Chapter - 1
১.
চোখ খুললেই যেন নিজের বুকটাকে দেখতে পায় শুকরা। একচিলতে মাঠ পেরিয়েই চায়ের গাছগুলো ঠাসাঠাসি দাঁড়িয়ে। যেন আকাশ ছুঁয়েছে দিগন্তে গিয়ে সবুজ জমাট ঢেউটা। আরো দূরে মাথাপোঁছা জঙ্গলে হাতছানি। দেখলেই বুক জুড়িয়ে যায়। চায়ের বাগান না বুকের কলিজা।
কিন্তু আজকাল বেশিক্ষণ চোখ চাইতে কষ্ট হয় শুকরার। যত দিন যাচ্ছে তত শরীরটা একটু একটু করে আর নিজের বশে থাকছে না। এই যে হাতের চামড়া ঢলঢলে, পা দুটো কাঠির মত সরু–এগুলো কি নিজের? মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখের সামনে ঝাপসা পর্দা ভাসে, কিছুতেই কাটতে চায় না। তখন, গাছ মাটি আকাশ সব একাকার। চোখ যখন বন্ধ হয় তখন মন কাজ করে যায়। মন দিয়ে দেখা শুরু হয়। সারাজীবন ধরে এই চোখদুটো যা দেখেছে তা বুকের মধ্যে সাজানো আছে। দৃষ্টি অচল হলেই সেগুলো মনের সামনে চলে আসে। নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকে সে।
কুলি লাইনের সামনে এই জায়গাটা বেশ উঁচু। মোটকা একটা কাঁঠাল গাছের তলায় বাঁশ কেটে মাচা বেঁধে ছিল লাইনের লোক আড্ডা মারার জন্যে। সন্ধে হলেই আধবুড়োগুলো এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গপ্পো করে আর হাঁড়িয়া খায়। এখনও নীচে তাকালে শালপাতা ছড়ানো, ছিটানো চোখে পড়বে। কিন্তু দিনের বেলায় কেউ নেই এখানে একমাত্র শুকনো বুড়ো ছাড়া। সাতসকালে কাজে যাবার সময় ওকে বসিয়ে যাওয়া হয় এখানে। ওই চা বাগানের ঢেউ-এর দিকে মুখ করে বসিয়ে দিলে আর কিছু চায় না শুকরা। অবশ্য সঙ্গে একটা কঞ্চিও আছে। এমনি এমনি বসে থাকলে চলবে না। মাঝে মাঝে শাসন করতে হবে ওই কুচোগুলোকে। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত সব। কালো সাপের মতো ছটফটে। লাইনের তাবৎ পরিবার বাচ্চাগুলোকে এখানে ছেড়ে দিয়ে যায় শুকরা বুড়োর জিম্মায়। কিন্তু ওরা বুঝে গেছে যে তার কিছু করার ক্ষমতা নেই। ঝিমুনি কাটিয়ে মাঝে মাঝে হেই বলে চিৎকার করে কঞ্চিটা মাচায় আছাড় মারা ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি বুড়ো ওদের দিতে পারবে না। কুঁজো হয়ে আসা শরীরটা নিয়ে কোনোরকমে যে হেঁটে আসে, সে কী করে পাল্লা দেবে ওদের সঙ্গে। কিন্তু জিভ আছে বুড়োর। বিকেলে বাপ মা ফিরলে ক্যাটস ক্যাটস করে সব কিছু লাগিয়ে দিলে আর দেখতে হবে না। তাই বাচ্চাগুলো কঞ্চির আওয়াজ শুনলেই চুপ করে যায় কিছুক্ষণের জন্যে। পিট পিট করে বুড়োকে লক্ষ্য করে। তারপর কেউ একজন কাছে ঘেঁষে বলে, একটা গল্প বলো আমাদের।
সকালে এখানে এসে ইস্তক মনে মনে হাঁ করে বসে থাকে শুকরা বুড়ো এই অনুরোধটার জন্যে। কথা বলার মানুষ পাওয়া যায় না আজকাল। যে যার কাজে ব্যস্ত। এত কাজ যে কি আছে ছাই মাথায় ঢোকে না ওর। এমন কি ওর বুড়ো ছেলেটা যার বয়স পর্যন্ত সে কাছে আসে না। সূর্য উঠলেই দেখা মেলে না। নাতিটা মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায় কিন্তু শালাকে দেখলেই গা জ্বলে যায় শুকরার। কালো প্যান্ট লাল গেঞ্জি চওড়া বেল্ট আবার মেয়েদের মুখ আঁকা গেঞ্জির পিঠসাহেব হয়ে গেছেন তিনি। অবশ্য দু-তিনটে বিড়ি বা সিগ্রেট কখনো সখনো তার সামনে ফেলে দিয়ে যায়। হ্যা হ্যা করে হাসে আর খারাপ খারাপ হিন্দি গান গায় পাছা নাচিয়ে। যখন বাড়িতে থাকে তখন এক মিনিট কান পাতা যায় না হাতে ঝোলানো রেডিওর জ্বালায়। কেমন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে আজকাল। অনেকদিন আগে যখন বড় সাহেবের কুঠিতে প্রথম রেডিও এল তখন চা-বাগানের মানুষরা তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল। লম্বা তারের মধ্যে দিয়ে গান বাজিয়েছিল সাহেব গাছের মাথায় চোঙ বেঁধে। কুলি-কামিন বাবুরা কুঠির সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ করে শুনেছিল সেই গান। শুকরা শুনেছিল গাড়ির ব্যাটারি দিয়ে নাকি সেই রেডিও চলে। আর এখন কুলি লাইনের ঘরে ঘরে হাতে হাতে ঘুরছে। ব্যাটারিটা নাকি ওর মধ্যেই ঢোকানো। যে সারাক্ষণ বাজনা বাজাবে সে আর কথা বলবে কেন শুকরা বুড়োর সঙ্গে।
ছেলেমেয়েগুলো এখন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ঘিরে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে যে বড় তার পরনে একটা ইজের আর ময়লা ফ্রক। এটি তার নাতনি। বছর সাতেক বয়স। শুকরা মুখখানাকে খানিকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখল। অনেকটা আদল আসে তার সঙ্গে। ওই চিবুকের কাছটায় আর চোখের চাহনিতে। মেয়েটাকে দেখলেই বুকের মধ্যে তির করে উঠতে থাকে। হিসেব নেই কবে চলে গেছে সে। সময় মনে করতে পারে না কিন্তু চোখ বুজলেই তাকে দেখতে পায় শুকরা। ত্রাইস পেরিয়ে ঢালু জমিটার পাশে ওদের কবরখানার একদম দক্ষিণ কোণটায় শুয়ে আছে সে তিনহাত মাটির তলায়। মেয়েছেলেটা মার খেয়েও কোনোদিন একটা কথা বলেনি। বেঁচে থাকতে যে চুপচাপ ছিল মরে গিয়ে বুক থেকে জল তুলে দুচোখে ছুঁড়ে মারছে।
সেই গল্পটা বলো।
নাতনির মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিল শুকরা। দুটো পাতা কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে দৃষ্টি সইয়ে নিল। এখন সকালের শেষ। রোদের তেজ নেই। হিম বাতাস আসছে ভুটানের পাহাড় থেকে। শীত আসছে শীগগির। এই শীতটা বোধহয় আর কাটবে না। প্রতিবছর যেন হাওয়ার দাঁত আরো ধারালো হচ্ছে। এবার আর সহ্য হবে না। বাচ্চাগুলো ওকে চুপচাপ দেখে উশখুশ করছে। শুকরা ফোকলা মুখে হাসল এবার। তারপর সামান্য নড়েচড়ে দেখে কানের পেছনে খুঁজে রাখা বিড়িটাকে বের করে ঘুরিয়ে মচমচে করে নিল। বাঁ হাতে কোমরটাকে বৃথা হাতড়াল সে। এটা গল্প বলার একটা ভূমিকা তা বাচ্চারা জেনে গেছে। এরই ফাঁকে তার হাত থেকে বিড়িটা নিয়ে মেয়েটা ছুটে গেছে পেছনের লাইনের দিকে। মিনিট খানেকও লাগল না, জ্বলন্ত বিড়িটা ফিরে এল শুকরার হাতে। আগুনটা বাঁচাতে দুতিনবার টান দিয়েছে মেয়েটা কিন্তু বেশি যাতে না পোড়ে সেদিকে খেয়াল ছিল। এখনও তার হাঁ করা মুখে আবছা ধোঁয়া–সেদিকে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে আছে বাচ্ছাগুলো। মেয়েটা জানে ওরা ওকে এখন হিংসে করছে। ওদের চেয়ে যে সে বড় এটা দেখাবার সুযোগ ছাড়তে চাইলে না।
চোখ বন্ধ করে তিনবার ধোঁয়া টানতেই গলা ঘড় ঘড় করে উঠল। আর তারপরেই কাশির দমকে বুক চুরমার। বাচ্চাগুলো শুকরাকে চুপচাপ দুমড়ে মুচড়ে কাশতে দেখল বেশ কিছুক্ষণ। শেষে হাঁ হাঁ করে বুকের হাপরটা থামতেই জ্বলন্ত বিড়িটা নিভিয়ে আবার কানে খুঁজে রাখল সে। এই বিড়ি খাওয়া, কাশি, নিঃশ্বাসের কষ্ট, বিড়ি নিভিয়ে রাখা একটা রুটিনের মত হয়ে গেছে। এইবার বুড়ো একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নেবে তারপর বলবে, সেই কথাটাকে ভাল লাগে। তাদের বাপ বলে ব্যাপারটা নাকি একটু একটু সত্যি।
এই জায়গাটা, এই চা বাগান, জঙ্গল আর এই মাটি–এটা আমাদের দেশ নয়। আমাদের দেশটা একদম অন্যরকম। এই দ্যাখ না, আমরা মদেশিয়া, ওঁরাও, মুন্ডা, আমাদের গায়ের রঙ কালো পাথরের মত আর ওই নেপালি ভুটিয়া লেপচা ওদের গায়ের রঙ হলদে সাদা সাদা। আমরা এই বাঙালিবাবুরা কেউ ফর্সা কেউ শ্যামলা কেউ আবার অন্যরকম। এটা নাকি দেশটার মানুষ হই তাহলে এক এক রকম হবে কেন? আবার দেখ, ওই নাকি ওদের দেশ। তাই কখনও হয়! এক মায়ের তিনছেলের মধ্যে এক রক্ত বইবে না?
ঠিক এই সময় যে প্রশ্নটা অবধারিত উঠবে সেটা হল, এটা আমাদের দেশ না? আমরা তো এখানেই থাকি?
ধাইবুড়ি কি করে? অ্যাঁ? মায়ের পেট থেকে পড়লি আর সে বুড়ি তোকে কোলে তুলে নিলে, মুখে জল দেওয়ালো, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টা টা করালো তাই বলে কি সে তোর মা হয়ে গেল? এই রকম। এ জায়গাটা আমাদের দেশ নয়। আমাদের দেশ অনেক দুরে। যেতে যেতে দিন যায় রাত যায় দিন আসে রাত আসে। গেল বছর একটা লোক এসেছিল, সে বলেছিল, চল্লিশ টাকা ভাড়া রেলের গাড়িতে। এ বছর নাকি আবার ভাড়া বাড়বে। আমার কাছে তো আর চল্লিশ টাকা নেই। কথাটা বলতে বুড়ো অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল।
সেটা টের পেয়ে নাতনি ওর হাঁটুতে হাত রাখল, তারপর? গল্পটা বলো না?
উত্তরের বাতাসে বুড়োর ঘিয়েসাদা চুল উড়ছিল। প্রকৃতির সুন্দর সুন্দর সৃষ্টিগুলোকে এখন মাঝে মাঝে শত্রু বলে মনে হয়, যেমন এই হাওয়াটা। এককালে এরকম কেন প্রচন্ড ঝড়ো বাতাসে শরীর ভাসিয়ে ছুটতে কি আরাম হত। আর এখন এই সামান্য ঝাপটা অসহ্য লাগে। বুড়ো আবার কাশল, এই দেশটা আমাদের দেশ নয়। লোকে যেমন কোথাও বেড়াতে যায় দুদিন থাকে, আমরাও তেমনি এখানে আছি। বলতে পারিস একটু বেশি দিন আছি। আমি আছি চারকুড়ির ওপর, তখন এখানে বাঘ হাঁটত দিন দুপুরে। মাত্তর তিরিশজন কুলি ছিলাম এই বাগানে আর ছিল একজন বাঙালি বাবু। কিন্তু আর থাকব না আমি, এবার আমি যাব। বিনাগুড়িতে গিয়ে রেলগাড়িতে চড়ব আর ঝিক ঝিক করে চলে যাব আমার দেশে।
সে দেশটা কোথায়?
নাতনির প্রশ্নটা শুনে মেয়েটাকে আর একবার দেখল বুড়ো। ঠিক ঠাকুমার মুখ পেয়েছে মালা। নামটা দিয়েছে ওর দাদা। যে ছিল এতোয়ারি সে এখন মালা। বাঙালি নাম। অনেক আপত্তি করেছিল বুড়ো কেউ শুনল না। মদেসিয়া মেয়ের নাম বাঙালি হল।
নাতি খিঁচিয়ে উঠেছিল, আরে এই নাম বাঙালির বাপকা সম্পত্তি হ্যায়? ইয়ে নাম বোম্বাইকা ফিলিম স্টারসে লিয়া হামনে। এখন ওদের দুঘরের কোয়ার্টার ছবিতে ছবিতে ছয়লাপ। সব শালা বড় বড় মেয়েছেলের ছবি। সিনেমার। নাতিটা ওগুলো এখানে ওখানে থেকে আনে আর ঘরে দেওয়ালে সাঁটে। তবে এই মেয়েটা ভাল, বড় বাধ্য বুড়োর। মাথা নেড়ে বুড়ো শুরু করল, অনেক দূর সে দেশ। আগে তিনদিন লাগত রেলগাড়িতে এখন কম লাগে বোধহয়। অনেক ভাড়া হয়ে গেছে। সেই যে গেলবার তোর বাপের শালার শ্বশুর এসেছিল, সে বলে গেল কমসে কম পঞ্চাশ টাকা হয়ে যাবে। আমাকে কে দেবে অত টাকা! তোর বাপ দেয় না, মা দেয় না, ভাই দেয় না। দুবেলা খেতে দেয় বাপ বলে। এমন কি হঠাৎ খেয়াল হলে তবে হাঁড়িয়া দেয়। আমার কাছে যে টাকা আছে তাতে যে হবে না নইলে চলেই যেতাম।
মালা বলল, তোমার টাকা আছে?
সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো সচকিত হল।
বেফাঁস হয়ে গেল। আজকাল জিভের ওপর নিজের ক্ষমতা কমে গেছে। বলে ফেলার পর বুঝতে পারে কী বলেছে। সজোরে ঘাড় নাড়তে লাগল সে, দূর দূর আমি টাকা পাব কোথায়? এই দ্যাখ লেংটি পরে আছি। তোর বাপের মত হাফ প্যান্ট পরি যে দুটো পকেটে টাকা রাখব? কুড়ি সাল আগে কাজ ছেড়েছি এখন আমাকে টাকা দেবে কে বল? নাতনিকে বিশ্বাস করাবার জন্যে গায়ে হাত বুলিয়ে দিল বুড়ো।
হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, চক্রধরপুর আর রাঁচি তার মাঝখানে একটা গ্রাম যার নাম টেবুয়া, সেইখানে আমি জন্মেছিলাম। আমার বাপ জন্মেছিল, তার বাপও! ওই মাটি আমার মাটি! আমাদের শরীরের যে রঙ সেটা ওই মাটির রঙ। অনেক অনেকদিন আগে একটা দেবতা আর একজন দেবীর সঙ্গে আকাশে উড়ে যাচ্ছিলেন। দেবীর কোলে ছিল একটা ফুটফুটে বাচ্চা। হঠাৎ হাত ফসকে সেই বাচ্চাটা পড়ে গেল পৃথিবীতে। দেবী কান্নাকাটি করে মাটিতে নেমে ছেলেকে কিন্তু চিনতে পারল না। মাটিতে নেমে বাচ্চাটা জীবনে প্রথম মাটির গন্ধ পেয়েছিল। এর আগে তো ওরা শুধু আকশেই উড়ত, মাটি কি জানবে কী করে। তাই আনন্দে ওই মিষ্টি মাটিতে গড়াগড়ি দিতেই মাটি তাকে আপন করে নিল। সে তার নিজের রঙ বাচ্চাটার শরীরে মাখিয়ে দিল। দেবী নিজের ছেলেকে চিনতে পারলেন না রঙ কালো হয়ে যাওয়ায়। সেই ছেলে বড় হল আর তার থেকে আমরা হলাম। বুড়ো চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করল।
মালা অস্থির হয়ে বলল, আ, থামলে কেন? টেবুয়া কেমন জায়গা!
আঃ সে যদি কোনোদিন দেখতিস দিদি। দেখবি দেখবি ওটাই তো তোর আসল জায়গা। গরমকালে যেমন গরম শীতকালে তেমনি ঠাণ্ডা। মাঠ আর মাঠ যেন আকাশে উঠে গেছে। পাহাড়ের রেখা দেখা যায় তবে এরকম মোটকা মোটকা পাহাড় নয়। বিকেলে গরম কমে যায় ঠাণ্ডা বাতাস বইলেই। সে কি মিষ্টি বাতাস তা কি করে বোঝাই! ছোট ছোট বন আছে সেখানে খরগোশ পাওয়া যায়, হরিণও আছে। আমাদের জমি ছিল। জলের জন্য চাষ হতো কম কিন্তু লোকে খুব খাটত। আমি মোষের পিঠে চড়ে মাঠে ঘুরতাম আর গরু চরাতাম। একটা নদী ছিল। গরমকালে সেটায় শুকনো বালি আর বর্ষার সময় কি ফোঁসফোঁসানি। যেন চোখের সামনে সেই স্বপ্নের দেশ টলছে, বুড়ো তাকে হাত বাড়িয়ে সামাল দিচ্ছে।
মালা বলল, ওখান থেকে চলে এলে কেন?
এলাম নিজের ইচ্ছায়। পেটের জন্য। জমিটা এমন কোনোরকমে খাবার জিনিস মেলে। আর গায়ে খেটে কাজ করে পয়সা পাবে তার কোনো সুযোগ নেই। সেই সময় কন্ট্রাক্টরের লোক এল। তারা লোভ দেখাল চায়ের চাষ হচ্ছে। গেলেই মুঠো মুঠো টাকা পাওয়া যাবে। যত ইচ্ছে রোজগার করো, খাও দাও, মজা মারো। যখন খুশি হুট করে সেই টাকা নিয়ে দেশে ফিরে এসো। সামান্যই পথ। ওই যে আকাশটা যেখানে শেষ হয়েছে তার একটু ওদিকে।
লোকে প্রথমে ঠিক বিশ্বাস করল না। চা গাছ আবার কী জিনিস? যদি গিয়ে আর ফিরে আসা যায়? এক টাকায় তখন একমণ চাল পাওয়া যেত। ওরা বলল তিন টাকা মাইনে দেবে। বুকের মধ্যে লোভ জন্ম নিল। ভাল খাওয়ার লোভ। মা বাপকে খাওয়ানোর লোভ।
এক এক করে কুড়ি পঁচিশ জন নাম লেখালাম। নাম লিখলেই একমণ চাল এমনি এমনি দিয়ে দিল। বুড়োদের চলবে না। জোয়ান মেয়ে ছেলে। আমাদের বাড়িতে জোয়ান কেউ নেই। আমার আগে তিন ভাই মরেছে ছেলেবেলায়। বাপের বেশি বয়সের ছেলে আমি। কিন্তু পনেরো বছরের ছেলেকে নেবে কেন ওরা। অবশ্য স্বাস্থ্য দেখে কুড়ি বলে মনে হয়। কি বুক কি হাত পা। আমার তখনও বিয়ে হয়নি। কিন্তু যাকে বিয়ে করব বলে মনে লেগেছে সেও যে চলে যাচ্ছে। তোদের ঠাকুমা তখন এইটুকু। কিন্তু ওর বাপ মা জোয়ান বলে নাম লিখিয়েছে আর ওরা গেলে মেয়েকে তো ফেলে যাবে না। তাই কোনোরকমে দলে ভিড়ে গেলাম। যেদিন আমরা চলে এলাম সেদিন গ্রামের লোক দল বেঁধে চারক্রোশ পথ সঙ্গে হেঁটে এল; সেদিন যদি জানতাম ওই আমাদের শেষ আসা, আর কোনদিন আমি ফিরবে পারব না!
এই অবধি বলেই বুড়ো ভেউ ভেউ করে কাঁদবে তা সবাই জানত। বাচ্চাগুলো ঠোঁট টিপে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল বুড়োর দিকে। ওরা জানে অনেক চেষ্টা করলেও আর বুড়োর পক্ষে এখনি কথা বলা সম্ভব নয়। একটা একটা করে সরে পড়তে লাগল সামনে থেকে। শেষ পর্যন্ত গাছতলা একদম ফাঁকা হয়ে গেল। বুড়ো তখনও হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেছে আর তার একটা হাত ধরে মালা চুপচাপ বসে আছে।
খাঁ খাঁ রোদ হঠাৎ চোখ ঝলসে দিয়েই আবার মিলিয়ে যায়। সামনের চায়ের গাছে সারাদিন রোদছায়ায় খেলা চলে। কুলি লাইনে দিনভর মুরগি আর গরুর হাঁকাহাঁকি, মাথার ওপরে গাছের ডালে ঘুঘুর গলায় দুপুরটা ধুঁকতে থাকে। এইসময় লাইনে যারা আছে তারা আশক্ত, হয় শিশু, বালক নয় বৃদ্ধ। শুকরা বুড়োর ছেলে ছেলের বউ আর নাতি এখন এই বাগানের নানান জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে। জোয়ান মানুষ ঘরে বসে থাকবে এমন চলবে না। ভোরে উঠে ছেলের বউ রুটি আর গুড় রেখে গেছে তাই দুপুরে বসে নাতনির সঙ্গে খায় শুকরা বুড়ো। বিকেল নাগাদ ছুটি হলে কামিনরা আসতে শুরু করবে পিঠে খালি ঝুলি নিয়ে। পুরুষগুলো পয়সা পেলেই চলে যায় ভাটিখানায়। যাদের বয়স হয়েছে এমন মেয়েও বাদ যায়না। হপ্তার টাকা পাওয়ার দিন মাঝে মাঝে রাতে তাই খাওয়া জোটে না।
.
এখনকার ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে খুব ভয় হয় শুকরা বুড়োর। এই তো চোখের সামনে নাতিটা আছে। সিরিল কথা বলে অর্ধেক ওদের ভাষায় অর্ধেক হিন্দিতে। ঘোরে ফেরে যেন ডোন্ট কেয়ার ভাব। হাঁড়িয়া খাক, বয়স হলে মানুষ খাবেই কিন্তু ওতে রুচি নেই ছেলের। ভুটানে নাকি ছয় সাত টাকার মদের বোতল বিক্রি হয়। তাই খেয়ে মাতাল হয় ছোকরা। নিজে কোনো দিন সে জিনিস খায়নি শুকরা বুড়ো। এখানে তাকে দেবে কে যে জিভে ঢালবে? অথচ একটা দিনও সে হাঁড়িয়া না খেয়ে থেকেছে এমন হয়নি। এই নিয়ে কি ঝগড়া হত ঘরে। হপ্তার টাকা হাতে পেলেই রামচন্দ্রের ভাটিখানায় জমা দিয়ে আসত। সারাদিন চা বাগানে খেটে ওইটুকুই যা শান্তি। ধারাটা বজায় রেখেছে ওর ছেলে মাংরা। নাতিকে না বুঝলেও শুকরা বুড়ো ছেলেকে বুঝতে পারে। ওরই মত হাবভাব তবে একটু সন্দেহ করে। সন্দেহটা সাহেববাবুদের নিয়ে। ছেলেকে ডেকে বোঝায় বুড়ো ওসব বলিস না মাংরা। ওরা হলেন দেবতা আর তার বাহন। আমাদের অন্ন দেয়।
এখান তো সাহেবরা কত ভাল হয়ে গেছে।
আগে একদম সাদা চামড়ার সাহেবে চারধার গমগম করত। কাজে গোলমাল হলেই সপাং সপাং চাবুক। কেউ মুখ ফুটে কিন্তু বলবে এমন হিম্মত ছিল?
দোকানপাট ছিল না, গাড়িঘোড়া নেই তেমন, রাস্তায় বেরুলে মানুষের মুখ দেখা যেত না। জ্বর হতো খুব, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতো। ম্যালেরিয়া। কত কুলি মরে গেছিল কিন্তু এখান থেকে পালাতে গেলে জান রেখে যেতে হতো। এখানে আসার পর ওরা দিন-রাত কাঁদত। যে টাকা দেবে বলেছিল তার সিকিটাও হাতে আসত না।
চা গাছ সেই প্রথম দেখল ওরা। এই চায়ের পাতা নিংড়ে শুকিয়ে পিষে চা বানানো হোত। এখন তো আট ঘণ্টা হয়ে গেলেই ছুটি। তখন সে সব বালাই ছিল না। পাতি তুলে গুদামে কাজ করে আবার সাহেবের কুঠিতে যেতে হতো ফরমাস খাটতে। একটু ডবকা বয়সের ছেলেমেয়ে হলে ওদের সাহেবের কুঠিতে যেতে হবেই এরকম নিয়ম বাঁধা ছিল। মন খারাপ লাগলেও কেউ কিছু বলতে সাহস পেত না। এখান থেকে পালাবার কথা মাঝে মাঝে শুকরা ভাবত কিন্তু এসেই যে বিয়েটা হয়ে গেল সেই মেয়ের সঙ্গে। আর তারই টানে টানে এতগুলো বছর পার হয়ে গেল। মেয়েটা ছিল খুব রোগা কিন্তু মুখটা ভারী ঢলে ঢলো। রোগা বলেই সাহেবের নজরে পড়েনি। মা মেরীর কাছে প্রার্থনা করত শুকরা, ওকে একটুও মোটা করো না–রোগা থাক, হাড়জিড়জিড়ে রোগা থাক।
মা মেরী! সেই সব সাহেবগুলো আর এখন নেই। সেই যে পাদ্রীসাহেবের দল। সাদা চোপকান পরে থাকত যারা আর মুখে মিশে থাকত হাসি। চা বাগানের বড়াসাহেবের হুকুমে ওদের এক রবিবারে যেতে হয়েছিল লাইন দিয়ে সাত মাইল দূরে গির্জায়। পাদ্রীসাহেব বলেছিলেন, ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন। তাহার কাছে নিজেকে সমর্পণ করো, দেখিবে আর কোনো অভাব থাকিবে না।
ওদের আগে যারা এসেছিল সেই দলের একজন সর্দার, যার নাম চার্লস ওঁরাও, বলেছিল, পাদ্রীসাহেব তোদের জ্ঞানের আলো দিতে চান। এতদিন তোরা অন্ধকারে ছিলি। আজ থেকে পরমপিতার পুত্র হলি।
লাইন দিয়ে সবাই খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেকের নামের আগে একটা সাহেবি নাম দিয়ে দিয়েছিল পাদ্রীসাহেব। শুকরারও একটা নামকরণ হয়েছিল বটে কিন্তু সেটা কোনোদিন ব্যবহার হয়নি। তা তখন প্রতি রবিবারে সর্চে যেতে হতো। পাদ্রী সাহেব যখন সাদা চামড়ার সাহেবদের নিয়ে চার্চের ভেতরে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেন তখন ওরা বাইরের লনে হাত জোড় করে বসে থাকত। তারপর প্রার্থনা শেষ হয়ে গেলে রুটি আর গুড় আসত প্রত্যেকের জন্যে। ওইটেই ছিল সবচেয়ে আনন্দের।
সে সময় যে নতুন বড়সাহেব এল সে ছিল ভারি জবরদস্ত। একা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা বিরাট বাঘকে মেরেছিল। মেরে চামড়া ছাড়িয়ে মাংসটা খেতে দিয়েছিল কুলিদের। এখন তো সিরিলদের অনেক বাছবিচার হয়েছে, এটা খাব না সেটা খাব না করে। তখন যা পেত তাই সই। পেট ভরলেই হলো। ইঁদুর পেঁচা কিংবা সাপ চোখে পড়লেই দিনটা ভালভাবে কেটে যেত! সিরিল শুনে বলে, সব জংলিকা কারবার। তা তো বলবিই। তখন এক সের চাল কিনতে আট মাইল তো যেতে হতো আর সেটা কেনার পয়সাও থাকতো না সবসময়। তা বাঘের মাংস বিলিয়ে সেই সাহেব চলে এল সন্ধ্যাবেলায় কুলি লাইনে। সাহেবকে দেখে সবাই জড়োসড়ো। মেয়েরা ঘর থেকে বের হতেই চায় না। সাহেব বলল, মাংস পাকাও আউর শরাব পিও।
তখন তো মদ পাওয়া যেত না এ তল্লাটে। ওদের কেউ কেউ ভাত পচিয়ে হাঁড়িয়া বানাত কিন্তু সেটা হতো খুবই অল্প। কারণ ভাত পেলে তো সেটা পেট ভরাতেই লেগে যেত। সাহেব সব শুনেটুনে মাসখানেকের মধ্যে ছোটখাটো ভাটিখানা খুলিয়ে দিল বাগানের বাইরে। ব্যস, হয়ে গেল। রবিবারে পাদ্রীসাহেবের কাছে রুটিগুড় খাওয়া আর হর-সন্ধ্যায় ভাটিখানায় পড়ে থাকা নিয়ম হয়ে গেল ওদের। তখন ভাটিখানায় রোজ পয়সা দিতে হতো না। হপ্তার দিন মালিক এসে দাঁড়িয়ে থাকত। হিসেব মত পয়সা গুনে নিত। অনেকেই খালি হাতে ঘরে ফিরত তখন। শুকরা বুড়োর মনে আছে সে যখন সাহেবের কুঠিতে কাজ পেল তখন লাইনের মানুষ কি রকম হিংসে করত তাকে। দুবেলা পেট ভরে খাবার জুটত আবার তা থেকে বাঁচিয়ে বউএর জন্যে নিয়ে আসত রাত্রে। হ্যাঁ, সেটা একটা সুখের সময় গিয়েছে বটে।
.
কিন্তু সত্যি কি সবটাই সুখের ছিল! রোজ সন্ধেবেলায় মেয়েগুলোর চিৎকার শুনতে শুনতে বুকের ভেতর একটা পাথর জমে গিয়েছিল না? তখন কোনো সাহেবই মেমসাহেবদের নিয়ে আসত না চাবাগানে। তার ফলে মাঝেমাঝেই দেখা যেত কোনো কুলি মেয়ে সাদা ধবধবে বাচ্চা বিইয়েছে। সে রকম বাচ্চা হলে পাদ্রীসাহেব এসে নিয়ে যেত। অনেক সময় মায়েরা দিতে চাইত না, কান্নাকাটি করত কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজি হতেই হতো। তার বাপ-মাই তাকে রাজি হতে বাধ্য করত। ওরকম একটা সাদা চামড়ার মানুষকে কেউ নিজের জাতের লোক বলে কোনোদিন মানতে পারবে না এটা শেষ পর্যন্ত মায়েরা বুঝত।
একটা চা বাগানের রাজা ছিল তার ম্যানেজার। হাফপ্যান্ট শার্ট বুট পরা লোকটাকে দেখে তামাম বাগান কাঁপত। পাতি তুলতে গিয়ে কেউ সর্দারের চোখের আড়ালে থেকে জিরিয়ে নিচ্ছে খানিক এমন সময় ম্যানেজারের নজরে পড়ে গেল। এমন এক একজন ম্যানেজারকে দেখেছে শুকরা যে ওই অবস্থায় পিঠের চামড়া খুলে নিতে বাকি রেখেছে। আবার এই সাহেবই দরাজ হলে ভগবানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই রাতটার কথা মনে থাকবে ওর।
কুঠিতে কাজ করছে শুকরা। কাজ মানে বাগান কোপানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া আর ফুলদানিতে ফুল রাখা। এগুলো গুদামের ডিউটি সেরে তবেই করতে হতো। বদলে ম্যানেজারের কুঠিতে খাবার মিলত। সেদিন সন্ধে থেকেই বৃষ্টি। এই চা বাগানে ওটা শুরু হলে মনে হয় আর কখনো শেষ হবে না। মেঘ যেন মাথার ওপরে নেমে এসে চুপ করে বসে থাকে। রাত্রে খাবার না নিয়ে শুকরা যেতে পারত না। তখন বয়স ওর এককুড়ি দশ হবে। অতরাতে ঘরে ফিরতে হত চোখ বন্ধ করে। তখন রাস্তাগুলো এমন চওড়া আর পরিষ্কার হয়নি। চা বাগানের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার যে পথ ছিল সেটায় সন্ধের পরই জন্তু জানোয়ারের রাজত্ব হয়ে যেত। শুকরা ফিরত মশাল জ্বালিয়ে চিৎকার করতে করতে। ঘরে তখন বউ আর বাচ্চা গুটিসুটি মেরে বসে থাকত। তার গলার আওয়াজ পাওয়ার আশায়। তখন কুলি লাইনেও চিতাগুলো স্বচ্ছন্দে রাত্রে ঘুরে বেড়াত যদি কোনো গরু বাছুরকে অসতর্ক অবস্থায় পায়।
সন্ধে থেকে বৃষ্টি শুরু হলে শুকরার বুক হিম হয়ে গেল। এর আগে বিকেল থেকেই মেঘ জমলে সাহেবের কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করলে ছেড়ে দিত তাকে। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিনের আলো থাকতেই ছুটে যেত সে তাদের লাইনে। সে রাতে খাবার না জুটলেও প্রাণ তো বেঁচে যেত। কিন্তু আজ সাহেবের ফেরার নাম নেই অথচ জল ঝরছে বেশ এবং বাইরে ঘন অন্ধকার। কাঠের বাংলোর এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল শুকরা। শালা, আজকের রাতটা এখানেই থেকে যেতে হবে মনে হচ্ছে। এই বৃষ্টিতে মশাল জ্বলবে না। জন্তুগুলোকে যদি ভয় দেখানো না যায় তো হয়ে গেল। কুঠিতে সাহেবের যে আর্দালি আছে সেই রান্না করে। তার আস্তানা এইখানেই। বয়স হয়েছে আর মদেসিয়া নয় বলে ওর সঙ্গে ঠিক পাত্তা দিয়ে কথা বলে না। বাড়ি না ফিরলে বউটা সারারাত কান্নাকাটি করবে এটা বুঝতে পেরে শুকরার অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছিল।
এমন সময় বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে গাড়ির আওয়াজ শুনতে পেল। সাহেব আসছে। বৃষ্টিতে ঝাপসা আলো ফেলে গাড়িটা নীচে এসে থামল। শুকরা এমনভাবে সরে দাঁড়াল যাতে সাহব ওকে দেখতে না পায়। এখন কী মেজাজ আছে কে জানে, শুধু দেখার অপরাধেই চাবুক খাওয়া অসম্ভব নয়। চিৎকার করে গান গাইছে সাহেব ভাষা বোঝা শুকরার পক্ষে সম্ভব নয়। সাহেব রাতে একা ফেরে না। একটা মেয়েকে জুটিয়ে আনে। সে মেয়ে কাঁদুক কিংবা হাসুক তাতে কিছু যায় আসে না। শুকরা দেখল সাহেবের জামা কাপড় আধভেজা আর চিৎকার করে যাকে নামতে বলছে। সেই মেয়েছেলেটার নামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দুবার ডাকার পর সাহেবের মেজাজ বোধহয় বিগড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে যাকে টেনে হিঁচড়ে নামাল তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল শুকরা। মেয়েটা মোটেই কালো চামড়ার নয়। দস্তুরমতো ফর্সা এবং এরকম মেয়েকে এ তল্লাটে দেখা যায় না। মেয়েটা সমানে প্রতিবাদ করছিল। একসময় প্রায় মারামারি পর্যায়ে চলে গেল ব্যাপারটা। সাহেব বোধহয় খুব নেশা করেছিল কারণ মেয়েটা সাহেবকে মাটিতে ফেলে দিল। অতবড় শরীরটাকে কুঠির সিঁড়ির ওপর দড়াম করে পড়তে দেখে হাঁ হয়ে গিয়েছিল শুকরা। কেউ যে সাহেবের গায়ে হাত তুলতে পারে, এভাবে ফেলে দিতে পারে তা কল্পনাতেও ছিল না।
সাহেব উঠল। একবার মেয়েটাকে দেখে চিৎকার করে গালাগালি শুরু করে এক পা এক পা করে এগিয়ে এমন একটা চড় মারল যে শুকরার মনে হলো মেয়েটার মুখের হাড় বোধহয় গুঁড়িয়ে গেছে। কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেল মেয়েটা। সাহেবের গালাগালি কিন্তু তখনো চলছিল। মেয়েটা পড়ার পর আর নড়েনি। শুকরার মনে হল মেয়েটা নির্ঘাৎ মরে গেছে। মরে না গেলে কেউ অমন করে পড়ে থাকতে পারে? সাহেবেরও বোধহয় হঠাৎ সে সন্দেহ হয়েছিল। কারণ তার মুখে আর গালাগালি শোনা যাচ্ছিল না। হাত বাড়িয়ে গাড়ি থেকে একটা বোতল বের করে ঢকঢক করে গলায় ঢালল খানিকটা। তারপর মেয়েটাকে জরিপ করতে গলায় মুখে হাত দিল। শরীর টলছে, বোতলটা নিয়ে লাথি মেরে দরজা খুলে ভেতরে চলে এল সাহেব। মেয়েটা পড়ে রইল তেমনি।
শুকরা তখন থরথর করে কাঁপছে। চোখের সামনে খুন হতে সে এই প্রথম দেখল। খুন অবশ্য তখন চা বাগানে আকছারই হতো। এখনকার মত থানা পুলিস ছিল না চা বাগানে। সাহেব যা বলত তাই শেষ কথা। শুকরা পায়ে পায়ে সরে আসছিল এমন সময় সাহেবের গলা পাওয়া গেল। চিৎকার করে ডাকছে, কৌন হ্যায়? কৌন হ্যায়?
শুকরা জানত আর্দালি নিশ্চয় ছুটে যাবে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত বাদেই সে আর্দালিকে দেখল, ইঙ্গিতে সাহেবের ঘরে যেতে বলছে শুকরাকে। হাত পা জমে গেল যেন। এখন যদি রাগের মাথায় তাকেও খুন করে ফেলে সাহেব তাহলেও কিছু বলার নেই। আবার বাঘের ডাকের মত চিৎকার ভেসে আসতেই শুকরা প্রায় দৌড়ে সাহেবের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। সাহেব চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। শুকরা কোনোরকমে বলেছিল, হজৌর। ইশারায় কাছে ডাকল সাহেব। ভয়ে প্রাণ গলার কাছে এসে ঠেকেছে! শুকরা মাথার নিচু করে কাছাকাছি হলে সাহেব জিভে একটা শব্দ করল। শব্দটার মানে কি তা আজও বুঝতে পারে না সে। তারপর বোতলটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে, ড্রিঙ্ক ড্রিঙ্ক এনজয় ইট। এমন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল শুকরা যে আর একটু হলেই অজ্ঞান হয়ে যেত। সাহেব তাকে মদের বোতল দিচ্ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। এই বোতলগুলোকে আলমারিতে দেখেছে, থরে থরে সাজানো। আর্দালি বলেছে ওসব নাকি সাহেবের দেশ থেকে আনানো। তার এক ফোঁটা জিভে পড়লে নাকি জীবন সার্থক হয়ে যায়। ভয়ে শ্রদ্ধায় জুলজুল করে এতদিন বোতলগুলোকে দেখে এসেছে। এখন সাহেব সেই বোতলের ভাগ নিতে বলছে ওকে। একি সম্ভব?
