Chapter - 1 to 5
এক
কর্দমাক্ত এসইউভিটা কালো রঙের, গত তিন দিনে ছয়টি দেশের সীমান্ত পার হয়ে ঢুকে পড়েছে পুব ইউরোপের বেলারুশে। এর আগে পেছনে ফেলে এসেছে বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, পোল্যাণ্ড ও লিথুয়ানিয়া।
এখন ধোঁয়াভরা কালিঝুলি মাখা কারখানাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে চলেছে ওটা। পথের ধারে কাঁচফাটা জানালাসহ কিছু দোকান এবং রঙচটা, পুরনো জং-ধরা রাশান সেডান। দু’পাশে পরিত্যক্ত এক হাউসিং এরিয়া যেন পচা লাশ থেকে খসে পড়া ক’টা হাড়। এসইউভির আরোহীদের মনে হচ্ছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মত বিপন্ন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্বিষহ এলাকায় খুন হওয়ার জন্যে পৌঁছে গেছে তারা।
গত তিন দিন ধরে যা খুঁজছে, তা এখনও পায়নি। তাদের বিত্তবান নিয়োগকারী বলেছে দুনিয়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর অপরাধীকে হাতের মুঠোয় চাই তার।
সিটের পাশে শটগান ঠেস দিয়ে রেখে সানগ্লাস না খুলে ভিউফাইণ্ডারে চোখ রাখল ক্যামেরাম্যান। হাই ডেফিনিশন ভিডিয়ো ক্যামেরা দিয়ে তুলল রুগ্ণ এক ক্ষুধার্ত কুকুরের ছবি।
‘বলো তো, আর কত দূরে যেতে হবে?’ ড্যাশবোর্ড থেকে ঠাণ্ডা বার্গার নিয়ে চিবুতে লাগল ড্রাইভার। গত বাহাত্তর ঘণ্টায় মেঝেতে জমে গেছে অনেকগুলো রুপালি র্যাপার। ড্রাইভারের চোখে সানগ্লাস, নইলে যখন-তখন ঘটত দুর্ঘটনা। মধ্য দুপুরে গনগনে আগুন ঢালছে সোনালি সূর্য। রোদের খরতাপে রুক্ষ পথে নানান ধরনের রহস্যময় অতিলৌকিক মরীচিকা।
এসইউভির ড্রাইভারের নাম বনি মার্সেল, উত্তর আমেরিকার মানুষ সে। বয়স একত্রিশ। গত চার বছর ধরে দুনিয়ার দুর্লভ সব জিনিস খুঁজে নিয়ে লুঠ করছে সে। ফ্রিল্যান্সিং করে বলে চেনা অনেকে তাকে নাম দিয়েছে: ‘স্কাউট’। মাঝে মাঝে নিজের পথে বাধা এলে কাঁচকলা দেখিয়ে দেয় মানুষের তৈরি আইনগুলোকে। গত একমাস ধরে নানান দেশের অপরাধীদেরকে বের করে আনছে জেল থেকে। এই কাজে জুড়ি নেই তার।
গাড়ির দরজার পাশে চামড়ার পকেট থেকে মানচিত্র নিল ক্যামেরাম্যান। ওটার ভাঁজ খুলে আঙুল রাখল সরু, আঁকাবাঁকা এক পথের ওপরে। ‘আমরা ঠিক পথেই আছি,’ বলল সে।
দু’পাশে রোদে পোড়া বাদামি ঘাসে ছাওয়া শুকনো জমি। সামনে ছোট শহর পোলাতস্ক। ওটা পেরোলে কয়েক মাইল দূরে ওদের আজকের গন্তব্য।
মার্সেলের চেয়ে বয়সে ছোট অস্ট্রেলিয়ান ক্যামেরাম্যান, নাম তার জোহানসন। সে-ও ফ্রিল্যান্সার। অস্ট্রেলিয়ান টিভির জন্যে শ্যুট করে নিউয ফুটেজ। অবশ্য পুব ইউরোপে এসেছে আলাদা এক কাজে। তার ফুটেজ পছন্দ হলে মালিকপক্ষের তরফ থেকে পাবে মোটা অঙ্কের টাকা।
বার্গার শেষ করে মেঝেতে র্যাপার ফেলল স্কাউট। রেডিয়ো চালু করে দুটো স্টেশনের গান পছন্দ না হওয়ায় বিরক্ত হয়ে বাটন টিপে বন্ধ করল যন্ত্রটা। দু’পাশে সাঁই-সাঁই করে পিছিয়ে যাচ্ছে বাদামি ঘাসে ভরা জমি।
বিশ মিনিট পর ছোট শহর পোলাতস্কে ঢুকল এসইউভি। সামনের মোড়ে বামে বাঁক নিয়ে পেছনে ফেলে দিল শহরটাকে। এখন চারপাশে বিরান এলাকা। কোথাও নেই জনমানবের কোন চিহ্ন। যদিও বহু দূরে দিগন্তের কাছে ধুলোর ভেতরে খরতাপে থরথর করে কেঁপে চলেছে বিশাল এক ধূসর দুর্গ। ওটার সামনের কম্পাউণ্ডে দু’সারিতে রেযর ওয়াএয়ার, একটু দূরে টাওয়ারের ওপরে গান টারেট। ওখানে পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র সৈনিকেরা। পাথুরে দুর্গ থেকে কেউ পালিয়ে যাবে, সে-উপায় নেই।
মেইন গেটের সামনে গিয়ে গাড়ি রাখল মার্সেল। সাবমেশিন গান হাতে ওর দিকে এল একজন গার্ড। তার হাতে নিজেদের কাগজপত্র ধরিয়ে দিল মার্সেল। মন দিয়ে পেপার্স পড়ছে গার্ড। একবার দেখল কালো এসইউভির ছাতে স্যাটেলাইট ডিশ। মুখে কিছু না বলে ফেরত দিল কাগজপত্র। হাতের ইশারা করল সঙ্গীদের দিকে। ধীরে ধীরে খুলে গেল খিলান দেয়া লোহার ফটক। মার্সেল গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পেছনে বন্ধ হয়ে গেল গেট।
‘তোমার কাজ অডিশনের ভিডিয়ো তোলা,’ গাড়ি নিয়ে সামনে বেড়ে ক্যামেরাম্যানকে বলল বনি মার্সেল।
‘আমরা ওকে কিনে নিলে আশপাশের ভিডিয়ো চাইবে মিস্টার স্টিল।’ ক্যামেরা ঘুরিয়ে ছবি তুলছে জোহানসন।
দোতলা উঁচু পাথুরে দেয়ালের কাছে গাড়ি রেখে নেমে পড়ল তারা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে শরীর। আড়মোড়া ভাঙল তারা দু’জন, তারপর ক্যামেরা হাতে মার্সেলের পিছু নিল জোহানসন। দুর্গের দরজার কাছে যেতেই হাজির হলো সশস্ত্র ক’জন সৈনিক। অতিথিদের জন্যে খুলে দেয়া হলো দালানের চওড়া দরজা। মার্সেল ও জোহানসনকে হাতের ইশারায় পথ দেখাল নিম্নপদস্থ এক অফিসার।
ধূসর দুর্গ দেখলে মনে হবে, ওখানে বাস করে অত্যাচারী কোন রাজা বা জমিদার। ভেতরের পরিবেশ নরকের ভয়ঙ্কর গভীর কোন গহ্বরের মত। মানুষ তো দূরের কথা, কোন জানোয়ারও থাকতে চাইবে না ওখানে। বদ্ধ দুর্গে ঘামের বাসি বোটকা গন্ধ। সেই সঙ্গে পচা মাংসের কুবাস। মেঝেতে এখানে-ওখানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের খয়েরি দাগ। দু’পাশে জং-ধরা লোহার খাঁচার ভেতরে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে আছে হিংস্র চেহারার ক’জন কঠোর লোক।
জোহানসন বুঝে গেল, এখানে বাঁচতে হলে খুব কষ্টসহিষ্ণু হতে হবে। মার্সেল ও জোহানসনের দিকে এল বেলারুশ আর্মির এক অফিসার। পরনে তার লাল ল্যাপেলসহ খাকি ইউনিফর্ম। অফিসারের পেছনে দুই সৈনিক। তাদেরকে দেখে নীরবে বিদায় নিল নিম্নপদস্থ অফিসার। মার্সেল ও জোহানসনের সঙ্গে হাসিমুখে হাত মেলাল কারাগারের জেলার।
জোহানসন ধারণা করল, মায়ের পেট থেকে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে হারামিপনা করতে শুরু করেছে এ-লোক। মার্সেল অবশ্য আগেই বলে দিয়েছে, কারাগারের বন্দিদের ওপরে প্রচণ্ড নির্যাতন করে এই নরপশু। তার হাসি চওড়া হলেও চোখ দুটো বরফ-শীতল। একে রাগিয়ে দিলে আর এখান থেকে বাকি জীবনে বেরোতে পারবে না, বলে দিয়েছে মার্সেল। অফিসারের ছবি তুলতে চাওয়ায় জোহানসনের ক্যামেরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল এক সৈনিক।
ঘড়ঘড়ে গলায় কী যেন বলল ওয়ার্ডেন। তার কিছুই বুঝল না জোহানসন। বেলারুশের ভাষা জানা আছে স্কাউটের। আলাপ শুরু করল সে। একটু পর জোহানসনকে বলল, ‘বসের ছবি ভুলেও তুলবে না।’
জোহানসন ক্যামেরা নিচু করতেই এগোবার ইশারা করল অফিসার। সঙ্গীকে নিয়ে তার পিছু নিল মার্সেল। কাঠের নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে এল তারা। সামনের করিডরে লোহার শিক দেয়া একের পর এক পাথুরে প্রকোষ্ঠ। ওগুলোর ছবি তুলবে বলে মার্সেলের কাঁধে টোকা দিল জোহানসন। ‘এগুলোর ভিডিয়ো নেব?’
জবাবে মাথা দোলাল বনি মার্সেল।
সেলগুলোর ভিডিয়ো নিল জোহানসন। এদিকে মাঝারি এক অফিসঘরে গিয়ে ঢুকেছে ওয়ার্ডেন ও মার্সেল। কিছুক্ষণ ভিডিয়ো করার পর সামনের অফিসে ঢুকল জোহানসন। ঘরটা সাদামাঠা। দেয়ালে আর্মির কিছু ছবি ও ডেকোরেশন। আসবাবপত্র সস্তা হলেও একদিকের কোণে মেহগনি কাঠের পুরনো লিকার কেবিনেট। ওখানে আছে দুনিয়ার নামকরা সব মদের বোতল। বেলারুশের কারাগারের ওয়ার্ডেন যে বেতন পায়, তাতে ওগুলো তার অফিসে থাকার কথা নয়। যে-কেউ বুঝবে, অপরাধে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত এ-লোক। ছবি তোলার লোভ হলেও ভিডিয়ো ক্যামেরা চালু করল না জোহানসন।
চেয়ারে না বসে ওদিকের একটা দরজা দেখাল ওয়ার্ডেন।
তার পিছু নিল ওরা। দরজার ওদিকে খাঁচার মত এক ব্যালকনি। ওখান থেকে নিচে দেখা গেল পাথুরে উঠন।
ওখানে এখন আছে মাত্র একজন বন্দি। তবে সে সাধারণ কেউ নয়, তাকে বলা চলে বিশাল এক ইয়েতি!
চুলদাড়ি ও দেহের লোমে ভরা লোকটা দৈর্ঘ্যে অন্তত সাড়ে সাত ফুট। চওড়ায় তিনজনের সমান। মনে মনে খুশি হলেও মুখ খুলল না মার্সেল। আগে দেখবে কেমন লড়াই করে এই লোক।
দানবের মত এই বন্দির নাম ম্যানইয়া লোপাতিন। হাতে-পায়ে, বুক-পেটে থোকা থোকা পেশি। বসে বসে আধপচা এক পাউরুটিতে কামড় দিচ্ছে সে। ফুলে উঠছে দু’চোয়াল। মাঝে মাঝে গিলছে কাঠের বউলে রাখা ধূসর স্যুপ। ন্যাড়া মাথা চারকোনা বাক্সের মত। সারামুখে অসংখ্য কাটাছেঁড়ার দাগ। গরিলার মত কোঁৎ-কোঁৎ করে খাচ্ছে নিজের খাবার।
আগেই তার ছবি দেখেছে মার্সেল। ম্যানইয়ার বয়স এখন তিরিশ। দেখার মত তার ডোশিয়ে। জাতে রাশান। ক্ষুধার্ত বাঘের চেয়েও হিংস্র। এরই ভেতরে খুন করেছে আঠারোজন মানুষকে। তাদের ছয়জন মারা গেছে এই কারাগারে। মৃতদের ভেতরে ছিল চারজন মহিলা। খুন করার আগে তাদেরকে ধর্ষণ করেছে ম্যানইয়া।
কারাগারের বন্দিদের কাছে চরম এক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে এই দানব। নিচের উঠনে তার সঙ্গে থাকতে রাজি নয় কেউ। এগারোজন মানুষকে হত্যার দায়ে ফাঁসির রায় আছে তার বিরুদ্ধে। কিছু দিনের ভেতরে কার্যকর করা হবে মৃত্যুদণ্ড।
এমনই কাউকে মনে মনে খুঁজছিল বনি মার্সেল।
লোপাতিনের মত দানবকে হাতের মুঠোয় পেলে খুব খুশি হবে তার নিয়োগকারী ব্র্যাড স্টিল।
এবার দেখতে হবে কাজে কেমন লোপাতিন।
‘দেখে তো ভালই লাগছে,’ রাশান ভাষায় বলল মার্সেল, ‘শরীরটা বড় হলেও লড়াইয়ে কেমন তা দেখতে চাই।’
তার কথা শুনে হাসল ওয়ার্ডেন। লোহার খাঁচার শিকে ব্যাটন দিয়ে বাড়ি মেরে ঠং-ঠং করে শব্দ তৈরি করল। উঁচু গলায় বলল, ‘এবার ওদেরকে নিয়ে এসো!’
নিচে উঠনের একদিকে খুলে গেল ইস্পাতের ভারী জালের দরজা। এক এক করে ভেতরে ঢুকল তিন কয়েদী। তারা পুব ইউরোপের লোক। প্রত্যেকে কমপক্ষে সাড়ে ছয় ফুট উঁচু। তাদের পেছনে ঝটাং শব্দে বন্ধ হলো জালের দরজা। ওদিক থেকে আটকে দেয়া হলো বল্টু। পেশিবহুল তিন কয়েদীর গায়ে নানান ধরনের ক্ষত-চিহ্ন। হাত-পা ও বুকে উল্কি। দাগী খুনি। তাদেরকে আগে আহত করেছে, তাই লোপাতিনের রক্ত ঝরাতে ব্যাকুল হয়ে আছে তারা। ভাবছে, উঠনে বইয়ে দেবে রক্তের স্রোত।
লোপাতিন আর তার তিন প্রতিপক্ষের দিকে চেয়ে ডান ভুরু উঁচু করল মার্সেল। তিন বন্দির যে-কোন একজন দানবের জন্যে শক্ত প্রতিপক্ষ। আর এবার একসঙ্গে হামলা করবে তারা! এরপরেও লোপাতিন জিতে গেলে বুঝতে হবে তাকেই আসলে চাইছে ব্র্যাড স্টিল।
‘এবার ভিডিয়ো চালু করো!’ নির্দেশ দিল মার্সেল।
ক্যামেরা বাগিয়ে বারো ইঞ্চি অ্যান্টেনা ওপরে তাক করল জোহানসন।
এদিকে স্পিড ডায়াল থেকে স্টিলের নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করল মার্সেল। ‘বস্, আমি বনি। এবার ভিডিয়ো পাঠাচ্ছি।’
খাবার ফেলে উঠে পড়েছে ম্যানইয়া লোপাতিন। দুই প্রতিপক্ষের চেয়ে প্রায় একফুট উঁচু সে। তিনদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরেছে তিন খুনি। বিশাল মাথা ঘুরিয়ে তাদেরকে দেখছে লোপাতিন।
পেছন থেকে দানবের ওপরে হামলা আসতেই ক্যামেরা যুম করল জোহানসন। মস্ত শরীরে ঝট্ করে ঘুরল লোপাতিন। তবে আরও দ্রুত পেছনের শত্রু। দানবের মাথা হেডলকে আটকে নিল সে। ময়লা ভরা কালো আঙুলে উপড়ে নিতে চাইল শত্রুর চোখ। তাতে আরও রেগে গেল লোপাতিন। কুঁজো হয়ে খপ্ করে ধরল সাড়ে ছয় ফুটি প্রতিপক্ষের ডান ঊরু, পরক্ষণে দু’হাতে ময়দার বস্তার মত তাকে তুলে গায়ের জোরে ছুঁড়ে ফেলল দেয়ালের ওপরে। পরিষ্কার শোনা গেল লোকটার পাঁজরের হাড় ভাঙার মড়াৎ আওয়াজ। ধপাস্ করে মেঝেতে পড়ল অচেতন বন্দি। সে জানে না, কপাল খুব ভাল তার।
এবার একই সঙ্গে লোপাতিনের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্য দুই কারাবন্দি। মস্ত মুঠো পাকিয়ে একের পর এক ঘুষি মারছে দানবের মুখে, ঘাড়ে, বুকে ও পেটে। দুই বন্দির মধ্যে আকারে যে ছোট, হাঁটু তুলে লোপাতিনের থুতনির নিচে গুঁতো দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে দানবের মুখ থেকে কলের পানির মত ঝরঝর করে ঝরল টকটকে লাল রক্ত। দু’সারি দাঁতের মাঝে পড়ে কুচ করে কেটে গেছে রাশানের জিভের ডগা।
খারাপ হয়ে গেল মার্সেলের মন। বসের চাই দুর্দান্ত লড়াকু কাউকে। তাকে হতে হবে এমন একজন, যে লড়বে নয়জন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। অথচ দেখা যাচ্ছে মাত্র তিনজনের সঙ্গে লড়তে গিয়ে মার খাচ্ছে লোপাতিন।
দর্শকেরা এত টাকা খরচ করে হারু পার্টির লড়াই দেখলে ফ্লপ হবে ব্র্যাড স্টিলের শো। এদিকে টাকা না দিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই মার্সেলের, নইলে খেপে উঠবে ওয়ার্ডেন। তাকে বেশি কিছু বলতে গেলে, টাকা কেড়ে নিয়ে গুম করবে ওদের দু’জনকে।
এইমাত্র ‘থুহ!’ করে মুখ থেকে কাটা জিভ ফেলেছে লোপাতিন। বারকয়েক মাথা দুলিয়ে নিচু হলো। গরিলার মত দীর্ঘ দু’হাতে খপ করে ধরল আকারে ছোট শত্রুর মাথা। তবে সেটা মাত্র একসেকেণ্ডের জন্যে, পরক্ষণে শুকনো সরু ডালের মত মড়াৎ করে ভেঙে দিল বন্দির ঘাড়। মেঝেতে পড়ে থাকা অচেতন শত্রুর ওপরে ছুঁড়ে দিল লাশটাকে।
যে-কেউ ভাববে আগুন জ্বেলে নেয়ার জন্যে এক এক করে চ্যালা কাঠ গুছিয়ে নিচ্ছে লোপাতিন। দু’হাতে তার মুখ ও বুকে ঘুষি মারছে তৃতীয় কারাবন্দি। আকারে সে লোপাতিনের প্রায় সমান। তবে প্রতিপক্ষের হিংস্রতা দেখে ঘাবড়ে গেছে।
ক্ষুধার্ত বাঘের মত তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাশান দানব। দু’জনের তুমুল লড়াই দেখে হেসে ফেলল মার্সেল। বুঝে গেছে, ভালভাবে শেষ করেছে নিজের হোমওঅর্ক। বহু খুঁজে বের করতে পেরেছে এই বিশাল দানবটাকে। বলা চলে পেয়ে গেছে সোনার খনি। ভিডিয়ো দেখে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হচ্ছে ওর বস্। আর তার মানেই শো-র কমিশন হিসেবে পকেটে আসবে লাখ লাখ ডলার!
এদিকে জোহানসন বুঝ দিচ্ছে নিজের মনকে, সে মানুষ খুনের কোন ভিডিয়ো তুলছে না। যদিও রাশান দানবের মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে সেই ভিডিয়ো করেছে সে। ভুলে যেতে চাইছে, এই মারামারির প্রতিটি দৃশ্য আসলে রূঢ় বাস্তব।
ক’দিন পর ফিরবে সিডনিতে। নৃশংস দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলে খচখচ করবে তার বিবেক। বিশেষ করে আঠারো মাসের সন্তানদুটোকে কোলে নিয়ে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না স্ত্রীর চোখে। যে কাজ নিয়েছে সেটা চরম অন্যায় জেনেও বা কী করার আছে তার?
দু’হাতে মুড়ির মত ডলার ছিটাচ্ছে ব্র্যাড স্টিল।
সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে তার কথায় রাজি হয়ে গেছে সে। যাবে লোকটার সঙ্গে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এক দ্বীপে। কীভাবে খুন হবে একদল দাগী আসামী, সেটা গোপনে ভিডিয়ো করবে। এরপর হয়তো বাকি জীবন ঘুমাতে পারবে না আর। মেয়েদুটোর কথা ভাবতেই মনে মনে বলল: মা রে, স্রেফ টাকার জন্যে বিক্রি করে দিয়েছি নিজের আত্মা।
নিচের উঠনে লড়ছে দুই দানব।
সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ ভাববে না লড়াই হচ্ছে সমানে সমানে। যা ঘটছে সেটা ঠাণ্ডা মাথায় মানব-হত্যা।
মুখোমুখি সংঘর্ষে হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়েছে দুই বন্দি। ট্রাকের ওপরে দ্রুতগামী ট্রেন যেভাবে চড়াও হয়, শত্রুর বুকে চেপে বসেছে লোপাতিন। দু’হাতে ঘুষি মারছে শত্রুর মুখে। লোপাতিনের মুঠো যেন বৈদ্যুতিক মুগুর। দু’মিনিটে কিমা হলো প্রতিপক্ষের মুখ।
অচেতন শত্রুর গলা টিপে ধরল রাশান দানব। মিনিট তিনেক পর উঠে দাঁড়িয়ে খুশি হয়ে ছাড়ল বিকট এক হুঙ্কার।
.
হাজারো মাইল দূরে দামি চামড়ামোড়া লাউঞ্জ চেয়ারে বসে মস্তবড় এলইডি স্ক্রিনে লড়াই দেখছে ব্র্যাড স্টিল। রাশান দানবের প্রথম প্রতিপক্ষ খুন হতেই মুচকি হেসেছে সে। মন ভাল লাগছে বলে দোলাচ্ছে পায়ের উডল্যাণ্ড ণ্ড্য। দামি সুতির সাদা ফুলহাতা শার্টের আস্তিন গুটিয়ে দেখল ত্রিশ হাজার ডলারের রোলেক্স ঘড়ি। বুঝে গেছে, তার নতুন শো-র সেরা আকর্ষণ হয়ে উঠবে লোপাতিন।
জিন্সের প্যান্টের উরুতে মুছে নিল হাতের তালুর ঘাম। বসে আছে স্টেট-অভ-দি-আর্ট এক বিশাল তাঁবুর ভেতরে। একপাশে অসংখ্য এলইডি স্ক্রিন, অন্যদিকে কমপিউটারাইড্ এডিটিং বে ও টপ-এণ্ড অডিয়ো ভিণ্ড্যুয়াল ইকুইপমেন্ট। বেলারুশের কারাগারে নিজেকে যেমন রাজা ভাবছে ওয়ার্ডেন, তার মতই নিজেকে দ্বীপের মালিক বলে মনে করছে স্টিল।
বয়স তার পঁয়ত্রিশ। মাথার চুল বালির মত ধূসর। চোখের মণি যেন সাগরের হালকা নীল। ম্যালিব্যুতে সূর্যস্নান করে ত্বক করে নিয়েছে বাদামি রঙের। ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করেছে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে। ক’দিন আগেও ব্যবসার প্রসার নিয়ে ব্যস্ত ছিল লস এঞ্জেলেসে। লাকি সিক্স কোম্পানির সিইও সে। গত আট বছরে রিয়েলিটি টেলিভিশন শো তৈরি করে এরই ভেতরে অর্জন করেছে আটাশ মিলিয়ন ডলার।
অত্যন্ত সুদর্শন এক পুরুষ সে। তারুণ্যে টাকা না থাকলেও অমোঘ আকর্ষণে তার চারপাশে ঘুরঘুর করত রূপসী মেয়েরা। আর এখন তো কোন কিছুরই অভাব নেই। গত ছয় বছরে দু’বার বিয়ে করে নিজেই ডিভোর্স দিয়েছে সুন্দরী দুই স্ত্রীকে। বুঝে গেছে, বিয়েতে প্রথমে ফূর্তি হলেও পরে গচ্চা দিতে হয় বহু টাকা। তাই ভেবেছে, আর কখনও পা দেবে না সংসারের ফাঁদে। মন চাইলে দৈহিক সম্পর্ক গড়ছে সুন্দরী মডেলদের সঙ্গে। বিরক্তি লাগলে আগের জনকে বিদায় করে দিয়ে জোগাড় করে নিচ্ছে অন্য কোন রূপসী মেয়েকে।
আবারও স্ক্রিন দেখল ব্র্যাড স্টিল।
এইমাত্র তৃতীয় কয়েদীর বুক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিকট গর্জন ছাড়ল ম্যানইয়া লোপাতিন। বুটের হিল দিয়ে চুরমার করে দিল শত্রুর কণ্ঠনালী।
দৃশ্যটা দেখে নিয়ে হেডসেটে বলল স্টিল, ‘হ্যাঁ, আমি ওকে চাই।’
স্বস্তির হাসি হাসল মার্সেল। ‘আপনি ওকে পেয়ে গেছেন, বস্!’
ভিডিয়ো লিঙ্ক কেটে যেতে স্টিল বুঝল, এবার ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ হাজার ইউরো ওয়ার্ডেনের হাতে তুলে দেবে মার্সেল। আজই কারাগার থেকে নিয়ে ম্যানইয়া লোপাতিনকে পার করে দেয়া হবে বেলারুশের সীমান্ত।
আগামী ক’দিন পর তাকে হাতে পাবে ব্র্যাড। এরপর আর কোন বাধা থাকবে না নতুন শো শুরু করতে। মনের মত দশজন দাগী অপরাধী পেয়ে গেছে সে।
দুই
তাঁবুর এডিটিং বে-তে কাজ করছে বারোজন টেকনিশিয়ান। সামনে ছাতের কাছে ঝুলছে মস্ত এলইডি স্ক্রিন। ওটার ভেতরে আছে দশটা বক্স। তার নয়টার ভেতরে অপরাধীদের পাসপোর্ট ছবি। অবশ্য দশ নম্বর বক্সে কারও ছবি নেই। অলিম্পিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের মত অপরাধীদের প্রত্যেকের ছবির নিচে ফুটে উঠেছে তাদের নাম ও জাতীয় পতাকা।
হঠাৎ দশম বক্সে দেখা দিল রাশান অপরাধী লোপাতিনের ছবি। মস্ত স্ক্রিনের প্রথম বক্সে আছে মা-বোন ও স্ত্রীকে হত্যাকারী এক সিরিয়ান মুসলিম আরবের ছবি। এরপর মধ্যবয়সী এক জার্মান নাৎসি। তারপর কোঁকড়ানো চুলের আফ্রিকান-আমেরিকান এক যুবক। তার পাশের দুই বক্সে দুই মেক্সিকান লুঠেরার ছবি। তাদের একজন পুরুষ। অন্যজন মহিলা। ষষ্ঠ অপরাধী মার্শাল আর্টে দক্ষ জাপানি এক খুনি। সপ্তম হত্যাকারী অদ্ভুত সুন্দরী আফ্রিকান এক কালো মেয়ে। অষ্টম ছবি পনি টেইল করা এক ইতালিয়ান খুনির। নয় নম্বর অপরাধী সাইকোপ্যাথের মত চোখের এক ইংলিশ যুবক।
নানান কারাগার থেকে আনা হয়েছে এদের দশজনকে। প্রত্যেকে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর খুনি। তাদেরকে যার যার দেশে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। নিজের বেছে নেয়া অপরাধীদের দিকে চেয়ে খুশিতে ভরে গেল স্টিলের অন্তর। আর তখনই ওর পাশে এসে থামল ফ্যাশান ডিযাইনার রূপসী রিটা জোসেফ।
‘আমার অনুষ্ঠানের প্রতিযোগীদেরকে দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার?’ জানতে চাইল স্টিল।
‘তোমার তুলনা নেই,’ প্রেমিকের কাঁধে হাত রাখল রিটা। ‘ভাবতে পারিনি এত কঠিন কাজ তুমি করে দেখাবে।’
মেয়েটার ব্রিটিশ উচ্চারণের জন্যে ওকে আরও সেক্সি বলে মনে হচ্ছে স্টিলের। হেসে বলল, ‘ও, তা হলে আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার মনে কোন সন্দেহ ছিল?’
‘ভাবতেই পারিনি কেউ এ-কাজ পারবে,’ বলল রিটা।
‘অসম্ভবকে সম্ভব করার কাজটাই আমার পছন্দ।’
‘আর সেজন্যেই তোমাকে আমার এত ভাল লাগে,’ হাসল রিটা। ওর কাঁধে ঝিলমিল করছে একরাশ সোনালি চুল।
সাত মাস হলো মেয়েটা স্টিলের নতুন প্রেমিকা। আগে কখনও কোন মেয়ে এত দিন তার সঙ্গে টিকতে পারেনি। এ- থেকে স্টিল বুঝে গেছে, তার মেজাজ বুঝে চলে রিটা। যেমন দারুণ সুন্দরী, শরীরটাও তেমন নিখুঁত। তুলনা নেই বিছানায়। আরও বড় কথা—রিটা বুদ্ধিমতী। চেপে বসে না কারও ঘাড়ে।
চামড়ার লাউঞ্জ চেয়ার ছেড়ে নেমে পড়ে রিটার ঠোঁটে চুমু দিল স্টিল। নতুন শো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে টেস্টোস্টেরন বেড়ে গেছে তার শরীরে, অথচ উপায় নেই রিটাকে বিছানায় তোলার। চারপাশের কর্মীদেরকে দেখে তার মনে হলো, শো তৈরি করে মানুষের মন কেড়ে নেয়ার চেয়ে ফূর্তির আর কিছু নেই। নানান আকারের ডিসপ্লেতে দেখা যাচ্ছে অনেক রকমের গ্রাফিক। অন্যগুলোতে বিজ্ঞাপন, ব্লগ ও ওয়েব প্রচারণা।
‘দুই ও তিন নম্বর স্ক্রিনে কিসের প্রোমো?’ জানতে চাইল এডিটিং অ্যাণ্ড গ্রাফিক্স টিমের চিফ এমিলি। ওর বয়স মাত্র তেইশ। মাথার খাটো করে ছাঁটা চুল কালো রঙের। পরনে ঢিলা গেঞ্জি ও জিন্সের প্যান্ট। চোখে পুরু কাঁচের চশমা।
‘এইমাত্র দিতে শুরু করেছি,’ জবাবে বলল টিমের তরুণ এক টেকনিশিয়ান।
কোথাও কোন ত্রুটি আছে কি না, সেটা বোঝার জন্যে মস্তবড় তাঁবুর ভেতরে চক্কর কাটল ব্র্যাড স্টিল। ‘এমিলি, আমাকে জানাও প্রোমোর কী অবস্থা।’
‘এইমাত্র তিরিশ সেকেণ্ডের প্রোমো রেডি করে ছেড়েছি, ‘ অতিরিক্ত ক্যাফেইনে ভরা কর্কশ স্বরে বলল এমিলি। ‘একই সঙ্গে ইউটিউব আর ফেসবুকে প্রোমো যাচ্ছে।’
‘গুড,’ রাশান দানবের ছবি আরেকবার দেখল স্টিল। ‘আমাদের নতুন আকর্ষণ ম্যানইয়া লোপাতিনের ছবি শেয়ার করো। ওর চেহারা পয়সার মাল! মানুষ গপগপ করে গিলবে!’
‘ঠিকই বলেছেন, বস্।’
আরেক টিমের কাছে গিয়ে থামল স্টিল। তারা ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে ইণ্টারনেটে।
‘সিওয়ার্স, ওরা কেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে আমাদের প্রতি?’
‘খবর আগুনের মত ছড়িয়ে গেছে,’ বলল লাল চুলের যুবক রন সিওয়ার্স। একমাস হলো থুতনিতে রেখেছে দাড়ি।
‘আগুনের তাপ কতটা ভাবছ?’
‘সূর্যের চেয়েও বেশি। আমার টিম খবর দিচ্ছে নানান ব্লগ আর চ্যাট-রুমে। বিক্রি করছে বিজ্ঞাপনের জন্যে স্পেস। প্রতি মিনিটে সাইটগুলো থেকে সাড়া পাচ্ছি নয় শ’র বেশি। পর্নো ও ফাইট ব্লগ আগ্রহ দেখাচ্ছে বিরানব্বুই পার্সেন্ট।’ বিশ বছরের তরুণের মত উৎসাহ নিয়ে কাজ করছে রন সিওয়ার্স।
এই যুবক স্টিলের ওয়েব গুরু। আগে ছিল পাকা হ্যাকার। ধরা পড়ে জেলে যেত, কিন্তু তখন সে ছিল নাবালক। সেজন্যে আদালত থেকে মাফ করা হয় তাকে। পোর্শে গাড়ির কোম্পানি যেমন হাতের তালুর মত চেনে অটোবাহন, তার চেয়ে বেশি ভালভাবে ইন্টারনেটের জগৎ চেনে সিওয়ার্স।
‘এমিলির কাছে আধমিনিটের ম্যাটার আছে,’ বলল স্টিল। ‘দেখো, ওটা যেন পরের একঘণ্টা দেখানো হয় সেক্স, ফাইট আর গেম্স্ সাইটে।’
‘তথাস্তু!’ ঘুরে কমপিউটারের কিবোর্ডে ঝড়ের বেগে দশ আঙুল চালাল সিওয়ার্স। তাকে পাশ কাটিয়ে অন্যদিকে চলল স্টিল। নিজেকে দক্ষ এক জেনারেল বলে মনে হচ্ছে তার। নিজের সৈনিকদেরকে প্রস্তুত করছে পরবর্তী যুদ্ধের জন্যে।
‘জলদি! কোথাও যেন কোন ত্রুটি না থাকে! আমাদের বিজ্ঞাপন থেকে যেন বাদ না পড়ে কোন ইন্টারনেট সার্ফার। এই শো যেন এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, দুই আমেরিকা, ওশেনিয়া এমন কী অ্যান্টার্কটিকার ভয়ঙ্কর ঝড়ের মাঝেও ইগলুর ভেতরে বসে দেখতে পায় এস্কিমোরা। আগামী ক’দিন চব্বিশ ঘণ্টা চালাও বিজ্ঞাপন।’
চরকির মত ঘুরে সিওয়ার্সের দিকে তাকাল সে। ‘সিওয়ার্স, মাত্র বিরানব্বুই পার্সেন্ট কেন? আমি চাই পুরো হান্ড্রেড পার্সেন্ট! ইন্টারনেটের সবাই যেন এই শো-র কথা জানতে পারে! আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’
‘গট ইট, বস্!’ একসেকেণ্ড বিরতি না নিয়েই টাইপ করে চলেছে সিওয়ার্স। তাঁবুর ক্যানভাসের ভেতরে উষ্ণ পরিবেশে একুশ ঘণ্টা বিশ্রামহীনভাবে অন্যদের সঙ্গে কাজ করছে সে।
এক টেকনিশিয়ানের সামনে থামল স্টিল। ঘুম ঠেকাতে ফেনা ওঠা কড়া কফিতে চুমুক দিচ্ছে তরুণ। স্টিলের ইচ্ছে হলো কষে তার গালে চড় দিতে। কিন্তু ক্রুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে তার ফলাফল হবে খুব খারাপ। তাই হাসি-হাসি মুখে বলল সে, ‘জেগে থাকো, আমার দুর্ধর্ষ সৈনিক! যুদ্ধের সময় ঘুমাতে নেই!
বসের বক্তব্য শুনে বুঝে গেল তরুণ, জরুরি কাজে কোন গাফিলতি করা চলবে না।
‘এমিলি, ওদের কাজ বুঝিয়ে দাও,’ তাঁবুর দরজার দিকে চলল স্টিল। ‘ওদের বলো, আমাদের টার্গেটের চেয়ে প্রতি মিলিয়ন ভিউ বেশি হলে সবাই পাবে বাড়তি দশ হাজার ডলার করে।
এ-কথা শুনে নতুন করে মনোযোগী হয়ে উঠল তাঁবুর সবাই। স্টিলের ক্রুরা বয়সে তরুণ। সামনে কোন টার্গেট দেয়া হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে প্রমাণ করতে। একবার সবার হাসিমুখ দেখে নিয়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এল স্টিল। সে জানে, মানুষকে শতবার বললে যে ফলাফল হবে, তার বহু গুণ কাজ হবে একহাজার ডলার হাতে ধরিয়ে দিলে।
টাকা সবসময় কথা বলে।
তাঁবুর ভেতরে রয়ে গেছে রিটা। পেছন থেকে প্রশংসার চোখে স্টিলকে দেখছে আর ভাবছে, মানুষটা বড্ড বেশি কাজ পাগল। নিজের দিকে একটুও খেয়াল নেই। মাত্র সাত মাস হলো ওকে চেনে রিটা। এরই ভেতরে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছে। মানুষ হিসেবে স্টিল যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি টাকা- পয়সাওয়ালা। একবার কোন কিছুতে মন দিলে কাজটা না শেষ করে থামে না। নিজে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফ্যাশন ডিযাইনিঙে এম.এস. করেছে রিটা, তবে স্টিলের তুলনায় নিজেকে ওর মনে হয় তুচ্ছ মানুষ। ফ্যাশন ডিযাইনার হিসেবে সামনে ছিল ওর চমৎকার ক্যারিয়ার। নিজেই হয়তো একসময় ফ্যাশন শো করে সবাইকে চমকে দিত। কিন্তু সে-পথে যাওয়ার আগেই লণ্ডনের এক ডিযাইন শো-তে ওর সঙ্গে দেখা হলো স্টিলের। সে বলল, চিরকৃতজ্ঞ হয়ে যাবে তার দলের সবার জন্যে ডিযাইনার পোশাক রিটা তৈরি করে দিলে।
পুরুষমানুষের চোখ দেখে অনেক কিছুই বুঝে ফেলে মেয়েরা। মাত্র কয়েক দিনের ভেতরে রিটা বুঝল, মন থেকে ওকে কাছে চাইছে স্টিল। ডিনারে নিয়ে গিয়ে সেরা খাবার অর্ডার করে শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে লাজুক মুখে বলল স্টিল, ‘আমি বোধহয় মস্তবড় ভুল করে বসেছি। রিটা, কখন যেন ভালবেসে ফেলেছি তোমাকে।’
এরপর প্রেমের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারেনি রিটা কিছু দিন আগে ব্র্যাড বলেছে, লঞ্চ করবে অদ্ভুত এক শো। আর ওটা হবে দুর্ধর্ষ দাগী কয়েদীদের নিয়ে। আর তাই চাই তাদের জন্যে ভাল পোশাক। সে-দায়িত্ব রিটা নিজের কাঁধে নিলে খুশি হবে স্টিল। ও আরও বলেছে, শো-তে থাকবে চরম উত্তেজনা ও দুর্দান্ত বিনোদন। প্রথমে এই শো-র কথা শুনে অবাক হয়েছিল রিটা। আগে কখনও কারও মনে এমন ভাবনা এসেছে কি না, জানা নেই ওর। স্টিল জানিয়ে দিয়েছে, দক্ষতার সঙ্গে অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে ও। আর তাতেই শাস্তি পেয়ে যাবে ক্রিমিনালেরা। এবং এর মাধ্যমে শেষ হবে ডার্টি গেম শো।
এলইডি স্ক্রিনে খুনিদের দেখে রিটা বুঝে গেছে, এদেরকে প্রতিযোগিতায় নামানোর জন্যেই জড় করেছে ব্র্যাড। ফাঁসির মঞ্চে বা ইলেকট্রিক চেয়ারে এমনিতেই জীবন দিত এরা। ব্র্যাড শুধু চেয়েছে, তাদের ভেতরে যেন শুরু হয় লড়াই। সেই প্রতিযোগিতায় শেষমেশ যে বিজয়ী হবে, মেলা টাকাসহ নিরাপদ কোন দেশে পৌঁছে দেয়া হবে তাকে।
অবশ্য স্টিল এসব নিয়ে কথা বললে কেন যেন ডার্টি গেম শো-র ব্যাপারে মন থেকে একদম সাড়া পাচ্ছে না রিটা। বিশাল তাঁবু থেকে বেরিয়ে চারপাশে তাকাল ব্র্যাড স্টিল। নতুন শো-র জন্যে গড়ে নিয়েছে তাঁবুর তৈরি এই গ্রাম। এখানে-ওখানে ক্যানোপি দেয়া জায়গা, ক্যামোফ্লেজ করা ভেহিকেল ও একাধিক স্যাটেলাইট ডিশ। দশ ফুট উঁচু রেযর ওয়াএয়ার দিয়ে ঘেরা হয়েছে গোটা গ্রাম। এটা যেন ভিডিয়ো প্রোডাকশনের কোন হাউস নয়, যুদ্ধের এক কমাণ্ড সেন্টার।
গ্রামের একদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জঙ্গলের মাঝ থেকে হঠাৎ করেই আকাশে নাক তুলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নড়বড়ে এক ওয়েদার টাওয়ার। ওটার ওপর থেকে সহজেই দেখা যায়, দ্বীপের চারপাশ। টাওয়ারের ওপরে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন যন্ত্র ও ট্র্যাকিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে আট ঘণ্টার শিডিউলে কাজ করছে যোগ্য ক’জন টেকনিশিয়ান।
শো-র জন্যে টাওয়ারের ওপর ক্যামেরা বসাচ্ছে একদল অডিয়োভিস্যুয়ার টেকনিশিয়ান। তাদের পাশ কাটাল স্টিল। কম্পাউণ্ডের চারপাশে সেট করা হয়েছে এক শ’র বেশি ভিডিয়ো লেন্স। এ-ছাড়া জঙ্গলে আছে ক্যামোফ্লেজ করা তিনগুণ ক্যামেরা। জিপে করে টেক গ্রামে আনা হয়েছে এসব যন্ত্রপাতি। সব দক্ষতার সঙ্গে বসানো হয়েছে সঠিক জায়গায়। গ্রামের রেযর ওয়াএয়ারের ওদিকে দ্বীপের অন্য জায়গাগুলোকে ধরে নেয়া হয়েছে খুনিদের প্লে-গ্রাউণ্ড হিসেবে।
আরেকবার টেকনিশিয়ানদের দেখল ব্র্যাড। ওখানে আছে তার ডানহাত গ্রেগরি সিলভারম্যান। কয়েক বছর ধরে স্টিলের টেকনিকাল ডিরেক্টর ও ক্যামেরা উইয়ার্ড হিসেবে কাজ করছে সে। দুই বিয়েতে দুই স্ত্রী স্টিলের সঙ্গে যেসময় কাটিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি পাশে থেকেছে সিলভারম্যান। সহজ লোক নয় সে। নিখুঁত দৃশ্যধারণে যেমন দক্ষ, তেমনি প্রতিটি বিষয়ে নালিশ করার বিশ্রী এক অভ্যেস আছে তার।
‘ঠিক আছে, আমার কথা বুঝতে পেরেছ, রবি? বাইশতম ক্যামেরার কী হলো? ওটার দৃশ্য তো ক্যাডিলাকের মত বড় দেখাচ্ছে। অথচ হওয়ার কথা পিঁপড়ের সমান! তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? সামনে কিন্তু বড় ধরনের কাজ। তুমি পাগল হয়ে গেলে তো আমার চলবে না! বিষয়টা কী?’
বরাবরের মতই উত্তেজিত হয়ে নিজের কাজ করছে গ্রেগরি, সিলভারম্যান। তাকে ভাল করে চেনে স্টিল। কোন কাজ না পেলে খেপে ওঠে মানুষটা। বয়স তার বড়জোর আটাশ। অথচ এরই ভেতরে মুখটা হয়ে গেছে বুড়ো বুলডগের মত তিক্ত। চোখের নিচে ফকিরের শত তালি দেয়া নীল-বেগুনি ও লালচে দুটো ব্যাগের মত ঝোলা। কানদুটো কুলোর মত বড়। চুল উঠে ফাঁকা হয়ে গেছে মাথার তালু। গত পাঁচ দিনে স্নান করে পোশাক পাল্টায়নি। জীবনে কখনও ব্যায়াম করেছে এমন কোন ইতিহাস কারও জানা নেই। সারাদিন পড়ে আছে ভিডিয়ো ক্যামেরা ও ভিডিয়ো সুইচ নিয়ে। অদ্ভুত মানুষটার দৃশ্যপটে হাজির হলো স্টিল।
‘কী খবর,’ একটা স্যাটেলাইট ডিশের দিকে পা বাড়িয়ে হাতের ইশারা করল সিলভারম্যান। বাধ্য হয়ে তার পিছু নিল স্টিল। বুঝে গেছে, আপাতত খারাপি আছে ওর কপালে।
‘বুঝলে, আমরা দোষ ছাড়াই পাছামারা খেয়ে গেছি,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল সিলভারম্যান। ‘আমার কথা কি বুঝতে পেরেছ? এই শো আর কোনদিনই সাফল্যের মুখ দেখবে না!’
চুপ করে থাকল স্টিল। বিশাল এক ডিশের পাশে কাজ করছে হোঁৎকা এক তরুণ। সেদিকে চলেছে সিলভারম্যান। সঙ্গে যেতে বাধ্য হচ্ছে স্টিল।
‘হিলি, মিউযিক তো বাদ পড়ে গেল! মিউযিক ছাড়া আবার সেক্স হবে কীভাবে? মেরামত করা হয়েছে স্যাটেলাইট? তুমি তো দেড়ঘণ্টা আগে বলেছিলে কাজটা শেষ করবে!’
পকেট থেকে রুপালি বোতল বের করে ওটা থেকে নিয়ে পানি ছাড়াই মুখে সাদা ট্যাবলেট ফেলল সিলভারম্যান।
‘আমি কি পানি এনে দেব?’ জানতে চাইল স্টিল।
‘তাতে কোন লাভ নেই,’ মাথা নাড়ল সিলভারম্যান।
‘কড়া এক মগ কফি?’ হেসে বলল স্টিল। জানে, এরই ভেতরে অন্তত পাঁচ মগ এসপ্রেসো কফি গিলেছে তার বন্ধু।
‘কফি? জীবনেও আর ওই জিনিস খাব না!’ তিক্ত স্বরে বলল গ্রেগরি। ‘পানি গেলার টাইম পাই না, তো তার আবার কফি! এমন কী প্রস্রাব করারও সময় নেই আমার! ব্র্যাড, মন শক্ত করো, যা বলব সেটা খুব কঠিন বাস্তব। কোনভাবেই আমরা হিট করাতে পারব না এই শো! আমার কথা মাথায় ঢুকিয়ে নাও! গত কয়েক বছর আগে যে ফালতু শো তৈরি করেছিলে, ওটার কথা মনে আছে? ওই যে, যেখানে মহিলাদের সাংসারিক ব্যর্থতা নিয়ে মন্তব্য করেছিল তাদের স্বামীরা? আর আমাদের দিকে পচা ডিম আর ভাঙা তরমুজ ছুঁড়ে মেরেছিল পোলকের বউটা?’
‘আমরা তাতে আহত হইনি,’ আত্মসমর্থন করল স্টিল। ‘তার চেয়ে বড় কথা, ওই শো থেকে এসেছে আড়াই লাখ ডলার।’
‘তা যাই হোক, সেবার বেঁচে গেলেও এবার একটা কিলও বোধহয় মাটিতে পড়বে না!’
নতুন শো ব্র্যাড স্টিলের উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট। সম্ভাবনা আছে হুমড়ি খেয়ে পড়বে ওটা। কিন্তু সেটা না হলে এই এক শো থেকে আসবে শত মিলিয়ন ডলার। নানান শো তৈরি করার সময় বরাবরের মত ব্যর্থ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সিলভারম্যান। কিন্তু আগে কখনও এত জোরেশোরে এ-কথা বলেনি। যাই হোক, এখন কোনভাবেই পিছাতে পারবে না স্টিল। তার চাই সিলভির পেশাদারী দক্ষতা। তাই দরকার হলে তেল মেরে তাকে সন্তুষ্ট করবে।
‘এত হতাশ না হয়ে আমার ওপর ভরসা রাখো, সিলভি, ‘ নরম সুরে বলল স্টিল। ‘বলো তো, এখন কাজের ঠিক কোন্ পর্যায়ে আছ তুমি?’
‘জানতে চাইছ তাই বলছি: এরই ভেতরে নানাদিকে সেট করা হয়েছে ঊননব্বুইটা ক্লাস্টার ক্যামেরা। এ-ছাড়া, নানান দিকে মাইকসহ এক শ’ আশিটা সোলো ক্যাম। এরই ভেতরে পাহাড়ে, জঙ্গলে আর সৈকতে কাজ করছে আশিটা লেন্স। সবমিলিয়ে ধরো দ্বীপের ওপরে চোখ রাখছে পাঁচ শ’টা ক্যামেরা। তবে এরপরেও রয়ে গেছে কিছু ডেড স্পট। ওগুলো কাভার করতে পারিনি ইকুইপমেন্টের অভাবে। তা ছাড়া, আমার এত লোকবল নেই যে ভালভাবে কাজ শেষ করব। আর সেজন্যেই বলছি, সফল হবে না ডার্টি গেম-এর এই শো।’ উত্তেজিতভাবে কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটের কোনায় সাদা ফেনা জমেছে তার।
স্টিল বুঝে গেল, নিজের দায়িত্ব ভালভাবেই শেষ করবে সিলভি। নানান অ্যাঙ্গেল দিয়ে দ্বীপের ওপরে চোখ রাখছে পাঁচ শ’র বেশি ক্যামেরা। তার ওপর আছে লাইভ ইউনিট। সে-কথা বলতে ভুলে গেছে সিলভি। নিজের হাতে সেট করেছে শত শত ক্যামেরা। এর আগে দুনিয়ার আর কোন শো-তে এত টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়নি।
‘দেখো, আমরা ঠিকই উৎরে যাব,’ বলল স্টিল, ‘বিপদ এলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ব তুমি আর আমি।’
‘এটা যুদ্ধ না, স্টিল, টেলিভিশনের কাজ আরও কঠিন, ‘ তিক্ত সুরে বলল সিলভি। ‘হয়তো খেয়াল করেছ, আমাদের কাছে যথেষ্ট ইকুইপমেন্ট নেই। পড়ে আছি এমন এক দ্বীপে, যেখানে চট করে ওগুলো সভ্য জগৎ থেকে সংগ্রহ করতে পারব না। জানোই তো, ক্যামেরার কাজ করতে ভালবাসি বলে এখনও রয়ে গেছি। কিন্তু শেষমেশ কী হবে সেটা জানি না।’
একটু দূরে দুই টেকনিশিয়ান এক স্যাটেলাইট ডিশে সংযোগ দেয়ায় বিশ্রীভাবে চারপাশে ছড়াল আগুনের কমলা ফুলকি। তাতে চমকে গেছে সিলভারম্যান। তার ভাব দেখে স্টিলের মনে হলো, বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে সিলভির মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে। ‘অ্যাই, অ্যাপেল! ভুলেও ওয়াএয়ার ধরবে না! মনে নেই আগে কী বলেছি? ওগুলো ধরতে যেয়ো না!’
অবাক চোখে ওকে দেখল টেকনিশিয়ানেরা। একটা কথাও বুঝতে পারেনি।
স্টিলের দিকে তাকাল সিলভারম্যান। বাদীর উকিলের ভঙ্গিতে আঙুল তাক করল টেকনিশিয়ানদের দিকে। তারা যেন দাগী আসামী। ‘বারবার স্পার্ক হচ্ছে। আর এরা একদম ইংরেজি জানে না। তো এদেরকে দিয়ে কাজ করাব কীভাবে!’
কারও ভেতরে ইতিবাচক মনোভাব দেখলেই খেপে যায় সিলভি। সবসময় কাজ করে মনে নিরাশা নিয়ে। তবে কাজটা শেষ করে প্রথমশ্রেণীর টেকনিকাল ডিরেক্টরের মতই।
বন্ধুর কথা শেষ হতে স্টিল বলল, ‘একটা কথা, সিলভি, এই শো কিন্তু ঠিকভাবেই শেষ হবে।’
‘কীভাবে?’ বলল সিলভারম্যান। ভাবছে, তুই, শালা, কিছুই বুঝিস না! গাধা কোথাকার!
‘এই শো খুব ভাল হবে, কারণ এটার দায়িত্বে তুমি আছ।’
প্রতিবাদ করতে গিয়েও খপ্ করে মুখ বুজল সিলভি।
প্রিয় বন্ধু বলছে, তার কাজে সে দুনিয়ার সেরা।
আর সেজন্যেই খুব জনপ্রিয় হবে ডার্টি গেম শো।
এরপর আর কোন কথা চলে?
তিন
‘এইমাত্র এসেছেন ডায়ানা এরেনো,’ ঘোষণার সুরে বলল রিটা। সে দাঁড়িয়ে আছে পাম গাছের কাছে। সোনা রোদ এসে ঝিলমিলিয়ে দিচ্ছে ওর সোনালি চুল।
‘সে জানে আমাদের স্কোর কত?’ জানতে চাইল স্টিল। মাথা দোলাল রিটা।
নেটওঅর্ক টিভির নামকরা মহিলা সাংবাদিক ডায়ানা পা রেখেছে এই দ্বীপে, আর তাই কঠোর কিছু আইন জারি করেছে স্টিল। এ-ছাড়া, হেলিকপ্টারে করে আনার সময় মহিলাকে বলা হয়নি কোথায় আছে এই দ্বীপ। ডায়ানা কথা দিয়েছে, শো শুরু হলে ওটার ওপরে লিড স্টোরি করবে। এখন এখানে এসেছে স্টিলের সাক্ষাৎকার নিতে।
‘আগামীকাল তুমি হয়ে উঠবে টপ স্টোরি,’ বলল রিটা। ‘তাঁর কিছু সাক্ষাৎকার আমি দেখেছি। তোমার কাছ থেকে কথার প্যাচে অনেক কিছুই বের করে নিতে চাইবেন তিনি।’
তারকাদের মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হওয়ার মানুষ নয় ডায়ানা। পাক্কা সাংবাদিক। নানা দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার ও বিলিয়নেয়ারদের পেটের খবর টেনে বের করে। স্টিলের শর্ত মেনে এখানে এসেছে, সুতরাং আশা করা যায় আপত্তিকর কোন প্রশ্ন তুলবে না সে।
ডায়ানার সঙ্গে দেখা হলে ডার্টি গেম শো-র কয়েদীদের নিয়ে বহু কথা জানাতে পারবে স্টিল। ওর কথায় উঠে আসবে আপত্তিকর কিছু বিষয়। আর তাতে তৈরি হবে দুনিয়াজুড়ে বিতর্ক। আর সেটাই চাইছে স্টিল। যত বেশি মানুষ এই শো-তে জড়াবে, ততই বেশি বিক্রি হবে টিকেট।
‘রুপালি জগতের মহাহারামি কুত্তী এই ডায়ানা এরেনো,’ বলল স্টিল, ‘ওর চেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করতে পারবে না কেউ। আর তাই ওর সঙ্গে দেখা করার জন্যে আমি তৈরি।’
‘দেখা যাক কী বলেন তিনি,’ সোনালি চুল গুছিয়ে নিল রিটা।
‘আমাকে কেমন দেখাচ্ছে, ডার্লিং?’ হাত বাড়িয়ে ওকে বুকে টেনে নিল স্টিল। গভীরভাবে চুমু দিল ঠোঁটে। জবাবে সমান আগ্রহে চুমু ফেরত দিল মেয়েটা। যদিও অস্বস্তি বোধ করছে স্টিলের নতুন শো-র কথা ভাবতে গিয়ে।
নামকরা শোম্যানদের মত ব্যক্তিগত মেকআপম্যান আছে স্টিলের। কোথাও যাওয়ার আগে ওকে রেডি করে দেয় সে। এবার ক্যামেরার সামনে স্টিল বুঝিয়ে দেবে সবই নিয়ন্ত্রণে আছে তার। গ্রামে ডায়ানার জন্যে মাঝারি আকারের এক তাঁবু বরাদ্দ করেছে সে। ওটার ভেতরে বিলাসবহুল কোনকিছুর অভাব নেই। মহিলা সাংবাদিকের কাছে চারবেলা পৌঁছে যাবে সেভেন স্টার হোটেলের শেফের তৈরি খাবার। শ্যাম্পেন থেকে শুরু করে যে-কোন দামি মদ পাবে সে। এখন মুখ-হাত ধুয়ে হালকা নাস্তা করার পর স্টিলের জন্যে অপেক্ষা করছে। নিজের তাঁবুতে পোশাক ছেড়ে সুন্দর টমি বাহামা সিল্কের শার্ট ও কালো জিন্স পরে ডায়ানার তাঁবুতে গিয়ে ঢুকল স্টিল।
সাদা টেবিলের ওদিকের চেয়ারে বসে আছে মহিলা। স্টিল তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই মুখ তুলে তাকাল সে।
‘হ্যালো, ডায়ানা, আপনি এসেছেন বলে আমি খুব খুশি,’ পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠে বলল স্টিল। মুখে আন্তরিক হাসি। বহুকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশে সে অভ্যস্ত। বেশিরভাগ মানুষ বুঝবে না আসলে আন্তরিক নয় স্টিল।
ডায়ানা এরেনো অন্য মাপের সাংবাদিক। ঠিকই বুঝে গেল খুশির ভান করছে স্টিল। প্রচুর প্রচারণা পাবে বলে তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সে।
‘আপনার শো-র ওপরে রিপোর্ট করব, তাই আমিও খুশি,’ মাপা কণ্ঠে বলল ডায়ানা। তার পরনে সিল্কের সবুজ জ্যাকেট। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশের জন্যে ওটা উপযোগী নয়। তবে দারুণ আকর্ষণীয় দেখাবে টিভির পর্দায়। সবুজ দুই মণির সঙ্গে মিলে গেছে জ্যাকেট।
‘কেমন ছিল হেলিকপ্টার ভ্রমণ?’ দুশ্চিন্তার ভান করে বলল স্টিল। যদিও মহিলার ভালমন্দে কিছুই যায় আসে না ওর। ‘কোন কষ্ট হয়নি তো?’
‘ভ্রমণটা ছিল জঘন্য,’ সরাসরি বলল ডায়ানা। ‘পুরো সময় বেঁধে রাখা হয়েছিল আমাদের চোখ। এতে সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন ভালভাবে গুছিয়ে নিতে পারিনি।’
‘সেজন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত,’ মিথ্যা বলল স্টিল। ‘তবে আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন, আপাতত আমরা কোথায় আছি, সেটা বড় একটা রহস্য হিসেবে রাখতে চাই।’
‘সেটা বুঝেছি,’ বলল ডায়ানা। অন্য সাংবাদিকদের আগে চমকপ্রদ সব সংবাদ প্রচার করা তার উদ্দেশ্য। আগেও কাভার করেছে স্টিলের কিছু শো। সেসব সাক্ষাৎকারে আগেই বলে দেয়া হয়েছিল, দুর্বল মানসিকতার বা হৃৎপিণ্ডে গোলমাল আছে এমন দর্শক যেন এসব শো না দেখেন। শো-তে ছিল অনৈতিক কিছু দৃশ্য। আর সেজন্যে ডার্টি গেম শো তৈরি করা হচ্ছে জানতেই আলোচনার ঝড় উঠেছে সংবাদ মাধ্যমে। সাংবাদিক মহলে আলাপ চলছে, এবারের শো-তে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙতে যাচ্ছে ব্র্যাড স্টিল। তার শো সফল হলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মুনাফা করবে সে। আইন ভঙ্গের জন্যে কোন আদালত তাকে দায়ী করলে, প্রচুর টাকার বিনিময়ে নামকরা বেশ ক’জন উকিল লড়বে তার পক্ষে।
‘আসুন, সাক্ষাৎকার শুরু করার আগে সামান্য শ্যাম্পেন নিই,’ হেসে বলল স্টিল।
‘আমার কোন আপত্তি নেই।’
টেবিল থেকে নিয়ে দুটো ফুট গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালল ব্র্যাড। সোনালি তরলে ভরা একটা গ্লাস ডায়ানার হাতে দিয়ে টোস্ট করল। ‘আসুন, প্রার্থনা করি মঙ্গল যেন হয় বিনোদনের জগতের।’
দুই চুমুক শ্যাম্পেন নেয়ার পর শুরু হলো সাক্ষাৎকার। নিজের ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে দু’জনই তারা খুব সতর্ক।
‘স্টিল, আপনি তো আজকাল হলিউডে কাজ করছেন না। সেটা কেন?’
একটা ক্যামেরা তাক করা আছে স্টিলের দিকে। দ্বিতীয় ক্যামেরা দেখাবে ডায়ানার প্রতিক্রিয়া। স্টিলের অনুরোধে ব্যবহার করা হচ্ছে বাউন্স লাইট। তাতে কোমল দেখাবে তার মুখ। কয়েক বছর আগে এক সাংবাদিক শয়তানি করে কড়া আলো ফেলে স্টিলের মুখটাকে সাক্ষাৎ ইবলিশের মত করে দেখিয়েছিল। তারপর থেকে সতর্ক হয়ে গেছে সে।
‘আমি চাই দুনিয়ার মানুষ যেন দেখে সত্যিকার সব দৃশ্য। হলিউডে আপনি বাস্তব কিছু পাবেন না। শুধু হলিউডের কথাই বা বলছি কেন, ইউরোপ, এশিয়া বা অন্য যে-কোন জায়গায় ভাল কোন শো আমরা দেখি না। বাস্তব কিছু দেখাতে গেলেই নানান আইন বেঁধে ফেলে আমাদের মুখ-হাত-পা। আর তাই আমি এমন এক জায়গায় নিজের শো করছি, যেখানে আমাকে বাধা দেবে না কেউ। বলবে না যে এটা করতে পারবে, আর ওটা করতে পারবে না।’
তাঁবুর কোণে দাঁড়িয়ে স্টিলের আত্মবিশ্বাস দেখে বিস্মিত হয়েছে রিটা। অন্তর থেকে যেটা অনুভব করে, সেটাই বলছে ওর প্রেমিক। কণ্ঠে তার বিদ্রোহের সুর। নিজেও টিভির নকল সব অনুষ্ঠান দেখে বিরক্ত রিটা। বুঝে গেছে, মিথ্যা বিনোদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি দর্শক। আর সেজন্যেই তারা ঝুঁকে গেছে ইণ্টারনেট ও অন্য সব সাইটে।
‘যেহেতু আপনার সঙ্গে বড় কোন টিভি নেটওঅর্ক নেই, তা হলে কীভাবে অনুষ্ঠান ব্রডকাস্ট করবেন ভাবছেন?’ জানতে চাইল ডায়ানা এরেনো।
‘আমি শো প্রচার করব ইন্টারনেটের ওয়েব জুড়ে। আমার দর্শক হবে গোটা দুনিয়ার মানুষ। যার একটা কমপিউটার আর ক্রেডিট কার্ড থাকবে, সে-ই দেখতে পাবে আমার নতুন শো। ওটা হবে লাইভ, আনসেন্সর্ড ও আনকাট।’
‘তা-ই? তা হলে বলুন আপনার নতুন শো-র ব্যাপারে।’
‘আমরা নানান জেলখানা থেকে দশজন দাগী অপরাধীকে সংগ্রহ করে এনেছি। আগামী কিছু দিনের ভেতরে মারা পড়ত তারা। এবার নিজেদের ভেতরে প্রতিযোগিতা করবে এরা। সেটা হবে এ-দ্বীপে। লড়াই চলবে নয়জনের মৃত্যু পর্যন্ত। আর এই প্রতিযোগিতায় যে বিজয়ী হবে, দক্ষিণ এশিয়ার কোন বন্দরে তাকে পৌঁছে দেব আমরা। সে পাবে এক সুটকেস ভরা নগদ ডলার।’
বিস্ময় নিয়ে স্টিলের দিকে তাকাল ডায়ানা। দশ কয়েদীর বিষয়ে সঠিক শুনতে পেয়েছে কি না, সেটা নিয়ে দ্বিধান্বিত মনে প্রশ্ন জাগল তার, মৃত্যু পর্যন্ত লড়তে হবে কেন? আর এসব খুনির শেষজনকেই বা কেন ছেড়ে দেয়া হবে সভ্য জগতে?
ক্যামেরার ওদিকে দাঁড়িয়ে ঢোক গিলল রিটা। চমকে গেছে স্টিলের কথা শুনে। ওর প্রেমিক আগে বলেছিল প্রতিযোগিতা হবে। তখন এটা বলেনি, লড়াই হবে মরণপণ। আর তাতে মরতে হবে নয়জনকে। যে কয়েদী প্রাণে বাঁচবে, মুক্তি দেয়া হবে তাকে।
‘অর্থাৎ নয়জন মরবে, আর প্রাণে বাঁচবে মাত্র একজন, বিস্ময় সামলে নিল ডায়ানা। ‘আর তাদের লড়াই সরাসরি সম্প্রচার করবেন আপনি। আমি কি ভুল শুনেছি?’
সাংবাদিকের গলার আপত্তির সুরটা রোমাঞ্চিত করল স্টিলকে। এর চেয়ে ভাল বিজ্ঞাপন পেত না সে।
‘আসলে, ডায়ানা, আপনার বুঝতে হবে, এই দশজন কিন্তু এমনিতেই ফাঁসি বা বৈদ্যুতিক চেয়ারে মারা যেত। ঘাগু খুনি এরা। তাদের একজন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। মনে করি না এতে বড় কোন দোষ আছে।’
‘কিন্তু বিষয়টি অনৈতিক এবং বেআইনী,’ দ্বিধাহীনভাবে বলল ডায়ানা। ‘এই লাইভ হরর সিনেমা দেখাবার জন্যে কত ডলার করে নিচ্ছেন আপনি?’
‘মাত্র এক শ’ নিরানব্বুই ডলার পঁচানব্বুই সেণ্ট। টিকেট কিনলে আমার সাইটে পাবে আনলিমিটেড অ্যাক্সেস। ওদিকে শো-র আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে আমার উকিলেরা।’
‘কিন্তু এমন শো কেন তৈরি করছেন? কেন মনে হলো মানুষ লাইভ হরর সিনেমা আগ্রহ নিয়ে দেখবে?’ মহিলার বলার ভঙ্গিতে মনে হলো সিরিয়াল কিলারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে সে।
সবই বুঝে গেছে স্টিল। তবে তাতে কিছুই যায়-আসে না তার। আগেও নানা বিতর্ক তৈরি করেছে। আর বিতর্ক মানেই আরও বেশি দর্শক জুটে যাওয়া।
‘আপনার মনে আছে, আমার প্রথম প্রিমিয়ার যখন গেল নেটওঅর্ক টিভিতে, হলিউডের বোকা প্রডিউসারেরা বলেছিল, আমি নাকি বদ্ধ উন্মাদ। আজ ওরা কোথায়, আর আমি কোন্ পর্যায়ে আছি?’
‘ওরা বলেছিল, অন্তর বলতে আপনার কিছু নেই,’ বলল ডায়ানা, ‘এটাও বলেছে, যারা এসব প্রোগ্রাম দেখে, তারা আসলে মানুষ নয়। প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দ্য টাইমস- আপনি সত্যিকারের একজন নাস্তিক। রিপোর্টে সাংবাদিক আরও বলে যে…’
মহিলা সাংবাদিকের মুখের কথা কেড়ে নিল স্টিল, ‘হ্যাঁ, আমার বিরুদ্ধে বহুকিছুই সাংবাদিকেরা লিখেছে। তবে এবার যা করছি সেটা আলাদা কিছু। আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছেন।’ মহিলা পুরনো কথা তুলছে বলে সে বিরক্ত। অবশ্য এটা ভেবে খুশি, ডায়ানা এরেনোর প্রচারণার কারণে হুড়মুড় করে বাড়বে তার শো-র দর্শক। নিজেও সেটা জানে মহিলা, সাঁই-সাঁই করে রেটিং বাড়বে তার সাক্ষাৎকারের।
স্টিলের কথা শুনে তিক্ত হয়ে গেছে ডায়ানার মন। তার বস্ তাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে রসাল রিপোর্ট পাবে বলে। সেটা হয়তো হবে, কিন্তু সৎ এক সাংবাদিক হিসেবে স্টিলের গায়ে বমি করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। নৈতিকতা মেনে চলা মানুষ সে। তিন ছেলেমেয়ের মা। কয়েক সেকেণ্ড পর সে খেয়াল করল, হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেছে নোস্।
‘আপনি তো মিলিয়নেয়ার। সত্যিকারের খুনোখুনি দেখিয়ে হয়তো হবেন বিলিয়নেয়ার। কিন্তু এসব করতে গিয়ে মনে কি কোন লজ্জা অনুভব করছেন না আপনি?’
জোর করে হাসল স্টিল। সরাসরি চোখ রেখেছে ক্যামেরার লেন্সের দিকে। ‘মানুষ যা দেখতে পছন্দ করে, আমি শুধু সেই ধরনের শো তৈরি করি। সেটা কি খুব দোষের?’
‘আপনার কথা বুঝলাম। তো আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। আমার ধারণা, আপনার দর্শকেরা একই কথা ভাববে। আপনি যখন আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, নিজেকে কী দৃষ্টিতে দেখবেন?’ চড়ে গেছে ডায়ানা এরেনোর গলা।
মহিলার সঙ্গে ডার্টি গেম শো নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবে ভেবেছিল স্টিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গোপন করতে হবে বহু কিছু। ভাল হতো অন্তর খুলে কথা বলতে পারলে। যেমন দুই মেক্সিকান স্বামী ও স্ত্রী যখন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্যে নিজেদের ভেতরে লড়বে, কী দারুণভাবেই না দুলবে দর্শকের মন। অথবা নিজেদের ভেতরে যখন লড়বে খুনি জার্মান নাৎসি ও ধর্ষক এসএএস অফিসার-বারবার দেখানো হবে তাদের দুই দেশের পতাকা। কী দারুণই না জমবে খেলা!
‘আসলে আপনার মত সাংবাদিক ও সমালোচকদের চোখে নিজেকে বারবার ছোট হতে দেখে আমি খুব বিরক্ত। আর তাই ঘাড় থেকে নামিয়ে দিয়েছি আপনাদের হলিউড। দুনিয়ার সবার জন্যে খোলা থাকবে আমার শো। প্রতিটি নেটওঅর্ক ও শোগুলোকে কাঁচকলা দেখিয়ে ডার্টি গেম হবে সর্বকালের সেরা শো। এই বিষয়ে মনে কোন ভুল ধারণা রাখবেন না।’
ডায়ানা বুঝে গেছে রাগিয়ে দিতে পেরেছে স্টিলকে। ‘তা হলে বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, যা করছেন সেটা নৈতিক?’
পরের দশ মিনিট ঝড়ের বেগে চলল সাক্ষাৎকার। দু’জনই যে-যার যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইল পরস্পরকে। তাতে রেগে গেল দু’জনই। এরপর দশ মিনিট পর ঝট্ করে উঠে দাঁড়াল স্টিল। ল্যাপেল থেকে মাইক্রোফোন খুলে বরফের মত শীতল হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার আর কিছু বলার নেই। ভাল লাগল আপনার সঙ্গ। ভাল থাকবেন।’ দ্রুত তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল সে। ডায়ানাকে এখানে এনে পূরণ হয়েছে তার উদ্দেশ্য। আগেই টিভির জগতের মন্দ লোক হিসেবে প্রমাণিত ছিল সে, আর এবার হবে ইন্টারনেট জগতের দানব। ফলে এবারের শো-তে দুনিয়ার অন্যসব শো-র চেয়ে বেশি দর্শক পাবে।
তাঁবুর ভেতরে রয়ে গেছে রিটা। বুকের ভেতরে হিমবাহের চেয়ে ঠাণ্ডা লাগছে ওর। আজ স্টিল নিজের আরেকটা রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এ-ও ঠিক, এত বিরোধিতার মুখে পড়লে কারই বা মেজাজ ভাল থাকে!
নিজেকে বুঝ দিল রিটা, আর যাই হোক স্টিল তো একজন মানুষ। ওর কিছু দোষ থাকবে না, তা হবে কেন! তা ছাড়া, হয়তো খুনোখুনি এড়িয়ে যাবে। সাক্ষাৎকারে জেনে- বুঝে মিথ্যা বলেছে, যাতে বিক্রি করা যায় প্রচুর টিকেট।
রিটা ও ডায়ানার দৃষ্টি মিলিত হতে অস্বস্তিতে পড়ল ওরা।
‘যা হলো সেজন্যে আমি দুঃখিত,’ বলল রিটা। ‘আসলে খুব চাপের ভেতরে আছে স্টিল।’
‘আপনি কি জানেন, আসলে এখানে কী করছেন স্টিল?’ জানতে চাইল ডায়ানা।
এ-প্রশ্নের সহজ কোন জবাব নেই রিটার কাছে। স্টিলকে ভালবাসে সে। জানে, বাধ্য হয়ে আধুনিক দুনিয়াতেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখেছে বহু দেশ। দাগী আসামীরা ডাকাত, খুনি ও ধর্ষক। তাদের জন্যে সর্বনাশ হচ্ছে বহু পরিবারের। আর ডার্টি গেমের জন্যে নির্বাচিত ভয়ঙ্কর অপরাধীদের আগেই দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। একসময়ে রিটার মাতৃভূমি ইংল্যাণ্ডেও ছিল চরম এই রায়। সেটা বেশিকাল আগের কথাও নয়। এদিকে স্টিল চাইছে সাধারণ মানুষ যেটা দেখতে পছন্দ করে, সেটা ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচার করতে। সেটা ন্যায্য বলে ভাবছে না ডায়ানা। তার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে মানুষের হিংস্র ভাবটা এবার প্রকটভাবে ফুটে উঠবে।
কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এল রিটা। আবার গিয়ে ঢুকল বিশাল তাঁবুতে।
নিজের চেয়ারে বসে এলইডি স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে ব্র্যাড। চেহারায় অপরাধের কোন ছাপ নেই।
‘ইয়ে… ব্র্যাড…. আমরা বড় একটা ঝামেলায় পড়েছি, ‘ অস্বস্তি নিয়ে বলল এমিলি। চট করে দেখে নিল সিওয়ার্সকে।
‘ব্যাপারটা বেশ জটিল,’ মুখ খুলল সিওয়ার্স।
অনুগত দুই কর্মচারীর দিকে তাকাল স্টিল। মনে বইছে কালবৈশাখী ঝড়। বাজে কোন সংবাদ শুনলে রেগে উঠবে T
গলা পরিষ্কার করে নিচু গলায় বলল এমিলি, ‘আমাদের এক প্রতিযোগীকে হারিয়ে বসেছি আমরা।’
‘সংক্ষেপে বলো কী হয়েছে?’ থমথমে কণ্ঠে জানতে চাইল স্টিল। চেয়ার ছেড়ে চলে গেল সিওয়ার্স আর এমিলির সামনে।
‘মরোক্কোর জেলখানা থেকে সিরিয়ান যে খুনিটাকে আমরা বের করে এনেছি, এ-দেশে নামার পর আসলে বেশি বাড়াবাড়ি করছিল…’ একবার ঢোক গিলে নিয়ে চুপ করে গেল সিওয়ার্স।
‘ওর হাতে-পায়ে শেকল ছিল, তবে তার পরেও গলা টিপে মেরে ফেলেছে আমাদের এক গার্ডকে,’ কথা শেষ করল এমিলি।
‘অন্য গার্ডেরা তখন পেটাতে থাকে ওকে, বলল সিওয়ার্স, ‘পাল্টা হামলা করে হারামজাদা। তাকে ঠাণ্ডা করতে না পেরে গুলি করে একজন গার্ড। আরব লোকটার মাথায় গুলি লেগেছে। মারা গেছে সঙ্গে সঙ্গে।’
সিওয়ার্স ও এমিলির দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল স্টিল। রাগে কাঁপছে ওর শরীর। মনে হচ্ছে কারও ওপরে গায়ের ঝাল মেটাতে না পারলে পুড়ে খাক হবে অন্তর।
এমিলি ও সিওয়ার্স তার বিশ্বস্ত কর্মচারী। নিজে অনেকের মাঝ থেকে এদের বেছে নিয়েছে স্টিল। কমপিউটার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভাল ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি পেয়েছে এরা। বিশেষ করে সিওয়ার্স ছিল তরুণ প্রতিভাবান হ্যাকার। ওর চেয়ে বেশি কেউ জানে না ওয়েব সম্পর্কে। ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়া অনুচিত, নিজেকে সতর্ক করল স্টিল। বেসুরো কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘ওরা গুলি করে মেরে ফেলেছে আমার আরব লোকটাকে?’
এলইডি স্ক্রিনে বক্সের ভেতরে দেখা যাচ্ছে আরব লোকটার ছবি। এখন আর তার ছবি রেখে কোন লাভ হবে না। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই ঝরে গেছে দশজনের একজন।
‘স্কাউটকে বলো যেখান থেকে হোক যেন জোগাড় করে আরেকজন প্রতিযোগী,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল স্টিল।
‘ভাববেন না, বস্,’ বলল এমিলি, ‘এরই ভেতরে আরেক অপরাধীকে খুঁজে বের করেছে স্কাউট।’
‘তা-ই?’ ডানহাতে কপাল টিপতে শুরু করল স্টিল। ‘সে কে? কোথায় আছে? আগে দেখতে হবে তাকে দিয়ে আমাদের চলবে কি না।’
ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে লাগল সিওয়ার্স।
কমপিউটার স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে রিটাকে বলল এমিলি, ‘সাক্ষাৎকার কেমন হলো?’
‘ভাল,’ রিটা কিছু বলার আগেই বলল স্টিল।
হিংস্র চেহারার এক অপরাধীর ছবি স্ক্রিনে আনল এমিলি। নিচে লেখা কী ধরনের অপরাধ করেছে লোকটা।
‘রদ্রিগো পেদ্রো। গুয়েতেমালার গুয়েতেমালার খুনি ও ধর্ষক। নির্মমভাবে খুন করেছে তেরোজন মানুষকে।
ছবি দেখে মাথা নাড়ল স্টিল। ‘গুয়েতেমালার খুনি চাই না। এরই ভেতরে পেয়েছি মেক্সিকোর দুটোকে। গোটা পৃথিবী থেকে লোক নেব, আর তাই নিয়েছিলাম একজন মুসলিম। আরব না হলেও মুসলিম হতেই হবে।’
একদিকের দেয়ালে ঝুলছে বিশাল মানচিত্র, ওখানে গিয়ে আঙুল তাক করল স্টিল। ‘আরবের না পেলে অন্য দেশের মুসলিম ধরে আনুক। সেক্ষেত্রে মুসলিমরাও শো দেখবে।’
ফোন টেবিলে রেখে স্টিলের দিকে তাকাল সিওয়ার্স। ‘স্কাউট বলছে দক্ষিণ আমেরিকায় ছয়জন মুসলিম অপরাধী পেয়েছে, যাদেরকে বিক্রি করতে রাজি জেলখানার সুপার। স্কাউট এখন তার সঙ্গে কথা বলবে।’
‘অপরাধীরা কোন দেশের? মুসলিম তো?’
‘মুসলিম তাতে সন্দেহ নেই,’ হাসল সিওয়ার্স। ‘সিরিয়ান আর ইরাকি সন্ত্রাসী দিয়ে কি আমাদের চলবে, বস্?’
‘দাম কত?’ মৃত আরব অপরাধীর ছবিটা দেখল স্টিল।
‘এখনও ঠিক করা যায়নি,’ জানাল সিওয়ার্স।
‘সবচেয়ে ভালটার ভিডিয়ো পাঠাতে বলো। তাকে নিজের
চোখে দেখতে চাই। অনলাইনে যেন যোগ্যতার প্রমাণ পাই, সেটা স্কাউটকে জানিয়ে দাও।’
চার
পাপুয়া নিউ গিনি থেকে হাজারো মাইল দূরে পাহাড়ি পথে ওপরদিকে ছুটে চলেছে এক এসইউভি, ছাতে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ। গাড়ি ড্রাইভ করছে বনি মার্সেলের পরিচিত এক লোক। ক্যামেরাম্যান হিসেবে পেছনের সিটে আছে তার সঙ্গী। বনি মার্সেল চাইলেই দুনিয়ার নানান অংশে হাজির হতে পারবে না, তাই এদের দু’জনকে ভাড়া করেছে সে। এখন এসইউভি নিয়ে এল সালভেদরের সোনসোনেট কারাগারের দিকে উঠে চলেছে এরা। জেলারের সঙ্গে এরই ভেতরে আলাপ করেছে স্কাউট। অন্য কারাগারে কয়েকজন কয়েদীকে খুন করেছে বলে এই কারাগারে সরিয়ে আনা হয়েছিল ভয়ঙ্কর খুনি হাতিম আল-রহিমকে। তিন লাখ ডলারের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করতে রাজি আছে জেল সুপার।
পুরনো দুর্গ সোনসোনেট থেকে চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল প্রশান্ত মহাসাগর। বেশিরভাগ সময় উঁচু পর্বতের ওপরে ধূসর মেঘের ভেলায় লুকিয়ে থাকে আঠারো শ’ সালে তৈরি এই কারাগার। ওটার চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। কারাগারের দু’মাইল দূর থেকে নাকে আসে শ্যাওলা ও পয়োবর্জ্যের দুর্গন্ধ। প্রায় পচা কাঠের ফটকের সামনে এসইউভি থামতে খুলে গেল ফটক। ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যানের কাগজপত্র মন দিয়ে দেখতে গেল না গার্ডেরা। হাতের ইশারায় জানিয়ে দিল গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারে তারা।
ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যান দু’জনই এল সালভেদারিয়ান। ভেতরের উঠনে থেমে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল তারা। তাদের সামনে এসে থামল একজন গার্ড। হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল কোথায় আছে ওয়ার্ডেনের অফিস।
পরের দশ মিনিটে জেলারের অফিসে স্থির হলো অপরাধীর জন্যে দরদাম। ঠোঁট থেকে কালো চুরুট নামিয়ে হলদে দাঁত বের করে হাসল জেলার। তার কোঁচকানো ইউনিফর্ম ঢেকে দিয়েছে বিশাল ভুঁড়ি। গা থেকে এল ঘামের বোটকা টকটক গন্ধ। মুখভরা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি তার। অতিরিক্ত মদ্যপান করে আপেলের মত লাল করে তুলেছে আলুর মত নাক। মাথার ওপরে চেপে বসা ক্যাপ ঠিক করে নিয়ে ইন্টারকমের রিসিভার তুলে কাকে যেন নির্দেশ দিল সৈ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন, দেখা যাক আপনাদের পছন্দ হয় কি না!’
দুর্গের ভেতরে সারি সারি পাথুরে প্রকোষ্ঠ। বন্দিদের কখনও ব্যায়াম করাতে নেয়া হয় না উঠনে। জায়গাটা যেন পাতালপুরী। দেয়ালের গায়ে সবজেটে শেওলা। নানান দিকে সরু করিডর। কোন কোনটা নেমে গেছে বেসমেন্টে। পাথরের করিডরে খট খট শব্দ তুলছে জেলারের বুটের হিল। বেসমেন্টে নামতেই নাকে এল কাঁচা পায়খানা ও প্রস্রাবের কটু দুর্গন্ধ। খুব নিচু এই তলার ছাত। ওপরতলার পাইপ নেমে এসেছে এখানে। জয়েন্ট বেয়ে চুইয়ে নামছে মলমূত্র ভরা দূষিত পানি।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক করিডর ধরে এগোল জেলার। তার পিছু নিয়ে হাঁটছে এসইউভির ড্রাইভার ও ক্যামেরাম্যান। বিশ গজ যেতেই সামনে পড়ল পুরু লোহার ছোট এক দরজা। এপাশে দু’জন গার্ড। হাতে এলজি বুলেট ভরা শটগান।। দরজার নিচে ফুড স্লট থেকে আসছে হলদেটে আলো। গার্ডদেরকে গেট খুলতে হাতের ইশারা করল জেলার।
ক্যাঁচকোঁচ শব্দে খুলল জং-ধরা ছোট গেট। ওদিকে ত্রিশ ফুট বাই ত্রিশ ফুটের বড় সেল। ওপরে একদিকের সরু এক জানালা দিয়ে আসছে রোদ। এককোণে লোহার শিকের তৈরি খাঁচা আপাতত খালি। কামরার একদিকে ছাতের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহী এক ইরাকি আরব।
‘হাতিম!’ জোর গলায় তাকে ডাকল জেলার।
ধীরে ধীরে মুখ নিচু করে তাকে দেখল হাতিম আল- রহিম। গলায় লোহার কলারের সঙ্গে পুরু শেকল। ওটার শেষমাথা তালা মেরে আটকে দেয়া হয়েছে দেয়ালের লোহার প্লেটে। সবমিলিয়ে দশ ফুট হাঁটতে পারবে আরব লোকটা।
‘সত্যিকারের এক জানোয়ার,’ বলল জেলার।
হাতিম আল-রহিমের পরনে শার্ট নেই। সারাশরীর বড় বড় কালো রোমে ভরা। মানুষের চেয়ে ভালুকের সঙ্গেই যেন তার বেশি মিল। হাতে-পায়ে থোকা থোকা পেশি। খাঁচায় বন্দি বাঘের চোখে জেলারের দিকে চেয়ে আছে সে।
‘ডেসেও প্রোবারলো,’ জানাল ড্রাইভার।
পরীক্ষা না করে তারা কিনবে না এই বন্দিকে।
দুর্গন্ধ ভরা চুরুট মুখ থেকে নামাল জেলার। চেহারায় পুরনো গাড়ির সেলসম্যানের মত বিরক্তির ছাপ। ভাবটা এমন যে: কিনলে কেনো, নইলে ভাগো। কয় পয়সাই বা দেবে!
‘ভাল দেখে একটা আরব ধরে আন!’ গার্ডদের দিকে চেয়ে খেঁকিয়ে উঠল সে। ‘মুসলিমগুলোর মধ্যে মজিদ আল- কবিরকে আনলে ভাল। এক কাজ কর, দুটো নিয়ে আয়। কবিরের পাশের সেলে আছে মাসুদ রানা। ওটা আরব না হলেও চোখ দেখলে মনে হয় ব্যাটা আসলে ক্ষুধার্ত সিংহ।’
করিডরে বেরিয়ে সরু প্যাসেজে ঢুকল দুই গার্ড। কিছুক্ষণ পর পৌঁছে গেল ডানজনের মত এক জায়গায়। একের পর এক সেল পার হয়ে থামল একটি কুঠুরির সামনে। হাতিমের ঘরের চারভাগের একভাগ হবে এই কুঠরি। ভেতরে একা আছে মজিদ আল-কবির। ঘোলা চোখে গার্ডদের দিকে তাকাল সে।
শিকের দরজা খুলল এক গার্ড। তার সঙ্গী দু’হাতে বাগিয়ে ধরেছে গুলি ভরা শটগান।
‘অ্যাই, মজিদ! বেরিয়ে আয়!’
তিক্ত চেহারায় উঠে দাঁড়াল প্রকাণ্ডদেহী মজিদ। জেলারের তলব মানেই খারাপ খবর। আজই হয়তো ফাঁসি হবে তার। তবুও বলা যায় না, সুযোগ হয়তো আসবে ভেগে যাওয়ার।
অস্ত্রের মুখে সেল থেকে বেরোল মজিদ আল-কবির। যে গার্ড দরজা খুলে দিয়েছে, সে খুলল পাশের কুঠরির দরজা। এবারের কামরা বেশ বড়, ভেতরে অন্তত দশজন কয়েদী।
‘বেরিয়ে আয়, মাসুদ রানা,’ হুঙ্কার ছাড়ল গার্ডদের একজন, ‘জেলার তোকেও ডেকেছেন।’
ছোট্ট জানালার সামনে আছে মাসুদ রানা। ওদিক থেকে আসছে হলদে রোদ। নিজের ভাগের রুটির গুঁড়ো কয়েকটা চড়ই পাখিকে খাওয়াচ্ছে বাঙালি যুবক। মাথার দীর্ঘ চুল এলোমেলো। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। ভাবলেশহীন চেহারায় দরজার দিকে এল সে। কবিরের মতই বুঝে গেছে, মন্দ কোন সংবাদ দেবে জেলার। করিডরে বেরোতেই ওদের দু’জনকে সামনে রেখে পিছু নিল অস্ত্র হাতে দুই গার্ড।
ধীরপায়ে হাঁটছে মাসুদ রানা। ওর মনে পড়েছে কয়েক মাস আগের বিপজ্জনক এক মিশনের কথা।
ওটার নাম ছিল অপারেশন ব্ল্যাক লিস্ট। এ-বিষয়ে ওর কাছ থেকে জেনে ছোট এক বই লিখেছিল বাংলাদেশি এক লেখক। তারপর থেকে নাকি তাকে খুব ত্যক্ত করছে তার পাঠকেরা। তাই শেষমেশ উপায় না দেখে যোগাযোগ করেছিল ওর সঙ্গে। ফোনে অনুনয় করেছে, ‘স্যর, এত প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে আমি তো প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি! প্লিয, আমাকে কি একটু সময় দেবেন? আমি শুধু জানতে চাই, ব্ল্যাক লিস্ট আপনার হাতে এলে তারপর কী হলো? ড্রাগসের চালান কি বন্ধ হয়েছে দেশে আসা? গ্রেফতার করা গেছে মাফিয়ার সেসব ক্রিমিনালদেরকে?’
গোপন কথা ফোনে বলতে চায়নি রানা। তাই জানিয়ে দিয়েছে, লেখক যেন ওর বাড়িতে এসে দেখা করেন।
পরদিন সকাল নয়টায় গুলশান এক-এ রানার বাড়িতে এল লেখক। তাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে সংক্ষেপে ব্ল্যাক লিস্ট মিশন সম্পর্কে জরুরি আরও কিছু তথ্য দিয়েছে রানা। সোনসোনেট কারাগারের করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে পরিষ্কার মনে পড়ল ওর নিজের বলা কথা: ‘যেদিন ব্ল্যাক লিস্ট হাতে এল, সেদিনই স্পেন থেকে ফিরে এসেছি বাংলাদেশে। আর এর পরদিন বিসিআই ও বিএসএস-এর দুই চিফ মিলে গড়লেন একটি চৌকশ টিম। আমরা টিমের সবাই ভেবেছিলাম এবার ঝাঁপিয়ে পড়ব ড্রাগ লর্ডদের ওপরে। কিন্তু বাস্তবে কাজে নামতে গিয়ে দেখা গেল, মাত্র দু’দিনে উবে গেছে ড্রাগের চেনা-অচেনা সব রুট। এদিকে অপরাধীদের কারও হদিস নেই।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছে রানা, ‘আমাদের ধারণা, মোরেলিকে যখন খুন করল এলিনা পার্কারসন, এর একটু পর আমার তৈরি তুষার ধস খুঁড়ে উঠে এসেছিল মেয়েটা। মাফিয়া দলে নিজের আসন পোক্ত করতে গিয়ে ফোনে সতর্ক করেছে মাফিয়া কমিশনকে। আর তাই ঝুঁকি না নিয়ে আণ্ডারওঅর্ল্ডে চলে গেছে মাফিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ লোক।’
লেখককে আরও কিছু তথ্য দিয়েছে রানা।
মাফিয়া ডনদের সবাই ড্রাগ ব্যবসা করে না। সুতরাং যারা নোংরা এ-ব্যবসায় নেই, তাদের কারও কাছ থেকে হয়তো আবারও পাওয়া যাবে ড্রাগ লর্ডদের বিষয়ে দরকারি তথ্য ও প্রমাণ। আপাতত আর কিছুই করার নেই। মেনে নিতে হচ্ছে, মাফিয়ার কবল থেকে আপাতত রেহাই পাবে না কেউ।
এর পরের পাঁচ দিনে দু’বার ঢাকার মগবাজার ও বনানীতে হামলা হলো রানার ওপরে। বসের নির্দেশে আত্মগোপনে যেতে হলো ওর। পরের দিনগুলো ছিল খুব নিরানন্দ। চিরকাল মুক্ত বিহঙ্গের মত থেকেছে যে মানুষ, তার তো ভাল লাগার কথা নয় বন্দি জীবন। খাঁচার বাঘের মত অস্থির হয়ে গেল ও।
সপ্তম দিনে মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের কাছ থেকে এল ফোন। খিলগাঁর একতলা সেফ হাউস ছেড়ে নানান এলাকার জ্যামে কয়েকটা সিএনজি বদলে মতিঝিলে বিসিআই অফিসে হাজির হলো রানা। সকাল এগারোটায় নিজের রুমে বসে আছে, এমন সময় ইন্টারকমে ডাকলেন বস্।
সপ্তম তলায় উঠে বসের সুন্দরী নতুন রিসেপশনিস্ট ললিতা সান্যালকে উড়ন্ত চুমু উপহার দিয়ে বিসিআই চিফের ঘরে ঢুকে পড়ল রানা। হাতের ইশারায় সামনের চেয়ারে ওকে বসতে ইশারা করলেন তিনি।
রানা দেখল টিপটিপ করে লাফ দিচ্ছে বসের কপালের পাশের নীলচে শিরা। ও বসতেই বললেন তিনি, ‘তুমি ব্ল্যাক লিস্ট মিশনে যাওয়ার আগে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছ সিআইএ এজেন্ট জন মিউলারকে। আর তখনই তোমাকে শেষ করে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিআইএ চিফ। এত দিন মাফিয়া দলের বিষয়ে তথ্য পাবে ভেবে চুপ করে ছিল সে। তবে মাফিয়ার বড় নেতারা ডুব দিতেই এখন হন্যে হয়ে তোমাকে খুঁজতে শুরু করেছে তার এজেন্টরা। ফলে তুমি এখন দুনিয়ার কোথাও নিরাপদ নও।’
‘আমি, স্যর, সতর্ক আছি,’ বলল রানা।
‘এই তো ক’দিন আগে মগবাজারে তোমার ওপরে হামলা করল পিসিআই এজেন্টরা। তারা মারা গেলেও আবার কেউ না কেউ তোমাকে খুন করতে চাইবে। ফাণ্ড নেই বলে কিছু দিন পর হাল ছেড়ে দেবে পিসিআই কর্মকর্তারা। কিন্তু সিআইএর হাত তো অনেক লম্বা। তোমার ওপরে বনানীতে দ্বিতীয় যে হামলা, ওটা ছিল তাদেরই। এভাবে কত দিন তুমি নিজেকে বাঁচাতে পারবে?’
চুপ করে থাকল রানা।
‘আজ ভোরে আমাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছেন আমেরিকার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির চিফ লুকাস ম্যাকগিল।’ বাক্স থেকে নিয়ে ঠোঁটে পুরু এক কালো চুরুট ঝোলালেন রাহাত খান। রানার উপহার দেয়া রনসন লাইটার দিয়ে জ্বেলে নিলেন ওটা। বুক ভরে টেনে ছাতের দিকে পাঠালেন নীলচে ধোঁয়া। ‘তুমি রাজি হলে আমি তাঁর কথায় সম্মতি দেব। তার আগে শুনে নাও তোমাকে কী করতে হবে।
‘তুমি রাজি হলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে সিআইএ চিফকে নিরস্ত করবেন ডিআইএ চিফ। সেক্ষেত্রে তোমার বিরুদ্ধে হুলিয়া তুলে নেবে সিআইএ। তাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে তুমি।’ গম্ভীর দৃষ্টিতে রানাকে দেখছেন বিসিআই চিফ। ‘নতুন এই মিশনে তোমার যাওয়ার আরেকটা জরুরি কারণ আছে।’ চুপ হয়ে গেছেন তিনি।
কথা গুছিয়ে নিচ্ছেন বস্। অপেক্ষা করল রানা।
কিছুক্ষণ পর বললেন বিসিআই চিফ, ‘ডিআইএ চিফ যা চাইছেন, সেটা আমাদের দেশের জন্যেও মঙ্গলকর।’
‘আমাকে আসলে কী করতে হবে, স্যর?’ বলল রানা।
‘ডিআইএর মিশন নিয়ে যাবে এল সালভেদরে,’ বললেন (অব.) মেজর জেনারেল, ‘ধ্বংস করবে হেরোইন, পাউডার কোকেন, ক্র্যাক কোকেন, মেথ, এলএসডি আর এমডিএমএ তৈরি করার বড় কিছু কারখানা। সম্ভব হলে ধরে সাগরতীরে পৌঁছে দেবে তিন ড্রাগ লর্ডকে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে লঞ্চে তুলে নিজেদের দেশে নেবে ডিআইএর দুই এজেন্ট। এদিকে আমাদের কাছে তথ্য আছে, এল সালভেদরের যে ড্রাগ দক্ষিণ-পুব এশিয়ায় আসে, এর বড় এক অংশ ঢুকছে বাংলাদেশে। এই একই কথা বলেছেন ডিআইএ চিফ। তুমি এল সালভেদরে কারখানাগুলো উড়িয়ে দিলে এবং ড্রাগ লর্ডদেরকে ধরতে পারলে ড্রাগের চালান অর্ধেকের বেশি কমে যাবে বাংলাদেশ ও আমেরিকায়।’
‘ডিআইএর এজেন্টরা নিজেরা এই কাজটা করছে না কেন, স্যর?’ জানতে চাইল রানা।
‘চেষ্টা তারা করেছে,’ বললেন রাহাত খান। ‘গত ছয় মাসে এল সালভেদরের গভীর জঙ্গলে কারখানা ধ্বংস করতে গিয়ে মারা গেছে তাদের তিনজন এজেন্ট।’
‘এখন আশা করছে তাদের কাজ আমি একাই পারব?’
