Chapter - 1
এক
বহুদিন ধরে দেশে ফিরতে আনচান করছিল মাসুদ রানার মন। আর এবার বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের জরুরি তলব পেয়ে গতকাল বিকেলে আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে এসেছে ও।
আজ ভোরে বসের ফোন পেয়ে গুলশানের একতলা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে বিশ্রী এক বিশাল জ্যাম ঠেলে কমাণ্ডোদের নিয়ম অনুযায়ী মিটিঙের নির্ধারিত সময়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে আটটা পঞ্চান্ন মিনিটে হাজির হয়ে গেছে মতিঝিলে বিসিআই হেডকোয়ার্টারে। এরপর লিফটে চেপে ছয়তলায় উঠে জানল, এইমাত্র অফিসে পা রেখেছেন বিসিআই চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সোহেল আহমেদ।
ব্যাটার সঙ্গে এখন আড্ডা দেয়ার উপায় নেই, ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি বেয়ে সাততলায় উঠে এল। আর তখনই মনে মনে মস্তবড় এক হোঁচট খেল রানা। বুড়োর নতুন প্রাইভেট সেক্রেটারি রূপসী পপি সুলতানা সত্যিই যেন শিশিরস্নাত তাজা এক শ্বেত-গোলাপ! অবশ্য তার সামনে না থেমে রোমান্টিক এক ফ্লাইয়িং কিস তাকে পাঠিয়ে দিয়ে সোজা ঢুকে পড়ল রানা বৃদ্ধ বাঘের গুহায়। নিঃশব্দে চেয়ার টেনে বসতেই সরু এক লাল ফাইল ওর দিকে ঠেলে দিলেন বিসিআই চিফ। মৃদু খুক-খুক করে কেশে উঠে শুকনো গলায় বললেন, ‘মন দিয়ে পড়ো।’
পাক্কা দশ মিনিট গভীর মনোযোগে ফাইল ঘাঁটল রানা। তারপর কাগজ থেকে চোখ তুলে তাকাল বসের দিকে। ‘স্যর, তার মানে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য সরাতে পারেনি কর্নেল হাকিমুল রাজা।’
ধীরে ধীরে মাথা দোলালেন বিসিআই চিফ। ‘আগেই সন্দেহ করা হয়েছিল স্বরাষ্ট্র সহকারী সচিব জলিল হায়দার চৌধুরীকে। তাই তার কমপিউটারে ছিল বাতিল করে দেয়া কিছু বাজে ডকুমেন্ট। গত পরশু রাতে হাকিমুল রাজার দাওয়াতে গিয়ে সায়ানাইড মেশানো খাবার খেয়ে খুন হয়ে গেছে বিশ্বাসঘাতকটা।’
‘অর্থাৎ, মিশন ব্যর্থ হয়ে গেছে পিসিআই-এর।’
দূরের দেয়ালে চোখ রাখলেন বিসিআই চিফ। ‘তা বলা যায় না। আমি নিজেও মস্ত সর ভুল করে বসেছি।’
চুপ করে তাঁর দিকে চেয়ে রইল রানা।
‘তোমরা সিনিয়ররা দেশে ছিলে না, তাই পিসিআই-এর সেরা অপারেটর হাকিমুল রাজাকে বন্দি করার নির্দেশ দিয়েছি জসিম ও রেজাউলকে।’ চুপ হয়ে গেলেন বৃদ্ধ। থমথম করছে তাঁর গম্ভীর মুখ।
কু ডাকছে রানার মন। পিসিআই এজেন্ট কর্নেল হাকিমুল রাজা পৃথিবীর দুর্ধর্ষ পাঁচজন স্পাইয়ের একজন।
‘জসিম আর রেজাউল পরশু রাতেই মারা গেছে,’ চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিসিআই চিফ। ‘ওদের মৃত্যুর দায় আমি এড়াতে পারি না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর মুখ খুলল রানা, ‘ওদের তো, স্যর, সব ধরনের ট্রেইনিং ছিল।
‘হ্যাঁ, তা ছিল।’ মৃদু মাথা দোলালেন রাহাত খান। কী যেন ভাবতে শুরু করেছেন। একটু পর মুখ তুলে রানাকে দেখলেন। ‘তবে তুমি হয়তো বুঝতে পারছ না, রানা, আমার আসলে উচিত ছিল আরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়া। গুলশান দুই-এ পিসিআই-এর সেফহাউসে তখন ছিল একাধিক দক্ষ খুনি। অথচ, জসিম বা রেজাউলকে যথেষ্ট সতর্ক করিনি। এ-ছাড়াও বেশকিছু বিষয়ে মারাত্মক সব ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বস্ আরও কিছু বলবেন বলে অপেক্ষা করছে রানা।
‘তথ্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, অমানুষিক নির্যাতনকারী পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর চরম নির্যাতন, অত্যাচার ও অনাচারে আগামী এক যুগের ভেতরে কয়েক টুকরো হবে গোটা পাকিস্তান,’ বললেন রাহাত খান। ‘তুমি তো জানো, দেশটির ট্র্যাডিশনাল সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নির্ভরশীল পাঞ্জাবি আর্মি অফিসারদের ওপরে। এবং তাদেরই পা-চাটা হাজার হাজার সরকারি আমলা ও একদল দুর্নীতি-পরায়ণ রাজনৈতিক নেতা মিলে ভয়ানক বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে বালোচিস্তান ও অন্যান্য সব প্রদেশে। …এরফলে আমরা যেন পরে সেসব এলাকার ফুঁসে ওঠা নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে পারি, সেজন্যে বিসিআই থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছিল জরুরি পলিটিকাল আর ইকোনমিকাল ডেটা। এ-ছাড়া . বিসিআই এজেন্টদের আরেকটি জরুরি দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের তৈরি নতুন নীল- নকশা সংগ্রহ করা। ইসলামাবাদে এ-কাজে ব্যস্ত ছিল সবমিলিয়ে আমাদের পাঁচজন তরুণ প্রতিভাবান ছেলে। কিন্তু গত ক’দিন আগে সতর্ক হয়ে ওঠে পিসিআই। তাদের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, প্রথম সুযোগে তারা নিশ্চিহ্ন করে দেবে বিসিআই এজেন্টদেরকে। এবং সেই কাজ দেয়া হয় কর্নেল হাকিমুল রাজাকে।’ ঠোঁটে পুরু এক কালো হাভানা চুরুট গুঁজে রানার উপহার দেয়া রনসন লাইটার দিয়ে ওটাতে আগুন দিলেন বৃদ্ধ। ‘চারদিন আগে ইসলামাবাদে হাকিমুল রাজার দলের হাতে খুন হয়েছে আমাদের সেই পাঁচ এজেন্ট। অথচ আমরা আমাদের ছেলেদের নির্মম মৃত্যুর জন্যে কোন ধরনের বদলা নিতে পারিনি। বা বলতে পারো খুঁজেই পাইনি, হাকিমুল রাজা বা তার দলের খুনিদেরকে। রানা, এ-দায় তো আসলে আমারই।’
চাপা শ্বাস ফেলল রানা। ‘স্যর, হাকিমুল রাজা দুনিয়ার প্রথম সারির গুপ্তচরদের একজন। আমরা অসতর্ক হয়ে খুন হয়ে গেলে আপনি তো সেজন্যে দায়ী হতে পারেন না।’
চুরুটে টান দিয়ে ছাতের দিকে একরাশ নীলচে ধোঁয়া পাঠালেন বৃদ্ধ। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। ‘ঠিক করেছি, এবার দেরি না করে দেখা করব আমাদের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে। আমি আসলে বুঝে গেছি, আমার সময় হয়ে গেছে অবসরে যাওয়ার। বিসিআই-এর নেতৃত্বে নতুন রক্ত এলে আমার চেয়ে ঢের ভালভাবে এই সংগঠন চালাতে পারবে সে।’
‘প্রথমে ভুলও করবে প্রচুর,’ ঢোক গিলল রানা। ‘ফলে নানা দেশে ভয়ানক সব বিপদে পড়বে আমাদের এজেন্টরা
‘আমার তা মনে হয় না; গম্ভীর চেহারায় রানাকে দেখলেন বিসিআই চিফ। ‘প্রধান উপদেষ্টার কাছে তোমার কথাই জানাব।’
আরও বড় একটা ঢোক গিলল রানা। ‘কিন্তু, স্যর…’
‘আসলে, রানা, এ-ছাড়া আর কোন উপায়ও তো নেই,’ বললেন (অব.) মেজর জেনারেল। ‘আশা করি বিসিআই চিফের দায়িত্ব তুমি নিজের কাঁধে তুলে নেবে। আমি যখন পাকিস্তানে বন্দি ছিলাম, তখনও তো ভাঙা এই বিসিআই তুমিই গড়ে তুলেছিলে।’ আবারও কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন রাহাত খান। তারপর নরম সুরে বললেন, ‘আসলে বুড়ো হয়ে গেছি, রানা। অনেক ধরনের ভুল করে বসেছি। এরপর হয়তো আরও বড় কোন ভুল করব, আর যেজন্যে মনে হবে আমার উচিত নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনা।’
‘স্যর, দয়া করে এখনই এ-ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না,’ অনুরোধের সুরে বলল রানা। ‘আমরা আপনার কাছে মাত্র কয়েকটা দিন সময় চাইছি।’
‘সে-সময় পেলে তোমরা কী করবে, রানা?’ গম্ভীর সুরে বললেন বিসিআই চিফ।
‘আমরা বিসিআই থেকে প্রতিশোধ নেব। কর্নেল হাকিমুল রাজা আর তার দলের সবাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খুঁজে বের করব। এরপরেও যদি আপনার মনে হয় অবসরে যাবেন, তখন আমরা কোন আপত্তি তুলব না।’
রানার পেছনে সাদা দেয়ালে চোখ রাখলেন রাহাত খান। একটু পর মৃদু মাথা দোলালেন। ‘বেশ, আমি না হয় আরও কয়েকটা দিন অফিসে এলাম।’
মরা কাঠের মত শুকিয়ে গেছে রানার গলা। ভীষণ কষ্টে চুরচুর হয়ে ভাঙছে বুকের পাঁজর। ছলছল করছে দু’চোখ। চট্ করে অন্যদিকে তাকাল। চাইছে না কট্টর বুড়ো দেখে ফেলুক ওর চোখের অসহায় অশ্রু। ‘আশা করি, স্যর, এই ক’দিনের ভেতরে ভাল কোন সংবাদ আমরা আপনাকে দিতে পারব।’
নির্বাক হয়ে বসে আছেন বিসিআই চিফ
‘তা হলে আমি আসি, স্যর,’ বলে চিফের অফিস থেকে বেরিয়ে এল রানা। এখন আর মনে নেই সুন্দরী পপির কথা।
Chapter - 2
দুই
ছয়দিন আগে বিসিআই হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেছে মাসুদ রানা। এরপর তিনদিন আগে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পাঁচজনের দুর্ধর্ষ একটি দল বেশ ক’টা গ্রেনেড ফাটিয়ে আর একে ফরটি-সেভেন অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিবর্ষণে খুন করেছে হাকিমুল রাজার কিলার টিমের আট সদস্যকে। অবশ্য কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে হাকিমুল রাজা।
সশস্ত্র সেই অচেনা পাঁচ যুবক যে ইসলামিক কোন জঙ্গি দলের সদস্য নয়, সেটা ভাল করেই জেনে গেছে পিসিআই- এর কর্মকর্তারা। তবে তাদের সাধ্য হয়নি পাকিস্তানের লাখ লাখ পুলিশ ও মিলিটারি পারসোনেলকে লেলিয়ে দিয়ে সেই বেপরোয়া যুবকদেরকে গ্রেফতার করা। পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত পার হয়ে ইরানে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেছে ওরা।
এরপর একে একে পার হয়ে গেছে আরও তিনটে দিন। বিসিআই হেডকোয়ার্টার ত্যাগ করার পর ষষ্ঠ দিনে উত্তর আফ্রিকায় মরোক্কোর রাজধানী রাবাতে গতকাল স্যাভয় লে গ্র্যাণ্ড হোটেলের বিলাসবহুল এক সুইটে উঠেছিল মাসুদ রানা। তবে এখন আর সেখানে নেই ও। ভয়ঙ্করভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে ওর সুইট। দু’পাশের দুই সুইটের অতিথিরা আহত হয়েছেন গুরুতরভাবে।
নকল এক পাসপোর্ট দেখিয়ে হোটেলের রেজিস্ট্রি খাতায় নিজের নাম লিখেছিল রানা: সৈয়দ আসাদ জায়েদ। ঠিকানা: ২৮ নং ফ্লাওয়ার গার্ডেন, খাইবান-এ-রুমি, ব্লক এইট, ক্লিফটন, করাচি, সিন্ধ, পাকিস্তান। ব্যবসায়ী মানুষটি এসেছিল মরোক্কোয় অত্যাধুনিক জার্মান প্রিন্টিং মেশিন বিক্রি করার উদ্দেশে। গতকাল গভীর রাতে হোটেল থেকে বহু দূরে সরে যাওয়ার পর, পান-সিগারেটের ছোট্ট এক টং দোকানের পাশে থেমে রেডিয়োর বরাতে রানা জেনে গেছে, রাবাতের পুলিশ ডিপার্টমেণ্ট ধারণা করছে, স্যাভয় লে গ্র্যাণ্ড হোটেলে প্রচণ্ড সেই বিস্ফোরণে একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে করুণভাবে মারা গেছেন মিস্টার সৈয়দ।
গতকাল গভীর রাতে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের তাগিদে চট্ করে ঘুম ভেঙে গেল রানার। মনে চরম অস্বস্তি নিয়ে বাতি না জ্বেলে সার্চ করতে লাগল ওর বেডরুম। একটু পর বিছানার নিচে উঁকি দিতেই দেখতে পেল দপ দপ করে জ্বলছে বৃত্তাকার এক ডায়ালের ভেতরে গোটা কয়েক লাল সংখ্যা!
ডায়ালের সঙ্গে আছে কৎবেলের সমান আকারের সাদাটে কাদার মত একদলা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ!
ওটা বিস্ফোরিত হবে মাত্র বাইশ সেকেণ্ড পর!
এদিকে ডায়াল আর ডেটোনেটর আছে রানার হাতের নাগালের বহু দূরে দেয়ালঘেঁষা নিচু বেডের ফ্রেমের ওদিকে। হামাগুড়ি দিয়ে ওখানে ঢুকতে পারবে না ও!
তখনই একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে চার সেকেণ্ডে রানা পৌঁছে গেছে সুইটের সদর দরজার কাছে। পরের দুই সেকেণ্ড ব্যয় করেছে দরজাটা খুলতে। এরপর ষোলো সেকেণ্ডে করিডোর’ ধরে তীরবেগে ছুটে সরে গেছে চার ঘর দূরে। আর এরপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা হোটেল। তখন কোথাও না থেমে একছুটে নিচতলায় নেমে এসেছে রানা। নির্জন কিচেনে ঢুকে পেছন-দরজা খুলে পা রেখেছে সামনের’ সরু গলিতে। গভীর রাতে গিয়ে উঠেছে রানা এজেন্সির মরোক্কো শাখার চিফ (অব.) ক্যাপ্টেন গোলাম কাদেরের ফ্ল্যাটে।
এরপর ভোরে এসে পৌঁছেছে বর্তমান এই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া নেয়া এই ফ্ল্যাটে। গত তিনদিন ছদ্মনামে এই সেফহাউসটাতে ছিল বিসিআই-এর যুগল এজেন্ট তানিম জাফরি আর তার স্ত্রী জ্যোৎস্না জাফরি। ওদের কাজ ছিল মুখোমুখি এক অ্যাপার্টমেন্টের ওপরে চোখ রাখা। অবশ্য আজ রাত তিনটেয় ওরা গিয়ে উঠেছে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি বাংলার মহাবিক্রম-এর একটি ডাবল-বেড কেবিনে। ভোর চারটায় বাংলাদেশের উদ্দেশে রাবাত বন্দর ছেড়ে রওনা হয়ে গেছে জাহাজটা।
রানার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটের জানালা দক্ষিণমুখী হলেও ঘরে ঢুকছে না একফোঁটা বাতাস। মাত্র ক’দিন আগে জানা গেছে, নিচের গলির উল্টোদিকের বাড়িটার পঞ্চমতলা সেফহাউস হিসেবে দু’বছর ধরে ব্যবহার করছে পিসিআই। গত তিনদিন ধরে ছুটা কাজের মেয়েটাকে মোটা অঙ্কের দিরহাম ঘুষ দিয়ে পিসিআই সেফহাউসের ড্রয়িংরুমের জানালা খুলিয়ে রেখেছে গোলাম কাদের। ওর নির্দেশ মত ফ্যাকাসে সবুজ পর্দা সরিয়ে. দিয়েছে মেয়েটা।
এখন নিজের ফ্ল্যাটের জানালার কাছে চেয়ারে বসে ওদিকের ঘরের দিকে চেয়ে আছে রানা। গতকাল সন্ধ্যায় কাজের মেয়েটা বাতি নিভিয়ে বিদায় নেয়ার পর থেকে ড্রইংরুমে বিরাজ করছে ঘুটঘুটে কালো আঁধার। রানার সামনে ট্রাইপডে বসে আছে স্কোপওয়ালা পুরনো এক রেমিংটন রাইফেল। মেলা বয়স হলেও তুলনা নেই ওটার। যত্নের সঙ্গে জিরো-ইন করে দিয়েছে রানার সাগরেদ রানা এজেন্সির তুখোড় অপারেটর, মার্ক-ম্যান রামিন রেজা। ওর ওপর ভরসা রাখা যায় যে, এক হাজার গজের ভেতরে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করবে ওর রাইফেলটার ৩০৮ বুলেট।
মাসুদ ভাই! হাক্কুর সঙ্গে লাল মুলোর মত অচেনা এক ঢ়েঙা শ্বেতাঙ্গ,’ নিচতলায় নোয়াখালির রশিদ আলীর ছোট্ট ইলেকট্রনিক্সের দোকানে বসে ওয়াকি-টকিতে জানাল গোলাম কাদের। ‘এখন সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। বোধহয় সোজা গিয়ে ঢুকবে ফ্ল্যাটে। প্রথম ঘরটাই ড্রইংরুম। তবে জানালার দিকে চোখ গেলে হয়তো সরাসরি দেখবে আপনাকে।’
‘ঠিক আছে, নিচে বসে চারপাশে চোখ রাখো,’ শান্ত স্বরে বলল রানা।
‘জী, মাসুদ ভাই।’ খুট শব্দে কেটে গেল সংযোগ।
লাল মুলো বোধহয় জন মিউলার, ভাবল রানা।
সিআইএ-র এই হারামি এজেন্টের সঙ্গে মাখামাখি আছে হাকিমুল রাজার। অবশ্য দু’জনই তারা জানে, যার যার দেশের স্বার্থে দেরি করবে না পরস্পরকে পা বাড়িয়ে ল্যাং মেরে ফেলতে। পাকিস্তানি জান্তাদের চোখ আমেরিকার মিলিটারি হার্ডওয়্যার ও মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তার ওপরে। ওদিকে আমেরিকার চাই সন্ত্রাসী দেশটির কাছ থেকে তালেবান গোষ্ঠীর বিষয়ে জরুরি সব তথ্য ও উপাত্ত। আফগানিস্তান থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে তাদেরকে। আমেরিকার সরকার স্বভাবে চরম স্বেচ্ছাচারী হলেও খুব খুশি হবে নতুন তালেবান নেতৃত্বকে কঠোরভাবে শায়েস্তা করার সুযোগ পেলে।
জন মিউলারের কথা ঘুরেফিরে আবারও মনে এল রানার। স্যাভয় লে গ্র্যাণ্ড হোটেলে ওর সুইটে বোধহয় বোমা রেখে গেছে ওই লোকটাই। সিআইএ-র হিংসুটে এই এজেন্ট বহুদিন ধরে চাইছে ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে সেজন্যে ক’বার আড়াল থেকে হামলা করলেও সফল হয়নি।
স্কোপের ভেতর দিয়ে সামনের আঁধার ড্রয়িংরুম দেখছে রানা। ফ্ল্যাটের সদর দরজা খুলে সামান্য ডানে সরলে হাকিমুল রাজা পাবে বৈদ্যুতিক সুইচের বোর্ড। আর আশা করা যায়, সে একবার বাতি জ্বেলে নিলে দুই গুলিতে তাকে আর জন মিউলারকে দুনিয়াছাড়া করতে পারবে রানা।
এক এক করে পেরোল পুরো দু’মিনিট। এরপর স্কোপে সরু একচিলতে সাদা আলো দেখতে পেল রানা। ভেতরের দিকে বামে খুলে যাচ্ছে সামনের ফ্ল্যাটের দরজা। প্রথমে এসে ঢুকল মাঝারি আকারের এক লোক। ডানে সরে এসে হাতড়াতে শুরু করেছে বৈদ্যুতিক বাতির সুইচবোর্চ প্রথমজনের পেছনে ফ্ল্যাটে পা রেখেছে দ্বিতীয়জন।
সুইচ পেয়ে হাকিমুল রাজা জ্বেলে নিল সাদা টিউব লাইট। সে ঘুরে দাঁড়াতেই তার মুখোমুখি হলো লালচে চেহারার দ্বিতীয় লোকটা। লম্বায় সে হাকিমুলের চেয়ে অন্তত ছয় ইঞ্চি উঁচু। সঙ্গীর ঠোঁটে চুমু দেয়ার জন্যে নেমে এস মিউলারের ভারি কামুক ঠোঁট। বিসিআই-এর ডেটা প্রসেসিং ব্রাঞ্চের চিফ রাশেদ আশরাফের তথ্য অনুযায়ী: পিসিআই এজেন্ট (অব.) কর্নেল হাকিমুল রাজা ও আমেরিকান সিআইএ এজেন্ট জন মিউলার দু’জনেই বহুদিনের সমকামী।
স্কোপের ভেতর দিয়ে সরাসরি চেয়ে আছে রানা। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে পাকিস্তানি এজেন্টের তুলে ধরা মুখে নেমে এল সিআইএ এজেন্টের মুখ। রানাকে খতম করে মহাফূর্তিতে আছে তারা। এবার বোধহয় বেডরুমে গিয়ে একদফা মৌজ না করলেই নয়!
মিউলারের মোটা মাথার গোড়ায় স্কোপের ক্রস-হেয়ার তাক করল রানা। ধীরে ধীরে ট্রিগারে চেপে বসল ওর তর্জনী। পরক্ষণে আলতো স্পর্শে ছিটকে গেল . ৩০৮ বুলেট। এক সেকেণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে চারপাশে ছড়িয়ে গেল বিকট ‘কড়াৎ!’ আওয়াজ। স্কোপের ভেতর দিয়ে চেয়ে আছে রানা। ফেটে গেছে আকাশ থেকে পড়া মাঝারি তরমুজের মত মিউলারের মাথা। সামনে হোঁচট খেয়ে কাত হয়ে কাটা কলাগাছের মত ধুপ করে মেঝেতে পড়ল তার লাশ। পরের সেকেণ্ডে রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত চেহারায় মৃত মিউলারের পাশে লুটিয়ে পড়ল হাকিমুল রাজার মৃতদেহ।
রানার এক ঢ়িলে খতম হয়ে গেছে দুই পাখোয়াজ ঘুঘু!
আপাতত কাজ শেষ বিসিআই এজেন্টের। ট্রাইপডে রাখা রেমিংটন রাইফেল থেকে পিছিয়ে ধীরেসুস্থে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা। ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা গিয়ে খুলল ফ্ল্যাটের সদর দরজা। হাত থেকে রাবারের গ্লাভস দুটো খুলে গুঁজে রাখল প্যান্টের পকেটে। দ্রুত নেমে এল নিচতলায়। গলিতে বেরিয়ে এসে হেঁটে চলল বড় রাস্তার দিকে। দূরে শুনতে পেল পুলিশের গাড়ির একাধিক সাইরেন। রানাকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে আরেক গলিতে গিয়ে ঢুকল গোলাম কাদের। একবার ওদিকে চেয়ে নিয়ে হাঁটার গতি বাড়াল রানা। ভাল করেই জানে, কর্নেল হাকিমুল রাজার আকস্মিক মৃত্যু এবং স্যাভয় লে গ্র্যাণ্ড হোটেলের সুইটে ওর লাশের চিহ্নমাত্র না পেয়ে উন্মাদ হয়ে উঠবে পিসিআই-এর কর্মকর্তারা। চারপাশে পাঠাবে রেড অ্যালার্ট: ফ্রম নাউ অন ড্রপ ইয়োর অল আদার মিশস্! গিভ ইয়োর ফুল অ্যাটেনশন টু কিল দ্য বাস্টার্ড বিসিআই এজেন্ট মাসুদ রানা!
তাদের সঙ্গে দল পাকিয়ে রানাকে খুঁজে বেড়াবে সিআইএ-র শতখানেক এজেন্ট। আর এমনটা হবে ভেবেই নিখুঁত এক নকল পাসপোর্ট বিসিআই থেকে রানাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান।
যেহেতু প্রদীপের তলা সবসময় অন্ধকার, সেই গূঢ় নিয়ম মেনে আজ দুপুর বারোটায় কেএলএম-এর এক বিমানে চেপে ব্যবসার জরুরি কাজে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপে চলেছেন ভারতীয় শর্ষে-তেল ব্যবসায়ী সুপ্রিয় সোমনাথ সাহা।
আপাতত বেশকিছু দিনের জন্যে গভীর অতলে ডুবে যেতে হচ্ছে তাঁকে!
Chapter - 3
তিন
প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল বিস্তৃত সুনীল বুকে ছোট্ট এক লালচে ফোঁটার সমান আমেরিকার আগ্নেয়দ্বীপ হাওয়াই।
বারো দিন আগে এ-দ্বীপের সাধারণ হোটেল হাওয়াই-এর একটি সুইটে উঠেছে রানা। আর আজ এখানে ওর তেরোতম ভোর। একটু আগে ঘুম ভেঙে যেতেই বাথরুম থেকে মুখ- হাত ধুয়ে এসেছে রানা। এরপর শুরু করেছে লিভিংরুমে বুকডন। প্রথমে বিশবার, তারপর চার দফায় কয়েক সেকেণ্ড বিরতি নিয়ে আরও আশিবার। ব্যথা থেকে বুঝতে পেরেছে, দাউ-দাউ করে পুড়ছে ওর ট্রাইসেপ ও ডেল্টয়েড পেশির ল্যাকটিক অ্যাসিড। বুকডন শেষ করে বিশ্রাম না নিয়েই বেডরুমে ফিরে দু’পায়ের আঙুল বাধিয়ে নিল টেবিলের নিচের অংশে। বিশবার করে পাঁচ দফায় দিল মোট এক শ’টা সিট আপ। আড়ষ্ট হয়ে গেছে ওর পেটের পেশি। উঠে চলে গেল বেডরুমের দরজার লিন্টেলের সামনে। রানার ওজন নেয়া ওটার জন্যে কিছুই নয়। লাফ দিয়ে তাকের মত জায়গাটার কিনারা দু’হাতে ধরল রানা। দু’পা ঝুলছে শূন্যে। ভাঁজ করে নিল হাঁটু। হাতের জোরে চিবুক তুলল লিন্টেলের কাছে। কয়েক সেকেণ্ড পর নামিয়ে নিল শরীর। আবারও চিবুক নিল লিন্টেল ব্রাবর। পাঁচ দফায় এক শ’বার চিন আপ করার পর আস্তে করে নেমে পড়ল মেঝেতে। তরতাজা বোধ করছে।
ভোরের ধূসর আলো ফোটার আগেই এই তিন ব্যায়াম সেরে নিল আরও ছয় দফা। এটা রানার কাছে আসলে সাধনার মত। ভাল করেই জানে, শারীরিকভাবে আনফিট হলে যে-কোন সময়ে আসবে করুণ মৃত্যু।
ব্যায়াম শেষ করে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার সেরে নিল রানা। পোশাক পরে ব্রেকফাস্টের জন্যে রেস্টুরেন্টের দিকে রওনা হবে, এমন সময় বেজে উঠল, স্মার্টফোন। ওটার স্ক্রিনের দিকে চেয়ে চমকে গেল রানা। ওকে কল করেছেন বিসিআই চিফ! বৃদ্ধের কণ্ঠ আবারও শুনবে ভেবে ধক করে উঠল ওর হৃৎপিণ্ড। শিরার ভেতরে কেমন এক শিরশিরে অনুভূতি। বুড়ো কি তা হলে দারুণ কোন রোমাঞ্চকর অ্যাসাইনমেন্ট দেবেন ওকে?
একবার ঢোক গিলে কল রিসিভ করল রানা।
ও-প্রান্ত থেকে টিট-টিট-টিট শব্দ হচ্ছে। তিন সেকেণ্ড পর খস খস শব্দ হতেই রানা বুঝল, কাজ শুরু করেছে বিসিআই-এর টেকনিশিয়ানদের তৈরি নিখুঁত ফোনকল এনক্রিপশন ইলেকট্রনিক মেশিন।
‘হ্যালো, স্যর, আই হোপ দ্যাট ইউ আর ওয়েল?’ নিচু গলায় বলল রানা।
‘ভাল আছি, রানা,’ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন (অব.) মেজর জেনারেল রাহাত খান। ‘এটাও জানি, ফিরে পেয়েছ তোমার ফিটনেস। সেক্ষেত্রে কি ধরে নেব আগের মতই ভাল স্কিয়িং করো?’
‘মোটামুটি পারি, স্যর,’ আরেকবার ঢোক গিলল রানা। ‘সেক্ষেত্রে নতুন করে অফিসে যোগ দেয়ার পর এটা হবে তোমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট, রানা।’
‘আমাকে কোথায় যেতে হবে, সার?’
‘স্পেন। ওখানে খুব বেশি তুষারপাত না হলেও সঙ্গে নেবে একজোড়া ভাল স্কি।’
‘জী, স্যর।’
‘অবশ্য, তার আগে মেয়েটাকে নিয়ে হাজির হবে লণ্ডনে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের হেডকোয়ার্টারে।’
বুড়োটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল, ভুরু কুঁচকে ফেলল রানা। উনি কি ভাবছেন ওর সঙ্গে কোন মেয়ে আছে? আর তাকে নিয়ে হাজির হতে হবে বসের সামনে?
‘স্যর, সঙ্গে করে কোন মেয়েকে নিয়ে আসব?’
‘যে চলেছে তোমার সঙ্গে স্পেনে। ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের নার্কোটিক ডিভিশনে কাজ করে, নাম মারিয়া হ্যারল্ড। সিয়েরা নেভাডায় গিয়ে এক লোকের সঙ্গে দেখা করবে তোমরা। পরে এ-বিষয়ে ব্রিফ করব। আগে হাওয়াই দ্বীপ ত্যাগ করে চলে যাও এনসেনাডায়।’
‘স্যর, এনসেনাডা তো বাজা ক্যালিফোর্নিয়ায়।’
‘হ্যাঁ, খুব ছোট এক জেলে-শহর।’
আগেও ক’বার মেক্সিকোয় গেছে রানা। মহাসাগরের তীরে জেলে-শহর বা গ্রামের পরিবেশে শুঁটকি মাছের চিমসে বাজে গন্ধের কথা মনে পড়ে গেল ওর।
‘তুমি মারিয়া হ্যারল্ডকে পিক করে ফিরবে লণ্ডনে। শুনেছি ড্রাগের চালানের রুট জানার বিষয়ে সে সত্যিকারের প্রতিভা।’
‘স্যর, সেক্ষেত্রে আমার নিজের কাজ আসলে কী হবে?’
‘তুমিই তো তোমাদের দু’জনের দলের লিডার। তোমরা ড্রাগ লর্ড রোমিয়ো মোরেলির কাছ থেকে এক বা একাধিক মাইক্রোফিল্ম সংগ্রহ করবে। শুনেছি পুরনো আমলের ধ্যান- ধারণার মানুষ সে। স্মার্টফোন বা কমপিউটার ব্যবহার করে না। মাফিয়ার খুনিরা গলা ফাঁক করে দেয়ার আগেই তার কাছ থেকে বুঝে নেবে সব। অবশ্য তোমার প্রথম কাজ এখন এনসেনাডার লা ক্যাসা ভার্দে মোটেলে গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে দেখা করা।’
‘জী, স্যর। যত দ্রুত সম্ভব লণ্ডনে পৌঁছে যাব আমরা।’
‘ব্রিটেনে ফিরে বিবাহিত দম্পতি হিসেবে পশ কোন হোটেলে উঠবে। আমি এখন লণ্ডনেই আছি। আমার ফোন পেলে চলে আসবে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের হেডঅফিসে। আরও কিছু জানতে চাও?
‘জী-না, স্যর।’
‘তুমি এয়ারপোর্টে গেলেই মেক্সিকোর ভিসার ব্যবস্থা করবে সৈয়দ শাহ্ আতিকুল্লাহ্। সিকিয়োর ই-মেইলে জরুরি কিছু তথ্য পাবে। বিমানে উঠে ওগুলো পড়ে নিয়ো।’
টিট করে একটা আওয়াজ হতেই কেটে গেল লাইন। মাত্র ক’দিন আগে মরুময় দেশ মরোক্কো থেকে হাওয়াই দ্বীপে উড়ে এসেছে রানা। অথচ আজই আবার এখান থেকে বিদায় নিতে হবে। স্মার্টফোন রেখে ইণ্টারকমে হোটেল ডেস্ক ক্লার্ককে জানাল ও, যাতে ওর বিল রেডি করে সে। এবার কল দিল এয়ারপোর্টে। ওখান থেকে জানানো হলো, মাত্ৰ দু’ঘণ্টা পর এনসেনাডার উদ্দেশে রওনা হচ্ছে অ্যাওরোমেক্সিকো এয়ারওয়েইযের ছোট এক বিমান।
চট্ করে নাস্তা সেরে লাগেজ গুছিয়ে নিলে ওই বিমানে করে দুপুরের আগেই এনসেনাডায় পৌঁছে যেতে পারবে, কাজেই দেরি না করে বিমানের টিকেট বুক করল রানা।
Chapter - 4
চার
ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চাদ্দেশে লেজের মত যে জায়গা, কে যেন ওটার নাম দিয়েছিল বাজা ক্যালিফোর্নিয়া। কোন একসময়ে আমেরিকা ও মেক্সিকোর ভেতরে মরুময় এ-এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেখা দিল চরম তিক্ততা। এরপর বহু মাস দরাদরি করার পর শেষমেশ ওটা আমেরিকার সরকারের কাছ থেকে বুঝে নিল মেক্সিকান সরকার।
বিসিআই চিফের দেয়া ই-মেইলের তথ্য পড়ে নেয়ার পর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল রানা। বিমানের ঝাঁকুনিতে চোখ মেলে জানালা দিয়ে দেখল; ছোট্ট জেলে-শহর, এনসেনাডার একপ্রান্তে এয়ারপোর্টের ধুলোভরা এয়ারস্ট্রিপে নেমে এসেছে অ্যাওরোমেক্সিকোর ছোট্ট বিমান।
মিনিটখানেক পর একতলা দালানের কাছে বিমান থেমে যেতেই ভেতর থেকে খোলা হলো পাঁচ ধাপের ধাতব সিঁড়ি। সবার শেষে বিমান থেকে নেমে সূর্যের আলোর প্রখরতা আর মারাত্মক তাপ টের পেয়ে চমকে গেল রানা। হাতব্যাগ থেকে নিয়ে চোখে পরল রে-ব্যান সানগ্লাস। এদিকে-ওদিকে চেয়ে ভাবল, মহাসাগরের এত কাছে কীভাবে বালির রাজ্য হয়ে উঠেছে এই মরু এলাকা!
রেইডার টাওয়ারের কাছে নতুন এক মাস্ট্যাং ট্যাক্সি- ক্যাব দেখে হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে ডাকল রানা। বাদামি রঙের যুবক শহরে যাবে সেটা জানার পর খুশিমনে রাজি হয়ে গেল ড্রাইভার। ব্যাক ডালায় ব্যাগ রেখে পেছনের সিটে উঠে পড়ল রানা। শুরু হলো ভাঙাচোরা রাস্তায় ঝাঁকি খেয়ে এগিয়ে চলা। দু’দিকে সেব্রাশ আর গ্রিসউডে ভরা সাভানা।
মিনিট পাঁচেক পর এবড়োখেবড়ো রাস্তার ধারে লাল এক সুজুকি গাড়ি দেখতে পেল রানা। বনেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক লোক। রানার গাড়ি দেখে ডানহাত তুলে থামতে- ইশারা করল সে। ইতস্তত করে লাল সুজুকির পাশে ট্যাক্সি- ক্যাব থামাল ড্রাইভার। ভুরু নাচিয়ে লোকটার কাছে জিজ্ঞেস করল, ‘গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে?’
মাথা নাড়ল লোকটা। ট্যাক্সি-ক্যাবের পেছনের জানালায় ঝুঁকে এল সে। হাতে ছোট একটা নীল পাউচ। ‘মিস্টার সাহা? এটা আপনার জন্যে। কাজ শেষে ভেতরের জিনিসটা বিসিআই সেফহাউসের কিপারের হাতে দিয়ে দেবেন।’
চামড়ার পাউচের ভেতরে আছে শক্ত কিছু। দৈর্ঘ্যে বড়জোর দশ ইঞ্চি। চওড়ায় চার বা পাঁচ ইঞ্চি।
‘আপনার পছন্দের জিনিস, স্যর,’ বলল লোকটা।
জবাবে একবার মাথা দোলাল রানা। বুঝে গেছে, বিসিআই থেকে পৌঁছে দেয়া হলো ওয়ালথার পিপিকে পিস্তল।
দ্বিতীয়বার না চেয়ে নিজের গাড়িতে উঠল লোকটা। রওনা হয়ে গেল এয়ারপোর্টের দিকে। নতুন করে শহরের দিকে চলল রানার ট্যাক্সি।
ছুটন্ত গাড়িতে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর শহরের প্রধান সড়কে পৌঁছে গেল রানা। ওর ভুল না হলে স্প্যানিশ ভাষায় লা ক্যাসা ভার্দের অর্থ ‘সবুজালয়’। অথচ রাস্তার শেষমাথায় গিরগিটির মত হরেক রঙা চুনামাটি আর একতলা মোটেলের কোথাও সবুজ গাছের চিহ্নমাত্র দেখতে পেল না।
ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্যাগ সংগ্রহ করল রানা। ড্রাইভারকে বকশিশ সহ ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল মোটেলের লবিতে। ঝলমলে রোদ থেকে এসে মোটেলের ভেতরটা ঘুটঘুটে আঁধার বলে মনে হলো ওর। অবশ্য কয়েক পলকে ফিরে পেল দৃষ্টিশক্তি।
লবির কাউন্টারে বসে আছে কাঠবিড়ালির লেজের মত মোটা গোঁফের এক যুবক। আগ্রহ নিয়ে দেখছে রানাকে। ভেবেছে পেয়ে গেছে নতুন গেস্ট। তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রানা। একবার হাতের ইশারা করে যুবককে পাত্তা না দিয়ে তুলে নিল হাউস ফোন। পাঁচ নম্বর বাটন টিপে দিতেই ওদিক থেকে কল রিসিভ করল এক মেয়ে। সে কিছু বলার আগেই তাকে জানাল রানা, ‘মারিয়া, ডার্লিং? আমি পৌঁছে গেছি!’
‘রানা?’ একটু কাঁপল মেয়েটার গলা।
‘তা হলে আমার বদলে আর কে আসবে, ডার্লিং?’
‘তুমি সত্যিই আমার ডার্লিং হলে বলো দেখি, বছরের এগারোতম মাস কখন হবে অক্টোবর?’
‘যখন পেকে গাছ থেকে খসে পড়বে আপেল।’
‘তুমি তা হলে সত্যিই রানা? এখন কোথায় আছ?’
‘মোটেলের লবিতে অধীর হয়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। তুমি আসবে, নাকি আমিই তোমার রুমে হাজির হব?’
‘না-না, আমিই আসছি,’ দ্রুত বলল মেয়েটা।
‘তো দেখা করো বারে,’ বলল রানা। লবির শেষমাথায় বারকাউন্টারের ওদিকে ব্যস্ত হয়ে তোয়ালে দিয়ে গ্লাস মুছছে এক লোক। জায়গাটা অন্ধকারময়। কাউন্টারের সামনে রানা গিয়ে থামতেই ওর দিকে তাকাল বারটেণ্ডার। ‘সেনোর?’
‘পিসকো সৌর,’ বলল রানা।
ঘুরে সিট্রাস দেয়া কনিয়্যাক মিক্স করতে লাগল লোকটা। পেছনে বাতাসের মৃদু আলোড়ন টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল রানা। এগিয়ে আসছে হালকা গড়নের এক মেয়ে। চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে তাজা লেবুর মিষ্টি সুবাস। মারিয়া হ্যারল্ডের মণিদুটো রাতের মত কালো। কালো চুল কোমর পর্যন্ত দীর্ঘ। বয়স হবে বড়জোর পঁচিশ। ত্বক শাপলা ফুলের মত ফ্যাকাসে সাদা।
‘রানা?’ কেমন যেন অনিশ্চিত সুরে বলল সে।
‘হাউ আর ইউ, মাই ডার্লিং মারিয়া?’ জবাবে বলল রানা। ওর দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিল মেয়েটা। নরম হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল রানা। একদিকের দেয়ালের কাছে একটা টেবিল দেখাল। ‘আমরা বরং ওখানে গিয়ে বসি।’
মারিয়া হ্যারল্ডকে এগোতে দিয়ে পিছু নিল রানা। এই সুযোগে দেখে নিল মেয়েটার দেহের গড়ন। রসিক প্রকৃতি দু’হাতে অঢেল যৌবন দিয়েছে মারিয়াকে। যেন কোন সুপার মডেল। বিশেষ করে উরু দুটো কলাগাছের কাণ্ডের মত পুরু।
টেবিলে মুখোমুখি চেয়ারে বসল ওরা।
নিজের জন্যে আইস টি চাইল মারিয়া, তারপর সামনে ঝুঁকে চকচকে চোখে দেখল রানাকে। ‘হ্যাঁ, এবার আলাপ করা যাক।’
‘বলার তো কিছু নেই, বলল রানা, ‘আমাকে বলা হয়েছে, লণ্ডনে যাওয়ার পর আমাদের দু’জনকে ব্রিফ করা হবে।
‘আমরা কখন রওনা হব?’
‘আজ বিকেলেই।’
‘কিন্তু… তা হলে তো এখনই রওনা হতে হবে!’
‘ঠিকই ধরেছ,’ বলল রানা। ট্রে হাতে এসে ওর সামনে হার্ড ড্রিঙ্কের গ্লাস নামিয়ে দিল এক বয়। এবার ট্রে থেকে নিয়ে মারিয়ার সামনে রাখল আইস দেয়া চা। গ্লাস তুলে এক চুমুক কনিয়্যাক গিলে বলল রানা, ‘চা শেষ করে ঘরে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নাও। পরের ফ্লাইটে রওনা হব আমরা।’
‘কিন্তু এখানে তো আমার মিশন শেষ হয়নি…..’
‘রিপোর্ট পড়ে সেটাই জেনেছি আমি। তবে যাদেরকে খুঁজছিলে তোমরা, সেইসব ড্রাগ লর্ড উড়াল দিয়েছে মেক্সিকো ছেড়ে উরুগুয়েতে।’
‘তো এখন আমাকে কী করতে হবে?’ তিক্ত কণ্ঠে বলল মারিয়া।
‘আমার সঙ্গে যেতে হবে স্পেনে। আরও জরুরি কাজে।’
‘ও, তাই?’ বরফখণ্ড দেয়া চায়ে চুমুক দিল মারিয়া।
‘হ্যাঁ। আমরা হয়তো দু’জন মিলে ওখানে স্কি করব।’
ঝিলিক দিল মেয়েটার দু’চোখ। ‘সত্যিই? তার মানে সিয়েরা নেভাডায় যেতে হবে? ওখানে তো গ্রানাডার সামান্য দূরেই দুনিয়ার সেরা স্কি রিসোর্ট!’
চুপ করে মেয়েটাকে দেখছে রানা।
‘তুমি কি স্কিয়িং পারো, রানা?’ জানতে চাইল মারিয়া।
‘একটু-আধটু,’ বলল রানা। ‘তুমি পারো তো?’
‘শুধু পারি বললে মিথ্যা বলা হবে, খুবই ভাল পারি,’ খুশি হয়ে হাসল মারিয়া।
রানার দিকে চেয়ে আছে বারটোর। তবে তাকে পাত্তা না দিয়ে মারিয়ার উদ্দেশে চোখ টিপল রানা।
জবাবে ওকে পাল্টা চোখ টিপে হাসল মারিয়া-তারুণ্যে ভরা ব্রিটিশ এক সুন্দরী মেয়ে।
মিনিটখানেক পর চা শেষ না করেই নিজের ঘরে ফিরল মারিয়া। লবিতে রয়ে গেল রানা।
দশ মিনিট পর মাঝারি এক হ্যাভারস্যাক হাতে লবিতে এল মেয়েটা। ওর ভাব দেখে রানার মনে হলো, মারিয়া আশা করছে ভদ্রতা করে হ্যাভারস্যাক বয়ে বেড়াবে ও।
মেয়েটার ব্যাগের দিকে হাত বাড়াল না রানা। বিরস চেহারায় ক্লার্কের কাছে বিল মিটিয়ে ওর পিছু নিল মারিয়া। মোটেল থেকে বেরিয়ে এল ওরা। আর তখনই সূর্যের সোনালি আলো ঠিকরে যেতেই রাস্তার ওদিকে ড্রাই ফুডের দোকানের ছাতে তাকাল রানা। ওর বুঝতে দেরি হলো না, রাইফেলের স্কোপের ক্রস-হেয়ার এখন চেয়ে আছে ওর কপাল লক্ষ্য করে!
এক সেকেণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে নড়ে উঠল রানা। খপ করে কাঁধ ধরে মারিয়াকে ঠেলে দিল বামদিকে, নিজে ঝাঁপিয়ে পড়ল ডানে। যদিও দরজার আড়াল নেয়ার আগেই প্রচণ্ড আওয়াজে গর্জে উঠল রাইফেল।
‘মারিয়া, মাটিতে শুয়ে থাকো!’ গলা উঁচিয়ে বলল রানা।
‘কিন্তু, রানা…’
‘একদম নড়বে না!’ চাপা স্বরে সতর্ক করল রানা। একদৌড়ে লবির জানালার কাছে পৌঁছে লাফ দিয়ে টপকে গেল চৌকাঠ। আড়াল থেকে জানালা দিয়ে দেখল রাইফেলের নলে রোদের সোনালি ঝিলিক। শুকনো খাবারের দোকানের ছাতে এখনও রয়ে গেছে আততায়ী।
রানা ওয়ালথার পিপিকে বের করার আগেই আবারও গর্জে উঠল রাইফেল। মারিয়ার মাথার তিন ইঞ্চি ওপরে কাঠের দেয়ালে বিধল বুলেট। ক্রল করে দরজার দিকে চলল মেয়েটা। মনে মনে খুশি হলো রানা, সঠিক কাজই করছে মারিয়া।
চোখ সরিয়ে দোকানের হাতের দিকে চেয়ে লোকটাকে আর দেখতে পেল না রানা। যদিও কানে এল কার যেন ছুটে চলার ধুপ-ধাপ আওয়াজ। দোকানের ধুলোভরা জানালার ওদিকে কালো স্যুট পরা এক লোক। দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ল সে। দৌড়ের গতি কালবৈশাখী ঝড়ের মত। দেখতে না দেখতে রাস্তার বাঁক ঘুরে হারিয়ে গেল লোকটা।
মারিয়া যেন মোটেল থেকে না বেরোয়, সেজন্যে হাতের ইশারা করে ছুটে রাস্তায় চলে এল রানা। শুকনো খাবারের দোকানে ঢুকে দেখতে পেল একদিকে সরু সিঁড়ি। একেকবারে তিনটে করে ধাপ ডিঙিয়ে উঠে এল ছাতে। বুঝতে দেরি হলো না যে, পলাতক আততায়ীকে গুলি করার সুযোগ হারিয়ে গেছে। এখন আর ছাতে কেউ নেই। ফাঁকা পড়ে আছে নিচে রাস্তা। ছাতে একগাদা মেক্সিকান সিগারেটের ফিল্টার আর একটা সমব্রেরো হ্যাট। রোদে চকচক করছে তামার গুলির কিছু খোসা।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল রানা। ওর দিকে চেয়ে চওড়া হাসি দিল দোকানের মালিক। থরথর করে কাঁপছে তার বিশাল ভুঁড়ি। ‘আপনার মতই ট্যুরিস্ট! দু’দিন হলো আমার দোকানের ছাত ভাড়া নিয়েছিল!’
‘ট্যুরিস্ট?’ তিক্ত সুরে বলল রানা।
‘সি।’
‘চেহারার বর্ণনা দিতে পারবেন?’
ঢালু দু’কাঁধ ঝাঁকাল দোকানের মালিক। ‘আপনার চেয়ে বেশ কম হবে লম্বায়। কালো চুল। কালো চোখ। তবে চিকন গড়নের লোক। কেমন যেন ঘাবড়ে যাওয়া চেহারা।’
এই বর্ণনা থেকে কাউকে চেনার উপায় নেই। দোকান থেকে বেরিয়ে মারিয়াকে নিয়ে আবার মোটেলের লবিতে ঢুকল রানা। ক্লার্ককে জানাতেই ট্যাক্সি-ক্যাবের কোম্পানিতে ফোন দিল সে। ওদিকের লোকটাকে জানাল, একবার মাঝে বিরতি নিয়ে সেনোর রানা ও তাঁর স্ত্রী সোজা যাবেন এয়ারপোর্টে।
লবির আরেকপ্রান্তে মারিয়াকে নিয়ে এল রানা। চেয়ার টেনে বসল ওরা। ‘লোকটা এসেছে দু’দিন আগে,’ বলল রানা।
‘তো?’ ওর চোখে তাকাল মারিয়া।
‘তুমি নিজে এখানে কবে এসেছ?’
‘চারদিন হলো।’
‘তোমার কি মনে হয় তোমাকে চিনে গিয়েছিল সে?’ চোখ সরু করে কী যেন ভাবল মারিয়া। রানার কথায় বিব্রত বোধ করছে। কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা নাড়ল। ‘আমার তা মনে হয় না।’
‘নতুন মিশন পাওয়ার আগে কী ধরনের কাজ করছিলে?’ জানতে চাইল রানা।
‘যারা ব্রিটেনে মেক্সিকান ড্রাগ পাচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করছিলাম আমরা। পুলিশের সাহায্য নিয়ে কয়েকজন ড্রাগ লর্ডের ক্ষতি করে দিই। তবে আমাদের দলের চারজন মারা গেলে আমাকে লুকিয়ে পড়তে হয়েছে।’
‘অর্থাৎ ড্রাগ লর্ডদের র্যাকেট তোমরা ভাঙতে পারোনি।’ চোখ নিচু করে মাথা দোলাল মারিয়া। ‘মেক্সিকান ড্রাগ লর্ডদের দলে আছে শত শত লোক।’
জানালা দিয়ে শুকনো খাবারের দোকান দেখল রানা। ‘সব মিলিয়ে এ-মিশনে তোমাদের, কতজনকে পাঠানো হয়েছিল?’
‘আমাকে নিয়ে পাঁচজন।’
‘অবাক না হয়ে পারলাম না,’ বিরক্তি চেপে বলল রানা।
‘বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। নার্কোটিক ডিভিশন থেকে বলা হয়েছিল তথ্য সংগ্রহ করার জন্যে। লড়তে নয়।’
‘কিন্তু তোমরা ধরা পড়ে গেলে শত্রুপক্ষের চোখে।’
রেগে গিয়ে রানার চোখে তাকাল মারিয়া। ‘এমনটা তো যে-কোন দলের ভাগ্যেই ঘটতে পারে।’
কনুই ধরে ওকে চেয়ার থেকে টেনে তুলল রানা। জানালা দিয়ে দেখেছে, এইমাত্র এসে থেমেছে ট্যাক্সি-ক্যাব। ‘চলো, এখানে আর নয়। একবার একজনের সঙ্গে দেখা করব। কিছু জিনিস ফিরিয়ে দেব। তারপর কয়েক দফা বিমান পাল্টে পৌঁছে যাব লণ্ডনে।’
রানার কণ্ঠস্বরে কঠোরতা বুঝে আপত্তি তুলল না মারিয়া হ্যারল্ড। ভেজা বেড়ালের মত চুপচাপ মোটেল ত্যাগ করে গিয়ে উঠল ট্যাক্সি-ক্যাবে। স্কার্ট সরে যাওয়ায় ওর লোভনীয় ফর্সা উরু বেরিয়ে আছে, তবে এখন আর ওদিকে মন নেই বেরসিক রানার।
Chapter - 5
পাঁচ
ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের সিচুয়েশন রুম সম্পূর্ণ সাউণ্ডপ্রুফ। সেখানে যাঁর যাঁর চেয়ারে বসে আছেন বিসিআই চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান আর বিএসএস-এর চিফ মার্ভিন লংফেলো। মুখোমুখি দুই চেয়ারে মাসুদ রানা ও মারিয়া হ্যারল্ড।
‘এবার বাতি নিভিয়ে দাও,’ জানালেন মিস্টার লংফেলো।
পরের সেকেণ্ডে ঘুটঘুটে অন্ধকার নামল বিশাল ঘরে। সামনের দেয়ালের মস্ত স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটা ছবি।
‘রোমিয়ো মোরেলি,’ গুড়গুড় করল বিসিআই চিফ রাহাত খানের ভারী কণ্ঠ। ‘এ-ছবি তার পনেরো বছর আগের। অপেক্ষাকৃত বড় ছবি থেকে কেটে নেয়া হয়েছে।’
রানা দেখল লোকটার পেছনে ভ্যাটিকান সিটির গম্বুজ।
‘ক্যানন ক্যামেরার এই ছবি অন্যগুলোর চেয়ে ভাল। এ- ছাড়া মোরেলির অন্যান্য যেসব ছবি পাওয়া গেছে, সেসবের জন্যে খরচ করতে হয়েছে বহু টাকা। তা ছাড়া, এমন কোন প্রমাণ নেই যে মাফিয়ার ভেতর থেকে কেউ এসব ছবি বিক্রি করেছে। যদিও আমরা সেটাই ধারণা করছি।’
ছবির দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিল রানা। ওটা এতই ঝাপসা যে ভাল করে বোঝা যায় না লোকটার নাক-মুখ। মোরেলির মাথার চুল কালো। থুতনি বড়। তবে মুখের তুলনায় বেমানান নয়। খুব ছোট ছবি থেকে বড় করা হয়েছে দৃশ্যটা।
রাহাত খান একটা বাটন টিপে দেয়ায় স্ক্রিনে ভেসে উঠল কর্সিয়ার ম্যাপ। লাল কালিতে ঘেরা হয়েছে বাসিয়া শহর।
‘জানা গেছে কর্সিয়ার বাসিয়ার শহরতলীতে নির্জন এলাকায় গোপনে বাস করে রোমিয়ো মোরেলি। তার বাড়িটা নেপোলিয়ানের আমলে তৈরি চমৎকার এক ভিলা। সেখানে কাজ করে বারোজন ভৃত্য। এ ছাড়া তাকে পাহারা দেয় দু’জন বডিগার্ড। এলিনা পার্কারসন নামের এক মেয়েকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছে মোরেলি।
‘মোরেলির মা বাঙালি মেয়ে, বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে গিয়েছিল স্কলারশিপ নিয়ে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বিয়ে করে মাফিয়ার এক ফুটসোলজারকে। এরপর আর লেখাপড়া হয়নি তার। একটা ছেলে হওয়ার মাত্র ছয় বছর পর ক্যান্সারে ভুগে মারা যায়। তার কয়েক বছর পর এক বন্দুক-যুদ্ধে খুন হয় মোরেলির বাবা। বর্তমানে রোমিয়ো মোরেলির বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। কিছু দিন রোমে চাকরি করার পর গোপন কোন কারণে তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে ইতালিয়ান সরকার। বিয়ে করেছিল ভালবেসে। কয়েক বছর পর নিউমোনিয়ায় মারা গেছে তার সেই স্ত্রী। মোরেলির চাকরি ছিল না বলে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারেনি। তাতে তিক্ত মনে ভিড়ে যায় একদল জালিয়াত ও চোরের দলে। এরপর ওখান থেকে বেরিয়ে এনফোর্সার হিসেবে যোগ দেয় ইতালিয়ান মাফিয়ায়। খুন-খারাবিতে বেশ ভাল করে। কয়েক বছর আগে যখন ইউরোপ আর এশিয়ায় ড্রাগ পাচার করতে মরিয়া হয়ে উঠল ইতালিয়ান আর আমেরিকান মাফিয়া ডনেরা, সে-সুযোগে নেপস্-এ নিজের ফ্লো পয়েন্ট তৈরি করল সে। এশিয়া আর ইউরোপে মাত্র তিন বছরে হয়ে উঠল ইতালি ও আমেরিকান মাফিয়া ডনদের চোখের মণি।’
‘সেক্ষেত্রে মাফিয়াদের কাছ থেকে সরে যেতে চাইছে কেন সে, স্যর?’ প্রথমবারের মত মুখ খুলল রানা।
‘আমাদের ধারণা তার মা বাঙালি বলেই বোধহয় ভেবেছে তাকে নিরাপদ আশ্রয় দেবে বাংলাদেশ,’ বললেন রাহাত খান। ‘আর এ-সুযোগটা আমরা নিতে চাই। তিনদিন আগে তাঁর অফিসে জরুরি বৈঠকে বসেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা। ওখানে ছিলেন স্বরাষ্ট্র সচিব, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সচিব, উপ-সচিব; বাংলাদেশ পুলিশ, ডি.এস.বি., এন.এস.আই. আর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধানেরা। বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয়, বিসিআই চিফ হিসেবে আমাকে অনুরোধ করা হবে ড্রাগস্ পাচারে জড়িত আন্তর্জাতিক মহলের বিরুদ্ধে যেন আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করি। সরকারের উপদেষ্টারা মনে-প্রাণে চান হুড়মুড় করে যেন বাংলাদেশে এসব ড্রাট্স্ না প্রবেশ করে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মিটিং শেষে যোগাযোগ করেছি দেশের প্রতিটি ছোটবড় রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে। প্রধান উপদেষ্টার মতই একই কথা বলেছেন তাঁরা। তাঁদের দলের নেতা-কর্মী বা তাদের আত্মীয়-স্বজন ড্রাগস্ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকলে, আমরা যেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিই। জাতির ক্রান্তিকালে এ-বিষয়ে একমত হয়েছেন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীবৃন্দ।
‘আমি তাঁদেরকে কথা দিয়েছি, মাফিয়ার ব্যবহৃত সব রুট চিহ্নিত করব আমরা। এবং এসবের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে গ্রেফতার করতে আইনী সংস্থাগুলোকে সহায়তা দেব। যেহেতু বাংলাদেশের মতই ব্রিটেনেও ঢুকছে প্রচুর ড্রাগ, তাই আলাপ করেছি বিএসএস চিফ মার্ভিন লংফেলোর সঙ্গে। আমার প্রস্তাব ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এরপর আমাদের দুই দেশের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, ভিডিয়ো কলে আলাপ সেরে লংফেলো ও আমার পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছেন তাঁরা। আর তাই বাংলাদেশ আর ব্রিটেনের যৌথ এই মিশন নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি।’
এবার সত্যি দেশের জন্যে লড়তে পারব, ভাবল রানা। আরও তথ্য পাওয়ার জন্যে চুপ করে থাকল ও।
স্ক্রিন থেকে উধাও হলো ম্যাপ। বদলে দেখা গেল এক শত আশি ফুট দৈর্ঘ্যের বিশাল এক সাদা রাজকীয় ইয়ট।
‘ওটা মোরেলির ইয়ট দ্য লিলি,’ বললেন রাহাত খান। ‘মাস্তুলে দেখছ তোমরা ফ্রান্সের পতাকা। নিজেকে কর্সিয়ার মানুষ হিসেবে ভাবলেও মোরেলির জন্ম আসলে মিলানে।’
স্ক্রিনে এল মস্তবড় এক ভিলার ছবি।
‘মোরেলির বাড়ি। নিজের নিরাপত্তার জন্যে মাত্র দু’জন বডিগার্ড রাখে সে। যদিও সর্বক্ষণ চারপাশ থেকে ভিলা পাহারা দেয় অন্তত বারোজন গানম্যান।’
পরের ছবিতে দেখা গেল ঝোপের ভেতরে পড়ে আছে এক লোকের ক্ষত-বিক্ষত লাশ। অন্তত পাঁচবার বুকে-পেটে গুলি করা হয়েছে। পচে বিকৃত হয়ে গেছে চেহারা, চেনা যায় না।
‘ডামডাম বুলেট,’ মনে মনে বলল রানা।
করাত দিয়ে বুলেটে X-এর মত কেটে নেয়া হয়। লক্ষ্যে লাগলে ছেতরে শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে ওটার টুকরো।
‘এই লাশ ফ্রান্সের সিক্রেট সার্ভিসের জেমিল এরেনকোর। সে ঢুকতে চেয়েছিল মোরেলির ভিলায়। তাকে দেখে ফেলে গানম্যানেরা। পরিণতি তো দেখতে পেলে তোমরা।’
এরপর দেখা গেল রুক্ষ, বিরান এক এলাকা। যুম লেন্স ব্যবহার করে বহু দূর থেকে তোলা হয়েছে একটা গাছ আর সেটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোকের ছবি। যুম করা হলো দৃশ্য। তাতে রানার মনে হলো লোকটার বয়স হবে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ। বেশ লম্বা। শক্তপোক্ত দেহ। গাছের ছায়ায় মুখ বড় অস্পষ্ট।
‘এই ছবিও মোরেলির। গত কিছু দিনের ভেতরে তোলা। এরচেয়ে আরও কাছে যেতে পারেনি আর কেউ।’
টেলিস্কোপিক লেন্স ব্যবহার করে উল্টোদিকের টিলার ওপর থেকে গোপনে তোলা হয়েছে ছবি। মুখ স্পষ্ট করে দেখা না গেলেও দেহের আকার-আকৃতি পরিষ্কার। ‘কমপিউটার ব্যবহার করে ধারণা করা হচ্ছে, মোরেলির ওজন এক শ’. চুরাশি পাউণ্ড। উচ্চতা কমপক্ষে ছয় ফুট। স্বাস্থ্য চমৎকার।’
কালো হলো স্ক্রিন। এরপর শুরু হলো মোশন পিকচার। সুনীল সাগরের ধারে রুপালি সৈকতের দৃশ্য। জায়গাটা বোধহয় ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা। বালিতে হাঁটছে সংক্ষিপ্ত বিকিনি পরা অদ্ভুত সুন্দরী এক মেয়ে। সূর্যের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে মাথার সোনালি চুল। কে যেন কথা বলছে মেয়েটার সঙ্গে। সেজন্যে হেঁটে যাওয়ার মাঝে ঘুরে তাকাল ক্যামেরার দিকে।.