পাথরের মত দাঁড়িয়েছিল শুকরা। সাহেবের ধৈর্যচ্যুতি হল। এমন একটা চিৎকার গলা থেকে বের হলে যে শুকরা প্রায় দৌড়ে গিয়ে বোতলটা ধরল। বোতল দিয়ে দেবার পরও সাহেবের গালাগাল কমল না। শেষে একটু থিতিয়ে এলে আসল কথাটা বলল। বাইরে যে মেয়েটা পড়ে আছে তাকে চা বাগানের ওপাশে গাড়ির রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসতে হবে। এখুনি এই রাত্তিরেই। আর এই খবরটা যেন কেউ জানতে না পারে। এর জন্যে সামনের মাস থেকে এক টাকা মাইনে বাড়বে শুকরার। কথাটা শেষ করে সাহেব বালিশ জড়িয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। হুকুম শোনার পর নিজের বুদ্ধি প্রয়োগ করা তখন অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এখন নাতি তো বটেই মাঝে মাঝে ছেলেকেও গাঁইগুঁই করতে শোনে। কিন্তু তখন সাহেব যদি বলে জান দাও তো জান দিয়ে দিতে হত। চোখের আড়ালে এসে চৈতন্য হল শুকরার। বৃষ্টিটা কমেছে। দূরে শেয়াল ডাকছে। আর্দালিটার দেখা নেই আশেপাশে। এই জলে মশাল কিছুতেই জ্বলবে না। বাইরে বেরুনো মানে প্রাণটা দিয়ে দেওয়া। তার ওপর এই মেয়েমানুষটা কাঁধে থাকবে। নিশ্চয়ই টেনে হিঁচড়ে আধমাইল নিয়ে যাওয়া যাবে না। কাঁধে নিয়ে হাঁটা এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়। ত্রিশ বছরের শুকরার তখন টগবগে স্বাস্থ্য। একবার মনে হল যে চুপচাপ রাতটা কাটিয়ে দিয়ে ভোর ভোর মেয়েটাকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু সাহেব যদি একবার দেখতে ঘর থেকে বের হয় তাহলে ওরও মেয়েটার অবস্থা হবে। এই মরাটার কোনো অনিশ্চয়তা নেই। বরং জঙ্গলে চা গাছের বাগানে বাঘা চিতা যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে বাঁচা যেতেও পারে। তারপরেই হাতের বোতলটার দিকে নজর পড়ল তার অর্ধেকটায় টলটল করছে, চেহারা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। খুব লোভ হল বোতলের মুখটা খুলে একটু চেখে দ্যাখে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সংযত করল সে। এ জিনিস ওদের লাইনের কেউ দ্যাখেনি চোখে। এটাকে নিয়ে গেলে সবার কাছে ওর খাতির যে কীরকম বেড়ে যাবে তা ভাবা যায় না। তাছাড়া এই মদ সাহেবরা খেয়ে সহ্য করে। সে যদি না পারে, যদি নেশা হয়ে পড়ে যায়? বোতলটাকে নেংটির কাপড়ে ভাল করে বেঁধে বাইরে এল শুকরা।
তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টির পড়ছে। ভিজতে হবেই। বাইরের দিকে তাকালে একটুও দৃষ্টি চলে না এমন কালো চারধার। মেয়েটা চিত হয়ে পড়ে আছে। না এ তল্লাটের মেয়ে নয়, এমন কি পোশাকও আলাদা। বেয়াদপির শাস্তি পেল বেচারা। শালা মাথা ঠাণ্ডা রাখলেই দুনিয়ার সব কিছু দেখা যায়।
এক হ্যাঁচকায় মেয়েটাকে কাঁধে তুলে নিল শুকরা। এখনও এই বয়সে সেই নরম নরম শরীরটার কথা মনে পড়ে, যৌবন ছিল বটে মেয়েছেলেটার। কিন্তু তখন সেসব হুঁশ ছিল না তার। ওই অন্ধকারে চা বাগানের মধ্যে দিয়ে অতটা পথ যেতে হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল।
প্রায় দৌড় শুরু করল সে। টিপটিকে বৃষ্টি মাথায় লাগছে। শরীরটা অনেকখানি মেয়েটার আড়ালে। পথ জানা কিন্তু তবু হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে গেল সে দুবার। ফ্যাক্টরির পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ শেয়ালটা এমন আচমকা ডেকে উঠল যে শুকরা হোঁচট খেল। আর এবার নিজের তাল রাখতে না পেরে মেয়েটি সমেত মাটিতে লুটোতে হল। আর এক সঙ্গে দুটোর বিপরীত বিস্ময় যেন ওকে অসাড় করে দিল। মাটিতে পড়া মাত্রই মেয়েটা একটা কাতরোক্তি করে উঠল। অস্ফুট কিন্তু স্পষ্ট। তার মানে ও বেঁচে আছে। সাহেবের মারে ওর প্রাণ বের হয়নি। এতক্ষণ একটা জ্ঞানহীন শরীরকেই সে বয়ে আনছিল। কিন্তু সেদিকে নজর দেবার সময় পাচ্ছে না শুকরা। কারণ বাঁ দিকে এক জোড়া লাল চোখ স্থির হয়ে আছে। ও দুটো চোখের মালিক যদি বাঘ হয় তাহলে আর কিছু করার নেই। এখন যদি দৌড়াবার চেষ্টা করে সে তাহলে বেশিদূর যেতে হবে না। শরীর জমে যাচ্ছে তবুও চোখদুটোর কোনো নড়াচড়া নেই। হঠাৎ কি হল শুকরা এখনো ভেবে পায় না। আচম্বিতে মাটি থেকে একটা বড় পাথর তুলে নিয়ে চোখ দুটো লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছিল সে। পলকেই লাল বল মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস ফেলার আগেই শুকরার শরীর হিম হয়ে গেল কান ফাটা চিৎকারে। মৃত্যুর সঙ্গে নিষ্ফল লড়াইটা থেমে যেতেই শুকরা প্রাণপণে দৌড়তে লাগল। কখন এল কীভাবে এল সে বুঝতে পারেনি। শুধু দেখেছে মেয়েটার শরীরটা শূন্যে উঠে গেল। ওরকম দৌড় সে জীবনে দৌড়ায়নি। একেবারে লাইনে পৌঁছে নিজের ঘরের দরজায় প্রাণপণে লাথি মেরে সে হাঁপাতে লাগল। বাঘের কথা বউ এবং পড়শিদের বলেছিল শুকরা কিন্তু বাঘটা আর কী করেছিল বলতে পারেনি। মেয়েছেলেটার কথা লাইনে জানাজানি হলে সাহেব চামড়া খুলে নেবে। কদিন বাদে অবশ্য চা বাগানের ভেতরে অচেনা মেয়ের জামাকাপড় পেয়েছিল কুলিরা। চেনাশোনা কেউ মরেনি বলে কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু মনে মনে শুকরা জানে ওর জীবনটা সেই মেয়েই দিয়ে গেছে। সাহেব একটা টাকা মাইনে বাড়িয়েছিল পরের মাসেই। কিন্তু প্রাণে ধরে মদের বোতলটা শেষ করতে পারেনি অনেক দিন। পড়শিরা যারা এক ঢোক খেয়েছে তারা নাকি তৃপ্তি পায়নি। ওটার চেয়ে নাকি হাঁড়িয়াতে নেশা জমে বেশি। কিন্তু শুকরার মনে হতো সেটা হিংসেতে বলত ওরা। সাহেবের ভালবাসা পায়নি বলে জ্বলত। এসব ঘটনা ঘটলেও সাহেবকে বুঝতে কোনো অসুবিধে হত না শুকরার। সাহেব আলাদা জাতের মানুষ তারা আলাদা জাতের। যে যার নিজের মত থাকলেই কোনো সমস্যা হয় না।
ছোট্ট এইটুকুন চা বাগান ছিল। প্রত্যেকের নাড়িনক্ষত্র প্রত্যেকের জানা। সেই বাগান আজ এত বড় হয়েছে যে চেনা লোকের চেয়ে অচেনার সংখ্যাই বেশি। এইখানেই প্রায় চারকুড়ি বছর পার হয়ে গেল তবু সেই গ্রামটাকেই নিজের গ্রাম বলে মনে হয়। এখানে কেউ জোর করে ধরে এনেছিল–একি কখনো নিজের হয়? চাকরি শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুকরা ঠিক করেছিল এবারে চলে যাবেই। ছেলে তখন সর্দার হয়েছে তার যাওয়ার মন নেই। সে বলে, যাও কিন্তু ঘুরে এসো। ওখানে এখন কোনো আত্মীয়স্বজন নেই যে তোমাকে দুদিন দেখবে। কথাটা শুনে হাসবে না কাঁদবে শুকরা ভেবে পায় না। যে মাটিতে সে জন্মেছে, শৈশব কেটেছে যার মাঠে ঘাটে সেখানে গেলেই তো শান্তিতে বুক জুড়িয়ে যাবে। এই কথাটা ছেলেকে যদিও বোঝানো যায় নাতি বোঝে না। সিরিল বলে, উ শালা ভুখা আদমিকো জিলা।
মোরগটা আচমকা এমন চিৎকার করে উঠল কানের কাছে যে শুকরা ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। এখন দুপুর না বিকেল বোঝা যাচ্ছে না। হাওয়া নেই, রোদ নেই।
মাচার ওপর সে এতক্ষণ একাই শুয়ে ছিল। নাতনিটা ধারেকাছে নেই। চোখের জোর কমে। এলেও গলা এখনো ঠিক আছে, শুকনো আধবসা হয়ে চিৎকার করল, ও মালা-মা-অ-আ। কোনো সাড়া নেই বেটির। শুকরা মাচার ওপর পা ঝুলিয়ে সামনের দিকে তাকাল। এক মাপে ছাঁটা চায়ের গাছগুলো যেন ঢেউ খেলানো মাঠের মতো চলে গেছে আকাশের দিকে। আর এখন ভূটানের পাহাড় থেকে চুপিচুপি নেমে এসেছে এক দঙ্গল কুয়াশা। ছোট ছোট বল হয়ে সেগুলো গড়িয়ে যাচ্ছে সেই মাঠের ওপর দিয়ে। এই কুয়াশা যত গড়াবে পাতার স্বাদ তত জমবে। একটু একটু করে সুগন্ধ জন্ম নেবে। হাসল শুকরা, এই যে চায়ের গাছগুলো যাদের নিয়ে এত যত্নআত্তি তাদের যা কিছু মূল্য পাতার জন্যেই। আর কোনো টান নেই গাছটার জন্যে। থাকবে কী করে? যে গাছ ফল দেয় না সে গাছের জন্য কোনো মায়া হয়? এই জায়গায় চারকুড়ি বছর থেকেও তাই একে নিজের বলে ভাবা গেল না কিছুতেই।
শুকরা বুড়ো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আশেপাশে কেউ নেই। কোনোরকমে লাঠিটাকে জড়িয়ে ধরে নীচে নেমে দাঁড়াল সে। এখন মাথাটা কিছুতেই সোজা হয় না। পা ফেললেই থরথরিয়ে শরীর কাঁপে। কিন্তু তবু মনটা টানতে লাগল শরীরটাকে। এক পা এক পা করে সে এগোতে লাগল পেছনের কুলি লাইনের দিকে। ওই যে ঝুপরি বটগাছটার বয়স ওর চেয়েও বেশি তার তলায় যেতে হবে ওকে।
এখনও সম্ভব। শুকরা বুড়ো বলল নিজের মনে। এখনও কোনরকমে বিনাগুড়িতে গিয়ে ট্রেনে চেপে বসলেই হল। শুয়ে ঘুমিয়ে একদিন না একদিন পৌঁছে যাবেই সেখানে। রেলের বাবু যদি কিছু বলে তো কেঁদে পায়ে পড়ে বলবে আমার কাছে এই আছে বাবা, তুমি এই নিয়ে আমাকে পৌঁছে দাও। আমি তোমার ভাড়া জানি না। কেউ আমাকে পয়সা দেয়নি অথচ আমাকে যেতে হবে। যেবার ওকে নিয়ে ফিরে যাব ঠিকঠাক, সেবার এই টাকায় হয়ে যেত। কিন্তু তখনই একদিনের ব্যারামে মেয়েছেলেটা চলে গেল। যাওয়ার মনটা ভেঙে গিয়েছিল তখন। খুব ইচ্ছে ছিল যে তারও। আমরা দুজন এই পরদেশ ছেড়ে নিজের মাটিতে শেষ কটা দিন কাটাই। সে বলতো আগে আমি মরব তুই গোর দিবি ওই মাটিতে। আমি বলতাম, না আমি আগে যাব। হেরে গেলাম। সে চলে গেছে আমাকে হারিয়ে। চা বাগানের মাটিতে শুয়ে সে ছটফট করে, রাত হলেই বলে কই তুমি গেলে না। আমার ঘুম আসে না আর। তাই বলি রেলের বাবু, তুমি এই টাকাটা রাখো আর আমাকে পৌঁছে দাও। এককুড়ি বছরের ওপর আমি এই টাকাটাকে বটগাছের নীচে যত্ন করে পুঁতে রেখেছিলাম। কেউ জানতো না। মাংরা না সিরিল না। আমার কাছে যে একটা পয়সা আছে তাই কেউ জানে না। সে যখন চলে গেল তখন তার নাকের নথটাকে পুঁতেছিলাম টাকার সঙ্গে। ওর ভারি শখ ছিল গাঁয়ের মাটিতে শোবার, হল না, তাই ওর নথটাকে নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে। আমি যখন শোব তখন এই নথটাও শোবে আমার সঙ্গে। ও খুশি হবে খুব। রেলের বাবু, দয়া করো। এতদিন পরদেশে ছিলাম, এবার দেশে যেতে দাও।
বটগাছের বাঁ দিকের গুঁড়ির মোটা শেকড়টার পাশে বসতেই বুক জুড়িয়ে গেল। ঠিক এখানে হাত খুঁড়লেই সেই টাকা আর নথটাকে পাওয়া যাবে! আর দেরি নয় এবার যেতেই হবে। নথটা পরলে সেই রোগা মুখটাকে যে কি সুন্দর লাগত। বুকের কান্নাটা সমস্ত শরীর নিংড়ে গলায় এসে জমল। কিন্তু একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ ছাড়া আর কিছুই হল না। আজকাল আর কান্নাতেও সুখ মেলে না।
.
টিপিস টিপিস বৃষ্টি পড়ছে! চট করে মনে হয় গায়ে লাগছে না কিন্তু একসময় পাতলা সরের মত জল জমে যায় শরীরে। তিন নম্বর ব্লকটার এ বছর প্রথম পাতি তোলা হচ্ছে। আশিজন মেয়ে পুরুষ টুকরি কাঁধে চা গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে হাত চালাচ্ছে। বেশির ভাগই মাথাই একটা করে বোরা এমন ভাবে ভাঁজ করে রেখেছে যে ঘোমটার মতো মনে হচ্ছে। বৃষ্টির ছোট্ট কণাগুলো থেকে আত্মরক্ষার সব চেয়ে সহজ উপায়। সকালের এই সময়টার বাতাসে একটা শীত শীত ভাব আছে কিন্তু এটা শীতকাল নয়। বরং সারা বছর ছড়িয়ে জমিয়ে থাকা বর্ষার এটা খুব মন্দা সময় বলা যেতে পারে। হাতে লাঠি নিয়ে মাংরা শেডট্রির নিচে দাঁড়িয়েছিল। ওর চোখ ঘুরছে এখন মানুষগুলোর হাতের দিকে। ঠিকমতন পাতি তোলা হচ্ছে কি না এইটে দেখাই ওর কাজ। নির্দিষ্ট পরিমাণের নিচে হলেই কৈফিয়ত দিতে হবে। জন্মইস্তক এই কাজ করছে সে। এখন কুলিকামিনদের হাতঘোরা দেখেই বলে দিতে পারে কে কতটা ফাঁকি দিচ্ছে। দুইকুড়ি দশ বয়স হয়ে গেল তার। চুল এর মধ্যেই সাদা। পায়ের গোছগুলো গুটিয়ে দড়ি হয়ে আসছে। কিন্তু এখনও খাটতে একটুও অনিচ্ছা নেই। দিনভর খাটা আর সন্ধেবেলায় রামচন্দ্রের ভাটিখানায় গিয়ে বুকভরা মাল খাওয়া–এই তো জীবন।
কেয়া করতিস রে? তুহার বাপকো বাগান? পাতিবাবুর চিৎকারটা কানে আসতেই ছটফটিয়ে উঠল মাংরা। যে দিক দিয়ে আওয়াজটা এল সেদিকে পা চালাল। দ্রুত যেতে চাইলেই যাওয়া যায় না। ঘন চা গাছগুলোকে অনেকদিন ইচ্ছেমতন বাড়তে দেওয়ায় এখন রাস্তা করে নিতে হয়। অন্য লোকের পক্ষে যা কষ্টকর মাংরার কাছে তা জলের মত সহজ। এই চা গাছের গন্ধ, ডালগুলোর ভঙ্গি তার মত আর কজন চেনে। বুড়োর বাপটার সঙ্গে সে তুলনা করছে না অবশ্য কারণ সে তাকে জন্ম দিয়েছে। এই বাগানের অনেক গাছের জন্মও এই বুড়োর হাতে। কিন্তু শুকরা বুড়োদের সময় এই সার দেওয়া গাছ সাজানো আর নতুন নতুন আইন কানুন তো এমন ছিল না। তার ওপর কুড়ি বছর বসে গিয়ে সব স্মৃতি এখন ঝাপসা হয়ে গেছে বাপের। দিনরাত শালা টেবুয়া টেবুয়া করবে। কবে কখন কোথায় ছিল এখনও তার টান গেল না। মাংরা বোঝে বাপ বেশি দিন নেই। মারা যাওয়ার আগেই এইসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু এটা তো ঠিক, কাজ জানত লোকটা।
গাছের জলে শরীর ভিজিয়ে পাতিবাবুর কাছে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল ব্যাপারটা। বুকু সর্দারের মেয়েটা সাতসকালে শেড়টির পাতায় নিজের খোঁপা সাজাচ্ছে। নিরি নাম মেয়েছেলেটার। বিনাগুড়িতে বিয়ে হয়েছিল কিন্তু স্বামীর ঘর করে না। হুটহাট চলে আসতে আসতে শেষপর্যন্ত আর গেলই না। এখন নাকি ওই লাইনের ছোঁড়াগুলোর মাথা চিবোয়। বুকু সর্দারের কথায় ওকে কাজে নিয়েছে মাংরা অথচ ওরই জন্যে পাতিবাবুর কাছে বেইজ্জত। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিরির টুকরিটা মাটি থেকে তুলে ধরল সে। কয়েকটা কচি পাতা রয়েছে ওখানে। অথচ এতক্ষণে অন্তত চার ইঞ্চি ভরে যাওয়ার কথা। একটা চাপা গুজব শুনত মাংরা দলের দুটো জোয়ান ছেলে নাকি ওর ঝুড়ি ভরে দিতে সাহায্য করে। ধরা যায়নি বলে কিছু বলার নেই। গাইবাছুরে ভাব থাকলে কে আটকাবে? পাতিবাবু ওকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলেন সামনে। যেন আর কিছু করার নেই। মাংরা যখন এসে পড়েছে যা করবার সেই করবে। তার ওপর কর্তৃপক্ষের এই আস্থা বা বিশ্বাস মাঝে মাঝে মাথা গরম করে দেয় মাংরার। তখন নিজেকে খুব ক্ষমতাবান বলে মনে হয়। কয়েক পা এগিয়ে খপ করে চুলের মুঠি ধরল সে নিরির। চিৎকার করে উঠল মেয়েটা। গলার ক্যানক্যানানিতে কানের দফা রফা হবার জোগাড়। হাতের চাপে খোঁপায় গোঁজা পাতা আর ফুল দুমড়ে গেছে। আগের দিন হলে এতক্ষণে সপাং সপাং লাঠি চালাত শরীরে। কিন্তু এখন সেটা অসম্ভব। গায়ে হাত দিলেই কাম বন্ধ হয়ে যাবে। কুলিদের য়ুনিয়ন হয়েছে। অন্যায় করলে শাস্তি দাও কিন্তু সেটা যেন বে-আইনি না হয়। তাই লাঠি হাতে নিয়ে ঘুরলেও ওটা কোনো কাজে লাগে না। এরকম অবস্থায় বাপের আমলে সাহেবরা পিঠের চামড়া ছাড়িয়ে নিত। ওদের অল্পবয়সে সারা শরীরে কালসিটে পড়ে যেত। আর এখন সব কুলি সাহেব হয়ে গেছে– গায়ে হাত তোলা যাবে না! আরে মারধর করলেই তো ভাল কাজ হবে। মুখে যতই তুমি গালাগাল দাও সেকথা কানে কখনও ঢোকে? আর এইসব বদমাস চিড়িয়াদের। নিজের মাথাকে একটা ঝটকায় ছিনিয়ে নিয়ে নিরি ফুঁসে উঠল, কেনে গায়ে হাত দিচ্ছিস। বুড়া মরা লজ্জা করে না।
এটা তোর রঙ করার জায়গায়? পাঁচটা পাতাও টুকরিতে পড়েনি আর তুই এখানে সাজগোজ করছিস! কোম্পানি মুখ দেখে পয়সা দেবে? চোখ পাকাল মাংরা।
যা শালা দালাল কোথাকার। আমি কাম করি আর সাজ করি তোর কী? তোর পাতি ঠিক পেলেই তো হোল। খবরদার বলছি, এই শেষবার, এরপর গায়ে হাত তুললে তোর নোকরি আমি খতম করব।
আমার নোকরি তুই খতম করবি? হাঁ হয়ে গেল মাংরা। বলে কি মেয়েটা। এই সেদিন জন্মাতে দেখল, বুকু সর্দারের অনুরোধে একে কাজ দিল নিজের দলে আর ওই এখন তাকে শাসাচ্ছে। ইচ্ছে হল বেধড়ক প্যাদায় কিন্তু সেটা উচিত হবে না এটা বুঝেছে। অনেক কষ্টে আজকাল নিজেকে সামলাতে হয়। আগের দিন হলে মেয়েটা বেয়াদপির জন্য এতক্ষণে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকত! দাঁত বের করে হাসবার চেষ্টা করল মাংরা, আরে শালি, তুই বাগানকা মালিক নাকি?
জরুর। শরীর দোলালো নিরি। সাহেবকে বলব তুই আমার ইজ্জত নিয়েছিস, ব্যস। একটা হাত শূন্যে তুলে চাকু চালাবার ভঙ্গি করে পাছা দুলিয়ে টুকরি তুলে ফিরে গেল মেয়েটা। একদম জমে গেল মাংরা। বলে কি রে মেয়েটা! মাথা গরম হয়ে গেল ওর। এর একটা বিহিত করতেই হবে। দুদ্দাড় চায়ের গাছ সরিয়ে দৌড়তে লাগল মাংরা। পাতিবাবুকে খুঁজে বের করে সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। মাথায় শোলার টুপি, হাফ প্যান্ট আর হাতে ছাতি নিয়ে পাতিবাবু তখন সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখছিলেন, প্লাকিং চলছে কতগুলো ব্লকে একসঙ্গে। পাতিবাবুকে সবটাই ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়। রোদ জল ঝড়–এই ঘোরা থেকে নিষ্কৃতি নেই। বুড়ো সর্দারকে ছুটে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে?
মাংরা ঘটনাটা এক টানে বলল। মেয়েটাকে অবিলম্বে ছাড়িয়ে দেওয়া দরকার। নইলে কখন কার নামে এমন মিথ্যে রটিয়ে দেবে যে বেইজ্জত হতে হবে। কথাটা শুনে পাতিবাবুর মুখ গম্ভীর হল। বড্ড বাড় বেড়েছে আজকাল ছোঁড়া ছুঁড়িদের। এক-একসময় এমন করে তাকায় অথবা কথা বলে যেন ওরা মালিকের বাবা। পাতিবাবু বললেন, সাহেব আধ ঘণ্টার মধ্যেই আসবে। তখন তোকে ডাকব, সব খুলে বলবি।
পাতিবাবু অন্য ব্লকে চলে যাওয়া মাত্র হঠাৎ বৃষ্টি জোরে নামল। একদম মুষলধারে না নামলে প্লাকিং থামে না। মাংরা দৌড়ে একটা শেডট্রির গা ঘেষে দাঁড়াল। বুকু সর্দারের সঙ্গে কথা না বলেই সাহেবকে রিপোর্ট করা ঠিক হবে? বুকু বলবে, মাংরা তুই একি করলি, এতদিনের বন্ধু লোক। কিন্তু মেয়েটার হাবভাব বুকে জ্বলুনি ছড়ায়। ওর ছেনালি দেখে এই বুড়ো বয়সেই শরীর নাচে তো ছোঁড়াগুলো দিশেহারা হবেই। কিন্তু মেয়েছেলে যদি পুরুষের নামে বদনাম দেয় তো সবাই সেটা বিশ্বাস করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। আগের দিন হলে এসবে কেউ ভাবত? শরীর নিয়েছে? বেশ প্রমাণ কর। নেই প্রমাণ? কেউ দ্যাখেনি? তো চুকে গেল। কিংবা বড় জোর হাঁড়িয়া পিয়াও সবাইকে। মেয়েটার যদি স্বামী থাকে তো অবশ্য ঝামেলা হত। মারপিট থেকে জান নেওয়া সবই সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন অন্য ব্যবস্থা। য়ুনিয়ন হয়েছে। ছোঁড়াগুলো সেই নেশায় বড় বড় কথা বলে। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করে। সব চেয়ে মুশকিল হল সাহেবরাও ওদের ঘাঁটাতে সাহস করে না। বাগানে কোনো গোলমাল হলে য়ুনিয়নবাবুদের সঙ্গে দুএকটা মদেসিয়া ছোকরা সাহেবের বাংলোয় ফয়সালা করতে গিয়ে নাকি একসঙ্গে বসে বিলিতি খায়। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারে না। মদেসিয়া গিয়ে সাহেবের সঙ্গে এক চেয়ারে বসে মদ খাবে? বাপের জন্মে শুনেছে কেউ? তা দিনগুলো এত জলদি পালটে যাচ্ছে। সেই সাহেবরাও আজ নেই সেই শাসনও গেছে। আগে সাদা চামড়া ছাড়া সাহেব হতো? এখন কালেভদ্রে ওরকম সাদা দেখা যায়। সব কালো চামড়ার মানুষ এখন সাহেব বনে এসেছে। আসল সাহেবি গুণ এদের থাকবে কী করে। নেড়ি কুত্তাকে বাংলোয় বাঁধলে কি অ্যালসেশিয়ানের মত আওয়াজ করবে? ফলে সব মাথায় উঠেছে। কাজ করতে চায় না কেউ। কেমন ফাঁকি দিয়ে পয়সা হাতিয়ে নেবার ধান্দায় থাকে। আর এসব যদি কারো সহ্য না হয় যদি কেউ মনে করে বাগানটা তাকে অন্ন দিচ্ছে অতএব ফাঁকি দেওয়া উচিত নয় তাহলে এরা এখন তাকে দালাল বলে মস্করা করে।
বাপের মত অন্ধ নয় মাংরা। বাপ বলে এ জায়গাটা আমাদের নয়। এখানে কাজে এসেছি, পয়সা পাচ্ছি তাই মন দিয়ে কাজ করব। সে পয়সা দিচ্ছে সে দেবতা, তার কথা অমান্য করার কথা করার স্বপ্নেও ভাবব না।
মাংরা কিন্তু এরকম ভাবে না। এ জায়গাটা বাঙালিদের। মদেসিয়ারা এখানে এসেছিল, থেকে গেছে এইমাত্র। এখন যদি আবার টেবুয়াতে ফিরে যায় তাহলে ওখানে কী করে মানাবে? যেখান থেকে খাবার অভাবে একদিন চলে আসতে হয়েছিল সেখানে ফিরে গেলে খাবেই বা কী! তাই ফেরার প্রশ্ন ওঠে না। বাপের কাছ থেকে সেই মাতৃভূমির জন্যে একটা মমতা পেয়েছে সে এইমাত্র। কিন্তু এই চা বাগানটা আমাদের রুটি দেয়। একে যত্ন করা, সেবা করা আমাদের কর্তব্য। পয়সা পাচ্ছি তাই কাজে ফাঁকি দেব না। সাহেবের মুখের ওপর কথা বলা ঠিক নয়। হয়তো অনেক অন্যায় আদেশ হয়–ওভারটাইম বলে খাটিয়ে পয়সা না দিয়ে তিনটে খাসি লাইনে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু এসব নিয়ে ঝামেলা পাকালে আখেরে নিজেরই ক্ষতি। কারণ মানুষ একবার উদ্ধত হলে আর থামতে জানে না। আবার সাহেবরা এখন যে ভাবে প্রশ্রয় দেয় তাতে যদি শাসন করার প্রয়োজন হবে যখন, তখন হাত শক্ত হবে না আর।
নিরিকে নিয়ে ঠিক কি করা উচিত বুঝতে পারছিল না মাংরা। এই হয়েছে তার অবস্থা, কোনো ব্যাপারে চটজলদি মন স্থির করতে পারে না। বুড়ো শুকরা যেমন পুরনো ধারণা নিয়ে গোঁ ধরে থাকে সেটা সে সব সময় মানতে পারে না। আবার ছেলে সিরিল যখন সব ব্যাপারে ডোন্টকেয়ার ভাব করে তখন তার ভয় লাগে। এরকম ঔদ্ধত্য সে কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারে না। ফলে নিজেকে কেমন অসহায় বলে মনে হয় আজকাল। অথচ সে সর্দার। যুবক বয়সে কেউ সর্দার হলে তাকে সে স্বপ্নের নায়ক হিসেবে দেখত। সর্দারদের কি প্রতিপত্তি তখন। একজন লেবার সাহেবের কাছে কেন বাবুদের সামনে গিয়ে কথা বলবে এমন বুকের পাটা কারো ছিল? তাকে যা বলার সর্দারকে জানাতে হতো। সর্দার সেটা বাবুদের মাধ্যমে সাহেবের কাছে পৌঁছে দিত। আর এখন? নিজেকে এক এক সময় ওই শেডট্রির সঙ্গে তুলনা করে সে। রোদ আটকায় না জল আড়াল হয় না তবু চা গাছগুলোর মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে শেডট্রি নাম দিয়ে। ওর সঙ্গী অন্য সর্দাররা বলে এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী! যে কদিন চাকরি আছে কাজ করে যাও চুপচাপ। তারপর ছুটি হয়ে গেলে মরে যাও। সেটা যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ অন্ধ হয়ে থাক আর রাতভর শরাব পিও ব্যস।
.
সারাটা দিন মেজাজ খিঁচড়ে থাকল মাংরার! মাঝে মাঝে বাগানের হালচাল দেখে তার মরে যেতে ইচ্ছে করে। নইলে পাতিবাবু যখন তাকে ডেকে পাঠালেন সকালে তখন এমন হয়? সাহেব জিপ চা বাগানের গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে এক হাতে পাইপ ধরিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কুছ গোলমাল হুয়া?
মাংরা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল। যদিও তখনও সে দোনামনা করছিল বুকুর সঙ্গে কথা না বলে নালিশটা করবে কিনা। পাতিবাবু তখন উস্কে দিলেন, সাহেব এসেছে, তুই সব খুলে বল সাহেবকে।
মাংরা তখন আর কী করবে! ঘটনাটা যেমন হয়েছিল তেমনি বলে গেল। ওর মনে একটু ভয় ছিল। আগে হলে ওই নিরিটাকে সাহেবের হুকুমে বাংলোয় যেতে হতো এই নালিশ শুনলে। সাতদিন পর যখন মেয়েটা ছাড়া পেত তখন তাকে দেখে চেনা কষ্টকর হত। কখানা হাড় ছাড়া সাহেব তার সব শুষে নিয়েছে। এর পর কোনো মেয়ে আর বেআদবির কথা চিন্তা করবে না। আর এখন কি হল? ঘটনা শুনে সাহেবের গলা থেকে এমন আওয়াজ বের হল সামনের গাছ থেকে একদল টিয়া চমকে উঠে টা টা করে উড়ে গেল। প্রায় দুলে দুলে হাসিতে ফেটে পড়লেন সাহেব। তারপর কোনো রকমে নিজেকে সামলে বললেন, হাউ ফানি। ভেরি ইন্টরেস্টিং। নো নো বুড্ডা; আমাদের চাই কাজ। দিনের শেষে প্রোডাকশন ঠিক থাকলে কিছু বলার নেই। পাতি মেয়েটা তুলুক বা অন্য কেউ ওকে হেল্প করুক তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করার কী আছে। ওর ব্যাপারে নাক গলাচ্ছ কেন? একটু সাজগোজ না করলে ছেলেরা উৎসাহ পাবে কেন? আমার মনে হচ্ছে এরকম মেয়ে যদি আরো বেশি থাকে তো প্রোডাকশন বেড়ে যেতে পারে, কী বলেন আপনি?
পাতিবাবু ঘাড় নাড়লেন, ইয়েস স্যার। ইউ আর রাইট স্যার। ইউ আর রাইট স্যার। তবে কিনা স্যার বাপের বয়সী লোকটাকে অমন কথা বলল।
কী কথা? ও বাপের বয়সী হলেও তো সর্দার মানুষ। সাহেব চোখ ছোট করে হাসলেন।
মাংরা বলল, সাব আমি ওর বাবার বন্ধু, বুড়ো হয়ে গেছি।
সাহেব বললে, সেটাই তো তোমার সুবিধে। ও যদি অভিযোগ করে তাহলে আমরা কেউ বিশ্বাস করব না। তুমি বুড়ো, অক্ষম। হো হো করে হেসে উঠলেন সাহেব নিজের রসিকতায়, আই মাস্ট সি হার। কোথায় সে?
পাতিবাবু সঙ্গে সঙ্গে একজনকে ডেকে নিরির খোঁজে পাঠাল। মাংরার বিমর্ষ মুখের দিকে তাকিয়ে সাহেব বললেন, দিন পালটে যাচ্ছে সর্দার। ভাল কথা বলে গায়ে হাতে হাত বুলিয়ে কাজ আদায় করো। এ বাগান নাকি সব চেয়ে পিসফুল ছিল। শুনছি এবার নাকি স্ট্রাইক হতে পারে। তাহলে?
এইসময় নিরি এল। ওর সাহেবের কাছে আসার কারণ অন্যান্য লেবাররা জেনে গেছে এর মধ্যে। তারা সবাই চা-গাছগুলোর সামনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। নিরি আসছে বুক ফুলিয়ে, হাঁটার ভঙ্গিতে থোড়াই পরোয়া করি ভাব। ওকে তো বটেই, পাতিবাবুকে পর্যন্ত উপেক্ষা করে সে সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, আমাকে ডেকেছেন সাব? সাহেব তখন ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করছিলেন। চোখ তুলে মাংরা সাহেবের চোখে কৌতুক দেখেছিল। সাহেব বললেন, নাম কী তোমার?
নিরি।
মরদের নাম কী?
ওকে আমি ছেড়ে দিয়েছি।
বিয়ে ভেঙে গেছে?
আমি ওকে ছেড়েই দিয়েছি।
এখানে কার কাছে আছ?
এখন বাপের কাছে। কদিন পর নতুন ঘরে যাব।
অ। সাহেব থতমত হয়ে গেলেন। চা বাগানে এসেছেন অল্পদিন। কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা ওঁর হয়নি কখনও। এমন স্মার্ট কথাবার্তা শোনে নি বোঝা যাচ্ছিল।
ওকে এসব কথা বলেছ কেন? মাংরাকে দেখালেন সাহেব।
আমি সাজি কি না সাজি তাকে ওর কী। পাতিবাবু চেঁচালো আর ও ছুটে এসে মাথায় হাত দিল। মাথায় হাত দেবার ও কে? ওর ছেলে সাহস পায় না তো ও! আমি পাতি তুলি কি না সেটাই আসল কথা। ঠিক কিনা?
সাহেব ঘাড় নাড়লেন, কিন্তু ও তো তোমার বাবার বন্ধু।
হাসল নিরি, ছোঃ, কত বাপের বন্ধু দেখলাম! তাছাড়া ওর ছেলেই আমাকে বলেছে কেউ ফালতু ঝামেলা করলে প্রতিবাদ করতে!
কথাটা শুনে মাংরা হকচকিয়ে গেল। সিরিল এই কথা মেয়েটাকে বলেছে? কখন সে এর সঙ্গে কথাবার্তা বলে? কেউ তো তাকে কিছু বলেনি। ছেলে বড্ড বেআদব, আজকাল লিডার হয়েছে তরুণদের। য়ুনিয়ন বাবুরাও ওকে খাতির করে বলে শুনেছে। কিন্তু এই মেয়েটার সঙ্গে কীসের সম্পর্ক! এই স্বামী তাড়ানো বদ মেয়েছেলেটার খপ্পরে পড়ল নাকি?
সাহেবও একটু অবাক হয়েছিলেন কথা শুনে, ওর ছেলে তোমাকে কী বলেছে? সাহেব একই সঙ্গে মাংরাকে দেখলেন।
দিনকাল পাল্টে গেছে, কেউ অন্যায় করলে ছেড়ে দেবে না।
তুমি ওর ছেলের কথা শোনো কেন?
ইস্! হঠাৎ মেয়েটার চেহারা পাল্টে গেল, সেকথা আপনাকে আমি বলব কেন? এটা আমার ব্যাপার।
মেয়েটার কণ্ঠস্বর এমন নিচে ছিল না যা কাছে-পিঠের লেবারা শুনতে পাবে না। তাই ওর কথা শেষ হতেই একটা হাসির হররা উঠল। সাহেব একটু গম্ভীর হবার চেষ্টা করে বললেন, তাহলে তো তুমি আরো অন্যায় করেছ ওকে ওই কথা বলে। যাকে তুমি মানো তার বাবাকে বদনাম দিতে লজ্জা করা উচিত।
মেয়েটা একটুও লজ্জিত হল না, কাজের জায়গায় সবাই এক। যে আমার মাথায় হাত দেয় তাকে আমি ছাড়ব কেন? আর আমি বলছি যদি আবার করে তবে নালিশ করব। আমি এখনি বদনাম দিইনি তো।
মাথায় হাত দিয়ে সে অন্যায় করেছে। কিন্তু হাজার হোক বুড়ো মানুষ, তোমার এসব কথা বলা উচিত হয়নি। সাহেব পাতিবাবুর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। যেন এই প্রসঙ্গে নিয়ে আর কথা বাড়াতে চান না তিনি।
নিরি এবার মাংরাকে দেখল। রাগে ঘেন্নায় এবং লজ্জায় কাঁপছিল মাংরা। এটা বিচার হল? আর মেয়েটা যে কথা শোনাল তার পরে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? ইচ্ছে হচ্ছে এখনই ছুটে গিয়ে বউকে বেধড়ক মারে। গুদামে কাজ করছে বউ, ছেলেও সেখানে। বউএর প্রশ্রয়েই ছেলেটা এমন সাপের পাঁচ পা দেখেছে। মাংরা চোখ তুলে দেখল সাহেব পাতিবাবুকে নিয়ে অন্যদিকে হেঁটে যাচ্ছে। লেবারদের হাত আবার চালু হয়েছে। হঠাৎ নিরি ওর কাছে এগিয়ে এল। তারপর ওর হাত ধরে বলল, আমার মাথায় হাত দিয়েছিল বলে আমি স্বামীর ঘর করিনি। মাথায় হাত দিলে আমার শরীরে আগুন জ্বলে। বলেছি তাই বলে সাহেবের কাছে এসে চুকলি কাটার কী আছে! হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে বিফল হল মাংরা! চা-গাছের মধ্যে হাঁটতে আরম্ভ করলেও মেয়েটা সঙ্গ নিল, আজকাল যে এসব করে সবাই তাকে কী বলে জানো?
কী? অন্যমনস্ক হয়ে বলল মাংরা।
মেয়েটার শরীর থেকে কেমন যেন ভদ্রলোক ভদ্রলোক মার্কা গন্ধ বের হচ্ছে, মদেসিয়াদের মতন নয়।
দালাল! বলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল নিরি।
আর সেই সময় ব্লকের শেষপ্রান্তে কানফাটানো চিৎকার উঠল। সবাই উত্তেজিত হয়ে জায়গাটা থেকে সরে আসছে। নিরির কথাটা কানে নিয়েও স্থির হতে পারল না মাংরা। প্রাণপণে দৌড়ে জায়গাটায় পৌঁছে গেল। গিয়ে শুনল একটা চা-গাছের গুঁড়িতে পাক দিয়ে পড়ে রয়েছে বিরাট সাপ। পাতি তুলতে তুলতে প্রায় তার গায়ে পড়ে গিয়েছিল একজন। এখন সাপটা গাছ ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। এই ঘন চা বাগানে মাটি ঘেঁষে এসে যদি ওটা কাউকে আক্রমণ করে তাহলে আত্মরক্ষার কোনো উপায় থাকবে না। চিৎকার শুনে সাহেবও ছুটে এলেন। বোঝা গেল সাপটা ছোটখাটো নয়। বর্ণনায় বুঝে গেল মাংরা এটা নির্ঘাৎ রাজসাপ। অজগর না পাইথন কি যেন বলে সাহেবরা। সাহেব তখনই বাংলোয় একজনকে পাঠালেন বন্দুক আনতে।
কিন্তু মাংরার তখন শরীর জ্বলছে। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে সে এগিয়ে যাচ্ছে। এক হাতে লাঠিটাকে উঁচিয়ে রেখেছে। এই চা-বাগানে সে জন্মেছে। একটু একটু করে বুড়ো হল। সে যেমন করে এখানকার প্রকৃতিকে জানে এই লেবারগুলো তার এক কণাও জানে না। আতা-বাগানে কাজ করতে এলেই সাপ তো জলভাত, বাঘের মুখেও পড়তে হতো। কত হরিণের বাচ্চা সে নিজের হাতে ধরে সাহেবকে ভেট দিয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে এক কালে লড়াই করতে হতো পাতি তুলতে এলে। এসব কথা এরা কেউ জানে? এখন সব বাবু হচ্ছে, মুখে লম্বা লম্বা বাত। সে যে সর্দার এদের সবার চেয়ে বড় এটা বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে কাকে তোরা দালাল বলছিস দ্যাখ।
Chapter - 2
২.
