← Back

এবং হিমু

Chapter - 1

রাত একটা।

আমার জন্যে এমন কোনো রাত না—বলা যেতে পারে রজনীর শুরু। The night has only started. কিন্তু ঢাকা শহরের মানুষগুলি আমার মতো না। রাত একটা তাদের কাছে অনেক রাত। বেশির ভাগ মানুষই শুয়ে পড়েছে। যাদের সামনে SSC. HSC বা এজাতীয় পরীক্ষা তারা বই সামনে নিয়ে ঝিমুচ্ছে। নববিবাহিতদের কথা আলাদা—তারা জেগে আছে। একে অন্যকে নানান ভঙ্গিমায় অভিভূত করার চেষ্টা করছে।

আমি হাঁটছি। বলা যেতে পারে হনহন করে হাঁটছি। নিশিরাতে সবাই দ্রুত হাঁটে। শুধু পশুরা হাঁটে মন্থর পায়ে। তবে আমার হনহন করে হাঁটার পেছনে একটা কারণ আছে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কিছু হোটেল-রেস্টুরেন্ট এখন খোলা। কড়কড়া ভাত, টক—হয়ে-যাওয়া বিরিয়ানি হয়তো-বা পাওয়া যাবে। তবে খেতে হবে নগদ পয়সায়। নিশিরাতের খদ্দেরকে কোনো হোটেলওয়ালা বিনা পয়সায় খাওয়ায় না। আমার সমস্যা হচ্ছে, আমার গায়ে যে-পাঞ্জাবি তাতে কোনো পকেট নেই। পকেট নেই বলেই মানিব্যাগও নেই। পকেটহীন এই পাঞ্জাবি আমাকে রূপা কিনে দিয়েছে। খুব বাহারি জিনিস। পিওর সিল্ক। খোলা গলা, গলার কাছে সূক্ষ্ম সুতার কাজ। সমস্যা একটাই—পকেট নেই। পাঞ্জাবির এই বিরাট ত্রুটির দিকে রূপার দৃষ্টি ফেরাতেই সে বলল, পকেটের তোমার দরকার কী!

রূপবতী মেয়েদের সব যুক্তিই আমার কাছে খুব কঠিন যুক্তি বলে মনে হয়। কাজেই আমিও বললাম, তাই তো, পকেটের দরকার কী!

রূপা বলল, তুমি নিজেকে মহাপুরুষ-টাইপের একজন ভাব। মহাপুরুষদের পোশাক হবে বাহুল্যবর্জিত। পকেট বাহুল্য ছাড়া কিছু না। আমি আবার রূপার যুক্তি মেনে নিয়ে হাসিমুখে নতুন পাঞ্জাবি পরে বের হয়েছি তার পর থেকে না খেয়ে আছি। যখন পকেটে টাকা থাকে তখন নানান ধরনের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়। তারা চা খাওয়াতে চায়, শিঙাড়া খাওয়াতে চায়। আজ যেহেতু পকেটই নেই, কাজেই এখন পর্যন্ত পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হয়নি।

আমার শেষ ভরসা বড় ফুপার বাসা। রাত দেড়টার দিকে কলিংবেল টিপে তাদের ঘুম ভাঙালে কী নাটক হবে তা আগেভাগে বলা মুশকিল। বড় ফুপা তাঁর বাড়িতে আমার যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। কাজেই আমাকে দেখে তিনি খুব আনন্দিত হবেন এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। সম্ভাবনা শতকরা ষাট ভাগ যে, তিনি বাড়ির দরজা খুললেও গ্রিল খুলবেন না। গ্রিলের আড়াল থেকে হুংকার দেবেন—গেট আউট। গেট আউট। পাঁচ মিনিটের ভেতর ক্লিয়ার আউট হয়ে যাও, নয়তো বন্দুক বের করব।

বন্দুক বের করা তাঁর কথার কথা না। ঢাকার অ্যাডিশনাল আইজি তাঁর বন্ধুমানুষ। তাঁকে দিয়ে তিনি সম্প্রতি বন্দুকের একটা লাইসেন্স করিয়েছেন এবং আঠারো হাজার টাকা দিয়ে টু টু বোরের রাইফেল কিনেছেন। সেই রাইফেল তাঁর এখনও ব্যবহার করার সুযোগ হয়নি। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।

বাকি থাকেন সুরমা ফুপু। সূর্যের চেয়ে বালি গরমের মতো, বড় ফুপার চেয়ে তিনি বেশি গরম। ঢাকার অ্যাডিশনাল আইজির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব থাকলে তিনি একটা মেশিনগানের লাইসেন্স নিয়ে ফেলতেন।

তবে ভরসার কথা—আজ বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবারে বড় ফুপা খানিক মদ্যপান করেন। খুব আগ্রহ নিয়ে করেন, কিন্তু তাঁর পাকস্থলী ইসলামিভাবাপন্ন বলে মদ সহ্য করে না। কিছুক্ষণ পরপর তাঁর বমি হতে থাকে। বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে তিনি বলেন—I am a dead man. I am a dead man. ফুপু তাঁকে নিয়ে প্রায় সারারাতই ব্যস্ত থাকেন। এই অবস্থায় কলিংবেলের শব্দ শুনলে তাঁরা কেউ দরজা খুলতে আসবেন না আসবে বাদল। এবং সে একবার দরজা খুলে আমাকে ঢুকিয়ে ফেললে আর কোনো সমস্যা হবার কথা না।

বড় ফুপার বাড়ির কাছাকাছি এসে টহল পুলিশের মুখোমুখি হয়ে গেলাম। তারা দলে চারজন। আগে দুজন দুজন করে টহলে বেরুত। ইদানীং বোধহয় দুজন করে বেরুতে সাহস পাচ্ছে না, চারজন করে বের হচ্ছে। আমাকে দেখেই তারা থমকে দাঁড়াল এবং এমন ভঙ্গি করল যেন পৃথিবীর সবচে বড় ক্রিমিন্যালকে পাওয়া গেছে। দলের একজন (সম্ভবত সবচে ভীতুজন, কারণ ভীতুরাই বেশি কথা বলে)। চেঁচিয়ে বলল, কে যায়? পরিচয়?

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আমি হিমু। আপনারা কেমন আছেন, ভালো?

পুলিশের পুরো দলটাই হকচকিয়ে গেল। খাকি পোশাক-পরা মানুষদের সমস্যা হচ্ছে কুশল জিজ্ঞেস করলে এরা ভড়কে যায়। যে-কোনো ভড়কে-যাওয়া প্রাণীর চেষ্টা থাকে অন্যকে ভড়কে দেয়ার। কাজেই পুলিশদের একজন আমার দিকে রাইফেল বাগিয়ে ধরে কর্কশ গলায় বল, পকেটে কী?

আমি আগের চেয়েও বিনয়ী গলায় বললাম, আমার পকেটই নেই।

‘ফাজলামো করছিস? হারামজাদা! থাবড়া দিয়ে দাঁত ফেলে দেব।’

‘দাঁত ফেলতে চান ফেলবেন। পুলিশ এবং ডেনটিস্ট এরা দাঁত ফেলবে না তো কে ফেলবে! তবে দাঁত ফেলার আগে দয়া করে একটু পরীক্ষা করে দেখুন, সত্যিই পকেট নেই।’

একজন পরীক্ষা করার জন্যে এগিয়ে এল। সারা শরীর হাতাপিতা করে বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গীদের একজনকে বলল, ওস্তাদ, আসলেই পকেট নাই।

যাকে ওস্তাদ বলা হয়েছে সে সম্ভবত দলের প্রধান এবং সবচে জ্ঞানী। সে বলল, মেয়েছেলের পাঞ্জাবি। এই হারামজাদা মেয়েছেলের পাঞ্জাবি পরে চলে এসেছে। মেয়েছেলের পাঞ্জাবির পকেট থাকে না। এই চল, থানায় চল।

আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, জি চলুন। আপনারা কোন থানার আন্ডারে? রমনা থানা? পুলিশের দলটা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। থানায় যাবার ব্যাপারে আমার মতো আগ্রহী কোনো আসামি তারা বোধহয় খুব বেশি পায় না।

‘কী নাম বললি?’

‘হিমু।’

‘যাস কই?’

‘ভাত খেতে যাই।’

‘রাত দেড়টায় ভাত খেতে যাস?’

‘ভাত সবসময় খাওয়া যায়।’

ওস্তাদ যাকে বলা হচ্ছে সেই ওস্তাদ এগিয়ে আসছে। পেছন থেকে একজন বলল, ওস্তাদ বাদ দেন। ড্রাগ-ফ্রাগ খায় আর কী! দুটা থাবড়া দিয়ে চলে আসেন।

ওস্তাদেরও মনে হয় সেরকমই ইচ্ছা। বলে কিক মারার আনন্দ এবং গালে থাবড়া মারার আনন্দ প্রায় কাছাকাছি। টহলপুলিশের ওস্তাদ এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে কেন?

জোরালো একটা থাবড়া খেলাম। চোখে অন্ধকার দেখার মতো থাবড়া। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ওরে খাইছেরে বলে চিৎকার দিতে গিয়েও দিলাম না। ওস্তাদ থাবড়া দিয়ে চলে যাচ্ছিল, আমি আন্তরিক ভঙ্গিতে বললাম, আরেকটা থাবড়া দিয়ে যান, নয়তো খালে পড়ব। খালে পড়লে উপায় নাই, সাঁতার জানি না।

পুলিশের দল থেকে একজন বলল, ওস্তাদ, চলে আসেন।

স্পষ্টতই ওরা ঘাবড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেছেন ‘ওস্তাদ’। আমি বললাম নিরীহ মানুষকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে চলে যাবেন এটা কেমন কথা!

ওস্তাদ দলের কাছে চলে যাচ্ছে। আমিও যাচ্ছি তার পেছনে পেছনে, যদিও উলটো দিকে যাওয়াই নিয়ম। পুলিশের দল যেন কিছু হয়নি এই ভঙ্গিতে হাঁটা শুরু করেছে। আমি ওদের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটছি। তারা আমার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে রাস্তা ক্রস করল। আমিও রাস্তা ক্রস করলাম।

‘এই, তুই চাস কী?’

আমি আন্তরিক ভঙ্গিতে বললাম, আরেকটা থাপ্পড় দিয়ে দিন, বাসায় চলে যাই।

পুলিশের দল কিছু না বলে আবার হাঁটা শুরু করেছে। আমিও তাদের অনুসরণ করছি। মানুষের ভয় চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে, এদেরও বাড়ছে। চারজন পুলিশ, দুজনের হাতে রাইফেল, অথচ ওরা এখন আতঙ্কে আধমরা। আমার মজাই লাগছে। আমি শিস বাজানোর চেষ্টা করলাম—হচ্ছে না। ক্ষুধার্ত অবস্থায় শিষ বাজে না। পেটে ক্ষুধা নিয়ে গান গাওয়া যায়, শিস বাজানো যায় না। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি—হিন্দি গানের একটা লাইন শিসে আমি ভালোই আনতে পারি—হায় আপনা দিল তো আওয়ারা… আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে আছে …

শিষ দেবার কারণে ক্ষুধা একটু কম-কম লাগছে। বড় ফুপার বাড়ি দেখা যাচ্ছে। পুলিশের দল হুট করে একটা গলিতে ঢুকে পড়ল।

আমি প্রায় গৌড়ে গলির মুখে গিয়ে বললাম, ভাইজান, আপনাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে। ফির মিলেঙ্গে। এরা মুখ-চাওয়াচাউয়ি করছে। আমার সামান্য বাক্য দুটির মর্মার্থ নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করবে। আজকের রাতের টহল তাদের ভালো হবে না। আজ তারা ছায়া দেখে ভয় পাবে।

.

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো—ফুপার বাড়ির প্রতিটি বাতি জ্বলছে। কোনো-একটা সমস্যা নিশ্চয়ই হয়েছে। আমি সেই সমস্যায় উপস্থিত হয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলব—‘ভাত খাব।’ সেই বলাটাও সমস্যা। আজ বোধহয় কপালে ভাত নেই। পুলিশের খাপ্পড় খেয়েই রাত পার করতে হবে। আমি কলিংবেলে হাত রাখলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সদর-দরজা খুলে গেল। বড় ফুপা তাঁর ফরসা ছোটখাটো মুখ বের করে ভীতচোখে আমার দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, আরে তুই! হিমু! আয় আয়, ভেতরে আয়। এই শোনো, হিমু এসেছে, হিমু।

সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে সবাই একসঙ্গে নেমে আসছে। কিছুক্ষণ আগে পুলিশকে ভড়কে দিয়ে এখন নিজেই ভড়কে যাচ্ছি।

গ্রিলের দরজা খুলতে খুলতে বড় ফুপা বললেন, কেমন আছিস রে হিমু? ‘ভালো আছি।’

বাড়ির অন্যরাও চলে এসেছে। আঠারো-উনিশ বছরের একজন তরুণীকে দেখা যাচ্ছে। তরুণী এমনভাবে আমাকে দেখছে যেন আমি আসলে আগ্রার তাজমহল। হেঁটে মালিবাগে চলে এসেছি। ফুপা বললেন, হেন জায়গা নেই তোকে খোঁজা হয়নি! কোথায় ছিলি?

আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলাম। নির্বিকার ভঙ্গি ঠিক ফুটল না। আমার জন্যে এই পরিবারটির প্রবল আগ্রহের আসল কারণটা না জানলে সহজ হওয়া যাচ্ছে না। সামথিং ইজ রং, ভেরি রং। বাদল আবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ওর কোনো খোঁজ না পেয়ে আমাকে খোঁজা হচ্ছে, যদি আমি কোনো সন্ধান বের করে দিই—এই হবে। এ ছাড়া আমার জন্যে এত ব্যস্ততার দ্বিতীয় কোনো কারণ হতে পারে না। আমি এ-বাড়ির নিষিদ্ধজন। শুধু আমি নিষিদ্ধ নই, আমার ছায়াও নিষিদ্ধ।

আমি ফুপুর দিকে তাকিয়ে বললাম, বাদল কোথায়? বাদলকে তো দেখছি না! শুয়ে পড়েছে?

ফুপা-ফুপু মুখ-চাওয়াচাউয়ি করলেন। ফুপা বললেন, ও ঘরেই আছে।

‘অসুখবিসুখ?’

‘না। হিমু তুই বোস, তোর সঙ্গে কথা আছে। চা খাবি?’

‘চা অবশ্যই খাব, তবে ভাত-টাত খেয়ে তারপর খাব। ফুপু, রাতে রান্না কী করেছেন? লেফট ওভার নিশ্চয় ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছেন?’

ফুপু গম্ভীর গলায় বললেন, আর রান্নাবান্না! দুদিন ধরে ঘরে হাঁড়ি চড়ছে না। ‘ব্যাপারটা কী?’

ফুপা গলা পরিষ্কার করছেন। যেন অস্বস্তির কোনো কথা বলতে যাচ্ছেন। ব্যাটারি চার্জ করে নিতে হচ্ছে।

‘বুঝলি হিমু, আমাদের উপর দিয়ে বিরাট বিপদ যাচ্ছে। হয়েছে কী, বাদল তার বন্ধুর বোনের বিয়েতে গিয়েছিল। ঐ বিয়ে খেতে গিয়েই কাল হয়েছে—গলায় কাঁটা ফুটেছে।’

‘খাসির রেজালা খেয়ে গলায় কাঁটা ফুটবে কী! গলায় হাড় ফুটতে পারে।’

‘কাঁটাই ফুটেছে। বেশি কায়দা করতে গিয়ে ওরা বাঙালি-বিয়ের আয়োজন করেছে—মাছ ভাত, ডাল দৈ… ফাজিল আর কী, বেশি-বেশি বাঙালি।’

‘বাদলের গলার সেই কাঁটা এখন আর বেরুচ্ছে না?’

‘না।’

‘ডাক্তার দেখাননি?’

‘ডাক্তার দেখাব না! বলিস কী! হেন ডাক্তার নেই যাকে দেখানো হয়নি। আজ সকালেও একজন ইএনটি স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম—হাঁ করিয়ে, চিমটা ঢুকিয়ে নানা কসরত করেছে। কাঁটা অনেক নিচে, চিমটা দিয়ে ধরতে পারছে না। দুদিন ধরে বাদল খাচ্ছে না, ঘুমুচ্ছে না। কী যে বিপদে পড়েছি!’

‘বিপদ তো বটেই। ‘

‘কাঁটা তোলার একটা দোয়া আছে ‘নিয়ামুল কোরানে’, ঐ দোয়াও তোর ফুপু এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বার পড়েছে। কিছুই বাদ নেই।’

‘বিড়ালের পায়ে ধরানো হয়েছে?’

তরুণী মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। পরক্ষণেই শাড়ির আঁচল মুখে চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করল। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, হাসবে না। গ্রামবাংলার মানুষ গত পাঁচশো বছর ধরে কাঁটা ফুটলেই বিড়ালের পায়ে ধরছে। কাজেই এর একটা গুরুত্ব আছেই। কাঁটা হচ্ছে বিড়ালের খাদ্য। আমরা সেই খাদ্য খেয়ে বিড়ালের প্রতি একটা অবিচার করছি, সেইজন্যে বিড়ালের পায়ে ধরে ক্ষমাপ্রার্থনা

ফুপা থমথমে গলায় বললেন, বিড়ালের পায়েও ধরানো হয়েছে। সেও এক কেলেঙ্কারি। বিড়াল খামচি দিয়ে রক্ত-টক্ত বের করে বিশ্রী কাণ্ড করেছে। এটিএস দিতে হয়েছে। এখন তুই একটা ব্যবস্থা করে দে।

‘আমি?’

‘হুঁ। বাদলের ধারণা একমাত্র তুই-ই পারবি, আর কেউ পারবে না। তোর ফুপা ওকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে। ও তোর সঙ্গে দেখা না করে যাবে না। হেন জায়গা নেই যে তোর খোঁজ করা হয়নি! তোকে হঠাৎ আসতে দেখে বুকে পানি এসেছে। দুটা দিন গেছে—ছেলে একটা-কিছু মুখে দেয়নি। আর কয়েকদিন এরকম গেলে তো—মরে যাবে!’

ফুপুর কথা শেষ হবার আগইে বাদল ঘরে ঢুকল। চুল উশকোখুশকো, চোখ বসে গেছে। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি বললাম, খবর কী রে?

বাদল ফ্যাকাশে ভঙ্গিতে হাসল। সাহিত্যের ভাষায় এই হাসির নাম—‘করুণ হাস্য’।

আমি বললাম, কীরে, শেষ পর্যন্ত মাছের হাতে পরাজিত?

বাদল তার মুখ আরও করুণ করে ফেলল। আমি বললাম, বসে থাক, ব্যবস্থা করছি। গোসল টোসল করে খাওয়াদাওয়া করে নিই, তারপর তোর প্রবলেম ট্যাকল করছি।

বাদলের মুখ মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে গেল। তরুণী মেয়েটির ঠোঁটের কোনায় ব্যঙ্গের হাসির আভাস। তবে সে কিছু বলল না। এ-বাড়ির পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ আমার অনুকূলে। এরকম অনুকূল আবহাওয়ার সুযোগ গ্রহণ না করা নিতান্তই অন্যায় হবে। আমি ফুপুর দিকে তাকিয়ে বললাম, গোসল করব। ফুপু, আপনার বাথরুমে হট ওয়াটারের ব্যবস্থা আছে না?

‘গিজার নষ্ট হয়ে গেছে। যা-ই হোক, পানি গরম করে দিচ্ছি। গোসল করে ফ্যাল। গোসল করে ভাত খাবি তো?’

‘হুঁ।’

‘তা হলে ভাত-টাত যা আছে গরম করতে দিই।’

ঘরে কি পোলাওয়ের চাল আছে?’

‘আছে।’

‘তা হলে চট করে পোলাওয়ের কিছু চাল চড়িয়ে দিন। আলুভাজা করুন। কুচিকুচি করে আলু কেটে ডুবাতেলে কড়া করে ভাজা। গরম ভাত, আলুভাজার সঙ্গে এক চামচ গাওয়া ঘি—খেতে একসেলেন্ট হবে। গাওয়া ঘি আছে তো?’

‘ঘি নেই।’

‘মাখন আছে?’

‘হুঁ।’

‘অল্প আঁচে মাখন ফুটাতে থাকেন। গাদ যেটা বের হবে ফেলে দেবেন—এক্কেবারে এক নম্বর পাতে-খাওয়া ঘি তৈরি হবে। কয়েকটা শুকনা মরিচ ভাজবেন—ঘিয়ের মধ্যেই ভাজবেন।

‘বাদলের কাঁটাটার কিছু করা যায় কি না দ্যাখ।’

‘দেখব। সে দুদিন যখন অপেক্ষা করেছে আরও ঘণ্টাখানিক অপেক্ষা করতে পারবে। পারবি না বাদল?’

বাদল হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মনে হচ্ছে কথা বলার মতো অবস্থাও তার নেই। আমি আরেকবার শিস দিয়ে বাজালাম—হায় আপনা দিল…। তরুণী মেয়েটি আমার দিকে তাকাচ্ছে। তার চোখের দৃষ্টিটা কেমন? ভালো না। সেই দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে। সুস্থ কৌতূহল না, অসুস্থ কৌতূহল। মেয়েটি একটা দৃশ্য দেখার জন্যে অপেক্ষা করছে—সেই দৃশ্য হচ্ছে অতিচালাক একজন মানুষের গলায় দড়ি পড়ার মজাদার দৃশ্য। পুলিশদের মতো এই মেয়েটাকেও ভড়কে দিতে পারলে ভালো লাগত, পারছি না। মেয়েরা পুলিশের মতো এত সহজে ভড়কায় না। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার নাম কী?

‘ইরা।’

‘শোনো ইরা, তোমার যদি কোনো কাঁটার ব্যাপার থাকে, গলায় কাঁটা বা হৃদয়ে কাঁটা, তা হলে আমাকে বলো, তোমার কাঁটার একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যাব।’

ইরা কঠিন ভঙ্গিতে বলল, আমার জন্যে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি গোসল করতে যান, আপনাকে গরম পানি দেয়া হয়েছে।

‘এত তাড়াতাড়ি তো পানি গরম হওয়ার কথা না!’

‘খাওয়ার জন্যে পানি ফুটানো হয়েছে। ঐ পানিই দেয়া হয়েছে’

‘মেনি থ্যাংকস।’

.

আমি খেতে বসেছি। চেয়ারে বসেই বাদলকে ডাকলাম, বাদল খেতে আয়। বাদলের জন্যে একটা প্লেট দেখি।

ফুপা বললেন, ও তো ঢোকই গিলতে পারছে না, ভাত খাবে কী! তুই তো ওর ব্যাপারটা বুঝতেই পারছিস না।

আমি ফুপাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডাকলাম—বাদল আয়।

বাদল উঠে এল। আমার আদেশ অগ্রাহ্য করা সবার পক্ষেই সম্ভব। বাদলের পক্ষে না। আমি অন্য সবাইকে সরে যেতে বললাম। খাওয়ার সময় একগাদা লোক তাকিয়ে থাকলে খেয়ে আরাম পাই না। নিজেকে জামাই-জামাই মনে হয়।

‘বাদল শোন, তোর পেটে খিদে, তুই খেয়ে যাবি। গলায় ব্যথা করবে—করুক। কিছু যায় আসে না। আপাতত কিছু সময়ের জন্যে গলাটাকে পাত্তা দিবি না। কাঁটা থাকুক কাঁটার মতো, তুই থাকবি তোর মতো। বুঝতে পারছিস?’

‘হুঁ।’

‘আরাম করে তুই আমার সঙ্গে ভাত খাবি। ভাত খাওয়ার পর আমরা মিষ্টি পান খাব। তারপর তোর কাঁটা নামানোর ব্যবস্থা করব।

‘হিমু ভাই, আগে করলে হয় না!’

‘হয়—আগে করলেও হয়। তাতে কাঁটাটাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আমরা ফুলকে গুরুত্ব দেব—কাঁটাকে না। ঠিক না?’

‘ঠিক।’

‘আয়, খাওয়া শুরু করা যাক।’

বাদল ভাত মাখছে। আমি বললাম, শুকনা মরিচ ভালো করে ডলে নে—ঝালের চোটে নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে পানি বেরুবে, তবেই-না খেয়ে আরাম! শুরু করা যাক—রেডি সেট গো…

বাদল খাওয়া শুরু করল। কয়েক নলা খেয়েই হতভম্ব গলায় বলল, হিমু ভাই, কাঁটা চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

‘চলে গেলে গেছে, এতে আকাশ থেকে পড়ার কী আছে? খাওয়া শেষ কর।’

‘ওদের খবরটা দিয়ে আসি?’

‘এটা এমন কোনো বড় খবর না যে মাইক বাজিয়ে শহরে ঘোষণা দিতে হবে। আরাম করে খা তো! আলুভাজিটা অসাধারণ হয়েছে না?’

‘অমৃতভাজির মতো লাগছে।’

‘ঘি দিয়ে চপচপ করে খা, ভালো লাগবে।’

‘আজ তুমি না এলে মরেই যেতাম। আমি সবাইকে বলেছি, হিমু ভাই-ই কেবল পারে এই কাঁটা দূর করতে। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না।’

‘মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না। তোর নিজের বিশ্বাসটাই প্রধান।’

‘ইরা তো তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। আমি যখন বললাম হিমু ভাই হচ্ছে মহাপুরুষ, তখন হাসতে হাসতে সে প্রায় বিষম খায়। আজ তার একটা শিক্ষা হবে। ‘

বাদলের চোখে পানি এসে গেছে। ঝালের কারণে চোখের পানি, না আনন্দের পানি সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

একেক ধরনের চোখের পানি একক রকম হওয়া উচিত ছিল। দুঃখের চোখের পানি হবে একরকম আনন্দের পানি অন্যরকম, আবার ঝালের অশ্রু আরেকরকম। প্রকৃতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আবেগের প্রকাশ চোখের পানি দিয়ে সেরে ফেলেছে। ব্যাপারটা কি ঠিক হলো?

দুঃখের চোখের পানি হবে নীল। দুঃখ যত বেশি হবে নীল রং হবে তত গাঢ়। রাগ এবং ক্রোধের অশ্রু হবে লাল। দুঃখ এবং রাগের মিলিত কারণে যে-চোখের পানি তার রঙ হবে খয়েরি। নীল এবং লাল মিশে খয়েরি রঙই তো হয়?

.

কাঁটামুক্তির যে-আনন্দ এ-বাড়িতে শুরু হলো তার কাছে বিয়েবাড়ির আনন্দ কিছু না। ফুপু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মরাকান্না শুরু করলেন। বাদল যতই বলে কী যন্ত্রণা! মা, আমাকে ছাড়ো তো! তিনি ততই শক্ত করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন।

ফুপা আনন্দের চোটে তাঁর হুইস্কির বোতল খুলেছেন। আজ বৃহস্পতিবার। এমনিতেই তাঁর মদ্যপান-দিবস। ছেলের সমস্যার জন্যে খেতে পারছিলেন না। এখন ডবল চড়াবেন। ফুপা যে-দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছেন সংস্কৃত কবিরা সেই দৃষ্টিকে বলেন ‘প্রেম-নয়ন’।

শুধু ইরার চোখ কঠিন। পাথরের চোখেও সামান্য তরল ভাব থাকে। তার চোখে তাও নেই।

.

রাতে ফুপার বাড়িতে থেকে গেলাম। আজ আমার থাকার জায়গা হলো গেস্টরুমে। এই বাড়ির গেস্টরুম তালাবদ্ধ থাকে। বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর গেস্ট এলেই শুধু তালা খোলা হয়। আজ আমি বিশেষ শ্রেণীর একজন গেস্ট। ঘুমুতে যাবার আগে-আগে আমার জন্যে কফি চলে এল। এটিও বিশেষ ব্যবস্থার একটা অঙ্গ। কফি নিয়ে এল ইরা। ইরা সম্পর্কে এ-পর্যন্ত তথ্য যা সংগ্রহ করেছি তা হচ্ছে—মেয়েটা শামসুন্নাহার হলে থেকে পড়ে। তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। হলে পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছে, তাই এ-বাড়িতে চলে এসেছে।

ফুপার খালাতো ভাইয়ের বড় মেয়ে। দারুণ নাকি ব্রিলিয়ান্ট। না পড়লেও নাকি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবে। তার পরেও পড়ছে, কারণ রেকর্ড মার্ক পেতে চায়।

ইরা কফির কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, আপনার ধারণা, আজ আপনি আপনার বিশেষ এক অলৌকিক ক্ষমতা দেখালেন?

আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বললাম, তোমার সেরকম ধারণা না?

‘অবশ্যই না। বাদলের আপনার উপর অগাধ বিশ্বাস। আপনাকে দেখে সে রিলাক্সড বোধ করেছে। সহজ হয়েছে। ভয়ে-আতঙ্কে তার গলার মাংসপেশি শক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই ভাবও দূর হয়েছে। তারপর আপনি তাকে ভাত খাওয়ালেন—সহজেই কাঁটা বের হয়ে এল। আমি কি ভুল বলছি?’

‘না, ভুল হবে কেন!’

‘নিতান্তই লৌকিক একটা ব্যাপার করে আপনি তাতে একটা অলৌকিক ফ্লেবার দিয়ে ফেলেছেন—এটা কি ঠিক হচ্ছে?’

‘আমি কোনো ফ্লেবার দিইনি ইরা, এটা তুমি কল্পনা করছ।’

‘আপনি না দিলেও অন্যরা দিচ্ছে। বাদল দিচ্ছে। আপনার ফুপা-ফুপু দিচ্ছেন।’

‘তাতে ক্ষতি তো হচ্ছে না। তোমার মতো যারা বুদ্ধিমান তারা ঠিকই আসল ব্যাপারটা ধরতে পারছে।’

ইরা কঠিন গলায় বলল, আমাদের সমাজে কিছু-কিছু প্রতারক আছে, যারা হাত দেখে, গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করে, পাথর দেয়, মন্ত্রতন্ত্র পড়ে—আপনি কি তাদের চেয়ে আলাদা? আপনি আলাদা না, আপনি তাদের মতোই একজন।

‘হতে পারে। কিন্তু তুমি আমার উপর এত রেগে আছ কেন?’

‘আপনি যে শুরু থেকেই আমাকে তুমি-তুমি করে বলছেন—সেটাও আমার খারাপ লাগছে। আমি তো স্কুলে-পড়া বাচ্চা মেয়ে না! আপনি আমাকে চেনেনও না। প্রথম দেখাতেই আপনি আমাকে তুমি বলবেন কেন?’

‘ভুল হয়েছে। একবার যখন বলে ফেলেছি সেটাই বহাল রাখি। মানুষ আপনি থেকে তুমিতে যায়। তুমি থেকে আপনিতে যায় না। নিয়ম ভাঙা কি ঠিক হবে?’

‘আমার বেলায় নিয়মটা ভাঙলেই আমি খুশি হব।’

‘এখন থেকে আপনি করে বলব।’

‘ধন্যবাদ। আরেকটা কাজ কি দয়া করে করবেন?’

‘অবশ্যই করব। বলুন।’

‘বাদলকে ডেকে একটু কি বুঝিয়ে বলবেন তার গলার কাঁটাটা কীভাবে গেল? ওর মন থেকে আধিভৌতিক ব্যাপারগুলি দূর করা দরকার। আপনি বুঝিয়ে বলে দিন। আমার বলায় সে কনভিন্সড হবে না। আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে আসি।’

‘জি আচ্ছা, নিয়ে আসুন।’

ইরা বাদলকে নিয়ে ঢুকল। আমি বললাম, বাদল, তুই স্থির হয়ে আমার সামনের চেয়ারটায় বোস। মিস ইরা, আপনিও বসুন। তবে আপনাকে স্থির হয়ে না বসলেও চলবে। আপনি ইচ্ছা করলে নড়াচড়া করতে পারেন।

ইরা তাকাচ্ছে তীব্র চোখে। আমি তার সেই চোখ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বাদলের দিকে তাকিয়ে বললাম, বাদল শোন, তুই যদি ভেবে থাকিস আমি আমার মহা ক্ষমতাবলে তোর গলার কাঁটা গলিয়ে ফেলেছি, তা হলে তুই বোকার স্বর্গে বাস করছিস। কীভাবে সেই ঘটনা ঘটল তা ইরা খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করে দেবে। ব্যাখ্যা শুনে তার পর ঘুমুতে যাবি—তার আগে না। মনে থাকবে?

‘থাকবে।’

‘যা ভাগ।’

বাদল হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়েছে। ইরা এখনও তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে খুব অপমানিত বোধ করছে। মেয়েটা সুন্দর। এরকম সুন্দর একটা মেয়ে ফিজিক্স পড়ছে কেন? ফিজিক্স পড়বে শুকনা রসকষহীন মেয়েগুলি। ইরার পড়া উচিত ইংরেজি কিংবা বাংলা সাহিত্য।

আমি চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ফোম-বিছানো গদি—আরামের বিছানা। এত আরামের বিছানায় কি ঘুম আসবে?

‘হিমু জেগে আছিস?’

ফুপার জড়ানো গলা। ইতোমধ্যেই তিনি উঁচু তারে নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছে। ফুপাকে ঘরে ঢোকানো এখন বিপজ্জনক হবে। তিনি উঁচু থেকে উঁচুতে চড়তে থাকবেন, তারপর সেখান থেকে ধপাস করে নিচে নামবেন, বমি করে ঘর ভাসাবেন।

‘হিমু, হিমু!’

‘জি?’

‘তোর সঙ্গে কিছু গল্পগুজব করা যাক—ম্যান টু ম্যান টক। তুই আজ ভালোই ভেলকি দেখালি। দরজা খোল। হিমু, হিমু!’

মাতাল দরজা খোলাতে চাইলে খুলিয়ে ছাড়বে। ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকবে। কাজেই দরজা খুললাম। বড় ফুপা গ্লাস এবং বোতল-হাতে ঢুকে পড়লেন।

‘তোর ফুপু ঘুমিয়ে পড়েছে। খুব টেনশান গেছে তো, এখন আরামে ঘুমুচ্ছে। আমি ভাবলাম ‘কণ্টক-মুক্তিটা’ সেলিব্রেট করা যাক। কণ্টক-মুক্তি শব্দটা কেমন লাগছে?

‘ভালো লাগছে।’

‘কণ্টক-মুক্তির ইংরেজি কী হবে? ‘Freedom from thorn’?’

‘ফুপা, আপনি দ্রুত চালাচ্ছেন। আমার মনে হয় এখন উচিত শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া।’

‘তোর সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। গল্প করতে ভালো লাগছে। আমার ধারণা তোর উপর ইনজাসটিস করা হয়েছে। তোকে যে আমি বা তোর ফুপু দেখতে পারি না এটা অন্যায়। ঘোরতর অন্যায়। তোর অপরাধ কী? আমি পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ভেবেছি। তোর নেগেটিভ দিকগুলি কী—

এক. তোর চাকরিবাকরি নেই। এটা কোনো ব্যাপার না, পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ লোক আছে যাদের চাকরি নেই।

দুই. তুই পথে-পথে ঘুরিস। এটা কোনো অপরাধ হতে পারে না। এটা অপরাধ হলে পৃথিবীর সব পর্যটকরাই অপরাধী।’

‘আর খাবেন না ফুপা।’

‘কথার মাঝখানে কথা বলিস না হিমু। আমি কী যেন বলছিলাম?’

‘পর্যটকদের সম্পর্কে কী যেন বলছিলেন।’

‘কোন পর্যটক? হিউয়েন সাং? হিউয়েন সাং-এর কথা খামোকা বলব কেন?’

‘আর না খেলে হয় না ফুপা?’

‘হয়। হবে না কেন? তবে আনন্দ পরিপূর্ণ হয় না। হিউয়েন সাং-এর কথা কী বলছিলাম?’

‘আমার ঠিক মনে পড়ছে না।’

‘শোন হিমু, তুই লোক খারাপ না। এবং তোর ক্ষমতা আছে। বাদল যে তোর নাম বলতে অজ্ঞান হয়ে যায়, বাদলের কোনো দোষ নেই। I Like You Himu.’

‘থ্যাংক ইউ ফুপা।’

‘তোর একটাই অপরাধ তুই শুধু হাঁটিস। এই অপরাধ ক্ষমা করা যায়। হিউয়েন সাংও তো হেঁটেছে। এই দ্যাখ আবার হিউয়েন সাং-এর কথা চলে এসেছে। বারবার এই নাকচ্যাপটা চাইনিজটার কথা কেন বলছি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

ফুপা চোখমুখ উলটে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর হড়হড় শব্দ হতে লাগল।

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। ফুপা বিছানাতে বসেছিলেন। বিছানা এবং আমার শরীরের এক অংশ তিনি ভাসিয়ে ফেলেছেন। বিড়বিড় করে বলছেন, ‘I am a dead man. I am a dead man.’

Chapter - 2

বদরুল সাহেব আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, কোথায় ছিলেন এতদিন?

তাঁর গলা মোটা, শরীর মোটা, বুদ্ধিও মোটা। আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রশস্ত মানুষের অন্তরও প্রশস্ত হয়। বদরুল সাহেবের অন্তর প্রশস্ত, মনে মায়াভাব প্রবল। আমি ছ’-সাতদিন ধরে মেসে আসছি না। কেউ হয়তো ব্যাপারটা লক্ষ্যই করেনি। তিনি ঠিকই লক্ষ্য করেছেন। আমাকে দেখে তিনি যে উল্লাসের ভঙ্গি করলেন সেই উল্লাসে কোনো খাদ নেই।

‘কোথায় ছিলেন রে ভাই?’

আমি হাসলাম। অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর আমি ইদানীং হেসে দেবার চেষ্টা করছি। একেক ধরনের প্রশ্নের উত্তরে একেক ধরনের হাসি। এখন যে-হাসি হাসলাম তার অর্থ হচ্ছে—আশেপাশেই ছিলাম।

বদরুল সাহেব বললেন, গত বৃহস্পতিবারে মেসে ফিস্ট হলো। বিরাট খাওয়াদাওয়া। পোলাও, খাসির রেজালা, সালাদ। খাসির মাংস আমি নিজে কিনে এনেছিলাম। একটা আস্ত খাসি দেখিয়ে বললাম, হাফ আমাকে দাও, নো হাংকি পাংকি।

‘হাফ দিয়েছিল?’

‘দেবে না মানে? মাংস কেটে আমার সামনে পিস করতে চায়। আমি বললাম, খবরদার, আগে ওজন করে তারপর পিস করবে।’

‘আগে পিস করলে অসুবিধা কী?’

‘আগে পিস করতে দিলে উপায় আছে! ফস করে বাজে গোসত মিক্স করে ফেলবে। কিছু বুঝতেই পারবেন না। ম্যাজিক দেখিয়ে দেবে। খাসির গোশত কিনে নিয়ে রান্না করার পর খেতে গিয়ে বুঝবেন পাঁঠার গোশত। মিস্টার পাঁঠা।’

বদরুল সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা মেসের সিঁড়িতে—তিনি বেরুচ্ছিলেন। আমাকে দেখে আমার পেছনে পেছনে ঘরে এসে ঢুকলেন। ফিস্টের ব্যাপারটা না বলে তিনি শান্তি পাবেন না। গোশত কেনা থেকে যে-গল্প শুরু হয়েছে সেই গল্প শেষ হবে খাওয়া কীভাবে হলো সেখানে। আমি ধৈর্য নিয়ে গল্প শোনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খাওয়াদাওয়ার যে-কোনো গল্পে ভদ্রলোকের অসীম আগ্রহ। এত আনন্দের সঙ্গে তিনি খাওয়ার গল্প করেন যেন এই পৃথিবী সৃষ্টিই হয়েছে খাওয়ার জন্যে। খাওয়া ছাড়াও যে গল্প করার আরও বিষয় থাকতে পারে ভদ্রলোক তা জানেন না।

‘খুব চর্বি হয়েছিল। গোশতের ভাঁজে ভাঁজে চর্বি।’

‘বাহ্, ভালো তো!’

‘চর্বিদার গোশত রান্না করা কিন্তু খুব ডিফিকাল্ট। বাবুর্চি করে কী—যেহেতু চৰ্বি বেশি, তেল দেয় কম। এটা খুব ভুল। চর্বিদার গোশতে তেল লাগে বেশি।’

‘জানতাম না তো!’

‘অনেক ভালো ভালো বাবুর্চিই ব্যাপারটা জানে না। রান্না তো খুব সহজ ব্যাপার না। আমি নিজে বাবুর্চির পাশে বসে রান্না দেখিয়ে দিলাম।‘

‘খেতে কেমন হয়েছিল?’

‘আমি নিজের মুখে কী বলব—আপনার জন্য রেখে দিয়েছি। চেখে দেখবেন।’

‘রেখে দিয়েছেন মানে? বৃহস্পতিবার ফিস্ট হয়েছে, আজ হলো শনিবার।’

‘দুই বেলা গরম করেছি। নিজের হাতেই করেছি। অন্যের কাছে এইসব দিয়ে ভরসা পাওয়া যায় না। ঠিকমতো জ্বাল দেবে না। মাংস টক হয়ে যাবে। বসুন, আমি নিয়ে আসছি।’

তিনি আনন্দিত মুখে গোশত আনতে গেলেন। আজ দিনটা মনে হয় ভালোই যাবে। সকালে ভরপেট খেয়ে নিলে সারাদিন আর খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বড় ফুপার বাসা থেকে ভোরবেলা বের হয়েছি। সবাই তখনও ঘুমে। কাজের মেয়েটা জেগে ছিল। সে-ই দরজা খুলে দিল। বেরিয়ে আসার সময় টুক করে এক কদমবুসি। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ব্যাপার কী?

সে নিচু স্বরে বলল, খাস দিলে আফনে এট্টু দোয়া করবেন ভাইজান। আমার মাইয়াটা বহুত দিন হইছে নিখোঁজ।

‘বল কী! কতদিন নিখোঁজ?’

‘তা ধরেন গিয়া দুই বচ্ছর হইছে। এক বাড়িত কাম করত। এরা মাইরধইর করত—একদিন বাড়ি থাইক্যা পালাইয়া গেছে। আর কোনো খুঁইজ নাই।‘

সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে যাদের বাস তাদের আবেগ-টাবেগ বোধহয় কম থাকে। দুবছর ধরে মেয়ে নিখোঁজ এই সংবাদ সে দিচ্ছে সহজ গলায়। যেন তেমন কোনে বড় ব্যাপার না।

‘নাম কী তোমার মেয়ের?’

‘লুৎফুন্নেসা। লুৎফা ডাকি।’

‘বয়স কত?’

‘ছোট মাইয়া, সাত-আট বছর। ভাইজান, আফনে এট্টু চেষ্টা নিলে মাইয়াটারে ফিরত পাই। মেয়ে ঢাকা শহরেই আছে।’

‘জান কী করে ঢাকা শহরে আছে?’

‘আয়না-পড়া দিয়া জানছি। ধনখালির পীরসাব আয়না-পড়া দিয়া পাইছে। অখন আফনে এট্টু চেষ্টা নিলে…’

‘আচ্ছা দেখি।’

সে আবার একটা কদমবুসি করে ফেলল।

সকালের শুরুটা হলো কদমবুসির মাধ্যমে। শুরু হিসেবে মন্দ না। সাধু-সন্ন্যাসীর স্তরে পৌঁছে যাচ্ছি কি না বুঝতে পারছি না। সাধু-সন্ন্যাসীরা পায়ের পবিত্র ধূলি-বিতরণের মাধ্যমে সকাল শুরু করেন। তার পরের অংশে ভুঁড়িভোজন, ঘি, হালুয়া, পরোটা, মাংস।

বদরুল সাহেব তাঁর বিখ্যাত খাসির গোশতের বাটি নিয়ে এসেছেন। গোশত বলে সেখানে কিছু নেই। জ্বালের চোটে সব গোশত গলে কালো রঙের ঘন স্যুপের মতো একটা বস্তু তৈরি হয়েছে। চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলা যায়। তবে বদরুল সাহেবের বিবেচনা আছে। তিনি সঙ্গে চায়ের চামচ এনেছেন। আমি সেই চামচে তরল খাসির মাংস এক চুমুক মুখে দিয়ে বললাম, অসাধারণ! রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার কাছাকাছি।

বদরুল সাহেব উজ্জ্বল মুখ করে বললেন, বাসি হওয়ায় টেস্ট আরও খুলেছে, তাই না? গোশতের ঐ মজা—যত বাসি তত মজা। টেস্ট খুলেছে না?

‘খুলেছে বললে কম বলা হয়। এক্কেবারে ডানা মেলে দিয়েছে।’

‘গরম গরম পরোটা দিয়ে খেলে আরও আরাম পেতেন। আপনি একটু ওয়েট করুন, আমি দৌড় দিয়ে দুটা পরোটা নিয়ে আসি। সাড়ে ছ’টা বাজে, মোবারকের স্টলে পরোটা ভাজা শুরু করেছে।’

‘পরোটা আনার কোনো দরকার নেই। আপনি আরাম করে বসুন তো! বরং এক কাজ করুন, আরেকটা চামচ নিয়ে আসুন, দুজনে মিলে মজা করে খাই।’

‘না না, অল্পই আছে।’

‘নিয়ে আসুন তো চামচ! ভালো জিনিস একা খেয়ে আরাম নেই। ‘

‘এটা একটা সত্য কথা বলেছেন।’

বদরুল সাহেব চামচ আনতে গেলেন। ভদ্রলোকের জন্যে আমার মায়া লাগছে। গত দুমাস ধরে তাঁর কোনো চাকরি নেই। ইনসুরেন্স কোম্পানিতে ভালো চাকরি করতেন। ইন্সপেক্টর-জাতীয় কিছু। কোম্পানি তাঁকে ছাঁটাই করে দিয়েছে। এই বয়সের একজন মানুষের চাকরি চলে গেলে আবার চাকরি জোগাড় করা কঠিন। ভদ্রলোক কিছু জোগাড় করতে পারছেন না। মেসের ভাড়া তিনমাস বাকি পড়েছে। যতদূর জানি, মেসের খাওয়াও তাঁর বন্ধ। ফিস্টে তাঁর নাম থাকার কথা না, বাজার-টাজার করে দিয়েছেন, রান্নার সময় কাছে থেকেছেন এই বিশেষ কারণে হয়তো তাঁর খাবার ব্যবস্থা হয়েছে।

চামচ নিয়ে এসে বদরুল সাহেব আরাম করে খাচ্ছেন। তাঁকে দেখে এই মুহূর্তে মনে করার কোনো কারণ নেই যে, পৃথিবীতে নানান ধরনের দুঃখকষ্ট আছে। যুদ্ধ চলছে বসনিয়ায়। রুয়ান্ডায় অকারণে একজন আরেকজনকে মারছে। তাঁর নিজের সমস্যাও নিশ্চয়ই অনেক। দুমাস বাড়িতে মনিঅর্ডার যায়নি। বাড়ির লোকজন নিশ্চয়ই আতঙ্কে অস্থির হচ্ছে। ভদ্রলোক নির্বিকার।

‘হিমু সাহেব!’

‘জি?’

‘হাড়গুলি চুষে চুষে খান, মজা পাবেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘Nearer the bone, sweeter is the meat.‘

আমি একটা হাড় মুখে ফেলে চুষতে লাগলাম।

তিনিও একটা মুখে নিলেন। আনন্দে তাঁর চোখ প্রায় বন্ধ।

‘বদরুল সাহেব!’

‘জি।’

‘চাকরি বাকরির কিছু হলো?’

‘এখনও হয়নি, তবে ইনশাআল্লাহ্ হবে। আমার অনেক লোকের সঙ্গে জানাশোনা। এদের বলেছি—এরা আশা দিয়েছে।’

‘শুধু আশার উপর ভরসা করাটা কি ঠিক হচ্ছে?’

‘আমার খুব ক্লোজ একজনকে বলেছি। ইস্টার্ন গার্মেন্টস-এর মালিক। স্কুলে একসঙ্গে পড়েছি। এখন রমরমা অবস্থা। গাড়িটাড়ি কিনে হুলস্থুল। বাড়ি করেছে গুলশানে।

‘তিনি কি আশা দিয়েছেন?’

‘পরে যোগাযোগ করতে বলেছে। সেদিনই সে হংকং যাচ্ছিল। দারুণ ব্যস্ত। কথা বলার সময় নেই। এর মধ্যেই সে পেস্ট্রি কোক খাইয়েছে। পূর্বাণীর পেস্ট্রি, স্বাদই অন্যরকম। মাখনের মতো মোলায়েম। মুখের মধ্যেই গলে যায়, চাবাতে হয় না।’

‘আপনার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু?’

‘বললাম-না স্কুলজীবনের বন্ধু! নাম হলো গিয়ে আপনার ইয়াকুব। স্কুলে সবাই ডাকত—বেকুব।’

‘আসলেই বেকুব?’

‘তখন তো বেকুবের মতোই ছিল। তবে স্কুলজীবনের স্বভাবচরিত্র দেখে কিছু বোঝা যায় না। আমাদের ফাস্ট বয় ছিল রশিদ। আরে সর্বনাশ, কী ছাত্র! অঙ্কে কোনো দিন ১০০-র নিচে পায় নাই। প্রিটেস্ট পরীক্ষায় এক্সট্রা ভুল করেছে। সাত নাম্বার কাটা গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিল। সেই রশিদের সঙ্গে একুশ বছর পর দেখা। গাল-টাল ভেঙে, চুল পেকে কী অবস্থা! চশমার একটা ডাণ্ডা ভাঙা, সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। দেখে মনটা খারাপ হলো।’

‘অঙ্কে একশো-পাওয়া-ছেলের এই অবস্থা, মন-খারাপ হবারই কথা। অঙ্কে টেনেটুনে পাশ করলে কানে সুতা বেঁধে চশমা পরতে হতো না।’

‘কারেক্ট বলেছেন। একুশ বছর পর দেখা—কোথায় কুশল জিজ্ঞেস করবে, ছেলেমেয়ে কত বড় এইসব জিজ্ঞেস করবে-তা না, ফট করে একশো টাকা ধার চাইল।’

‘ধার দিয়েছেন?’

‘কুড়ি টাকা পকেটে ছিল, তা-ই দিলাম। খুশি হয়ে নিয়েছে।’

‘মেসের ঠিকানা দেননি তো? মেসের ঠিকানা দিয়ে থাকলে মহা বিপদে পড়বেন। দুদিন পরে পরে টাকার জন্যে বসে থাকবে। আপনার জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলবে।‘

বদরুল সাহেব দুঃখিত গলায় বললেন, স্কুলজীবনের বন্ধু তো—দুরবস্থা দেখে মনটা এত খারাপ হয়েছে, আমার নিজের চোখে প্রায় পানি এসে গিয়েছিল। সুতা দিয়ে কানের সাথে চশমা বাঁধা—

বদরুল সাহেব দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বন্ধুর ভবিষ্যতের চিন্তায় তাঁকে বেশি কাতর বলে মনে হলো।

‘হিমু ভাই।’

‘জি!’

‘ভালো একটা নাশতা হয়ে গেল, কী বলেন?’

‘হ্যাঁ, হয়েছে। আপনি যে কষ্ট করে আমার অংশটা জমা করে রেখেছেন তার জন্যে ধন্যবাদ।’

‘আরে ছি ছি। এটা একটা ধন্যবাদের বিষয় হলো? এতদিন পর ফিস্ট হচ্ছে—আপনি বাদ পড়বেন এটা কেমন কথা? তা ছাড়া আপনি যেদিন মেসে খান না সেদিনের খাওয়াটা আমি খেয়ে ফেলি।’

‘ভালো করেন। অবশ্যই খেয়ে ফেলবেন। দেশে টাকা পাঠিয়েছেন?’

‘গত মাসে পাঠিয়েছি। এই মাস বাদ পড়ে গেল। তবে সমস্যা হবে না, আমার স্ত্রী খুবই বুদ্ধিমতী মহিলা—সে ব্যবস্থা করে ফেলবে।’

‘আপনার চাকরি যে নেই সেই খবর স্ত্রীকে জানিয়েছেন?’

‘জি না। আপনার ভাবি মনটা খারাপ করবে। কী দরকার’ চাকরি তো পাচ্ছিই, মাঝখানে কিছুদিনের জন্যে টেনশনে ফেলে লাভ কী? আজই ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করব। সংস্কৃতে একটা কথা আছে না—’শুভস্য শীঘ্রম’? চা খাবেন হিমুভাই?’

‘জি না। দরজা-টরজা বন্ধ করে লম্বা ঘুম দেব। আমার স্বভাব হয়ে গেছে বাদুড়ের মতো। দিনে ঘুমাই রাতে জেগে থাকি।’

‘কাজটা ঠিক হচ্ছে না ভাইসাহেব। শরীরের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীর নষ্ট হলে মন নষ্ট হয়। আমার শরীরটা ঠিক আছে বলেই এত বিপদে-আপদেও মনটা ঠিক আছে। শরীরটা ঠিক রাখবেন।

‘আমার আবার উলটা নিয়ম। মনটাকে ঠিক রাখি যাতে শরীর ঠিক থাকে।’

বদরুল সাহেব বাটি এবং চামচ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, ছোট্ট একটা কাজ করে দেবেন হিমু ভাই?

‘জি বলুন।’

‘মেসের ম্যানেজার আমাকে বলেছে সোমবারের মধ্যে মেস ছেড়ে দিতে আজেবাজে সব কথা। গালাগালি। আপনি যদি একটু বলে দেন! ও আপনাকে মানে।‘

‘আমি এক্ষুণি বলে দিচ্ছি।’

‘তাকে বললাম যে চাকরি হয়ে যাচ্ছে। ইয়াকুবকে বলেছি। এত বড় গার্মেন্টস-এর মালিক। চাকরি তার কাছে কিছুই না। সে একটা নিশ্বাস ফেললে দশটা লোকের এমপ্লয়মেন্ট হয়ে যায়। বিশ্বাস করে না। আপনি বললে বিশ্বাস করবে।’

.

আমাদের ম্যানেজারের নাম হায়দার আলি খাঁ। নামের সঙ্গে তার চেহারার কোনো সঙ্গতি নেই। রোগা, বেঁটে একজন মানুষ। বেঁটেরা সচরাচর কুঁজো হয় না। তিনি খানিকটা কুঁজো। ব্যক্তিবিশেষের সামনে তার কুঁজোভাব প্রবল হয়। আমি সেই ব্যক্তিবিশেষের একজন। তিনি কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ভয় পান।

হায়দার আলি খাঁ চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন। পিরিচে করে চা খাচ্ছেন। ঐ লোককে আমি কখনো চায়ের কাপে করে চা খেতে দেখিনি। আমি কাছে এসে হাসিমুখে বললাম, ভাইসাহেব, খবর কী?

ভদ্রলোক যেভাবে চমকালেন তাতে মনে হলো সাত রিখটার স্কেলের একটা ভূমিকম্প হয়ে গেছে। পিরিচের সব চা তাঁর জামায় পড়ে গেল। আমি বললাম, করছেন কী!

‘চা খাচ্ছি স্যার।’

‘খুব ভালো। বেশি বেশি করে চা খান। রিসার্চ করে নতুন বের করেছে—দৈনিক যে সাত কাপ চা খায় তার হার্টের আর্টারি কখনো ব্লক হয় না।’

‘থ্যাংক য়্যু স্যার।’

যেভাবে তিনি থ্যাংক য়্যু বললেন তাতে ধারণা হতে পারে হার্টের আর্টারি সংক্রান্ত রিসার্চটা আমার করা। আমি অবসর সময়ে মেসের ঘরের দরজা বন্ধ করে রিসার্চ করেছি।

‘বদরুল সাহেবকে নাকি নোটিস দিয়ে দিয়েছেন—কথা কি সত্যি?’

‘জি। তিনমাসের রেন্ট বাকি। আর নানান যন্ত্রণা করে। বোর্ডাররা নালিশ করেছে।’

‘কী যন্ত্রণা করেছে?’

‘রান্নার সময় বাবুর্চির পাশে বসে থাকে। ফিস্ট হয়েছে, ত্রিশ টাকা করে চাঁদা। একটা পয়সা দেয় নাই—ফিস্ট খেয়ে বসে আছে।’

‘চাঁদা না দিলেও খাটাখাটনি তো করেছে। গোশত কিনে আনা—খাসির গোশত যে—কেউ কিনতে পারে না, খুবই জটিল ব্যাপার। খাসি ভেবে কিনে এনে রান্নার পর প্রকাশ পায় পাঁঠা।’

হায়দার আলি খাঁ তাকাচ্ছেন। আমার কথাবার্তার ধরন বুঝতে পারছেন না। কী বলবেন তাও গুছিয়ে উঠতে পারছেন না।

‘ম্যানেজার সাহেব!’