‘এলিনা · পার্কারসন,’ বললেন রাহাত খান। বয়স ছাব্বিশ। জন্মেছে ডেনমার্কে। তরুণী বয়সে এসেছে রোমে। সিনেমায় নেমেছিল। তবে ছায়াছবি ফ্লপ হওয়ায় শেষ হয়ে যায় ক্যারিয়ার। এরপর দু’বছর থেকেছে সুইটয়ারল্যাণ্ডে। মাফিয়ার হয়ে মানি লণ্ডারিং করত। ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। যদিও বিচারের মুখোমুখি হয়নি। শোনা যায় সুইস কর্তৃপক্ষ বিপুল টাকার বিনিময়ে সীমান্তের ওদিকে তাকে পালিয়ে যেতে দেয়।
‘তারপর তার ঠাঁই হয় মোরেলির ভিলায়। যদিও তাকে ‘বিয়ে করেনি ড্রাগ লর্ড। কোথাও গেলে সঙ্গে করে তাকে নেয়। এ-মেয়ে ডেনিশ, সুইডিশ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, ইংরেজি আর আরবি ভাষায় গড়গড় করে কথা বলতে পারে। সুইস ব্যাঙ্কে চাকরির সময় যে ইন্টারভিউ দিয়েছিল, তাতে পেয়েছিল ১৪৫ আইকিউ স্কোর। দুর্দান্ত এক ‘স্কিয়ার।’
এবারের ছবি উঁচু পাহাড়ের। তুষারের বুকে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে এলিনা পার্কারসন। এই মেয়ে সত্যিই খুব ভাল স্কিয়ার, মনে মনে প্রশংসা করল রানা।
শীতের মাসে স্কিয়িং করে সময় কাটায়।’
স্ক্রিনে এল নতুন ম্যাপ।
এটা মার্কেইটর প্রজেকশন। তাতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে ইউরোপ আর এশিয়ায় ছড়িয়ে গেছে ড্রাগের চেইন।
‘গত কয়েক বছরে বারবার বদলে গেছে ড্রাগ চালানের রুট। আর সেটা মাফিয়া কমিশনের অনুমতি নিয়েই করেছে রোমিয়ো মোরেলি। এরফলে বড় মাপের মাফিয়া ডনদের আয় বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।’
আরও একটা ম্যাপ এল স্ক্রিনে।
ওটাতে আছে কীভাবে সাগরপথে পাচার হচ্ছে ড্রাগের চালান।
পরের ছবি বাস্ত্রিয়ায় মোরেলির এস্টেট ও ভিলার।
‘মন দিয়ে শোনো,’ খুক খুক করে কাশলেন বিসিআই চিফ রাহাত খান। ‘মাফিয়ার হয়ে এই দুই মহাদেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ করত মোরেলি। হয়তো গুজব হতে পারে, তবে শোনা যাচ্ছে মাফিয়া কমিশনের তৃতীয় ক্ষমতাশালী নেতা হয়ে ওঠে সে। আর তার সঙ্গেই গিয়ে দেখা করবে তোমরা।’
ছবি মিলিয়ে যেতেই জ্বলে উঠল সিচুয়েশন রুমের বাতি। নীরবতা নেমেছে ঘরে।
বললেন রাহাত খান, ‘কারও মনে কোন প্রশ্ন?’
চুপ করে থাকল রানা আর মারিয়া।
মার্ভিন লংফেলোর দিকে তাকালেন রাহাত খান।
‘ড্রাগসের ব্যবসা আরও বড় করতে চায় মাফিয়া ডনেরা, বললেন লংফেলো। ‘ছয় মাস আগে চেইনের সিস্টেম আরও ভালভাবে চেক করেছে তাদের বিশেষজ্ঞরা। আর এরপর আমেরিকান ডনেরা যোগাযোগ করেছে ইতালিয়ান ডনেদের সঙ্গে। গোপন মিটিং করেছে তারা। তাতে উঠে এসেছে ক্ষতিকর একটি দিক। গোটা ড্রাগসের ব্যবসার প্রায় অর্ধেক মুনাফা একাই নিচ্ছিল মোরেলি। আর সেজন্যেই আমেরিকান আর ইতালিয়ান ডনেরা সিদ্ধান্ত নেয়, এবার চিরকালের জন্যে বিদায় করে দেবে তাকে। দলের সেরা খুনিকে পাঠায় মোরেলিকে খুন করতে। তবে এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তোমরা আগেই দেখেছ, কী পরিণতি হয়েছে ফ্রেঞ্চ এজেন্টের। এবং সে-ই ছিল মাফিয়ার বেছে নেয়া সেরা খুনি। …এরপর অন্যদিক থেকে হামলা করল মাফিয়া ডনেরা। এজন্যে বেছে নিল এলিনা পার্কারসনকে। পুরনো মামলায় সুইট্যারল্যাণ্ডের এক ডিটেকটিভ পুলিশ অফিসার একদিন কর্সিয়ার বাসিয়ায় গিয়ে গ্রেফতার করতে চাইল মেয়েটাকে। তখন মোরেলির বডিগার্ডেরা সরিয়ে নিয়ে গেছে এলিনাকে। একই দিনে কাছের এক সৈকতে জোয়ারের সময়ে কে বা কারা যেন একটা খুঁটিতে হাত-পা বেঁধে রেখে গেছে পুলিশ অফিসারকে। কীভাবে যেন নিজেকে মুক্ত করেছে সে। এরপর দেরি না করে পালিয়ে গেছে কর্সিকা থেকে। আর ফেরেনি।’
রাহাত খান ও মার্ভিন লংফেলোর দিকে তাকাল রানা।
‘বলো, রানা?’ একই সঙ্গে ওর দিকে মনোযোগ দিলেন রাহাত খান ও মার্ভিন লংফেলো।
‘আমরা এসব কীভাবে জানলাম? কাদের মাধ্যমে?’
‘মোরেলি নিজেই এনক্রিপ করা ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলেছে,’ জানালেন রাহাত খান। ‘তুমি বোধহয় জানতে চাইছ কেন আমাদের কাছে নিরাপত্তা চাইছে? এর জবাব হচ্ছে: ইতালিয়ান সরকার, ফ্রেঞ্চ সরকার বা অন্যদেরকে একফোঁটা বিশ্বাস করে না সে। মাতৃভূমির কাছে সাহায্য চেয়ে বসেছে। আগেই বলেছি, বদলে আমাদের হাতে দেবে ড্রাগসের সঙ্গে জড়িত ইতালিয়ান ও আমেরিকান মাফিয়া ডন এবং তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ সবার নাম, ঠিকানা, সম্ভাব্য রুট ও তাদের কাজের একটি ব্ল্যাক লিস্ট।’
‘স্যর, আমরা জানব কীভাবে যে তার তৈরি ব্ল্যাক লিস্ট আসলে নকল নয়?’ জানতে চাইল রানা।
‘আপাতত সেটা জানার কোন উপায় নেই,’ বললেন লংফেলো। ‘আর সেজন্যেই আমরা পাঠাচ্ছি তোমার সঙ্গে মারিয়াকে। যাতে সে ড্রাগ চালানের রুটের বিষয়ে অন্তত মোরেলির কাছ থেকে বিশদ তথ্য জেনে নিতে পারে। তাতে হয়তো বোঝা যাবে’ লোকটা সত্যি কথা বলছে কি না।’
‘স্পেনের সোল ই নিয়েরেতে স্কি রিসোর্টে রোমিয়ো মোরেলির সঙ্গে দেখা করবে তোমরা,’ বললেন রাহাত খান। ‘প্রতিবছর একই স্কি রিসোর্টে যায় এলিনা পার্কারসন। আর সেই একমাস ধরে তাকে সঙ্গ দেয় মোরেলি।’
‘স্যর, সেক্ষেত্রে সে নিশ্চয়ই ছদ্ম-পরিচয় ব্যবহার করবে?’ রানার দিকে তাকালেন বিসিআই চিফ। ‘ঠিকই বলেছ, রানা। এ-মিশনে তার কোডনেম হচ্ছে দ্য নোবলম্যান। খুব সতর্ক থাকবে তোমরা। হয়তো তার ওপরে হামলা করবে মাফিয়ার খুনিরা।’
‘আমরা মোরেলির সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করব, স্যর?’
‘ম্যালাগায় আমাদের এজেণ্ট আছে,’ বললেন লংফেলো। ‘ওকে তুমি চেনো। রানা, তোমরা স্পেনের ম্যালাগায় গিয়ে দেখা করবে এজেণ্ট বার্টি এইচ. স্মিথের সঙ্গে। পরে সোল ই নিয়েরের সেই রিসোর্টে মোরেলির দলের কমবয়সী এক ছেলে তোমাদেরকে জানিয়ে দেবে কোথায় হবে দু’পক্ষের মিটিং।’
‘আমার কাভার কী হবে, স্যর?’ জানতে চাইল রানা।
‘তুমি পেশাদার ফোটোগ্রাফার স্যামি কিং,’ রানার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে মারিয়াকে দেখলেন রাহাত খান। ‘আর তুমি এখন থেকে কিঙের মডেল। আজই তৈরি হবে তোমাদের সমস্ত কাগজপত্র। এ-ছাড়া. ব্যাকগ্রাউণ্ড হিসেবে যেসব নোট দেয়া হবে, ওগুলো মুখস্থ করে নেয়ার পর সব পুড়িয়ে দেবে।’
‘আমাকে কি ফোটোগ্রাফারের মডেল হিসেবে উলঙ্গ হয়ে পোয দিতে হবে?’ জানতে চাইল মারিয়া হ্যারল্ড।
ওর কথা শুনে লজ্জায় ফ্যাকাসে হলেন চিরকুমার রাহাত খান। উদাস চোখে দেখলেন সামনের দেয়াল।
‘দরকার হলে সবই করবে,’ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন বিএসএস চিফ লংফেলো। ‘মনে রাখবে, সবচেয়ে জরুরি কথা হচ্ছে: তোমরা পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কাজ করবে।’
চট্ করে বসের দিকে তাকাল রানা। লালচে হয়ে গেছে মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের মুখ। কড়া চোখে ওর দিকে তাকালেন তিনি। দোষ যেন সব রানার।
আমি আবার কী করলাম, চেহারায় এমনই এক বেচারা ভাব ফুটিয়ে তুলল রানা।
দু’চোখের মণি চকচক করছে মিস্টার লংফেলোর।
‘একটা কারেকশন। তোমরা স্পেনে যাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে।’
‘এর কি কোন প্রয়োজন আছে?’ নিচু গলায় বলল রানা।
‘তোমরা এখন থেকে মিস্টার কিং ও মিসেস কিং। গত তিন বছর ধরে লিডসে বাস করছ। এতে মিশনে স্বস্তির সঙ্গে কাজ করতে পারবে মারিয়া। ‘
‘আমার এতে কোন সমস্যা নেই,’ বলল মারিয়া। ‘তবে মিশনে বড় কোন গোলমাল হয়ে গেলে, তখন গা বাঁচিয়ে স্পেন থেকে কীভাবে বেরোব, এ-ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন?’ মিস্টার লংফেলোর দিকে তাকাল সে।
রানা চেয়ে আছে বিএসএস চিফের দিকে।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন রাহাত খান, ‘গ্রানাডায় আমাদের লোক আছে। তার বাড়ি রিসোর্ট থেকে গাড়িতে করে মাত্র আধঘণ্টা দূরে। এ-বিষয়ে ম্যালাগায় গেলে সবই জানাবে বার্টি এইচ. স্মিথ।’
‘বেশ, বলল রানা, ‘ওর কাছ থেকে জেনে নেব।’
‘পারতপক্ষে আমাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করবে না। যদি যোগাযোগ করতেই হয়, তো দেবে কোডেড মেসেজ বা এনক্রিপ করা কল। মাফিয়ার হাত স্পেনে অনেক লম্বা, তাই বাধ্য না হলে স্মার্টফোন ব্যবহার করবে না।’
মাথা দোলাল মারিয়া হ্যারল্ড। রানার দিকে তাকাল। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, ‘তো এই মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে সঁপে দিলাম তোমার হাতে।’
এবার ব্রিফিং শেষ করা যাক,’ অস্বস্তি নিয়ে বললেন বিসিআই চিফ। ‘তোমরা হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নাও।’
একবার তাঁর দিকে মাথা দুলিয়ে সিচুয়েশন রুম ছেড়ে বেরিয়ে এল রানা। করিডর ধরে পাঁচ কদম যেতেই টের পেল, পাথরের মেঝেতে হাই-হিলের খট খট শব্দ তুলে ওর পিছু পিছু আসছে ওর ‘সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী মারিয়া কিং!
.
হোটেল হিল্টনের তৃতীয়তলায় নিজেদের সুইটে শুয়ে আছে রানা। প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু হঠাৎ করে দুই কামরার মাঝের দরজায় ঠক-ঠক আওয়াজে চটকা ভেঙে গেল ওর।
‘কিছু বলবে?’ বিছানায় উঠে বসে জানতে চাইল রানা। ‘রানা!’ নিচু গলায় ডাকছে মারিয়া।
‘কী হয়েছে?’
‘জানালা দিয়ে দেখো!’
‘কী দেখব?’ দূতাবাসের ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে করে আসা হোলস্টারে ভরা ওয়ালথার পিপিকে বেডপোস্টে ঝুলছে। ওটা হাতে নিয়ে জানালার একপাশে গিয়ে থামল রানা।
‘রাস্তার ওপরে চোখ বোলাও। গাড়িটার দিকে।’
দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পিস্তলের নল দিয়ে জানালার পর্দা সামান্য ফাঁক করল রানা। কয়েক তলা নিচে প্রায় অন্ধকার রাস্তা। গোটা ব্লকে একটা ক্যাডিলাক ছাড়া অন্য কোন যানবাহন নেই। ক্যাডিলাকের ড্রাইভারের সিটে এক লোক। কয়েক সেকেণ্ড পর রাস্তা পার হয়ে গাড়ির পাশে থামল আরেকজন। নিচু গলায় কী যেন বলছে ড্রাইভারকে। কথা শেষ করে উঠে পড়ল গাড়ির পেছন সিটে। রওনা হয়ে গেল ক্যাডিলাক। সামনে ডানে বাঁক নিল ওটা।
জানালা থেকে সরে সুইটের দুই কামরার মাঝের দরজায় টোকা দিল রানা। ‘তুমি কি কাউকে চিনতে পেরেছ?’
দরজা খুলল মারিয়া। ‘হ্যাঁ। যে-লোক ক্যাডিলাকে উঠল, আমাদের সুইটের জানালার দিকে চোখ ছিল তার। আজই এই হোটেলের লবিতে তাকে দেখেছি। হাতে চামড়ার ছোট একটা কেস। ওই যে, যেটার ভেতরে রাইফেলের স্কোপ রাখে। আর এই একই লোককে আগে দেখেছি ডালাস এয়ারপোর্টে।’
‘ঠিক আছে,’ অন্যমনস্কভাবে বলল রানা।
কয়েক সেকেণ্ড পর জানতে চাইল মারিয়া, ‘এবার?’
‘গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ো,’ বলল রানা। ‘অন্তত এটা বুঝলাম যে ওরা জানে, আমরা কোথায় উঠেছি।’
‘লোকটাকে ফলো করা গেলে…’
‘মারিয়া, লণ্ডন কিন্তু বড় শহর। এতক্ষণে তিন মাইল দূরে চলে গেছে।’
‘রানা…’
নিজের বেডের দিকে চলল রানা। ‘শুয়ে পড়ো, মারিয়া। ঘুমিয়ো স্বপ্নে দেখো স্বামীর সঙ্গে স্পেনে ফূর্তি করছ।’
বিড়বিড় করে কী যেন বলে দরজা আটকে দিল মেয়েটা। কয়েক সেকেণ্ড পর বেডের স্প্রিঙের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ শুনতে পেল রানা। তারপর ওদিক থেকে আর কোন আওয়াজ এল না। জানালার পাশে চেয়ার টেনে ওটাতে বসল রানা। চেয়ে রইল নিচের রাস্তার দিকে।
রাত গভীর হলেও হামলা করতে এল না কেউ।
Chapter - 6
ছয়
টিলা টপকে ম্যালাগা বন্দর-নগরীর সামান্য দূরে কোস্তা দেল সোল এয়ারপোর্টের রানওয়েতে নামল ব্রিটিশ এয়ারওয়েইযের রাজহংসীর মত সাদা রঙের এ৩৩০-৩০০ বিমান। পরের দশ মিনিটে ব্যাগেজ সংগ্রহ করে কাস্টম্স্ ও ইমিগ্রেশন এরিয়া পেরিয়ে টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে এল রানা ও মারিয়া। আগেই ওদের বলা হয়েছে, বাইরে অপেক্ষা করবে বিএসএস-এর নীল রঙের ছোট এক ফিয়াট ৫০০ গাড়ি।
বিসিআই ও বিএসএস-এর যৌথ খরচে সুইট বুক করা হয়েছে এসি ম্যালাগা প্যালাসিয়ো হোটেলে।
কিছুক্ষণ পর হোটেলের রেজিস্ট্রি খাতায় ওদের পাসপোর্ট দেখে জরুরি তথ্য টুকে নিল ক্লার্ক। এরপর নিজেদের নকল নাম সই করে তিনতলায় ওদের সুইটে ঢুকল রানা ও মারিয়া।
কামরার চওড়া জানালা দিয়ে দেখা গেল মালাগা বন্দর। সুনীল জলের অপূর্ব সুন্দর মেরিনায় নোঙর করেছে নানান আকারের বাণিজ্যিক জাহাজ ও প্রমোদতরী।
সুইটের দ্বিতীয় কামরা দখল করল মারিয়া। দু’ঘরের মাঝের দরজা আটকে দেয়ার আগে বলল, ‘লম্বা জার্নি, তাই খুব ক্লান্তি লাগছে। শাওয়ার নেয়ার পর ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নেব।’
‘বেশ,’ খুশিমনে বলল রানা। সুইট থেকে বেরিয়ে মেইন ডোর লক করে নেমে এল নিচে। লবি পেরিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এক ব্লক যেতেই পথের কোণে একতলা এক বাড়ির গেটে দেখতে পেল রঙচটা এক সাইনবোর্ড:
ড্রিম্স্ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি
ডিরেক্টর বার্টি এইচ. স্মিথ।
আঙুলের গাঁট দিয়ে বাড়ির দরজায় ঠক-ঠক করে টোকা দিল রানা। তাতে স্প্যানিশ ভাষায় ভেতর থেকে কে যেন বলল, ‘কে আপনি?’
‘সেনোর স্যামি কিং
‘তা-ই নাকি?’ আধমিনিট পর খুলে গেল বাড়ির দরজা। কবাট জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মত উঁচু বাৰ্টি .এইচ. স্মিথ।
‘কী খবর তোর, বার্টি?’ জানতে চাইল রানা।
‘আরে শালা! কতদিন পর তোর চাঁদমুখ দেখলাম!’ এক পা এসে গ্রিযলি ভালুকের মত প্রিয় বন্ধুকে জাপটে ধরল বার্টি।
হাঁসফাঁস লেগে উঠতেই ধমকে উঠল রানা, ‘অ্যাই, ছাড় বলছি! নইলে কিন্তু হাঁটু তুলে জায়গামত গুঁতো দেব!’
ওর কথা শুনে ঝড়ের বেগে দু’পা পিছিয়ে গেল বার্টি এইচ. স্মিথ। ‘ভয় দেখাস্ ক্যান! আয়, ভেতরে আয়।’
বন্ধু করিডরে ঢুকতেই দরজা আটকে ঘুরে এগোল বাটি, -পেছনে রানা। ডানের দরজা গলে বড় এক ঘরে ঢুকল ওরা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল রানা। ঘরের একদিকে চল্টা ওঠা ছোট ডেস্ক ও পেছনে আর্মচেয়ার। ডেস্কের সামনে কাঠের দুটো খটখটে চেয়ার। পাশে ফাইল রাখার কাঠের পুরনো এক আলমারি। একদিকে সরু দরজা। ওদিকে ওয়াশরুম। ঘরে আর কোন আসবাবপত্র নেই। ডেস্কের পেছনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ম্যালাগা বন্দরের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য।
রানার পিঠে মাঝারি আকারের এক চাপড় বসাল বার্টি এইচ. স্মিথ। বহু দিন পর দেখা, কী বলিস, দোস্ত! ইতালির সেই ঘটনার পর থেকে যে ডুব দিলি, আর দেখা পেলাম না!’
কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল রানার।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমার উপাত্ত সংগ্রহ করছিল বার্টি। দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে এক হোটেলে খুন হয়ে যেত। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওর হোটেলে হাজির হয় রানা। রুম থেকে বন্ধুকে বের করে সোজা নিয়ে তোলে নিজের গাড়িতে। রওনা হয়ে বলে, ‘একটু আগে জানলাম, উবে গেছে তোর কাভার। উত্তর কোরিয়ান সিক্রেট সার্ভিস টিমের কয়েকজন এজেন্ট আসছে তোকে খুন করতে।’
এ-ঘটনার আধঘণ্টা পর রেডিয়োতে ওরা শুনল, কারা যেন ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছে সেই হোটেলের বারোজন গেস্ট ও সাতজন কর্মচারীকে।
সাহায্য পেয়ে রানার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল বার্টি। এরপর ডার্ক মেডিউসা* (রানা ৪৬০ দ্রষ্টব্য) পর্ব শেষ হলে ইতালিতে নির্জন এক হোটেলে উঠেছিল রানা ও ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের নোরা গোল্ডফিল্ড।
দারুণ কাটছিল ওদের সময়। কিন্তু পঞ্চম দিনে এল বিসিআই চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের ফোন। তিনি বললেন: আত্মহত্যা করার আগে অস্থায়ী ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স চিফ জ্যারেট যোগাযোগ করেছে ঘনিষ্ঠ ক’জন স্যাঙাতের সঙ্গে। তাদেরকে বলেছে—তোমাদের উচিত পৃথিবী থেকে মাসুদ রানাকে সরিয়ে দেয়া। নইলে তোমাদেরকেও ছাড়বে না সে। সেক্ষেত্রে খুন হবে, রাধ্য হবে আত্মহত্যা করতে, অথবা বহু বছরের জন্যে পচে মরবে জেলে। সুতরাং, নিজ স্বার্থে তোমাদের উচিত তাকে খুন করা।
বিসিআই চিফ আরও জানান: ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস চিফ মার্ভিন লংফেলো হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেই তিনি জোর দাবি জানাবেন, যেন রানার পেছনে লেলিয়ে দেয়া মৃত্যুদূত ব্রিটিশ এজেন্টদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। তবে আপাতত ওর উচিত আত্মগোপন করা।
সেদিনই নোরাকে আমেরিকাগামী বিয়ানে তুলে হোটেলে ফিরতেই লবির তিনদিক থেকে এল ওর ওপরে হামলা। গোলাগুলির সময় খুন হলো চারজন ব্রিটিশ এজেন্ট। অন্য দু’জনকে ফাঁকি দিয়ে গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সের পাহাড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ল আহত রানা।
এদিকে ওর পিছু নিল সেই দুই ব্রিটিশ এজেন্ট। যদিও তাদের সঙ্গে দেখা হয়নি রানার। কারণ বন্ধুর প্রতি ভালবাসা, কৃতজ্ঞতাবোধ আর বিএসএস-এর চিফের নির্দেশে অসৎ দুই ব্রিটিশ এজেন্টকে প্রথম সুযোগে খতম করে দেয় বার্টি।;
‘সত্যিই বহু দিন পর আবার দেখা,’ পিঠে বার্টির আরেক চাপড় খেয়ে স্বীকার করল রানা।
‘চিফ লংফেলো বলেছেন তুই আসবি।’ আলমারি খুলে হোলস্টার আর ওয়ালথার পিপিকে রানার হাতে ধরিয়ে দিল বার্টি। ‘বিসিআই থেকে দিয়ে গেছে।’ এবার আলমারি থেকে
ডাব্লিউ-ডাব্লিউ টু বশ অ্যাণ্ড লম্ব্ ৭X৫০ এমকে ৪১ ওয়াইড ফিল্ড অ্যাঙ্গেলের বিনকিউলার। আনমনে বুঝতে চাইল ওটার ওজন। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ‘মনে হয় তোর একটা খবর জানা উচিত।’
‘কী সেটা?’ কৌতূহলী চোখে বন্ধুকে দেখল রানা।
চোখে বিনকিউলার তুলে বন্দরের দিকে তাকাল বার্টি। রানা বুঝে গেল, ও যখন এল, এই বিনকিউলার দিয়ে বন্দরের জাহাজ দেখছিল ওর বন্ধু।
গত দু’বছর ধরে বিএসএস-এর হয়ে ম্যালাগার স্টেশন- মাস্টার হিসেবে কাজ করছে বার্টি। খুব ভাল করেই জানে ম্যালাগায় কে আসছে আর কে চলে যাচ্ছে।
কোট খুলে বাম বগলের কাছে হোলস্টার পরে ওটার ভেতরে পিস্তল রাখল রানা। নতুন করে পরল কোট। বার্টির পেছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল বন্দরের মেরিনার দিকে। ওর মনে হলো, বার্টি চোখ রেখেছে বড় এক ইয়টের ওপরে। ওটা আছে মেরিনার ঠিক মাঝে।
‘ওটাই,’ নিচু গলায় বলল বার্টি। ‘দ্য লিলি, মোরেলির ইয়ট।’
বিএসএস-এর সিচুয়েশন রুমের ছবিটার কথা মনে পড়ল রানার। ওর হাতে বিনকিউলার ধরিয়ে দিল বার্টি।
চোখে যন্ত্রটা ঠেকিয়ে মেরিনার দিকে তাকাল রানা। দুর্দান্ত এক বিনকিউলার। সবই দেখতে পাচ্ছে পরিষ্কারভাবে। ইয়টের ডেকে ক’জন ক্রু। কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। মেইন ডেকে কয়েকটা কেবিন। নিচে দু’সারিতে কিছু পোর্টহোল বলে দিচ্ছে দু’ডেক নিচেও আছে একাধিক কেবিন। বিশাল আকারের দুর্দান্ত সুন্দর এক প্রমোদতরী মাস্তুলে পতপত করে উড়ছে ফ্রান্সের পতাকা।
ডেস্কের পেছনে গিয়ে চেয়ারে বসল বার্টি। খস খস করে সরাল কিছু কাগজ। রানা বুঝল, বন্ধু চাইছে ওর মনোযোগ। চোখ থেকে বিনকিউলার সরিয়ে নেবে, তার আগেই এক মেয়েকে মেইন কেবিন থেকে বেরিয়ে ডেকে আসতে দেখল রানা। তার পরনে সোয়েটার ও বাদামি প্যান্ট। মেয়েটার কোমর ছাড়িয়ে হাঁটুর কাছে নেমেছে সোনালি চুল। সুগঠিত দুই উদ্ধত স্তনের জন্যে ফুলে আছে সোয়েটারের ওপরদিক। বুকের তুলনায় কোমর এতই সরু, বুড়োমানুষও তাকে দেখে ভাববে: ধরার বুকে নেমেছে সত্যিকারের অপ্সরা। সুডৌল দু’উরু যেন তরুণ কবির স্বপ্নের প্রিয় কোন প্রেমের কবিতা। মসৃণ সাদা ত্বকে রোদ ঠিকরে পড়ে দেখাচ্ছে কাঁচা সোনার মত। ডাগর দুটো নীল চোখ যেন স্বর্গের মায়াহরিণীর। রোদ চোখে লাগতেই মাথার ওপর থেকে নামিয়ে সানগ্লাস পরল. মেয়েটা। তাতে একটু হলেও বুকে দাগা লাগল রানার। তাই বিড়বিড় করে বলল, ‘এলিনা পার্কারসন।’
গলা লম্বা করে জানালা দিয়ে তাকাল বার্টি। একবার ঢোক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ, রে, শালা!’
‘দেখার মত এক রূপসী মেয়ে,’ বিড়বিড় করল রানা।
‘সন্দেহ কী, মাসুদ রানার সত্যিকারের উপযুক্ত প্রেমিকা, ‘চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বার্টি। ‘কী করে যে এদের জুটিয়ে নিস!’
‘আমি বিসিআই চিফের কথার একতিল এদিক-ওদিক করি না,’ আত্মরক্ষা করতে চাইল রানা।
‘তা হলে বুঝতে হবে, জরুরি ভিত্তিতে বস্ পাল্টাতে হবে আমাকে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল বার্টি। ‘যাক্ গে! ওরা এসেছে গতকাল।’ আবারও কাগজ ঘাঁটতে লাগল সে।
সোয়েটারে ঢাকা এলিনার দুই কাঁধ ও বুক শেষবারের মত দেখে নিয়ে বিনকিউলার নামাল রানা। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর কাছ থেকে যন্ত্রটা কেড়ে নিল বার্টি। ‘একা একাই সব দেখে নিচ্ছে, শালা! চোখে বিনকিউলার লাগিয়ে জানালা দিয়ে তাকাল সে। ‘তুই, ব্যাটা, পারলে কাগজে মন দে!’
ডেস্কে থাকা ছোট্ট কাগজটা তুলে মেসেজ পড়ল রানা।
BARTY H. SMITH. 4 PASEO ZAFIO. ARRIVE TUESDAY. ABOARD LILY. HAVE VISITOR READY. ELINA PARKERSON WILL BRING HIM TO YACHT. WILL SET UP SKI RENDEZVOUS LATER ABOUT DRUG DEAL.
THE NOBLEMAN
‘দ্য নোবলম্যান?’ বার্টির দিকে তাকাল রানা।
মাথা দোলাল বিএসএস এজেন্ট। ‘ব্যাটা বোধহয় নিজেকে ভদ্রলোক বলে মনে করে!’
‘ভাল করেই জানে, মাফিয়া থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়েছে,’ বলল রানা। ‘কাগজে যা লেখা, তাতে তো মনে হচ্ছে আমাকে ইয়টে নিয়ে যাবে মেয়েটা।’
‘আমার এ-বাড়িতে তো আর আসবে না, ইয়টেও আমাকে ডেকে নেবে না-হায় রে, আমার কপালটাই মন্দ!’ বামহাতে কপালে চাপড় দিল বার্টি। ‘শুধু কি তা-ই, তোর হোটেলের রুমের নম্বরও জানে। নিজেই মেসেজ করে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
‘কখন হোটেলে আসবে মেয়েটা?’
‘দুপুরের পর। লবিতে।’ হাতঘড়ি দেখল বার্টি। ‘হাতে পাবি ধর্ আধঘণ্টা।’
‘আর মারিয়া হ্যারল্ডের কী হবে?’
‘সে বুক ভরা হতাশা নিয়ে বসে থাকুক নিজের ঘরে। তোর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে মোরেলি। তার সঙ্গে তো আর নয়।’
‘লোকটা এত অনর্থক বাগাড়ম্বর করছে কেন?’ জানতে চাইল রানা। ‘তোর কী ধারণা?’
‘মাফিয়া ডনদের তরফ থেকে যে-কোন সময়ে হামলা হবে, তাই মিনিটে মিনিটে আণ্ডারওয়্যারে পাতলা পায়খানা, করছে। হয়তো জানতে চায়, কেউ পিছু নিয়েছে কি না।’
‘অথবা আমরা তাকে ফলো করছি কি না,’ বলল রানা। বার্টির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারও হোটেলে ফিরে এল ও। সুইটে না গিয়ে রয়ে গেল লবিতে।
মিনিট বিশেক পর এলিনা পার্কারসন যখন লবিতে পা রাখল, হৃদয়ের হাজারো কষ্টে ভীষণ তিক্ত হয়ে গেল উপস্থিত মহিলারা। চোখে জন্মের খিদে নিয়ে চেয়ে আছে পুরুষেরা। ডেস্কের পেছনে চেয়ারে রসে থাকা ক্লার্ক মনে মনে হয়ে গেল ‘সিনেমার নায়ক টম ক্রু।
লবির সোফা ছেড়ে এলিনা পার্কারসনের দিকে এগিয়ে গেল রানা। ইংরেজিতে বলল, ‘মিস পার্কারসন?’
‘জী, মিষ্টি করে হাসল মেয়েটা। কণ্ঠে সামান্য বিদেশি টান। ‘আমি বুঝি একটু দেরি করে ফেলেছি? সরি!’
‘দুনিয়ার সবাই এই দেরিটা খুশিমনে মেনে নেবে,’ অন্তর থেকেই বলল রানা।
ফিয়োর্ডের বরফখণ্ডের মত শীতল চোখে ওকে দেখল এলিনা। ‘আমরা তা হলে বরং রওনা হয়ে যাই?’
‘বেশ,’ বলল রানা।
ঘুরে লবি থেকে বেরোবার দরজার দিকে পা বাড়াল মেয়েটা। তার পিছু নিল রানা। হোটেল থেকে বেরিয়ে স্পেনের সোনালি উজ্জ্বল রোদে হাঁটতে লাগল ওরা।
‘প্লাযা পেরোলেই গন্তব্যের কাছে চলে যাব,’ বলল এলিনা। ‘ট্যাক্সি লাগবে না।’
হাত বাড়িয়ে তার কনুই ধরল রানা। আর যাই হোক, এটা তো ইউরোপ! রানা তার হাত ধরে এগোচ্ছে বলে কোন ধরনের আপত্তি তুলল না এলিনা। সোনালি যুবতী আর বাদামি রানাকে দেখছে রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া স্প্যানিশ যুবকেরা। চোখে অঢেল প্রশংসা এলিনার জন্যে, আর রানার জন্যে একরাশ চরম ঘৃণা।
‘আজ সুন্দর একটা দিন, তা-ই না?’ বড় করে শ্বাস নিয়ে বলল এলিনা।
‘ম্যালাগা তোমার ভাল লাগে?’ মেয়েটার মুখ থেকে চোখ সরাতে পারছে না রানা।
‘তা তো বটেই,’ বলল এলিনা। ‘এ-শহরে কোন ঝামেলা নেই। সূর্যের সোনালি আলো সবসময় ভাল লাগে। উষ্ণতা সত্যিই অন্যকিছু।’
কেমন কাটল ইয়টে সময়টা?’ জানতে চাইল রানা।
বড় করে শ্বাস নিল এলিনা। ‘কোস্টা ব্রাভার কাছে উত্তাল ছিল সাগর। তা ছাড়া আর কোন সমস্যা হয়নি।’
‘আর তোমার সঙ্গী? তার কেমন লেগেছে?’
চোখে চিন্তা নিয়ে রানাকে দেখল এলিনা। ‘মিস্টার নোবলম্যান?’
‘হ্যাঁ, মিস্টার নোবলম্যান,’ একটু জোর দিয়ে বলল রানা।
‘একটু পর তার সঙ্গে দেখা হবে তোমার।’
‘শুনেছি তুমি খুব ভাল স্কিয়িং করো, মেরিনার কাছে এসে বলল রানা।
‘আমার ভাল লাগে স্কিয়িং করতে,’ বলল এলিনা। তোমারও কি ভাল লাগে?’
‘কখনও কখনও, বিশেষ করে অ্যাসপেনে গেলে।’
‘আমিও হয়তো কোনদিন আমেরিকায় গিয়ে স্কিয়িং করব,’ বলল এলিনা। ওর নীল চোখে উষ্ণতা দেখতে পেল রানা।
‘মিস্টার নোবলম্যান সেটা পছন্দ না-ও করতে পারে।’
মেয়েটা হাসতেই হীরার মত নিখুঁত ঝকঝকে দাঁত দেখল রানা। ‘তা হতেও পারে,’ চট্ করে রানাকে দেখল। ‘মনে হয় তোমার সঙ্গে ভাল আড্ডা জমবে নোবলম্যানের।
জেটিতে পা রাখতেই ওদের দিকে এল তরুণ এক ছেলে। এলিনার সামনে থামল সে। চিকন শরীর হলেও তার হাত-পায়ের পেশি তারের মত টানটান। মাথার চুল কুচকুচে কালো। ঠোঁটের ওপরে ব্রু গোঁফ। ‘সেনোরিটা, আসুন।’ এলিনার হাত ধরে ছোট এক পাওয়ারবোটের দিকে চলল সে।
তার সাহায্য নিয়ে বোটে উঠল এলিনা। নরম সুরে বলল, ‘ধন্যবাদ, প্লেটিনো।’ হাতের ইশারায় দেখাল রানাকে। ‘ইনি মিস্টার কিং।’
‘উঠে পড়ুন, সেনোর,’ তরুণের চোখের কালো মণিতে বুদ্ধিদীপ্ত দ্যুতি।
লাফ দিয়ে বোটে উঠল রানা। এলিনা সিটে বসতেই দড়ি খুলে লগি দিয়ে বোট সরিয়ে নিল প্লেটিনো। বোট ঘুরিয়ে চালু করল ইনবোর্ড মোটর। চলল ওরা ইয়টের দিকে। ওটা আছে মাত্র তিন শ’ গজ দূরে।
সূর্যালোকে ঝিকমিক করছে নীল উপসাগরের জল। ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে এসে ছোটসব মাছ ছোঁ দিয়ে ধরছে সফল সি- গালেরা। যারা মাছ পাচ্ছে না, কর্কশ চিৎকার করতে করতে ‘আবার উঠছে আকাশে। পা থেকে টপ-টপ করে ঝরছে জল।
একটু পর ইয়টের পাশে ভিড়ল পাওয়ারবোট। ইয়টের গায়ে এবার দ্য লিলি শব্দটা দেখতে পেল রানা। ডেক থেকে . ওদের দিকে চেয়ে আছে দু’জন নাবিক। দড়ির মই নিচে ফেলল তারা। একে একে এলিনা আর রানা উঠে এল ডেকে।
মেইন ডেকের বড় কেবিনটা ইয়টের স্যালন। ভেতরে বড় এক লাউঞ্জিং চেয়ারে বসে আছে মধ্যবয়স্ক এক লোক। মুখ থেকে পুরু সিগার সরিয়ে উগলে দিল নীলচে ধোঁয়া। তার মাথা ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে ধূম্রজাল।
এলিনার পর কেবিনে পা রাখল রানা। ধোঁয়া থেকে মাথা সরিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকটা। মৃদু হেসে নিচু গলায় বলল, ‘তো চলে এসেছ, এলিনা ডার্লিং? গুড!’
জবাবে হাসল এলিনা পার্কারসন। রানাকে দেখাল। ‘ইনি মিস্টার কিং। এসেছেন ব্রিটেন থেকে।’ হাতের ইশারায় দেখাল, মোরেলিকে। ‘মিস্টার কিং, ইনি মিস্টার নোবলম্যান।’
কেবিনে চোখ বোলাল রানা।
প্রতিটি আসবাবপত্র রাজকীয়।
হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ওর হাত ধরল নোবলম্যান। হ্যাণ্ডশেক করে বলল, ‘মিস্টার কিং, আশা করি আপনি স্কি করতে পছন্দ করেন?
মৃদু মাথা দোলাল রানা। ‘ভালবাসি।’
এলিনা আর আমিও। তবে সময় পাই না বলে তেমন স্কি করা হয়ে ওঠে না। এবার কিছু দিনের জন্যে সোল ই. নিয়েরেতে যাব। আশা করি ওখানে আবার দেখা হবে আপনার সঙ্গে।’
‘আমিও তা-ই আশা করি।’
‘আপনার সঙ্গে কি অন্য কেউ থাকবে?’
‘আমার স্ত্রী।’ সতর্ক চোখে মোরেলিকে দেখল রানা। ছবির সঙ্গে এর বয়স ও উচ্চতা মেলে। যদিও নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই এই লোকই সেই ড্রাগ লর্ড।
‘আমি সত্যিই ভালবাসি আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশকে, ‘ বলল মোরেলি, ‘সেখানেই শেষ জীবন কাটাতে চাই।’ হাসল ড্রাগ লর্ড। ‘আপনার কোন আপত্তি না থাকলে তা হলে আমাদের রদেভু হবে সোল ই নিয়েরেতে।’
বাংলাদেশকে তুমি এতই ভালবাস যে ড্রাগ্স্ ছড়িয়ে ছেয়ে ফেলেছ চারপাশ, ভাবল রানা। মুখে বলল, ‘আশা করি প্রথম মিটিঙে আমরা আমাদের কাজ শেষ করতে পারব?’
‘স্কি রিসোর্টে।’
মাথা দোলাল রানা। পরক্ষণে জানতে চাইল, ‘সেক্ষেত্রে আজ দেখা করার কী দরকার ছিল?’
‘সিকিউরিটির জন্যে এটা না করে উপায় ছিল না,’ সিগারে টান দিয়ে ভুসভুস করে নীলচে ধোঁয়া ছাড়ল মোরেলি।
‘আপনি এখানে নিরাপদ বলেই তো মনে হচ্ছে,’ বলল রানা।
‘তা হয়তো নয়,’ ম্লান হাসল রোমিয়ো মোরেলি।
চেয়ার টেনে বসল সবাই। আলাপ শুরু হওয়ার আগেই ট্রেতে করে ড্রিঙ্ক নিয়ে এল এক স্টুয়ার্ড। সে বিদায় নিতেই কোন্ রিসোর্টে রানা ও মারিয়ার সঙ্গে তার দেখা হবে, সেটা জানিয়ে দিল মোরেলি।
এই একই কথা মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের কাছে শুনেছে রানা। ড্রিঙ্কের ফাঁকে চলল নানান আলাপ। পনেরো মিনিট পর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এলিনা। নরম সুরে বলল, ‘আমার মনে হয় হোটেলে ফেরার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন মিস্টার কিং।’
‘সময় দেয়ার জন্যে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার নোবলম্যান,’ উঠে দাঁড়াল রানা। ‘আশা করি তুষারের রাজ্যে আবারও দেখা হবে আমাদের।’
চেয়ার না ছেড়েই হাত বাড়িয়ে ওর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল মোরেলি। রানার হাত ধরে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল এলিনা। নিচু গলায় বলল, ‘দুঃখিত, জরুরি কাজ আছে বলে নিজে আর তোমাকে তীরে পৌঁছে দিতে পারব না। প্লেটিনো তোমাকে তীরে দিয়ে আসবে।’
মেয়েটার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল রানা। ‘আপ্যায়নের জন্যে তোমাদের দু’জনকেই অনেক ধন্যবাদ।’
ডেক পেরিয়ে দড়ির মই বেয়ে পাওয়ারবোটে নামল রানা। ওপরের ডেক থেকে হাত নাড়ল এলিনা পার্কারসন। ইয়ট থেকে সরে গেল বোট। ধীর বেগে চলল তীরের দিকে। তবে পঞ্চাশ গজ যেতে না যেতেই হঠাৎ শোনা গেল চিৎকার। চট্ করে ঘুরে ইয়টের দিকে তাকাল রানা। প্লেটিনোর উদ্দেশে বলল, ‘থামো, প্লেটিনো!’
একটু আগে স্যালনে গিয়ে ঢুকেছে এলিনা, তারপর আবার বেরিয়ে এসেছে-এখন টলমল করছে মাতালের মত।,
স্যালনের ভেতরে ঝলসে উঠছে কমলা ফুলকি। পরক্ষণে সাগরের বিক্ষুব্ধ জলের ওপর দিয়ে ভেসে এল রাইফেলের টানা গুলিবর্ষণের আওয়াজ।
আর্তনাদ করে উঠল কেউ।
একটা গুলিতে ধুপ করে ডেকে পড়ল এলিনা পার্কারসন। মাঝপথে থেমে গেল ওর চিৎকার।
ডেক পার হয়ে ইয়টের রেইলিঙের কাছে গেল কালো ওয়েট স্যুট পরা কে যেন। পরক্ষণে লাফিয়ে নেমে গেল সাগরে। রানার হাতে উঠে এসেছে ওয়ালথার পিপিকে, ‘তবে লোকটাকে স্পষ্টভাবে দেখতে না পেয়ে গুলি করা থেকে বিরত থাকল।
‘ইয়টের দিকে চলো!’ প্লেটিনোকে নির্দেশ দিল রানা।
ভয় পেলেও বোট ঘুরিয়ে ইয়টের দিকে গেল বিচলিত তরুণ। স্কুবা ডাইভার সাগরের যেখানে নেমেছে, ওখানে এখন বড় বুদ্বুদ ছাড়া আর কিছুই নেই। চারপাশে যেসব জাহাজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তার সুযোগটা নিয়েছে খুনি। ইয়টের ডেকে স্কুবা গিয়ার ফেলে রেখে ওয়েট স্যুট পরনে ডুব-সাঁতার দিয়ে পালিয়ে গেছে সে।
পাওয়ারবোট নিয়ে পুরো এক মিনিট চারপাশে ঘুরল রানা। কোথাও দেখতে পেল না আততায়ীকে। এবার দেরি না করে দড়ির মই বেয়ে উঠে গেল ইয়টের ডেকে।
এলিনাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ইয়টের চার ক্রু। তাদের একজনকে সরিয়ে দিয়ে মেয়েটার পাল্স দেখল রানা। জ্ঞান হারালেও ভালভাবেই শ্বাস নিচ্ছে এলিনা। সোয়েটারের কাঁধ কালচে হয়ে গেছে রক্তে।
উঠে দাঁড়িয়ে স্যালনে গিয়ে ঢুকল রানা।
মেঝেতে পড়ে আছে মোরেলি। অজস্র বুলেটের আঘাতে প্রায় দু’টুকরো হয়ে গেছে তার মাথা। ডেকে আছড়ে পড়ার আগেই মারা গেছে লোকটা।
স্যালন থেকে বেরিয়ে তীরের দিকে তাকাল রানা। কিন্তু ওদিকে কোথাও নেই কালো ওয়েট স্যুট পরা কেউ। পাইলট হাউসে ঢুকে শিপ-টু-শোর রেডিয়ো ব্যবহার করে বার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করল রানা। ওর কথা শুনে কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে হতবাক হয়ে গেল বিএসএস এজেন্ট। তবে চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে ফোন দিল ম্যালাগার গার্ডিয়া সিভিল-এ।
এলিনার পাশে এসে বসল রানা। সামান্য নড়ে উঠল মেয়েটার চোখের পাতা।
‘এলিনা, শুয়ে থাকো,’ বলল রানা।
চোখ মেলে ওকে দেখল মেয়েটা। গুঙিয়ে উঠে বলল, ‘খুব ব্যথা!’ পরক্ষণে সোয়েটারে রক্ত দেখে জ্ঞান হারাল।
Chapter - 7
সাত
রাগে থমথম করছে মাসুদ রানার মুখ। একবার ওকে দেখে নিয়ে আলমারির দরজা মেলে নিচের ড্রয়ার খুলল বার্টি এইচ. স্মিথ। ড্রয়ারের ভেতরে আছে চামড়ার কেস। সেটা থেকে হাতে নিল রেডিয়ো ট্র্যান্সমিটার। ওটা চিনল রানা। জাপানি যন্ত্রটা এতই শক্তিশালী, অনায়াসেই সংকেত দেয়া যাবে চাঁদে।
রাটন টিপে দিতেই সবুজ বাতি জ্বলল ট্র্যান্সমিটারের কন্সোলে। সেকেণ্ড পাঁচেক পর ট্র্যান্সমিশন স্ক্র্যাম্বল হতেই রানার হাতে যন্ত্রটা ধরিয়ে দিল বার্টি। নিচু গলায় বলল, ‘কথা বল তোর বসের সঙ্গে।’
সামনে ঝুঁকে বসল রানা। ‘স্যর, আমি।’
‘হ্যাঁ, বলো।’
‘নোবলম্যান খুন হয়ে গেছে।’
‘খুন হয়ে গেছে?’ চুপ হয়ে গেলেন রাহাত খান। কয়েক সেকেণ্ড পর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি কি শিয়োর?’
‘অর্ধেক মাথা উড়ে গেছে,’ বলল রানা। ‘মাফিয়ার লোক ভাল করেই জানত কোথায় আছে সে।’
‘আর নোবলম্যানের রক্ষিতা?’
‘সে আহত।’
‘ভাবছ আমাদের পক্ষ থেকে ইনফরমেশন লিক হয়েছে?’
‘আমি এখনও জানি না, স্যর।’
‘মারিয়া হ্যারল্ড এখনও হোটেলে আছে?’
‘থাকার তো কথা, স্যর। যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা জানব কোথা থেকে লিক হয়েছে ইনফরমেশন।’
‘তুমি তা হলে হোটেলে গিয়ে দেখো সে আছে কি না।’
‘জী, স্যর।’ ট্র্যান্সমিটার অফ করে বার্টির দিকে তাকাল রানা।
‘মনে হয় না মারিয়া হ্যারল্ড বেঈমান,’ বলল ওর বন্ধু।
‘একটু পরে সেটা বুঝব। তুই সাবধানে থাকিস।’ পুরনো . বাড়িটা থেকে বেরিয়ে হনহন করে হেঁটে, হোটেলে ফিরল রানা। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল তিনতলায়। নিজেদের সুইটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল, ঘুম থেকে উঠেছে মারিয়া। পাশের ঘরে গুনগুন করে গান গাইছে। দু’ঘরের মাঝের দরজা এখন খোলা। হোলস্টার থেকে ওয়ালথার হাতে নিয়ে পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে থামল রানা। নিচু গলায় ডাকল, ‘মারিয়া?’
‘ও, রানা? চলে এসেছ?’
‘ভুলে যেয়ো না যে আমি স্যামি কিং।’
‘ওহ্, সরি! সব ঠিক আছে তো?’
দরজার কোনা থেকে মেয়েটাকে দেখছে রানা। তার সঙ্গে অন্য কেউ নেই দেখে নিয়ে ঢুকল ঘরে। সুতির চমৎকার গাউন পরেছে মারিয়া। খুব দামি না হলেও দেখলে মনে হয় অভিজাত। ওর দিকে চেয়ে হাসল মেয়েটা। রানা বুঝে গেল, মোরেলি-হত্যার ব্যাপারে এখনও কিছুই জানে না মারিয়া।
‘তোমাকে দেখে খুব ক্লান্ত লাগছে, কিং।’
বেডের কোণে বসল রানা। জানালা দিয়ে আসা ম্যালাগার কড়া রোদে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মারিয়ার মুখ। নিচু গলায় বলল রানা, ‘মোরেলি মারা গেছে।’
ফ্যাকাসে হয়ে গেল মেয়েটার মুখ। সত্যি অভিনয় করলে সেটা ভাল করেই বুঝত রানা। ফিযিওলজিস্টরা বলেন, আর্টারিয়াল সিস্টেম কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না।
‘খুন হয়ে গেছে? তার নিজের ইয়টে?’
মাথা দোলাল রানা। ‘ওয়েট স্যুট পরা একজনের হাতে।’
‘আর মোরেলির সঙ্গের মেয়েটা?’
‘সে আহত হয়েছে। অবশ্য বাঁচবে। গোটা ব্যাপার সেট- আপ বলে মনে হচ্ছে আমার।’
‘তা হলে আমাদের এখন কী করা উচিত?’
‘অপেক্ষা করব,’ বলল রানা। ‘দেখি কী বলেন আমার বস্।’
ওর দিকে তাকাল মারিয়া। ‘মোরেলিকে যে-লোক খুন করেছে, তার চেহারা কি দেখতে পেয়েছ?’
‘আবছাভাবে।’
‘এনসেনাডায় যে স্নাইপার, আমাদের ওপরে গুলি চালিয়েছিল, তার সঙ্গে লোকটার চেহারার কোন মিল পেলে?’ কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘চেহারা দেখার সুযোগ পাইনি।’
‘লণ্ডনে যে-লোক হোটেলের কাছে ছিল, সেই একই লোক মোরেলিকে খুন করে থাকতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’
‘হয়তো। খুনির পরনে ছিল ওয়েট স্যুট। যে-কেউ হতে পারে সে। তোমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী খুনি হলেও অবিশ্বাস করার কিছু নেই।’
রানার কথা পাত্তা দিল না মারিয়া। বেশ জোর দিয়েই বলল, ‘এ-ই সেই লোক, যে কি না এনসেনাডা থেকে ফলো করে এসেছে লণ্ডনে। তারপর হাজির হয়েছে ম্যালাগায়।’
‘হয়তো।’
‘আর কে হবে!’
চুপ করে আছে রানা। ওর সামনে এসে থামল মারিয়া। নিচু গলায় বলল, ‘শুনেছি তুমি দুনিয়ার পাঁচজন গুপ্তচরের একজন। তা হলে কীভাবে তুমি মোরেলিকে খুন হতে দিলে?’
মেয়েটার চোখে তাকাল রানা। এতই রেগে গেছে, ওর চেহারা থেকে যেন বেরোল রাগের আগুনের হলকা। ভয় পেয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল মারিয়া। চাপা স্বরে বলল রানা,
এইমাত্র যা বললে, সেটা আর কখনও বলবে না।’
ফ্যাকাসে মুখে বলল মারিয়া, ‘সরি, আর এমন হবে না।’ পকেটে স্মার্টফোন বেজে উঠতেই ওটা বের করে স্ক্রিন দেখল রানা। কল রিসিভ করতেই ওদিক থেকে বলল বার্টি, ‘আমি। কথা হয়েছে এলিনা পার্কারসনের সঙ্গে।’
‘কী বলল?’
‘অ্যালকাযাবা থেকে সামান্য দূরে প্রাইভেট এক ক্লিনিকে তাকে নিয়ে গিয়ে রেখেছে গার্ডিয়া সিভিলের অফিসারেরা। যে ডাক্তার ওকে চিকিৎসা দিচ্ছে, সে আবার আমাদের ভাতা নিয়মিত পায়।’
‘গুড,’ বলল রানা।
‘মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে। এখন তোর সঙ্গে দেখা করতে চায়।’
দ্রুত ভাবল রানা। ‘ঠিক আছে। ক্লিনিকের ঠিকানা দে।
‘আমিই নিয়ে যাব তোকে।’
‘বেশ, বিশ মিনিট পর তা হলে লবিতে আছ। আরেকটা কথা, গার্ডিয়া সিভিল কীভাবে জানল কোন্ ক্লিনিকে তাকে নিয়ে যেতে হবে?’
হাসল বার্টি। ‘ওদেরও ক’জনকে ভাতা দিই আমরা।’
বিদায় নিয়ে স্মার্টফোন পকেটে রাখল রানা।
‘কে ফোন করেছিল? কী বলল?’ নিচু গলায় বলল মারিয়া। মোরেলি খুন হয়েছে সেটা এখনও হজম করতে পারেনি। এ থেকে রানা বুঝে গেল, গোপনে কোন অন্যায়ে জড়িয়ে যায়নি মারিয়া হ্যারল্ড।
‘সুস্থ হয়ে উঠছে মেয়েটা। একটু পর তার সঙ্গে দেখা করতে যাব।’
‘আর আমি? আমি যাব না?’
আপাতত মারিয়াকে চোখের আড়াল করবে না ভেবেছে রানা। নরম সুরেই বলল, ‘তুমিও আমার সঙ্গে যাবে।’
কথাটা শুনে সহজ, হলো মারিয়া। ঠোঁটে ফুটল হাসি। ‘ভাল হলো। ভাবছিলাম আমাকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেবে কি না। সত্যি বলতে এসপিয়োনাজের কিছুই তো জানি না। শুধু জানি, কোন্ ধরনের পথে ড্রাগ্স্ পাচার হয়।
‘তুমি এখন থেকে খুব সতর্ক থেকো,’ বলল রানা।
কেন যেন লজ্জায় লালচে হলো মারিয়ার দু’গাল। বিড়বিড় করে বলল, ‘অবশ্যই সতর্ক থাকব।’
পনেরো মিনিট পর লবিতে নেমে এল ওরা। ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে বার্টি। হোটেল থেকে বেরিয়ে ফিয়াট ৫০০ গাড়িতে চাপল ওরা। ড্রাইভ করল বার্টি। জানিয়ে দিল, যে প্রাইভেট ক্লিনিকে এলিনা পার্কারসনকে রাখা হয়েছে, ওটা বেশি দূরে নয়। রানাকে নিজের দিকে আকর্ষিত করতে বার্টির সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে মারিয়া। যদিও সেটা বুঝেও যেন কিছুই বুঝল না রানা। ডুবে গেল চিন্তার সাগরে।
প্রথমে এনসেনাডায় ওদের ওপরে হামলা করেছে এক স্নাইপার। এরপর লণ্ডনে ওদের হোটেলের ওপরে চোখ রাখল কেউ। তাতে ওর বোঝা উচিত ছিল, মোরেলিকে খুন করতে হয়তো পাঠিয়ে দেয়া হবে আততায়ী। এখন নিজেকে দোষ দিচ্ছে রানা। কেন ধরে নিল মারিয়া আর ওকে খুন করতেই ফাঁদ পেতেছে তারা? অথচ, বড় টার্গেট তো আসলে ছিল রোমিয়ো মোরেলি। ওর গাফিলতির কারণেই খুন হয়ে গেছে লোকটা!
বাঁক নিয়ে রাস্তার ধারে গাড়ি রাখল বার্টি। দরজা খুলে নেমে পড়ল ওরা। চারদিকের বাড়িঘরের মাঝে সরু এক গলিতে সূর্যের আলো থেকে চিরকালীন ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে চারতলা প্রাইভেট ক্লিনিক। ভেতরে ডেটলের কড়া গন্ধ। মেঝে ও চারদেয়াল ঝকঝকে তকতকে। ম্যালাগার নোংরা সব বস্তি থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে বোধহয় চিকিৎসা নিতে আসে স্পেনের সমাজের উঁচু পর্যায়ের সব মানুষ।
রিসেপশন রুমের একদিকে মার্বেলের তৈরি ঘোরানো চওড়া সিঁড়ি। ওটা বেয়ে ওপরে রওনা দিতেই বার্টির পিছু নিল হাতির নিতম্বের মত বিশাল পাছার সাদা ইউনিফর্ম পরা বয়স্কা এক মহিলা নার্স। নিচু গলায় বলল, তাদের রোগিণী আগের চেয়ে এখন অনেক ভাল আছে।
তৃতীয়তলায় উঠে করিডর ধরে এগোল ওরা। একটু যেতেই খোলা এক দরজার সামনে দেখা গেল চিকন এক লোককে। তার পরনে বিযিনেস স্যুট। গলায় কালো টাই। বার্টির দিকে চেয়ে এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত বিশাল এক হাসি দিল সে। ‘আসুন, আসুন, মিস্টার স্মিথ! আমাদের কী পরম সৌভাগ্য যে আপনি নিজেই চলে এসেছেন!’
‘আমাদের রোগিণী এখন কেমন আছে?’ বলল বার্টি।
পেটের ওপরে দু’হাত জড় করল ডাক্তার গঞ্জালেস। বড় করে শ্বাস নিয়ে কী যেন ভেবে নিল, তারপর নিচু গলায় বলল, ‘আপনারা তো জানেন ওটা বুলেটের ক্ষত। এক্ষেত্রে মাঝে মাঝে রক্ত-প্রবাহে সেপসিস হয়। ওটা ভয়ঙ্কর ধরনের বিষ।’ কথাগুলো এখন বলছে রানার দিকে চেয়ে। ধরে নিয়েছে এই দলে ও-ই সবচেয়ে বড় মূর্খ। ‘সেটা যদি না হয়, আমার ধারণা বিশ্রামের সময় দিলে একেবারে সুস্থ হয়ে উঠবে মেয়েটা।’
‘কতদিন বিশ্রাম নিতে হবে ওর?’ জানতে চাইল রানা।
কী যেন ভেবে নিয়ে বলল ডাক্তার, ‘বেশ কয়েক দিন।’
‘তার মানে ক্ষতটা অত সিরিয়াস নয়,’ বলল রানা।
চকচক করে উঠল গঞ্জালেসের দু’চোখ। পরক্ষণে দুশ্চিন্তা ভরা ম্লান হাসি দিল সে। ‘বিষয়টা বেশ সিরিয়াস, সেনোর কিং। তবে স্রষ্টা চাইলে তাকে সুস্থ করে দিতে পারেন।
ডাক্তার যে আপাতত এলিনাকে ক্লিনিক থেকে ছেড়ে দেবে না, সেটা বুঝে গেছে রানা। নিজেও জানে, বুলেটের ক্ষত কখনও কখনও হয়ে ওঠে মারাত্মক। সেক্ষেত্রে সামান্য ক্ষতের ঘা থেকে মারা যেতে পারে রোগী।
‘ভাল দিক হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে রোগিণীকে এই ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়েছে,’ বলল ডাক্তার গঞ্জালেস। ‘প্রায় শকের ভেতরে চলে গিয়েছিল। ওটা হলে পরিণতি আরও খারাপ হতো।’
মাথা দোলাল রানা। ‘আমরা কি এখন ওর সঙ্গে কথা বলতে পারব?’