সবার নজরে পড়ে গেল মাংরা সর্দার সন্তর্পণে এগোচ্ছে। একটা লাঠি সম্বল করে সাপটার মোকাবিলা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। কুলিরা সব নিরাপদ জায়গায় সরে দাঁড়িয়েছে। এইসময় নারীকণ্ঠে চিৎকার উঠল, মাংরাকে ফিরে আসতে বলছে। গলাটা কার বুঝতে পারল না মাংরা, এখন তার নজর গাছগুলোর তলায়। উবু হয়ে হাঁটছে সে। অজগর হলে যে কোনো সময় এক ঝটকায় শুইয়ে দেবে তাকে। সেইটে হতে দিলে চলবে না। সাহেবের গলা শুনতে পাচ্ছে সে, হুকুম করছেন ফিরে যেতে। কান দিল না সে। না, এই মুহূর্তে কোনো আদেশ শুনবে না মাংরা।
এ ব্লকে চা গাছের তলাটায় যথেষ্ট আগাছা জমে গেছে। বাজপাখীর মত মাটি হাতড়াচ্ছিল সে চোখ দিয়ে। আর একটু এগোতেই সে স্থির হল। সাপটা তাকে দেখছে! একটা গাছের গুঁড়ি শুধু লেজে পাকিয়ে ধরে অনেকটা এগিয়ে এসেছে শরীরটা। আচমকা ঘাম জমতে লাগল শরীরে। এরকম মোটা আর লম্বা সাপ সে জীবনে দেখেনি। নির্ঘাৎ কিছু একটা খেয়েছে সাপটা। কারণ পেটের কাছটায় বেঢপ ফুলে আছে ওর। চোখাচোখি হতেই আস্তে আস্তে হাঁ করল সাপটা। মুখের গহ্বর এবং জিভ দেখে চকিতে সতর্ক হয়ে গেল মাংরা। ওই মুখ তার মত মানুষকে সহজেই অর্ধেকটা গিলে নিতে পারে। এই সাপ ফণা তোলে না কিন্তু নিজের পরিধির মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত ঝাঁপিয়ে গিলে নিতে পারে। কিংবা বিদ্যুতের মত লেজ ছুঁড়ে শিকারকে পাকে পাকে জড়িয়ে চাপ দিতে পারে যতক্ষণ তার হাড়গোড় না ভেঙে যায়। বেশ কিছুক্ষণ চোখে চোখ রাখল ওরা। পেছনে কুলিদের গলায় কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ সাপটার কী হল বুঝল না মাংরা, মুখটা সরিয়ে নিচ্ছে। একটু একটু করে শরীরটাকে আড়ালে নিয়ে যাওয়ার মতলব। পিছু হটছে ওটা, এই সময় ঝট করে একমুঠো মাটি তুলে ছুঁড়ে দিল মাংরা। ভেজা মাটির দলা থপাস করে সাপটার চোখের ওপর পড়ে ঘুঁটের মত বসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মরিয়া হয়ে সাপটা শন শন করে অনেকটা দূর মাথা সোজা করে এগিয়ে এল। কিন্তু চোখে দেখতে পাচ্ছে না ওটা। দুহাতে লাঠিটা ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাংরা। মাথা সরাবার আগেই ঠিক গলার কাছটাতে লাঠিটাকে আড়াআড়ি ফেলে ওটার দুই প্রান্তে দুই পা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আচমকা আক্রমণে সাপটা যে কয় পলক ঘাবড়েছিল সেইটে কাজে লাগাল মাংরা। প্রাণপণে লেজ ব্যবহার করবে জানে মাংরা। মাথা অকেজো হয়ে গেলে ওর বড় অস্ত্র। এক ঝটকায় তাকে ফেলে দিতে পারে লেজের আঘাতে। শরশর করে লেজটা খুলে আসছে গুঁড়ি থেকে। প্রচণ্ড গতিতে লেজটাকে ওপরে তুলতে গিয়ে বাধা পেল সাপটা। একটা চা-গাছের ডালে লেজটা আটকে গেল আঘাত করতে গিয়ে। মাংরা দেখল ডালটা পাটকাঠির মত ভেঙে গেল একবারই। এবার লেজটাকে সে গুটিয়ে আনছে। আক্রমণের ধারা পালটাচ্ছে ঠিক ওই জন্যেই তৈরি ছিল মাংরা। লেজের ডগাটা নাগালে আসামাত্র খপ করে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। পায়ে তলায় মাথা লাঠিতে আটকানো আর দুহাতের মুঠোয় লেজ, সাপটা প্রাণপণে শরীর দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড সেই শক্তির সঙ্গে যুঝতে পারছিল না মাংরা। একটু শিথিল হলেই মৃত্যু, মাংরা কোনরকমে শরীরটাকে সাপের পেটের নাগালের বাইরে রাখছিল।
এসময় হইহই বেড়ে গেল। দৃশ্যটা দূর থেকে সবাই দেখেছে। সাপটা এখন কব্জায় বুঝে ছুটে এল অনেকে। মুহূর্তেই দড়িতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়ে গেল সাপটা। কয়েকজন মাংরাকে ধরে ধরে খোলা জায়গায় নিয়ে এল। সমস্ত শক্তি নিঃসাড় হয়ে গেছে তার। শরীর ঝিম ঝিম করছে, চোখ ঝাপসা। ম্যানেজার এগিয়ে এল, ইয়েস সর্দার, তুমি খুব সাহসী। তোমার জন্যে আমি গর্ব বোধ করছি। এর জন্যে তুমি বকশিশ পাবে।
দুটো হাত জড়ো করে মাংরা কৃতজ্ঞতা জানালো কোনরকমে। কিন্তু মনে মনে বলল, এ তোমার কি রকম বিচার। আমি সর্দার আর আমার সম্মান নেই? পারত ওই ছোঁড়ারা এরকম একটা কাজ করতে?
ভিড় জমেছে সাপটাকে নিয়ে। দড়ি বাঁধা সাপটা সত্যি প্রকান্ড। হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠল মাংরা। তারপর চিৎকার করে বলল, কামমে লাগ যাও সব, জলদি। মাংরার মুখ চোখ এখন একজন সর্দারের যেমন হওয়া উচিত তাই। যথেষ্ট সময় নষ্ট হয়েছে আর নয়। লেবাররা তো বটেই ছোটসাহেব পর্যন্ত লোকটার এই রকম পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গেলেন। পাতিবাবুকে বললেন, হি ইজ আওয়ার অ্যাসেট। ওকে অফিসে পাঠিয়ে দেবেন বিকেলে। তারপর দড়িতে বাঁধা বিশাল সাপটাকে নিজের গাড়ির পেছনে ঝুলিয়ে বীরবিক্রমে ফিরে গেলেন।
না। সাপটাকে ধরেও মেজাজ ঠিক হল না মাংরার। বিকেলে গুদামের পাশে সাহেবের অফিসে যাওয়ার সময় ভেবেছিল সিরিলকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে ওই মরদ-ছাড়া বেশরম মেয়েছেলেটা যা বলল তা সত্যি কিনা! সিরিল যদি স্বীকার করে তাহলে এই মুহূর্তেই সম্পর্ক ত্যাগ করবে। ওরকম ছেলের কোনো প্রয়োজন নেই তার। হপ্তায় যে টাকা পায় তা তো জামাকাপড় আর ভুটানের মদ খেতেই চলে যায়। এইসব মেয়ের পেছনে ঢালছে কিনা কে জানে! ওর কাছ থেকে তো একটা পয়সাও নেয় না মাংরা! তার সংসারের অবস্থা এককুড়ি সাল আগে যেমন ছিল এখনও তাই। ছেলেকে তাড়িয়ে দিলে কোনো সমস্যা নেই শুধু একটি ছাড়া। বাগান থেকে ছুটি হয়ে গেলে মাথা গোঁজার জায়গা থাকবে না। নইলে ছেলে যদ্দিন চাকরি করবে তদ্দিন তাকে কোয়ার্টার ছাড়তে কেউ বলবে না। তা এরকম ছেলের আশ্রয়ে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল। সে নিজে কোনোদিন শুকরাবুড়োকে অপমান করেনি, ভাবতেও পারে না। আর এ হারামি ছেলের কান্ড দ্যাখো, ওই মেয়েটাকে নিজের বাপের পেছনে লেলিয়ে দিচ্ছে। আজ না হয় কোয়ার্টার হয়েছে ইটের দেওয়াল টালির ছাদ। আরে এককুড়ি সাল আগেও তো মাটির ঘরে খড়ের ছাদের তলায় থাকত ওরা। তাই থাকবে না হয়। বাগানের বাইরের জঙ্গলের মধ্যে একটা ঘর তুলে নেবে। কিংবা এখানে থাকবেই না। বুড়ো বাপকে নিয়ে সেই টেবুয়াতে চলে যাবে। বাপের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে সেটাই তো তাদের দেশ। নিশ্চয়ই দু-একজন আত্মীয়কে খুঁজে বের করে নেওয়া যাবে। শেষের সিদ্ধান্তটা রাগের মাথায় মনে এলেও ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ভাবতে যুৎ পায় না মাংরা। গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে সে একটু আড়ষ্ট হল। যদি সত্যি হয় ব্যাপারটা! হাতের লাঠিটা বগলে নিয়ে এক পা এক পা এগোতে অন্তত তিনটে লোকের প্রশংসা শুনতে হল। ওরকম বড় সাপ সে একা ধরল কী করে! কত বড় হিম্মত থাকলে এরকম সাহস দেখানো যায় এই সব কথাবার্তা। সারা বাগান আজ তার হিম্মতের কথা জেনে গেছে। অত বড় সাপটাকে যে ধরেছে তাকে এখন সবাই সম্মান করবে। এই সময় যদি সে ছেলের কাছে অপমানিত হয় তাহলে– মাংরা ফিরে এল। যা হবার ঘরে গিয়েই হবে।
একটা কড়কড়ে পাঁচ টাকার নোট বকশিশ পেল সে ছোটসাহেবের কাছ থেকে। মাংরা জানে ওই সাপটার চামড়া এতক্ষণ ছাড়ানো হয়ে গিয়েছে। বাজারে ওই চামড়ার দাম অনেক। অন্তত দুই-তিনজোড়া জুতো হয়ে যাবে। তিন সাহেবের পায়ে শোভা পাবে সেগুলো। এর আগের সাহেবরা হরিণ বা বাঘ পেলে চামড়া খুলে নিয়ে কত কি করত। মাংরা শুনল ছাল ছাড়িয়ে মাংসটা পাঠিয়ে দিয়েছে। পাঁচ টাকা হাতে নিয়ে খুশি হতে পারল না মাংরা। সিরিল হলে ছুঁড়ে ফেলে দিত। বলত, একটা আদমির জীবনের দামে জুতো বানাচ্ছ আর তার জন্যে মোটে পাঁচটা টাকা। আর বাপ হলে আনন্দে মাথা নাড়ত। সাহেব যে খুশি হয়ে দিয়েছে এই তো কত। না দিলে কিছু বলার ছিল? সাপটা যেহেতু বাগানে ছিল তাই তার মালিক তো সাহেবই। কিন্তু মাংরা চুপচাপ নিয়ে নিল। তারপর সেলাম করে খোয়া ছড়ানো পথ দিয়ে হেঁটে এল বাজারে। কামিনগুলো এখন খালি ঝুড়ি নিয়ে ফিরে যাচ্ছে যে যার বাড়িতে। গুদামের শিট বদল হচ্ছে। মাথার ওপর পাখিদের চিৎকার। পিচের রাস্তার দুপাশে লম্বা লম্বা গাছের সারি। চা বাগানের মধ্যে যখন সে হাঁটে তখন একধরনের গন্ধ পায়। সে গন্ধটা নাকে এলেই বুক জুড়িয়ে যায়। আর এখন পিচের রাস্তায় হাঁটার সময় গাড়ির হুসহাস শব্দে নিজেকে গুটিয়ে গুটিয়ে পা ফেলতে হয়। রামচন্দ্রের দোকানটা এত দূরে যে ফুরোতেই চায় না পথটা।
সব জিনিসের দাম বাড়ছে, মালের দাম তো বাড়বেই। তবে ঠিক যারা পুরনো খদ্দের তাদের সঙ্গে এরা জালিয়াতি করে না। এক নম্বরটা দেবেই। আগে পাঁচ টাকা হলে সাঁতার কাটা যেত, এখন নেশাটা জমব জমব হয় মাত্র। কিন্তু আজকে অন্য রকম ব্যাপার হল। সবাই সাপটার গল্পটা শুনতে চায়। যেচে অনেকেই খাওয়াতে লাগল তাকে। নিজেকে খুব বিরাট মানুষ বলে মনে হতে লাগল তার। গল্পটা বারংবার বলতে বলতে একটু একটু করে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কী করবে মাংরা। সেই সময় কে একজন মেয়েটার কথা তুলল। শুধু সাপ ধরা নয়, নিরি যে তাকে অমন হুমকি দিয়েছিল সেটাও রাষ্ট্র হয়ে গেছে। কথাটা ভুলেই গিয়েছিল মাংরা। সাপের গল্প আর পেটে মাল পড়ায় অন্য রকম মেজাজে ছিল। এখন কেউ একজন বলতেই আর একটা গলা খ্যানখেনিয়ে বলল, আমি হলে শালা সাপ না ধরে আগে ওই মেয়েটাকেই ধরতাম। মেয়েছেলে হল মেঘের মত। বৃষ্টি হবার আগেই যত হম্বিতিম্বি করে। কথাটা শোনা মাত্র মাংরা চোখ ঘুরিয়ে বুকু সর্দারকে খুঁজল। ভাটিখানার সামনে বিরাট উঠোনটায় ওরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে খাচ্ছো। মাঝে মাঝে কুপি জ্বালিয়ে ছোলাভাজা বিক্রি হচ্ছে। তারই আলোয় মানুষ দেখা এবং চেনা বেশ কষ্টকর। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পা নড়বড়ে হয়ে গেল। জব্বর খাওয়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মাথায় আবার আগুন জ্বলল যে। শালা বুকুকেই খতম করবে সে। মেয়ে যখন ওর, দায়িত্ব ওকেই নিতে হবে। টলতে টলতে পুরো উঠোনটা পাক দিল সে। না বুকু সর্দারকে সে চিনতে পারছে না। বুকু শালা আসেনি। রোজ আসে আর আজই বাদ। হঠাৎ ওর মনে পড়ল, পকেটে এখনও পাঁচটা টাকা ঠিকঠাক আছে। এটাও তো লজ্জার টাকা। এটাকেও খতম করা দরকার। যে কটা বোতল পেল সব নিয়ে বসল মাংরা।
রামচন্দ্রের খদ্দের বাগানের কুলি কামিন। অনেক অনেক বছর হয়ে গেল এই দোকান। একটা গোপন চুক্তি থাকায় সাহেবদের কাছে লীজের অংশ চলে যায়। নইলে আজ তাকে দ্যাখে কে। এই কুলিদের পয়সায় তার পেট্রোল পাম্প, লরি, বাস, জমিজমা। আগে ছোঁড়ারা লাইনে হাঁড়িয়া খেত। এখন ভুটানের মাল খায়। সেটার বিক্রি রামচন্দ্রের হাত দিয়ে। তবে সরাসরি এই আস্তানা থেকে নয়। সবাই জানে পুলিসও খবর রাখে কিন্তু মুখ খুলবে কোন্ শালা! তবে কুলিদের মধ্যে একটু অন্য রকম ভাব দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা ভাল নয়। জোয়ান যুবক-যুবতীরা আর আসছে উঠোনে বসতে। এখন ভিড় শুধু প্রৌঢ় আর বৃদ্ধদের। মেয়েছেলেরা লজ্জার বয়স পেরিয়ে তবে আসে। এই করলে ব্যবসা উঠে যাবে। দু-একটা মেয়ে যারা শরীর বেচে তাদের এখানে আনলে কেমন হয় এই চিন্তা রামচন্দ্রের হয়েছে। সাহেব হ্যাঁ বললেই ব্যাস, কেল্লা ফতে। তখন যুবকগুলো আসবেই, ফুল এবং মধু–একজোড়া আকর্ষণ।
খেতে খেতে এক সময় শুয়ে পড়ল মাংরা। মাথার ভেতর পরিষ্কার হয়ে গেছে। ঠিক সেইসময় মেয়েছেলেটা এসে দাঁড়াল। মাংরা দেখল কোথায় সাপ ধরেছে বলে সোহাগ করবে না চোখ জ্বলছে হিলহিলিয়ে। হাত নেড়ে পাশে বসতে বলল সে। সিরিলের মা ধূপ করে পাশে বসে কান্নার গলায় বলল, তোমাকে ছুঁড়িটা ওই কথা বলল আর তুমি শুনে গেলে? কী রকম মরদ তুমি?
মাংরা গায়ে না মাখার গলায় বলল, হাম বুড্ডা হো গ্যায়া।
সিরিলের মা থুতু ফেলল এক দলা, থু থু। তারপর ব্যবহৃত বোতলগুলোর দিকে হাত বাড়াল।
বেহেড মাতাল হয়ে দুজনে যখন ভাটিখানা থেকে বের হল তখন চাঁদ মাথার ওপরে, দোকানের আলো নিভে গেছে। সারাদিনের পর এখন আকাশ নির্মল। হাঁটুর তলায় পা দুটো নেই, দড়াম করে পড়ে গেল মাংরা। পড়ে বলল, নিরিকো হাম শাদী করেগা। সিরিলের মা চিৎকার করল কথাটা শুনে। তার নেশা হলেও এখনও শক্ত আছে। এ বুড়োটা নেশার ঝোঁকে বলেটা কি! ওই ছুঁড়িকে বিয়ে করবে। ইচ্ছে হল বেধড়ক পেটায় লোকটাকে। কিন্তু এই অবস্থায় সেটা কী করে সম্ভব! লোকটার যে হুঁশই নেই। খানিকক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে সে হাত ধরে টানতে লাগল মাংরাকে। টেনে হিঁচড়ে পথ চলতে লাগল। মাঝে মাঝে মাটিতে গড়িয়ে কখনও হামা দিয়ে মাংরা বউয়ের সঙ্গে চলতে লাগল। কখনও হুঁশ এলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে আর তখনই মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে, হাম উসকো শাদী করেগা। এ বুড্ডি ভাগো! আচমকা বউ-এর শরীরে একটা লাথি বসিয়ে মাটিতে পড়ে যায় মাংরা। পুরোটা রাস্তা এইভাবে মার খেয়ে স্বামীকে টেনে নিয়ে আসে সিরিলের মা। নিজের ঘরের দরজায় যখন পৌঁছয় তখনও সিরিলের ট্রানজিস্টর বাজছে। বিদেশি সুরের সঙ্গে শুয়ে শুয়ে পা নাচাচ্ছে সিরিল। এত রাতেও তার পরনে প্যান্ট, নেশা হলেও কিন্তু হুঁশ আছে। গোলমাল শুনে হাতে যন্ত্রটা ঝুলিয়ে বাইরে আসে বেরিয়ে। আর তখনই উঠে দাঁড়ায় মাংরা। টেনে টেনে বলে হাম উসকো শাদী করেগা। বাপের অবস্থা দেখে সিরিল বিরক্ত হয়েছিল, এখন সংলাপ শুনে সে হো হো করে হেসে উঠল। আর এতক্ষণ সহ্য করার পর মাংরার বউ-এর ধৈৰ্য্যচ্যুতি হল। ঘরের ভেতর থেকে ঝাঁটা এনে বেধড়ক মারতে লাগল স্বামীকে। পথে আসতে আসতে যত মার খেয়েছে সব ঝেঁটিয়ে উসুল করে নিচ্ছিল সে। তাই দেখে সিরিল ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, শালা, সব থার্ড কেলাস আদমী!
.
বিনাগুড়ি ক্যান্টনমেন্টের পাশে নতুন গজিয়ে ওঠা বাজারে ফরেন জিনিস পাওয়া যায়। ইন্ডিয়ার মালের চেয়ে বেশ সস্তা। টাকা থাকলে সব কিনে ফেলত সিরিল। রেডিও টেপ-রেকর্ডার জামা প্যান্ট দাড়ি কামাবার মেসিন আরো কত কি। দেখে শুনে ও একটা স্ট্রেচের প্যান্ট আর ব্যানলনের গেঞ্জি কিনেছে। ঠিক অমিতাভ বচ্চনের মত লাল কালো মেশানো। বাজারের পানের দোকানের আয়নায় দেখেছে জব্বর লাগে। প্রায় পঞ্চাশ টাকা বেরিয়ে গেল অবশ্য–জিন্দেগি মে এইসাই তো যাতা হ্যায়–ফিন আতা ভি হ্যায়। এখন ওই সবের ওপর চওড়া বেলট কোমরে এঁটে হাতে রেডিও ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে সে যখন হাঁটে তখন মনে হয় হিন্দি ছবির হিরো যাচ্ছে। জীবনে দুটো শখ সিরিলের। বিনাগুড়ি বাজারহাটে যত হিন্দি ছবি আসে সেগুলো দেখা আর ভুটানের রামের বোতল খাওয়া। গুদামে কাজ করে যে টাকা পায় সেগুলো পকেটে বেশিদিন থাকতে চায় না তার। এতদিন দুনম্বর টাকার ধান্ধা ছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছে এখন দরকার। বাপকে পয়সা দিতে হয় না, দিলে সব হাফিস হয়ে যেত। শোলের ডায়ালগ মুখস্থ সিরিলের। যখনই সুযোগ পায় পা ফাঁক করে আমজাদের গলা নকল করে সে আওড়ায়। তখন মদেসিয়া মেয়েপুরুষগুলো তার দিকে ভগবান দেখার চোখ করে তাকিয়ে থাকে। বাগানের মেয়েগুলোর কাছে সিরিল এক নম্বর হিরো।
আজ রবিবার। হাটবার। আশেপাশের চা-বাগানের মেয়েপুরুষ ভিড় জমিয়েছে বাজারে খোলা মাঠে৷ মাইকে গান, বিজ্ঞাপন বাজছে। মেলা মেলা ব্যাপার। সিরিল ট্রানজিস্টার হাতে হাঁটছিল। কিশোরকুমারের গানে অজান্তেই লিপ দিয়ে যাচ্ছে সে। ফ্রান্সিস ওরাওঁ-এর কোয়ার্টারে যেতে হবে। কাল গুদামে একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস কী বলে দেখা দরকার।
পড়াশুনা করেনি বলে এখন মাঝে মাঝে আফসোস হয় সিরিলের। বুড়া বাপ না হয় একদম গেঁয়ো ছিল বাপটাও যে হাফ-গেঁয়ো। নইলে তাকে জোর করে মিশনারিদের কাছে পাঠাতে পারত? যেমন ফ্রান্সিস গিয়েছে। তাহলে সিরিল আজ ফ্রান্সিসের মত বাবু বনে যেতে পারত।
মাত্র দুবছর আগে হল ব্যাপারটা। আগে বাবুদের চাকরি করত বাঙালিরা। কোনো বাবুর ছুটি হয়ে গেলে তার ছেলে কাজে লাগত। কোনোরকমে ম্যাট্রিক পাস করে নিলেই হল। এটাই নিয়ম ছিল। কিন্তু নতুন য়ুনিয়ন বলতে আরম্ভ করল বাবুর কাজে কুলিদেরও নিতে হবে। সিরিল নতুন যুনিয়নে তখন একজন মাতব্বর হয়ে গেছে। নেতা ফেতা নয় কারণ চা বাগানের য়ুনিয়নের নেতা হয় শহরের লোক। যা হোক, কুলির ছেলেরা ম্যাট্রিক পাস করলে তাকেও ওই বাবুর চাকরিতে নিতে হবে এই দাবীতে সাহেবের সঙ্গে দেখা করল ওরা। দুতিন দিন খুব ঝামেলা হল। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল সাহেব। সেই সুবাদে ফ্রান্সিস কাজ পেয়ে গেল, বাবুর চাকরি। চা বাগানের ইতিহাসে এমনটি হয়নি। বিনাগুড়ির মিশনারিদের স্কুলে কোনো রকমে ম্যাট্রিক পাস করে বসেছিল ফ্রান্সিস। বেচারা কুলির কাজেও যেতে পারছিল না আবার অন্য চাকরিও পাচ্ছিল না। যেদিন ফ্রান্সিস কাজ পেল সেদিন তাদের কি বিজয়োল্লাস। বাবুরা সব গম্ভীর মুখে রয়েছে। মদেসিয়া ওরাঁও-এর ছেলেরা যাদের এতদিন ওরা মানুষই মনে করত না তারা আজ সমান সমান, চেয়ারে বসবে, পাশাপাশি বাবুদের কোয়ার্টারে থাকবে এটা মেনে নিতে মন চাইছিল না। তখন থেকেই সিরিলরা ঠিক করেছিল যদি কেউ কটুক্তি করে তাহলে তাকে ছেড়ে দেবে না। এ চাবাগান কার? যারা রক্ত দিয়ে চা তৈরি করছে বছরের পর বছর, যাদের ওপর শুধু হুকুমের চাবুক চলেছে তারাই আজ সংখ্যায় ভারী। এই বাগানের বাবু যদি পনেরো জন হয় তবে কুলি হবে কমসে কম পনেরশ। এক ফুঁয়ে উড়ে যাবে ওরা। যাক্, মনে যাই হোক মুখে কিছু বলেননি বাবুরা। ফ্রান্সিস ছোট গুদামবাবুর কাজে লেগে গেল। লাইন থেকে উঠে বাবুদের পাশাপাশি কোয়াটারে চলে গেল। কুলিদের ভরসা বাড়ল। এই করে একদিন সাহেবের চাকরিতেও হয়তো মদেসিয়াদের দেখা যাবে। সিরিলের হাঁটার অভ্যেস দুলে দুলে এবং যেন খানিকটা উড়ে উড়েই। পিচের রাস্তায় কিছুটা হাঁটলে বাঁয়ে ডাইনে বাবুদের কোয়ার্টার। সেদিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে পেছনে হর্ন বাজল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সে ছোটা সাহেব। সেলাম করবে না ভেবেও হাতটাকে ঠেকাতে পারল না সে। ছোটসাহেব চলেই যাচ্ছিলেন কিছুদূর গিয়ে গাড়ি থামালেন। সিরিল একটু অবাক হল। বাগানের সাহেবদের ধারে কাছে ঘেঁষতে চায় না সে। সব শালা যেন এক একটা আমজাদ খান। সিরিল বাঁ দিক দিয়ে সরে যাবে বলে পা বাড়াতেই গাড়িটা ব্যাক করে পাশে এসে দাঁড়াল। ছোটসাহেব মুখ বেরে করে বললেন, তোর নাম কিরে? –
সিরিল।
মাংরা সর্দারের ছেলে না তুই? জি।
সবাইকে যেসব জ্ঞান দিচ্ছিস নিজে তা বুঝিস?
মানে?
কাল একটা মেয়ে তোর বাবাকে অপমান করেছিল। সে বলল তুই নাকি ওভাবে কথা বলতে শিখিয়েছিস। নিরি না কি যেন নাম–।
নিরি! সিরিল আস্তে আস্তে উচ্চারণ করল নামটা।
ছোটসাহেব বললেন, এই বাগান তোর মায়ের মত। এমন কিছু করিস না যাতে এর অপমান হয়। যে খাবার দেয় তাকে সম্মান জানানো উচিত। কথা শেষ করেই হুস করে চলে গেল গাড়িটা। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সিরিল। কী বলতে চাইলেন ছোটসাহেব? কোনো সাহেব যে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে এসব কথা বলতে পারে তাইতো বিশ্বাসযোগ্য না। বড়সাহেব হলে? ভাবাই যায় না।
এই ছোটসাহেব নোকটা অদ্ভুত। লোকটা নাকি গরিব ঘরের ছেলে। ভাল পড়াশুনা করে ট্রেনিং ফ্রেনিং নিয়ে সাহেব হয়েছে। অন্য সাহেবরা ওকে তাই ভাল নজরে দেখে না। এই চা বাগানে আগে একটাই য়ুনিয়ন ছিল। এখন তিনটে, এখন যারা মন্ত্রী তাদের য়ুনিয়নই বেশি জোরদার। প্রতিবারই এরকম হয়। কিন্তু একটা ব্যাপার নিয়ে কুলিদের মধ্যে ফিসফাস হচ্ছে। প্রথম থেকে কুলি য়ুনিয়নের মাথায় বসে আছে শহরের পলিটিক্যাল বাবুরা। গোলমাল হলে তারা যেন দয়া করে আসেন, সাহেবের বাংলোয় বসে কথা বলেন, একটা মিটমাট করে দিয়ে চলে যান। এই ব্যাপারটা পাল্টাতে হবে। সিরিল এবং তার বন্ধুরা এখন মাল কামায়। ভোটের আগে পার্টির কাছ থেকে পয়সা নেয় আর মনে মনে গালাগালি দেয়। মন্ত্রীত্ব যে দলের কব্জায় আসে তাদের য়ুনিয়নে ঢুকে যেতে ওদের সময় লাগে না। কিন্তু এসব করে মাঝে মাঝে পকেট ভারী হলেও মন কেমন করে। ওই যে ছোটসাহেব কথাটা বলে গেল, যে খাবার দেয় তার ইজ্জত বাঁচাতে হবে। সিরিলদের ধারণা, পলিটিক্যাল বাবুরা এসবের ধার ধারে না।
ট্রানজিস্টারটা হাতে বেজেই যাচ্ছিল। সিরিল গেটটা খুলল। বিরাট কোয়ার্টার। চারপাশ তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ফ্রান্সিস বাবু হবার পর এখানে এসেছে। মনে পড়ে, প্রথম দিন সে যখন এই কোয়ার্টারের দখল নিয়েছিল সেদিন কয়েকশ কুলি মিছিল করে এসেছিল ওর সঙ্গে। সিরিল ট্রানজিস্টারটা বন্ধ করে বারান্দায় উঠে চিৎকার করে ফ্রান্সিসকে ডাকল।
একটা বছর পাঁচেকের হাফ প্যান্ট পরা ছেলে দরজায় উঁকি মেরে ভেতরে ছুটে গেল। তারপর একটা বছর পনেরোর ছুকরি এসে জিজ্ঞাসা করল, কী চাস?
ফ্রান্সিসকে ডাক।
বাবু নাম জিজ্ঞাসা করল।
বাবু! সিরিলের খেয়াল হল এ মেয়েটাকে সে কখনো দ্যাখেনি। এ ফ্রান্সিসকে বাবু বলছে কেন? সিরিল জিজ্ঞাসা করল, তোর ঘর কোথায়?
হাসিমারা।
এখানে কী করিস?
কী আর করব। খানা পাকাই, ঘরের কাম করি।
ও, ফ্রান্সিসকে বল সিরিল এসেছে।
মেয়েটি ভেতরে চলে যেতেও সিরিল মাথা পরিষ্কার করতে পারছিল না। ফ্রান্সিস বাড়িতে কাজের লোক রেখেছে অন্য বাবুদের মতন। আর এনেছে একদম হাসিমারা থেকে যেখানে কেউ তাকে চেনে না। এসব ভাবতে ভাবতেই ফ্রান্সিস এল। পাজামা আর সার্ট পরেছে। ওকে দেখে অবাক হল যেন, বলল, কী খবর? গুদামে কিছু গোলমাল হয়েছে?
সিরিল দেখল এই সময়ে মধ্যেই ফ্রান্সিসের চেহারার বেশ পরিবর্তন হয়েছে। মদেসিয়াদের কালো চামড়ার ওপর একটা চকচকে পালিশ লেগেছে। এমন কি সে যে এই প্রথম বাড়িতে এল সেটা না ভেবে অন্য বাবুদের মত কাজের কথা বলছে।
সিরিল বলল, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
কী কথা?
সেদিন গুদামে তুমি বুধুয়ার সঙ্গে ওরকম কথা বলেছ এটা সবাই ভালভাবে নেয়নি। তুমি কি তোমার জাতভাইকে স্বীকার করছ না আজকাল?
এসব কথা কেন?
কারণ সবাই তোমাকে বাবু বলে ভাবতে শুরু করেছে।
হাসল ফ্রান্সিস, আমি তো বাবুই। ছোট গুদাম বাবু।
কিন্তু সেটা তোমাকে করল কে? আমরা যদি সাহেবকে গিয়ে না ধরতাম তাহলে তুমি এই চাকরি পেতে?
তুই কী চাস?
আমি চাই তুমি আমাদের লোকের মত কাজ করবে।
বাঃ, বহুৎ আচ্ছা! তোমরা ফাঁকি দেবে, কাম করবে না, আর আমি তাই দেখে চোখ বুঁজে থাকব? আমাকে তাই মাইনে দেওয়া হয়? আমি যখন বাবুর চাকরি করছি তখন একজন বাবু যে ভাবে কাজ করে আমি তাই করব। আর এ কথা তুই বলতে এসেছিস কেন? আমার সঙ্গে য়ুনিয়নের এ ব্যাপারে পরিষ্কার কথাবার্তা হয়ে গেছে।
কোন্ য়ুনিয়ন?
আমাদের য়ুনিয়ন। বাবু য়ুনিয়ন।
সিরিল আর দাঁড়াল না। ফ্রান্সিস সম্পর্কে ওর বাবাই এখন বলে–দাঁড় কাক ময়ূরের পেখম পাছায় গুঁজে ময়ূর সেজেছে। সিরিলের মনে হল, সাজাসাজি নয়, ফ্রান্সিস সত্যিকারের ময়ূর হয়ে গেছে। এখন ওর কোনো জাত নেই। শালা অতক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলল কিন্তু একবারও বসতে বলল না। কুলি লাইনের অনেকেই মনে করে ফ্রান্সিস তাদের লোক–এই ভুলটা ধরিয়ে দেওয়া দরকার।
নদী পেরোলেই হাট শুরু। আগে ছোট ছিল এখন বাড়তে বাড়তে নদী অবধি চলে এসেছে। দুপুর অবধি শাকসবজি আর সাপ্তাহিক প্রয়োজনে সবাই ঘোরাফেরা করে। দুপুরের পর থেকেই হাটের চেহারা যায় পালটে। তখন চারপাশে মেলার আমেজ। মেয়েরা আসে সেজেগুজে। নানান শখের জিনিস বিক্রি শুরু হয়ে যায়। মাইকে হিন্দি গান বাজে। যেন রমরমে ব্যাপার।
এ সিরিল! চিৎকারটা শুনে সিরিল চারপাশে চোখ বোলালো। চেনাশোনা প্রায় সবাই, কিন্তু যে ডাকছে তাকে দেখতে পেল না সে। আরো কয়েক পা যাওয়া মাত্র সেই চিৎকার। সিরিল গলাটা চেনে, রসিকতা ও তরফই শুধু করবে এরকা হতে দেওয়া যায় না। সে চটপট বাঁ দিকে পাঁপড়ের দোকানে দাঁড়ানো মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে বলল, তোকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে রে!
মেয়েটা এমন অবাক হয়ে গেল যে ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখতেই লাগল কিছুক্ষণ। হাতে পাঁপর আধখাওয়া অবস্থায় রয়েছে, ঠোঁটের চারদিকে তার তেল চকচক করছে। অন্য লাইনের মেয়ে, এর আগে কয়েকবার দেখেছে কিন্তু এভাবে কথা বলার মত সম্পর্ক নয়। মেয়েটি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, নেশা করেছিস না?
সিরিল হাতটা সরাল না, সুন্দর জিনিস কি নেশা করে দেখতে হয়? ওটা দেখেই তো মানুষের নেশা হয়। কয়েকদিন আগে অমিতাভ বচ্চনের মুখ থেকে শোনা এই ডায়লগটা। তেমনি কায়দা করে আবৃত্তি করল সে। মেয়েটা এতে আরো ঘাবড়ে গেল। কোনরকমে পাঁপরটা দু টুকরো করে বড়টা সিরিলের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, নে, খা।
সিরিল বাঁ হাতের দুই আঙুলে কায়দা করে সেটা তুলে নিয়ে বলল, আবার যখন দেখা হবে তখন যা খাওয়াব তুমি খাবে তো? এটাও অমিতাভ বচ্চনের সংলাপ। কথাটা শেষ করে উত্তরের জন্যে না দাঁড়িয়ে ও ভিড় বাঁচিয়ে হাঁটতে লাগল। মেয়েটি ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের মনে বলে উঠল, শালে বদমাস, অমিতাভ বন্ গেলেক!
সামনে তাকাতেই সিরিল হেসে ফেলল। কোমরে হাত রেখে নিরি দাঁড়িয়ে আছে। মুখ থমথমে, চোখে আগুন। বড় জোর মাস ছয়েক জানা-শোনা হয়েছে কিন্তু নিরি এমন ভঙ্গি করে যে মনে হয় সারাজীবন একসঙ্গে আছে। মেয়েটা সুন্দর। ওকে যদি জিনত আমন কিংবা হেমা মালিনীর মত পোশাক পরানো যেত তো চোখ জ্বলে যেত সবায়ের। এখনও সেই আদ্যিকালের প্যাঁচ দেওয়া শাড়ি আর তার ওপর আংরা পরে। তা শাড়িটা যদি বাঙালি মেয়েদের মত পরত তাহলেও কথা ছিল। সিরিল মানসনেত্রে নিরিকে জিনত আমনের পোশাকে দেখে শিহরিত হল। শালা ওর মরদটা নিশ্চয়ই তিন নম্বরের হারামি, নইলে এই রকম বউকে সামলাতে পারে না। বড় কষ্ট মেয়েটার–একে দেখার পর থেকেই সিরিলের মনে হচ্ছে এই চা-বাগানের সব কিছু বেশ ভাল।
আমি ডাকছি শুনতে পাচ্ছ না? নিরি ফুঁসে উঠল।
ডাকলেই শুনতে হবে?
সব পুরুষ সমান। ওই মেয়েটার মধ্যে কী আছে এমন যে আমার ডাক শুনবে না!
ওকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আসব? ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটাকে খুঁজল সিরিল।
সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে এসে সিরিলের হাতে প্রচণ্ড চিমটি কাটল নিরি। ওর মুখ থেকে চিৎকারটা বেরুনো মাত্র সবাই এ দিকে তাকাল। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, এরকম চিমটি যে বিনাগুড়িতে গেলে শেখা যায় তা জানতাম না, উঃ!