‘সেটা তারা ভাবছে না,’ রানাকে দেখলেন চিফ। মুখে বললেন না ডিআইএ এজেন্ট তো আর বিসিআই-এর কিংবদন্তী মাসুদ রানা নয়! ‘তারা তোমাকে সব ধরনের তথ্য ও অস্ত্র দেবে। তাদের হাতে মারা গেছে এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নের মাফিয়া দলের ক’জন। তার ওপর মিলিটারি থেকে সরাসরি সাহায্য পাচ্ছে ড্রাগ লর্ডেরা। তাই সে-দেশে ঢুকে নতুন কোন আন্তর্জাতিক বদনাম চাইছে না তারা। …এখন তুমি কী বলো, রানা? যাবে এল সালভেদরে? ডিআইএ চিফ কথা দিয়েছেন, তুমি গ্রেফতার হলে তোমাকে ওখান থেকে বের করে আনবেন তিনি। আমাদেরও চোখ থাকবে এল সালভেদারিয়ান সরকারের ওপরে।’
‘আমি যেতে রাজি, স্যর,’ দ্বিধা না করেই বলেছে রানা। ‘গুড,’ বললেন বিসিআই চিফ। ‘তা হলে ডিআইএ চিফকে জানিয়ে দেব যে তুমি যাচ্ছ। সেক্ষেত্রে আজ রাতেই বিমানে চেপে কয়েক দেশ ঘুরে পৌঁছুবে মেক্সিকোয়। একবার সেখানে গেলে ওখান থেকে তোমাকে এল সালভেদরে পৌঁছে দেবে ডিআইএর বোট।’
সরাসরি রানার চোখে তাকালেন রাহাত খান। ‘আরেকটা কথা, রানা। তোমার মিশন শেষ হলে সরাসরি ফিরে আসবে বাংলাদেশে। তখন তোমার নেতৃত্বে গড়া হবে ছোট একটা টিম।’ চুরুটে টান দিয়ে কী যেন ভাবছেন বস্। একটু পর বললেন, ‘তুমি তো জানো, বাংলাদেশের মানুষের ওপর খুব বাজে প্রভাব ফেলেছে লাখ লাখ বাস্তুহারা রোহিঙ্গা। ইয়াবার মত ভয়ঙ্কর সব ড্রাগ এদের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা দেশে। চরমভাবে আসক্ত হচ্ছে বাঙালি ছেলেমেয়েরা। মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ধসে যাচ্ছে হাজারো পরিবার। অথচ আমাদের সরকারের উচিত ছিল বহু আগে রোহিঙ্গাদের অন্যায়-অনাচারকে রুখে দেয়া।’
খুক-খুক করে কাশলেন চিফ। রানার চোখে আবারও স্থির হলো তাঁর কঠোর চোখ। ‘গত কয়েক বছরে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকেছে দক্ষিণ-পুবের জেলাগুলোতে। এরা প্রায় সবাই নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখেছে ইয়াবার মত ভয়ঙ্কর সব ড্রাগ চোরাচালানে। বিশেষ করে এখানে বসে মায়ানমারের কাঁচা রসদ পেয়ে ইয়াবার কারখানা করেছে এরা। জোগানদারদের প্রশ্রয় পেয়ে যা খুশি করছে। অথচ আন্তর্জাতিক দু’চোখা নীতির কারণে আমাদের সরকার এদেরকে মায়ানমারে ঘাড় ধরে ফেরত পাঠাতে পারবে না। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের লাখ লাখ মানুষ। সুতরাং রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে যারা ক্ষতিকর কিছু এ- দেশে পাচার করছে, এবার মায়ানমারে ঢুকে তাদের শিকড় উপড়ে দেবে তোমরা।’
‘তার মানে, স্যর, ড্রাগ তৈরির রসদ যেন রোহিঙ্গাদের কাছে না আসে, সেটা আমরা নিশ্চিত করব,’ বলল রানা।
মাথা দোলালেন বিসিআই চিফ। ‘তুমি ফিরলে সরকারি কিছু এজেন্সির চিফসহ বিস্তারিত আলাপ করব আমরা।’
টেবিল থেকে লাল একটা ফাইল নিলেন তিনি। অর্থাৎ, তুমি এবার যেতে পারো।
সোনসোনেট কারাগারের করিডর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাস্তবে ফিরে এল রানা। মুখে ফুটল তিক্ত একটুকরো হাসি।
বড় চারটে ড্রাগের কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছে ও। তৃতীয় দিনে এক মিটিঙের খবর পেয়ে সেখানে হামলা করে শেষ করেছে প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নেসহ চার ড্রাগ লর্ডকে। কিন্তু এরপর মাথায় ভেঙে পড়ল আস্ত আকাশ। ওর পেছনে লেলিয়ে দেয়া হলো এল সালভেদারিয়ান মিলিটারিকে। জঙ্গলে রানার হাতে খুন হলো নয়জন সৈনিক ও অফিসার। আগেই ফুরিয়ে গিয়েছিল ওর অস্ত্রের গুলি। শেষ দু’জনকে খতম করেছে বুবি ট্র্যাপ তৈরি করে। এদিকে বুকে ও উরুতে দুটো গুলি। প্রচুর রক্তক্ষরণে একসময় হারিয়ে গেল চেতনা। জ্ঞান ফিরতে নিজেকে দেখল জঘন্য কারাগার সোনসোনেটের হাসপাতালে। সুস্থ হওয়ার আগেই কর্তৃপক্ষ জানাল, প্রাইম মিনিস্টারের নির্দেশে আদালতে উঠবে না ওর কেস। আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সুপ্রিম কোর্ট থেকে রায় ঘোষিত হলো- দেশের চরম শত্রু বিদেশি লোক মাসুদ রানাকে ফাঁসি দেয়া হবে তিন মাস পর। এরপর থেকে রানা আছে এই কারাগারে। ডিআইএ থেকে কোন সাহায্য আসেনি। এমন কী তাদের তরফ থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি কেউ। ক’দিন আগে শুনেছিল, এল সালভেদারিয়ান সরকারের কাছে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল, যেন তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় রানাকে। তবে তাতে কোন সাড়া দেয়নি এল সালভেদরের সরকার।
পিঠে শটগানের নলের খোঁচা খেয়ে হাঁটার গতি বাড়াল রানা। মিনিটখানেক পর পৌঁছে গেল হাতিম আল-রহিমের সেলের সামনে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে কামরার ভেতরে ঠেলে দেয়া হলো ওকে। বিশালদেহী আরবের দিকে চেয়ে ওর মনে হলো, শেকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ভীষণ হিংস্র এক জলহস্তি। আগে কখনও তাকে দেখেনি রানা। তার সম্পর্কে কিছু শোনেওনি। অবশ্য কারও কিছু বলতে হবে তা নয়, লোকটার চোখে-মুখে নীচতা দেখেই যা বোঝার বুঝে গেছে ও।
জেল সুপারের দিকে তাকাল রানা। হলদে দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে লোকটা। এক ক্যামেরাম্যান ব্যস্ত হয়ে ভিডিয়ো তুলছে রহিমের।
‘আমাকে এখানে আনা হয়েছে কেন?’ ইংরেজিতে বলল রানা।
‘লড়ে জেতার জন্যে,’ বলল ওয়ার্ডেন।
চুপ করে থাকল রানা।
‘লড়াই শুরু করো!’ চেঁচিয়ে উঠে নির্দেশ দিল জেলার।
মজিদ আল-কবিরকে কিছুই বলতে হলো না, স্বজাতি হাতিম আল-রহিমের ওপরে ক্ষুধার্ত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। হাত তুলে তার আক্রমণ ঠেকাল পাহাড়ের মত উঁচু আল-রহিম। ডান হাঁটু তুলে প্রচণ্ড এক গুঁতো দিল মজিদের বুকে। তার মারে এত জোর, ভুস্ করে বুক থেকে বাতাস বেরিয়ে গেল মজিদের। সে পিছিয়ে আসার আগেই বামহাতে খপ্ করে তার মুখ চেপে ধরল হাতিম। ডানহাতে শত্রুর নাকের ওপরে বসাল প্রচণ্ড এক ঘুষি। পরের মাত্র দশ সেকেণ্ডে আলুর ভর্তা হয়ে গেল মজিদের মুখ। ভারসাম্য রাখতে না পেরে ধুপ করে মেঝেতে পড়ল সে।
সিগার মুখে নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে মারামারি দেখছে জেল সুপার। কিন্তু চট্ করেই শেষ হয়ে গেছে লড়াই। পরের পাঁচ সেকেণ্ডে মজিদের পাশে বসে তার ঘাড় মটকে দিল হাতিম আল-রহিম। উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের জোরে এক লাথি মেরে কয়েক ফুট দূরে ছিটকে ফেলল লাশটা। এবার রানার দিকে ঘুরে তাকাল হাতিম। কয়েক পা এগোল সে, তবে শেকলের কারণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারল না রানার ওপরে।
হাতিমের দিকে চেয়ে আছে রানা। নিজে থেকে আক্রমণ করার কোন আগ্রহ নেই ওর।
অধৈর্য হয়ে উঠল কারাগারের সুপার। পকেট থেকে একটা চাবি নিয়ে ছুঁড়ে দিল হাতিমের দিকে। খপ্ করে চাবিটা ধরল আরব খুনি। তার সময় লাগল না গলার কলারের তালা খুলে নিতে। আবার তাকাল সে রানার দিকে। এবার বুকের ভেতর থেকে বেরোল ঘড়ঘড়ে গর্জন। পরক্ষণে বাংলাদেশি কয়েদীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।
বিদ্যুদ্বেগে বারকয়েক মার্শাল আর্টের কিছু কৌশল কাজে লাগাল রানা। তাতে সময় নিয়েছে বড়জোর সাত সেকেণ্ড। মড়াৎ করে ভেঙে গেছে হাতিমের পাঁজরের তিনটে হাড়। তার একটা গেঁথে গেছে ফুসফুসে। চুরমার হয়েছে হাতিমের বাম চোয়ালের হাড়। নাক এখন নেই। বিশাল রেডউড গাছের মত দড়াম করে মেঝেতে পড়ল হাতিম আল-রহিম। এই পতনে থরথর করে কেঁপে গেল গোটা ঘর।
নির্বিকার চেহারায় জেল সুপারের দিকে তাকাল রানা। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও একদম স্বাভাবিক। নিচু গলায় বলল রানা, ‘আমি কি এবার যেতে পারি?’
হতবাক হয়ে ওকে দেখছে স্কাউটের প্রতিনিধি।
রানার চেহারা যুম করে ডার্টি গেম শো-র প্রযোজকের কাছে ভিডিয়ো পাঠাল ক্যামেরাম্যান।
.
এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মাসুদ রানাকে। এইমাত্র যে লড়াই দেখেছে স্টিল, তাতে চমকে না গিয়ে পারেনি সে। স্যাটেলাইট ফোনে জানতে চাইল, ‘এই লোক আসলে কে? কোথা থেকে এসেছে?’
‘এই লোক কি আরব?’ জানতে চাইল এমিলি।
‘না, সে আরব নয়,’ বলল স্কাউটের প্রতিনিধি, ‘আমাদের আরব এখন মৃত্যুযাত্রী।’ জেলারের দিকে তাকাল সে। ‘এই লোক আসলে কোথাকার?
নিচু গলায় কী যেন বলল জেলার।
শুনতে পেল না এমিলি।
সিওয়ার্সের দিকে তাকাল স্টিল। ‘এর খোঁজ নাও।’
বস্ নিজে থেকে কিছু বলার আগেই এল সালভেদারিয়ান পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কমপিউটার ডেটাবেস-এ ঢুকে পড়েছে হ্যাকার সিওয়ার্স। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ‘এর নামে যা আছে, ডাউনলোড করেছি। সে একজন বাংলাদেশি খুনি। এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নে আর কয়েকজন ড্রাগ লর্ডকে খুন করেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে ড্রাগের কারখানা। তার হাতে মরেছে সবমিলিয়ে আঠারোজন লোক। তাদের ক’জন আবার মিলিটারি পার্সোনেল। তাকে ধরতে সাহায্য নেয়া হয়েছে এল সালভেদারিয়ান মিলিটারির। সুপ্রিম কোর্টের কয়েক মাস আগের এক রায় অনুযায়ী সাত দিন পর ফাঁসি হবে তার। যদিও যাদেরকে খুন করেছে, তাদের সবাই ছিল ড্রাগ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ‘
‘অর্থাৎ, সে একজন ভাল মানুষ?’ ভুরু কুঁচকে ফেলল স্টিল। ‘তা হলে তো আমাদের চলবে না!’
‘তার ওপর এই লোক মুসলিম হলেও আরব নয়,’ বলল এমিলি। ‘বস্, আপনি না একজন আরব ক্রিমিনাল চাইছেন?’
‘আরব আর চাই না, মাসুদ রানার মারামারির দক্ষতা দেখে তাকেই আমার ভাল লেগেছে।’
তর্ক করার সাহস নেই এমিলির। বহু কিছু শিখেছে বসের কাছ থেকে। মনে স্বপ্ন, একদিন নিজে তৈরি করবে রিয়েলিটি শো। ‘তা হলে, বস্, আমরা কি ওকে কিনব?’
তরুণেরা যেভাবে ঝকঝকে নতুন ফেরারি গাড়ি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়, সে-দৃষ্টিতে রানাকে দেখছে স্টিল। নিচু স্বরে বলল সে, ‘হ্যাঁ, আমার ওকেই চাই!’
পাঁচ
দু’পায়ে বেড়ি ও হাতে হ্যাণ্ডকাফ নিয়ে প্রাইভেট গাল্ফ্স্ট্রিম জি৫৫০ জেট বিমানের সিটে বসে আছে মাসুদ রানা। ওকে পাহারা দিচ্ছে চারজন রেণ্ট-আ-গার্ড। আটজন যাত্রীবাহী বিমানে পাইলট ছাড়া ওরা আছে পাঁচজন। ওকে কোথায় নেয়া হচ্ছে, সে-ব্যাপারে কোন ধারণা নেই রানার। কারাগার থেকে বেরোবার সময় বুঝে গেছে, আপাতত মুক্তি পাবে না ও।
গার্ডদের কাছে শুনেছে, কারা যেন অভিনয় করাবার জন্যে আরব খুনি হাতিম আল-রহিমের অডিশন নিত, কিন্তু সে খুন হওয়ায় একই কাজের জন্যে মনোনীত করা হয়েছে রানাকে। অ্যান্টেনাসহ ভিডিয়ো ক্যামেরা আর এসইউভির স্যাটেলাইট ডিশ দেখে ও বুঝে গেছে, দূর থেকে লড়াই দেখেছে কেউ।
এয়ারপোর্টে ওকে তোলা হলো বিমানে। গার্ডেরা জানাল, রেস্টরুমে গিয়ে যেন হাত-মুখ ধুয়ে নেয় রানা। সর্বক্ষণ বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের নল ওর ওপরে তাক করে রাখল চার গার্ড। রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে সিটে ফেরার পর কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিল রানা। জেগে উঠে জানালা দিয়ে দেখল আকাশের কোথায় আছে সূর্য। ওর ভুল না হলে বিমান আছে পাপুয়া নিউ গিনির উত্তর উপকূলে এইটেপ শহরের কাছে। তারপর একসময়ে ব্যক্তিগত সরু এক এয়ারস্ট্রিপে নেমে পড়ল জেট বিমান। ওটা স্থির হতেই বড় এক হ্যাঙার থেকে ওদের দিকে এল এক লোক। সিভিলিয়ান হলেও তার পরনে কমব্যাট ফেটিগ। লালচে চেহারা দেখে তাকে আমেরিকান বলে মনে হলো রানার। দৈর্ঘ্যে সে ছ’ফুটের বেশি। তারের মত টানটান দেহ। কোমরের হোলস্টারে অটোমেটিক পিস্তল। বিমানের দরজা খুলে যেতেই গার্ডদের ইশারা করল সে। কড়া চোখে দেখল রানাকে।
রানার মনে প্রশ্ন জাগল, এই লোক কি সিকিউরিটি চিফ? সেক্ষেত্রে কার হয়ে কাজ করে সে?
রানা এখনও জানে না লোকটার নাম রিভ সিম্পসন। বয়স পঁয়ত্রিশ। আগে চাকরি করত নিউ ইয়র্ক পুলিশে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বদনাম ছিল তার। বন্দিদের পিটিয়ে আহত করেছিল বলে পুলিশবাহিনী থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। এরপর চালু করেছে প্রাইভেট সিকিউরিটি ফার্ম। কিছু দিনের ভেতরে প্রচার হয়ে গেল, ক্লায়েন্টের জন্যে বড় কোন অপরাধ করতে দ্বিধা করে না সিম্পসন। বছরদুয়েক আগে ফ্লোরিডায় কিউবান মাফিয়ার সঙ্গে গোলমাল হওয়ায় তাকে ভাড়া করেছিল ব্র্যাড স্টিল। একরাতে তার কাছ থেকে চাঁদা নিতে এসে খুন হলো মাফিয়ার দু’জন মস্তান। উধাও হলো আরও দুই কিউবান যুবক। এরপর ব্র্যাডকে ঘাঁটাতে আসেনি কিউবান মাফিয়া। হাজার হাজার ডলার খরচ করে সিম্পসনের সেবা গ্রহণ করছে স্টিল।
কিছু দিন পর এক গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরল ব্র্যাডের, প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রডিউসার। চালককে গ্রেফতার করতে পারল না পুলিশ। স্টিলের মতই একই ধরনের শো তৈরি করবে বলে ভেবেছিল আরেক প্রযোজক। টেস্ নদীর ভাটিতে পাওয়া গেল তার লাশ।
আসলে দামি ক্লায়েন্টের জন্যে বেআইনী যে-কোন কাজ করতে আপত্তি নেই সিম্পসনের। ভাল করেই জানে, দুনিয়ায় সবচেয়ে জরুরি জিনিস হচ্ছে টাকা। আর সেটা স্টিল খরচ করলে তার কাজ কেন করে দেবে না সে!
‘নেমে এসো,’ হ্যাঙারের দিকে ইশারা করল সিম্পসন।
তাকে অপছন্দ করছে রানা। পিঠে এক গার্ডের অস্ত্রের নলের খোঁচা খেয়ে সিম্পসনের পিছু নিল ও।
.
ওদিকে হ্যাঙারের ভেতরে জমে গেছে নাটক।
পেছনের দেয়ালের ব্র্যাকেটে হাত-পায়ের শেকল আটকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে নয়জন প্রতিযোগীকে। একটু দূরে তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে বারোজন সশস্ত্র গার্ড। নানান ভাষায় প্রতিবাদ করছে দাগী আসামীরা। তাদের কেউ কেউ বেশি গালাগালি করলে তাদের কাঁধে নামছে অস্ত্রের বাঁট।
দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে গালি দিচ্ছে জাপানি খুনি কাইতো তানাকা। তার কাঁধে অ্যাসল্ট রাইফেলের বাঁট নামাতে গিয়ে মুখে গোটা সাতেক ঘুষি আর পাছায় জোর এক লাথি খেয়ে ছিটকে দূরের মেঝেতে পড়ল এক গার্ড। তানাকার বয়স বড়জোর আটাশ। চিকন হলেও শক্তপোক্ত দেহ। উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট হলেও ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক ইয়াকুযা লড়াকু সে। কুং-ফুতে ডাবল ব্ল্যাক বেল্ট। তলোয়ার, ছোরা ও পিস্তল ব্যবহারে ওস্তাদ। এরই মধ্যে খুন করেছে বিশজন মানুষকে। তাদের আটজন আবার মহিলা।
হ্যাঙারে ঢুকে কয়েদীদের ডান গোড়ালিতে একটা করে ব্রেসলেট দেখতে পেল রানা। ইলেকট্রনিক জিনিসটার ভেতরে আছে মাইক্রোচিপ্স্ ও এলইডি স্ক্রিন। ওর গোড়ালিতেও একই জিনিস আটকে দেবে এরা, ভাবল ও।
হ্যাঙারে আছে প্রাইভেট বেল জেটরেঞ্জার চপার। মডেল দেখে চিনতে পারল রানা। ২০৬বি-৩। পাইলটকে বাদ দিলে সবমিলিয়ে ওটা বহন করবে পাঁচজন যাত্রী। যান্ত্রিক ফড়িঙের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন-বছর তিরিশেকের সুপুরুষ এক লোক, অন্যজন অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে।
রানা জানে না, আসার পথে ফোন করে সিম্পসনকে শান্ত করেছে পৌরুষদীপ্ত লোকটা। সে এতই ব্যস্ত, জরুরি কিছু কথা তাকে বলতে পারেনি তার সঙ্গিনী।
নারী সাংবাদিক ডায়ানার সাক্ষাৎকার প্রকাশ হতেই গোটা দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে ডার্টি গেম শো-র বিশ্রী প্রচারণা। ওটা যে বড়দের শো সেটা বুঝে গেছে সবাই। অথচ ব্র্যাড বলেছিল সামলে নেবে সব। ওর প্রেমিক এবার কী করবে, সেটা দেখার জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে রিটা। আশা করছে, কোন ধরনের অন্যায়ে নিজেকে জড়াবে না ব্র্যাড।
ক্রিমিনালদের জন্যে উপযুক্ত পোশাক দেয়ার কাজ নিয়েছে রিটা। এখানে এসেছে সেজন্যে। আগে কখনও নিজের চোখে কোন খুনিকে দেখেনি। তবে হ্যাঙারে ঢুকে ভয়ে শুকিয়ে গেছে ওর বুক।
রাশান দানব ম্যানইয়া লোপাতিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চমকে গেল রিটা। হাত-পায়ের শেকল ছেঁড়ার জন্যে টানাহেঁচড়া করছে দৈত্য। গলার গভীর থেকে বেরোচ্ছে চাপা গর্জন। স্বর্ণকারের চোখে তাকে দেখছে স্টিল। লোপাতিনের পরনে ছেঁড়া সাদা শার্ট ও কারাগারের সবুজ প্যান্ট। চারকোনা মাথা ঘুরিয়ে লোভী চোখে বারবার দেখছে রিটাকে।
আনমনে বড় করে ঢোক গিলল রিটা।
প্রেমিকা আতঙ্কিত সেটা বুঝে জানতে চাইল স্টিল, ‘ওকে দেখে কী বুঝলে?’
‘আমি ওর ধারেকাছে যেতে চাই না।’ খসখস করে প্যাডে কয়েকটা শব্দ লিখল রিটা। ‘এর কোন পোশাক লাগবে না।’
একই কথা প্রযোজ্য বেশিরভাগ ক্রিমিনালের ক্ষেত্রে। এরা এসেছে মরণপণ লড়াই করতে। আর তাদের হিংস্রতা দেখার জন্যেই টিকেট কেটে শো দেখবে কোটি কোটি মানুষ।
ডেরেক স্লাইডারের সামনে থামল স্টিল আর রিটা। জার্মান নাৎসির বয়স হবে পঞ্চাশ। চোখের ধূসর মণির মতই একই রঙের ছেঁটে রাখা মাথার চুল। পরনে আস্তিন ছাড়া গেঞ্জি। বাইসেপে মিলিটারি উল্কি। লোকটার বয়স হলেও দেহে আছে প্রচণ্ড শক্তি। বাবা-মা ডেরেক স্লাইডার নাম দিলেও কারাগার কর্তৃপক্ষ তাকে ডাকত নাৎসি বা কসাই বলে। যখন মিলিটারি কমাণ্ডার ছিল সে, এরিয়ান জাতির না হলে প্রথম সুযোগে গোপনে নিধন করেছে অন্য জাতির বৃদ্ধ- বৃদ্ধা-যুবক-যুবতী ও শিশু—রেহাই ছিল না কারও। তার দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চিফ। ছোটবেলায় তার কাছে স্নাইডার শুনেছে ভয়ঙ্কর সব গল্প। সারাজীবন আফসোস করেছে, কেন জন্মাতে পারল না হিটলারের সময়ে।
স্টিল বা রিটার দিকে তাকাল না নাৎসি, সম্পূর্ণ মনোযোগ মেক্সিকান স্বামী-স্ত্রী আর দুই কৃষ্ণাঙ্গের ওপরে।
‘অ্যাই, তুমি নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবো, তাই না?’ স্টিলের উদ্দেশে বলল ইসাবেলা আলকারায। ‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি আসলে নর্দমার নোংরা একটা কেঁচো!’
জবাবে মৃদু হাসল স্টিল। মেয়েটাকে পাশ কাটাবার আগে একবার দেখল ওর স্বামীকে। লোকটার নাম আলেক্যান্দ্রো আলকারায। স্বামী-স্ত্রী মিলে গুয়েতেমালায় দোকানি ও পেট্রল স্টেশন কর্মচারীদের কাছ থেকে লুটপাট করত টাকা। বাধা এলে দ্বিধা করত না গুলি করতে। এদের চোখে নগ্ন আতঙ্ক দেখে মনে মনে হাসল স্টিল। বুঝে গেছে, একবার লড়াই শুরু হলে সবচেয়ে আগে মরবে এরা।
‘তুমি নিজেকে খুব সুন্দরী মনে করো, তা-ই না?’ রিটার দিকে তাকাল ইসাবেলা, ‘অথচ তুমি আসলে নোংরা কেঁচোটার পোষা পতিতা!’
‘ওকে ভুলেও পাত্তা দিয়ো না,’ রিটাকে বলল স্টিল।
আগের জায়গায় রয়ে গেছে রিটা। অপছন্দ করেছে স্বামী-স্ত্রীর জুটি। তাদের প্রতি ওর মনে রইল না সামান্যতম করুণা।
সুন্দরী এক কৃষ্ণাঙ্গিনীর সামনে থেমেছে স্টিল। মেয়েটার নাম রোযি ইয়াসিমান। দুনিয়ায় যেসব কৃষ্ণাঙ্গিনী সুপার মডেল আছে, রূপের দিক থেকে তাদের চেয়ে কম নয় সে। কফি রঙের ত্বক মাখনের মত মসৃণ। দীর্ঘ আঁখি পল্লব খুব সুন্দর। হীরার মত জ্বলজ্বল করছে খয়েরি মণি। কাঁধে যত্নহীন কোঁকড়া চুল। রোযিকে দেখলে দু’বার ঘুরে দেখবে যে-কেউ। আলাদা কোন পরিবেশে ওকে দেখলে মুগ্ধ হতো স্টিল। এখন খুনির শীতল চোখে তাকে দেখছে যুবতী।
দক্ষিণ আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে এলেও তুখোড় মগজ মেয়েটার। কিশোরী বয়সে বুঝে গেছে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে স্রষ্টাদত্ত রূপ। দৈহিক প্রেমের ফাঁদে ফেলে নানান সুবিধা নিত ধনীদের কাছ থেকে। তারপর প্রাণে বাঁচতে দিত না তাদের কাউকে।
রোযি ইয়াসিমানের মুখ থেকে সরে তার বুকে স্থির হলো স্টিলের চোখ। মেয়েটার পরনে ট্যাঙ্ক টপের ওপরে জেলখানার ময়লা পুরনো সাদা শার্ট।
‘খুলে নাও এর শার্ট,’ রিটাকে জানাল স্টিল। ‘মনে রাখবে আমরা আছি শো বিযনেসে।’
শুনতে খারাপ লাগলেও কথা যৌক্তিক। শার্ট খুলে নিলে রোযি ইয়াসিমানকে আরও আকর্ষণীয় দেখাবে। এক এক করে তার শার্টের বোতাম খুলল রিটা। বাধা দিল না রোযি। নিষ্পলক চোখে দেখছে রিটাকে।
রিটার মনে হলো, চোখের দৃষ্টি দিয়ে ওকে পটাতে চাইছে মেয়েটা।
সামনে বেড়ে অন্যান্য বন্দির ওপরে চোখ বোলাল স্টিল। ‘আরে, নতুন ক্রিমিনাল কোথায়? ওই যে বাঙালি লোকটা?’
‘এখানে,’ হাতের ক্লিপবোর্ডে রাখা কাগজে টিক চিহ্ন দিল সিম্পসন। ‘এইমাত্র পায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে ব্রেসলেট।’
পাশ কাটাবার সময় ইংরেজ খুনি রুপার্ট শ্যাননকে দেখল স্টিল। জবাবে বড় বড় দাঁত বের করে হাসল প্রাক্তন এসএএস মেজর। তার দেহ গ্র্যানিট পাথরের মত নিরেট। চৌকো চোয়াল বলছে সে ভয়ঙ্কর জেদী ও আক্রমণাত্মক। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। লালচে চোখদুটো সাইকোপ্যাথের।
তার পাশের শেকলে আছে আফ্রিকান-আমেরিকান ড্রাগ ডিলার জনি এস. ক্লার্ক। সুদর্শন, বুদ্ধিমান ও সতর্ক এক কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধী। লস এঞ্জেলেসের মানুষ। ওখানে কয়েকটা খুন করে পালিয়ে গিয়েছিল মালোয়েশিয়ায়। কিন্তু ওখানে ড্রাগের কারবার করার সময় ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। সে-দেশের আইন অনুযায়ী ফাঁসির রায় হয়েছে তার।
‘তোমাকে কোথা থেকে এনেছে?’ ফিসফিস করে শ্যাননের কাছে জানতে চাইল ক্লার্ক।
কঠোর চোখে ওকে দেখল প্রাক্তন মেজর। ‘ফালতু কথা বন্ধ করো। তোমাকে দেখে এমনিতেই বিরক্তি লাগছে।’
‘এত বিরক্তির কারণ কী?’
জবাবে বাঁকা হাসল শ্যানন। কালো লোকটাকে খুন করতে ভাল লাগবে তার।
‘রুপার্ট শ্যানন এসেছে ইংল্যাণ্ড থেকে,’ ক্লিপবোর্ড থেকে মুখ তুলে বলল সিম্পসন। ‘আগে ছিল এসএএস ফোর্সে। তিনবার গেছে রুয়াণ্ডায় মিশনে। খুন করেছে সবমিলিয়ে একুশজনকে। ধর্ষণ করেছে নয়জন মেয়েকে। তার ভেতরে তিনজন ছিল পাঁচ বছরের নিচের শিশু। চরম নির্যাতন করেছে প্রত্যেককে।’ প্রশংসার চোখে প্রাক্তন মেজরকে দেখল সে। ‘আশা করি ভালভাবেই লড়বে সে!’
‘ওর সঙ্গে আমার আগেও ফোনে কথা হয়েছে,’ বলল স্টিল।
ফ্যাকাসে হয়ে গেছে জনি এস. ক্লার্কের মুখ। নিচু গলায় বলল শ্যাননকে, ‘তুমি কি পাগল নাকি? তোমার সমস্যাটা কী? ‘
‘কেলেকুত্তা, গলায় পাড়া দিয়ে আমি তোকে খুন করব,’ শীতল হাসল শ্যানন।
অন্যদিকে তাকাল ক্লার্ক। তার চোখ আটকে গেল রোযি ইয়াসিমানের ওপরে। কথাগুলো শুনতে পেয়েছে যুবতী। তার চোখে ভয় দেখল ক্লার্ক। ওর মতই মানুষ খুন করেছে মেয়েটা, তবে সেটা করেছে প্রয়োজনে, ফূর্তির জন্যে নয়। পরস্পরের দিকে কয়েক সেকেণ্ড চেয়ে রইল ওরা।
এদিকে গোড়ালিতে ব্রেসলেট আটকে দেয়ার পর ওটা খেয়াল করে দেখেছে রানা। ওর বুঝতে দেরি হয়নি, জিনিসটার ভেতরে আছে জিপিএস, ঘড়ি ও বিস্ফোরক। ব্রেসলেট থেকে একটু বেরিয়ে আছে লাল একটা ট্যাব। ওটা বোধহয় কাজ করবে গ্রেনেডের পিনের মত। ফেটে যাওয়ার আগেই প্রথম সুযোগে ডিসআর্ম করতে হবে বোমা, ভাবল রানা।
এই ব্রেসলেট স্টেট-অভ-দি-আর্ট। ভেতরে আছে সি- ফোর আর অ্যান্টি-টেম্পারিং মাইক্রোচিপ্স্।
রানাকে সামনে রেখে এক ইতালিয়ানকে পাশ কাটাল দুই গার্ড। ইতালিয়ানের বয়স চল্লিশ। মাথার পনি টেইল করা চুল কালো হলেও পেকে গেছে দাড়ি। দুই গার্ডের উদ্দেশে নিচু স্বরে বলল সে, ‘চাবি দিয়ে দে, ভাই! আমাকে ছেড়ে দে! বদলে তোদের মেলা টাকা দেব! যা চাস্, তা-ই দেব!’
তাকে পাত্তা না দিয়ে রানাকে নিয়ে এগোল গার্ডেরা। ঝড়ের বেগে কথা বলে এনযো বিয়াঞ্চি। বেশিরভাগ সময় তার মেজাজ থাকে তিরিক্ষি। আর সেজন্যেই স্ত্রী, শ্বশুর আর শাশুড়িকে গুলি করে মেরেছে সে। তাদেরকে বাঁচাতে এসেছিল প্রতিবেশীরা। তারাও মরেছে বিয়াঞ্চির গুলি খেয়ে। গণহত্যা করার আগে, পুরনো ফিয়াট গাড়ি বিক্রি করত। আদালত থেকে ফাঁসির রায় হওয়ায় পত্রিকাগুলো তার নাম দিয়েছিল ঝোড়ো মুখের খুনি।
অন্যদের চেয়ে একটু দূরে দেয়ালের স্টিলের ব্র্যাকেটে রানার শেকল আটকে দিল একজন গার্ড। সেটা দেখে এগিয়ে এল স্টিল। ‘হাই! আমি ব্র্যাড স্টিল। টিভি শো প্রডিউসার।’
‘তা-ই?’ সহজ সুরে বলল রানা।
‘তুমি বোধহয় আগেও আমার নাম শুনেছ?’
‘আমি খুব একটা টিভি দেখি না,’ বলল রানা। গত বারো ঘণ্টার ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবছে। কারাগারে ভেবেছিল ওকে খুন করবে এল সালভেদারিয়ান মিলিটারির সদস্যরা। কিন্তু পরে ভাবল এসবের পেছনে আছে সিআইএ। কারাগারে তারাই এনেছে অ্যান্টেনাসহ হাই-টেক ভিডিয়ো ক্যামেরা, যাতে ওর মৃত্যুর ভিডিয়ো করা যায়।
ক্যামেরাম্যান ও তার সহযোগী আসার কিছুক্ষণ পর এল কয়েকজন সশস্ত্র লোক। ওকে নিয়ে তোলা হলো বিমানে।
আর এখন এ-দ্বীপে এসে ওর মনে হচ্ছে, এসবের পেছনে আছে দামি পোশাক পরা ব্র্যাড স্টিল নামের লোকটা। খুনিদের রহস্যময় কোন রিয়েলিটি শো তৈরি করবে সে।
একটা ফোল্ডিং চেয়ার ওকে এগিয়ে দিল স্টিল। ‘বোসো।’
ভিডিয়ো তুলতে এসেছে এক ক্যামেরাম্যান। রানা চেয়ারে বসতেই ঝনঝন আওয়াজ তুলল ওর পায়ের শেকল।
স্টিলের পাশে থামল রিটা। অন্য খুনিদেরকে যেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে, সেভাবেই দেখছে রানাকে। কলম দিয়ে খসখস করে কী যেন লিখল নোটপ্যাডে।
‘আমরা তোমাদেরকে এক দ্বীপে নেব,’ বলল স্টিল। ‘ওখানে পরের ত্রিশ ঘণ্টায় একে অপরকে খুন করবে তোমরা। শেষে বাঁচবে মাত্র একজন। আর তাকে দেয়া হবে সুটকেস ভরা ডলার। দক্ষিণ-পুব এশিয়ার কোন দেশে আত্মগোপন করার সুযোগ পাবে সে। তোমাদের কেমন লাগছে আমার প্রস্তাব?’
‘এর সঙ্গে টিভি শো-র কিসের সম্পর্ক?’ জানতে চাইল রানা।
‘টিভি নয়, ইন্টারনেট। ওয়েব-এ কোটি কোটি মানুষ দেখবে তোমাদের দশজনের মরণপণ লড়াই।’
ব্র্যাড স্টিলের দিকে চেয়ে রানার মনে হচ্ছে, এইমাত্র শুনেছে মানসিক এক রোগীর প্রলাপ।
রেপুটেশন শিটের জন্যে সিম্পসনের দিকে তাকাল স্টিল। তার হাতে ক্লিপবোর্ড ধরিয়ে দিল সিকিউরিটি চিফ। পৃষ্ঠা উল্টে দশম পাতায় এসে থামল প্রযোজক। কাগজে আছে তিনটে প্যারাগ্রাফ। হতাশা নিয়ে মাথা নাড়ল সে। ‘ব্যস? আর কিছুই নেই? নাম মাসুদ রানা। বাংলাদেশি। বড় কয়েকটি ড্রাগ কারখানা উড়িয়ে দিয়েছে। হামলা করে খতম করে দিয়েছে এল সালভেদরের প্রাইম মিনিস্টারের ভাগ্নেসহ কয়েকজন ড্রাগ লর্ডকে। গোটা মিলিটারিকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল এর পেছনে। জঙ্গলে তার হাতে খুন হয়েছে নয়জন সৈনিক ও অফিসার। ফুরিয়ে গিয়েছিল অস্ত্রের গুলি। শেষ দু’জনকে খতম করেছে বুবি ট্র্যাপ তৈরি করে। জঙ্গলে বুকে আর উরুতে গুলি লাগলে প্রচুর রক্তক্ষরণে জ্ঞান হারায়। তারপর তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় টপ প্রায়োরিটি জেলখানা সোনসোনেটে। প্রাইম মিনিস্টারের নির্দেশে কোর্টে তোলা হয়নি এর কেস। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সুপ্রিম কোর্ট থেকে রায় দেয়া হয়েছে-এর ফাঁসি হবে তিন মাস পর। এরপর থেকে কারাগারে ছিল।’ রানার দিকে তাকাল স্টিল। ‘আর কোন অন্যায় করোনি তুমি?’
চুপ করে থাকল রানা।
‘অন্যদের মত এরও ভাল বায়োগ্রাফি চাই,’ আনমনে বলল স্টিল। রানার দিকে তাকাল। ‘এল সালভেদরে কী করছিলে?’
‘গায়ের ত্বক ট্যান করছিলাম,’ বলল রানা।
‘ড্রাগের কারখানাগুলো কেন উড়িয়ে দিলে?’
‘ওগুলোর কারণে গায়ে রোদ পড়ছিল না।’
‘আগে কী ধরনের কাজ করতে?’
‘ইনটেরিয়ার ডেকোরেটরের কাজ।’
বিরক্ত হলো স্টিল। ‘আগে কোথায় ছিলে?’
‘সাইবেরিয়া,’ গম্ভীর চেহারায় স্টিলকে দেখল রানা।
‘সাইবেরিয়া? ওখানে কেন?’
‘ছয় প্রেমিকা সঙ্গে নিয়ে বরফে ভরা এক পুকুরে নেমে ফূর্তি করছিলাম।’
বিরক্তির মাত্রা বাড়ল স্টিলের। ঘাড় কাত করে দেখল রিটাকে। ‘এর নতুন অটোগ্রাফি চাই। আগে ছিল টেক্সাসে। আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এক এতিমখানায়। ফলে খুন হয়ে গেছে বিশজন ছেলেমেয়ে। বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে দুটো ব্যাপটিস্ট চার্চ। বহু দিন ধরেই তাকে খুঁজছে এফবিআই…’
ঝড়ের বেগে বলছে সে, আর নোট নিচ্ছে রিটা।
‘দক্ষিণ আমেরিকায় উড়িয়ে দিয়েছে পঙ্গু ও অটিসটিক বাচ্চাদের এক ক্লিনিক। বিস্ফোরণে মরেছে চোদ্দজন মহিলা ও বত্রিশজন বাচ্চা। আরও যা মাথায় আসে, লেখো, রিটা।’
বিস্মিত চোখে প্রেমিককে দেখছে মেয়েটা। ওর চোখ গিয়ে পড়ল রানার চোখে। মনে মনে রিটা বুঝে গেল, এত নিষ্পাপ দৃষ্টির কেউ জেনে-বুঝে কোন অন্যায় করতে পারবে না।
ব্র্যাড স্টিলের প্রেমিকা বোকা নয়, টের পেয়ে গেছে রানা। ওর নকল জীবনী লিখতে হবে জেনে দ্বিধায় পড়েছে মেয়েটা। তার চোখ ও আড়ষ্ট কাঁধ অনেক কিছুই বলে দিল ওকে।
প্রযোজকের দিকে তাকাল রানা। ‘জানি না তুমি আসলে কে বা কী চাও। তবে তোমার বোধহয় উচিত হচ্ছে না আগুন নিয়ে খেলা।’
‘তোমাকে লড়াইয়ে জিততে হবে এমন নয়,’ জবাবে বলল স্টিল, ‘তবে তোমরা সবাই খেলবে আমার তৈরি নিয়মে।’
রানার সামনে থেকে সরে হ্যাঙারের দরজার কাছে মঞ্চে গিয়ে উঠল স্টিল। প্রতিযোগিতার দশজনকে দেখা হয়ে গেছে তার। সবাই তৈরি ডার্টি গেম শো-র জন্যে। নিজের প্রোগ্রামে পৃথিবীর নৃশংস ক’জন খুনি জড় করে খুশি হয়ে উঠেছে সে। এবার বক্তৃতা দিল, ‘খুনি, ডাকাত ও ধর্ষকেরা-তোমরা চরম সব অপরাধে জড়িত। তাই নানান দেশের আদালত থেকে তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।’ তাকে ঠিকভাবে ক্যামেরায় দেখাচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত হলো সে।
‘মর্, চুদির ভাই!’ জার্মান ভাষায় গালি দিল নাৎসি। তার ফলে তার হাঁটুর ওপরে খটাস্ করে নামল এক গার্ডের ব্যাটন।
‘মুখ সামলে,’ বলল স্টিল। হেসে তাকাল গার্ডের দিকে। ‘সাবধান, খেলার সময় এরা যেন লাফ-ঝাঁপ দিতে পারে।’
নাৎসির কাছ থেকে শিক্ষা নেয়নি ইতালিয়ান খুনি এনযো বিয়াঞ্চি। ‘চুদি তোর মা-রে! মর্, শালা, কুত্তার বাচ্চা!’
তার পেটে গেঁথে গেল এক গার্ডের লোহার ব্যাটন।
অপরাধীদের ভেতরে উঠেছে প্রতিবাদের গুঞ্জন।
‘বস্, আগে পেট ভরে খেতে তো দেবেন, নাকি?’ বলল ক্লার্ক। ‘লড়তে গেলে তো শক্তি লাগে, ঠিক কি না?’ সহমতের জন্যে এদিক-ওদিক তাকাল। অন্তত একটু পানি তো দেবেন। গতকাল থেকে সামান্য পানিও পাইনি আমরা।’
হ্যাঙারের ভেতরে হৈ-চৈ করে উঠল বেশ কয়েকজন।
চুপ করে আছে দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী আর এসএএস-এর প্রাক্তন অফিসার। মেয়েটাকে ভীত মনে হলো রানার। অন্যদের দেখছে ইংরেজ খুনি। চোখাচোখি হতেই পিস্তলের মত রানার বুকে তর্জনী তাক করে চোখ টিপল সে।
‘একবার দ্বীপে গেলে আকাশ থেকে পাবে পানি, খাবার ও অস্ত্র,’ বলল স্টিল। ‘যে আগে যাবে ব্যাগের কাছে, সে পাবে।’
‘এ-কথা কি সত্য?’ শ্যাননের দিকে তাকাল ক্লার্ক। জবাবে নিষ্ঠুর হাসল শ্যানন। হতাশ হয়ে আফ্রিকান সুন্দরী রোযির দিকে তাকাল ক্লার্ক। ওকে একবার দেখে নিয়ে লাজুক দৃষ্টি নিচু করে নিল মেয়েটা।
‘তোমার তো এসব করার কোন অধিকারই নেই, কেঁচোর বাচ্চা!’ চেঁচিয়ে উঠে বলল ইসাবেলা। হ্যাণ্ড কাফ্ড্ হাতদুটো স্বামীর দিকে বাড়াল সে। মিশে গেল দু’জনের বাহুর উল্কি।
দাঁত বের করে হাসল স্টিল। ‘আমরা পেয়েছি সত্যিকারের দুই প্রেমিক-প্রেমিকা। ওদের লড়াই হলে দারুণ জমবে শো। তবে দু’জনের মধ্যে লড়াই হলে বাঁচবে মাত্র একজন!’
স্টিলের মুখে থুতু ছিটাল ইসাবেলা। ঝড়ের বেগে গালি দিচ্ছে স্প্যানিশ ভাষায়। চুলের মুঠি ধরে ওকে পিছিয়ে নিল একজন গার্ড। তার হাতের ব্যাটনের বাড়ি পড়ল ইসাবেলার গলায়। ব্যথা পেয়ে চুপ হয়ে গেল মেয়েটা।
শার্টের আস্তিন দিয়ে মুখের থুতু মুছল স্টিল। নরম সুরে বলল, ‘যেভাবে মুখ ছোটাও, আশা করি পালিয়ে যাওয়ার সময় সেভাবে ছুটবে। কারণ, আমার ধারণা আগে খুন হবে তুমি।’
রাগে লাল হয়ে গেছে ইসাবেলার স্বামী আলকারাযের মুখ। কর্কশ সুরে বলল সে, ‘ওকে ছেড়ে দিন!’
‘সেটা আর সম্ভব নয়।’ হাসল স্টিল। ‘তোমাদেরকে মন দিয়ে খেলতে হবে।’ আর কারও কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। রিটাকে বলল, ‘চলো, এবার যাওয়া যাক।’ চোখের ইশারা করল সিম্পসনকে। ‘ওদেরকে রওনা করিয়ে দাও।’
হ্যাঙার থেকে বেরিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল রিটা।
ওদিকে বসের হয়ে সিম্পসন জানাল, ‘আমার কথা মন দিয়ে শুনবে। ব্রেসলেটে আছে বিশ আউন্স প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ। তোমরা নিজেরা না লড়লে ফাটিয়ে দেয়া হবে সেটা। ছোট কোন বাড়ি উড়িয়ে দেয়ার জন্যে ওটা যথেষ্ট। তোমাদের কানে ঢুকেছে আমার কথা?’
প্রতিযোগীদের দেখছে রানা ও শ্যানন। ওরা ছাড়া অন্যরা চট্ করে তাকাল যার যার গোড়ালির দিকে।
শ্যাননের ধারণা, লড়াইয়ের শুরুতেই খুন হবে মেক্সিকান স্বামী-স্ত্রী। তার আগে তাদেরকে নিয়ে একটু মজা করবে সে। লড়তে পারবে না দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী মেয়েটাও। রাশান দানব আকারে বিশাল হলেও বোকা। এদিকে বয়স হয়েছে নাৎসির। লড়াই করে জিততে পারবে না সে। আর নিজের বউ ও শ্বশুর-শাশুড়িকে খুন করলেও সত্যিকার যুদ্ধে তিন মিনিটও টিকতে পারবে না ইতালিয়ান বাচাল। বিপদ আসতে পারে জাপানি লড়াকু ও ড্রাগ ডিলার কালো লোকটার তরফ থেকে। যদিও অ্যাকিউরিয়ামের মাছের মত তাদেরকে খুন করতে পারবে শ্যানন। তো বাকি থাকল বাংলাদেশি যুবক। তার অতীত খুব রহস্যময়। এসএএস ফোর্সের অফিসারদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে বহু কিছুই শুনেছে সে। খুব সতর্ক থাকতে হবে তার বিষয়ে।
পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে শ্যানন ও রানা।
ভাবভঙ্গি থেকে রানা বুঝে গেছে, আগে ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্সে ছিল এই লোক। প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে এখন মজা পাচ্ছে। দৃষ্টি বলছে সে একজন ভয়ঙ্কর সাইকোপ্যাথ।
‘ত্রিশ ঘণ্টা পর ফাটবে বোমা,’ বলল সিম্পসন, ‘সেটা না চাইলে সময়ের আগে খুন করবে পরস্পরকে।’
সিকিউরিটি চিফের মুখে হাসি দেখে রানা বুঝে গেল, স্যাডিস্ট লোকটা এবার বলবে ব্রেসলেটের লাল ট্যাবের কথা। সিম্পসন যে পাকা হারামি, সেটা বুঝে গেছে ও।
‘মাত্র দু’ভাবে তোমরা ফাটাতে পারবে ব্রেসলেটের বোমা,’ বলল সিম্পসন। ‘প্রথম উপায়, লাল ট্যাব খুলে নেয়া। তা হলে দশ সেকেণ্ড পর বিস্ফোরিত হবে বোমা। বুম!’
আবারও সবার চোখ গেল গোড়ালির ব্রেসলেটের ওপরে।
‘দুই, ব্রেসলেট খুলতে চাইলে বা কোন তার নাড়াচাড়া করলে তা হলে ফাটবে বোমা। তোমাদেরকে সহজ এক খেলার জন্যে ধরে আনা হয়েছে। হয় খুন করবে, অথবা খুন হবে।’
কথাগুলো শুনে ভাবছে রানা, জিপিএস-এর কথা এড়িয়ে গেছে সিম্পসন। শ্যানন আর ও ছাড়া অন্যরা বোধহয় জানে না, এই খেলায় জিপিএস-এর মাধ্যমে ওদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখবে স্টিলের লোক। রানা আর কিছু ভাবার আগেই দেখল, গোড়ালির ব্রেসলেটের ডিজিটাল এলসিডি প্যানেলে ফুটে উঠেছে তারিখ ও লাল কিছু সংখ্যা- সোমবার, ৩০:০০:০০।
অর্থাৎ, যে-কোন সময়ে শুরু হবে প্রতিযোগিতা।
মুখ তুলে রানা দেখল, এক গার্ডের দিকে ইশারা করছে সিকিউরিটি চিফ। লোকটার হাতের ল্যাপটপে বিশেষ কোন কোড দিয়ে কিবোর্ডে এন্টার টিপল সে। টিট করে আওয়াজ হলো রানার ব্রেসলেটে। অন্যরা চেয়ে আছে নিজেদের গোড়ালির দিকে। এলসিডি ডিসপ্লেতে দেখা গেল-সোমবার, ২৯:৫৯:৫৯।
চমকে গিয়ে স্প্যানিশ গালি দিচ্ছে আলেক্যান্দ্রো আর ওর স্ত্রী ইসাবেলা। কর্কশ গলায় জার্মান ভাষায় অভিশাপ দিল নাৎসি। ঝুঁকে গেল সে। মনে হলো টেনে গোড়ালি থেকে ছিঁড়ে আনবে ব্রেসলেট। ল্যাংড়া ঘোড়ার মত একই জায়গায় ঘুরছে ইতালিয়ান খুনি এনযো বিয়াঞ্চি। এত দ্রুত কথা বলছে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বিকট গলায় চিৎকার জুড়েছে রাশান দানব লোপাতিন। কিন্তু জিভের তিনভাগের একভাগ কাটা পড়েছে বলে একটা কথাও স্পষ্ট নয়। সুন্দরী রোযিকে দেখলে যে-কেউ ভাববে, রাতে গাড়ির জ্বলন্ত হেডলাইটের সামনে পড়ে থমকে গেছে কোন হরিণী। গোড়ালির কাছ থেকে শরীরের অন্য অংশ সরাতে চাইছে জনি এস. ক্লার্ক। ভয় নিয়ে দেখছে ব্রেসলেট, যেন ওটা জীবন্ত কোন গোখরা সাপ।
অন্যদের প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু হাসছে শ্যানন।
রানাও দেখছে সবাইকে। ব্রেসলেট টানা-হেঁচড়া করলে বিস্ফোরিত হবে, আর সে কাজই করছে কয়েকজন। এখন কী করা উচিত সেটা ভাবল রানা। যে-কারও বোমা ফেটে গেলে নিজে খুন হবে ও।
একই কথা ভেবে গার্ডদের হাতের ইশারা করল সিম্পসন।
ব্যাটন হাতে বন্দিদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল গার্ডেরা। বোমা ফাটার আগেই কয়েক সেকেণ্ডের হামলায় উত্তেজিত খুনিদেরকে ঠাণ্ডা করে দিল তারা। ব্যাটন দিয়ে এত জোরে মারছে না যে গুরুতরভাবে আহত হবে কেউ। গার্ডরা জানে, এদের সুস্থ দেহে পৌঁছে দিতে হবে দ্বীপে। আর তারপর শুরু হবে ভয়ঙ্কর এক মরণখেলা–দ্য ডার্টি গেম শো।
Chapter - 6 to 10
ছয়
দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে খাড়া এক টিলার ওপরে ল্যাণ্ড করেছে স্টিলের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার। ল্যাণ্ডিং প্যাডের দু’দিকে দুর্গম ক্লিফ। অন্যদিকে এক শ’ ফুট নিচে বোল্ডারের ওপরে আছড়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল ঢেউ। সাগরের দিক দিয়ে দ্বীপে ওঠা প্রায় অসম্ভব। আর সেটা সম্ভব হলেও সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে ঘন জঙ্গল। ওটার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে চওড়া নদী। স্টিল ভেবেছে, দ্বীপের দক্ষিণে নামিয়ে দেবে খুনিদেরকে। সেক্ষেত্রে গিরিখাদের কারণে ওর গ্রামে সহজে পৌঁছুতে পারবে না কেউ।
হেলিপ্যাড থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে টেক গ্রাম। উঁচু টিলা থেকে পঞ্চাশ ফুট নেমে জিপের কাছে পৌঁছল রিটা ও স্টিল। জিপের ড্রাইভার সিম্পসনের একজন গার্ড। জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো পথে গাড়ি চালিয়ে গ্রামে পৌঁছে দেবে সে।
হেলিকপ্টারে ওঠার পর থেকে কোন কথা বলেনি রিটা। উষ্ণ পরিবেশে তিরিক্ষি হয়ে গেছে ওর মন। নিজেকে বোঝাতে চাইছে, মানুষগুলো মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত খুনি। এমনিতেই হত্যা করা হতো তাদেরকে। কিন্তু এ-কথা ভাবতে গেলেই মনে খোঁচা দিচ্ছে অন্য চিন্তা। ব্র্যাড আসলে কে ওদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার? আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কোথায় পেল সে? দর্শকেরা যা দেখতে চাইছে, সেটাই দেখাবে। কিন্তু মানুষগুলোর মৃত্যু নিশ্চিত করে কোটি কোটি ডলার আয় করার ভাবনাটা কি অমানবিক নয়?
মৃত্যুপথযাত্রীদের নতুন পোশাক আর তাদের নকল জীবন বৃত্তান্ত তৈরি করতে গিয়ে নিজেও বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে গেছে রিটা। স্টিল যদিও বলেছে, আইনের পথ বাঁকা করে নিলেও ডার্টি গেম শো-র জন্যে কোন ধরনের অপরাধ করবে না। কিন্তু তাই যদি হয়, সেক্ষেত্রে কেন কোটি কোটি মানুষের কাছে এই শো-র টিকেট বিক্রি করছে সে? প্রথম থেকেই ভাল পরিচালক স্টিল। আর সে যোগ্যতার কারণে কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের মনোযোগ। প্রেমিক হিসেবেও তুলনা নেই ওর। সবসময় স্টিলকে বিশ্বাস করেছে রিটা, নইলে কখনও তার কথা শুনে নিজের ক্যারিয়ার ফেলে এখানে আসত না। স্টিলের হঠাৎ এই পরিবর্তন নতুন করে ভাবাচ্ছে ওকে।
দ্বীপে ফেরার সময় নিজেও চুপ করে থেকেছে স্টিল। বুঝে গেছে, খুব অস্বস্তির ভেতরে পড়েছে রিটা। তবে সেটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। মানুষ খুনের মাধ্যমে টাকা উপার্জনের বিষয়টা মানতে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। ভাল বিক্রেতা সবসময় বোঝে কখন কঠিন হবে তার মাল বিক্রি করা, আর কখন একেবারেই পারবে না। স্টিল জানে, আগে হোক বা পরে ওর মত করে ভাবতে শুরু করবে রিটা। বিশেষ করে বিশাল স্ক্রিনে শো শুরু হলে ডার্টি গেমের এডিটিং, গ্রাফিক্স ও মিউযিকের গুণে উত্তেজনার স্রোতে না ভেসে উপায় থাকবে না। ওর কাজ এখনও ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখছে না রিটা। সেটা যদি করত, অনেক আগেই মানা করে দিত এখানে আসতে। মেয়েটা গত কয়েক মাসে জেনে গেছে, সুদর্শন, প্রতিভাবান কোটিপতি স্টিলের অমোঘ আকর্ষণ এড়ানো যায় না।
গ্রামে পৌঁছে জিপ থেকে নেমে সিম্পসনের গার্ডকে বলল স্টিল, ‘এবার গেট আটকে দাও। শুরু হচ্ছে শো-টাইম।’
রেযর ওয়াএয়ার গেট আটকে শেকল জড়িয়ে তালা মারল গার্ড। বিশাল তাঁবুতে ঢুকতেই শিরায় অ্যাড্রেনালিনের স্রোত টের পেল স্টিল। বুঝে গেল, এবার শো শুরু হচ্ছে বলে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে তাঁবুর সবাই।
‘ওরা রওনা হয়ে গেছে,’ সবার ওপরে চোখ বোলাল স্টিল। ‘তোমরা তৈরি তো? তোমার কী খবর, সিলভি?’
‘খবর ভাল না, দুর্বল স্বরে বলল সিলভারম্যান, ‘তুমি আসলে আমাকে কী করতে বলো? এখানে তো টেকনিকাল কোন কিছুই আসলে ঠিকঠাক নেই!’
অসংখ্য স্ক্রিনের দিকে চেয়ে ঘামছে টেকনিকাল ডিরেক্টর। কিছু স্ক্রিনে একাধিক দৃশ্য। বক্সের মত সব অংশে লাইভ ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল-স্বর্গের মত সুন্দর সৈকত, উঁচু জলপ্রপাত, বিধ্বস্ত মিলিটারি ট্র্যান্সপোর্ট বিমান, এমন কী সাগরের নিচেও আছে চমৎকার সব দৃশ্য। প্রতিটি দৃশ্যের নিচে টেপ লাগিয়ে ক্যামেরার নম্বর ও এলাকার নাম লিখছে সিলভির অ্যাসিস্ট্যান্টরা।
এতদিন সিলভির সঙ্গে কাজ করে স্টিল বুঝেছে, তার বন্ধুর মন যত খারাপ হবে, তত ভালভাবে চলবে শো।
‘এমিলি? তুমি কি রেডি?’
‘আমার জন্মই তো হয়েছে রেডি থাকার জন্যে, খুশিমনে বলল এমিলি।
‘সিওয়ার্স?’
কিবোর্ড থেকে তুলে বুড়ো আঙুল দেখাল সিওয়ার্স। ‘সব ঠিক আছে।’
অন্য কোন শো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আগে এত ভাল লাগেনি স্টিলের। উত্থিত হলো তার পুরুষাঙ্গ। রিটার সঙ্গে সঙ্গমের সময়েও এত উত্তেজিত হয় না সে।
‘এমিলি! পুরনো কিছু রক অ্যাণ্ড রোল চালু করো।’
মুচকি হেসে ডিভিডি নিয়ে পাশের মেশিনে ভরল এমিলি।
ব্রডকাস্ট শুরু করার আগে তিক্ত মুখে স্ক্রিনগুলো দেখছে সিলভারম্যান। তার মানে, সবকিছুই ঠিকভাবে চলছে।
‘মিলা, এক শ’ তেতাল্লিশ নম্বর ক্যামেরা।’ বছর বিশেকের এক মেয়ের দিকে তাকাল সিলভি। মিলাকে দেখলে মনে হবে ওর বয়স বড়জোর পনেরো। ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? এমন হলে তো ডুবে যাবে এই শো! পাম গাছের পাতা থেকে সরিয়ে সরাসরি ক্যামেরা তাক করো সাগরে।’
মেইন স্ক্রিনে শুভ্র তুষারের দৃশ্য দেখে ঘুরে তাকাল স্টিল। ‘সিলভি, আমাদের স্যাটেলাইট কি কাজ করছে?’
‘না, করছে না।’
পরের সেকেণ্ডে তুষারের মত দৃশ্যের বদলে এল সবুজ দ্বীপের দক্ষিণ দিক ও নীল সাগর। সমুদ্র-সমতল থেকে মাত্র পঞ্চাশ ফুট ওপর দিয়ে গর্জন ছাড়তে ছাড়তে আসছে দুটো মিলিটারি হেলিকপ্টার। প্রতিটির ভেতরে আছে পাঁচজন করে অপরাধী।
মস্ত স্ক্রিনে তাকাল স্টিল। ক্রমে ক্রমে বড় হয়ে উঠছে হেলিকপ্টার দুটো। যেন সোজা আছড়ে পড়বে তাঁবুর ওপরে।
‘মিউযিক, এমিলি!’
মেয়েটা প্লে-বাটন টিপে দিতেই চালু হলো গাল্স্ অ্যান’ রোযেসের বিখ্যাত গান—’ওয়েলকাম টু দ্য জাঙ্গল’।
বিশাল তাঁবুর স্পিকার ছড়িয়ে দিল বিকট আওয়াজ।
‘সিওয়ার্স, এবার আমাদেরকে নেবে ওয়েব-এ!’
সাত
প্রতি হেলিকপ্টারে আছে পাঁচজন করে ক্রিমিনাল, দু’জন করে সশস্ত্র গার্ড এবং একজন করে পাইলট। আলফা হেলিকপ্টারে প্রতিযোগী হিসেবে আছে রানা, রাশান খুনি, দুই মেক্সিকান অপরাধী আর সাইকোপ্যাথ রুপার্ট শ্যানন। কার্গো বেতে একই শেকলে বেঁধে নেয়া হয়েছে ওদের হ্যাণ্ডকাফের চেইন। বড় ধরনের কোন ঝামেলা হোক সেটা চাইছে না স্টিল, তাই তার অনুরোধে এদের সঙ্গে এসেছে রিভ সিম্পসন।
হেলিকপ্টারে সবাইকে তোলা হয়েছে বহু হিসেব-নিকেশ কষে। স্টিল চেয়েছে প্রতিটি যান্ত্রিক ফড়িঙে থাকবে একজন করে মেয়ে। আর ওর জন্যে কামুক হয়ে উঠবে পুরুষেরা। যাদেরকে আনা হচ্ছে এ-দ্বীপে, রানা ছাড়া অন্যরা সবাই খুনি ও ধর্ষক। আলেক্যান্দ্রো ও তার স্ত্রীর সঙ্গে ভেবেচিন্তে জুটিয়ে দেয়া হয়েছে ইংরেজ সাইকো শ্যাননকে। লোকটা নিষ্ঠুর এক ধর্ষণকারী বলে আতঙ্কে থাকবে ইসাবেলা। আর তাতে ওকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে উত্তেজিত থাকবে তার স্বামী। এদিকে হেলিকপ্টার থেকে কাছাকাছি জায়গায় নামানো হবে তাদের তিনজনকে। ফলে মেক্সিকান দুই খুনি জোট তৈরি করলে জমে উঠবে শ্যাননের সঙ্গে তাদের বিরোধ।
লোপাতিন হয়তো কারও সঙ্গে দল গড়বে না।
হ্যাঙারের ভেতরে স্টিল দেখেছে, পরস্পরকে মেপে নিচ্ছে মাসুদ রানা আর রুপার্ট শ্যানন। ওদের লড়াই নিজের চোখে দেখেছে সে। দু’জনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে সেটা হবে খুব আকর্ষণীয় কিছু।
সাগরের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টারে করে আসার সময় কারও দিকে খুব একটা মনোযোগ দেয়নি রানা। চল্লিশ মিনিট পর পাইলটের উইগুস্ক্রিনের ওদিকে দেখতে পেল দ্বীপটাকে। হেলিকপ্টার এত নিচু দিয়ে চলেছে যে বুঝতে পারল না দ্বীপটা আসলে বড় না ছোট। আন্দাজ করল, ওটা প্রশস্তে বড়জোর আট বা দশ মাইল। দৈর্ঘ্যে বিশ মাইল। চারপাশে ঘন জঙ্গল। এদিকে-ওদিকে উঁচু টিলা ও গভীর সব উপত্যকা। সূর্যের যে অ্যাঙ্গেল দেখা যাচ্ছে, তাতে রানার ধারণা ওরা এসেছে পশ্চিম দিক থেকে। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে ওরা চলেছে পুবদিকে।
পুবদিকে দ্বীপ বা রিফ নেই যে ছোট হবে সাগরের ঢেউ। দ্বীপের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে ঢেউয়ের বুকে তৈরি হচ্ছে সফেদ ফেনা-ওগুলো বলে দিচ্ছে পুবে চলেছে বাতাসের তোড়। রানা তাতে বুঝে গেল, দ্বীপের পুবে ভিড়তে পারবে না কোন ধরনের বোট। একই কারণে সাগরে নেমে পালিয়ে যেতে পারবে না কেউ।
চোখ সরিয়ে শ্যাননকে দেখে নিয়ে ভাবল রানা, ওর মত একই হিসাব কষছে সে। কিন্তু পরের সেকেণ্ডে বুঝল, মেক্সিকান খুনি ইসাবেলার ওপরে তার লোভী দৃষ্টি। মেয়েটার ঊরু বেয়ে স্তনে থামল শ্যাননের চোখ। তারপর দৃষ্টি আবার নেমে গেল ঊরু-সন্ধিস্থলে। রানার মনে হলো, মানসিকভাবে মেয়েটাকে ধর্ষণ করছে ইংরেজ সাইকোপ্যাথ।
সচেতন হয়ে উঠেছে ইসাবেলা। আড়ষ্ট কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘অ্যাই, তোমার আসলে সমস্যাটা কী?’
জবাবে বড় বড় সাদা দাঁত বের করে হাসল শ্যানন। আলেক্যান্দ্রোর দিকে তাকাল। নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে স্ত্রীর পাশে আছে লোকটা। ‘তোমার বউ খুবই সুন্দরী,’ প্রশংসার সুরে বলল শ্যানন।
‘আমি তোর পুটকি মারি, শালা!’ চোখ পাকিয়ে তাকে দেখল আলকারায।
ভাষা অচেনা হলেও সবই বুঝে গেছে রাশান দানব। সে-ও চেয়ে আছে ইসাবেলার বুকের দিকে। হাসতেই দুই সারি ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের মাঝ দিয়ে গিরগিটির মত বেরোল কাটা লাল জিভ। ভয় পেয়ে দূরে সরে যেতে চাইল ইসাবেলা।
হঠাৎ উচ্চতা হ্রাস করে বামে বাঁক নিল হেলিকপ্টার। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে ডানে দ্বিতীয় হেলিকপ্টারটা দেখতে পেল রানা। পুব সাগর বিক্ষুব্ধ বলে দ্বীপের অন্যদিকে চলেছে দুই যান্ত্রিক ফড়িঙ। এরা আলাদা জায়গায় আমাদের নামিয়ে দেবে, ভাবল রানা। তবে খুব বেশি ব্যবধান থাকবে না পরস্পরের ভেতরে।
আবারও শ্যাননকে দেখল ও। স্টিলের পরিকল্পনা বুঝে তিক্ত হলো ওর মন। লোকটা চাইছে মেয়েদুটোকে দখলে নেয়ার জন্যে লড়তে শুরু করবে অপরাধীরা। আর তাতে জমে উঠবে ডার্টি গেম শো।
হেলিকপ্টারের সাইড ডোর সিম্পসন খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল দমকা হাওয়া। দ্বীপের কোনা ঘুরল চপার। পলকের জন্যে জঙ্গলে পুরনো এক ওয়েদার টাওয়ার দেখতে পেল রানা। ওটার ছাতে বিশাল এক আধুনিক অ্যান্টেনা। ঘন জঙ্গলে আরও কী আছে বুঝতে ঝুঁকে তাকাল ও। গাছপালার মাঝে চলাচলের সরু পথ। এ-ছাড়া, ওদিকে আছে বিশাল এক তাঁবু আর আকাশের দিকে তাক করা স্যাটেলাইট ডিশ। মাত্র একসেকেণ্ডে পেছনে হারিয়ে গেল সব।
পাইলটের কাঁধের ওপর দিয়ে কম্পাসে চোখ রাখল রানা। ছোট যন্ত্রটার কাঁটা উত্তরদিকে।
আরও নিচে নেমে এল হেলিকপ্টার।
খোলা দরজা দিয়ে ঢুকল সোনালি রোদ।
নিচে জনশূন্য সৈকত ও এবড়োখেবড়ো উপকূল।
বুঝতে দেরি হলো না রানার, ওদেরকে নেয়া হচ্ছে দ্বীপের দক্ষিণ তীরে। ওখানেই শুরু হবে সবার ভয়ঙ্কর লড়াই।
আর সেটা এড়াতে হলে নিখুঁত কোন প্ল্যান চাই ওর।
.
ব্রাভো হেলিকপ্টারের বিকট আওয়াজ ছাপিয়ে সিসিলিয়ান ও ইংরেজিতে মেশা চিৎকার জুড়েছে ইতালিয়ান খুনি বিয়াঞ্চি। গত আধঘণ্টায় তার গালাগালির তোড়ে আধপাগল হয়ে গেছে অন্যরা।
‘ওরে, আমার দয়ালু যিশুর বাপ! এরা আমার কথা একদম শুনছে না! হারামজাদা কুত্তাগুলো কোন মানুষই না! শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে চরম শাস্তি দিন, আমার দয়ালু মালিক!’ কথার ফাঁকে কাইতো তানাকার দিকে তাকাল এনযো।
কোনকিছু তোয়াক্কা না করে শেকলে ভর দিয়ে বুকডন দিচ্ছে জাপানি খুনি।
‘তুই আসলে আমার ভাই! আমার কথা মন দিয়ে শোন! আমরা নিজেরা নিজেরা মারামারি করব না! না হলে সবাই মিলে খুন হতে হবে!’
‘অ্যাই, শালা, চুপ!’ দাঁত খিঁচিয়ে ধমক দিল ড্রাগ ডিলার ক্লার্ক, ‘একদম চুপ!’
কৃষ্ণাঙ্গ লোকটাকে দেখছে নাৎসি স্লাইডার, চোখে তীব্র ঘৃণা। একবার ঘুরে তাকাল বিয়াঞ্চির দিকে। ‘অ্যাই, শালা, তুই চুপ কর, নইলে তোর লালচে পাছা দিয়ে সাদা স্প্যাগেটি ভরে দেব!’
ক্লার্ককে দেখল রোযি ইয়াসিমান। কতবড় বিপদে পড়েছে সেটা বুঝে চোখ রাখল চপারের মেঝেতে। যেন পণ করেছে চোখ তুলে দেখবে না জার্মান খুনিকে। কৃষ্ণকায় সুন্দরীর ওপর চোখ পড়ার পর থেকে জিভের লালা ঝরছে স্লাইডারের। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল রোযি, যেন একই চপারে না থাকে লোকটা। কিন্তু ওর প্রার্থনায় বরাবরের মত এবারও সাড়া দেননি স্রষ্টা।
এটা ঠিক যে অনেকের জীবন কেড়ে নিয়েছে রোযি, কিন্তু তারাই তো আগে খুন করতে চেয়েছিল ওকে। সেই কিশোরী বয়সে ধর্ষণ করা হয়েছে, আর সেসময়ে রোযি বুঝে গেছে, পুরুষমানুষ আসলে খুব হিংস্র জানোয়ার। শুধু সুন্দরী বলে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত তারা। খাবারের অভাবে একসময় হতে হলো পতিতা। ভোগ করে টাকা দিত কেউ কেউ আবার কেউ চাইত ঠকাতে। আর যারা ঠকাতে চাইত, তাদেরকেই ছুরি মেরে খুন করত ও। ক’জনকে খুন করার পর ধরা পড়ে গেল পুলিশের হাতে। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হলো ওর।
রোযির নিটোল ঊরু লোভী চোখে দেখছে স্লাইডার। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল পাতলা ব্লাউযের ওপরে ফুটে থাকা স্তনবৃন্তের ওপর। এখানে ধরে এনেছে বলে স্টিলকে খুন করতে চাইছে স্লাইডার। আবার এ-ও ভাবছে: চকোলেটের মত লোভনীয় সুন্দরীকে এই চপারে তুলে খুব ভাল কাজ করেছে ব্যাটা। একবার দ্বীপে নামলে প্রথম সুযোগে রোযিকে ধর্ষণ করবে সে, তারপর হাসতে হাসতে গলা টিপে খুন করবে।
এখনও একনাগাড়ে বকবক করছে বিয়াঞ্চি। ‘শালারা, সব ক’টা তোরা কিন্তু মরবি!’ আঙুল তুলল নাৎসির দিকে। ‘আগে আমার হাতে মরবি তুই, শুয়োরের বাচ্চা! স্রেফ চিবিয়ে খেয়ে নেব তোকে!’
নাৎসি জবাব না দিলেও ইতালিয়ান গাধার কথা শুনে ফিক করে হাসল আমেরিকান ড্রাগ ডিলার ক্লার্ক।
‘হারামির বাচ্চা কেলে শয়তান, তুই ভেবেছিস তোর পেটের কথা আমি বুঝিনি?’ সাপের মত ফোঁস তুলল বিয়াঞ্চি। ‘কুচ করে কেটে নেব তোর কালো নেংটি। তারপর ওটা ভচ করে ভরে দেব তোর কালো পোঁদে! কুত্তার বাচ্চা কোথাকার, শালা, ‘তুই চিনিস আমি আসলে কে?’
‘বুঝলাম, তুই, শালা, সত্যিকারের এক ধলা পোঁদ, ‘ বলল ক্লার্ক, ‘তবে এবার মুখ না বুজলে এক ঘুষিতে তোর নাক ভচকে দেব।’
খপ্ করে মুখ বন্ধ করল বিয়াঞ্চি। সেটা ক্লার্কের কথায় নয়। হঠাৎ করে ডানে বাঁক নিয়ে দক্ষিণ-পুবে চলেছে চপার।
.
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল সিলভি। ‘ধীরে ধীরে যুম করো!’
কন্সোলের সামনে বসে জয়স্টিক ঠেলে দিল টেকনিশিয়ান মিলা। পাম গাছের ইমেজ যুম হতেই দূরে দেখা গেল উড়ে আসছে দুই হেলিকপ্টার। বেজে উঠল ওয়েলকাম টু দ্য জাঙ্গল গানটির কোরাস। দেখিয়ে দেয়া হলো দুই চপারের গ্রাফিক সুপারইমপোজ্ড ইমেজ। এর মাধ্যমে দর্শকদের বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, শুরু হয়ে গেছে ডার্টি গেম শো। দুই চপার দু’দিকে বাঁক নিয়ে চলে যাওয়ার আগেই স্ক্রিনে বিস্ফোরিত হলো শো-র টাইটেল নেম: ডার্টি গেম শো!
‘ক্যামেরা ফিফটিন আর টোয়েন্টি-টু, আমার চাই স্প্লিট স্ক্রিন,’ নির্দেশ দিল সিলভারম্যান।
এলইডি স্ক্রিনে ফুটল উড়ন্ত দুই চপারের দৃশ্য। লেন্সের ওপর দিয়ে গেল আলফা চপার। ক্যামেরা সেট করা আছে ওয়েদার টাওয়ারের ওপরে। পাম গাছে সেট করা এক ক্যামেরা দেখাল সাদা সৈকতের ওপর দিয়ে উড়ে গেল ব্রাভো চপার।
শ্বাস আটকে দৃশ্য দুটো মন দিয়ে দেখল স্টিল। চলচ্চিত্র ধারণে কোথাও কোন ত্রুটি নেই। ভাল পরিচালক জানে, প্রথম সেকেণ্ড থেকে খপ্ করে ধরতে হবে দর্শকদেরকে। এ- ধরনের শো তৈরির সময় চোখ থাকতে হয় টেকনিশিয়ানদের ওপরে, যাতে সঠিক ক্লিক দেয়া হয় কমপিউটার মাউসে। শুধু তা-ই নয়, যেন ডুবে না যায় শো, সেজন্যে চোখ থাকতে হয় নতুন ব্লগ ও মেসেজের ওপরে। সেজন্যেই বাধ্য না হলে টেকনিকাল ডিরেক্টরের কাজে নাক গলাতে হয় না পরিচালকের। সিলভির ওপর ভরসা ছিল না বলে পণ্ডিতি করতে গিয়ে ফ্লপ করে দিয়েছিল স্টিল তার প্রথম শো। সিলভি ভাল করে জানে কোথায় রাখতে হবে তার ক্যামেরা।
‘দক্ষিণ উপকূলে পৌঁছে গেছে চপার ব্রাভো…
অর্কেস্ট্রার পরিচালকের ভঙ্গিতে আঙুল তুলে স্ক্রিনের বাঁকা এক চাঁদের আকৃতির সৈকত দেখাল সিলভি। পরের সেকেণ্ডে ক্যামেরার ওপর দিয়ে গেল ব্রাভো চপার।
দৃশ্য ধারণে কোথাও কোন ভুল নেই সিলভির।
.
ব্রাভো চপারে বিকট চিৎকার জুড়েছে ইতালিয়ান খুনি বিয়াঞ্চি। কেবলে আটকানো আছে ইয়াসিমানের হ্যাণ্ডকাফ। তাকে চপারের খোলা দরজার দিকে ঠেলে দিল একজন গার্ড। মেয়েটার উরুতে হাত রেখেছে সে। আপত্তি থাকলেও কিছু বলছে না ইয়াসিমান। ইঞ্জিনের আওয়াজের ওপর দিয়ে বলল গার্ড, ‘মুখ খোলো!’
ভয় পেয়ে পেছাতে চাইছে বুঝতে পেরে মেয়েটাকে সামনে ঠেলে দিল দ্বিতীয় গার্ড। ছোট এক চাবি দেখিয়ে চিৎকার করল প্রথম গার্ড, ‘মুখের ভেতরে চাবি নাও!’
হ্যাণ্ডকাফের দিকে চেয়ে সবই বুঝে গেল রোযি। হাঁ মেলতেই মুখের ভেতরে চাবি গুঁজে দিল গার্ড। দু’সারি দাঁতের ফাঁকে চাবিটা ধরল মেয়েটা। দু’হাতে হ্যাণ্ডকাফ। ওভারহেড কেল্ থেকে তাকে খুলে দিল দ্বিতীয় গার্ড। এদিকে রোযির উদ্দেশে ফ্লাইয়িং কিস দিয়ে চপারের দরজা থেকে তাকে নিচে ফেলে দিল প্রথম গার্ড। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে চল্লিশ ফুট নিচে নীল সাগরে পড়ে টুপ করে তলিয়ে গেল রোযি ইয়াসিমান।
.
দৃশ্য ধারণে ব্যস্ত টেকনিকাল ডিরেক্টর সিলভি। মেয়েটা সাগরে ডুবে যাওয়ার আগে তর্জনী ওপরে তুলল সে। ‘ওয়ান সেভেণ্টি-ওয়ান বি!’
মস্ত স্ক্রিনে এল সাগরতলের দৃশ্য। পানির নিচে সরাসরি নেমে চলেছে মেয়েটা। বিশাল তাঁবুর ভেতরে চুপ করে তাকে দেখছে ওরা। আহত সাপের মত শরীর মুচড়ে ওপরে উঠতে চাইছে রোযি। দু’হাত তুলে মুখ থেকে নিতে গিয়ে আরেকটু হলে চাবি ফেলে দিত। ফুরিয়ে এসেছে ওর দম। কাছে এসেও অন্যদিকে গেল তেরো ফুটি এক টাইগার শার্ক।
তাতে খুশি হয়ে হাসল স্টিল। স্রেফ কপালের জোরে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে হাঙরের আগমন। তার মনে হলো, এটা স্রষ্টার তরফ থেকে বিশেষ এক উপহার। হয়তো আরও ভাল হতো হাঙরটা হামলা করে বসলে। তবে দুনিয়ায় তো আর সবকিছু পাওয়া যায় না। তা ছাড়া, খেলার শুরুতে সুন্দরী মেয়েটাকে মরতে দেখলে হতাশ হতো দর্শকেরা। রোযিকে যখন ধর্ষণের পর খুন করবে কোন খুনি, তখন সবার মনেই তৈরি হবে চরম রোমাঞ্চ।
ঘুরে এসে রোযিকে দেখে নিয়ে আরেক দিকে গেল টাইগার শার্ক। চাবি দিয়ে গোড়ালির বেড়ির তালা খুলল মেয়েটা। প্রাণপণে পা ছুঁড়ল সাগর-সমতলে উঠে আসতে। স্টিলের মনে হলো, হ্যাণ্ডকাফের তালার ফুটো খুঁজে পায়নি রোযি। দুশ্চিন্তায় গলা শুকিয়ে গেল তার। দুই মেয়ের মধ্যে রোযি বেশি সুন্দরী, এখন খেলা শুরু হওয়ার আগেই সে ডুবে মারা গেলে মস্ত ক্ষতি হবে শো-র!
মেয়েটার দিকে আবারও ঘুরে এল টাইগার শার্ক।
হ্যাণ্ডকাফে আটকে বন্দিদের সাগরে ফেলতে বুদ্ধি দিয়েছে সিম্পসন। এখন সেজন্যে আফসোস হচ্ছে স্টিলের। অবশ্য হাঙরের আক্রমণে মেয়েটার মৃত্যুদৃশ্য দেখতে পেলে অন্যরকম এক অনুভূতি হবে দর্শকদের।
কয়েক সেকেণ্ড পর হ্যাণ্ডকাফের তালা খুলল রোযি। ভারী হাতকড়া নেমে গেল সাগরতলের সাদা বালির ওপরে। বুকের শেষ বাতাসটুকু খরচ করে ভুস্ করে উঠে এল মেয়েটা।
‘ওয়ান সেভেণ্টি-টু এ,’ বলল সিলভি। রোযির কাছ থেকে মাত্র বিশ ফুট দূরে বয়া রেখেছে সে। নিজেই কন্সোলে ঝুঁকে খপ্ করে ধরল জয়স্টিক। ক্যামেরা যুম করে দেখাল রোযির আতঙ্কিত মুখ। বড় করে দম নিচ্ছে মেয়েটা।
দুর্দান্ত দৃশ্য দেখে বড় করে শ্বাস ফেলল সবাই। হাততালি দিল স্টিল। ‘ব্রাভো! সিলভি, তোমার কোন তুলনা নেই!’
স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে বলল সিলভারম্যান, ‘কী বললে? আরেকবার বলো তো!’
‘তুমি আসলে দুনিয়ার সেরা!’
‘কথাটা বলার জন্যে অনেক ধন্যবাদ।’ বন্ধুর দিকে চেয়ে হাসল সিলভি। সবসময় নিজের পাতে দই তুলে নেয় স্টিল, মূল্যায়ন করে না অন্যের অবদানের-তাই তার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া মানেই সেটা বিরাট এক পুরস্কার।
সাঁতরে তীরে উঠল রোযি। তার জানা নেই, অন্তত তিনটে ক্যামেরা ট্র্যাক করছে ওর প্রতিটি নড়াচড়া। তিন ক্যামেরার একটা আছে উঁচু গাছে। আরেকটা আছে বালিতে ডেবে যাওয়া মরা গাছের গুঁড়ির ওপর। তৃতীয়টা আছে সৈকতের কাছে কলাগাছের বনে। রোদে ঝিকমিক করছে সাদা সৈকত। দৃশ্যটা ট্রপিকাল ট্র্যাভেল ব্রাউচার থেকে যেন তুলে আনা। সাগরের নীল-সবুজ ঢেউ এসে মাথা কুটে মরছে সৈকতে। কোথাও নেই কারও পদচিহ্ন। সবুজ কলাগাছের বনে অসংখ্য নারকেল গাছ। এই স্বর্গে এখন শুধু চাই বিলাসী কাউকে, যে কি না হ্যামকে শুয়ে চুমুক দেবে মাই টাই-এর গ্লাসে।
ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকল রোযি, খুশি যে এখনও প্রাণে বেঁচে আছে। একবার থেমে চোখ বুজে টানটান করল পিঠ। বুক ভরে টেনে নিল বাতাসের বুনো গুল্মের সুবাস। রওনা হলো আবারও। জঙ্গলে ওকে অনুসরণ করছে ক্যামেরা। মেয়েটার দোদুল্যমান কোমর থেকে ঝাপসা হলো ওয়াইড শট। যে-কেউ ভাববে এটা জ্যামাইকা বা ভার্জিন আইল্যাণ্ডের ট্যুরিযম এজেন্সির বিজ্ঞাপন। রোযির ভেজা ট্যাঙ্ক টপ সেঁটে আছে বুকে। অপরূপ মুখে ক্যামেরা ক্লোযআপ করল সিলভি। রোযি চোখ মেলতেই তাতে প্রতিফলিত হলো সাগরের নীল-সবুজ বিস্তৃতি।
‘দুর্দান্ত সুন্দরী এক মেয়ে,’ স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল না রন সিওয়ার্স। তার কথায় মনে মনে সায় দিল তাঁবুর পুরুষেরা। অবশ্য ব্যতিক্রম হচ্ছে সিলভি। টেকনিকাল দিক নিয়ে ভাবছে সে এবার তাকে যেতে হবে নতুন কোন দৃশ্যে।
‘আলফা চপারের কী খবর?’ স্ক্রিনের অসংখ্য ইমেজের দিকে তাকাল সে। সময় নিল না জরুরি দৃশ্য খুঁজে নিতে। দক্ষিণ উপকূলে এক খাঁড়ির ওপরে ভাসছে হেলিকপ্টার।
‘কাট টু টু থার্টি-ফোর।’
মেইন স্ক্রিন থেকে রোযির ক্লোযআপ মুখ বিদায় হতেই সেখানে ফুটল নতুন দৃশ্য। এবারও নিখুঁত হয়েছে সিলভির টাইমিং।। একসেকেণ্ড পর হেলিকপ্টারের দরজা থেকে নিচে পড়ল ভারী একটা দেহ। লোকটা রাশান খুনি-ধর্ষক ম্যানইয়া লোপাতিন। সাগরে পড়ে আলোড়ন তৈরি করল সে। দ্রুত বেড়ি ও হ্যাণ্ডকাফ খুলে উঠে এল সাগর-সমতলে। তিন মিনিট পর পৌঁছে গেল সৈকতে। ওদিকটাতে বোল্ডার থাকলেও ছোট্ট উপসাগর ও সৈকত সত্যিই দেখার মত সুন্দর। সৈকতের এখানে-ওখানে ছোট ছোট ঝোপ।
জার্মান নাৎসির মতই ইংরেজি জানে না লোপাতিন। আলাদাভাবে তাকে ব্রিফ করার সময় সঙ্গে ছিল এক দ্বিভাষী। লোপাতিন এখন জানে কী করতে হবে ওকে। পুব ইউরোপের কনকনে শীত আর বেদম নির্যাতন থেকে উষ্ণ এই দ্বীপে এসে তার মনে হচ্ছে, সে পৌঁছে গেছে চমৎকার এক স্বর্গে।
তারুণ্যে ম্যানইয়া লোপাতিন ছিল দক্ষ কিকবক্সার। বাবা-মা ছিল পরিশ্রমী সৎ মানুষ। তারা কখনও বোঝেনি নিজের ছোট ভাইকে কেন খুন করল লোপাতিন, আর কেনই বা তার মনে জন্মাল না কোন অনুশোচনা। সারা উঠনে খেলে বেড়াত ওরা দু’ভাই। খুন করার পর বাবা-মাকে লোপাতিন বলেছিল, ছোট ভাই ভিকিকে আসলে ব্যথা দিতে চায়নি। যদিও কথাটা ছিল ডাহা মিথ্যা। আবারও কারও ঘাড় ভাঙার তীব্র ইচ্ছে ছিল তার মনে। তাই নিজেও জানে না কবে হয়ে উঠল পাকা এক খুনি ও ধর্ষক। বিশেষ করে মেয়েদের ওপরে হামলা করতে খুব ভাল লাগত তার। মনে হতো যে কাজের কাজ করেছে।
সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল লোপাতিন। লুকিয়ে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। মন চাইছে কাউকে খুন করতে।
খাড়ি ঘুরে সৈকতের দূরে এগিয়ে চলেছে আলফা চপার।
এবার নামবে মেক্সিকান খুনে-ডাকাত আলকারায। চট্ করে দেখল স্ত্রীকে। তার পাশে খোলা দরজার কাছে চেঁচিয়ে উঠল সিম্পসন, ‘তুমি রেডি?’ ছোট্ট প্লাস্টিকের বালতি থেকে নিয়ে চাবি বাড়িয়ে দিল আলকারাযের দিকে।
চাবি নিজের মুখে পুরল মেক্সিকান দস্যু। শেষবারের মত দেখছে ইসাবেলাকে। তার চোখ বলে দিচ্ছে বহু কথা।
‘দেখো, আবারও আমাদের দেখা হবে,’ চোখে অশ্রু নিয়ে বলল ইসাবেলা।
মৃত্যুমুখে পড়ে স্বামীর প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা অনুভব করছে মেয়েটা। এই পৃথিবী চরম নিষ্ঠুরতা করেছে ওর প্রতি। তারপর আলকারাযের সঙ্গে পরিচয় হলে বদলে গেল জীবন। অভাব ও নির্যাতন থেকে ওকে রক্ষা করল ওর স্বামী।
অতীতে চেয়ে ইসাবেলা বুঝল, যে ছয় মাস ডাকাতি করতে গিয়ে মানুষ খুন করেছে ওরা, সেই গ্লানি যেন মুছে যাচ্ছে ওদের এই বিচ্ছেদে। মৃতদের মুখ ঝাপসা হয়ে গেছে ওর মন থেকে। আর সেটা খুব স্বস্তিকর। ডাকাতি করার সেই সময়টা ছিল প্রায় ছুটি কাটাবার মত। খারাপটা মুছে গেলেও মনে রয়ে গেছে ভাল লাগার সময়টুকু।
ইসাবেলার কষ্টকর জীবনে যা ভাল, তার মস্ত অংশ জুড়ে আছে স্বামীর সঙ্গে মধুর স্মৃতি। এখন হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দিলে হয়তো আর কখনও ফিরে পাবে না মানুষটাকে।
স্মৃতিচারণ করছে আলকারাযও।
মুছে দিতে পারেনি মনের খাতায় লেখা স্মৃতি। ইসাবেলা তার জীবনের প্রথম নারী নয়। যদিও এই প্রতিযোগিতা থেকে রেহাই পেলে ওকেই জীবনের শেষ নারী হিসেবে চাইবে সে। বহু মেয়ের সঙ্গে শুয়ে অন্তত এটা বুঝেছে আলকারায, ওর জীবনে ইসাবেলা আসলে ম্যারি ম্যাগডালেন। যেমন অনুগত, তেমনি কোন খাদ নেই ওর ভালবাসায়।
মানবিক ত্রুটি থাকলেও পরস্পরকে ভালবেসেছে ওরা। ইসাবেলার হাতে যখন রিভলভার তুলে দিল, তখনও কাজটা করতে গিয়ে খারাপ লেগেছিল ওর। তবুও নিজের হাতে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে গুলি করতে হবে। ইসাবেলা একবারও জানতে চায়নি, কেন শিখতে হবে আগ্নেয়াস্ত্রের চালনা। মানব-হত্যা কখনও ভাল লাগেনি আলকারাযের। দোকানি আর সাক্ষীদের বাধ্য হয়ে খুন করত। ওর মত করেই ভাবত ইসাবেলা। কিন্তু খেয়ে পরে বাঁচার জন্যে ডাকাতি না করে উপায় ছিল না ওদের। অন্তত সেটা নিজের মনকে বোঝাতে চেয়েছে আলকারায, নইলে উধাও হতো রাতে ঘুম।
আর এখন ত্রিশ ঘণ্টার ভেতরে বিস্ফোরিত হবে গোড়ালির শক্তিশালী বোমা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে ওর দেহ। এসবে ইসাবেলাকে টেনে এনেছে বলে এখন অনুশোচনা হচ্ছে ওর। বারবার ভাবছে, ক্যাথোলিক ধর্ম অনুযায়ী সত্যিই যদি একবার ওদের দু’জনকে মাফ করে দিতেন মহান ঈশ্বর!
নিজেকে ভুলে বুক ভরে ইসাবেলাকে দেখছে আলকারায। জানে, স্ত্রীকে বাঁচাবার জন্যে জান দিতেও দ্বিধা করবে না সে। ইসাবেলার কোন ক্ষতি হবে, সেটা ভাবতে গেলে…
‘এত ভেবো না, তোমার বউয়ের দেখভাল আমিই করব,’ বাঁকা হাসল প্রাক্তন মেজর শ্যানন।
ইংরেজ সাইকোর দিকে তাকাল আলকারায। ধক করে উঠেছে ওর অন্তর। বুঝে গেছে, কতবড় বিপদেই না ফেলে দিয়েছে ওর ইসাবেলাকে! এই মৃত্যু-খেলার নিয়ম অনুযায়ী একবার দ্বীপে উঠলে শেষ করতে হবে অন্যদেরকে। তাদের ভেতরে আছে এই হারামজাদা ইংরেজ। শেষে যদি বেঁচে থাকে ইসাবেলা আর সে, তখন কী হবে? নিজে তো আলকারায় টোকাও দিতে পারবে না ইসাবেলার গায়ে।
ওর মুখের ওপরে টিটকারির হাসি হাসছে শ্যানন। কিছু বলবে ভেবে মুখ থেকে চাবি বের করবে আলকারায, কিন্তু তার আগেই হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে তাকে সাগরে ফেলে দিল সিম্পসন।
বিবাহিত দু’জনের ওপরে চোখ ছিল রানার। দেখেছে ওদেরকে বিরক্ত করছে শ্যানন। সহজেই বুঝে গেছে ও, স্ত্রীর কথা ভেবে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে আলকারায। ফলে বিপদ এলে নিজেকে রক্ষা করা কঠিন হবে তার পক্ষে।
নিজে রানা শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট।
ডার্টি গেম শো-তে ওর কঠিন প্রতিপক্ষ হবে শ্যানন।
এ-ছাড়া আছে রাশান দানব ও জার্মান খুনি। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কম যাবে না তারা।
.
তাঁবুর ভেতরে মস্ত স্ক্রিনে দেখা গেল ব্রাভো চপার থেকে এইমাত্র ফেলে দেয়া হয়েছে স্নাইডারকে। ঝকঝকে সাদা সৈকতের একটু দূরের সাগরে পড়ল সে।
ওখান থেকে সামান্য ব্যবধানে নেমেছে রোযি ইয়াসিমান। এটা যে ভুলবশত করা হয়নি, স্টিলের চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না। সৈকতে উঠে মেয়েটাকে খুঁজে নিয়ে ধর্ষণ করার পর খুন করবে নাৎসি। তাতে প্রথম লাশ হবে সুন্দরী মেয়েটা। আর সেটা হলে সঠিকভাবে চলবে ডার্টি গেম শো।
‘এবার মেয়েটাকে খুঁজে নেবে স্নাইডার,’ বলল স্টিল, ‘এরপর পিঠ টানটান করে চেয়ারে বসবে দর্শকেরা।’
আট
সাগরতলে নেমে পায়ের বেড়ির তালা ও হ্যাণ্ডকাফ খুলে ভেসে উঠেছে নাৎসি স্লাইডার। সময় লাগেনি সৈকতে উঠে আসতে। ইচ্ছে করেই সুন্দরী রোযি আর তাকে একই সৈকতে রেখেছে স্টিল। মেয়েটাকে ধর্ষণ করার পর খুন করবে বলে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল জার্মান খুনি। অবশ্য সেটা জানে না রোযি।
এরই মধ্যে কয়েক খাড়ি পেরিয়ে গেছে ব্রাভো চপার। ওটা থেকে সামান্য দূরের সাগরে অর্ধনিমজ্জিত এক টর্পেডো বোট। বিশ্বযুদ্ধে জাপানি মিলিটারির আক্রমণে ওটাতে মারা গিয়েছিল দুই আমেরিকান অফিসার ও আটজন সিম্যান। অন্যরা সাঁতরে সৈকতে উঠলে খুন করা হয় তাদেরকে।
এই দ্বীপে মানুষ খুন হওয়া আসলে নতুন কিছু নয়।
উড়ন্ত হেলিকপ্টারে চিৎকার জুড়েছে ইতালিয়ান খুনি বিয়াঞ্চি, ‘কুত্তার বাচ্চারা, ‘কুত্তার বাচ্চারা, একবার ঝোপের ভেতরে তোদেরকে পেলে হাসতে হাসতে জান কবজ করে নেব!’
স্ত্রীকে গুলি করে মেরেছে সে। বাধা দেয়ায় খুন হয়েছে আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা। বিক্রি করত ভাঙাচোরা ফিয়াট গাড়ি। যত বড় হারামি লোক হোক, তাকে নিয়ে খুব একটা ভাবছে না কেউ।
‘এবার খেলতে যাও, পিৎযা-ম্যান,’ খোলা দরজার দিকে বিয়াঞ্চিকে ঠেলে দিল একজন গার্ড।
‘আমি তোদের কাঁচা হৃৎপিণ্ড চিবিয়ে খাব!’ জাপানি খুনি তানাকা ও আমেরিকান ড্রাগ ডিলার ক্লার্কের উদ্দেশে চোখ পাকাল বিয়াঞ্চি। ‘আজই তোরা মরবি আমার হাতে!’
বিরক্তিকর লোকটার বকবকানি থামাতে তার মুখে চাবি পুরে দিল গার্ড। ঠেলে নিয়ে গেল খোলা দরজার দিকে। কিন্তু তাতে আপত্তি আছে ইতালিয়ানের। গার্ডের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। কোনভাবেই ঝাঁপ দেবে না হেলিকপ্টার থেকে। প্রথম গার্ডের সাহায্যে এগিয়ে এল দ্বিতীয় গার্ড। ধুপ-ধুপ করে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিল বিয়াঞ্চির গালে। পা পিছলে মেঝেতে পড়ল ইতালিয়ান।
আগ্রহের সঙ্গে সবই দেখছে তানাকা ও ক্লার্ক।
‘আমরা জায়গাটা পেরিয়ে গেছি!’ চিৎকার করল পাইলট।
মেঝে থেকে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে শেয়ালের মত কেঁদে উঠল বিয়াঞ্চি। বামের গার্ডের মোক্ষম এক ঘুষি লাগল তার চোয়ালে। ঝাঁকি খেয়ে দরজার দিকে পিছিয়ে গেল সে। পায়ের তলায় আর মেঝে নেই বুঝতেই টানা চিৎকার ছাড়ল বিয়াঞ্চি। সরাসরি নেমে গেল সাগরের দিকে। তবে বিধ্বস্ত টর্পেডো বোটে আকাশ থেকে পড়তেই হঠাৎ থামল তার করুণ আর্তনাদ। তিন ফুটি লোহার এক জং-ধরা শাফট ঘ্যাচ করে পিঠে ঢুকে বেরিয়ে গেছে তার বুক ভেদ করে।
.