‘জি স্যার?’

‘বদরুল সাহেবকে আর কিছু বলবেন না।’

‘তিন মাসের রেন্ট বাকি পড়ে গেছে। অন্য পার্টিকে কথা দিয়ে ফেলেছি। মানুষের কথার একটা দাম আছে। ঠিক না স্যার?’

‘ঠিক তো বটেই। কথার দাম আগে যা ছিল মুদ্রাস্ফীতির কারণে সেই দাম আরও বেড়েছে। তবু একটা ব্যবস্থা করুন। একমাসের মধ্যে সব পেমেন্ট ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’

‘কীভাবে হবে? শুনেছি উনি ছাঁটাই হয়ে গেছেন। অফিসের পাওনা টাকাপয়সাও দিচ্ছে না। টাকাপয়সার কী না কী গণ্ডগোল আছে।’

‘গণ্ডগোল তো থাকবেই। পৃথিবীতে বাস করবেন আর গণ্ডগোলে পড়বেন না, তা তো হয় না। এই গণ্ডগোল নিয়েই বাস করতে হবে। উপায় কী? মনে থাকবে তো কী বললাম?’

‘জি স্যার।’

.

আমি ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। ম্যানেজার অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জি স্যার বলেছে বলেই ঠিক ভরসা পাচ্ছি না। বিনয়ের বাড়াবাড়িটাই সন্দেহজনক। আমার নিজের ধারণা বিনয় ব্যাপারটা পৃথিবী থেকে পুরোপুরি উঠে গেলে পৃথিবীতে বাস করা সহজ হতো। বিনয়ের কারণে সত্য-মিথ্যা প্রভেদ করা সমস্যা হয়। মিথ্যার সঙ্গে বিনয় মিশিয়ে দিলে সেই মিথ্যা ধরার কারও সাধ্য থাকে না।

ঘুমের চেষ্টা করছি। ঘুম আসছে না। বেশ কয়েকদিন থেকে নিদ্রা এবং জাগরণের সাইকেলটা বদলাবার চেষ্টা করছি। রাত ঘুমের জন্যে এবং দিন জেগে থাকার জন্যে, এই নিয়ম ভাঙা দরকার। মানুষ ঘুমকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সূর্য নিয়ন্ত্রণ করবে না। সূর্য হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নিগোলক। মানুষের মতো অসাধারণ মেধার প্রাণিগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করার তার কোনো অধিকার নেই।

টানা ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায় সন্ধ্যায়। এই সময় মেসটা ফাঁকা-ফাঁকা থাকে। বেশির ভাগই চা-নাশতা খেতে বাইরে যায়। মেসে শুধু একবেলা খাবার ব্যবস্থা, রাতে। এককাপ চা খেতে হলেও রাস্তা পার হয়ে স্টলে যেতে হবে। ইদানীং অবিশ্যি নুতন এক চাওয়ালা-শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। এরা বিশাল ফ্ল্যাঙ্কে করে চা ফেরি করে। চায়ের দাম ফিক্সড—একটাকা কাপ। চিনি বা দুধের দাম বাড়লে কাপের সাইজ ছোট হয়, কিন্তু চায়ের দামের হেরফের হয় না। আমাদের এখানে যে-ছেলে চা বিক্রি করে তার নাম মতি। দেখতে রাজপুত্রের মতো, আসলে ভিখিরিপুত্র।

বারান্দায় এসে মতিকে খুঁজলাম। মতি এখনও আসেনি, তবে অপরিচিত এক ভদ্রলোক এসেছেন। শুকনোমুখে টুলে বসে আছেন। ভদ্রলোক অপরিচিত হলেও দেখামাত্র চিনলাম—কারণ তাঁর চশমার একটা ডাঁট ভাঙা, সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বাঁধা। ভদ্রলোক সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছেন। আমি বললাম, কী ভাই, ভালো আছেন?

তিনি হকচকিয়ে গেলেন। উঠে দাঁড়ালেন।

‘বদরুল সাহেবের কাছে এসেছেন, তা-ই তো?’

‘জি স্যার?’

‘টাকা ধারের জন্যে?’

ভদ্রলোক খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেছেন। চট করে কিছু বলতে পারছেন না। আবার খুব চেষ্ট করছেন কিছু বলতে।

আমি বললাম, বদরুল সাহেব আমাকে আপনার কথা বলেছেন। খুবই প্রশংসা করছিলেন। প্রিটেস্ট পরীক্ষায় একটা এক্সট্রা নাকি ভুল হয়েছিল। তাড়াহুড়া করেছিলেন নিশ্চয়ই। অনেক সময় ওভার কনফিডেন্সেও সমস্যা হয়। যা-ই হোক, কেমন আছেন বলুন।

‘জি ভালো। বদরুল কখন আসবে?’

‘উনি আসবেন কোত্থেকে?’

‘এখানে থাকেন না?’

‘আগে থাকতেন। মেসে অনেক বাকি পড়ে গেছে। চারদিকে ধারদেনা। পালিয়ে গেছেন।

‘নিচের ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন, মেসেই থাকে।’

‘ম্যানেজার তা-ই বলেছে? সেরকমই বলার কথা। সেও জানে না। জানলে জিনিসপত্র ক্রোক করে রেখে দিত। চুপিচুপি পালিয়েছে। শুধু আমি জানি। আপনাকে বললাম, কারণ আপনি তার ক্লোজ ফ্রেন্ড। ছাত্রজীবনের বন্ধু। অঙ্কে সবসময় হাই মার্ক পেয়েছেন।’

‘বদরুল থাকে কোথায়?’

‘সেটাও বলা নিষেধ। যা-ই হোক, আপনাকে বলছি। দয়া করে খবরটা গোপন রাখবেন। উনি টেকনাফের দিকে চলে গেছেন।’

‘কোন দিকে গেছে বললেন?’

‘টেকনাফের দিকে। চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট। তাঁর দূর সম্পর্কের এক মামা আছেন, বনবিভাগে চাকরি করেন, তাঁর কাছে গেছেন। কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটা যেন কী?’

‘আবদুর রশিদ।’

‘শুনুন আবদুর রশিদ সাহেব। ওনার জন্যে অপেক্ষা করে লাভ নেই। এখানে ওনার খোঁজে আসাও অর্থহীন। চলে যান।’

‘চলে যাব?’

‘আপনাকে এককাপ চা খাওয়াতে পারি শুধু চা। খাবেন?’

আবদুর রশিদ হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি পুরোপুরি আশাহত। আমি ভদ্রলোককে চা খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। চা খাওয়ালাম, শিঙাড়া খাওয়ালাম। এইখানেই শেষ করলাম না, রাস্তার পাশে ঘড়ি-সারাইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে চশমার ডাঁট লাগিয়ে দিলাম। আমার সর্বমোট ১৩ টাকা খরচ হলো।

ভদ্রলোক বললেন, ভাইসাহেব, আপনাকে একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না করেন। আপন ভেবে বলছি।

‘বলুন, কিছু মনে করব না।’

‘কথাটা বলতে খুবই লজ্জা পাচ্ছি। আপনি অতি মহৎপ্রাণ এক ব্যক্তি। আপনাকে বিব্রত করতেও লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে…’

‘মাথা কাটা যাওয়ার কিছু নেই আপনি বলুন।‘

‘দারুণ এক সংকটে পড়েছি ভাইসাহেব। আত্মহত্যা ছাড়া এখন আর পথ দেখছি না।’

‘ছেলে অসুস্থ? টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না?’

‘ধরেছেন ঠিকই। তবে ছেলে না, মেয়ে। কণিষ্ঠা কন্যা। সকাল থেকে হাঁপানির মতো হচ্ছে। ডাক্তার ইনজেকশনের কথা বলল-’

‘দাম কত ইনজেকশনের?’

‘শ-খানেক টাকা হলে হয়। ইনজেকশন, সেইসঙ্গে কী ট্যাবলেট যেন দিয়েছেন। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, চিকিৎসা করার টাকা কোথায়? তুমি বরং গলা টিপে মেরে ফ্যালো।’

‘উনি গলা টিপে মারতে রাজি হচ্ছেন না?’

আবদুর রশিদ আমার এই কথায় অশ্বস্তিতে পড়ে গেলেন। আমি বললাম, এইসব কঠিন কাজ স্ত্রীলোক দিয়ে হবে না। এইসব হলো পুরুষের কাজ। গলা টিপে মারতে হলে আপনাকেই মারতে হবে।

‘ভাইসাহেব, ঠাট্টা করছেন?’

‘না, ঠাট্টা করছি না। মৃত্যু কোনো ঠাট্টা-তামাশার বিষয় না। আমি আপনাকে একশো টাকা দেব।’

‘দেবেন? সত্যি দেবেন?’

‘অবশ্যই দেব। স্কুলজীবনে আপনি অঙ্কে খুব ভালো ছিলেন, তা-ই না? কেমন ভালো ছিলেন প্রমাণ দিন দেখি। সহজ একটা অঙ্ক জিজ্ঞেস করব। কারেক্ট উত্তর দেবেন—একশো টাকা নিয়ে চলে যাবেন।’

আবদুর রশিদ ক্ষীণ স্বরে বললেন, কী অঙ্ক?

‘একটা বাড়িতে চারটা হারিকেন জ্বলছিল। গভীর রাতে কথা নেই বার্তা নেই শুরু হল ঝড়। একটা হারিকেন গেল নিভে। এখন আপনি বলুন ঐ বাড়িতে হারিকেন এখন কয়টা?’

‘তিনটা!’

আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, হয়নি। একটা হারিকেন নিভে গেছে ঠিকই, হারিকেনের সংখ্যা তো কমেনি! হারিকেন চারটাই আছে। আপনি তো ভাই অঙ্ক শিখতে পারেননি। টাকাটা দিতে পারলাম না। কিছু মনে করবেন না।

আবদুর রশিদ দাঁড়িয়ে আছেন—আমি হাঁটা ধরেছি। মেসে ফিরে যাব। সারাদিন কিছু না খাওয়াতে খিদেয় নাড়িভুঁড়ি পাক দিচ্ছে। মেসে রান্না হয়েছে কি না খোঁজ নিতে হবে। মেসের ভাত সকাল-সকাল নেমে যায়। ভাত নেমে গেলে একটা ডিম ভেজে দিতে বলব। আগুন-গরম ভাত ডিমভাজা দিয়ে খেতে অতি উপাদেয়। তবে খেতে হয় চুলা থেকে ভাত নামার সঙ্গে সঙ্গে, দেরি করা যায় না।

.

ঘর থেকে বেরুবার জন্যে রাত বারোটা খুব ভালো সময়। জিরো আওয়ার। কাউন্টআপ শুরু হয় জিরো আওয়ার থেকে—0, 1, 2, 3… ঠিক রাত বারোটায় কী বার হবে? শনিবার নয়, রবিবারও নয়। জিরো আওয়ারে বার থেমে থাকে।

দরজা তালাবন্ধ করে বেরুচ্ছি, দেখি বদরুল সাহেব। কলঘর থেকে হাতমুখ ধুয়ে ফিরছেন। মুখ ভেজা, কাঁধে গামছা। রাত বারোটায় আমার মন-টন খুব ভালো থাকে। কাজেই আমি উল্লাসের সঙ্গেই বললাম, কী খবর বদরুল সাহেব!

তিনি লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলেন।

‘কোথায় ছিলেন আজ সারাদিন?’

তিনি আবারও হাসলেন। আমি বললাম, গিয়েছিলেন নাকি ইয়াকুব আলির কাছে?

‘জি।’

‘দেখা হয়নি?’

‘দেখা হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যস্ত।’

‘কথা হয়নি?’

‘হয়েছে। চাকরির ব্যাপারটা বললাম।’

‘আগেও তো বলেছিলেন! আবার কেন?’

‘ভুলে গিয়েছে। নানান কাজকর্ম নিয়ে থাকে তো! আজকে তার আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটল। তার মনটা ছিল খারাপ।‘

‘কী দুর্ঘটনা?’

‘একুশ লাখ টাকা দিয়ে নতুন গাড়ি কিনেছে। সেই গাড়ির হেডলাইট ভেঙে ফেলেছে। কেয়ারলেস ড্রাইভার। ঐ নিয়ে নানান হৈচৈ, ধমকাধমকি চলছে, তার মধ্যে আমি গিয়ে পড়লাম।’

‘আপনি ধমক খেয়েছেন?’

‘জি না, আমি ধমক খাব কেন? আমার ছেলেবেলার বন্ধু। ভেরি ক্লোজ ফ্রেন্ড। গাড়ির হেডলাইট ভাঙার কারণে ইয়াকুবের মন-খারাপ দেখে আমারও মন-খারাপ হলো। এর মধ্যে চাকরির কথাটা তুলে ভুল করেছি।’

‘ইয়াকুব সাহেব রেগে গেছেন?’

‘তা ঠিক না। বলল বায়োডাটা তার সেক্রেটারির কাছে দিয়ে যেতে। দুটা পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ বায়োডাটা, সে দেখবে।’

‘দেখবে বলেছে?’

‘দেখবে তো বটেই। স্কুলজীবনের বন্ধু, ফেলবে কী করে? বায়োডাটা নিয়েই সারাদিন ছোটাছুটি করলাম। একদিনের মধ্যে ছবি তুলে, বায়োডাটা টাইপ করে, পাঁচটার সময় একেবারে ইয়াকুবের হাতেই ধরিয়ে দিয়েছি।’

‘ইয়াকুব সাহেব আপনার কর্মতৎপরতা দেখে নিশ্চয়ই খুশি হলেন?’

বদরুল চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, খুশি হননি?

‘জি না। একটু মনে হয় বেজার হয়েছে। সেক্রেটারির হাতে দিতে বলেছে, আমি তা না করে তার হাতেই দিলাম—এতে সামান্য বিরক্ত। এত বড় একটা অর্গানাইজেশন চালায়। তার তো একটা সিস্টেম আছে। হুট করে হাতে কাগজ ধরিয়ে দিলে হবে না। ভুলটা আমার।’

‘বদরুল সাহেব, আপনার কি ধারণা ইয়াকুব আলি আপনাকে চাকরি দেবেন?’

‘অবশ্যই। আমার সামনেই সেক্রেটারিকে ডেকে বায়োডাটা দিয়ে দিল। বলল উপরে আর্জেন্ট লিখে ফাইলে রাখতে।’

‘কবে নাগাদ চাকরি হবে বলে মনে করছেন?’

‘খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ। ইয়াকুব আমাকে এক সপ্তাহ পরে খোঁজ নিতে বলেছে। আগামী শনিবারের মধ্যে ইনশাআল্লাহ্ হয়ে যাবে। স্বপ্নেও তা-ই দেখলাম।’

‘এর মধ্যে স্বপ্নও দেখে ফেলেছেন?’

‘জি। ছোটাছুটি করে কাগজপত্র জোগাড় করে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, একটু রেস্ট নিই। ইয়াকুবের পি.এ. বলল, বসুন, চা খান। চা খাওয়ার জন্যে বসেছি। বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনির মতো এসে গেল। তখন স্বপ্নটা দেখেছি। দেখলাম কী—ইয়াকুব এসেছে। তার হাতে বিরাট এক মৃগেলমাছ। এইমাত্র ধরা হয়েছে। ছটফট করছে। ইয়াকুব বলল, নিজের পুকুরের মাছ। তোর জন্যে আনলাম। নিয়ে যা। মাছ স্বপ্নে দেখা খুবই ভালো। হিমু ভাই, আপনি যাচ্ছেন কোথায়?

‘হাঁটতে যাচ্ছি।’

রাতদুপুরে কেউ হাঁটতে যায়’ আশ্চর্য! দুপুররাতে হাঁটার মধ্যে আছে কী?’

‘চলুন, আমার সঙ্গে হেঁটে দেখুন।’

‘যেতে বলছেন?’

‘এক রাতে একটু অনিয়ম করলে কিছু হবে না।‘

‘খুবই টায়ার্ড লাগছে হিমু ভাই। ভাবছি ঘুমুব।’

‘ঘুম তো আপনার আসবে না। খিদেপেটে শুয়ে ছটফট করবেন। এরচে চলুন কোথাও নিয়ে গিয়ে আপনাকে খাইয়ে আনি। মনে হচ্ছে সারাদিন কিছু খাননি।’

‘সারাদিন খাইনি কী করে বুঝলেন?’

‘বোঝা যায়। মানুষের সব খবর তার চোখে লেখা থাকে। ইচ্ছে করলেই সেই লেখা পড়া যায়। কেউ ইচ্ছে করে না বলে পড়তে পারে না।’

‘আপনি পারেন?’

‘মাঝে মাঝে পারি। সবসময় পারি না। আপনি যে সারাদিন খাননি এটা আপনার চোখে পড়তে পারছি। এইসঙ্গে আরেকটা জিনিস পড়া যাচ্ছে—সেটা হচ্ছে, আজ দিনটা আপনার জন্যে খুব আনন্দের।’

বদরুল সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। হতভম্ব কাটার পর বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আজ আমার বিবাহবার্ষিকী। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, সন্ধ্যার সময় হঠাৎ মনে হয়েছে—আরে, আজ তো ২৫শে এপ্রিল!

‘চলুন, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বিয়ের দিনের গল্প করবেন। অনেকদিন কারও বিয়ের গল্প শুনি না।’

বদরুল সাহেব লজ্জিত গলায় বললেন, বলার মতো কোনো গল্প না।

‘সব গল্পই বলার মতো।’

.

রাস্তায় নেমেই বদরুল সাহেব বিস্মিত স্বরে বললেন, হাঁটতে তো ভালোই লাগছে! রাস্তাগুলি অন্যরকম লাগছে। আশ্চর্য তো! ব্যাপারটা কী?

আমি ব্যাপার ব্যাখ্যা করলাম না। রাতের বেলা রাস্তার চরিত্র বদলে যায় কেন সেই ব্যাখ্যা একেক জনের কাছে একেক রকম। আমার ব্যাখ্যা আমার কাছেই থাকুক।

বদরুল সাহেব বললেন, হাঁটতে হাঁটতে আমরা কোথায় যাব?

আমি বললাম, মাথায় কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে হাঁটার কোনো আরাম থাকে না। হাঁটতে হবে এলোমেলোভাবে। বলুন কীভাবে আপনাদের বিয়ে হলো।

‘মুন্সিগঞ্জে বেড়াতে গিয়েছিলাম। খালার শ্বশুরবাড়িতে। ওদের একান্নবর্তী পরিবার। লোকজন গিজগিজ করছে। কে কখন খায় কোনো ঠিক নেই। খাওয়াদাওয়ার ভেতরে কোনো যত্ন নেই। খেলে খাও, না খেলে খেও না ওইরকম ভাব। মাঝে মাঝে কী হয় জানেন? ভালো একটা পদ হয়তো রান্না হচ্ছে, এদিকে বেশির ভাগ মানুষ খেয়ে উঠে গেছে। কেউ জানেই না—মূল পদ এখনও রান্না হয়নি…’

বদরুল সাহেব তাঁর বিয়ের গল্পের জায়গায় খাওয়ার গল্প ফেঁদে বসেছেন। এই খাওয়াদাওয়ার ভেতর থেকে বিয়ের গল্প হয়তো শুরু হবে, কখন হবে কে জানে! ভদ্রলোকের সম্ভবত খিদেও পেয়েছে। খিদের সময় শুধু খাবার কথাই মনে পড়ে। তাঁকে খাওয়ানোর কী ব্যবস্থা করা যায় বুঝতে পারছি না। আবারও পকেটবিহীন পাঞ্জাবি নিয়ে বের হয়েছি। এই পাঞ্জাবি মনে হয় আর ব্যবহার করা যাবে না। বদরুল সাহেব গল্প চালিয়ে যাচ্ছেন—সেদিন কী হয়েছে শুনুন। পাবদামাছ এসেছে। এক খালুই মাছ, প্রত্যেকটা দেড় বিঘত সাইজ। এ-বাড়িতে আবার অল্প কিছু আসে না। যা আসে ঝুড়িভরতি আসে…

আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকলাম। বদরুল সাহেবের গল্পে বাধা পড়ল। আমরা টহলপুলিশের মুখোমুখি পড়ে গেলাম। খাকি পোশাকের কারণে সব পুলিশ একরকম মনে হলেও এটি যে গতকালেরই দল এতে আমার কোনো সন্দেহ রইল না। আমি আন্তরিক ভঙ্গিতে বললাম, কী খবর?

টহল পুলিশের দল থমকে দাঁড়াল।

‘আজ আপনাদের পাহারা কেমন চলছে?’

এই প্রশ্নেরও জবাব নেই। বদরুল সাহেব হকচকিয়ে গেছেন। কথাবার্তার ধরন ঠিক বুঝতে পারছেন না।

কালকের ওস্তাদজি আজও প্রথম কথা বললেন, তবে তুই-তোকারি না, ভদ্র ভাষা।

‘আপনারা কোথায় যান?’

‘ভাত খেতে যাই। আজ অবিশ্যি আমি খাব না। এই ভদ্রলোক খাবেন। ওনার নাম বদরুল আলম ওনাকে থাপ্পড় দিতে চাইলে দিতে পারেন। উনিও কিছু বলবেন না। উনিও আমার মতোই বিশিষ্ট ভদ্রলোক।‘

বদরুল সাহেব ফিসফিস করে বললেন, ব্যাপারটা কী কিছুই তো বুঝতে পারছি না! কী সমস্যা?

‘কোনো সমস্যা না। জনগণের সেবক পুলিশ ভাইরা এখন আপনার রাতের খাবার ব্যবস্থা করবেন।’

পুলিশদলের একজন বলল, কালকের ব্যাপারটা মনে রাখবেন না। নানা কিসিমের বদলোক রাস্তায় ঘোরে, নেশা করে। আমরা বুঝতে পারি নাই। একটা মিসটেক হয়েছে।

‘আমি কিছু মনে করিনি। মনের ভেতর অতি সামান্য খচখচানি আছে, সেটা দূর হয়ে যাবে—যদি আপনারা বদরুল সাহেবের রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’

‘এত রাতে!’

‘আপনাদের কারবারই তো রাতে। আপনাদের একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দি—কোনো—একটা বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল টিপুন। বাড়িওয়ালা দরজা খুলে এতগুলি পুলিশ দেখে যাবে ভড়কে। তখন আপনাদের যে ওস্তাদ তিনি বিনীত ভঙ্গিতে বলবেন, স্যার, এত রাতে ডিসটার্ব করার জন্যে খুবই দুঃখিত। একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক সারাদিন না খেয়ে আছেন। যদি একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন! দেখবেন তৎক্ষণাৎ খাবার ব্যবস্থা হবে। মধ্যরাতের পুলিশ ভয়াবহ জিনিস।’

বদরুল সাহেবের হতভম্ব ভাব কাটছে না। তাঁর ক্ষুধা-তৃষ্ণাও সম্ভবত মাথায় উঠে গেছে। পুলিশদলের একজন আমার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে একটু ‘প্রাইভেট টক’ আছে।

আমি ‘প্রাইভেট টক’ শোনার জন্যে ফুটপাত ছেড়ে নিচে নামলাম। সে কানের কাছে গুনগুন করে বলল, স্যার, বিরাট মিসটেক হয়েছে। রাস্তায় কত লোক হাঁটে, কে সাধু, কে শয়তান বুঝব কীভাবে!

আমিও তারমতোই নিচু গলায় বললাম, না-বোঝারই কথা।

‘ওস্তাদজি একটা ভুল করেছে। চড় দিয়ে ফেলেছে। তারপর থেকে উনার হাত ফুলে প্রচণ্ড ব্যাথা। ব্যথার চোটে রাতে ঘুমাতে পারেনি।’

‘বেকায়দায় চড় দিয়েছে। রগে টান পড়েছে। কিংবা হাতের মাসলে কিছু হয়েছে। ‘কী যে ব্যাপার সেটা স্যার আমরা বুঝে গেছি। এখন স্যার আমাদের ক্ষমা দিতে হবে। এটা স্যার আমাদের একটা আবদার।’

‘আচ্ছা যান, ক্ষমা দিলাম।’

‘ওস্তাদজি আজ ছুটি নিয়েছে। সারাদিন শুয়েছিল, রাতে বের হয়েছে শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য।

‘ভালোই হয়েছে দেখা হয়ে গেল।’

‘আপনি স্যার আমাদের জন্যে একটু দোয়া রাখবেন।’

‘অবশ্যই রাখব।’

‘উনার খাবার ব্যাপারে স্যার কোনো চিন্তা করবেন না।’

আমি বদরুল সাহেবকে বললাম, আপনি এদের সঙ্গে যান। খাওয়াদাওয়া করুন। তারপর মেসে চলে যাবেন। আমি ভোরবেলা ফিরব।

তিনি পুরোপুরি হকচকিয়ে গেছেন। কিছুতেই যাবেন না। পুলিশরা বলতে গেলে তাঁকে গ্রেফতার করেই নিয়ে গেল। বেচারার হতাশ দৃষ্টি দেখে মায়া লাগছে। মায়া ভালো জিনিস না। অনিত্য এই সংসারে মায়া বিসর্জন দেয়া শিখতে হয়। আমি শেখার চেষ্টা করছি।

Chapter - 3

বাদুর-স্বভাব আয়ত্ত করার চেষ্টা সফল হচ্ছে না। বাদুর-ভাব কয়েকদিন থাকে, তারপর ভেতর থেকে মানুষ-ভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাতে ঘুমুতে ইচ্ছে করে। দিনে হাজার চেষ্টা করেও ঘুমুতে পারি না। এখন আমার মানুষ-ফেজ চলছে। রাতে ঘুমুচ্ছি, দিনে জেগে আছি। রাস্তায় যাচ্ছি। হাঁটাহাঁটি করছি। দিনে হাঁটাহাঁটি করার মধ্যেও কিছু থ্রিল আছে। হঠাৎ-হঠাৎ খুব বিপজ্জনক কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যার সঙ্গে নিশিরাতে দেখা হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। রাত তিনটার সময় নিশ্চয়ই রেশমা খালার সঙ্গে নিউ মার্কেটের কাছে দেখা হবে না। প্রায় দুবছর পর রেশমা খালার সঙ্গে দেখা। পাজেরো নামের অভদ্র গাড়ির ভেতর ড্রাইভারের সিটের পাশে তিনি বসে আছেন। তাঁর মতো মহিলা ড্রাইভারের পাশে বসবেন ভাবাই যায় না। তবে শুনেছি পাজেরো গাড়িগুলি এমন যে ড্রাইভারের সিটের পাশে বসা যায়। এতে সম্মানহানি হয় না।

রেশমা খালা হাত উঁচিয়ে ডাকলেন, এই হিমু, এই…। ড্রাইভার ক্রমাগত হর্ন দিতে লাগল। আমার উচিত দ্রুত পালিয়ে যাওয়া। কোনো গলিটলির ভেতর ঢুকে পড়া। গলি না থাকলে ম্যানহোলের ঢাকনি খুলে তার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া। কিছু-কিছু-ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে ১০০ হাত দূরে থাকুন। রেশমা খালা সেই ট্রাকের চেয়েও ভয়াবহ। আশেপাশে গলিবা ম্যানহোল নেই। কাজেই আমি হাসিমুখে এগিয়ে গেলাম। রাস্তা পার হবার আগেই খালা চেঁচিয়ে বললেন, হিমু, তুই নাকি গলার কাঁটা নামাতে পারিস?

রেশমা খালা আমার কেমন খালা জানি না। লতায়-পাতায় খালা। ভদ্রমহিলার বয়স পঞ্চাশ পার হলেও এই মুহূর্তে খুকি সেজে আছেন। মাথাভরতি ঢেউ-খেলানো ঘন কালো চুল। এই চুল হংকং থেকে আনানো। ঠোঁট লাল টুকটুক করছে। জামদানি শাড়ি পরেছেন। গলায় মাটির মালা। কানে মাটির দুল। এটাই লেটেস্ট ফ্যাশান শান্তিনিকেতন থেকে আমদানি হয়েছে।

আমি গাড়ির কাছে চলে এলাম। রেশমা খালা চোখ বড় বড় করে বললেন, বাদলের মা’র কাছে ঘটনা শুনলাম। বড় বড় সার্জন কাত হয়ে গেছে—তুই গিয়েই মন্ত্রটন্ত্র পড়ে কাঁটা নামিয়ে ফেললি। কী রে, সত্যি?

