← Back

হায় সজনি

Chapter - 1

এককালে পাড়ার লোকেরা বলত, ডানাকাটা পরি। সেইসব পরিদের ছবি দেখত সে রূপকথার বইতে। মেঘরঙা হাঁটু ছোঁয়া চুলের ঢেউ, মোমের মতো গায়ের রঙ, টানা টানা চোখ, টিকালো নাক। সেই ছোট্টবেলা থেকে সে শুনে এসেছে, মা তো প্রায়ই বলত, যে-কোনও পরির চেয়ে আমার মেয়ে সুন্দরী। এর বিয়ে দেব আমি রাজপুত্রের সঙ্গে।

বিধবা বড়পিসি গালে হাত দিয়ে বলত, ‘সর্বনাশ!’

‘ওমা! কার সর্বনাশ হল?’

‘নিজের। ও কথা বলা মানে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা। আজকের দিনে এদেশে তো রাজপুত্র পাওয়া যায় না। শুনেছি সাহেবদের দেশে এখনও তারা আছে। তাদের খোঁজ পাবে কী করে? আর দরকার হলে ও নিজেই তাদের খুঁজে নেবে।’ বড়পিসি বলেছিল।

কথাগুলো পছন্দ হয়নি মায়ের। বলেছিল, ‘আপনার ভাইকে তো চেনেন, ওসব করতে চাইলে মেরে পা ভেঙে দেবে মেয়ের!’

মেয়েদের স্কুল শেষ করে মেয়েদের কলেজ। পুরনো প্রৌঢ় ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে মেয়েকে কলেজের দরজায় নামিয়ে দিয়ে আসে। ছুটির কিছু আগে আনার জন্যে পৌঁছে যায়। মাঝে মাঝে সেই গাড়িতে বসে থাকে মেয়ের মা।

পড়াশুনায় বেশ ভালো মেয়ে। মেয়ের নাম অনেক বাছাই করার পর তার ঠাকুর্দা রেখে গিয়েছিলেন মৃণালিনী। স্কুলের শেষ দিকেই প্রতিবাদ শুরু করেছিল মেয়ে। বান্ধবীরা যেদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুই কোন শতাব্দীর মেয়ে রে?’

গালে রক্ত জমেছিল মেয়ের। এক সহপাঠিনী হেসে বলেছিল, ‘তোকে বোধহয় অনুমান করে সেই কতবছর আগে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন স্ত্রীর পত্র।’

আর একজন বলেছিল, ‘তাহলে তো ও বিশাল সম্মান পেয়েছে। স্ত্রীর পত্রের মৃণাল অত্যাচারী পুরুষদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। আমাদের এই মৃণালের অবশ্য কোনও ছেলে বন্ধু নেই, প্রতিবাদও করতে হয় না।’

কিন্তু প্রতিবাদ কি শুধু স্বামী বা তার পরিবারের বিরুদ্ধে, বালিকা বয়সে নিজের পরিবারের যেসব ব্যাপার নজরে পড়লেও তা মাথায় কোনও প্রতিক্রিয়া ঢুকত না, তা স্কুলের শেষ দিকে অস্বস্তির কারণ হতে লাগল। আমরা ব্রাহ্মণ, তাই অন্যজাত তো বটেই, কায়স্থদের পরিবারের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ করার কথা বাবা-ঠাকুর্দা-মা-পিসি ভাবতেই পারে না। বড়পিসিমাকে মৃণাল জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আচ্ছা, তোমরা কি কায়স্থদের মানুষ বলে মনে করো না?’

বড়পিসিমা চোখ কপালে তুলেছিল, ‘ওমা! একথা কখন বললাম?’

‘তাহলে তোমাদের বাড়ির ছেলেমেয়ের বিয়ে কায়স্থদের সঙ্গে দাও না কেন?’

‘বিয়ে হয় সমানে-সমানে। তাহলে সেই বিয়ে সুখের হয়।’

‘তোমারও তো সমান ঘরে বিয়ে হয়েছিল তাহলে—’ কথা শেষ করেনি মৃণাল।

বড়পিসির মুখে মেঘ জমেছিল। বলেছিল, ‘মাঝ নদীতে নৌকো ডুবে গেলে বাঁচবে কী করে!’ বলে সামনে থেকে চলে গিয়েছিল।

তারপর থেকেই বাড়িতে যেন একটা রাখঢাক ব্যাপার শুরু হল। সে ঘরে ঢুকলেই যারা ঘরে বসে কথা বলছে তারা হয় চুপ করে যেত, নয় অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করত। সেই চেষ্টাটা মৃণাল স্পষ্ট বুঝতে পারত।

সেদিন কলেজের একটা পিরিয়ড শেষ হতেই খবর এল গভর্নিং বোর্ডের একজন সদস্য মারা গিয়েছেন বলে কলেজ ছুটি হয়ে যাচ্ছে। অনেক মেয়ে খুশিতে চেঁচামেচি করে কলেজ থেকে বাড়ি চলে গেল। কিছু মেয়ে কলেজের অফিসরুমের সামনে লাগানো পাবলিক টেলিফোন থেকে বাড়িতে ফোন করার জন্যে লাইনে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করল মৃণাল। তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে বাড়িতে গাড়ি রেখে ড্রাইভার ভাত খেতে বাড়ি চলে যায়। ঘণ্টা দুয়েক পরে ফিরে এসে ছুটির সময়ে গাড়ি কলেজে নিয়ে আসে। তাই এখন ফোন করলে ড্রাইভার না থাকায় গাড়ি পাওয়া যাবে না।

অথচ তাদের বাড়ি কলেজ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। গাড়িতে খুব বেশি হলে পঁচিশ মিনিট লাগে। তাও রাস্তায় বাসট্রাম গাড়ির ভিড় থাকে বলেই দেরি হয়। তার ক্লাশের কিছু মেয়ে তো ওই দূরত্ব হেঁটেই চলে যায়। একা এতটা পথ কোনওদিন হাঁটেনি মৃণাল। কিন্তু যাওয়া আসার সময় গাড়িতে বসে প্রচুর বাস দেখেছে সে। বিশেষ করে দোতলা দু-নম্বর বাস। দোতলা বাসে কোনওদিন চড়েনি সে। তাদের বাড়ির মেয়েরা বাসে চাপবে এটা কেউ ভাবতেই পারে না। একবার মা বাবা এবং মাসিমণির সঙ্গে ওদের বাড়ির কাছাকাছি ট্রামডিপো থেকে ট্রামে চড়ে ধর্মতলা ঘুরে এসেছিল সে। সেটা ছিল ছুটির দিনের বিকেল। মা, মাসিমণি খুব সেজেছিল। সেই একবারই। কী যে মজা হয়েছিল সেদিন।

মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল মৃণাল। ড্রাইভার আসবে ঠিক চার ঘণ্টা পরে। ততক্ষণে কলেজ নিশ্চয়ই ফাঁকা হয়ে যাবে। লাইব্রেরি যদি খোলা থাকে তাহলে সেখানে গিয়ে হয়তো বসে থাকা যায়। কিন্তু সেখানে আর কেউ যদি না থাকে? তার চেয়ে কলেজের গেট থেকে তিন পা হাঁটলেই তো বাসস্ট্যান্ড। সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই তো লাল রঙের দুই নম্বর বাস সে পেয়ে যাবে যা তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যায়। তার ব্যাগে একটা দশ টাকার নোট আছে।

নোটটা একবছর আগে মাসিমণি তাকে দিয়ে বলেছিল, ‘ব্যাগে রেখে দিস। দেখবি, ঠিক কাজে লেগে যাবে।’ গত এক বছরে দরকার পড়েনি বলে টাকাটার কথা মৃণালের খেয়াল ছিল না। আজ তড়িঘড়ি ব্যাগটা খুলে দেখল টাকা দু’ভাজ করে ব্যাগের পকেটে সে যেমন রেখেছিল তেমনই রয়ে গেছে। দশ টাকার অনেক কমে যে বাসের টিকিট পাওয়া যাবে তা সহপাঠিনীদের কাছে জেনেছিল সে।

কেউ চোখ রাঙালো না, মৃণাল ব্যাগ নিয়ে কলেজের গেট পেরিয়ে বাস স্টপের দিকে পা বাড়ালো। ইতিমধ্যে সে কিছুটা দেরি করে ফেলায় বাস স্টপের দুজন সিনিয়ার ছাত্রী ছাড়া কেউ নেই। একটা একতলা বাস এসে দাঁড়াতেই তারা উঠে গেল সেই বাসে।

বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছিল। আশেপাশে কেউ নেই। বাসও আসছে না। মৃণালের মনে হল তার কলেজে ফিরে যাওয়া উচিত। তার এইভাবে বের হওয়া বাড়ির কেউ পছন্দ তো করবেই না, খুব বকাবকি করবে। দূরে একটা বাস দেখা দিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ওই বাস যদি তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যায় তাহলে উঠে পড়বে আর সমস্যা থাকবে না। বাস থেকে নেমে সে সোজা বাড়িতে ঢুকে যাবে।

বাসটা যখন কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক তখনই একটা গলা কানে এল, ‘টু বি অর নট টু বি?’

প্রশ্নটা যে তাকেই করা হয়েছে তা বুঝতে পারল না মৃণাল। সে দু’পা এগিয়ে যেতেই বাসের নম্বর দেখতে পেল। বাসের সামনে যে বোর্ড ঝুলছে তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে টুবি অর্থাৎ এই বাস মৃণালদের বাড়ির দিকে যাবে না! সে দুই পা পিছিয়ে গেল। তাহলে এবার তার কলেজে যাওয়াই উচিত।

মৃণাল ঘুরে দাঁড়াতেই ছেলেটিকে দেখতে পেল। সাধারণ শার্টপ্যান্ট পরা একুশ-বাইশ বছরের তরুণ। গালে হালকা দাড়ি যার রঙ এখনও কালো হয়নি। তাহলে এই ছেলেটি একটু আগে ওই কথাগুলো বলেছিল?

ছেলেটি এগিয়ে এল এক পা, ‘তাহলে নট টুবি। কোনও কোয়েশ্চেন নেই। আপনার বাস শুধু নাম্বার টু। তাই তো?’

চোখ বন্ধ করল মৃণাল। ছেলেটার পাশ কাটিয়ে দৌড়ে কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাবে? ছেলেটা হাসল, ‘আমার নাম অমিত। না, আমিত রায় নয়, অমিত মিত্র। এম.এ পড়ি। ওই মোড়ের মাথায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস আছে, সেখানেই থাকি। ইয়ে, মানে আপনি বলব না তুমি? যাক গে, নাম জানতে পারি?’

এইসময় দু’নম্বর বাস সামনে এসে দাঁড়াতেই মৃণাল দ্রুত তার পাদানিতে উঠে পড়ল। তার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল দোতলা বাসের ওপর তলায় উঠে জানলার ধারে বসার। কিন্তু আজ নার্ভাস চোখে দেখল বাসের নিচ তলায় তিনজন মহিলা যাত্রী বসে আছেন। ওঁদের পাশে বসলে নিরাপদে যেতে পারবে ভেবে সে একতলার আসনে গিয়ে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকাতে তার ভয় করছিল।

গায়ে পড়ে যে ছেলে কথা বলে তাকে বিশ্বাস করা মুশকিল। মৃণাল জানলার বাইরে তাকালো। তার খুব ভয় হচ্ছিল, ছেলেটা ওপাশের খালি আসনে এসে না বসে। মোড়ের মাথায় দুজন মহিলা নেমে গেলে সে তৃতীয় মহিলার দিকে তাকাল। চশমা পরা মধ্যবয়সি মহিলাকে দেখে মনে হল উনি খুব রাগী।

হঠাৎ তার মনে হল নিজেদের বাড়ির সামনে বাস থেকে নেমে যাওয়া ঠিক হবে না। ছেলেটি নিশ্চয়ই এই বাসে আছে। তাকে নামতে দেখলে ও অনুসরণ করবে। বাড়িটা বুঝে নিয়ে পরে সে বিরক্ত করতে আসবে না নিশ্চয়তা কি? আর সেটা যদি বাবা-মা জানতে পারে তাহলে আর দেখতে হবে না; নির্ঘাত তাকে কলেজ থেকে ছাড়িয়ে এনে বর খুঁজতে বের হবে। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চেয়েছিল। দুটো কারণে বিয়ে হয়নি, মাসিমণি প্রচণ্ড আপত্তি করেছিল আর তার বয়সের পাত্রীর জন্যে অল্পবয়সি বর পাওয়া যায়নি; বাবা বলেছিল, ‘অনার্স গ্রাজুয়েট হলে তিনবছর বয়স বাড়বে আর পাত্রও ভাল পাওয়া যাবে।’ কিন্তু একটা ছেলে তাকে ফলো করেছে, এটা তার অপরাধ না, ওঁরা বুঝতেই চাইবে না। মৃণাল ঠিক করল, নিজের বাড়ির সামনের স্টপে সে বাস থেকে নামবে না।’

চোখ বন্ধ করল সে। বাস বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে চলে আসার পরে সে চোখ খুলল। আর তখনই তার মনে পড়ল মাসিমণির কথা। তাদের বাড়ির থেকে মিনিট আটেক দূরে মাসিমণির বাড়ি। মাসিমণি বেশি আসে তাদের বাড়িতে। বাবা মেসোকে পছন্দ করে না বলে বিশেষ উপলক্ষ না থাকলে তারা যায় না। মৃণাল সোজা হল। মাসিমণির বাড়িতেই যাবে সে? তাতে যদি ছেলেটা ভেবে নেয় ওটাই তার বাড়ি, তাই ভাবুক।

মাসিমণির বাড়ির স্টপে সে বাস থেকে নেমে একবার পেছনে তাকিয়ে নিল। না, ছেলেটাকে দেখতে পেল না। বাস চলে গেলে শূন্য স্টপেজে সে একা। স্বস্তির শ্বাস ফেলল মৃণাল। না, হয় ছেলেটা তাকে অনুসরণ করেনি, নয়তো বাসেই বসে আছে, সে যে নেমে পড়েছে তা বুঝতে পারেনি। দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সে গলিতে ঢুকেই মাসিমণির বাড়ির দরজার বেলে চাপ দিল।

কাজের মেয়ে চম্পা দরজা খুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওম্মা, তুমি?’

তার চিৎকারে মাসিমণি দ্রুত চলে এসে কপালে ভ্রু তুললেন, ‘একি! তুই একা এলি? সঙ্গে কেউ আসেনি!’

মাথা নেড়ে না বলে বাইরের ঘরের চেয়ারে বসে পড়ল মৃণাল। তারপর কাজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এক গ্লাস জল দাও।’

মেয়েটি ভেতরে দৌড়ে গেলে মাসিমণি কাছে এসে অদ্ভুত গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে রে? মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস নাকি?’

মাথা নেড়ে না বলল মৃণাল।

‘তুই আজ কলেজে যাসনি?’

‘গিয়েছিলাম।’ মেয়েটির হাত থেকে গ্লাস নিয়ে জল খেল সে অনেকটা। তারপর বলল, ‘ওঃ।’

‘কী হয়েছে? নিশ্চয়ই কোনও ঝামেলা বাঁধিয়েছিস?’

‘আমি ঝামেলা বাঁধাই?’

‘নইলে তুই একা আমাদের বাড়িতে এলি কী করে? আজ পর্যন্ত কোনও দিন তুই একা এই বাড়িতে কখনও এসেছিস না তো মা-বাবা আসতে দিয়েছে? কী হয়েছে খুলে বল।’ বলতে বলতে পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন মাসিমণি। তাঁর হাত দু’হাতে ধরল মৃণাল। তারপর ঠিক যা যা ঘটেছিল তাই খুলে বলল।

সব শুনে মাসিমণির চোখ কপালে উঠল, ‘কী সর্বনাশ! তুই এ কী করেছিস? কত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিস তা জানিস? তোর মা-বাবা জানলে আমার শ্রাদ্ধ করবে। ওদের একদম ইচ্ছে ছিল না তোকে কলেজে পড়ানোর। আমার জোরাজুরিতে রাজি হয়েছিল। এখন এসব শুনলে আমাকে আস্ত রাখবে?’

মুখে ভয় জমেছিল মৃণালের। বলল, মাসিমণি, তুমি ওদের বোলো না।’

মাসিমণি একটু ভাবলেন। তারপর এগিয়ে গিয়ে বড় টেবিলে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে তাদের বাড়ির নম্বর ডায়াল করলেন। করেই জিজ্ঞাসা করলেন মৃণালকে, ‘আর কখনও এমন কাজ করবি না তো?’

নিঃশব্দে মাথা নেড়ে না বলে মৃণাল।

ওপাশ থেকে মৃণালের মায়ের গলা ভেসে আসতেই মাসিমণি বললেন, ‘আমি বলছি গো, কী করছ?’

‘এই তো, খাবার দিতে বসলাম। আজ হঠাৎ এই সময়ে? সূর্য উঠেছে তো?’ গলায় হাসি মিশিয়ে প্রশ্ন করল মৃণালের মা।

‘উঠেছে উঠেছে। যে যার নিয়মের কাজ ঠিকঠাক করেছে। শুধু একটাই বেঠিক কাজ হয়েছে। আজ তোমার জামাই-এর সঙ্গে দোকানে গিয়েছিলাম। উনি আফিসে নেমে গেলে আমি কলেজ স্ট্রিট-কর্নওয়ালিস স্ট্রিট হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম।’

‘একা একা?’

‘ওমা! দোকা কোথায় পাব? তাছাড়া বুড়ো ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে, আমি পেছনে একা বসে আছি, ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই। তা যেই হেদোর সামনে গাড়ি এল, দেখলাম দলে দলে মেয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে। ড্রাইভারকে বললাম, কী হয়েছে তার খোঁজ নিতে। সে ফিরে এসে বলল হঠাৎ কলেজ ছুটি হয়ে গিয়েছে। তখন ভাবলাম খুকির ড্রাইভার কি ছুটির খবর জানে?’

‘সে কি রে?’ মৃণালের মা চিৎকার করে বলল, ‘সে তো গাড়ির চাবি নিয়ে গিয়েছে, আবার বিকেলে আসবে। এখন কী হবে?’

‘কী আর হবে? আমি তোমার মেয়েকে কলেজ থেকে বের করে আমার বাড়িতে নিয়ে এলাম। ও অবশ্য কিছুতেই আসতে চাইছিল না। বলছিল, মা-বাবা খুব রাগ করবে। আমি বলেছি, করে করুক। তাই বলে খালি হয়ে যাওয়া কলেজে তুই বিকেল অবধি কার ভরসায় বসে থাকবি। কিগো, ঠিক করিনি নিয়ে এসে?’

‘হ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু তোর জামাইবাবু শুনলে খুব রাগ করবে। আচমকা যদি ছুটি হয়ে যায় তাহলে প্রিন্সিপালের উচিত মেয়েদের দায়িত্ব নেওয়া। তোর বদলে অন্য কেউ যদি ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওকে নিয়ে যেত?’ দিদির গলায় আতঙ্ক।

‘কী যে বলো! ও কি বাচ্চা মেয়ে যে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কেউ নিয়ে যাবে। আমার সঙ্গেই আসতে চাইছিল না যদি তোমরা রাগ করো।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই ওকে এখনই গাড়ি দিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দে। ওর বাবা বিকেলে ফিরবে। আমি তাকে জানাতে চাই না।’

‘আঃ। এত ভয় পাচ্ছ কেন? ও তো জলে পড়ে নেই। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক সময়ে ওকে তোমার কাছে দিয়ে আসব। এখন রাখছি।’

রিসিভার রেখে মাসিমণি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভাত খেয়ে বেরিয়েছিস না খাবি?’

মাথা নাড়ল মৃণাল, সে খাবে না।

এবার গলার স্বর বদলে গেল মাসিমণির, ‘ছেলেটা কে?’

‘আমি চিনি না।’

‘তুই চিনিস না অথচ তোকে ওসব বলল?’

‘হ্যাঁ।’

‘আর কী বলল?’

‘বলল ওর নাম অমিত মিত্র, কিছু দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকে। এম.এ পড়ে। এইটুকু।’

‘অমিত মিত্র? কায়স্থ! তোর সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলল?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে বোঝাই যাচ্ছে কীরকম ছেলে। এম.এ পড়ুক বা যাই পড়ুক, চরিত্র বলে কিছু নেই। তোর বাবা মা জানলে আমি কী জবাব দেব? তারা তো তোকে কলেজে পড়াতেই চায়নি। আমি জোর করেছিলাম বলে—।’ একটু ভাবলেন মাসিমণি; ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকে বলেছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘মিথ্যেও বলতে পারে। ভদ্রঘরের সুন্দরী মেয়েদের মিথ্যে কথা বলে ভুলিয়ে সর্বনাশ করে যারা, তারা কি সত্যি কথা বলবে? যাক গে, এসব কথা যেন কেউ জানতে না পারে। এখন যাও, ভিতরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়ো। যাওয়ার আগে তোমাকে ডেকে নেব। যাও।’ মাসিমণি বললে মৃণাল উঠে ঘরে চলে গেল। বাবা-মায়ের কাছে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে না যার জন্যে তার কথা না শুনে উপায় নেই।

মৃণাল উঠে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে ভাবলেন মাসিমণি। তারপর উঠে গিয়ে টেলিফোনের নম্বরগুলো টিপলেন। স্বামীর গলা কানে যেতেই যা যা ঘটেছে তা প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন মাসিমণি। সমস্তটা বলার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বুঝতেই পারছি, এই ছেলেটা অত্যন্ত বদ। ওকে তুমি শাস্তি দিতে পারবে? এমন শাস্তি যাতে আবার কোনও মেয়ের দিকে মুখ তুলে না তাকায়।’

‘অল্প বয়সের চাপল্য। ওরকম হতেই থাকে। বুদবুদের মতো। এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনও দরকার নেই। তোমার ভাগ্নীকে এবার সাবালিকা হতে দাও।’ ফোন রেখে দিলেন মেসোমশাই।

কিন্তু মন মানছিল না। দিদি-জামাইবাবু যদি জানতে পারে তাহলে তারা তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। মেয়েকে কলেজে না পাঠালে বাইরের ছেলেরা ওর নাগাল পেত না। আর এই ছেলে যে চরিত্রহীন তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না।

মাসিমণি মনস্থির করলেন। আজ যেটুকু এগিয়েছে, কে বলতে পারে কাল তার চেয়ে আরও বেশি এগোবে না। এই বয়সের মেয়েরা ভালো কথা শুনলে অল্পেই গলে জল হয়ে যায়। তাই যা করার তা আজই করতে হবে। এই মেয়েকে তো রোজ রোজ এই বাড়িতে পাওয়া যাবে না।

বাইরে যাওয়ার পোশাক পরে তিনি ওপাশের ঘরে শুয়ে থাকা মৃণালের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমি একটু আসছি। তুই শুয়ে থাক।’

‘কোথায় যাচ্ছ গো?’ পাশ ফিরল মৃণাল।

‘পাড়াতেই, একজনের বাড়িতে।’ হাসলেন মাসিমণি, ‘তুই বিশ্রাম নে।’

বাইরে বেরিয়ে এসে মাসিমণি ইশারায় ড্রাইভারকে ডেকে গাড়ি বের করতে বললেন। তারপর গাড়ি চললে নির্দেশ দিলেন কোথায় যেতে হবে। যাতায়াতের পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলটা কয়েকবার তিনি দেখেছিলেন। আজ গেটের সামনে গাড়ি রেখে দারোয়ানকে বললেন, ‘এখানে কি অমিত মিত্র নামের কোনও ছাত্র থাকে?’

দারোয়ান হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে চলে গেল। দু’মিনিটের মধ্যে সে বেরিয়ে এল এক মধ্যবয়সিকে নিয়ে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাকে চাইছেন?’

‘অমিত মিত্র। এম.এ পড়ে।’ মাসিমণি বললেন।

‘ও হ্যাঁ। সে এই হোস্টেলেই থাকে। তাকে দরকার?’

‘হ্যাঁ। একটু ডেকে দিলে ভালো হয়।’

‘আপনার নামটা—!’

‘মাসিমা বলুন, তাতেই হবে।’

ভদ্রলোক ভেতরে চলে গেলেন। মিনিট তিনেক পরে একটি তরুণকে বাইরে বেরুতে দেখলেন তিনি। সে কাছে এসে বলল, ‘আপনি কি আমাকে খুঁজছেন?’

‘তোমার নাম অমিত?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ল ছেলেটি।

‘এম.এ পড়।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে কড়া গলায় মাসিমণি বললেন, ‘কোনও কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসো।’

‘গাড়িতে?’ হকচকিয়ে গেল ছেলেটি।

‘কানে কম শোন নাকি। ওঠো বলছি!’ ধমকে এত জোর ছিল যে ছেলেটি, যার নাম অমিত মিত্র, সুড়সুড় করে গাড়িতে উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে মাসিমণি ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন। ‘গাড়ি বাড়িতে নিয়ে যাও।’

অমিত জানলা দিয়ে একবার বাইরে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘আরে! এ কী করছেন? কে আপনি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?’

প্রায় সমান উঁচু গলায় ধমক দিলেন মাসিমণি, ‘চুপ! একদম চুপ করে বসে থাকো।’

বলার ভঙ্গীতে এমন তেজ ছিল যে অমিত একটু নেতিয়ে গেল। অসহায় লাগছিল তাকে।

বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নেমে মাসিমণি ধমক দিয়ে বললেন, ‘নেমে এসো।’ তারপর পাশাপাশি হেঁটে বাড়ির দরজার পাশে বেলের বোতাম টিপলেন।

কাজের মেয়ে চম্পা দরজা খুলে একপাশে সরে দাড়াল। মাসিমণি গম্ভীর গলায় অমিতকে বললেন, ‘ভেতরে এসো। ওই চেয়ারে চুপ করে বসো।’ তারপর চম্পাকে বললেন, ‘দরজা বন্ধ কর।’ অমিত চেয়ারে বসলে মাসিমণি গম্ভীর মুখে ভেতরের ঘরে গেলেন। যে ঘরে মৃণাল শুয়েছিল সেই ঘরে ঢুকে তিনি অবাক হলেন। ঘরে কেউ নেই। চিৎকার করে চম্পাকে ডাকলেন। সে দৌড়ে এলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মৃণাল কোথায় রে?’

‘দিদিমণি তো একটু আগে বাড়ি চলে গেল।’ চম্পা বলল।

‘এ্যাঁ? চলে গেল!’ আঁতকে উঠলেন মাসিমণি।

‘বলল, বাড়িতে যাবে। আমি বলেছিলাম আপনি ফিরে এলে গাড়িতে যেতে কিন্তু শোনেনি। মনে হচ্ছিল যেন ভয় পেয়েছে।’ চম্পা বলল।

‘ভয়? কীসের ভয়?’

‘তাতো জানি না।’

খাটের ওপর ধপাস করে বসে পড়লেন মাসিমণি। চলে গেল কেন মৃণাল? সে কি বুঝতে পেরেছিল কিছু? কী করে বুঝবে মাসিমণি এই ছেলেটাকে ধরে আনতে গিয়েছেন? একবারও তো সেকথা তিনি বলে যাননি। এখন যদি মেয়ে বাড়িতে না ফিরে অন্য জায়গায় চলে যায়? কী কৈফিয়ত দেবেন তিনি? দিদি জামাইবাবু তো বটেই নিজেকে কী বলবেন? দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে মা কালীকে ডাকতে লাগলেন। তারপর এই ঘরে টেলিফোনের যে এক্সটেনশন লাইন আছে সেখানে গিয়ে ভয়ে ভয়ে রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরেই দিদির গলা কানে এল, ‘তোর দেখছি খুব পা ভারী হয়েছে। বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিস কিন্তু মুখ দেখাচ্ছিস না!’

‘এমা! এসব কী বলছ?’ অবাক হলেন মাসিমণি।

‘নেকু! যেন কিছুই বুঝতে পারছিস না! তুই মৃণালকে কলেজ থেকে তুলে এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি যাসনি?’

‘তাই বলো—ওই ভরদুপুরে বাড়িতে গেলে তুমি মুখে কিছু বলতে না, মনে মনে ভাবতে জ্বালাতে এল।’

‘খুব কথা শিখেছিস! এখন ভরদুপুর? তুই তো একটু আগে মেয়েকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলি।’ তারপর একটু থেমে দিদি বললেন, ‘খুব ভালো করেছিস ফোন করে। তুই যে মেয়েকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছিস তা বলার দরকার নেই।’

‘তাহলে?’

‘এই বিষয়ে ওর বাবার সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। সে শুনলে আমার মাথার পোকা বের করে ছাড়বে।’

‘তাহলে মেয়ে বাড়ি ফিরল কী করে?’

‘কলেজ যে আগেভাগে ছুটি হয়েছিল তা ওর জানার কথা নয়।’

‘ঠিক আছে।’

ফোন রেখে মাসিমণি বাইরের ঘরে এসে দেখলেন ছেলেটা প্রায় শামুকের মতো গুটিয়ে আছে।

একটু দূরের চেয়ারে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী যেন নাম?’

‘আজ্ঞে, অমিত, অমিত মিত্র।’

‘হোস্টেলে থাকো, বাড়ি কোথায়?’

‘কুচবিহারে।’

‘বাবা বোধহয় প্রচুর টাকা পাঠান?’

‘না, মানে, কেন?’

‘কলকাতায় পড়তে আসার নাম করে বদমায়েসি করে বেড়াচ্ছ! নিশ্চয়ই বিড়ি সিগারেট খাচ্ছ। হোস্টেলের ছেলেরা শুনেছি মদ খায়, তুমি গেলো নাকি?’

‘না না না।’ প্রবল মাথা নাড়ল অমিত।

‘কী করে বুঝব তুমি সত্যি বলছ। যে ছেলে বাবার পয়সায় কলকাতায় পড়তে এসে বাসস্টপে দাঁড়ানো অচেনা মেয়ের সঙ্গে গায়ে পড়ে ভাব জমাতে চায় সে যা খুশি তাই করতে পারে।’ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন মাসিমণি।

বিশ্বাস করুন, আমি খারাপ কাজ কী করেছি তাই বুঝতে পারছি না।’ কাতর গলায় বলল অমিত, ‘একটু যদি আমাকে বলেন।’

‘তুমি মেয়েদের কলেজের সামনে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও মেয়েকে গায়ে পড়ে কথা বলানোর চেষ্টা করোনি? বলো না, বলো।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘ও। কেন? কী জন্যে নাটক করে কথা বলেছ?’

‘কিছু ভাবিনি। হঠাৎ কথা বলতে ইচ্ছে হল, তাই!’

‘বা বাঃ। চমৎকার। হঠাৎ খুন করার ইচ্ছে হল, তাই খুন করলাম।’

‘দুটো কি এক হল?’

‘এ্যাঁ? তুমি কি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ?’ মাসিমণি রেগে গেলেন, ‘সে ভালো মেয়ে তাই কথা বলেনি। কথা বললে তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেতে চা খাবে বলে। প্রথমদিন নিজেই দাম দিতে, তারপর থেকে ওর ঘাড় ভেঙে খাবার খেতে। এরকম গল্প আমি শুনেছি। আমি তোমার হেস্টেলে গিয়ে কমপ্লেন করব।’

‘প্লিজ। সুপার খুব কড়া মানুষ। আমাকে হোস্টেলে রাখবেন না।’

‘তাই তো উচিত। বেশ, তাহলে ইউনিভার্সিটির অফিসে জানাব। তুমি তো এম.এ-তে নাম লিখিয়েছ। কোন সাবজেক্ট?’

‘আজ্ঞে বাংলা।’

‘কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তাই এসব করে বেড়াচ্ছ। সায়েন্স ইকনমিক্স নিয়ে পড়লে এসব করার সময় পেতে না।’

‘ম্যাডাম, আর কখনও এই ভুল করব না।’

ম্যাডাম শব্দটি শুনতে ভারি ভালো লাগল মাসিমণির। তবু তিনি মাথা নাড়লেন, ‘তাহলে তোমার বাবার ঠিকানা দাও। তাঁকে সব জানাব।’

‘বাবা!’ হাঁ হয়ে গেল অমিত।

‘মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল মনে হচ্ছে?’

‘আমার বাবা খুব রাগী। জানলে টাকা পাঠানো বন্ধ করবেন।’

‘তাই তো করা উচিত। কী নাম তোমার বাবার।’

‘ম্যাডাম। আমাকে ক্ষমা করুন। প্লিজ!’

আবার ম্যাডাম শব্দটি শুনতে খুব ভালো লাগল। আর এইসময় বেলের আওয়াজ হল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চম্পা ভেতর থেকে ছুটে এসে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল। প্রবীণ এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পরনে স্যুট, টাই, হাতে ছড়ি। দেখে মনে হয় গত শতাব্দী থেকে চলে এসেছেন।

অমিতকে দেখে ভদ্রলোকের কপালে ভাঁজ পড়ল, ‘হু ইজ হি?’

মাসিমণি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘এর নাম অমিত। এম.এ পড়ে।’

‘অমিত! আই সি।’ ভদ্রলোক সোজা হওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘হু ইজ হি?’

‘এই সেই ছেলে যে আজ মৃণালকে টিজ করেছিল।’ মাসিমণি উঠে দাঁড়ালেন।

‘মাই গড! একে কোথায় পেলে?’

‘ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে থাকে।’

‘ও। তুমি গিয়ে ডাকলে আর সুড়সুড় করে চলে এল! তাজ্জব ব্যাপার!’ বলতে বলতে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন ভদ্রলোক।

মাসিমণি অমিতকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওঁকে তুমি চেনো?’