বিশাল তাঁবুর মস্ত স্ক্রিনে স্টিল দেখল, গলগল করে মুখ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে ইতালিয়ান খুনির। শূন্য চোখে দেখছে সে নীল আকাশ। গোটা দৃশ্য এতই বীভৎস, মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে যে সত্যিই মারা গেছে লোকটা।
‘যাহ্!’ নিচু গলায় বলল সিলভারম্যান।
‘শুধু একটা যাহ্ বললেই হবে?’ বলল বিরক্ত স্টিল, ‘ওকে জেল থেকে আনতে গিয়ে আমার খরচ হয়েছে পাক্কা দেড় লাখ ডলার!’
বনি মার্সেল আগেই বলেছিল, তৃতীয় বিশ্বের জেলারদের মত কম পয়সায় কয়েদীকে ছাড়বে না ইতালিয়ান ওয়ার্ডেন। বিয়াঞ্চি ছিল কমিকাল চরিত্র। তার সঙ্গে অন্যদের লড়াই হলে হাসির খোরাক পেত দর্শকেরা। দেড় লাখ ডলার ফুৎ করে শেষ! তবুও কপাল ভাল, দর্শকেরা বুঝে গেছে যে সত্যিই খুন হয়ে গেছে লোকটা, এটা কোন নকল সিনেমা নয়।
কী কারণে ঠিক জায়গায় নামতে পারল না বিয়াঞ্চি, সেটা নিয়ে মাইকে এক গার্ডের সঙ্গে কথা বলছে এমিলি।
ওর মাইক কেড়ে নিল স্টিল। ধমকের সুরে বলল, ‘অ্যাই, গাধার দল, আমরা একটা শো দেখাচ্ছি! মাথায় রাখবে এরপর যেন আর কাউকে এভাবে মরতে না হয়!’
‘ব্যাটার মাথা আসলে নষ্ট ছিল, মিস্টার স্টিল,’ জবাবে বলল গার্ড। ‘আমাদের কিছু করার ছিল না।’
এমিলির মাইক ফেরত দিয়ে আরেক দিকে চলল স্টিল। অজুহাত শোনার ধৈর্য বা মানসিকতা তার নেই। শো ঠিকভাবে চলছে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। সিম্পসনের সঙ্গে কথা বলবে ভেবেছে স্টিল। ওর নিশ্চিত হতে হবে যে, যাদের জন্যে এত বড় ক্ষতি হলো, তারা যেন আর কখনও কারও চাকরি করতে না পারে।
অপলক চোখে ব্র্যাড স্টিলকে দেখছে রিটা, ওর চোখে এখন একরাশ দুশ্চিন্তা।
এদিকে পরে ব্যক্তিগত তাঁবুতে ফিরে নিজের কাজের ব্যাখ্যা দেবে বলে ভাবল স্টিল। নিচু গলায় বলল, ‘ভাল
কোন শো তৈরি করার কাজ সবসময় কঠিন।’
কোন মন্তব্য না করে মৃদু মাথা দোলাল রিটা
‘শো-র প্রথম দিকটা কেমন লাগল?’ জানতে চাইল স্টিল।
উপযুক্ত কথা খুঁজতে গিয়ে কয়েক সেকেণ্ড পর বলল রিটা, ‘খুব উত্তেজনাময় ছিল।’
মিথ্যা বলেনি রিটা।
প্রথমে দূর থেকে এল দুই হেলিকপ্টার। দেখা দিল দুর্দান্ত গ্রাফিক্স। এরপর দর্শকেরা দেখল অ্যাকশন সিনেমার মত সাগরতলের দৃশ্য। কিন্তু তারপর যা ঘটল, সেটা মেনে নেয়া খুব কঠিন। এখনও স্ক্রিনে ফুটে আছে মৃত লোকটার রক্তাক্ত মুখ। রিটার চোখ অনুসরণ করে ওদিকে তাকাল ব্র্যাড। ‘এই লোক তার পরিবারের সবাইকে খুন করেছে,’ নরম সুরে বলল সে, ‘ওর যা প্রাপ্য সেটাই পেয়েছে। তা ছাড়া, নিজে ডেকে এনেছে নিজের মৃত্যু। পাগলামি না করলে এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকত।’
ব্র্যাডের কথা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। তার চেয়েও বড় কথা, লোকটার চিৎকার এখন আর কানে এসে লাগছে না। তবুও রিটার মগজে কে যেন বলল: এখানে যা ঘটছে, সেটা সত্যিই খুব অমানবিক ও বেআইনী। এই কণ্ঠ ডায়ানা এরেনোর। বহু আগে দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে মহিলা। এখন কোটি কোটি মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে, এই নিষ্ঠুর শো তৈরি করার মাধ্যমে কী ধরনের অন্যায় করা হচ্ছে।
স্ক্রিনে চেয়ে এই দ্বীপ আর মানুষগুলোকে অলীক বলে মনে হলো রিটার। এসব দৃশ্য যেন অচেনা কোন বইয়ের কাল্পনিক অংশ। অথচ স্ক্রিনে উড়ন্ত ব্রাভো চপার এক শ’ ভাগ বাস্তব।
.
গার্ডের কথা পরিষ্কার শুনতে পেয়েছে জনি এস. ক্লার্ক। তাই জেনে গেছে যে মারা পড়েছে এনযো বিয়াঞ্চি। ‘ইতালিয়ান গাধা তো মরল,’ তানাকার দিকে তাকাল সে, ঠোঁটে হাসি। এবার হেলিকপ্টার থেকে নামতে হবে জাপানি দস্যুকে। সে হয় এর অর্থ বুঝতে পারছে না, অথবা তোয়াক্কা করছে না। এ-বিষয়ে আর মাথা ঘামাল না ক্লার্ক। মনে মনে বলল, ‘মরুক শালা! সামনা-সামনি লড়াইয়ে জাপানি কুত্তাটাকে স্রেফ সুশি বানিয়ে খেয়ে নেব!’
বাস্তবতা জানে তানাকা। চট করে দেখল পিটি বোটের ধ্বংসস্তূপ আর লাশ। রেডিয়োতে কথা বলছে সামনের গার্ড। নিজের কাজে ব্যর্থ হয়েছে বলে পরাজিতের মত হয়ে গেছে তার বডি ল্যাংগুয়েজ। এর ফলে আরও ভালভাবে বুঝে গেছে তানাকা, এরা অপেশাদার গার্ড। ইতালিয়ান বোকা লোকটাও ছিল নির্বোধ। গার্ডদের সঙ্গে লড়তে গেল কেন সে? এর কোন দরকার ছিল? ব্যাটার তো উচিত ছিল দ্বীপে নেমে লড়াইয়ের জন্যে মানসিকভাবে তৈরি হওয়া।
কোঁকড়ানো চুলের কালো লোকটাকে দেখল তানাকা। তার নড়াচড়ার ভেতরে মার্শাল আর্টের কোন ছাপ নেই। সুতরাং সে ধরে নিল, মাত্র কয়েক মিনিটে খতম করতে পারবে কালো কুত্তাটাকে। আসলে তাদের দলের মধ্যে মাত্র তিনজনকে নিজের প্রতিযোগী বলে ভাবছে তানাকা। প্রথমজন ইংরেজ লোকটা। দ্বিতীয়জন রাশান দানব। তৃতীয়জন চুপচাপ বাঙালি যুবক। শেষজনের কুচকুচে কালো মণি দেখলে ভয়ের শিরশিরানি তৈরি হচ্ছে তার বুকে। বাঙালি লোকটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
‘মুখ খোলো!’ তানাকার দিকে চাবি এগিয়ে দিল গার্ড।
কথা মেনে মুখে চাবি ভরতে দিল তানাকা। গার্ডের সবুজ সানগ্লাসে দেখছে নিজের প্রতিবিম্ব। বাইরে কাঠফাটা রোদ। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় সৈকতের সাদা ঝিকঝিকে বালি। সত্যিই কাজে লাগবে সবুজ সানগ্লাসটা।
সিলিঙের কেল্ থেকে তানাকার তালা খুলেছে দ্বিতীয় গার্ড। ঝড়ের বেগে নড়ে উঠল মার্শাল আর্টিস্টের দু’হাত। ছোঁ দিয়ে প্রথম গার্ডের নাকের ওপর থেকে সানগ্লাস নিল সে। ঝট করে পিছিয়ে ডিগবাজি মেরে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে। তার ফাঁকে একবার স্যাল্যুটও দিয়েছে প্রথম গার্ডকে।
‘অ্যাই, শালা!’ খেপে গিয়ে বলল গার্ড।
মজা পেয়ে ফিকফিক করে হাসতে লাগল ক্লার্ক।
বাঘের চোখে তাকে দেখল প্রথম গার্ড। ‘তোর মজা লাগছে, কালো কুত্তার বাচ্চা! ওটা রে-ব্যান সানগ্লাস! কিনতে গিয়ে আমার খরচ হয়ে গেছে দুই শ’ ডলারের বেশি!’
‘তাতে আমার কী?’ হাসির বেগ বাড়ল ক্লার্কের।
এক পা এগিয়ে গায়ের জোরে তার ঘাড়ে ঘুষি মারল গার্ড। শেকলে আটকে না থাকলে ব্যথার চোটে ভাঁজ হয়ে বসে পড়ত ক্লার্ক। আধমিনিট পর তার মুখে পুরে দেয়া হলো চাবি। প্রথম গার্ড চেইন খুলে ধাক্কা দিয়ে হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দিল ক্লার্ককে। সাগরের দিকে সাঁই করে নেমে গেল সে। বন্দিদের নামিয়ে দিয়ে মেইন ল্যাণ্ডের দিকে চলল ব্রাভো চপার।
.
আলফা চপারে রয়ে গেছে বন্দি রানা ও শ্যানন। মুষ্টিযোদ্ধার মত পরস্পরকে মেপে নিচ্ছে ওরা। কার কী ধরনের দুর্বলতা আছে, সেটা বুঝতে চাইছে।
প্রথমে মুখ খুলল শ্যানন, ‘তো, বলো দেখি হেলিকপ্টারে করে আসতে গিয়ে কেমন লেগেছে তোমার?’
জবাব না দিয়ে তার দিকে চেয়ে রইল রানা। শ্যাননের ইংরেজি উচ্চারণ উঁচু বংশীয় নয়। লিভারপুলের শ্রমিকেরা এই সুরে কথা বলে। স্পেশাল ফোর্সের মেজর হলেও ইংল্যাণ্ডের রানির জন্যে মিলিটারিতে যোগ দেয়নি শ্যানন। তার উদ্দেশ্য ছিল নিজের নোংরা চাহিদা পূরণ করা।
রানা যে মনোযোগ দিয়ে দেখছে, সেটা বুঝে অলস সুরে বলল শ্যানন, ‘ধরে নিলাম, তোমার এখানে আসতে খুব একটা ভাল লাগেনি। তবে এত ভেবো না, দেখবে চট্ করে শেষ হয়ে গেছে তোমার সব সমস্যা।’
সিকিউরিটি চিফের কনুইয়ের গুঁতো পাঁজরে খেল রানা।
‘সামনে বাড়ো, তুমি আগে নেমে যাবে, মুসলিমের বাচ্চা!’
একতিল না নড়ে সিম্পসনের চোখে চেয়ে রইল রানা।
আবারও ওকে সামনে ঠেলতে চাইল সিম্পসন।
কিন্তু পাথরের দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে রানা।
‘কুত্তার বাচ্চা, ঘাড় ত্যাড়ামি দেখাচ্ছিস?’ ব্যাটন দিয়ে ভয় দেখাতে চাইল সিম্পসন। ‘মুখ খোল, শালা! চাবি নিবি জিভের ওপরে!’
ব্যাটনের আঘাত আসার আগেই হেলিকপ্টারের দরজার দিকে দুই পা পিছিয়ে গেছে রানা।
‘হাঁ কর, শালা!’ সামনে বাড়ল সিম্পসন। ‘এবার এমন মারব যে…’ কথাটা আর শেষ করতে পারল না, তার আগেই রানার বাম কনুই খটাস্ করে লাগল সিম্পসনের চিবুকে। বনবন করে ঘুরে উঠল লোকটার জগৎ। পিছাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল দ্বিতীয় গার্ডের ওপর। ওখান থেকে নামল মেঝেতে। তার কপাল ভাল, কেবলে আটকে আছে রানা, নইলে হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ত সিকিউরিটি চিফের ওপরে।
হো-হো করে হেসে উঠেছে শ্যানন। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘মারটা কোথা থেকে এল, বোঝোনি, তা-ই না?’
চপারের মেঝে থেকে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল সিম্পসন। কোমরের কালো খাপ থেকে সড়াৎ করে নিল কমব্যাট নাইফ। মাথায় চেপে গেছে খুন। এবার ছোরার আঘাতে বের করে আনবে বাঙালি হারামজাদার পেটের নাড়িভুঁড়ি, কিন্তু তখনই তার মনে পড়ল স্টিলের ভীষণ গম্ভীর মুখ। শেষ সময়ে এই শুয়োরটাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছে বস্। কাজেই এখন একে শেষ করে দিলে বড় ধরনের বিপদে পড়বে সিম্পসন।
ভয় দেখাবার জন্যে কালো ছোরার ডগা রানার গলায় ঠেকাল সে। ছোট এক খোঁচা দিতেই বেরোল এক ফোঁটা রক্ত। হুমকির সুরে বলল, ‘কুত্তার বাচ্চা, তোর কপালে দুঃখ আছে।’ পাইলটের দিকে তাকাল সে। ‘দ্বীপের ওপরে চপার নাও।’
ডানে বাঁক নিল হেলিকপ্টার। ঝড়ের বেগে এগিয়ে এল সাদা সৈকত। নিচে একের পর এক উঁচু বালির ঢিবি।
অধীনস্থ গার্ডকে ইশারা করল সিম্পসন।
রানার চেইন খুলে দিল সে। ঘুরে দেখল বকে। ‘একে চাবি দেবেন না?’
জবাব না দিয়ে গায়ের জোরে ঠেলে রানাকে চপার থেকে নিচে ফেলল সিকিউরিটি চিফ রিভ সিম্পসন।
নয়
চপার থেকে পড়ে যেতেই দুনিয়াটাকে বনবন করে ঘুরতে দেখছে রানা। চারদিকে নীল, সবুজ, তামাটে ও সাদা রঙের খেলা। বিশ্বের চারভাগের একভাগ নীল আকাশ। পরের ভাগ সবুজ জঙ্গল। তৃতীয় অংশ তামার তৈরি। আর শেষে আছে ঝলমলে সাদা সৈকত। বহু ওপর থেকে বালির ঢিবিতে পড়লে হাড়গোড় বোধহয় একটাও আস্ত থাকবে না, ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল রানার। তারপর হঠাৎ করেই ভুস্ করে বুক থেকে বেরোল সব দম। বালির ঢিবিতে পতন হতেই গড়াতে গড়াতে ফুটবলের মত নেমে চলল ও। হাত-পা বেড়ি ও হ্যাণ্ডকাফে আটকানো বলে গড়িয়ে যাওয়ার গতি হ্রাস করতে পারছে না। শক্ত করে বুজে রেখেছে চোখ-মুখ। জানে না শেষমেশ কোথায় গিয়ে থামবে।
আরও দশ সেকেণ্ড পর ঢিবি থেকে নেমে সমতল জমিতে এসে থামল রানা। মুখের ভেতরে ঢুকে গেছে কর্কশ বালি। থুথু করে ওগুলো ফেলতে চাইল। চোখ মেলে দেখল মাত্র দশ ফুট দূরে সৈকতে প্রায় ডুবে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জং-ধরা এক উইলি জিপ। ওটা মিত্র বাহিনী ও অক্ষ বাহিনীর যুদ্ধের সাক্ষী। গায়ে জোয়ারের দাগ। জিপটার কারণে রানার মনে পড়ে গেল দ্বীপের সেই ওয়েদার টাওয়ারের কথা। একবার ওখানে গেলে হয়তো যোগাযোগ করতে পারবে বিসিআই হেডকোয়ার্টারে।
পায়ের শেকলের দিকে তাকাল রানা। চাবি ছাড়া কোনভাবেই খুলবে না বেড়ির তালা বা হ্যাণ্ডকাফ। বুঝে গেল, হেলিকপ্টারে সিম্পসনের থুতনিতে কনুইয়ের গুঁতো দেয়া বুদ্ধির কাজ হয়নি। গোড়ালির ব্রেসলেটের ওপরে থামল ওর চোখ। টাইম বমের ডিজিটাল ক্লক বলছে: আজ সোমবার, ২৬:৩২:০৫ মিনিট।
আশপাশে এখন কেউ নেই। উঠে বসে বোমার ওয়াএয়ার ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের হাউসিং পরখ করে দেখল রানা। যেহেতু অভিজ্ঞ বোমা বিশারদ, তাই সহজেই বুঝে গেল মিথ্যা বলেনি সিম্পসন। ঠিক যন্ত্রপাতি থাকলেও ডিযআর্ম হবে না এই বোমা। ওয়াওয়ারলেস হোস্ট প্রোগ্রাম বা বিশেষ কোন চাবিও ওর কাছে নেই।
মনে পড়ল শ্যাননের কথা। ইংরেজ সাইকোপ্যাথ বোধহয় ভেবেছে সবাইকে খুন করলে মুক্তি পাবে সে। চালাক লোক, সাগরে নেমে সহজেই খুলে নেবে নিজের হাত-পায়ের তালা। খুশিমনে নেমে পড়বে মানব-হত্যার খেলায়। এদিকে হাতে-পায়ে বেড়ি ও হ্যাণ্ডকাফ নিয়ে তার সঙ্গে দেখা হলে একমিনিটে খুন হবে রানা!
.
বিশাল তাঁবুর মেইন স্ক্রিনে রুপার্ট শ্যাননকে দেখছে সবাই। ব্রডকাস্ট করা হচ্ছে দৃশ্যটা। শুধু তাই নয়, রানা ছাড়া অন্য আটজনকে দেখানো হচ্ছে ক্যামেরার ফিডব্যাক থেকে। মেইন স্ক্রিনে অন্যদের দেখলেও রানাকে খুঁজে পাচ্ছে না পরিচালক ও প্রযোজক স্টিল। ভুরু কুঁচকে মস্ত স্ক্রিন দেখল সে, তারপর সিলভির দিকে চেয়ে বলল, ‘বাঙালিটা কোথায়?’
সব ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল দেখা যাচ্ছে বিশেষ এক স্ক্রিনে। ওখান থেকে বালির ঢিবির একটা দৃশ্য বেছে নিল সিলভি।
ক্যামেরাটা দেখাচ্ছে জং-ধরা জিপের পাশে রানা।
‘বালির ঢিবি টপকে ওদিকে গিয়ে পড়েছে সে।’
কন্সোলের একটা বাটন টিপে মস্ত স্ক্রিনে রানাকে আনল সিলভি। দুই সেকেণ্ড পর শর্ট কাট করে বেছে নিল কাছের এক অ্যাঙ্গেল। লেন্সটা আছে জিপের ভেতরে।
ভুরু কুঁচকে গেল স্টিলের। ‘ওর হ্যাণ্ডকাফ আর বেড়ি খুলে দেয়া হয়নি কেন?’
‘পড়বার সময় বোধহয় হারিয়ে গেছে এর চাবি,’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল সিলভি।
বন্ধুর সঙ্গে একমত নয় ব্র্যাড। ভাবল, সময় মত এ- বিষয়ে জানতে চাইবে সিম্পসনের কাছে। এটা বুঝে গেছে, বড় ধরনের বিপদে আছে মাসুদ রানা। অবশ্য তার মানে এমন নয় যে, খেলা থেকে বাদ পড়ে গেছে সে। চিরকাল নিজের শো-র জন্যে সেরা লোক বেছে নিয়েছে স্টিল। প্রতিভা চেনার অদ্ভুত এক গুণ আছে তার। ভাল করেই জানে, বিপদে লড়াই করতে দ্বিধা করবে না রানা।
স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সিওয়ার্সের দিকে তাকাল স্টিল। ‘সিওয়ার্স?’
নিজের প্যানেলে দ্বীপের কমপিউটার গ্রাফিক ইমেজ নিয়ে ব্যস্ত যুবক। দক্ষিণে আছে নয়টা + চিহ্ন। সেগুলো নড়েচড়ে বলে দিচ্ছে কারা আছে ওখানে।
‘ওরা আছে দক্ষিণে, সময় মত যে-যার মত খুঁজে নেবে নিজেদের।’
‘গুড। সিলভি, আমাদের কৃষ্ণ-সুন্দরী আর নাৎসির বেলায় কী ঘটছে?’
‘মিলা, দেরি না করে স্প্লিট স্ক্রিনে যাও,’ টেকনিশিয়ানকে বলল সিলভি।
স্ক্রিন দুই ভাগ হয়ে দেখা দিল দুটো দৃশ্য।
ডানের ছবিতে রোযি ইয়াসিমান, বামেরটায় নাৎসি।
দু’জনের চেহারা ও দৈহিক আচরণ থেকে যে-কেউ বুঝবে, কে আসলে শিকারি আর কে হচ্ছে শিকার।
এদিকে-ওদিকে চেয়ে হনহন করে হেঁটে চলেছে মেয়েটা। ঝোপের ভেতর দিয়ে সরাসরি ওদিকেই চলেছে স্লাইডার।
ওদিকে দিকহীনভাবে হাঁটছে রোযি। সাগর বা নদীর বানে ভেসে আসা বিশাল এক গাছের ডালপালা সরিয়ে এগোল সে। পাঁচ সেকেণ্ড পর একই গাছের শাখার কাছে পৌঁছে গেল নাৎসি স্লাইডার। সাপের মত নিঃশব্দে চলেছে। বুঝে গেছে, সামান্য দূরেই আছে মেয়েটা।
একটু দূরের সাদা সৈকত একদম নির্জন। উপকূলে মৃদু চুমু দিচ্ছে ছোট সব ঢেউ। সাগরের হাওয়া এসে বারবার দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে পাম গাছগুলোকে। আপাত শান্ত এই পরিবেশে নিজেকে একা আর নিরাপদ বলে ভাবছে রোযি। মাথার ওপরে কী যেন গুনগুন করে উঠতেই মুখ তুলে চেয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল সে। একটু দূরের দুই গাছের মাঝ দিয়ে উপসাগরের দিকে গেছে একটা কেব্ল্। ওটা থেকে ঝুলছে চারটে গুচ্ছ ক্যামেরা। সরসর করে এসে থামল রোযির মাথার ওপরে। ওর মনে হলো, অস্বাভাবিক কী যেন এবার ঘটবে!
ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে সৈকতে তাকাল রোযি। এইমাত্র এক শ’ গজ দূরে বড় এক পাথরের ওদিকে লুকিয়ে পড়েছে জাপানি খুনি কাইতো তানাকা। ভয়ে শুকিয়ে গেল রোযির গলা। লোকটা আবার ওকে দেখে ফেলেনি তো? আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না, ওর উচিত এখান থেকে সরে যাওয়া।
ঘুরে দৌড় দেবে ভেবেছে রোযি, এমন সময় ধক্ করে উঠল ওর হৃৎপিণ্ড। মাত্র ছয় ফুট দূরে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে নাৎসি স্নাইডার!
শ্বাস আটকে ফেলে ঘুরেই অন্যদিকে ছুটল রোযি।
.
‘অ্যাকশন! শুরু হয়ে গেছে ওদের লড়াই!’ খুশি হয়ে মস্ত তাঁবুর ভেতরে চেঁচিয়ে উঠল ব্র্যাড স্টিল। ‘এবার জমবে খেলা!’
উধাও হলো স্প্লিট স্ক্রিন। এখন একই পর্দায় দেখা যাচ্ছে দুই অসম প্রতিযোগীকে। সৈকতের দিকে ছুটছে রোযি, আর তার পিছনে ধেয়ে যাচ্ছে স্লাইডার। ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরসর করে এগোচ্ছে সিলভির কেবলের ক্যামেরা।
‘আরও ভাল করে দেখাও!’ চিৎকার করে উঠল স্টিল। ‘ওদিকে তোমার আর কোন ক্যামেরা নেই?’
‘এইটিন, টোয়েন্টি, থার্টি-ওয়ান, ‘থার্টি-ওয়ান,’ টেকনিশিয়ানকে জানাল সিলভি, ‘প্রতিটি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক আছে। আমরা আছি টোয়েন্টির সঙ্গে।’
রোমি ও স্নাইডারের সঙ্গে কেব্ল্ বেয়ে চলেছে ক্যামেরা। মেয়েটা হরিণীর বেগে ছুটলেও দৌড়ে নাৎসি যথেষ্ট পারদর্শী। মরিয়া হয়ে উঠেছে সুন্দরী মেয়েটাকে ধর্ষণ করতে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর মাটিতে রোযিকে পেড়ে ফেলল সে। ওর বাম গালে বসাল ডানহাতি জোরালো এক ঘুষি।
ক্যামেরার নানা অ্যাঙ্গেল ইন্টারকাট করছে সিলভি। একই সময়ে ডিসপ্লেতে মাউসের ক্লিক দিয়ে উপজাতিদের প্রার্থনার সুরেলা এক মন্ত্র বাজিয়ে দিল এমিলি।
‘দারুণ!’ চেয়ারে সোজা হয়ে বসল স্টিল। ‘আরও কাছ থেকে ছবি নাও, সিলভি! কিছু যেন বাদ না পড়ে!’
দৃশ্য ধারণে মন রাখতে গিয়ে ভুরু কুঁচকাল সিলভারম্যান। ‘একটা কথা, ব্র্যাড, তুমি ষাঁড়ের মত চেঁচালে মনোযোগ আমার বাড়বে না। মনে হবে সব ছেড়ে পালিয়ে যাই!’
‘এমিলি, মন্ত্রের সঙ্গে চলুক জাঙ্গল মিউযিক!’ নির্দেশ দিল স্টিল। ‘তাতে আরও বাড়বে উত্তেজনা!’
.
সৈকতে মরা এক গাছের ডাল ধরে স্লাইডারের তলা থেকে হাঁচড়েপাঁচড়ে বেরিয়ে আসছে রোযি। ভয়ে গলার কাছে এসে লাফ দিচ্ছে ওর হৃৎপিণ্ড। মনে পড়েছে ছোটবেলায় ধর্ষিত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছে খুন করে ফেলা লোকগুলোর বিকৃত চেহারা। প্রথমবার যখন ধর্ষিত হলো, তার আগে লুকিয়ে পড়েছিল বিছানার নিচে। এখনও মরা গাছের ডালপালার নিচে আছে সে। দুই গোড়ালি ধরে হিড়হিড় করে টেনে বের করা হচ্ছে ওকে। বারো বছর বয়সে যে-লোক ধর্ষণ করেছিল, সে ছিল ওরই মায়ের গোপন প্রেমিক। পাপোশ খামচে ধরেও বিছানার নিচে লুকিয়ে থাকতে পারেনি রোযি। এখন দু’হাতের দশ আঙুলে খামচে ধরেছে বালি। মায়ের প্রেমিক বিছানার তলা থেকে টেনে বের করে ওকে চিত করে শুইয়ে একের এক এক চড় দিয়েছিল গালে। কাঁদতে শুরু করলে ছিঁড়ে নিয়েছিল ওর ব্লাউয। এখন তার চেয়েও অনেক বড় বিপদে আছে রোযি। নাৎসি লোকটা ভোগ করার পর হাসতে হাসতে খুন করবে ওকে!
ডেরেকের বয়স পঞ্চাশ হলেও শরীরে অসুরের শক্তি। বারবার ঘুষি মারছে রোযির তলপেট ও ঊরুর ওপরে। ওকে গাছের তলা থেকে বের করে এনে উঠে দাঁড়াল লোকটা। শুরু হলো একের পর এক লাথি রোযির পাঁজরে। আত্মরক্ষা করার জন্যে লোকটার পায়ে খামচি মেরে পিছিয়ে যেতে চাইছে ও।
নিরীহ দেখালেও শরীরে বেশ শক্তি আছে রোযির। অবশ্য সেটা কিছুই নয় স্লাইডারের তুলনায়। লোকটার প্রচণ্ড এক ঘুষি বুকে লাগতেই প্রায় উড়ে গিয়ে ঝোপের ভেতরে পড়ল রোযি। ব্যথা পেয়েছে ভীষণ। ওর মনে হলো অচেতন হয়ে গেলেই বুঝি ভাল ছিল। তাতে শেষ হতো কষ্টের এই জীবন। এসব ভাবলেও মনের জোরে নিজেকে সামলে নিতে চাইল মেয়েটা।
ক্ষুধার্ত নেকড়ে যেমন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আহত খরগোশের দিকে তাকায়, সেভাবে রোযিকে দেখছে ডেরেক। প্রচণ্ড যৌন-লালসায় ঠোঁটের কশ বেয়ে নামছে লালা। মেয়েটাকে ভোগ করার পর খুশিমনে খুন করবে। অন্য জাতির কোন মেয়েকে বাগে পেলে মিলিটারি জীবনে ধর্ষণের পর খুন করত। তাদের বিকৃত লাশ দেখে কেউ বুঝত না দেখতে আগে কেমন ছিল বেচারি। ছোরা দিয়ে জবাই করার শখ ছিল স্লাইডারের। আর তাই ধরা পড়ার পর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কসাই’।
ইস্পাত নীল চোখে এখন রোযিকে দেখছে সে। ভাবছে, যৌন-মিলনের পর মেয়েটাকে গলা টিপে মারলে কেমন হয়!
.
বিশাল তাঁবুর ভেতরে মস্ত স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে সবাই। কারও মুখে কোন রা নেই। বুঝে গেছে, চোখের সামনে দেখতে হবে মেয়েটাকে ধর্ষণের পর খুন করছে স্নাইডার। হাঁ হয়ে গেছে ক’জন। অন্যদের মনে কাজ করছে অপরাধবোধ।
‘এসব মারাত্মক ফুটেজ,’ ঢোক গিলল সিওয়ার্স।
‘সত্যিই খুব ভীতিকর,’ সায় দিল এমিলি।
এসব দৃশ্য এতই আপত্তিজনক ও অসুস্থকর, স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছে রিটা। তিক্ত মনে ভাবছে, আর কতক্ষণ এই ভয়াবহ দৃশ্য দর্শকদের দেখাবে ব্র্যাড!
স্ক্রিনের দৃশ্য যেন গপগপ করে গিলছে স্টিল। হঠাৎ করে ঘুরে দেখল, চরম আপত্তি ফুটে উঠেছে রিটার মুখে।
অনুষ্ঠান শেষ হলে নানান দেশে হাজার হাজার সাংবাদিক বলবে, সত্যিকারের জঘন্য এক জানোয়ার এই ব্র্যাড স্টিল। কেউ কেউ হয়তো নেবে আইনের আশ্রয়। কিছু দেশের সরকার চাইবে, যাতে ভবিষ্যতে এ-ধরনের কোন শো কেউ আর তৈরি করতে না পারে। মনে মনে হাসল ব্র্যাড, রাজনীতিবিদ, বিচারক, জুরি বা সমালোচকেরা যা-ই বলুক, দেখার মত শো তৈরি করছে ও। এরপর আর কখনও বক্স অফিস নিয়ে ভাবতে হবে না। ধর্ষণ-দৃশ্য দেখে কোটি কোটি দর্শক বলতে বাধ্য হবে, আর কখনও এমন শো দেখিনি।
সুতরাং কোনভাবেই এখন বন্ধ করা যাবে না এই শো।
.
সাপের মত পিছলে এসে রোযির বুকে উঠে পড়েছে স্নাইডার। দু’হাতে খামচে ধরেছে সুন্দরী মেয়েটার ট্যাঙ্ক টপ। এবার ফড়ফড় করে ছিঁড়ে নেবে সংক্ষিপ্ত পোশাক।
কৈশোরের সেই ধর্ষকের মুখ যেন চোখের পাতায় দেখছে রোযি। ছোটবেলায় খুব ভয় পেয়েছিল। কিছু করার ছিল না তখন। পরে বড় হয়ে শিখে নিয়েছে শুয়োরগুলোকে কীভাবে ঠেকাতে হবে। রাগ ও ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে দু’হাতে ডেরেকের অণ্ডকোষ ধরে হ্যাঁচকা টান দিল রোযি।
তাতে বিকট এক আর্তচিৎকার ছেড়ে প্রায় অবশ হয়ে গেল জার্মান খুনি। আর এ-সুযোগে হাঁচড়েপাঁচড়ে তার তলা থেকে বেরিয়ে এল রোযি। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় দেবে, কিন্তু তার আগেই আবারও খপ্ করে ওর কবজি ধরল ডেরেক। ডানহাতি জোর এক ঘুষি মারল রোযির বুকে। ধর্ষণ করার কথা ভুলে গিয়ে এখন ভাবছে: কত বেশি কষ্ট দিয়ে খুন করতে পারবে বেটিকে।
উঠে বসে রোযির কণ্ঠনালী চেপে ধরল সে। গলায় তীব্র ব্যথা পেয়ে দু’হাতে ডেরেকের দুই কনুই সরাতে চাইল রোযি। লাথি ছুঁড়লেও লাগাতে পারল না লোকটার তলপেটে। বাড়ছে শ্বাসনালীর ওপরে চাপ। দমের অভাবে রোয়ির মনে হলো ডুবে মরে যাচ্ছে সে। জার্মান খুনির নীল চোখে চেয়ে তাকে সাক্ষাৎ ইবলিশ বলে মনে হচ্ছে ওর। এতকাল যারা শরীর ভোগ করে গেছে, তাদেরই যেন প্রতিভূ এই নাৎসি লোকটা। তাদের সবাইকে খুন করতে পারলেও এখন মনে হচ্ছে রোযির, নরক থেকে উঠে এসে ওকে শেষ করে দিচ্ছে এই হারামজাদা।
রোষির হাত খসে গেল স্লাইডারের বাহু থেকে। ঝাপসা দেখছে চোখে। জগৎ হয়ে গেল ধূসর। একটু পর ঢলে পড়বে মৃত্যু-মুখে। অথচ, ভেবেছিল কোন না কোনভাবে প্রাণে বেঁচে যাবে। কেন যেন ওর ভীষণ অভিমান হলো স্রষ্টার ওপরে।
নিজেকে বলল রোযি, নাহ্! আমি একে জিতে যেতে দেব না! কাত হয়ে মরা এক শুকনো ডাল তুলে নিল ও। একদিকে চাপ দিতেই মড়াৎ করে ভাঙল ওটা। শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ডালের চোখা দিক ডেরেকের ঘাড়ে গেঁথে দিল রোযি।
বেসুরো আর্তনাদ করে উঠল স্নাইডার। রোযির গলা ছেড়ে পিছিয়ে গেল সে। এই সুযোগে বড় করে দম নিল রোযি। বাতাস যে এত মিষ্টি সেটা আগে কখনও ভাবেনি। দুই সেকেণ্ড পর চোখ মেলল ও।
রক্তে ভাসছে ডেরেকের ঘাড়ের একদিক। গভীর ক্ষতটার ভেতরে গেঁথে আছে চোখা ডাল।
জার্মান ভাষায় কী যেন বলল লোকটা। ঘাড়ের গর্ত থেকে বের করতে চাইল তর্জনীর মত পুরু ডাল।
এক পা ছুটিয়ে নিয়ে গায়ের জোরে তার মুখে লাথি মারল রোযি। ছিটকে মাটিতে গিয়ে চিত হয়ে পড়ল স্নাইডার।
.
রোযির দুর্দান্ত সাহসিক কাণ্ড দেখে বিশাল তাঁবুর ভেতরে প্রশংসা করছে কয়েকজন মিলে। চোখ তুলে মস্ত স্ক্রিনের দৃশ্য দেখে নিল রিটা। গোপনে ফেলল স্বস্তির শ্বাস। পরক্ষণে নিজেকে সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পালাও! এবার পালিয়ে যাও!’
চোখে খুশি নিয়ে ওকে দেখল স্টিল। তার তৈরি শো মুগ্ধ করছে প্রেমিকাকে। আর এমন হবে সেটা আগেই জানত সে।
.
একদল মানুষ যে শো দেখে হাততালি দিচ্ছে বা প্রশংসা করছে, তার কিছুই মাথায় নেই রোযি ইয়াসিমানের। ছুটে পালিয়ে যাওয়ার কথাও মনে নেই। অথচ সেটা উচিত ছিল ওর। রোযি এটা বুঝেছে, এখন আর হামলা করতে পারবে না জার্মান খুনি। রক্তক্ষরণে না মরলেও দ্বীপে যারা আছে, তাদের হাতে মরবে লোকটা।
অবশ্য তাতে তো আর কমে যাচ্ছে না রোযির রাগ। সাবধানে সামনে বেড়ে স্লাইডারের ব্রেসলেটের লাল ট্যাব এক টানে খুলে নিল সে।
টাইমারে দেখা দিল নতুন সংখ্যা – ০০:০০:১০।
পরের সেকেণ্ডে ঘড়িটা বিপবিপ আওয়াজে জানান দিল, মাত্র নয় সেকেণ্ড পর ফাটবে শক্তিশালী বোমা!
জীবনে প্রথমবারের মত বুঝে গেল স্লাইডার, সত্যিকারের ইবলিশ আসলে হচ্ছে এই রোযি ইয়াসিমান!
রক্তাক্ত ঘাড়ের ব্যথা ভুলে গেল স্নাইডার। দু’হাতে গোড়ালি থেকে খুলতে চাইল ব্রেসলেট।
ওদিকে ঝড়ের বেগে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে কালো মেয়েটা। তার উদ্দেশে জার্মান ভাষায় বিশ্রী সব গালি দিল স্লাইডার। বদ্ধ উন্মাদের মত চাইল টাইম বমের ব্রেসলেট খুলে ফেলতে।
আর মাত্র তিন সেকেণ্ড পর ফাটবে বোমা!
মৃত্যুক্ষণে গলা ফাটিয়ে ঈশ্বরের বাপ তুলে গালি দিল সে।
আস্ত কোন কেবিন উড়িয়ে দেয়ার জন্যে বিশ আউন্স সি- ৪ মোটেই কম নয়। টাইম বম ফেটে যেতেই আগুনের বিশাল ফুটবলটা হলো দেখার মত। একসেকেণ্ডে বাষ্প হয়ে উবে গেল স্লাইডার। বালির বুকে শুধু রয়ে গেল লালচে কিছু দাগ।
.
বিশাল তাঁবুর ভেতরে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল সবাই।
‘কঠিন শো,’ চট্ করে কমপিউটারের ডিসপ্লে দেখল সিওয়ার্স। স্ক্রিনে এখন দেখাচ্ছে কমে গেছে একটা + চিহ্ন।
বিশাল স্ক্রিনে ফুটল স্নাইডারের পাসপোর্ট ছবি। ওটার ওপরে দেখা গেল লাল এক্স অক্ষর।
খুশিমনে ওদিকে চেয়ে আছে স্টিল।
দ্বীপে প্রতিযোগী রয়েছে এখন মাত্র আটজন।
মাত্র একঘণ্টায় ভালভাবে জমে গেছে শো।
প্রথম থেকে দেখানো হচ্ছে বিস্ময়কর সব ঘটনা।
যদিও এখনই খুব খুশি হওয়ার কিছু নেই।
যখন-তখন গুবলেট হয়ে যেতে পারে সব।
সাত প্রতিযোগীকে শেষ করে বিজয়ী হতে হলে একজনের লাগবে অনেক ঘণ্টার শ্রম। আর এ-সময়ে দর্শক- সংখ্যা বাড়িয়ে নিতে হবে স্টিলের। যতক্ষণ ধরে চলবে এই শো, ততই লাভ হবে তার। শুধু মনে রাখতে হবে ডার্টি গেম যেন না হয়ে ওঠে বিরক্তিকর।
স্টিলের কোন শো কখনও বিরক্তিকর বলে মনে করেনি দর্শকেরা। আর এবারের শো হবে আগেরগুলোর চেয়ে ভাল।
দশ
কয়েক মাইল দূর থেকে শোনা গেছে সি-৪ বিস্ফোরণের শব্দ। অবশিষ্ট আট প্রতিযোগী বুঝে গেছে ওটার অর্থ আসলে কী।
স্লাইডারের সবচেয়ে কাছে ছিল তানাকা। চপারে গার্ডের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া সানগ্লাস পরে আগুনের কমলা ছাতি ম্লান লেগেছে তার চোখে। বুঝতে অসুবিধে হয়নি, দশজনের দু’জন এখন আর নেই। তানাকা ভাবছে, মরে ভূত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী। জার্মান খুনির সঙ্গে গায়ের জোরে জেতার কথা নয় তার। অবশ্য অন্যকিছুও হতে পারে। তানাকার মনে হচ্ছে, উর্বশী, লোভনীয় এক নারী পেয়েও তাকে বোমা ফাটিয়ে খুন করেছে নাৎসি। তার তো ইচ্ছে হওয়ার কথা নারীদেহ ভোগের পর খুন করতে। রোযি বেঁচে থাকুক সেটা মনে মনে চাইছে তানাকা। জার্মান শুয়োর মরলে প্রতিযোগিতায় জেতার সম্ভাবনা বেড়েছে তার।
সাগরের দিকে তাকাল সে। আকাশ থেকে পিটি বোটে পড়ে মরে ভূত হয়েছে ইতালিয়ান। আগুনের শিখা আর প্রায় নিমজ্জিত বোট তানাকাকে মনে করিয়ে দিয়েছে ওর দাদীর কথা।
নাগাসাকির কাছে ছোট এক গ্রামে বাস করত মহিলা। অ্যাটম বোমা পড়লে প্রাথমিক বিস্ফোরণে বেঁচে গেল। তবে ভয়ঙ্কর সেই জীবন হয়ে উঠল মৃত্যুসম। তানাকার মা তখন কায়োটোতে আত্মীয়ের বাড়িতে ছিল বলে তার ওপরে পড়েনি বিকিরণের প্রভাব। অনেক পরে ছেলেকে বলেছে মহিলা, বিশ্বযুদ্ধের সময় কোথাও পাওয়া যেত না ব্যথা-নাশক ওষুধ। তাই ক্যান্সারে দু’বছর ধুঁকে খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছে ওর দাদী।
অন্য দেশের চেয়ে জাপানে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহু গুণ বেশি। তানাকার বয়স যখন মাত্র বারো, তার মায়ের শরীরে দেখা দিল লিমফোমা। ওটা হয়েছিল মার্কারি বিষক্রিয়ার কারণে। জাপানের মানুষের ওপরে অ্যাটম বোমা ফেলেছে বলে আমেরিকার সবাইকে ঘৃণা করে সে।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাশান দৈত্য, ইংরেজ মিলিটারিম্যান ও বাঙালি লোকটার কথা আবারও মনে পড়ল তানাকার। তারা একবার খুন হলে অন্যদের শেষ করে দিতে কষ্ট কম হবে ওর।
আরেকবার চারপাশ দেখে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল সে।
.
দু’মাইল দূর থেকে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে রানা। এটাও দেখেছে যে দূরে কালো ধোঁয়া। ওর বুঝতে দেরি হয়নি, ব্রেসলেট ফাটার অর্থ আসলে কী। এখন হাতে- পায়ে হ্যাণ্ডকাফ আর বেড়ি নিয়ে ভাবছে, গোড়ালি থেকে কীভাবে খুলবে শক্তিশালী টাইম বম। দক্ষিণ আকাশে আরও ওপরে উঠে গেছে কালো ধোঁয়া। দ্বিতীয় হেলিকপ্টার থেকে পড়ে যে-লোক মরল, তাকে বাদ দিলেও কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে বোধহয় এখনও রয়ে গেছে সাইকো শ্যানন, জাপানি ইয়াকুয়া দলের ডাকাত, দুই মেক্সিকান খুনি ও রাশান দানব।
কীভাবে তাদের মোকাবিলা করবে, সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবার সুযোগ হয়নি রানার। ব্রিটিশ ও রাশান লোকদুটো ওর জন্যে বড় ধরনের হুমকি। বাধ্য হয়ে ওর মেনে নিতে হচ্ছে, হাত-পায়ের শেকল খুলতে না পারলে যে-কেউ খুন করতে পারবে ওকে।
বেড়ির শেকল বা হ্যাণ্ডকাফের তালা ভাঙা যাবে এমন কিছু জিপের কাছে দেখতে পেল না রানা। স্টিয়ারিং শাফট শক্ত করে ধরতেই ভুস্ করে ওটা হয়ে গেল লালচে জঙের ধুলো। রানা বুঝে গেল, এই জিপে কিছুই পাবে না।
ড্যাশবোর্ড থেকে চারপাশে চোখ রেখেছে এক ক্যামেরা। বুঝে গেল রানা, এখানে থাকলে ক্যামেরার মালিকেরা একটু পর দেখতে পাবে সহজ এক খুনের দৃশ্য। বালির ঢিবির কাছে হামলা করা হলে বাঁচার কোন উপায় থাকবে না ওর। .
দক্ষিণে চেয়ে আধমাইল দূরে বালির ঢিবি শেষ হয়ে গেছে দেখতে পেল রানা। এরপর শুরু হয়েছে পাথরখণ্ডের এলাকা। চাইলে ওখানে লুকিয়ে পড়তে পারবে ও। শক্ত কোন পাথর পেলে ওটা দিয়ে হয়তো ভাঙা যাবে বেড়ির কড়া ও হ্যাণ্ডকাফের তালা।
.
পাথুরে এলাকার দিকে রানা যেতেই মেইন তাঁবুর বড় স্ক্রিনে আনা হলো আরেক এলাকার ছবি। ওখানে বিস্ফোরণে উবে গেছে নাৎসি। তার মৃত্যু যেন ছিল পরাবাস্তব। তাঁবুর সবার মনে হয়েছে, সত্যিই কি মারা গেছে লোকটা, নাকি এখনও বেঁচে আছে?
যারা অ্যাকশন সিনেমা পছন্দ করে, প্রতিটি ফ্রেম পয করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে গোটা দৃশ্য। তাদের বুঝতে দেরি হবে না যে বিস্ফোরণে কমপিউটারের কোন কৌশল ছিল না।
দুনিয়া জুড়ে যারা স্টিলের শো দেখছে, এরই ভেতরে তারা বুঝে গেছে ঘটনাগুলো সত্যি ঘটছে। বর্তমান দর্শকেরা জানিয়ে দিচ্ছে পরিচিতদেরকে, আসলে কী চলছে ডার্টি গেম শো-তে। ফলে হুড়মুড় করে বাড়তে শুরু করেছে সদস্য- সংখ্যা। এরই ভেতরে সদস্যপদ নেয়ার জন্যে অনুরোধ জানাচ্ছে লাখ লাখ নতুন গ্রাহক। তাদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে উঠেছে সিওয়ার্স। একবার ঘাড় ফিরিয়ে স্টিলের দিকে তাকাল। ‘আমাদের দর্শক এখন পাঁচ মিলিয়ন!
‘এটা তো মাত্র শুরু, ‘ হাসল ব্র্যাড স্টিল।
তার দিকে মুখ তুলে তাকাল সিলভারম্যান। ‘এটা মাত্র শুরু? তা হলে কী পরিমাণ দর্শক তুমি আসলে আশা করছ?’
‘সুপার বোউল-এ দর্শক কত হয়, সেটা জানো?’
‘চল্লিশ মিলিয়ন।’
‘আমি আশা করছি তার চেয়ে বেশি দর্শক পাব।’ হতবাক হয়ে স্টিলের দিকে চেয়ে রইল এমিলি, সিলভি ও সিওয়ার্স।
‘কিন্তু সেটা তো অসম্ভব!’ বলল সিলভারম্যান।
‘পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই,’ হাসল স্টিল। ‘এরই ভেতরে সাড়া পড়ছে ব্লগ ও চ্যাট-রুমগুলোতে। তাদের ভেতরে আলাপ চলছে, আফ্রিকান এক সুন্দরী মেয়ে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে এক জার্মান নাৎসিকে। এর ফলে কী হচ্ছে সেটা কি বুঝতে পেরেছ, সিলভি? আগুন ধরে গেছে ইন্টারনেটে!’
‘শুরু হয়েছে লাখ লাখ পোস্ট,’ মন্তব্য করল সিওয়ার্স।
পুরনো বন্ধু সিলভারম্যানের কাঁধ চাপড়ে দিল স্টিল। ‘গুড ওঅর্ক! চালিয়ে যাও, বাড়ি!’
জবাবে দুর্বল হাসল সিলভি।
‘ধরে নাও আমরা জাদু দেখাচ্ছি,’ দলের উদ্দেশে বলল স্টিল। রিটার প্রতিক্রিয়া দেখতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, কিন্তু তাঁবু ছেড়ে চলে গেছে মেয়েটা।
.
চপার থেকে প্রবাল প্রাচীরের কাছে সুনীল সাগরে এসে পড়েছে আলকারায। সাগরের তিন ফুটি ঢেউ আছড়ে পড়ছে অগভীর রিফের গায়ে। একবার সৈকতে উঠলে দ্বীপের দক্ষিণে একের পর এক বালির ঢিবি ও দূরে খাড়া টিলা। আলকারাযের বেশিক্ষণ লাগল না রিফ টপকে পাথুরে জমিতে পা রাখতে। করুণ চোখে দেখল ধারাল প্রবাল ছিঁড়ে দিয়েছে ওর প্যান্ট। সৈকতে উঠতে গিয়ে বার কয়েক আছাড় খেল। তাতে ছিলে গেল কনুই। চাবি দিয়ে খুলে নিল বেড়ির তালা ও হ্যাণ্ডকাফের লক। এরপর ক্লান্তি দূর করতে শুয়ে পড়ল সৈকতের বালিতে।
মাত্র দশ সেকেণ্ড হলো বিশ্রাম নিচ্ছে, এমন সময় চমকে গেল বিকট বিস্ফোরণের আওয়াজে। শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে চারপাশে তাকাল। সামনের ক্লিফের জন্যে কিছুই দেখতে পেল না। তাকাল ওর গোড়ালির টাইম বমের দিকে।
টিকটিক করে কমছে ঘড়ির সময়। বোমার বিস্ফোরণে এরই ভেতরে মারা গেছে ওদের একজন। জানা নেই, মারা গেছে কে। স্ত্রীর বিপদ হয়েছে ভেবে গলা শুকিয়ে গেল তার। মনে মনে বলল, বাঁচাতে হবে ইসাবেলাকে!
হাতে শক্ত করে ধরা চাবি একবার দেখল আলকারায। বুঝে পেল না ওটা আর কোন কাজে আসবে কি না। ওকে নামিয়ে দিয়ে দক্ষিণে গেছে হেলিকপ্টার। তখনও ওটাতে ছিল ইসাবেলা। সুতরাং ধরে নেয়া যায় বালির ঢিবির কাছে নামানো হবে ওকে। ইসাবেলাকে খুঁজতে দক্ষিণে মরুভূমির মত বালির ঢিবির দিকেই যাওয়া উচিত ওর। কিন্তু সেক্ষেত্রে আগে পার হতে হবে চওড়া সৈকত। ওখানে যে-কেউ দেখতে পাবে ওকে। আলকারায সবসময় হামলা করেছে শিকারি হিসেবে। সুবিধামত ডাকাতি বা খুন করেছে। তখন আত্মরক্ষার কোন পথ ছিল না নিরীহ মানুষের। অথচ এখন এই দ্বীপে নিজেকে অসহায় এক শিকার বলেই মনে হচ্ছে তার।
বোমা বিস্ফোরণের এলাকার দিকেই চলল আলকারায। সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র নেই বলে উলঙ্গ লাগছে তার। ফিরে গিয়ে সংগ্রহ করল বেড়ির শেকল। বিপদ এলে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে ওটা।
.
মরুভূমির মত বালির ঢিবি পেরিয়ে পাথুরে এলাকার কাছে চলে গেছে রানা। পায়ে বেড়ি ও হাতে হ্যাণ্ডকাফ নিয়ে ঢিবি টপকাতে গিয়ে হতক্লান্ত। হাঁটার গতি মন্থর। হাত-পায়ের শেকলের ঝনঝন শব্দ চাপা পড়ছে সাগরের ঢেউয়ের শোঁ-শোঁ শব্দে। পাথুরে এলাকায় কেউ থাকলেও সে শুনছে না রানার তৈরি কোন আওয়াজ।
সামনে দেয়ালের মত বিশাল বোল্ডার দেখে সাগরে গলা সমান পানিতে নেমে এল ও। বুটের নিচে কুড়মুড় করে ভাঙছে রঙিন প্রবাল। পাশ কাটাল বিশাল বোল্ডার। এবড়োখেবড়ো পাথুরে জমিতে বেধে যাচ্ছে পায়ের বেড়ি। বুঝতে পারছে, আশপাশে শত্রু থাকলে তার সহজ শিকার হয়ে উঠবে।
বোল্ডার পেছনে ফেলে আবার তীরে উঠে এল রানা। সামনে জোয়ারের জলে ভরা পাথুরে বিশাল টেরেস। ওখানে বসে চারদিকে চোখ বোলাল রানা। ওর চাই এমন এক টুকরো শক্ত পাথর, যেটা দিয়ে ভাঙতে পারবে বেড়ির কড়া ও হ্যাণ্ডকাফের তালা। পাথর খুঁজতে গিয়ে ওর চোখে পড়ল ডোবার দিকে পানির ভেতরে কিসের যেন নড়াচড়া। চট্ করে সরে গিয়ে বড় এক পাথরের আড়াল নিয়ে সেদিকে চেয়ে রইল রানা। হাওয়ার তোড়ে রোদে ঝিলমিল করছে ডোবার ওপরদিকের জল। ওখানে কে আছে সেটা বুঝতে পারল না রানা।
কয়েক সেকেণ্ড পর পানি থেকে উঠে এল এক লোক। সম্ভবত ডোবা পাশ কাটিয়ে বালির ঢিবির দিকে যাবে সে। বোল্ডারের পেছনে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করার জন্যে তৈরি হয়ে গেল রানা। এক এক করে পেরোচ্ছে সেকেণ্ড।
বোল্ডার পাশ কাটিয়ে এগোল লোকটা, সম্পূর্ণ অসতর্ক। তাকে চিনে গেল রানা। এ সেই মেক্সিকান ডাকাত ও খুনি। সে কিছু বোঝার আগেই পেছন থেকে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা।
পাথুরে জমিতে হুমড়ি খেল আলকারায। অনায়াসে তার হাত থেকে শেকল কেড়ে নিল রানা। খপ্ করে তার ঘাড় চেপে ধরে টেনে তুলে ঠেস দিয়ে ধরল এক বোল্ডারের গায়ে। হ্যাণ্ডকাফের শেকলে পেঁচিয়ে নিয়েছে লোকটার গলা। শ্বাস আটকে যেতেই নিজেকে ছাড়াতে চাইল সে।
তার চেয়ে গায়ের জোর বেশি রানার। নিচু গলায় জানতে চাইল ও, ‘তুমি কি আমার পিছু নিয়েছ?’
রানার কোমরে কনুইয়ের গুঁতো দিতে চাইল আলকারায। তবে আগেই সরে গেছে রানা। হ্যাণ্ডকাফের শেকল দিয়ে আরও জোরে চাপ দিল যুবকের গলায়।
‘তোমার মতলবটা কী?’ জানতে চাইল রানা।
নিজেকে ছাড়াতে গিয়ে মেক্সিকান দস্যু বুঝে গেল, গায়ের জোরে কোনভাবেই পারবে না। মনে মনে মেনে নিল, এবার খুন হতে হবে তাকে।
‘তুমি কি মরতে চাও, নাকি বাঁচতে?’ বলল রানা।
‘আমি… আমার স্ত্রীকে খুঁজছি, সেনর,’ ফ্যাসফেঁসে কণ্ঠে বলল আলেক্যান্দ্রো। ‘কাউকে খুন করতে চাই না।’
হ্যাঙারে ও চপারে রানা দেখেছে, ডাকাত ও খুনি হলেও স্ত্রীকে অন্তর থেকে ভালবাসে যুবক। পুরুষমানুষ হিসেবে স্ত্রীর প্রতি সে বিশ্বস্ত। তা ছাড়া, প্রতিপক্ষ হিসেবে বড় কোন হুমকি নয় যুবক। তাকে নিজ পথে যেতে দেবে বলে ভাবল রানা। হ্যাণ্ডকাফের শেকল গলা থেকে সরিয়ে নিয়ে পিছিয়ে এল। ‘তা হলে যাও। খুঁজে বের করো তোমার স্ত্রীকে।’
কিছুক্ষণ ব্যথাভরা গলা টিপল আলকারায, তারপর পাথুরে জমি থেকে তুলে নিল রানার ফেলে দেয়া শেকল। একবার তাকাল ওর চোখে; দৃষ্টিতে একরাশ বিস্ময়। জানে না, কেন ওকে সুযোগ পেয়েও খুন করল না বাঙালি যুবক!
কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে কী যেন বের করল আলকারায, ওটা ছুঁড়ে দিল রানার দিকে। ‘সেনর, এটা হয়তো তোমার কাজে লাগবে। আমাকে যে ছেড়ে দিলে, সেজন্যে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’
খপ্ করে চাবি ধরেছে রানা। ওটা কি-হোলে ভরে মোচড় দিতেই খুলে গেল হ্যাণ্ডকাফের তালা। পরের পাঁচ সেকেণ্ডে বেড়ি থেকে মুক্ত হলো ওর দু’পা।
সম্মান দেখাতে পরস্পরের প্রতি মৃদু মাথা দোলাল দুই পুরুষ। ঘুরে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর খোঁজে চলল মেক্সিকান দস্যু।
Chapter - 11 to 15
এগারো
হেলিকপ্টার থেকে যে ওয়েদার টাওয়ার দেখেছে রানা, এখন সেদিকেই চলেছে ও। একবার বিসিআই-এ যোগাযোগ করতে পারলে জানিয়ে দেবে কোথায় আছে। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিট পর বিস্ফোরিত হবে ওর গোড়ালির টাইম বম।
পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমি, মেরু এলাকা ও সাগরে রানার আছে ইনটেনসিভ সার্ভাইভাল ট্রেনিং। তবুও দরকারি যন্ত্রপাতি ছাড়া পেরোতে পারবে না সাগরতীরের খাড়া ক্লিফ। ফলে ওকে যেতে হবে গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। মাথার ওপরে গাছপালা থাকবে, তাই সূর্য দেখতে না পেয়ে খুঁজে নিতে পারবে না নিখুঁত কোন কোর্স। তার ওপর রুক্ষ পাথুরে এলাকায় কোনভাবেই বুঝবে না কোথায় চলেছে।
রানা বুঝে গেল, ওর এখন চাই নিখুঁত কোন কমপাস। তাই ভাবল তৈরি করে নেবে ওঅটার কর্ক দিক নির্দেশক। তবে সেজন্যে লাগবে চৌম্বক সুঁই বা কোন ধাতু।
বারবার চুম্বকে ঘষলে সুঁই হয়ে উঠবে চুম্বকীয়। জিপিএস-এর মেকানিযম দেখল রানা। জিনিসটার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স ব্যবহার করে কমপাস তৈরি করা খুব কঠিন কিছু হবে না। তবে আগে ওর লাগবে সুঁই ও একটা কর্ক।
ব্রেসলেটের তার খুলে নিলে সেটা কাজে লাগত, কিন্তু তাতে হয়তো বিস্ফোরিত হবে বোমা।
কয়েক সেকেণ্ড ভেবে পকেট থেকে চাবি নিয়ে পাথরের সরু এক ফাটলে গুঁজল রানা। বাঁকা করতেই মট্ করে ভাঙল চাবি। সরু অংশটা সংগ্রহ করল ও। এরপর সৈকতের শৈবালের ভেতর থেকে বেছে নিল ছোট একটা কন্দ।
ব্রেসলেটের ইলেকট্রনিক্স অংশে ঘষতে লাগল চাবির সরু অংশ। মিনিট দুয়েক পর শৈবালের কন্দের ওপরে সাবধানে বসিয়ে নিল আলকারাযের চাবির অংশ। ছোট্ট এক ডোবায় ভাসিয়ে দিল কন্দ। ধীরে ধীরে বাঁক নিয়ে চাবির সরু দিক তাক হয়ে গেল উত্তরদিকে।
.
বিশাল তাঁবুর মস্ত স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মাসুদ রানাকে। ছোট এক উপসাগরের সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে চলেছে সে। অপেক্ষাকৃত ছোট আরও সাতটি স্ক্রিনে অন্য সাত প্রতিযোগী। যে-যার মত দ্বীপের গভীর জঙ্গল লক্ষ্য করে চলেছে তারা। পরস্পরের মধ্যে দেখা হচ্ছে না তাদের।
বিরক্তি ও হতাশা নিয়ে তাঁবুর ভেতরে পায়চারি করছে প্রযোজক স্টিল। বুঝে গেছে, কিছুক্ষণের মধ্যে আকর্ষণীয় কিছু না ঘটলে ঝপ্ করে কমে যাবে তার দর্শক-সংখ্যা। পয়সা খরচ করে ভাল অনুষ্ঠান দেখতে না পেয়ে গালি দেবে ব্লগগুলো থেকে। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে মৃত্যু হয়েছে ডার্টি গেমের শো-র।
তাঁবুতে সিম্পসন ঢুকতেই তাকে ধমকের সুরে বলল স্টিল, ‘শো ভালভাবে চলছে না! এখনই রসদ ফেলো বি-২৫ বিমানের কাছে!’
দেরি না করে রেডিয়োতে পাইলটের সঙ্গে কথা বলতে লাগল সিকিউরিটি চিহ্ন রিভ সিম্পসন।
.
সাগর থেকে তীরে উঠে পায়ের বেড়ি ও হ্যাণ্ডকাফ খুলে নিয়েছে জনি এস. ক্লার্ক। গার্ডের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে এখনও টনটন করছে তার ঘাড়। হেলিকপ্টার থেকে বেকায়দাভাবে পড়ে আরেকটু হলে মটকে যেত মাথা। কনকনে ব্যথা মেরুদণ্ডে। তিক্ত ক্লার্ক ভাবছে, আমেরিকায় থাকলে দলের ছেলেদের দিয়ে অন্ধকার কোন গলিতে বদমাশ গার্ডের জান কবজ করিয়ে নিত। অথচ এখন এই অচেনা দ্বীপে কিছুই করার নেই তার। এটা চেনা কোন ক্লাব নয় যে, তাকে এসে বিয়ার সাধবে কেউ। ড্রাগ ঘুষ দিয়ে কিনে নিতে পারবে না কাউকে। উপায় নেই এ-নরক থেকে ভেগে যাওয়ার। নিজেকে হেরে যাওয়া একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে ওর।
গোড়ালির টাইম বমের দিকে তাকালে ভয়ে কেমন যেন শিরশির করছে বুক। রিভ সিম্পসন শালা বলে দিয়েছে, ওটা নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করতে গেলে যখন-তখন ‘বুম!’ করে ফাটবে!
হাতের শেকল দিয়ে ব্রেসলেটের লকে হালকা একটা বাড়ি দিল ক্লার্ক। ডিভাইসের ডায়ালে চলছে টাইমার। শেকল দিয়ে আরেক বাড়ি দিতেই ধীর লয়ে বিইইইপ আওয়াজ করল টাইমার। তাতে মরুভূমির মত শুকিয়ে গেল ড্রাগ ডিলারের গলা। জুলজুল করে চেয়ে রইল ডায়ালের দিকে। ভাবছে, এই বুঝি, শালা, বোমা ফেটে মরলাম!
আর তখনই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে আড়াই ফুট ওপরে লাফ দিয়ে উঠল ক্লার্ক। কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝল, মরে যায়নি সে। একমাইল দূরে চপার থেকে যেখানে নেমেছে অন্যক’জন, আওয়াজ এসেছে ওখান থেকে। সেদিকের আকাশে ভেসে উঠেছে বোমার কালো ধোঁয়ার ব্যাঙের ছাতা।
গোড়ালির বোমার দিকে তাকাল ক্লার্ক। থেমে গেছে বিপ-বিপ আওয়াজ। দপদপ করে আর জ্বলছে না ডায়ালের সংখ্যা। না রে, বাবা, আমি শালা আর তোকে ভুলেও ঘাঁটাব না, ভাবল সে।
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে কালো ধোঁয়ার ছাতা।
‘তা হলে মরল কোন্ শালা?’ আনমনে বলল ক্লার্ক। নাৎসি কুত্তাটা মরে ভূত হলে খুশি হবে সে। শালা যেভাবে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল, তাতে মনে হচ্ছিল সুযোগ পেলে গলা টিপে ওকে মেরে ফেলবে! যে শালাই মরুক, এটা খুব ভাল খবর। এরই ভেতরে মরে ভূত হয়েছে দুই শালা। তারা আর জ্বালাতে আসবে না। এদিকে দুই দলে আছে মাত্র একটা করে মেয়ে। তাদের বেঁচে থাকার কোন পথ নেই। সেটাও ভাল!
কীভাবে এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবে সেটা ভাবতে ভাবতে সৈকত পার করে জঙ্গলে ঢুকল ক্লার্ক। বারবার ওর মন বলছে, পিস্তল থাকলে জাদু দেখিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ওটা তো আর আকাশ থেকে টুপ করে কোলে এসে পড়বে না!
জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে শুকনো এক গাছ দেখে ওখানে থামল ক্লার্ক। একবার কারও সঙ্গে লড়াই শুরু হলে হাতে কোন ডাল থাকলে সুবিধা পাবে। গাছের একটা ডালের ছয় ফুট অংশ ভেঙে নিয়ে ভাবল, বিপদ দেখলে এটার চোখা দিক ব্যবহার করতে পারবে বর্শার মত করে।
চারপাশ দেখে নিয়ে ডাল হাতে রওনা হবে ক্লার্ক, এমন সময় শুনতে পেল মৃদু যান্ত্রিক আওয়াজ। একটা পাম গাছের ডাল সরিয়ে থমকে গেল সে। মাত্র একফুট দূরে ওর দিকেই চেয়ে আছে ক্যামেরার লেন্স। ওটার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল সে, ‘মর্, চুদির ভাইয়েরা!’
বর্শার খোঁচা মেরে ক্যামেরার চোখ অন্ধ করে দিল ক্লার্ক। বর্শা হাতে হনহন করে চলল গভীর জঙ্গলের দিকে।
বিশাল তাঁবুর একটা ছোট স্ক্রিন হয়ে গেছে তুষারের মত সাদা। ওটা আগে খেয়াল করল এমিলি। ‘তেইশ নম্বর লেন্স কোন দৃশ্য দেখাচ্ছে না!’
‘মহামুশকিল তো!’ বলল সিলভি, ‘এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই, তার ওপর অদক্ষ লোক দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমার দরকারি সব ক্যামেরা!’
‘শান্ত হও, সিলভি,’ নরম সুরে বলল স্টিল। দেখছে মস্ত স্ক্রিন। এবার যে-কোন সময়ে অন্যদিকে মোড় নেবে অলস প্রতিযোগিতা।
.
প্রায় অদৃশ্য মানবের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ক্লার্ক। কিছুক্ষণ পর সামনে পড়ল দীর্ঘ ঘাসে ভরা একটা মাঠ। ওটার একদিকে জং-ধরা বিশাল এক বিমান দেখে থমকে গেল সে। টিভিতে এখনও এসব বিমান দেখা যায় বিশ্বযুদ্ধের সিনেমায়। দেহ থেকে ডানা ও ইঞ্জিন ছিটকে গেলেও প্রায় আস্ত আছে ফিউজেলাজ।
ভুতুড়ে দৃশ্যটা দেখে শিরশির করে উঠল ক্লার্কের বুকের ভেতরে। বিমানের ফিউজেলাজে হয়তো আছে মৃত ক্রুদের হাড়গোড়। তার চেয়েও বড় কথা, ওটার ভেতরে হয়তো ওকে খুন করতে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে কোন শালা।
হতেই তো পারে এমন, পারে না?
বর্শা হাতে সাবধানে ভাঙা বিমানের দিকে চলল ক্লার্ক। সে জানে না, বি-২৫-এর ভেতর থেকে তাকে দেখছে অন্তত ছয়টা ক্যামেরা। ফিউজেলাজে ঢুকবে, এমন সময় ধুপ-ধুপ আওয়াজ শুনে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল ক্লার্ক।
এদিকেই উড়ে আসছে রুপালি এক যান্ত্রিক ফড়িঙ।
.
ব্র্যাড স্টিল ব্রিফ করার পর রুপার্ট শ্যাননের শিরায় শিরায় বইছে অ্যাড্রেনালিনের স্রোত। চপার থেকে স্বেচ্ছায় সাগরে ঝাঁপ দিয়েছে সে। সাঁতরে এসে উঠেছে চমৎকার এক সৈকতে। তিনদিকে ছিল ঘন সবুজ ঝোপঝাড়। হাত-পায়ের শেকল খুলে নিজেকে মনে হয়েছে মুক্ত বিহঙ্গ। অচেনা এ- দ্বীপ যেন সত্যিকারের এক ডিসনিল্যাণ্ড, যেখানে নয়টা রাইড চড়ার সুযোগ পাবে সে।
শেকল কাঁধে তুলে সৈকত পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকতেই শুনতে পেল বিস্ফোরণের আওয়াজ। না থেমে ক্ষুধার্ত বাঘের মত এগিয়ে চলল সে। বুঝে গেছে, জিতে যেতে পারবে সামনের প্রতিযোগিতায়।
শ্যাননের ধারণা, প্রথম সুযোগে জোট বাঁধবে মেক্সিকান দুই অপরাধী আলকারায ও ইসাবেলা। সেক্ষেত্রে তাদেরকে বন্দি করবে সে। যুবকের সামনে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার পর হাসতে হাসতে খুন করবে মেয়েটাকে। তাতে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে উঠবে যুবক। আর তখন তাকে খতম করে দেবে সে।
ওদিকে আকারে বিশাল হলেও বোকা লোক রাশানটা। মর্দা হাতিটাকে খুন করে মজা পাবে শ্যানন।
এরপর আছে আফ্রিকান সুন্দরী মেয়েটা। মেরে ফেলার আগে তারিয়ে তারিয়ে তাকে ভোগ করবে সে।
হেলিকপ্টার থেকে জাহাজে পড়ে মরেছে ইতরামি ভরা মুখের ইতালিয়ান। তাকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না।
কালো লোক জনিকে কেউ না কেউ খুন করবে। সেটা যদি না হয়, প্রথম সুযোগে তাকে হত্যা করবে শ্যানন।
আর জার্মান গাধাটা বোধহয় এইমাত্র বোকামি করে বোমা ফাটিয়ে মরে গেছে।
তো বাকি রইল জাপানি দস্যু আর বাঙালি লোকটা।
জাপানি বাঁদরটা মার্শাল আর্টে পারদর্শী হলেও শ্যাননের সঙ্গে লড়তে গেলে প্রাণে বাঁচতে পারবে না সে।
ওদিকে রানার মিলিটারির ট্রেনিং থাকলেও মরার আগে বুঝবে যুদ্ধের কৌশলে আসলে কতটা অযোগ্য ছিল সে।
মাথার ওপর চপারের আওয়াজ শুনে মুখ তুলে তাকাল শ্যানন। পাম গাছের ওপর দিয়ে গেল যান্ত্রিক ফড়িঙ। ওটা দুই চপারের ভেতরে ছোট। হেলিকপ্টারটা থেকে নিচে ফেলা হলো প্যারাশ্যুটসহ কালো এক বড় ডাফেল ব্যাগ।
ওটা কোথায় নামবে বোঝানোর জন্যে সঙ্গে আছে উজ্জ্বল হলদে-সবুজ ধোঁয়াযুক্ত সিগনাল ফ্লেয়ার।
শ্যানন বুঝে গেল, ব্যাগ পড়বে এক শ’ গজ দূরে। এক কান থেকে অন্য কানে গেল তার হাসি। জলাভূমির মধ্য দিয়ে তীরবেগে ব্যাগ লক্ষ্য করে ছুটল সে।
.
ঝোপের ভেতর দিয়ে দ্বীপের একদিকে চলেছে জাপানি দস্যু কাইতো তানাকা, এমন সময় দেখতে পেল হেলিকপ্টার থেকে পড়ছে কালো এক ব্যাগ। ছোঁড়া হয়েছে সিগনাল ফ্লেয়ার। ব্যাগটা কোথায় পড়বে সেটা বুঝে সেদিকে ছুট দিল সে।
.
কালো ব্যাগের ড্রপ যোনের ঠিক সামনেই আছে ড্রাগ ডিলার জনি এস. ক্লার্ক। লুকিয়ে আছে বি-২৫ বিমানের বিযুক্ত এক ইঞ্জিনের আড়ালে। তার বুঝতে দেরি হলো না, বড়জোর বিশ ফুট দূরে পড়বে কালো ব্যাগ। তার জানা নেই, ওটার ভেতরে কী আছে। অথবা, কেন ওটা ফেলা হলো এদিকে। তার মনে পড়ল ব্র্যাড স্টিলের বলা কথা, সময়ে সময়ে পৌঁছে দেয়া হবে দরকারি রসদ। আজ ভাগ্য ভাল ক্লার্কের, সঠিক সময়ে হাতের কাছে নেমে আসছে রসদের ব্যাগ!
.
কালো ব্যাগ মাটিতে নামতেই তিনদিক থেকে প্রাণপণে ওটার দিকে ছুটে চলেছে তিন অপরাধী। আর সেটা আলাদা তিন স্ক্রিনে দেখছে আর ভাবছে ব্র্যাড স্টিল, ডাস্টবিনে এক টুকরো মাংস ফেললে তিনটা কুকুর যেভাবে কামড়াকামড়ি করে, ব্যাগ পাওয়ার জন্যে এবার তেমনই করবে এরা। আগে থেকেই স্থির ছিল কোথায় নামানো হবে ডাফেল ব্যাগ। বিধ্বস্ত বি-২৫ বিমানের এলাকা সিনেমার দৃশ্যের জন্যে সত্যিই অপূর্ব সুন্দর সেট।
সবার আগে ব্যাগের কাছে পৌঁছে গেল ক্লার্ক। দেরি না করে যিপার খুলে উঁকি দিল ভেতরে। ওপরদিকে আছে পানির বোতল আর স্বচ্ছ কাগজে মোড়া স্যাণ্ডউইচ। বোতলের ক্যাপ খুলে ঢকঢক করে গলায় পানি ঢালল সে। এক কামড়ে সাবড়ে দিল অর্ধেক স্যাণ্ডউইচ। অন্যহাতে হাতড়াতে শুরু করেছে ব্যাগের ভেতরে। হাতে উঠে এল বড় একটা হান্টিং নাইফ। আরেকটু হলে কপাল পেরিয়ে তার চাঁদিতে গিয়ে উঠত বিস্মিত দুই চোখ।
‘আরেশালা, একেই বলে কপাল!’ চামড়ার খাপ থেকে সড়াৎ করে ছোরা টেনে বের করল ক্লার্ক।
.
মাঠের ধারে পৌঁছে ক্লার্কের বলা কথাগুলো শুনতে পেয়েছে তানাকা। কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল জঙ্গলের কিনারায়। এক পা এক পা করে এগোল ক্লার্কের দিকে। তার ধারণা, একাধিক প্রতিযোগী চলে আসার আগেই কোঁকড়ানো চুলের গাধাটাকে খতম করতে পারবে। তানাকা কুং-ফুতে পারদর্শী। ক্লার্কের হাতে ছোরা থাকলেও জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিল সে।
জাপানি যুবককে দেখে থমকে গেল ক্লার্ক। কুকুর যেভাবে আগলে রাখে হাড্ডি, সেভাবে ব্যাগ পাহারা দিচ্ছে সে।
স্ক্রিনে দৃশ্যটা দেখে খুশিমনে হাসল ব্র্যাড স্টিল।
ধীর পায়ে ক্লার্কের দিকে এগোল কাইতো তানাকা।
ঝিরঝির শব্দ শুনতে পেল ক্লার্ক। জঙ্গলের কিনারায় সারি দেয়া পাম গাছে ঝুলে সরসর করে এগিয়ে এল একগুচ্ছ ক্যামেরা। শকুনের মত চোখ রেখেছে ক্লার্কের ওপরে। বিপদ হতে পারে ভেবে একবার শিউরে উঠল ক্লার্ক।
ক্যামেরা পাত্তা না দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ড্রাগ ডিলারের ওপর পূর্ণ মনোযোগ রেখেছে তানাকা। পৌঁছে গেছে তার খুব কাছে।
বারো
আকাশে হেলিকপ্টার দেখতে পেয়েছে রানা। ওটা থেকে পড়ল উজ্জ্বল হলদে-সবুজ ধোঁয়াযুক্ত সিগনাল ফ্লেয়ারসহ কালো ব্যাগ। তবে না থেমে ওয়েদার টাওয়ারের দিকে এগিয়ে চলল ও।
ড্রপ যোন থেকে সরে এল পুরো দুই মাইল। ওর ভুল না হলে মাত্র বারো মিনিট হাঁটলে পৌঁছুতে পারবে লঙ্ঘনীয় এক ক্লিফের কাছে। একমাইলের মধ্যে ব্যাগ থাকলেও ওটার জন্যে উতলা হয়ে উঠত না। বুঝে গেছে, অপরাধীদেরকে নিয়ে নোংরা খেলা খেলতে শুরু করেছে স্টিল। দূর থেকে ইঁদুরের পালের মধ্যে ছুঁড়ছে পনির, যাতে লড়াই করে মরে তারা।
চারদিকে চোখ রেখে ফার্নে ভরা এক গিরিখাদে পৌঁছে গেল রানা। উপত্যকার মাঝে উচ্ছল সব ঝর্নার ধারে জন্মেছে সবুজ গাছপালার জঙ্গল।
বাঁশের ঝাড় থেকে একটা বাঁশ ভেঙে নিল রানা। গাঁটের ভেতরে ঝর্নার তাজা পানি ভরে রাবার গাছের পুরু পাতা দিয়ে আটকে নিল ওটার মুখ। ওর প্রাকৃতিক ক্যান্টিনগুলোতে আছে এখন এক পাইন্ট করে পানি। ওয়েদার টাওয়ার পর্যন্ত যেতে এর বেশি লাগবে না ওর।
শেষবার এসব বাঁশের তৈরি ক্যান্টিন ব্যবহার করেছে এল সালভেদরের জঙ্গলে। এরপর ওর ওপরে হামলে পড়েছিল গোটা দেশের মিলিটারি। আহত শরীরে আর বেরোতে পারেনি জঙ্গল থেকে। তবুও তখন ওর মনে ছিল সন্তুষ্টি- নিজের কাজ শেষ করতে পেরেছে। পরে দুর্গম সোনসোনেট কারাগারে ওকে তিন মাস আটকে রাখা হলে বুঝে গেল, ওর সঙ্গে বেইমানি করেছে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ।
এল সালভেদরের তিক্তস্মৃতি মন থেকে ঝেড়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ওয়েদার টাওয়ার লক্ষ্য করে এগোল রানা। কিছুক্ষণ পর মাটিতে ছোট এক গর্ত করে ওটার ভেতরে ঢালল ঝর্না থেকে ক্যান্টিনে নেয়া পানি। গর্তে সাগরের শৈবালের কন্দ রেখে তার ওপরে রাখল চুম্বক চাবি। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে কমপাস জানিয়ে দিল এবার কোনদিকে যেতে হবে ওকে।
.
সামনে বেড়ে ক্লার্কের ওপরে হামলা করে বসেছে তানাকা। ঝড়ের বেগে চলছে তার চার হাত-পা। এটাকে লড়াই না বলে দ্রুতগতি ব্যালে ড্যান্স বললেও দোষ হবে না। এক ঘুষিতে শত্রুকে শেষ করতে চাইছে না সে। একের পর এক কিক ও পাঞ্চ আসছে ক্লার্কের মুখ-হাত-পা ও বুক-পেট লক্ষ্য করে। আমেরিকান ড্রাগ ডিলার কয়েক সেকেণ্ডে বুঝে গেল, এই হারে আক্রান্ত হলে বেশিক্ষণ লাগবে না তার খুন হতে।
হাতে উদ্যত ছোরা নিয়েও আক্রমণ ঠেকাতে পারছে না ক্লার্ক। জাপানি দস্যুর বুক-পেট লক্ষ্য করে সাঁই করে ছোরা চালালেও বাতাস কেটে ফিরে আসছে ধারাল ফলা। প্রতিবার একসেকেণ্ড আগে সরে যাচ্ছে তানাকা। ক্লার্কের দু’বার মনে হলো চিরে দিতে পেরেছে যুবকের বুক। পরক্ষণে দেখেছে অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে জাপানি দস্যু। তার চেয়েও খারাপ কথা, এশিয়ান ভূতটা বোধহয় জানে কীভাবে উড়তে হয়! একসেকেণ্ড থাকছে মাটিতে, পরক্ষণে উড়ছে আকাশে। হাতের চেয়ে বেশি চলছে তার দু’পা। মাত্র দু’মিনিটে ধুপধাপ করে গোটা দশেক লাথি খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে গেল ক্লার্ক। আরেক লাথি কবজির ওপরে পড়তেই দীর্ঘ ঘাসের ভেতরে গিয়ে পড়ল হান্টিং নাইফ।
.
আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ আর জাপানি দস্যুর লড়াই মস্ত স্ক্রিনে দেখে বলে উঠল স্টিল, ‘ছবি ঠিকঠাক তুলতে পারছ তো, সিলভি?’
‘সবই তো দেখানো হচ্ছে,’ স্ক্রিন দেখাল সিলভি, বি-২৫ বিমান থেকে চোখ রাখছে তিনটে লেন্স। এ ছাড়া পাম গাছে আছে আরও অন্তত আটটা ক্যামেরা।’ দক্ষ হাতে নানান ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করছে সে। দুই লড়াকু যোদ্ধার ক্লোয-আপ দৃশ্যের জন্যে গাছের ওপর থেকে তাক করেছে ক্যামেরা।
‘ওখানে সবমিলিয়ে কতগুলো ক্যামেরা?’
‘অভাব নেই।’
‘ফাইটিঙের কুইক কাট দেখাও, সিলভি! ঘুষি আর লাথি যেন একদম পরিষ্কার দেখা যায়।
‘সাধ্যমত সবই করছি,’ সিলভি চাইছে না বিরক্ত করুক স্টিল, তাই বলল, ‘আমি কি কখনও তোমার কাজে কোন ভুল ধরিয়ে দিই?’
মারপিটের দৃশ্য দেখে সিলভারম্যানের পেছনে হাজির হয়ে গেছে সিওয়ার্স আর এমিলি।
‘জাপানি ব্যাটা জানে কীভাবে পেটাতে হয়!’ মুচকি হেসে বলল সিওয়ার্স।
‘কথাটা একদম ঠিক,’ সায় দিল এমিলি। ‘তুমি কার ওপরে বাজি ধরবে?’
‘অ্যাই, তোমরা আমাকে বিরক্ত কোরো না তো!’ ধমকে উঠল সিলভি, ‘যে-যার স্টেশনে যাও। আমাকে আমার কাজ করতে দাও!’ ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। ওর কাজটা যেন হয়ে উঠছে সস্তা পর্নোগ্রাফির মত। অবশ্য কিছুক্ষণ পর বুঝল, নানান অ্যাঙ্গেল ও কাট-এর মাধ্যমে দর্শকদের দেখাতে পারছে ভয়াবহ লড়াইয়ের দৃশ্য। কুঁচকে গেল তার দু’ভুরু।
.
সিলভির দিকে চেয়ে বুঝে গেল স্টিল, এসব লড়াই সমর্থন করছে না তার বন্ধু। অথচ শো থেকে যে মোটা অঙ্কের মুনাফা আসবে, ওটার দশভাগের একভাগ নিজের পকেটে পুরে নিতে কোন আপত্তি নেই তার!
খোলা মাঠে লড়াই করছে তানাকা ও ক্লার্ক। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ব্যাগের পাশে ফেলল জাপানি দস্যু। মনস্থির করেছে এবার ঝাঁপিয়ে পড়বে পূর্ণ শক্তিতে। পর পর কয়েক লাথি মারার পর শেষ এক লাথি মেরে মটকে দেবে আমেরিকান ড্রাগ ডিলারের ঘাড়।
এদিকে বেমক্কা সব লাথি-ঘুষি খেয়ে রাগ ও ভয় একই সঙ্গে কাজ করছে ক্লার্কের মনে। বুঝতে পারছে না কীভাবে ওকে হারিয়ে দিচ্ছে আকারে ছোট এশিয়ান লোকটা। রাস্তার মারপিটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাকে খতম করতে পারবে কি না ভাবছে ক্লার্ক। চট্ করে তার চোখ গিয়ে পড়ল দীর্ঘ ঘাসের মাঠে পড়ে থাকা ছোট্ট প্যারাশ্যুটের ওপরে। আর এ-সুযোগে তার মাথার পাশে মাঝারি এক লাথি দিল তানাকা।
যা চেয়েছে সেটা পেয়ে গেছে ক্লার্ক। শত্রুকে খুন করতে এগিয়ে এল তানাকা। আর একই সময়ে ঝট করে ঘাস থেকে সিল্কের প্যারাশ্যুট নিয়ে ওটা দিয়ে জাপানি দস্যুকে মুড়িয়ে দিল ক্লার্ক। মাকড়সার জালে আটকা পড়া মৌমাছির মত জোর গুঞ্জন তুলে গালি বকছে তানাকা। আর এ-সুযোগে তার মুখে দমাদম দুই ঘুষি বসাল ক্লার্ক। ছিটকে পিছিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে গিয়ে পড়ল তানাকা।
ক্লার্ক বুঝে গেছে, জাপানি শালার মারাত্মক লাথির কাছে ওর দুই মুঠোর ঘুষি আসলে কিছুই নয়। যে-কোন সময়ে প্যারাশ্যুটের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসবে বেঁটে শয়তান। এখন তাকে খুন করতে হলে চাই .৩৫৭ ক্যালিবারের হ্যাণ্ডগান, যেটা ওর কাছে নেই। চট্ করে ছোরাটা খুঁজতে শুরু করল ক্লার্ক। কিন্তু ঘন ঘাসে দেখতে পেল না ওটা। এদিকে শরীর মুচড়ে প্যারাশ্যুটের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসছে তানাকা।
এখন কী করতে হবে সেটা বুঝে গেল ক্লার্ক।
দশ সেকেণ্ড পর সিল্কের কাপড় গা থেকে সরিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল জাপানি দস্যু। ফাঁদে পা দিয়ে খেপে গেছে রাগী বোলতার মত। আশপাশে ক্লার্ককে দেখতে না পেয়ে ছুটে গিয়ে ঢুকল বি-২৫ বিমানের ফিউজেলাজে। কিন্তু ব্যারেলের মত জায়গাটায় লুকিয়ে নেই কেলেভূত।
বিমান থেকে ছিটকে বেরিয়ে চারপাশে তাকাল তানাকা। কিন্তু কোথাও নেই ক্লার্ক। বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যাটা ভেগে গেছে বুঝতে পেরে নিজের ওপরে আরও রেগে গেল তানাকা। মনে মনে শপথ নিল-পরেরবার রেহাই পাবি না, শালা!
ফিউজেলাজ থেকে সরে একবার ভাবল ঘাসের বন থেকে খুঁজে বের করে নেবে ছোরা। কিন্তু আবারও ব্যাগের দিকে চোখ যেতেই কে যেন ভারী গলায় বলল, ‘আজকের দিনটা খুব সুন্দর, কী বলো, বাছা?’
স্পটলাইটের মত করে শ্যাননের ওপরে পড়েছে সূর্যরশ্মি। রসদের ব্যাগের কাছেই বসে আছে সে। চোখে এখন তানাকার সানগ্লাস। বাম মুঠোয় আধখাওয়া টসটসে এক পাকা সোনালি আপেল। ডানহাতে ক্লার্কের হারিয়ে ফেলা হাণ্টিং নাইফ।
নাটকীয়ভাবে মার্শাল আর্টের স্ট্যান্স নিয়ে নতুন শত্রুর দিকে কঠোর চোখে তাকাল তানাকা। এরই ভেতরে বুঝে গেছে, কেলেভূতের চেয়ে ঢের বেশি বিপজ্জনক এই ইংলিশম্যান। অবশ্য তাতে ঘাবড়ে গিয়ে কোন লাভ হবে না, একে একে সবাইকে শেষ করেই জিতে নিতে হবে এই প্রতিযোগিতা। বাঁচতে দেয়া যাবে না কাউকে।
বাতাসে কয়েকটা জ্যাব ও কিক মেরে সামনে বাড়ল জাপানি দস্যু। লড়াই শুরু করার জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি।
‘শান্ত হও, বাছা, এত রেগে যাওয়ার কিছু নেই,’ উঠে দাঁড়িয়ে আপেলে আরেকবার কামড় দিল শ্যানন।
পরের সেকেণ্ডে তার মুখ লক্ষ্য করে প্রচণ্ড বেগে রাউণ্ডহাউস কিক ছুঁড়ল তানাকা। লাথিটা তার দিকে আসছে দেখে ঝট্ করে একদিকে মাথা সরিয়ে নিল শ্যানন। একই সময়ে আপেল ধরে রাখা হাতে তানাকার বুকে বসিয়ে দিল জোরাল এক ঘুষি।
ভারসাম্য হারিয়ে দ্বিতীয় কিক আর দিতে পারল না তানাকা। এদিকে শ্যাননের ছোরা ছোবল দিল গোখরার মত। লাফিয়ে সরে গেল তানাকা, আরেকটু হলে ফুটো হতো তার হৃৎপিণ্ড।
‘আজকের সকাল কিন্তু খুব চমৎকার, কী বলো, বাঘের বাচ্চা?’ তানাকার দিকে চেয়ে হাসল শ্যানন।
বিড়বিড় করে জাপানি ভাষায় একগাদা নোংরা গালি দিল তানাকা। এরই ভেতরে বুঝে গেছে, ক্লার্কের মত সহজ প্রাণী নয় শ্যানন। তার ওপরে, একই দিনে দু-দুটো লড়াই হেরে গেলে ভীষণ কষ্ট পাবে মনে। ভাবনাটা আরও রাগিয়ে দিল তাকে। এক পায়ে শ্যাননের পাঁজর লক্ষ্য করে লাথি চালাল সে। একই সময়ে ডানহাতের চপ উড়িয়ে দিল শত্রুর হাত থেকে ছোরা।
এখন কারও হাতেই আর কোন অস্ত্র নেই।
‘তুমি তা হলে আমার সঙ্গে খেলতে চাও, তা-ই না?’ হাসিমুখে বলল শ্যানন। হ্যাণ্ড-টু-হ্যাণ্ড কমব্যাটের জন্যে তৈরি হয়ে গেছে সে।
আরেক দফা হামলা শুরু করল তানাকা। প্রতিটি হামলার বিপরীতে দক্ষতার সঙ্গে কাউন্টার দিল শ্যানন। ঘুষির বদলে ঘুষি, লাথির বদলে লাথি। কুং-ফুতে দক্ষ বলেই মিলিটারি থেকে তাকে দেয়া হয়েছিল ডাবল ব্ল্যাক বেল্ট নতুন উদ্যমে লড়াই চালিয়ে গেল তারা।
একজন আক্রমণ করলে ব্লক করছে দ্বিতীয়জন। কয়েক মিনিট পর তানাকার মাথা হেডলকে ধরল শ্যানন। এবার কী ঘটবে সেটা আগেই বুঝে গেছে জাপানি মার্শাল আর্ট এক্সপার্ট। খপ্ করে শ্যাননের গলা কনুইয়ের ভাঁজে ধরল তানাকা। একই সময়ে ডেড লক করেছে তারা, ফলে আটকে দিয়েছে একে অপরের শ্বাস।
হাসি মিলিয়ে গিয়ে তিক্ত হলো শ্যাননের মুখ। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘চাইলে আমরা বাকি দিন লড়তে পারি, ছোট ভাই। কিন্তু তাতে আসলে কোন লাভ হবে না। তুমি কি ইংরেজি ভাষা বোঝো, বাছা?’
জাপানি ভাষায় কী যেন বলল তানাকা।
‘বাঁদরের ভাষা কোন্ শালাই বা জানবে,’ দাঁত খিঁচাল শ্যানন। তানাকা যে তার প্রশংসা করেছে সেটা জানে না। ‘তুমি কুং-ফুতে বেশ ভাল। তবে আমিও তো জানি একই বিদ্যা।’
পরস্পরকে লক করে দাঁড়িয়ে আছে তারা। একই সময়ে শত্রুকে ছেড়ে পিছিয়ে গেল। অপরজনের লড়াইয়ের সাধ্যটাকে সম্মানের চোখে দেখছে দু’জন।
‘তুমি আসলে ভাল করেই জানো কীভাবে লড়তে হবে,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল শ্যানন। ‘এত ছোট শরীরের মানুষ হিসেবে তোমার শক্তি সত্যিই অবাক করার মত।’
জবাবে হাতের ইশারায় কিছু কৌশল দেখাল তানাকা। তাতে শ্যানন বুঝে গেল, কালো লোকটার সঙ্গে লড়াই করার সময় কী ঘটেছে সেটা অভিনয় করে দেখাচ্ছে জাপানি দস্যু।
‘মনে হচ্ছে, আমরা একদলে থাকলে অন্যদেরকে শেষ করে দিতে আমাদের মোটেও সময় লাগবে না।’ তানাকা আর নিজেকে বুড়ো আঙুল দিয়ে দেখাল শ্যানন। এরপর হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিল দ্বীপ। আকাশে ছুঁড়ল কয়েকটা ঘুষি। এবার দু’হাতের দশ আঙুল জড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘তুমি আর আমি দল তৈরি করলে কেমন হয়, বাছা?’
নির্বিকার চোখে তাকে দেখছে তানাকা।
শ্যাননের মনে হলো কথা বুঝতে পারেনি এশিয়ান যুবক।
কিন্তু ওর ধারণা ভুল।
দু’জন মিলে অন্যদের শেষ করলে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা কমবে, সেটা ঠিকই বুঝেছে তানাকা। এখন ভাবছে: অন্যরা মারা গেলে ইংরেজ ব্যাটা তখন চাইবে ওকে খতম করতে। আর সে-সময়ে সত্যিকারের লড়াই শুরু হলে জিতে যেতে পারবে তো সে?
অবশ্য সেই লড়াই শুরু হবে অনেক পরে।
যুদ্ধের গোটা সময়ে চোখে সানগ্লাস পরে লড়াই করেছে শ্যানন। এবার ওটা নাকের ওপর থেকে নিয়ে তানাকার দিকে বাড়িয়ে দিল সে। এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দিল, তারা আসলে এখন থেকে মিত্র।
‘তোমার মুখেই ওটা অনেক বেশি মানাচ্ছে।’
কয়েক সেকেণ্ড শ্যাননকে দেখার পর সানগ্লাস নিয়ে নাকের ডগায় ঝুলিয়ে নিল তানাকা।
সানগ্লাস লেনদেনের মাধ্যমে শুরু হলো দু’জনের জোট।
তেরো
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে খাড়া এক টিলার সামনে পৌঁছে গেছে রানা। ভাবছে, একবার ওপরে উঠলে বোধহয় দেখতে পাবে কাছেই ওয়েদার টাওয়ার।
শুকনো মাটিতে জুতোর কুড়মুড় শব্দ তুলে টিলা বেয়ে উঠতে লাগল রানা। ওপরদিকের মাটি কালচে ও পাথুরে। একটু পর ও বুঝে গেল, সাগরতলের অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্পে তৈরি হয়েছে এই দ্বীপ। নানাদিকে ছোটবড় পাহাড় ও টিলা গভীর অরণ্যের সবুজ ও সাগরের সুনীলে এই দ্বীপ যেন মর্ত্যে তৈরি এক স্বর্গ। আবার একই সঙ্গে এখানে আছে নানান ধরনের ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ। ওগুলো মানবসৃষ্ট নয়। বিশেষ করে খাড়া টিলা বেয়ে উঠতে গিয়ে নিচের ধারাল ঝামাপাথরে আছড়ে পড়লে হবে নিশ্চিত মৃত্যু। এ-ছাড়া, আছে লাভার গোপন সুড়ঙ্গ। একবার ওপরের মাটি ধসে গেলে সরাসরি পড়তে হবে বহু নিচে।
সাবধানে টিলা বেয়ে উঠছে রানা। কিছুক্ষণ পর পাহাড় বেয়ে উঠে এল এক অধিত্যকায়। দূরে দেখতে পেল পশ্চিমে উপকূল। এরই ভেতরে দিগন্তের দিকে নেমে গেছে সূর্য। ফলে দিক নির্ধারণ করা এখন কোন সমস্যা নয়। দক্ষিণে ওদের সবাইকে হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। ওদিক এখন রানার বামে। দ্বীপের চারদিকের দৃশ্য অনায়াসে দেখতে পেল ও। বিশেষ করে ওর চোখ কেড়ে নিল দক্ষিণে গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়নের মত এক এলাকা ও কিছু জলপ্রপাত। বড়সব ঝর্না হয়ে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে জলপ্রপাতের পানি। এক পর্যায়ে বড় ধরনের নদী তৈরি করে নেমে গেছে সাগরে।
রানা যেতে চাইছে দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে। উঁচু পাহাড়ের জন্যে ওদিকে দেখা যাচ্ছে না ওয়েদার টাওয়ার। ওর বুঝতে দেরি হলো না যে ঠিক দিকেই চলেছে।
অধিত্যকার শেষে খাড়া জমিন। তবে এত দূর থেকে বোঝা গেল না ওদিক দিয়ে নেমে যেতে পারবে কি না। শেষ বাঁশের ক্যান্টিনের পানিটুকু গিলে নিয়ে ওদিকে চলল রানা।
বামে দুই কলাগাছের মাঝ দিয়ে এল ন্যাড়া-মাথা, বিশাল এক দানব। সে-ও চলেছে অধিত্যকার খাড়া জমির দিকে।
রাশান এই লোকই ম্যানইয়া লোপাতিন। নানান শুকনো গাছপালা সরিয়ে হেঁটে আসছে রানার দিকে। লোকটা যেন সাক্ষাৎ এক মৃত্যুদূত। অক্সিজেনের অভাবে মানুষ যেভাবে মারা যায়, কাউকে খুন করতে না পেরে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে গেছে তার পক্ষে।
‘একটু ভেবে দেখো, আমি কিন্তু মোটেও তোমার শত্রু নই,’ তাকে বলল রানা।
জবাবে মাটিতে বুট দিয়ে আঁচড় কেটে নিয়ে ওর দিকে বাইসনের মত তেড়ে এল লোপাতিন।
কুঁজো হয়ে আক্রমণ ঠেকাতে তৈরি হলো রানা।
ষাঁড়টা ওকে উড়িয়ে নেয়ার আগে সরে গিয়ে কাঁধ দিয়ে তার গাছের গুঁড়ির মত উরুতে প্রচণ্ড গুঁতো দিল রানা। ওকে টপকে হুড়মুড় করে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ল লোপাতিন।
‘তুমি হামলা না করলে তোমার সঙ্গে আমার কোন শত্রুতা নেই,’ বোঝানোর সুরে বলল রানা।
সাড়ে সাত ফুটি দেহ নিয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল লোপাতিন। ঢালু নিচু জমিতে তাকে সাত ফুটি দানব বলে মনে হচ্ছে রানার। সে এখনও ওর চেয়ে অন্তত একফুট বেশি উঁচু।
‘বড় ধরনের বিপদে পড়ে গেছি!’ বিড়বিড় করল রানা।
.
