Chapter - 1
যতই সন্ধে ঘনিয়ে আসছে, ভদ্রলোকের মুখ ততই যেন শক্ত হয়ে উঠছে। যাকে বলে তেড়িয়া ভাব, সেই রকম। জানি না, এর পরে, আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে, এই কুপে থেকে বের করে দেবেন কি না। দিলেও আমার কিছু করার সাধ্য নেই। আমাকে করিডরেই রাত কাটাতে হবে। এমন না যে, চেয়ার কার কমপার্টমেন্টে গিয়ে, কোনও চেয়ারে বসে, রাতটা কাটিয়ে দিতে পারব। আমার মতো লোকের পক্ষে যতটা জানা সম্ভব, সেই হিসাবে জানি, এই পুরো এয়ারকন্ডিশন্ড এক্সপ্রেস ট্রেনে একটি খালি সিট নেই, একটিও চার বা দুই জনের কুপে খালি নেই। সব একেবারে ভরাভরতি, সেই কী একটা কথা যেন আছে, বর্ষার জলে ভরে ওঠা পুকুরকে বলে কী কথাটা? আহ, মমতা কাকিমার মুখে যে কথাটা প্রায়ই শুনেছি। কী কথাটা? মমতা কাকিমা বাঙাল-মানে পূর্ববাংলার মেয়ে, কিন্তু অনেকের মতে, তিনি বাঙাল’ বললে চটে যান না, যেমন আমাকে কেউ ঘটি বললে আমার বেশ মজা লাগে। ঘটি। আমি একটা ঘটি, কী তার মানে, আমি কিছুই জানি না, কিন্তু আমি যেন একটা ঘটি, পেতলের বা অ্যালুমিনিয়ামের, ভাবলেই হাসি পায়, আর মজা লাগে। অথচ বাঙাল শব্দের একটা বিশেষ অর্থ আছে, কার বইয়ে যেন পড়েছিলাম, বঙ্গ+আল, বঙাল–মানে বাঙাল। অবিশ্যি জানি না, বঙ্গ+আ বঙাল থেকেই বাঙাল কথাটা এসেছে কি না, তবে এটা জানি বাঙালদের শব্দের স্টক আমাদের থেকে অনেক বেশি। সেজন্যই বোধ হয় মমতা কাকিমাকে কেউ বাঙাল বললে, তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলেন, বাঙালরা ছিল, তাই তরে গেলে। খুব সত্যি কথা। বাংলা ভাষার শব্দের স্টক আজকাল অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে, আর সেটা পুব বাংলার মানুষদের জন্যই। কিন্তু সেই কথাটা–মমতা কাকিমা যেটা বলেন–সেই কথাটা–এমন অস্বস্তি হয়, ইচ্ছা করে, মারি এক থাপ্পড় নিজের গালে, অথবা যদি পেতাম ‘মেমারি’ বলে বস্তুটাকে নিজের শরীরের মধ্যে কোথাও, এক রামচিমটি কেটে, উল্লুকটার ঝুঁটি নেড়ে আহ, যাক, এত দূর আর যেতে হল না, মনে পড়ে গিয়েছে, কেন না, মমতা কাকিমার পান খাওয়া সেই সুন্দর লাল ঠোঁট দুটো চোখের সামনে ভেসে উঠল কি না, তাতেই মনে পড়ে গেল, কথাটা টইটুম্বুর। টই-টুমবুর, মানে একেবারে ভরাভরতি, মানে এই গাড়িটা যাত্রীতে ভরা টইটুম্বুর। কোথাও একটু জায়গা পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভদ্রলোকের হাবভাব আমার মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। মুখের ভাব যে কেবল তেড়িয়া হয়ে উঠছে, তা না। যত বারই চোখ তুলে তাকাতে গিয়েছি, উনি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে দেখছেন। চোখে চোখ পড়লেই, দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, আর প্রকাণ্ড শরীরটাকে নড়িয়ে-চড়িয়ে বসবার ভঙ্গি বদল করছেন, আর তার জন্য ওঁর খুব সুন্দর ছাপা সিল্কের লুঙ্গিতে, র সিল্কের জামায় খসখস শব্দ হচ্ছে, গদি মসমঁসিয়ে উঠছে, আমি মোটেই স্বস্তি বোধ করছি না। এমনিতেই ওঁর মুখটা চৌকো আর মোটা তুমবো তুমবো মতো, ফরসা আর লালচে রং, চোখের কোলগুলো ফোলা ফোলা, এবং চোখ দুটোও লাল, রেগে টং হলে যেমন হয়। না, শুধু রাগ-ই বা বলছি কেন, একটা–একটা মানে, একটা ঘৃণা আর আক্রোশের ভাব–অর্থাৎ যাকে বলে অভিব্যক্তি, যেন রয়েছে।
কেন যে তপনকাকা আমাকে এই এসি কোচের, সিঙল কুপে-তে টিকেট কেটে তুলে দিলেন! চেয়ার কারের টিকেট কেটে দিলেই পারতেন, আমি অনেক লোকের সঙ্গে, অনেকের অনেক কথা শুনতে শুনতে, বেশ জার্নি করতে পারতাম। রাত্রে শোয়া? কোনও দরকার ছিল না। একটা রাত না শুলে মরে যাব না। কিন্তু টাকা? আমাদের যে অনেক টাকা, তপনকাকার অনেক টাকা। আমি যত খারাপ আর পাজি আর বদমাইশ আর নোংরা চরিত্রের ছেলে হই, (মাস চারেক আগে সেটা প্রমাণ হয়েছে, আমি খারাপ, আমার একেবারে বারোটা বেজে গিয়েছে। আমাকে তো এ রকম আরামেই ভ্রমণ করতে হবে। প্লেনে আসতে রাজি হইনি, তা-ই এই এসি কোচের সিঙল কুপে-তে আমাকে মরতে আসতে হয়েছে। তা ছাড়া আর কী বলব। এ রকম ঠাণ্ডা একটা খুপরির মধ্যে আমি আর এই ভদ্রলোক, আমার কাছে তো এখন মনে হচ্ছে, একটা গুহার মধ্যে বাঘের পাশে বসে আছি। অথচ মাত্র পাঁচ দিন আগেও, দুমাস আমি কোথায় ছিলাম? যাকে বলে সশ্রম কারাদণ্ড, তাই তো ভোগ করছিলাম, আর আজ আমি ভারতবর্ষের একটা সেরা এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়ির সিঙল কুপেতে বসে, কলকাতা যাচ্ছি। বোঝো।
ওহ বাবা, আবার ভদ্রলোকের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল, আর সেই ছোট ঘোট লাল চোখে রাগ, আক্রোশ, ঘৃণা এবং পায়ের ওপর পা বদলাতে গিয়ে সিল্কের লুঙ্গির সেই খসখস এবং গদির সেই মসমস শব্দ, যেন আমাকেই পিষে মারছেন। সন্ধে যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উনি যেন কেমন ‘ভয়ংকর হয়ে উঠছেন, অন্তত আমার সেই রকমই মনে হচ্ছে। অবিশ্যি কারণ একেবারে নেই, তা বলব না, কারণ উনি আমাকে চেনেন, আমিও ওঁকে চিনি, আর আমার সশ্রম কারাদণ্ডের কথাও উনি জানেন, মানে বলতে গেলে, আমাকে অভিযুক্ত করা এবং শাস্তি দেবার পিছনে ওঁরও যথেষ্ট অবদান আছে। অবদানই বলতে হবে, কারণ সবাই জানে, উনি আসলে একটি মহৎ কাজই করেছেন। কিন্তু এখন এ রকম করছেন কেন, আর সন্ধে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ রকম হয়ে উঠছেন কেন। আমি তো শান্তভাবেই বসে আছি, বই পড়ছি, এবং এমনকী আমি আগে এসে জানালার ধারে বসেছিলাম বলে, আমাকে সরে যেতে বলেছেন, আমি সরে গিয়েছি, উনিই জানালার ধারে বসে আছেন, আর চার মাস আগেও সবাই জানত, আমি বরাবরই শান্ত, বাধ্য। এখন হয়তো অনেকে আর ওটা বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু আমি তো জানি, আমি যে আমি, সেই আমিই আছি, সেই আদি ও অকৃত্রিম মদনমোহন। শান্ত বাধ্য বলতে যে আমি গল্পগুজব, হাসিঠাট্টা করতে ভালবাসি না, তা না। এমনকী আমি পড়াশোনায়ও বরাবর ভাল ছিলাম, এখনও বই ছাড়া আমার চলে না, যদিও কিনা, আমাদের বাড়ির লোকেরা, বা আত্মীয়স্বজনরা সকলেই আমাকে কেমন যেন বোকা বোকা ভাবে। নির্বোধ যাকে বলে। অথচ সত্যি আমি তা না, আমি নিজে তা ভালই জানি, এবং এও জানি, এ কথা কারোকে বলা চলে না, বিশ্বাস করো, আমি সত্যি বোকা না। এখন তো অবিশ্যি সবই বদলিয়ে গিয়েছে। এখন আমি বোকা তো বটেই, তার ওপরে দুর্নাম জুটেছে, আমি খারাপ চরিত্রের ছেলে, নোংরা, বদমাইশ। আমাকে দিয়ে এ সংসারে আর কিছুই হবে না। তপনকাকার দাদা সবিতামোহন তো পরিষ্কার আমার মুখের ওপরেই বলে দিয়েছেন, বদমাইশি করতে হলে চালাক হওয়া দরকার। বোকা বদমাইশদের ওষুধ একমাত্র উত্তমমধ্যম। উত্তমমধ্যম মানে মার। তা হবে হয়তো। সত্যি, কী যে হয়ে গেল একটা ব্যপার।
উহ্ মিস্টার জে. বিশওয়াস্ আবার আমার দিকে সে রকম করে তাকিয়ে দেখলেন, এবং সেই শব্দ, ঘাড়ে ঝটকা। ব্যাপারটা এবার যেন একটু ঘন ঘন হচ্ছে। প্রথমে কুপে-তে ঢুকেই মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন একটা ঘেয়ো কুকুর দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। দু চোখে রাগ, ঘৃণা, বিরক্তি, কী না ছিল। তখন তিনি ট্রাউজার, টাই, কোট ইত্যাদি পরেছিলেন এবং চোখে চশমা ছিল, আর কপালের সামনে থেকে। কলপ উঠে যাওয়া বাদামি চুল ভালভাবে পাট করা ছিল। কয়েক সেকেন্ড সেই রকম ভাবে তাকিয়ে থেকে, চোখ থেকে চশমাটা যেন হেঁ মারার মতো ছিনিয়ে খুলে নিয়ে, প্রায় ধমকে উঠেছিলেন, তুমি? এখানে?
আমি যে রকম শান্তভাবে বলে থাকি, সেভাবেই বলেছিলাম, কলকাতায় যাচ্ছি।
মিস্টার জে. বিশওয়াস–মানে জগত বিশ্বাস, (উনি নিজে কখনও বিশ্বাস উচ্চারণ করেন না, নিজেকে বিশওয়াস বলেন।) তারপরেও কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে সেইভাবেই তাকিয়েছিলেন, এবং কিছু যেন ভেবেছিলেন, এবং শব্দ করেছিলেন, হুম! শব্দের মধ্যে রাগ স্পষ্ট ছিল। পিছনেই দরজার সামনে, কুলি ওঁর সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মিস্টার জে. বিশওয়াস সুটকেসটা কুলিকে রাখতে ইঙ্গিত করে, কোটের পকেট থেকে কিছু খুচরা পয়সা বের করে দিয়েছিলেন। কুলিটা একটু হেসে কপালে হাত ঠেকিয়েছিল, হাসিটা কেমন যেন খোশামোদের হাসির মতো দেখাচ্ছিল, এবং আবার হাত পেতে বলেছিল, হুজোর।
তার মানে, সে আরও বেশি পয়সা চেয়েছিল, উনি জোরে ধমকে উঠেছিলেন, ভাগো।
কুলিটা যে ভয় পেয়েছিল, আমি তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। সে কেবল মিস্টার জে বিশওয়াস সাহেবের মুখের দিকে এক বার দেখে, মাথা নিচু করে চলে গিয়েছিল। কুলিরা অনেক সময়েই খুব অন্যায় করে, বিরক্ত করে, বলা যায়, পেজোমি করে, কিন্তু তখন কুলিটার জন্য আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কুলিটা চলে যেতেই তিনি কোট খুলে কুপের দেওয়ালে আয়নার পাশে হুকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, টাইটার নট আলগা করে দিয়েছিলেন, এবং নিজেকে আয়নায় দেখছিলেন। উনি বেশ চওড়া, শক্ত, মোটাসোটা লোক, তবে বেশ বেঁটে। বেঁটে বললে অনেকে চটে যান, আমি মনে মনে বলেই বলতে সাহস পেয়েছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াস তার কপালের সামনে চুল দেখতে দেখতে বেশ রাগ রাগ গম্ভীর স্বরেই হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওটা কী বই পড়ছ?
এমন চমকে উঠেছিলাম ওঁর জিজ্ঞাসায়, কারণ আমার খেয়ালই ছিল না যে, আমি বই পড়ছিলাম, আমার কোলের ওপরে একটা বই রয়েছে। আমাকে কেউ তো সেই যাকে বলে সি অফ বা গুডবাই বা বিদায় দিতে আসেনি। তপনকাকার ড্রাইভার আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে, সুটকেসটা নামিয়ে দিয়েই চলে গিয়েছিল। আমি আমার কুপে দেখে, ঠিক মতো টিকেট দেখিয়ে উঠে, জানালার ধারে বসে বই পড়ছিলাম। আমার দু সেকেন্ড দেরি হয়েছিল জবাব দিতে, বলেছিলাম, এটা গর্কির মামা’
আমার কথা শেষ হবার আগেই, মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, মাদার, গর্কিজ মাদার! গুড, ভেরি গুড, গ্রেট বুক, য়ু শুড রিড দ্যাট বুক।
মালভা! মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন আঁতকে উঠেছিলেন। তারপরেই, কী বলব, ঠিক যেন বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছিলেন, মালভা? যু আর রিডিং দ্যাট স্টোরি?
আমি বুঝতে পারিনি, কেন মিস্টার জগট বিশওয়াস, (ওঁর নামের উচ্চারণটা উনি এ রকমই করেন, আমি শুনেছি, ‘জগট’) এতটা–মানে যাকে বলে ক্ষেপে ওঠা, তা-ই উঠেছিলেন। কারণ আমার ধারণা ছিল, আমি একটা জগৎ (এক্ষেত্রে ‘জগট’ না।) বিখ্যাত গল্প পড়ছিলাম। তাই আমি ভেবেছিলাম, উনি বোধ হয় কিছু একটা ভুল করেছেন। আমি যে ম্যাকসিম গর্কির বিখ্যাত গল্প মাল পড়ছি, উনি হয়তো সেটা ঠিক ধরতে পারেননি, কিন্তু, তা-ই বা হয় কী করে। উনি তো মালভার নাম উচ্চারণ করলেন, শুনতে ভুল করিনি, অথচ রাগে ওঁর চোখ দুটো যেন ধকধক করছিল, সেই চোখের দিকে চেয়ে থাকা কঠিন, আর ভীষণ রাগেই উনি যেন কথাও বলতে পারছিলেন না। তবু আমি খানিকটা ভুল ভাঙাবার মতো করেই, একটু হেসে বলেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ, মানে দ্যাট ফেমাস স্টোরি অব
শাট আপ৷ মিস্টার জে, বিশওয়াস আমাকে এক ধমক দিয়ে উঠেছিলেন। আমি এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, আর বুকের মধ্যে এমন করছিল, ভেবেছিলাম, আমাকে হয়তো একটা থাপ্পড় মেরেই দেবেন, কেন না ওঁর শক্ত, মোটা শরীর নিয়ে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসেছিলেন, এবং রেগে ধমকেই বলেছিলেন, য়ু ডোন্ট ট্রাই টু টি মি, হুইচ অ্যান্ড হোয়াট স্টোরি ইজ ফেমাস। আমি জানি, এটাই তোমার কাছে ফেমাস স্টোরি হবে, ইট ফিটস য়ু, দিস অবসিন ফিলদি স্টোরি।
ভীষণ অবাক হলেও যে গায়ের মধ্যে কেঁপে, কী রকম একটা ঘুলিয়ে ওঠার মতো হয়, আমার তা আগে জানা ছিল না। আমি কোনও রকমে উচ্চারণ করতে পেরেছিলাম, অবসিন? ফিলদি?
মিস্টার জে. বিশওয়াস তার স্বরে একটা জোর ধাক্কা দিয়ে বলেছিলেন, অবকোর্স। যেখানে বাবা আর ছেলে একটা মেয়েমানুষের (মেয়েমানুষ! মিস্টার জে. বিশওয়াস উচ্চারণ করতে পারলেন।) জন্য পশুর মতো মারামারি করতে পারে, আর তাই দেখে সেই মেয়েটা লুটিয়ে পড়ে হাসতে পারে, দ্যাট ইজ অবসিন, হান্ড্রেড পার্সেন্ট অবসিন।
আমার মনে হয়েছিল, সমস্ত শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে, আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যাচ্ছে, তবু আমি বুঝতে পারছিলাম, অবাক না, আসলে যাকে বলে অসহায়–্যা, অসহায় প্রতিবাদেই আমার গায়ের মধ্যে কেঁপে উঠেছিল, এবং আমি একটা নিকৃষ্ট উল্লুকের মতো আবার বলেছিলাম, কিন্তু দেখুন, পেটি বুর্জোয়া বাবা আর ছেলের মাঝখানে, আসলে মালভা চরিত্র, আর সেই বেকার আর দু-দু-দুর্জয়।
আমার কথা শেষ হতে পারেনি, তার আগেই মিস্টার জে. বিশওয়াস ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, কেমন একটা বাঘা চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে, ঘাড় একটু কাত করে আমার দিকে সোজা তর্জনী তুলে ঠিক বাঘের মতোই নিচু স্বরে যেন গরগর করে উঠেছিলেন, আর য়ু টিচিং মি ইজ ইট?
আমি তাড়াতাড়ি ঘাড় নেড়ে বলেছিলাম, আজ্ঞে না।
তিনি তেমনিভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ডু য়ু নো হু অ্যাম আই?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মিস্টার জগট বিশওয়াস, এবং একজন বিরাট কেন্দ্রীয়
লিভ ইট। য়ু নো, প্রাইম মিনিস্টার টেকস অ্যাডভাইস ফ্রম মি, নট ওনলি অন ইকনমিকস, অলসো অন আর্ট অ্যান্ড লিটারেচর?’
না, জানতাম না, আমি শুধু জানতাম, উনি অর্থ বিভাগের একজন বিশিষ্ট কর্মচারী, আমার বাবা বা তপনকাকাদের বিশিষ্ট বন্ধু, যদিও উনি আমার বাবার থেকে বয়সে কিছু ছোট, কিন্তু কলকাতায় আমার বাবার সঙ্গে এক টেবলে বসে ড্রিঙ্ক করেন। তাই আমি হা করে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে, ঘাড় নেড়ে বলেছিলাম, আঁ-আজ্ঞে না।
উনি তর্জনী নেড়ে, যেন আমাকে খোঁচা দিচ্ছেন, এমনিভাবে বলেছিলেন, তা হলে জেনে রাখো। জেনে রাখো প্রাইম মিনিস্টার আমার কাছ থেকে মার্কসিস্ট ইকনমিকস সম্পর্কে অ্যাডভাইস নেন, কারণ আমি জানি, আমি ছাড়া তাঁকে মার্কসিজম অ্যান্ড মার্কসিস্ট ইকনমি বোঝাবার কেউ নেই, বিকজ আয়াম দ্য ওনলি ম্যান, হু ইজ এ ডিক্লেয়ার্ড মার্কসিস্ট, এভরিবডি নোজ দ্যাট, ডু য়ু ফলো মি?
আমি হা করেই ঘাড় কাত করে বলেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার জবাব শোনার মেজাজ ওঁর মোটেই ছিল না, উনি বলে চলেছিলেন, আর তুমি এটা নিশ্চয়ই জানো, আমি ইংরেজি আর বাংলায় আর্ট অ্যান্ড লিটারেচরের ওপর প্রায়ই লিখে থাকি, আর সেটা প্রগ্রেসিভ আউটলুক নিয়ে?
প্রগ্রেসিভ আউটলুক মানে, উনি বোধ হয় প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন, উচ্চারণ করা দূরে থাকুক, মনে মনে ভাবতেও আমার ভয় করছিল, ওঁর যে দু-একটা লেখা আমি। পড়েছিলাম, সেগুলো এতই অশিক্ষিত, আর–আর ওটাকে কী যেন বলে, হ্যাঁ, আত্মম্ভরিতায় পরিপূর্ণ, আমি পড়তে পড়তে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। অথচ উনি যে অনেক পড়েছেন, তা ওঁর লেখা পড়লে বোঝ যায়, কিন্তু যখন বিচারকের মতো রায় দেন, ঠিক যেন একটা তলোয়ার দিয়ে ঝপাং করে কোপ বসিয়ে দেন। ওহ, দেরি হয়ে যাচ্ছিল জবাব দিতে, আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
উনি তখন ফাঁক করা ঠ্যাং সোজা করেছিলেন, আর তর্জনী নামিয়ে নিয়েছিলেন। আমি যে কী স্বস্তিবোধ করেছিলাম, ইচ্ছা করছিল, যা কখনও করিনি, তা-ই করি, ভগবানকে ডাকি। তারপরে উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাড় দোলাতে দোলাতে, ঠোঁটের কোণ কুঁকড়ে বলেছিলেন, অ্যান্ড হু ইজ দ্য ব্লান্ডারার, য়ু নো? লেনিন।
লেনিন?’ উচ্চারণ করবার ক্ষমতা প্রায় না থাকলেও, কোনও রকমে করেছিলাম।
ইয়েস, লেনিন। তিনি যদি গর্কিকে বলতেন, মালভা গল্পটা তাঁর সাহিত্যকৃত্য থেকে বাদ দিতে, তা হলে নিশ্চয়ই গর্কি তা করতেন। গর্কি তা করেছিলেন, যেমন স্কাই ব্লু বা আরিকোয়াটেড লাভ-এর মতো গল্প, যা বুর্জোয়া দোষে দুষ্ট, গর্কি তার লিটারেরি ক্রিয়েশন হিসাবে অবসোলিট করেছিলেন, ডু য়ু নো দ্যাট?
জানি, কিন্তু মালভা যে বুর্জোয়া দোষে দুষ্ট, জীবনে আজই আমি প্রথম শুনেছিলাম, কিন্তু মিস্টার জে. বিশওয়াসকে সে কথা বলবার সাহস আমি পাচ্ছিলাম না। কেবল বলেছিলাম, জানি।
তিনি যেন ঠোঁটে একটু হাসি ফোঁটাবার ভাব করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বই দুটো পড়েছ বোধ হয়?
হ্যাঁ।
তৎক্ষণাৎ ওঁর মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল, তা তো পড়বেই, তা তো পড়বেই, তোমার মতো ছেলের তো ও সবই পড়তে ভাল লাগবে, তা না হলে দিল্লির রাস্তায় পাবলিকলি কেউ ও রকম অবসিনিটি আর ইমমরাল ব্যাপার করে না। তা ঘানি টেনেও এখন মালভার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দুরন্ত যৌবন আর ককেট্রি আর ভোলাপচুয়াসনেস চুষে চুষে এনজয় করছ, না?
ককেট্রি আর ভোলাপচুয়াসনেস বলতে তিনি কী মনে করেছিলেন? যাকে বলে ছে-ছেছেনালি (তাই তো, না কি?) আর স্বৈরিণীতন্ত্রতা? মালভা সম্পর্কে আমি এ সব ভাবতে পারি না। কিন্তু চুষে চুষে এনজয় করার মানেই বা কী। পড়তে পড়তে আবার চোষা যায় নাকি? সে কথা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার ছিল না, কারণটা তিনি নিজেই বলে দিয়েছিলেন, কারণটা আর কিছুই না, উনি যে আমার অন্যায় আর কারাবাসের ব্যাপারটা জানেন। আমি বলেছিলাম, না, মানে পড়ছিলাম।
জানি। মুখ থাবাড়ি দিয়ে একরকমের কথা বলার ভাব আছে, সেভাবে কথাটা উচ্চারণ করে তিনি আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে, সুটকেসটা টেনে তুলে ধপাস করে গদির ওপর ফেলেছিলেন। পারলে বোধ হয় আমাকেই ওভাবে ফেলতেন, এ রকম একটা ভাব। আর হুকুমের স্বরে আমার দিকে না তাকিয়েই বলেছিলেন, জানালার ধারটা ছেড়ে বসো।
আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু বসার জায়গা ছিল না, কারণ যেদিকটায় সরে বসতে পারি, সেদিকটার অনেকখানি জুড়ে মিস্টার জে. বিশওয়াসের বেশ বড়, কিন্তু হালকা বিলাতি সুটকেসটা ছিল। পকেট থেকে চাবি বের করে সুটকেস খুলতে খুলতে, না তাকিয়েই বলেছিলেন, তোমার মতো ছেলে, কী জন্য কী পড়ে, তা আমি জানি।
বলেই তিনি এখন যে সুন্দর সিল্কের লুঙ্গিটা আর র-সিল্কের পাঞ্জাবিটা পরে আছেন, সে দুটো সিটের ওপর রেখেছিলেন, আর তখনই সুটকেসের মধ্যে এক জোড়া জনিওয়াকারের বোতল আমার চোখে পড়েছিল। ঠিক তখনই আমি সেই বিখ্যাত ফরাসি সেন্টটার গন্ধ পেয়েছিলাম কি না, মনে করতে পারি না, বা হয়তো প্রথমেই পেয়েছিলাম, উনি যখন কুপে-তে ঢুকেছিলেন, কিন্তু ওঁর রাগ আর অবাক হওয়া দেখে তা আমার মনেই জাগেনি। মমতা কাকিমা ওই সেন্টটা ব্যবহার করেন, আমি জানি, আরও অনেকে করে, আমাদের বাড়িতেও। মিস্টার জে. বিশওয়াস টাইয়ের নটটা পুরোপুরি না খুলে, খানিকটা ফাঁস বড় করে মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে বের করে নিয়েছিলেন। অলওপন শার্টের বোতাম খুলে, টাই আর শার্ট-কোট ঝোলানো হুকেতেই ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, প্রায় আমার গায়ে ধাক্কা মারার উপক্রম করে। আমি দেওয়ালের দিকে আরও চেপে না গেলে, হয়তো ধাক্কাই লাগত। তারপরেই তিনি লুঙ্গিটা নিয়ে মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে, নীচের দিকে নামিয়ে, সামনের অংশ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে, ভিতরে হাত নামিয়ে নিয়েছিলেন। উনি যে ট্রাউজারের বোম খুলছেন, তা বুঝতে পেরে, আমি এক বার লেভেটরি আছে কি না, দরজার দিকে দেখেছিলাম, কেননা, হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল, এ কুপে-তে বুঝি লেভেটরি আছে, তারপরে আমি মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই, আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম। মনে পড়েছিল মমতা কাকিমা দাড়িটা কামিয়ে নিতে বলেছিলেন, কিন্তু হয়ে ওঠেনি, আর চুলগুলোও বেশ বড় হয়েছে। আমাকে লোকে বোকা বলুক, আর এখন খারাপ বা বদমাইশ বা চরিত্রহীন বলুক, আমার চেহারার নিন্দা কারোর মুখে কখনও শুনিনি, বরং–যাক গিয়ে, সে সব কথা মনে করেই বা কী হবে, এ চেহারাটাই বোধ হয় আমার কাল করেছে, আমার সর্বনাশ–যাক গিয়ে সে সব কথাও, এখন আমি খুব রোগা হয়ে গিয়েছি। মোটা কখনওই ছিলাম না, কিন্তু দু মাস সশ্রম কারাদণ্ড কারাদণ্ডের থেকেও কারাগার বলে জায়গাটার ভিতরের যা সব ব্যাপার, কারাদণ্ডের থেকে সে সবই আমাকে শেষ করে দিয়েছে। তার ওপরে আমি বেশ লম্বা, মিস্টার জে. বিশওয়াসের থেকে এক হাত বেশি তো বটেই। মমতা কাকিমা বলেন, ঢ্যাঙা, কখনও বা তেঢেঙে লম্বা। এ সবই অবিশ্যি আমাদের ঘটিদের কথা, আমার শুনতে বেশ লাগে। ইতিমধ্যে সঁতে লুঙ্গি কামড়ে ধরেই মিস্টার জে. বিশওয়াস বলতে আরম্ভ করেছিলেন, গর্কির লেখা যদি পড়তে হয়, পড়বে মাদার। সকলে সবকিছু হজম করতে পারে না। যদি পারতে, তা হলে তুমি ও রকম কাণ্ড করতে না। (কী বলব, আমি তো জানি, আমি ওঁকে কিছুতেই আমার অবস্থা বোঝাতে পারব না।) গর্কির মা পড়েছ?
