলে বেড়াতে গেল আমেরিকার এক প্রান্তে একটা পেট্রিফায়েড ফরেস্ট-এ। সেখানে মাইলের পর মাইল সবুজ গাছপালা। সে রকম একটা জায়গাতেই গাড়ির গতি কমিয়ে দিল বাবা। খুব কাছে এসে দেখা গেল, তার দিয়ে ঘেরা সেই স্থানটি একটি ছোটখাটো চিড়িয়াখানাও বটে। প্রথমেই চোখে পড়ল, একটা ঝাঁকড়া গাছের নীচে বসে আছে একটা ভাল্লুক। বাচ্চা ছেলেটি সে দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল, ওই তো একজন রাজকুমারী। শি ইজ আ প্রিন্সেস, শুধু তাঁর বাবা-মা’ই নয়, কাছাকাছি কিছু লোকও এই কথা শুনে অবাক। একটা ভাল্লুক দেখেই তাকে রাজকুমারী বলল কেন বাচ্চাটি। তার মা তাকে এই কথাটা জিজ্ঞেস করতেই অয়ন নামে বাচ্চাটি বেশ জোরের সঙ্গে বলে উঠল, ‘আই ইউজ্ড মাই ইমাজিনেশন, আমি কল্পনা করেছি।’
২৯, ৮. ২০১২
কলকাতায় তখন উঁচু বাড়ি ছিল না
আমাদের ছেলেবেলায় উঁচু কোনও বাড়ি ছিল না। প্রাক্তন জমিদার, অভিজাত শ্রেণি আর ধনী ব্যবসায়ীদের অনেকখানি ছড়ানো বাগানওয়ালা বাড়ি ছিল। কলকাতার প্রান্তসীমার ও পাশে আর এক ধনিক শ্রেণির প্রমোদ ভবন। তারপর এক সময় শুরু হল জমি নিয়ে টানাটানি। তখন আর ছড়ানো বাড়ির বদলে নতুন বাড়িগুলো হতে লাগল ঊর্ধ্বমুখী। রিফিউজিদের ঢল নামার পর তারা ওই সব বাগানবাড়ি দখল করে নিল। বাগানবাড়ি দখল করা খুব বেশি শক্ত কিছু নয়, কিন্তু ফ্ল্যাট বাড়ি সে ভাবে দখল করা যায় না। শুরু হয়ে গেল ফ্ল্যাট কালচার।
আমি থাকতাম তখন উত্তর কলকাতায়। হাতিবাগান অঞ্চলে অনেকগুলি থিয়েটার হল ছিল এবং ছিল একটি বেশ সুসজ্জিত সিনেমা হল, রূপবাণী। বাংলা উচ্চারণের নিয়ম অনুযায়ী বলা উচিত রুপোবাণী। অনেকেই অবশ্য বলত, রূপ্বাণী। তাঁর পাশেই গড়ে উঠল একটা পাঁচতলা বিশাল ফ্ল্যাটবাড়ি। সেটা এমনই অভিনব যে অজ পাড়াগাঁ থেকেও অনেক ছেলেমেয়ে সেটা দেখতে আসত। সেটার নাম হয়ে গেল পাঁচতলা বাড়ি, এবং দিক্দর্শক। ওই অঞ্চলের কোনও ঠিকানা বলতে হলে বলা হত, ওই তো পাঁচতলা বাড়ির ডান দিকে বা পিছন দিকে ইত্যাদি।
এখন তো পৃথিবীর অনেক শহরের মতন কলকাতায়ও কুড়ি-তিরিশ তলা অট্টালিকায় ভরে গেছে। আমি নিজেও এখন একটা উঁচুবাড়িতে থাকি। এই ফ্ল্যাটবাড়ির উপকারিতা-অপকারিতা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। তার মধ্যে একটা সর্বসম্মত তথ্য উঠে আসে। আত্মহত্যা করার জন্য এই উঁচুবাড়ির অবস্থান। বেশ সুবিধাজনক।
খবরের কাগজে প্রায় রোজই খুন বা আত্মহত্যা, ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির খবর পড়তে পড়তে গা গুলিয়ে ওঠে। তাই ইদানীং আর ও-সব একেবারেই পড়ি না। কয়েক দিন আগে একজন পরিচিত মানুষ ফোন করে বলল, দাদা, আপনি খবরটা দেখেছেন? মুকুতা আর নেই। সে তার মা আর এক বোনকে নিয়ে…।