‘হ্যাঁ সত্যি। তোমার কাঁটা লাগলে খবর দিও, নামিয়ে দিয়ে যাব।’

‘তোকে খবর দেব কীভাবে? তোর ঠিকানা কী? তোর কোনো কার্ড আছে?’

ঠিকানাই নেই—আবার কার্ড!’

‘তুই এক কাজ কর-না! আমার বাড়িতে চলে আয়। একতলাটা তো খালিই পড়ে থাকে। একটা ঘরে থাকবি। আমার সঙ্গে খাবি। ফ্রী থাকা-খাওয়া’

‘দেখি, চলে আসতে পারি।’

‘আসতে পারি-টারি না। চলে আয়। তুই কাঁটা নামানো ছাড়া আর কী পারিস?’

‘আপাতত আর কিছু পারি না।’

‘কে যেন সেদিন বলল, তুই ভূত-ভবিষ্যৎ সব বলতে পারিস। তোর সিক্সথ সেন্স নাকি খুব ডেভেলপড।

আমি হাসলাম। আমার সেই বিশেষ ধরনের হাসি। হাসি দেখে রেশমা খালাও আরও অভিভূত হলেন।

‘এই হিমু, গাড়িতে উঠে আয়।‘

‘যাচ্ছ কোথায়?’

‘কোথাও যাচ্ছি না। খালিবাড়িতে থাকতে কতক্ষণ আর ভালো লাগে! এইজন্যেই গাড়ি নিয়ে মাঝে মাঝে বের হই।’

‘বাড়ি খালি নাকি?’

‘ও আল্লা, তুই কি কিছুই জানিস না? তোর খালুর ইন্তেকালের পর বাড়ি খালি না? এত বড় বাড়িতে একা থাকি, অবস্থাটা চিন্তা করতে পারিস!

‘দারোয়ান, মালী, ড্রাইভার এরা তো আছে।’

‘খালিবাড়ি কি দারোয়ন, মালী, ড্রাইভার এই সবে ভরে? তুই চলে আয়। তোর কাঁটা নামানোর ক্ষমতার কথা শুনে দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগছে। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’

‘গাড়িতে ওঠ।’

‘আজ তো খালা যেতে পারব না। জরুরি কাজ।’

‘তোর আবার কিসের জরুরি কাজ? হাঁটা ছাড়া তোর আবার কাজ কী?’

‘আরেকজনের কাঁটা নামাতে হবে। চিতলমাছের কাঁটা গলায় বিধিয়ে বসে আছে। কোঁ কোঁ করছে। সেই কাঁটা তুলতে হবে।’

‘আমাকে নিয়ে চল। আমি দেখি ব্যাপারটা কী।’

‘তোমাকে নেয়া যাবে না খালা। মন্ত্রতন্ত্রের ব্যাপার তো! মেয়েদের সামনে মন্ত্ৰ কাজ করে না।’

‘মেয়েরা কী দোষ করেছে?’

‘মেয়েরা কোনোই দোষ করেনি। দোষ করেছে মন্ত্র। এই মন্ত্র নারীবিদ্বেষী।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমাকে না নিতে চাইলে না নিবি। গাড়িতে ওঠ, তোকে কিছুদূর এগিয়ে দি। রোদের মধ্যে হাঁটছিস দেখে মায়া লাগছে।’

কেউ গাড়িতে ওঠার জন্যে বেশি রকম পীড়াপীড়ি করলে ধরে নিতে হবে গাড়ি নতুন কেনা হয়েছে। আমি গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম, গাড়ি নতুন কিনলে?

‘নতুন কোথায়, ছয় মাস হয়ে গেল না।’

‘ছয় মাসে স্বামী পুরাতন হয়—গাড়ি হয় না। দারুণ গাড়ি!’

‘তোর পছন্দ হয়েছে?’

‘পছন্দ মানে! এরোপ্লেনের মতো গাড়ি!’

‘এই গাড়ির সবচে বড় সুবিধা কী জানিস? সামনাসামনি কলিশন হলে গাড়ির কিছু হবে না, কিন্তু অন্য গাড়ি ভর্তা হয়ে যাবে।’

‘বাহ্, দারুণ তো!’

‘তোর সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগছে রে হিমু। চাকরিবাকরি কিছু করছিস?’

‘তোমার হাতে চাকরি আছে?’

‘না। তোর খালুর মৃত্যুর পর মিল-টিল সব বিক্রি করে ক্যাশ টাকা করে ফেলেছি। ব্যাংকে জমা করেছি। আমি একা মানুষ—মিল-টিল চালানো তো সম্ভব না। সবাই লুটেপুটে খাবে। দরকার কী?’

‘কোনো দরকার নেই।’

গাড়ি চলছে। কোনো বিশেষ দিকে যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ড্রাইভার তার ইচ্ছামতো চালাচ্ছে। মিরপুর রোড ধরে চলতে চলতে ফট করে ধানমণ্ডি চার নম্বরে ঢুকে পড়ল। আবার কিছুক্ষণ পর মিরপুর রোডে চলে এল।

‘হিমু!’

‘জি খালা?’

‘তোর খালুর স্মৃতিরক্ষার্থে একটা-কিছু করতে চাই। কর্মযোগী পুরুষ ছিল। পথের ফকির থেকে কলকারখানা, গার্মেন্টস, করেনি এমন জিনিস নেই। স্ত্রী হিসেবে তার স্মৃতিরক্ষার জন্যে আমার তো কিছু করা দরকার।‘

‘করলে ভালো। না করলেও চলে।‘

‘না না, করা দরকার। ভালো কিছু করা দরকার। ওনার নামে একটা আর্ট মিউজিয়াম করলে কেমন হয়?’

‘ভালো হয়। তবে খালু সাহেবের নামে করা যাবে না। মানাবে না।’

‘মানাবে না কেন?’

‘গনি মিয়া মিউজিয়াম অভ মডার্ন আর্ট’ শুনতে ভালো লাগছে না। খালু সাহেবের নামটা গনি মিয়া না হয়ে আরেকটু সফেসটিকেটেড হলে মিউজিয়াম অভ মর্ডান আর্ট দেয়া যেত। তোমার নিজের নামে দাও না কেন? ‘রেশমা মিউজিয়াম অভ মডার্ন আট’ শুনতে তো খারাপ লাগছে না।’

গাড়ি মিরপুর রোড থেকে আবার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে ঢুকে পড়েছে। আবারও মনে হয় মিরপুরে আসবে। ভাল যন্ত্রণায় পড়া গেল!

‘খালা, আমার তো এখন যাওয়া দরকার। চিতলমাছের কাঁটা নামানো খুব সহজ না।‘

‘আহা বোস-না! তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে। কথা বলার মানুষ পাই না। কেউ আমার বাড়িতে আসে না। এটা একটা আশ্চর্য কাণ্ড! তোর খালুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কার্ড ছাপিয়ে পাঁচশো লোককে দাওয়াত দিয়েছি। তিনটা দৈনিক পত্রিকায় কোয়ার্টার পেইজ বিজ্ঞাপন দিলাম। লোক কত হয়েছে বল তো?’

‘একশো?’

‘আরে না—আঠারো জন! এর মধ্যে আমার নিজের লোকই সাতজন। ড্রাইভার, মালী, দারোয়ান, কাজের দুটা মেয়ে।’

‘আমাকে খবর দিলে চলে আসতাম।‘

‘তোকে খবর দেব কীভাবে? তোর কি কোনো স্থায়ী ঠিকানা আছে? ঠিকানা নেই। রাস্তায় যে ফকিরগুলি আছে তাদেরও ঠিকানা আছে। রাতে তারা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুমায়। আজিজ মার্কেটের বারান্দায় যে ঘুমুবে সে সেখানেই ঘুমুবে। সে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুমুবে না। আর তুই তো আজ এই মেসে, কাল ঐ মেসে। হিমু, তুই চলে আয় তো আমার কাছে! গুলশানের বাড়ি নুতন করে রিনোভেট করেছি। টাকাপয়সা খরচ করে হুলুস্থুল করেছি। তোর ভালো লাগবে। আসবি?’

‘ভেবে দেখি।’

‘ভাবতে হবে না। তুই চলে আয়। থাকা-খাওয়ার খরচার হাত থেকে তো বেঁচে গেলি! মাসে-মাসে নাহয় কিছু হাতখরচও নিবি।’

‘কত দেবে হাতখরচ?’

‘বিড়ি-সিগেরেটের খরচ—আর কী! কী, থাকবি? তুই থাকলে একটা ভরসা হয়। দিনকালের যে-অবস্থা চাকর-দারোয়ান এরাই বটি দিয়ে কুপিয়ে কোনোদিন-না মেরে ফেলে! এমন ভয়ে-ভয়ে থাকি! চলে আয় হিমু। আজই চলে আয়। বাড়ি তো চিনিসই। চিনিস না?’

‘হুঁ।’

‘তোকে দেখে আরেকটা কথা ভাবছি—বিশেষ বিশেষ ক্ষমতা আছে, প্যারা নরমাল পাওয়ার যাদের, এদের বাড়িতে এনে রাখলে কেমন হয়। অ্যাস্ট্রলজার, পামিস্ট, বুঝতে পারছিস কী বলছি?’

‘পারছি—ইনস্টিটিউট অভ সাইকিক রিসার্চ টাইপ।’

‘ঠিক বলেছিস। বাংলাদেশে তো এরকম আগে হয়নি। নাকি হয়েছে?’

‘না, হয়নি। করতে পার। নাম কী দেবে? ‘গনি মিয়া ইনস্টিটিউট অভ সাইকিক রিসার্চ’?

‘নামটা কেমন শোনাচ্ছে?’

‘মিয়াটা বাদ দিলে খারাপ লাগবে না—গনি ইনস্টিটিউট অব সাইকিক রিসার্চ খালা, এইখানে আমি নামব। ড্রাইভার, গাড়ি থামাও। গাড়ি না থামালে আমি জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নেমে পড়ব।’

ড্রাইভার গাড়ি থামাল। রেশমা খালা বললেন, কী ঠিক হলো? তুই আসছিস?

‘হুঁ। আমার এ-মাসের হাতখরচের টাকা দিয়ে দাও।’

‘থাকাই শুরু করলি না—হাতখরচ কী?’

‘আমি তো খালা চাকরি করছি না যে মাসের শেষে বেতন। এটা হলো হাতখরচ।’

‘তুই আগে বিছানা-বালিশ নিয়ে উঠে আয়, তারপর দেখা যাবে।’

‘আচ্ছা।’

আমি লম্বা লম্বা পা ফেলা শুরু করলাম। উদ্ধার পাওয়া গেছে, এখন চেষ্টা করা উচিত যত দূরে সরে পড়া যায়। সম্ভাবনা খুব বেশি যে খালা তাঁর গাড়ি নিয়ে আমার পেছনে পেছনে আসবেন। আমার উচিত ছোট কোনো গলিতে ঢুকে পড়া, যেখানে পাজেরো—টাইপ গাড়ি ঢুকতে পারে না।

‘এই হিমু, এই, এক সেকেন্ড শুনে যা! এই, এই!’

বধির হয়ে যাবার ভান করে আমি গলি খুঁজছি। গাড়ির ড্রাইভার ক্রমাগত হর্ন দিচ্ছে। না ফিরলে চারদিকে লোক জমে যাবে। বাধ্য হয়ে ফিরলাম।

‘নে, হাতখরচ নে। না দিলে আবার হাতখরচ দেয়া হয়নি এই অজুহাতে আসবি না।’

রেশমা খালা একটা চকচকে পাঁচশো টাকার নোট জানালা দিয়ে বাড়িয়ে ধরলেন। ‘তুই সন্ধ্যায়-সন্ধ্যায় চলে আসিস। সন্ধ্যার পর থেকে আমি বাসায় থাকি। নানান সমস্যা আছে, বুঝলি? ভয়ংকর ব্যাপার ঘটেছে। কাউকে বলা দরকার। রাতে একফোঁটা ঘুমুতে পারি না।’

‘চলে আসব।’

‘টাকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? পবেটে রাখ। হারিয়ে ফেলবি তো!’

‘খালা, আমার পকেট নেই। যাবতীয় টাকাপয়সা আমাকে হাতে নিয়ে ঘুরতে হয়।’

‘বলিস কী!’

‘খালা, যাই?’

যাই বলে দেরি করলাম না, প্রায় দৌড়ে এক গলিতে ঢুকে পড়লাম।

.

টাকা কি কেউ হাতে নিয়ে ঘোরে? বাসের কন্ডাক্টাররা টাকা হাতে রাখে। আর কেউ? পাঁচশো টাকার চকচকে একটা নোট হাতে রাখতে বেশ ভালোই লাগছে। নোটটা এতই নতুন যে ভাঁজ করতে ইচ্ছা করছে না। চনমনে রোদ ওঠায় গরম লাগছে। নোটের সাইজ আরেকটু বড় হলে টাকা দিয়ে বাতাস খেতে খেতে যাওয়া যেত।

খালার হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছি শ্যামলীতে। সেখান থেকে কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। হেঁটে হেঁটে আবার নিউ মার্কেটের কাছে চলে আসা যায়। ইচ্ছা করলে রিকশা নিতে পারি, ভাড়া দেয়া সমস্যা হবে না। বুড়ো অথর্ব-টাইপ রিকশাওয়ালা যাদের রিকশায় কেউ চড়ে না, এমন কেউ যে রিকসা ঠিকমতো টানতেও পারে না, বয়সের ভারে কানেও ঠিক শোনে না, গাড়ির সামনে হঠাৎ রিকশা নিয়ে উপস্থিত হয়—এইসব রিকশায় চড়া মানে পদেপদে বিপদের মধ্যে পড়া।

যেহেতু রেশমা খালার বাড়িতে আমি থাকতে যাব না, সেহেতু এই পাঁচশো টাকা কোনো এক সৎকর্মে ব্যয় করতে হবে।

অনেকদিন কোনো সৎকর্ম করা হয় না। ভাড়া হিসেবে পুরো নোটটা দিয়ে দিলে সাধারণ মানের একটা সৎকর্ম করা হবে।

পছন্দসই কোনো রিকশাওয়ালা পাওয়া যাচ্ছে না। একজনকে বেশ পছন্দ হলো, তবে তার বয়স অল্প। বুড়ো রিকশাওয়ালা কেউই নেই। বুড়োরা আজ কেউই রিকশা বের করেনি। আসাদ গেটে এসে একজনকে পাওয়া গেল। চলনসই ধরনের বুড়ো। রিকশার সিটে বসে চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খাচ্ছে। সকালের ব্রেকফাস্ট বোধ হয় না, বারোটার মতো বাজে। লাঞ্চ হবারও সম্ভাবনা কম। সম্ভবত প্রি-লাঞ্চ।

‘রিকশা, ভাড়া যাবেন?’

বুড়ো প্রায় ধমকে উঠল—না। খাওয়ার মাঝখানে বিরক্ত করায় সে সম্ভবত খেপে গেছে।

‘কাছেই যাব। বেশি দূর না—নিউ মার্কেটে।’

‘ঐ দিকে যামু না।’

‘ফার্মগেট যাবেন? ফার্মগেট গেলেও আমার চলে।’

‘যামু না।’

‘যাবেন না কেন?

‘ইচ্ছা করতাছে না। ‘

‘আমি নাহয় অপেক্ষা করি। আপনি চা শেষ করেন, তারপর যাব। ফার্মগেট যেতে না চান তাও সই। অন্য যেখানে যেতে চান যাবেন। আমাকে কোনো এক জায়গায় নামিয়ে দিলেই হবে।’

মনে হয় আমার প্রস্তাবে সে রাজি হয়েছে। কিছু না বলে চা-পাউরুটি শেষ করল। লুঙ্গির ভাঁজ থেকে বিড়ি বের করে আয়েশ করে বিড়ি টানতে লাগল। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি। কাউকে দান করতে যাওয়াও সমস্যা। দান করতেও ধৈর্য লাগে। হুট করে দান করা যায় না। বুড়ো বিড়িটানা শেষ করে রিকশার সিট থেকে নামল। আমি উঠতে যাচ্ছি সে গম্ভীর গলায় বলল, কইছি না যামু না! ত্যক্ত করেন ক্যান?

সে খালি রিকশা টেনে বেরিয়ে গেল। একটু সামনে গিয়ে দুজন যাত্রীও নিল। যে—কোনো কারণেই হোক আমাকে তার পছন্দ হয়নি। পাঁচশো টাকার চকচকে নোটটা তাকে দেয়া গেল না।

আমি ফার্মগেটের দিকে রওনা হলাম। নানান কিসিমের অভাবী মানুষ ঐ জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ভিক্ষার বিচিত্র টেকনিক দেখতে হলে ফার্মগেটের চেয়ে ভালো কোনো জায়গা হতে পারে না। একবার একজনকে পেয়েছিলাম ইংরেজিতে ভিক্ষা করেন।

‘Sir. I am a needy man sir.
Three school-I going daughters.
Lost my job, presently pennyless.‘

আমি বললাম, ইংরেজিতে ভিক্ষা করছেন কেন? বাংলা ভাষার জন্যে আমরা এত রক্ত দিয়েছি সে কি ইংরেজিতে ভিক্ষা করার জন্যে? শিক্ষার জন্যে বাংলার চেয়ে ভালো ভাষা হতেই পারে না।

ইংরেজি ভাষার ভিক্ষুক চোখমুখ কুঁচকে তাকাল। আমি বললাম, ফেব্রুয়ারি মাসেও কি ইংরেজিতে ভিক্ষা করেন? নাকি তখন বাংলা ভাষা?

আরেকজন আছেন, ভদ্র চোহরা। ভদ্র পোশাক। তিনি এসে খুবই আদবের সঙ্গে বলেন, ভাই কিছু মনে করবেন না, কয়টা বাজে? আমার ঘড়িটা বন্ধ।

যাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি ভদ্রলোকের ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে যান–ঘড়ি দেখে সময় বলেন।

‘অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকাল মানুষ এমন হয়েছে সময় জিজ্ঞেস করলে রেগে যায়।’

‘না না, ঠিক আছে।’

তখন ভদ্রলোক গলা নিচু করে বলেন—ভাইসাহেব, একটা মিনিট সময় হবে? দুটা কথা বলতাম।

যে সময় দিয়েছে সে-ই মরেছে। তার বিশ-পঁচিশ টাকা খসবেই।

আরেক ভদ্রলোককে মাঝে মাঝে দেখা যায়। খদ্দরের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল, হাতে বেনসনের প্যাকেট। ভদ্রলোকের পাঞ্জাবির পকেটে সম্রাট আকবরের সময়কার একটা মোহর। দেড় ভরির মতো ওজন। তাঁর গল্প হচ্ছে—তিনি এরকম মুদ্রাভরতি একটা ঘটি পেয়েছেন। কাউকে জানাতে চাচ্ছেন না। জানলে সরকার সিজ করে নিয়ে যাবে। তিনি গোপনে মুদ্রাগুলি বিক্রি করতে চান। তাই বলে সস্তায় না। সোনার যা দাম সেই হিসেবে কিনতে হবে। কারণ, খাঁটি সোনার মোহর। ভদ্রলোকের মূল ব্যবসার জায়গা ফার্মগেট না। ফার্মগেটে তিনি অন্য উদ্দেশ্যে আসেন। উদ্দেশ্যটা আমার কাছে পরিষ্কার না।

পরিচিত ভিক্ষুকের কাউকেই পেলাম না, তবে আশ্চর্যজনকভাবে আবদুর রশিদকে পেয়ে গেলাম। চশমা দেখে চিনলাম। চশমার ডাঁট নেই, সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বাঁধা হাতে একতাড়া কাগজ নিয়ে এর-তার কাছে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। হলুদ রঙের বড় একটা খামও আছে। নির্ঘাত এক্সরে প্লেট।

‘রশিদ সাহেব না? কেমন আছেন? চিনতে পারছেন?’

ভদ্রলোক চশমার আড়াল থেকে পিটপিট করে তাকাচ্ছেন। চিনতে পারছেন কি না বোঝা যাচ্ছে না।

‘চশমার ডাঁট আবার ফেলে দিয়ে সুতা লাগিয়েছেন? এতে কি ভিক্ষার সুবিধা হয়?’

‘আপনাকে চিনতে পারছি না।’

‘চিনবেন না কেন? আমি বদরুল সাহেবের বন্ধু। আপনার হাতে কী? প্রেসক্রিপশন? এত পুরানো টেকনিকে গেলেন কেন?’

আবদুর রশিদ কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন, ছেলে মরণাপন্ন। লাংসে পানি জমেছে। পুরিসি। প্রফেসর রহমান ট্রিটমেন্ট করছেন। বিশ্বাস না হলে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২ নং ওয়ার্ডে যেতে পারেন।

‘অবস্থা খারাপ?’

আবদুর রশিদ জবাব দিলেন না। ক্রুর দৃষ্টিতে আমাকে দেখছেন। আমি বললাম, টাকাপয়সা কিছু জোগাড় করতে পেরেছেন?

‘তা দিয়ে আপনার দরকার কী?’

‘দরকার আছে। আমি এককাপ চা খাব। চা এবং একটা সিগারেট। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। হাতে একদম পয়সা নেই।’

‘পাঁচশো টাকার একটা নোট তো আছে।’

‘নোটটা আমার না। বুড়ো এক রিকশাওয়ালার নোট। তাকে ফেরত দিতে হবে। খাওয়াবেন এককাপ চা? আপনার কাছে আমার চা পাওনা আছে। ঐদিন আপনাকে চা—শিঙাড়া খাইয়েছিলাম।’

আব্দুর রশিদ চা খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। শুকনো গলায় বললেন, চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন?

শিঙাড়া খাওয়ান। তা হলে শোধবোধ হয়ে যাবে। আপনিও আমার কাছে ঋণী থাকবেন না, আমিও ঋণী থাকব না।’

চায়ের সঙ্গে শিঙাড়াও এল। আমি গলার স্বর নামিয়ে বললাম, রশিদ সাহেব, ভিক্ষার একটা ভালো টেকনিক আপনাকে শিখিয়ে দিই। কিছুদিন ব্যবহার করতে পারবেন, তবে এক জায়গায় একবারের বেশি দুবার করা যাবে না। জায়গা বদল করতে হবে। বলব?

রশিদ সাহেব চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। তাঁর চোখমুখ কঠিন। আমি খানিকটা ঝুঁকে এসে বললাম, ময়লা একটা গামছা শুধু পরবেন। সারা শরীরে আরকিছু থাকবে না। চোখে চশমা থাকতে পারে। আপনি করবেন কি—মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত-টাইপের লোকদের কাছে যাবেন। গিয়ে নিচু গলায় বলবেন—আমার কোনো সাহায্য লাগবে না, কিচ্ছু লাগবে না, দোকান থেকে আমাকে শুধু একটা লুঙ্গি কিনে দেন। কেউ টাকা দিতে চাইলেও নেবেন না। দেখবেন দশ মিনিটের ভেতর আপনাকে লুঙ্গি কিনে দেবে। তবে একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন—বড়লোকের কাছে কিছু চাইবেন না। আপনি গামছা পরে আছেন, না ন্যাংটো আছেন তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু যারা নিম্নবিত্ত তারা আপনাকে দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হবে। ওদের মনে হবে একদিন আপনার মতো অবস্থা তাদেরও হতে পারে। তখন তারা ব্যস্ত হয়ে পড়বে লুঙ্গি কিনে দিতে। সেই লুঙ্গি আপনি বিক্রি করে দেবেন। আবার আরেকটার ব্যবস্থা করবেন। বুঝতে পারছেন? মন দিয়ে কাজ করলে দৈনিক পাঁচ থেকে ছ’টা লুঙ্গির ব্যবস্থা ইনশাল্লাহ্ হয়ে যাবে।

আবদুর রশিদ কঠিন চোখে তাকালেন। আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, ভালো বুদ্ধি দিয়েছি, এখন একটা সিগারেট খাওয়ান।

আবদুর রশিদ সিগারেট খাওয়ালেন না। চা-শিঙাড়ার দাম দিয়ে উঠে চলে গেলেন।

বুড়ো রিকশাওয়ালা একজন পাওয়া গেল। বুড়ো হলেও তার গায়ে শক্তিসামর্থ্য ভালোই। টেনে রিকশা নিয়ে যাচ্ছে। গল্প জমাবার চেষ্টা করলাম। গল্প জমল না। শুধু জানাল তার আদিবাড়ি ফরিদপুর।

সাতটাকা ভাড়ার জায়গায় পাঁচশো টাকা ভাড়া পেয়ে তার চেহারার কোনো পরিবর্তন হলো না। নির্বিকার ভঙ্গিতেই সে টাকাটা রেখে দিল। গামছা দিয়ে মুখ মুছল। মনে হয় তার বিস্মিত হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।

.

ম্যানেজার হায়দার আলি খাঁ আমাকে দেখে আনন্দিত গলায় বললেন, সকাল থেকে আপনার জন্যে একটা মেয়ে বসে আছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল শেষে আমি আপনার ঘর খুলে দিলাম।

ঘর খুলে দিলেন কেন?’

‘মেয়েছেলে কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকবে!’

‘নাম কী মেয়ের?’

‘নাম জিজ্ঞেস করি নাই। নাম জিজ্ঞেস করলে বেয়াদবি হয়। সুন্দরমতো মেয়ে।’

রূপা নাকি? রূপা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। সে এসে দীর্ঘ সময় বসে থাকবে না। গাড়ি থেকেই তার নামার কথা না। সে গাড়িতে বসে থাকবে—ড্রাইভারকে পাঠাবে খোঁজ নিতে। তা হলে কে হতে পারে?

ঘরে ঢুকে দেখি বাদলদের বাসায় যে মেয়েটিকে দেখেছিলাম—সে। পদার্থবিদ্যার ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী। মীরা কিংবা ইরা নাম।

আমি খুব সহজভাবে ঘরে ঢুকে বিন্দুমাত্র আশ্চর্য না হওয়ার ভঙ্গি করে বললাম, কী খবর ইরা, ভালো?

ইরা বসে ছিল, উঠে দাঁড়াল। কিছু বলল না। তার মুখ কঠিন। ভুরু কুঁচকে আছে। বড় ধরনের ঝগড়া শুরুর আগে মেয়েদের চেহারা এরকম হয়ে যায়।

‘আমার এখানে কী মনে করে? গলায় কাঁটা?’

‘আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। আমি সেই সকাল এগারোটা থেকে বসে আছি!’

‘বসো। তারপর বলো কী কথা।

‘আপনার সঙ্গে আমার কথা ছিল যে আপনি আমাকে আপনি-আপনি করে বলবেন।‘

‘আমার একদম মনে থাকে না। কোনো কোনো মানুষকে প্রথম দেখা থেকেই এত আপন মনে হয় যে শুধু তুমি বলতে ইচ্ছে করে।’

‘দয়া করে মেয়েভুলানো কথা আমাকে বলবেন না। এইজাতীয় কথা আমি আগেও শুনেছি।‘

‘পাত্তা দেননি?’

‘পাত্তা দেয়ার কোনো কারণ আছে কি?

‘আছে। ছেলেরা নিতান্ত অপারগ হয়ে এইসব কথা বলে। প্রথম দেখাতে তো সে বলতে পারে না—’আমি আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।’ বলতে লজ্জা লাগে। যে শোনে তারও খারাপ লাগে। কাজেই ঘুরিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয়।

‘প্রেমবিষয়ক তত্ত্বকথা আমি শুনতে আসিনি। আপনার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। আমি কথাগুলি বলে চলে যাব।’

‘অবশ্যই। একটু বসুন। ঠাণ্ডা হোন। ঠাণ্ডা হয়ে তারপর বলুন।’

ইরা বসল না, দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখমুখ যতটা কঠিন ছিল তারচেয়েও কঠিন হয়ে গেল।

‘কথাটা হচ্ছে বাদলদের বাড়িতে যে কাজের বুয়া আছে—তার একটা মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল।’

‘ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। লুৎফা নাম।’

‘সে নাকি আপনাকে বলেছিল তার মেয়েকে খুঁজে দিতে?’

‘হ্যাঁ, বলেছিল। এখনও খোঁজা শুরু করিনি। আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনি বলায় মনে পড়ল।’

‘আপনাকে খুঁজতে হবে না। মেয়ে পাওয়া গেছে।’

‘বাঁচা গেল! তিরিশ লক্ষ লোকের মাঝখান থেকে লুৎফাকে খুঁজে পাওয়া সমস্যা হতো।’

‘আপনাকে সে যেদিন বলল, সেদিন দুপুরেই মেয়ে উপস্থিত। ব্যাপারটা যে পুরোপুরি কাকতালীয় তাতে কি আপনার কোনো সন্দেহ আছে?’