বলেছিলাম, পড়েছি।
কিন্তু তার রেজাল্ট কিছুই হয়নি, তা হলেই বুঝতে পারছ।বলতে বলতে তিনি ট্রাউজারটাও হুকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। ওঁর মোটা পেশল আর ধূসর লোমশ গায়ে তখন বগল খোলা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা। পাঞ্জাবিটা পরতে পরতে বলেছিলেন, এই যেমন ধরো আমি, আমি লেডি চ্যাটারলিজ লাভার-এর আনএকসপারগেটেড এডিশন পড়েছি, (উনি এত বড় একজন সরকারি কর্মচারী, কী করে বলছেন, ও বইটা উনি পড়েছেন? ওটা একটা বেআইনি কাজ। অবিশ্যি বইটা আমিও পড়েছি, তপনকাকার একটা কপি আছে, কিন্তু আমি তো আর মিস্টার জে. বিশওয়াস না, একদিকে দায়িত্বশীল কর্মচারী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শদাতা, এবং সাহিত্য-শিল্প সম্পর্কেও উপদেষ্টা এবং লেখক।) কিন্তু আমাকে। মোটেই কোনও দিক থেকে পারভার্ট বা কোরাপ্ট করতে পারেনি। আমি বলব, ইট’জ এ গ্রেট বুক, বাট নট ফর য়ু। তুমি যদি পড়তে, তা হলেই বইটা অবসিন হত, কেন না, তোমার মতো ছেলেকে বইটা খারাপ পথে নিয়ে যেত, তোমাকে কোরাপ্ট করাত, তোমার মতো ছেলেকে স্পেশালি, আর সেই কারণেই ইন্ডিয়াতে বইটা পোসক্রাইব করা হয়েছে।
ওঁকে আমি কী বলব, বুঝতে পারছি না। একজন ত্রিশ বছরের লোককে উনি ছেলে ছেলে বলে যাচ্ছেন–তা না হয় বলুন, ওঁর বয়স আমার থেকে কুড়ি-পঁচিশ বেশিই হবে, কিন্তু কী বলব ওঁকে, ওঁর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া, কেননা উনি পত্র-পত্রিকায় যেমন প্রগতিশীল আউটলুকে লেখেন, বিচারকের মতো রায় দেন, সেইভাবেই বলে যাচ্ছেন, আনএকসপারগেটেড এডিশন অব লেডি চ্যাটারলিজ লাভার আমাকে খারাপ পথে নিয়ে যাবে, স্পেশালি আমার মতো ছেলেকেই কোরাপ্টেড করবে, সেইজন্যই বইটা ভারতে নিষিদ্ধ। অথচ বইটা গ্রেট, তার মানে, মালভা গল্প অশ্লীল। নেহাত আমি খারাপ কথা বলতে শিখিনি, এবং কারোকে কখনও খারাপ কিছু বলতেও পারি না, আমার বাধে, তা ছাড়া কারোকে সমালোচনা করতে আমি যেন কেমন লজ্জা বোধ করি, কেন না, আমি যেন কেমন– সেই ইয়ে–হ্যাঁ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, যদিও জানি, এটাও অনেকে আমার দুর্বলতা মনে করবে, কারণ ট্রেনে, বাসে, কফিখানায়, ক্লাবে বা বাড়ির পার্টিতে, সবখানেই শতকরা নিরানব্বইজনই সমালোচক, আমি শুধু শুনেই যাই, কেন না পথ বাতলাবার বা রায় দেবার মতো হাজার হাজার রাস্তা আমার সত্যি জানা নেই। থাকলে মিস্টার জে. বিশওয়াসকে আমি বলতাম–বলতাম–আহ, একটা কিছু মনে আসছে না, ওঁর সেই গ্রেট বুক থেকেই একটা মোক্ষম গালাগালি আমার বেছে নিতে ইচ্ছা করছে। তার দরকার নেই, আমি বরং মনে মনে বলছি, লোকটা একটা ডাহা মিথ্যুক। মিথ্যুক, এই কথাই আমার মনে হচ্ছে, কারণ আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, উনি ওঁর সেই গ্রেট বুকটি পড়েননি বা পড়ে থাকলেও, ভারতে আর জাপানে, লেডি চ্যাটারলির প্রেমিক’-এর নিষিদ্ধ অংশ বাতিল যে বইটি সবাই পড়ে থাকে, উনি সেটাই পড়েছেন, তা না হলে, মালভা সম্পর্কে কেউ এ কথা বলতে পারতেন না। এর ওপরে ওঁকে যদি আমি বলতাম, আমি সেই গ্রেট বুকের নিষিদ্ধ সংস্করণটি পড়েছি, তা হলে আমি ওঁর মোটা মোটা দুটো হাতের দিকে তাকিয়েছিলাম, যে হাতে উনি তখন স্যুটকেসের ভিতর থেকে টেনে বের করেছিলেন, একজন আমেরিকান লেখকের সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম থ্রিলার একটি পকেট বই, যার ওপরের ছবিতে একটি মেয়ের ব্রা তার হাতের কনুইতে ঝুলছে, এবং যদিও সে অর্ধেক পিছন ফেরা, একটি পুরুষের শক্ত হাত তার কোমরের প্যান্ট খানিকটা টেনে নামিয়ে ফেলেছে। চকচকে বইটি এক হাতের থাবায় ধরে অন্য হাতে সুটকেসটা নীচে সিটের তলায় নামিয়ে দিয়ে, জানালার ধার ঘেঁষে বসেছিলেন, সেই খসখস মসমস শব্দ তুলে, যে- জানালার ধার থেকে উনি আমাকে বাঘের মতো ছাগলছানা তাড়া করেছিলেন। খেয়ালই করিনি, গাড়িটা কখন চলতে আরম্ভ করেছিল, কখন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যমুনার ওপর ব্রিজ পার হতে আরম্ভ করেছিল। মনে মনে ইচ্ছা ছিল, আমি যমুনা নদী দেখব, নদীর দূরে আকাশ দেখব, এবং তাই দেখবার জন্য গদির অন্য প্রান্তে বসে আমি মাথা নিচু করেছিলাম, কিন্তু ব্রিজ তখন শেষ, যমুনা এক পলকের জন্য দেখা দিয়েই আমার দৃষ্টি থেকে সরে গিয়েছিল, তখনও রোদ চিকচিকে গাছপালা আর নগরের কিছু ইমারত আমার চোখে ভাসছিল, আর সে সময়েই আমি শুনতে পেয়েছিলাম, য়ু শু্যড লারন অ্যান্ড টেক লেসন ফ্রম একসপার্টস–আই মিন–সত্যিকারের পড়াশোনা করা লোক, যারা তোমাকে বোঝে, কী বই তোমার পড়া উচিত আর উচিত নয়। সে যাই হোক গে, তুমি এ ট্রেনে ট্রাভেল করছ কেন, তুমি তো এ খরচে প্লেনেই যেতে পারতে।
কথাটা অবিশ্যি আমারই জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, কারণ তিনি যে একজন মস্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, তা না, প্রধানমন্ত্রীকে নাকি মা-মার্কসীয় অর্থনীতির বিষয়ে উপদেশ দেন, এবং আর্ট অ্যান্ড লিটারেচর সম্পর্কেও তার মতো ব্যস্ত লোকের পক্ষে প্লেনে যাওয়াই তো উচিত ছিল। আমি জবাব দিয়েছিলাম, আমার তো তেমন তাড়াহুড়োর কিছু নেই, তাই ভাবলাম গাড়িতেই যাই। তবে মানে আমি ঠিক এভাবে যেতে চাইনি, চেয়ার কারেই চলে যেতে পারতাম, তপনকাকা কুপের টিকেট।
তপনকাকা? আমার কথার মাঝখানেই মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, মানে আমাদের তপন সেন?
আশ্চর্য, উনি কি আমার তপনকাকাকেও ভুলে গিয়েছিলেন নাকি। আমি বলেছিলাম, মানে হ্যাঁ, তপনকাকা।
তপনটার কোনও দিন বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না।’ বলেই তিনি বই খুলে পড়তে আরম্ভ করেছিলেন। তপনকাকা ওঁর বন্ধু, এ রকম কথা বলতেই পারেন, কিন্তু এ রকম ক্ষেত্রে কেন, তা বুঝতে পারিনি, কিছু জিজ্ঞেসও করিনি, অথচ আমার হাতের বইয়ের পাতাটা খুলব কি না, বুঝতে পারছিলাম না, উনি যদি আবার ধমকে ওঠেন। অবিশ্যি প্রায় বছর দশেক আগের একটি মজার ঘটনা আমার মনে পড়েছিল, যা আমাদের কলকাতার বাড়িতেই ঘটেছিল, এবং একই সঙ্গে, জানালাটা দূরে হলেও আমার চোখ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, বাইরের বেলাশেষের রোদ-লাগা বাবলা বন, সবুজ মাঠ আর শস্যের খেত, রাখাল ছেলে। বা মেয়ের মহিষের দল নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া, আর আশ্বিনের নীল আকাশ, নীচের অংশে কিছু বা লালের ছোঁয়া, কিন্তু বাংলার শরতের আকাশ তা না।
মাত্র কয়েক মিনিট বাইরে তাকিয়ে আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, অথচ বাইরের পড়ন্ত বেলার ছবি দেখতে দেখতে কলকাতার বাড়ির সেই মজার ঘটনাও মনে পড়ছিল, যে কারণে আমি মনে মনে হাসছিলাম, তখনই কুপের দরজাটা খুলে গিয়েছিল, একজন মহিলা দাঁড়িয়েছিলেন খোলা দরজায়, তার চোখে তখনও মস্ত বড় গোল সানগ্লাস। লাল সোনালি রঙে মেশামিশি ম্যাকসির ওপরে রং মেলানো স্লিভলেস জ্যাকেট। আমার ঘ্রা-ঘ্রাণেন্দ্রিয় ভরে গিয়েছিল সেই, সেই ফরাসি সেন্টের গন্ধে, মিস্টার জে. বিশওয়াসের খুশি চলকানো গলা শোনা গিয়েছিল, আহ আ! তারপরেই টাকরায় জিভ ঠেকিয়ে তিনি যে শব্দটি করেছিলেন, আমার কানে তা বেজেছিল, ঠা ঠা এবং তার মানে কী, বুঝে ওঠার আগেই তিনি আবার বলে উঠেছিলেন, আই ওয়াজ থিংকিং অব য়ু। এভ্রি মোমেন্ট।
রিয়্যালি। মহিলা যেন গানের সুরে বলে উঠেছিলেন, এবং ঘাড়ে একটু দোলা লেগে যেতেই, আমি তার ঘাড়-ছাটা মোলায়েম কালো সুন্দর চুলের গোছায় দোলা লাগতে দেখেছিলাম। দরজাটা তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। রিয়্যালি’ বলবার সময় তাঁর ঝকঝকে দাঁত এক সেকেন্ডের জন্য দেখতে পেয়েছিলাম, তারপরেই তাঁর রং-মাখা ঠোঁট কেন যেন বেঁকে উঠেছিল, তিনি দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, দুটি হাত দুই জংঘার মাঝখানে জড়ো করে রেখে, যখন আমি তার রাঙানো নখের সুন্দর একটি আঙুলে সবুজ রঙের বড় পাথরের আংটি দেখতে পেয়েছিলাম, আর ডান হাতে মস্তবড় সোনার ঘড়ি, এবং তার পানা চরণের দিকে আমার চোখ পড়েছিল, রাঙানো নখ যে ফরসা পায়ে, প্রায় তার পোশাকের রঙেই রং মেলানো কেবল দুটি প্রজাপতি, কোথায় যে স্লিপারের স্ট্র্যাপ দেখতেই পাচ্ছিলাম না। মুহূর্তের মধ্যেই সিল্কের লুঙ্গির খসখস শব্দ শুনেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস দরজার কাছে উঠে গিয়ে মহিলার একটি হাত টেনে ধরে বলেছিলেন, কাম, সিট ডাউন ফর এ কাপল অব মিনিটস, অ্যান্ড–
ওঁর কথা শেষ হবার আগেই মহিলা তার হাতটি ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, আর চোখ থেকে প্রকাণ্ড সানগ্লাস খুলে নিয়েছিলেন, আর আমার বুকটা কেমন ধক করে উঠেছিল, আমি মহিলাকে চিনি। মহিলার চোখ দুটি, সেই যে একটা সুন্দর কথা আছে–সেই যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানেও ব্যবহার করেছেন, না না, কালো হরিণ-টরিণ না, ডা-ডা-ডা-ড ডাগর চোখ, কুচকুচে কালো তারা, কিন্তু ভুরু কুঁচকে উঠেছিল, আমার দিকে তাঁর দৃষ্টি, দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি উঠে দাঁড়ানো উচিত, কিংবা তাঁকে না চেনাই আমার ভাল, যদিও তা অসম্ভব, কারণ উনি মমতা কাকিমার থেকে বয়সে ছোট হলেও বান্ধবী, ওঁরা সব মহিলারা কী একটা সমিতি করেন, অনেক বার সপ্তাহে অন্তত দু-তিনদিন মমতা কাকিমার কাছে ওঁকে আসতে দেখেছি, আমার সঙ্গে পরিচয় আছে, অনেক সময় অনেক কথাও হয়েছে, পরিষ্কার মনে করতে পারছিলাম (দু মাস সশ্রম কারাদণ্ডের পরে বিশেষ করে কারাগারের সেই পরিবেশে থেকে, আমি অনেক কিছুই হঠাৎ মনে করে উঠতে পারি না।) উনি মিসেস চ্যাটার্জি, না সুদীপ্তা। জেল থেকে বেরোবার পরে এই ট্রেনে প্রথম দেখা, সেজন্যই ওঁর ভুরু কুঁচকে উঠেছে কিনা বুঝতে পারছিলাম না, মানে আমার ওপর ঘৃণায় বা রাগে উনি ও রকম করে তাকিয়েছিলেন কি না, যে কারণে পরিচিতের মতো উঠে দাঁড়ানো উচিত কি না, বুঝতে না পেরে আমি বসেই ছিলাম, এবং মুখ ফিরিয়ে নেবার সময়েই মিস্টার জে, বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, ক্যান য়ু ইমাজিন বিমি, হি ইজ দ্যাট ম্যান, মিস্টার এম. এম. মুকেজি, যার জন্য আমি এই সিঙল কুপেটা পুরোপুরি দখল করতে পারিনি। আমি তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বিশওয়াসের জন্যই সিঙল। কুপে চেয়েছিলাম, ওনলি ফর যু, মিসেস বিশওয়াসের যাবার কোনও ব্যাপারই নেই, বাট হিউম্?
মিস্টার জে. বিশওয়াস হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন, কারণ মিসেস চ্যাটার্জি হঠাৎ ওঁর দিকে চোখের তারা ঘুরিয়ে দেখেছিলেন, এবং তারপরেই আবার আমার দিকে। আমি তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথাগুলো বোঝবার চেষ্টা করছিলাম, আর তখনই তার গাঁক করে ওঠা গলা শুনতে পেয়েছিলাম, আই ডোন্ট কেয়ার ফর হিম এনি হাউ, দুটোই তো মাত্র সিঙল কুপে, তার মধ্যে আর একটি তুমি আর চ্যাটার্জি দখল করে বসে আছ, আর আমাকে এর সঙ্গে, ওহ, হোয়াট এ ক্রাইসিস, আই ওন্ট গেট য়ু ফর এ মিনিট…উম? নো, নো, আই ডোন্ট কেয়ার ফর হিম। জানি না, তুমি একে চেনো কি না—
ঠিক সে মুহূর্তেই কথার মাঝখানে মিসেস চ্যাটার্জির গান গেয়ে ওঠা গলার স্বর আমি শুনতে পেয়েছিলাম, হোয়াট ডু থু মিন, চেনো কি না? আই নো হিম ভেরি ওয়ে-এ এল, হি ইজ মদনমোহন–মানে মদনবাবু।
তারপরে আমি আর মুখ ফিরিয়ে, চুপ করে বসে থাকতে পারিনি, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে, কপালে দু হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করেছিলাম এবং দেখেছিলাম, ওঁর ভুরু কোঁচকানো নেই, ঠোঁটে হাসি, সেই–সেই চোখে জিজ্ঞাসা, এবং তিনি নিজেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, কলকাতায় যাচ্ছেন নাকি?
আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ’, কিন্তু পালটা ওঁকে জিজ্ঞেস করিনি, উনিও তাই যাচ্ছেন কি না, আর তখনই মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শোনা গিয়েছিল, বাট বিমি, প্রোবাবলি য়ু রিমেমবার অব হিজ–
মিসেস চ্যাটার্জি তার সুন্দর ডানাসহ হাত তুলে বলেছিলেন, আই রিমেমবার এভ্রিথিং বিশওয়াস, য়ু প্লিজ বি সেনসিবল।তারপরেই তিনি আমাকে বসতে বলেছিলেন, বসুন বসুন’ এবং মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে ফিরে বলেছিলেন, এসো, আমরাও বসি।
সেই মুহূর্তে জগট বিশওয়াসের চোখে আমার চোখ পড়ে গিয়েছিল, মনে হয়েছিল, দুটো বাঘের চোখ আর চোয়াল। কিন্তু মিসেস সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যে ওঁকে তুমি’ করে বলেন, এটা ভাবতে পারিনি। অবিশ্যি আমি জানি-ই বা কী, ভাববার ক্ষমতাই বা কতটুকু, তা-ই মনে মনে অবাক হয়েছিলাম আরও বিশেষ করে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির বয়স আমার থেকে বেশি হবে না বোধ হয়, হলেও দু-এক বছর। এখনও পরিষ্কার মনে আছে, (এত পরিষ্কার মনে থাকাটা উচিত কিনা, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।) বছর তিনেক আগে, মমতা কাকিমা প্রথম যখন আমার সঙ্গে মিসেস চ্যাটার্জির আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, দেখিস বিমি, (ভারী মিষ্টি, না?) আমার এই ভালমানুষ ভাসুরপোটির দিকে যেন নজর দিস নে।
মমতা কাকিমা বরাবরই একটু-একটু সেই যাকে বলে মুখফেঁড়, তা-ই কিংবা তারও কিছু বেশি, তার মুখে যেন কোনও কথাই আটকায় না, যে সব কথা আমি বোধ হয় কখনও মুখেই আনতে পারব না। মমতা কাকিমা আমার থেকে দশ বারো বছরের বড় তো নিশ্চয়, কিন্তু এমন অনায়াসে। এমন সব কথা আমাকে–থাক, তখন আমি আর সে সব কথা মনে করতে চাইছিলাম না, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি, (নরোত্তম চ্যাটার্জি, একজন মস্ত বড় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী, মিস্টার জে. বিশওয়াসের থেকে অবিশ্যি একটু ছোট, ডিপার্টমেন্টও আলাদা, তার স্ত্রী।) মমতা কাকিমার জবাবে, তার সেই সেই চোখে আমার দিকে দেখে বলেছিলেন, কেন মমতাদি, আমি বুঝি খালি হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যানদের দিকে নজর দিয়ে বেড়াই?’ কথাটা শুনে আমিই লজ্জা পেয়েছিলাম, এবং সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমাকে দেখে কি আপনার তাই মনে হয়? আমি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে উঠেছিলাম, না না না। শুনে, মমতা কাকিমা আর সুদীপ্তা চ্যাটার্জি দুজনেই হেসে উঠেছিলেন, মাঝখান থেকে আমাকেই কেমন একটা অস্বস্তিতে সরে যেতে হয়েছিল, যদিও তাতেও কিন্তু সে সব কথাও থাক, দেখেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির প্রায়। কটি কটিই তো বলে ওটাকে, কোমর আর পিঠের মাঝখানটা? সেইখানে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে জানালার ধারে বসিয়ে দিয়েছিলেন, এবং নিজেও সিল্কের লুঙ্গির খসখস শব্দ তুলে পাশে বসেছিলেন। বুঝতে পারছিলাম না, আমার সত্যি বসা উচিত কি না, তবু কোনও রকমে গদিতে খুব আস্তে বসেছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা তখন শোনা যাচ্ছিল, এনি হাউ, আই ট্রায়েড মাই বেস্ট টু হ্যাভ দিস সিঙল কুপে ফর মাই ওন, কিন্তু শুনলাম কে এক ভি.আই.পি. অলরেডি অর্ধেক মেরে বসে আছে, তার মানে তপন সেন-তপনই টিকেটটা কেটেছে, অথচ তোমার সঙ্গে কলকাতা যাবই-উম?
একটা জিজ্ঞাসার শব্দ করে মিস্টার জে. বিশওয়াস থেমে গিয়েছিলেন, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা শুনতে পেয়েছিলাম, (কারণ আমি ওঁদের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম না।) এ সব কথার এখন আর কোনও দরকারই নেই। তুমি আমার সঙ্গেই কলকাতা যাচ্ছো। ইন দিস জার্নি, টাইম টু টাইম আই। শ্যাল মিট য়ুউ? হু রিয়্যালি, তা ছাড়া মদনবাবু ইজ এ ভেরি নাইস ইয়ংম্যান, ভেরি স্মার্ট অ্যান্ড অ্যাকোমডেটিং।
আমি জানি না, লজ্জায় না কীসে, আমার ঠাণ্ডা কুপের মধ্যেও গরম লাগতে আরম্ভ করেছিল যেন, আর ভীষণ অস্বস্তি, এবং হয়তো আরও কিছু আমার মনে হয়ে থাকবে, যা আমি বুঝতে পারি না, আমি ঘাড় ফিরিয়ে সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়েছিলাম, উনি আমার দিকে তাকিয়েই, সেই সেই চোখে হাসছিলেন, যা দেখে আমার সুন্দর লেগেছিল, বরাবরই লেগেছে, ওঁকে সব সময়েই আমার সিনেমার হিরোয়িনের মতো মনে হয়েছে, খুব রূপসী আর যৌ যৌ যৌবন ভরা, হিরোয়িনদের শরীরে যেমন থাকে, সত্যি ওঁর চোখ, মুখ, চুল বুক, কটি (আমি ওঁর খোলা নাভিও দেখেছি, যখন নাভির নীচে শাড়ি পরেন।) কোমর পা-পানা না, পাছা না, নিতম্ব উরু জঙ্ঘা, সবখানেই যৌবন যেন উপছে পড়ছে, কোনও পোশাকের ঢাকাটুকিই যেন মানতে চায় না, তাকালেই। আমার কেমন লজ্জা করে, বা সেটা আর কিছু, যে কারণে আমি তাকিয়ে থাকতে পারি না। আমি ওঁর আমার দিকে ঘাড় ফেরানো হাসিমুখের দিকে তাকাতেই, উনি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তা-ই না মদনবাবু?
স্মার্ট আমি না, অ্যাকোমডেটিং কাকে বলে, বিশেষ করে এ রকম ক্ষেত্রে, তাও আমার ঠিক জানা নেই, তাই আমি কেবল একটু, যাকে বলে বিব্রত লজ্জায় হাসতেই পেরেছিলাম, আর মিস্টার জে. বিশওয়াসের চোখে আমার চোখ পড়েছিল, আশ্চর্য বাঘের চোখে তখন একটা হাসি-হাসি ভাব, তার সঙ্গে কৌতূহলের একটা, একটা কী বলে—-আমি জানি না। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি খিলখিল করে হেসে উঠেছিলেন, আমি মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, এবং ওঁর গলা শুনতে পেয়েছিলাম, দেখেছ? তোমরা। ওকে মোটেই চেনো না, বোঝ না, আমার মতো তুমিও ওকে বন্ধু মনে করতে পারো, ওর সামনে ফ্রাংক আর ইজি হতে পারো? কী, জেলাস হচ্ছ নাকি? কিন্তু যা-ই বলল, মদনবাবুকে আমার ভীষণ ভাল লাগে, দেখেই বুঝতে পারছ, তোমাদের থেকে অনেক–আচ্ছা আচ্ছা, বলব না, ও রকম খোকনের মতো ঠোঁট ফুলিও না। তবে এটা ঠিক, ওর মাথায় কলঙ্কের বোঝাটা তোমরা, বিশেষ করে দিল্লির একটা কমিউনিটি হ্যাঁ, জঁদরেল কমিউনিটি জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে–আহ, ও কী হচ্ছে? আচ্ছা, ঠিক আছে, এ সব আর বলব না, কিন্তু তুমি মানছ তো, মদন খুব ভাল ছেলে?