অ্যাই! নিরি আর একবার আক্রমণ করতে উদ্যত দেখে সিরিল দ্রুত সরে দাঁড়াল। তারপর হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, দাঁড়াও দাঁড়াও, জব্বর খবর আছে। কাল রাত্রে মাংরা সর্দার সবাইকে ডেকে বলেছে তোমাকে শাদী করবে হা-হা হা। তাহলে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী দাঁড়াল যেন।
কথাটা এমন মজা করে বলা যে হাটের মানুষগুলো হো হো করে হেসে উঠল শুনে। কেউ কেউ আবার সম্পর্কটা চেঁচিয়েও বলে দিল। শোনামাত্রই নিরি বড় বড় পা ফেলে হিন্দুপাড়ার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। দ্রুত যে চোখের জলের বন্যা ওর দিকে ধেয়ে আসছে তাকে সামলাবার জন্যে ওকে কষ্ট করে লড়তে হচ্ছিল। হাটের মানুষজন, দোকানের তাবু টাঙানো দড়ি–কিছুই আর চোখের সামনে নেই। ওর শুধু এটুকুই মনে হচ্ছিল এ রকম অপমানিত সে কখনও হয়নি। এই একহাট মানুষের সামনে সিরিল যে ঠাট্টাটা ওর সঙ্গে করল তা বিনাগুড়ির স্বামীর ঘর থেকে চলে আসার সময় যা ঘটেছিল তার থেকে অনেক জ্বালাকর। অথচ আজ সকাল থেকে ও ভাবছে কখন হাটে সিরিল আসবে! সে ঠিক করেছিল সিরিলকে বলবে কাল রাগের মাথায় মাংরা সর্দারকে যেকথা সে বলেছে সেটা বলা ঠিক হয়নি। আজ সিরিলের সঙ্গে মাংরা সর্দারের কাছে গিয়ে সে ক্ষমা চাইবে বলে ঠিক করেছিল। বুড়ো মানুষ, তার ওপর লোকটা সিরিলের বাবা, ক্ষমা চাইতে কোনো লজ্জা নেই। কিন্তু দেখা হওয়া মাত্রই সিরিল ও কথা বলল কেন? নিজের বাপকে নিয়ে ওর সঙ্গে রসিকতা! হন হন করে হাঁটতে লাগল নিরি।
এই পরিবর্তন, নিরির অমন চলে যাওয়ামাত্র সিরিল বুঝেছিল যে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। কেন যে সবাই অত অল্পে মন ভার করে কে জানে। কাল রাত্রে বাপ নেশার ঘোরে কথাটা বলছিল বার বার, মা যখন ধোলাই দিচ্ছিল তখনও সেই বাক্যিটা মুখ থেকে সরছিল না–এই নিয়ে খুব হাসি-তামাসা হয়েছিল। নেশার ঘোরে মানুষ নাকি সত্যি কথা বলে। তাহলে মাংরা সর্দারের নিরির ওপর মনে মনে লোভ ছিল। কথাটা কেউ জানাতে মায়ের রাগ আরো বেড়ে গিয়েছিল। সিরিলের কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই বেশ মজাদার বলে মনে হয়েছিল। লোকমুখে বাগানের ভেতর বাবা আর নিরির গোলমালটা সে শুনেছিল। প্রতি মুহূর্তে সে সতর্ক হয়েছিল বাবা ওকে আচ্ছাসে ঝাড়বে। খামোকা একটা মেয়ের ঝুঁটি ধরার কোনো অধিকার বাবার নেই। সেটা করলে ও রকম ব্যবহার তো পাবেই। নিরি যে ফোঁস করে উঠছে তাতে সে খুশি। দাদু বলে আগে নাকি যে-কোনো মেয়েকে যখন তখন সাহেবরা তুলে নিয়ে গিয়ে মা বানিয়ে ছেড়ে দিত। কারো কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না। দাদুর কথা শুনলে মনে হয় এটাই সেকালে স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। বাবা অতটা মনে করে না কিন্তু সাহেবদের কাছ থেকে শিখেছে যে কাজ আদায় করতে গায়ের জোর ফলাতে হবে। সে ছেলে কিংবা মেয়ে হোক তাতে কিছু এসে যায় না। বাড়িতে দুদণ্ড থাকতে ইচ্ছে করে না সিরিলের। সব্বাই যেন ধুঁকছে। হাঁড়িয়া খাওয়া পানসে চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কেউ কিছু জানে না। শুধু তার বাড়িই নয়, লাইনের অন্যান্য ঘরগুলোরও ওই এক দশা। আজ সকালে মাংরা সর্দার তাকে কিছু বলল না। উলটে মা ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করল। নিরি নাকি একটা বাজে ধরনের মেয়ে। স্বামীর ঘর করতে তো পারেইনি উলটে এর ওর তার সঙ্গে ঘুরছে কিন্তু কাউকে শাদী করছে না। সিরিলের মত ছেলে ইচ্ছে করলে কত ভাল ভাল মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। এই তো তেলিপাড়ায় একটা মেয়ে আছে। বাঙালি বাবুদের স্কুলে দুই তিন ক্লাস পড়েছে। শাড়িটাড়ি পরে বাঙালিদের মতন। তাকে বিয়ে করে সুখে থাকতে পারে। কিন্তু ওই বেশরম মেয়েটার পাল্লায় পড়লে তার সব যাবে। এসব কথা তাকে শুনিয়ে বলা, সামনাসামনি নয়। আর সেটা শোনার পর নিরি সম্পর্কে অন্যরকম ভাবতে শুরু করল। মেয়েটার সঙ্গে তার আলাপ আছে, ঘনিষ্ঠতাও একটু কিন্তু ঠিক প্রেমট্রেম হয়নি। এর একটা অন্যতম কারণ নিরি হিন্দি সিনেমা দ্যাখে না। যে মেয়ে হেমা মালিনীকে দ্যাখেনি তার সঙ্গে ডায়লগ বলে সুখ নেই। বরং চুনাভাটি বাগানের নেপালি দারোয়ানের মেয়ে প্রেমকে তার পছন্দ খুব। জামাকাপড় কথাবার্তা দেখলে মনে হয় একদম ফিল্ম থেকে মাটিতে নেমে এসেছে। হাসে যেন হেমা মালিনী, হাঁটে যেন জিনত আর কথা বলে রেখার মতন। কিন্তু মুশকিল হল বাজার-হাট বিনাগুড়ি যেখানেই ও সিনেমা দেখতে যাক মৌমাছির মত একগাদা মালদার ঘিরে থাকে। তাই প্রেম আর ফিলিমস্টার ওর কাছে একই রকম।
নিরির চলে যাওয়া নিয়ে প্রথমে মাথা ঘামায়নি সিরিল। এইসাই তো হোতা হ্যায়। কিন্তু কয়েক পা হাঁটতেই যাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তারা বেশ উত্তেজিত। এই চা বাগানের সবচেয়ে শক্তিশালী য়ুনিয়নের ওরা সক্রিয় কর্মী। এরা সিরিলকে অনেকবার দলে টানতে চেয়েছে কিন্তু ততদিনে সিরিল শাঁসটা বুঝে গিয়েছে! যতক্ষণ না তোমার দল মন্ত্রিত্ব পাচ্ছে আমি তার মধ্যে নেই।
হাটের একপাশে টেনে নিয়ে গেল ওরা সিরিলকে। একজন সিরিলকে অভিনন্দন জানাল নিরিকে ঐভাবে তৈরি করার জন্যে। অত্যাচার করলে নিজের বাবাকেও যে ছেড়ে দেবে না এই সাহস এখন সমস্ত শ্রমিকের দরকার। ওরা ভাবছে নিরিকে নিয়ে একটা সভা করবে বড় মাঠে। নিরির সাহস যাতে অন্য মেয়েরা পায় সেই জন্যে এ রকম সভা হওয়া দরকার। কারণ সামনে খুব খারাপ সময় আসছে। মালিকের মতলব বোঝা যাচ্ছে না। বাগানে যে লাভ হয় তার সবই তো মালিকের ব্যাঙ্কে যায়। এবার বিশ পার্সেন্ট বোনাস চেয়েছে য়ুনিয়ন। যদি রফা না হয় তাহলে বাগান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্যে সমস্ত শ্রমিককে এক করা দরকার। সিরিল যেন আর গা এলিয়ে না থেকে য়ুনিয়নের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা করে। এ ব্যাপারে নিরিকে ও বুঝিয়ে সভায় আসতে রাজি করাক।
আগে হলে চটপট মনের কথা প্রকাশ করত সিরিল। আজকাল ভাববার সময় নেয় সব কিছুতেই। এতে অনেক সময় অপ্রিয় হবার দায় থেকে বাঁচা যায়। এর মধ্যে ওদের একজন বলল, তোরা শাদী করছিস কবে?
শাদী?
হুম। তোর মদৎ না থাকলে নিরি কখনো মাংরা সর্দারকে অপমান করতে পারে? তা আজ কী হল? একটু আগে দেখলাম মেয়েটা হিন্দুপাড়ায় রাস্তায় কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে যাচ্ছে। আরে বাবা মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে যা না বউ করে তাহলেই সব মিটে যায়। চাঁদ আকাশে ছাড়া থাকলে মেঘ তাকে ঢাকবেই!
ঠিকই তো! আর একজন টিপ্পনি কাটল, মাথার ওপর স্বামী নেই তাই এর ওর মাথা খাবেই তো মেয়েটা। তোর উচিত আর দেরি না করা।
ওদের কাছ থেকে সরে এসে সিরিল কিছুক্ষণ বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। নিরিকে ওর ভাল লাগে কিন্তু বিয়ে করার কথা চিন্তাও সে করেনি। তার ওপর মেয়েটার একটা স্বামী বেঁচে আছে বিনাগুড়িতে, সে শালা ঝামেলা পাকাতে পারে। কিন্তু মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ওদিকে গিয়েছে কেন। ওই রাস্তায় মানুষজন এমনিতেই বেশি যেতে চায় না। একটু ইতস্তত করে সিরিল হাট ছেড়ে হিন্দুপাড়ার দিকে পা বাড়াল।
কিন্তু ব্যাপার স্যাপার ক্রমশ ঘোরালো হয়ে যাচ্ছে। বোনাসের দাবি নিয়ে এবার একটা জব্বর লড়াই হবে কোম্পানি আর শ্রমিকদের মধ্যে এসব অনেকদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল। কোম্পানি দিয়েছে সাড়ে আট পার্সেন্ট, য়ুনিয়ন চাইছে বিশ। দেড় গুণ। শালা, রক্ত দিয়ে চা তৈরি করি আমরা আর লাভের গুড় একলাই খাবে তোমরানা, এ হয় না। কিন্তু কাম বন্ধ হলে সেটা কতদিন চলবে। একটা শ্রমিক যদি তিনশ টাকা রোজগার করে তার দশ টাকাও মাসের শেষে ধার হয়। আর যদি এক মাস বন্ধ চলে তো হয়ে গেল। মালিকরা সেটা জানে বলেই এত জোর পায়। কিন্তু এবার কোন আপোস না, ইয়ে চা বাগান হামারা হ্যায়, আমাদেরও অংশ দিতে হবে এর লাভের। খুব জোর মালিক বাগান বিক্রি করে দিতে পারে। নতুন মালিককেও তো এটা মানতে হবে। দশটা বাঙালি বাবুকে রাতারাতি তাড়িয়ে নতুন বাবু বসাতে পারে কোম্পানি কিন্তু দেড় দু হাজার কুলি সরালে কাকে দিয়ে বাগান চালাবে? এর আগে একবার এ রকম হয়েছিল। কোম্পানির সঙ্গে গোলমাল লেগেছিল য়ুনিয়নের দার্জিলিং-এর কাছে এক বাগানে! বহুৎ ভারী ঝামেলা। কোম্পানি বাগান বন্ধ করল। সবাই বাগান থেকে পাতি তুলে এক জায়গায় জমা করে নিয়ে অন্য বাগানের কাছে সস্তায় বিক্রি করতে চাইল। অন্য বাগানের মালিক প্রথম প্রথম এ রকম পাতি দু হাতে কিনলেও পরে কি কারণে পিছিয়ে গেল। চায়ের পাতা তো আর মুখে ফেলে খাওয়া যায় না? অনেক মেশিনের কসরৎ ওকে দামি করে তোলে। সেই মেশিনটাই যদি তুলে নিয়ে যায় কোম্পানি তাহলে চা বাগান তো মাঠ হয়ে যাবে। হঠাৎ সিরিলের খেয়াল হল ওরা কেউ চাষবাস জানে না। সেই টেবুয়া থেকে চলে আসার পর, চাষবাসের আর প্রশ্নই ওঠেনি। এখন তার নিজের পক্ষেও চাষ করা অসম্ভব। বাপ তো প্রায় বুড়োই হয়ে গেল। এই চা-বাগান না থাকলে তার রোজগারের একমাত্র পথ হাটে বাজারে মাল বওয়া। না, এই চা-বাগানই তাদের প্রাণ, এটাকে মেরে ফেলে তারা বাঁচতে পারে না। দাদু যে টেবুয়াতে ফিরে যাওয়ার কথা সব সময় বলে, তা নিছক পাগলামি বলে মনে হয় সিরিলের। টেবুয়াতে ফিরে গেলে খাবটা কী! সেখানে তো চা-বাগান নেই।
চৌমাথা পার হতে গিয়ে মনে ঢেউ উঠল। অম্বিকার দোকানে আজ করনেশন রামটা আসার কথা। ভুটানের রাজার অভিষেকের সময় এই ব্র্যান্ডটা বাজারে ছেড়েছিল সামচির ডিস্টিলারি। প্রথম প্রথম খুব ডিম্যান্ড ছিল, চোখেই দেখা যেত না। এখন অম্বিকা মাঝে মাঝে আনায়। পানের দোকানের আড়ালে বারো টাকায় বোতল বিক্রি করে।
কোনো রকমে লোভ সামলাল সিরিল। সন্ধের পর দেখা যাবে। আগে নিরির ব্যাপারটা সামলানো যাক। পেট্রল পাম্প ছাড়িয়ে নির্জন পথটায় পড়ল সে। ছায়া ছায়া চার ধার। খুব চুপচাপ বলে পাখির গলা স্পষ্ট শোনায়। সিরিল ভেবেই পাচ্ছিল না এখানে নিরি কী জন্যে আসতে পারে। পিচের রাস্তাটা ছোট্ট বাঁক নিয়ে দু পাশে চা বাগান রেখে চলে গেছে বানারহাট বিনাগুড়ির দিকে। তবে কি ও বিনাগুড়িতে হেঁটে ফিরে যাচ্ছে? দূরত্ব এমন কিছু নয়। তিন ক্রোশ পথ হেঁটে অনেকেই যায়। কিন্তু সামান্য একটা রসিকতা শুনে ফেলে আসা স্বামীর ঘরে আবার ফিরে যাবে মেয়েটা? সিরিলের মনে হল তাই যদি যায় তো যাক। শান্তি না পাক স্বস্তিতে থাকুক। পরক্ষণেই খেয়াল হল যে স্বামীকে এত ঘেন্না করে ও চলে এল তার কাছে ফিরে যাওয়া মানে স্বেচ্ছায় নিজেকে মেরে ফেলা–কি একটা সিনেমায় এ রকম ঘটনা সে দেখেছে। ডায়লগটা ছিল, বিষ খেলে মানুষ জানার আগেই মরে যায়–আর এ মরণ তিলে তিলে প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণা নিয়ে। সিরিলের শরীরটা গরম হয়ে গেল। ও যদি যায় তো যেতে পারে কিন্তু যাবার আগেই সিরিল একবার প্রশ্ন করবে। যদি যাবেই তো এল কেন?
দু পাশে বড় বড় গাছ, কিছু জঙ্গল–মাঝে মাঝে হুম হাম গাড়ি ছুটে যাওয়া। বিকেল ফুরিয়ে আসছে। ডুয়ার্সে এখন বাঘ নেই। কিন্তু হাতির উপদ্রব বেশি। মাঝে মাঝে একলা হওয়া হাতি এসে জোর ঝামেলা করে। হিন্দুপাড়ার এই রাস্তায় মানুষ আসছে না ও রকম এক হাতির জ্বালায়। বুড়ো হওয়ায় দল ছাড়া হাতিটা শয়তানের চেয়ে বেশি বুদ্ধি ধরে। তিন তিনটে মানুষকে মেরেছে এক মাসে। হিন্দুপাড়ার এই জঙ্গলটা তার এলাকা। সাহেব শিকারি আনিয়েও ওকে মারতে পারেনি। জঙ্গলে খাবার না পেয়ে হাতির দল মাঝে মাঝে কুলি লাইন এমনকি এক রাতে বাজারের চৌমাথায় নেমে এসেছিল। তখন তাদের সামনে অতি মূর্খও দাঁড়াবে না। শিকারিরা আসার পরই সেই হাতিটা এমন গা ঢাকা দিয়েছিল যে কেউ আর তার সাড়াশব্দ পায়নি। কিন্তু সে আছে এখানেই। তাই সন্ধ্যে হয়ে আসা সময়ের নির্জন পথটায় নিরির দেখা যদি সে পায় তাহলে আর রক্ষে নেই এটা ভাবতেই সিরিলের বুকের রক্ত চলকে উঠল। বিনাগুড়ি নয়, নিরি কি ইচ্ছে করে এ রাস্তায় এসেছে? হাতিটা ওকে দেখতে পাক এটাই কি বাসনা?
পিচের রাস্তাটা এখন নাকবরাবর সিধে। অন্তত আধ মাইল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। না, নিরি নেই। ওর হাট থেকে চলে আসা আর সিরিলের রওনা হওয়ার মধ্যেও সময়ে কি একটা মেয়ে আধ মাইল যেতে পারে? অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিল সে। নিরিকে যদি দেখতে না পায় আর। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় বিনাগুড়িতে পৌঁছে যাবে ও। সেখানে গিয়ে যদি শোনে নিরি চলে এসেছে তাহলে চুপচাপ ফিরে আসবে। ফিরে আসতে পারে যদি হাতিটার সঙ্গে দেখা না হয়।
একটু একটু করে কুয়াশা জমছে রাস্তায়। ফগ লাইট জ্বালাচ্ছে গাড়িগুলো! এখন অবশ্য গাড়ির সংখ্যা কম। শীত লাগছে সিরিলের। হাতের রেডিও আবার খুলতে গিয়ে মন পাল্টালো। গানের শব্দ শুনে হাতিটা যদি কাছাকাছি থাকে তবে আর দেখতে হবে না।
সিরিলের মনে হল রাস্তা না দেখে দু পাশের চা বাগানগুলো দেখলে হয়। কেউ যদি ইচ্ছে করে লুকোতে চায় তাকে ভগবানও খুঁজে বের করতে পারবে না। কিন্তু তবু–। চট করে বাঁদিকের। নীচু-ডাল একটা কাঁঠাল গাছে উঠে পড়ল সে। ট্রানজিস্টরকে বেলটের হুকে আটকে তর তর করে অনেকটা ওপরে উঠে চার পাশে চোখ বোলাতে লাগল। এদিকটা চা বাগান বেশি চওড়া নয়। শ দুয়েক গজ পরেই ফরেস্ট শুরু। সন্ধ্যে নামল বলে। হতাশ হয়ে নামবার আগে বিন্দুটা চোখে ঠেকল। ভাল করে ঠাওর করতে গিয়ে মেরুদণ্ডে কনকনানি টের পেল সিরিল। অন্তত পাঁচ মিনিটের পথ ছাড়িয়ে চা বাগানের ওপাশে জঙ্গলে যেটা স্থির কালো জমাট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা যে ওই একলা হাতিটাই এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ সে। অমন স্থির হয়ে আছে কেন হাতিটা? আরো কয়েক মিনিট সে লক্ষ্য করল। এত নিশ্চল যে চট করে মনে হবে জঙ্গলেরই একটা অংশ। তার সঙ্গে যে দূরত্ব তাতে বিপদের কোনো আশংকা নেই। তাছাড়া এত ওপরে হাতি নাগালও পাবে না। কিন্তু তেমন হলে সারা রাত সে আটক থাকলে পারে এখানে–সেটাই সমস্যা কিন্তু হাতিটা নড়ছে না কেন? কি দেখছে? হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সিরিল। গাছের ডালে বসে দুটো হাতে মুখের দু পাশ ঢেকে উৎকট শব্দ বের করল। সেই সঙ্গে ট্রানজিসটার চালিয়ে দিল পুরো শক্তিতে। আর এটা করতেই সে চমকে উঠল। হাতিটা নড়ে উঠেছে। যেন কোনো কিছুতে একাগ্রতা ভাঙতেই তার চাঞ্চল্য। এক পা এগিয়েই মত পরিবর্তন করল। সিরিল বিস্ময়ে ওর পাহাড়ের মত আকৃতিটা স্পষ্ট দেখতে পেল এবার। হয়তো কোনো বিপদের গন্ধ পেয়েই ঘুরে গেল হাতিটা। তারপর জঙ্গল ভাঙতে ভাঙতে উল্টোদিকে দৌড় শুরু করল। কিছুক্ষণ পর তার চিহ্ন দেখা গেল না, শব্দও মিলিয়ে গেল। এবার সিরিলের চোখ যার দিকে সে কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছে না। নিরির লম্বা শরীরটা এখন সোজা দাঁড়িয়ে হাতিটার কাছ থেকে ওর দূরত্ব পঞ্চাশ গজও ছিল না। এত কাছাকাছি গিয়েও বোধ হয় হাতিটাকে দ্যাখেনি নিরি। ওখানে নিশ্চয় একটা ছোট ঝরনা আছে যেগুলো চা বাগানের মধ্যে দিয়ে চুপচাপ বয়ে যায়। নিরিকে এতক্ষণ দেখা যায়নি কারণ সে ঝরনার পাশে বসেছিল। হাতিটা অবশ্যই তাকে দেখেছে। কিন্তু দেখেই খেপে গিয়ে আক্রমণ করেনি, তারিয়ে তারিয়ে দেখছিল। কিন্তু ওখানে গিয়ে বসা মানে মৃত্যু ফণায় চুমু খাওয়া নিরি কি তা জানত না?
নিরি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে পেছনে তাকাচ্ছে। ততক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে তার যম কত কাছে ছিল! চিৎকার করেছে কিনা শুনতে পায়নি সিরিল কিন্তু হঠাৎ পাগলের মতো দৌড়তে দেখল শরীরটাকে। আতঙ্কিত হলে যেভাবে মানুষ দৌড়ায়। সিরিল গাছ থেকে নেমে চা বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। যদিও হাতিটা এখন দৃষ্টিসীমার মধ্যে নেই তবু এ রকম অবস্থায় যে কোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাস্তাটার আড়াআড়ি চা-বাগানের মধ্যে দৌড়ে যাচ্ছে নিরি। সিরিল চিৎকার করে তাকে ডাকল। হঠাৎ যেন পাথর হয়ে গেল মেয়েটা! দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখল। সিরিল বুঝতে পারল ভীষণ অবাক হয়ে গেছে মেয়েটা। দূরত্বটা অনেক হলেও সিরিলকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সিরিল কাছাকাছি হতেই নিরি এক ঝটকায় নিজেকে সচেতন করে আবার পাগলের মত দৌড়তে লাগল। হঠাৎ এ রকম কাজের পেছনে কি যুক্তি থাকতে পারে বোধগম্য না হওয়ায় সিরিল আরো গতি বাড়িয়ে সামনে চিৎকার করে ওকে ডাকতে লাগল।
চা-বাগানের মধ্যে যে পায়ে চলার পথ সেগুলো গোলকধাঁধার মত। স্বচ্ছন্দে অনেকটা ঘুর ঘুর করা যায়। এই নির্জন সন্ধ্যা হওয়া সময়টা দুটো শরীর সেই গোলকধাঁধার পথে ছুটতে ছুটতে ক্রমশ কাছাকাছি হয়ে এল। মাথার ওপর ঘরে-ফেরা পাখির অজস্র চিৎকার, শরীরের ওপর দিয়ে ফিনফিনে কুয়াশারা গড়িয়ে যাচ্ছে। সিরিল এক সময় নিরির কাধ ধরে থামাতে চাইল। এতক্ষণে ওরও বেদম অবস্থা। আটক হওয়া মাত্রই নিরি প্রচণ্ড এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল। সিরিলের হাত সরিয়ে দিয়ে সে যখন সরে যাচ্ছে তখন সিরিল আবার তাকে ধরল, কি হল তোমার–এমন করছ কেন?
মুখে কোনো উত্তর না দিয়ে সজোরে নিজেকে মুক্ত করল নিরি। প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল সিরিলের। আশ্চর্য বেয়াদপ মেয়ে তো! রাগ হলে সিরিল নিজেকে সামলাতে পারে না। সজোরে চড় মারল সে নিরিকে। মুখ সরিয়ে নেওয়ায় আঘাতটা জোরালো হল না। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হল মারাত্মক। বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরি। মেয়েটা বেশ শক্তি ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটো শরীর ধস্তাধস্তি করে পরস্পরকে আঘাত করার চেষ্টায় নিয়োজিত হল। এর মধ্যে সিরিলের ট্রানজিসটারটা মাটিতে বেল্ট থেকে খুলে পড়ে গেছে। কাপড় খানিকটা ছিন্ন হয়ে অসংলগ্ন নিরি ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠেছে। পরস্পরের আঘাতগুলো নির্দ্বিধায় চলছিল। সিরিলের মাথায় এখন কোনো যুক্তি কিংবা আবেগ কাজ করছিল না। একটি অবাধ্য মেয়েকে শক্তির মাধ্যমে সমুচিত শিক্ষা দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে নিরি তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সিরিলের আঘাতে ওর ঠোঁটের কোল রক্তাক্ত। হঠাৎ নিরি শক্ত হয়ে গেল। এ রকম নিশ্চল হয়ে যাওয়া মাত্র সিরিলের সমগ্র সত্তা চমক খেল। সে আবিষ্কার করল তার একটি হাত নিরির অর্ধ উন্মুক্ত স্তনের ওপর। এতক্ষণ যে রকম শারীরিক সংঘর্ষ চলছিল তা থেকে এই অনুভূতিটা আলাদা। সিরিলের সমস্ত শরীরে আঘাতের বেদনা ছাড়িয়ে এক অন্য রকম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। মেয়েদের স্তন। সম্পর্কে তার এই বয়সে অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে মনে হল তার শরীরে অজস্র জোনাকি জ্বলছে আর নিভছে। এই যে নিরির নিথর হয়ে যাওয়া, একি আহ্বান? কারণ নিরির দুটো চোখ এখন বন্ধ। রক্তে ভেজা লাল ঠোঁটের কোণের অদ্ভুত সুখের ভাঁজ। হাতের মুঠোয় দুটো নরম স্বপ্ন পরম আবেগে লালন করতে করতে সিরিল আবিষ্কার করল তার পিঠের ওপর দুটো সাপের মত হাতের আঁটোসাঁটো বাঁধন আরো তীব্রতর হচ্ছে। যে দুটো হাত এতক্ষণ আক্রমণে ভয়ঙ্কর ছিল তাই এখন ফুলের ডালের মত থরথরিয়ে কাঁপছে। সিরিল একটু একটু করে ডুবতে লাগল। এই উন্মুক্ত নির্জন চরাচরে, পাখির চিৎকার আর কুয়াশার চাদর মোড়া চা-বাগানের সরু রাস্তায় সে নিরির ঝরনায় পাথরঠোকা মাছের মত ঘুরে বেড়াতে লাগল পরম বিস্ময়ে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন অতি যত্নে নিরি আগলে আগলে নিয়ে যাচ্ছে চরম লক্ষ্যের দিকে। কেউ কোনো কথা বলছে না। কথা যখন মরে যায় তখনই বোধহয় এই রকম আনন্দ জন্ম নেয়। নিরির শরীরে নিজেকে প্রবলভাবে আবিষ্কার করল সিরিল।
টিপিয়ে টিপিয়ে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কুয়াশারা পালাচ্ছে। আকাশটা যেন অতি দ্রুত নীচে নেমে এসেছে। চারপাশে এখন দৃষ্টি যায় না। অন্ধকার গাছের মাথা থেকে বুঝুরু করে মাটিতে ঝরছে। চোখের দৃষ্টি সহজ হলে সিরিল দুহাতের অঞ্জলিতে নিরির মুখ ধরে পরমতৃপ্তিতে চুম্বন করল। নিরির গলায় একটা অস্ফুট আদুরে শব্দ যার মানে পৃথিবীর কোনো কথায় ব্যক্ত করা যায় না। সিরিল শব্দটাকে উপভোগ করে উঠে বসতে গেল। কিন্তু নিরির হাতের বাঁধন শিথিল হতে চাইছে না।
সিরিল বলল, এবার উঠব।
চোখ না খুলে নিরি পাখির মত নরম গলায় বলল, না।
কেন?
আরো একটু থাকো।
বৃষ্টি পড়ছে।
পড়ুক।
রাত হচ্ছে।
হোক।
সিরিলের মনের কোথাও যে চিন্তাটা ছিল না হঠাৎ সেটা উদয় হতে সে শক্ত হল। সেই একলা হাতিটা দুদ্দাড় করে ছুটে পালালেও যদি আবার চুপচাপ ফিরে আসে? ওর মতন ধূর্ত প্রাণী এ তল্লাটে কখনো আসেনি। এখন যদি সে এখানে উপস্থিত হয় তাহলে এ অবস্থায় ওদের কিছুই করার থাকবে না। স্বচ্ছন্দে একটা পা যদি ওদের শরীরে তুলে দেয় তাহলে ওকে আর নিরিকে হয়তো আলাদা করে চেনাও যাবে না। এভাবে শুয়ে থাকা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। এতক্ষণের উত্তেজনায় যে চিন্তা একবারও মাথায় আসেনি, সেটা সিরিলকে অস্থির করল।
যেন খুব জেদী ছেলেকে ভোলাবার গলায় সে বলল, ওঠো।
ন্ না।
সেই হাতিটা এ অঞ্চলেই আছে। যদি আসে তাহলে মরে যেতে হবে।
যাব।
মানে?
আজ থেকে তো আমি মরেই গেলাম।
সেই বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় চা-বাগানের মাটিতে নিরির দুহাতের বাঁধনে শুয়ে সিরিল বুক ভরে ভালবাসা নিতে লাগল। ওর হঠাৎ মনে হল দাদু একদম ভুল কথা বলে। এই চা বাগান, যার গন্ধ এখন নাক জুড়ে, নিরি থাকলে তা কখনো বিদেশ হয়?
কুলি লাইনে রটে গেল ছোট সাহেব চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা এতখানি অবিশ্বাস্য যে চট করে কেউ মানতে চাইল না। খবরটা শুকরা বুড়ো কানে গেলে সে হকচকিয়ে গেল। আজ সকাল থেকে কুলি লাইন অন্য একটা ব্যাপারে টগবগে ছিল। সন্ধ্যায় পঞ্চায়েতের মিটিং ডাকা হয়েছে বুকু সর্দারের অনুরোধে। লাইনের সব চেয়ে বুড়োর মানুষ হিসেবে শুকরাকে সে সময় থাকতে হবে। পঞ্চায়েত বসে এই গাছতলায় মাচাটাকে ঘিরে। বুকু সর্দারের সমস্যা ওর মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে জামাই-এর ঘরে যাবে না আর জামাই মাঝে মাঝেই এখানে এসে ঝামেলা। করছে। মেয়ের বদলে এটা ওটা দাবি করছে। পঞ্চায়েতের মিটিং বলেই শুকরা একটু আগে গোটা দুয়েক নিটোল বিড়ি পেয়েছে বুকুর কাছে। খেতে মায়া হল বলে সে দুটো দুকানে খুঁজে রেখেছে সে। রেখে উবু হয়ে বসে ছিল মাচায়। আর মাঝে মাঝে চিৎকার করছিল, মালা– এ মালা! ত্রিসীমানায় মেয়েটার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না যদিও। ঘড়ির টিকটিকের মত এক নাগাড়ে ডাকাটা থামাল সে একটা ধমকে। ধমকটা নাতির সেটা বুঝতে পেরে কুঁকড়ে বসল সে।
সিরিল ধমকালো, নিজের গলা কানে যায় তোমার?
হারামি এক নম্বরের হারামি। বিড় বিড় করল শুকরা।
খামোকা গালাগালি করছ কেন?
বেশ করব একশবার করব! শালারা নিজেরাই খাবে আমাকে দেবে না। আরে আমি না থাকলে তোর বাপ জন্মাত? তুই জন্মাতিস? এখন যে তোর এত বোলচাল সে আমারই জন্যে এটা মনে রাখিস?
কী হল তোমার? শর্টকাট করো মাইরি।
মাংস এসেছিল না ঘরে?
মাংস?
শালা আকাশ থেকে পড়ল যেন। তোর বাপ যে সাপটাকে মেরেছিল তার মাংস এসেছিল? সেটা গেল কোথায়? এই বুড়োটার কথা না-হয় ছেড়েই দিলাম, ওই ছুঁড়িটাকেও দিলি না? আরে ও তো নিজের বোন। সব নিজেরাই সাঁটালি! হ্যাঁরে, সাপটার শরীরে চর্বি ছিল?
থুঃ থুঃ! শালা যত জংলী আদমীকো ঝামেলা! তুম আদমী হ্যায় না পাজামা? সাপের মাংস কি ভদ্রলোক খায়? সব ফেলে দিয়েছি আমি।
ফেলে দিয়েছিস? হায় কপাল! সাপের মাংস খেলে জীবন বাড়ে, যৌবন লম্বা হয়। তিন তিনটে মেয়েকে কাহিল করে দিতে পারতিস একা, ও ভগবান, কি গাধা!
একটা মেয়েকে পারি না তো তিনটে, সাপের মাংস দেখলেই ঘেন্না করে। যখন জংলী ছিলে তখন খেতে। এখন ভদ্রলোক হতে হলে ওসব খাওয়া চলবে না।
ভদ্ররলোক? কে ভদ্দরলোক?
কেন আমরা।
আমরা? তুই! খিলখিল করে ফোকলা মুখে হাসি উপচে এল। কিছুতেই বাগ মানে না, ভেঙেচুরে যাচ্ছে হাসির দমকে, শেষে সেটা কাশিতে গিয়ে শেষ হল। কাশতে কাশতে দম বন্ধ হবার জোগাড়। কোনোক্রমে সেটা থামলে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে শুকরা বুড়ো বলল, মদেসিয়ারা ভদ্রলোক? তাহলে বাবুরা কী?
ওরা ভদ্রলোক!
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল শুকরা, আমরা আর ওরা এক?
আলবৎ এক।
আমি থাকব না এখানে। আমি চলে যাব। পাপ, পাপে ভরে গেছে জায়গাটা নইলে তুই একথা মুখে আনিস! হাত বাড়িয়ে লাঠিটা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল শুকরা বুড়ো। সিরিল হাসছিল, কোথায় যাবে? তোমার গ্রাম টেবুয়াতে?
হাঁ হাঁ জরুর। টেবুয়া আমার গ্রাম। আমার বাপ জন্মেছে তারও বাপ। এ চা বাগান আমাদের জায়গা নয়। এখানে নকরির জন্যে এসেছিলাম। এখানে তোরা ভদ্দরলোক হচ্ছিস, সাহেব চাকরি ছেড়ে দিয়ে মদেসিয়া হয়ে যাবে বোধহয়। ওরে নাতি, তুই আমাকে একটা ভিক্ষে দে। কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল শুকরা বুড়োর গলা।
কী?
আমাকে ইস্টিশানে নিয়ে গিয়ে রাঁচির রেলে তুলে দে।
তুলে দিলে যেতে পারবে?
সে পারব।
টিকিট?
চকিতে সামলে নিল শুকরা বুড়ো। মাটিতে পোঁতা টাকাটার কথা জিভে এসে গিয়েছিল প্রায়। মুখে বলল, রেলবাবুর পায়ে পড়ব।
ওখানে গিয়ে কী করবে? খাবে কী? দেখবে কে?
ওখানকার মাটি জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকব।
ব্যাস! তাতেই পেট ভরবে?
ভরবে রে ভরবে। সে মাটি কি তাই তুই জানিস না। যাবি আমার সঙ্গে?
ধ্যুৎ। আমি এখানে জন্মেছি, আমার বাপ জন্মেছে এখানে, এ জায়গাটাই আমার দেশ। চা পাতার গন্ধ নাকে না গেলে সে জায়গাটাকে বিদেশ ঠেকে। শোন বুড়ো, তোমার কোথাও যাওয়া চলবে না। অন্তত আজকের রাতে আগে নয়।
কেন? আজকের রাতে কী?
আঃ, ভুলে গেলে পঞ্চায়েত বসবে না?
তোর বাপের কী?
বাপের না আমার!
বুকু সর্দারের মেয়ে মরদের-ঘর করবে না তার মধ্যে তুই এলি কোত্থেকে?
হাসল সিরিল, রাত্তিরে ঢিবরি জ্বালা হয় কেন? ঘর আলো করতে তো! সেটা দিনের বেলা জ্বলে না কেন? না সূর্য উঠে গেছে তাই।
তার মানে? শুকরা বুড়ো রহস্য বুঝতে পারে না।
সিরিল এক হাতে বুড়োর মাথাটা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, আমার রক্ত ওর শরীরে দিয়ে দিয়েছি। সূর্যটা আমি, বুঝলে।
প্রায় ঝটকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্ট করল শুকরা, দেবার আগে আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করলি না কেন?
কেন? এসব কেউ কাউকে বলে নাকি?
আমি মেয়েটাকে একটু ভাল করে দেখতাম আগে।
হো হো করে হাসতে লাগল সিরিল, দেখো আজ রাত্রে, ওই যা, তুমি তো আবার রাত্রে দেখতেই পাও না। তবু–। আর হ্যাঁ, একথা কাউকে বলো না, যদি শুনি বলেছ তাহলে তুলব আর আংরাভাসায় ফেলে দেব।
আর যদি না বলি, তাহলে রেলে চড়িয়ে দিবি, বল, কথা দে।
বেশ দেব। অন্তত যে যেখানে গেল সুখী হয়, যার যেটা দেশ সে সেখানে যাক। কিন্তু আমি যাব না, এটা আমার দেশ।
না, এটা বাংলার দেশ। সাহেবদের আর বাবুদের জায়গা।
সাহেব, সাহেব কে? এই ছোট সাহেব, গাড়ি চালাত বাংলোয় থাকত হুকুম করত আগে হলে চাবুক মারত সে আজ থেকে সেসব আর কিছুই থাকবে না। একদম বাজারকা আদমি হো যায়ে গা।
কেন? লোকটা কি পাগল না বোকা? কক্ষনো শুনিনি এমন কথা। লোকটা কি গান্ধী মহারাজের চেলা?
সেটা আবার কে? মেয়েছেলে আবার মহারাজ হয় নাকি? গান্ধী তো মেয়ে-ছেলে, এই দেশের রানি। ওর পার্টির লোকদের তত শক্তি বেশি। না তার কেউ নয় ছোটাব। ঠিক আছে, এখন তো আর সাহেব থাকছে না ছোট সাহেব, আমি নিজের মুখে জিজ্ঞাসা করব কেন চাকরি ছাড়ল? আঁ! বিড়ি খাবে?
ঘাড় নাড়ল শুকরা বুড়ো,না। দুটো চোখের পাতা বন্ধ করে ভাবতে বসল সে। এটা কি কখনো সম্ভব? ম্যাকফার্স সাহেব, গেলি সাহেব, ওনিল সাহেব, কি কি ভারী ভারী চেহারা সব–কেউ কি কখনো বুড়ো হবার আগে চাকরি ছেড়ে চলে গেছে? কালে কালে কি হল! গান্ধীবাবার নাম শুনেছিল সে অনেক আগে। নাকি সাহেবদের তাড়াতে চায়। বাংলোয় বসে সাহেবরা নাকি এইসব বলে হাসিঠাট্টা করত। তার চেহারা দ্যাখেনি শুকরা। অথচ আজ নাতি বলল সে নাকি মেয়েছেলে, এই দেশের রানি। তাহলে তার বয়স কত? মেয়েছেলে বলেই কি এতদিন বেঁচে আছে! তা কি করে হয়! তাহলে তো ও মেয়েটাও এখন বেঁচে থাকত! অনেক দিন পরে পাঁজর ঝাঁপিয়ে নিঃশ্বাস ছিটকে বেরিয়ে এল। মৃত স্ত্রীর মুখটা মনে পড়ে না আজকাল। কিন্তু তার স্পর্শ গন্ধ সব যেন অনুভবে ছড়িয়ে। নাতি বলেছে রেলে তুলে দেবে। যীশু প্রভু যীশু, তোমার অসীম দয়া। চোখ খুললো বুড়ো, কেউ নেই সামনে। সিরিলটা কোন ফাঁকে উঠে গেছে। যাওয়ার সময় বলারও প্রয়োজন মনে করে না। মানুষ বলে ভাবে না তাকে। আবার ভদ্দরলোক হবার ইচ্ছে। চিৎকার শুরু করল শুকরা বুড়ো, মালা, এ মালা–আ। কয়েকটা মিনিট পার হয়ে গেল ডাকের তালে তালে, পায়ের শব্দ হল। নাতিনিটা ছুটে আসছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, খাও।
দুটো শুকনো রুটি হাতে নিয়ে নাতনির মুখের দিকে তাকালো বুড়ো। মালার দু কানের লতিতে হলুদ মাখা কাঠি বেঁধানো। কান ফুটিয়েছে ও।
চা বাগানের মাঝখানে বেশ কিছুটা জায়গা খাসমহলের দখলে। ওখান যারা বাস এবং ব্যবসা করে তারা চা বাগানের অধীনে নয়। যা কিছু হাট বাজার দোকানপাট সব এখানেই। সরকার নিয়মিত খাজনা আদায় করে থাকেন। পাকিস্তান হবার পর একটু একটু করে মানুষজন এখানে এসে বেশ জমজমাট করে তুলেছে। ন্যাশনাল হাইওয়ের দুপাশে এই ছোট্ট বসতিতেই ভাটিখানা। ছোটসাহেব সেখানেই একটা কারখানা খুলল। মোটরসারাই-এর কারখানা। লোকটাকে এখন আর চেনা যায় না। যখন খাটে তখন সারা শরীরে কালি মেখে মিস্ত্রি হয়ে যায়। এই কাজটা এত ভাল জানা ছিল, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একদিন সিরিল গেল তার সঙ্গে দেখা করতে।
অবশ্যই এই কদিন ছোটসাহেবকে কম হাঙ্গামা পোয়াতে হয়নি। দলে দলে বাগানের কুলিরা। এসে ভিড় করেছে কারখানার সামনে। অবাক হয়ে দেখেছে ছোটসাহেবের পরিবর্তন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি অনেকে। এরকম হয়? যদিও আর চা বাগানে নেই তবু লোকে এমনকি বাবুরাও ওকে ছোটসাহেব বলেই ডাকছে। অন্য নাম ভাবা মুশকিল। কুলিরা দেখেছে ছোটসাহেবকে মোটেই অখুশি দেখাচ্ছে না। শিস দিয়ে কাজ করছে। মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে। দশ-বারোটা লোককে কারখানায় কাজ দিয়েছে। বিস্ময় বেশিদিন জীবিত থাকে, শেষে এটাও গা সওয়া হয়ে গেল। কিন্তু ছোটসাহেব কেন চাকরি ছাড়ল এটা অনেকের কাছে স্পষ্ট হল না। নানান গল্প ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। চা-বাগানে আজকাল চুরি না করলে চাকরি যায় না। ছোট সাহেব কি চুরি করেছে? সাহেবরা চুরি করে এটা সর্দাররা জানে, কিন্তু ওটা এত বড় চুরি যে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এতো আর গুদাম থেকে পাতি কোঁচড়ে বেঁধে চুপচাপ সরে পড়া নয়। ছোটসাহেব কারখানা খোলার পর দেখা গেল অন্যান্য সাহেবরা সামনের বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলে যান, এককালে যে চিনতেন তা ভাবগতিকে দেখে বোঝা যায় না। আর একটা মজার ব্যাপার দেখা গেল। এতকাল বাংলোয় ছোটসাহেব একা ছিল কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেবার পর কারখানার ওপর যে ঘরখানা ভাড়া করে আছে সেখানে প্রতি শনিবার এক বুড়ি জলপাইগুড়ি থেকে এসে থাকে আবার রবিবার বিকেলে চলে যায়। সবাই জেনে গেল ওই বুড়ি নাকি ছোটসাহেবের মা।
Chapter - 3
৩.