‘কোনো সন্দেহ নেই। ‘

‘আপনি নিশ্চয়ই দাবি করেন না যে আপনার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দিয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন?’

‘পাগল হয়েছেন!’

‘বুয়ার ধারণা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দিয়ে কাজটা করা হয়েছে। বাদলেরও তা-ই ধারণা।’

‘কার কী ধারণা তাতে কী যায় আসে? মেয়েটাকে পাওয়া গেছে এটাই বড় কথা। ইরা কঠিন গলায় বলল, কে কী ভাবছে তাতে অনেক কিছুই যায়-আসে। এইভাবেই সমাজের বুজরুকি তৈরি হয়। আপনার মতো মানুষরাই সোসাইটির ইকুইলিব্রিয়াম নষ্ট করেন। বাদলের মাথা তো আপনি আগেই খারাপ করেছিলেন, এখন বুয়ার মাথাও খারাপ করলেন।

‘তা-ই নাকি!’

‘হ্যাঁ, তা-ই। বাদলের মাথা যে আপনি কী পরিমাণ খারাপ করেছেন সেটা বি আপনি জানেন?’

‘না, জানি না।’

‘দু’একদিনের ভেতর একবার এসে দেখে যান। ব্রাইট একটা ছেলে। বাবা-মা’র কত আশা ছেলেটাকে নিয়ে! আপনি তাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলেছেন। ফালতু বুজরুকি। উদ্ভট উদ্ভট কথা। মহাপুরুষ মহাপুরুষ খেলা। রাতদুপুরে রাস্তায় হাঁটলেই মানুষ মহাপুরুষ হয়ে যায়?’

ইরা রাগে কাঁপছে। মেয়েটা এতটা রেগেছে কেন বুঝতে পারছি না। এত রাগার তো কিছু নেই! আমার বুজরুকিতে তার কী যায় আসে?

ইরা বলল, আমি এখন যাব।

‘চা-টা কিছু খাবেন না?’

‘না। আপনি দয়া করে বাদলকে একটু দেখে যাবেন। ওর অবস্থা দেখে আমার কান্না পাচ্ছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে আসলে আপনার শাস্তি হওয়া উচিত। কঠিন শাস্তি।’

ইরা গটগট করে বের হয়ে গেল। মেয়েটা বেশ সুন্দর। রেগে যাওয়ায় আরও সুন্দর লাগছে। যে-রাগের সঙ্গে ঘৃণা মেশানো থাকে সেই রাগের সময় মেয়েদের সুন্দর দেখায় না, যে-রাগের সঙ্গে সামান্যতম হলেও ভালোবাসা মেশানো থাকে সেই রাগ মেয়েদের রূপ বাড়িয়ে দেয়। ইরা কি সামান্য ভালোবাসা আমার জন্যে বোধ করা শুরু করেছে। এটা আশঙ্কার কথা। ভালবাসা বটগাছের মতো। ক্ষুদ্র বীজ থেকে শুরু হয়। তারপর হঠাৎ একদিন ডালপালা মেলে দেয়, ঝুড়ি নামিয়ে দেয়।

ইরার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। বাদলদের বাড়িতে ভুলেও যাওয়া যাবে না। ইর মেসের ঠিকানা বের করে চলে এসেছে কীভাবে সেটাও এক রহস্য। ঠিকানা তার জানার কথা না। ঐ বাড়ির কেউ জানে না।

রাতে খেতে গিয়ে শুনি বদরুল সাহেব আমার খাওয়া খেয়ে চলে গেছেন। মেসের বাবুর্চি খুবই বিরক্তি প্রকাশ করল।

‘রোজ এই কাম করে! আফনের খাওন খায়!’

‘ঠিকই করেন। আমি তাঁকে বলে দিয়েছি। এখন থেকে তিনিই খাবেন।’

‘আফনে খাইবেন না?’

‘আমি কয়েকদিন বাইরে থাকব।’

.

ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমানোর আলাদা আনন্দ আছে। সেই আনন্দ পাবার উপায় হচ্ছে—পেট ভরতি করে পানি খেয়ে ঘুমুতে যাওয়া। পেটভরতি পানির কারণেই হোক কিংবা অন্য কারণেই হোক, নেশার মতো হয়। ঝিমুনি আসে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমের সময়ের স্বপ্নগুলি হয় অন্যরকম। তবে আজ তা হবে না। রাতে না খেলেও দিনে খেয়েছি। ক্ষুধার্ত ঘুমের স্বরূপ বুঝতে হলে সারাদিন অভুক্ত থাকার পর পেট ভরতি করে পানি খেয়ে ঘুমুতে যেতে হয়। নেশার ভাবটা হয় তখন!

বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। বদরুল সাহেব মিহি গলায় ডাকলেন, হিমু ভাই! হিমু ভাই! আমি উঠে দরজা খুললাম।

বদরুল সাহেব লজ্জিত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একঠোঙা মুড়ি, খানিকটা গুড়। আমি বললাম, ব্যাপার কী বলুন তো!

‘শুনলাম আপনি খেতে গিয়েছিলেন। এদিকে আমি ভেবেছি আপনি আসবেন না…’

‘ও, এই ব্যাপার!’

‘খুব লজ্জায় পড়েছি হিমু ভাই। আপনার জন্যে মুড়ি এনেছি।’

‘ভালো করেছেন। আজ রাতটা উপোস দেব বলে ঠিক করেছি। মাঝে মাঝে আমি উপোস দিই। আপনি গুড়-মুড়ি খান। আমি মুড়ি খাওয়ার শব্দ শুনি।’

‘কিছু খাবেন না হিমু ভাই?’

‘না। তারপর ঐদিন কী হলো বলুন—পুলিশরা যত্ন করে খাইয়েছিল?’

‘যত্ন বলে যত্ন! এক হোটেলে নিয়ে গেছে। পোলাও, খাসির রেজালা, হাঁসের মাংস, সব শেষে দৈ-মিষ্টি। এলাহি ব্যাপার! খুবই যত্ন করেছে। হাঁসের মাংসটা অসাধারণ ছিল। এত ভালো হাঁসের মাংস আমি আমার জীবনে খাইনি। বেশি করে রসুন দিয়ে ভুনা-ভুনা করেছে। এই সময়ের হাঁসের মাংসে স্বাদ হয় না। হাঁসের মাংস শীতের সময় খেতে হয়। তখন নতুন ধান ওঠে। ধান খেয়ে খেয়ে হাঁসের গায়ে চর্বি হয়। আপনার ভাবিও খুব ভালো হাঁস রাঁধতে পারে। নতুন আলু দিয়ে রাঁধে। আপনাকে একবার নিয়ে যাব। আপনার ভাবির হাতের হাঁস খেয়ে আসবেন

‘কবে নিয়ে যাবেন?’

‘এই শীতেই নিয়ে যাব। আপনার ভাবিকে চিঠিতে আপনার কথা প্রায়ই লিখি তো! তারও খুব শখ আপনাকে দেখার। একবার আপনার অসুখ হলো—আপনার ভাবিকে বলেছিলাম দোয়া করতে। সে খুব চিন্তিত হয়েছিল। কোরান খতম দিয়ে বসে আছে। মেয়েমানুষ তো, অল্পতে অস্থির হয়।’

‘আপনার চাকরির কী হলো? শনিবারে হবার কথা ছিল না? গিয়েছিলেন?’

বদরুল সাহেব চুপ করে রইলেন। আমি বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললাম, যাননি?

‘জি, গিয়েছিলাম। ইয়াকুব ভুলে গিয়েছিল।’

‘ভুলে গিয়েছিল?’

‘হ্যাঁ। সে তো একটা কাজ নিয়ে থাকে, না, অসংখ্য কাজ করতে হয়। তার পিএ সে ফাইল দেয়নি। কাজেই ভুলে গেছে।’

‘এখন কি ফাইল দিয়েছে?’

‘এখন তো দেবেই। পিএ-কে ডেকে খুব ধমকাধমকি করল। আমার সামনেই করল। বেচারার জন্যও মায়া লাগছিল। সে তো আর শত্রুতা করে আমার ফাইল অটকে রাখেনি, ভুলে গেছে! মানুষমাত্রেরই তো ভুল হয়।

‘ইয়াকুব সাহেব এখন কী বলছেন? কবে নাগাদ হবে?’

তারিখ-টারিখ বলেনি। আরেকটা বায়োডাটা জমা দিতে বলেছে।’

‘দিয়েছেন?’

‘হুঁ।’

‘এবারও কি ফাইলের উপর আর্জেন্ট লিখে দিয়েছেন?’

‘হুঁ।‘

‘আবার কবে খোঁজ নিতে বলেছেন?’

‘বলেছে বারবার এসে খোঁজ নেবার দরকার নেই। ওপেনিং হলেই চিঠি চলে আসবে।’

‘সেই চিঠি কবে নাগাদ আসবে তা কি বলেছেন?’

‘খুব তাড়াতাড়িই আসবে। আমি আমার অবস্থার কথাটা বুঝিয়ে বলেছি। চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম যে অন্যের খাবার খেয়ে বেঁচে আছি। শুনে সে খুবই মন-খারাপ করল।

‘বুঝলেন কী করে যে মন-খারাপ করেছে? মুখে কিছু বলেছে?’

‘কিছু বলেনি। চেহারা দেখে বুঝেছি।’

‘আমার কী মনে হয় জানেন বদরুল সাহেব, আপনার অন্যান্য জায়গাতেও চাকরির চেষ্টা করা উচিত। ইয়াকুব সাহেবের উপর আমার তেমন ভরসা হচ্ছে না।’

‘ভরসা না হবার কিচ্ছু নেই হিমু ভাই। স্কুলজীবনের বন্ধু। আমার সমস্যা সবটাই জানে। আমার ধারণা, এক সপ্তাহের মধ্যেই চিঠি পাব।’

‘যদি না পান?’

‘না পেলে অফিসে গিয়ে দেখা করব। বারবার যেতে লজ্জাও লাগে। নানান কাজ নিয়ে থাকে। কাজে ডিসটার্ব হয়।’

ঘর অন্ধকার। কচকচ শব্দ হচ্ছে। বদরুল সাহেব মুড়ি খাচ্ছেন।

‘হিমু ভাই!’

‘জি?’

‘ফ্রেশ মুড়ি। খেয়ে দেখবেন?’

‘আপনি খান।‘

‘মুড়ির আসল স্বাদও পাওয়া যায় শীতকালে। আপনার ভাবি আবার মুড়ি দিয়ে মোয়া বানাতে পারে। কী জিনিস তা না খেলে বুঝবেন না।’

‘একবার খেয়ে আসব।’

‘অবশ্যই খেয়ে আসবেন।’

‘বদরুল সাহেব।’

‘জি?’

‘আমি কিছুদিন অন্য জায়গায় গিয়ে থাকব। কেউ আমার খোঁজে এলে বলে দেবেন মেস ছেড়ে দিয়েছি। মিথ্যা কথা বলতে পারেন তো?’

‘আপনি বললে—মিথ্যা বলব। আপনার জন্যে করব না এমন কাজ নাই। শুধু মানুষ-খুনটা পারব না।’

‘মানুষ খুন করতে হবে না, শুধু একটু মিথ্যা বলবেন। ইরা নামের একটা মেয়ে আমার খোঁজে আসতে পারে, তাকে বলবেন আমি সুন্দরবনে চলে গেছি। মাসখানিক থাকব। তবে রূপা এলে আমি কোথায় আছি সেই ঠিকানা দিয়ে দেবেন।’

‘ঠিকানাটা কী?’

‘আমার এক দূর সম্পর্কের খালা আছে—রেশমা। গুলশানে থাকে। গুলশান দুই নম্বর। বাড়ির নাম গনি প্যালেস। ঐ প্যালেসে সপ্তাহখানিক লুকিয়ে থাকব। না থাক, ওকেও সুন্দরবনের কথাই বলবেন।’

Chapter - 4

গুলশান এলাকায় সবচে বড়, সবচে কুৎসিত বাড়িটা রেশমা খালার। খালুসাহেব গনি মিয়ার সিক্সথ সেন্স ছিল অকল্পনীয়। তিনি সস্তাগণ্ডার সময়ে গুলশানে দুবিঘা জমি কিনে ফেলে রেখেছিলেন। তাঁর বেকুবির উদাহরণ হিসেবে তখন এই ঘটনার উল্লেখ করা হতো। যার সঙ্গেই দেখা হতো রেশমা খালা বলতেন, বেকুবটার কাণ্ড শুনেছ? জঙ্গল কিনে বসে আছে।

খালুসাহেবের চেহারা বেকুবের মতোই ছিল। অন্যের কথা শোনার সময় আপনা—আপনি মুখ হাঁ হয়ে যেত। ব্যবসা-বিষয়ে যেসব কথা বলতেন সবই হাস্যকর বলে মনে হতো। যে-বছর দেশে পেঁয়াজের প্রচুর ফলন হলো এবং পেঁয়াজের দাম পড়ে গেল সে—বছরই তিনি পেঁয়াজের ব্যবসায় চলে এলেন। ইন্ডিয়া থেকে পেঁয়াজ আনার জন্য এলসি খুললেন। অন্য ব্যবসায়ীরা হাসল। হাসারই কথা। রেশমা খালা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি নাকি বেকুবের মতো পেঁয়াজের ব্যবসায় নামছ? যত দিন যাচ্ছে তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি তো ততই চলে যাচ্ছে! আগে মাঝেমধ্যে হাঁ করে থাকতে, এখন দেখি সারাক্ষণই হাঁ করে থাক। পেঁয়াজের ব্যবসার এই বুদ্ধি তোমাকে কে দিল?

‘কেউ দেয় নাই। নিজেরই বুদ্ধি। পেঁয়াজের ফলন খুব বেশি হয়েছে তো, চাষি ভালো দাম পায় নাই। এইজন্য আগামী বছর পেঁয়াজের চাষ হবে কম। পেঁয়াজের দাম হবে আকাশছোঁয়া।

‘তোমার মাথা!’

‘দ্যাখো-না কী হয়!’

গনি সাহেব যা বললেন তা-ই হলো। পরের বছর পেঁয়াজ দেশে প্রায় হলোই না। রেশমা খালা হতভম্ব। তিনি বলে বেড়াতে লাগলেন, বেকুব মানুষ তো! বেকুব মানুষের উপর আল্লাহর রহমত থাকে। যে-ব্যবসাই করে দুহাতে টাকা আনে। টাকা ব্যাংকে রাখার জায়গা নেই, এমন অবস্থা।

রেশমা খালার আফসোসের সীমা নেই—বেকুব স্বামী টাকা রোজগার করাই শিখেছে, খরচ করা শেখেনি। তিনি আফসোসের সঙ্গে বলেন, টাকা খরচ করতে তো বুদ্ধি লাগে। বুদ্ধি কোথায় যে খরচ করবে? খালি জমাবে।

গনি সাহেব মাছ-গোশত একসঙ্গে খান না। ছোটবেলায় তাঁর মা বলেছেন, মাছ—গোশত একসঙ্গে খেলে পেটের গণ্ডগোল হয়। সেটাই মাথায় রয়ে গেছে। গাড়িতে চড়তে পারেন না, বেবিট্যাক্সিতেও না। পেট্রোলের গন্ধ সহ্য হয় না। বমি হয়ে যায়। লোকজনের গাড়ি থাকে। গনি সাহেবের আছে রিক্শা। সেই রিকশার সামনে-পেছনে ইংরেজিতে লেখা ‘Private’!

সেই রিকশায় কোথাও যেতে হলে রেশমা খালার মাথা কাটা যায়। সাধারণ রিকশায় চড়া যায়, কিন্তু ‘প্রাইভেট’ লেখা রিকশায় কি চড়া যায়? লোকজন কেমন-কেমন চোখে তাকায়।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য রেশমা খালা গাড়ি কিনলেন। খালুসাহেব নাকে অডিকোলন ভেজানো রুমালচাপা দিয়ে কয়েকবার সেই গাড়িতে চড়লেনও, তারপর আবার ফিরে গেলেন প্রাইভেট রিকশায়। তাতে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো অসুবিধা হল না। ব্যবসা-বাণিজ্য হুহু করে বাড়তে লাগল। কাপড়ের কল দিলেন, গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি করলেন।

রেশমা খালার শুধু আফসোস—খালি টাকা, আর টাকা। কী হবে টাকা দিয়ে। একবার দেশের বাইরে যেতে পারলাম না। এমন এক বেকুব লোকের হাতে পড়েছি, আকাশে প্লেইন দেখলে তার বুক ধড়ফড় করে। এই লোককে নিয়ে জীবনে কোনোদিন কি বাইরে যেতে পারব? কোনোদিন পারব না। লোকে ঈদের শপিং করতে সিঙ্গাপুর যায়, ব্যাংকক যায়। আর আমি কোটিপতির বউ, আমি যাই গাউছিয়ায়।

খালুসাহেবের মৃত্যুর পর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন যে কী পরিমাণ হয়েছে সেটা তাঁর বাড়িতে ঢুকে দেখলাম।

পুরানো বাড়ি ভেঙে কী হুলস্থুল করা হয়েছে। মারবেল-পাথরের সিঁড়ি। ময়লা জুতা-পায়ে সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে ভয় লাগে। ঘর-ঘরে ঝাড়বাতি। ড্রয়িংরুমে ঢুকে আমি হতভম্ব গলায় বললাম, সর্বনাশ। রেশমা খালা আনন্দিত গলায় বললেন, বাড়ি রিনোভেশনের পর তুই আর আসিসনি, তা-ই না?

‘না। তুমি তো ইন্দ্রপুরী বানিয়ে ফেলেছ!’

‘আর্কিটেক্টটা ভালো পেয়েছিলাম। টাকা অনেক নিয়েছে। ব্যাটা কাজ জানে, টাকা তো নেবেই! ভেতরের সব কাজ দিয়েছি ইন্টারনাল ডিজাইনারকে। আমেরিকা থেকে পাশ-করা ডিজাইনার। ফার্নিচার-টার্নিচার সব তার ডিজাইন। দেয়ালে যে-পেইনটিংগুলি দেখছিস সেগুলিও কোনটা কোথায় বসবে সে-ই ঠিক করে দিয়েছে।

‘এই বাড়িতে তো খালা আমি থাকতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। এখনই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’

রেশমা খালা আনন্দিত গলায় বললেন, তোর ঘর দেখিয়ে দি। ঘর দেখলে তুই আর যেতে চাইবি না। গেস্টরুম আছে দুটা। তোর যেটা পছন্দ সেটাতে থাকবি। একটায় ভিক্টোরিয়ান ফার্নিচার, অন্যটায় মডার্ন। তোর কোন ধরনের ফার্নিচার পছন্দ? দুটা ঘরই দ্যাখ—যেটা ভালো লাগে। দুটাতেই অ্যাটাচড বাথ—দুটাতেই এসি।

‘এত বড় একটা বাড়িতে একা থাক?’

‘একা তো থাকতেই হবে, উপায় কী? গুষ্টির আত্মীয়স্বজন এনে ঢোকাব? শেষে ঘুমের মধ্যে মেরে রেখে যাবে। সবাই আছে টাকার ধান্দায়। মানুষ দেখলেই আমার ভয় লাগে।’

‘আমাকে ভয় লাগছে না?’

‘না, তোকে ভয় লাগছে না। তোকে ভয় লাগবে কেন? শোন, কোন বেলা কী খেতে চাস বাবুর্চিকে বলবি—রেঁধে দেবে। দুজন বাবুর্চি অছে। ইংলিশ ফুডের জন্যে একজন, বাঙালি ফুডের জন্যে একজন।

‘চাইনিজ ফুড কে রাঁধে?’

‘ইংলিশ বাবুর্চিই রাঁধে। ও চাইনিজ ফুডের কোর্সও করেছে। রাতে কী খাবি—চাইনিজ?’

‘তুমি যা খাও তা-ই খাব।’

‘তোর যখন চাইনিজ ইচ্ছা হয়েছে তখন চাইনিজই খাব। দাঁড়া, বাবুর্চিকে বলে দি। এই বাড়ির মজা কী জানিস—কথা বলার জন্যে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে হবে না। ইন্টারকম আছে। বোতাম টিপলেই হলো। আয়, তোকে ইন্টারকম ব্যবহার করা শিখিয়ে দি।’

ইন্টারকম ব্যবহার করা শিখলাম। বাথরুমের গরম পানি, ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা শিখলাম। এসি চালানো শিখলাম। রিমোট কনট্রোল এসি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও বোতাম টিপে এসি অন করা যায়। ঘর আপনা-আপনি ঠাণ্ডা-গরম হয়।

‘তোর গানবাজনার শখ আছে? একটা মিউজিক-রুম রয়েছে, ক্যাসেট ডেক, সিডি প্লেয়ার সব আছে।‘

‘আর কী আছে?’

‘প্রেয়ার-রুম আছে।’

‘সেটা কী?’

‘প্রার্থনাঘর। নামাজ পড়তে ইচ্ছা হলে নামাজ পড়বি। দেখবি? দেখতে হলে অজু করে ফ্যাল। অজু ছাড়া নামাজঘরে ঢোকা নিষেধ।’

‘নামাজঘরে কী আছে? জায়নামাজ, টুপি?’

‘আরে না! জায়নামাজের দরকার নেই। মেঝে সবুজ মারবেলের। রোজ একবার সাধারণ পানি দিয়ে মোছা হয়, তারপর গোলাপ জল মেশানো পানি দিয়ে মোছা হয়। চারদিকে কোরান শরিফের বিভিন্ন আয়াত ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছি। ইসলামিক আৰ্চ ডিজাইন। এই ডিজাইন আবার অন্য একজনকে দিয়ে করিয়েছি।’

‘নামাজ পড়ছ?’

‘শুরু করব। ছোটবেলায় কোরান শরিফ পড়া শিখেছিলাম… তারপর ভুলে গেছি। কথায় বলে না—অনভ্যাসে বিদ্যা নাশ—ঐ হয়েছে! একজন মওলানা রেখে কোরান শরিফ পড়া শিখে তারপর নামাজ ধরব। আয়, নামাজঘর দেখে যা। বাংলাদেশে এই জিনিস আর কারও ঘরে নেই। এখন আবার অনেকেই আমার ডিজাইন নকল করছে। প্রেয়ার-রুম বানাচ্ছে। নকলবাজের দেশ। ভালো কিছু করলেই নকল করে ফেলে।’

‘তোমার বাড়িতে বার নেই খালা?’

‘আছে, থাকবে না কেন? বার ছাড়া কোনো মডার্ন ডিজাইন হয়? ছাদের চিলেকোঠায় বার। তোর আবার ঐসব বদ অভ্যাস আছে নাকি? থাকলে ভুলে যা। আমার বাড়িতে বেলেল্লাপনা চলবে না। যা, অজু করে আয়, তোকে নামাজঘর দেখিয়ে আনি।’

অজু করে নামাজঘর দেখতে গেলাম। খালা মুগ্ধ গলায় বললেন, ঘরে কোনো বাল্ব বা টিউবলাইট দেখছিস?’

‘না।’

‘তার পরেও ঘর আলো হয়ে আছে না?’

‘হ্যাঁ।’

‘এর নাম কনসিলড লাইটিং। বাঁদিকের দেয়ালে দ্যাখ একটা সুইচ, টিপে দে।’

‘টিপলে কী হবে?’

‘টিপে দ্যাখ-না! বিসমিল্লাহ্ বলে টিপবি।’

আমি বিসমিল্লাহ্ বলে সুইচ টিপে আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করছি। আমার ধারণা, সুইচ টেপামাত্র নামাজঘর পুরোপুরি পশ্চিম দিকে ঘুরবে। তা হলো না। যা হলো সেটাও কম বিস্ময়কর না। কোরান তেলাওয়াত হতে লাগল।

রেশমা খালা বললেন, পুরো কোরান শরিফ রেকর্ড করা আছে। একবার বোতাম টিপে দিলে অটোমাটিক কোরান খতম হয়ে যায়।

‘সেই কোরান-খতমের সোয়াব তো তুমি পাও না, সোয়াব পায় তোমার ক্যাসেট—রেকর্ডার। এই ক্যাসেট-রেকর্ডারের বেহেশতে যাবার খুবই উঁচু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।‘

‘খবরদার, নামাজঘরে কোনো ঠাট্টা-ফাজলামি করবি না।’

নামাজঘরে কোরানপাঠ চলতে লাগল। খালা আমাকে ছাদের চিলেকোঠায় বার দেখাতে নিয়ে গেলেন। শ্বেতপাথরের কাউন্টার টেবিল। পেছনে আলমিরা ভরতি নানা আকারের এবং নানা রঙের বোতল ঝিকমিক করছে।

‘কালেকশান কেমন, দেখেছিস?’

‘হুঁ। আক্কেলগুডুম অবস্থা। শুধু আক্কেলগুড়ুম না, একই সঙ্গে বে-আক্কেলগুড়ুম।’

‘বে-আক্কেলগুড়ুম আবার কী?’

‘কথার কথা আর কী! করেছ কী তুমি! দুনিয়ার বোতল জোগাড় করে ফেলেছ!’

‘খাওয়ার লোক নেই তো, শুধু জমছে।’

‘তোমার এখানে সবচে দামি বোতল কোনটা খালা?’

‘পেটমোটা বোতলটা—ঐ যে দেখে মনে হচ্ছে মাটির বোতল। পঞ্চাশ বছরের পুরানো রেড ওয়াইন। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের বিশেষ বিশেষ উৎসবে এই জিনিস খাওয়া হয়।’

‘দাম কত তা তো বললে না।’

‘দাম শোনার দরকার নেই। দাম শুনলে তুই ভিরমি খাবি।’

‘এম্নিতেই ভিরমি খাচ্ছি। আজ আর আমার ভাত খেতে হবে না। ভিরমি খেয়ে পেট ভরে গেছে।’

আনন্দে খালার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। আমার মুখ হয়ে গেল অন্ধকার। এক সপ্তাহ এ-বাড়িতে থাকা যাবে না। আজই পালাতে হবে। রাতটা কোনোমতে পার করে সকালে সূর্য ওঠার আগেই ‘হ্যাপিশ’।

‘আয়, লাইব্রেরি-ঘর দেখি।’

‘আবার লাইব্রেরি-ঘরও আছে?’

‘বলিস কী! লাইব্রেরি-ঘর থাকবে না! লাইব্রেরি-ঘর পুরোটা কাঠের করেছি। মেঝেও কাঠের। সবরকম বইপত্র আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুই বই পড়ে কাটাতে পারবি। নিউ মার্কেটের এক দোকানের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে রেখেছি—ভালো ভালো বই এলেই পাঠিয়ে দেয়। লাইব্রেরি-ঘরে কম্পিউটার বসিয়েছি। তুই কম্পিউটার চালাতে জনিস?’

‘না।’

‘আমিও জানি না। যাদের কাছ থেকে কিনেছি ওদের বলা আছে, অবসর পেলেই খবর দেব, ওরা এসে শিখিয়ে দেবে।’

‘অবসর পাচ্ছ না?’

‘অবসর পাব কোথায়? সকালটায় একটু অবসর থাকে। দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমুতে যাই—সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমাই। সারারাত জেগে থাকি—দুপুর না ঘুমালে চলবে কেন?’

‘সারারাত জেগে থাক কেন?’

‘ঘুম না হলে জেগে না থেকে করব কী? ‘

‘ঘুম হয় না?’

‘না!’

‘ডাক্তার দেখিয়েছ?’

‘ডাক্তারের পেছনে জলের মতো টাকা খরচ করেছি। এখনও করছি। এখনও চিকিৎসা চলছে। সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসা করছেন।’

‘তারা কিছু পাচ্ছে না?’

‘পাচ্ছে কি পাচ্ছে না ওরাই জানে। ওদের চিকিৎসায় লাভ হচ্ছে না। এখন তুই হলি ভরসা।’

‘আমি ভরসা মানে? আমি কি ডাক্তার নাকি?’