মাথা নেড়ে না বলল অমিত।

‘দুপুরে লাঞ্চ পার্টি ছিল, তাই বোধহয়—! ঠিক আছে তুমি এখন যেতে পারো? কিন্তু আমি তোমাকে যা যা বলেছি তা যদি মনে না রাখো তাহলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।’

অমিত উঠে দাঁড়াল। এই সময় ভদ্রলোক ফিরে এলেন। তখন তার শরীরে কোট এবং টাই নেই। জামার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। ঘরে ঢুকে উল্টো দিকের চেয়ারে বসে বললেন, ‘তাহলে তুমিই অমিত। মেয়েদের টিজ করে বেড়াও।’

‘না স্যার, আমি কখনও কোনও মেয়েকে টিজ করিনি।’ অমিত বলল।

‘তোমার বিরুদ্ধে সেটাই অভিযোগ।’ আঙুল নেড়ে বসতে বললেন তিনি, বাধ্য হল অমিত। বসে মাসিমাণির দিকে তাকাল।

মেসোমশাই মাসিমণিকে বললেন, ‘তুমি গিয়ে ডাকলে আর ও সঙ্গে সঙ্গে চলে এল? বাঃ! হোস্টেলে থাকো। বাড়ি কোথায়?’

‘আজ্ঞে কুচবিহারে।’

‘যাকে আজ টিজ করেছ তাকে কতদিন ধরে ফলো করেছ?’

‘না না, আমি টিজ করিনি, এর আগেও কখনও দেখিনি।’

‘আজই প্রথম দেখেই কথা বলতে ইচ্ছে করল?’

‘বাঃ!’ স্ত্রীর দিকে তাকালেন ভদ্রলোক, ‘প্রিন্সেস কোথায়? ডাকো তাকে?’

অস্বস্তিতে পড়লেন কিন্তু বলতে হল মাসিমণিকে, ‘ও বাড়িতে ফিরে গেছে।’

‘সেকি? কোর্টে মামলা উঠল আর অভিযোগকারিণী উধাও। তাহলে কি ওর মামলা ধোপে টিকবে?’

‘বোধহয় খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল।’

‘শোনো, কি যেন নাম বললে—!’

‘অমিত।’

‘হ্যাঁ, অমিত, আমার পকেটে একটা ছোট্ট টেপ রেকর্ডার আছে।’ তাতে আমরা এতক্ষণ যা যা বললাম সব রেকর্ডেড হয়ে গিয়েছে। আমি তোমাকে একটা অনুরোধ করছি। তুমি আগামী চার বছরের মধ্যে মৃণালের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ করবে না। চার বছর পরে তোমরা যথেষ্ট স্বাবলম্বী হবে, তখন যা করবে তা নিজের দায়িত্বে করবে। অবশ্য যদি তখন সেরকম পরিস্থিতি হয়। কিন্তু তার আগে যদি খবর পাই খুব বিপদে পড়বে। আমার হাত বেশ লম্বাই।’ খুব ধীরে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন মৃণালের মেসোমশাই।

দরজার বাইরে কয়েক পা সঙ্গে এলেন মাসিমণি। বললেন, ‘ওঁর কথায় কিছু মনে করো না বাবা। মেয়েটাকে খুব ভালোবাসেন তো, তাই রেগে গিয়েছেন। রাগ যেমন চট করে চড়া হয় আবার তেমনি অল্পতেই জল হয়ে যায়।’

‘আমি আসছি।’ অমিত বলল।

‘না না, দাঁড়াও। আমি ড্রাইভারকে বলছি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে।’

‘না না, তার দরকার নেই। এখান থেকে বাসে উঠলে বেশি সময় লাগবে না। এই সময় তো বাসে ভিড় থাকে না।’ অমিত মাথা নাড়ল।

‘ও হো, তোমার কাছে কাগজ কলম আছে?’

‘হ্যাঁ, কেন?’

‘তোমার হোস্টেলের টেলিফোন নম্বরটা লিখে দাও। আলাপ যখন হয়েই গেল তখন নিয়েই রাখি।’ হাসলেন মাসিমণি।

পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে তাতে নম্বর লিখে সামনে ধরলে মাসিমণি সেটা নিয়ে পড়লেন, ‘এমনি রেখে দিলাম। যদি কখনও খুব প্রয়োজন পড়ে!’

‘নিশ্চয়ই আপনার প্রয়োজন হলে বলবেন। যাই?’

‘হ্যাঁ, ও, আর একটা কথা। তুমি তো ওই পথে যাতায়াত করো, যদি হঠাৎ চোখে পড়ে ও এমন কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যা ভালো নয়, তাহলে আমাকে জানিও। আমার বাড়ির নম্বর লিখে নাও।’ নম্বর বললেন মহিলা।

সেটা লিখে নিয়ে অমিত বলল, ‘এবার চলি।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলি বলতে নেই, আসি বলো। সাবধানে যাও, দুর্গা, দুর্গা!’

.

হোস্টেলের ছেলেরা জটলা করে অমিতের উধাও হওয়া নিয়ে কথা বলছিল। এক মধ্যবয়সিনী গাড়ি নিয়ে এসে ধমকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছে, দারোয়ান এমন কথাই বলেছে। নেতা স্থানীয় ছাত্ররা স্থির করল, এখনই থানায় গিয়ে জানানো উচিত। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় অমিত হোস্টেলের দরজায় পৌঁছে গেল।

তাকে দেখতে পেয়ে হই-হই করে ছেলেরা এগিয়ে এসে ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, ‘কে ওই মহিলা? কেন তাকে ইলোপ করেছিলেন? মুক্তি পাওয়ার জন্য মহিলাকে কত টাকা দিতে হয়েছে? আমিত কি থানায় গিয়েছিল।’

অমিত মাথা নেড়ে যাচ্ছিল। বন্ধুরা থামলে বলল, ‘ওই ভদ্রমহিলা আমার এক সহপাঠিনীর মাসিমা। খুব রাগী। কেউ ওঁর কাছে আমার বিরুদ্ধে কিছু বলেছিল বলে যাচাই করতে এসেছিলেন। এমন কোনও ব্যাপার নয়।’

বন্ধুদের উত্তেজনায় জল ঢেলে নিজের ঘরে চলে এসেছিল অমিত। ওর রুমমেট সুজয় এসে বলল, ‘কেসটা কী বল তো?’

ঘরে আর কেউ নেই দেখে সুজয়কে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল অমিত।

সুজয় বলল, ‘বাপস। কী ডেঞ্জারাস মহিলা। ছেলেদেরও হার মানাবে। শোন অমিত, ভুলেও ওই মেয়ের ছায়া মাড়াস না। মাসি যদি এইরকম হয় তাহলে মা-বাবা কীরকম হবে তা আন্দাজও করা যাচ্ছে না। কলকাতায় প্রচুর নরম মনের বাবা-মা আছে, ভাগ্যে থাকলে তাদের কাউকে পেয়ে যাবি।’

.

হোস্টেল থেকে বেরিয়ে বাসে উঠলে ওই মেয়েদের কলেজ পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছতে কুড়ি মিনিটও লাগে না। বাসে উঠে বসতে পারলে তো কথাই নেই, দাঁড়িয়ে থাকলেও কলেজ পার হওয়ার সময় দুই চোখ বন্ধ করে রাখে তখন। বলা যায় না, ওই মেয়ের সঙ্গে যদি চোখাচুখি হয়ে যায়। সে বাসের ভেতরে থাকলে অবশ্য তাকে চিনতে পারা সম্ভব নয়। তাছাড়া মেয়েটা তো তাকে ভালো করে দ্যাখেওনি।

বাবার ইচ্ছে ছিল না, মায়ের জোরাজুরিতে সে কলকাতায় পড়তে আসতে পেরেছে হায়ার সেকেন্ডারির পর। প্রেসিডেন্সি কলেজে সুযোগ পেয়েছে। বাবার ইচ্ছে ছিল সে ইকনমিক্স নিয়ে পড়ুক। আবেদন করা সত্ত্বেও সে সুযোয় পায়নি। তাই বাংলা নিয়ে পড়ে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিল। সেটা জানার পর বাবা একটু শান্ত হয়েছে। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় সে কোনও মেয়েকে বিরক্ত করেছে জানলে টাকা পাঠানো বন্ধ করে বলবে, ‘আর পড়তে হবে না, ফিরে এসো।’

অমিত ভাবছিল, সেদিন মেয়েটিকে দেখে তার যে আচমকা কী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটা ঠিক, ওর সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল তার বেশি কিছু নয়। এরকম ভুল সে কখনও করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। ওই মেসোমশাই মাসিমণি যদি তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতেন তাহলে আর দেখতে হত না! তার ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকত না। তবে এখন তার মনে কতগুলো প্রশ্ন এল। মেয়েটা তার বিরুদ্ধে মাসিমণির কাছে নালিশ করেছিল। কিন্তু তিনি যখন তাকে বাড়িতে আনতে গেলেন তখন মুখোমুখি না হয়ে বাড়ি চলে গেল কেন? তার সামনে দাঁড়িয়ে মাসিমণির কাছে নালিশ করাই তো স্বাভাবিক ছিল। মেয়েটা পাগল নাকি!

দ্বিতীয়, ওর মেসো কি প্রকৃতিস্থ ছিলেন। যেরকম ভয়ঙ্কর রেগে প্রথম দিকে ছিলেন, মাঝপথ থেকেই কেমন নরম হয়ে গেলেন। কেন? মাসিমণিও খুব দ্রুত বদলে গিয়েছিল। শেষদিকে খুব ভালো মানুষ বলেই মনে হয়েছিল।

এইরকম পরিবারের কাছাকাছি যাওয়া মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। মাস চারেক পরে স্মৃতি যখন ঈষৎ ঝাপসা তখন হোস্টেলের কাজের লোক ঘরে এসে বলল, ‘আপনার ফোন এসেছে।’

খুব প্রয়োজন ছাড়া বাবা কুচবিহার থেকে ফোন করে না। বাবার ফোন মানে একটা না একটা উপদেশ অথবা আদেশ। দ্রুত অফিসঘরে গিয়ে রিসিভার তুলে অমিত বলল, ‘হ্যালো।’

‘আমি কি অমিত মিত্রের সঙ্গে কথা বলছি?’ একজন মহিলা স্পষ্ট উচ্চারণে প্রশ্ন করলেন।

‘হ্যাঁ। আমি অমিত।’

‘তুমি আমার নাম বললে তো চিনতে পারবে না বাবা। এক দুপুরে তুমি আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে এসেছিলে। মনে আছে?’

সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ড কনকনিয়ে উঠল। চট করে সেই দুপুরটার কথা মনে এসে গেল। অমিত বলল, ‘ওহো, হ্যাঁ, কেমন আছেন মাসিমণি?’

‘ভালো না বাবা, একদম ভালো না। খুব বিপদের মধ্যে আছি। কী করব বুঝতেই পারছি না। এখনকার ছেলেমেয়েদের আমি বুঝি না। তুমি যদি কষ্ট করে আমাদের বাড়িতে একবার আসো তাহলে খুব উপকার হয়।’

অমিতের গলা শুকিয়ে গেল, ‘কে-কেনো, কী হয়েছে?’

‘আমি বুঝতে পারছি না। যদি সর্বনাশ হয় তাহলে তার সব দায় আমার ওপর পড়বে। কারও সঙ্গে যে আলোচনা করব এমন কেউ পাশে নেই। তোমার মেসোমশাই অফিসের কাজে এখন ইউরোপে গিয়েছেন। তাঁকে ফোন করে এসব কথা বলা ঠিক না। তাই তোমার কথা মনে পড়ল। আজ একবার আসবে?’ কাতর গলায় বললেন ভদ্রমহিলা।

কথাগুলো বলার সময় এমন একটা করুণ আবহ তৈরি হল যে অমিতের গলা থেকে যে সব শব্দ বেরিয়ে এল তার জন্যে সে নিজেই প্রস্তুত ছিল না। অমিত বলল, ‘আমি যদি বিকেল পাঁচটার সময় যাই তাহলে কি অসুবিধে হবে?’

‘না, কোনও অসুবিধে হবে না। এসো, আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব।’ যেন স্বস্তির শ্বাস ফেললেন মৃণালের মাসিমণি।

.

খুব নার্ভাস হয়ে হোস্টেল থেকে বেরিয়েছিল অমিত। ফোনটা আসার পরে সে রুমমেট সুজয়কে জিজ্ঞাসা করেছিল, কী করা যায়? সুজয় মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘আমার তো মনে হয় ঘুরে আসা উচিত। ভদ্রমহিলা খুব অসহায় না হলে তোকে ফোন করতেন না।’

‘তুই যাবি আমার সঙ্গে?’

‘পাগল! আমাকে দেখে হয়তো খুব বিরক্ত হবেন। কথাই বলবেন না।’

.

ঠিক পাঁচটায় হোস্টেল থেকে বেরিয়ে বাসে চেপে যেতে যেতে অমিত ভাবল, দুদিনের যাওয়ার মধ্যে কত পার্থক্য। সেদিন সে প্রায় চুরির দায়ে ধরা পড়েছিল।

বেল বাজাতেই মাসিমণি নিজেই দরজা খুললেন। ‘এসো, এসো। বসো বাবা। তোমাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হলাম বলে কিছু মনে করো না।’

‘না না, এভাবে বলবেন না।’

ভদ্রমহিলা দরজা বন্ধ করে সামনের সোফায় এসে বসলেন, ‘ওইরকম শান্ত লাজুক, ভীরু স্বভাবের মেয়েটার এ কী হল বলত। তুমি জানো, ও আমার কাছে মিথ্যে কথা বলছে! এটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।’

‘এসব কথা আমাকে বলছেন কেন?’ অমিত নীচু স্বরে বলল।

‘আমি কাকে বলব বাবা? দিদি-জামাইবাবুকে তো বলতে পারছি না। আমার স্বামীও বাইরে। দিদি-জামাইবাবু জানলে কোনওদিন আমার মুখ দেখবে না। ওই মেয়েকে ওঁরা কলেজে পড়াতে চাননি। হায়ার সেকেন্ডারির পরেই বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আমিই জোর করেছিলাম। অন্তত গ্রাজুয়েশনটা করুক। আমার কথায় ওঁরা রাজি হয়েছিল। কিন্তু বলেছিল ও যেন ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা না করে।’

অমিত বলল, ‘ও তো মেয়েদের কলেজেই পড়ছে।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু আজকাল ও প্রায়ই মিথ্যে কথা বলছে। কলেজ থেকে বেরিয়ে গাড়ির ড্রাইভারকে বলছে সে আমার বাড়িতে আসবে। এখানে এসে গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে না ঢুকে কোথাও যায়। যখন আমার কাছে আসে তখন ওর হাঁটু পর্যন্ত ধুলো। তার মানে ও অনেক হাঁটাহাটি করে। যে মেয়ে কোনওদিন গাড়ি ছাড়া রাস্তায় যায়নি সে কোথায় যাচ্ছে।’

‘ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছেন?’

‘করেছি। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে মিথ্যে বলছে। মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস কোনওদিন ছিল না ওর। অত্যন্ত শান্ত, বলতে পারো একটু ভীরু প্রকৃতির মেয়ে ছিল। কিন্তু আমার মন বলছে ও কোনও অন্যায় কাজ করছে। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলেন মহিলা।

‘আপনি অনুমান করে কষ্ট পাচ্ছেন। ওকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলে নিশ্চয়ই সত্যি কথাটাই আপনাকে বলবে।’ অমিত বুঝতে পারছিল না আর কী বলা উচিত।

‘দ্যাখো, আমি ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত জানি। আমি চেয়েছিলাম, আমরা যে পড়াশুনা করার সুযোগ পাইনি তা ও পাক। কিন্তু এরকম হবে ভাবতে পারিনি।’

‘কিন্তু ও কোথায় যাচ্ছে বলে আপনি সন্দেহ করছেন?’

‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে ও খুব অসৎ ছেলেমেয়ের সঙ্গে মিশছে। তোমায় বলব কি বাবা, একদিন এই বাড়িতে দুপুরবেলায় এসে সোজা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। পাক্কা পনেরো মিনিট পরে যখন বের হল তখন ওর নাকের নীচের ঠোঁট পর্যন্ত লালচে হয়ে গেছে। অথচ যখন বাথরুমে সে ঢুকেছিল তখন মুখ স্বাভাবিক ছিল। জিজ্ঞাসা করতে বলল মুখ কুটকুট করছিল বলে সাবান লাগিয়েছে। আমার কিন্তু অন্য সন্দেহ।’ চোখ বড় করলেন মহিলা।

‘কী?’

‘ও সেদিন নির্ঘাত সিগারেট খেয়েছিল।’

‘সেকি!’

‘তাই তো তোমাকে লজ্জার মাথা খেয়ে ডাকলাম।’

‘না না, ওভাবে বলছেন কেন!’

‘তুমি আমার উপকার করে দাও বাবা!’

‘বলুন, কী করতে হবে?’

‘তুমি মেয়ের ওপর একদিন একটু নজর রাখতে পরাবে? মানে, ও আমার বাড়িতে আসার নাম করে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেশে, এইসব খবর এনে আমাকে দেবে বাবা।’ মাসিমণি কাতর গলায় বললেন।

‘আমার মনে হয় সরাসরি ওকেই জিজ্ঞাসা করলে ভালো হবে।’

‘বলবে না। একটা কথাও ওর পেট থেকে বের করতে পারব না। এতদিন যা ছিল এখন তার উল্টোটা হয়ে গিয়েছে।’

‘কিন্তু আমি কোথায় গিয়ে খোঁজ নেব তাই তো জানি না।’

‘তুমি এককাজ করো। আমার বাড়ির কাছাকাছি বেলা তিনটে নাগাদ এসে অপেক্ষা করবে। মেয়ে যখন বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেকে নেমে কোথাও যাবে তখন তাকে অনুসরণ করবে। দেখবে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেশে। গলা নামিয়ে কথাগুলো বলেন মাসিমণি, ‘ও যেন টের না পায়।’

‘কিন্তু—!’

‘আপত্তি কোরো না বাবা, আমার এই উপকারটুকু করো!’

ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে আর আপত্তি করতে পারল না অমিত।

.

পরদিন ঠিক দুপুর বেলায় ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে বাস ধরে অমিত চলে এল। মাসিমণির বাড়ির কাছাকাছি বাসস্টপে লোকজন নেই। রাস্তাও ফাঁকা। ঠিক সাড়ে তিনটের সময় সাদা গাড়িটাকে আসতে দেখল সে। গাড়িটা যখন বাড়ির একটু আগে, গাড়ি থেকে দরজা খুলে নেমে চারপাশে চট করে তাকিয়ে নিল মৃণাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভারকে নীচু গলায় কিছু বলে ফুটপাত ধরে পেছন দিকে হাঁটতে লাগল দ্রুত পায়ে।

অর্থাৎ মেয়েটা, যার নাম মৃণাল, সে তার মাসির বাড়িতে এখন যাচ্ছে না। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে ও। অমিত উল্টো ফুটপাত ধরে অনুসরণ করল। খানিকটা যাওয়ার পর মৃণাল বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে পড়ল। অনেকটা দূরত্ব রাখা ঠিক নয়। যে-কোনও বাড়িতে যদি মৃণাল ঢুকে যায় তাহলে বুঝতেই পারবে না। কিন্তু দূরত্ব কমাতেও সাহস পাচ্ছিল না। কলেজের সামনে বাসস্টপে সে কথা বলতে চেয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। তাছাড়া, সেদিনে মৃণাল তার মুখের দিকে একবারও তাকায়নি। তাই এখন তাকে দেখে চিনতে পারার কথা নয়।

আরও খানিকটা এগিয়ে যেতেই একটা পার্ক শুরু হল ডান দিকে। সেই পার্কের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল মৃণাল। তখনই অমিতের খেয়াল হল, গাড়ি থেকে এদিকে আসার সময় মৃণাল তার খাতাবই সঙ্গে আনেনি। ওগুলো গাড়িতেই রেখে এসেছে।

পার্কের ধার দিয়ে একই গতিতে হেঁটে মৃণাল যেখানে পৌঁছাল সেখানে একটা শেডের নীচে বেঞ্চিতে বসে আছে তিনটে ছেলে আর একটা মেয়ে। মেয়েটি মৃণালকে দেখে উঠে হাসতে হাসতে হাত মেলাল। মৃণাল ওদের সঙ্গে বসল।

খানিকটা দূরে একটা বড় থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ্য করতে লাগল অমিত। ছেলে তিনটের দুটো ওদেরই বয়সি, একটা বছর তিনেকের বড়। ওদের কথা শুনে খুব হাসছে মৃণাল। এবার বড় ছেলেটা পকেট থেকে প্যাকেট বের করে তা থেকে সিগারেট নিয়ে লাইটার জ্বেলে আগুন ধরালো। ধরিয়ে বেশ জোরে ধোঁয়া টেনে বাইরে ছাড়ল। বাকি ছেলে দুটো আর মেয়েটি উদগ্রীব হয়ে সিগারেট খাওয়া দেখছে। কিন্তু মৃণাল বসে আছে মাথা নীচু করে।

এবার বড় ছেলেটা জ্বলন্ত সিগারেট এগিয়ে ধরতে একজন ছেলে তা নিয়ে খুব সন্তর্পণে ধোঁয়া টেনে কাশতে শুরু করল। এবার তৃতীয় ছেলেটি সেই সিগারেট নিয়ে সামান্য টান দিয়ে মেয়েটির হাতে সিগারেট ধরিয়ে দিল। মেয়েটি চোখ বন্ধ করে সেই সিগারেটে একবার টান দিয়েই ক্ষান্ত হল না। দ্বিতীয়বার ধোঁয়া টানল। অমিত লক্ষ্য করল মেয়েটা সিগারেটে টান দিয়েও একবারও কাশল না।

এবার মেয়েটা সিগারেটটা এগিয়ে ধরল মৃণালের সামনে। মৃণাল দ্রুত মাথা নেড়ে না বলল। তখন বড় ছেলেটা আর একটা প্যাকেট পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দিল। মেয়েটি সেটা থেকে সিগারেট বের করে লাইটার চেয়ে নিয়ে ধরিয়ে মৃণালকে দিলে সে অতি সন্তর্পণে সেটা নিয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর আলতো করে সিগারেটে টান দিতেই এমনভাবে কাশতে লাগল যে উঠে দাঁড়াল। পাশের মেয়েটি ওর হাত থেকে সিগারেট নিয়ে অন্য হাতে মৃণালের পিঠে আলতো করে আদুরে-আঘাত করতে লাগল। দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও অমিতও বুঝতে পারল মৃণাল বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে। বাঁ-হাতের মুঠোয় ধরা রুমালে চোখের জল মুছে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল।

সঙ্গের মেয়েটিও কিছু প্রশ্ন করলে মৃণাল মাথা নেড়ে না বলে শেষ পর্যন্ত হাসল। সঙ্গিনী আবার সিগারেটটা মৃণালকে দিল। এবার সে কাশল না। সঙ্গে সঙ্গে তিনটি ছেলে খুশির আওয়াজ তুলে হাততালি দিল। সবাই হাত বাড়িয়ে মৃণালের হাত স্পর্শ করল। এবার বড় ছেলেটি তার অন্য হাতে ধরা সিগারেট দেখিয়ে কিছু বললে মৃণাল চোখ বড় করে প্রবলভাবে মাথা নেড়ে না বলল।

ওরা কী বলছে তা এতদূর থেকে শোনা সম্ভব না। যেখানে ওরা বসে আছে তার কাছাকাছি কোনও আড়াল নেই যে সেখানে গিয়ে কথা শোনা যাবে। এখন যেখানে সে দাঁড়িয়ে আছে তার আড়াল ছেড়ে এগোলেই ওরা তাকে দেখতে পেয়ে যাবে। তাই ওদের কথা শোনার কোনও উপায় নেই। একটু পরে সে দেখল মৃণাল উঠে দাঁড়িয়েছে। বাকিরা তাকে যেন অনুরোধ করছে কিন্তু হাতের কব্জির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল মৃণাল। অমিত অনুমান করল মৃণাল এখন ফিরতে চাইছে। ফিরতে হলে এই পথ দিয়েই তাকে আসতে হবে। অমিত দ্রুত পেছন দিকে হাঁটতে লাগল। পার্ক থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকে না গিয়ে সে ডানদিকের একটা দুধের বুথের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। মৃণাল দ্রুত পার্ক থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারের নলকূপের সামনে দাঁড়াল। তারপর হাতলে চাপ দিলে বেরিয়ে আসা জল হাতে নিয়ে কয়েকবার কুলকুচি করে রুমালে মুখ মুছল। তারপর হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

গলি থেকে বেরিয়ে সে মাসিমণির বাড়িতে না গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। পেছন পেছন খানিকটা দূরত্ব রেখে আসছিল অমিত। মেয়েটি যে আবার গাড়িতে উঠে বসবে তা সে ভাবেনি। ভেবেছিল এবার নিশ্চয়ই মৃণাল মাসিমণির বাড়িতে যাবে। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে যখন ফিরে গেলে তখন বুঝল মৃণাল বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

দৃষ্টির বাইরে গাড়ি চলে গেলে অমিত ফাঁপড়ে পড়ল। মৃণালের এই গোপন অভিযানের কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? তা করুক না করুক তার উচিত মাসিমণিকে ব্যাপারটা জানানো। ওই বড় ছেলেটা যে সিগারেট খাচ্ছিল সেটা নিশ্চয়ই সাধারণ সিগারেট নয়। তাদের হোস্টেলের কোনও কোনও ছেলে গাঁজা পোরা সিগারেট খায়। ওটা বোধহয় সেই ধরনের সিগারেট। আজ মৃণাল ওই সিগারেট খায়নি বটে কিন্তু কাল যে খাবে না তার ঠিক কি? সে হেঁটে এসে মাসিমণির দরজার বেলে চাপ দিল।

দ্বিতীয়বার কাজের মেয়েটি দরজা খুলে বলল, ‘ও, আপনি!’

তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘মা, নতুন দাদা এসেছেন। আপনি আসুন।’

অমিতকে বাইরের ঘরে বসিয়ে মেয়েটি ভেতরে চলে গেল। মাসিমণি এলেন একটু পরে। অমিত অনুমান করল কাজের মেয়ের ডাকে ভদ্রমহিলার ঘুম ভেঙেছে।

অমিত উঠে দাঁড়াল, ‘এই অসময়ে আসার জন্যে আমাকে ক্ষমা করবেন।’

‘না না, বসো বসো। এখন তো প্রায় বিকেলই হয়ে এল। বলো, কী ব্যাপার?’

দুজনে মুখোমুখি বসার পর আজ যা যা দেখেছে তা বিশদে বর্ণনা করল অমিত। শুনতে শুনতে প্রথমে চোখ বড় হয়ে গেল ভদ্রমহিলার। তারপর তিনি দু-হাতে মুখে ঢাকলেন। ‘ছি ছি ছি! আমাদের বাড়ির মেয়ে পার্কে বসে সিগারেট খাচ্ছে। আমার সন্দেহটা তাহলে সত্যি। ছিঃ! এর জন্যে আমিই দায়ী।’

‘একথা কেন বলছেন।’ জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘জামাইবাবুর খুব আপত্তি ছিল, দিদিও প্রথমে রাজি হয়নি। আমিই জোর করে মৃণালকে কলেজে ভর্তি করিয়েছিলাম। ওর হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেশ ভালো ছিল। ইচ্ছে করলে প্রেসিডেন্সিতেও ভর্তি হতে পারত। কিন্তু কো-এডুকেশন কলেজে ওকে পড়াতে ওরা কিছুতেই রাজি হয়নি বলে বেথুনে ভর্তি করেছিলাম। এখন এইসব কথা জানলে দিদি আমার রক্ষা রাখবে? জামাইবাবু জীবনে আমার মুখ দেখবে না। হায় হায়, এখন আমি কী করি!’ দু-হাতে মুখ ঢাকলেন ভদ্রমহিলা।

একটু অপেক্ষা করে অমিত বলল, ‘আপনি যদি ওকে একটু বুঝিয়ে বলেন—।’

‘যে মেয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে সে সত্যিটা স্বীকার করবে ভেবেছ? না, কক্ষনো না। তার চেয়ে…’ একটু ভাবলেন মাসিমণি, ও কি রোজ এখানে আসে?’

‘তা তো আমি জানি না।’ বলল অমিত।

‘সে তোমাকে তো দেখতে পায়নি, না?’

‘না বোধহয়।’

‘তাহলে বাবা কষ্ট করে ক’দিন তুমি এসে লক্ষ্য রেখো। যদি দ্যাখো সে গাড়ি থেকে নেমে পার্কের দিকে যাচ্ছে তাহলে আমাকে খবরটা দিও।’ সোজা হয়ে বসলেন ভদ্রমহিলা। তার মুখ থমথমে।

‘আপনি কী করবেন?’

‘কী করব মানে? সোজা পার্কে গিয়ে ওর ঘাড় ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসব বাড়িতে। যাদের সঙ্গে বসে সিগারেট খায় তাদের চোদ্দোপুরুষের নাম ভুলিয়ে তবে ছাড়ব।’ ভদ্রমহিলা খুব উত্তেজিত।

অমিত বলল, ‘আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি যা বললেন তা যদি করেন তাতে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।’

‘তার মানে?’ বড় চোখে তাকালেন মাসিমণি।

‘ওরা চেঁচামেচি করতে পারে। তাই শুনে ভিড় জমে যেতে পারে। যা ঘটেছে তা জানার পরে লোকে হাসাহাসি করতে পারে। ঠিক কিনা?’

একটু ভাবলেন ভদ্রমহিলা, ‘তা ঠিক। উঃ, কী বিপদে পড়েছি! তুমি বাবা একটা রাস্তা বলতে পারবে?’

‘আমি কী বলব বলুন—’ অস্বস্তিতে পড়ল অমিত।

মাসিমণি মাথা নাড়ালেন, ‘না, আর আমি দায়িত্ব নিতে পারব না। ওর পড়াশুনো বন্ধ হলে বাড়ি থেকে বেরুতে পারবে না। জামাইবাবু তো বিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাই এখন দিয়ে দিক।’ মাথা নাড়লেন মহিলা, ‘আমাদের বাড়ির মেয়ে হয়ে সিগারেট খাচ্ছে! ভাবাই যায় না। আর তিনটে ছেলে আর ওই—মেয়েটা, ওরা কারা? ওদের দেখে কি তোমার মনে হল ওরা পড়াশোনা করে?’

‘বোধহয়। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।’ অমিত বলল।

‘আমার তো মনে হয় না? তুমি বললে যে সিগারেটটা বড় ছেলেটা খাচ্ছিল তা মৃণাল খেতে চায়নি বলে তাকে অন্য সিগারেট খেতে দিয়েছে?’

‘তাই তো দেখলাম।’

‘বড় ছেলেটা যে সিগারেট খাচ্ছিল সেটা কি অন্যরকম ছিল?’

‘বোধহয় খুব কড়া সিগারেট।’ অমিত বলল।

‘ঠিক আছে। তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব বাবা। এই খবর না দিলে মেয়েটা বোধহয় নষ্ট হয়ে যেত। আমাকে এখনই দিদির বাড়িতে যেতে হবে।’

‘ওর সঙ্গে কথা বলতে যাবেন?’ অমিত জিজ্ঞাসা করল।

‘না। ওর সঙ্গে কোনও কথা নয়। ওর বাবা মাকে বলে আসব মেয়ের জন্যে পাত্র খুঁজতে। আর কলেজে পাঠাবার দরকার নেই।’ মাসিমণির মুখ গম্ভীর।

‘ওরা নিশ্চয়ই কারণ জানতে চাইবেন।’

‘একটা কিছু বলে দেব। যেমন, বাজে ছেলেরা পেছনে লেগেছে। কখন কী হয়ে যাবে বলা যাচ্ছে না। বিয়ের পিঁড়িতে তো বসতেই হবে, তাহলে আর দেরি করে লাভ কী! আমার কথা শুনলে ওরা খুব খুশি হবে। এটাই তো ওরা চেয়েছিল।’ বড় শ্বাস ফেললেন মাসিমণি, তারপর উঠে দাঁড়ালেন।

অমিতও উঠল। বলল, ‘একটা অনুরোধ করব?’

অমিতের মুখের দিকে তাকালেন মাসিমণি।

‘আপনি বলেছিলেন মৃণাল হায়ার সেকেন্ডারিতে ভালো রেজাল্ট করেছিল। আপনিই ওকে আরও পড়াতে চেয়েছিলেন। এই ঘটনাটা যদি আর না ঘটে তাহলে ওর পড়াশুনা বন্ধ কেন করবেন?’ অমিত বলল।

‘কী বলতে চাইছ তুমি?’

‘ওকে একটু বুঝিয়ে বলুন। আপনি যে সব কথা জেনে গেছেন, তা ওকে বলুন। ওই সংস্পর্শে থাকলে ওর ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে তা ওকে বোঝান। ওর কাছ থেকে কথা আদায় করে নিন, পড়াশুনা করতে হবে।’ খুব জোর গলায় বলল অমিত।

‘ধরো, আমাকে চাপে পড়ে কথা দিল। কিন্তু সে যে কথা রাখছে তা আমি জানব কী করে? আমার পক্ষে তো রোজ কলেজের সামনে গিয়ে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।’ মাসিমণি মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, ‘তুমি যদি কোনও পাহারাদার ব্যবস্থা করে দাও তো আমি ভরসা করতে পারি। বৃদ্ধ হলেই ভালো হয়। তেমন কেউ জানা আছে?’

‘না। তা নেই।’ মাথা নাড়ল অমিত।

‘তাহলে! ওরকম নির্ভরযোগ্য লোক আমি কোথায় পাব! ঠিক আছে, এখন কয়েকদিন ওর কলেজ ছুটির আগে আমি সেখানে যাব। ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারপর ফিরে আসব।’ মাসিমণি বললেন।

অমিত বলল, ‘হঠাৎ এরকম কেন করছেন সেকথা তো ওঁরা জানতে চাইবেন!’