আমার নিজেকে কেমন ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো মনে হচ্ছিল, অথচ উনি তো আমার প্রশংসাই করছিলেন, তবু আমার ভিতরটা যেন ছটফট করছিল, মনে হচ্ছিল, আমার একটা কিছু করা উচিত, কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না, মিস্টার জে, বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, হুঁ, তোমার কথা শুনে তা-ই তো মনে হচ্ছে।’
তারপরেই কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ, অথচ গদিটা যেন ঢেউয়ের মতো নড়ছিল, আর লুঙ্গির খসখস শব্দ এবং সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা, নো, নট নাউ’ আর আমি এমনই একটা ইডিয়ট, ওঁদের দিকে তাকিয়েছিলাম, দেখেছিলাম মিস্টার জে. বিশওয়াস সুদীপ্তা চ্যাটার্জিকে পাশ ফিরে জড়িয়ে ধরেছেন, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির মুখ বা শরীরের অনেকখানি অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম না, আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। তৎক্ষণাৎ সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা শুনতে পেয়েছিলাম, না না, যাবেন না মদনবাবু, আপনি খুব ভাল ছেলে আমি জানি, বসুন।
মিস্টার জে. বিশওয়াস তখন তাঁর হাত সুদীপ্তা চ্যাটার্জির শরীর থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, এবং বলেছিলেন, ও একটু বাইরে থেকে ঘুরেই আসুক না।’
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, বলেছিলেন, দুষ্টুমি কোরো না। (মিস্টার জে, বিশওয়াসের মতো লোক দুষ্ট! দুষ্টুমি করতে পারেন! আমি তো ভাবতে পারি না।) লেভেটরিতে যাব বলে বেরিয়েছি। এখনও দিনের আলো রয়েছে, পরে আসব।’
বলতে বলতে তিনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, আমিও ওঁর দিকেই তাকিয়েছিলাম, এবং চোখ ফেরাবার মুহূর্তেই মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, চ্যাটার্জি কি জানে, আমি এ গাড়িতে ট্রাভেল করছি?
মিসেস চ্যাটার্জি বলেছিলেন, সে রকম কিছু তো শুনিনি৷’ বলে তিনি আবার, সেই–সেই চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন, এবং মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, বিমি, এক মিনিট বসো, আমি বেয়ারাকে ডাকি, দুটো গেলাস আর দু টুকরো বরফ দিতে বলি, একটা ছোট স্কচ অন রক হয়ে যাক।
নো, নট নাউ, বোঝ না কেন?’ সুদীপ্তা চ্যাটার্জি চোখের পাতা কাঁপিয়ে, ভুরু কুঁচকেছিলেন। সেটাকে কী ভঙ্গি বলে, আমি জানি না, একটা ইশারার মতো মনে হয়েছিল, তা ছাড়া আরও কিছু, কেন না, ওঁর ম্যাকসি আর জ্যাকেটে কেমন যেন একটা ঢেউ খেলে গিয়েছিল, আর ওঁর বেশ কী বলে, সিনেমার হিরোয়িনদের মতো সুন্দর সুন্দর? তা হবে হয়তো, আসলে ওঁর বুক দুটো যেন জীবন্ত, কথা বলতে পারে–সত্যি জানি না, বুক কথা বলতে পারে কি না, মনে হয়েছিল, জ্যাকেটের বাইরে এসে বুক দুটো যেন কিছু বলতে চেয়েছিল। তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে আবার হেসেছিলেন, এবং মিস্টার জে. বিশওয়াস জিজ্ঞেস করেছিলেন, চ্যাটার্জি কী করছে?
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, ও তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চন্দন সিং-এর সঙ্গে বসে গেছে।
শুনেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা কনকনে ঠাণ্ডা সাপ কিলবিল করে উঠেছিল, উঠতে উঠতে আমার ঘাড়ের রক্তের শিরায় যেন, সাপটা তার চেরা জিভ দিয়ে চাটছিল, মাথাটা খুলে পড়ে যাবে কি না ভাবছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শোনা গিয়েছিল, বসে গেছে মানে?’ সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, বসে গেছে মানে, স্কচ অন রক নিয়ে। মিস্টার জে. বিশওয়াস জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু ওই সর্দার সর্দারনী এসে জুটল কোথা থেকে? সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, তা। জানি না। দেখলাম, চন্দন সিং লায়লী সিংকে নিয়ে ঢুকল, (সেই সাপটা যেন আমার ঘাড়ের শিরার। ভিতর দিয়ে, মস্তিষ্ক নামক পদার্থটির ভিতরে কিলবিল করে ঢোকবার চেষ্টা করছে–উহ, লায়লী। সিং!) বোতল গেলাস নিয়ে হই হই করে বসে গেল। আমাকে নিতে বলছিল, আমি নিইনি, একটু কথা বলে, তোমার এখানে চলে এসেছি, অ্যান্ড ইট ইজ অলরেডি টু-উ লেট।’ বলতে বলতেই তিনি আমার দিকে ফিরে বলেছিলেন, মদনবাবু কি জানতেন নাকি, লায়লী সিং আজ এ গাড়িতে যাচ্ছে।
আমি যেন সাপের ছোবল খাবার মতোই, যাকে বলে যন্ত্রণাকাতর, সেইভাবে বলে উঠেছিলাম, না, না–না। এবং আমার স্বরে বোধ হয় ভয়ও মেশানো ছিল, কিন্তু সুদীপ্তা চ্যাটার্জি খিলখিল করে হেসে উঠে আমার কাঁধে হাত দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ভয় নেই, আমি ওদের কিছু বলব না, আপনি যে কত ইনোসেন্ট অ্যান্ড লাভেবল আমি তা জানি। দাড়ি কামাননি কেন? আমার নাকে তখন সেই ফরাসি সেন্টের গন্ধ, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, আর সেই–সেই চোখে হাসি, ওঁর গা আমার গায়ে প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সাপটা–নাহ, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি কোনও জবাব না চেয়েই, দরজাটা খুলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যাবার আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কতক্ষণ আমি চলন্ত গাড়ির দোলানিতেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, মনে করতে পারি না, কারণ মস্তিষ্কের মধ্যে সাপটা কিলবিল করতে করতে, কুণ্ডলী পাকিয়ে, যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল, এবং লুঙ্গির খস খস শব্দে ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস জানালার ধার ঘেঁষে বসে, তার সেই বইটা খুলে নিয়ে মুখ নিচু করে বসেছেন। তখনও অবিশ্যি আমার শিরদাঁড়ায়, ঘাড়ের রক্তের শিরায় একটা শিরশির ভাব রয়েছে, কিন্তু আমি সেটাকে ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করে, আস্তে আস্তে সিটে বসেছিলাম, যাতে সিটে ঢেউ খেলে না যায়, ভীষণ নরম মাংসের মতো গদি কিনা। বাইরের দিকে আমার চোখ পড়েছিল, মনে হয়েছিল, গাছপালা, মাঠ, শস্যের খেত লাল আর সোনালি রঙে যেন চিকচিক করছে। ঠিক আগুন না, তবু আগুনের মতোই যেন। কিন্তু লায়লী সিং, মস্তিষ্ক নামক পদার্থটা সত্যি যেন কেমন গোরুর পায়ের মতো, একটা মাছি বসলে শরীরের চামড়া কেঁপে যায়, তেমনি সাপটা কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকলেও, একটা কী–একটা ভাইব্রেশনের মতো যেন বাজছে আর টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেই দু-দুদদুঃস্বপ্নের দিনটাতে, চার মাস আগে…….
.
আমি কনট সার্কাসে ভর দুপুরে, কিন্তু সত্যি গরম নেই, এ বছরটা হিমালয়ে বা দূর সমুদ্রে কী একটা অঘটন ঘটেছে, কিছুই জানি না, আবহাওয়া অফিসের লোকেরাও জানে কি না, জানি না, কিন্তু মে শেষ, জুনের শুরুতে বেলা দুটোয় দিল্লির রাস্তায় হিপিনিরা অনায়াসে খালি পায়ে হাঁটছিল, কুকুরের সঙ্গে। কুকুরের সঙ্গে মানে, এক হিপিনি রাস্তার একটি রোয়া-ওঠা ঝলসানো গা কুকুরকে, শাড়ির ছেঁড়া পাড় দিয়ে বেঁধে, (বেল্ট আর শিকলের বদলে) আদর করে সঙ্গে নিয়ে চলেছে, তার সঙ্গে আরও তিন হিপিনি, সকলেরই খালি পা, কুকুরটা তার মনিবান হিপিনির গা ঘেঁষে, যেন বড় সুখে ল্যাজ নেড়ে নেড়ে চলেছে। ওদের কেউ পরেছে হাফ প্যান্টের ওপর বুক খোলা শার্ট, কেউ বা পাতলা কাপড়ের ঘাঘরার ওপরে ময়লা অথচ ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি আর ভিতরে ওটাকে কী বলে–মেয়ে–মানে মহিলারা বুকে পরে, সে সব ওরা পরেনি। তা ছাড়া কেউ পান চিবিয়েছে, ঠোঁটে লাল ছোপ, কেউ কপালে এঁকেছে মস্ত সিঁদুরের টিপ। আমি দেখলাম হা করে, আরও অনেকেই দেখল, কিন্তু সকলেই হা করে না, হেসে, চোখের তারা অন্ধকারের চিতাবাঘের মতো করে। আমার যেন কেমন গা শিরশির করে, হিপি-হিপিনিদের দেখলেই, মনে হয় ওরা অতিমানব-মানবী, তবে সেজন্যই যে ওরা খালি পায়ে, জুন মাসে কনট সার্কাসের শান বাঁধানো চওড়া ফুটপাতের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারছে, তা আমি বলি না, কারণ এ বছর জুন মাসে, অন্য বছরের তুলনায় দিল্লি অর্ধেকও তাতেনি। কেশর ফোলানো ক্ষুধার্ত সিংহের মতো দিল্লির গরম, দরজা জানালা বন্ধ করে, অন্ধকার ঘরে থাকতে হয়; এ বছর সিংহ ছুটি নিয়েছে, অথবা বলা যায়, ড্রাগনের নিশ্বাসের আগুনে খরতা প্রায় নেই বললেই চলে, কেবল আমি না, দিল্লির সব লোকেরাই এ ব্যাপার নিয়ে বলাবলি করছে। মমতা কাকিমা আজ সকালেও বলেছেন, আজকাল কলকাতায় দিল্লির থেকে বেশি গরম পড়ে।এ বছরের ব্যাপারে, কথাটা শতকরা সত্যি। সেই জন্যই মমতা কাকিমা এই দুপুরে বেরোলেন, গেলেন সফদরজং-এ ওঁর এক লেডি ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, ওইটি মমতা কাকিমার একটি দোষ, যখন তখন যেখানে সেখানে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, বোঝেন না, যে ওঁর মহিলা মহলের সামনে গিয়ে, আমি মোটেই স্বস্তি বোধ করি না, অথচ কী একটা আশ্চর্য ব্যাপার, আমি দেখছি, আজকাল মহিলারা পুরুষদের সামনে মোটেই অস্বস্তি বোধ করেন না। পুরুষরাও যে করেন, তা বলছি না, আমি করি, কারণ আমি যেন অগাধ জলে পড়ে যাই, ওঁদের আড্ডা গল্পের মাঝখানে কী বলব, কী করব, কিছুই ভেবে পাই, এবং আমি সত্যি একটা বাচ্চা ছেলেমানুষও না যে, মমতা কাকিমাকে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, কিন্তু মমতা কাকিমার মুখে লেগেই আছে, চলো ঘুরে আসি।অবিশ্যি আমি বেকার, সারাদিন বই পড়া আর ঘুরে বেড়ানো ছাড়া, বলতে গেলে কিছুই করার নেই, এবং আমার দ্বারা কিছু হবার চান্স আছে কি না, সেই জন্যই বাবা তপনকাকার কাছে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাকা মানে, কোনও বংশগত আত্মীয়তা নেই, তপনকাকারা সেন, আমরা মুখোপাধ্যায়, তপনকাকারা বরিশালের বদ্যি, আমরা পশ্চিম, বাংলার রাঢ়ের বামুন, কিন্তু আমার বাবা মহাদেব মুখোপাধ্যায় মহাশয় যেন দেবাদিদেব মহাদেব, কী রাজ্যের, কী কেন্দ্রের, অনেক আমলাকেই দেখি, বাবাকে খুব খাতির করতে, দাদা দাদা করতে, তা সে হোম, ফাইনান্স, ল, যে কোনও ডিপার্টমেন্টেরই হোক, এমনকী শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক-গায়িকারাও বাবার বিশেষ বিশেষ কী বলে ওটাকে? প্রীতিভাজন, হ্যাঁ প্রীতিভাজন। সন্ধে হলেই বাড়ি গুলজার, সেলার ওপন হয়ে গেল, নরম গরম পানীয় চলল, এবং সবাই এক ঘরে এক জায়গায় না, নীচের তলায় বিভিন্ন ঘরে, বিভিন্ন দলের আড্ডা, বাবা কিন্তু মহাদেবের মতোই যে কৈলাসে সেই কৈলাসে, তাকে কখনও সন্ধের সময় বা রাত্রে বাড়ির বাইরে যেতে দেখি না, আমাদের বাড়িটাই একটা বিচিত্র আসর।
আমার ছোট ভাই এখন আমেরিকায় আছে, সত্যি কথা বলতে কী, আমি জানি না ও সেখানে কী করে, শুধু এইটা জানি বা দেখেছি, ষোলো-সতেরো বছরের একটি আমেরিকান মেয়েকে ও বিয়ে করেছে, এখন নিশ্চয় উনিশ কুড়ি হয়েছে, বা একুশ, আমি ও রকম বয়সেই দেখেছিলাম, কারণ খোতে (আমার ছোট ভাইয়ের ডাক নাম, আমার ডাক নাম গবা, বড়দার ডাক নাম ঘোঁতন, বড়দির ডাক নাম তোতা, সবথেকে ছোট বোনের ডাক নাম ফুচকি, এবং এই সব খোতে, ঘোঁতন, তোতা আর ফুচকি, সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে, গবারই কোনও দিক থেকে কোনও গতি হয়নি।) মেরিয়ানকে সেই বয়সেই প্রথম নুইয়র্ক থেকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল, বলেছিল, মেরিয়ান ওর বউ। মেরিয়ান একেবারে টুকটুকে সুন্দর ছোট একটি মেয়ে, গাঢ় বাদামি রঙের চুল, পুষি বেড়ালের মতো চোখ, ছিপছিপে, একেবারে প্রথম দর্শনেই ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে ঢুকেছিল, পরেছিল মিনি ফ্রক, কিন্তু খোতে যখন বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, মেরিয়ান ঠোঁটের সিগারেট ঠোঁটেই রেখে, বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল, এবং আমার পরিষ্কার মনে আছে, বাবা বলেছিলেন, তোফা! ছোট বউমাটি আমার বেশ হয়েছে। অবিশ্যি ইংরেজিতেই বলেছিলেন, তারপরে মেরিয়ানকে নিজের পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, খোতে, একে জোগাড় করলি কোথা থেকে? কথাটা আমার ঠিক পছন্দ হয়নি। খোতে জবাব দিয়েছিল, জোগাড় হয়ে গেল, আমাদের দেশের তুলনায় ওর বাবা বেশ বড়লোক। সাত দিন থাকব, আবার ইয়র্কে ফিরে যাব। তোমাদের বউ দেখাতে এসেছি। বাড়িতে একদিন একটা পার্টি দেবার কথা ভাবছি। বাবা বলেছিলেন, বাড়িতে পার্টি দেবার তুই কে? পার্টি দেব আমি। তুই তোর নিজের বন্ধুদের হিসাবটা দিয়ে দিস। তারপরে বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, দ্যাখ, গবা, খোতে তো বউ জুটিয়ে ফেলল। ঘোঁতনা তো দু ছেলেমেয়ের বাবা, তোতা তো আমাকে নাতির মুখ দেখিয়ে দিয়েছে, ফুচকিটা শুনছি কোন এক স্টুডেন্ট লিডরের সঙ্গে ঘুরছে-টুরছে, তার মানেই, হয়ে। গেল। তুই কী করবি? বাইরে-টাইরে যাবি নাকি?’ বাবার কথাবার্তাই ও রকম, আমি হেসে বলেছিলাম, বিয়ে করবার জন্য বাইরে যাব কেন। কাজকর্মের দরকার থাকলে যেতে পারি।’বাবা বলেছিলেন, তাও তুই যাবি বলে আমার মনে হয় না।তারপরে খোতে মেরিয়ানের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, মেরিয়ান উঠে এসে আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, বলেছিল, হেলো ড্যাড–।’ খোতে তাড়াতাড়ি বলেছিল, নট ড্যাড, দাদা, মেজদামেজদা। মেরিয়ান একেবারে খুকিনা না, মানে বালিকা, লজ্জা না পেয়েই বলেছিল, হেলো মেইজডা। আমি কেবল হাসছিলাম, ভারী ভাল লাগছিল মেরিয়ানকে, আমাদের ফুচকির তখন প্রায় কুড়ি বছর বয়স, সে তুলনায় এ তো ছেলেমানুষ; এত ছেলেমানুষ একটি মেয়ের বিয়ে আমাদের দেশেই আজকাল হয় না, আর মেরিয়ান কিনা খোদ আমেরিকার মেয়ে! ভেবেছিলাম, খোতেটা করেছে কী! অবিশ্যি খোতের বয়সই বা তখন কত, হার্ডলি বাইশ-তেইশ। দেখা গিয়েছিল, মেরিয়ান আমাদের বিরাট বাড়িটার মধ্যে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিয়েছিল, ওইটুকু মেয়ে চেন স্মোকার, হার্ড ড্রিঙ্কেও বেশ অভ্যন্ত। ফুচকির সঙ্গেও ওর বেশ ভালই জমেছিল, আমার নিজেকে কেমন যেন, একজন থিয়েটারের দর্শক বলে মনে হয়েছিল, মানে পরিবারের বাইরের লোক। তারপরে বিরাট পার্টিও হয়েছিল, সাত দিন পরে খাতে মেরিয়ানকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। বড়দা (ঘোঁতন) ব্যবসা-ট্যাবসা মিলিয়ে কী একটা করেন, ঠিক জানি না, নিজেই একটা বাড়ি করেছেন বাঃ সাঃ রোডে, সেখানেই থাকেন, তোতা (বড়দি) বম্বেতে ওর স্বামীর সঙ্গে, ফুচকি শুনছি খুব রাজনীতি করছে, ওর স্বামীর নাম আমি জানি না, যুবনেতা হিসাবে নাকি খুব নামডাক। মা তো বছর দশেক আগেই মারা গিয়েছেন; বাবা, বলতে গেলে, কলকাতায় এখন একলা, এবং সত্যি বলতে কী, বাবাও যে কী করেন, আমি তার প্রায় প্রায় কেন, কিছুই ঠিক বুঝি না। বেলা বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোন, চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যেই ফেরেন, অথচ তিনি যে অর্থবান এবং ওটাকে বলে, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি, তা-ই। আমাদের একাধিক বাড়ি, গোটা তিনেক গাড়ি, চাকরবাকর, ঝি, ঠাকুর, খানসামা, বেয়ারা, বাবুর্চি নিয়ে ডজন খানেকের ওপর লোক, আর বাড়িতে মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে সব স্তরের লোকেরই যাতায়াত প্রচুর। তবে লক্ষ করে দেখেছি, হোম আর ফাইনালের আমলাদের যাতায়াতটা বোধ হয় একটু বেশি। আমার মনে হয়েছে, আমাদের পরিবারের সকলের মধ্যেই কোথায় একটা অদ্ভুত যোগাযোগের নিজেকে খুঁজে পাই না। পাই, পাই না একেবারে, তা বলব না, বাবাকে আমার কেমন যেন খুব ভাল লাগে, কারণ বাবা আমাকে বোধ হয় খানিকটা বোঝেন, বোঝেন যে, আমি একটু দিশাহারা ধরনের ছেলে, যে কারণে তিনি প্রায়ই আমাকে ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে হেসে বলেন, দ্যাখ গবা, তুই একটা নেহাত মাকাল ফল, আমার তা মনে হয় না। তার মানে, দেখতে ভাল অথচ কাজের না, আমাকে বাবার তা মনে হয় না। বাবা বলেন, আসলে তুই ছুরিটা তুলে নিতে ভয় পাচ্ছিস, বোর্ডের ঠিক জায়গাটাতে বেঁধাতে পারবি কি না। তাতে কী হয়েছে, এক চালে সবাই বাজিমাত করতে পারে না, ছুরিটা ছুঁড়েই দ্যাখ না। দু-একবার ফসকে যায়, লোকে হিড়িক দেবে, খবরের কাগজে কেচ্ছা বেরোবে, বেরোক গে, ও সব গায়ে মাখতে গেলে চলে না। সাহস চাই, সাহস। বাবা যে কী বলতে চান, আমি ঠিক বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারি না। তিনি আমাকে ইলেকশনে দাঁড়াতে বলেছেন, পার্টনারশিপে বিজনেস করতে বলেছেন, সরকারি বা বেসরকারি চাকরি নিতে বলেছেন, যেগুলোর রাস্তাঘাট আমার-আমার ঠিক ফেয়ার মনে হয়নি। কোনওটাই যখন হল না, বাবা বললেন, ঠিক আছে, তোর যেমন ভাল লাগে, তেমনি থাক, আমার কিছু বলবার নেই।
আমি মডার্ন হিস্টরি নিয়ে এম এ পাশ করেছি, কিন্তু কেন এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছি, আমি নিজেও তা ঠিক জানি না, অবিশ্যি আমি পরীক্ষায় কখনও ফেল করিনি, এবং এম এ অবধি ধৈর্য ধরে আমার দাদা, দিদি, ভাই বোনেরা কেউ-ই যায়নি, আর আমার মনে হয়েছে, ওটা আসলে ধৈর্যেরই অভাব, ওদের সব কিছুতেই ভীষণ তাড়াহুড়ো। ওদের যত বন্ধু বান্ধব, আমার তা নেই বললেই চলে, তার মানে আমি একটা, যাকে বলে, রোগ এলিফ্যান্ট, মোটেই না। আমার নিজেকে কখনওই পরাজিত মনে হয়নি, ঈর্ষাকাতরও না, এবং নিজেকে আমি কখনওই সুখী বোধ করিনি, অসুখীও বোধ করিনি, ঘরকুনো, গোমড়ামুখো বলতে যা বোঝায়, আমি তাও না। আমি পারি না তর্ক করতে। জেদ করতে, বাজি ধরতে, এবং বাইরের উত্তেজনা আমাকে তেমন ছোঁয় না, যে কারণে রাজনীতি বা খেলার মাঠে আমার কোনও টান নেই, কিন্তু আমার দিশাহারা নিশ্চেষ্ট ভাবের জন্য আমি মনে মনে কেমন ছটফট করি।
তপনকাকা, মমতা কাকিমা কলকাতায় গেলেই আমাদের বাড়িতে যান, বাবাকে দাদা দাদা করেন, খানাপিনা হয়, ওঁদের সঙ্গে অনেক দিন থেকেই আমার পরিচয়। মমতা কাকিমা কেবল আমাকে না, বাবাকেও অনেক বার বলেছেন, দাদা, মদনকে আমার ওখানে দিল্লিতে নিয়ে যাই।’ তপনকাকা বলেছেন, মদনকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে দেখা যাক না, কিছু করা যায় কি না। আপনি অনুমতি করুন দাদা। বাবা বললেন, আমার অনুমতি করার কিছু নেই, গবা যদি যেতে চায়, নিয়ে যাও, টাকার যা দরকার লাগে, আমি তা পাঠিয়ে দেব।তপনকাকা জিভ কেটেছেন, মমতা কাকিমা বাবার দিকে, সে কী একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁট ফোলাতেন, বলতেন, টাকার কথা আপনি বলতে পারলেন দাদা?’ বাবা হাসতেন। তার পরে বছর তিনেক আগে, আমি রাজি হয়ে গেলাম দিল্লিতে যেতে। সেই থেকে আমি দিল্লিতে, এবং দিল্লি আমার বেশ ভাল লেগেছিল। অনেক বাঙালির মুখেই যেমন শুনেছি, দিল্লি শহর দেখতে সুন্দর, কিন্তু হার্টলেস, মানে প্রাণহীন, (সে আবার কেমন, আমি তা জানি না।) আমার তা কখনওই মনে হয়নি। কলকাতার সঙ্গে দিল্লির নিশ্চয় অনেক তফাত আছে, আর তফাত আছে বলেই তো ভাল লাগে। একটা কলকাতা ছেড়ে যদি আর একটা কলকাতায় যেতে হয়, সেটা নিশ্চয় ভাল লাগবে না, একটা নতুন কোথাও সবাই যেতে চায়, এবং সেই হিসাবে, দিল্লিকে আমার বেশ ভাল লেগেছিল। আসলে যাকে বলে, বিশেষ জায়গার জন্য বিশেষ কাতরতা–যার কারণ বোধ হয়, সেই বিশেষ জায়গার সঙ্গে নিজেকে এমন করে মিলিয়ে ফেলা যে, মনে হয় অন্য কোথাও গেলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আমার সে রকম কিছু নেই। দিল্লিতে প্রাণের কোনও অভাব আছে বলে, আমার কখনও মনে হয়নি, অবিশ্যি আমি যদিও ঠিক জানি না, কোনও একটা শহরের প্রাণ নামে বস্তুটা কী। সব শহরেরই নিজস্ব কতগুলো কী বলে–প্যাটার্ন অব লাইফ আছে, যে কোনও একটার সঙ্গে জড়িয়ে গেলে, আর একটাকে মেনে নিতে অসুবিধা হয়। আমি সে রকম কোনও অসুবিধা বোধ করিনি, তার কারণ বোধ হয়, আমি কলকাতায়ও যে রকম প্রায় নিঃসঙ্গ ছিলাম, দিল্লিতেও প্রায় তাই। মমতা কাকিমা অবিশ্যি আমাকে প্রায় একলা থাকতে দিতেই চাইতেন না, তপনকাকাও নানান জায়গায় নিয়ে যেতে চান, নিয়ে গিয়েছেনও, আমি স্বস্তিবোধ করিনি। বিশেষত বড় বড় আমলা বা এম. পি. বা মন্ত্রী, এক কথায় বলতে পারি, ইমপসিবল। আমি একলা একলা ঘুরতে পারি, অনেক কিছু এনজয় করতে পারি। দিল্লির আশেপাশে দেখবার অনেক কিছুই আছে, ইতিহাসের ভাঙাচোরা, এলোমেলো ছড়ানো অনেক চিহ্ন, যা নতুন দিল্লির এদিকে ওদিকেই অনেক আছে, তা ছাড়া নানা রকমের লোকজন দেখতে আমার বেশ ভালই লাগত। তপনকাকার বাড়িতেই প্রায়ই পার্টি-টার্টি হয়, মমতা কাকিমার সমিতি আর সমিতির বাইরের মহিলাদের একটা বড় আড্ডা সেই বাড়ি। সব মিলিয়ে তিনটি বছর আমার ভালই কেটে যাচ্ছিল। মমতা কাকিমার অত্যাচার কিছুটা ছিল, কারণ মমতা কাকিমা ঠিক কাকিমার মতো ব্যবহার। করতেন না, অনেকটা অনেকটা কী বলব, বন্ধুর মতো, যে কারণে আগেই বলেছি, মমতা কাকিমা ভারী মুখফেঁড়, মুখে কোনও কথাই আটকায় না। যেমন বিনয়নগরের মিসেস ঘোষের মেয়ে, রত্নার সম্পর্কে হঠাৎ আমাকে একদিন বললেন, মেয়েটা কিন্তু দারুণ, দ্যাখো না, বঁড়শিতে গেঁথে তুলতে পার কি না। আমি অবাক, কথাই বলতে পারিনি, মমতা কাকিমা আমার গালে, আস্তে করে চিমটি কেটে দিয়ে বললেন, দ্যাখো মদন, ও রকম ন্যাকার মতো তাকিয়ে থেকো না। রত্না ঘোষকে তোমার ভাল লেগেছে, তোমার চাউনি দেখেই বুঝেছি, তাই বলছি, ছিপটা ফেলেই দ্যাখো না, গাঁথা যায় কি না।তার মানে কী? আমার সেই বাবার ছুরি ছুঁড়ে মারার কথা মনে পড়েছিল। এক-আধবার ফসকে যেতে পারে, তাতে কিছু কেচ্ছা রটনা হতে পারে, কিন্তু ও সব গায়ে মাখতে গেলে চলে না, বাবা এ রকমই বলেছিলেন, মমতা কাকিমার কথাও যেন অনেকটা সেই রকম, অথচ ছিপ ফেলে বঁড়শিতে গেঁথে রত্নাকে আমি তুলব কেমন করে! তা কি কখনও তোলা যায় নাকি! আমি কাকিমাকে বললাম, রত্নাকে। আমার ভাল লাগে, সে তো সত্যি কথা। কিন্তু ও কি মাছ নাকি যে ওকে আমি বঁড়শিতে গেঁথে তুলব?’ মমতা কাকিমা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন, তারপরেই হঠাৎ দেখি মুখ। শুঁকে’ বলেই আমার কাঁধে হাত দিয়ে উঁচু হয়ে, ওঁর নাকটা প্রায় আমার ঠোঁটে ঠেকিয়ে দিলেন; আমি চমকে উঠলাম, মমতা কাকিমা বললেন, হু, এখনও অন্নপ্রাশনের ভাতের গন্ধ রয়েছে ছেলের মুখে, এখনও কিছুটি বোঝে না। অথচ আসলে আমার মুখে তখন সিগারেটের গন্ধ, নিয়মিত না হলেও, অল্পস্বল্প ধূমপান করি, আর মমতা কাকিমা নিজেই আমার সিগারেট কিনে দেন, ফলে একটু বেশি দামি বিদেশি সিগারেট ধূমপান করা হয়, কারণ তপনকাকা আর আমার ব্র্যান্ড একই। আমার অবাক মুখের। দিকে তাকিয়ে, মমতা কাকিমা অদ্ভুত একরকম হেসে, (এই বয়সেও মমতা কাকিমা যথেষ্ট সুন্দরী, আর আর কী বলে, প্রায় যুবতীর মতোই দেখতে।)। বললেন, সত্যি মদন, অনেক বজ্জাত ছেলে দেখেছি, তোমার মতো দেখিনি। বঁড়শিতে গেঁথে তোলা কাকে বলে শিখিয়ে দেব? এসো, শিখিয়ে দিচ্ছি।বলেই। মমতা কাকিমা যা করলেন, আর যা বললেন, এখনও ভাবতে গেলে, মনে হয় আমার গায়ে একশো আট ডিগ্রি জ্বর এসে গিয়েছে, কিন্তু তারপরেই মমতা কাকিমা এত সহজ, সাবলীল আর কী বলে ওটাকে হা-হা-হাস্যময়ী, যে ব্যাপারটার মধ্যে কোনও ইয়েই যেন নেই–মানে মালিন্য। অথচ আমি এমন উল্লুক হয়ে যাই তাঁ, তা ছাড়া আর কিছু না, আমি মমতা কাকিমাকে ভয় পাই, কেন না, উনি যে কখন কী বলবেন, বা করবেন, তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না, ভাবা যায় না। এমনকী সোনা আর মুনা যখন বাড়িতে থাকে, মমতা কাকিমার দুই মেয়ে, যারা নৈনিতালে থেকে পড়াশোনা করে, পনেরো আর বারো যাদের বয়স, ওদের সামনেও মমতা কাকিমা একই রকম।