‘অবশ্যই পারবেন!’ বার্টির দিকে হাতের ইশারা করে খোলা দরজা দেখাল ডাক্তার। ‘প্রিয়, আসুন আপনারা।’
দরজা পেরিয়ে বড় এক ঘরে ঢুকল রানা ও বার্টি। ওদের পেছনে মারিয়া, ডাক্তার গঞ্জালেস ও মোটা মহিলা নার্স। ঘরের মাঝে আছে হাসপাতালের আধুনিক একটি বেড। সরিয়ে দেয়া হয়েছে চারদিকের পর্দা। বেডের পাশের ছোট্ট টেবিলে জ্বলছে ল্যাম্প। ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে ঢাকা এলিনা পার্কারসনের বুক। কাঁধে ও বুকের ওপরের অংশে পুরু ব্যাণ্ডেজ। চোখ বুজে শুয়ে আছে অপরূপা মেয়েটা। বালিশে এলিয়ে পড়েছে সোনালি একরাশ চুল। সেজন্যে ওকে দেখাচ্ছে ঘুমন্ত কোন পরীর মত।
ঘরে কেউ ঢুকেছে সেটা বুঝে চোখ মেলে পায়ের দিকে তাকাল এলিনা। রানার মুখের ওপরে স্থির হলো ওর দৃষ্টি। দুর্বল সুরে বলল, ‘মিস্টার কিং।’
এক পা এগোল রানা। ‘তুমি সুস্থ হয়ে উঠছ, সেটা দেখে খুশি হলাম।’
ক্লান্ত হাসল মেয়েটা। ‘আসলে… কী যে হয়ে গেল…’ এলিনার চোখ বেয়ে টপটপ করে নেমেছে অশ্রু।
অদ্ভুত সুন্দরী মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়াল রানা। ‘এলিনা, জানি, খুব বাজে একটা ঘটনা ঘটেছে। তুমি কি এ- বিষয়ে আমাকে কিছু বলতে চাও?’
‘আমি… আসলে খুব লজ্জিত,’ ফিসফিস করল এলিনা। চোখে কেন যেন করুণা প্রার্থনার দৃষ্টি।
ঘুরে অন্যদের দিকে তাকাল রানা। ‘ঠিক আছে, তোমরা ঘরের বাইরে যাও। আমি ওর সঙ্গে একা কথা বলতে চাই।’
‘আমিও থাকব, একটু জোর দিয়ে বলল মারিয়া।
ইংরেজ মেয়েটার চোখে তাকাল রানা। দু’সেকেণ্ড পর বলল, ‘বেশ। তুমি থাকো। তবে অন্যেরা চলে যাক।’
ঘর ছেড়ে করিডরে গেল সাদা ইউনিফর্ম পরা নার্স, বার্টি এবং ডাক্তার গঞ্জালেস। পেছনে দরজাটা ভিড়িয়ে দিল বার্টি।
এলিনার হাত আলতো করে ধরল রানা। ‘কী বলতে আমাকে ডেকেছ, এলিনা? কী কারণে লজ্জিত বোধ করছ?’
রানার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল এলিনা। দুর্বল স্বরে বলল, ‘আমরা আসলে চালাকি করেছি। যেটা উচিত হয়নি।’
‘কী ধরনের চালাকি?’ নিচু স্বরে জানতে চাইল মারিয়া।
চুপ করে থাকল এলিনা। চেয়ে আছে দেয়ালের দিকে।
‘আমাকে খুলে বলো, এলিনা,’ নরম স্বরে বলল রানা।
‘বুদ্ধিটা ছিল মোরেলির। ভয়ের ভেতরে ছিল সে। ভাবছিল যে-কোন সময়ে ওকে খুন করবে যে-কেউ।’
‘ওর ওপরে হামলা হবে সেটা এত নিশ্চিত ছিল কেন?’ জানতে চাইল রানা।
‘আগেও তো কয়েকবার হামলা করা হয়েছে ওর ওপরে।’
‘ঠিক আছে, বুঝলাম যে সে ধারণা করেছিল স্পেনে এলে তার ওপরে হামলা হবে। কিন্তু সেটা কি আমাদের সঙ্গে তার মিটিং হবে, সেজন্যে?’
‘হ্যাঁ,’ ফিসফিস করে বলল এলিনা।
‘মোরেলি যদি আগেই জানত আক্ৰমণ হবে, সেক্ষেত্রে জেনে-বুঝে ফাঁদে পা দিল কেন?’
‘ফাঁদে পা দেয়নি তো,’ বলল এলিনা। ‘কোন ঝুঁকিও নেয়নি। আমি সেটাই বলতে চাইছি।’
চট করে মারিয়ার দিকে তাকাল রানা। ওর মনের ভেতরে বিদ্যুতের গতিতে খেলে গেছে একটা চিন্তা। আগের চেয়ে জোরে এলিনার কবজি ধরল ও। ‘ঠিক আছে, প্রথম থেকে সব খুলে বলো।’
‘ইয়টে আসলে মোরেলি ছিলই না,’ লজ্জা নিয়ে রানার দিকে তাকাল এলিনা।
অবাক হয়নি রানা। সহজ সুরে বলল, ‘তা-ই?’
‘হ্যাঁ। তুমি যার সঙ্গে ইয়টে গিয়ে কথা বললে, সে আসলে মোরেলি নয়। সে ছিল ওর বহু বছরের পুরনো বন্ধু বাস্তিলো দে ভ্যানারি। সিসিলির লোক।’
‘আর মোরেলি? সে ইয়টে তা হলে ছিল না?’
‘না, ছিল না। আগেই চলে গেছে সিয়েরা নেভাডায়। কথা ছিল ইয়টে মিটিং হওয়ার পর ওকে আমরা জানাব, তোমরা স্কি রিসোর্টে যাবে। প্রথম সাক্ষাৎকার ছিল তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্যে। নিজের ডাবলকে ইয়টে রেখেছিল মোরেলি।’
‘আর সে-লোক খুন হয়ে গেছে,’ আনমনে বলল মারিয়া।
করুণ চোখে রানার চোখে তাকাল এলিনা। ‘ঘটনা তা-ই।’
রানার পাশে এসে দাঁড়াল মারিয়া। কড়া গলায় বলল, ‘তুমি যে আসলে মিথ্যা বলছ, সেটা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি।’
ভয় পেয়ে কনুইয়ের জোরে উঠে বসল এলিনা। শুকিয়ে গেছে সুন্দর মুখ। ‘এভাবে বলছেন কেন? আমি তো মিথ্যা বলছি না!’
‘মিথ্যাই বলেছ তুমি!’ দৃঢ় কণ্ঠে বলল মারিয়া। ‘রোমিয়ো মোরেলি মারা গেছে! আর তুমি আমাদের কাছে নকল তথ্য বিক্রি করতে চাইছ। সেটাই তোমার উদ্দেশ্য।
‘কথাটা ঠিক নয়!’ ঘামছে এলিনা। ‘শপথ করে বলছি!’
‘আমি কোনভাবেই তোমার বলা কোন মিথ্যা কথা বিশ্বাস করব না,’ জোর দিয়ে বলল মারিয়া।
‘মোরেলি এখন সিয়েরা নেভাডায়,’ ঢোক গিলল এলিনা। ‘ভ্যালেন্সিয়ায় ওকে ইয়ট থেকে নামিয়ে দিয়েছি আমরা। আমি তার প্রমাণ দিতে পারব।’
‘কীভাবে সেটা প্রমাণ করবে?’
‘আ… আমি…’ বারকয়েক ফুঁপিয়ে উঠল এলিনা। অসহায় চোখে তাকাল রানার চোখে।
‘কী করে প্রমাণ দেবে?’ এলিনার বাহু স্পর্শ করল মারিয়া। ‘এসব মিথ্যা কথা বলে কিন্তু রেহাই পাবে না!’
বুলেটের ক্ষতে টান পড়তেই গুঙিয়ে উঠল এলিনা। চোখ বেয়ে দরদর করে ঝরছে অশ্রু। ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘আমি মিথ্যা বলছি না! ভালভাবেই বেঁচে আছে মোরেলি! বিশ্বাস না হলে ভ্যালেন্সিয়ার রেকর্ড দেখুন। ওখানে ইয়ট থেকে নেমে গেছে মোরেলি!’
সোজা হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল মারিয়া। চোখ সরু করে দেখছে এলিনাকে। কয়েক সেকেণ্ড পর রানার দিকে তাকাল। ‘এই মেয়ে সত্যি বলছে কি না, সেটা আমরা রেকর্ড দেখে জেনে নিতে পারব।’
মারিয়ার সাহস ও দৃঢ়তার জন্যে মনে মনে ওর প্রশংসা করছে রানা। পরস্পরকে আরেকবার দেখে নিল ওরা। এটা এখন জানা গেছে, সত্যিই মৃত্যু হয়নি মোরেলির।
‘সে এখন কোথায় আছে?’ জানতে চাইল রানা।
মুখ আরও শুকিয়ে গেছে এলিনার। ‘আমি তো বলেছি। সিয়েরা নেভাডায়।’
‘কিন্তু…’
‘মোরেলি আমাকে জানিয়ে দেবে তোমাদের সঙ্গে কোথায় দেখা করবে সে।’
‘ছদ্ম-পরিচয়ে রিসোর্টে আছে সে?’
ঘন ঘন মাথা দোলাল এলিনা। ‘হ্যাঁ! আমি মিথ্যা বলছি না! ইয়টের গোটা ব্যাপারটার জন্যে আমি দুঃখিত।’
‘সত্যিই দুঃখিত হওয়া উচিত তোমার,’ বিরক্তি চেপে বলল রানা।
‘তোমরা তো রিসোর্টে ওর সঙ্গে দেখা করবে, তা-ই না?’
‘মোটেও না,’ সরাসরি জানিয়ে দিল রানা।
‘দেখা করবে না?’ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল এলিনা।
‘কেন ঝুঁকি নেব?’
‘তা…. তা হলে তো….’ ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করেছে
মেয়েটা। ‘ও… ও যে… তা হলে আমাকে খুন করবে?’
‘আমারও তা-ই ধারণা,’ সহজ সুরে বলল রানা।
Chapter - 8
আট
অন্যের মগজে নিজের চিন্তা গোপনে পাঠিয়ে দেয়া নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এ-পৃথিবীতে। তবে ইএসপি নিয়ে সত্যিকার কোন প্রমাণ আজও কেউ দেখাতে পারেনি। এখন মারিয়ার দিকে চেয়ে প্রাণপণে নিজের ইচ্ছে তার মগজে গুঁজে দিতে চাইছে রানা। মনে মনে বলছে, ‘এলিনা পার্কারসনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও, মারিয়া! তুমি হচ্ছ দলের ভাল মানুষটা! আর আমি চিরকালের বাজে লোক!
ওর চোখে চেয়ে আছে মারিয়া। কী ভাবছে সেটা সে-ই জানে! রোমান্টিক কিছু হতে পারে। লালচে হলো গোটা মুখ।
মারিয়ার মগজে নিজের মনের কথা পাঠাতে না পেরে বেশ হতাশ হয়ে গেছে রানা। বুঝতে পারছে, মেয়েটা বোধহয় ভাবছে ওকে নিয়ে নোংরা কিছু ভাবছে লোকটা!
মহাঝামেলায় পড়েছি তো! তিক্ত মনে ভাবল রানা। ঘুরে তাকাল এলিনার দিকে। আরও কঠোর সুরে বলল, ‘কোনভাবেই মোরেলির সঙ্গে আর দেখা করব না আমরা! খেলা খতম তোমাদের! প্রথম থেকেই মিথ্যা বলেছ! কাজেই মিটিং করতে গিয়ে কোন ধরনের ঝুঁকি নেব না আমি!’
চোখ সরু করে রানার দিকে চেয়ে আছে মারিয়া। দ্রুত কী যেন হিসাব কষছে। ‘এক মিনিট!’ কয়েক সেকেণ্ড পর চট্ করে বলল সে। ‘এটা কি ঠিক হবে যে মোরেলির সঙ্গে দেখা না করেই স্পেন ছেড়ে চলে যাব আমরা?’
ফোঁপানি থামিয়ে. চোখে একরাশ আশা নিয়ে মারিয়ার দিকে তাকাল এলিনা।
বাগানের সুন্দর ফুলে বিশ্রী এক শুঁয়োপোকা কিলবিল করতে দেখলে যেভাবে ভুরু কুঁচকে ওটার দিকে তাকায় মানুষ, সেভাবে কঠোর চোখে মারিয়াকে দেখল রানা। ‘দেখা না করে চলে গেলে অসুবিধে কী আমাদের?’ রাগী গলায় বলল,
‘প্রথম থেকেই তো এরা মিথ্যা কথা বলছে!’
‘কিন্তু মোরেলি যেসব তথ্য দেবে বলেছে, তার কী হবে?’
‘ওগুলো না পেলেও আমাদের চলবে।’
‘তোমার হয়তো লাগবে না,’ নরম সুরে বলল মারিয়া। ‘তবে আমার লাগবে! আমি নিজের কাজ থেকে পিছিয়ে যেতে চাই না! আমি ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করব না!’
ওদের নাটক কেমনভাবে দেখছে এলিনা, সেটা চট্ করে দেখে নিল রানা। লন টেনিস ম্যাচে দর্শকেরা যেভাবে মাথা এদিক-ওদিকে ঘুরিয়ে খেলোয়াড়দের খেলা দেখে, সেভাবে একবার মারিয়া, আরেকবার ওকে দেখছে মেয়েটা।
‘দেরি না করে আমার বসকে জানিয়ে দেব, আমরা বাতিল করে দিচ্ছি মিশন!’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল রানা।
এবার সত্যিই যেন বিরক্ত হলো মারিয়া। ‘আমি মোরেলির সঙ্গে দেখা করতে চাই। এই মিটিং থেকে হয়তো অনেক কিছুই আমরা জেনে নিতে পারব!’
‘এ-মেয়ের সামনে আমাদের আলাপ করা ঠিক হচ্ছে না।’ আরও গম্ভীর হয়ে গেল রানা।
‘এলিনা পার্কারসন কী শুনছে, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না! আমি আমার অ্যাসাইনমেন্টে সফল হতে চাই!’
দলে বিভক্তির ফলাফল কেমন হবে, সেটা নিয়ে যেন চিন্তায় পড়ে গেছে রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ‘তুমি কি তা হলে সত্যিই মোরেলির সঙ্গে দেখা করতে চাও?’
মাথা দোলাল মারিয়া। ‘অবশ্যই! ইয়টে তুমি যাওয়ার পর সব গুবলেট হয়ে গেল। তবে তার অর্থ এমন নয় যে…
মারিয়াকে বাধা দিয়ে এলিনার দিকে চেয়ে বলল রানা, ‘আর তুমি, এলিনা? তুমি কোন্ নিশ্চয়তা দেবে যে এবার সিয়েরা নেভাডায় গেলে সত্যিকারের মোরেলির সঙ্গে আমাদের দেখা হবে?’
‘আমি তো আগেই বলেছি! সমস্ত তথ্য হাতে পেলেই তোমরা বুঝবে, কোনকিছু গোপন করা হয়নি।’
উদাস ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল রানা।
তাতে রেগে গিয়ে বলল মারিয়া, ‘যেভাবে হোক মোরেলির সঙ্গে আমি দেখা করব। এটা আমার দেশের জন্যে খুবই জরুরি।’
লক্ষ্মী মেয়ে, মনে মনে হাসল রানা। কঠোর চেহারায় এলিনার দিকে ঝুঁকে পড়ল। ‘ঠিক আছে, শেষবারের মত তোমাদেরকে আরেকটা সুযোগ দিলাম আমি।’
স্বস্তি বোধ করে চোখ বুজল এলিনা, মুখে অপূর্ব সুন্দর এক চিলতে হাসি।
‘তবে আমাদের সঙ্গে পূর্ণ সহায়তা করবে তুমি, এলিনা, ‘ বলল রানা। ‘ধরে নেয়ার কোন কারণ নেই যে বাড়ি ফিরে গেছে সেই খুনি। তোমাকেও হয়তো শেষ করে দিতে চাইবে সে।’
ভুরু কুঁচকে গেল মারিয়ার। ‘কিন্তু সেটা করবে কেন? তাকে তো টাকা দেয়া হয়েছে মোরেলিকে শেষ করার জন্যে। সে তো নিজের কাজ শেষ করেছে।’
‘তা নয়, খুনি জেনে নেবে মোরেলি আসলে খুন হয়নি। মাফিয়া কমিশনও জানবে, মারা যায়নি সে। আর তখন এলিনাকে মুঠোর ভেতরে ভরতে চাইবে খুনি। অথবা ওর পিছু নিয়ে হাজির হবে মোরেলির কাছে।’
ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল এলিনার।
‘এ-ঘরের সামনে একজন গার্ড রাখব,’ বলল রানা। ‘এ-ব্যাপারে কথা বলব স্মিথের সঙ্গে।’
‘কিন্তু পেশাদার খুনি তো যেখানে-সেখানে হাজির হতে পারে,’ বলল মারিয়া, ‘গার্ড কীভাবে বুঝবে যে কখন আসবে হামলা?’
ভুরু কোঁচকাল রানা। ‘আমাদের জানা নেই কে আসলে খুনি। তাই নার্স ও ডাক্তার ছাড়া আর কাউকে এ-রুমে ঢুকতে দেয়া হবে না।’
ব্যথায় মুখ কুঁচকে আবারও উঠে বসল এলিনা। ‘কিন্তু আমরা ঠিকই জানি, কে আসলে সেই খুনি।’
‘কী করে জানলে?’ ওর দিকে তাকাল মারিয়া।
‘তার কথা আমরা আগেই জেনেছি। পেশাদার খুনি সে। নাম অ্যালবার্ট কিউলেক।’
‘তার কথা তুমি কীভাবে জানলে?’ জিজ্ঞেস করল রানা।
‘আণ্ডারওঅর্ল্ডের সবাই তাকে বলে কিউলেক্স মশা। ছয় মাস আগে একবার কর্সিকায় এসেছিল মোরেলির ভিলায়। ওই বাড়িতে আছে নানান ধরনের ফাঁদ। দেয়ালে দেয়ালে আধুনিক সব ডিভাইস। তাই শেষমেশ আর ঢুকতে পারেনি একটা তারে পা দেয়ায় ক্যামেরায় উঠেছিল তার ইনফ্রারেড ছবি। ওটা ডেভেলপ করে মোরেলি জেনেছে, ওর ওপরে হামলা করতে এসেছিল পেশাদার খুনি কিউলেক্স।’
‘কিউলেক্সকে আগে থেকেই চেনে মোরেলি?’ জানতে চাইল রানা।
‘না, কখনও সামনা-সামনি দেখা হয়নি ওদের। তবে মোরেলির এক লোক চিনত কিউলেক্সকে।
‘তার মানে নিজ চোখে কখনও ড্রাগ লর্ডকে দেখেনি কিউলেক্স। অর্থাৎ সে ধরে নিয়েছে খুন হয়েছে মোরেলি?’
মাথা দোলাল এলিনা। ‘আমি আগে কখনও এটা ভেবে দেখিনি। তবে কথাটা ঠিক বলেই তো মনে হচ্ছে।’
‘কিউলেক্স সম্পর্কে আরও কিছু তোমার জানা আছে?’ বলল রানা। ‘এমন কিছু, যেটা থেকে তাকে ধরা যাবে?
গোলাপি হয়ে গেল এলিনার গাল। বিড়বিড় করে বলল, ‘শুনেছি মেয়েদেরকে খুব পছন্দ করে সে।’
‘আরও কিছু?’ জানতে চাইল রানা।
ব্রিত চেহারায় বিড়বিড় করল এলিনা, ‘শুনেছি একই সময়ে বিছানায় দুটো করে মেয়েকে নেয় সে।’
‘তা-ই?’ খুক খুক করে কাশল রানা।
‘এটা খুব অপমানজনক,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল মারিয়া।
এলিনার দিকে তাকাল রানা। ‘তার মানে সে ট্রিপল- ডেকার সেক্স করে?
‘হ্যাঁ,’ চোখ নামিয়ে নিল এলিনা। ‘প্রতিবার কাউকে খুন করার আগে সেটা করে। তাতে নাকি মন ভাল থাকে তার।’
‘সে আমাদেরকে খুঁজে নেয়ার আগেই, এই তথ্য থেকে হয়তো আমরা তাকে খুঁজে নিতে পারব,’ বলল রানা।
‘আমাদেরকে খুঁজে নেবে… মানে?’ অবাক চোখে ওর দিকে তাকাল মারিয়া।
‘ড্রাগ লর্ডের চেহারা চেনে না সে।’ জানালার বন্ধ কাঁচের দিকে তাকাল রানা। ‘কাজেই এবার আমাদের পিছু নিয়ে মোরেলির কাছে যেতে চাইবে সে।’
উজ্জ্বল হয়ে উঠল মারিয়ার চোখ-মুখ। ‘তা হলে আমাদের বোধহয় উচিত হবে ম্যালাগায় ফূর্তি করে বেড়ানো। সেক্ষেত্রে আমাদের ফাঁদে হয়তো পড়বে সে।’
‘না, মাথা নাড়ল রানা। ‘নিজেরা ফাঁদে পড়তে চাই না। তার আগেই খুঁজে বের করব তাকে।’ এলিনার দিকে তাকাল ও। ‘এবার বলো কীভাবে যোগাযোগ করবে মোরেলির সঙ্গে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল এলিনা। ‘নিজেই আমার সঙ্গে কথা বলবে মোরেলি। তার আগে তোমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।’
‘কিন্তু তুমি যে স্পেশাল এই ক্লিনিকে আছ, সেটা মোরেলি জানবে কীভাবে?’ জানতে চাইল মারিয়া।
‘ঠিকই জেনে নেবে,’ হালকা করে কাঁধ ঝাঁকাল এলিনা। ‘এতে মনে কোন সন্দেহ রাখবেন না।’
‘স্কি রিসোর্টে গিয়ে বোকার মত অপেক্ষা করতে চাই না,’ বলল রানা।
‘ডাক্তার বলেছেন দু’চার দিনের ভেতরে আমাকে ছেড়ে দেবেন,’ বলল এলিনা। ‘তাই এক বা দু’দিন আগে তোমরা ওখানে চলে গেলে তাতে কোন ক্ষতি নেই।’
‘আমরা আপাতত ম্যালাগাতেই থাকছি,’ বলল রানা, ‘শেষ করতে চাই কিউলেক্সকে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে দেখা করতে পারব মোরেলির সঙ্গে।’
এলিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এল রানা ও মারিয়া। করিডরে এখন কেউ নেই। আশপাশের বেশকিছু কেবিন থাকলেও এই তলায় কোন অফিস নেই। সিঁড়ি বেয়ে রিসেপশনে নেমে এল ওরা। একটা সোফায় বসে নতুন একটা সিনে ম্যাগাযিনে চোখ বোলাচ্ছে বার্টি। রানাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ‘কথা শেষ তোদের?’
‘চল, এবার ফেরা যাক,’ বলল রানা। ‘মারিয়াকে হোটেলে পৌঁছে দেয়ার পথে আলাপ সেরে নেব।’
একটু পর গলি থেকে বেরিয়ে ফিয়াট গাড়িতে উঠল ওরা। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে হোটেলের দিকে চলল বার্টি। ক্লিনিকের কেবিনে এলিনার সঙ্গে কী ধরনের কথা হয়েছে, সংক্ষেপে ওকে জানাল রানা। ফলে ম্যালাগার কমাণ্ড্যান্টের কাছে ফোন দিল বার্টি। তাতে স্থির হলো, এখন থেকে এলিনার ওপরে চোখ রাখবে গার্ডিয়া সিভিলের দু’জন সদস্য। ফোন রেখে গাড়ি চালাতে চালাতে বন্ধুর দিকে তাকাল বার্টি। ‘ম্যালাগায় কিউলেক্স পা রাখলে সে খবর আমি ঠিকই পেতাম। তোদের কোন ভুল হচ্ছে না তো?’
‘হচ্ছে না,’ বলল রানা। ‘এটা নতুন খবর।’
‘তা হলে তোর বোধহয় একবার ঢুঁ দেয়া উচিত ম্যালাগার আণ্ডারওঅর্ল্ডে,’ বলল বার্টি।
‘সেটা কোথায়?’ জানতে চাইল রানা।
‘বস্তি এলাকা বলতে পারিস। আবার ওখানেই আছে একের পর এক দারুণ সব নাইট ক্লাব। সেখানে গেলে হয়তো জানবি ম্যালাগায় সত্যিই এসেছে কি না কিউলেক্স। এক কাজ কর, মারিয়াকে নিয়ে ঢুঁ দে নাইট ক্লাবগুলোতে। তোরা বড়লোক ট্যুরিস্ট। পরনে দামি পোশাক। যাতে বিপদ না হয়, সেজন্যে তোদের সঙ্গে থাকবে একজন বডিগার্ড। এমনই একজনকে ভাল করেই চিনি। তোদের হয়ে এখানে- ওখানে খোঁজ নেবে। নাম ওর পেদ্রো রামিরেজ। সন্ধ্যায় তোদের হোটেলে তাকে পাঠিয়ে দেব।’
একবার মারিয়ার দিকে তাকাল রানা, তারপর বাটিকে বলল, ‘আমি কিউলেক্সের কাছে পৌঁছে যেতে চাই।’
বাকি পথ ওদের ভেতরে আর কোন কথা হলো না।
ওদেরকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল বার্টি। ওরা সুইটে ফিরতে না ফিরতেই রানার কাছে এল একটা ফোন। ‘ঠিক আছে, রামিরেজের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে,’ জানাল বার্টি।
‘গুড,’ খুশি হলো রানা।
‘সে দৈর্ঘ্যে পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। ভদ্রলোকের মত চেহারা। ঠোঁটের ওপরে পেন্সিল গোঁফ। খুব বুদ্ধিমান। ভাবচক্কর দেখে বোঝা যায় না যে দরকার হলে নির্দ্বিধায় মানুষ খুন করে।’
‘আমার তাতে কোন সমস্যা নেই,’ বলল রানা।
‘আরেকটা কথা। এইমাত্র ইন্টারপোল থেকে একটা তথ্য পেলাম।’
‘ইন্টারপোল?’
‘হ্যাঁ। ইয়টে মৃত লোকটার ছবি ওদেরকে দিয়েছিলাম। ওরা বলছে, লোকটা রোমিয়ো মোরেলি নয়। সত্যি সত্যিই সে বাস্তিলো দে ভ্যানারি।’
‘অর্থাৎ, মিথ্যা বলছে না এলিনা পার্কারসন,’ বলল রানা।
‘তাই তো দেখছি। দেখ, রাতে কিছু জানতে পারিস কি না। গুড লাক!’
.
সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসতেই লবিতে নেমে এল রানা ও মারিয়া। ঘরের পেছনদিক থেকে এসে ওদের সামনে থামল এক লোক। দৈর্ঘ্যে সে হবে বড়জোর পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। ভদ্রলোকের মত চেহারা। ঠোঁটের ওপরে পেন্সিলের মত গোঁফ। পরনে দামি স্যুট। তার সঠিক বর্ণনাই দিয়েছে বার্টি।
রানার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে। ‘আমিই পেদ্রো রামিরেজ। আপনাদের আজকের গাইড।’
‘আমি স্যামি কিং,’ হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল রানা। .’আর ইনি আমার স্ত্রী মারিয়া কিং।’
‘আমাদের সেনোরা কিং সত্যিই অপূর্ব সুন্দরী,’ মারিয়াকে বিরাট এক বাউ দিল রামিরেজ। ‘তাঁকে যিনি জীবনে পেয়েছেন, সত্যিই তাঁর ভাগ্য খুবই সুপ্রসন্ন।’
রানা দেখল আড়ষ্ট হয়ে গেছে মারিয়ার গম্ভীর চেহারা।
‘মিস্টার স্মিথ আমাকে বলেছেন, কী কারণে আজ রাতে বেড়াতে যাবেন আপনারা,’ চট্ করে একবার রানাকে দেখে নিল রামিরেজ।
‘বলুন তো, ঠিক কোথা থেকে শুরু করব?’ বলল রানা।
গড়গড় করে একের পর এক নাইট ক্লাবের নাম বলে গেল রামিরেজ। হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি-ক্যাব নিল ওরা। পেছনের সিটে মারিয়ার পাশে বসল রামিরেজ। সামনের সিটে রানা। স্প্যানিশ ভাষায় মারিয়ার প্রশংসা করছে রামিরেজ। অবশ্য তাতে আলাপ জমাতে না পেরে কথা বলতে শুরু করল ইংরেজিতে। জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল রানা।
ম্যালাগায় কোথা থেকে শুরু বস্তি এলাকা, আর তার শেষে নাইট ক্লাবের আরম্ভ, সেটা বোঝা বেশ কঠিন। প্রথমে সাগরতীরে বন্দরের কাছে শহরের লা ম্যালাগুয়েতা এলাকার এক রেস্টুরেন্টে ঢুকল রানা, মারিয়া ও রামিরেজ। কিছুক্ষণ আগে সাগরের পশ্চিমে ডুবে গেছে পোচ ডিমের লালচে কুসুমের মত সূর্য। রঙিন কাঁচের পিদিমে মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছে ওয়েটাররা। ঘরের পেছনদিকের এক টেবিলে বসে সি-ফুড আর ওয়াইন অর্ডার করে ডিনার সেরে নিল ওরা।
‘আমার একটা কথা মনে হচ্ছে, রামিরেজ,’ বলল রানা।
‘বলুন?’ মৃদু হাসল যুবক। রহস্যময়তা পছন্দ করে সে।
‘আমি ভঙ্গি করব যে আমি এক ধনী ব্রিটিশ ট্যুরিস্ট,’ বলল রানা। ‘আর আপনার কাজ হবে আমাকে আর আমার স্ত্রীকে সবচেয়ে দামি নাইট ক্লাবে নিয়ে যাওয়া। দু’হাতে টাকা ছিটাব। কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নই। সুন্দরী স্প্যানিশ মেয়েদেরকে বিছানায় নিতে চাই। আমি আবার মানসিকভাবে বিকৃত। তাই সেক্স করতে আমার লাগবে একই সঙ্গে দুটো মেয়ে।
কয়েক সেকেণ্ড ভেবে নিয়ে বলল রামিরেজ, ‘কিন্তু সেটা করবেন কীভাবে, সেনোর? আপনার সঙ্গে তো সর্বক্ষণ আছে সুন্দরী এই স্ত্রী!’
‘গোপনে আপনার সঙ্গে বিছানায় যাচ্ছে আমার স্ত্রী।’
কথাটা শুনে বেশ খুশি হয়ে হাসি দিল রামিরেজ। ‘বাহ্!’
‘আর আমরা যখন একই সঙ্গে বিছানায় যেতে রাজি এমন দুটো মেয়েকে পাব, টাকার বিনিময়ে জেনে নেব গত কয়েক দিনের ভেতরে কেউ ওদেরকে ভাড়া নিয়েছে না। বিশেষ করে গতরাতে।’
‘বুঝলাম,’ মাথা দোলাল রামিরেজ। ‘তা হলে, চলুন, প্রথম নাইট ক্লাব থেকে শুরু করি। দেখা যাক কী জানা যায়।’
ম্যালাগার প্রথম নাইট ক্লাবটাতে ঢুকল রানা, রামিরেজ ও মারিয়া। বেশিরভাগ ক্লাবের পরিবেশ প্রায়ান্ধকার। ছাত খুব নিচু। হলঘরে নেই কোন জানালা। চারপাশে ছোটসব টেবিল। ঘরের মাঝখানে মঞ্চ। ওখানে ছাত থেকে ঝুলছে শুকনো শেওলা, বেল্ট, দড়ি, মেয়েদের গার্ডার, জি-স্ট্রিং, ব্রা, চাবুক ইত্যাদি। গোপন কোথাও থেকে বাজছে স্টেরিয়ো মিউযিক। শক্তিশালী স্পিকার ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই আওয়াজ। চারপাশে দপ-দপ করে জ্বলছে রঙিন বাতি। দেয়ালে প্রজেক্ট করা হচ্ছে উলঙ্গ নারীর ছবি ও বিভিন্ন আসনে যৌনমিলনের নোংরা দৃশ্য।
একটু পর হঠাৎ করে নিভে গেল দপ-দপ করা বাতি। একে একে মঞ্চে উঠল ক’জন গিটার বাদক। তাদের সঙ্গে আছে এক ফ্ল্যামেনকো ড্যান্সার। বোঝা গেল না সে নারী নাকি পুরুষ।
মাঝরাত পর্যন্ত একে একে অন্তত আধ ডযন ক্লাব ছুঁড়ে ফেলল রানা, রামিরেজ ও মারিয়া। যদিও তাতে কোন লাভ হলো না। ষষ্ঠ ক্লাব থেকে বেরিয়ে রামিরেজের দিকে তাকাল হতাশ রানা। ‘এবার?’
এ তো বিপদের কথা, সেনোর,’ মাথা নাড়ল স্প্যানিশ যুবক। ‘কিছুই তো জানলাম না আমরা। একাকী পতিতা, জোড়া পতিতা; তিনজন মিলে মিলন করে যারা, তাদের সঙ্গেও তো কথা বলে দেখেছি! কিন্তু ওরা কেউ গত ক’দিনে একসঙ্গে কাজ করেনি। পরের কোন ক্লাবে হয়তো কপাল খুলতে পারে আমাদের।’
‘এমন ক্লাব আরও কয়টা আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আর বেশি নেই,’ চোখ সরু করল রামিরেজ। ‘আমার মনে হয় এবার আমাদের যাওয়া উচিত টরেমোলিনোসে।’
‘ওটা আবার কোথায়?’
‘ম্যালাগার খানিক দক্ষিণে। ওটা কোস্তা দেল সোল-এ।’
‘ওখানেও এদিকের মত নাইট ক্লাব আছে?’
‘ওরা দেশের সেরা। কী নেই ওখানে!’
মৃদু মাথা দোলাল রানা। ‘বেশ, তা হলে ওখানে চলুন।’
রাত দেড়টার পর টরেমোলিনোসের প্রধান সড়কে প্রায় অন্ধকার এক নাইট ক্লাবে ঢুকল ওরা। বিশাল ঘরের দরজার কাছে ছাত থেকে ঝুলছে কয়েকটা খাঁচা। সেগুলোর ভেতরে আছে সিংহ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গরিলা, চিতাবাঘ ইত্যাদি।
ফসফরাসের মত কিছু দিয়ে পেইন্ট করা হয়েছে চেয়ার ও টেবিলে। অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। ঘরের মাঝে ছোট এক স্টেজে নাচতে নাচতে ঘেমে-নেয়ে গোসল হয়ে যাচ্ছে এক পুরুষ ফ্ল্যামেনকো নর্তক। দেয়ালে প্রজেক্ট করা হয়েছে দুই লেসবিয়ানের যৌনক্রিয়ার চলচ্চিত্র। গিটারের সঙ্গে তাল রেখে দ্রুত গান গেয়ে চলেছে এক গায়িকা। সেই বিকট আওয়াজে প্রায় বধির হওয়ার দশা দর্শকদের। মারিয়া ও রামিরেজকে নিয়ে একটা টেবিল দখল করে স্যাংগ্রিয়ার অর্ডার দিল রানা।
একটু পর টেবিল ছেড়ে কোথায় যেন গেল রামিরেজ।
পরস্পরকে দেখল রানা ও মারিয়া, দু’জনই হতক্লান্ত।
কিছুক্ষণ পর কে যেন এসে হাত রাখল রানার কাঁধে। সতর্ক হয়ে ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল রানা। কাঁধের হোলস্টারের কাছে চলে গেছে হাত।
‘আমি বোধহয় পেয়ে গেছি ওদের, ঝুঁকে ওর কানে বলল রামিরেজ।
হাত বাড়িয়ে মারিয়ার বাহু স্পর্শ করল রানা। নীরবে বুঝিয়ে দিল বসে থাকতে। রামিরেজের পিছু নিল ও। নাইট ক্লাবের একদিকে ছোট এক দরজার কাছে ওকে নিল রামিরেজ। ওদিকে সরু করিডর। ওটা ধরে এগিয়ে পেছনদিকের এক ঘরে পা রাখল ওরা। ভেতরে পুরনো এক টেবিলের ধারে তিন ঠ্যাঙের চেয়ারে বসে আছে ময়লা ফ্ল্যামেনকো কস্টিউম পরা মাঝবয়সী এক মহিলা। ছাত থেকে ঝাপসা আলো দিচ্ছে ঘোলাটে বার্। তাতে যেন ঘরে আরও চেপে বসেছে অন্ধকার। মহিলার চুল কালো। চোখও কালো। চোখের নিচে যে ব্যাগের মত ফুলে আছে, ওটাও কালো।
‘ট্রিয়াঙ্কা,’ বলল রামিরেজ। ‘ইনিই তোমার খদ্দের।’
রানার দিকে চেয়ে ক্লান্ত হাসল মহিলা। খসখসে স্বরে বলল, ‘আপনাকে দেখে খুব খুশি হলাম।’
মন খারাপ হলেও হাসি-হাসি চেহারা করল রানা। ‘আর তোমার সঙ্গিনী?’
‘ও আমার মত এতটা দক্ষ নয়। তবে একই সঙ্গে কাজ করবে।’
‘নাম কী ওর?’
‘নেলি,’ বড় করে শ্বাস ফেলে বলল ট্রিয়াঙ্কা।
‘ট্রিয়াঙ্কা, তোমাকে কিন্তু খুব পেশাদার হতে হবে,’ বলল রানা। ‘আমি চাই না আমার পয়সা পানিতে যাক।’
‘ট্রিয়াঙ্কা আর নেলিকে নিলে কাউকে ঠকতে হয় না,’ নাক ফুলিয়ে বলল পতিতা। ‘আমরা সেরা। খুবই পেশাদার।’
‘আমি কিন্তু কাঁচা কাউকে চাই না,’ বলল রানা। ‘আগেই বলছি, তোমরা একই সঙ্গে কাজ না করলে পরে কিন্তু বিপদে পড়বে। এক পয়সাও দেব না।’
‘আমরা অনেক দিন ধরেই একসঙ্গে কাজ করছি,’ হাত তুলে আশ্বস্ত করতে চাইল ট্রিয়াঙ্কা। ‘আমাদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। টাকা আমরা সবসময় ভাগ করে নিই।’
‘কত চাও তোমরা?’
‘একেকজন মাত্র ষাট হাজার পেসেতাস।’
‘অনেক বেশি চাইছ! আমি জানব কী করে যে ঠকে যাচ্ছি কি না?’
‘দেখুন, এই এলাকার যে-কাউকে জিজ্ঞেস করুন। সত্যি কথাই বলবে তারা।’
‘সেনোর কাকে জিজ্ঞেস করবেন, ট্রিয়াঙ্কা?’ হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল রামিরেজ। ‘সত্যিই কি এমন কেউ আছে, যার কাছ থেকে জেনে নেয়া যাবে?’
‘নিশ্চয় আছে!’ জোর দিয়ে বলল ট্রিয়াঙ্কা, ‘যেমন মারবেলার সেই ফ্রেঞ্চ। বহু বছর ধরে একটা বাড়িতে ভাড়া নিয়ে ওখানে বাস করছেন তিনি।’
‘আমি নিজে ব্রিটিশ নাগরিক,’ বলল রানা, ‘কখনও কোন ফ্রেঞ্চকে বিশ্বাস করি না!’
ক্লান্ত হাসল ট্রিয়াঙ্কা। ‘তো শুনুন, আপনার মত আমিও কোন ফ্রেঞ্চকে বিশ্বাস করি না!’
‘তা-ই?’ কাঁধ ঝাঁকাল রানা।
কী যেন মনে পড়তেই এবার বলল ট্রিয়াঙ্কা, ‘এক মিনিট! গতকাল তো একজনের সঙ্গে শুয়েছি নেলি আর আমি। সে সত্যিকারের এক পিশাচ! চাইলে তার কাছ থেকে জেনে নিতে পারবেন! আমাদেরকে সবদিক দিয়েই ব্যবহার করেছে।’
‘নাম কি লোকটার?’ আগ্রহ দেখাল রানা।
ওর কথায় কুঁচকে গেল ট্রিয়াঙ্কার ভুরু। ‘তা জানি না। ‘নিজের নাম বলেনি সে। আপনার মতই শ্যামলা রঙের লোক। দেখে মনে হয়েছিল ইতালিয়ান হবে। ভাল করে স্প্যানিশ বলতে পারে না।’
রামিরেজের দিকে তাকাল রানা।
জবাবে চট্ করে ওকে চোখ টিপল সে।
‘লোকটা থাকে কোথায়?’ জানতে চাইল রানা।
‘আমাদেরকে নিয়ে গিয়েছিল টরেমোলিনোসেরই এক ভিলায়।’
প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে ষাট হাজার পেসেতাস নিল রানা। ‘তার ঠিকানা জানালে কাজ না করেই পাবে এই ষাট হাজার পেসেতাস।’
টাকা দেখে বিস্ফারিত হয়েছে মহিলার চোখ। রানা দেখল দরদর করে ঘামছে ট্রিয়াঙ্কা। লালায় ভিজে গেছে নিচের ঠোঁট। লোভ আর সতর্কতার দুই দড়িতে পা রেখে কী করবে ভাবছে মহিলা। বুঝে গেছে, রানা অস্বাভাবিক যৌনক্রিয়া করতে তাকে ভাড়া করছে না। ওদিকে টাকা হাতে পাওয়া খুব জরুরি।
পেসেতাস নেয়ার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল ট্রিয়াঙ্কা।
‘আগে লোকটার ঠিকানা দাও,’ বলল রানা।
‘ঠিকানা জানি না। তবে আপনাকে চিনিয়ে দেব বাড়িটা।’
হাত পিছিয়ে নিয়ে তিরিশ হাজার পেসেতাস আলাদা করল রানা। অর্ধেক টাকা রাখল মানিব্যাগে। বাকি টাকা ধরিয়ে দিল ট্রিয়াঙ্কার হাতে। ‘এখন অর্ধেক। রাকিটা বাড়ি চেনার পর।’
বিচলিত চোখে ওকে দেখল রামিরেজ। ‘সেনোর, ইয়ে… অন্য সেনোরার কী হবে? মানে… আপনার স্ত্রী?’
‘রামিরেজ, আধঘণ্টার ভেতরে ওকে হোটেলে পৌঁছে দেবেন আপনি,’ বলল রানা। ‘আমি কাজ শেষে পরে ফিরব।’ ভাবছে, কেউ থাকলে রামিরেজ ও মারিয়ার পিছু নিয়ে হোটেলে যাবে সে। এ-সুযোগে নিজের কাজ সেরে নিতে পারবে ও।
ট্রিয়াঙ্কা উঠে দাঁড়াতেই তার বাহু ধরে নাইট ক্লাবের পেছন দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরোল রানা। ক্লাবের সামনে উজ্জ্বল সব বাতির আলো থাকলেও পেছনদিকে ঘুটঘুটে আঁধার।
‘আপনি একটু অপেক্ষা করুন, বলল ট্রিয়াঙ্কা। আবার পেছনের দরজা দিয়ে নাইট ক্লাবে ঢুকে পড়ল সে। মিনিট পাঁচেক পর আবার বেরিয়ে এল। প্রায় একই সময়ে নাইট ক্লাবের পাশের রাস্তায় এসে থামল এক ট্যাক্সি-ক্যাব। রানাকে ওটা দেখাল মহিলা।
একে একে ক্যাবের পেছনের সিটে উঠল রানা ও ট্রিয়াঙ্কা। মহিলার সস্তা মেকআপ, মেয়েলি ঘাম ও পুরনো না ধোয়া পোশাকের গন্ধে একটু সরে বসল রানা।
ক্যাবের ড্রাইভারকে এগিয়ে যেতে বলল পতিতা। মাথার ক্যাপ পেছনের দিকে ঠেলে রওনা হয়ে গেল ড্রাইভার। সরু সব রাস্তা দিয়ে চলেছে শহরের পেছনে টিলার দিকে। পেরিয়ে গেল টরেমোলিনোসের বাণিজ্য এলাকা। সামনে পড়ল আবাসিক শহরতলী।
মিনিট দশেক পর সামনে ঝুঁকে ড্রাইভারের কাঁধে চাপড় দিল ট্রিয়াঙ্কা। ‘থামো! আমরা পৌঁছে গেছি!’
ব্রেক কষে রাস্তার ধারে ট্যাক্সি রাখল ড্রাইভার।
ডানদিকের ভিলার দিকে আঙুল তাক করল ট্রিয়াঙ্কা।
‘ওই বাড়ি?’ বলল রানা। ‘ওখানে একা থাকে লোকটা?’
মাথা দোলাল ট্রিয়াঙ্কা। ‘হ্যাঁ, একাই থাকে ওখানে।’
তার হাতে বাকি তিরিশ হাজার পেসেতাস ধরিয়ে দিল রানা। ট্যাক্সি-ক্যাব থেকে নেমে মিটিয়ে দিল ড্রাইভারের টাকা। বাড়তি টাকাও দিয়েছে, যাতে ট্রিয়াঙ্কাকে নাইট ক্লাবের সামনে নামিয়ে দেয় সে।
এক মিনিটের ভেতরে ফিরতি পথে অদৃশ্য হলো ট্যাক্সি- ক্যাব। শোল্ডার হোলস্টার থেকে ওয়ালথার নিয়ে একবার চেক করে নিল রানা।
ট্রিয়াঙ্কা যে ভিলার কথা বলেছে, ওটা ছোট এক চৌকো বাড়ি। চারপাশে জংলা গাছে ভরা বাগান। সামনের দিকে চওড়া গেট। ওপরে লোহার হুড়কো। নিঃশব্দে ওটা সরিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল রানা।
ঘুটঘুটে আঁধারে ডুবে আছে বাড়িটা।
জংলা বাগানের মাঝ দিয়ে ভিলার একপাশে চলে এল রানা। বুঝে গেল, হয় বাড়ির বাসিন্দা কোথাও গেছে, নয় তো ঘুমিয়ে আছে সে।
পর পর দুটো জানালা দিয়ে উঁকি দিল রানা।
একটা কিচেন, অন্যটা ডাইনিংরুম।
তৃতীয় জানালা রানাকে জানিয়ে দিল, এ-ঘর বেডরুম। খাটে ঘুমিয়ে আছে কেউ।
ওকে কেউ দেখছে কি না সেটা বুঝতে একবার চারপাশে দেখে নিল রানা। একদম থমথম করছে রাত। আবার কিচেনের জানালার কাছে ফিরল রানা। কোন আওয়াজ না করেই খুলে নিল সরু জানালা। পাল্লায় ছিটকিনি দেয়া নেই বলে অবাক হয়েছে। জানালা টপকে সাবধানে নেমে এল কিচেনের টাইল করা মেঝেতে। ওয়ালথার হাতে করিডরে এসে নিঃশব্দে চলল বেডরুমের দিকে। ভাবছে, আজ সত্যিই ভাগ্যদেবী ওর প্রতি খুব প্ৰসন্ন।
ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে বেডরুমের দরজা। কোন আওয়াজ না করেই ঘরে ঢুকল রানা। দরজার পাশেই বৈদ্যুতিক বাতির সুইচ। খাটের দিকে ওয়ালথার তাক করে ঝট্ করে বাতি জ্বালল রানা। খুনি হয়তো হাতের কাছে রেখেছে তার পিস্তল।
‘খবরদার! একদম নড়বে না!’ ধমকে উঠল রানা। কিন্তু খাটে কোনধরনের নড়াচড়া নেই। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যাচ্ছে বেডরুম। আর তখনই প্রথমবারের মত রানা বুঝতে পারল, মস্তবড় ভুল করে বসেছে ও!
খাটে যে শুয়ে ছিল, সে এখন আর ওখানে নেই!
বালিশ ও কোল-বালিশ সাজিয়ে তার ওপরে কম্বল রেখে সরে গেছে লোকটা!
চট্ করে বোঝার উপায় নেই যে ওখানে ঘুমাচ্ছে না কেউ।
চরম অস্বস্তি নিয়ে বাতির সুইচ অফ করতে চাইল রানা। আর তখনই শুনল পেছনে মৃদু আওয়াজ।
ওয়ালথার হাতে ঝড়ের বেগে ঘুরতে চাইল রানা। কিন্তু একই সময়ে বাতাস কেটে সাঁই করে মাথার ওপরে নেমে এল ভারী লোহার পাইপ। হঠাৎ দপ করে নিভে গেল ওর চোখের সব আলো।
Chapter - 9
নয়
ধোঁয়ায় ভরা ধূসর এক গ্রহ থেকে পালিয়ে যেতে চাইছে রানা। খুব কঠিন সেখানে দম নেয়া। যে-কোন সময়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে। তারপর ভয়ঙ্কর পতন হলো ওর। ধড়মড় করে উঠে বসতে চাইল। আর তাতেই টের পেল, এইমাত্র চেতনা ফিরে এসেছে ওর। টনটন করছে মাথার তালু। বেকায়দাভাবে শুয়ে আছে সংকীর্ণ কোন জায়গায়। ব্যথা করছে হাত-পায়ের হাড়-মাংস।
বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাস নেয়া খুব কষ্টকর। চোখ মেলে কিছুই দেখতে পেল না রানা। ভীষণ জ্বলছে চোখের পাতা। উঠে বসতে গিয়ে বুঝল, ও আছে এক ফোক্সভাগেন বিটলের সামনের সিটে। ঘড়ঘড় শব্দে চলছে ইঞ্জিন। যদিও কোথাও যাচ্ছে না গাড়িটা।
কেশে উঠে গলা পরিষ্কার করতে চাইল রানা। যদিও তাতে কোন লাভ হলো না। গাড়ির ভেতরে ভকভক করে ঢুকছে সাইলেন্সার পাইপের কটু ধোঁয়া। বামের প্রায়-বন্ধ জানালার কাঁচের ফাঁক দিয়ে ঢুকেছে হোস পাইপ। ওটা দিয়ে এসে গাড়ি ভরে গেছে নীলচে ধোঁয়ায়।
ফোক্সভাগেন বিটল ভাল করেই চেনে রানা। ওগুলো প্রায় রাতাস-পানি নিরোধক। তার ওপরে ভেতরে জমেছে কার্বন- মনোক্সাইড। সেজন্যে দম আটকে মরতে বসেছে ও।
জবাইয়ের আগে গবাদি পশুকে যেভাবে মাটিতে ফেলে বাঁধা হয়, সেভাবেই বেঁধে রাখা হয়েছে ওকে। ইঞ্জিন বন্ধ করতে দু’গোড়ালি দিয়ে ইগনিশনের চাবি ধরতে চাইল রানা। তবে ছোট্ট জায়গায় সেটা করা গেল না।
হাপরের মত শ্বাস নিচ্ছে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রানা। বুঝে গেছে, তাজা বাতাস না পেলে একটু পর খুন হতে হবে। বাইরে কোথাও অপেক্ষা করছে কিউলেক্স। হয়তো দশ মিনিট পর এসে ঢুকবে গ্যারাজে। বন্ধ করে দেবে ইঞ্জিন। তারপর ওর লাশ গাড়ি থেকে বের করে ফেলে দেবে কোথাও।
আরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল ওর!
ডানহাতে গোড়ালি স্পর্শ করতে পারছে রানা। আরেকটু ওপরে হাত তোলা গেলে গোড়ালিতে টেপ দিয়ে আটকে রাখা স্টিলেটো ধরতে পারবে। শরীর মুচড়ে সিট ছেড়ে গিয়ার শিফটের ওপরে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল রানা। তাতে আরেকটু হলে বেঁকে যেত লোহার দণ্ড।
হ্যাঁ, এবার ধরতে পেরেছে স্টিলেটোর বাঁট। কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে সচেতনতা। কয়েক সেকেণ্ড পর আবারও ফিরল ওর জ্ঞান। ভীষণ কাশছে রানা। ব্যথায় মুচড়ে উঠছে বুকের ভেতরটা। বুঝে গেল, যে-কোন · সময়ে খাঁচা ছেড়ে উড়াল দেবে প্রাণপাখি। গোড়ালি হাতড়াতে গিয়ে আবারও ধরল স্টিলেটোর হাতল। ছোরাটা বের করে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল গোড়ালির বাঁধন কাটতে। গাড়ির ভেতরে ফুরিয়ে গেছে শেষটুকু অক্সিজেন। আর দম নিতে পারছে না রানা। চারপাশ থেকে যেন ওকে ঘিরে ধরছে কালো এক বড় চাদর। খুব ধীর হয়ে গেছে ওর মগজ। নড়তে চাইছে না স্টিলেটো ধরা আঙুল। দম আটকে রেখে ছোরা দিয়ে দড়ির ওপরে পৌঁচ দিচ্ছে। গাড়ির ভেতরে ঢুকছে আরও কার্বন-মনোক্সাইড।
দড়ির ওপরে চেপে বসেছে স্টিলেটোর ফলা। কিন্তু কিছু কাটছে কি না বোঝার সাধ্য আর রানার নেই। একবার মনে হলো হাত থেকে পড়ে গেছে ছোরাটা। তারপর হঠাৎ করেই ছিঁড়ে গেল ওর দু’গোড়ালির বাঁধন। ঝটকা দিয়ে সামনে দু’পা পাঠাল রানা। ডানপায়ের পাতা চেপে বসল অ্যাক্সেলারেটর প্যাডেলের ওপরে। অবশ্য গিয়ার দেয়া হয়নি গাড়িটাতে। বাড়ল ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় আওয়াজ।
শরীর মুচড়ে গিয়ার শিফটের লাট্টু ধরল রানা। ওটা বামে ঠেলে চাপ দিল নিচে। পরক্ষণে ক্লাচ চেপে পেছনে নিল লাট্টু। ক্লাচ ছাড়তেই পেছনে রওনা হয়ে গেল ফোক্সভাগেন। মাত্র তিন সেকেণ্ডে চড়াও হলো গ্যারাজের বন্ধ দরজার ওপরে। তাতে ফাটল ধরলেও ভাঙল না কাঠের ভারী দরজার কবাট।
এবার সামনের গিয়ার ফেলল রানা। গুড়গুড় আওয়াজে গ্যারাজের পেছন-দেয়ালের দিকে চলল গাড়িটা। বাতাসের অভাবে চারপাশে আঁধার দেখছে রানা। বুক ও পাঁজর আঁকড়ে আসছে ভীষণ ব্যথায়। একবার বিষাক্ত বাতাস টেনে নিলে…
ব্রেক করে আবারও পেছনের গিয়ার ফেলল রানা। দড়াম করে গ্যারাজের দরজার ওপরে আছড়ে পড়ল ফোক্সভাগেনের পেছনদিক। জোর এক ঠাস্ আওয়াজে দু’দিকে খুলে গেল গ্যারাজের দরজার ভারী দুই পাল্লা। বাইরে রাতের অন্ধকার। চওড়া ড্রাইভওয়েতে বেরিয়ে এসেছে ফোক্সভাগেন। আবারও ব্রেক করে গাড়ি থামাল রানা। জানালার সরু ফাঁক দিয়ে ঢুকছে সামান্য তাজা হাওয়া। ওর ডানে হঠাৎ করেই দেখতে পেল কমলা এক ফুলকি। পরক্ষণে এল গুলির জোরাল ‘কড়াৎ!’ আওয়াজ।
পাশের সিটে থাকা স্টিলেটো নিয়ে কবজির বাঁধন কাটতে লাগল রানা। সেকেণ্ড তিনেকের ভেতরে পট করে ছিঁড়ল দড়ি। দেরি না করে হ্যাণ্ডেলে টান দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে নিল ও। ফুসফুসের জমা শ্বাস ভুস্ করে ছেড়ে বুক ভরে টেনে নিল তাজা বাতাস। মাত্র পাঁচ সেকেণ্ডে নিজেকে সামলে নিল রানা। হেডলাইট জ্বেলে’ গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা চলল বাগান লক্ষ্য করে। ওখানেই দেখেছে আগুনের কমলা স্ফুলিঙ্গ।
বাগানে চিৎকার করল কে যেন!
আবার গর্জে উঠল পিস্তল!
ড্রাইভওয়ে পার করে ঝোপঝাড় মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে ফোক্সভাগেন। সামনের এক ঝোপ থেকে বেরিয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল এক লোক। তার দিকে গাড়ির নাক তাক করল রানা। দৌড়াতে দৌড়াতে একবার ঘুরে তাকাল লোকটা।
হেডলাইটের আলোয় তার আতঙ্কিত চেহারা দেখতে পেল রানা। দৈর্ঘ্যে সে বড়জোর সাড়ে পাঁচ ফুট। মাথার চুল কালো। চেহারা চাঁদের মত গোল। ঝোপের মত ঘন দুই ভুরু। জুলফি লম্বা। চোয়ালে দু’দিন না কাটা নীলচে দাড়ি। লোকটা যে কিউলেক্স তাতে মনে কোন সন্দেহ থাকল না রানার।
গাড়ির দিকে গুলি পাঠালেও তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মিস করল লোকটা। অ্যাক্সেলারেটরে চাপ আরও বাড়াতেই রানাকে নিয়ে লাফ দিয়ে এগোল ফোক্সভাগেন।
প্রাণভয়ে এঁকেবেঁকে ছুটছে কিউলেক্স। বাগানটা এত বড় নয় যে চট্ করে লুকিয়ে পড়বে কোথাও। অ্যাক্সেলারেটর দাবিয়ে গাড়ির গতি আরও বাড়াল রানা। বিশ গজ দূরে বাগানের ইঁট দিয়ে গাঁথা দেয়ালের কাছে পৌঁছে গেছে কিউলেক্স। দেয়ালে উঠে লাফ দিয়ে নেমে গেল ওদিকে। দেয়ালের কাছে পৌঁছে ব্রেক করতেই পিছলে গেল গাড়ির চার চাকা। একরাশ ঘাস উপড়ে দেয়ালের একদিকে ঘষা দিল ফোক্সভাগেন। দপ করে নিভে গেল দুই হেডলাইট। দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে এল রানা। উঁকি দিল ইঁটের দেয়ালের ওদিকে। ওপাশে আরেক বাড়ির ঝোপ ও আগাছায় ভরা পরিত্যক্ত বাগান। আশপাশে কেউ নেই। এখন আর সুযোগ নেই যে ধরবে রানা পুরুষ মশা কিউলেক্সকে।
আবার বাড়িতে গিয়ে ঢুকল রানা। চলে এল বেডরুমে। একবার দেখল নিজে কোথায় ছিল, তারপর ওখানে গিয়ে মেঝে থেকে তুলে নিল ওয়ালথার। ভাবছে, এ-বাড়িতে কোথায় ফাঁদ পাতলে ধরতে পারবে কিউলেক্সকে। ওর মনে হচ্ছে, আগে হোক আর পরে, এখানে আবারও ফিরবে লোকটা।
লিভিংরুমে এসে হঠাৎ রানা আবিষ্কার করল, ও একা নয়!
এইমাত্র করিডর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেছে এক লোক। ওর দিকে চেয়ে আন্তরিক হাসছে সে!
পরস্পরের দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে ওরা দু’জন।
আগন্তুকের হাতের অস্ত্রটা প্রচণ্ড শক্তিশালী পিস্তল ওয়েবলি মার্ক সিক্স। লোকটার বয়স হবে আন্দাজ পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ। পরনে বেল্ট দেয়া রেইনকোট। আস্তে করে পিস্তল নামাল সে। কড়া ব্রিটিশ সুরে বলল, ‘হাউ ডু ইউ ডু?’
‘আই অ্যাম ফাইন। হু দ্য হেল আর ইউ?’ ওয়ালথার নামাল রানা।
‘মনে হয় না কিউলেক্স আর ফিরবে। এসো, সোফায় বসে এ-বিষয়ে আলাপ সেরে নিই,’ সোফা দেখাল লোকটা। দৈর্ঘ্যে রানার চেয়ে এক ইঞ্চি উঁচু সে। লম্বাটে মুখ। চোখের মণি কালো। কপালে এসে পড়া মাথার চুল ঢেউ খেলানো। ঠোঁটে হাসি থাকলেও চোখে-মুখে নিস্পৃহ একটা ভাব। ব্রিটিশদের ভঙ্গিতে দুঃখ-প্রকাশের সুরে বলল, ‘পাখি উড়াল দিয়েছে। বোকার মত ওকে পালিয়ে যেতে দিলে তুমি, বন্ধু!’
‘ভুল বললে,’ বিরক্তি নিয়ে বলল রানা। ‘তুমি এ-বাড়িতে না এলে সতর্ক হতো না। ঠিকই ওকে ধরতে পারতাম।’
‘হয়তো,’ উদাস সুরে বলল আগন্তুক। রেইনকোটের পকেটে রাখল ওয়েবলি। ‘দেখে তো মনে হচ্ছে না তুমি এই দেশের মানুষ। আবার ইউরোপেরও কেউ নও। তা হলে তুমি আসলে কে?’
‘আগে বলো তুমি কে,’ বলল রানা।
‘আমি ব্রিটিশ নাগরিক। বেড়াতে এসেছি। আর তুমি?’
‘আমিও সাধারণ একজন ব্রিটিশ ট্যুরিস্ট,’ বলল রানা।
ওর দিকে চেয়ে চওড়া হাসল লোকটা। ওপরে-নিচে নেচে চলেছে অ্যাডাম্স্ অ্যাপল। তাকে টিপিকাল ব্রিটিশ বলেই মনে হলো রানার। সামনে ঝুঁকে বসল লোকটা। ‘আমার নাম কার্সন। জন কার্সন। তোমার নাম কী?’
‘আমি স্যামি কিং,’ বলল রানা।
‘মিথ্যা বলার আর জায়গা পাও না!’ আবারও হেসে ফেলল কার্সন।
‘কেন খামোকা মিথ্যা বলব, বলো তো?’ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রানা। তাকাল লিভিংরুমের চারপাশে। ‘এখানে খুব অন্ধকার। তুমি কি এখানে অপেক্ষা করতে চাও কিউলেক্সের জন্যে?’