‘ডাক্তার না হলেও তোর নাকি অনেক ক্ষমতা। সবাই বলে। তুই আমাকে রাতে ঘুমের ব্যবস্থা দে। তুই যা চাইবি তা-ই পাবি। ওয়াইনের ঐ বোতলটা তোকে নাহয় দিয়ে দেব।’

পঞ্চাশ বছরের পুরানো মদের বোতল পাব এই আনন্দ আমাকে তেমন অভিভূত করতে পারল না। আমার ভয় হলো এই ভেবে যে রেশমা খালা আমার উপর ভর করেছেন। সিন্দাবাদের ভূত সিন্দাবাদের উপর একা চেপেছিল। রেশমা খালা আমার উপর একা চাপেননি, তাঁর পুরো বাড়ি নিয়ে চেপেছেন। একদিনেই আমার চ্যাপটা হয়ে যাবার কথা। চ্যাপটা হওয়া শুরু করেছি।

‘হিমু!’

‘জি?’

‘আমার ব্যাপারটা কখন শুনবি?’

‘তোমার কোন ব্যাপার?’

‘ওমা, এতক্ষণ কী বললাম—রাতে ঘুম না হওয়ার ব্যাপারটা!’

‘একসময় শুনলেই হবে। তাড়া তো কিছু নেই।’

‘এখন তুই কী করবি?’

‘বুঝতে পারছি না। নিজের ঘরে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব বলে ভাবছি। যে-বিছানা বানিয়েছ শুতে সাহসও হচ্ছে না।’

রেশমা খালা বললেন, বিছানা এমনকিছু না। সাধারণ ফোমের তোষক। তবে বালিশ হচ্ছে পাখির পালকের।’

‘বল কী!’

‘খুব এক্সপেনসিভ বালিশ। জ্যান্ত পাখির পাখা থেকে এইসব বালিশ তৈরি হয়। মরা পাখির পালকে বালিশ হয় না।’

‘একটা পালকের বালিশের জন্যে ক’টা পখির পালক লাগে?’

‘কী করে বলব ক’টা—কুড়ি-পঁচিশটা নিশ্চয়ই লাগে।’

‘একটা বালিশের জন্যে তা হলে পঁচিশটা পাখির আকাশে ওড়া বন্ধ হয়ে গেল?’

‘আধ্যাত্মিক ধরনের কথা বলবি না তো হিমু! এইসব কথা আমার কাছে ফাজলামির মতো লাগে।

‘ফাজলামির মতো লাগলে আর বলব না।’

‘যা তুই রেস্ট নে। চা কফি কিছু খেতে চাইলে ইন্টারকমে বলে দিবি।

‘তুমি কি বেরুচ্ছ?’

‘হুঁ। বললাম না সকালে আমি একটু বের হই। দিনরাত ঘরে বসে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসবে না! তুই তো এখন আর বের হবি না?’

‘না।’

‘তা হলে তালা দিয়ে যাই।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, তালা দিয়ে যাবে মানে?

খালা আমার চেয়েও অবাক হয়ে বললেন, তুই আমার মূল বাড়িতে থাকবি, তোকে তালা দিয়ে যাব না? লক্ষ লক্ষ টাকার জিনিস চারদিকে।

‘ঘরে যদি আগুন-টাগুন লেগে যায় তখন কী হবে?’

‘খামোকা আগুন লাগবে কেন? আর যদি লাগে প্রতি ফ্লোরে ফায়ার এক্সটিংগুইসার আছে।’

‘তালা দেয়া অবস্থায় কতক্ষণ থাকব?’

‘আমি না আসা পর্যন্ত থাকবি। আমি তো আর সারাজীবনের জন্যে চলে যাচ্ছি না। ঘণ্টাখানিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসব। সামান্য কিছুক্ষণ তালাবন্ধ থাকবি এতেই মুখচোখ শুকিয়ে কী করে ফেলেছিস!’

‘খালা, আমি হচ্ছি মুক্ত মানুষ। এটাই সমস্যা।’

‘বিছানায় শুয়ে বইটই পড়, টিভি দ্যাখ। আমি তোকে কফি দিতে বলে যাচ্ছি।’ আমি বিছানায় শুয়ে শুয়েই ঘটাং ঘটাং শব্দে তালা দেয়ার আওয়াজ পেলাম। এ—বাড়ির সবকিছু আধুনিক হলেও তালাগুলি সম্ভবত মান্ধাতার আমলের। বড্ড শব্দ হয়।

.

পালকের বিছানায় মাথা রেখে শুয়ে আছি। আমাকে কফি দিয়ে গেছে। চাইনিজ খাবার কী খাব বাবুর্চি জানতে এসেছিল, হাতে নোটবুক, পেনসিল। আমি গম্ভীর গলায় বলেছি আরশোলা দিয়ে হট অ্যান্ড সাওয়ার করে একটা স্যুপ খাব। চাইনিজরা শুনছি আরশোলার স্যুপ খুব শখ করে খায়। আমি কখনো খেয়ে দেখিনি

বাবুর্চি হতভম্ব গলায় বলল, স্যারের কথা বুঝতে পারলাম না। কিসের স্যুপ?

‘ককরোচ স্যুপ। সঙ্গে মাশরুম দিতে পারেন, বেবি কর্ন দেবেন। সয়াসস অল্প দেবেন। আরশোলার গন্ধ মারার জন্যে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু বেশিও না কমও না।’

‘আমি স্যার আসলেই আপনার কথা বুঝতে পারছি না।’

‘বুঝতে না পারলে বিদায় হয়ে যান।’

‘জি আচ্ছা, স্যার।’

তালাবন্ধ বাড়িতে পড়ে আছি। আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি কাজ করতে শুরু করেছে। সময় থেমে গেছে। টাইম ডাইলেশন। তালাবদ্ধ অবস্থায় যে এর আগে থাকিনি তা না। হাজতে কাটানো রাতের সংখ্যা কম না। তবে হাজত তালাবন্ধ থাকবে এটা স্বীকৃত সত্য বলে খারাপ লাগে না। তালা খোলা অবস্থায় হাজতে বসে থাকাটা বরং অস্বস্তিকর। কিন্তু স্বর্গপুরীতে তালাবন্ধ অসহনীয়।

শুয়ে শুয়ে ভাবছি বেহেশত কেমন হবে? সেখানেও কি এরকম তালা সিস্টেম থাকবে। নাকি বেহেশতবাসীরা মুক্ত স্বাধীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে পারবে? কারও ইচ্ছা হল, সে দোজখে তার কোনো পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এল। বেহেশতের বর্ণনা ভালোমতো জেনে নিতে হবে। খালার নামাজঘরে প্রচুর ধর্মের বইটই আছে। সেখানে বেহেশত সম্পর্কে কী লেখা আছে পড়তে হবে।

কফি খাচ্ছি, কফিতে কোনো স্বাদ পাচ্ছি না। স্বাদ যেমন নেই, গন্ধও নেই। একটু পরপর চোখ চলে যাচ্ছে ঘড়ির দিকে। ঘড়ি মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে গেছে।

আমার বিখ্যাত বাবা আমাকে বন্দি থাকার ট্রেনিং অতি শৈশবে দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল মহাপুরুষ বানানোর জন্যে এই ট্রেনিং অতি জরুরি। বন্দি না থাকলে মুক্তি’র স্বরূপ বোঝা যায় না। কাজেই একদিন আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিলেন—তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। যতটা অবাক হওয়ার কথা ততটা হলাম না। বাবার পাগলামির সঙ্গে ততদিনে পরিচিত হয়ে পড়েছি। আমার ধারণা সন্ধ্যা-নাগাদ তালা খোলা হবে। আতঙ্কে অস্থির হয়ে লক্ষ্য করলাম সন্ধ্যার পরপর বাবা বাড়ি ছেড়েই চলে গেলেন। যাবার সময় মেইন সুইচ অফ করে দিলেন। একেবারে কবরের অন্ধকার। এটা ছিল আমার বাবার ভয়-জয়-করা ট্রেনিং-এর প্রাথমিক অংশ। তাঁর ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন—

‘অদ্য রজনীতে হিমালয়কে ভয় জয় করিবার প্রস্তুতিসূচক ট্রেনিং দেওয়া হইবে। মানুষের প্রধান ভয় অন্ধকারকে, যে-অন্ধকারের স্মৃতি সে অন্য কোনো ভুবন হইতে লইয়া আসিয়াছে। অন্ধকারকে জয় করার অর্থ সমস্ত ভয় জয় করা। অদ্যকার অন্ধকার জয় করা-বিষয়ক প্রাথমিক ট্রেনিং হিমালয় কীভাবে গ্রহণ করিবে বুঝিতে পারিতেছি না। এই শক গ্রহণ করিবার মানসিক শক্তি কি তাহার আছে? বুঝিতে পারিতেছি না। কাহাকেও বাহির হইতে দেখিয়া তাহার মানসিক শক্তি সম্পর্কে ধারণা করা যায় না। সেই দিব্যদৃষ্টি প্রকৃতি মানবসম্প্রদায়কে দেয় নাই….’

আমি ইন্টারকম টিপে বাবুর্চিকে ডাকলাম। ইন্টারভিউ নেয়ার ভঙ্গিতে বললাম, কী নাম?

‘ইদ্রিস!’

শুরুতে তাকে আপনি করে বলেছিলাম, এখন তুমি।

‘শোনো ইদ্রিস, এ-বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা আছে? বাথরুম থেকে পাইপ বেয়ে নেমে পড়া বা এজাতীয় কিছু?’

‘জি না।’

‘ছাদে উঠে, ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে যাওয়া যায় না?’

‘জি না।’

‘টেলিফোন নিয়ে আসো। দমকল অফিসে টেলিফোন করে দি। ওরা তালা খুলে উদ্ধার করবে।’

‘টেলিফোন নাই স্যার।’

‘টেলিফোন নাই মানে?

‘এই বাড়িতে সব আছে, টেলিফোন নাই। টেলিফোনে লোকজন বিরক্ত করে। ম্যাডামের ভালো লাগে না।’

‘ও, আচ্ছা।’

‘স্যার, আরেক কাপ কফি এনে দেই। চিন্তার কিছু নাই, ম্যাডাম চলে আসবেন। উনি বেশিক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকেন না। চলে আসেন। কফি দিব স্যার?’

‘দাও।’

বাবুর্চি কফি এনে দিল। আমি কফি খেয়ে রেশমা খালার অপেক্ষা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। সেই ঘুম যখন ভাঙল তখন দেখি রাত হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার।

.

‘কীরে, ঘুম ভেঙেছে?’

রেশমা খালা ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালালেন। তিনি মাথার নকল চুল খুলে ফেলেছেন। তাঁকে মোটামুটি বীভৎস দেখাচ্ছে। তাঁর মাথার আদি চুলের এই অবস্থা কে জানত! কিছু আছে কিছু নেই। যেখানটায় নেই সেখানটার মাথার হলুদ চামড়া চকচক করছে।

‘ঘরে ফিরে দেখি তুই মড়ার মতো ঘুমুচ্ছিস। তাই আর ঘুম ভাঙালাম না। ঘুমের মূল্য কী তা আর কেউ না জানুক আমি তো জানি! এতক্ষণ ধরে কেউ ঘুমুতে পারে তাও জানতাম না। তোর কোনো অসুখবিসুখ নেই তো?’

‘ক’টা বাজে খালা?’

‘ন’টার কাছাকাছি। তুই একনাগাড়ে প্রায় দশঘণ্টা ঘুমুলি। খিদে লেগেছে নিশ্চয়ই? হাতমুখ ধুয়ে আয়, ভাত খাই।’

আমি উঠলাম। শান্ত গলায় বললাম, ভাত খেয়েই আমি একটু বেরুব খালা।

‘বের হতে চাইলে বের হবি। আমি কি তোকে আটকে রেখেছি নাকি? বাবুর্চি বলছিল তালা দিয়ে যাওয়ায় তুই নাকি অস্থির হয়ে পড়েছিলি। আশ্চর্য! তুই কি ছেলেমানুষ নাকি? তুই আবার তাকে বলেছিস তেলাপোকার স্যুপ খেতে চাস। হি-হি—হি। বাবুর্চিটা বোকা-টাইপের, ও সত্যি ভেবে বসে আছে। ঠাট্টা বুঝতে পারেনি।’

‘তেলাপাকার স্যুপ তৈরি করেছে? আমি ঠাট্টা করিনি। আসলেই খেতে চেয়েছিলাম।’

‘তুই দেখি আচ্ছা পাগল! আয়, খেতে আয়। খেতে খেতে আমার ভয়ংকর গল্পটা বলব। তুই আবার চারদিকে বলে বেড়াবি না।’

.

ডাইনিংরুম ছাড়াও ছোট্ট একটা খাবার জায়গা আছে। শ্বেতপাথরের টেবিল দুটামাত্র চেয়ার। মোমবাতি জ্বালিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার। টেবিলে নানা ধরনের পদ সাজানো।

বাবুর্চি পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। খালা বললেন, ‘তুমি চলে যাও, তোমাকে আর লাগবে না। খাওয়া শেষ হলে ঘণ্টা বাজাব, তখন সব পরিস্কার করবে।

‘ঘণ্টার ব্যবস্থাও আছে?’

‘আছে, সব ব্যবস্থাই আছে। খাওয়া শুরু কর। বাবুর্চির রান্না কেমন বলবি। রান্না পছন্দ না হলে ব্যাটাকে বিদেয় করে দেব। ব্যাটার চোখের চাউনি ভালো না। স্যুপটা কেমন?’

‘ভালো। খুব ভালো।

‘তুই তো এখনও মুখেই দিসনি। মুখে না নিয়েই বলে ফেললি ভালো!’

‘গন্ধে-গন্ধে বলে ফেলেছি। চায়নিজ খাবারের আসল স্বাদ গন্ধে। গন্ধ ঠিক আছে। বাবুর্চিকে রেখে দাও।’

‘চোখের চাউনিটা যে খারাপ! মাঝে মাঝে ভয়ংকর করে তাকায়।‘

‘ওকে বলবে সবসময় যেন সানগ্লাস পরে থাকে।’

‘বুদ্ধিটা খারাপ না। ভালো বলেছিস হিমু। এটা আমার মাথায় আসেনি। কথায় আছে না একমাথার থেকে দুমাথা ভালো—আসলেই তা-ই। এখন আমার সমস্যাটা শোন। খুব মন দিয়ে শুনবি।’

‘খাওয়া শেষ হোক, তার পর শুনি…’

‘খেতে খেতেই শোন। আমি আবার চুপচাপ খেতে পারি না। ব্যাপারটা কী হয়েছে শোন। তোর খালু মারা যাবার পর বাড়ি ভরতি হয়ে গেল ফালতু লোকে। অমুক আত্মীয় তমুক আত্মীয়। এক্কেবারে খুঁটি গেড়ে বসেছে। মতলব আর কিছু না—টাকাপয়সা হাতানো। টাটকা মধু পড়ে আছে—পিঁপড়ার দল চারদিকে থেকে এসে পড়েছে। আমি একে একে ঝেঁটিয়ে সব বিদেয় করলাম। বাড়ি খালি করে ফেললাম। চব্বিশ ঘণ্টা গেটে তালার ব্যবস্থা করলাম। একজনের জায়গায় দুজন দারোয়ান রাখলাম। চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি। কাউকে ঢুকতে দেবে না। কেউ যদি ঢোকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি নট। আমার যদি কারোর সঙ্গে কথা বলার দরকার হয় আমি নিজেই দেখা করতে যাব, কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। লোকজন টেলিফোনে বিরক্ত করে। দিলাম টেলিফোন লাইন কেটে।

‘এত বড় বাড়িতে আমি থাকি একা। একটু যে ভয়ভয় লাগে না তা না। লাগে, কিন্তু আত্মীয়স্বজনের যন্ত্রণার চেয়ে ভয় পাওয়া ভালো। লক্ষ গুণ ভালো।’

তারপর একদিন কী হয়েছে শোন। রাত এগারোটার মতো বাজে। খুব দেখি মশা কামড়াচ্ছে। দরজায়, জানালায় নেট আছে, তার পরেও এ মশা ঢুকল কীভাবে? আমার মেজাজ হয়েছে খারাপ। কারণ, আমি আবার মশারির ভেতর ঘুমুতে পারি না। আমার একটা কাজের মেয়ে ছিল—রেবা। ওকে বললাম মশারি খাটিয়ে দিতে। ও মশারি খাটিয়ে দিল। মেজাজ-টেজাজ খারাপ করে ঘুমুতে গেছি। বাতি নিভিয়ে মশারির কাছে গেলাম, মশারি তুলে দেখি মশারির ভিতর ও বসে আছে। তোর খালু। ন্যাংটো হয়ে বসে আছে। গুটিসুটি মেরে বসা। মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

‘আমি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান। সেই থেকে শুরু। কখনো তাকে দেখি খাটের নিচে। কখনো বাথরুমের বাথটবে। একদিন পেলাম ডিপ ফ্রিজে।’

‘কোথায়, ডিপ ফ্রিজে?’

‘হ্যাঁ। ডিপ ফ্রিজ সবসময় বাবুর্চি খোলে। সেদিন ফ্রিজে জিনিসপত্র কী আছে দেখার জন্যে ডালাটা তুললাম—দেখি একেবারে খালি ফ্রিজ, সেখানে ও বসে ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছে। এই হলো ব্যাপার বুঝিলি। এর পর থেকে রাতে ঘুমুতে পারি না।’

‘রোজই দেখ?’

‘প্রায় রোজই দেখি।‘

‘আজ দেখেছ?’

‘এখনও দেখিনি—তবে দেখব তো বটেই। এর মানেটা কী বল তো হিমু! এই অত্যাচারের কারণ কী? ভূত-প্রেত বলে সত্যি কিছু আছে? মানুষ মরলে ভূত হয়?’

আমি দেখলাম রেশমা খালা আর কিছু খেতে পারছেন না। মুখ শুকিয়ে গেছে। হাত কাঁপছে। তিনি কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন, হিমু, কথা বলছিস না কেন?

‘তুমি একাই ওনাকে দেখ না আরও অনেকেই দেখে?’

‘সবাই দেখে। রেবা দেখেছে। দেখে চাকরি-টাকরি ছেড়ে চলে গেছে। আমার সাথে যারা আছে তারাও দেখেছে। এরা কেউ রাতে দোতলায় ওঠে না। তুই রাতটা আমার সঙ্গে থাক। তুইও দেখবি।’

আমি খালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই প্রথম বেচারির জন্যে মায়া লাগছে।

Chapter - 5

রেশমা খালার ‘প্যালেসে’ এক সপ্তাহ পার করে দিলাম। সমস্যামুক্ত জীবনযাপন। আহার, বাসস্থান-নামক দুটি প্রধান মৌলিক দাবি মিটে গেছে। এই দুটি দাবি মিটলেই বিনোদনের দাবি ওঠে। খালার এখানে বিনোদনের ব্যবস্থাও প্রচুর আছে। আমার ভালোই লাগছে।

ট্রাক দেখলে লোকে রাস্তা ছেড়ে পালিয়ে যায়, কিন্তু সেই খোলা ট্রাকে করে ভ্রমণের আনন্দ অন্যরকম। আমার অবস্থা হয়েছে এরকমই। রেশমা খালার সঙ্গে গল্পগুজব করতে এখন ভালোই লাগে। শুধু রাতে একটু সমস্যা হয়। রেশমা খালা আমার দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেন, আয় আয়, দেখে যা, নিজের চোখে দেখে যা। বসে আছে, খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে।

আমি হাই তুলতে তুলতে বলি, থাকুক বসে। তুমিও তার পাশে বসে পা নাচাতে থাকো। এ ছাড়া আর করার কী আছে?

পুরোপুরি নিশ্চিত, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন সম্ভব না। সব জীবনেই কিছু ঝামেলা থাকবে। কাবাব যত ভালোই হোক, কাবাবের এক কোনায় ছোট হাড্ডির টুকরো থাকবেই।

রাতে রেশমা খালার হৈচৈ, ছোটাছুটি, চিৎকার অগ্রাহ্য করতে পারলে গনি প্যালেসে মাসের পর মাস থাকা যায়। তা ছাড়া ঐ বাড়ির বাবুর্চির সঙ্গে আমার বেশ সখ্য হয়েছে। নাপিতসম্প্রদায়ের মানুষ খুব বুদ্ধিমান হয় বলে জনশ্রুতি—আমাদের বাবুর্চি সব নাপিতরে কান কেটে দেয়ার বুদ্ধি রাখে। বোকার ভান করে সে দিব্যি আছে।

এক সকালে সে আমার জন্যে বিরাট এক বাটি স্যুপ বানিয়ে এনে বলল, আপনি একবার আরশোলার স্যুপ চেয়েছিলেন, বানাতে পারিনি। আজ বানিয়েছি। খেয়ে দেখুন স্যার, আপনার পছন্দ হবে। সঙ্গে মাশরুম আর ব্রকোলি দিয়েছি।

বাটির ঢাকনা খুলে আমার নাড়িভুঁড়ি পাক দিয়ে উঠল। সাদা রঙের স্যুপ, তিন—চারটা তেলাপোকা ভাসছে। একটা আবার উলটো হয়ে আছে। তার কিলবিলে পা দেখা যাচ্ছে।

বাবুর্চি শান্ত স্বরে বলল, সস-টস কিছু লাগবে স্যার?

আমি বললাম, কিছুই লাগবে না। তাকে পুরোপরি হতভম্ব করে এক চামচ মুখে দিয়ে বললাম, স্যুপটা মন্দ হয়নি। তবে আরশোলার পরিমাণ কম হয়েছে।

আমি কোন চিজ সে ধরতে পারেনি। ধরতে পারলে আমার সঙ্গে রসিকতা করতে যেত না। আমি তাকে সামনে দাঁড় করিয়েই পুরো বাটি স্যুপ খেয়ে বললাম—বেশ ভালো হয়েছে। পরেরবার আরশোলার পরিমাণ বাড়াতে হবে। এটা যেন মনে থাকে।

বাবুর্চি বিড়বিড় করে বলল, জি আচ্ছা স্যার।

.

রেশমা খালা আমার প্রতি যথেষ্ট মমতা প্রদর্শন করছেন। সেই মমতার নিদর্শন হচ্ছে আমাকে বলেছেন, ও হিমু, তোর তো ভিক্ষুকের মতো হাঁটাহাঁটির স্বভাব। হাঁটাহাঁটি না করলে পেটের ভাত হজম হয় না। এখন থেকে গাড়ি নিয়ে হাঁটাহাঁটি করবি।

আমি বললাম, সেটা কীরকম?

‘পাজেরো নিয়ে বের হবি। যেখানে যেখানে হাঁটতে ইচ্ছা করবে ড্রাইভারকে বলবি, গাড়ি নিয়ে যাবে।’

‘এটা মন্দ না। গাড়িতে চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল।’

কিছুদিন থেকে আমি পাজেরো নিয়ে হাঁটছি। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করছি, এই গড়িতে বসলেই ছোট ছোট গাড়ি বা রিকশাকে চাপা দেয়ার প্রবল ইচ্ছা হয়। ট্রাক-ড্রাইভার কেন অকারণে টেম্পো বা বেবিট্যাক্সির উপর ট্রাক তুলে দেয় আগে কখনো বুঝিনি। এখন বুঝতে পারছি। এখন মনে হচ্ছে দোষটা সর্বাংশে ট্রাক-ড্রাইভারদের নয়, দোষটা ট্রাকের।

যে বড় সে ছোটকে পিষে ফেলতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক জাগতিক নিয়ম। ডারউইন সাহেবের ধারণা ‘সারভাইভেল ফর দ্য ফিটেস্ট’ শুধু জীবজগতের জন্যে প্রযোজ্য হবে, বস্তুজগতের জন্যে প্রযোজ্য হবে না, তা হয় না।

পাজেরো নিয়ে হাঁটতে বেরুবার একটাই সমস্যা—গলিপথে হাঁটা যায় না। রাজপথে হাঁটতে হয়। এরকম রাজপথে হাঁটতে বের হয়েই একদিন ইরার সঙ্গে দেখা। সে বেশ হাত নেড়ে গল্প করতে করতে একটা ছেলের সঙ্গে যাচ্ছে। দূর থেকে দুজনকে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো লাগছে। ছেলেটা সুদর্শন। লম্বা, ফরসা, কোঁকড়ানো চুল। কষি কালারের শার্টে সুন্দর মানিয়েছে। তার চেহারায় আলগা গাম্ভীর্য। সুন্দরী মেয়ে সঙ্গে নিয়ে হাঁটলেই আপনা-আপনি ছেলেদের চেহারায় কিছু গাম্ভীর্য চলে আসে। তার একটু বেশি এসেছে।

আমি পাজেরো-ড্রাইভারকে বললাম, ঐ যে ছেলেমেয়ে দুটি যাচ্ছে, ঠিক ওদের পেছনে গিয়ে বিকট হর্ন দিন যেন দুজন ছিটকে দুদিকে পড়ে যায়।

ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বলল, তারা যাচ্ছে ফুটপাতে। ফুটপাতে গাড়ি নিয়ে উঠব কীভাবে?

‘তা হলে তাদের সাইডে নিয়ে গিয়েই হর্ন দিন। চেষ্টা করবেন হর্নটা যথাসম্ভব বিকট করার জন্যে।’

তা-ই করা হলো। হর্ন শুনে ছেলেটার হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেট পড়ে গেল। ইরা ছেলেটার মতো চমকালো না। মেয়েদের স্নায়ু ছেলেদের চেয়ে শক্ত হয়। আমি গলা বাড়িয়ে বললাম, এই ইরা, এই! যাচ্ছ কোথায়?

ইরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সঙ্গী ছেলেটা হতভম্ব

আমি প্রায় অভিমানের মতো গলায় বললাম, ঐ যে তুমি মেসে এসে একবার গল্পগুজব করে গেলে, তারপর তোমার আর কোনো খোঁজ নেই। ব্যাপার কী বলো তো? আমি এমন কী অন্যায় করেছি?

আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ছেলেটার চোখমুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে। তার প্রেমিকা অন্য একজনের মেসে গল্প করে সময় কাটাচ্ছে এটা সহ্য করা মুশকিল। কোনো প্রেমিকই করে না।

আমি হাসিহাসি মুখে বললাম, উঠে এসো ইরা, উঠে এসো। তোমার সঙ্গে এক লক্ষ কথা আছে। আজ সারাদিন গাড়ি করে ঘুরব আর গল্প করব।

ইরা কঠিন মুখ করে এগিয়ে এল। গাড়ির জানালার কাছে এসে চাপা গলায় বলল, আপনি এইভাবে কথা বলছেন কেন?

‘কোনভাবে বলছি?’

‘এমনভাবে বলছেন যেন আপনি আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। ব্যাপার সেরকম নয়। মুহিব না জানি কী ভাবছে!’

‘মুহিবটা কে? ঐ ক্যাবলা?’

‘ক্যাবলা বলবেন না, কোনোদিন না। কখনো না।’

‘তোমার ক্লোজ ফ্রেন্ড?’

‘হ্যাঁ।’

‘তার ফ্রেণ্ডশিপ কতটা গাঢ় সেটা আজ আমরা একটু পরীক্ষা করি। তুমি এক কাজ করো—মুহিবকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গাড়িতে উঠে এসো। ওর প্রেমের দৌড়টা পরীক্ষা করা যাক। সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকবে, রাগে থরথর করে কাঁপবে। সেটা দেখতে ইন্টারেস্টিং হবে।’

‘সবার সঙ্গেই আপনি একধরনের খেলা খেলেন। আমার সঙ্গে খেলবেন না। এবং আপনি আমাকে আবার তুমি করে বলছেন। এরকম কথা ছিল না।’

‘আপনি তা হলে গাড়িতে উঠবেন না?’

‘অবশ্যই না। আপনি আমাকে কী ভেবেছেন? পাপেট? সুতা দিয়ে বাঁধা পাপেট?’

‘গাড়িতে না উঠলে চলে যাই। শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া মুহিব ছেলেটি কেমন ক্যাবলার মতো হাঁ করে আছে। দেখতে খারাপ লাগছে। আপনি বরং ওর কাছে চলে যান। ওকে বলুন হাঁ করে তাকিয়ে না থাকতে। মুখে মাছি ঢুকে যেতে পারে।’

‘এরকম অশালীন ভঙ্গিতেও আর কোনোদিন কথা বলবেন না।’

‘আর কোনোদিন আপনার সঙ্গে দেখাই হবে না। কথা বলার তো প্রশ্ন আসছে না।’

‘দেখা হবে না মানে কী?’

‘দেখা হবে না মানে, দেখা হবে না। মাস খানিকের জন্যে আমি অজ্ঞাতবাসে যাচ্ছি।’

‘কোথায়?’