জীবনে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় যা কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। আমার সমস্ত পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়-স্বজন, সবারই একটা চরিত্র-চিত্র তৈরি করে নিই, নিজের বিচারক্রমে। অর্থাৎ আমাদের বোধের মধ্যে রয়েছে একটা বিরাট আর্ট গ্যালারি। যাতে রয়েছে সব চেনা মানুষের ছবি আর তাদের সম্পর্কে আমার ধারণা-বৰ্ণনা। সেই সব চরিত্র-চিত্রণ বাস্তবে কিছুটা এ-দিক ও-দিক হতেই পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে বিপরীত হলে মেনে নিতে কষ্ট হয়। যেমন ধরা যাক, একজন খুব ভাল তবলা বাজায়। হঠাৎ যদি সে ছবি এঁকে খুব নাম করে ফেলে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই, আমরা মেনে নিই, খুশি হই। কিন্তু এমন এক জন বন্ধু প্রায়ই আসে আমাদের বাড়ি। মুড়ি আর বেগুনি খেয়ে আড্ডা দেয় আমাদের সঙ্গে। আমার স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তার পর যদি একদিন হঠাৎ দেখি যে, রাস্তায় আমাকে দেখেও মুখ ফিরিয়ে থাকে, ডাকলেও সাড়া দেয় না। তাতে কেমন লাগে? কারণটা খোঁজার জন্য আমার রাত্তিরে ঘুম চলে যায়।
সেই রকমই মুকুতা সম্পর্কে আমার যে ধারণা করে রেখেছি, তাতে এই সরল তেজি মেয়েটি যদি দেখে কোনও ব্যক্তি তার আদর্শকে বাধা দিচ্ছে কুৎসিত ব্যবহার করে, তা হলে ঝোঁকের মাথায় মুকুতা তাকে গুলি করে মেরে ফেলতেও পারে। তা আমি বিশ্বাস করে নিতে পারি। কিন্তু আত্মহত্যা? এ তো তার চরিত্র থেকে একেবারে বিপরীত মেরুতে সরে যাওয়া।
কত দিন ধরে চিনি মুকুতাকে। সে নিজে নিজেই দেখা করতে এসেছিল আমাদের বাড়িতে। তখন সে বেহালা ফ্লাইট ক্লাবে বিমান-উড়ান শিখছে। যত দূর জানি, দশ হাজার মাইল নিজে নিজে চালাতে শিখলে তবেই সে পাইলট হওয়ার পরীক্ষায় যোগ্য হতে পারে। সংখ্যাটা ঠিক না-ও হতে পারে। মুকুতার সাড়ে সাত হাজার মাইল হয়েছে তখন পর্যন্ত। এই শেষের দিকটায় খরচও বেশি। যাই হোক, সে সব ব্যবস্থা হয়ে গেল, পরে মুকুতা পাইলট হওয়ার লাইসেন্স পেয়েছে। মেয়েদের পক্ষে পাইলট হওয়া এখন আর অভিনব কিছু নয়। অনেক আগেই দুর্বা ব্যানার্জির নাম শুনেছি। কিন্তু আমাদের চেনাশোনা, মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে হঠাৎ আকাশে উড়তে চাইবে কেন, তা নিয়ে আমাদের কৌতূহল থাকবেই। পাইলট হয়েও মুকুতা কিন্তু সেটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেনি। কেন, তা জানি না। তাঁর বাবা একজন সরকারি অফিসার, মুকুতা মাঝে মাঝে ছোটখাটো কাজ করে কিছু উপার্জন করত, সে বাঁধা পড়ে থাকতে চায়নি৷ এবং মধ্যবিত্ত জীবনের ধারা অনুযায়ী এই সময়েই তো বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা। সে বেশ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং আকর্ষণীয়া তরুণী। তবু তার বিয়ের বিষয়ে কোনও প্রস্তাবনার কথাও শুনিনি। তাঁর সঙ্গে কোনও পুরুষের গোপন হৃদয়-সম্পর্ক ছিল কি না তাও জানা যায়নি। মাঝে মাঝে হঠাৎ সে চলে আসত এক ঝলক স্নিগ্ধ, মিষ্টি বাতাসের মতন। এর মধ্যেই সে হয়ে উঠল একজন সমাজকর্মী এবং কট্টর ভাবে পরিবেশ সংরক্ষণের সৈনিক। কোথাও বেআইনি গাছ কাটা কিংবা পুকুর ভরাটের খবর পেলেই সে ছুটে যেত সেখানে। কখনও দলবদ্ধ ভাবে, কখনও একাই সে সব জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলত। সেই জন্যই প্রোমোটার নামের যে শ্রেণির এখন খুব রমরমা, তাদের একটা অংশ দু’চক্ষে দেখতে পারত না। টাকার লোভ দেখিয়ে কিংবা হত্যার হুমকি দিয়েও তাকে বাধ্য করা যেত না। তারা ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে তাকে মেরে ফেলতেও পারত। মুকুতার মতো মেয়েকে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু জয় করা যায় না।
