Chapter - 1
১.
কুচি কুচি করে ঢেঁকির শাক কেটে তাতে পেঁয়াজ আর রসুন দিয়ে অল্প তেলে ভেজে নিলে এক থালা ভাত গোগ্রাসে খেয়ে নেওয়া যায়। কোম্পানি রেশনে যে-চাল দেয়, তা পেঁয়াজ রসুনের কল্যাণে খেতে মন্দ লাগে না। আকাশ ফরসা হলেই ঝোলা নিয়ে কুলিলাইন থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে চলে যেতে কার ভাল লাগে! এতোয়ারিরও লাগে না। কিন্তু নদীর ধারে পৌঁছলেই প্রথম যে-হাওয়ার ঢেউটা মুখে বুকে আলতো ছুঁয়ে যায়, তাতেই মনে ভাল লাগাটা ঝটপট এসে যায়। ছোট্ট নদী, চওড়ায় বড়জোর ষাট কি সত্তর ফুট, তরতরিয়ে ছুটে যাচ্ছে ডুডুয়া নদীর বুকে মিশে যেতে। সেই নদীর দুই পাড়ে ঢেঁকিশাকের গাছ দঙ্গল বেঁধে রয়েছে। পাতা ছিঁড়ে ছেঁড়া ঝোলায় ভরে ফেলতে হয় ঝটপট। তারপর চারধারে নজর বুলিয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে জলে ডুব দেয়। এক দুই করে পাঁচবার। এখন সাবান নয়। সাবান মেখে স্নান হয় বিকেলেশেষে। সারা দিনের ক্লান্তি-ঘাম ধুতে সাবানের দরকার হয়। ভেজা কাপড় ঠিকঠাক শরীরে জড়িয়ে এক ঝোলা ঢেঁকি শাক নিয়ে এতোয়ারি যখন ঘরে ফিরে আসে, তখন লাইনের দু’-চারজন মেয়েছেলে আর আধরাত জাগা কিছু বুড়ো ছাড়া কেউ আশপাশে নেই। ঝটপট শাড়ি পালটে চুলে চিরুনি বুলিয়ে শাক কাটতে বসে সে। খাওয়ার মানুষ তিনজন। বাবা আমগাছ থেকে পড়ে সেই যে পা ভেঙেছিল, তারপর থেকে ঘরে বসে আছে। হাতে লাঠি নিয়ে চায়ের কারখানায় কাজ করা যায় না। একটু সুস্থ হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, খানিকটা হাঁটতেই মাথা ঘুরেছিল, শরীর ঝিমঝিম। মা এখনও কাজ করে যাচ্ছে। চা-বাগানে দলের সঙ্গে পাতা তোলার কাজ। শরীর বেশ দুর্বল। প্রতিদিনের বরাদ্দ চায়ের পাতা তুলতে পারছে না। ঝুড়িতে পাতা নিয়ে যখন ফ্যাক্টরির সামনে ওজন করাতে হয়, তখনই দেখা যায় যা হুকুম, তার চেয়ে অনেক কম পাতা তুলতে পেরেছে এতোয়ারির মা। বরাদ্দ পাতা না-তুলতে পারলে মজুরির টাকা কমে যায়। পরপর তিনদিন একই অবস্থা হলে পাতিবাবু দু’দিন বসিয়ে দেন। অপরাধীর গলায় এতোয়ারির মা বলে, “খুব মাথা ঘোরে যে…”
এতোয়ারি একদিন জোর করে চা-বাগানের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে দেখিয়েছিল। নতুন আসা যুবক ডাক্তারবাবু প্রেশার দেখে, বুকে পিঠে স্টেথো চেপে দেখে বলেছিলেন, “ওষুধ দিচ্ছি। সাতদিন বাড়িতে বিশ্রাম করতে হবে। ওষুধ শেষ করে সাতদিন পরে এসো।”
এতোয়ারি বলেছিল, “একদিন দু’দিন বিশ্রাম নিলে হয় না?”
“ডাক্তারিটা করছে কে, আমি না তুমি?” ডাক্তারবাবু রেগে গিয়েছিলেন।’
“আপনি।”
“তা হলে আমি যা বলছি তাই করো।”
মুখ নিচু করে ওষুধ নিয়ে চলে এসেছিল এতোয়ারি, মায়ের সঙ্গে।
মা কিছু বলে না কিন্তু বাবাকে মাঝে মাঝে সহ্য করতে পারে না এতোয়ারি। পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর থেকে একটু একটু করে বাবার কথাবার্তা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। মায়ের সঙ্গে সবসময় ঝগড়া তো করতই, তাকেও অভিশাপ দেওয়া শুরু করল। মেজাজ যখন খুব খারাপ হত, তখন যা মুখে আসে তাই বলা শুরু করল।
আজ যখন ঢেঁকির শাকপাতা কাটা সবে শেষ হয়েছে, তখন বাবার গলা কানে এল।
“তোর ছেলেবেলায় আমি কত কী কিনে এনে খাইয়েছি। তুই তার বদলে আমাকে মাগনায় তোলা ঢেঁকি শাক খাওয়াচ্ছিস রোজ। ছ্যা ছ্যা ছ্যা। খরচ করে বিয়ে দিলাম। এমন মেয়েছেলে তুই যে, বছর না-ঘুরতেই বর দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। হায় ভগবান! তুমি কেন যে আমাকে এই মেয়ে না-দিয়ে একটা ছেলে দিলে না!”
বাবার দিকে না-তাকিয়ে জবাব দিয়েছিল এতোয়ারি, “পয়সার লোভ দেখিয়েছিলে তাকে, তাই সে বিয়ে করেছিল। টাকা দাওনি তাই মাতালটার মার থেকে বাঁচতে আমি পালিয়ে এসেছি। আমি না-ফিরে এলে তো এতদিনে না-খেয়ে শুকিয়ে মরতে।”
পাশ ফিরে শুয়ে মা চোখ বন্ধ করে ছিল। এবার চিনচিনে গলায় বলল, “দোহাই তোমাদের, চুপ করো। তুই কি পাগল হয়ে গেলি?”
“আমি পাগল হলাম? বাবা কী বলছে শুনতে পাওনি?” খেঁকিয়ে উঠল এতোয়ারি।
মা উঠে বসল, “আমার আর ভাল লাগে না। এত মানুষ চটপট মরে যায়, আমার কেন মরণ হয় না! ও ও ভগবান, তুমি কী নিষ্ঠুর!”
“জানি জানি, সব জানি,” বাবার গলা ওপরে উঠল, “নিজের নয়, তুমি আমার মৃত্যু চাইছ! এত লোক মরে যাচ্ছে, আমি কেন বেঁচে আছি, তাই না? ঠিক আছে, আমি এবার সব বলে দেব, এতদিন মুখ বন্ধ করে ছিলাম, এবার মুখ খুলব।”
পাশের বারান্দা ঘিরে রান্নার জায়গায় চলে এল এতোয়ারি। একটু কেরোসিন ঢেলে উনুনের কাঠ জ্বেলে ঢেঁকিশাক রাঁধতে শুরু করল। তারপর ভাত ডাল রান্না করে সেগুলো পেটে দিতে হবে। দিয়ে রাতের রুটি আর গুড় ঠোঙায় নিয়ে শাড়ি পালটে ছুটতে হবে কাজে।
কাজটা পাইয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবুর বউ। কপাল ছাড়া আর কী বলবে! নদীতে বাসন মাজতে গিয়েছিল সে দুপুর পার করে। তখনও রোদ ছিল চড়া। হঠাৎ বাচ্চার গলা কানে আসতেই চোখ তুলে দেখতে পেয়েছিল ওপারে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে বছর আড়াইয়ের শিশু। চোখাচোখি হতেই মা মিষ্টি হাসলেন। নদীর ওপারে জঙ্গলের শেষে, কোয়ার্টার্সের চা-বাগানে যেসব বাবু কাজ করেন, তাঁরা থাকেন। তাঁদের একপাশে ডাক্তারবাবুরও কোয়ার্টার্স, ওই মহিলাকে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার্সের বারান্দায় কয়েকবার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে। তাই আজ বুঝতে অসুবিধে হল না যে উনি ডাক্তারবাবুর বউ।
বাসন মাজা থামিয়ে বাচ্চাটাকে যখন কিছু বলতে যাচ্ছিল এতোয়ারি, তখন চিলটা দ্রুত নেমে এল নদীর ওপর। কিছু বোঝার আগেই দুই পা দিয়ে একটা ছোট মাছ তুলে নিয়ে উড়ে গেল ওদিকের গাছের ডালে। আর তাকে দেখে বাচ্চাটা এমন উত্তেজিত হল যে, সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইল। এতোয়ারি দেখল টাল সামলাতে না-পেরে ছোট্ট শরীরটা ঝুপ করে জলে পড়ে গিয়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। বাচ্চার মা চিৎকার করে জলে নামার চেষ্টা করলেও ছেলের শরীরকে তখন নদীর স্রোত নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছে। আর দেরি না-করে লাফিয়ে, জলে শরীর ভাসিয়ে, বাচ্চাটাকে ধরতে পারল এতোয়ারি। এর মধ্যে পেটে জল ঢুকে যাওয়ায় বাচ্চাটা হাঁসফাঁস করছে। তাড়াতাড়ি নদীর পাড়ে উঠে ওকে নিজের কোলের ওপর উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে পিঠে আস্তে আস্তে চাপ দিতেই মুখ থেকে বেশ খানিকটা জল বেরিয়ে এল। তখন বাচ্চাটাকে সোজা করে বসাতেই তার গলা থেকে কান্না বের হল। ততক্ষণে ওর মা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়েছেন।
এতোয়ারি হেসে বলল, “আর ভয় নেই। জল বেরিয়ে গিয়েছে।”
মায়ের কোলে গিয়ে শান্ত হতে বাচ্চাটা সময় নিল। আর-একবার জল তোলার পর সে মায়ের কাঁধে মুখ লুকোল।
এতোয়ারি বলল, “আর ভয় নেই। ও এখন ভাল আছে।”
ছেলের মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে ডাক্তারের স্ত্রী বললেন, “তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না। তুমি আমার ছেলের জীবন বাঁচিয়ে দিলে, আমি সারা জীবন তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম।”
“ছি ছি, এ কী বলছেন! আমি যা করেছি তা যে-কোনও মানুষ করত। আপনি এভাবে বলবেন না,” হাতজোড় করল এতোয়ারি।
বাচ্চা এবার মুখ তুলল। এতোয়ারি বলল, “ওর জামাপ্যান্ট ভিজে গিয়েছে, ওগুলো খুলে তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে যান।”
“তোমার নাম কী”
“আমার নাম এতোয়ারি।”
“এতোয়ারি, তুমি একটু পরে আমার বাড়িতে আসতে পারবে? ওর বাবা হলেন ডাক্তারবাবু।”
“বুঝতে পেরেছি। আপনি যখন বলছেন তখন নিশ্চয়ই যাব,” এতোয়ারি বলতেই মহিলা শিশুকে নিয়ে দ্রুত তাঁদের কোয়ার্টার্সের দিকে চলে গেলেন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে।
বিকেল বিকেল এতোয়ারি চলে এসেছিল। জিজ্ঞাসা করে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার্সে পৌঁছতে কোনও অসুবিধে হল না। গেটের সামনে দাঁড়াতেই বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়ালেন ডাক্তারবাবুর বউ, “এসো এতোয়ারি। এখানে এসে বসো।”
এতোয়ারির এবার বেশ সংকোচ হচ্ছিল। বারান্দায় উঠে সে জিজ্ঞাসা করল, “ছেলে কোথায়?”
“কাজের লোকের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছে। এতোয়ারি, তুমি আজ যে-উপকার করেছ, তা আমি জীবনে ভুলতে পারব না। আমার ছেলেটাকে তুমি আজ বাঁচিয়ে দিয়েছ,” ডাক্তারবাবুর বউ বলল।
“না না, একটা বাচ্চা ডুবে যাচ্ছে, তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করব না?” এতোয়ারি বারান্দায় রাখা একটা মোড়ায় বসল।
সামনের চেয়ারে বসে ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ওকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি নিশ্চয়ই চা-বাগানের চাকরিতে আছ! কোথায় কাজ করো, বাগানে না ফ্যাক্টরিতে?”
মাথা নাড়ল এতোয়ারি, “না মেমসাব, আমি চাকরি করি না।”
“ওমা, কেন?” ডাক্তারবাবুর স্ত্রী অবাক হলেন।
“আমার মা পাতি তোলে। এক ফ্যামিলি থেকে একজনই পাতি তোলার কাজ করতে পারে। ফ্যাক্টরিতে নাকি কোনও কাজ খালি নেই।”
“তোমার বিয়ে হয়নি?”
একটু চুপ করে এতোয়ারি বলল, “হ্যাঁ, হয়েছিল।”
“হয়েছিল মানে? তোমার স্বামী নেই?”
“আছে।”
“থাক ওসব কথা,” এইসময় সাইকেলের বেল শোনা গেল। ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বললেন, “ওই যে, ডাক্তারবাবু এসে গিয়েছেন।”
কথাটা কানে যেতেই এতোয়ারি উঠে দাঁড়াল। সাইকেল ভেতরে ঢুকিয়ে ডাক্তারবাবু সিঁড়িতে পা দিতেই তাঁর স্ত্রী বললেন, “এর কথা তোমাকে তখন বলেছিলাম। ওর নাম এতোয়ারি। আমি ওকে আসতে বলেছিলাম।”
“আচ্ছা,” ডাক্তারবাবু বললেন, “কোন লাইনে থাকো তুমি?”
“দু’নম্বর লাইন।”
“তুমি আমাদের খুব বিপদ থেকে রক্ষা করেছ।”
“বেচারার কোনও চাকরি নেই। তুমি একটু দ্যাখো না!” বেশ আন্তরিক গলায় বললেন ডাক্তারবাবুর স্ত্রী।
ডাক্তারবাবু সব খবর নিলেন। বাবা কী করে, স্বামী এই বাগানে কাজ করে কি না, মা বাগানের কাজে আছে— এইসব। যেই শুনলেন, বিয়ে হয়েছিল, স্বামী তেলিপাড়া চা-বাগানে চাকরি করে কিন্তু তিন হাজার টাকা পণ চেয়ে না-পেয়ে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল বউকে, অমনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, “থানায় গিয়ে ডায়েরি করেছ?”
মাথা নেড়ে না বলল এতোয়ারি।
ডাক্তাবাবুর স্ত্রী ভেতরে চলে গেলেন। ফিরে এসে কয়েকটা দশ টাকার নোট এগিয়ে ধরলেন, “কিছু মনে কোরো না, এই টাকা রাখো, মিষ্টি কিনে খেয়ো।”
দ্রুত মাথা নাড়ল এতোয়ারি, “না না। ওইটুকু বাচ্চাকে জল থেকে তুলেছি বলে আমি যদি টাকা নিই, তা হলে আমার নরকেও জায়গা হবে না। আচ্ছা, আমি আসছি।”
মাথা নিচু করে বেরিয়ে এসেছিল এতোয়ারি।
কিন্তু তার ঠিক তিনদিন পরে একটা লোক এসে বলল, “তোমাকে ডাক্তারবাবু আজই হাসপাতালে গিয়ে দেখা করতে বলেছেন।”
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “কেন?”
লোকটা জবাব দিতে পারেনি। কিন্তু ঘরে বসে বাবা চেঁচিয়েছিল, “যা যা, গিয়ে আমার জন্যে ওষুধ নিয়ে আয়। আমার সারা শরীরে ব্যথা, তোর মাকে বললে তো সে শুনতেই চায় না।”
যাব না যাব না করেও হাসপাতালে গিয়েছিল এতোয়ারি। ডাক্তারবাবু তখন হাসপাতালে ছিলেন না। তাকে দেখে বড় নার্স বললেন, “তোর কপাল ভাল।’’
“কীরকম ভাল তা আমি জানি,” এতোয়ারি বলেছিল।
“তার মানে? কী জানিস?”
“বিয়ের পর যদি তোমার স্বামী টাকার জন্যে মেরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিত, তা হলে বুঝতে কপাল কীরকম ভাল।”
বড় নার্স কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, “রাত তো চিরকাল থাকে না, একসময় ভোর হয়, অন্ধকার সরিয়ে আলো ফোটে। বুঝলি!” বলে অন্যদিকে চলে গেলেন।
ডাক্তারবাবু এলেন ঘণ্টাখানেক পরে। তার ডাক পড়ল ঘরে। বেশ ভয় লাগছিল, সেইসঙ্গে কৌতূহলও। তাকে দেখে ডাক্তারবাবু বললেন, “তুমি কাজ করবে?”
এতোয়ারি হতভম্ব হয়ে তাকাল। এরকম প্রশ্ন সে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি। চট করে হ্যাঁ বা না বলার হুঁশ তার হল না।
ডাক্তারবাবু বললেন, “আমি বড়সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। যে-মেয়েটি এখানে কাজ করত, সে বিয়ের পর অসমের বাগানে চলে গিয়েছে। আমার ওর জায়গায় একজনকে দরকার।”
ততক্ষণে সাহস ফিরে পেয়েছে, সেইসঙ্গে আনন্দ, এতোয়ারি বলল, “আপনি আমাকে যা করতে বলবেন আমি তাই করব।”
“তোমাকে বড় নার্সদিদি বুঝিয়ে দেবে কী করতে হবে,” ডাক্তারবাবু কথা বলার মধ্যেই বড় নার্স ঘরে ঢুকলেন। ডাক্তারবাবু বললেন, “দেবী, তুমি ওকে কী কী কাজ করতে হবে তা দেখিয়ে দাও। একদিনে নয়, দু’-তিনদিনে ও কাজগুলো যদি ঠিকঠাক বুঝে নিতে পারে, তা হলে ওকেই রাখতে চাই।”
“আপনি যেমন বলবেন,” বড় নার্স নিজে নেপালি হলেও ভাল বাংলা বলেন।
ডাক্তারবাবু বললেন, “ঠিক আছে, তুমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করো। ইনি যেমন বলবেন, ঠিক সেইমতো কাজ করবে। যাও।”
এতোয়ারি ডাক্তারবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
কাজটা শুরু হয়েছিল নার্সদের সাহায্যকারী হিসেবে। সেইসঙ্গে এই ছোট্ট হাসপাতালের পাঁচখানা বেডের চাদর পালটানো থেকে রোগীদের যাবতীয় সেবার কাজ করা। সকাল সাতটায় হাসপাতালে আসতে হত, ছুটি পেত সন্ধে সাতটায়। বারো ঘণ্টার কাজ কিন্তু একটুও খারাপ লাগত না এতোয়ারির। উলটে মনে হত, হাসপাতালের কাজ পেয়ে সে বেঁচে গেছে।
দুপুরের খাবার হাসপাতাল থেকেই পাওয়া যেত। সবাই বলত, খুব খারাপ রান্না কিন্তু এতোয়ারির তা মনে হত না। ভাত ডাল আর আলুর তরকারি তো খেতে পাচ্ছে, স্বাদ যত পানসে হোক, বিনা পয়সায় কে দিচ্ছে তাকে। বিকেলে বিনা পয়সায় এক গ্লাস চা আর একটা বিস্কুট। সন্ধে সাতটায় লাইনে ফিরেই উনুন ধরিয়ে ভাত আলুসেদ্ধ রাঁধতে হত। কোনও কোনওদিন মা রেঁধে রাখত বলে জামাকাপ়ড় নিয়ে চলে যেতে হয় নদীতে। ঘাটে বসে চারপাশে অন্ধকার সইয়ে নিতে, দৃষ্টি ঠিক করতে সময় লাগত। আর চাঁদের রাত হলে মন কী ভালই না হয়ে যেত! আকাশ থেকে যেন রুপোর স্রোত নেমে আসছে পৃথিবীতে। সমস্ত চরাচর যেন ভাতের ফ্যানের মতো রূপের গমকে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ছোট্ট নদীর দুরন্ত ঢেউগুলোয় সেই আলো এমনভাবে মাখামাখি হয়ে গিয়েছে যে, চোখ ফেরানো মুশকিল হয়ে ওঠে।
কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বুক টনটন করে ওঠে এতোয়ারির। আঙুল চলে যায় বাঁ চোখের ওপরে। ভ্রূ ঘেঁষে আধ ইঞ্চি উঁচু হয়ে থাকা আব তার শত্রু। এই শত্রুটাকে কপালে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তার বর বলেছিল, “তোর বাপ বলেছিল ওই আব সমেত বিয়ে করলে যে-টাকা দেবে, তার অর্ধেকও দেয়নি। এতদিন চুলের মুঠো ধরেছি। পিঠে লাঠি মেরেছি এবার তোর ওই আব ফাটিয়ে দেব। তোর বাপ যদি ওই আবের দাম না-দিতে পারে, তা হলে আবের সঙ্গে সঙ্গে তুইও খতম হয়ে যাবি। সাতদিনের মধ্যে তোর বাপ যদি আব বাঁচাতে টাকা না দেয়, তা হলে আমাকে দোষ দিবি না।”
চোখ খোলা, বাইরে ঝিলিক দেওয়া জ্যোৎস্না, কিন্তু এতোয়ারির কোনও হুঁশ নেই। ঘাটে বসে আছে পাথর হয়ে। জল ছেড়ে কাঁকড়ার দল যখন খাবার খুঁজতে পাড়ে উঠে এল, তখনও তার হুঁশ নেই।
হঠাৎ শরীরে ঝাঁকুনি লাগল। ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে চাঁদের আলোয় মাকে দেখতে পেল। দেখামাত্র দু’হাতে মায়ের জীর্ণ শরীরকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল এতোয়ারি। সেই কান্নার শব্দ কানে যেতেই কাঁকড়াগুলো দৌড়োতে লাগল নদীর জলের দিকে। একটা রাতপাখি চিৎকার করে উড়ে গেল সামনের গাছের ডাল থেকে।
মেয়ের কাঁপতে থাকা শরীর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে শেষপর্যন্ত মা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। তার গলা থেকেও কান্না বের হল। চতুর্দশীর চাঁদ তখন একফালি সাদা মেঘের আড়ালে ছটফট করছে।
মাইনে পাওয়ার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল। জলপাইগুড়ি শহর থেকে সিভিল সার্জেন সাহেব এসেছিলেন বানারহাটে, যাওয়ার সময় এই চা-বাগানের হাসপাতালে ম্যানেজারের আমন্ত্রণে কিছুক্ষণের জন্যে এসেছিলেন।
ডাক্তারবাবু আর ম্যানেজারের সঙ্গে ভদ্রলোক হাসপাতালটা ঘুরে দেখলেন। তখন সকাল দশটা। হাসপাতালের আউটডোরে ততক্ষণ জনা তিরিশেক মানুষ তাদের নানা রকমের অসুখ নিয়ে হাজির হয়েছে। ওইসময় সিভিল সার্জেনের চোখ গেল এতোয়ারির দিকে। ছোট নার্স একটি মেয়ের পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছিল। তাকে সাহায্য করছিল এতোয়ারি। সিভিল সার্জেন ম্যানেজারকে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওই মেয়েটি কি এখানে কাজ করে?”
ম্যানেজার সাহেব ডাক্তারবাবুর দিকে তাকালেন। ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, ওই মেয়েটি কিছুদিন আগে হেল্পার হিসেবে কাজ শুরু করেছে। খুব কাজের মেয়ে।”
সিভিল সার্জেন বললেন, “মেয়েটিকে এখানে আসতে বলুন তো।”
ডাক্তারবাবু কাছে গিয়ে এতোয়ারিকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। এতোয়ারি কপালে হাত ছুঁইয়ে সবাইকে নমস্কার করল।
ভাঙা হিন্দিতে সিভিল সার্জেন জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কপালে এটা কবে থেকে হয়েছে?”
মাথা নিচু করে ভাবল এতোয়ারি। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “জানি না, মনে নেই।”
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে এতোয়ারির ভ্রূ-র ওপরের আবটাকে পরীক্ষা করলেন। তারপর গম্ভীর মুখে ডাক্তারবাবুকে ইংরেজিতে বললেন, “তোমার কি মনে হয়নি এটা বেশিদিন রেখে দিলে এই বেচারার প্রাণসংশয় হতে পারে?”
“হ্যাঁ স্যার, মনে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের এখানে ওটা অপারেশন করা সম্ভব নয়। এরা এত গরিব যে, শহরে গিয়ে নিজেদের উদ্যোগে অপারেশন করাতেও পারবে না,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ওর বাবা মা আছে?” সিভিল সার্জেন জিজ্ঞাসা করলেন।
উত্তরটা এতোয়ারির কাছ থেকে জেনে নিয়ে জানালেন ডাক্তারবাবু।
“আমার মনে হচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওটা অপারেশন করে বাদ দেওয়া দরকার। কিছুদিন পরে আর অপারেশন করাও যাবে না। আপনারা যদি মেয়েটিকে বাঁচাতে চান, তা হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জলপাইগুড়ির হাসপাতালে পাঠিয়ে দিন,” সিভিল সার্জেন বললেন।
ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর ম্যানেজার সাহেব ডাক্তারবাবুকে ডেকে বললেন, “আমি স্থির করেছি, মেয়েটির অপারেশনের ব্যাপারে কোম্পানিকে অনুরোধ করব সাহায্য করতে। এটা প্রচার হলে সবাই জানবে, আমরা শ্রমিকদের সঙ্গে মানবিক ব্যবহার করি। আপনি ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলুন। ওরা অনুমতি দিতে ওকে জলপাইগুড়িতে পাঠিয়ে দিন।’’
“ঠিক আছে। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি বেশির ভাগ শ্রমিক অপারেশনে ভয় পায়। যদি ওর বাবা মা রাজি না হয়,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ওরা রাজি না-হলেও মেয়েটি যদি রাজি থাকে, তা হলে ওকে জলপাইগুড়িতে সিভিল সার্জেনের অফিসে পাঠিয়ে দিন। কেউ কিছু বললে তাকে বলবেন আমার সঙ্গে কথা বলতে,” ম্যানেজার গম্ভীর হয়ে বললেন।
বাবা আসেনি। বাবার পক্ষে আসা সম্ভবও ছিল না। মা এসেছিল। ডাক্তারবাবুর প্রস্তাব শুনে জিজ্ঞাসা করেছিল, “অপারেশন হলে ও কি মাইনে পাবে?”
অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। তারপর মাথা নেড়েছিলেন, “আমি ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে কথা বলব যাতে ওকে টাকা দেওয়া হয়!”
ম্যানেজার সাহেবের নির্দেশে পাতিবাবু এতোয়ারি আর তার মাকে নিয়ে জলপাইগুড়ি শহরে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে এতোয়ারির বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হল। মেয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে না-আসা পর্যন্ত পঙ্গু মানুষটা হাসপাতালের এক কোণে থাকবে। এই ব্যবস্থা না করলে এতোয়ারির মা মেয়ের সঙ্গে যেতে চাইছিল না।
তিনদিন পরে অপারেশন হল। এই তিনদিন এতোয়ারিকে যখন ওষুধপত্র অথবা ইনজেকশন দেওয়া হত, তখন ওর মা পাশে থাকত। কিন্তু এতোয়ারি লক্ষ করছিল, দ্বিতীয় দিন থেকেই মায়ের চালচলনে একটু একটু করে পরিবর্তন আসছে। কথাবার্তাতেও। হাসপাতালের খাবার খাওয়া, হাসপাতালেই মেয়ের খাটের পাশে মেঝের ওপর চাদর পেতে শোওয়া, হাসপাতালের বাথরুম ব্যবহার করে মা বাকি সময়টা, প্রাথমিক আড়ষ্টতা কাটানোর পর ঘুরে ঘুরে বেড়াত। কোন মহিলা কী অসুখ নিয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছে, তা যেমন তার একদিনেই জানা হয়ে গিয়েছিল, তেমনই তার মেয়েকে সবচেয়ে বড় ডাক্তার নিজে অপারেশন করতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন, এই খবর সবাইকে জানিয়ে দিয়ে সে খুব তৃপ্তি পেয়েছিল।
দ্বিতীয়দিনের বিকেলে এতোয়ারির মনে হচ্ছিল মাকে একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে কথা বলছে, একটু যেন ছটফটে। কয়েকবার একই কথা বলল, “তুই একদম ভয় পাবি না। ডাক্তারবাবু তোকে ঠিক করে দেবে। আর কেউ তোকে খারাপ দেখতে বলতে পারবে না।”
অপারেশনের দিন একটুও ভয় পাচ্ছিল না এতোয়ারি। সবাই বলত যদি তার কপালের এই ঢিবিটা আচমকা ফেটে যায়, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে সে মরে যাবে। ডাক্তারবাবুরা যদি আবটাকে যত্ন করে সরিয়ে দিতে পারে, তা হলে আর সেই ভয় থাকবে না। বাড়িতে যে-ঘষা আয়না আছে, তাতে নিজের যে-মুখ দেখতে সে অভ্যস্ত, তাতে আব চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছে। ওই আব অপারেশনের পর সে মারা গেল না, এমন হলে তার মুখটা কীরকম দেখাবে? সে কল্পনা করতে চেয়েও নাগাল পায়নি।
অপারেশনের আগে অনেক ওষুধ, কয়েকটা ইনজেকশনের যন্ত্রণা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছিল এতোয়ারি। পাশে দাঁড়িয়ে মা বারবার বলছিল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অপারেশনের পর কতক্ষণ বাদে তার জ্ঞান ফিরে এসেছিল সে জানে না। মুখে মাথায় ব্যথা। চোখ খুলে তাকাতেই নার্সের ঝাপসা মুখ দেখতে পেল। নার্সের গলা কানে এল, “শরীর খারাপ লাগছে? ব্যথা হচ্ছে?”
কথা না বলে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল এতোয়ারি।
মিনিটখানেক বাদে বাঁ হাতের কবজির কিছুটা ওপরে সুচ ফোটানোর ব্যথা অনুভব করল সে। মুখ থেকে যন্ত্রণার শব্দ ছিটকে বেরিয়ে এল। কিন্তু নার্স ব্যথার জায়গাটা মালিশ করে দিতে না-দিতেই কীরকম ঘোর লাগল। আর কিছু মনে নেই।
যখন চেতনা এল তখন মায়ের গলা শুনতে পেল, “বাব্বা, কতক্ষণ ধরে তুই ঘুমালি! এখন কীরকম লাগছে?”
বড় শ্বাস নিল এতোয়ারি, “ভাল,” তারপর মনে পড়তেই হাত তুলে কপাল স্পর্শ করে বুঝতে পারল তার কপাল ঢেকে রাখা হয়েছে। নার্স এগিয়ে এল, “হাত দিয়ো না। তোমার যে-জায়গায় অপারেশন হয়েছে, সেটা ব্যান্ডেজে ঢাকা আছে।”
সেই বিকেলে মা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, “এরা আমাকে চলে যেতে বলছে।”
“মানে?” অবাক হল এতোয়ারি।
“এরা বলছে তোর অপারেশন ভালভাবে হয়ে গেছে, তাই আর আমার এখানে থাকার দরকার নেই। তোকে আরও সাতদিন এখানে রেখে বাগানে পাঠিয়ে দেবে এরাই। কিন্তু আমি এখন যেতে চাই না, আমি তোর সঙ্গে ফিরে যেতে চাই,” মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল।
কী বলবে বুঝতে পারছিল না এতোয়ারি।
মা বলল, “জীবনে এত আরাম, এত আনন্দে আমি কখনও থাকিনি রে। তোর বাবা আমাকে কোনওদিন এত শান্তি দেওয়ার কথা ভাবেওনি। আমি যদি আরও ক’টা দিন এখানে থেকে তোকে নিয়ে ফিরে যাই, তা হলে এদের কত ক্ষতি হবে!”
“তুমি ওদের বলেছ?”
“কেউ শুনতেও চাইছে না,” মা কেঁদে ফেলল।
এইসময় নার্স প্রায় দৌড়ে কাছে এসে বলল, “যাও, যাও, বাইরে যাও। সিভিল সার্জেন সাহেব আসছেন। এখন এখানে থেকো না।”
মা কিছু বলার আগেই একজন আয়া তাকে ধরে বাইরে নিয়ে গেল। একটু পরে সিভিল সার্জেন এলেন, সঙ্গে কয়েকজন ডাক্তার এবং হেড নার্স। ইশারায় এতোয়ারিকে দেখিয়ে দিলে, সিভিল সার্জেন খাটের পাশে এসে ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন কেমন আছ?”
এত লোক দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল এতোয়ারির। তার গলা দিয়ে স্বর বের হল না। সিভিল সার্জেন ইশারা করলে, হেড নার্স ব্যান্ডেজ খুলে দিলেন। জায়গাটা ভাল করে পরীক্ষা করে মাথা নাড়লেন সিভিল সার্জেন। তাঁর ঠোঁটে হাসি ফুটল। বললেন, “গুড,” যে-ডাক্তারের অধীনে এতোয়ারির চিকিৎসা হচ্ছে, তিনি প্রেসক্রিপশন দেখালেন। কী কী ওষুধ দেওয়া হচ্ছে দেখে খানিকটা কথা বলে সিভিল সার্জেনের নির্দেশে আবার ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হল। ভদ্রলোক ভাঙা হিন্দিতে বললেন, “আর সাতদিন পরে বাড়িতে যেতে পারবে।”
এতোয়ারির গলা থেকে শেষপর্যন্ত শব্দ বের হল।
সিভিল সার্জেন জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়েস, কিছু বলবে?”
“আমার মা, মা যদি আমার সঙ্গে থাকে…” কথা শেষ করতে পারল না সে।
বড় ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে ঘাড় লাড়লেন সিভিল সার্জেন, “ওয়েল, ঠিক আছে, তোমার মা থাকতে পারে।”
দলটা চলে যাওয়ার পরেই মা ছুটে এল। হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমাকে যেতে হবে না রে, ওরা আমাকে থাকতে দেবে। ওঃ, আরও কয়েকটা দিন এখানে থাকতে পারব রে।”
চা-বাগানের গাড়ি ওদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল অপারেশনের জন্যে। এখন কয়েকটা দিন কী কী ওষুধ খেতে হবে, তা বুঝে নিয়ে বাগানে ফিরে যাওয়ার জন্যে বাইরে বেরিয়ে কোনও গাড়ি দেখতে পেল না। পাতিবাবু তাদের পৌঁছে দিতে এসেছিলেন, তিনিও আসেননি। এই সময় যে-ডাক্তারবাবু দু’বেলা তার দেখাশোনা করছিলেন, তিনি ওদের দেখতে পেয়ে সমস্যার সমাধান করলেন। জলপাইগুড়ি থেকে চা-বাগানের বাজারে যে-বাস যায়, তার ভাড়ার পয়সা হাতে গুঁজে দিলেন।
চা-বাগানের বাজারে বাস পৌঁছল ভরদুপুরে। চেনা জায়গা, চেনা পথ। এতোয়ারিরা প্রথমে চা-বাগানের ভেতরে হাসপাতালের দিকে এগোল। বাগানের মুখেই বঙ্কু সর্দারের সঙ্গে দেখা। বঙ্কু সর্দার মাকে জিজ্ঞাসা করল, “আরে! মেয়ে কেমন আছে?”
মা হেসে বলল, “এই তো, পাশেই আছে, ওকেই জিজ্ঞাসা করো।”
বঙ্কু সর্দারের চোখ বড় হয়ে গেল, “কী আশ্চর্য! ওর মুখ যে একদম পালটে গিয়েছে!”
মা বলল, “হ্যাঁ, অপারেশনের পরে এরকম দেখাচ্ছে। ওই টিউমারটা সব ঢেকে রেখেছিল।”
মাথা নাড়ল বঙ্কু সর্দার, “ঠিক ঠিক। কিন্তু শুধু মেয়ে না, মায়েরও পরিবর্তন হয়েছে নাকি!”
মা ঠোঁট ওলটাল, “কী যে বলো, আমার পরিবর্তন হবে কেন?”
“উঁহু! তোমাকে একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে।”
“কীরকম?” হাসল এতোয়ারির মা।
কথার জবাব না-দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল বঙ্কু সর্দার।
এইসময় চা-বাগান ঝিমিয়ে থাকে। বাগানের ভেতর নুড়ি বিছানো রাস্তাগুলো চুপচাপ ঘুঘুর ডাক শোনে। মা এবং মেয়ে পথটা হেঁটে চলে আসে ছোট্ট হাসপাতালের সামনে। এখন ডাক্তার দেখাতে আসা রোগীদের ভিড় নেই, কিন্তু বারান্দায় পা দিতেই ছোট নার্স চোখ বড় করে এগিয়ে এল, “ও মা! তুই তো একদম অন্যরকম হয়ে গিয়েছিস রে,” ছোট নার্স কাছে এসে এতোয়ারির চিবুক তুলে ধরে ভ্রূ-র দিকে তাকাল। পাতলা তুলোর ওপর একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে।
ছোট নার্স বলল, “বাঃ, তোর আবটা একদম চলে গেছে। ব্যান্ডেজ খোলার পর তোকে খুব সুন্দর দেখাবে রে।”
ভিড় জমে গেল এতোয়ারিকে ঘিরে। বড় নার্স বললেন, “তোমরা এখন বাড়িতে চলে যাও। কাল সকালে এসে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করবে।”
কিন্তু বেঁকে বসেছিল এতোয়ারির বাবা। মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠল, “দূর! এ আমার মেয়ে না। বউ কোথা থেকে কাকে ধরে এনেছে।”
ছোট নার্স হাসি চাপতে চাপতে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ভাল করে তাকিয়ে দ্যাখো, পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে সে তোমার বউ কি না!”
“বউ ছিল, এখন নেই,” গম্ভীর গলায় বলল লোকটা।
চোখ কপালে উঠল ছোট নার্সের, “সে কী! কেন?”
“শহরে গিয়ে ও একদম বদলে গিয়েছে। দেখছ না, শহরের মেয়ের মতো শাড়ি পরেছে। যার অত বড় মেয়ে, সে কেন ওভাবে শাড়ি পরবে?”