‘হয় টেকনাফে, নয় তেঁতুলিয়ায়।’

‘বাদলদের বাড়িতে আপনাকে যেতে বলেছিলাম, আপনি যাননি। ঐ বাড়িতে আপনাকে ভয়ংকর দরকার।’

‘দরকার হলেও কিছু করার নেই। আচ্ছা ইরা, আমি বিদেয় হচ্ছি—তুমি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাও।’

ইরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, আপনি এখন চলে গেলে আর আপনার দেখা পাব না। বাদলের আপনাকে ভয়ংকর দরকার।

‘তা হলে দেরি করে লাভ নাই, উঠে এসো।’

‘এই গাড়িটা কার?’

‘কার আবার? আমার! তুমি দেরি করছ ইরা।’

‘আপনি আসলে চেষ্টা করছেন মুহিবের কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে কেন বলুন তো?’

‘ঈর্ষা।’

‘ঈর্ষা মানে? আপনি কি আমার প্রেমে পড়েছেন যে ঈর্ষা?’

মুহিব আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছে। তার মুখে বিরক্তির গাঢ় রেখা। সে কর্কশ গলায় ডাকল—ইরা, শুনে যাও।

আমি বললাম, যাও, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি বেজে উঠেছে।

ইরা দোটানায় পড়ে গেল। আমি ড্রাইভারকে বললাম, চলো, যাওয়া যাক।

ড্রাইভার হুঁশ করে বের হয়ে গেল। যতটা স্পিডে তার বের হওয়া উচিত তারচেয়েও বেশি স্পিডে বের হলো। মনে হচ্ছে সেও খানিকটা অপমানিত বোধ করছে। পাজেরোর মতো বিশাল গাড়ি অগ্রাহ্য করার দুঃসাহসকে সেই গাড়ির ড্রাইভার ক্ষমা করে দেবে, তা হয় না।’

‘এখন কোনদিকে যামু স্যার?

‘দিক টিক না—চলতে থাকো।’

.

দুপুরের দিকে আমি আমার পুরানো মেসে গেলাম। বদরুল সাহেবের খোঁজ নেয়া দরকার—চাকরির কিছু হয়েছে কিনা। হবার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না, তবে বদরুল সাহেবের বিশ্বাস থেকে মনে হচ্ছে, হয়ে যেতেও পারে। মানুষের সবচে বড় শক্তি তার বিশ্বাস।

অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর বদরুল সাহেব দরজা খুললেন। তাঁর হাসিখুশি ভাব আর নেই। চোখ বসে গেছে। এই দুদিনেই মনে হয় শরীর ভেঙে পড়েছে। তাঁর গোলগাল মুখ কেমন লম্বাটে দেখাচ্ছে।

‘বদরুল সাহেবের খবর কী?’

‘খবর বেশি ভালো না হিমু ভাই।’

‘কেন বলুন তো?’

‘আমার স্ত্রীর শরীরটা খুব খারাপ। ছোট মেয়ের চিঠি গত পরশু পেয়েছি। চিঠি পাওয়ার পর থেকে খেতেও পারছি না, ঘুমুতেও পারছি না।’

‘ঢাকায় পড়ে আছেন কেন? আপনার চলে যাওয়া উচিত না?’

‘ইয়াকুব আগামীকাল বিকেলে দেখা করতে বলেছে, এইজন্যেই যেতে পারছি না।’

‘শেষ পর্যন্ত তা হলে আপনার চাকরি দিচ্ছে?’

‘জি। চাকরিটাও তো খুব বেশি দরকার। চাকরি না পেলে সবাই না-খেয়ে মরব। আমি খুবই গরিব মানুষ, হিমু ভাই। কত শখ ছিল স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে একসঙ্গে থাকব। অর্থের অভাবে সম্ভব হয় নাই। একবার মালিবাগে একটা বাসা প্রায় ভাড়া করে ফেলেছিলাম। দুই-রুমের একটা ফ্ল্যাট। বারান্দা আছে। রান্নার একটা জায়গা আছে। সামনে বড় আমগাছ। ডালে দোলনা বাঁধা। এত পছন্দ হয়েছিল! ভেবেছিলাম কষ্ট করে কোনোমতে থাকব। এরা ছয় মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স চাইল। কোথায় পাব ছয় মাসের অ্যাডভান্স বলুন দেখি!’

‘তা তো বটেই।’

‘হিমু ভাই, ছোট মেয়ের চিঠিটা একটু পড়ে দেখেন। মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে। কিন্তু ভাই, চিঠি পড়লে মনে হয় না। মনে হয় কলেজে-পড়া মেয়ের চিঠি। দুটা বানান অবশ্য ভুল করেছে।’

চিঠি পড়লাম।

আমার অতি প্রিয় বাবা,

বাবা, মা’র খুব অসুখ করেছে। প্রথমে বাসায় ছিল, তারপর পাশের বাড়ির মজনু ভাইয়া মা’কে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ডাক্তাররা বলছে ঢাকা নিয়ে যেতে। বাসায় সবাই কান্নাকাটি করছে।

তুমি কোনো টাকা পাঠাও নাই কেন বাবা? মা প্রথম ভেবেছিল পোস্টাপিসে টাকা আসেনি। রোজ পোস্টাপিসে খোজ নিতে যায়। তারপর মা কোত্থেকে যেন শুনল তোমার চাকরি চলে গেছে।

বাবা, সত্যি কি তোমার চাকরি চলে গেছে? সবার চাকরি থাকে, তোমারটা চলে গেল কেন? তোমার চাকরি চলে যাবার খবর শুনে মা বেশি কান্নাকাটি করেনি, কিন্তু বড় আপা এমন কান্না কেঁদেছে তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না। বড় আপা কাঁদে আর বলে—’আমার এত ভাল বাবা! আমার এত ভাল বাবা!’ আমি বেশি কাঁদিনি, কারণ আমি জানি, তুমি খুব একটা ভাল চাকরি পাবে। কারণ আমি নামাজ পড়ে দোয়া করেছি। বাবা, আমি নামাজ পড়া শিখছি। ছোট আপা বলেছে আত্তাহিয়াতু ছাড়া নামাজ হয় না। ঐ দোয়াটা এখনও মুখস্থ হয় নাই। এখন মূখস্থ করছি। মূখস্থ হলে আবার তোমার চাকরির জন্যে দোয়া করব।

বাবা, মা’র শরীর খুব খারাপ। এত খারাপ যে তুমি যদি মা’কে দেখ চিনতে পারবে না। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো বাবা।

ইতি তোমার অতি আদরের ছোট মেয়ে

জাহেদা বেগম

ক্লাস সিক্স

রোল নং ১

.

‘চিঠি পড়েছেন হিমু ভাই?’

‘জি।’

‘মেয়েটা পাগলি আছে। চিঠির শেষে সবসময় কোন ক্লাস, রোল নং কত লিখে দেয়। ফার্স্ট হয় তো, এইজন্য বোধহয় লিখতে ভালো লাগে।’

‘ভালো লাগারই কথা। ‘

‘দুটা বানান ভুল করেছে লক্ষ্য করেছেন? খোঁজ আর মুখস্থ। মুখস্থ দীর্ঘ উকার দিয়ে লিখেছে। কাছে থাকি না, কাছে থাকলে যত্ন করে পড়াতাম। সন্ধ্যাবেলা নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াতে বসার আনন্দের কি কোনো তুলনা আছে? তুলনা নেই। সবই কপাল!’

বদরুল সাহেবের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছছেন। যতই মুছছেন ততই তাঁর চোখে পানি আসছে।

‘বদরুল সাহেব!’

‘জি হিমু ভাই?

‘আগামীকাল পাঁচটার সময় আপনার ইয়াকুব সাহেবের কাছে যাবার কথা না?’

‘জি।’

‘আমি ঠিক চারটা চল্লিশ মিনিটে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। আমিও যাব আপনার সঙ্গে। আপনার বন্ধু আবার আমাকে দেখে রাগ করবেন না তো?’

‘জি না, রাগ করবে না। রাগ করার কী আছে! সে যেমন আমার বন্ধু, আপনিও সেরকম আমার বন্ধু। আপনি সঙ্গে থাকলে ভালো লাগবে। চাকরির সংবাদ একসঙ্গে পাব। দুঃখ ভাগাভাগি করতে ভালো লাগে না ভাইসাহেব, কিন্তু আনন্দ ভাগাভাগি করতে ভালো লাগে।’

‘ঠিক বলেছেন। দুপুরে কিছু খেয়েছেন?’

‘জি না।’

‘আসুন, ভাত খেয়ে আসি।’

‘কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না হিমু ভাই। এম্নিতেই মেয়ের চিঠি পড়ে মনটা খারাপ, তার উপরে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে—মনটা ভেঙে গেছে।’

‘কী ঘটনা?’

‘বলতে লজ্জা পাচ্ছি হিমু ভাই।’

‘লজ্জা পেলে বলার দরকার নেই।’

‘না, আপনার কাছে কোনো লজ্জা নেই, আপনি শুনুন। ফার্মগেটে গিয়েছি—হঠাৎ দেখি রশিদ। আবদুর রশিদ। নগ্ন। শুধু কোমরে একটা গামছা। এর-তার কাছে যাচ্ছে আর বলছে একটা লুঙ্গি কিনে দিতে।’

‘আপনার সঙ্গে কথা হয়েছে?’

‘জি না। ও যেন আমাকে দেখতে না পায় এইজন্যে পালিয়ে চলে এসেছি। তারপর নিজের একটা লুঙ্গি, একটা শার্ট নিয়ে আবার গেলাম। তাকে পাইনি। মানুষের কী অবস্থা দেখেছেন হিমু ভাই?’

‘জি, দেখলাম।’

‘ইয়াকুবের কাছে ওর চাকরির কথা বলব বলে ভাবছি।’

‘আগে নিজেরটা হোক, তারপর বলবেন

‘রশিদকে দেখে এত মনটা খারাপ হয়েছে।’

‘আপনি তা হলে দুপুরে কিছু খাবেন না?’

‘জি না।’

‘তা হলে আমি উঠি। আগামীকাল চাকরির খবরটা নিয়ে আমরা এক কাজ করব। সরাসরি আপনার দেশের বাড়িতে চলে যাব

‘সত্যি যাবেন হিমু ভাই?’

‘যাব।’

‘আপনার ভাবির শরীরটা খারাপ, আপনাকে যে চারটা ভালোমন্দ রেঁধে খাওয়াবে সে-উপায় নেই।

‘শরীর ঠিক করিয়ে ভালোমন্দ রাঁধিয়ে খেয়ে তারপর আসব। ভাবি সবচে ভালো রাঁধে কোন জিনিসটা বলুন তো?’

‘গরুর গোশতের একটা রান্না সে জানে। অপূর্ব! মেথিবাটা দিয়ে রাঁধে। পুরো একদিন সিরকা-আদা-রসুনের রসে মাংস ডুবিয়ে রাখে, তারপর খুব অল্প আঁচে সারাদিন ধরে জ্বাল হয়। বাইরে থেকে এক ফোঁটা পানি দেয়া হয় না… কী যে অপূর্ব জিনিস ভাইসাহেব!’

‘ঐ মেথির রান্নাটা ভাবিকে দিয়ে রাঁধাতে হবে।’

‘অবশ্যই—অবশ্যই! পোনামাছ যদি পাওয়া যায় তা হলে আপনাকে এমন এক জিনিস খাওয়াব, এই জীবনে ভুলবেন না। কচি সজনে পাতা ব্লেটে পোনামাছের সঙ্গে রাঁধতে হয়। কোনো মশলা না, কিছু না, দুটা কাঁচামরিচ, এককোয়া রসুন, একটু পেঁয়াজ। এই দেখুন বলতে বলতে জিবে পানি এসে গেল।’

‘জিবে পানি যখন এসে গেছে চলুন, খেয়ে আসি।’

‘জি আচ্ছা, চলুন। আপনি দেশে যাবেন ভাবতেই এত ভালো লাগছে!’

মেস থেকে বেরুবার মুখে ম্যানেজার হায়দার আলি খাঁ বললেন, স্যার, আপনি মেসে ছিলেন না, আপনার কাছে ঐ মেয়েটা দুবার এসেছিল।

‘ইরা?’

‘জি, ইরা। উনার বাসায় যেতে বলেছে। খুব দরকার।’

‘জানি। আমার সঙ্গে ঐ মেয়ের দেখা হয়েছে। ঐ মেয়ে যদি আবার আসে, বলবেন Get lost.‘

‘স্যার, কী বলব?’

‘বলবেন Get lost, কঠিন গলায় বলবেন।‘

‘জি আচ্ছা।’

হায়দার আলি খাঁ পিরিচে চা খাচ্ছিলেন। আবার সারা শরীরে চা ফেলে দিলেন। এই মানুষটা আমাকে এত ভয় পায় কেন কে জানে!

Chapter - 6

রাতের অনিদ্রাজনিত ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক ভোরবেলা একটা ‘হট শাওয়ার’ দিয়ে রেশমা খালা দূর করে দেন। গোসলের পর তিনি পরচুলাটা মাথায় দেন। খানিকটা সাজগোজ করে আমার ঘরে এসে বললেন, কী রে হিমু, জেগেছিস? গুড মর্নিং।

আমিও বলি গুড মর্নিং খালা।

‘চা দিতে বলেছি। হাতমুখ ধুয়ে আয়!’

‘তোমাকে তো আজ দারুণ লাগছে! কপালে টিপ দিয়ে বয়স দশ বছর কমিয়ে ফেলেছ। এখন তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার বয়স বাহান্ন।’

খালা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, আমার বয়স তো আসলেই বাহান্ন।

‘ও সরি!’

‘হিমু, তোর ঠাট্টা-ফাজলামি আমার ভালো লাগে না। সাজগোজ সামান্য করি—তাতে কী? দুদিন পরে তো মরেই যাব। কবরে গিয়ে তো সাজতে পারব না। কবরে তোরা তো আর ক্রিম, লিপস্টিক দিয়ে আসবি না!’

‘সেটা খাঁটি কথা।’’

‘বয়সকালে সাজতে পারিনি। এমন এক লোকের হাতে পড়েছিলাম যার কাছে সাজা না-সাজা এক। তাকে একবার ভালো একটা ক্রিম আনতে বলেছিলাম, সে দেশি তিব্বত ক্রিম নিয়ে চলে এসেছে। তার পরেও আফসোস—এত নাকি দাম!’

‘এখন তো পুষিয়ে নিচ্ছ। ‘

‘তা নিচ্ছি। আয়, চা খাবি। আজ ইংলিশ ব্ৰেকফাস্ট!’

‘চমৎকার!’

চায়ের টেবিলে রেশমা খালাকে বললাম, খালা, অদ্য শেষ সকাল।

খালা বললেন, তার মানে কী?

‘তার মানে হচ্ছে, নাশতা খেয়েই আমি ফুটছি!’

‘ফুটছি মানে কী?’

ফুটছি মানে বিদেয় হচ্ছি। লম্বা লম্বা পা ফেলে পগারপার।’

‘আশ্চর্য কথা! চলে যাবি কেন? এখানে কি তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে?’

‘কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না। বরং সুবিধা হচ্ছে। আমার ভুঁড়ি গজিয়ে গেছে। ‘মেদ-ভুঁড়ি কী করি’-ওয়ালাদের খুঁজে বের করতে হবে।

ঠাট্টা করবি না হিমু। খবর্দার, ঠাট্টা না।’

‘আমি মোটেও ঠাট্টা করছি না খালা। চা খেয়েই আমি ফুটব।’

খালা বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, আমার এই ভয়ংকর অবস্থা দেখেও তোর দয়া হচ্ছে না? রাতে একফোঁটা ঘুমুতে পারি না। ঐ বদমায়েশ লোকটার যন্ত্রণায় মাঝেমাঝে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে। আর তুই চলে যাবি?

আমি অবাক হয়ে বললাম, খালুসাহেব কি কালও এসেছিলেন? গতকাল তো তাঁর আসার কথা না।

‘গতকাল তার আসার কথা না মানে? তুই জানলি কী করে তার আসার কথা না?’

‘আমার সঙ্গে কথা হয়েছে।’

খালা হতভম্ব হয়ে বললেন, তোর সঙ্গে কথা হয়েছে?

‘হুঁ।’

‘হুঁ-হ্যাঁ করিস না, ঠিকমতো বল। তুই দেখেছিস?’

‘হুঁ।’

‘আবার হুঁ! আরেকবার হুঁ বললে কেতলির সব চা মাথায় ঢেলে দেব। কখন দেখা হলো?’

‘কাল রাত ন’টার দিকে।’

‘বলিস কী!‘

তুমি রাতে খাওয়ার জন্যে ডাকলে। আমি ঘর থেকে বেরুব। স্যান্ডেল খোঁজার জন্যে নিচু হয়ে দেখি, উনি ঘাপটি মেরে খাটের নিচে বসে আছেন।’

‘তোর খাটের নিচে ও বসবে কীভাবে? তোর খাটটা হলো বক্সখাট। বক্সখাটের আবার নিচ কী?’

‘ঠিক নিচে না, বলতে ভুল করেছি। খাটের সাইডে।’

‘গায়ে কাপড়চোপড় ছিল?’

‘উঁহুঁ।’

‘তুই দেখে ভয় পেলি না?’

‘ভয় পাব কেন? জীবিত অবস্থায় ওনার সঙ্গে আমার ভালো খাতির ছিল। একবার হেঁটে হেঁটে সদরঘাটের দিকে যাচ্ছি। তিনি তাঁর প্রাইভেট রিকশায় যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে রিকশা থামিয়ে তুলে নিলেন। পথে এক জায়গায় আখের শরবত বিক্রি হচ্ছিল। রিকশা থামিয়ে আমরা আখের শরবত খেলাম। আরেকটু এগিয়ে দেখি ডাব বিক্রি করছে—রিকশা থামিয়ে দুজন ডাব খেলাম। তারপর খালুসাহেব আইসক্রিম কিনলেন খেতে খেতে আমরা তিনজন যাচ্ছিলাম।’

‘তিনজন হলো কীভাবে?’

‘রিকশাওয়ালাও খাচ্ছিল। তিনজন মিলে রীতিমতো এক উৎসব। বুঝলে খালা, তখনই বুঝলাম ইনি একজন অসাধারণ মানুষ। প্রায় মহাপুরুষ পর্যায়ের। ব্যবসায়ীরাও মহাপুরুষ হতে পারে কোনোদিন ভাবিনি।’

‘তুই এক কথা থেকে অনেক কথায় চলে যাচ্ছিস। আসল কথা বল। খাটের নিচে ও বসে ছিল?’

‘খাটের নিচে না, সাইডে।’

‘তারপর?’

‘আমি বললাম, খালুসাহেব, কেমন আছেন?’

‘সে কী বলল?’

‘কিছু বললেন না। মনে হলো লজ্জা পেলেন। তখন আমি বেশ রাগ-রাগ ভাব নিয়ে বললাম, আপনার মতো একটা ভদ্রলোক… মেয়েছেলেকে ভয় দেখাচ্ছেন! এটা কি ঠিক হচ্ছে? ভয় দেখানোর মধ্যেও তো শালীনতা, ভদ্রতা আছে। ন্যাংটো হয়ে ভয় দেখান—তাও নিজের স্ত্রীকে! ছি ছি!’

‘তুই কি সত্যি এইসব বলেছিস?’

‘হ্যাঁ, বললাম। উনি আমার কথায় লজ্জা পেলেন খুব। মাথা নিচু করে ফেললেন। আমার তখন মনটা একটু খারাপ হলো। আমি বললাম, এসব করছেন কেন?’

‘সে কী বলল?’

‘কথাবার্তা তাঁর খুব পরিষ্কার না। অস্পষ্ট। কিছু বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায় না। তবু যা বুঝেছি, উনি বললেন, তোর খালাকে শিক্ষা দেয়ার জন্যে এইসব করছি। শিক্ষা হয়ে গেলে আর করব না।’

রেশমা খালা ফস করে বললেন, শিক্ষা? কিসের শিক্ষা? আমি কী করেছি যে সে আমাকে শিক্ষা দেবে? সারাজীবন যন্ত্রণা করেছে। মরার পরেও যন্ত্রণা দিচ্ছে। আরকিছু না—লোকটা ছিল হাড় বদমাশ!

আমিও খালুসাহেবকে এই কথাই বললাম। শুধু বদমাশটা বললাম না। তখন খালুসাহেব বললেন, তুমি আসল ঘটনা জান না। তোমার খালা আমাকে বিষ খাইয়েছিল।

‘এত বড় মিথ্যা কথা আমার নামে! এত সাহস! ব্যথায় তখন ওর দম যায় যায় অবস্থা। আমার মাথার নেই ঠিক—দৌড়ে অষুধ নিয়ে এনে খাওয়ালাম…..’

খালু বললেন, যেটা খাওয়ানোর কথা সেটা না খাইয়ে ভুলটা খাইয়েছে। পিঠে মালিশের অষুধ দুচামচ খাইয়ে দিয়েছে।

‘ইচ্ছা করে তো খাওয়াইনি। ভয়ে আমার মাথা এলোমেলো।’

‘আমিও খালুসাহেবকে তা-ই বললাম। আমি বললাম—এটা অনিচ্ছাকৃত একটা ভুল। রেশমা খালা মানুষ খুন করার মতো মহিলাই না! অতি দয়ার্দ্র মহিলা।’

‘এটা শুনে কী বলল?’

খিকখিক করে অনেকক্ষণ হাসল। তারপর আমি বললাম, এখনও আপনার প্রতি খালার গভীর ভালোবাসা। আপনার স্মৃতি রক্ষার্থে ‘গনি মিয়া ইন্সটিটিউট অভ মডার্ন আর্ট’ করবে।’

‘শুনে কী বলল?’

‘শুনে বললেন, এইসব যদি করে তা হলে লাথি মেরে মাগির কোমর ভেঙে ফেলব। ভূত হবার পর খালুসাহেবের ভাষার খুবই অবনতি হয়েছে। স্ত্রীকে মাগি বলা জীবিত অবস্থায় ওনার জন্যে অকল্পনীয় ছিল।’

রেশমা খালা এখন আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন না। স্থিরচোখে তাকিয়ে আছেন। চোখের দৃষ্টি আগের মতো না—অন্যরকম।

‘আমি খালুসাহেবকে বললাম, যা হবার হয়েছে। মাফ করে দেন। ক্ষমা যেমন মানবধর্ম, তেমনি ক্ষমা হচ্ছে ভূতধর্ম। উনি এক শর্তে ক্ষমা করতে রাজি হয়েছেন।’

‘শর্তটা কী?’

‘শর্তটা হচ্ছে—তুমি তাঁর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি দান-খয়রাত করবে। স্কুল-কলেজে দেবে, এতিমখানা করবে, তাঁর দরিদ্র সব আত্মীয়স্বজনকে সাহায্য করবে। তা হলেই তিনি আর তোমাকে বিরক্ত করবেন না।’

‘হিমু!’

‘জি খালা?’

‘তুই অসম্ভব বুদ্ধিমান। তুই কিছুই দেখিসনি। কারও সঙ্গেই তোর কথা হয়নি। পুরোটা আমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছিস। অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছিলি—ঢিল লেগে গেছে। তোর খালু যেমন বোকা ছিল, আমিও ছিলাম বোকা। শুধু ছিলাম না—এখনও আছি। কথা দিয়ে তুই আমাকে প্যাচে ফেলেছিস। তোর ধারণা তোর কথা শুনে তার কোটি কোটি টাকা আমি দান-খয়রাত করে নষ্ট করব? রাতে ভূত হয়ে আমকে ভয় দেখায়, তাতে কী হয়েছে? দেখাক যত ইচ্ছা। বদমায়েশের বদমায়েশ!

‘এখন রাতে ভয় দেখাচ্ছেন, তারপর দিনেও দেখাবেন। আমাকে সেরকমই হিন্টস দিলেন।’

‘বেশি চালাকি করতে যাস না হিমু। তোর চালাকির আমি পরোয়া করি না। খবর্দার, তোকে যেন আর কোনোদিন এই বাড়ির আশেপাশে না দেখি।’

‘আর দেখবে না খালা। এই যে আমি ফুটব, জন্মের মতোই ফুটব। খালা শোনো, খালুসাহেবের সঙ্গে দীর্ঘ কথাবার্তার যে-বর্ণনা আমি দিলাম তার পুরোটাই বানানো, তবে ওনাকে আমি কিন্তু দেখেছি।’

‘চুপ থাক হারামজাদা!’

‘বিশ্বাস করো ওনাকে দেখেছি, এবং তুমি যে ওনাকে মেরে ফেলেছ এটা উনি ইশারায় আমাকে বোঝালেন। উনি কোনো কথা বলেননি। ভূতদের সম্ভবত কথা বলার ক্ষমতা থাকে না।’

‘চুপ হারামজাদা—শুয়োরের বাচ্চা! চুপ!’

রেশমা খালা ভয়ানক হৈচৈ শুরু করলেন। বাবুর্চি, দারোয়ান, মালী সবাই ছুটে এল। রেশমা খালা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, এই চোরটাকে লাথি মেরে বের করে দাও।

রেশমা খালার কর্মচারীরা ম্যাডামের আদেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করল। শুধু লাথিটা দিল না। লাথির বদলে এমন গলাধাক্কা দিল যে রাস্তায় উলটে পড়তে পড়তে কোনোমতে রক্ষা পেলাম। খালার বাড়িতে আমার রেক্সিনের একটা ব্যাগ রয়ে গেল। ব্যাগের ভেতর আমার ইহজাগতিক যাবতীয় সম্পদ। দুটা শার্ট, একটা খুব ভালো কাশ্মীরি শাল। শালটা রূপা আমাকে জন্মদিনে দিয়েছিল। আমি হতদরিদ্র মানুষ হলেও বুকে হাত দিয়ে একটা কথা বলতে পারি—ঢাকা শহরে এমন দামি শাল আর কারোরই নেই।

গলাধাক্কার ভেতর যে-দিন শুরু হয়েছে সেই দিনের শেষটা কেমন হবে ভাবতেই আতঙ্ক লাগে। বিকেলে বদরুল সাহেবকে নিয়ে ইয়াকুব নামক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের কাছে যাবার কথা। সেখানে কোন নাটক হবে কে জানে!

রূপার সঙ্গে আজ সকালের মধ্যেই আমার দেখা করা দরকার। একমাত্র সে-ই পারে একদিনের নোটিসে বদরুল সাহেবের জন্যে চাকরির ব্যবস্থা করতে। টেলিফোনে রূপার সঙ্গে কথা বলব—না সরাসরি তার বাড়িতে উপস্থিত হবো, বুঝতে পারছি না। বাদলদের বাড়িতেও একবার যাওয়া দরকার। বাদল এমন কী করছে যে ইরাকে বারবার আমার খোঁজে যেতে হচ্ছে? রূপাকে বাদলদের বাসা থেকেও টেলিফোন করা যায়।

দরজা খুলে দিল ইরা। আমি অসম্ভব ভদ্র গলায় বললাম, কেমন আছেন?

ইরা কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। দিন শুরু হয়েছে গলাধাক্কায়, কাজেই যার সঙ্গেই দেখা হবে সে-ই কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকবে এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে? আমাকে যে লাঠি দিয়ে মারছে না এই আমার তিনপুরুষের ভাগ্য।

‘বাদল আছে নাকি?’

‘আছে।’

‘ফুপা-ফুপু আছেন?’

‘সবাই আছেন। আপনি বসুন।’

ইরা কঠিনমুখে ভেতরে চলে গেল।

এমনভাবে গেল যেন বন্দুক আনতে গেছে। ফুপা অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, প্যান্ট পরেছেন বোতাম লাগানো হয়নি, প্যান্টের বেল্ট লাগানো হয়নি। এই অবস্থাতেই চলে এলেন। আগুন-আগুন চোখে তাকালেন। স্বামীর পেছনে পেছনে স্ত্রী—তাঁর চোখেও আগুন।

আমি হাসিমুখে বললাম, তারপর, খবর কী আপনাদের? সব ভালো?

ফুপা ক্রুদ্ধ গর্জন করলেন। গর্জন শুনেই মনে হচ্ছে খবর ভালো না। ‘আপনাদের আর কারও গলায় কাঁটা-টাটা বিঁধেছে?’

ফুপা এবারে হুংকার দিলেন, ইয়ারকি করছিস? দাঁত বের করে ইয়ারকি?