‘তা করা যায়, ‘কিং।’ পকেট থেকে এক প্যাকেট স্প্যানিশ সিগারেট বের করল কার্সন। একটা শলা ঠোঁটে তুলে জ্বেলে নিল লাইটার দিয়ে। ‘স্মোক করলে কোন আপত্তি নেই তো, কিং? দেব একটা? ভাল জিনিস।’
মাথা নাড়ল রানা। ‘কিছু দিন আগে ছেড়ে দিয়েছি।’
‘কিউলেক্সের সঙ্গে জড়ালে কীভাবে?’ হঠাৎ করেই জানতে চাইল কার্সন।
‘কার কথা বলছ?’ রানা নিজেই বুঝল, ওর কথা হাস্যকর শোনাচ্ছে।
‘তুমি কি নিজের ব্যাপারে কিছুই বলবে না?’ হতাশ সুরে বলল জন কার্সন।
চট্ করে নিজের জন্যে কাভার স্টোরি তৈরি করল রানা। মুখ খুলল, ‘আমি আসলে জড়িয়ে গিয়েছি ম্যালাগার এক ভদ্রমহিলার দুর্ভাগ্যের জন্যে। বড়লোক এক ব্যবসায়ীর স্ত্রী সে। আর এই ব্যবসায়ী আবার আমার বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে রক্ষিতার সঙ্গে সুইট্যারল্যাণ্ডে ফূর্তি করতে যেতেই এক ভবঘুরের পাল্লায় গিয়ে পড়েছে আমার বন্ধুর স্ত্রী। আর সেই হারামজাদার কথাই বলছ তুমি। কিউলেক্স। মহিলাকে এখন ব্ল্যাকমেইল করছে সে। প্রচুর টাকা না দিলে অন্তরঙ্গ ছবি তুলে দেবে মহিলার স্বামীর হাতে। আর সেজন্যে আমার সাহায্য চেয়েছে সেনোরা। ছবিগুলো আদায় করতে চাই কিউলেক্সের কাছ থেকে।’
এঁকেবেঁকে ওপরে উঠছে জন কার্সনের সিগারেটের ধোঁয়া। অন্ধকারেও রানা টের পেল, নিঃশব্দে হাসছে সে। একবার খুক করে কেশে উঠে বলল, ‘তুমি তো দেখি সহজেই সবসময় খুঁজে ‘নিচ্ছ বড় ধরনের ঝামেলা! নামটা তা হলে কিং? ঠিক তো? আমার তো তা মনে হয় না। মিথ্যা না হয় না-ই বা বললে।’
‘তুমি জানতে চেয়েছ সত্যিকারের ঘটনা, আর আমি কোন দিনও কোন মিথ্যুক মানুষ ছিলাম না, বলল রানা, ‘এর চেয়ে বেশি সত্য বোধহয় আর কিছুই নেই। …আর তুমি? তোমার কাহিনীটা কী?
‘আর আমি…’ বড় করে শ্বাস নিল জন কার্সন। ‘নানান কারণেই হন্যে হয়ে খুঁজছি কিউলেক্সকে। অবশ্য একটা কথা বলতে পারি, তোমার এসব কথা একেবারেই ডাহামিথ্যা। কোন কালেই দক্ষ প্রেমিক ছিল না সে।’
‘সেটা জানে শুধু আমার পরিচিতা সেনোরা, কাঁধ ঝাঁকাল রানা।
‘কিউলেক্স বা অ্যালবার্ট কিউলেককে ভাল করেই চিনি আমি, কারণ তার ছবি আগেও কয়েকবার দেখেছি। সে দক্ষ একজন খুনি। আসল নাম সোলনি দে নায়েসুরা। রোম থেকে স্পেনে একজনকে খুন করতে পাঠানো হয়েছে তাকে। কিউলেক্স এসেছে নিয়োপলিটান এলাকা থেকে।’
‘কিন্তু তুমি কেন তাকে খুঁজছ?’
‘ব্যাপারটা প্রথমে প্যারামিলিটারি বিষয় ছিল না। কিন্তু ছয় সপ্তাহ আগে রোমে সে খুন করেছে আমাদের দলের একজনকে।
‘তোমাদের একজন মানে?’
‘ব্রিটিশ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল কার্সন। ‘ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে প্রচুর ড্রাগ ঢুকছে বলে সতর্ক ছিলাম আমরা। এসব ড্রাগ ভূমধ্যসাগর দিয়ে আসে, তাই ওদিকে চোখ ছিল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের। বিশ্বাসযোগ্য সূত্র পেয়ে নেপলসের এক ওয়্যারহাউসে রেইড দিয়ে খুন হলো জ্যাক। ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে আমরা জানলাম, ওকে খুন করে গেছে কিউলেক্স।’
ভাবনার ভেতরে যেন তলিয়ে গেল কার্সন
‘বুঝলাম,’ বলল রানা।
‘গত সপ্তাহে কিউলেক্সের পিছু নিয়ে এসে ঢুকেছি স্পেনে। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সে এখন আছে ম্যালাগায়। যদিও তাকে খুঁজে পাইনি। তারপর আমাদের একজনের কাছ থেকে সূত্র পেয়ে আজ মাঝরাতে গেলাম এক নাইট ক্লাবে। ওখানে ব্যবসা করে এক পতিতা। তার পেট থেকে সব বের করব, এমন সময় টের পেলাম তাকে ভাড়া করেছ তুমি। অপেক্ষায় থাকলাম নাইট ক্লাবে। তারপর সে ফিরে আসতেই তার কাছ থেকে সব জেনে নিয়ে দেরি করিনি এই বাড়িতে আসতে।’
‘মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স?’ বলল রানা, ‘অর্থাৎ এমআই-সিক্স?’
‘আসলে ফাইভ,’ হাসল কার্সন, ‘এসপিয়োনাজের জন্যে বেশিরভাগ মানুষ কেন যেন চেনে এমআই-সিক্সকে। তবে কাউন্টার এসপিয়োনাজের কাজ কিন্তু ফাইভের। আমার কথা বুঝতে পেরেছ? যা-ই হোক, আমি তোমাকে কোন চাপাচাপি করব না যে তুমি আসলে কোন্ দেশের হয়ে কাজ করছ। আমরা যে ধরনের কাজ করি, তাতে সিকিউরিটির ব্যাপারে আমাদেরকে সবসময় সতর্ক হতে হয়। তুমি বা আমি আলাদা দলের হয়ে কাজ করলেও আমরা আসলে একই কাজে এসেছি। আমাদের উদ্দেশ্যও এক। যেভাবে হোক হাতের মুঠোয় পেতে হবে কিউলেক্সকে।’
‘কিউলেক্সের ব্যাপারে কী ধরনের নির্দেশ আছে তোমার, ওপরে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আমাকে বলা হয়েছে, হারামজাদাকে যেন দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিই।’
‘এটা কি জানো, তার পেছনে কে বা কারা আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আমার মনে কোন সন্দেহ নেই, তাকে ব্যবহার করছে মাফিয়ার ডনেরা। আগেও বহুবার তাকে কাজ দিয়েছে তারা।’
‘জ্যাকের অকাল মৃত্যুর জন্যে আমি দুঃখিত,’ বলল রানা।
‘জ্যাক?’ ফাঁকা চোখে ওকে দেখল জন কার্সন।
‘তোমাদের সহযোগী, যাকে কিউলেক্স খুন করেছে।’ —ও, ওর আসল নাম রবসন। পুরো নাম জ্যাক রবসন। বেচারা।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল কার্সন। ‘তবে ও ভাল করেই জানত, ড্রাগের ব্যাপারে কাজ করলে কী ধরনের বিপদ হবে।’
অন্ধকারে জন কার্সনের দিকে চেয়ে আছে রানা। ঠোঁট শক্ত করে বসে আছে ব্রিটিশ লোকটা।
‘তুমি নিজে এসব থেকে কী পাবে?’ জানতে চাইল কার্সন। ‘সেই মহিলা কি তোমার সঙ্গে বিছানায় গেছে? বা টাকা দেবে বলে কথা দিয়েছে?’
‘তা নয়,’ মাথা নাড়ল রানা। ‘নিজেকে রবিন হুডের মত দুঃসাহসী বীর বলে মনে করি না, তবে এ-ও ঠিক যে বিপদগ্রস্ত এক মহিলাকে বাঁচাতে গিয়েই এখানে এসেছি।’
‘সত্যিকারের এক সাদা মনের মানুষ তুমি।’
নীরবতা নামল দু’জনের মাঝে।
চুপচাপ একঘণ্টা বসে থাকার পর ওরা সিদ্ধান্ত নিল, অন্তত আজ রাতে আর এই বাড়িতে ফিরবে না কিউলেক্স।
ঠাণ্ডা-মাথার খুনির ফোক্সভাগেনে চেপে বাড়ি ত্যাগ করল ওরা। একঘণ্টা পর হোটেলের দু’ শ’ গজ দূরে গাড়িটা ফেলে রেখে ঢুকে পড়ল রানার সুইটে।
দু’গ্লাসে সুপার ডিলাক্স স্কচ উইস্কি ঢেলে নিয়ে মুখোমুখি সোফায় বসল ওরা। ততক্ষণে রানা হয়ে গেছে কার্সনের প্রিয় বন্ধু কিং। আর অবলীলায় কার্সনকে জনি বলে ডাকছে কিং। যদিও কার্সনের ব্যাপারে মনের ভেতরে গভীর সন্দেহ কাজ করছে রানার। ভাবছে, এই লোক আরও তথ্য দিলে বহু কিছুই পরিষ্কার হবে ওর কাছে।
একটু পর গ্লাসের টুং-টাং আওয়াজে পাশের ঘরের দরজায় এসে থামল মারিয়া। ওর পরনে বুক-খোলা’ রোব। কুঁচকে গেছে ভুরু। চোখে জন্মের ঘুম।
‘এ-কী মোহনীয় এক দৃশ্য!’ উইস্কি ভরা গ্লাস ওপরে তুলল জনি। ‘এ যেন গভীর রাতে স্বর্গ থেকে পতিত বা উদয় হওয়া এক অপ্সরা!’
‘ও আসলে মারিয়া,’ পরিচয় দিল রানা।
‘ইনিই কি তোমার বলা সেই সেনোরা? উঠে দাঁড়িয়ে মস্ত বাউ দিল জনি। দুই গ্লাস উইস্কি গিলে প্রায় মাতাল।
‘তা নয়,’ বলল রানা। ‘মারিয়া আমার স্ত্রী।’
অবিশ্বাস নিয়ে ওকে দেখল জনি। তারপর চোখ বড় করে চেয়ে রইল মারিয়ার দিকে। ঢোক গিলে বলল, ‘তা-ই নাকি? সত্যিই রুচি আছে তোমার, কিং! দুনিয়া-সেরা মেয়েটাকে তুমি জিতে নিয়েছ!’
‘কথাটা বলার জন্যে ধন্যবাদ, জনি,’ রানা উঠে দাঁড়াল। ‘মারিয়া, সরি। এসো, পরিচয় করিয়ে দিই। ও জনি। আমার বহু পুরনো বন্ধু। ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই ভাবলাম, গভীর রাত হয়ে গেলেও ওকে নিয়ে আসি আমাদের সুইটে।’
‘সেনোরা, এই হতভাগ্যের নাম জন কার্সন, ‘ আফসোসের সুরে বলল জনি। ‘যে কি না আগে আপনাকে দেখতে না পেয়ে বিয়ে করতে পারল না!’
‘আমার স্ত্রীর পুরো নাম মারিয়া কিং,’ বলল রানা।
রানা ও জনির নাটকীয়তা দেখে পূর্ণ সচেতন হয়ে গেছে মারিয়া। এদিকের ঘরে পা রেখে রানার কাছে জানতে চাইল, ‘বলো তো, আসলে কী হয়েছে?’
‘পরে সব খুলে বলব, ডার্লিং,’ বলল রানা। ‘আপাতত শুধু এটা জেনে রাখো, আমাদের প্রিয় বন্ধু কাজ করে ব্রিটিশ এমআই-সিক্সে। অনেক দিন পর আবারও দেখা।’
‘এমআই-ফাইভ,’ ওর পাতা ফাঁদ এড়িয়ে গেল জনি।
‘ফাইভ হোক বা সিক্স, হবে একটা,’ মৃদু হাসল রানা। আড়াই গ্লাস উইস্কি গিলেও মগজ ওর টনটনে। ‘এসো, মারিয়া, আমাদের সঙ্গে বসে পড়ো।’
‘অনেক রাত হয়ে গেছে,’ আপত্তির সুরে বলল মারিয়া। ‘খুব ক্লান্তি লাগছে।
‘আপনাকে দেখে তো মোটেই ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছে না, মারিয়ার সামনে গিয়ে থামল জনি। ‘মনে হচ্ছে আপনি যেন স্বর্গের অচেনা এক সুন্দর ফুল!’ ঝড়ের বেগে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট নিল সে। ওটার ভেতর থেকে একটা শলা বের করে গুঁজে দিল মারিয়ার দু’ঠোঁটের ফাঁকে। লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিল সিগারেট।
কয়েক সেকেণ্ড জনি কার্সনকে দেখল মারিয়া, তারপর বড় করে টান দিল সিগারেটে। মুখে ফুটেছে আন্তরিক হাসি। দু’চোখে জনির জন্যে একরাশ আগ্রহ। রানার উপস্থিতি যেন মনেই নেই। অথবা নিজের দিকে ওকে টেনে নিতে অভিনয় করছে মেয়েটা।
স্বামীর সামনে অপর পুরুষের প্রতি কতটা আকর্ষণ দেখাবে ওর স্ত্রী, সেটা দেখার জন্যে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল রানা।
জনির চোখে চোখ রেখে তার গায়ে ঢলে পড়ল মারিয়া। অস্ফুট স্বরে বলল, ‘তুমিও আমার মতই ব্রিটিশ, তা-ই না?’
আমাদের জনি আসলে বুড়ো এক সিংহ,’ মাতালের হাসি হাসল রানা।
‘সিংহ হয়েই বা কী লাভ হলো আমার?’ আফসোস করল জনি। ‘তুমি তো আগেই জয় করে নিলে দুনিয়ার সেরা মেয়েটাকে!’
‘কী যে বলো,’ ভদ্রতা করে মাথা নাড়ল মাতাল রানা।
একবার ওকে দেখে নিয়ে জনির চোখে তাকাল মারিয়া। ‘তুমি কি তা হলে সত্যিই এমআই-ফাইভ, মানে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের একজন অফিসার?’
‘অথচ দুনিয়ার সবচেয়ে রূপসী মেয়েটাকে পেল না এই বেচারা,’ মাথা নাড়ল জনি। মারিয়ার চোখে তাকাল। ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, বলো তো? তুমি এসে সামান্য ড্রিঙ্ক করলে আমার বাড়িতে গিয়ে? আমি কিন্তু খুবই খুশি হব!’
এ-কথায় ঝলমলে হাসি দিল মারিয়া। ‘আমারও তো খুব ভাল লাগবে।’
ক্লান্ত হাসি দিয়ে রাজি হয়ে গেল রানা। ‘বেশ, আমরা ঘুরে আসব জনির বাড়ি থেকে।’
‘তুমিও বরং তা হলে চল, কিং,’ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল জনি। ‘মনে হয় না ঠকবে।’
‘ঠিক আছে,’ পরাজিত, ব্যর্থ এক স্বামীর সুরে বলল রানা।
.
জন কার্সনের ব্যাপারে জরুরি তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব মনে মনে মারিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে রানা। কার্সনকে যেমন বড়শি দিয়ে তুলতে চাইছে মেয়েটা, তেমনিভাবে ওর কাছ থেকেও সব জানতে চাইবে সে।
জন কার্সনের ভাড়া নেয়া বিলাসবহুল বিশাল ভিলা সাগরের তীরে। সামনের ঘরে জ্বলছে উজ্জ্বল সাদা আলো। দামি এক সোফায় গা ছেড়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে রানা। একটু পর পর তুলছে বড় সব হাই। যে-কেউ বুঝবে, বেহেড মাতাল হয়ে গেছে ও।
একবার ওকে দেখে নিয়ে জনির চোখে তাকাল মারিয়া, ভেজা ঠোঁটে আমন্ত্রণের মুচকি হাসি। মাতাল রানাকে একবার দেখে নিল জনি, তারপর একটু সরে দু’হাতে নিজের বুকে টেনে নিল মারিয়াকে। পরস্পরকে গভীরভাবে চুমু দিল ওরা। চোখের প্রায় বন্ধ পাতার ফাঁকে সবই দেখছে রানা। মনে মনে বলল, মারিয়া হ্যারল্ড দেখি সত্যিই খরস্রোতা নদীর তুখোড় কোন ঘড়িয়াল!
‘কী যে রূপ তোমার, ডার্লিং!’ মারিয়ার ঠোঁটে আরেকটা চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল কার্সন। ‘আমি স্রেফ খুন হয়ে যাব! তোমাকে না পেলে বেঁচে থেকে আমার কী লাভ!’
‘তা-ই?’ নিজে থেকে কার্সনকে চুমু দিল মারিয়া।
পরস্পরকে আবারও জড়িয়ে ধরল ওরা।
হঠাৎ করে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছন-দরজার দিকে তাকাল রানা, চোখে মাতালের ঘোর। দরজায় এসে থেমেছে সুন্দরী এক যুবতী। বুকের ওপরে ভাঁজ করে রেখেছে দু’হাত। মেয়েটার এলো চুল ও চোখের মণি বাদামি রঙের।
ওকে দেখেও মারিয়ার কাছ থেকে সরল না জনি। সহজ সুরেই বলল, ‘ক্যাথি, এরা কিং আর মারিয়া।’
‘তা-ই,’ মৃদু আপত্তির সুরে বলল ক্যাথি।
কার্সনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে মেয়েটাকে দেখল মারিয়া। নিচু গলায় বলল, ‘এই মেয়ে আসলে কে?’
একবার রানার দিকে তাকাল জনি কার্সন। ঢুলু-ঢুলু চোখে ওকেই দেখছে রানা। মারিয়ার চোখে চেয়ে বলল কার্সন, ‘ও আসলে আমার স্ত্রী।’
‘তুমি কেমন করে এলে এই দুনিয়ায়, আমার স্বর্গের হুর পরী?’ জড়ানো কণ্ঠে ক্যাথিকে বলল রানা।
‘আমি ক্যাথি মোনালিসা,’ ওর দিকে চেয়ে হাসল যুবতী। মোহনীয় ভঙ্গিতে সুগঠিত কোমর দুলিয়ে হেঁটে এসে বসল . রানার পাশে।
দু’সেকেণ্ডের জন্যে কালচে হলো মারিয়ার মুখ। কিন্তু জনি ওর ঠোঁটে চুমু দিতেই কেটে গেল ঝড়ের সেই কালো মেঘ। আলতো করে মারিয়ার হাত ধরে মৃদু চাপ দিল জনি। সোফা ছেড়ে পাশের ঘরে গেল ওরা। এক মিনিট পেরোবার আগেই ওদিকের ঘর থেকে এল গ্লাস-বোতলের টুং-টাং শব্দ। ঘাড় কাত করে ক্যাথিকে দেখল রানা। খুব ধীরে কাঁধ থেকে নাইট গাউন একটু সরিয়ে দিল মেয়েটা। দেখা যাচ্ছে দুই পর্বতের মাঝের বাদামি গভীর গিরিখাদ। মনে মনে স্বীকার করল রানা, মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের লাল নেইল পলিশ করা সুন্দর নখ পর্যন্ত একেবারে নিখুঁত এই মেয়ে!
‘তুমি কি সত্যিই জনির স্ত্রী?’ নিচু গলায় বলল রানা। মৃদু হাসল ক্যাথি। ‘হলেই বা কী?’
‘তা হলে কিছুই না?’ মাতালের হাসি দিল রানা।
‘এসো, ওরা যা করতে গেছে পাশের ঘরে, আমরাও সেটাই করি,’ রানার নাকের ডগায় ছোট্ট চুমু দিল ক্যাথি।
সোজা হয়ে বসে ওর পেলব কাঁধে দু’হাত রাখল রানা। কাছে টেনে নিল ক্যাথিকে। তবে চুমু দেয়ার আগেই মেয়েটা বলল, ‘তোমার স্ত্রী কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দরী। ওকে বড্ড পছন্দ করে ফেলেছে জনি।’
‘তুমি তো ওর চেয়েও রূপসী,’ ক্যাথির লোভনীয় ভেজা ঠোঁটে নেমে এল রানার নিষ্ঠুর ঠোঁট।
কয়েক পলক পর পিছিয়ে বসল ক্যাথি। পাশের ঘরে থেমে গেছে টুং-টাং আওয়াজ। পরের দু’মিনিটে ড্রিঙ্ক নিয়ে এল না কেউ। ওদিকের ঘরে শুরু হয়েছে স্প্রিঙের ক্যাঁচকোঁচ বিশ্ৰী শব্দ।
চট করে উঠে গিয়ে ঘরের বাতি নেভাল ক্যাথি। বদলে জ্বেলে দিল সোফার কাছের রঙিন এক টেবিল-ল্যাম্প। আবছা আলোয় রাজকন্যার মত হেঁটে এসে সোফায় বসল মেয়েটা। হঠাৎ করেই ওর গা থেকে খসে গেল স্বচ্ছ নাইট গাউন। নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে যেন উন্মাদিনী হয়ে গেছে যুবতী। দ্রুত হাতে খুলল রানার পোশাক। শার্টের কাঁধে হোলস্টার ও ওয়ালথার দেখে একটু দ্বিধা করেও ওগুলো খুলে সরিয়ে রাখল পাশের টেবিলে। রানার ওপরে ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সুন্দরী ক্যাথি। গভীর এক উত্তপ্ত সাগরে ডুবে যেতে যেতে রানা ভাবল, কার্সনের কাছ থেকে জরুরি কিছু জানতে পারবে তো মারিয়া?
Chapter - 10
দশ
সিয়েরা নেভাডার দক্ষিণের ঢালু জমি বেয়ে উঠে গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় সোল ই নিয়েরেতে। প্রাডো লানোর নিচের অংশে হোটেল সিয়েরা নেভাডায় স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে দামি এক সুইট ভাড়া নিয়েছে রানা ও মারিয়া। ওদের ঘরের চওড়া জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেয়া যাচ্ছে তুষারে ছাওয়া স্কি রান।
বোরেগুইলাসের ঢালু বরফে ঢাকা স্কি রান নিচে নেমে মাঝখানে দু’ভাগ হয়ে গেছে পিকাচো দে ভেলেটা ও প্রাডো লানোতে। প্রাডো লানোর কাছে এসে শেষ হয়েছে নিচের অংশের কেবল-কারের স্টেশন। ওপরে উঠে আসার কেবল- কারের স্টেশন নতুন করে শুরু হয়েছে বোরেগুইলাস থেকে। ওখানেই আছে কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুম।
বোরেগুইলাস থেকে প্রাডো লানো পর্যন্ত সমান্তরাল দুই গিরিখাতে স্কি করার জন্যে চমৎকার তুষারে ভরা ঢালু জমি। তার মাঝে আছে গ্র্যানিট ও মিকা পাথরের শৈলশিরা। প্রচুর তুষারপাত হলেও ওখানে নাক তুলেছে ছোরার মত কালো সব ধারাল পাথর।
প্রধান গিরিখাদের ওপরে ঝুলতে ঝুলতে প্রাডো লানো থেকে বোরেগুইলাস পর্যন্ত উঠে এসেছে কেবল-কার। ওদিকের তুষারের স্কি রান নতুন সব স্কিয়ারের জন্যে উপযোগী। পুবের গিরিখাতে স্কি করে নেমে যাওয়া অনেক বেশি কঠিন।
হোটেলের ব্যালকনির চেয়ারে বসে পুরো স্কি রান দেখতে পাচ্ছে রানা। সাঁই-সাঁই করে নিচে নেমে যাচ্ছে একদল স্কিয়ার। আপাতত স্কি করার ইচ্ছে নেই রানার। নিজের কাভার পোক্ত করার জন্যে স্কিয়ারদের দেখিয়ে হাতের ক্যানন এইট-ফিফটি এমএম এসটিএম লেন্সের ওইএস নাইণ্টিডি থার্টি-টু এমপি ডিএসএলআর দিয়ে ব্যালকনি থেকে তুলছে কিছু ছবি। এ-ক্যামেরায় কিছু কারিগরি ফলিয়ে তারপর ওর হাতে তুলে দিয়েছেন বিসিআই-এর টেকনিকাল ডিপার্টমেন্টের বর্তমান হেড পাগলাটে বিজ্ঞানী শামশের আলী।
ম্যালাগা থেকে সোল ই নিয়েরে পৌছুবার দীর্ঘ যাত্রা ছিল বিরক্তিময় ও ক্লান্তিকর। হোটেলে নিজের ঘরে ঢুকে জুতো খুলে আরামদায়ক বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে রানা। কিন্তু নানান দুশ্চিন্তায় এল না একফোঁটা ঘুম। জেগে থেকে চোখ বুজে ভাবতে লাগল গত ক’দিনের ঘটনাগুলো।
দু’দিন আগে ইয়টে খুন হয়ে গেছে রোমিয়ো মোরেলির ডাবল। লোকটা মারা গেছে কিউলেক্সের হাতে। তারপর জন কার্সন আর ক্যাথির সঙ্গে দেখা হলেও কোন কিছুই ঘটেনি। এরই ভেতরে কয়েকবার বন্ধু বার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রানা। তবে বার্টির হাত ঘুরে কোন মেসেজ আসেনি।
এদিকে জরুরি কাজে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন বিসিআই চিফ। অবশ্য চোখ রেখেছেন এই মিশনের ওপরে। গতকাল সকালে ম্যালাগায় রানার স্মার্টফোনে এনক্রিপটেড মেসেজ পাঠিয়েছেন: বিএসএস চিফ লংফেলোর কাছ থেকে সিআইএ-র চিফ জানতে পেরেছে, আমেরিকান ও ইতালিয়ান মাফিয়ার বিরুদ্ধে লড়ছ তুমি। তাই তাদের এজেন্ট জন মিউলারকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিলেও তোমার ওপরে জারি করা মৃত্যু-পরোয়ানা আপাতত প্রত্যাহার করেছে তারা।
এবার তুমি চেষ্টা করবে. সরাসরি মোরেলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তার দেয়া দরকারি তথ্য আমাদের জন্যে খুব জরুরি। মনে করি না হঠাৎ করে পিছিয়ে য স। এলিনা পার্কারসনের মাধ্যমে লোকটা যোগাযোগ করবে, সেজন্যে অপেক্ষা করো।
আমরা জেনেছি কিউলেক্স এখন আর ম্যালাগায় নেই। ভুলেও তার পিছু নেবে না। চোখ খোলা রাখো তার জন্যে।
পরের মেসেজে তিনি লিখেছেন:
আগের মতই বহাল আছে পারস্পরিক চুক্তি। সোল ই নিয়েরেতে তুমি দেখা করবে মোরেলির সঙ্গে।
এদিকে আমরা খোঁজ নিয়েছি এমআই-ফাইভে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, জন কার্সন নামে কোন এজেন্ট নেই তাদের। ছদ্মনাম ও নকল পরিচয় ব্যবহার করছে সে। ওদিকে লংফেলো বলেনি কার্সন ওর এজেন্ট নয়। বিএসএস চাইছে না মিশন শেষ হওয়ার আগে তার ব্যাপারে কিছু করো তুমি। লোকটার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।
জানা গেছে কিউলেক্স বেশ কয়েক বছর ধরেই মাফিয়ার হয়ে খুন করছে। এ ছাড়া নানান দেশের অপরাধীদের জন্যে লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে মানুষ খুন করে সে।
আমরা ক্যাথি মোনালিসার বিষয়ে কোন ধরনের তথ্য পাইনি। আগে কখনও এসপিয়োনাজ, কাউন্টার- এসপিয়োনাজ বা আণ্ডার-কাভার এজেন্ট হিসেবে কোথাও তার কোন রেকর্ড নেই। স্প্যানিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মেয়েটা বোধহয় তাদের দেশের কেউ নয়। তার ফ্রেঞ্চ বা ইতালিয়ান হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
আরও জেনেছি, মেক্সিকোর এনসেনাডায় তোমাদের ওপরে যে স্পাইপিং করা হয়েছে, সেই একই সময়ে ওখানে ছিল কিউলেক্স। পরে তোমাদের পিছু নিয়ে আলাদা এক বিমানে চেপে ইউরোপে ফিরে এসেছে সে।
এরপর আর কোন মেসেজ দেননি বিসিআই চিফ।
গতকাল দুপুরে ম্যালাগায় মারিয়াকে নিয়ে হোটেলের লবিতে নেমেছে রানা, এমন সময় এল বার্টির ফোন। রানা হ্যালো বলার আগেই বলল সে, ‘বিসিআই-এ তোর বসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে নোবলম্যান। কথা অনুযায়ী তোদের যেতে হবে সোল ই নিয়েরেতে।’
‘ঠিক আছে,’ বলেছে রানা।
‘তাকে যেন না খুঁজিস, সেজন্যে অনুরোধ করেছে। মাঝরাতে ট্রাট্টু নামের একজন যাবে কেবল-কার ইঞ্জিন- রুমে। নোবলম্যানের সঙ্গে তোর সাক্ষাৎকারের সময় আর জায়গা জানিয়ে দেবে সে। প্রথম আর দ্বিতীয় মিটিঙে মারিয়াকে সঙ্গে না নিতে অনুরোধ করেছে নোবলম্যান।’
‘বুঝলাম।’
‘গুড লাক, কিং।’
‘এক মিনিট,’ বন্ধু ফোন রেখে দেয়ার আগেই বলেছে রানা। ‘এলিনা এখন কেমন আছে?’
‘সুস্থ হয়ে উঠছে।’
‘তা হলে সে-ও নিশ্চয়ই রিসোর্টে যাবে?’
‘সেটা এখনও আমরা জানি না। ডাক্তার গঞ্জালেস এখনও তাকে ক্লিনিক থেকে ছেড়ে দেয়নি। কবে ছাড়বে, সেটাও বলেনি।’
‘জন কার্সনের ব্যাপারে নতুন কিছু জানা গেল?’
‘এখনও না।’
‘আর ক্যাথি মোনালিসা?’
‘তার ব্যাপারেও কোন ইনফরমেশন নেই।’
‘তুই দেখি সারাদিন মাছি মেরে মেরে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিস!’
‘কী যে বলিস!’ হাসল বার্টি। ‘আরও জরুরি কাজ আছে। ওটা হচ্ছে: মনে মনে এলিনা পার্কারসনের সঙ্গে প্রেম করা!’
‘রাখ্ তো তোর ফোন!’ কল কেটে পকেটে স্মার্টফোন রেখে দিয়েছে রানা।
.
বিকেলে স্কি প্যান্ট, শার্ট ও সোয়েটর পরে নিল রানা। এখনও তুষারে ভরা ঢালু পথে স্কি করছে অনেকে। পুরুষদের পরনে লাল জ্যাকেট, মেয়েদের সবুজ জ্যাকেট। একেবারে নিচের ঢালে নেমে যাচ্ছে তারা। বোরেগুইলাস পার করে দ্বিতীয় ‘গিরিখাদ ধরে নামছে ওয়েদারকক লক্ষ্য করে। চলাচল করছে কেবল-কার। পাশ কাটাচ্ছে পরস্পরকে। আরোহী নিয়ে ওপরে যাচ্ছে, নেমে আসছে খালি পেটে। চোখ তুলে ইঞ্জিনরুমের দিকে চেয়ে রোমিয়ো মোরেলির কথা ভাবল রানা। লোকটার চেহারা চেনা থাকলে আশপাশের হোটেলে খোঁজ নেয়া যেত। ওদের এই হোটেল খুব বড় নয়। একবার লবিতে বসে চোখ রাখবে নাকি লোকটার জন্যে?
না, থাক।
এরই ভেতরে খুন হয়ে গেছে একজন লোক। এমনিতেই জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে মোরেলি। সিকিউরিটির বিষয়টা তার জন্যে খুব জরুরি।
সুইটে পাশের ঘরের দরজায় টোকা দিল রানা।
ওদিক থেকে বলল মারিয়া, ‘কিছু বলবে?’
‘এসো, নিচে যাব।’
মিনিট পাঁচেক পর হোটেলের লবিতে নেমে এল ওরা। স্ত্রীর ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করছে মারিয়া। চেহারায় রানার জন্যে গভীর ভালবাসা আর শ্রদ্ধা।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ঝিরঝির করে বইছে বরফের মত শীতল হাওয়া। কিছুক্ষণ আগে ঝরে গেছে পেঁজা তুলার মত হালকা তুষার। আকাশ দেখে রানার মনে হলো না রাতের আগে আর তুষারপাত হবে।
হোটেলের তুষারে ভরা মাঠের শেষ প্রান্তে একটা টেবিলে বসে চকোলেট দেয়া কনিয়্যাকের জন্যে অর্ডার দিল রানা। একটু পর ট্রে হাতে এক বয় এসে ওদের টেবিলে নামিয়ে দিয়ে গেল দুই গ্লাস সুস্বাদু পানীয়। ঠোঁটে গ্লাস তুলে চুপচাপ চুমুক দিচ্ছে ওরা, এমন সময় দেখল ওপরের ঢাল বেয়ে নেমে এল চারজন লোক। স্ন্যাকবারের দেয়ালে স্কি ও পোল রেখে এদিক-ওদিক তাকাল তারা। আশপাশে কোন টেবিল খালি নেই।
জার্মান ভাষায় কথা বলছে তারা, খেয়াল করেছে রানা। নিজেদের টেবিলের অর্ধেক তাদেরকে ছেড়ে দিতে চাইল ও। তাতে খুশি হয়ে ওকে ধন্যবাদ জানাল তারা। চেয়ারে বসার আগে মারিয়ার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাল তাদের দলনেতা। রানা আন্দাজ করল, তার বয়স হবে চল্লিশ। দলের অন্য তিনজনের বয়স বড়জোর পঁচিশ। এদের দলনেতা জার্মানভাষী হলেও তার জাতীয়তা, সুইট্যারল্যাণ্ডের। অন্য দু’জন জার্মান, আর তৃতীয়জন ড্যানিশ। বাষ্প-ওঠা চকোলেটের মগ চলে এলেও বারবার মারিয়ার কমনীয় চেহারা দেখছে যুবকেরা।
‘আমি হের আর্নেস্ট মুলার,’ রানার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল দলনেতা।
‘স্যামি কিং, এসেছি ইংল্যাণ্ড থেকে,’ তার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিল রানা।
‘তা-ই? বাহ! এত ভাল জার্মান শিখলেন কোথা থেকে?’
‘এক বান্ধবীর সাহায্যে,’ বলল রানা। ‘দুঃখিত, আমার আগেই উচিত ছিল আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া।’
‘আপনি পৃথিবীতে এসেছেন সৌভাগ্য নিয়ে, স্যর!’ ভারী গলায় বলল স্কি টিমের দলনেতা আর্নেস্ট মুলার। ‘সত্যিই অপূর্ব সুন্দরী আপনার স্ত্রী।’ দলের অন্যদের দিকে তাকাল সে। ‘তোমরা কী বলো?’
‘ইয়া, ইয়া,’ ঘন ঘন মাথা দোলাল অন্য দুই জার্মান। জবাব না দিয়ে চকোলেটের গ্লাসে চুমুক দিল ড্যানিশ যুবক।
‘আপনারা কি আজ স্কি করবেন?’ রানার কাছে জানতে চাইল হের মুলার।
‘তাই তো চাইছি,’ নিজে থেকে বলল মারিয়া।
‘তা-ই? আগামীকাল স্কি রানে যাব না, তবে পরশু দিন বা তরশু দিন তা হলে আপনার সঙ্গে দেখা হবে।’ উত্তেজিত হয়ে নিজের উরুতে চাপড় দিল হের মুলার। ‘দারুণ হবে একসঙ্গে আমরা স্কি…’ মারিয়ার সঙ্গে যে তার স্বামী আছে, সেটা মনে পড়তেই চট করে যোগ করল, ‘তিনজন মিলে করলে।’
‘আমারও খুব ভাল লাগবে,’ চোখের তারা চকচক করে : উঠল মারিয়ার।
‘হের কিং?’
‘আমার কোন আপত্তি নেই, বলল রানা। তবে বলার সুরে সবাই বুঝল স্বামী হিসেবে খুশি নয় ও।
হেসে ফেলল হের মুলার এবং দলের অন্যরা।
এরপর নানান আলাপ হলো ওদের ভেতরে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই মারিয়ার বাহু ধরে ওকে টেনে তুলল হের মুলার। টেবিল থেকে সরে স্যাকবারের দেয়ালে ঠেক দিয়ে রাখা স্কি আর পোলের কাছে নিয়ে গেল। স্কির লক ডিভাইসের বিষয়ে টেকনিকাল কী যেন বোঝাতে লাগল। তাতে উচ্ছ্বসিত হয়ে মুলারের প্রশংসা করল মারিয়া।
‘হের মুলার তা হলে একজন বিযিনেস ম্যান?’ পাশে বসে থাকা জার্মান যুবকের কাছে জানতে চাইল রানা।
যুবকের চোখ নীল, মাথার চুল সোনালি। ঘন ঘন মাথা দোলাল সে। ‘ইয়া! হের মুলার মস্তবড় ব্যবসায়ী! তাঁর কাজের শেষ নেই!’
‘এবার কীভাবে সময় বের করলেন?’ নিরীহ সুরে বলল . রানা।
‘এক সপ্তাহ পর প্যারিসে বিশাল মিটিং,’ বলল যুবক, ‘তার আগে ভাবলেন একটু বিশ্রাম নেবেন। তুষারে স্কি করতে খুব ভালবাসেন। আর তার ওপরে…’
হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেল যুবক।
পরস্পরের দিকে তাকাল দুই জার্মান। জোরে নিজের ঊরুতে চাপড় দিল ড্যানিশ যুবক।
শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগল তারা।
‘সুন্দরীদের বিছানায় নিতে খুব ভালবাসেন আমাদের হের মুলার,’ কথা শেষ করল প্রথম জার্মান যুবক।
.
বেশিরভাগ স্কি রিসোর্টের বিশাল ডাইনিংরুমের মতই মস্ত ‘রানাদের হোটেলের রেস্টুরেন্ট। বড় এক ঘরের মাঝে অসংখ্য পায়ের ওপরে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ টেবিল। ছোটগুলো আছে ঘরের চার কোনায়।
রাত সাড়ে দশটায় ডিনার সেরে নেয়ার জন্যে নিচতলার রেস্টুরেন্টে ভিড় জমিয়েছে হোটেলের অতিথিরা। মাঝের বিশাল টেবিলে হের মুলার ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে বসেছে রানা ও মারিয়া। বহু মানুষের আলাপচারিতায় গমগম করছে ঘর। ভারী গলা উঁচিয়ে আশপাশের সবার কান ধরিয়ে দিচ্ছে হের মুলার। সবাই বুঝে গেছে, নানান বিষয়ে বিশদ জ্ঞান আছে লোকটার। কখনও বলছে জার্মান ভাষায়, কখনও ইংরেজিতে। কথা বলার ভঙ্গি এমনই যে মন না দিয়ে পারা যায় না।
ডিনার সেরে নেয়ার পুরো সময়ে গভীর মনোযোগে হোটেলের অতিথিদেরকে খেয়াল করছে রানা। বারবার ওর চোখ খুঁজছে ড্রাগ লর্ড নোবলম্যানকে। ওদের হোটেলে উঠে থাকলে এসব মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সে।
ডিনার শেষ হওয়ার পর একবার হাতঘড়ি দেখল রানা। এখন রাত সাড়ে এগারোটা। রেস্টুরেন্টের এক বয় দিয়ে গেল গ্লাস ভরা ব্র্যাণ্ডি। সোনালি তরলে চুমুক দিয়ে চারপাশে চোখ বোলাল রানা। শীতের ভেতরে গলা ভিজিয়ে নেমে গিয়ে পাকস্থলি উষ্ণ করে দিচ্ছে দামি ব্র্যাণ্ডি। গ্লাস খালি করে মারিয়াকে বলল রানা, ‘শুয়ে পড়ার আগে একটু তাজা বাতাসে ঘুরে আসতে চাই। তুমি কি আসবে আমার সঙ্গে, ডিয়ার?’
রানাকে দেখে নিয়ে বলল মারিয়া, ‘না, ডার্লিং। সরি। বাইরে বেশি ঠাণ্ডা। এই পরিবেশে বেশিক্ষণ বাইরে থেকো না, সর্দি ধরে যেতে পারে।’
মাথা দুলিয়ে চেয়ার ছাড়ল রানা। হের মুলারকে বলল, ‘হের মুলার, আপনার সঙ্গে সময়টা খুব সুন্দর কাটল। আশা, করি আগামীকাল আবার দেখা হবে।’
প্রচুর পরিমাণে ওয়াইন ও ব্র্যাণ্ডি গিলে লাল হয়ে গেছে হের মুলারের দুই গাল। ‘ইয়া,’ খুশিমনে বলল সে। ‘শুভরাত্রি, হের কিং।’
অন্য দুই জার্মান আর ড্যানিশ যুবকের দিকে একবার মাথা দুলিয়ে ভিড়ের ভেতর দিয়ে রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে চলল রানা। সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের সুইটের সামনের করিডরে চলে এল। সুইটে ঢুকে ইয়ার মাফলার দিয়ে কান ঢেকে নিয়ে মাথায় পরল ক্যাপ। শোল্ডার হোলস্টারে পিস্তল একবার চেক করে নিয়ে গায়ে চাপিয়ে দিল উইণ্ডচিটার। গোড়ালিতে হাত দিয়ে দেখল, জায়গামত আছে স্টিলেটো। তারপর সুইট ত্যাগ করে নেমে এল নিচতলায়। একবার লবিতে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে।
বাইরে কালো রাত। উত্তর থেকে হু-হু করে আসছে হিম শীতল হাওয়া। পেছনের দালানের আড়াল ছেড়ে ট্রেইল ধরে এগোতেই হাড়ে হাড়ে টের পেল কাকে বলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। গরম পোশাক ভেদ করে শরীরে যেন কামড় বসাচ্ছে কনকনে হাওয়া। নিজেকে উলঙ্গ বলে মনে হলো রানার।
কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুমে কোন বাতি জ্বলছে না। থমথম করছে পাহাড়ি এলাকা। উত্তরা হাওয়ার শোঁও-শোও ছাড়া কোথাও কোন আওয়াজ নেই। একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল রানা। হোটেলের রুমগুলোর জানালা দিয়ে বাইরে এসে তুষারের বুকে পড়েছে সোনালি আলো। তাতে প্রাডোর সাদা বরফে তৈরি হয়েছে ছোপ-ছোপ নকশা।
চারপাশের তুষারের মাঝে থম মেরে বসে আছে চেয়ার- লিফট মেশিনারির রুম। ওটার দরজা উপত্যকার দিকে। ভিড়ানো থাকলেও তালাবদ্ধ নয়। রানা নব ঘুরিয়ে ঠেলা দিতেই খুলে গেল কবাট। নির্মেঘ আকাশের কোটি নক্ষত্রের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে ভেতরের কিছু অংশ। সাধারণত এত গভীর রাতে এতটা রূপালি আলো বিলায় না আকাশে। ঘরের ভেতরে আঁধারে চোখ সয়ে যেতেই কেবল-কারের স্টিলের তার টেনে নেয়ার বিশাল চাকা আর একটা কেবল- কার দেখতে পেল রানা। ভোর হলেই ব্যস্ত হয়ে উঠবে ঘরের নানান ধরনের মেশিনারি।
ঘরে পা রাখবে রানা, তার আগে কেবল-কারের কাছ থেকে ঝট করে সরে গেল কালো এক ছায়া। বুঝতে দেরি হলো না ওর, আগে থেকে অপেক্ষা করছে কেউ। বোধহয় মোরেলির বার্তাবাহক ট্রাট্টু। অথবা কোন আততায়ী।
হোলস্টার থেকে পিস্তল নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে একদিকে সরে গেল রানা। ফিসফিস করে ডাকবে, ‘ট্রাটু?’ কিন্তু তার আগেই কেবল-কারের কাছে নড়ল অন্য কেউ।
নিজেও ডাকল লোকটা, ‘ট্রাটু!’
এই লোক যেহেতু ট্রাট্টুকে ডাকছে, কাজেই সে নিজে ট্রাটু হতে পারে না! অন্ধকারে তার দিকে পিস্তল তাক করল রানা। ‘জী?’ ইঞ্জিন-রুমের অন্যদিক থেকে এল চিকন কণ্ঠ।
আর তখনই বিকট শব্দে গর্জে উঠল ভারী ক্যালিবারের পিস্তল। বদ্ধ ঘরে হাজার ঢাকের প্রতিধ্বনি তুলেছে। গুলির কমলা ফুলকি জ্বলে উঠেই নিভে গেছে। বামদিকে চিকন গলায় কাতরে উঠেছে কেউ।
কেবল-কারের কাছে ছায়ামূর্তির দিকে গুলি পাঠাল রানা। স্প্যানিশ ভাষায় গালি দিল কে যেন। রানার বামে ধুপ করে মেঝেতে পড়ে গোঙাচ্ছে কেউ। এদিকে কেবল-কারের পেছনে সরে গেছে ছায়ামূর্তি। তাকে লক্ষ্য করে আবারও গুলি করল রানা। তিন সেকেণ্ড পর ঘরের পেছনে ঠাস্ করে খুলে আবারও বন্ধ হলো দরজা। রানা বুঝে গেল, পালিয়ে যাচ্ছে আততায়ী। অন্ধকারে তার পেছনে ছুটল ও।
এখন আর কেউ নেই কেবল-কারের কাছে। ঘরের দ্বিতীয় দরজা খুঁজে নিয়ে খুলল রানা। ইঞ্জিন-রুম থেকে বেরিয়ে তুষারে ভরা ঢালু জমিতে চোখ বোলাল।
তবে ওদিকে এখন কেউ নেই।
আবার ইঞ্জিন-রুমে ঢুকল রানা। ঘড়ঘড় করে শ্বাস নিচ্ছে কে যেন। গোঙানির আওয়াজ অনুসরণ করে তার পাশে পৌঁছে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল রানা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঘুটঘুটে আঁধারে।
‘ট্রাট্টু?’ নিচু গলায় ডাকল রানা।
‘জী,’ কাঁপা গলায় বলল কেউ।
‘বলো তো, যার জন্যে এসেছি, কোথায় তার সঙ্গে দেখা হবে?’
‘ভেলেটার ওপরে… পিকাচো দে ভেলেটা। আগামীকাল মনুমেন্টের কাছে। রাত বারোটায়।’
‘ঠিক আছে,’ সামনে ঝুঁকে ছেলেটাকে দেখতে চাইল রানা। বেচারার গলার ভেতরে বেড়ে গেছে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। গুলি লেগেছে ফুসফুসে। মারা যাচ্ছে বেচারা। একবার জোরে গুঙিয়ে উঠে স্থির হলো কিশোর ছেলেটা। ওর হাত খুঁজে নিয়ে পাল্স্ দেখল রানা।
নেই।
দেরি না করে ইঞ্জিন-রুম থেকে বেরিয়ে এল রানা। তুষারে ঢাকা পাথুরের এলাকা পেরিয়ে পৌঁছে গেল প্রাডো লানোর কাছে। আশপাশে কেউ নেই দেখে হোলস্টারে রাখল পিস্তল। হোটেলের আঙিনায় পৌঁছে একবার ঘুরে তাকাল কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুমের দিকে। ওখানে এখন জ্বলছে বাতি। ভেতরে ঘোরাঘুরি করছে বেশ কয়েকটা ছায়ামূর্তি।
গুলির শব্দে পৌঁছে গেছে গার্ডিয়া সিভিলের অফিসারেরা।
চট্ করে গিয়ে হোটেলের লবিতে ঢুকল রানা।
তিক্ত হয়ে গেছে ওর মন।
Chapter - 11
এগারো
গুলির আওয়াজে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে হোটেলের অতিথিরা। যদিও কিছুক্ষণ পর থিতিয়ে গেল সবার উত্তেজনা। ট্রাট্টুর লাশ সংগ্রহ করে থানায় নিয়ে গেল গার্ডিয়া সিভিলের তিন সদস্য। এরপর শুরু হলো খুনের তদন্তের দীর্ঘ তৎপরতা। স্কি, রিসোর্টে শান্তিরক্ষার জন্যে গার্ডিয়ার যে- ক’জন অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা হোটেলে এসে একে একে জেরা করতে লাগল অতিথিদেরকে।
গভীর রাতে পাহাড়ের এত ওপরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় নিজেদের কাজ করছে তারা। ভাল মানুষ না হলে হয়তো ভাবত সকালে জেরা করলেই হবে। সুতরাং তাদের প্রতি কোন বিরক্তি বোধ করছে না রানা।
নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হলো ওর। জেরার সময়- কেউ বলেনি হোটেল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ও। কনিয়্যাকের গ্লাসে চুমুক দিয়ে অপেক্ষা করল কখন জেরা করা হবে ওকে। কে বা কারা হোটেলে আসছে বা বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটা জানার জন্যে চোখ রেখেছে লবির দরজার ওপরে। অবশ্য টরেমোলিনোসের সেই ভিলায় যাকে দেখেছে, তার সঙ্গে কারও মিল খুঁজে পেল না রানা। ফলে এটা বুঝে গেল, অন্তত এ-হোটেলে ওঠেনি কিউলেক্স।
কিছুক্ষণ পর লবির অন্যদিকে গিয়ে চোখ বোলাল প্রাডো লানোর ওপরে।- ওকে জেরা শেষ হলে লবি ত্যাগ করে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় নিজেদের সুইটের দরজায় এসে থামল রানা। দরজার তালায় চাবি ভরে শুনল ওদিকের ঘরে পুরুষালী হাসি।
পরের খিলখিল হাসিটা মারিয়ার
বোধহয় নিজের কামরায় হের মুলারকে এনেছে মেয়েটা। লোকটা মধ্যবয়স্ক হলেও হাসি-ঠাট্টা ও রসিকতা দিয়ে পটিয়ে ফেলে সবাইকে। দরজা খুলে ঘরের বাতি জ্বালল রানা। আবার শুনতে পেল মেয়েলি হাসি। জোরে দু’বার শীৎকার করে উঠল মারিয়া। ডাইনিংরুমে ওকে যে আনন্দে রেখেছিল হের মুলার, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি মজা দিচ্ছে! লোকটাকে একফোঁটা বিশ্বাস করে না রানা।
‘উহ্, কার্স! কী যে করো তুমি! নাহ্, কার্সন! এটা করে না!’
‘করলে কী হয়!’
‘করে না!’ অনুনয় করল মারিয়া।
কার্সন? ভুরু কুঁচকে গেল রানার।
তার মানে ওদিকের ঘরে হাজির হয়েছে জন কার্সন?
এবার ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজি শুনতে পেল রানা।
তীক্ষ্ণ এক দীর্ঘ শীৎকারের পর নীরবতা নেমেছে পাশের ঘরে।
সোফায় বসে অপেক্ষায় থাকল রানা।
মিনিট তিনেক পর শুনল কার্সনের কথা, ‘ডার্লিং, নাও না আরেক গ্লাস স্কচ?’
শেষবার লোকটার সঙ্গে রানার দেখা হয়েছে ম্যালাগায়। যেদিন ইয়টে খুন হলো মোরেলির ডাবল, তার পরদিন দুপুরে মারিয়া আর ওকে নিয়ে শপিঙে গিয়েছিল সে। রাতে ডিনার করেছে নামকরা রেস্টুরেন্টে। তারপর মারিয়াকে নিয়ে পরদিন সকালে সোল ই নিয়েরের উদ্দেশে রওনা হয়েছে রানা। মারিয়া বা ও একবারও বলেনি কোথায় চলেছে ওরা। সেক্ষেত্রে কার্সন কীভাবে জানল ওদের হদিস?
সেক্ষেত্রে সে কি এ-ও জানে, পিছু নিয়েছে কিউলেক্স?
হয়তো জানে!
কিউলেক্স যে এখানে এসেছে, তাতে সন্দেহ নেই রানার মনে। সে-ই খুন করেছে কিশোর ছেলেটাকে। সেটা যৌক্তিক।
অবশ্য সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে: সত্যি যদি কিউলেক্সের পিছু নিয়ে থাকে কার্সন, তো তাকে ঠেকাতে বাইরে বা ইঞ্জিন- রুমের ভেতরে ছিল না কেন?
এর আবার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই।
রানা ‘আগে ভেবেছে, মোরেলিকে শেষ করতে এসেছে কিউলেক্স। কিন্তু এখন নতুন করে সাজাতে হবে ওর হাতের তাস। এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, পরিচিত কোন স্পাই সংগঠনের কেউ নয় কার্সন। হয়তো সৎ ব্রিটিশ নাগরিকও নয় সে।
প্রথম পরিচয়ে বলেছে, রানাকে ভিলায় পৌঁছে দিয়ে সেই পতিতা নাইট ক্লাবে ফিরলে তার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে টরেমোলিনোসের ভিলায় গিয়েছিল সে।
সে-রাতের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠল রানার।
ভিলার বেডরুমে শুয়ে ছিল এক লোক। যদিও বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরতে পারেনি রানা। জ্ঞান ফেরার পর গাড়ি নিয়ে গ্যারাজ থেকে বেরোলে যে-লোককে দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে দেখেছে, সে-ই হয়তো জন কার্সনের সঙ্গী!
পরে ভিলায় ঢুকে নাম ভাঁড়িয়ে রানার সঙ্গে আলাপ করেছে কার্সন। নিজের পরিচয় দিয়েছে এমআই-ফাইভ এজেণ্ট হিসেবে। খুঁজছে ঠাণ্ডা-মাথার খুনি কিউলেক্সকে।
অথচ এটা অসম্ভব নয় যে, তারই ভাড়া করা কাউকে নিজের ভিলার বেডরুমে থাকতে বলেছে কার্সন। সেই লোক ভান করেছে যে সে-ই আসলে কিউলেক্স। তারপর অভিনয় করেছে পালিয়ে যাওয়ার। পরে নকল কিউলেক্স অদৃশ্য হলে, বাড়িতে ঢুকেছে কার্সন। রানাকে বলেছে, খুনিটাকে ধরতে এসেছে সে।
সেক্ষেত্রে কার্সন নিজেই হয়তো খুনি কিউলেক্স। সোল ই নিয়েরেতে ওদের পিছু নিয়ে এসেছে। আজ একটু আগে কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুমে রানা মনে করে খুন করেছে ছেলেটাকে। দেরি না করে ফিরে এসেছে হোটেলে। আর এখন মারিয়ার সঙ্গে শুয়ে জানতে চাইছে, রোমিয়ো মোরেলির কাছে তাকে পৌঁছে দিতে পারবে কি না রানা!
শীতের ভেতরেও মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম নামল রানার। চট্ করে চলে গেল ফোনের সামনে। সুইটের দুই কামরায় আলাদা দুটো ফোন আছে। রিসিভার তুলে লবির ডেস্কে যোগাযোগ করে বলল ও, ‘মিসেস কিংকে ডেকে দিন।’
একটু পর পাশের ঘরে রিঙের আওয়াজ শুনতে পেল রানা। দু’বার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ করল মারিয়া। ‘হ্যালো?’
‘কোন কথা বোলো না। আমি রানা। তোমার ঘরে কার্সনের গলা শুনছি। ভঙ্গি করো, রং নাম্বারের কল পেয়েছ।’
‘সরি! মনে হচ্ছে আপনি ভুল নাম্বারে…’
‘তোমার ঘরে · ওকে আটকে রাখো। আগামীকাল. মাঝরাতে মোরেলির সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ভেলেটায়। এই তথ্য জানাতে গিয়ে খুন হয়েছে তার দলের ছেলেটা। যদি পারো, আজ রাতে কার্সনকে নিজের ঘরে রাখো। হয়তো মোরেলির ডাবলকে সে-ই খুন করেছে।’
‘আপনি কিন্তু আমাকে খুব বিরক্ত করছেন, স্যর। আমাকে এসব বলছেন কেন? আপনি তো ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন!’
‘কার্সনকে কিছু বলতে যেয়ো না। যা বললাম, সেটা যদি বুঝে থাকো, তো শুধু বলো: ‘আমি আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে চাই না, স্যর। আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারছি না।’ এরপর রেখে দেবে ফোন।’
‘আমি আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে চাই না, স্যর। আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারছি না।’
কল কেটে যেতেই ক্রেডলে রিসিভার রাখল রানা। পাশের ঘরে শুনতে পেল জন কার্সনের গলার আওয়াজ।
‘কে ফোন করেছিল, মারিয়া ডার্লিং?’
‘রং নাম্বার। কোথাকার এক মাতাল ইংরেজ।’
হাসতে লাগল কার্সন। ‘ঠিক বলছ তো, কিং নয় তো?’
‘লোকটার উচ্চারণ ঠিক তোমার মত,’ বলল মারিয়া। ‘এবার এসো, আরেকবার…’
‘এখনই? এত জলদি? বেশ্! আমি অবশ্য পুরো রেডি…’
‘যাহ্, দুষ্টু!’
আবারও নীরবতা নেমেছে পাশের ঘরে।
স্টিলেটো আর ওয়ালথার চেক করে পোশাক পাল্টে টার্টলনেক সোয়েটার পরে নিল রানা। মনস্থির করেছে আপাতত যাবে বারে। বেশকিছু বিষয়ে ভাবতে হবে ওকে। তা ছাড়া, রাতে এ-ঘরে থাকার কোন আগ্রহ নেই ওর।
বাতি নিভিয়ে সুইট থেকে বেরিয়ে এল রানা। দরজা লক করে নিচে নেমে দেখল, এখনও বারে আছে দু’চারজন। আজ পুলিশি ঝামেলা হওয়ার পর উত্তেজনার কারণে ঘরে গিয়ে ঘুমাতে পারেনি। ডেস্কে জিজ্ঞেস করল রানা, ‘আর সবাই কোথায়?’
‘কেন, স্যর, নাইট ক্লাবে,’ বিস্ময় নিয়ে বলল বারটেণ্ডার। ‘ওটা বেসমেন্টে।’
‘তা হলে যে গান-বাজনার আওয়াজ পাচ্ছি না?’
‘নাইট ক্লাব সাউণ্ডপ্রুফ, স্যর।’
হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে একতলা নামল রানা। বেসমেন্টে দেখতে পেল রসদ রাখার দুটো ঘর। পাশেই বড় এক দরজা। ওটার ওপরে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে: নাইট ক্লাব।
দরজা দিয়ে ঢুকে ডানে বার দেখতে পেল ও। ওখানে গিয়ে ড্রিঙ্কের অর্ডার দিল। বারটেণ্ডারের পরনে ফ্ল্যামেনকো ড্যান্সারের পোশাক। জুলফি নেমে মিশে গেছে চাপ দাড়িতে। চেঁছে ফেলেছে মাথার দু’দিকের চুল। দ্রুত হাতে ড্রিঙ্ক সার্ভ করল সে।
নাইট ক্লাবের অতিথিদের ওপরে চোখ বোলাল রানা। এই জায়গাটা সম্পর্কে আগে ওর কোন ধারণা ছিল না। অথচ, সময় কাটাতে হলে কিউলেক্সের মত লোকের জন্যে চমৎকার এক জায়গা এটা। অবশ্য কার্সন নিজে কিউলেক্স হলে আরও ভাল কাভার জোগাড় করে নিয়েছে সে।
টরেমোলিনোসের ভিলায় যাকে দেখেছে, তাকে নাইট ক্লাবে দেখতে পেল না রানা। একটা টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসবে, এমন সময় দেখতে পেল পরিচিত একজনকে।
সে আছে একদিকের টেবিলে। তার মাথার ওপরে দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে নকল এক চ্যাপটা পাথর। ঘুরন্ত বাতির আলো মুখে পড়তেই অন্যদিকে তাকাল সে।
মেয়েটা ক্যাথি মোনালিসা।
এই মিশনে এই মেয়ের আসলে কী ভূমিকা? – নিজেকে জিজ্ঞেস করল রানা। ক্যাথি কি জানে সোল ই নিয়েরেতে এসেছে কার্সন?
হয়তো জানে।
অথবা জানে না।
ক্যাথি হয়তো কিছু না জেনেই এসবে জড়িয়ে গেছে। নিজের কাভার পোক্ত করতে ওকে ব্যবহার করছে জন কার্সন।
লোকটা আসলে কী চায়?
তার সম্পর্কে ভুল ধারণা করছে না তো রানা?
ছায়ার ভেতর দিয়ে এগিয়ে ক্যাথি মোনালিসার পাশে গিয়ে থামল রানা, মুখে আন্তরিক হাসি। ‘হ্যাল্পে।, ক্যাথি!’
‘কিং!’ অবাক হয়েছে ক্যাথি। ‘হঠাৎ করে এখানে?’
‘কখন এলে এই রিসোর্টে?’
‘জনি আর আমি এসেছি রাত এগারোটার দিকে। শাওয়ার সেরে পোশাক পাল্টে নেমেছি ডাইনিংরুমে। কিন্তু ততক্ষণে খাবার সার্ভ করা বন্ধ করে দিয়েছে ওরা। অনুরোধ করে খাবার আনিয়ে নিয়েছি। তখন দেখলাম তোমার স্ত্রীকে। আমাদেরকে বলল হাওয়া খেতে বাইরে গেছ।’ খুশিতে চকচক করছে ক্যাথির চোখ।
‘তো একা এখানে বসে কী ভাবছ?’ জানতে চাইল রানা।
‘এসেছিলাম আমরা সব মিলিয়ে তিনজন। আমাদের সঙ্গে ছিলেন দুর্দান্ত সুদর্শন এক জার্মান লোক। তারপর ব্যাগেজে কী এক সমস্যার কথা বলে ওপরে গেল জনি। আধঘণ্টা পর ফিরে এল। তখনই আবার বিদায় নিলেন জার্মান ভদ্রলোক। এরপর জনি আর আমি কিছুক্ষণ নাচলাম। আর তারপর…’
‘জার্মান ভদ্রলোক কতক্ষণ তোমাদের সঙ্গে ছিলেন?’