আমাদের পরিবারে স্বাতীর সঙ্গেই তার পরিচয় ছিল বেশি। সেই স্বাতীকেও সে একবার বকুনি দিয়েছিল। ব্যাপারটা হয়েছিল কী, আমাদের শান্তিনিকেতনের বাড়ির পাশেই আছে একটা ছোট পুকুর। এটা আমার পূর্ববঙ্গীয় স্মৃতি আর শখের ব্যাপার। আমি সেখানে ছিপ ফেলে বসে থাকতাম অনেকক্ষণ। তার মধ্যে কয়েক বার মাছও ধরেছি। কয়েকটা হাঁসও সেখানে খেলে বেড়ায়। দেখেছি মাছ-ধরা পাখির সুনিপুণ ছোঁ মারা। দু’একটা সাপেরও ডুব সাঁতার।
একবার আমি দেশের বাইরে ছিলাম কিছু দিন, তারই মধ্যে স্বাতী কিছু লোকের ভুল পরামর্শে পুকুরটার চার পাশ সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে দেয়। কিছু কিছু ক্লাবের সুইমিং পুল থাকে এ রকম। কিন্তু তাদের ব্যবস্থা অন্যরকম। গাঁয়ে গঞ্জে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য পুকুরে এ রকম ভাবে বাঁধানোর রীতি নেই। কারণ, বৃষ্টির সময় পাড়ের মাটি ধুয়ে ধুয়ে যে জলের ধারা পুকুরের জলে মেশে, তার মধ্যেই থাকে মাছ ও অন্যান্য পোকা-মাকড়ের কিছুটা খাদ্য। সিমেন্টের ওপর দিয়ে জল গড়িয়ে এলে তাতে কিছুই থাকে না। এটা এক ধরনের পরিবেশ দূষণও বটে।
মুকুতা এক দিন এসে আমাদের পুকুরের সেই দশা দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তারপর বলতে লাগল, ছি ছি ছি, বউদি, তুমি এই কাজ করলে? আমি অনেক জায়গায় পুকুর বাঁধানোর কাজ আটকাবার জন্য ধর্না দিই, আর তুমি আমার প্রিয় বউদি এ কাজ করলে?
মুকুতার এই ধরনের আহত ছটফটানি দেখে স্বাতী বলল, আমি ভুল করেছি রে। ঠিক বুঝতে পারিনি। এখন বুঝেছি, ওই পুকুর ধারের সিমেন্ট আমি সব ভেঙে দেব।
আমিও তাতে যোগ দিয়ে বললাম, মুকুতা শান্ত হও। আমরা আজ কালের মধ্যেই ওটা ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করছি।
পরে খবর নিয়ে জানলাম, পুকুর পাড় সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া সহজ, ভেঙে ফেলা তার থেকে অনেক শক্ত। খরচও অনেক বেশি। ভাঙা সিমেন্টের চাঁই জমে গেলে তা আবার ওঠানো খুবই কষ্টসাধ্য।
মুকুতাকে আমরা কথা দিয়েছিলাম। সে কথা রাখতে পারিনি এখনও। মুকুতা আমাদের আর একটু সময় দিল না। আগেই বলেছি, মুকুতা কারওকে খুন করে ফেললেও ততটা অবাক হতাম না। কিন্তু আত্মহত্যা! আমার সমস্ত অভিজ্ঞতার বাইরে। মুকুতার পক্ষে এমন আত্মহত্যা একেবারেই মানায় না। কোনও আত্মহত্যার খবর শুনলে অনেক মানুষ তার একটা কার্য-কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। নিজেরা কিছু তত্ত্বও বানিয়ে ফেলে। মুকুতার এই ব্যাপার সম্পর্কে নিজস্ব কোনও তত্ত্ব বলতে আমি অক্ষম। আর এক পরিবারের কয়েক জন মিলে আত্মহত্যা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য ব্যাপার। মুকুতা এই কাণ্ডটি করার আগে যদি ঘুণাক্ষরেও কিছু ইঙ্গিত দিত, তা হলে তাকে বকেঝকে হয়তো নিবৃত্ত করতেও পারতাম। মুকুতা সে সুযোগ আমাদের দিল না।
১২. ৯. ২০১২
বন্ধু বলছিলেন, ভারত নাকি অহিংসার দেশ!