হাসপাতাল ছেড়ে যেতে চাইছিল না লোকটা। দু’বেলা পেট ভরতি খাবার, সকাল-বিকেল চা বিস্কুট, মেঝেতে শুতে হলেও মাথার নীচে বালিশের আরাম ছেড়ে লাইনের ঘরে যাবে না বলে প্রায় বিদ্রোহ করে বসেছিল, তাকে অনেক বুঝিয়ে রিকশায় চাপিয়ে মেয়ে-বউয়ের সঙ্গে বাড়ি পাঠানো হল।
সেই রাতে এতোয়ারি মায়ের অন্য রূপটা প্রথম দেখল।
বিকেলে আসার সময় ছোট নার্স যে-রুটি তরকারি দিয়েছিল, তাতেই ওদের রাতের খাবার হয়ে যেত। কিন্তু ঘরে আসার পর থেকেই বাবা গালাগাল শুরু করেছিল। অপারেশনের পর এতোয়ারির চেহারা বদলে গিয়েছে। এই খবরটা চাউর হওয়ায় লাইনের অনেকেই দেখতে এসেছিল। তাদের দেখে গলা আরও ওপরে উঠেছিল। সে বারবার বলতে লাগল তার মেয়েকে শহরে নিয়ে গিয়ে একটা খারাপ মেয়েমানুষকে ঘরে নিয়ে এসেছে তার বউ। শুধু তাই নয়, নিজের সাজগোজও খারাপ মেয়ের মতো করে ফেলেছে। সে চিৎকার করে সবাইকে চলে যেতে বলেছিল সামনে থেকে।
মহল্লার লোকজন চলে গেলেও চিৎকার থামছিল না। এবার তার লক্ষ এতোয়ারির মা। সে শহরে গিয়ে নিজের চরিত্র নষ্ট করেছে। নইলে শাড়ি পরার ধরন আর চুল বাঁধার কায়দা বদলে যাবে কেন? গালাগালি দিতে দিতে যখন তার মধ্যে অশ্লীল শব্দ ঢুকে গেল, তখন এতোয়ারির মা উঠে দাঁড়াল। তার চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁট কামড়ে ধরেছে। এতোয়ারি মায়ের এই রূপ কখনও দেখেনি। গলা ফাটিয়ে মা ধমকাল, “চুপ।”
“ধমকাচ্ছিস? আমাকে ধমকাচ্ছিস? মেরে হাড় ভেঙে দেব। শহরে গিয়ে তোর গায়ে অনেক তেল জমেছে দেখছি,” উঠে বসল বাবা।
এতোয়ারির মা ছুটে গিয়ে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা উনুন ধরানোর চ্যালাকাঠ তুলে নিয়ে এসে বাবার শরীরে এলোপাথাড়ি মারতে লাগল। এতোয়ারি চিৎকার করে মাকে থামাতে চাইলেও তা মায়ের কানে ঢুকছিল না। বাবার কাঁধে, পিঠে পাগলের মতো আঘাত করতে করতে হাঁপিয়ে পড়ল মা। দু’হাতে নিজের মাথা আগলে বসেছিল বাবা। মার খাওয়ার পর থেকেই তার চিৎকার বন্ধ হয়েছিল। মার খাওয়ার সময় তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। শেষপর্যন্ত পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল মাথা দু’হাতে চেপেই।
চ্যালাকাঠ ফেলে দিয়ে মা টলতে টলতে ঘরের অন্য কোণে ধপাস করে বসে পড়ল। এতোয়ারি ধীরে ধীরে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। মা দুটো হাত ভাঁজ করে হাঁটুর ওপর রেখে মুখ ঢেকে বসে ছিল। এতোয়ারি তার পিঠে হাত আলতো করে রাখতেই বড় শ্বাস ফেলল মা। এতোয়ারি কিছু বলার আগেই সে মুখ তুলে বলল, “ওঃ।”
“শান্ত হও মা, একটু শুয়ে পড়ো,” এতোয়ারি বলল।
“আমার এখন খুব শান্তি লাগছে। এত শান্তি আমি জীবনে কখনও পাইনি। উঃ, এতদিন বুকে যে-রাগ পুষে রেখেছিলাম তা আজ…” মাথা নাড়ল মা।
এতোয়ারি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের এমন তৃপ্ত মন সে কখনও দেখেনি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সে শুধু মাকে বাবার হাতে মার খেতে দেখেছে। মুখ বুজে সহ্য করেছে মা। আজ প্রথমবার উলটো দৃশ্য দেখল। মা হিংস্র হয়ে বাবার গায়ে হাত তুলল আর বাবা সেটা মেনে নিতে বাধ্য হল। হতভম্ব এতোয়ারির মনে হল তার মরে যাওয়া উচিত।
অপারেশন খুব ভালভাবেই হয়েছে। পরের কাজটা বাগানের ডাক্তারবাবুই করে দিলেন। কপালের ওপর একটা কাটা দাগ থাকল বটে কিন্তু বড় নার্স মলমের টিউব দিয়ে বললেন, “এই নে, ডাক্তারবাবু দিয়েছেন। রোজ রাত্রে, শোওয়ার সময় লাগাবি। দেখবি, ধীরে ধীরে দাগটা মিলিয়ে যাবে।”
শেষপর্যন্ত মা অসুস্থ হল। চা-পাতা তুলে ঝুড়িতে বোঝাই করে ফ্যাক্টরির সামনে নিয়ে আসতে হয়। সেই পাতা ওজন করে যে এনেছে, তার নামের পাশে খাতায় লিখে রাখা হয়। সাপ্তাহিক টাকা যে যত পাতা তুলেছে, তার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। ওই চা-পাতার ঝুড়ি পিঠে বেঁধে নিয়ে আসার সময় বাগানের ভেতরের সরু পথে মাথা ঘুরে পড়ে গেল এতোয়ারির মা। অন্য কামিনরা দৌড়ে এসে দেখল ওর দাঁতে দাঁত লেগে আছে। কারও কাছে জল নেই। নদীও বেশ দূরে। তাই ধরাধরি করে মানুষটাকে নিয়ে আসা হল হাসপাতালে। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে। ঘোলাটে চোখে তাকাচ্ছে। যে-খাটটা খালি ছিল, তাতে শুইয়ে মাকে হাওয়া করতে লাগল এতোয়ারি। মাকে বয়ে নিয়ে আসা লোকেরা বলতে লাগল, কীভাবে এতোয়ারির মা চা-বাগানের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। বড় নার্সকে নিয়ে ডাক্তারবাবু এসে মাকে পরীক্ষা করলেন। সংবিৎ ফিরে আসতেই মা উঠে বসতে চাইলে বড় নার্স ধমক দিলেন, “না, একদম না। শুয়ে থাকো।”
ডাক্তারবাবু সবরকম পরীক্ষা করে বললেন, “ভয়ের কিছু নেই। আজ এখানেই থাকো, বিশ্রাম হবে। প্রেশারটা বেশ বেড়ে গিয়েছে। ওষুধ লিখে দিচ্ছি, খাইয়ে দাও,” ডাক্তারবাবু চলে গেলেন।
এতোয়ারির মা মাথা নাড়ল। বড় নার্স জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হল?”
“ঘরে ও একা থাকলে মুশকিল হবে।”
“তোমরা মা-মেয়ে কাজে বেরিয়ে এলে তো ও একাই থাকে। ঝামেলা কোরো না।”
বড় নার্স বেরিয়ে গেলে এতোয়ারি বলল, “বাবার জন্যে চিন্তা কোরো না, আমি তো থাকব।”
“খুব গালি দেবে, আমি সহ্য করতে পারব না,” মা করুণ গলায় বলল।
“তোমাকে সহ্য করতে হবে না,” জোর গলায় বলল এতোয়ারি।
“মানে?” বলার ধরনে মা অবাক।
“এতদিন তুমি সহ্য করেছ, আমি দেখেছি। এখন যা বলার আমি বলব, তোমাকে কিছু বলতে হবে না,” মাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মেয়ে তার কাজে চলে গেল।
খারাপ খবর বাতাসের আগে দৌড়োয়। হাসপাতালে ভরতি হয়েছে বউ, এই খবর ঘরে বসেই পেয়ে গিয়েছিল এতোয়ারির বাবা। এতোয়ারি ঘরে ফিরে দেখল বাবা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। সে এসেছে বুঝেও মুখ খুলল না।
মুখ খুলল রাতের খাওয়া শেষ করে একটা বিড়ি ধরিয়ে।
অবাক হয়ে এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “বিড়ি কোথায় পেলে?”
“যেখান থেকেই পাই, তোর দরকার কী!” ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “সব শুনেছি। তা ডাক্তার কী বলল? মরবে না বেঁচে যাবে?”
ঠোঁট কামড়াল এতোয়ারি। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কী চাইছ?”
“কী আর চাইব? আমার কথা কে শুনছে!” মুখ বেঁকাল বাবা।
কিছুক্ষণ পরে নেভা বিড়ি ছুড়ে ফেলে দিয়ে বাবা আবার বলল, “কাল তোর শরীর খারাপ বলে হাসপাতালে যাবি না।”
“আমার শরীর খারাপ? কে বলল তোমাকে?” নাক দিয়ে শব্দ বের হল এতোয়ারির, “আমার শরীর এখন ঠিক আছে।”
“আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই কাল ঘরে থাকবি।”
“কিন্তু কেন সেকথা বলবে তো!”
“আমি কোনও কথা বলব না। আমি যদি তোর বাপ হই, তা হলে তুই আমার কথা শুনবি!” বাবার চোখ বন্ধ হল এবং খানিক পরেই নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল।
ফাঁপরে পড়ল এতোয়ারি।
ভোর হতে না-হতেই এঁটো বাসন নিয়ে নদীতে গিয়ে চটপট ধুয়ে নিয়ে সে জল ভেঙে ওপারে চলে এল। এখনও সূর্য ওঠেনি। এ দিকটায় একের পর এক বাবুদের কোয়ার্টার্স। এত ভোরে তাদের ঘুম ভাঙার কথা নয়। কিন্তু এখানে না-আসা ছাড়া তার মাথায় অন্য উপায় এল না।
একটু আলো ফুটলে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার্সের দরজা খুলল কাজের লোক।
এতোয়ারিকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছ? হবে না। এখন উনি ঘুমাচ্ছেন। অসুখ-বিসুখ হলে হাসপাতালে যখন যাবেন, তখন দেখা কোরো।”
“কিন্তু আমার যে এখনই ওঁর সঙ্গে দেখা করা দরকার,” জোর দিয়ে বলল এতোয়ারি।
এই সময় ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তারবাবুর স্ত্রী। হেসে বললেন, “ওমা, তুমি। এই ভোরবেলায় এসেছ, ডাক্তারবাবুকে দরকার নিশ্চয়ই।”
“হ্যাঁ। আমার মা হাসপাতালে ভরতি হয়ে আছে। আবার বাবারও শরীর হঠাৎ খারাপ হয়েছে। আমি যদি আজ হাসপাতালে যেতে না-পারি, তা হলে ডাক্তারবাবু কি ছুটি দেবেন,” বেশ কাতর গলায় কথাগুলো বলল এতোয়ারি।
“এ কথা ওকে বলার জন্যে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে না। আমি ওকে বলব তোমাকে একটা দিন ছুটি দিতে। কিন্তু তোমার বাবাকে তো হাসপাতালে আনা উচিত।”
“না, সেরকম খারাপ হয়নি, হলে নিয়ে যাব।”
“ঠিক আছে, তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যাও,” ডাক্তারবাবুর স্ত্রী হাসলেন।
সকালেই রান্না শেষ করে বারান্দায় বসেছিল এতোয়ারি। ঘুম থেকে উঠে বাবা মুখ-হাত ধুয়ে এক বাটি মুড়ি খাওয়ার পরে ভাল জামা পরে ঘরে বসে আছে। হাসপাতালে যাওয়ার সময় বাবা জামা পরে গিয়েছিল, না হলে সারাক্ষণ তো খালি গায়েই থাকে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিল না এতোয়ারি। এই সময় তার কপাল টনটন করে উঠল। ডাক্তারবাবু বলেছেন, ওটা কিছুদিন করবে, এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই।
হঠাৎ মুখ ঘোরাতেই এতোয়ারি লোকটাকে দেখতে পেল, ডোরাকাটা পাজামার ওপর নীল শার্ট পরে হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁত বের করে হেঁটে আসছে। কয়েক সেকেন্ড লাগল বুঝতে। তারপরেই সে তড়াক করে উঠে ঘরের ভেতর চলে গেল। বাবা বসেছিল ছোট্ট জলচৌকির ওপরে, তাকে ওইভাবে ঘরে ঢুকতে দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটল।
এতোয়ারি সোজা বাবার সামনে এল, “ওই লোকটা কেন আসছে?”
বাবা চোখ বন্ধ করল, “কোন লোকটা?”
“তুমি জানো না আমি কার কথা বলছি? ও কেন আসছে?”
“তা আমি কী করে বলব!”
“কী করে বলব মানে? আমি কার কথা বলছি তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ! তুমি তো এই ঘরে বসেই বুঝে গেলে। বাবা, চালাকি কোরো না!” বেশ জোরে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করল এতোয়ারি।
এই সময় বাইরে থেকে গলা ভেসে এল, “এসে গেছি, ভেতরে আসব?”
সঙ্গে সঙ্গে বাবা ঠোঁটে আঙুল চাপা দিল। তারপর গলা তুলে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, এসো, ভেতরে এসো।”
লোকটা দরজায় এসে দাঁড়াল। প্রথমেই তার চোখ গেল এতোয়ারির মুখের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো বিস্ফারিত হল। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না লোকটা। তার মুখ থেকে শব্দ বের হল, “বাঃ।”
চোখ ছোট হল, কপালে ভাঁজ পড়ল এতোয়ারির। লোকটা ঘরের ভিতর ঢুকতেই সে হনহন করে বাইরে বেরিয়ে এল। কোথায় যাবে ঠাওর না-করে খানিকটা হেঁটে সে বটগাছটার কাছে এসে ধনুবুড়োকে দেখতে পেল। তিনমাথা এক হওয়া বুড়োটাকে রোজ বাড়ির লোক এখানে বসিয়ে দিয়ে যায়। দুপুরে নিয়ে গিয়ে স্নান পায়খানা করিয়ে আবার রাত পর্যন্ত এখানেই ফেলে রেখে দেয়। ধনুবুড়োর হাতে একটা লাঠি আছে যার সাহায্যে পাশের জঙ্গলে জলবিয়োগ করে আসে। আর সারাক্ষণ হাঁটুতে মুখ গুঁজে যে-ভাবনা ভাবে, তা এই লাইনের এমন কেউ নেই যে জানে না।
এতোয়ারির মাথা এত গরম হয়ে গিয়েছিল, সে আর কিছু ভাবতে না-পেরে ধনুবুড়োর পাশে এসে বসল। ধনুবুড়ো তার দিকে তাকালও না। কিছুক্ষণ পরে একটা বড় শ্বাস ফেলল এতোয়ারি। তারপর ধনুবুড়োর দিকে তাকাল। সে যখন ছোট ছিল, তখন ধনুবুড়োর মুখে শুনতে পেত অনেক কাহিনি। এই চা-বাগান তার দেশ নয়। তার দেশ বহুদূরে, রেলগাড়িতে চড়ে যেতে হয়। সেই দেশ থেকে সে চা-বাগানে এসেছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে। যখন কেউ জিজ্ঞাসা করে, ‘ও ধনুবুড়ো, এখন তোমার বয়স কত হল?’ ধনুবুড়ো মুখ তোলে। ঘোলাটে হয়ে যাওয়া চোখ আকাশের দিকে তুলে অনেকক্ষণ ভাবে। তারপর উত্তর খুঁজে না-পেয়ে আবার মুখ নামিয়ে নেয়।
আজ এতোয়ারি নিচু গলায় ডাকল, “ও ধনুবুড়ো, ধনুবুড়ো, শুনতে পাচ্ছ?” এতোয়ারি ধনুবুড়োর খালি পিঠে তার বাঁ হাতটা রাখল। শীতের কয়েক মাস ছাড়া ধনুবুড়োর বাড়ির ছেলেরা তাকে শুধু নেংটি পরিয়ে রেখে দেয় দিনরাত।
ধনুবুড়ো মুখ তুলল। ঘাড় ঘুরিয়ে এতোয়ারিকে দেখে ফিক করে হাসল। এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “ধনুবুড়ো, তোমার দেশে যাবে?”
যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না ধনুবুড়ো।
এতোয়ারি বলল, “আমি চাকরি করছি, মাইনে পাব। সেই টাকায় টিকিট কেটে রেলে চড়ে তোমাকে নিয়ে তোমার দেশে যাব। তুমি যাবে তো?”
কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে এতোয়ারির হাত শক্ত করে ধরল ধনুবুড়ো, “সত্যি?”
“হ্যাঁ। তুমি রাজি হলে আমি এখানে থাকব না,” এতোয়ারি বলল।
ধীরে ধীরে অপূর্ব এক আলো ফুটে উঠল ধনুবুড়োর মুখে। ধনুবুড়োর এমন মুখ এতোয়ারি কখনও দেখেনি। সে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার দেশে যেতে হলে কোন স্টেশনে নামতে হয়? কোথাকার টিকিট কাটতে হয়?”
বুড়ো হাঁ করল, যেন কথা হাতড়াল কিন্তু খুঁজে পেল না।
“নামটা তোমার মনে নেই? ছেলেবেলায় তোমাকে বলতে শুনেছি।”
এবার ধনুবুড়োর মুখ দেখে মনে হল সে প্রাণপণে চেষ্টা করেও বিফল হচ্ছে। পিঠে আলতো আদর করল এতোয়ারি। বলল, “ঠিক আছে। ধীরে ধীরে মনে করার চেষ্টা করো।”
এইসময় দূর থেকে একটা বাচ্চা ছুটে এল ওদের সামনে, “ও পিসি, তোমাকে তোমার বাবা ডাকছে,” বলে ছুটে চলে গেল অন্যদিকে।
“যা যা,” খসখসে গলায় বলল ধনুবুড়ো, “আমি ভাবি, নামটা কী যেন, ঠিক মনে পড়ে যাবে, ভাবিস না,” বলে বুড়োর মাথা দুই হাঁটুর ওপর নেমে গেল। চোখের পাতা বন্ধ হল।
হঠাৎ এতোয়ারির মনে হল, সে যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ওই নির্লজ্জ লোকটাকে যা বলার তা সামনাসামনি বলাই উচিত। এতোয়ারি বড় বড় পা ফেলে নিজেদের ঘরের দরজায় পৌঁছতেই হাঁড়িয়ার কটু গন্ধ টের পেল। বাবা বলল, “এই যে, এসে গিয়েছিস। জামাইকে একটু খাতিরযত্ন কর, তোর মা ঘরে থাকলে সে সব করত।”
থমথমে মুখে লোকটার দিকে তাকাল এতোয়ারি, “অ্যাই! লজ্জা করে না তোমার তা জানি, কিন্তু এতখানি নির্লজ্জ তুমি! এত লোক রোজ মরে যাচ্ছে, তোমার কেন মরণ হয় না। কোন মুখে তুমি এ বাড়িতে এসেছ, অ্যাঁ?”
বাবা বলল, “আঃ, এতি, চুপ কর। ভুলে যা আগের কথা। আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। ছেলেমানুষ তো, একটা ভুল করে ফেলেছে…”
“বাঃ, তুমি কীরকম বাপ? লোকটা এসে তোমাকে হাঁড়িয়া খাওয়াল আর তুমি সব ভুলে আমাকে ক্ষমা করতে বলছ? তুমি বাপ না কসাই?” চিৎকার করল এতোয়ারি।
“আঃ, যা মুখে আসছে তাই বলছিস? চাকরি পেয়ে তোর পা ভারী হয়ে গেছে। জামাই এসে ক্ষমা চেয়েছে, তা জানিস?” হাঁড়িয়ার বোতলে চুমুক দিল বাবা।
লোকটা দাঁত বের করে হাসল, “আহা, মাথা তো গরম হতেই পারে। একসময় তো বেচারা খুব কষ্ট পেয়েছে, দোষ তো আমারই।”
আর-একটা চুমুক দিয়ে বাবা বলল, “দেখ, ও নিজের দোষ স্বীকার করছে। আরে, মানুষ তো চিরকাল একরকম থাকে না।”
কোমরে দুটো হাত রেখে এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “কেন এসেছ এখানে?”
“তোর জন্যে খুব মনকেমন করছিল তাই চলে এলাম। তোর বাপের কাছে ক্ষমা চাইলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আরে, আমি যতই অন্যায় করে থাকি, তবু তো আমি তোর স্বামী। জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। হ্যাঁ!’’ লোকটা বলল।
বোতল থেকে হাঁড়িয়া গলায় ঢেলে বাবা বলল, “জামাই বলেছে ওর আর টাকা চাই না। উঃ, আমার মাথার ওপর থেকে পাহাড় সরে গেল।”
“ওঠো, ওঠো বলছি। ফের যদি এখানে দেখি, তা হলে তোমার পা ভেঙে দেব,” দৌড়ে ঘরের কোণে গিয়ে একটা বড় কাটারি তুলে এতোয়ারি ঘুরে দাঁড়াল।
দ্রুত উঠে দাঁড়াল লোকটা। তারপর এতোয়ারির বাবার সামনে গিয়ে হাত পাতল, “দাও, এই পাগলি মেয়েমানুষকে আমার চাই না। দাও টাকা ফেরত।”
অবাক হয়ে এতোয়ারি দেখল বাবা গোল করে পাকানো নোটগুলো বেশ অনিচ্ছায় লোকটাকে ফেরত দিল। টাকা পাওয়ামাত্র হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটা। এতোয়ারি কাটারি হাতে এগিয়ে এল বাবার সামনে, “ছিঃ! তুমি না আমার বাবা! লজ্জা! কী লজ্জা! ছিঃ! আজ দুপুরে তোমাকে কোনও খাবার দেব না, গেলো, গেলো ওই বিষ,” হনহন করে রান্না করা খাবার নিয়ে এতোয়ারি সোজা চলে এল ধনুবুড়োর সামনে। খাবার তার সামনে রেখে বলল, “ও বুড়ো, খিদে পেলে খেয়ে নিয়ো, আমি পরে পাত্রটা নিয়ে যাব।”
বুড়ো মুখ তুলে খাবার দেখল। তার মুখে হাসি ফুটল। বলল, “যাবি তো?”
“যাব। কিন্তু স্টেশনের নামটা মনে পড়েছে?” এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল।
“পড়বে, পড়বে। ঠিক মনে পড়বে,” ধনুবুড়ো মাথা নাড়ল।
এখন দুপুর শুরু হতে দেরি নেই। এতোয়ারি হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালে চলে এল। প্রথমেই দেখা হয়ে গেল বড়নার্সের সঙ্গে, “তোর বাবা এখন কেমন আছে?”
“ভাল,” মুখ নিচু করে বলল এতোয়ারি।
“ছুটি যখন নিয়েছিস তখন আজ এলি কেন?” বড় নার্স বলে গেল।
এতোয়ারি চুপচাপ মায়ের বিছানার পাশে এসে দেখল মা পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। একটা টুল টেনে মায়ের মাথার পাশে বসল সে। এই সময় ছোট নার্স এগিয়ে এসে নিঃশব্দে ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ইশারা করল কথা না-বলতে। এতোয়ারি উঠে দাঁড়াতেই ইশারায় তাকে বসতে বলে ছোট নার্স অন্য কাজে চলে গেল। নিঃশব্দে আবার টুলের ওপর বসল এতোয়ারি। মায়ের শীর্ণ শরীরটা মড়ার মতো বিছানায় পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে বহুকাল পরে মা এখন তৃপ্তির ঘুম ঘুমোচ্ছে।
বেশ অনেকক্ষণ পরে চোখ বন্ধ করেই পাশ ফিরল মা। আর তখনই একটা কাক জানলার ওপর বসে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল। সেই শব্দে মায়ের চোখের পাতা খুলে গেল। একটু বিরক্তির ছাপ ফুটল মুখে। তারপর পাশ ফিরতেই মা মেয়েকে দেখতে পেল। বুঝতে একটুখানি সময়, তারপরেই হাত বাড়িয়ে দিল। সেই হাতের স্পর্শ পেয়ে এতোয়ারির বুকে বর্ষার ডুডুয়া নদী যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক কষ্টে সে নিজেকে সামলে মায়ের হাত ধরে জিজ্ঞাসা করল, “কেমন লাগছে এখন?”
কিছুক্ষণ হাত ধরে থেকে মা জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”
ঢোঁক গিলল এতোয়ারি। কোনওমতে বলল, “কিছু না।”
এই সময় ছোট নার্স ফিরে এল, “কী, মাকে কেমন দেখছিস?”
“কথা বলছে,” চোখ মুছল এতোয়ারি।
মা কথা বলছে আর তুই চোখ থেকে জল ফেলছিস? কী বোকা মেয়ে রে তুই! তোর মাকে ইচ্ছে করলে বাসায় নিয়ে যেতে পারিস। আর যদি চাস তা হলে আর-একটা দিন এখানে রেখে দিতে পারিস। হাসপাতালের আরও দুটো বেড খালি হয়েছে, নতুন পেশেন্ট এলে অসুবিধে হবে না,” ছোট নার্স হাসিমুখে কথাগুলো বলল।
“কিন্তু ডাক্তারবাবু তো একদিন থাকতে বলেছিলেন!” এতোয়ারি বলল।
“সেটা কাল বলেছিলেন। আজ সকালে তোর মায়ের প্রেশার দেখে বলেছেন যদি তোদের ইচ্ছা হয়, তা হলে আজ এখানে থাকতে পারিস,” ছোট নার্স চলে গেল।
মা মাথা নাড়ল, “না, আমি আজ ঘরে ফিরে যাব।”
“কেন?” মায়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিল এতোয়ারি।
“আমি এখন ভাল আছি। কাল একটু মাথা ঘুরে যেতে হাসপাতালে ভরতি করে দিল। আমার শরীর ঠিক আছে।”
“না, ঠিক থাকলে ডাক্তারবাবু রাখতে চাইত না।”
“তুই সব বুঝে গিয়েছিস,” চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বাদে মা বলল, “আমি এখানে আরামে ঘুমোব, ভাল ভাল খাবার খাব আর তোরা…” কথা শেষ করল না মা।
“ঠিক আছে। আর-একটা দিন এখানে থাকো, ডাক্তারবাবু যখন বলেছেন।”
হঠাৎ মা জিজ্ঞাসা করল, “তুই কেমন আছিস?”
“আমার অপারেশনের ঘা তো কবে শুকিয়ে গিয়েছে, এই দাগটা বোধহয় কোনওদিন মিলিয়ে যাবে না,” হাসার চেষ্টা করল এতোয়ারি।
হঠাৎ শক্ত করে মেয়ের হাত ধরল মা। এতোয়ারি অবাক হয়ে তাকাল মায়ের মুখের দিকে। তার চোখে চোখ রেখে মা বলল, “আমি আবার তোর বিয়ে দেব।”
“পাগল! একবার তো দিয়েছিলে, তাতে শিক্ষা হয়নি?” মুখ ফেরাল এতোয়ারি।
“তখন তুই এইরকম ছিলি না,” মায়ের কথা শেষ হতেই ছোট নার্স খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আবার ঠোঁটে আঙুল চাপল। মা চোখ বন্ধ করলে এতোয়ারির স্বস্তির শ্বাস পড়ল। এই সময় মাকে বাবার কীর্তির কথা বলাটা ঠিক হত না।
সন্ধের মুখে ঘরে ফিরে এতোয়ারি দেখল তার বাবা চিত হয়ে শুয়ে আছে। বুক ওঠানামা করছে বলে বোঝা যাচ্ছে মরে যায়নি। পাশে হাঁড়িয়ার খালি বোতল। সারাদিন পেটে কোনও খাবার যায়নি। এখন এতোয়ারি দু’-দুটো খালি বোতল দেখতে পেল। ওই বদমাশ লোকটা শ্বশুরের জন্যে দুটো হাঁড়িয়ার বোতল নিয়ে এসেছিল!
একরাশ বিরক্তি সত্ত্বেও ঘর পরিষ্কার করল এতোয়ারি। হাসপাতাল থেকে বেরোনোর আগে ছোট নার্স তাকে টিফিন খাইয়ে দিয়েছিল। এখন রাতের ভাত রান্না করার ইচ্ছেটা মন থেকে চলে গেল। এই সময় বাইরে থেকে কিছু লোকের চেঁচামেচি ভেসে এল। কেউ একজন বেশ জোরে কাঁদছে। কৌতূহলী হয়ে সে ঘরের বাইরে এসে খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট ভিড় দেখতে পেল।
এতোয়ারি ভিড়ের কাছে যেতেই শুনতে পেল, বিকেল থেকে ধনুবুড়ো তিনমাথা এক করে বসে ছিল, কেউ তাকে নড়াচড়া করতে দেখেনি। মাংরা সর্দার বলল, “মারা নাও যেতে পারে, অনেক সময় মানুষ অজ্ঞান হয়ে গেলে এরকম দেখায়!”
শেষপর্যন্ত একজন বাজারের এক কম্পাউন্ডারকে নিয়ে এল। লোকটা ধনুবুড়োকে ভাল করে পরীক্ষা করে বলল, “নাঃ। নেই। অনেক আগেই প্রাণ বেরিয়ে গেছে।”
শোনামাত্র একজন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তাকে সান্ত্বনা দিল কয়েকজন। মাংরা সর্দার ধমক দিল, “কাঁদছিস কেন? কত বয়স হয়েছিল তা জানিস? আমি ছেলেবেলাতেই ওকে ঠিক এই চেহারায় দেখেছি। বয়সের গাছপাথর নেই বুড়োর। মরে গিয়ে বেঁচে গেছে।”
ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে ধনুবুড়োর মুখ দেখল এতোয়ারি। চোখ বন্ধ। চুপসে যাওয়া মুখ। একটাও দাঁত নেই। কিন্তু ঠোঁটের কোণে যেন চিলতে হাসি জড়িয়ে আছে। এতোয়ারি যেন শুনতে পেল, ‘পড়বে, পড়বে। ঠিক মনে পড়বে।’ ধনুবুড়োর দেশ যে-গ্রামে, সেখানে পৌঁছতে যে-স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতে হয়, তার নামটা বুড়োর মন থেকে মুছে গিয়েছিল। মৃত্যুর আগে কি ধনুবুড়োর সেই নামটা মনে পড়েছিল?
কত বয়স হয়েছিল ধনুবুড়োর, এই নিয়ে আলোচনা চলছিল। চার্চে খবর দিতে হবে। কবরখানায় নিয়ে গিয়ে গোর দেওয়ার আগে চার্চের পাদরিকে খবর দিতে একজনকে পাঠাল মাংরা সর্দার। ধীরে ধীরে সরে এল এতোয়ারি।
ধনুবুড়োর বহুকালের ইচ্ছে পূর্ণ হল না। এতোয়ারির কথা শুনে মানুষটা বেশ খুশি হয়েছিল। কিন্তু স্টেশনটার নাম বুড়োর স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল। ট্রেনের টিকিট কাটার সময় রেলের বাবুকে বলতেই পারত না কোথায় যাবে। দিনের পর দিন, মাস, বছর এখানে তেমাথা এক করে বসে বুড়ো ভেবে গেছে একদিন না-একদিন তাকে তার পূর্বপুরুষের গ্রামে ফিরে যেতেই হবে। কিন্তু শেষ শ্বাস ফেলার আগে ধনুবুড়ো দেশের স্টেশনের নামটা জেনে যেতে পারল না।
Chapter - 2
২.
আজ লাইনের অনেক লোক রাত জাগবে। বয়স্ক মানুষ মারা গেলে লাইনের সর্দার বাগানের সাহেবদের খবর দিয়ে আসে। রাতে মরলে আধবেলা ছুটি মঞ্জুর হয়। দিনে মরলে ছুটি নিলে রোজ কাটা হয়। তাই কথাটা চালু আছে, মরতে হলে মাঝরাতের আগেই মরো! এতোয়ারি দেখল, ধনুবু়ড়োর মৃতদেহ একপাশে কাপড়ে ঢেকে হাঁড়িয়া খাওয়া শুরু হয়ে গেল শোক ভুলতে। সে হাঁটতে শুরু করল।
চা-বাগানের ভেতরে রাত ঘন হলে বিচিত্র শব্দের জন্ম হয়। প্রথমে খুব মৃদু; শব্দ কানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে যায়। তারপর হঠাৎ চারধার চমকে দিয়ে কোনও রাতপাখি চিৎকার করে গাছের ডাল ছেড়ে ঝাপসা হয়ে পড়ে থাকা চা-বাগানের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। সেই শব্দ মিলিয়ে যেতেই চরাচর অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। বেশ কিছুক্ষণ পরে, চারদিক দেখেশুনে, সাহস করে পেঁচারা ডেকে এ ওর খবর নেয়। সেই ডাক কানে যেতে, চা-বাগানের ভেতরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আজ এতোয়ারির মনে হল, পাখিদেরও বন্ধু আছে, তারাও বন্ধুর সঙ্গ চায়, কিন্তু তার কোনও বন্ধু নেই।
ছোটবেলায় এতোয়ারির কোনও বন্ধু ছিল না। সাত বছর বয়সেই চারমাসের বাচ্চা ভাইকে কাপড়ে বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। শীতকাল এলে, শরীর একটু লম্বা হলে পিঠে ভাইকে নিয়ে নদী পেরিয়ে চলে যেত বাবুদের কোয়ার্টার্সের সামনের মাঠের পাশে। সেখানে বিকেলের রোদ মরে যাওয়ার আগেই বাবুদের ছেলেরা জাম্বুরাকে ফুটবল বানিয়ে খেলত। এতোয়ারি ভাইকে পিঠে নিয়ে খেলা দেখতে দেখতে দুটো দলের একটাকে নিজের দল ভেবে নিত। যখন খেলা শেষ করে বাবুদের ছেলেরা যে যার ঘরে চলে যেত, তখন গরম হয়ে চেপটে যাওয়া জাম্বুরাটাকে ফেলে দিত। নির্জন সেই খেলার মাঠে পড়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত ফলটাকে তুলে নিতেই হাতে রস লেগে যেত। দ্রুত ভাইকে পিঠে নিয়ে নদীর গায়ে চলে আসত সে। একটু চাপ দিতেই জাম্বুরার একটা দিক ফেটে গলগলিয়ে রস বের হত। ঘুমন্ত ভাইকে ডাকত সে, “এই রস খাবি?”
দিদির পিঠে গাল চেপে ঘুমিয়ে থাকা ভাইয়ের সাড়া পাওয়া যেত না। তখন বাতাবিটা মুখের ওপর তুলে চাপ দিতেই গলগল করে রস বেরিয়ে আসত মুখে। বেশির ভাগ জাম্বুরার রস এত টক থাকত যে ফেলে দিতে হত। মাঝে মধ্যে কম টক আর একটু মিষ্টি মেশানো রস পাওয়া গেলে তৃপ্তি করে অনেকটা পান করে নিত এতোয়ারি।
ভাইয়ের ওজন বাড়ছিল। পিঠে বয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টের হয়ে উঠছিল। তা ছাড়া ও তখন ভাল হাঁটতে পারে বলে সহজে পিঠে উঠতে চাইত না। তখন ওকে জাম্বুরার রসের লোভ দেখিয়ে পিঠে নিতে পারত এতোয়ারি। ওকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ, নদীর জল মাঝে মাঝে ওর গলাসমান হয়ে বয়ে যেত। আর বাবা-মা ওর ওপর ভাইয়ের দায়িত্ব ছেড়ে কাজে যেত বলে, এতোয়ারি একা বল খেলা দেখতে যেতে পারত না। ভাইকে পিঠে ওঠাতে হত লোভ দেখিয়ে, কষ্ট হলেও।
সেই ভাইয়ের এক রাতে জ্বর এল। ভাইয়ের মাথা জলে ধুয়ে দিচ্ছে মা, এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিল এতোয়ারি। ঘুম ভাঙল মায়ের কান্নার শব্দে। বাবার কোলে ভাই, মা এবং লাইনের আরও কয়েকজন পেছনে। এতোয়ারি শুনতে পেল, ভাইয়ের শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, তাই ওকে নিয়ে সবাই বাগানের হাসপাতালে যাচ্ছে। কেউ তাকে ডাকেনি, তবু দলটার পেছন পেছন এতোয়ারি হাঁটতে লাগল।
জীবনে প্রথমবার সে হাসপাতালে গিয়েছিল। তাকে এবং অন্যদের বাইরে রেখে মা আর বাবা ভাইকে ভেতরে নিয়ে গেল। বেলা বাড়লে বাবা-মা ভাইকে হাসপাতালে রেখে তাকে লাইনে ফেরত নিয়ে এসেছিল ওরা। দুপুরের খাবার ওদের কাছ থেকেই পেয়েছিল সে। লাইন থেকে বেরোনোর মুখে পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ির ওপর সারা দুপুর বসে থাকল এতোয়ারি। বিকেলে ওরা এল। পাগলের মতো কাঁদছিল মা। বাবাও। বাবার কোলে ভাই। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীর। জীবনে প্রথমবার কাউকে মরে যেতে দেখেছিল এতোয়ারি।
তার শরীরের সঙ্গে ভাইয়ের শরীর প্রতিটি দিনের বেশ কয়েক ঘণ্টা মিশে থাকত। ভাইয়ের শরীরের গন্ধ নাকে আসত তখন। এসব তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। মায়ের কান্না ধীরে ধীরে কমে এল, বাবাকে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু এতোয়ারি ঘরের দাওয়ায় পাথরের মতো বসে থাকত। ভাই ছাড়া তার কোনও সঙ্গী ছিল না। সে মরে যাওয়ার পরে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেই হয়নি। সে জানত তার কপালের ওপর আব থাকায় সে অন্যদের চেয়ে আলাদা। ওই আবের জন্য সমবয়সি মেয়েরা তাকে এড়িয়ে যায়। ছেলেরা দূরে দূরে থাকে। মাকে বলতে শুনেছে, “ছেলেটাকে কেড়ে নিলে তুমি? কী পাপ করেছি আমি?”
বাবা শুয়ে শুয়ে বলত, “ভগবান মেয়েটাকে নিতে পারত। ওই আবওয়ালি মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে? চিরকাল ঘাড়ে বসে খাবে।”
কথাগুলো কানে যেত। কিন্তু শুনতে শুনতে মন আর খারাপ হত না। অভ্যেস হয়ে গেলে ব্যথাকে ব্যথা বলে মনে হয় না। যে-লোকটা তাকে দু’চোখে দেখতে পারত না ভগবান তাকেই শাস্তি দিলেন, কিন্তু পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও বাবার মুখের তেজ এতদিন কমেনি। কিন্তু বউয়ের হাতে মার খাওয়ার পর থেকে একদম চুপ করে গিয়েছে মানুষটা।
ফিনফিনে অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছিল এতোয়ারি। একবার তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুল পাথরে ধাক্কা খাওয়ায় ব্যথা সামলে সে সজাগ হল। অন্যমনস্ক হয়ে সে হাসপাতালের দিকেই হেঁটে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন ইমার্জেন্সির পেশেন্ট ছাড়া কাউকে হাসপাতালে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তাকে দেখলে চৌকিদার নিশ্চয়ই চিনতে পারবে, ঢুকতেও হয়তো দেবে কিন্তু বড় নার্স তার কৈফিয়ত চাইবেন। এমন কী প্রয়োজন হল যে, অত রাতে সে মাকে দেখতে এসেছিল!
দ্বিধায় পড়ল এতোয়ারি আর তখনই তার কানে খিলখিল হাসির শব্দ বাজল। মহিলার গলায় খুশির হাসি, অবাক হয়ে বাঁ দিকে তাকাল এতোয়ারি। তারপরেই মহিলাকণ্ঠে কথা শুনল, “যদি মরে যাই।”
এবার একটি পুরুষ কণ্ঠ নিচু গলায় যা বলল তা বুঝতে পারল না এতোয়ারি। খুব অবাক হয়ে গেল সে। এই রাতের অন্ধকারে লোকালয়ের বাইরে, নদীর ধারে নারী ও পুরুষ এভাবে গল্প করতে আসবে ভাবা যায় না। মহিলা যে আনন্দে আছে তা ওর হাসি থেকে বোঝা যাচ্ছে। কৌতূহলী হল এতোয়ারি। নিঃশব্দে সে নদীর দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বড় ঝোপের আড়ালে দাঁড়াল। অন্ধকারে নদীর জল ভাল করে বোঝা না-গেলেও সেটা যে দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, তা আঁচ করা যাচ্ছে। মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই নদীর পাশে ঝোপের গায়ে দুটো শরীরকে অস্পষ্ট দেখতে পেল এতোয়ারি। দু’জনে ঘনিষ্ঠ হয়ে শুয়ে আছে ঘাসের ওপর। ওরা কারা তা বুঝতে পারছিল না সে। নারীকণ্ঠ বলল, “আজ ওটা না। যদি লেগে যায় তা হলে পেটে যেটা আছে তার ক্ষতি হবে।”
“আহা,” পুরুষ বলল, “পেটে যে আছে তার বাবা কে?”
নারী হাসল, “তুমি, তুমি, তুমি।”
“বাবা হয়ে আমি ওর ক্ষতি চাইতে পারি?”
“জানি। শোনো, তোমার বন্ধুও বাচ্চার জন্যে খুব ভাবছে।”
“তাই?”
“হ্যাঁ, আজ ওকে লুকিয়ে এখানে এসেছি। অবশ্য আমি যা বোঝাব তাই ও মেনে নেয়। নিজের যে ক্ষমতা নেই তা বুঝতেই চায় না।”
“ভাগ্যিস তোমার স্বামীর ক্ষমতা নেই, তাই আমি তোমাকে পেলাম,” পুরুষ এবার নারীর ঘনিষ্ঠ হল। নারী আনন্দিত এবং সতর্ক স্বরে বলল, “সাবধান, যেন বেশি চাপ দিয়ো না। দুষ্টু!”
সরে এল এতোয়ারি। সে বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। শেষপর্যন্ত মনে হল ঘরে ফিরে যাওয়াই ভাল। সে ঘরের পথ ধরল।
তখন কুলিলাইনে রাত ঘন হয়েছে। ধনুবুড়োকে কবর দিতে অনেকেই চলে গেছে কবরখানায়। এতোয়ারি দেখল ধনুবুড়োর নাতবউ আর একজন প্রৌঢ়া গাছতলায় বসে আছে, যেখানে ধনুবুড়োকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হত। সম্ভবত কবরখানা থেকে লোকজন ফিরে না-আসা পর্যন্ত ওরা গম্ভীর মুখে ওখানে বসে থাকবে।
এতোয়ারিকে দেখে ধনুবুড়োর নাতবউ হাত নেড়ে কাছে ডাকল।
এতোয়ারি কাছে এলে প্রৌঢ়া ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, “তোর মা কেমন আছে?”
“ভাল।”
“সব কী যে হয়ে যাচ্ছে!” ধনুবুড়োর নাতবউ শ্বাস ফেলল। তারপর যেন মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল, “তোর সঙ্গে ধনুবুড়োর কোনও কথা হয়েছিল?”
“কোন কথার কথা বলছ?” এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল।
“মারা যাওয়ার একটু আগে ধনুবুড়ো নাকি দুটো কথা বেশ কয়েকবার বলেছিল! আমার ছেলের বউ খাবার দিতে গিয়ে শুনেছিল।”
“কী কথা?”
“তোর নাম বলছিল আর বলছিল মহুয়ামিলন,” বেশ ভেবে ভেবে বলল প্রৌঢ়া, “মহুয়ামিলন মানে কী তুই জানিস?”
মাথা নাড়ল এতোয়ারি, “না।”
অন্য মহিলা জিজ্ঞাসা করল, “তোমার ছেলের বউ ঠিক শুনেছিল?”
“হ্যাঁ। ঘরে ফিরে তখনই আমাকে বলেছিল। আমিও কথাটার মানে বুঝতে পারিনি। তুই কথাটা কখনও শুনিসনি?”
“না,” মাথা নাড়ল এতোয়ারি।
সঙ্গের মহিলা বলল, “কী বলতে কী বলেছে, মাথার কি ঠিক ছিল!”