ভুরু নাচাল ক্যাথি। ‘ব্যাপার কী, কিং? একেবারে পুলিশের মত করে জেরা করছ?’
‘তা নয়,’ হাসল রানা। ‘তারপর ব্যাগেজের ঝামেলা শেষ করে ফিরে এসে কী করল জনি?’
‘আগেই বলেছি, বিদায় নিল জার্মান ভদ্রলোক। তারপর সাড়ে বারোটায় মারিয়াকে বলল জনি, নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে ওকে ওর ঘরে। খুব চনমনে দেখাচ্ছিল মেয়েটাকে। জনি আমাকে বলেছে এখানে অপেক্ষা করতে।’ এবার ভুরু কুঁচকে বিরক্তির সুরে বলল ক্যাথি, ‘তারপর থেকে বসেই আছি তো আছি, ওর আর দেখা নেই।’
বারটেণ্ডারকে ড্রিঙ্কের অর্ডার দিয়ে ক্যাথির পাশের চেয়ারে বসল রানা। মনে পড়েছে মারিয়াকে কী করতে বলে এসেছে। নরম সুরে বলল ও, ‘কিন্তু জনি যদি রাতে আর না ফেরে?’
রানার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল ক্যাথি। ‘তা হলে ঘরে ফিরে একাই শুয়ে পড়ব।’
‘বেশি একা লাগবে না?’
‘তা তো লাগবেই।’ রানার চোখে তাকাল মেয়েটা। ‘তুমি কি আমাকে অন্যকিছু বোঝাতে চাইছ?’
‘হয়তো।’
‘আমি বোধহয় তোমার কথা বুঝতে পেরেছি।’ রানার ঊরুতে হাত রাখল ক্যাথি। ‘তো এক কাজ করো, বারটেণ্ডারের কাছ থেকে এক বোতল কনিয়্যাক নিয়ে চলে এসো আমার ঘরে। ওখানে বসে জনির জন্যে অপেক্ষা করব আমরা।’
বারটেণ্ডারের কাছ থেকে কনিয়্যাকের বোতল সংগ্রহ করে ক্যাথিকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চতুর্থতলায় উঠল রানা। ওর পাশে হাঁটতে গিয়ে সামান্য টলে উঠছে মেয়েটা। হ্যাণ্ডব্যাগ থেকে চাবি নিয়ে খুলল নিজেদের সুইটের দরজা। হাতের ইশারায় রানাকে বলল ঘরে ঢুকতে। নিজে সুইচবোর্ড পেয়ে জ্বেলে দিল বাতি। রানা বেডের কিনারায় বসতে না বসতেই কাগজের কাপ নিয়ে এল ক্যাথি। দুটো কাপে কনিয়্যাক ঢেলে পরস্পরকে টোস্ট করল ওরা। এক চুমুকে ড্রিঙ্ক শেষ করে রানার চোখে তাকাল ক্যাথি। ‘আগেও বলেছি, তোমার স্ত্রী খুব সুন্দরী।’
মাথা নাড়ল রানা। ‘তবে তোমার মত এত সুন্দরী নয়।’
মৃদু হাসল ক্যাথি। ‘বলবে, কীভাবে তোমাদের সাংসারিক অশান্তি শুরু হলো?’
‘ওটা তেমন কিছু নয়।’
‘আমার কিন্তু মনে হয়েছে, তোমার চেয়ে অন্য পুরুষদের সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি ভালবাসে সে।’
‘যেমন জনি?’
‘তা বলতে পারো।’
‘জনি কি সত্যিই তোমার স্বামী?’ জানতে চাইল রানা।
হেসে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল ক্যাথি। ‘আমরা ভঙ্গি করি যে আসলে দু’জনে বিবাহিত।’
‘কতদিন ধরে চেনো জনিকে?’
‘হবে… মাসখানেক।’
‘প্রথম কোথায় ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তোমার?’
ভুরু উঁচু করল ক্যাথি। ‘ম্যালাগায়।’
‘বলবে, কী ধরনের পেশায় আছে জনি?’
মুচকি হাসল ক্যাথি। ‘ভালবাসা দেয়ার বিযিনেসে।’
‘ঠাট্টা করছ?’
‘না তো! আমি আসলে কারও ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাই না।’
মাথা দোলাল রানা। ঠিকই বলেছে ক্যাথি। স্প্যানিশ মেয়েরা কখনও স্বামী বা প্রেমিকের বিষয়ে গোপন কিছু জানতে চায় না। সমাজটাই ওদের এমন।
‘আর তুমি?’ হাসিমুখে রানাকে দেখল ক্যাথি। তুমি নিজে কী ধরনের কাজ করো?’
‘আমি আসলে ফোটোগ্রাফার,’ বলল রানা, ‘ভাল ছবিগুলো বিক্রি করে নিজের পেট চালাই।’
‘তা-ই?’ সন্দেহ নিয়ে’ ওকে দেখল ক্যাথি। ‘আমি তো কখনও তোমার সঙ্গে ক্যামেরা দেখিনি!’
‘আমরা তো আছি ছুটিতে,’ ব্যাখ্যা দিল রানা।
‘ব্রিটিশরা বোধহয় এমনই হয়,’ বিড়বিড় করল ক্যাথি।
‘জনি কখনও বোধহয় কোন কাজ করে না, তা-ই না?’
‘আমাকে বলেছে, কাজ করে এক ব্রিটিশ কোম্পানিতে, ‘ বলল ক্যাথি। ‘বিক্রয়-কর্মী।’
নতুন খবর, ভাবল রানা। ওটাই কার্সনের কাভার স্টোরি। লোকটার সম্পর্কে আরও কিছু জানার জন্যে ক্যাথিকে জিজ্ঞেস করল ও, ‘জনি কী ধরনের জিনিস বিক্রি করে?’
‘তা আমি জানি না। কখনও জিজ্ঞেস করিনি।’
‘কখনও ব্রিটেনে যোগাযোগ করে?’
‘তা করে। অনেক ফোন কল করে নানান দেশে।’
‘তা-ই?’
‘হ্যাঁ। আমার মনে হয় ওর একজন সেক্রেটারি আছে। সে-মেয়ের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলে ফোনে।’
‘আচ্ছা? তো কোথায় থাকে সেই মেয়ে?’
‘সেটা জানি না। জনি ফোন করলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। বা মেয়েটা ফোন করলে ওকে ডেকেও দিই। আর আমি ঘর ছেড়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত কথা বলে না জনি।’
‘তোমরা স্প্যানিশ মেয়েরা সত্যিই খুব ভাল,’ বলল রানা। ‘ব্রিটিশ মেয়ে হলে দরজায় কান পেতে সব শুনত। আর তারপর সেসব নিয়ে স্বামী বা প্রেমিকের সঙ্গে ঝগড়া করত।’
‘আমি আসলে এসব ঠিক বুঝি না।’ হাসল ক্যাথি।
‘কখনও শুনেছ ওর ফোনে বলা কথা?’
‘মাঝে মাঝে।’
‘লক্ষ্মী মেয়ে,’ উৎসাহ দিল রানা। ‘আমাকে শোনাও তো দেখি কী বলে ও।’
ফোনে কখনও ব্যবসা নিয়ে কথা বলে না। সবই কোন না কোন লোকের ব্যাপারে। আমি আবার তাদের কাউকে চিনি না। কখনও কথা বলে মেয়েদের সঙ্গে। তবে কারও নাম কখনও উচ্চারণ করে না।’
সিক্রেট সার্ভিসের লোক হলে তার এত কথা বলার কথা নয়, ভাবল রানা। আলতো করে স্পর্শ করল ক্যাথির গাল। ‘তুমি কখনও ওর সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলেছ?’
‘হ্যাঁ। তখন এমন ভাব করেছি যে আমি একটা বোকা।’ রানার দিকে চেয়ে দুষ্টু হাসল ক্যাথি।
হাত বাড়িয়ে মেয়েটার উরুতে চাপ দিল রানা। ‘আমি তো জানি, তুমি আসলে অনেক বুদ্ধিমতী মেয়ে।’
‘কিন্তু মেয়েটা ধরে নিয়েছে আমার মগজে কিছুই নেই।’
‘কী যেন নাম বললে মেয়েটার?’
‘লিনা। তার সঙ্গেই প্রতিদিন কথা বলে জনি।’
‘মেয়েটার পুরো নাম জানো, ক্যাথি?’
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল ক্যাথি মোনালিসা।
‘তুমি যতদিন ধরে জনির সঙ্গে আছ, ততদিন ধরে মেয়েটার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে ও?’ ক্যাথির সঙ্গে এই আলাপ ওকে কোথায় নেবে, সেটা জানে না রানা, তবে তথ্য সংগ্রহের জন্যে কথা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘পরিচয়ের পর থেকেই তো দেখছি মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে জনি। কখনও কখনও অন্য দেশেও ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। বোধহয় জরুরি ব্যবসার কোন কথা।’
‘ইংল্যাণ্ডে বেশি কল করে?’
‘হুঁ। কখনও ইংল্যাণ্ড আবার কখনও ফ্রান্সে।’
‘তুমি শিয়োর যে ফ্রান্স?’
ভুরু কুঁচকে ভাবল ক্যাথি। ‘আমার তো তা-ই মনে হয়। আমি অবশ্য খুব মনোযোগ দিয়ে শুনিনি। বলো তো, এত কিছু আমার কাছ থেকে কেন জানতে চাইছ, কিং?’
‘আমি বন্ধু হিসেবে জনিকে খুব পছন্দ করি, হেসে বলল রানা। ‘তাই জানতে চেয়েছি আসলে কীসের ব্যবসা ওর।’
‘আমিও জনিকে খুব পছন্দ করি।’
‘তোমার মনে পড়ে, যে-রাতে মারিয়া আর আমি গেলাম তোমাদের সেই ভিলায়? ওই যে, আমাদের নিয়ে গেল জনি?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। মাত্র ক’দিন আগের কথা।’
‘সেদিন সারাবেলা কোথায় ছিল জনি?’
‘যতটা মনে পড়ে, সারাদিন বাড়িতেই ছিল।’
অর্থাৎ, ইয়টে তখন মোরেলির ডাবলকে গুলি করার সুযোগ ছিল না কার্সনের, ভাবল রানা। এর মানে কোনভাবেই কিউলেক্স নয় সে।
‘সেদিনও লিনার সঙ্গে কথা বলেছিল জনি?’
‘লিনা?’
‘ওই যে, জনির সেক্রেটারি?’
‘ওহ্! না, মনে হয় না সেদিন কথা বলেছিল। জনি সারাদিন বাড়িতে ছিল। তারপর আমাকে নিয়ে গেল সৈকতে।’
‘তারপর?’
‘নির্জন সৈকতে রোদে শুয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম দু’জনে, ‘ খিলখিল করে হাসল ক্যাথি। ‘দারুণ মজা লেগেছিল।’
‘আর তার পরের দিন? ইংল্যাণ্ডে ফোন করেছিল?’
‘না, সেদিনও ফোনের কাছে ভেড়েনি।’
‘আর তারপর?’
‘এরপর সকালে বোধহয় ফোন করল মেয়েটা। মানে আজ ভোরের কথা বলছি।’
‘সেই লিনা মেয়েটা?’
‘জনি বলেছে, সে খুব ভাল মেয়ে। কাজে দক্ষ। জানো, মনে মনে ওর একটা ছবি এঁকেছি। বসে আছে এক অফিসের ডেস্কে। ব্যস্ত হয়ে গুছিয়ে নিচ্ছে ফাইল।’
মাথা দোলাল রানা।
হেসে ফেলল ক্যাথি। ‘আমি যেন নিজের চোখে দেখতে পাই, ফোনে কথা বলছে সে। মাঝে মাঝে ভাবছে আমার কথা। দু’চোখে আমাকে দেখতে পারে না।’
‘জনি আর তোমার ব্যাপারে সব জানে মেয়েটা?
‘নিশ্চয়ই। এলিনা আর আমি….’
ক্যাথির বাহু ধরল রানা। আরেকটু হলে ওর বামহাত থেকে পড়ে যেত কনিয়্যাকের কাপ।
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল ক্যাথি। ‘হঠাৎ কী হলো?’
‘মেয়েটার নাম এলিনা? আগে তো তুমি বলেছিলে লিনা।’
‘একটু ছোট করে নিয়ে বলেছি। তাতে দোষ কোথায়?’
কেন যেন রানার মন বলছে, এসবের ভেতরে বড় ধরনের কোন ঝামেলা আছে। যদিও সেটা ধরতে পারছে না। লিনা আসলে এলিনা। তার সঙ্গে জনি কার্সনের কীসের সম্পর্ক?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ক্যাথি। ‘তুমি হঠাৎ করে কোথায় হারিয়ে গেলে?’ কৌতূহলী চোখে দেখছে রানাকে।
ধীরে মাথা নাড়ল রানা। ‘না, কিছু না।’ কনিয়্যাকের কাপ পাশের টি-পয়ে রেখে ঘুরে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে।
ওর বুকে আলতো করে ঠেলা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ক্যাথি। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো। এক্ষুণি ফিরছি।’
বাথরুমে গিয়ে ঢুকল মেয়েটা। মিনিট পাঁচেক পর ফিরল পোশাক ছাড়া। মোহিনী ভঙ্গিতে কোমর দুলিয়ে এসে বসে পড়ল রানার পাশে। পরস্পরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল ওরা।
ঘরে বাতি জ্বললেও সেটা নিভিয়ে দিল না কেউ।
Chapter - 12
বারো
পরদিন সকালে হোটেলের ডাইনিংরুমে ব্রেকফাস্টের পালা শেষ করে এনেছে রানা, এমন সময় ঘরে ঢুকে ওর সামনে এসে থামল মারিয়া। একটু আগে স্নান করেছে বলে তরতাজা দেখাচ্ছে ওকে। মুখে মৃদু হাসি।
‘গুড মর্নিং, মিসেস কিং,’ মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে নকল বাউ দিল রানা।
‘গুড মর্নিং, মিস্টার কিং,’ একটু আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল মারিয়া। চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ল রানার পাশে।
‘তোমাকে খুব ফ্রেশ লাগছে,’ বিস্কিটে কামড় দিল রানা।
কেউ ওদেরকে দেখছে কি না, তা একবার এদিক-ওদিক চেয়ে দেখে নিল মারিয়া। আপাতত ডাইনিংরুমে আছে মাত্র পাঁচজন অতিথি।
‘তোমার কথা মত কার্সনকে সারারাত আমার ঘরে রেখেছি,’ কড়া চোখে রানাকে দেখল মারিয়া।
‘সেজন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ,’ বলল রানা। ‘সময়টা নিশ্চয়ই খুব খারাপ কাটেনি?’
লালচে হলো মারিয়ার দুই সাদা গাল। নিচু গলায় বলল, ‘আসলে এসব কী ঘটছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’
‘আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি, জনি বোধহয় ছদ্ম- পরিচয়ে আমাদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে।’
আরেকবার চারদিকে তাকাল মারিয়া
রানার ব্রেকফাস্ট করা শেষ।
এখনও অর্ডার দেয়নি মারিয়া, তাই ওদের কাছে এসে থামল এক ওয়েটার। তাকে দুটো পোচ ডিম, পুরু মাখন দেয়া পাউরুটির চারটে স্লাইস, কমলার জুস আর এক মগ কফি আনতে বলল মারিয়া। লোকটা চলে যেতেই রানার দিকে তাকাল। ‘আমি এখনও জানি না কার্সন আসলে কে।’
‘তা-ই?’ হতাশ হলো রানা।
‘বলেছিলে মোরেলির ডাবলকে হয়তো খুন করেছে।’
‘ভুল ভেবেছি,’ বলল রানা। ‘ওর খুন করার উপায় ছিল না। জোরাল অ্যালিবাই আছে।’
‘মাফিয়া সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে সে।’
কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘নিজেকে বলছে এমআই-ফাইভের এজেন্ট। মাফিয়াদের ড্রাগসের চেইন ভাঙতে কাজ করছে।’
সেটা আমিও জানি। কিন্ত ওর কথা সত্যি বলে মনে হয়নি আমার।’
এই একই কথা ভেবেছে রানা। বলল, ‘ইন্টারেস্টিং!’
‘সারারাত কোথায় ছিলে?’ হঠাৎ জানতে চাইল মারিয়া।
ব্রেকফাস্ট, কমলার জুস আর ধোঁয়া ওঠা কফির মগ দিয়ে গেল ওয়েটার। সে বিদায় নিতেই বলল রানা, ‘এক বন্ধুর ওখানে।’
কাঁটাচামচ দিয়ে ডিম পোচের অংশ কেটে ডান ভুরু উঁচু করে ওকে দেখল মারিয়া। ‘তাই নাকি?’
‘আমার সেই বান্ধবী আসলে মিসেস কার্সন।’
‘ও?’ বিড়বিড় করল মারিয়া। ‘আমার অবশ্য মনে হয়েছিল নাইট ক্লাবে গেলে ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে।’
‘তা-ই হয়েছে।’
‘মোরেলির সেই ছেলেটার ব্যাপারে কিছু জানলে?’
ঘাড় ফিরিয়ে চারপাশ দেখে নিয়ে বলল রানা, ‘ইঞ্জিন- রুমে আমার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল কিউলেক্স। ছেলেটাকে গুলি করে পালিয়ে গেছে। মারা যাওয়ার আগে বেচারা বলে গেছে কোথায় দেখা করবে মোরেলি।’
‘আমাকে সেটা বলেছ। আজ মাঝরাতে। আমিও কি যাব?’
‘প্রয়োজন নেই। আমাকে একা যেতে বলেছে।’
‘আমাদের বোধহয় এখানে বসে এসব আলাপ করা উচিত হচ্ছে না,’ নিচু কণ্ঠে বলল মারিয়া।
‘বললে অসুবিধে কী?’ হাসল রানা। ‘তোমার কফির মগে ইলেকট্রনিক গুবরে পোকা রেখেছে কেউ? অবশ্য তোমার ঘরে এখন থেকে গোপন কোন কথা আর বলা যাবে না। আমার ধারণা: ওখানে গুবরে পোকা রেখে গেছে কার্সন অথবা কিউলেক্স। নইলে খুনির জানার কথা না ইঞ্জিন-রুমে মোরেলির কন্ট্যাক্টের সঙ্গে দেখা করতে যাব। ভাল কথা, মোরেলি সম্বন্ধে কিছু বলেছে কার্সন?’
‘মোরেলি?’ মাথা নাড়ল মারিয়া। ‘না, হঠাৎ এ-কথা তুললে যে?
‘আমার ধারণা: জনি কার্সন চেনে এলিনা পার্কারসনকে।’
ওর কথা শুনে চমকে গেছে মারিয়া। ‘তুমি শিয়োর?’
‘পুরো শিয়োর নই,’ বলল রানা।
‘ইতালিয়ান ভাষায় কার্সন খুব দক্ষ। চরম এক পর্যায়ে হঠাৎ করে এক ইতালিয়ান মনীষীর উদ্ধৃতি দিয়েছিল।’
‘তা-ই? তো তার সঙ্গে এলিনার কী ধরনের সম্পর্ক আছে বলে তুমি ভাবছ?’
‘হয়তো কিছুই না। তবে মনে হলো, জনি কার্সন হয়তো আসলে আমাদের সেই রোমিয়ো মোরেলি।’
চুপ করে থাকল রানা।
কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। ‘তা যদি না-ও হয়, কার্সন বোধহয় • জাতে ইতালিয়ান। খুব ভাল করেই চেনে মোরেলিকে।’
‘কার্সন কি স্কি করে?’ জানতে চাইল রানা।
‘তা জানি না। আমার কি জানার কথা, বলো?’
‘আজ আমরা স্কি করব,’ বলল রানা। ‘আমার কাভারের জন্যে ওটা খুব জরুরি। বেশকিছু ছবিও তুলব।’
‘গুড। বিরক্তিকর কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।’
‘আমার তো ধারণা ফূর্তিতেই আছ,’ বলল রানা।
চোখে আগুন নিয়ে ওকে দেখল মারিয়া। ‘বাজে কথা একদম বলবে না। এটা কোন লাইফ হলো?
‘তা হলে কোন্ ধরনের জীবন তুমি চাও?’
‘যেখানে কোন বিপদ হবে না। নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেব জীবন।’ দূর দেয়ালে তাকাল মারিয়া। ‘আমার বোধহয় উচিত হয়নি এ-ধরনের চাকরি নেয়া।’ রানাকে দেখল মেয়েটা। ‘আমরা কখন স্কি করতে যাব?’
‘আগে শাওয়ার নেব। তারপর রওনা হব।’
‘সাড়ে নয়টায় তোমার জন্যে লবিতে অপেক্ষা করব,’ বলল মারিয়া।
‘বেশ। প্রথমে আমরা যাব ভেলেটায়। ওপরদিক থেকে শুরু করতে কোন আপত্তি নেই তো তোমার?’
‘না, নেই। গর্বের সঙ্গে থুতনি উঁচু করল মারিয়া। ‘আমি অনেকের চেয়ে অনেক ভাল স্কি করি!’
চেয়ার ছাড়ল রানা। সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে এল ওদের সুইটে। মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে পরের কাজ।
.
সোনালি রোদে ভরা চমৎকার দিন। সকাল সাড়ে নয়টায় হোটেল ত্যাগ করে ইকুইপমেন্ট বয়ে প্রাডো লানোতে এল রানা ও মারিয়া। ওরা স্থির করেছে, স্কি করবে বোরেগুইলাস পর্যন্ত। স্টেশনে কেবল-কার-এ চাপল ওরা। ঝাঁকি খেতে খেতে দুলতে দুলতে উঠতে লাগল কেবল-কার। চলেছে সিয়েরা নেভাডার দিকে। এত ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে মাইলের পর মাইল এলাকা। পরিবেশ বরফের মত কনকনে। আবারও চারপাশে তাকাল রানা। ওর মনে হলো দুনিয়া ছেড়ে চলে এসেছে মহাশূন্যে। বহু দূরে নিচে বিছিয়ে আছে গ্রানাডা। জায়গাটা ঘিরে ভাসছে ঘোলাটে মেঘের ভেলা। দৃশ্যটা এতই সুন্দর যে, শ্বাস নিতে ভুলে যাবে যে-কেউ 1
আবারও জানালা দিয়ে চারপাশে তাকাল রানা। বাতাসে আর্দ্রতা টের পেয়ে বুঝে গেল, আজ রাতে আবারও তুষারপাত হবে। বরফে ভরা পাহাড়ের চূড়ায় কেবল-কার পৌঁছে যেতেই দু’দিক থেকে ওটাকে শক্ত হাতে ধরল দু’জন অ্যাটেন্ড্যান্ট। কার থেকে নেমে পড়ল রানা ও মারিয়া। তুষারে ভরা সমতল জমি পার করে পৌঁছে গেল স্কি রানের সামনে। এত ওপরে বাতাস খুব হালকা। হিমশীতে ওদের মনে হলো কোটি কোটি সুঁই বিধছে দেহে। বহু নিচে বিশাল বিরান শুভ্র অঞ্চল। তারই বুকে অভ্র ও স্ফটিক মিশ্রিত স্লেট পাথরের স্তূপ, কালো গিরিখাদ, শুভ্র তুষার ও অসীম নীল আকাশের রাজত্ব। কোথাও নেই সবুজের কোন চিহ্ন।
নীরবে অস্ট্রিয়ান স্কির বাকল আটকে নিল রানা। দেখতে পেল কানাডিয়ান স্কি পরতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মারিয়া। মেয়েটার কাজ শেষ হলে ক্যাপের ওপর থেকে সানগ্লাস নিয়ে চোখে পরে নিচে তাকাল রানা। কানের ওপরে চাপিয়ে নিল ক্যাপ। মারিয়ার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি আগে রওনা হও!’
মাথা দোলাল মারিয়া। সামান্য ভাঁজ করল দু’হাঁটু, তারপর তুষারে ভরা খাড়া ঢালু জমিতে নিচের দিকে রওনা হয়ে গেল। ওর পিছু নিল রানা। অবলীলায় নেমে চলেছে সাঁই-সাঁই করে। তুষারের নরম বুকে চেপে বসেছে স্কির নিচের দু’দিকের অংশ। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে রানা বুঝে গেল, স্কি করার জন্যে আজকের দিনটা সত্যিই ভাল।
নেমে যাওয়ার মাঝপথে একবার থামল ওরা। পকেট থেকে দুটো স্যাণ্ডউইচ বের করে রানাকে অবাক করল মারিয়া। চারপাশের, থমথমে নীরবতার ভেতরে চুপচাপ হালকা নাস্তা সেরে নিল ওরা। দু’চোখ ভরে দেখে নিল বরফে ছাওয়া নির্জন পর্বতের অদ্ভুত নীরব রূপ।
আবারও রওনা হলো ওরা। ওপর থেকে নেমে পৌঁছে গেল বোরেগুইলাসে। ওখান থেকে স্কি করে নামল আরও নিচে।
এরপর দেরি না করে ফিরে গেল হোটেলে। বিকেলে লাউঞ্জে ফায়ারপ্লেসের কমলা আগুনের ধারে বসে শুনল জনি কার্সন ও ক্যাথি মোনালিসার প্রেম-কাহিনী। সেটা শোনার ফাঁকে লবির দরজার ওপরে চোখ রাখল রানা। হোটেলের অতিথিদের অনেকে এল আবার বিদায় নিল। ওরা যেখানে বসে আছে, সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে বোরেগুইলাস আর প্রাডো লানোর লোয়ার রান। স্কিয়ারদের ছোটার ভেতরে কী ধরনের বৈশিষ্ট্য আছে, সেটা নিয়ে বিশদ আলাপ করল কার্সন ও মারিয়া।
বিকেল পেরিয়ে গেলে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুইটে ফিরল রানা। আবারও শাওয়ার সেরে ইজিচেয়ারে বসে বিশ্রাম নিল। রাত নয়টার দিকে আবার নেমে এল লাউঞ্জে।
আজ ডিনারে রেস্টুরেন্টের কিচেন থেকে লোভনীয় যেসব খাবার দেয়া হলো, নীরবে খেল সবাই। এরপর রাত সাড়ে এগারোটায় সতর্ক হয়ে উঠল রানা। এখনও লাউঞ্জে রয়ে, গেছে বেশিরভাগ অতিথি। ড্রিঙ্কের ফাঁকে চলছে নানান গল্প।
পরিচিতদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুইটে ফিরল রানা। চেক করে নিল ওয়ালথার ও স্টিলেটো। সকালে ওপরের স্কি রান থেকে কিনেছে এই এলাকার ম্যাপ। ওটা খুলে দেখল কোন্ পথে যেতে হবে ভেলেটায়। গ্রানাডা থেকে সরকারি পিচঢালা রাস্তা গেছে কোস্তা দেল সোল-এর মতরিলে। তিন মাইল দূরে প্রাডো লানোর হাইওয়ে মিশেছে গিয়ে সেই রাস্তায়। এরপর উত্তরদিকে দু’ভাগ হয়েছে হাইওয়ে। ওখানে পৌঁছে দক্ষিণের পথ ধরে যেতে হবে, ভেলেটায়। পকেটে ম্যাপ রেখে বেডের পাশের টেবিল থেকে ভাড়া করা রেঁনো গাড়ির চাবি নিয়ে লবিতে নেমে এল রানা।
ডাইনিংরুমে দেখতে পেল বসে বসে গল্প করছে মারিয়া ও ক্যাথি। কার্সন আবার কোথায় গেল কে জানে, আনমনে ভাবল রানা। জানালা দিয়ে তাকাল হোটেলের পার্কিংলটের দিকে। বার এস্কুই থেকে বেরিয়ে প্রাডোর দিকে চলেছে ক’জন ট্যুরিস্ট। তাদের ভেতরে আছে হের আর্নেস্ট মুলার।
লবির দরজা খুলে বাইরের অন্ধকারে পা রাখল রানা। ওকে খেয়াল করেছে হের মুলার। ওর দিকে হাত দোলাল সে। ‘ভুলে যাবেন না যে একসঙ্গে স্কি করব আমরা!’
‘আমি দিনের আলোয় স্কি করতে পছন্দ করি,’ জার্মান ভাষায় বলল রানা।
হাসল হের মুলার। রানাকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়ল হোটেলের লবিতে।
পার্কিংলটে এসে রেঁনোর ড্রাইভিং সিটে উঠল রানা। মন খারাপ হয়ে আছে। ম্যালাগায় ট্যুরিস্টদের ভিড় ছিল। রেন্টাল কোম্পানি থেকে ভাল সব গাড়ি আগেই সংগ্রহ করে নিয়েছে তারা। রানার কপালে জুটেছে উনিশ শ’ ছিয়াত্তর সালের এই ঝরঝরে গাড়ি। তিনবার ইঞ্জিন স্টার্ট করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো ও। চতুর্থবারে চালু হলো ইঞ্জিন। জানালা সামান্য নিচু করে নিল রানা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসে হু-হু করে বইছে শীতের হাওয়া। পুরনো গাড়িটা হয়ে গেছে হিমঠাণ্ডা কফিনের মত। অবশ্য কিছুক্ষণ চললে ইঞ্জিনের তাপে গরম হয়ে উঠবে ভেতরের পরিবেশ।
আকাশ থেকে ঝরছে শুভ্র তুষার। রাস্তায় কোথাও কোথাও জমে গেছে বরফ। আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে জায়গাগুলো। পাকা পার্কিংলটে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে তুষারের স্তূপ।
কর্কশ আওয়াজ করছে রেঁনোর ইঞ্জিন। সাবধানে পার্কিংলট থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে এগোল রানা। চেষ্টা করছে পথের মাঝ দিয়ে এগোতে। বরফ জমে সরু হয়ে গেছে রাস্তা। বড়জোর পরস্পরকে পেরোতে পারবে সাধারণ দুটো গাড়ি। সামনে গ্রানাডার দিকে যাওয়া এক বাসকে পাশ কাটাতে গিয়ে আরেকটু হলে দুর্ঘটনার শিকার হতো একটা গাড়ি। বাসটাকে হাতি আর ছোট গাড়িটাকে পিঁপড়ে বলে মনে হলো রানার
প্রাডো লানোর দিক থেকে এসে হাইওয়েতে উঠল দুটো গাড়ি। ওগুলোকে অনুসরণ করে এগোল রানা। তারপর বাঁক নিয়ে চলল ভেলেটার দিকে। ক্রমে বাড়ছে তুষারপাতের ধারা। হেডলাইটের সামনে যেন ঝরছে পেঁজা তুলো। তৈরি করেছে সাদা এক পর্দা। বেশি দূর দেখতে পাচ্ছে না রানা।
এঁকেবেঁকে ওপরে গেছে রাস্তা। একটু পর কঠিন হয়ে গেল সামনের হাইওয়ে দেখা। তার ওপরে জায়গায় জায়গায় জমে গেছে বরফ। মাঝে মাঝে পিছলে যেতে চাইছে গাড়ির চাকা। একবার রাস্তা থেকে হড়কে গেলে শত শত ফুট নিচে পাথুরে জমিতে আছড়ে পড়বে গাড়ি। খাড়া পথে অতিরিক্ত খাটতে গিয়ে গুঙিয়ে উঠছে রেঁনোর পুরনো ইঞ্জিন।
গতি মন্থর করে পিচ্ছিল বরফের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল রানা। তারপর সামনে সাইনবোর্ডে দেখতে পেল: ভেলেটা।
সাইনবোর্ড পেরোলেই পাকা সরু এক রাস্তা উঠেছে পাথুরে টিলায়। ওখানে আছে কংক্রিটের তৈরি বহু বছরের পুরনো মনুমেন্ট। রেঁনোতে চেপে উঠে এসে কংক্রিটের চত্বরে থামল রানা। ঝিরঝির করে ঝরছে তুষার। অন্য কোন গাড়ি নেই পার্কিংলটে। একবার হাতঘড়ি দেখল রানা। এখন বাজে বারোটা পাঁচ। আনমনে ভাবল ও, এখন কোথায় আছে রোমিয়ো মোরেলি? আরেকটা কথা মনে এল ওর: ট্রাট্টু খুন হয়ে গেছে সেটা জানার পরেও কি এখানে দেখা করবে লোকটা?
হয়তো এসেছে সে। লুকিয়ে আছে মনুমেন্টের কাছে।
ইগনিশনের চাবি মুচড়ে ইঞ্জিন বন্ধ করল রানা। পাকা চত্বরে নানান গাড়ির চাকার পুরনো সব চিহ্ন। একবার শিউরে উঠল রানা। নির্জন এ-পাহাড়ে নিজেকে বড় একা লাগল ওর। হয়তো কাছেই কোথাও আছে মোরেলি। বাস্তিলো দে ভ্যানারি আর ট্রাটুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে ওকে গুলি করে।
চট্ করে গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে দিল রানা। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল ড্রাইভিং সিটে। এবার কী করবে সেটা সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করল। কয়েক সেকেণ্ড পর উইণ্ডচিটারের পকেট থেকে নিল ওয়ালথার। ড্যাশবোর্ডের ড্রয়ার খুলে সংগ্রহ করল ফ্ল্যাশলাইট। নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে এদিকে-ওদিকে আলো ফেলে দেখল, আশপাশে কেউ নেই। গাড়ি থেকে নেমে ভীষণ শীতে গায়ে কাঁপ ধরে গেছে ওর। উইণ্ডচিটারের চেইন টেনে নিল গলা পর্যন্ত। ঠাস্ শব্দে বন্ধ করল রেঁনোর পুরনো ড্রাইভিং দরজা। একবার মুখ তুলে আকাশে তাকাল রানা। পাহাড়ি হাওয়ায় ভর করে ঝরঝর করে ঝরে চলেছে শুভ্র তুষার। ক্রমে বাড়ছে শীতের প্রকোপ।
ওপর থেকে ঝুঁকে আছে বিশাল মনুমেন্ট। ওটার পেছনে এসে লাল এক সিমকা গাড়ি দেখতে পেল রানা। বরফ ও তুষারের স্তূপ এড়িয়ে গাড়িটা কীভাবে নিয়ে এল ড্রাইভার, সেটা ভেবে পেল না ও। সিমকার বনেটে হাত রেখে দেখল, এখনও গরম হয়ে আছে ইঞ্জিন।
মনুমেন্ট মেরামতের জন্যে পেছনদিকে এনে রাখা হয়েছে সিমেন্টের অনেকগুলো বস্তা, শতখানেক রড ও প্রচুর বালি। সিমকার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রানা। হু-হু করে বয়ে চলা হিমঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপ ধরছে ওর শরীরে। আরও কয়েক সেকেণ্ড পর পদশব্দ শুনে ওদিকে ওয়ালথার তাক করল রানা।
বালি-স্তূপের পাশে থেমে বলল কেউ, ‘যাক, পৌঁছে গেছ!’
হাওয়ার শোঁ-শোঁ শব্দে কণ্ঠস্বরটা চিনতে পারল না রানা।
ওর দিকে এগোল লোকটা।
ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় এবার তাকে চিনে গেল রানা।
জন কার্সন!
অবশ্য এখন হারিয়ে গেছে তার ব্রিটিশ উচ্চারণ।
লোকটা আসলে কে বা কোন্ দেশের? -ভাবল রানা।
সামনে বেড়ে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল কার্সন।
হ্যাণ্ডশেক না করে তার দিকে চেয়ে রইল রানা।
‘ভয় নেই,’ ইতালিয়ান সুরে বলল কার্সন। ‘তোমার কোন ক্ষতি করব না। আমিই মোরেলি। রোমিয়ো মোরেলি।’
Chapter - 13
তেরো
দমকা হাওয়ায় উড়ছে কোটি কোটি তুষারকণা। একতিল নড়ল না রানা বা কার্সন ওরফে মোরেলি।
পাহাড়ের এত ওপরে বেড়ে গেছে শীতের দাপট।
‘তো?’ একটু ঝুঁকে রানার চেহারা দেখতে চাইল লোকটা।
উইণ্ডচিটারের পাশে ওয়ালথার রেখেছে সতর্ক রানা। সহজ সুরে বলল, ‘প্রথমে নিজের নাম বলেছ জন কার্সন। আর এখন বলছ তুমিই রোমিয়ো মোরেলি। তুমি সে, তার নিশ্চয়তা কোথায়?’
‘তুমি কিন্তু অন্তর থেকে ভাল করেই জানো, মোরেলি ছাড়া আর কেউ আসবে না এখানে।’ হাসল লোকটা।
‘মিটিং সম্বন্ধে জানে, এমন যে-কেউ আসতে পারে।’
‘তা নয়, বাচ্চা ছেলেটা আর আমি ছাড়া আর কেউ জানত না এখানে আসতে হবে।’ মাথা নাড়ল কার্সন।
‘তুমি তো কিউলেক্সও হতে পারো।’
‘ভাবছ আমি কিউলেক্স?’ গলা ছেড়ে হাসল কার্সন।
‘সে হয়তো জানে মোরেলির সঙ্গে এখানে দেখা করব আমি।’
‘বোকার মত কথা বোলো না। ভাল করেই জানো আমি কিউলেক্স নই।’
‘তুমি তা-ই বলছ। তবে আমি অত শিয়োর নই।’
‘আমি যদি কিউলেক্স হতাম, তো এখানে এলাম কেন?’
‘যাতে খুন করতে পারো মোরেলিকে।’
‘তুমি যা-ই বলো, আমিই কিন্তু সত্যিকারের মোরেলি।’
রানার মনে হলো, মঞ্চে নাটকের ডায়ালগ দিচ্ছে ওরা। ‘ধরে নিলাম তুমিই মোরেলি। তো এই শীতের ভেতরে দাঁড়িয়ে না থেকে, চলো, কথা বলি আমার গাড়ির ভেতরে বসে।’
কাঁধ ঝাঁকাল কার্সন ওরফে মোরেলি। ‘বেশ, চলো।’
রানার পাশে হেঁটে রেঁনোর সামনে এল সে।
রানা দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসতেই প্রশংসার সুরে বলল সে, ‘সেই আমলের ভাল একটা গাড়ি।’
‘এখনও আগের মতই চলছে ইঞ্জিন,’ বলল রানা।
প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে ঠাস্ শব্দে দরজা আটকে নিল কার্সন। তাতে এদিক-ওদিক দুলল হালকা গাড়িটা।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর বলল সে, ‘বরং খুলে বলি বাস্তিলো দে ভ্যানারির কথা। ওকে রেখেছিলাম আমার নকল হিসেবে। দায়িত্ব দিই, কারণ কয়েক মাস ধরে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইছে মাফিয়ার ডনেরা। এমনকী মাফিয়া কমিশনের বড় পদ থেকেও বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে।’
ওরা তোমার ওপরে এত খেপল কেন?’
‘কারণ, দুনিয়ার অর্ধেক ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ করতাম আমি। তাতে যে পরিমাণ টাকা আসত, তার ষাট ভাগ নিজের কাছে রেখে বাকি অংশ দিতাম মাফিয়া কমিশনকে। কখনও কখনও আরও অনেক বেশি দামে বিক্রি করেছি লাখ লাখ ডোয ড্রাগ্স্।
‘কবে বুঝলে খুনি লেলিয়ে দেয়া হয়েছে তোমার পেছনে?’
‘মাফিয়া কমিশন থেকে যেদিন আমাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিল, সেদিনই সন্ধ্যায় জানিয়ে দিল আমার এক বন্ধু। তথ্য গোপন রাখতে পারেনি গড ফাদারদের চিফ কাপো।’
‘সেই লোকের নাম কী?’
রানার দিকে চেয়ে হাসল’ কার্সন। ‘পরে সবই খুলে বলব। পর পর দু’বার আমাকে খুন করতে চেয়েছে তারা। একবার কর্সিয়ায়। আরেকবার নেপলসে।’
‘নেপলসে? কিউলেক্স এসেছে ওই শহর থেকে।’
সতর্ক চোখে রানাকে দেখল কার্সন ওরফে মোরেলি। ‘তুমি তো দেখি অনেক কিছুই জানো!!
‘আমাকে জানানো হয়েছে।’
‘কে জানাল?’
‘সেটা তোমার না জানলেও চলবে।’
‘দ্বিতীয়বারের মত হামলা করা হলে…’
‘ওটা করা হয়েছিল তোমার ভিলায়, কর্সিয়ায়।’
ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল সে। ‘হ্যাঁ, তখনই বুঝলাম, মাফিয়া কমিশনের কাছ থেকে বাঁচতে হবে। যোগাযোগ করলাম বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তারা আবার আমার ব্যাপারে জানাল বিসিআই-এর চিফকে। তাদের কাছ থেকে টেলিফোন নাম্বার পেয়ে যোগাযোগ করেছি ভদ্রলোকের সঙ্গে।’
‘এ-পর্যন্ত আমি জানি,’ বলল রানা। ‘তবে তাতে আমার কোন লাভ হচ্ছে না। তুমিই যে মোরেলি, সেটা জানার আপাতত কোন উপায় আমার নেই।’ ি
‘দেরি না করে কর্সিয়া থেকে ইয়টে উঠি ভ্যানারি, এলিনা আর আমি। তখন থেকে অভিনয় করেছে ভ্যানারি। পরে ভ্যালেন্সিয়ায় পৌঁছে বন্দরে নেমে পড়ি। নতুন করে রওনা হলো ইয়ট। ওটাতে তখন ছিল ভ্যানারি আর এলিনা।’
‘অর্থাৎ তোমাকে ছাড়াই রওনা হলো ইয়ট দ্য লিলি।’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপর তারা গেল ম্যালাগায়। তখনও তোমার পরিচয়ে অভিনয় করছে ভ্যানারি?’
‘ওকে সাহায্য করছিল এলিনা।’
ভ্যানারি কি ম্যালাগায় ইয়ট থেকে নেমেছিল?’,
‘না। আমার মনে হয়েছে, সে ইয়টে রয়ে গেলেই ভাল হবে। সেক্ষেত্রে ওকে দেখতে পাবে না কেউ। তাই বুঝবে না, সে আসলে আমি নই।’
‘ম্যালাগায় তাকে চিনে ফেলেছে কেউ, সেটা কি সম্ভব?’
‘না, সেটা অসম্ভব।’ হাসল কার্সন ওরফে মোরেলি।
‘তারপর কী হলো?’
‘তোমাকে ইয়টে নেয়ার জন্যে তীরে এল এলিনা।’
এ-পর্যন্ত ঠিকই বলেছ।’
‘আর তখনই তোমার সঙ্গে এলিনার কী সম্পর্ক, সেটা জেনে গেল কেউ। স্কুবা গিয়ার পরে পিছু নিল তোমাদের।
‘সে কে হতে পারে বলে ভাবছ?’
‘আর কে, কিউলেক্স! আগেই আমার সম্পর্কে সবই জেনে নিয়েছে। তা ছাড়া, আমার ইয়ট ম্যালাগায় ভিড়লে বুঝে গিয়েছিল, এ-সুযোগে আমাকে খুন করতে পারবে। তোমার দ্য লিলিতে ওঠা আর আমাকে খুনের চেষ্টা, এ-দুটো হয়তো কাকতালীয়।’
‘কিউলেক্স কেন বুঝল না যে ইয়টে আছে নকল লোক?’
‘আমাকে কখনোই কাছ থেকে দেখেনি সে।’ .
‘কিউলেক্স ইয়টে ভ্যানারিকে খুন করার পর, পালিয়ে যাওয়ার সময় আহত করেছে এলিনাকে,’ নরম সুরে বলল রানা।
‘স্রষ্টাকে ধন্যবাদ, ও গুরুতরভাবে আহত হয়নি।’
তীক্ষ্ণ চোখে কার্সন ওরফে মোরেলির চোখ দেখল রানা। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ঠোটে একটা শলা ঝোলাল লোকটা। লাইটার দিয়ে আগুন জ্বেলে নিল সিগারেটে। রানার দিকে বাড়িয়ে দিল খোলা প্যাকেট। জবাবে মাথা নাড়ল রানা। ‘ছেড়ে দিয়েছি।’
আগে একে স্প্যানিশ সিগারেট ফুঁকতে দেখেছে রানা। তখন ছিল ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট। সে যে পাকা একজন অভিনেতা, তাতে ওর মনে কোন সন্দেহ নেই।
‘এলিনা এখন কেমন আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘জানতে চাইছ ক্লিনিক থেকে ওকে ছেড়ে দিয়েছে কি না?’
‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল রানা।
‘ভালই আছে। সুস্থ হয়ে উঠছে।’
‘কবে এসে তোমার সঙ্গে দেখা করবে?’
‘বোধহয় একটু দেরি হবে,’ দ্বিধা করে বলল মোরেলি।
‘মাইক্রোফিল্ম কখন হাতে দেবে আমাদের?’
‘এলিনা চলে এলেই। আমি বিসিআই চিফের সঙ্গে এ- বিষয়ে কথা বলেছি। এলিনা আমার সঙ্গে বাংলাদেশে যাবে। তোমার তো এসব জানা থাকার কথা।’
‘জানি,’ বলল রানা। ‘তবে আগে দেখব মাইক্রোফিল্মে কী ধরনের তথ্য দিয়েছ।’
‘তাতে আমার কোন সমস্যা নেই,’ মাথা দোলাল সে।
‘একটা ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছি না,’ বলল রানা।
‘কী বিষয়ে?’ ধোঁয়া ছেড়ে নিজের মুখ ঢেকে দিল কার্সন ওরফে মোরেলি। রেঁনোর উইণ্ডশিল্ডে তার চেহারার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে রানা। সিগারেটে আবারও টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল সে।
‘টরেমোলিনোসে কিউলেক্সের পিছু নিলে কীভাবে?’
হেসে ফেলল মোরেলি। ‘সহজেই।’
‘সেটা একটু ব্যাখ্যা করো। তোমার ওখানে থাকার কথা নয়।’
চোখ সরু করে রানাকে দেখল সে। ‘তুমি আসলে কী বলতে চাইছ?’
‘তোমার কোন কথা আমি বিশ্বাস করছি না। কিউলেক্সকে বন্দি করব, এমন সময় তাকে ভাগিয়ে দিলে। নিজের পরিচয় দিলে জন কার্সন হিসেবে। তুমি সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট। আর এখন বলছ তুমিই রোমিয়ো মোরেলি। তা হলে তোমার কোন্ পরিচয় আমি সত্যি বলে ধরে নেব?’
‘তো শোনো, জানতাম যে তুমি কিউলেক্সের পিছু নেবে। এটা তো মানো?’
মাথা দোলাল রানা। ‘বেশ। কিন্তু তোমার তো ম্যালাগায় থাকার কথা নয়। তুমি রোমিয়ো মোরেলি, লুকিয়ে আছ ভ্যালেন্সিয়াতে। সেক্ষেত্রে ম্যালাগায় এসে নিজের বিপদ ডেকে আনবে কেন?’
‘ওটা আমার জন্যে ছিল ইন্স্যুরেন্স,’ বলল মোরেলি।
‘কীসের ইন্স্যুরেন্স?’
‘আমি ইয়ট থেকে ভ্যালেন্সিয়াতে নেমে গেলে নিরাপদে ছিলাম। এটা তো বুঝতে পারছ?’
নড করল রানা।
‘এবার ভেবে দেখো, সবার চোখ ইয়টের ওপরে। সেখানে হামলা করল কিউলেক্স, অথচ আমি আছি পর্দার আড়ালে।’
‘কিন্তু তোমার তো চলে যাওয়ার কথা সোল ই নিয়েরেতে,’ বলল রানা।
‘এলিনাকে আমি সেটাই বলেছি।’
‘সেক্ষেত্রে তুমি ম্যালাগায় এলে কেন? আমি কিন্তু এখনও আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি।’
‘ম্যালাগায় গেছি তোমার ব্যাপারে আরও তথ্য জানতে।’ কাঁধ ঝাঁকাল মোরেলি। ‘যে-কোন সময়ে খুন হব। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব লুকিয়ে পড়তে হবে। আর সেটা চাই মাতৃভূমিতে। আমার সঙ্গে নেব এলিনাকে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’
‘আমি শুনছি।’
‘জানতে চেয়েছি, এজেন্ট হিসেবে তুমি কতটুকু যোগ্য।’
নীরবতা নামল গাড়িতে। ঠাণ্ডা চোখে মোরেলিকে দেখছে রানা। ওর মত একই শীতল চোখে ওকে দেখছে মোরেলি।
‘কীভাবে জানলে কোথায় আছি?’ জানতে চাইল রানা।
ফোঁস করে শ্বাস ফেলল মোরেলি। ‘জানতাম ‘কিউলেক্সকে খুঁজে নেবে। অন্তত চেষ্টা করবে।’
‘বলতে থাকো।’
‘আমার লোকের কাছে জেনেছি, তাকে খুঁজছ তুমি।’
‘আগেই কি জেনেছ যে আমি আসলে কে?’
‘অবশ্যই। এলিনা যেখানে যেখানে গেছে, ওর ওপরে চোখ রেখেছে আমার লোক।’
‘তো সেজন্যে সে-রাতে মারিয়া আর আমার পিছু নিলে?’
‘অবশ্যই। পরে নাইট ক্লাবে তিনজন মিলে সঙ্গমে অভ্যস্ত সেই পতিতার সঙ্গে দেখা করলে তুমি। বুঝে গেলাম এবার কিউলেক্সের খোঁজ পেয়ে যাব। পরে তোমার পিছু নিয়ে পৌঁছে গেলাম সেই ভিলায়।’
‘কিউলেক্স ঘুমিয়ে আছে, এমন সময়ে তাকে ধরতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম, কিন্তু তোমার তৈরি করা কোন আওয়াজ বা অন্যকিছুর জন্যে সতর্ক হয়ে গেল সে। এর কী ব্যাখ্যা দেবে?’
‘মানুষ তো ভুল করে,’ রানার চোখে তাকাল মোরেলি।
কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘বুঝলাম, কিন্তু সেক্ষেত্রে মিথ্যা কাহিনী তৈরি করলে কেন?’
‘মানে জন কার্সনের সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের গল্প?’ এখন মোরেলির উচ্চারণে ব্রিটিশ টান নেই। ‘ওটা চট করে তৈরি করে নিয়েছি। সে-সময়ে মাথায় আর কিছু আসেনি। ভেবে দেখো, আমার কি হঠাৎ করে বলা উচিত ছিল: এই যে আমি! আমিই রোমিয়ো মোরেলি! ওটা অতিরিক্ত নাটকীয় হয়ে যেত না?’
‘এখনও নাটকীয়তা কম হচ্ছে না,’ বলল রানা। ‘নাইট ক্লাবে মারিয়া আর আমাকে বলতে পারতে, তুমি আসলে কে। পরে ভাড়া করা ভিলায় নিয়ে মারিয়ার সঙ্গে ঘুমালে। এখানের হোটেলেও একই কাজ করলে। অথচ, অনায়াসেই মারিয়াকে মাইক্রোফিল্ম বা অন্যান্য তথ্য দিতে পারতে। সেক্ষেত্রে তোমার দেয়া তথ্য সঠিক কি না, এতক্ষণে আমরা জেনে যেতাম।’
সিগারেটের ফিল্টারে চিমটি কেটে উইণ্ডশিল্ড ভেদ করে দূরে তাকাল কার্সন ওরফে মোরেলি। বাইরে ঝরছে তুষার। অবশ্য আগের চেয়ে কমেছে। গভীর এই রাতে কাঁচে দু’জনের প্রতিচ্ছবি দেখছে রানা।
কাঁচে ওর প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে আছে লোকটা।
‘কখনও কোন মেয়েকে নিয়ে বেডরুমে শুলে জরুরি কথা বলি না,’ ভুরু কুঁচকে বলল মোরেলি। ‘সেটা নিজের বেডরুম হলেও। টরেমোলিনোসের সেই ভিলায় তোমার পিছু নিয়ে যাওয়ার আগে কিউলেক্স আমার বেডরুমে গুবরে পোকা রেখে গেছে কি না, সেটা জানার কোন উপায় ছিল না আমার। সে ভেবেছিল ইয়টে আমাকে খুন করেছে। কিন্তু সেটা না-ও তো হতে পারে। অনেক আগে থেকেই হয়তো পিছু নিচ্ছে আমার। আমাকে শেষ করে দিতে হয়তো নিজের ভিলায় বসে অপেক্ষা করছিল। তুমি বা আমি সেটা কী করে জানব?’
চুপ করে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকল রানা। ভাবছে, আরও কিছু বলবে লোকটা।
‘তারপর এলাম স্কি রিসোর্টে। বলো তো, কাকে বিশ্বাস করব আমি? হয়তো সব কামরায় আছে ইলেকট্রনিক গুবরে পোকা। আগেই পরিচয় হয়েছে বলে তোমাকে আমি চিনি। ছেলেটাকে পাঠালাম কেবল-কার ইঞ্জিন-রুমে, যাতে তোমাকে জানিয়ে দেয় কোথায় দেখা করব। কিন্তু তোমাকে বা আমাকে ভেবে ওকে খুন করল কিউলেক্স। মনে হলো, খুন হওয়ার আগে ছেলেটা হয়তো তোমাকে বলে গেছে, কোথায় আসতে হবে। তাই আজ এসেছি এখানে। আমার কথায় কোথাও কোন ভুল খুঁজে পেলে?’
‘এবার কী?’ তার দিকে তাকাল রানা। ‘মাইক্রোফিল্ম কি এখানেই আমার হাতে দেবে?’
‘আজ নয়,’ বলল মোরেলি। ‘মারিয়া আর তুমি অন্য এক জায়গায় আমার কাছ থেকে মাইক্রোফিল্ম নেবে।’
‘কোথায় যেতে হবে আমাদেরকে?’
‘ভেবেছিলাম এলিনা এলে তোমার হাতে ওটা দেব। তবে -এখন ভাবছি অন্য কথা। হোটেলে অতজনের ভেতরে না দিয়ে আমরা দেখা করব প্রাডো লানোর স্কি রানে।
‘ওটা অবশ্য বেশ নির্জন এলাকা,’ মাথা দোলাল রানা। ‘তুষারের রাজ্যে ইলেকট্রনিক গুবরে পোকা থাকার কথা নয়। আমার আপত্তি নেই ওখানে যেতে।’
‘তুষার নয়, ভয় আমার অন্যখানে। টেলিস্কোপিক লেন্সসহ রাইফেল দিয়ে এক মাইল দূর থেকে আমাকে শেষ করে দিতে পারবে দক্ষ মাস্-ম্যান। ওটা আমার অস্বস্তির কারণ।’
‘সেক্ষেত্রে তাকে জানতে হবে, তুমি আসলে সে।’
‘হয়তো আগে থেকেই জানে। আশপাশে খাপ পেতে বসে আছে। ছেলেটাকে তো রেহাই দিল না। ভাল করেই তো চেনে মারিয়াকে। তাই আমাদের ওপরে হয়তো চোখ রাখবে।’
‘হয়তো।’
‘তা-ই তোমাদেরকে আসতে হবে গোপন কোথাও।’
কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘তেমন জায়গা খুঁজে নেয়া কঠিন।’
‘কে বলেছে? আমরা দেখা করব কেবল-কারে। অনেক ওপরে আমাদের ওপরে চোখ রাখতে পারবে না কেউ।’
‘গণ্ডোলায়?’ কয়েক সেকেণ্ড ভাবল রানা। ‘ওখানে দেখা করে মারিয়া আর আমাকে দেবে মাইক্রোফিল্ম? ওটার ভেতরে দরকারি কিছু পাওয়া গেলে দু’দিনের ভেতরে তোমাকে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হব।’
‘আমিও তা-ই চাই। মাইক্রোফিল্মে বহু কিছুই পাবে।’
‘অবশ্য ঢালু পাহাড় থেকে তোমার ওপরে গুলি চালাতে পারবে কিউলেক্স,’ বলল রানা।
‘আর সেজন্যে তুমি থাকবে স্কিসহ বোরেগুইলাস স্টেশনের কাছে,’ বলল মোরেলি, ‘আমরা উঠে এলে কাভার দেবে।’
আরও কিছুক্ষণ ভাবল রানা। বুঝে গেল খারাপ কোন প্রস্তাব
দেয়নি লোকটা। এতে বিপদের সম্ভাবনা কমবে। জানিয়ে দিল ও, ‘আমি রাজি।’
‘তোমরা কখন আসতে চাও?’
‘আগামীকাল সকাল দশটায়?’ বলল রানা।
‘ঠিক আছে,’ মাথা দোলাল মোরেলি। ‘মারিয়ার সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক রাখব না। ফূর্তির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি চুক্তিটা বহাল রাখা।’
‘তা হলে আগামীকাল দেখা হবে, বলল রানা।
দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল মোরেলি। হু-হু করে হিম-বাতাস ভরে গেল ভেতরে। একবার শিউরে উঠল রানা। রেঁনোর দরজা বন্ধ করে নিজের গাড়ির দিকে পা বাড়াবার আগে বলল মোরেলি, ‘তুমি রওনা হও। আমি পিছু নেব।’
মাথা দোলাল রানা।
আঁধারে মনুমেন্টের ওদিকে হারিয়ে গেল মোরেলি।
রেঁনোর ইঞ্জিন প্রথমবারে চালু হওয়ায় অবাক হলো রানা। মিনিটখানেক ইঞ্জিন গরম করে ঘুরিয়ে নিল গাড়ি। রিয়ার ভিউ মিররে দেখল মনুমেন্ট ঘুরে পিছু নিয়েছে সিমকা। ধীর গতি তুলে সরু রাস্তা পার হয়ে হাইওয়েতে এসে উঠল রানা। নতুন করে শুরু হয়েছে জোর বেগে তুষারপাত। একবার দেখল, পেছনে আসছে দুটো হেডলাইট।
হাইওয়ে এঁকেবেঁকে নেমে গেছে বহু নিচে। বারবার ব্রেক করতে হচ্ছে রানাকে। একটা বাঁক পেরিয়ে টের পেল, মোটেই কাজ করছে না ওর গাড়ির ব্রেক। সামনে নেমে গেছে কালো পাথরে ভরা উপত্যকা। ওটার বুকে ডিনামাইট ফাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে আঁকাবাঁকা পথ। দূরে ডানে বাঁক। গতিহ্রাস করতে গিয়ে রানা ভাবল, বোধহয় জমাট বরফে পিছলে গেছে চার চাকা। কিন্তু দ্বিতীয়বার ব্রেক করতে ডেবে গেল প্যাডেল।
ঝোড়ো বেগে নেমে চলেছে রেঁনো। ক্লাচ চেপে শি স্টিক নিউট্রাল করতে চাইল রানা। তবে এত বেশি বেগে নিচের গিয়ার দেয়া গেল না পুরনো গাড়িতে। বাম পায়ে মেঝেতে ব্রেক প্যাডেল চেপে ধরল ও। তারই ফাঁকে বিদ্যুদ্বেগে বাঁক ঘুরে দেখল, একটু দূরে এস-এর মত জটিল হয়ে গেছে রাস্তা!
স্টিয়ারিং নিয়ে ধস্তাধস্তি করছে রানা। এস-এর মত জায়গা পেরিয়ে আবার সোজা হলো ঢালু রাস্তা। তবে সেটা মাত্র কিছুক্ষণের জন্যে। রেঁনোর হেডলাইট গিয়ে পড়ল রাস্তার ধারে বড় এক সাইনবোর্ডের ওপরে:
Switchback! Slow Down!
পর্বতের গায়ে চুলের কাঁটার মত সুইচব্যাক! বারবার ব্রেক প্যাডেলে চাপ দিলেও মোটেই কমছে না রেঁনোর গতি। হ্যাচকা টানে গিয়ারের স্টিক নিউট্রাল করতে চাইলেও তাতে কোন লাভ হলো না। দু’চাকা এদিকে-ওদিকে সরিয়েও কমছে না গতি। একবার বেগ কমলে নিচের গিয়ার ফেলে গাড়ি থামাতে পারবে রানা। রিয়ার ভিউ মিররে দেখল, পেছনে গাড়ির হেডলাইট। মোরেলি বোধহয় ভাবছে বদ্ধউন্মাদ হয়ে গেছে রানা। আর সেজন্যেই এত বাজে ড্রাইভিং করছে!
দু’বার হেডলাইট নিভিয়ে চালু করল রানা। মোরেলি হয়তো বুঝবে, বড় কোন বিপদে পড়েছে সামনের ড্রাইভার।
দ্রুত এগিয়ে এল পাহাড়ি সুইচব্যাক। গতিহ্রাস না করেই সাঁই করে বাঁক নিল রেঁনো। গতিবেগ এক শ’ ছত্রিশ মাইল!
পথের পাশের নর্দমায় গাড়ির চাকা ফেলে গতিহ্রাস করতে পারবে কি না, সেটা নিয়ে ভাবল রানা। আনমনে মাথা নাড়ল। উচিত হবে না এত বড় ঝুঁকি নেয়া। অ্যাক্সেল থেকে উপড়ে যাবে চাকা। কয়েক গড়ান দিয়ে পাহাড়ে বিধ্বস্ত হবে গাড়ি। তাতে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। লাফ দিয়ে দিয়ে নেমে- চলেছে রেঁনো।
স্টিয়ারিং হুইল ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে রানা। কর্কশ শব্দ তুলছে চার চাকার রাবার। পাহাড়ের উল্টোদিকে খাড়া নেমে গেছে পাথুরে খাদ। নিচে সর্পিল নদী। আর সেটা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যে ডানে রাখা হয়েছে একফুট উঁচু গাছের গুঁড়ির দেয়াল। যদিও রেঁনোর পতন ঠেকাবে না ওটা!