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। তিনি জেনে গেলেন কি না জানি না, স্বাধীনতা এসে গিয়েছিল তার পাঁচ সাত বছর পরেই। কিন্তু রক্তের স্রোত থামেনি, বেড়েই চলেছে।
আমার জন্ম পরাধীন ভারতে। দেশভাগ আর স্বাধীনতা যখন আসে, তখন আমার কৈশোর, সেই সময়কার অনেক স্মৃতিই এখনও মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করে। সেই বয়েসে মানুষের বিশ্বাস ও আদর্শে কোনও ভেজাল থাকে না। সত্যি আর মিথ্যার মধ্যে থাকে একটা স্পষ্ট বিভাজিকা।
সেই চল্লিশের দশকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখেছি আমরা। তাতে কত লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল তাঁর সঠিক হিসেব আজও হয়নি। হিটলারের ইহুদি নিধনের কাছাকাছিই হবে। তার পর ছেচল্লিশের সাঙ্ঘাতিক দাঙ্গা এবং স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশভাগের নির্মম ট্র্যাজেডি। আমাদের পরিবারও সেই ট্র্যাজেডির মধ্যে পড়েছিল। এত সব কাণ্ডের মধ্যেও আমরা কী করে যে বেঁচে রইলাম, সেটা আজও বিস্ময়কর মনে হয়। এর সব কিছুরই জন্য দায়ী আমাদের শাসক বিদেশি সরকার। যারা এ দেশের ভালমন্দ কিছু গ্রাহ্যই করে না, তারা যতদূর সম্ভব ভারতীয় সম্পদ লুটেপুটে নিয়ে যেতে চায়। সুতরাং ওরা চলে গেলেই কিংবা যেতে বাধ্য হলেই স্বাধীন ভাবে সোনার ভারত গড়ার কার্যক্রম শুরু হবে। আমরা সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সেই দৃপ্ত ঘোষণায়, দেশ স্বাধীন হলেই তিনি কালোবাজারিদের ধরে ধরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবেন। এটা অতিশয়োক্তি হতে পারে, কিন্তু কিছু তো করবেন তিনি। কিন্তু কিছুই করেননি, বা করতে পারেননি। বরং তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি হচ্ছিল হু হু করে। এখনকার খোলা বাজারের মতোই সে যুগে কালোবাজার দেশকে গ্রাস করে নিচ্ছিল।
যাই হোক, এ সব নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, এখনও হয়। আমি আর তা চর্বিতচর্বণ করতে চাই না। তবে সেই সব স্মৃতি হঠাৎ আমার মনে গজগজ করছে। তাই না লিখে পারছি না। আমি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করার পর পোল্যান্ডের এক লেখিকার সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তিনি বেশ খ্যাতিময়ী। নোবেল পুরস্কারের জন্যও কয়েক বার তাঁর নাম উঠেছিল। তিনি একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, পৃথিবীর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন ভারতকে। কারণ, কখনও ভারত অন্য কোনও দেশ আক্রমণ করেনি। সাম্রাজ্য বিস্তারেরও কোনও চেষ্টা করেনি। ভারত হচ্ছে অহিংসা ও শান্তির দেশ।
এ কথা শুনে কি গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠা উচিত ছিল? না, আমার তা হয়নি, আমি বরং লজ্জায় অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলাম। এত বড় প্রশংসা ভারতের প্রাপ্য নয়, ইতিহাসসম্মতও নয়। ভারত অন্য কোনও দেশ আক্রমণ করেনি, তার মূল কারণ, ভারতের সে রকম ক্ষমতাই ছিল না। এত বড় দেশে কোনও বিশাল ও মজবুত সেনাবাহিনী গড়ে ওঠেনি। এমনকী মোগল আমলেও না।