ঘরে ফিরে এল এতোয়ারি। যেভাবে বাবাকে সে দেখে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে বাবা। এই কুলিলাইনে যে একটা ঘটনা ঘটে গেল, তার খবর বাবার কাছে এখনও পৌঁছয়নি। ঘরের বিপরীত দেওয়ালে বিছানা করে শুয়ে পড়ল এতোয়ারি। চোখ বন্ধ করতেই আচমকা নদীর গা ঘেঁষে শুয়ে থাকা দুই নারী-পুরুষের শরীর সামনে চলে এল। আসন্ন সন্তানসম্ভবা ওই নারীটি কে, সে গলা শুনে বুঝতে পারেনি। নিশ্চয়ই এই লাইনে থাকে না। পুরুষটিকেও সে চেনে না। কিন্তু সন্তানের পৃথিবীতে আসার দিন যখন বেশি দেরিতে নেই, তখনও ওরা শরীরের আনন্দ পেতে রাতের অন্ধকারে নদীর ধারে মিলিত হয়েছে। ওরা স্বামী-স্ত্রী নয়, ওদের সন্তান কখনওই বাবার নাম জানতে পারবে না। কিন্তু এতোয়ারির মনে আজ অন্য রকমের অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। তার স্বামী মুখে কাপড় চাপা দিয়ে শরীর ভোগ করত। সে-সময় ভয়ংকর যন্ত্রণা পেত সে। আজ ওই নারীর মুখ থেকে যেসব শব্দ বের হচ্ছিল, তাতে বিন্দুমাত্র যন্ত্রণা ছিল না। উলটে উপভোগের সুখ ঝরে পড়ছিল।
ঘুম ভেঙে গেল এতোয়ারির। শ্বাস ভারী হল। আর ঘুম আসছিল না।
একদম যন্ত্রের মতো অন্ধকার থাকতেই ঘুম থেকে উঠে নদীতে যাওয়া, ঝটপট সেদ্ধ ভাত আর ডাল রেঁধে তৈরি হয়ে বাবার সামনে খাবার রেখে দিয়ে এতোয়ারি শাড়ি বদলে যখন বাইরে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে, তখন সূর্য উঠে গেছে। উঠে বসে বাবা তার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে, দেখেও দেখে না এতোয়ারি। হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ায়।
মায়ের শরীর এখন স্বাভাবিক। সকালেই বড় নার্স ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতোয়ারির অনুরোধে মাকে সন্ধে পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে দিলেন তিনি। এতোয়ারি ছুটির পরে মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফিরে যাবে।
কাজ একটু হালকা হলে এতোয়ারি ছোট নার্সকে জিজ্ঞাসা করল, “দিদি, আপনি কি জানেন মহুয়ামিলন বলে যে-জায়গা আছে, সেটা কোথায়?”
ছোট নার্স অবাক হয়ে তাকাল, “মহুয়ামিলন?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল এতোয়ারি।
“জায়গার নাম না ফুলের নাম?” ছোট নার্স জিজ্ঞাসা করল।
“জায়গার নাম,” এতোয়ারি জবাব দিল।
ঠোঁট ওলটাল ছোট নার্স, “বড়দিকে জিজ্ঞাসা করো, উনি হয়তো জানেন।”
বড় নার্সকে জিজ্ঞাসা করতে সাহস হচ্ছিল না। ঘণ্টাখানেক পরে দুই দিদি যখন একসঙ্গে পেশেন্টদের দেখতে এলেন, তখন ছোট নার্স বলল, “এই কী নাম বলছিলি?”
বড় নার্স জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার?”
“ও একটা জায়গার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল, নামটা আমার অচেনা,” ছোট নার্স হেসে কথাগুলো বলে সামনের রোগীর দিকে এগিয়ে গেল।
বড় নার্স তাকালেন, চোখে জিজ্ঞাসা।
এতোয়ারি নামটা বলল। বড় নার্স চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করে মাথা নাড়লেন, “এরকম নামের কথা আমি শুনিনি। বোধহয় কোনও ছোট জায়গা বা গ্রামের নাম। কিন্তু তুমি জানতে চাইছ কেন? কোনও দরকার আছে?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল এতোয়ারি, কোনও কথা বলল না।
“তুমি ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করতে পারো,” বড় নার্স চলে গেলেন।
বিকেলে ডাক্তারবাবু যখন ওয়ার্ডে এলেন, তখন এতোয়ারি একজন জ্বরাক্রান্ত রোগীর কপালে জলপট্টি লাগিয়ে দিচ্ছিল। দেখতে পেয়ে ডাক্তারবাবু কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “জ্বর এখন কত?”
তাঁর পেছনে ছিল ছোট নার্স। বলল, “একশো এক।”
“তা হলে কিছুটা কমেছে। থাক, আর জলপট্টি দিতে হবে না। ওকে একবার ভেজা গামছা দিয়ে শরীর মুছিয়ে দাও,” বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক পা হেঁটেই ফিরে তাকালেন ডাক্তার, “বড়দিদি বলছিল তুমি মহুয়ামিলনের কথা জিজ্ঞাসা করেছ।”
নীরবে মাথা নাড়ল এতোয়ারি।
“এই নামটার কথা তুমি জানলে কী করে?”
“শুনেছি,” নিচু গলায় বলল এতোয়ারি।
“ও। মহুয়ামিলন নামে বোধহয় একটা জায়গাই আছে। সেটা এখান থেকে প্রায় আট-ন’শো মাইল দূরে বিহার প্রদেশে। আমার খুব অবাক লাগছে শুনে, তুমি কার কাছে জায়গাটার নাম শুনলে?” ডাক্তারবাবুর কথা শেষ হতে না-হতেই বড় নার্স দ্রুত ঘরে এসে বললেন, “ডক্টর, ম্যানেজার সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।”
ডাক্তারবাবু চলে গেলেন কিন্তু আধ ঘণ্টা পরে এতোয়ারির ডাক পড়ল তাঁর ঘরে। সংকোচের সঙ্গে ঘরে ঢুকে দাঁড়াতেই ডাক্তারবাবু মুখ তুললেন। তাঁর সামনের টেবিলে একটা বই খোলা। বললেন, “হ্যাঁ, তুমি মহুয়ামিলন নামের জায়গাটার কথা জিজ্ঞাসা করছিলে তো?”
কথা না-বলে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল এতোয়ারি।
“বলছি। কিন্তু তার আগে বলো এই নাম তুমি শুনলে কার কাছ থেকে?”
একটু ইতস্তত করে এতোয়ারি বলল, “ধনুবুড়ো বলেছিল।”
“ধনুবুড়ো?” কপালে ভাঁজ পড়ল ডাক্তারবাবুর। তারপর অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কাল যে-বৃদ্ধ মানুষটি মারা গিয়েছে তার নাম ধনুবুড়ো না?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল এতোয়ারি।
“আচ্ছা!” ডাক্তারবাবু বললেন, “মহুয়ামিলন বিহারের রাঁচির কাছে একটা জায়গা। ওই নামে একটা স্টেশনও আছে। ধনুবুড়ো আর কী বলেছিল তোমাকে।”
“আমাকে বলেননি উনি। কিন্তু ওই জায়গায় ফিরে যেতে চেয়েছিলেন।”
“কেন?”
“বোধহয় ওখানে ওঁর দেশ ছিল, সেই দেশ থেকে উনি এখানে এসেছিলেন।”
“হ্যাঁ। চা-বাগানের প্রয়োজনে শ্রমিকদের আনা হয়েছিল বিহারের ওইসব জায়গা থেকে। তোমার সঙ্গে ঠিক কী কথা হয়েছিল ধনুবুড়োর?” ডাক্তারবাবু কৌতূহলী হলেন।
মাথা নিচু করল এতোয়ারি। সে যেটুকু জানে, তা বলা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছিল না। কিন্তু ডাক্তারবাবু তার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে সে বলল, “উনি তো হাঁটাচলা করতে পারতেন না, এক জায়গায় সারা দিন বসিয়ে রাখা হত ওঁকে। কিন্তু ওঁর মন সবসময় চলে যেত ছেলেবেলায় যে-দেশ ছেড়ে এসেছেন, সেই দেশে। বয়সের জন্যে ভাল করে কথা বলতে পারতেন না। অনেক কথা ওঁর মন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। এমনকী, যে-দেশ থেকে উনি ছেলেবেলায় এসেছিলেন, সেই দেশের নামটাও মনে করতে পারতেন না। কাল যখন আমি বললাম, ওঁকে দেশে নিয়ে যেতে পারি, তখন খুব খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু যে-জায়গায় ফিরে যাবেন, তার কথা কিছুতেই মনে করতে পারেননি। পরে তাঁর হঠাৎ নাম মনে পড়েছিল। বাড়ির বউদের সেই নাম বলেওছিলেন। আমি তাঁর এক নাতবউয়ের মুখে নামটা শুনেছি।”
চুপচাপ শুনলেন ডাক্তারবাবু। তারপর শ্বাস ফেলে বললেন, “মহুয়ামিলন নামটা যদি কিছুদিন আগেও ওঁর মনে পড়ত, তা হলেও ওই শরীরে ট্রেনে চেপে যাওয়া সম্ভব হত না। ভেরি স্যাড। কিন্তু উনি তোমাকে বলেছিলেন যে ফিরে যেতে চান?”
“হ্যাঁ।”
“তা তো হল, কিন্তু তুমি জায়গাটা কোথায় তা জানতে চাইছ কেন?”
“উনি কতদূর থেকে এদেশে এসেছিলেন তা জানতে চাইছিলাম।”
“দ্যাখো, যখন চা-গাছের চাষ এদেশে চালু হল, তখন তা করার জন্যে শ্রমিক পাওয়া যায়নি। শ্রমিক আনা হয়েছিল বিহারের সেইসব অঞ্চল থেকে, যেখানে বছরের বেশির ভাগ সময় ফসল জন্মায় না। সেখানকার মানুষ জল আর খাবারের লোভে এদেশে চলে এসেছিল দালালদের সঙ্গে। যারা এসেছিল তারা ফিরে যাওয়ার কথা ভাবত না। চা-বাগানে কাজ করে দু’বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়াটা তাদের কাছে এত মূল্যবান ছিল যে, তারা আর ছেড়ে আসা দেশের ভয়ংকর কষ্ট ভোগ করতে চাইত না। সেই সময় যারা এসেছিল, শুধু তারা কেন, তার পরের মানুষগুলোও এখানেই মরে গিয়েছে। হয়তো ধনুবুড়োর মতো অতিবয়স্ক কিছু মানুষ ডুয়ার্স কিংবা আমাদের চা-বাগানে এখনও অথর্ব হয়ে বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে,” কথা শেষ করে ডাক্তারবাবু তাকালেন এতোয়ারির দিকে।
মন দিয়ে শুনছিল এতোয়ারি। এই দেশ তার নয়, একথা সে-ও জানে। কিন্তু কীভাবে তাদের পূর্বপুরুষরা এদেশে এসেছিল, সেই কাহিনি সে কারও কাছে শুনতে পায়নি।
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এসব কথা তুমি লাইনের বয়স্ক মানুষদের মুখে শোনোনি?”
মাথা নেড়ে নিঃশব্দে না বলল এতোয়ারি। তারপর ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, ওই মহুয়ামিলন নামের জায়গাটা কি এখনও আছে?”
“না থাকার তো কোনও কারণ নেই। যাদের প্রাণ আছে তাদের একসময় মৃত্যু হয়, এমনকী নদীর বুকে জলের যে-ধারা, তার প্রাণ না-থাকলেও শুকিয়ে গেলে গতি হারায়। পাহাড়ও ধ্বংস হয়। আর মাটির চেহারা পালটাতে পারে কিন্তু কখনওই ধ্বংস হয় না। তাই নাম বদলে গেলেও, মহুয়ামিলন নামের জায়গাটা নিশ্চয়ই আছে,” ডাক্তারবাবু কথা শেষ করে নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
চুপচাপ সরে এল এতোয়ারি।
সন্ধের মুখে মাকে নিয়ে ফিরে এল এতোয়ারি। এখন মাকে অনেক ভাল দেখাচ্ছে। আসার পথে ধনুবুড়োর মৃত্যুর খবরটা সে মাকে দিয়েছিল। শুনে মা বলেছিল, “যাক, মানুষটা বেঁচে গেল এতদিনে।”
অবাক হয়েছিল এতোয়ারি, “এ কথা বলছ কেন?”
“বা রে! ওরকম পুতুলের মতো বেঁচে থেকে কী লাভ হত বুড়োর! কিছু ভাবতেও তো পারত না, কাজ করা দূরের কথা,” মা বলেছিল।
“ভাবতে পারত। নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবত।”
“নিজের দেশ আবার কী! যতসব ফালতু কথা,” মা হেসেছিল।
ঘরে ফিরে দেখল ভেজানো দরজার ওপারটায় অন্ধকার। এতোয়ারি হারিকেন জ্বালাতে গিয়ে বুঝল তাতে তেল নেই। হাতড়ে হাতড়ে ঢিবরি বের করে তার সলতেতে আগুন দিতে ঘরের অনেকটা দেখা গেল। বাবা শুয়ে আছে পাশ ফিরে। সকালে রেখে যাওয়া খাবার খেয়ে নিয়েছে।
মা বলল, “কুয়ো থেকে এক বালতি জল এনে দে।”
“নদীতে যাবে না?”
“না।”
“রাতে খাবে তো? আমি তিনটে ডিম হাসপাতাল থেকে ধার করে এনেছি।”
ডিমের কথা কানে যেতেই বাবাকে উঠে বসতে দেখল এতোয়ারি। মা বসে পড়লে সে বালতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একটা মানুষ বছরের পর বছর চুপচাপ তিনমাথা এক করে বসে থাকত। গাছ, ঢিপি অথবা পাথরের মতো পড়ে থাকত সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত। শুধু বৃষ্টি হলে মানুষটাকে দয়া করে বাইরে খোলা আকাশের নীচে আনা হত না। সেই মানুষটা আর নেই। এতোয়ারির মনে হচ্ছিল এই না-থাকায় কারও কিছু এসে যাচ্ছে না। এই ডুয়ার্সের চা-বাগানের শ্রমিকদের লাইনে বসে, মনে মনে ধনুবুড়ো চলে যেত তার বাল্যকালের মহুয়ামিলনে। এখন মহুয়ামিলনে কি পৌঁছে গিয়েছে ধনুবুড়োর আত্মা?
বালতিভরা জল মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে ঘরে পরার কাপড় এবং গামছা নিয়ে আধা অন্ধকারে এতোয়ারি নদীর ধারে চলে এল। কুলকুল আওয়াজ তুলে ছোট ছোট ঢেউ ধীর গতিতে চলে যাচ্ছে ডুডুয়া নদীর দিকে। সেই জলের পাশে বড় পাথরের ওপর বসে এতোয়ারির কেবলই ধনুবুড়োর কথা মনে পড়ছিল। দিনের পর দিন মানুষটা ভেবে গিয়েছিল যে, সে একদিন মহুয়ামিলনে যেতে পারবে। তার সেই ইচ্ছে পূর্ণ হল না।
জলে শব্দ হতে চমকে তাকাল এতোয়ারি। জলের ওপর অন্ধকার কি একটু পাতলা হয়ে যায়? এতোয়ারি সোজা হয়ে বসে দেখল তরতর করে লম্বা কিছু নদীর জলে সাঁতার কেটে ওপারে চলে গেল। ওটা যে একটা সাপ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দিনের বেলায় সে কোনওদিন এই নদীতে সাপ দেখেনি।
ঘরে ফিরে সে দেখল বাবা একদিকে আর মা অন্যদিকে শুয়ে আছে। টেবরিটার আলো কমে এসেছে। কাঠের আগুন জ্বেলে ভাত রাঁধতে বসল এতোয়ারি। আগুনটার দিকে তাকিয়েই মনে হল ধনুবুড়োর কথা। মরে গেলে হিন্দুদের দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, খ্রিস্টানদের কবর। সেই কবে থেকে নাকি চা-বাগানের শ্রমিকদের বেশির ভাগই খ্রিস্টান। অনেকেই রবিবারে গির্জায় যায়। যত দিন যাচ্ছে, তত গির্জায় যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সে ছেলেবেলায় প্রতি রবিবারে গির্জায় যেত। আজকাল শুধু বড়দিনের সময় যায়। আর মরে গেলে খ্রিস্টান বলে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু এতোয়ারি শুনেছে তাদের পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টান ছিল না।
হাসপাতালে কাজের চাপ ছিল না। ছোট নার্স হাসতে হাসতে বলল, “মানুষের যত শরীর কম খারাপ হয়, তত হাসপাতালের ওপর চাপ কমে যায়। যদি কোনওদিন এই হাসপাতালে একটাও পেশেন্ট না-থাকে, তা হলে কোম্পানি গর্বের সঙ্গে বলবে, এই বাগানের মানুষের অসুখ হয় না,” বলে হাসল ছোট নার্স।
বড় নার্স ওপাশ দিয়ে যেতে যেতে কথাগুলো শুনতে পেয়ে বললেন, “এখন হাসছ, তখন কী করবে?”
“মানে?” ছোট নার্স হকচকিয়ে গেল।
“এই বাগানের কোনও কর্মচারীর যদি অসুখবিসুখ না-হয়, তা হলে আমাদের চাকরি থাকবে কি না ভেবে দেখেছ?” বলে গেলেন বড় নার্স।
শোনামাত্র জিভ কেটে সরে গেল ছোট নার্স।
প্রথম মাসের মাইনে হাতে পেয়ে, এতোয়ারি জানে না কেন, চোখ উপচে জল বেরিয়ে এল। সেটা মুছে ঘরে ফিরে মায়ের হাতে টাকাটা তুলে দিলে মা বলল, “না, সবটা দিবি না। নিজের জন্যে রাখ। কালই ছুটি নিয়ে পোস্ট অফিসে গিয়ে নিজের নামে খাতা খুলবি। আমি তোর সঙ্গে যাব।”
বাবা তাকিয়ে দেখল। কিছু বলল না।
সেই রাতে চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেল মা-মেয়ের। ধড়মড়িয়ে উঠে দেখল, বাবা নেই। চেঁচামেচি চিৎকারটা খানিকটা দূরে হচ্ছে। ওরা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। যে-মানুষটা একটা লাঠি নিয়ে কোনওমতে লেংচে লেংচে চলে, এত রাতে সে কোথায় গেল?
যেদিক থেকে আওয়াজটা আসছিল সেদিকে বেশ অন্ধকার। তবু মা-মেয়ে সেদিকে যেতেই ছোট্ট ভিড়টাকে দেখতে পেল। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল লোকগুলো মাতাল। ওরা এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। আরও একটু এগোতেই বুঝতে পারল ওই লোকগুলোর মাঝখানে মাটিতে শুয়ে আছে একজন। লোকটা যে তার বাবা, বুঝতে পেরে মায়ের দিকে তাকাল সে। মা শক্ত মুখে তাকিয়ে দেখছে।
এতোয়ারি নিচু গলায় বলল, “আমি গিয়ে দেখছি।”
সে পা বাড়াতেই মা খপ করে তার হাত ধরল, “না, যাবি না।”
অবাক হল এতোয়ারি, “ওখানে বাবা পড়ে আছে।”
“থাক। আমাদের না-জানিয়ে নিজের ইচ্ছেয় ও ওখানে গিয়েছে। নিশ্চয়ই খুব হাঁড়িয়া গিলেছে। নিজেই তো গিয়েছে, ও নিজেই ফিরে আসবে। ঘরে চল,” মা তার হাত ধরে টানল।
অবাক হয়ে তাকাল এতোয়ারি। মাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হল সে। ঘরে ফিরে আবার শুয়ে পড়তে গিয়েও উঠে বসল মা। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “এই, তুই তোর মাইনের টাকা কোথায় রেখেছিস?”
“বালিশের নীচে,” এতোয়ারি বলল।
“ওগুলো আঁচলে বেঁধে রাখ শক্ত করে।”
হেসে ফেলল এতোয়ারি, “তোমার কী হল?”
“কী হল মানে?” মা বিরক্ত।
“এই ঘর থেকে চুরি করবে?” বলে বালিশের তলায় হাত ঢোকাল সে। কিন্তু হাতে কিছু ঠেকল না। চটপট বালিশ তুলে নিতে দেখতে পেল সেখানে কিছুই নেই। টাকাগুলো ভাঁজ করে রেখেছিল সে। উত্তেজিত হয়ে আশপাশে তন্নতন্ন করে খুঁজেও নোটগুলো চোখে পড়ল না।
মা জিজ্ঞাসা করল, “কী হল?”
“বালিশের নীচে টাকা রেখেছিলাম, এখন দেখছি নেই,” বেশ উত্তেজিত গলায় বলল এতোয়ারি।
“সর্বনাশ। এটাও দেখতে হল,” মা কপাল চাপড়াতে লাগল।
“তার মানে?”
“বুঝতে পারছিস না হতভাগী। তোর টাকায় দলবল জুটিয়ে লোকটা লেংচে লেংচে ভাটিখানায় গিয়ে মচ্ছব করেছে। এখন একগলা গিলে মাটিতে পড়ে আছে। ছি ছি ছি! লোকটা মরে না কেন? মেয়ের রোজগারের টাকা চুরি করে হাঁড়িয়া খাচ্ছে দলবল জুটিয়ে!” চিৎকার করে কথাগুলো বলল এতোয়ারির মা। ঠিক তখন বাইরে মাতালদের গলা শোনা গেল। এতোয়ারি দরজায় গিয়ে দেখল, চারটে লোক বাবার দেহটাকে টেনে এনে কোনওমতে ঘরের সামনে রেখে দিয়ে টলতে টলতে চলে গেল।
ঘরের দরজা বন্ধ করে মা বলল, “শুয়ে পড়, পড়ে থাক ওখানে।”
গরমকালে লাইনের অনেক পুরুষ খোলা আকাশের নীচে ঘুমিয়ে থাকে। যদি লাইনের কুকুরগুলো ঘুম ভাঙানো চিৎকার করে, তা হলে উঠে বসে সতর্ক হয়। মাঝে-মাঝেই চিতাবাঘ চলে আসে জঙ্গল থেকে, বাইসন তো আছেই। কুকুরগুলোর চিৎকার শুনে বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে চলে যায়। অতএব ঘরের বাইরে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকলেও বিপদের সম্ভাবনা খুব আছে তা বলা যায় না। এসব জানা সত্ত্বেও মনের মধ্যে কাঁটা ফুটছিল এতোয়ারির। নেশা যখন মানুষের সমস্ত বোধ কেড়ে নেয়, তখন তার মুখ খুব অসহায় দেখায়। বাবার মুখ সেরকম মনে হয়েছিল। ওর ইচ্ছে করছিল বাবার বেহুঁশ শরীরটাকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসতে।
“এক পয়সা রোজগার করার মুরোদ নেই অথচ মেয়ের গোটা মাসের মাইনের টাকায় লোক জুটিয়ে হাঁড়িয়া খেল। এই লোক মরে গেলে আমরা বেঁচে যেতাম,” তারপর খেয়াল হতে পাশ ফিরে মা বলল, “কী রে! চুপ করে আছিস যে! অতগুলো টাকা ও উড়িয়ে দিল, তোর রাগ দুঃখ কিছুই হচ্ছে না?”
শোনামাত্র টাকাগুলো যেন চোখের সামনে দেখতে পেল এতোয়ারি। চা-বাগানের কেরানিবাবু, যিনি বাক্সে টাকা ভরে নিয়ে আসেন হাসপাতালে, নাম ডেকে ডেকে সবাইকে মাইনে দেন, বলেছিলেন, “প্রথম মাসের মাইনে, সাবধানে রেখো। নইলে ফুড়ুৎ হয়ে যাবে।”
কেরানিবাবুর কথা সত্যি হয়ে গেল! হঠাৎ এতোয়ারির মনে হল, হাঁড়িয়ার দাম তো বেশি নয়, যে-ক’জন লোককে সে বাবার সঙ্গে দেখেছে, তাদের সবাই মিলে যদি খায়, তা হলেও কি অতগুলো টাকা শেষ হয়ে যাবে! ধন্দে পড়ল এতোয়ারি।
“কী হল? কী ভাবছিস? তুই যদি দয়া দেখাতে চাস…”
“না মা, আমি ভাবছি, অতগুলো টাকার হাঁড়িয়া নিশ্চয়ই ওরা খেতে পারেনি, তা হলে বাকি টাকা গেল কোথায়?” এতোয়ারির গলায় প্রশ্ন।
“ঠিক কথা!” মা উঠে বসল, “নিশ্চয়ই টাকাটা ওর কোমরে আছে। চল, দেখি।”
মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল এতোয়ারি। চিত হয়ে শুয়ে আছে বাবা। দুটো হাত দু’দিকে ছড়ানো, মুখ হাঁ করা। চোখ বন্ধ, কোনও হুঁশ নেই। উবু হয়ে পাশে বসে পড়ল মা। তারপর কোমরের কাপড় খুলে তল্লাশি করতে লাগল। শেষপর্যন্ত মাথা নেড়ে হতাশ গলায় বলল, “নাঃ, নেই। সব উড়িয়ে দিয়েছে রে!”
“কী করে সব উড়ল?” সন্দেহ যাচ্ছিল না এতোয়ারির।
মা একটু ভাবল। তারপর বলল, “চল তো!”
“কোথায় যাবে?” অবাক হল এতোয়ারি।
উত্তর না-দিয়ে মা হানহনিয়ে হাঁটা শুরু করলে, দ্রুত তাকে অনুসরণ করল সে। কুলিলাইনের শেষপ্রান্তে, নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটা ঝুপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সোমরা আর তার ছেলে এঁটো গ্লাস, প্লেট গুছিয়ে তুলছিল। মা এবং মেয়েকে ওইভাবে আসতে দেখে অবাক হয়ে সোমরা বলল, “আমাকে দোষ দিয়ো না। আমি তোমার মেয়ের বাবাকে অনেক নিষেধ করেছিলাম, সে কোনও কথা শুনতেই চায়নি, উলটে গালি দিয়েছিল। বলল, সবাইকে হাঁড়িয়া খাইয়ে জন্মের ঋণ শোধ করতে চায়। আমি কী করব বলো!”
“সে কোথায় টাকা পেল জিজ্ঞাসা করোনি কেন?” মা চেঁচিয়ে বলল।
“করেছিলাম,” সোমরা মাথা নাড়ল, “বলল, তুমি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছ বলে মেয়ে টাকা দিয়ে বলেছে, সবাই মিলে আনন্দ করতে। কিন্তু একটু খেয়ে সে সহ্য করতে পারল না।”
মা মেয়ের দিকে তাকাল। এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “বাবা যা টাকা এনেছিল তার সবটাই কি হাঁড়িয়া খেয়ে উড়িয়ে দিয়েছে?”
সোমরা কিছু বলার আগে তার বালক ছেলে হাত নাড়ল, “না, না। অনেক টাকা বুধুয়াচাচার কাছে রাখতে দিয়েছিল। সব টাকা খরচ হয়নি।”
সঙ্গে সঙ্গে সোমরা ছেলেকে ধমক দিল, “অ্যাই চোপ! তোকে কে কথা বলতে বলেছে,” তারপর এতোয়ারির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার বাবা তো বুধুয়ার বন্ধু। তাই বোধহয় রাখতে দিয়েছিল। ভাগ্যিস বুধুয়া দাম দিয়ে আগেই চলে গিয়েছিল, না-হলে ওরা এত খেত যে, কেউ হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারত না।”
মা আর দাঁড়াল না। বলল, “তাড়াতাড়ি চল।”
কিছুটা যেতেই ওরা বুধুয়ার বউকে দেখতে পেল। দ্রুত হেঁটে আসছে। এতোয়ারির মা জিজ্ঞাসা করল, “এ কী, এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?”
সে বলল, “আর কোথায়! আমি গলায় দড়ি দেব তবে তার আগে লোকটাকে নিজের হাতে মেরে তবে মরব। ভাটিখানার পাশ দিয়ে এলে তোমরা?”
“হ্যাঁ। ভাটিখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ওখানে কেউ নেই,” মা বলল।
কপালে বাঁ হাতের চড় মারল প্রৌঢ়া, “ওঃ, কী করি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নাতি-নাতনি হয়েছে তবু লোকটা বদলাল না। নিশ্চয়ই পুষির ঘরে গিয়ে ফুর্তি করছে। আজ ওকে শেষ করবই।”
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। পুষিকে এই তল্লাটে সবাই চেনে। আগে ওরা লাইনেই থাকত। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পরে পুষির স্বভাবচরিত্র বদলে যায়। প্রায়ই এই বাগান সেই বাগানে চলে যায়। ফিরে আসে অনেক উপহার নিয়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পরে কিছুদিন পাতি তোলার কাজ করে ছেড়ে দেয় পুষি। এখন সে চা-বাগানের লাগোয়া ফরেস্টের বস্তিতে ঘর ভাড়া করে একাই থাকে। পছন্দমতো লোককে সে তার ঘরে ঢুকতে দেয়। সেখানে নেশা করে। যেহেতু ওই বস্তি চা-বাগানের লাগোয়া হলেও, কুলিলাইন থেকে বেশ খানিকটা দূরে, তাই পুষিকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
মা বলল, “মাথা ঠান্ডা রাখো। আমি তোমার স্বামীকে খুঁজছি। সে আমার মেয়ের রোজগারের টাকা নিয়ে বোধহয় ফুর্তি করতে গিয়েছে। চলো,” মা হাঁটতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল। দুটো হাত দু’দিকে বাড়িয়ে কিছু ধরতে চাইল। পাতলা অন্ধকারে প্রথমে ঠাওর করতে পারেনি এতোয়ারি। যখন পারল, তখন মায়ের শরীর কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, ছুটে এসে মাকে জাপটে ধরল সে। চিৎকার করে ডাকল, “মা!”
চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড থাকার পর মা চোখ খুলল, “ঠিক আছে।”
“কী হয়েছে তোমার?” জিজ্ঞাসা করল এতোয়ারি।
“মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। এখন ঠিক আছে,” মা জোরে শ্বাস ফেলল।
“চলো, ঘরে চলো। তোমাকে কোথাও যেতে হবে না,” মাকে জড়িয়ে পা ফেলল এতোয়ারি। এতক্ষণ বড়বড় চোখে দেখছিল বুধুয়ার বউ। এতোয়ারিদের ঘরের দিকে পা বাড়াতে দেখে, সে হনহন করে হাঁটতে লাগল ফরেস্টের দিকে। মাকে কোনওরকমে ঘরে নিয়ে এল এতোয়ারি। বাবা তখনও শুয়ে আছে, যেভাবে একটু আগে দেখে গেছে। শুধু পাড়ার দুটো কুকুর এসে বসে আছে বাবার মাথার পাশে। ঘরে ঢুকে মাকে শুইয়ে দিল এতোয়ারি।
টাকাগুলো হাতে আসতে না-আসতেই হাতছাড়া হয়ে গেল। বাবা এরকম করল কেন? পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর বাবা ঘরেই শুয়ে-বসে থাকত। হঠাৎ পুরনো বন্ধুদের হাঁড়িয়া খাওয়ানোর ইচ্ছে হল কেন?
উত্তরগুলো এতোয়ারির জানা নেই। দুটো কুকুরের পাশে বাবা প্রায় অচৈতন্য হয়ে শুয়ে আছে। বাবাকে তার পক্ষে একা তুলে ঘরে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। মাকে বললে সুস্থ অবস্থাতেই তাকে সাহায্য করতে রাজি হত না, এখন তো হবেই না। শ্বাস ফেলল এতোয়ারি। সে চোখ বন্ধ করল কিন্তু বন্ধ চোখে ঘুম এল না।
হঠাৎ মনে হল কেউ একজন দৌড়ে এসে তাদের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে থামল। এতোয়ারি চটপট উঠে বসল। তারপর গলা তুলে জিজ্ঞাসা করল, “কে?”
“আমি,” হাঁপাতে হাঁপাতে শব্দটা যেন কোনওমতে বের হল মহিলার গলা থেকে।
তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিভু নিভু ঢিবরি হাতে নিয়ে দরজা খুলে এতোয়ারি অবাক হয়ে দেখল বুধুয়ার বউ উবু হয়ে বসে আছে সামনে।
এতোয়ারি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”
কোমরে হাত দিয়ে বুধুয়ার বউ যা বের করে মাটিতে রাখল, সেটা যে পাকানো টাকার বান্ডিল, তা আন্দাজে বুঝতে পারল এতোয়ারি। হাত না-বাড়িয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় পেয়েছ?”
তখনও শ্বাস স্বাভাবিক নয়, হাত নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করেও পারল না। বোঝাই যাচ্ছিল তার শরীরে শক্তি নেই।
এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি জল খাবে?”
চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিতে নিতে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল বুধুয়ার বউ। তারপর থেমে থেমে বলল, “টাকাটা দিয়ে গেলাম।”
“কোথায় পেলে টাকা? তোমার বর দিয়েছে?”
মাথা নেড়ে ‘না’ বলে উঠে দাঁড়াল বুধুয়ার বউ।
“তা হলে? কোথায় পেলে তাকে?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল এতোয়ারি।
“পুষির ঘরে।”
“তুমি চাইতেই টাকা দিয়ে দিল?”
অদ্ভুত হাসি যেন ছিটকে বের হল বুধুয়ার বউয়ের মুখ থেকে, “আর কোনওদিন সে কথা বলবে না। ওর শরীর থেকে প্রাণটা বের করে দিয়েছি। আচ্ছা…” কথাগুলো বলেই সে আবার দৌড়োতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার ছোট্ট শরীরটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অবাক চোখে সেই অন্ধকার দেখে কুকুরের চিৎকারে সংবিৎ ফিরল এতোয়ারির। সে নিচু হয়ে টাকার বান্ডিলটা তুলতেই বুঝতে পারল ওগুলো যেন খানিকটা ভিজে আছে। সন্দেহ হতে ওটা নাকের কাছে আনতেই তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে এল সে। মায়ের ঘুম ভাঙেনি। ডাকতে গিয়েও থেমে গেল এতোয়ারি। অসুস্থ শরীরটার ঘুম দরকার। ডেকে তুললে আবার অসুস্থ হতে পারে। ঘরের কোণে টাকার বান্ডিলটাকে একটা বাটি চাপা দিয়ে রেখে দিল সে।
ঘণ্টাখানেক পরে চিৎকার চেঁচামেচিতে লাইনের লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পাশের লাইনের দুটো লোক বুধুয়াকে জঙ্গলের কাছে পড়ে থাকতে দেখে বয়ে নিয়ে এসেছে। বুধুয়ার বুকে একটা বড় ক্ষত যা থেকে রক্ত বেরিয়ে জামা ভিজে গিয়েছে। লোক দুটো যখন বুধুয়াকে দেখেছিল, তখনই ওর শরীরে প্রাণ ছিল না।
খবর পেয়ে বুধুয়ার ছেলেরা, ছেলের বউরা ছুটে এল। সবাই বলাবলি করছিল, হাঁড়িয়া খেয়ে মাতাল হয়ে কারও সঙ্গে মারপিট করতে গিয়ে ছুরির আঘাতে মারা গিয়েছে। বউগুলো কাঁদছিল। একজন বলল, “তোদের মা কোথায়? মাকে খবরটা দে।”
আর-একজন বলল, “বেচারা নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছে, জানতেই পারল না কী সর্বনাশ হয়ে গেল। কী আর করা যাবে, কপাল, কপাল!”
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন প্রতিবাদ করে উঠল, “পুলিশে খবর দাও, ওকে খুন করা হয়েছে।”
মাথা নাড়ল একজন প্রবীণ মানুষ, “আমরা থানায় যাব কী করে? থানা তো বারো মাইল দূরে। এরকম ঘটনা ঘটলে প্রথমে বড়বাবুকে জানাতে হয়। তিনি বড়সাহেবকে জানাবেন। বড়সাহেব পুলিশকে ফোন করবেন। বুঝলে!”
এক যুবক বুধুয়ার ক্ষত দেখে মাথা নাড়ল, “ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। কার রাগ ছিল বুধুয়ার ওপর? চল, দু’জন চল আমার সঙ্গে, আমি যাচ্ছি বড়বাবুর বাসায়।”
একজন বলল, “এত রাতে গেলে বড়বাবু খুব রেগে যাবে। তার চেয়ে সকাল হলে যাওয়াই বোধহয় ভাল।”
সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ প্রতিবাদ করে উঠল। তারা বলল, একটা মানুষের প্রাণ চলে গিয়েছে শুনে যদি রাগ করে, তা হলে লোকটা মানুষ নয়।
এই সময় বুধুয়ার ছোট পুত্রবধূ ঘর থেকে ফিরে এসে জানাল সে তার শাশুড়িকে খুঁজে পায়নি। ঘরের আশপাশে কোথাও নেই।
একজন বলল, “হয়তো পেটখারাপ তাই নদীতে গিয়েছে। এখনই ফিরে আসবে। তোমরা বড়বাবুর কাছে যাও, দেরি কোরো না।”
তিনজন রওনা হওয়ার পর কিছু সময় চলে গেল, কিন্তু বুধুয়ার বউ ফিরে এল না। তখন লাইনের শিশুরা ছাড়া সবাই জেগে উঠে বুধুয়ার মৃতদেহের চারপাশে ভিড় করেছে। কিন্তু বুধুয়ার বউকে দেখা যাচ্ছে না।
যে-দু’জন লোক বুধুয়াকে বহন করে নিয়ে এসেছিল, তাদের প্রশ্ন করা হলে তারা বলল, বুধুয়ার বউকে দেখেনি। জল্পনা শুরু হল, বুধুয়ার বউ গেল কোথায়! কিন্তু কেউ ঠিকঠাক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছিল না।
ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকে এতোয়ারি এইসব কথা শুনছিল। এখন তার মনে হল, সে যা জানে, তা বলা উচিত। মনস্থির করে ভিড় ঠেলে পা বাড়াতেই দূর থেকে চিৎকার ভেসে এল, “জলদি এসো, পাওয়া গিয়েছে,” যারা বড়বাবুকে খবর দিতে নদী পার হয়ে যাচ্ছিল, তাদের একজনের কণ্ঠস্বর। সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের বেশির ভাগ মানুষ নদীর দিকে ছুটল। কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন বুধুয়ার বউকে কাপড় জড়িয়ে নিয়ে এল।
বুধুয়ার বউয়ের শরীর নগ্ন। সে পরনের শাড়িটাই গাছের ডালে বেঁধে গলায় জড়িয়ে ঝুলে পড়েছিল। দুর্বল শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যেতে সময় লাগেনি। সেই পরনের কাপড়েই মৃতার শরীর গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া হল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর বুধুয়ার ছেলে-বউরা গলা খুলে কাঁদতে শুরু করল। তাদের সঙ্গে গলা মেলাল কলোনির কিছু বউ। ছেলে, ছেলের বউরা বুধুয়ার বউয়ের চারপাশে বসে কাঁদতে লাগল।
মুখ খুলতে গিয়েও খুলতে পারল না এতোয়ারি। একটু আগে স্বামীকে খুন করে টাকা নিয়ে বউটা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তখন সে ভাবতেই পারেনি টাকা পৌঁছে দিয়ে বউটা নদীর ধারে গাছের ডালে ঝুলে আত্মহত্যা করবে। এতোয়ারির মনে হল সব কথা বলা ঠিক হবে না। বললে লোকে বিশ্বাস না-ও করতে পারে। বুধুয়াকে খুন করেছে তার বউ, একথা তার মুখ থেকে শুনলে লোকে নিশ্চয়ই প্রমাণ চাইবে। তার কাছে কোনও প্রমাণ নেই। তাই বললে সমস্যায় পড়তে হবে।
কী করবে তা এতোয়ারি বুঝতে পারছিল না। অথচ মৃত্যুর আগে বুধুয়ার বউ যা যা করেছিল তার কিছুটা মা জানে, সে অনেকটা।
লোকজন উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিল। স্বামী খুন হয়েছে বলে বউ আত্মহত্যা করবে? কিন্তু বুধুয়ার বউ কী করে ঘরে বসে জানল তার স্বামী খুন হয়েছে? তা হলে তাকেও কি খুনি মেরে ফেলেছে। কেন? কী করেছিল বুধুয়া?
হঠাৎ একজন মৃতদেহ বয়ে নিয়ে আসা দু’জনকে জিজ্ঞাসা করল, “বুধুয়ার শরীর কোথায় পেয়েছ?”
“জঙ্গলের পাশে বস্তির সামনে,” একজন জবাব দিল।
লোকটা বুধুয়ার ছেলেদের জিজ্ঞাসা করল, “বুধুয়া ওইরকম জায়গায় কেন গিয়েছিল জানো?”
একটু চুপ করে থেকে দু’জনে মাথা নেড়ে না বলল।
ভিড়ের একজন বলল, “এত রাতে গিয়েছিল যখন, তখন নিশ্চয়ই কেউ ওখানে থাকে, যাকে সে চেনে। ওই বস্তিতে বুধুয়ার চেনাজানা কে থাকে তা কি তোমরা জানো?”