একই সময়ে স্ক্রিনে লোপাতিন ও রানাকে দেখছে সিওয়ার্স। বুঝে গেছে, এবার তুমুল লড়াই হবে দুই প্রতিযোগীর ভেতরে।
‘মিস্টার স্টিল,’ গলা ফাটাল সে। ‘নতুন করে কিছু ঘটতে শুরু করেছে!’
দ্রুত এসে সিওয়ার্সের স্ক্রিনে চোখ বোলাল পরিচালক। সিলভারম্যানের উদ্দেশে বলল, ‘এবার লড়ছে বাঙালি মাসুদ রানা আর রাশান ম্যানইয়া লোপাতিন!’
স্ক্রিনের দিকে হাতের ইশারা করল স্টিল। ‘সিলভি! তুমি কি কানা হয়ে গেলে? জলদি ছোট স্ক্রিনের দৃশ্য লাইভে দাও!’
এরই মধ্যে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সিলভারম্যান। মেইন স্ক্রিনে ফুটল রানা ও লোপাতিনের লড়াইয়ের দৃশ্য।
কয়েকটা অ্যাঙ্গেল কাট করল সিলভি। অধিত্যকার ওপরে চালু করে দিয়েছে তিনটে ক্যামেরা। এ-ছাড়া আছে আরও অন্তত দশটা লেন্স। রানা আর লোপাতিনের প্রাণান্তকর লড়াই পরিষ্কার দেখতে পাবে দর্শকেরা।
‘দারুণ!’ খুশিমনে চেঁচাল স্টিল, ‘ভাল করে লড়ক ওরা!’
.
অধিত্যকার ওপরে পরস্পরের বুকে প্রচণ্ড ঘুষি বসাচ্ছে রানা ও লোপাতিন। দুই প্রতিযোগী যেন লড়ছে কোন খাঁচার ভেতরে, আর শ্বাস আটকে সেটা দেখছে দর্শকেরা।
এই যুদ্ধের অস্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে, পুরনো আমলের মত লড়াকুদের চারপাশে কোন চেইন লিঙ্ক নেই। উড়ে গিয়ে বাইরে পড়লে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে না কেউ। তার বদলে আছে খাড়া ক্লিফ। একবার ওদিক দিয়ে শত শত ফুট নিচে পাথরের ঝামার স্তূপে পড়ে গেলে মরতে হবে নিশ্চিতভাবে। অন্যদিকে আছে রহস্যময় ঢালু জমি। ওখানে হঠাৎ করে থেমে গেছে অধিত্যকা। ওদিকে হয়তো বহু নিচে উপকূলে আছড়ে পড়ছে অতল প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল সব ঢেউ। একবার ওখানে পড়লে বাঁচবে না দুই প্রতিযোগীর কেউ।
রানার মাথার পাশে লেগেছে রাশানের মুগুরের মত হাতের মারাত্মক ঘুষি। বাধ্য হয়ে পিছিয়ে গেছে ও। পরের ঘুষি আসার আগেই কীভাবে যেন তাল সামলে ওর সেরা ঘুষি লোপাতিনের চোয়ালে ও ঘাড়ে মারল রানা। যদিও এর ফলে থামল না দানবের এগিয়ে আসার গতি। গরিলার মত রানাকে জড়িয়ে ধরে বুকে তুলে অধিত্যকার কিনারায় চলে গেল সে।
গায়ের জোরে কয়েকবার লোপাতিনের পাঁজরে কনুইয়ের গুঁতো মারল রানা। ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। তারই মধ্যে ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দিয়েছে দৈত্যের নাক। তবুও কমল না ওর ওপরে রাশানের হামলার বেগ।
অধিত্যকার কিনারায় দাঁড়িয়ে একবার নিচে চোখ বোলাল রানা। প্রথম পঞ্চাশ গজ প্রায় খাড়াভাবে নেমে গেছে পাহাড়। কোথাও জন্মায়নি কোন গাছপালা। এখানে-ওখানে পাথরের বোল্ডার। যেদিক দিয়ে উঠে এসেছে ওরা, এদিকটা তার চেয়েও অনেক বেশি দুর্গম।
বুকে প্রচণ্ড এক ঘুষি লাগতেই মাটিতে পড়ে গেল রানা। ঢালু জমি বেয়ে গড়িয়ে নেমে যেতে লাগল ও। আরও নিচে কী আছে সেটা আর দেখতে পেল না। আগেই বুঝে গেছে, লড়াইয়ে জিতে গেলেও নতুন কোন পথে যেতে হবে ওয়েদার টাওয়ারে।
একের পর এক ঘুষি ও লাথি মেরে অধিত্যকার কিনারায় রানাকে নিয়ে গেল লোপাতিন। পরের লাথি আসার আগেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে দানবের দু’ফুটের ভেতরে পৌঁছে গেল রানা। গায়ের জোরে কয়েকটা ঘুষি মারল রাশানের বুক ও মুখে। তাতে ভয়ঙ্কর রেগে প্রচণ্ড এক গর্জন ছেড়ে রানাকে ট্যাকল করল রাশান দৈত্য। হাত-পা পেঁচিয়ে অধিত্যকা থেকে নিচে হুড়মুড় করে নেমে গেল ওরা।
ঢালু জমিতে গড়িয়ে পঁচিশ গজ নামার পর বড় এক ফার্নের ঝোপে থেমে গেল ওরা দু’জন। দু’হাতে গলা পেঁচিয়ে ধরে রানার শ্বাস আটকে দিল লোপাতিন।
জবাবে হাতের তালু দিয়ে তার দু’কানের তালি ফাটিয়ে দিতে চাইল রানা। নাক থেকে ঝরঝর করে ওর মুখে রক্ত ঝরাচ্ছে দানব। ফুরিয়ে গেছে তার সব ধৈর্য। একহাত সরিয়ে নিয়ে রানার গোড়ালির লাল ট্যাব টেনে খুলে নিতে চাইল সে।
একই সময়ে ডানপায়ে দৈত্যের চোয়ালে লাথি দিল রানা। ওর গোড়ালির ব্রেসলেটে লেগে পিছলে গেল লোপাতিনের সাগর কলার মত আঙুল। আর সে-সুযোগে দৈত্যের বামহাত গলা থেকে ছুটিয়ে নিল রানা। প্রচণ্ড এক ঘুষি মারল রাশানের মুখে। তাতে আবারও গড়ান খেয়ে শুরু হলো ওদের পতন। কয়েকটা ঝোপের ভেতর দিয়ে নেমে চলেছে ওরা। পৌঁছে গেল একটা কার্নিশের ওপরে। এরপর পাহাড় সরাসরি নেমে গেছে অতল গভীরে। আবারও রানার বুকে চেপে বসেছে লোপাতিন। এবার এক ঘুষিতে নিভিয়ে দেবে রানার জীবনের বাতি। কিন্তু তখনই জোর এক ‘বিইইইপ!’ আওয়াজ শুনে থমকে গেল সে।
একই সময়ে রানা বুঝল, গড়িয়ে নেমে আসার সময় কোন এক ঝোপে লেগে খুলে গেছে ওদের একজনের লাল ট্যাব!
চট্ করে নিজের গোড়ালির দিকে তাকাল রানা। এখনও রয়ে গেছে ওর ব্রেসলেটের লাল ট্যাব।
নিজের গোড়ালির দিকে বোকা চোখে তাকাল লোপাতিন। এবার কী হবে সেটা ভালভাবে বুঝে গেছে। একেক সেকেণ্ডে কমে যাচ্ছে তার জীবনের ক্ষণ! মাত্র তিন সেকেণ্ডে বুঝে গেল সে, বড়জোর আর বাঁচবে সে পাঁচ সেকেণ্ড!
মরতেই যদি হয়, তো একা কেন!
তাতে আপত্তি আছে দানবের।
নতুন করে রানার গলা পেঁচিয়ে ধরতে দু’হাত তুলল সে।
আর তখনই সরাসরি তার কণ্ঠনালীতে ঘুষি মারল রানা। চুরমার করে দিল অ্যাডাম্স্ অ্যাপল। তাতেও তোয়াক্কা করল না দানব। এদিকে বিপ বিপ শব্দ তুলছে টাইম বম!
রাশান দৈত্যের মাথা প্রকাণ্ড আর বিকৃত। দাড়িতে মেখে আছে রক্ত। মুখে একরাশ লালা। চোখ হাঁসের ডিমের মত। দৈত্যটার জন্যে মরতে হবে ভাবতে গিয়ে মনে প্রবল আপত্তি এল রানার। আর তখনই হাতড়াতে গিয়ে পেয়ে গেল যা খুঁজছে।
লাভা পাথরের অংশ ওটা। মাথার পাশে পাথরের টুকরোর প্রচণ্ড তিনটে বাড়ি খেয়ে গলা থেকে হাত সরিয়ে নিল লোপাতিন। দু’হাঁটু তুলে গায়ের জোরে তার বুকে লাথি দিল রানা। ওর ওপর থেকে পিছলে প্যারাশ্যুটহীন প্যারাট্রুপারের মত কিনারা থেকে নিচে খসে গেল রাশান দৈত্য।
দুই সেকেণ্ড পর ক্যানিয়নের ভেতর থেকে এল বিকট বিস্ফোরণের আওয়াজ। বিশ্ব যেন কেঁপে গেল থরথর করে। মায়া জাদুর মত মাত্র একসেকেণ্ডে উবে গেছে দৈত্য!
ওখানে রয়ে গেল শুধু লালচে মেঘ ও একরাশ কালো ধোঁয়া। ভুস্ করে উঠে এল ওটা ওপরদিকে।
লোপাতিনের মাংস ও হাড়ের টুকরো রয়ে গেলে সেটা সাঁই করে নেমে গেছে আড়াই শ’ ফুট নিচে কালো নারকীয় কোন গহ্বরে।
বড় করে শ্বাস নিল রানা। পাহাড়ের কিনারা থেকে নিচে তাকাল। এখনও ওর দিকে উঠে আসছে বিশ্রী গন্ধের ধোঁয়া।
‘আগেই বলেছি মারামারি করতে নেই,’ বিড়বিড় করে লোপাতিনের উদ্দেশে বলল রানা। চট্ করে দেখে নিল নিজের গোড়ালির টাইমার। ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে সময়।
ঘড়িতে বাজে ২৩:১৫:১৭!
হাঁচড়েপাঁচড়ে ঢালু জমি বেয়ে ওপরে চলল রানা।
.
যে তাঁবুতে স্টিলের সঙ্গে বাস করছে, ওখানে বসে ল্যাপটপে রানা ও লোপাতিনের লড়াইয়ের শুরুর দিক দেখেছে রিটা। দুনিয়ার লাখো দর্শক ওর মত করেই চোখ রেখেছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মরণপণ লড়াইয়ের ওপরে।
এরপর ব্যক্তিগত তাঁবু থেকে বেরিয়ে মেইন তাঁবুতে ঢুকে সবাইকে হাসিখুশি দেখে খুব বিস্মিত হয়েছে রিটা। ওর মনে হয়েছে, মানুষ খুন হওয়া যেন এদের কাছে ম্যাডেলিন স্কয়্যারের কোন সভার মত সাধারণ কিছু! লড়াইয়ে অংশ নিয়ে সবমিলিয়ে দশজনের ভেতরে শেষমেশ বাঁচবে মাত্র একজন!
বিশাল তাঁবুর কেউ যেন বুঝতে চাইছে না, নিজেদের ভেতরে লড়াই করে মরছে একদল মানুষ!
এরই ভেতরে রিটা দেখেছে, কীভাবেই না মারা গেছে দু’জন লোক!
বিশাল তাঁবুর দিকে আসার সময় বোধহয় অধিত্যকার নিচের ঢালে খুন হয়ে গেছে রানা বা লোপাতিন। ডার্টি গেম শো এখনও কেন দেখছে, নিজেও জানে না রিটা। এটা ঠিক, অদ্ভুত এক উত্তেজনা আছে এই প্রোগ্রামের। আজ রানার চোখে অন্যকিছু দেখতে পেয়েছে রিটা। ওটা মানবিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তার নকল ব্যাকগ্রাউণ্ড তৈরি করে দিয়ে এখন নিজেকে দোষী বলে মনে হচ্ছে ওর। বড় রহস্যময় মানুষ এই মাসুদ রানা। দুর্গম জঙ্গলে একা উড়িয়ে দিয়েছে হেরোইনের মত ভয়ঙ্কর সব ড্রাগসের কারখানা। তার হাতে খুন হয়ে গেছে পশুর চেয়েও ঘৃণ্য একদল লোক। কিন্তু একজন সন্ত্রাসী হিসেবে এই কাজ রানা করেছে বলে ভাবছে না রিটা। নিশ্চয়ই কোন না কোন দেশের হয়ে কাজ করে সে। আরও বড় কথা, মানবতার পক্ষে একা লড়ছে মানুষটা।
কোনভাবেই মাসুদ রানাকে একজন অপরাধী হিসেবে ভাবতে পারছে না রিটা। রাশান খুনি-ধর্ষক লোপাতিন ভয়ঙ্কর একজন অপরাধী। আগ বাড়িয়ে খুন করতে চেয়েছে রানাকে। তার মত নিচু পর্যায়ের মানুষ হিসেবে বাঙালি যুবককে ভাবছে ‘না রিটা।
মরুভূমির ঝড়ে বালির নিচে মুখ ডুবিয়ে দেয়া উটপাখির মত নিজেকে মনে হচ্ছে ওর। স্বীকার করুক বা না করুক, এরই ভেতরে বেছে নিয়েছে পক্ষ। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ভেবেছে অপরাধীদের চরম শাস্তি দেয়ার পূর্ণ অধিকার আছে স্টিলের। কিন্তু এখন ভাবছে, সত্যিই কি সেটা আছে তার? কারও মৃত্যু নিশ্চিত করার ন্যায্যতা কোথায় পেল স্টিল? যতই সে বলুক শো-র কোটি টাকা পরে ব্যয় করবে নানান দেশের জেলের উন্নয়নে, সেটা সত্য বলে মোটেও মনে হয়নি রিটার।
শো-র শুরু থেকে স্টিলকে চরম স্বার্থপর এক লোক বলেই মনে হয়েছে ওর। অপরাধীদের ভাল-মন্দ নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা আসলে ছিল না তার। অথচ আগে এটা ভাবতে আপত্তি ছিল রিটার।
বিশাল শরীরের রাশান অপরাধী খুনি এবং ধর্ষক। কিন্তু সেজন্যে কর্তৃপক্ষের বদলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কে আসলে ব্র্যাড স্টিল? মৃত্যু-দৃশ্য দেখাতে দর্শকদের কাছ থেকে নিচ্ছে কোটি কোটি ডলার। যারা এমন শো দেখতে টাকা দিচ্ছে, তারাই বা কেমন ধরনের বিকৃত মানসিকতার মানুষ!
খুশিতে হৈ-চৈ করছে স্টিল আর তার কর্মচারীরা।
তাদের সঙ্গে নিজের মানসিকতার তফাৎটা এখন ভাল করে বুঝতে পারছে রিটা।
.
‘এক কোটি বিশ লাখ,’ উঁচু গলায় বলল সিওয়ার্স, ‘আমাদের দর্শক এখন এক কোটি বিশ লাখ!’ হাসিমুখে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে সে। এইমাত্র দেখা গেল মেইন স্ক্রিনে ধোঁয়ার মধ্যে ভুস্ করে উবে গেছে রাশান দানব।
সামনে বেড়ে সিলভারম্যানের কাঁধে প্রশংসার চাপড় দিল স্টিল। হাসছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। চট করে তাকাল মেইন স্ক্রিনে-ওখানে লোপাতিনের ছবির ওপরে ফুটে উঠেছে লাল একটা ক্রস।
‘কী বুঝলে, সিলভি? এখন আমাদের শো দেখছে এক কোটি বিশ লাখের বেশি দর্শক!’
‘এক কোটি বিশ লাখ তো আর চার কোটি নয়,’ জবাবে বলল সিলভারম্যান।
‘চিন্তা কোরো না, ঠিকই ওখানে পৌঁছে যাব আমরা,’ বলল স্টিল।
বন্ধুকে সন্দেহ নিয়ে দেখল সিলভারম্যান।
দর্শক-সংখ্যা জেনে হতবাক হয়ে গেছে রিটা।
প্রতি সেকেণ্ডে হুড়মুড় করে বাড়ছে দর্শক।
এমিলি ও সিওয়ার্সের দিকে তাকাল রিটা।
খুশিতে উরুতে চাপড় দিচ্ছে ওরা।
‘এমিলি, সিওয়ার্স, নতুন কিছু ঘটার আগে স্লো মোশনে দেখাতে থাকো রাশানের মৃত্যু। একে একে দেখাবে প্রতিটা ফ্রেম। কাজটা করতে দেরি কোরো না!’
‘আগেই মেইন স্ক্রিনে দেখাচ্ছি,’ লোপাতিনের অদ্ভুত মৃত্যু বিস্মিত করেছে এমিলিকে। ওর মনে হচ্ছে, দেখতে পেয়েছে কোন স্পেশাল এফেক্ট সিকিউয়েন্স। মনেই হয়নি সত্যি সত্যি মারা গেছে লোকটা। লোপাতিন যেন ছিল দক্ষ স্টান্টম্যান, যার কপট মৃত্যু দেখানো হয়েছে বোমা বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়ার মাধ্যমে।
এমিলি ভাবছে, অপরাধীদের গোড়ালিতে বোমা রেখে দুর্দান্তভাবে শো জমিয়ে তুলেছেন ওদের বস্!
চট্ করে স্টিলের দিকে তাকাল সে। অন্তর থেকে মেনে নিয়েছে, এই দুনিয়ায় ওদের বসের মত জিনিয়াস আর কেউ নেই।
বারবার বন্ধুকে দেখছে সিলভারম্যান। তার ক্যারিয়ারে এত জনপ্রিয় শো আগে কখনও তৈরি করতে পারেনি স্টিল। ভয়ঙ্কর দৃশ্য প্রচারের জন্যে বাকি জীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে সে। রক্তপিশাচের মত জঘন্য কাজ করে লুটে নিচ্ছে শত শত কোটি ডলার। এরই ভেতরে বিনোদন জগতে নিজের নাম লিখে নিয়েছে ইগোম্যানিয়াক হিসেবে। তার শো দেখতে গিয়ে নিষ্ঠুরতার চরম প্রকাশ ঘটাচ্ছে কোটি মানুষ।
দীর্ঘ দিনের সম্পর্কে প্রথমবারের মত সিলভারম্যান টের পেল, স্টিল আসলে খুব অরুচিকর মানসিকতার এক লোক। অথচ বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে এই শো-তে কাজ করতে হবে। এবং সেজন্যে বাকি জীবন ওকে কুরে কুরে খাবে ওর বিবেক।
চোদ্দ
আমেরিকার কানেকটিকাট-এ নিউ হ্যাভেন শহরে এফবিআই ভবনে ফেডারেল ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশনের কমপিউটার ক্রাইম টাস্ক অফিস। ধারণা করা হয় ওটা দেশের সেরা ল্যাবোরেটরি। চব্বিশ ঘণ্টা দেশ-বিদেশের নানান অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ছে এই সংগঠন।
কমপিউটারের ইন্টারনেট অপরাধ তদন্ত করতে দু’হাজার তিন সালে গড়ে তোলা হয় সিসিসিটিএফ। কমপিউটার ইনট্রুশন, চাইল্ড অ্যাবিউশন, কপিরাইট ভায়োলেশন্স, ইন্টারনেট ফ্রড, ইন্টারনেট থ্রেট ও হ্যারাসমেন্ট নিয়ে কাজ করছে এই অফিস। ওয়েব যখন হয়ে উঠল নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, তখন থেকে পরিচয়-চোর, ব্লুফিল্ম, ভাড়াটে খুনি ও টেরোরিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ওখানে ইন্টারনেট আইনরক্ষা করতে কাজ করছে কয়েক শ’ অফিসার।
ইউএস সিক্রেট সার্ভিস, ইউএস পোস্টাল ইন্সপেকশন সার্ভিস, ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্স ইন্সপেকশন জেনারেল ও ইন্টারনাল রেভ্যুনিউ অফিসের সঙ্গে তাল রেখে ইন্টারনেট অপরাধীদের গ্রেফতার করে তারা। গোটা দেশে আছে এমন আরও বিরানব্বুইটি অফিস। তবে ধারণা করা হয় ওগুলোর চেয়ে অনেক দক্ষ সিসিসিটিএফ। সেখানে এলে কমপিউটার জিনিয়াসেরা বুঝে যায়, অফিসটা আধুনিক এক টেকনিকাল স্বর্গ।
কাটিং এজ ইলেকট্রনিক্সসহ এজেন্টদের জন্যে চারদিকে আছে অসংখ্য কিউবিকল। তারই একটায় বয়স্কা এক মহিলার অভিযোগ রেকর্ড করছে একজন এজেন্ট। বাড়ি বিক্রি করবে বলে লোভ দেখিয়ে মহিলার তিন লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়ে ভেগে গেছে নাইজেরিয়ান এক বাটপার। অন্য কিউবিকলে তরুণী মেয়ে সেজে চ্যাট-রুমে নারীলোভী এক লোককে হানি ট্র্যাপে ফেলেছে আরেক এজেন্ট। পাশের কিউবিকলে সন্দেহজনক হ্যাকারের পাসওয়ার্ড ভেদ করে প্রমাণ সংগ্রহ করছে এক ফরেনসিক একযামিনার।
ল্যাবোরেটরির হাই-ডেফিনিশন স্ক্রিনে চোখ রেখে চেয়ে আছে স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্স। স্ক্রিনের নিচে একের পর এক অ্যাড ব্যানার। ওগুলোর ভেতরে আছে অ্যালকোহল, সিগারেট, পর্নো ও ফায়ারআর্ম-এর বিজ্ঞাপন। কিন্তু সেদিকে মন না দিয়ে বিশেষ এক সাইটে আটকে গেছে সিমন্সের চোখ। সেখানে প্রচার করা হচ্ছে, মাত্র এক শত নিরানব্বুই ডলার পঁচানব্বুই সেণ্ট ব্যয় করে লগ-ইন করা যাবে দুনিয়ার সেরা শো ডার্টি গেম-এর সাইট-এ।
বিজ্ঞাপনে দশবার দেখানো হলো পাহাড় থেকে পড়ে বিস্ফোরিত হয়েছে বিশালদেহী এক রাশান।
প্রচুর গুঞ্জন নিয়ে ব্লগটি চালু হতে এই শো ট্র্যাক করেছে সিমন্স। এ-বিষয়ে তাকে চোখ রাখতে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে তার বস্ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর রবার্ট রাইডার। এই শো কপট না হলে দুনিয়ার প্রতিটি আইন ভাঙছে ওটার প্রযোজক। প্রথমে সিমন্সের ধারণা ছিল: টাকা লুটপাট করার জন্যে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে কোন হ্যাকার। দেখানো হচ্ছে মানুষের বানোয়াট মৃত্যু।
এডওয়ার্ড সিমন্সের বয়স ত্রিশ। হাই-স্কুলের ছেলেদের মত বৃথা স্বপ্ন দেখে না যে কমপিউটার দিয়ে জয় করে নেবে দুনিয়া। দেখতে সুদর্শন সে। মাথায় ঝাঁকড়া বাদামি চুল। পরনে ইস্ত্রি করা দামি ধূসর সুট, গলায় নীল টাই ও পায়ে টম ফোর্ড শ্যু।
রাশানের মৃত্যু দেখার আগেই সিমন্স বুঝে গেছে, এই শো নকল কিছু নয়। একটু আগে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, এই প্রোগ্রামে যারা অংশ নিচ্ছে, তারা সবাই বাস্তব জগতের মানুষ। শো-র প্রযোজক ব্র্যাড স্টিল এমনই এক লোক, যে বিকৃত মানসিকতার প্রোগ্রাম তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত। আর যেখানে ঘটছে এসব, সেই দ্বীপে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে একদল অপরাধী।
‘এক্ষুণি আপনাকে দেখা করতে বলেছেন রাইডার, কিউবিকলের দরজা খুলে বলল সিমন্সের সহকর্মী স্টেলা। কিছু দিন আগে চাকরি নিয়েছে এই অফিসে।
নিজের বস্ রবার্ট রাইডারকে ঘৃণা না করলেও শ্রদ্ধা করে না সিমন্স। মানুষ হিসেবে খারাপ নয় রাইডার, তবে কোন ঝুঁকি নিতে প্রবল আপত্তি আছে তার। অফিসে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটায় উচ্চপদস্থ অফিসারের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে।
নিজের কিউবিকল থেকে বেরিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর রাইডারের অফিসে গিয়ে ঢুকল সিমন্স। নিজের চেয়ারে বসে মাথার তালু ডলছে রাইডার। সিমন্সকে দেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসল সে। নাকের ওপরে সিধে করে নিল কালো ফ্রেমের চশমা। হাত বুলিয়ে চুল গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘সিমন্স, এখন পর্যন্ত কী জানলে ব্র্যাড স্টিল সম্পর্কে?’
‘কোথা থেকে ডেটা স্ট্রিমিং করছে সেটা এখনও জানতে পারিনি,’ বলল সিমন্স, ‘বেশ ক’টা দেশের কাছ থেকে ডেটা নিচ্ছে বলে আমরা কথা বলেছি ইন্টারপোলের অফিসারের সঙ্গে। বোঝা যাচ্ছে, এসব ছবি আসছে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কোন দ্বীপ থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর সেদিকের এলাকার ওপরে বিশেষজ্ঞ একজন এখন ইমেজ দেখছে ওয়েব সাইটে। তবে এসব দেখে চট্ করে বোঝা খুব কঠিন, কোন্ দ্বীপে আপলোড করা হচ্ছে ভিডিয়ো। ইন্দোনেশিয়া বা পাপুয়া নিউ গিনির মাঝে আছে ছোট দু’ শ’র বেশি দ্বীপ। তাই স্টিল আর তার টিমকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করা প্রায় অসম্ভব।’
আনমনে কথাগুলো শুনে মাথা দোলাল রাইডার। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। ডার্টি গেম শো-র বিষয়টা ছেড়ে দিয়েছে সিমন্সের ওপরে। যদিও তাকে একফোঁটা বিশ্বাস করে না সে। সিমন্স অফিসের সেরা এজেন্ট হলেও তার ব্যাপারে ভীষণ ভয় আছে রাইডারের-একদিন ষড়যন্ত্র করে তার চেয়ারটা দখল করে নেবে যুবক।
‘এই শো-তে আছে দশজন অপরাধী,’ বলল রাইডার।
‘যাদের তিনজন এরই ভেতরে মারা গেছে,’ বসের মুখের কথা কেড়ে নিল সিমন্স। উচ্চপদস্থ অফিসারকে তেল দিতে পারবে না বলে রাইডারের চেয়ারে বসার কোন আগ্রহ নেই ওর। ‘ওরা এখন আছে সবমিলিয়ে সাতজন।’
‘তাদের একজন আমেরিকান। …সে কি বেঁচে আছে?’
মাথা দোলাল সিমন্স। ‘সে একজন ড্রাগ ডিলার। নাম জনি এস. ক্লার্ক। দেশে থাকলে মরত ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে। পালিয়ে যাওয়ার আগে থাকত লস এঞ্জেলেসে। বয়স বত্রিশ বছর। ড্রাগ পাচার, মানুষের ওপরে হামলা ও খুনের আসামী। বছরখানেক আগে তার ফাঁসির রায় হয়েছে মালোয়েশিয়ায়।’
‘ওখানে গিয়ে কী করছিল?’
‘ড্রাগ ডিলিং। গাঁজা। মালোয়েশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়ে দিয়েছে, ক্লার্কের বিষয়ে আমাদেরকে কোন তথ্য দেবে না তারা।’
রিসার্চ করে বড়ধরনের ঝামেলার খোঁজ পেয়েছে সিমন্স। প্রচুর ঘুষের বিনিময়ে নানান দেশের জেল ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে অপরাধী সংগ্রহ করে সেই দ্বীপে নিয়ে গেছে ব্র্যাড স্টিল। অবশ্য এটা সিসিসিটিএফ-এর এক্তিয়ারের বাইরে।
সিমন্সের কথা শুনে ব্যথা শুরু হয়েছে রবার্ট রাইডারের কপালে। বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
বসের অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের কিউবিকলে গিয়ে ঢুকল স্পেশাল এজেন্ট সিমন্স। ডার্টি গেম-এর প্রতিযোগীদের খোঁজ নিতে ডেকে এনে কাজ দিল পাঁচজন এজেন্টকে।
একঘণ্টা পর ওর অফিসে ঢুকল তাদের একজন।
‘নতুন কিছু পেলে?’ জানতে চাইল সিমন্স।
‘একজন আছে, যাকে আমরা খুঁজে পেয়েছি।’
‘নাম কী?’ বলল সিমন্স। ‘সে কি আমেরিকার নাগরিক?’
মাথা নাড়ল এজেন্ট। ‘আমি যার ছবি সনাক্ত করেছি, তাকে আমাদের ডিআইএ ধার হিসেবে নিয়েছিল বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স থেকে। সেই এজেন্টের নাম মাসুদ রানা।’
‘আর কিছু?’
মাথা নাড়ল এজেণ্ট।
নিচু গলায় বলল সিমন্স, ‘আরও খোঁজ-খবর নাও। কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।’
অধীনস্থ এজেণ্ট কিউবিকল থেকে চলে যেতেই টেবিল থেকে মোবাইল ফোন তুলে নিল সিমন্স। মনস্থির করেছে, কথা বলবে বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টের চিফ রায়হান রশিদের সঙ্গে। বছর দুয়েক আগে যৌথ এক ট্রেনিঙে পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গে। হাসিখুশি রশিদকে দায়িত্বশীল মানুষ বলেই মনে হয়েছে সিমন্সের।
দেরি না করে তাকে ফোন দিল সে। ওদিক থেকে রায়হান রশিদ ফোন ধরতেই কুশল বিনিময় করল। মাত্র তিন মিনিটের ভেতরে জেনে গেল বেশ কিছু জরুরি তথ্য।
সংক্ষেপে বলল রায়হান রশিদ, ‘বিসিআই চিফকে কথা দিয়েছিলেন ডিআইএর চিফ, এল সালভেদরের মিশনে গেলে মাসুদ ভাইকে সব ধরনের সহায়তা দেবেন তাঁরা। কিন্তু এরপর তিনি বিপদে পড়লে দেখা গেল মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।’
রাইডারের মত দুর্বল চিত্তের মানুষ নয় সিমন্স। বাংলাদেশি এজেন্টকে এল সালভেদরে পাঠিয়ে থাকলে সে- দায় এড়াতে পারবে না ডিআইএ, সেটা বুঝতে অসুবিধে হলো না তার। রায়হান রশিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেখে দিল ফোন। আবারও চোখ বোলাল কমপিউটার স্ক্রিনে। কুঁচকে গেছে দুই ভুরু।
পনেরো
আট ঘণ্টা আগে আলফা চপার থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে ইসাবেলা আলকারাযকে। সাগরে ডুবে যেতেই নোনা পানির সঙ্গে আরেকটু হলে গিলে নিত চাবি। সেক্ষেত্রে হাত-পায়ের শেকল খুলতে না পেরে মরত শ্বাস আটকে। অবশ্য কপাল ভাল, মুখ থেকে চাবি নিয়ে খুলতে পেরেছে কবজির তালা। ভেসে উঠে সাঁতরে গিয়ে উঠেছে সৈকতে। ওখানে বসে হড়হড় করে বমি করেছে। একটু সুস্থির হওয়ার পর পায়ের শেকল খুলে চারদিকে চেয়ে দেখল, আশপাশে কেউ নেই। তখনই মনে হলো, আর বুঝি দেখা হবে না আলকারাযের সঙ্গে। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল ওর।
ইসাবেলার বয়স যখন মাত্র দশ, ওদের পরিবার ফেলে উধাও হয়ে গিয়েছিল ওর বাবা। খাবার জোগাড় করতে না পেরে ওকে আর ওর ছোট বোন এলাকে নিয়ে আকাপুলকোয় এক রিসোর্টে চাকরি নিয়েছিল ওদের মা। কাজের মেয়ে হিসেবে প্রতিদিন খাটত ষোলো ঘণ্টা। তাতে যা পেত, ছোট একটা কেবিনের ভাড়া দেয়ার পর খুব কম পয়সা থাকত খাবার কেনার জন্যে। পরের ছয় বছর প্রচণ্ড পরিশ্রম করল ইসাবেলার মা। এরপর একদিন হয়ে গেল অসুস্থ। কাজ করার আর সাধ্য থাকল না। এদিকে চাকরির বয়স হয়নি এলার। একা ইসাবেলার পক্ষে কঠিন হয়ে গেল কেবিনের মালিকের ভাড়া শোধ দেয়া। তা ছাড়া, ওদের তিনজনের খাবার আর মা-র ওষুধ জোগাড় করবে কীভাবে!
ইসাবেলার বয়স তখন মাত্র ষোলো বছর। দেহে এসেছে যৌবনের ঢেউ। আর সেটা দেখে অনেকে প্রশংসা করে শিস বাজায়। বাঁচার জন্যে যা করা জরুরি, সেটাই করল ইসাবেলা। আর সেজন্যে গোটা দুনিয়ার ওপরে ঘৃণা জন্মাল ওর মনে।
এরপর একসময়ে ওর শূন্য জীবনে এল আলেক্যান্দ্রো আলকারায। আকাপুলকোর পতিতালয়ে ওর সঙ্গে পরিচয় হলো তার। ইসাবেলার বয়স তখন উনিশ। আলেক্যান্দ্রোর চলছে তেইশ। গত তিন বছর নিজের দেহ বিক্রি করে মা, ছোট বোন আর নিজের জীবন কোনরকমে পার করে দিয়েছে ইসাবেলা। তত দিনে বুঝে গেছে, ওর কাছে আসলে কী চায় পুরুষেরা। কিন্তু আলেক্যান্দ্রো যেন অন্য ধরনের মানুষ। প্রথম দর্শনে ইসাবেলাকে ভালবেসে ফেলল সে। কী করে যেন বুঝল ওর মনের গভীর আকুতি। সমবেদনা দেখাতে গিয়ে ওকে ছোট করল না। দু’চার কথায় শুধু জানাল, ওর জীবনও খুব কষ্টের। শৈশব কেটেছে টিজুয়ানার ভয়ঙ্কর সব রাস্তায়। তবে এবার যখন দেখা পেয়ে গেছে ইসাবেলা নামের মরুভূমির অদ্ভুত সুন্দর গোলাপের, তো কোনভাবেই তাকে আর হারিয়ে যেতে দেবে না সে।
পতিতালয় ত্যাগ করে সে-রাতেই বিয়ে করল আলকারায ও ইসাবেলা। নিজের স্ত্রীকে পতিতার কাজ করতে দেবে না বলে নামকরা এক রিসোর্টে কাজ নিল আলকারায। ওখানেই পরিচ্ছন্নকর্মী হলো ইসাবেলা। দু’জন যে বেতন পেত, তাতে ওরা থাকত দারিদ্র্য সীমার নিচে। রাতে আলাপ করত, গোপনে ঢুকবে কি না ইউএসএতে। কিন্তু তাতে আছে বড় ধরনের বিপদ। পনেরো শ’ ডলার খরচ করে আগে একবার সে-দেশে গিয়ে ধরা পড়েছে আলকারায। ওকে ফেরত আসতে হয়েছে মেক্সিকোতে। যে ক’দিন আমেরিকায় ছিল, ছোট এক ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে বাস করত বেআইনী নয়জন অভিবাসী মিলে। যেসব চাকরি করেছে, সেই বেতনে পেট চালিয়ে নেয়া খুব কঠিন কাজ। সুতরাং ইসাবেলাকে বলেছে আলকারায, দুঃস্বপ্নময় ভিন দেশে না গিয়ে নিজেদের দেশে রয়ে যাওয়াই ওদের জন্যে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আমেরিকায় ডাকাতির দায়ে পুলিশ ওকে খুঁজছিল, সেটা ইসাবেলাকে বলেনি আলেক্যান্দ্রো। একই কীর্তি করেছিল মেক্সিকোর বাজা ক্যালিফোর্নিয়ায়। ভেবেচিন্তে আলকারায একদিন জানাল, ওদের উচিত গুয়াতেমালায় গিয়ে চুরি- ডাকাতি করে জীবন চালিয়ে নেয়া। আর এতে মানা করেনি ইসাবেলা। বিয়ের একমাস পর যৎসামান্য যে টাকা জমাতে পেরেছে, সেটা নিয়ে রাতে বাইরে খেতে গেল ওরা। ফিরে এসে দেখল তচনচ হয়ে গেছে ওদের তেলাপোকায় ভরা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। আলকারাযকে ধরতে হানা দিয়েছিল দ্য ফেডারেল-এর লোক। এখানেও আর থাকতে পারবে না বুঝে মনের দুঃখে কার্ডবোর্ডের দেয়াল ঘুষি মেরে ভেঙে দিয়েছিল আলকারায। বুঝে গিয়েছিল, যত সৎ থাকার চেষ্টা করুক, এই দুনিয়া ওদেরকে সোজা পথে চলতে দেবে না।
পুলিশের লোক আলকারাযকে জেলে ভরবে ভাবতে গিয়ে আতঙ্ক চেপে ধরল ইসাবেলাকে। বুঝে গেল, আলকারাযকে ছাড়া একা যে টাকা রোজগার করতে পারবে, তাতে ওর একারই চলবে না। সেক্ষেত্রে আবার হতে হবে পুরুষমানুষের ভোগ্য পণ্য। আলকারাযের মতই মানব-সমাজটাকে চরমভাবে ঘৃণা করতে লাগল ইসাবেলা। স্বামীকে বলল, ‘তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাব। তোমাকে আমি হারাতে চাই না।’
আগে মস্তানদের এক দলে ছিল আলকারায। কাউকে গুলি না করলেও তাদের কাছ থেকে শিখেছে আগ্নেয়াস্ত্র চালানো। ইসাবেলাকে সে জানাল, পারতপক্ষে কাউকে গুলি করবে না ওরা। কিন্তু দরকারে যেন নিজেদের বাঁচাতে পারে, সেজন্যে ওদের চাই আগ্নেয়াস্ত্র। পরিচিত এক মস্তানের কাছ থেকে দুটো .৩৮ স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসন রিভলভার কিনল সে। ইসাবেলাকে নিজের হাতে শেখাল কীভাবে গুলি করতে হয়। পরিকল্পনা করল ওরা, দেরি না করে চলে যাবে গুয়াতেমালার দক্ষিণে। ওখানে ওদেরকে চেনে না কেউ।
এরপর প্রথম ডাকাতিটা ওরা করল মাযাটেনানগোর ছোট এক মুদি দোকানে। কাউন্টারের তলা থেকে অস্ত্র বের করতে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে কর্মচারীর বুকে দুটো গুলি করল ইসাবেলা ও আলকারায। আর একবার খুন করে বসার পর ওরা বুঝল, আর যাই হোক ডাকাতির কখনও কোন সাক্ষী রাখতে নেই।
গুয়াতেমালায় সন্ধ্যার পর চলল ওদের দু’জনের ডাকাতি। দু’মাসে চোদ্দটা দোকান ও পেট্রল পাম্প লুঠ করল। সবমিলে তাতে ব্যয় হলো আঠারোটা গুলি। কিন্তু উনিশতম লুটের সময় ওদেরকে চিনে গেল এক লোক। তার চেয়েও খারাপ কথা, গুলি করলেও মরল না সে।
পরে ইসাবেলাকে বলেছে আলকারায, কপাল মন্দ হলে আসলে যা হয়, তা-ই হয়েছে। চিরকাল ধরে ওদেরকে তাড়া করে এসেছে চরম দুর্ভাগ্য, কাজেই এখনই বা ভাগ্য ভাল হবে কেন!
আহত লোকটার বর্ণনা অনুযায়ী পুলিশের লোক এঁকে নিল ওদের মুখের ছবি। মাত্র এগারো দিন পর ধরা পড়ল ওরা। একবছর পর আদালত থেকে রায় দেয়া হলো মৃত্যুদণ্ডের। জেলে বসে মরণের দিন গুনতে লাগল ওরা। তারপর পৌনে দু’বছর পর ওদেরকে কারাগার থেকে বের করে আনল ব্র্যাড স্টিল। তবে তাতে আসলে কোন লাভ হয়নি। আজ বা কাল অন্য কোন অপরাধীর হাতে খুন হবে ওরা!
সৈকতের বালিতে বসে এসব ভাবতে গিয়ে আরও তিক্ত হয়েছে ইসাবেলার মন। উঠে এগিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। বারবার ভাবছে, যেভাবে হোক খুঁজে নিতে হবে স্বামীকে।
কিছুক্ষণ পর দূরে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে বুঝে গেল, ফেটে গেছে কারও গোড়ালির বোমা! মনে মনে প্রার্থনা করল ইসাবেলা, খুন হওয়া লোকটা যেন অচেনা কেউ হয়। আলকারায যদি মারা যায়, সেক্ষেত্রে ওর উচিত হবে নিজের গোড়ালির বোমা ফাটিয়ে মরে যাওয়া। তাতে মানসিক আর দৈহিক যন্ত্রণা কম হবে ওর।
হেলিকপ্টারে কানে কানে বলেছে আলকারায, একবার তীরে উঠলে যেন জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে ও। দ্বীপ খুব বড় নয়। ওকে খুঁজে নেবে আলকারায। যে সৈকতের কাছ থেকে বোমার আওয়াজ এসেছে, তাতে মনে হয় না খুন হয়েছে ওর স্বামী।
এসব ভাবতে ভাবতে সৈকত পার করে জঙ্গলে ঢুকল ইসাবেলা। ওর মনে হলো, যে-কোন সময়ে দেখা হবে কারও সঙ্গে। ভয় নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর পৌঁছে গেল এক নদীর তীরে। পাশের ঘন জঙ্গলে আছে বড় একটা ডোবা। ওখানে ঢকঢক করে পানি খেয়ে তারপর গা থেকে লবণ ধুয়ে নিল ইসাবেলা। ভাবল, এখানেই অপেক্ষা করবে স্বামীর জন্যে।
বহুক্ষণ পর আবারও শুনতে পেল দ্বিতীয় বিস্ফোরণের আওয়াজ। ইসাবেলার জানা নেই, বোমার আঘাতে উবে গেছে রাশান দানব। গুরুগম্ভীর শব্দ এসেছে দ্বীপের ভেতর দিক থেকে। আবারও হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন থেমে গেল ওর। কে জানে কে মারা গেল! স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করল ও, যেন বেঁচে থাকে ওর স্বামী।
এরপর পেরোল আরও একঘণ্টা। সূর্য হেলে যেতেই জঙ্গলে নেমে এল অন্ধকার। ইসাবেলার বুকে আবারও চেপে বসল ভয়। বুঝে পেল না ডোবার ধারে বসে কোন লাভ হবে কি না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওকে কীভাবে খুঁজে নেবে ওর স্বামী? আবার নদীর ধারে এসে উজানের দিকে চলল ইসাবেলা। সিকি মাইল যেতে না যেতেই হালকা হলো সামনের জঙ্গল। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল বিকেলের হলদেটে আলো। আর তখনই ঝোপঝাড়ের ভেতরে শুনল কার যেন পায়ের আওয়াজ। আরেকটু হলে স্বামীর নাম ধরে ডেকে বসত ইসাবেলা। নিজেকে সামলে লুকিয়ে পড়ল বড় এক গাছের গুঁড়ির ওদিকে। বেচারি জানে না চোখে পড়ে গেছে ও।
নদীর ধারে ইসাবেলার দিকে চেয়ে আছে রুপার্ট শ্যানন, ঠোঁটে শয়তানির হাসি। শিকার ধরার জন্যে এক পা এগোতেই ঝিলিক দিল তার হাতের ছোরা।
চোখের কোণে ঝলকানি দেখে ঘুরে তাকাল ইসাবেলা। পরক্ষণে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলল জঙ্গলের অন্যদিক লক্ষ্য করে। কিন্তু শুকনো এক ডালে পা বেধে হুড়মুড় করে পড়ে গেল মাটিতে। ওর ডানহাতে খচ করে লাগল চোখা এক পাথর। শরীর পিছলে নেমে গেল নদীর তীরে। তীব্র ব্যথা সহ্য করে শ্যাননের দিকে তাকাল ইসাবেলা। দুটো গাছ পাশ কাটিয়ে তীরের বেগে ওর দিকেই ছুটে আসছে লোকটা!
.
‘ডার্লিং ইসাবেলা, বাঁচতে চাইলে ঝেড়ে দৌড় দাও!’ নিচু গলায় বলল স্টিল। বিশাল তাঁবুর ভেতরে নিজের চেয়ারে আরাম করে বসে আছে সে।
তার কথা শুনেই যেন উঠে দাঁড়িয়ে ছুট দিল ইসাবেলা। গতি হরিণীর মত। তবে বেশিক্ষণ এভাবে দৌড়াতে পারবে না। উড়ে চলেছে এক গিরিখাদের মাঝ দিয়ে। এরই ভেতরে জ্বলতে শুরু করেছে ফুসফুস। দৌড়ের ভেতরে একবার ঘুরে তাকাল ইসাবেলা। পেছনে এখন কেউ নেই। মনে মনে বলল, ভাগ্য ভাল হলে হয়তো ওকে হারিয়ে ফেলেছে লোকটা। একটা ঘন ছায়া দেখে ওখানে থামল ইসাবেলা। ভাবছে, বিশ্রাম করে নেবে একটু। ব্যথায় টনটন করছে ডানহাতের হাড়। তালু চোখের সামনে তুলে দেখল মাংস কেটে দরদর করে রক্ত পড়ছে। পোশাকে হাত মুছে এদিকে- ওদিকে তাকাল। আর তখনই শুনতে পেল পেছনে পায়ের আওয়াজ।
চরকির মত ঘুরে তাকাল ইসাবেলা।
ওর দিকেই ছুটে আসছে কে যেন!
মানুষটা অন্য কেউ নয়, তার আলেক্যান্দ্রো!
চোখে অশ্রু নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা।
ইসাবেলার সামনে এসে নিচু গলায় বলল আলকারায, ‘আমার জান!’ হাত থেকে শেকল ফেলে প্রিয় স্ত্রীকে কোলে তুলে নিল সে। উন্মাদের মত পরস্পরকে চুমু দিল তারা।
ইসাবেলার হাতের তালু কেটে গেছে দেখে তিক্ত হলো আলকারাযের মুখ। নিচু গলায় জানতে চাইল, ‘কেটে গেল কীভাবে?’
প্রায় ফিসফিস করে বলল ইসাবেলা, ‘আমাকে ধাওয়া করেছিল সেই ইংরেজ লোকটা। তবে কোনমতে পালিয়ে আসতে পেরেছি। কাছেই কোথাও আছে সে।’
‘আমি কুত্তাটাকে নিজের হাতে খুন করব,’ রেগে গিয়ে বলল আলকারায।
‘না, চলো, আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই,’ কাঁপা গলায় বলল ইসাবেলা।
‘আমি কুত্তাটার হাড়গোড় ভেঙে দেব,’ চাপা স্বরে বলল আলকারায। ‘আমার কাছ থেকে কোন মাফ পাবে না সে।’ অন্য কেউ তার স্ত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সেটা ভাবতে গিয়ে ভীষণ রেগে গেছে সে। আবার ইসাবেলার হাতের তালু দেখল। ‘আগে বন্ধ করতে হবে রক্ত পড়া।’ টি-শার্ট খুলে ফড়ফড় করে ওটা ছিঁড়ে ইসাবেলার তালু কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দিল সে।
নিজের গোড়ালির ব্রেসলেটের দিকে চেয়ে আছে ইসাবেলা।
ডায়ালে এখন: ১৭:৩১:০৫।
বেসুরো কণ্ঠে বলল ও, ‘আলেক… আমরা কি মারা যাব?’
স্ত্রীর মাথা ভরা কালো চুলে হাত বুলিয়ে দিল আলকারায। খয়েরি বড় চোখদুটোয় দৃষ্টি রেখে গলা শুকিয়ে গেল ওর। এ-প্রশ্নের কী জবাব দেবে ও? প্রতিযোগিতা করতে এই দ্বীপে ওদেরকে ধরে এনেছে বদ্ধ এক উন্মাদ। বলে দিয়েছে, বাকি নয়জনকে খুন করতে পারলে শেষেরজন হবে বিজয়ী। আলকারায অবশ্য ভেবে রেখেছে, যেভাবে হোক সেই দশম প্রতিযোগী করে তুলবে ইসাবেলাকে। তাতে মৃত্যু হোক তার নিজের। মনের ভেতরে কু ডাকছে তার। বুঝতে পারছে যে তার চেয়ে অনেক যোগ্য প্রতিযোগী রয়ে গেছে। স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে আলতো করে ওর কপালে চুমু দিল আলকারায। নিচু গলায় বলল, ‘দেখো, বেলা, অন্যরা মরবে। আমরা নই।’
‘বাহ্! তোমাদের ভেতরে কত রোমাণ্টিকতা!’ মাত্র পনেরো ফুট দূর থেকে টিটকারির সুরে বলল শ্যানন, হাতে চকচকে ছোরা। ‘আমি বোধহয় তোমাকে বলতে ভুলে গেছি, তোমার বউ কিন্তু খুব সেক্সি!’ এক কান থেকে আরেক কানে চলে গেছে তার হাসি।
ইসাবেলাকে মাটিতে নামিয়ে ঝট্ করে শেকল তুলে নিল আলকারায। চাপা স্বরে স্ত্রীকে বলল, ‘তুমি পালিয়ে যাও, বেলা! আমি এদিকটা দেখছি!’
স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে না ইসাবেলা, কিন্তু ওর চেয়ে অনেক ভাল বোঝে আলেক। গিরিখাদের ভেতর দিয়ে দৌড় দিল সে।
ছুটে গিয়ে শ্যাননের মাথা লক্ষ্য করে সাঁই করে শেকল চালাল আলকারায। তবে চট্ করে মাথা নিচু করে নিল প্রাক্তন কমাণ্ডো। বামহাতে মেক্সিকানের চোয়ালে বসিয়ে দিল প্রচণ্ড ঘুষি। একই সময়ে কোপ দিয়েছে তার বাহুর ওপরে। ভীষণ ব্যথা পেয়ে ফুঁপিয়ে উঠল আলকারায।
‘আরও জোরে দৌড় দাও, আমার ডার্লিং! গতি সবসময় মানুষের জীবনের সব!’ উৎসাহ দেয়ার ভঙ্গিতে ইসাবেলাকে বলল শ্যানন। ‘আর ওই তুমুল বেগেই তোমার যৌনাঙ্গে ঢুকব আমি!’
কথা বলতে গিয়ে তিন সেকেণ্ড ব্যয় করেছে শ্যানন, আর এই সুযোগে গায়ের জোরে তার কিডনির ওপরে শেকল ঘুরিয়ে মেরেছে আলকারায। অন্যহাতে বসিয়ে দিয়েছে লোকটার চোয়ালে ঘুষি। শ্যানন আকারে বড়, শক্তিও বেশি। তবে ছোটবেলা থেকে পথঘাটে মারপিটের অভিজ্ঞতা কম নয় আলকারাযের। ঝোড়ো বেগে হামলা করছে সে। সামনে বেড়ে ইংরেজ লোকটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার এক ঘুষি খেয়ে শ্যাননের হাত থেকে ছিটকে নদীতে গিয়ে পড়ল ছোরা। আর তখনই আর্তচিৎকার করে উঠল এক মেয়ে।
কণ্ঠস্বর ইসাবেলার!
চরকির মত ঘুরে ওদিকে তাকাল আলকারায।
এইমাত্র ইসাবেলার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তানাকা। শ্যাননের আনা শেকলে জড়িয়ে নিয়েছে বেচারির দুই হাঁটু।
‘আলেক! সাবধান! আলেক!’ কেঁদে উঠল ইসাবেলা।
আলকারায অন্যদিকে চেয়ে আছে দেখে নদীর তীর থেকে শুকনো একটা ডাল তুলে নিয়েছে শ্যানন। ওটা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে বাড়ি দিল মেক্সিকান ডাকাতের বাম হাঁটুর বাটিতে। খটাস্ আওয়াজে ফেটে গেল হাড়। ব্যথার চাপা গর্জন ছেড়ে মাটিতে হুড়মুড় করে পড়ল আলকারায। ধীর পায়ে সরে গিয়ে স্বচ্ছ জলের নদী থেকে ছোরা তুলল শ্যানন। ফিরে এসে ধারাল ফলা ঠেসে ধরল শত্রুর গলার ওপরে। ‘এখন কেমন হয় তোকে জবাই করলে? দেব জোর একটা পোঁচ?’
তানাকার দিকে তাকাল সে। এরই ভেতরে শেকলে মেয়েটার পা বেঁধে নিয়েছে জাপানি তস্কর। দল গড়ে তারা কাজের কাজ করেছে বলেই মনে হলো শ্যাননের।
Chapter - 16 to 20
ষোলো
মাত্র পাঁচ মিনিটের ভেতরে কবজিতে শেকল বেঁধে বড় এক গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়া হলো আলকারাযকে। পিঠে ঘষা দিচ্ছে রুক্ষ বাকল। মাটি থেকে মাত্র তিন ইঞ্চি ওপরে ঝুলছে ওর দু’পা। প্রচণ্ড ব্যথায় পাগল হয়ে গেছে সে। গোঙানি চেপে দেখছে একটু দূরে শুইয়ে নেয়া হয়েছে ইসাবেলাকে। এবার ওর স্ত্রীর কপালে কী আছে, সেটা ভেবে অপমানে ও দুঃখে চোখদুটো বেয়ে দরদর করে অশ্রু ঝরল তার।
মেক্সিকান ডাকাতের ভাবনাগুলো বুঝতে পারছে শ্যানন। মনে মনে হাসছে সে। তার জানা আছে, মানুষকে নানানভাবে নির্যাতন করা যায়। আলকারাযকে দৈহিকভাবে ব্যথা দিলে সে যতটা যন্ত্রণা ভোগ করবে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাবে চোখের সামনে প্রিয় স্ত্রীকে ধর্ষিত হতে দেখলে। যুবক বারবার ভাববে, সে একজন ব্যর্থ মানুষ, তাই বাঁচাতে পারছে না ইসাবেলাকে। আলকারায মানসিক কষ্ট ভোগ করুক সেটাই চাইছে শ্যানন। মনে মনে জানে, মেয়েটাকে খতম করার পর বাঁচতে দেবে না আলকারাযকেও। তবে তার আগে অপরাধী কপোতীকে নিয়ে একটু ফূর্তি না করে নিলে নিজের কাছেই দোষী হয়ে যাবে সে।
গাছের সামনে থেমে আলকারাযের ভুরুতে আলতো করে আঙুল বোলাল শ্যানন। বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাচ্চা ছেলের সমান ক্ষমতাও এখন নেই মেক্সিকানের।
‘আলকারায, তুমি বাছা বরং মাথা ঠাণ্ডা করো,’ নরম সুরে বলল শ্যানন, ‘আমরা আবার তোমার বউয়ের সঙ্গে মৌজ করতে গিয়ে বেশিক্ষণ সময় নেব না।’
রাগ-ক্ষোভে ইংরেজ খুনির মুখে থুতু ছিটাল আলকারায। চাইছে যেন দ্রুত মেরে ফেলা হয় তাকে। সেক্ষেত্রে ইসাবেলার করুণ পরিণতি দেখতে হবে না। তার মন বলছে, একবার সুযোগ পেলে খুন করত জানোয়ারটাকে। কিন্তু মুখে থুতু মেরে অপমান করা ছাড়া আর কিছুই তার করার নেই।
‘এই কাজ আবারও করলে তোর বউয়ের সামনের গর্ত আর পেছনের গর্তে এমনভাবে পেনিস চালাব, ওখানে আস্ত একটা পুকুর তৈরি হবে,’ হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছল শ্যানন। আগের চেয়ে নরম সুরে বলল, ‘আমি চাই তুমি আমাদের বন্ধু হও। তোমাকে খুন করতে চাই না। হাঁটুর ব্যথা কি এখন খুব বেশি?’ আলকারাযের ভাঙা হাঁটুর বাটির ওপরে প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিল সে।
ভীষণ ব্যথায় বিকট আর্তনাদ করল মেক্সিকান ডাকাত।
স্বামী কতটা ব্যথার ভেতরে আছে, সেটা বুঝে কেঁদে ফেলল ইসাবেলা। তানাকাকে ঠেলে ধড়মড় করে উঠে বসল। কিন্তু ছোট এক গাছ ঘুরিয়ে এনে ওর হাঁটুতে শেকল জড়িয়ে তালা মেরে দিয়েছে তানাকা। ইসাবেলার পাশেই আছে সে, চোখে তীব্র যৌন-লালসা। কারাগারে যাওয়ার পর পুরো চার বছর কোন মেয়েকে ভোগ করতে পারেনি সে।
আলকারাযের গালে আলতো করে টোকা দিল শ্যানন। বাতাসে শুঁকল কী যেন। ‘গন্ধটা কি পাচ্ছ, আলকারায?’ আরও জোরে নাক টানল সে। ‘এটা তো দেখি ভালবাসার গন্ধ। বাতাসে তুমি প্রেমের গন্ধ পাচ্ছ না? তুমি আসলে খুবই সৌভাগ্যবান একজন মানুষ। দারুণ সুন্দরী এক বউ পেয়ে গেছ। আর আমরা এখন ওকে মজা দেয়ার জন্যে খুব পরিশ্রম করব!’
ক্ষুধার্ত শেয়ালের চোখে ইসাবেলাকে দেখল সে।
তার দৃষ্টি অনুসরণ করল আলকারায। এরই ভেতরে ইসাবেলাকে শুইয়ে দিয়ে ওর ব্লাউয ছিঁড়ে নিয়েছে তানাকা। জোর করে শুয়ে পড়ল মেয়েটার ওপরে।
‘হায়, আমার বেলা!’ হাহাকার করল আলকারায। ভুলে গেছে ভাঙা হাড়ের ব্যথা।
গিরিখাদের দিকে এগিয়ে নরম সুরে বলল শ্যানন, ‘তোমার এত তাড়া কিসের, তানাকা? আরে, বাবা, একটু ধৈর্য ধরো। আমাকে আগে দাও মেয়েটার সঙ্গে ফূর্তি করতে!’
কড়া চোখে তাকে দেখল তানাকা, তারপর কী যেন ভেবে নেমে পড়ল ইসাবেলার বুকের ওপর থেকে।
‘অনুমতি ছাড়া কোন মেয়েকে জোর করে ভোগ করতে নেই,’ মাথা নাড়ল শ্যানন। ইসাবেলার চোখে চেয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘আমি কি ঠিক বলেছি, কী বলো, ডার্লিং?’
ইসাবেলার পায়ের কাছে থেমেছে সে। হাত বাড়াল মেঘের মত কালো চুল স্পর্শ করতে। আর তখনই তার হাঁটুর নিচের হাড়ে কষে লাথি দিল ইসাবেলা।
মারাত্মক ব্যথা পেয়েও কিছু বলল না শ্যানন। যৌন- সঙ্গমের আগে মারকুটে মেয়েদের, বাড়াবাড়ি চুপচাপ সহ্য করে সে। ‘তোমার তেজ দেখি অন্যসব মেয়ের চেয়ে বেশি।’ তানাকার দিকে চেয়ে হাসল শ্যানন। ইসাবেলার পাশে থেমে চিমটি কাটল ওর স্তনবৃন্তে। ‘দেখি তো কতটা মজা লাগে তোমার!’
জবাবে গায়ের জোরে তার গালে চড় দিল ইসাবেলা। কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে হতভম্ব হয়ে গেল শ্যানন। স্বামীর মত শরীরে অত জোর নেই ইসাবেলার, কিন্তু কৈশোর ও তারুণ্যে বিপদে পড়ে শিখে নিয়েছে কীভাবে রক্ষা করতে হবে নিজের সম্মান। ভাবছে, মরেই যদি যাই, তো তার আগে লড়াই করাই তো ভাল!
রাগে উন্মাদ হয়ে গেছে শ্যানন। তার কাছে যৌনতা মানে হিংস্রতা, যেখানে থাকবে না কোমল কোন অনুভূতি। গায়ের জোরে ধর্ষণের পর শেষ করে দেবে মেয়েটাকে, যাতে তার মাধ্যমে কোন বিপদ তৈরি না হয়। চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে ইসাবেলাকে দাঁড় করিয়ে নিল শ্যানন। পরক্ষণে গায়ের জোরে ঘুষি মারল মেয়েটার চোয়ালে। ধপ্ করে মাটিতে পড়ে গেল ইসাবেলা। ওর মাথার পাশে একের পর এক লাথি মারতে লাগল শ্যানন।
কর্কশ গলায় চিৎকার জুড়েছে আলকারায। বারবার ঝটকা দিয়ে শেকল থেকে ছুটিয়ে নিতে চাইছে নিজের দুই হাত। বুঝে গেছে, থামাতে না পারলে চোখের সামনে ওর স্ত্রীকে খুন করবে উন্মাদ লোকটা।
ইসাবেলার নাক ভেসে যাচ্ছে রক্তে, চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি। তবুও বুঝে গেল, খুনিটার হাতে এখন ছোরা। ইসাবেলার গালে প্রচণ্ড চড় দিল শ্যানন। তারপর ছোরা দিয়ে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে দিল ব্রেসিয়ার। মানসচক্ষে ভেসে উঠেছে রুয়াণ্ডার শান্তিরক্ষা মিশনের দৃশ্য। মিলিটারি ছাড়া আর কোথাও এত হালকাভাবে নেয়া হয় না সাধারণ মানুষের ওপরে নির্যাতন ও খুনের বিষয়। রুয়াণ্ডায় সেবার এক গ্রামে বিদ্রোহীরা হামলা করেছে শুনে নিজের সৈন্যদের নিয়ে হাজির হয়েছিল শ্যানন। কিন্তু গ্রামে ছিল সবমিলিয়ে নিরীহ তিনজন মানুষ। তাদের দু’জন আবার খুব ভিতু বুড়ো। তাদেরকে অপরাধ স্বীকার করতে বললে পরস্পরের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে ছিল। তখন বাধ্য হয়ে তাদেরকে জবাই করেছিল শ্যানন। দলের কয়েকজনকে নিয়ে নাবালক মেয়েটাকে ধর্ষণ করে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল।
আর ওটাই ছিল চরম ভুল। উচিত ছিল দলের সবাইকে খুন করে ফেলা। সেক্ষেত্রে ধরা পড়ত না শ্যাননের কোন অপরাধ।
ওই সামান্য দোষে আমরণ জেল হয়ে গিয়েছিল তার। নিজের দেশের জন্যে অন্তর ঢেলে কাজ করেও শিকার হতে হয়েছিল চরম অন্যায়ের!
.
বিশাল তাঁবুর ভেতরে ঢুকে স্পিকারে পুরুষ-নারীর সম্মিলিত আর্তচিৎকার শুনতে পেল রিটা। এ-ছাড়া আর কোন শব্দ নেই তাঁবুর ভেতরে। মস্ত স্ক্রিনের দিকে বিস্ময় ও ঘৃণা নিয়ে চেয়ে আছে স্টিলের সহকর্মীরা।
রাশান লোকটা বোমা ফেটে মরার পর যখন বারবার সে- দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, নিজের ল্যাপটপ অফ করে দিয়েছে রিটা। এতক্ষণ কম্পাউণ্ডের এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছে। ভেবে বের করতে চেয়েছে, আসলে কেমন ধরনের শো তৈরি করছে ব্র্যাড স্টিল! আর নিজেই বা কেন এসবে জড়াতে গেল ও! শেষমেশ স্থির করেছে, স্টিলের সামনে তুলে ধরবে ওর নিজের আপত্তি। কিন্তু এখন তাঁবুর সবার থমথমে নীরবতা ও নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার যেন বলে দিচ্ছে, আপাতত চুপ করে থাকাই ওর জন্যে ভাল।
স্ক্রিনে বারবার দেখা যাচ্ছে আলকারাযের বিকৃত মুখ। ব্যাকগ্রাউণ্ডে আরও তিনজন। অন্য এক ক্যামেরায় দেখা গেল, একটা গাছের সঙ্গে ধর্ষিতা, বিপর্যস্ত ইসাবেলার পা বেঁধে রেখেছে তানাকা। এ-সুযোগে মেয়েটার মুখে-মাথায় ঘুষি মারছে শ্যানন। একই সময়ে ছোরা দিয়ে চিরে দিচ্ছে বেচারির বুক ও পেট। ভয়ঙ্কর ব্যথা সহ্য করতে না পেরে হাউমাউ করে কাঁদছে রক্তাক্ত ইসাবেলা। গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করছে ওর স্বামী।
অন্যদের মতই চরম অবিশ্বাস নিয়ে দৃশ্যটা দেখছে রিটা। এদিকে সিলভির পাশে চলে গেছে ব্র্যাড স্টিল। বুঝতে দেরি হয়নি তার, এসব দৃশ্য দেখতে মোটেই ভাল লাগছে না তার বন্ধুর।
‘কতগুলো অ্যাঙ্গেলে দেখাচ্ছ?’ নিচু গলায় জানতে চাইল স্টিল।
স্ক্রিন থেকে মুখ ফিরিয়ে ফিসফিস করল সিলভি, ‘বাড়তি আর কোন ক্যামেরা নেই।’
‘দৃশ্য কিন্তু খুব পরিষ্কার নয়,’ আপত্তির সুরে বলল ব্র্যাড।
হতবাক হয়ে তার দিকে তাকাল সিলভারম্যান।
সিওয়ার্সের দিকে তাকাল স্টিল। ভয়ঙ্কর শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য দেখে স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারছে না যুবক।
‘সিওয়ার্স, আমাদের লাইভ ইউনিট কোথায়?’
স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিজের ডিসপ্লেতে ম্যাপ দেখল সিওয়ার্স। ওখানে আছে কিছু + চিহ্ন। শ্যানন, আলকারায, তানাকা ও ইসাবেলার যেসব দৃশ্য তুলছে গুচ্ছ ক্যামেরা, তার একটু দূরে নীল রঙের ক্যামেরার আইকন। দপদপ করছে ওটা।
‘বেশি দূরে নেই।’
স্ক্রিনের দৃশ্য দেখছে সিকিউরিটি চিফ রিভ সিম্পসন। তার সামনে গিয়ে থামল স্টিল। ‘ওখানে লাইভ ইউনিট পাঠাও!’
গিরিখাদের ভেতরে রক্তাক্ত মেয়েটাকে ধর্ষণের পর খুন করবে ভেবেছে শ্যানন। সে জানে, ক্যামেরার লেন্স এখন তার দিকে তাক করা। মনে মনে বলছে সে-’দ্যাখ, শালারা, কীভাবে ফূর্তি করার পর মেয়েদের খুন করতে হয়!’
জঙ্গলে নড়ে উঠল কিছু। শ্যানন, তানাকা, আলকারায ও ইসাবেলা জানল না, এগিয়ে এসেছে আস্ত এক ঝোপ। ওটার ভেতরে আছে ক্যামোফ্লেজ পরা ক্যামেরাম্যান। মুখে মুখোশ, হাতে গ্লাভ্স্ আর পুরো শরীরে একগাদা নকল পাতা। শক্ত হাতে ধরেছে দামি ক্যামেরা। সে না নড়লে কারও সাধ্য নেই যে বুঝবে, ওখানে কেউ বসে আছে।
অস্ট্রেলিয়ান ক্যামেরাম্যানের নাম জোহানসন। ওর সামনেই বেলারুশের জেলে বিক্রি করা হয়েছিল রাশান অপরাধী ম্যানইয়া লোপাতিনকে। আট ঘণ্টারও বেশি জঙ্গলে ঘাপটি মেরে বসে আছে সে। একটা ক্লিপ ছবিও তুলতে হয়নি। সেজন্যে কারও প্রতি কোন অভিযোগও নেই তার। হেডসেটের মাধ্যমে বরাবর জেনে গেছে, এরই ভেতরে খুন হয়েছে তিনজন অপরাধী। জোহানসন বুঝে গেছে, এবার তার চোখের সামনে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হবে আরও দু’জনকে। আর সেই দৃশ্য ক্যামেরায় তুলতে হবে ওকে।
‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই এগোও,’ সিম্পসনের কণ্ঠস্বর হেডসেটে শুনল জোহানসন। ‘নইলে দেরি হয়ে যাবে।
ধীরে ধীরে এগোল জোহানসন। পেছনে এল আরেকটা ঝোপ। সে একজন গার্ড, হাতে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল। জোহানসন বিপদে পড়লে গুলি চালাবে অপরাধীদের ওপরে।
একটু পর শ্যাননের হামলা থেমে যেতে লাশের মত পড়ে থাকল ইসাবেলা। এবার ওকে ধর্ষণ করবে তানাকা। অপরাধের ঘটনা যেখানে ঘটছে, তার তিরিশ গজের ভেতরে পৌঁছে জঙ্গলের কিনারায় থামল জোহানসন। দক্ষ হাতে যুম করল লেন্স।
‘লাইভ ইউনিট এখন পযিশনে,’ টেকনিকাল ডিরেক্টরকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল স্টিল। ‘এবার ফিল্ম স্ক্রিনে দাও।’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেইন স্ক্রিনে লাইভ ক্যামেরার ফিড দিল সিলভারম্যান। জোহানসনের তোলা ছায়াছবিতে দেখা যাচ্ছে বীভৎস দৃশ্য। তাঁবুর ভেতরে স্টিল ছাড়া আঁৎকে উঠেছে অন্যরা। মস্ত স্ক্রিনে ক্লোয-আপে দেখা যাচ্ছে, শ্যানন ছুরিকাঘাত করার পরেও ধর্ষিতা ইসাবেলাকে ভোগ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে তানাকা।
এখন আর হাসি নেই স্টিলের মুখে। চোখে ভীতির ছাপ। নিচু গলায় বলল, ‘সিওয়ার্স… দর্শক কত হলো?’
স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে দ্রুত কিবোর্ডে আঙুল চালাল সিওয়ার্স। এখন পর্যন্ত যা দেখেছে, তাতে ওর মনে হচ্ছে এনসি-১৭ হরর ফিল্ম এসবের কাছে কিছুই নয়। স্টিলের বদলে অন্য কেউ কখনও দেখাতে পারবে না এরচেয়ে বাস্তব সব মৃত্যু-দৃশ্য। ‘দর্শক দ্রুত বাড়ছে। এখন আছে পনেরো মিলিয়ন।’
‘এসব বন্ধ করো,’ ভারী কণ্ঠে বলল রিটা।
ওর দিকে ধীরে ধীরে ঘুরে হাসি-হাসি চেহারায় তাকাল স্টিল। প্রেমিকা ফিরে এসে প্রতিবাদ করবে সেটা ভাবেনি। ‘কী বললে, রিটা? ওই মেয়ে তো প্রমাণিত একজন খুনি। তার আগে ছিল পতিতা।’
‘কিন্তু মানুষ তো!’
‘এমন একজন, যে কি না স্বামীর সঙ্গে নানান শহরে গিয়ে নিরীহ বহু মানুষকে গুলি করে মেরেছিল,’ হালকাভাবে কাঁধ ঝাঁকাল স্টিল। ‘গুয়াতেমালায় ওদেরকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিত। তোমার বোধহয় মনে নেই, আজই সেই দেশে ওদের ছিল শেষ দিন।’
ফ্যাকাসে হয়ে গেছে রিটা। চাপা স্বরে বলে উঠল, ‘এরা যাই করুক, ভুলে যেয়ো না যে তুমি যেটা করছ, সেটা চরম অন্যায়।’ এত জোরে কথাগুলো বলেছে, তাঁবুর ভেতরে এমন কেউ নেই যে কি না শুনতে পায়নি।
মাত্র একসেকেণ্ডে প্রচণ্ড রাগে রক্তবর্ণ হলো স্টিলের চেহারা। ভেবে পাচ্ছে না, কেন হঠাৎ দল ত্যাগ করেছে রিটা। তার ওপর কাজটা করেছে তার কর্মচারীদের সামনে। অস্বীকার করেছে তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। নিশ্চয়ই অন্যরা এখন ভাবছে, যে-লোক নিজের প্রেমিকাকে সামলে রাখতে পারে না, তার আবার কিসের সম্মান!
‘রিটা, আমি চেয়েছি নাটকীয়তা থাকবে এই শো-তে,’ অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা গলায় বলল স্টিল। আঙুল তাক করল স্ক্রিনের দিকে। ‘তোমার দেখতে ইচ্ছে না হলে আমাদের তাঁবুতে গিয়ে বিশ্রাম নাও। আরও কিছু বলার থাকলে সেটা পরে জানাবে। ঠিক আছে?’
অনুরোধের সুরে কথাটা বলেনি স্টিল। থমথম করছে তার চেহারা। জবাবে স্টিলের চোখে চেয়ে রইল রিটা। মনে পড়েছে, এই লোক জীবনে আসার আগে চমৎকার ছিল ওর সময়টা। কারও নির্দেশ মেনে চলতে হতো না। আর এখনও কোন প্রয়োজন নেই কারও কথা মেনে নেয়ার। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল রিটা, ‘তুমি কী করে এমন নৃশংস শো দুনিয়ার মানুষকে দেখাচ্ছ, সেটা আমার মাথায় ঢুকছে না।’
চট করে ঘুরে কর্মচারীদের দেখল স্টিল। অন্যদিকে চেয়ে আছে তারা, যেন কিছুই শোনেনি। স্টিল বুঝে গেল, আপাতত যেভাবে হোক সামলে নিতে হবে রিটাকে। তাই রাগ ও বিরক্তি চেপে নরম সুরে বলল, ‘বাস্তবে যা হওয়ার কথা, ঠিক সেটাই হচ্ছে, রিটা। আমরা শুধু ক্যামেরায় সেসব ছায়াছবি তুলছি দর্শকের জন্যে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে দৃশ্যগুলো নৃশংস। তবে ভেবে দেখেছ, আমরা তো আর নিজেরা এসব করছি না।’
‘তুমি জেনে-বুঝে এদেরকে দিয়ে অন্যায় করাচ্ছ। আর সেজন্যে কোনভাবেই দায় এড়াতে পারবে না।’
‘হ্যাঁ, এটা বলতে পারো যে, দ্বীপে দশজন খুনিকে ছেড়ে দিয়েছি আমি,’ ভদ্রলোকের মুখোশ খুলে কড়া গলায় বলল স্টিল। ‘আর তাতে যা ঘটছে, সেটার দায় আসলে ওই মানুষগুলোর। দুনিয়া জুড়ে সবাই সেটাই দেখছে। বাস্তবতা আসলে এমনই হয়। আমার কথা কি তুমি বুঝতে পেরেছ, রিটা? দয়া করে এরপর থেকে এই বিষয়ে আর কোন তর্ক আমার সঙ্গে করবে না।’
নার্ভাস চোখে স্টিল ও রিটাকে দেখছে ডার্টি গেমের কর্মচারীরা। বাবা-মা ঝগড়া করলে এভাবেই তাদের দিকে অসহায় চোখে চেয়ে থাকে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। স্টিল বুঝে গেছে, এখনই কৰ্তৃত্ব প্রমাণ করার শেষ সময়, নইলে যে- কোন সময়ে বিদ্রোহ করবে তারই দলের লোকেরা।
‘আমরা বাস্তব শো নিয়ে এখানে ব্যস্ত,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল স্টিল। ‘ওই মেয়েলোককে মরতেই হতো। আমি তো আর তার রায় লিখিনি। সেটা করেছে গুয়াতেমালার জুরিরা। এই দ্বীপে এসে বাঁচার ভাল একটা সুযোগ পেয়েছিল। তবে সেটা কাজে লাগাতে পারেনি। আর আমি তাকে বাঁচাবার জন্যে কোন চেষ্টা করিনি, কারণ সেটা করলে শো-র বাস্তবতার দিকটা বিনষ্ট হতো। গুয়াতেমালায় মেয়েটার মৃত্যু আমি ঠেকাতে পারতাম না। তা হলে এই দ্বীপেই বা কেন তাকে আমি বাঁচাতে যাব? ইসাবেলা আলকারায প্রমাণিত অপরাধী। তার যা প্রাপ্য সেটাই সে পাচ্ছে। অন্যরা এরপর লড়াই করে মারা গেলে আমি কে তাদেরকে বাঁচিয়ে দেয়ার!’
শুধু রিটা নয়, গোটা তাঁবুর সবার জন্যে কথাগুলো বলেছে স্টিল। তার কথায় মাথা দোলাল ক’জন। বিশেষ করে এমিলি ও সিওয়ার্স।
বন্ধুর দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না সিলভারম্যান। রিটার মতই বিব্রত বোধ করছে বলে স্ক্রিনের দিকেও চেয়ে নেই সে।
‘তোমার আরও কত কোটি ডলার চাই, স্টিল?’ সরাসরি প্রেমিকের চোখে চেয়ে বলল রিটা।
মনের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে রিটার গালে চড় দেয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখল স্টিল। নিস্পৃহ করে রেখেছে চোখ- মুখ। কয়েক পা গিয়ে রিটার সামনে থামল সে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘এসব টাকা রোজগারের জন্যে করছি না, রিটা। কোটি মানুষ এখন দেখছে আমার শো। তারা জানে ওটা তৈরি করেছে কে। আর এমন অনুষ্ঠান তৈরি করার কাজে আমার কোন তুলনা নেই। বলতে পারো আমিই সেরা।’
অন্তর থেকে কথাগুলো বলেছে স্টিল। তার চোখে চেয়ে বুঝে গেল রিটা, একফোঁটা মিথ্যা বলছে না ওর প্রেমিক। বুকের ভেতরে ভীষণ ভয় ঢুকে গেল রিটার। আর কোন কথা না বলে বিশাল তাঁবু ত্যাগ করে চলল নিজেদের তাঁবুর দিকে। বহু দিনের বিশ্বস্ত বন্ধু সিলভির দিকে ঘুরে তাকাল স্টিল। প্রতিটি অনুষ্ঠানে সে ছিল ওর ডানহাত। কিন্তু এখন চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। তার চেয়েও খারাপ কথা, কন্সোল ছেড়ে তাঁবুর দরজার দিকে চলেছে সে।
‘অ্যাই, সিলভি, তুমি আবার কোথায় চললে?’
‘আমার তাজা বাতাস লাগবে,’ না থেমে দরজার দিকে এগোল সিলভারম্যান।
এখন আপত্তি না জানালে সিলভির মত অন্যরাও হয়তো বিদ্রোহ করবে, কাজেই কড়া গলায় বলল স্টিল, ‘কী, এত সহজেই ঘাবড়ে গেলে? শেষমেশ বন্ধুর কাছ থেকেও পালিয়ে যাচ্ছ? তা হলে কি হঠাৎ তোমার মনে ফালতু কোন আবেগ কাজ করছে? তা-ও আবার একদল খুনি-ধর্ষকের জন্যে?’
ফ্যাকাসে মুখে ঘুরে স্টিলের চোখে তাকাল সিলভি। সত্যিই দংশন হচ্ছে তার বিবেকে। আর সেটা শুরু হয়েছে প্রথম লোকটা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তখনও নিজের কাজ করে গেছে, কারণ কোন বন্ধুকে বা কোন শো ফেলে কখনও চলে যায়নি সে। কিন্তু এখন তিক্ততায় ভরে গেছে তার মন।
‘না, স্টিল, আসলে… আমার মনে হয় না… আমরা এসব ঠিক কাজ করছি,’ মস্ত স্ক্রিন দেখাল সিলভারম্যান। এখন আর তীব্র ব্যথায় আর্তচিৎকার করছে না ইসাবেলা। লাশটাকে ছোরার আঘাতে বিকৃত করছে শ্যানন। ‘এসব মৃত্যু দেখা সহজ কোন কাজ নয়। তবে এখনও তোমার সঙ্গেই আছি। একবার ঘুরে আসি বাইরে থেকে। এখানে বমি করতে চাইছি না।’
‘বেশ, ঘুরে এসো,’ বিরক্তির সুরে বলল স্টিল। তার মনে হচ্ছে, কখন যেন হারিয়ে বসেছে পুরনো বন্ধুকে। এই শো- তে সে নিজে ছাড়া এমন কেউ নেই, যে দায়িত্ব পালন না করলে ক্ষতি হবে না। সিলভির বদলে কাজ চালিয়ে নিতে পারবে সিওয়ার্স ও এমিলি, কিন্তু সেক্ষেত্রে সেরা মানের হবে না শো।
‘সিওয়ার্স?’ নরম সুরে বলল স্টিল, ‘তুমি আমার সঙ্গে আছ তো?’
‘নিশ্চয়ই, বস্!’ হাসল যুবক। ‘কাজটা আমি পছন্দ করি।’
‘এমিলি?’
‘এই কাজ আমি সত্যিই ভালবাসি। আমরা তো আসলে খুব ভাল একটা টিম।’
আন্তরিক হাসল স্টিল। ‘ভবিষ্যতে দেখবে এরচেয়ে ঢের বেশি রোজগার হবে তোমাদের।’
তাঁবুর দরজার দিকে তাকাল স্টিল। এরই ভেতরে বিবেকের ছোরা চিরে দিচ্ছে সিলভারম্যানের অন্তর। সুতরাং আগে বা পরে, একসময় বেঁকে বসবে সে।
স্ক্রিনের দিকে তাকাল স্টিল। ইসাবেলা আলকারাযের ছবির ওপরে এখন লাল একটা ক্রস চিহ্ন।
এরই মধ্যে থিতিয়ে এসেছে তাঁবুর ভেতরের উত্তেজনা। মন দিয়ে স্ক্রিন দেখছে সবাই।
ইসাবেলার ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল শ্যানন, সারাশরীরে মেখে আছে নব্য লাশের তাজা রক্ত। কিছুটা দূরে হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে তানাকা। মেয়েটা মারা যাওয়ায় তাকে ভোগ করতে না পেরে তিক্ত হয়ে গেছে ওর মন। তানাকার সামনে গিয়ে হাতের ইশারা করল শ্যানন। ‘চলো, আমাদের কাজ এখানে প্রায় শেষ।’
বিড়বিড় করে জাপানি গালি দিল তানাকা, তারপর গিরিখাদের দিকে চলল তারা। এর মাত্র ছয় সেকেণ্ড পর বিস্ফোরিত হলো ইসাবেলার গোড়ালির বোমা। বিকট শব্দের সঙ্গে ভুস্ করে মিলিয়ে গেল লাশ।
কনুই ধরে তানাকাকে থামিয়ে ঘুরে তাকাল শ্যানন।
এবার পালা এসেছে আলেক্যান্দ্রো আলকারাযের।
ঘন ধোঁয়া সরে যাবে সেজন্যে অপেক্ষা করছে শ্যানন ও তানাকা। মিনিটখানেক পর দেখতে পেল, কীভাবে যেন শেকলসহ উধাও হয়ে গেছে আলকারায।
যুবক নেই জেনেও গাছটার দিকে দু’পা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শ্যানন। তার জানা আছে, হাঁটুর বাটি ফেটে যাওয়ায় লড়তে পারবে না আলকারায। হাসি-হাসি মুখে তানাকাকে বলল সে, ‘ওকে নিয়ে একদম ভাববে না। ব্যাটা পালিয়ে যাবে কোথায়!’
সতেরো
মতিঝিল, ঢাকা।
বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স-এর হেডকোয়ার্টার। সোমবার দুপুর দেড়টা। নিভিয়ে রাখা হয়েছে সাততলা দালানের ষষ্ঠ তলার কিছু অফিসের বাতি। করিডরে আপাতত কেউ নেই। দুনিয়ার নানান দেশে জরুরি মিশনে আছে বেশিরভাগ এজেন্ট। অফিসে রয়ে গেছে মাত্র ক’জন-সোহেল আহমেদ, সলীল সেন, জাহেদ, রূপা ও জুনিয়র এজেন্ট রায়হান রশিদ। ওদেরও অফিশিয়াল কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, কিন্তু বসের নির্দেশে হাজির হয়েছে কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে। আজ ভোরে দেশে ফিরে এসেছে সোহানা। অফিসে আসত আগামীকাল সকালে, তবে আধঘণ্টা আগে ফোন করে ওকে ডেকেছেন বিসিআই চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান।
একটু আগে বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্ট থেকে মেইন সুপার কমপিউটারের এক্সটেণ্ডেড লাইন দেয়া হয়েছে সপ্তম তলায় চিফের পার্সোনাল কমপিউটারে। এখন গম্ভীর চেহারায় এলইডি স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছেন তিনি।
কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে ডার্টি গেম-এর প্রতিযোগিতা দেখতে গিয়ে বিসিআই এজেন্টরা বুঝে গেছে, ভয়ঙ্কর এই মরণপণ লড়াইয়ে নয়জন খুনি ও ধর্ষককে খুন করতে পারলে তবেই প্রাণে বাঁচবে ওদের বন্ধু মাসুদ রানা।
ডেস্কে ইন্টারকম বাজতে কল রিসিভ করল বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টের চিফ রায়হান রশিদ।
‘এইমাত্র এলেন সোহানা ম্যাডাম,’ জানাল আর্মি থেকে অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার মোজাম্মেল শেখ।
অন্য এক স্ক্রিনে রায়হান রশিদ দেখল, গ্রাউণ্ড ফ্লোরে ঢুকে মেইন লিফট দুটো পেছনে ফেলে ডানে বাঁক নিল সোহানা। অচেনা কেউ ওদিকে যায় না। ভুল করে গেলেও দেখে ওখানে আছে পরিত্যক্ত জং-ধরা লিফট। সোহানা ডানহাতের তালু ওটার পাশের দেয়ালে ভাঙাচোরা অ্যাকসেস কন্ট্রোল ডিভাইসের সামনে নিতেই দেখা গেল জং-ধরা দরজার গায়ে দেখা দিয়েছে চার ইঞ্চি বর্গাকার চকচকে স্ক্রিন। ওখানে ভার্চুয়াল কিবোর্ডে নিজের পিন নম্বর দিতেই খুলে গেল দরজা। তবে ওটা আসলে লিফট নয়, আধুনিক স্ক্যানার। আপাদমস্তক ডিজিটালি নিরীক্ষা করা হবে আগত মানুষটার, যাতে ক্ষতিকর কিছু বহন করলে সেটা ধরা পড়ে। সোহানা ভেতরে ঢুকতেই লেগে গেল দরজা। ভেতরটা ঝকঝকে তকতকে। সোহানার জানা আছে, ইতোমধ্যে কাজ করছে অদৃশ্য স্ক্যানার। ওর প্রতিটি পদক্ষেপ সিসিটিভিতে দেখছে সিকিউরিটির লোকজন।
স্ক্যানিং শেষ হয়ে যেতেই নিজ থেকে খুলল উল্টোদিকে আরেকটা দরজা। সোহানা বেরিয়ে এল ফাঁকা বেসমেন্ট এরিয়ায়। এখানে আরেকটা লিফটে, চেপে উঠল ছয়তলায়। ওর অফিস এই ফ্লোরেই। লিফটের দরজা খুলে যেতেই বিস্মিত হলো ও। করিডরে দাঁড়িয়ে আছে সোহেল, সলীল, জাহেদ, রূপা, রায়হান রশিদ ও সিকিউরিটি টিমের সদস্যরা।
‘কী?’ ভুরু কুঁচকে বলল সোহানা। ‘একসঙ্গে সবাই হঠাৎ করে হাজির?’
অন্যরা বুঝে গেল, সোহানাকে কিছুই বলেননি বস্।
‘ইয়ে, সোহানা, তুমি বরং কমপিউটার সেকশনে এসো, ‘ খুক খুক করে কেশে উঠল সোহেল।
‘কেন, বিশেষ কিছু দেখতে হবে?’ সবার মুখ শুকিয়ে গেছে দেখে জানতে চাইল সোহানা, ‘আসলে কী হয়েছে?’
‘পরে বলছি, আগে এসো,’ কমপিউটার ডিপার্টমেন্টের দরজা দেখাল সোহেল।
‘বেশ, অন্যদের পিছু নিল সোহানা।
ওরা ঢুকে পড়ল কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে। বিশাল ঘরে কাজ করছে ক’জন ব্যস্ত অপারেটর। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে মেইন কমপিউটারের মস্ত স্ক্রিনের সামনে থামল সোহেল। আগেই ওখানে রাখা আছে ক’টা চেয়ার। হাতের ইশারায় ওগুলো দেখাল রায়হান রশিদ। ‘আপনারা বসুন।’
সবাই বসতেই কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল সোহানা, ‘আসলে কী হয়েছে? সবাই এত গম্ভীর কেন? আমি দেশে ফিরতে না ফিরতেই কল করে কেন আসতে বললেন বস্?’
‘তুমি তো জানো, রানা ছিল এল সালভেদরের পাহাড়ি দুর্গ সোনসোনেট কারাগারে,’ শুষ্ক গলায় বলল সোহেল। ‘আমরা স্থির করেছিলাম ওখান থেকে ওকে বের করে আনব। এই ব্যাপারে কথা হয়েছিল বসের সঙ্গে।’
‘হ্যাঁ,’ বলল সোহানা, ‘কোঅর্ডিনেটর হব আমি।’
‘তবে রানা এখন আছে প্রশান্ত মহাসাগরের অচেনা এক দ্বীপে,’ বলল সোহেল। বাকি কথা বলতে হাতের ইশারা করল রায়হান রশিদকে।
‘আপনি আগে দেখুন কমপিউটার স্ক্রিন,’ সোহানাকে বলল রায়হান। ‘পরে আলাপ হবে।’
স্ক্রিনের দিকে তাকাল সোহানা।
ওখানে মুভি পোস্টারের মত গ্রাফিক। ব্যাকগ্রাউণ্ডে জং- ধরা জেলখানার সেল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সবুজ দ্বীপের দৃশ্য। ইমেজে ফাঁসির মঞ্চ, পিচ্ছিল দড়ি ও ইলেকট্রিক চেয়ার। নিচে বন্দিদের ছবি ও নাম। ক্লোযআপ করা হয়েছে রূপসী রোযি ইয়াসিমানের ছবি। পাশে রুপার্ট শ্যাননের সাইকোটিক চেহারা। খাড়া এক ক্লিফের কাছ থেকে সরে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকছে অন্যরা। রানাকে অনেক পরে পেয়ে ওর ছবি আপলোড করেছে স্টিলের ক্রুরা।
স্ক্রিনের ডিজিটাল তারিখ ও সময় বলছে: আজ সোমবার, ১৭:৩৩:০০।
সোহানার জানার কথা নয়, একটু পর মেক্সিকান মেয়ে ইসাবেলাকে ধর্ষণের পর খুন করবে প্রাক্তন এসএএস মেজর রুপার্ট শ্যানন।
মাউস দিয়ে কমপিউটার স্ক্রিনে রায়হান ক্লিক দিতেই ফুটে উঠল একটি রঙিন মেন্যু:
রুলস্
কনটেস্ট্যান্টস্
গো টু লাইভ!
ব্র্যাড স্টিল-বায়োগ্রাফি
রায়হান কনটেস্ট্যান্ট্স আইকনে ক্লিক দিতেই স্ক্রিনে এল দশজন মানুষের পাসপোর্ট ছবি। সেগুলোর তিনটে এখন লাল ক্রসচিহ্ন দেয়া। নিচে মৃতদের নাম:
রাশান, ম্যানইয়া লোপাতিন।
ইতালিয়ান, এনযো বিয়াঞ্চি।
এবং জার্মান, ডেরেক স্লাইডার।
দশম ছবি দেখে মুখ শুকিয়ে গেল সোহানার
‘দুনিয়ার সবচেয়ে হারামি ক’জন খুনির সঙ্গে লড়বে মাসুদ ভাই,’ জানাল রায়হান। এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্সের কাছ থেকে যা জেনেছে, সেটা এবার গড়গড় করে বলল সে। কথা শেষ করে ক্লিক দিল রানার বায়োগ্রাফির ওপরে। ঝড়াৎ করে খুলে গেল নতুন পেজ। ওখানে আছে ব্র্যাড স্টিলের তৈরি করে নেয়া রানার নকল পরিচয়।
ঢাকা শহরে মৌলবাদী এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছে বিকৃত মস্তিষ্কের ভয়ঙ্কর নরপশু মাসুদ রানা। তরুণ বয়সে ঢাকা শহরে নামকরা এক ক্যাথোলিক চার্চে হামলা করে। তাতে খুন হয়ে যায় তেরোজন যাজক ও নান। অবশ্য প্রমাণের অভাবে পরে জেলখানা থেকে মুক্তি দেয়া হয় রানাকে। ডিভি লটারিতে জিতে চলে গিয়েছিল আমেরিকায়। একুশ সালে গভীর রাতে অকটেন ঢেলে আগুন দিয়েছে আর্কানসাসের লিটল রকের এক ব্যাপটিস্ট চার্চে। তাতে খুন হয়েছে ছয় যাজক ও এতিমখানার আঠারোজন নাবালক ছেলে। এরপর রানা আমেরিকা থেকে পালিয়ে গিয়ে ঢুকেছে এল সালভেদরে। বাইশ সালে পঙ্গু ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছেলেমেয়েদের একটি হাসপাতালে ফাটিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী প্লাস্টিক বোমা। সেই বিস্ফোরণে মারা গেছে বারোজন মহিলা নার্স আর তেত্রিশজন অসহায় ছেলেমেয়ে। তারপর…
আর কিছু না পড়েই সোহেলের চোখে তাকাল সোহানা। ‘এসব কী? এটা কী ধরনের মস্করা?’
মাথা নাড়ল সোহেল। ‘না, সোহানা, এটা মস্করা নয়। গোটা দুনিয়া জুড়ে ওর নামে এসব ছড়াচ্ছে প্রযোজক ব্র্যাড স্টিল।’
‘সত্যিটা আমরা জানলেও সাধারণ মানুষ সেটা জানে না, বলল সলীল, ‘তারা ভাবছে এসব নৃশংস খুনিদের মতই রানাও একই ধরনের রক্তপিশাচ।’
‘এখন আমাদের তা হলে কী করা উচিত?’ বলল সোহানা।
‘তুমি তো দেখলে সবার গোড়ালিতে টাইম বম,’ বলল সোহেল, ‘ফাটবে সতেরো ঘণ্টার একটু পর। প্রশান্ত মহাসাগরের ওদিকে আছে দু’ শ’র বেশি দ্বীপ। আমরা জানি না ঠিক কোথায় আছে রানা। যদি জিপিএস লোকেশন পাঠাতে পারে, তবুও ঠিক সময়ে ওখানে বোধহয় পৌঁছুতে পারব না আমরা।’
‘তাই বলে…’ প্রতিবাদ করতে গিয়েও চুপ হয়ে গেল সোহানা। রাগে লালচে হয়ে গেছে ওর অপরূপ সুন্দর মুখ।
‘আমাদের আসলেই কিছু করার নেই,’ বিড়বিড় করল জাহেদ।
মেনে নিতে কষ্ট হলেও কথাটা চরম সত্যি,’ নিচু গলায় বলল সোহেল। ‘দেখা যাক বস্ কোন পথ খুঁজে বের করতে পারেন কি না।’
ডার্টি গেমের লাইভ ভিডিয়ো চালু করল রায়হান।
কমপিউটার রুমে নেমেছে পিন-পতন নীরবতা।
থমথম করছে সোহানা, সোহেল, জাহেদ ও সলীলের মুখ। আগে কখনও এত অসহায় বোধ করেনি ওরা।
.
সন্ধ্যার আগে দ্বীপ জুড়ে নেমে এসেছে অপার্থিব মায়াবী এক পরিবেশ। চারদিকের আকাশ এখন গভীর নীল জলের পুকুরের মত। লাল-বেগুনি দিগন্তরেখার আগে ভেসে বেড়াচ্ছে গোলাপী ও কমলা ছেঁড়া মেঘের ভেলা। একটু পর আকাশের কালো চাদরের বুকে ফুটে উঠবে কোটি কোটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তপ্ত হাওয়ায় সর-সর শব্দে নড়ে উঠছে পাম গাছের সবুজ পাতা।
প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে সত্যি চমৎকার এক আবহ। এবং তেমনটা মনে হবে বলেই এ-দ্বীপটি বেছে নিয়েছে স্টিল। তার প্রতিটি শো-তে ছিল ভয়াবহতা আর মজা। প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে আয়েস করে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে এখানে হাজির হয়নি স্টিল। প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছে গত একমাস ধরে। আর তারই ফল আজকের ডার্টি গেম। মস্ত তাঁবুর ভেতরে সবার সামনে রিটা অপমান করলেও মেয়েটার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়নি তার। এই শো শেষ হলে বিছানায় তুলতে গেলে বোধহয় বাধা দেবে রিটা। আর তখন ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফূর্তি করার সময় মনে মনে হাসবে স্টিল।
ওদের যে তাঁবু, তার সামনে ছোট্ট বারান্দায় বসে দূরে চেয়ে আছে রিটা। আবছা আলোয় ওকে দেখে নিজের রুচির প্রশংসা না করে পারল না স্টিল। দুনিয়ার দশ সুন্দরীর একজন হচ্ছে এই রিটা। যখন ওর প্রবল আকর্ষণে সব ভুলে ঘনিষ্ঠ হবে মেয়েটা, দারুণ লাগবে স্টিলের। আসলে কোন মেয়ে কখনও উপেক্ষা করতে পারে না তাকে।
সময় হলে নিজের ভুল ঠিকই বুঝবে রিটা।
ওকে সুযোগ করে দেয়ার জন্যে স্টিলের বোধহয় এখন উচিত গিয়ে ওর ঠোঁটে চুমু দেয়া। প্রেমিক-প্রেমিকার ঝগড়া হওয়ার পর দারুণ লাগে যৌন-মিলন করতে, ভাবল স্টিল। রিটার সামনে থেমে নরম সুরে বলল সে, ‘তুমি কি সত্যিই আমাকে ঘৃণা করো?’ তার দু’হাতে বরফ দেয়া কফির দুটো মগ। সূর্যাস্তে লাটিস কফিতে চুমুক দিতে পছন্দ করে রিটা।
মাথা সামান্য পিছিয়ে মৃদু স্বরে বলল মেয়েটা, ‘হ্যাঁ।’
অর্থাৎ সত্যি ঘৃণা করে। বেশ বিরক্ত হলো স্টিল। পরক্ষণে ভাবল, কিন্তু
কিন্তু এটা তো হতে পারে না! ওকে ভালবাসে মেয়েটা। তার মানে আসলে ঘৃণা করছে ওর কাজটাকে। দ্বিধার ভেতরে পড়েছে রিটা। বুঝতে পারছে ওকে ঠকায়নি স্টিল। এমন কী কোন মিথ্যাও বলেনি। এটা ঠিক, ডার্টি গেমের বিষয়ে রিটার সঙ্গে খুঁটিনাটি কোন আলাপ করেনি। তবে সেটা তো হতেই পারে। স্টিল একজন সফল পুরুষ, নিজের কাজ ভালবাসে। সুতরাং ভাল হোক বা মন্দ, যে-কোন মেয়ের উচিত ওকে মন থেকে ক্ষমা করে দেয়া। রিটাকে তো মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে এই দ্বীপে আসতে বাধ্য করেনি স্টিল। যদিও মনে হচ্ছে এখানে এসে নিজের ওপরে রেগে গেছে মেয়েটা।
‘আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, কী ধরনের শো তৈরি করব,’ ফিসফিস করল স্টিল। ‘তুমি তো সবই জানতে, তা-ই না?’