‘জিজ্ঞাসা করলে বলব, বাজে ছেলেরা কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, পুলিশও কিছু করে না, তাই আমাকেই যেতে হচ্ছে। তখন যদি জামাইবাবু বলে, ওকে আর পড়তে হবে না তাহলে আমি আর আপত্তি করব না।’ মাসিমণি বললেন।

নমস্কার করে হোস্টেলে ফিরে গিয়েছিল অমিত। পরের দিন সে কৌতূহল সমালাতে না পেরে মৃণালের কলেজের গেট থেকে খানিকটা দূরে একটা থামের আড়ালে ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। কলেজ ছুটি হতেই ছাত্রীরা একে একে নিজের নিজের বাড়ি থেকে আসা গাড়িতে উঠে পড়ছিল। এই সময় সে মৃণালকে দেখতে পেল। হনহনিয়ে আসছিল সে কলেজের ভেতর থেকে। গাড়ির সামনে এসে সে থমকে গেল।

মাসিমণি পেছনের দরজা খুলে দেওয়ায় বোঝা গেল, সে অনিচ্ছা সত্ত্বে গাড়িতে উঠতে বাধ্য হল। গাড়ি বেরিয়ে গেলে অমিতের মুখে হাসি ফুটল। আর তখনই তার মনে হল, এসব সে কেন করছে? এখানে এসে মেয়ে আর তার মাসির ব্যাপারটা দেখার কোনও দরকার ছিল না। নিজের ওপর বিরক্ত হল সে।

.

মাস দুয়েক পরে হোস্টেলের অফিসে ডাক পড়ল অমিতের। সে সেখানে যেতেই একজন কর্মচারী বললেন, ‘আপনার মাসিমা ফোন করেছিলেন। এই নম্বরে তাঁকে ফোন করতে বলেছেন। চট করে চিনতে অসুবিধা হল। মাসিমা বলে কাউকে সে এই শহরে এখনও ডাকেনি। কর্মচারীর দেওয়া নম্বর ডায়াল করল অমিত। রিং হচ্ছে কানে এল। তারপরেই মাসিমণির গলা শুনতে পেল, ‘হ্যালো।’

‘আমি অমিত।’

‘ও অমিত। আমি তোমাকে ফোন করেছিলাম। আগে বলো তো, এই ফোন করার জন্যে তোমাকে কি ওদের টাকা দিতে হবে?’

‘কেন বলুন তো? হোস্টেলে তো বিনা পয়সার ফোন নেই।’

‘তাহলে রেখে দাও রিসিভার। আমি তোমাকে ফোন করছি।’ কথা বলেই লাইন কেটে দিলেন ভদ্রমহিলা। পরক্ষণেই রিং শুরু হল। রিসিভার তুলতেই মাসিমণির গলা কানে এল, ‘তোমাকে বোধহয় বিরক্ত করছি বাবা, কিছু মনে কোরো না। আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। তোমার পরামর্শ চাই।’

‘আমি? কী ব্যাপার?’ অবাক হল অমিত।

‘তুমি কি আজ একবার আমাদের বাড়িতে আসতে পারবে?’

‘আজ? কখন?’

‘তোমার যখন খুশি এসো।’

‘ঠিক আছে। আমি বিকেল বিকেল যাব।’

‘এসো বাবা। তোমার সাহায্য খুব দরকার।’

Chapter - 2

হোস্টেল থেকে মাইল খানেক রাস্তা হেঁটেই এল অমিত। বাবা যা প্রতি মাসে পাঠান তাতে সব খরচ মেটাবার পর হাতখরচ হিসেবে সামান্যই থাকে। কিছুদিন তার মনে হয়েছে পার্ট টাইম কোনও কাজ করবে। কিন্তু তার জন্যে যে সময় দিতে হবে তাতে পড়াশুনার ক্ষতিই হবে। বাবা যা পাঠান তাতে বাজে খরচ না করে চললে তেমন অসুবিধে হয় না।

একবার বেল বাজাতেই কাজের মেয়েটি দরজা খুলে বলল, ‘আসুন, বসুন।’ অমিত চেয়ারে বসলে সে দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে যাওয়ামাত্র ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে একটা বড় খাম। চেয়ারে বসে তিনি বললেন, ‘তোমার কথাই আমি ভাবছিলাম। তুমি ভালো আছ তো?’

‘হ্যাঁ। মেসোমশাই নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন!’

‘হ্যাঁ। তোমাকে যে আসতে বলেছি তা উনি জানেন। কিন্তু ওঁর অফিসে খুব জরুরি একটা মিটিং আছে আজকে। বলেছে আগে শেষ হলে চলে আসবে। আচ্ছা, তোমাকে কয়েকটা ছবি দেখাব। প্রথমে একে দ্যাখো।’ একটা পোস্টকার্ড সাইজের ফটোগ্রাফ খাম থেকে বের করে অমিতের হাতে দিলেন ভদ্রমহিলা।

বছর আটাশ উনত্রিশের এক যুবকের ছবি। দেখেই বোঝা যায় মানুষটি যাকে বলে গুডবয়, তাই। মেয়েদের মতো মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি কাটা। গলায় মোটা সোনার হার রয়েছে। খুব ফর্সা গায়ের রঙ।

‘ভদ্রলোক কে?’ জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘জামাইবাবুর এক পরিচিত মানুষের ছেলে। কলকাতায় পাঁচ পাঁচখানা বাড়ি আছে। কোনও নেশা ভাঙ করে না। মায়ের খুব বাধ্য ছেলে। আমাদের মৃণালের সঙ্গে কেমন মানাবে বলে তোমার মনে হয়?’ মাসিমণি জিজ্ঞাসা করলেন।

অস্বস্তিতে পড়ল অমিত। কী বলবে সে? ভদ্রমহিলা এই ব্যাপারে তার মতামত নেওয়ার জন্যে তাকে ডেকেছেন? সে বলল, ‘ভালোই। কতদূর পড়েছেন ইনি?’

‘ওইটাই মুশকিল।’

‘কেন?’

‘বলছে ছেলেটি এস এফ ব্যাকড।’

‘মানে স্কুল ফাইন্যাল পাশ করেনি? অবাক হল অমিত।

‘তাই তো দাঁড়ায়। কিন্তু দিদি বলছে বি.এ এম.এ পাশ করলেই বা কী এমন হত? ওর যা সম্পত্তি আছে তাতে পাঁচ পুরুষ খরচ করে শেষ করতে পারবে না। ছেলে নেশা করে না, বদ কোনও বন্ধু নেই। মা যা বলে তাই মান্য করে। আর কী চাই?’ মাসিমণি বললেন, ‘আচ্ছা অমিত, পাত্র হিসেবে তুমি একে দশে কত নম্বর দেবে?’

‘দেখুন, আমি তো এসব—!’

‘সঙ্কোচ কোরো না, আমি ছাড়া কেউ জানবে না। আচ্ছা, এই কাগজে লিখে তোমার কাছেই রেখে দাও।’ ভদ্রমহিলা একটা কাগজ এগিয়ে দিলে তাতে শূন্য লিখে নিজের পকেটে রেখে দিল অমিত।

ভদ্রমহিলা বললেন, ‘এবার দ্বিতীয় ছবিটা দ্যাখো। এই ছেলের বাবা খুব নামকরা উকিল। ছেলে ল’ পড়ছে। পাশ করে বাবার মক্কেলদের পেয়ে যাবে। বুঝতেই পাচ্ছ বিস্তর টাকা। শুনলাম, গাড়ি চালিয়ে ল’ পড়তে যায়। এটাই আমার খারাপ লাগছে। এই বয়সেই এত বৈভবের মধ্যে থাকা ভালো নয়। এরা শোভাবাজারে থাকে। তুমি একটু খোঁজ নিতে পারবে?’

‘আমি?’

‘আর কাকে পাব বাবা। মেয়ের ভাগ্যে যা আছে তা তো হবেই। তবু ওকে ভালোবাসি বলেই আমি চাই খারাপ ছেলের সঙ্গে যেন বিয়ে না হয়। এই কাগজে ছেলে, তার বাবা আর বাড়ির ঠিকানা লেখা আছে।’ কাগজ এগিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা। এসব করার ইচ্ছে ছিল না অমিতের, তবু না বলতে পারল না।

.

শোভাবাজারের যে রাস্তায় উকিল পরিবার থাকেন সেখানে গিয়ে বাড়ি দেখে চোখ বড় হয়ে গেল অমিতের। বিশাল চারতলা বাড়ির চারপাশে পাঁচিল দেখেই বোঝা যায় প্রচুর ধনী পরিবার। কিন্তু এই পরিবার, বিশেষ করে যে ছেলে ল’ পড়ে তার সম্পর্কে খবর পাবে কী করে?

অমিত রাস্তার দিকে তাকাল। বেশি লোকজন চলাচল করছে না। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে একজন কাজের লোক ছুটে এসে গেট খুলে দিল। তার একটু পরে সাদা রঙের একটা গাড়ি ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বেশ জোরে গতি বাড়াতেই একটা হাতে টানা রিকশা তার সামনে পড়ে গেল। প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষল গাড়ির ড্রাইভার। রিকশাওয়ালা ‘মর গিয়া’, ‘মর গিয়া’ বলে চিৎকার করতে লাগল মাটিতে বসে পড়ে। গাড়ি যে চালাচ্ছিল সে দরজা খুলে নেমে এসে সবেগে রিকশাওয়ালাকে একটা চড় মেরে বাপ-মা তুলে গালাগাল করতে লাগল। তারপর লাথি মেরে রিকশাটাকে সরাতে চাইল। ওপাশ দিয়ে একজন বৃদ্ধ হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি কয়েক পা এগিয়ে এসে বললেন, ‘একি করছ তুমি? দোষ তোমার অথচ ওকে মারধোর করছ? ছি ছি ছি!’

ড্রইভার বেশ কেতাদুরস্ত পোশাক পরা যুবক! আঙুল নেড়ে বলল, ‘যান যান, নিজের কাজে যান। জ্ঞান দিতে আসবেন না। এই রিকশাওয়ালা, হাঠাও রিকশা। জলদি কর!’

বৃদ্ধ বললেন, ‘একি! দোষ করলে তুমি অথচ—।’

তাকে থামিয়ে ছেলেটি বলল, ‘আপনি কেটে পড়ুন। এই পাড়ায় থাকেন বলে মনে হয় না।’ বলে নিজেই রিকশাটাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেশ জোরে বেরিয়ে গেল।

বৃদ্ধ মুখ চুন করে চলে গেলেন। আশেপাশের লোক উল্টো দিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখে চুপচাপ চলে যাচ্ছিল। তাদের একজনকে অমিত জিজ্ঞাসা করল, ‘ছেলেটা কে দাদা?’

‘উকিলবাবুর ছেলে। হবু উকিল। দিনের বেলা বলে মারপিট করল না, রাত হলে রিকশাওয়ালা মার খেত।’ লোকটা বলল।

‘কেন?’

‘রাতে তো খালি পেটে বাড়ি ফেরে না।’ লোকটা চলে গেল।

এই ছেলের সঙ্গে মৃণালের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। একজন পড়ুয়া ছাত্রের এমন মেজাজ থাকলে ওদের দাম্পত্য জীবনে মৃণালের কী অবস্থা হবে? দ্বিতীয়ত এই ছেলে যদি এই বয়সেই পান করে বাড়িতে ফেরে তাহলে স্ত্রীর সঙ্গে যে বন্ধুর মতো সম্পর্ক থাকবে না তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না।

Chapter - 3

হোস্টেলে ফিরতেই অবাক হয়ে গেল অমিত। গেটের সামনে যে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সেটা যে মাসিমণিদের তা বুঝে এগিয়ে গেল সে। গাড়ির দরজা খুলে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমি না এসে পারলাম না। সামনের রবিবার উকিলবাবু মেয়ে দেখতে আসতে চাইছেন।’

‘সেকি?’

‘হ্যাঁ! আজকের মধ্যেই খোঁজ খবর নাও বাবা।

‘আমি এখন ওদের বাড়ি দেখে এলাম।’

ভদ্রমহিলার মুখে হাসি ফুটল, ‘তাই! খুব বড় বাড়ি বুঝি!’

‘চারতলা বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা।’ অমিত বলল।

‘বাঃ। ছেলেটি সম্পর্কে কিছু কি আজ জানতে পারলে?’

‘হ্যাঁ।’ আজ যা যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তা অকপটে বলল অমিত।

শুনতে শুনতে চোখ বড়, মুখ হাঁ হল, গালে হাত দিলেন মাসিমণি, তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘সেকি গো?’

‘আমার তো ওকে বড়লোকের বকে যাওয়া ছেলে বলে মনে হয়েছে।’

‘তাহলে তো এই বিয়ে আটকাতেই হবে। জেনেশুনে তো মেয়েটাকে ভাসিয়ে দিতে পারি না।’ তারপরেই চিন্তায় পড়লেন, ‘কিন্তু কথাটা তো দিদি-জামাইবাবুকে জানাতে হবে, কী করে জানাব?’

অমিতের মনে হল মাসিমণি ঠিকই বলেছেন। ওঁরা নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন তিনি জানলেন কী করে? কী উত্তর দেবেন মাসিমণি। আচমকা তার মাথায় মতলবটা এল। সে বলল, ‘আপনার দিদির ফোন নাম্বার যদি দেন তাহলে নিজের পরিচয় না দিয়ে ওঁকে সব কথা জানিয়ে দিতে পারি।’

‘পারবে? তুমি পারবে?’ মুখে হাসি ফুটল ভদ্রমহিলার।

‘এরকম কখনও করিনি। তবে কারও ভালো হবে বলে চেষ্টা করতে পারি।’ নীচু স্বরে কথাগুলো বলল অমিত।

‘দাঁড়াও। দিদির টেলিফোন নাম্বারটা তোমাকে লিখে দিচ্ছি।’ ভদ্রমহিলা একটা কাগজে নাম্বার লিখে দিলে অমিত বলল, ‘আপনি একটু বসুন, আমি হোস্টেলের অফিসঘর থেকে ফোন করে আসি।’

দ্রুত অফিসঘরে চলে এসে খুশি হল অমিত। এখন ঘরে কেউ নেই। সে রিসিভার তুলে ডায়াল করল। কিছুক্ষণ পরে মহিলা কণ্ঠ কানে এল। অমিত জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, মৃণালের বাবাকে ফোনটা দেবেন?’

‘উনি কাজে গিয়েছেন। আপনি কে বলছেন?’

‘আপনি আমাকে চিনবেন না। তাহলে মৃণালের মাকেই দিন।’

‘আমি মৃণালের মা। আপনি কে বলুন তো?’

‘পরিচয় দিলে চিনতে পারবেন না। শুধু বলব, যার সঙ্গে আপনারা মেয়ের বিয়ে দিতে যাচ্ছেন সেই উকিলবাবুর ছেলের চরিত্র কীরকম তা খোঁজ নিয়ে দেখুন। রোজ মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরে, মানুষের সঙ্গে কোনও কারণ ছাড়াই খারাপ ব্যবহার করে। নিজের মেয়ের সর্বনাশ করবেন না। আমার কথা বিশ্বাস না-হলে ওর পাড়ায় গিয়ে খোঁজ করলেই সত্যিটা জানতে পারবেন। আচ্ছা নমস্কার।’ ভদ্রমহিলাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফোন করার খাতায় নিজের নাম লিখে বাইরে বেরিয়ে এল অমিত।

ভদ্রমহিলা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। একটা হাত গাড়ির দরজায়। মুখে উদ্বেগের ছাপ। তিনি কথা-বলার আগেই টেলিফোনের কথাগুলো অমিত তাঁকে সবিস্তারে বলল, ভদ্রমহিলা বললেন, ‘সত্যি এসব বলেছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওঃ, তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব বাবা। তোমার কি মনে হয় দিদি তোমার কথা বিশ্বাস করবে? দিদি করলও জামাইবাবু কি শুনবে?’

‘আমি তো ওঁদের চিনি না, কী করে বলব বলুন।’

‘আচ্ছা, এই যে ফোন করলে, তার দাম হোস্টেল নেবে?’

‘তা তো নেবেই।’

সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুঠোয় ধরা পার্সের চেন খুলে তা থেকে দশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে ধরলেন ভদ্রমহিলা, ‘তুমি টাকাটা রাখো।’

‘না না, একি করছেন আপনি।’

‘দ্যাখো, তুমি চাকরি করো না। মফসসল থেকে কলকাতায় এসেছ পড়াশুনা করতে। এখন তুমি বাড়তি খরচের টাকা কোথায় পাবে?’

‘ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না প্লিজ।’

ভদ্রমহিলা টাকাটা রেখে দিয়ে বললেন, ‘আমি এখনই দিদির বাড়িতে যাচ্ছি। ওখানে কী হচ্ছে তা তোমাকে জানাব।’ গাড়িতে উঠলেন তিনি।

.

এখন প্রায় সন্ধ্যা। জামাইবাবুর বাড়ি প্রায় পুরোনো দিনের জমিদার বাড়ির মতন। দোতলায় উঠে তিনি দেখলেন দিদি বারান্দায় বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। উল্টোদিকে জামাইবাবু।

তাকে দেখে দিদি সোজা হল, ‘কিরে।’

‘আর বলিস না দিদি। জিলিপি খাওয়ার শখ হয়েছিল তাই ড্রাইভারকে বলেছিলাম মিষ্টির দোকানে যেতে। অন্তত তোদের বাড়ি অবধি দশটা দোকানে ঢুঁ মেরে এসে ড্রাইভার বলল কেউ নাকি বিকেলে জিলিপি বিক্রি করে না। ওটা সকালে বানায়, সকালেই শেষ। এতদূরে এসেছি যখন তখন ভাবলাম তোর বাড়ি থেকে চা খেয়ে যাই। মেয়ে কোথায়? ডাক তাকে! চেয়ার টেনে বসলেন মহিলা।

দিদি ঢোঁক গিলে জামাইবাবুর দিকে তাকালেন। তাই দেখে জামাইবাবু কাঁধ নাচালেন। সেটা লক্ষ করে বোন বলল, ‘কিছু হয়েছে নাকি? তোমরা কীরকম গম্ভীর মুখ করে বসে আছ!’

জামাইবাবু বললেন, ‘তোমার দিদির বাস্তববুদ্ধি কবে হবে জানি না। কাক কান নিয়ে গেছে শুনে কাকের পেছনে দৌড়াচ্ছে।’

বোন হাসল, ‘ও মা। কী হয়েছে?’

‘একদম বাজে কথা বলবে না। একটা অচেনা লোক গায়ে পড়ে এমন খবর দেবে কেন?’ দিদি ফুঁসে উঠল।

লোকটা কে? তাকে চেনো? সে কি তার নাম বলেছে? এটা আজ নয়, চিরকাল হয়ে এসেছে। কিছু লোকের অভ্যেস হল ভালো কাজ যাতে না হয় তাই লাগানি ভাঙানি দেওয়া।’

‘তাতে তার কী লাভ! বললেই হল।’ দিদি বলল।

বোন মাথা নাড়ল, ‘ব্যাপারটা কী তা বলবে তো?’

দিদি বলল, ‘একজন ফোন করে তোর জামাইবাবুকে প্রথমে চাইল। ও নেই শুনে আমাকে বলল, যে ছেলের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে সে নাকি রোজ মদ খায়। অত্যন্ত খারাপ ছেলে।’

‘মদ খেলেই খারাপ হয়? আমিও তো পার্টিতে গেলে এক আধ পেগ ড্রিঙ্ক করি। তারমানে আমি খারাপ?’ জামাইবাবু বললেন।

‘তোমার বয়সে বছরে দুদিন যা কর তা তোমার হাঁটুর বয়সি ছেলে যদি রোজ করে তাহলে তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলে কী হবে তা কল্পনা করতে পারো?’ দিদি চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

বোন জিজ্ঞাসা করল, ‘যার সঙ্গে মৃণালের সম্বন্ধ এসেছে সে কি খুব মদ খায়? কী করে ও। পড়াশুনা করে তো?’

‘তাতেই এই, বোঝ। ওর সঙ্গে বিয়ে হলে মাস দুয়েক পরে মেয়ে নেশা করে বাড়িতে ফিরবে, এই তোমাকে বললাম।’ দিদি কথাগুলো বেশ জোরের সঙ্গে বলল।

‘আমি বুঝতে পারছি না, তোমরা একটা উড়ো ফোনের কথা বিশ্বাস করছ কী করে। লোকটা যদি নিজের পরিচয় দিয়ে ওই কথাগুলো বলত তাহলে বোঝা যেত।’ জামাইবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে, ওই পাড়ায় আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক থাকেন। ভেবেছিলাম বিয়ের ব্যাপার নিয়ে পরিচিতদের জিজ্ঞাসা করলে তারা হয়তো ওই ছেলের বাবাকে খবরটা দিয়ে দেবে। তোমরা যা করছ তাতে আর না করে কোনও উপায় থাকছে না।’ জামাইবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দেওয়ালের পাশে টেবিলের ওপর রাখা ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। মিনিট তিনেক কথা বলে রিসিভার নামিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে চেয়ার ফিরে এলেন?

দিদি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হল?’

‘নাঃ, ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবতে হবে। ভদ্রলোক বলছেন, ছেলেটা হয়তো একটু রগচটা, কিন্তু মাঝে মাঝে ড্রিঙ্ক করলেও করতে পারে, তবে রোজ করে বলে মনে হয় না।’ মুখ গম্ভীর জামাইবাবুর।

শোনামাত্র দিদি চেঁচিয়ে উঠল, ‘তার মানে ফোনে লোকটা যা বলল তা মিথ্যে নয়। ছিঃ! কলেজে পড়া একটা ছেলে বাপের পয়সায় মদ খাচ্ছে আর বাপ তাকে কিছু বলছে না, প্রশ্রয় দিচ্ছে, এই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেবে তুমি?’

‘আমি তো বললাম, আর একটু খোঁজ করে দেখতে হবে।’ জামাইবাবু বললেন।

দিদি বোনের দিকে তাকালেন, ‘দ্যাখ তোর জামাইবাবুর কাণ্ড। এসব শোনার পরেও উনি বলছেন ভাবতে হবে, খোঁজ নিতে হবে। তারচেয়ে মেয়েকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দাও না। তোমার ঘাড় থেকে বোঝা নেমে যাবে।’

এবার শ্যালিকা কথা বলল, ‘জামাইবাবু, ভাগ্যিস ফোন এসেছিল, নইলে তো আমরা জানতেই পারতাম না। তাই না। দিদি ঠিকই বলছে, আর ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। আপনি ওদের রবিবারে আসতে নিষেধ করে দিন।’

‘নিষেধ করতে হলে বিশ্বাসযোগ্য কারণ দেখাতে হয় যে—?’

‘আশ্চর্য! তোর জামাইবাবুর কথা শুনলি?’ দিদি মাথা নাড়ল।

শ্যালিকা বলল, ‘যা হোক কিছু বলে দাও না। জ্যোতিষী বলেছে দেড় বছরের মধ্যে বিয়ে দিলে ঘোর অমঙ্গল হবে। যে সে জ্যোতিষী নয়, একবারে বেনারসের জ্যোতিষী। নাম জিজ্ঞাসা করলে যা হোক নাম বলে শেষে একটা আনন্দ বসিয়ে দিলেই বিশ্বাস করবে।’

দিদি বলল, ‘খুব ভালো, বলো, তুমি এখনই বলো।’

‘এখন তো ফোন ধরেন না, মানে ফোন করলে বিরক্ত হন। বলেন, সকাল আটটা থেকে ন’টার মধ্যে ফোন করতে।’ জামাইবাবু বললেন।

‘না জামাইবাবু,’ শ্যালিকা বলল, ‘এটা অত্যন্ত অসভ্যতা। আপনি ভদ্রলোকের হবু বেয়াই। আপনার সঙ্গে কর্মচারীর মতো ব্যবহার করছেন। দিনে ওই এক ঘণ্টার বেশি তিনি আপনার সঙ্গেও কথা বলবেন না? চমৎকার!’

জামাইবাবু আবার উঠলেন, ফোন করে উকিলবাবুকে শেখানো কথাগুলো স্পষ্ট গলায় বলে রিসিভার রেখে দিলেন।

শ্যালিকা বলল, ‘খুব ভালো কাজ করলেন জামাইবাবু।’

জামাইবাবু বললেন, ‘শোনো, যে ছেলেটি কলেজে পড়াচ্ছে, বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে, অবশ্য বনেদি বড়লোক নয়, তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করলে আশা করি তোমাদের আপত্তি হবে না—!’

দিদি বলল, ‘আগে খোঁজ খবর নাও। সব ছেলে তো মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভেতরে ভেতরে কী আছে তা জানব কী করে?’

জামাইবাবু বললেন, ‘লাক! লাকে যা আছে তাই হবে। তোমাদের বাবা-মায়ের লাক ভালো ছিল বলে দুটো ভালো জামাই পেয়েছিলেন। বলছ যখন, তখন নিশ্চয়ই খোঁজ নেব।’

শ্যালিকা উঠে দাঁড়াল, ‘মেয়ে কোথায়?’

‘রবিবারে পাত্রপক্ষ আসবে শুনে রাগ করে শুয়ে আছে।’ দিদি বলল। ‘তুই যা তো, গিয়ে খবরটা দে ওকে।’

মৃণালের মাসিমণি হাসিমুখে ভেতরে চলে যায়।

.

পরের দিন সকালে মাসিমণি অমিতকে ফোন করে বললেন, ‘তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব বাবা, মৃণালের ওই সম্বন্ধ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তুমি যদি ওখানে গিয়ে খবরটা না নিয়ে আসতে তাহলে সারাজীবন কেঁদে মরত মেয়েটা।’

‘খুব ভালো খবর এটা। তবে—!’ বলতে গিয়ে থেমে গেল অমিত।

‘থেমে গেলে কেন, কী বলছিলে বলো বাবা!’

‘মৃণাল ওই পার্কে আর যাচ্ছে না তো!’

‘না না। আমি রোজ ওকে কলেজে পৌঁছে দিচ্ছি আবার ছুটির সময় নিয়ে আসছি আমার বাড়িতে। দিদি এসে ওকে নিয়ে যায়। পার্কে যাবে কী করে?’

‘তাহলে তো ভালোই।’

‘তোমার ওপর খুব কাজের বোঝা চাপাচ্ছি আমি। কিছু মনে করছ না তো?’

‘না না। বলুন, কী করতে হবে?’

‘আগে বলো, তোমার পরীক্ষা কবে?’

‘এখনও বারো সপ্তাহ বাকি আছে।’

‘তাহলে থাক।’

‘না না, কী করতে হবে বলুন না। আমার কোনও অসুবিধে নেই।’

কিন্তু কিন্তু করেও শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক ছেলেটির কথা অমিতকে বললেন মাসিমণি, ‘দ্যাখো, পড়াশুনা নষ্ট করে খোঁজখবর নিতে বলছি না। যদি তুমি সময় পাও তাহলেই—, বুঝতেই পারছ!’

‘আপনি ঠিক কী খবর চাইছেন তা যদি বলেন—।’ অমিত বলল।

‘ছেলেটি কেমন? কীরকম বয়স। ওর সম্বন্ধে পড়ার লোকজন কী বলে এটুকু জানলেই হবে। বাকিটা মৃণালের কপালে যা আছে তাই হবে।’

মাসিমণি ফোনেই ছেলেটির সম্পর্কে যা যা তথ্য বললেন তা অমিত একটা কাগজে লিখে নিল।

ভাবী পাত্রের নাম তারাশংকর রায়। গড়িয়ার একটি কলেজের ইংরেজি অধ্যাপক। বাড়ি হাজরা রোডে। অমিতের মনে পড়ল ওর ক্লাসের সহপাঠী স্বপন হাজরা রোডে থাকে। সে খুব সরলভাবে স্বপনকে বলল, ‘তুমি হাজরা রোডের যেখানে থাকো সেখান থেকে কমলালয় বলে দোকানটা কতদূরে?’

‘কাছেই। কেন বলো তো?’

‘ওখানে, মানে ওই দোকানের পাশে একজন ভদ্রলোক থাকেন যিনি ইংরেজিতে অধ্যাপনা করেন। নাম বললে চিনতে পারবে?’

‘কী নাম?’

স্বপনকে নামটা বলল। স্বপন চিনতে পারল না, কিন্তু জানালো খোঁজ নিয়ে এসে জানাবে। ওখানে একটা মুদির দোকান আছে। তারা সবাইকে চেনে।

দুদিন বাদে স্বপন যে তথ্য জানাল তার সঙ্গে মাসিমণির দেওয়া তথ্যের পার্থক্য নেই। তখন স্বপনকে খোঁজ নেওয়ার কারণটা বলল অমিত। স্বপন যা বলল তাতে অমিত বুঝতে পারল বাঙালি মা-মাসিরা যেমন ধরনের পাত্রকে জামাই হিসেবে পেতে চান তারাশংকর রায় তার আদর্শ উদাহরণ।

খবরটা নিশ্চয়ই ভালো। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার এইরকম পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তার জীবন নিশ্চিন্ত করতে চান। কিন্তু হঠাৎ অমিতের মন উদাস হয়ে গেল।

স্রেফ মজা করার জন্যে কলেজের বাসস্টপে সে মৃণালের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়েছিল। তারপর যে যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে মন থেকে মজা করার ইচ্ছাটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। সেসময় যেন মনে হয়েছিল, ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। তারপর থেকে তার সঙ্গে মৃণালের দেখা হয়নি এবং দেখা করার জন্যে মনে আগ্রহ তৈরি হয়নি। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পার্কে বসে সিগারেট খাওয়া, বড় উকিলের কুপুত্রের সঙ্গে প্রায় পাকা হতে চলা বিয়ের সম্পর্ক তার উদ্যোগে বানচাল হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার মনে একটা নরম অনুভূতি তিরতিরিয়ে কাঁপছে।

তাই এই সুপাত্রের কথা যদি মাসিমণিকে জানিয়ে দেয় তাহলে পাত্রীপক্ষ হিসেবে নিশ্চয়ই ওঁরা খুশি হবেন। হয়তো মৃণালের বিয়েও এই অধ্যাপক ছেলের সঙ্গে হয়ে যাবে। দুজনের বয়সের পার্থক্য কত? মৃণালের বয়স আঠারোর বেশি নয়। অধ্যাপকের কত হবে? অন্তত বাইশ-তেইশের আগে তো এম.এ পাশ করা সম্ভব নয়। তারপরে চাকরির চেষ্টা করে শেষপর্যন্ত কলেজের চাকরি পেতে পেতে তো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। যদি পাঁচ বছর অপেক্ষার পরে চাকরি পেয়ে থাকে এবং সেই চাকরির বয়স যদি দু’বছর হয়ে থাকে তাহলে ওই তারাশংকর রায়ের বয়স কিছুতেই তিরিশের নীচে হবে না। তাহলে দুজনের বয়সের পার্থক্য অবশ্যই বারো বছর। এই কথাটা কি সে মাসিমণির কানে ঢুকিয়ে দেবে?

সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। বেল বাজার পরে দরজা খুললেন মেসোমশাই। বললেন, ‘আরে তুমি যে! এসো এসো।’

ঘরে ঢোকার পর চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে নিজে একটায় বসে বললেন, ‘তারপর! কী খবর বলো? কেমন আছ?’

‘আছি।’ হাসল অমিত।

‘শুনলাম তুমি মৃণালকে এবার রক্ষা করেছ। গুড। গুড।’

এইসময় ভেতর থেকে মাসিমণি বেরিয়ে এলেন, ‘ওমা! তুমি কখন এলে। বসো বসো।’ ভদ্রমহিলা অন্য চেয়ারে বসে বললেন, ‘কোনো খবর পেয়েছ বুঝি?’

‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ল অমিত।

মেসোমশাই বললেন, ‘আমি শুধু খবর পেয়েছি ছাত্রদের কাছে ও অধ্যাপক হিসেবে বেশ পপুলার।’

‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়ল অমিত। ‘ওঁর বিরুদ্ধে কোনও কথা শুনিনি।’

মেসোমশাই বললেন। ‘বাঃ, তাহলে তো হয়েই গেল। তুমি তোমার দিদিকে ফোন করে দাও। ছেলে-মেয়ে যদি দুজন দুজনকে যদি পছন্দ করে তাহলে তো কাজটা হয়েই যেতে পারে।’

মাসিমণি উঠে দাঁড়ালেন, ‘দাঁড়াও, আগে তোমাকে মিষ্টি খাওয়াই।’

Chapter - 4

হোস্টেলে ফেরার সময় বাসে বসে চোখ বন্ধ করল। যা বলবে বলে ভেবে গিয়েছিল তা না বলে যা সত্যি তাই বলে এল সে? কিছুতেই সাজিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারল না মৃণালের মেসোমশাই-মাসিমণিকে।

অমিত চোখ খুলল। আচ্ছা, যদি সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারত তাহলে কী হত? সে যদি বলত যার সঙ্গে সম্বন্ধ হচ্ছে সেই ছেলের একজন প্রেমিকা আছে। বহুদিনের প্রেম। সেই প্রেমিকাও কলেজে পড়ায়। বেজাতের মেয়ে বলে পাত্রের মা-বাবা সেই মেয়েকে বাড়ির বউ করবে না। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মতো মনের জোর ছেলের নেই। চাপে পড়ে যদি সে বিয়ে করে তাহলেও তার পক্ষে প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এইসব কথা বলার সময় কিছু কিছু লোকের নাম তাকে করতে হত যাদের কোনও অস্তিত্ব নেই।

কিন্তু বলার সময় কিছুতেই কথাগুলো মুখ দিয়ে বের হল না।

এইসব ভাবতে ভাবতে তার মনে আর একটা কথা ধীরে ধীরে জোরালো হল। যদি সে বলতে পারত এই মিথ্যেটা তাহলে বিয়ে ভেঙে গেলেও যেতে পারত। তারপর আবার কোনও সম্বন্ধ এলে মাসিমণি তাকে খোঁজখবর নিতে অনুরোধ করলে সে একটা না একটা কারণ দেখিয়ে সেই ছেলে বা তার পরিবারের বিরুদ্ধে কথা সাজাত। তাতেও হয়তো বিয়ে ভাঙত। তারপর কী হত?