সিরিল গিয়েছিল নেশা করে। পা টলছে মাথা ঠিক। ট্রানজিস্টার খারাপ হয়ে যাওয়ায় হাত খালি। খালি ছিল কারখানাও। কারণ সকাল থেকেই টুপুস টাপুস করে বৃষ্টি ঝরছে। তখন ঠিক বিকেল নয় কিন্তু মেঘগুলোর জন্যে সন্ধের চেহারা চারধারে। সিরিলকে দেখে ছোটসাহেব চিৎকার করে ডাকল, কতখানি খেয়েছিস?
পুরা বোতল! সিরিল দুটো হাতের মাপে বোতলটাকে বোঝাবার চেষ্টা করল।
ব্যস? তাতেই এই অবস্থা! হাসছিল ছোটসাহেব। দেখে রাগ হয়ে গেল সিরিলের। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, এ হাঁড়িয়া না ভুটানকা ইংলিশ হুস্কি।
ও তাই বল, তাহলে তো নেশা হবেই। তারপর কী মনে করে?
তুই বাগানকা নোকরি ছেড়ে দিলি কেন?
সবাই সব কিছু পারে না, আমিও পারছিলাম না।
ঝুটা বাত। যে মিস্ত্রি হতে পারে সে রাজার চাকরি ছাড়ে না।
ছোটসাহেব একটু টুল টেনে বসে ওকে কিছুক্ষণ দেখে বলল, ঐ বাক্সটার ওপর বোস। কাঠের বাক্সটা পাশেই ছিল, সিরিল সেটায় বসতে গিয়েও বসল না। ছোটসাহেবের সামনে এভাবে বসাটা ঠিক হবে না। বাংলোয় গেলে ওরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে পারে না পর্যন্ত আর এখন সমান হয়ে বসবে?
ছোটসাহেব ধমকে উঠল, কী হল বসতে বলছি না?
সিরিল বিড় বিড় করল, আমি তো কুলি–
ছোটসাহেব বলল, আমি কে? আমিও তো মিস্ত্রি। বসে পড়। নইলে যেকম পা টলছে তোর কখন আমার ঘাড়ে এসে পড়বি।
তাই তো! সিরিলের মাথায় কথাটা ঢুকল। এখন তোর আর এই লোকটা বাগানের সাহেব নয়। এর সামনে বসতে আপত্তি কী! ভাবা মাত্রই ধপাস করে বাক্সটায় বসে সে জিজ্ঞাসা করল,
তুই কি চুরি করেছিস?
চুরি? মানে? ছোটসাহেব হাঁ হয়ে গেল।
চুরি না করলে চাকরি ছাড়তে হল কেন?
বাজ পড়ল যেন। হো হো করে হাসতে লাগল ছোটসাহেব। কিছুতেই আর হাসি থামতে চায় না। কোনরকমে ঢোক গিলে বলল, তোকে যদি বলি এখানে হামাগুড়ি দিতে হবে। তুই তাই করতে গিয়ে যদি হাঁটু থেকে রক্ত বের হয় কী করবি?
আমি বলব পারব না।
আমিও তাই বলেছি। যা ভাগ, বৃষ্টি আসছে খুব, বাড়ি পৌঁছতে পারবি না।
কিছুই বুঝতে পারল না সিরিল। ছোটসাহেব চুরি না করে চাকরি ছেড়েছে। রক্ত পড়েছিল বলছে, কিন্তু সেটা কি রকম রক্ত। লোকটা যদ্দিন বাগানের সাহেব ছিল তদ্দিন অন্যরকম ছিল। কথা বলতে ভয় লাগত সেই সঙ্গে রাগও। এখন কিন্তু সেসব কিছু হচ্ছে না। আর এই সামনাসামনি বসে সিরিলের সাহসও বেড়ে যাচ্ছিল। সে বলল, বৃষ্টি তো পড়েই আর ভিজতে আমার খারাপ লাগে না। তুই চাকরি ছাড়লি কেন?
ছোটসাহেব ইতস্তত করল আরও কিছুক্ষণ। সিরিল পুরোপুরি মাতাল নয় কিন্তু এরকম নেশা হয়েছে যা মানুষকে নাছোড়বান্দা করে। চাকরি ছাড়ার পর তার এই বাগানের মধ্যেই থেকে যাওয়া বিশেষ জেদের জন্যেই। কোম্পানি কিন্তু তার চাকরি ছাড়ার কোনো কারণ কাউকে জানায়নি। অন্য ম্যানেজাররা তো বটেই বাবুরাও জেনে গেছে কিন্তু সবাই রহস্যজনকভাবে চুপচাপ। এই কদিন এসব কথা এড়িয়ে গেছে ছোটসাহেব, কিন্তু আজ এইরকম শীতল বিকেলে ওর মনে হল কুলিদের ব্যাপারটা জানানো দরকার। সিরিল দুটো হাত কোলের ওপর নিয়ে বড় বড় চোখে ছোটসাহেবকে দেখছিল। ছোটসাহেব সিগারেট ধরিয়ে বলল, শুনতে চাইছিস যখন তখন শোন। আমার বাড়ি শিলিগুড়িতে। খুব গরিব ছিলাম আমরা। বাবা নেই, দুই ভাই মায়ের কাছে থাকতাম। মা হাসপাতালের নার্স। ছোট ভাই আমার চেয়ে ছ বছরের ছোট। পড়াশুনায় ভাল ছিলাম আমি। স্কুলে পয়সা লাগত না। কিন্তু ফাইন্যাল পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে পারল না মা। একজন বড়লোক আমাকে সেই টাকা দিলেন। তাঁরই পয়সায় আমি কলেজে পড়ি। তারই চেষ্টায় টোকলাইতে গিয়ে ট্রেনিং নিই। আর সাহেববাগানে চাকরিতে যখন সই করলাম তখন দেখলাম আমাকে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে আমি যেন আমার চেয়ে যারা নিচু ক্লাসের লোক তাদের সঙ্গে না মিশি, না আড্ডা মারি, আমার বাড়িতে আসতে না দিই। আমি মিশব আমার সমান বা উঁচু মানুষের সঙ্গে। নইলে তোরা আমাকে সাহেব বলে মানবি না। এসব মেনে নিতে হবেই চাকরি করতে গেলে। ব্রিটিশরা যে নিয়ম তৈরি করেছিল তা তো আর পাল্টায়নি। কিন্তু কোম্পানি বলল আমার মা যেন চাকরি ছেড়ে দেয় তা না হলে আমি যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ না করি। মাকে লিখলাম আমার বাংলোয় এসে থাকতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে। অনেকদিন তো হলো, আর কেন! মা লিখল, তা সম্ভব নয়। যে চাকরি করে এতদিন বেঁচে আছেন তা শেষ ছুটি হওয়ার আগে ছাড়বেন না। প্রতিদিন হাসপাতালে কত গরিব মানুষের সেবা করেন তিনি, তারাই তার ছেলেমেয়ে। আমার চাকরিতে অসুবিধে হলে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দরকার নেই। খুব কষ্ট হল, মানতে পারছিলাম না কিন্তু কিছুই করার ছিল না। প্রতি শনিবার রাত্তিরে চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে শিলিগুড়িতে চলে যেতাম। চোরের মত মায়ের সঙ্গে দেখা করতাম, আবার ভোরের আগেই ষাট মাইল রাস্তা পেরিয়ে বাংলোয় ফিরে আসতাম। এই ভাবেই চলছিল মাসের পর মাস। কিন্তু সময় তো পালটায়। আমার ছোট ভাই এখন বড় হয়েছে। পার্টি করে। সে একরাত্রে আমাকে বাড়ির বাইরে ধরে শাসাল, যদি আমি দিনের বেলায় মাথা উঁচু করে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারি, তাহলেই যেন ওখানে যাই, না হলে সে আমার আসা পছন্দ করে না। ধিক্কার হল খুব। এই ছেলেটা যা বোঝে তা আমি টাকার নেশায় ভুলে যেতে চাইছিলাম? টাকার জন্যে নিজের মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে চাইছিলাম? আর পারলাম না। এসব কথা খোলাখুলি লিখে চাকরি ছেড়ে চলে এলাম। কিন্তু আমার তো অন্য কোন বিদ্যে জানা নেই; চাকরি দেবে কে আমাকে? গাড়ি সারানোটা এককালে শিখেছিলাম। সেটাই কাজে লাগালাম। হয়তো অন্য জায়গায় গিয়ে এই কারখানাটা খুলতে পারতাম। কিন্তু ভীষণ জেদ ধরে গেল। আমি চা-কোম্পানির মুখের সামনেই কারখানা করব যাতে ওরা দুবেলা আমাকে দ্যাখে। আর এই ভাবে দেখতে দেখতে ওরা যদি মনে করে আইনকানুনগুলো সময়ের সঙ্গে পালটে ফেলা দরকার তাহলে আমার পরে যারা আসবে তারা উপকৃত হবে। হাসল ছোটসাহেব, শুনলি তো এই হল আমার গল্প। এখন আমি ভাল আছি, খুব ভাল আছি।
ছোটসাহেবের সব কথার মানে সিরিলের মাথায় ঢোকেনি। কিন্তু এটুকু সে বুঝতে পারছিল যে ছোটসাহেব মাকে ভালবাসে বলে ওই চাকরি ছেড়ে এসেছে। তার মানে লোকটা সত্যিকারের ভাল। আর এই যে ছোটসাহেব এত লোক থাকতে তাকেই এরকম দুঃখের কাহিনি শোনালো তার মানে হলো সে ছোটসাহেবের আপন লোক। তাহলে তো সেও কিছু প্রশ্ন ওকে করতে পারে। ঠোঁট শুকিয়ে আসছিল। জিভ নিয়ে সেটা চেটে নিয়ে সিরিল বলল, আচ্ছা, একটা কথা বল্ তো, আমাদের তোরা কী ভাবিস?
ভাবি মানে?
আমরা ভদ্রলোক কি না?
ভদ্রলোক কি চেহারায় বোঝা যায়? ওটা ব্যবহারে জানা যায়।
ঠিক হ্যায়। তাহলে বল, এই দেশটা আমাদের না তোদের?
মানে? ছোটসাহেব কথাটা বুঝতে পারছিল না।
এই সোজা কথাটা বুঝছিস না! ওই চা বাগানে আমরা মদেসিয়ারা দেড় হাজার লোক আছি আর তোরা বাঙালিরা হাতগুনতি। তাহলে জায়গাটা কার? দুদিকে মাথা দোলাতে দোলাতে প্রশ্ন করল সিরিল।
দুজনেরই। এসব কথা তোদের মাথায় কে ঢোকাচ্ছে?
কেন? ঢোকাবে কেন? বিশজন বাঙালিবাবু সব সময় অর্ডার করবে, বেগার খাটাবে, আমাদের ছোটলোক বলবে আর আমরা শুনব? আমার বাপ শোনে তার বাপ শুনেছে কিন্তু আমি শুনব কেন?
অন্যায় কথা শুনতে কে বলেছে? কিন্তু তার সঙ্গে দেশের প্রশ্ন আসছে কেন? আমরা সবাই ভারতবর্ষের নাগরিক। আমরা সবাই সব জায়গায় থাকতে পারি। সব জায়গাই আমাদের দেশ। একথা তোকে কে বলেছে।
কে আবার বলবে? আমার বড়বাপ বলে এটা আমাদের দেশ নয়। আমাদের দেশ হল টেবুয়াতে, রাঁচি হাজারীবাগ ছোটনাগপুরে। কিন্তু সে জায়গা তো আমি দেখিনি। আমি এখানে জন্মেছি; বড় হয়ে এই চা বাগান দেখছি। এটাই আমার দেশ, কি ঠিক কি না বল?
নিশ্চয়ই ঠিক। কিন্তু এ নিয়ে ভাববার কোনো কারণ আছে?
সিরিল ছোটসাহেবকে জরিপ করতে চেষ্টা করল। তারপর বলল, ফ্রান্সিসকে দেখেছিস? যেই শালা বাবু হয়ে গেল অমনি আমাদের কুলি ভাবতে লাগল। কোনো বাবু আমাদের মানুষ বলে মানে না। সাহেবরা তো সব সময় ভাবে আমরা ওদের কেনা গোলাম। তুইও ভাবতিস কদিন। আগে। আগে খড়ের ঘরে আমরা থাকতাম এখন দয়া করে পাকাবাড়ি খুপরি ঘর করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা যা ছিলাম তাই আছি। পিক্ করে দাঁতের ফাঁক দিয়ে থুতু ফেলল সিরিল।
তোদের য়ুনিয়ন আছে, য়ুনিয়ন তো খুব জোরদার।
সব সমান। য়ুনিয়নের মাথায় কে আছে? না সেই শহরের বাঙালি বাবু। আজকাল গোলমাল কিছু হলে য়ুনিয়নের বাবুরা এসে সাহেবের বাংলোয় বসে একসঙ্গে মাল খায়, কথা বলে! আমরা গেলে বসতে পারা তো দূরের কথা, খাতিরও করবে না। সব শালা মালিকরা হাতের মধ্যে রেখে দিয়েছে। সিরিল উঠে দাঁড়াল, তুই লোকটা ভাল। এতদিন ভাল ছিলি না, এখন ভাল হয়েছিস।
ছোটসাহেব উঠল, তা না হয় হলো, কিন্তু সব সময় মনে রাখিস এই দেশ আমাদের সবার, কারো একার নয়।
পা বাড়াতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল সিরিল, আচ্ছা! তাহলে আমাদের য়ুনিয়ন যখন বলছে এবারের বোনাস বিশ পার্সেন্ট দিতে হবে বাবুরা সব চুপ কেন? কেন সাড়ে আট পার্সেন্ট মানব আমরা? বাবুরা কেন আমাদের সঙ্গে আসছে না? এটা বেইমানি নয়? কী করে সবাই এক দেশের হলাম?
ছোটসাহেব বলল, হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান হয়? কিন্তু মুঠোয় কিছু ধরতে গেলে সবাইকে একসঙ্গে নামতে হয়। তোকে আমি সোনার ভাত খেতে দেব বললেই যদি লাফিয়ে উঠিস আনন্দে তাহলে তোর মত গর্দভ আর কেউ নেই। বুঝেসুঝে কাজ কর, মাথা ঠাণ্ডা রাখ। সিরিলের মাথায় কিছু ঢুকছিল না আর। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। সে রাস্তায় পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। তারপর নিঃশব্দে ফিরে এল ছোটসাহেবের কাছে। এখন ওর চোখ, আধবোজা, ঠোঁট কুঁচকে উঠছে। ছোটসাহেব বলল, কিরে কিছু বলবি?
ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলেও কিছুক্ষণ থম ধরে থাকল সিরিল। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, হাম শাদী করে গা।
একটু চমকে গেল ছোটসাহেব বলার ধরনে তারপরে অত্যন্ত খুশির গলায় চিৎকার করে উঠল, খুব ভাল, করে ফ্যাল।
কিন্তু আমি জানি না কি করে শাদী করতে হয়।
জানিস না? তা তোর বাপকে বল, তারাই ব্যবস্থা করবে।
না, ওরাও জানে না।
তোর বাপ মা শাদীর নিয়ম জানে না?
না। আমি সই করে শাদী করব। সাহেবরা যেমন করে। টলতে টলতে নিজেকে সামলে নিল সিরিল।
হকচকিয়ে গেল ছোটসাহেব। ব্যাপারটা বুঝে নিতে কয়েকটা মুহূর্ত ব্যয় হল। তারপর বলল, সই করতে পারিস?
ঘাড় কাত করল সিরিল, হুঁ। টিপসই ভি সই, ঠিক কিনা?
তা ঠিক। কিন্তু এই শখ হল কেন তোর?
আমার ইচ্ছে তাই করব। একশবার করব, আলবাত করব। আমার শাদী দেবে সরকার, সাহেবদের যেমন দেয়।
ঠিক আছে ঠিক আছে। ছোটসাহেব ওর কাঁধে হাত রাখল, পাত্রী ঠিক হয়েছে?
হুঁ। তুই আমাকে নিয়মটা বাতলে দে। কী করতে হবে আমি কিছু জানি না। তুই লোকটা ভাল আছিস। এখন তো আর বাগানের সাহেব নোস, তুই বল কী করতে হবে।
ঠিক আছে, আমি ভাল করে আইনটা জেনে নিয়ে তোকে বলব।
তুই খুশি তো ছোটাসাহেব।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই খুশি।
তোকে আমি মিঠাই খাওয়াবো, ভূটানকো রম্ খাওয়াবো।
বেশ বেশ।
তুই বড়া আদমি আছিস! সাহেবলোককা মুখমে লাথ মেরেছিস ওই নোকরি ছেড়ে দিয়ে। পড়তে পড়তে কোনো রকমে বেঁচে গেল সিরিল। তারপর দরজায় দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে ছোটসাহেবকে কায়দা করে সেলাম জানাল কপালে হাত ছুঁইয়ে, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, বন্ডেমাত্র।
এটা করতেই মন প্রফুল্ল হয়ে গেল ওর। খানিক পরে যখন অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে পথ হাঁটতে লাগল তখন আর কোনো কষ্ট নেই ওর। মাথায়, শরীরের সবখানে যে শীতল জলের ধারা নামছে সেটা খেয়াল নেই। রাস্তার দুপাশে ঝকড়া ঝাকড়া শিরীষ দেবদারু গাছগুলো এখন অন্ধকারকে আরো ঘন করেছে। বাজার ছাড়িয়ে বাবুদের কোয়ার্টারের সামনে দিয়ে ঘোরের মধ্যে হেঁটে সে কুলি লাইনের দিকে চলল। চোখ বন্ধ করেই হেঁটে যাওয়া এখন অসম্ভব নয়। সিরিল ভাবতে চাইল, এই চা বাগানের প্রতিটি ইঞ্চি সে জানে! এই অন্ধকার বৃষ্টির রাত আর
কি বাধা হতে পারে। অদ্ভুত একটা গুনগুনানি আনন্দ বুকের মধ্যে নাচছিল। চোখ বন্ধ করলেই এখন নিরির মুখ, চোখ খুললেই এখন নিরির হাসি। হায়, হায়, কি খেল দেখাল নিরি সেদিন পঞ্চায়েতের মিটিং-এ? ওই সেই লাফাঙ্গা স্বামীর মুখ শুকিয়ে ঘুঁটে হয়ে গেছিল। মার শালা লাথ, হাজারবার লাথ। ভাবতে ভাবতেই পরমানন্দে শুন্যে একটা লাথি ছুড়ল সিরিল। সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা বেতাল হয়ে আছড়ে পড়ল রাস্তার একপাশে দেওদার গাছের গোড়ায়! উপুড় হয়ে জলকাদায় শুয়ে শুয়ে সে কিছুটা সামনে নিলে দুহাতের বাঁধনে একটা বড় পাথর পেয়ে। অজান্তেই অমিতাভ বচ্চনের গলায় বলে উঠল, নিরি মেরা পেয়ার, মেরা জিন্দেগি, ও মেরা ডার্লিং।
পঞ্চায়েতের মানুষগুলোর মুখ কেমন হয়েছিল? বুকু সর্দার ওর বাবা মাংরা সর্দার, অন্যান্য বুড়োগুলো হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। শুধু শুকরা বুড়ো বসেছিল সেই পাথরের মত যাকে ঝরনার জল সারাদিন শব্দ করে ঠেলে যায় কিন্তু পাথরটা খেয়ালই করে না।
খুব লম্বা লম্বা বাত ঝাড়ছিল বুকু সর্দারের জামাই। যে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে চায়।, দুদিন পরেই পালিয়ে আসে সে মেয়ে নষ্ট, বদ, রান্ডী। যে মেয়ে পেটে বাচ্চা ধরতে পারে না সেই মেয়ে সংসার সামলাতে পারে না। তাই সে সমবেত বয়স্কজনকে অনুরোধ করছে এ ব্যাপারে একটা বিহিত করতে।
মাচাটাকে ঘিরে পঞ্চায়েতের সদস্যরা বসেছিল। মাচার ওপর নেংটি পরে শুকরা বুড়ো গম্ভীর মুখে রয়েছে। আজ তার হাতে বিড়ির পুরো বাণ্ডিল। যে পঞ্চায়েত ডাকবে তাকে এটা খরচ করতেই হয়। সদস্যদের সামনে একদিকে বুকু সর্দার অন্যদিকে তার জামাই দাঁড়িয়ে আছে। জামাই কথা শেষ করলে মাংরা সর্দার উঠে দাঁড়াল, সব কথা শুনলাম, কথাগুলোর মোটেই ভাল নয়। বুকু সর্দার বলুক তার যা বলার আছে।
বেশ কিছুটা দূরে লাইনের তামাম মানুষ গোল হয়ে বসে পঞ্চায়েত শুনছিল। তারা দেখল বুকু খুব ঘাবড়ে গেছে। তার পা কাঁপছে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে। লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে বুকু বলল, কোনো গাছ বলে না তার ফল খারাপ। কোনো মেঘ কি বলবে তার বৃষ্টিতে নুন আছে? যে যেমন সে সেইভাবে ভেবে নেয়। আমার মেয়ে দোষ করতে পারে নাও পারে। তাকে আমি শাদীর পর চারবার জোর করে বিনাগুড়িতে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দুধ দুইতে গেলে তো গরু লাথি মারবেই, তাই বলে ওই ভয়ে যে দুধ না দুয়ে গরুটাকে তাড়িয়ে দিতে চায় তার মতো মূর্খ আর কে আছে?
সঙ্গে সঙ্গে বুকু সর্দারের জামাই চিৎকার করে উঠল, বাঃ বাঃ, যে গরুর দুধ দেবার ক্ষমতা নেই তার লাথি খেতে যাব কোন দুঃখে?
পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে মাংরা সর্দার দুজনকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, বুকু সর্দার কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে?
জামাই দ্রুত মাথা নাড়ল, আমার ঘর তো ওকে নিয়ে নয়, ওর মেয়েকে নিয়ে। ও ভাল ব্যবহার করল কি না করল তাতে কী এসে যায়?
মাংরা সর্দার আবার জিজ্ঞাসা করল, জিজ্ঞাসা করছি তার জবাব দাও আগে!
সঙ্গে সঙ্গে জামাই বলল, না।
ওর মেয়ে করেছে?
হ্যাঁ।
কী করেছে?
সে আমার ঘরে থাকতে চায় না। আশেপাশের ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে। এসব কারণের জন্য আমি তাকে মারতেই পারি। নিজের বউকে মারার অধিকার সব স্বামীর আছে। কিন্তু সে সুযোগ পেলেই পালিয়ে আসে। এমনকি শেষবার আসবার আগে আমাকেই সে মেরেছে। এখান থেকে কেউ নিশ্চয়ই মতলব দিয়েছিল। নষ্ট রাণ্ডী মেয়েছেলে হলে যেমন হয় আমার বউ তাই। বলতে বলতে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল জামাই।
শোকটাকে মরে যেতে কিছুটা সময় দিল সবাই। পঞ্চায়েতের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে খানিকটা গুগুনাল তারপর। পাকামাথাগুলো এক হয়ে যে সিদ্ধান্ত নিল সেইমত বুধুয়া সর্দার বলল, বউ যদি বেঁকে যায় তাহলে জীবনটা মিথ্যে হয়ে যায়। তা বিনাগুড়ির জামাইকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে সে কী চায়?
চোখের জল মুছে গলা পরিষ্কার করে জামাই বলল, ও আমার সঙ্গে চলুক। এই চাওয়াটার কথা সবাই জানত বলে একটু খুকখুকে হাসি উঠল দুরের শ্রোতাদের মধ্যে। কারণ এত অভিযোগের শেষে এটা কানে লাগছে সবার। মাংরা সর্দার বলল, বুকু সর্দার, তোমার কি জামাই-এর ঘরে মেয়েকে পাঠাতে এখন আপত্তি আছে?
বুকু সর্দার আবার লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াল, সব বাপই চায় মেয়ে স্বামীর ঘর করুক। কিন্তু যাবে কিনা সেটা বলতে পারে যে যাবে সে।
পঞ্চায়েতের হুকুমে লোক গিয়ে নিরিকে ডেকে নিয়ে এল। নিরি এল চুপচাপ, খুব শান্ত ভঙ্গিতে। এমনিতে আজকাল যে রকম বেপরোয়া ভাব দেখা যায় ওর হাঁটাচলায় এখন সেটা নেই। বাপ এবং স্বামীর থেকে সমান দূরত্ব রেখে দাঁড়াল সে। তাকে দেখামাত্র বিনাগুড়ির জামাই এর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
বুধুয়া সর্দার জিজ্ঞাসা করল, তোর স্বামী তোকে নিয়ে যেতে এসেছে, তুই যাবি?
কথা না বলে ঘাড় নাড়ল নিরি, না।
সঙ্গে সঙ্গে জামাই চিৎকার করে গালাগালি শুরু করল। কিন্তু তার দিকে নিরি এমন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকাল যে বেচারা আস্তে আস্তে গলা নামাল।
কেন যাবি না? পঞ্চায়েতের প্রশ্ন।
ওটা মানুষ না, আমার স্বামীকে মানুষ হতে হবে। নিরির গলা পরিষ্কার, ওর কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল।
কুত্তি, নষ্ট, রাণ্ডী মেয়েছেলের কথা শুনছেন সবাই? চিৎকারটা থামালো নিরি একটা হাত ওপরে তুলে, আমি যদি ওখানে ফিরে যাই তাহলেই নিজেকে রাণ্ডী ভাবব।
পঞ্চায়েত জিজ্ঞাসা করল, কেন ফিরবি না পরিষ্কার করে বল।
নিরি বলল, বললাম তো লোকটা মানুষ না। খেতে পেতাম না, মারধোর করত, সব বউ এর ভাগ্যেই থাকে, তা নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু একটা রাতও সে আমাকে সুখ দিতে পারেনি। আমি কি আরো খুলে বলব?
আবার গুঞ্জন উঠল চারধারে। সেসব ছাপিয়ে জামাই-এর গলা শুনতে পেল সবাই, এসব মিথ্যে কথা, হাজারবার মিথ্যে কথা।
মিথ্যে কথা! ফুঁসে উঠল নিরি, তাহলে এতবছর ধরে আমি মা হতে পারলাম না কেন? বল, সাহস থাকে তো বল?
একটু থমকে গিয়েও তুলল জামাই, খারাপ মেয়েরা মা হয় না। ভগবান ওদের মা হতে দেন না।
কথাটা শুনে মুখে হাত চাপা দিয়ে নিরি হাসতে লাগল।
পঞ্চায়েত বলল, ঠিক আছে, যা হবার হয়েছে, এবার দুজন ফিরে যাও।
ঘাড় নাড়ল নিরি, না, আর ফিরব না।
কেন?
ফিরলে আমি রাণ্ডী হয়ে যাব।
রাণ্ডী? স্বামীর ঘর গেলে? এ কেমন কথা?
ঠিক কথা। ও লোকটাকে আমি আর স্বামী বলে মনে করি না। আমি নষ্ট মেয়ে তাই ভগবান আমাকে বাচ্চা দেবেন না, না? স্বামীর দিকে মুখ করে গর্জে উঠল নিরি, তাহলে শোন, তোর কথা যে মিথ্যে, তুই যে একটা মানুষ নোস এর প্রমাণ হল আমার পেটে বাচ্চা এসেছে। তার মানে আমি মা হতে যাচ্ছি!
চিৎকার করে গর্বিত গলাকে থামিয়ে দিতে চাইল জামাই, আকাশ থেকে বাজ পড়ুক, মাটি ফেটে যাক, পাহাড় থেকে হাতিরা নেমে আসুক আর তা না হলে ও বলুক এসব মিথ্যে কথা।
হাসল নিরি, ওসব গল্প থাক, সত্যি কথা একদম সত্যি কথা।
পঞ্চায়েত বলল, তুই ঠিক বলেছিস?
হ্যাঁ।
কিন্তু স্বামী থাকতে–।
ও আমার স্বামী না।
কে তোর ছেলের বাবা?
সেকথা আমি বলব না। পঞ্চায়েত রায় দিক, আমি ওর ঘরে যাব না। একজনের বাচ্চা পেটে নিয়ে আর একজনের ঘরে যে যায় সেই তো রাণ্ডী। পঞ্চায়েত কি আমাকে রাণ্ডী হতে বলছে?
পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে মাংরা সর্দার উঠে দাঁড়াল, স্বামী থাকতে যে মেয়ে অন্যের বাচ্চা পেটে ধরে সে সমাজের কলঙ্ক। তার শাস্তি পাওয়া উচিত।
জামাই বলল, ঠিক ঠিক।
মাংরা সর্দার বলল, বুকু সর্দারের মেয়ে বলুক কে এর জন্য দায়ী!
নিরি হাসল, যাকে আমি বিয়ে করব।
জামাই ফ্যালফেলে গলায় বলল, আমার বউ না তুই!
নিরি বলল, আমি মানি না।
মাংরা সর্দার হুকুম করল, বুকু সর্দারের মেয়ে নাম বলুক সেই বদমায়েসের।
নিরি একটু ভাবল, তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলল, নামটা বলতেই হবে?
পঞ্চায়েতের সবকটা মাথা এক সঙ্গে নড়ল, হ্যাঁ।
নিরি বলল, বেশ। আমি আর সিরিল ঠিক করেছি যে বিয়ে করব।
সিরিল! সিরিল! সিরিল! মুখে মুখে নামটা ঢেউ হয়ে গেল। মাংরা সর্দারের চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন দুলছে! কোনোরকমে বলল, মিথ্যে কথা।
পরম তৃপ্তিতে নিরি বলল, না, সূর্যের মত সত্যি।
বুকু সর্দার এবার কথা বলল, আমি পঞ্চায়েতের কাছে মিনতি করছি এ ব্যাপারে যা করার এখনই যেন করে দেওয়া হয়।
মাথাগুলো এক হল। প্রায় দশ মিনিট গুঞ্জন চলল নিজেদের মধ্যে। ওদের কথা বাইরের কেউ শুনতে পাচ্ছে না। অনেক মত বিনিময়ের পর মাংরা সর্দার মুখপাত্র হয়ে এগিয়ে গেল মাচার দিকে। সেখানে শুকরা বুড়ো দুই হাঁটুর ওপর চিবুক ফেলে দ হয়ে বসেছিল। মাংরা সর্দার তার কাছে গিয়ে চিৎকার করে বলল, এই পঞ্চায়েত মনে করছে যে বুকু সর্দারের মেয়ে অত্যন্ত অন্যায় করেছে। তার এবং সিরিলের শাস্তি পাওয়া দরকার। পঞ্চায়েতের নিয়ম অনুসারে পঞ্চায়েতের মাথা হিসেবে তুমি এই শাস্তি ঠিক করবে।
ঘাড় নাড়ল শুকরা বুড়ো, তারপর হাত বাড়িয়ে নাতনিকে খুঁজল। মালা যে এখন নেই সেটা বুঝতে পেরে লাঠিটা ওপরে উঁচিয়ে গলা তুলল সে, ঠিক কথা। অন্যায় হয়েছে। শাস্তি পাওয়া দরকার, ঠিক কথা।
ভেঙে পড়া শরীরটা থেকে এরকম শক্ত আওয়াজ বেরুবে তা অনেকেই ভাবতে পারেনি। শুকরা সর্দার চিন্তা করল খানিক, তারপর বলল, বুকু সর্দারের মেয়ে আর মাংরা সর্দারের ছেলে এই অন্যায় করেছে। মাংরা সর্দার নিজে বলেছে ওরা শাস্তি পাক। বাপ হয়ে ছেলেকে সে প্রশ্রয় দেয়নি। ঠিক কাজ। কিন্তু কী শাস্তি দেব? ওদের মেরে ফেলা যাবে না, আইন নেই। এখান থেকে তাড়িয়ে দিলেও কি ক্ষতি! আমার মনে হয় মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি হল দুজনের মন রেখে চলা। তাই আমি ওদের এই শাস্তি দিলাম যে এক মাসের মধ্যে ওরা শাদী করুক। তখন বুঝবে কী রকম কষ্ট পেতে হয় সারা জীবন ধরে। এইটুকু বলতেই চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল চারধারে। তিরের মত ছুটে এল নিরি শুকরা বুড়োর কাছে, এসে পাগলের মত তার পায়ে মাথা ঠুকতে লাগল। একটা হাত মেয়েটার মাথায় রেখে শুকরা বুড়ো বলল, আজ থেকে আগের বিয়ে ভেঙে গেল ওর। বুকু সর্দার তিনটে খাসি, দুকুড়ি টাকা, একজোড়া ধুতি জামাইকে দিক আর আমাদের পেট ভরে হাঁড়িয়া খাইয়ে দেবে। এসবের টাকা যদি তার কাছে না থাকলে তাহলে তার নতুন জামাই দেবে। সে ছেলে কি এখানে আছে?
সঙ্গে সঙ্গে তল্লাসি শুরু হয়ে গেল। না, এই ভিড়ের মধ্যে না কুলি লাইনের কোনো বাড়িতে সিরিলকে পাওয়া গেল। খবরটা পৌঁছে দেওয়া হলে শুকরা বুড়ো শেষ কথা জানিয়ে দিল, এইসব খরচ তিনদিনের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে।
রায় শোনার পর দুজন লোক একদম চুপ মেরে গিয়েছিল। একজন বিনাগুড়ির জামাই অন্যজন মাংরা সর্দার। পঞ্চায়েত ভেঙে গেলেও লোকটা দাঁড়িয়ে আছে দেখে বুকু সর্দার এগিয়ে এল। তার মনটা এখন প্রফুল্ল, মেয়েটা যদি মনের মত ঘর পায় তো আরামে চোখ বোজা যাবে। বুকু সর্দার বলল, জিনিসগুলো দুদিনের মধ্যেই পৌঁছে দিয়ে আসব, চিন্তা কোরো না।
জামাই-এর নজর তখন নিরির দিকে। চোখের দৃষ্টি ক্ষয়ে যাওয়া ভোরের চাঁদের মত। শ্বশুরের কথাটা শুনল কি না বোঝা গেল না। বুকু বলল, রাত হয়ে গেছে আজ, এখানে থেকে গেলেই ভাল হত।
জামাই-এর হুঁশ এল, বলল, আমার পা দুটো আছে কী করতে? বলে আর দাঁড়াল না, হন হন করে বিনাগুড়ির রাস্তায় চলে গেল।
পঞ্চায়েতের সদস্যরা ঠিক এরকম বিচার চায়নি! এটা কি শাস্তি দেওয়া হল? এরকম আদেশ হলে ছেলে-ছোকরারা মানবে? শুকরা বুড়োর মাথা আর কাজ করে না এটা বোঝা উচিত ছিল। মাংরা সর্দারের শরীর যেন বিছুটি পাতায় মোড়া। ধাঁ করে এগিয়ে গেল বাপের দিকে। শুকরা বুড়োর আদর খেয়ে নিরি তখন উঠে যাচ্ছে। বাপের দিকে একবার রোষ চোখে তাকাল মাংরা। সর্দার, এই সর্বনাশ কেন করলে? নিজের বংশের মুখে নিজেই চুনকালি মাখালে?
চুনকালি? সেটা কি জিনিস? বুড়ো এই মুহূর্তটির জন্য সিঁটিয়ে ছিল।
তুমি বেইমান! শালা ওই শয়তান নিশ্চয়ই কিছু খাইয়েছে তোমাকে। কী বলেছে? টেবুয়াতে নিয়ে গিয়ে মাটি খুঁড়ে শুইয়ে দিয়ে আসবে? ছাই দেবে! নিজের ছেলের চেয়ে নাতি এখন আপন হল না!
শুকরা বুড়ো নির্লিপ্তের গলায় বলতে চাইল, মেয়েটার পেটে বাচ্চা এসেছে, যার বাচ্চা তারই তো স্বামীর হওয়া উচিত।
বাঃ, কি সুন্দর বিধান!
ঠিকই তো, তোর মা যদি না বলতো তাহলে আমি কি করে জানতাম যে আমি তোর বাবা! তাই এ ব্যাপারে মেয়েদের কথাই শোনা উচিত।
মাংরা সর্দারের মনে হল বুড়োটা আসল শয়তান আর ছেলেটা ওই তার স্যাঙাৎ। চেঁচিয়ে বলল সে, আজ থেকে আমি জানব যে আমার কোনো ছেলে নেই। সে যেন আমার ঘরে না ঢোকে। কথাটা সবাই শুনল, আচমকা চুপচাপ হয়ে গেল তল্লাটটা। সঙ্গে সঙ্গে একটা মিহি গলায় প্রশ্ন করল শুকরা বুড়ো, আমার কী হবে?
বাপের দিকে তাকাল মাংরা সর্দার। কিছু ভেবে নিয়ে মাথা দোলালো সে, এখানে আমি আর থাকব না। সাহেবকে বলব ছুটি দিয়ে দিতে।
বাপ জিজ্ঞাসা করল, তারপর কী করবি?
তোমাকে নিয়ে টেবুয়াতে চলে যাব। সেখানে গেলে ওই শুয়োরটার মুখ দেখতে হবে না। আর জায়গাটা যখন মাতৃভূমি আমাদের–।
সত্যি যাবি? আমাকে নিয়ে যাবি?
যাব, নিশ্চয় যাব।
কিন্তু সেখানে চা-বাগান নেই, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট।
তো বয়ে গেল…।
শুকরো বুড়োর শরীর আনন্দে কাঁপতে লাগল থরথরিয়ে। আহা রায় দিয়ে কি ভালই না হল। নাতি বলছে নিয়ে যাবে ছেলেও বলছে নিয়ে যাবে। এবার তার যাওয়া কে আটকায় দেখি।
বৃষ্টির জল চোখে মুখে কানে ঢুকতেই সিরিল উঠে বসল। চোখের সামনে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিজলির ব্লেড দিয়ে যখন কেউ আকাশটাকে চিরছে তখনই সাদা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে চরাচর। সিরিল টের পেল ওর নেশা হয়েছে, জোর নেশা। জামাপ্যান্ট ভিজে কাদা হয়ে মিশে আছে শরীরে। ঠিক কোথায় এসেছে বুঝতে পারছে না অন্ধকারে। কয়েকবার চেষ্টার পর উঠল সে। টলতে টলতে লাইনের দিকে যেতে যেতে ওর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। শালা সেই পঞ্চায়েতের পর বাপটার ঘরে আর সে যাচ্ছে না। আজ এর ঘরে কাল ওর ঘরে দিন যাচ্ছে। সাহেব বলেছে তার কোয়ার্টার মিলবে সামনের মাসে। বাপটা মাইরি শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছে। মা অবশ্য দুবেলা তাকে ঘরে ডাকছে। কিন্তু সেখানে যাবে কী করে সে যদ্দিন বাপ তাকে যেতে না বলেছে! নিরি কোয়ার্টার পেলেই ঘরে উঠে আসবে। আর বেশি দেরি করা যাচ্ছে না, বাচ্চাটা নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে এরই মধ্যে। হাতি তাড়িয়ে বাপ হয়ে গেল সে, আরে ইয়ার?