তাই বলছিলাম, মমতা কাকিমা ঠিক কাকিমার মতো ব্যবহার করেন না, বন্ধু বা তার থেকেও কিছু বেশি, যে কারণে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার ভাষা আর ভঙ্গির কথা আগেই বলেছি, তারপরে লায়লী সিং-এর সঙ্গে, আলাপ করিয়ে দেবার ভাষা ও ভঙ্গি, কী বলে ওটাকে, সেই বেশ চলতি কথার মতো, আর এক কাঠি সরেস। সে ক্ষেত্রে ভাষাটা কেবল ইংরেজিতে, কিন্তু কানে আগুন জ্বালিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। লায়লী সিং সুদীপ্তা চ্যাটার্জির থেকে সব বিষয়েই আরও কয়েক ডিগ্রি ওপরে, কেন না, ও বলেছিল, আমার মুখের দিকে দেখে, এখনই চেখে দেখব নাকি? তারপরেই খিলখিল করে হেসে উঠে, আমার হাত চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, সর্দারনির–মানে লায়লী সিং-এর সুন্দর হাতটিতে জোরও কম ছিল না, এবং তার চোখা নাক, টানা চোখ, রং মাখা লাল ঠোঁট আর নাকে সরু সোনার আধ ইঞ্চি ডায়মেটারের রিং, কাজল টানা চোখের তারার ঝঝলক, ফরসা মুখ যেন একটু লাল লাল দেখাচ্ছিল, আর একটা হালকা গন্ধ, হয়তো ওয়াইনের হতে পারে বা অন্য কোনও হার্ড ড্রিঙ্কসেরও অসম্ভব না, সব মিলিয়ে ওর সামনে আমি যেন গুটিয়ে যাচ্ছিলাম। ওর বয়সও মমতা কাকিমার থেকে কম, অন্তত আমার তা-ই ধারণা, হয়তো সুদীপ্তা চ্যাটার্জির থেকেও। কেন মনে। হয়েছিল, তা বলতে পারি না, কেন না, এমনিতে মমতা কাকিমা বা সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যে কম সুন্দরী তা বলছি না, তবু লায়লী সিংকে আমার সাতাশ-আটাশ মনে হয়েছিল। লায়লী সিং নাভির নীচে গাঢ় সবুজ শাড়ি বেঁধেছিল, সবুজ কাচুলির মতো স্লিভলেস জামা, আর সবুজ গোল টিপ কপালে, সবুজ রঙের ফোমের হাতব্যাগ খুলে, লাল সোনালি রঙের সুন্দর কিংসাইজ সিগারেটের প্যাকেট বের করে আমাকে অফার করেছিল। কী করা উচিত ভেবে পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলাম, মমতা কাকিমা কখন ডাইনিং রুম থেকে চলে গিয়েছেন। (আমরা ডাইনিং রুমেই ছিলাম, লায়লী সিং সোজা সেখানেই চলে এসেছিল, পাশেই ড্রয়িংরুমে তপনকাকা এবং অন্য একটা মোটা গলার ইংরেজিতে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল– চন্দন সিং-এর গলা, পরে আলাপ করতে গিয়ে জেনেছিলাম, চন্দন সিংও কেন্দ্রীয় সরকারের একজন মস্তবড় আমলা, মোম মাখানো গোঁফ-দাড়ি, মাথায় সবসময়েই নানা রঙের পাগড়ি, আর স্যুটেড বুটেড, মোটা ত্রিকোণ নটের টাই, কিন্তু ধূমপান করে না, এ বিষয়ে সে লায়লী সিং-এর থেকে ধার্মিক।) লায়লী সিং ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, ডোঞ্চ ইউ স্মোক? আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম, আই মিন, ইয়েস, বাট নট রেগুলারলি–’আমার কথা শেষ হবার আগেই, লায়লী সিং বলে উঠেছিল, নাউ স্মোক ওয়ান অব মাই সিগারেটস ইরেগুলারলি।’ কথাটার সঠিক মানে কী, না বুঝেই আমি একটি সিগারেট তুলে নিয়েছিলাম, লায়লী সিংও ঠোঁটে সিগারেট গুঁজেছিল, এবং লাইটার দিয়ে আমার সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটা ধরিয়েছিল। ওর টানা দেখে বোঝা গিয়েছিল, ধূমপানে ও বেশ অভ্যস্ত, এবং ড্রিঙ্কসের ব্যাপারে ও সেই পাখির মতো, চাতকী–যদি চাতকের ফেমিনিন তা-ই বলা যায়। পরে দেখেছি, ওর মতো কোনও মেয়েই এত মদ্যপান করতে পারে না, অবিশ্যি তপনকাকার বাড়িতে এবং লায়লী সিং-এর নিজের বাড়িতে ছাড়া অন্য কোথাও দেখিনি। সেই থেকে শুরু এবং তারপরে অনেক বারই লায়লী সিং-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে তপনকাকার বাড়িতে বা ওদের নিজেদের বাড়িতে, অনেক বারই ওদের বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে। লায়লী সিং ভীষণ ভীষণ কথা বলতে পারে, যাকে বলে বেআবরু, মমতা কাকিমার অনেক ওপরে যায়, এবং আমাকে নিয়ে ও কয়েক বার নাচতে চেয়েছে, যা আমি মোটেই পারি না, ফলে আমাকে জড়িয়ে ধরে খানিকটা ঘুরপাক খাওয়া আর হুডযুদ্বু করা ছাড়া কিছুই হয়নি, অন্যেরা মজা পেয়েছে, হেসেছে, হাততালি দিয়েছে, বিশেষ করে চন্দন সিংও। লায়লী সিং ড্রিঙ্ক করার জন্যও আমাকে অনেক বার জোর করেছে, যা আমার সহ্য হয় না, হলে আমাদের বাড়িতে কোনও নিষেধ ছিল না, ফুচকি আর আমি ছাড়া, আমাদের বাড়ির সবাই ড্রিঙ্ক করে, কিন্তু লায়লী সিং-এর কাছে আমাকে দু-একবার হার মানতে হয়েছে, কষ্ট করে এক-আধ পেগ গিলতে হয়েছে, যদিও তাতে আমি মাতাল হইনি, এনজয় করিনি, আমার ভাল লাগে না। তা ছাড়া, কেউ বেশি ড্রিঙ্ক করলে, তাকে আমার কেমন যেন ভয় লাগে, আমি মাতালদের চোখে চোখ রাখতে পারি না, আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। লায়লী সিং-এর মাতলামিকে আমি ভয় পেতাম, এমনও কয়েক বার হয়েছে, তার কাছ থেকে পালাবার জন্য আমাকে লুকোচুরি খেলার মতো পালাতে হয়েছে বা ছুটতে হয়েছে, আর মমতা কাকিমারা সবাই সেটাকে একটা মজার খেলা পেয়ে হেসে গড়িয়ে পড়েছে, আর আমার প্রাণ যাবার দাখিল।
চার মাস আগে–চার মাস সাত দিন হবে–আগে, আমি কনট সার্কাসে, একটু ছায়া দেখে, দুপুরে ঘুরছি, কখনও কোথাও দাঁড়িয়ে কিছু দেখছি, যেমন কুকুরওয়ালী হিপিনিদের, ভিড়ের অন্যান্য নরনারীদের, কেন না, আমি মমতা কাকিমার সঙ্গে সফদারজঙে তার সেই লেডি ডাক্তার বান্ধবীর বাড়ি যাইনি, বলেছিলাম, আমাকে কনট সার্কাসে নামিয়ে দিয়ে যান, আমি আমার এক জার্নালিস্ট বন্ধুর সঙ্গে দেখা করব।কথাটা একেবারে মিথ্যা না, আমার এক বন্ধু দিল্লির একটি ইংরেজি পত্রিকায় সাংবাদিকের চাকরি করে, এবং কনট সার্কাস থেকে আমি অলসভাবে ঘুরতে ঘুরতে, দেখতে দেখতে, কখনও বা দাঁড়িয়েও, সেই পত্রিকার অফিসের দিকেই যাচ্ছিলাম, আর দিল্লিতে জুন মাসে এমন আবহাওয়া, ভাবা যায় না, নেচারের কথা কিছুই বলা যায় না, আমি প্রথমে শুনলাম, মাদান, ওহ মাদান! শুনেই চিনতে পারলাম লায়লী সিং-এর গলা, মুখ ফেরাবার আগেই কনট সার্কাসের চলন্ত লাঞ্চ আওয়ারের জনতার সামনে, লায়লী সিং আমাকে জড়িয়ে ধরল, মনে করতে পারি না, কী রঙের কী পোশাক ও পরেছিল, ঠোঁট খুলে কথা বলবার আগেই, (উহ, অভাবিত অভাবিত!) আমার ঠোঁট ওর গ্রাসে, হাতের বন্ধন শক্ত, আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলাম, হাসি আর নানান কথার রোল শুনতে পেলাম, নাকে উগ্র হুইস্কির গন্ধ পাচ্ছিলাম, এমনকী লায়লী সিং-এর শরীরের ঘেঁয়াও আমি অনুভব করতে পারছিলাম না, কেন না, আমার সে অনুভূতি ছিল না। সময়ের কোনও জ্ঞান ছিল না আমার, কত যুগ কেটে যাচ্ছিল, তারপরেই কে যেন লায়লী সিংকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, আর কী বলব, সপাটে আমার গালে একটা থাপ্পড়, এবং শুনতে পেলাম, রাসকেল, সানোফাবীচ, তেরেকো দেখ লেংগে। পলকেই দেখতে পেলাম চন্দন। সিংকে, তার রক্তবর্ণ চোখে রাগ আর ঘৃণা, লায়লী সিংকে নিয়ে ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠল, এঞ্জিনে শব্দ তুলে ছুটেই চলে গেল, আর আমাকে ঘিরে তখন জনতা, কী যে বলছিল, কিছুই জানি না, হয়তো কেউ আমাকে ধরে মারত, কিন্তু পুলিশ এসে পড়েছিল, এবং আমার হাত চেপে ধরে, গাড়িতে তুলে, সোজা থানায় নিয়ে গিয়েছিল। আমি কিছু বলবার চেষ্টা করতেই, গালে আবার এক থাপ্পড়, তারপরে হাজতের মধ্যে। ঘণ্টাখানেক পরে, হাজতের বাইরে অফিসে নিয়ে গিয়েছিল, আমার কিছু ভাববার ক্ষমতাই ছিল না। একজন অফিসার আমার নামধাম, ঠিকানা আর তপনকাকার নাম, টেলিফোন নাম্বার লিখে নিল, আমি কী অপরাধ করেছি, কিছুই বলল না, কিছু জিজ্ঞেসও করল না, পকেটের সামান্য টাকা পয়সা, হাতের ঘড়ি, হিরার আংটি, সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই আর রুমাল সব নিয়ে নিল, একটা কাগজে সই করিয়ে আবার হাজতে পুরে দিল।
ঘণ্টা দুয়েক পরেই তপনকাকা আর মমতা কাকিমা থানায় এলেন, হাজতের ভিতর থেকে তাদের দেখে আমার চোখে জল এসে গেল, কিছুতেই আটকে রাখতে পারলাম না, এমন মনে হল, মমতা কাকিমার চোখও জলে ভরে উঠল। তপনকাকা ব্যস্তভাবে অফিসে চলে গেলেন, আমাকে মমতা কাকিমা ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করলেন, আমি সবই বললাম, শুনে মমতা কাকিমা বিরক্ত আর খানিকটা দুঃখের স্বরে বললেন, মদ গিললে লায়লীটার কোনও কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। ছি ছি, কী একটা কাণ্ড করে বসল। ওকে তো আর পুলিশ ধরবে না, তোমাকেই ধরে নিয়ে এসেছে।
একটু পরেই তপনকাকা হাজতের গরাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর মুখ গম্ভীর আর থমথম করছে, বললেন, মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা নিয়ে অনেক জল ঘোলা হবে। ওরা তোমাকে বেল দিতে রাজি না, কাল কোর্ট থেকে বেল নিতে হবে। আমি বললাম, কিন্তু তপনকাকা, আমি তো কিছুই করিনি, লায়লী সিং হঠাৎ এসে–তপনকাকা আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, আমি সবই জানি, ওই স্পটে ছিল, এমন লোকের মুখ থেকে আমি ঘটনাটা সবই শুনেছি, কিন্তু এদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হচ্ছে, তোমাকে ফাঁসিয়ে এরা লায়লী সিং-এর ইজ্জত বাঁচাবে। ঘটনাটা পাবলিকলি ঘটেছে, চাপা দেওয়াও যাবে না, আর দিল্লিতে চন্দন সিংদের হোন্ড অনেকখানি। এনি হাউ, আমি দেখছি কী করা যায়, তুমি নার্ভাস হয়ো না, মনে কর, একটা অ্যাকসিডেন্ট, এ ছাড়া আমি আর কী বলব। এখন মহাদেবদাকে (আমার বাবা) খবরটা কেমন করে জানাই, তাই ভাবছি।
মমতা কাকিমা বললেন, ওই স্পটে যারা ছিল, তারা যদি সাক্ষী দেয়, তবু কি কিছু হবে না? তপনকাকা বললেন, এত সহজে কি সাক্ষী পাওয়া যায়, না সাক্ষী দিতে কেউ আসতে চায়? লোকদের বয়ে গেছে, কাজকর্ম ছেড়ে তারা একটি বাঙালি ইয়ংম্যানকে বাঁচাতে আসবে।’ মমতা কাকিমা যাকে। বলে অসহায়-সেই রকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপরে আজ কিছু করা না গেলে, পরের দিন কোর্টে দেখা হবে, এ কথা জানিয়ে, আর একটু সাহস দিয়ে তপনকাকা মমতা কাকিমাকে নিয়ে চলে। গেলেন। পরে শুনেছি, তপনকাকা ব্যাপারটাকে নিয়ে কোনও রকম প্রকাশ্যে কিছু হোক, সেটা বন্ধ করার জন্য চন্দন সিং-এর সঙ্গে সেই রাত্রেই কথা বলেছিলেন, চন্দন সিং নাকি তার জবাবে বলেছে, পুলিশ আমাকে ধরেছে, তার কিছু করার নেই, পুলিশ যা ভাল বুঝবে, তাই করবে। দুজনের মধ্যে কিছু তিক্ত কথা কাটাকাটিও হয়েছে, আমার মনে হয়, যার ফলে ব্যাপারটা খানিকটা জেদাজেদিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, এবং পরের দিন, নগর দায়রা আদালতে গভর্নমেন্ট প্রসিকিউটর এই বলে আমাকে অপরাধী হিসাবে পেশ করলেন যে, আমাকে ইমমর্যাল ট্রাফিকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে, কারণ আমি নাকি দিনের বেলা ভোলা রাস্তায়, একজন রেসপেক্টেবল মহিলার ওপর জোর করে অবসিন আচরণ করেছি। তপনকাকা আমার জন্য উকিল নিয়েই এসেছিলেন। সেই উকিল, আমার দোষ সমস্ত অস্বীকার করে, বেল প্রে করলেন। ম্যাজিস্ট্রেট তা নাকচ করে দিয়ে, আরও প্রমাণাদির জন্য, আরও তিন দিন হাজতবাসের নির্দেশ দিলেন, শুনে মনে হল, আমি বোধ হয় কোর্টেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব, কারণ হাজতের কথা আমার মনে পড়ছিল, সন্ধের পরে আরও বারো জন আসামিকে সেই ঘরে পাঠানো হয়েছিল, সকলেই অবাঙালি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ধরা পড়েছে, চোলাই মদের ব্যবসা থেকে চুরি, রাহাজানি, এমনকী ধর্ষণের অপরাধীও ছিল, তারা আমাকে সারা রাত ঘুমোতে দেয়নি। আরও তিন দিন সেখানে থাকতে হবে ভাবতেই, আমি যেন অন্ধকার দেখছিলাম। কিন্তু আমাকে সেই হাজতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি, জেল হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, থানার হাজতের থেকে সেটাকে, কী বলে, সেই–যাকে বলে–মন্দের ভাল। যাই হোক, তিন দিন পরে আমি কোর্টে বেল পেয়েছিলাম, ইতিমধ্যে খবরটা কাগজে বেরিয়ে গিয়েছিল, এবং দু-একটি কাগজে, কনট সার্কাসে দিনের বেলা অভূতপূর্ব দৃশ্য’ বলে, খানিকটা বিদ্রূপ করে প্রায় সত্যি ঘটনাই লিখেছিল, বাকি কাগজগুলো, বাঙালি যুবকের কীর্তি! এইরকমভাবে প্রসিকিউটরের ভাষায় সংবাদটা ছাপিয়েছিল। তারা আমার নাম ছাপিয়েছিল, লায়লী সিং-এর নাম ছাপেনি। কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে জানতে পেরেছিলাম, ইতিমধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে, ভিতরে ভিতরে চরম উত্তেজনা আর দলাদলির সৃষ্টি হয়েছে। তখনই প্রথম জানতে পেরেছিলাম, এই মিস্টার জগট বিশওয়াস আমার বিরুদ্ধে লেগেছিলেন, ভদ্রলোককে আমি তপনকাকার বাড়িতেই কয়েক বার দেখেছি, এবং আমার সঙ্গে সেখানেই প্রথম পরিচয়। ঘটনাটা নতুন করে ভাববার কিছু নেই, মামলা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছিল, এবং বোঝা যাচ্ছিল, ভিতরে ভিতরে ঘটনা এমনভাবে ঘটছিল যে আমার শাস্তি হবেই, এমনকী আমার বাবা দেবাদিদেব মহাদেব মুখোপাধ্যায়েরও ক্ষমতা ছিল না, আমাকে বাঁচাতে পারেন, কারণ দিল্লির একটি ক্ষমতাশালী গ্রুপ জেদ ধরে বসেছিল, আমাকে শাস্তি দেবেই। শাস্তি আমাকে পেতেও হয়েছে, দু মাস সশ্রম কারাদণ্ড, সেই নরকবাসের স্মৃতি আমি আর মনে করতে চাইনা, এবং বাবা কী ভেবে নাকি তপনকাকাকে জানিয়েছিলেন, হায়ার কোর্টে মুভ করার দরকার নেই, দণ্ডই যেন মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরে আমি আর দিল্লির রাস্তায় বেরোইনি। আজ তপনকাকার ড্রাইভার এসে আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে গিয়েছে। এখন দেখছি, আমারই কুপে-তে মিস্টার জে. বিশওয়াস, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির আবির্ভাব এবং শুনতে পেলাম, চন্দন সিং আর লায়লী সিং এ গাড়িতেই ট্রাভেল করছে। কেন? নতুন করে কিছু ঘটতে চলেছে নাকি? আমার মস্তিষ্কের মধ্যে সাপের কুণ্ডলীটা মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে।
Chapter - 2
কিন্তু এদিকে যেন আমি, যাকে বলে, গেটিং দ্য স্মেল অব এ ডেঞ্জার লাইক অ্যান ওয়ার হর্স। যত সন্ধে ঘনিয়ে আসছে, মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন কেমন হয়ে উঠছেন, সিল্কের লুঙ্গি খসখসিয়ে বারে বারে নড়েচড়ে বসছেন, চোখে যেন রাগ জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে, মুখ ফুলে শক্ত হয়ে উঠছে, আর চোখ তুলতে গেলেই সেই চোখের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে, আর আমার ভিতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি তো মালভা গল্পটা আর পড়ছি না, আর সুদীপ্তা চ্যাটার্জি তো আমার প্রশংসাই করে গিয়েছেন, তবু উনি এ রকম করছেন কেন।
এই ভাবতে ভাবতেই, মিস্টার জে, বিশওয়াস হঠাৎ বইটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, সুইচ অন করে বাতি জ্বাললেন, তারপরে দরজা খুলে, দরজাটা খোলা রেখেই বেরিয়ে গেলেন। সেই ভোলা। দরজা দিয়ে আলোকিত করিডরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আমার কেমন যেন দু-দু-দুর্গম আর হি-হিংস্র জঙ্গলে একলা মনে হতে লাগল, অথচ দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বসবার উপায় নেই, মিস্টার জে. বিশওয়াস হয়তো আরও রেগে যাবেন। আগাগোড়া ব্যাপারটা আমি এখনও কিছুই বুঝতে পারছি না। মিস্টার জে. বিশওয়াস চেয়েছিলেন, এই সিঙল কুপেটা তিনি এবং তার মিসেসের নামে নেবেন, এবং মিসেসের আসার কোনও ব্যাপার নেই, সুদীপ্তা চ্যাটার্জিকে তিনি তা হলে একটু একলা পেতেন, আর সেই জন্যই নাকি তিনি কলকাতায় যাচ্ছেন। এর মানে কী? আমি কিছু দিয়েই, স্ত্রীকে কারোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন না, কারোর সঙ্গে মিশতে দেন না, বিনা অনুমতিতে বাড়ি থেকে বেরোতেও দেন না, অথচ তাঁকে যেন সুদীপ্তা চ্যাটার্জির জন্য কেমন ইয়ে মানে কাতর দেখাচ্ছিল। আমার ভাবনা শেষ হবার আগেই মিস্টার জে. বিশওয়াস ফিরে এলেন, তার সঙ্গে সাদা পোশাকের ট্রেনের বেয়ারা, হাতে ট্রে, ট্রেতে দুটো গেলাস, একটা পাত্রে বরফ আর চারটে সোডার বোতল, জানালার ধারে টেবিলে রাখল, জিজ্ঞেস করল, সোডাকা বোতল খুল দেগা সাব?’ মিস্টার জে. বিশওয়াস বললেন, কোই জরুরত নহি হ্যায়, তুম আধা ঘণ্টা বাদ বাদ খবর লেও।
বেয়ারা বলল, জি বহোত আচ্ছা’ বলে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। মিস্টার জে. বিশওয়াস লুঙ্গি খসখসিয়ে, মেঝেতে উটকো হয়ে বসে তার সুটকেস খুলে জনি ওয়াকারের একটা বোতল, আর স্টেনলেস স্টিলের অদ্ভুত দেখতে ওপনার বের করে সুটকেসটা আবার সিটের নীচে ঠেলে দিলেন। কিন্তু দুটো গেলাস কেন? আমার কী রকম ভয় করছে, উনি কি আমাকে ড্রিঙ্ক করতে বলবেন। নাকি? কিন্তু আমি তো পারি না। জীবনের সবথেকে বড় মারটা (আপাতত, পরে কী হবে জানি না।) যার কাছ থেকে খেয়েছি, দু-একবার তার কাছেই আমাকে হার মানতে হয়েছে। তা–তা সেই খোয়ারি যাকে বলে, সে তো ভাল করেই ভেঙেছে, মিস্টার জে. বিশওয়াস কি আবার সে চেষ্টা করবেন নাকি? তা হলে আমাকে কুপে থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু দেখলাম, উনি একটা গেলাসেই হুইস্কি। ঢাললেন, বরফ ফেললেন, তারপরে ওপর দিয়ে সোডার বোতল খুললেন, আর তখনই দেখতে পেলাম, ওপনারটার ভিতরের ফাঁকটা আসলে একটি মেয়ের মূর্তি উঁচ কাটা, এবং সেই কাটা জায়গায়, যেখানে মেয়েটির কটি, সেই কটির সরু জায়গায় সোডার বোতলের মুখ ঢুকিয়ে, চাড় দিয়ে খুললেন। এখন আমি বুঝতে পারছি, ওপনারটার কাটা মূর্তির তিন-চার জায়গা দিয়ে সোডার বোতল খোলা যায়। আহ, মানুষের চিন্তা কত ভাবেই না খেলে, আমার মাথায় কোনও দিন আসত না। মিস্টার জে. বিশওয়াস হুইস্কিতে সোডা ঢেলে, চোখ বুজে একটি চুমুক দিলেন। আর আমার মধ্যে একটা নতুন ভয় জাগতে লাগল। এমনিতেই উনি কেমন যেন বাঘের মতো হয়ে আছেন, তারপরে যদি ড্রিঙ্ক করে মাতাল হয়ে যান–অসম্ভব! আমাকে কুপের বাইরেই রাতটা কাটাতে হবে বোধ হয়, এবং আর সে চেষ্টাটা এখন থেকে করাই বোধ হয় ভাল। এই ভেবে বইটা মুড়ে নিয়ে, পকেটে এক বার দেখে নিলাম, সিগারেটের প্যাকেটটা আছে কি না। ইতিমধ্যেই বাইরে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে, ডিনার সার্ভ করবে রাত্রি। আটটায়। এখন মাত্র পৌনে সাতটা। জানি না, কুপের বাইরেই, করিডরে আমাকে ডিনার দেবে কি না, তা হলে আমি সেখানেই খেয়ে নিতে পারব। বাইরে গিয়ে বেয়ারাদের জিজ্ঞেস করলেই হবে, না হয় আটটার সময় ঢুকে কোনও রকমে খাওয়াটা সেরে গেলেই হবে। কিন্তু এতটা সময় করিডরে থাকলে যদি লায়লী সিং বা চন্দন সিং-এর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? সে তো ভয়ংকর বিপদ। সুদীপ্তা চ্যাটার্জির কথা থেকে তো মনে হল, পাঁচটা থেকেই তাদের ড্রিঙ্কস শুরু হয়ে গিয়েছে। তার মানে, যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। উপায়? আছে, একটা আছে, আমি চেয়ার কারের বগির করিডরে চলে যেতে পারি, সেখানে এরা কেউ নিশ্চয়ই যাবে না। আহ, তবু একটা রাস্তা পাওয়া গিয়েছে, ভেবে খুবই স্বস্তিবোধ করছি তারপরে মিস্টার জে. বিশওয়াস ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে আস্তে এসে ওপরে শুয়ে পড়া যাবে, কারণ উনি নিশ্চয়ই নীচে শশাবেন। হঠাৎ আমি গুনগুনিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, আর তৎক্ষণাৎ স্থান কাল পাত্রের কথা মনে করেই সামলে গেলাম, এবং ওঠবার উদ্যোগ করলাম।
‘ইউ নো বয়…’। মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠলেন। আমি উঠতে পারলাম না, ওর দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। ওঁর গেলাস প্রায় অর্ধেক শেষ, উনি আমার দিকে তাকিয়ে নেই, গেলাসের দিকেই যেন তাকিয়ে আছেন, এবং বললেন, লাইফ ইজ এ ভেরিহোয়াট শ্যড আই স্যে, এ পিকুলার থিঙ।’ বলে গেলাস তুলে চুমুক দিলেন, আর আমি কিছু না বুঝে, ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি আবার সে ভাবেই বললেন, আই মিন, আওয়ার একজিসটেনেন্স অব লাইফ, এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, তোমারও তা মনে হয় নাকি?’ বলে তিনি মুখ ফিরিয়ে, আমার দিকে তাকালেন, এবং আমি দেখে আশ্বস্ত হলাম, ওঁর চোখ এখন মোটেই বাঘের মতো দেখাচ্ছে না, সেই জ্বলন্ত রাগ আর নেই। কিন্তু আমি কী বলব, আমি তো ওঁর কথা বুঝতে পারছি না। কী জবাব দেওয়া উচিত, ভেবে না পেয়ে বলে ফেললাম, হ্যাঁ, তা ঠিক।
মিস্টার জে. বিশওয়াস ঘাড় দুলিয়ে বললেন, ঠিক হতেই হবে। তোমার নিজের কথাই ধরো না। কনট সার্কাসে লায়লী সিং-এর ব্যাপারটা।’
আমার মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে যাওয়া কুণ্ডলীর পাক যেন খুলতে লাগল, আমার শিরদাঁড়ার কাছে কাঁপছে। উনি গেলাসে চুমুক দিয়ে বললেন, যদি তপন সেনের কথা সত্যি হয়, লায়লী ড্রাঙ্কেন অবস্থায় তোমাকে জড়িয়ে ধরে ওই কাণ্ড করে থাকে–অবিশ্যি শুধু তপন সেন না, অনেকেই তোমাকে নির্দোষ বলে জানে, যেমন বিমি (সুদীপ্তা চ্যাটার্জি), বিমিও মনে করে, তোমার কোনও দোষ নেই, তুমি ইনোসেন্ট–আরও কী সব বলে গেল–সত্যি, হ্যাঁ, তুমি দাড়ি কামাওনি কেন বলো তো?