মুখ তুলে তাকে দেখল রিটা। ধীরে ধীরে মাথা দোলাল।
‘আমি কী ধরনের কাজ করি, সেটা জেনেও এলে কেন?’
কোন জবাব দিল না মেয়েটা। দু’জনই জানে কেন এসেছে রিটা। স্টিলের প্রেমে পড়েছে সে। সবার গোড়ালিতে টাইম বম সেট করার আগে সেই ভালবাসায় কোথাও কোন খামতি ছিল না। এমন কী এতকিছুর পরেও মনের অনুভূতি চেপে রাখতে পারছে না রিটা।
বারান্দায় ওর পাশে বসে কফির মগ মেঝেতে রাখল স্টিল। গভীরভাবে চুমু দিল রিটার ঠোঁটে। প্রত্যুত্তরে আগ্রহ নিয়ে চুমু ফেরত দিল মেয়েটা। বরাবরের মতই ভেঙে গেল ওর তৈরি বাঁধ। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল স্টিল ও রিটা ওদের এই ভালবাসার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, জোর করে সেটা ভুলে যেতে চাইল মেয়েটা। মনস্থির করল, আর কখনও মৃতপ্রায় মানুষের আর্তনাদ শুনতে যাবে না। সেক্ষেত্রে এত কষ্ট পেতে হবে না ওকে। মাত্র আঠারো ঘণ্টার ভেতরে শেষ হবে এই অনুষ্ঠান। আর তারপর একসময়ে মনের আয়নায় জমে যাবে প্রচুর ধুলো। তখন আগের মত মনের ভেতরে হানা দেবে না আজকের দগদগে স্মৃতি।
হঠাৎ ইসাবেলার ভয়ঙ্কর মৃত্যু-দৃশ্য মনে পড়তেই ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে সঙ্গীর চোখে তাকাল রিটা। কী করে যেন মিলেমিশে গেল মেক্সিকান মেয়েটার লাশ ও স্টিলের চেহারা।
সরে বসে ফিসফিস করে বলল রিটা, ‘আমি আর কখনও তোমার কাছ থেকে কোন চুমু নেব না।’ কথা না বাড়িয়ে উঠে গিয়ে ঢুকে পড়ল তাঁবুর ভেতরে। কুঁকড়ে বসল একটা চেয়ারে। আজ দৈহিক মিলনে নিজেকে জড়াতে পারবে না। হয়তো বহু বছর আর স্টিলের কাছে যাওয়া হবে না।
বারান্দায় চুপ করে বসে থাকল স্টিল। কোন দিনই উপেক্ষা সহ্য করে না সে। বিশেষ করে সেটা যদি আসে কোন মেয়ের তরফ থেকে। স্টিলের মনে পড়ল, কী ভয়াবহভাবেই না ইসাবেলাকে জোর করে ধর্ষণ করেছে শ্যানন। তারও ইচ্ছে হলো তাঁবুতে ঢুকে দু’হাতে ছিঁড়ে ফেলতে রিটার পোশাক। মেয়েটা পছন্দ করুক না করুক, গায়ের জোরে ওকে ভোগ করতে পারলে এখন ভাল লাগবে তার। রিটার বোঝা উচিত, যুদ্ধ চলছে এই দ্বীপে। আর যুদ্ধে সবকিছুই আসলে বৈধ।
নিজের প্রিয় শো-র কথা ভেবে যৌন-আকাঙ্ক্ষা দমন করল স্টিল। রিটাকে নিয়ে ফূর্তি করতে গিয়ে ডার্টি গেমের কথা ভুলে গেলে ওর চলবে না। এখনও বেঁচে আছে ছয় অপরাধী। তাদের পাঁচজনের মৃত্যু চমৎকারভাবে দেখাতে হবে দর্শকদের কাছে। সুতরাং ওদিকে দিতে হবে পূর্ণ মনোযোগ।
কফির মগ ফেলে রেখে বিশাল তাঁবুর দিকে চলল সে।
আঠারো
রাশান দানব ম্যানইয়া লোপাতিন ক্লিফ থেকে পড়ার পর হেঁটে চলেছে রানা। বিকেলের সোনালি আকাশ একসময় হয়ে গেল কালো আঁধার। বিরামহীনভাবে কমছে গোড়ালির ব্রেসলেটের ঘড়ির ডিজিট, সুতরাং বিশ্রাম নেয়া বা ঘুমাবার কোন উপায় নেই ওর।
আরেকটু হলে গভীর যে বিশাল ক্যানিয়নে পড়ত রানা, ওটা একসময় রুদ্ধ করল ওর চলার পথ। লাভার তৈরি যে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে এসেছে, বাধ্য হয়ে আবার ওটা বেয়ে নেমে এল রানা। নতুন করে এগোল গ্রীষ্মকালীন বনের ভেতর দিয়ে। রাত নামার পর পৌঁছে গেল কালো এক ক্যানিয়নের মুখে। প্রকাণ্ড ফাটলের মাঝ দিয়ে গেছে অগভীর নদী। ওটাতে নেমে পেট পুরে পানি খেল রানা। মনে পড়ল ওর বাঁশের ক্যান্টিনগুলোর কথা। লোপাতিনের সঙ্গে লড়তে গিয়ে কোথায় যেন পড়ে গেছে ওগুলো।
হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের অভ্যন্তরে নানান ধরনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে রানা। মাঝে মাঝে দূর থেকে আসছে সাগরের শোঁ-শোঁ গর্জন। কখনও ওটা চাপা পড়ছে অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে। একসময় কানে এল বড় কোন জলপ্রপাতের বিকট শব্দ। অবশ্য একটা টিলায় ওঠার পর আর থাকল না সেই আওয়াজ। ইসাবেলা বা তার স্বামীর প্রতিবাদ বা আর্তচিৎকার না শুনলেও মেয়েটার টাইম বম ফাটার শব্দ পেয়েছে রানা। কে মারা গেল সেটা জানতে গিয়ে সময় নষ্ট করেনি। এটা বুঝে গেছে, কমে গেল আরও এক প্রতিদ্বন্দ্বী।
একটু পর আকাশে মুখ তুলল মস্তবড় এক চাঁদ। তবে ওটা পূর্ণিমার নয়, ঝাপসা আলোয় চিতাবাঘের মত নিঃশব্দে এগিয়ে চলল রানা। লোপাতিনের সঙ্গে মোকাবিলা করার পর থেকে এখনও আর কারও সঙ্গে দেখা হয়নি। মাটিতে কারও পদচিহ্ন নেই। ভাঙা হয়নি কোন গাছের ডাল। আশপাশে নেই মানুষের প্রস্রাবের কটু গন্ধ।
একসময় ঘনিয়ে এল মাঝরাত। যে গিরিখাদে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরভাবে ইসাবেলাকে খুন করে গেছে শ্যানন, ওটা থেকে দু’মাইল উজানে পৌঁছে গেল রানা। ওর ধারণা, চওড়ায় এই দ্বীপ বড়জোর চার মাইল। রানা আছে মাঝের ঘন জঙ্গলে। বিরতি না দিলে সূর্যোদয়ের আগে পৌছুতে পারবে ওয়েদার টাওয়ারের কাছে। যেহেতু দিনের আলোয় স্টিলের কম্পাউণ্ডে ঢুকতে পারবে না, তাই ভোরের আগে ওখানে হাজির হওয়া রানার জন্যে খুব জরুরি।
আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর বুটজুতোর ভেজা দাগ দেখতে পেল রানা। চিহ্নগুলো কোন মেয়ের তৈরি নয়। এক পা টেনে এগিয়ে গেছে লোকটা। জঙ্গলে থমকে গেল রানা। কান পেতে অপেক্ষা করতেই শুনতে পেল একটু দূরেই ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে কে যেন।
অন্ধকারে চারপাশে চোখ বোলাল ও। একটু সামনে বড় এক গাছের গুঁড়ি ছেয়ে ফেলেছে লতাগাছে। কাণ্ডের ওপাশ থেকে বেরিয়ে আছে একটা বুটজুতোর ডগা।
বড় করে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল কেউ।
সাবধানে এগোল রানা। উঁকি দিল গুঁড়ির ওদিকে।
যুবক মেক্সিকান দস্যু আলকারায। কবজিতে হ্যাণ্ডকাফ। খুব কাছে কেউ পৌঁছে গেলেও হুঁশ নেই তার। তাকে দেখে রানার মনে হলো, মরতে পারলে যেন প্রাণে বেঁচে যাবে সে।
চারপাশে আরেকবার চোখ বোলাল রানা। ওর মনে হলো না এখানে অ্যাম্বুশ করবে কেউ। নিচু গলায় বলল, ‘তোমার আসলে কী হয়েছে?’
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল আলকারায। বুকের কাছে নেমে গেছে থুতনি।
‘কী হয়েছে তোমার?’ আবারও জানতে চাইল রানা।
একবার মাথা নেড়ে মুখ তুলে ওকে দেখল আলকারায। রানা বুঝে গেল, প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছে তাকে।
‘আমি ওদেরকে খুন করতে চাই,’ ঢোক গিলে বলল মেক্সিকান দস্যু।
‘কাদেরকে খুন করবে?’
বিকৃত হলো আলকারাযের মুখ। হঠাৎ করে খপ্ করে চেপে ধরল রানার ঊরু। ‘আমাকে সাহায্য করো ওদেরকে খুন করতে। আমরা দু’জন মিলে খতম করে দেব ওদেরকে।’
‘তুমি আসলে কী বলতে চাইছ?’ আলকারায যাদেরকে খুন করতে চাইছে, তারা হয়তো আশপাশে কোথাও আছে। তাই আবারও চারপাশে চোখ বোলাল সতর্ক রানা।
‘আমার ইসাবেলা… ওরা ওকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে! তার আগে ইংরেজ কুকুরটা ছোরা দিয়ে ফালি ফালি করে দিয়েছে ওর শরীর। তারপর টাইম বম দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে ওকে। আমার চোখের সামনে সব ঘটে গেল।’ রাগে ও ঘৃণায় থরথর করে কাঁপছে ‘যুবক আলকারায। ‘তুমি আমাকে সাহায্য করলে আমরা ওদেরকে খুন করব।’
আলকারাযের মানসিক যন্ত্রণার মাত্রা বুঝে তিক্ত হয়ে গেল রানার অন্তর। মনে পড়ল সোহানার মিষ্টি মুখ। ওকে কেউ এভাবে খুন করলে আলকারাযের মতই প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে পাগল হয়ে যেত রানা।
আলকারায বলছে শ্যাননের সঙ্গে আরও কেউ আছে। দু’জন মিলে দল তৈরি করেছে তারা।
‘ওদেরকে খুন করতে সাহায্য করো, প্লিয,’ আগের চেয়ে জোরে বলল আলকারায।
দূরে মট করে একটা ডাল ভাঙার আওয়াজ শুনতে পেল রানা। নিচু গলায় বলল, ‘লুকিয়ে পড়ো। কারা যেন আসছে।’
কান পেতে রইল ওরা। একটু পর পঞ্চাশ গজ দূরে ঘন ঝোপের ভেতরে কারও নড়াচড়া দেখতে পেল রানা। পাশাপাশি আসছে দু’জন লোক। একজন লম্বায় ছয় ফুটের মত, অন্যজন বেশ বেঁটে। জাপানি খুনি তানাকার সঙ্গে জোট বেঁধে খুন করে চলেছে প্রাক্তন এসএএস মেজর। ইংরেজ লোকটার হাতে ছোরা। রানা বুঝে গেল, আহত আলকারাযকে নিয়ে সরে যেতে হবে ওর।
‘আমি তোমাকে সাহায্য করব,’ ফিসফিস করে বলল রানা। ‘মন শক্ত করো। ওঠো, এখান থেকে সরে যেতে হবে।’
‘আমি আর হাঁটতে পারব না। ভেঙে দিয়েছে হাঁটুর বাটি।’
চাপা শ্বাস ফেলল রানা। বুঝে গেল জঙ্গলের ভেতরে কেন ছেঁচড়ে চলার দাগ ছিল। আর সে-চিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে আসছে শ্যানন ও তানাকা।
বাঁচার জন্যে লড়াই চলছে এই দ্বীপে।
আলকারাযকে এখন কোথাও লুকিয়ে রাখবে, সেটা আর সম্ভব নয় রানার পক্ষে। এদিকে পেরিয়ে গেছে মাঝরাত। ভোরের আগে পৌছুতে হবে ওয়েদার টাওয়ারের কাছে। তাই বলে আহত কাউকে ফেলে চলে যাবে, তেমন মানুষ নয় রানা। দু’হাতে পাঁজাকোলা করে আলকারাযকে তুলে নিল ও, দ্রুত পায়ে সরে যেতে লাগল এই এলাকা থেকে।
.
সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসতেই আবার বিধ্বস্ত বি-২৫ বিমানের কাছে ফিরে এসেছে জনি এস. ক্লার্ক। তানাকার ওপরে চাদরের মত করে প্যারাশ্যুট ফেলে ছুটে গিয়ে ঢুকেছিল জঙ্গলে। তখন নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে, নিশ্চয়ই হেলিকপ্টার থেকে আবারও পড়বে রিলিফের ব্যাগ। আর সে- সময়ে কেউ বাধা দিলে দ্বিধা করবে না তাকে খুন করতে। তবে এরপর আর এল না কোন হেলিকপ্টার। ফলে ব্যাগও আর মিলল না। কাউকে খুনও করতে হলো না।
মাঠে ফিরে ক্লার্ক দেখল এখন আর ব্যাগের ভেতরে কিছু নেই। তবে বিমানের ফিউজেলাজে হয়তো কাজে লাগবে এমন কিছু থাকতে পারে।
ছোরা পেয়ে ওর তৈরি বর্শা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ক্লার্ক। ফিউজেলাজে ঢোকার আগে আবার সংগ্রহ করল ওটা।
আকাশে এখনও চাঁদ ওঠেনি।
চারপাশে ঘুটঘুটে আঁধার রাত। ভুতুড়ে দেখাচ্ছে ভাঙা বিমান।
‘শালার মারাত্মক কোন ভূত আছে ওটার ভেতরে,’ বিড়বিড় করল ক্লার্ক। ভয় লাগতেই পিছিয়ে গেল কয়েক পা।
পরের পাঁচ মিনিট কান পেতেও কোথাও কোন অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনতে পেল না।
বিমানে হয়তো দরকারি কিছু পাব, নিজেকে বোঝাল ক্লার্ক। তা ছাড়া, সারারাত এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কোন ফায়দা নেই। আরও বড় কথা, কোন্ শালা বলেছে যে আসলে আমার সাহস নেই!
দ্রুত পায়ে ফিউজেলাজে গিয়ে ঢুকল ক্লার্ক। ডালের বর্শা দিয়ে খোঁচা দিল চারদিকে। বিমানের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান জিনিস। ভেতরে কেউ নেই। ফিউজেলাজে সে একা আছে ভেবে মনের ভেতরে বেশ স্বস্তি পেল ক্লার্ক।
বেশ কয়েক সেকেণ্ড ওর লাগল অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতে। মেঝেতে পড়ে আছে সার্ডিন মাছের ক্যান। একটা কুড়িয়ে নিল ক্লার্ক। রুক্ষ হয়ে গেছে কৌটার ধাতব দেহ। এক জায়গায় লেখা: ১৯৪২। সার্ডিন মাছ একদম পছন্দ করে না সে। কিন্তু এখন পেটের তীব্র জ্বালায় অস্থির লাগছে তার। মাছ খেতে পাবে ভেবে গলা দিয়ে বেরোল গুনগুনে গান। কি-র ভেতরে তর্জনী ভরে চড়চড় করে খুলল পাতলা ঢাকনি। তবে কৌটার ভেতর থেকে যে ভয়াবহ দুর্গন্ধ বেরিয়ে এল, তাতে আরেকটু হলে চিত হয়ে ধপাস্ করে মেঝেতে পড়ে যেত ক্লার্ক। তাড়াতাড়ি বাইরে ছুঁড়ে ফেলল ভয়ঙ্কর কৌটা। নতুন উদ্যমে খুঁজতে লাগল অন্যকিছু। মেঝেতে পেল আরেকটা কৌটা। আগেরটার মতই জং ধরে গেছে এটার গায়ে। আবার লেবেলও নেই। ভেতরের জিনিসটাও বোধহয় বহু বছর আগে নষ্ট হয়ে গেছে।
তাতে কী! অন্তত একবার তো দেখা উচিত ভেতরে কী!
কৌটার ঢাকনি খুলে মারাত্মক দুর্গন্ধের জন্যে তৈরি হলো ক্লার্ক। গন্ধের আওতার বাইরে সরিয়ে নিল নাক। তবে ওটার ভেতর থেকে বাজে কোন কুবাস এল না।
কৌটার কাছে নাক নিল সে।
নাহ্, গন্ধটা তো বাজে লাগছে না!
কৌটার মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে ভেতরের জিনিসটা বের করে জিভে ঠেকাল। তাতে মায়ের কথা মনে পড়ে গেল ক্লার্কের।
ছোটবেলায় ওদের বাবার তেমন টাকা ছিল না বলে ভাল মাংস বাড়িতে আসত না। ওর মা তখন এ-ধরনের টিনবন্দি রান্না করা মাংস কিনে সেটা পাউরুটি, নুডল্স্ আর বাঁধাকপির সঙ্গে মিশিয়ে ওদেরকে খেতে দিত। তাতে কখনও কোন ক্ষতি হয়নি কারও।
কৌটার মাংস আশি বছর আগের হলেও এই মৃত্যুদ্বীপে ওটাই বা কে দিচ্ছে ক্লার্ককে!
সেই আগের মতই স্বাদ। মাংস খেতে পেয়ে ভাল লাগলেও মায়ের কথা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে গেল ক্লার্কের। মার সামনে গিয়ে দাঁড়াবার সাহস আর নেই ওর। শেষবার যখন জেলখানায় গেল ক্লার্ক, দেখা করতে এসেছিল মা। আর তখন শপথ করে ও বলেছিল, নিয়মিত গির্জায় গিয়ে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে ওকে, আসলে কোন অপরাধই করেনি। কবে মানুষের মত মানুষ হয়ে গেছে সে সেটা আইনের লোকেরা জানেও না। সমাজের কল্যাণের জন্যে এখন হু-হু করে কেঁদে ওঠে ওর অন্তর। কিন্তু ক’দিন পর প্রমাণ হয়ে গেল, ড্রাগসের ব্যবসায় ওরই এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে খুন করেছে ক্লার্ক।
মায়ের সঙ্গে কথা বলার পরের সপ্তাহে সোলেড্যাড কারাগার থেকে ওকে ফোলসম জেলখানায় নেয়ার সময় দু’জন পুলিশকে আহত করে পালিয়ে গেল ও। একমাস আগে থেকেই জানত, সোলেড্যাড কারাগার বর্ণবাদীদের আস্তানা বলে ওকে সরিয়ে দেয়া হবে অন্য কোথাও। একই কুঠরিতে তখন ছিল বয়স্ক এক পাকা অপরাধী। সে ঠিক করে দিয়েছিল আমেরিকা থেকে মেক্সিকোতে গিয়ে তারপর কীভাবে মালোয়েশিয়া পালিয়ে যাবে ক্লার্ক। জাহাজে চেপে এশিয়ার দেশটাতে গিয়ে বুঝে গেল, সরকারের খুব কড়াকড়ি আছে ড্রাগের ব্যাপারে। তার কিছু দিনের ভেতরে ড্রাগের চালানসহ ধরা পড়ে গেল ক্লার্ক। আর তাতে আবার আদালত থেকে রায় দেয়া হলো ওর মৃত্যুদণ্ডের। আসলে কোন্ দেশে আছে, কখনও ভুলেও মাকে বলেনি ক্লার্ক, নইলে ভেঙে যেত মহিলার বুক। এমনিতেই বেচারি জেনে গেছে, সোলেড্যাড প্রিযন থেকে ভেগে গেছে তার ছেলে। আর এর মানেই নিজের মাকে একগাদা মিথ্যা বললেও অপরাধ-জগৎ থেকে কখনও বেরিয়ে আসেনি সে।
আর এখন এই দ্বীপে যে একদল খুনির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হবে, সেটা জানলে তো মা হয়তো হার্ট অ্যাটাক করে মরেই যেত!
প্রাচীন মাংস চিবুতে চিবুতে দূর হলো ক্লার্কের সব চিন্তা। কিছুক্ষণ পর কৌটা খালি করে এনেছে, এমন সময় বিমানের পাশের ফাটল দিয়ে বাইরে চোখ গেল তার। ফিউজেলাজের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে সাবধানে তাকাল। ভেতরের অন্ধকারে ভাল করেই সয়ে গেছে চোখ। চাঁদের ম্লান আলোয় বাইরে সব দেখা যাচ্ছে।
ভীত হরিণীর মত পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ আফ্রিকান সুন্দরী রোযি ইয়াসিমান। চট্ করে একবার ঘুরে তাকাল বিমানের দিকে। মেয়েটার চেহারায় কোন ধরনের অনুভূতি দেখতে পেল না ক্লার্ক।
বাইরে থেকে তো আমাকে দেখার কথা নয়, ভাবল সে। ভুল করে একবার কাছে আসুক, খতম করে দেবে শালীকে।
বিমানের দিকেই এল রোযি। তারপর থমকে গিয়ে দ্বিধা করল। চাঁদের আবছা আলোয় দেখে মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে সে। যদিও ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে না। একটু পর ধীর পায়ে এল বিমানের দরজার দিকে।
ফিউজেলাজের দরজার কাছে চলে গেল ক্লার্ক। এখনও নিশ্চিত নয় মেয়েটাকে ধরতে পারলে কী করবে। তবে এটা ঠিক, সুযোগ পেয়ে পশুর মত ধরে ফেলে ধর্ষণ করবে না। হয়তো উচিত হবে সুন্দরীকে দলে টেনে নেয়া। ওরা একসঙ্গে লড়াই করলে হয়তো জিতে যাওয়া সহজ হবে অন্যদের বিরুদ্ধে। খাপ পেতে বিমানের ভেতরে অপেক্ষা করল ক্লার্ক।
.
বিমানে আশ্রয় নেবে বলে ভাবছে রোযি ইয়াসিমান। তাতে হয়তো কিছুক্ষণের জন্যে বুজতে পারবে দু’চোখ। তবে ক্লার্ক জানে না, ফিউজেলাজের ভেতরে কারও নড়াচড়া দেখে ফেলেছে সে। আর তখনই বুঝে গেছে, এখন ছুট দিলে নির্ঘাৎ বিমানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটা ধেয়ে আসবে খুন করতে। ছোটবেলা থেকে পুরুষমানুষকে বোকা বানিয়ে বাঁচতে হয়েছে ওকে, তাই সহজেই বুঝে গেছে এখন বুদ্ধির কাজ ওর হবে লোকটাকে বুঝতে দেয়া, আসলে কিছুই জানে না ও।
আজ ভীতিকর যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে বিমানের ভেতরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারত না, সেটা বুঝে গেছে রোযি ইয়াসিমান। হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেয়ার পর আরেকটু হলে দম আটকে মরত পানির নিচে। তারপর খুব কাছে চলে এল জার্মান হারামজাদা। আরেকটু হলে ধর্ষণের পর ওকে খুন করত শুয়োরটা। তাকে বোমা ফাটিয়ে খুন করার পর আর কোথাও ভুলেও থামেনি রোযি। একবারও ভাবেনি, জিতে যাবে এই অন্যায় প্রতিযোগিতায়। অবশ্য তাতে কী, ওর চেষ্টা করতে হবে বেঁচে থাকার জন্যে।
কান খাড়া করে রেখেছে সে। বুঝে গেছে, অলক্ষে কেউ না কেউ দেখছে ওকে। হরিণের মত এখন দৌড় দিলে বিমান থেকে বেরিয়ে ধাওয়া করবে লোকটা। তাতে মরতে হবে ওর।
পেছনে ঝোপঝাড় ও ঘাস সরে যাওয়ার খস খস শব্দ শুনতে পেল রোযি। পাঁজরে ধুপধাপ করে লাগছে ওর উত্তেজিত হৃৎপিণ্ড। ওটার অস্বাভাবিক আওয়াজ প্রায় তলিয়ে দিচ্ছে লোকটার পদশব্দ।
আমি ভুলেও দৌড়ে পালিয়ে যাব না, মনে মনে নিজেকে বলল মেয়েটা। কয়েক পা দূরে শুকনো একটা গাছ। এখনই ঘুরে দৌড় দিতে হবে, নইলে পরে আর নয়!
গাছ ঘুরে সামনে এগোল রোযি। আপাতত ওকে দেখতে পাচ্ছে না লোকটা। গাছের একটা ডাল দেখতে ওয়াকিং স্টিকের মত। মড়াৎ করে ওটা ভেঙে নিল রোযি। ভাবছে, কপাল ভাল হলে লোকটা ভাববে, শুকনো কোন ডালের ওপরে পা পড়তেই ভেঙে গেছে ওটা।
আবারও পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল রোযি।
এইমাত্র মরা গাছটা ঘুরে ওর দিকেই আসছে সে।
লোকটার দিকে নিজের পিঠ রেখে এগোচ্ছে রোযি। ধীর পায়ে চলেছে বিমানের দরজার দিকে। সামনের দিকে ধরে রেখেছে হাতের লাঠি। ওর মন বলে দিল, ঠিক কখন হামলা করতে হবে। মচমচ আওয়াজ তুলছে লোকটার বুট। এল শ্বাস ফেলার ফোঁস আওয়াজ। আততায়ী এত বেশি কাছে, তার গায়ের গন্ধ পেল রোযি। ঝড়ের বেগে ঘুরেই মাথার ওপরে লাঠি তুলে নামিয়ে আনল ক্লার্কের মাথার ওপরে।
ডালের বাড়ি সরাসরি লেগেছে যুবকের কাঁধের হাড়ের ওপরে। ঝটকা দিয়ে পিছিয়ে যেতে গিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল সে। চিতার মত তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রোযি। ডালের ডগা দিয়ে খোঁচা দিতে চাইল শত্রুর গলায়। কিন্তু এক হাতে লাঠিটা ধরে আরেক দিকে সরিয়ে দিল ক্লার্ক। ওর পাশে মাটিতে গেঁথে গেল লাঠির ডগা। ল্যাং মেরে নিজের পাশে মেয়েটাকে ফেলে দিল সে। লাফ দিয়ে উঠে বসে লাঠি তুলে তলোয়ারের মত ঠেকিয়ে দিল রোযির বুকে। তানাকার সঙ্গে লড়ার পর তার শিরায় বইছে অ্যাড্রেনালিনের স্রোত। দরকার হলে ভেঙে দেবে রোযির ঘাড়। হ্যাঙার বা হেলিকপ্টারের সেই মেয়ে এখন অন্য কেউ- যে কি না আসলে তার জন্মের শত্রু!
.
‘জলদি!’ উত্তেজিত হয়ে বলল স্টিল, ‘মেয়েটার দিকে ক্যামেরা তাক করো!’
মস্ত স্ক্রিনে চেয়ে আছে সিওয়ার্স ও এমিলি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে ক্লান্ত। কিন্তু এখনও আরও বহু ঘণ্টার শ্যুটিং বাকি।
ওদের কাছে গিয়ে থামল ব্র্যাড। প্রতিযোগিতায় কেউ বিজয়ী না হওয়া পর্যন্ত ঘুমাতে পারবে না সে। আপাতত বিশাল তাঁবুতে নেই রিটা। তবে এক সময়ে যে তার প্রতি ভালবাসায় আবারও ভরে উঠবে মেয়েটার বুক, তাতে মনে কোন সন্দেহ নেই স্টিলের। দুশ্চিন্তায় পড়েছে অন্য কারণে। তাই নিজে থেকে বলে দিয়েছে, যাতে বিশ্রাম করে সিলভি। এ-ছাড়া কোন উপায়ও ছিল না। ধর্ষণ করার পর যখন মেক্সিকান মেয়েটাকে খুন করল শ্যানন, তখন নাক-মুখ কুঁচকে আপত্তির চোখে ওকে দেখেছে সিলভি। যে-কোন সময়ে প্রতিবাদ করে উঠত।
ক্লার্ক ও রোযিকে বিমানের কাছে দেখে সিলভির ক্যামেরা বসাবার দক্ষতার প্রশংসা মনে মনে না করে পারছে না স্টিল। ব্যবহার করা হয়েছে সুপার ব্রাইট লেন্স ও নাইট-ভিশন সফটওয়্যার। সেজন্যে রাতের আঁধারেও দেখা যাচ্ছে কালো দু’জন মানুষের লড়াই। অবশ্য ডার্টি গেমের প্রতিযোগীরা নিজেদের ভেতরে লড়াই না করলে কোন কাজে আসবে না দামি টেকনোলজি।
মেক্সিকান মেয়েটাকে শ্যানন খুন করার পর বিকেলে মন্থর হয়ে গেছে শো। মারা পড়েনি আর কেউ। আগ্রহ তৈরি হবে এমন কোন ঘটনাও ঘটেনি। তবে ইংরেজ সাইকোর গুণে এখনও ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি দর্শকেরা। স্টিল এখন আশা করছে, নতুন করে শো-টা আবারও জমিয়ে দেবে ক্লার্ক ও ইয়াসিমান।
‘এবার বোধহয় কিছু ঘটবে,’ ক্লার্কের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল স্টিল। ‘সুন্দরী মেয়েটাকে খুন করলেই ভাল।’
.
ধস্তাধস্তি করে উঠে বসতে চাইছে ইয়াসিমান, তবে ক্লার্কের গায়ের জোর তার চেয়ে অনেক বেশি। মেয়েটা জানে, নাৎসির কাছ থেকে বেঁচে গেছে স্রেফ ভাগ্যের জোরে। আর এবার প্রাণে বাঁচতে হলে অলৌকিক কিছু ঘটতে হবে।
‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, তোমার ভয়ের কিছু নেই,’ লোকটাকে নরম সুরে বলতে শুনল ইয়াসিমান। ‘আমি তোমাকে খুন করব না।’
বুক থেকে চাপ কমে যেতেই বড় করে শ্বাস নিল মেয়েটা। এখনও ওকে মাটিতে ঠেসে ধরে রেখেছে ক্লার্ক।
‘আমি খুব ভয় পেয়েছি,’ কাঁপা গলায় বলল রোযি।
‘তোমার কোন ক্ষতি করব না। আমি শুধু চাই গোড়ালির এই বোমা খুলে ফেলতে।
‘আমাকে খুন করে ফেললে কি ওটা খুলে যাবে,’ ভয়ে ভয়ে বলল ইয়াসিমান।
দীর্ঘ দশ সেকেণ্ড ভেবে বলল ক্লার্ক, ‘তা নয়।’ মেয়েটাকে খুন করবে কি না ভাবতে গিয়ে সময় নিচ্ছে সে। একজন প্রতিযোগী কমে গেলে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর শেষমেশ যে মেয়েটা মরবে, সে-ও সত্যি। অন্যরা বেঁচে থাকলে কোনভাবেই প্রথম হতে পারবে না ক্লার্ক। আগেও দু’জন ড্রাগ ডিলারকে খুন করেছে সে। তবে কখনও কোন মেয়েকে হত্যা করেনি। অবশ্য পুরুষের চেয়ে মেয়েরা কম হিংস্র হলেও এমন নয় যে তারা কম ক্ষতিকর। ওর বোধহয় উচিত ঝুঁকি না নিয়ে এই সুন্দরীকে খতম করে দেয়া।
এই মেয়ে রীতিমত মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত রূপসী হলেও খুনই করত ক্লার্ক, কিন্তু মনের ভেতরে বাধা হয়ে দাঁড়াল ওর মা। ওকে এখন দেখলে মা কী বলত-আত্মরক্ষা করার জন্যে পুরুষদের খুন করলেও দুর্বল ও অসহায় এক মেয়েকে কীভাবে তুই খুন করলি, ক্লার্ক?
এমনিতেই জীবনে নানান ধরনের পাপ করেছে সে।
আজ এই মেয়েকে অন্য কেউ শেষ করে দিলে সেই দায় এসে পড়বে না ওর ঘাড়ে।
সুতরাং অন্যের হাতেই মরুক মেয়েটা!
আবারও রোযির দিকে তাকাল ক্লার্ক।
মেয়েটার চোখদুটো মায়া হরিণীর মত। নাক বাঁশির মত খাড়া। কমলার টসটসে কোয়ার মত নিখুঁত ঠোঁট। চিবুক খুব সুন্দর।
‘হায়, যিশু, এত সুন্দরী মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি!’ মনে মনে বলল ক্লার্ক। আরও বড় কথা, কী যেন গোপনে ঘটে যাচ্ছে ওদের দু’জনের ভেতরে।
এটাই কি তা হলে মানব-মানবীর সত্যিকারের ভালবাসা?
এখন আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে না রোযি। শুয়ে আছে শরীর শিথিল করে। দেখছে ক্লার্কের চোখ। সুরেলা গলায় বলল সে, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।’
‘এর আগে যে মেয়েকে বিশ্বাস করেছি, তার জন্যে আদালত থেকে আমার ফাঁসির রায় হয়েছিল,’ ভুরু কুঁচকে বলল ক্লার্ক।
একফোঁটা মিথ্যা কথা বলেনি। মালোয়েশিয়ায় প্রতিযোগী এক ড্রাগ ডিলারকে খুন করে সেটা বলে ফেলেছিল গার্লফ্রেণ্ডের কাছে। একটা স্ট্রিপ ক্লাবে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ওর। পরে জানা গেল ক্লার্কের ব্যবসা আরও বড় হচ্ছে দেখে অন্য দলের ডিলার টাকার বিনিময়ে ওর সঙ্গে ভিড়িয়ে দিয়েছিল মেয়েটাকে। প্রেমের দুর্দান্ত অভিনয় করত বেটি। বোকার মত কুত্তীটার প্রতিটা কথা বিশ্বাস করে বসেছিল ক্লার্ক। এরপর আর কখনও একই ভুল করবে না। সবসময় খুলে রাখবে চোখ।
অপরূপ সুন্দরী রোযির দিকে সতর্ক চোখে চেয়ে আছে ক্লার্ক। হালকা শরীরটা থেকে সরে যেতেই উঠে বসল রোযি ইয়াসিমান।
.
‘হায় হায়, মেয়েটাকে তো দেখি ছেড়ে দিচ্ছে!’ আপত্তির দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে সিওয়ার্স।
বারকয়েক মাথা নাড়ল এমিলি। ‘আমাদের কপাল বোধহয় আসলেই মন্দ।’
রাগে গরম হয়ে উঠেছে স্টিলের মাথা। ‘কী হলো, কালো কুত্তাগুলোর সমস্যাটা আসলে কী? ওরা কি দ্বীপটাকে ফ্রেণ্ডশিপ রিসোর্ট বলে ভাবতে শুরু করেছে? এদের কি বাঁচার কোন আগ্রহ নেই?’
বস্ খেপে গেছে সেটা বুঝতে পেরেছে সিওয়ার্স। যে- কোন সময়ে বাজে গালি বেরোবে স্টিলের মুখ থেকে। আগেও মেজাজ খাট্টা হওয়ায় ঘাড় ধরে দলের এক লোককে তাঁবু থেকে বের করে দিয়েছিল। দেরি করেনি চাকরি নট করতে। আপাতত স্টিলের গুড বুকে সিওয়ার্স থাকলেও পাঁচ মিনিট পর সেটা না-ও থাকতে পারে। সাবস্ক্রিপশন পেজ বের করে ভাল সংবাদ দিতে পারে কি না, সেটা দেখল সে।
এরই ভেতরে দিন হয়ে গেছে দুনিয়ার নানান জায়গায়। আর তার মানেই বাড়ছে অনলাইনের গ্রাহক।
‘এত ভাববেন না, বস্। এরই ভেতরে শো দেখার জন্যে টাকা দিয়ে লগ ইন করেছে বিশ মিলিয়ন ভিউয়ার।’
তথ্যটা একটু শান্ত করল স্টিলকে। শুকনো গলায় বলল সে, ‘এখন পর্যন্ত মাত্র অর্ধেক লোক আমাদের শো দেখছে। আমার আরও অনেক দর্শক চাই।’ স্ক্রিনে চেয়ে ভাবল, একঘণ্টার ভেতরে কেউ খুন না হলে ডার্টি গেম বাঁচাতে কারও না কারও জান নিতে হবে।
উনিশ
রুপার্ট শ্যানন আর কাইতো তানাকা যেন পিছু নিতে না পারে, সেজন্যে আলেক্যান্দ্রো আলকারাযকে নিয়ে পর পর দু’বার অগভীর এক নদী পার হয়েছে মাসুদ রানা। একটা গাছের ডাল ভেঙে যুবকের হাতে দিয়েছে, যাতে লাঠি হিসেবে ওটা ব্যবহার করে হাঁটতে পারে সে। আহত সৈনিকের মত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলেছে মেক্সিকান লোকটা। রানা জানে, পিছু নিয়েছে ব্রিটিশ প্রাক্তন মেজর ও জাপানি খুনি। দ্রুত হেঁটে আসছে তারা। তাদের কাছ থেকে বাঁচাতে হলে ‘গোপন কোন নিরাপদ জায়গায় আলকারাযকে রেখে যেতে হবে। তারপর আবার রওনা হতে হবে ওয়েদার টাওয়ারের দিকে। তখন ইচ্ছে করে রেখে যাবে নিজের ট্র্যাক। সেক্ষেত্রে হয়তো দুই নৃশংস খুনির কবল থেকে প্রাণে বেঁচে যাবে আলকারায। মেক্সিকান লোকটা যে শেষমেশ মারা পড়বে, মনে কোন সন্দেহ নেই রানার। ভাবছে, ইংরেজ পিশাচ ও তার নরপশু সঙ্গীর হাতে প্রচণ্ড নির্যাতনে খুন হওয়ার চেয়ে বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু আলকারাযের জন্যে ঢের আনন্দের।
ওরা এখন কোথায় আছে সেটা জানে না, শ্যানন ও তানাকা। আলকারাযকে নিয়ে ছোট এক টিলায় উঠল রানা। ওপর থেকে তাকাল চারপাশে। মাত্র একমাইল দূরে বড় এক গিরিখাদের ওদিকে দেখতে পেল ওয়েদার টাওয়ার। চাঁদের রুপালি স্নিগ্ধ আলোয় চকচক করছে ওটার টিনের ছাত। এত কাছে পৌঁছে গেছে বুঝতে পেরে মনে স্বস্তি বোধ করল রানা। কিন্তু ঠিক তখনই মনে পড়ল জরুরি একটা বিষয়। কালো মেঘে ছেয়ে গেল ওর অন্তর। যেটা নিয়ে ভাবছে, ওটার জন্যে হয়তো বানচাল হয়ে যাবে ওর প্ল্যান। গোড়ালির ব্রেসলেটের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল রানা। আগেই ওটার কথা ওর ভাবা উচিত ছিল।
ডিভাইসটার সঙ্গে আছে জিপিএস। শত্রুপক্ষ জানে দ্বীপের কোথায় আছে ও। রাত বা দিনে যেখানেই থাকুক, তারা জেনে নিতে পারবে কোনদিকে চলেছে ও। সুতরাং নিজের পরিকল্পনা মত কাজ করতে হলে আগে বিকল করতে হবে জিপিএস। এর আগে লুকিয়ে থাকার মত জায়গা খুঁজে বের করতে হবে আলকারাযের জন্যে।
অন্ধকারে চারপাশে তাকাল রানা। উঁচু-নিচু টপোগ্রাফি ছাড়া তেমন কিছুই বুঝতে পারল না। বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে ঘন জঙ্গল। ওখানে রয়ে গেলে আগে হোক বা পরে ওদেরকে খুঁজে বের করবে শ্যানন ও তানাকা।
গিরিখাদের দিকে চেয়ে রইল রানা। দূরে ঝোপঝাড়ের ভেতরে দেখতে পেল পুরনো এক কাঠের সেতু। ওর মনে হলো সরু সেতু দিয়ে যেতে পারবে কোন জিপ। গিরিখাদ একবার পেরোলে ওদিকে অপেক্ষাকৃত ঘন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়তে পারবে আলকারায।
মেক্সিকান ডাকাতকে সঙ্গে নিয়ে টিলা থেকে নেমে সেতুর দিকে চলল রানা। চেষ্টা করছে ট্র্যাক আড়াল করে এগোতে। সেতুর কাছে গিয়ে দেখতে পেল, মর্টারের শেল মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে ওটার মাঝের অংশ। ওদিকের স্ট্রাকচার ও এদিকের অংশের মাঝে ঝুলছে জং-ভরা কিছু সাপোর্ট কেব্ল্। যদিও ওগুলো বেয়ে ওদিকের তীরে আলকারাযকে নেয়া যাবে না।
সতর্ক চোখে চারদিকে আবারও তাকাল রানা। ভাবছে, এখানে কেন তৈরি করা হয়েছে এই সেতু? নিশ্চয়ই কাছে ছিল কোন সামরিক স্থাপনা। আর ওটা দখল করতে সেতুর ওপরে বোমা ফেলেছে মিত্রপক্ষ।
আরও পঞ্চাশ গজ যাওয়ার পর রানা দেখতে পেল, জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহের এক ডকের কাছে কংক্রিটের দালান। ওটার পেছন অংশ গিরিখাদের দিকে। ডকের কাছে উঁচু করে রাখা আছে কাঠের অসংখ্য ক্রেট। জায়গাটা আলকারাযকে লুকিয়ে রাখার জন্যে উপযুক্ত বলে মনে হলো ওর। হয়তো দালানের ভেতরে এখনও রয়ে গেছে কোন অস্ত্র।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে কমাণ্ড পোস্টের কাছে চলে গেল রানা। আলকারাযকে সাহায্য করল লোডিং ডকের পাশে বসতে। ঢোলের মত ফুলে গেছে যুবকের ভাঙা হাঁটু। বোধহয় সহ্য করছে প্রচণ্ড ব্যথা।
‘ভাঙা হাঁটুর কী অবস্থা?’ জানতে চাইল রানা।
‘হাঁটতে পারছি না, লড়তেও পারব না,’ মুখ বিকৃত করে বলল আলকারায। চোখ তুলে তাকাল রানার চোখে। ‘লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আমার হয়ে ওদেরকে খুন কোরো তুমি। এটা আমার একান্ত অনুরোধ।’
স্ত্রী-হত্যার প্রতিশোধ নেবে ভাবছে যুবক। তবে তাকে কোন ধরনের প্রতিশ্রুতি বা সান্ত্বনা দিল না রানা। শ্যানন ও তানাকাকে খুন করতে গিয়ে সময় নষ্ট করা ওর উদ্দেশ্য নয়। যেভাবে ‘হোক ওয়েদার টাওয়ারে গিয়ে যোগাযোগ করতে হবে বিসিআই-এ। ‘আপাতত তোমার অনুরোধ রাখতে পারছি না,’ আলকারাযকে বলল রানা, ‘আরও জরুরি একটা কাজ আমাকে করতে হবে।’
‘সেটা কী?’
‘দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে ওয়েদার টাওয়ার দেখেছি। ওখানে রেডিয়ো থাকার কথা। ওটা ব্যবহার করব।’
ক্ষণিকের জন্যে উজ্জ্বল হলো আলকারাযের মুখ। ‘তুমি রেডিয়োর মাধ্যমে কারও কাছে সাহায্য চাইবে?’ বুঝে গেছে যে বেঁচে থাকার আরেকটা কারণ তৈরি করেছে বাঙালি যুবক।
‘অন্তত চেষ্টা তো করবই,’ বলল রানা।
মাথা দোলাল আলকারায। ইসাবেলাকে ছাড়া অর্থহীন হয়ে গেছে তার জীবন, তাই কখনও সুযোগ পেলে শ্যাননকে নিজের হাতে হত্যা করবে সে।
‘কাকে রেডিয়ো করবে তুমি?’
চুপ করে থাকল রানা।
‘তোমার বউ আছে? তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে?’
আলকারাযের দিকে তাকাল রানা। একটু আগে নিজের চোখে যুবক দেখেছে তার স্ত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে এক নরপশু। নরম সুরে বলল রানা, ‘আমার আত্মীয় বলতে আর কেউ নেই। তবে কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে। আমার কিছু হলে খুঁজে বের করে ব্র্যাড স্টিলকে খুন করবে ওরা। এখন যদি সম্ভব হয়, তা হলে আমার বসের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’
‘তোমার কপাল ভাল, জীবনে বিশ্বাস করার মত কিছু বন্ধু পেয়েছ,’ দূরে তাকাল আলকারায, ‘আমার তো আর কেউই রইল না। ডাকাতির দায়ে খুঁজছে পুলিশ, এমন সময় আকাপুলকোর এক পতিতালয়ে পরিচয় হয়েছিল ইসাবেলার সঙ্গে। নিজের অসুস্থ মা আর ছোট বোনের জন্যে দেহ দান করতে বাধ্য হতো ও। ওখান থেকে ওকে সরিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিলাম। কয়েক মাস পর ওকে বললাম, তুমি যদি রিভলভার চালাতে পারো, তো দু’জন মিলে আমরা অনেক টাকার মালিক হতে পারব। খুব দ্রুত সব শিখে নিল ও।’
নিজের মনে ডুব দিল আলকারায। একটু পর ঠোঁটে ফুটে উঠল তিক্ত এক চিলতে হাসি। ‘একের পর এক ডাকাতি করেছি আমরা। কিন্তু ইসাবেলা যখন আর দুনিয়ায় নেই, তাই আমি আসলেই জানি না এরপর কী করব।’
.
অন্ধকারে লোডিং ডকের পাশে এক ভিডিয়ো ক্যামেরা আছে, যেটা দেখতে পায়নি রানা ও আলকারায।
বিশাল তাঁবুর মস্ত এলইডি স্ক্রিনে ওদেরকে দেখছে ব্র্যাড স্টিল। কুঁচকে গেছে তার ভুরু। চট্ করে বদলে গেল দৃশ্যটা। এখন দেখা যাচ্ছে শ্যানন ও তানাকাকে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত জঙ্গলে হেঁটে চলেছে তারা।
স্ক্রিনে এল তৃতীয় দৃশ্য। পরস্পরের হাত ধরে বিধ্বস্ত বি- ২৫ বিমানের দিকে চলেছে ক্লার্ক ও ইয়াসিমান।
সত্যি কথা বলতে শো-তে নতুন আর কিছুই ঘটছে না।
বাইরে থেকে ঘুরে এসে আবার কন্সোলে বসেছে সিলভি। আগের চেয়ে সুস্থ। ভাবছে, কপাল ভাল যে কারও হাতে খুন হতে হচ্ছে না কাউকে। ‘আসলে এই দ্বীপে ঘটছেটা কী?’ আনমনে বলল সে।
‘কিছুই ঘটছে না,’ বলল সিওয়ার্স। ‘লড়ছে না কেউ।’
‘বাজে অবস্থা,’ বলল বিরক্ত স্টিল। ‘সিওয়ার্স, দেখো তো এরা পরস্পরের কতটা কাছে?’
সিওয়ার্স দেখল গ্রিড ম্যাপ। ওটার ভেতরে আছে + চিহ্ন দেয়া সবার অবস্থান।
‘এইমাত্র ভাঙা বিমানে গিয়ে ঢুকেছে ক্লার্ক আর কেলে সুন্দরী। এদিকে জাপানি ধ্বংসস্তূপের কাছে রানা আর আলকারায।’
‘সেটা তো দেখতে পেয়েছি,’ প্রায় খেঁকিয়ে উঠল স্টিল। ‘কিন্তু শ্যানন আর তার সঙ্গী এখন কোথায়? ওদের কাছ থেকে কতটা দূরে অন্যরা?’
উত্তেজনা তৈরি করার জন্যে ইংরেজ সাইকোর ওপরে নির্ভর করছে স্টিল। খুনি লোকটা বোঝে কীভাবে ক্যামেরা নিজের দিকে টেনে নিতে হয়। সে সাধারণ কোন খুনি নয়, সত্যিকারের এক পাকা অভিনেতা।
রানা ও আলকারাযের কাছ থেকে সামান্য দূরে এক জোড়া + চিহ্ন ব্র্যাডকে দেখাল সিওয়ার্স। ‘এই যে ওরা। রানা আর আলকারায থেকে সামান্য পুবে।’
পঞ্চম কফির মগ খালি করেছে সিকিউরিটি চিফ সিম্পসন। তার সামনে গিয়ে থামল স্টিল। মনস্থির করেছে, এবার নতুন করে প্রতিযোগীদের ভেতরে বাধিয়ে দেবে লড়াই।
‘আমাদের তরফ থেকে শ্যাননের কাছে আরেকটা ক্রিসমাস ব্যাগ পৌঁছে দাও,’ নিচু গলায় বললেও ব্র্যাডের কথা শুনতে পেল সিলভি। ‘দরকারি সব মালপত্র পৌঁছে দেবে, যাতে জাপানি ধ্বংসস্তূপে গিয়ে হামলা করতে কোন ধরনের অসুবিধে না হয় ওদের।’
বিশ
সিকিউরিটি চিফ রিভ সিম্পসনের দেয়া কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী উপত্যকার বড় গাছগুলোর মাথা ছুঁয়ে দ্বীপের অভ্যন্তর লক্ষ্য করে উড়ে চলেছে হেলিকপ্টার। ওটার গন্তব্য জঙ্গলের মাঝে ছোট এক ফাঁকা ময়দান। রানা ও আলকারা বা শ্যানন ও তানাকার মাঝে পড়বে জায়গাটা।
এখন রানা ও আলকারাযকে অনুসরণ করছে শ্যানন ও তানাকা। যে গিরিখাদে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছে ইসাবেলাকে, এরই ভেতরে জায়গাটা অনেক পেছনে ফেলে এসেছে তারা। আর সামনে যারা রয়ে গেছে, কে যেন খুব দক্ষতার সঙ্গে মুছে দিচ্ছে তাদের পদচিহ্ন। শ্যানন বুঝে গেছে, চিহ্ন গোপনকারী লোকটা অবশ্যই বাংলাদেশ আর্মি আর ব্রিটেনের এসএএস ফোর্স থেকে ট্ৰেইণ্ড কমাণ্ডো মাসুদ রানা।
নিজের কাজ খুব ভালভাবে বোঝে সে। তবে যতই দক্ষ হোক, কোন না কোন সীমাবদ্ধতা থাকে যে-কোন মানুষের। ল্যাংড়া হাঁসের মত বাতিল এক লোককে সঙ্গে রেখে মস্তবড় ভুল করে বসেছে রানা। কেন যে মেক্সিকান ডাকাতকে সাহায্য করছে সে, সেটা মাথায় ঢুকছে না শ্যাননের। তার হাতে আছে তুরুপের টেক্কা, কাজেই বেশি কিছু ভাবতেও চাইছে না সে।
হেলিকপ্টারের ধুপ-ধুপ আওয়াজ শুনে মুখ তুলে আকাশে তাকাল শ্যানন ও তানাকা। এক কিলোমিটার সামনে আকাশে জ্বলে উঠে নামতে শুরু করেছে লালচে এক আলো।
‘আমাদের স্যান্টা ক্ল্য দেখি আবারও ব্যাগ ভরা উপহার দেবে!’ দুই কানে চলে গেল শ্যাননের হাসি।
দৌড়ে এক কিলোমিটার জঙ্গল পার করে মাঠের মত এক জায়গায় পৌঁছে গেল তারা। ঝিরঝির আওয়াজে পুড়ছে ফ্লেয়ার। আশপাশে কেউ থাকলে আলো দেখতে পাবে, তাতে হতে পারে বড় ধরনের বিপদ। তাড়াহুড়ো করে আগুন নিভিয়ে দিল শ্যানন। ব্যাগ সংগ্রহ করে সরে গেল মাঠের একপাশে। ওদের জন্যে হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হয়েছে ভারী এক কালো ডাফেল ব্যাগ। ওটার চেইন খুলে হাতড়াতে লাগল শ্যানন। ভেতরে দেয়া হয়েছে দরকারি অনেক কিছুই।
‘শালারা তো দেখি ক্রিসমাসের উপহার পাঠিয়ে দিয়েছে, ‘ খুশিমনে বলল শ্যানন। ‘স্যাণ্ডউইচ, আপেল, পানি, ছোরা… আবার দামি চুরুট!’ তানাকার পিঠে চাপড় দিল সে। ‘দোস্ত, আমরা তো দেখি পেয়ে গেছি জ্যাক পট!’
শুধু যে তামাক আর খাবার দেয়া হয়েছে, তা নয়, ব্যাগে আছে কমপাস, পেশাদারী ধনুক ও তৃণ ভরা তীর। এ-ছাড়া আছে তিন ফুটি ম্যাচেটি, কয়েক ক্যান ভরা অকটেন, দুটো ম্যাচের বাক্স ও অন্যান্য কিছু জিনিস।
তারা স্বর্গে পৌঁছে গেছে বলে ভাবছে শ্যানন ও তানাকা ব্যাগ হাতড়ে দ্বীপের ম্যাপ পেয়ে ওটা নিল শ্যানন। ‘আমরা এখানে আছি,’ একটা বৃত্ত দেখাল সে। একটু দূরে জাপানি এক কমাণ্ড পোস্টের ভেতরে আছে দুটো লাল চিহ্ন। নির্বোধ না হলে যে-কেউ বুঝবে, শ্যানন ও তানাকার জন্যে ওখানে অপেক্ষা করছে দুটো অসহায় শিকার।
টপটপ করে তিনটে পানির ফোঁটা পড়ল ম্যাপের ওপরে। তখনই গুডগুড করে উঠল আকাশ। ম্যাপ গুটিয়ে ব্যাগের ভেতরে রেখে দিল শ্যানন। মুখ তুলে তাকাল ওপরের দিকে। কালো মেঘে ভরে গেছে আকাশ। ব্যাগ থেকে ধনুক ও তীর ভরা তূণ নিল সে। ফাইবারগ্লাস, অ্যালিউমিনিয়াম ও কাঠের তৈরি ধনুক প্রস্তুত করা হয়েছে আমেরিকান আর্মির জন্যে। মাইক্রোপুলি সিস্টেমের কল্যাণে বহু দূরে যাবে গ্রাফাইট তীর। এক কথায় সাধারণ তীরন্দাজের জন্যে নয়, অস্ত্রটা তৈরি করা হয়েছে মানব-হত্যার জন্যে।
দুটো বোলো নাইফ নিয়ে খেলতে শুরু করেছে তানাকা। ছোরাগুলোর হাতল ক্যারিব্যুর শিং দিয়ে তৈরি। ফলা আঠারো ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের। জিনিসদুটো এসেছে সরাসরি ফিলিপিন্স থেকে। এই ধরনের ছোরা ব্যবহার করে খতম করা হয় শুয়োর, মুরগি ও গরু। অবশ্য এবার ওগুলো কাজে লাগবে মানুষ হত্যায়।
‘বাছা, তুমি তৈরি হও,’ তানাকাকে চোখ টিপে বলল শ্যানন, ‘আমাদেরকে এবার দারুণ একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে।’
জবাবে কুং-ফুর স্টাইলে ঝোড়ো বেগে দু’হাত ঘোরাল তানাকা। বুঝিয়ে দিল, আক্রমণ করার জন্যে সে তৈরি।
‘তো রেডি?’ হাসল শ্যানন। হাতে অস্ত্র পেয়ে নিজেও বেশ উত্তেজিত হয়ে গেছে। এবার রানা আর আলকারাযকে একহাত নেবে সে। তাদেরকে বন্দি করে নির্যাতন করার পর জবাই করবে হাসতে হাসতে।
জাপানি স্থাপনার দিকে রওনা হওয়ার আগেই ঝমঝম করে নামল তুমুল বৃষ্টি। তারই ভেতর দিয়ে হনহন করে এগিয়ে চলল তারা। আশা করছে বিশ মিনিটে পৌঁছে যাবে টার্গেট এরিয়ায়। রানা আর আলকারায জানেও না, কী ধরনের ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ে গেছে ওরা।
.
হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে রানা। তবে জঙ্গলের গভীরে কমাণ্ড পোস্টে আছে বলে দেখতে পায়নি ফ্লেয়ারের লাল আলো। তা ছাড়া, হেলিকপ্টার থেকে ব্যাগ ফেলা হয়েছে ছোট এক টিলার ওদিকে। রানার কাছে মনে হয়েছে, এবার হয়তো আশপাশে পড়বে খাবারের কোন ব্যাগ। তবে সেটা সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় নষ্ট করার কোন উপায় নেই ওর। প্ল্যান অনুযায়ী আগে শেষ করতে হবে হাতের কাজ। একবার জিপিএস অফ করতে পারলে রওনা হবে ওয়েদার টাওয়ার লক্ষ্য করে।
প্রথমবার বাঙ্কার সার্চ করতে গিয়ে রানা জেনে গেছে, পেছনে পাহাড়ি এলাকা। নিরেট পাথর কেটে একদিকে তৈরি করা হয়েছে একফুটি ভিউয়িং স্লিট। ওটার ভেতর থেকে নাক বের করে সামনের দিকে তাক করা আছে জঙে ভরা টাইপ ৯১ টেন-সেন্টিমিটারের হাওয়াইট্যার। বিশাল অস্ত্রটা অবশ্য ওদের কোন কাজে আসবে না।
অন্ধকার বাঙ্কারে আবারও ঢুকে ভেতরের দিক হাতের ছোঁয়ায় বুঝতে চাইল রানা। মেঝের একদিকে অব্যবহৃত কিছু আর্টিলারি শেল। এখন না লাগলেও পরে হয়তো কোন কাজে ওগুলো লাগবে।
বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে লোডিং ডকের কাছে ফিরল রানা। আগের জায়গা থেকে সরে গেছে আলকারায।
‘ভেতরে খাওয়ার মত কিছু আছে?’ জানতে চাইল সে। আকাশ-পাতাল বৃষ্টি শুরু হতেই হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছে কমাণ্ড পোস্টে।
তার কথার জবাব না দিয়ে অক্ষশক্তি ও মিত্র শক্তির ফেলে যাওয়া নানান জিনিস ঘেঁটে দেখছে রানা। ফুটো হয়ে গেছে টিনের ছাত। বেশ কয়েকটি ধারায় নিচে ঝরছে বৃষ্টির পানি। ঘরের ভেতরে তেমন কিছু নেই যা কাজে আসবে। অস্ত্র নেই, অ্যামিউনিশন নেই, খাবারও নেই। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় পচে গেছে সবই।
আরও কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে কাজে লাগবে এমন মাত্র একটা জিনিসই খুঁজে পেল রানা। ওটা আছে জাপানি পুরনো এক ধুলোভরা রেডিয়োর পাশে। জিনিসটা ১৯৪৩ সালের সার্কা লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি।
রানা আগেই দেখতে পেয়েছে লোডিং ডকের পাশে আধুনিক কিছু লেন্স। কমাণ্ড পোস্টে বোধহয় কোন ক্যামেরা নেই। তবে খুব সতর্কতার সঙ্গে চোখ বোলাবার পর রানা বুঝে গেল, অফিসের কোণে আছে আরেকটা ভিডিয়ো ক্যামেরা। ভুলবশত ধাক্কা দিয়েছে এমন ভঙ্গি করে লেন্সের সামনে ক’টা ক্রেট ঠেলে ফেলল রানা। ব্র্যাড স্টিলের লোকেরা ধরে নেবে ওর বোকামির কারণে ব্লক হয়ে গেছে তাদের লেন্স।
এখন কেউ দেখবে না ওকে, সেটা বুঝে ঘরের কোনার কংক্রিটের দেয়ালে বাড়ি মেরে ব্যাটারিটা ভাঙল রানা। নিজের গোড়ালির ব্রেসলেট দেখিয়ে আলকারাযকে বলল, ‘ডিভাইসে জিপিএস আছে। ওটা বন্ধ হলে আমাকে আর ট্র্যাক করতে পারবে না।’
জাপানি ব্যাটারিতে আছে সীসার সরু কিছু নমনীয় পাত। ওখান থেকে দুটো নিয়ে ইলেকট্রনিক জিপিএস ইউনিটের সামনে ও পেছনে আটকে নিল রানা। এবার ভুল না হলে সীসার পাতের জন্যে রিসিভারে তথ্য পাঠাতে পারবে না জিপিএস ডিভাইস। যদিও নিশ্চয়তা নেই যে এতে কাজ হবে, তবুও ঝুঁকি না নিয়ে কোন উপায়ও তো নেই রানার।
এবার ছাত থেকে ঝরঝর করে নেমে আসা বৃষ্টির পানির ধারার নিচে বড় একটা কাঠের গামলা রাখল রানা। একটু পর পানিতে ভরে যাবে ওটা। ‘তোমার জন্যে পানি,’ আলকারাযকে বলল ও। ‘এটা নাও।’ ধুলোভরা এক তাকে পাওয়া জং-ধরা ছোরা তার হাতে তুলে দিল রানা। অস্ত্র হিসেবে হয়তো ওটা কিছুই নয়, তবে মানসিক স্বস্তি পাবে আলকারায। রানা আশা করছে, এতক্ষণে বৃষ্টির পানিতে মুছে গেছে ওদের পায়ের ছাপ। সেক্ষেত্রে এখানে হয়তো আসবে না শ্যানন আর তানাকা। আর সেক্ষেত্রে ছোরা হাতে লোকগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে হবে না আহত যুবকের।
কমাণ্ড পোস্ট থেকে বেরোবার আগে তার দিকে তাকাল রানা। ভাল থেকো বলতে গিয়েও চুপ রয়ে গেল। আপাতত কপাল ভাল থাকলেও একসময় মরতেই হবে আলকারাযের। গোড়ালির টাইম বোমার জন্যে প্রতি সেকেণ্ডে কমছে ওদের সবার বাঁচার সময়। একবার আলকারাযের দিকে চেয়ে ঘর থেকে বেরোবে রানা, এমন সময় পেছন থেকে বলল মেক্সিকান দস্যু, ‘অনেক ধন্যবাদ, বন্ধু। তুমি ভাল থেকো।’
অন্য কারও জন্যে যা করত, আলকারাযের জন্যেও তার চেয়ে বেশি কিছু করেনি রানা। মৃদু মাথা দুলিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল ও। আগের চেয়ে জোরে পড়ছে বৃষ্টি। কমাণ্ড পোস্ট থেকে সরে সেতুর দিকে চলল রানা। ওর জানা নেই, শ্যানন ও তানাকার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে আধুনিক একটি ম্যাপ। ওটাতে চিহ্ন বসিয়ে জানিয়ে দিয়েছে ঠিক কোথায় তারা পাবে অপ্রস্তুত দুই শিকারকে।
তীব্র ব্যথা সহ্য করে মেঝেতে চুপচাপ পড়ে আছে আলকারায। ওর জানা নেই, মাত্র পঁচিশ মিনিট পর ওকে মুঠোর ভেতরে পাবে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর দুই খুনি।
.
রানা যখন চুরমার করছে জাপানি পুরনো ব্যাটারি, একই সময়ে দর্শক-সংখ্যা ও ব্লগ দেখার কাজে ব্যস্ত ছিল সিওয়ার্স। এদিকে দর্শকেরা যাতে বিরক্ত হয়ে লগ আউট না করে, সেজন্যে নির্ঘুম চোখে সংক্ষিপ্ত এক রিলের হাইলাইট মেইন স্ক্রিনে দিয়েছে এমিলি। বিশাল তাঁবুর ভেতরে স্টিল, সিওয়ার্স আর সে আশা করছে, একটু পর খুনোখুনির উত্তেজনাপূর্ণ আবহ তৈরি করবে শ্যানন ও তানাকা। বিরক্ত হয়ে কপালের দোষ দিচ্ছে সিলভারম্যান।
ব্লগ চেক করার পর শ্যানন কতটা এগোল সেটা দেখার জন্যে আবারও গ্রিড ম্যাপের দিকে তাকাল সিওয়ার্স। সবুজ দুটো + সাইন ধীরে ধীরে চলেছে আরও দুটো + সাইনের দিকে। কিন্তু জাপানি ধ্বংসস্তূপে হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেল সবুজ একটা + চিহ্ন।
‘সর্বনাশ!’ বিড়বিড় করল সিওয়ার্স। ‘মিস্টার স্টিল! কী করে যেন উবে গেছে মাসুদ রানা! ব্যাটা বোমা ফেটে মরল নাকি!’
মেইন স্ক্রিনে শো-র সেরা অভিনেতা শ্যাননের ক্লোযআপ ছবি দেখছে স্টিল। পিঠে কালো ডাফেল ব্যাগ ঝুলিয়ে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে ইংরেজ লোকটা, হাতে ধনুক। বোলো ছোরা হাতে তার পেছনে পেছনে আসছে তানাকা।
‘কী বললে, সিওয়ার্স? অদৃশ্য হয়ে গেছে?
‘হঠাৎ করেই নেই। আমার গ্রিডে তাকে আর পাচ্ছি না।’ ম্যাপের দিকে স্টিলের মনোযোগ আকর্ষণ করল সিওয়ার্স। ‘আর কোন সিগনাল দেখতে পাচ্ছি না।’
‘এটা কীভাবে সম্ভব? এই সময়ে এ-ধরনের টেকনিকাল ম্যালফাংশন হলে তো মহাবিপদ!’
‘নিশ্চয়ই তার ব্রেসলেটে বড় কোন সমস্যা হয়েছে,’ বলল সিওয়ার্স, ‘সফটওয়্যার তো ঠিক আছে।’
জিপিএস ইউনিটের দায়িত্ব সিওয়ার্সের নয়, কাজেই তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে লাভ হবে না, সেটা জানে স্টিল। তার সব রাগ গিয়ে পড়ল সিলভারম্যানের ওপরে। শ্যাননের কাছে ব্যাগ পৌঁছে দেয়ার পর মাত্র দুটো শব্দ উচ্চারণ করেছে সে।
‘সিলভি, লোকটাকে খুঁজে বের করো।’
মাথা দোলাল সিলভারম্যান। মন দিল অসংখ্য ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের দিকে। ভাবছে, নৃশংস এই শো ফেলে আবার যদি ফিরতে পারত অতীতে ফুটবলের দৃশ্য ধারণে! কিন্তু সেটা তো আর আপাতত সম্ভব নয়।
জাপানি কমাণ্ড পোস্টের ভেতরে কিছু ক্রেট পড়ে গেছে, ওগুলোর কারণে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে ক্যামেরার লেন্স। হয়তো এখনও বাঙ্কারের ভেতরেই আছে মাসুদ রানা। তবে সেটা আপাতত নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই।
নানান স্ক্রিনের ওপরে চোখ রেখে এক এক করে পেরিয়ে গেল কয়েক মিনিট, তারপর স্বস্তির শ্বাস ফেলল সিলভারম্যান। ‘ওকে পেয়েছি!’ স্টিলের জন্যে বড় স্ক্রিনে দৃশ্যটা দিল সে।
সেতুর কেব্ল্ দু’হাত ও দু’পায়ে আঁকড়ে ধরে গিরিখাদের ওপরে ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে চলেছে রানা।
চোখ কুঁচকে স্টিল বুঝতে চাইল বাঙালি লোকটা আসলে কী করতে চাইছে। ‘করে কী ব্যাটা?’
‘জানি না,’ বলল সিলভারম্যান।
‘ওর ওপরে চোখ রাখো।’
সেটা আবার বলতে, মনে মনে বলল সিলভারম্যান। শত শত ক্যামেরার ওপরে চোখ রাখছে সে। এটাই তার কাজ। স্টিল আবারও বেফাঁস কিছু বললে হয়তো তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বসবে সে। নাৎসি, রাশান ও মেক্সিকান মেয়েটার প্রতিটি দৃশ্য কে ক্যামেরায় ঠিকভাবে ধরেছে? আর এসব ভিডিয়ো করতে গিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে সিলভি। তার ধারণা, আগে কখনও এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখেনি বলে ওর মতই অসুস্থ হয়ে গেছে স্টিলের প্রেমিকা রিটা। মেয়েটার শুধু জোগান দেয়ার কথা অপরাধীদের উপযুক্ত পোশাক। রিটা যে স্টিলের মত অশুভ আর নিষ্ঠুর নয়, সেটা বুঝে গেছে সিলভি। গোটা ক্যাম্পে শুধু সে আর রিটা মাত্র দু’জন মানুষ, যারা এই শো-র নৈতিকতা নিয়ে ভাবছে।
.
ল্যাপটপে চোখ রেখে গিরিখাদের ওপরে কেবলে ঝুলতে ঝুলতে রানাকে এগোতে দেখছে স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্স। এরই ভেতরে বিসিআই থেকে রানার বিষয়ে কিছু ডেটা জোগান দিয়েছে রায়হান রশিদ। এখন বাঙালি এজেন্টের ব্যাপারে আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অফিস থেকে আরও তথ্য পাবে বলে অপেক্ষা করছে সিমন্স।
একটু পর তার কিউবিকলের দরজায় টোকা দিল কেউ। পরক্ষণে দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘরে ঢুকল জুনিয়র এজেন্ট স্টেলা। ‘এক্ষুণি আপনাকে নিজের অফিসে ডেকেছেন রাইডার।’
‘কী কারণে ডাকছে, সেটা জানো?’
‘বস্কে খুব নার্ভাস বলে মনে হলো।’
চেয়ার ছেড়ে কিউবিকল থেকে বেরিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের অফিসে গিয়ে ঢুকল সিমন্স। নিজের ডেস্কে বসে আছে রাইডার। তার পেছনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে নিউ হ্যাভেন আর কানেক্টিকাটের গ্রাম্য দৃশ্য।
‘আমাকে ডেকেছেন?’ দরজার কাছে থেমে বলল সিমন্স।
‘মাসুদ রানার ব্যাপারে সবধরনের তদন্ত বন্ধ করো।’
এক পা সামনে বাড়ল সিমন্স। ‘তদন্ত বন্ধ করে দেব?’ এবার ঘরের কোণে এক লোককে বসে থাকতে দেখল সে। তার পরনে দামি কালো সুট, পায়ে মুচির তৈরি চামড়ার জুতো। বয়স হবে কমপক্ষে পঁয়তাল্লিশ। কলপ করেছে মাথার চুল। সিমন্সকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল না রাইডার।
‘তোমার আর তদন্ত করতে হবে না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর।
রহস্যময় লোকটার দিকে চেয়ে নিচু গলায় বলল সিমন্স, ‘ওই দ্বীপে আটকা পড়েছে আমেরিকার একজন নাগরিক। আর আমাদের দেশের জন্যে মস্তবড় ঝুঁকি নিয়েছে মাসুদ রানা। আমরা চাইলেই তো তাদেরকে…’
‘সিমন্স… তোমার আর নতুন করে কোন তর্কের সুযোগ নেই।’
রবার্ট রাইডার ঘাবড়ে গেছে, সেটা টের পেল সিমন্স। লোকটা চাইছে অন্য কোন অফিসে যেন তাকে বদলি করে দেয়া না হয়।
‘মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আপনিই আমাকে বলেছেন, আমরা যেন ভালভাবে তদন্ত করি,’ বসের চোখে আপত্তি দেখেও বলল সিমন্স। ‘আমেরিকার নানান উপকার করেছে মাসুদ রানা। আর আপনি এখন আমাকে বলছেন তদন্ত বন্ধ করে দিতে?’
চেয়ার থেকে না উঠে পা বাড়িয়ে আধখোলা দরজা বন্ধ করল অতিথি। শুকনো গলায় বলল, ‘আপনি যখন তদন্ত শুরু করলেন, তখন থেকেই আমার অফিসের অনেকে বিব্রত বোধ করছে।’ ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী আমলাদের সুরে কথা বলেছে লোকটা।
‘তো আপনার অফিসটা যেন কোথায়?’ তোয়াক্কা না করে তেড়া সুরে জানতে চাইল সিমন্স।
খুকখুক করে কেশে নিয়ে লোকটার হয়ে জবাব দিল রাইডার, ‘ইনি কাজ করেন পেন্টাগনের ডিআইএ অফিসে। তাঁর নাম ডোমেনিক উসবার্টি। ডিআইএর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর।’
কথাগুলো শুনে তিক্ত হয়ে গেল সিমন্সের মন। ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির কথা কে না জানে! এই অফিসের মোটো: সর্বশক্তি দিয়ে দেশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।
সারাবছরে সিআইএ ও এফবিআই গোটা দুনিয়ায় গোপন যে অপারেশনগুলো চালায়, তার কয়েক গুণ মিশন পরিচালনা করে ডিআইএ। অত্যন্ত দক্ষ একদল অপারেটরকে দিয়ে টপ কোয়ালিটি টেকনোলজি ব্যবহার করে চালানো হয় সেসব অপারেশন। একদল তুখোড় মগজের ডিফেন্স প্ল্যানার দেশের প্রয়োজনে নিরাপত্তার জন্যে ধার নেয় হাইলি ট্রেইণ্ড মিলিটারি অপারেটিভদেরকে। তাদের কথার ওপর দিয়ে কিছু করতে গেলে চাকরি থাকে না কারও।
‘আপনার এই তদন্ত এখানেই শেষ,’ আবেগহীন সুরে বললেন ডোমেনিক উসবার্টি। ‘মাসুদ রানা সম্পর্কে সবই আমরা জানি। এবং জনি এস. ক্লার্কের মত অপরাধীকে নিয়েও আপনার কিছু ভাবার দরকার নেই। ‘
আমি বসের মত পদোন্নতির জন্যে লালায়িত নই, ভাবল সিমন্স। ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর দাবড়ি দিলেই তদন্ত বন্ধ করে দুই পায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে নেব না।
‘মাসুদ রানা কি আমাদের দেশের জন্যে এল সালভেদরে গিয়ে ড্রাগসের ফ্যাক্টরি ধ্বংস করে দেয়নি?’ বলল সিমন্স।
সর্বজ্ঞানী সাধুর মত মুচকি একটা হাসি দিলেন উসবার্টি। ‘হ্যাঁ, সেটা সে করেছে।’
‘তা হলে বিপদে আমরা তাকে সাহায্য করব না কেন?’
‘যথেষ্ট হয়েছে, সিমন্স!’ রাইডারের কপালে জমে গেছে বিন্দু-বিন্দু ঘাম।
‘না, বলুক না,’ দাদাগিরির ভঙ্গিতে বললেন উসবার্টি। ‘অনেক কিছুই জানে না স্পেশাল এজেন্ট সিমন্স। তার জানার অধিকার আছে। নানান ধরনের জ্ঞান পরবর্তী জীবনে কাজে আসবে। আপনি বলুন, সিমন্স।’
‘আপনাদের এজেন্সি চিফ নিজে মাসুদ রানাকে বিসিআই থেকে ধার নিয়েছেন,’ বলল সিমন্স। ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সকে বলা হয়েছিল, মাসুদ রানা এল সালভেদরে বন্দি হলে আমেরিকান সরকার থেকে যথাসাধ্য সহায়তা করা হবে। তারপর তিন মাস আগে নিজের কাজ শেষ করেছে সে। কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার পর ডিআইএ তাকে একদম ভুলে গেছে। বলুন, এটা কেন হবে? আপনারা কি চান অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করুক লোকটা?’
‘সে মারা গেলেই বা আমাদের কী, আর বেঁচে থাকলেই বা কী,’ হালকা সুরে বললেন উসবার্টি। ‘মাসুদ রানা আমাদের হয়ে কাজ করেছে বলে তার বদলে নানান ধরনের সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বিসিআই চিফ সেটা জানেন বলেই ডিআইএ চিফের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি।’ নিষ্পলক চোখে সিমন্সকে দেখলেন তিনি। ‘ধরে নিন, যে দরজা বন্ধ করে রাখা খুব জরুরি, জোর করে সেটা খুলতে যাওয়া হবে খুব অনুচিত।’
‘এটাই আসলে উচ্চ পর্যায়ের অফিসারদের সিদ্ধান্ত, ‘ বলল অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর রাইডার।
‘আমি বুঝতে পারছি, সিমন্স, আপনি চান মাসুদ রানার বিষয়ে আমরা যেন হস্তক্ষেপ করি,’ বললেন উসবার্টি। ‘কিন্তু সেটা করতে গেলে আমরা যেমন ফেঁসে যাব, তেমনি জন্ম নেবে নানান ধরনের প্রশ্ন।’ ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বুঝে গেছেন, নীতিবান মাথাগরম ধরনের লোক সিমন্স।
চুপ করে থাকল এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট।
রাইডারের চোখে চোখ রেখে শীতল কণ্ঠে বললেন উসবার্টি, ‘কোন ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা হোক, সেটা আমরা চাইছি না।’
ঘাড় বেয়ে ঘামের স্রোত নামল সিমন্সের পিঠে। যা বলার বলে দিয়েছেন উসবার্টি। নতুন করে কিছু করতে গেলে টান পড়বে ওর চাকরি নিয়ে। ডিআইএর খাতা থেকে আলগোছে মুছে দেয়া হয়েছে মাসুদ রানার নাম।
‘তবুও ডার্টি গেমের ওপরে আমি চোখ রাখব,’ মনে মনে নিজেকে শোনাল সিমন্স। ‘যোগাযোগ থাকবে বিসিআই এজেণ্ট রায়হান রশিদের সঙ্গে। আর সম্ভব হলে দেরি করব না মাসুদ রানাকে সাহায্য করতে।’
Chapter - 21 to 25
একুশ
আগে কখনও অনিদ্রায় ভুগতে হয়নি রিটা জোসেফের। গত বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে ওর শরীর ও মগজ বারবার করে বলছে, অনেক তো হলো, এবার একটু বিশ্রাম নাও। বরাবরের মত বিছানায় শুয়ে তিন মিনিটে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখনই এল একের পর এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। ক’বার ঘুম ভাঙার পর এখন ভয় লাগছে ওর ঘুমাতে।
দুঃস্বপ্নে দেখছে, দ্বীপে নিয়ে আসা অপরাধীদের একজন ও নিজে। ওকে ধর্ষণ করতে চাইছে নাৎসি লোকটা। বাধা দেয়ার ফাঁকে তার গোড়ালির লাল ট্যাব খুলতে চাইছে রিটা। কিন্তু কোনভাবেই ধরা যাচ্ছে না ওটা। লাথি দিচ্ছে স্লাইডারের তলপেটে। ঘুষি মারছে মুখে ও মাথায়। খামচি মেরে রক্ত বের করে দিচ্ছে লোকটার, কিন্তু ভূতের মত বায়বীয় দেহে কোন আঘাত লাগছে না তার। চারপাশে ভিড় করেছে অনেকে। হাসতে হাসতে তারা দেখছে রিটা ও স্লাইডারের অসম লড়াই।
লোকগুলো আমেরিকান ও জাপানি মিলিটারির পোশাক পরা। কারও হাত নেই, কারও পা। মৃত অপরাধীদের দেখা যাচ্ছে তাদের ভেতরে। নিষ্ঠুরভাবে খলখল করে হাসছে ইতালিয়ান খুনি বিয়াঞ্চি, ধর্ষক লোপাতিন ও পতিতা ইসাবেলা। সবার চোখে-মুখে ওর প্রতি তীব্র ঘৃণা। চোখের সামনে ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে স্নাইডার হলো ব্র্যাড স্টিল। আর তখনই শীতল ঘামে ভিজে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হচ্ছে রিটা। ভীষণ ভয়ে ধকধক করছে ওর বুক। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে চরম বাস্তবতা।
এরই ভেতরে বুঝে গেছে, কোনভাবেই আর ঘুমাতে পারবে না। মন অন্যদিকে সরাতে গিয়ে ভাবল, এখন আসলে কী করা উচিত ওর?
নিশ্চয় অনেকের কাছেই আপত্তিকর বলে মনে হচ্ছে ডার্টি গেম শো। যদিও নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই যে তারা কোন প্রতিবাদ করবে কি না। সবার মধ্যে সিলভারম্যানকে বেশি বিব্রত হতে দেখেছে রিটা। তার সঙ্গে জোট বাঁধলে হয়তো স্টিলকে বোঝানো যাবে, কতবড় অনৈতিক কাজ করছে সে। ক্যাম্পের সবাই তাকে ভয় পেলেও রিটা ও সিলভি নেতৃত্ব দিলে হয়তো বন্ধ করা যাবে স্টিলের জঘন্য এই শো।
আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে নিজেদের ব্যক্তিগত তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল রিটা, সোজা গিয়ে ঢুকল বিশাল তাঁবুর ভেতরে। ওর দৈহিক সৌন্দর্যের কারণে প্রভাব খাটাতে পারবে স্টিলের ওপরে, তবে সেক্ষেত্রে আগে মন থেকে দূর করতে হবে সব ভয়। তারপর দলে টানতে হবে অন্যদেরকে।
কী একটা বিষয়ে উত্তপ্ত তর্কে জড়িয়ে গেছে স্টিল ও সিলভি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনতে লাগল রিটা।
‘তুমি তো জানো, আবারও উধাও হয়ে গেছে মাসুদ রানা। আমার কোন স্ক্রিনে সে নেই। গ্রিডেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। একবার লেন্সে পেয়েও আবার তাকে হারিয়ে ফেলেছি। আর সেটা হয়েছে, কারণ সরাসরি আমাদের দিকে আসছে সে। এদিকে যথেষ্ট ক্যামেরা রাখা হয়নি। আর সেজন্যে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। যে-কোন সময়ে আমাদের ওপরে হামলা করবে ক্রিমিনালেরা।’
‘অত বেশি ভেবো না,’ নিশ্চিন্ত চেহারায় বলল স্টিল। ‘ওদের কেউ এদিকে আসবে না।’ আরও জরুরি একটা কারণে চিন্তায় পড়ে গেছে সে। সত্যি যদি দ্বীপের ক্যামেরাহীন কোন অংশে শ্যানন ও তানাকার হাতে খুন হয়ে যায় মাসুদ রানা, তা হলে তার মৃত্যু-দৃশ্য কোন লেন্সে ধরা পড়বে না।
‘খুনি আর ধর্ষকেরা দ্বীপের অন্যদিকে থাকলে তখন মনে একটু স্বস্তি পাব, ব্র্যাড, বলল সিলভারম্যান। ‘কথাটা বুঝেছ?’
পকেট থেকে অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট নিয়ে খোসা খুলে মুখে ফেলল সে। ওয়াকিটকি তুলে দলের লোকদের নির্দেশ দিল, যাতে বাইরের কম্পাউণ্ডে বসানো হয় আরও তিনটে ক্যামেরা।
মনে মনে হাসল স্টিল। তা-ও ভাল, মনের অনুভূতি আবারও প্রকাশ করতে শুরু করেছে সিলভারম্যান। এদিকে নিজে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে গেছে ব্র্যাড। যতই চেষ্টা করুক, কোন অপরাধী ঢুকতে পারবে না এই কম্পাউণ্ডে। চারপাশে পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র গার্ডেরা। তা ছাড়া, এখানে এসে লাভ কী কারও?
না, উপযুক্ত কারণ ছাড়াই ভয় পেয়েছে সিলভারম্যান। একটু দূরে চেয়ারে বসে আছে রিভ সিম্পসন। মাসুদ রানা এদিকে আসছে শুনে কালচে হয়ে গেছে তার মুখ। বাঙালি শয়তানটার কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে বেগুনি বর্ণ ধারণ করেছে তার থুতনি। আগে কখনও সিস্পসনকে এভাবে বোকা বানাতে পারেনি কেউ। যদি সত্যিই লোকটা এদিকে আসে, স্টিলের ভাল লাগুক বা না লাগুক, প্রথম সুযোগে তাকে যমপুরীতে পাঠিয়ে দেবে সে।
‘আমি ওকে খুঁজে নেব,’ তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল সিম্পসন।
পেছন থেকে তাকে দেখল সিলভি। সিকিউরিটি চিফ চলে যেতেই তার চোখ পড়ল রিটার চোখে। পরস্পরের দিকে চেয়ে দু’জনই বুঝে গেল, একই দলে আছে ওরা। আর ভাবছে, অপরাধীদের ওপরে চরম অন্যায় করছে ডার্টি গেম শো-র পরিচালক স্টিল।
.
তাঁবুর তৈরি গ্রামের ওপরে দূর থেকে চোখ রেখেছে রানা। কম্পাউণ্ড ঘিরে নেয়া হয়েছে দশ ফুটি রেযর ওয়াএয়ার দিয়ে। ভেতরেও বৃত্তাকার আরেকটা তারের বেড়া। ওটা না টপকে গ্রামে পা রাখতে পারবে না কেউ। অভিজ্ঞ যে-কেউ বলবে, নিরাপত্তার জন্যে সীমান্তের কাছে মিলিটারি থেকে তৈরি করা হয়েছে এই গ্রাম। রানার মনে পড়ল, এমনই সব ড্রাগের কারখানা দেখেছে এল সালভেদরের জঙ্গলে। সেসব জায়গায় ঢুকতে হয়েছে খুব সতর্কতার সঙ্গে।
বৃষ্টি থেমে যেতে ভালভাবে গ্রামটা দেখতে পাচ্ছে রানা। ওয়েদার টাওয়ারের একটু দূরে একের পর এক তাঁবু। ওগুলোর ভেতরে একটা বহু গুণ বড়। হেলিকপ্টার থেকে যে বিশাল স্যাটেলাইট ডিশ দেখেছে রানা, আগের মতই কাত হয়ে আছে ওটা। কম্পাউণ্ডে কমপক্ষে বারোজন সশস্ত্র গার্ড। আড়ালে হয়তো আরও আছে। ওর বুঝতে দেরি হলো না, এই গ্রাম স্টিলের হেডকোয়ার্টার। দুনিয়া জুড়ে যে ভিডিয়ো ছড়িয়ে দিচ্ছে লোকটা, সেটা ড্রাগের চেয়েও ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। অবশ্য তার শো বন্ধ করে দেয়ার কথা ভাবছে না রানা। ওর উদ্দেশ্য আসলে বিসিআইকে জানানো যে এই দ্বীপ আসলে কোথায়।
এল সালভেদরের জঙ্গলের ড্রাগের কারখানাগুলোর মতই এখানে পাহারা দিচ্ছে অটোমেটিক অস্ত্রসহ গার্ডেরা। রানার মনে পড়ল পুরনো কিছু স্মৃতি। অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সাপ্লাইসহ এল সালভেদরে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ডিআইএর চিফ। কথা দিয়েছিলেন, রানা গ্রেফতার হলে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবেন সে দেশের সরকারের ওপরে। তার মাধ্যমে ওকে বের করে আনবেন জেল থেকে। কিন্তু গত তিন মাসে ও বুঝে গেছে, ডাহা মিথ্যা বলেছেন তিনি। সোনসোনেট জেলখানার সুপার যদিও বলেছে, ওকে ফেরত চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার থেকে। কিন্তু সেটা গ্রাহ্য করেনি এল সালভেদর সরকার।
এখন ওর কাছে কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র নেই। গোপনে ঢুকতে হবে সামনের কম্পাউণ্ডে।
ওর মনে পড়ল এল সালভেদরের জঙ্গলে তারের বেড়া কেটে ঢুকেছিল প্রথম টার্গেট এরিয়ায়। পিস্তলের বাঁটের বাড়ি মেরে অজ্ঞান করেছিল এক গার্ডকে। দ্বিতীয়জন আক্রমণ করে বসলে বাধ্য হয়ে ছোরা দিয়ে ফুটো করে দিয়েছিল তার হৃৎপিণ্ড। পরের কারখানাগুলোতে ঢুকতে গিয়ে খুন করতে হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন গার্ডকে। অবশ্য তাদের মৃত্যুর জন্যে এল সালভেদরের আদালত থেকে ওকে কোন ধরনের শাস্তি দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর আপন ভাগ্নে আর তার সঙ্গী ড্রাগ লর্ডদের খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ওকে।
এখন তারের বেড়া কেটে ঢোকার জন্যে কোন কাটার নেই রানার কাছে। এমন কী একটা ছোরাও নেই। তবে কপাল মন্দ না হলে ঠিকই ঢুকতে পারবে কম্পাউণ্ডে। কঠোরভাবে পাহারা দেয়া হচ্ছে মেইন গেট। ওদিক দিয়ে ঢুকতে গেলে গুলি শুরু করবে শত্রুপক্ষ। সেক্ষেত্রে শুরুতেই ভেস্তে যাবে ওর প্ল্যান। সুতরাং গোপনে ড্রাগ কারখানার মত করেই ঢুকতে হবে সামনের গ্রামে।
তারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দূরে তালাবদ্ধ আরেকটা গেট দেখছে রানা। আকারে ওটা মেইন গেটের অর্ধেক। পাশে আনমনে বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে দামি সিকিউরিটি ক্যামেরা বসাচ্ছে পলিনেশিয়ান এক টেকনিশিয়ান। তার সামান্য দূরে ওয়েদার টাওয়ার। ওটার ভেতরে দেখা যাচ্ছে একজন লোককে। মনে মনে বলল রানা, মাত্র দু’জন লোককে নিরস্ত্র করলে ওয়েদার টাওয়ারে উঠে মেসেজ পাঠাতে পারব।
এইমাত্র মেইন গেট খুলে জিপ নিয়ে জঙ্গুলে পথে বেরোল ক’জন সশস্ত্র গার্ড। একই সময়ে আঙিনায় এসে থামল রিভ সিম্পসন। তার সঙ্গে আছে তিনজন গার্ড। সবার হাতে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল। সিকিউরিটি চিফের হাতের শেকলে বিশাল এক জার্মান শেফার্ড কুকুর। চাপা গর্জন ছাড়ছে ওটা। নিজেদের ভেতরে কী যেন আলাপ করছে চারজন। তারা দূরে আছে বলে কিছুই শুনতে পেল না রানা।. দু’ভাগে ভাগ হয়ে দু’দিকে চলল লোকগুলো। রানার মাত্র পাঁচ ফুট দূর দিয়ে গেল তাদের দু’জন, জানে না কাছেই ঝোপে বসে আছে ও। তারা চোখের আড়ালে চলে যেতেই বেড়ার পাশের ঝোপগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে পেছনের ছোট গেটের কাছে গেল রানা। একইসময়ে নিজের কাজ শেষ করেছে ক্যামেরা টেকনিশিয়ান। এখনও অন করেনি যন্ত্রের এলইডি পাওয়ার লাইট। ওটা চালু করার আগেই যা করার করতে হবে, বুঝে গেল রানা।
গেটের পাশের কলামে ঠেস দেয়া মই থেকে নেমে এল দীর্ঘকায় পলিনেশিয়ান টেকনিশিয়ান। কোমর থেকে নিল চাবির ছোট একটা ছড়া। অলস ভঙ্গিতে চাবি বেছে নিয়ে খুলল গেটের তালা। হ্যাঁচকা টানে ভেতরের দিকে নিল গেট। আর তখনই ঝোপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে চিতার বেগে লোকটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। ওর ডানহাতের প্রচণ্ড এক ঘুষি লাগল বিস্মিত টেকনিশিয়ানের থুতনির ওপরে। একসেকেণ্ডে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। সামনে বেড়ে ক্যামেরার তার ছিঁড়ল রানা। গেট বুজে দিয়ে তালার ভেতরে রেখে দিল চাবি। দরকার হলে গেট খুলে হাওয়া হবে জঙ্গলে।
মাত্র বিশ ফুট দূরে গ্রামের তাঁবুর সারি। ভেতরের তারের বেড়ায় কোন কাঁটা নেই। সহজে বেড়া টপকে গেল রানা। দ্রুত গিয়ে থামল ওয়েদার টাওয়ারের পুরনো মইয়ের কাছে। একবার মনোযোগ দিয়ে দেখল এদিক-ওদিক। আকাশ কালো হলেও একটু পর ভোরের আলো ফুটলে ধরা পড়তে হবে ওকে।
ওয়েদার টাওয়ারের ওপরের ঘরে আছে অন্তত একজন।
আপাতত অন্ধকারে কেউ দেখতে পাবে না রানাকে। এখানে-ওখানে জ্বলছে গ্রামের সাদা রঙের বাতি। জোরালো আলো ফেলা হয়েছে মেইন গেট ও তাঁবুতে ঢোকার পথের ওপরে। ওয়েদার টাওয়ারের মইয়ের কাছে জ্বলছে একটা হলদে বাতি। ওটাকে পাশ কাটিয়ে মই বেয়ে উঠতে হবে ঘরে। আবারও চারপাশে তাকাল রানা। একটু পর ওর মনে হলো এদিকে চেয়ে নেই গার্ডদের কেউ। ঝড়ের বেগে মই বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল রানা। চোখের কোণে দেখল ল্যাট্রিন থেকে বেরিয়ে বড় তাঁবুর দিকে চলেছে এক লোক। ওদিকে ঘুরঘুর করছে কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড। রানার মনে পড়ল, হ্যাঙারে দেখেছে অপেশাদার গার্ডদের নিয়ে নিজের দল তৈরি করেছে সিম্পসন। তবুও সতর্ক হতে হবে ওকে। যে-কাউকে খুন করতে আসলে লাগে মাত্র একটা বুলেট। তার ওপরে ওর নিজের কাছে কোন অস্ত্র নেই।
ওয়েদার টাওয়ারের মইয়ের মাঝামাঝি উঠে আবারও বড় তাঁবুর দিকে তাকাল রানা। ওর বুঝতে অসুবিধে হলো না যে বিশাল তাঁবুতে বসেই ডার্টি গেম শো চালাচ্ছে ব্র্যাড স্টিল।
একবার ভাবল রানা, বন্ধ করে দেব তার ব্রডকাস্ট? সহজেই খুন করতে পারব যে-কোন গার্ডকে। তারপর তার অস্ত্র সংগ্রহ করে জিপ চালিয়ে ঢুকতে পারব প্রধান তাঁবুর ভেতরে। সেক্ষেত্রে চুরমার হবে কমপিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি। জিম্মি করা যাবে লোকগুলোকে। কিন্তু তাতে বড় সমস্যা হচ্ছে: তখনও টিকটিক করে কমে আসবে গোড়ালির টাইম বোমার ঘড়ি।
কাউকে খুন করে কোন ধরনের ফায়দা হবে না, তাই সুযোগ পেয়েও পলিনেশিয়ান লোকটাকে খুন করেনি রানা। আসলে চরম শাস্তি দেয়া উচিত ব্র্যাড স্টিল আর তার সিকিউরিটি চিফ রিভ সিম্পসনকে। তবে তাদেরকে খুঁজতে গেলে গোলাগুলিতে মরবে নিরীহ লোকজন। নিজেও হয়তো খুন হবে রানা। না, এখন ওর প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিসিআই-এর কমিউনিকেশন সেন্টারে যোগাযোগ করা। সরাসরি কথা বলতে হবে বসের সঙ্গে।
আবারও মই বেয়ে উঠতে লাগল রানা।
ওয়েদার টাওয়ারের ওপরের মেঝে তিন শ’ ষাট ডিগ্রি অর্থাৎ বৃত্তাকার। মাঝে টিনের ছাতওয়ালা ঘর। জানালার ঘোলাটে কাঁচ দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল রানা।
ঘরের মেঝে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বড়জোর পনেরো ফুট। ছাতের বিম থেকে ঝুলছে জ্বলন্ত চাইনিয ল্যাম্প। যা ভেবেছে, সেটাই দেখতে পেল রানা। দু’দিকের দেয়াল ঘেঁষে বসানো হয়েছে নতুন ওয়েদার ট্র্যাকিং ও স্যাটেলাইট ইকুইপমেন্ট। সেগুলোর ওপরে চোখ রেখেছে বছর তিরিশেকের এক টেকনিশিয়ান। তার পিঠ এখন ওর দিকে।
রানার মনে হলো না লোকটা সশস্ত্র। নিঃশব্দে কয়েক পা সরে নব ঘুরিয়ে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ও। নিচু গলায় বলল, ‘কী খবর?’