আমার অপরাধ কী বুঝতে পারছি না। তবে গুরুতর কোনো অপরাধ যে করে ফেলেছি তা বোঝা যাচ্ছে। ইরাও এসেছে। তার চোখে আগে চশমা দেখিনি, এখন দেখি চশমা-পরা।

ফুপু বললেন, তোকে যে এতবার খবর দেয়া হচ্ছে আসার জন্যে গায়ে লাগছে না? তোকে কি হাতি পাঠিয়ে আনাতে হবে?

‘এলাম তো!’

‘এসে তো উদ্ধার করে ফেলেছিস!’

‘ব্যাপারটা কী খোলাসা করে বলুন।’

কেউ কিছু বলছে না। ভাবটা এরকম—আমি বলব না, অন্য কেউ বলুক। আমি ইরার দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললাম, ইরা, চা খাব।

ইরা এমন ভাব করল যেন অত্যন্ত অপমানসূচক কোনো কথা তাকে বলা হয়েছে। আমি বললাম, তুমি যদি চা বানাতে না পার তা হলে লুৎফার মা’কে বলো। ভালো কথা, লুৎফা মেয়েটা কোথায়?

এবারও জবাব নেই। ফুপা প্যান্টের বোতাম লাগাচ্ছেন বলে অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে পারছেন না। তাঁকে বোতামের দিকে লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে, তবে ফুপু তাঁর দৃষ্টি দিয়ে স্বামীর অভাব পূরণ করে দিচ্ছেন। তাঁর চোখে ডাবল আগুন। কথা বলল ইরা। কাটা-কাটা ধরনের কথা। তার কাছ থেকেই জানা গেল লুৎফা মেয়েটা চোরের হদ্দ। এসেই চুরি শুরু করেছে। বিছানার তল থেকে টাকা নিচ্ছে, মানিব্যাগ খুলে নিচ্ছে, সবশেষে যা করেছে তা অবিশ্বাস্য। ফুপুর কানের দুল চুরি করে নিজের পায়জামার ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে। লাফালাফি করছিল, হঠাৎ পায়জামার ভাঁজ থেকে দুল বের হয়ে এল। তৎক্ষণাৎ মা-মেয়ে দুজনকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। কাজেই বাড়িতে এই মুহূর্তে কোনো কাজের মেয়ে নেই। আগের মতো চাইলেই চা পাওয়া যাবে না।

বাদলের প্রসঙ্গে যা জানা গেল তা কানের দুলের চেয়েও ভয়াবহ। সে গত দশদিন হলো ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে না। দরজা বন্ধ করে ধ্যান করছে।

আমি মধুর ভঙ্গিতে ফুপার দিকে তাকিয়ে বললাম, ধ্যান করা তো গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। আপনারা এত আপসেট কেন?

ফুপা বললেন, মুগুর দিয়ে এমন বাড়ি দেব যে সব ক’টা দাঁত খুলে চলে আসবে। ধ্যান করা শেখায়’ সাহস কতবড়! যা, ধ্যান কীভাবে করছে নিজের চোখে দেখে আয়।

কীভাবে ধ্যান করছে?’

‘কাপড়-জামা খুলে ধ্যান করছে। হারামজাদা! দশদিন ধরে বিছানার উপর ন্যাংটো হয়ে বসে আছে।’

‘সেকী!’

‘আবার বলে সেকী? তুই-ই নাকি বলেছিস নাংটো হয়ে ধ্যান করতে হয়। ধ্যান করা কাকে বলে তোকে আমি শেখাব। বন্দুক দিয়ে আজ তোকে আমি গুলি করে মেরে ফেলব। গুরুদেব এসেছে—ধ্যান শেখায়!’

ফুপু বললেন, তুমি এত হৈচৈ কোরো না। তোমার প্রেশারের সমস্যা আছে। তুমি অফিসে চলে যাও। যা বলার আমি বলছি।

‘অফিস চুলায় যাক। আমি হিমুকে সত্যি সত্যি গুলি করে মেরে তারপর অফিসে যাব। গুরুদেবগিরি বের করে দেব।’

ইরা বলল, হৈচৈ করে তো লাভ কিছু হবে না। ব্যাপারটার ভালো মীমাংসা হওয়া দরকার। উনি বাদলকে বুঝিয়ে বলবেন যেন সে এসব না করে। তারপর এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। আর কখনো এ-বাড়িতে আসবেন না। এবং বাদলের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ রাখবেন না।

ফুপা তীব্র গলায় বললেন, যোগাযোগ রাখবে কীভাবে? হারামজাদাকে আমি দেশছাড়া করব না! এ ক্রিমিন্যাল! এ পেস্ট!

পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হতে আধঘণ্টার মতো লাগল। এর মধ্যে ইরা চা বানিয়ে আনল। ফুপার অফিসের গাড়ি এসেছিল—তিনি আমাকে গুলি করা আপাতত স্থগিত রেখে অফিসে চলে গেলেন। ফুপু ফোঁসফোঁস করে কাঁদতে বসলেন। ফোঁসফোঁসানির মাঝখানে যা বললেন তা হচ্ছে—এত বড় ধামড়া ছেলে ন্যাংটা হয়ে বসে আছে! কী লজ্জার কথা। তাকে তার ঘরে খাবার দিয়ে আসতে হয়। ভাগ্যিস বেশি লোকজন জানে না। জানলে নির্ঘাত পাবনা মেন্টাল হাসপাতালে ভরতি করিয়ে আসত।

ইরা আমার দিকে তাকিয়ে মোটামুটি শান্ত ভঙ্গিতেই বলল, আপনি চা খেয়ে দয়া করে বাদলের কাছে যান। তাকে বুঝিয়ে বলুন। সে বাস্তব এবং কল্পনা গুলিয়ে ফেলেছে। আমি চায়ের কাপ হাতে বাদলের ঘরে গিয়ে টোকা দিলাম। বাদল আনন্দিত গলায় বলল, হিমু ভাই?

‘হুঁ।’

‘আমি টোকা শুনেই টের পেয়েছি। তুমি ছাড়া এরকম করে কেউ টোকা দেয় না।’

‘তুই ধ্যান করছিস নাকি?’

‘হুঁ। হচ্ছে না।’

‘দরজা খোল দেখি!’

বাদল দরজা খুলল। সে যে নগ্ন হয়েই বসে ছিল সেটা বোঝা যাচ্ছে। তার কোমরে তোয়ালে জড়ানো। মুখ আনন্দে ঝলমল করছে।

‘তোমাকে দেখে এত আনন্দ হচ্ছে হিমু ভাই! মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলব।’

‘তুই মনে হচ্ছে নাগা সন্ন্যাসীর পথ ধরে ফেলেছিস।’

তুমি একবার বলেছিলে না—সব ত্যাগ করতে হবে? আসল জিনিস পেতে হলে সর্বত্যাগী হতে হবে। পোশাক-পরিচ্ছদও ত্যাগ করতে হবে।

‘বলেছিলাম নাকি?’

‘হ্যাঁ, বলেছিলে।’

‘ঐ স্টেজে তো ঝপ করে যাওয়া যায় না। ধাপে ধাপে উঠতে হয়। ব্যাপারটা হলো সিঁড়ির মতো। লম্বা সিঁড়ি। সিঁড়ির একেকটা ধাপ পার হয়ে উঠতে হয়। ফস করে জামাকাপড় খুলে ন্যাংটা হওয়াা কোনো কাজের ব্যাপার না।’

‘শার্ট-প্যান্ট পরে ফেলব?’

‘অবশ্যই পরে ফেলবি। ইউনিভর্সিটি খোলা না?’

‘হ্যাঁ।’

‘আজ ক্লাস আছে?’

‘আছে।’

‘জামাকাপড় পরে ক্লাসে যা। সাধনার প্রক্রিয়া শিখিয়ে দেব। আস্তে আস্তে উপরে উঠতে হবে। কাউকে কিছু বুঝতে দেয়া যাবে না। তুই ন্যাংটা হয়ে বসে আছিস—আর এদিকে বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। এইভাবে সাধনা হয়?

‘ঠিকই বলেছ। ইউনিভার্সিটিতে যেতে বলছ?’

‘অবশ্যই।’

‘আমার ইউনিভার্সিটিতে যেতে একেবারেই ইচ্ছা করে না।’

‘কী ইচ্ছা করে?’

‘সারাক্ষণ ইচ্ছা করে তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকি। তোমার সঙ্গে পথে-পথে হাঁটি।’

‘পাশাপাশি দুভাবে থাকা যায়। স্থূলভাবে থাকা যায়। এই যেমন তুই আর আমি এখন পাশাপাশি বসে আছি। আবার সূক্ষ্মভাবে—চেতনার ভেতরও থাকা যায়। তুই যেই ভাববি আমার সঙ্গে আছিস, অম্লি তুই আমার পাশে চলে এসেছিস। সাধারণ মানুষ স্থুল অর্থেই জীবনকে দেখে। এতেই তারা সন্তুষ্ট। তুই নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ হতে চাস না?’

‘না।’

‘ভেরি গুড। যা, ইউনিভার্সিটিতে চলে যা।’

‘আচ্ছা যাচ্ছি। হিমু ভাই, তুমি কি আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে? জাস্ট ওয়ান।‘

‘তোর একটা না, একলক্ষ রিকোয়েষ্ট রাখব। বলে ফ্যাল।’

‘ইরা মেয়েটাকে একটা শিক্ষা দেবে? কঠিন একটা শিক্ষা।’

‘সে কী করেছে?’

‘তোমাকে নিয়ে শুধু হাসাহাসি করে। রাগে আমার গা জ্বলে যায়।’

‘সামান্য ব্যাপারে গা জ্বললে হবে কেন?’

‘আমার কাছে সামান্য না। কেউ তোমাকে কিছু বললে আমার মাথা-খারাপের মতো হয়ে যায়। হিমু ভাই, তুমি ইরাকে একটা শিক্ষা দাও। ওকে শিক্ষা দিতেই হবে।

‘কী শিক্ষা দেব?’

‘ওকেও তুমি হিমু বানিয়ে দাও। মহিলা-হিমু, যেন সে হলুদ পাঞ্জাবি পরে রাস্তায়—রাস্তায় হাঁটে।’

‘মেয়েমানুষ হয়ে রাত-বিরাতে রাস্তায় হাঁটবে! এটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া এমন একজন ভালো ছাত্রী!’

‘বেশ, তা হলে তুমি তাকে একরাতের জন্যে হিমু বানিয়ে দাও। জাস্ট ফর ওয়ান নাইট।’

‘দেখি।’

‘না, দেখাদেখি না। তোমাকে বানাতেই হবে। তুমি ইচ্ছা করলেই হবে।‘

.

ফুপু এবং ইরার বিস্মিত চোখের সামনে দিয়ে বাদল কাপড়চোপড় পরে ইউনিভার্সিটিতে চলে গেল।

ইরা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি যা করেছেন তার জন্যে ধন্যবাদ। এখন দয়া করে এ-বাড়িতে আর আসবেন না।

আমি বললাম, জি আচ্ছা। শুধু একটা টেলিফোন করব। টেলিফোন করে জন্মের মতো চলে যাব।

ইরা বলল, যদি সম্ভব হয় আপনি দয়া করে নিজেকে বদলাবার চেষ্টা করবেন। আপনাকে আমি কোনো উপদেশ দিতে চাই না। অপাত্রে উপদেশ দেয়ার অভ্যাস আমার নেই। তার পরেও একটা কথা না বলে পারছি না—হলুদ পাঞ্জাবি পরে রাস্তায় হাঁটলেই প্রকৃতিকে জানা যায় না। প্রকৃতিকে জানার পথ হলো বিজ্ঞান। বুঝতে পারছেন?

‘পারছি।’

‘পারলে ভালো। না-পারলেও ক্ষতি নেই।‘

ফুপু বললেন, ওর সঙ্গে কথা বলিস না ইরা। টেলিফোনটা এনে দে। টেলিফোন করে বিদেয় হোক।

ইরা টেলিফোন এনে দিল।

‘হ্যালো রূপা! আমি হিমু।‘

‘বুঝতে পারছি!’

‘কেমন আছ, রূপা?’

‘আমি কেমন আছি সেটা জানার জন্যে তুমি আমাকে টেলিফোন করনি। তোমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। সেটা বলে ফ্যালো।’

‘রাগ করছ কেন?’

‘রাগ করছি না। তোমার উপর রাগ করা অর্থহীন। যে রাগ বোঝে না তার উপর রাগ করে লাভ কী?’

‘রাগ হচ্ছে মানবচরিত্রের অন্ধকার বিষয়ের একটি। রাগ না-বোঝাটা তো ভালো।’

‘যে অন্ধকার বোঝে না, সে আলোও ধরতে পারে না।’

‘রূপা, তোমার লজিকের কাছে সারেন্ডার করছি।’

‘কী জন্যে টেলিফোন করেছ বলো।’

‘আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দাও রূপা। এমন একটা চাকরি যেন ভদ্রভাবে খেয়ে-পরে ঢাকা শহরে ছোটখাটো একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকা যায়। জোগাড় করে দিতে পারবে?’

‘এমন কী কখনো হয়েছে যে তুমি আমার কাছে কিছু চেয়েছ আর আমি বলেছি— না?’

‘হয়নি।’

‘এবারও হবে না।’

‘আজ দিনের ভেতর চাকরিটা জোগাড় করে দিতে হবে।’

‘সেটা কী করে সম্ভব?’

‘তোমার জন্যে কোনোকিছুই অসম্ভব না।’

‘চাকরিটা কার জন্যে?’

‘আমার এক বন্ধুর জন্যে। অতি প্রিয় একজনের জন্যে।‘

‘নাম বলো। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে তার নাম তো লাগবে।‘

‘লেখো—বদরুল আলম। চাকরিটা কিন্তু আজকের মধ্যেই জোগাড় করতে হবে।’

‘চেষ্টা করব। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কি তুমি এসে নিয়ে যাবে?’

‘হ্যাঁ, আমি এসে নিয়ে যাব।’

‘তুমি কোত্থেকে টেলিফোন করছ? যদি বলতে তোমার কোনো আপত্তি না থাকে।’

‘আমি বাদলদের বাসা থেকে টেলিফোন করছি। এই নম্বর তোমার কাছে আছে। এই নম্বরে টেলিফোন করে আমাকে পাবে না। তারা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।’

‘সবাই তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়?’

‘হ্যাঁ, দেয়। এই ভয়েই আমি তোমার কাছে যাই না। কাছে গেলে তুমিও হয়তো বের করে দেবে। রূপা, আমি টেলিফোন রাখি?’

‘না, আরেকটু কথা বলো। প্লিজ, প্লিজ!’

‘কী বলব?’

‘যা ইচ্ছা বলো। এমনকিছু বলো যেন…’

‘যেন কী?’

‘না, থাক।’

আমার আগেই রূপা টেলিফোন নামিয়ে রাখল। আমি ফুপুর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ইরার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ইরা বলল, আপনাকে অনেক কঠিন কথা বলেছি—আপনি কিছু মনে করবেন না।

আমি বললাম, আমি কিছু মনে করিনি। আমি নানানভাবে আপনাকে বিরক্ত করার চেষ্টা করেছি। আপনিও কিছু মনে করবেন না।

আমার ক্ষীণ আশা ছিল, মেয়েটা হয়তো বাড়ির গেট পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দেবে। সে এল না। আশ্চর্য কঠিন এক মেয়ে!

.

আমি এবং বদরুল সাহেব পাশাপাশি বসে আছি। ইয়াকুব আলি আমাদের সামনেই আছেন। আমাদের মাঝখানে বিরাট এক সেক্রেটারিয়েট টেবিল। টেবিলে দুটা টেলিফোন। একটা সাদা, একটা লাল। ইয়াকুব আলি সাহেব রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। তিনি অসম্ভব ব্যস্ত। আমরা বসে থাকতে থাকতে তিন-চারটা টেলিফোন করলেন। তাঁর টেলিফোন করার ধরনটা বেশ মজার। স্থির হয়ে কথা বলতে পারেন না। রিভলভিং চেয়ারে পাক খেতে খেতে কথা বলেন। বদরুল সাহেব খুব উসখুস করছেন। আমি চুপচাপ বসে আছি। ইয়াকুব আলি এক ফাঁকে আমাদের দিকে একটু তাকাতেই বদরুল সাহেব বললেন, ইয়াকুব, ইনি হচ্ছেন আমার ফ্রেন্ড, হিমুসাহেব, ওনাকে সাথে করে এনেছি।

ইয়াকুব আলি আমার দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে হেসে বললেন, চা চলবে? বলেই ইন্টারকমে কাকে খুব ধমকাতে লাগলেন।

আমরা ধমকপর্ব শেষ হবার জন্যে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। একসময় ধমকপর্ব শেষ হলো। ইয়াকুব আলি অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, এ কী, এখনও চা দেয়নি? বলেই কর্কশ শব্দে বেল বাজাতে লাগলেন। কিংবা কে জানে বেল হয়তো মধুর শব্দেই বাজল, তবে আমার কানে কর্কশ লাগল।

বদরুল সাহেব বললেন, চা লাগবে না ইয়াকুব।

‘অবশ্যই চা লাগবে। তুমি তোমার বন্ধু নিয়ে এসেছ। ফার্স্ট মিটিং, চা লাগবে না মানে? তারপর বলো কী ব্যাপার!’

বদরুল অস্বস্তির সঙ্গে বলল, তুমি আজ আসতে বলেছিলে।

‘ও আচ্ছা, আজকে আসতে বলেছিলাম?’

‘আমার একটা চাকরির ব্যাপারে। তুমি বলেছিলে ব্যবস্থা করবে।’

ইয়াকুব আলি হাসিমুখে বললেন, বলেছি যখন তখন অবশ্যই করব। স্কুলজীবনের বন্ধুর সামান্য উপকার করব না তা তো হয় না। বায়োডাটা তো দিয়ে গিয়েছ?

‘হ্যাঁ! দুবার দিয়েছি।’

‘আমি দেখেছি। দ্যাখো বদরুল, আপাতত কিছু করা যাচ্ছে না। নো ওপেনিং। যেসব ওপেনিং আছে তোমাকে তা দেয়া যায় না। তুমি নিশ্চয়ই পিয়নের চাকরি করবে না। হা হা হা।’

বদরুল সাহেব ক্ষীণ স্বরে বললেন, তুমি আজকের কথা বলেছিলে। আমার অবস্থা খুবই ভয়াবহ।

ইয়াকুব দার্শনিক ভাব ধরে ফেলে বললেন, অবস্থা তো শুধু তোমার একার ভয়াবহ না, পুরো জাতির অবস্থাই ভয়াবহ। বিজনেস বলতে কিছু নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান লসে রান করছে। বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না।

‘ইয়াকুব, আমি তোমার উপর ভরসা করে এসেছিলাম…’

‘ভরসা নিশ্চয়ই করবে। ভরসা করবে না কেন? আমি কী করব তোমাকে বলি—আমি আমার বিজনেস কসমেটিক্স লাইনে এক্সপান্ড করছি। আমি মনে মনে ডিসাইড করে রেখেছি—তোমাকে সেখানে ম্যানেজারিয়েল একটা পোস্ট দেব।’

‘সেটা কবে?’

‘একটু সময় নেবে। মাত্র জমি কেনা হয়েছে। লোনের জন্যে অ্যাপ্লাই করেছি। বিদেশি কোনো ফার্মের সঙ্গে কোলাবরেশানে যাব। ফ্যাক্টরি তৈরি হবে—তারপর কাজ। তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। সবুরে মেওয়া ফলে—এটা মনে রাখবে।’

বদরুল সাহেবের হতভম্ব মুখ দেখে আমার নিজেরই মায়া লাগছে। আহা বেচারা! তিনি বোধহয় জীবনে এত অবাক হননি। এসি-বসানো ঠাণ্ডা ঘরেও ঘামছেন।

চা চলে এসেছে। ইয়াকুব সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সিগারেট কি চলে নাকি ভাই? তিনি আমাদের দিকে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন। আমি সিগারেট নিতে নিতে বললাম, বদরুল সাহেবকে চাকরিটার জন্যে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

ইয়াকুব সাহেব সিগারেটে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন—এগজ্যাক্ট বলা মুশকিল। তিন-চার বছর তো বটেই! বেশিও লাগতে পারে।

আমি সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। হাসিমুখে বললাম, ভাই শুনুন, চাকরি আপনার পক্ষে দেয়া সম্ভব না এই কথাটা সরাসরি আপনার বন্ধুকে বলে দিচ্ছেন না কেন? বলতে অসুবিধা কী? চক্ষুলজ্জা হচ্ছে? আপনার মতো মানুষের তো চক্ষুলজ্জা থাকার কথা না।

ইয়াকুব আলি চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। ঠাণ্ডা মাথায় আমাকে বোঝার চেষ্টা করছেন। আমার ক্ষমতা যাচাইয়ের একটা চেষ্টাও আছে।

বদরুল সাহেব বললেন, হিমু ভাই, চলুন যাই।

আমি বললাম, চা-টা ভালো হয়েছে, শেষ করে তারপর যাই।

ইয়াকুব আলি এখনও তাকিয়ে আছেন। তাঁর হাত টেলিফোনের উপর। আমি তাঁর দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললাম, আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি নিরীহ একজন মানুষ। আমি যা করতে পারি তা হচ্ছে—আপনার মুখে থুথু ফেলতে পারি। এতে আপনার কিছু হবে না। কারণ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আপনার মুখে অদৃশ্য থুথু ফেলছে। আপনি এতে অভ্যস্ত। থুথু না ফেললেই বরং আপনি অবাক হবেন।

বদরুল সাহেব হাত ধরে আমাকে টেনে তুলে ফেললেন। চাপাগলায় বললেন, হিমু ভাই, কী পাগলামি করছেন।

ইয়াকুব সাহেব তাকিয়ে আছেন। রাগে তাঁর হাত কাঁপছে। সম্ভবত কী করবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, ভাই, আপনি আমাকে ভালো করে চিনে রাখুন। আমার নাম হিমু। আমি কাউকে সহজে ছেড়ে দিই না। আপনাকেও ছাড়ব না।

বদরুল সাহেব আমাকে টেনে ঘর থেকে বের করে ফেললেন।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমি বললাম, বদরুল সাহেব আপনি মেসে চলে যান। আমি একটা কাজ সেরে মেসে আসছি। তারপর দুজন একসঙ্গে আপনার দেশে রওনা হয়ে যাব।

‘আমার সঙ্গে তো টাকাপয়সা কিছুই নাই।’

‘একটা ব্যবস্থা হবেই। আপনার কি মেসে ফিরে যাবার মতো রিকশা-ভাড়া আছে? ‘জি না।’

‘আমার কাছেও নেই। পকেট-নেই পাঞ্জাবি আজও পরে চলে এসেছি। আপনি হেঁটে হেঁটে চলে যান। চিটাগাঙের রাতের ট্রেন ক’টায়?

‘সাড়ে দশটায়।’

‘রাত দশটার আগে আমি অবশ্যই পৌছে যাব।’

বদরুল সাহেব পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, কী ইচ্ছা করছে জানেন হিমু ভাই? ইচ্ছা করছে একটা চলন্ত ট্রাকের সামনে লাফ দিয়ে পড়ে যাই।

‘ট্রাকের সামনে লাফ দিয়ে পড়তে হবে না। আপনি মেসে চলে যান, আমি আসছি।’

‘হিমু ভাই, আমার কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না।’

আমি লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোক সত্যি হাঁটতে পারছেন না। পা কাঁপছে। মাতালের মতো পা ফেলছেন।

আমি বললাম, চলুন, আপনাকে মেসে পৌঁছে দিয়ে তারপর যাই, আমার কাজটা সেরে আসি। হাত ধরুন তো দেখি!

‘দেশে গিয়ে আমি আমার স্ত্রীকে কী বলব? মেয়েগুলিকে কী বলব?’

‘কিছু বলতে হবে না। এদের জড়িয়ে ধরবেন। এতেই তারা খুশি হবে। ভাই, চোখ মুছুন তো!’

আমি বদরুল সাহেবকে মেসে নামিয়ে দিয়ে গেলাম রূপার কাছে। আমি নিশ্চিত সে একটা ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমি তার হাত থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা নেব। হাজারখানিক টাকা নেব। কিছু মিষ্টি কিনব। বদরুল সাহেবের ছোট মেয়েটার জন্যে একটা বাংলা ডিকশনারি কিনব। মেয়েটা বড্ড বানান ভুল করে। ‘মুখস্থ’-র মতো সহজ বানান ভুল করলে চলবে কেন? এইসব উপহার নিয়ে রাতের ট্রেনে রওনা হবো বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধুপত্নীর মেথি দিয়ে রাঁধা মাংস খেতে হবে। মাছের পোনা পাওয়া গেলে সজনে পাতা এবং পোনার বিশেষ প্রিপারেশন।

রূপাকে বাড়িতে পেলাম না। সে কোথায় কেউ বলতে পারল না। কখন ফিরবে তাও কেউ জানে না। দুপুরে বেরিয়েছে, আর আসেনি।

রাত ন’টা পর্যন্ত আমি রূপাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বদরুল সাহেব অপেক্ষা করে থাকবেন। তাঁর স্ত্রীর কাছে তাঁকে পৌঁছনো দরকার। সঙ্গে একটা পয়সা নেই। ফিরে গেলাম মেসে। কোনো-একটা ব্যবস্থা কি হবে না?

.

মেসের ম্যানেজার আমাকে আসতে দেখে ছুটে এলেন। তাঁর ছুটে আসার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে বিশেষ কিছু ঘটেছে। সেই বিশেষ কিছুটা কী? দুঃসংবাদ, না সুসংবাদ? রূপা কি মেসে আমার জন্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার-হাতে অপেক্ষা করছে, নাকি বদরুল আলম ভয়ংকর কোনো কাণ্ড করে বসেছেন? সিলিং ফ্যানে ঝুলে পড়েছেন?

ম্যানেজার হড়বড় করে বলল, স্যার, আপনি মেডিক্যাল কলেজে চলে যান!

‘কেন?’

‘বদরুল সাহেবের অবস্থা খুবই খারাপ।’

‘কী হয়েছে?’

চুপচাপ বসে ছিলেন। তারপর খুব ঘামা শুরু করলেন। কয়েকবার আপনার নাম ধরে ডাকলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন। আমরা দৌড়াদৌড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না, কিছু পাওয়া যায় না। রিকশায় করে নিতে হয়েছে, হাত-পা একেবারে ঠাণ্ডা।

আমি হাসপাতালের সিঁড়িতে চুপচাপ বসে আছি। রূপা তার কথা রেখেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়েছে। আমাকে না পেয়ে ইরার হাতে দিয়ে এসেছে। ইরা সেই চিঠি নিয়ে প্রথমে গেছে আমার মেসে। সেখানে সব খবর শুনে একাই রাত এগারোটার দিকে এসেছে হাসপাতালে।

বদরুল সাহেবের জন্যে খুব ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছে রূপা। আট হাজার টাকার মতো বেতন। কোয়ার্টার আছে। বেতনের সাত পার্সেন্ট কেটে রাখবে কোয়ার্টারের জন্যে। রাত বারোটার দিকে বদরুল সাহেবের অবস্থা কী খোঁজ নিতে গেলাম। ইরাও এল আমার সঙ্গে সঙ্গে। ডাক্তার সাহেব বললেন, অবস্থা ভালো না। জ্ঞান ফেরেনি।

‘জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা কি আছে?’

‘ফিফটি-ফিফটি চান্স।

আমি বললাম, ডাক্তার সাহেব এটা একটা আপয়েন্টমেন্ট লেটার। আপনার কাছে রাখুন। যদি জ্ঞান ফেরে ওনার হাতে দেবেন। যদি জ্ঞান না ফেরে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলবেন।

আমি হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছি। এখন কাঁটায়-কাঁটায় রাত বারোটা-জিরো আওয়ার। আমার রাস্তায় নেমে পড়ার সময়। ইরা বলল, কোথায় যাচ্ছেন?

আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, কোথাও না। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটব।

‘আপনার বন্ধুর পাশে থাকবেন না?’

‘না।’

ইরা নিচুগলায় বলল, হিমু ভাই, আমি কি আপনার সঙ্গে হাঁটতে পারি? শুধু একটা রাতের জন্যে?

আমি বললাম, অবশ্যই পার।

ইরা অস্পষ্ট স্বরে বলল, আপনাকে যদি বলি আমার হাত ধরতে, আপনি রাগ করবেন?

আমি শান্ত গলায় বললাম, আমি রাগ করব না। কিন্তু ইরা, আমি তোমার হাত ধরব না।

হিমুরা কখনো কারও হাত ধরে না।