ছেলেরা বা ছেলের বউরা কাঁদছিল, জবাব দিল না।
ভোর হয়ে আসছিল। ধীরে ধীরে ভিড়টা হালকা হয়ে গেল। শুধু বুধুয়ার ছেলে, ছেলের বউ এবং তিন-চারজন আত্মীয়বন্ধু বসেছিল মৃতদেহের পাশে। এখন আর ওরা কাঁদছিল না। একটি বউ এতোয়ারিকে বলল, “আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ডিউটিতে যেতে পারব না,” সে চলে যেতে এতোয়ারি ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।
তখন কলোনির ঘরগুলোকে আবছা দেখা যাচ্ছে। সূর্য ওঠেনি, হালকা অন্ধকার চারপাশে। ঘরের সামনে এসে এতোয়ারি অবাক, বাবার ঘুমন্ত শরীরটা মাটিতে পড়ে নেই। সে দরজা ঠেলে পাতলা অন্ধকারেও বুঝতে পারল ঘরের একপাশে বাবা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। উলটোদিকে মা ঘুমিয়ে আছে। কখন বাবার ঘুম ভাঙল, হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল তা কি মা জানতে পেরেছে? নিজের জায়গায় গিয়ে বসল সে।
হঠাৎ একটা ভাবনা তাকে ছোবল মারল। তার কপালে আব ছিল বলে স্বামী মারধর করত, টাকা নিয়ে যেতে বলত, সব টাকা পেয়ে গেলেও লোকটা অত্যাচার বন্ধ করত না। মায়ের সঙ্গে বাবার কোনও ব্যাপারেই মনের মিল হতে সে দেখেনি। সুস্থ থাকার সময় বাবা ঝগড়া করত, দু’-তিনবার মায়ের গায়ে হাত তুলতে সে দেখেছে। লাইনের অনেক স্বামী-স্ত্রীকে ঝগড়া করতে দেখে মনে হয়েছে, ওরা কেন বিয়ে করে একসঙ্গে আছে? তার আজ দুটো মেয়ে, নাতি-নাতনি, জামাইরা থাকা সত্ত্বেও কতখানি সম্পর্ক খারাপ হলে বুধুয়ার বউ স্বামীকে খুন করতে পারে!
মাথা নাড়ল এতোয়ারি। দশজনের মধ্যে আট-ন’জন স্বামী-স্ত্রীরই এই এক অবস্থা। এতোয়ারি বাবার দিকে তাকাল। বাবা কি নিজেই ঘরে উঠে এসে শুয়েছে? যে-অবস্থায় বাবাকে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে গিয়েছিল, তাতে এত তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরে পেয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়বে, তা কল্পনা করতে অস্বস্তি হল। তা হলে কি মা বাবাকে বাইরে থেকে ঘরে তুলে নিয়ে এসেছে? অসম্ভব! বাবাকে মা এতটাই অপছন্দ করে যে, এই কষ্টটুকু করবে না। তা ছাড়া হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আজ উত্তেজিত হওয়ার পর মায়ের শরীরে বাবাকে বয়ে ঘরে নিয়ে আসার শক্তি নেই।
আলো ফুটছে। এখনই উঠে নদী থেকে ঘুরে এসে রান্না না-চাপালে ঠিকসময় হাসপাতালের কাজে যাওয়া যাবে না। এতোয়ারি উঠল। মাকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না সে। মায়ের এখন অনেকটা ঘুম দরকার।
নদীতে স্নান করতে গিয়ে এতোয়ারি দেখল, আজ অনেক মহিলাই এসেছে। কাল রাতের ঘটনাগুলো ঘুম কেড়ে নেওয়ায়, কাজে বেরোনোর আগে স্নান করে সবাই একটু ঝরঝরে হতে চাইছে। নদীর ধারে এসে ওদের মুখে বুধুয়া আর তার বউয়ের গল্প ছাড়া আর কিছু নেই।
টুনিয়াবুড়ি জলে নামেনি। পাড়ে বসে কপাল চাপড়াচ্ছিল। যারা কাছে ছিল, তারা জিজ্ঞাসা করল, “কী হল, ওরকম করছ কেন?”
“তোরা কেউ পুলিশকে বলে দিবি, বুধুয়ার শরীর যেখানে পড়েছিল তার পেছনেই ওই মেয়েমানুষটার বাড়ি,” টুনিয়াবুড়ি বলল।
“কোন মেয়েমানুষ?”
“যে-দু’জন ওকে বয়ে এনেছিল, তাদের মুখে শুনলাম,” কথাগুলো বলেই চুপ করে চোখের পাতা ওলটাল বুড়ি।
“কী শুনেছ?”
“যেখানে বুধুয়াকে পাওয়া গিয়েছিল তার পেছনেই ওই হারামজাদি পুষির ঘর। নিশ্চয়ই ওর কাছে গিয়েছিল বুধুয়া,” বলতে বলতে ফিক করে হেসে ফেলল বুড়ি, “আর কত মাথা খাবে পুষি তা কে জানে!”
এতোয়ারি স্নান করে ঘরে ফিরে দেখল, মা উঠে বসেছে। বোধহয় মুখ-হাত-পা ধুয়ে নিয়েছে। এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “এখন কেমন আছ মা?”
“একটু ভাল,” তারপর হতাশ গলায় বলল, “তুই দেখেছিস?”
“কী?” এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল।
“বুধুয়ার বউকে।”
“হ্যাঁ। গলায় কাপড় বেঁধে ঝুলেছিল নদীর পাশের গাছে।”
“হায় ভগবান!” শ্বাস ফেলল মা, “এরকম স্বামীকে আর কতদিন সহ্য করতে পারে।”
শুনে মাথা নাড়ল এতোয়ারি, “তা হলে তো প্রায় সব মেয়েকেই গলায় দড়ি দিতে হয় মা। আমাদের কুলিলাইনের বেশির ভাগ মেয়েরই তো এইরকম অবস্থা।”
“আমি যে কী করি!” নিচু গলায় বলল মা।
মায়ের দিকে তাকাল এতোয়ারি। তারপর বলল, “তুমি আজ সারা দিন ঘুমিয়ে থাকো। এই শরীরে কাজে যাওয়ার দরকার নেই।”
“পাগল!” মা শ্বাস ফেলল।
অবাক হয়ে তাকাল এতোয়ারি।
মা বলল, “একদিন না-গেলে টাকা কাটবে। তা ছাড়া কাজে না-গেলে ওই লোকটার সঙ্গে এই ঘরে সারা দিন থাকতে হবে! পারব না, পারব না আমি।!”
এতোয়ারি বাবার শরীর দেখল। তাদের দিকে পেছন ফিরে শুয়ে আছে।
“তা হলে কী করবে?”
“এখানে ওর সঙ্গে থাকা আর বুধুয়ার বউয়ের মতো গলায় ফাঁস দেওয়ার মধ্যে কোনও তফাত নেই রে! তুই বেঁচে গিয়েছিস। খুব কপাল করেছিলি বলে স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসপাতালে কাজ পেয়েছিস। সব মেয়ের যদি তোর মতো কপাল হত, তা হলে তারা বেঁচে যেত!” মা উঠল।
বাবাকে উঠে বসিয়ে হাতে লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বেশ ঝাঁজালো গলায় এতোয়ারি বলল, “খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। নদীর ধারে যখন যাবে তখন দরজা বন্ধ করে যেয়ো।”
শোনামাত্র দু’হাতে মুখ ঢেকে ভেউভেউ করে কেঁদে উঠল বাবা। সঙ্গে সঙ্গে দরজার পাশে দাঁড়ানো মা চেঁচিয়ে উঠল, “শুনিস না, লোকটা মনভেজানো কান্না কাঁদছে,” এতোয়ারি ঘর থেকে বেরিয়ে এলে মা হাঁটতে শুরু করল।
এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করলে, “তুমি কোথায় যাবে?”
“হাসপাতালে।”
“সে কী! আবার শরীর খারাপ লাগছে?”
“ঘরে বসে থাকার চেয়ে ওখানে গেলে ভাল থাকব,” মা বলল।
লাইন ছাড়িয়ে চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে খুব ধীরে হাঁটতে হচ্ছিল এতোয়ারিকে। মায়ের শরীর যে পুরোপুরি সুস্থ নয়, তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না।
হাসপাতালের দরজায় ছোট নার্স দাঁড়িয়েছিল। মাকে দেখে চোখ কুঁচকে বলল, “কী হল তোমার? আবার শরীর খারাপ?”
“একটু। মাথা ঘুরছে!” মা দুর্বল গলায় বলল।
“শরীর দুর্বল, ঘরে শুয়ে থাকলে উপকার হত। এলে কেন?”
“ঘরে থাকলে অপকার হত,” বিড়বিড় করল মা।
“কী বললে?” চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল ছোট নার্স।
মাথা নাড়ল মা, “কিছু না।”
“ভেতরে গিয়ে বোসো। একটু পরে নাম লেখানো হবে,” ছোট নার্স চলে গেল। এতোয়ারি বলল, “নিজে যেতে পারবে?”
“হ্যাঁ। এখন একটু ভাল লাগছে।”
আজ কাজ করতে করতে কেবলই বুধুয়ার বউয়ের মুখ মনে পড়ছিল। এতদিন যে বুধুয়ার বউ লাইনে থাকত, তা কারও তেমনভাবে নজরে পড়ত না। সেই বউটা ওরকম রুগ্ণ শরীর নিয়েও মনের জ্বালা মেটাতে স্বামীকে খুন করে তার টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার পর নিজেকে মেরে ফেলা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারল না। যতই স্বামীকে খুন করুক, আত্মহত্যা করা মানে তো নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়া। আত্মহত্যা না-করলে কী হত ওর? তাকে খুন করতে দেখেছে বলে কেউ সাক্ষী দিলে, পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে হয় ফাঁসি নয় সারা জীবন জেলে ঢুকিয়ে রাখত। জেলে ঢুকিয়ে রাখলে তো সে বেঁচে থাকত। তার বদলে বোকার মতো আত্মহত্যা করে ফেলল? কী লাভ হল!
দুপুরে ডাক্তারবাবু কোয়ার্টার্সে চলে যান স্নান-খাওয়া করতে। বিকেলে ফিরে আসেন হাসপাতালে। দুপুরে তেমন কাজ থাকে না। কিচেনে গিয়ে খাওয়ার প্লেট চেয়ে নিতেই এতোয়ারির মনে পড়ল মা না-খেয়ে আছে। সে প্লেট হাতে মাকে খুঁজতে বাইরে এসে হতাশ হল। মা কোথাও নেই। ডাক্তারবাবু যেখানে পেশেন্ট দেখেন, সেখানটা এখন ফাঁকা। মা কোথায় গেল, ভেবে পাচ্ছিল না এতোয়ারি।
সবে সে খাওয়া শেষ করেছে বড় নার্স সামনে এসে দাঁড়ালেন, “তুই তো ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার্স চিনিস!”
এতোয়ারি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“শোন, এই প্যাকেটটা নিয়ে ডাক্তারবাবুর বাড়িতে দিয়ে আয়,” বড় নার্স বললেন, “তাড়াতাড়ি যাবি। বুঝলি?”
এখন আকাশে হালকা মেঘ। প্যাকেটটা নিয়ে একটু এগোতেই দূরে গাড়ির আওয়াজ হল। নতুন লালমুখো ম্যানেজার প্রায়ই গাড়ি নিয়ে চা-বাগানের ভেতরে ঘুরে বেড়ায়। লোকটির চরিত্র নাকি খারাপ। চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রথমেই বাংলোর বয়স্ক মহিলা কর্মচারীদের ছাঁটাই করে অল্পবয়সি মেয়েদের চাকরি দিয়েছে। ক’দিন আগে লোকটা হাসপাতালে এসেছিল। বড় নার্স যখন ওঁর সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন দূরে দাঁড়ানো এতোয়ারিকে লোকটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। পরে বড় নার্স তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ছোটসাহেবের বাংলো দেখাশোনার কাজে যেতে রাজি আছিস? এককথায় না বলে দিয়েছিল।
চটপট পাশের চা-বাগানের ভেতর লুকিয়ে পড়ল এতোয়ারি। জিপটা জোরে শব্দ তুলে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আর গাড়ির রাস্তা না-ধরে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে ডাক্তারবাবুর বাংলোয় পৌঁছে গেল। ডাক্তারবাবু নিজে দরজা খুলে চারপাশে নজর বুলিয়ে বললেন, “ভেতরে এসো। দেখি প্যাকেটটা!”
দরজা বন্ধ করে প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রেখে খুলে দেখলেন। এইসময় ভিতরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন ডাক্তারবাবুর স্ত্রী। এতোয়ারির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন তিনি। তারপর স্বামীকে বললেন, “আর একবার ভেবে দ্যাখো।”
“আমি অমানবিক হতে পারব না। প্লিজ়, তুমি পাশে থাকো,” ডাক্তারবাবু এতোয়ারির দিকে তাকালেন, “আমি এখানে একটা অপারেশন করব। তোমাকে সাহায্য করতে হবে। আর এই অপারেশনের কথাটা বাইরের কেউ যেন না-জানে।”
মাথা নিচু করে এতোয়ারি বলল, “আচ্ছা।”
পাশের ঘরে এল সে ডাক্তারবাবুর পেছন পেছন। একটা চৌকিতে শুয়ে যে-লোকটা ছটফট করছে, তার মুখে কিছু ঢুকিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এক ডাক্তারবাবু হিন্দিতে বাংলা মেশানো ভাষায় বললেন, “আর-একটু কষ্ট করুন। একটু পরে কষ্ট অনেক কমে যাবে।”
লোকটা মাথা নাড়ল প্রবলভাবে। ডাক্তারবাবু আলমারি খুলে চামড়ার স্ট্র্যাপ বের করে এনে লোকটার হাতে একটা দিকে বেঁধে অন্য দিকটা চৌকির গায়ে শক্ত করে জড়িয়ে দিয়ে বললেন, “হাসপাতালে গেলে তোমাকে যেটুকু আরাম দিতে পারতাম, এখানে তো তা দিতে পারব না। গুলিটা বের করে দিচ্ছি, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করো ভাই।”
এতোয়ারির নিয়ে আসা প্যাকেট থেকে ইনজেকশন বের করে লোকটির হাতে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে ওষুধ দিতেই ধীরে ধীরে লোকটি শান্ত হয়ে গেল, মাথা একপাশে এলিয়ে পড়ল। এতোয়ারি বুঝতে পারল ওকে অজ্ঞান করা হয়েছে। প্যাকেট থেকে যন্ত্রগুলো বের করে একটা ট্রে-তে রেখে ডাক্তারবাবু তাদের নাম বলে দিলেন। বললেন, “আমি যখন যে যন্ত্র চাইব, সেই যন্ত্র এগিয়ে দেবে। নামগুলো আবার বলব, না মনে থাকবে?”
গোটা চারেক অপারেশন করার ছুরি, কাঁচি, তুলো, ওষুধের শিশি আর ইনজেকশন। এতোয়ারি মাথা নাড়ল, মনে থাকবে। তারপর ডাক্তারবাবু লোকটার ক্ষতস্থানে বাঁধা কাপড়ের ব্যান্ডেজ খুলে সেখানে ওষুধ ঢাললেন। তারপর ছুরি দিয়ে ক্ষতস্থান কেটে ভেতর থেকে একটা ধাতব বস্তু বের করে এনে ভেতরে ওষুধ ঢেলে তুলো চেপে ধরে নতুন ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। এরপর অন্য টেবিল থেকে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ এনে লোকটার হাতে সুচ ঢুকিয়ে ওষুধ দিলেন। লোকটা এবার একটু নড়াচড়া করল। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “আহা, তোমার নামটা যেন কী!”
“এতোয়ারি।”
“হ্যাঁ, এতোয়ারি, তুমি এই লোকটাকে কি কখনও দেখেছ?”
ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে না বলল এতোয়ারি।
“তুমি যে এখানে এসে লোকটার শরীর থেকে আমাকে গুলি বের করতে দেখলে, তা কাউকে না-বললে খুশি হব,” ডাক্তারবাবু বললেন।
মাথা নিচু করে এতোয়ারি বলল, “ওকে কে গুলি করল?”
“পুলিশ।”
“সে কী!” চোখ বড় হয়ে গেল এতোয়ারির।
“কিন্তু এই লোকটা চোর, ডাকাত, বদমাইশ নয়। ও বিপ্লবী। আমাদের দেশকে ওরা স্বাধীন করতে চায়। আচ্ছা, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্যে ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করছে, তাদের কথা তুমি শোনোনি?”
কেউ কেউ যে বলাবলি করেনি তা নয়, কিন্তু এদিককার যত চা-বাগানের মানুষ ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করছে, এমন কথা এতোয়ারি শোনেনি। এদিককার সব চা-বাগানের মালিক সাদা চামড়ার সাহেবরা, বড় ম্যানেজার থেকে ছোট ম্যানেজারের গায়ের চামড়াও সাদা। ওরা যে সাগরপারের দেশের মানুষ, তা সবাই জানে। লাইনের বুড়োরা বলত, এই চা-বাগানে সাহেবরা এসেছে সাগর পেরিয়ে, বহুদূর থেকে। আর তারা, যারা চা-পাতা তোলে, ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তারাও এখানকার মানুষ নয়। তারা এসেছে রেলগাড়িতে চেপে বহু দূরের দেশ থেকে। ওই সাদা চামড়ার মানুষগুলো চাকরির শেষে যে যার নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে, তারা পারে না। দেশে ফিরে যাওয়ার রাস্তা যারা জানত, তারা কবে মরে গিয়েছে। আবার এই চা-বাগান যে কারও দেশ হতে পারে না, সেটাও তারা বুঝে গেছে।
“আঃ, আঃ,” লোকটার শরীর নড়ে উঠল। এতোয়ারি দেখল এবার চোখ খুলছে লোকটা।
ডাক্তারবাবু ঝুঁকে লোকটার মুখের বাঁধন খুলে চওড়া ধাতব বস্তু দাঁতের তলা থেকে বের করে বললেন, “আর ভয় নেই। গুলি বের করে দিয়েছি। চুপচাপ কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলে ব্যথা কমে যাবে, তার ওষুধ দিচ্ছি।”
লোকটা মুখ খুলল। ওর কথা শুনে এতোয়ারি বুঝতে পারল বাঙালি নয়, মদেশিয়া, মুন্ডা বা ওঁরাও হবে। কাতরে কাতরে লোকটা বলল, “আমি চলে যেতে পারব। আপনার এখানে ধরা পড়লে আপনি বিপদে পড়বেন।”
“ঠিক কথা। কিন্তু যে তোমাকে এখানে রেখে গেছে, সে সন্ধের পরে আসবে। ততক্ষণ তো এখানে থাকতে হবে ভাই। তা ছাড়া এই দিনের আলোয় তোমাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখলে সবাই তাকাবে। তুমি ধরা পড়বেই,” ডাক্তারবাবু বললেন, “কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে তুমি চলে যেয়ো।”
লোকটা মুখ ঘুরিয়ে এতোয়ারিকে দেখল। মুখে ভয় ফুটে উঠল তার, “এই মেয়েটা কে? এ বলে দেবে না তো?”
“ওকে নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না,” ডাক্তারবাবু আর-একটা ইনজেকশন দিলেন লোকটার হাতে। এতোয়ারি দেখল ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল লোকটা। ব্যবহৃত ওষুধগুলোর খালি প্যাকেট একটা কাগজে মুড়ে ডাক্তারবাবু বললেন, “এগুলো হাসপাতালের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ো। আর এগুলো বড় নার্সকে ফেরত দেবে,” বড় নার্সের পাঠানো জিনিসগুলো প্যাক করে দিলেন ডাক্তারবাবু।
দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “আজ তুমি খুব ভাল কাজ করলে। আর হ্যাঁ, বড়রাস্তা দিয়ে না-গিয়ে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে হাসপাতালে যাবে। যাও।”
এতোয়ারি কথাগুলোর মানে বুঝতে পারছিল না। তবে কোনও মানুষের সঙ্গে দেখা হলে নানা প্রশ্ন শুনতে হবে, যার উত্তর ডাক্তারবাবু আর ওই লোকটির ক্ষতি করতে পারে, এটা বুঝতে পারল সে।
Chapter - 3
৩.
চা-বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল এতোয়ারি। রাস্তাটি কিছুটা দূরে। কাউকে সেখানে যেতে আসতে দেখলে সে একটু নিচু হয়ে গেলেই হল। কারও নজরে পড়বে না। হঠাৎ বেশ উত্তেজিত হল সে। কাজটা করতে বেশ রোমাঞ্চ বোধ করছে। যদিও দূরের গাড়ি যাওয়ার রাস্তায় এখন কেউ নেই, তবু সে কোনও ঝুঁকি নিচ্ছিল না। গাড়ি না-আসুক সাইকেল চালিয়ে কেউ না-কেউ তো যেতেই পারে। হঠাৎ থমকে গেল এতোয়ারি।
সামনের শেড ট্রি-তে একটা বড় সাপ দোল খাচ্ছে। ওটা যেমন লম্বা তেমনই মোটা। নিচু হয়ে বসে পড়ল এতোয়ারি। দোল খেতে খেতে সাপটা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল চা-গাছের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে একটা শেয়াল ছটফটিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল সেখান থেকে। সাপটা ধীরে ধীরে চা-বাগানের মধ্যে ঢুকে গেল। সতর্ক পায়ে জায়গাটা পেরিয়ে এল এতোয়ারি।
হাসপাতালে ফিরে এসে মাকে দেখতে পেয়ে স্বস্তি হল। সে জিজ্ঞাসা করার আগে মা-ই জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গিয়েছিলি?”
“ডাক্তারবাবুর বাড়িতে,” মুখ ফসকে বেরিয়ে এল শব্দ দুটো।
“ওর ঘরে তো বউ আছে, নেই?”
“আছে। না থাকলেই-বা কী হত?”
“কিছু হলে তুই তো জানতেই পারতিস,” মা আবার হাসল।
এই হাসিটা একটুও ভাল লাগল না এতোয়ারির। মা যেন এখন অন্যরকম হয়ে আছে।
বড় নার্সকে প্যাকেট ফেরত দিতেই প্রশ্ন হল, “কে রে?”
সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হল এতোয়ারি, “মানে?”
“কার জন্যে ওগুলো নিয়ে গেলি?”
“জানি না তো। ডাক্তারবাবুর বউ নিয়েছিল।”
“ডাক্তারবাবুর বউ?” খুব অবাক হলেন বড় নার্স। তারপর কিছু ভেবে আর প্রশ্ন করলেন না।
বিকেলে পেশেন্টদের দেখতে এলেন ডাক্তারবাবু, রোজ যেমন আসেন। সঙ্গে দুই নার্স। এতোয়ারি লক্ষ করল তার দিকে ডাক্তারবাবু একবারও তাকালেন না। ডাক্তারবাবু যখন একজন পেশেন্টকে বুকে স্টেথো চেপে পরীক্ষা করছেন, তখন দু’-দুটো গাড়ি এসে হাসপাতালের সামনে দাঁড়াল। গাড়ি দুটো থেকে নেমে এলেন এই চা-বাগানের চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এবং পুলিশের পোশাক পরা ভারতীয় অফিসার। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার গলা তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, “হোয়ার ইজ ডক্টর? ডক্টর কিধার?”
ছোট নার্স দৌড়ে বাইরের দরজায় গিয়ে উঁকি মেরে ফিরে এসে উত্তেজিত হয়ে বলল, “সেকেন্ড ম্যানেজার পুলিশকে নিয়ে এসে আপনাকে ডাকছেন।”
ডাক্তারবাবু বড় নার্সকে রোগীর দায়িত্ব দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ওঁদের দেখতে পেয়ে বললেন, “গুড আফটারনুন স্যার। আসুন, ভেতরে আসুন।”
চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বললেন, “এঁকে নিশ্চয়ই আপনি চিনবেন না। আমিও আজ প্রথম দেখলাম। উনি বাজারহাট পুলিশ স্টেশনের চার্জ নিয়েছেন।”
ডাক্তার বললেন, “গ্ল্যাড টু মিট ইউ।”
তাঁর বাড়ানো হাত আলতো স্পর্শ করে অফিসার বললেন, “আমাদের কাছে খবর আছে একজন ভয়ংকর ক্রিমিনাল এদিকের চা-বাগানগুলোতে শেল্টার নিয়েছে। গত রাতে একটা এনকাউন্টারে ওর শরীরে গুলি লেগেছে বলে আমি রিপোর্ট পেয়েছি। আপনাদের এই হাসপাতালে কোনও অজানা লোক উন্ডেড হয়ে ভরতি হয়েছে?”
মাথা নাড়লেন ডাক্তার, “না, আমার জানা নেই।”
পেছনে দাঁড়ানো ছোট নার্স বলল, “না স্যার। এরকম কেউ আসেনি।”
অফিসার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারকে বললেন, “আমি একবার হাসপাতালটা ঘুরে দেখতে চাই। আপনাদের সঙ্গে আসতে হবে না।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বললেন, “আপনার গাইড হিসেবে এই নার্স গেলে সুবিধেই হবে।”
অফিসার ছোট নার্সকে ইশারা করে সামনে যেতে বলে তাকে অনুসরণ করলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বললেন, “গুলিতে উন্ডেড হয়ে কেউ হাসপাতালে ভরতি হলে আপনি নিশ্চয়ই জানতে পারতেন!”
“নিশ্চয়ই।”
“আমাদের এদিককার চা-বাগানগুলোতে সো কলড বিপ্লবীদের আসা-যাওয়ার কথা আগে কখনও শুনিনি। আশ্চর্য! এরা আমাদের এদেশ থেকে তাড়াতে চাইছে। আরে, আমরা চলে গেলে দেশটাকে চালাতে পারবে? এই চা-বাগানের কথাই ধরুন, আমরা ম্যানেজাররা যেভাবে বাগানের প্রোডাকশন, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করি, আমরা চলে গেলে ইন্ডিয়ানরা তা পারবে? ডাক্তার, আমাদের পরে ইন্ডিয়াতে টি ইন্ডাস্ট্রি থাকবে না।”
ডাক্তার কথা বলছিলেন না। সেটা লক্ষ করে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার এই কথাগুলো কি ভাল লাগছে না?”
ডাক্তারবাবুকে উত্তর দিতে হল না। তার আগেই থানার দারোগা ফিরে এলেন, পেছনে ছোট নার্স। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করলেন, “দেখলেন?”
“নাঃ। পেশেন্টরা বলছে তেমন কাউকে আসতে দেখেনি। আপনাদের এই বাগান না-হোক অন্য বাগানের হাসপাতালে গিয়ে থাকতে পারে।”
মাথা নেড়ে দারোগা বললেন, “ওয়েল, আপনাদের সবাইকে বলছি, অজ্ঞাতপরিচয় কোনও লোক যদি আহত অবস্থায় আসে তা হলে তার চিকিৎসা করা, আশ্রয় দেওয়া মারাত্মক অপরাধ হবে। তেমন কেউ এলে তাকে আটকে রেখে সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেবেন।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বললেন, “অনেক ধন্যবাদ অফিসার। আপনারা আছেন বলেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এদেশে সুরক্ষিত।”
অফিসার মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, “আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস স্যার,” দু’পা এগিয়ে ভদ্রলোক ঘুরে দাঁড়ালেন, “খুব সাবধানে সবাই থাকবেন স্যার। যে-লোকটিকে আমরা খুঁজছি, সে খুব বিপজ্জনক বিপ্লবী। বাঙালি হলে বুঝতাম। কিন্তু লোকটা মদেশিয়া। সন্দেহ করা হচ্ছে ওকে চা-বাগানের শ্রমিকরা শেল্টার দিতে পারে। যদি ধরা পড়ার পরে লোকটা পালাতে চায়, তা হলে ওকে আটকাতে না-পারলে খুন করলেও সরকার আপনাদের পুরস্কৃত করবে। আচ্ছা…” অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের হাতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দারোগাবাবু গাড়িতে উঠলেন।
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বললেন, “ডক্টর, খুব সাবধানে থেকো। আমরা বাগানের লেবারদের খুশি করার জন্যে একটা কাজ করার কথা ভাবছি। সেটা করতে পারলে এই বাগানের কুলিলাইন শান্ত থাকবে।”
ডাক্তারবাবু যখন একা তাঁর চেয়ারে বসে ভাবছেন তখন বড় নার্স কাছে এসে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “ও কি চলে যেতে পেরেছে?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “জানি না।”
“আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকলাম স্যার।”
“এসব কথা থাক।”
“আপনি যদি সাহায্য না-করতেন তা হলে ও মরে যেত।”
“ঠিক আছে। এসব কথা থাক,” ডাক্তারবাবু নিচু স্বরে বললেন, “ওর কথা তুমি হাসপাতালের কাউকে বলোনি তো?”
“না। শুধু এতোয়ারি জানে। মনে হয় ও কাউকে বলবে না। একটু পরে ওকে নিয়ে যেতে লোক আসবে। অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে পারবে।”
“তুমি বলেছিলে ও তোমার ভাই হয়…”
“হ্যাঁ। আমার মামার ছেলে। ওর নাম নোয়াম, তাই বলেছে তো?”
মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু।
কিন্তু তাঁর খুব স্বস্তি হচ্ছিল না। সাধারণত কেউ খুন না-হলে চা-বাগানে পুলিশ আসে না। শ্রমিকদের মধ্যে মারামারি হয়েছে, রক্ত ঝরেছে তবু পুলিশ আসেনি, ক্ষুব্ধ শ্রমিকরাই থানায় গিয়েছে। আজ থানার বড়বাবু সটান চলে এলেন চা-বাগানে, হাসপাতালে ঢুকে আহত লোকটির খোঁজ নিলেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই ওপর মহলের চাপ আছে। দশটা খুনিকে ধরলে হয়তো একটু বেতনবৃদ্ধি হয়, কিন্তু একজন বিপ্লবীকে ধরলে চাকরিতে প্রোমোশনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়। বিশেষ করে সেই বিপ্লবী যদি যদি কোনও ইংরেজকে আহত বা খুন করে থাকে, তা হলে কথাই নেই। ডাক্তারবাবু চিন্তিত হলেন।
এই তল্লাটে হাতে গোনা কয়েকজন ডাক্তার আছেন। তাঁদের অধিকাংশই বিভিন্ন চা-বাগানের কর্মী। একশো মাইলের মধ্যে গুনলে তিনজনের বেশি হবে না। চা-বাগানের বাইরে গঞ্জের মানুষদের চিকিৎসার জন্যে দু’জন আধা ডাক্তার আছেন। এঁদের সবাই এখন নিশ্চয়ই পুলিশের নজরে পড়েছেন। ডাক্তারবাবুর মনে হল, তাঁর কোয়ার্টার্সের ওপর পুলিশের লোক নজর দিচ্ছে না তো!
এতোয়ারি দরজায় এসে দাঁড়িয়ে তাঁকে নমস্কার জানাল। প্রতিদিন ছুটির পরে ঘরে ফেরার আগে সে এটা করে। ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, মুখে কিছু বললেন না। তারপরই তাঁর খেয়াল হল। বললেন, “তুমি একবার আমার কোয়ার্টার্সে যেতে পারবে?”
“কিছু আনতে হবে?” এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল।
“না, আনতে হবে না, তুমি তো এখন লাইনে ফিরে যাচ্ছ?”
“হ্যাঁ। মাকে নিয়ে ফিরে যাব।”
“ও। তা হলে থাক,” ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“বলুন না। আমার কোনও অসুবিধে হবে না,” এতোয়ারি বলল।
একটু ভাবলেন ডাক্তারবাবু। মেয়েটাকে বিশ্বাস করা যেতে পারে। নোয়ামের পা থেকে গুলি বের করতে দেখেও যে হাসপাতালে ফিরে এসে কাউকে সেকথা বলেনি। কিন্তু এখন অন্য কোনও পথ তাঁর সামনে নেই। ভেবেছিলেন পুলিশ এই বাগানে নজর দেবে না। বাগান পত্তন হওয়ার পর থেকে কখনও কোনও ব্যাপারে পুলিশকে এখানে নাক গলাতে হয়নি। সাধারণ অপরাধগুলোর ব্যাপারে বড় ম্যানেজার যা সিদ্ধান্ত নিতেন, তাই সবাই মেনেছে এতকাল। এখন দিন বদলাচ্ছে। দশ বছর আগে কেউ কি ভেবেছে সাদা চামড়ার মানুষগুলোকে এই দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য কালো চামড়ার ভারতীয়রা মরিয়া হয়ে উঠবে? এই ব্যাপারে বাঙালি, বিহারি, মদেশিয়া, ওঁরাও এক হয়ে যাবে!
ডাক্তারবাবু বললেন, “তুমি তোমার মাকে নিয়ে আমার কোয়ার্টার্সে যাও। আমার স্ত্রীকে বলবে আমি তোমাদের পাঠিয়েছি। আমি না-ফেরা পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করবে।”
মাথা নেড়ে চলে গেল এতোয়ারি।
রাতের বেলায় হাসপাতালের সব ঠিকঠাক থাকবে কি না নজর বুলিয়ে যখন কোয়ার্টার্সে ফেরার জন্যে ডাক্তারবাবু পা বাড়িয়েছেন, তখন বড়সাহেবের গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
হুডখোলা গাড়ির জানলা থেকে মুখ বের করে বড়সাহেব বললেন, “গুড ইভনিং, ডক্টর। হসপিটালে কোনও প্রবলেম নেই তো?”
“গুড ইভনিং স্যার। সব ঠিক আছে,” হাসলেন ডাক্তারবাবু।
“উঠে এসো। তোমাকে আজ হাঁটতে হবে না। আমি নামিয়ে দিচ্ছি।”
গাড়িতে উঠে বসলেন ডাক্তারবাবু। গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে বড়সাহেব বললেন, “তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ আমাদের এই দেশ থেকে তাড়াতে যে-আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার ছোঁয়া ডুয়ার্সের চা-বাগানগুলোতে লেগেছে। অথচ দ্যাখো, ব্রিটিশরা যদি এই অঞ্চলে চা-বাগান তৈরি না-করত, তা হলে জায়গাটা জন্তু জানোয়ারদের রাজত্ব হয়ে থাকত। স্বাধীনতা আন্দোলন, সাহেব খুন করে দেশ স্বাধীন করবে। নিজের দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই অথচ দৌড়োবার স্বপ্ন দেখছে। তুমি কি শুনেছ একজন ম্যানেজারকে গুলি করে মারতে গিয়ে তার ড্রাইভারকে ওরা মেরে ফেলেছে? যে-লোকটা মারা গেল সে কী দোষ করেছিল? বলো!”
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, কথা বললেন না।
“অথচ দ্যাখো ডক্টর, চা-বাগানে কাজ পেয়ে যারা দু’বেলা খেতে পাচ্ছে, আরামে থাকছে তাদের পূর্বপুরুষরা বিহারে কীভাবে বেঁচে ছিল, তা নিশ্চয়ই ওরা জানে না,” অন্ধকার চা-বাগানের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বড়সাহেব কথা বলছিলেন। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোয় কিছু চোখে পড়ায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, “দেখতে পাচ্ছ?”
ডাক্তারবাবু দেখতে পেলেন। একটা চিতাবাঘ ঠিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ির হেডলাইট পছন্দ না-হওয়ায় চিতাবাঘ পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল।
বড়সাহেব বললেন, “আমি যখন প্রথম এই চা-বাগানে চাকরি করতে এসেছিলাম, তখন বাঘের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। সেটা তিরিশ বছর আগের কথা। যাকগে, আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, আমাদের কুলিলাইনের কিছু মানুষকে ওদের পূর্বপুরুষের দেশে পাঠাই। গিয়ে দেখে আসুক, সেখানে ওদের আত্মীয়রা কেমনভাবে বেঁচে আছে,” হাসলেন ম্যানেজার, “অবশ্য তারা যদি এখনও বেঁচে থাকে তবেই জানা যাবে।”
ডাক্তারবাবু হেসে ফেললেন। বড়সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি হাসছেন?”
“হাসছি কারণ, ছেলেবেলায় পড়েছিলাম, সবকিছু আবার গোড়ায় ফিরে যায়। আপনি যা ভেবেছেন তা সত্যি অভিনব। যারা যাবে, তারা ফিরে এসে পূর্বপুরুষের দেশের গল্প শোনাতে পারবে।”
“ঠিক তাই। তখন এরা কমপেয়ার করতে পারবে ওখানে থাকলে সুখে থাকত না, এখানে সুখে আছে। বড়সাহেব বললেন, “এটা দেখলে স্বাধীনতার ভূত আর মাথায় উঠবে না।”
ক্রমশ গাড়ি চা-বাগান ঘেঁষা কোয়ার্টার্সগুলোর সামনে পৌঁছে গেল। ডাক্তারবাবু বড়সাহেবকে ধন্যবাদ জানালে তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলেন। এখনও অন্ধকার হালকা, খানিকটা দূরের গাছপালা ভাল দেখা যাচ্ছে না। ডাক্তারবাবুকে দেখে একটা লোক এগিয়ে এল, কপালে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, “সেলাম ডকদর সাব। আপনি এসে গিয়েছেন এবার আমি যেতে পারি।”
“তুমি কী করছিলে এখানে?”
“অর্ডার ছিল, বাইরের লোক এখানে লুকিয়ে আছে কি না তা দেখা। রাত্রে বাঘের ভয়ে কেউ আসবে না। দিনের বেলাতেও কেউ আসেনি,” কপালে আঙুল ছুঁইয়ে লোকটা বড়রাস্তা ধরে চলে গেল।
বাইরের দরজায় শব্দ করতেই ডাক্তারবাবুর স্ত্রী দরজা খুলে বললেন, “এসো। চা হয়ে গিয়েছে।”
ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ডাক্তারবাবু নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “যে-মেয়েটি দুপুরে এসেছিল, সে কি ওর মাকে নিয়ে এসেছে?”
“এসেছিল। আবার চলেও গিয়েছে।”
“সে কী! ওকে যে আমি থাকতে বলেছিলাম।”
“শুনেছি। কিন্তু আমি ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। অযথা ওদের বিপদে ফেলে কী হবে। মেয়েটা কিন্তু খুব সিরিয়াস ধরনের!”
“কীরকম?”
“বলে গেছে ও পেছনের নদীর ধারে রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যদি দরকার হয়ে ওকে…”
“বাঃ,” ডাক্তারবাবু ভেতরের ঘরে ঢুকে দেখলেন হারিকেন জ্বলছে। তাঁদের বসার এবং শোওয়ার ঘরগুলোতে হ্যাজাক জ্বলে। নদীর স্রোত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শুধু ফ্যাক্টরির ইঞ্জিন চালানো হয়। শোনা যাচ্ছে, খুব শিগগির শক্তিশালী ডায়নামো এনে ম্যানেজারদের বাংলো, বাবুদের কোয়ার্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ডাক্তারবাবু লোকটাকে দেখলেন। খাটের পাশে টুলের ওপর বসে আছে।
ডাক্তারবাবুকে দেখেই নোয়াম কপালে আঙুল ছুঁইয়ে নমস্কার জানাল।
“কেমন আছ এখন?”
“খুব ব্যথা, তবে আগের চেয়ে ভাল। আমাকে যে পৌঁছে দিয়েছিল, সে কি এসেছে? আমি একা হেঁটে যেতে বোধহয় পারব না,” নোয়াম বলল।
“না। এলেও আমার সঙ্গে দেখা করেনি,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ওঃ,” নোয়ামের মুখে হতাশা ছড়িয়ে গেল।
“চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই আসবে। কিছু খেয়েছ?”
“হ্যাঁ, মা চা দিয়েছেন। চা আর মুড়ি।”
পকেট থেকে কতগুলো ট্যাবলেট বের করে নোয়ামকে দিলেন ডাক্তারবাবু, “এখন একটা ট্যাবলেট খেয়ে নাও। আর-একটা রাতের খাবার খেয়ে খাবে। মনে হয়, দু’দিনেই তুমি অনেকটা ঠিক হয়ে যাবে।”
শুনে নোয়াম হাসল। ডাক্তারবাবু সেটা লক্ষ করেও কিছু বললেন না।
নোয়াম বলল, “আমার পক্ষে তো বেশি দূরে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হবে না, কেউ যদি না-নিতে আসে, তা হলে আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না!”
“তুমি যে আমার এখানে আছ, তা তোমার দলের লোকেরা নিশ্চয়ই জানে। তারা নিশ্চয়ই তোমাকে নিরাপদে নিয়ে যাবে। তবে তোমার খোঁজে এই বাগানেও পুলিশের চর ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাই যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারো তত ভাল।”
ডাক্তারের কথা শেষ হতেই একটা হুইসলের আওয়াজ ভেসে এল। পর পর দু’বার।
সঙ্গে সঙ্গে নোয়াম উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, “আমি এবার যেতে পারি।”
“ওই শব্দ কি তোমার দলের লোক করল?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তুমি তো হেঁটে যেতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। অপেক্ষা করো, ওরা নিশ্চয়ই এখানে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে,” কথাগুলো বলে ডাক্তারবাবু ভেতরে চলে গেলেন।
কিন্তু মিনিট দশেকের মধ্যেও কারও সাড়া পাওয়া গেল না। আধঘণ্টা পরে ডাক্তারবাবু যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, তখন উঠোনের পেছনের দরজায় শব্দ হল। ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ভেতরের বারান্দায় গিয়ে চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কে?”
“আমি!” কাঁপা স্বর বেরিয়ে এল মহিলাকণ্ঠ থেকে। ডাক্তারবাবুর স্ত্রী টর্চ জ্বাললেন, “এ কী! তুমি?”
পায়ে পায়ে এতোয়ারি সামনে এসে দাঁড়াল, “আমি।”
“ওহ! কী ব্যাপার? এত রাতে কেন ফিরে এলে?”
“ডক্টরসাব এসেছেন?”
উত্তর দিতে হল না। তার আগেই ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এলেন, “কী হয়েছে?”