লাইনে এসে পিটপিট করল সিরিল। তুমুল বৃষ্টিতে সবকটা ঘরের দরজা বন্ধ। কেউ বাইরে নেই। কার কাছে যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে ও যে কখন মাংরা সর্দারের ঘরের সামনে এসেছে খেয়াল ছিল না। সেটা বুঝতে পেরে পেছন ফিরল। এতক্ষণ জলে ভিজে এবং সুরার প্রতিক্রিয়ার শরীর আর খাড়া থাকতে চাইছিল না। ওর চোখ বিদ্যুতের ঝলকে শুকরা বুড়োর খালি মাচাটাকে দেখল। ওখানে শুলে কেমন হয়? সারারাত বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সকাল বেলায় মরে পড়ে থাকবে। ধ্যৎ, মরার জন্য সে জন্মেছে নাকি! সিরিল টলতে টলতে বুকু সর্দারের দরজায় গিয়ে থামল। পঞ্চায়েত রায় দেওয়ার পর সে আর এমুখো হয়নি। এখন এই গভীর বৃষ্টির রাতে তার খুব ইচ্ছে হল নিরিকে দেখতে।
দরজা ধরে নিজেকে সামলাতেই সেটা মচমচ করে উঠল। শব্দটা ভেতরে যেতেই নিরির গলা বাজল, কে?
আমি। সিরিল ফিসফিস করল।
কৌন?
সিরিল।
ঢিবরি জ্বলল ভেতরে। তারপর দরজা খুলেই মুখে হাত নিয়ে অস্ফুট শব্দ করল দৃশ্য দেখে, কী হয়েছে, কোথায় গিয়েছিলে, এ অবস্থা কেন?
সিরিল বলল, হাম দেওয়ানা হো গ্যয়া।
হাত ধরে সিরিলকে ভেতরে নিয়ে এল নিরি। ওপাশের আড়ালে বুকু সর্দার হাঁড়িয়া খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। মাথার ওপর বৃষ্টির একটানা শব্দ! শুয়ে শুয়ে এতক্ষণ ছটফট করছিল নিরি। এখন এরকম রাতে বড্ড একা লাগে।
ঘরে ঢুকে নড়চড়ে হয়ে গেল সিরিল। মায়ের মত যত্নে ওকে ভেজা জামাকাপড় থেকে বের করে এনে শুকনো বিছানার উত্তাপে শুইয়ে দিল নিরি। শরীরের ভেতরে একজন শরীরের বাইরে আর একজনকে জড়িয়ে সারারাত পাতি তুলতে লাগল বুকের ঝুড়িতে।
আর সেই নরম শরীরের উত্তাপে ডুবে যেতে যেতে সিরিল বিড়বিড় করল, ইয়ে মেরে জায়গা, খাস জায়গা।
.
হাওয়া গরম হয়ে উঠল চা বাগানের। জলপাইগুড়ি থেকে য়ুনিয়নের বাবুরা ঘন ঘন আসছে এখন। যে পার্টির ওপর দেশের ভার তাদেরই য়ুনিয়ন দখলে। বাগানের কুলিদের ওপর য়ুনিয়নের প্রতাপ খুব। একটা ছোট অফিস অফিস খোলা হয়েছে। সেখানে বাগানের যে সব ছেলে য়ুনিয়ন, করে এসে গরম গরম কথাবার্তা বলছে সারাদিন। সারাবছর য়ুনিয়ন ঘুমিয়ে ছিল, এদেরও অস্তিত্ব বোঝা যেত না। এখন নেতাবাবুরা আসা মাত্রই এরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সিরিল গুদামের কাজ শেষ করে ওই অফিসে যায় রোজ। বোনাসের দাবিতে নেতারা সাহেবের বাংলোয় ঘন ঘন মিটিং করছে।
সিরিলের এখন মন মেজাজ ভাল। একঘরের একটা কোয়ার্টার তার ভাগ্যে জুটে গেছে এর মধ্যে। তেলিপাড়ার চার্চে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে ওরা। নিরির এখন ভারী শরীর। পাতি তুলতে বাগানে যেতে কষ্ট হয়। গুদামবাবুকে বলে কয়ে ওকে গুদামের কাজে নিয়ে এসেছে সিরিল। আগে হলে এই সব অনুরোধ কেউ শুনতো না। কিন্তু য়ুনিয়ন অফিসে যাওয়া আসা করার পর তার কথা লোকে শুনছে এটা আবিষ্কার করে ওর মেজাজ খুশ। ছোটসাহেবকে অনেক বলে করেও সই করা বিয়েটা সম্ভব হল না বলে অবশ্য আফসোস হয়। নিরিটাই বিগড়ে গেল, টিপসই বিয়েতে রাজি হতে চাইল না কিছুতেই।
মিটিং ভেস্তে গেল। য়ুনিয়ন সরাসরি দাবি জানিয়েছিল বিশ পার্সেন্টের নিচে বোনাস নেওয়া হবে না। শ্রমিকদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের বিনিময়ে কোম্পানি মুনাফা লুঠছে, এবার থেকে তাদেরও কিছুটা ভাগ দিতে হবে। মিটিং যখন ভেঙেই গেছে তখন পরবর্তী কার্যক্রম স্থির করতে যুনিয়নের বাবুরা শহরে চলে গেল। খবরটা চালু হয়ে যেতে হাওয়াটা আরো জোরালো হল। শালা সাহেব বোনাস বাড়াতে রাজি নয়। একটা বিশৃঙ্খল মেজাজ এসে গেল চা বাগানে। সিরিলদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সমস্ত শ্রমিকদের সংগঠিত করে আন্দোলনের দিকে নিয়ে যেতে। এই বাগানের ইতিহাসে এরকম ঘটনা প্রথম। লোকজন ডেকে সিরিল বোঝাতে শুরু করল, ইয়ে বাগান হামারা হ্যায়। আমরা জন্মেই-এর চায়ের পাতা দেখি, মরবার আগেও ওই পাতার গন্ধ নাকে আসে। তাই বাগান থেকে যা লাভ হবে তার একটা মোটা অংশ আমাদের দিতে হবে। কোনো আইন দেখানো চলবে না।
প্রথম প্রথম সাধারণ মানুষ এসব কথা পরম বিস্ময়ের সঙ্গে শুনতো। এও কি কখনও হয়? সাহেবের সঙ্গে লড়াই? যারা বয়স্ক তারা কিছু বলতে চাইছে না। মাংরা সর্দার ভয় পাচ্ছে এই সব আহাম্মকির জন্যে ছেলের কপালে যে শাস্তি নাচছে তার আশঙ্কায়। ছেলে আলাদা থাকে বউকে নিয়ে কিন্তু এই রকম বেয়াদপি লড়াইতে নাক গলাচ্ছে দেখে দূরত্ব বাড়ানো ছাড়া আর কিছু করার থাকল না।
কিন্তু একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র পেলে যেমন জলরাশি তার মাধ্যমে মুক্তি পাবার জন্য সচেষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে বিরাট সুড়ঙ্গ করে ফেলে তেমনি এক সময় সমস্ত চা বাগানের নারী-পুরুষ। উত্তাল হয়ে উঠল। ফ্যাক্টরিতে একজন শ্রমিক নির্দিষ্ট কাজ সময় মতো না করায় ছোট গুদাম বাবু ফ্রান্সিস তাকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাবড়াচ্ছিল। অন্য সময় হলে ক্ষমা চাওয়া ইত্যাদিতে ব্যাপারটা শেষ হতো, তাও শ্রমিকটির একদিনের বেতন কাটা যেত। কিন্তু এদিন ফ্রান্সিস ছুটে গেল বড় গুদামবাবুর কাছে। চোখ বড় এবং মুখের চেহারা বিহ্বল, ফ্রান্সিস নালিশ করল, শ্রমিকটি বলছে যা সে করেছে ঠিকই করেছে। তার যদি কিছু করার থাকে তো করুক। সব শেষে লোকটা ফ্রান্সিসকে বলেছে, সাহেবকা কুত্তা।
বড় গুদামবাবু সোজা হয়ে বসলেন। দূরের কিছু চা-বাগানে শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হলেও এই বাগান ততদিন শান্ত ছিল। এই কথাটা তো খারাপ, মারাত্মক খারাপ। বোনাসের দাবিতে ওরা চেঁচামেচি করছে কাজের পর কিন্তু এ ধরনের ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে বলে আশাই করা যায় না। তিনি লোকটিকে ডেকে পাঠালেন।
অল্পই বয়স, ওর বাপ মারা গেছে বছর তিনেক হল। হাতজোড় না করে কোনোদিন কথা বলতো না ওর বাপ। ছেলেটার নাম রেতিয়া।
বড় গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ছোট গুদামবাবুকে সাহেবের কুত্তা বলেছিস?
রেতিয়া বলল, ওটা ওর সঙ্গে আমার ব্যাপার, তুই নাক গলাচ্ছিস কেন?
এটা গুদাম, তোদের লাইন না। বলেছিস কিনা বল?
হ্যাঁ বলেছি।
তোকে আমি এখনই নোকরি থেকে ছাড়িয়ে দিতে পারি, জানিস?
ফুঁসে উঠল রেতিয়া, ইস! এটা আমাদের বাগান, ছাড়িয়ে দেব বললেই হল?
বড় গুদামবাবুর দীর্ঘকালের চাকরিজীবনে এ ধরনের বেয়াদপির মুখোমুখি কখনো হননি। স্বভাবতই তিনি উত্তেজিত হলেন। নিজের বয়স আর একটু কম হলে হয়তো মেরেই বসতেন লোকটাকে। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে তিনি দ্রুত ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে সাহেবের বাংলোয় চললেন। মাথার ওপর শিরিষ গাছে পাখি ডাকছে, নদীর জলে যেখানে ফ্যাক্টরির হুইল ঘুরছে সেখানে অদ্ভুত একটানা শব্দ বেরুচ্ছে, চারধার গভীর নির্জন ছায়াময়। বড় গুদামবাবু সেই পথ ডিঙিয়ে এসে সাহেবকে সমস্যাটা নিবেদন করলেন। আজ থেকে বিশ বছর আগে হলে হার্ডসন সাহেবের চাবুকের তলায় রেতিয়ার রক্তাক্ত শরীর এরপরেই তিরতির করে নড়ত। বড় গুদামবাবু দেখলেন গুপ্তা সাহেব কথাটা শুনে বললেন, লেবার আনরেস্ট এখন চারধারে। আমরা লাকি যে এতদিন এখানে এসব হয়নি। ব্যাপারটা ট্যাক্টফুলি ম্যানেজ করতে হবে, ঠিক আছে ওকে পাঠিয়ে দাও।
বড় গুদামবাবু বললেন, হি শুড বি পানিশড। নইলে ওর দেখাদেখি আরো অনেক ঘটনা ঘটবে।
গুপ্ত সাহেব বলেছিলেন, নো প্রব্লেম, আমি দেখছি, ইউ গো।
বড় গুদামবাবু ফেরার পথে খুব বড় অভিমান বুকে নিয়ে হাঁটছিলেন। ওঁর মনে হচ্ছিল আর এখানে স্থির সুস্থ হয়ে কাজ করা যাবে না। যেখানে ম্যানেজারের কোনো মেরুদণ্ড নেই সেখানে কি করে শৃঙ্খলা থাকবে। এরপর হয়তো ওরা তার গায়েই হাত তুলবে একদিন।
কথাটা তিনি সেদিনই বাবুদের ক্লাবে গিয়ে তুললেন। অবশ্য একজন কুলি এ ধরনের কথাবার্তা বলেছে তা চাউর হয়ে গেছে তার আগেই। অন্যান্য কুলিরা বেশ মজা পাচ্ছে। রেতিয়া ওদের কাছে হিরো হয়ে যাচ্ছে এখন। তাই বড় গুদামবাবু বলার আগেও অন্যান্য বাবুরা একথা জেনেছেন।
মালবাবু বললেন, একি হল মশাই! ওদের বাপ-কাকারা কত ভালো লোক ছিল আর এরা তো ভাবিয়ে তুলল দেখছি।
পাতিবাবু বললেন, বুড়োরা ভাল ছিল, ছেলেছোকরাগুলোই ওদের খ্যাপাচ্ছে। সাহেব যদি এখনই স্টেপ না নেয় তাহলে আর দেখতে হবে না।
টাইপবাবু বললে, আস্পর্দা দেখে গা জ্বলে যায়। ছিলি ছোটনাগপুর হাজারীবাগে না খেয়ে, এখানে থাকতে দিয়েছি বলে মাথায় উঠবি।
মালবাবু বললেন, বাঙালি মশাই সর্বংসহা জাত। এই যে ছয়-সাত লাখ বাইরের লোক এখানে জুড়ে বসেছে তা নিয়ে কারো চিন্তা নেই। এখানে রয়েছে অথচ আমাদের সম্পর্কে কোনো ফিলিংস নেই। বাংলাদেশের কোন উপকারে লাগবে এরা? এই যে শুনি, লাখ লাখ বাঙালি ছেলে বেকার হয়ে রয়েছে। তারা যদি এসে এদের কাজ শুরু করে তাহলে তোরা কোথায় যাবি?
বড় গুদামবাবু বললেন, বাঙালিরা কখনই খাটনির কাজ করবে না, তাই এদের প্রয়োজন হবেই। কিন্তু একটা কিছু করা দরকার।
টাইপবাবু নিচু গলায় শুধোলেন, সাহেবের মতলব কী?
বড় গুদামবাবু জানালেন, বোঝা গেল না!
টাইপবাবু বললেন, আমাদের য়ুনিয়নে এই পয়েন্টটা তুলতে হবে। আসলে বোনাসের লোভ দেখিয়ে ব্যাটাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছে। কি আবদার, বিশ পার্সেন্ট বোনাস চাই! কেউ দেয়? দিয়েছে কখনো। আমাদের য়ুনিয়ন অনেক লজিক্যাল, দশ পার্সেন্ট চাই।
মালবাবু বললেন, বেশি চাইলে অবশ্য ক্ষতি ছিল না কিছু।
যেটা পাওয়া যাবে না সেটা চাইলে কী লাভ? আকাশের চাঁদ চাই! কথাটা বলেই গলা নামালেন টাইপবাবু, একটু সাবধানে থাকবেন। আমরা মোটে পনেরোজন বাঙালি আর ওরা পনেরোশো।
মালবাবু বললেন, আমি ভাবছি ফ্যামিলি বাইরে পাঠিয়ে দেব।
বড় গুদামবাবু বললেন, আমরা পশ্চিম বাংলায় বসে এসব কথা বলছি, কি দুর্ভাগ্য বলুন। এরপর বাঙালি জাতুটার নাম মুছে যাবে।
পাতিবাবু চুপচাপ শুনছিলেন এতক্ষণ, হঠাৎ মনে পড়ে যেতে বললেন, আচ্ছা ছোটসাহেব লোকটার ব্যাপারটা কী বলুন তো, বাজারে কারখানা খুলে বসে আছে আর কুলিকামিনদের সঙ্গে গল্প করছে। বাঙালি বলেই বোধহয় এরকম অধঃপতন হয়। লোকটা যখন সাহেব ছিল তখনো কিরকম অ্যাবনরম্যাল বিহেভ করত।
এক মাসের নোটিস দিয়েছে লেবার য়ুনিয়ন। কোম্পানি যদি বোনাসের দাবি মেনে না নেয় তাহলে ধর্মঘট হবে। প্রচার চলছে লাইনে লাইনে। নেতারা এখন প্রায় সারাদিন ওদের মধ্যে রয়েছেন। সাহেব কোলকাতার সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগ করেও কোনো রফায় আসতে পারছেন না। সিরিলের কথাটা এখন স্লোগান হয়ে সবার মুখে মুখে, ইয়ে বাগান হামারা হ্যায়–মালিকের লাভ আমাদেরও লাভ। এক মাসের নোটিশ কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রোডাকশান ফল করতে আরম্ভ হয়েছে। কারোরই কাজে মন নেই। যত দিন যাচ্ছে তত বাবুরা হুকুম করার মুখ সেলাই করছেন। বাবুয়ুনিয়ন ঘোষণা করেছে লেবার য়ুনিয়নের এই দাবির সঙ্গে তাদের কোনো যোগ নেই। দরকার হলে তারা পৃথকভাবে আন্দোলন করবে। খবরটা শ্রমিকদের মধ্যে ছড়ানো মাত্র আগুন জ্বলল। সন্ধেবেলায় বাবুদের ক্লাব ঘেরাও করল সিরিলরা। জনা বিশেক লোককে উত্তেজিত হয়ে আসতে দেখে টাইপবাবু থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলেন। তার বাড়ি কোলকাতায়। কোনো রকমে যে কথাটা। বললেন তা হল, বিদেশ-বিভুইয়ে চাকরি করতে এসে পৈতৃক প্রাণটা হারালাম মশাই, কী হবে!
বড় গুদামবাবু গাম্ভীর্য বজায় রেখে চাপা গলায় ধমকালেন, বিদেশ-বিভুঁই কি বলছেন, এটা তো পশ্চিম বাঙলাই।
বাইরে স্লোগান উঠছিল, মালিকদের দালাল হুঁশিয়ার, হামারা লড়াই রুটিকা লড়াই। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হলে সিরিল আর রেতিয়া ভেতরে ঢুকল। বাবুরা তখন তাস, দাবা ফেলে এক জায়গায় জড়ো হয়ে রয়েছেন। সিরিল বলল, আপনাদের সঙ্গে আমাদের কথা আছে।
এদিন বড়বাবুও ক্লাবে ছিলেন। যথেষ্ট ব্যক্তিত্ববান মানুষ। চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুই? টাইপবাবু ফিসফিসিয়ে বললেন, মাংরা সর্দারের ছেলে সিরিল।
বড়বাবু বললেন, মাংরা সর্দার—মানে শুকরা বুড়োর নাতি! অ। তোর সঙ্গে কি কথা বলব। তোর বাপ-ঠাকুর্দাকে পাঠিয়ে দে।
এটা আমাদের ব্যাপার, ঠাকুর্দার নয়। সিরিল দাঁতে দাঁত চাপল।
তোর বাপও তো এখানে কাজ করে। বড় গুদামবাবু এবার কথা বললেন।
আমার ঠাকুর্দাকে তো আপনার চাবকাতেন, বাবাকে চোখ রাঙিয়ে পায়ের তলায় রেখেছিলেন তাই ওদের এখন আর আপনাদের সামনে আমাদের জন্যে আসতে দিতে পারি না। আমরাই কথা বলব। সিরিল একটু এগিয়ে চেয়ারে হাত রাখল। ওখানে বসবে কি বসবে না এই দোলায় দুলছিল সে।
বড়বাবু মাথা নাড়লেন, ঠিক আছে, কী বলবি বল?
সিরিল বলল, আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন কি না বলতে হবে।
বড়মাবু নাক কুঁচকালেন, আমরা তো এক সঙ্গেই আছি। তোর বাপঠাকুর্দা এক সময় আমার বাড়িতে কাজ করে গেছে–এ আর নতুন কথা কী!
সিরিল চিৎকার করে উঠল, বোনাসের আন্দোলনে আপনারা বাবুরা আমাদের সঙ্গে ধর্মঘট করবেন কি না স্পষ্ট করে খুলে বলুন।
বড়বাবু বললেন, সেটা আমাদের য়ুনিয়ন যা বলবে সে-মত করব।
রেতিয়া বলল, আপনাদের য়ুনিয়ন তো থাকবে না বলেছে।
বড়বাবু বললেন, তাহলে তো আমরা য়ুনিয়নের নির্দেশ অমান্য করতে পারি না।
সিরিল বলল, বাঃ, আপনারা সাহেবের সঙ্গে দোস্তি করবেন তাহলে?
বড়বাবু হাত তুলে কথা শেষ করতে চাইলেন, যা বলার বলা হয়ে গেছে।
সিরিল বলল, কিন্তু ব্যাপারটা একটু ভাবলে ভাল করতেন।
বড় গুদামবাবু বললেন, কি! চোখ রাঙাচ্ছিস!
টাইপবাবু বললেন, জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে দিতে হয় হারামজাদাদের। ছোটলোক ছোটলোকের মত থাকবি।
কথাটা গরম সীসের মতো সিরিলের কানে ঢুকতেই পাগল হয়ে গেল। একলাফে টাইপবাবুর টুটি টিপে ধরতে সে হাত বাড়াল। রেতিয়া চিৎকার করছে, বাবুরাও সমানে চেঁচাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ সিরিলকে টাইপবাবুর সামনে থেকে সরিয়ে ফেলতে চাইছেন। বাইরের লোকজন আসল ব্যাপার না বুঝতে পেরে হই হই করে তেড়ে আসছিল। এই সময় একটা গাড়ি অন্ধকার হেডলাইটে চিরতে চিরতে সামনে এসে দাঁড়াল। বাবুরা কাঁপতে কাঁপতে দেখলেন ছোট সাহেব কখন ঘরে ঢুকে সিরিলের কাধ ধরে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দিচ্ছে।
সিরিল প্রতি আক্রমণ করতে গিয়েও পারল না। ছোটসাহেব চাপা গলায় ধমকাল, কী আরম্ভ করেছিস তোরা, ছি ছি ছি। সিরিল তেড়ে উঠল, এ শালারা সাহেবের দালালি করছে আবার সেকথা বলতে আমাদের গালিগালাজ দিচ্ছে।
যাই করুক, তোর বাড়ি গিয়ে করেছে? ছোটসাহেব ওদের বের করে আনছিল। এতক্ষণে বড়বাবু একটু ধাতস্থ হয়েছেন। তার গলা শোনা গেল, একদম দৈহিক আক্রমণ, থানায় রিপোর্ট করতে হবে, ছোটসাহেব আপনি সাক্ষী থাকবেন!
ছোটসাহেব তখনও সিরিলের হাত ধরে ছিল, এসব ঝামেলা কেন করতে যাচ্ছেন।
ঝামেলা? একি কথা বলছেন স্যার! ওরা, এতবড় আস্পদা যে আমাদের গায়ে হাত তুলতে আসে? আপনি এটাকে সমর্থন করছেন? বড়বাবুর চোখ কপালে।
না। সমর্থন করিনি বলেই খবর পাওয়া মাত্র ছুটে এসেছি। প্রাইভেট প্রোপারটিতে এভাবে আমার ঢোকা উচিত নয় জেনেও এসেছি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখা উচিত, আত্মসম্মানবোধ আমাদের যেমন আছে ওদেরও আছে। সেখানে হাত দিলে এরকম হতেই পারে।
বড়বাবু হাসলেন, আপনি তো কয়েকটা বছর চা-বাগানে কাজ করেছেন। এখনও যদি চাকরিতে থাকতেন তাহলে আমি এভাবে কথা বলতে সাহস পেতাম না। সেটাই ভদ্রতা। এদের আপনি চিনবেন কোত্থেকে। দে হ্যাভ নো মর্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড। ফ্রান্সিসবাবু বাবু হয়েছে, কিন্তু এখনও বাড়িতে হাঁড়িয়া খায়।
টাইপবাবু ফোড়ন কাটলেন, উনি তো এখন লেবারদের বন্ধু, বাঙালির নাম ডুবিয়েছেন।
জ্বলে উঠল ছোটসাহেবের চোখ। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, আমি তার জন্যে গর্বিত। এই চা বাগানে আপনার মত বাবু পয়সা ফেললেই পাওয়া যায়। কিন্তু ওরা যদি হাত গোটায় তাহলে চা-ইন্ডাষ্ট্রি বন্ধ হয়ে যাবে। এসব কথা বাদ দিন, সরলতা বস্তুটা তো উধাও হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে থেকে। সেটা এখনও এদের মধ্যেই দেখা যায়। অনুরোধ, এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করবেন না।
বাইরে বেরিয়ে এসে ছোটসাহেব বললেন, তোরা এখানে এসেছিলি কেন?
রেতিয়া বলল, বাবুদের জিজ্ঞাসা করছিলাম হরতাল হলে ওঁরা আমাদের সঙ্গে আছে কিনা? তার উত্তরে যা-তা গালাগাল দিল।
ছোটসাহেব অন্যমনস্ক গলায় বলল, তোরা সত্যিই হরতাল করছিস?
সিরিল বলল, জরুর।
কেন করছিস?
বোনাসকে লিয়ে। নাফার ভাগ দিতে হবে।
কোম্পানি যদি না মেনে নেয় তাহলে কতদিন হরতাল করতে পারবি?
যব তক জিন্দা রহেগা–।
তাহলে ঠিক আছে। নিজেরা এক হ আর কে কী করল তাতে তোর কী দরকার। নিজেরা ঠিক থাকলেই হল। যা যে যার বাড়ি ফিরে যা।
ছোটসাহেব যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল বাজারের রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে। বাবুদের ক্লাবের আলো জানলা দিয়ে তখনও অন্ধকারে নাচছে। সিরিলরা ঘেন্নার চোখে সেদিকে তাকিয়ে বড় রাস্তায় চলে এল। দলটা ভেঙে গেল, খেলাটা জমল না বলে অনেকেরই আফসোস হচ্ছে এখন। ছোটসাহেবটা না এলে জব্বর হত। বেশির ভাগই চলে গেল ভাটিখানার দিকে। দুপাশের লম্বা লম্বা গাছগুলোর বুকে মাঝে মাঝে আলো চলকে উঠছে। অন্ধকার রাত্তিরে এই আলোর মানে ওরা জানে। সিরিল আর রেতিয়া চুপচাপ হেঁটে এল একটা বড় দেবদারু গাছের তলায়। সেখানে হাফপ্যান্ট পরা দুটো বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের দেখে তারা অন্ধকারেই সাদা দাঁত দেখাল। তারপর একজন চট করে ওপরের ডালে টর্চের ফোকাস ফেলতেই অন্যজন দ্রুত গুলতির লক্ষ্য স্থির করল। সিরিল মাথা উঁচিয়ে দেখল। অনেক ওপরের একটা সরু ডালে বাদুড়টা ঝুলছে। তার চোখ টর্চের আলো পড়ায় তা জ্বলছে। হতভম্ব হয়ে সে নিচের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছে। ব্যাপারটা কি এবং আলোর ঝলকানিতে কয়েক মুহূর্তের জন্যে বোধ হয় তার বোধও অসাড় হয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণেই শন করে শব্দ হওয়া মাত্র সিরিল বাদুড়ের মুখটাকে নড়বড়ে হয়ে যেতে দেখল। সুইচ টিপে টর্চের আলোর সুতো গুটিয়ে নিয়েই ছেলেটা নিচে মাটিতে আলো ফেলল। অন্যজন দ্রুত গিয়ে ধপাস করে পড়া বাদুড়টাকে তুলে নিল তার কাঁধের ঝোলায়। বেশ ভারী ওটা তা তোলার সময়েই বোঝা গেল। ছেলে দুটো নির্বিকার, পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ না করে অন্য একটা গাছের দিকে নিঃশব্দে পা বাড়াল ওরা। রেতিয়া বলল, ফার্স্টক্লাস হাত। আধা কিলো হবে।
লাইনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সিরিলের চোখে বাদুড়ের জ্বলন্ত চোখ দুটো বার বার ফিরে আসছিল। আঃ, যদি এমনি করে ওরা গুলতি দিয়ে একটিপে সব বাদুড়দের নামিয়ে আনতে পারে– তাহলে কি ভোজটাই না লাইনে হবে। মুশকিল হল সে নিজে যে এসব মাংস খায় না।
.
মাংরা সর্দারের নিশ্চিত ধারণা শুকরা বুড়োর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। বয়স হলে এরকম হয়। নইলে সে যেখানে আপত্তি করছে সেখানে তার বাপ হয়ে ওরকম রায় দেয়। সেদিন রাগের মাথায় সে বাপকে বলেছিল এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবে টেবুয়াতে। বাপ খুশি হয়েছিল। আর তারপর থেকেই ট্যাঙস ট্যাঙস করে পেছনে লেগেই আছে, কবে যবি কবে যাবি শুনতে কান ঝালাপালা। মাংরা সর্দার মন ঠাণ্ডা হলে ভেবে দেখেছে চলে যাওয়ার কোনো মানে নেই। জন্মস্থান বা দেশ তো হয়েছেটা কী! এই পরিচিত গণ্ডি থেকে অন্য কোথাও যেতে তার ভীষণ ভয়। এখানে তার এখনও হুকুম করার ক্ষমতা আছে সেটা হারাবে কেন? ছেলেকে সে দূর করে দিয়েছে। কদিন এখানে ওখানে ঘুরঘুর করে মেয়েটাকে নিয়ে ঘর বেঁধেছে সিরিল। খবর রাখে সে, বউটা যে ছেলের ঘরে যায় তাও জানে। একদিন নিরিকে দূর থেকে দেখেও ছিল, ভারী পেট নিয়ে হাঁটলেও বেশ ভালই দেখাচ্ছিল। মন নরম হতে দেয়নি মাংরা। অপমান ভোলা সম্ভব নয়, আসুক না নাতি।
অপমানের কথা উঠলেই বউটা অবশ্য তাকে তাতিয়ে দেয়। বেড়ালের থাবার নখ গজালে মাটিতে আঁচড়াবেই। আর সে মাটি নরম হয় তো বেড়ালের দোষ কী! জোয়ান ছেলে অমন সোমখ মেয়েছেলে পেলে কি আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে? লাইনে কি এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি? তার কটা বিয়ে-থা হয়েছে? অপমান যদি কেউ করে থাকে তো ওই মাটিতে যেতে বসা বুড়োটা। ওই তো যত নষ্টের গোড়া। শুকরা বুড়ো যদি ওরকম রায় না দিত তাহলে কি আর ছেলে পর হয়ে যেত। বউ বলে, নিজের বাপকে না বলে ছেলেকে শাসন করছে মাংরা সর্দার।
কথাটা যে নিজেরও মনে হয়নি তা নয়। কিন্তু ওই বুড়ো মানুষটা তাকে জন্ম দিয়েছিল। তাকে বড় করেছে, হাত ধরে কাজে ঢুকিয়েছে। এই শরীরটা তাই সব দিক দিয়ে ওই মানুষটার কাছেই ঋণী। কি করে লোকটাকে সে বলবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। তাছাড়া এই তল্লাটে, জানাশোনা সব মানুষের মধ্যে ওর চেয়ে বেশি বয়স আরো কারো হয়নি। লোকে তাই ওকে চেনে, নাম বলে। সে যদি মানুষটাকে অনাদর করে তাহলে লোকে তাকেই খারাপ বলবে। তাই বউ-এর কথায় কান দেয় না মাংরা সর্দার।
কাজ হচ্ছে না বাগানে। কারণ হরতাল হবে। সাহেব বেশি বোনাস দিচ্ছে না তাই কাম বন্ধ। সেটা শুরু হওয়ার আগেই কিন্তু সবাই কাজে ঢিলে দেওয়া শুরু করেছে। প্রথম প্রথম চেঁচামেচি করেছে, ভয় দেখিয়েছে কিন্তু ক্রমশ মাংরা সর্দার বুঝে গিয়েছে এসবে আর কাজ হচ্ছে না। মানুষের মনে যদি একবার বেয়াড়াপনা ঢুকে যায় তাহলে কোনো শাসনই কাজ দেয় না। বরং উলটে তাকেই কথা শুনতে হচ্ছে। রাত হলে তাই শুকরা বুড়োকে মাংরা সর্দার ঘরে নিয়ে আসে হাত ধরে। সুস্থ থাকুক কিংবা মাতাল হোক সে এই কাজটা করবেই। অবশ্য যে দিন শরীরটা আর মাটি ছেড়ে উঠতে চায় না সেদিন আলাদা কথা। আজ ওরা দল বেঁধে এসে দা নিয়ে গেল। ঝগড়া করেও ঠেকাতে পারেনি মাংরা সর্দার। হরতাল হবে তাই পাঁচ টাকা করে চাঁদা। টাকা তুলে য়ুনিয়নের বাবুদের হাতে জমা দেবে ওরা। হরতালের সময় সাহেব তো মাইনে দেবে না তখন ওই টাকা নাকি তাদেরই সাহায্যে খরচ হবে। সরল বিশ্বাসে সবাই যখন কষ্ট করেও টাকা দিচ্ছে তখন সে একা কতক্ষণ ঝগড়া করতে পারে। পাঁচটা টাকা মানে অনেক বোতল হাঁড়িয়া। দুঃখে শোকে বুক ফেটে যাচ্ছিল তার।
শুকরা বুড়ো ঝিমুচ্ছিল। সামনের চা বাগানের ওপর ঘন অন্ধকার। হিম বাতাস বইছে। এক রাশ মশা তাকে হেঁকে ধরলেও আজকাল কোনো হুঁস নেই, মশারা বোধহয় শুকনো চামড়ায় তেমন রক্ত পায় না। খিদে পাচ্ছে কিন্তু কেউ না ডাকলে সে ওঠে কী করে। এমন সময় ছেলে এল।
বাপ, ঘর চল। মাংরা সর্দার আজ নেশা করেনি।
ঘোলা চোখে তাকাল শুকরা বুড়ো। হ্যাঁ ছেলেই তো। তারপর দু হাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, মরে যাব বাপ। চা-পাতির গন্ধ পাচ্ছি না, আমি আর বাঁচব না। এখানে বসলেই আমি চা-পাতির গন্ধ পেতাম রোজ। আজ সকাল থেকে আর গন্ধটা নাকে আসছে না। সব পাচ্ছি শুধু ওটাই নেই। তুই আমাকে নিয়ে চল টেবুয়া, আর দেরি করিস না রে–। কান্নায় জড়ানো ঘড়ঘড়ে গলাটা আচমকা থেমে যেতে মাংরা সর্দার খুঁটিয়ে বাপকে দেখল। কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে, বুকটা নড়ছে ঘনঘন। হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল সে বাপকে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, দুদিন দাঁড়া বাপ। হরতালটা মিটে যাক, গোলমাল থেমে গেলে সাহেব বেশি টাকার বোনাস দেবে, তখন আমরা বেড়াতে যাব।
ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে দাঁড়িয়ে গেল শুকরা বুড়ো, হ্যাঁ। শুনলাম বটে, হরতাল হবে বাগানে। সব গেল, সর্বনাশ হয়ে গেল!
মাংরা সর্দার মাথা নাড়ল, তোমরা নাতিটা লিডার নেতা।
দূর করে তাড়িয়ে দেবে সাহেব। কার সঙ্গে লড়ছিস তুই, ওদের বন্দুক আছে, পুলিস আছে, গায়ের চামড়া সাদা আছে। মাথা কেটে মাটিতে ফেলে দেবে।
ঘাড় নাড়তে গিয়েও থমকে গেল মাংরা সর্দার, সব ঠিক বাপ কিন্তু এখন যারা সাহেব তাদের চামড়া সাদা নয়। আমাদের চেয়ে একটু কম কালো। শুকরা বুড়ো মাথা উঁচু করে খবরটা শুনল। তারপর বিরক্তির গলায় বলল, তা হোক, তবু তো ওরা সাহেব। ওরা না থাকলে তোরা খাবার পেতিস? সাদা সাহেবেরা ওদের কাছে তোদের দিয়ে গেছে। লোভ, লোভ বড় বেড়ে গেছে মানুষের, এই করে মরবি-বাগান পুড়ে ছারখোর হয়ে যাবে।
মাংরা সর্দার ফিসফিস করে বলল, সবাই যখন এক হয়েছে তখন আর আমি কী করব বাপ; যদি পয়সা পাওয়া যায় তো কপাল বলতে হবে।
হ্যাঁ বাপ। সিরিলরা গিয়েছিল বাবুদের দলে টানতে, ওরা হটিয়ে দিয়েছে।
তো ওরা সাহস পায় না আর তোরা লড়বি। আর লড়ার দরকারই বা কী। পেট ভরে খাবার হাঁড়িয়া আর এই বাতাস নাক ভরে নিলেই তো জীবনটা বেশ কেটে যায়। না, না, এসব আর চোখে দেখতে পারব না, তুই আমাকে নিয়ে চল।
বাপের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সর্দার নিশ্চিত হলো আর এখানে থাকা যায় না। বাপ যা বলে তা যদি ঠিক হয় তাহলে টেবুয়া তো স্বর্গের মত একটা জায়গা। সেখানে গেলে শান্তি যদি পাওয়া যায় তবে সে নিশ্চয়ই যাবে। অন্তত ওই অবাধ্য ছেলেটার মুখ সেখানে গেলে দেখতে হবে না। তবে কিনা হাতে কিছু পয়সা না জমলে যায় কি করে সে। ট্রেনের খরচ আছে, সেখানে গেলে তো আর লোকে মুখে খাবার খুঁজে দেবে না। তাই টাকা জমানো দরকার। যদি হরতাল ঠিকঠাক হয় তাহলে মাংরা সর্দার বাপকে শুইয়ে দিয়ে ঠিক করল বোনাসটা নিয়েই যাওয়া যাবে।
সবরকম আলোচনা বিফল হল। বাগানের অবস্থা থমথমে। পনেরোশো মদেসিয়া শ্রমিক তো আছেই আরো কিছু লোক বাইরে থেকে যাওয়া-আসা শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত ধর্মঘট শুরু হল।
এইরকম অভিজ্ঞতা এ বাগানের মানুষের কাছে প্রথম। সকালে উঠে ভোঁ শুনতে পাচ্ছে না কেউ। লাইন দিয়ে টুকরি পিঠে নিয়ে মেয়ে পুরুষ পাতি তুলতে বেরুচ্ছে না। ফ্যক্টরিটা দীর্ঘকাল বাদে নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছে। সকালে উঠে লোকে আলসেমি করতে পারছে বেশ, দিনভর আড্ডা, ঠিক ছুটি ছুটি মেজাজ। কিন্তু কাজ না থাকায় নেশাটা জমকালো হল। হাঁড়িয়ার খরচ বেড়ে গেল অনেকের। বাগানের চা পাতার ওপর ধুলো জমল। দিন সাতেকের মধ্যেই অনেক গাছ ঔদ্ধত্যে মাথা তুলল এপাশ ওপাশ। ফ্যাক্টরির গেট তালা দেওয়া। ছেলে মেয়েরা এই চেহারা দেখতে যাচ্ছিল লাইন থেকে দল বেঁধে। এরকম বিস্ময় ওদের জন্যে অপেক্ষা করে ছিল তো। যেন ধারণাও বাইরে। এমনকি যে বড় হুইলটা নদীর বুকে ঘুরে ঘুরে ফ্যাক্টরিকে সচল রাখতে তার গায়ে স্রোতে ভেসে আসা আবর্জনার স্তূপ জমছে। এত বড় বাগান সর্বঅর্থেই নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ।
সুনিয়ন অফিসে এখন প্রচণ্ড কর্মতৎপরতা। হরতাল শুরু হওয়ার পরই যেন বাগানের সব। দায়িত্ব ওদের কাঁধে এসে চেপেছে। নিয়মিত শ্রমিক থেকে আর্দালি খালাসি পর্যন্ত এই ধর্মঘটের আওতায়। তারা দিনরাত ওখান ভিড় করছে সাহেব কোনো খবর দিয়েছে কিনা জানতে। এই লোকগুলোকে বুঝিয়ে ঠিক রাখতে হচ্ছে। শহরের বাবুরা সিরিলদের বলে দিয়েছেন সাধারণ শ্রমিকদের মন বড্ড নরম। অল্পেই নার্ভাস হয়ে যায়। ওদের সাহস দিয়ে সঙ্গে রাখতে হবে। তাই সিরিলদের নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। এক সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই সবাই এসে হাত পাতা শুরু করল। য়ুনিয়ন যদি সাহায্য না করে তবে কারোরই হাঁড়ি চড়বে না। হপ্তার মাইনে পেলে যাদের পাঁচ দিনও চলে না তাদের পক্ষে এই অবস্থায় পড়া স্বাভাবিক। অনেক আলোচনার পর সিরিলরা ঠিক করল ব্যক্তিগতভাবে কাউকে টাকা দেওয়া হবে না। যে সংগ্রাম তহবিল ওরা সংগ্রহ করেছে তা থেকে প্রতি লাইনে দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হল। ধর্মঘট শুরু হবার পর সিরিল আবিষ্কার করল এতদিন বাদে মনে হচ্ছে এই চা-বাগান ওদের নিজেদের। এখন আর কারো হুকুম এখানে চলছে না। তারা যা বলবে তাই হবে যে জায়গায় তা কি নিজেদের দেশ নয়। ও জানে, শুকরা বুড়ো কিছুতেই এটা মানবে না। এই থুথুরে বুড়োর মাথায় যা ঢুকে আছে তার কোনো পরিবর্তন হবে না। আর এই ব্যাপারটা বাপের মাথাতেও কিছুটা আছে। ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর যারা সকালে কাজে গিয়ে বাধা পেয়ে ফিরে এসেছে তাদের মধ্যে বাপটাও আছে। এর মধ্যে একদিনও য়ুনিয়ন অফিসে আসেনি মাংরা সর্দার। সহকর্মীদের কাছে এর জন্যে নানান ঠাট্টা শুনতে হয়েছে সিরিলকে। কিন্তু সেই পঞ্চায়েতের রাতের পর বাপ আর তার সঙ্গে কথা বলে না। প্রথম প্রথম কেয়ার করত না সিরিল, এখন যেন মনটা কেমন লাগে। ধর্মঘটটা মিটে যাক তারপর একদিন সে একটা ব্যবস্থা করবেই।
দিনরাত খাটতে হচ্ছে বলে বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না সিরিল। ধর্মঘট শুরু হওয়ায় নিরির ভালই হয়েছে। কিন্তু যত সময় এগিয়ে আসছে ততই ঘ্যানঘেনে হয়ে উঠছে মেয়েটা। ঘরে গেলেই সিরিলকে আটকে রাখতে চায়। শরীরটাও ভাল নয়। বাচ্চা হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মেয়েদের সব সৌন্দর্য বোধহয় শুষে নেয় পেটের বাচ্চা। সিরিল চেয়েছিল বুকু সর্দারের বাড়িতে গিয়ে থাকুক নিরি বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু কেন যেন রাজি হয়নি মেয়েটা। জেদ ধরে আছে স্বামীর ঘরেই থাকবে সে কোথাও যাবে না আশেপাশের বুড়িদের বলে রেখেছে সিরিল কিছু হলেই খবর যেন য়ুনিয়ন অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মেয়েটার চোখের টান ভুলতে পারে না সে সময় সময়। ধর্মঘট চালু হওয়ার পরও হাসপাতাল খোলা ছিল ডাক্তারবাবু নার্স দুবেলা নিয়ম করে বসত। কিন্তু বাবুদের ব্যাপারটা ঘটতেই সেটা বন্ধ। নিরির যদি তেমন কিছু হয় তাহলে–ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় সিরিলের। শালা, এই একটা ব্যাপার কিছুতেই গায়ের জোরে সমাধান করা যায় না।
Chapter - 4
৪.