পরিচিত কেউ এসেছে ভেবে ঘুরে তাকাল লোকটা। কিন্তু চাইনিয ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোয় একসেকেণ্ডে বুঝে গেল, এই লোক অপরাধী দলের কেউ। মস্তবড় হাঁ মেলে চিৎকার দিতে গেল সে। কিন্তু সামনে বেড়ে তার কানের পাশে জোর এক ঘুষি বসাল রানা। জ্ঞান হারিয়ে চেয়ার থেকে কাত হয়ে মেঝেতে পড়ল লোকটা।
ডেস্কে নানান জিনিসপত্র। ওগুলোর ভেতরে আছে কলম, কাগজ, কাটার ও অর্ধেক খরচ করা ডাক্ট টেপ। শেষেরটা দিয়ে টেকনিশিয়ানের মুখ-হাত-পা বাঁধবে কি না ভাবল রানা।’ পরক্ষণে বুঝল, সেটা করতে হবে না। লোকটার জ্ঞান ফেরার অনেক আগেই এখান থেকে উধাও হবে ও। টেপ অবশ্য পরে অন্য কাজে লাগতে পারে। রোলটা পকেটে রেখে কন্সোলের সামনে বসে পড়ল রানা।
গুপ্তচর হিসেবে যে ধরনের ট্রেনিং ওকে দেয়া হয়েছে, তার ভেতরে আছে স্যাটেলাইট ও জিপিএস কমিউনিকেশন স্কিল। অরবিটে আছে কমপক্ষে দেড় শ’ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট। তার অন্তত এক শ’টা জিয়োসিনক্রোনাই অরবিটে। বিশ্বের ইকুয়েটরের থেকে একটা বেছে নেবে রানা। এক স্যাটেলাইট থেকে ঠিকরে অন্য স্যাটেলাইটে যাবে ওর দেয়া তথ্য। এভাবে নির্বিঘ্নে চব্বিশ ঘণ্টা ধরে চলছে পৃথিবীতে দেশ থেকে অন্য দেশের জরুরি যোগাযোগ। এই একই টেকনোলজি ব্যবহার করে ডিজিটাল ফোন। কিন্তু দ্বীপে ওয়াএয়ারলেস নেটওঅর্কের কোন টাওয়ার দেখতে পায়নি রানা। সুতরাং ওর যোগাযোগ করতে হবে কোন স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে।
জিয়োসিনক্রোনাইয স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হলেও ব্রডকাস্টিং টিভি ও ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পর্ক নেই গ্লোবাল পযিশনিঙের। পৃথিবী জুড়ে আছে মাত্র একত্রিশটা জিপিএস লো আল্টিচ্যুড স্যাটেলাইট। সেই টেকনোলজি ব্যবহার করে ট্র্যাক করা যাবে দ্বীপের ক্রিমিনালদের। যদিও তার অর্থ এমন নয় যে দুর্গম এই দ্বীপে চট্ করে এসে ওদেরকে উদ্ধার করতে পারবে কেউ।
আপাতত জিপিএস সিস্টেমের কথা ভুলে টেবিল থেকে স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল প্রিফেক্স কোড ব্যবহার করে বিসিআই হেডকোয়ার্টারে কল দিল রানা। রিসিভারে শুনতে পেল ওদিকে টিট-টিট শব্দে বাজছে রিং।
‘হ্যালো, কে বলছেন?’ ওদিক থেকে বলল কেউ।
‘আমি মাসুদ রানা,’ বলল রানা।
‘মাসুদ ভাই?’ চমকে গেছে মানুষটা। ‘আমি এখনই বসের কাছে লাইন দিচ্ছি। জাস্ট আ মিনিট!’
পেরোল পঁয়তাল্লিশ সেকেণ্ড, তারপর লাইনে রানা শুনতে পেল গুরুগম্ভীর কণ্ঠ: ‘তুমি এখন কোথায়, রানা?’
‘স্যর, এক দ্বীপে। পাপুয়া নিউ গিনির কোথাও।’
চুপ করে আছেন বিসিআই চিফ। তারপর বললেন, ‘তুমি তো ছিলে সোনসোনেট প্রিযনে। কীভাবে গেলে পাপুয়া নিউ গিনির দ্বীপে?’
মাত্র তিন মিনিটে সংক্ষেপে রিপোর্ট দিল রানা। ওর কথা শেষ হতে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন রাহাত খান, ‘এজন্যে জবাব দিতে হবে ডিআইএর চিফকে।
‘স্যর, এবার জিপিএস কোঅর্ডিনেট্স্ দিচ্ছি।’
‘গুড, দেরি না করে পাঠিয়ে দাও। তারপর টাইম বম ডিফিউস করে যত দ্রুত সম্ভব চলে যাও চোখের আড়ালে। আমরা দেখছি তোমাকে কীভাবে ওখান থেকে বের করে আনা যায়।’
‘জী, স্যর।’ বলল রানা। এবার সংখ্যাগুলো দেখে জানিয়ে দেবে জিপিএস কোঅর্ডিনেট্স্।
.
প্রায় ভোর। গাঢ় নীলচে আকাশে ঝাপসা হয়ে গেছে নানান রঙের নক্ষত্রের মিছিল। ব্র্যাড স্টিলের কম্পাউণ্ডের পেছন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সিকিউরিটি চিফ রিভ সিম্পসন। কঠোর চোখে দেখছে অচেতন পলিনেশিয়ান টেকনিশিয়ানকে। এরই মধ্যে চারদিকে তল্লাসী শুরু করেছে গার্ডেরা।
‘মিস্টার স্টিল, পুব গেট দিয়ে ঢুকে পড়েছে অপরাধীদের কেউ,’ হেডসেটে বলল সিম্পসন।
নিজের লাউঞ্জ চেয়ারে আয়েস করে বসে কথাগুলো শুনল ব্র্যাড স্টিল। মাত্র একসেকেণ্ডে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ। কোন কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে দূরে সরে গেল সে।
স্টিলের দিকে চেয়ে আছে সিলভি। বন্ধুর পাণ্ডুর মুখ দেখে চট্ করে জিজ্ঞেস করল, ‘খারাপ কিছু?’
‘মাসুদ রানা এসে ঢুকে পড়েছে কম্পাউণ্ডে,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল ব্র্যাড।
‘বাহ্, এ তো দারুণ সংবাদ!’ মুখে বললেও শুকিয়ে গেছে সিলভির মুখ। ‘এবার বোধহয় এসে ঢুকবে এখানে!’
‘এত সহজ নয়,’ বলল ব্র্যাড। ‘বাইরে অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে সিম্পসন আর তার দলের লোকেরা।’
.
বাইরের আঙিনায় রাইফেলের স্কোপের মত নানান দিকে চোখ বোলাচ্ছে সিকিউরিটি চিফ। গেট থেকে সবচেয়ে কাছের স্থাপনা ওয়েদার টাওয়ার। ওটার ওপরে স্থির হলো তার চোখ। কেউ আছে টাওয়ারের ঘরে। ডিউটি দেয়ার কথা টেকনিশিয়ানের। টিনের ঘরের ভেতরে চোখ বোলাবার জন্যে কয়েক পা এগোল সিম্পসন। পরক্ষণে বুঝে গেল কন্সোলে ঝুঁকে কী যেন করছে মাসুদ রানা!
‘সে টাওয়ারের ওপরে,’ হেডসেটে বলল সিম্পসন।
চট্ করে সিলভারম্যানের দিকে তাকাল স্টিল। ‘আপাতত বন্ধ করে দাও টাওয়ারের জেনারেটর।’
বাইশ
কন্সোলের সামনে বসার মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর কাদের যেন উঠে আসার পদশব্দ শুনতে পেল রানা। ঘাড় কাত করে তাকাল জানালার দিকে। মই বেয়ে ধুপধাপ করে টাওয়ারে উঠে আসছে রিভ সিম্পসন ও তার দলের লোক। এখন আর মই বেয়ে নেমে যেতে পারবে না রানা। কন্সোল থেকে না সরে বলল, ‘ল্যাটিচ্যুড ৭.৫৫৯২৮০, লংগিচ্যুড…’
রানা কথা শেষ করার আগেই দপ করে চলে গেল বিদ্যুৎ। নিভে গেছে ঘরের বাতি ও কন্সোলের আলো।
স্যাটেলাইট ফোন এখন ডেড!
মইয়ের কথা ভুলে অন্য কোন উপায়ে টাওয়ার থেকে নেমে যেতে হবে রানাকে। উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের চারপাশে তাকাল ও। নিজেকে ওর মনে হলো খাঁচায় বন্দি সিংহের মত। রিভ সিম্পসন এবং তার দলের লোক উঠে আসছে বলে মৃদু কাঁপছে টাওয়ার।
একটা জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিতেই সরাসরি ব্র্যাড স্টিলের সঙ্গে চোখাচোখি হলো রানার।
বিশাল তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, চোখে নির্বিকার দৃষ্টি। কয়েক সেকেণ্ড পরস্পরকে দেখল ওরা, তারপর নিজে থেকেই চোখ সরিয়ে নিল রানা। এখন প্রতিটা সেকেণ্ড ওর জন্যে খুব জরুরি। বেরিয়ে যেতে হবে এই কম্পাউণ্ড থেকে। ছুটে গিয়ে খুলল দরজা। আর তখনই কয়েকটা বুলেটের আঘাতে ঝনঝন করে ভেঙে গেল পাশের কাঁচের জানালা। দশ সেকেণ্ডের মধ্যে প্ল্যাটফর্মে উঠে আসবে সিম্পসন ও তার লোকেরা।
শরীরে গুলি লাগতে পারে জেনেও দরজা খুলে প্ল্যাটফর্মের কোণে ডাইভ দিয়ে পড়ল রানা। ক্রল করে এগিয়ে চলল বাম দিকে। টাওয়ার কমপক্ষে তিনতলা উঁচু। ওপর থেকে নিচে রেযর ওয়াএয়ারের বেড়া দেখতে পেল রানা। একবার ওটা টপকে ঝোপঝাড়ের ভেতরে পড়লে উঠে দাঁড়িয়ে এক দৌড়ে ঢুকে পড়তে পারবে জঙ্গলের ভেতরে।
আবারও এল গুলির আওয়াজ।
ঝনঝন করে ভাঙল রানার পেছনের জানালার কাঁচ।
এখন মাত্র একটা কাজই করতে পারে রানা। আর সেটাই করল-প্ল্যাটফর্মের রেলিঙে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিচে। তার- কাঁটার বেড়া পার হয়ে হুড়মুড় করে নামল ঘন ঝোপের ভেতরে। এ-ধরনের ঝুঁকি নিলে হাড়গোড় ভাঙবে বেশিরভাগ মানুষের, কিন্তু মাটিতে শরীর গড়িয়ে দিয়েছে রানা। হাত-পা ও পাঁজরের ব্যথায় ওর মনে হলো এইমাত্র খুন হয়ে গেছে। ঝোপে ঢুকল একরাশ গুলি। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে ঝেড়ে দৌড় দিল রানা। ওদিকে টাওয়ারের প্ল্যাটফর্মে উঠে এসেছে সিম্পসন ও তার লোকেরা। একের পর এক গুলি করছে রানাকে লক্ষ্য করে।
লোকগুলো মিলিটারি থেকে ট্রেনিং নিলে দশ ফুট যাওয়ার আগেই লাশ হয়ে যেত রানা। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। পছন্দ করুক বা না করুক, আবারও ওকে অংশ নিতে হবে ডার্টি গেমের নোংরা খেলায়।
.
বিধ্বস্ত বি-২৫ বিমানের ফিউজেলাজের ভেতরে গা ঘেঁষে বসে আছে জনি এস. ক্লার্ক ও রোযি ইয়াসিমান। সামনে জ্বলছে ছোট্ট আগুন। কমলা শিখার ওপরে জনি ঝলসে নিচ্ছে মৃত একটি পাখি। ইয়াসিমান যে চোখা ডাল দিয়ে ওকে খুন করতে চেয়েছিল, ওটা দিয়েই পাখিটাকে পিটিয়ে মেরেছে ক্লার্ক।
আগুনের ওপর থেকে ঝলসানো পাখি সরিয়ে এক কামড়ে খানিকটা মাংস খেল সে, তারপর বাকি অংশ তুলে দিল সুন্দরী মেয়েটার হাতে। সামান্য মাংস খেয়ে খিদে মেটেনি তার। মন অন্যদিকে সরানোর জন্যে বলল, ‘তোমার মত এত সুন্দরী এক মেয়ে এখানে কেন?’
‘তার বহু কারণ আছে।’ পোড়া পাখির মাংসে কামড় দিল রোযি। এ-বিষয়ে আর কিছু বলতে আগ্রহী নয়।
নিজেও চুপ করে থাকল ক্লার্ক। বলার তো আসলে কিছু নেই। পর পর দু’বার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ওকে। আর এবার মৃত্যু থেকে রেহাই পেতে হলে খুন করতে হবে অন্যদেরকে। আর সেটা করা এই দ্বীপে সহজ কাজ নয়। ওদের দু’জনের ব্রেসলেটের ঘড়িতে এখন বাজে রাত ০৮:০৩:০৪।
অর্থাৎ, আর মাত্র আট ঘণ্টা তিন মিনিট পর বোমার বিস্ফোরণে মরবে ওরা। মনে মনে নিজের ভাগ্যটাকে অকথ্য গালি দিচ্ছে ক্লার্ক। মুখেও সেটা উচ্চারণ করত, কিন্তু করছে না কারণ সেক্ষেত্রে ওকে হয়তো কাপুরুষ বলে ভাববে সুন্দরী মেয়েটা। সেটা তো আর হতে দেয়া যায় না।
মুখ তুলে রোযিকে দেখল ক্লার্ক। আগুনের আলোয় খুব রূপসী লাগছে মেয়েটাকে। কতই বা হবে ওর বয়স? বড়জোর পঁচিশ? কী অপূর্ব সুন্দরী, অথচ যে-কোন সময় মরবে বেচারি।
‘এটা বোধহয় জানো, যে-কোন সময়ে খুন হবে তুমি, ‘ বলল ক্লার্ক।
‘হয়তো মরতে হবে না,’ আশা ভরা গলায় বলল রোযি।
ওর সাহস দেখে বিস্মিত হয়েছে ক্লার্ক। নিজে সে বাঁচার কোন উপায় দেখছে না। সেটাই বলল, ‘বারবার ফিরেছি মৃত্যুর কবল থেকে। সবসময় ওটা ছিল খুব কাছে।’
নিজের গোড়ালির ব্রেসলেট দেখল ক্লার্ক। ‘কিন্তু এবার হয়তো আর বাঁচব না। এই বোমা শেষ করে দেবে আমাকে।
‘আমি মরার আগেও লড়তে চাই,’ বলল ইয়াসিমান।
তিক্ত হাসল ক্লার্ক। আসলে বাঁচার উপায় নেই মেয়েটার। নিজে খুব সহজে সুন্দরীকে লড়াইয়ে হারিয়ে দিয়েছে ও। দ্বীপে আছে ওর চেয়ে অনেক শক্তিশালী সব প্রতিযোগী। তারা চাইলে মাত্র একমিনিটে খতম করে দিতে পারবে রোষিকে। তার আগে হয়তো চাইবে ওকে ভোগ করতে।
না, কোনভাবে বাঁচবে না রোযি ইয়াসিমান।
‘আমাদের ভাগ্য আসলে খারাপ,’ বলল ক্লার্ক। ‘এমন নয় যে ঘুম ভেঙে দেখব সবই আসলে স্বপ্ন।’ গত চব্বিশ ঘণ্টায় অনেক বেড়ে গেছে ঘাড়ের ব্যথা। ঘাড় টিপতে লাগল সে।
‘তুমি ঠিক আছে তো?’ মিষ্টি সুরে জানতে চাইল রোযি।
‘হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেয়ার আগে ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছি। রোযি, আমাদের বোধহয় উচিত নিজেদের ভেতরে প্রতিযোগিতা না করা। আমরা একসঙ্গে হামলা করতে পারি অন্যদের ওপরে। তাতে সম্ভাবনা বাড়বে আমাদের বাঁচার। শেষমেশ হয়তো খতম করে দিতে পারব ব্র্যাড স্টিলকে। সুযোগ পেলে চলে যাব দ্বীপ ছেড়ে। ….তুমি কী বলো?’
ক্লার্কের গা ঘেঁষে বসল রোযি। নরম হাতে টিপতে শুরু করেছে সঙ্গীর ঘাড়। ‘টিপে দিলে ব্যথা কি কমছে?’
চোখ বুজল ক্লার্ক। ব্যথার জায়গা ম্যাসাজ করা হচ্ছে বলে খুব আরাম লাগছে। একটু পর নিচু গলায় বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে জীবনে আর কখনও এত ভাল ছিলাম না।’
সামনে ঝুঁকে নিচু গলায় মধু ঝরাল রোযি, ‘ব্যথা তা হলে কমছে তো?’
‘হ্যাঁ, কমছে,’ চোখ বুজে হাসল ক্লার্ক। ‘আমি বোধহয় তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি!’
সঙ্গীর পিঠ বেয়ে কোমরে নেমে এল রোযির নরম হাত। টিপে দিচ্ছে আড়ষ্ট সব পেশি। ক্লার্ক এখন কী ভাবছে, সেটা বুঝে গেছে মেয়েটা। পুরুষগুলো সবসময় একই কথা ভাবে। অবশ্য ক্লার্ক বোধহয় শুধু সেক্স নিয়ে ভাবছে না।
‘তুমি তো বলেছিলে শেষ যে মেয়েটাকে বিশ্বাস করেছিলে, তার জন্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল তোমাকে। আসলে কী ঘটেছিল?’
চোখের পাতা সামান্য খুলল ক্লার্ক। বোকা নয় সে। নিশ্চিত হয়ে নিল, রোযি ইয়াসিমানের আশপাশে কোন ধরনের অস্ত্র আছে কি না। যদিও ক’বার আক্রমণের সুযোগ পেয়েও হামলা করেনি মেয়েটা। বোধহয় বুঝে গেছে, একই ডুবন্ত নৌকায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে ওরা দু’জন।
‘আমি বাস করতাম লস এঞ্জেলেসে। আগে কখনও জায়গাটার নাম শুনেছ?’
মাথা দোলাল রোযি। ‘শুনেছি।’ ক্লার্কের শার্টের ভেতরে ঢুকে গেছে ওর হাত। কোমর আর বুকে মালিশ করছে। তাতে খুব আরাম লাগছে ক্লার্কের।
‘থাকতাম হলিউডের খুব কাছে,’ ম্যাসাজ করে দেয়ায় শিথিল হচ্ছে ক্লার্কের দেহের পেশি। ‘ওদিকের এলাকায় আমরা ছিলাম মাত্র তিনজন ড্রাগ ডিলার। প্রচুর ব্যবসা ছিল। টাকার কোন অভাব নেই। সেসময়ে পরিচয় হলো এক মেয়ের সঙ্গে। মাত্র কয়েক দিনে প্রেমে পড়ে গেলাম আমরা। পরস্পরকে নিয়ে আমরা ছিলাম খুব সন্তুষ্ট। তারপর এক রাতে হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে এল সে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে নাক-মুখ। ফুলে গেছে গাল ও কপাল। আমাকে বলল, আমার প্রতিযোগী ড্রাগ ডিলার বুন্স বায়িন্স ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে খুব মেরেছে। তাতে রাগে প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। দুটো পিস্তল হাতে নিয়ে চলে গেলাম হারামজাদাকে খুন করব বলে। আর তারপর…’
রাগে আড়ষ্ট হয়ে গেছে ক্লার্কের ঘাড়। নতুন করে ম্যাসাজ করতে লাগল রোযি ইয়াসিমান।
‘কিন্তু আসলে আমাকে ফাঁদে ফেলেছিল ওরা। মেয়েটা ছিল অন্য আরেক ড্রাগ ডিলার ডিন রলিন্সের খাস প্রেমিকা। আমি তো মাথাগরম করে খুন করে ফেললাম বায়িন্সকে। আর তাতে আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল পুলিশের লোক। আর এই সুযোগে বায়িন্স আর আমার এলাকা হাসতে হাসতে দখল করে নিল ডিন রলিন্স। যাই হোক, জেল থেকে পালিয়ে গেলাম মালোয়েশিয়ায়। কিন্তু তারপর ওখানে আবার বেইমানি করল ভয়ঙ্কর শয়তান একটা কুত্তী। আসলে, বুঝলে, আমার জীবনটাই বিশ্বাসঘাতকতার বিশাল এক করুণ কাহিনী।’ চোখ মেলে আগুনের আলোয় ফিউজেলাজে একটা লেন্স দেখতে পেল ক্লার্ক। জং ধরা সার্ডিনের একটা কৌটা তুলে নিয়ে ওটা লক্ষ্য করে ছুঁড়ল সে। ঠনাৎ করে লাগতেই ভেঙে গেল লেন্সের কাঁচ।
.
ক্লার্ক আর ইয়াসিমানের অন্তরঙ্গ দৃশ্য একটা স্ক্রিন থেকে মুছে যেতেই ওদিকে তাকাল সিওয়ার্স ও এমিলি। স্ক্রিনে এখন দেখা যাচ্ছে একরাশ সাদা ঝিরঝিরে পোকার মত কিছু। এদিকে মাসুদ রানা গ্রামে ঢুকতেই বিশাল তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেছে স্টিল ও সিলভি। তার আগে কন্সোলের দায়িত্ব দিয়েছে মিলার কাছে।
‘মিলা, অন্য ক্যামেরা চালু করো,’ তাড়া দিল সিওয়ার্স। ‘তোমার কি কানে কিছু ঢুকছে না?’,
গরম চোখে সিওয়ার্সকে দেখে নিয়ে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বদলে নিল মিলা। এবারের লেন্স ক্লার্ক ও ইয়াসিমানের ওপরে চোখ রেখেছে ফিউজেলাজের ছাত থেকে। বসের ধমকের ভয়ে বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেগে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে ওদের। তার ওপরে গ্রামে এসে ঢুকেছে অপরাধীদের একজন। যেটা ওদের মনের ওপরে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। স্ক্রিনে ওরা দেখতে পেল ক্লার্কের পাশে বসে একহাতে তার ঘাড় টিপে দিচ্ছে রোযি।
‘মনে তো হয় একটু পর কাপড় খুলে সেক্স করবে ওরা,’ দাঁত বের করে হাসল সিওয়ার্স।
‘পাঁচ শ’ ডলার বাজি ধরব, ওটা করবে না এরা,’ বলল এমিলি। ‘লোকটাকে ফাঁদে ফেলেছে মেয়েটা।’
বাজি ধরে হাত মেলাল সিওয়ার্স ও এমিলি।
আবার মনোযোগ দিল স্ক্রিনে।
.
‘তুমি বরং শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও, আমি ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করে দিই,’ মিষ্টি কণ্ঠে বলল ইয়াসিমান। টান দিয়ে ওপরে তুলে দিল ক্লার্কের প্যান্টে গোঁজা শার্ট। ওরা জানে না, ওদের ওপরে চোখ রেখেছে আরেকটা নাইট-ভিশন লেন্স।
নিজেকে দুনিয়ার রাজা বলে মনে হচ্ছে ক্লার্কের। বুঝে গেছে, মেয়েটা আসলে চাইছে ওকে যেন আদর করে ও। এদিকে জেলের ভেতরে বছরের পর বছর মেয়েদের সঙ্গে যৌন-মিলনের সুযোগ হয়নি। এখন দারুণ হবে দেবীর মত সুন্দরী মেয়েটা ওকে সুযোগ করে দিলে। মৃত্যুর আগে এমন সুযোগ ক’জন কয়েদী তাদের জীবনে পায়!
দেরি না করে বিমানের মেঝেতে শুয়ে পড়ল ক্লার্ক। পাশে বসে তার বুকের ঘন কালো রোমে হাত বোলাতে লাগল রোযি। হাসিমুখে সহানুভূতির সুরে বলল, ‘তুমি মেয়েদেরকে একদম বিশ্বাস করো না। তবে সেজন্যে তোমাকে কোন দোষ দেব না।’
সুবোধ বালকের মত নীরবে মাথা দোলাল ক্লার্ক। মনে পড়ে গেছে তিক্ত সব অতীত। অবশ্য একটু পর বোধহয় আসবে দারুণ এক ফূর্তির সময়!
‘আমাকে ট্র্যান্সফার করতে চাইল ফোলসম জেলে। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে ঢুকলাম মেক্সিকোতে। ওখান থেকে গেলাম মালোয়েশিয়ায়। ওখানে যখন পৌছুলাম, আমার হাতে এক পয়সাও নেই। তবে কিছু দিনের ভেতরে সুযোগ চলে এল গাঁজা বিক্রি করে বড়লোক হওয়ার।’
ক্লার্ক বলল না, এক মালোয়েশিয়ান ড্রাগ ডিলারকে পথে বসিয়ে দিয়ে নিজেই দখল করে নিয়েছিল তার এলাকা।
‘কিছু দিনের ভেতরে যেতে লাগলাম স্থানীয় মেয়েদের সঙ্গে বিছানায়। ওদের ভেতরে একজন ছিল বেশ সুন্দরী। মিষ্টি করে হাসিমুখে কথা বলত। আর জানত কীভাবে করতে হয় দুর্দান্ত সেক্স। বলতে পারো আমি ছিলাম স্বর্গে। টাকার অভাব নেই। কোন বিপদ হচ্ছে না। পছন্দমত মেয়ে পেয়ে গেছি। জীবনে আর কী চাই!’
অতীত স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে উদাস হয়ে গেছে ক্লার্ক। টের পাচ্ছে ওর উরু মালিশ করে দিচ্ছে রোযি। আহ্, একেই তো বলে জীবনের সত্যিকারের আনন্দ! এই সুন্দরীর উচিত ম্যাসাজ পার্লার খুলে নামকরা হয়ে ওঠা। চোখ বুজে নিজের জীবনের কাহিনী বলতে লাগল ক্লার্ক: ‘কিন্তু মেয়েটা আসলে ছিল মালোয়েশিয়ান পুলিশের চর। একদিন নিজের আস্তানায় আরাম করে শুয়ে আছি ভোরে, এমন সময় এল একদল পুলিশ অফিসার। আমার বিছানার নিচে পেয়ে গেল দশ কেজি গাঁজা। আর এর মানে বুঝতে পারো? মালোয়েশিয়ায় যে-কোন ড্রাগ কারও কাছে পাওয়া গেলে তাকে দেরি না করে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড! আবারও গেলাম জেলে। আমাকে দেয়া হলো মরণের সাজা। তবে আমিও থাকলাম তক্কে তক্কে। ভাবলাম, জেলের দু’জন পুলিশ অফিসারকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে পালিয়ে যাব। তবে এর আগেই আমাকে বিক্রি করে দিল তারা। বুঝতে পারছ কত কষ্ট পেয়েছি আমার নরম এই মনে?’
চুপ করে থাকল রোযি ইয়াসিমান।
পরক্ষণে একটু জোরে একটা ‘বিপ’ শব্দ শুনতে পেল ক্লার্ক। চোখ মেলে চট্ করে দেখল, উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক লাফে বিমানের দরজার কাছে চলে গেছে রোযি। পরক্ষণে তীর বেগে বেরোল রাতের আঁধারে!
গোড়ালির ব্রেসলেটের ওপরে চোখ পড়ল ক্লার্কের। ডিভাইসের ভেতরে দপদপ করে জ্বলছে লাল বাতি। খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে ওর টাইমারের সংখ্যা!
এখন আর পাঁচ সেকেণ্ড নেই ওর মরে যাওয়ার!
‘তোর মায়েরে দশবার চুদি, হারামজাদী কুত্তী মাগী!’ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল ক্লার্ক। ‘শালার কপাল, এই খানকি মাগীও আমাকে একেবারে ঠকিয়ে দিয়েছে!’
ষাঁড়ের মত মোটা গলায় চিৎকার জুড়েছে ক্লার্ক। ওদিকে হরিণীর বেগে বিমান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে রোযি।
‘আমাকে খুন করে ফেলেছে, শালীর মাগী! হারামজাদী, তোর মায়েরে আমার….’
বিকট শব্দে বোমা ফাটতেই চারদিকে ছিটকে গেল ভাঙা ফিউজেলাজ। আকাশে উঠেছে আগুনের কমলা শিখা।
.
কয়েক মাইল দূর থেকে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেল সিলভারম্যান। গার্ডেরা তাড়া করে মাসুদ রানাকে গ্রাম থেকে ভাগিয়ে দেয়ার পর পেটে কিছু দিতে খাবারের তাঁবুতে ঢুকেছে সে। প্রথম লোকটা মারা যাওয়ার পর থেকে খাওয়ার রুচি নষ্ট হয়ে গেছে তার। কিন্তু খালি পেটে ওষুধ খেলে স্টমাক ওয়াল পুড়ে যাবে বলে মুখে কিছু দিতে হবে। টেবিলে নানান প্লেটে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গলদা চিংড়ির কাটলেট, গরুর মাংসের স্টেক, পাস্তা, নুডল্স, চাইনিয ডিশ, নানা সালাদ ও ডেয়ার্ট। কর্মচারীদেরকে সেরা খাবার দিতে দ্বিধা করে না স্টিল।
বোমার আওয়াজ শোনার পর কালো হয়ে গেছে সবার মুখ। খাবারে মন নেই কারও। টেবিলে প্লাস্টিকের প্লেট আর চামচ ফেলে রেখে উঠে পড়ল সিলভারম্যান। বুঝে গেছে, অভিশপ্ত এই দ্বীপ থেকে চলে না গেলে পাগল হয়ে যাবে সে। হতক্লান্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে আবারও গিয়ে ঢুকল বিশাল তাঁবুর ভেতরে। হৈ-চৈ করছে এমিলি আর সিওয়ার্স।
‘বলেছি না মেয়েটা বহুৎ চালু মাল?’ সিওয়ার্সের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল এমিলি। ‘আগেও আমাদের বোকা বানিয়ে দিয়েছে। দেখার মত একটা শো!’
‘অত খুশির কিছু নেই,’ গোমড়া মুখে মানিব্যাগ থেকে পাঁচটা এক শ’ ডলারের নোট এমিলির হাতে দিল সিওয়ার্স।
‘এবার স্কোর বোর্ড দেখি!’ নোটগুলো পকেটে রেখে স্ক্রিনে ক্লার্কের ছবির ওপরে লাল একটা ক্রস চিহ্ন বসাল এমিলি।
‘এত হৈ-চৈ কিসের?’ হতাশ সুরে বলল সিলভি। মেইন স্ক্রিনে দেখতে পেল আগুনে পুড়ছে বি-২৫ বিমান। ভকভক করে আকাশে উঠছে প্রচুর কালো ধোঁয়া।
‘আরও একটা গেল;’ বিড়বিড় করল সিওয়ার্স। মানুষ মারা গেছে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই তার। মনে কষ্ট, বাজি ধরে গচ্চা গেছে পুরো পাঁচ শ’ ডলার। ‘বুম!’ করে উড়ে গেছে কালো আমেরিকান।’ হাত তুলে কালো ধোঁয়া দেখাল সে।
মিলার চেহারায় কোন প্রতিক্রিয়ার ছাপ নেই। এই শো-তে সত্যিকারের মানুষ মারা পড়ছে, বিষয়টা বহু আগেই মন থেকে মুছে গেছে তার। চাইছে নিখুঁত হোক তার কাজ, যাতে ধমক খেতে না হয় স্টিলের কাছ থেকে। সাবধানে আগুন ও ধোঁয়ার দিকে ক্যামেরার লেন্স তাক করল সে।
পরিবেশটা খুব অসহ্য মনে হলো সিলভারম্যানের। ‘যথেষ্ট হয়েছে, এবার অন্যকিছু দেখাও,’ নির্দেশ দিল সে। তিক্ত চেহারায় দেখল কর্মচারীদের।
স্ক্রিনে অন্য ফুটেজ আনল মিলা। জায়গাটা জাপানি কমাণ্ড পোস্ট। টেনেহিঁচড়ে মেক্সিকান দস্যুকে লোডিং ডকে তুলে আনছে রুপার্ট শ্যানন আর কাইতো তানাকা।
অসহায় আহত লোকটাকে লাথি-ঘুষি মারার ফাঁকে চওড়া হেসে লেন্সের দিকে তাকাচ্ছে সাইকোপ্যাথ ইংরেজ।
তেইশ
এইমাত্র কাঠের মেঝেতে বুটের খট খট শব্দ শুনতে পেয়েছে আলকারায। ওর মনে হয়েছে, যদি উঠে দাঁড়াতে পারত! সেক্ষেত্রে রানার দেয়া ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত শ্যাননের ওপরে। কিন্তু বাস্তবে এসব আকাশ-কুসম স্বপ্নের মত। জখমী হাঁটু নিয়ে কোনভাবে লড়ে জিতে যেতে পারবে না। তবুও নিজেকে বলল, যদি পারি তো শেষ করে দেব দুই ইবলিশের একটাকে!
ডকের মেঝেতে একাধিক লোকের পদশব্দ। কমাণ্ড পোস্টের দরজার কাছে ছেঁচড়ে চলে গেল আলকারায। আওয়াজ কাছে আসতেই ছুরি হাতে তৈরি হয়ে নিল। মেক্সিকোতে মস্তানদের দলের সদস্য হিসেবে ছুরির লড়াইয়ে আগেও যোগ দিয়েছে। তাই জানে কী করতে হবে। প্ৰথম সুযোগে ছুরির ফলা ভরে দেবে কিডনির ভেতরে। ইস্পাতের ফলার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খোঁচা ঢুকবে হৃৎপিণ্ডে। আলকারায ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল, যেন দরজা দিয়ে আগে ঢোকে ইংরেজ শয়তানটা। সেটা হলে ইসাবেলার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারবে সে।
তার জানা নেই স্টিলের সরবরাহ করা ম্যাপের কল্যাণে শ্যানন ও তানাকা আগেই জানে কোথায় লুকিয়ে আছে তাদের শিকার। আর জানে বলেই উল্টোদিকের ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে তারা। শ্যানন ও তানাকা ভেবেছিল একসঙ্গে পাবে বাঙালি লোকটা আর মেক্সিকান ডাকাতকে। প্ল্যান ছিল একই ঢিলে দুই পাখি মারবে। অথচ দেখতে পেল দরজার কাছে হাঁটুভাঙা হারামি লোকটা থাকলেও রানা নেই। তাতে যেমন হতাশ হয়েছে তারা, তেমনি স্বস্তিও পেয়েছে।
মজা করার জন্যে তানাকাকে নিয়ে আবার ডকে ফিরে গেছে শ্যানন, যাতে ওদের পদশব্দ শুনতে পায় আলকারায। এবার লোকটা ভাববে গোপনে হামলা করবে ওদের ওপরে। কিন্তু পরে বোকা বনতে হবে তাকে। আর তখন লোকটাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে ওরা।
তানাকাকে ইশারা করল শ্যানন, যাতে ছুটে গিয়ে দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে জাপানি দস্যু। এতে হতভম্ব হয়ে যাবে হাঁটুভাঙা মেক্সিকান ডাকাত। এদিকে পেছন থেকে এসে তার হাত থেকে ছুরি কেড়ে নেবে শ্যানন। এরপর হাসতে হাসতে লোকটাকে বের করে নিয়ে গিয়ে খতম করবে তারা।
তাদের জানা নেই, এরই ভেতরে ছেঁচড়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার চৌকাঠ ধরে উঠে দাঁড়িয়েছে আলকারায।
ইংরেজ সঙ্গীর কথামত ঝড়ের বেগে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল তানাকা। ছুরি দিয়ে তার কিডনি ফুটো করতে চাইল আলকারায। তবে জাপানি খুনির গতি বিদ্যুতের মত। তাকে স্পর্শ করতে পারল না ছুরির ফলা। ওদিকে পেছন থেকে এসে আলকারাযের ছুরি কেড়ে নিল শ্যানন। মুচড়ে ধরে ভেঙে দিল মেক্সিকান ডাকাতের কনুইয়ের হাড়। হাঁটুর বাটি ভাঙার সময় যে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে আলকারায, তার চেয়ে কম ব্যথা লাগল না কনুই ভেঙে যাওয়ায়। প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেল সে।
‘বলো তো, তোমার এত অবাক হওয়ার কী আছে!’ আলকারাযের চোয়ালে হাসতে হাসতে ঘুষি মারল শ্যানন।
উপুড় হয়ে হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ল আলকারায। প্রায় অচেতন হলেও বুঝে গেল যে ব্যর্থ হয়েছে ওর পরিকল্পনা। এ-ও টের পেল, বাঁচতে হলে সরে যেতে হবে নিরাপদ কোথাও। ক্রল করে ক’টা ক্রেটের ওদিকে যেতে চাইল সে। কিন্তু কোমরে জোর এক লাথি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলল শ্যানন। অসহায় যুবকের গোড়ালি চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল বাইরে। ‘তানাকা, একটু সাহায্য করো তো!’
আলকারাযকে ধরে নিয়ে গিয়ে লোডিং ডকে তুলল দুই খুনি। শ্যানন আগেই দেখেছে ওখানে আছে ভিডিয়ো লেন্স। মেক্সিকানটাকে বেধড়ক মার দিলে ওটার কারণে সবই দেখবে ডার্টি গেমের দর্শকেরা।
সাহায্য পাওয়ার জন্যে গলা ছেড়ে চেঁচাতে শুরু করেছে আলকারায। ওর মনের এক অংশ বলছে: মরে গেলেই তো বেঁচে যাই। আবার অন্য অংশ বলছে: সুযোগ এলে প্রতিশোধ নিবি কুত্তার বাচ্চাগুলোর ওপরে!
মাঝে মাঝে বিরতি নিয়ে ওকে পেটাতে লাগল দুই খুনি। শ্যাননের জানা আছে অচেতন না করে কীভাবে বেশি ব্যথা দেয়া যায়। ওদিকে তানাকা চাইছে আহত লোকটাকে দ্রুত খুন করতে। কিন্তু তাকে বাধা দিচ্ছে ইংরেজ সাইকোপ্যাথ। তার যুক্তি হচ্ছে, ব্যাটাকে শেষ করার আগে লুটে নিতে হবে পুরো মজা।
.
বিশাল তাঁবুর মস্ত এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে নৃশংস দৃশ্য।
‘আলকারাযের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে,’ বিড়বিড় করে বলল সিওয়ার্স। ভুলে গেছে বাজি হেরে গচ্চা দিয়েছে অনেক টাকা। ‘এবার খুব ভয়ঙ্করভাবে লোকটাকে পিটিয়ে মারবে শ্যানন।’
‘সূর্য ওঠার আগেই বাজে একটা দিন শুরু করেছে আলকারায,’ টিটকারির সুরে বলল এমিলি। মারাত্মক পিটুনি দেখেও মেক্সিকান ডাকাতের জন্যে ওর মনে কোন করুণা এল না।
হতবাক হয়ে সিওয়ার্স 3 এমিলিকে দেখছে সিলভারম্যান। ভাবছে, এরা কি অপরাধীদেরকে মানুষ বলে ভাবছে না? মনে করছে সবই ভিডিয়ো গেম? নিজের চোখে তো দেখছে বোমার আঘাতে উড়ে যাচ্ছে আস্ত মানুষ! সিওয়ার্স বা এমিলি হয়তো এভাবে ভাবছে, জঙ্গলে যারা আছে, তারা তো মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত আসামী, তাই তারা বাঁচলেই কী আর মরলেই বা কী!
‘এরই ভেতরে লগ ইন করেছে আটাশ মিলিয়ন ভিউয়ার,’ ডিসপ্লে দেখে ঘোষণা দিল সিওয়ার্স। ‘আরও বাড়ছে আমাদের দর্শক।
কোন কথা না বলে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল সিলভারম্যান, আরও তিক্ত হয়ে গেছে তার মন। ছায়ায় দাঁড়িয়ে হড়হড় করে বমি করল। পেটে খাবার নেই, গলা বেয়ে উঠছে টক পানি। ভীষণ অসুস্থ লাগছে, কিন্তু সেটা কোন অসুখের জন্যে নয়। আরেক দফা বমি করে নিজের তাঁবুর দিকে চলল সে। কিন্তু একটু যেতেই দেখতে পেল পথ ‘আটকে দাঁড়িয়ে আছে রিটা।
দশ সেকেণ্ড পেরোলেও কোন কথা বলল না ওরা।
সিলভি বুঝে গেছে, ডার্টি গেমের জন্যে মনের ভেতরে কেমন বোধ করছে রিটা। আগে স্টিলের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে গিয়েছিল সে, তাই সিলভি জানে ওর মনোভাব এখন কেমন।
এদিকে সিলভি কী ভাবছে, সেটাও বুঝতে পারছে রিটা।
‘স্টিল বস্ হলেও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু,’ তিক্ত স্বরে বলল সিলভি। ‘নিজের কাজে সে খুব দক্ষ। একজন জিনিয়াস। যে-লোক সোনার খনি পেয়ে গেছে, তার কাছে বিক্রি করছে বস্তা ভরা ধুলো।’
‘তা-ই আসলে,’ ঠাণ্ডা গলায় বলল রিটা।
শার্টের আস্তিনে মুখ মুছল ‘সিলভি।
‘সে যা খুশি করলেও তুমি একমাত্র লোক, যে কি না তার ওপরে ভরসা রেখেছিলে,’ বলল রিটা। ‘স্টিল কিন্তু তোমার কথা মন দিয়ে শোনে। মেনেও নেয় অনেক কিছু।’
‘আমার তা মনে হয় না।’ মাথা নাড়ল সিলভি।
‘সিলভি, যেভাবে হোক বন্ধ করো এই ভয়াবহ শো।’
মেয়েটা যে সঠিক কথাই বলছে, তাতে সন্দেহ নেই। স্টিলের মোকাবিলা করার জন্যে নিজেদের ভেতরে আলাপ শুরু করল সিলভি ও রিটা।
.
এদিকে নিজের ব্যক্তিগত তাঁবুতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে স্টিল। গত দু’দিন ধরে নিপাট হয়ে আছে বিছানার চাদর। ডার্টি গেমের শো শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে আর ঘুম হবে না, সেটা বুঝে গেছে সে।
যুদ্ধের ময়দানে জেনারেলের তাঁবুর মত তার এই টেণ্ট। অবশ্য এই তাঁবুতে আছে বিলাসবহুল সবই। চারদিকে দামি আসবাবপত্র। একদিকের দেয়াল ঘেঁষে দুর্মূল্য মদের বার। বহুক্ষণ আগে যে চেয়ারে কুঁকড়ে বসে ছিল রিটা, সেটাতে বসে সামনের ছোট্ট এলইডি স্ক্রিন দেখছে সে। ভাবার সময় যেন মনোযোগ ছুটে না যায়, সেজন্যে নিচু করে রেখেছে ডার্টি গেম শো-র সাউণ্ড। ভাবছে, চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, অথচ মারা গেছে মাত্র পাঁচজন অপরাধী। সুতরাং ওর উচিত এদেরকে লড়াইয়ে উৎসাহ জুগিয়ে দেয়া। নইলে শেষমেশ দেখা যাবে কাউকে বিজয়ী করা যাচ্ছে না। ভালভাবে শো শেষ করতে হলে আগামী ছয় ঘণ্টার ভেতরে মরতে হবে চারজনকে, নইলে দর্শকেরা বলবে তাদের সঙ্গে চিটিংবাজি করেছে ব্র্যাড স্টিল।
এলইডি স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। বেদম মার খেয়ে নেতিয়ে পড়েছে আলকারায। তিক্ত মনে ভাবল স্টিল, তা-ও ভাল যে শো-তে আকর্ষণ করার মত কিছু পাচ্ছে দর্শকেরা। এখন মেক্সিকান ডাকাতকে শেকল দিয়ে পেটাচ্ছে শ্যানন। ধরাশায়ী যুবকের বুক-পেটে লাথি মারছে তানাকা। অডিয়ো অফ করে রেখেছে স্টিল, তাই শুনতে হচ্ছে না আহত লোকটার করুণ আর্তনাদ। অবশ্য দর্শকেরা তো আর কালা নয়, আর্তচিৎকারে কানে তালা লেগে যাওয়ার কথা তাদের।
তাঁবুর ভেতরে রিটা ও সিলভি ঢুকতেই তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাল স্টিল। বুঝে গেল কী ধরনের কথা বলবে এরা। মনস্থির করে নিল সে, কোনভাবেই বিরক্ত হবে না। রিটা ও সিলভির ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আবারও মন দিল স্ক্রিনে।
‘এখানে যা করছ, সেটা চরম অন্যায়,’ জোর দিয়ে বলল রিটা। ‘প্রতিযোগীদের কাউকে কাউকে বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছ। আহত একজনের স্ত্রীকে একটু আগে যারা খুন করল, তাদেরকেই আবার পাঠালে অসহায় লোকটাকে খুন করতে।’
একটু আগে সিলভির কাছে সবই শুনেছে রিটা।
অপরাধীদের প্রায় সবার ওপরে চরম অন্যায় করছে স্টিল।
গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলেও রিটা বুঝে গেল, রেগে গেলে হেরে যেতে হবে ওর। তাই জোর করে নিজেকে শান্ত রাখল। ওকে প্রমাণ করে দিতে হবে, ও অন্য মেয়েদের মত বোকা নয়। চাপের মুখে কখনও দমে যাবে না।
‘তুমি এরই ভেতরে একাধিক বার প্রতিযোগীদের ব্যাপারে নাক গলিয়ে দিয়েছ,’ না চাইলেও চড়ে গেল ওর গলা।
স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বলল স্টিল, ‘আমি যে শো তৈরি করেছি, সেটা এখন দেখছে আটাশ মিলিয়ন দর্শক। অথচ কোন নেটওঅর্ক আমার কাছ থেকে চার আনা পয়সা নিতে পারছে না।’
হতবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল রিটা ও সিলভি। তারা এতদিন যাকে চিনত, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সে। যাকে দেখছে, সে ভীষণ নীচ এক নিষ্ঠুর মেগালোম্যানিয়াক।
স্টিল আর তার স্ক্রিনের মাঝে এসে থামল সিলভারম্যান। ভীষণ বিষণ্ন তার চেহারা। সরাসরি তাকাল বন্ধুর চোখে। ‘ব্র্যাড, আমি এই চাপ আর নিতে পারছি না। আগেই জানতাম দ্বীপে কী ঘটবে। কিন্তু তখন বুঝিনি আমরা কতটা বাড়াবাড়ি করে বসব।’
গম্ভীর চোখে বন্ধুকে দেখল স্টিল।
যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মত দেখাচ্ছে সিলভিকে। এখনও তাকে বিশ্বস্ত বন্ধু বলেই মনে হলো স্টিলের। হয়তো ঘুম দিয়ে উঠলে সবকিছু অন্য চোখে দেখবে সে।
‘ঠিক আছে, আমি তোমাদের কথা বুঝতে পেরেছি,’ বলল স্টিল। ‘সত্যি বেশ কিছু দৃশ্য ছিল খুব ভয়ঙ্কর। আর সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু দুনিয়ার যে-কোন উপন্যাসে এভাবে আঁকা হয়েছে নানান ধরনের চরিত্র। নাটকীয়তা তৈরির জন্যে এর দরকার আছে। এতে পাঠক বা দর্শকেরা সহজে বোঝে কারা ভাল আর কারা খারাপ।’
স্টিলের কথা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে সিলভারম্যানের। ‘ব্র্যাড, আমরা কিন্তু এখানে কোন টেলিপ্পে লিখছি না। চোখের সামনে দেখছি করুণভাবে মরছে মানুষ। আর সেসব দৃশ্য দেখে খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে আমার।’
রাগে লালচে হলো স্টিলের মুখ। এদের কথা শুনে ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে তার পক্ষে। চাপা স্বরে বলল, ‘বলো তো, সিলভি, দুনিয়ায় আসলে কি সত্যিকারের কিছু আছে? মুভি, নাটক, ম্যাগাযিন, দৈনিক পত্রিকা-সবই তো কোটি মানুষকে ঠকিয়ে পয়সা রোজগারের ফন্দি। দুনিয়ায় তা হলে আসল মজা মানুষ পাবে কোথায়?’
সিলভারম্যানের কণ্ঠে চরম হতাশা প্রকাশ পেল, ‘তুমি যা করছ, সেটাকে কি ফূর্তির কোন অনুষ্ঠান বলে ভাবছ? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে, ব্র্যাড?’
তার দিকে চেয়ে হো-হো করে হেসে ফেলতে ইচ্ছে হলো স্টিলের। ডার্টি গেম শো আর হজম করতে পারছে না সিলভি। ‘সিএনএন, এবিসি, এমটিভি-এরা কিন্তু মানুষের মনরক্ষা করে লুটপাট করেছে তাদের পকেট। বিনোদনের জগৎটা এমনই।’ কাঁধ ঝাঁকাল স্টিল। ‘তাদের প্রডাক্টে সত্যিকারের কিছুই নেই। তোমার তো এতদিনে সেটা বুঝে নেয়ার কথা।’
স্টিলকে এখন বদ্ধ এক উন্মাদ বলে মনে হচ্ছে রিটা ও সিলভির। ওদের চোখে চরম অপছন্দের ছাপ। আর সেটা বুঝে আরও রেগে গেল স্টিল। তার মন চাইল লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিলভির গালে কষে চড় দিতে। বদমাশটা আবার ওরই প্রেমিকাকে জুটিয়ে এনে তর্ক জুড়েছে! দুই গাধা-গাধী জানেও না, কতবড় শো তৈরি করে দুনিয়ার বুকে বিশাল এক ইতিহাস গড়ে তুলেছে সে!
‘তোমরা যাই করো, সবসময় মনে রেখো, জীবন কিন্তু মাত্র একটা,’ নিচু গলায় বলল স্টিল। ‘আর আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে ওটা। এই দ্বীপে যা ঘটছে, তার সম্পূর্ণ দায় স্রষ্টার। আর এ-ও ভেবে দেখো, আমরা কিন্তু মেরে ফেলতে পারলেও এই দশজনের একজনকে বাঁচিয়ে দিচ্ছি।’
‘আর সেজন্যে অন্যদেরকে এভাবে নির্যাতন করতে হবে?’ প্রতিবাদের সুরে বলল রিটা।
‘মস্তবড় কোন বিপদ হওয়ার আগেই এখনই এই শো বন্ধ করো,’ জোর দিয়ে বলল সিলভি।
ডানহাতের তর্জনী স্ক্রিনে তাক করল স্টিল। ‘তোমাদের কি মনে হয় গুয়াতেমালায় ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে মরতে পারলে তাতে খুব খুশি হতো মেক্সিকান ডাকাত?’
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত লাগছে সিলভির। জোর করে তাকাল স্ক্রিনের দিকে। লোডিং ডকের মেঝেতে কুঁকড়ে পড়ে আছে আলকারায। করুণ সুরে দয়া-প্রার্থনা করছে। ধুপধাপ সব লাথি আর ঘুষি পড়ছে তার বুক ও মুখে।
‘আমার তা-ই ধারণা,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল সিলভারম্যান।
অর্থাৎ, সিলভি এখন আর একই দলে নেই, বুঝে গেল স্টিল। প্রচণ্ড রাগের বিস্ফোরণ হলো তার মগজে। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। দেহের পাশে মুঠো হয়ে গেছে দু’হাত। দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল, রুপার্ট শ্যানন যা করছে আলকারাযের ওপরে, সিলভিকে ওভাবে শাস্তি দিতে পারলে ভাল লাগত তার।
‘অকৃতজ্ঞ শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার!’ গর্জে উঠল স্টিল। ‘আমি তোকে দুই পয়সার টেকনিশিয়ান থেকে কোটি টাকার মালিক করে দিয়েছি! আর তুই এখন খুঁত বের করছিস. আমার শো-র? আমি সাহায্য না করলে বস্তিতে পচে মরতি! এতকিছু করে বদলে শুধু চেয়েছি সামান্য আনুগত্য, সেটাও দেখাতে পারলি না! আমার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছিস আমারই প্রেমিকার সঙ্গে! তোর মত অকৃতজ্ঞ আমি আর কাউকে দেখিনি!’
স্টিলের বরফ-শীতল দৃষ্টি দেখে এক পা পিছিয়ে গেছে রিটা।
প্রচণ্ড রাগে স্টিলের বুকের ভেতরে গর্জে উঠছে অচেনা এক হিংস্র পশু। অবশ্য সিলভি বা রিটার গায়ে হাত তুলবে, সে-সময়টা পেরিয়ে গেছে। চাপা স্বরে বলল স্টিল, ‘তোমরা ভাল করেই জানো, ষড়যন্ত্র করলে কী ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে তোমাদের। আমি আর কোন তর্কে যাব না।’
সিলভারম্যানের নাকের কাছে নিজের নাক নিল স্টিল। হিসহিস করে বলল, ‘এখনই ঠিক করো কোন্ পক্ষে থাকবে। হয় আমার পক্ষে, নইলে শো শেষ হলে তোমাকে পাঠিয়ে দেব এই দ্বীপ থেকে মেইন ল্যাণ্ডে। সেক্ষেত্রে তোমার সঙ্গে শেষ হবে আমার সব সম্পর্ক। আর তুমি যদি আমার হয়ে কাজ করো, কেইম্যান আইল্যাণ্ডে তোমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে লাখ লাখ ডলার। এটা ভুলে যেয়ো না, এই শো-র মুনাফা তোমাকে দেব বলেছি। কী করবে সেটা ভাল করে ভেবে দেখো।’
বন্ধুর সঙ্গে বেইমানি করার ইচ্ছে সিলভারম্যানের নেই। নৈতিকতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে চেয়েছিল বন্ধুকে এসব থেকে সরিয়ে নিতে, নইলে ভবিষ্যতে মস্ত বিপদে পড়বে সে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে সরে যাবে না ব্র্যাড। সিলভির মনে পড়ল, আগেও নানান বিপদে পিছিয়ে যায়নি ওর বন্ধু। আর আজ হুমকি দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে কিছু করলে তার ফলাফল হবে খুব খারাপ। নিজেও সিলভারম্যান কখনও কোন দায়িত্বে অবহেলা করে না। যারা নিজের কাজ ফেলে পালিয়ে যেতে চায়, তাদেরকে ঘৃণা করে সে। তা ছাড়া, যারা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে অভ্যস্ত, তাদের বদনাম হয়ে যায় ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রিতে।
না, সিলভি আর যাই হোক, বেইমান নয়। বিশেষ করে গোটা ব্যাপারটাতে যখন জড়িয়ে গেছে তার বন্ধু।
ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা যাবে বলে লোভ দেখাচ্ছে স্টিল, তবে সেটা আসলে কিছুই নয়। টাকার জন্যে স্টিলের কথা মেনে আত্মাটাকে বিক্রি করতে আপত্তি আছে সিলভির। কী করবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে সে। বুঝতে পারছে জবাবটা তাকে এখনই জানাতে হবে।
‘তোমার বক্তব্য আমাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও,’ পাঁচ সেকেণ্ড বিরতির পর জানতে চাইল স্টিল।
‘এই শো ঠিকই শেষ করব আমি,’ বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সিলভি।
হতাশা নিয়ে ওকে দেখছে রিটা। ‘কিন্তু, সিলভি, কারও কথায় যা খুশি করলে…
তর্ক এড়াতে গিয়ে বলল সিলভারম্যান, ‘আমি পরে এ- ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’ একবার রিটাকে দেখে নিয়ে তাঁবুর দরজার দিকে চলল সে। ‘আমি স্ক্রিনগুলো দেখতে গেলাম।’.
সিলভি বেরিয়ে যেতেই সামনে বেড়ে রিটার গালে কষে চড় দিল স্টিল। তাতে টু-টু বোর রাইফেলের গুলি বেরোবার মত আওয়াজ হলো। এত জোরে মেরেছে যে হাতটা ছুটে আসতে দেখেনি রিটা। ঝিমঝিম করে উঠেছে ওর মাথা। যেন আগুন ধরে গেছে গালে। জীবনে প্রথমবারের মত কেউ হাত তুলেছে ওর গায়ে। এখন কী করবে ভেবে পেল না রিটা।
‘তোমার বোধহয় আক্কেল নেই যে গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে যা খুশি করে বেড়াচ্ছ?’ ছোট বাচ্চাকে শাসনের সুরে বলল স্টিল। ‘যা খুশি করবে সেটা এই দ্বীপে চলবে না। কী করতে পারবে তুমি? কীভাবে বাঁচাবে এসব খুনিদেরকে? কী লাভ হতো মেক্সিকান এক পতিতাকে বাঁচিয়ে দিলে?’
কড়া কথাগুলো শুনে দরদর করে রিটার চোখ বেয়ে গালে নেমে এল অশ্রু। ফিসফিস করে বলল ও, ‘আমি শুধু তোমাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে চেয়েছি।’ ঘুরে একছুটে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল ও।
রাগ ঝেড়ে এখন ভাল লাগছে স্টিলের। আবারও চেয়ারে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নতুন করে আবারও দারুণ জমে গেছে ডার্টি গেমের শো।
চব্বিশ
রিভ সিম্পসন ও তার খুনিরা গুলি করে গেঁথে ফেলার আগেই গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে মাসুদ রানা। বুঝে গেছে, এখন আর ওর পিছু নিতে পারবে না তারা। স্টিল আর তার দলের চাই অপরাধীদের ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের ভিডিয়ো। তাই সিম্পসন ওকে খুন করবে সেটা চাইবে না তারা। রানা নতুন করে ডার্টি গেমে যোগ দেয়ায় পূরণ হয়েছে তাদের উদ্দেশ্য।
সামনে-পেছনে ও ডানে-বামে চোখ রেখে ফিরতি পথে চলল ও। ওয়েদার টাওয়ারে গোলমাল হওয়ার আগে ভেবেছে, যদি কোনভাবে ব্র্যাড স্টিলকে জিম্মি করতে পারত, সেক্ষেত্রে তাকে বন্দি করে ডিফিউয করিয়ে নিত ব্রেসলেটের বোমা। কিন্তু এখন আর লোকটাকে কিডন্যাপ করার কোন সুযোগ নেই। বাড়তি সুবিধা বলতে এখন আছে শুধু একটা বিষয়-টেকনিশিয়ানদের গ্রিড থেকে উধাও হয়েছে ও। কিন্তু একটু পর উবে যাবে এই সুযোগটাও। সূর্য উঠলে জঙ্গল- পাহাড়-সাগর আর সৈকতের যেখানেই থাকুক রানা, ধরা পড়বে ক্যামেরাগুলোর কোন না কোনটায়। তা ছাড়া, গ্রামে হাজির হয়েছিল বলে আগের চেয়ে সতর্ক হয়ে গেছে সিম্পসনের লোকেরা। সুতরাং বাধ্য না হলে ওদিকে আর না যাওয়াই ভাল। স্টিলের হাতের পুতুল হতে চরম আপত্তি আছে রানার। ভাবছে, নিশ্চয়ই কোন না কোন উপায় আছে অপরাধীদেরকে খুন না করে নিজেকে মুক্ত করে নেয়ার।
মিনিট দশেক পর পৌঁছে গেল জাপানি কমাণ্ড পোস্টের কাছে। আর তখনই শুনতে পেল আলকারাযের চাপা গোঙানি। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করছে কেউ। জঙ্গলে তীরবেগে ছুটে সেতুর কাছে হাজির হলো রানা। ঝোপ থেকে বেরিয়ে পুব দিগন্তে ডিম পোচের মত লালচে সূর্যের কচি আলোয় দেখতে পেল লোডিং ডক।
ফুলে অদৃশ্য হয়ে গেছে আলকারাযের নাক-মুখ ও দুই চোখ। রক্তে মাখা সারাদেহ কাঁচা লালচে মাংসের মত। পালা করে ওকে পেটাচ্ছে শ্যানন ও তানাকা।
ইংরেজ পিশাচের ঠোঁটে এখন জ্বলছে পুরু চুরুট।
‘ওকে ছেড়ে দাও!’ চিৎকার করে বলল রানা।
আলকারাযের ওপর থেকে চোখ তুলে সরাসরি ওকে দেখল শ্যানন আর তানাকা। কিছু দেখা বা শোনার পর্যায়ে নেই প্রায় অচেতন আলকারায।
‘আরে, তুমি আবার কোথা থেকে এলে, দোস্ত!’ খ্যাকখ্যাক করে হাসল শ্যানন।
‘এবার ওকে ছেড়ে দাও, ওর যথেষ্ট শাস্তি হয়ে গেছে, বলল রানা।
‘এটা আবার কী বলো! আমরা তো এখনও শুরুই করিনি!’ ঘুরে পা তুলে আলকারাযকে লাথি দিতে তানাকাকে ইশারা করল শ্যানন। ‘শালাকে আরও জোরে লাথি মারো!’
আলকারাযের বুকে প্রচণ্ড এক লাথি বসাল তানাকা। চাপা গোঙানি বেরোল মৃতপ্রায় যুবকের গলা থেকে। ক্রমেই মৃত্যুর কালো গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে সে।
তূণ থেকে তীর নিল শ্যানন। ‘বলো তো, রানা, তুমি যেখানে আছ, তোমার বুকে তীর গেঁথে দিতে পারব না?’
রানাকে সাহায্য করবে বলে উঠে বসতে চাইল আলকারায। চোখে কিছুই দেখছে না। কুঠারে কাটা কলাগাছের মত টলে পড়ে গেল ডকের মেঝেতে।
‘শালার পো শালা, পারলি না তো বসতে!’ ধনুকে তীর জুড়ল শ্যানন। এত কাছ থেকে অনায়াসে ফুটো করতে পারবে আলকারাযের বুক।
সেতুর ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে অসহায় রানা।
ছিলা কানের কাছে টেনে তীর ছেড়ে দিল শ্যানন। স্যাৎ করে আলকারাযের হৃৎপিণ্ডে ঢুকল গ্রাফাইটের তীর।
মাত্র তিন সেকেণ্ড থরথর করে কাঁপল যুবকের দেহ, তারপর নিথর হয়ে গেল চিরতরে।
‘কিছু বুঝলে?’ রানার উদ্দেশে বলল শ্যানন।
শীতল চোখে তাকে দেখছে রানা। অন্তরের গভীরে বুঝে গেল, প্রতিযোগিতায় জিততে গিয়ে কাউকে খুন করতে হলে হাসতে হাসতে খতম করতে পারবে শ্যানন আর তানাকাকে। আসলেই দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই এই দুই দানবের।
‘আমি ব্রিটিশ মিলিটারির এসএএস ফোর্স থেকে ট্ৰেইণ্ড,’ নিজের বুকে বুড়ো আঙুল ঠেকাল শ্যানন। ‘জানি যে তুমিও মিলিটারিতেই ছিলে। তোমার আর আমার ভেতরে অনেক মিল।’
সেতুর ওদিক থেকে তার চোখে চেয়ে আছে রানা। চাপা স্বরে বলল, ‘মস্তবড় ভুল বললে। তোমার আর আমার মধ্যে কোন মিল নেই। আমি সাধারণ মানুষ আর তুমি সত্যিকারের এক রক্তপিশাচ।’
রানার সঙ্গে দোস্তি হবে না বুঝে গেছে শ্যানন। বাঁকা হাসল সে। ‘আমাকে খুব হতাশ করলি তুই। তোর মন আসলে কাদার মত নরম। আর আমি তার ঠিক উল্টো- গ্র্যানিট পাথর দিয়ে তৈরি।’ সাপ্লাই ব্যাগের দিকে আঙুল তাক করল প্রাক্তন ব্রিটিশ মেজর। ‘তানাকা, ক্যান থেকে অকটেন ঢালো লাশের ওপরে।’
ক্যান থেকে আলকারাযের দেহে দাহ্য তেল ঢেলে দিল তানাকা। সে সরে যেতেই মৃতদেহের বুকে জ্বলন্ত চুরুট ফেলল শ্যানন। অকটেনে ভেজা লাশে দপ্ করে জ্বলে উঠল নীলচে আগুন। চিড়বিড় শব্দে পুড়তে শুরু করেছে ত্বক, চর্বি ও মাংস। চারপাশে ছড়িয়ে গেল বিশ্রী দুর্গন্ধ। আকর্ণ হাসি ‘নিয়ে রানাকে দেখল শ্যানন।
‘তুই আসলে বের হয়েছিলি তোর বাবার পেছনদিক দিয়ে,’ গিরিখাদে গমগম করে উঠল রানার কণ্ঠ। সম্ভব হলে সেতুর মাঝের শূন্য জায়গাটা পেরিয়ে দু’হাতে ফেড়ে দিত হারামি দুই ইবলিশের বুক!
রানা খুঁচিয়ে দিয়েছে ইংরেজ সাইকোকে। ওর ধারণা, এর ফলে রেগে গিয়ে অযৌক্তিক আচরণ করবে সে। তৃণ থেকে আরেকটা তীর নিয়ে ধনুকে জুড়ল শ্যানন। রানার বুক লক্ষ্য করে ধনুক তাক করে একটানে কানের কাছে নিল ছিলা। যে-কোন সময় তীর ছুঁড়বে সে।
সরাসরি শ্যাননের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে দুঃসাহসী রানা।
‘মর্ তুই, কুত্তার বাচ্চা!’ তিন আঙুলে ধরা ছিলা ছেড়ে দিল সাইকো। বাতাসে শিস তুলে সেতুর দিকে ছুটল তীর।
রানা কোনদিকে সরে যাওয়ার আগেই স্যাৎ করে ওর মাথার তিন ইঞ্চি দূরে পচা কাঠের বিমে গাঁথল গ্রাফাইটের তীক্ষ্ণধার ফলা। মনে মনে নিজেকে বলল রানা, ‘শুরু হয়েছে মরণখেলা!’
একলাফে সেতু থেকে নেমে ঘন জঙ্গলে হারিয়ে গেল ও।
.
এফবিআই ভবনের লবিতে অনুগত ভৃত্যের মত ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ডোমেনিক উসবাটিকে পথ দেখাচ্ছে এফবিআই ডেপুটি ডিরেক্টর রবার্ট রাইডার। চেহারায় বিনয়ের ছাপ।
‘আশা করি বিষয়টা আপনি বুঝতে পেরেছেন,’ সতর্ক করার সুরে বললেন ডোমেনিক উসবার্টি। ‘আপনার স্পেশাল এজেন্টকে অন্য কোন কাজ দিন।’
‘তা তো অবশ্যই,’ উসবার্টির জন্যে সামনের দরজা খুলে দিল রাইডার। অতিথিকে বিদায় দেয়ার আগেই লবিতে দেখতে পেল এডওয়ার্ড সিমন্সকে। দ্রুত তাদের দিকেই আসছে স্পেশাল এজেন্ট, হাতে একটুকরো কাগজ। খারাপ কিছু শুনতে হবে ভেবে ভুরু কুঁচকে গেল রাইডারের।
তাদের সামনে এসে থামল সিমন্স। ‘একটা জরুরি খবর পেলাম। বিসিআই-এ যোগাযোগ করে কোঅর্ডিনেট্স্ দিয়েছে মাসুদ রানা।’
দরজা পার হতে গিয়েও থমকে গেছেন উসবার্টি। তাঁর দিকে চেয়ে কালচে হয়ে গেল রাইডারের মুখ।
‘ওটা আংশিক হলেও দ্বীপটা সপ্তম ও অষ্টম প্যারালালের মাঝে। এই যে সংখ্যাগুলো।’ হাতের কাগজ সামনে বাড়িয়ে দিল সিমন্স। এখনও নিশ্চিত নয় যে উসবার্টি না রাইডার ওটা আগে হাতে নেবেন।
যেহেতু ডিআইএ চাইছে মাসুদ রানার ব্যাপারে সব চেপে যেতে, তাই এই কাগজের তথ্য পড়লে হয়তো নানান বিপদে পড়বে—তাই ওটার দিকে বিষ-দৃষ্টিতে তাকাল রাইডার।
এডওয়ার্ড সিমন্স বুঝে গেছে, ওর কাছ থেকে কাগজ নেবে না রাইডার, তাই জিজ্ঞেস করল সে, ‘এবার তা হলে বলুন এ-ব্যাপারে আমরা কী করব।’
থমথমে নীরবতা নামল লবির দরজার কাছে।
কাগজ নিতে রাইডার ও উসবার্টির অনিচ্ছা আছে দেখে রেগে গেল সিমন্স। ‘তা হলে কি আমরা চুপ করে বসে থাকব?’
‘এটা এমন এক বিষয়, যা নিয়ে আলাপ না করাই ভাল, সিমন্স,’ একবার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর উসবার্টিকে দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল রাইডার।
তাকে উপেক্ষা করে ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের দিকে তাকাল সিমন্স। ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন সেই দ্বীপে কী ঘটছে? যেভাবে হোক এই বেআইনী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত। দোষ না করে এল সালভেদরের জেলখানায় তিন মাসের বেশি বন্দি ছিল মাসুদ রানা। আর সেটা তার করতে হয়েছে, কারণ কথা দিয়েও তাকে সাহায্য করেনি ডিআইএ চিফ। আমরা এ-ও জানি, আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন তথ্য ফাঁস করেনি সে। নিজের দেশ আর এই দেশের জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। সুতরাং দুর্নীতিপরায়ণ আমলার মত রুমাল দিয়ে মুখ মুছে নেবেন না।’
‘সিমন্স…’ নিচু গলায় সতর্ক করতে চাইল রাইডার।
‘বলুন তো আপনাদের এত ভয় কিসের?’
ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে থাকল রাইডার।
নিজেও মুখ খুলছেন না উসবার্টি।
হাত তুলে বিশাল দালান দেখাল সিমন্স। ‘বলুন তো, এই দালান আমেরিকার সরকার কেন তৈরি করেছে? অন্যায় চেপে রাখার জন্যে?’
ভয়ে উসবার্টির দিকে তাকাতে পারছে না রাইডার। কিন্তু তার দিকেই চেয়ে আছেন ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। এফবিআই স্পেশাল এজেন্টের সাহস দেখে বিস্মিত হয়ে গেছেন। ভাবতে পারেননি বসের মুখের ওপরে এসব বলবে যুবক। আরও একটা বিষয় উসবার্টি বুঝেছেন, দায়িত্ব পালন করার চেয়ে নিজের পদটাকে অনেক ভালবাসে কাপুরুষ রাইডার।
এক পা সামনে বেড়ে সিমন্সের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে ওটার ওপরে চোখ বোলালেন ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর উসবার্টি। এই তথ্য অনুযায়ী খোঁজ নিলে হয়তো তাঁর চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে। তবুও সহজ সুরে বললেন তিনি, ‘বেশ, নেভিকে জানাব তারা যেন তাদের জেট ফাইটার দিয়ে এই কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী খোঁজ নেয়।’
উসবার্টি এফবিআই লবি থেকে বেরিয়ে যেতেই সন্তুষ্ট হয়ে মাথা দোলাল স্পেশাল এজেন্ট সিমন্স। নিজের অফিসের দিকে রওনা হয়েছে রাইডার। তার পিছু নিল সে।
রাগে গা জ্বলছে রাইডারের। মন চাইছে সিমন্সের চাকরি খেয়ে নিতে। কিন্তু নিজেকে সামলে রাখল সে। কোন কারণ ছাড়া চাকরি থেকে কাউকে অব্যাহতি দিলে সেটার পক্ষে জরুরি ব্যাখ্যা চাই। অথচ তেমন কিছু তার কাছে নেই।
তা ছাড়া চাকরি নিয়ে সমস্যা হলে নিজেও চুপ থাকবে না সিমন্স। অভিযোগের আঙুল তুলবে রাইডারের দিকে। তাতে চাকরি নিয়ে সমস্যা হবে তার। সারাদিনের ঘটনায় এমনিতেই প্রচণ্ড মাথা-ব্যথা শুরু হয়েছে রাইডারের, তাই কথা না বাড়িয়ে প্রায় টলতে টলতে গিয়ে ঢুকল নিজের অফিসে।
.
বিসিআই হেডকোয়ার্টার, মতিঝিল।
থমথম করছে কমপিউটার ডিপার্টমেন্টের বিশাল ঘর। যে-যার মত চুপ করে চেয়ারে বসে আছে বিসিআই এজেন্টরা। সবার মনোযোগ বিশাল এলইডি স্ক্রিনের ওপরে।
দক্ষিণ সাগরের অপূর্ব সুন্দর দ্বীপটিতে ধীরে ধীরে আসছে লালচে ভোর। জঙ্গলে শুরু হয়েছে হাজারো পাখির কাকলি। ক্যামেরার দৃশ্য বদলে যেতেই দেখা গেল পিটিয়ে প্রায় মেরে ফেলা হয়েছে বাদামি এক লোককে। আর এই কুকীর্তি করেছে রুপার্ট শ্যানন নামের এক শ্বেতাঙ্গ এবং কাইতো তানাকা নামের এক জাপানি অপরাধী।
কাঠের এক সেতুর ওপরে প্রিয় গুরুকে দেখে বলে উঠল রায়হান রশিদ, ‘ওই যে মাসুদ ভাই!’
মুখ শুকিয়ে গেছে সোহানার।
সোহেল, সলীল ও জাহেদ চট করে একবার দেখল ওকে। সান্ত্বনা দেয়ার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না ওরা।
এইমাত্র মেক্সিকান আহত লোকটার বুকে তীর গেঁথে দিল রুপার্ট শ্যানন। কয়েকবার নড়ে উঠে স্থির হলো দেহটা।
‘অমানুষিক একটা শো,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল সোহেল।
অকটেন ঢেলে আগুন দেয়া হলো আলকারাযের শরীরে। পোড়া লাশ দেখবে না বলে মুখ সরিয়ে নেবে সোহানা, এমন সময় আবারও দেখতে পেল রানাকে।
সেতুর ওপরে দৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রানা, চোখে- মুখে একফোঁটা ভয় নেই। কী যেন কথা হলো ওর সঙ্গে রুপার্ট শ্যাননের। তারপর ধনুকে তীর জুড়ল লোকটা। ছিলা টেনে নিল কানের কাছে। পরক্ষণে ছুঁড়ল তীর। রানার কানের পাশে পচা কাঠের বিমে বিধে গেল তীক্ষ্ণধার ফলা।
এতক্ষণ আটকে রাখা দম ফোঁস করে ফেলল সোহানা। অস্ফুট স্বরে বলল, ‘প্লিয, রানা, নিজের খেয়াল রেখো!’
যেন ওর কথা শুনেই সেতু থেকে নেমে জঙ্গলে হারিয়ে গেল বিসিআই-এর সেরা এজেন্ট।
পঁচিশ
ভোরের নরম আলো পড়েছে জাপানি কমাণ্ড পোস্টের ওপরে। দামি রে-ব্যান সানগ্লাস পরে ডকের ওপরে পায়চারি করছে কাইতো তানাকা। অধৈর্য হয়ে দু’হাতে ঘোরাচ্ছে বোলো নাইফ। আলকারাযের কয়লা হওয়া দেহের সামনে গিয়ে থামল সে। এখনও সামান্য ধোঁয়া উঠছে দেহভস্ম থেকে। যে-কোন সময়ে মাসুদ রানা হামলা করবে ভেবে চারপাশে চোখ রেখেছে জাপানি খুনি। তার ধারণা, হাসতে হাসতে বাঙালি লোকটাকে লড়াইয়ে হারিয়ে দিতে পারবে সে।
ধনুক আর তীরে ভরা তৃণ নিয়ে কমাণ্ড পোস্টের ছাতে গিয়ে উঠেছে রুপার্ট শ্যানন। তারও চোখ চারদিকে। ছাত থেকে নিচের দিকে চেয়ে নিজেকে দ্বীপের রাজা মনে হচ্ছে তার। ভাবছে, কমাণ্ড পোস্ট আসলে রাজ-সিংহাসনের মত। কিন্তু তার রাজ্যে গোপনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর এক লোক-নাম তার মাসুদ রানা। কোনভাবেই বাঁচতে দেয়া যাবে না তাকে। লোকটাকে কী কায়দায় খুন করবে সেটা ভাবতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠছে শ্যানন। হারামজাদা বাঙালি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে তার দিকে। তাতে অবশ্য কোন সমস্যা নেই। চিরকালই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ভালবাসে শ্যানন। এই দ্বীপে এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে লড়াই করেছে, সবাই ছিল মাছির মত ফালতু। এখন আশা করছে মাসুদ রানার কারণে অন্য পর্যায়ে চলে যাবে এরপরের লড়াইটা।
কমাণ্ড পোস্টের ছাত থেকে নিচে চেয়ে তানাকাকে দেখতে পেল শ্যানন। জাপানি যুবক আকারে তার অর্ধেক হলেও সত্যিকারের এক লড়াকু যোদ্ধা। তাকে বলা চলে এই দ্বীপের রাজার একমাত্র বিশ্বস্ত সেনাপতি। কিন্তু অন্য সবাই খুন হলে তানাকার জন্যে তখন একটা তীর’ খরচ করবে শ্যানন। এ-ছাড়া আসলে কোন উপায়ও নেই।
‘আশপাশে এখন না থাকলেও হারামজাদা আবারও হাজির হবে,’ ছাত থেকে জানাল শ্যানন, ‘তানাকা, তুমি কি ওকে নিজের হাতে খতম করতে চাও, নাকি আমার জন্যে রাখবে?’
ইংরেজি ভাল করেই বোঝে তানাকা। তবে মুখে কিছু না বলে বোলো ছুরি ঘুরিয়ে ক’বার বাতাস চিরে দিল সে। সামনে পেলে ফালি ফালি করে দেবে মাসুদ রানাকে।
‘আমিও তা-ই ভেবেছি,’ দাঁত বিকশিত হাসি দিল সাইকো শ্যানন।
.
ফিরতি পথ ধরে গিরিখাদের নিচের দিকে নেমে চলেছে রানা। এখন মাথার ওপরে কাঠের ভাঙা সেতু। শুকনো এক গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে নদী তীরে দুটো পাথরের মাঝে বারবার ঘষে চোখা করে নিয়েছে ওটার একমাথা। লাঠিটা দেখতে হয়েছে ছয় ফুটি কাঠের বর্শার মত। ওর ধারণা গ্রাম থেকে পিছু নেয়নি কেউ, তবুও পায়ের চিহ্ন আড়াল করতে অগভীর নদী পেরিয়ে গেল রানা।
ওর ভুল না হলে বোমা বিস্ফোরণে যারা মারা গেছে, আর মৃত আলকারাযকে হিসেবে নিলে দ্বীপে প্রতিযোগী আছে সবমিলিয়ে বড়জোর চার বা পাঁচজন।
সবচেয়ে সহজে শত্রুকে নিকেশ করতে হলে বুদ্ধিমানের কাজ হবে লাল ট্যাব ধরে টান দেয়া। মরার আগে আরেকটু হলে ওর লাল ট্যাব টেনে বের করত রাশান দৈত্য। আবারও কাউকে এ-সুযোগ দিতে চাইছে না রানা। ভাবছে, জিপিএস সিগনাল যেভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছে, শত্রুর কাছ থেকে সেভাবেই নিরাপদ রাখবে গোড়ালির ব্রেসলেটের লাল ট্যাব।
নদীর উজানে হেঁটে সেতুর কংক্রিটের ভিত্তির দিকে এগিয়ে গেল রানা। ভাঙা ব্রিজের মাঝে বিশাল সিমেন্টের স্তম্ভের ওপরে একসময় ছিল কাঠের বিম। কিন্তু বোমার আঘাতে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে ওটা। শক্তিশালী বিস্ফোরণে স্তম্ভের এখানে-ওখানে খসে গেছে চাপড়া চাপড়া সিমেন্ট। সেখানে বেরিয়ে এসেছে জং-ধরা লোহার রডের কঙ্কাল।
রাতে হেলিকপ্টারটা তীরধনুক, দাহ্য তেল ও ছোরা পৌঁছে দিয়েছে শ্যাননের হাতে। তাতে রানা বুঝে গেছে প্রতিযোগীদের কাউকে কাউকে বিশেষ সুবিধে দিচ্ছে ব্র্যাড স্টিল। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জীবনে থাকে অন্যায্য সব ঘটনা। কেউ পাবে তো কেউ পাবে না। সুতরাং এটা নিয়ে আর ভাবছে না রানা।
মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে সামনের লড়াইয়ের জন্যে। খপ্ করে একটা রড ধরে একদিকে ঠেলে দিল ও। পরক্ষণে নিল অন্যদিকে। বারবার এদিক-ওদিকে নেয়ায় একমিনিটের ভেতরে ভেঙে গেল রড। পরের পনেরোটা ভাঙতে লাগল দশ মিনিট। প্রতি রডের দৈর্ঘ্য বড়জোর একফুট। ওগুলো মাটিতে রেখে ওয়েদার টাওয়ার থেকে সংগ্রহ করা ডাক্ট টেপ বের করল রানা। কিছুক্ষণের মধ্যে কনুই থেকে কবজি আর হাঁটু থেকে গোড়ালিতে ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকে নিল রড। আশা করছে এই বর্মের জন্যে তীর মেরে সহজে ওকে খুন করতে পারবে না শ্যানন।
এবার নামল পরের কাজে। গোড়ালির বোমা ও লাল ট্যাব ভাল মত টেপ দিয়ে মুড়িয়ে নিল। এখন চট্ করে লাল ট্যাব টান দিয়ে খুলে নিতে পারবে না কেউ। এমনভাবে টেপ আটকে নিয়েছে, যাতে পরিষ্কার দেখা যায় টাইমার।
এখন ঘড়িতে বাজে ০৪:৪৩:২৫।
রানার মনে হলো না এখনও জাপানি কমাণ্ড পোস্টে রয়ে গেছে শ্যানন আর তানাকা। তবে তাদের পিছু নিতে হলে ওটা হবে সেরা জায়গা।
কথাটা মাত্র ভেবেছে রানা, এমন সময় মাথার ওপরে সেতুর পাটাতনে শুনতে পেল পদশব্দ। দেরি না করে চট্ করে কংক্রিটের পিলারের ওদিকে সরে গেল ও। ভাঙা বিমের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তানাকাকে। দু’হাতে বোলো নাইফ ঘোরাচ্ছে সে। রানার বুঝতে অসুবিধে হলো না, এই ব্যাটা যখন এখানে রয়ে গেছে, তো খুব কাছেই কোথাও আছে শ্যানন।
দুই খুনি ভাবছে তাদেরকে মোকাবিলা করতে আবারও হাজির হবে রানা। আর এর আরেক অর্থ হচ্ছে: কষ্ট করে এদেরকে অনুসরণ করতে হবে না ওর। তানাকার আচরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে কোন ধরনের দুশ্চিন্তায় নেই, সঙ্গীর মতই আত্মবিশ্বাসী সে।
দ্রুত নিজের পরিকল্পনা গুছিয়ে নিল রানা।
.
সেতুর ওপরে অধৈর্য হয়ে উঠছে জাপানি খুনি। ভাবছে, বাঙালি লোকটা হাজির হলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে খতম করে দেবে। এরপর প্রথম সুযোগে দুনিয়া থেকে বিদায় করবে রুপার্ট শ্যাননকে। যাই ভাবুক, ইংরেজ সাইকোপ্যাথ আসলে দলনেতা নয়। সঠিক সময়ে তার ভুল ভাঙিয়ে দেবে কুং-ফু মাস্টার। বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজ গুনে সে জানে, রানাকে খুন করার পর শুধু শ্যানন আর বড়জোর একজনকে খতম করে দিতে হবে। অথবা হয়তো এরই ভেতরে লোকটা বা মেয়েটা মারা গেছে। সেক্ষেত্রে শ্যাননকে পৃথিবী থেকে সরালে হিসাব অনুযায়ী দশজনের মধ্যে শুধু বেঁচে থাকবে সে। অর্থাৎ, তখন ডার্টি গেমের বিজয়ী বলে তাকেই ঘোষণা দেবে ব্র্যাড স্টিল। শ্যানন নিশ্চয়ই ভাবছে, রানাকে খুন করে তারপর মুখোমুখি হবে তানাকার। ধরে নিয়েছে, অন্যান্য প্রতিযোগীকে শেষ করে দিতে কোন ঝামেলায় পড়বে না সে।
ভবিষ্যতে কীভাবে হামলা করবে সেটা নিয়ে ভাবছে তানাকা। তার জানা নেই, একই সময়ে গিরিখাদের ঢালু জমি বেয়ে উঠে আসছে রানা। ঝোপঝাড়ের ভারী পাতার ওদিক থেকে দেখতে পেল, কমাণ্ড পোস্টের ছাত থেকে চারদিকে চোখ রেখেছে শ্যানন। মনোযোগ বেশি তার সেতুর ওপরে। রানা বুঝে গেল, অন্য কোনদিকে না গিয়ে ওর উচিত কমাণ্ড পোস্টের পেছনদিক দিয়ে ঢোকা। টেপ দিয়ে মোড়া রডের ‘ জন্যে একটু আড়ষ্ট পায়ে ঝোপঝাড় ও গাছপালার মাঝ দিয়ে এগোল রানা।
কম্পাউণ্ডের পেছনে পাথুরে দেয়ালের কাছে এসে বুঝে গেল, ওটা বেয়ে ওঠার সময় খুব সতর্ক হতে হবে ওকে, নইলে রডের সঙ্গে পাথরের আওয়াজে সবই টের পাবে শ্যানন। এ-ও ভাবল রানা, একবার ছাতে উঠলে সরাসরি ওর ওপরে হামলা করবে সে। সেক্ষেত্রে রানার বোধহয় উচিত হবে প্রথমে তানাকাকে শেষ করে দেয়া। পাথুরে দেয়ালে শুয়ে জাপানি খুনির ওপরে চোখ রাখল ও। সেতুর ওপরে অধৈর্য হয়ে পায়চারি করছে তানাকা। এখন নিঃশব্দ পায়ে ওদিকের ঝোপে গিয়ে ঢুকলে হয়তো আচমকা হামলা করা যাবে তার ওপরে।
সেতুর পাশের ঝোপঝাড় আর মাঝের দূরত্ব হিসাব কষল রানা। মনে মনে নিজেকে সতর্ক করল, শ্যাননের কাছে আছে তীরধনুক। নিজে যখন সেতুর ওদিকে ছিল ও, আর ওর দিকে তীর ছুঁড়ল সে, তার চেয়ে অনেক কাছে এদিকের ঝোপঝাড় ও তানাকা। একবার তার সঙ্গে লড়তে গেলে সেটা শেষ করতে হবে খুব দ্রুত। কারণ, বুলেটের মত একের পর এক তীর ছুঁড়তে না পারলেও ছাত থেকে অনায়াসেই ওকে গেঁথে ফেলতে পারবে শ্যানন। অবশ্য তীর ছুঁড়বার মাঝে থাকবে সামান্য বিরতি, আর সেই সুযোগে হয়তো এঁকেবেঁকে দৌড় দিয়ে আড়ালে সরে যেতে পারবে রানা। আর পরে সুযোগ মত মোকাবিলা করবে শ্যাননকে।
এবার এমন একটা সময় রানার বেছে নিতে হবে, যখন পরস্পরের দিকে পিঠ থাকবে দুই খুনির। সেতুর ভাঙা অংশের কাছে গিয়ে থামল তানাকা। চোখ বোলাল নিচের নদীতে। একই সময়ে কম্পাউণ্ডের পেছনে তাকাল শ্যানন। আর এই সুযোগে দেয়াল থেকে নেমে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে তীরবেগে ছুটে চলল রানা। পাতাগুলোর মাঝ দিয়ে দেখতে পেল তানাকাকে। সে আছে মাত্র বিশ ফুট দূরে। ঘুরে আবারও এগিয়ে এল সেতুর এদিকে।
আমাকে সঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে, মনে মনে নিজেকে বলল রানা।
সেতুর গোড়ায় এসে থেমে গেল তানাকা। শক্ত হাতে লাঠি ধরে অপেক্ষা করছে রানা। ভাবছে, আরেকটু কাছে আয়!
রানার দিকে আরও এক পা এগোল তানাকা।
এইবার!
চিতার বেগে ঝোপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে সেতুতে উঠল রানা। হাতের বর্শার চোখা দিক বিদ্যুদ্বেগে চালাল তানাকার হৃৎপিণ্ড লক্ষ্য করে। ভেবেছিল সঙ্গে সঙ্গে মরবে যুবক। কিন্তু চট্ করে বর্শা এড়িয়ে গেল কুং-ফু মাস্টার। শুধু তা-ই নয়, ছোরার কোপে দু’ভাগ করে দিল রানার লাঠি।
এদিকে খটাশ্ শব্দ শুনতে পেয়ে ঘুরে তাকাল শ্যানন। রানাকে মোকাবিলা করতে এগিয়ে এল তানাকা, মুখে জাপানি গালি। সে যেন উন্মাদ কোন সুশি শেফ, ফালি ফালি করে দেবে রানাকে। দৃশ্যটা দেখে এক কান থেকে আরেক কানে গেল শ্যাননের দুই ঠোঁট। বাঙালি গাধাটাকে নিজের হাতে খুন করতে চেয়েছিল, কিন্তু নিজের কাজে কোন খুঁত রাখছে না তানাকা। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, এই লড়াইয়ে শেষমেশ জিতে যাবে রানা। তবে ঘটনা যাই হোক, কিছুই যায়-আসে না শ্যাননের। দুই প্রতিযোগীর মধ্যে যে জয়ী হবে, তাকে মরতে হবে বুকে তীর খেয়ে।
তানাকার সঙ্গে লড়তে গিয়ে মস্তবড় বিপদে আছে রানা। জাপানি খুনির ওপরে যেমন চোখ রাখতে হবে, আবার যে- কোন সময়ে ছুটে আসতে পারে শ্যাননের তীর। তানাকা এগিয়ে আসতেই খাটো দুই লাঠির একটা দিয়ে খটাস্ করে তার মাথার পাশে বাড়ি বসিয়ে দিল রানা। তবে সত্যিকারের লড়াকু লোক এই জাপানি খুনি। টলমল করে পিছিয়ে পরক্ষণে পা ঘুরিয়ে কিক-জ্যাব করল রানার বাম কিডনিতে। বেদম ব্যথা পেয়ে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ফেললেও তানাকার দিকে এগোল রানা। ঝড়ের বেগে দু’হাতে দুই ছোরা ঘোরাচ্ছে কুং- ফু মাস্টার। কচকচ করে কাটা পড়ল রানার হাতের খাটো দুই লাঠি। ওর মুঠোয় রয়ে গেছে মাত্র তিন ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ডাল। সে-দুটো বড়জোর ডাংগুলি খেলার সময় কাজে লাগবে বাচ্চাদের। হতাশ হয়ে ডালের টুকরো দুটো হাত থেকে ফেলে দিল রানা। লাফ দিয়ে এগিয়ে ছোরা ঘোরাতে ঘোরাতে ওর মুখে নকশা কাটতে চাইল জাপানি খুনি। কিন্তু বাহু তুলে তার আক্রমণ ঠেকিয়ে দিল রানা। ছোরার সংঘর্ষে চারদিকে ছিটকে গেল লাল ফুলকি। নিজের কাজ ঠিকভাবেই করছে সেতুর রড।
এ-ধরনের অদ্ভুত বাধার মুখে পড়বে সেটা ভাবতে পারেনি তানাকা। আর সে সুযোগটা পুরোপুরি নিল রানা। ওর ডানহাতি ঘুষি গেঁথে গেল তানাকার পেটে। একই সময়ে বাম বাহু দিয়ে খটাস্ করে বাড়ি দিল জাপানি খুনির মাথায়।
লোকটা এতই বেশি ব্যথা পেয়েছে, তার হাত থেকে সেতুর ওপরে ঠং-ঠং করে পড়ল দুই ছোরা।
এখন আর কোন অস্ত্র নেই তানাকার হাতে। যত ভাল মার্শাল আর্টিস্ট হোক, রানার অভিজ্ঞতা আর দৈহিক শক্তির কাছে সে আসলে কিছুই নয়। তানাকার প্রতিটি কিক আর জ্যাব ঠেকিয়ে দিয়ে পাল্টা বাড়তি কিছু ঘুষি তাকে উপহার দিচ্ছে রানা। ওর দু’হাতের মুঠো যেন কামানের গোলা, ধুপধাপ করে পড়ছে জাপানি যুবকের নাকে-মুখে ও বুকে। তার ওপর লোহার রড দিয়ে ঘেরা পায়ের জোর এক লাথি কোমরে লাগতেই ব্যথায় বাঁকা হয়ে গেল তানাকা। পরক্ষণে তার চোয়ালে নামল রানার ডানহাতি হুক। উড়ে গিয়ে ছিটকে সেতুর মেঝের পাটাতনে পড়ল তানাকা, প্রায় অচেতন।
এদিকে শ্যানন বুঝে গেছে যে হারাতে চলেছে নিজের সঙ্গীকে, তাই তূণ থেকে তীর নিয়ে ধনুকে জুড়ল সে। রানার বুকে ধনুক তাক করে থমকে গেল। এই দূরত্বে লক্ষ্যভেদ করতে পারবে কি না সেটা নিয়ে ভাবছে। তবে আরও অপেক্ষা করলে হয়তো রানার হাতে খুন হবে তানাকা। এরপর তীর এসে বুকে বিঁধবে সেজন্যে বোকার মত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে না রানা। তিন সেকেণ্ডে উধাও হবে ঝোপঝাড়ের ভেতরে।
দৌড়ে গিয়ে ছাতের কিনারায় থামল শ্যানন। ওখানে না থেমে লাফিয়ে নেমে এল নিচের ডকে। আনমনে হাসল নিজের যোগ্যতা দেখে। তীরবেগে ছুটল সেতুর দিকে। তারই ফাঁকে ধনুকে তীর জুড়ে ছিলা টেনে নিল কানের কাছে। দেখতে পেল তানাকার বুকে চেপে বসেছে রানা। এবার মট করে ভেঙে দেবে জাপানির ঘাড়।
এদিকে হঠাৎ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সতর্ক করতেই মুখ তুলে তাকাল রানা। দেখতে পেল কমাণ্ড পোস্টের কাছ থেকে ওকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে প্রায় অদৃশ্য তীর। কাত হয়ে তানাকার ওপর থেকে সেতুর মেঝেতে গড়িয়ে নামল রানা। পরের সেকেণ্ডে ওর শার্টের কলারের অংশ ছিঁড়ে নিয়ে নদীর দিকে গেল তীর। রানা বুঝে গেল, এবার গেঁথে ফেলা হবে ওকে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেতু থেকে নেমে পড়ল ও। দু’ সেকেণ্ড আগে যেখানে ছিল ওর মাথা, সে জায়গা পেরিয়ে সেতুর বিমে গেঁথে গেল আরেকটা তীর।
কম্পাউণ্ডের বাঙ্কার লক্ষ্য করে ছুটে চলল রানা। একবার বাঙ্কারের কোনা ঘুরতে পারলে তীর মেরে ওকে খুন করতে পারবে না শ্যানন। তখন রানাকে শেষ করতে হলে ঝুঁকি নিয়ে তাকে ঢুকতে হবে অন্ধকার বাঙ্কারে, আর তখন শুরু হবে হ্যাণ্ড-টু-হ্যাণ্ড কমব্যাট।
ছোটার গতিহ্রাস না করেই বাঙ্কারের কোনা ঘুরে ডাইভ দিয়ে সাইড ডোরের ওদিকে গিয়ে পড়ল রানা। পাশের দেয়ালে লেগে ঠিকরে গেল একটা তীর। বাঙ্কারের দেয়ালে ঠাস্ করে লেগেছে রানার মাথা। আঁধারে দেখতে পেল জাপানি আর্মির তৈরি সরু ভিউয়িং স্লট। ওদিক দিয়ে আসছে ভোরের আলো। আর সেই লালচে রশ্মিতে দেখা যাচ্ছে, ওর দিকেই চেয়ে আছে বড় মায়াবী দুটো চোখ!
রানার বুঝতে দেরি হলো না, ও ছাড়াও আরও কেউ আছে বাঙ্কারে!
.
সেতুর ওপরে উঠে দাঁড়াল কাইতো তানাকা, রক্তাক্ত চেহারায় দুই ছোরা হাতে ছুটে গেল বাঙ্কারের দিকে। ডকে পড়ে থাকা সাপ্লাই ব্যাগ হাতের ইশারায় তাকে দেখাল শ্যানন, ঠোঁটে শয়তানির হাসি। মুখে কিছু বলতে হলো না তানাকাকে। ব্যাগে এখনও আছে আরও দুটো অকটেনের বোতল।
.
এদিকে বাঙ্কারের ভেতরে লালচে আলোয় সরে এল অদ্ভুত সুন্দর চোখের মেয়েটা। সে রোযি ইয়াসিমান। বি-২৫ বিমানের ভেতরে জনি এস. ক্লার্ক বোমা বিস্ফোরণে মারা যাওয়ার পর আবারও ফিরে গিয়েছিল ওখানে। কাজে লাগবে বলে ওখান থেকে সংগ্রহ করেছে ধাতব একটা চোখা শাফট।
শ্যানন ও তানাকা আলকারাযকে নির্যাতন করার সময়ে বাঙ্কারের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল সে। এখনও ভাবছে কোন উপায়ে শেষ করে দেবে অন্যান্য প্রতিযোগীদেরকে। আর সেক্ষেত্রে ওকে বিজয়ী ঘোষণা করবে ব্র্যাড স্টিল। ভেবেছিল বাঙ্কারে শ্যানন বা তানাকা ঢুকলে তাদেরকে খুন করবে সে। এখন রানাকে দেখে একই কথাই ভাবছে।
‘তুমি তা হলে এখানে,’ নিচু গলায় বলল রানা। ভেবেছিল অনেক আগেই খুন হয়ে গেছে মেয়েটা। তবে এখন বুঝে গেল, সত্যিকারের লড়াকু মনের মানুষ রোযি ইয়াসিমান।
‘এবার নিশ্চয়ই আমার ওপরে হামলা করবে?’ হিসহিস করে বলল মেয়েটা।
পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল ওরা।
আঁধারে ইয়াসিমানের চোখ সয়ে গেলেও রানা এখনও অভ্যস্ত নয়। তা ছাড়া, মাথায় বাড়ি খেয়ে এখনও সামলে নিতে পারেনি। তবুও ওর যোগ্য প্রতিপক্ষ নয় রোযি। হঠাৎ করে মেয়েটা এগোতেই তার কবজি খপ্ করে ধরে ফেলল রানা। ধাক্কা মেরে ঠেলে দিল সরু স্লটের দেয়ালের গায়ে। মেয়েটার দেহের পেছনে আটকা পড়েছে হাতের চোখা শাফট। সেঁটে আছে ওদের পরস্পরের দেহ। দুই নাকের মাঝে মাত্র এক ইঞ্চি ব্যবধান। হঠাৎ করেই শরীরে ঢিল দিল রোযি। মুখ থেকে বিদায় নিল কঠোরতা। চোখে-মুখে কাতর ভাব। একই অভিনয় করে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে আমেরিকান ড্রাগ ডিলারের।
‘প্লিয, আমাকে ছেড়ে দাও,’ কাঁপা গলায় বলল রোযি। ‘রেপ কোরো না। আমি ভেবেছিলাম তুমি হামলা করবে।
চুপ করে থাকল রানা।
ছলছলে চোখে মায়াবী দৃষ্টি এনে ওকে দেখছে রোযি। ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আমি কখনও তোমার কোন ক্ষতি করব না।’
‘এই দ্বীপের কাউকে আমি বিশ্বাস করি না,’ বলল রানা।
ইয়াসিমান কিছু বলার আগেই হুস্ করে একটা আওয়াজ শুনতে পেল ওরা।
ভীষণ ঝটকা খেল মেয়েটার দেহ। বিস্ফারিত চোখে রানার দিকে তাকাল সে। কী যেন বলতে মুখ হাঁ করলেও গলা চিরে বেরোল না কোন শব্দ।
কারোযিকে সরিয়ে এনে রানা দেখতে পেল তীর গেঁথে আছে তার পিঠে। জিনিসটা ঢুকেছে সরু স্লট দিয়ে।
এক্কেবারে বুল’স্ আই!’ বাইরে হো-হো করে হেসে উঠল শ্যানন। ‘বেরিয়ে আয়, বাঙালি হারামজাদা! এবার তোর পালা!’