“ওকে নদীর ধারে নিয়ে যেতে বলল,” এতোয়ারি বলল।
“কে বলল?”
“ওর বন্ধু। এদিকে আসতে ভয় পাচ্ছে। বলল, ওকে শাড়ি পরিয়ে নিয়ে গেলে বিপদ হবে না। বলল, তাড়াতাড়ি করতে।”
“তোমাকে কি লোকটা চেনে?”
“না। বড় নার্স ওকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। বললেন, লোকটা এখানে এলে বিপদ হতে পারে। আমি যদি নদীর ধারে পৌঁছে দিই, ও লাইনের পাশ দিয়ে নিয়ে যেতে পারবে,” এতোয়ারি বলল।
ডাক্তারবাবুর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যে-কাজটা করতে এসেছ, তার জন্যে পুলিশ তোমাকে ধরে জেলে ঢুকিয়ে দিতে পারে, তা কি জানো?”
একটু চুপ করে থেকে এতোয়ারি বলল, “কাজটা নিশ্চয়ই ভাল কাজ, না-হলে ডক্টরসাব বলতেন না।”
এতোয়ারিকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ওঁরা ভেতরে চলে গেলেন। এতোয়ারি আকাশের দিকে তাকাল। আজ আকাশে আলো নেই। মেঘের পরে মেঘ জড়িয়ে যাচ্ছে আকাশে। ঘরে ফিরে ওরা বাবাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখেছিল। এতোয়ারিকে অবাক করে ওর মা জিজ্ঞাসা করেছিল বাবার সামনে দাঁড়িয়ে, “খিদে পেয়েছে?” বাবা যতটা অবাক হয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অবাক হয়েছিল এতোয়ারি। মা এতোয়ারির দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল, “আজ আমি ভাত চাপাই।”
শাড়ি পালটে মা যখন হাতমুখ ধুতে গেল, তখন এতোয়ারির মনে হচ্ছিল আজ মা যেন অন্যরকম, একটু খুশি খুশি ভাবভঙ্গি! শেষ কবে মাকে এইরকম সে দেখেছে মনে পড়ল না।
ডাক্তারবাবুর গলা কানে এল, “এই মেয়েটির সঙ্গে যাও।”
এতোয়ারি দেখল একটা সাধারণ শাড়ি পরা ঘোমটা মাথায় দেওয়া মহিলাকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ডাক্তারবাবু বললেন, “ওর নাম এতোয়ারি। ওকে বিশ্বাস করতে পারো। তোমার পা থেকে যখন গুলি বের করছিলাম, তখন ওর সাহায্য দরকার হয়েছিল। এতোয়ারি, ওকে সাবধানে নিয়ে যাও।”
ঘোমটার আড়াল থেকে পুরুষকণ্ঠে প্রশ্ন করল, “যে পাঠিয়েছে তার নাম কী? তোমাদের বড় নার্সের সঙ্গে কে ছিল?”
“একজন ছিল। নাম বলেনি আমাকে।”
একটু যেন দ্বিধায় পড়ল শাড়ির আড়ালে থাকা লোকটা। তারপর পা বাড়াল। বোঝা যাচ্ছিল পা ফেলতে কষ্ট হলেও সেটা সহ্য করছে সে।
খুঁড়িয়ে হাঁটলেও নদীর ধারে পৌঁছাতে ছ’মিনিটের বেশি লাগল না। এতোয়ারির মনে হচ্ছিল লোকটাকে বলে, সুবিধে হলে তার কাঁধ ধরতে পারে। কিন্তু সংকোচে বলতে পারছিল না। নদীর ধারে পৌঁছনো মাত্র অন্ধকার ফুঁড়ে দুটো লোক বেরিয়ে এল। চাপা গলায় নোয়ামের সঙ্গে কথা বলে একজন এগিয়ে এল এতোয়ারির সামনে, “অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি এবার ঘরে ফিরে যাও।”
মাথা নেড়ে নদীর জলের দিকে পা বাড়াচ্ছিল এতোয়ারি, পেছন থেকে মাথার ঘোমটা সরিয়ে নোয়াম ডাকল, “তোমার কী নাম তা বলে যাও।”
একটু ইতস্তত করে নিজের নাম বলল এতোয়ারি। তারপর অন্ধকারে হাঁটুজলের নদী পার হয়ে ঘরের পথ ধরল।
ঘরে ঢুকে এতোয়ারি দেখল বাবা ডাল-ভাত-আলুসেদ্ধ খাচ্ছে। তাকে দেখে মা বলল, “তোর জন্যে বসে আছি, কোথায় গিয়েছিলি?”
“নদীর ধারে।”
“কেন? কে আছে ওখানে?” মায়ের ঠোঁটে হাসি ফুটল।
“আশ্চর্য! কে থাকবে ওখানে!”
“কী জানি বাবা! যাকগে, ভাত ডাল আলু আর ডিমসেদ্ধ রেঁধেছি। খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে।”
“ডিম কোথায় পেলে?”
“দুটো ডিম হাসপাতাল থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছিলাম।”
“ঠিক করোনি। হাসপাতালের জিনিস বাড়িতে আনা ঠিক নয়।”
কথাটা শুনে মা ঠোঁট মোচড়াল।
“আমাকে আস্ত ডিম দিয়েছ কেন? তুমি কি অর্ধেক নিয়েছ?”
“অর্ধেক কেন নেব! তুই আর আমি গোটা গোটা।”
“বাবাকে দাওনি?”
“নাঃ,” মা ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।
শ্বাস ফেলল এতোয়ারি। সে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হল। অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে বাবা। সে নিজের থালা থেকে ডিমসেদ্ধটা তুলে উঠে গিয়ে বাবার পাতে দিয়ে এল। বাবা মাথা ঝাঁকাল, মুখে খুশি ফুটল। ডিম তুলে অতি ক্ষুদ্র একটা টুকরো কেটে চোখ বন্ধ করে চিবোতে লাগল। তার দাড়ি-গোঁফ ভরতি মুখে খুশি ফুটে উঠল।
মধ্যরাতে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল। এতোয়ারির মা উঠে বসে অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে? বাইরে গিয়ে দেখ তো!”
এতোয়ারি দরজা খুলতে লাইনের স্ত্রী-পুরুষদের ঘরের বাইরে এসে কান্নাকাটি করতে দেখল। তারপরই টর্চ হাতে পুলিশদের ওপর চোখ পড়ল তার। লোকগুলো এক হাতে টর্চ অন্যহাতে লাঠি উঁচিয়ে কুলি বস্তি তছনছ করতে করতে এগিয়ে আসছে। অন্ধকার এখন অনেক পাতলা হয়ে এসেছে। লোকগুলো পাশের ঘর ভাঙচুর করে এগিয়ে আসতেই এতোয়ারি গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করল, “অ্যাই! খবরদার!”
গোটা পাঁচেক লাঠিধারী পুলিশ যারা এতক্ষণ ঘরভাঙার উল্লাসে মেতে ছিল, তারা থমকে দাঁড়াল। এতোয়ারি চিৎকার করল, “সবাই ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকো। যা খুঁজছ, তা দেখতে শুধু একজন ঘরের ভেতরে আসতে পারো।”
লোকগুলো নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলল। একজন জিজ্ঞাসা করল, “এই, তুমি কে?”
“আমি হাসপাতালে কাজ করি। একজন আসতে পারো।”
নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচায়ি করে একজন এগিয়ে এলে এতোয়ারি দেখল পুলিশটির বয়স হয়েছে। ঘরের ভেতর লোকটা ঢোকামাত্র মায়ের আর্তনাদ শোনা গেল। দরজার কাছে ছুটে গিয়ে এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে।”
যে ঢুকেছিল, সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এল, “কিছু করিনি, মাইরি বলছি বুড়ি কেন যে ভয় পেল জানি না।”
ততক্ষণে মা এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। চিৎকার করে বলল, “অ্যাই! তুই কাকে বুড়ি বলছিস? তোর বউ বুড়ি, তোর মেয়ে বুড়ি! রাতদুপুরে শোওয়ার ঘরে ঢুকে হামলা করছিস, লজ্জা করে না?”
এতোয়ারি অবাক হয়ে দেখল লোকটা কথা না-বলে তার দলের কাছে চলে গেল। দলের একজন চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কোনও বাইরের লোককে আজ লাইনে ঢুকতে দেখেছ?”
কেউ জবাব দিল না। লোকটি বলল, “জবাব না-দিলে সবাইকে ধরে জেলে ঢোকাবার অর্ডার আছে।”
একজন মিনমিন করে বলল, “কোনও নতুন লোক লাইনে আসেনি।”
“বেশ। নতুন কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেবে!”
পুলিশগুলো চলে যাওয়ার পর সবাই যে যার ঘরে ঢুকে গেল। কিন্তু ঘরে ঘরে তখন এতোয়ারিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। আজ পর্যন্ত কোন কুলির মেয়ে-বউ পুলিশকে ধমক দিয়ে কথা বলার সাহস করেনি। হাসপাতালে চাকরি পাওয়ার পর থেকে এতোয়ারির মধ্যে একটু একটু করে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা কেউ কেউ বলতে লাগল।
এতোয়ারি মায়ের দিকে তাকাতে মা হাসল, “চল, শুয়ে পড়ি। এখনও রাত শেষ হতে ঢের দেরি আছে,” মা ভেতরে ঢুকে গেলেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল এতোয়ারি। মা যেন অনেক বদলে যাচ্ছে।
কয়েকদিন ধরে সমস্ত চা-বাগান থমথমে হয়ে রইল। কাজকর্ম মানুষ করে যাচ্ছে যন্ত্রের মতো। পাতি তুলতে যারা ঝুড়ি পিঠে নিয়ে বাগানের বিভিন্ন অংশে রোজ সকালে ছড়িয়ে পড়ে, তারাও হাসিঠাট্টা করছে না নিজেদের মধ্যে। মাঝে-মাঝেই একটা পুলিশের জিপ টহল দিতে চা-বাগানের ভেতরের রাস্তায় ঢুকে পড়ছে। কাজে যাওয়ার পথে সেই জিপ দেখে এতোয়ারি বুঝতে পারে এখনও নোয়াম ধরা পড়েনি।
নোয়াম নিশ্চয়ই একা সাহেবদের সঙ্গে, পুলিশের সঙ্গে লড়াই করছে না। পুলিশ যে নোয়ামকে ধরতে কাল রাত থেকে এভাবে খোঁজাখুঁজি করছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে লোকটা সাধারণ মানুষ নয়।
হাসপাতালে এসে অবাক হল এতোয়ারি। আজ আউটডোরে ওষুধ নিতে খুব কম রোগী এসেছে। ডাক্তারবাবুর আসার সময় এখনও হয়নি। তাকে একলা পেয়ে বড় নার্স ডেকে বললেন, “তোর জন্যে কাল নোয়াম পালিয়ে যেতে পারল। তুই যে কাল কী উপকার করেছিস জানিস না।”
মনের মধ্যে যে-প্রশ্ন বুজকুড়ি কাটছিল, সেটা উগরে দিল এতোয়ারি, “ওকে পুলিশ খুঁজছে কেন?”
“পুলিশ হল ইংরেজদের চাকর। ইংরেজরা হল বিদেশি। জোর করে আমাদের দেশ দখল করে মালিক হয়ে আছে। ওদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করতে আন্দোলন শুরু করেছে নোয়ামরা। মুশিকল হল, আমাদের এই দেশের কিছু লোক ইংরেজদের পা-চাটা হয়ে আছে,” মাথা নাড়লেন বড় নার্স।
একটু একটু মাথায় ঢুকছিল। এতদিন সে ধনুবুড়োর মুখে শুনে এসেছে তাদের একটা দেশ আছে। সেটা অনেক দূরে। সেই দেশ থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের ট্রেনে চাপিয়ে এখানে আনা হয়েছিল। ধনুবুড়ো সেই দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। বেচারার স্বপ্ন বাস্তব হয়নি। ধনুবুড়োর কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে এইসব চা-বাগানে যারা কাজ করে, তাদের নিজেদের দেশ অনেক দূরে ছিল। কথাটা যদি সত্যি হয়, তা হলে নোয়ামরা কেন এই দেশের স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করছে। উত্তরটা মাথায় ঢুকছিল না এতোয়ারির। বরং মনে প্রশ্ন জাগছিল, যে-দেশ ছেড়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে এসেছিল, সেই দেশটাকেও কি ইংরেজরা দখল করে আছে?
তিনদিন পরে বড় নার্স ফিসফিস করে খবরটা দিলেন, “নোয়ামকে পুলিশ ধরতে পারেনি। ও এখন আসামের চা-বাগানে চলে গিয়েছে।”
শোনামাত্র নোয়ামের পায়ের কথা মনে এল। এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “ওর পা ঠিক হয়ে গেছে?”
“নিশ্চয়ই কিছুটা ঠিক হয়েছে। না-হলে গেল কী করে!” বড় নার্স গলা আরও নামিয়ে বললেন, “এসব কথা কাউকে যেন বলে ফেলিস না।”
তিনদিন পরে পুলিশের গাড়ি চা-বাগানে ঢোকা বন্ধ হল। ফলে একটু স্বস্তি ফিরে এল মানুষের মনে। কিন্তু সমস্যায় পড়ল এতোয়ারি। খালিগায়ে ঘরের বাইরে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে বুকে সর্দি বসেছে বাবার, সেই সঙ্গে জ্বর। দুম করে জ্বর এত বেড়ে গেল যে, তাকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে হল।
মেয়েদের ঘরে বেড খালি থাকলেও ছেলেদের ঘরে বেড খালি না-থাকায় মেঝেতে বিছানা পেতে শোয়াতে হয়েছে। বাবা সুস্থ না-হওয়া পর্যন্ত বড় নার্স এতোয়ারিকে হাসপাতালেই থেকে যেতে বললেন। মা এল না। সকালবেলায় পাতি তুলতে যাওয়ার সময় বলে গেল, “এত লোকের থাকার কোনও দরকার নেই, তুই তো আছিস!”
খুব অবাক হয়েছিল এতোয়ারি। বাবা যতই খারাপ কাজ করে থাকুক, এটা শোনার পর লোকটার জন্যে তার মায়া হয়েছিল।
দ্বিতীয় রাতে দু’জন মহিলা আর চারজন লোক রিকশায় এক মহিলাকে নিয়ে হাসপাতালে এল। মহিলাটির প্রসববেদনা উঠেছে। লাইনের ঘরেই ধাই দিয়ে প্রসব করানোর চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি।
মহিলাকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল। ঘিরে দেওয়া হল খাটটা সাদা পরদা দিয়ে। ছোট নার্স চেঁচিয়ে বলল, “সঙ্গে কে এসেছে? বাবা না স্বামী? যে-ই এসে থাকো অফিসে চলো, নাম ঠিকানা লেখাতে হবে।”
স্বামী লোকটি লম্বাচওড়া কিন্তু কণ্ঠস্বর মেয়েদের মতো। এক সঙ্গীকে নিয়ে সে অফিসে গেল। নাম-ঠিকানা লেখাল। তখন দুই মহিলা আর এক পুরুষ ঘেরাটোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে গর্ভবতী মহিলাকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছিল। লোকটি বলছিল, “তোর আর কোনও ভয় নেই। হাসপাতালে এসে গিয়েছিস যখন—তখন ডাক্তারবাবু ঠিক বাচ্চা বের করে আনবে।”
যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল গর্ভবতী। শ্বাস নিয়ে বলল, “চুপ করো। চুপ করো। তোমার জন্যে, তোমার জন্যেই এত কষ্ট আমার…”
“কী করব! তুমিই চেয়েছিলে!” লোকটি মিনমিন করল।
উলটোদিকে বসা মহিলাদের একজন ধমক দিল, “চুপ কর। কী কথা বলছিস? মেয়েটার কি মাথাখারাপ হয়ে গেল?”
গর্ভবতী চোখ খুলল, “কাকে বলছি?”
“শুকরাকে। তোর বরের বন্ধু,” অন্য মহিলা চাপা গলায় বলল।
“ও,” গর্ভবতী চোখ বন্ধ করল।
এই সময় ছোট নার্স এসে বলল, “আপনারা সবাই বাইরে যান,” ডাক্তারবাবু এখনই এসে যাবেন।
সেই পুরুষ সঙ্গী বলল, “দিদি, কোনও ভয় নেই তো!”
ছোট নার্স লোকটির দিকে তাকাল, “আপনি কে?”
মহিলাদের একজন বলল, “ওর স্বামীর বন্ধু।”
“অ! ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করবেন। তিনিই বলতে পারবেন। এখন আপনারা বাইরে যান, আর এখানে থাকবেন না,” ছোট নার্স চড়া গলায় বলল।
এতোয়ারি গর্ভবতী মহিলার মাথার পাশে এসে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল। না, তার ভুল হচ্ছে না। এই লোকটিকে সে নদীর ধারে আবছা আলোয় একজন গর্ভবতী মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে দেখেছিল। মেয়েটির দ্বিধা ছিল, কিন্তু তাকে বাধ্য করেছিল। এতোয়ারি পায়ে পায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। না, বেদনা কমলে গর্ভবতীর মুখ যখন স্বাভাবিক হচ্ছিল, তখন তাকে দেখে আর চিনতে অসুবিধে হল না। মেয়েটির সঙ্গে এই মহিলাকেই সে নদীর ধারে রাতের বেলায় দেখেছিল। লোকটির দ্বিধা হওয়া সত্ত্বেও এই লোকটি ওর কাছে শরীরের আনন্দ আদায় করে নিয়েছিল। আজ ছোট নার্সের সঙ্গে গিয়ে যে-লোকটি পরিচয় লিখিয়ে এসেছে, সে যদি এই নারীর স্বামী হয়, তা হলে এই উদ্বিগ্ন লোকটি কে? লোকটির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল না।
ছোট নার্স বলল, “এতোয়ারি, সবাইকে সরিয়ে দাও। আপনারা চলে যান, বাইরে যান।” ছোট নার্স বাইরে বেরিয়ে গেলে এতোয়ারি প্রায় জোর করেই সবাইকে বের করে আনল। সে দেখল সেই লম্বাচওড়া লোকটি সঙ্গীর সঙ্গে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার নজর এদিকে। যে-লোকটি বেডের পাশে বসেছিল, সে ধীরে ধীরে লোকটির পাশে গিয়ে মাথা নেড়ে কিছু বলতে লাগল।
এতোয়ারি আবার ঘেরাটোপের ভেতর ঢুকল। গর্ভবতীর প্রসববেদনা এখন আগের মতো বোধহয় তীব্র নয়। সে বলল, “আর-একটু অপেক্ষা করো, ডাক্তারবাবু এসে তোমার ব্যথা কমিয়ে দেবেন।”
“আমার পেট থেকে যদি না বের হয়…”
“কেন বের হবে না। সব বাচ্চাই বেরিয়ে আসে।”
“অনেক সময় বেরুতে চায় না। তা হলে আমি কি মরে যাব?”
“না না, কিছু হবে না।”
এইসময় ডাক্তারবাবু আর ছোট নার্স ভেতরে ঢুকলেন। ঢুকে হাসলেন ডাক্তারবাবু, “ভয় পেয়ো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ছোট নার্স সঙ্গে একটা ট্রে এনেছিল। তাতে মায়ের পেট থেকে বাচ্চাকে বের করে আনার জন্যে যেসব যন্ত্র দরকার হয়, তা তোয়ালে দিয়ে মোড়া আছে। ইশারায় এতোয়ারিকে সাহায্য করতে বলল ছোট নার্স। বিড়বিড় করে বলল, “কপালে কী লেখা আছে কে জানে।”
ডাক্তারবাবু কাজ শুরু করলেন। গর্ভবতী যাতে হাত পা না-ছুড়তে পারে, তার দাঁত যাতে ঠোঁটে না-বসে যায় তার ব্যবস্থা করে ডাক্তারবাবু শিশুকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে আনার চেষ্টা শুরু করলেন যন্ত্রের সাহায্যে। বেশ সময় লাগলেও শেষপর্যন্ত শিশুকে পৃথিবীর আলোয় নিয়ে আসতে সক্ষম হলেন ডাক্তারবাবু। গর্ভবতী সমানে শরীর মুচড়ে যাচ্ছিল। শিশু বেরিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে স্থির হল। ডাক্তারবাবুর হাত থেকে শিশু নিয়ে ছোট নার্স নানারকম চেষ্টা করার পর কান্নার আওয়াজ বের হল। তখন এতোয়ারিকে বাকি সব কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিল ছোট নার্স।
সদ্য মা হয়েছে যে, সে একপাশে মাথা হেলিয়ে শুয়েছিল। ছোট নার্স তার মুখের কাছে গিয়ে বলল, “এই যে, চোখ খুলে দ্যাখো, তোমার ছেলে হয়েছে। ফুটফুটে ছেলে।”
স্ত্রীলোকটি চোখ খুলল। তার মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট, তবু সে যেন কিছু জানতে চাইল। ছোট নার্স আবার বলল, “ছেলে হয়েছে, ছেলে।”
স্ত্রীলোকটির ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটল। তারপর একটা বড় শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল।
ছোট নার্স শিশুকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে গলা তুলে বলল, “বাবা কে? এদিকে এসে দেখুন, ছেলে হয়েছে।”
লম্বা চেহারার লোকটিকে তার সঙ্গী বলল, “যান, ডাকছে।”
লোকটি এগিয়ে যেতে ছোট নার্স শিশুকে উঁচু করে তুলে দেখাল। লোকটি ঝুঁকে দেখল, তারপর হাসল। ছোট নার্স বলল, “খুশি তো? আমাদের মিষ্টি খাওয়ার টাকা না-দিলে একে বাড়িতে নিয়ে যেতে দেব না।”
স্বামী কী বলবে তা বোধহয় ভেবে পাচ্ছিল না, পাশে এসে দাঁড়িয়ে যে-লোকটা তাকে ইশারা করল হ্যাঁ বলতে, সে একটু আগে গর্ভবতীর সঙ্গে কথা বলছিল। এবার স্বামী জোর পেয়ে বারবার মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। এতোয়ারি দেখল পরামর্শ দেওয়া লোকটি দাঁত বের করে হাসল।
এতোয়ারি হতভম্ব। তার বারবার সেই রাতে দেখা দুটি মানুষকে মনে পড়ছিল। যাদের একজন যে-কোনওদিন মা হতে পারে, এমন শরীর নিয়েও যার সঙ্গে মিলিত হতে নদীর ধারে এসেছিল, সে স্বামী নয়, প্রেমিক। আজ সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় সে যখন প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছিল, তখন তার জন্যে উদ্বিগ্ন মুখে পাশে বসেছিল সেই প্রেমিকই। স্বামী আছে কিন্তু থেকেও নেই। সবচেয়ে অবাক হওয়ার ব্যাপার, স্ত্রীর প্রেমিককে মেনে নিতে স্বামীর বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। যে-সন্তান আজ জন্মগ্রহণ করল তার বাবা স্বামী নয়, প্রেমিক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ধড়পাকড় চলছিল। মাঝে-মাঝেই দেশের অন্য জায়গায় যে-স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন জ্বলে উঠছিল, তার আঁচ ডুয়ার্স এবং অসমের চা-বাগানেও এসে পড়ছিল। তবে বেশির ভাগ মানুষ তাদের নিরীহ জীবনযাপনের অভ্যেসে ভয়ে গুটিয়ে থাকছিল। তবে আর যেখানে যাই হোক, এতোয়ারি শুধু তার গল্পই শুনতে পাচ্ছিল, তাদের চা-বাগানের কাউকে সাহেবদের সামনে দাঁড়িয়ে গালাগালি দেওয়ার সাহস দেখাতে দেখেনি। কিন্তু হাসপাতালে এসে ডাক্তারবাবুর জন্যে অপেক্ষায় থাকায় রোগীরা নিজেদের মধ্যে যখন কথা বলত, তখন নিচু স্বরে ওদের গল্পই বলত, যারা ইংরেজদের এই দেশ থেকে তাড়িয়ে স্বাধীনতা আনতে চায়। কিন্তু স্বাধীনতা, সেটা নিয়ে এলে সাধারণ মানুষের কী হবে, সে সম্পর্কে ওইসব মানুষের মতো এতোয়ারিরও স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
ডাক্তারবাবু যেখানে বসে রোগী দেখেন, কাগজে ওষুধের নাম লিখে কম্পাউন্ডারবাবুর কাছে পাঠান, তার পেছনের দেওয়ালে একটা বড় কাগজ বাঁধানো আছে। কোনও মানুষ বা প্রকৃতির ছবি সেই কাগজে ছাপা নেই, একটা রেখার ভেতরে অনেক ফুটকি, ফুটকির গায়ে জায়গায় জায়গায় নাম লেখা আছে। ছোট নার্স বুঝিয়ে বলেছিল, ওটাকে ম্যাপ বলে। এই দেশটার নাম কিন্তু হিন্দুস্তান, যার ইংরেজি ইন্ডিয়া। ওটা ইন্ডিয়ার ছবি। ইন্ডিয়ায় যত বড় শহর আছে, তার নাম লেখা আছে ওখানে। প্রথম দিন শোনামাত্র এতোয়ারির মনে প্রশ্ন এসেছিল, কেন এই দেশটার নাম হিন্দুস্তান। তাদের তো খ্রিস্টান বলা হয়। যিশু তাদের দেবতা। তা হলে কি শুধুই হিন্দুদের দেশ, খ্রিস্টানদের নয়? আবার লাইনের বাইরে যেখানে চা-বাগান শেষ হয়ে হাট বসার জায়গা, তার গায়ে দশ-বারো ঘর মুসলমান থাকে। দেশটা যদি হিন্দুস্তান হয়, তা হলে কি খ্রিস্টান বা মুসলমানদের নয়?
বড় নার্স অবসর সময়ে গল্প করেন। তখন কথাটা তুলেছিল এতোয়ারি। বড় নার্স হেসে মাথা নাড়তে লাগলেন, “দূর বোকা, এই হিন্দুস্তান শুধু হিন্দুদের নয়। হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলমান সবার দেশ। তবে আগে, ইংরেজরা এই দেশে আসার আগে প্রথমে শুধু হিন্দুরাই থাকত এখানে। তারপর মুসলমান এসেছিল। সাহেবরা, মানে খ্রিস্টানরা এদেশে এল এই সেদিন। তখন দেশের বেশির ভাগ মানুষ ছিল খুব গরিব। তাদের খাবারের লোভ দেখিয়ে, নিজেদের ধর্ম, নাম দিয়ে খ্রিস্টান বানিয়ে দিল। এই যেমন তোর নাম এতোয়ারি ব্রাউন। তুই খ্রিস্টান। আবার ডাক্তারবাবুর বউয়ের নাম জানিস? সরস্বতী মুখার্জি। ওরা হিন্দু। কিন্তু দেশটা তো আমাদের সবার।”
কিছুটা স্পষ্ট হয়, অনেকটাই অস্পষ্ট। কিন্তু বড় নার্সের মতো এত সুন্দরভাবে কেউ এতোয়ারিকে বুঝিয়ে বলেই না কথাগুলো।
সেই বিকেলে চৌকিদার চিৎকার করতে করতে এসে বলল, “আজ কেউ হাসপাতালের ভেতরে অনুমতি ছাড়া ঢুকতে পারবে না। দরজা বন্ধ থাকবে।”
ছোট নার্স উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন? কী হয়েছে?”
“খুন হয়েছে। পুলিশ একজনকে পিটিয়ে খুন করেছে,” চৌকিদার উত্তেজিত।
“সে কী! কেন?” দু’-তিনজন একসঙ্গে জিজ্ঞাসা করল।
“কেন আবার! লোকটা নাকি স্বাধীনতা চাইছিল। সব কিছু চাইতে নেই, লোকটা জানত না। না-জানলে তো দাম দিতে হবে,” হাসপাতালের মূল দরজা বন্ধ করে লাঠি হাতে ভেতরে ঢুকে পড়ল চৌকিদার।
এর কিছুক্ষণ আগে ডাক্তারবাবু তাঁর বিকেলের রাউন্ড দিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। খবরটা তাঁর কানে গেল। তিনি চৌকিদারকে ডেকে পাঠালেন। চৌকিদার সামনে এসে মাথা নাড়তে লাগল, “সাব আমি লোকটাকে চিনতাম। ও যে সাহেবদের খতম করার দলে নাম লিখিয়েছে, আমি জানতাম না। দেখে মনেও হয়নি।”
“লোকটা কি এই বাগানে কাজ করে?”
“না না হাটে সবজি বিক্রি করে।”
“কী হয়েছিল? তুমি কী শুনেছ?”
“লোকটাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ও নাকি সাহেবমারা দলকে খাবার পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু লোকটা যেতে যেতে পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছিল বলে অন্য পুলিশরা ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। পুলিশরা চেঁচিয়ে বলেছে, ওর নাকি কয়েকজন সঙ্গী এখানে আছে। তাদের তিনদিনের মধ্যে ধরে ফাঁসি দেওয়া হবে।”
“বাজারে যারা সবজি বিক্রি করে তাদের আমি চিনি। তুমি কার কথা বলছ?” ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
“শনিচয়, সামনের দাঁত একটু উঁচু।”
ডাক্তারবাবু চিনতে পারলেন লোকটাকে। গোবেচারা চেহারার ওই লোকটিকে দেখে কল্পনা করা যায় না যে, ওর ভেতরে যে-আগুন ছিল, তাকে ভয় পেয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “হাসপাতালের দরজা বন্ধ করার কথা তোমাকে কে বলেছে?”
“সবাই দরজা-জানলা বন্ধ করছে, তাই…”
“তারা কি হাসপাতালে থাকে? হাসপাতালের দরজা কখনও বন্ধ হয় না। মন্দির গির্জা মসজিদের দরজা বন্ধ হয়, কিন্তু হাসপাতালের হয় না। যাও, দরজা খুলে দিয়ে পাহারায় থাকো,” ডাক্তারবাবু বললেন।
ঠিক তখনই বড়সাহেবের বেয়ারা এসে সেলাম করে বলল, “বড়াসাহেব আপকো সেলাম দিয়া।”
“কী ব্যাপার?” ডাক্তারবাবু অবাক হলেন। এরকম ডাক কদাচিৎ পড়ে।
“নেহি মালুম,” মাথা নেড়ে বলে চলে গেল লোকটা।
ডাক্তারবাবু শঙ্কিত হলেন। তাঁকে কি এখন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে?
Chapter - 4
৪.
নদীটা এখানে বেশ সরু হয়ে যাওয়ায় জল শুধু গভীর হয়নি, স্রোতও যথেষ্ট বেড়ে গেছে। সেই তীব্র স্রোত বিশাল হুইল ঘুরিয়ে যে-বিদ্যুৎ তৈরি করে, তাতে কারখানার মেশিন ঘোরে, বিদ্যুতের আলো পাওয়া যায় চা-কারখানায়। নদীর ওপর লোহার সাঁকো, সাঁকোর ওপর দিয়ে পিচের যে-রাস্তা করা হয়েছে, তাতে দিব্যি গাড়ি চলাচল করতে পারে। ডাক্তারবাবু সাঁকো পেরিয়ে বড়সাহেবের অফিসে পৌঁছে দেখলেন, বড়সাহেবের বেয়ারা ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে। ডাক্তারবাবুকে দেখে সেলাম করে দরজা খুলে দিল।
ভেতরে পা দিতেই বড় মেজ ছোটসাহেবকে চেয়ারে আর ভারতীয় বড়বাবুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন ডাক্তারবাবু। তিনি বললেন, “গুড ইভনিং স্যার, আপনি আমাকে ডেকেছেন?”
“গুড ইভনিং ডক্টর। প্লিজ় সিট ডাউন,” বড়সাহেব বললেন।
একটু স্বস্তি পেলেন ডাক্তারবাবু। আক্রমণ করার থাকলে প্রথমে এত মিষ্টি করে কথা বলেন না বড়সাহেব। তিনি উলটোদিকের চেয়ারে বসলেন। বড়সাহেব বললেন, “প্রথমে আমি ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ক্রমশ ওদের কাজকর্ম দেখে উদ্বিগ্ন না-হয়ে উপায় নেই। তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ, আজ একজন উগ্রপন্থী পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গিয়েছে। আর ঘটনাটা ঘটেছে চা-বাগানের পাশের বাজার এলাকায়। এত কাছে যে, উদ্বিগ্ন না-হয়ে উপায় নেই। তুমি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হচ্ছ?”
“হ্যাঁ, ব্যাপারটা সত্যি দুশ্চিন্তা করার মতো?” ডাক্তারবাবু বললেন।
দ্বিতীয় ম্যানেজার বললেন, “পুলিশের গুলিতে কোনও কোনও বিদ্রোহী উন্ডেড হয়েছে বলে খবর পাচ্ছি, তারা কি চিকিৎসার জন্যে আপনার হাসপাতালে এসেছে?”
মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু, “আমার জানা নেই।”
তৃতীয় ম্যানেজার বললেন, “দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন না। চা-বাগান এলাকায় যারা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, তাদের কোনওরকম প্রশ্রয় আমরা দেব না। ওদের মেরে ফেললেও, আমাদের বিরুদ্ধে গভর্নমেন্ট কোনও ব্যবস্থা নেবে না। তাই কোনওরকম মার্সি দেখাবেন না।”
বড় ম্যানেজার হাত তুললেন, “শান্ত হও চার্লস। ডক্টর কয়েক বছর আমাদের কোম্পানিতে আছেন। কোম্পানি ওঁর ওপর খুব নির্ভর করে। ওয়েল ডক্টর, ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছে করলে বিদ্রোহীদের দেখামাত্র গুলি করে মেরে ফেলে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু আমি ওই পথে যেতে চাইছি না। আমার মাথায় একটা অন্য রকম পরিকল্পনা এসেছে। সেই ব্যাপারেই আলোচনা করব,” সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন বড়সাহেব। একটু ভেবে বললেন, “ডুয়ার্স এবং অসমের চা-বাগানের কাজের জন্যে এদেশে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না একথা আপনারা তো জানেন।”
দ্বিতীয় ম্যানেজার বললেন, “হ্যাঁ’ লোকাল আদিবাসীরা চা-গাছের চাষ করতে চায়নি, তা জানি।”
তৃতীয় ম্যানেজার অবাক হলেন, “কেন? ওরা তো মাইনে পেত!”
বড় ম্যানেজার বললেন, “চার্লস, কোনও কোনও মানুষ পেটের চেয়ে ধর্মকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। লোকাল আদিবাসীরা মনে করেছিল, যে-গাছের ফল-ফুল-পাতা বা শেকড় খাওয়া যায় না, সেই গাছের চাষ করলে ওদের ভগবান রেগে যাবে। ওদের কিছুতেই চা গাছের বাগানে কাজ করানো যায়নি। কোনও অনিচ্ছুক ঘোড়ার পিঠে বসে তুমি রেস জিততে পারো না।”
তৃতীয় ম্যানেজার বললেন, “মাই গড। কী বোকা ওই লোকগুলো?”
বড়সাহেব বললেন, “ওয়েল, তখন এজেন্টরা এসে প্রমিস করল তারা চা-বাগানে কাজ করার জন্যে শ্রমিক এনে দেবে পাশের প্রভিন্স বিহার থেকে। মাথাপিছু টাকা নিয়ে জল আর খাবারের সঙ্গে ঘরের লোভ দেখিয়ে ওরা আমাদের চা-বাগানগুলোতে কাজের জন্যে শ্রমিক এনে দিত।”
“থ্যাঙ্ক গড,” তৃতীয় ম্যানেজার বললেন।
দ্বিতীয় ম্যানেজার হাসলেন, “এটা আমি শুনেছি। ওই লোকদের এখানে এনে চার্চের ফাদারকে অনুরোধ করা হয়েছিল ব্যাপটাইজ করে দিতে। তাই করা হলে লোকগুলো রাতারাতি খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল এবং একটা খ্রিস্টান নামও ফাদারের কাছ থেকে পেয়েছিল। তাই তো?”
“কারেক্ট,” বড়সাহেব মাথা নাড়লেন, “এই লোকগুলোর পূর্বপুরুষ যদি তাদের বিহারের গ্রামে থেকে যেত, তা হলে এরা বোধহয় জন্মাত না।”
তৃতীয় ম্যানেজার অবাক হল, “কেন?”
“খাবার না-পেয়ে এদের পুর্বপুরুষ কতদিন বেঁচে থাকত? জল নেই, খাবার নেই, বন্যপ্রাণী শেষ করে ফেলেছে ধরে খেয়ে, ভয়ংকর অবস্থা থেকে চলে এসেছিল এরা। খুব কম সংখ্যায় লোক থেকে গিয়েছিল। কীভাবে ছিল, আদৌ তারা আছে কি না, তা আমি জানি না। এখানে আসার পর কেউ ফিরে গিয়েছে বলে আমি শুনিনি।”
দ্বিতীয় ম্যানেজার জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী চাইছেন?”
আবার কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়লেন বড়সাহেব চোখ বন্ধ করে। তারপর চোখ খুলে বললেন, “আমি নিশ্চিত, যদি ওখানে ওদের কেউ বেঁচে থাকে, তা হলে খুব দুর্দশার মধ্যে আছে। আপনি কী বলেন ডাক্তার?”
হঠাৎ নিজের নাম শুনে ডাক্তারবাবু হকচকিয়ে গেলেন। বললেন, “আমার কাছে কোনও খবর নেই। এখানে তো খবরের কাগজ নিয়মিত পাই না। রেডিয়োর ওপর নির্ভর করতে হয়। মুশকিল হল, রেডিয়োতে সব খবর বলে না। তাই জানবার কোনও উপায় নেই।”
“ঠিক কথা,” বড়সাহেব মাথা নাড়লেন, “যদি চা-বাগানের কাজে ওদের ডুয়ার্স এবং অসমে না-নিয়ে আসা হত, তা হলে নিজের দেশে কীরকম থাকত, আপনারা কোনও ধারণা করতে পারেন?”
ছোট ম্যানেজার হাসলেন, “বেশির ভাগ মানুষ না খেয়ে হয়তো মরেই গেছে।”
মেজ ম্যানেজার বললেন, “তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?”
বড় ম্যানেজার বললেন, “ঠিক কথা। প্রথমে যাদের চা-বাগানের কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল, তাদের কেউই বোধহয় আর জীবিত নেই। আর ওখানে কী ঘটছে, যারা থেকে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ এদের হয়নি। তার প্রধান কারণ, যারা থেকে গিয়েছিল, তারা তো বটেই, যারা এসেছিল, তাদের কারও অক্ষরজ্ঞান না-থাকায় চিঠি লিখে খোঁজখবর নিতে পারেনি।”
ডাক্তারবাবু কথা বললেন। বিষয়টা তাঁকে বেশ অবাক করছিল। বললেন, “আমি বুঝতে পারছি না, আপনি ওদের নিয়ে ঠিক কী ভাবছেন!”
“খুব সহজ ব্যাপার। আমি আমাদের শ্রমিকদের বোঝাতে চাই, যদি তাদের এখানে নিয়ে আসা না হত, তা হলে তারা এখন কী দুর্দশার মধ্যে ওখানে থাকত। আমরা এখানে এনেছি বলে ওদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত,” বড়সাহেব গম্ভীর গলায় কথাগুলো বললেন।
মেজসাহেব আঁতকে উঠলেন, “মাই গড। আমাদের চা-বাগানের সমস্ত শ্রমিকদের অত দূরে নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?”
বড়সাহেব হাসলেন, “মাথার ব্যবহার করতে তুমি দেখছি ভুলে গেছ। এত লোক কেন নিয়ে যাওয়া হবে, চার-পাঁচজনের একটা দল, যাদের লিডার ছাড়া সবাই ওই অঞ্চলের মানুষের বংশধর, শুধু তাদেরই পাঠানো হবে। এই শ্রমিকরা সব দেখেশুনে ফিরে আসার সময় দু’জন পুরুষ এবং নারীকে সঙ্গে নিয়ে আসবে, যারা এখনও ওখানে বেঁচে আছে। এই লোকগুলোর মুখে আমাদের শ্রমিকরা শুনবে, কী ভয়ংকর কষ্টের মধ্যে ওরা বেঁচে আছে। যদি আমরা ওদের না-নিয়ে আসতাম, তা হলে একই দুর্দশায় পড়ত ওরা।”
ছোটসাহেব বললেন, “বাঃ, ভাল হবে। কিন্তু যাদের নিয়ে আসা হবে, তাদের কি আবার ফেরত পাঠাবেন?”
বড়সাহেব বললেন, “আমার বিশ্বাস ওদের কেউ ফিরে যেতে চাইবে না এখানকার আরাম ছেড়ে।”
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা করার পেছনে আপনার উদ্দেশ্য হল, শ্রমিকদের বোঝানো দেশে থাকলে তারা কী দুর্দশায় থাকত। তাই তো?”
“ঠিক,” বড়সাহেব মাথা নাড়লেন।
মেজসাহেব বললেন, “ওদের দেখিয়ে কোম্পানি কী লাভ করবে?”