আর অহিংসা আর শান্তির দেশ? অহিংসা শব্দটি তখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল মহাত্মা গাঁধীকে কেন্দ্র করে। তাঁর অহিংসা সত্যাগ্রহ আন্দোলন সারা পৃথিবীতেই অভিনব। কিন্তু আমরা জানি, এ দেশের মানুষ মোটেও অহিংস নয়। গাঁধীজি পরাধীন আমলে খুন হননি, খুন হয়েছেন স্বাধীন ভারতে। ভারতীয়রা আত্মকলহ কিংবা নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বেই বেশি দক্ষ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘শক-হুণ দল পাঠান-মোগল’ যখন-তখন এসেছে আর ভারতীয়রা মারও খেয়েছে। তাও তো চেঙ্গিস খান এ দেশে ঢোকেননি। ঢুকলে আরও কত লক্ষ মানুষ তাদের মুণ্ডু হারাত, কে জানে।
ছেলেবেলায় পাঁঠাবলি দেখেছি। তখন শুনতাম এক বলিতেই পাঁঠার গলা কাটতে হবে। কেউ যদি তা না-পারে, তা হলে দুর্গা বা কালীমাতা অত্যন্ত রেগে যাবে। অভিশাপও দিয়ে ফেলতে পারেন। সেই জন্য সে অঞ্চলের কোনও বলশালী লোককে ডেকে আনা হত। পালোয়ান সেজেগুজে এসে দাঁড়াত। পাঁঠাটাকে রাখা হত হাঁড়িকাঠে। দু’তিন জন লোক উল্টো দিক থেকে পাঁঠার মাথা টেনে ধরত, যাতে তার গলাটা যত দূর সম্ভব লম্বা করা যায়। পাঁঠাটা মৃত্যুভয়ে চেঁচাত আর আততায়ীরাও ভক্তিভরে ডাকত মা মা… তার পরেই ঘচাং। কখনও সে কোপ ব্যর্থ হতে দেখিনি।
আমাদের ধারণা ছিল, মানুষের গলা কাটা অত সহজ নয়। ভুল ধারণা। এখন তো দেখছি প্রায়ই এখানে সেখানে মুণ্ডহীন ধড় পাওয়া যাচ্ছে। এ রকম বর্বরতা অন্য কোনও সভ্য দেশে নেই। ছেলেবেলায় শুনতাম, কোনও কোনও অঞ্চলে এক জন অসহায় নারীর উপর ডাইনিগিরির অভিযোগ চাপিয়ে পুড়িয়ে মারা হত। আজও তেমন ঘটনা শুনতে পাই। পঞ্চাশ ষাট বছর আগে বড় বড় রাস্তার মোড়ে স্ত্রীলোককে দেখেছি একটা শিশুকে কোলে নিয়ে ভিক্ষে চায়। এখনও তা দেখি। হঠাৎ আমার মনে হয়, যেন এত বছর ধরে সেই একই স্ত্রীলোক একই শিশু নিয়ে ফিরে ফিরে আসে।
এক সময় শোনা যেত যে, ভারতের তিনটি বড় বড় শহরের মধ্যে এক একটাকে এক এক পরিচয় দেগে দেওয়া হয়েছে। যেমন, দিল্লি তো অবশ্যই রাজনৈতিক রাজধানী। বম্বে অর্থাৎ অধুনা মুম্বই হচ্ছে ব্যবসাবাণিজ্যের রাজধানী আর কলকাতা হচ্ছে শিল্প সাহিত্যের রাজধানী। কে রটিয়েছে তা জানি না। হয়তো বাঙালিরাই। বাঙালিরা ব্যবসা বাণিজ্য করতে জানে না, রাজনীতিতেও তেমন উঁচু জায়গায় পৌঁছতে পারে না। তাই তাদের দেওয়া হয়েছে শিল্প সংস্কৃতির তকমা। যদিও এটা অর্থহীন। বাঙালিদের মধ্যে বহু স্রষ্টার অভূতপূর্ব উত্থান হয়েছে, যেমন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, যামিনী রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। কিন্তু তাদের প্রভাব কতখানি? একটা ছোট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। অধিকাংশ বাঙালি মূর্খ, তাদের শিল্প-সাহিত্যের কোনও বোধই নেই। অর্ধেকের বেশি বাঙালি তো এখনও পড়তে-লিখতেই জানে না।
লেখাটা থামিয়ে হঠাৎ আমার মনে হল, এ সব আমি লিখছি কেন? আমি তো সাধারণত নৈরাজ্যের কথা লিখতে চাই না। আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও আমার হাতে ঠিক আসে না। এ লেখা কি শেষ হবে তিক্ততার স্বাদ নিয়ে?