আচ্ছা, যদি উল্টোটা হত। যদি মাসিমণি তাকে জিজ্ঞাসা করত, ‘এত চেষ্টা করেও মেয়ের জন্যে ভালো ছেলে পাওয়া যাচ্ছে না, তুমি তো আজ বাদে কাল এম.এ পাশ করবে। তোমার বাবার ফোন নাম্বার দাও, আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলব।’

কথাগুলো মাথায় আসামাত্র সে সোজা হয়ে বসল। এরকম যদি হয় তাহলে কেমন হবে? ভাবাই যায় না। কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে রইল সে। বাস থেকে হোস্টেলে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল সে। তারপরেই বাবার মুখ মনে এল। বাবা যদি মেসোমশাই-মাসিমণিকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা অমিতের সঙ্গে আপনাদের মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছেন, কিন্তু ভেবেছেন কি, ওকে খাওয়াবে কে? অমিতের তো আমার পয়সায় চলছে। যদি পাস করে তাহলে কবে কীরকম চাকরি পাবে তা ঈশ্বর জানেন। আপনারা কি ভেবেছেন আমি চিরকাল ওদের দুজনের ভাতকাপড়ের দায়িত্ব নেব?

বাবা এরকম প্রশ্ন করতেই পারেন। করলে মাসিমণি তার কাছে এর জবাব চাইলে সে কী বলবে? এখন যা অবস্থা তাতে কোনও পাগলও বিয়ের কথা চিন্তা করতে পারে না। সপ্তাহে দুই-তিনঘণ্টা পার্কে বাসে প্রেম করা যায় তার বেশি এক পা-ও নয়।

অমিত চোখের সামনে হাতের আঙুলগুলো মেলে ধরল। যদি এরা না থাকত তাহলে সে কোনও কিছু ধরতে পারত। ওই যে পাণিগ্রহণ না কি যেন বলে, তা কি গ্রহণ করতে পারত? অসম্ভব। তার তো এখন ওই আঙুলছাড়া হাতের অবস্থা। মনে মনে তলোয়ার ঘুরিয়ে জীবনযুদ্ধে নামার স্বপ্ন দেখে কী লাভ—এইসব ভাবতে ভাবতে মিইয়ে গেল অমিত। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে তো কোনও লাভ নেই!

.

পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই কুচবিহার থেকে বাবার চিঠি এল, ‘তোমার পরীক্ষা শেষ হলে রেজাল্ট বের না হওয়া পর্যন্ত কলকাতায় থাকার আবশ্যকতা আছে বলে আমার মনে হয় না। এম.এ পাশ করার পর তোমার কী করার ইচ্ছা তা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন আছে? আজ তোমাকে এই মাসের টাকার সঙ্গে কুচবিহারে আসার ট্রেনের ভাড়া পাঠালাম। পাওয়ামাত্র টিকিট কেটে নিও। আশীর্বাদক, তোমার বাবা।’

যাঃ। অমিত ভেবেছিল পরীক্ষার পরে সে দীঘায় বেড়াতে যাবে। দীঘাতে তার সহপাঠী রবীন্দ্রনাথের বাড়ি আছে। অবশ্য সেখানে ওর বাবা-মা থাকেন না। তাঁরা থাকেন তমলুকে। রবীন্দ্রনাথ বার বার করে বলেছে। দীঘার বাড়িতে যে কাজের লোক আছে সে রান্না করে দেবে। বারান্দায় বসেই সমুদ্রের ঢেউ দেখা যাবে। এখনও কোনও দিন স্বচক্ষে সমুদ্র দ্যাখেনি অমিত। তাই খুব ভালো লেগেছিল প্রস্তাবটা। কিন্তু বাবার এই চিঠির পরে সমুদ্র দ্যাখার ইচ্ছে বাতিল করতে হল।

যেদিন পরীক্ষা শেষ হল সেই বিকেলে বেয়ারা এসে জানাল, একজন দিদিমণি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’

বাইরে বেরিয়ে অবাক হল অমিত। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মাসিমণি। মুখে মিষ্টি হাসি। জিজ্ঞসা করলেন, ‘পরীক্ষা কেমন হল?’

‘ভালোই। আপনারা কেমন আছেন?’

‘খুব চাপে আছি বাবা। আগে এটা ধর!’ হাত বাড়িয়ে একটা খাম এগিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা। ‘তোমার সুপারিশে মৃণালের বিয়ে স্থির হয়েছে। সামনের সপ্তাহেই বিয়ে। ছেলের মায়ের ওকে দেখে এত পছন্দ হয়ে গেল যে একটুও দেরি করতে চাইলেন না। তোমার হোস্টেলের কাছাকাছি বিয়ে বাড়ি নেওয়া হয়েছে। তোমাকে তো আসতেই হবে।’ মাসিমণি বললেন।

তারিখটা দেখল অমিত। ওই সময় তার কুচবিহারে থাকার কথা। বিয়ে উপলক্ষে কলকাতায় আসতে হলে অনেক কৈফিয়ত দিতে হবে। এই একমাস হোস্টেলের মিল অফ করে গেলে অনেক পয়সা বাঁচবে। ভদ্রমহিলাকে একথা সে বলবে কী করে!

সে মাথা নাড়ল, ‘চেষ্টা করব। খুব চেষ্টা করব।’

‘মানে? একি বলছ তুমি?’ মাসিমণি খুব অবাক হলেন।

‘আসলে আমার তো পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। আগামীকাল আমি কুচবিহারে বাবা-মায়ের কাছে চলে যাচ্ছি। রেজাল্ট বের হওয়ার আগে ফিরে আসার কথা। বিয়েটা তো তার মধ্যেই হয়ে যাচ্ছে। তাই—।’ বলতে বলতে থেমে গেল অমিত। মুখের ওপর না বলতে সঙ্কোচ হচ্ছিল।

‘সেকি! তুমি বিয়েতে থাকবে না তা হয় নাকি? তোমার জন্যেই তো এমন পাত্র মৃণালের জন্যে পেয়েছি।’ বিমর্ষ মুখে বললেন মাসিমণি।

‘আমি চেষ্টা করব, খুব চেষ্টা করব।’

অনেক অনুরোধ করে ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পর অমিতের মনে হল, শাপে বর হয়েছে। বাবার চিঠিটা পেয়ে তার মন খারাপ হয়েছিল দীঘায় যেতে না পারার জন্যে। এখন মনে হচ্ছে কলকাতায় থাকলে মৃণালের বিয়েতে না যাওয়ার কী কারণ দেখাত? কিন্তু এটাও সত্যিই যেতে তার ইচ্ছে করছে না।

কিন্তু পরের দিন সকালে যে তার জন্যে এত বড় চমক অপেক্ষা করছিল তা অমিতের কল্পনাতেই আসেনি। সকালের চা খাওয়ার পর জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল অমিত। তার ট্রেন দুপুরে। হোস্টেলের কাজের লোক এসে জানিয়ে গেল তার ফোন এসেছে।

সে যে কুচবিহারে যাচ্ছে তা কয়েকজন সহপাঠী জানে। তাদের কেউ হয়তো ফোন করেছে ভেবে অমিত দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে অফিস ঘরে এসে টেবিলের ওপর শোওয়ানো রিসিভার তুলে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’

‘আপনি কি অমিত?’ একটি মেয়েলি গলা ভেসে এল।

‘হ্যাঁ, আমি অমিত।

‘ও। নিজেকে আপনি কী ভাবেন? খুব বড় মনের মানুষ? দাতা কর্ণ?’ ভদ্রমহিলার গলায় বিদ্রুপ স্পষ্ট।

চোখ বড় হয়ে গেল অমিতের। বলল, ‘আপনি কে বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’

‘বুঝতে গেলে যে মগজ মাথায় থাকা দরকার তা আপনার নেই। আপনাকে এই ফোন করছি একটা প্রশ্ন করতে। জবাব দিন। আমার সর্বনাশ না করা পর্যন্ত আপনার ঘুম হচ্ছিল না কেন?’

‘আপনি কে আমি সত্যি বুঝতে পারছি না। আপনার সর্বনাশ কেন করব? আমার কতটুকু ক্ষমতা? আপনি ভুল করছেন—!’

‘সেকি! আমার মাসিমা আপনাকে আমার জন্যে পাত্র খোঁজার কথা বললে আপনি সেই দায়িত্ব নেননি? সত্যি কথা বলুন!’

‘ও।’ হকচকিয়ে গেল অমিত, ‘আপনি!’

‘টু বি আর নট টু বি—এই ন্যাকামি আপনি করেননি?’

‘মানে—।’ কথা খুঁজে পেল না অমিত।

‘আমি পার্কে গিয়ে কী করছি, কাদের সঙ্গে বসে সিগারেট খাচ্ছি তাতে আপনার কী? কী লাভ হল আপনার?’

আমি কোনও কিছুর জন্যে ওঁকে বলিনি।’

‘তাহলে আমাকে ফলো করে পার্কে গিয়েছিলেন কেন?’

কী জবাব দেবে ভেবে পেল না অমিত।

‘চুপ করে থাকলে চলবে না। জবাব দিন।’

‘বিশ্বাস করুন, আমি আপনার ক্ষতি হোক এমন কিছু কখনই করতে চাইনি।’ পরিষ্কার গলায় বলার চেষ্টা করল অমিত।

‘একশোবার করেছেন। আপনি একজন মানুষ যার কোনও মেরুদণ্ড নেই। শুনলাম বিয়েতে আসবেন না বলে কলকাতা থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। কেন? আসুন, বিয়ের নেমন্তন্ন পেট ভরে খেয়ে যান।’ কথাগুলো বলেই ফোন রেখে দিল মৃণাল।

পাথরের মতো কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল অমিত। আজ মৃণাল যেসব কথা বলল তার পেছনে যে কারণটা সে আন্দাজ করছে তা এতকাল বুঝতে পারেনি কেন? বড় ঢোঁক গিললো অমিত।

.

কুচবিহারের বাড়িতে এসে প্রথমদিকে মা বাবা ভাই-এর সঙ্গে এবং ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গ পেয়ে সে ভালোই ছিল। কিন্তু মৃণালের বিয়ের তারিখটা কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। যেদিন কলকাতায় মৃণালের বিয়ে সেদিন শরীরে উত্তাপ এল। জ্বর হয়েছে বলে বিছানায় শুয়ে রইল অমিত। কিন্তু দুপুরবেলায় তার মনে হল হলিউড বা বলিউডের বিখ্যাত সুন্দরী তারকাদের দেখলে মন মোহিত হয়। খুব কম তরুণ তাঁদের কাছে পৌঁছনোর জন্যে পাগল হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ একটু বয়স হলে সেই উন্মাদনা কাটিয়ে ওঠে। ব্যাপারটা নিয়ে ওইরকম ভাবা যে হাস্যকর তা বুঝতে আর অসুবিধে হয় না।

মৃণালের পরিবার, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান তাদের থেকে এতটাই ওপরে যে তুলনা করাই চলে না। আজ মৃণালের বিয়ে হয়ে যাবে। আজ তার এক পয়সা রোজগার করার ক্ষমতা নেই। এম.এ পাশ করে যখন সে কাজকর্ম করবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে তখন হয়তো মৃণালের বিবাহিত জীবনে সন্তান এসে যাবে। সে কখনই মৃণালের সঙ্গে এক প্লাটফর্মে আসবে না। তাই মৃণালের নতুন জীবনে যাওয়ার দিনে মন খারাপ করে কী লাভ? রাত যখন বাড়ল তখন কিনু গোয়ালার গলির লাইনগুলো মনে এল অমিতের, ‘মেয়েটা তো রক্ষে পেলে, আমি তথৈবচ।’

রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই চাকরির ইন্টারভিউ লেটারটা কুচবিহারের বাড়িতে চলে এল। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি, ইন্সপেক্টারের পদ। চিঠিটা দেখে বাবা বললেন, ‘মাইনেটা খারাপ নয়। কিন্তু তোমাকে প্রশ্ন করব, এম.এ পড়লে কেন?’

‘মানে?’ হকচকিয়ে গেল অমিত।

‘এই চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অন্তত বি.এ পাশ। তাহলে আরও দু’বছর পড়াশোনা করে এম.এ দেওয়ার কী দরকার ছিল? উত্তর দাও।’

বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর খুঁজে পেল না অমিত।

‘উত্তর তোমার জানা নেই। ঠিক আছে, কলকাতায় যাও, ইন্টারভিউ দাও, কিন্তু যদি চাকরিটা পাও তাহলে তোমাকে ঋণশোধ করতে হবে।’

‘ঋণশোধ? মানে?’ হকচকিয়ে গেল অমিত।’

‘এই সরকারি চাকরিটার জন্যে দু’বছর এম.এ পড়ার দরকার ছিল না। তার মানে আমি দু’বছর ধরে তোমার পেছনে অর্থের অপব্যায় করেছি। তোমার একটি ভাই আছে। তার পড়াশুনা চলছে। আমি তাকে বঞ্চিত করতে পারি না। তাই এম.এ পড়ার জন্যে যে টাকা খরচ হয়েছে তা চাকরি পেয়ে আমাকে ফেরত দেবে। সেইজন্যে আমি তোমাকে চারবছর সময় দিচ্ছি। তুমি দ্যাখো, কলকাতায় গিয়ে ইন্টারভিউ ভালো দিয়ে চাকরিটা পাও কিনা।’ গম্ভীর মুখে বাবা কথাগুলো বললেন।

‘যদি এই চাকরি না পাই—!’

তোমার দুর্ভাগ্য। তবে যদি এম.এ পাশ করার পর এমন কোনও চাকরি পাও যার জন্যে এম.এ ডিগ্রির যোগ্যতা দরকার হয়, তাহলে তোমার কাছ থেকে আমি কোনও টাকা ফেরত নেব না।’ বাবা সামনে থেকে সরে গেলেন।

কী করবে বুঝতে পারছিল না অমিত। যা হয় হবে ভেবে কলকাতায় ফিরে এল সে।

Chapter - 5

হোস্টেলের নিয়ম অনুযায়ী এম.এ-এর রেজাল্ট বের হওয়ার সাতদিনের মধ্যে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হয়। এই সমস্যায় যাতে পড়তে না হয় তাই অনেক ছাত্র শেষ বছরে এসে আইনক্লাসে ভর্তি হয়ে যায়। ফলে ক্লাস করুক বা না করুক আরও দু’বছর হোস্টেলের সিট হাতছাড়া হয়ে যায় না। অমিত সেটা করেনি অথবা করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হল আইনক্লাসে ভর্তি হতে হলে যত টাকা দরকার হয় তা অমিতের ছিল না। তাছাড়া সে যখন ল’ পড়বে না, ওকালতি করার বিন্দুমাত্র বাসনা তার ছিল না, তাই রেজাল্ট বের হলেই তাকে হোস্টেল ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। কিন্তু তার রুমমেট ল’ক্লাসে ভর্তি হয়ে গেছে। তার গেস্ট হিসেবে সে অন্তত মাসখানেক হোস্টেলে থাকতে পারে। তারপরেই কলকাতায় থাকার জন্যে একটা জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাপারটা যে কী করে সম্ভব হবে তা তার মাথায় ঢুকছে না।

মাত্র দশ নম্বরের জন্যে এম.এ-তে প্রথম শ্রেণি না পেলেও চাকরির ইন্টারভিউটা ভালোই হল। চাকরিতে প্রথম মাসে যে মাইনে পাবে তাতে একজন মানুষের আরামসে চলে যাবে এবং তা কলেজের অধ্যাপনার মাইনের চেয়ে খুব কম নয়। যদিও পরের দিকে অধ্যাপকদের মাইনে অনেক বেশি হয়ে যাবে। কিন্তু পড়ে পাওয়া চৌদ্দোআনা কথাটা মেনে চাকরিতে ঢুকে পড়ল অমিত। প্রথম মাসের মাইনের টাকার এক তৃতীয়াংশ বাবাকে দিতে হবে বলে ব্যাঙ্কে জমা রেখে সে আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটা মেসবাড়িতে চলে এল। খবরটা পেয়ে বাবা খুব দুঃখ পেলেন। মা চিঠিতে জানালেন, ‘চেষ্টা করো যদি তুমি অধ্যাপনার চাকরি পেতে পারো। তোমার বাবার ইচ্ছে ছিল তোমাকে অধ্যাপক হিসেবে দেখতে পাওয়া।’

এই চিঠির পর অমিতের ধ্যানজ্ঞান হল কলেজের চাকরিতে লেকচারার পদের জন্যে আবেদন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক পরামর্শ দিলেন, যদি মফসসলে গিয়ে কলেজের চাকরিতে তার আপত্তি না থাকে তাহলে তিনি চেষ্টা করতে পারেন। কলকাতা ছেড়ে বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে অমিতের মোটেই ছিল না, কিন্তু এখন তার মনে হল সুযোগ পেলে যাওয়াই উচিত।

বর্ধমানের একটি কলেজে তার লেকচারারের চাকরি হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সুপারিশে। চাকরি পেয়েই বাবাকে চিঠি লিখে জানালে তিনি একটি ছোট চিঠি লিখলেন, ‘খবরটি বোধহয় আমার আয়ু বাড়িয়ে দিল। ভালো অধ্যাপক হও, ভালো মানুষ হও।’

যেদিন কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে তার আগের দিন সকালে তার মনে সেই বেদনাটা ফিরে এল যা মৃণালের বিয়ের দিন তাকে পীড়িত করেছিল। সেসব এখন ইতিহাস হয়ে গিয়েছে, অমিতের মনে হল, কিন্তু কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে মৃণালের মাসিমণির সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে হল তার। ফোন করতে পারত কিন্তু সেটা না করে সেই বিকেলে সোজা ভদ্রমহিলার বাড়িতে চলে গেল সে। কাজের মেয়েটি তাকে দেখে চিৎকার করতে করতে ভেতরে দৌড়ে গেল। একটু বাদে মাসিমণি ভেতরের দরজায় এসে দাঁড়ালে অমিত তাঁকে দু’হাত বুকের ওপর এক করে নমস্কার জানাল।

‘বাব্বা।’ মাসিমণি চোখ বড় করলেন, ‘অ্যাদ্দিনে মনে পড়ল মাসিমাকে।’

‘কুচবিহারে ছিলাম এতদিন। তারপর রেজাল্ট বের হল।’

‘তাই?’ ভদ্রমহিলা হাসলেন, ‘কেমন রেজাল্ট হল?’

‘একটুর জন্যে ফার্স্টক্লাস হয়নি।’ মুখ নামাল অমিত।

‘ইসস!’ মাসিমণি মাথা নাড়লেন, ‘হলে ভালো হত, এই বা কম কী? এসো। বসো। আগে মিষ্টি মুখ করো।’

চেয়ারে বসে অমিত বলল, ‘না না। মিষ্টি খাব না। আপনারা সবাই ভালো আছেন তো?’

‘হ্যাঁ বাবা।’ মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা, ‘তুমি তো আসতে পারলে না বিয়েতে। সবাই খুব আনন্দ করেছে। নয়শো লোক নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিল। খুব আনন্দ করেছে সবাই শুধু একজন ছাড়া।’

‘মানে? কে তিনি?’

‘আর বোলো না, বিয়ের কনের কথা বলছি। আমাদের যেন কারও বিয়ে হয়নি। আমরা কেউ বিয়ের পর বাপের বাড়ি ছেড়ে আসিনি—’

‘কেন? কী হয়েছিল?’

‘আষাঢ় মাসের আকাশ করে বসেছিল মুখটাকে। বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আগে সবারই কষ্ট হয়, আমারও হয়েছিল, তাই বলে ওরকম গোমড়া মুখে বসে থাকতে হবে?’ মাসিমণি বললেন।

‘তারপর?’

‘তারপর আর কি? ওখানে গিয়ে কী করছে জানি না, দ্বিরাগমনে বাপের বাড়িতে এসে আমার সঙ্গে একটাও কথা বলেনি, জানো? এটাকে বাড়াবাড়ি বলব না তো কী? সেই তো এখন বরের সঙ্গে উড়িষ্যার সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলি, তার বেলা? হাসলেন মহিলা।

বড় শ্বাস ফেলল অমিত। জিজ্ঞাসা করল, ‘মেসোমশাই বাড়িতে নেই?’

‘আর বোলো না। শুধু ট্যুর আর ট্যুর! অফিসের কাজে দিল্লি গিয়েছে।’ এইসময় টেলিফোনের রিং হচ্ছে বোঝা গেল। মাসিমণি ‘একটু বসো বাবা’ বলে ভেতরে চলে গেলেন। একটু পরেই তাঁর তীব্র চিৎকার কানে আসায় উঠে দাঁড়াল অমিত।

দ্রুত পাশের ঘরে গিয়ে সে দেখতে পেল ভদ্রমহিলা হাউহাউ করে কাঁদছেন। তাঁর হাতে তখনও টেলিফোনের রিসিভার ধরা রয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বসে পড়লেন চেয়ারে।

অমিত কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’

কাঁদতে কাঁদতে মাসিমণি বললেন, ‘কপাল পুড়ে গেল মেয়েটার। জামাই নেই! সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছে—’

‘সেকি!’ চমকে উঠল অমিত।

‘এখন কী হবে, এখন কী হবে!’ ভদ্রমহিলা পাগলের মতো মাথা নাড়তে লাগলেন। আর এক নাগাড়ে কেঁদে চললেন। কী বলবে বুঝতে পারছিল না অমিত। এখন তার কী করা উচিত! ভদ্রমহিলা কান্না জড়ানো গলায় বলে চলেছেন, ‘আমার জন্যে মেয়েটা বিয়ে হতে না হতেই বিধবা হয়ে গেল! আমিই দায়ী, ও ভগবান।’

অমিত জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনাকে কে ফোন করেছিলেন?’

‘জামাইবাবু। ওরা গোপালপুরে রওনা হয়ে গিয়েছে।’

‘কী হয়েছিল কিছু শুনলেন?’

‘সাঁতার কাটতে গিয়ে স্রোতের টানে জামাই ভেসে গিয়েছে।’ কথার মধ্যেই ফোন বেজে উঠল। কান্না গিলতে গিলতে মাসিমা ফোন তুললেন। ‘হ্যালো! দিদি একি হল রে!’ কিছুক্ষণ কান্না চলল। তারপর বললেন, ‘তুই, তুই জামাইবাবুর সঙ্গে গেলি না কেন? মেয়েটা ওখানে একা এই অবস্থায় কী করছে ভগবান জানেন। হ্যাঁ, ক’টায় ট্রেন, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই, আমিও যাব।’ ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন মহিলা। তারপর অমিতের দিকে তাকিয়ে যেন তার সম্বিত ফিরল, অমিত, তুমি কি কখনও গোপালপুর অন সি-তে গিয়েছ?’

‘না মাসিমা। কেন?’

‘দিদির বুকে ব্যথা হচ্ছে খবরটা শোনার পর, তাই জামাইবাবু ওকে গাড়িতে নিয়ে যাননি। কিন্তু মেয়েটা একা আছে বলে আমাদের কারও যাওয়া উচিত। তুমি আমাদের একটা উপকার করবে।’

‘নিশ্চয়ই, বলুন কী করতে হবে!’

‘আমি টাকা দিচ্ছি। শুনলাম রাত ন’টার ট্রেন। যেমন করেই হোক ট্রেনের টিকিট কিনে আনবে?’

‘নিশ্চয়ই।’

ভদ্রমহিলা উঠে আলমারি খুলে টাকা বের করে ফিরে এসে কিন্তু কিন্তু করে বললেন, ‘তোমায় একটা কথা বলব?’

‘বলুন।’

‘তোমার তো রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে, এখন পড়াশুনার চাপ নেই, তুমি আমার সঙ্গে যাবে? আমি কখনও একা ট্রেনে কোথাও যাইনি। তুমি সঙ্গে থাকলে ভরসা পাই।’ ভদ্রমহিলা আবেদন করলেন।

সঙ্গে যাব বলতে যাচ্ছিল অমিত। এখানে এসে আকস্মিকভাবে মেয়েটার বিধবা হওয়ার খবর পেয়ে সে কী করবে বুঝতে পারছিল না। মাসিমার সঙ্গে গেলে নিশ্চয়ই একটা বড় উপকার করা হবে। কিন্তু হ্যাঁ বলতে যাওয়ার সময় তার মনে পড়ে গেল কাল সকালে তাকে বর্ধমান যেতে হবে। কাল সকাল দশটায় চাকরিতে জয়েন করার নির্দেশ এসেছে। সে যদি গোপালপুরে মাসিমার সঙ্গে যায় তাহলে ফিরে এসে চাকরিটা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। না পেলে কী জবাব দেবে সে বাবাকে? নিজের ভবিষ্যৎ আবার অস্পষ্ট হয়ে যাবে! কিন্তু কিন্তু করে সে কথাটা বলল মাসিমাকে। তিনি বড় চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘এই হল প্রকৃতির নিয়ম। এক পাড় ভাঙে তো অন্য পাড় গড়ে। ঠিক আছে, আমি এক কাজ করি। দু’সেকেন্ড ভাবলেন মহিলা, ‘আমি বরং দিদির বাড়িতে যাই। দিদি এখন একা আছে, খুব ভেঙে পড়েছে, আমার ওর সঙ্গেই থাকা উচিত। হুটহাট করে একা বেরিয়ে পড়ে যদি বিপদে পড়ি তাহলে এই অবস্থায় সবাই দুর্ভোগে পড়বে।’ চোখের জল মুছলেন মাসিমণি, ‘যাও বাবা, সাবধানে যাও।’ আঁচলে মুখ চাপা দিলেন তিনি। কথা খুঁজে না পেয়ে মাথা নীচু করে বেরিয়ে এল অমিত।

বাড়ির বাইরে এসে তার মন খুব খারাপ লাগছিল। মৃণালের বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ওর বর মারা গেল। সাঁতার যারা জানে তারাও সমুদ্রে সাঁতার কাটতে চায় না। নতুন বউ-এর সামনে কৃতিত্ব না দেখালেই কি চলছিল না লোকটার? অমিতের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এক ছুটে সমুদ্রের ধারে চলে গিয়ে মৃণালকে বলে, ‘ভেঙে পড়ো না, শক্ত হও। জীবন তো এখানেই শেষ নয়, জীবন অগাধ।’

কিন্তু এই ইচ্ছে পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তাকে কাল সকালে চাকরির জন্যে কলেজে পৌঁছতেই হবে? না গেলে বাবাকে কী কৈফিয়ত দেবে সে? একদিন সে বাসস্টপে যে মেয়েটির সঙ্গে মাত্র একবার কথা বলার চেষ্টা করেছিল কোনও একদিন তার স্বামী সমুদ্রে ডুবে গিয়েছে শুনে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রে চলে গিয়েছিল। শুনে বাবা কী বলবে? হয়তো সারাজীবনে আর মুখ দেখবে না। কিন্তু তাকে দেখলে কি মৃণাল কান্না মুছে তাকাত?

কিন্তু এমন হতেই পারে, সে পৌঁছনোর আগেই মৃণালের আত্মীয়স্বজন পৌঁছে গেছে এবং তাদের ভিড় সরিয়ে সে মৃণালের কাছে পৌঁছতে পারবে না। সেক্ষেত্রে এই যাওয়াই বিফলে যাবে। তবু মেয়েটার জন্যে অমিতের খুব মন খারাপ লাগছিল। বাঙালি মেয়ে বিয়ের ক’দিনের মধ্যেই যদি বিধবা হয়ে যায় তাহলে তার ভাগ্য কি সুখের হয়?

.

বর্ধমান থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরের কলেজে পৌঁছে প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করতেই তিনি বললেন, ‘আসুন ভাই। বসুন। এর আগে কখনও ছাত্র পড়িয়েছেন? স্কুলে বা প্রাইভেটে?’

মাথা নেড়ে সত্যি কথা বলল অমিত, ‘না।’

হেসে ফেললেন ভদ্রলোক, ‘একরম প্রশ্ন শুনলে জয়েন করতে এসে ক্যান্ডিডেট অনেক বড় বড় কথা বলে। আপনি সেই পথে হাঁটেননি শুনে খুশি হলাম। আপনি কি বর্ধমান শহর থেকে রোজ যাতায়াত করবেন?’

‘এখানে থাকার ব্যবস্থা না থাকলে তাই করব।’ অমিত বলল।

‘ব্যবস্থা আছে। স্কুলের কাছেই এক ভদ্রলোক তাঁর বাড়িতে পেয়িং গেস্ট রাখেন। আগের মাস্টারমশাইও ওখানে থাকতেন। খুব রিজনেবল চার্জ করেন।’

‘তাহলে তো খুব ভালো, হয়ে গেল! আমাকে কবে জয়েন করতে হবে?’

‘আগামী সোমবারে অসুবিধে হবে?’

‘একদম নয়।’

প্রিন্সিপ্যালের কাছ থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা করে কথা বলে কলেজে ফিরে চাকরির যাবতীয় কাগজপত্রে সই করল সে।

Chapter - 6

কলেজের চাকরিতে যোগ দেওয়ার খবর ফোন করে বাবাকে জানাল অমিত। বাবা এখন অফিসে। শুনে বললেন, ‘খবরটা চিঠি লিখে মাকে জানিও।’

কলকাতা ফিরে এল সে বিকেল বিকেল। শিয়ালদা স্টেশনে পা দিয়েই তার মনে হল এই শহরের মানুষের কাছে সে বাইরের লোক। এখানে থাকার কোনও প্রয়োজন তার নেই, কেউ তার জন্যে অপেক্ষা করে নেই। সে ঠিক করল, রবিবার দুপুরেই সে হোস্টেল ছেড়ে স্টেশন গিয়ে বর্ধমানের ট্রেন ধরবে।

শনিবার দুপুরে হোস্টেল ভর্তি থাকে। যে বন্ধুর নামে সে রুম শেয়ার করছে তার কাছে একজন গেস্ট আসায় সে বাইরে বেরিয়ে এল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে তার মনে হল অ্যাদ্দিন নিশ্চয়ই মৃণালকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন ওর আত্মীয়রা। মৃণাল কি এখন বিধাবাদের মতো জীবন যাপন করছে। পোশাকও সেইরকম? এখন কি আর আগের মতো মেয়েরা বৈধব্য পালন করে?

অমিতের খুব ইচ্ছে করছিল মৃণালের সঙ্গে দেখা করতে! মাসিমণির কথা শুনে এই অধ্যাপক ছেলেটির ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার পরে সে স্থির করেছিল বানিয়ে বানিয়ে এমন মিথ্যে বলে যাতে বিয়ে ভেঙে যায়। কিন্তু বলার সময় তার কী যে হল, সত্যি কথা না বলে পারল না।

কিন্তু মৃণালের বাড়িতে গেলেই যে ওর দেখা পাবেই তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। মাসিমণিকেও বলা যাবে না সে মৃণালের সঙ্গে দেখা করতে চায়। কেন চায় তা সে বোঝাতে পারবে না। কী করবে বুঝতে পারছিল না অমিত।

তবু বাস ধরে সে সোজা চলে গেল মৃণালের মাসিমার বাড়িতে। দরজা খুলল সেই কাজের মেয়েটি। তাকে দেখে মাথা নেড়ে বলল, ‘মা তো বাড়িতে নেই। উনি ওঁর দিদির বাড়িতে গিয়েছেন। আপনার কাছে কি ওঁর কোনও ফোন নম্বর আছে? না থাকলে দিতে পারি, কথা বলে নিতে পারেন আপনি।’

মাথা নাড়ল অমিত। ‘ওঁর নম্বর আমার কাছে আছে। আচ্ছা, মৃণালকে নিয়ে ওঁরা নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন, তুমি কিছু জানো?’

‘হ্যাঁ, ফিরে এসেছেন।’

‘মৃণাল কি শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছে না বাবা-মায়ের কাছে আছে?’

‘দিদি বাপের বাড়িতেই আছে।’

‘ঠিক আছে।’ বলে রাস্তায় বেরিয়ে এল অমিত।

শেষপর্যন্ত ফোন করবে বলে ঠিক করল সে। শোকের বাড়িতে গেলে কথা খুঁজে পাওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। খানিকটা হাঁটার পর একটা দোকানের গায়ে এসটিডি-লোক্যাল কলের বোর্ড ঝুলতে দেখে সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার মধ্যে একটা কাগজে মাসিমণির মোবাইল নাম্বার লেখা ছিল। সেই নাম্বার ডায়াল করল অমিত।

কয়েকবার রিং হতেই ভদ্রমহিলা কথা বললেন, ‘হ্যালো।’

‘আমি অমিত বলছি। আপনার বাড়িতে গিয়ে শুনলাম আপনি এই বাড়িতে এসেছেন।’ অমিত খুব শান্ত গলায় কথাগুলো বলল।

‘ও, তুমি কলকাতা থেকে তো চাকরি করতে চলে যাচ্ছ, তাই না?’

একটু অবাক হল অমিত, ভদ্রমহিলা এরমধ্যেই কথাগুলো ভুলে গেলেন! সে বলল, ‘হ্যাঁ।’

ঠিক আছে। যাও, ভালো থেকো বাবা, জীবনে সফল হও। রাখছি।’ ফোন রেখে দিলেন ভদ্রমহিলা। অমিত খুব অবাক হল। এইরকম নির্লিপ্ত গলায় উনি কখনও কথা বলেননি।

.

ছাত্র পড়ানোর চাকরিতে মজে গেলে খানিকটা নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন অনেক তরুণ শিক্ষক। অমিতের অবস্থা তাই হল। বিভাগীয় প্রধান তাকে বলেছেন আধুনিক বাংলা সাহিত্য পড়াতে। বাংলা বিভাগের বেশিরভাগ শিক্ষকই বয়স্ক, পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে বয়স। তাঁরা চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী থেকে বঙ্কিমচন্দ্র পড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্য শুরু হয় কুমুদরঞ্জন মল্লিক এবং তৎকালীন লেখকদের ছুঁয়ে রবীন্দ্রনাথ হয়ে শরৎচন্দ্রের নির্বাচিত কিছু রচনায়। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস প্রবন্ধ ছোটগল্প অনার্স ক্লাসে পড়ানো হয়। পাশ ক্লাসে তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা নির্বাচন করা হয়েছে।

তা যাই হোক, রবীন্দ্রনাথ পড়াতে গিয়ে বেশিরভাগ দিনই সিলেবাসের বাইরে চলে যায় অমিত। তার বাচনভঙ্গী, ব্যবহার ছাত্রদের মুগ্ধ করেছে। একজন প্রবীণ অধ্যাপক প্রফেসরদের বসার ঘরে তার পাশে বসে বলেছিলেন, ‘বুঝলে ভাই, এটা হল ম্যারাথন রেসের মতন। আগেই যদি জোরে দৌড়াও তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই হাঁপিয়ে পড়বে। তখন ক্লাস করবে চাকরি বাঁচাতে, ছাত্ররা তোমার কাছ থেকে অতিরিক্ত কিছু পাবে না।’

‘তাহলে কী করা উচিত?’