সাবধানে এগিয়ে আসছে ইংরেজ সাইকো। ওদিকে বাঙ্কারের সাইড ডোর লক্ষ্য করে এল তানাকা, হাতে মলোটভ ককটেল। এরই ভেতরে আগুন জ্বেলে নিয়েছে সলতের ডগায়। এসএএস ফোর্সে থাকার সময়ে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা মাসুদ রানা সম্পর্কে বহু কিছুই শুনেছে শ্যানন, তাই কোন ঝুঁকি নিচ্ছে না।
আস্তে করে বাঙ্কারের মেঝেতে ইয়াসিমানকে শুইয়ে দিল রানা। কাতর সুরে গোঙাচ্ছে মেয়েটা। নিজেও বুঝে গেছে, মরতেই হবে ওকে। পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল রানা ও ইয়াসিমান। আর তখনই ভেতরের একটা দেয়ালে লেগে ঠাস্ করে ভাঙল অকটেনের কাঁচের বোতল। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে চারদিকে ছড়িয়ে গেল নীল আগুনের হলকা। লেলিহান শিখা চলে গেছে আর্টিলারি শেলগুলোর খুব কাছে। যে-কোন সময়ে বাঙ্কারের ভেতরে তৈরি হবে আস্ত নরক।
.
‘বাঙ্কারের দৃশ্য দেখাও! বাঙ্কার! জলদি!’ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল ব্র্যাড স্টিল।
সিলভারম্যানের বেছে নেয়া লো-লাক্স নাইট-ভিশন লেন্সের কল্যাণে সবাই দেখতে পাচ্ছে বাঙ্কারের ভেতরে মাসুদ রানার ওপরে হামলা করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার সুন্দরী রোযি ইয়াসিমান। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর মলোটভ ককটেল ফাটতেই ঘরের ভেতরে দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। পরক্ষণে লেলিহান শিখায় পুড়ে গেল লেন্সের সার্কিট
‘ভেতরের দুই ক্যামেরার সার্কিট পুড়ে গেছে, আমাদের আর কিছু করার নেই,’ হতাশ সুরে বলল সিলভি। কী ভয়াবহভাবে মেক্সিকান দম্পতিকে হত্যা করেছে শ্যানন ও তানাকা, নিজের চোখে দেখেছে সে। এ-ও জানে, খুন না করে উল্টে আলকারাযকে সাহায্য করেছে মাসুদ রানা। বাঙালি মানুষটাকে বাঙ্কারে দেখে সিলভির মনে হয়নি সে রোযি ইয়াসিমানকে খুন করবে। আর তারপর দেখল মেয়েটাকে তীর মেরেছে শ্যানন।
এই অন্যায় লড়াইয়ে কে বিজয়ী হবে, সেটা নিয়ে একটু আগেও আগ্রহ ছিল না সিলভির। কিন্তু এখন বুঝে গেছে, কার উচিত এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া, আর কাদের উচিত খুন হওয়া। রুপার্ট শ্যানন ও কাইতো তানাকা অশুভ মানুষ, বিশেষ করে ইংরেজ সাইকোপ্যাথ-আর তাকে শেষ করতে হলে চাই মাসুদ রানার মত যোগ্য কাউকে। অথচ শেষ দৃশ্য দেখে সিলভির মনে হয়েছে, আগুনে পুড়ে মরতে হবে রানার। তাই এখন সিলভি ভাবছে, হয়তো এটাই ভাল হলো, নিজের চোখে তার মৃত্যু দেখতে হলো না ওকে।
.
বাঙ্কারে আগুনে পুড়ে বা শেল ফাটার মাধ্যমে ওর মৃত্যু হবে সেটা জেনেও ঘাবড়ে যায়নি রানা। নানান সিনারিয়ো নিয়ে গবেষণা করেছে আর্মি জীবনে। তাই জানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানি মিলিটারি ছিল দুর্ধর্ষ এক ফোর্স। কোনভাবেই তাদেরকে কোণঠাসা করা যেত না। বিশেষ করে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্টিলারি বাঙ্কারে। শক্তিশালী শত্রুপক্ষ হামলা করবে অথচ নিজেরা নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ জাপানি যোদ্ধারা রাখবে না, এটা অসম্ভব।
এখান থেকে বেরোবার অবশ্যই অন্য কোন পথ আছে।
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে লকলকে আগুন। বাঙ্কার থেকে বেরোবার দ্বিতীয় পথ খুঁজতে লাগল রানা। খাড়া একটা পাথুরে টিলা ঘেঁষে এই বাঙ্কার, তাই ধরে নেয়া যায় টিলা ভেদ করে তৈরি করা হয়নি কোন সুড়ঙ্গ। ঘন ধোঁয়া থেকে বাঁচতে মেঝেতে বসে পড়েছে রানা। দু’হাতে মেঝেতে কিল দিতে দিতে হামাগুড়ি দিয়ে এগোল সামনে। প্রথম পাঁচ ফুট শক্ত মাটির হলেও এরপর মেঝেতে কিল দিতেই ওদিক থেকে এল ফাঁপা একটা আওয়াজ। দ্রুত হাতে মেঝে থেকে ধুলোবালি সরিয়ে কাঠের এক ট্র্যাপডোর দেখতে পেল রানা। হ্যাঁচকা টানে ওটা ওপরে তুলতেই পেয়ে গেল নিচে গোপন এক ছোট চেম্বার। ধোঁয়ার ভেতরে হাত বাড়িয়ে রোযির হাত ধরল রানা।
‘এসো! এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে!’
কথাটা শুনেও নড়ল না মেয়েটা। আবছা আলোয় রানা দেখতে পেল ইয়াসিমানের আরেক হাত চলে গেছে গোড়ালির লাল ট্যাবের কাছে।
‘কাজটা কোরো না, এখনও হয়তো বাঁচার সুযোগ আছে,’ নরম সুরে তাকে বলল রানা।
পিঠে গেঁথে থাকা তীরের জন্যে অসহ্য ব্যথা সইতে হচ্ছে মেয়েটার। বুঝে গেছে যে, আর বাঁচতে পারবে না। মুখের কাছে দুলছে নীল আগুনের শিখা। চোখ মেলে ফিসফিস করে বলল সে, ‘প্লিয, আমাকে কোথাও সরিয়ো না। তাতে ব্যথা বেড়ে যাবে।’
চুপ করে থাকল রানা। দু’জনই বুঝে গেছে, কোন উপায় নেই রোযি ইয়াসিমানের বেঁচে থাকার। মারাত্মক যে ব্যথা সহ্য করছে, তার চেয়ে দ্রুত মৃত্যু অনেক বেশি সুখের।
আস্তে করে মেয়েটার হাত ছেড়ে দিল রানা।
হ্যাঁচকা টানে লাল ট্যাব খুলে নিল রোযি ইয়াসিমান।
শেষবারের মত তাকে দেখে নিয়ে নিচের চেম্বারে নেমে গেল রানা।
Chapter - 26 to 30
ছাব্বিশ
আর্টিলারি বাঙ্কারে ভারী শেল ফাটার প্রচণ্ড বিস্ফোরণ দেখে হতবাক হয়ে গেছে বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে জড় হওয়া সবাই। শকওয়েভের জোর ধাক্কায় পিছিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে চিত হয়ে পড়েছে রুপার্ট শ্যানন ও কাইতো তানাকা।
সোহানা, সোহেল, সলীল, জাহেদ ও অন্যরা দেখেছে বাঙ্কারে গিয়ে ঢুকেছে রানা। তারপর কালো মেয়েটার সঙ্গে লড়তে হলো ওকে। এরপর আর বের হয়নি রানা। একটু পর বিস্ফোরিত হয়েছে বাঙ্কার।
কারও মনে কোন সন্দেহ নেই যে, মারা গেছে মাসুদ রানা। সোহানার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না সোহেল, জাহেদ ও সলীল।
‘রানা… রানা…’ মুখে হাত চেপে ফিসফিস করে বলল সোহানা। রক্তশূন্য হয়ে গেছে ওর চেহারা। মায়া ভরা দুই চোখ থেকে দরদর করে গালে নেমে এল অঝোর অশ্রুধারা।
নীরব হয়ে গেছে বিশাল ঘর।
পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে ওরা। কারও মুখে রা নেই।
টেলিভিশনের স্পিকারে শোনা গেল এক নারীকণ্ঠ: ‘গোটা দুনিয়া জুড়ে কমবয়সী ছেলেমেয়েরা দেখবে কী করুণভাবেই না মারা পড়বে একের পর এক মানুষ!’
মুখ তুলে টিভি দেখল সোহানা। দুনিয়াজোড়া নামকরা মহিলা সাংবাদিক ডায়ানা এরেনো ইন্টারভিউ নিচ্ছে প্রযোজক ব্র্যাড স্টিলের। এই লোকই তৈরি করেছে ডার্টি গেম শো। আর তার জন্যেই মারা গেছে সোহানার ভালবাসার মানুষটা।
স্টিলের পরনে দামি প্যান্ট ও শার্ট, চোখে হাসির ছাপ। ‘ওরা অবশ্যই দেখবে, দেখবে না কেন! আর সেজন্যে চাই মাত্র একটা ক্রেডিট কার্ড। ছোটদের এই শো দেখা থেকে আমরা বিরত রাখতে পারব না। ওদের বাবা-মার উচিত তাদের বাচ্চাদের সামলে রাখা। এর দায় তাদেরই, আমাদের নয়।’
আগে কাউকে এতটা ঘৃণা করেনি সোহানা, যেটা এখন করছে ব্র্যাড স্টিলকে। অন্তর থেকে বুঝে গেছে, দুনিয়ার যেখানেই লুকিয়ে থাকুক লোকটা, তাকে খুঁজে বের করে নিজের হাতে খুন করবে ও।
.
সোহানার মতই ডায়ানা এরেনোর ব্রডকাস্ট নিজেদের বিশাল তাঁবুর ছোট এক এলইডি স্ক্রিনে দেখছে স্টিল। এদিকে বিশাল স্ক্রিনে বারবার দেখানো হচ্ছে বাঙ্কার বিস্ফোরণের দৃশ্য। একই সঙ্গে দুই প্রতিযোগী শেষ হয়ে যাওয়ায় খুব খুশি হয়েছে স্টিল। শো শেষ হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি, এরপর কে বিজয়ী সেটা ঘোষণা দেবে সে। এখন বেঁচে আছে শ্যানন ও তানাকা। গোটা শো-তে দুর্দান্ত অভিনয় করেছে ইংরেজ সাইকোপ্যাথ। সে যে জয়ী হবে, সেটা বুঝে গেছে স্টিল।
বিস্ফোরণের শকওয়েভে ছিটকে পড়েছে শ্যানন ও তানাকা। ওদেরকে ঘিরে নিয়েছে ঘন কালো ধোঁয়া। তবে যেহেতু বেঁচে আছে, তাই এবার উত্তেজনার চরমে উঠবে ডার্টি গেম শো। প্রথম থেকে শ্যানন ছিল স্টিলের সেরা প্রতিযোগী। তাই তাকে নানান ধরনের অন্যায় সুবিধা করে দিয়েছে সে। এই একই কাজ করেছে আগের সব রিয়েলিটি শো-তে। ডার্টি গেমের শো-র জটিল কাহিনী রচনা করেছে বলে নিজেকে বারবার বাহবা দিচ্ছে সে।
নিজেকে আবারও দেখল ছোট্ট স্ক্রিনে।
গত ক’বছরে বহুবার ইন্টারভিউ দিয়েছে বলে ওর জানা আছে কীভাবে ক্যামেরার সামনে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। এবারের ইন্টারভিউয়ের সময় তার চেহারা ও বডি ল্যাংগুয়েজে প্রকাশ পেয়েছে অমিত আত্মবিশ্বাস। ছোটবেলায় সাইকেল থেকে পড়ে কেটে গিয়েছিল থুতনি, আর সেই দাগ আড়াল করতে এবার ক্যামেরা নিচু থেকে ফোকাস করতে দেয়নি। এদিকে বাম থেকে ভাল দেখায় তার নাক, তাই ডায়ানা এরেনোর ডানে ক্যামেরা রাখতে বাধ্য করেছে সে। স্টিলের ধারণা দুনিয়ার সেরা সব শো-র মতই নিখুঁত হতে হবে তার জীবন, যেখানে কখনও কোন দুর্ঘটনা ঘটবে না।
‘ভুলেও ধরে নেবেন না যে এসবে আপনার কোন দায় নেই,’ টিভিতে বলছে ডায়ানা। ‘এই শো তৈরি করা কতবড় অন্যায়, সেটা আপনি কিন্তু নিজেই ভাল করে জানেন।’
টিভির স্ক্রিনে নিজেকে দেখে হাসল স্টিল। কী উজবুকের মত কথা বলছে মহিলা! যেন জানে না, ওকে ভিলেন হিসেবে দেখালে উল্টে হুড়মুড় করে বাড়বে শো-র দর্শক-সংখ্যা।
‘ডায়ানা, আমি তো কাউকে বাধ্য করছি না লগ ইন করতে,’ আরাম করে চেয়ারে বসে স্বাভাবিক চেহারায় বলেছে স্টিল। ‘আমি এ-ধরনের শো-র চাহিদা তৈরি করিনি। হাজার বছর আগে সেটা করেছে রোমানরা তাদের কোসিলিয়ামে। প্যারিসে ফ্রেঞ্চরা গিলোটিনের মাধ্যমে। সালেমে করা হয়েছে ডাইনী গণহত্যার সময়। প্রাচীনকাল থেকে সবসময় সহিংসতা দেখতে চেয়ে অধীর হয়ে অপেক্ষা করেছে বিশ্বের মানুষ। সেটা অতীত বলুন বা বর্তমান যুগ-আগামীতেও শত কোটি মানুষ চাইবে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা দেখতে। কারণ বেশিরভাগ মানুষ আসলে এমনই।’
আমার আসলে কোন তুলনা নেই, মনে মনে বলল স্টিল।
ডায়ানার পেছনের স্ক্রিনে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সবুজ দ্বীপ। দৃশ্যটা উধাও হতেই দর্শকের উদ্দেশে বলল মহিলা সাংবাদিক, ‘এই সাক্ষাৎকার শেষ হলে প্রযোজক ব্র্যাড স্টিলের ওপরে ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম। আমার প্রতিক্রিয়া ছিল খুব স্বাভাবিক। তবে গত চব্বিশ ঘণ্টায় কোটি কোটি মানুষ লগ ইন করেছে তার ওয়েব সাইটে। মিস্টার স্টিলের সাফল্যে আমি এখন রেগে নেই। আমি আসলে হতাশ ও দুঃখিত যে, এমন এক নোংরা ও নৃশংস পৃথিবীতে বাস করি আমরা।’
‘ভাল বলেছে,’ স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে বিড়বিড় করে বলল স্টিল। সে নিজেও হয়তো এত ভালভাবে সাক্ষাৎকার নিতে পারত না। ডায়ানা এরেনোর কথা শুনে নতুন করে অন্তত আরও দশ মিলিয়ন মানুষ সাবস্ক্রাইব করবে ডার্টি গেম শো-তে।
‘আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমরা আসলে ব্র্যাড স্টিলের মত মানুষদেরকে থামাতে চাই কি না। আমরা কি আসলে মানুষ হতে পেরেছি? আমরা আসলে কারা বা কী?’ আবেগ- প্রবণ হয়ে বলে চলেছে ডায়ানা এরেনো, ‘আমরা যারা ব্র্যাড স্টিলের শো দেখে তার পকেটে কোটি কোটি ডলার তুলে দিচ্ছি, আমরা নিজেরা কি আসলে অপরাধী নই?’
স্টিলের পেছনে থেমে টিভি স্ক্রিন দেখছে রিটা। নিজের সাক্ষাৎকারে আকণ্ঠ ডুবে আছে প্রযোজক, খেয়াল করেনি বিশাল তাঁবুতে ফিরে এসেছে তার প্রেমিকা। ডায়ানা এরেনোর মত চট করে রেগে যায়নি রিটা। ওর আসলে খারাপ লাগছে স্টিল, সিলভারম্যান, নিষ্ঠুর এই পৃথিবী আর নিজের জন্যে।
সিলভির দিকে তাকাল রিটা। সিওয়ার্সকে কন্সোল দেখতে বলে স্টিলের সাক্ষাৎকার মন দিয়ে দেখছে সে। একবার চোখ তুলে রিটাকে দেখে নিচু করে নিল দৃষ্টি। ভাল করে জানে, প্রতিবাদ করে কোন লাভ হবে না। তাই চেহারায় ফুটে উঠেছে অপরাধবোধের ছাপ।
সিলভির মত একই কথা ভাবছে রিটা। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা দাঁতে দাঁত চেপে পার করতে পারলে চিরকালের জন্যে বিদায় নেবে অভিশপ্ত এই দ্বীপ থেকে। এরপর ওদের দু’জনের জীবন থেকে চিরকালের জন্যে বিদায় নেবে ব্র্যাড স্টিল। কিন্তু গত কয়েক ঘণ্টায় ভয়াবহ যেসব ঘটনা দেখতে হলো, বাকি জীবনেও ওদের মন থেকে মুছে যাবে না সেটার রেশ।
‘প্রিয় দর্শক, তা হলে আগামীকাল আবারও দেখা হবে…’
সন্তুষ্ট হয়ে রিমোট কন্ট্রোলের বাটন টিপে টিভি বন্ধ করল স্টিল। ধারণা করেছিল শো-র বাকি সময়ে আর ফিরে আসবে না রিটা। অথচ পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সে।
ব্র্যাড বুঝতে পারছে, ওকে অপছন্দ করছে রিটা। বিশেষ করে কষে চড় খাওয়ার পর। কিন্তু সুপুরুষ হিসেবে ওর যে আকর্ষণ শক্তি, সেটা এড়াতে পারবে না রিটা। বেশিরভাগ মেয়ে অর্থশালী ও ক্ষমতাবান লোকের পূজারিণী হয়। কখনও কখনও পুরুষ চরম দুর্ব্যবহার করে বসলেও সেটা গোনায় ধরে না তারা। তা ছাড়া, স্টিল একজন নামকরা, বিত্তবান মানুষ, যে কি না রিয়েলিটি শো-র জগতে মস্ত বিশাল এক তারকা।
রিটার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করে নেয়ার সুযোগ এলেও সেটা নিল না স্টিল। চেয়ার ছেড়ে রিটাকে পাশ কাটিয়ে চলল অন্যদিকে। মনে মনে বলল, ‘পরে দেখব যাতে আমার পা চেপে ধরতে হয় তোমার।’
বিশাল স্ক্রিনে চোখ রাখল স্টিল।
এবার মরণপণ লড়তে শুরু করবে শেষ দুই প্রতিযোগী শ্যানন ও তানাকা। ওদের মধ্যে কে বিজয়ী হবে, সেটাও জানে সে।
এখন জরুরি হচ্ছে চমৎকারভাবে এই শো শেষ করা।
সাতাশ
আর্টিলারি বাঙ্কারের বিস্ফোরণে ছিটকে পড়ে প্রায় অচেতন হয়ে গেছে শ্যানন ও তানাকা। বুক, পেট ও পায়ে এসে লেগেছে শত শত পাথরের টুকরো ও শাপনেল। আগে কখনও সার্চ করতে যায়নি বলে তারা জানত না, বাঙ্কারে আছে আর্টিলারি শেল।
পাক্কা দুই মিনিট পর সচেতন হলো তারা। মাথার ভেতরে আওয়াজ হচ্ছে ভনভন করে। কানের ভেতরে চিঁইইই শব্দ। হালকা হয়ে গেছে চারপাশের কটুগন্ধী ধোঁয়া। প্রায় একই সময়ে চোখ মেলল শ্যানন ও তানাকা। আর তখনই চট্ করে বুঝে গেল, দশ প্রতিযোগীর ভেতরে তারা রয়ে গেছে মাত্র দু’জন।
সকালের কুয়াশা ভেদ করে পরস্পরকে দেখল তারা। দুই খুনির মাঝে এখন ব্যবধান বড়জোর ত্রিশ ফুট। দুই ছোরা রয়ে গেছে তানাকার হাতে। ওদিকে শ্যাননের কাছ থেকে মাত্র একফুট দূরেই পড়ে আছে ধনুক। তবে তীরের তৃণ আছে কয়েক ফুট ব্যবধানে।
দর্শকেরা এখন নিশ্চয়ই ভাবছে: তূণ থেকে নিয়ে ধনুকে তীর জুড়ে তানাকাকে গেঁথে ফেলতে পারবে শ্যানন, নাকি তার আগেই ছুটে এসে ছোরার ঘায়ে তাকে খুন করবে জাপানি খুনি!
পরস্পরের দিকে চেয়ে পাথুরে মূর্তি হয়ে গেছে শ্যানন ও তানাকা। অপেক্ষা করছে প্রতিপক্ষ কী করবে সেটা দেখার জন্যে।
‘ঠিক আছে, হারামজাদা বেঁটে শালা, এবার দেখি তোর মুরোদ কত,’ পাগলের মত হো-হো করে হেসে উঠল শ্যানন। এই দুর্গ তারই দেশের, তাই এখানেই আচমকা শ্যাননের ওপরে হামলা করবে বলে ভেবেছে তানাকা। কিন্তু সরাসরি আক্রমণে গেলে তার ফলাফল ভাল না-ও হতে পারে। কালো আমেরিকান লোকটার সঙ্গে লড়তে গেলে প্যারাশ্যুট দিয়ে তার মাথা মুড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিল শয়তানটা। আর তার অন্তত দ্বিগুণ বিপজ্জনক এই ইংরেজ শুয়োর। এরই ভেতরে নিজেদের মধ্যে একদফা লড়াই করে দেখেছে তারা, ফলে দু’জনই জানে কেমন হবে শত্রুর প্রতিআক্রমণ। হয়তো স্রেফ গায়ের জোরে তানাকাকে পিটিয়ে মারবে সাদা ইবলিশটা।
এদিকে তীর সংগ্রহ করার ভাবনা আপাতত বাদ করে দিয়েছে শ্যানন, নইলে হয়তো ছুটে এসে ওকে খুন করতে চাইবে জাপানি বাঁদরটা।
আসলে দু’জনই ভাবছে, আগে হামলা করুক প্রতিপক্ষ। শ্যাননের মনের কথা যেন পড়ে নিয়েছে জাপানি খুনি। আগে নড়ে উঠল সে। একই সময়ে হাতে তীর পাওয়ার জন্যে একদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্যানন। কিন্তু সে যথেষ্ট দ্রুত নয়। মাত্র ছয় সেকেণ্ডে একছুটে জঙ্গলে হারিয়ে গেল তানাকা।
‘মর্, শালা, শুয়োরের বাচ্চা কোথাকার!’ তিক্ত সুরে বলল শ্যানন। চট্ করে দেখল গোড়ালির টাইমার–০২:০০:০৪।
জাপানি বাঁদরটাকে খুঁজে নিতে এখনও দুই ঘণ্টা হাতে পাবে শ্যানন। তানাকাকে খুন করতে পারলে সেক্ষেত্রে বিজয়ীর মুকুট উঠবে তার মাথায়।
তূণের ভেতরে সবমিলিয়ে মাত্র তিনটে তীর দেখতে পেল শ্যানন। সাপ্লাই ব্যাগ হাতড়ে বের করে নিল ম্যাচেটি। ওটা দেবে বাড়তি নিরাপত্তা।
.
পচা কাঠের বিমের সেতু পাশ কাটিয়ে গিরিখাদ ধরে তীরবেগে ছুটে চলেছে তানাকা। মনে মনে চাইছে শ্যাননের কাছ থেকে বহু দূরে সরে যেতে। এরই ভেতরে ভেবে দেখেছে, ইংরেজ হারামজাদাকে অ্যাম্বুশ করতে হলে চাই ভাল কোন জায়গা। একবার তার মনে হলো লাফিয়ে নেমে যাবে কি না নদীতে। কিন্তু পাহাড়ি তীর থেকে ওটা প্রায় এক শ’ ফুট নিচে। ওখানে ডাইভ দিলে হয়তো জলমগ্ন কোন পাথরে পড়ে মড়াৎ করে ভেঙে যাবে ঘাড় ও মাথা। সুতরাং ঝুঁকিপূর্ণ কাজটা না করে ছুটে চলল তানাকা
একটু পর দেখতে পেল গিরিখাদের পাশে নদীর তিন ফুট ওপরে নেমে গেছে প্রাচীন এক মোটা ড্রেনেজ পাইপ। ওটার মুখ থেকে রাতের বৃষ্টির জল ঝরঝর করে পড়ছে নদীতে। গতিহাস না করে জায়গাটা পেরিয়ে গেল তানাকা।
এর ঠিক পাঁচ সেকেণ্ড পর মোটা পাইপের অন্ধকার গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল কাদামাখা কালো খয়েরি রঙের এক ভূত।
ট্র্যাপডোর খুলে নিচের অন্ধকার চেম্বারে নেমে গিয়েছিল রানা। ক্রল শুরু করে পাঁচ সেকেণ্ডে পৌঁছে গেছে এক ড্রেনেজ পাইপের ভেতরে। এর মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর বিস্ফোরিত হলো আর্টিলারি বাঙ্কার। গোলা ফেটে যাওয়ায় ভূমিকম্পের মত থরথর করে কাঁপল ভূগর্ভস্থ পাইপ। রানার পায়ের ওপরে এসে পড়ল মাটির বড় সব চাকা ও ভাঙা কংক্রিটের চাপড়া। ধুপ করে পেছনে ধসে গেল পাইপ। পা ছুটিয়ে নিয়ে প্রাণপণে ক্রল করে এগোল রানা। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার ওপরে ধুলো ও ভেজা কাদায় ভরে গেছে ওর দু’চোখ। ক্রল করে এগিয়ে চলল অন্ধের মত। নাকে ভক করে এসে লাগল ইঁদুরের মল ও ছোট সব জানোয়ারের লাশের দুর্গন্ধ। এ-ছাড়া পাইপে আছে পচা শেকড়, শেওলা ও বহু বছরের বদ্ধ বাতাসের কুবাস। চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না বলে খুশিই হলো রানা। ওর দেহের চাপে ভচ করে পিষে গেল মৃত ইঁদুরের দেহ। কুড়মুড় আওয়াজে ভাঙল হাড়। চাপা পড়ে কিচকিচ শব্দ করে উঠছে জীবন্ত গাছ-ইঁদুর। হাতের বাড়ি মেরে কয়েকটাকে সরাল রানা। তার একটা পালিয়ে যাওয়ার আগে কামড়ে দিল ওর কড়ে আঙুলের ডগা।
দূরে শুনতে পেল পানি ঝরে যাওয়ার শব্দ। আরও দশ গজ ক্রল করার পর পৌঁছে গেল পাইপের এক জটিল জংশনে। অন্যান্য পাইপ থেকে এখানে এসে পড়েছে কাদাভরা পানি
জলধারা অনুসরণ করে আরও কিছুক্ষণ ক্রল করার পর পাইপের মুখে সাদা আলো দেখতে পেল রানা। মিনিট দুয়েক পর পাইপের শেষ মাথা থেকে খসে পড়ল নদীতে। প্রথমেই ধুয়ে নিল কাদাভরা চোখদুটো। ওপরে চেয়ে দেখতে পেল গিরিখাদের কিনারা ধরে ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে তানাকা। বারবার ঘাড় কাত করে দেখছে পেছনে। রানার মনে হলো, তাকে ধাওয়া করেছে কেউ না কেউ।
আর সেই লোক রুপার্ট শ্যানন। আর এর অর্থ হচ্ছে ভেঙে গেছে দুই খুনির তৈরি জোট। এটা ভাল সংবাদ রানার জন্যে। শ্যানন আর তানাকা ভাবছে মারা গেছে ও। আর এর ফলে পরবর্তী সময়ে হয়তো পাবে কোন সুবিধে।
পরের আধঘণ্টা তানাকা ও শ্যাননকে এড়িয়ে এগিয়ে চলল রানা। সিলভির অসংখ্য লেন্সের কোন কোনটায় ধরা পড়লেও কন্সোলের স্ক্রিনের দিকে খেয়াল নেই স্টিলের কর্মচারীদের। শেষ দুই প্রতিযোগীকে নিয়ে মেতে আছে তারা। তা ছাড়া, ব্যাটারির সীসা দিয়ে জিপিএস ইউনিট ঘিরে দেয়ায় গ্রিডে ধরা পড়ছে না রানার কোন উপস্থিতি।
.
কেমন এক ঘোরের ভেতরে পড়ে বিশাল তাঁবুর ভেতরে রয়ে গেছে রিটা। সিলভির মতই মনে কষ্ট পেয়েছে সুদর্শন বাঙালি যুবকের মৃত্যু হয়েছে জেনে। রানার সত্যিকার ইতিহাস জানা নেই রিটার, তবে গত আটাশ ঘণ্টায় ওর মনে হয়েছে, মিথ্যা কোন মামলায় ফাঁসিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল রানাকে। অন্য খুনিদের সঙ্গে কোনভাবে মেলানো যায় না মানুষটাকে। তার ছিল আন্তরিক এক সুন্দর নরম হৃদয়। রিটা মনে মনে বারবার চেয়েছে, ওয়েদার টাওয়ারে উঠে ব্র্যাড স্টিলের উন্মাদনাময় শো-র প্রচার যেন বন্ধ করে দেয় সে।
.
হাজারো মাইল দূরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বিসিআই হেডকোয়ার্টারে কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে চুপ করে ডার্টি গেম শো দেখছে ক’জন যুবক ও যুবতী। চরম ক্রোধে থমথম করছে তাদের চেহারা।
প্রাণপ্রিয় মাসুদ ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর শো-র সাউণ্ড মিউট করে দিয়েছে রায়হান রশিদ। স্ক্রিনে চেয়ে থাকলেও কারও মনে এখন আর কোন উৎসাহ নেই। ঘরে শুধু রয়ে গেছে মাত্র একটা কারণে-প্রতিযোগিতার শেষ দু’জনের মধ্যে যে প্রথম হবে, তাকে খুঁজে বের করে খুন করবে ওরা। এবং দুনিয়ার কোথাও গিয়ে বাঁচতে পারবে না ব্র্যাড স্টিল।
এখন জঙ্গলের ভেতরে তীরবেগে ছুটছে তানাকা। আগের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী সে। ভাল করেই জানে, মাত্র কয়েকটা তীর আছে ইংরেজ সাইকোর কাছে। ওগুলো খরচ হয়ে গেলে দূর থেকে আর হামলা করতে পারবে না লোকটা। আর তখন শুরু হবে জাপানি কুং-ফু মাস্টারের দুই ছোরার দুর্দান্ত খেলা।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল শ্যাননকে। সে ধরে নিয়েছে তার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না তানাকা। তীর মেরে খুন করতে না পারলেও শ্যাননের বেল্টে আছে ম্যাচেটি। কয়েক কোপে নামিয়ে দিতে পারবে সে জাপানি খুনির গর্দান। তা ছাড়া, তার পেশিবহুল দেহে যে প্রচণ্ড শক্তি, সেটা বাড়তি সুবিধা। ছুঁচোর সমান তানাকা হাতাহাতি লড়াইয়ে জিতে যেতে পারবে না।
জঙ্গলে তানাকার পিছু নিয়েছে শ্যানন। এইমাত্র বড় এক বোল্ডার টপকে ঝোপের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে তানাকা। আর সেটা দেখেও ফেলেছে শ্যানন। দৌড়ের গতিহ্রাস করে তৃণ থেকে তীর নিয়ে ধনুকে জুড়ল সে।
এদিকে ছোটার গতি কমাল তানাকা। আশা করছে তীর ছুঁড়ে তৃণ খালি করবে ইংরেজ সাইকো।
ছিলা কানের কাছে টেনে গ্রাফাইটের তীর ছেড়ে দিল শ্যানন। তবে একেবারে শেষ সময়ে একটা গাছের আড়ালে সরে গেল জাপানি দস্যু। গাছের গায়ে ঠক্ করে লেগেছে তীর। আবারও দৌড় শুরু করল তানাকা। বোধহয় ভাবছে আরও তীর খরচ করুক ইংরেজ খুনি। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে. দেখল পেছনে। আবারও তীর ছুঁড়েছে শ্যানন। এবার বড় এক বোল্ডারের ওদিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল তানাকা। পাথরে লেগে ঠনাৎ আওয়াজে ঠিকরে গেল তীর।
বোল্ডারের ওদিক থেকে উঁকি দিল তানাকা। তৃণের শেষ তীর ধনুকে জুড়ে নিয়েছে শ্যানন। আবারও দৌড় দিল তানাকা। বোধহয় ভাবছে লোভ দেখিয়ে নষ্ট করাবে শেষ তীর। যদিও এবার ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে একদম নিখুঁত হতে হবে তার টাইমিং।
জঙ্গলের খোলা এক অংশে বেরিয়ে এল তানাকা। আর তখনই হড়কে গেল তার দু’পা। তাই দেখে ধেয়ে এল ইংরেজ সাইকোপ্যাথ। আবারও উঠে ঝেড়ে দৌড় দিল জাপানি দস্যু। শ্যাননকে দিয়ে বসেছে সহজ টার্গেট।
প্রথম তীর ছুঁড়ে টের পেয়ে গেছে শ্যানন, তাকে নিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলায় মেতে উঠেছে তানাকা। আত্মবিশ্বাসী হয়ে দ্বিতীয় তীর ছুঁড়েছে শ্যানন। তবে সেটাও যখন লক্ষ্যভেদ করল না, খুব হতাশ হয়েছে সে। বুঝে গেছে, এবার কোনভাবেই নষ্ট করা যাবে না তৃতীয় তীর। এদিকে হঠাৎ করেই ব্রেক কষে থমকে গেছে তানাকা। এখন তার পিঠ শ্যাননের দিকে। কী যেন দেখছে দূরে। এখন তার পিঠে লক্ষ্যভেদ করতে পারবে সাধারণ যে-কোন তীরন্দাজ। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে শেষ তীর ছুঁড়ে দিল শ্যানন।
একই সময়ে মস্ত এক লাফে কয়েকটা ডালের ওদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল তানাকা। অবশ্য এবার তার পাছার আধ ছটাক মাংস ছিঁড়ে নিয়ে দূরের এক গাছে গিয়ে লেগেছে তীর। ক্যামেরা যুম হতেই দেখা গেল, শেষ তীরটা ব্যয় করাতে গিয়ে নিজের রক্ত ঝরাতে হয়েছে তানাকার।
ইংরেজ সাইকোর কাছে এখন আর কোন তীর নেই। মোটা এক ডালে দুলে প্যারালাল বারের জিমন্যাস্টের মত উঠে এল তানাকা। হতাশ চেহারায় ধনুক দূরে ছুঁড়ে ফেলল শ্যানন। বদলে বেল্ট থেকে হাতে তুলে নিল ভয়ঙ্কর-দর্শন ম্যাচেটি।
ওটা দেখে শুকিয়ে গেল তানাকার মুখ। এই অস্ত্রটার কথা মনে ছিল না তার। ডাল ছেড়ে দিয়ে একছুটে গিয়ে ঢুকল সবুজ জঙ্গলে। গায়ের জোর শ্যাননের বেশি হলেও তার চেয়ে অনেক জোরে ছুটে পালিয়ে যেতে পারে তানাকা। মাত্র একমিনিটে হারিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। একটা গাছের আড়ালে গিয়ে অপেক্ষা করল শত্রুর ওপরে হামলা করার জন্যে। উদ্যত ম্যাচেটি হাতে ধীরপায়ে এগিয়ে চলেছে শ্যানন। তানাকা যে গাছের ওদিকে লুকিয়ে আছে, সেটা না জেনে গাছটা পার হয়ে গেল সে।
নিখুঁতভাবে শত শত লেন্স রেখেছে সিলভি। নতুন দৃশ্যে দেখা গেল পা টিপে টিপে শ্যাননের পিছু নিয়েছে তানাকা, দু’হাতে দুই ক্ষুরধার বোলো নাইফ।
.
কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে বসে বিসিআই-এর এজেন্টরা চাইছে, যেন খুব কষ্ট পেয়ে খুন হয় ওদের প্রিয় রানার হত্যাকারী স্যাডিস্ট ইংরেজ সাইকো। ফলে আপাতত মনে মনে তানাকাকে সমর্থন করছে ওরা।
হঠাৎ করে স্ক্রিনে দেখা গেল আরেক গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল মাসুদ রানা!
বিসিআই এজেন্টের প্রচণ্ড এক ঘুষি চোয়ালে লাগতেই পাশের কাদায় ভরা অগভীর ডোবায় ঝপাৎ করে গিয়ে পড়ল তানাকা!
‘আমাদের রানা! ও বেঁচে আছে! ও বেঁচে আছে!’ খুশিতে চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সোহেল।
গলা ফাটিয়ে হৈ-হৈ করে উঠেছে অন্যরা।
সোহেল ঘুরে দেখল, সোহানার চোখ বেয়ে নেমে এসেছে অশ্রু।
কাদাভরা ডোবায় বিহ্বল হয়ে পড়ে আছে তানাকা। সচেতন হতেই ওপরে তুলল দুটো হাত। মুঠোয় এখনও রয়ে গেছে দুই বোলো নাইফ।
‘ওগুলো ফেলো,’ অগভীর ডোবায় নেমে এল গম্ভীর রানা।
একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে ছোরা চালাল তানাকা। তবে বাহুর রড দিয়ে তার হামলা অনায়াসে ঠেকিয়ে দিল রানা।
এদিকে তানাকা ডোবার ভেতরে পড়তেই থমকে গেছে শ্যানন। ভাবছে, জাপানি শালা খুন হলে তো মহাবিপদ! শত্রু হিসেবে তার চেয়ে ঢের বিপজ্জনক বাঙালি হারামি রানা। তাকে খুন করতে হলে কাজে লাগবে জাপানি বাঁদরের সাহায্য। তা ছাড়া, যেভাবে বেদম মার খাচ্ছে তানাকা, সে-ও বোধহয় মনে মনে চাইছে প্রাক্তন মিত্র এসে সাহায্য করুক।
রানা ও তানাকার দিকে এগোল শ্যানন। মনস্থির করেছে পেছন থেকে ম্যাচেটির কোপে নামিয়ে দেবে রানার গর্দান।
তবে শ্যাননকে চোখের কোণে আগেই দেখেছে রানা। তানাকার মুখে ঘুষি মেরেই চরকির মত ঘুরে গেল ও। রডে ঘেরা দু’বাহু তুলে খটাং শব্দে ঠেকিয়ে দিল শ্যাননের ম্যাচেটির কোপ। একদিকে সরে গিয়ে তৈরি হলো পরের আক্রমণ ঠেকাতে।
এখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে প্রাক্তন মিত্র- তানাকা ও শ্যানন। এদের যে-কোন একজনকে খুন করতে পারবে আশা করছে রানা, তবে তারা একযোগে হামলা করলে নির্ঘাৎ মরতে হবে ওকে।
তানাকা বোধহয় ভাবছে, একটু আগে ওকে তাড়া করেছে শ্যানন। কিন্তু এখন রানার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে হাতের ইশারা করছে লোকটা। তাতে সায় দিয়ে মাথা দোলাল তানাকা। ওদের জানা নেই বিস্ফোরণের পরেও কীভাবে বেঁচে আছে বাঙালি যুবক। জঙ্গলে যেন ভূতের মত এসে হাজির হয়েছে। আর তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে গেছে তানাকার। রানা যে একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, তাতে মনে কোন সন্দেহ নেই আর। সুতরাং যত দ্রুত মরবে বাঙালি লোকটা, তানাকার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বেশি বাড়বে।
আবারও তানাকাকে হাতের ইশারা করল শ্যানন।
এবার একই সঙ্গে বোলো নাইফ ও ম্যাচেটি হাতে রানার ওপরে হামলে পড়ল দুই খুনি। নিজে আক্রমণে যেতে না পারলেও তাদের মারাত্মক কয়েকটা আক্রমণ দু’বাহুর রড দিয়ে ঠেকিয়ে দিল রানা। ক্রমেই বাধ্য হচ্ছে পিছিয়ে যেতে। তিক্ত চোখে অন্যায় লড়াই দেখছে বিসিআই এজেন্টরা।
‘রানা, তুই হাল ছাড়িস না,’ দু’মুঠো পাকিয়ে ফিসফিস করে বলল সলীল। ‘কুত্তাগুলোকে হারিয়ে তোকে জিততেই হবে! তুই পারবি!’
চট্ করে একবার বামে তাকাল সোহেল। চুপ করে বসে আছে সোহানা, শুকিয়ে গেছে মুখ।
একটু পর দম নেয়ার জন্যে লড়াইয়ে বিরতি দিল শ্যানন ও তানাকা। তাদের কাছ থেকে দশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে রানা। ধারালো ছোরার পোঁচে কেটে-ছিঁড়ে গেছে দু’বাহু। বাম হাঁটুর নিচে হাড়ে বসে গেছে ম্যাচেটির ফলা। ঝরঝর করে ক্ষত থেকে ঝরছে রক্ত।
‘রানা, আত্মরক্ষা করতে গেলে তুই বাঁচবি না,’ বিড়বিড় করে বলল সোহেল। ছলছল করছে দু’চোখ। ‘তুই আক্রমণে যা!’
নিজেও যেন তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে রানা।
শ্যানন ও তানাকা একযোগে এগোতেই দু’দিকে দু’হাত প্রসারিত করে পাল্টা আক্রমণে গেল রানা। ওর ডান বাহুর আঘাতে চিরে গেল শ্যাননের গালের মাংস। তীব্র ব্যথা পেয়ে টলমল করে পিছিয়ে গেল সে। পেছনে উপড়ে পড়া মরা এক গুঁড়িতে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ল। এই সুযোগে রানার বুক-পেটে ছোরা গাঁথতে চেয়েছে তানাকা। তবে রানা পিছিয়ে যাওয়ায় হালকাভাবে ওর পেটে আঁচড় কেটেছে ছোরার ডগা। একই সময়ে বাম বাহুর রড দিয়ে তানাকার ঘাড়ে জোর এক চাপড় বসিয়ে দিয়েছে রানা। ফলে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়েছে জাপানি দস্যু।
এদিকে বেকায়দাভাবে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেছে শ্যানন। তার সাহায্য পাবে না বুঝেও উঠে দাঁড়িয়ে রানার ওপরে হামলে পড়ল তানাকা। বাহুর রড দিয়ে তার আক্রমণ রানা ঠেকিয়ে দিতেই ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল জাপানি দস্যুর বামহাতের ছোরা। তাতে না পিছিয়ে ডানহাতের ছোরা সরাসরি রানার হৃৎপিণ্ডে ঢোকাতে চাইল সে। তবে খপ্ করে তার বাহু ধরে কবজি মুচড়ে দিয়ে তারই বুকে বোলো নাইফের দীর্ঘ ফলা গেঁথে দিল রানা।
বিস্মিত চোখে ওকে দেখল তানাকা। মুখ দিয়ে ভলকে ভলকে বেরিয়ে এল তাজা লাল রক্ত। হৃৎপিণ্ড ভেদ করে সরাসরি ফুসফুসে ঢুকে গেছে বোলো নাইফের ফলা। ঘড়ঘড় করে শ্বাস নিল তানাকা, তারপর মৃত্যু হওয়ায় টলে পড়ে গেল রানার প্রসারিত দুই হাতের ওপরে।
লাশটা মাটিতে ফেলে শ্যাননের দিকে তাকাল রানা। এখনও উঠে দাঁড়াতে পারেনি ব্রিটিশ দানব। মাটি থেকে একটা বোলো নাইফ তুলে ইংরেজ সাইকোর দিকে চলল রানা।
এই প্রতিযোগিতায় নিজের সত্যিকারের পরিচয় এবার দিল রুপার্ট শ্যানন, উঠে দাঁড়িয়েই ঘুরে ঝেড়ে দৌড় দিল সে।
হৈ-হৈ করে উঠল বিসিআই কমপিউটার ডিপার্টমেন্টের সবাই। এবার বাদ পড়েনি সোহানাও।
.
‘আমি জানি মাসুদ রানাই এই লড়াইয়ে জিতবে!’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সিলভি। ‘ওরই উচিত এই শো-তে, প্ৰথম হওয়া!’
অবাক হয়ে সবাই দেখছে, জঙ্গলে তানাকাকে খতম করে দিয়ে শ্যাননের পিছে ছুটে চলেছে দুর্ধর্ষ বাঙালি যুবক।
পরিস্থিতির পরিবর্তনে বোকা বনে গেছে স্টিল। নিজেকে বলল, আমার তো কখনও ভুল হয় না! তো মাসুদ রানাকে আগে কেন চিনলাম না?
দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষের মতই বিস্মিত হতে ভালবাসে স্টিল, সেটা যদি যায় তার পক্ষে।
শো অদ্ভুত মোড় নেয়ায় জমে উঠেছে ডার্টি গেম শো। মৃত্যুর পরেও রানা দুর্দান্তভাবে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসায় চেয়ারে পিঠ সোজা করে বসেছে দর্শকেরা।
ভয়ঙ্কর নৃশংস এক খুনিকে খতম করে আরও বড় এক হত্যাকারীর পিছে ছুটছে রানা।
বাহ্, এ তো দারুণ শো!
রানার যে বায়োগ্রাফি তৈরি করে দিয়েছে স্টিল, তাতে দর্শকেরা ভাববে-প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে এবার লড়বে দুর্দান্ত দুই নৃশংস যোদ্ধা। এরচেয়ে উত্তেজনাময় শো দর্শকেরা পেত কোথায়?
‘সাড়ে তিন কোটি দর্শক,’ জানাল সিওয়ার্স।
তার দিকে চেয়ে হাসল স্টিল। আবার চোখ রাখল মস্ত স্ক্রিনে। লেজ তুলে ভাগছে শ্যানন। পিছনে মাসুদ রানা।
‘দেখা যাক আমরা চার কোটি দর্শক পাই কি না,’ খুশিমনে বলল ব্র্যাড স্টিল।
আটাশ
মাথা নিচু করে নিল এফবিআই-এর স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্স, দমে গেছে তার মন। এইমাত্র প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উড়ে গেছে আর্টিলারি বাঙ্কার। চারপাশে আগুনের বিশাল গোলক।
সিমন্সের দেয়া কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী দ্বীপের ওপর দিয়ে নেভির বিমান উড়ে যাবে কি না, জানা নেই তার। উসবার্টি হয়তো তার কথায় গুরুত্ব দেননি। হয়তো এক কথায় তাঁকে মানা করে দিয়েছেন ডিআইএ চিফ।
সেক্ষেত্রে নিজে কী করতে পারবে সিমন্স?
অবশ্য উসবার্টির চোখে আগ্রহের ছাপ দেখেছে ও।
তিনি হয়তো ভেবেছেন, কাগজ নেয়ায় সহজেই ওকে সন্তুষ্ট করা গেছে।
যতই ভাবছে সিমন্স, বুঝতে পারছে যে ওর মতই নিজেও আসলে অসহায় উসবার্টি। দু’জনেরই বস্ হয়তো চান গোটা ব্যাপারটা পাপোশের নিচে চাপা দিতে।
সেক্ষেত্রে কী করবেন উসবার্টি?
বস্ মানা করার আগেই হয়তো নেভিতে যোগাযোগ করেছেন তিনি। মনে মনে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করছে সিমন্স, উসবার্টি যেন সে-কাজটাই করেন। তবে রানাসহ আর্টিলারি বাঙ্কার উড়ে যাওয়ার পর এখন আর বাঙালি এজেন্টের বাঁচার কোন উপায় নেই।
এখন ব্র্যাড স্টিলকে গ্রেফতার করতে হলে কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী যেতে হবে নির্জন সেই দ্বীপে।
এককাপ কফি নেয়ার জন্যে কিউবিকল থেকে বেরিয়ে এল সিমন্স। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চাইল-বাঙালি হিরোকে বাঁচাবার জন্যে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। এরই ভেতরে বিসিআই অফিসের সবাই জেনে গেছে, তাদের সহকর্মী এখন আর নেই।
সিমন্সের মনে পড়ল রানাকে কত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে রায়হান রশিদ। কথাটা ভাবতে গিয়ে মুখের ভেতরে তিতকুটে স্বাদ পেল সে।
অফিসে ফিরে বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে ফোন দিল। তারই ফাঁকে চোখ বোলাল কমপিউটার স্ক্রিনে। হঠাৎ ধক করে উঠল তার হৃৎপিণ্ড। জঙ্গলে পুরু এক গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে মাসুদ রানা!
তার প্রচণ্ড এক ঘুষি খেয়ে ছিটকে পড়ল জাপানি খুনি।
চট্ করে কল কেটে কমপিউটার স্ক্রিনে মন দিল সিমন্স।
.
জঙ্গলের ভেতরে শ্যাননকে ধাওয়া করেছে রানা। গত ঊনত্রিশ ঘণ্টা স্রেফ ফূর্তির জন্যে নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুন করে গেছে ব্রিটিশ সাইকো। এল সালভেদরের ড্রাগ লর্ড ও তাদের দলের সদস্যদের চেয়ে বড় অপরাধী সে। নিজে নানান সময়ে বহু মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে রানা। তবে সেটা করেছে দেশের ক্ষতি ঠেকাতে গিয়ে। বিষয়টা ব্যক্তিগত কিছু ছিল না। এবং ব্যক্তিগত কারণে যখন কাউকে খুন করেছে, তার পেছনে সবসময় ছিল উপযুক্ত কারণ। এই দ্বীপে নিজের চোখে দেখেছে কীভাবে চরম নির্যাতন করে তিলে তিলে আলকারাযকে খুন করেছে ইংরেজ সাইকো। আর এ- ধরনের ভয়াবহ অপরাধের জন্যে অবশ্যই তার পাওনা হয় কষ্টকর মৃত্যু। শ্যাননের মতই মস্তবড় এক অপরাধী ডার্টি গেম শো-র প্রযোজক ব্র্যাড স্টিল। অন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলার জন্যে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে তাকে।
তিন শ’ গজ দূরে প্রাণপণে ছুটে পালাচ্ছে রুপার্ট শ্যানন। বাড়াতে চাইছে রানার সঙ্গে ব্যবধান। তাড়া খেয়ে আবারও গিরিখাদের দিকে চলেছে সে। তাতে সামনে পড়বে খাড়া পাথুরে কার্নিশ। ওটার পর আছে শুধু বিশাল এক কালো গভীর গহ্বর। ওখানে প্রবেশ করেনি সূর্যের কোন আলো। বহু নিচে গিয়ে পড়েছে বড় এক জলপ্রপাত। এখন আর অন্য কোন পথে পালিয়ে যেতে পারবে না শ্যানন।
.
এতকাল যাকে খুশি খুন করতে পারলেও শ্যানন কখনও ভাবেনি যে তাকেও কখনও মরে যেতে হবে। গত ক’ঘণ্টায় বুঝতে পেরেছে মাসুদ রানা নামের যুবকের মনে কোথায় যেন আছে নরম একটা জায়গা। তাই একবার ভাবল আত্মসমর্পণ করবে কি না। পরক্ষণে নাকচ করল ভাবনাটা। এই দ্বীপে এসে, যেসব চরম অন্যায় করেছে, তাতে কোনভাবেই তাকে ক্ষমা করবে না বাঙালি যুবক। এদিকে লড়াই করে যে জিতে যাবে, সেটাও প্রায় অসম্ভব। জীবনে এই প্রথমবারের মত নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে গেছে শ্যানন।
.
এদিকে রুপার্ট শ্যাননের পেছনে ছুটতে ছুটতে বুঝে গেছে রানা, বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছে ও। সোজা সামনে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনদিকেই আর যেতে পারবে না শ্যানন। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, হাতাহাতি লড়াইয়ে কতটা দক্ষ সে? নিষ্ঠুর পিশাচটাকে গভীর গহ্বরে ফেলে দেয়া হলে সেটা হবে খুব সহজ বিচার। তাতে চট করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে সে। তবে গভীর খাদের নিচে কী আছে সেটা কে জানে! হয়তো পতনের পরেও কোনভাবে বেঁচে যাবে শ্যানন। তার চেয়ে ঢের ভাল হ্যাণ্ড-টু-হ্যাণ্ড কমব্যাটে তাকে শেষ করে দেয়া। কাউকে খুন করতে হবে ভাবতে গিয়ে তিক্ত হয়ে গেল রানার মন। আর তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠল আলকারাযের রক্তাক্ত মুখ।
পাহাড়ে উঠতে গিয়ে ছোটার গতি কমে গেছে শ্যাননের। পেছন থেকে গলা ছাড়ল রানা, ‘যাও কই? সাহস থাকলে মোকাবিলা করো!’
শ্যাননের কাছাকাছি পৌঁছে তার চোখে আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেল ও। পরিষ্কার বুঝে গেল, বেশিরভাগ স্যাডিস্ট খুনির মতই শ্যাননও একজন কাপুরুষ। এতদিন সুযোগ পেয়েছে বলে নিজের পৈশাচিক আনন্দের জন্যে চড়াও হয়েছে দুর্বলের ওপরে। এখন নিজে বিপদে পড়ে ভাবতে শুরু করেছে কোন উপায়ে রেহাই পাবে কি না।
‘আজ আর লড়াই নয়,’ চিৎকার করে বলল শ্যানন। পরক্ষণে দৌড়ের গতি না কমিয়ে সরু কার্নিশ পার করে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিল অতল গহ্বরে।
রানা প্রথমে ভাবল, কাপুরুষের মত আত্মহত্যা করেছে লোকটা। কিন্তু বেশ কয়েক সেকেণ্ড পর নিচ থেকে এল ঝপাৎ করে একটা শব্দ। ও বুঝে গেল, শ্যানন বোধহয় এখনও বেঁচে আছে!
ডার্টি গেম শো-র নিষ্ঠুর নিয়ম অনুযায়ী অন্যদেরকে শেষ করে দিয়ে বাঁচতে হবে মাত্র একজনকে। তবে প্রতিযোগীরা যদি পার করে দেয় তিরিশ ঘণ্টা, সেক্ষেত্রে তাদেরকে মরতে হবে বোমার বিস্ফোরণে।
গভীর গহ্বরের কিনারায় থেমে নিচে তাকাল রানা। ওদিকে কালো অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই যেন নেই। চট্ করে দেখল গোড়ালির টাইমার-০০:৫৯:০২। ওর বুঝতে দেরি হলো না, নিচে ঝাঁপ দিলে যেমন মরতে হতে পারে, তেমনি ঝাঁপ না দিলেও ওকে মরতেই হবে টাইমারের সময় শেষ হলে।
একসেকেণ্ড পর শ্যাননের মত অতল কালো গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। ওর মনে হলো নেমে চলেছে অনন্তকাল ধরে। একটু দূরে সাঁই-সাঁই করে ওপরে উঠছে শেওলা ভরা এবড়োখেবড়ো পাথুরে দেয়াল। কী এক গাছের ডাল চাবুকের মত সপাং করে লাগল ওর পিঠে। ভাবতে শুরু করল রানা, বোধহয় মস্তবড় ভুল করেছে ও! হয়তো নিচে নদীর জলমগ্ন কোন পাথরে পড়ে ঘাড় ভেঙে মরেছে শ্যানন। আর বোকামি করে একই পরিণতি বেছে নিয়েছে রানা!
আরও ধীর হয়ে গেল সময়। ফার্নে ভরা পাথুরে দেয়াল একটু পর হলো কুচকুচে কালো। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে ওর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা দেখতে পেল চোখের সামনে। আর্মিতে যোগ দেয়ার প্রথম দিনের স্মৃতি, সোহানার ঠোঁটে প্রথম চুমু, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটি, সুলতা, রেবেকা, লুবনা ও প্রিয় ক’জনের মৃত্যু… বসের কঠোর দুটো চোখ… কুঁচকে গেছে তাঁর সাদা-পাকা দুই ভুরু…
তারপর হঠাৎ করে ওর মনে হলো, আকাশ থেকে পতন হলো নিরেট কংক্রিটের চাতালে। ঝনঝন করে উঠল শরীরের সব হাড়গোড়। কানের কাছে কিসের যেন ভারী গর্জন। পরক্ষণে আবছা হলো সেই আওয়াজ। চোখ মেলেও কিছুই দেখতে পেল না রানা। চারপাশে শুধু ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার। বুট ঠেকে গেল নদীর নিচের মেঝেতে, তবে কপাল ভাল চুরচুর হয়ে ভেঙে গেল না ওর পায়ের হাড়। সোজা হয়ে চার হাত-পা ছুঁড়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল রানা।
নদীর তলা থেকে ভুস্ করে ভেসে উঠতেই বিকট আওয়াজে ভরে গেল ওর দুই কান। পুরো ঘুটঘুটে কালো নয় চারপাশ। বড় এক পুকুরের মত জায়গায় এসে পড়েছে রানা। আর ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে জোরাল স্রোত। ওপর থেকে এত জোরে পড়েও ওর হাতে রয়ে গেছে তানাকার বোলো নাইফ। বিস্মিত না হয়ে পারল না রানা।
ঘুরে তাকাল চারপাশে। পেছনে প্রাগৈতিহাসিক আমলের বোল্ডারের ওপরে এসে পড়েছে বিরাট এক জলপ্রপাত। গোটা পুকুর ঘিরে রেখেছে পাথুরে দেয়াল। মাত্র কয়েক ফুট দূরে পড়লে গুঁড়ো হয়ে যেত ওর হাড়গোড়। ডানে বড় এক গুহা দেখতে পেল রানা। আর ওটার ভেতরে গিয়ে ঢুকছে জলপ্রপাতের জলরাশি।
আবারও চারপাশে তাকাল রানা। আশপাশে কোথাও নেই শ্যানন। সে কোথায় গেছে সেটা বুঝতে দেরি হলো না ওর।
সাঁতরে গুহায় গিয়ে ঢুকল রানা। ওকে টেনে নিয়ে চলেছে জোরাল জলস্রোত।
.
বিসিআই ও এফবিআই-এর এজেন্টরা এবং দুনিয়া জুড়ে কোটি কোটি মানুষ কমপিউটারের সামনে বসে জানতে চাইছে: ‘ওরা কোথায়?’
তাঁবুর ভেতরে প্রায় পাগল হয়ে চিৎকার জুড়েছে স্টিল, ‘সিলভি, লেন্সে কিছু পেলে? ওদেরকে খুঁজে বের করো! তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে এখন কী করা উচিত?’
‘আমি খুঁজছি,’ উত্তেজিত স্বরে বলল সিলভারম্যান অন্তর থেকে জানতে চাইছে রানা ও শ্যানন এখন কোথায়। নিজেকে বলছে, আমি ভাল লোকের পক্ষে। রানার যেন কোন ক্ষতি না হয়। শ্যাননের কারণে গত ঊনত্রিশ ঘণ্টায় বারকয়েক বমি করতে হয়েছে তার। তাই চাইছে ইংরেজ সাইকো যেন কষ্ট পেয়ে খুন হয় রানার হাতে।
‘ঈশ্বরের দোহাই, ওদের খুঁজে বের করো!’ গুঙিয়ে উঠল ব্র্যাড স্টিল। ‘নিচে কোন ক্যামেরা রাখোনি তুমি?’
‘আমাকে কি তুমি জাদুকর বলে মনে করো?’ প্রতিটি ক্যামেরা অন করল সিলভি। এখন কাজ করছে সব অ্যাঙ্গেল। ‘আমি তো আর জানতাম না যে গুহার ভেতরে জলপ্রপাতের পানি গিয়ে ঢোকে, আর সে-পথে কেউ যেতে পারে। তাই ওদিকে কোন ক্যামেরা নেই।’
একটা লেন্সে দেখা যাচ্ছে বিশাল জলপ্রপাত। এত ওপর থেকে কেউ ঝাঁপ দেবে, সেটা স্টিলও ভাবেনি। তাই অন্যদের মতই সে-ও নিশ্চিত নয় শ্যানন আর রানা মারা গেছে, নাকি বেঁচে আছে।
‘ওদিকে কিছু দেখলে?’ সিলভিকে ছেড়ে সিওয়ার্সের কাছে জানতে চাইল স্টিল।
গ্রিড মনিটরে চোখ রেখেছে যুবক। তার গ্রিডে দেখা যাচ্ছে মাত্র একটা + চিহ্ন।
‘ওদের একজনের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি,’ বলল সিওয়ার্স।
‘দু’জনের মধ্যে কোন্জন?’
চিহ্ন পরখ করে দেখল সিওয়ার্স। ‘শ্যানন। কয়েক ঘণ্টা আগেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি রানাকে। তাই মনে হচ্ছে সে-ও বোধহয় বেঁচে আছে।’
‘হায়রে কপাল!’ কালো গহ্বরে দুই প্রতিযোগী গায়েব হয়ে যাওয়ায় স্থির হয়ে গেছে স্টিল। প্রথমবারের মত মনে মনে রানার জন্যে প্রার্থনা করল সে। ‘যে আমার ঈশ্বর, তাকে আপনি বাঁচিয়ে রাখুন!’ প্রতিযোগিতার শেষ দিকে দুর্দান্ত চমক দেবে বলে ভেবে রেখেছে স্টিল। কিন্তু তার প্রিয় প্রতিযোগী শ্যাননের কোন মূল্য থাকবে না মাসুদ রানা বেঁচে না থাকলে।
.
বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে মস্ত স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে এজেন্টরা। ওরা দেখেছে গভীর এক বিশাল কূপের মত জায়গায় ঝাঁপ দিয়েছে রুপার্ট শ্যানন। আর তার মাত্র কয়েক সেকেণ্ড পর ঝাঁপিয়ে পড়েছে রানা। এরপর থেকে দেখানো হচ্ছে জলপ্রপাতের দৃশ্য। নানান চিন্তা ঘুরছে বিসিআই এজেন্টদের মনে।
এত ওপর থেকে পড়ে গিয়ে কি মারা গেছে রানা?
নিচে আসলে কী আছে?
কপালে আসলে কী ঘটেছে রুপার্ট শ্যাননের?
শেষমেশ কি লড়াই হবে রানা আর ওই নরপিশাচটার মধ্যে?
.
বিসিআই এজেন্টদের মতই এফবিআই অফিসে উৎকণ্ঠায় ভুগছে এডওয়ার্ড সিমন্স এবং তার অধীনস্থ এজেন্টরা। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে লাইভ ব্রডকাস্ট। বাঙ্কারে বিস্ফোরণের পর যখন জানা গেল বেঁচে আছে রানা, এরপর থেকে নিজেদের স্ক্রিনে ডার্টি গেমের প্রতিযোগিতা দেখছে অফিসের প্রত্যেকে। এমন কী বাদ পড়েনি রাইডার। নিজেই সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, শোনা যাচ্ছে নির্দিষ্ট সেই দ্বীপ খুঁজে বের করতে আমেরিকান নেভি থেকে ওদিকের আকাশে উড়াল দিয়েছে কয়েকটি যুদ্ধ বিমান। যদিও দ্বীপটা পাওয়া গেলেও সময় লাগবে রেসকিউ অপারেশনে যেতে।
বসের কথা শুনলেও সেটা বিশ্বাস করেনি সিমন্স। নতুন খবর হিসেবে রাইডার যা বলেছে, সেটা অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে বিসিআই এজেণ্ট রায়হান রশিদকে। ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারেনি ডিআইএ ডেপুটি ডিরেক্টর উসবার্টির সঙ্গে।
ওরা সবাই দেখেছে শ্যাননের পেছনে ধাওয়া করে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়েছে রানা। তারপর শুধু দেখানো হচ্ছে বিশাল এক জলপ্রপাতের দৃশ্য।
এবার এল ঘন সবুজ জঙ্গলের ফুটেজ। সিমন্সের মনে হলো, দর্শকদের উত্তেজিত করতে এটা করছে পরিচালক, অথবা সে হারিয়ে বসেছে শেষ দুই প্রতিযোগীকে। সেক্ষেত্রে নতুন করে তাদেরকে লেন্সে ধরতে চাইছে সে।
আদতে দুটো কথাই সঠিক।
.
কন্সোলের সামনে বসে রানা ও শ্যাননকে হন্যে হয়ে খুঁজছে সিলভি। এমিলিকে বলেছে দ্বীপের জঙ্গলের দৃশ্য দেখাতে, যাতে হতাশ না হয় দর্শকেরা।
দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পর হঠাৎ করে আবারও ক্যামেরায় ধরা পড়ল প্রতিযোগীদের একজন-রুপার্ট শ্যানন।
ঊনত্রিশ
জলপ্রপাত থেকে তৈরি নদী প্রাগৈতিহাসিক গুহায় ঢুকে একটু পর হয়ে গেছে অগভীর খর জলস্রোত। গুহাটা আসলে আগ্নেয় লাভার সুড়ঙ্গ, যেখানে কখনও প্রবেশ করেনি সূর্যের রশ্মি।
সাবধানে সাঁতরে এগিয়ে চলেছে রানা। অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ওর চোখ। ধারণা করছে সামনে কোথাও ওকে অ্যাম্বুশ করবে ইংরেজ কমাণ্ডো শ্যানন। যেহেতু ওর নিজের হাতে ছোরা আছে, তাই রানা ধরে নিয়েছে তার হাতেও আছে ধারাল সেই ম্যাচেটি। অ্যালিগেটরের মত শুধু চোখদুটো ভাসিয়ে রেখে চুপচাপ সাঁতরে চলেছে ও। কখনও কখনও জলমগ্ন পাথরে লেগে ছড়ে যাচ্ছে বুকের ত্বক। অবশ্য অ্যাড্রেনালিনের স্রোতের কারণে সহজেই সহ্য করতে পারছে সেই ব্যথা।
গুহার গভীরে কুচকুচে কালো অন্ধকার। পেছনে পড়ে গেছে জলপ্রপাতের আওয়াজ। চারপাশে এখন জলস্রোতের প্রশান্তিময় মৃদু ছল-ছলাৎ শব্দ। এটা বোধহয় ভয়ঙ্কর কোন ঝড় আসার আগের শেষ সময়টা, ভাবছে রানা। ওর মণি- তারা বিস্ফারিত হওয়ায় দেখতে পাচ্ছে আবছা সব আকার।
চোখের কোণে ড্যাবডেবে দুটো চোখ দেখে সোজা হয়ে বোলো নাইফ চালাল রানা। তাতে সুড়ঙ্গ ভরে গেল তীক্ষ্ণ আর্তনাদে। হঠাৎ রানা ভেসে ওঠায় চারদিকের দেয়াল ও ছাত থেকে উড়াল দিয়েছে শত শত ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। সুড়ঙ্গে এখন শুধু ওগুলোর তীক্ষ্ণ বিশ্রী আর্তনাদ।
কালো ডানার বাদুড়গুলোকে শান্ত করতে আবারও ডুব দিল রানা। কিছুক্ষণ পর দম ফুরিয়ে যেতেই মাথা তুলল পেরিস্কোপের মত। আবারও সামনের দিক দেখে নিয়ে সাঁতরে চলল।
একটু পর একদিকে বাঁক নিল নদী। সামনে সাদা আলো। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ওদিকে এগোল রানা।
আশপাশে নেই রুপার্ট শ্যানন।
ক্রমে আলোকিত হচ্ছে গুহার সামনের দিক। বাইরে উজ্জ্বল সূর্যের আলোক। সুড়ঙ্গ থেকে বেরোবার আগে রোদে চোখ অভ্যস্ত করে নিল রানা। বুঝে গেছে, সুড়ঙ্গ থেকে বেরোলে প্রথম সুযোগে হামলা করবে ইংরেজ সাইকো।
তবে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে কোথাও তাকে দেখতে পেল না রানা। ওর মনে হলো, এমন হতে পারে যে বেকায়দাভাবে পাথরে পড়ে মারা গেছে শ্যানন। কিন্তু কোথাও পাথরের ওপরে রক্ত বা ছেঁড়া কোন কাপড় দেখেনি বলে চিন্তাটা বাতিল করে দিল রানা। শ্যানন অচেতন হয়ে পুকুরে ডুবে গেছে সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোথাও ছিল না তার লাশ। তা ছাড়া, সে স্পেশাল ফোর্সের মেজর। তার মত প্রশিক্ষিত অফিসার সাধারণ মানুষের মত চট্ করে মারা পড়ে না। বিস্মিত হওয়ার বিষয় হচ্ছে, যেহেতু সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে রানাকে অ্যাম্বুশ করা ছিল তার সেরা সুযোগ, তা হলে সেটা করল না কেন সে?
এর বড় একটা কারণ বোধহয় এটা-পালিয়ে যেতে ব্যস্ত ছিল শ্যানন। কিন্তু সেক্ষেত্রে রানাকে মোকাবিলা না করে ত্রিশ ঘণ্টা পেরোবার পর বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু বেছে নিতে চেয়েছে সে?
কেন যেন তা সম্ভব বলে মনে হলো না রানার। শ্যানন একজন কাপুরুষ, তবে নির্বোধ তো নয় যে বুঝবে না রানা মারা গেলেই মুক্তি পাবে সে!
পাথুরে ক্যানিয়নের ভেতরে সাঁতরে এগিয়ে চলেছে রানা। সামনে পড়ল ছোট কিছু জলপ্রপাত। হুড়মুড় করে নদীর পানি নেমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পাথুরে এক কোলিসিয়ামে। দৃশ্যটা এতই সুন্দর যে জুড়িয়ে যায় চোখ। অবশ্য এসব দেখার মত সময় এখন রানার নেই। ক্যানিয়নে কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে শ্যানন। প্রথম সুযোগে হামলা করবে ওর ওপরে।
ঊরু পানি ভেঙে সিঁড়ির মত ধাপ বেয়ে নেমে চলেছে রানা। একবার চোখ তুলে দেখতে পেল, বড় এক বোল্ডারের ওপর থেকে ওর দিকে চেয়ে আছে একটা ক্যামেরা। রেগে গেলেও নিজেকে সামলে নিল রানা। ক্যামেরার মাধ্যমে বোধহয় ব্র্যাড স্টিলের মতই একই দৃশ্য দেখছে বিসিআই অফিসের সবাই।
ওর বস্, প্রিয় বন্ধুরা এবং সোহানার কথা ভেবে নতুন করে মনে উদ্যম ফিরে পেল রানা। মনে মনে নিজেকে বলল, আমি মরে গেলে চলবে না।
রানার জানা নেই, স্টেডিয়ামের মত জায়গাটা কাভার করতে সিলভারম্যান চারপাশে রেখেছে অন্তত চল্লিশটা ক্যামেরা। এলাকাটা এতই অপরূপ, স্টিল চেয়েছে শেষ লড়াই, যেন হয় ওখানে। সেক্ষেত্রে অতুলনীয় সব দৃশ্য দেখতে পাবে দর্শকেরা।
.
বিশাল তাঁবুর মেইন স্ক্রিনে রানাকে তুলে আনল সিলভারম্যান। ‘আমরা ওদেরকে পেয়ে গেছি! পাথুরে ক্যানিয়নে প্রচুর অ্যাঙ্গেল পাব!’
বড় করে দম নিল স্টিল। বুঝতে পারছে পাহাড়ি কার্নিশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে দিব্বি ক্যানিয়নে হাজির হয়ে গেছে শ্যানন। ঝুঁকি নিলেও আসলে বোকা নয় সে।
‘একটা কাজ করো, ওখানে যেতে বলো লাইভ ইউনিটকে। এদিকে আমার প্রিয় প্রতিযোগী এখন কোথায়?’
জিপিএস ব্যবহার করে ক্যানিয়নের কোঅর্ডিনেট্স্ খুঁজে নিল সিওয়ার্স। সিম্পসনের পাশে থেমে নিচু গলায় কী যেন বলল স্টিল। কান পেতেও কথাগুলো শুনতে পেল না সিলভি। মাথা দুলিয়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে গেল সিকিউরিটি চিফ।
স্টিল ও সিম্পসন নিচু গলায় কথা বলেছে, সেটা দেখেছে রিটা। সিলভারম্যানের মতই ওর মনে হচ্ছে, এবার আরও বড় কোন অপরাধে জড়িয়ে যাবে ব্র্যাড। তবে যেহেতু তার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করে কোন লাভ হবে না, তাই চুপ করে আছে রিটা।
হয়তো আবারও ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য দেখতে হবে, তবুও কী ঘটবে সেটা দেখার জন্যে তাঁবুতে রয়ে গেল ও। এখানে রয়ে যাওয়ার আরও একটা বড় কারণ হচ্ছে, কিছুক্ষণের ভেতরে রুপার্ট শ্যাননের বিরুদ্ধে লড়বে মাসুদ রানা। আর সেজন্যে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে রিটা, যাতে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারে বাঙালি যুবক।
.
চুপ করে যার যার চেয়ারে বসে আছে বিসিআই এজেন্টরা।
‘ওই যে রানা!’ সুড়ঙ্গ থেকে প্রিয় বন্ধু বেরোতেই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সোহেল। ‘ও সুস্থ আছে!’
‘আমরা ওকে যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছি,’ ওরা স্পিকারে শুনতে পেল রাহাত খানের কণ্ঠ। ‘আমাদের নেভির গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট বিএনএস উমর ফারুক এখন নিউ যিল্যাণ্ড থেকে ফেরার পথে আছে পাপুয়া নিউ গিনির সাগরে।’
রানার দিকে চেয়ে আছে সোহানা। ওর প্রিয় মানুষটার চোখদুটো এখন খুব কঠোর। সরাসরি ক্যামেরার দিকে চেয়ে কোমল হলো দৃষ্টি। হয়তো ভাবছে বস্, সোহানা বা বন্ধুদের কথা। কেন যেন খুব কান্না পেল সোহানার।
.
পাথুরে কোলিসিয়ামের দিকে উড়ে চলেছে স্টিলের একটি ছোট হেলিকপ্টার।
ক্যানিয়নের ভেতরে যান্ত্রিক ফড়িঙের বিকট গর্জন শুনতে পেয়ে মুখ তুলে তাকাল রানা। দ্রুত নেমে আসছে যন্ত্রটা। পাখায় লেগে ঝিলিক দিচ্ছে সোনালি রোদ। হঠাৎ খুলে গেল হেলিকপ্টারের দরজা। ছুঁড়ে দেয়া হলো একটা কালো ব্যাগ। ওটার ওপরে ভেসে উঠল ছোট একটা প্যারাশ্যুট। রানার কাছ থেকে অন্তত দেড় শ’ গজ দূরে ব্যাগ নিয়ে নামবে ওটা। সঙ্গে আছে হলদে-সবুজ ধোঁয়ার ফ্লেয়ার। রানা বুঝে গেল, কী ঘটতে চলেছে এবার। ওর বিরুদ্ধে লড়াই করে জিতে যাওয়ার জন্যে সাহায্য করা হচ্ছে রুপার্ট শ্যাননকে।
তীরবেগে ব্যাগের দিকে ছুটল রানা। তবে পাথুরে জমিতে দ্রুত দৌড়াতে পারছে না। বুঝে গেছে, ব্যাগের অনেক কাছে আছে শ্যানন। তার জিপিএস সিগনাল পাচ্ছে বলে বরাবরের মত তাকে রসদ জুগিয়ে দিচ্ছে ব্র্যাড স্টিল। ব্যাগের ভেতরে কী আছে জানা নেই রানার, তবে ওর মন বলছে ওটার ভেতরে থাকবে আধুনিক কোন অস্ত্র।
প্যারাশুটে ভর করে মস্ত এক বোল্ডারের ওদিকে গিয়ে নামল ব্যাগ। জায়গাটা থেকে আকাশে ভুস ভুস্ করে উঠছে হলদে-সবুজ মেঘ। মাত্র তিন সেকেণ্ড পর রানা দেখতে পেল, অপদেবতার মত ওখানে পৌঁছে গেছে রুপার্ট শ্যানন। রোদে চকচক করছে ভেজা সাদা দেহ। রানার হাতে যেমন বোলো নাইফ, ঠিক তেমনি তার হাতে রয়ে গেছে ম্যাচেটি। ব্যাগ দেখে মুখে ফুটে উঠেছে হাসি। ম্যাচেটি পাথুরে মাটিতে রেখে টান দিয়ে ব্যাগের জিপার খুলল সে। ভেতরে হাত ভরে জিনিসটা বের করে এক কান থেকে আরেক কানে গেল তার হাসি। চট্ করে একবার তাকাল বিশ ফুট দূরের ক্যামেরার দিকে। অস্ত্রটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লেন্সের দিকে চেয়ে চোখ টিপল। এখন আর ম্যাচেটি লাগবে না তার।
এইমাত্র পৌঁছে দেয়া হয়েছে নলকাটা বারো গেজের শটগান ও পুরো এক বাক্স কার্তুজ!
ত্রিশ
ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিরে ভাবছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ডোমেনিক উসবার্টি—অনুমতি না নিয়ে যে নেভিকে কাজে নামিয়ে দিয়েছেন, সেটা নিশ্চয়ই এরই ভেতরে জেনে গেছেন ডিরেক্টর লুকাস ম্যাকগিল। সেক্ষেত্রে তাঁর কি এখনও চাকরি আছে?
নানান ধরনের প্রাইমারি ডিরেক্টরেট-এর অধীনে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে চাকরি করে আট হাজার পুরুষ-নারী অফিসার ও কর্মচারী। এতকাল তাদের ওপরে ছিল উসবার্টির কর্তৃত্ব। দুর্ব্যবহার করেন না বলে সবাই পছন্দ করে তাঁকে। স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট ব্রাঞ্চের হিউম্যান ডিরেক্টরেটের দায়িত্বে আছেন। এসএসবি ডিভিশনের ফিল্ড অ্যানালিস্ট, টেকনিকাল স্পেশালিস্ট, ইন্টারোগেশন এক্সপার্ট, স্পেশাল ফোর্স ও ব্ল্যাক অপারেশনের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে চালান জটিল সব মিশন। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নানান অপারগতার জন্যে নাইন/ইলেভেনের পর এসএসবি তৈরি করেন প্রাক্তন ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রাফিল্ড। এরপর কয়েক বছর প্রায় কেউ জানত না, সত্যিই অস্তিত্ব আছে কি না এই সংগঠনের।
নিউ হ্যাভেনের সিসিসিটিএফ ত্যাগ করে দু’বার ফোনে কথা বলেছেন উসবার্টি। তাঁর মনে হয়েছে খামোকা সময় নষ্ট করেছেন তিনি। মাত্র একজন মানুষ, যে আবার আমেরিকার নাগরিক নয়, এমন কারও জন্যে আমেরিকান নেভিকে কোঅর্ডিনেট্স্ দিয়ে পাপুয়া নিউ গিনিতে এয়ার সার্চ করার নির্দেশ দেয়ায় হয়তো এবার চাকরিটা যাবে তাঁর।
দ্বিতীয় ফোন ছিল অফিস থেকে, তাঁকে নাকি তিনবার কল করেছে এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট সিমন্স। এটা জেনেও যুবকের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি তিনি।
ডিআইএর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের ক্ষমতা আসলে এতই বেশি, নেভির অধিকার নেই প্রশ্ন তুলবার। নির্দেশ পেতেই দক্ষিণ সাগরে ইউএস নিমিট্য থেকে আকাশে উড়াল দিয়েছে দুটো এফ/এ-১৮সি হর্নেট। পেন্টাগনে যখন পা রাখছেন উসবার্টি, একই সময়ে কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দ্বীপের ওপরে এয়ার সার্চ করতে শুরু করেছে বিমানদুটো।
উসবার্টি অফিসের চেয়ারে বসতে না বসতেই বেজে উঠল ইন্টারকম। রিসিভার তুলতেই শুনতে পেলেন ডিরেক্টর লুকাস ম্যাকগিলের গম্ভীর কণ্ঠ, ‘আপনি আসলে কী করছেন? আমার সঙ্গে আলাপ না করেই নেভিকে নির্দেশ দিলেন কেন?’
ফ্যাকাসে হলো উসবার্টির মুখ। কী জবাব দেবেন সেটা ভাবতে শুরু করেছেন, তবে তার আগেই বললেন ম্যাকগিল, ‘আমি তো আপনাকে বলেছি ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে। অথচ আপনি আরও গোলমেলে করে দিলেন পরিস্থিতি।’
চুপ করে থাকলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর উসবার্টি। বুঝে গেছেন রণতরী থেকে আকাশে যুদ্ধবিমান উঠতেই ডিরেক্টর ম্যাকগিলের সঙ্গে দেরি না করে যোগাযোগ করেছেন নিমিট- এর ক্যাপ্টেন।
‘সিসিসিটিএফ থেকে জানানো হয়েছে, একটা দ্বীপ থেকে আংশিক কোঅর্ডিনেন্স ট্র্যান্সমিট করেছে মাসুদ রানা। সে এখন এল সালভেদরের জেলখানায় নেই।’ কয়েক সেকেণ্ড বিরতি নিয়ে বললেন উসবার্টি, ‘আপনাকে জানানোর জন্যে দু’বার ফোন করেছি, তবে আপনি ব্যস্ত ছিলেন। হাতে বেশি সময় নেই বলে আমি নিজেই নির্দেশ দিয়েছি।’
পুরো মিথ্যা কথা বলেননি। সত্যি দু’বার ভেবেছেন কথা বলবেন ডিরেক্টরের সঙ্গে, তবে ডায়াল আর করেননি।
‘আপনি বোধহয় জানেন, এ-ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে হয়তো আপনার চাকরিতে সমস্যা হবে,’ বললেন লুকাস ম্যাকগিল।
‘জী, সেটা আমি জানি, স্যর। আমি জেনে-বুঝেই ঝুঁকিটা নিয়েছি। মাসুদ রানা বহুবার নানানভাবে আমাদেরকে সাহায্য করেছে। মানুষ হিসেবেও সে ভাল। আমরা যদি তাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারি, সেজন্যে প্রশংসা পাবে এসএসবি।’
‘আর আমরা যদি তাকে জীবিত না পাই?’
‘আমরা অন্তত বলতে পারব, তাকে উদ্ধার করার কাজে এসএসবি কোন ত্রুটি করেনি। স্যর, যেহেতু এ-মিশনের পুরো অথোরাইযেশন দিয়েছি, কাজেই এর সমস্ত দায় আমিই নেব।’
মনে মনে তিক্ত হাসলেন উসবার্টি। যা হবে সেটার জন্যে তাঁর বসের কোন ধরনের বিপদ হবে না। তবে মিশন সফল হলে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ঢুকবে ম্যাকগিলের পকেটে। আর ব্যর্থতা এলে সেজন্যে পূর্ণ দায় বহন করবেন উসবার্টি।
কিছুক্ষণ ভেবে ইন্টারকমে বললেন ডিরেক্টর ম্যাকগিল, ‘তো ধরে নিন আমাদের ভেতরে কোন কথাই হয়নি।’
‘তা তো বটেই, স্যর।’
লুকাস ম্যাকগিল ইন্টারকমের রিসিভার রেখে দিতেই বড় করে শ্বাস নিলেন ডোমেনিক উসবার্টি। বহু বছর পর নিজেকে মানুষ বলে মনে হচ্ছে তাঁর। যদিও বুঝতে পারছেন, গোটা ক্যারিয়ারে আগে কখনও এত বড় ঝুঁকি নেননি। তাঁর মিশন সফল না অসফল হবে, সেটা এখন নির্ভর করছে মাসুদ রানার বেঁচে থাকার ওপরে।
.
রাগে থমথম করছে বিসিআই-এর সবার মুখ। কথা বলছে না কেউ। এইমাত্র চকচকে নতুন বারো গেজের পাম্প অ্যাকশন শটগানের চেম্বারে কার্তুজ ভরে নিয়েছে রুপার্ট শ্যানন। এখন আর মুখোমুখি লড়াইয়ে জিতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই রানার।
অসৎ বিনোদন প্রচারের জন্যে নিজের ইচ্ছা রানার ওপরে চাপিয়ে দিয়েছে ব্র্যাড স্টিল। শ্যানন যেমন চরম অপরাধী, একইভাবে মানব-হত্যার দায় কখনও এড়াতে পারবে না সে।
স্ক্রিনে দেখা গেল নানান আকারের বোল্ডারের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে রানা।
পরের দৃশ্যে দেখানো হলো শটগান হাতে শ্যাননকে।
‘রানা, দোস্ত! হারামজাদার হাতে গুলি ভরা শটগান!’ বিড়বিড় করে বলল সোহেল। দুশ্চিন্তায় কালচে হয়ে গেছে ওর মুখ।
.
ক্যানিয়নে নিজের বুটের শব্দ ছাড়া কিছুই শুনছে না রানা। জানা নেই শ্যাননের হাতে কী ধরনের অস্ত্র আছে। অবশ্য এটা বুঝে গেছে, তার কাছে বোধহয় দেয়া হয়েছে খাবার, ছোরা ও মলোটভ ককটেল। এটা এখন পরিষ্কার, লড়াইয়ের এই পর্যায়ে কী করবে সেটা আগেই জানত স্টিল। রানা আর শ্যানন মুখোমুখি লড়াই না করলে হতাশ হবে দর্শকেরা। তাই স্টিল চাইবে না যে বোমার বিস্ফোরণে মরুক ডার্টি গেমের শেষ দুই প্রতিযোগী।
নিজেও বোমার আঘাতে মরতে চাইছে না রানা। পাশ কাটিয়ে গেল কয়েকটা বোল্ডার, তারপর হঠাৎ শুনতে পেল শ্যাননের কণ্ঠ: ‘অ্যাই, শালা, তুই নাকি আমাকে খুঁজছিস?’
মুখ তুলে বড় এক বোল্ডারের ওপরে তাকে দেখতে পেল রানা। ইংরেজ সাইকোপ্যাথের হাতে এখন নলকাটা বন্দুক
এবার তোর নাচ দেখব, বুঝলি?’ কাঁধে কুঁদো তুলে রানার দিকে বন্দুক তাক করল শ্যানন।
শটগান গর্জে উঠতেই একই সময়ে ডানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রানা। পরক্ষণে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে টপকে গেল বড় এক বোল্ডার। রানার হাঁটুর নিচে ঝড়াৎ শব্দে লেগেছে ছোট পাখি মারার নয় নম্বর কার্তুজের পেলেট। সেতু থেকে ভেঙে নেয়া রডে লেগে আরেক দিকে ছিটকে গেছে বেশিরভাগ গুলি।
খুশিতে হো-হো করে হেসে উঠল শ্যানন। বোল্ডার থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে গেল রানার দিকে। পাম্প করে বের করে দিল খরচ করা শেল। পরক্ষণে চেম্বারে ভরে নিল তাজা বুলেট।
.
তাঁবুর ভেতরে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সিলভির মুখ। মনোযোগ দিয়ে দেখছে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল। স্টিল খুশিতে হাত তালি দিতেই তিক্ত হলো তার মন।
‘একেই বলে মজা! হেসে উঠল স্টিল।
স্টিল। ‘এবার দারুণভাবে শেষ হবে ডার্টি গেম শো!’
তার কথা শুনে চোখ বুজল সিলভারম্যান। এমনিতেই দিনের পর দিন ঘুম নেই তার, এর ওপরে মুখে কিছু দিতে পারছে না; মনে কাজ করছে অপরাধবোধ-সবমিলিয়ে নিজেকে একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে না ওর। জোর করে চোখ মেলে স্টিল ও সিম্পসনকে দেখল সে। বিশাল তাঁবুর কোণে দাঁড়িয়ে আছে স্টিল ও সিম্পসন। প্রতিযোগিতাটাকে খুব নোংরা করে তুলেছে তারা। যার চরম শাস্তি হওয়া উচিত, তাকে এরা দিচ্ছে অন্যায় সব সুযোগ। ওদিকে পুরস্কার প্রাপ্য যার, তাকে ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। আর এজন্যে সিলভির মনে হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত ব্র্যাড স্টিল আর রিভ সিম্পসনকে। ‘আমার আসলে আর কিছু করার নেই,’ ভাবল সে। কখন যেন উঠে পড়েছে চেয়ার ছেড়ে। নিজেকে বলল, ‘অনেক তো সহ্য করেছি, আর নয়!’
স্টিলের সামনে গিয়ে সিলভি দাঁড়াতেই কন্সোলের দায়িত্ব নিল সিওয়ার্স।
‘তুমি গোটা প্রতিযোগিতায় ম্যানিয়াকটাকে অন্যায় সব সুযোগ করে দিয়েছ,’ অভিযোগের সুরে স্টিলকে বলল সিলভারম্যান।
‘গোটা শো জমিয়ে রেখেছে সে, তাই মাঝে মাঝে তাকে একটা-দুটো হাড় জুগিয়ে দিয়েছি,’ মেইন স্ক্রিনের ওপরে চোখ রেখে হাসিমুখে বলল স্টিল।
একের পর এক গুলি করছে শ্যানন।
বোল্ডারের আড়ালে সরে গিয়ে কাভার নিতে চাইছে রানা।
৩০২
গম্ভীর মুখে বিশাল স্ক্রিন দেখছে রিটা। গত ছত্রিশ ঘণ্টা ঘুমাতে না পেরে শুকিয়ে গেছে মুখ। এখন যা ঘটছে, সেটা মেনে নিতে পারছে না। সেটা বলেও ফেলল, ‘ওরা ন্যায্যভাবে লড়াই করলে সেটা অনেক ভাল হতো!’
‘ন্যায্য বলে এই দুনিয়ায় কিছু নেই,’ ধমকের সুরে বলল স্টিল। এত জোরে বলেছে যে এমিলি আর আশপাশের সবাই চমকে গেছে। ‘বাঙালি লোকটা এখন যেভাবে বিপদে পড়েছে, সেটা তারিয়ে তারিয়ে দেখছে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ। এমন কাউকে খুঁজে পাবে না, যে কি না এখন উঠে পড়বে ডার্টি গেমের শো বাদ দিয়ে। একেই বলে যোগ্য লেখকের নিখুঁত ম্যান্যুস্ক্রিপ্ট।’
কথাটা শুনে আরও তিক্ত হলো সিলভির মন। বুঝে গেল, মাসুদ রানা বা অন্য যে ক’জন প্রতিযোগী ছিল, তাদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করেনি স্টিল। নিজের হাতে লেখা চরিত্রগুলো চাপিয়ে দিয়েছে এদের ওপরে। যেমন মাসুদ রানা। তার ভাল গুণ গোপন করে তাকে পচিয়ে দেয়ার জন্যে মিথ্যার পর মিথ্যা গিলিয়ে দিয়েছে দর্শকদেরকে। প্রথম থেকেই স্থির করে রেখেছিল, এই প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে রুপার্ট শ্যানন।
কত নোংরামিতে নাক গুঁজে দিয়েছে, সেটা ভাবতে গিয়ে মন দমে গেল টেকনিকাল ডিরেক্টরের। ডার্টি গেম তৈরি করার জন্যে স্টিলের প্রতি তার মনে জন্মে গেল একরাশ ঘৃণা। অন্তর থেকে বুঝে গেল, বহু আগে উচিত ছিল এসব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া। অথচ এখন অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছে।
তার দিকে নিষ্পলক চোখে চেয়ে বুঝে গেল রিটা, চাইলেও তাঁবু ছেড়ে এখন চলে যেতে পারবে না লোকটা। আর তার এই অপারগতার জন্যে তাকে অক্ষম লোক বলে মনে হলো ওর। পরক্ষণে ভাবল, আমিই বা কেন প্রতিবাদ করিনি? নিজেকেও তো ঘৃণা করা উচিত। আমি নিজে কি বিক্রি হইনি শয়তানের কাছে?
ভয়ঙ্কর দানব ব্র্যাড স্টিলের দিকে চেয়ে রইল ও।
রিটাকে পাত্তা দিচ্ছে না স্টিল। আবারও তাকাল এমিলির দিকে। সিলভির কথায় অস্বস্তিতে পড়ে গেছে মেয়েটা। সিওয়ার্সের দিকে ঘুরে গেল স্টিল। ‘দর্শক-সংখ্যা এখন কত?’
‘আগুন ধরে গেছে ওয়েব সাইটে,’ জানাল যুবক। ‘আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি চার কোটির কাছে।’
কথাটা শুনে হেসে ফেলল স্টিল। ‘ঠিক আছে, চার কোটি ক্রস করলে আমাকে সেটা জানাবে।
আবারও দর্শক-সংখ্যা দেখল সিওয়ার্স। মনে মনে বলল, স্টিলের সঙ্গে থাকলে কখনও টাকার অভাব হবে না আমার।
সবাই চেয়ে আছে বিশাল স্ক্রিনের দিকে।
.
‘শুয়োরের বাচ্চা, সাহস থাকলে মোকাবিলা কর্ পুরুষমানুষের মত!’ চিৎকার ছাড়ল কাপুরুষ শ্যানন। রানার পিছু নিয়েছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, কারণ হাতে গুলিতে ভরা বন্দুক। অসংখ্য বোল্ডারের ভেতরে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে রানা। অবশ্য তাতে ওর কোন লাভ হবে না। রেহাই পাবে না শ্যাননের হাত থেকে। বারো গেজের বন্দুকের গুলি খেয়ে মরতে হবে রানার।
ওকে কীভাবে খুন করবে সেটা ভাবতে গিয়ে খুশি হয়ে উঠেছে শ্যানন। প্রথমে গুলি করবে ডান ঊরুতে। হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইবে রানা। তখন গুলি করে তার বাম ঊরু ফুটো করে দেবে শ্যানন। মাটিতে পড়ে থাকবে রানা। কোমরে লাথি মেরে ওকে চিত করবে শ্যানন। এরপর সরাসরি গুলি গেঁথে দেবে তলপেটে। ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে লোকটার। প্রায় যায় যায় অবস্থা হলে তখন তার মুখে পুরে দেবে বন্দুকের নল। দুই ব্যারেলের দুই গুলিতে উড়িয়ে দেবে হারামজাদার মাথা।
আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, খুনের গোটা দৃশ্য ক্যামেরার কল্যাণে দেখতে পাবে দর্শকেরা। শ্যানন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার পর বারবার খুনের দৃশ্যটা দেখাবে ব্র্যাড স্টিল। চুক্তি অনুযায়ী, ওর হাতে তুলে দেবে সুটকেস ভরা ডলার। ওকে পৌঁছে দেয়া হবে নিরাপদ কোন দেশে। লোকারণ্যে হারিয়ে যাবে সে। এরচেয়ে ভাল কিছু আর কী ঘটতে পারে ওর মত একজন মানুষের জীবনে!
.
শ্যাননকে কীভাবে ঘায়েল করবে সেটা নিয়ে ভাবছে রানা। অস্ত্র বলতে আছে শুধু ছোরা। ওটার জোরে বন্দুকের বিরুদ্ধে জিতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তানাকার মতই শ্যাননকে লোভ দেখাতে চাইছে রানা। এগিয়ে চলেছে ক্যানিয়নের দূর থেকে দূরে। বুঝে গেছে, যেভাবে হোক খরচ করাতে হবে ইংরেজ সাইকোর গুলি।
রানার পরিকল্পনায় নিজেও সহায়তা করছে শ্যানন। তার জানা আছে আগামী চুয়াল্লিশ মিনিটের ভেতরে রানাকে খুন করতে না পারলে নিজেই মরবে গোড়ালির বোমা বিস্ফোরণে।
অস্বাভাবিক রঙের এক ঝোপের দিকে ছুটে চলেছে রানা। ওটার পাতা সবজেটে-নীল। অবশ্য এখন কিছু ভাবার সময় নেই ওর। পেছনে ‘বুম্!’ শব্দে গর্জে উঠল বন্দুক। একরাশ ছররা গুলি লাগতেই আগুন জ্বলে উঠল রানার পিঠে। ঝাঁপিয়ে পড়ল বামের এক ঝোপে। উঠে বসে ডানহাত পেছনে নিয়ে স্পর্শ করল আহত জায়গা। হাত ফিরিয়ে এনে দেখতে পেল তাজা রক্তে ভিজে গেছে ওর তালু।
বন্দুকের চেম্বারে গুলি ভরছে শ্যানন। বিড়বিড় করে গালি দিচ্ছে স্টিলের বাপ-মা তুলে। শুয়োরের বাচ্চা এলজি শেল না পাঠিয়ে ওকে গছিয়ে দিয়েছে ছোট পাখি মারার কার্তুজ। আবার খুব যে মন্দ লোক ওই শালা, তেমনটাও নয়। বাক্সের ভেতরে অভাব নেই গুলির। সুতরাং সমস্যা হবে না তার। শেয়ালের মত তাড়া খেয়ে ভাগছে এসএএস ফোর্স থেকে প্রশিক্ষিত মাসুদ রানা। শেয়ালের মতই গুলি খেয়ে মরবে সে। শ্যাননের শুধু সতর্ক হতে হবে, যাতে দূর থেকে ছুঁড়ে ছোরা দিয়ে ওকে আহত করতে না পারে সে।
বন্দুকে গুলি ভরে ঝড়ের বেগে ছুটে চলল শ্যানন। খেয়াল করল না, সামনের ঝোপ কেমন যেন অস্বাভাবিক।
.