বিদ্যুদ্বেগে বামে পাহাড়ের দিকে সরে এল রানা। পাঁচ শত গজ দূরে ডানে আবারও বাঁক নিয়েছে পথ। ওখানেও সড়ক মন্ত্রণালয়ের নিচু গাছের গুঁড়ির দেয়াল। তার আগে একই ধরনের সাইনবোর্ড।
দূরের বাঁক বড় দ্রুত চলে আসছে কাছে। ওখানে উল্টে গিয়ে হয়তো নিচের নদীতে গিয়ে পড়বে রেঁনো। সরে এসে বামের কাঠের গুঁড়ি ঘেষ্টে এগোল রানা। কর্কশ শব্দে কী যেন খসে গেল গাড়ি থেকে। পরক্ষণে আবার সরে পাহাড়ের গায়ে ঘষা দিল ও। যে-কোন সময়ে ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়বে রেঁনো! আবারও নিচে নেমে গেছে পথ। এত বেশি গতিবেগে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না রানা। আর তখনই পাশে শুনল আরেকটা গাড়ির ইঞ্জিনের ভারী গর্জন।
ওর পাশে ছুটছে মোরেলির সিমকা। ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে রেঁনোকে পাশ কাটাল লোকটা। রানা বুঝল না আসলে কী করতে চাইছে সে।
নিজের গাড়ি সরাসরি রেঁনোর সামনে নিয়ে এল মোরেলি। সে সরে না গেলে তীব্র গতিতে দুর্ঘটনায় পড়বে দুই গাড়ি!
আবারও শিট স্টিক নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে রানা। যদিও তাতে একতিল নড়ল না স্টিক। এদিকে হালকা ব্রেক করে মোরেলি চলে এসেছে সরাসরি ওর সামনে।
চোখ বুজে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করবে কি না, সেটা ভাবল রানা। কিন্তু এল না দুর্ঘটনার বিকট আওয়াজ।
হঠাৎ রেঁনোর ফ্রন্ট বাম্পারে ঠেকে গেল সিমকার পেছনের বাম্পার। জ্বলে উঠেছে গাড়িটার ব্রেক লাইট। ধীরে ধীরে কমে আসছে দুই গাড়ির গতি। মনে মনে লোকটার ড্রাইভিঙের তারিফ না করে পারল না রানা।
পেছনের গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়ার এটা পুরনো কৌশল।
স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরেছে রানা। ভাল করেই জানে, পথে গর্ত বা পাথর থাকলে সিমকার বাম্পার থেকে ছিটকে সরে যাবে রেঁনো। সেক্ষেত্রে বামের খাদে পড়ে অথবা পাহাড়ে লেগে বিধ্বস্ত হবে ওর গাড়ি।
বারবার জ্বলছে মোরেলির ব্রেক লাইট।
পাহাড়ি বাঁকের দশ গজের মধ্যে পৌঁছে শেষমেশ থেমে গেল সিমকা ও রেঁনো। ব্যাক গিয়ার ফেলে ড্রাইভিং সিটে বসে রইল রানা। কনকনে শীতেও গোসল হয়ে গেছে ঘেমে-নেয়ে।
সিমকার দরজা খুলে নামল মোরেলি। রানার পাশে এসে থামল। হাওয়ায় তার চারপাশে বইছে তুষারের শ্বেত কণা।
রেঁনোর আলোয় জ্বলজ্বল করছে সিমকার পেছনদিক। একবার ওদিকে চেয়ে বলল সে, ‘মনে হচ্ছে স্যাবোটাজ করা হয়েছে তোমার গাড়িটা।’
মাথা দোলাল রানা। ‘সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ।’
‘পেছনে পেছনে প্রাডো পর্যন্ত চলো,’ বলল মোরেলি।
আপত্তি করল না রানা।
আধঘণ্টা পর প্রাডোর বার এস্কুই-এর কাছে পৌঁছে গেল ওরা। ওখান থেকেই বিদায় নিল মোরেলি।
গভীর রাতেও খোলা থাকে প্রাডোর এক গ্যারাজ। ওখানে গিয়ে মেকানিকের কাছে রেঁনোটা বুঝিয়ে দিল রানা। এরপর গিয়ে ঢুকল বার এস্কুই-এ। তিন মগ লুমামবা আর এক কাপ কফি শেষ করেও মনে কোন স্বস্তি পেল না।
Chapter - 14
চোদ্দ
কিছুক্ষণ পর বার এস্কুই ত্যাগ করে হোটেলে ফিরে এল রানা। ওদের সুইটে ঢুকে জ্বেলে নিল বাতি। শুনতে পেল পাশের ঘরে পায়ের হালকা শব্দ। পরক্ষণে খুলে গেল মাঝের দরজা। কৌতূহলী চোখে ওকে দেখল মারিয়া
‘তা হলে দেখা হলো তার সঙ্গে?’
‘হ্যাঁ,’ সংক্ষেপে জানাল রানা। সরে ব্যুরো থেকে প্যাড ও কলম নিয়ে খস খস করে কাগজে লিখল: ‘ঘরে গুবরে পোকা। কথা বোলো না।’
কাগজটা দেখাতেই মাথা দোলাল মারিয়া। দুই সেকেণ্ড পর প্রশ্ন করল, ‘কেমন কাটল সময়?’
প্যাডে লিখল রানা: ‘আগামীকাল সকাল দশটায় গণ্ডোলায় তার সঙ্গে দেখা করবে তুমি। পরে সব খুলে বলব।’
নড করল মারিয়া।
‘আমি এবার বিশ্রাম নেব,’ বলল রানা।
‘ঠিক আছে,’ মাথা দোলাল মারিয়া।
আঙুল তুলে বাইরের করিডর দেখাল রানা। ওখানে গিয়ে কথা বলতে চায়।
‘গুড নাইট, স্যামি,’ বলে নিজের ঘরে ঢুকল মারিয়া। গায়ে শাল জড়িয়ে সুইট ছেড়ে চলে গেল করিডরে।
ওর পিছু নিল রানা।
সিগারেট জ্বেলে ওকে দেখল মারিয়া। ‘তুমি শিয়োর যে ঘরে গুবরে পোকা আছে?’
‘আমি নিশ্চিত।’
‘মোরেলির সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ। আমরা তাকে চিনি জন কার্সন নামে।’
রানার চোখে তাকাল মারিয়া। ‘আমিও সেটাই ভেবেছি।’
‘আমি অত শিয়োর নই। আগামীকাল মাইক্রোফিল্ম হাতে পেলে, দু’দিনের ভেতরে জানব সে নকল লোক কি না
‘মাইক্রোফিল্ম না দেখলেও তার কথা থেকে অনেক কিছুই বুঝতে পারব,’ বলল মারিয়া।
‘দেখা যাক কী বলে। আমার কাজ হবে পাহাড়ের ঢাল থেকে তোমাদেরকে কাভার দেয়া। সে সেটাই চাইছে।’
‘কিন্তু মোরেলির সঙ্গে দেখা হবে, সেটা আগে থেকে কীভাবে জানল কিউলেক্স?’
‘আমাদের পিছু নিয়ে এখানে এসেছে সে।’
‘চারপাশে চোখ রাখব আমি।’
‘দরকার হবে না। সে-কাজ আমিই করব। তোমার কাজ হবে জেনে নেয়া যে মিথ্যা বলছে কি না।’
সিগারেটে টান দিল মারিয়া। ‘আগেই আমাদের হাতে সব বুঝিয়ে দেয়নি কেন সে?’
‘আমাকে বলেছে, সে কোন ঝুঁকি নিতে চায়নি।’
কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। ‘যুক্তি আছে তার কথায়।’
‘তার সঙ্গে কেবল-কারে উঠে চলে যাবে ওপরে। স্কি করে নেমে আসবে বোরেগুইলাসে। হোটেলে ফিরে তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। মাইক্রোফিল্ম হাতে পেলে তুলে দেব একজনের হাতে। এটা জানা খুব জরুরি যে মাইক্রোফিল্ম আসল কি না।’
‘ম্যালাগায় কারও হাতে দেবে?’
‘গ্রানাডায় বিসিআই-এর লোক আছে,’ বলল রানা।
‘আশা করি একই জিনিস বিএসএসও হাতে পাবে।’
‘নিশ্চয়ই।’
সুইটে ঢুকে দরজা আটকে দিল ওরা।
দুই ঘরের মাঝের দরজা ভিড়িয়ে নিল মারিয়া।
জুতো ও উইণ্ডচিটার খুলে বেডে শুয়ে পড়ল রানা। মনে ঘুরপাক খাচ্ছে নানান ধরনের দুশ্চিন্তা। একটু পর মেডিটেশন করে ঘুমিয়ে গেল অকাতরে।
.
সোনালি রোদে ঝিকঝিক করছে গিরিখাদের তুষার, ধাঁধিয়ে দিচ্ছে চোখ। যেইস ৬০x বিনকিউলার চোখে সেদিকে চেয়ে আছে রানা। মারিয়া ও মোরেলিকে নিয়ে উঠে আসছে কেবল-কার। মেয়েটার পরনে হলদে সোয়েটার। সাধারণত এসব গণ্ডোলা বহন করে চারজন স্কিয়ার, তবে কেবল-কারে এখন আছে ওরা মাত্র দু’জন। রানা বুঝে গেল, মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে বিশেষ সুবিধা নিয়েছে ড্রাগ লর্ড।
অবশ্য এসব নিয়ে ভাবছে না রানা। চোখ বোলাল তুষারে ভরা ঢালু পাহাড়ে। আর তখনই দেখতে পেল তাকে।
বড় একটা পাথরে কনুই রেখে কেবল কারের দিকে দীর্ঘ নলের রাইফেল তাক করেছে সে। চোখ স্কোপের সাইটে। রানা বুঝতে পারল না ওটা কোন্ কোম্পানির অস্ত্র।
সঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করছে লোকটা। স্কোপের মাঝ দিয়ে দেখছে গণ্ডোলা। ওটায় চেপে উঠে আসছে মারিয়া ও মোরেলি।
কখন এবং কোথায় হামলা করতে হবে সেটা কীভাবে জানল আততায়ী? – ভাবল রানা।
হামলার পেছনে স্বয়ং জন কার্সন নেই তো?
হয়তো তার সঙ্গী এই খুনি।
দু’জন মিলে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছে মারিয়া আর ওকে!
ওদের নিজেদের ভেতরের কথা ফাঁস হলো কীভাবে?
হোটেলে জরুরি কোন কথা বলেনি ওরা।
কার্সন ওরফে মোরেলি ছাড়া অন্য কারও জানার কথা নয়, কোথায় দেখা করা হবে।
অথচ, সে কি কিউলেক্স?
খাপ পেতে বসে আছে আততায়ী!
সম্ভবত সে-ই!
উইণ্ডচিটারের চেইন খুলে ওয়ালথার হাতে নিল রানা। চেম্বারে গুলি আছে দেখে নিয়ে রেখে দিল পকেটে। গিরিখাদে লোকটার কাছে পৌছুতে হলে স্কি করে নেমে যেতে হবে বহু নিচে। কিউলেক্স প্রাণে বাঁচলে মোরেলিকে খুন করবে সে, কাজেই গুলি শুরু করার আগেই পাথুরে জমিতে ক্রল করে গিয়ে শেষ করতে হবে তাকে।
কেবল-কারের উঠে আসার ধীরগতি আর পাথুরে জমিতে শুয়ে থাকা লোকটাকে দেখে রানা বুঝল, গণ্ডোলায় মারিয়া বা কার্সনের খুন হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হলে হাতে ও পাবে বড়জোর দেড় মিনিট!
বরফে ছাওয়া ঢাল বেয়ে রওনা হয়ে গেল রানা। সামনেই শক্ত বরফের এলাকা। ওটা এড়িয়ে গেল ও। ওর স্কিয়িঙের কারণে ওপরে শুরু হয়েছে তুষারের একটা ধস। হুড়মুড় করে নেমে এল সাদা ঢেউ। কয়েক সেকেণ্ডে ডুবে গেল রানার দু’হাঁটু। কাত হয়ে পড়ে যেতে গিয়েও সামলে নিল ও। তুষারের খরস্রোত নেমে গিয়ে ধাক্কা খেল নিচের পাথুরে জমিতে। এদিকে এরই ভেতরে কয়েক সেকেণ্ড নষ্ট করে বসেছে রানা। নিচে পাথুরে জমিতে আর দেখতে পেল না লোকটাকে। বিনকিউলার চোখে তাকাল নিচের ঢালে। এক পলক পরে আবারও দেখল রাইফেল হাতে আততায়ীকে।
তুষারের স্রোতের ধাক্কায় অন্তত পঞ্চাশ গজ সরে গেছে রানা। এখনও আছে বহু ওপরে। তুষার ধসের এলাকা থেকে সরে ঝড়ের বেগে নামতে লাগল রানা। কোনাকুনিভাবে চলেছে আততায়ীকে লক্ষ্য করে।
এক মিনিট পেরোবার আগেই পৌঁছে গেল পাথুরে জমিতে। চট্ করে জুতো থেকে খুলল স্কির ক্ল্যাম্প। এবার পিছলে যাবে না ওর পা। বিনকিউলার চোখে তাকাল নিচের পাথুরে কিনারায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পোলের মাঝে চলে এসেছে কেবল-কার। রাইফেলের গ্রিপ ধরে গণ্ডোলার দিকে চেয়ে আছে আততায়ী।
পকেট থেকে ওয়ালথার নিয়ে তার মাথা লক্ষ্য করে ট্রিশার স্পর্শ করল রানা। তাতে লোকটার মাথার পাশের পাথরে লেগে ‘বিইইইয়িং’ শব্দে কোথায় যেন চলে গেল .৩৮ বুলেট।
ঝট্ করে মাথা ঘুরিয়ে ওপরে তাকাল আততায়ী।
বহু দূরে আছে বলে তার সাদা চেহারা ঝাপসাভাবে দেখল রানা। ঘুরে ওর দিকে রাইফেল তাক করল লোকটা। পরক্ষণে রানার মাথার তিন ফুট ওপরে গেঁথে গেল ভারী ক্যালিবারের গুলি। খুন হয়ে যাওয়ার তোয়াক্কা না করে আবারও গুলি পাঠাল রানা।
যদিও পাথরের ওদিকে মাথা নিচু করে নিয়েছে খুনি।
তাকে আর দেখতে পেল না রানা। ওর পাশের পাথরে এসে লাগল বুলেট। ঝুপ করে তুষারে ভরা ঢালু জমিতে বসে পড়ল রানা। কেবল বেয়ে উঠছে গণ্ডোলা। ভেতরে মারিয়ার হলদে সোয়েটার দেখতে পেল ও। অবশ্য দ্বিতীয়বার ওদিকে দেখার সুযোগ পেল না। ওর দিকে পিঠ দিয়ে রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে আততায়ী। গণ্ডোলার দিকে তাক করল অস্ত্রটা। আর একই সময়ে আবারও গুলি পাঠাল রানা।
ওর গুলি গায়ে না লাগলেও খোঁড়লের মত এক জায়গায় ঝুপ করে বসে পড়ল লোকটা। তাকে গণ্ডোলার দিকে রাইফেল তাক করতে দেখে বুঝে গেল রানা, ঠিক সময়ে পৌঁছুতে পারবে না আততায়ীর কাছে। কেবল ক্ল্যাম্প আটকে বিদ্যুদ্বেগে আবারও স্কি করে নেমে যেতে লাগল।
দুই পোল বামহাতে রেখে, ডানহাতে ধরেছে ওয়ালথার। যে-কোন সময়ে পিছলে গিয়ে শুরু হবে ওর দীর্ঘ পতন। কিছুটা নেমে টের পেল, স্কি করতে হলে গুলি লাগাতে পারবে না টার্গেটে। চট করে থেমে বসে পড়ল রানা। স্কি খুলে কুঁজো হয়ে তাকাল নিচে। ওই যে, পাথরের স্তূপের ভেতরে লোকটা!
দেরি না করে গুলি পাঠাল রানা। প্রায় একই সময়ে গণ্ডোলা লক্ষ্য করে গুলি করেছে আততায়ী। রানার গুলি কানের পাশ দিয়ে যেতেই চমকে গেছে সে। ফলে কাঁচ ভেদ করে মোরেলির হৃৎপিণ্ডে না বিঁধে বুলেট লেগেছে গণ্ডোলার নিচে।
পরক্ষণে আবারও গুলি পাঠাল রানা। তাতে পাথুরে জমিতে শুয়ে পড়ে ওর দিকে রাইফেলের নল তাক করল আততায়ী।
এদিকে তুষারে পিছলে সরসর করে নেমে চলেছে রানা। ওর চারপাশের তুষারে এসে লাগল বেশকিছু গুলি।
পিচ্ছিল পাথরের স্তরে নেমে, ক্রল শুরু করতেই রানার কানের পাশ দিয়ে গেল একটা বুলেট। আর তখনই আবারও আততায়ীকে দেখতে পেল ও।
এবার তার ঘাড় লক্ষ্য করে গুলি পাঠাল রানা।
তাতে ভীষণ ঝটকা খেয়ে তুষারে পড়ল লোকটা। মাথার চারপাশে ভেসে উঠেছে লাল কুয়াশার মত কণা।
উঠে দাঁড়িয়ে পিছলে নিচে নেমে এল রানা। আততায়ী পড়ে আছে রক্তের পুকুরে। সে আর কেউ নয়, কুখ্যাত কিউলেক্স ওরফে সোলনি দে নায়েসুরা।
পিস্তলের বুলেটের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে পুরুষ মশা!
মোরেলি আর রানাকে খতম করতে ব্যবহার করেছে ৩০- ০৬ স্প্রিংফিল্ড কার্তুজের উইনচেস্টার মডেল ৭০ স্নাইপার রাইফেল। সঙ্গে আছে বশ অ্যাণ্ড লম্ব্ ব্যালভার ভ্যারিয়েবল পাওয়ার লি ডট টেলিস্কোপ। এই ধরনের রাইফেলের ব্যারেল থেকে বেরোবার সময় স্প্রিংফিল্ড ব্রোঞ্জ পয়েন্ট কার্ট্রিজের গতি হয় প্রতি সেকেণ্ডে ঊনত্রিশ শ’ ষাট ফুট। তিন শ’ গজ দূরত্বে প্রতি সেকেণ্ডে গতিবেগ বাইশ শ’ ষাট ফুট। মাযল থেকে বেরোলে তখন বুলেটের হিটিং পাওয়ার প্রতি ফুট-পাউণ্ডে ঊনত্রিশ শ’ বিশ ফুট। তিন শ’ গজ দূরে সেই শক্তি কমে হয় সতেরো শ’ ফুট-পাউণ্ড। আর ভ্যারিয়েবল পাওয়ার স্কোপের গুণে বাতাস ও উচ্চতা বুঝে মাত্র দুটো মুভিং পার্টস সরিয়ে সঠিক জায়গায় পাঠানো যায় প্রচণ্ড গতি বুলেট।
এই মারণাস্ত্র এতই নিখুঁত, মার্কস্-ম্যানের হাত থেকে প্রাণে বাঁচার উপায় আসলে নেই বললেই চলে।
মৃত মশার লাশের প্যান্টের পেছন-পকেটে ওয়ালেট পেল রানা। ওটার ভেতরে আছে কিছু কাগজপত্র। পরিচয়-পত্রে লেখা: সোলনি দে নায়েসুরা। এসেছে ইতালির বারি থেকে। তামাটে মুখ ক্লিন শেভড়। মাথার চুল কালো। জুলফি বেশ লম্বা। পরনে দামি উইণ্ডচিটার ও টাইট ফিটিং স্কি প্যান্ট।
পেছনে হঠাৎ করে শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাল রানা। এইমাত্র স্কি করে এসে থেমেছে গার্ডিয়া সিভিলের মধ্যবয়স্ক এক অফিসার। পা থেকে স্কি খুলে ওর দিকে এল সে। একহাতে নোটবুক ও কলম। রানা খেয়াল করল, হোলস্টারের বোতাম আটকে রেখেছে লোকটা।
ওকে একবার দেখে নিয়ে লাশের পাশে থামল অফিসার। মৃতদেহের দিকে ঝুঁকে খস খস করে কী যেন লিখল নোটবুকে। মৃতের পাল্স্ আছে কি না, সেটা বোঝার জন্যে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল মশার ঘাড়। পাস্ নেই দেখে নিয়ে তুষারে পড়ে থাকা কাগজপত্র তুলে চোখ বোলাল। আনমনে কী যেন বলে মন দিল রাইফেল ও স্কোপের প্রতি।
চুপ করে আছে রানা।
‘আপনাকে বিরক্ত করছি সেজন্যে মাফ করবেন, সেনোর,’ একবার কেশে নিয়ে ইংরেজিতে বলল অফিসার।
মৃদু হাসল রানা। ‘জানলেন কীভাবে যে আমি ইংরেজি জানি?’
‘ধারণা করেছি,’ বলল সে। ‘সেনোর, আপনি কি এই হত্যাকাণ্ডের একজন সাক্ষী?’
কাঁধ ঝাঁকাল রানা।
‘আপনি হয়তো স্রেফ সাক্ষী নন, এর মৃত্যুর জন্যে দায়ী।’
এবার ওকে গ্রেফতার করতে চাইবে লোকটা, ভাবল রানা। আসামীর আইনগত কোন্ কোন্ অধিকার আছে, সেটা জানায় না স্পেনের পুলিশ। অপরাধীর কোন অধিকারই থাকে না।
ওয়ালেট বের করতে উইণ্ডচিটারের চেইন খুলবে বলে হাত ওপরে তুলল রানা। আর সঙ্গে সঙ্গে হোলস্টার থেকে .৪৫ কোল্ট পিস্তল বের করে ওর দিকে তাক করল লোকটা।
নরম সুরে বলল, ‘সেনোর, পকেট থেকে কিছু দয়া করে বের করবেন না।’
‘পরিচয়-পত্র বের করছি,’ হাসি-হাসি চেহারা করল রানা। ‘যাতে জানাতে পারি, আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন ম্যালাগার সেনোর বার্টি এইচ. স্মিথ।’
এ-কথায় কী যেন ভেবে রানার হাত থেকে ওয়ালেট নিল অফিসার। আইডি কার্ড দেখে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। আগেই আপনার কথা আমাদেরকে বলা হয়েছে।’ রানার হাতে ওয়ালেট ধরিয়ে দিল সে। ‘বিরক্ত করেছি সেজন্যে দুঃখিত, সেনোর। আমার আর কিছু জানার নেই। আপনি এখন চলে যেতে পারেন।’
বিএসএস এজেন্ট বার্টির লম্বা হাতের দৌড় দেখে মনে মনে হাসল রানা। গার্ডিয়া অফিসারের দিকে তাকাল। ‘আপনি কি একে চেনেন?’
মাথা নাড়ল অফিসার। ‘না, আগে দেখিনি। তবে সে আসলে কে এবং কোথা থেকে এসেছে, সবই জেনে নেব।’
‘আমার বোধহয় একটা কথা বলা উচিত,’ বলল রানা। ‘এই লোক বোধহয় ম্যালাগায় একজনকে খুন করেছে।’
‘তা-ই?’
‘এ-ছাড়া খুন করেছে গত দু’রাত আগে প্রাডো লানোতে ছোট এক ছেলেকে।’
সরু হলো অফিসারের চোখ। ‘আপনি অনেক কিছু জানেন দেখছি, সেনোর।
‘খুব কমই জানি,’ বলল রানা।
পা ঠুকে খটাস্ করে ওকে স্যালিউট দিল অফিসার। ‘ঠিক আছে, আপনাকে দেরি করিয়ে দিতে চাই না। এবার বরং এখান থেকে চলে যান। যে-কোন সময়ে এখানে আসবে আমার জুনিয়র অফিসার। কম বয়স ওর। অনেক কিছু বুঝতে চাইবে না।’
ঢালু পাহাড়ের দিকে তাকাল রানা। ওপর থেকে স্কি করে নেমে আসছে আরেক গার্ডিয়ার অফিসার।
‘আপনাকে ধন্যবাদ,’ মধ্যবয়স্ক অফিসারকে বলল রানা।
কোমর পর্যন্ত বাউ করে আরেকবার রানাকে স্যালিউট দিল সে। ‘সেনোর স্মিথকে জানাব, আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’
জুতোয় স্কির ক্ল্যাম্প আটকে পোল দুটো হাতে নিল রানা। ঘুষখোর অফিসারের কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে রওনা হয়ে গেল নিচে প্রাডো লানো লক্ষ্য করে। মিনিট বিশেক পর পৌছুল হোটেলের কাছে। লাউঞ্জে ঢুকে ফায়ারপ্লেসের কমলা দাউ-দাউ আগুনের পাশে দেখতে পেল মারিয়াকে। আপাতত লাউঞ্জে আর কেউ নেই।
খুশিতে ঝলমল করছে মেয়েটার মুখ। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘হাতে সব পেয়ে গেছি!’
মৃদু মাথা দোলাল রানা।
‘নিচে মনে হলো কোন ঝামেলা হয়েছে,’ বলল মারিয়া।
‘কিউলেক্স আমার হাতে খুন হয়ে গেছে,’ বলল রানা।
কথাটা শুনে ফ্যাকাসে হলো মারিয়ার মুখ। ‘সে কীভাবে জানল যে আমরা কেবল-কারে আছি? তুমি, আমি আর মোরেলি ছাড়া তো আর কারও জানার কথা নয়!’
‘তুমি কি সত্যিই ভাবছ কার্সন আসলে মোরেলি?’ জানতে চাইল রানা। কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। ‘ড্রাগের রুটের ব্যাপারে অনেক কিছুই সে জানে। এ বিষয়ে
এ-বিষয়ে আমার হাতে একটা মাইক্রোফিল্ম দিয়েছে। নকল কারও তো এটা করার কথা নয়।’
‘আজকে বিকেলে গ্রানাডায় যাব,’ বলল রানা। ‘জিনিসটা তুলে দেব একজনের হাতে। ফিল্মটা সত্যি না মিথ্যা, সেটা জেনে নিতে এক দিনের বেশি লাগার কথা নয়।’
মাথা দোলাল মারিয়া। কী যেন ভাবছে। মুখ তুলে তাকাল রানার চোখে। ‘সরি, যে-কাজ দেয়া হয়েছিল, সেটা পারিনি। আসলে চট করে জানার উপায় নেই মাইক্রোফিল্ম খাঁটি কি না।’
‘এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না,’ বলল রানা, ‘বিসিআই বা বিএসএস-এর বিশেষজ্ঞরা সহজেই সব বুঝবে।’
‘আসলে জানিও তো না কেন আমাকে এখানে পাঠানো হলো,’ ঠোঁট ফুলিয়ে রানাকে দেখল মারিয়া।
‘কাজে সাহায্য করার জন্যে,’ বলল রানা, ‘আর সেটা তুমি করেছ। এত ভেবো না।
চুপ করে আগুনের ধারে বসে থাকল মারিয়া।
নিজেদের সুইটে ফিরল রানা। পোশাক পাল্টে আবার নেমে এল নিচে। হোটেল ত্যাগ করে চলে গেল কেবল- কারের জংশনে। বিশ মিনিট পর পৌঁছুল গাড়ি মেরামতির গ্যারাজে। ওকে দেখে দুঃখ প্রকাশ করল মেকানিক। ‘সরি, সেনোর, আশা করি দুপুর দুটোর আগে আপনার গাড়ি ফেরত দিতে পারব। তাতে কোন অসুবিধে নেই তো?’
কাঁধ ঝাঁকাল রানা। ‘অসুবিধে নেই। তবে কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে গাড়িতে, সেটা জানতে এসেছি।’
‘ব্রেকের ফ্লুইড সব পড়ে গেছে, সেনোর।’
‘সেটা কীভাবে হলো?’
‘আসলে সমস্যা পাইপ লাইনে,’ চুপ হয়ে গেল মেকানিক।
‘একটু ব্যাখ্যা করে বলুন,’ বলল রানা।
‘বড় অবাক কাণ্ড, সেনোর,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেকানিক। ‘নইলে তো আর পাইপ লাইন থেকে ফ্লুইড পড়ার কথা নয়। আসলে এটা তো কোনভাবেই সম্ভব নয়।’
‘তো তা হলে কী হয়েছিল?’ জবাবটা কী হবে, ভাল করেই বুঝে গেছে রানা।
‘ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে লাইন। সেটা করেছে কোন এক অমানুষ। আপনি দুর্ঘটনায় পড়ে মারাও যেতে পারতেন। রানার চোখে তাকাল মেকানিক। ‘এটা করেছে আপনার- কোন জন্মশত্রু, সেনোর। সে হয়তো কোন মহিলার প্রতারিত স্বামী।’
স্পেনের মানুষ খুব রোমান্টিক, ভাবল রানা। মুখে বলল, ‘ঘটনা হয়তো তা-ই। তবে মেয়েটা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী।’
ঝলমল করে উঠল মেকানিকের মুখ। ‘বাহ্! তা হলে তো আপনার জীবনের সেরা মুহূর্ত পেয়ে গেছেন!
‘আমি তা হলে দুটোর সময় গাড়ি নিতে আসব।’
‘আরেকটা কথা, সেনোর,’ বলল মেকানিক।
‘সেটা আবার কী?’
দ্বিধায় পড়ে গেছে লোকটা। আশপাশে কেউ আছে কি না সেটা চট্ করে দেখে নিল, তারপর পকেট থেকে বের করল ছোট্ট এক কয়েনের মত কিছু। ‘সেনোর, এটা কি আপনার?’
মেকানিকের হাতের তালু থেকে ওটা নিয়ে দেখল রানা। যন্ত্রটা আধুনিক এক ম্যাগনেটিক গুবরে পোকা। একই সঙ্গে ট্র্যান্সমিটার ও ডিরেকশন ফাইণ্ডার। বহু দিন ধরেই পেশাদার গুপ্তচরেরা ব্যবহার করে। তৈরি করা হয়েছে জাপান বা জার্মানিতে।
‘এটা যে কী, সেটা জানি না,’ বলল রানা।
‘আমিও না, সেনোর।
‘কোথায় পেলে এটা?’
‘রেঁনো গাড়ির অ্যাক্সেলের কাছে।’
‘হয়তো হাইওয়েতে চলার সময়ে গাড়িতে আটকে গেছে।
‘ওটার ভেতরে চুম্বক আছে। ভাবলাম, এটা দেখলে আপনি হয়তো অবাক হবেন।’
‘অবাক তো হয়েইছি।’ পকেটে গুবরে পোকা রেখে দিল রানা। ওয়ালেট থেকে দশ হাজার পেসেতা নিয়ে ধরিয়ে দিল মেকানিকের হাতে। ‘এটা তোমার মুখ বন্ধ রাখার জন্যে।’
ঘন ঘন মাথা দোলাল লোকটা। বুঝেছি, সেনোর।’
‘আমিও বুঝেছি,’ মনে মনে বলল রানা। গাড়িতে গুবরে পোকা রেখে কার্সন ওরফে মোরেলি আর ওর কথা কান পেতে শুনেছে কিউলেক্স। পরে আজ সকালে গেছে টার্গেটকে খুন করতে, আর তখন নিজেই হয়ে গেছে খুন।
Chapter - 15
পনেরো
রেঁনো গাড়িটা বাইরের পার্কিংলটে রেখে আলহাব্রা গার্ডেনে ঢুকেছে রানা ও মারিয়া। এরপর এক মিনিট পেরোবার আগেই ওদের সঙ্গে এসে দেখা করেছে কালচে রঙের এক যুবক। দেখলে মনে হয় জাতে সে জিপসি। মাথার কোঁকড়া চুল খয়েরি। ভাসা-ভাসা চোখ দুটো কুচকুচে কালো, রানার মতই। এখন তারই পিছু নিয়ে হাঁটছে রানা ও মারিয়া।
‘আন্দালিউসিয়ার তুলনায় পরিবেশ এখন বহুৎ গরম,’ নিখুঁত বাংলায় বলল শায়েদ আনন্দ।
‘মরোক্কোর জন্যে তো আর নয়,’ মন্তব্য করল রানা।
মাথা দুলিয়ে, সায় দিল যুবক। একটা পেপার গাছের নিচে পৌঁছে বেঞ্চ দেখাল সে।
বেঞ্চে পাশাপাশি বসে পড়ল ওরা।
একটু দূরে মুরদের তৈরি বিশাল খিলানের উল্টোদিকে রোদ পড়ে ঝলমল করছে পুকুরের টলটলে জল।
‘আপনার জন্যে নতুন খবর আছে,’ নিচু গলায় বলল আনন্দ। ‘ট্যুর শেষ হয়ে গেলে সবই বলব।’
‘কী ধরনের খবর?’ জানতে চাইল রানা।
ঠোঁটের ওপরে ডান তর্জনী রাখল যুবক। ‘টিলার ওদিকে যাওয়ার পর বলব।’ হাতের ইশারায় আলহামব্রা গার্ডেনের উত্তর দিকের টিলা দেখাল সে। ওদিকে আছে একের পর এক গভীর গুহা। ওখানে বাস করে জিপসিদের অনেকে। নিজেই এসব তথ্য দিয়েছে শায়েদ আনন্দ।
‘ঠিক আছে, ট্যুর শেষ হলে আমরা থামব আলহামব্রার প্রবেশ-পথের কাছে,’ বলল রানা।
এমনিতেই হালকা হয়ে গেছে আলহামব্রা দেখতে আসা ট্যুরিস্টদের ভিড়। প্রবেশ-পথ পার করে পার্কিংলটের দিকে চলেছে অনেকে।
মিনিট পাঁচেক পর রানা ও মারিয়াকে নিয়ে পার্কিংলটে এসে থামল আনন্দ।
‘তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আহা, সে-কথা বলে বুকে আর কষ্ট দেবেন না, ‘ একগাল হাসল নকল জিপসি। করুণ চোখে দেখল মারিয়াকে। ‘সত্যি বলতে আমার আছে মাত্র একটা পুরনো ল্যামব্রেটা।’
‘তা-ই বলে তোমার এত কষ্ট পাওয়ার তো কিছু নেই,’ কাঠখোট্টা সুরে বলল রানা। বুঝে গেছে, মারিয়ার সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে যুবক। ‘আমাদের সঙ্গে চলো। কাজ শেষ হলে আবারও তোমাকে পৌঁছে দেব ‘ল্যামব্রেটার কাছে।’
‘আপনি, ভাই, বড় পাষণ্ড,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল আনন্দ। ‘আমি তো বুকের কষ্ট বলছি ম্যাডামকে।’
‘অত কথা বলতে নেই,’ বলল রানা।’তোমার বউ জেনে গেলে রাতে আর পেটে খাবার জুটবে না।’
‘নীলা?’ বড় করে ঢোক গিলল যুবক।
‘হ্যাঁ, নীলা,’ কড়া চোখে ওকে দেখল রানা। বিসিআই থেকে ওকে বলা হয়েছে, দু’বছর হলো স্পেনের নামকরা এক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে ভবঘুরে স্বভাবের বাঙালি যুবক শায়েদ আনন্দের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেছে ঢাকার মেয়ে নীলা কুণ্ডু। তারপর থেকে বিসিআই-এর হয়ে কাজ করছে ওরা স্বামী-স্ত্রী।
আধহাত জিভ বের করল আনন্দ। ‘রাম, রাম! আমি আবার কী বললাম!’
‘টিলা বেয়ে উঠতে গিয়ে সময় নেবে, তাই গাড়ি করে আমাদের সঙ্গে চলো। তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘নীলা আর আমি থাকি দুঃখজনক এক গুহার ভেতরে,’ করুণ চোখে মারিয়ার দিকে তাকাল যুবক।
জবাবে কড়া চোখে তাকে দেখল মারিয়া।
‘মিথ্যা বলছ না তো,’ বলল রানা। ‘গুহার ভেতরে হয়তো লুকিয়ে রেখেছ সাত ঘড়া সোনার মোহর!’
‘না, না, ব্রাদার, ওসব কোথায় পাব!’
রেঁনোর পেছনের সিটে উঠল আনন্দ ও মারিয়া। ড্রাইভিং সিটে উঠে দরজা আটকে নিল রানা। ‘পথ দেখাও।’
‘সোজা যান, তারপর ডানে বাঁক নেবেন,’ বলল যুবক। ‘তারপর পৌঁছে যাব আমাদের বাড়িতে।’
কিছুক্ষণ পর রেঁনো থামল উঁচু এক টিলার সামনে। ওটার গায়ে রয়েছে অসংখ্য গুহা। এখানে-ওখানে একটা-দুটো করে পেরোজেও গাড়ি ও কমদামি মোটর সাইকেল।
‘আমরা গুহায় গিয়ে বসব,’ বলল যুবক।
রিয়ার ভিউ মিররে তাকে দেখল রানা। ‘এবার বলো তোমার সেই খবরটা কী?’
‘আপনাকে ম্যালাগায় সেনোর স্মিথের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছে।’
‘কী কারণে, সেটা কি জানো?’
‘তা জানি না।’
‘তোমার এনক্রিপ করা ফোন আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘গুহায় পাবেন, বড় এক গুহামুখ দেখাল আনন্দ। ‘চলুন, ভেতরে যাওয়া যাক।
গাড়ি থেকে নেমে শায়েদ আনন্দের পিছু নিল ওরা। গুহার ভেতরে স্বাভাবিক যে-কোন বাড়ির মত আসবাবপত্র। মেঝের ওপরে সস্তা কার্পেট। দেয়ালের নানান জায়গায় ইলেকট্রিক সকেটে জ্বলছে ন্যাংটো বাল্ব ও মাঝারি মানের ল্যাম্প। প্রধান গুহার ভেতরের বাতাসে ভাসছে বাঙালিদের প্রিয় সব খাবারের সুবাস। পেছনের এক ছোট গুহা থেকে এল খুন্তির টুং-টাং শব্দ। রিনরিনে একটা কণ্ঠ এল ওদিক থেকে, ‘বাড়ি ফিরলে?’
‘না ফিরে কি আমার উপায় আছে?’ জবাবে বলল শায়েদ। ‘আমাকেও তো বাঁচতে হবে!’
‘বেশি কথা বলে!’ চাপা এক গর্জন এল রান্নাঘর থেকে।
বড় গুহার একদিকে চওড়া বুকশেলফ্। ওটার তিন নম্বর তাক থেকে মোটা এক বই সরাল নীলার স্বামী। গর্তের ভেতরে হাত ভরে বের করল ছোট এক টেলিফোন সেট ওটার একটা বাটন টিপে দিতেই জ্বলতে লাগল লাল বাতি। ডায়াল করে কয়েক সেকেণ্ড পর সেটের একটা বাটন টিপে দিল সে।
‘বার্টি?’ স্পিকারে বলল রানা। ‘জরুরি কিছু বলবি?’
‘ম্যালাগার মেয়েটা… সে যাচ্ছে সোল ই নিয়েরেতে।’
‘তো?’
‘তুই কি কোন বিপদে পড়েছিস? আমাদের তো বললি না যে নোবলম্যানের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে কি না।’
মন দিয়ে কথা শুনছে মারিয়া।
‘দেখা হয়েছে, তবে সে নোবলম্যান কি না, সেটা আমি এখনও জানি না,’ বলল রানা।
কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবার পর বলল বার্টি, ‘শোন, নোবলম্যানের কাছ থেকে ফোন পেয়েছে মেয়েটা। লোকটা বলেছে; রিসোর্টে গত দুই রাত আগে তার ইনফর্মার ছেলেটাকে খুন করা হয়েছে। আর আজ সকালে খুন হয়েছে আরেকজন!’
‘জানি।’
‘নোবলম্যান এখন তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না। বলেছে, পরে যোগাযোগ করবে।’
‘এর কারণটা কী?’ জানতে চাইল রানা।
‘বুঝতেই তো পারছিস, ভয় পেয়ে গেছে সে। ভাবছে, তাকে খুন করার জন্যে নতুন আরও কোন ফাঁদ পেতেছে মাফিয়া।’
‘তাকে দোষ দেয়া যায় না,’ বলল রানা।
‘তার প্রেমিকা এখন লাল এক জাগুয়ারে চেপে সোল ই নিয়েরের দিকে যাচ্ছে,’ বলল বার্টি।
‘কিন্তু’ আসছে কেন?’
‘বলেছে, জরুরি ভিত্তিতে নোবলম্যানের সঙ্গে তোদের মিটিঙের ব্যবস্থা করবে।’
‘এক মিনিট, বার্টি,’ বলল রানা, ‘এলিনা বা আমি দু’জনই চিনি নোবলম্যানকে। এর মানে বুঝতে পারছিস?’
‘বুঝেছি।’
‘কাজেই মনে হচ্ছে না যে নোবলম্যানের সঙ্গে দেখা করতে আসছে মেয়েটা।’
‘তুই বোধহয় সত্যিকারের নোবলম্যানের হদিস পাসনি।’
‘হয়তো তা-ই। আমাদের পক্ষের কেউ কখনও তাকে দেখেনি। যদিও আমাদের হাতে মাইক্রোফিল্ম দিয়েছে একজন। এ থেকে কী বুঝলি?’
‘এলিনা জোর দিয়ে বলেছে, আসল নোবলম্যানের সঙ্গে তোর দেখা হয়নি। সত্যিকারের নোবলম্যান চাইছে আবারও কর্সিয়ায় গিয়ে লুকিয়ে পড়তে। সেক্ষেত্রে কোনভাবেই আমরা তার কাছ থেকে ব্ল্যাক লিস্ট পাব না।’
‘অর্থাৎ আমার বস্ আর মিস্টার লংফেলো ভাবছেন আসল লোকের সঙ্গে দেখা হয়নি আমার,’ বলল রানা।
‘বোধহয় তা-ই।’
‘বুঝলাম,’ বলল রানা। ‘সেক্ষেত্রে দুটো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এক, নোবলম্যান সঠিক লোক। দুই, আমার সঙ্গে যে দেখা করেছে, সে এক ঠগ। বার্টি, তুই দেরি না করে চলে আয় সোল ই নিয়েরেতে।’
‘কী কারণে?’ জানতে চাইল বিএসএস এজেন্ট।
‘তোকে চাইছি কারণ তোর সাহায্য আমার লাগবে। আমাদের জানতে হবে কে আসলে নোবলম্যান।’
‘কী করতে হবে আমাকে?’
‘পরে বলব। চলে আয় আগামীকাল।’
‘কোথায় আসব?’
‘আসবি সোল ই নিয়েরের সিয়েরা নেভাডা হোটেলে।’
‘ঠিক আছে।’
লাইন কেটে দিল রানা। ওর থমথমে চেহারার দিকে চেয়ে আছে মারিয়া। নিচু গলায় জানতে চাইল, ‘এবার কী করবে?’
বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখছে আনন্দ। তাকে পাত্তা না দিয়ে মারিয়াকে বলল রানা, ‘আনন্দের কাছে মাইক্রোফিল্ম দাও।’ .
হাতব্যাগ খুলে জিনিসটা নিয়ে যুবকের হাতে দিল মারিয়া। চোখ তুলে তাকাল রানার চোখে।
‘গোটা রোল ব্লো করে তারপর বিসিআই-এর কাছে পাঠিয়ে দেবে,’ আনন্দের উদ্দেশে বলল রানা।
‘ওটা করবে নীলা,’ বলল যুবক।
‘রেঁনো নিয়ে সোল ই নিয়েরেতে ফিরে যাবে, মারিয়া,’ বলল রানা।
‘আর তুমি?’ চোখ সরু করে ওকে দেখল মেয়েটা।
‘আমি যাব এলিনার সঙ্গে মাঝপথে দেখা করতে।’
‘কিন্তু সেটা করতে হবে কেন?’
‘কারণ, মেয়েটা একবার রিসোর্টে গেলে হয়তো অন্যদের চোখে ধরা পড়বে সত্যিকারের মোরেলি।’
‘কিন্তু…’
‘মাফিয়ার লোক খুন করতে চাইছে তাকে,’ মারিয়াকে মনে করিয়ে দিল রানা।
‘সে কে হতে পারে?’
‘ধরে নাও সে জন কার্সন ওরফে মোরেলি।’
অবাক চোখে ওকে দেখল মারিয়া। ‘কিন্তু কেন ধরে নিচ্ছ যে কার্সন আসলে মোরেলিকে খুন করতে চাইছে?’
‘কারণ, সে আর কিউলেক্স ছাড়া অন্য কারও এত গরজ নেই।’
সেক্ষেত্রে মোরেলিকে খুন করতে চেয়েছে আলাদা দু’জন খুনি?’ ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল মারিয়া।
‘বোধহয় মাফিয়া নিয়োগ দিয়েছে দু’জন খুনিকে। একজন ব্যর্থ হলেও যেন আরেকজন সফল হয়।’
‘তা হলে তো ঘটনা আরও জটিল হয়ে গেছে!
‘জীবন সবসময় বড় জটিল, মারিয়া,’ বলল রানা, ‘একটু ভেবে দেখো, কার্সন চাইছে মোরেলিকে খুন করতে। কিন্তু নিজের চোখে তাকে কখনও দেখেনি। তবে এটা জেনেছে, মোরেলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছি তুমি আর আমি। কাজেই প্রথম সুযোগে আমাদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে সে।’
রানার কথা শুনে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মারিয়ার মুখ।
‘এবার ভেবে দেখো, রিসোর্টে ট্রাট্টু যখন খুন হয়ে গেল, তার আগেই কিউলেক্স আর কার্সনকে ভাড়া করেছে মাফিয়া কমিশন। আর আমি ইঞ্জিন-রুমে মৃতপ্রায় ছেলেটার কাছ থেকে কথা শোনার সময়ে ওখানে লুকিয়ে ছিল কার্সন। আমার কথা এ-পর্যন্ত বুঝতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপর’ মনুমেন্টে’ গিয়ে মোরেলিকে খুন করতে চাইল কার্সন। কিন্তু মোরেলি ওখানে গেলই না। তার বদলে হাজির হলাম আমি। তাতে মাথায় বাজ পড়ল কার্সনের।’
‘কিন্তু সত্যিকারের মোরেলি ওখানে গেল না কেন?
‘বার্টির কথা তো আগেই শুনেছ। ট্রাট্টু মারা যাওয়ায় গা ঢাকা দিয়েছে আসল মোরেলি।’
‘কিন্তু ওখানে গিয়ে মোরেলিকে কেন খুন করতে চাইল কার্সন?’
‘সেটা আমি এখনও জানি না,’ বলল রানা, ‘তবে মনে হচ্ছে ইঞ্জিন-রুমে মৃতপ্রায় ছেলেটার শেষ কথাগুলো শুনেছে। আর সেজন্যেই মোরেলিকে খুন করতে ভেলেটায় গেছে।’
ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল মারিয়া।
ওখানে ছিলাম কার্সন আর আমি,’ বলল রানা। ‘আমি যে মোরেলি নই সেটা জেনে গেল সে। এ-ও বুঝল, কোথায় গিয়ে দেখা করব মোরেলির সঙ্গে। তাই মনুমেন্টে যখন মোরেলি এল না, দেখা করে আমাকে বলল কার্সন, সে-ই আসলে মোরেলি। এরপর বাকি সময়ে অভিনয় করে গেছে সে।’
‘কিন্তু আমার হাতে যে দিল মাইক্রোফিল্ম?’
ওটা সত্যিকারের কি না, আমরা চেক করে দেখব। তখন বাদ পড়বে না মাফিয়া ডনদের নাম, ছবি, ঠিকানা, সঠিক জায়গা আর তারিখ এসব জানতে।’
‘তা হলে…..’
‘আমার ধারণা: আমাদেরকে নকল মাইক্রোফিল্ম দিয়েছে কার্সন। কেবল-কারে এমন ভান করেছে, যেন সে-ই মোরেলি। আর ওদিকে সত্যিকারের মোরেলিকে পেয়ে গেছে ভেবে ওকে খুন করতে গিয়ে আমার হাতে খুন হয়েছে কিউলেক্স।’
‘কিন্তু আমরা কোথায় দেখা করব, সেটা কীভাবে জানল সে?’
‘গুবরে পোকা রেখেছে কিউলেক্স রেঁনোর নিচে,’ বলল রানা।
‘কার্সন তা হলে এখন কী করতে চায়?’ জানতে চাইল মারিয়া।
‘এলিনার জন্যে অপেক্ষা করছে সে। ক্যাথিকে বোকা মনে করে আগেও ফোন করেছে মোরেলির প্রেমিকার কাছে। কার্সন ভাল করেই জানে, আগে হোক আর পরে, ‘সোল ই নিয়েরেতে যাবে এলিনা। আর তখন প্রথম সুযোগে সত্যিকারের মোরেলিকে খুন করবে সে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’
‘কিন্তু এলিনাকে তুমি মাঝপথে থামিয়ে দিলে আমাদের আসলে কী লাভ?’
‘মেয়েটাকে জানিয়ে দেব, সে সোল ই নিয়েরেতে এলে তার কারণে খুন হবে সত্যিকারের মোরেলি।
মাথা দোলাল মারিয়া। ‘বুঝেছি। না হয় কথা বললে মেয়েটার সঙ্গে, কিন্তু তারপর কী করবে?’
‘পরে কী করব সেটা এখনও ভাবিনি,’ বলল রানা।
.
শায়েদ আনন্দ আর রানাকে নিয়ে গ্রানাডায় পৌঁছে এক কার রেন্টাল অফিসের সামনে রেঁনো রাখল মারিয়া। গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া করার জন্যে কার রেন্টাল দোকানে ঢুকল রানা। ওদিকে আনন্দকে আলহাব্রা পার্কের সামনে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিল মারিয়া। তারপর ফিরে চলল সোল ই নিয়েরের হোটেলে।
এদিকে পরের দশ মিনিটে টাকা পরিশোধ করে তেইশ সালের নীল রঙের এক সিট অ্যাটেকা গাড়ি ভাড়া করল রানা। প্রায় নতুন গাড়িটা চালিয়ে উঠে এল ম্যালাগা-গ্রানাডা হাইওয়েতে। ঝোড়ো বেগে চলেছে ম্যালাগার দিকে। শেষ বিকেলে জ্বলজ্বল করছে স্পেনের সোনালি রোদ। সোল ই নিয়েরের দিকে লাল কোন জাগুয়ার যেতে দেখলে ওটাকে থামাবে রানা।
টানা পঁচিশ মিনিট ম্যালাগার দিকে এগোবার পর ঢালু উপত্যকার দূরে লাল জাগুয়ার দেখতে পেল ও। কড়া ব্রেক কষে ঘুরিয়ে নিল অ্যাটেকা। থেমে গেল গমের এক বিশাল খেতের পাশে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পেল ক্রমেই এগিয়ে আসছে লাল গাড়িটা।
এক শ’ ফুটের ভেতরে জাগুয়ার পৌঁছে যেতেই হাত বের করে ওটার ড্রাইভারকে থামাবার ইশারা করল রানা।
অ্যাটেকা গাড়ি থেকে হাত বের করেছে কেউ, সেটা দেখতে পেয়েছে মেয়েটা। অবাক হলেও রানার গাড়ির পেছনে এসে থামল সে। গাড়ি থেকে নেমে জাগুয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল রানা। কয়েক দিন ক্লিনিকে বিশ্রাম নিয়ে যেন আগের চেয়েও সুন্দরী হয়ে গেছে এলিনা পার্কারসন। একবার মুখের দিকে তাকালে বারবার ফিরে দেখতে ইচ্ছে হয়। মেয়েটার পরনে এখন সবুজ সোয়েটার ও ধূসর স্কার্ট।
‘সেনোর স্মিথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে,’ নরম সুরে বলল রানা।
‘তা-ই? তা হলে তো তুমি জানো কেন এখানে এসেছি।’
‘হ্যাঁ, জানি। কিন্তু বদলে নেয়া হয়েছে আমাদের প্ল্যান।’ অবাক চোখে ওকে দেখল এলিনা। ‘তা হলে কি এরই ভেতরে বাড়ি ফিরে গেছে মোরেলি?’
‘হয়তো তা-ই। আমরা সেটা এখনও জানি না। তবে অন্য ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
‘তুমি এসব কোথা থেকে জানলে?’ চোখ পিটপিট করে রানার দিকে তাকাল এলিনা।
‘আমি জেনেছি, কারণ নিজের পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছে মোরেলি।’
‘না, সেটা কখনও করবে না ও।’ রানার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে গমের খেতের দিকে তাকাল এলিনা। ‘তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করছ না, কিং? আমি শপথ করে বলতে পারি, একটা কথাও মিথ্যা কখনও বলিনি।’
‘আমি তোমাকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করি, এলিনা,’ বলল রানা। ‘তবে সমস্যা হচ্ছে, অন্য একজন দাবি করছে যে সে-ই আসলে মোরেলি।’
‘তা হলে তো মোরেলিকে সতর্ক করতে হবে…’
মাথা নাড়ল রানা। ‘কেউ না কেউ চাইছে তাকে খুন করতে। তুমি মোরেলির সঙ্গে দেখা করলেই খুনিও জানবে সে আসলে কে। কথাটা বুঝতে পেরেছ?’
ফ্যাকাসে হলো অপরূপা মেয়েটার মুখ। ‘বুঝতে পেরেছি,’ প্রায় ফিসফিস করে বলল। রানার চোখে তাকাল। ‘তুমি তা হলে আমাকে কী করতে বলো?’
‘আমি চাই তুমি যেন গ্রানাডায় রয়ে যাও।’
দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল এলিনা। ‘ওখানে খুব একা লাগবে আমার।’
‘ক্লিনিকে তো একাই ছিলে। পারবে না আর দু’এক দিন
একা থাকতে?’
‘খুব বিরক্তি লেগেছে ওখানে।
তোমার কাঁধের ক্ষতের কী অবস্থা?’
‘প্রায় সেরে গেছে।’ মিষ্টি করে হাসল এলিনা। ‘তুমি দেখতে চাও? দু’আঙুলে সোয়েটারের গলা টান দিয়ে ক্ষতটার ওপরে ছোট্ট ব্যাণ্ডেজ দেখাল মেয়েটা।
‘এলিনা, ভেবে দেখো গ্রানাডায় রয়ে যাবে কি না।’
‘ওখানে বসে কী করব?’
‘রাতে তোমাকে ডিনারে নিয়ে যাব,’ ষড়যন্ত্রের সুরে বলল রানা। ‘আর তারপর ঘুরে বেড়াব যেখানে তুমি যেতে চাইবে।’
জ্বলজ্বল করে উঠল এলিনার দুই চোখ। ‘সত্যি, কিং?’
হাসল রানা। ‘তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভাল লাগবে আমার।’
‘ঠিক আছে। তা হলে গ্রানাডাতেই থেকে যাচ্ছি।’
‘আমার গাড়ির পিছু নাও,’ বলল রানা। ‘ভাল কোন হোটেলে তোমাকে তুলে দেব।’
উত্তেজনায় চকচক করছে এলিনার চোখ।
‘আমরা একসঙ্গে ঘুরছি সেটা জানলে ভীষণ খেপে যাবে . মোরেলি। এটা একবার ভেবে দেখেছ?’
‘যা খুশি ভাবুক। আমি তো আর ওকে ভয় পাই না।’
‘আমিও না,’ মুচকি হাসল এলিনা।
বিপজ্জনক এক জীবন বেছে নিয়েছে মেয়েটা, মনে করেছে সর্বক্ষণ ফূর্তি করে কাটাবে, তবে জীবন কখনও এত সহজ হয়ে ওঠে না, আনমনে ভারল রানা।
.
গ্রানাডার শপিং এলাকার কাছে দুর্দান্ত দামি এক রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে নিল রানা ও এলিনা। এককোণে স্প্যানিশ মিউযিক বাজাল পাঁচ. মিউযিশিয়ান। একটু পর পর ওয়েটার এসে জানতে চাইল.আরও কিছু ওদের লাগবে কি না।
রাতের শহর গ্রানাডার চারপাশে দোকানগুলোয় ঝলমল করে অসংখ্য বাতি। পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত ট্যুরিস্ট। রাত দশটা বাজলেও বাইরে রয়ে গেছে শহরের নাগরিকেরা। সবার জন্যে অপরাধ-মুক্ত সুন্দর এক পরিবেশ উপহার দিয়েছে গার্ডিয়া সিভিলের অফিসারেরা।
রাত সাড়ে দশটার দিকে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে হোটেলে পৌঁছে গেল রানা ও এলিনা। হোটেলের ডেস্ক থেকে চাবি সংগ্রহ করল রানা। এলিনাকে নিয়ে এগোতেই খেয়াল করল, ম্যালাগার মতই এলিনার সঙ্গে ওকে দেখে চরম বিদ্বেষ নিয়ে চেয়ে আছে হোটেলের বেশ ক’জন অতিথি।
লিফটে করে উঠে লাল গালিচার করিডরে পা রাখল ওরা। প্যাসেজের শেষমাথায় বিশাল এক বিলাসবহুল সেটি। পেছনের দেয়ালে ঝুলছে ফুলদানিতে তাজা সাদা ও লাল ফুল। সুইটের দরজার সামনে থেমে রানার চোখে চেয়ে চোখ টিপল এলিনা। ‘তুমি কি তালার ভেতরে ভাল করে চাবি ঢোকাতে পারো?’
‘খুবই ভালভাবে,’ মৃদু হাসল রানা। .
‘তা-ই? তো তুমিই বরং তালায় আজ চারি দাও,’ চকচক করছে এলিনার নীল দুই চোখ।
চাবি দিয়ে সুইটের দরজার তালা খুলল রানা। ঘুরে দেখল এলিনার চোখ। কেন যেন খিলখিল করে হাসল মেয়েটা। হাতে হাত রেখে সুইটের ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা।
বেডরুমের বাতি জ্বেলে প্রকাণ্ড বেডের পাশে গিয়ে থামল এলিনা, চোখে কীসের এক ঘোর নিয়ে দেখছে রানাকে। কখন যেন ফেলে দিয়েছে কাঁধের ছোট্ট ব্যাণ্ডেজ। সোয়েটার খুলে আঙুল তাক করল ক্ষতের ওপরে। ‘ভেবো না এটার জন্যে কোন ধরনের ব্যথা পাব।’
‘বাতি?’ ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইল রানা।
‘থাকুক না! আজকের রাত হোক আলোকিত।’ ঝুপ করে কার্পেটে পড়ল এলিনার ধূসর স্কার্ট।
মেয়েটার সামনে গিয়ে থামল রানা। দু’গোড়ালি উঁচু করে ওকে দেখছে এলিনা। ওর কমলার কোয়ার মত ঠোঁটে নেমে এল রানার নিষ্ঠুর ঠোঁট। পরক্ষণে ব্যস্ত হয়ে গেল ওরা।
Chapter - 16
ষোলো
পরদিন সকাল।
হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে আছে রানা ও এলিনা। ওদের মত যারা ব্রেকফাস্ট করতে এসেছে, বারবার ঘুরে ঘুরে দেখছে পরীর মত রূপসী মেয়েটাকে।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে বলল রানা, ‘তুমি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছ, হোটেল ছেড়ে কোথাও যাবে না।’
‘তবে আমার কিন্তু খুব খারাপ লাগবে,’ বলল এলিনা। ‘স্কি করতে পারব না।’
‘তুমি সোল ই নিয়েরেতে গেলে মোরেলি হত্যার পুরো দায় চেপে বসবে তোমার মাথায়।’
‘সেটা বুঝতে পেরেছি,’ ঠোঁট ফোলাল এলিনা।
‘নিজেও তুমি খুন হয়ে যেতে পারো।’
‘ঠিক আছে, কিন্তু তুমি নিজে এখন কোথায় যাবে?’
‘ফিরব সোল ই নিয়েরের রিসোর্টে। কাজ শেষ করে এসে তোমার সঙ্গে দেখা করব।’
কিছুক্ষণ পর সুইটে এলিনাকে পৌঁছে দিল রানা। নেমে এসে হোটেল ত্যাগ করে গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে গেল। পাহাড়ি এলাকা সোল ই নিয়েরের উদ্দেশে ঝড়ের বেগে চলেছে।
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর ‘সোল ই নিয়েরেতে ওদের হোটেলের পার্কিংলটে গাড়ি রেখে লবিতে ঢুকল রানা। এদিকে-ওদিকে চোখ বোলাতেই দেখতে পেল, লাউঞ্জ থেকে সামান্য দূরে বারের স্টুলে বসে আছে ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বার্টি এইচ. স্মিথ। হাতে স্কচ উইস্কির প্রায় খালি গ্লাস।
গিয়ে তার পাশের স্টুল দখল করল রানা। ‘সকালেই চালু করে দিলি?’
‘না রে, এইমাত্র এসেছি।’
‘এত তাড়াতাড়ি এলি যে?’
‘মনে হলো আগেভাগেই আসি। আমাকে ডাকলি কেন? নিশ্চয়ই জরুরি কোন কাজ?’
‘এখানে থাকলেও মৃত্যুভয়ে দেখা দিচ্ছে না নোবলম্যান। ওদিকে নকল ‘ একজন ভান করছে, সে নাকি মোরেলি। আমার ধারণা সে মাফিয়ার পাঠিয়ে দেয়া খুনি। চাইছে আমরা যেন তাকে পৌঁছে দিই নোবলম্যানের কাছে।
‘তো এখন কী করতে চাস?’
‘তা হলে এবার শোন…’ বন্ধুর দিকে ঝুঁকে নিচু গলায় বলতে লাগল রানা।
কথা শেষ হলে পাঁচ মিনিট পর বার ত্যাগ করে নিজেদের সুইটে এল ও। পোশাক পাল্টে পাশের কামরার দরজায় ঠক- ঠক করে টোকা দিল।
একটু পর দরজা খুলল মারিয়া। ‘ও, তো ফিরেছ?’
‘একটু আগে,’ বলল রানা।
‘তো আজ আমাকে কী করতে হবে?
‘রাতে পাবে জরুরি কাজ।’
‘কী ধরনের কাজ?’ আগ্রহ নিয়ে রানাকে দেখল মারিয়া।
‘ক্যাথিকে যেভাবে হোক আটকে রাখবে লাউঞ্জে।’
‘আর তারপর?’
‘ওদিকে জরুরি কিছু কাজ সেরে নেব বার্টি আর আমি। তারপর তোমার ছুটি।’
সত্যিকারের কোন কাজ দেয়া হবে না ভেবে হতাশ হয়ে গেল মারিয়া। তবুও বলল, ‘কিন্তু ক্যাথি আবার কী দোষ করল? ওকে তো সরল মনের মেয়ে বলেই জানি।’
‘দোষী না নিরপরাধ সেটা পরে দেখব,’ বলল রানা। ‘বার্টি আর আমি একা চাই কার্সনকে। তখন যেন মেয়েটা ওখানে না থাকে।’
‘দেখি কী করতে পারি। এখন কী করবে বলে ভাবছ?’