তা হলে একটা অন্য কথা বলি। বারো-পনেরো বছর আগেকার কথা। এক সন্ধেবেলা আমি এক কবিবন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম, সে দিনটা যে তাঁর জন্মদিন তা না-জেনে। বাইরের বসার ঘরে অনেক ফুলের তোড়া আর কিছু কিছু নারী পুরুষ রয়েছে। কবি সেখানে নেই। তিনি উঠে গেছেন একটু আগে একটা ভেতরের ঘরে। এ বাড়িতে আমার অবাধ ঘোরাফেরার অধিকার আছে, তাই চলে গেলাম সেই ভেতরের ঘরে। নতুন ধুতি পাঞ্জাবি আর কপালে চন্দনের ফোঁটা নিয়ে মাটিতে আধশোয়া হয়ে রয়েছেন সেই কবি। আরও আট দশ জন তরুণ দু’জন তরুণী সমেত সেখানে বসে আছে, কেউ চেয়ারে, কেউ মাটিতে।
বন্ধুটি আমাকে বসতে বলল। ওদের একজন একটা কবিতা পড়তে শুরু করল। তখন ওদের দিকে তাকিয়ে কয়েক জনকে চিনতে পারলাম। জয় গোস্বামী, পিনাকী ঠাকুর, শ্রীজাত, বিনায়ক, শিবাশিস, শ্যামলকান্তি, রূপক, চিরঞ্জীব, জয়দেব, সেবন্তী আর প্রায় তরুণী নবনীতা। আরও কেউ কেউ হয়তো ছিল। এরা সবাই নতুন কবিতা এনেছে এখানে পাঠ করার জন্য। বর্ষীয়ান কবিকে শোনাবার জন্য নয়। নিজেরাই নিজেদের কবিতা শোনাবে। এমনকী সেই কবিও একটু লাজুক মুখে বললেন, আমিও দুটো কবিতা নতুন লিখেছি। যদি তোমরা আমায় একটা চান্স দাও।
প্রথমটায় সেই কবিতা পাঠে আমি মনোযোগ দিতে পারিনি। মনটা খুবই চঞ্চল হয়েছিল। সে দিন সকাল থেকে নানা কুৎসিত ও বীভৎস ঘটনা শুনতে হয়েছে। শুনেছি, একটা ছোটদের স্কুলে কিছু অস্ত্রধারী (তারা ডাকাত না বিপ্লবী তা অবশ্য জানা যায়নি) ছাত্রদের সামনেই শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে। এখানে এই কবিতার আসরে সে সব ঘটনার চিহ্নমাত্র নেই। তাদের কবিতা যেমন নানা বিষয়ে, তেমনই তাদের পাঠেও গুরুগম্ভীর জ্যাঠামি নেই। আমার মনে এই প্রশ্ন এসে গেল, কবিতা কি মুছে দিতে পারে সমাজের এত গ্লানি? ক্রমে সব প্রশ্নটশ্ন ভুলে গিয়ে আমিও ডুবে গেলাম কবিতার রসে।
সেই দিনটি আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। তারপর থেকেই যখন কোনও সাংঘাতিক ঘৃণ্য ব্যাপার ঘটতে থাকে, যার প্রতিকার করার ক্ষমতা আমার নেই, শুধু শুধু মর্মযাতনা ভোগ করতে হয়, তখন আমি কোনও প্রিয় কবির কবিতার বই খুলে পড়তে শুরু করি। প্রথমে কয়েক মিনিট মন বসাতে পারি না, তারপর আস্তে আস্তে নিমজ্জিত হই কবিতার রসে। হ্যাঁ, কবিতার সেই শক্তি আছে। বাস্তবের নগ্ন দিকটা সে ভুলিয়ে দিতে পারে।
২৬. ৩. ২০১২
Chapter - 11
ভালবাসার জন্য কাঙালপনা মুছে যায়নি তো?