বাবুদের ব্যাপারটা হঠাৎ ঘটে গেল। ধর্মঘটের আগের রাতে ওরা ঠিক করেছিল, লেবার য়ুনিয়ন যখন ধর্মঘট করছে তখন বাবুদের কাজে যেতে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। ফ্যাক্টরি না চললে গুদামবাবুরা বেকার, পাতি না তোলা হলে পাতিবাবুর কিছু করার নেই। ওরা কজন অফিসে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকলে তাদের আর কি ক্ষতি হবে। প্রথম দু-তিন দিন সেইমত কাজ হচ্ছিল। বাবুরা নিয়ম করে সকাল বিকেল সাইকেলে করে অফিসে গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসছিল। শুধু হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও কাজ হচ্ছিল না তখন।
কিন্তু গোলমালটা বেধে গেল এখানেই। সাধারণ লোক দেখছিল বাবুরা বেশ হাসতে হাসতে যাচ্ছে আর আসছে। কাজ না করেও ওরা মাসের শেষে মাইনে নেবে। আর ধর্মঘট করার জন্য শ্রমিকরা মাইনে পাবে না। কথাটা কানাকানি হতে লাগল দ্রুত। মানুষ নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারে কিন্তু অন্যের সুখ চেয়ে দেখা আরো কষ্টকর। য়ুনিয়ন অফিসে শ্রমিকরা এসে ভিড় করল। বাবুদের অফিস যাওয়া বন্ধ করতে হবে। চাপ বাড়াতে লাগল ক্রমশ। য়ুনিয়ন ফুনিয়ন বুঝি না, বাবুরাও নোকর আমরাও নোকর, দুজনের ভাগ্য আলাদা হবে কেন? নেতারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিল যে বাবুদের অনুরোধ করা হবে যেহেতু শ্রমিকরা উত্তপ্ত তাই বাবুরা যেন এই কয়দিন অফিসে না যায়। সিরিল গেল ফ্রান্সিসের মাধ্যমে বাবুদের খবরটা দিতে।
কোয়ার্টারের বারান্দায় ফ্রান্সিস বসেছিল খালি গায়ে। সিরিল দেখল যতই ও বাবু হোক চেহারাটা একটুও পালটায়নি। সিরিলকে দেখে যেন খুশি হল ফ্রান্সিস। হেসে বলল, খুব খেল শুরু করেছিস তোরা। সাহেব ঘাবড়ে গেছে এখন।
সাহেবের কোনো প্রতিক্রিয়া জানত না সিরিল। মেজাজে পাইপ মুখে গাড়ি চালিয়ে ক্লাবে যায় যেন কিছুই হচ্ছে না বাগানে। ফ্রান্সিসের কথা শুনে জিজ্ঞাসা করল, কেন, কী বলছে সাহেব?
বলবে আবার কি, মাথায় বাজ পড়েছে। বিরাট একটা এক্সপোর্ট অর্ডার পেয়েছে কোম্পানি। চল্লিশ দিনের মধ্যে দিতে হবে। এদিকে তোদের জন্য প্রোডাকশন বন্ধ। অর্ডারটা ফিরিয়ে দিলে বদনাম তো বটেই প্রচুর লস হয়ে যাবে।
তাই যদি হয় আমাদের বোনাস দিয়ে দিক, কাজ হয়ে যাবে।
এখন লড়াই হচ্ছে। আর কি পেছনে ফেরা যায়!
সিরিল লক্ষ্য করল ফ্রান্সিস হেসে কথা বললেও তাকে বসতে বলছে না। তাদের আন্দোলন সমর্থন করছে হাবেভাবেও, কেন? ফ্রান্সিস সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, হঠাৎ কী মনে করে?
সিরিল তখন য়ুনিয়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনুরোধটা ফ্রান্সিসকে জানাল। ফ্রান্সিস যেন অবিলম্বে বাবুদের জানিয়ে দেয়।
ফ্রান্সিসের ভুরু কুঁচকে গেল, তোরা কি ভয় দেখাচ্ছিস?
ভয় না। পাবিলক খেপে গেলে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে। সিরিল ঠাণ্ডা গলায় বলল।
ফ্রান্সিস মুখ বেঁকিয়ে বলল, তোদের যুনিয়ন হরতাল করছে, নাফা করবি তোরা, আমাদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক!
সিরিল ফ্রান্সিসের মুখটা একবার দেখে গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, নাফা শুধু আমরা একাই করব না। সাহেব বোনাস দিলে শুধু আমাদের দেবে না, তোমাদেরও দেবে। আমাদের কথা বলে গেলাম এখন বাবুদের বলো তারা যা ইচ্ছে হয় করুক।
খবরটা পেয়েও গুরুত্ব দিল না বাবুরা। য়ুনিয়ন হুকুম করল যে সব মদেসিয়া ছেলে বাবুদের কাজ করে তাদের অবিলম্বে লাইনে ফিরে আসতে। বাবুরা সব একসঙ্গে গিয়ে সাহেবকে ধরল একটা বিহিতের জন্যে। সাহেব সাফ বলে দিলেন হাজিরা না দিলে মাইনে কাটা যাবেই। এসময় কোনোরকম ছুটি মঞ্জুর করা সম্ভব হবে না। তবে দুবেলা আসবার বদলে একবেলা এলেই কাজ হবে। কথাটা শোনার পর মাইনের লোভ ছেড়ে তিনজন বাবু ফ্যামিলি নিয়ে জলপাইগুড়ি চলে গেল। টাইপবাবু তাদের একজন। প্রাণে বাঁচলে আবার চাকরি করতে আসা যাবে। কিন্তু যাঁরা। দীর্ঘকাল এখানে কাজ করছেন তারা ব্যাপারটাকে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। এতদিন যাঁদের ওরা হুকুম দিয়ে এসেছেন, মাথা নিচু করে যারা সে হুকুম পালন করেছে তারা কখনই তাদের। অপমান করতে পারে না। তবে ঠিক হল, সাইকেলে নয়, পায়ে হেঁটে ওঁরা দল বেধে হাজিরার জন্যে অফিসে যাবেন।
সাধারণত দিনে তিনবার কোয়ার্টার আর অফিস করতে হয় বাবুদের। সেদিন সকাল সাতটা নাগাদ সবাই দল বেঁধে অফিসে চললেন। এরকম অভিজ্ঞতা ওঁদের কাছে নতুন। দীর্ঘকাল ধরে সাহেবের স্নেহ পাওয়ার জন্যে পরস্পরের মধ্যে একটা চাপা রেষারেষি রয়েছে যার জন্যে এ ওকে দেখতে পারেন না। কিন্তু এই রকম বিপদের সময় ওঁরা সেসব মনে রাখতে চাইছেন না।
মাথার ওপর পাখি ডাকছে, গায়ে কচি রোদ মাখতে মাখতে ওরা চায়ের গাছগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে এলেন। না, কেউ তাদের বাধা দিতে এল না। নিজেদের কাল্পনিক ভয় নিয়ে ওরা অফিসে বসে রসিকতা করছিলেন। এখন অফিস ঘরে বসলে চারপাশে অস্বাভাবিক লাগে। ফ্যাক্টরির সেই একটানা শব্দ কানে আসছে না, নদীর ওপর হুইলটাও নিঃশব্দ। আশেপাশে কোথাও একটা কুলি নেই, এমনকি এক গ্লাস জল খেতে হলে বাবুদের নিজেদের তার ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে সাহেব এসে কিছুক্ষণের জন্যে ঘুরে গেলেন। বাবুরা তাকে ধরলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে বাবুদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা তার পক্ষে করা অসম্ভব। পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। দু-একদিন মধ্যে ফয়সালা না হলে লকআউট ঘোষণা করা হতে পারে।
সাহেবের মুখে এই কথা শোনার পর বাবুরা সত্যিকারের আতঙ্কিত হলেন। দুপুরের খাওয়ার সময় যখন তারা দল বেঁধে ফিরে আসছেন তখন মিছিলটাকে চোখে পড়ল। উলটো দিকে রাস্তা। ধরে স্নোগান দিতে দিতে আসছে। ওঁদের দেখতে পেয়ে মিছিলটা যেন আচমকা উত্তেজিত হয়ে উঠল। বাবুরা দেখলেন মিছিলের কেউ কেউ তাদের আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। যে ভঙ্গিতে ওরা চা বাগানের ভেতরে হিংস্র জন্তু চোখে পড়লে সবাইকে আঙুল দিয়ে দেখায়। কিছু বলার আগেই দুজন বাবু ছুটতে শুরু করলেন, তাঁদের দেখাদেখি অন্যান্য বাবুরাও পা চালালেন। বাবুদের কাছে। এইরকম দৌড় স্বপ্নাতীত কারণ তাদের শরীর বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। পেছনের হল্লাটা বাড়ছিল। চিৎকার সঙ্গে সঙ্গে আমোদ পাওয়া উল্লাস ওঁদের কানে আসছিল। কোনো রকমে অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায় ওঁরা কোয়ার্টারে ফিরে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন না। যে যা পারলেন দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে সপরিবারে বাগান ছাড়বার জন্য পা বাড়ালেন। প্রত্যেকেই অনুভব করলেন এতদিনের বিশ্বাস আজ অচল হয়ে গেছে। কুলিদের উল্লাস তাদের মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। পোঁটলাপুটলি বেঁধে ওঁরা কোয়ার্টারগুলো ছেড়ে হাইওয়েতে ওঠা মাত্রই কালো কালো মাথাগুলোকে দেখা গেল। বন্যার ঢেউএর মত তেড়ে আসছে হইহই করতে করতে। সমস্ত কুলি লাইন যেন ভেঙে পড়েছে। বাবুদের কোয়ার্টারের সামনে। তাদের পালাতে দেখে ওরা হইহই শব্দে হাতের লাঠি উঁচিয়ে ধাওয়া করল। বড়বাবু তার বিশাল ভূঁড়ি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে দেখলেন তাদের এত বছরের গৃহিণী হরিণের মত ছুটছেন। অন্যান্য বাচ্চাদের চিৎকার কান্নার মধ্যে দিয়ে ওঁরা প্রাণের ভয়ে ছুটতে ছুটতে বাগানের সীমানা পেরিয়ে খাসমহলের জমিতে প্রবেশ করলেন। এদিকে কুলিরা প্রথমে নিছক উল্লাসে পেছন-ধাওয়া করেছিল কিন্তু কেউ কেউ সেটাকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ হিসেব গ্রহণ করল। যতই দুপক্ষের মধ্যে দুরত্ব কমে আসছিল ততই উত্তেজনা বাড়ছিল। এর মধ্যে কেউ কেউ বাবুদের উদ্দেশে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে দিয়েছে। ছোট গুদামবাবু সস্ত্রীক এই দলে আছে। তার ছোটা স্বচ্ছন্দ হলেও স্ত্রীর জন্যে তাকে পিছিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আচমকা একটা পাথর এসে তার পিঠে পড়তেই যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল ছোট গুদামবাবু। কিন্তু সেদিক নজর দেবার সময় কারো নেই। দিশেহারা অবস্থা তখন সবায়ের। ঠিক এই সময় বাবুদের চোখে পড়ল ওঁরা ছোটসাহেবের কারখানার সামনে এসে পড়েছেন। হই হল্লা শুনে ছোটসাহেব বাইরে বেরিয়ে এসে এই দৃশ্য দেখতে পেয়েই চিৎকার করে ওঁদের কারখানার ভেতরে ঢুকতে বললেন। যেন হঠাৎ মরূদ্যান দেখতে পেয়েছেন এই ভঙ্গিতে বাবুরা পিল পিল করে সপরিবার কারখানার মধ্যে ঢুকে পড়তেই ছোটসাহেবের নির্দেশে দরজা বন্ধকরে দেওয়া হল। বাইরে তখন প্রবল চিৎকার। কারখানার ওপর পাথর বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। ছোটসাহেব চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাদের কারো কিছু হয়নি তো! বড়বাবু বললেন, আর কী হবে, সর্বনাশ হয়ে গেল। আমাদের কুকুরের মত তাড়িয়ে নিয়ে এল। ওঁর গলাটা কান্নায় বুজে গেল।
ছোটসাহেব হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে বললেন, আপনারা সবাই নিশ্চিন্তে এখানে বিশ্রাম নিন, আমি ওদের বুঝিয়ে বলছি। একপাশে ফ্রান্সিস জামা খুলে স্ত্রীকে পিঠ দেখাচ্ছে। পাথরের ধারে পিঠ কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা। ছোটসাহেব এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই ফ্রান্সিস দুর্বল গলায় বলল, চোঙাসে খুন নিকলায়। সবাই ফ্রান্সিসের কালো চকচকে পিঠটা দেখছিল। বড়বাবু বললেন, নিজের জাতভাইকে যদি এই অবস্থা করে তাহলে আমাদের যে কী করবে ভাবাই যায় না। দিনকাল যে কি হল, বাগানের মালিক যেন ওরাই!
ছোটসাহেব অন্যমনস্ক গলায় বললেন, জাত তো এখন দুটো। তারপর পাশের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
.
কারখানার দরজার উপর তখন লাথি পড়ছে। মরিয়া হয়ে গেছে মুখগুলো। বাবুরা ডরপুকের মত এখানে লুকিয়ে আছে তাদের টেনে বের করতে হবে এইরকম একটা জিদ সবার মনে। আচমকা ছোটসাহেবকে দেখতে পেয়ে চিৎকারটা থমকে গেল। কিন্তু তারপরেই একজন ছুটে এসে দাবি জানাল, শালাদের বের করে দাও, দালালদের আমরা উচিত শিক্ষা দেব। কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই সবাই হইহই করে ছোটসাহেবকে ঘিরে ধরল। ছোটসাহেব উত্তেজিত মুখগুলো দেখছিলেন। এদের সঙ্গে এখন যুক্তি দিয়ে কথা বলে কোনো লাভ হবে না। বেশি ভাগ মুখই অপরিচিত। এই সময় তার চোখ পড়ল সিরিল আর রেতিয়ার দিকে। দুজনে একপাশে দাঁড়িয়ে কিছু পরামর্শ করছে। চিৎকার করে সিরিলকে ডাকতেই সে এগিয়ে এল। তারপর দু পা ফাঁক করে অমিতাভের মত পোজ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুই আমাদের বন্ধু না শত্রু?
কেন?
বন্ধু হলে দরজা খুলে দে।
দরজা খুলে দিলে কী করবি? ছোটসাহেব চোখের দিকে তাকালেন।
আমরা বদলা নেব। দালালদের শিক্ষা দেব।
সেটা করলেই তোদের ধর্মঘট সার্থক হবে?
সিরিল থমকে গেল প্রশ্নটা শুনে, কিন্তু পরক্ষণেই বলে উঠল, তুই ওদের বাঁচাচ্ছিস?
না, আমি তোদের বাঁচাচ্ছি। আজকে ওই কটা লোককে মারবি তোরা কিন্তু তারপর এই বাগান হয়তো চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। তখন খাবি কী? নিজেরা যে জন্যে ধর্মঘট করছিস সেটা সার্থক কর, এদের গায়ে হাত তুলে কী লাভ? দেখছিস তো এর মধ্যেই ওরা ভয়ে কেঁচো হয়ে গেছে। ছোটসাহেব বোঝালেন।
ভিড় থেকে একজন চিৎকার করে উঠল, ওসব কথা শুনছি না, দালালদের খুন চাই।
ছোটসাহেব বললেন, ঠিক আছে। মনে রাখিস এটা বাগানের জমি নয়। এখানে যদি কোনো হামলা হয় তবে তা ডাকাতি হবে। আর আমাকে খুন না করে কেউ দরজা খুলতে পারবে না। তোরা যদি চাস তবে তাই কর।
কথাটা শোনামাত্র গুঞ্জন উঠল চারধারে। যে উত্তেজনা নিয়ে একদল পালিয়ে যাওয়া লোকের পেছনে ছোটা যায় সেই উত্তেজনা এরকম ঠাণ্ডা গলায় বলা মানুষের সামনে দাঁড়ালে থাকে না। কেউ কিছু যখন স্থির করতে পারছে না তখনই সাঁই সাঁই করে একটা ঢিল ছুটে এল পেছন থেকে, এসে ছোটসাহেবের কপালে আছড়ে পড়তেই চিৎকার করে কপাল চেপে ধরলেন তিনি। দরদর করে রক্ত গড়িয়ে এসে জামা কাপড় ভিজিয়ে দিল তার। কুলিরা এমন হতভম্ব হয়ে গেল যে কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। রক্তে ছোটসাহেবের মুখ ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় লোকটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। সিরিল ছুটে গেল ওর কাছে। তারপর একটানে নিজের জামাটা খুলে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল, যে শালা ঢিল ছুঁড়েছে তাকে ধরে আন এখানে।
হইহই করে ভিড়টা তালগোল পাকিয়ে গেল। তার মধ্যে দেখা গেল একটা শরীর তিরের মত উলটো দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। কয়েকজন তার পেছন তাড়া করলেও শেষে ধরতে না পেরে ফিরে এল। পিছু ধাওয়া করার চেয়ে এখানেই বেশি আকর্ষণের নাটক আছে যা ছেড়ে যেতে ওদের মন চাইছিল না।
ছোটসাহেবকে নিয়ে সিরিল রেতিয়া পাশের ডাক্তারখানায় এল। অনেকটা গর্ত হয়েছে। ডাক্তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে বললেন, এটা পুলিস কেস হতে পারে, থানায় খবর দেওয়া দরকার। ছোটসাহেবের মাথায় সাদা ব্যান্ডেজে লাল ছোপ, বলল, না, তার দরকার নেই। আপনাকে অনেকে ধন্যবাদ।
সাহায্য চাইছিল না ছোটসাহেব কিন্তু সিরিলরা কিছুতেই ওকে ছাড়ল না। ধরে ধরে নিয়ে এল কারখানার ওপরের ঘরে। চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে সিরিল বলল, তোর জন্যে এবার ওরা বেঁচে গেল। আমি সবাইকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু তুই ওদের বলে দিস যেন হরতাল শেষ হবার আগে কেউ যেন বাগানে না যায়।
আচমকা এতবড় নাটকের এইরকম পরিসমাপ্তিতে অনেকের মন ভরছিল না। কারখানার সামনে জমায়েত কুলিরা সিরিলদের সিদ্ধান্ত অনেক তর্কবিতর্কের পর মেনে নিল। ছোট ছোট দলে ওরা সরে যেতে থাকল ওখান থেকে। কারখানার ভেতরে বাবুদের বুকের ধুকপুকুনি তখনই চলছে। দরজার ফুটো দিয়ে ছোটসাহেবের আহত হবার দৃশ্যটা ওঁরা দেখেছেন। ছোটসাহেব যদি আহত হন তাহলে ওদের যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এ তথ্য আবিষ্কৃত হওয়ায় মেয়েদের মধ্যে কান্নার রোল উঠেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ চেঁচামেচির পর যখন কুলিরা ফিরে গেল তখন ওঁরা ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন। বাইরে বেরতে সাহস হচ্ছে না অথচ এই বন্ধ ঘরে বেশিক্ষণ থাকাও যায় না। প্রায় ঘণ্টা দুই বাদে ছোটসাহেব নিচে নেমে এল, বাবুদের চেহারা দেখে আচমকা খাঁচার মুরগির কথা মনে হল তার।
ছোটসাহেব বলল, আপনারা এবার ফিরে যান। ইচ্ছে হলে কোয়ার্টারে যেতে পারেন নাহলে অন্য কোথাও। আমি ওদের কথা দিয়েছি যে হরতাল চলার সময়ে আপনারা কাজে বের হবেন না।
বড়বাবু মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, সাহেব যে মাইনে কাটবে অফিসে না গেলে–এটাও তো সমস্যা। বুঝতেই পারছেন।
ছোটসাহেব যেন নিজেকে আর সামলাতে পারল না, চিৎকার করে বলল, এতক্ষণ আপনারা কী করছিলেন? মুরগির মত ওদের ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। যখন আপনাদের প্রাণসংশয় হয়েছিল তখন কোম্পানি আপনাদের কি হেল্প দিয়েছে? বড়সাহেব আপনাদের বাঁচিয়েছে? ছি ছি ছি, আপনাদের এইরকম দাস মনোভাবের জন্যেই কোম্পানির সব কিছু সহজে করে যেতে পারে। যাক, আমার যা বলার তো বলে দিলাম, এখন নিজের মর্জি মত কাজ করুন।
মুখে যাই বলুন বাবুদের আর কোয়ার্টারে ফিরে যাওয়ার সাহস ছিল না। বিরাট এলাকা নিয়ে এক একটা কোয়ার্টার। রাত দুপুরে চিৎকার করলেও পাশে কোয়ার্টারের মানুষ বেরুবে না। নির্জন চা বাগানের কাছাকাছি থানা আট মাইল দূরে। অতএব যাদের ভরসায় এতদিন এখানে প্রতাপে থাকা গেছে তারাই যদি আতঙ্কের কারণ হয় তাহলে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। দেখা গেল চৌমাথায় গিয়ে সবাই জলপাইগুড়ি কিংবা আলিপুরদুয়ারের বাস ধরলেন।
বাবুরা চলে যাওয়ার ঘণ্টা তিনেক বাদেই একটা জিপ এসে থামল ছোটসাহেবের কারখানার সামনে। পাঁচটা স্টিচ হয়েছে, দুর্বল ছোটসাহেব একটা ইজিচেয়ারে শুয়েছিল কারখানার ভেতরেই। জিপ থেকে যিনি নামলেন তাকে দেখে বিব্রত হল ছোটসাহেব। উঠে বসতে চেষ্টা করতে দু হাত তুলে তাকে নিষেধ করলেন এই চা বাগানের সর্বময় কর্তা বড়সাহেব। বৃহৎ চেহারার এই উত্তরপ্রদেশীয় মানুষটি যথেষ্ট শক্তিশালী। ছোটসাহেব এঁর আগমনে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কারণ চাকরি ছেড়ে দেবার পর এঁরা কখনো সামান্য সৌজন্য দেখিয়ে এই কারখানার সামনে গাড়ি দাঁড় করাননি।
বড়সাহেব চিবোনো ইংরেজিতে বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে ওরা তোমাকে এরকম আহত করেছে। যাহোক, তুমি এখন কেমন আছ?
ছোটসাহেব বলল, এমন কিছু ব্যাপার নয়, সামান্য রক্ত পড়েছিল। বসুন।
না না, বসার জন্যে আসিনি। তুমি বাবুদের সেভ করার জন্যে এতবড় রিস্ক নিয়েছি এটা গর্বের কথা। যাহোক, তুমি অ্যাকশন নেবে ভেবেছ?
অ্যাকশন! কী ব্যাপারে?
ওহো! তোমার রক্তপাতের জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। তুমি আমার সঙ্গে থানায় চলো। তোমার ডায়েরি নেবার পর পুলিস বাগান রেইড করে যারা দোষী তাদের তুলে নিয়ে যাবে। আমি তাদের উচিত শিক্ষা দিতে চাই। তুমি কি নিজেই উঠতে পারবে?
একটুও চিন্তা না করে মাথা নাড়ল ছোটসাহেব, দুঃখিত। আমার আহত হবার জন্যে কাউকে দায়ী করতে চাই না। আপনি এই ব্যাপারে চিন্তা না করলেই খুশি হব।
ওয়েল, তুমি আমাকে সাহায্য করলে না? আফটার অল তুমি একদিন ম্যানেজার ছিলে। বড়সাহেব ছটফট করছিলেন।
ছিলাম, এখন তো নই। ওরা উত্তেজনায় যে কাজ করেছে আমরা ঠাণ্ডা মাথায় তার প্রতিশোধ নিতে চাইলে কোনোদিনই ব্যাপারটার শেষ হবে না। অতএব এটা ভুলে যাওয়াই ভাল। ছোটসাহেব হাসল। কথাটা শোনার পর আর একটুও দাঁড়াননি বড়সাহেব! জিপ নিয়ে সোজা বাগানে ফিরে গিয়েছিলেন। সন্ধের পর খবর রটে গেল যে বড়সাহেব জিনিস গুছিয়ে বাগান ছেড়ে চলে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে অফিস বাড়ি এবং চায়ের ফ্যাক্টরির দরজায় নিজের হাতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আর সেই সময়েই হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তারবাবুও একা এই বাগানে থাকতে সাহস পাননি। ফলে এখন সমস্ত চা বাগান খাঁ খাঁ করছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই।
উত্তেজনায় যদি নিয়মিত তাত না লাগে তাহলে তা দীর্ঘ জীবন পায় না। বাবুরা নেই, সাহেবও নেই, কুলিদের মধ্যে ঝিমুনি এসে গেল। হপ্তার মাইনে না পাওয়ার পর লাইনে লাইনে সাইকেলে কাবুলিওয়ালা আসা-যাওয়া শুরু হল। সবাই ধার করছে, হরতাল মিটলেই বোনাস পেয়ে শোধ করবে। চার হপ্তার টাকা জুড়লে তিনশো টাকা হয়। বিশ পার্সেন্ট বোনাস মানে সাতশো টাকার ওপর পাওনা হবে। এ ব্যাপারে কারো মনে কোনো দ্বিধা নেই। কোলকাতায় কোম্পানি য়ুনিয়নের বাবুদের ডেকে পাঠিয়েছে। মিটমাট হলেই বাগান খুলবে। যে কদিন তা না হচ্ছে সে কদিন। চালাবার জন্যে ধার করতে হবে।
কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষেও ফয়সালা হল না। সিরিলরা যতই বোঝাক সাধারণ কুলিরা কিছুতেই তাতে রাজি হচ্ছে না। খাওয়ার সমস্যা মেটাতে সংগ্রাম তহবিল থেকে লাইনে লাইনে চুল্লি জ্বালানো হয়েছিল। তাতে দুবেলা খিচুড়ি তৈরি করে সবাইকে দেওয়া হতো। কিন্তু নেতাদের কোলকাতায় যাওয়া থাকার টাকার প্রয়োজনে ব্যাপারটা বাতিল করতে হওয়ায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ল সবায়ের মনে। মাংরা সর্দার তার বয়সীদের নিয়ে য়ুনিয়ন অফিসে এসে প্রকাশ্যে গালাগাল করে গেল। সিরিলদের হঠকারিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। বেশি লোভেই সর্বনাশ ডেকে আনে। এই চা-বাগানে এত পাতা থাকতেও সাধারণ কুলিরা প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে–সেজন্যে এরাই দায়ী। সিরিলরা বোঝাতে গিয়েছিল নেতাদের কথামত, বৃহৎ স্বার্থে জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়। আন্দোলন বাঁচাতে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়, এ তো তুচ্ছ।
কিন্তু হাতের কাছে চা পাতা, পেটে খিদে, এক জ্যোছনার রাতে সব মানুষ পিল পিল করে বেরিয়ে এসে নিজের ব্যবস্থা করে নিল। চা-বাগানের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে তারা সেই জ্যোছনায় মিশে চায়ের পাতা তুলতে লাগল। এরই মধ্যে একজন পাশের চা বাগানের মালিকের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন। তাঁকে লোক রেখে মাইনে বোনাস মিটিয়ে কাজ পেতে হয় তার চেয়ে অনেক অল্প পয়সায় প্রোডাকশন পেলে তিনি খুশিই হবেন। তার ওপর নিজের চা-পাতা। অক্ষত থাকল অথচ কাজও ভালভাবে চলল। ভোর হবার আগেই ঝুড়ি ভর্তি পাতি নিয়ে হরতালি শ্রমিকরা যাত্রা করল পাশের চা বাগানের উদ্দেশে। না, সেই চা-বাগানের ফ্যাক্টরি অবধি এরা যাবে না, কাছাকাছি একটা খোলা মাঠে ট্রাক্টর থাকবে ক্যারিয়ার নিয়ে। সেখানে চা-পাতি মেপে নগদ বিদায় করা হবে। এমন অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো হয়নি। বস্তুত চা বাগানের মধ্যে একটা রেষারেষি রয়েছে চিরকাল। এই বাগানের চা ওই বাগানের চেয়ে ভাল এরকম একটা গর্ব নিয়ে প্রায়ই তর্ক চলে। এই রাতের আলোয় পাতি আহরণে মাংরা সর্দার যোগ দেয়নি। এরকম দৃশ্য দেখতে গিয়ে তার শরীর জ্বলছে। নিজেদের ফ্যাক্টরি নিঃশব্দ হয়ে রয়েছে আর অন্যের ফ্যাক্টরির যন্ত্রগুলো এই পাতিগুলোকে পিষবে–এব ভাবা যায় না। অর্থকষ্ট আছেই, হপ্তা না পেয়ে ধার বাড়ছে এবং এসবের জনে দায়ী হল ওই সিরিলরাই কিন্তু সেকারণে নিজের বাগানের পাতা অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে? সিরিলরা শেষ পর্যন্ত এই অপহরণপর্বে অংশ নিতে পারল না। ওরা দেখল পাশের বাগানের শ্রমিকরা এ ব্যাপারে খুব ক্ষুব্ধ। কারণ তারা সারাদিন খেটে পাতি তুলে মালিকের কাছে যে অর্থ পায় তাতে তাদের একটা সন্তুষ্টি আছে। কিন্তু মালিক যখন বিনা ঝামেলায় অন্য বাগানের পাতি পেয়ে যাচ্ছে অনেক কম খরচে তখন ওই বাগানের শ্রমিকেরা ভয় পেয়ে যাবেই। সিরিলরা দেখল পাতি কিনতে গিয়ে ওই বাগানের মালিক অবিশ্বাস্য কম দাম দিচ্ছে। কারণ তারা জানে এই বাগানের শ্রমিকদের তা না নিয়ে কোনো উপায় নেই। সিরিল পিছিয়ে গেলেও সাধারণ শ্রমিকরা কিন্তু তখন মরিয়া। লাইন বেঁধে ঝুড়িগুলো চলল এই বাগান ছেড়ে।
ট্রাক্টর দাঁড়িয়ে আছে ক্যারিয়ার নিয়ে। একটু চুপচাপ, গোপনীয়তা যেন সবার হাবভাবে। এক চা-বাগানের মালিক প্রকাশ্যে অন্য চা-বাগানের পাতি কিনতে পারেন না তার মালিকের অজান্তে। গুরুতর অপরাধ এটি। তাই একটা তাড়াহুড়ো ভাব আছে, যত শিগগির কাজ শেষ করা যায় ততই মঙ্গল কিন্তু তার আগেই হইহই শব্দ উঠল। ক্রেতা চাবাগানের শ্রমিকরা দলে দলে ছুটে আসছে বাধা দিতে। তারা কিছুতেই মালিককে অন্য বাগানের পাতি কিনতে দেবে না। বিক্রেতারা প্রতিরোধ করার সাহসই পেল না কারণ ওদের উপস্থিতি টের পেতেই ট্রাক্টর ক্যারিয়ার নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল।
ক্লান্ত কুলিরা দুপুর রোদে ঝুড়ি বোঝাই পাতি নিয়ে ফিরে এল নিজের লাইনে। এখন হতাশা চারধারে। হরতালের নেতারা সামনে আসছে না।
শুকরা বুড়ো মাচায় বসে ব্যাপারটা শুনল। পিছ করে থুতু ফেলে বলে উঠল, মর শালারা, মর। যেমন লোভ হয়েছে সাহেবদের সঙ্গে লড়ার, ঠিক হয়েছে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলে উঠল, ব্যাটাদের মাথায় বুদ্ধি নেই এক ফোঁটা! নিজের বেইজ্জত নিজের হাতেই করলি! কেন হাত মাড়াই ছিল না? নিজের হাত থাকতে পরের কাছে ভিক্ষে চাইতে গেলি সব! হাতমাড়াই কর।
ব্যস। সঙ্গে সঙ্গে লাইনে লাইনে কথাটা কানাকানি হয়ে গেল। হাতমাড়াই শুরু কর। ধান শুকুবার মত চায়ের পাতা বিছিয়ে দেওয়া হল রোদে। এই রোদ এই মেঘ। বৃষ্টি এলেই হইহই করে ঘরে তোলে। আবার কড়া রোদ এলে মুখে হাসি। রোদে পোড়া পোড়া হতে লাগল নধর চায়ের পাতাগুলো। লাইনময় তারই গন্ধ ছড়ানো।
চা গাছের পাতা আর বাক্সের চায়ের মধ্যে অনেকরকম কার্যপ্রকরণ আছে। কচি কুঁড়ি আর নধর পাতা তুলে ঝুড়িতে করে যা ফ্যাক্টরিতে আসে তা চায়ের আকার নিতে অনেক প্রক্রিয়া এবং পরিশ্রমের সাহায্য নেয়। তাপ যত বাড়ে লিকার তত গাঢ় হয়, শীতলতায় শুধু সুগন্ধ বহন করে। এই শর্ত গাছে থাকতেই চা পাতায় আসে। দার্জিলিং-এর পাতায় তাই গন্ধ বেশি, ডুয়ার্সের সমতলে লিকার বাড়ে। ফ্যাক্টরির একটি শর্টকার্ট ব্যবস্থা চালু আছে। রোদে শুকিয়ে পাতাগুলোকে ঝুরু ঝুরু করে নিয়ে হাতের তেলোয় ডলতে ডলতে তাকে গুঁড়ো করে ফেলে পানীয় চায়ের আকার দেয় ওরা। স্বাদে নিশ্চয়ই খামতি থাকে, মানের পাল্লায় পিছিয়ে যায় অনেক, কষা স্বাদই বেশি কিন্তু তাই কেনার জন্য মুদিখানার মালিকরা নারাজ নয়। কাজটা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। সারাদিন খেটে সামান্যই চা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু লাইনের কুলিরা এই হাতমাড়াই-এর লেগে গেল।
একমাত্র ভাটিখানায় ধারে মদ পাওয়া যায়। তৃতীয় সপ্তাহের শেষে শ্রমিকরা যেন হাঁড়িয়া খেয়েই শুয়ে থাকল লাইনে লাইনে। মেয়েরা হাতমাড়াই করে সেই চা বিক্রির টাকায় উনুন ধরায়। শুকরা বুড়ো সবাইকে ডেকে ডেকে বলে, এখান থেকে পালা সব। ওই চা বাগান বন্ধ হলে আমাদের পেটে ভাত পড়বে না। এক ফালি জমি নেই যে চাষ করবি! তার চেয়ে চল সবাই মিলে টেবুয়াতে। সেখানে গিয়ে মাটিতে ফসল ফলাবি। এতদিনে অনেক বৃষ্টি পড়েছে সেই মাটিতে। নিশ্চয়ই উর্বর হয়েছে সে ভিজে ভিজে। এতদিন যে কথাগুলো শুনে সবাই হাসত এখন তাতে খটকা লাগে অনেকের। এইভাবে আধপেটা হয়ে মালিকের দয়ার জন্যে না বসে থেকে শুকরা বুড়ো যা বলছে তা শুনলে কেমন হয়? কিন্তু এই মাটি চা বাগান ছেড়ে অনিশ্চয়তায় পা বাড়াতে আড়ষ্ট হয়ে যায় সবাই। দলে দলে এসে সারাদিন য়ুনিয়ন অফিসের সামনে ভিড় করে। চুপচাপ চেয়ে থাকে যদি খবর পাওয়া যায়। হাত-মাড়াই করতে গিয়ে অনেকের হাতেই একধরনের ঘা দেখা দিয়েছে।
কোলকাতা থেকে শেষ পর্যন্ত খবর এল। মালিক হেরে গিয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বইল শরীরে শরীরে। য়ুনিয়ন অফিস থেকে ঢোল মাদল নিয়ে শোভাযাত্রা বেরিয়ে এল। ইয়ে বাগান হামারা হ্যায়। খুন দো ইজ্জত নেহি! কুড়ি দিনের দিন কোম্পানি মেনে নিল শ্রমিকদের দাবি। এই কুড়ি দিন কোনো মাইনে পাবে না শ্রমিকরা। না পাক, সিরিলরা বোঝাল, সারাজীবনের লাভের জন্য কুড়ি দিন সহজেই ত্যাগ করা যায়। একটা শ্রমিক যদি মাসে তিনশো টাকা বেতন পায় তাহলে সাতশ টাকার ওপর বোনাস পাবে। তাই কুড়ি দিনের দুশো টাকা মাইনে স্বচ্ছন্দে ছেড়ে দেওয়া যায়। উৎসবের চেহারা নিল লাইনগুলোর।
কিন্তু বিকেলেই খবরটা এল। কোম্পানি মেনে নিয়েছে দাবি। য়ুনিয়নের দাবি ছিল বিশ পার্সেন্ট কোম্পানি দিতে চেয়েছিল সাড়ে আট। সেটা দশে রফা হয়েছে। কোম্পানির পরাজয়, কারণ সাড়ে আট থেকে দশে উঠতে হয়েছে তাদের এটা শ্রমিকদেরই জয় বলে নেতারা মনে করছেন। বিপ্লব একদিন হয় না, ধীর পায়ে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হয়।
সিরিলরা খবর পেয়ে থমকে গেল। লাভ হল তাহলে মাত্র দেড় পার্সেন্ট। তার মানে চুয়ান্ন টাকার মতন। দুশো টাকা ক্ষতি করে চুয়ান্ন টাকা লাভের মধ্যে কী ধরনের বিজয় থাকতে পারে? তার উপর, এই কুড়ি দিনে কাবুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় যে ধার শ্রমিকরা করেছে তার সুদ তো ওই চুয়াম টাকায় কুলোবে না। তাহলে? কী করে শ্রমিকদের কাছে মুখ দেখাবে সিরিলরা। মাংরা সর্দাররা এখন হাসবে, বলবে কাদের কথায় তোরা বিশ্বাস করেছিলি দ্যাখ? মদেসিয়া ছেলেরা দরজা বন্ধ করে আলোচনায় বসল। প্রত্যেকেই উত্তেজিত। এই ধরনের ফালতু বিজয় তারা চায় না। হয় বিশ পার্সেন্ট বোনাস চাই নইলে কুড়ি দিনের মাইনে কাটা চলবে না।
আলোচনা যখন উত্তপ্ত তখন সিরিল উঠে দাঁড়াল। তার দিকে তাকিয়ে থাকা মুখগুলোর দিকে সে অমিতাভ বচ্চনের মত তাকাল। গলা পরিষ্কার করে বলল, নেতাদের এই সিদ্ধান্ত আমরা মানব না। কিন্তু একথা ঠিক আমরা যদি আরো কিছু দিন বিশ পার্সেন্টের জন্য হরতাল চালাই তো সবাই আমাদের ছেড়ে যাবে। নেতারা বিগড়াবে। তাই আমার মাথায় সম্পূর্ণ অন্য চিন্তা এসেছে। তোমরা যদি সবাই হাত মেলাও তো কারো কোনো অসুবিধে হবে না। আমরা দেখাতে পারব যে আমাদের কম শক্তি নেই।
সবাই কিছুটা সন্দেহ এবং আগ্রহ নিয়েই সিরিলকে দেখল। ঘোলা জলে পাক খেতে খেতে হঠাৎ যদি কেউ পায়ের তলায় নিটোল মুক্তো দেখায় তখন বুক খুলে বিশ্বাস করতে অসুবিধে হয়। রেতিয়া বলল, রাস্তাটা বল।
সিরিল বলল, এক মাস কাজ করে যে টাকা আমরা পেতাম তা তিন ভাগের দুই ভাগ মার হয়ে যাবে কুড়ি দিন হরতালের জন্যে। বেশি যে টাকা বোনাস আমরা পাচ্ছি তাতেও লোকসান মিটবে না। এখন, বাকি দশ দিনে যদি আমরা পুরো মাসের কাজ করে দিই তাহলে সাহেবকে বলতে পারব যে পুরা মাইনে দিতে হবে।
কেন দেবে? আর একজন চিৎকার করল।
কেন দেবে না? এক মাস কাজ করলে সাহেব যে প্রোডাকশন পেত তাই আমরা দশ দিনে। করে দেব। সাহেবের কোনো লোকসান না হলে আমাদের কেন দেবে না? আমি যা বলছি তা বুঝতে পারছ? সিরিল দু হাত নেড়ে বোঝাতে চাইল।
কিন্তু দশ দিনে কি এক মাসের কাজ করা সম্ভব? পাগলামি। একজন বেজার মুখে জানাল, না, তা সম্ভব নয়। এমনিতেই দিনের কাজ শেষ হতে চায় না তো আড়াইগুণ কাজ করতে বললে সবাই যেন করবে।
রেতিয়া উঠল, করতে হবে। আমরা সবাইকে বোঝাব। সিরিল যা বলছে তা করতে পারলে সবাই পুরো টাকা আদায় করতে পারবে।
গুঞ্জন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসে টলতে লাগল। অলস এবং কিছুটা কর্মবিমুখ প্রৌঢ়দের সহযোগিতা কতটা পাওয়া যাবে তাই নিয়ে রাত দুপুর পর্যন্ত আলোচনা চলল। য়ুনিয়নের নেতারা অপমানিত হতে পারেন এই ভেবে যে তাদের নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। কিন্তু সিরিল বলল, এই দেশ আমাদের দেশ, এই বাগান আমাদের রক্ত দিয়ে তৈরি। এর বাঁচা মানে আমাদের বাঁচা। ইয়ে বাগান হামারা মা, তাই কেউ রাগুক কিংবা আমাদের ছেড়ে যাক তাতে আমাদের কিছুই এসে যায় না। আমরা জানব, আমরা আমাদের মায়ের সেবা করছি।
কথাটা সবার মনে লেগে গেল। সেই রাতেই হইহই করে বেরিয়ে পড়ল। সবাই লাইনে লাইনে লোক চলে গেল বোঝাতে। আগামী দশ দিন ছেলেবুড়ো সবাইকে দিনরাত খাটতে হবে। যতটুকু বিশ্রাম না নিলে নয় তার বেশি কেউ নেবে না। এখন জোছনার রাত, আকাশে মেঘ না থাকলে পাতি তোলার কাজ চলবে রাতেও। সদারদের একসঙ্গে ডেকে সিরিলরা এ ব্যাপারে যা করার তা করতে অনুরোধ করল। এ ধরনের অমানুষিক এবং অস্বস্তিকর কাজের কথা চিন্তা করে সর্দাররা ইতস্তত করছিল। কোম্পানি থেকে মাইনে ছাড়া বেশি কিছু পাওয়া যাবে না। এমনকি সাহেব সন্তুষ্ট হবেন কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। কটা টাকার জন্যে এইরকম ফালতু ঝামেলা জড়ানো ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না ওরা।
সিরিল সোজা মাথা নিচু করে হেঁটে এসে মাংরা সর্দারের সামনে এসে দাঁড়াল। লাঠির ঠেক দিয়ে অন্য সর্দারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মাংরা একটু বিরক্তমনে কথাগুলো শুনছিল। ছেলেকে এগিয়ে আসতে দেখে একটু সচকিত হয়ে মুখ অন্যপাশে ঘুরিয়ে নিল। মাংরা সর্দারের সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল সিরিল। তারপর খুব গাঢ় গলায় বলল, বাপ, আমরা প্রমাণ করব এই জায়গা আমাদের। তুমি সাহায্য করে।
মাংরা সর্দারের বুকের মধ্যে একটা কিছু পাক খেয়ে উঠল। সে কথা বলল না। সিরিল বলল, বুড়া বাপ যা বলে তার কাছে ঠিক কিন্তু আমার কাছে নয়। তোমার কাছে কি ঠিক বাপ?