বড়সাহেব সিগারেট নেভালেন, “ঘোষণা করে দেওয়া হবে যারা বিদ্রোহী লোকগুলোকে সাহায্য করবে, তাদের ধরে পূর্বপুরুষদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাকি জীবনটা ওদের ভয়ংকর কষ্টের মধ্যে কাটাতে হবে। যারা সাহায্য করবে না, তাদের শিশুদের পড়াশোনা শেখানো হবে। হয়তো ভবিষ্যতে তাদের বাবুর চাকরিতে নেওয়া হবে,” বড় ম্যানেজার সাহেব বললেন, “মানুষ প্রথমে পেটের কথা ভাবে। তারপর নিরাপত্তা চায়। দেশভক্তি খিদের চাপে উড়ে যেতে বাধ্য।”
ছোটসাহেব বললেন, “বাঃ, চমৎকার আইডিয়া।”
মেজসাহেব বললেন, “কিন্তু এটা বেশি দেরিতে করা চলবে না, না-হলে যারা বিপ্লব করতে চাইছে, তাদের দল আরও ভারী হয়ে যাবে।”
বড়সাহেব বললেন, “একদম ঠিক কথা। আমি আপনাদের এখানে ডেকেছি একটা টিম তৈরি করার জন্যে, যারা ওদের ফেলে আসা গ্রামগুলোতে যাবে।”
ছোটসাহেব হাসলেন, “ব্যাপারটার মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ আছে। আপনি যদি বলেন, তা হলে আমার যেতে আপত্তি নেই। আমি লিড করতে পারি।”
“বাঃ! অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের এই দলে না-যাওয়াই ভাল। গায়ের চামড়া বলবে আমরা বিদেশি। মনে রাখবেন স্বাধীনতা আন্দোলন খুব ছোঁয়াচে রোগের মতো। ওখানেও যে ওই আন্দোলনের আঁচ পৌঁছয়নি, তা আমি বলতে পারি না। তাই কোনও ঝুঁকি না-নিয়েই এই দলে সাদা চামড়ার কাউকে না-রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বড়সাহেব ডাক্তারবাবুর দিকে তাকালেন, “আমার মনে হয় এই দলের নেতা হিসেবে ডক্টরের যাওয়া উচিত।”
ডাক্তারবাবু চমকে উঠলেন, “আমি!”
“হ্যাঁ। আপনি ওদের আস্থাভাজন মানুষ, ওদের ভাষা ভাল বলতে পারেন। আপনার কাছে ওরা মনের কথা সহজে বলতে পারবে। আপনি ছাড়া দু’জন পুরুষ এবং দু’জন মহিলা শ্রমিককে দলে রাখতে চাই, যাদের চেহারা দেখলেই মনে হবে ভালভাবে খেয়েদেয়ে আছে। এদের আপনি বেছে নিন। আপনার হাসপাতালের নার্সদের কাউকে ইচ্ছে হলে নিতে পারেন।”
এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল যে, আপত্তি করার সুযোগ পেলেন না ডাক্তারবাবু। তিনি যখন ইতস্তত করছেন, তখন বড়সাহেব বললেন, “এবার আপনি বলুন বড়বাবু, আমাদের এই টিম কীভাবে ওখানে যাবে?”
বড়বাবুর বয়স হয়েছে। অবসর নেবেন এক বছর পরে। প্রতিটি বাক্যে দু’বার স্যার বলেন। তিনি মুখ খোলার আগেই ছোটসাহেব বললেন, “আপনি যখন ইংরেজি লেখেন, তখন একটাও ভুল পাওয়া যায় না। কিন্তু মুখ খুলেই তো-তো করে ভুল ইংরেজি বলেন! আপনি ধীরে ধীরে কথা বলুন।”
বড়বাবু পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে চোখে চশমা এঁটে পড়তে লাগলেন, “স্যার, এই চা-বাগান থেকে গাড়ি করে ওদের শিলিগুড়ি স্টেশনে যেতে হবে। সেখান থেকে ট্রেনে করে বারসই হয়ে বিহারের ট্রেন ধরে মহুয়ামিলন স্টেশনে নামতে হবে। মহুয়ামিলনে ছোট-বড় হোটেল আছে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে একশো মাইলের মধ্যে আদিবাসীদের বিভিন্ন গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যাবে।”
“গুড। আপনি ডক্টরের সঙ্গে বসে এই ট্যুরের জন্যে কত খরচ হবে, তার হিসেব করে তার টেন পার্সেন্ট বাড়িয়ে দেবেন। ডক্টর, আমি চাইছি আপনি কালকের মধ্যে টিম তৈরি করে নিয়ে পরশু রওনা হয়ে যান,” বড়ম্যানেজার কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়ালেন। যেন আর কিছু বলার বা শোনার নেই।
রাতে কোয়ার্টার্সে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন ডাক্তারবাবু। বেশ কিছুদিন ধরে ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বলছিলেন, চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করতে। জলপাইগুড়িতে ডাক্তারবাবুর পৈতৃক বাড়ি আছে। পড়াশোনাও সেখানেই করেছেন। ফলে পরিচিতি যে একদম নেই, তা নয়। অতএব জলপাইগুড়ি শহরে থেকে ডাক্তারি করে বেঁচে থাকা খুব সমস্যার হবে না।
ডাক্তারবাবুকে তাঁর স্ত্রী আবার ওই কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বললেন, “এটা তো আমি সহজেই পারি। কিন্তু চা-বাগানের এই কর্মীরা এবং তাদের পরিবারের লোকজন কী অসহায়, তা তো তুমি দেখছ। এদের ছেড়ে চলে যাব?”
“থেকেই-বা তুমি কী করতে পারছ? বলো!”
“প্রকাশ্যে কিছুই পারছি না কিন্তু…”
“তুমি গোপনে ওদের সাহায্য করছ, একথা প্রকাশ পেলে কী হবে তা ভাবতে পারছ?”
“জানি। কিন্তু আমার একটা ব্যাপারে এখন কৌতূহল হচ্ছে। এই যে ম্যানেজার আমাদের যে-উদ্দেশ্যে পাঠাতে চাইছেন, তার পাশাপাশি আমি এইসব মানুষের আত্মীয়রা, যারা ওখানে থেকে গিয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। না-গেলে আমি সেই সুযোগ পাব না।”
“তুমি ম্যানেজারের অর্ডার মেনে নেবে?”
“এই অর্ডার মেনে নিলে যদি আমার অনকেদিনের কৌতূহলের নিরসন হয়, তা হলে তা মেনে নিতে আমার আপত্তি নেই,” ডাক্তারবাবু হাসলেন।
চা-বাগানের বড়বাবু হাসপাতালে এলেন পরের দিন সকালে। বললেন “গুড মর্নিং ডাক্তারবাবু! আসতে পারি?”
“নিশ্চয়ই। বসুন।”
উলটোদিকের চেয়ারে বসে একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন বড়বাবু, “এই নিন। এই কাগজে সমস্ত ইনফরমেশন ডিটেলস লিখে দিয়েছি। কিন্তু আমি চেষ্টা করেও মহুয়ামিলনের কোনও হোটেলের নাম পাইনি। আপনাদের যেতে এবং আসতে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচদিন সময় লাগবে। বড়সাহেব চাইছেন ওখানে অন্তত পাঁচদিন থেকে সব তথ্য সংগ্রহ করে আনুন।”
“এই যে প্রায় এগারোদিন ধরে পাঁচজন মানুষ যাবে, থাকবে, ঘুরবে এবং ফেরার সময় আরও দু’জন সংখ্যায় বাড়বে, তাদের যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার খরচ কত পড়বে, তার হিসেব করেছেন?” ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
“ডাক্তারবাবু, গতকাল সন্ধ্যায় অর্ডার পেয়েছি। এত অল্প সময়ের মধ্যে সবটা করে উঠতে পারিনি। আপনাকে বিকেলের আগেই দিয়ে দেব,” বড়বাবু মাথা নাড়লেন, “আপনি যাদের সঙ্গে নিয়ে যাবেন তাদের ঠিক করেছেন?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “আপনি ঠিক করে দিন না!”
“তা দিতে পারি। কিন্তু ছেলেগুলো কি কমবয়সি হলে ভাল হবে! ওরা তো দেশের কথা শুনেছে বলে মনে হয় না!”
“কমবয়সি নয়। একজন প্রৌঢ়, একটু শক্তসমর্থ বৃদ্ধ হলে ভাল হয়। বাকিরা বিভিন্ন বয়সের। আর হ্যাঁ, সবাই ছেলে না-হয়ে একজন মেয়ে দলে থাকলে সুবিধে হবে। ওখানকার মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে,” বলতে বলতে মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু।
“কিন্তু একজন মেয়ে দূরদেশে ছেলেদের সঙ্গে যেতে কি রাজি হবে? অল্পবয়সি হলে তার বাবা বা স্বামী ছাড়বে না। বেশি বয়সিদের নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, সমস্যা হবে। দু’জন মেয়ে হলে তবু…”
“তা হলে দু’জনেই যাক। দু’জন ছেলে আর দু’জন মেয়ে। এক কাজ করুন, আমাদের হাসপাতালে এতোয়ারি নামে যে-মেয়েটি কাজ করে, তার স্বামী সঙ্গে থাকে না। ওকে নিতে পারেন। আর ওর সঙ্গে আর-একজনকে বেছে নিন। দেরি না-করে এখনই ঠিক করবেন, সঙ্গে ছেলেদুটোকেও,” ডাক্তারবাবু কথা শেষ করলেন।
কিন্তু যাও বললেই যাওয়া যায় না। পাশের চা-বাগানের এক বাঙালিবাবুর কলেজে পড়া ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এসেছিল। ছেলেটি নাকি দেশদ্রোহী। সে পুলিশের কাছে ধরা দিতে চায়নি। পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে সে মারা গিয়েছে।
ছেলেটিকে এলাকায় সবাই পছন্দ করত। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ামাত্র হাটের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বাগানের মালিক সাহেব কোম্পানি বলে কর্মচারীরা কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু মানুষ অসন্তুষ্ট হয়েছে। অসম থেকে যে-ট্রেন আসে এবং অসমে যায় তা অর্ধেকদিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আর এই কারণে বড়সাহেব তার প্রতিনিধিদের যাত্রা কয়েকদিন পিছিয়ে দিলেন।
এতে লাভ হল ডাক্তারবাবুর। চা-বাগানে বইপত্র পছন্দসই পাওয়া যায় না। কিছু বই সংগ্রহ করলেন, কিন্তু তাতেও খুব একটা কাজ হল না। চা-বাগানের কাজে খাবারের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা শ্রমিকদের ইতিহাস সেসব বইয়ে তেমনভাবে নেই। দু’জন বৃদ্ধ যারা একসময় বালক বয়সে এসে চা-বাগানের কাজে সারা জীবন কাটিয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। তারা স্মৃতি হাতড়ে যেটুকু বলতে পেরেছিল, তা জড়ো করে ডাক্তারবাবু বুঝলেন, ওরা বাবা-মায়ের সঙ্গে দলে দলে গ্রাম ছেড়ে বহু পথ হেঁটে একটা জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে পেটকাটা গাড়ি রেল ইঞ্জিনের পেছনে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই ওয়াগনে বাবা মায়ের নাম লিখে সবাইকে তোলা হয়েছিল। জায়গাটার নাম তারা জানে না। হয়তো বাবা-মা জানত। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, গ্রাম থেকে ওই জায়গায় পৌঁছতে তাদের কতটা সময় লেগেছিল। দু’জন দু’রকম উত্তর দিয়েছিল। কেউ বলেছিল দু’দিন, কেউ বলেছিল একদিন। তবে দু’জনে একটা বিষয়ে একই কথা বলেছে। যারা বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসেছিল, তাদের সবাইকে ইংরেজদের আড়কাঠিরা নিয়ে আসেনি। বিশেষ করে বৃদ্ধবৃদ্ধা এবং অভিভাবকহীন শিশুদের বাধ্য করা হয়েছিল থেকে যেতে। ওরা চোখের জল ফেললেও কাজ হয়নি।
ডাক্তারবাবু খুশি হলেন। সেই বৃদ্ধরা এতদিন পরে বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু বালক-বালিকা, শিশু, হয়তো কিশোর-কিশোরীদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। তাদের খুঁজে বের করে কথা বলতে হবে। ডাক্তারবাবু ভাবলেন, যখন ওদের পূর্বপুরুষদের চা-বাগানের কাজে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন যাতায়াতের ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল। কিন্তু তার পরে তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ওইসব গণ্ড পাড়াগাঁ থেকে আসা-যাওয়ার পথের চেহারা কি বদলায়নি?
বিকেলবেলায় বড়বাবু হাসপাতালে এলেন। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বললেন, “খুব ভাল হল যাত্রার দিন পিছিয়ে যাওয়ায়।”
ডাক্তারবাবু তাকালেন। বড়বাবু বললেন, “ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল,” এখন একটু ধীরেসুস্থে কাজ করা যাবে। বড়সাহেব জিজ্ঞাসা করছিলেন, কত টাকা দিলে আপনাদের ওখান থেকে ঘুরে আসতে অসুবিধে হবে না? আমি হিসেব করে একটু বেশি বলেছি। ট্রেনভাড়া বাদ দিয়ে তিনশো টাকা। ঠিক আছে?”
“ব্যাপারটা আমার চেয়ে আপনি ভাল বুঝবেন,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ম্যানেজার সাহেব বলেছেন, আপনার জন্যে সব ব্যবস্থা আলাদা করতে।”
“আপনি এখান থেকে ওসব আলাদা করবেন কী করে? আমার ওপর ছেড়ে দিন।”
“ঠিক কথা। আচ্ছা, আপনার সঙ্গে যারা যাবে তাদের একজনের নাম আপনি বলেছিলেন। বাকিদের কথা চিন্তা করেছেন?” বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
“না। তা ছাড়া ওই মেয়েটি তো যেতে রাজি না-ও হতে পারে। আপনি বরং ওর সঙ্গে কথা বলে দেখুন,” ডাক্তারবাবু খবর পাঠালেন, এতোয়ারি যেন এখনই এসে দেখা করে।
বড়বাবু বললেন, “দুটি লোককে আমি ভেবেছি। আপনি কথা বলে দেখুন, একজন ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, অন্যজন বড়সাহেবের বেয়ারা। দু’জনেই বেশ চটপটে। বেয়ারা এক-আধটা ইংরেজি শব্দ জানে। আচ্ছা, যদি এই মেয়েটি রাজি হয়ে যায় তা হলে ওকেই দায়িত্ব দিন না, যে ওর সঙ্গে যাবে সেই মেয়েকে বেছে নিতে।”
এতোয়ারি দরজায় এসে দাঁড়াল। মুখে কৌতূহল।
ডাক্তারবাবু বললেন, “ভেতরে এসো। শোনো, আমাদের বড়সাহেবের ইচ্ছে, তোমরা যারা চা-বাগানে কাজ করো, তাদের পূর্বপুরুষরা যেখান থেকে এসেছে, সেই জায়গাটা তোমরা কয়েকজন দেখে এসে কীরকম লাগল তা সবাইকে বলো। দু’জন ছেলের সঙ্গে দু’জন মেয়ে এই দলে থাকবে। মেয়েদের একজন হিসেবে তোমাকে ভাবা হয়েছে।”
বড়বাবু বললেন, “তোমরা চারজন এখান থেকে শিলিগুড়ি গিয়ে ট্রেনে চেপে তোমাদের পূর্বপুরুষের দেশে যাবে। আমাদের ডাক্তারবাবু তোমাদের নিয়ে যাবেন। উনি যা বলবেন তাই তোমাদের করতে হবে, ওঁর কথামতো চলতে হবে। এখন বলো, তুমি যেতে রাজি আছ তো?”
একটু সময় নিল এতোয়ারি। দুটো মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। যাদের সঙ্গে অন্য সময় সে কথা বলতে সাহসই পেত না।
ডাক্তারবাবু বিরক্ত হলেন, “কী হল? অসুবিধে থাকলে বলো।”
এতোয়ারি জিজ্ঞাসা করল, “ওখানে গিয়ে কী করতে হবে?”
“ওখানে তোমার পূর্বপুরুষের আত্মীয়রা আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলবে। কী কথা বলবে তা আমি পরে বলে দেব,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“আর কোনও মেয়ে সঙ্গে থাকবে তো?”
“হ্যাঁ থাকবে।”
মাথা নিচু করল এতোয়ারি, “আপনি হুকুম করছেন, আমি যাব।”
“তা হলে আর-একটা কাজ করো। তোমার পছন্দমতো আর-একজন মেয়েকে সঙ্গে নাও। তাকে কাল সকালে নিয়ে আসবে,” বড়বাবু বললেন।
এবার মাথা নাড়ল এতোয়ারি, “আমি যাদের চিনি তাদের স্বামী বা বাবা একা যেতে দেবে না,” তারপর একটু নিচু স্বরে বলল, “আমার মতো কেউ নেই।”
বড়বাবু বললেন, “ঠিক কথা। কী করা যায়! এই মেয়েটিকে একা পাঠালে ওকে নিয়ে নানা কথা রটবে,” বলতে বলতেই মনে পড়ে গেল বড়বাবুর। এতোয়ারির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “একটি মেয়ে আছে, যেতে রাজি হলে বাবা-মা-স্বামী কোনও সমস্যা করবে না। কারণ, তারা কেউ নেই। তবে মেয়েটা চা-বাগানে কাজ করে না, এটাই মুশকিল।”
“কে? ওর পূর্বপুরুষ কি ওদেশ থেকে এসেছিল?”
“হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। জ্বরজারি হলে আপনার কাছে নিশ্চয়ই ওষুধ নিতে এসেছে। মেয়েটার নাম পুষি। আমাদের চা-বাগানের বাউন্ডারির বাইরে যে-কয়েকটা ঝুপড়ি আছে, তার একটায় থাকে। তিরিশ-বত্রিশের বেশি বয়স না।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “হ্যাঁ, অল্প বয়সে পুষি চা-বাগানে কাজ করত। কিন্তু ওই মেয়েটার তো বেশ দুর্নাম আছে বলে শুনেছি।”
“থাক না। বড়সাহেব যে জন্যে পাঠাচ্ছেন, সেই কাজটা ঠিকঠাক করে এলে আমাদের অসুবিধে কোথায়! ওর সঙ্গে আজই কথা বলা দরকার।”
“হ্যাঁ, বলুন। এমন তো হতে পারে, পুষি যেতে রাজি হবে না। আপনি তো ওকে জোর করে পাঠাতে পারবেন না,” ডাক্তারবাবু এতোয়ারির দিকে তাকালেন, “পুষিকে নিশ্চয়ই চেনো। ও যদি সঙ্গে যায় তা হলে তোমার কি অসুবিধে হবে?”
একটু ভাবল এতোয়ারি। তারপরে মাথা নেড়ে না বলল।
বিকেলে চেম্বারে এসে বসতেই ছোট নার্স সামনে এসে বলল, “পুষিকে কি আপনি দেখা করতে বলেছেন স্যার?”
“পুষি? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার কাছে নয়, বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে বলো।”
“পুষি বলছে বড়বাবু নাকি ওকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।”
“ও। ডাকো ওকে।”
ছোট নার্স যাকে ঘরে নিয়ে এল, তার শুধু চেহারা নয়, হাঁটাচলাতেও চটক আছে। ছোট নার্স বলল “এর নাম পুষি।”
“এটাই কি তোমার ভাল নাম?”
“তাই তো ছেলেবেলা থেকে শুনেছি। চার্চের জন্য অবশ্য আর-একটা নাম ছিল, সে নাম বললে কেউ চিনতে পারবে না,” পুষি হাসল।
মেয়েটাকে ভাল করে দেখলেন ডাক্তারবাবু। বয়স আন্দাজ করা খুব কঠিন, তবে অন্য সব শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের মতো শরীরটাকে অবহেলায় ফেলে রাখে না। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন তোমাকে আজ ডাকা হয়েছে তা নিশ্চয়ই বড়বাবু বলেছেন?”
পুষি হাসল, “হ্যাঁ। বলেছেন অনেক দূরে রেলগাড়িতে চড়ে যে-দল যাবে, আমাকে সেই দলে থাকতে হবে। আর-একটা মেয়েও নাকি দলে থাকবে।”
“হ্যাঁ। আমরা দশ দিনের মধ্যে ফিরে আসব,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“আপনি যাবেন তো?”
“হ্যাঁ, যাব।”
“আমার যেতে খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু…” থেমে গেল পুষি।
ডাক্তারবাবু তাকালেন, কপালে ভাঁজ পড়ল।
“বলতে লজ্জা করছে…”
ডাক্তারবাবু তাকিয়ে থাকলেন, কথা বললেন না।
“এতদিন থাকব না,” চোখের কোণে তাকাল পুষি, “খরচ আছে। আপনারা কি সবাইকে শুধু শুধু বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন, না টাকাও দেবেন?”
“তোমার কথা তো আমি ম্যানেজার সাহেবকে বলব। আর কেউ তো টাকা চায়নি। অবশ্য এটাও সত্যি, সবাই বিনা পারিশ্রমিকে যাবে কেন! হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে এতোয়ারির পরিচয় আছে?”
“এতোয়ারি?”
“যে-মেয়েটি এখন এই হাসপাতালে কাজ করে।”
“ও। যে-মেয়েটার চোখের ওপরে বিরাট আব ছিল? হ্যাঁ, তাকে দেখেছি। কারও সঙ্গে মেশে না বলে শুনেছি। কেন?”
“এতোয়ারি দলের সঙ্গে যাচ্ছে। তুমি যদি যাও, তা হলে তোমরা দু’জন মেয়ে একসঙ্গে থাকবে!” ডাক্তারবাবু বললেন, “ও এখনও টাকার কথা বলেনি। তোমাকে যদি বড়সাহেব টাকা দেন, তা হলে ওকেও দেওয়া হবে।”
“কী করব বলুন? ওদের তো বাবা-দাদা-স্বামী আছে। আমার তো কেউ নেই। যত খরচ সব আমাকেই মেটাতে হয়,” পুষি হাসল।
“ঠিক আছে। তুমি কাল সকালে এসে খবর নিয়ে যেয়ো বড়সাহেব টাকা দিতে রাজি আছেন কি না । আর হ্যাঁ, একটু দাঁড়াও,” ডাক্তারবাবু এতোয়ারিকে ডেকে পাঠালেন। এতোয়ারি এল। মুখ নিচু করে দাঁড়াল।
ডাক্তারবাবু বললেন, “এতোয়ারি, এই হল পুষি। তুমি নিশ্চয়ই ওকে চেনো। আমাদের সঙ্গে ওর যাওয়ার কথা আছে।”
এতোয়ারি মাথা নাড়ল। পুষি বললে, “ও মা, তোমার কপালে একটা আব ছিল না? সেটা কোথায় গেল?”
এতোয়ারি মুখ তুলল, “ছিল, এখন নেই।”
“বাঃ, আব চলে যাওয়ার পর তোমার মুখ খুব সুন্দর হয়ে গেছে।”
শান্ত গলায় এতোয়ারি বলল, “ডাক্তারবাবু ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।”
“কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে বুঝি! অল্পবয়সে করলে ভাল জায়গায় বিয়ে হতে পারত। যার সঙ্গে বাপ-মা বিয়ে দিয়েছিল সে আছে না গেছে!”
“আমার জানা নেই।”
ডাক্তারবাবু দেখলেন পুষি ঠোঁট উলটে কাঁধ নাচাল। তার একটাই মানে, এতোয়ারিকে পুষির এখন পছন্দ হচ্ছে না। ডাক্তারবাবু বললেন, “পুষি, তুমি এখন যেতে পারো।”
বড়বাবু চারজনের জন্যে পঞ্চাশ টাকা বরাদ্দ করতে বড়সাহেবকে রাজি করালেন। ডাক্তারবাবুকে বললেন, “বড়সাহেবকে এই খাতে টাকা দিতে রাজি করাতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমি বলি কী, টাকাটার পাঁচ ভাগ করে এক ভাগ আপনিও নিন।”
মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু, “ওসব কথা থাক।”
“আর-একটা ভাল খবর আছে। পুষিকে বলেছি দশ দিনের জন্যে দশ টাকা দেওয়া হবে। তার বেশি বড়সাহেব পারবেন না। সে গুঁইগাই করেও শেষপর্যন্ত রাজি হল। তা হলে তৈরি হয়ে নিন। এই খামটা রাখুন। এতে সমস্ত টাকা রয়েছে। আপনারা কাল সকালেই রওনা হয়ে যান,” বড়বাবু বললেন।
সকাল হতেই ফ্যাক্টরির সামনে ভিড় জমতে লাগল। কুলিলাইনগুলো থেকে দলে দলে মানুষ এসেছে। যারা তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটে দেখতে যাচ্ছে, তাদের বিদায় জানাতে। তারা নিজেদের মধ্যে যেসব কথা বলছিল, তা সেইসব গ্রাম নিয়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের ছিল। তারা কেন, তাদের বাবা-কাকারাও সেই গ্রাম চোখে দেখেনি। শোনা কথার সঙ্গে কল্পনা মিশে গিয়ে গল্প ক্রমশ লম্বা হচ্ছিল।
স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারবাবু এলেন। সঙ্গে কাজের লোকের মাথায় একটা বেডিং আর সুটকেস। এতোয়ারি এবং তার মা একপাশে দাঁড়িয়ে। ফ্যাক্টরির লোকটির নাম কালু, সাহেবের বেয়ারার নাম সোমরা। দু’জনেই বেশ সেজেগুজে এসেছে। তাদের বউ-ছেলেমেয়েরা ঘিরে রেখেছে তাদের।
একটু পরে বড়সাহেব মেজ এবং ছোটসাহেবকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। বড়সাহেব ডাক্তারবাবুর সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, “গুড লাক। ওখানকার যত খারাপ সব এদের দেখাবে!”
গাড়ি এল। বাগানের গাড়ি। এই গাড়িতে সবাই দু’ঘণ্টা দূরে তিস্তা নদীর গায়ে গিয়ে নামবে। সেখান থেকে নৌকোয় ওপারে গিয়ে বাসে চেপে শিলিগুড়িতে পৌঁছে ট্রেন ধরবে।
বড়সাহেব বললেন, “ওরা চারজন কেন? আর-একজন মহিলার আসার কথা ছিল, সে কোথায়?”
ঠিক তখনই পুষিকে দেখা গেল দুলতে দুলতে আসছে। তার হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ। বড়সাহেবকে বড়বাবু ফিসফিস করে কিছু বললে তিনি পুষিকে দেখলেন।
চোখাচোখি হওয়া মাত্র অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল পুষি। দেখা গেল বিদায় জানাতে প্রত্যেকের আত্মীয়বন্ধুরা এলেও পুষির জন্যে কেউ আসেনি। ড্রাইভারের পাশের আসনে উঠে বসলেন ডাক্তারবাবু। বাকিরা পেছনের দু’সারি আসনে। বড়সাহেব বললেন, “ডক্টর, কোনও বড় সমস্যা হলেই লোকাল থানাকে জানালে, ওরা এখানকার থানাকে ওয়্যার করে জানালে, আমি খবর পেয়ে যাব। ও হো, আপনি এটা রাখুন।”
বড়সাহেবের নির্দেশে একটা থলি এগিয়ে দিল তাঁর বেয়ারা। বড়সাহেব বললেন, “এর মধ্যে ক্যামেরা আছে। সঙ্গে অনেক ছবি তোলার জন্যে ফিল্ম। ওখানকার মানুষের দারিদ্র্যের ছবি যতটা পারেন তুলে আনবেন।”
থলিটা নিয়ে মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু। বড়সাহেব বললেন, “ওয়েল, ভালভাবে সব কাজ শেষ করে ফিরে আসুন। মনে রাখবেন, ওখানকার দু’জন মানুষ, অবশ্যই স্বামী-স্ত্রীকে যেমন করে হোক এখানে নিয়ে আসবেন। ওদের মুখে না-শুনলে এখানকার মানুষ বিশ্বাস করবে না। ব্যাপারটা ভুলে যাবেন না যেন।”
গাড়ির চাকা গড়াতে আরম্ভ করলেই অনেকগুলো নারীকণ্ঠ চিৎকার করে কেঁদে উঠল। একটু পরে পুরুষকণ্ঠ সঙ্গে যোগ দিল। কান্না যে সংক্রামক, তা আর-একবার প্রমাণিত হল। গাড়ির পেছন পেছন শ্রমিকেরা প্রথমে হাঁটতে, পরে দৌড়োতে লাগল সবাই গাড়ির পেছন পেছন। একসময় গাড়ির গতি বেড়ে যেতে তারা পেছনে পড়ে রইল।
জলপাইগুড়ি আর বার্নিশের মধ্যে যে-বিশাল তিস্তা নদী, তার ওপর নৌকো যাতায়াত করছে। চা-বাগান থেকে সেখানে পৌঁছতে প্রায় দু’ঘণ্টা সময় লাগল। ডাক্তারবাবু লক্ষ করছিলেন, এই পথটুকু পেছনে বসা চারজন মানুষ কোনও শব্দ করেনি। সবাই অদ্ভুত চোখে দু’পাশের গাছপালা, গ্রামের ঘরবাড়ি দেখে গিয়েছে।
ডাক্তারবাবু গাড়ি থেকে নেমে ওদের ডাকলেন। কালু বলল, “আমি যাব না ডাকদারসাব। আমার খুব ভয় করছে।”
“ভয় করছে? কেন? আমরা তো দশদিন পরে ফিরে আসব।”
ঠিক তখনই গাড়ি থেকে নেমে হাসল পুষি, “আমার তো ভয় দূরের কথা, খুব মজা লাগছে। জীবনে কখনও ট্রেনে করে কোথাও যাইনি, আজ যেতে পারব,” হাত তুলে কালুকে বলল, “তুমি কী! বাচ্চা ছেলে নাকি? নেমে এসো।”
নৌকায় চেপে নদী পেরিয়ে আসার পর সোমরা বলল, “এতবড় নদী আমি কখনও দেখিনি। নৌকোতেও আজ প্রথম চড়লাম।”
অন্যরা কথা না-বললেও মুখ দেখে মনে হচ্ছিল তারাও একইরকম ভাবছে। নদীর এ পাশে তিনটে ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল। প্রথম ড্রাইভার সাগ্রহে রাজি হল শিলিগুড়ি স্টেশনে ওদের পৌঁছে দিতে। ভাড়া নিয়ে একটুও দরাদরি করল না। অনেকদিন পরে জলপাইগুড়ি শহরের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ডাক্তারবাবুর মনে হল, স্ত্রী সঙ্গে না-থাকলে চা-বাগানে থাকা সম্ভব হত না। হঠাৎ পেছন থেকে পুষির চিৎকার ভেসে এল, “রোককে, রোককে, জারা রোককে।”
ড্রাইভার ঝটপট গাড়ি থামালে পুষি জানলা দিয়ে মুখ বের করে কিছু দেখে বলল, “কী সুন্দর, কী সুন্দর!”
এতোয়ারি পুষির মাথার পাশ দিয়ে দেখতে পেল রাস্তার ধারে একটা খুব সুন্দরী মেয়ের ছবি টাঙানো রয়েছে। এত সুন্দরীকে সামনাসামনি দূরের কথা, ছবিতেও কখনও দেখেনি সে।
ডাক্তারবাবু গম্ভীর গলায় ড্রাইভারকে বললেন, “চলো।”
গাড়ি চলতে শুরু করলে আবার বসে পড়ে পুষি জিজ্ঞাসা করল, “বাব্বা! এত সুন্দরী মেয়ে সত্যি সত্যি হয়?”
“ছবিটা আমি দেখিনি, বলতে পারব না,” ডাক্তারবাবু বললেন।
শিলিগুড়ির টাউন স্টেশনটি বেশ ছোট। অবশ্য সারা দিনে হাতে গোনা কয়েকটি ট্রেন এই স্টেশনে এসে দাঁড়ায়। ভাড়ার গাড়ি ছেড়ে দিয়ে সবাইকে নিয়ে একটা অপেক্ষাগৃহে ঢুকে ডাক্তারবাবু বললেন, “তোমরা এখানেই অপেক্ষা করো। ওপাশে বাথরুম আছে। ছেলেরা আমার সঙ্গে এসো।”
এখন দুপুর প্রায় শেষ। সামনের দোকান থেকে চারজনের জন্যে খাবার কিনে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে, ডাক্তারবাবু স্টেশন মাস্টারের ঘরে ঢুকে দেখলেন, ভদ্রলোক বাঙালি। আলাপ হল।
সব শুনে ভদ্রলোক বললেন, “আমি এতদিন এখানে আছি, কাউকে আপনার মতো উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা করতে দেখিনি। আপনি কি ওদের সঙ্গে যাবেন, না আলাদা কোচে যেতে চান?”
“ওদের আলাদা ছাড়া উচিত হবে না। ওই ক্লাসে আমার তেমন অসুবিধে হবে না। অন্য কোচে গেলে চিন্তায় থাকব,” ডাক্তারবাবু বললেন। স্টেশন মাস্টার টাকা নিয়ে তাঁর কর্মচারীকে দিয়ে টিকিট করিয়ে আনলেন। বললেন, “ও হ্যাঁ, দু’মিনিট বাঁ দিকে গেলে ভাল খাবারের দোকান পাবেন। বললে ওরা পথের জন্যে প্যাক করে দেবে।”
টিকিট নিয়ে ওয়েটিং রুমে এসে ডাক্তারবাবু দেখলেন, একদিকের মেঝের ওপর বসে আছে এতোয়ারি। উলটোদিকে কালু ও সোমরা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। পুষিকে না-দেখতে পেয়ে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “পুষি কোথায়?”
ছেলেরা তাকাল। কালু হাত তুলে দরজা দেখিয়ে বলল, “বাইরে চলে গেল।”
ডাক্তারবাবু আবার ঘরের বাইরে এসে দু’পাশে তাকিয়েও মেয়েটাকে দেখতে পেলেন না। যেরকমই জীবনযাপন করুক, পুষি যদি হারিয়ে যায় তা হলে তাঁকেই জবাব দিতে হবে।
খানিকটা এপাশ-ওপাশ ঘোরার পর ডাক্তারবাবু পুষিকে দেখতে পেলেন। একটা সিগারেটের দোকানের সামনে দুটো ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হেসে কথা বলছে। তিনি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, “পুষি!”
ঘাড় ঘুরিয়ে পুষি তাঁকে দেখে একটা হাত নাড়ল। তখনই ডাক্তারবাবু দেখলেন, ওর অন্য হাতে সিগারেট জ্বলছে। শ্রমিক মেয়েরা বিশেষ করে যাদের একটু বয়স হয়েছে, তাদের বিড়ি খাওয়ার অভ্যেস আছে। হাট থেকে তামাক পাতা আর তামাক কিনে বাড়িতে বিড়ি বানিয়ে নিলে খুব কম খরচ হয়। কিন্তু পুষির হাতে সিগারেটটা খুব চোখে লাগল।
ছেলেদের কিছু বলে পুষি বেশ কায়দা করে সিগারেট নিভিয়ে হেলতে দুলতে কাছে এল, “একটু দেখতে না-পেয়ে মাথাখারাপ হয়ে গেল নাকি! বলুন কী বলছেন।”
“তোমরা চারজন একসঙ্গে থাকবে, একা কোথাও যাবে না। এটা তো চা-বাগান নয়। বদমাশ লোকজন চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে!”
“ও মা! তাই?” হাসল পুষি।
“যাও, ওদের কাছে যাও।”
“আচ্ছা আপনি বদমাশ লোকদের চেনেন?” তাকাল পুষি।
“তাদের দেখে বোঝা যায় না, ব্যবহারে প্রকাশ পায়।”
“ও! কিন্তু ওই যাদের এনেছেন, তাদের সঙ্গে থাকতে আমার একটুও ভাল লাগছে না। বিচ্ছিরি,” ঠোঁট বেঁকাল পুষি।
“মানে?” অবাক হলেন ডাক্তারবাবু।
“সেই চা-বাগান ছাড়ার পর কেউ কথা না-বলে মুখ ভেড়ার মতো করে বসে আছে। কথা বললেও উত্তর দেয়নি।”
“তুমি এতোয়ারির সঙ্গে কথা বলতে পারো!”
“এতোয়ারি? সে তো সতী-সাবিত্রী! আমার সঙ্গে কথা বললে যদি তার চরিত্র খারাপ হয়ে যায় এই ভয়ে কুঁকড়ে আছে,” খিলখিলিয়ে হেসে উঠল পুষি।
“তুমি তো খুব বাচাল! যাও, ওদের সঙ্গে বসে থাকো। খবরদার একা একা কোথাও যাবে না। এটা শহর, চা-বাগান নয়। এখানকার মানুষেরা সবাই সরল নয়। যাও!” শেষ শব্দটা বেশ জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন ডাক্তারবাবু।
অবাক হয়ে একবার ডাক্তারবাবুকে দেখে স্টেশনের ঘরের দিকে চলে গেল পুষি। ডাক্তারবাবু লোকগুলোর মুখ দেখে বুঝলেন বেশ হতাশ হয়েছে।
কাঠের বেঞ্চ, যাত্রী কম থাকায় তাতেই কেউ কেউ শুয়ে পড়েছে। যতই সংকুচিত হয়ে থাকুক, মানুষ দেখেই শেখে। ট্রেন ছাড়ার পর খাওয়া সেরে সোমরা এবং কালু সাহসী হল। ওরা ওপাশের একটা খালি বেঞ্চে দু’পাশে পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। জানলার ধারে বসে ছিল পুষি। তার পাশে এতোয়ারি। ট্রেন চলছে সাধারণ গতিতে। ডাক্তারবাবু ওদের উলটোদিকে বসে আদিবাসীদের ইতিহাস সংক্রান্ত একটা বই পড়ছিলেন।
হঠাৎ পুষি চিৎকার করে এক হাতে চোখ চেপে এপাশে মুখ ফেরাল।
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে?”
বাঁ হাতে একটা চোখ ঢেকে অন্য খোলা চোখে তাকাল পুষি। বলল, “উঃ, কী একটা ঢুকল চোখে। খুব জ্বলছে ওঃ মাগো?”
“ধোঁয়ার সঙ্গে ইঞ্জিনের কয়লার কুচি উড়ে আসে। তারই গুঁড়ো হয়তো ঢুকেছে। এতোয়ারি ওর চোখ থেকে গুঁড়োটা এই রুমালের একটা কোণ দিয়ে তুলে বাইরে বের করে দাও। অস্বস্তি চলে যাবে,” ডাক্তারবাবু বললেন।
একটু ইতস্তত করল এতোয়ারি। তারপর ডাক্তারবাবুর এগিয়ে দেওয়া রুমাল নিয়ে পুষির পাশে বসে নিচু গলায় বলল, “চোখ খুলে তাকাও।”
পুষি চোখ বড় করল। করে আঃ, আঃ বলতে লাগল।
রুমালের কোনা সুচলো করে চোখের কোণ থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কয়লার কুচি বের করে এনে এতোয়ারি বলল, “বেরিয়ে গেছে।”
পুষি তিন-চারবার চোখের পাতা ফেলে বন্ধ করে চিৎকার করল, “ওঃ, এখনও কচকচ করছে। বের হয়নি।”
এতোয়ারি বলল, “দেখি!” সে আবার ভাল করে চোখ দেখে নিয়ে বলল, “আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”
“কিন্তু আমার চোখে ব্যথা করছে!” কাঁদো কাঁদো হল পুষি।
ডাক্তারবাবু দেখলেন, এতোয়ারি তার আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে রুমালটা এগিয়ে দিল। সেটা নিয়ে বাধ্য হয়ে ডাক্তারবাবু পুষির সামনে গিয়ে বললেন, “দেখি চোখটা, মুখ ওপরে তোলো।”
আদুরে আদুরে ভঙ্গিতে পুষি মুখ তুলে দু’চোখই বন্ধ করে রাখল। চিবুকে আঙুল দিয়ে মুখটা তুলে ডাক্তারবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “চোখ খোলো।”
সঙ্গে সঙ্গে দুটো চোখই খুলল পুষি। ডাক্তারবাবু যখন পরীক্ষা করছিলেন, তখন লক্ষ করলেন পুষি যে-চোখে ময়লা পড়েনি, সেই চোখ বারবার খুলছে আর বন্ধ করছে। দেখা হয়ে গেলে ডাক্তারবাবু বললেন, “ওপাশের ছোট্ট দরজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে ভাল করে চোখ ধুয়ে এসো। ময়লা যা ছিল বেরিয়ে গেছে। যাও।”
যে-চোখে ময়লা পড়েছিল সেই চোখের পাতা কয়েকবার খোলা বন্ধ করে একগাল হাসল পুষি, “নাঃ, চলে গেছে। আর ধুতে হবে না। আপনি হাত দিলেই সব অসুখ সেরে যায়।”
দু’-দু’বার ট্রেন পালটে ওরা যখন মহুয়ামিলন স্টেশনে পৌঁছল, তখন দুটো দিন কেটে গিয়ে তৃতীয় দিনের ভোর এসেছে। ওরা পাঁচজন ছাড়া খুব অল্প যাত্রী ট্রেন থেকে নামল, উঠল। টিকিট দেখিয়ে বাইরে আসার সময় ইউনিফর্ম পরা একটি লোককে দেখে ডাক্তারবাবু বুঝতে পারলেন ইনি স্টেশন মাস্টার। এগিয়ে গিয়ে বললেন, “গুড মর্নিং। আমি ডক্টর মুখার্জি। নর্থ বেঙ্গল থেকে আসছি। আপনি…”
“স্টেশন মাস্টার অফ দিস স্টেশন,” বলতে বলতে ভদ্রলোক গর্বের হাসি হাসলেন।
“আপনার কাছে একটু সাহায্য চাইছি।”
“ইয়েস!” ভদ্রলোক বোধহয় বাংলা বলতে চাইছিলেন না।
“কাছাকাছি থাকা-খাওয়ার হোটেল কোথায় আছে?”