এই সময়টায় মাঝে মাঝেই কোনও একটা সংবাদ মাধ্যম (ছাপার জন্য কিংবা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য) আমার কাছে এসে জানতে চান, আমাদের অল্প বয়সে দেখা দুর্গাপুজো আর এখনকার পুজোর উৎসবের কী তফাত বলুন তো? এই প্রশ্নটার মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে যে, আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। তা তো হয়েছে সত্যিই। আমরা ছাপা অক্ষরের পক্ষপাতী। বৈদ্যুতিন মাধ্যমটিকে ঠিক এখনও রপ্ত করতে পারিনি। অনেক পরিচিত শব্দের অর্থ বদলে গেছে। যেমন বাইট, তার জন্য অবশ্য কারওকে কামড়াতে হয় না। মাউস মানেও কোনও ইঁদুরকে ধরে আনার দরকার নেই। উইন্ডো মানে জানালা নয়, ইত্যাদি।
যাকে বলে কম্পিউটার-স্যাভি, সেটা আমি আজও হতে পারিনি। আর বোধহয় হবেও না। আমি জীবনের শুরু থেকেই ‘লম্বা হাতে’ (অর্থাৎ কি না ‘লং হ্যান্ড’-এ) লিখি। তার বদলে মুখে কিছু বলতে গেলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কারণ, তাতে কিছু কিছু ভাষার তফাত হয়ে যায়। তবু মুখের ভাষাতেই সব বলতে হয়। যারা বই-টই নিতে আসে, তারা লেখা-টেখা কিছুই চায় না। গত তিন চার বছর ধরে দেখছি, বৈদ্যুতিন মাধ্যমে চ্যানেলের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কী সুন্দর স্মার্ট তরুণী-তরুণরা এই কাজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রত্যেক বছরই এই একই প্রশ্নে আমি ঠিক একই রকম উত্তর দিই। এমনকী আমার একটি বইতেও অনেকখানি লেখা আছে। তারা সে সব কিছুই উল্লেখ করে না। হাসি মুখেই চলে যায়। অর্থাৎ তারা ওই সব লেখাটেখা পড়ে না। পড়ার দরকারও মনে করে না। ওদের কাছে সে সব হচ্ছে হার্ড কপি। আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম, গদ্য লেখাকেই বুঝি এরা হার্ড কপি বলে, আর কবিতা হচ্ছে সফট কপি। এখন আমি বুঝতে পেরেছি, কম্পিউটারের কাছে গদ্য-পদ্যের কোনও তফাত নেই। ওদের কাছে মুড়ি মিছরি এক দর।
আমার জন্ম হয়েছিল পূর্ব বাংলার অজ পাড়াগাঁয়ে। আমার মায়ের মামাবাড়িতে ওঁরা বেশ সচ্ছল। ছোটখাটো জমিদারের মতন। এবং তাঁদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বেশ চল ছিল। মায়ের এক মামার নাম সুরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়। ওই রকম সামান্য গ্রামে লেখাপড়া শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত হয়েছিলেন ডি এস সি৷ প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্ক বিভাগের প্রধান। ত্রিকোণমিতি নিয়ে পাঠ্যবইও লিখেছিলেন। তাঁর ছেলেরাও ছিল উচ্চশিক্ষিত। অন্তত এম এ পাশ না করলে তাঁরা কাউকেই ঠিক শিক্ষিত বলে গণ্য করতেন না। সে জন্যই মা আমার আফসোস করে বলতেন, আমার ভাইরা সব এম এ পাশ। আর আমার ছেলেরা…তুই এম এ পর্যন্ত পড়বি না? আমি তখন গ্র্যাজুয়েট হয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করব না ঠিক করেছিলাম।
যাক সে সব কথা, মানুষ নিজের জীবনের অনেক ঘটনা আস্তে আস্তে ভুলে যেতে শুরু করে। আবার কিছু কিছু স্মৃতি যেন খোদাই করার মতন চিরকাল থেকে যায়। মামাবাড়িতে খুব ধুমধাম করে পুজো হত। সেই সময়কার দু-তিনটি স্মৃতি বেশ মনে আছে। অনেক দুঃখের ঘটনা পরবর্তী জীবনে আস্তে আস্তে বেশ মধুর হয়ে আসে। আমার অবশ্য একটি ঘটনা এখনও একটা তিক্ত স্বাদ এনে দেয়।