‘আজ চমৎকার এই দিনে আমরা একসঙ্গে স্কি করব।’
‘এক্ষুণি আসছি!’ দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে ফিরল মারিয়া।
.
ছিমছাম এক রেস্টুরেন্টে লাঞ্চের বিরতির সময়টা বাদ দিলে সারাদিন তুষারে ছাওয়া পাহাড়ের ঢালে স্কি করল রানা ও মারিয়া। মোরেলি, এলিনা, কার্সন, ক্যাথি ও মুলারের কথা যেন ভুলেই গেল রানা। মাত্র দু’একবার মনে এল মিশন ব্ল্যাক লিস্ট সফল করার চিন্তা। আর ভাবল আজ রাতে কী করবে ওরা।
বিকেলে বোরেগুইলাসে কার্সন ও ক্যাথির সঙ্গে ওদের দেখা হলো। কেন যেন ভীত বলে মনে হলো মেয়েটাকে। ওদিকে আগের মতই ফূর্তিতে আছে কার্সন ওরফে মোরেলি।
‘আমরা সকাল থেকে দুর্দান্ত একটা সময় কাটালাম, তা-ই না, ক্যাথি?’ ব্রিটিশ সুরে বলল লোকটা।
‘তা-ই?’ অবাক হলো ক্যাথি।
‘আমি তো ভেবেছি তুমি খুশি হয়েছ! কী সুন্দর পরিবেশ! স্কি রান ছিল দেখার মত!’ মারিয়ার দিকে চেয়ে চওড়া হাসি দিল কার্সন। ‘আর আপনি? সুন্দরী লেডি?’ তার কণ্ঠে সত্যিকারের প্রশংসা।
‘ভালই তো লাগল সময়টা,’ জানাল মারিয়া।
‘গতকাল আপনাকে ডিনারে পাব ভেবেছিলাম। কোথায় ছিলেন আপনি?’
‘ঘরেই ছিলাম মাথা-ব্যথা নিয়ে,’ বলল মারিয়া।
‘এদিকে আমি ছিলাম গ্রানাডায়,’ জানাল রানা।
কথাটা শুনে কাঁধ ঝাঁকাল কার্সন। তাকে ডেকে নিয়ে নিচু গলায় বলল রানা, ‘আজ রাতে আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।’
‘তা-ই?’ একটু ফ্যাকাসে হলো কার্সনের মুখ।
‘ট্রিপের ব্যাপারে তোমাকে জানাব।’
‘কী ধরনের ট্রিপ? আমি তো কিছুই বুঝছি না, কিং!’
‘বাংলাদেশে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে।’
‘ও, তো জেনে গেছ মাইক্রোফিল্মে সবকিছু আছে?’
‘তা নয়। তবে মনে হচ্ছে, তোমার নিরাপত্তার জন্যেই আমাদের ভেতরে একটা মিটিং হওয়া উচিত।’
‘আমরা কোথায় বসব?’ খুক খুক করে গলা পরিষ্কার করে জানতে চাইল কার্সন।
‘কারও কামরায় নয়,’ বলল রানা, ‘আমার ধারণা, ওখানে কেউ ইলেকট্রনিক গুবরে পোকা রেখে গেছে।’
বিস্ফারিত হলো কার্সনের দু’চোখ। ‘তাই ভাবছ?’
ভণ্ড কোথাকার, মনে মনে বলল রানা। শালা, তুই নিজেই তো গুবরে পোকা রেখে গেছিস! ‘আমার তা-ই ধারণা।’
‘তা হলে কোথায় আলাপ করা যেতে পারে?’
‘নাইট ক্লাবে,’ বলল রানা।
‘হোটেলের বেসমেন্টে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার কোন আপত্তি নেই,’ রাজি হয়ে গেল কার্সন।
‘তা হলে ওখানে বসব আমরা রাত দশটার পর।’
‘বেশ।’
‘মারিয়াকে বলেছি, ও যেন ক্যাথিকে সঙ্গ দেয়,’ বলল রানা। ‘চাই না আমাদের আলাপে অন্য কেউ থাকুক।’
‘ঠিক আছে, বুড়ো খোকা!’
‘একসঙ্গে ডিনার সেরে তারপর ক্যাথিকে নিয়ে লাউঞ্জে যাবে মারিয়া।’
‘কাঁঠালের আঠার মত লেগে আছে ক্যাথি, এ-কথা ঠিক, ‘ ভুরু কুঁচকে বলল কার্সন।
‘তা হলে দেখা হবে রাতে,’ বলল রানা।
পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিল ওরা। রানা ও মারিয়া ফিরে এল হোটেলে।
ওদিকে আরও স্কি করতে রয়ে গেল কার্সন ও ক্যাথি। স্কি করার পর কিছু শপিং শেষ করে হোটেলে ফিরবে তারা।
হোটেলের সুইটে ফিরে ওর প্ল্যান আরও গুছিয়ে নিল রানা। রাত নয়টায় একই টেবিলে ডিনারে বসল ওরা। দশটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে খাবার সেরে গল্প করার জন্যে ক্যাথিকে নিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে বসল মারিয়া।
নিজেদের আলাপ সেরে নেয়ার জন্যে কার্সনকে সঙ্গে নিয়ে বেসমেন্টে নাইট ক্লাবে গিয়ে ঢুকল রানা।
এখনও লাউড স্পিকারে বাজতে শুরু করেনি মিউযিক। স্টেজে নাচের জন্যে তৈরি হচ্ছে নর্তকেরা। ঘরের এককোণে একটা টেবিল বেছে নিল রানা। দরকার আছে বলেই কার্সনকে জানাল ওর বামে বসতে। ডানের চেয়ার এখনও খালি। খেয়াল করেছে, যে-কোন সময়ে বাজতে শুরু করবে বাজপড়া বিকট মিউযিক। এরই ভেতরে মাতাল হয়ে গেছে কয়েকজন গেস্ট। সুস্থ সঙ্গীরা তাদেরকে জাপটে ধরে নাইট ক্লাব থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। পরের মিনিটে দূরে বার্টিকে দেখতে পেল রানা। একের পর এক টেবিল পাশ কাটিয়ে এসে ওদের টেবিলের কাছে পৌঁছে গেল সে। রানার দিকে চেয়ে আন্তরিক হাসি দিল। ‘আরেহ্, কিং! চলে এসেছ?’
‘বসে পড়ো, বার্টি, হাতের ইশারায় কার্সনের পাশে তাকে বসতে ইশারা করল রানা। ‘এসো, পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি জন কার্সন। আর এ আমার বন্ধু বার্টি এইচ. স্মিথ।’
আন্তরিক হেসে চেয়ার টেনে বসল বার্টি। হাতের ইশারায় ডেকে আনল এক ওয়েটারকে। তিন মিনিটের ভেতরে ওয়াইন দিয়ে গেল সে। পরের মিনিটে দপ করে নিভল সব বাতি। বদলে ছাতে জ্বলল ঘুরন্ত রঙিন আলো। শক্তিশালী কিছু বাতি গিয়ে পড়ল ড্যান্স ফ্লোরের ওপরে।
‘আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি ইতালিয়ান, হাসি- হাসি চেহারায় কার্সনকে বলল বার্টি।
‘আপনাকেও তো মনে হয় না,’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল কার্সন।
‘আমি তো আর ইতালিয়ান বলে নিজেকে দাবি করছি না,’ প্রাণখোলা হাসি হাসল বার্টি।
ওর কথায় সরু হয়ে গেল কার্সনের দুই চোখ। চট্ করে তাকাল রানার দিকে। নিস্পৃহ চেহারায় বসে আছে বিসিআই এজেন্ট। ‘কিং, এই ভদ্রলোক আসলে কী বলতে চাইছেন?’
‘মূল কথা: কীভাবে প্রমাণ করবে যে তুমিই আসলে মোরেলি?’ সহজ সুরে বলল রানা।
আরাম করে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল কার্সন। ‘আমার তো ধারণা এরই ভেতরে সব ধরনের প্রমাণ দিয়ে দিয়েছি। সেসব কি যথেষ্ট নয়?’
‘বাংলাদেশে তোমাকে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমাকে,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল বার্টি। ‘নকল কাউকে ওখানে পাঠাব না, কারণ তাতে অসম্মান হবে আমার ডিপার্টমেন্টের।’
‘আমি সত্যিই মোরেলি,’ কর্সিয়ান সুরে বলল কার্সন। ভেলেটায় এভাবেই কথা বলেছে।
চুপচাপ দু’জনের কথা শুনছে রানা।
‘আমরা আসলে সম্পূর্ণ আলাদা দুই বিষয় নিয়ে কথা বলছি, কার্সন, সহজ সুরে বলল বার্টি। ‘আমার ডিপার্টমেন্ট বলছে, বাংলাদেশে যেন পৌঁছে দেয়া হয় আসল রোমিয়ো মোরেলিকে। সে এমন এক লোক, যে কি না দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি ড্রাগ পাচার করত।’
‘আমিই সেই লোক,’ রেগে গিয়ে বলল কার্সন।
‘তা হলে বলছ তুমিই রোমিয়ো মোরেলি?’ মৃদু হাসল বার্টি। যদিও চোখ দুটো ওর বরফের মত শীতল।
‘হ্যাঁ, আমিই সে,’ জোর দিয়ে বলল কার্সন। চেপে বসেছে ঠোঁটে ঠোঁট। চেহারায় অজানা দুশ্চিন্তা।
‘সেটা আমার কাছে প্রমাণ করো, সেনোর মোরেলি!’
ঠোঁটে আঙুল রাখল কার্সন। ‘এত জোরে আমার নাম উচ্চারণ করবেন না! খুনিদের হাতে খুন হতে চাই না!’
‘এত শব্দে কেউ কিছু শুনবে না,’ বলল বার্টি। ‘আবারও বলছি: কী প্রমাণ আছে যে তুমি মোরেলি?’
‘আমি তো এরই ভেতরে মাইক্রোফিল্ম দিয়েছি!’ ধীরেসুস্থে কাঁধ ঝাঁকাল রানা।
শার্টের পকেট থেকে এনভেলপ নিল বার্টি। ওটার ভেতর থেকে বের করল এক রোল ফিল্ম। আস্তে করে রাখল টেবিলের মাঝে।
মাইক্রোফিল্মের দিকে চেয়ে আছে কার্সন। কয়েক সেকেণ্ড পর ফিসফিস করে বলল, ‘আমার নিজের দেয়া মাইক্রোফিল্ম?’
‘না। রোমিয়ো মোরেলির,’ শুকনো গলায় বলল বার্টি।
‘কিন্তু আমি তো কিংকে আসল মাইক্রোফিল্ম দিয়েছি!’
‘তোমার পক্ষে ওটা হাতে পাওয়া সম্ভব ছিল না, কার্সন।’
‘কেন অসম্ভব?’ শুকনো হাসল কার্সন। আবছা আলোয় তার চোখে আতঙ্ক দেখতে পাচ্ছে রানা।
‘কারণ, আমি নিজে আসলে রোমিয়ো মোরেলি, কার্সন,’ চাপা স্বরে বলল বার্টি। ‘পারলে অস্বীকার করো দেখি!’
গ্র্যানিট পাথরের মত হয়ে গেল কার্সনের চেহারা। স্কি রানে এ-ধরনের কালচে পাথর দেখেছে রানা। টেবিলের মাঝে পড়ে থাকা মাইক্রোফিল্মের দিকে চেয়ে আছে লোকটা। খুব ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল ফিল্ম। চেষ্টা করল ওটা খুলে দেখতে।
ভেতরের ম্যাটার এভাবে দেখতে পাবে না,’ বলল বার্টি ‘সবই আছে খুব ছোট আকারে। তা ছাড়া, ওটা ডুপ্লিকেট।’
পাতলা ঘামে ভিজে গেছে কার্সনের চেহারা। একবার ঢোক গিলে নিয়ে বলল, ‘ডুপ্লিকেট?’
‘অবশ্যই,’ বার্টির ঠোঁটে এখন শয়তানির হাসি।
মন দিয়ে দু’জনকে দেখছে রানা।
‘তা হলে সত্যিকারেরটা কোথায়?’ বলল কার্সন।
‘মিস্টার কিং ওটা পাঠিয়ে দিয়েছেন ঢাকায়। সঠিক সময়ে ওটার বিষয়ে রিপোর্ট আসবে।’
দীর্ঘ একটা সময় বার্টির দিকে চেয়ে রইল কার্সন, তারপর বড় করে শ্বাস ফেলল। ‘ও, বুঝলাম। আর কিছু বুঝতে আমার বাকি নেই।’
‘আমরাও সবই বুঝেছি,’ বলল রানা। ‘এবার কী করবে ভাবছ, কার্সন?’
ঘুরে ওর দিকে তাকাল কার্সন। ঠোঁট মুচড়ে বলল, ‘এটা কী ধরনের ফাজলামি, কিং? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’
আত্মরক্ষা করতে চাইছে লোকটা, বুঝে গেল রানা। বার্টি আর ও মিলে যে পরিকল্পনা করেছে, তাতে ওরা সফল। ওরা এখন ভাল করেই জানে, এ-লোক আর যে-ই হোক, মোরেলি নয়। আসল মোরেলি ভুরু কুঁচকে ওদেরকে দেখত, তারপর হো-হো করে হেসে ফেলত। হয়তো বলত, কায়দা করে সত্যিই জেনে নিলে যে আমি আসলে কে!
কার্সনের বড় সমস্যা হচ্ছে, সে জানে না দেখতে কেমন মোরেলি। ওর মনে গভীর ভয়, সত্যিই হয়তো বার্টি রোমিয়ো মোরেলি। তার ওপরে মাইক্রোফিল্ম দেখে ঘাবড়ে গেছে। ওটা হয়তো সত্যিকারের জিনিস। ফলে এখন কী করা উচিত, ভেবে পাচ্ছে না সে।
‘আজ মোরেলির কথাতেই আমরা এই মিটিং ডেকেছি,’ বার্টিকে দেখাল রানা।
‘হ্যাঁ।’ মুচকি হাসল বার্টি। ‘আমি জানতে চেয়েছি যে কে আমাকে খুন করতে চায়। দেখতে কেমন সে।’
শতবছরের পুরনো চামড়ার মত কালচে হয়ে গেছে কার্সনের মুখ। একবার ঢোক গিলে বলল সে, ‘আপনি আমাকে হাসালেন, মিস্টার স্মিথ।
‘আমাকে মোরেলি বলে ডাকতে পারো, মিস্টার কার্সন,’ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল বার্টি। ‘আগে কখনও ভেবেছ, নকল সাজতে গিয়ে এভাবে ধরা পড়বে?’
সতর্ক চোখে কার্সনকে দেখছে রানা।
‘এটা ঠিক, তোমার খেলাটা সত্যি-সত্যি ইঁদুর- বেড়ালের,’ শুকনো গলায় বলল কার্সন। তার মুখ বেয়ে দরদর করে ঝরছে ঘামের স্রোত। ‘কিন্তু আমি ইঁদুর-বেড়াল খেলতে পছন্দ করি না।’
‘কেউ পছন্দ করে না,’ বলল বার্টি। ‘বিশেষ করে সে যদি হয় ইঁদুর। মাত্র এক মিনিট আগে ছিলে বেড়াল। আর এখন দেখছ বাঘের সোনালি চোখ।
বড় করে শ্বাস ফেলল কার্সন। ‘এবার কী করতে চাও তোমরা?
‘আমি জানতে চাই, কেন আমাকে বোকা বানাতে চেয়েছ,’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল রানা।
ঠোঁট সরু করে হাসল কার্সন। ‘তুমি যে-ই হও, প্রথম থেকেই তোমাকে বোকা লোক বলে মনে হয়েছে আমার।’
‘সত্যি কথা হচ্ছে, ভেলেটায় তুমি মোরেলির রোলে অভিনয় করলে সতর্ক হয়ে উঠি,’ জবাবে নরম সুরে বলল রানা। ‘তারপর ওখান থেকে ফেরার সময়ে ব্রেক ফেইল করল আমার গাড়ি। আর সেই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলাম তোমার কল্যাণে। তাতে আরও বেশি সন্দেহ হলো মনে। পরে গাড়ির নিচে মিলল ইলেকট্রনিক গুবরে পোকা। তখন বুঝলাম কেবল-কার ইঞ্জিন-রুমে ট্রাটুকে যখন খুন করা হয়, সে-সময়ে ওখানে ছিলে তুমি। পরের রাতে গেলে ভেলেটায় মোরেলিকে খুন করতে।’
বন্ধুর কথা শুনতে শুনতে ড্রিঙ্কে চুমুক দিচ্ছে বার্টি।
মুখে জমাট হাসি নিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল কার্সন। ‘মোরেলিকে খুন করতে গিয়ে তোমাদের পিছু নিয়ে সোল ই নিয়েরেতে এসেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল তোমাদের সঙ্গে যারা দেখা করবে, তাদের ওপরে চোখ রাখা।’
‘অর্থাৎ, তুমি জানতে যে আমরা মোরেলির সঙ্গে দেখা করব,’ চট্ করে বার্টিকে দেখে নিল রানা।
‘অস্বীকার করছি না। ভেবেছি ভেলেটায় নিজেকে মোরেলি বলে পরিচয় দেয়াই উচিত হবে। সেক্ষেত্রে কোন না কোন সময়ে হাতের মুঠোয় পাব আসল মোরেলিকে।’ বার্টির দিকে তাকাল কার্সন। ‘আর ঠিক যা ভেবেছি, তা-ই হলো।’
‘একের পর এক মিথ্যা বলেছ তুমি,’ বলল রানা। ‘তা ঠিক।’ কাঁধ ঝাঁকাল কার্সন।
‘এ-ও ভেবেছ: তার নাম ভাঙিয়ে কে হাজির হয়েছে, সেটা জানতে আড়াল থেকে বেরোবে মোরেলি,’ বলল রানা।
‘ভুল বলোনি।’
‘ভেবেছিলে নকল মাইক্রোফিল্ম আমরা পরখ করে দেখার আগেই তাকে খুন করে উধাও হবে।’
‘ঝুঁকি না নিয়ে উপায় ছিল না।’
‘অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়েছ, কার্সন। কিন্তু শেষমেশ ধরা পড়লে।’
‘আমি কিন্তু গাড়ির ব্রেক নষ্ট করিনি।’ বড় করে শ্বাস নিল কার্সন। ‘সত্যিই যদি তোমাকে খুন করতে চাইতাম, তো পরে তোমাকে এত ঝুঁকি নিয়ে বাঁচাতাম না।’
রানার দিকে তাকাল বার্টি।
‘তা নয়, কার্সন,’ বলল রানা। ‘আমার গাড়ির ব্রেক লাইন কেটে দেয়ার পরে যখন জানলে, ভেলেটায় দেখা করতে আসেনি মোরেলি, তখন আমাকে না বাঁচিয়ে তোমার আর কোন উপায় ছিল না। আমি একমাত্র মানুষ, যাকে বিশ্বাস করে দেখা করবে মোরেলি। আমার যুক্তি খণ্ডন করতে পারবে?’
পাথরের মত চেহারা করে বসে থাকল কার্সন।
হঠাৎ নিভে গেল নাইট ক্লাবের প্রতিটা বাতি। থেমে গেল স্টেরিয়োর মিউযিক। মঞ্চ থেকে নেমেছে নতর্কেরা। তাদের বদলে স্টেজে উঠল একদল স্প্যানিশ ফ্ল্যামেনকো পোশাক পরা নর্তক। ওদের পেছনে যে যার সিটে বসল ছয় গিটারিস্ট।
মাইক হাতে নিল এক পুরুষ গায়ক।
ঝনঝন করে বেজে উঠল গিটার।
‘তোমরা এবার আমার কাছে কী চাও?’ বার্টির দিকে তাকাল কার্সন।
‘কেউ না কেউ আমাকে খুন করতে তোমাকে ভাড়া করেছে,’ শুকনো গলায় বলল বার্টি। ‘তোমাকে বলতে হবে সে আসলে কে।’
‘কেউ আমাকে খুন করতে পাঠায়নি,’ বলল কার্সন।
‘মিথ্যা বলে রেহাই পাবে না,’ হুমকির সুরে বলল বার্টি। ‘তুমি একজন পেশাদার খুনি। তোমার নাম কার্সন নয়। বেশ কয়েক দেশের পুলিশের খাতায় লেখা আছে; নানা জায়গায় গিয়ে মানুষ খুন করো তুমি। ইন্টারপোল তোমার সম্পর্কে ভাল করেই জানে।’
এটা ছিল রানা আর বার্টির হাতের শেষ তাস।
বরফের মত ঠাণ্ডা চোখে রানা আর বার্টিকে দেখল কার্সন। ‘আমি পেশাদার খুনি, এটা ঠিক। যে সবচেয়ে বেশি টাকা দেয়, আমি তার হয়েই কাজ করি।’
পরস্পরের দিকে তাকাল রানা ও বার্টি।
‘কে এবার তোমাকে ভাড়া করেছে?’ আবারও জানতে চাইল বার্টি।
‘যদি মুখ খুলি, আজই খুন হব,’ ফাঁপা হাসল কার্সন।
‘আর মুখ না খুললে এখনই এই নাইট ক্লাবে খুন হবে, ‘ গম্ভীর কণ্ঠে বলল বার্টি।
‘আমি এমনিতেই খুন হব,’ শুকনো গলায় বলল কার্সন।
‘মুখ খুললে এখান থেকে বেরোতে পারবে,’ বলল বার্টি। ‘কাজেই বলো, কে তোমাকে ভাড়া করেছে। মিথ্যা না বললে রিসোর্ট থেকে তোমাকে বেরিয়ে যেতে দেব। আমার লোক তোমাকে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবে।
ঘুরে বারের দিকে তাকাল বার্টি। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে এক ওয়েটার। বিএসএস এজেন্টের ইশারায় মাথা দোলাল সে। ঘরের উল্টোদিকে তাকাল রানার বন্ধু। ওখানে কালো কোট পরা এক লোক বসে আছে একটা টেবিলে। তার দিকে বার্টি তাকাতেই ব্যারেট হ্যাট উঁচু করে এদিকে তাকাল সে।
মাফিয়া স্টাইলে ঘটছে সব।
ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কার্সন।
বাজতে শুরু করেছে ফ্ল্যামেনকো মিউযিক। একা নাচছে এক নর্তক। জুতো দিয়ে মেঝেতে তৈরি করছে মেশিনগানের গুলির মত খট-খট শব্দ। ক্রমে আরও দ্রুত তালে নেচে চলেছে সে।
‘বলো, কে তোমাকে ভাড়া করেছে!’ ধমকে উঠল বার্টি।
‘আমি এর জবাব দেব না,’ চাপা স্বরে বলল কার্সন।
‘আমরা কি ধরে নেব তারা মাফিয়ার ডন?’ জানতে চাইল রানা।
ওকে বিরক্তি নিয়ে দেখল কার্সন। ‘ওরা ছিল কিউলেক্সের বস্, আমার নয়!’ কথাটা মুখ ফস্কে বলে দিয়ে বিস্ফারিত হলো তার চোখ। বুঝে গেছে, জানিয়ে দিয়েছে আসলে তাকে ভাড়া করেছে কে।
মাত্র একজন পারে তাকে ভাড়া করতে!
‘তা হলে লিনা?’ কার্সনের দিকে ঝুঁকল রানা।
চমকে গেছে লোকটা। হাঁ করেও খপ করে বন্ধ করল মুখ। কয়েক সেকেণ্ড পর ধীরে ধীরে দোলাল মাথা। পরক্ষণে ঝড়ের বেগে নড়ল সে। গতি তার বিদ্যুতের মত। বেল্টের দিকে তাকে হাত নামাতে দেখল রানা। ওর জানা আছে, ওখানে আছে ভারী ক্যালিবারের ওয়েবলি। আগেই দেখেছে, লোকটার শার্টের নিচে রাখা আছে অস্ত্রটা। বিপদ হলে বের করবে ওয়েবলি। আর সেটা ভেবেই তাকে নিজের বামে রেখেছে রানা, যাতে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারে তার হাত।
‘বুম!’ শব্দে গর্জে উঠল ওয়েবলি।
মেঝের তক্তায় গেঁথে গেল ওটার শক্তিশালী বুলেট।
একই সময়ে কড়াৎ শব্দে গর্জন ছাড়ল আরেকটা অস্ত্র।
ওটা প্রমাণ সাইযের ওয়ালথার।
হৃৎপিণ্ডে বুলেট বিঁধে যেতেই ঝটকা খেয়ে সিটের পিঠে হেলান দিল কার্সন, পরক্ষণে সুতো দিয়ে বাঁধা পুতুলের মত মুখ থুবড়ে পড়ল টেবিলের ওপরে। মেঝেতে ওয়েবলির ওপরে পা চাপিয়ে দিয়েছে রানা। চেয়ার ছেড়ে দ্রুত কার্সনের পাশে গেল বার্টি। এত জোরে বাজছে মিউযিক, তার ওপরে নর্তকের জুতোর মেশিনগানের মত শব্দ, নাইট ক্লাবের কারও সাধ্য নেই যে বুঝবে কী ঘটেছে আঁধার টেবিলে।
কাঁধ খামচে ধরে লাশ সোজা করে চেয়ারে বসাল বার্টি। এদিকে ঝুঁকে ওয়েবলি তুলল রানা। অস্ত্রটা বেল্টের নিচে গুঁজে শক্ত হাতে ধরল কার্সনের ডানকাঁধ। পরস্পরের দিকে একবার তাকাল দু’বন্ধু, তারপর একই সঙ্গে দু’দিক থেকে ধরে টেনে তুলল কার্সনের লাশ। রওনা হয়ে গেল টেবিলগুলোর মাঝের সরু পথে। যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে নাইট ক্লাব থেকে।
কাছের এক ওয়েটারকে স্প্যানিশ ভাষায় বলল বার্টি, ‘আমাদের দোস্ত তো দেখি পুরো মাতাল হয়ে গেল!’
সহানুভূতি নিয়ে মাথা দোলাল ওয়েটার।
কাঠের মেঝেতে মেশিনগানের মত আওয়াজ তুলে মঞ্চে নেচে চলেছে ফ্ল্যামেনকো ড্যান্সার। ড্রিঙ্ক হাতে তার দিকে চেয়ে আছে হোটেলের অতিথিরা।
‘মাঝে মাঝে মনে হয়, আর করব না শালার এই চাকরি!’ লবিতে পা রেখে সিঁড়ির দিকে চলল বার্টি। ‘একেক শালার ওজন যেন হাতির সমান!’
রানা ও বার্টির ভাগ্য ভাল, এ-মুহূর্তে লবিতে কেউ নেই। দু’পাশ থেকে লাশ ধরে টলমল করতে করতে লবি পেরিয়ে গেল ওরা। ধীরে ধীরে উঠল সিঁড়ি বেয়ে। পাঁচ মিনিটের মাথায় কার্সনের ঘরে ঢুকে বিলাসবহুল বেডে শুইয়ে দিল লাশটাকে।
Chapter - 17
সতেরো
দ্রুত হাতে মৃতদেহ সার্চ করছে বার্টি। টুকটাক যা পেল, সবই রাখল ব্যুরোর ওপরে। বাথরুমে গিয়ে নিয়ে এল শুকনো তোয়ালে। কার্সনের বুলেটের ক্ষত থেকে রক্তে ভেসে গেছে বেড। বার্টির হাত বেয়ে এখনও টপটপ করে পড়ছে। নিজের ওয়ালথারের গুলিতে কার্সনের হৃৎপিণ্ড ফুটো করেছে ও। হাতের রক্ত তোয়ালেতে মুছে চট্ করে দেখে নিল হাতঘড়ি। ‘যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।’
কার্সনের ওয়ালেট থেকে কাগজপত্র, নিয়ে পড়তে শুরু করেছে রানা। ‘আইডি অনুযায়ী এর নাম জন কার্সন।’
‘নকল নাম,’ রানার পাশে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল বার্টি। ‘পাকা কারও হাতের কাজ।’
‘কাগজ এমআই-ফাইভের। …তোর কী ধারণা?’
মাথা নাড়ল বার্টি। ‘যোগাযোগ করেছি। এই নামে ওদের কোন এজেণ্ট নেই।’
ক্রেডিট কার্ড ও পাসপোর্ট দেখল রানা। আবারও মাথা নাড়ল বার্টি। ‘না রে, এই শালার সবই নকল। তোর মনে নেই, বলেছিল সে ভাড়াটে খুনি? পরে আমি ইন্টারপোলে এর হাতের ছাপ পাঠাব।’
কাগজপত্র দেখা শেষ করে লোকটার লাগেজ খুলল রানা। কিন্তু ভেতরে এমন কোন তথ্য নেই, যা দেখে মনে হবে না কার্সন আসলে ব্রিটিশ নয়।
স্মার্টফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে লাশের দু’হাতের দশ আঙুলের ছাপ নিল বার্টি। কাজটা শেষ করে কয়েক দিক থেকে ছবি নিল কার্সনের মুখের। রানার মনে হলো, ‘নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে লোকটা। এখন বোঝার উপায় নেই যে সে ছিল ঠাণ্ডা-মাথার একজন খুনি।
এমন কোন কাগজপত্র নেই, যেটা দেখে মনে হবে বিশেষ কোন দলের হয়ে খুন করত। এটাও জানা গেল না, আসলে কাদের হয়ে কাজ করছে এলিনা।
বারবার হাতঘড়ি দেখছে বার্টি।
‘এত ব্যস্ত কেন তুই?’ জানতে চাইল রানা।
‘ভাবছি লাশটা কোথায় সরাব।’
‘কিছু করার নেই,’ বলল রানা। ‘এখানেই থাকুক।’
‘কিন্তু ক্যাথি মোনালিসা এলে তো ঘরে ঢুকে চমকে যাবে। তারপর চিৎকার করে মানুষ জড় করবে।’
‘তাতে আমাদের কী?’ বন্ধুর দিকে তাকাল রানা। ‘কার্সনের সঙ্গে আমাদের তো কোন সম্পর্ক নেই।’
‘নাইট ক্লাবে যে তার সঙ্গে আমাদেরকে দেখা গেছে, তার কী হবে?’
‘গার্ডিয়া সিভিলের লোকের সঙ্গে কথা বলবি। তারা সামলে নেবে সব।’
‘এখন বাজে রাত সাড়ে এগারোটা।’ আরেকবার হাতঘড়ি দেখল বার্টি। ‘ডিউটি অফিসারকে এখন পাব না।’
‘তো সকালে কথা বলিস।’ কার্পেটের দিকে তাকাল রানা। ‘আরও বড় এক সমস্যা নিয়ে ভাবছি। এলিনা পার্কারসন জানে না, তার ভাড়া করা খুনি নিজেই খুন হয়ে গেছে। মেয়েটা ভাবছে, সোল ই নিয়েরেতে এসে কার্সনকে চিনিয়ে দেবে, আসলে কে মোরেলি। তার মানেই আগে হোক বা পরে এলিনা এখানে আসবে। আর সেটা যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে।’
‘কী করে ঠেকাবি?’ ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল বার্টি।
দ্রুত ভাবছে রানা। একটু পর বলল, ‘ধর, আমরা ফোন দিলাম গ্রানাডায় এলিনার হোটেলে। নোবলম্যানের তরফ থেকে নকল মেসেজ পেল ক্লার্ক। তাতে বলা হলো, আপাতত সোল ই নিয়েরে ত্যাগ করে অন্য জায়গায় যাচ্ছে মোরেলি। পরে জানাবে কোথায় এলিনার সঙ্গে দেখা করবে। এরপর এই হোটেলের সবার ফোনে কান পাতবি তোরা। আর মেয়েটা ফোন দিলেই আমরা জানব কার সঙ্গে কথা বলেছে সে। সেই লোকই আমাদের রোমিয়ো মোরেলি।’
‘তা হলে কাজ দিতে হবে ফোন কোম্পানির ঘুষখোর কর্মচারীদের,’ বলল বার্টি। ‘তবে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ফতুর হয়ে যাবে ব্রিটেন।’
‘একটা কথা ভেবেছিস? একটু পরে মেয়েটা হয়তো ফোন করে কার্সনকে জানাতে চাইবে, কে মোরেলি। যাতে তাকে খুন করা যায়। কিন্তু ওর ফোন ধরবে না মৃত কার্সন।’
কাঁধ ঝাঁকাল বার্টি। ‘সেক্ষেত্রে মেয়েটা বুঝবে বিপদে পড়েছে বা খুন হয়ে গেছে কার্সন। তখনও বোধহয় সে ফোন করবে মোরেলিকে। তাতেও আমরা জানব কে আমাদের ড্রাগ লর্ড।
‘আমি লাউঞ্জে নেমে যাচ্ছি,’ বলল রানা, ‘ক্যাথি এ-ঘরে এসে লাশ দেখে হোটেলের সবাইকে যেন জড় করতে না পারে, সেটা ঠেকাতে হবে।’
‘তুই তা হলে রওনা হয়ে যা,’ বলল বার্টি। ‘আমি এলিনা পার্কারসনের কাছে মেসেজ পাঠিয়ে একটু পরে আসছি।’
কার্সনের কামরা থেকে বেরোবার আগে হলওয়েতে চোখ রাখল দুই বন্ধু। বাইরে কেউ নেই। হলওয়েতে বেরিয়ে এসে যে যার কাজে চলল ওরা।
.
কয়েক মিনিট পর মারিয়া আর ক্যাথিকে লাউঞ্জে দেখতে পেল রানা। গল্প করছে মেয়ে দুটো। ওকে দেখে মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল তারা। গলা ছেড়ে হাসির আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকাল রানা। সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে হের মুলার, তার সঙ্গের দুই জার্মান ও ড্যানিশ যুবক। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে কমপক্ষে দশজন স্কিয়ার দম্পতি। ফূর্তিতে আছে সবাই।
মারিয়া ও ক্যাথির উদ্দেশে মাথা দুলিয়ে ওদের মাঝে গিয়ে বসে পড়ল রানা। ওকে দেখে আন্তরিক হাসল হের মুলার। একে একে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল অন্যদের।
হাসিমুখে সবার উদ্দেশে হাত নাড়ল রানা। ক্যাথি আর মারিয়ার মাঝে কাউচে বসে চেয়ে রইল ফায়ারপ্লেসের জ্বলজ্বলে কমলা আগুনের দিকে। আনমনে ভাবল, এ-ঘর কত নিরাপদ, নেই গুলির আওয়াজ আর তাজা রক্ত।
নিজের জীবনের মজার মজার কাহিনী বলছে হের মুলার। প্রচুর শিকার করেছে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারতে। মাছ ধরতে কখনও বোট নিয়ে চলে গেছে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে। একা উঠেছে কয়েকটি মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। এসব শুনতে শুনতে পকেট থেকে স্মার্টফোন নিয়ে মারিয়াকে টেক্সট্ মেসেজ পাঠাল রানা।
খুন হয়ে গেছে কার্সন। মোরেলিকে খুন করতে চাইছে এলিনা পার্কারসন। ক্যাথি যেন কিছু না জানে।
হাসি-হাসি চেহারায় হের মুলারের কথা শুনছিল মারিয়া, হাতে স্মার্টফোন। ওটার স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই চট্ করে মেসেজ খুলে পড়ল সে। কনুই দিয়ে রানার পাঁজরে হালকা এক গুঁতো দিয়ে বুঝিয়ে দিল, সে বুঝতে পেরেছে।
মেসেজের শেষ বাক্য রানা লিখেছে, কারণ ও এখনও নিশ্চিত নয় যে কী করা উচিত ক্যাথি মোনালিসার বিষয়ে। মেয়েটা যদি কার্সনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে, তো সে ভাল করেই জানে কী কাজে এসেছিল লোকটা। আর তা যদি না হয়, সেক্ষেত্রে অনুচিত হবে পুলিশি তদন্তের জালে ফেলে ওকে হয়রানি করা।
মিনিট তিনেক পর লাউঞ্জের দরজা পেরিয়ে পরিচিত এক দম্পতিকে দেখে তাদের উদ্দেশে হাসল বার্টি। তারপর ওর চোখ গিয়ে পড়ল রানার ওপরে। ধীর পায়ে বন্ধুর পাশে থেমে নিচু গলায় বলল, ‘লবিতে আয়, জরুরি।’ রানার কাঁধ চাপড়ে দিল সে। ঝুঁকে মারিয়ার গালে চুমু দিয়ে তাকাল হের মুলারের দিকে। আড্ডায় যোগ দিতে পারছে না বলে দুঃখের হাসি ওর মুখে। মৃদু মাথা দুলিয়ে আবারও চলে গেল লাউঞ্জ ছেড়ে।
মারিয়ার বাহু স্পর্শ করে কাউচ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা, লাউঞ্জ ছেড়ে বেরিয়ে এল লবিতে। ঘরের পেছনের দিকে মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বার্টি। চোখ নিচের স্কি রানের ওপরে। আসলে দেখছে কাঁচে বন্ধুর প্রতিচ্ছবি। নির্জন লবিতে ওরা ছাড়া আর কেউ নেই।
বার্টির পাশে গিয়ে থামতেই রানার কানের কাছে ফিসফিস করল সে, ‘মেয়েটা গ্রানাডার হোটেল থেকে বেরিয়ে গেছে। ধারণা করছি আসবে সোল ই নিয়েরেতে।’
‘কখন রওনা হয়েছে?’
‘আজ বিকেলে। ঠিক কখন, সেটা জানতে পারিনি।’
‘দুঃসংবাদ।’
মাথা দোলাল বার্টি।
জানালার কাঁচের মাধ্যমে ডেস্ক ক্লার্ককে দেখতে পেল রানা। কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে সে, তারপর ক্রেডলে রিসিভার রেখে দিয়ে গিয়ে ঢুকল লাউঞ্জে। দু’মিনিট পর আবার এল লবিতে। এখন তার পেছনে আসছে ক্যাথি মোনালিসা।
বার্টির পাঁজরে কনুইয়ের গুঁতো দিল রানা।
সিঁড়ির দিকে চলেছে ক্যাথি, শুকিয়ে আমশি হয়ে গেছে মুখ। সন্দেহ নেই এখনই গিয়ে ঢুকবে ওদের সুইটে!
পরস্পরকে দেখল রানা ও বার্টি। এদিকে লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এসেছে মারিয়া, চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। বার্টির পাঁজরে আরেক গুঁতো বসাল রানা। ‘তুই মারিয়াকে লাউঞ্জে আটকে রাখ্। আমি যাচ্ছি ক্যাথির সঙ্গে কথা বলতে।’
‘ঠিক আছে,’ নড করল বার্টি।
ক্যাথি সিঁড়ি বেয়ে দেড়তলা উঠতেই ওর পিছু নিল রানা। বুঝেছে, লবির ক্লার্ককে ফোন করে মেয়েটাকে ডেকে নিয়েছে কেউ। সে যে কে এবং কী তার উদ্দেশ্য, আঁচ করছে রানা।
চতুর্থতলার করিডরে বাঁক নিয়ে ব্যাগের ভেতরে চাবির জন্যে হাত ভরল ক্যাথি। আর তখনই দেখল ওদের ঘরের দরজা খোলা। ঘুরে করিডরের এদিকে-ওদিকে চোখ বোলাল মেয়েটা। এমনটা হবে ভেবে আগেই করিডরের কোণে থেমে এক পা পিছিয়ে গেছে রানা। উঁকি দিল ওদিকে।
এইমাত্র মেয়েটার পেছনে আটকে গেছে দরজা।
দ্রুত হেঁটে ক্যাথির সুইটের দরজার সামনে থামল রানা। ভারী কবাটের জন্যে প্রথমে কোন আওয়াজ শুনতে পেল না। তারপর ওর মনে হলো, ঘরের ভেতরে নিচু গলায় কথা বলছে কারা যেন। একটা কণ্ঠ হালকা, অন্যটা উঁচু স্বরের। দুটোই নারীকণ্ঠ। ক্যাথি বোধহয় লাশ দেখে চমকে গেছে।
কিন্তু কার সঙ্গে কথা বলছে সে?
ভেতরে তো অন্য কারও থাকার কথা নয়!
বোধহয় আলাপ করছে টেলিফোনে!
থেমে গেল নিচু গলার আওয়াজ। তারপর ক্র্যাচ্ আওয়াজ তুলে খুলল একটা দরজা।
ওটা কি কোন ক্লসিটের?
বাইরে বেরোবার জন্যে পোশাক পাল্টে নিচ্ছে মেয়েটা?
সুইটের দরজা থেকে সরে করিডরের শেষমাথায় পৌঁছে ব্যালকনিতে থামল রানা। এ-হোটেলের তিনদিকে ব্যালকনি। ওখানে দাঁড়িয়ে ক্যাথি করিডরে বেরোবে, সেজন্যে অপেক্ষা করল রানা।
পেরিয়ে গেল পুরো দশ মিনিট।
একবার হাতঘড়ি দেখল রানা, তারপর ধৈর্য হারিয়ে ফিরে এল করিডরের মাঝে ক্যাথিদের দরজার সামনে। কবাটে কান পেতে কোন আওয়াজ শুনতে পেল না।
ধীরে ধীরে পেরোচ্ছে সময়।
আরও দেরি না করাই বোধহয় ভাল। ওয়ালথার বের করে দরজার নবে মোচড় দিল রানা। আগের মতই খোলা দরজার তালা। কবাট ঠেলে পিস্তল হাতে ঘরে ঢুকে পড়ল রানা।
বিছানায় পড়ে আছে কার্সনের লাশ।
ঘরে আর কেউ নেই।
পাশের ঘরে উঁকি দিল রানা। ওখানেও কেউ নেই।
তা হলে কোথায় গেল ক্যাথি মোনালিসা?
ক্লসিটের দরজার দিকে তাকাল রানা।
কিন্তু ওটা এতই ছোট, ওখানে কেউ লুকাতে পারবে না।
এবার কী করবে সেটা ভাবতে শুরু করেছে রানা, এমন সময় শুনতে পেল আবছা আওয়াজ। শ্বাস নিতে ভুলে গেল ও। তখনই আবারও শুনল আওয়াজটা। খস খস আওয়াজে নড়ে উঠেছে কেউ। ঝট করে আবারও ক্লসিটের দিকে তাকাল রানা। কিন্তু আওয়াজটা ওদিক থেকে আসেনি।
শব্দ হয়েছে বাথরুমে।
উদ্যত ওয়ালথার হাতে বাথরুমের কাছে চলে গেল রানা।
বাথরুমের দরজা বন্ধ।
‘ক্যাথি,’ নিচু গলায় ডাকল রানা।
ওদিক থেকে এল না কোন জবাব।
কেউ না কেউ আছে বাথরুমে।
আর সে ক্যাথি নয়।
মেয়েটা তা হলে গেছে কোথায়?
নাকি অন্য কারও সঙ্গে বাথরুমে আছে সে?
‘ক্যাথি,’ আগের চেয়ে একটু জোরে ডাকল রানা।
এবারও কোন জবাব নেই।
‘আমি দরজা খুলছি, হাতে পিস্তল, সতর্ক করল রানা। ‘মাথার ওপরে হাত তুলে বেরিয়ে এসো।’ দরজার একপাশে সরে গেল ও।
কবাট খুলল না কেউ।
একদিকের চৌকাঠে শরীর ঠেস দিয়ে দরজার নব ধরে মোচড় দিল রানা। ভেতরে ঠেলা খেয়ে সামান্য খুলে গেল দরজা। হামলা হবে ভেবে সতর্ক হয়ে উঠেছে রানা।
কিন্তু আক্রমণ এল না। কোথাও কোন আওয়াজ নেই।
একটু খোলা দরজার ওদিকে চোখ গেল ওর। বাতি জ্বলছে বাথরুমে। ফ্যাকাসে চেহারায় ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে এলিনা পার্কারসন, চোখে ভীষণ ভয়।
বাথরুমে পা রেখে ওর দিকে ওয়ালথার তাক করল রানা। আর তখনই চোখ গেল বেসিনের ওপরে। ওখানে ছোট এক বোতল ফ্লুইড, হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ আর কয়েক টুকরো তুলা। ড্রাগ নিচ্ছে অপ্সরার মত সুন্দরী মেয়েটা!
বিস্ফারিত চোখে রানার দিকে তাকাল এলিনা।
‘ক্যাথি কোথায়?’ জানতে চাইল রানা।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল এলিনা। ফিসফিস করে বলল, ‘ওকে দেখিনি। এখানে এসে দেখি… মারা গেছে কার্সন!’
এলিনার কনুই ধরল রানা। ওর গায়ে ঢলে পড়ল মেয়েটা। কাঁপা গলায় বলল, ‘কার্সনকে খুন করেছে ক্যাথি?’
জবাব না দিয়ে পাল্টা জানতে চাইল রানা, ‘তুমি সোল ই নিয়েরেতে এলে কেন?’
চোখ তুলে ওকে দেখল এলিনা। বাথটাবের কিনারায় ওকে বসিয়ে দিল রানা। নিজেও বসল ওর পাশে। হাতের পিস্তলের নল তাক করে রেখেছে এলিনার বুকে। ভাল করেই জানে, এই মেয়ে আসলে চরম প্রতারক।
‘আমি… আমি এসেছিলাম…’
‘কার্সনের সঙ্গে দেখা করতে,’ তথ্য জুগিয়ে দিল রানা। ‘যাতে চিনিয়ে দিতে পারো মোরেলিকে। যাতে খুন করা যায় তাকে।’
চুপ করে আছে এলিনা। থরথর করে কাঁপছে দু’ঠোঁট। রানার চোখ থেকে সরিয়ে নিল নিজের চোখ। ফিসফিস করে বলল, ‘তা-ই আসলে।’
‘মোরেলিকে খুন করতে কার্সনকে ভাড়া করেছিলে,’ বলল রানা। ‘মিথ্যা বলে রেহাই পাবে না। মারা যাওয়ার আগে সবই বলে গেছে কার্সন।’
‘আমি কিছুই অস্বীকার করছি না,’ নিচু স্বরে বলল এলিনা। গালে ফিরেছে রঙ। একবার দেখল হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ।
‘কী কারণে মোরেলিকে খুন করতে চাও?’ জানতে চাইল রানা। ‘তুমি কি বেশকিছু দিন ধরেই ড্রাগ অ্যাডিক্ট? মোরেলির দেয়া ড্রাগে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছ বলে তার ওপরে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলে?’
‘আমি আসলে জানি না কেন ওকে খুন করতে চাই,’ ঢোক গিলে বলল এলিনা। ‘তবে এই দুনিয়ায় ওর চেয়ে বেশি আর কাউকে এতটা ঘৃণা করি না।’
‘মোরেলি তো ড্রাগের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে,’ বলল রানা। ‘অপরাধীদেরকে ধরিয়ে দেবে ভেবেছে।’
বুকের কাছে ঝুলে গেল এলিনার মাথা।
আবারও জানতে চাইল রানা, ‘তুমি এখানে এলে কেন?’
‘কার্সনের সঙ্গে কথা বলতে,’ বিড়বিড় করল এলিনা। ‘ব্যালকনির দিক থেকে এসে দেখি ওর ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকলাম। তারপর… তারপর দেখি… ও খুন হয়েছে!’
এলিনার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল রানা। বুঝে গেছে, কোন্ পথে ঘর ছেড়ে চলে গেছে ক্যাথি। ঘরে কার্সনের লাশ দেখে ভীষণ ভয় পেয়েছে। দেরি করেনি পালিয়ে যেতে। ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো খুলে পা রেখেছে ব্যালকনিতে, তারপর সিঁড়ি বেয়ে ছুটে নেমে গেছে নিচে। এর কিছুক্ষণ পর কার্সনের সঙ্গে কথা বলতে এ-ঘরে এল এলিনা। হয়তো আলাপের জন্যে এখানেই দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু এলিনা যখন দেখল খুন হয়ে গেছে কার্সন, তখন নার্ভাস হয়ে ড্রাগ নিতে ঢুকেছে বাথরুমে। আর প্রায় একই সময়ে ঘরের দরজা খুলেছে রানা।
‘ঘরে ঢুকে দেখি কে যেন গুলি করে মেরেছে কার্সনকে। প্রথমে ভাবলাম, কাজটা ক্যাথির। তবে এখন মনে হচ্ছে, কে তাকে খুন করতে এসেছে, সেটা জেনে গিয়েছিল মোরেলি।’ অশ্রুতে ভরে গেল এলিনার অপূর্ব সুন্দর দুটো চোখ। ‘আমার খুব ভয় লাগছে, কিং!’
ওর চোখে তাকাল রানা। ‘মোরেলি আসলে কে, সেটা চিনিয়ে দেবে তুমি, এলিনা। বাঁচতে হলে এ-ছাড়া তোমার আর কোন উপায় নেই। যেভাবে হোক মোরেলির কাছ থেকে মাইক্রোফিল্ম পেতে হবে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’
ফ্যাকাসে হয়ে গেল এলিনার চেহারা। ‘কিং, মোরেলি জেনে গেছে তাকে খুন করতে খুনি ভাড়া করেছি আমি! এখন তাকে চিনিয়ে দিলে বাঁচতে দেবে না আমাকে! কিং, প্লিয, আমাকে ছেড়ে দাও! আমি পালিয়ে যাব!’
‘সে-উপায় নেই, এলিনা, গম্ভীর কণ্ঠে বলল রানা। ‘তুমি মোরেলিকে চিনিয়ে দেবে। দূর থেকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেই চলবে। তারপর..:
‘মোরেলি নিজের পরিচয় অস্বীকার করবে!’ ফুঁপিয়ে উঠল এলিনা। ‘তারপর প্রথম সুযোগে খুন করবে আমাকে!’
‘লিনা…’
হাইপোডারমিক সিরিঞ্জের জন্যে হাত বাড়াল এলিনা। সে কী করতে চায় সেটা বুঝে মন খারাপ হয়ে গেল রানার। নরম সুরে বলল, ‘লিনা, ড্রাগ তোমাকে বাঁচতে দেবে না। বাস্তবে পা রাখো!’
হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ শক্তহাতে ধরেছে এলিনা। ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘রানা, এ-ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই!’
পকেটে ওয়ালথার রেখে হাইপোডারমিক নিডল নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল রানা। আর তখনই হঠাৎ করে বদলে গেল এলিনার দুঃখী-দুঃখী ভাব। অপরূপ মুখটা যেন হয়ে গেল হিংস্র বেড়ালের মত। জ্বলজ্বল করছে দুই চোখ। হীরার মত দাঁতের ওপর থেকে সরে গেছে লিপস্টিক-মাখা লাল ঠোঁট রানা আত্মরক্ষা করার আগেই খচ করে ওর বাহুতে গেঁথে গেল হাইপোডারমিক নিডল!
কর্কশ সুরে হেসে উঠল এলিনা পার্কারসন।
রানার মনে হলো, মাত্র এক সেকেণ্ডে উধাও হয়ে গেছে ওর শরীরের সব শক্তি!
কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে টেনে তুলল এলিনা। ঘরে নিয়ে গিয়ে ধুপ করে বসিয়ে দিল একটা চেয়ারে। এলিনার ঠোঁটে এখন শেয়ালের মত দুষ্ট হাসি। খুশিমনে বলল, ‘এটা আমার নিজের তৈরি মিক্সচার। এবার লক্ষ্মী ছেলের মত চুপ করে বসে থাকো। আর এই সুযোগে আমি বিদায় নিচ্ছি।’
‘না, এলিনা, ভুল করছ,’ বলতে চাইল রানা, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। ওর চোখের সামনে দুলছে গোটা ঘর। তারই ভেতরে হাসতে হাসতে ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো খুলে ব্যালকনিতে বেরিয়ে গেল এলিনা।
ঘরের ভেতরে নেমেছে থমথমে নীরবতা।
এরপর যেন কেটে গেল কোটি বছর। তারপর দরজায় জোরে জোরে টোকা দিল কেউ। বোধহয় বার্টি।
‘রানা! তুই কি ভেতরে আছিস? রানা?’
ঠোঁট ফাঁক করলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না রানা। ভাবতে চাইল, কখন কাটবে দেহের অবশ ভাব!
দড়াম করে খুলে গেল ঘরের দরজা। পিস্তল হাতে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকল বার্টি। চেয়ারে রানাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে হতবাক হয়ে গেছে।
‘কী রে, রানা? বসে আছিস কেন?’
বারকয়েক ঠোঁট নাড়ল রানা। ওর হাত-পায়ে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে সাড়া।
সুইটের দুই রুম দেখে নিয়ে বাথরুমে উঁকি দিল বার্টি। ওখানে ওষুধের কড়া গন্ধ। ঘরে ফিরে রানার পিঠে চাপড় দিল সে। আরেকটু হলে চেয়ার থেকে কাত হয়ে মেঝেতে পড়ত রানা। চেয়ার থেকে টেনে তুলে ওকে বাথরুমে নিল বার্টি। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে পানির ধারার নিচে ধরল রানার ঊর্ধ্বাঙ্গ। বরফ-ঠাণ্ডা পানি কুলকুল করে নামছে মাথা বেয়ে মেঝেতে।
বন্ধুর মুখ ধুয়ে দিতে দিতে বলল বার্টি, ‘নতুন ড্রাগ, কিছু দিন আগেই আমাদের হাতে এসেছে। ইনজেক্ট করলে নড়াচড়া করা যায় না। চুপচাপ বসে বসে সব দেখতে হয়। কিছুক্ষণের জন্যে দেহ হয় অবশ। মাফিয়া এই ড্রাগের নাম দিয়েছে উউরারা।’
মিনিট দুয়েক পর উঠে বসল রানা। এখনও মাথা ঘুরছে। নিচু গলায় বলল, ‘গ্রানাডা থেকে চলে এসেছে এলিনা পার্কারসন। ঘরে কার্সনের লাশ দেখেছে। ভাবছে, ওকে হাতে পেলে খুন করবে মোরেলি। এখন পালিয়ে যাচ্ছে। সে-সুযোগ পেলে আবারও চেষ্টা করবে মোরেলিকে খুন করতে।’
‘আমি যখন তোকে খুঁজতে ওপরে এলাম, নিচতলায় ওকে দেখেছি,’ বলল বার্টি। ‘লবিতে সিন ক্রিয়েট করছিল। তারপর ক্লার্ককে রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে গেল হোটেল থেকে।’
‘চল, ওকে ধরতে হবে!’ উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে ঢুকল রানা। চট্ করে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে বার্টির সঙ্গে বেরোল করিডরে। প্রায় ছুটতে ছুটতে লবিতে নামল ওরা। নিজেদের ভেতরে কথা বলছে বেশ কয়েকজন। সবার চোখ পার্কিংলটে। তাদের পাশে থেমে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রানা ও বার্টি।
ওদের পেছনে এসে থামল মারিয়া। নিচু গলায় বলল, ‘লাল এক জাগুয়ারে আছে এলিনা। কী যেন হয়েছে ওখানে। আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি।’
পার্কিংলটে হঠাৎ করেই জ্বলে উঠল দুটো হেডলাইট। প্রাডো লানোর পাহাড়ি রাস্তায় গিয়ে পড়েছে উজ্জ্বল আলো। রওনা হয়ে গেল গাড়িটা। চলেছে হাইওয়ে লক্ষ্য করে।
‘আসলে কী হয়েছে?’ অধৈর্য হয়ে বলল রানা।
‘তার প্রেমিক মারিয়ো কাপতি কোথায় গেছে, সেটা ক্লার্ক জানে না কেন সেজন্যে চেঁচামেচি করেছে,’ বলল মারিয়া।
‘মারিয়ো কাপতি আসলে কে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আমরা সেটা জানি না,’ বলল বার্টি। ‘ক্লার্ক যখন বলল এখানে এই নামের কেউ নেই, রাগে প্রায় পাগল হয়ে গেল মেয়েটা। শুরু করল চিৎকার করে গালি। লাউঞ্জে যারা ছিল, সবাই চলে এল লবিতে। আর তখনই তোর খোঁজে ওপরে গেলাম আমি।’
‘তার মাত্র আধমিনিট পর হোটেল থেকে বেরোল এলিনা,’ বলল মারিয়া, ‘আর তার একটু পর নিচে নেমে এলে তোমরা।’
ছুটন্ত জাগুয়ারের ওপরে গিয়ে পড়ল রানার চোখ। নিচু গলায় বলল ও, ‘এলিনাকে থামাতে হবে।’
‘এদিকে আমি কী করব?’ জানতে চাইল বার্টি।
‘মারিয়ো কাপতির ব্যাপারে খোঁজ নে,’ বলল রানা। ‘যদিও মনে হয় না এই নামের কেউ আছে।’
ভিড়ের ভেতর দিয়ে দরজার কাছে চলে গেল রানা।. কিছুটা দূরে আছে হের মুলার। ওর উদ্দেশে হাত নাড়ল সে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে পার্কিংলটে এল রানা। তালা খুলে উঠে পড়ল রেঁনো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে। বরফের টুকরো হয়ে গেছে পুরনো ইঞ্জিন। পাঁচবারের বার চালু হলো। শক্ত বরফে চাকা পিছলে জাগুয়ারের পিছু নিল রেঁনো।
নিচে নেমে গেছে হাইওয়ে। ডানে বাঁক নিয়ে আবারও দূরে জাগুয়ার গাড়িটার পেছনের লাল বাতি দেখতে পেল রানা। ওর মনে পড়ল, সামনেই বামে ঘোড়ার নালের মত বড় একটা বাঁক। তারপর আবারও চুলের কাঁটার মত ঘুরে গেছে রাস্তা। পাশেই গভীর নদীখাদ। ইঞ্জিনের সম্পূর্ণ শক্তি নিংড়ে নিতে চাইছে রানা। মনের ভেতরে ভয়, চোখের আড়ালে চলে যাবে জাগুয়ার।
পথের বাঁকে হেডলাইটের আলো পড়তেই ব্রেক কষে গতি কমাল রানা। টের পেল, ঠিকভাবেই কাজ করছে ব্রেক শ্য। পরের বাঁক পেরিয়ে ঘোড়ার নালের মত জায়গায় জাগুয়ার গাড়িটাকে দেখল রানা। অন্ধকারে ধীরবেগে যেতে যেতে হঠাৎ করেই কেন যেন ঝোড়ো গতি তুলল গাড়িটা। জ্বলজ্বল করছে পেছনের লাল বাতি। তারপর কী যেন হয়ে গেল এলিনার। বোধহয় বরফে পিছলে গেছে চার চাকা। হঠাৎ সরে গিয়ে পথের ধারে নিচু পাথুরে দেয়ালের ওপরে চড়াও হলো জাগুয়ার।
আকস্মিক এ-ঘটনায় চমকে গেছে রানা। মনে মনে বলল, ‘ব্রেক, এলিনা! ব্রেক করো!’
আসলে কী ঘটেছে সেটা বুঝল না রানা। ওর চোখের সামনে দেখল, পথের পাশের পাথুরে নিচু দেয়াল টপকে সাঁই করে বহু নিচে সরু নদীর খাদের দিকে নেমে গেল জাগুয়ার!
একপলক আগে পাহাড়ের খাড়া গায়ে ছিল হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো, পরক্ষণে মিলিয়ে গেছে শেষ রশ্মি!
গিরিখাদের নিচ থেকে এল লোহা-লক্কড় ভাঙার বিকট আওয়াজ। তারপর হঠাৎ নামল নীরবতা। উঁচু পাহাড়ের গায়ে এসে লাগল কমলা আগুনের আভা। পাক খেয়ে উঠে আসছে ঘন কালো ধোঁয়া।
জাগুয়ার যেখান থেকে নিচে পড়েছে, ওখানে পৌঁছে রেঁনো থামাল রানা। ইঞ্জিন বন্ধ করে চাবি হাতে নেমে এল গাড়ি থেকে। ভাঙা দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অন্তত এক শ’ ফুট নিচে পড়ে নদীতীরে বিধ্বস্ত হয়েছে জাগুয়ার। চারপাশে ভাঙা লোহা ও প্লাস্টিকের টুকরো। জ্বলন্ত গাড়িটা চাটছে দাউ-দাউ আগুনের হলকা।
পরের দু’মিনিটে পেছনে আলো দেখতে পেল রানা। হোটেল থেকে আসছে অতিথিরা। প্রথমে এসে থামল এক দম্পতির ফিয়াট গাড়ি। তারপর এল একে একে অনেকে।
বেশিরভাগ মানুষ ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার বর্ণনা তারিয়ে তারিয়ে বলতে ভালবাসে। কী অদ্ভুত বিকৃতি তাদের মানসিকতায়!