ঠিক সেইসময় একটা চিৎকার ভেসে আসতে সবাই চমকে ফিরে তাকাল। একটি কিশোরী ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে সিরিলকে ডাকছে। কাছাকাছি হয়ে সে জানাল নিরির যন্ত্রণা হচ্ছে। বাচ্চা হবে এখনই। সিরিলকে দেখতে চাইছে সে।
কথাটা শোনামাত্র মাংরা সর্দার বাঘের মত লাফিয়ে উঠল। ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে তোর মাকে নিয়ে আয়। আমার নাতি হচ্ছে। কথাটা শেষ করেই সে ছুটল সিরিলদের নতুন ঘরের দিকে। সিরিল নিজের চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আজও সে নিরিকে দেখে এসেছে স্বাভাবিক চেহারায়। এত জলদি যে বাচ্চাটা আসবে ভাবাই যায় না। আর সেই খবর শুনে বাপের যে এই রকম প্রতিক্রিয়া হবে তাই বা কে জানত।
সিরিলের মা খবর পেয়ে ছেলের ঘরে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। সিরিল যখন তার ঘরের কাছে পৌঁছালো তখন মাংরা সর্দার দরজার বাইরে উবু হয়ে বসে আছে। ভেতরে মেয়েদের। কথাবার্তা। এই মুহূর্তে সিরিলের সব রকম সপ্রতিভতা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। চারধার চুপচাপ। এবং তারপরেই সেই আকাঙ্ক্ষিত কান্নাটা শোনা গেল। একটি মেয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে জানিয়ে দিল, ছেড়িয়া হোলাক রে।
সঙ্গে সঙ্গে মাংরা সর্দার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে কাঁধে হাত ছুঁইয়ে দু হাত জোর করে আকাশের উদ্দেশে প্রণাম জানাল। বন্ধুরা সব আনন্দ জানাতে সিরিলকে জড়িয়ে ধরেছে। মিষ্টি খাওয়াবার আবদার করছে সব। সিরিল কোনরকমে তাদের হাত থেকে রেহাই নিয়ে বাপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাংরা সর্দারের তখন অন্য চেহারা। ছেলেকে হুকুমের গলায় বলল, এদিকটা তোমরা দেখবে। তুই সবাইকে কাজে যেতে বল। দশ দিনে এক মাসের কাজ হওয়া চাই।
.
ঠিক উৎসব বললে কম হবে। এখন চাবাগানে তার চেয়ে বেশি কিছু হচ্ছে। বাবুরা নেই, সাহেবও নেই। সিরিল ছোটসাহেবের সঙ্গে দেখা করল। ভদ্রলোক এখন বেশ দুর্বল। সিরিলের মুখে পরিকল্পনা শুনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করল ছোটসাহেব, পারবি?
জরুর।
কিন্তু, ফ্যাক্টরিতে নিশ্চয়ই তালা দিয়ে গেছে বড়সাহেব। তালা ভাঙলে থানা-পুলিস হতে পারে। বাবুরা নেই, তোরা নিজে নিজে প্রোডাকশন চালাতে পারবি?
বাবুরা তো শুধু হিসাব রাখত, কাজ যা করবার আমরাই করতাম। তালা ভাঙার জন্যে পুলিস ধরে তো পুরো লাইনকে ধরতে হবে। কিন্তু কাজ পেলে কি সাহেব খুশি হবে না?
বলা শক্ত। কিন্তু তোরা কর। এরকম জিনিস কেউ করে না। সবাই কিছু না দিয়েই পেতে চায়। তোরা দেখিয়ে দে তোরা যোগ্যতা দেখিয়ে অর্জন করতে পারিস। কিন্তু সাবধান, কোনো গোলমাল করিস না।
ছোটসাহেব আর একটা কথা বলল, সবাই কাজ করবে কথা দিয়েছে, মেনে নিয়েছে?
হ্যাঁ। বুড়োদের আপত্তি ছিল, এখন হাওয়া দেখে রাজি হয়েছে।
তাহলে একটা কাজ কর। তোরা দল বেঁধে গিয়ে ভাটিখানার মালিককে অনুরোধ কর আগামী দশ দিন দোকান বন্ধ রাখতে। ওটা খোলা থাকলে কাজ করানো মুশকিল হয়ে যায়। সাদা চোখে একরকম কিন্তু নেশায় ডুবলে কোন হুঁশ থাকলে না।
ছোটসাহেবের কথাটা তাৎপর্য বুঝতে অসুবিধে হল না সিরিলের। রেতিয়াদের বলতেই সবাই দল বেঁধে ছুটে গেল চৌমাথায়। অনেক কথা কাটাকাটি হুজ্জোতের পর ভাটিখানা দশ দিনের জন্য বন্ধ হল। এরা শাসিয়ে এল যদি এই সময়ের মধ্যে কোন শ্রমিককে মদ বিক্রি করা হয় তাহলে ভাটিখানা জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
কাজ শুরু হয়ে গেল। দীর্ঘদিন বাদে হুইল চলল নদীতে, ফ্যাক্টরিতে পরিচিত শব্দটা বাজতে লাগল। সাহেব নেই, বাবুরাও নেই তাতে উৎসাহ বেড়ে গেল যেন সবার। এটা হুকুমের কাজ নয়, নিজের প্রয়োজনের কাজ–এই বোধ প্রত্যেকের মনে। তিন শিফটে দিনরাত কাজ হয়ে যাচ্ছে। সিরিলরা পালা করে ডিউটি দিচ্ছে। কাজের গতি দেখে সর্দাররাই অবাক। তারা এতকাল চিৎকার চেঁচামেচি মারের ভয় দেখিয়েও এর অর্ধেক কাজ কখনো আদায় করতে পারেনি। অভিজ্ঞতা হিসেব করে বলল এইরকম কাজ যদি চলে তাহলে নদিনের মাথায় এক মাসের প্রোডাকশন হয়ে যাবে। সবকটা মেশিন একসঙ্গে চলছে, বাছাই পাতি শুকোবার জন্যে যে তারের স্লাভ ছিল তাতে জায়গা হচ্ছে না। গরম হাওয়ার মেসিন চালিয়ে পাতাগুলোকে মুচমুচে করে নেওয়া হচ্ছে।
তিন দিনের মাথায় য়ুনিয়নের বাবুদের নিয়ে সাহেব বাগানে ফিরলেন। ফিরে ব্যাপার দেখে তাজ্জব। তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তিনি বাংলোয় গিয়ে জানালেন। য়ুনিয়নের বাবুরা সেখানে ছিল। সিরিল আর রেতিয়া প্রতিনিধি হিসেবে ওঁদের মুখোমুখি হল।
বড়সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ফ্যাক্টরি চলছে কেন?
সিরিল উত্তর দিল, কাজ হচ্ছে তাই?
বড়সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, কার হুকুমে কাজ হচ্ছে। আমি ফ্যাক্টরিতে তালা দিয়ে গিয়েছিলাম। সেই তালা খুলল কে? আমি এখনই থানায় খবর দিচ্ছি। আমার দামি দামি মেসিন আছে ওখানে। একটা যদি চুরি যায় তাহলে তার জন্য কে দায়ী হবে?
রেতিয়া বলল, নেহি সাহেব, হামলোক ঠিক খেয়াল রাখা হ্যায়।
হু আর ইউ? কে তোমাদের অর্ডার দিয়েছে ফ্যাক্টরি চালাতে?
সিরিল জবাব দিল, আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি।
এবার য়ুনিয়নের বাবু বললেন, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তোরা এই কাজটা কেন করলি। কোম্পানি আমাদের দাবি কিছুটা মেনে নিয়েছে। এটা আমাদের জয়। কোথায় তোরা ফুর্তি করবি না ফ্যাক্টরি চালিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিস? কার মতলবে চলছিস তোরা? সাহেব ঠিক বলছে, যদি তোদের নামে পুলিস কেস হয় তাহলে কিছু করার থাকবে না।
সাহেব বললেন, অন্য সময় তো কাজ করাতেই পারি না। নো নো দেওয়ার মাস্ট বি সাম প্ল্যান! কে তোমাদের সুপারভাইজ করছে?
আমরাই।
দেন এগেন, হোয়াই? কেন ফ্যাক্টরি চালাচ্ছ তোমরা উইদাউট মাই পারমিশন? বড়সাহেব ভেবে পাচ্ছিলেন না।
তখন আপনারা কেউ ছিলেন না যে জিজ্ঞাসা করব।
তাহলে অপেক্ষা করলে না কেন?
অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
হোয়াই?
ধর্মঘটের কুড়ি দিন কি আমরা মাইনে পাব সায়েব?
নো নো। তোমাদের য়ুনিয়নের সঙ্গে সেই চুক্তিই হয়েছে। নো ওয়ার্ক নো পে।
কেন?
গুড গুড। তোমরা কুড়ি দিন কাজ করোনি বলে আমাদের প্রোডাকশন হয়নি। আমরা ব্যাডলি সাফার করেছি। যেখানে আমার কোনো লাভ হচ্ছে না আমি কেন তোমাকে পয়সা দিতে যাব?
ঠিক তাই। কিন্তু যদি আমরা বাকি দশ দিনে এক মাসের কাজ তুলে দিই, যদি প্রোডাকশন ঠিক থাকে তাহলে পুরা মাসের টাকা আমাদের দিতে হবে।
হাউ ফানি! দশ দিনে এক মাসের কাজ করবে তোমরা! হা হা হা! এইরকম প্রতিজ্ঞা আরো আগে কেন এল না মনে? ফ্যাক্টরিতে তাহলে দিন রাত কাজ হচ্ছে!
হ্যাঁ। রাতেও পাতি তোলা হচ্ছে।
শোনো, যদি তোমরা দশ দিনে ওই প্রোডাকশন শেষ করতে পার তাহলে আমি আর এই নিয়ে হইচই করতে যাব না। কিন্তু তা যদি না হয় তাহলে আমি ছেড়ে দেব না। আর হ্যাঁ, তোমরা যাই করো না কেন এই কাজের জন্যে ওভারটাইম চেয়ে বোসো না যেন। আমার সঙ্গে এই কাজের কোনো সংস্রব নেই। সিরিল বলল, না সাহেব তা হবে না। আমরা কাজ করে পয়সা নেব। এক মাসের প্রোডাকশন করে আমরা পুরা মাসের মাইনে চাইব। কোনো কাটাকাটি চলবে না। প্রোডাকশন দেখাই হল আসল কাজ, কখন হল কে করল এসব নিয়ে নাই বা ভাবলেন।
সাহেব কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বাবুদের দিকে তাকিয়ে সম্মতির মাথা নাড়লেন, ঠিক হ্যায় মেনে নেব, আগে প্রোডাকশন দেখি নিজের চোখে।
য়ুনিয়নের বাবু জিজ্ঞাসা করল, তোরা তো আমাদেরও জিজ্ঞাসা করলি না। এটা কি ভাল কাজ হয়েছে?
সিরিল গম্ভীর গলায় বলল, নিজের মায়ের সেবা তাতে আলোচনা করার কী আছে। কথাটা বলে বেরিয়ে এল সে। কাম চালাও কাম চালাও।
লাইন এখন একদম ফাঁকা। এতদিন বাতিল বৃদ্ধ এবং কচি শিশুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত এখানে ওখানে, আজ তারাও নেই। আজ উৎসবের দিন।
শুকরা বুড়ো অনেক কষ্টে মালাকে ধরে রেখেছে। মেয়েটা ভোর হতে না হতেই যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল। শুকরা বুড়ো অনেক বলে কয়ে দুপুর অবধি থাকতে রাজি করিয়েছে। শুকরা বুড়ো তাকে লোভ দেখিয়েছে যে আজ তাকে সে রেল দেখাবে। অনেক শর্তের পর এই লোভ দেখানো, ঘুণাক্ষরে যেন কেউ জানতে না পারে। আর এ রকম একটা অভিনব প্রস্তাব পাওয়ার পর মালা অপেক্ষা করছে কখন বুড়ো বাপের সময় হয়। লাইন তো ফঁকা। দশ দিন পুরো হয়ে গেল। ফ্যাক্টরির সামনে মেলা বসে গেছে। কুলিরা এক মাসের কাজ দশ দিনে শেষ করেছে। প্রাণ জুড়ানো আনন্দ প্রত্যেকের। ফ্যাক্টরিকে ঘিরে তাই উৎসব আজ। সাহেব চেক করে গেছে আজ সকালে। বলেছে, তোমরা অসাধ্যসাধন করেছ। প্রত্যেকে পুরা মাইনে পাবে বোনাসের সঙ্গে।
এরকমটা কখনো হয়নি। প্রবীণ কুলিদেরও আনন্দটা স্পর্শ করেছে। আজ দুপুরের পর ভাটিখানা খুলবে। সবাই মুখিয়ে আছে সময়টার জন্যে। দশ দিন পেটে পড়েনি কারো, আজই তো ফুর্তির আসল সময়। প্রত্যেকেই মনে করছে এটা তাদেরই জয়। নিজের হাতে দিনরাত পরিশ্রম করে ওরা বাক্সগুলোয় চা ভরেছে, কোনো বাবুর নির্দেশ নিতে হয়নি। দেড় পার্সেন্ট বেশি বোনাস পাওয়ার চেয়ে এর আনন্দ হাজারগুণ বেশি।
খবরটা শুকরা বুড়োর কানে এসেছিল। অবিশ্বাসের পানসে চোখ মেলে সে বিড়বিড় করেছিল, হয়ে গেল, শেষ হয়ে গেল। সাহেবের কাজ বাবুদের কাজ করছিস মদেসিয়ারা! আস্পর্ধা কত দ্যাখো! সাহেব নেই তবু গুদাম চালাচ্ছিস, জেলে যাবি সব, পুলিস তোদের নরকে পুরে রাখবে।
তারপর আজ সকালে যেই শুনল কাম খতম, ঠিকঠাক কাজ শেষ করেছে, সবাই, সাহেবও খুশি, তখন তাজ্জব হয়ে গেল শুকরা বুড়ো। যতই পরিশ্রম করুক, এটা তো অন্যায় কাজ। সাহেব কী বলে সমর্থন করল? দিনকাল পাল্টে গেছে একদম। এই মাচায় এতগুলো বছর বসে সে এই পাল্টানোর কথা টের পায়নি এমন করে। শুকরা বুড়ো সোজা হয়ে বসল। বাইরে আজ বড় মিঠে রোদ। নাতনির কাঁধে হাত রেখে বলল, আশেপাশে কেউ আছে কি না একবার দ্যাখ তো চেয়ে।
মালা মাথা নাড়ল, কে আবার থাকবে এখানে! সবাই গুদাম দেখতে গেছে।
ঠিক বলছিস?
হ্যাঁ, তুমি কখন রেল দেখাবে আমাকে?
মন স্থির এখন শুকরা বুড়োর। এক হাতে লাঠি অন্য হাত নাতনির কাঁধে রেখে সে হাঁটতে শুরু করল মাচা থেকে। কয়েক পা যাওয়ার পর পেছন ফিরে এত বছরের প্রিয় জায়গাটার ওপর আর একবার নজর রাখল। কয়েক মুহূর্ত, তরপর হেঁটে চলে এল সেই কঁকড়া গাছটার তলায়। শুধু মুরগি আর ঘুঘুর ডাক ছাড়া কোন শব্দ নেই লাইনে। দূরে গুদামের সামনে যে মাদলগুলো বাজছে তার শব্দ অবশ্য গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে–দ্রিমি দ্রিমি। নিজের হাঁটার ক্ষমতা দেখে আজ নিজেই অবাক হয়ে গেল সে। কি সোজা পা পড়ছে তার, একটুও কাঁপছে না অন্যদিনের মতো। ওর মনে হল মালা নয়, সেই মেয়েটা যে মাটির তলায় শুয়ে ছিল এতদিন, সে আজ উঠে এসে তার হাত ধরেছে, তাকে টেবুয়াতে ফিরে যেতে সাহায্য করছে। শিহরিত হল শুকরা বুড়ো।
গাছটার নির্দিষ্ট কোণে এসে শুকরা বুড়ো বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে মাটিটাকে স্পর্শ করল। আঃ কি আরাম। তারপর কোমর থেকে লোহার শিকটা বের করে গর্ত খুঁড়তে বসল সে। মালা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, মাটি খুঁড়ছ কেন?
শুকরা বুড়ো হাসল, খুঁড়ছি খুঁড়ছি, দেখতে পাবি কী আছে এতে?
কী আছে?
রেল দেখার মন্ত্র। কত্তো বছর জমিয়ে রেখেছি একে, আজকের জন্যে, এই দিনটার জন্যে। হাত লাগা না রে, আমি বুড়ো মানুষ, একা পারি?
শিরায় জড়ানো হাতের সঙ্গে কচি হাত যুক্ত হল। গর্ত বড় হচ্ছে তো হচ্ছেই। শুকরা বুড়োর মুখ এখন উদ্বেগে টান টান। আর তারপরেই সেই ভাঁড়টার মুখ দেখা গেল। হাসিতে মুখ ঢলো ঢলো এবার, সাবধান, সাবধানে তোল, ওইটার মধ্যে আমার সব আছে। নাতনির হাত সরিয়ে দিয়ে নিজেই ভাঁড়টাকে তুলল সে। নরম হয়ে গেছে কেন? কেন হাতের বাঁধনে শক্ত থাকছে না? স্পষ্ট মনে আছে একটা কাপড়ের পুটলির মধ্যে ভাঁড়টাকে রেখেছিল সে। কাপড়টাই বা নেই কেন? শুকরা বুড়োর মনে আছে ভাঁড়ের মধ্যে আর একটা ছোট্ট পুঁটলিতে ছিল সেগুলো। কিন্তু এখন ভাঁড় জমাট হয়ে আছে মাটিতে। এত মাটি কোত্থেকে এল? প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে যাচ্ছে আঙুলগুলো, কাঁপছে। বুকের মধ্যে পাহাড় ধসার টাল।
ওপরের স্তর সরিয়ে ফেলার পর মাটিটা যেন অন্যরকম দেখাতে লাগল। আর তারপরেই সেই নথটায় আলো লাগতেই চিকচিকিয়ে উঠল।
হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল শুকরা বুড়ো। খেয়ে নিয়েছে, মাটি সব টাকা খেয়ে নিয়েছে। মাথা ঠুকতে লাগল শুকরা বুড়ো গাছের তলায়। হেই বাপ যীশু, এই তোর মনে ছিল! এই মাটি আমার সব নিয়েছে, আমার বউকে, আমার যৌবন, জীবনকে। শেষতক আমার যাওয়ার টাকাকেও খেয়ে ফেলল গো। আমি কী করে জানব মাটির পেটে এত খিদে, সব খেয়ে নেবে সে?
নাতনির হাত পড়ল মাথায়। শুকরা বুড়ো জলমাটিতে নিকানো মুখ তুলে নাতনির দিকে তাকাতেই যেন স্ত্রীকে দেখতে পেল। তার চোখে জল দেখে সেই চোখও টলটলে। দু হাতে নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল শুকরা বুড়ো, আমার যাওয়ার টাকা সব মাটি হয়ে গেছে রে।
খানিক বাদে শুকরা বুড়ো আবার ভাঁড়টাকে পরম স্নেহে দু হাতে তুলে নিল। সেই টাকা আজ মাটি। এমন করে মায়ায় বাঁধে কেন মাটি? অথচ নথটার একটা কোণ এখনও চকচকে। সেটাকে জীর্ণ আঙুলে তুলে ধরল সে। খাঁজে খাঁজে মাটি জমে গেছে। এই নথ সেই মেয়ের নাকে ঝলসাত। বড় ইচ্ছে ছিল তার, শুকরা বুড়ো যখন টেবুয়ার মাটিতে গিয়ে শোবে তখন এই নথটাকেও যেন পাশে নেয়। তাহলেই তার ইচ্ছা পূর্ণ হবে। এখন তো আর টেবুয়াতে যাওয়ার কোনো উপায় থাকল না। কী করে এই নথটা সেই মাটিতে শোবে? কান্নাটা আবার বুক উপচে বেরিয়ে এল।
মালা বুঝতে পারছিল না। কিছু একটা ছিল বুড়া বাপের যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এখন। যা না থাকায় রেল দেখা যাবে না। কিন্তু বুড়া বাপের হাতে ওটা কি? কী সুন্দর নথ! সে হাত বাড়াল। চমকে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল শুকরা বুড়ো। মুখে বলল, না। কক্ষনো না। এটা তার নথ। আসল জায়গায় যাওয়ার জন্যে এতদিন বেঁচে আছে এটা। একদম হাত বাড়াবি না?
নিজের নাকের হলদে কাঠি গোঁজা ফুটোটা এখন খালি। নাক তার ফোঁটানো হয়েছে কিন্তু নাকছাবি কিনে দেয়নি কেউ। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল দাদুর হাত থেকে নথটাকে ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু শুকরা বুড়োর হাতের আঙুলে যে এখন হাজার বাঘের শক্তি, কিছুতেই নথটাকে ছাড়ল না সে। চেষ্টা করেও যখন পারল না মালা তখন শুকরা বুড়ো উঠে দাঁড়াল। এক হাতে মাটি হয়ে যাওয়া টাকা অন্য হাতে নথ। বিড় বিড় করতে লাগল সে, রেলের বাবুকে গিয়ে বলব, আমার আর কিছু নেই রেলের বাবু; এই এমুঠো মাটি যা কিনা একদিন টাকা ছিল আর এই নথটা ছাড়া। নথটা তো দিতে পারব না, তোমার পায়ে পড়ি আমাকে টেবুয়াতে নিয়ে চল।
এখন আর তার হুঁশ নেই কিছু। লাঠিটা পিছনে পড়ে রইল। মালা দেখল বুড়া বাপ হাঁটছে একা একা। নিশ্চয়ই রেল দেখতে যাচ্ছে। সে ছুটে এসে বুড়োর কোমর ধরল। চমকে তাকাল শুকরা বুড়ো, সেই মুখ, অবিকল এক গড়ন। ফিসফিস করল সে, বউ, চল আমার সঙ্গে, নিয়ে চল এখান থেকে।
ওরা লাইন পেরিয়ে আসতেই রাস্তা দু ভাগ হয়ে গেল। একটা রাস্তা চলে গেছে গুদামের দিকে অন্যটা চা বাগান পেরিয়ে হাইওয়েতে। আর এখানে মাদলের শব্দটা তীব্র হল। গুদামের পথটা ছেড়ে শুকরা বুড়ো অন্য রাস্তায় পা বাড়াতেই পেছন থেকে ডাকটা ভেসে এল। মালা চিৎকার করে উঠে ছুটে গেল পেছনে। শুকরা বুড়ো দুটো মুঠো চোখের ওপর তুলে আলো আড়াল করে দেখল একজন ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। মালার পাশাপাশি সে হেঁটে এল শুকরা বুড়োর সামনে। চিনতে পারল শুকরা বুড়ো, নিরি। দু হাতে বুকের ওপর ধরে রেখেছে যাকে তার শরীর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কপাল আর ঘুমন্ত চোখ নাক স্পষ্ট। কালো হীরের মত ঝকঝকে।
এই প্রথম নাতির বেটা পুতিকে দেখল শুকরা বুড়ো। এই কদিন কেউ তাকে নিয়ে যায়নি দেখাতে। তার ইচ্ছে হলেও এতদিন যে নিজেকে শাসন করছিল, আর মায়ায় জড়াস নে। এখন নাতবউ-এর মুখের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল যেন নতুন বৃষ্টি পেয়ে চা গাছের শরীর থেকে কুঁড়ি মুখ তুলছে। লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিরি বলল, আমিও যাব।
শুকরা বুড়ো জিজ্ঞাসা করল, খানিকটা অবাক হয়েই, কোথায়?
কোথায় আবার? সবাই যেখানে গেছে।
কেন যাচ্ছিস সেখানে?
বাঃ, আজ আমাদের জয়ের দিন আনন্দের দিন। এই প্রথম আমরা প্রমাণ করলাম আমরা পারি। এই জায়গা আমাদের, এখান থেকে আমাদের কেউ সরাতে পারবে না।
এই জায়গা আমাদের?
নিশ্চয়ই। জায়গাটাকে ভাল না বাসলে ওরকম কাজ কি কেউ করতে পারে? একেও নেয়ে যাচ্ছি তাই, বাপ কাকাদের কাজ দেখবে না ও?
শুকরা বুড়োর চোখ শূন্য। বুকের মধ্যে চৈত্রের আকাশ। মালা বলল, চল না, একবার দেখেই সেখানে যাব আমরা।
নিরি বলল, তুমি যাবে না নাতিদের দেখতে?
আর কোলের দশ দিনের বাচ্চাটা সেই সময় ট্যাঁ ট্যাঁ করে উঠতেই শুকরা বুড়ো চমকে গিয়ে হাত বাড়িয়ে তার গাল স্পর্শ করতে গেল। ঝুর ঝুর করে মুঠোর মাটি মাটিতে পড়ে গেলেও অদ্ভুত তুলতুলে গালের স্পর্শে বিদ্যুৎ বইল যেন ওর শরীরে।
দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়ে কয়েকজন ছুটে গেল ভেতরে। আজ বাবুরা এসে গেছেন। তাঁরাও বিস্ময়ে তারিফ করছেন কুলিদের এই উদ্যোগকে। সিরিল তাই শুনছিল। খবরটা শুনতেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। এক হাতে বাচ্চা অন্য হাতের শুকরা বুড়োকে ধরেছে নিরি। শুকরা বুড়োর আর এক পাশে মালা। বুড়ো আসছে ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে, এক পা এক পা করে। কথা বলতে বলতে। সিরিল বুঝল কথা হচ্ছে দশ দিনের শিশুর সঙ্গে। বাইরে জমজমাট। মেলার মানুষ অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। সিরিল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এক ছুটে দূরত্বটা অতিক্রম করে শুকরা বুড়োকে কাঁধে তুলে নিল। চমকে গিয়েছিল বুড়ো, নাতির গলা শুনে ধাতস্থ হল। মাথায় বুড়োকে নিয়ে এক পাক ঘুরে সিরিল চেঁচাল, তোমরা সবাই দ্যাখো। কে এসেছে, এই বুড়ো আশি সাল আগে এখানে এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হইচই করে ওদের ঘিরে ধরল।
শুকরা বুড়ো ঘাবড়ে গেল খুব। কোনোদিন কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না ডেকে, আজ এমন করছে কেন সবাই তাকে নিয়ে?
সিরিল বলল, বুঝতে পারছ না? তুমি এসে বীজ পুঁতেছিলে এখানে, আজ প্রথম সেই বীজের গাছে ফল ফলল।
শুকরা বুড়ো কাঁধের ওপর বসে জিজ্ঞাসা করল, তোরা সব নিজের হাতে করেছিস?
জরুর। শুধু সিরিল নয়, অনেকগুলো গলা থেকে শব্দটা বের হল। শুকরা বুড়ো শুধু বলতে পারল, আমি দেখব।
চারধারে টাটকা চায়ের গন্ধ ম ম করছে। একটাও মেসিন চলছে না এখন কিন্তু তবু বাতাসে কাজের স্পর্শ। শুকরা বুড়োর মনে হল অনেক দিন বাদে যেন নিজের ঘুরে চুল সে। কাঁধ থেকে তাকে মেঝের ওপর নামিয়ে দিতেই সে বিহ্বল চোখে চারপাশে তাকাল। চা-গুদামের কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। কত নতুন রকমের মেসিন, এমন কি জানলা দরজাগুলো পর্যন্ত অন্যরকম চেহারা নিয়েছে। এই গুদামে সে তিন কুড়ি বছর কাটিয়ে গেছে। হিসেবটা এখন অবশ্য মাঝেমাঝেই গোলমেলে হয়ে যায় তবু ওরকম একটা সময় তো বটেই। সে দেখল ছেলেরা তার দিকে মজার মুখ করে তাকিয়ে আছে। মুখ ঘোরালো বুড়ো, ওপাশে থাকে থাকে চায়ের বাক্স রয়েছে। সেদিকে দেখতে দেখতে তার মাথার ভেতর চিড়বিড় করে উঠল। কীভাবে প্যাকিং করেছে দ্যাখো, মুখ হাঁ করে আছে! বাতাস যদি ভেতরে ঢোকে তাহলে কি আর মুচমুচে চা থাকবে ঠিকঠাক! নড়বড়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে। বাক্সটা হাত রেখে চিৎকার করে উঠল, কোন শালা হারামীর বাচ্চা এই কাজ করেছে? শুধু ফাঁকি দেবার মতলব, এটা কি প্যাকিং হয়েছে?
যেন আচমকা বোমা ফাটল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারধার। কারো মুখ কথা সরছে না। সবাই বিস্ময়ে হতবাক। লাল চোখে ঘুরে দাঁড়াল শুকরা বুড়ো। সিরিল এগিয়ে গেল কাছে, কী হয়েছে?
হাড়িয়া খাওয়ার মত হাঁ হয়ে আছে বাক্সগুলো। ঠিক করো, জলদি জলদি ঠিকসে কাম করো। শুকরা বুড়ো ধমকাতেই ভুলটা চোখে পড়ল সবার। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ছুটে গিয়ে বাক্স মেরামতের কাজে লেগে গেল। শুকরা বুড়ো এক একটা ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে আর ছেলেরা খুশি মনে তাই সংশোধন করছে। একজন বুড়ো সর্দার পাশের মানুষকে বলল, সেকালের লোকের কাজের নমুনাই ছিল আলাদা, ফাঁকি পাবে না।
শুকরা বুড়ো মনে হল সে তার যৌবনে ফিরে গেছে। এমন আনন্দ সে গত কুড়ি বছরে পায়নি। যতই বদলাক, এই গুদামের গন্ধটা তো একই রকম আছে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল সে। ঘুরতে ঘুরতে কোনার থামটার কাছে যেতেই সে থমকে দাঁড়াল। তখন তার বয়স কত? বড় জোর দেড়কুড়ি। গুলাং সাহেব ওই থামটার গায়ে বেঁধে বেত চালিয়েছিল তার ওপর। কারণ? দু মুঠো দামী চা হাতে নিয়ে সে বেরিয়েছিল গুদাম থেকে। বউটার বড় শখ ছিল সেই চা খাবার। চুরি করেনি। গুদামবাবুকে বলে কয়েই নিয়েছিল ওইটুকু চা। সাহেব সেসব কথা শুনতেই চাইল না। বেত চালিয়ে পুরো একটা দিন তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল থামটার গায়ে। রক্ত লেগেছিল থামটায়।
থামটার গায়ে হাত রাখল শুকরা বুড়ো। অবিকল একই চেহারায় আছে, শুধু রক্তের দাগটাই নেই। হঠাৎ কি মনে হল, থু থু ছিটোতে লাগল সে, বাঁ পা তুলে লাথি মারল মাটিতে। পেছনে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষরা অবাক হয়ে দেখল শুকরা বুড়ো থর থর করে কাঁপছে। সিরিল এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরা আগেই শরীরটা বেঁকেচুরে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
হইহই করে উঠল সবাই। খবর পেয়ে মাংরা সর্দার ছুটে এসেছে। সিরিল গিয়ে সদ্য ফেরা ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এসেছে এখানে। শুকরা বুড়ো অসাড় হয়ে পড়ে আছে, দুটো হাতের মুঠো বন্ধ। মালা তার বুকের পাশে। ইঞ্জেকসান দেবার পর চোখ খুলল শুকরা বুড়ো। তার শরীর এখন কাঁপছে, গলায় গোঁ গোঁ শব্দ।
কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও কথা বের হচ্ছে না। শুকরা বুড়ো অসহায় চোখে সামনের বিষণ্ণ মুখগুলোকে দেখল। এরা তাকে এত ভালবাসে? ওই যে সব নতুন নতুন লোকজন? সাহেবদের আমলে সবাই তাকে চাবুক মেরেছে, চাবুক মেরে কাজ করতে শিখিয়েছে। এমন করে কেউ ভালবাসা জানায়নি। শুধু একজন ছাড়া, যে মাটির তলায় শুয়ে আছে। কিন্তু সে ছটফট করছে না কেন মাটির তলায়? সারাজীবন যে তাকে খোঁচাতো টেবুয়াতে ফিরে যাওয়ার জন্যে, সে এখন শান্ত কেন? আজ এই মাটিতে শুয়ে তার ছোঁয়া পাচ্ছে বুঝি, তাই কি সে আজ এত শান্ত? এরও নাম কি ভালবাসা, এটাই কি আসল জায়গা?
চোখ খুলতেই চমকে গেল বুড়ো। দু চোখে জল কেন ওই শিশুর! নাকের পাটা ফুলছে। হলদে কাঠি বের করা ফুটোটায় কিছু নেই ওর। শুকরা বুড়ো সারাক্ষণের মুঠো করে রাখা হাতটা খুলল। কোনরকমে হাতের চেটোয় রাখা নথটা বাড়িয়ে দিল নাতনির দিকে। কচি হাতে মালা তুলে নিল নথটা। শুকরা বুড়ো বলল, পর, নাকে লাগা, আমি দেখি।
যতটুকু মাটি পরিষ্কার করা সম্ভব করে দু-একজন মালার নাকে নথটা পরিয়ে দিতেই বুক জুড়ে নীল আকাশ টলে উঠল শুকরা বুড়োর। চোখের সামনে তার বউ, যার নাকে এমনি করে নথটা ঝলসাত।
শুকরা বুড়োর মুখে কোনোরকম কুঞ্চন নেই। কারণ কেউ তার শিরায় শিরায় তখন ফিস ফিস করছিল, ঠিক জায়গায় গেছে গো নথটা। আমার বুক জুড়িয়ে গেল তাই। জানো বুড়ো, এই মাটি, এই চায়ের গন্ধ। এই ভালবাসা আরও ওই তোমার রক্ত নিয়ে গড়া কচি মুখের ওপর ঝকঝকে নথ-এর কাছে কোন টেবুয়া বড় হবে? এই আমাদের বাসভূমি গো, আমাদের স্বর্গ।
.
এই চা বাগানের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় মিছিল আর কখনো হয়নি। সবাই, সাহেব বাবুরা থেকে ছোটসাহেব পর্যন্ত এসেছিল সেই মিছিলে। প্রবীণতম মানুষটি মাটির তলায় যাতে ভালভাবে ঘুমুতে পারে সেজন্যে ফ্যাক্টরির সামনে একটি বিশেষ জায়গা নির্দিষ্ট করা হল। তখন আকাশ জুড়ে একটি কালো শিশুর মুখ, যার চোখে জলের ধারা, নাকের পাটায় ভালবাসার হিরে জ্বলছে। সেই মুখের ভেতরে অস্পষ্ট সবুজ ঢেউ-খেলানো চায়ের বাগান। সেই মুখের একপাশ দিয়ে দীর্ঘ মিছিল এল মৃতদেহ নিয়ে। এসে সেই হিরের কাছে থমকে দাঁড়াল। এই দৃশ্য যারা দেখতে পেল তারা জানল, শেকড় নামিয়ে গাছ মাটির ভালবাসা নিল, নিয়ে বাঁচল।