মিস্টার জে. বিশওয়াসের কাছ থেকে, এ রকম জিজ্ঞাসার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, তাই প্রথমটা থতিয়ে গেলেও, বললাম, এমনি, আসলে আমি কখনও রোজ দাড়ি কামাতাম না। তা ছাড়া, আজ আবার যাবার তাড়া ছিল, সেজন্য দাড়ি কামাবার কথা মনেই হয়নি।’
উনি গেলাসে চুমুক দিয়ে বললেন, কিন্তু মহিলারা হার্ট হন, বিমির কথা শুনেই তুমি বুঝতে পারলে?
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যে আহত হয়েছেন, তা আমি বুঝতে পারিনি, তাই অবাক স্বরে শব্দ করলাম, ও!
হ্যাঁ, জীবনের এটা একটা বিশেষ অঙ্গ, পুরুষদের রোজ দাড়ি কামানো। দাড়ি কামাবে, রোজ। সকালবেলা দাড়ি কামাবে, যে কোনও দায়িত্বশীল ভদ্রলোকদের রোজ সকালবেলা দাড়ি কামানো উচিত।
আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সাফ মুখ, চকচক করছে উনি বললেন, হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, এই জীবনের অস্তিত্বটা, এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, ভৌতিকও বলা চলে। তোমার নিজের জীবন দিয়েই বুঝতে পারছ, অপরাধ করল লায়লী, জেল খেটে এলে তুমি। আমি অবিশ্যি তোমার বিরুদ্ধে ছিলাম, কারণ কারণ অবিশ্যি অনেক। তুমি নিশ্চয় বোঝো, দিল্লিতে চন্দন সিং-এর ইনফ্লুয়েন্স অনেক বেশি। লায়লী সিং-এর ইজ্জত বাঁচাবার জন্য অনেক ওপর মহল থেকে তোমার পানিশমেন্ট দাবি করা হয়েছিল। আমি তোমার ফরে গেলেও, কিছুই হত না, কিন্তু আমার অনেক এনিমি হয়ে যেত। তাতে কী লাভ? তোমার ফরে যারা ছিল, তারাও কেউ তোমার জন্য কিছু করতে পারেনি। তপন কি কিছু করতে পারল? পারল না। অবিশ্যি ওর কাজকে সবাই প্রশংসা করেছে, অ্যান্ড দ্যাট ইজ ইনএভিটেবল। তোমাকে নিয়ে এ দু দিনের ঝগড়া ওদের মিটে যাবে, দে উইল সিট টুগেদার, ইট, ড্রিঙ্ক টুগেদার, অ্যান্ড দে উইল ফরগেট ইউ, অ্যান্ড দিস ইজ লাইফ।
এতগুলো কথা বলে, মিঃ জে. বিশওয়াস গেলাস হাতে নিয়ে এক চুমুকে সমস্ত হুইস্কিটুকু পান করে নিলেন, বোতল খুলে আবার ঢাললেন, বরফ নিলেন, তারপরে সেই ওপনার নিয়ে, এবার নারী মূর্তির মাথা দিয়ে সোডার বোতল খুললেন, এবং এ বার আমি আরও ভালভাবে দেখতে পেলাম, ঝকঝকে স্টেনলেস স্টিলের পাতের ওপরে, এক সাইড থেকে দাঁড়ানো মূর্তিটা বেশ স্পষ্ট। যেহেতু সবটাই কাটা, মূর্তিটা নগ্ন কি নগ্ন না, কিছুই বোঝার উপায় নেই, কেবল আমার কেন যেন মনে হল, আমি এক পাশ থেকে সুদীপ্তা চ্যাটার্জিকে দেখতে পাচ্ছি, উনি যেন অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ, চুল, গলা, বুক, পেট, কটি, কোমর, উরু, জঙঘা, পা। মিস্টার জে. বিশওয়াস সোডা ঢাললেন, ফেনা উঠল গেলাসে, গেলাস তুলে চুমুক দিলেন, এবং তখনও তার ডান হাতে সেই প্রায় দশ ইঞ্চি লম্বা ওপনারটি। রয়েছে, এবং তিনি ওপনারটি তুলে ধরে দেখলেন, তারপরে হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বললেন, এটা প্যারিস থেকে এনেছিলাম। বলেই সেটা রেখে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম?
আমার একটা কথাও মনে নেই, কেবল শেষের একটা কথা ছাড়া, অ্যান্ড দে উইল ফরগেট ইউ, দিস ইজ লাইফ।’ আমি বলতে গেলে, হতভম্বের মতো ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি গেলাসে আবার চুমুক দিলেন, বললেন, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তোমার আর লায়লী সিং-এর কথা বলছিলাম। আসলে ব্যাপারটা কী, তোমরা যদি ওই কাণ্ডটা ঘরের মধ্যে করতে।
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, আ-আমি কিছু করিনি।
দ্যাট আই নো, কনট সার্কাসে তুমি কিছু করোনি, লায়লীই এমব্রেসড অ্যান্ড কিসড ইউ, কিন্তু তোমাদের দুজনের মধ্যে একটা অ্যাফেয়ার তো ছিলই, তা না হলে আর লায়লী তোমাকে রাস্তায় জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে যাবে কেন?
অ্যাফেয়ার?
হ্যাঁ, অ্যাফেয়ার। অ্যাফেয়ার মানে জানো না?
আমার ঠোঁট খুলে, মুখ হা হয়ে গিয়েছে, কারণ অ্যাফেয়ার বলতে উনি কী বোঝাতে চাইছেন, আমি তা বুঝতে পারছি না। আমি যাকে বলে অসহায়, সেভাবে ঘাড় নাড়লাম, আর সঙ্গে সঙ্গে, ওঁর চোখের পাতা কুঁচকে উঠল, মুখটা আবার শক্ত হয়ে উঠল, আমার চোখের দিকে ওঁর লাল চোখ যেন বিধিয়ে দিলেন, এবং নিচু গরগর স্বরে বললেন, লায়লীর সঙ্গে তোমার আর কখনও কিছু হয়নি? তোমাদের
আমি প্রায় আঁতকে উঠে বললাম, মেক লালাভ টুগেদার? না না, বিশ্বাস করুন।
শাট আপ।‘ মিস্টার জে. বিশওয়াস ধমক দিয়ে উঠলেন, ডোন্ট লাই টু মি। তুমি বলতে চাও, লায়লী তোমাকে কনট সার্কাসেই প্রথম কিস করেছিল?
মিস্টার জে. বিশওয়াস ঠোঁট দুটো ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ফেললেন, তাঁর নাকের পাটা দুটো ফুলে উঠল, যেন এত রেগে গিয়েছেন, কী বলবেন, বুঝতে পারছেন না। তারপরে হঠাৎ গেলাস তুলে একটা লম্বা চুমুক দিলেন এবং আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। মাই নেম ইজ জগট বিশওয়াস, ডু ইউ নো দ্যাট?’ বলে আমার দিকে তাকালেন। আমি জানি, ঘাড় ঝাঁকিয়ে বোঝাতে পারলাম, কারণ কথা বেরোচ্ছে না, ওঁর চোখমুখের ভাব আবার বদলে গিয়েছে। উনি হঠাৎ আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে, মুখের অদ্ভুত মানে সত্যি অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে, যেন চুপিচুপি কিছু বলছেন, এভাবে বললেন, লুকিয়ে মজা মারতে খুব ভাল লাগে, না? আমি নিজের চোখেই এক বার দেখেছি, লায়লী তোমাকে জড়িয়ে ধরে, নাচবার নাম করে, কী সব করছিল, করেনি?
আমি এমনিতেই এক এক সময় তোতলা হয়ে যাই, এ রকম অবস্থায় পড়লে তো একেবারেই তোতলা হয়ে যাই। ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললাম, হ্যাঁ, মানে আ-আমাকে উনি না–নাচাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু আর তো কিছু করেননি?
না, কিছু করেনি, তোমাকে সমস্ত শরীর দিয়ে চেপে ধরে। কথা শেষ না করে, এক হ্যাঁচকায়। যেন নিজেকে ঝোকা অবস্থা থেকে টেনে নিয়ে গেলেন, বললেন, দ্যাটস অলরাইট, ইফ ইউ ডোন্ট লাইক টু এক্সপোজ ইওরসেল্ফ, ডোন্ট এক্সপোজ, বাট ডোন্ট টেল লাইজ।
বলে তিনি গেলাস তুলে চুমুক দিলেন, এবং গেলাসের দিকে চোখ রেখেই বললেন, দিস ইজ লাইফ। এনি হাউ, আমি যা বলতে যাচ্ছিলাম, আসলে যা-ই কর, চেপে।
চেপে?
হ্যাঁ, চেপে, লুকিয়ে। আরে, চন্দনের সামনেই তুমি লায়লীকে যা খুশি করোনা, বড়জোর তোমাদের মধ্যে এক চোট হাতাহাতি হয়ে যাবে, কিন্তু ঘরের মধ্যে সে সব তো আর বাইরের লোকে দেখতে আসছে না। তোক দেখিয়ে কিছু করলেই, তোমাকে ইমমরাল ট্র্যাফিকে পড়তে হবে। আইনকানুন বলে ব্যাপারগুলো আছে তো, তুমি তার সম্মান দেবে না? আফটার অল, তুমি হচ্ছ সভ্য জগতের মানুষ। হ্যাঁ কি না?
আমার মুখে যেন জবাবটা এসেইছিল, কেবল ওঁর ধমকের অপেক্ষায় ছিল, আমি উচ্চারণ করলাম, হ্যাঁ।
দ্যাটস অলরাইট।’ বলে তিনি গেলাসে চুমুক দিলেন, এবং আবার কিছু বলবার জন্য মুখ খোলবার উদ্যোগ করতেই, দরজায় নকিং-এর শব্দ হল, উনি দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ইয়েস, কাম ইন।
দরজা খুলে বেয়ারা ঢুকল, বলল, হ সাব, কুছ অর্ডার হ্যায়?
মিস্টার জে. বিশওয়াস বললেন, হোড়া বাদ থোড়া বরফ, অওর দো সোডা লাও।
বেয়ারা জিজ্ঞেস করল, ডিনার আভি লায়েগা??
মিস্টার জে. বিশওয়াস কবজির ঘড়িতে সময় দেখে বলে উঠলেন, মাই গড, কোয়ার্টার টু এইট? হোয়েন শি উইল বি–।’ বলতে বলতে থেমে গেলেন, এবং চোখের কোণ দিয়ে এক বার আমাকে দেখে নিয়ে বললন, মেরা খানা আভি নহি চাহিয়ে। তুম আগারি এ সাহাবকো ডিনার দে দো।আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তুমি এখন খেয়ে নাও, তাই না?
আমি ঘাড় কাত করে বললাম, হ্যাঁ, খেয়ে নিই।’
বেয়ারা দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে চলে গেল। উনি এক চুমুকে গেলাস শুন্য করে, আবার হুইস্কি ঢাললেন, বরফের শেষ টুকরোগুলো তুলে নিলেন, আর ওপনারটা তুলে, এ বার সুদীপ্তা চ্যাটার্জির (বুকটা ধক করে উঠল, আমি ওপরের ঘঁচের মূর্তিটাকে সত্যি সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ভাবছি নাকি? উনি শুনলে কী ভাববেন, ছি ছি!) এ বার সেই মূর্তির পয়েন্টেডা, তা ছাড়া আর কী বলতে হয়, আমি জানি না, পয়েন্টেড বুক দিয়ে সোডার বোতল খুলে, সোডা ঢাললেন, কিন্তু তুলনায় পরিমাণে খুবই কম। লায়লী সিং যেমন বলে, কুইক কিক’ উনি কি তা-ই চাইছেন? কুইক কিকের জন্য সে তো যাকে বলে নিট গলায় ঢালত। উনি গেলাস তুলে চুমুক দেবার মুহূর্তেই, দরজায় খট খট শব্দ করে, বেয়ারা দরজা খুলে, খাবার নিয়ে ঢুকল। এ বেয়ারা অন্য একজন, ক্যাটারিং-এর বোধ হয়, হাতে ডিনারের থালা, সঙ্গে আগের বেয়ারাও ঢুকল, বরফ আর সোডার বোতল নিয়ে। খাবারের বেয়ারা আমার ডান দিকে, দেওয়ালের গায়ে, ছোট টেবিলের ওপর খাবারের থালা রাখল, এবং ঢাকনাটা খুলতেই, খাবারের গন্ধ পাওয়া গেল, যা আমার একবারেই ভাল লাগল না। একটা ছোট স্টিলের বাটিতে, মিষ্টি হিসাবে পুডিং দিয়েছে। দুজন বেয়ারাই, দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে চলে গেল। আমি কী করব বুঝতে না পেরে, মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে তাকালাম, উনিও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ক্যারি অন, আরম্ভ করে দাও।’
আমি ফর্ক আর চামচ তুলে নিলাম। খাবারের মধ্যে প্রধান যেটা, সেটা বোধ হয় বিরিয়ানি বা পোলাও-টোলাও জাতীয় একটা কিছু হবে, যার গন্ধে আমার খিদে নষ্ট হয়ে যেতে চাইছে, এবং মাংস, আর যেন কী রয়েছে। ভাল করে না দেখেই, আমি খেতে আরম্ভ করে দিলাম। গরম আছে, কিন্তু কী বিশ্রী স্বাদ, জানি না, এত জবজবে করে, কী দিয়ে ভাতগুলোকে মেখেছে। মিস্টার জে, বিশওয়াসের গলা শোনা গেল, হা, যে কথা বলছিলাম, (উনি ভোলেননি দেখছি, রেসপনসিবিলিটি বোধ যাঁদের বেশি, তাদের বোধ হয় এ রকমই হয়, ড্রিঙ্ক করুন আর যা-ই করুন, দায়িত্ব ভোলেন না।) তা হলেই বুঝতে পারছ, সভ্য হলেই, আমাদের একটা রেসপনসিবিলিটি এসে যায়, বাট দিস ইজ লাইফ, কেন না, বাই ইনস্টিংক্ট আমার অনেক কিছু চাই, মানে আমার করতে ইচ্ছা করে, ইজন্ট ইট?
আমার ফর্কে তখন হাড়সুদ্ধ এক টুকরো মাংস মুখের কাছে, মুখে দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আর মুখে পুরতে পারলাম না। উনি বলে চললেন, অ্যান্ড দেয়ার ইজ দ্য ক্রাইসিস, ইনস্টিংক্ট অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি–খাও খাও, তুমি খাও, আমি বলে যাচ্ছি, (গেলাসে চুমুক দিলেন, আমি মাংসের টুকরো মুখে দিলাম, বিশ্রী স্বাদ!) তখনই দরকার হয়ে পড়ে প্রাইভেসির। প্রাইভেসি ইজ প্রাইভেসি, তাকে তুমি প্রকাশ্যে আনতে পারো না, ইভন নট ইন লিটারেচার, দ্যু য়ু ফলো মি? প্রথমেই তোমাকে আমি যে প্রসঙ্গে বলতে যাচ্ছিলাম, ইয়েস–আমরা অনেক কিছুই করি, তার মানে এই নয় যে, সে সব তুমি প্রকাশ্যে বলবে বা লিখবে বা করবে, দ্যাট ইজ ভালগারিটি, অবসিন। আমরা কী না করি? আমরা (ওহ্, কী জঘন্য খাবার, ঠিক যেন চটচটে কিটকিটে, আমি আর খেতে পারছি না।) নেকেড হই, আমরা–আমরা–মানে আমি বলছি, তুমি একটা মেয়েকে সেডিউস করতে পারো, (আ-আ-আমি?) ইয়েস, আমি মানি, বাবা আর ছেলে একটি মেয়ের জন্য মারামারিও করতে পারে, বাট দ্যাট ইজ ইনডিসেন্ট, য়ু কান্ট ব্রিং ইট টু পাবলিক, লাইফ ইজ এ ভেরি–।
ওঁর কথা শেষ হল না, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি দরজা খুলে ঢুকলেন, আর উনি, কী বলে ওটাকে, হ্যাঁ, উল্লাসে কেমন একরকম গলায় বলে উঠলেন, আহ্ বিমি! দেন য়ু হ্যাভ কাম?’
আমি পুডিং মুখে তুলতে যাচ্ছিলাম, থপ করে নীচে পড়ে গেল, দেখলাম, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি নাইটি পরে আছেন, তার ঠোঁটে বা মুখে রং নেই, ঘাড় অবধি চুল এখন উশকোখুশকো, চোখ টকটকে লাল, তিনি যেন ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না, এবং ঠিক যেন হাসছেন না, অথচ হাসছেন, মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে তাকাচ্ছেন না, ওঁর দৃষ্টি যেন জানালার দিকে, জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, য়ু মেন আর স্যো কুইয়ার’
মিস্টার জে. বিশওয়াস লুঙ্গি খসখসিয়ে উঠে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির কাছে গিয়ে, তার কাঁধে হাত রাখলেন, জিজ্ঞেস করলেন, হোয়াট ইজ য়োর হাজব্যান্ড ডুয়িং?
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যেন হাসলেন, আর ওঁর প্রায় ট্রান্সপারেন্ট নাইটির ভিতরে শরীরটা কেঁপে উঠল বা দুলে উঠল, বললেন, ওহ্, হি ইজ স্নোরিং লাইক এ টাইগার।
বাঘের মতো নাক ডাকাচ্ছেন? মিস্টার জে. বিশওয়াস সুদীপ্তা চ্যাটার্জির কাধ ধরে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে এলেন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আবার বললেন, আমি কুপে অন্ধকার করে দিয়ে, দরজা টেনে দিয়ে চলে এসেছি।’
ফাইন!’ বলেই তিনি সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে মুখ নামিয়ে নিতে গিয়ে, আমার দিকে ফিরে তাকালেন। পাবলিক! আমার মনে পড়ে গেল, প্রাইভেসি ইজ প্রাইভেসি, তার মাঝখানে আমি একজন পাবলিক। আমি তাড়াতাড়ি পেপার ন্যাপকিন আর বইটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম, আর সে সময়েই সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন, বলে উঠলেন, ওহ, ডার্লিং মদন, য়ু আর হিয়ার! বলেই তিনি মিস্টার জে. বিশওয়াসের হাত থেকে কাঁধ ছাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন, এবং আমার কাঁধে দু হাত রাখলেন, আর মুখটা তুলে বললেন, দাড়ি কামাওনি কেন?