পাহাড়ের যেখানে গিয়ে প্রথমে পড়েছে জাগুয়ার, ওখানে নেমে এল রানা। পকেট থেকে ছোট্ট ফ্ল্যাশলাইট বের করে- আলো জ্বেলে এদিকে-ওদিকে তাকাল। পাথরে লেগে আছে জাগুয়ারের চটে যাওয়া লাল রঙ। পাহাড়ি ঢালু জমি বেয়ে নদীতীরে নেমে এল ও। অবশ্য আগুনের তীব্র তাপে যেতে পারল না গাড়িটার কাছে। জাগুয়ারের ড্রাইভিং সিটে আছে অঙ্গার হয়ে যাওয়া এলিনা। এখন কেউ বলবে না দুনিয়ার অন্যতম সুন্দরী মেয়ে ছিল সে।
ওপরের পথে থেমেছে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি। ওটা থেকে নেমেছে অগ্নিযোদ্ধারা।
পোর্টেবল হাতে এক্সটিংগুইশার। পাহাড়ি খাদে নেমে এল তারা, পরনে স্কি জ্যাকেট। মিনিট পাঁচেকের ভেতরে স্প্রে ছিটিয়ে আগুন নেভাল তারা।
গোটা সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অঙ্গার হওয়া এলিনার দেহাবশিষ্টের দিকে চেয়ে রইল রানা। একটু পর ওর পাশে থামল গার্ডিয়া সিভিলের এক অফিসার। হাতে শক্তিশালী ফ্ল্যাশলাইট। ওটার আলোয় পরিষ্কার রানা দেখল এলিনার পোড়া মুখ। ওর মনের ভেতরে ঘুরপাক খেল মেয়েটার সঙ্গে কাটিয়ে দেয়া অদ্ভুত রোমাঞ্চকর রাতটির কথা
ওর পাশে এসে থামল কে যেন। নিচু গলায় বলল, ‘রানা, চল, ওপরে যাই।’
‘ওর মৃত্যু বড় অদ্ভুত, বার্টি,’ প্রায় বিড়বিড় করল রানা।
‘বুঝে গিয়েছিল যে ওকে ধরা পড়তেই হবে,’ বলল বার্টি। ‘ওকে বাঁচতে দিত না রোমিয়ো মোরেলি।’
‘হয়তো সে এখনও জানে না এখানে কী ঘটেছে।’
‘জেনে নেবে।’
‘তা-ই আসলে।’
‘মারিয়ো কাপতির ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি,’ বলল বার্টি।
বন্ধুর দিকে তাকাল রানা।
মাথা নাড়ল বার্টি। ‘আশপাশের হোটেলে এ-নামে কেউ নেই।’
‘অথচ ক্লার্ককে এই নাম বলেছে এলিনা।’
‘তোদের হোটেলের ক্লার্ক ওকে বলেছিল, এই নামে কেউ নেই,’ বলল বার্টি, ‘আর তাতে রেগে গিয়েছিল এলিনা।’
লাশের দিকে আবারও তাকাল রানা। ‘তা হলে কি তুই বলতে চাস সোল ই নিয়েরেতে আসেইনি মোরেলি?’
‘এটা অন্তত জানি, গত একমাসের ভেতরে কোন হোটেলে ওঠেনি সে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। ‘আগেই বোধহয় জেনেছে, খুনি ভাড়া করে তাকে খুন করাতে চাইছে এলিনা।’
বন্ধুর দিকে তাকাল বার্টি। ‘তা হলে কি ধরে নেব, এলিনাকে দুনিয়া থেকে সরাতে আমাদের সঙ্গে মিটিঙে বসার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছে মোরেলি?’
‘হয়তো তা-ই,’ বলল রানা, ‘সে জানত এলিনা আর কার্সনের ব্যাপারে। মাফিয়া থেকে পাঠানো হত্যাকারী, এলিনার ভাড়া করা খুনি আর আমরা সবাই ভেবেছি মোরেলি এখানে এসেছে। অথচ সবাইকে হয়তো বোকা বানিয়ে দিয়েছে।’
এবার তোর বস্ আর আমার বসকে সব জানাতে হবে, ‘ বলল বার্টি। ‘নতুন করে যোগাযোগ করতে হবে মোরেলির সঙ্গে। চল, ওপরে যাই।’
পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগল দুই বন্ধু।
আফসোসের সুরে বলল বার্টি, ‘মেয়েটা সত্যিই দুর্দান্ত সুন্দরী ছিল। তবে সুন্দরীরা বেশিরভাগ সময় খুব বোকা হয়। এলিনা হয়তো মোরেলিকে ভালবাসত, আবার একই সঙ্গে ঘৃণা করত তাকে।’
‘অথবা ভালবাসত মোরেলির টাকা,’ মন্তব্য করল রানা। ‘টাকা কে না ভালবাসে, রানা?’ হাসল বার্টি। ‘ওকে ধাওয়া করত মোরেলির দলের খুনি।
আত্মহত্যা করে বসেছে মেয়েটা।’
সেটা বুঝেই হয়তো
‘এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কোথায় আছে সেই মোরেলি,’ বিড়বিড় করল রানা।
Chapter - 18
আঠারো
পরদিন সকাল।
অন্যদের আগেই ব্রেকফাস্ট সেরে নেয়ার জন্যে নিচে নেমে এসেছে রানা ও মারিয়া। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বলে রাতে ঘুমাতে পারেনি মারিয়া, তাই ধসে গেছে ওর কমনীয় চেহারা। ওরা দু’জনই বুঝে গেছে, ব্যর্থ হয়ে গেছে ওদের মিশন।
হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে চুপচাপ ব্রেকফাস্ট করল ওরা। খাবার শেষ করে ওয়েটার ডেকে বিল মিটিয়ে দিল রানা। হোটেলের লনে রোদে গিয়ে বসল ওরা। কিছুক্ষণ পর মারিয়াকে বলল রানা, ‘স্পেন থেকে চলে যাওয়ার আগে একবার স্কি করতে চাও?’
মাথা নাড়ল মারিয়া। ‘ওপরে গিয়ে লাগেজ গুছিয়ে নেব।’
মাথা দোলাল রানা। ‘বেশ। আমি একবার ভেলেটাতে যাচ্ছি। পাহাড়ের ওপর থেকে স্কি করে নেমে যাব।’
জবাব দিল না মারিয়া, ডুব দিয়েছে নিজের মনে।
‘এত ভাবছ কেন?’ বলল রানা। ‘পরে হয়তো এর চেয়ে অনেক ভাল কোন মিশন পাবে।’
চুপ করে দূরে চেয়ে রইল মারিয়া। রানা উঠে পড়বে কি না ভাবছে, এমন সময় মুখ খুলল মেয়েটা, ‘ভাবছিলাম, শুধু শুধু কত মানুষের প্রাণ ঝরে গেল। মোরেলির ডাবল লোকটা। কিউলেক্স। জন কার্সন। এলিনা পার্কারসন। তারপর আছে ক্যাথি মোনালিসা। ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওকে কোথাও পেলাম না।
মারিয়ার বাহুতে আলতো চাপড় দিল রানা। ‘দুনিয়াটা ভাল জায়গা নয়, মারিয়া। আর আমাদের সবাইকে একদিন এখান থেকে বিদায় নিতেই হবে।’
‘কিন্তু পৃথিবীটা এমন না হলেও তো পারত!’
‘কেউ তো কথা দেয়নি যে পৃথিবী সুন্দর হবে।’
মন খারাপ করে মাথা দোলাল মারিয়া।
ওপরে ওদের সুইটে গিয়ে স্কি আর পোল সংগ্রহ করল রানা, তারপর হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে গেল ভেলেটায়। সোনালি রোদ বিছিয়ে আছে পাহাড়ের তুষারের ওপরে। উত্তর দিক থেকে হু-হু করে বইছে শীতের হাওয়া। স্কি রানের ওপরে গুঁড়ো তুষারের ধবল স্তর। পকেট থেকে ছোট্ট বিনকিউলার নিয়ে পাহাড়ি ঢালে চোখ বোলাল রানা। ওদিকে আছে ভেলেটা থেকে নিচে দু’ভাগ হয়ে যাওয়া দুটো স্কি রান।
দুটোর ভেতরে বামেরটা দীর্ঘ। ওটাই স্কিয়িঙের জন্যে বেছে নিল ও। চামড়ার কেস থেকে বের করে চোখে সানগ্লাস পরল। আর তখনই দেখতে পেল কেবল-কারের দিক থেকে ওকে লক্ষ্য করে আসছে এক লোক।
সে হের আর্নেস্ট মুলার। এখন সাঙ্গপাঙ্গরা নেই তার।
লোকটার উদ্দেশে হাত নাড়ল রানা। ‘গুড মর্নিং, হের মুলার।’
রানার কাছে এসে থামল সে। মুখে আন্তরিক হাসি। ‘গুড মর্নিং, মিস্টার কিং।’
‘গতকাল আপনার সঙ্গে স্কিয়িং করতে পারিনি,’ বলল রানা। ‘তবে আজকে সুযোগটা হারাতে চাই না।’
‘আপনিও বোধহয় ব্যবসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন,’ হাসল জার্মান ব্যবসায়ী।
‘তা তো বটেই;’ হের মুলারের দিকে তাকাল রানা।
পাহাড়ের নিচের ঢালে চোখ বোলাচ্ছে ভদ্রলোক। নিচু গলায় বলল, ‘আপনার সুন্দরী স্ত্রী কোথায় গেলেন?’
‘ব্যাগেজ গুছিয়ে নিচ্ছে।’
‘এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবেন?’
‘উপায় কী, ওর বান্ধবীর মা মারা গেছে।’
‘দুঃখজনক। স্কিয়িঙের জন্যে আজকের দিন বড় সুন্দর।’
‘ঠিকই বলেছেন।’
বোল্ডারের ওপরে বসল হের মুলার। তার পাশে বসে পড়ল রানা। বুটের ফিতা শক্ত করে বেঁধে নিয়ে স্কি দুটোর নিচে মাখিয়ে নেয়ার জন্যে নীল মোম বের করল হের মুলার।
অলস সময়ে কিছু করার নেই, তাই জানতে চাইল রানা, ‘আপনারা বন্ধুরা যে সঙ্গে এল না আজ?’
‘ওরা হোটেলে রয়ে গেছে,’ হাসল হের মুলার। ‘দু’জন তো এখনও ঘুম থেকে ওঠেইনি। গতরাতে সেই দুর্ঘটনার পর বার এস্কুইতে গিয়ে গলা পর্যন্ত কনিয়্যাক গিলেছে।’
‘আপনাকে তো কখনও একা থাকতে দেয় না, তাই জানতে চেয়েছি।’
‘টাকার জোর আসলে এমনই,’ গাল কুঁচকে হাসল হের মুলার। ‘যার বেশি আছে, তার কাছে ঘুরঘুর করে চাটার দল। টাকা সবসময় চুম্বকের মত মানুষকে আকর্ষণ করে।’
‘আপনি কিন্তু বন্ধু-সমাজের নিন্দা করছেন, হের মুলার।’
‘মিথ্যা তো আর বলিনি, হের কিং।’ প্রথম স্কি তুলে নিয়ে ওটার নিচে নীল মোম ডলতে লাগল হের মুলার। ভাল জার্মান ভদ্রলোকের মতই নিজের কাজে নিখুঁত।
‘ফ্রাউলিন মারিয়াকে দেখলে আমার খুব কাছের একজনের কথা মনে পড়ে,’ কিছুক্ষণ পর বলল সে।
‘তা-ই? সে কে?’
‘আপনার জানার কথা নয়, তবে সে ছিল আমার একমাত্র মেয়ে, মুখ তুলে রানাকে দেখল হের মুলার। আবার মোম ডলতে লাগল স্কির নিচে। ‘অপূর্ব সুন্দরী ছিল।’
‘ছিল বলছেন, ওর কী হয়েছে সেটা কি বলবেন, হে মুলার?’
‘ওর বয়স তখন উনিশ,’ সোনালি রোদে ভরা পাহাড়ের চূড়ার দিকে উদাস চোখে তাকাল হের মুলার। ‘পড়ছিল সুইট্যারল্যাণ্ডের নামকরা এক ইউনিভার্সিটিতে। ওর মা, মানে আমার স্ত্রী মারা গেছে বহু বছর আগে। শিলা তখন একেবারেই ছোট্ট। সে-সময়ে বারবার ভাবতাম কী করে অবোধ এই বাচ্চাটাকে মানুষ করব? আমার কথা বুঝতে পেরেছেন, হের কিং?’ রানার দিকে তাকাল হের মুলার।
‘আমি কখনও কারও বাবা হইনি, তাই একজন বাবার মনের অনুভূতি কীভাবে বুঝব, বলুন?’ নরম সুরে বলল রানা।
‘যা বললেন, সেটা আপনার অন্তরের কথা, কাজেই কেউ আপনাকে দোষ দেবে না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল হের মুলার। ‘অজান্তে অবহেলা করা, সময় না দেয়া বা ভুল পথে সন্তানকে ঠেলে দেয়া, তার সবই করেছি আমি। তাই শিলা যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো, আমার ওপরে অভিমান করে বন্ধ করে দিল সব যোগাযোগ।’
‘আজকাল সব দেশেই এসব হচ্ছে।’
‘শিলা যা করল, সেটার জন্যে তৈরি ছিলাম না আমি। বাজে বন্ধু-বান্ধবীর পাল্লায় পড়ে ড্রাগসের নেশায় ডুবে গেল।’ রানাকে আরেকবার দেখল হের মুলার। আবার মন দিল স্কিতে মোম পলিশে। ‘তাতে ভীষণ রেগে গেলাম।
হের মুলারের দিকে চেয়ে আছে রানা।
‘পুরো একবছর নেশার জগতে থেকে ওভারডোযের কারণে মারা গেল শিলা,’ গ্রানাডার সুউচ্চ চূড়া দেখল হের . মুলার। ‘নিজের হাতে নিজেকে শেষ করে দিল।’
‘আমি দুঃখিত, আন্তরিক সুরে বলল রানা।
‘আমাকে সান্ত্বনা দেবেন না, কারণ ওর মৃত্যুর পেছনে ছিল আমার নোংরা হাত,’ কর্কশ শোনাল হের মুলারের কণ্ঠ। হাসিখুশি গলা এখন হারিয়ে গেছে। ‘বাবা হিসেবে কোন দায়িত্ব পালন করিনি। চরম অবহেলা করেছি নিজের একমাত্র সন্তানকে। একের পর এক সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে এসে নিজের বাড়িতে রেখেছি। আর তাতে আমার কাছ থেকে বহু দূরে সরে গেছে শিলা। ঘৃণা করেছে আমাকে। প্রথম সুযোগে চলে গেছে আমার প্রভাব বলয়ের বাইরে। শেষ করে দিয়েছে নিজেকে। আর তারপর ওকে হারিয়ে বসার পর বুঝলাম, কত চরম প্রতিশোধ নিয়েছে ও আমার ওপরে।’
চুপ করে থাকল রানা।
‘শিলা ভাল করেই জানত, আমি কী ধরনের ব্যবসা করি।’
হের মুলারের দিকে তাকাল রানা। বুঝে গেছে, এরপর কী ধরনের কথা বলবে হের মুলার।
‘আমি ড্রাগসের ব্যবসা করতাম,’ তিক্ত হাসল লোকটা। ‘হ্যাঁ, আমারই ছড়িয়ে দেয়া ভয়ঙ্কর ড্রাগের কবলে পড়ে নিজে শেষ হয়ে গেছে শিলা। হের কিং, আপনি বলতে পারেন, আমি যা করেছি, সেজন্যে আমার ওপরে চরম প্রতিশোধ নিয়েছে প্রকৃতি।
মৃদু মাথা দোলাল রানা।
‘শিলার কফিন কবরে শুইয়ে দিয়ে পরের ক’দিন শুধু ভেবেছি, শত কোটি মানুষের ওপরে কত ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়েছে আমার সরবরাহ করা ড্রাগসের। এসব ভাবতে গিয়ে হয়ে গেলাম প্রায় উন্মাদ।’ দ্বিতীয় স্কির নিচে মোম ঘষছে হের মুলার। ‘তখনই শপথ করলাম: যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে, ড্রাগসের সঙ্গে জড়িত জানোয়ারগুলোর বিরুদ্ধে লড়ব।’
রানাকে দেখল হের মুলার। ‘মাফিয়া থেকে আমাকে সতর্ক করা হলো, তাদের সংগঠন থেকে বেরিয়ে গেলে প্রাণে বাঁচতে দেবে না তারা আমাকে। দুনিয়ার কোথাও লুকিয়ে বাঁচব না।’ তিক্ত হাসল সে। ‘আমার কথা বুঝতে পেরেছেন, হের কিং?’
‘হ্যাঁ, সেনোর রোমিয়ো মোরেলি।’
‘হ্যাঁ, আমিও জানি আপনি কে। আপনি মিস্টার রানা, যার কথা বিসিআই চিফ আমাকে বলেছেন। তাঁর সংগঠনের সেরা এজেন্ট আপনি।’
মোরেলি আরও কিছু বলরে, সেটা বুঝে চুপ করে থাকল রানা।
‘প্রথমে ভাবলাম আপনার হাতে তুলে দেব মাইক্রোফিল্ম। আর সেজন্যে কর্সিয়া থেকে ইয়ট দ্য লিলিতে চেপে রওনা হলাম ম্যালাগার উদ্দেশে। মনস্থির করলাম আপনার সঙ্গে দেখা করব সিয়েরা নেভাডায়। কিন্তু আমারই খুব কাছের কেউ আগেই ফাঁস করে দিয়েছে আমার পরিকল্পনা। তাতে সতর্ক হয়ে উঠল ইতালিয়ান ও আমেরিকান মাফিয়া কাপোরা। তারা ভাড়া করল নামকরা পেশাদার খুনি কিউলেক্সকে। আমিও বুঝলাম, যে-কোন সময়ে হামলা হবে আমার ওপরে। তখন আমার পুরনো বন্ধু বাস্তিলো দে ভ্যানারির সাহায্য নিলাম। আমার চরিত্রে ইয়টে অভিনয় করল সে। আর এ-সুযোগে ভ্যালেন্সিয়া বন্দরে নেমে উধাও হলাম আমি।’
‘এ-পযন্ত আমি জানি,’ বলল রানা।
‘ভাবতেও পারিনি ইয়টে উঠে ভ্যানারিকে খুন করতে পারবে কিউলেক্স। কিন্তু ঘটল তেমনই। ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে ভ্যানারির কথা শেষ হলে আপনাকে জানিয়ে দেব, কোথায় দেখা করব আমরা। যা-ই হোক, বন্ধু ভ্যানারি খুন হয়ে গেলে কয়েকটা সূত্র থেকে জানলাম, আমারই অপূর্ব সুন্দরী এক রক্ষিতা চাইছে আমাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে।’
‘এলিনা পার্কারসন।’
‘হ্যাঁ, সে-ই। ভয়ঙ্কর এক নিমফোম্যানিয়াক। ভীষণ লোভী মেয়ে। আমার গড়ে তোলা ড্রাগসের ব্যবসা নিজে চালাতে চাইছে। সেজন্যে যোগাযোগ করেছে মাফিয়া কমিশনে। ওখান থেকে হ্যাঁ-না জানানো না হলেও নিজে থেকেই আমাকে খুন করতে ভাড়া করেছে পেশাদার খুনি।’ তিক্ত হাসল মোরেলি।.
কৌতূহলী চোখে তাকে দেখছে রানা।
‘ওর বারো বছর বয়সে ডেনমার্কের এক খামারে বয়স্ক এক খামারি ধর্ষণ করে ওকে। তাতে প্রেগনেন্ট হয়ে যায় এলিনা। নষ্ট করে দেয়া হয় বাচ্চা। কিন্তু ঘা হয়েছিল ওর ওভারিতে। ফলে হিস্টোরেকটমি করতে বাধ্য হয় ডাক্তারেরা। তাতে বেঁচে থাকল এলিনা। অদ্ভুত সুন্দরী এক মেয়ে। দুর্দান্ত বুদ্ধিমতী। অথচ হয়ে গেছে বন্ধ্যা। আর কোনদিন মা হতে পারবে না। তখন থেকেই দুনিয়াটাকে অন্য চোখে দেখেছে এলিনা। না সে কোন ভদ্রমহিলা, না সে কোন পুরুষ। ওকে বলতে পারেন সুপার হিউম্যান! আমি মাফিয়া কমিশনের সঙ্গে আর নেই, সেটা বুঝতেই ভাবতে লাগল দখল করবে আমার রাজত্ব।’
‘আপনি চান ধ্বংস করে দিতে ড্রাগ চেইন,’ বলল রানা।
‘ঠিকই ধরেছেন। আর সেজন্যে সবই গুছিয়ে নিয়েছি।’
মাথা দোলাল রানা। ‘এবং সেজন্যে আপনাকে খুন করতে জন কার্সনকে ভাড়া করেছে এলিনা পার্কারসন।’
‘আপনার ধারণা সঠিক। বলেছিল, কখনও আমার সঙ্গে বেঈমানি করবে না। তবে আমি ছিলাম সতর্ক। ফলে চোখ রেখেছি এলিনার ওপরে। কর্সিয়ার বাড়িতে ট্যাপ করেছি ওর ফোন। তাতে জেনেছি ম্যালাগার পেশাদার খুনি জন কার্সনকে ভাড়া করেছে সে। আমার কথা কি আপনি বুঝেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
এরপর আমি নিজেই কার্সনের ওপরে চোখ রাখতে ভাড়া করলাম একজনকে। অবশ্য ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী কার্সনের সত্যিকারের নাম হচ্ছে অ্যালেন রলিন্স। আমেরিকার নাগরিক। ওর বাবা-মা ফ্রান্সের এক ব্যাঙ্কে ডাকাতি করতে গিয়ে খুন হয়। তখন থেকে প্যারিসে অমানুষ হয়েছে রলিন্স।’
‘মারা গেছে সে,’ সহজ সুরে বলল রানা।
‘আমারও তা-ই ধারণা,’ কাঁধ ঝাঁকাল মোরেলি। ‘আমার কন্ট্যাক্টের কাছে শুনেছি, আপনি আর আপনার বন্ধু অ্যালেন রলিন্সকে নাইট ক্লাব থেকে বের করে নিয়ে গেছেন। অবশ্য তার আগেই খুন হয়ে গেছে সে।’
‘দেখা যাচ্ছে সবদিকেই আপনার নজর থাকে।’
‘সবদিকে তো আর চোখ রাখতে পারি না, তবে ম্যালাগায় রলিন্সের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিই ক্যাথি মোনালিসাকে। সে-ই প্রথম জানাল, আমাকে খুন করতে সোল ই নিয়েরেতে আসছে লোকটা। এরপর আপনার সঙ্গে আর ভেলেটায় গিয়ে দেখা করিনি।’
‘আমিও সেটাই ভেবেছি।’
জুতোয় স্কি সেট করে নড করল মোরেলি। ‘ভাবলাম ইয়টে মাফিয়া কাপোদের পাঠানো খুনির গুলিতে খুন হয়েছে এলিনা। কিন্তু পরে বুঝলাম সামান্য আহত হয়ে দিব্যি বেঁচে আছে বেঈমান মেয়েলোকটা। তখন মেনে নিতে হলো, এরপর থেকে শুধু মাফিয়ার পাঠানো খুনি নয়, এলিনা পার্কারসনের লেলিয়ে দেয়া খুনির জন্যেও সতর্ক হতে হবে আমাকে। একদিকে কিউলেক্স, আরেকদিকে অ্যালেন রলিন্স। ‘তখন বাধ্য হয়ে হলাম হের আর্নেস্ট মুলার। ভ্যালেন্সিয়ার এক থিয়েটার থেকে ভাড়া করলাম তিন অভিনেতাকে। আমি মস্তবড় এক ব্যবসায়ী, আর আমার পা চাটতে ব্যস্ত হয়ে আছে তিন কর্মচারী।’
হেসে ফেলল রানা। ‘বুদ্ধিটা কিন্তু চমৎকার।’
বিপজ্জনক পেশায় প্রচুর মাথা খাটাতে হয়েছে। ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল মোরেলি। ‘যদিও ওটাকে আমার কোন পেশা বলা উচিত হয়নি। ছিলাম একদল নরপশুর দলনেতা।’
মাথা দোলাল রানা। ‘আপনি বলুন, আমি শুনছি।’
‘এখানে এসে আপনাকে দেখে বুঝলাম, আপনি একজন যোগ্য মানুষ।’ হাসল মোরেলি। ‘দূর থেকে দেখলাম কীভাবে আপনার হাতে খুন হলো কিউলেক্স। ভেবেছিলাম ওর হাতে খতম হবে রলিন্স। কিন্তু সেটা আর হলো না। গতকাল আমার জন্যে বিস্ময়কর ছিল এলিনার আকস্মিক মৃত্যু। প্রাডো লানোর মানুষ যা-ই বলুক, আমার মনে হয়নি জেনে-বুঝে আত্মহত্যা করে বসেছে সে। অবশ্য এটা হতে পারে, গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড় থেকে নদীর খাদে গিয়ে পড়েছে সে।’
‘যেভাবেই ওর মৃত্যু হোক, আপনার হাতে খুন হবে সে- ভয়ে এখান থেকে চলে যেতে চেয়েছিল এলিনা,’ বলল রানা।
‘হাতের নাগালে পেলে ওকে সত্যিই বাঁচতে দিতাম না। যা-ই হোক, বড় কথা হচ্ছে সে এখন আর বেঁচে নেই।’ স্কির কেবল শক্ত করে বাঁধল মোরেলি, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কুঁজো হয়ে রানার দিকে তাকাল।
জবাবে মাথা দোলাল রানা। স্কি রান বেয়ে নেমে যাওয়ার জন্যে তৈরি।
‘বেশি খাড়া ঢাল দিয়ে নেমে যেতে আপত্তি নেই তো?’ জানতে চাইল মোরেলি।
‘নেই,’ বলল রানা।
‘আমরা স্কিয়িং শুরু করার আগে আপনার হাতে একটা জিনিস দিতে চাই,’ আন্তরিক হাসল রোমিয়ো মোরেলি। তার হাতে এখন একটা এনভেলপ। ভেতরে ফোলা কী যেন।
ড্রাগ লর্ডের হাত থেকে এনভেলপ নিল রানা। একমাথা খুলে ভেতরে উঁকি দিল। খামের ভেতরে ছোট্ট মাইক্রোফিল্ম।
‘যা ভাবছেন সেটাই, ওটার ভেতরে সবই পাবেন,’ বলল মোরেলি, ‘সবার নাম, বাড়ির ঠিকানা, নতুন রুট আর করে কখন কোথায় ড্রাগ চালান দেয়া হয়েছে ইত্যাদি। এ-ছাড়া বেশ কয়েকজন মাফিয়া ডন এবং তাদের ঘনিষ্ঠ লোকদের ছবি।’
‘ধন্যবাদ, মোরেলি,’ মন থেকে বলল রানা।
ওর পিঠে হালকা চাপড় দিল মোরেলি। ‘চলুন, এবার রওনা হই!’ সামনে বেড়ে ফল লাইন থেকে খসে পড়ল সে। নিচের তুষারে স্কি নেমে যেতেই বাঁক নিয়ে পাথরের কিছু স্তূপ পাশ কাটিয়ে তীরবেগে ছুটে চলল নিচে।
স্কি জ্যাকেটের পকেটে মাইক্রোফিল্ম রেখে মোরেলির পিছু নিল রানা। আজকের গুঁড়ো তুষার সত্যি মসৃণ। নেমে যাওয়ার সময় ওটার বুকে বসে যাচ্ছে রানার স্কি। পাথরের স্তূপ এড়িয়ে বাঁক নিয়ে শুরু হলো তুমুল স্কিয়িং।
ঝড়ের বেগে নেমে চলেছে মোরেলি। বাঁক নিয়ে তার পিছনে ছুটে চলল রানা। তারই ফাঁকে ওর চোখে পড়ল দ্বিতীয় স্কি রানে আছে আরেক স্কিয়ার। সেই ঢালু পথে কোন কোন জায়গায় জড়িয়ে-পেঁচিয়ে গেছে দুই স্কি রান।
তৃতীয় স্কিয়ার বয়সে তরুণ, পরনে বাদামি পোশাক। টানটান করা তারের মত মেদহীন দেহ। দুর্দান্ত স্কি করছে। প্রতিটা বাঁক যেন তার চিরকালের চেনা।
দুই স্কি রান যেখানে এক হয়েছে, ওখানে পৌঁছে সমতল এলাকা বেছে নিয়ে গতি কমাল তরুণ। পাথরের উঁচু পিঠের কারণে তাকে আর দেখতে পেল না রানা। দুই স্কি রানের ওপরদিকের সঙ্গমে এসে মোরেলিকে ধরল ও। খুশিমনে বলল, ‘আজকের দিন সত্যি স্কিয়িং করার জন্যে দারুণ!’
মাথা দোলাল মোরেলি। ‘এবার আসুন, পরের ধাপে নেমে যাই!’ প্রচণ্ড বেগে নেমে যেতে লাগল সে।
পিছু নিল রানা। অবশ্য সামান্য ঢিলা হয়ে গেছে ওর ডান পায়ের স্কি। তুষারে যেন আরও ভালভাবে বসে স্কির তলা, সেজন্যে গতি কমিয়ে আরেকটু ভাঁজ করল দু’হাঁটু। খাড়া পথে নেমে যেতে লাগল বিদ্যুদ্বেগে। কিছুটা নিচে বড় দুটো পাথরের স্তূপের মাঝে সরু পথ। একবার ওটা পেরোলে দারুণ সুন্দর চওড়া ঢালু জমি। যে-কোন দক্ষ স্কিয়ার বলবে, ওটা স্কিয়িং করার জন্যে পৃথিবীর বুকে আস্ত এক স্বর্গ। এরই ভেতরে ওখানে পৌঁছে গেছে মোরেলি। নতুন উদ্যমে রওনা হলো রানা। চাইছে মোরেলির বামে পৌঁছে যেতে। আর তখনই আবারও দেখতে পেল তরুণ ছেলেটাকে। দ্বিতীয় স্কি রান বেয়ে রানা বা মোরেলির চেয়ে ঢের বেশি বেগে নেমে গেছে সে।
সামনেই আবার. এক হয়েছে দুই স্কি রান। তারপর তুষারে ঢাকা পাহাড়ের চওড়া এক ঢাল নেমে গেছে বহু একবার ওদিকে চেয়ে আইস হকি স্টপ করল রানা। অর্থাৎ কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল। নিচের মসৃণ তুষার যেন দেখতে ঠিক পাউডার দুধের মত। নিচেই শক্ত বরফ। ওদিকে আরেকবার চেয়ে মাঠের অ্যাঙ্গেলটা সন্দেহজনক বলে মনে হলো রানার। কোথাও বরফের সমতল প্রান্তর, আবার কোথাও ঝুপ করে নেমে গেছে বহু নিচে। আরেকটু ওপরের তুষার নিরাপদ বলে মনে হলো না ওর।
যদিও নিচের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার আধাআধি জায়গা এরই ভেতরে পাড়ি দিয়েছে মোরেলি। তাতে কোন বিপদ হয়নি তার। রানার নিচে ডানে সরে নেমে যেতে যেতে আবার বামে সরল মোরেলি। আর তখনই তার পেছনে সেই তরুণকে আবার দেখতে পেল রানা। এইমাত্র পাহাড়ের শিরদাঁড়ার মত এক জায়গা থেকে নতুন করে নিচে রওনা দিয়েছে তরুণ।
আবারও স্কিয়িং শুরু করবে রানা, এমন সময় কী যেন; ঝলসে উঠল ওর চোখের কোণে। ঘাড় ফিরিয়ে ওদিকে তাকাল। কড়া রোদে কুঁচকে গেল ওর দুই চোখের পাতা। নিজেকে মনে মনে জিজ্ঞেস করল, আমি কি ভুল দেখলাম?
না, তা তো নয়!
তুষারের মাঠে থেমেছে তরুণ।
রোদ পড়ে হাতে ঝিলিক দিচ্ছে কী যেন!
বাম বগলে পোল গুঁজে ছুটন্ত মোরেলিকে লক্ষ্য করে পিস্তল তাক করেছে তরুণ!
সাবেক ড্রাগ লর্ড জানেও না যে গুলি করা হবে তাকে। ‘মুলার!’ গলা ফাটিয়ে সতর্ক করল রানা। ‘সাবধান!’
ঘাড় ফিরিয়ে ওপরের ঢালে তাকাল মোরেলি। হাতের ইশারায় তরুণকে দেখাল রানা। কিন্তু মোরেলি যেখানে আছে, ওখান থেকে ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছে না সে। ঘন ঘন হাত নাড়ছে রানা। মোরেলি বুঝে গেল, কোথাও বড় কোন ঝামেলা হয়েছে। তাকে সরে যেতে বলছে বিসিআই এজেন্ট। বাঁক নিয়ে অন্যদিকে সরে যেতে চাইল সে। কিন্তু ছুটে চলায় মনোযোগ ছিল না বলে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল তুষারের ঢালু মাঠে। শরীর মুচড়ে আঘাতটা নিল ঊরুতে। গড়াতে গড়াতে নেমে যেতে লাগল নিচে।
এদিকে দুই পোল ব্যবহার করে দ্রুত রওনা হয়েছে রানা। সরাসরি নামছে একসারি পাথরের দিকে। ওখানে ঘাপটি মেরে আছে সেই তরুণ। ছুটতে ছুটতে বামহাতে পোল দুটো নিল রানা, পরক্ষণে ওর হাতে উঠে এল ওয়ালথার পিপিকে।
পাথরগুলোর ওদিকে তরুণের মাথা দেখতে পেল রানা। নেমে যাওয়ার সময় টের পায়নি, সামনেই আছে ফুলে ওঠা তুষারের বড় একটা স্তূপ। তীব্রবেগে ওটার একপাশে পৌছুতেই ডুবে গেল ওর দু’হাঁটু। হুমড়ি খেয়ে তুষারে পড়ল রানা। পা থেকে ছিটকে গেছে একটা স্কি। গোটা এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে গুঁড়ো তুষারের ধস। ওটার সঙ্গে সরসর করে নেমে চলেছে স্কিটা। নিজেও পিছলে নামছে রানা। অবশ্য কয়েক সেকেণ্ড পর থেমে গেল ওর পতন। পাশে এসে থামল দ্বিতীয় স্কি। স্কি কখন হারিয়ে গেছে, জানেও না রানা। : ধড়মড় করে উঠে বসে এদিকে-ওদিকে তাকাল।
তুষার ধসের এলাকা থেকে সরে গেছে রোমিয়ো মোরেলি। ঘুরে তাকাল কালো পাথরের স্তূপের দিকে। আর তখনই তার দিকে গেল তরুণের প্রথম গুলি।
অবশ্য মিস করেছে সে। পাথরের স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তরুণ। এবার তাকে পরিষ্কার দেখতে পেল রানা। এগোতে শুরু করেছে ছেলেটা।
টার্গেটে বুলেট লাগার সম্ভাবনা খুব কম, তবুও তার মাথা লক্ষ্য করে ওয়ালথার থেকে গুলি পাঠাল রানা।
ঝট করে ঘুরে ওকে দেখল তরুণ। গুলির আঘাতে মাথা থেকে খসে গেছে তার ক্যাপ। কাঁধে লুটিয়ে পড়েছে একরাশ সোনালি চুল। এবার ভাল করেই তাকে চিনল রানা।
মেয়েটা অপরূপা সুন্দরী এলিনা পার্কারসন!
এক সেকেণ্ডে রানা বুঝে গেল, আসলে কী ঘটেছে।
জাগুয়ারের ভেতরের লাশটা ছিল ক্যাথি মোনালিসার!
কার্সনের ঘরে খুনিটাকে নির্দেশ দিতে হাজির হয়েছিল এলিনা পার্কারসন। লোকটার লাশ ওখানে দেখার পর ফোন করে লাউঞ্জ থেকে ডেকে নিয়েছে ক্যাথিকে। ভাল করেই জানত, ক্যাথি আসলে মোরেলির গুপ্তচর। মেয়েটা ঘরে ঢুকতেই পিস্তলের মুখে তাকে নিয়ে গেছে ব্যালকনিতে। পরে হোটেল থেকে বের করে খুন করেছে নিজের গাড়ির ভেতরে। কার্সনের ঘরে জরুরি কিছু আছে কি না, সেটা জানতে আবার ফিরে এসেছে ড্যানিশ দানবী। তার একটু পর ওখানে ঢুকল রানা। ওর কণ্ঠস্বর শুনে বাথরুমে লুকিয়ে পড়ল মেয়েটা। তারপর রানা সেখানে ঢুকলে ওকে ড্রাগ দিয়ে অবশ করে পালিয়ে গেছে। বুঝেছিল, একটু পর তাকে খুঁজতে শুরু করবে রানা। কাজেই লবিতে নাটক করে গভীর রাতে বেরোল হোটেল থেকে। জাগুয়ারের ড্রাইভিং সিটে আগেই বসিয়ে রেখেছিল ক্যাথির লাশ। প্রথম সুযোগে গাড়ি নিয়ে রওনা হলো এলিনা। রাস্তায় ঘোড়ার নালের মত জায়গায় গতি কমিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তার আগে লম্বা কিছু দিয়ে ঠেস দিয়েছে অ্যাক্সেলারেটর প্যাডেলে। তাতে দ্রুত গতিতে রওনা হয়েছে জাগুয়ার। ঝড়ের বেগে রাস্তার পাশের নিচু দেয়াল টপকে গাড়িটা গিয়ে পড়েছে পাহাড়ি নদীখাদে। ওদিকে আঁধারে পালিয়ে গেছে এলিনা পার্কারসন।
আর এখন এসেছে মোরেলিকে খুন করতে, যাতে সে হতে পারে মাফিয়ার মহিলা ড্রাগ লর্ড!
মোরেলিকে উঠে দাঁড়াতে দেখল রানা। গম্ভীর চেহারায় নিজের রক্ষিতাকে দেখছে সে। রানার দিকে গুলি পাঠাল এলিনা। জবাবে নিজেও তাকে লক্ষ্য করে গুলি করল রানা। অবশ্য অনেক বেশি দূরে রয়ে গেছে মেয়েটা।
একবার রানাকে দেখল এলিনা, তারপর তাকাল মোরেলির দিকে। এক পা এক পা করে এগোল ড্রাগ লর্ডের দিকে।
ফস্কা তুষার থেকে বেরিয়ে প্রায় দৌড়িয়ে ঢালু পাহাড় বেয়ে নেমে চলেছে রানা। বুঝে গেছে, বিপজ্জনক পেশার বেশিরভাগ লোকের মতই নিজের সঙ্গে অস্ত্র রাখে না মোরেলি। ধীর পায়ে সাবেক ড্রাগ লর্ডের দিকে হাঁটছে এলিনা, হাতে উদ্যত পিস্তল।
মোরেলি আর এলিনার বেশ ওপরে তুষারের মাঠ ঘিরে জমাট-বাঁধা বরফের আস্তরণ। স্কিয়ারদের ছুটে চলার কম্পন ও গুলির বিকট আওয়াজে ওখানে কটকট শব্দে ফাটছে বরফ। যে-কোন সময়ে হুড়মুড় করে নেমে যাবে হিমস্রোত।
আর সেটাই হয়তো রক্ষা করবে মোরেলিকে।
বরফের মাঠের দিকে ওয়ালথার তাক করে এক এক করে তিনটা গুলি’ করল রানা। পাহাড়ে লেগে চারদিকে ছড়িয়ে গেল গুলির জোরাল প্রতিধ্বনি। তার তিন সেকেণ্ড পর মড়াৎ করে জোর শব্দ তুলে ফাটল ধরল তুষারের মাঠের চারপাশের শক্ত বরফে। পরক্ষণে পিছলে নিচে রওনা হলো মাঠের তুষার ও বরফের চাঁই। মাত্র পাঁচ সেকেণ্ডে অবিশ্বাস্য গতি পেল ওটা!
হিমস্রোতের সুনামি নেমে আসতে দেখছে এলিনা, কোথাও যে পালিয়ে যাবে সে-উপায় নেই। পর পর দু’বার মোরেলিকে লক্ষ্য করে গুলি করল সে। তারপর নেমে যেতে লাগল সাবেক প্রেমিকের দিকে। যদিও পরের সেকেণ্ডে ওকে তলিয়ে দিয়ে তীব্রবেগে নেমে গেল হিমস্রোত। পলকের জন্যে মেয়েটার কাঁচা সোনার মত চুল দেখতে পেল রানা।
বহু নিচে পাথুরে দেয়ালে ভীষণ জোরে ‘থ্যাপ!’ আওয়াজে আছড়ে পড়ল তুষারের স্রোত। ওখানে ফুলে উঠে তৈরি করল মাঝারি আকারের শুভ্র একটা টিলা।
উঠে দুই স্কি জড় করল রানা, তারপর ও-দুটো বুট জুতোয় আটকে নিয়ে. ধীরে ধীরে নেমে গেল মোরেলির কাছে।
কাত হয়ে পড়ে আছে ড্রাগ লর্ড। বুকের কাছের তুষার ভিজে গেছে লাল রক্তে। লোকটার সামনে গিয়ে থামল রানা।
ব্যথায় পাণ্ডুর হয়ে গেছে মোরেলির মুখ। চোখে ঝাপসা দৃষ্টি। একবার মাথা তুলে রানাকে দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘আজকের এই পরিণতি আসলে আমার প্রাপ্য ছিল, রানা। শুধু দুঃখ এটা, দেখে যেতে পারলাম না ধ্বংস হয়ে গেছে ড্রাগের চেইন!
তার পাশে বসে হাত দিয়ে মোরেলির ঘাড় তুলে ধরল রানা। ঘোলা চোখে ওকে দেখছে মোরেলি।
‘ভেবো না, মোরেলি, অবশ্যই শেষ করে দেয়া হবে ওটা,’ নরম সুরে বলল রানা।
কী যেন ভেবে স্মিত হাসল মোরেলি, পরক্ষণে রানার হাতে কাত হয়ে গেল তার মাথা। মৃত্যু এসেও কেড়ে নিয়ে যেতে পারেনি তার ঠোঁটের মৃদু হাসি।
রোমিয়ো মোরেলির চোখ দুটো বুজে দিয়ে উঠে দাঁড়াল রানা। অপেক্ষা করল গার্ডিয়া সিভিল অফিসারদের জন্যে। যে-কোন সময়ে হাজির হবে তারা।
Chapter - 19
উনিশ
কিছুক্ষণ পর তুষারে ভরা পাহাড়ি ঢালে এল গার্ডিয়া সিভিলের চার অফিসার। এদের ভেতরে আছে রানার পরিচিত সেই গোঁফওয়ালা লোকটা। দলের অন্য তিনজনকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে কী যেন বলল সে। তারপর মৃত মোরেলি আর রানার সামনে এসে বলল, ‘ঠিক আছে, সেনোর, আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না। আপনি হোটেলে ফিরে যেতে পারেন।’
নিজে থেকেই এলিনা পার্কারসনের তুষারের নিচে চাপা পড়ার বিষয়টা তাকে জানাল রানা। জবাবে অফিসার বলল, কোদাল এনে মেয়েটাকে খুঁড়ে তুলবে তারা।
আর কিছু করার নেই সেটা বুঝে স্কিয়িং করে নিচে রওনা হলো রানা’। ভাবছে, শেষ হয়ে গেছে ওর মিশন ব্ল্যাক লিস্ট। এবার ফিরে যেতে হবে হোটেলে। নিজের কামরায় গিয়ে শাওয়ার নেবে। স্পেন ত্যাগ করবে বলে আগেই গতকাল রাতে গুছিয়ে নিয়েছে লাগেজ। এই দেশে ওর আর কোন কাজ নেই।
বিশ মিনিট পর হোটেলে পৌছুল রানা। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল ওদের সুইটের সামনের করিডরে। তালা খুলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল নিজের কামরায়। দরজা আটকে পোশাক ছেড়ে পা রাখল বাথরুমে। দশ মিনিট উষ্ণ জলে ভিজে দেহ- মন থেকে দূর করল সব ক্লান্তি। একটু পর কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। গিয়ে থামল বেডপোস্টে ঝুলন্ত শোল্ডার হোলস্টারের কাছে। চামড়ার খাপ থেকে নিল ওয়ালথার। দ্রুত চেক করল গুলি আছে ম্যাগাযিনে।
পা শুকিয়ে গেছে ওর। গোড়ালিতে টেপ দিয়ে আটকে নিল স্টিলেটো। গায়ে দিল আরামদায়ক সুতির রোব। আবার ফিরল বাথরুমের দরজার সামনে। বাষ্পে ঘোলা হয়ে গেছে আয়না। অবশ্য অভিজ্ঞতা থেকে চিরুনি দিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে নিল রানা। ঘুরে দেখল ওর ট্র্যাভেল ব্যাগ। গতকাল ওটার ভেতরে সব গুছিয়ে রেখেছে। একবার ভাবল, ছাড়া পোশাক ওটার ভেতরে গুঁজে তারপর টোকা দেবে মারিয়ার কামরার দরজায়। পরক্ষণে উড়িয়ে দিল ভাবনাটা। কাপড় পরে ভরবে ব্যাগে। দৃঢ়পায়ে গিয়ে নক করল পাশের দরজায়।
‘কান ইন,’ পাশের ঘর থেকে এল চাপা মেয়েলি কণ্ঠ।
‘তুমি কি ম্যালাগায় যাওয়ার জন্যে রেডি?’
ওদিকের ঘর থেকে জবাব দিল না কেউ।
দরজা খুলে পাশের কামরায় ঢুকল রানা। পেছনে কবাট আটকে দিয়ে ফিরে চেয়ে বিস্মিত হলো। একটু দূরেই চেয়ারে বসে আছে মারিয়া, সম্পূর্ণ উলঙ্গ! রুমাল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে ওর মুখ। দু’হাত পেছনে বাঁধা। পা দুটোও দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়েছে চেয়ারের পায়ার সঙ্গে। অসহায় চোখে রানার দিকে চেয়ে আছে মারিয়া।
চট্ করে অর্ধেক ঘুরে ডোর নব ধরল রানা। কিন্তু তখনই নরম সুরে বলে উঠল এক নারীকণ্ঠ: ‘ভুলেও দরজা খুলবে না!’
দুলে উঠেছে ঘরের জানালার পর্দা। ওটার পেছন থেকে বেরোল এলিনা পার্কারসন, হাতে বড় একটা পিস্তল!
মেয়েটার হাতে বেমানান দেখাচ্ছে জন কার্সনের ওয়েবলি মার্ক সিক্স।
এলিনার পরনে এখনও স্কি ড্রেস। তুষারের তলা থেকে উঠে আসতে গিয়ে ভিজে গেছে। মেয়েটার চোখে খেপা দৃষ্টি।
‘হ্যালো, ডার্লিং রানা,’ বাঁকা হাসল এলিনা।
‘তা হলে ভালই আছ, লিনা,’ সহজ সুরে বলল রানা।
‘ভাল? তা বলতে পারো। অ্যাভালাঞ্চ তৈরি করেও খুন করতে পারোনি আমাকে।’
‘তা-ই তো দেখছি।’
ঘুরে উলঙ্গ মারিয়ার দিকে তাকাল রানা। জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে মেয়েটার দুই স্তনবৃন্ত। একপলকে রানা বুঝে গেল, এলিনার ভেতরে আছে স্যাডোম্যাসোকিস্টিক স্ট্রেইন। সাধারণত ওটা থাকে লেসবিয়ানদের ভেতরে। একই সঙ্গে সঙ্গে এরা হয়ে ওঠে ছিঁচকে চোর বা নিমফোম্যানিয়াক।
‘তুমি আসলে অসুস্থ মানসিকতার মেয়ে, লিনা, শান্ত স্বরে বলল রানা। ‘মানুষকে কষ্ট দিয়ে তোমার আসলে লাভ কী?’
বোমার মত বিস্ফোরিত হলো এলিনা পার্কারসন। ‘গাধা মোরেলি চেয়েছে ড্রাগ চেইন নষ্ট করে দিতে! অথচ, দুনিয়ার সেরা বড়লোক হওয়ার সুযোগ ছিল তার সামনে! কী করে যেন নষ্ট হয়ে গেল হারামজাদার মাথা, নইলে এমন বোকার কাজ করবে কোন্ উন্মাদ?’
‘ড্রাগের কারণে মারা গিয়েছিল ওর মেয়ে।’
টিটকারির হাসি হাসল এলিনা। ‘ওই বেটি তো দুনিয়ার অন্যসব মাতারির মতই পাকা বেশ্যা! ইউনিভার্সিটিতে এমন কোন ছেলে ছিল না, যার সঙ্গে সে শুয়ে দেখেনি!’
‘নোংরা কল্পনায় এসব তুমি দেখো, লিনা,’ ঠাণ্ডা স্বরে বলল রানা। ‘আমার মনে হয় তোমার উচিত ভাল একজন মানসিক ডাক্তার দেখানো।’
মাথা পেছনে নিয়ে অট্টহাসি দিল এলিনা পার্কারসন। ‘তুমি আসলে বড় বোকা, রানা! জানোই তো না মেয়েমানুষ কত খারাপ হয়! অবশ্য আমার কথা আলাদা!’
ওর নিজের ঘরে বেডপোস্টে হোলস্টারে ওয়ালথার রয়ে গেছে, সেটা মনে পড়ল রানার। এখন সত্যি নিজেকে বোকা বলেই মনে হচ্ছে ওর। বিপজ্জনক মিশনে অসতর্ক হওয়া একদম উচিত হয়নি। আর সেজন্য এবার হয়তো বেকায়দায় পড়ে খুন হবে।
‘দিয়ে দাও মাইক্রোফিল্ম, রানা,’ পর্দার কাছ থেকে সরে এল এলিনা। ‘মোরেলির সঙ্গে তোমাকে দেখেছি। সে নিশ্চয়ই ওটা তোমার হাতে দিয়েছে। রানা, লক্ষ্মী ছেলের মত দিয়ে দাও। নইলে হাসতে হাসতে খুন করব তোমাকে।’
‘অনেক দেরি করে ফেলেছ, লিনা,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। ‘ওটা তুলে দিয়েছি দলের আরেকজনের হাতে। তবুও যদি মারিয়া আর আমাকে খুন করতে চাও, তো কিছু বলার নেই।’
‘মিথ্যা কথা বলবে না!’ গর্জে উঠল এলিনা। ‘তোমরা খুন হবে কি না তা নিয়ে আমার কোন, মাথা-ব্যথা নেই! তোমাদেরকে ছেড়েও দিতে পারি। তবে আগে আমাকে দিতে হবে মাইক্রোফিল্ম!’
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রানা। ‘ওই যে বললাম, দেরি করে ফেলেছ!’
সকালের রোদ পড়া হিমবাহের মত জ্বলজ্বল করছে এলিনার নীল দু’চোখ। মেয়েটার স্কি ড্রেসের দিকে চেয়ে রানার মনে পড়ল দু’রাত আগে গ্রানাডার হোটেলের সেই অদ্ভুত সুন্দর রাতটির কথা।
ওয়েবলি পিস্তলের নল মারিয়ার বুকে তাক করল এলিনা। খুন করবে ভেবে অসুস্থ খুশিতে চকচক করছে চোখ। ভয়ে মুখ বিকৃত করে ফেলেছে মারিয়া। থরথর করে কাঁপছে হাত-পা। ওর গাল বেয়ে পিস্তলের নল নিচের দিকে নামাল এলিনা।
‘তুমি সত্যিই ভয়ঙ্কর এক পিশাচী,’ শান্ত স্বরে বলল রানা। ‘মারিয়াকে বন্দি করার পর আগুনে পোড়ালে ওর বুক। তোমার কুকীর্তি দেখে এখন আমার মনে হচ্ছে, তুমি আসলে চিরকাল ধরেই ছিলে মানবীর রূপে ভয়ঙ্কর এক রাক্ষসী।’
জবাবে কাঁধ ঝাঁকাল এলিনা। ‘আমি তিন গোনার আগেই মাইক্রোফিল্ম দেবে, রানা; নইলে আমার হাতে খুন হবে মারিয়া। গুনতে শুরু করলাম: এক!’
‘বিশ্বাস করো, আমার কাছে সত্যিই মাইক্রোফিল্ম নেই, ‘ অসহায় সুরে বলল রানা। মনে খেলে গেছে একটা চিন্তা। ওর বোধহয় উচিত এলিনাকে বুঝিয়ে দেয়া, মাইক্রোফিল্ম ওর কাছে আছে বলেই বেশি বেশি প্রতিবাদ করছে ও।
চোখ সরু করে ওকে দেখছে এলিনা। ‘আমি নিজের চোখে তোমাকে মোরেলির সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। আর তখনই ওর কাছ থেকে নিয়েছ জিনিসটা। তোমার সঙ্গে মাত্র একবার দেখা করতে চেয়েছিল। আর সেটা করতে পেরেছে। অর্থাৎ, মাইক্রোফিল্ম এখন তোমার কাছে। ভুলেও মিথ্যা কথা বলার চেষ্টা করবে না, রানা!’
করুণ চেহারায় ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রানা। ‘আমার কথা শোনো, এলিনা। মাইক্রোফিল্ম ডাক-বিভাগের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে মোরেলি। সেটা নিজে বলেছে আমাকে।
‘ডাক-বিভাগকে কখনও বিশ্বাস করত না মোরেলি!’ চোখে আগুন নিয়ে ওকে দেখছে এলিনা। ‘মিথ্যা বলার আর জায়গা পাও না! …দুই!’
‘লিনা, এটাই আসলে সত্যি! বিশ্বাস করো!’ অতি নার্ভাস ভঙ্গিতে তার দিকে কয়েক পা এগোল রানা। ‘দয়া করে অস্ত্রের নল সরাও। এসো, চেয়ার থেকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিই মারিয়াকে। বেচারি ভয়ঙ্করভাবে আহত।’
আধপাক ঘুরে ওর বুকে পিস্তল তাক করল এলিনা। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘ভুলে যেয়ো না এটা .৪৫৫ ক্যালিবার ওয়েবলি! এত কম রেঞ্জে এক গুলিতে ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে তোমার বুক! আর তখন মাইক্রোফিল্মের জন্যে এই গোটা সুইট কষ্ট করে সার্চ করতে হবে আমাকে। তাই ভালর জন্যেই বলছি, রানা, দিয়ে দাও ওটা!’
নীরবে কাঁদতে শুরু করেছে মারিয়া।
একদিকে সামান্য সরে গেল রানা।
‘খবরদার! আর এক পা নড়বে না!’ গর্জে উঠল এলিনা। ঝট্ করে পিস্তল ঘুরিয়ে নল তাক করল মারিয়ার মাথায়। ‘হয় মাইক্রোফিল্ম দেবে, রানা, নইলে এখনই খুন হবে মেয়েটা!
তার চোখ দেখে বুঝল রানা, চরম খেপেছে মেয়েলোকটা।
‘আমি কিন্তু দুই পর্যন্ত গুনেছি, রানা! এবার শেষবারের মত বলব। আর তারপরই…’ বড় করে শ্বাস নিল এলিনা।
‘ঠিক আছে,’ হার মেনে নিল রানা, ‘ওটা আছে আমার রুমে।’
‘আমি তোমাকে একফোঁটা বিশ্বাস করি না!’ টিটকারির হাসি হাসল এলিনা। ‘নিশ্চয়ই তোমার কাছেই আছে! এত দামি জিনিস অন্য কোথাও রাখবে না তুমি!!
এলিনার কথা শুনে ঝুলে গেল রানার নিচের চোয়াল। বোকা-বোকা চেহারায় কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি এত নিশ্চিত হয়ে গেলে কীভাবে?’
চালিয়াতির হাসি হাসল মেয়েটা। ‘ভাল করেই জানতাম! : আর কোথায় রাখবে!’ রানার দিকে এগোল সে। ‘দেরি না করে জলদি ওটা বের করে দাও!’
রোবের পকেটের দিকে হাত নিল রানা। ‘লিনা…’
‘পকেটে সাবধানে হাত ঢোকাবে!’ ওর ঘাড় লক্ষ্য করে পিস্তলের নল তাক করেছে মেয়েটা।
ভয়ে এক পা পেছাল রানা। ‘ও… ওটা আছে আমার পকেটে…’
সতর্ক চোখে ওকে দেখছে এলিনা। ঝড়ের বেগে ভাবছে এবার কী করবে। ‘ঠিক আছে, তো খুলে ফেলো তোমার রোব। এরপর সাবধানে পকেট থেকে বের করে মেঝেতে রাখবে মাইক্রোফিল্ম।’
ধীরে ধীরে রোবের বেল্ট খুলছে রানা। ভাবছে, ওটা তো পকেটে নেই! সেক্ষেত্রে না পেয়ে ওকে খুন করবে পিশাচীটা। আর ওর মৃত্যুর পর দানবীটার হাত থেকে বাঁচবে না মারিয়া। অবশ্য…
‘খোলো তোমার রোব!’ চিৎকার করে ধমক দিল এলিনা।
দূরত্ব অনেক বেশি বলে রোব খুলে মেয়েটার মুখে ছুঁড়ে দিতে পারবে না রানা। সেটা যদি পারত, এক লাফে গিয়ে তার হাত থেকে কেড়ে নিত ওয়েবলি। তিক্ত মনে কাঁধ থেকে রোব সরিয়ে সরসর করে ওটাকে মেঝেতে নেমে যেতে দিল রানা। দাঁড়িয়ে আছে উলঙ্গ এক সঙের মত।
‘রোব তুলে ছুঁড়ে দাও বেডের ওপরে!’
ঝুঁকে রোব তুলে নির্দেশ পালন করল রানা।
ওর বুক-পেটের দিকে পিস্তল তাক করে বেডের সামনে গেল এলিনা। রোবের পকেটে বামহাত ভরে খুঁজতে শুরু করেছে মাইক্রোফিল্ম।
কিন্তু পকেট খালি!
এবার অন্য পকেটে হাত ভরল সে। তিন সেকেণ্ড পর রানার চোখে চোখে চেয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘মিথ্যুক কোথাকার! ওটা কোথায়? কোথায় লুকিয়ে রেখেছ!’
এলিনার নীল দুই মণিতে জ্বলছে নরকের আগুন। রানার শরীরের দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা। কাঁধ আর বুক পার করে চোখ নেমে গেল পা বেয়ে। সামান্য সরে দাঁড়াল রানা। যেন চাইছে না এলিনা দেখুক ওর গোড়ালিতে অ্যাডহেসিভ টেপ।
দৃষ্টি অনুসরণ করে ওর ডান পায়ের ওপরে স্থির হলো এলিনার চোখ। দ্রুত কী যেন ভাবছে। আরও সতর্কতার সঙ্গে চোখ বোলাল রানার পা দুটোর ওপরে। চোখ আটকে গেল ওর গোড়ালির অ্যাডহেসিভ টেপের ওপরে।
‘ওই তো!’ ধমকে উঠল এলিনা, ‘টেপ দিয়ে আটকে রেখেছ! ওটা দাও, রানা! নইলে এক গুলিতে……
‘সত্যি বলছি, এলিনা, ওখানে কিছুই নেই!’ কেমন যেন কেঁপে গেল উলঙ্গ রানার গলা।
‘আর দেরি করলে এক গুলিতে খুন করে তারপর বুঝে নেব আমার মাইক্রোফিল্ম!’
একটা কথাও মিথ্যা বলছে না মেয়েটা, বুঝে গেল রানা। আর কিছু করার নেই এমন একটা চেহারা করে ডান গোড়ালির দিকে ঝুঁকে গেল ও। একটু আগে শাওয়ার নিয়েছে বলে ভিজে আছে টেপ। এক সেকেণ্ডে ওর হাতে উঠে এল স্টিলেটো।
‘আমাকে এক্ষুণি ওটা দাও!!’ সামনে কয়েক পা এগিয়ে বামহাত বাড়িয়ে দিল এলিমা।
সোজা হয়ে মুঠো করা বামহাত সামনে বাড়াল রানা। অতি লোভে আরেক পা এগোল এলিনা। তার দিকে বাম মুঠো এগিয়ে দিল রানা। আরাধ্য জিনিস পাবে ভেবে রানার মুঠো খামচে ধরল মেয়েটা। আর তখনই খপ করে তার কবজি ধরল রানা। একই সময়ে ওর ডানহাতের স্টিলেটো খচ্ করে ঢুকল এলিনার কানের নিচে ঘাড়ের ভেতরে। গলায় গড়গড়ার বিদঘুটে আওয়াজ তুলে পিস্তলের ট্রিগার টিপে দিল মেয়েটা।
হোটেলের রুমের দেয়াল ভেদ করে পাশের কামরায় গিয়ে বিধল বুলেট। আগুনের কমলা হলকায় পুড়ে গেছে রানার বুকের রোম। ঝটকা দিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেছে। ওর পায়ের কাছে ঝুপ করে মেঝেতে পড়ল এলিনা। আর্টারিয়াল ঘন লাল রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সোনার মত সোনালি ঊর্ধ্বাঙ্গ।
অপূর্ব রূপসী এক মেয়ের কী দুঃখজনক পরিণতি!
থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এক. চোখ খুলে রানাকে দেখল এলিনা। ফিসফিস করে বলল, ‘রানা! আমি তো সত্তর বছর বাঁচতাম না-তা-ই না?’
‘তুমি খুব ভুল পেশা বেছে নিয়েছিলে,’ বলল রানা।
একবার ঝাঁকি খেয়ে শিথিল হলো এলিনা পার্কারসনের দেহ। ওর লাশ থেকে সরে মারিয়ার চেয়ারের কাছে গেল রানা। ব্যস্ত হাতে খুলল মেয়েটার হাত-পায়ের দড়ির বাঁধন। মুখের রুমালের গিঁঠ খুলে সাহায্য করল পোশাক পরে নিতে। কাজটা শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে ড্রেস পরল।
পাঁচ মিনিট পর ফিরে এল পাশের ঘরে। এখন ওর হাতে ক্যানন এইট-ফিফটি এমএম এসটিএম লেন্সের ওইএস নাইণ্টিডি থার্টি-টু এমপি ডিএসএলআর। মিশনে কাভার আইডি অনুযায়ী রানা একজন পেশাদার ফোটোগ্রাফার। ক্যামেরা দিয়ে পটাপট তুলে নিল মারিয়ার কয়েকটা ছবি।
‘বলো তো, রানা, মোরেলির সেই মাইক্রোফিল্ম এখন কোথায়?’ জানতে চাইল মারিয়া।
‘আর কোথায়, ভাল ক্যামেরাম্যান কি কখনও নিজের ক্যামেরা হাতছাড়া করে?’ ক্যানন ক্যামেরা দেখাল রানা।
জিভ বের করে ওকে ভেঙচি কাটল মারিয়া।
এ-ছবিটাও তুলে নিয়েছে রানা। দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে বলবে ফোটোগ্রাফার হিসেবে ও ভাল নয়। অবশ্য মারিয়া কখনও জানবে না, রানার প্যান্টের পকেটে নকল সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে আছে মোরেলির মাইক্রোফিল্ম।
আজ রাতেই ওটা পৌঁছে যাবে বিসিআই হেডকোয়ার্টারে!
***