‘যা জানো তার সবটাই বিলোতে যেও না। ধীরে ধীরে এগোও। মনে রেখো তোমাকে ষাট বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে হবে। প্রতিবছর নতুন ছাত্রদের মুখোমুখি হবে। ওদের যখন শেখাবে যদি দ্যাখো তুমি নিজেও কিছু শিখছ, পুরোনো ধারণাগুলো বদল হচ্ছে তখন তুমিই লাভবান হবে।’ খুব আন্তরিক গলায় বলেছিলেন ভদ্রলোক।

টিভিতে ম্যারাথন দৌড় দেখেছিল সে; তিরিশ পঁচিশজন প্রতিদ্বন্দ্বী শুরুতে প্রায় একসঙ্গে দৌড় শুরু করল। ছাব্বিশ মাইল দৌড়তে হবে তাদের। সেই দৌড়ের সময় অনেকেই থেমে যায়, অনেকেই পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু দূরত্ব যত কমে আসে তত পরিবর্তনটা চোখে পড়ে? শরীরে সঞ্চয় করা শক্তি তখন উজাড় করে দেন প্রতিযোগীরা। বোঝাই যায় না তাঁরা ছাব্বিশ মাইল দৌড়ে এসেছেন। অমিতের মনে হল শিক্ষকতা ওই ধরনের এক দৌড়। সেই দৌড়ে সে সবে যোগ দিয়েছে।

আর এই সময়ে সে যেন কলকাতাকে ভুলে গেল। ছাত্রদের মনে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে বদ্ধপরিকর হল সে। তিন বছর পরে সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপকের চিঠি পেল। মাত্র দুটো কথা লেখা ছিল তাতে, ‘দেখা করো?’

দু’দিনের ছুটি পেয়ে শিয়ালদায় ট্রেন থেকে নেমে একটু ফাঁপড়ে পড়ল সে, কোথায় উঠবে? হোস্টেলে যেতে হলে সেই বন্ধুর খোঁজ নিতে হবে যা এখন পছন্দ হল না। মির্জাপুর স্ট্রিটের একটি সাধারণ হোটেলের উঠে বেশ স্বস্তি পেল অমিত। বহুদিন হোটেলে বা পেয়িং গেস্ট থাকার অভ্যেস কাজে লাগল। তক্তাপোষের ওপর পাতা পাতলা তোষকের বিছানায় টানটান হয়ে সে জানলার বাইরের আকাশ দেখল। কলকাতা আর বর্ধমানের আকাশের মধ্যে তেমন কোনও ফারাক নেই। ভেসে আসা শব্দের পার্থক্য আছে। দিনের বেলায় কলকাতা শান্ত হতে জানে না।

তিনটে নাগাদ হোটেল থেকে বেরিয়ে বাস ধরে সে ভবানীপুরে চলে এল। অধ্যাপকই দরজা খুললেন, ও তুমি, এসো। বসো। কবে এলে?’

‘আজই। আপনি কেমন আছেন?’ চেয়ারে বসে জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘আছি।’ উল্টোদিকের চেয়ারে বসে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে বললেন, ‘মনে হচ্ছে, তোমরা শরীরের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। একটা কথা অল্প বয়স থেকে শুনে আসছি, যারা বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করে বা পড়ায় তারা শরীরচর্চা করে না। তোমার ক্ষেত্রেও কি কথাটা প্রযোজ্য?’

অমিত হাসল, মুখ নামাল, কিছু বলল না।

‘মফস্বল শহরে বাংলা পড়াতে কেমন লাগছে?’

‘প্রথম প্রথম অসুবিধে হচ্ছিল, এখন মানিয়ে নিয়েছি।’

‘শোনো, তোমার কি গবেষণা করার বাসনা রয়েছে?’

ব্যাপারটা বেশ কিছুদিন মনে আসছে এবং যাচ্ছে। সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

‘বাঃ বিষয়? অধ্যাপক প্রশ্ন করলেন।

‘রবীন্দ্রনাথের না বলা বাণী।’

চোখ বড় হয়ে গেল অধ্যাপকের। তারপর বললেন, ‘এমন বিষয় তোমার মনে এল কী করে? আমি খুব অবাক হচ্ছি অমিত।’

‘রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই লিখে গিয়েছেন—!’

‘হু! এরজন্যে তো কঠিন পরিশ্রম করতে হবে তোমাকে? অনেক বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বর্ধমান শহর থেকে অত দূরের ছোট শহরে বসে সেই সাহায্য কী করে পাবে! আচ্ছা, এটি ছাড়া অন্য বিষয় ভেবেছ?’

‘না। তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা করতে যাওয়া ছাড়া আমাদের তো অন্য পথ নেই।’

হাসলেন অধ্যাপক। তারপর বললেন, ‘দ্যাখো, ভেবে দ্যাখো। তবে এই গবেষণা তো কল্পনার ডানায় ভেসে করা সম্ভব নয়। তথ্য সংগ্রহ করতে তোমাকে হয় কলকাতা নয় শান্তিনিকেতনে এসে থাকতে হবে। আসতে চাও?’

‘ছাত্র পড়ানো ছাড়া অন্য কোনও জীবিকার কথা তো আমার জানা নেই।’

‘বছর তিনেক স্কুলে পড়াও। শান্তিনিকেতনের পনেরো মিনিটের মধ্যে একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পার্ট টাইম বাংলার টিচার প্রয়োজন। পার্ট টাইম কিন্তু ওই চাকরি বছর দুই বা তার বেশি থাকতে পারে। এখনই তোমাকে কিছু বলতে হবে না। ফিরে গিয়ে ভাবনা চিন্তা করে আমাকে জানিও। তুমি কী খাবে? চা না কফি?’

অধ্যাপক জিজ্ঞাসা করা মাত্র উঠে দাঁড়াল অমিত। তারপর কাঁধের ঝোলা থেকে ভাঁজ করা কয়েকটা ফুলস্কেপ কাগজ বের করে সামনের টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘বাংলা পড়েছি বলে কুঁজোর চিৎ হয়ে শোওয়ার রোগটা ধরেছে। যদি দয়া করে চোখ বোলান স্যার। এটি আমার আট নম্বর গল্প। আগেরগুলো ভয়ে ভয়ে কাউকে দিইনি।’

.

আশুতোষ কলেজের কাছাকাছি একটি পাবলিক টেলিফোন বুথ দেখে ইচ্ছেটা প্রবল হল। পকেট থেকে পয়সা বের করে সে মাসিমণির ফোনের নাম্বার ডায়াল করল। এই নাম্বারে শেষবার ফোন করেছিল কলকাতা ছাড়ার আগে।

পুরুষকণ্ঠে হ্যালো কানে আসতেই অমিত অনুমান করল, ফোন ধরেছেন মেসোমশাই। সে বলল, ‘আমি অমিত বলছি মেসোমশাই!’

‘অমিত!’ ভদ্রলোক বুঝতে একটু সময় নিলেন, ‘ওহো, তুমি অনেক দিন পরে ফোন করলে! ব্যাপার কী?’

‘আমি বর্ধমান জেলার একটা কলেজে এখন পড়াচ্ছি। অনেককাল বাদে আজ কলকাতায় এলাম। আপনারা সবাই কেমন আছেন?’ অমিত জিজ্ঞাসা করল।

‘আমরা? ওহো, তুমি তো জানো মৃণালের কথা। তাই তো?’

‘হ্যাঁ জানি।’

‘তারপর আর কীরকম থাকতে পারি অনুমান করতেই পারো।’

‘মাসিমা বাড়িতে আছেন?’

‘হ্যাঁ। পাশের ঘরে মৃণালের সঙ্গে গল্প করছে। দাঁড়াও।’

মিনিট খানেকের মধ্যে মাসিমার গলা শুনতে পেল অমিত, ‘কী খবর? এতদিন পরে মাসিমাকে মনে পড়ল। এখন কোথায়?’

‘আজই কলকাতায় এসেছি।’

‘কেমন আছ তুমি?’

‘আছি। মফস্বল শহরের কলেজে ছাত্র পড়াই। চলে যাচ্ছে দিন।’

‘শুধু ছাত্র? কলেজে ছাত্রীরা পড়ে না?’

‘না। ওটা ছেলেদের কলেজ।’

‘সেকি! এখনও শুধুমাত্র মেয়েদের স্কুল-কলেজ আছে বলে জানি, কেবল মাত্র ছেলেদের জন্যে কলেজ এখনও এদেশে আছে? যাক গে, ক’দিন আছ?’

‘কালই চলে যাব।’

‘তাহলে কি তোমার দেখা এবার পাচ্ছি না?’

‘দেখি, আমার খুব ইচ্ছে আছে দেখা করে যাওয়ার।’

‘দ্যখো, এলে তো বেশ ভালো লাগবে।’ ফোন রেখে দিলেন। আজ যেন মাসিমা তার সঙ্গে অন্যরকম গলায় কথা বললেন, আগের সেই উত্তাপের স্পর্শ পাওয়া যাচ্ছিল না তাঁর আজকের কথায়। সে ওঁর সঙ্গে সমুদ্রে যেতে পারেনি বলে কি অসন্তুষ্ট হয়েছেন? তা কেন হবেন? সেদিন তার যে সমস্যা ছিল তা তো তিনি বুঝেছিলেন।

তাছাড়া আজ ভদ্রমহিলার কথা বলার ভঙ্গীতে শোকে ভেঙে পড়ার কোনও ইঙ্গিত সে পায়নি; হয়তো চলে যাওয়া সময় সেই শোকটাকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেষ্টা করছেন উনি। কিন্তু মাসিমা একবারও মৃণালের কথা বললেন না। অথচ তিনি এতক্ষণ পাশের ঘরে মৃণালের সঙ্গে গল্প করছিলেন, মেসোমশাই তো তাই বললেন। অমিত ঠিক করল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে আজ মাসিমার বাড়িতে যাবে না।

.

অধ্যাপকের উপদেশ মতো আবেদনপত্রের সঙ্গে নিজের বায়োডাটা পাঠিয়েছিল অমিত। তার মাসখানেক পরে সে ইন্টারভিউ-এর চিঠি পেয়ে গেল।

কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে স্কুলের শিক্ষকতার আবেদন করার সময়ে মনে কিন্তু কিন্তু ভাব এসেছিল। কিন্তু সেটা দূর হয়ে গেল এক ছাত্রের কথায়। ছাত্রটি এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি পত্রিকাটি পেয়েছেন স্যার?’

‘কোন পত্রিকা?

‘সাহিত্য!’

‘না। কী আছে তাতে?’

ছেলেটি তার ব্যাগ থেকে পত্রিকাটি বের করল। ছেলেটি বলল, ‘বাবা আজ বর্ধমান থেকে কিনে এনেছেন?’

বেশ অবাক হয়ে পত্রিকাটি হতে নিল অমিত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলার বিখ্যাত পাক্ষিক পত্রিকাটি সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিয়মিত পড়ত। বেশ অবাক হয়ে প্রথম দুটি পাতার পর সূচিপত্রের ওপর চোখ বোলাতে গিয়ে তার শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এল। তার গল্পটি যা সে অধ্যাপককে পড়তে দিয়ে এসেছিল তা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

দ্রুত সূচিপত্রে পাতার নম্বর দেখে নিজের গল্পের ইলাস্ট্রেশন দেখল সে। তার নাম বেশ কায়দা করে লিখেছেন শিল্পী। অমিতের আঙুল কাঁপছিল। খুশিতে চোখ বুজে এল তার। অধ্যাপকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে আসছিল মন। সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি বলল, ‘এই গল্প আপনি লিখেছেন, তাই না স্যার?’

নিঃশব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল অমিত। তারপর বলল, ‘এই পত্রিকা আজ আমি রেখে দিতে পারি? কাল ফেরত নিয়ে যেও।’

‘না না, ফেরত দিতে হবে না। গল্প যদি আপনার লেখা হয় তাহলে বাবা বলেছেন আর একটা কপি বর্ধমান থেকে আনিয়ে নেবেন।’

‘বাঃ, খুব ভালো হল। ওঁকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ দিও।’ খুশি হয়ে বলল অমিত।

ছেলেটি চলে গেলে নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখল অমিত। তারপর গল্পটি পড়তে লাগল। লাইনগুলো কীরকম অচেনা মনে হচ্ছিল। মাঝে মাঝে সে চোখ ছোট করছিল। কোন কোন শব্দ না লিখলেই ভালো হত। কোনও কোনও লাইন একটু অতিরিক্ত লেখা হয়ে গিয়েছে।

গল্পটি পড়া শেষ হলে চুপচাপ বসে থাকল অমিত। এই পত্রিকা কি মৃণালের হাতে পৌঁছাবে? পৌঁছলেও মৃণাল কি গল্পটি পড়বে? যদি পড়ে তাহলে কি সে বুঝতে পারবে গল্পের নায়িকার ছায়ায় মাখামাখি হয়ে রয়েছে সে। বিখ্যাত সেই লাইনটা মনে এল, তুমি তো জানিলে না, না জানিলে—!

তখনই অধ্যাপককে চিঠি লিখে তার কৃতজ্ঞতা জানাল সে। যার উত্তরে অধ্যাপক লিখলেন, তীর ছেড়ে যাত্রা করার সময় লগি দিয়ে জোরে জোরে ঠেলা দিতে হয়। নৌকো চলতে শুরু করার পর সেই লগির তেমন কোনও ভূমিকা থাকে না। নৌকো কেমন চলবে তা মাঝির ওপর নির্ভর করে।’

.

বড় কাগজে একবার লেখা ছাপা হলে সামনের বেশ কয়েকটি বন্ধ দরজা একটু একটু করে খুলে যায়। অমিত বর্ধমানের একটি ছোট শহর থেকে গল্প পাঠানোর সময় ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পটির উল্লেখ করেছিল। নিজের প্রসঙ্গে সে কেন বলবে, তার গল্পই তো কথা বলবে, এই ভাবনায় আটকে থাকতে পারেনি সে। ফলে তার দ্বিতীয় গল্পটিও একটি সিনেমার সঙ্গে গল্প উপন্যাস মেশানো কাগজে শুধু ছাপাই হল না, তারা একটি ছোট উপন্যাস পাঠাতে বলল। নিজের লেখার জন্যে চারশো টাকা সম্মানমূল্য পাবে তা কোনওদিন কল্পনা করেনি সে।

কলকাতার স্কুলে চাকরির ইন্টারভিউ-এর চিঠি আসার পর তার মনে হল এই চাকরিটা তার হয়ে যাবেই। সে শুধু ভালো নম্বর পেয়ে এম.এ পাশ করেনি, তরুণ গল্পকার হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। ইন্টারভিউ-এর চিঠি পেয়ে সে আবার সেই আগের হোটেলে উঠল। বিকেলে দেখা করতে গেল অধ্যাপকের সঙ্গে। ভেবেছিল, এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে যাবে কিন্তু শেষ মুহূর্তে মনে হল, মিষ্টির বদলে স্যারকে বই দেওয়াই শোভন হবে। কাল সোমবার, কলেজ স্ট্রিট থেকে বই কিনে স্যারকে দিয়ে আসবে। কিন্তু স্যারের বাড়িতে গিয়ে খুব হতাশ হল সে। জরুরি প্রয়োজনে স্যার কলকাতার বাইরে গিয়েছেন। ফিরবেন সামনের শুক্রবার। অর্থাৎ স্যারের সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনও সুযোগ এবার নেই। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত আত্মবিশ্বাস যেন দুলতে শুরু করল। স্যার কলকাতায় নেই অথচ কাল তার ইন্টারভিউ। এর ব্যবস্থা স্যারই করে দিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতি কি অন্যরকম ইঙ্গিত দিচ্ছে। হয়তো স্যার জানতে পেরেছেন, এই চাকরির জন্যে অন্য প্রার্থী ঠিক হয়ে গেছে, তাই তিনি অমিতের মুখোমুখি হতে চান না।

নানান ভাবনা মাথায় নিয়ে সে হোটেলে ফিরে এসেছিল। রাতের খাওয়ার পরেও ঘুম আসছিল না। আর তখনই তার মনে পড়ল, কলকাতায় এসে নিজের চাকরির চিন্তায় এতটাই আটকে ছিল যে মৃণালের কথা মনে আসেনি! মৃণাল কি আবার কলেজে যাচ্ছে? তাহলে তো ওর এবার বি.এ পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কেমন আছে সে? মাসিমা কেমন আছেন?

ঘড়ি দেখল অমিত। রাত দশটা। এইসময় কারও বাড়িতে ফোন করা অনুচিত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ফোন করলে মানুষ বিরক্ত হবেই। তবু, কিন্তু কিন্তু করে সে হোটেলে ম্যানেজারের ঘরে চলে এসে বলল, ‘ফোন করতে চাই।’

হাত বাড়িয়ে যন্ত্রটা দেখিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। রিসিভার তুলে একটু আগে দেখে আসা নাম্বার ডায়াল করল অমিত। রিং হচ্ছে। কে তুলবে ওদিকের রিসিভার? এক দুই করে দশবার রিং হওয়ার পরেও যখন কেউ ওদিকের রিসিভার তুলল না তখন লাইন কেটে দিয়ে সে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ রেসপন্স করেনি।’ ভদ্রলোক হেসে মাথা নাড়লেন, যার অর্থ, পয়সা লাগবে না।

ঘরে ফিরে এসে শোওয়ার পরেও ঘুম আসছিল না। মাসিমা বা মেসোমশাই কি বাড়িতে নেই? তাই হবে। মৃণালের যদি নিজস্ব ফোন থাকত তাহলে সে সাহস করে জিজ্ঞাসা করত, ‘কেমন আছ?’ বুক থেকে চাপ যেন ঈষৎ কমল। মনে মনে কত কথাই না বলা যায়!

Chapter - 7

ঠিক দশটায় শহরতলীর স্কুলে পৌঁছে নিজের উপস্থিতির কথা অফিসে জানিয়ে দিল অমিত। যে ঘরে তাকে বসতে বলা হল সেখানে আরও দুজন প্রার্থী বসে আছেন। অমিত বুঝতে পারল এরাও চাকরি প্রার্থী। গম্ভীর মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না, বেশ টেনশনে আছেন দুজনে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর অমিত একটু নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি কলকাতার বাইরে থেকে এসেছি, আপনারা কি কলকাতায় থাকেন?’

দুজনে একসঙ্গে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল, মুখ খুলল না।

‘আমার কোনও ব্যাকিং নেই। শুনেছি কলকাতায় ব্যাকিং ছাড়া চাকরি পাওয়া যায় না। আপনাদের কেউ কি ব্যাক করছেন?’

দুজনে অমিতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আগের মতো গম্ভীর হয়ে বসে রইল।

এই সময় একজন বেয়ারা গোছের লোক এসে ইন্টারভিউ লেটার চেয়ে নিয়ে গেল তিনজনের কাছ থেকে। মিনিট দশেক পরে লোকটি ফিরে এসে গলা তুলে বলল, ‘রবীন্দ্রনাথ কর। আপনি আসুন।’

ওপাশের ভদ্রলোক তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পরপর তিনবার দুহাত জড়ো করে কপালে ঠেকাতে ঠেকাতে বিড়বিড় করল। তারপর পাশে রাখা ফাইল তুলে দ্রুত লোকটির পেছনে হাঁটতে থাকল।

ওরা চোখের বাইরে চলে গেলে দ্বিতীয় লোকটি অমিতের দিকে তাকাল, ‘আমার চেয়ে পার্সেন্টেজ অনেক কম। কিন্তু শুনলাম চেয়ারম্যানের নাকি দূর সম্পর্কের রিলেটিভ। সবই কপাল।’

অমিত বলল, ‘তাহলে আর এখানে বসে আছেন কেন?’

‘চলে যাওয়া আর বসে থাকা যখন সমান তখন বসেই থাকি।’ বলেই লোকটা আবার আগের মতো বন্ধু হয়ে গেল।

পাঁচ মিনিট পরে বেয়ারা ঘরে এসে বলল, ‘বিক্রমজিৎ দত্ত!’

লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাই পূর্বদিক কোনটা?’

বেয়ারা একটা দেওয়াল দেখিয়ে দিতেই লোকটা সেদিকে ঘুরে হাত জোড় করে কী একটা বিড়বিড় করে বলে বারংবার কপালে হাত ছুঁইয়ে নিজের ব্যাগ তুলে নিয়ে বেয়ারার সঙ্গে এগিয়ে গেল।

অমিতের ডাক পড়ল দশ মিনিট পরে। তাকে হাঁটতে দেখে বেয়ারা হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি প্রণাম করবেন না?’

‘চাকরি পেলে করব।’ হেসে বলল অমিত।

পাঁচজন প্রবীণ বসে আছেন টেবিলের ওপাশে। অমিত তাঁদের নমস্কার করতে মাঝের ভদ্রলোক বললেন, ‘বসুন।’

অমিত বসামাত্র একজন বললেন, ‘অমিতবাবু, আপনি তো বর্ধমানের একটা কলেজে অধ্যাপনা করেন। সেটা না করে স্কুলের টেম্পোরারি শিক্ষকতার চাকরি করতে চাইছেন কেন?’

অমিত বলল, ‘স্কুলের ছাত্রদের পড়ানোর সময়ের বাইরে যে সময়টা আমি পাব তা কলকাতায় থাকলে গবেষণার কাজ করতে পারব! তাই!’

পঞ্চমজন বললেন, ‘অর্থাৎ আপনি স্কুলের শিক্ষকতা করতে চাইছেন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে। ছাত্রদের সামনে একজন আদর্শ শিক্ষকের ছবি আপনি রাখতে চাইছেন না।’

‘কথাটা ঠিক নয় স্যার। আমাকে সুযোগ দিলে শিক্ষক হিসেবে প্রতিটি ক্লাসে নিজেকে উজাড় করে দিতে আমি প্রস্তুত। সেই কাজে আমার কোনও গাফিলতি বিন্দুমাত্র থাকবে না।’ অমিত বলল।

‘এর অর্থ আপনি নিজেকে চব্বিশ ঘণ্টাই শিক্ষক বলে ভাববেন না।’

‘স্যার, সেটা কি সম্ভব? যখন কোনও শিক্ষক তার মাইনের চেক হাতে নেন তখন তিনি সেই চেক ক্যাশ করার কথাই ভাবেন, শিক্ষকতা করার চিন্তা তো মাথায় আসতে পারে না।’ নম্র গলায় বলল অমিত।

‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন এই চাকরি স্থায়ী নয়, অস্থায়ী বলাও ঠিক হবে না। একজন ছুটিতে গিয়েছেন কয়েক মাসের জন্যে। এসব জানার পরে আপনি কলেজের চাকরি ছেড়ে আসার পেছনে যে তথ্য দিলেন তা কি বিশ্বাসযোগ্য?’ মাঝখানে যিনি বসেছিলেন তিনি গম্ভীর প্রশ্ন করলেন।

‘যা সত্যি আমি তাই বলেছি।’

পাঁচজনের একজন যিনি চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন, এবার মুখ খুললেন, ‘সাহিত্য পত্রিকায় লেখার আগে আপনি কোথায় লিখেছেন? কোনও লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে কি আপনি যুক্ত?’

‘আজ্ঞে না। আমার প্রথম লেখা সাহিত্য পত্রিকাতেই প্রকাশিত ওই গল্পটি।’ বিনীত গলায় বলল অমিত।

‘আপনি এখন বর্ধমানে আছেন?’ মধ্যবর্তী জিজ্ঞাসা করলেন।

‘হ্যাঁ। বর্ধমান শহর থেকে দেড়ঘণ্টা দূরে।’

‘ঠিক আছে, আপনি এখন আসতে পারেন।

বাইরে বেরিয়ে এল অমিত। তারপর বাস ধরে চলে এল কলেজ স্ট্রিট। সোজা কফি হাউসে ঢুকে একটা খালি টেবিলে একা বসে রইল বিকেল পর্যন্ত। চাকরিটা যে হবে না তা টেবিলের ওপাশে যাঁরা বসেছিলেন তাদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে সে বুঝতে পেরেছিল। নিজেকে বোঝাল সে। যাঁরা কলকাতা থেকে অনেক দূরে থেকেও রিসার্চ করেন তাঁরা নিশ্চয়ই প্রচুর অসুবিধে সত্ত্বেও কাজটা করে থাকেন। তাহলে সেই অসুবিধের সঙ্গে লড়াই করে সে কেন পারবে না। হেস্টেলে ফিরে গিয়ে আচমকা মাথায় আসা একজন লড়াকু মানুষের লড়াই নিয়ে গল্প লিখল অমিত।

তিনদিন পরে অমিতকে অবাক করে স্কুল থেকে চিঠি এল। আপাতত ছয়মাসের জন্যে স্কুল তাকে বাংলার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করছে। আগামী সোমবারের মধ্যে তাকে চাকরিতে যোগ দিতে হবে। তখনই তাকে যাবতীয় তথ্য দেওয়া হবে।

.

নতুন চাকরিতে এসে সহকর্মী হিসেবে যাদের অমিত পেল তাঁদের অধিকাংশই মধ্যবয়সি। অমিত বুঝতে পারল সে একজন গল্প লেখক এই খবর সহকর্মীরা জানেন, এবং সেই কারণে তার সঙ্গে বেশ সমীহ করেই কথা বলছেন।

কলেজের ছাত্রদের পড়ানোর আর স্কুলের ওপরের ক্লাসের ছাত্রদের ক্লাস নেওয়া এক ব্যাপার নয়। ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝার জন্যে অমিত অধ্যাপকের বাড়িতে গেল। তাঁকে প্রণাম করতেই ভদ্রলোক বললেন, ‘কি খুশি তো?’

‘আপনি কলকাতায় না থাকায় আমি বেশ হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। ইন্টারভিউতে ওঁরা যে ভাবে প্রশ্ন করছিলেন তাতে মনে হয়েছিল আমাকে নাকচ করা হবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম, আপনার সাহায্য ছাড়া চাকরিটা পেতাম না।’ অমিত বলল।

‘ওসব কথা ছেড়ে দাও। ক্লাস আরম্ভ করেছ?’ প্রফেসর প্রশ্ন করলেন।

‘না। আগামীকাল শুরু হবে।’ অমিত বলল, ‘এই কয়েকমাস আমি কলেজের ছেলেদের আমার মতো করে পড়িয়েছি। স্কুলের ছাত্রদের ম্যাচিউরিটি কিছুটা কম, ওদের যখন পড়াব, তখন কি সরল কথায় বোঝাব?’

‘শোন, স্কুলের যেসব ছেলেকে পড়াবে তাদের সম্পর্কে আগাম কোনও ধারণা নিয়ে ক্লাসে যেও না। হয়তো দেখবে যে ছেলেটি ক্লাস টেনে পড়ে সে ইলেভেনে পড়া অনেক ছাত্রের চেয়ে বেশি ভাবতে পারে; তাই ক্লাসে গিয়ে প্রথম দশ মিনিট ওদের সঙ্গে আলাপ করার ছলে অ্যাসেস করে নেবে, ওদের বোধবুদ্ধি কি স্তরের সেই অ্যাসেনমেন্ট ঠিক হলে পড়াতে অসুবিধে হবে না তোমার।’ অধ্যাপক বললেন।

অধ্যাপকের স্ত্রী এসে এক প্লেট মিষ্টি দিয়ে গেলেন। বললেন, ‘তোমার স্যারের কাছে চাকরির খবর শুনেছি। কিন্তু এই মিষ্টি চাকরির জন্যে নয়।’

অমিত অবাক চোখে তাকাল। ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, ‘গল্পটি পড়ে এত ভালো লেগেছে তাই মিষ্টি খাওয়াচ্ছি। এরকম লেখা আরও লেখো।’

প্রফেসারকে অমিত জানাল, পত্রিকা থেকে তার কাছে একটি বড় লেখা চেয়েছে। সে যেহেতু সবে লেখা শুরু করেছে তাই ভেবে পাচ্ছে না কী নিয়ে লিখবে।

প্রফেসরের স্ত্রী ওপাশের চেয়ারে বসে ওদের কথা শুনছিলেন। এবার তিনি বললেন, ‘ওমা, এ আর কি কঠিন ব্যাপার! তুমি নিজেকে নিয়ে লেখো, নিজেকে নিয়ে, কিন্তু আত্মজীবনী নয়।’

প্রফেসর বললেন, ‘বাঃ, ভালো বলেছ তো।’

Chapter - 8

কলকাতায় এখনও সেই ধরনের মেস বাড়ির কয়েকটি অবশিষ্ট আছে যাদের নিয়ে গতশতকের মাঝামাঝি প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। অনেক গল্প বা উপন্যাসের নায়ক কলকাতায় এসে যে ধরনের মেসে ষাট বছর আগে থাকত, সেইরকম এক মেসের সন্ধান অমিত পেয়ে গেল আমহার্স্ট স্ট্রিটে। খাওয়া থাকার জন্যে যা দিতে হবে তা স্কুলের মাইনের এক চতুর্থাংশ। একটি ঘরে দুটি তক্তাপোষ। অমিত যে ঘরে জায়গা পেল সেখানে অন্য যে ভদ্রলোক থাকেন তিনি দীর্ঘকাল ধরে আছেন। রোগা, পঞ্চাশের ওপর বয়স, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে শুয়ে থাকে দিনভর। সন্ধের পর বেরিয়ে যান, ফেরেন ভোর বেলায়। অমিত ওই ঘরে এলেও তিনি একবার শুধু তাকালেন, কথা বললেন না।

.

মাসখানেক স্কুলে পড়ানোর পরে অমিতের মনে হচ্ছিল সে যেন যন্ত্রের মতো জীবন যাপন করছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়েই স্নান করতে চলে যেতে হয়। পৌনে ন’টায় খাওয়ার ঘরে গিয়ে বারোয়ারিভাবে রান্না করা ভাত ডাল আর মাছের ঝোল খেয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে বাস ধরে চলে যায় শিয়ালদা স্টেশনে। সেখান থেকে সাউথের ট্রেন ধরে শহরতলীতে পৌঁছে যায় দশটা বাজার খানিকটা আগেই। এগারোটায় ক্লাস শুরু হয়। তার আগের সময়টুকু সে টির্চাস রুমে বসে সেদিনের ক্লাসগুলোয় যে বিষয় পড়াবে তা ঝালিয়ে নেয়। সারাদিন ধরে ছেলেদের পড়াতে তার মন্দ লাগছে না। চারটের সময় স্কুল ছুটি হওয়া মাত্র ট্রেন ধরে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে উল্টোদিকের একটা দোকানে ঢুকে জলযোগ সেরে নেয়। ওই দোকানের সিঙ্গারা এই তল্লাটে বিখ্যাত।

মেসে ফিরে ঘরে ঢুকে দ্যাখে তার রুমমেট তখনও পাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে। সে যখন হাতমুখ ধুয়ে তার টেবিলে লিখতে বসে তখন ভদ্রলোক খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরে যান। অমিত কয়েকবার ভেবেছিল, ভদ্রলোকের সঙ্গে যেচে আলাপ করবে। কিন্তু তিনি তাঁর মুখটা এমন গম্ভীর করে রাখেন যে ইচ্ছেটা ওঁর দিকে তাকালেই মন থেকে উধাও হয়ে যায়।

গল্প লিখতে বসে প্রথম দু’দিন অনেকগুলো পাতা ছিঁড়ে ফেলেছিল অমিত। কোনওটায় দুটো লাইন, কোনওটায় অর্ধেকটা, প্রতিবারই মনে হচ্ছিল কিছুই দাঁড়াচ্ছে না। তারপর একসময় মনে হল, হঠাৎই আচমকা তার কলম থেকে দুটো গল্প বেরিয়ে এসেছিল। ওই গল্প দুটোতেই তার সব সাহিত্য প্রতিভা শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন করে আর কিছু তার লেখার নেই।

একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় তার মনে এল স্যারের কথা। স্যার বলেছিলেন, নিজেকে নিয়ে লেখো। এই যে কুচবিহার থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্যে ভয়ে ভয়ে কলকাতায় এসেছিল, দুই তিনজনের সঙ্গে কথাবার্তা হত বটে কিন্তু বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে হয়নি, সেই ছেলে বাংলা সাহিত্য গোগ্রাসে গিলতে গিলতে এসে পড়ার সময় রাস্তায় একটি মেয়েকে দেখে আচ্ছন্নের মতো এগিয়ে গিয়েছিল। কী কথা বলবে ভাবতে না পেরে শেক্সপীয়ারের লাইন বলতে গিয়ে থমকে গিয়েছিল, সেই ছেলেটাকে নিয়ে লিখলে কেমন হয়!

একটা ঘোরের মধ্যে যেন চলে এল অমিত।

মাত্র চারদিন। স্কুল ফেরত মেসে এসে লেখা নিয়ে বসে চারদিনেই লেখাটা শেষ হল। ইচ্ছে করেই সে পত্রিকার অফিসে লেখা পৌঁছতে গেল না। ডাকে পাঠাল।

সেই লেখা ছাপা হল পরের মাসেই। সঙ্গে এল সম্পাদকের চিঠি। তিনি অনুরোধ করেছেন, অমিত যেন অবিলম্বে তাঁর সঙ্গে দেখা করে। লেখালেখি নিয়ে তিনি কথা বলতে চান। অমিতও ঠিক করল আগামী শনিবার সে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। সেদিন তার দুটোর মধ্যেই ছুটি হয়ে যায়।

.