আমার নিশ্বাস প্রায় বন্ধ, ওঁর মুখ থেকে মদের গন্ধ লাগছে, আর–আর ওঁর শরীর–সেই ওপনারের মতো, আমাকে ভারী কষ্ট দিচ্ছে, অথচ ওঁর সেই–সেই চোখে উনি আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছেন, আমার শিরদাঁড়া বেয়ে সাপটা নামছে না উঠছে, বুঝতে পারছি না, আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে তাকালাম। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি তার মুখটা আরও উঁচু করে তুলে ধরতেই, মিস্টার জে. বিশওয়াস তাকে হাত ধরে নিজের কাছে ছিনিয়ে নিলেন, বললেন, বিমি, বিহেভ য়োরসেলফ। ও ওখানে যাবে কি না, সেটা বলে দাও।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, ওহ শু্যর।আমার দিকে ফিরে বললেন, মদন, তুমি (উনি আমাকে তুমি’ করে কখনও বলেননি।) ই বার্থে চলে যাও। নীচে চ্যাটার্জি ঘুমোচ্ছে, তুমি ওপরে শুয়ে পড়োগে, বালিশ আর চাদর রাখা আছে, অ্যান্ড আফটার অ্যান আওয়ার অর টু, আই শ্যাল মিট য়ু উ? ওহ, হাউ লাভলি য়ু আর…।’
ওঁর কথা শেষ হবার আগেই, মিস্টার জে. বিশওয়াস্ ওঁকে আরও গায়ের কাছে টেনে নিলেন, আমি তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে বেরিয়ে, আবার দরজা বন্ধ করে দিলাম। আফটার অল, প্রাইভেসি ইজ প্রাইভেসি। ভিতর থেকে লক করে দেবার শব্দ শুনতে পেলাম, আর দেখলাম, সেই সোডা বরফের বেয়ারাটি আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে, কেমন একরকম করে যেন হেসে চলে গেল। করিডরে এখন বেয়ারাদের ডিনার সার্ভ করার ব্যস্ততা। আমি বাথরুমের স্পেসের দিকে এগিয়ে গেলাম।
.
আহ, অনেকটা স্বস্তিবোধ করছি। বাথরুমের স্পেসের কাছে বেয়ারারা এক পাশে ডিনার নিয়ে ব্যস্ত, দু-একজন সেখানে দাঁড়িয়েও গেলাস হাতে নিয়ে ড্রিঙ্ক করছে, আর কথা বলছে, আমি পকেট থেকে, মমতা কাকিমার দেওয়া কিং সাইজ ফরেন সিগারেট বের করে ধরালাম। তারপরেই ভাবনাটা মাথায় এল, যার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না যে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির সঙ্গে মিস্টার জে. বিশওয়াসের ব্যাপারটা কী। চাকরির পজিশনের দিক থেকে মিঃ চ্যাটার্জি, মিস্টার জে, বিশওয়াসের থেকে ছোট, বিভাগও ভিন্ন, কিন্তু ওঁর বয়স অনেক কম। মিস্টার জে. বিশওয়াসের বয়স অনেক বেশি, পঞ্চাশের ওপরে, সেই তুলনায় মিঃ চ্যাটার্জির বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ, সুদীপ্তা চ্যাটার্জিও অনেক ছোট, অথচ তিনি মিস্টার জে. বিশওয়াসের সঙ্গে–সেই বেয়ারাটার সঙ্গে আমার আবার চোখাচোখি হল, এবং সে যেন কেমন একরকম করে হাসল, নাকি কোনও ইঙ্গিতই করল, বুঝতে পারলাম না, হঠাৎ মহিলা গলায় খিলখিল হাসি শুনে, আমি চমকে ফিরে তাকালাম। না, লায়লী সিং না, অন্য একজন মহিলা, আর একজন মহিলার সঙ্গে এসে, বাথরুমে ঢুকে গেলেন, কিন্তু আমার মাথায় লায়লী সিং ঢুকে যেতেই, মস্তিষ্কের মধ্যে সাপের চেরা জিভের স্পর্শ পেলাম যেন। আবার আমার মনে হল, আমি যেন সেই দু-দুর্গম হি-হিংস্র, গ–গভীর অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে আছি। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে করিডরের এদিকে ওদিকে দেখতে লাগলাম। কোনও একটা কুপের মধ্যে চন্দন সিং আর লায়লী সিং নিশ্চয়ই আছে, এবং যে কোনও মুহূর্তেই বেরিয়ে আসতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি সিগারেটটা দেওয়ালের গায়ে অ্যাশট্রেতে চেপে দিয়ে, কুপের অক্ষর দেখে দেখে, ই কুপের সামনে দাঁড়ালাম। আমি এখন নিরুপায়, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পাচ্ছি না।
খুব আস্তে আস্তে, হ্যাঁন্ডেলটা বাঁকিয়ে, দরজা ফাঁক করলাম, আর কানে এল, সত্যি বাঘের গর্জন। একটি মাত্র বেগুনি রঙের জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে, সেই আলোতে দেখতে পেলাম, মিঃ চ্যাটার্জি পায়জামা পরে, গেঞ্জি গায়ে চিত হয়ে শুয়ে আছেন। একটা হাত পেটের ওপর, আর একটা হাত ওপর দিকে পড়ে আছে, মুখ অল্প একটা হাঁ করা। আমার কানে এল, মহিলা গলার খিলখিল হাসি, আমি তাড়াতাড়ি কুপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম, দরজাটা শব্দ না করে টেনে বন্ধ করে দিলাম, এবং আবার মিঃ চ্যাটার্জির দিকে তাকালাম। তিনি আমার মতোই লম্বা, কিন্তু আমার থেকে চার গুণচার ডবল যাকে বলে, চওড়া আর মোটা। ওপরের বার্থের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ঠিকই বলেছেন, বালিশ আর চাদর রয়েছে। কিন্তু মিঃ চ্যাটার্জি যদি জেগে ওঠেন, আর উঠে আমাকে দেখতে পান? ভাবতে পারি না। হয়তো ভয় পেয়েই আমাকে মারতে আরম্ভ করে দেবেন, চিৎকার করে তোক ডাকাডাকি করবেন। অসম্ভব! চিন্তা করতে পারছি না, আমার গায়ের মধ্যে যেন কেমন করছে। আমি নিঃশব্দে দরজা খুলে, আবার বেরিয়ে এলাম। দরজাটা টেনে দিয়ে, বাথরুম পেরিয়ে, দরজা ঠেলে, চেয়ার কার বগিতে ঢুকে পড়লাম। চমৎকার, যেন অন্য একটা জগৎ,কত মহিলা পুরুষ, বাচ্চাদের ভিড়, অধিকাংশই এখন খেতে ব্যস্ত। একসঙ্গে অনেকের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে, দু-তিনটি বাচ্চা ছুটোছুটি করছে, বিউটিফুল! কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকবার উপায় নেই, মাঝখানের সরু স্পেস দিয়ে আমি এগিয়ে গিয়ে, দরজা ঠেলে, বাথরুমের সামনে গেলাম। ওহ, এখানেও দেখছি, অনেকে গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে, গেলাস হাতে ড্রিঙ্ক করছে, সিগারেটের ধোঁয়ায়, সেই খবরের কাগজের ভাষায় ধোঁয়াশা ছড়িয়ে দিয়েছে। আমি সকলের মধ্যে একটু ফাঁক দেখে দাঁড়ালাম, এবং বাধ্য হয়ে পকেট থেকে প্যাকেট বের করে, একটা সিগারেট ধরালাম, কেন না অকারণে এদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানে হয় না। হঠাৎ একজন যুবক পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল, দেখি দাদা, একটা আপনার সিগারেট ছাড়ুন তো।
আমি বলতে গেলে, খুব খুশিই হয়ে উঠলাম, প্যাকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, নিশ্চয়। দেখলাম, তার চোখ দুটি টকটকে লাল, হাতে গেলাস, খয়েরি রঙের ড্রিঙ্কস, বোধ হয় রাম। সে বোধ হয় গাড়ির দোলানিতেই দুলছে, সকলকেই একটু দুলতে হচ্ছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে। অন্য দিক থেকে কে একজন বলে উঠল, কমল, প্যাকেটটা এদিকেও এক বার চালান করে দিস।
যে বলল, সে বাথরুমের অন্য পাশে, আর একটা কমপার্টমেন্টের দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। কমল যার নাম, সে ড্রিঙ্কিং ওয়াটারের স্টিলের ফ্ল্যাট বেসিনে গেলাস রেখে, প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল, এবং প্যাকেটটা অনয দিকে ছুড়ে দিল। আমার দিকে কয়েকজন তাকিয়ে দেখল, তাতে একটু অস্বস্তি হলেও, আমার কিছু খারাপ লাগল না। সারা রাত্রের মধ্যে আমার আর একটা সিগারেটেরও দরকার নেই। কমল যার নাম, সে সিগারেট ধরিয়ে, হাতে গেলাস তুলে নিয়ে বলল, ডু য়ু নো, হু অ্যাম আই?
কী করে জানব, শুধু নামটাই জানতে পেরেছি। একটু হেসে বললাম, আপনি কমলবাবু। কে যেন আমার পাশ থেকে হেসে উঠল, এবং কমল যার নাম, সে কাত হয়ে আমার দিকে ফিরে বলল, ইয়েস, কিন্তু আমি কোন কমল, তা আপনি জানেন না?’
আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম, ও লাল টকটকে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কেমন যেন একটা অফেন্ডেড ভাব, কিন্তু আমি কী করে জানব, ও কোন কমল। আমি এ রকম চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না, তাই চোখ সরিয়ে নিয়ে বললাম, না তো।
কমল নামে যুবক যুবকই বলা যায়, কেমন যেন ধমকের সুরে বলল, কমল বসুর নাম আপনি শোনেননি? আপনি কি একটা বাঙালি না কি, অ্যাঁ? গ্রেট সিঙার কমল বসুর নাম আপনি শোনেননি, তার ছবি দেখেননি, তাকে চেনেন না?
আমি–আমি কী বলব, যেন অগাধ জলে পড়ে গেলাম। কমল বসু, বিরাট গায়ক? কিছুতেই মনে। করতে পারছি না, আমি তার গান শুনেছি বা নাম শুনেছি বা ছবি দেখেছি কখনও। অবিশ্যি এ সব। ব্যাপারে আমি একটু ইয়ে আছি–মানে ক্যালাস–মানে লেস ইনফর্মড। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, অনেকেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছে আর কেমন যেন ঠোঁট টিপে টিপে হাসছে। এ বার আমি সত্যি অস্বস্তি বোধ করলাম। কমল বসু, গ্রেট সিঙার আবার বলল, আমি আপনার কাছে। এমনি এমনি সিগারেট চাইলাম? আমি কারোর কাছে সিগারেট চাইলে, সে নিজেকে গ্লোরিয়াস মনে করে, আপনাকে গ্লোরিয়াস্ করার জন্যই আপনার কাছে সিগারেট চেয়েছি, আর আপনি আমাকে রিকগনাইজ না করে, গবাকান্তর মতো তাকিয়ে আছেন?
কান্ত না হলেও, গবা আমার ডাকনাম ঠিকই, কিন্তু আমি যে সত্যিই কমল বসু নামে কোনও বিরাট গায়ককে চিনি না, কখনও তার গান শুনে থাকলেও, আমি মনে করতে পারছি না বা তার ছবি আমি কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না, যে কারণে আমি একটু লজ্জিতই হয়ে পড়লাম, বললাম, খুবই দুঃখিত, সত্যি।
এ সব দুঃখ-টুঃখে কিছু যায় আসে না, আপনি কমল বসুকে চেনেন না, আপনার গলায় দড়ি দেওয়া উচিত। টপ হিরো আমার ভয়েসে লিপ দেয়, মাই রেকর্ডস আর বেস্ট সেলার, আপনি আমার নাম জানেন না?
গ্রেট সিঙার কমল বসু কেমন যেন ক্ষেপে ক্ষেপে উঠছে, এবং এক চুমুকে গেলাস শুন্য করে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, এই প্যানা, মাল দে।’
কাছেই একজন দাঁড়িয়েছিল, নিশ্চয়ই প্যানা, রামের বোতল খুলে, গেলাসে ঢেলে দিল। কমল বসু আরও জোরে চিৎকার করে উঠল, এ্যাই বেয়ারা, রাসকেল, কঁহা গেয়া, হমকো কোকস ডালো।
একটি বেয়ারা অনেককেই সোভা আর কোকাকোলার ছিপি খুলে দিচ্ছিল। সে হঠাৎ ভুরু কুঁচকে, কেমন একটু রোখা গলায় বলল, জবান সামালকে বাত কিজিয়ে সাব, আপ রাসকেল কেঁও কহতে?
কমল বসুকে আমার মনে হল, সে যেন একটা ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপা কী? ওটাকে বলে হস্তী, হস্তীর মতো বেয়ারার দিকে ফিরে বলল, কেয়া বাতায়া সসালা, হম তুমকো সাথ জবান সামালকে বাত করেগা, শুয়ার, ছোটা মুখ মে বড়ি বাত?
আমি একেবারে আঁতকে উঠে দেখলাম, বেয়ারাটা যেন বাঘের মতো প্রায় কমল বসুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর চিৎকার করে উঠল, কেয়া? হম সালা, শুয়ার? তেরি–একটা খুব খারাপ গালাগাল দিল, যা আমি উচ্চারণ করতে পারব না।) তেরা মাফিক সিঙার ম্যায় বহোত দেখা।
বলে সে কমল বসুর শার্টের কলার চেপে ধরল। কমল বসু বেয়ারার কলার চেপে ধরা হাত চেপে ধরে, চিৎকার করল, ওরে শুয়ার কা বাচ্ছা, কমল বসু কো তুম নহি জানতা?’
কে যেন বলে উঠল, এই কমলদা, ছেড়ে দাও।’
আমি দেখলাম, আশেপাশের লোকজন সবাই যেন কেমন সরে যাচ্ছে, এবং একটা মারামারির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, কারণ বেয়ারাটা বসুকে কলার ধারে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ফিন গালি বকতা, সালা তুমকো ম্যায় গাড়িসে ফেক দেগা।
বলে সে তাকে হ্যাঁচকা টান দিল, আমি প্রায় কেঁপে উঠলাম, এবং অবাক হয়ে দেখলাম সেই সব প্যানা না কারা ছিল, বা যাকে কমল বসু আমার সিগারেটের প্যাকেটটা দিয়েছিল, তারা কেউ এগিয়ে আসছে না, এবং ইতিমধ্যে আরও কয়েকজন বেয়ারা খবর পেয়ে ছুটে এসেছে, এবং তাদের মুখে একটি মাত্র কথা, মারো সালেকো।
আমি থামাতে যেতে সাহস পাচ্ছি না, এবং সেই বেয়ারাটা কমল বসুকে কলার ধরে টানছে, আর বলছে, আও, তুমি কেতনা বড়া আদমি, ম্যায় দেখ লেংগে।
কমল বসুকে এখন যেন কেমন কাকা কাতর মতো দেখাচ্ছে, তার লাল চোখে সেই ক্ষ্যাপা ভাব আর নেই, এবং সে কলারটা ছাড়াবার চেষ্টা করে খালি বলছে, ছোড়ো, ছোড়ো হমকো, নহি তো বহোত খারাপ হো যায়েগা।
কেয়া খারাপ হো যায়েগা, শরম নাই লাগতা হ্যায়, এ্যায়সা গালি বকতা? আদমি লোক ঘরকা নোকরকো ভি এ্যায়সা নহি গালি দেতা৷’ বলে বেয়ারাটা তাকে আবার হ্যাঁচকা টান মারল। অন্য বেয়ারারা বলে উঠল, উসকো মাফি মানে পড়েগা, নহি তো ছোড়না নহি।
এ সময়েই কয়েকজন যাত্রী দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। তাঁরা বেয়ারাদের বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলেন, এবং বোঝাতে লাগলেন, মাতাল লোকের কথায় কান দিতে নেই, ওদের কথার কোনও দাম নেই, যদিও অন্যায় করে ফেলেছে, ওরা মাফ করে দিক। তবু বেয়ারারা ছেড়ে দিতে চাইল না, কমল বসুকে মাফ চাইবার জন্য জেদাজেদি করতে লাগল, আর ভালমানুষ যাত্রীরা ওদের বোঝাতে লাগলেন, এবং শেষপর্যন্ত ওরা কমল বসুকে ছেড়ে দিল, আর ভালমানুষ যাত্রীরা কমল বসুকে নিয়ে কমপার্টমেন্টের মধ্যে ঢুকে গেলেন। এখন দু-তিনজন মাত্র এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে, কারোর হাতেই গেলাস দেখতে পাচ্ছি না, সবাই চুপচাপ, কেবল বেয়ারারা নিজেদের মধ্যে, কমল বসুর নামে গালাগাল দিয়ে, ঘটনাটা বলাবলি করছে। তারপরেই এক ভদ্রলোক এলেন, ঢলঢলে মতো স্যুট পরা, সরু টাই পরা, তার হাতে একটি ছোট নোটবুক আর পেনসিল। তিনি হিন্দিতে বেয়ারাদের বললেন, ঘটনা তিনি সবই শুনেছেন; খুবই অন্যায় করেছে লোকটা, কিন্তু এখন আর গাড়িতে এ নিয়ে গোলমাল করে লাভ নেই। যার ইজ্জত বোধ নেই, তাকে বোঝাবার কিছু নেই, এ বার সবাই যে যার কাজে চলে যাক। দেখা গেল, ওঁর কথা সবাই মেনে নিল। যারা অন্য দিক থেকে এসেছিল, তারা চলে গেল, এখানকার বেয়ারাটি গেলাস আর সোডার আর কোকাকোলার খালি বোতলগুলো, এখান থেকে ওখান থেকে এক জায়গায় জড়ো করতে লাগল। ভদ্রলোকটিও চলে গেলেন, এবং আমি তাকিয়ে দেখলাম, করিডরে আগের কেউ নেই, ওপাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন, একজন মহিলা বাথরুমে ঢুকলেন। আমি যেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তেমনি দাঁড়িয়ে রইলাম, হাতের বইটা হাতেই রয়েছে, এটা এখন খোলবার কথা ভাবতেই পারছি না, মনে হচ্ছে, আমি যেন একটা সাড়া শব্দ নেই, এরকম–এরকম একটা যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার চারদিকে মৃতরা পড়ে রয়েছে, আর গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছুটে চলেছে।
তারপরেই কমল বসুর কথা আমার আবার মনে পড়ল, আর মনটা খারাপ হয়ে গেল। সত্যি মানুষকে দেখে, সবসময়ে চেনাই যায় না বা বোঝা যায় না, সে কত বেচারির মতো হেলপলেস্। মনে মনে ঠিক করলাম, কলকাতায় ফিরে গিয়ে, আমাকে জানতেই হবে, কমল বসু কে, কী রকম গায়ক, এবং তার গান আমি শুনব, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাকে যে কী বলা যায়, বলা উচিত, আমি তো বুঝতে পারছি না। কমল বসু এত ইয়ে কেন, মানে নিজের সম্পর্কে এতটা বড় ধারণা করা বোধ হয় ঠিক না। তার বন্ধুরাই বা কী, তারাই তো সমস্ত ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে পারত, বন্ধুকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে পারত, কিন্তু তারা কে কোথায় চলে গেল, বোঝাই গেল না।
কেয়া সাব, আপকো কুছ দেগা? বেয়ারাটি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমি এক সেকেন্ড ভেবে বললাম, কোকাকোলা হ্যায়?
হ্যায়।
একঠো দো।
সে আমাকে একটি কোকাকোলার ছিপি খুলে, ঔ ডুবিয়ে এগিয়ে দিল। আমি ঐ ঠোঁটে নিয়ে চুমুক দিলাম। আহ, সত্যি, আমার গলাটা শুকিয়ে যেন একেবারে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বেয়ারা না বললে, এ কথাও আমার মনে থাকত না বোধ হয়। খানিকটা চুমুক দিয়ে, দাম কত জিজ্ঞেস করে, পয়সা দিয়ে দিলাম, আর ওকেও কিছু দিলাম, ও আমাকে কপালে হাত ঠেকিয়ে সেজন্য সম্মান জানাল। আর তখনই আমার খোতেমানে আমার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। খোতে নিশ্চয় কারোর সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করে না, মানে আমি কমল বসুর কথা ভাবছি, ও আবার একটু অন্য রকমের ছেলে তো। মেরিয়ানের একটি ছেলে হয়েছে, এ কথাও মনে পড়ে গেল, ওরা এখন নাকি ক্যালিফোর্নিয়ায় আছে, আচ্ছা, খোতেটা আমেরিকায় কী করে?
যে সব কথার কোনও জবাবই আমার জানা নেই, সে সব কথা আমার মনে চারদিক থেকে ভিড় করতে লাগল, এবং এক সময়ে হঠাৎ আমার মনে হল, আমি একেবারে একা দাঁড়িয়ে আছি, কেউ নেই, কোথাও কোনও শব্দ নেই, কেবল গাড়ি ছোটার শব্দ। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি কি এখনও সেই কুপেতে আছেন, নাকি নিজের কুপেতে ফিরে এসেছেন? রাত কত হল? আমার হাতে কোনও ঘড়ি নেই। বেয়ারাটাও চলে গিয়েছে, কোকাকোলার শূন্য বোতলটা কোথায় রাখব? দেখলাম এক পাশে, কাঠের বাক্সে খালি বোতল অনেক রয়েছে। তার মধ্যেই বোতলটা ঢুকিয়ে দিলাম। চেয়ার কারের কমপার্টমেন্টের দরজা একটু ফাঁক করে দেখলাম, অন্ধকার, বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, সবাই বোধ হয় ঘুমোচ্ছ। মনে হল, এখন আমি আমার কমপার্টমেন্টের করিডরে ফিরে যেতে পারি, লায়লী সিং এখন নিশ্চয় জেগে নেই।
আমি আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে, অন্ধকারে সাবধানে, মাঝখানের সরু স্পেস দিয়ে এগিয়ে গেলাম, এখানেও নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে, এবং কেউ কেউ শীতের রাত্রের মতো, চাদর দিয়ে গা, মাথা মুড়ি দিয়ে, আধশোয়া হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে কমল বসু কোথায়, তা এখন বোঝবার উপায় নেই। আমি আর একটা এন্ডের দরজা খুলে, বাথরুম স্পেসে পা দিলাম। করিডরে আলো জ্বলছে। অ্যাটেনডেন্ট তার নিজের আসনে বসেছিল, আমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকাল। হয়তো সে ভেবেছে, আমি এই কমপার্টমেন্টের যাত্রী না, অথবা অবাক হয়েছে আমাকে এখন চেয়ার কার কমপার্টমেন্ট থেকে ফিরতে দেখে। আমি বাঁ দিক ফিরে করিডরের দিকে যেতে যাব, বাথরুমের দরজা খুলে গেল, দরজার সামনে লায়লী সিং দাঁড়িয়ে। সে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, মাদান।
মাদান! উহ, মস্তিষ্কের মধ্যে সাপটা কেবল কুণ্ডলী পাক দিচ্ছে আর ঝুলছে, তার চেয়ে দ–দ– দংশন করলে আমি বাঁচতাম, এটা একটা অসহ্য অবস্থা, কেন না, আমার সারা গা কেঁপে, মাথা ঘুরে যাচ্ছে, অথচ আমার ভিতরটা যেন বরফের মতো জমে গিয়েছে, আমার একটুও মুভ করার ক্ষমতা নেই। ঠিক যেন সেই শোনা কথার মতো, কারণ কখনও দেখিনি, অজগরের সামনে কী বলে ওটাকেস সম্মোহিত নিশ্চল ছাগলছানার মতো আমার অবস্থা, কঁপছি অথচ নড়তে পারছি না, আর দেখছি, গাঢ় বেগুনি রঙের সিল্কের ঢোলা পায়জামার ওপরে, একই রঙের লুজ পাঞ্জাবি পরা অজগরের চোখ দুটি টকটকে লাল, মাথার চুল গালে, কপালে ছড়ানো, রঙের কোনও প্রলেপ নেই, এবং অজগর যদিও ফণা তুলতে পারে না, তবু এ অজগর যেন, দু হাতে দরজা ধরে দুলছে। সেটা কেবল গাড়ির ঝাঁকুনিতে না, বোধ হয় কেন না, অজগরের লাল চোখ কেমন যেন ঢুলুঢুলু করছে। মাদান!’ সেই নাম, কনট সার্কাসের জুনের দুপুরে শুনেছিলাম, অথচ পিছন ফিরে দৌড়তে পারছি না, লায়লী সিং আবার ডেকে উঠল, য়ু মাদান! রিয়্যালি য়ু মাদান?’
আমি প্রায় স–সভয়ে ঘাড় নাড়তে গেলাম, কিন্তু আমার ঘাড় নড়ল না, যেন পেরেক ঠুকে অনড় করে দিয়েছে। লায়লী সিং-এর মুখ দরজার বাইরে খানিকটা এগিয়ে এল, বলল,’হোয়্যার ফ্রম, য়ু মাদান, হাউ য়ু আর হিয়ার, ইন দিস ভেরি মোমেন্ট?
আমারও সেটাই ভাবতে ইচ্ছা করছে, ঠিক এই মুহূর্তেই, এই অ–হ্যাঁ, অলৌকিক সাক্ষাৎ ঘটল কী করে? বাস্তবের সংজ্ঞা কী? লায়লী সিং-এর কথা ঠিক জড়ানো না, অনেকটা ভাঙা ভাঙা আর মোটা, যেন কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছে, আর আমি গাড়ির ঝাঁকুনিতে যেন প্রায় লগবগ লগবগ করছি। লায়লী সিং আবার ইংরেজিতে যা বলল, তার মানে এই, আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও না, বলা উচিত না, কেন বলবে, এত ঘটনার পর? সব দোষ আমার। সব। যদিও তার পরদিনই আমাকে সিমলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা হোক, সব দোষ আমার, আমাকে তুমি বলতে পারো, কী করে এটাকে কমপেসেট করা যায়?