পুজোর মাসখানেক আগেই চারটে ছাগলছানা কিনে আনা হত হাট থেকে। তারপর আমাদের মতো কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়েকে ভার দেওয়া হত সেগুলো দেখাশোনা করার। আমরাও প্রবল উৎসাহে তাদের ঘাস খাওয়াতাম। ছোটাছুটি করে খেলতাম ওদের সঙ্গে। ওদের একটা করে নামও দেওয়া হত। তারপর যথারীতি পুজোর দিনে বলি দেওয়া হত তাদের। সপ্তমী ও নবমীর দিন একটি করে, অষ্টমীর দিন দুটি। একটা বছরের কথাই মনে আছে। তখন আমার বয়স এগারো। যথারীতি চারটে পাঁঠাকে এক মাস ধরে লালন পালন করেছি। সপ্তমীর দিন একটা পাঁঠাকে হাঁড়িকাঠে চড়ানো হয়েছে, আর্ত চিৎকার করছে সে। হঠাৎ আমার বুকে যেন একটা ধাক্কা লাগল। দু’-চোখ বেয়ে ঝরঝরিয়ে নেমে এল কান্না।
আমি তখনই একটা দৌড় লাগালাম। পুজো মণ্ডপ ছাড়িয়ে, পাকা বাড়িটার পাশ দিয়ে, উঠোনটা পেরিয়ে রান্নাঘরের ডান পাশে একটা সরু গলির ভিতর দিয়ে আরও কিছুটা ফাঁকা জমির ও-ধারে একটা বড় বাঁশঝাড়। সেখানেই আমার লুকিয়ে থাকার জায়গা। সেখানে বসে আমি কাঁদতে লাগলাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। খানিক বাদে আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এক মামা এসে পড়লেন সেখানে। তিনি কোনও ব্যস্ততা দেখালেন না। আমাকে কোনও বকুনিও দিলেন না। একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ে রইলেন আমার দিকে। সিগারেটটা শেষ করার পর তিনি বললেন, তুই যে এত কাঁদছিস, তার মানে বুঝলি? আজ থেকেই শুরু হল তোর বড়দের জগতে ঢুকে পড়া। আস্তে আস্তে বুঝতে পারবি, বড়দের জগৎটায় হিংসে ও নিষ্ঠুরতা আরও কত বেশি।
বড়দের জগতে পুরোপুরি ঢুকে পড়ার পরও আমার মনে বার বার এই প্রশ্ন জেগেছে, আমার ওই মামাবাড়ির অধিকাংশ পুরুষেরা উচ্চশিক্ষিত হয়েও বলিদান প্রথা সমর্থন করতেন কেন? শিক্ষাও কি মানুষের মন থেকে অনেক রকম কুসংস্কার দূর করতে পারে না?
দেশভাগের পর সেই গাঙ্গুলি পরিবার সেখানকার বাড়ি-ঘর ও সম্পত্তি ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। এখানেও তাঁরা দুর্গাপুজো বহাল রেখে দেন। কিন্তু বলিদান বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কোনও আদর্শ মেনে নয়, নিতান্তই বাস্তব কারণে।
আমার গ্রামে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় চোদ্দো বছর বয়সে। সেই বয়সটায় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখার কথা। তাই-ই তো করেছি নিষ্ঠার সঙ্গে। তার দু-তিন বছর পরেই কিন্তু মানসিকতা অনেকখানি বদলে যায়। তখন মণ্ডপে ঠাকুর দেখা হত এক ঝটকায়। তার পরই দু-চোখ খুঁজত জ্যান্ত সুন্দরী কিশোরীদের। তখন মাইক্রোফোনে ঘোষণা করতে হত, শ্রীমতী ছবিরানি বিশ্বাস, শোনো, তুমি যেখানেই থাকো, আমাদের অফিস ঘরে চলে এস। তোমার পিসেমশাই অপেক্ষা করছেন।
কিন্তু ছবিরানি সেখানে আসবে কী করে? সে তো তখন আরও দুই বান্ধবীর সঙ্গে গঙ্গার ধারের রাস্তায়। সেখানে আমি ও আর দু’জন অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি তাদের মনোরঞ্জনের জন্য।
আমরা মেয়েদের কাছে দয়া চাইতাম। কখনও কখনও তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দু-একটা ব্যাপারে সম্মতি আদায় করতেও আপত্তি ছিল না। আমরা ছিলাম ভালবাসার কাঙাল। সেই কাঙালপনাকেও আমরা তৈরি করে নিতাম কিছুটা প্রশ্রয় পাওয়ার জন্য। কোনও মেয়ের শরীর স্পর্শ করার জন্য গায়ের জোর ফলানো ছিল আমাদের চিন্তার অতীত।
এখন ছেলেমেয়েদের মেলামেশার কত সুযোগ রয়েছে। ও-রকম লুকোচুরির কোনও দরকার নেই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই যে ভালবাসা পাওয়ার জন্য যে তীব্র আকাঙক্ষা, তা এ-কালে বরবাদ হয়ে যায়নি নিশ্চয়ই।
১০. ১০. ২০১২