কিন্তু পত্রিকার অফিসে যাওয়ার আগেই অমিতের মেসের ঠিকানায় চিঠিটা ডাকে এল। খামটা এসেছিল তার নামেই, কেয়ার অফ সম্পাদক। তাঁর দপ্তর থেকে রি-ডাইরেক্ট করে অমিতের মেসের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে।

তক্তাপোষে শুয়ে খামটাকে দেখল অমিত। ওপাশের তক্তাপোষে তার রুমমেট পাশ ফিরে শুয়ে নাক ডাকছেন। খামের ওপর যে হাত ঠিকানা লিখেছে সেটা অবশ্যই একজন মহিলার। এর আগেই ওই দুটো গল্পের একটির জন্যে চিঠি পেয়েছিল, সেটা পোস্টকার্ডে এবং মহিলার নয়।

খামটার মুখ ছিঁড়ে সে ভাঁজ করা কাগজটা বের করল। সুন্দর হাতের লেখা দেখলেই ভালো লাগে।

আপনাকে কী বলে সম্বোধন করব না জানা থাকায়, রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করি, থাক সে কথায়, লিখি বিনা সম্বোধনে। আপনার লেখা গল্পটি পড়ার পর আবার লেখকের নাম পড়লাম। না, ওই নামের কোনও লেখকের লেখা আগে পড়িনি।

ভালো লিখেছেন। বেশ ভালো। কিন্তু একটা অনুরোধ, কোনও ঘটনা ঘটেছিল কল্পনা করে লিখতেই পারেন, কিন্তু যা ঘটেছিল তার সঠিক চেহারা জেনে লিখলে চরিত্রগুলো কাচের বলে মনে হয় না। আর একটা কথা, আমার অনুমান ভুল হচ্ছে না, তাই জানাচ্ছি যাঁকে মেসোমশাই বলতেন তিনি দু’মাস আগে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। শুভেচ্ছা সহ, এই গল্পের পাঠিকা।

সোজা হয়ে বসল অমিত। নিজের নাম লেখেনি কিন্তু স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে মৃণাল—এই চিঠি তারই লেখা। কিন্তু তার গল্প পড়ে এই চিঠিতে মৃণাল যে ভাবে লিখতে বলছে সেটা নিয়ে সে ভাবছিল না, চোখের সামনে মৃণালের মেসোমশাই-এর মুখ ভেসে উঠল। মানুষটি চলে গেছেন পৃথিবী থেকে? খুব খারাপ হয়ে গেল মন। তার সঙ্গে মেসোমশাই-এর মাত্র কয়েকবার দেখা হয়েছিল কিন্তু তাঁকে তার অন্যধরনের মানুষ বলে মনে হয়েছিল।

তক্তাপোষ থেকে নেমে আবার জামাপ্যান্ট পরে নিয়ে মেস থেকে বেরিয়ে পড়ল অমিত। চিঠিটা পড়ার পর তার মনে হচ্ছে মাসিমার সঙ্গে অবশ্যই দেখা করা দরকার।

আজ আর বাসে নয়, খালি ট্যাক্সি পেয়ে উঠে বসল অমিত। এই প্রথমবার সে ওই বাড়িতে ট্যাক্সি করে যাচ্ছে। শিক্ষকতা করায় এটুকু বিলাসিতা সে করতেই পারে।

সেই পরিচিত মেয়েটি দরজা খুলল। অমিতকে দেখে সে খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি খবরটা জানেন?’

নিঃশব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল অমিত। তাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে মেয়েটি ভেতরে চলে গেল। মিনিটখানেক পরে, মাসিমা ভেতর থেকে এসে দাঁড়ালেন, ‘কেমন আছ অমিত?’

অমিত উঠে দাঁড়াল। মুখ নীচু করে বলল, ‘আমি আজই জানতে পারলাম।’

‘ও!’ তারপর বললেন, ‘কাগজে শোক সংবাদ কলমে ছাপা হয়েছিল। মন দিয়ে না দেখলে ছবি দেখে চেনা যাবে না। সর্বনাশ তো একা আসে না। আমাকে তো সব দিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। যাক গে, তুমি কি কলকাতায় কোনও কাজে এসেছ না বেড়াতে?’

সত্যি কথাই বলল অমিত, ‘আমি এখানকার একটি স্কুলে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছি। চাকরিটি সাময়িক কিন্তু আমাকে সাহায্য করবে।’

‘কীরকম?’

‘আমি গবেষণা করব। সেই কারণে কলকাতায় থাকলে কিছু সুবিধে হবে। যদি দুই বছর চাকরিটা থাকে তাতে অনেক উপকৃত হব।’

‘মাত্র দুই বছর? এরকম কেন?’

‘যাঁর জায়গায় আমি পড়াচ্ছি তিনি ছুটি থেকে ওই সময় ফিরে আসতে পারেন বলেই শুনেছি।’ একটু থেমে অমিত জিজ্ঞাসা করল, ‘ওঁর কী হয়েছিল?’

মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা, ‘কিছুই না। দুপুরে কখনই ঘুমান না। কিন্তু সেই রবিবারে খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুলেন। বিকেলে ডাকতে গিয়ে জানলাম চলে গেছেন। বোধহয় নিজেও বুঝতে পারেননি।’

এরপর কী কথা বলবে বুঝতে পারছিল না অমিত।

ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই ইউনিভার্সিটির সেই হোস্টেলে এখন থাকছ না?’

‘না। আমি আপাতত আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটা বোর্ডিং-এ থাকি। আপনি এখন এই বাড়িতে একাই থাকেন?’ জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘ওমা! আমি কোথায় যাব! ওই মেয়েটা, যে তোমার জন্যে দরজা খুলল, ওকে তো আগেও তুমি দেখেছ, আমরা দুজনেই থাকি।’ ভদ্রমহিলার কথার মধ্যেই মেয়েটি একটা ট্রে-তে চায়ের কাপ আর প্লেটে বিস্কুট নিয়ে এল। ভদ্রমহিলা বললেন, ‘নাও।’

এই অবস্থায় খাব না বলা যায় না আবার খেতেও ভালো লাগে না। অমিত বিস্কুটের প্লেট তুলে ধরে মেয়েটিকে বলল, ‘এটা নিয়ে যাও।’

মেয়েটি ভদ্রমহিলার দিকে তাকালে তিনি মাথা নেড়ে নিয়ে যেতে ইশারা করলেন।

ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমি জোর করেছি বলে মৃণাল শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়েছে। পড়াশুনা তো করেনি, রেজাল্ট ভালো হবে বলে মনে হয় না।’

মাথা নেড়ে সমর্থন করল অমিত। চায়ে চুমুক দিল।

‘এর মধ্যে আর এক সমস্যায় পড়েছি আমরা। কী যে করি বুঝতেই পারছি না। ভেবেছিলাম পাশ করে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে কী করবে তা ও নিজেই ঠিক করবে। কিন্তু যা ভাবি তা তো কখনও হয় না।’

‘কেন?’

‘হঠাৎ ওঁর মাথায় ঢুকেছে তিনি অভিনয় করবেন। স্কুলে ভালো আবৃত্তি করত, স্কুলের নাটকে অভিনয় করেছে, তাই সিনেমায় সুযোগ পেলে সে নাকি খুব ভালো অভিনয় করতে পারবে। বোঝ! এই ভূত আমি কী করে ওর মাথা থেকে নামাই, বলো!’

খুব অবাক হয়ে গেল অমিত। যে মেয়ে অভিভাবকদের পাহারায় কলেজে যাওয়া আসা করেছে সে হয়তো তার মধ্যেই নিজের মতো ফাঁক পেলেই বিদ্রোহী হওয়ার চেষ্টা করেছে। সহপাঠিনীর প্ররোচনায় পার্কে গিয়ে সিগারেটে সে টান দিতে শুরু করেছিল। অমিত যদি খবরটা মাসিমাকে পৌঁছে না দিত তাহলে সেটা কোথায় গিয়ে শেষ হত তা কেউ জানে না।

অমিত জিজ্ঞাসা করল, ‘ওকে কেউ সিনেমায় অভিনয় করার কথা বলেছে?’

‘অমি জানি না। স্বামী মারা যাওয়ার পর তো আমার কাছে ও কিছুতেই মুখ খোলে না। যেন আমি ওর সবচেয়ে বড় শত্রু।’ বড় শ্বাস নিলেন মাসিমা, ‘অনেক বোঝাচ্ছি কিন্তু কে শোনে কার কথা?’

আরও কিছুক্ষণ মাসিমার সঙ্গে থাকার পর অমিত বেরিয়ে এল। তখন সন্ধের অন্ধকার ফিকে হয়ে কলকাতার পথে নেমে এসেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে মাসিমা বলেছেন, ‘সময় পেলে আবার এসো বাবা। তবে আসার আগে ফোন করে নিও।’

.

সম্পাদকের সঙ্গে শনিবার দুপুরে দেখা করল অমিত। প্রবীণ ভদ্রলোক বেশ অবাক হলেন অমিতকে দেখে। বসতে বলে আলাপ করার সময় যখন জানতে পারলেন অমিত শিক্ষকতা করছে তখন বলেই ফেললেন, ‘আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; প্রথমে এই খামটা রাখুন।’

অমিতের নাম লেখা একটা লম্বা খাম সামনে রাখলেন ভদ্রলোক। বললেন, ‘আপনি নতুন লেখক। তবু আমাদের সাধ্যমতো সম্মানদক্ষিণা দিতে পেরে খুশি হয়েছি।’ ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন, ‘আর হ্যাঁ, আপনার গল্প পাঠকদের খুব ভালো লেগেছে। যেহেতু চিঠিগুলো আমাকে লেখা হয়েছে তাই আপনাকে ওগুলো পাঠাইনি। আপনি কোথায় আছেন? একটা মেসের ঠিকানা দেখলাম—!’

‘হ্যাঁ, মেসটা আমহার্স্ট স্ট্রিটে।’

‘আপনার মা-বাবা থাকেন কুচবিহার। কুচবিহার একটা স্বাধীন রাজ্য ছিল। প্রচুর কাহিনির পটভূমি ওই জেলা। কুচবিহার রাজপরিবারের সঙ্গে ভারতের বিখ্যাত রাজপরিবারদের কারও কারও সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক হয়েছিল। আপনি চেষ্টা করলে তথ্য জোগাড় করে একটা বড় মাপের উপন্যাস লিখতে পারবেন। যদি লেখেন তাহলে আমি এই কাগজে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব। সম্পাদক বললেন।

‘খুব বড় কাজ। আমার পক্ষে সামলানো কি সম্ভব হবে?’

‘জলে না নামলে কি সাঁতার কাটা যায়?’ ভদ্রলোকের কথার মধ্যেই ফোন বেজে উঠল, তিনি রিসিভার তুলে ওপাশের কথা শুনে বললেন, ‘ও, এসে গেছেন! কাউকে সঙ্গে দাও, আমার ঘর চিনিয়ে দেবে।’

রিসিভার নামিয়ে রেখে সম্পাদক বললেন, ‘আপনি আমার ছেলের বয়সি, তুমি বললে নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না।’

‘না-না।’ সোজা হল অমিত।

‘এক ভদ্রলোক আসছেন আপনার সঙ্গে আলাপ করতে। উনি বেশ নামকরা চলচ্চিত্র পরিচালক। আমরা একসময় সহপাঠী ছিলাম।’ বলতে না বলতে দরজায় শব্দ হল। সম্পাদক চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে হেসে বললেন, ‘বাঃ, একদম ঠিক সময়ে। এসো, এসো, বসো।’

অমিত দেখল। মধ্যবয়সি মানুষটির ছবি সে আগেও দেখেছে। ভদ্রলোক তাকে নমস্কার করতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। সম্পাদক বললেন, ‘বসো সুকুমার। ইনি হলেন তরুণ লেখক যাঁর লেখা তুমি পড়েছ। অমিত, ইনি সুকুমার চ্যাটার্জি। তুমি বিখ্যাত চিত্রপরিচালক সুকুমার চ্যাটার্জির নাম নিশ্চয়ই শুনেছ, ইনি সেই ভদ্রলোক।’

চেয়ারে বসে হাত নেড়ে থামতে বললেন সুকুমারবাবু, ‘আমি চেষ্টা করি ভালো ছবি তৈরি করতে। আমার ক্ষমতা অনুযায়ী চেষ্টা করতে ফাঁকি দিই না। হ্যাঁ, অমি আপনার লেখা আগে কখনও পড়িনি। এই বড় কাগজে লেখার আগে নিশ্চয়ই ছোট কাগজে শুরু করেছিলেন?’

হেসে ফেলল অমিত, ‘না, লেখার কথা আগে আমি ভাবিনি। এই কাগজেই আমার একজন অধ্যাপকের উৎসাহে প্রথম লিখেছিলাম।’

‘বাঃ। চমৎকার ব্যাপার তো!’

সম্পাদক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি সুকুমারের ছবি দেখেছ?’

‘কুচবিহারে যখন ছিলাম তখন দেখেছি। কিন্তু কলকাতায় আসার পর দুটো কারণে ছাত্রাবস্থায় ছবি দেখা হয়নি।’ হেসে বলল অমিত।

‘কী কারণ?’ সম্পাদক জিজ্ঞাসা করলেন।

‘পড়াশুনার চাপ আর অর্থাভাব।’ হাসল অমিত।

‘অর্থাভাবের জন্যে একটাও সিনেমা দ্যাখোনি?’ সম্পাদক খুব অবাক।

‘হ্যাঁ। বাবা যা টাকা পাঠাতেন তা দিয়ে থাকা খাওয়া ইউনিভার্সিটির মাইনে, যাতায়াতের বাসভাড়া দেওয়ার পর যা থাকত তা তেল সাবান কিনতেই ফুরিয়ে যেত। সিনেমা থিয়েটারের টিকিটের কথা ভাবতেই পারতাম না।’ অমিত বলল।

‘যাক গে, সেই সব দিন পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছ। এখন আশাকরি পেছনদিকে তাকাতে হবে না। হ্যাঁ, সুকুমার তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। আমি ওকে বলেছিলাম তোমাকে দেখা করার কথা বলব কিনা। ও রাজি না হয়ে নিজেই তোমার কাছে আসতে চাইল নিশ্চয়ই তুমি খুব অবাক হচ্ছ। সুকুমার, তুমিই বলো।’ সম্পাদক হাসলেন।

সুকুমার চ্যাটার্জি বললেন, ‘অমিতবাবু, আমার বন্ধুর কাগজে আপনার লেখা বড় গল্পটি নিয়ে একটি ছবি বানাতে ইচ্ছে করছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করছি, আপনার কোনও আপত্তি নেই তো?’

প্রথম কয়েকটি সেকেন্ড অমিত যেন কথা খুঁজে পেল না। তারপর বলল, ‘আমি জানি না এটা ছবি হবে কি না?’

সম্পাদক বললেন, ‘মৃণাল সেন বলেছিলেন, খবরের কাগজের একটা হেডলাইন থেকে ছবি হতে পারে।’

‘না না, আমার সেই ক্ষমতা নেই।’ সুকুমার বললেন, ‘কিন্তু আপনার গল্পটি পড়ে মনে হয়েছে ছবি তৈরি হলে দর্শকদের ভালো লাগবে।’ এখন বলুন, আপনার আপত্তি নেই তো?’

অমিত কী বলবে বুঝতে না পেরে সম্পাদকের দিকে তাকাল। সম্পাদক হেসে বললেন, ‘এ তো খুব আনন্দের কথা! তুমি তরুণ গল্পকার। লেখা শুরু না করতেই পাঠকের প্রশংসা পাচ্ছ। সুকুমারের মতো প্রতিষ্ঠিত চিত্রপরিচালক আগ্রহী হয়েছে ছবি তৈরি করতে। এটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। আমার বন্ধু বলে নয়, সুকুমারের যা খ্যাতি তাতে একটা নতুন পালক যোগ হবে ও যদি এই ছবিটা করে।’

সুকুমার বললেন, ‘আপনার গল্প ছবি হলে আপত্তি নেই তো?’

অমিত এবার কথা বলতে বাধ্য হল, ‘তা নয়। আপনার মতো একজন বিখ্যাত পরিচালক আমার গল্প নিয়ে ছবি করার কথা ভাবছেন এটা কি কম কথা!’

‘জানি না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচালক শিব গড়তে চান কিন্তু বাঁদর তৈরি হয়। আমার ছবি দেখেও আপনার মনে হতে পারে কেন অনুমতি দিলাম। তবে একটা কথা জোর দিয়ে বলছি, আমি খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে যাই।’

সম্পাদক বললেন, ‘তাহলে তো হয়েই গেল। হ্যাঁ, এবার অর্থিক এবং অন্যান্য চুক্তির ব্যাপারটা বলো।’ বলে বেলের বোতাম টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেয়ারা দরজা খুললে তিনি চায়ের অর্ডার দিলেন।

সুকুমার বললেন, ‘আমার প্রযোজক আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে চুক্তিপত্রে সইসাবুদ করাবে। এখন বলুন, আপনি কত টাকা সম্মানদক্ষিণা নেবেন?’

মাথা নাড়ল অমিত, ‘বিশ্বাস করুন, এ ব্যাপারে আমার কোনও অভিজ্ঞতা নেই।’

‘আচ্ছা, একটা—’ বলেই সুকুমার সম্পাদকের দিকে তাকালেন, ‘তুমি না হয় টাকার অঙ্কটা ঠিক করে দাও।’

‘তুমি কত দিতে পারবে?’ সম্পাদক জিজ্ঞাসা করলেন।

‘একজন তরুণ লেখক হিসেবে প্রযোজককে আমি এক লক্ষ টাকা দিতে রাজি করিয়েছি। অমিতবাবু, এইরকম লেখা যদি আপনি কয়েক বছর ধরে লিখতেন তাহলে দুই-এর নিচে পেতেন না। এবার বলুন আপনি!’

অমিত নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওইটুকু লেখার ওপর ভিত্তি করে সিনেমা তৈরি করবেন ভদ্রলোক আর তার জন্যে তাকে এক লক্ষ টাকা দেবে? এত টাকা?

সম্পাদক বললেন, ‘আমার মনে হয় এটা উত্তম প্রস্তাব অমিত।’

অমিত বড় শ্বাস নিয়ে বলল, ‘বেশ।’

সুকুমার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে একটা মোটা খাম আর ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন, ‘এই কাজটা আমি কখনই করি না। কিন্তু আপনি নবীন লেখক বলে মনে হল করা উচিত। এই খামে অগ্রিম হিসেবে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এই কাগজে লেখা আছে, আপনাকে মোট এক লক্ষ টাকা দিতে হবে। তা থেকে শতকরা দশ টাকা হিসেবে দশ হাজার টাকা ইনকামট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স হিসেবে জমা দেওয়া হবে। বাকি নব্বুই হাজারের প্রথম দশ হাজার আজ আপনাকে দেওয়া হল। বাকি আশি হাজার প্রযোজক শুটিং শুরু করার আগেই চুক্তিপত্র তৈরি করে সইসাবুদ করার সময় চেকে আপনাকে দিয়ে দেবেন। বোঝাতে পেরেছি?’

মাথা নেড়ে অমিত জানাল, সে বুঝেছে। তারপর যেখানে যেখানে সই করার তা করে দিলে সুকুমার একটা করে কপি তাকে দিলেন। সম্পাদক ড্রয়ার থেকে একটা খাম বের করে সুকুমারকে বললেন, ‘এর ভেতরে রেখে দাও।’

.

সুকুমার থাকে গড়িয়াহাটে। তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে চলুন। আমি তো আগেই নেমে যাব, তারপরে আমার গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।’

‘অনেক ধন্যবাদ কিন্তু আমি বাসেই চলে যেতে পারতাম।’ অমিত হেসে বলল।

‘পারতেন কিন্তু আপনার পকেটে এখন যে টাকার প্যাকেট রয়েছে সেটার জন্যে একটু সতর্ক হয়ে যাওয়া দরকার। কলকাতার পকেটমাররা আপনার চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী!’ সুকুমার বললেন।

পরিচালকমশাই নেমে গেলে গাড়ির পেছনের আসনে একা বসে রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল অমিত। হঠাৎ খেয়াল হল, কলকাতার রাস্তায় এই প্রথমবার সে একা কোনও প্রাইভেট গাড়িতে চেপে যাচ্ছে। এই প্রথম তার পকেটে দশ হাজার টাকা রয়েছে। আচ্ছা, ভদ্রলোক এই টাকা সঙ্গে নিয়ে নিশ্চিত হয়ে এসেছিলেন যে অমিত চুক্তিতে সই করবে। নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে এটাই বোধহয় স্বাভাবিক। যাঁরা বিখ্যাত লেখক, যাঁদের অনেক খ্যাতি, তাঁদের একটা গল্প সিনেমা করতে হলে কত টাকা দিতে হয় কে জানে। যাই হোক, লেখা শুরু করেই যে সে একটা গল্পের ছবি হবে বলে এক লাখ টাকা পাচ্ছে, এখনও ভাবতে পারছে না। ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করল, ‘আমহার্স্ট্র স্ট্রিট কোন পথ দিয়ে ঢুকব বাবু?’

ঘোর কাটল। ড্রাইভারকে পথ বলে দিল সে।

মেসের ঘরে গিয়ে সে অভিনব দৃশ্যটা দেখল। তার রুমমেট নিজের তক্তাপোষের মাঝখানে পদ্মাসনে বসে আছেন চোখ বন্ধ করে। এর মানে, সে যখন ঘরে থাকে না তখন ভদ্রলোক এইসব করে থাকেন!

নিঃশব্দে নিজের তক্তাপোষের পাশে এসে পোশাক পরিবর্তন করতে করতে অমিত টাকাটার কথা ভাবল। কাল সকালের আগে ওটা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া যাবে না। এখন যদি টাকাগুলো স্যুটকেসে রাখে তাহলে তা তালাচাবি দিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। টাকার প্যাকেটটা সে যে পাজামা এখন পরেছে তার পকেটে রেখে পাঞ্জাবি পরে নিল। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না তার পকেটে দশ হাজার টাকা আছে।

.

দু’দিন বাদেই খবরটা কাগজে বেরিয়ে গেল, ‘তরুণ লেখক অমিত মিত্রের গল্প ”পদ্মপাতায় জল” অবলম্বনে ছবি করছেন বিখ্যাত পরিচালক সুকুমার চ্যাটার্জি। আগামী মাসেই ছবির শ্যুটিং শুরু হবে।’

এই খবরের কল্যাণে স্কুলে বিখ্যাত হয়ে গেল সে। এর মধ্যেই অমিত ছাত্রদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল। এখন খবরটা তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিল।

মাথা থেকে সিনেমার ব্যাপারটাকে সরিয়ে গবেষণার কাজে স্কুল ছুটির পরে জাতীয় গ্রন্থাগারে যাতায়াত শুরু করেছিল অমিত। এক শনিবার গ্রন্থাগারে না গিয়ে মেসে ফিরে এসেছিল নতুন একটা লেখা তৈরি করার জন্যে। কাজের লোক ঘরে এসে জানাল, ‘একজন মহিলা আপনার খোঁজে আজ একবার এসেছিলেন, আবার এসেছেন। অফিসে কেউ নেই, ওখানেই বসাচ্ছি।’ বলেই চলে গেল লোকটা। ধরেই নিয়েছে, মহিলা যখন তখন অমিত নিশ্চয়ই দেখা করবে।

অবাক হয়ে গেল অমিত। তার কাছে কোনও পুরুষই আসে না, এই মহিলা এলেন কোত্থেকে! সেই স্কুলের ভিজিটার্স রুমে কখনও কোনও গার্জেন আসেন তাদের সঙ্গে দেখা করতে। অবশ্য বাবা জ্যেঠারাই বেশি, মায়েরা বেশ কম। তাঁরা নিশ্চয়ই কলকাতার একেবারে উল্টোদিকে তার মেসে আসবে না দেখা করতে।

আবার পাজামা ছেড়ে প্যান্ট পরতে ইচ্ছে হল না। পাজামা এবং ঘরোয়া পাঞ্জাবি পরেই অমিত ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

অফিসঘরের দরজায় এসে অমিত দেখল অল্প বয়সি একটি যুবতী দেওয়ালে টাঙানো বিবেকানন্দের ছবি দেখছে। অমিত গলার শব্দ করে বলল, ‘বলুন!’

যুবতী ঘুরে দাঁড়ালে অমিত প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল। মাত্র একবার সে দেখেছে, তাও দু’তিন মিনিটের জন্যে। কিন্তু এই যুবতী মৃণাল ছাড়া অন্য কেউ নয়। কিন্তু মৃণাল জানবে কী করে সে এই মেসে এখন থাকে! তাহলে তারও ভুল হতে পারে।

‘মুখ দেখে বুঝতে পারছি আপনার চিনতে অসুবিধে হয়নি। ভালোই হল। নিজের পরিচয় নিজের গলায় বলতে হল না!’ গম্ভীর গলায় বলল যুবতী।

‘আপনি, আপনি বসুন।’ অমিত বলল।

‘আমি তো এখানে বসার জন্যে আসিনি।’

‘ও। মাসিমা কেমন আছেন?’

‘দেখুন, আমার মাসিমা আপনার মাসিমা কী করে হল ভগবান জানেন? হ্যাঁ, সবাই ভালো আছেন। আপনি তো আমার চরিত্র ভালো করার জন্যে ওঁর কাছে খবর পৌঁছে দেন। আশাকরি আমি এখানে এসেছি এই খবরটাও পৌঁছে দেবেন।’

‘না না। আমি ভেবে পাচ্ছি না আপনি কীভাবে জানলেন যে আমি এই মেসে থাকি। এর ঠিকানা তো মাসিমাও জানেন না।’

‘তাই? আচ্ছা, বলুন তো, আপনি চালাক না ধূর্ত?’

‘এসব আপনি কেন বলছেন!’

‘কলকাতা শহরে একটা সূত্র পেলে ইচ্ছে হলে যে-কোনও মানুষের ঠিকানায় পৌঁছোনো যায় তা জানতেন না, এখন জানলেন। শুনুন, আপনার শ্রীমুখ দেখতে এখানে আসিনি।’

‘বলুন, কেন এসেছেন?’

‘কাগজে বেরিয়েছে আপনার গল্প ”পদ্মপাতায় জল” নিয়ে পরিচালক সুকুমার চ্যটার্জি সিনেমা তৈরি করতে যাচ্ছেন। সত্যি কথা তো?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু—!’

‘আপনি পরিচালককে যদি বলেন ওঁর এই ছবিতে একটা ভালো চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দিতে। আমি অভিনয় করতে চাই।’

‘সেকি!’ চমকে উঠল অমিত।

‘মানে? কথাটার মনে আপনি বুঝতে পারেননি?’

‘তা পেরেছি। কিন্তু কোনও অনুশীলন ছাড়া, নিজেকে তৈরি না করে কি অভিনয় করা সম্ভব? একটু ভেবে দেখুন!’ অমিত বলল।

একটা হাত ওপরে তুলে মাথা নাড়ল মৃণাল, ‘আমাকে জ্ঞান দেবেন না, প্লিজ! শর্মিলা ঠাকুর ”অপুর সংসার” করার আগে অভিনয়ে অনুশীলন কি করেছিলেন? সবাইকে একই ফর্মুলায় ফেলা খুব খারাপ অভ্যেস!’

ঢোঁক গিলল অমিত। বললেন, ‘আপনি যে অভিনয় করতে চাইছেন তা আপনার মাসিমা, মা এবং বাবা জানেন? ওদের সম্মতি আছে?’

‘অদ্ভুত লোক তো আপনি! আমি একজন অ্যাডাল্ট।’ মাথা নাড়ল মৃণাল। ‘যেহেতু আপনার গল্প নিয়ে একজন নামকরা পরিচালক ছবি করছেন তাই—!’ বলতে বলতে থেমে গেল মৃণাল। অদ্ভুত চোখে অমিতের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল। তারপর বলল, ‘আপনি তো বেশিদিন আগে এম-এ পড়তেন না, তাই না? তখন কি আপনি লেখালেখি করতেন? অন্তত চর্চা করতেন? কোথাও কি আপনার লেখা ছাপা হয়েছিল ওই সময়?’

‘না।’ বলতে বাধ্য হল অমিত।

‘সেসময় আপনি রাস্তায় ঘুরে দেখতেন কোনও সুন্দরী মেয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েদের কাছে গিয়ে নাটক করে বলতেন, টু বি আর নট টুবি?’ হাসল মৃণাল।

আর ধৈর্য রাখতে পারল না অমিত। জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আমার কাছে এসেছেন সাহায্য চাইতে। অথচ আসার পর থেকে একের পর এক আক্রমণ করে চলেছেন! এটা কি উচিত হচ্ছে?’

‘উচিত?’ যেন অবাক হল মৃণাল, ‘আপনি যা করেছেন সেসব কি উচিত কাজ ছিল?’

‘আমি বুঝতে পারছি না।’

‘আচ্ছা! আমি যখন কলেজে পড়তাম তখন আমার পেছনে আপনি গোয়েন্দাগিরি করতেন কেন? আমি পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে কী করছি তা আপনি মাসিমণিকে দেখিয়ে কী লাভ করেছেন? বলুন?’

‘উনি অনুরোধ করেছিলেন, তাই—।’

‘ভালো ছেলে মাসিমণির সেবা করতে লেগে পড়লেন। একটা গোবেচারা ভালোমানুষ ছেলের গলায় আমাকে ঝুলিয়ে দেওয়ার পর চৈতন্য হল আপনার। সহ্য করতে না পেরে কলকাতা থেকে পালালেন। আমার সর্বনাশ করার জন্যে যা যা দরকার তা আপনি করেছেন। চমৎকার! যাক গে, এসব বলতে আমি এখানে অসিনি! কাগজে দেখলাম আপনি গল্প লিখতে শুরু করেছেন। একেবারে জীবন থেকে নেওয়া গল্প! তারপর দেখলাম আপনার গল্পের সিনেমা হচ্ছে। তাই বলছি অনেক উপকার করেছেন, এবার একটু অপকার করুন।’ হাসল মৃণাল।

‘অপকার?’

‘ওঠাতে না বলে নামাতে বলছি। সিনেমায় নামানো। সিনেমায় নামানো তো এখনও ভদ্র বাঙালি উপকার বলে না।’

‘দেখুন, আমি পরিচালক ছাড়া কাউকে চিনি না।’

‘আশ্চর্য! মিথ্যে কথা কেন বলছেন? একজন লেখককে এটা মানায় না! আপনার সঙ্গে আলাপ পরিচয় না করেই পরিচালক খবরের কাগজকে বলে দিলেন?’

‘ওহো! একদিনই কথা হয়েছিল। উনি এসে কথা বলে চুক্তিপত্রে সই করে, অগ্রিম টাকা দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।’

‘তার বেশি কী করবেন? আপনার যদি আমাকে সাহায্য করার ইচ্ছে না থাকে তাহলে সরাসরি সেটা বলতে পারছেন না কেন?’

‘আমি বললেই পরিচালক আপনাকে কাজ দিতে নাও পারেন।’

‘হতেই পারে। আমাকে তো একটার পর একটা ধাক্কা খেতে হচ্ছে, নাহয় আর একটা ধাক্কা খাব।’

‘বেশ। আপনি বসুন, আমি আমার ঘর থেকে লিখে নিয়ে আসছি চিঠিটা। বেশি দেরি হবে না।’

‘এখানে তো আপনি একাই থাকেন!’

‘হ্যাঁ। এটা মেসবাড়ি।’

‘বউ কোথায় থাকে? কুচবিহারে?’

চমকে তাকাল অমিত। তার বাড়ি যে কুচবিহার সেই খবর মৃণাল জানল কী করে! সে হেসে বলল, ‘তিনি কোথায় এখন আছেন তা জানি না, তবে কুচবিহারে এখনও পৌঁছতে পারেননি। বসুন, আমি আসছি।’

ঘরে গিয়ে একটা সাদা খাতার কাগজ ছিঁড়ে অমিত লিখল, ‘শ্রীযুক্ত সুকুমার চ্যাটার্জি, চলচ্চিত্র পরিচালক, শ্রদ্ধাভাজনেষু। পত্রবাহিকার পরিবার আমার পরিচিত। উনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে চাইছেন। আপনার ছবির কোনও চরিত্রে যদি ওকে আপনি উপযুক্ত মনে করেন তাহলে সুযোগ দিলে ভালো লাগবে। আশাকরি, আপনাকে বিব্রত করলাম না। বিনীত, অমিত্র মিত্র।’ তারপর চুক্তিপত্র বের করে তা থেকে সুকুমার বাবুর ঠিকানা নিয়ে নীচে লিখে দিল।

তার কাছে কোনও সাদা খাম নেই। বাধ্য হয়ে কাগজটি ভাঁজ করে সযত্নে অমিত ঘরে এসে দেখল মৃণাল তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অমিত বলল, ‘আমার কাছে কোনও খাম নেই। অনুগ্রহ করে একটা খামে এই চিঠি ভরে ওঁকে দিলে ভালো হয়। ঠিকানা নীচে লেখা আছে।’

‘অনেক ধন্যবাদ।’

‘ওহো, ওঁর ফোন নাম্বারটা—।’

‘আমি জানি।’ ঘড়ি দেখল মৃণাল, ‘আমি যে আপনার কাছে এই কারণে এসেছি তা মাসিমাকে কবে বলবেন?’

‘ওঁর সঙ্গে তো অনেকদিন যোগাযোগ নেই।’

‘তাতে কী? এখন তো খবরটা দেওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।’

‘উনি জিজ্ঞাসা না করলে আমি যেচে আপনার কথা বলব না।’ একটু থেমে অমিত বলল, ‘পরিচালক কী বললেন জানালে ভালো হত।’

‘উনি যদি সুযোগ দেন তাহলে ছবি দেখতে গিয়ে তো আমাকে দেখতেই পাবেন। আচ্ছা, এলাম।’ জোরে জোরে পা ফেলে বেরিয়ে গেল মৃণাল।

অমিতের মনে হল একবার, মৃণালকে অনুসরণ করলে হয়। ও একা এসেছিল, না সঙ্গে যে এসেছিল সে একটু দূরে অপেক্ষা করছে। তারপরেই ভাবনাটা বাতিল করল। জেনে কী হবে! এটা তো মৃণালের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি সঙ্গে এসেও থাকে তাহলে তার কী এসে যায়?