কমপেনসেট? আর ঠিক এই মুহূর্তেই আমার মনে পড়ে গেল, অ্যাটেনডেন্ট গার্ড আমার ডান দিকের পিছনেই বসে আছে, এবং মনে হতেই, আপনা থেকেই আমার ঘাড় ফিরে গেল। আশ্চর্য, সে অদ্ভুতভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে, যেন কিছুই দেখছে না, শুনছে না। কিন্তু কমপেনসেট? তার মানে কী, পরিশোধ? আমি আবার লায়লী সিং-এর দিকে তাকালাম, দেখলাম, ও এক পা এগিয়ে এসেছে। অ্যাটেনডেন্ট গার্ডের দিকে চোখের ইশারায় দেখিয়ে বলল, ওর জন্য ভেবো না, ওর ব্যবস্থা আমি করে দেব, (কমপেনসেট?) তুমি বলল মাদান, কীভাবে আমি এটা কমপেনসেট করতে পারি?
বলতে বলতে ও একটা হাত বাড়িয়ে দিল, আর তৎক্ষণাৎ গ্রাসে ঢোকবার আগে, একটা শেষ চেষ্টার মতো, আমি নড়ে উঠলাম, এক পেছিয়ে গেলাম, আর এ সময়েই ভারী পায়ের খসখস শব্দ এগিয়ে এল, আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন মিঃ চ্যাটার্জি। টকটকে লাল চোখ ঘুমে জড়ানো, শরীরও দুলছে, এবং আমার দিকে কেমন একটা ভুরু কোঁচকানো অচেনা দৃষ্টিতে তাকালেন–তার মানে, আমাকে চিনতে পারছেন না, এবং বোধ হয়, কয়েক সেকেন্ডের জন্য বোধ হয় লায়লী সিংকেও চিনতে পারলেন না। তারপরে চিনতে পেরেই, জড়ানো প্রায়, মোটা স্বরে বলে উঠলেন, হ্যালো মিসেস সিং!’ বলে তিনি আবার আমার মুখের দিকে তাকালেন, এবার তাঁর লাল চোখের পাতা আর একটু খুলল, আমার আতঙ্ক উত্তরোত্তর বাড়ছে, কিন্তু, আহ, সত্যি উনি আমাকে চিনতে পারলেন না, এবং লায়লী সিং-এর দিকে ফিরে তেমনি স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, মিসেস সিং, হ্যাভ য়ু সিন বিমি এনিহোয়্যার? আই ডোন্ট সি হার ইন দ্য কুপো
বলে তিনি অন্য আর একটি লেভেটরির বন্ধ দরজার দিকে তাকালেন। লায়লী সিং পলকে এক বার আমার দিকে দেখে নিল, কারণ আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, কী বলে সেটা শোনবার জন্য। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ওহ, মিসেস চ্যাটার্জি? উনি তো আমাদের কুপেতে আছেন, আমি ওঁর সঙ্গে গল্প করতে করতে একটু এসেছিলাম, এখুনি আবার ফিরে যাচ্ছি। মিসেস চ্যাটার্জিকে কি পাঠিয়ে দেব?
মিঃ চ্যাটার্জি তার কবজির ঘড়ি দেখে বললেন, আমার মনে হয়, ওর এখন এসে শুয়ে পড়া উচিত, তা না হলে হ্যাঙোভার হয়ে যাবে, সকালে কষ্ট পাবে।
আমি এখুনি গিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ বলতে বলতে লায়লী সিং বাথরুমের বাইরে এল।
থ্যাংকু। মিঃ চ্যাটার্জি ফিরে চলে যাবার আগে, আবার আমার দিকে তাকালেন, এবং এ বার ওঁর চোখে বিশেষভাবে একটি কী বলে–অনুসন্ধিৎসা আর জিজ্ঞাসা ফুটে উঠেছে। উনি ভারী পায়ে স্লিপার খসখসিয়ে চলে যাবার পরেই, লায়লী সিং যেন ভয় পাওয়া স্বরে বলে উঠল, এখন আমি কোথায় খুঁজতে যাব মিসেস চ্যাটার্জিকে? আমি তো জানি না, সে কোন কুপেতে আছে। আর একটা সিঙল কুপেতে সে যাবে, আমাকে বলেছিল।এ সব ঘটনা সত্যি আমার সামনে ঘটছে বলে, আমি যেন। বিশ্বাস করতে পারছি না, এবং লায়লী সিংকে আমার কিছু বলা উচিত কি না, বুঝতে পারছি না। লায়লী সিং আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এ কমপার্টমেন্টে ট্রাভেল করছ?
মম– মমি?’ বলেই আমি চুপ করে গেলাম, সত্যি কথা বলতে পারছি না, মিথ্যাটাও চট করে মুখে এল না, আর লায়লী সিং কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল, বুঝেছি, আমার সঙ্গে কথা বলতে তোমার ঘৃণা হচ্ছে।বলেই সে অ্যাটেনডেন্ট গার্ডের দিকে ফিরে বলল, গার্ড, আপকা ক্যায়া মালুম হ্যায়, সিঙল কুপে কয়ঠো হ্যায়, উসকি পাতা ক্যায়া?
অ্যাটেনডেন্ট গার্ড উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দো হ্যায়, এক সি, দুসরা ই।
হঠাৎ আমার শার্টের বুকে লায়লী সিং-এর হাত। আমি সরে যাবার আগেই ও বলে উঠল, জাস্ট এ মিনিট মাদান, ডোন্ট গো, আয়াম কামিং ব্যাক।
বলেই ও পায়জামায় একটা শব্দ তুলে, তাড়াতাড়ি করিডরের দিকে এগিয়ে গেল। আমি তৎক্ষণাৎ চেয়ার কার কমপার্টমেন্টের দরজার দিকে ফিরে তাকালাম। কিন্তু সেখানে এখন অন্ধকার, আমাকে আবার ওপাশের করিডরে যেতে হবে। আমি অ্যাটেনডেন্ট গার্ডের দিকে ফিরে তাকালাম, আর সাধ্যমতো হিন্দিতে বললাম, ভাই, মুঝে এক কৃপা কিজিয়ে, ম্যায় এ লেভেটরিকে অন্দরমে যারাহে। মেমসাব আনেসে মেরা বাত কুছ পুছেগি তো কহনা কি ম্যায় চেয়ার কার কমপার্টমেন্ট মে চলা গয়া।
আমার মুখ দেখে, লোকটির কী মনে হল জানি না, কেবল দেখতে পেলাম, সে খুব অবাক হয়েছে, এবং জিজ্ঞেস করল, আপ তো সি বার্থ মে হ্যায় না?
জি। আপ মুঝে কৃপা কিজিয়ে, ম্যায় ঘুস যাতা।
যাইয়ে।
আমি আর কোনও কথা না, তাড়াতাড়ি পাশের লেভেটরিতে ঢুকে, ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। আয়নায় আমার নিজের মুখ দেখতে পেলাম, সত্যি, আমার নিজেকেই পিটি করতে ইচ্ছা হচ্ছে, এত দুদু-দুর্গতিও কারোর হয়? অবিশ্যি আমার উচিত, সোজাসুজি কথা বলা। আমার এত ভয়। কীসের? ভয়? এটা ঠিক ভয়-ই কি না, আমি জানি না, কিন্তু সোজাসুজি কথা বলা বা ফ্লেয়ার করা, এ সব যেন আমার ঠিক আসে না। তা ছাড়া, একটা কথা তো আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমি জেলে বসে প্রায় মাথার চুল ছিঁড়েছি আর নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছি, কেন আমার জীবনে এমন ঘটল, এই। শাস্তি ভোগ করছি, তবু লায়লী সিং-এর ওপরে, যাকে বলে প্রচণ্ড একটা রাগ বা ঘৃণা, সে সব আমার হয়নি, এবং কেন হয়নি, তাও আমি ঠিক বুঝি না, কিন্তু আমি আবার লায়লী সিং-এর সামনে, এটা ভাবলেই আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। না না, অসম্ভব; আর কমপেনসেট? তার মানে কী? এর আবার কমপেনসেট হয় নাকি? আমি তো ভাবতেই পারি না। আমি আয়নার দিকে, আমার মুখ দেখলাম আবার, আর আমার হলুদ রঙের গুরুপাঞ্জাবির কলারটা ঘাড়ের নীচে গোঁজা দেখে, অবাক হলাম। বোধ হয় সেই কমল বসুর গোলমালের সময়, নিজেই গুঁজে দিয়ে থাকব। কোনও কারণে উত্তেজিত হলে, আমি এ রকম করি। কলারটা টেনে তুলতে যাব, সে সময়েই অস্পষ্ট হলেও লায়লী সিং-এর গলা আমি। শুনতে পেলাম, চলা গয়া? চেয়ার কার মে? তারপরে আর কিছু না, কেবল গাড়ির শব্দ আর ঝাঁকুনি, আমি দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। প্রায় মিনিটখানেক পরে, দরজায় আস্তে খুটখুট শব্দ হল। কে? অ্যাটেনডেন্ট গার্ড নিশ্চয়? আমি তবু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপরে আস্তে আস্তে দরজাটা খুলোম। অ্যাটেনডেন্ট গার্ড। আমি বাইরে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিলাম। এখন লোকটির চোখে যাকে বলে কৌতূহল, তা-ই। বলল, মেমসাব আপনা বার্থমে চলি গয়ি। অওর–।’ লোকটি একটু চুপ করে থেকে, আবার বলল, আপকা বার্থমে যো মেমসাব থি, উয়ো মেমসাব ভি আপনা বার্থমে ঘুস গয়ি।
কথাটা শোনা মাত্র, লোকটির চোখের দিকে তাকিয়েই, আমার হাত আপনা থেকেই পকেটে চলে গেল। কিছু খুচরো টাকা আমার কাছে ছিল। আমি তাকে দুটো টাকা দিলাম, সে টাকা নিয়ে, কপালে হাত ঠেকাল, চোখে এখনও সেই কৌতূহলটা রয়েছে, কিন্তু তার দ্বিতীয় সংবাদে আমি খুবই স্বস্তিবোধ করছি যে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ওঁর কুপেতে ফিরে গিয়েছেন, এবং কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি, যা ঘটতে পারত, সবই ভালয় ভালয় মিটে গিয়েছে। মিঃ চ্যাটার্জি যদি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করতেন, তা হলে কী সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটতে পারত, ভাবতেই আমার ভয় করছে। আমার হয়তো কিছুই হত না, কিন্তু উত্তেজনা? আমি তো উত্তেজনা সহ্য করতে পারি না।
আমি করিডর দিয়ে, প্রায় পা টিপে টিপে আমার কুপের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বন্ধ দরজাটা টেনে খুলে দেখলাম, সেই বেগনি রঙের জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। মিস্টার জে. বিশওয়াস কাত হয়ে শুয়ে আছেন, তার লুঙ্গিটানা তাকানো যায় না, যদিও অস্পষ্ট, তিনি ঘুমোচ্ছেন, নিশ্বাসের শব্দে বোঝা যাচ্ছে। এর মধ্যেই কী করে ঘুমোলেন, জানি না। দেখছি, তার খাবার ঢাকা দেওয়া পড়ে আছে, গেলাসে হুইস্কি এখনও কিছু অবশিষ্ট, বোতলের তিন ভাগ শেষ। ওপরের বার্থে বালিশ আর চাদর দেওয়া রয়েছে। বইটা সেখানে রেখে, দরজাটা বন্ধ করলাম, তারপরে ঠিক জায়গায় পা দিয়ে, বার্থে উঠে বসলাম। এবং নিচু হয়ে উঁকি দিয়ে, আর এক বার মিস্টার জে. বিশওয়াকে দেখলাম, মনে পড়ে গেল, দিস ইজ লাইফ।সারা কুপের মধ্যে সেই ফরাসি সেন্টের গন্ধ ছড়ানো, এবং হুইস্কি, এবং আরও অনেক কিছুই যেন তার সঙ্গে মিলেমিশে, একটা অদ্ভুত গন্ধ ছড়ানো, ওহ, সত্যি আমি জানি না, জীবনটা কী। আমি হাত বাড়িয়ে রিডিং সুইচটা অন করতেই মনে হল, আলোটা যেন বড় উজ্জ্বল, আবার সঙ্গে সঙ্গে অফ করে দিলাম। না। এখন আর পড়া হবে না, কিন্তু ঘুম যে আসবে না, তাও ভালই বুঝতে পারছি, তবু আমাকে চুপ করে শুয়েই থাকতে হবে, আর জীবন কী, তার সংজ্ঞাই বা কী, এ জিজ্ঞাসা আমাকে হন্ট করতে থাকবে। আমি শুয়ে পড়লাম।
.
আশ্চর্য, হন্ট করা সত্ত্বেও দেখছি, খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, যে জানালার পরদাটা গোটানো, তার গায়ে আমি ভোরের আলো দেখেছি। এখন পাশ ফিরতেই দেখতে পেলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাচ্ছেন। দাড়ি কামাবে, দাড়ি কামাবে, যে কোনও রেসপনসিব লোকেরাই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শেভ করে। তা ছাড়া মহিলারা হার্ট হন।‘ আমি আমার গালে এক বার হাত বোলালাম, বেশ খড়খড় করছে, কিন্তু প্রথমেই আমার দাঁত মাজার কথা মনে হল, এবং বাথরুমে যাওয়া প্রয়োজন, অথচ অথচ, যদি লায়লী সিং-এর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়? এ সব কোচে অ্যাটাচড বাথ দেয় না কেন। আমাকে উঠতেই হল, কেন না, আমাকে বার্থরুমে। যেতেই হবে, নামবার সময় শুনতে পেলাম, গুডমর্নিং বয়।
উনি মরনিং উচ্চারণ করেননি, আমি জবাব দিলাম, গুডমর্নিং।
নীচে নেমে, আয়নাতে ওঁর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। ওঁর চোখের কোল দুটো ফোলা ফোলা, চোখ দুটো চকচক করছে, দেখে মনে হয়, ঘুমটা ভালই হয়েছে। আমি শুয়ে পড়ার পর ওঁর বেশ নাক ডাকছিল, অনেকটা মিঃ চ্যাটার্জির মতোই। একটু অস্বস্তিবোধ করছি, কারণ গতকাল আমি জানালার কাছে যখন বসেছিলাম, তখন আমার সুটকেস আর কিটব্যাগটা কুলি ওখানে সিটের নীচে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। উনি যেভাবে দু পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছেন, না সরলে নিচু হয়ে ব্যাগটা বের করতে পারব না। বললাম, সিটের নীচে আমার ব্যাগটা আছে, মানে আপনি যদি–
আমাকে বের করে দিতে হবে? এমনভাবে জিজ্ঞেস করলেন, যেন নিছক একটু মজা করছেন, কেন না, কথা বলেই উনি গাল দুটো এমনভাবে ফোলালেন, মুখটা প্রায় ফুটবলের মতো দেখাচ্ছে, অবিশ্যি দাড়ি কামাবার জন্যই।
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না, মানে, সে কী কথা! আমিই বের করব, আপনি একটু না সরলে।
তাই বলো। তুমি যেভাবে বললে, আপনি যদি-ভাবলাম ঠিক আছে, নিয়ে নাও।বলে উনি আয়না থেকে সরে গেলেন। আমি নিচু হয়ে, কেবল ব্যাগটা টেনে নিয়ে, দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। সত্যি, এখন মনে হচ্ছে, আমি ভগবানকে ডাকতে শিখলে পারতাম, অনেক লোকে যেমন কোথাও বেরোবার সময় দুর্গা দুর্গা বা ওই জাতীয় কিছু বলে, দুর্গতিনাশিনী, তা হলে ভাল হত। জানি না, তাতে সুফল কিছু হয় কি না, এখন আমার তা-ই মনে হচ্ছে, দরজাটা খোলবার আগে। কিন্তু নতুন করে এখন আর বলতে পারছি না। দরজাটা অর্ধেক খুলে, কোন দিকের বাথরুমটা কাছে, দেখে নিলাম। ডাইনেরটা। গতকাল রাত্রে লায়লী সিং গিয়েছিল বাঁয়েরটায়–তার মানে সে ও দিকেই কোনও কুপেতে আছে, এবং গেলে, সে দিকেই যাবে। করিডরটা ফাঁকাই দেখছি। আমি বেরিয়েই, দরজাটা। টেনে দিয়ে, প্রায় ছুটেই বাথরুমের দিকে গেলাম, এবং যেটাতে হাত দিলাম, ভাগ্য ভাল, সেটা এনগেজড নেই। ঢুকে পড়লাম।
বাথরুম থেকে বেরিয়েই মনে হল, বেয়ারারা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, ব্রেকফাস্ট সার্ভ করতে আরম্ভ করেছে। আমি করিডরে আসতেই, একজন মহিলাকে দেখে, বি’ কুপের হ্যাঁন্ডেলেই হাত দিয়ে ফেললাম, কিন্তু মহিলাটি লায়লী সিং না, এবং কয়েক পা এগিয়ে সি’-তে ঢুকে গেলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াস ইতিমধ্যে ট্রাউজার, শার্ট পরে নিয়েছেন, টাইটা মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে, কলারের মধ্যে ঢুকিয়ে, ফাঁসটা এঁটে দিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই, ওঁর ভুরু কুঁচকে উঠল, জিজ্ঞেস করলেন, দাড়ি কামালে না?
আমার এক বার দাড়ি কামাবার কথা মনে হয়েছিল, কিন্তু ভাবলাম, এগারোটা ত্রিশের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে যাব, বাড়ি গিয়েই দাড়ি কামাব, যদিও সেফটি রেজার, ব্রাশ, ক্রিম সবই আমার এ ব্যাগে রয়েছে। বললাম, বাড়ি গিয়েই কামাব। ব্যাড, ভেরি ব্যাড, এটাকে তোমার একটা হ্যাবিট করে তুলতে হবে, সকালবেলা দাড়ি কামানো’ বলতে বলতে তিনি বসে পড়ে, স্লিপার খুলে মোজা পরতে লাগলেন। বেয়ারা কখন ওঁর গতকালের খাবারের বাসন তুলে নিয়ে গিয়েছিল, এখন সে আমাদের ব্রেকফাস্ট নিয়ে ঢুকল, এবং দুদিকে দুজনের খাবার রেখে, মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কফি অওর টি সাব?’
‘কফি।’ বললেন তিনি, এবং বেয়ারা হোত আচ্ছা’ বলে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপকা?
‘চা।’ বলে আমি ব্যাগটা হুকে ঝুলিয়ে রাখলাম। একটা বেশ সুন্দর গন্ধ পাচ্ছি, সেই সেন্টের গন্ধ না, সেটা এখনও আছে, অন্য একটা গন্ধ, বোধ হয় আফটার শেভিং লোশনের গন্ধ, তপনকাকা যেটা ইউজ করেন, অনেকটা সেই রকম। মিস্টার জে. বিশওয়াস জুতো, মোজা পরে নিলেন। বালিশ, চাদর নিয়ে গিয়েছে, বইটা ওপরে পড়ে আছে। আমি বসলাম, এবং খাবারের ঢাকনা খুলোম, আর আমাদের বাড়ির সেই মজার ঘটনাটার কথা আমার আবার মনে পড়ে গেল, গতকাল যে ঘটনা আমার মনে পড়েছিল। তা প্রায় দশ বছর আগের কথা, সন্ধেবেলা আমাদের বাড়িতে এক ভদ্রলোক এলেন, ওরিজিনালি তিনি হিন্দি সাহিত্যিক, তেমন নামকরা নন, কিন্তু মানুষটিকে আমার ভাল লাগত, তিনি সব সময়ই বেশ হাসিখুশি থাকতেন, বাবার আসরে প্রায়ই আসেন। বাবার আসরে কত রকমের লোক–মানে ভদ্রলোক যে আসেন। আমাদেরও সে আসরে যাওয়া বারণ ছিল না, এমনকী ড্রিঙ্ক করাও বারণ ছিল না, সে কথা আগেই বলেছি। বছর দশেক আগে, একদিন মিঃ ঝা এলেন, আর খুব হাসতে হাসতে বাবাকে একটি মজার গল্প শোনালেন, আমার ঘটনাও সেটাই, এবং গল্পটাও ম্যাকসিম গর্কির ব্যাপার নিয়েই। মিঃ ঝা প্রগতিশীল হিন্দি সাহিত্যিকদের আসরে একটি হিন্দি গল্প শুনিয়ে এসেছিলেন, এবং সে গল্প শুনে, সবাই ওঁকে অশ্লীল বলে যা-তা সমালোচনা করেন। ওঁর ভাষায়, (উনি ভাল বাংলা বলতে পারেন।) বুঝলেন মহাদেবদা, আমি এক-একজনের গালাগাল শুনছি আর মিটিমিটি হাসছি।’ বাবা বলেছিলেন, তার মানে, তুমি তোমার কোঁচার মধ্যে একটি বেড়াল রেখে দিয়েছিলে। মিঃ ঝা। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, একজাক্টলি মহাদেবদা, আর সেই বেড়ালের নাম, মাফ করবেন, ম্যাকসিম গর্কি, কেন না, গল্পটা আমার না, তাঁর। গল্পটা অনুবাদ করার সময়, আমি নামধামগুলো এদেশি করে। দিয়েছিলাম, আর জায়গাটাও আমাদের বিহারের একটা অঞ্চলের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত যখন দেখলাম, তাদের আক্রমণ অনেক দূর পর্যন্ত এসে গেছে, তখন আমি বেড়ালটাকে ছেড়ে দিলাম। প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে চায় না। তারপরে গল্পের নামটা যখন বললাম, তখন সবাইকেই চুপ করতে। হল, কিন্তু একজন ছাড়লেন না, তিনি বললেন, রাশিয়ার লুমপেন প্রলেটারিয়েটদের জীবনের সঙ্গে ইন্ডিয়ান লুমপেন প্রলেটারিয়েটদের কোনও মিল নেই, তাদের বাস্তবতা আমাদের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন, এ ধরনের অনুবাদ করে ঠকানোও অশ্লীল।‘ আমি তা মানি না কিন্তু তর্কে গিয়েও কোনও ফল হত না, তখন সবাই আমার ওপরে খুব খাপ্পা। বাবা বলেছিলেন, তা তুমিই বা ওদের ইঁদুর ভেবেছিলে কেন? তুমি নিয়ে গেছ মাসিকে, ওরা যে সব মাসির বোনঝি বাঘ। মিঃ ঝা খুব হেসে উঠেছিলেন, বাবা মিটিমিটি করে হাসছিলেন। বাবা যে ঠিক কেমন মানুষ, আমি কোনও দিন বুঝতে পারিনি, কেন না বাবার কথা আর হাসির মধ্যে যেন কেমন একটা কী বলে-রহস্য ছিল। মিঃ ঝায়ের সমালোচকদের বাঘ বলে উনি যে ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন, আমি বুঝতে পারি নি, তবে কেমন একটা টিজিং যেন ছিল মনে হয়।
বেয়ারা চা আর কফি নিয়ে দরজা খুলে ঢুকল। দিয়ে আবার চলে গেল। আমার খাবার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কাপে চা ঢেলে দুধ চিনি দিয়ে নেড়ে চুমুক দিয়ে, আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে তাকালাম, আমার ভিতরে একটা উত্তেজনা জাগছে, এবং মুখ খুলতে গিয়েও হঠাৎ খুলতে পারলাম না, উনি এখন কাপে কফি ঢালছেন। কফি ঢালা শেষ হল, দুধ ঢাললেন, চিনি নিলেন না, আস্তে করে চুমুক দিয়ে, কাপ রাখলেন। আমি বললাম, আচ্ছা, ইয়ে মানে, আপনি লেখেন না কেন?
‘কেন’ শব্দটা যেন কেমন ঢেউ খেয়ে গেল, একটু বেশি রকম বি–বিনীত আর অমায়িক হতে গিয়ে। উনি ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে, যাকে বলে, খানিকটা ফ্রাউনিং করে বললেন, লিখি না। কেন? হোয়াট দ্যু য়ু মিন?
আমার যা ব্যাপার, আমি আবার তোতলা হয়ে গেলাম, বললাম, তা–তা–তা না, আ-আপনি তো লেখেনই, আমি–আমি বলছিলাম, লে-লেনিন যে বব ব্লান্ডার করেছেন না, মানে গর্কির মা–মালভার কথা বলছি, এ বিষয়ে লে–লেখেন না কেন?’ কে’ শব্দটা যেন ককিয়ে ওঠার মতো শোনাল, কারণ মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখ-চোখ, সেই–সেই রকম ভীষণ হয়ে উঠেছে। শক্ত মুখে আর শক্ত স্বরে বললেন, হোয়াট ডু য়ু মিন, কলকাতা এগিয়ে আসছে, তা-ই?’
আমি একেবারে ফ্যাফ্ল্যাবারগাসটেড। আমার কথার সঙ্গে, কলকাতা এগিয়ে আসার সম্পর্ক কী, বুঝতে পারছি না। কোনও রকমে উচ্চারণ করতে পারলাম, মা-মানে?’ তার মানে, ইট সিমস, তুমি আমাকে লেঙ্গি মারতে চাইছ। আমি বুঝি, তা না হলে এ সব কথার মানে কী? লেনিন ব্লান্ডার করেছেন বা মালভা অবসিন, এ সব কথা আমি লিখব? এমনকী, মালভা গর্কির রিপ্রেজেন্টিটিভ স্টোরি না, এ কথাও আমি লিখব না, বুঝেছ?
ওহ্!