রুপার্ট শ্যানন পেরিয়ে যেতেই নড়ে উঠে এগোল একটা ঝোপ। বেলারুশের জেলখানায় রাশান অপরাধী লোপাতিনের লড়াইয়ের যোগ্যতা দেখতে যাদের পাঠিয়ে দিয়েছিল স্টিল, তাদেরই একজন অস্ট্রেলিয়ান ক্যামেরাম্যান জোহানসন। এখন ক্যামোফ্লেজ্জ্ ঝোপ নিয়ে এগোচ্ছে সে। ঘুমাতে পারেনি প্রায় তিরিশ ঘণ্টা। তার ওপরে নিজের চোখে ভয়ঙ্কর খুনোখুনি দেখে দমে গেছে তার মন। রানার সঙ্গে লোপাতিনের লড়াই দেখার পর থেকে শুরু হয়েছে তার মানসিক যন্ত্রণা। এটা বুঝে গেছে, দেশে ফিরে গেলে দেরি না করে দেখাতে হবে ভাল কোন সাইকিয়াট্রিস্ট। থেরাপি নিলেও বোধহয় বহু দিন লাগবে সুস্থ হতে।
ভিউফাইণ্ডারে চোখ রেখে যে দৃশ্য ধারণ করেছে, সেজন্যে নিজেকে দোষী বলে ভাবছে সে। ভাল করেই জানে, মানুষ খুনকে কখনও বিনোদন বলে চালিয়ে দেয়া যায় না। এই যে এখন ধীরে ধীরে ঝোপ নিয়ে এগোচ্ছে, সে-ও তো মানুষের খুনের ভিডিয়ো তুলতে। প্রিয় স্ত্রী জেনি আর লক্ষ্মী বাচ্চাদুটোর কথা ভাবতে গেলেই তার মনে চেপে বসছে অপরাধবোধ। জেনি শুধু জানে প্রশান্ত মহাসাগরে এক দ্বীপে একটি রিয়েলিটি শো-তে ক্যামেরাম্যানের কাজ করছে সে। নিয়মিত চার্চে যায় বেচারি, কখনও যদি জানতে পারে ওর স্বামী একদল পশুর জন্যে মানব-হত্যার ভিডিয়ো তুলে বেড়িয়েছে, তাতে চুরচুর হয়ে ভেঙে যাবে ওর মন। আর জানবে না তেমনও নয়। হয়তো এরই মধ্যে পরিচিতরা বলে দিয়েছে, জোহানসন কাজ করছে ডার্টি গেম শো-তে। নিজেকে বোঝাতে চাইছে সে, সংসারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এই কাজটা নিতে বাধ্য হয়েছে সে। কিন্তু তাতেও রেহাই পাচ্ছে না বিবেকের দংশন থেকে। বড় হয়ে বাচ্চারা যখন জানবে ডার্টি গেম-এর ক্যামেরাম্যান ছিল ওদের বাবা, হয়তো চরম ঘৃণা করবে ওকে। পর্নো ক্যামেরাম্যানের চেয়ে নিজেকে ভাল মানুষ বলে ভাবতে পারছে না জোহানসন।
‘এগোও,’ নিচু গলায় বলল পাশের ঝোপ।
জোহানসনকে নিরাপত্তা দিতে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে বসে আছে লোকটা।
কী করবে ভাবতে গিয়ে দ্বিধা এল জোহানসনের মনে। সব ছেড়ে-ছুঁড়ে দেশে ফিরলেই হয়তো ভাল হতো। কিন্তু ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রি অদ্ভুত এক জগৎ। একবার বদনাম হয়ে গেলে আর কখনও কোন কাজ পাবে না। তা ছাড়া, এখন চলে গেলে হয়তো আটকে দেয়া হবে ওর চেক। নিজেকে বুঝ দিল জোহানসন, ঊনত্রিশ ঘণ্টা তো কষ্টেসৃষ্টে পেরিয়ে গেছে, কোনমতে বাকি সময়টুকু পার করতে পারলে হাতে পাব মোটা অঙ্কের টাকা। এরপর আর কখনও যাব না ব্র্যাড স্টিলের ধারে-কাছে। বাকি জীবন খুঁজে নেব ভাল সব শো।
শ্যাননের ওপরে লেন্স তাক করে এগোল জোহানসন। বড় এক বোল্ডারের ওদিকে গুলি করল ইংরেজ সাইকোপ্যাথ। ডান বাহুতে ছররা লাগতেই রানার হাত থেকে উড়াল দিয়ে দূরে গিয়ে পড়েছে বোলো নাইফ। পেছনে বারো গেজের বন্দুকের গর্জন শুনতে পেল রানা। বুঝে গেল, খুব দ্রুত সরে না গেলে পরের গুলি শেষ করে দেবে ওকে। পনেরো গজ দূরে পাথুরে এক গভীর গামলার মত জায়গায় জমে আছে নদীর পানি। ওদিকে ছুটে গেল রানা। প্রায় উড়ে গিয়ে ঝাঁপ দিল ডোবার ভেতরে। পানির নিচে তলিয়ে যেতেই ওপরদিকের পানিতে এসে লাগল একরাশ পেলেট।
পাথুরে ডোবার কিনারায় এসে থামল শ্যানন। বন্দুক রিলোড করে পায়চারি শুরু করেছে ডোবা ঘিরে।
ডোবার ভেতরে কোথাও কোন চিহ্ন নেই মাসুদ রানার।
‘আরে উঠে আয়, শুয়োরের বাচ্চা! এত ভয় কিসের তোর!’ পাথুরে ক্যানিয়নে গমগম করছে শ্যাননের কর্কশ কণ্ঠ।
দুই মিনিট পেরিয়ে গেলেও আর ভেসে উঠল না রানা।
লোকটার গায়ে বোধহয় গুলি লাগেনি, ভাবছে শ্যানন। তবে এবার যে-কোন সময়ে ভেসে উঠতে হবে তাকে।
ডোবার বিশ ফুট দূরে নড়ে উঠল একটা ঝোপ
কীভাবে যেন ডোবা ত্যাগ করে ওদিকের ঝোপে লুকিয়ে পড়েছে মাসুদ রানা, বুঝে গেল শ্যানন। নিশ্চয়ই লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে হারামজাদাটা! শেওলা ভরা পাথুরে জমিতে ঘুরেই ওদিকে ছুটল শ্যানন। জানে, এখন রানার হাতে ছোরাও নেই। ঝোপ আবারও নড়ে উঠতেই নলকাটা বন্দুক ওদিকে তাক করল ইংরেজ সাইকো। ‘বেরিয়ে আয়, শুয়োরের বাচ্চা!’
আরও কয়েক পা যেতেই ঝোপের ভেতরে ক্যামেরার লেন্স দেখতে পেল সে। ধরা পড়ে গেছে বুঝে ভিউফাইণ্ডার থেকে চোখ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল জোহানসন। তার চোখ সরাসরি খুনির লালচে চোখে।
পরস্পরকে দেখছে জোহানসন ও শ্যানন। তারপর বলে উঠল প্রাক্তন মেজর, ‘তুই ঝোপের ভেতরে কেন?’
চোখের কোণে আরেকটা ঝোপ নড়ে উঠতে দেখল শ্যানন। ওর দিকে অ্যাসল্ট রাইফেল তাক করছে এক লোক। শ্যানন জানে না, গার্ডকে বলা হয়েছে বাধ্য না হলে যেন গুলি না করে। গুলি করবে কি না সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে লোকটা। আর সেজন্যেই প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
বন্দুক ঘুরিয়ে তার মুখ লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল শ্যানন। একগাদা পেলেটের আঘাতে উড়ে গল গার্ডের মুখ। পিছিয়ে ধুপ করে পাথুরে মাটিতে পড়ল সে। পরক্ষণে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে ক্যামেরাম্যানের বুকে গুলি করল শ্যানন।
হৃৎপিণ্ডে ছররা ঢুকতেই ধড়াস করে পড়ে গেল জোহানসন। শুধু বলতে পারল, ‘আমি তো সামান্য এক ক্যামেরাম্যান!’
‘তো কীভাবে মরলি সেটা ভিডিয়ো কর্!’ খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল শ্যানন।
মৃত্যুদূত এসে প্রাণটা নিয়ে যাওয়ার আগে পলকের জন্যে প্রিয় স্ত্রী আর বাচ্চাদুটোর হাসিমুখ দেখতে পেল জোহানসন।
.
একই সময়ে ডোবার ভেতরে রানা ভেসে উঠতেই দৃশ্যটা স্ক্রিনে তুলে দিল এমিলি। চোখ এড়িয়ে গেছে গার্ড ও ক্যামেরাম্যানের হত্যাকাণ্ড।
‘এসব দৃশ্য কোথা থেকে এল! লাইভ ইউনিট কী করছে!’ হতাশা নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ব্র্যাড স্টিল।
‘লাইভ ইউনিট মারা গেছে,’ ঢোক গিলে বলল সিওয়ার্স।
জোহানসনের ক্যামেরার দৃশ্য স্ক্রিনে আনল এমিলি। মাটিতে পড়ে আছে যন্ত্রটা। পাশেই মৃত জোহানসন। সামান্য দূরেই অ্যাসল্ট রাইফেলের পাশে গার্ডের লাশ।
এর অর্থ ভাল করে বুঝে গেছে মেইন তাঁবুর সবাই।
এইমাত্র তাদেরই দলের দু’জনকে খুন করে ফেলেছে শ্যানন।
‘ব্যাটা করছেটা কী!’ বিড়বিড় করল স্টিল। লোকদু’জন মারা গেছে বলে তার মনে কোন দুঃখ নেই। আফসোস করছে যে শো-র দুর্দান্ত কিছু দৃশ্য এখন আর দেখতে পাবে না দর্শকেরা।
ক্যামেরায় দেখা গেল শ্যাননের বুটের অংশ। তারপর লোকটা তুলে নিল অটোমেটিক অস্ত্রটা।
রানা যে ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে, ক্যামেরা সেদিকে আবারও ফিরিয়ে আনল এমিলি। একসেকেণ্ডের জন্যে দেখা গেল একটা ঝোপের ওদিকে চলে গেল বাঙালি যুবক।
স্রেফ কপালের জোরে বেঁচে আছে রানা। মিনিট চারেক পানির নিচে ছিল, তারপর দম ফুরিয়ে যেতেই ভেসে উঠেছে ঘন কিছু নলখাগড়ার ভেতরে। আর তখনই দেখতে পেয়েছে ডোবা পাশ কাটিয়ে আরেক দিকে গেল শ্যানন। এরপর গর্জে উঠল তার হাতের বন্দুক। পরক্ষণে আবারও ‘বুম!’ শব্দ ছাড়ল অস্ত্রটা। কে যেন অসহায় স্বরে বলল, ‘আমি তো সামান্য এক ক্যামেরাম্যান!’
নলখাগড়ার ভেতর দিয়ে শ্যাননের দিকে এগোল রানা। কিন্তু তখনই হাত বাড়িয়ে অটোমেটিক অস্ত্র তুলে নিল সাইকো লোকটা।
এবার নিশ্চিত হয়ে গেছে ওর মৃত্যু, বুঝতে দেরি হলো না রানার। তবুও ভাবল ঝুঁকি নিয়ে আক্রমণ করবে শ্যাননের ওপরে। এ-ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই ওর। ডোবার কাছে ওকে খুঁজছে শ্যানন। আর তখনই ঝোপ থেকে বেরিয়ে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা।
একেবারে শেষ সময়ে ওকে দেখে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের নল ঘুরিয়ে নিতে চাইল শ্যানন। তবে রানার হাতের ঝটকা খেয়ে ছিটকে পড়ল অস্ত্রটা। তাতে কমে গেল না বিপদের মাত্রা। ডানহাতে নলকাটা বন্দুক ঘুরিয়ে নিল শ্যানন। অবশ্য গুলি বেরোবার আগেই লাথি মেরে তার হাত থেকে বন্দুক ফেলে দিল রানা। দু’জনই বুঝে গেছে, এবার মরণপণ লড়াইয়ে বোঝা যাবে ওদের ভেতরে কে আসলে সত্যিকারের যোগ্য যোদ্ধা।
Chapter - 31 to 37
একত্রিশ
ডার্টি গেম শো-র শেষ দুই প্রতিযোগীর ভেতরে মরণপণ যুদ্ধ শুরু হলে সেটা ইন্টারনেটে দেখবে চার কোটির বেশি মানুষ।
প্রথমেই ঘুষি ও লাথির কম্বো অ্যাটাকের মাধ্যমে রানাকে কুপোকাৎ করতে চাইল প্রাক্তন ইংরেজ মেজর। সেটার ভেতরে আছে মিলিটারিতে শেখা মার্শাল আর্টের ছোঁয়া। তবে ব্লক করে ঝড়ের বেগে শ্যাননের মুখে, কিডনিতে ও পেটে তিনটে ঘুষি গেঁথে দিল রানা। পিছিয়ে গিয়ে আবারও আক্রমণে এল শ্যানন। রানার চোয়ালে ঘুষি মারল সে। কিন্তু কবজিটা সরিয়ে দিয়ে তার মুখে শক্তিশালী একটা জ্যাব করল রানা। হুড়মুড় করে পিছিয়ে গেল লোকটা
রানার জানা নেই, একই সময়ে বিসিআই হেডকোয়ার্টারে ওদের দু’জনের লড়াই দেখছে অনেকে। প্রত্যেকে উত্তেজিত রানার প্রতিটা ঘুষি ও লাথি মনোযোগ দিয়ে দেখছে সবাই।
ওদিকে নিজেদের অফিসে বসে লড়াই দেখছে স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্স ও তার টিমের সদস্যরা। এমন কী নিজের অফিসে ডার্টি গেম শো গিলছে তাদের বস্ রাইডার। ভুরু কুঁচকে ভাবছে, ইংরেজ মেজরকে লাথিয়ে ও ঘুষিয়ে যেভাবে নাজেহাল করছে মাসুদ রানা, সেটা সত্যিই দেখার মত। এদিকে দ্বীপ লক্ষ্য করে রওনা হয়ে গেছে নেভির বিমান, সুতরাং এখন আর ডিআইএ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর খেয়ে নেবে না তার চাকরি। তথ্য দিয়েছে বলে পদোন্নতিও হতে পারে রাইডারের।
হাতাহাতি লড়াইয়ে কে জিতবে সেটা অনিশ্চিত।
হেলিকপ্টার থেকে ব্যাগ ফেলা হলে ওটার ভেতরে ছিল শটগান ও খাপে ভরা কমব্যাট নাইফ। এখন ইংরেজ মেজরের গোড়ালিতে আছে ছোরাটা। ওটা হয়তো এনে দেবে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
রানার ঘুষি খেয়ে ফুলে গেছে শ্যাননের মুখ। মার খেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে সে। যে-কেউ ভাববে কাহিল হয়ে গেছে।
রানার আরেক ঘুষি মাথার পাশে নিয়ে কার্নিশের মত এক জায়গায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল শ্যানন। ভঙ্গি করছে যে লড়াই করার আর কোন শক্তি নেই। ওদিকে গোড়ালির কাছে হাত নিয়ে খাপ থেকে বের করেছে ছোরা। সামনে বেড়ে ঝুঁকে তার মুখে ঘুষি দিতে চাইল রানা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে একপাশ থেকে ওর বুক লক্ষ্য করে ছোরা চালাল শ্যানন।
বুকের পেশি চিরে যাওয়ায় হোঁচট খেয়ে পিছিয়ে মাটিতে পড়ল রানা। ব্যথা এতই বেশি, ওর মনে হলো যেন দাউ-দাউ করে মগজে জ্বলে উঠেছে আগুন। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে টকটকে লাল রক্তে ভরে গেল ওর শার্ট।
খাপে ছোরা রেখে উঠে দাঁড়াল শ্যানন। এবার হাসতে হাসতে খুন করতে পারবে রানাকে। একটু দূরেই কোথাও আছে গুলি ভরা বন্দুক।
ক্লান্ত রানা কোথাও সরে যাবে, সেটা আর হওয়ার নয়। লড়াই এবার সত্যিই শেষ। আর সেটা ভাল করে জানে শ্যানন। পাথুরে এলাকায় বন্দুকটা খুঁজছে সে।
নিচের দিকে জলে ভরা সব ডোবা দেখতে পাচ্ছে রানা। কার্নিশ থেকে ওদিকে গড়ান দিয়ে নেমে গেলে আহত হবে। তবে এখানে রয়ে গেলেও মরতেই হবে ওকে।
এদিকে বন্দুক হাতে তুলে নিয়েছে শ্যানন।
কার্নিশে শরীরটা গড়িয়ে দিয়ে ঢালু জমি বেয়ে নেমে চলল রানা। তীক্ষ্ণ পাথরে লেগে কেটে যাচ্ছে ওর হাত-পা ও শরীর। শ্যাননের হাতে বিকট শব্দে গর্জে উঠল বন্দুক। একরাশ ছররা লাগতেই রানার মনে হলো নরকের আগুন জ্বলে উঠেছে ওর পিঠে। তীব্র ব্যথা সহ্য করে গড়িয়ে নেমে গেল ও। এবার গুলি লাগল ওর ডান বাহুতে। ঠনাৎ শব্দে ভেঙে গেল কয়েকটা রড। ছররা গুলি ফুটো করে দিয়েছে ওর বাহু। গুলির চেয়ে কম ব্যথা দিচ্ছে না পাথরের খোঁচা। কার্নিশে দাঁড়িয়ে আবারও ওকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল শ্যানন। আর তখনই ছোট এক জলপ্রপাত পেরিয়ে গেল রানা। কিছুই ভাবতে পারছে না তীব্র যন্ত্রণায়। শরীরে বইছে ব্যথার একের পর এক ঢেউ। বরাবরের মত হাল ছাড়ল না ওর নার্ভাস সিস্টেম। ফলে জ্ঞান হারাল না ও। গুলি এসে লাগল ওর শরীরে। পরের গড়ান দিয়ে ঝপাস্ করে নেমে গেল রানা নিচের ডোবায়। ঘোলা চোখে দেখতে পেল ধূসর পানি। কানের ভেতরে এখন আছে অদ্ভুত এক নীরবতা।
কার্নিশে ঝুঁকে ওকে দেখছে ইংরেজ সাইকো। আবার পাম্প করে গুলি ছুঁড়ল। রানার চারপাশের পানিতে লাগল অসংখ্য পেলেট। পানিতে ডোবা পুরুষ লাশের মত উপুড় হয়ে ভেসে থাকল রানার দেহ। ওর মাথা ও অণ্ডকোষে গুলি করবে বলে ভেবেছে শ্যানন। কিন্তু সেটা করতে হলে নেমে যেতে হবে বহু নিচে। হাত ভরে দেখল পকেটে আর কোন গুলি নেই। চারপাশে তাকাল লেন্স দেখার জন্যে। ভাবছে, কোন না কোন ক্যামেরায় দেখানো হচ্ছে ডার্টি গেমের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে গেছে সে।
.
ফ্যাকাসে মুখে মস্ত স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে সোহানা। অনেক কষ্টে সামলে রেখেছে অদম্য কান্না। রানার চারপাশের পানিতে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে লাল রক্ত। কিছুক্ষণের জন্যে ওর দেহের ওপরে স্থির হলো ক্যামেরা। তারপর দেখানো হলো হাসিমুখে রুপার্ট শ্যাননকে।
থমথমে নীরবতা নেমেছে বিসিআই-এর কমপিউটার ডিপার্টমেন্টে। অবিশ্বাস নিয়ে দৃশ্যটা দেখছে সবাই। কেউ মেনে নিতে পারছে না যে ওদের প্রিয় রানা আর বেঁচে নেই।
‘এই দুনিয়াটা সত্যিই খুব নিষ্ঠুর, আর স্রষ্টা আসলে চরম অবিবেচক,’ বিড়বিড় করল সলীল।
ঘরের কারও সাহস নেই যে তাকাবে সোহানার দিকে।
.
মস্ত তাঁবুতে বসে আত্মতৃপ্তি নিয়ে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে ব্র্যাড স্টিল, খুশিতে ফুরফুর করছে তার মন। এটা ঠিক, অন্য অপরাধীদের মত রানাকে নির্যাতন করতে পারেনি শ্যানন, আর সেটা বোধহয় ভালই হয়েছে। দারুণভাবে শেষ হয়ে গেছে ডার্টি গেম শো। এভাবে অনুষ্ঠানটা শেষ হবে সেটা নিজেও কখনও ভাবেনি ব্র্যাড। যেমন ধরনের মানুষই হোক শ্যানন, সে একজন শ্বেতাঙ্গ, তাই পশ্চিমা দুনিয়া খুশি হবে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়নি বাদামি চামড়ার এক লোক।
তারকা হিসেবে শ্যাননের ক্লোয-আপ ছবি স্ক্রিনে দিল এমিলি। ইংরেজ প্রতিযোগী ভাল করে জানে কোথায় আছে ক্যামেরা, তাই লেন্সের দিকে চেয়ে চোখ টিপে হাসল সে। শেষ দৃশ্যের জন্যে আগেই বিজয়ের একটা সুর বেছে দিয়েছে স্টিল। এবার বেজে উঠল সেই মিউযিক।
নিজেকে নিয়ে গর্ব বোধ করছে স্টিল। সিওয়ার্সের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল সাবস্ক্রিপশন নাম্বারের ওপরে। যা চেয়েছিল সেটাই পেয়ে গেছে সে। বুক ফুলিয়ে বলল স্টিল, ‘পুরো চার কোটি পাঁচ লাখ চার হাজার বায়ান্ন জন দর্শক।’
.
এখন তিনটে লেন্স সরাসরি তাক করা আছে শ্যাননের ওপরে।
পেখম মেলা ময়ূরের মত যেন নেচে চলেছে ইংরেজ সাইকো। বারবার তার মনে হচ্ছে, সে যেন হয়ে গেছে দুনিয়ার রাজা। আরও বড় একটা কারণে ভাল লাগছে তার, চিরকালের জন্যে মুক্ত হয়ে গেছে প্রযোজক স্টিলের কল্যাণে। বাকি জীবন আর অভাব হবে না টাকার।
চাপা গর্জন শুনে আকাশে চোখ তুলল শ্যানন।
তার মাথার ওপর দিয়ে গেল নেভির জেট বিমান।
দ্বীপ পেরিয়ে কোথায় যেন চলেছে ওটা।
.
শ্যানন যখন বিমান উড়ে যেতে দেখল, তার মাত্র দুই সেকেণ্ড পর জেট ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে পেল সিম্পসন। চমকে গেছে সে। দ্রুত বিশাল তাঁবু থেকে বেরিয়ে চোখ রাখল নীল আকাশে। শুকিয়ে গেছে তার মুখ।
.
হাজার হাজার মাইল দূরে তীব্র হতাশা নিয়ে স্ক্রিনে চেয়ে আছে বিসিআই-এর এজেন্টরা। কারও বুঝতে দেরি হয়নি, প্রথম থেকেই চরম প্রহসন করে গেছে ব্র্যাড স্টিল। আগেই স্থির ছিল আসলে কে জিতবে।
নতুন দৃশ্যে দেখা গেল ডোবার ভেতরে উপুড় হয়ে ভাসছে রানার লাশ। পানিতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে লাল রক্ত।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই পকেট থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে স্ক্রিন দেখল রায়হান রশিদ। বাটন টিপে কানে ঠেকাল যন্ত্রটা। ‘হ্যাঁ, বলুন, এডওয়ার্ড।’
‘দ্বীপটা পাওয়া গেছে,’ জানাল স্পেশাল এজেন্ট সিমন্স। .’আগামী কয়েক ঘণ্টার ভেতরে ওখানে পৌঁছে যাবে নেভি সিল।’
স্ক্রিনে রানার ভাসমান লাশ দেখে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রায়হান। ক্লো-আপ করা দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে হাস্যরত শ্যাননের মুখ। হঠাৎ রানার ছবির ওপরে এল লাল এক বড় ক্রস-চিহ্ন। দপদপ করে উজ্জ্বল আলো ছড়াল শ্যাননের ছবি।
‘আমাদের আর কিছু করার ছিল না,’ বলল সিমন্স। ‘বিসিআই এজেণ্ট মাসুদ রানাকে সাহায্য করতে গিয়ে অনেক দেরি করে ফেলেছে ডিআইএ।’
‘আপনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, সেজন্যে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,’ শুকনো গলায় বলল রায়হান। ‘ভাল থাকুন!
স্পেশাল এজেন্ট এডওয়ার্ড সিমন্সের কল কেটে দিল ও।
ইন্টারনাল স্পিকারে ওরা শুনল বিসিআই চিফের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ: ‘কোঅর্ডিনেট্স্ অনুযায়ী সেই দ্বীপের খুব কাছে আছে বাংলাদেশ নেভির ব্যাটল শিপ। আগামী আধঘণ্টার ভেতরে ওখানে পৌঁছে যাবে আমাদের অফিসার ও জোয়ানেরা। ওরা ধরে আনবে ব্র্যাড স্টিল এবং তার দলের লোকগুলোকে। রানার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে, সেজন্যে আমাদের তরফ থেকে চরম শাস্তি দেয়া হবে তাদেরকে।’ আরামদায়ক চেয়ারে বসে বিশাল স্ক্রিন দেখছে ব্র্যাড স্টিল। গর্বে আরও দশ ইঞ্চি ফুলে গেছে তার বুক। এ-ধরনের কোন অনুষ্ঠান আগে কখনও দেখেনি কেউ। চিরকালের জন্যে ইতিহাসে লেখা থাকবে তার নাম।
‘এমিলি, হাইলাইট করা রিল কাট করে নিয়েছ?’ স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে বলল সে।
‘আমার কাজ শেষ,’ জবাবে জানাল মেয়েটা। তর্কে যেতে রাজি নয়, তবে তারও মনে হচ্ছে প্রতিযোগিতায় কোন ন্যায্যতা ছিল না। চরম অন্যায় করেছে ওদের বস্।
‘আমাদের বিজয়ীকে এনে অনুষ্ঠান শেষ করার আগে রিল দেখাও,’ ক্লান্ত স্বরে বলল স্টিল। তার চেহারা দেখলে যে- কেউ এখন ভাববে, এইমাত্র যৌন-মিলন শেষে বিশ্রাম করছে লোকটা।
মাথা দোলাল এমিলি। ‘তো শেষ হয়ে গেল এই শো।’
তার দিকে চেয়ে খুশির হাসি হাসল স্টিল। এমিলি যেহেতু বেইমানি করেনি, তাই অন্য কোন শো-তে ওকে নেবে সে। রিটার কথা ভেবে মনে মনে বলল স্টিল, ‘তোমার এতক্ষণে বোঝার কথা, আমি সত্যিই একজন জিনিয়াস।’ ঘুরে তাকাল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা।
কিন্তু কখন যেন বিশাল তাঁবু ছেড়ে চলে গেছে রিটা।
মেয়েটা নেই বলে খুব বিরক্তি বোধ করল স্টিল। রিটাকে খুঁজে নেবে বলে চেয়ার ছেড়ে রওনা হবে, এমন সময় তাঁবুর ভেতরে এসে ঢুকল রিভ সিম্পসন। শুকিয়ে গেছে তার মুখ। ‘আবার কী হয়েছে?’ বিরক্তি আরও বাড়ল স্টিলের।
অন্যরা যেন শুনতে না পায়, তাই তার কানের কাছে মুখ নিয়ে সিম্পসন বলল, ‘এইমাত্র ইউএস নেভির একটা এফ/এ-১৮ বিমান দ্বীপের ওপর দিয়ে গেছে। ওরা এখন জানে আমরা কোথায় আছি।’
কথাটা অ্যাটম বোমার মত আঘাত করল স্টিলের মগজে। এতদিন এই দ্বীপের অবস্থান গোপন করে রেখেছিল সে। দ্বিগুণ বেতন দিয়েছে পাইলটদেরকে, যাতে মুখ বন্ধ রাখে তারা। সবাই মুখ বুজে থাকলেও আজ ভোরে কম্পাউণ্ডে ঢুকে ওয়েদার টাওয়ার থেকে কোঅর্ডিনেট্স্ ফাঁস করে দিয়েছে মাসুদ রানা। এরই ভেতরে মারা গেছে লোকটা, নইলে নিজের হাতে তাকে গুলি করে মারত স্টিল।
‘এবার?’ নিচু গলায় বলল সিম্পসন। চট্ করে তাকাল এমিলি, সিওয়ার্স ও অন্যদের দিকে।
তার দৃষ্টি অনুসরণ করল ব্র্যাড। আগে কখনও ভাবেনি দলের সবাইকে হঠাৎ করে অন্য কোথাও সরাতে হলে কী করতে হবে। কয়েক সেকেণ্ড ভেবে বুঝে গেল সে, আইনী ঝামেলা থেকে বাঁচতে চাইলে অন্যদেরকে ফেলে পালিয়ে চলে যেতে হবে দ্বীপ ছেড়ে।
‘বড় হেলিকপ্টারটা কি ফিরেছে?’
‘না,’ মাথা নাড়ল সিম্পসন। ‘সেট-আপ ক্রুদের পৌঁছে দিতে মেইন ল্যাণ্ডে গেছে।’
পাইলটকে বাদ দিলে মাত্র কয়েকজন উঠতে পারবে বেল জেটরেঞ্জার হেলিকপ্টারে। আর সেক্ষেত্রে দ্বীপ ত্যাগ করতে পারবে শুধুমাত্র ব্র্যাড, সিম্পসন, রিটা আর অন্য একজন। বিশাল তাঁবুর ভেতরে চোখ বোলাল স্টিল। সন্দেহ নিয়ে ওকে দেখছে সিলভি। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে বেয়াড়াপনা করলেও এতকাল ভাল বন্ধুর মত নিজের দায়িত্ব পালন করেছে সে। একবার বিশ্বাসী কর্মী সিওয়ার্স ও এমিলিকে দেখল স্টিল। কাজে দক্ষ না হলেও এই শো-র জন্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছে তারা।
এমিলি ও সিওয়ার্সের মধ্যে কাকে সঙ্গে নেবে ভেবে পেল না স্টিল। ফিসফিস করে বলল সিম্পসনের কানে, ‘সব গুছিয়ে নেব। দশ মিনিটের ভেতরে চলে এসো জিপের কাছে।’
স্টিলের দিকে এল সিলভি, চোখে অভিযোগের দৃষ্টি।
‘অন্যদের কী হবে?’ নিচু গলায় বলল সিম্পসন।
‘মিলিটারি হানা দিলে আগে ধরতে চাইবে আমাদের ক’জনকে, ওদেরকে নয়।’
কথাটা যে আসলে মিথ্যা, সেটা ভাল করে জানে সিম্পসন ও স্টিল। ডার্টি গেমের মত চরম অন্যায় শো-তে যারা জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেবে না দুনিয়ার কোন আদালত।
‘হঠাৎ তোমার এত তাড়া কিসের?’ বলল সিলভারম্যান।
জবাব না দিয়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে গেল সিম্পসন। পেছন থেকে তাকে দেখছে সিলভি। প্রথম থেকে সিকিউরিটি চিফকে বিপজ্জনক, অসৎ লোক বলে মনে হয়েছে ওর। সিম্পসন যখন পুলিশের চাকরি করত, তখনও নানা অপরাধে জড়িত ছিল। তার ভেতরে ছিল ডাকাতি ও খুনের অভিযোগ। ডার্টি গেমের · শো-র জন্যে ভাল লোক চেয়েছিল সিলভারম্যান, কিন্তু তার কথা কানেই তোলেনি স্টিল। উল্টে বলেছে, ‘সিম্পসন ভাল একজন মানুষ। নিজের কাজও খুব ভাল করে বোঝে।’
দ্বীপের ওপর দিয়ে বিমান যেতেই সেই আওয়াজ শুনেছে সিলভি। এ-ও বুঝে গেছে, গোপনে কী যেন করছে স্টিল ও সিম্পসন।
‘আমি এখন ব্যস্ত, সিলভি,’ নিজের তাঁবুতে যাওয়ার জন্যে রওনা হলো ব্র্যাড।
‘দূরে কোথাও যাচ্ছ, স্টিল?’ তার পিছু নিল সিলভারম্যান।
জবাব না দিয়ে হনহন করে হাঁটছে স্টিল।
‘আসলে যাচ্ছ কোথায়? ভেবেছ আমি কিছুই বুঝিনি? এইমাত্র দ্বীপের ওপর দিয়ে গেছে বিমান। আমার তো মনে হচ্ছে আমাদেরকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছ তোমরা!’
একটু দূরে আছে সিম্পসন। সিলভির কথা শুনতে পেয়েছে সে। এটা বুঝে গেছে, ঝামেলা করবে টেকনিকাল ডিরেক্টর।
বহুকালের বন্ধু হলেও সিলভি যে ঝগড়া করেছে, সেটা মনে পড়তেই তিক্ত হলো স্টিলের মন। ব্যক্তিগত তাঁবুতে ঢুকে ভাবল সে, সিলভির অন্তত সত্যি কথাটা জানার অধিকার আছে।
‘একটু আগে নেভির বিমান আমাদের ক্যাম্প দেখে গেছে। নেভি যে-কোন সময়ে এই দ্বীপে রেইড দেবে।’
‘নেভি?’ চমকে গেল সিলভি। ‘আর তুমি ভাবছ সবাইকে ফেলে পালিয়ে যাবে?’
‘গলা নিচু করে কথা বলো, সিলভি।’
‘তুমি তো সবাইকে আশ্বস্ত করেছিলে, আইনী কোন বিপদ হলে সেটা সামলে নেবে তুমি,’ গলা আরও চড়ল সিলভির। ‘এখন চোখ উল্টে নিচ্ছ কেন! অন্যরা বিপদে থাকবে আর তুমি কাপুরুষের মত সটকে পড়বে?’
‘পরিস্থিতি এখন একদম বদলে গেছে,’ দ্রুত হাতে ব্যক্তিগত কিছু জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছে স্টিল।
‘তুমি যা খুশি করতে চাইলেই হবে? অন্যদের কোন অধিকার নেই নিরাপদে চলে যাওয়ার? আমি সবাইকে বলে দেব! এমিলি, সিওয়ার্স, রিটা… সবাইকে!’
চট্ করে প্রেমিকার কথা মনে পড়ল স্টিলের। মেয়েটা কোথায় গেল? সে ভেবেছিল তাঁবুতে থাকবে রিটা।
‘আমরা গেলে একসঙ্গে যাব, নইলে কেউ নয়!’ চেঁচিয়ে উঠল সিলভারম্যান।
তাঁবুর দরজার কাছে সিম্পসনকে দেখতে পেল স্টিল। লোকটার চোখে সিলভির প্রতি চরম বিদ্বেষ। যে-কোন সময়ে টেকনিকাল ডিরেক্টরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে সে।
সিলভিকে শেষবার সুযোগ দিল স্টিল। ‘হেলিকপ্টারে আর মাত্র একজন উঠতে পারবে। তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারো। শো-তে কাজ করেছ বলে তোমাকে দেব পুরো এক মিলিয়ন ডলার।’
স্টিলের কথায় আরও রেগে গেল সিলভি। অন্যদের কী হবে সেটা ভাবতে গিয়ে ভয়ে শুকিয়ে গেছে তার গলা। বুঝে গেল, ডার্টি গেম শো-তে কাজ করে নিজের আত্মা শয়তানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সে। ‘তুমি এক মিলিয়ন ডলার দিতে চাইছ? অন্যদের কী হবে? তোমার সঙ্গে যে মৌখিক চুক্তি আমার হয়েছে, তাতে আমাকে দেয়ার কথা অন্তত পাঁচ মিলিয়ন ডলার!’
টাকার অঙ্ক শুনে সিলভির প্রতি শেষ ফোঁটা বন্ধুত্বও উবে গেল স্টিলের মন থেকে। শীতল কণ্ঠে বলল সে, ‘তুমি কিন্তু একজন টেকনিশিয়ান, এর বেশি কিছু নও। চাকরি করেছ, তাই বেতন পাবে। শো থেকে যে টাকা এসেছে, সেসবে কিন্তু তোমার কোন অধিকার নেই।’
‘শালা, কুত্তার বাচ্চা কোথাকার…’ মারমুখী হয়ে স্টিলের দিকে এগোল সিলভি। কিন্তু পরক্ষণে তার সামনে পৌঁছে গেল সিম্পসন। হ্যাঁচকা টানে স্টিলের কাছ থেকে সিলভিকে সরিয়ে নিল সে। প্রচণ্ড ঘুষি বসাল টেকনিশিয়ানের পেটে। বুক থেকে বাতাস বেরোতেই প্রায় দুই ভাঁজ হয়ে গেছে সিলভি।
পরস্পরের চোখে তাকাল স্টিল আর সিম্পসন। তাদের ভেতরে কোন কথা হলো না। দু’জনই জানে এবার কী করতে হবে। প্রাক্তন বন্ধুকে দেখল ব্র্যাড। একসময় অনেক কাজে এসেছে সিলভি, আর সেজন্যে পেয়েছে মেলা টাকা বেইমানি না করলে হয়তো আরও বহু কিছু পেত। মনিবের ওপরে চড়াও হতে গিয়েছিল বলে এখন চরম শাস্তি পাবে সে।
সিম্পসনের দিকে চেয়ে মৃদু মাথা দোলাল স্টিল। গোছাতে লাগল নিজের মালপত্র। সিলভারম্যানকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে তাঁবুর পেছনে ফাঁকা জায়গায় গেল সিম্পসন। এদিকে আসে না কেউ। মাত্র দম ফিরে পেয়েছে সিলভি, এমন সময় দেখতে পেল সিম্পসনের হাতে আর্মির ছোরা।
‘আমাকে মেরো না,’ করুণ সুরে বলল সিলভি।
অসহায় যুবকের গলায় ছোরার ফলা ঠেকাল সিম্পসন। গত ত্রিশ ঘণ্টায় বারবার করে দেখেছে মানুষ খুন হতে। ভেবেছে, সে-ও যদি পেত এই সুযোগ! হেলিকপ্টারের ভেতরে রানা কনুইয়ের গুঁতো মারার পর বহুবার মনে হয়েছে, নিজের হাতে ব্যাটাকে খুন করতে পারলে খুব ভাল লাগত তার। তবে সেটা যখন হলো না, বেইমান সিলভিকে খতম করে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিতে দোষ কোথায়!
সিলভির পেটে ডান হাঁটু গেঁথে দিল সিম্পসন। ভুস্ করে ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে যেতেই কুঁজো হয়ে গেল যুবক। আর এই সুযোগে গরু জবাইয়ের মত করে তার গলায় ছোরা চালাল সিকিউরিটি চিফ। ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে বেরোল টকটকে রক্ত। মাটিতে ধুপ করে পড়ে দু’পা ছুঁড়ছে সিলভি। একটু সরে তার ওপরে চোখ রাখল সিম্পসন।
একমিনিটের ভেতরে থেমে গেল সিলভির দেহের সব নড়াচড়া আর গলার ভেতরে ঘড়ঘড় আওয়াজ। আকাশে অস্বচ্ছ চোখে চেয়ে রইল টেকনিকাল ডিরেক্টর।
মনে অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিয়ে জিপের দিকে চলল সিম্পসন। নিজেকে বলল, এভাবে খুন করতে যে এত মজা, আগে তো বুঝিনি! আমি চাই এমন করে আরও অনেকের জান নিতে!
বত্রিশ
ক্যামেরার জন্যে পোয দেয়ার পর পুরস্কারের কথা মনে পড়ল শ্যাননের। গুলিশূন্য বন্দুক ফেলে সংগ্রহ করে নিল বিআর ১৮। এখন তার প্রথম কাজ হবে ব্র্যাড স্টিলের সঙ্গে গিয়ে দেখা করা। খুলিয়ে নিতে হবে গোড়ালির বোমা ভরা ব্রেসলেট। টিকটিক করে সময় গুনে চলেছে টাইমার। ওটার দিকে তাকালে কেমন যেন শিরশির করে উঠছে তার বুক। আর মাত্র উনিশ মিনিট পর বিস্ফোরিত হবে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ।
তিন মিনিটে ক্যানিয়ন থেকে উঠে এসে পাঁচজন গার্ডকে চোখের সামনে দেখতে পেল শ্যানন। ওর মত তাদের হাতেও বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল। এরা এসেছে বিজয়ীকে বরণ করে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। তাদের একজন কড়া গলায় বলল, ‘অস্ত্র ফেলো!’
কথাটা শুনে কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে থমকে গেল – শ্যানন। চট্ করে বুঝে নিতে চাইল পাঁচজনের বিরুদ্ধে একা লড়াই করে জিতে যেতে পারবে কি না। তার মন চাইছে এদেরকে খুন করতে। এই দলের কাউকে কাউকে দেখেছে হ্যাঙারে। কারও বয়স বিশ বাইশের বেশি নয়। কোন সন্দেহ নেই যে যুদ্ধে এরা একেবারেই অদক্ষ।
‘শেষবারের মত বলে দিচ্ছি, হাত থেকে অস্ত্র ফেলো!’ বলে উঠল তাদের দলনেতা। সবাই মিলে ঘিরে ধরেছে শ্যাননকে।
একা এতজনকে খুন করে ফেলতে পারবে না বুঝে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল শ্যানন।
‘তুমি লড়াইয়ে জিতে গেছ, তাই এই খেলা এখন শেষ, ‘ বলল একজন গার্ড।
এদের ওপরে গুলি চালায়নি বলে মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ দিল শ্যানন। সে-ধরনের কিছু করে বসলে খেপে যেত প্রযোজক ব্র্যাড স্টিল। আগে লোকটাকে দিয়ে খুলিয়ে নিতে হবে টাইম বম, তারপর আদায় করতে হবে ডলারে ভরা সুটকেস। বোকার ভঙ্গি করে বলল সে, ‘তাই? খেলা শেষ? আমি তো মাত্র মজা পেতে শুরু করেছি!’
‘বস্ তোমাকে কম্পাউণ্ডে নিয়ে যেতে বলেছেন,’ বলল গার্ডদের দলনেতা। ‘এবার এসো আমাদের সঙ্গে।’
মাটি থেকে বিআর ১৮ রাইফেল তুলে নিল এক গার্ড। অন্য দু’জন দ্রুত হাতে সার্চ করল শ্যাননকে। তার পায়ের খাপে রাখা ছোরা নিয়ে নিল একজন।
‘আশা করি তোমাদের হাতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সিগার আর ব্র্যাণ্ডি,’ মুচকি হাসল শ্যানন। যেহেতু একটু পর মুক্তি পাবে আর সঙ্গে পাবে সুটকেস ভরা ডলার, তাই সহায়তা করতে কোন ধরনের আপত্তি নেই তার।
সিম্পসন টেকনিকাল ডিরেক্টর সিলভির গলা ফাঁক করে দেয়ার মাত্র একমিনিটের ভেতরে শ্যাননকে নিয়ে কম্পাউণ্ডে ঢুকে পড়ল গার্ডদের জিপ। একই সময়ে নিজের তাঁবু থেকে সরু এক ব্রিফকেস নিয়ে বেরিয়ে এল স্টিল। তার সামনেই ব্রেক কষে থামল গার্ডদের জিপ। বিজয়ীর ওপরে নিজেদের বিআর ১৮ রাইফেল তাক করে রেখেছে গার্ডেরা।
‘কংগ্রাচুলেশন্স,’ শুকনো গলায় শ্যাননকে বলল স্টিল। ‘তুমি সত্যিই জিতে গেছ। আর তাই এখন থেকে তুমি মুক্ত একজন মানুষ।’
‘আগে আমার গোড়ালি থেকে টাইম বম খুলে দাও, মেট,’ প্রযোজককে বিশ্বাস করার কোন কারণ দেখছে না শ্যানন। আর মাত্র বারো মিনিট পর ফেটে যাবে বোমা।
গলা থেকে চেইন খুলল স্টিল। ওটা থেকে ঝুলছে ছোট্ট রুপালি চাবি। শ্যাননের গোড়ালির ব্রেসলেটের তালায় ওটা ভরে দিল সে। লক খুলে যেতেই নিভে গেল টাইমারের এলইডি লাল বাতি।
‘তুমি এখন থেকে মুক্ত,’ কাঠের মত শুকনো হাসল স্টিল। এটা বলতে গেল না যে দ্বীপ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে ইউএস নেভির রণতরী। সৈনিকেরা একবার এখানে পৌঁছে গেলে বন্দি করা হবে শ্যাননকে। অবশ্য ততক্ষণে হেলিকপ্টারে চড়ে বহু দূরে চলে যাবে স্টিল। এখন খুঁজে নিতে হবে রিটাকে।
শ্যানন গোড়ালি থেকে ব্রেসলেট খুলতেই তার হাত থেকে ওটা নিয়ে নিল স্টিল। তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল শ্যানন। ‘তোমার এত তাড়া কিসের? কোথায় যাচ্ছ? আমার টাকা কোথায়?’
তিক্ত চোখে তাকে দেখল ব্র্যাড। ‘খুশি থাকো যে প্রাণে বেঁচে গেলে। মুক্ত মানুষ হিসেবে কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারবে।’
কথাগুলো শুনে সরু হয়ে গেল শ্যাননের দুই চোখ। ‘তুমি কিন্তু এই শো-র জন্যে আমার সঙ্গে একটা চুক্তি করেছ। ভাল করে অভিনয় করেছি তোমার শো-র জন্যে। প্রতিযোগিতায় প্রথমও হয়ে গেছি। তোমার কারণে এখন আমি মুক্ত। কিন্তু মুক্ত মানুষের বাঁচতে হলে তার লাগে বহু টাকা। সেগুলো এখন কোথায়?’
‘তুমি জিতে যেতে পেরেছ কারণ আমি সেটাই চেয়েছি,’ অধৈর্য স্বরে বলল স্টিল। ‘তোমার সঙ্গে আবার আমার কিসের চুক্তি! তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, এটাই তো তোমার জন্যে অনেক বেশি।’ গার্ডদের দিকে তাকাল সে। ‘একে এখানেই আটকে রাখো। আমি একটু পর ফিরে আসব। তারপর দেখব এর কী ব্যবস্থা করা যায়।’
চিরকালের জন্যে দ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে সেটা নিজে ভাল করেই জানে স্টিল। বড় তাঁবুর দিকে হনহন করে হেঁটে চলল সে।
তীব্র রাগ চেপে রেখে তার দিকে চেয়ে রইল শ্যানন। ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল গার্ডদের দিকে। হাসি-হাসি মুখে চোখ টিপে বলল, ‘সত্যি, আমি খুব ভাগ্যবান! বেঁচে তো গেলাম!’
আমার হাত থেকে আর রেহাই নেই ব্র্যাড স্টিলের, মনে মনে কঠোর শপথ নিল সে।
তেত্রিশ
ডোবার পানিতে ভেসে আছে রানার দেহ। বারবার নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ওকে দেখাচ্ছে অন্তত তিনটে ক্যামেরা। পরের দু’মিনিটে মৃদু স্রোতে ভাসতে ভাসতে নলখাগড়ার জঙ্গলের কাছে চলে গেল ওর দেহ। ততক্ষণে কার্নিশের ওপরে শ্যাননের নর্তন-কুর্দনের ভিডিয়ো ব্যস্ত হয়ে তুলছে ক্যামেরা তিনটে।
সবুজ শেওলা ও লাল রক্তে ভরা শরীরে গত চার মিনিট ধরে দম আটকে উপুড় হয়ে ভেসে থেকেছে রানা। এবার বাধ্য হয়ে ঘাড় কাত করে একবার শ্বাস নিল। ভীষণ জ্বলছে বুকের গভীর ক্ষত। বন্দুকের পেলেটের আঘাতে ফুটো হয়ে গেছে পিঠ ও হাত-পা। দরদর করে ক্ষত থেকে ঝরছে রক্ত। ছোট এক গুহার মত জায়গায় ওর দেহ ঠেকে যেতেই মাথা কাত করে ওপরে তাকাল রানা। কার্নিশের কাছে আছে শ্যানন। ধরে নিয়েছে খুন হয়ে গেছে ও।
বাজেভাবে আহত হয়েছে রানা। শরীরে শক্তি নেই যে ডোবা থেকে উঠে আসবে। বারবার ওর মন চাইছে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়তে। সত্যিই হয়তো দুর্বলতার কারণে পানির নিচে তলিয়ে যেত, কিন্তু ওর মনের আয়নায় ভেসে উঠল কুঞ্চিত একজোড়া কাঁচা-পাকা ভুরু। কঠোর চোখে দেখছেন মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান। খুব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘উঠে পড়ো, রানা! তোমার কাজ এখনও শেষ হয়নি!’
‘জী, স্যর,’ বিড়বিড় করে বলল রানা। সোজা হয়ে পা ওপরে তুলে আনল। টাইমারে দেখতে পেল-০০:১৪:০৫ মিনিট। আবারও কাজ করতে শুরু করেছে ওর মগজ। বুঝে গেছে মাত্র কয়েক মিনিটের ভেতরে মরতে হবে বোমা বিস্ফোরণে। আর ভাবনাটা ওকে এনে দিল মানসিক ও দৈহিক শক্তি। গুহার মত জায়গাটা থেকে বেরিয়ে ডোবার তীরে উঠে এল রানা। তীব্র ব্যথা সহ্য করে সরে গেল মোটা এক গাছের ওদিকে। দূরে দেখতে পেল ক্যানিয়ন ছেড়ে উঠে গেছে শ্যানন।
ওদিকে চেয়ে রইল রানা। মনে তীব্র ঘৃণা নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি যদি মরেই যাই, তার আগে চাই তোকে শেষ করে দিতে!’
চৌত্রিশ
রানার মৃত্যুর পর বিশাল তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে রিটা। বাঙালি যুবক খুন হয়ে যাওয়ায় মনের সব আশা ফুরিয়ে গেছে ওর। গত ত্রিশ ঘণ্টা আগে নিজেকে ভাবত একজন নিরপরাধ মানুষ হিসেবে। কিন্তু এখন অন্তর থেকে জানে, পাপীদের সঙ্গে মিশে তাদের মতই অপরাধী হয়ে গেছে ও। স্টিল যা চেয়েছে, সেটা সে পেয়ে গেছে। চার কোটির বেশি মানুষ দেখেছে তার নিষ্ঠুর শো। বেশিরভাগ লোক হয়তো খুশি হয়েছে রানার মৃত্যুতে। আর স্টিলের কথায় তাদেরকে মিথ্যা তথ্য জুগিয়ে দেয়ার পেছনে অবদান রেখেছে নীতিহীন রিটা নিজে।
সিলভির মতই অস্বচ্ছ ছিল ওর ভাবনাগুলো। ভুলেও কখনও বুঝতে পারেনি যে কতবড় বিপদে গিয়ে পড়ছে। কয়েক দিন আগেও ভয়ঙ্কর অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে ছিল রিটা। অথচ এরপর যা ঘটে গেছে, তাতে মনে হচ্ছে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার আসলে কারোরই নেই।
মাসুদ রানার ছবির ওপরে যখন লাল ক্রস-চিহ্ন ফুটে উঠল, মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেছে রিটা। কাঁদতে শুরু করে ভেবেছে, যদি দূরে কোথাও চলে যেতে পারত এই কম্পাউণ্ড ছেড়ে! কিন্তু তাতে হতে পারে বড় ধরনের বিপদ, তাই ওকে বাধা দিয়েছে গার্ডেরা। যদিও এই এলাকাটাও এখন আর নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে না ওর।
কিছুক্ষণ কাঁদবার পর ভাবল রিটা, ব্র্যাড স্টিলের অনুমতি পেলে দেরি না করে ত্যাগ করবে এই দ্বীপ। আবারও মস্ত তাঁবুতে ফিরে দেখতে পেল কোথায় যেন গেছে স্টিল। প্রতিযোগিতার বিশেষ সব রিল এখন দেখানো হচ্ছে স্ক্রিনে। একটু পর পর হলিউডের সিনেমার মত করে বাজছে নাটকীয় সব মিউযিক। এখনও বিশ্বাস হতে চাইছে না রিটার, কতবড় অপরাধ করে বসেছে স্টিল এবং তার দলের কর্মীরা।
এদের কারও জানা নেই আসলে কোথায় গেছে ব্র্যাড। এমিলি বলেছে, একটু পরে ফিরে এসে শ্যাননকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেবে স্টিল। মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চুপচাপ ব্র্যাডের চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে রইল রিটা। বুঝে গেছে, বাড়ির চেয়ে বেশি শান্তির আর কোন জায়গা নেই এই দুনিয়াতে। ওর মনটা এখন চাইছে হেলিকপ্টার বা বোট না পেলেও স্রেফ সাঁতরে সাগর পাড়ি দিয়ে ইংল্যাণ্ডে ফিরতে। তবে বাস্তবতা আসলে হচ্ছে যে স্টিল অনুমতি না দিলে কোথাও যেতে পারবে না রিটা। নিষ্ঠুর লোকটার কথা ভাবতে, গেলেই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করছে ও।
কয়েক মিনিট পর সরু এক ব্রিফকেস হাতে তাঁবুর ভেতরে এসে ঢুকল ব্র্যাড। তার অন্য হাতে রুপার্ট শ্যাননের গোড়ালির সেই ব্রেসলেট। এইমাত্র বলে এসেছে, চিরকালের জন্যে মুক্তি পেয়ে গেছে শ্যানন, তবে তাকে কোন ধরনের টাকা দেয়া হবে না।
স্টিলকে দেখে কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল এমিলি, ‘কী ব্যাপার, কোথাও কোন সমস্যা?’
‘কোথাও কোন সমস্যা নেই, মন দিয়ে নিজের কাজ করো,’ হাসি-হাসি মুখে বলল ব্র্যাড। এইমাত্র দেখতে পেয়েছে তাঁবুর কোণে দাঁড়িয়ে আছে রিটা। দ্রুত ওর সামনে চলে গেল সে। বাহুতে হাত রেখে নিচু গলায় বলল, ‘আমার সঙ্গে এসো।’
অন্যদিকে চেয়ে বাহু ছুটিয়ে নিয়ে আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল রিটা, ‘আমাকে আর কখনও স্পর্শ করবে না।’
মেয়েটার কথা শুনে মনে মনে মস্ত হোঁচট খেয়েছে ব্র্যাড স্টিল। এক পলকে বুঝে গেছে, তাকে এখন চরম ঘৃণা করে রিটা।,
দ্বীপ থেকে বিদায় নিতে চায় বলে নরম সুরে কথা বলবে ভেবেছিল রিটা, কিন্তু ওর কণ্ঠ থেকে ঝরেছে তীব্র ক্ষোভ।
স্টিল খুব ভাল করেই জানে, কাউকে বোঝাবার মত সময় এখন তার হাতে আর নেই। আড়চোখে দেখল এদিকেই চেয়ে আছে কর্মীরা। তারা জানে, এবার শ্যাননকে বিজয়ী ঘোষণার মাধ্যমে শেষ করা হবে ডার্টি গেম শো। বিশেষ করে সিওয়ার্স ও এমিলির চোখে হতবাক দৃষ্টি। তারা যেন বুঝতে পারছে না, বসের হাতে ব্রিফকেস কেন।
শেষবারের মত রিটাকে দেখে নিয়ে মনে মনে বলল স্টিল, শালী কুত্তী, তোর চেয়ে ঢের বেশি সুন্দরী কাউকে আমি জুটিয়ে নেব। তাঁবু থেকে বেরোবার আগে ডাহা মিথ্যা বলল সে, ‘আমি একটু পরেই ফিরছি।’
.
দু’জন সশস্ত্র গার্ড পাহারা দিচ্ছে শ্যাননকে। প্রযোজকের কথা শোনার পর থেকে রাগে ফুঁসছে সে। একটু আগে দেখেছে বড় তাঁবুতে গিয়ে ঢুকেছে স্টিল, তারপর আর বেরোয়নি।
হাসি-হাসি চেহারায় গার্ডদেরকে দেখছে শ্যানন। তাদের একজনের বেল্টের খাপে যে ছোরা, সেটা চোখ এড়ায়নি তার।
অন্যজন শিথিলভাবে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে।
দুই গার্ডের দিকে চেয়ে আবারও হাসল শ্যানন। ‘বাড়তি কোন সিগারেট হবে? এটা তো বোঝো, কী খাটুনিই না করেছি তোমাদের শো-র জন্যে!’
সিগারেটের প্যাকেট বের করতে বুক পকেটে হাত ভরল ধূমপায়ী গার্ড। আর এই সুযোগটা নিল স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন মেজর। অসতর্ক গার্ডের গালে বসিয়ে দিল প্রচণ্ড এক ঘুষি। পরক্ষণে ছোঁ দিয়ে প্রথম গার্ডের কোমরের খাপ থেকে ছোরা নিয়ে গেঁথে দিল যুবকের বুকে।
দ্বিতীয় গার্ড বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের নল ওপরে তোলার আগেই ফাঁক হয়ে গেল তার গলা। দুই লাশ মাটিতে পড়ার আগেই তাদের একজনের হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিল শ্যানন। একই সময়ে দেখতে পেল কাছের এক তাঁবুর কোনা ঘুরে বেরিয়ে এসেছে তৃতীয় গার্ড। তার মুখে ধুপ করে বিআর ১৮-র বাঁট নামাতেই দেখতে না দেখতে ভূমিশয্যা নিল অচেতন গার্ড।
চোখে তীব্র ক্রোধ নিয়ে বড় তাঁবুটার দিকে তাকাল শ্যানন। প্রায় ছুটে গিয়ে ঢুকল ওটার ভেতরে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে খুঁজল ব্র্যাড স্টিলকে। কিন্তু আশপাশে নেই লোকটা।
তাঁবু থেকে বেরোবার দরজার কাছে আছে এমিলি। মেইন স্ক্রিনে ব্যস্ত হয়ে রিল দিচ্ছে সে। মন ওদিকে থাকলেও চোখের কোণে নড়াচড়া দেখে ঘুরে তাকাল মেয়েটা। আর সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল তাঁবুতে এসে ঢুকেছে ভয়ঙ্কর খুনি রুপার্ট শ্যানন! ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল ওর। খেয়াল করল এখন লোকটার হাতে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল!
এমিলির দিকে চেয়ে নিজের ঠোঁটে আঙুল রাখল শ্যানন। বুঝিয়ে দিল একদম চুপ করে থাকতে হবে মেয়েটাকে। ঢোক গিলে মাথা দোলাল এমিলি। ওর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আরেকবার তাঁবুর ভেতরে স্টিলকে খুঁজল ইংরেজ সাইকো।
চেয়ার ঘুরিয়ে তাকে দেখতে পেল মিলা। ওর গলা চিরে বেরিয়ে এল বেসুরো আর্তনাদ। ‘ওরে, বাবারে!’
‘অ্যাই, মাগী, চুপ কর্!’ আরও রেগে গিয়ে ধমক দিল শ্যানন। ‘টু শব্দ করলে গলা দিয়ে ভরে দেব রাইফেলের নল! কোন সুইচে ভুলেও আঙুল দিবি না, নইলে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেব তোর বুক!’
ভীষণ আতঙ্কে বরফের মূর্তি হয়ে গেছে তাঁবুর, সবাই। কেউ কেউ মেনে নিতে পারছে না যে, স্ক্রিনের সেই একই খুনি হাজির হয়ে গেছে তাদের তাঁবুর ভেতরে!
নানান ধরনের টেবিল পাশ কাটিয়ে স্টিলকে খুঁজতে লাগল শ্যানন। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে বুঝে গেল, তার চোখ এড়িয়ে কখন যেন লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে পেটভরা পায়খানাওয়ালা কাপুরুষটা।
‘স্ক্রিনে মানুষকে খুন হতে দেখলে তোদের বুক কাঁপে না, তাই না?’ তিক্ত হেসে বলল শ্যানন। এবার তা হলে দ্যাখ সত্যি করে মরতে কেমন লাগে!’
দরজার কাছে ফিরে এমিলির মাথার তালুতে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে দিল সে। ‘তোকে দিয়েই বরং শুরু করি!’
কথা বলার সাহস এমিলির নেই। জীবনে প্রথমবারের মত বুঝে গেল, নিজের প্রাণটা আসলে ওর কাছে খুবই প্রিয়।
‘ঠিক আছে, রাজকন্যা, এবার বল্, কুত্তার বাচ্চা আসলে কোথায় গেছে!’
‘আ… আ… আমি জা… জানি না,’ তোতলার মত করে বলল এমিলি।
‘তা হলে মর্!’ এক গুলিতে মেয়েটার মাথার তালু ফুটো করে দিল শ্যানন। কাত হয়ে চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ল এমিলির লাশ। চারদিকে ছিটকে গেছে হলদেটে মগজ।
হাউমাউ করে উঠল ডার্টি গেম শো-র কর্মীরা।
‘দয়া করে আমাদেরকে গুলি করবেন না!’ ছুটে গিয়ে এমিলির লাশের পাশে বসল সিওয়ার্স। দু’হাতে ওপরে তুলল সহযোগিনীর ঘাড়। কমপিউটার জিনিয়াস কখনও নিজের চোখে কাউকে গুলি খেয়ে মরতে দেখেনি। এমিলির অস্বচ্ছ চোখে এখন কোন আলো নেই দেখে ভীষণ কষ্ট লাগল তার। টের পেল থরথর করে কাঁপছে ওর গোটা দেহ। একবার ভাবল, আগের মত করে কি আর সুইচ টিপে অদৃশ্য করে দিতে পারবে রুপার্ট শ্যাননকে?
‘কুত্তার বাচ্চারা, তোরা তো রিয়েলিটি শো দেখাবি, তা-ই না?’ খলখল করে হাসল ইংরেজ সাইকো। ‘তা হলে নিজেরা দ্যাখ খুন হতে হলে কেমন লাগে!’
মিলার সামনে গেল সে।
কাঁপা দু’হাত মাথার ওপরে তুলেছে মেয়েটা।
‘বল্, মাগী, শুয়োরের বাচ্চা ব্র্যাড এখন কোথায় গেছে!
‘চলে গেছে,’ প্রায় কেঁদে ফেলল মিলা।
‘আমাকে ভয় পাচ্ছিস?’ এক গুলিতে মেয়েটার কপাল ফুটো করে দিল শ্যানন।
ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল অন্যরা। ট্রিগার টিপে. একদিক থেকে অন্যদিকে অ্যাসল্ট রাইফেল ঘোরাল শ্যানন। তাতে চুরমার হয়ে গেল নানান ধরনের ইকুইপমেন্ট। মারা পড়েছে কমবয়েসী কয়েকজন টেকনিশিয়ান।
‘আশা করি তোদের মনোযোগ, আমি আকর্ষণ করতে পেরেছি, তা-ই না?’
দরজার দিকে ছুট দিল এক তরুণ টেকনিশিয়ান।
‘কোথায় যাস, শালা কুত্তা!’ হাসিমুখে ছেলেটার পিঠে গুলি করল শ্যানন। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে নিল তাঁবুর চারপাশে। এই জায়গা প্রায় আফ্রিকার সেই গ্রামের কুঁড়েঘরের মত। প্রতিবাদ বা হামলা করতে পারবে না কেউ। আর যে যা-ই বলুক, নিরীহ মানুষদেরকে খুন করার মজাই অন্যরকম। তার চোখ থামল মেঝেতে শুয়ে পড়া এক মেয়ে টেকনিশিয়ানের ওপরে। তাকে জিজ্ঞেস করল শ্যানন, ‘তোর নাম কী রে, শালী?’
বোবার মত গোঁ-গোঁ আওয়াজ বেরোল বেচারির মুখ দিয়ে। তাতে বিরক্ত হয়ে তার গলায় গুলি করল শ্যানন।
ঝড়ের বেগে তাঁবুর ভেতরে ঢুকল দুই গার্ড। কিন্তু অস্ত্র তাক করার আগেই শ্যাননের গুলি লাগল তাদের বুকে। ধুপ- ধাপ করে মেঝেতে পড়ল তাদের লাশ।
এমিলির লাশের পাশে বসে আছে সিওয়ার্স। তার সামনে পৌঁছে গেল শ্যানন। কড়া গলায় বলল, ‘উঠে দাঁড়া, শালা!’
উরু কাঁপছে বলে দাঁড়াতে গেল না সিওয়ার্স। কমপিউটার সিস্টেমের মত যেন ক্র্যাশ করেছে তার মগজ। একবার ভাবল, ইলেকট্রনিক মেশিনের মত করে মনটাকে যদি রি-ইনস্টল করে নেয়া যেত!
‘ওঠ, শুয়োরের বাচ্চা! কাপুরুষের মত করে মরবি কেন!’ সিওয়ার্সের মাথায় রাইফেলের নল তাক করল শ্যানন।
মৃত এমিলির ঘাড়ের তলা থেকে হাত সরিয়ে নিল সিওয়ার্স। টলমল করে উঠে দাঁড়াল। দরদর করে দুই চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রু। সাহস পেল না শ্যাননের চোখে তাকাতে।
‘অ্যাই, শালা, আমার চোখে তাকা!’ আরও রেগে গিয়ে বলল শ্যানন।
কয়েক সেকেণ্ড পর ঘর্মাক্ত এবং কর্দমাক্ত চেহারার লোকটার দিকে মুখ তুলে তাকাল সিওয়ার্স। ইংরেজ সাইকোর চোখে-মুখে চরম নিষ্ঠুরতার ছাপ।
অস্ত্রের ব্যারেল ঘুরিয়ে বিশাল স্ক্রিন দেখাল শ্যানন। ‘কী রে, প্রতিযোগিতাটা তোর ভাল লেগেছে তো?’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্ক্রিনে চোখ রাখল সিওয়ার্স। ওখানে এখন দেখা যাচ্ছে ইসাবেলাকে ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে মারছে শ্যানন। এই দৃশ্য কাছ থেকে ক্যামেরায় তুলেছে মৃত জোহানসন। সিওয়ার্সের মনে এল, এই যে মেয়েটাকে খুন করা হয়েছে, তাতে কেন যেন ওর মনে আসেনি কোন করুণা! ভাল করেই বুঝে গেল নিজে কতবড় অন্ধ আর পশু ছিল সে।
হড়হড় করে মেঝেতে বমি করল সিওয়ার্স। তারই ফাঁকে দেখতে পেল, বড় তাঁবুতে তার সহকর্মীদের ভেতরে কেউ আর এখন বেঁচে নেই। আর এমিলি… এমিলি পড়ে আছে রক্তের পুকুরের ভেতরে!
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সিওয়ার্স।
‘কী রে, শালা, মানুষ খুন হলে দেখতে তোর ভাল লাগে, তাই না রে?’
‘না, আমি আসলে বুঝিনি সত্যি সত্যি খুন করা হবে মানুষকে,’ বিড়বিড় করে মিথ্যা বলল সিওয়ার্স।
‘তা হলে তো বলতে হয়, বুঝতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছিস তুই!’ শ্যাননের একঝাঁক বুলেট ছিঁড়েখুঁড়ে দিল সিওয়ার্সের বুক। ছিটকে মেঝেতে এমিলির পাশে গিয়ে পড়ল যুবকের লাশ।
প্রিয় বান্ধবীর রক্তের সঙ্গে এখন মিশে যাচ্ছে তার রক্ত।
পঁয়ত্রিশ
ক্যানিয়নের যেদিক দিয়ে উঠে গেছে রুপার্ট শ্যানন, একই পথ অনুসরণ করে উঠে এল রানা। রক্তাক্ত শরীরের জায়গায় জায়গায় তীব্র ব্যথা। বারবার নিজেকে বলছে, খুঁজে নিতে হবে শ্যানন আর স্টিলকে। চুকিয়ে দিতে হবে ওদের পাওনা।
অধিত্যকায় উঠে মাত্র একমাইল দূরে ওয়েদার টাওয়ার দেখতে পেল রানা। ওর মনে কোন সন্দেহ থাকল না যে ওখানেই নেয়া হয়েছে শ্যাননকে। চট করে টাইমার দেখে নিল রানা। হাতে আছে মাত্র কয়েক মিনিট, তারপর বিস্ফোরিত হবে প্লাস্টিক বম।
আহত দেহে পাঁচ মিনিটে স্টিলের কমপাউণ্ডে পৌঁছে যেতে পারবে বলে ভাবছে রানা। শরীর থেকে ঝরঝর করে ঝরছে রক্ত। দ্রুত হাঁটতে লাগল ও। কখনও কখনও হালকা দৌড়ে এগোচ্ছে। একটু পর ঢুকে পড়ল জঙ্গলে। টাইমারে নয় মিনিট থাকতেই পৌঁছে গেল স্টিলের তাঁবুর গ্রামের গেটে। তখনই শুনতে পেল বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেলের একঝাঁক গুলির আওয়াজ। আধ মিনিট আগেও প্রধান গেটের কাছে ছিল দু’জন তরুণ গার্ড, তবে গোলাগুলির আওয়াজে ভয় পেয়ে ছুটে জঙ্গলে পালিয়ে গেছে তারা। এখন গুলি হচ্ছে থেমে থেমে। কোন বাধা ছাড়াই খোলা গেট পেরিয়ে কম্পাউণ্ডে ঢুকে পড়ল রানা। বিশাল তাঁবুর ভেতর থেকে শুনতে পেল ক’জনের আর্তচিৎকার।
বোধহয় ওখানেই গুলি করছে রুপার্ট শ্যানন।
দুর্বল শরীরেও মস্তবড় তাঁবুটার দিকে ছুটল রানা। একটু দূরে দেখতে পেল তাঁবুর প্রবেশ-পথে এক টেকনিশিয়ান। আর তখনই পেছন থেকে তাকে ফুটো করে দিল একটা গুলি। দৌড়ে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকল তরুণ দুই গার্ড। পরক্ষণে গুলির আওয়াজ হতেই করুণ চিৎকার শুনতে পেল রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, শ্যাননের রাইফেলের গুলিতে খুন হয়ে গেছে গার্ডেরা।
শ্যাননের অকথ্য গালি ভেসে এল রানার কানে। একটু পর পর এক বা একাধিক মানুষকে গুলি করছে সাইকো লোকটা।
একটা জিপের পাশে পড়ে আছে দু’জন গার্ড। তাদের একজনের পাশে বিআর ১৮ অ্যাসল্ট রাইফেল। কয়েক পা এগিয়ে অস্ত্রটা তুলে নিতে চাইল রানা, তবে তখনই ওর থুতনির নিচে ধুপ করে লাগল বুটের ডগা। ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল রানা।
আচমকা এসে হামলা করেছে রিভ সিম্পসন। ঝুঁকে রানার দু’চোখের মাঝে তাক করল নাইন এমএম সেমিঅটোমেটিক সিগসাওয়ার পিস্তল। চাপা স্বরে বলল, ‘শালা, শেষমেশ তোকে পেলাম! একদম নড়বি না!’
কম্পাউণ্ডে রানাকে দেখে বিস্মিত হয়েছে লোকটা। তার ধারণা ছিল প্রতিযোগিতার শেষ দিকে খুন হয়েছে রানা। কিন্তু এখন যখন দেখা যাচ্ছে দিব্বি বেঁচে আছে বাঙালি লোকটা, তো সিম্পসনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তাকে খতম করে দেয়া। অবশ্য গুলি করলে মস্তবড় ঝুঁকি নিতে হবে তাকে। হয়তো আওয়াজ পেয়ে তার ওপরে হামলা করবে রুপার্ট শ্যানন। সেটা এড়াতে চাইছে সিম্পসন। বিশেষ করে ইংরেজ সাইকোর হাতে যখন আছে অ্যাসল্ট রাইফেল।
এখন কী করবে সেটা ভাবতে শুরু করেছে সিম্পসন, এমন সময় একটা তাঁবুর ওদিক থেকে এল ব্র্যাড স্টিল। গুলি আর আর্তনাদ শুরু হতেই ভেবেছে সিম্পসনকে ফেলে পালিয়ে যাবে সে। কিন্তু তখন তার মনে হয়েছে, যেহেতু বেইমানি করেছে ব্রিটিশ সাইকোর সঙ্গে, তাই সে যখন বুঝবে বড় তাঁবুতে স্টিল নেই, তখনই বেরিয়ে এসে খুঁজতে শুরু করবে তাকে-সুতরাং শ্যাননের হাত থেকে বাঁচাতে কাউকে না কাউকে চাই পাহারাদার হিসেবে।
উঠানে পড়ে আছে রানা। তার দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে সিম্পসন। বাঙালি যুবককে দেখে তিক্ত হয়ে গেল স্টিলের মন। ভাবল, এই শালা আসলে গু-র চেয়েও আঠাল। যেন পণ করেছে কোনভাবেই আর মরবে না!
‘ভাল একটা শো উপহার দেয়ায় তোমাকে অনেক ধন্যবাদ,’ খুশি-খুশি স্বরে রানাকে বলল স্টিল।
‘এই শো এখনও শেষ হয়নি,’ আধশোয়া হয়ে বসল রানা। টপটপ করে ওর মুখ থেকে বুকে পড়ছে রক্ত।
বিশাল তাঁবু থেকে এল গুলি ও আর্তচিৎকার। রানাকে গুলি করলে সেই আওয়াজে বেরিয়ে আসবে শ্যানন। চট্ করে সিম্পসনের দিকে তাকাল স্টিল। ‘চলো, রওনা হই। একে ঠিকই শেষ করে দেবে শ্যানন।’
রানার মুখের দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে সিম্পসন। বারবার মনে হচ্ছে তার, শালাকে খতম করে দিয়ে যাই।
‘জিপের সামনে অপেক্ষা করুন,’ স্টিলকে বলল সে। ‘আমি এক্ষুণি আসছি।’
জিপের দিকে ব্র্যাড স্টিল পা বাড়াতেই ঘাড় কাত করে তাকে দেখল রানা। নিচু গলায় বলল, ‘তোমার মরতে হবে আমার হাতে।’
রানাকে পাত্তা না দিয়ে জিপের দিকে চলল স্টিল। সিম্পসনের চোখে তাকাল রানা। ‘তুমিও বাঁচবে না।’
‘শালা, তোর মাথাটা সত্যিই গেছে,’ হেসে ফেলল সিম্পসন। কথাটা মাত্র শেষ করেছে, এমন সময় হাতের ঝাপটা দিয়ে পিস্তলের নল অন্যদিকে সরিয়ে দিল রানা। অন্যহাতে লোকটার দু’হাঁটু ধরে টান দিয়েছে সামনের দিকে। পা ভাঁজ হয়ে যেতেই মাটিতে কাত হয়ে পড়ল সিকিউরিটি চিফ। হাত থেকে খসে গেছে পিস্তল। পরের সেকেণ্ডে হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে চাইল অস্ত্রটা। কিন্তু ক্ষিপ্র বাঘের মত তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা। ওর গায়ের জোর এখনও সিম্পসনের চেয়ে খুব বেশি কম নয়। লোকটার হাত থেকে কেড়ে নিল সিগ সাওয়ার পিস্তলটা। পরক্ষণে পর পর তিনটে গুলি গেঁথে দিল সিম্পসনের বুকে।
গুলির আওয়াজে ঘুরে তাকাল ব্র্যাড স্টিল। ভীষণ ভয় চেপে বসল তার মনে। ঝেড়ে দৌড় দিল জিপের দিকে।
ঝট্ করে মুখ তুলে তাকে দেখল রানা। লাফ দিয়ে জিপে উঠে ইঞ্জিন চালু করে রওনা হয়ে গেল স্টিল।
এদিকে বিশাল তাঁবুর ভেতরে আবারও গর্জে উঠেছে আগ্নেয়াস্ত্র।
রানা বুঝে গেল, শ্যাননকে শেষ করা এখন খুব জরুরি। সুতরাং আপাতত পিছু নিতে পারবে না প্রযোজক স্টিলের।
.
বিশাল তাঁবুর ভেতরে সিওয়ার্সের লাশের দিকে চেয়ে আছে রুপার্ট শ্যানন, ভাবছে আসলে কোথায় লুকিয়ে আছে ব্র্যাড স্টিল?
হঠাৎ বাইরে গুলির আওয়াজ শুনে তাঁবুর পেছনে চলে গেল সে। অন্ধকার এক জায়গায় নজর পড়তেই সরু হয়ে গেল তার চোখ। তাঁবুর কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিটা! ভয়ে বিকৃত হয়ে গেছে ওর মুখ। বুঝে গেছে, যে-কোন সময়ে অন্যদের মত এবার খুন হবে। ভয় পেলেও বুঝে গেছে, কখনও জীবন ভিক্ষা চাইবে না রুপার্ট শ্যাননের কাছে। অন্যায় শো-তে যোগ দিয়েছে বলে বিবেকের কাছে চিরকালের জন্যে অপরাধী হয়ে গেছে ও। তাই ধরে নিয়েছে, পাপে জড়িত ছিল বলে মৃত্যু এখন ওর প্রাপ্য। আর সেটা মেনেও নেবে মুখ বুজে।
সুন্দরী মেয়েটাকে দেখে হেসে ফেলল শ্যানন। চিনে গেছে রিটা আসলে কে। সত্যি যদি কেউ জানে কোথায় গেছে স্টিল, তো সে এ-ই মেয়ে! এবার তার কাছ থেকে সবই জেনে নেবে শ্যানন। নোংরা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে এগোল রিটার দিকে।
বারকয়েক চোখ পিটপিট করল রিটা। ওর দৃষ্টি শ্যাননের পেছনে। কেউ যে তাঁবুতে এসে ঢুকেছে, সেটা বুঝে গেল ইংরেজ সাইকো। ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইল সে, কিন্তু তার আগেই মেরুদণ্ডে ঠেকে গেল শীতল ধাতব কিছু। ওটা নিশ্চয়ই কোন আগ্নেয়াস্ত্র!
পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে শ্যানন। ওর পেছনের লোকটা বোধহয় কোন গার্ড বা সিকিউরিটি চিফ সিম্পসন। স্টিলের দলের গার্ড বা তাদের বস্ আসলে অদক্ষ, কাজেই ধৈর্য ধরলে পরে প্রথম সুযোগে শেষ করে দিতে পারবে লোকটাকে।
শ্যাননের হাত থেকে বিআর ১৮ রাইফেল কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলল রানা। চাপা স্বরে বলল, ‘বসে পড়ো।’
রানার হাতের ধাক্কা খেয়ে স্টিলের চেয়ারে বসতে বাধ্য হলো শ্যানন। চোখের কোণে রানাকে দেখে চুনের মত সাদা হয়ে গেছে তার মুখ। ভেবে পাচ্ছে না ফেলে আসা লাশ আবার কীভাবে জিন্দা হলো। ‘তোমার সঙ্গে আমার আসলে কোন শত্ৰুতা নেই,’ নিচু গলায় বলল সে। অজান্তে চোখ গেল তাঁবুতে তার খুন করা লাশগুলোর ওপরে। আত্মসমর্থন করল শ্যানন, ‘আমি কিন্তু এসব করতে ভলান্টিয়ার হইনি। এদের আসলে যা প্রাপ্য, সেটাই পেয়েছে তারা। আমি তো আসলে তোমার সঙ্গে লড়তেও চাইনি। আমাদেরকে যা করতে বলা হয়েছে, সেটার দায় আসলে ব্র্যাড স্টিল আর তার দলের লোকের। আমার কথা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ?’
‘এবার বাজে কথা বাদ দাও,’ গুডগুড করে উঠল রানার গম্ভীর কণ্ঠ। সরাসরি শ্যাননের কপালে তাক করল সিম্পসনের পিস্তলের নল।
‘আমি কিন্তু কোন মিথ্যা কথা বলছি না। যা করার সেটা করেছে…’
ইংরেজ সাইকোর কপালে ঘামের বিন্দু ফুটতে দেখছে রানা। ভীষণ ভয় তার চোখে। ‘ভাই, রানা, বিশ্বাস করো, আসলে বাধ্য হয়ে আমাকে এসব করতে হয়েছে।’
‘তা-ই?’ তিক্ত হাসল রানা।
‘হ্যাঁ, আর ভাল লাগছে যে সব নোংরামি শেষমেশ খতম হয়ে গেছে।’
‘নোংরামি এখনও আসলে শেষ হয়নি,’ মাথা নাড়ল রানা, ‘তুমি ওটার বড় অংশ। আর সেটা এবার শেষ করে দিচ্ছি।’ সিম্পসনের পিস্তলের প্রতিটি গুলি শ্যাননের বুকে গেঁথে দিল ও।
স্টিলের আরামদায়ক চেয়ার থেকে কাত হয়ে কার্পেটে মোড়া মেঝেতে ধুপ করে পড়ল ইংরেজ সাইকোপ্যাথের লাশ।
ছত্রিশ
শ্যাননের ক্ষত-বিক্ষত বুকের এবড়োখেবড়ো গর্ত থেকে ওপরে উঠে যাচ্ছে ধূসর ধোঁয়া।
পরস্পরের দিকে চেয়ে আছে রিটা ও রানা।
রিটা ভাল করেই বুঝে গেছে, এই লোক মোটেই সাধারণ কেউ নয়। বোধহয় আগে ছিল মিলিটারিতে বড় কোন অফিসার। রিটার চোখে প্রায় দেবতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে রানা। ও এমন একজন মানুষ, যে মৃতপ্রায় হয়ে গেলেও ফিরে এসেছে রিটাকে বাঁচাতে। দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে ভয়ানক এক নৃশংস খুনিকে। সাধারণ মানুষকে স্বার্থহীনভাবে ভালবাসে এই যুবক।
কীভাবে মাসুদ রানাকে ধন্যবাদ দেবে সেটা ভেবে পেল না রিটা। ও কিছু বলার আগেই শোনা গেল নীরবতা ভেঙে পাহাড়ে চালু হয়েছে হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন।
ওরা বুঝে গেল, কর্মীদের পাশে যখন থাকার কথা, সে- সময়ে সবাইকে ত্যাগ করে তাদেরকে বিপদে ফেলে লেজ তুলে পালাচ্ছে ভীতু, কাপুরুষ ব্র্যাড স্টিল।
এক গার্ডের পিস্তল মেঝে থেকে তুলে নিল রানা। বাড়তি একটা ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে দুটো লাশ টপকে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল।
পেছন থেকে অবাক চোখে ওকে দেখছে রিটা। হঠাৎ করেই বুঝে গেল, এখন নিজের জীবনের কথা ভেবে কোন লাভ নেই। স্টিলের জন্যেই মারা গেছে অনেকে, সুতরাং সে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, সেটা যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে।
.
প্রতিশোধ স্পৃহায় দাউ-দাউ করে জ্বলছে রানার বুক। কম্পাউণ্ডে এখনও রয়ে গেছে একটা জিপ। কিন্তু ওটার কোন চাবি নেই। জিপে চেপে ইগনিশনের তারগুলো ছিঁড়ে মুচড়ে নিল রানা। ইঞ্জিন গর্জে উঠতেই গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেল। তীরবেগে পেছনে ফেলল মেইন গেট। একদিকের কাঁচা রাস্তা সোজা গেছে পাহাড়ের দিকে। রওনা হয়ে রানা শুনতে পেল গতি বাড়ছে হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের। তবে আওয়াজ থেকে ওর মনে হচ্ছে, এখনও মাটি ছেড়ে উঠে যায়নি যান্ত্রিক ফড়িঙ।
দু’পাশের জঙ্গল ঝড়ের বেগে ফুরিয়ে যেতেই রানা দেখল, জিপ উঠে এসেছে খাড়া এক টিলার ওপরে। দূরে টিলা সরাসরি নেমে গেছে এক শ’ ফুট নিচের পাথুরে উপকূলে। ওখানে আছড়ে পড়ছে সাগরের উত্তাল ঢেউ। শেষবার জায়গাটা হেলিকপ্টার থেকে ওকে ফেলে দেয়ার সময় দেখেছে রানা।
পথের শেষে আছে স্টিলের জিপ। টিলার ওপরে পঞ্চাশ গজ দূরে হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন গরম করছে পাইলট। সরু এক পথে ওপরে উঠে যাচ্ছে স্টিল, হাতে সরু ব্রিফকেস।
কড়া ব্রেক কষে জিপ থামিয়ে নেমে পড়ল রানা। আহত শরীরে দৌড়াতে শুরু করে ভাবল, আগে কখনও এত ব্যথা ছিল না ওর শরীরে।
একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল স্টিল। সে ভেবেছিল পিছু নিয়ে আসছে সিম্পসন। কিন্তু রানাকে তেড়ে আসতে দেখে আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে গেল তার। সোজা দৌড় দিল হেলিকপ্টারের দিকে। কয়েক সেকেণ্ড পর আবারও তাকাল কাঁধের ওপর দিয়ে। ভয়ে অস্থির লাগছে তার। মাত্র বিশ ফুটের ভেতরে পৌঁছে গেছে ছুটন্ত মাসুদ রানা!
ঘুরেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে নিল স্টিল। পর পর চারবার গুলি করল রানাকে লক্ষ্য করে। তিনটে গুলি ফস্কে গেলেও চতুর্থ গুলি লাগল রানার কাঁধে। জোর ধাক্কা খেয়ে আধপাক ঘুরে গেল রানা। ওর মনে হলো যে-কোন সময়ে পড়ে যাবে মাটিতে। জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে ঘুরে তাকাল। পঁচিশ ফুট দূরে মোটা এক গাছের ওদিকে চলে যাচ্ছে স্টিল। একবার আড়াল নিলে গুলি করে পাখির মত মারবে রানাকে।
ব্র্যাড স্টিলকে লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে দুটো গুলি পাঠাল রানা। একই সময়ে ঘুরে চেয়েছে লোকটা। ফলে দুটো গুলির একটা গেঁথে গেল তার পেটে। পড়ে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে রইল সে। পিস্তলের শেষ চার গুলি খরচ করল রানাকে লক্ষ্য করে। ওগুলোর একটা লাগল রানার বুকে। প্রচণ্ড ব্যথায় বসে পড়ল রানা।
ওদিকে হেলিকপ্টার থেকে বারবার হাতের ইশারা করছে পাইলট। এরই ভেতরে মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে গেছে সে। টলতে টলতে ওদিকে চলল স্টিল। তাকে গুলি করার জন্যে ট্রিগারে চাপ দিল রানা। কিন্তু ম্যাগাজিনে এখন আর কোন গুলি নেই!
যান্ত্রিক ফড়িঙে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ব্র্যাড। ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে পাইলট। পিস্তলে নতুন ম্যাগাজিন ভরে হেলিকপ্টারের নিচের দিক তাক করে অস্ত্রটা থেকে পর পর কয়েকবার গুলি পাঠাল রানা। ঠাস করে ফেটে গেল চপারের জানালার প্লেক্সিগ্লাস। পরের দুটো গুলি লাগল পাইলটের কন্সোলে।
ইঞ্জিনের ভেতরে বড় কী যেন গোলমাল হয়ে গেছে, বুঝে গেল পাইলট। এখন আর আগের মত উঠে যাচ্ছে না হেলিকপ্টার। একই জায়গায় ঘুরছে মাতালের মত। স্টিলকে কী যেন বলছে পাইলট। দরজা খুলে যেতে দেখল রানা। দশ ফুট ওপর থেকে পাহাড়ের কিনারায় লাফিয়ে নামল স্টিল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড় দিল একটু দূরের বড় আরেক গাছ লক্ষ্য করে। উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে ছুটে গেল রানা। চোখের কোণে দেখতে পেল জিপের কাছে পৌঁছে গেছে রিটা, হাতে কী যেন।
এদিকে হেলিকপ্টারের ভেতরে জ্বলে উঠেছে লকলকে নীল আগুন। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আওয়াজ হলো ইঞ্জিনের ভেতরে। পরক্ষণে ভীষণ কাত হয়ে সোজা সাগরের দিকে নেমে গেল জ্বলন্ত উড়োজাহাজ। কয়েক সেকেণ্ড পর নিচ থেকে এল সবকিছু ভেঙেচুরে যাওয়ার বিকট আওয়াজ।
স্টিল যে গাছের আড়ালে আছে, সেদিকে এবার ধীর পায়ে এগোল রানা। ওর কানে এল কারও ফুঁপিয়ে ওঠার আওয়াজ। পরের পাঁচ ফুট পার করে গাছের ওদিকে গেল রানা। মাটিতে শুয়ে আছে স্টিল। ওর দিকে করুণ চোখে তাকাল সে। এখন আর তার হাতে কোন পিস্তল নেই। দুই হাতে চেপে ধরেছে পেট। গলগল করে দশ আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে তাজা রক্ত। বেসুরো সুরে বলল লোকটা, ‘তো তুমিই তা হলে জিতলে! আমার একদম উচিত হয়নি তোমাকে জেলখানা থেকে বের করা!’
পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল রানা।
পৌঁছে গেছে রিটা।
স্টিলের বুকে পিস্তল তাক করল রানা, নিজেও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। বসে পড়ল মাটিতে। ক্লান্ত স্বরে বলল ও, ‘তুমি কি কষ্ট পেয়ে মরতে চাও, স্টিল, নাকি তোমার বুকে গুলি করব?’
‘জানি, আমি আসলে মানুষ নই, তবু এই দয়াটা আমাকে করো, রানা,’ ব্যথায় বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখে বলল ব্র্যাড স্টিল।
তার হৃৎপিণ্ড লক্ষ্য করে পিস্তল তাক করল রানা। পরক্ষণে টিপে দিল ট্রিগার। গুলির আওয়াজটা ফাঁকা জায়গায় পটকার মত হালকা শোনাল ওর কানে। মাত্র দু’বার শরীর মুচড়ে স্থির হয়ে গেল ব্র্যাড স্টিল
নিজেও মাথা ঘুরছে বলে শুয়ে পড়ল রানা। বুঝে গেছে গোড়ালির বোমার কারণে একটু পর মরতে হবে ওকে।
ওর পাশে এসে বসে পড়ল রিটা, হাতে এখন সিম্পসনের গলার চেইন। ওটার সঙ্গে ঝুলছে রুপালি ছোট এক চাবি। হাত বাড়িয়ে রানার ব্রেসলেটের তালায় ওটা ভরল রিটা। চাবিতে মোচড় দিতেই টিট আওয়াজ তুলে থেমে গেল টাইমার। রানার গোড়ালি থেকে ব্রেসলেট খুলে নিল রিটা। টাইমারের দিকে একবার তাকাল রানা। ওখানে জ্বলতে জ্বলতে নিভে গেল লাল কিছু সংখ্যা : 00:00:0१।
‘তোমার আসলে অনেক সাহস,’ বিড়বিড় করে বলল রানা।
‘তোমার মত মোটেও নয়,’ আপত্তি তুলল রিটা। ‘তা ছাড়া, আমি তোমার মত অকাতরে মানুষকে সাহায্য করতে শিখিনি। আর সেটা আমার চরম একটা অন্যায়।’ হঠাৎ বুটজুতোর আওয়াজ পেয়ে ঘুরে পাহাড়ের নিচের দিকে তাকাল মেয়েটা। নেভির সাদা পোশাকে একদল লোক ছুটে আসছে ওদের দিকে। তাদের দু’জনের হাতে একটা স্ট্রেচার।
বিস্মিত চোখে রানাকে দেখল রিটা। এরা জানল কী করে যে আমরা এখানে আছি?’
মাথা নাড়ল প্রায় অচেতন রানা। কিছুই জানা নেই ওর।
ক্রমে চলে যাচ্ছে কোমার ভেতরে।
দু’মিনিট পর রানা ও রিটার পাশে পৌঁছে গেল নেভির যুবকেরা। তাদের একজন অফিসার। নরম সুরে জানতে চাইল সে, ‘স্যর, আপনিই কি মেজর রানা?’
‘মেজর নই,’ বিড়বিড় করল রানা। ‘তবে আমিই মাসুদ রানা।
‘স্যর, আমরা জানি আপনি আসলে আমাদের কে। আমি লেফটেন্যান্ট কমাণ্ডার আজিজুর জুয়েল। বিসিআই চিফের অনুরোধে নেভির চিফ আমাদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছেন এই দ্বীপে, যাতে আপনাকে সরিয়ে নিতে পারি। আমরা এখন আমাদের শিপে আপনাকে নিয়ে যাব। দুশ্চিন্তা করবেন না, স্যর। আমাদের ডাক্তার ও নার্স আন্তর্জাতিক মানের।’ রিটার দিকে তাকাল তরুণ অফিসার। ‘আপনি কি আমাদের সঙ্গে যেতে চান? সেক্ষেত্রে পৌঁছে দেব পাপুয়া নিউ গিনির রাজধানীতে।’
মাথা দোলাল রিটা। ‘তা হলে খুব ভাল হয়।’
রানার দিকে তাকাল নেভির অফিসার। তবে রক্তশূন্যতার কারণে জ্ঞান হারিয়ে গেছে বিসিআই-এর সেরা এজেন্টের।
অফিসারের নির্দেশে রানাকে খুব সাবধানে স্ট্রেচারে তুলল নেভির দুর্ধর্ষ ক’জন জোয়ান। ফিরতি পথে রওনা হলো ওরা।
সাঁইত্রিশ
বিসিআই হেডকোয়ার্টার, ঢাকা।
এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে বেশ ক’টা দিন।
আজ অফিসে এজেন্টদের নিজেদের মধ্যে চলছে ফিসফাস করে আলাপ। কেমন যেন অস্থির হয়ে গেছে দুর্ধর্ষ মানুষগুলো। এখন নিজেদের অফিস ত্যাগ করে জড় হয়েছে কনফারেন্স রুমে।
‘আমি কিন্তু আগেই জানতাম,’ জোর দিয়ে আবারও বলল সলীল।
‘তা-ই বলে এত জলদি?’ আপত্তির সুরে বলল রূপা। ‘কিন্তু ও তো এমনই,’ বলল জাহেদ। সোহানার দিকে তাকাল। ‘তুমি কী বলো?’
চুপ করে থাকল সোহানা।
‘উনি কেন যে নিজের ভালটা বুঝতে চাইলেন না,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিসিআই জুনিয়র এজেন্ট রাশেদুন্নবী।
ওর কথায় মাথা দোলাল রায়হান রশিদ।
মন খারাপ করে চেয়ারে বসে আছে সোহেল। একঘণ্টা আগে বিসিআই-এর জুনিয়র এজেন্ট অণু কর্মকার ফোন করে কথা বলেছে ওর সঙ্গে।
গাজিপুরের জঙ্গলে বিসিআই-এর জন্যে নির্মিত বিশেষায়িত ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছিল রানা। চারদিকের জঙ্গল ও বাড়ি ঘিরে রেখে পাহারা দিচ্ছিল অণুরা। কিন্তু কখন যেন নিজের কেবিন থেকে উধাও হয়ে গেছে রানা। তার আগে আবার টেবিলে রেখে গেছে ছোট একটা চিঠি: ‘অনেক তো হলো! আর পাহারা দিতে হবে না। আমি ভাল আছি। এবার যে-যার মত বাড়িতে ফিরে বিশ্রাম নাও!’
‘আমাদের মত ওদেরও প্রতিটি ট্রেনিং করা আছে, কিন্তু আমরা তো আর মাসুদ রানা নই,’ বলল সলীল। ‘মজা করার জন্যেই চিঠি রেখে গেছে ও!’
‘কিপটে সোহেল ভাইয়ের মস্তবড় ক্ষতি হয়ে গেল,’ বলল রূপা। ‘তাই না, সলীলদা আর জাহেদ ভাই?’
গত ক’দিন ধরে ওরা আলাপ করেছে, যে-কোন দিন বিরক্ত হয়ে ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসে চলে আসবে রানা। এটা নিয়ে সোহেলের সঙ্গে বাজি ধরেছিল সলীল ও জাহেদ। আজ হেরে গেছে সোহেল। আর সেজন্যে আধঘণ্টা আগে অর্ডার দিয়ে বিশাল এক সাত পাউণ্ডের ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক আনাতে হয়েছে ওকে। কেকটা এখন আছে রানার অফিসের টেবিলের ওপরে।
‘আমি হেরে গেলেও কিন্তু জিতে গেছি,’ আত্মসমর্থন করল সোহেল। ‘রানা যে এখন সুস্থ, সেটা তো প্রমাণ হয়ে গেল!’
‘তা ঠিক,’ হেসে ফেলল রূপা। ‘তবে এত টাকা গচ্চা দিতে হলো বলে আপনার প্রতি রইল আমার সমবেদনা।’
‘এই ফাজিল মেয়েটাকে অফিস থেকে কেন যে বের করে দেয় না, সেটা বুঝতে পারি না,’ মুখ গম্ভীর করল সোহেল। আরও কিছু বলত, কিন্তু ইন্টারকম বেজে উঠতেই রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল। ‘তুমি কিছু বলবে, মোজাম্মেল?’
‘জী, স্যর, এইমাত্র লিফটে উঠে পড়লেন মাসুদ স্যর, ‘ বলল অবসর-প্রাপ্ত আর্মির হাবিলদার।
‘ঠিক আছে, চারপাশে চোখ রাখো,’ রিসিভার ক্রেডলে নামিয়ে রাখল সোহেল। বড় করে শ্বাস ফেলে বলল, ‘রানা তা হলে পৌঁছে গেছে।’
ওরা সবাই চলে গেল কনফারেন্স রুমের দরজার কাছে। সবার কান খাড়া।
লিফট উঠে এলে দরজা খুললেই আওয়াজ হবে টিং করে। আর তখনই হুড়মুড় করে করিডরে বেরিয়ে রানাকে চমকে দেবে ওরা।
এক এক করে পেরোচ্ছে মিনিট, অথচ দেখা নেই রানার। পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে ওরা।
এরপর পেরিয়ে গেল পুরো পাঁচ মিনিট।
‘বোধহয় বেশি অসুস্থ, হয়তো লিফটে অচেতন হয়ে গেছে?’ বলল সোহেল, ‘আমাদের বোধহয় খোঁজ নেয়া উচিত!’
‘আমারও তা-ই মনে হচ্ছে,’ বলল রূপা।
দুশ্চিন্তায় ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সোহানার মুখ।
ওরা করিডরে বেরোবে, এমন সময় কনফারেন্স রুমে বেজে উঠল ইন্টারকম। ছুটে গিয়ে যন্ত্রটার স্পিকার চালু করল সোহেল, ‘হ্যালো?’
ওর দিকে চেয়ে আছে সবাই।
‘তোদের আনা কেক বেশ স্বাদের, বুঝলি, বোকা শালা?’ রানার ফুরফুরে কণ্ঠ শুনে চমকে গেছে সোহেল। ‘আর তোরা যে খাপ পেতে কনফারেন্স রুমে বসে আছিস, সেটাও আমি জানি। তাই ফায়ার এস্কেপ ল্যাডার বেয়ে উঠে এসেছি আমার অফিসে। এবার কেকের ভাগ যদি সত্যিই চাস্, তো জলদি করে আয়! ওটা কিন্তু এরই ভেতরে অর্ধেকের বেশি শেষ! ‘
‘হায়-হায়, রানা শালা তো আমাদেরকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে!’ হাউমাউ করে উঠল সোহেল। ‘তার ওপরে খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে আমার আনা দামি কেক! অ্যাই, তোরা চল! জলদি! নইলে কিন্তু একটুকরো কেকও আর কপালে জুটবে না!’
কনফারেন্স রুম থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে রানার অফিসে গিয়ে ঢুকল ওরা। আর ওখানেই থমকে গেল। মিশরের মামির মত সাদা ব্যাণ্ডেজে প্রায় মোড়া রানা কোঁৎ- কোঁৎ করে গিলে চলেছে কালো কেক।
‘তুই আগে বল্, এই গুরুতর অসুস্থ শরীরে ক্লিনিক থেকে কীভাবে বেরোলি?’ করুণ সুরে বলল সোহেল।
‘সবই আসলে আমার ওপরঅলার ইচ্ছে রে,’ সপ্তম তলার দিকে আঙুল তাক করে আরেক টুকরো কেক গালে চালান দিল রানা। ‘আজই সকালে আমাকে দেখতে গেলেন বস্। আর তারপর কেবিন ছেড়ে দেখা করলেন ডাক্তারের সঙ্গে। সেই সুযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘুষ গুঁজে দিলাম পরিচিত ড্রাইভারের পকেটে। একমিনিটে চেপে বসলাম বসের গাড়ির পেছনের ট্রাঙ্কে। পরের সবই বহু পুরনো ইতিহাস! কী রে, তোরা কি একআধ টুকরো কেক খাবিটাবি নাকি?’
ওর হাত আবারও কেকের দিকে ছোঁ দিয়েছে দেখে ওকে প্রায় ঘিরে ফেলল অন্যরা। রানা মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের ড্রাইভারকে ঘুষ দিয়ে গাড়ির পেছনে শুয়ে আরামসে অফিসে পৌঁছে যাওয়ায় সবার মুখে ফুটে উঠেছে মুচকি হাসি।
রানা ছাড়া অন্য কেউ দেখতে পেল না, চট্ করে চোখদুটো মুছে নিয়েছে সোহানা। এখন অপূর্ব সুন্দর মুখে একচিলতে হাসি।
***