দিন সাতেক পরে মেসের ঠিকানায় সুকুমার চ্যাটার্জির চিঠি নিয়ে এল একজন প্রোডাকশনের কর্মী। সুকুমারবাবু লিখেছেন, ‘আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না। যদি আপনি একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাহলে ভালো হয়। পত্রবাহকের হাতে আমি একটি স্বল্পমূল্যের ফোন পাঠালাম। আপাতত এটিকে গ্রহণ করতে পারেন।

দ্বিতীয়, আপনার চিঠি নিয়ে মৃণাল আমার কাছে এসেছিলেন। তার সঙ্গে কথা বলে ভালোই লেগেছে। আগামী সোমবার তার একটা স্ক্রিন টেস্ট নেব। দেখা যাক। শুভেচ্ছা সহ—!

লোকটি তার পকেট থেকে ছোটখাটো একটা মোবাইল ফোন আর চার্জার বের করে এগিয়ে দিল। অমিত বলল, ‘ওঁকে আমার ধন্যবাদ দেবেন।’

লোকটি চলে গেলে মোবাইলের ওপর লেখা নাম্বারটা কয়েকবার চোখ বোলাতেই মুখস্থ হয়ে গেল। অমিত দেখল মোবাইলে ফুল চার্জ দেওয়াই আছে। বোতাম টিপে সে দেখতে পেল সুকুমারবাবুর নাম এবং মোবাইল নাম্বার লেখা আছে। আর কোনও নাম নেই।

সে নাম্বারটায় চাপ দিতেই রিং-এর আওয়াজ কানে এল। তারপর সুকুমারবাবুর গলা শুনল, ‘হ্যালো!’

‘নমস্কার। আমি অমিত মিত্র বলছি। ফোনটা পেয়েছি। আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব আমি জানি না। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে এর দাম কত বললে খুব ভালো হয়!’ অমিত বলল।

হাসলেন সুকুমারবাবু, ‘ওটার দাম কত আমি জানি না। একজন ভক্ত ওটা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। আমি কী করে আপনার কাছ থেকে দাম নেব! এসব নিয়ে ভাববেন না। হ্যাঁ, সামনের সাতাশ তারিখ হল রবিবার। সেদিন দুপুর দুটোয় আমার বাড়িতে স্ক্রিপ্ট পড়া হবে। আমার ইচ্ছে আপনাকে শোনাতে। আসবেন?’

‘নিশ্চয়ই।’ উৎসাহের সঙ্গে বলল অমিত।

‘ঠিক আছে। আমার সহকারীরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। ছবির জন্যে যেটুকু গল্পের বদল করা দরকার তার বেশি কিছু করিনি। আচ্ছা ভাই, রাখলাম।’ সুকুমারবাবু কথা শেষ করলেন।

একটু ক্ষুণ্ণ হল অমিত। মৃণাল যে তার চিঠি নিয়ে সুকুমারবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তিনি ওর টেস্ট নিচ্ছেন, এসব কথা তাকে জানাবার প্রয়োজন মনে করেনি! অদ্ভুত মেয়ে। এমনভাবে সেদিন কথা বলছিল যেন শেষ কথা সে-ই বলছে। আচরণেও তাই বোঝাল। সেই বাসস্টপে দাঁড়ানো ভীরু মেয়েটির কী পরিবর্তন!

.

সকালে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ন্যাশন্যাল লাইব্রেরিতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার কাজ করা। দিনগুলো যেন হুড়মুড়িয়ে চলে যাচ্ছিল। একদিন সকালে সুকুমারবাবুর দেওয়া মোবাইল বেজে উঠতেই তড়িঘড়ি সেটাকে থামিয়ে ঘরের বাইরে চলে এল অমিত। তার রুমমেট দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়েছিল, শব্দটা কানে যেতে অত্যন্ত বিরক্তমুখে উঠে বসলেন।

ভিতরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জানান দিল অমিত। ওপাশ থেকে একজন কথা বলল, ‘নমস্কার। অমিতবাবু বলছেন?’

‘হ্যাঁ বলছি।’

‘আমি সুকুমারদার অ্যাসিস্টেন্ট। আগামী কাল দুপুর ঠিক দুটোর সময় সুকুমারদার বাড়িতে আমাদের আগামী ছবির চিত্রনাট্য পড়া হবে। সুকুমারদা জানাতে বললেন, আপনি কি নিজেই আসতে পারবেন না আমরা গাড়ি পাঠাব?’

‘উনি তো গড়িয়াহাটে থাকেন জানি, ঠিকানাটা যদি বলেন—?’

ছেলেটি সুকুমারবাবুর ঠিকানা বলল। অমিত মাথা নাড়ল, ‘কোনও অসুবিধে নেই। আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব, গাড়ি পাঠাতে হবে না।’

ফোন বন্ধ করে ঘরে ফিরে অমিত দেখল তার রুমমেট আবার ওপাশের দেওয়ালের দিকে মুখ করে আগের মতো শুয়ে পড়েছেন। এরকম মানুষকে অদ্ভুত বললে কমা হয়। ওর মনে হল এই লোকটিকে নিয়ে সে একটি ছোট গল্প লিখবে।

শনিবারের রাত্রে তার মোবাইল ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে বাসে উঠে বসেছিল অমিত। এইসময় বাস একদমই ফাঁকা থাকে। নাম্বার অচেনা। নিশ্চয়ই সুকুমারবাবুর কোনও সহকারী। হয়তো আগামীকাল চিত্রনাট্য পড়া হবে না, সেকথাই জানাতে ফোন করছে।

সে হ্যালো বলতেই মহিলার গলা কানে এল, ‘আমি কি অমিতের সঙ্গে—!’

‘হ্যাঁ, আপনি?’ বলেই গলার স্বর চিনতে পারল অমিত। বেশ জোরেই বলে উঠল, ‘আরে! মাসিমা, আপনি?’

‘ও, চিনতে পেরেছ তাহলে! তুমি যে মোবাইল ফোন নিয়েছ তা আমাকে জানাবার দরকার আছে বলে মনে করোনি!’ মাসিমার গলায় অভিমান।

‘আমি মাত্র কয়েকদিন আগে পেয়েছি। একজন, এক চলচ্চিত্র পরিচালক এটি আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। কাউকে জানাবার সময় পাইনি। আপনি এর নাম্বার কার কাছে পেলেন?’

‘যে ভদ্রলোক তোমার গল্পের সিনেমা করছেন, তিনিই দিয়েছেন।’

‘সেকি!’ অবাক হয়ে গেল অমিত, ‘সুকুমারবাবু সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে! কিন্তু একথা তো মৃণাল সেদিন বলেনি।’

‘মৃণাল জানে না। শোন অমিত, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা বলা দরকার। এখন রাত প্রায় সাড়ে সাতটা। কোথায় দেখা করবে বলো?’

‘আপনি আজই দেখা করতে চাইছেন?’

‘হ্যাঁ। আজই।’

‘তাহলে আমি আধঘণ্টার মধ্যে আপনার ওখানে যাচ্ছি।’ অমিত বলল। কী হয়েছে সে বুঝতে পারছিল না।

.

দরজা খুললেন মাসিমা। বললেন, ‘এসো।’

ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল অমিত। মৃণালের মা গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সে হাতজোড় করে দুজনকেই নমস্কার করল। মৃণালের মায়ের কোনও প্রতিক্রিয়া নেই।

মাসিমা বললেন, ‘সবাই বলছে তুমি প্রতিশোধ নিচ্ছ?’

‘প্রতিশোধ? কীসের প্রতিশোধ! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘সেই যে তুমি মৃণালের পেছনে লেগেছিলে, ওর কলেজের বাইরে গায়ে পড়ে কথা বলতে গিয়েছিলে, পাত্তা পাওনি বলে ওর ক্ষতি করে যাচ্ছ একের পর এক। কেন এমন করছ বাবা? আমি তো ভালো মনে তোমাকে গ্রহণ করেছিলাম।’ মাসিমা কথা শেষ করতে মৃণালের মা বললেন, ‘দুধ দিয়ে কলসাপ পুষেছিলে!’

মাসিমা বললেন, ‘অমিত তুমি বসো।’

‘কী হয়েছে বলুন তো?’ অমিত চেয়ারে বসে জিজ্ঞাসা করল।

‘একথা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, তোমার গল্প নিয়ে যে সিনেমা হচ্ছে, তাতে অভিনয় করার জন্যে তুমি মৃণালের নাম সুপারিশ করেছ?’ মাসিমা জিজ্ঞাসা করলেন। ‘সিনেমা লাইনে যে মেয়েরা ঢোকে তাদের খুব সতর্ক থাকতে হয়। তুমি ভালো করেই জানো ওর সেসবের বালাই নেই। তবু করেছ। কেন?’ এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর মৃণালের মা প্রশ্ন করলেন।

‘আমি কথাটা বুঝতে পারছি না।’ অমিত অবাক হয়ে বলল।

‘বুঝতে পারছ না? নিজের কীসে ভালো হবে তা জানলে কোনও মেয়ে বাজে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পার্কে বসে সিগারেট খেতে যায়? তুমি তা ভালো করেই জানো।

‘দেখুন, আমি মৃণালকে সিনেমায় নামতে উৎসাহ দিইনি। তাছাড়া ওকে আমি কলেজের সামনে মাত্র দু’মিনিটের জন্যে দেখেছিলাম। তারপর এই ক’দিন আগে সে আমার মেসে এসে উপস্থিত হল।’

‘তুমি ওকে সুযোগ দেওয়ার জন্যে পরিচালককে চিঠি লিখে অনুরোধ করোনি? এটা নিশ্চয়ই মিথ্যে কথা নয়।’ মাসিমা জানতে চাইলেন।

‘না, নয়। মৃণাল আমার মেসে এসে ওটা করতে বলেছিল।’

‘কেউ যদি বলে তাকে বিষ দিতে তাহলে তুমি তাকে বিষ দেবে?’

‘এসব আপনি কী বলছেন?’

‘ঠিকই বলছি। আমাদের ঘরের মেয়ে সিনেমায় অভিনয় করছে, ওর শ্বশুরবাড়িতে কী জবাব দেব?’ মাসিমা বললেন, ‘ওকে সুপারিশের চিঠি দেওয়ার আগে আমার সঙ্গে কথা বললে না কেন?’

‘দেখুন, মৃণাল প্রাপ্তবয়স্ক। ও যেরকম করে কথা বলছিল তাতে বোঝাচ্ছিল সিনেমায় সে অভিনয় করবেই। তাছাড়া ওর স্ক্রিনটেস্ট হবে আর তারপর পরিচালক সিদ্ধান্ত নেবেন ও অভিনয় করবে কি না! এখনই ধরে নিচ্ছেন কেন ও অভিনয় করবে?’ অমিত বলল।

মৃণালের মা বললেন, ‘আমি কিছু জানি না। পরিচালককে বলতে হবে ওকে যেন সিনেমায় চান্স না দেন। এটা বন্ধ করতেই হবে।’

‘শুনলে?’ মাসিমা বললেন, ‘এই উপকারটুকু করো বাবা। ও যদি কোনও ভালো ছেলেকে পছন্দ করত তাহলে আমি দাঁড়িয়ে থেকে আবার ওর বিয়ে দিতাম। দ্যাখো অমিত, আমরা চাই ওর জীবনে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে কিন্তু যা হবে তা যেন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে হয়।’

কয়েক সেকেন্ড ভাবল অমিত। সুকুমারবাবুকে বলতে হবে, যে মেয়েটিকে সুযোগ দেওয়ার জন্যে আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম তা দেওয়ার দরকার নেই।

মাসিমা জিজ্ঞাসা করলেন। ‘কী ভাবছ তুমি?’

‘পরিচালককে কীভাবে কথাটা বলা যায় তাই ভাবছি।’ উঠে দাঁড়াল অমিত। ‘আপনাদের এই ইচ্ছের কথা মৃণাল জানে?’ অমিত প্রশ্ন করল।

মৃণালের মা রেগে গেলেন, ‘এই যে শোন, আমি মৃণালের মা, ও ওর মাসিমা। আমরা ওর ভালো যা বুঝি তা ও নিজেই বোঝে না।’

‘বেশ। আমি আসছি।’ বলেই তার খেয়াল হল, ‘আচ্ছা, আপনারা আমার মোবাইল নাম্বার কোথায় পেলেন?’

‘সুকুমারবাবু দিয়েছেন?’ মাসিমা বলল।

‘সেকি! ওঁকে এসব কথা বলেছেন নাকি?’

‘তুমি আমাকে কী ভাবো? ঘরের কেচ্ছার কথা বাইরে বলে বেড়াব?’ মাসিমা বললেন, ‘ওঁকে বললাম আমরা তোমার লেখার ভক্ত তাই আলাপ করতে চাই। তখন উনি এই মোবাইল নাম্বারটা দিলেন।’

অমিত আর দাঁড়াল না।

কিন্তু সে ভেবে পাচ্ছিল না কীভাবে মাসিমার কথা রাখা যায়! আজ মৃণালের মা তার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছেন। কী করা যায়! হঠাৎ তার মনে হল, সে কেন এত ভাবছে? মৃণাল একজন প্রাপ্ত বয়স্কা মহিলা। সে যা ভালো বোঝে তাই তাকে করতে দেওয়া উচিত। যদি সেই কাজের ফল খারাপ হয় তাহলে সেটা সে-ই ভোগ করবে। সিনেমায় না অভিনয় করতে নিশ্চয়ই ওর বাড়ি থেকে অনেক বোঝানো হয়েছে। সেসব কথা মৃণাল নিশ্চয়ই শুনতে চায়নি। তার পক্ষে মৃণালকে নিষেধ করা সম্ভব নয়। আর সে এখন সুকুমারবাবুকে কী করে বলবে পছন্দ হলেও মৃণালকে কাস্ট করবেন না।

অমিত স্থির করল, মৃণালের ব্যাপারে সে নাক গলাবে না।

.

রবিবার ঠিক দুটো বাজতে দশ মিনিটে অমিত সুকুমারবাবুর বাড়িতে পৌঁছে গেল। অনেকেই এসে গিয়েছিলেন। সুকুমারবাবু তাঁদের সঙ্গে অমিতের আলাপ করিয়ে দিলেন। এঁরা কেউ বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান, কেউ এডিটার, প্রধান সহকারী পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক। ঠিক দুটো বাজতে পাঁচ মিনিট আগে চলে এলেন বাংলা সিনেমার এক তরুণ নায়ক যাঁর এর মধ্যেই বেশ ভালো পরিচিতি হয়েছে।

পরিচালক সহকারীকে পড়তে বললেন। সহকারী চিত্রনাট্য পড়া শুরু করলেন। অমিতের মনে হল সে চোখের সামনে চরিত্রগুলোকে দেখতে পাচ্ছে।

টানা দেড়ঘণ্টা ধরে চিত্রনাট্যটি পড়া হল। মাঝের কিছু অংশ যা মূল গল্পে নেই তা চিত্রনাট্যে রয়েছে। মনে খুঁতখুঁতানি এসেছিল কিন্তু পরে অমিতের মনে হল গল্প যা লেখক লেখেন, কাগজে তাই ছাপা হয়, পাঠক পড়েন। সেই গল্প তো হুবহু সেলুলয়েডে ছাপা যায় না। নায়ক বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে চলে এল, একথা এক লাইনে লেখা যায়। কিন্তু স্টেশনে আসার পথে কোনও ঘটনা যদি পরিচালক সংযোজন করেন যা গল্পের বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করে তাহলে আপত্তি করার কী আছে!

চিত্রনাট্য পড়া শেষ হলে পরিচালক কথা বললেন, ‘আমরা এতক্ষণ চিত্রনাট্যটি শুনলাম। এখন আপনাদের অভিমত আমি জানতে চাই।’

প্রথমে কেউ কিছু বলছিলেন না। কিন্তু যেই একজন শুরু করলেন তখন সবাই মুখ খুললেন। সবাই স্বীকার করলেন, খুব জমজমাট চিত্রনাট্য হয়েছে। এটা না থাকলে বোধহয় আর একটু গতি বাড়ত। একজন বললেন, ‘ছবির শেষদিকে একটু যেন স্লো।’ এইসব কথা স্তিমিত হয়ে এলে সুকুমারবাবু বললেন, ‘এবার আমরা লেখকের কথা শুনতে আগ্রহী। বলুন অমিতবাবু।’

অমিত হাসল। বলল, ‘সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র একদম পৃথক দুটি মাধ্যম। এখানে গল্প থেকে চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে। রুটি বা পরোটা তো আটা থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু পরোটার মধ্যে শুকনো আটা যারা খোঁজেন তারা—।’ কথা শেষ না করে হাসল অমিত।

সঙ্গে সঙ্গে সুকুমারবাবু বললেন, ‘চমৎকার, চমৎকার বলেছেন!’ তারপর গলা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শুনে কেমন লাগল?’

‘আমার তো কোনও অভিজ্ঞতা নেই, ছবি দেখে বলব কেমন লেগেছে।’ খুব সাধারণ গলায় কথাগুলো বলল অমিত।

‘সাধারণত, অনেক লেখকই চান তাঁর লেখা নিয়ে ছবি হোক। কিন্তু ছবি হওয়ার পরে তাঁদের বেশিরভাগেরই মনে হয় গল্পটা অনুসরণ করা হয়নি। তাঁরা ভুলে যান, দুটো মিডিয়া একদম আলাদা। আপনাকে ধন্যবাদ।’ বললেন সুকুমার। সবাই একমত হল। তারপর চা পানের পর্ব মিটে গেলে সবাই যে যার গন্তব্যে ফিরে গেলেন। অমিত যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু পরিচালক বললেন, ‘আপনার সঙ্গে এই ছবির প্রযোজকের আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়নি। ইনি সূর্যশেখর দত্ত, ছবিটি প্রযোজনা করছেন।’

অমিত দেখল ভদ্রলোক করমর্দনের জন্যে হাত বাড়ালেন। সেই পর্ব শেষ হলে সূর্যশেখর বললেন, ‘আপনার কাছে আরও লেখা আমরা আশা করছি। ও হ্যাঁ, এটা রাখুন।’

একটা খাম এগিয়ে দিলেন ভদ্রলোক।

‘কী ব্যাপার?’ অবাক হল অমিত।

‘অগ্রিম আর ট্যাক্স বাদ দিয়ে বাকি টাকার চেক। এখানে একটা সই করে দিলে হবে।’ একটা কাগজ এবং কলম ভদ্রলোক দিলে অমিত সই করে দিল।

এখন ঘরে পরিচালক, প্রযোজক এবং সহকারী পরিচালক এবং অমিত ছাড়া কেউ নেই।

অনেকক্ষণ থেকেই মনে আসছিল, কীভাবে বলবে ভেবে পাচ্ছিল না অমিত। যতই সে স্থির করে আসুক নাক গলাবে না তবু মৃণালের মাসিমার মুখটা মনে পড়ছিল। এতকাল ভদ্রমহিলার সঙ্গে তার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই কথাও তো ফেলতে পারছে না।

‘কিছু বলবেন?’ সুকুমার জিজ্ঞাসা করলেন।

‘হ্যাঁ। আমি একজন মহিলাকে চিঠি দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম—।’

হাত তুলে অমিতকে থামতে বললেন সুকুমার। তারপর বললেন, ‘সেই মহিলা এসেছিলেন। আমি এসব দায়িত্ব সাধারণত সহকারীদের ওপর দিয়ে দিই। কিন্তু আপনার চিঠির জন্যে ওর সঙ্গে কথা বলে মনে হল একটা সুযোগ দেওয়ার আগে পরীক্ষা করাই যেতে পারে। বলার ধরন বেশ ভালো।’ বলেই সুকুমার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মেয়েটি বলল আপনি ওর মাসিমার দিকের আত্মীয়। তাই?’

হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিল অমিত। মাথা নাড়ল। যার দুটো অর্থই হয়।

‘খুব ভালো। মেয়েটির স্ক্রিনটেস্ট নেওয়া হলে আমাদের বেশ ভালো লেগেছে। ওকে ছবিতে কাজ দেব বলে স্থির করেছি। তবে প্রথম ছবিতেই নায়িকার ভূমিকায় ওকে টেস্ট না করে অর্পনার চরিত্রে ভেবেছি। কাজ করার ভালো সুযোগ আছে। আমি ওর সঙ্গে পারিশ্রমিকের ব্যাপারে কোনও কথা বলিনি। আপনার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নেব ভেবেছি।’ সুকুমার বললেন।

মাথা নাড়ল অমিত, ‘আপনার ছবিতে কাজ করে ও যা পারিশ্রমিক পাবে তা আমার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা সঙ্গত হবে না। এই ব্যাপারটা আমি একদম বুঝি না। আর একটা কথা, আমি কিন্তু মেয়েটির অভিভাবক নই।’

‘ও। তাহলে—!’

‘এই ব্যাপারটা নিয়ে ওর সঙ্গেই কথা বললে ভালো হয়।’

.

সুকুমারবাবু অমিতের আপত্তি শুনতে চাইলেন না, তাঁর গাড়ি ওকে আমহার্স্ট্র স্ট্রিটে পৌঁছে দিল। ঘরে ঢুকে দেখল তার রুমমেট শীর্ষাসন করছেন। তার ব্যাঙ্ক সন্ধে সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকে। অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ে ব্যাঙ্ক তাকে যে চেক বই দিয়েছিল তার একটা পাতায় যা যা লেখার তা লিখে চেকটাকে আলপিন দিয়ে আটকে মেসের বাইরে পা বাড়াল সে। তার ব্যাঙ্ক বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে। আশি হাজার টাকার চেকটা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দিলে একটা ঝামেলা দূর হয়।

ফুটপাত দিয়ে সে যখন হাঁটছিল ঠিক তখন তার পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওটা বের করে কানে চাপতেই মৃণালের গলা শুনতে পেল সে।’ অনেক ধন্যবাদ।’

‘কী জন্যে?’

‘ইচ্ছে করলেই মাসিমার হয়ে ওকালতি করতে পারতেন, সেটা করেননি। তাহলে আমি আপনার গল্পের একটা চরিত্র হচ্ছি। এবার মাসিমা আপনাকে খারাপ চোখে দেখবেন। কী করা যাবে! রাখছি।’ লাইন কেটে দিল মৃণাল।

.

শ্যুটিং যেদিন হবে তার আগের দিন সুকুমারবাবু ফোন করেছিলেন, ‘আগামী কাল এন টি ওয়ানের স্টুডিয়োতে কাজ শুরু করছি। আপনি এলে ভালো লাগবে।’

বিপাকে পড়ল অমিত। আগামীকাল স্কুলের সিনিয়ার ক্লাসগুলোর বাংলা বাৎসরিক পরীক্ষা। তাকে বিকেল চারটে পর্যন্ত স্কুলে থাকতেই হবে। কিন্তু তার গল্পের প্রথম ছবির শুরুর দিনটায় উপস্থিত থাকার ইচ্ছে এত প্রবল হয়ে উঠল যে, অমিত স্থির করল ঘণ্টা দেড়েকের ছুটি নিয়ে সে স্টুডিয়োতে যাবে, কিছুক্ষণ শ্যুটিং দেখেই স্কুলে ফিরে যাবে। সে যদি হেডমাস্টারকে ব্যাপারটা বলে তাহলে নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না। ভদ্রলোক একেবারেই প্রাচীনপন্থী নন।

কিন্তু সে যখন তৈরি হয়ে মেস থেকে বের হচ্ছে তখন তার ফোন জানান দিয়ে উঠল, নাম দেখে অবাক হল। ফোন অন করে সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, বলুন।’

‘আজ আমার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। আপনার সৌজন্যে আমি আজ নতুন জীবনের দিকে এগোচ্ছি। আমার নমস্কার নেবেন।’ স্পষ্ট বাংলায় বলল মৃণাল। বলেই লাইন কেটে দিল, যেন সব কথা তার বলা হয়ে গেছে।

স্কুলে যেতে যেতে অমিত ভাবনার বদল করল। না, সে আজ শ্যুটিং দেখতে যাবে না। অবশ্য আজই মৃণালের কাজ আছে কি না তা জানা নেই। না থাকলেও সে উপস্থিত থাকতেই পারে। ওদের পারিবারিক সমস্যার মধ্যে সে আর জড়াতে চায় না। এমনিতেই হেডমাস্টারের অনুমতি নিয়ে শ্যুটিং দেখতে যাওয়ার জন্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল। না গেলে হেডমাস্টারের অনুমতি নিতে হবে না, পরীক্ষার সময় ছেলেদের পাশেই থাকা যাবে।

স্কুলে পৌঁছে অমিত সুকুমারবাবুকে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করল। যেহেতু আজ ছেলেদের বাৎসরিক পরীক্ষা তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে যেতে পারছে না। কিন্তু ছবির জন্যে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।

.

মাঝে-মাঝেই বিভিন্ন কাগজে সুকুমারবাবুর সিনেমার সংবাদ ছাপা হতে দেখেছে অমিত। কিন্তু পরিচিত নায়ক নায়িকার নামের সঙ্গে সে মৃণালের নাম দেখতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি বিখ্যাত দৈনিকের সিনেমার পাতায় এই ছবির নায়ক-নায়িকা এবং মহানায়িকার যে ছবি ছাপা হল তা দেখে অবাক হয়ে গেল সে। ছবির ক্যাপশনে মৃণালের বদলে লেখা হয়েছে, নবাগতা অমৃতা। অর্থাৎ মৃণাল সিনেমার অভিনেত্রী হতে গিয়ে নিজের নাম বদল করেছে। তা সে করতেই পারে কিন্তু এত নাম থাকতে অমৃতা কেন? ইচ্ছে করে অমিতকে বিব্রত করতে?

এসব ব্যাপার থেকে মন সরিয়ে অমিত তার গবেষণার কাজে মন দিল। খুব ভালো এগোচ্ছে কাজটা। অধ্যাপকও খুশি। অমিতের লেখা গল্প নিয়ে ছবি হচ্ছে জেনে ভদ্রলোক খুশি হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন ‘লোক তোমার গল্পের চিত্ররূপ দেখবে এটুকু খুব আনন্দের। আবার যদি ছবি ভালো না হয় তাহলে কিন্তু দোষ দেবে তোমাকেই। বলবে, ওই গল্পটাই ভালো ছিল না। আর যদি ছবি সফল হয় তাহলে পরিচালকের নামই হবে। ব্যাপারটা খুব সাময়িক, এটা মনে রেখো।’

এইসব কথা শোনার পর মাথা থেকে শ্যুটিং দেখার আগ্রহ চলে গেল। এমনকী ওঁরা যখন আউটডোরে শ্যুট করতে কুচবিহারে গেলেন তখন আমন্ত্রিত হয়েও এড়িয়ে গেল সে। তার ফলে বাবার চিঠি এল। বাবা লিখলেন, ‘আমি সবাইকে বলেছিলাম তুমি যে গল্প লিখেছ সেটা সিনেমা হচ্ছে। তাই সেই সিনেমার লোকজন কুচবিহারের রাস্তায়, রাজবাড়ির সামনে যখন ছবি তুলছিল তখন সবাই তোমার খোঁজ করছিল। তুমি আসোনি তাই এই সিনেমার গল্প সত্যি তোমার রচনা কিনা তাতে সবাই সন্দেহ প্রকাশ করছিল। আমার মুখ রক্ষা করলেন এই সিনেমার একজন অভিনেত্রী যিনি শ্যুটিং করতে দলের সঙ্গে এসেছিলেন। অমৃতা বাড়িতে এসে আমার এবং তোমার মায়ের আশীর্বাদ প্রণাম করে নিয়ে গেছে। শুনলাম মেয়েটি এই প্রথম সিনেমায় নেমেছে তাই এখনও অহঙ্কারী হয়নি। যা হোক, সে আমার বাড়িতে আসায় কুচবিহারের মানুষ বিশ্বাস করেছে সিনেমার গল্প তোমার লেখা।

চিঠি পড়ে অবাক হল অমিত। মৃণাল শ্যুটিং করতে দলের সঙ্গে কুচবিহারে যেতেই পারে কিন্তু তার বাড়িতে যাওয়ার তো কোনও কারণ নেই। এটা যেন ইচ্ছে করেই তাকে খোঁচা দেওয়া। বাবা লেখেনি, তাই জানা যাচ্ছে না, কুচবিহারের বাড়িতে গিয়ে মৃণাল তাকে নিয়ে কোনও গল্প তৈরি করে বলেছে কিনা। আর কিছু নয়, শুধু ওর কলেজের সামনে বাসস্টপে সে গায়ে পড়ে কথা বলতে গিয়েছিল কয়েকবছর আগে এই কথা যদি কুচবিহারের বাড়িতে জানিয়ে দিয়ে আসে তাহলে বাবা আর কখনই তার মুখ দেখবেন না। কিন্তু বাবা এই যে চিঠিটা লিখেছেন তা পড়ে মনে হচ্ছে মৃণাল তার সম্পর্কে বিরূপ কথা বলে আসেনি।

শ্যুটিং-এর পরে দল ফিরে এসেছিল কলকাতায়। মৃণাল আর তাকে ফোন করেনি। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল অমিত। কিছুদিন পরে সকালে ফোন এল সুকুমারবাবুর। বললেন, ‘কী ভাই, চিত্রনাট্য যে পছন্দ হয়নি তা নীরব থেকে বুঝিয়ে দিলেন!’

‘না, না, একথা কেন বলছেন?’ অস্বস্তিতে পড়ল অমিত।

‘তাহলে অন্তত একদিন শ্যুটিং দেখতে তো আসতে পারতেন। যাক, ছবি তো তৈরি হয়ে গেছে। সামনের মাসে মুক্তি পাবে। তবে তার আগে আমরা একটা ক্লোজডোর শো করাচ্ছি। এসে দেখে বলুন কী রকম লাগল।’ পরিচালক বললেন। শো কোথায় কখন হচ্ছে জেনে নিয়ে অমিত জানিয়ে দিল, সে যাবে।

কিন্তু শো-এর আগের দিন মনে হল, ওখানে তো মৃণাল থাকবে। সে যদি কুচবিহারে গিয়ে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারে তাহলে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে? সে তখন কী করে এড়িয়ে যাবে ওকে; সেটা করলে আর কারও না হোক সুকুমারবাবুর চোখে তো পড়বেই। শেষপর্যন্ত অমিত ঠিক করল সে মৃণালকে দেখেও না দেখার ভান করবে। মুখোমুখি হলে, এড়াতে না পারলে দেঁতো হাসি হাসবে। এইটুকু।

ধর্মতলার একটি বড় সিনেমা হলের ওপরে যে একটি প্রজেকশন রুম আছে তা জানা ছিল না অমিতের। পরিচালক মশাই তাকে দেখে এগিয়ে এসে হাত ধরে নিজের আসনের পাশের আসনে বসালেন। ইচ্ছে করেই অমিতকে স্বস্তি দিয়ে ছবি শুরু হল। সুকুমারবাবুর মুন্সিয়ানা স্বীকার করতেই হয়। মাঝে মাঝে যেখানে তিনি মৃদু গল্পের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন সেখানে সেটা জোর করে বানানো বলে মনে হচ্ছিল না। ছবি শেষ হলে সবাই যখন সোৎসাহে হাততালি দিচ্ছিল তখন সুকুমারবাবু অমিতকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বলুন?’

ভদ্রলোক ডান হাত চেপে ধরে অমিত বলল, ‘খুব উপভোগ করলাম!’

‘আপনার গল্পের অমর্যাদা করিনি তো?’

‘আমার তো মনে হয়নি।’

‘ব্যস। এর চেয়ে বেশি আমি কিছু চাই না।’ খুশি হলেন সুকুমারবাবু। তারপর তিনি মঞ্চে উঠলেন। সীমিত দর্শক সত্ত্বেও উচ্ছ্বাসের যেন বন্যা বইল। হাত ওপরে তুলে সবাইকে শান্ত করে পরিচালক বললেন, ‘এই ছবি তৈরি করতে যাঁরা আমাকে সাহায্য করেছেন তাঁদের আমি মঞ্চে আহ্বান করছি। এই ছবি তৈরি করা সম্ভব হত না যদি এর কাহিনি শ্রীঅমিত মিত্র না লিখতেন। অমিতবাবু তরুণ লেখক, আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।’ হাত তুলে নমস্কার করলে দর্শকরা অমিতকে আবার অভিনন্দন জানালেন। এক এক করে নায়ক, নাকিয়া এবং বিভিন্ন কলাকুশলীদের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দিলেন পরিচালক। অমিত অবাক হয়ে দেখল মঞ্চে মৃণাল উঠে আসেনি। শিল্পীদের সঙ্গেও তাকে দেখা যায়নি।

পরিচয় পর্ব শেষ হলে পরিচালক এগিয়ে এলেন অমিতের কাছে। ‘আচ্ছা, আপনি কি জানেন মৃণালের ঠিক কী হয়েছে?’

‘কেন? ও কি আজ আসেনি?’ জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘না। এলে সে নিশ্চয়ই মঞ্চে পরিচয়-পর্বে উঠে আসত। সে গতকাল ফোন করে জানিয়েছে শরীর খারাপ হওয়ায় আজ আসতে পারবে না। ব্যস্ততার জন্যে ওর খবর নেওয়া হয়নি। তাহলে আপনার কিছুই জানা নেই!’

মাথা নেড়ে না বলল অমিত।

জীবনের প্রথম ছবি, যে ছবিতে কাজ করার জন্যে মৃণাল মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তৈরি হয়ে যাওয়ার পর এমনকী অসুস্থ হয়ে পড়ল যে আজ থাকতে পারল না! পরিচালক তো ভাবতেই পারেন, যে মহিলাকে অমিত সুপারিশ করেছিল তার কোনও খবরই সে রাখে না। ছবিতে মৃণাল যা অভিনয় করেছে তাতে মনেই হয়নি ও প্রথম ছবিতে কাজ করেছে। বোঝাই যাচ্ছিল, পরের ছবিতেই মৃণাল নায়িকার ভূমিকা পেয়ে যাবে।

মেসে ফিরে এসে অমিত মৃণালকে ফোন করল। ফোনের সুইচ বন্ধ করে রেখেছে মৃণাল! আধঘণ্টা পরেও ফোন করে দেখল কোনও পরিবর্তন হয়নি। তখন মনে হল, মৃণালের মাসিমাকে জিজ্ঞাসা করবে কি না! কিন্তু সে ফোন করল না। খামোখা কু-কথা শোনার কোনও মানে হয় না।

ছবি মুক্তি পেল। নায়ক ও দুই নায়িকার ছবিতে শহর ছেয়ে গেল। ইদানীং বাংলা ছবিতে তেমন ভিড় হচ্ছিল না। কিন্তু এই ছবির জন্যে প্রথম সপ্তাহ থেকে সেই যে হাউসফুল বোর্ড ঝুলল তা সহজে নামবে বলে মনে হচ্ছিল না। একদিন সুকুমারবাবু ফোন করলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো, মৃণাল ফোন ধরছে না, বাড়িতে লোক পাঠালে বলে দিচ্ছে অসুস্থ, দেখা করতে পারবে না। লুকিয়ে সিনেমা হলে সিনেমাটা যদি না দেখে থাকে তাহলে বলতে হবে আচমকা নির্লিপ্ত হয়ে গিয়েছে। কী ব্যাপার আপনি জানেন?’