“নো হোটেল।”
“সর্বনাশ!”
“হোয়্যার টু গো?”
“আমরা এখানকার গ্রামগুলো ঘুরে দেখতে চাই।”
“ও! দেন ইউ আর গভর্নমেন্ট অফিসার। ইউ ইন মাই স্টেশন। দেয়ার ইজ় আ গেস্টরুম। দে আর উইথ ইউ? দেন দে ক্যান স্টে ইন দ্য প্লাটফর্ম। ফুড ইজ় নো প্রবলেম। মাই নেম ইজ় মিস্টার এস কে দে,” ভদ্রলোক হেলতে-দুলতে চলে গেলেন।
খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে একটা বুড়ো লোক হাফপ্যান্ট আর চাদর মুড়ি দিয়ে কথা শুনছিল। স্টেশন মাস্টার চলে গেলে এগিয়ে এল সে। কপালে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, “আপনারা যদি থাকা-খাওয়ার জায়গা চান, তা হলে দু’মাইল দূরে মরা সাহেবের বাংলোতে চলে যান।”
“মরা সাহেবের বাংলো মানে?”
“ওখানে একজন বুড়ো সাহেব থাকতেন। অনেকদিন হল মরে গিয়েছেন। এখন যে-বুড়িটা থাকে, তাকে সবাই ওই মরা সাহেবের বউ বলে। সঙ্গে মেয়েছেলে আছে দেখলে বুড়ি হয়তো জায়গা দিতে পারে। মুশকিল হল সাহেবের সঙ্গে থাকতে থাকতে বুড়ি আর মদেশিয়া ভাষায় কথা বলে না। বাইরের লোকের সঙ্গে শুধু ইংরেজিতে কথা বলে। আপনারা ওখানে যেতে পারেন।”
কথাগুলো মনে ধরল ডাক্তারবাবুর! লোকটির কাছে ঠিকঠাক হদিশ জেনে নিয়ে চারজনকে বললেন, তাঁকে অনুসরণ করতে।
স্টেশন ছাড়াতেই যেসব গাছ নজরে এল, তাদের উত্তরবাংলার চা-বাগান অঞ্চলে দেখা যায় না। সুরকির রাস্তা। তার ওপর গাড়ির চাকার দাগ রয়েছে। কিন্তু দু’পাশে কোনও বাড়িঘর নেই।
স্টেশনের রাস্তাটা একটা বড় রাস্তায় মিশে যেতে ডান দিকে ঘুরলেন ডাক্তারবাবু। লোকটা এই দিক দিয়েই যেতে বলেছিল। এখন পরিচিত গাছ দেখা যাচ্ছে। বেশির ভাগই আমগাছ। দূরে দূরে কয়েকটা খড়ের বাড়ি, কিন্তু লোকজন নজরে পড়ছে না। রাস্তাটা বাঁক নিতেই যে-বাড়িটা চোখে পড়ল, সেটা যে মরা সাহেবের বাংলো তাতে ডাক্তারবাবুর আর সন্দেহ থাকল না।
দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাড়িটাকে বেশ যত্ন করে তৈরি করা হয়েছিল।
মানুষসমান পাঁচিলে চারপাশ ঘেরা দোতলা বাড়িটার কাছাকাছি অন্য কোনও বাড়ি নেই। ডাক্তারবাবু তাঁর দল নিয়ে বাড়ির বন্ধ লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভেতরে খানিকটা ঘাসের জমি, তারপর বারান্দা পেরিয়ে ঘরগুলো। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ, বারান্দায় কেউ নেই।
ডাক্তারবাবু ইংরেজিতে চিৎকার করে জানতে চাইলেন ভেতরে কেউ আছে কি না! দ্বিতীয়বারে নীচের দরজা খুলে কুঁজো চেহারার প্রৌঢ় বেরিয়ে ওঁদের দেখে বেশ অবাক হয়ে তাকাল। ডাক্তারবাবু বললেন, “ভেতরে আসতে পারি?”
“আপনি কে?” হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল লোকটা।
“আমি একজন ডক্টর।”
“ডক্টর? আপনি চিকিৎসা করেন?” লোকটি গলা তুলল।
“হ্যাঁ।”
সঙ্গে সঙ্গে নীচে নেমে গেটের তালা খুলে লোকটা বলল, “ম্যাডামের শরীর খুব খারাপ, দয়া করে দেখে বলবেন, কী করতে হবে!”
“চলুন।”
“এরা?” বাকিদের দিকে তাকাল লোকটা।
“ওরা আমার সঙ্গে এসেছে। চলুন।”
ডাক্তারবাবু সঙ্গীদের বললেন, “তোমরা বারান্দায় অপেক্ষা করো,” নিজের সুটকেস থেকে একটা ব্যাগ বের করে এতোয়ারির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে এসো। ঝোলাটাকে ওখানেই রেখে দাও। তোমরা অপেক্ষা করো।”
পুষি ঠোঁট ওলটাল। বুঝিয়ে দিল এতোয়ারিকে গুরুত্ব দেওয়া তার পছন্দ হয়নি। প্রৌঢ় ওদের দোতলায় নিয়ে গিয়ে একটু অপেক্ষা করতে বলে একটা ঘরে ঢুকে গেল। মিনিট তিনেক পরে প্রৌঢ়র সঙ্গে একজন প্রৌঢ়া বেরিয়ে এলে, প্রৌঢ় বলল, “ইনি ডাগতারবাবু, ভেতরে নিয়ে যা।”
প্রৌঢ়া ইশারা করে ভেতরে ঢুকলে ওঁরা পা বাড়ালেন। ডাক্তারবাবু দেখলেন, সুন্দর গদিওয়ালা খাটে একটি মহিলা শুয়ে আছেন। তাঁর মাথার চুল ধবধবে সাদা। পরনে পা ঢাকা স্কার্ট। বুকের ওপর চাদর চাপা দেওয়া।
মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। বললেন, “গুড মর্নিং, আর ইউ ডক্টর?”
“ইয়েস!” কাছে গিয়ে মহিলাকে ভাল করে দেখে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কী অসুবিধে হচ্ছে?”
“সারা শরীরে ব্যথা, মাঝে মাঝে জ্বর আসছে। আমার বয়স এখন বাহাত্তর, কিন্তু আরও আট বছর আমি বাঁচতে চাই,” মহিলা বললেন।
হাত বাড়িয়ে মহিলার কবজি ধরে নাড়ি পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু বুঝলেন, গতি সামান্য বেশি। হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, “আশি কেন? তার বেশি?”
ডাক্তারবাবুকে থামিয়ে দিয়ে মহিলা বললেন, “আমার স্বামী আশিতে মারা গিয়েছেন। ওয়েল, এখানে একজন হোমিওপ্যাথ ছাড়া কোনও ডাক্তার নেই। আমার স্বামী ওর ওষুধ পছন্দ করতেন না। মুশকিল হল এখানে কোনও অ্যালোপ্যাথি ওষুধের দোকান নেই। তুমি আমার চিকিৎসা কীভাবে করবে?”
ডাক্তারবাবু বুঝলেন মহিলা কথা বলতে ভালবাসেন। তাই উত্তর না-দিয়ে যা যা পরীক্ষা করার, তা করে কিছু প্রশ্ন করলেন। উত্তর পেয়ে বললেন, “আমার সঙ্গে সামান্য কিছু ওষুধ আছে, যা ইমার্জেন্সিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি রাঁচি থেকে ওষুধ আনানো যায়, তা হলে খুব ভাল হয়।”
ব্যাগ খুলে একটা শিশি আর ট্যাবলেট বের করে তিনি এতোয়ারিকে বললেন, “দু’চামচ জলের সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে দাও। দশ মিনিট পরে ট্যাবলেটটা দেবে। ম্যাডাম, যদি এই ওষুধে কাজ হয় তা হলে খুব ভাল, তা না হলে ওষুধ আনাতে হবে।”
ডাক্তারবাবু দেখলেন, মহিলা শুয়ে শুয়ে হাতজোড় করে চোখ বুজে বিড়বিড় করে, সম্ভবত প্রার্থনা করলেন।
প্রৌঢ়া মহিলার সহযোগিতায় গ্লাসের জলের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে এতোয়ারি সযত্নে খাইয়ে দেওয়ার পর বৃদ্ধা বললেন, “তোমরা নীচে গিয়ে অপেক্ষা করো। এই মেয়েটি আমার কাছে থাক।”
নীচে তিনটে ঘর খুলে দিল প্রৌঢ়া নেমে এসে। বলল, “আজকের দিনটা আপনি, আপনারা এখানে থাকতে পারেন। চার ক্রোশ দূরে একটা বাজার আছে। সেখানকার ধর্মশালায় অনেকে থাকেন। কাল সেখানে চলে যেতে পারেন।”
“অনেক ধন্যবাদ,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ওই মেয়েটি বলল, আপনারা অনেক দূর থেকে এসেছেন। সেখানে নাকি চা গাছের বাগান আছে। এখানে নাকি মেয়েটার পূর্বপুরুষ থাকত। তারা কোথায় থাকত তাই দেখতে এসেছেন। কথাটা কি সত্যি?” প্রৌঢ়া জিজ্ঞাসা করল।
“হ্যাঁ। ঠিকই শুনেছেন,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“আপনার সঙ্গের লোকদুটো কি মেয়েদের স্বামী?”
“না না। ওরা একই চা-বাগানে থাকে।”
“ওদেরও পুর্বপুরুষ এই দেশে থাকত?”
“হ্যাঁ।”
প্রৌঢ়া চলে গেলে ডাক্তারবাবু পুরুষদের এবং মেয়েদের ঘর আলাদা করে দিলেন। একটু পরে যে-লোকটি প্রথম দরজা খুলেছিল, সে দুটো প্লেট নিয়ে নীচে এল। একটা প্লেটে অনেকগুলো মোটা রুটি আর অন্য প্লেটে গুড় রয়েছে। লোকটা বলল, “ঘরেই ছোট প্লেট আছে, তাতে খাবার ভাগ করে নিন। আর হ্যাঁ, ওপরে যে-মেয়েটা আছে, সে ওপরেই খেয়ে নেবে।”
প্রৌঢ়া চলে গেলে ডাক্তারবাবু পুষিকে ডেকে বললেন, অর্ধেক রুটি আর অর্ধেক গুড় একটা প্লেটে ঢেলে পাশের ঘরে ছেলেদের দিয়ে আসতে। এইসময় প্রৌঢ়া আবার ফিরে এল। বলল, “বাড়ির পেছনে কুয়ো আছে। তার জলে স্নান করা, খাওয়া, কাপড় কাচা করা যাবে।’ তারপর পুষিকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি রাঁধতে পারো?”
পুষি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না বলে জানাল, “এতোয়ারি, মানে যে-মেয়েটি ওপরে আছে, সে খুব ভাল রাঁধতে পারে।”
“তা হলে ঠিক আছে,” প্রৌঢ়া চলে গেল।
অবাক হয়ে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এতোয়ারির রান্না তুমি কোথায় খেয়েছ? তোমার সঙ্গে পরিচয়ই ছিল না!”
“না থাক, দেখে তো বোঝা যায়,” হাসল পুষি, “আমার আবার রান্নাবান্না একদম ভাল লাগে না। আচ্ছা, আমরা বাইরে যাব না?”
“এতটা পথ ট্রেনে চেপে এসেছ, স্নান-খাওয়া সেরে বিশ্রাম করে নাও। তারপর বাইরে যাবে,” ডাক্তারবাবু বললেন, “ওদের ওই প্লেট দিয়ে বলে এসো বাড়ির পেছনের পুকুরের জল ব্যবহার করতে পারে।”
মুখ ভ্যাটকালেও প্লেট তুলে বেরিয়ে গেল পুষি।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার আগে প্রৌঢ়া এসে ডাক্তারবাবুকে ডেকে বৃদ্ধার কাছে নিয়ে গেল। বৃদ্ধাকে দেখার আগেই এতোয়ারির ওপর চোখ গেল। বেশ অবাক হলেন তিনি। এরই মধ্যে স্নান সেরে নেওয়ায় অনেক ঝকঝকে দেখাচ্ছে ওকে। কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়ছে ওর পরনের পোশাক। আসার সময় যা পরে এসেছিল, তা এখন ওর অঙ্গে নেই। যদিও পুরনো কিন্তু বেশ ধবধবে সাদা পায়ের পাতার কাছাকাছি ঢাকা স্কার্ট পরে আছে এতোয়ারি। চোখাচোখি হতে যেন লজ্জা পেল সে।
ডাক্তারবাবুকে দেখে উঠে বসলেন বৃদ্ধা, “থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর। তিনদিন ধরে খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। এখন আপনার দেওয়া ওষুধ খেয়ে খানিকটা আরাম পাচ্ছি। আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাব জানি না।”
“আপনি আপনার হাতটা একবার দিন তো!” পাশে বসে ডাক্তারবাবু বৃদ্ধার নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, “আপনার হয়তো একটু আরাম লাগছে, কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আরও একটু সময় লাগবে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রৌঢ়া জিজ্ঞাসা করল, “কী খেতে দেব?”
“হালকা খাবার, যা সহজে হজম করতে পারবেন। এতোয়ারি হাসপাতালে কাজ করে, ওকে জিজ্ঞাসা করলে ঠিক বলে দেবে। এতোয়ারি, দুপুরের খাওয়ার পর ওঁকে সকালের ওষুধটা আবার দিয়ে দিয়ো,” ডাক্তারবাবুর এবার প্রৌঢ়াকে বললেন, “ওঁর মাথা ভাল করে ধুয়ে দিন। এমন করে মুছিয়ে দেবেন যেন চুলে জল না-থাকে। ভেজা গামছা দিয়ে শরীর মুছিয়ে দেবেন।”
প্রৌঢ়া মাথা নাড়লে ডাক্তারবাবু বললেন, “আপনারা এখানে একটু দূরে যাতায়াত করেন কীভাবে?”
“গোরুর গাড়িতে, ঘোড়াও ভাড়া পাওয়া যায়,” বৃদ্ধা বললেন, “আপনি কোথায় যেতে চান তা ওদের বলুন, ব্যবস্থা করে দেবে।”
“আমরা বাজারে যাব। ওখানকার ধর্মশালায় যদি জায়গা পাওয়া যায় তার চেষ্টা করব,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“সেটা কাল করলেও তো হবে। আজ এখন খাওয়াদাওয়া করুন,” বৃদ্ধা চোখ বন্ধ করলেন।
পুরুষ দু’জনকে তাদের ঘরে খাবার দেওয়া হল। রুটি, সবজি আর ডালের সঙ্গে ডিমসেদ্ধ। পুষি খাবার নিয়ে সামনে বসে বলল, “আমি তো রান্না জানি না। কিন্তু ওই মেয়েটার চেয়ে ভাল রাঁধতে পারতাম।”
ডাক্তারবাবুর খিদে পেয়েছিল, চুপচাপ খেয়ে নিলেন।
Chapter - 5
৫.
রোদ একটু পড়লে কালু ও সোমরাকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তারবাবু যখন বেরোচ্ছিলেন, তখন পুষি সঙ্গ নিল, “আমি কি ঘরে বসে থাকতে এতদূর এসেছি? আমিও আপনার সঙ্গে জায়গাটা দেখতে যাব।”
ডাক্তারবাবু পুষির কথাটা উপেক্ষা করলেন। মেয়েটি হয়তো ইচ্ছে করে ‘আপনাদের সঙ্গে’ না-বলে ‘আপনার সঙ্গে’ বলেনি। এ নিয়ে কথা বললে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি তিনজনকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। বৃদ্ধা যেভাবে এতোয়ারিকে আঁকড়ে ধরেছেন, তাতে এখন ওকে নিয়ে আসা ঠিক হত না।
এখন বিকেল হয়ে এলেও রোদের তেজ মরেনি। রাস্তায় মানুষ নেই। রোদ্দুরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ পুষি চেঁচিয়ে আঙুল তুলে পেছন দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ডাক্তারবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, একটা এক-ঘোড়ার গাড়ি ধীরে-ধীরে আসছে। ওঁরা অপেক্ষা করলেন গাড়িটার জন্যে। সামনে এলে হাত তুলে থামিয়ে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি আমাদের নিয়ে একটু ঘুরে জায়গাটাকে দেখিয়ে দেবে? এর জন্যে যা ভাড়া চাও আমরা যদি দিতে পারি নিশ্চয়ই দেব।”
লোকটা মাথা নাড়ল। তারপর যে-ভাষায় কথা বলল, তা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল পুষি। তার মুখ থেকে অনর্গল ওই ভাষায় কথা বেরিয়ে আসতে লাগল। ঘোড়ার গাড়ির চালক বেশ অবাক হয়ে গেল। তারপর মাথা নেড়ে ডাক্তারবাবুকে ইশারা করল উঠে বসতে।
ডাক্তারবাবু চালকের পেছনের আসনে উঠে বসলেন। দু’জন পুরুষ পেছনের দাঁড়ানোর জায়গায় উঠে দাঁড়াল কিন্তু পুষি পাদানিতে পা রেখে উঠে সামনের চালকের পাশে বসে পড়ল। তার মুখ থেকে কথা যেন উপচে পড়ছিল। দীর্ঘকাল একসঙ্গে থাকার কারণে চা-বাগানের মুন্ডা, ওরাওঁ, মদেশিয়া শ্রমিকদের মুখের ভাষা ধীরে ধীরে অনেকটা মিলমিশ হয়েছে। ঘোড়ার গাড়ির চালকের ভাষা তা থেকে কিছুটা আলাদা হলেও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। পুষি একটু চেষ্টা করেই সেই ভাষায় কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু ডাক্তারবাবু লক্ষ করলেন চালক মাঝে-মাঝেই পুষিকে আড়চোখে দেখছে। ও যে খুব বিস্মিত তাতে সন্দেহ নেই।
বেশির ভাগই শুকনো মাঠ, তারপর নদীটাকে দেখা গেল। কাছে গিয়ে বোঝা গেল ওটা নদী নয়, কোথাও নিশ্চয়ই নদী রয়েছে, সেখান থেকে খাল কেটে জলের ধারা আনা হয়েছে। জলে স্রোত আছে। কিছু লোক সেই জল যাতে জমির মাটি ভেজাতে পারে, তার ব্যবস্থা করছে। লোকটার সঙ্গে কথা বলে পুষি মুখ ফিরিয়ে বলল, “এই জল নদী থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে দু’পাশের জমিতে বছরে অন্তত দু’বার ফসল ফলাতে পারে। কী ভাল, তাই না? এখানে আমাদের পূর্বপুরুষরা থাকত। আমার তো মনে হচ্ছে এখানেই থেকে যাই।”
ডাক্তারবাবু কথা বললেন না। এই আবেগ যে ক্ষণস্থায়ী, তা তিনি জানেন।
অনেকটা ঘোরার পর যেখানে ঘোড়ার গাড়ি এল, সেখানে চালাঘরগুলো প্রায় শূন্য। কয়েকটি মানুষ খালিগায়ে নিম্নাঙ্গে কাপড় জড়িয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। ডাক্তারবাবু বললেন, “ধর্মশালা কোথায়?”
চালক একটি চালাঘরের সামনে ঘোড়া থামাল। নিচু গলায় পুষিকে বলল, “এই হল ধর্মশালা। এখন কেউ নেই বলে মনে হয়।”
ডাক্তারবাবু চারপাশ দেখে আবার গাড়ি চালাতে বললেন। পুষি জিজ্ঞাসা করল, “এবার কোনদিকে যেতে বলব?”
“গ্রামের দিকে যেতে বলো।”
পুষি পাশ ফিরে চালককে কথাটা বললে সে অবাক হল। পুষি হাসল, “আমরা শুধু একটু ঘুরে বেড়াব।”
কপালে ভাঁজ পড়ল লোকটার। পুষির কথা পরিষ্কার বুঝতে পারছিল না সে। পুষি ততক্ষণে রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়েছে। চালক পেছন ফিরে ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে ভঙ্গিতে বোঝাল সে পুষির কথা বুঝতে পারছে না। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি মদেশিয়া?”
দ্রুত মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল চালক। তারপর বলল, “আমি একটু একটু হিন্দি বুঝতে পারি। এই মেয়েটা যখন হিন্দিতে কথা বলছিল তখন বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, এখন যা বলল তা বুঝতে পারলাম না।”
“ও বলল তোমাদের গ্রাম দেখতে চায়,” হিন্দিতে থেমে থেমে বললেন ডাক্তারবাবু। মাথা নেড়ে সামনের দিকে ফিরে ঘোড়া ছোটাল চালক। ডাক্তারবাবুর মনে পড়ল, কোথায় যেন পড়েছিলেন, মানুষ যখন তার জন্মস্থান ত্যাগ করে পরবাসে যেতে বাধ্য হয়, তখন ধীরে ধীরে নতুন দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসে রপ্ত হয়ে ওঠে। পরের প্রজন্ম পূর্বপুরুষের ভাষা একটু একটু করে ভুলতে শুরু করে। তার পরের প্রজন্ম নতুন দেশের ভাষায় স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠে, তবে পূর্বপুরুষদের ভাষার কিছু শব্দ তাদের বলা বাক্যে থেকে যায়, অজান্তেই মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে। এই চালক লোকটি এবং তার আত্মীয়রা এখন যে-ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষায় পুষির পূর্বপুরুষরা কোনও এককালে কথা বলত। পুষি হয়তো বাবার কাছ থেকে শোনা দু’-তিনটি শব্দ বলে চালককে বিস্মিত করেছে। অথবা এই ঘোড়ার গাড়ি চালানোর সুবাদে চালক ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতে কোনওরকমে পারছে।
অনেকটা খোলা জমি পার হওয়ার পর দূরে বেশ কিছু একতলা চালাঘর দেখা গেল। চালক তার হাতের চাবুক উঁচিয়ে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, “গ্রাম।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “আমরা ওই গ্রামে যাব।”
গাড়ি এগিয়ে চলল। সামনে চাষের খেত। তারপর মাঠের ধার ঘেঁষে মাটির দেওয়াল, খড়ের ছাউনি দেওয়া একতলা ঘরগুলোর সামনে বাচ্চারা খেলা করছে। ডাক্তারবাবুর অনুরোধে গাড়ি দাঁড়াল। ডাক্তারবাবু নীচে নামতেই পুষিও লাফিয়ে নামল। বাকি দু’জন গাড়ির পেছনে যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রইল। ইশারায় চালককে নীচে নামতে বলে বাচ্চাদের দিকে এগোলেন ডাক্তারবাবু। ততক্ষণে বাচ্চারা এক জায়গায় জড়ো হয়ে অবাক চোখে আগন্তুকদের দেখছে। সম্ভবত এমন অভিজ্ঞতা আগে ওদের হয়নি। আরও একটু এগোতেই বাচ্চারা চিৎকার করতে করতে যে যার ঘরের দিকে ছুটল। তারপর অনেক মানুষ বেরিয়ে এল সেই সব ঘর থেকে। প্রত্যেকেই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে চালককে কিছু জিজ্ঞাসা করল। প্রশ্নের কিছু শব্দ পরিচিত মনে হলেও সবগুলো নয়। তবে ডাক্তারবাবু বুঝলেন। চালককে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তারা কারা, কী কারণে এসেছে?
চালক হাত নেড়ে কিছু বলে পুষির দিকে তাকাল। ভাঙা হিন্দিতে বলল, “ওদের সঙ্গে কথা বলুন!”
পুষি হাসিমুখে যা বলল, তাতে বাসিন্দাদের কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। ডাক্তারবাবু চালককে বললেন, “ওদের জিজ্ঞাসা করো, বহু বছর আগে জল আর খাবারের কথা বলে যাদের এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের কথা ওরা শুনেছে কি না!” চালক ওই কথাগুলো দিশি ভাষায় বলামাত্র অতিবৃদ্ধরা প্রায় একসঙ্গে কথা বলা শুরু করল। চালক বলল, “ওরা বলছে এসব কথা ওরা শুনেছে।”
ডাক্তারবাবু বললেন, “ওদের জিজ্ঞাসা করো, পূর্বপুরুষেরা যে-দেশে গিয়েছে সেই দেশে ওরা যেতে চায় কি না?”
চালকের মুখ থেকে প্রশ্ন শুনে অনেকগুলো মাথা একসঙ্গে দু’পাশে দুলতে লাগল, যার অর্থ ওরা যাবে না। তারপরেই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল। বয়স্ক মানুষেরা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে যে যার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। চালক বলল, “চলুন।”
সন্ধে নামছিল। ডাক্তারবাবুর অনুরোধে চালক তাদের যেখান থেকে তুলেছিল, সেখানে নামিয়ে দিল। ডাক্তারবাবু পকেট থেকে টাকা বের করতেই লোকটি হেসে কোনও কথা না-বলে গাড়ি নিয়ে চলে গেল। খুব অবাক হয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু। তাদের জন্যে অনেক সময় নষ্ট করেছে লোকটা। কিন্তু টাকা না-নেওয়ার পেছনে একটাই কারণ অনুমান করতে পারছেন তিনি। এখানে তাঁদের আসার কী উদ্দেশ্য তা বুঝতে না-পারায় নিজেকে দূরত্বে রাখতে চাইছে চালক। এইসময় পুষি বলল, “লোকটার ভাষা ঠিক আমাদের মতো নয়। আমাদের পূর্বপুরুষরা কি ওর মতো কথা বলত!”
চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোড়া। শুধু পাঁচিলে ঘেরা দোতলা বাড়ির ভেতরে যে-আলো জ্বলছে, তা জানলার কাচের দিকে তাকালে বোঝা যায়। সদর দরজা ভেতর থেকে তালা বন্ধ। কয়েকবার আওয়াজ করার পর সেই প্রৌঢ় লোকটি হারিকেন নিয়ে এসে আলো মাথার ওপর তুলে পরিচয় জিজ্ঞাসা করল। ডাক্তারবাবুর পরিচয় পেয়ে সে দরজা খুলে দিল।
লোকটি বলল, “অন্ধকারে বাইরে থাকলে বিপদ হতে পারে। সাপ তো আছেই, বন্য জন্তুও চলে আসে। আসুন।”
যে যার ঘরে ঢুকে দেখতে পেল আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। একটু পরে এতোয়ারি একটা থালা আর জলের গ্লাস নিয়ে ঘরে ঢুকে টেবিলে রাখল। ডাক্তারবাবু বললেন, “বাঃ, ওদের সাহায্য করছ দেখে ভাল লাগছে। আমরা অনেকটা ঘুরলাম। একটা গ্রামে গিয়ে এখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাও বললাম। কিন্তু ওদের ভাষা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না। বহু বছর আগে যারা এদেশ ছেড়ে গিয়েছিল, তাদের ভাষায় অন্য ভাষা একটু একটু করে মিশে এমন বদলে গিয়েছে যে, মূল ভাষার সঙ্গে আর মিলছে না। কিন্তু ওদের যখন জিজ্ঞাসা করলাম, যে-দেশে ওদের পূর্বপুরুষরা গিয়েছে, সেই দেশে যেতে ইচ্ছে আছে কি না, তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। ওরা খুব ভয় পেয়ে যে যার ঘরে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।”
চোখ বড় করে শুনছিল এতোয়ারি। কথা শুনে মাথা নিচু করে ঘর থেকে চলে গেল। মেয়েটির ব্যবহার এত শীতল যে, ডাক্তারবাবু কিছু বুঝতে পারলেন না।
আধঘণ্টা পরে প্রৌঢ়া মহিলা দরজায় এসে বললেন, “আপনাকে একবার ওপরে আসতে হবে। উনি ডাকছেন।”
ডাক্তারবাবু প্রৌঢ়ার সঙ্গে ওপরের ঘরে ঢুকে দেখলেন বৃদ্ধা বিছানার ওপরে উঠে বসেছেন। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন কেমন আছেন?”
“অনেক ভাল, আপনি খুব ভাল ওষুধ দিয়েছেন। ওই ওষুধ আর কতদিন খেতে হবে?”
“মনে হয় আর দু’দিন খেলেই হবে।”
“বাঃ,” একটু ভেবে বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা আজ কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলেন? কিছু দেখা হল?”
খানিক ইতস্তত করে ডাক্তারবাবু তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত জানালেন। সব শুনে হাসলেন বৃদ্ধা, “আমি এই ভাঙা হিন্দি মেশানো ইংরেজি শিখেছি আমার স্বামীর কাছ থেকে। আমার স্বামী ছিলেন খাঁটি ইংরেজ। কিন্তু এই দেশটাকে ভালবেসেছিলেন। চার্চে গিয়ে বিয়ে হয়েছিল আমাদের।”
“আপনার বাবা-মা কি খ্রিস্টান ছিলেন?”
“না, না। ওঁকে বিয়ে করব বলেই আমি খ্রিস্টান হয়েছিলাম,” বৃদ্ধা চোখ বন্ধ করলেন। যেন অতীতের কথা ভাবলেন।
ডাক্তারবাবু বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আমার সঙ্গে অন্য যে-মেয়েটি এসেছে, সে মদেশিয়া, অথচ এখানকার মানুষের সঙ্গে ওর ভাষার অনেক পার্থক্য আছে। এতোয়ারিও আপনার সব কথা নিশ্চয়ই বুঝতে পারে না, তাই তো?”
“ঠিক। কিন্তু এই মেয়েটি এত চুপচাপ যে মনের কথা বুঝতে দেয় না। তবে আমার সঙ্গে এখানকার মেয়েদের অনেক তফাত হয়ে গিয়েছে। বিয়ের পর আমি আর আত্মীয়দের কাছে ফিরে যাইনি। স্বামীর ভাষা শিখে নিয়েছি একটু একটু করে। স্বামী হিন্দি বলতেন ভাঙা ভাঙা। সেই ভাঙা হিন্দি বলতেও আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার গায়ের রং কালো হলেও স্বামীর সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার সবকিছু এমন বদলে গেল যে, লোকে আমাকে কালা মেম বলে আড়ালে কথা বলত,” বুড়ি হাসলেন। বেশ গর্বিত দেখাচ্ছিল ওঁকে। জানেন, “এতু আজ আমার হাত-পা-মাথায় এত সুন্দর হাত বুলিয়ে দিয়েছে যে, খুব আরাম হয়েছে।”
“এতু?”
“ও হো! আপনার সঙ্গে যে মেয়েটি এসেছে, আমার সঙ্গে আছে।”
“ও,” হেসে ফেললেন ডাক্তারবাবু। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি বিয়ের পর থেকেই আর আগের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি?”
“না। কী করব বলুন! প্রথম প্রথম খুব মনখারাপ হত। কিন্তু আমার স্বামীর ওই একটাই নিষেধ ছিল। তিনি চাইতেন আমি মেমসাহেব হয়ে থাকি, মা-বাবার ভাষায় যেন কথা না-বলি,” হাসলেন বৃদ্ধা, “প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হত, কিন্তু স্বামীর ভালবাসা সেই কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।”
“কিছু মনে করবেন না, আপনার স্বামীর মৃত্যুর পরে আবার গ্রামের আত্মীয়দের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়নি?”
“নাঃ। আমি নিজেই অনেক বদলে গিয়েছিলাম। স্বামীর মৃত্যুর পরে সরকার আমাকে যে-ভাতা দেয়, তাতে দিব্যি চলে যায়। স্বামীর খুব ইচ্ছে ছিল আমাকে নিয়ে ওঁর দেশে যাওয়ার। কিন্তু সাহস পাননি। আমার চামড়ার রংকে ওঁর দেশের আত্মীয়রা মেনে নেবেন না বলে ওঁর ভয় ছিল।”
উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তারবাবু, “আপনি এখন বিশ্রাম করুন।”
“একটা কথা বলব?”
“নিশ্চয়ই, বলুন!”
“আপনি যে-উদ্দেশ্যে এসেছেন, সেটা সফল হবে বলে আমার মনে হয় না। আজ থেকে দু’পুরুষ আগে যারা খাবারের লোভে এই মাটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদের সম্পর্কে যারা থেকে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের বংশধরদের কোনও আগ্রহ নেই। খবর তো চাপা থাকে না। ওদের সেই পুর্বপুরুষদের খ্রিস্টান করা হয়েছিল, মৃত্যুর পরে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পোড়ানো হত না— এই সব খবর কিছু লোক এখানে প্রচার করেছে।”
“কিছু লোক? ওখান থেকে কেউ এসেছে বলে শুনিনি।”
“তারা আসেনি কিন্তু এই দেশের যেসব ছেলে ইংরেজদের তাড়াতে চাইছে, তারা এইসব খবর রটিয়ে দিয়েছে। আমি খ্রিস্টান হওয়ার পর থেকে ওরা আমাকে এড়িয়ে চলে। আমার এখানে যারা কাজ করে, তারা বারবাকানার মানুষ। ধর্মে মুসলমান,” বৃদ্ধা বললেন।
নমস্কার জানিয়ে নীচে নেমে এলেন ডাক্তারবাবু। তাঁর মনে হচ্ছিল, ব্যাপারটা যতটা সরল হবে বলে ভেবেছিলেন, ততটা নয়। ঘরের কাছে এসে দেখলেন পুষি বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর ঘরে ঢুকতেই পুষি দরজায় এসে দাঁড়াল। ডাক্তারবাবু চেয়ারে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওই দু’জন কোথায়? কী করছে এখন?”
“ঘুমাচ্ছে,” গম্ভীর গলায় বলল পুষি।
“সে কী? এই অসময়ে?”
“খুব ভয় পেয়েছে বোধহয়,” হাসল পুষি।
ডাক্তারবাবু তাকালেন, “ও! কিন্তু তুমি এখানে কী করছ?”
“আপনার অনুমতি নেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি।”
“কীসের অনুমতি?”
খুব মিষ্টি হাসি হাসল পুষি, “বলতে সাহস পাচ্ছি না, যদি ভরসা দেন তা হলে বলব।”
“বেশ, বলো।”
“চা-বাগান থেকে একটা জিনিস এনেছিলাম। খাওয়ার জিনিস। আজ সেই জিনিসটা খেতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু আপনি যদি অনুমতি না দেন তা হলে…”
“কী সেই খাবার জিনিস?”
ছুটে বেরিয়ে গেল পুষি। কিন্তু ফিরে এল অল্প সময়ের মধ্যে। হেসে বলল, “এটা চা-বাগান থেকে এনেছি। খুব ভাল হাঁড়িয়া।”
“সর্বনাশ!”’ চোখ বড় হল ডাক্তারবাবুর, “তুমি ওটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ? না না, ওটা খেয়ে মাতলামি করলে…”
“না না, আমি মাতলামি করি না, যারা আমায় দেখে তারাই মাতাল হয়,” খিলখিলিয়ে হেসে উঠল পুষি।
“তুমি কি রোজ হাঁড়িয়া খাও?”
“কী করব! না-খেলে সবাই মনখারাপ করে। তবে সবাই বলে খাওয়ার পর আমি কখনও মাতাল হইনি,” চোখ ছোট করল পুষি, “একটু খাই?”
“আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি না, কিন্তু কেউ যদি তোমার বিরুদ্ধে নালিশ না-করে, তা হলে আমার কিছু বলার নেই।”
শোনামাত্র এক মুহূর্ত না-দাঁড়িয়ে পাশের ঘরে চলে গেল পুষি।
ডাক্তারবাবুর একবার ইচ্ছে হল কালু এবং সোমরা কী করছে তার খোঁজ নেওয়ার। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে শেষপ্রান্তের ঘরের খোলা দরজার সামনে পৌঁছে গান শুনতে পেলেন। দুটি পুরুষকণ্ঠ বেসুরো গলায় যিশুর ভক্তিগীতি যা চার্চে ফাদার গেয়ে থাকেন, তাই চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছে। ডাক্তারবাবু ওদের বিরক্ত করলেন না।
সকালে প্রৌঢ়া মহিলার অনুরোধে এতোয়ারির এনে দেওয়া রুটি আর আলুর তরকারি খেয়ে ডাক্তারবাবু বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এতোয়ারি বলল, “উনি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন। ওঁর ঘুম আসছিল না। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখন কি ডাকব?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “না, না। থাক। তুমি তৈরি হয়ে নাও, আমরা বেরিয়ে যাব।”
এতোয়ারি কথা বলল না, দাঁড়িয়েই রইল।
প্রৌঢ়া বলল, “ওকে এখন না-নিয়ে গেলে কি অসুবিধে হবে?”
অবাক হলেন ডাক্তারবাবু। বললেন, “কেন?”
উনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে আমরা খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু এই মেয়ে এসে যেভাবে সেবাযত্ন করল, সেরকম তো আমরা করতে শিখিনি। ওর সেবায় উনি এখন কিছুটা ভাল হয়ে উঠেছেন। আর কিছুদিন থাকলে একদম ভাল হয়ে যাবেন। যদি ওকে না-নিয়ে গেলে হয়…” প্রৌঢ়া কথা শেষ করল না।
ডাক্তারবাবু এতোয়ারির দিকে তাকালেন। মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন এই প্রস্তাবে ওর আপত্তি নেই। তিনি সম্মতি জানালেন। তারপর এই বাড়ির প্রৌঢ় পরিচারককে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন বাকি তিনজনের সঙ্গে।
অনেক ঘোরাঘুরির পর একটি ঘোড়ায় টানা গাড়ি জোগাড় করে দিয়ে প্রৌঢ় ফিরে গেল। ভাড়া ঠিক করে চালককে যা বললেন, তা যে ওর বোধগম্য হল না, তা বুঝতে পেরে হতাশ হলেন ডাক্তারবাবু। ওই প্রৌঢ় পরিচালককে সঙ্গে রাখলে ভাষার সমস্যা হত না। পরিচারক লোকটাকে তিনটে আঙুল তুলে দেখিয়েছিল। একটু আপত্তি করে শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল চালক। প্রৌঢ় চলে যাওয়ার আগে ভাড়া বাবদ কী দিতে হবে জানিয়ে গিয়েছিল।
চালকের পাশে বসে পুষি কিছুক্ষণ বকবক করেও কোনও সাড়া না-পেয়ে মুখ ফিরিয়ে ডাক্তারবাবুকে বলল, “ও কথা বলছে না কেন?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “একটু আগে ওই প্রৌঢ়ের সঙ্গে ও অন্যরকম ভাষায় কথা বলছিল। বোধহয় তোমার ভাষা বুঝতে পারছে না।”
পুষি খুব হতাশ হয়ে সামনে তাকাল।
দূরে একটা গাড়ি ধুলো উড়িয়ে বিকট শব্দ করে এগিয়ে আসছে। সামনে এসে গাড়িটা থেমে গেল। ডাক্তারবাবু দেখলেন ওই গাড়ির ড্রাইভার এদেশীয় মানুষ। পেছনে সাদা চামড়ার মধ্যবয়সি পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়ছেন। দরজা খুলে ভদ্রলোককে নামতে দেখে ডাক্তারবাবু নেমে দাঁড়ালেন।
ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বললেন, “আমি যার সঙ্গে কথা বলছি তার নিশ্চয়ই ইংরেজি ভাষাটা জানা আছে।”
“নিশ্চয়ই,” ডাক্তারবাবু বললেন, “ডাক্তারি পড়তে হলে এদেশে ইংরেজি ভাষা শেখাটা আবশ্যিক। তাই শিখতে হয়েছিল।”
“আই সি’ তুমি তা হলে একজন ডাক্তার। গুড। কিন্তু আগে যখন তোমাকে এই এলাকায় দেখিনি তখন জানতে পারি কি এই লোকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?” কাঁধ নাচালেন সাহেব, “আমার একটা বদ অভ্যেস হল অন্যকে সাহায্য করা। তোমার কোনও সাহায্য দরকার আছে?”
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, “আমি এখানকার আদিবাসীদের সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছি। আমার সঙ্গে যাদের দেখছেন তাদের পূর্বপুরুষরা এখানেই থাকতেন। চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের ডুয়ার্স অসমের চা-বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা এসেছে পূর্বপুরুষের দেশ দেখতে।”
“বাঃ! খুব ভাল,” ভদ্রলোক গাড়ির ওপরে বসে থাকা পুষির দিকে তাকিয়ে কিছু বললেন। ডাক্তারবাবুর মনে হল এটা অবশ্যই কোনও আদিবাসী ভাষা, কিন্তু চেনা চেনা লাগলেও পুরোটার অর্থ বুঝতে পারলেন না। তিনি দেখলেন পুষি বোকা বোকা মুখ করে তাকিয়ে আছে। ডাক্তারবাবু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “উনি কী বললেন বুঝতে পারছ না?”