‘না। আমি তো জানি না।’ অমিত বলল।

‘আশ্চর্য ব্যাপার। আচ্ছা, আপনি তো মৃণালকে সুপারিশ করে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে ওর সম্পর্কে কোনও তথ্যই আপনি জানেন না। ব্যাপার হচ্ছে, আমি পরের ছবি শুরু করতে চলেছি। প্রযোজক চাইছেন, আমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে মৃণালকে নায়িকার চরিত্রে কাস্ট করি। কিন্তু যদি তার সঙ্গে যোগাযোগ না করা যায় তাহলে তো অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারি না।’ ভদ্রলোকের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। আচমকা ফোন রেখে দিলেন।

অমিত ভেবে পাচ্ছিল না, তার কী করা উচিত। শেষ পর্যন্ত সে শনিবার বিকেলে মাসিমার বাড়িতে গেল। গিয়ে শুনল—সেই অল্প বয়সি কাজের মেয়েটিই জানাল, মাসিমা তাঁর দিদি এবং জামাইবাবুর সঙ্গে হরিদ্বার-কেদার-বদ্রীতে তীর্থ করতে গিয়েছেন। সঙ্গে আর কেউ গিয়েছে কিনা জানতে চাইলে মেয়েটি জানাল, সে জানে না।

এবার অমিত সোজা পৌঁছে গেল মৃণালের বাড়িতে। কাজের লোক জানিয়ে দিল বাড়ির কর্তা গিন্নিমা আর তার বোনকে নিয়ে তীর্থ করতে গিয়েছেন। ফেরার সময় কয়েকদিন দিল্লিতে থেকে আসবেন।

একটু ইতস্তত করে অমিত জানতে চাইল বাড়িতে মৃণাল আছে কি না। লোকটি মাথা নাড়ল। ‘সিনেমায় নামার পর থেকে দিদি আর এই বাড়িতে থাকেন না। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হলে এই নাম্বারে টেলিফোন করবেন।’

একটু ফাঁকা জায়গায় এসে সেই নাম্বারে ফোন করল অমিত। সেটা বেজে বেজে থেমে গেলে হতাশ হল সে। আর একবার মরিয়া হয়ে চেষ্টা করল। এবার ফোন যে ধরল তাকে অমিত পরিষ্কার বলল, ‘মৃণালকে বলুন, অমিত ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।’

একটু পরেই অমিত মৃণালের গলা পেল, ‘বলুন।’

‘আমি অমিত বলছি।’

‘তা তো আপনি কাজের লোককে একটু আগেই বলেছেন।’

‘সুকুমারবাবু আমাকে ফোন করেছিলেন। উনি নাকি কিছুতেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।’

‘আমি তো তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিই নি, যে তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেই আমি কথা বলব!’ মৃণাল বলল।

‘উনি তোমাকে ওঁর পরের ছবির নায়িকার চরিত্রে ভাবছেন।’

‘ভাবতেই পারেন।’

‘আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।’

‘আশ্চর্য ব্যাপার! কে কী ভাবছে তা সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব আমাকে কেন নিতে হবে? সেরকম কথা কি আমি দিয়েছিলাম?’ বেশ ঝাঁঝিয়ে কথাগুলো বলল মৃণাল।

একটু মিইয়ে গেল অমিত, ‘তাহলে তুমি আর অভিনয় করতে চাইছ না?’

‘না। অন্তত এখন নয়।’

‘কিছু মনে কোরো না, জানতে পারি কি কেন এরকম সিদ্ধান্ত নিলে?’

‘যেদিন বুঝব আপনি আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত নেওয়ার যোগ্য মানুষ সেদিন নিশ্চয়ই কৈফিয়ত দেব।’ মৃণাল বলল।

‘আমি একটা কথা বুঝতে পারছি না, ফিল্মে সুযোগ পাওয়ার জন্যে তুমি একটা সময় মরিয়া হয়ে উঠেছিলে, সুযোগ পাওয়ার পর এরকম নির্লিপ্ত হয়ে গেলে কেন?’

‘আপনার কী মনে হয়?’ এবার আলতো হাসল মৃণাল।

‘আমি বুঝতে পারছি না, আমি তো কোনও কারণ দেখছি না—!’

‘তাহলে আর বুঝতে চেষ্টা করবেন না। হাসল মৃণাল, ‘এবার রাখি।’

‘কিছু মনে কোরো না, তোমার সামনে কিন্তু সুবর্ণ সুযোগ আছে।’

সাড়া পেল না অমিত। তিনবার হ্যালো বলে বুঝল মৃণাল লাইন কেটে দিয়েছে। কেন?

এই প্রশ্নটা কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছিল না। সাফল্যের প্রায় চুড়োর কাছে এসে কেউ কি চুপচাপ সরে যায়? এখনও পশ্চিমবাংলায় বিভিন্ন শহর ছাড়াও গৌহাটিতে মৃণালের ছবি রমরমিয়ে চলছে। অমিত কুচবিহারের তার বাড়িতে ফোন করেছিল। দুটো কথার পর মা উত্তেজিত হয়ে বললেন, পাশের বাড়ির মাসিমার সঙ্গে তিনি ছেলের গল্প নিয়ে তৈরি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। সেই সিনেমায় তাঁর বাড়িতে দেখা করতে আসা মৃণালের অভিনয় দেখে খুব ভালো লেগেছে। মনে হয়েছিল, নায়ক যদি নায়িকার বদলে ওকেই বিয়ে করত তাহলে তার বেশি ভালো লাগত। যেমন মিষ্টি দেখতে তেমনি মিষ্টি ওর কথা বলার ভঙ্গী।

কথাগুলো শুনে অমিতের মনে হল, মায়ের কথাগুলো চুপচাপ মেনে নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে বিতর্ক না করাই ভালো।

.

পৃথিবীটা চুপচাপ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে কলকাতায় হোর্ডিং, রাস্তার দু’পাশের দেওয়াল থেকে তার গল্পের ছবির অস্তিত্ব মুছে গেল। বাংলা চলচ্চিত্রে একজন সম্ভাবনাময় নায়িকা আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেলেন, একথা নিয়ে বেশিদিন চর্চা হল না।

অধ্যাপকের অনুপ্রেরণায় গবেষণা শেষ করল অমিত। সেটা জমা দেওয়ার পরেই স্কুল থেকে তাকে জানানো হল, যে শিক্ষক ছুটিতে গিয়েছিলেন তিনি ফিরে আসছেন। তবে তিন মাস পরে আর একজন শিক্ষকের ছুটির সময়ে সে আবার কাজে যোগ দিতে পারে।

এইসময় একটি অভাবনীয় সুযোগ পেয়ে গেল অমিত। অধ্যাপকের সাহায্যে জলপাইগুড়ির ডি সি কলেজে লিভ ভ্যাকেন্সিতে এক বছরের জন্যে লেকচারারের চাকরি পেয়ে গেল অমিত। জলপাইগুড়ি থেকে কুচবিহার বাসে চেপে কয়েকঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। জলপাইগুড়িতে পৌঁছে সে হোটেলে উঠল ইন্টারভিউ-এর আগের দিন। বিকেলে রিকশায় বসে সমস্ত শহর ঘুরে দেখল সে। তিস্তা নদীর গায়ে বাঁধের দিকে তাকাতেই তার মনে পড়ল দেবেশ রায়ের লেখা ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসটির কথা। শহরটাকে ভালো লেগে গেল তার।

ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে মনে মনে সুকুমারবাবুকে ধন্যবাদ দিল সে। তাঁর লেখা গল্প নির্বাচকরা পড়েননি এটা সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল কিন্তু ওঁরা সুকুমারবাবুর তৈরি সিনেমা দেখেছেন এবং সেই সিনেমা তার গল্প অবলম্বনে তৈরি হয়েছে এই খবরও জানেন। শুধু একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি এমন একটি গভীর বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, তারপরেও সিনেমার জন্যে গল্প লিখেছেন কী করে তা যদি আমাদের বলেন—!’

মাথা নেড়েছিল অমিত, ‘আমি সিনেমার জন্যে গল্প লিখিনি।’

‘সেকি! আপনার লেখা গল্পের ওপর তো সিনেমা হয়েছে!’

‘হ্যাঁ, তা হয়েছে। আমি যখন গল্পটি লিখেছিলাম তখন তো সিনেমার কথা মাথায় ছিল না। সিনেমাজগতের কাউকেই আমি চিনতাম না। ওই গল্প প্রকাশিত হলে পরিচালক তা পড়ে মনে করেন, সিনেমায় আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারবেন। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেন। কথা বলে গল্পের চিত্রসত্ত্ব কিনে সিনেমাটি তৈরি করেন। গল্প লেখার সময় আমি কল্পনা করিনি ওটা নিয়ে কেউ সিনেমা তৈরি করবেন।’ অমিত বলল।

ভদ্রলোক একটু হতাশ হলেও অমিত চাকরিটা পেয়ে গেল।

অধ্যাপকদের মেসে জায়গা ছিল। হেঁটেই কলেজে যাওয়া আসা করা যায়। শনিবার দুপুর দুটোয় ছুটি হলে কুচবিহারের বাসে চেপে সে সোজা বাড়িতে চলে যায়। দুটো রাত বাড়িতে থেকে সোমবার সকালেই জলপাইগুড়িতে ফিরে এসে আবার ক্লাস করে। এই জীবন যাপন করতে মন্দ লাগে না তার।

মা চাপ দিচ্ছিলেন, এবার তাকে বিয়ে করতে। নানান সূত্রে তাঁর কাছে সুপাত্রীদের খবর আসছিল। কিন্তু বাবা রাজি নন। এখন অমিত একটার পর একটা টেম্পোরারি চাকরি করছে। চাকরি চলে যাওয়ার পর বউকে খাওয়াবে কী? গল্প লিখে যা পায় তা দিয়ে সংসার চালানো যায় না। আর তার ওই একটাই গল্প সিনেমা হয়েছে। লিখলেই যে সিনেমা হয় না তা তো স্পষ্ট। তাই যতদিন না ছেলে পাকা চাকরি পাচ্ছে তদ্দিন বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না।

বাবার এই সিদ্ধান্তে খুশি হল অমিত। দীর্ঘদিন হয়ে গেল, কিন্তু কিছুতেই ফোনে শেষবার যে কথা মৃণালের সঙ্গে হয়েছিল তা সে ভুলতে পারছে না। যতদিন গেছে ততদিন তার মনে হয়েছে, মৃণাল যা বলতে চেয়েছিল তার আসল মানেটা বুঝতেই পারেনি সেদিন। কিছু সময় ব্যবধানে রেখে সে ওই নাম্বারে ফোন করেছিল, কিন্তু মৃণাল আর ফোন ধরেনি।

যেদিন তার থিসিস স্বীকৃতি পেল সেদিন সে পুজোর উপন্যাসের শেষ পর্ব লিখতে ব্যস্ত ছিল। খবর পেয়েই সে অধ্যাপককে ফোন করে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাল। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমিই তোমাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম, তুমি সামনের রবিবারের মধ্যেই কলকাতায় চলে এসো। আর হ্যাঁ, আসার আগে কলেজকে জানিয়ে এসো তোমার পক্ষে আর জলপাইগুড়িতে থাকা সম্ভব নয়।’

Chapter - 9

তিনজন নামী প্রকাশক, বই-এর সংখ্যা ষাট ছাড়িয়ে গিয়েছে। কলকাতার নামী কাগজগুলোর শারদীয়ায় তাঁর লেখা না থাকলে পাঠকরা খুশি হয় না। সল্টলেকে ছিমছাম দোতলা বাড়ি, একফালি বাগান।

বয়স পঞ্চান্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামী অধ্যাপক। তাঁর ক্লাস করতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও চলে আসে। পড়ানোর বাইরে লেখা নিয়েই অমিতের সময় দিব্যি যায়। বাবা গত হয়েছেন অনেকদিন হয়ে গেল। কুচবিহারের বাড়ি তালাবন্ধ থাকে। বৃদ্ধা মা অমিতের কাছে কলকাতায়।

মায়ের ইচ্ছে পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। ব্যাপারটা অদ্ভুত ধরনের।

তার তখন গোটা চারেক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতার কলেজের অধ্যাপক সে। পাত্র হিসেবে অবশ্যই চাহিদা তুঙ্গে। মায়ের বাপের বাড়ির সূত্রে সম্বন্ধটা এসেছিল। মেয়ে সুন্দরী এবং ইতিহাসে এম.এ করেছে। দু-পক্ষের দেখাদেখি হয়ে যাওয়ার পর সব যখন স্থির ঠিক তখন অমিত মেয়েটির ফোন পেল। বিয়ের আগে হবু স্বামী-স্ত্রীর দেখা করা এখন রেওয়াজ হয়ে গিয়েছে। অমিত সেরকম প্রস্তাব পাবে বলে ভেবেছিল।

কিন্তু মেয়েটি টেলিফোনেই বলল, ভণিতা না করেই বলছি। অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। সরাজীবন ধরে একটা গ্লানি বয়ে বেড়াতে আমি পারব না। শুনুন, আপনাকে অনুরোধ করছি, এই বিয়ে আপনি ভেঙে দিন।’

নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না অমিত। শুধু বলল, ‘হঠাৎ?’

‘তার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সাহসী হতে পারিনি। কিন্তু সময়টা যত এগিয়ে আসছে তত মনে হচ্ছে আমার পক্ষে তঞ্চকতা করা সম্ভব নয়। আপনি যদি রাজি না হন তাহলে আমার সামনে আত্মহত্যা করা ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা নেই।’ মেয়েটি বলেছিল।

‘কিন্তু কেন?’

‘আপনি না মানুষের মন নিয়ে গল্প লেখেন? হ্যাঁ, আর যাকে ভালোবাসি সে আপনার মতো সুপাত্র নয় তাই বাবার অপছন্দের। আর বেশি কিছু নিশ্চয়ই আপনাকে বলতে হবে না।’

‘আগেই যদি কথাগুলো বলতেন তাহলে ভালো হত। তবু আপনাকে ধন্যবাদ একেবারে না বলার চেয়ে দেরিতে হলেও বললেন। আপনি চিন্তা করবেন না। যা চাইছেন তাই হবে!’ অমিত বলেছিল।

হবু কনে চটপট ফোন রেখে দিয়েছিল।

শেষপর্যন্ত মায়ের পাশে বসে সত্যি কথাটা তাঁকে বলেছিল অমিত। শুনে মায়ের চোখ যেন কপালে উঠেছিল। সেকি রে! কী হচ্ছে দিন দিন। তা মেয়েটা তো অনেক আগেই বাড়িতে এসব বলতে পারত।’

‘বাবার ভয়ে বলেনি।’

‘না না বাবা, এরকম মেয়েকে জোর করে এই বাড়িতে নিয়ে আসা উচিত হবে না। শরীর থাকবে এখানে, মনে পড়ে থাকবে সেখানে। কোনও দরকার নেই।’ মা স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন।

অথচ ঘটনাটি একেবারে বদলে গেল মুখে মুখে। গল্প তৈরি হচ্ছিল, তাতে যে যার ইচ্ছেমতো কল্পনা যোগ করছিল। শেষতক এই দাঁড়াল, গোপন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন মেয়েটির বাবা। জেনেছিলেন, অমিত শারীরিক ত্রুটির কারণে কখনই পিতা হতে পারবে না। গল্প ছড়াল, প্রচণ্ড অপমানিত হয়ে মেয়েটি নাকি ফোনে ভাবী পাত্রকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি নিশ্চয়ই জানতেন যে, বাবা হওয়ার ক্ষমতা আপনার নেই, তারপরেও বিয়ের জন্যে মুখ থেকে লালা পড়ছিল কেন? এর জবাব দিতে পারেনি পাত্র।

সেই বিখ্যাত লাইনটি সত্যি হল। দিকে দিকে এই বার্তা রটে গেল ক্রমে—! আরও যেসব বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল তাঁরা দ্রুত নীরব হলেন। মা অনেক চেষ্টা করেও ছেলের জন্যে পাত্রী জোগাড় করতে পারলেন না। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল অমিত।

কখনো বিয়ে করবে না এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি অমিত। সে বোঝে, তার মায়ের বয়েস বাড়ছে। এখন বাড়িতে ফিরে সে মায়ের সঙ্গে অনেকটা সময়ে গল্প করে কাটায়। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর তো সে একেবারে একা হয়ে যাবে। এই বাড়িতে তাকে থাকতে হবে কাজের মহিলার ওপর ভরসা করে। সে বিয়ে করবে না এমন পণ কখনই করেনি; কিন্তু ওই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বছর খানেক পরে এক ভদ্রলোক তাঁর অধ্যাপিকা মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব মাকে দিয়েছিলেন। ছবি দেখে মা খুব উৎসাহিত হন। কিন্তু মেয়ের বাবা মাকে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলে সম্পর্কে সব খবর মোটামুটি আমরা জানি; উনি একজন বিখ্যাত লেখক। কিন্তু আমার মেয়ের বিয়ে যার সঙ্গে আমি দিতে চাই সে যেন ভালো স্বামী হয়। আপনি কিছু মনে করবেন না, আপনার ছেলে বিয়ের পরে সুস্থ বিবাহিত জীবন যাপন করতে পারবে, সন্তানের পিতা হতে পারবে, এমন একটা সার্টিফিকেট যদি ডাক্তারের কাছ থেকে নিয়ে আমাকে পাঠান তাহলে আমি নিশ্চিন্তে বিয়ের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।’

চিঠিটা হাতে পাওয়ার পরে আর সেটা মাকে দেখায়নি অমিত। ভদ্রমহিলা যদি চাপে পড়ে ছেলেকে বলেন, ‘লোকের মুখ বন্ধ করতে ভালো ডাক্তারের দেখিয়ে সার্টিফিকেট এনে মেয়ের বাবাকে পাঠিয়ে দাও। সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।’ মায়ের মুখে ওইরকম কথা শোনার পরে সেটা এড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। আর মায়ের আদেশ মান্য করতে হলে সারাজীবন মাথা নীচু করে থাকতে হবে।

পঞ্চাশে পা দেওয়ার পর মা আর ছেলের বিয়ের আশা ছেড়ে দিলেন। পাশের প্রতিবেশী এক সমবয়সি মহিলার সঙ্গে তার কিছুটা সখ্যতা হয়েছিল। রোজ বিকেলে দুজনে গল্প করতেন। এক ভোরে প্রায় নিঃশব্দে ওঁরা দুজনে বেলুড়ে গিয়ে দীক্ষা নিয়ে এলেন।

আচমকা যেন জীবন বদলে গেল মায়ের। সকাল-সন্ধে রোজ কয়েকঘণ্টা তাঁর আরাধ্য গুরুদেব-গুরুমাতা এবং স্বামীজির ছবির সামনে বসে ধ্যান শুরু করলেন।

একদিন অমিত তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘দীক্ষা নিয়ে তুমি কেমন আছ মা?’

মা হেসে বলেছিলেন, ‘খুব শান্তিতে আছি বাবা।’

ইদানীং বিভিন্ন সাহিত্যসভায়, জেলার বইমেলায় এত আমন্ত্রণ আসছিল যে হাঁপিয়ে উঠছিল অমিত। ইতিমধ্যে তার আরও তিনটে উপন্যাস অবলম্বনে ছবি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি, লেখার চাপ সামলে নিজের জন্যে আলাদা করে কোনও সময় বের করার কথা অমিত ভাবত না।

এই সময় একটি বিখ্যাত পাঠাগারের কর্তাব্যক্তিরা এসে জানালেন তাঁরা তাকে সম্বর্ধনা জানাতে চাইছেন। অমিত এইসব অনুষ্ঠানে যেতে খুব অস্বস্তি বোধ করে। সে এড়িয়ে যেতে চাইলেও উদ্যোক্তারা নাছোড়বান্দা হওয়ায় রাজি হতে হল। অনুষ্ঠানটি হবে পাঠাগারের সামনে মঞ্চ তৈরি করে। তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়ার পরে দুজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী গান শোনাবেন।

নির্দিষ্ট দিনে উদ্যোক্তাদের দুজন গাড়ি নিয়ে এসে অমিতকে বেশ সমাদর করে নিয়ে গেল। যে অঞ্চলে গাড়ি যাচ্ছিল সেই অঞ্চলে বহুদিন বাদে এল অমিত। এর মধ্যে বাড়িঘরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, রাস্তাও বেশ চওড়া। যে গলির মুখে গাড়ি থেকে ওঁরা নামল তার গায়ের একটি বাড়িতেই বসার ব্যবস্থা হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরু হলে ডেকে নিয়ে যাবে ওরা।

বনেদি বাড়ির বসার ঘর। সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে নমস্কার করলেন, ‘আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি পাশের বাড়িতে থাকি।’

মাথা নাড়ল অমিত। এই কথা শুনে কী বলা যায় বুঝতে পারল না।

‘আমার এক জ্যেঠতুতো বোনকে আপনি বোধহয় চিনতেন।’

‘ও।’ সে কোনও প্রশ্ন করার আগেই পাশে দাঁড়ানো একজন বলল, ‘জানেন, আমি নর্থবেঙ্গলের ছেলে। আপনার লেখা পড়তে তাই খুব ভালো লাগে।’

‘নর্থ বেঙ্গলের কোথায়?’ অমিত জিজ্ঞাসা করল।

‘আলিপুরদুয়ার।’

অমিত প্রথম লোকটির দিকে তাকাল। জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার জ্যেঠতুতো বোনের নাম কী ভাই?’

‘মৃণাল। উনি একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু কী যে হল, তারপর থেকে আর করেননি।’

‘উনি তো আপনার দিদি বললেন, তাহলে আপনি আপনি করে কথা বলছেন কেন?’ হাসল অমিত।

‘উনি তো এখন প্রায় সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপন করেন, কারও সঙ্গে কথা বলেন না, তাই ওঁর সম্পর্কে কথা বলতে গেলেই আমরা আপনি আপনি আপনি বলে থাকি!’ লোকটি বলল।

‘হ্যাঁ, উনি বোধহয় আমার গল্প নিয়ে প্রথম যে ছবিটা হয়েছিল তাতেই অভিনয় করেছিলেন।’ অমিত বলল।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনার তাহলে মনে আছে?’ লোকটি কথা শেষ করতেই উদ্যোক্তারা হই-হই করে এসে অমিতকে অনুষ্ঠানমঞ্চে নিয়ে গেল। অমিত দেখল বেশ ভিড় হয়েছে। কিন্তু দর্শকদের মধ্যে কোনও পরিচিত বয়স্কা মহিলার মুখ নেই। সে ওপরের দিকে তাকাল। উত্তর কলকাতার বাড়িগুলো যেমন হয়। ছাদে ছাদে মহিলাদের ভিড়। তারা ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখবেন। না, তাদের কাউকেই বয়স্কা বলে মনে হল না।

হঠাৎ অমিতের খেয়াল হল। মৃণাল এখন কীরকম দেখতে হয়েছে তা সে জানে না। অন্তত তিরিশ বছর চলে গিয়েছে এর মধ্যে। দশ বছরেই মানুষের চেহারা কত অদলবদল হয়, এ তো তিরিশ বছর। যদি এতগুলো বছর মৃণাল গৃহবন্দী হয়ে থাকে তাহলে সে কীরকম এখন দেখতে হয়েছে আন্দাজ করা কী সম্ভব! সভাপতি এসে সামনে দাঁড়াতেই অমিত উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানাল।

অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়ে গেল। একটি মেয়ে সুন্দর গলায় রবীন্দ্রনাথের গাই গাইল। তারপর ক্লাবের সম্পাদক একটি জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। প্রচুর হাততালি পড়ল। সম্পাদক দর্শকদের জানালেন, আজ যাকে আমরা সম্বর্ধনা জানাচ্ছি তিনি ছাত্রাবস্থায় আমাদের পাড়ায় প্রায়ই আসতেন। আজ আবার এলেন।’

তারপর সভাপতি খুব কম কথায় তাঁর বক্তব্য রাখলেন। এর পরে সংস্থার পক্ষ থেকে নানান উপহারসমগ্রী দিয়ে অমিতকে শুভেচ্ছা জানানো হল। তারপরে সম্পাদক অমিতকে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন।

অমিত তার ভাষণ শুরু করল সংস্থা এবং সমবেত দর্শককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে। বলল, ‘উত্তর কলকাতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিবিড়। আমার জন্মস্থান কুচবিহার। কিন্তু তারপরে এই উত্তর কলকাতাতেই আমার জীবনের অনেকটা সময়ে কেটেছে। আমার গল্প যা নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের পটভূমিতেই। অনেকেই হয়তো জানে না সেই সিনেমায় একটি অন্যতম চরিত্রে এই অঞ্চলের একজন তরুণী অভিনয় করে সুনাম পেয়েছিলেন। তবে দুঃখের বিষয় সেই তরুণী আর কোনও ছবিতে অভিনয় করেননি। করলে বাংলা চলচ্চিত্র একজন সত্যিকারের প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীর অভিনয় দেখা থেকে বঞ্চিত হত না।’ এর পরে অমিত অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। বক্তৃতা শেষ হলে প্রচুর হাততালি পড়ল।

এরপর গানের আসর শুরু হবে বলে সম্পাদক অমিতকে সঙ্গে নিয়ে যে বাড়িতে প্রথমে এসে বসেছিল সেখানে চলে এলেন। অমিত কিছু খাবে না বললেও অন্তত এক কাপ কফি খেতে রাজি করালেন। ওদিকে গান শুরু হয়ে যাওয়ায় ঘরে চারপাঁচজন অমিতকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। অমিত তাদের মধ্যে সেই প্রৌঢ়কে দেখতে পেয়ে বলল, ‘আমি যাঁর বাড়িতে যেতাম তিনি বোধহয় আপনার মাসিমা। তাই কি?’

‘হ্যাঁ। আমার বাবারা ছিলেন দুই ভাই। উনি বড়জনের স্ত্রী, মানে জ্যোঠিমার বোন। আমরাও তাঁকে মাসিমা বলেই ডাকতাম। বছর দুয়েক আগে উনি মারা গিয়েছেন। তাঁর আগে আমার জ্যেঠিমা-জ্যাঠামশাই চলে গিয়েছেন। শুধু জ্যাঠতুতো দিদি এখনও বাড়িতে আছেন।’ লোকটি বলল।

‘কেমন আছেন উনি?’ শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল অমিত।

‘শরীর ভালো নয়। সবসময় পুজোআর্চা নিয়ে থাকেন, নয়তো ধর্মের বই পড়েন। আপনার গল্পের ওপর যে ছবি হয়েছিল তাতে উনি অভিনয় করেছিলেন। আমরা টিভিতে দেখেছি। সেই চেহারার সঙ্গে এখন কোনও মিল নেই।’ লোকটি বলল।

‘ও। বাইরে কোথাও যান না?’

‘একদম না। যাওয়া দূরের কথা, খুব প্রয়োজন হলে আমাদের কয়েকজন ছাড়া কারও সঙ্গে দেখাও আর করেন না।’

‘কেন?’ নিজের অজান্তে প্রশ্নটা মুখ থেকে বেরিয়ে এল অমিতের।

মাথা নাড়ল লোকটি, ‘ঠিক জানি না। ছেলেবেলা থেকে এইরকম দেখে আসছি।’

চা খেতে খেতে অমিত ভাবল, লোকটিকে বলবে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেতে। কিন্তু যে মহিলা জগৎসংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন, বাড়িতে গেলে তিনি তো দেখা করতে নাও পারেন! শুধু শুধু তাঁকে বিব্রত করার কী দরকার।

অমিত বাড়ি ফিরে এল।

.

কিছুদিন থেকেই অস্বস্তি হচ্ছিল। ডাক্তার বললেন, ‘হাসপাতালে চলুন, মাত্র একদিনের ব্যাপার। আজ ভর্তি হলে পরশু বাড়ি ফিরে আসতে পারবেন। তারপর দিন সাত-আট বিশ্রাম নিলে আর কোনও সমস্যা থাকবে না।

অমিত হেসে বলেছিল, ‘তাহলে যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে বাঁচতে হবে!’

ডাক্তার হেসে বললেন, ‘নড়ে যাওয়া দাঁত ফেলে দিয়ে আর্টিফিসিয়াল দাঁত লাগিয়ে মানুষ সারাজীবন তো দিব্যি খাওয়াদাওয়া করে থাকে, তাই না?’

সল্টলেকের একটি নার্সিংহোমে অমিতকে ভর্তি করা হল। খুব সহজভাবে তার বুকে যন্ত্র বসিয়ে দিলেন ডাক্তার।

তৃতীয় দিন বিকেলে সে বাড়িতে ফিরে যাবে। দুপুরের পর নার্স এসে জানাল তার একজন ভিজিটার আছে। নাম শুনে চিনতে না পেরেও অমিত লোকটিকে পাঠিয়ে দিতে বলল।

যে লোকটি তার ঘরে এল তাকে অমিত কল্পনাও করেনি। লোকটি হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘কাগজে আপনার খবরটা আজই পড়েছি। আমি তো রোজ এই নার্সিংহোমে আসছি, ভাবলাম যদি অনুমতি পাওয়া যায় তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা করব। এখন কেমন আছেন?’

‘এখন ভালো। আজই বাড়িতে ফিরে যাব। আপনি এখানে রোজ আসেন কেন? কোনও কাজের সূত্রে আসতে হয়?’ অমিত জিজ্ঞাসা করল।

‘না না। দিদি, মানে মৃণালদিদি এখানে ভর্তি আছেন। স্ট্রোক হয়েছে। বাঁ-দিকটায় কোনও সাড় নেই। তবু অদ্ভুত মনের জোর বলেই এখনও লড়াই করতে পারছেন। ক’দিন পারবেন ডাক্তারও বলতে পারছে না।’ লোকটি বলল।

বিষাদে আক্রান্ত হল অমিত। একটা বড় শ্বাস নিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওঁর সেন্স চলে যায়নি তো?’

‘অধিকাংশ সময়েই সেন্স থাকে না। তাবে মাঝে মাঝে বোধহয় আসে। তখন ওঁর হাতের আঙুলগুলো মুঠো হয়, যেন কিছু ধরতে চেষ্টা করে।’ লোকটি বলল।

অমিত এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল, ‘আমি কি ওঁকে দেখতে যেতে পারি?’

‘আপনি তো অসুস্থ। শুনলাম পেসমেকার বসানো হয়েছে। আপনি—?’

‘কোনও অসুবিধে হবে না।’

‘উনি তো কথা বলতে পারবেন না, আপনাকে চেনার ক্ষমতাও ওঁর নেই।’

‘আমি তো ওঁকে দেখতে যাব, দেখেই চলে আসব।’ উঠে দাঁড়াল অমিত।

Chapter - 10

১০

‘নার্সকে বলে লোকটির সাহায্য নিয়ে অমিত এগিয়ে গিয়ে দেখল, সে যে তলায় আছে সেই তলায় অন্যপ্রান্তে মৃণালের কেবিন। সে একা নয়, আর একজন বালিকা রয়েছে অন্য বিছানায়!

নাকে নল, চিৎ হয়ে হয়ে যে মহিলা শুয়ে আছেন তিনিই কি মৃণাল। না বলে দিলে চেনা সহজ ছিল না। বিছানার সঙ্গে শরীর যেন মিশে গিয়েছে; মুখের আদলও অনেক বদলেছে। দুটো চোখের পাতা বন্ধ। মৃণালের শীর্ণ দুটো হাত শরীরের দু’দিকে বিছানার ওপর পড়ে আছে। লোকটি একটা টুল টেনে খাটের পাশে দিলে অমিত বসে পড়ল।

বোঝাই যাচ্ছে, মৃণালের চৈতন্য নেই। নার্স পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারায় জানাল, কথা বলবেন না।

চোখ বন্ধ করল অমিত। কলেজ থেকে বের হয়ে বাসস্টপে দাঁড়ানো ফার্স্ট ইয়ারের মৃণাল, পার্কে সিগারেট খাওয়া মৃণালের মুখ আর ছবিতে সুযোগ পাওয়ার জন্যে তার কাছে অনুরোধ করতে আসা মুখের সঙ্গে এই মুখের কোনও মিল নেই। সময় জীবন থেকে কী এইভাবে সব কেড়ে নেয়।

নার্স বলল, ‘এবার আপনি চলুন স্যার।’

উঠতে গিয়ে মৃণালের মুঠো করা হাতের দিকে নজর যেতেই অমিত অবাক হয়ে দেখল আঙুলগুলো একটু একটু করে প্রসারিত হচ্ছে। হাতের চামড়ার রং প্রায় সাদাটে। ডান হাত বাড়িয়ে মৃণালের সেই প্রসারিত হাতের একটিতে হাত রাখল অমিত। কয়েক সেকেন্ড যেতেই মৃণালের হাত যেন নড়ে উঠল। তারপর সেটি মুঠো হয়ে যেতে অমিতের হাত সেই মুঠোর মধ্যে চলে গেল।

অমিতের মনে হল মৃণালের আঙুলগুলো তার পাঁচটা আঙুল আকড়ে ধরেছে। সে তাকাল। মৃণালের চোখ যেমন ছিল, তেমনই বন্ধ। শরীরের কোথাও বিন্দুমাত্র সাড় নেই।

কিন্তু সে মৃণালের রক্তের তাপ স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

( সমাপ্ত )