পুষি দু’পাশে মাথা নাড়ল। তারপর পেছন ফিরে গাড়ির পাদানিতে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনকে জিজ্ঞাসা করল তারা কথার অর্থ বুঝছে কি না। ওরা মাথা নেড়ে না বলল।
সাহেব হাসলেন, “ডক্টর, আমাদের বন্ধুরা যারা ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছে, তারা একটাই অভিযোগ শোনে, তাদের উচ্চারণ নাকি পালটে গিয়েছে। আর এদের পূর্বপুরুষ তো বহু বছর আগে চলে গিয়েছেন। তাই শুধু উচ্চারণ নয়, ভাষাও বদলে গিয়েছে অনেকটা। অচেনা তো লাগবেই। আমার মনে হয় এভাবে ওদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করে লাভ হবে না। আপনি বরং আমার অফিসে আসুন। সেখানে কয়েকজন আদিবাসী কর্মচারী কাজ করে। তাদের সঙ্গে কথা বললে আর কষ্ট করতে হবে না।”
সাহেবকে অনুসরণ করে ভাড়ার ঘোড়ার গাড়ি তিন মাইল দূরের লোকালয়ে এল। সেখানে পাঁচিল দেওয়া গেটের দরজায় পাহারাদার রয়েছে, যে কপাল থেকে হাত নামাচ্ছে না। গাড়ি বাইরে রেখে নীচে নামতেই ডাক্তারবাবু দেখলেন, পুষিও নেমে পড়েছে। তিনি ভেতরে পা বাড়ালে সে-ও সঙ্গ নিল। ডাক্তারবাবু তাকে নিষেধ করতে গিয়েও থেমে গেলেন। যদি কারও ভাষা পুষি বুঝতে পারে!
সাহেব বললেন, “এসো ডাক্তার। এবার তোমাকে আমার পরিচয়টা দিই। আমি এই এলাকার কালেক্টর। তবে আর বেশিদিন নেই। সামনের মাসে আমাকে বদলি হয়ে রেঙ্গুনে যেতে হবে। ওসব কথা থাক,” বলে তিনি টেবিলে রাখা কলিং বেলের বোতামে চাপ দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে একজন উর্দিপরা লোক ছুটে ভেতরে ঢুকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সেলাম জানাল। সাহেব বললেন, “কল অল স্টাফ, কুইক।”
কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরে জনা দশেক মানুষ এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল। এরা সকলেই আদিবাসী শুধু একজন ছাড়া। তার পরনে ধুতির নীচে শার্ট গোঁজা, ওপরে টাইট কোট। এগিয়ে এসে লোকটা বলল, “ইয়েস স্যার?”
ডাক্তারবাবু লক্ষ করছিলেন কর্মচারীদের সাহেব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তিনি যে-চেয়ারে বসেছেন, তার সামনে একটা ছোট বেতের টেবিল, দ্বিতীয় চেয়ার নেই। অতএব দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।
সাহেব বললেন, “এই ন’জন জাতে মদেশিয়া এবং মুন্ডা। যদি কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকে তা হলে করতে পারেন।”
ডাক্তারবাবু লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বহু বছর আগে আপনাদের পূর্বপুরুষদের কাজ করার জন্যে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, জানেন তো?”
লোকগুলোর মুখে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কিন্তু যেই ধুতিপরা বাবু হাত তুলে তাদের থামিয়ে গড়গড় করে কিছু বলতে শুরু করলেন, একটু থেমে দ্বিতীয়বার অন্যরকম ভাষায়, তখনই মানুষগুলো গুনগুন করে উঠল। ধুতিপরা বাবু ওদের সঙ্গে কিছু কথা বলে ভাঙা ইংরেজিতে শুরু করলেন, “ইয়েস স্যার অ্যান্ড নো স্যার। ইয়েস স্যার মানে দে নো। দেয়ার ফাদার টোল্ড, ফাদার্স ফাদার টোল্ড দেয়ার ফাদার। বাট নো লাভ ফর দেম। অন্য কিছু?”
ডাক্তারবাবু নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। ধুতিপরা বাবু ইশারা করতেই লোকগুলো পড়ি কি মরি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সাহেব বললেন, “বাবু, ইউ মে গো।”
সঙ্গে সঙ্গে কপালে আঙুল ছুঁইয়ে বাবু বেরিয়ে গেলেন। সাহেব হাসলেন, “এরা অপরিচিতদের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারে না। এদের পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই চলে গেছে রাঁচি, বারকানায়। কুলির কাজ, ভৃত্যের কাজ করে তারা। খুব অনুগত কর্মী। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন জায়গায় যে-ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে, তার প্রভাব এখনও এদের ওপর পড়েনি। পড়লে কী হবে জানি না,” কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সাহেব। তারপর পাশে এসে বললেন, “তুমি তো চা-বাগানে ডাক্তারি করো। তোমার কোম্পানি নিশ্চয়ই ব্রিটিশ কোম্পানি?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“তারা তোমাকে কয়েকজনকে সঙ্গে দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে দেখে অবাক হয়েছি। তোমার ম্যানেজার নিশ্চয়ই ব্রিটিশ?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“মিছিমিছি টাকা এবং কাজের সময় নষ্ট করেছে তোমাদের এখানে পাঠিয়ে। আমার নাম জন স্মিথ। তাকে বোলো কথাটা আমি বলেছি।”
মাথা নেড়ে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলেন ডাক্তারবাবু।
সময় যে বিরাট ফারাক তৈরি করে দিয়েছে, তা বুঝতে পারলেন ডাক্তারবাবু। চা-বাগান তৈরির সময়ে স্থানীয় লোক না-পেয়ে এই অঞ্চল থেকে যেসব ক্ষুধার্ত মানুষদের জল এবং খাবারের লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের বংশধরদের সঙ্গে যারা তখন এখানে পড়ে ছিল তাদের বংশধরদের জীবনযাপন, ধর্মাচরণের কোনও মিল নেই। ঘোড়ার গাড়িতে চারপাশ ঘুরে দেখতে দেখতে তাঁর মনে হল, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের মাটিরও অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। খাল কেটে জল নিয়ে আসা হয়েছে, মাঝে-মাঝেই কুয়োর সামনে জল তুলতে আসা দেহাতি মহিলাদের দেখা যাচ্ছে।
সমস্যা হল, এইসব গল্প চা-বাগানের বড়সাহেবকে তিনি ফিরে গিয়ে বলতে পারলেও দু’জন স্বামী-স্ত্রীকে কিসের লোভ দেখিয়ে চা-বাগানে নিয়ে যাবেন? সেরকম দম্পতিকে পাবেনই-বা কোথায়?
দুপুর নাগাদ ফিরে এসে ঘোড়ার গাড়ির চালককে আরও কিছু বকশিশ দিয়ে ছেড়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিল আর এখানে থাকার কোনও মানে হয় না। বাড়ির সদর দরজা খুলতেই কানে গুলির আওয়াজ এল। সঙ্গীরা ভেতরে ঢুকতেই তিনটে ছেলেকে দৌড়ে আসতে দেখলেন। কিন্তু ওরা কাছাকাছি আসতেই আবার গুলির আওয়াজ এবং চারজন অশ্বারোহী পুলিশকে চিৎকার করতে করতে আসতে দেখামাত্র, ওই তিনজনের একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার সঙ্গীরা অতিদ্রুত চোখের আড়ালে চলে যেতেই, অশ্বারোহীরা পড়ে থাকা যুবকের পাশে চলে এসে ছেলেটিকে দ্বিতীয়বার গুলি করল। শরীরে গুলি ঢুকলেও ছেলেটি একটুও নড়ল না। একজন সৈন্য ঘোড়া থেকে নেমে মৃত ছেলেটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আবার ঘোড়ার পিঠে উঠে, ওরা যেদিক দিয়ে এসেছিল সেদিকে ফিরে গেল।
সমস্ত দৃশ্যটা পাঁচিল এবং বন্ধ গেটের পাশে লুকিয়ে থাকা ডাক্তারবাবু এবং পুষি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখলেন। বাকি ছেলে দুটো চলে গিয়েছিল পাঁচিলের আড়ালে।
পুলিশগুলো মৃতদেহ নিয়ে ফিরে গেলে পুষি কথা বলল, “ওরা ছেলেটাকে মেরে ফেলল? কেন? কী করেছে ও?”
ডাক্তারবাবু মেয়েটিকে দেখলেন। ওর মুখটা এখন অন্যরকম দেখাচ্ছে। তিনি বললেন, “ভেতরে চলো। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না।”
পুষি জিজ্ঞাসা করল, “ছেলেটা কি চোর বা ডাকাত?”
ডাক্তারবাবু জবাব দিলেন না।
ঘরে ঢোকামাত্র সেই প্রৌঢ় কর্মচারী সামনে এসে বলল, “খুব ভাল সময় এসে পড়েছেন। এরকম সময় পুলিশকে বিশ্বাস করা যায় না।”
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ওরা গুলি করে মারল কেন?”
লোকটি একটু ইতস্তত করল। বাড়িতে ঢোকামাত্র চা-বাগান থেকে আসা দু’জন পুরুষ তাদের জন্যে বরাদ্দ ঘরে ঢুকে গিয়েছিল আশ্রয়টি নিরাপদ ভেবে। কিন্তু পুষি দাঁড়িয়েছিল ঘরের কোণে।
শেষপর্যন্ত প্রৌঢ় বলল, “এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। অল্পবয়সি ছেলেরা সাহেবদের দেশ থেকে হঠাতে চাইছে। আজ সকালে নাকি পুলিশের সাহেবের আর্দালিকে ছুরি মেরেছে। আমাদের এখানে পুলিশ আসবে না। আমাদের সাহেবকে সবাই সম্মান করত। তাঁকে কবর দেওয়ার সময় এই জেলার অনেক সাহেব সঙ্গে হেঁটেছিলেন। কিন্তু দিন তো সবসময় এক থাকে না,” কথাগুলো বলে প্রৌঢ় চলে যাচ্ছিল কিন্তু পুষি তাকে ডাকল, “আচ্ছা, এই ছেলেগুলো সাহেবদের দেশ থেকে হঠাতে চায় কেন?”
প্রৌঢ় বলল, “আমি অত কথা জানি না। তবে শুনেছি, সাহেবরা কালাপানি পার হয়ে জোর করে আমাদের এই দেশ দখল করে আছে। এতদিন এদেশের মানুষরা কিছু বলেনি, এখন কেউ কেউ বলছে।”
প্রৌঢ় চলে গেলে পুষি গালে আঙুল দিল, “আরেব্বাস! এতসব কথা চা-বাগানের লোকরা কি জানে? না, না জানে না। এখানে আসার আগে একজনকে পুলিশ ধরতে চাইছিল যে, সাহেবদের তাড়াতে চাইছিল! কিন্তু আন্দোলন করছে বলে আমাদের বাগানের কাউকে পুলিশ খুন করেনি। গুলি লাগার পর ছেলেটা কেমন পড়ে গিয়েই মরে গেল! আচ্ছা, ওর বাবা-মা জানতে পারবে যে ও মরে গিয়েছে?”
একটু অবাক হলেন ডাক্তারবাবু। পুষির মতো মেয়ের মুখে এইরকম কথা শুনে বললেন, “ঠিক আছে। আমরা অনেক দূর থেকে এখানে ক’দিনের জন্যে এসেছি। এসব নিয়ে বেশি কথা বলার দরকার নেই।”
“কিন্তু…,” তাকাল পুষি, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”
“বলো।”
“আচ্ছা, আমরা যেখানে থাকি আর এই জায়গাটা কি দুটো আলাদা দেশ? এক দেশ না?” পুষি জিজ্ঞাসা করল।
“হ্যাঁ। একই দেশ।”
“সর্বনাশ!” পুষি গালে হাত রাখল।
“কী হল?”
“তা হলে তো চা-বাগানের ছেলেদেরও পুলিশ গুলি করে মারতে পারে! আচ্ছা, এখানে শুধু ছেলেরাই সাহেবদের তাড়াতে চায়, না মেয়েরাও তাদের সঙ্গে আছে?” পুষি জিজ্ঞাসা করল।
“এইসব জেনে তোমার কী লাভ হবে?”
চট করে জবাব দিল না পুষি। গালে হাত দিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। ডাক্তারবাবু বললেন, “কী হল? তোমার ঘরে যাও।”
এবার পুষি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ডাক্তারবাবু খুব অবাক হলেন। আজ সকালে বেরোনোর সময়েও পুষিকে বেশ চপলা দেখাচ্ছিল। এই বাংলোয় ফিরে এসে চোখের সামনে একটি তরুণকে পুলিশের গুলিতে মরে যেতে দেখার পর ওর মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে গেল। চাপল্য উধাও, খুব গম্ভীর হয়ে গেছে পুষি। চোখের সামনে আচমকা কাউকে মরে যেতে দেখলে ধাক্কা লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পুষির ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া শুধু ধাক্কার কারণে নয়, আরও গভীর মনে হচ্ছিল ডাক্তারবাবুর।
এভাবে একদম অপরিচিত এক মহিলার বাড়িতে দু’বেলা পাঁচজনে মিলে খাওয়া এবং থাকা অশোভন। আজ দুপুরের খাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার জন্যে বৃদ্ধার কাছে এলেন ডাক্তারবাবু। বৃদ্ধা বসেছিলেন। এতোয়ারি তার পা টিপে দিচ্ছিল। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছেন? দেখে মনে হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক ভাল।”
বৃদ্ধা হাসলেন, “এই মেয়েটার সেবা পেয়ে ভাল লাগছে।”
“আচ্ছা, আপনাকে কীভাবে ধন্যবাদ দেব জানি না,” ডাক্তারবাবু বললেন, “আমাদের তো এখন অনেক জায়গায় ঘুরে খোঁজাখুঁজি করতে হবে, তাই একটু পরে বিদায় নিতে চাই। আপনাকে কখনও ভুলতে পারব না।”
বৃদ্ধা বললেন, “ডক্টর, আপনাকে আমার দুটো কথা রাখতে হবে।”
“নিশ্চয়ই, বলুন কী করতে হবে!”
“এখন এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো আপনাদের পক্ষে নিরাপদ নয়। আজ যখন আপনারা এলাকা দেখতে বেরিয়েছিলেন, তখন পুলিশের দু’জন অফিসার এই বাড়িতে এসে আমার কাছে আপনাদের সম্পর্কে খোঁজখবর করেন। তারপর একটা ছেলে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছে। এখন পুলিশ আরও অ্যাকশন নেবে। তাই এখানে থাকা আপনাদের পক্ষে নিরাপদ নয়,” বৃদ্ধা বললেন।
“আমরা আজই এখান থেকে চলে যাব।”
“এখান থেকে মানে এই এলাকা থেকে অন্য কোথাও ট্রেনে চড়ে চলে যান।”
বৃদ্ধার কথায় মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু, “বুঝতে পেরেছি। আর-একটা কিছু আপনি বলতে চেয়েছিলেন!”
“ও হ্যাঁ। দুটো ছেলে এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে চায়। না-যেতে পারলে পুলিশের গুলিতে ওদের মৃত্যু হতে পারে। আপনারা যে-ট্রেনে চড়ে এখান থেকে চলে যাবেন, সেই ট্রেনে ওই দু’জনকে যদি সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন, তা হলে হয়তো ওরা পুলিশের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। আপনি রাজি না-হলে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু যেহেতু ওরা ইন্ডিয়াকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখছে, তাই ওদের সাহায্য যদি করতে পারেন, তা হলে ভাল হয়,” বৃদ্ধা ইশারা করলে এতোয়ারি জলের গ্লাস এনে দিল। জল খেলেন তিনি।
ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
নীরবে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন বৃদ্ধা।
“আপনার স্বামী একজন ব্রিটিশ ছিলেন, যাঁকে তাঁর স্বজাতিরা শ্রদ্ধা করতেন বলে মৃত্যুর খবর পেয়ে সবাই এসেছিলেন। সেই আপনি দু’জন ইংরেজবিরোধী বিপ্লবীকে সাহায্য করতে চাইছেন, কেন? আমি জানি না পুলিশ যাদের খোঁজ করছে, আপনি তাদের আশ্রয় দিয়েছেন কি না!” বেশ শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন ডাক্তারবাবু।
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা। হেসে বললেন, “আমার ইংরেজ স্বামীকে আমি ভালবাসতাম আর যারা স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন করছে তাদের আমি শ্রদ্ধা করি। মনে হয় উত্তরটা আপনি পেয়েছেন। ও হ্যাঁ, আপনাদের ট্রেন বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। যদি অনুরোধ রাখেন, তা হলে অন্তত আধঘণ্টা আগে স্টেশনে পৌঁছে যাবেন,” কথা শেষ করে দুটো শীর্ণ হাত এক করলেন বৃদ্ধা।
ডাক্তারবাবু নমস্কার জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই এতোয়ারি উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কিছু বলবে নাকি,” এতোয়ারি মাথা নিচু করেছিল, এবার উঁচু-নিচু করল।
“বেশ, বলো।”
“আমি যদি এখন চা-বাগানে ফিরে না যাই…”
“সে কী! না-ফিরে গিয়ে এখানে থেকে কী করবে?” ডাক্তারবাবু অবাক। বৃদ্ধাকে ইশারায় দেখিয়ে এতোয়ারি বলল, “মায়ের কাছে থাকব!”
বৃদ্ধা বললেন, “কাল থেকে ওকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু ও কিছুতেই ফিরে যেতে চাইছে না। বলছে, আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন ও আমার কাছে থাকবে। তারপর না হয় চা-বাগানে ফিরে যাবে। আপনি ওকে বোঝান।”
ডাক্তারবাবু এতোয়ারির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি বললেন, “চা-বাগানে তোমার মা আছে বাবা আছে…”
তাঁকে থামিয়ে এতোয়ারি বলল, “আমাকে তো শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই কিছুদিন আমি না-থাকলে কারও অসুবিধে হবে না।”
ডাক্তারবাবু বৃদ্ধার দিকে তাকালেন, “আপনি কী চাইছেন?”
বৃদ্ধা হাসলেন, “ও থাকলে আমার খুব সুবিধে হবে। তবে আমার মৃত্যুর পরে ও যদি চলে যেতে চায় তার ব্যবস্থা আমি করে রাখব।”
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে এতোয়ারি ডাক্তারবাবুর পায়ে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করল। করে হাসিমুখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
প্রৌঢ় লোকটি ঘোড়ার গাড়ি ডেকে এনেছিল। ওরা চারজন গাড়িতে উঠে পেছন ফিরে দেখল দোতলার জানলায় বৃদ্ধা কালো মেমসাহেবের পাশে এতোয়ারি দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাদের দেখছে। তারপর স্পষ্ট দেখা গেল, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলাচ্ছে।
প্ল্যাটফর্ম আজ জনশূন্য। সঙ্গী তিনজনকে এক কোণে বসিয়ে ডাক্তারবাবু স্টেশন মাস্টারের ঘরে গেলেন। গিয়ে শুনলেন ভদ্রলোক অসুস্থ হওয়ায় স্টেশনে আসেননি। সহকারী টিকিট তৈরি করে দিয়ে বললেন, “এই তো এলেন, এখনই চলে যাচ্ছেন! অবশ্য চলে যাওয়াই ভাল। এখানে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে বিদেশিরা বিপদে পড়তেই পারে।”
“বিদেশি?”
“আপনারা তো এখানকার লোক নন। তাই না?”
কথা না-বাড়িয়ে টিকিট নিয়ে বাইরে এসে চারপাশে তাকিয়েও সঙ্গী তিনজন ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলেন না।
ঠিক সময়ে ট্রেন এল। একদম ফাঁকা ট্রেন। ট্রেন থেকে নেমে ট্রেনের গার্ড এবং টিকিট চেকার সহকারী স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বললেন। সহকারী হাত তুলে ডাক্তারবাবুদের দেখিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওরা এগিয়ে এল। কালো চামড়ার গার্ড ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করল, “আন্ডারস্ট্যান্ড ইংলিশ?”
নিঃশব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন ডাক্তারবাবু।
“গো ইন দিস কম্পার্টমেন্ট। লক দ্য ডোর। ডোন্ট ওপেন। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড মাই ইংলিশ?”
“শিয়োর।”
“ও মাই গড। ইউ নো ইংলিশ?”
“আই অ্যাম আ ডক্টর।”
“অ। গো ইনসাইড। লক দ্য ডোর,” বেশ ভদ্রভাবে এবার এই কথাগুলো বলল গার্ড।
ডাক্তারবাবু তিনজনকে নিয়ে ট্রেনে উঠলে, ওরা যে যার জায়গায় চলে গেল। ট্রেন চলতে শুরু করলে ওপাশের বন্ধ দরজায় শব্দ শুরু হল। ডাক্তারবাবু এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দুটি ছেলে ভেতরে ঢুকে হাতজোড় করে একপাশে দাঁড়াল। ডাক্তারবাবু বুঝলেন এদের কথাই বৃদ্ধা তাঁকে বলেছিলেন। তিনি ইশারায় ওদের বসতে বলে খানিকটা দূরে গিয়ে বসলেন। দেখলেন তাঁর সঙ্গে আসা ছেলেদুটো জানলা দিয়ে প্রকৃতি দেখছে। পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এসেছে এইসময়। পুষি উলটোদিকে বসে উঠে আসা ছেলেদের দেখছে। তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বলল, “আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারি?”
“কী কথা?”
“এমনি এমনি।”
ডাক্তারবাবু উত্তর না-দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। একটু ইতস্তত করে পুষি উঠে ছেলেদুটোর সামনে গেল, “আমার নাম পুষি, তোমাদের নাম কী? ট্রেনে কি আগেই উঠেছিলে না চলন্ত ট্রেনে উঠলে?”
ছেলেদুটো পুষির দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিলে নিল, কথা বলল না। পুষি নাছোবান্দা, “আমার কথা কি তোমরা বুঝতে পারছ না?”
ছেলেদুটোর কোনও প্রতিক্রিয়া হল না। ওরা এবার জানলা দিয়ে বাইরের পৃথিবীটাকে দেখতে লাগল। বেশ হতাশ হয়ে পুষি ওদের উলটোদিকের বেঞ্চে বসে পড়ল। তার মনে হচ্ছিল ওরা ওর ভাষা বুঝতে পারছে না। দ্বিতীয়বার সে ভাঙা হিন্দিতে কথা বলেছে। তাও ওরা বোঝেনি। এই ছেলেদুটোর সঙ্গী যে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছে, তাতে পুষির কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ওদের সঙ্গীকে যারা খুন করল, তাদের শাস্তি না-দিয়ে এখান থেকে ওরা চলে যাচ্ছে কেন? নিজেই মাথা নাড়ল পুষি, তখন রুখে দাঁড়ালে ওদের দেহও লাশ হয়ে যেত। ছেলেগুলো তার সঙ্গে কথা বলছে না। কেন? তাকে নিশ্চয়ই ওরা বিশ্বাস করছে না। ওরা দেশ থেকে সাহেবদের, সাদা চামড়ার সাহেবদের তাড়াতে চায়। তার জন্যে ওরা প্রাণ দিতেও রাজি আছে।
চা-বাগানের লাগোয়া জমিতে থাকলেও, তার বাবা, ঠাকুরদা, মা তো একসময় চা-বাগানে কাজ করত বলে কুলি লাইনেই থাকত। সে চা-বাগানের কাজ থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে আছে। তার শরীর যতদিন ছেলেদের মুগ্ধ করবে, ততদিন খাওয়ার অভাব হবে না। তার কাছে যারা আসে, তাদের কাছেই সে অনেক রকম খবর পায়। শৈশব থেকে সে বাবা-মায়ের কাছে শুনে এসেছে সাহেব হল চা-বাগানের ভগবান। কেউ অন্যায় করলে সাহেব তাকে চাবুক মারতে মারতে মেরে ফেললেও পুলিশ কিছুতেই নাক গলাবে না। এখানে আসার আগে সে শুনেছিল, পুলিশ একজনকে খুঁজছে, পেলেই মেরে ফেলবে। এই চা-বাগানের মানুষরা শুনতে পেল সেই ছেলে নাকি ইংরেজদের দেশ থেকে তাড়াতে চায়। অন্যদের মতো পুষিও বিশ্বাস করেনি। এ কখনও সম্ভব! কিন্তু সে চোখের সামনে ওরকম একজনকে পুলিশের গুলি খেয়ে মরে যেতে দেখল। যেসব পুলিশ গুলি করছে তাদের কারও গায়ের চামড়া সাদা নয়, তবু গুলি করল।
বাইরে এখন রাত নেমেছে। বেরোনোর আগে এতোয়ারি নীচে এসে একটা প্যাকেটে রুটি আর তরকারি দিয়েছিল। ডাক্তারবাবুর কাছে রাখা সেই প্যাকেট খুলে পুষি দেখল অনেকগুলো রুটি আর আলুর তরকারি রয়েছে ভেতরে। ডাক্তারবাবুকে খাবার দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, “ওরা বোধহয় না-খেয়ে আছে, একটু দিতে পারি।”
ডাক্তারবাবু এমনভাবে অন্যদিকে তাকালেন যেন শুনতেই পাননি। একটু ইতস্তত করে চারটে মোটা রুটি আর তরকারি কাগজের মোড়কে নিয়ে ওই ছেলেদুটোর কাছে গিয়ে বলল, “খেয়ে নাও।”
ছেলেরা বাইরে তাকিয়েছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে হাত বাড়িয়ে খাবার নিল। ঠোঁটে চিলতে হাসি ফুটেই মিলিয়ে গেল। পুষি ফিরে এসে সঙ্গী দু’জনকে খাবার দিয়ে নিজেরটা নিয়ে খেতে লাগল।
একটু পরেই ট্রেনের গতি কমে আসতে লাগল। পুষি দেখল, ওই ছেলেদুটো খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওরা যেদিক দিয়ে কামরায় ঢুকেছিল সেদিকের দরজা খুলে ফেলল। দু’জনেই ঝুঁকে বাইরে তাকাল। একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে খুব ধীরে ট্রেন যাচ্ছে এখন। হঠাৎ ছেলেদুটো বাকি চারজনের দিকে তাকিয়ে ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি চিৎকার করে বলে দরজার বাইরে লাফিয়ে পড়ল। পুষি ছুটে এল সেই দরজায়। নদীর ওপরের ব্রিজে কোনও রেলিং নেই। ছেলেদুটো অন্ধকারেই নদীর জলে নেমে গিয়েছে। হাতল ধরে অনেকটা ঝুঁকেও তাদের হদিশ পেল না পুষি। রাতের নিবিড় অন্ধকারে নদী মুখ ডুবিয়ে থাকে।
দরজা বন্ধ করে ফিরে আসতে আসতে পুষির নজর পড়ল ব্যাগটার ওপর। ছেলেদুটো যেখানে বসেছিল সেখানে পড়ে আছে। ওরা কি ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুলে গেল? এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে কথাটা বলল পুষি। ডাক্তারবাবু উঠলেন। এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটাকে তুলে ভেতরে নজর দিতেই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল। তারপর দরজা খুলে যতটা সম্ভব দূরে ছুড়ে ফেললেন। ট্রেন ততক্ষণে ব্রিজ পেরিয়ে গিয়েছে। অন্ধকারে কোথায় ব্যাগটা পড়ল দেখা গেল না কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে পরপর কয়েকবার বোমা ফাটার তীব্র শব্দে যেন ট্রেনটাও কেঁপে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনটার গতি কমে এলেও থামল না। বরং গতি বাড়ল।
ট্রেন থামল পরের স্টেশনে। চিৎকার চেঁচামিচি শুরু হয়ে গেল। জানলা দিয়ে ডাক্তারবাবু দেখলেন বন্দুকধারী পুলিশরা দৌড়োদৌড়ি করছে। সম্ভবত ট্রেনটাকে পরীক্ষা করছে ওরা। ডাক্তারবাবু চাপা গলায় সবাইকে শুয়ে পড়তে বললেন। ছেলেরা আদেশ মান্য করল, কিন্তু পুষি নিজেকে যথাসম্ভব আড়ালে রেখে জানলার তলা থেকে প্ল্যাটফর্মটাকে দেখতে লাগল। তারপর যখন ট্রেনটা আবার চলা শুরু করল, তখন বেঞ্চের ওপর শরীর এলিয়ে দিল। পরিবর্তনটা লক্ষ করছিলেন ডাক্তারবাবু। যে-পুষি চা-বাগান থেকে এখানে এসেছিল, তার সঙ্গে এখনকার পুষির যেন একটুও মিল নেই। সেই লাস্যভাব, স্বদেশি সহযাত্রীদের এড়িয়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গ পাওয়ার যে-চেষ্টা ওর মধ্যে ছিল, তা আর ওর মধ্যে নেই। চোখের সামনে ছেলেটাকে মরতে দেখে ও যেন খুব ঝাঁকুনি খেয়েছে। ডাক্তারবাবু নিঃশব্দে হাসলেন। তিনি কল্পনা করতে পারছিলেন না চা-বাগানে ফিরে গিয়ে পুষি কী করবে! এই আগুন জ্বললে কি সহজে নিভে যেতে পারে!
শিলিগুড়ি স্টেশনে নামতেই একজন পরিচিত মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ডাক্তারবাবুকে দেখে এগিয়ে এলেন, “আরে! আপনি বাইরে গিয়েছিলেন নাকি? কোথায় কলকাতায়?”
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন, “না। মহুয়ামিলনে।”
“সেটা আবার কোথায়? এরাও সঙ্গে গিয়েছিল নাকি?”
“ওই আর কী। আপনি ভাল আছেন?”
“আর ভাল! বিপ্লবীরা যেরকম খুনখারাপি করছে, তাতে আর কী করে ভাল থাকা যায়! চা-বাগানের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্রিটিশ ম্যানেজারকে তো…”, বলেই যেন মনে পড়ে গেল এমন ভঙ্গিতে ডাক্তারবাবুর দিকে তাকালেন ভদ্রলোক, “আরে, উনি তো আপনাদের বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিলেন, খবর পাননি?”
অবাক হলেন ডাক্তারবাবু। বললেন, “কী হয়েছে?”
“পরশুদিন পুলিশ একজন বিপ্লবীকে গুলি করে মারে। লোকজন যে ওই ঘটনায় একটুও খুশি হয়নি, তা ম্যানেজাররা বুঝতে পারেননি। কাল চা-বাগানের রাস্তায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার গাড়ি চালিয়ে যখন আসছিলেন, তখন কয়েকজন শ্রমিক তাঁকে আটকে পিটিয়ে মেরে ফেলে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। শুনলাম খুব ধরপাকড় চলছে! এতদিন চা-বাগান খুব শান্তির জায়গা ছিল, লোকজন হঠাৎ স্বাধীন হওয়ার জন্য খুনখারাপি করা শুরু করল কেন! আরে, স্বাধীন হলে যে দেশটা ভিখিরি হয়ে যাবে!” খুব বিরক্ত হয়ে কথা বললেন ভদ্রলোক।
শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ির তিস্তা নদী পার হয়ে বাসে চেপে চা-বাগানে আসতে বিকেল গড়িয়ে এল। কপালে কয়েকবার হাত ঠুকে পুরুষ সঙ্গীরা চা-বাগানের গলিপথে দৌড়ে চলে গেল যে যার লাইনে।
ডাক্তারবাবু দেখলেন চা-বাগানের লাগায়ো হাটের সবক’টা দোকান বন্ধ। একটাও মানুষ নেই। পেছন থেকে পুষির গলা ভেসে এল, “ডাগদারবাবু, আমার খুব আনন্দ হচ্ছে!”
অবাক হলেন ডাক্তারবাবু, “আনন্দ হচ্ছে? কেন?”
“আমাদের দেশের একজনকে ওরা গুলি করে মেরে ফেলেছে, তা আমি চোখের সামনে দেখেছি। এখানে এসে শুনলাম ওদের একজনকে আমাদের দেশের মানুষ পিটিয়ে মেরে তার বদলা নিয়েছে,” বেশ খুশি খুশি গলায় বলল পুষি।
“এসব কথা এখানে দাঁড়িয়ে না-বলে বাড়ি চলে যাও,” বেশ কড়া গলায় বললেন ডাক্তারবাবু।
যেন অবাক হল পুষি। তারপর চা-বাগানের মধ্যে ঢুকে গেল। ওই পথে গেলে বাড়ি ফিরতে কম হাঁটতে হবে। আর তখনই গাড়ির আওয়াজ কানে এল। একটা নয়, দু’-দুটো গাড়ি। ওরা আসছে ফ্যাক্টরির দিক থেকে। সামনের গাড়িটি পুলিশের ভ্যান, পেছনের গাড়িতে চা-বাগানের প্রধান সহকারী ম্যানেজার। ডাক্তারবাবু রাস্তার মাঝখান থেকে সরে দাঁড়াতেই গাড়ি দুটো থেমে গেল।
দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নেমে এলেন সহকারী প্রধান ম্যানেজার। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি এখানে? তার মানে তুমি যাওনি?”
“গিয়েছিলাম, আজ ফিরছি!” ডাক্তারবাবু বললেন।
“তুমি, তুমি গাড়িতে ওঠো।”
“কেন?”
“অতদূর থেকে এসেছ, নিশ্চয়ই টায়ার্ড,” বলেই সামনের গাড়ি থেকে নেমে আসা পুলিশের অফিসারকে বললেন, “ওকে অ্যারেস্ট করুন অফিসার। ও ক্রিমিন্যালকে অপারেশন করে বাঁচিয়েছে। অ্যারেস্ট হিম।”
প্রধান সহকারী ম্যানেজারের চিৎকার শুনে পুলিশ অফিসার একজন সেপাইকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তারবাবুর দিকে এগিয়ে যাওয়া মাত্রই পাশের চা-বাগান থেকে একটা পাথর তীব্র বেগে উড়ে এসে প্রধান সহকারী ম্যানেজারের মাথায় আঘাত করল। তাঁর মুখ থেকে শব্দ পুরোটা বেরোনোর আগেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। পুলিশ অফিসার দিক বদল করলেন। ডাক্তারবাবুর দিকে না-গিয়ে যেদিক থেকে পাথর উড়ে এসেছিল, সেদিকে বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে যেতেই তাঁর কাঁধে আর-একটা পাথর আছড়ে পড়ল। তিনি ‘ওরে ব্বাবা’ বলে বসে পড়তেই বাকি পুলিশরা তাঁকে কোনওরকমে গাড়িতে তুলে নিল। প্রায় নিমেষের মধ্যে গাড়ি দুটো চা-বাগানের বাইরের পিচের রাস্তার দিকে তীব্র গতিতে ছুটে গেল।
ডাক্তারবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন মাঝরাস্তায়। গাড়ি দুটো চোখের বাইরে চলে যাওয়ার পরেও বুঝতে পারছিলেন না চা-বাগানের ভেতর থেকে পাথর দুটো কে অত জোরে ছুড়ে মারল! তিনি চা-বাগানের ওপর নজর রাখলেন। কোথাও কোনও মানুষের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না। শেডট্রিগুলোয় পাখিরা দিব্যি ডেকে যাচ্ছে। হঠাৎ ডাক্তারবাবুর মনে হল, ওই পাথর দুটো পুষি ছুড়ে মারেনি তো?
নিজের বাড়ির সামনে এসে অবাক হলেন ডাক্তারবাবু। সদর দরজায় তালা ঝুলছে। একটু দূরে পাতিবাবুর বাসস্থান। সেদিকে কয়েক পা যেতেই ভদ্রলোক জানলায় এলেন, “আপনার ওয়াইফ বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছেন। ডাক্তারবাবু, আপনি সেখানেই চলে যান,” বলে জানলা বন্ধ করে দিলেন ভদ্রলোক।
কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। তবু ডাক্তারবাবু চা-বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলে এলেন হাসপাতালের সামনে। স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন হাসপাতালের ঢোকার দরজায় তালা ঝুলছে। খুব অবাক হলেন ডাক্তারবাবু। এভাবে তালা ঝুলিয়ে দিলে অসহায় গরিব মানুষগুলো তো বেঘোরে মারা যাবে।
“ডাগদারসাব?”
গলা শুনে পেছন ফিরে হাসপাতালের চৌকিদারকে দেখতে পেলেন তিনি। লোকটি করুণ মুখ করে বলল, “আপনি এখন এখানে থাকবেন না সাব। পুলিশ অনেককেই ধরে নিয়ে গিয়েছে। বাগান এখন একদম বন্ধ।”
আর ম্যানেজারের অফিস যাওয়ার সাহস পেলেন না ডাক্তারবাবু। কিন্তু বড়রাস্তা দিয়ে আর না-হেঁটে বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল। তিনি যে বাগানে ফিরে এসেছেন, তা ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গিয়েছে। নিশ্চয়ই বড়সাহেবের কানে খবরটা পৌঁছে যাবে। এখান থেকে কীভাবে বাইরে যাওয়া যায়? স্ত্রী এখন কোথায়? সে তো কোনও অন্যায় করেনি। পুলিশ নিশ্চয়ই তাকে ধরেনি।
মত পালটালেন ডাক্তারবাবু। আবার পিছন ফিরে হাঁটতে আরম্ভ করলেন।
প্রায় তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হল। বড়সাহেবের বাংলোর সামনে তিনজন বন্দুকধারী পুলিশ। দু’জন চৌকিদার যারা ডাক্তারবাবুকে চেনে, তাদের একজন ভেতরে গিয়ে খবরটা দিয়েছিল।
তিরিশ মিনিট পরে ডাক এল।
আরামকেদারায় বসে আছেন বড়সাহেব। পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন বন্দুকধারী। ম্যানেজার সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে? ওখানে কি অসুবিধে হয়েছে?”
“অসুবিধে হয়নি কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব বেড়ে যাওয়ায় থাকাটা নিরাপদ নয়,” বললেন ওখানকার প্রশাসক।
“যাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে তাদের দেখা পেয়েছ?”
“হ্যাঁ স্যার। আমার সঙ্গে যারা গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে ওদের কোনও মিল নেই। ভাষাও বদলে গিয়েছে।”
“তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওখান থেকে দু’জনকে এখানে নিয়ে আসতে। তার বদলে যাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে, তাদের একজনকে শুনলাম ফেরত আনোনি। এর কী ব্যাখ্যা দেবে?”
“সে নিজে থেকেই সেখানে থাকতে চেয়েছে, আমি নিষেধ করিনি,” ডাক্তারবাবু বললেন।
“তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওদের ওখানে নিয়ে গিয়ে বিশেষ একটা কাজ করিয়ে আনা। তুমি দায়িত্ব পালন করোনি। তোমার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে। তোমাকে সেই কারণে আপাতত সাসপেন্ড করলাম। তোমার সম্পর্কে এনকোয়ারি শেষ না-হওয়া পর্যন্ত তুমি বাগানে ঢুকবে না। তুমি এই জেলার বাইরেও যাবে না,” বড়সাহেব এমনভাবে হাত নাড়লেন যেন তিনি শার্টে লাগা ময়লা সরাচ্ছেন।
বাইরে এসে নদীর পাশে দাঁড়িয়ে একটু ভাবলেন ডাক্তারবাবু। কিছুদিন ধরে তাঁর স্ত্রী বলছিলেন চাকরি থাকতে থাকতে চা-বাগানের বাইরে একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে। অবসরের পর সেখানে থাকা যাবে। বাস্তববাদী যাঁরা, তাঁরা সেই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তিনি অলস হয়ে ছিলেন। বাড়ি করে রাখলে এখন সেখানে যাওয়া যেত! আপাতত তাঁর মনে হল স্ত্রীর সন্ধানে যাওয়াই প্রথম কাজ। তিনি হাঁটা শুরু করলেন।
একপাশে কুলিলাইন, অন্যপাশে ছোট্ট নদী, ডাক্তারবাবু হাঁটতে হাঁটতে চিৎকারটা শুনতে পেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হলেন। পুষি দৌড়োতে দৌড়োতে এগিয়ে আসছে। সামনে পৌঁছে পুষি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। ছেলেটার পেটে গুলি লেগেছে।”
“কোন ছেলে? কে গুলি করেছে?”
“আর কে!” খুব বিরক্ত হল পুষি, “তাড়াতাড়ি চলুন। এখন তো যারা স্বাধীনতা দেবে না, তারা গুলি করে মারে আর যাহা স্বাধীনতা চায়, তারা গুলি খেয়ে মরে। তাড়াতাড়ি চলুন,” ব্যস্ত হয়ে হাত নাড়ল পুষি।
ডাক্তারবাবু অনুসরণ করলেন। পুষির দ্রুত চলার সঙ্গে তাল রাখতে হচ্ছিল তাঁকে। হঠাৎ মনে হল, ওদের পূর্বপুরুষদের জন্মস্থান দেখাতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এখন পুষি তাঁকে পথ চেনাচ্ছে।
হঠাৎ বহু দূর থেকে ভেসে আসা চিৎকার কানে এল। আরও একটু এগোলে শব্দগুলো স্পষ্ট হল, ‘ভারতমাতা কি জয়!’ অনেকগুলো কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হচ্ছে।
একটা ভাঙা খড়ের ঘরের মধ্যে ঢুকে পুষি থমকে দাঁড়াল। ঘরে একটি লোক শুয়ে আছে। একটি কিশোর তার পাশে বসে। ডাক্তারবাবু লোকটির পাশে বসে নাড়ি দেখলেন। শরীর প্রাণহীন।
ওপাশের চিৎকার করা লোকগুলো কাছাকাছি এসে গেছে। আচমকা গলার শিরা ফুলিয়ে পুষি চিৎকার করে উঠল, ‘ভারতমাতা কি জয়!’ কিশোর সশব্দে কেঁদে উঠল।
ডাক্তারবাবু অতীত এবং আগামীকালকে দু’হাতে ধরে রাখলেন। শক্ত করে।
***