হ্যাঁ, যা বিশ্বাস করা যায়, তা-ই লেখা যায় না। তুমি আমাকে কেন এ কথা বলছ, তা আমি ভালই জানি, বাট ডোন্ট গো ফারদার। আমি নকশালদের সমর্থন করেও আর্টিকেল লিখেছি, তুমি আমাকে কলকাতার ভয় দেখিয়ো না।
বলে তিনি উত্তেজিত ভাবে কফির কাপ তুলে চুমুক দিলেন। কিন্তু আমি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে পারলাম না, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথার কোনও ইয়ে মানে খেই পাচ্ছি না। আমি কী বলেছি যে উনি এ সব বলছেন। আমি ওঁকে লেঙ্গি মারতে চাই? অর্থমন্ত্রকের এত বড় একজন কর্মচারী, এবং উনি নাকি প্রাইম মিনিস্টারেরও অ্যাডভাইসার, যদিও বিশেষ বিশেষ সাবজেক্টে ওঁকে আমি? ভাবতেই পারছি না।
মিস্টার জে. বিশওয়াস কফি শেষ করে ফেললেন, আবার বললেন, অবকোর্স, আমি তোমাদের বাড়িতেও যাব, মহাদেবদার (বাবা) সঙ্গে দেখা করব, তুমি মনে কোরো না, উনি আমাকে কোনও রকম ভুল বুঝবেন। তোমার কেসের সময়ই ওঁর সঙ্গে আমার ট্রাঙ্কে কথা হয়েছিল। তোমাকে নিয়ে কী হচ্ছে,
আমি একেবারে স-সকাতরে বললাম, বিশ্বাস করুন, আমি খারাপ কিছু ভেবে আপনাকে কিছু বলিনি। আমি জীবনে কখনও কারোকে লেগপুল করিনি।
তিনি বললেন, তা যদি হয়, ওয়েল অ্যান্ড গুড।
বলে তিনি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি কয়েক সেকেন্ড ওঁর দিকে তাকিয়ে, আমার চায়ের কাপের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। আর আমার কিছু মুখে দিতে ইচ্ছা করছে না। আহ্, কেন যে ভগবানকে ডাকতে শিখিনি। আমি ওঁর সমস্ত কথাগুলোর কোনও মানেই করতে পারছি না। যা বিশ্বাস করা যায়, তা লেখা যায় না; নকশাল সমর্থন করে আর্টিকেল; লেঙ্গি মারা; লেগপুলিং; কলকাতা এগিয়ে আসা; কোনও কথারই মানে বুঝলাম না, কেবল এইটুকু ছাড়া, দিল্লিতে আমার ব্যাপারে, বাবার সঙ্গে ওঁর আগেই সব বলাবলি হয়ে গিয়েছে, যদিও সেটা আমাকে বলার কী উদ্দেশ্য, তা বুঝতে পারছি না, কারণ ও বিষয়ে আমার কিছু যায় আসে না। ওটা বাবার আর ওঁর ব্যাপার।
দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল, দেখা গেল স্যুটেড বুটেড টাই বাঁধা মিঃ চ্যাটার্জিকে, ওঁর সেই কেমন যেন ভীষণ মোটা গলায় বলে উঠলেন, গুডমর্নিং স্যার।
হ্যালো হ্যালো হ্যালো মিঃ চ্যাটার্জি, কাম ই প্লিজ। মিস্টার জে. বিশওয়াস খুশি গলায় ডাকলেন।
মিঃ চ্যাটার্জি ঢুকতে ঢুকতে বললেন, আমি আজ সকালে বিমির মুখে শুনলাম, আপনি এ গাড়িতে কলকাতায় যাচ্ছেন। আপনার সঙ্গে যে ওর কাল সন্ধেয় করিডরে দেখা হয়েছিল, বলতেই ভুলে গেছে।
মিস্টার জে. বিশওয়াস হেসে বললেন, তাই নাকি? তাতে কী হয়েছে, প্লিজ সিট ডাউন।
মিঃ চ্যাটার্জি, ওঁর পাশে বসলেন। বললেন, হঠাৎ একটা জরুরি দরকারে-আই মিন নট অফিসিয়াল, একটু কলকাতায় যেতে হচ্ছে। আপনি হঠাৎ?
আমারো তা-ই বলতে পারেন, পারিবারিক আই মিন পারিবারিক, তা ছাড়া দু-একটা কালচারাল গ্যাদারিং আছে, আই মিন, টু টক।
ও আচ্ছা।’বলে মিঃ চ্যাটার্জি এতক্ষণে আমার দিকে তাকালেন। আমি তাড়াতাড়ি মুখটা ফিরিয়ে নিতে গেলাম, উনি একটু অবাক হয়ে বললেন, স্ট্রেঞ্জ, ইফ য়ু ডোন্ট মাইন্ড, ডিড আই সি য়ু আর টকিং উইথ মিসেস সিং, লাস্ট নাইট?
উনি কথাটা আমাকেই জিজ্ঞেস করেছেন, অতএব জবাবটা আমাকেই দিতে হয়, তাই মুখ ফিরিয়ে, ঘাড় কাত করে, হ্যাঁ বলে, মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখের দিকে আমার চোখ পড়ল। মনে হলো, উনি বোধ হয় জীবনে এত অবাক কখনও হননি, যে কারণে ওঁর মুখটা পর্যন্ত লাল হয়ে উঠেছে। মিঃ চ্যাটার্জি এ বার বলে উঠলেন, আরে, আপনি তো সেই, আমাদের তপন সেনের ইয়ে মানে–
আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি মদনমোহন।
মদনমোহন, ইয়েস। মাই গড, আপনি কাল রাত্রে মিসেস সিং-এর সঙ্গে কথা বলছিলেন, বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে?
বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে?’ মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলায় কয়েক টন বিস্ময় ঝরে পড়ল।
মিঃ চ্যাটার্জি তার মোটা দরাজ গলায় হেসে উঠলেন, ওঁর শরীর দুলে উঠল, গোটা সিটের দোলায় মনে হল আমি যেন নাচছি। হাসি থামলে বললেন, হ্যাঁ, কাল তো তাই দেখলাম। বাহু, গুড, ভেরি গুড ইয়ংম্যান, ইট ইজ রিয়্যালি এ স্ন্যাপ টু আস অল। আয়াম রিয়্যালি হ্যাপি।
উনি কী ভেবে এ সব বলছেন, বুঝে ওঠার আগেই, মিস্টার জে, বিশওয়াস আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসার স্বরে বললেন, তার মানে, য়োর দিস জার্নি ওয়াজ প্রিঅ্যারেঞ্জড উইথ লায়লী সিং?’
না আমার কথা শেষ হবার আগেই, খোলা দরজায় মিসেস চ্যাটার্জি দেখা দিলেন, এবং জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?
মিসেস চ্যাটার্জি এখন শাড়ি পরে এসেছেন, অনেকটা গতকাল বিকালের মতোই পোশাকে। মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, তোমাকে আজ সকালে বলছিলাম না, একটি অদ্ভুত ছেলের সঙ্গে মিসেস সিংকে কাল রাত্রে আমি বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখেছি। দ্যাট ইজ হি, দিস মদনমোহন।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, ওহ, সে কথা লায়লীর কাছ থেকে এইমাত্র আমি শুনে এলাম। ইট ওয়াজ অ্যান অ্যাকসিডেন্ট। মদনবাবু আসছিলেন, লায়লী তখন বাথরুম থেকে বেরোচ্ছিল, ও খুব অবাক হয়ে গেছল। ব্যাপারটা আর কিছুই না।
বলেই তিনি আমার আর মিঃ চ্যাটার্জির মাঝখানের ফাঁকে বসে পড়লেন। আমি প্রায় কাত হয়ে সরে বসতে গেলাম, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, ঠিক আছে মদনবাবু, বসুন আপনি, আপনাকে পুলিশে ধরবে না। এখন বলুন তো, লায়লী আপনাকে কাল রাত্রে কী বলল?
আমি খোলা দরজাটার দিকে এক বার অসহায়ের মতো দেখলাম, তারপরে বললাম, না-হা মানে উনি খুবই অবাক হয়েছিলেন, আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, যা ঘটে গেছে, সেটা কী ভাবে কনপেনসেট করা যায়।
কমপেনসেট? মিস্টার জে. বিশওয়াস অবাক স্বরে বলে উঠলেন।
কমপেনসেট?’ বলেই সুদীপ্তা চ্যাটার্জি খিলখিল করে হেসে উঠলেন, সেই সঙ্গে মিঃ চ্যাটার্জিও। এক জন বেয়ারা প্রায় দাঁড়িয়েই পড়েছিল দরজার কাছে, মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠলেন, বেয়ারা, দরবাজা বন্ধ কর দো।
বেয়ারা দরজাটা টেনে দিয়ে গেল, আমি ককথঞ্চিৎ স্বস্তি বোধ করলাম, এবং ওঁদের দুজনের হাসি থামার পর, প্রথম সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা শোনা গেল, মিস্টার বিশওয়াস আপনি বলুন, কী করে লায়লী মদনবাবুকে কনপেনসেট করতে পারে?
মিঃ চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, আমি বলতে পারি, বিশেষ করে লায়লী সিং যখন কলকাতাতেই যাচ্ছে, দেয়ারইজ এ গ্রেট চান্স টু কমপেনসেট। কী বলেন মদনবাবু?
আমি এ সব কথাবার্তার মানে কিছুই বুঝতে পারছি না, যাকে বলে ইয়ে, মানেফ্যালফ্যাল করে। ওঁদের মুখের দিকে দেখতে লাগলাম, যদিও মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখ যেন কেমন থমথম করছে। বললাম, না, মানে আমি ঠিক–আই মিন, কুডন্ট ফলো য়ু।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন, এবং মিঃ চ্যাটার্জিকে এক কঁধ দিয়ে একটা ধাক্কা দিলেন, বললেন, কেন ওঁকে এ সব বলছ। হি ইজ রিয়্যালি ইনোসেন্ট অ্যান্ড এ লাভলি ইয়ংম্যান।
বলেই আর এক কঁধ দিয়ে আমাকেও একটা ধাক্কা দিলেন, বললেন, আমি আপনাকে জানি মদনবাবু, হোয়াট য়ু আর। য়ু আর নট এ লেডি কিলার, বাট দে কিল য়ু।
বলে ঘাড় কাত করে, চোখের তারা দুটো ঘুরিয়ে, কেমন কেমন করে যেন আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু মেয়েরা আমাকে আবার কি করবে কী করে? বুঝতে না পেরে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির সেই সেই চোখের কেমন যেন তারা ঘোরানো দেখতে লাগলাম। কয়েক সেকেন্ড দেখতেই, আমার মাথাটা যেন ঘুরে গেল, আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম, এবং মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শুনতে পেলাম, কিন্তু মিসেস চ্যাটার্জি (আশ্চর্য, উনি তো ওঁকে বিমি’, তুমি’ বলে ডাকেন!) আপনি ওকে যতটা ইনোসেন্ট ভাবছেন, ততটা বোধ হয় না, একটু আগেই তার একটা প্রমাণ আমি পেয়েছি। এনি হাউ, তা নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না, কিন্তু লাস্ট নাইটে লায়লী সিং-এর সঙ্গে যে ওর দেখা হওয়াটা একটা অ্যাকসিডেন্ট, এটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারছি না।’
আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখের দিকে তাকালাম। ওঁর শক্ত মুখে কেমন একটা চ্যালেঞ্জের। এক্সপ্রেশন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জির অবাক চোখ বড় হয়ে উঠল, বললেন, বাট লায়লী টোন্ড মি! সে মিথ্যা কথাও বলতে পারে। বলে মিস্টার জে. বিশওয়াস এক বার আমার দিকেও তার শার্প দৃষ্টি দিয়ে যেন। বিধিয়ে দিলেন।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জির ঠোঁট দুটো কেমন যেন একটু বেঁকে উঠল, আর গলার স্বরে বেশ একটু জোর দিয়ে, এবং আরও কিছু–বোধ হয় বিদ্রূপ মিশিয়ে বললেন, মিস্টার বিশওয়াস, কোনও কোনও বিষয়ে আপনি আমার কথাকে সত্যি বলে মনে করতে পারেন। মেয়েরা কখন মিথ্যা বলে আর কখন সত্যি বলে, সেটা আপনাদের থেকে আমরা একটু ভাল বুঝি।
মিস্টার জে. বিশওয়াস সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়েছিলেন। ওঁর কথা শুনে, মিস্টার জে, বিশওয়াসের মুখের ভাব একেবারে বদলে গেল, বলে উঠলেন, নিশ্চয় নিশ্চয়, আর বলতে হবে না মিসেস চ্যাটার্জি, এরপরে আর আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই।
মনে হল, মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন একটু ঘাবড়েই গিয়েছেন, এবং কেমন এক রকম করে যেন সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকালেন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার দিকে ফিরে, একটু হাসলেন, যে হাসিটাকে বলা যায়, একটা বাবাতুলের কথা শুনে হাসছেন, কিন্তু ওঁর শরীরটা–মানে ইয়ে, হ্যাঁ শরীরটাই এমন, আর জামা আর শাড়ি আর ভোলা নাভি আর সেই, সেই গন্ধ, সব যেন আমাকে ধাক্কা মারতে চাইছে, তাই ভয়ে ভয়ে আমি সরে যেতে চাইছি।
মিঃ চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, কিন্তু মিস্টার বিশওয়াস, যদি লায়লীর সঙ্গে মদনবাবুর মিটিংটা প্রিঅ্যারেঞ্জডই হয়, তাতেই বা কী যায় আসে। আমি তো মনে করি, সেটা আরও মজার ব্যাপার।’
মিস্টার জে. বিশওয়াস বললেন, মজার হতে পারে। কিন্তু একজন মিথ্যা কথা বলবে সেটা মেনে নেব কেন?
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, সোহোয়াট, আপনি যদি মেনে না নেন? মদনবাবুর কী আসবে যাবে তাতে, লায়লীরই বা কী যাবে আসবে?
আমি কখনও সুদীপ্তা চ্যাটার্জির মতো কথা বলতে পারব না, বিশেষ করে, মিস্টার জে. বিশওয়াসকে। অনেকে যেমন বলে, অদ্ভুতভাবে, ছুরি চালিয়ে দিয়েছে, উনি যেন সেই রকম ছুরি চালিয়ে দিলেন, যদিও আমার কানে এখনও খটখট করে বাজছে, ওঁদের দুজনে দুজনকে আপনি’ করে বলতে শুনে। গতকাল এক বারও বলেননি। কী যে ব্যাপার জানি না, একমাত্র মনে পড়ে, দিস ইজ লাইফ। মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন কেমন-কেমন নিভে গেলেন, যদি মানুষ নিভে যেতে পারে, এবং বললেন, অবকোর্স তা ঠিক। কিন্তু এভাবে বলবেন না মিসেস চ্যাটার্জি। অনেকেরই অনেক কিছুতে কিছুই যায় আসে না, কিন্তু সেটাই সব না।’
কোনও গরম জিনিস জুড়িয়ে গেলে যেমন হয়, মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলাও যেন সেই রকম জুড়িয়ে গিয়েছে। আবার বললেন, ভেবে দেখুন, ব্যাপারটা যদি চন্দন সিং-এর চোখে পড়ে যেত, তা হলে কাল রাত্রে গাড়িতেই একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যেত।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, যেত যেত। মদনবাবু আর লায়লী যদি আগে থেকে কথাবার্তা বলেই দেখা করত, তা হলে রিস্ক তারাই নিত, যদিও ব্যাপারটা মোটেই তা না। আর সর্দার যদি মনে করে, তার সর্দারনিকে মদনবাবু কেবলি ফুসলে নেবার তাল করছে, তা হলে সে তো একটা হোস। যার ওয়াইফ নিজেই এগ্রেসিভ, তার স্বামীর কী করবার আছে? আসল ব্যাপারটা কী, তা তো আমরা সবাই জানি মিস্টার বিশওয়াস। তারপরে আর প্রেস্টিজ কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির কথা আমার ভাবতে ইচ্ছা করে না।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জির চোখের দিকে যেন মিস্টার জে. বিশওয়াস তাকাতে পারছেন না, কেবল বলতে পারলেন, তা ঠিক।
মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, মদনবাবু, আমি আপনাদের কলকাতার বাড়ি যাব, মহাদেবদার সঙ্গে এক বার দেখা তো করতেই হবে। তখন আপনার মুখ থেকে আমি শুনতে চাইব, আপনি লায়লী সিং-এর ব্যাপারটা কী ভাবে নিয়েছিলেন।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, তার কী দরকার। হাতের ঘড়ি দেখে বললেন, হাওড়া পৌঁছুতে এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। মদনবাবুর মনের কথাটা আমরা এখনই শুনি না। আয়াম রিয়্যালি সো। কিউরিয়াস টু নো’ বলতে বলতে তিনি আমার দিকে তাকালেন, কথা শেষ করলেন, হোয়াট ইজ য়োর রিঅ্যাকশন। প্লিজ মদনবাবু বলুন।
রিঅ্যাকশন? মুশকিল সত্যি, আমি কী করে বোঝাব, আমার কী মনে হয়েছিল। কী বললে সেটা বোঝানো যায়, আমি জানি না। জিজ্ঞেস করলাম, মানে, কী বলব বলুন তো?
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি এখন প্রায় আমার দিকে ঘুরেই বসেছেন, এবং বলতে গেলে, প্রায় আমার গায়ের সঙ্গে ছুঁয়ে আছেন, কেন না, চার জনের বসবার মতো সাফিসিয়েন্ট জায়গা নেই। তিনি বললেন, আপনার রিঅ্যাকশন, অব দ্য অ্যাফেয়ার।’
আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না, মনে হল, যাকে বলে, অগাধ জলে পড়ে গিয়েছি। সত্যি, আমার কী রিঅ্যাকশন? অবাক, হ্যাঁ, ভীষণ অবাক হয়েছিলাম, আর জেলে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। তা-ই বললাম, খুব অবাক হয়েছিলাম, আর জেলে–মানে জেলের যা ব্যবস্থা, আর অনেক কয়েদির যা চরিত্র, তাতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।’
বাট দ্যাট’জ ভেরি কমন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, লায়লী যখন কনট সার্কাসে ও রকম একটা কাণ্ড করল, আপনি কী ভাবলেন?
অবাক হলাম।
স্রেফ? তারপরে যখন আপনাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেল, মামলা উঠল আপনার নামে, রিগরাস পানিশমেন্ট দিয়ে দিল, তখন?
তখন? তখন–ভয় পেলাম, কষ্ট পেলাম, খুব একটা দুদু-দুঃখ যাকে বলে।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আর লায়লীর সম্পর্কে কী মনে হল?
মিসেস সিং সম্পর্কে? ওঁর কথা আমার মনেই আসেনি।
মনেই আসেনি? ওর ওপর অ্যাঙার বা হেট্রেড কিছু হয়নি?
না তো।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ওঁর সেই–সেই চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যদিও দৃষ্টিটা কেমন এক রকম যেন, এই আলো এই অন্ধকার, এ রকম দেখাচ্ছে, এবং দেখলাম, মিঃ চ্যাটার্জি আর মিস্টার জে, বিশওয়াসও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ওঁর দুহাত দিয়ে আমার দু গাল চেপে ধরে বলে উঠলেন, ওহ, হাউ পিওর য়ু আর!’ বলেই এক সেকেন্ড থেমে আবার বলে উঠলেন, দাড়ি কামাননি কেন?
আস্ক হিম, হোয়েদার আই টোন্ড হিম অর নট? মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠলেন।
হাউ পিওর য়ু আর থেকে যে দাড়ি কামাবার কথাটা উঠতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনি, এবং সত্যি কথা বলতে কী, এঁদের সকলের, তার সঙ্গে মমতা কাকিমা, তপনকাকাও আছেন, এমনকী আমার বাবা, দাদা, ভাই, দিদি, কারোরই কথাবার্তা কোনখান থেকে কোথায় যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারি না।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার গাল থেকে হাত নামিয়ে নিলেন। সত্যি, ভারী লজ্জা করছে, আমার খরখরে। গালে ওঁর এই সুন্দর হাত-মমতা কাকিমা হলে, আমার গালে একটা চাটিই মেরে দিতেন। আমি অস্বস্তি নিয়ে বলতে গেলাম, বাড়িতে গিয়েই শেভ করব’ ঠিক সেই মুহূর্তেই মাইকে পুরুষের নিচু স্বর শোনা গেল, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, উইদিন এ ফিউ মিনিট উইল বি রিচিং হাওড়া স্টেশন, অ্যান্ড…।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি প্রথমে উঠে দাঁড়ালেন, এবং মিঃ চ্যাটার্জিও, এবং বললেন, তা হলে মিস্টার বিশওয়াস, কলকাতায় দেখা হচ্ছে। আপনার কদিনের প্রোগ্রাম?
মিস্টার জে. বিশওয়াস বললেন, ওহ, ওনলি টু ডেজ, আই উইল ফ্লাই অন দ্য থার্ড ডে বাই মর্নিং ফ্লাইট। আপনারা কদিন?
মিঃ চ্যাটার্জি সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকালেন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, এক সপ্তাহ। অবিশ্যি আপনার সঙ্গে দুদিনই দেখা হবে। চলি।
বলে আমার দিকে ফিরে বললেন, চলি মদনবাবু, আপনাদের বাড়িতে দেখা হবে।
আমি দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করলাম। মিঃ চ্যাটার্জি এক বার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ঘাড় আঁকালেন, তারপরে দুজনেই দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। আমি মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস জানালার দিকে মুখ করে বসে আছেন, এবং হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে বা নেমে, আমার সঙ্গে একটি কথাও বললেন না, আমার দিকে তাকালেন না, যেন আমাকে চেনেনইনা। কী করব, আমার কিছু করার নেই, কেবল চুপচাপ তাকিয়ে দেখলাম, আর ওঁর কথাটাই ভাবলাম, বোধ হয় দিস ইজ লাইফ।কুলি ওঁর সুটকেস নিয়ে, ওঁর সঙ্গে নেমে গেল। আর এক জন কুলি জিজ্ঞেস করল, আমার কোনও লাগেজ আছে কিনা; আমি না বলে দিলাম, কারণ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সুটকেসটা নিয়ে, আমি নিজেই ট্যাকসি স্ট্যান্ডে যেতে পারব। আমি ইচ্ছা করেই একটু দেরি করছি, লায়লী সিং নেমে চলে যাক। সবাই নেমে গেলে নামব। ভাবতে ভাবতেই, দরজার কাছে ডাক শুনতে পেলাম। মেজদা।
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, বদ্রী, বাবার দুই ড্রাইভারের এক জন, এবং পুরনো। বদ্রী বিহারি হলেও ভাল বাংলা বলতে পারে, আমাদের বাড়িতে প্রায় বছর পনেরো আছে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি!
বদ্রী হেসে বলল, হ্যাঁ, নামবেন না? আমি তো ভাবছি, আপনি এলেন কি না। বিলকুল প্যাসেঞ্জার নেমে গেছে।
বলতে বলতে সে ভিতরে ঢুকল। বললাম, এই একটু ধীরে সুস্থে নামছিলাম।
বদ্রী জিজ্ঞেস করল, আপনার মালপত্র কোথায়?
একটা সুটকেস আছে, ওটা আমিই নিতে পারব।বলে আমি সুটকেসটা সিটের নীচে থেকে টেনে বের করলাম। বদ্রী তাড়াতাড়ি সুটকেসটা নিয়ে বলল, আপনি ছেড়ে দিন।
জানি বদ্রী ওটা আমাকে নিতে দেবে না। বদ্রী বেশ ফরসা, আর বাবা তার ড্রাইভারদের সবসময় সাদা ট্রাউজার আর গলাবন্ধ কোটে ফিটফাট রাখেন। আমি হুক থেকে কিটব্যাগটা নিলাম। এখনও সেই–সেই সেন্টের গন্ধ ছড়ানো, আমি বদ্রীর পিছনে পিছনে নেমে গেলাম, আর তখনই দেখতে পেলাম চন্দন সিং আর লায়লী সিং দাঁড়িয়ে আছে, এবং আমার দিকে দু জনে দু রকম চোখে তাকিয়ে আছে। আমি প্রায় পঁড়িয়েই পড়েছিলাম, বদ্রী পিছন ফিরে ডেকে উঠল, আসুন, তা না হলে জ্যামে পড়ে যাব।
আমি তাড়াতাড়ি বদ্রীর পিছনে পিছনে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, গাড়ি এনেছ নাকি?
বদ্রী হেসে উঠে বলল, তবে কি এমনি এমনি আসব নাকি?
তোমরা আমার আসার খবর জানতে?
সাহেব জরুর জানতেন, তিনিই তো আমাকে বললেন, আপনি আসছেন, আপনাকে যেন আমি বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য আসি।’
তপনকাকা তা হলে বাবাকে আগেই ইনফর্ম করে দিয়েছেন। বাবার মুখটা আমার মনে পড়ল। তিনি আমাকে কী ভাবে রিসিভ করেন, কে জানে। দিল্লির ঘটনায়, তার রিঅ্যাকশন আমি কিছুই জানি না। শুধু এইটুকু জানি, হায়ার কোর্টে মুভ না করে, লোয়ার কোর্টের ভারডিক্টই যেন মেনে নেওয়া হয়, এবং পানিশমেন্ট মেনে নেওয়া হয়। এর থেকে বাবার মনোভাব কিছুই বুঝতে পারছি না। উনি হয়তো। আমাকে সত্যি অপরাধী ভেবে নিয়েছেন। বদ্রী আগে সুটকেসটা পিছনের কেরিয়ারে ঢুকিয়ে দিল, তারপরে আমাকে ঢোকবার জন্য পিছনের দরজা খুলে দিল। আমি ভিতরে গিয়ে বসলাম। সে আমার। দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজের আসনে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল, এবং এক পলকের জন্য যেন আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের মুখ দেখতে পেলাম, তিনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাবা বাড়ি আছেন তো?
বদ্রী বলল, না, সাহেব আজ সকাল সকালে বেরিয়েছেন, সাড়ে চারটের সময় ফিরবেন।
এত সকাল সকাল? বাবা তো বারোটা সাড়ে বারোটা নাগাদ বেরোন?
আজ কী একটা কাজ পড়ে গেছে বলছিলেন।
আমি হাওড়া ব্রিজের দিকে তাকালাম। প্রায় তিন বছর বাদে কলকাতায় ফিরছি। কলকাতাকে আমি ভালবাসি, দিল্লিকেও আমার ভাল লেগেছিল, কিন্তু কী একটা পাগলামি যে ঘটে গেল কলকাতা যেন সেই কলকাতাই আছে। বদ্রী স্ট্রান্ড রোড ধরে, ময়দানের দিকে এগিয়ে চলল।
আমাদের বাড়িটাকে কলকাতার কোন এরিয়াতে বলা যায়? সাউথ? না। সেন্ট্রাল? তাও যেন ঠিক না। এ রকম কোনও শব্দ কি বলা যায়, সাউসেন্ট। কেন না, এরিয়াটা সাউথ সেন্ট্রালের মাঝামাঝি। পোস্টাল অ্যাড্রেস কলকাতা-১৯। আমাদের বাড়ির সামনে খানিকটা খোলা জায়গা আছে, যার এক পাশে তিনটি গ্যারেজ, এবং একটু বাগানের মতো। প্রথমে নাথুর সঙ্গেই দেখা হল, বাইরে অংশটা দেখাশোনা করা, (আসলে পাহারা দেওয়া) ওর কাজ। ও কপালে হাত ঠেকিয়ে হাসল, কিন্তু ওর চোখে কেমন একটা অবাক জিজ্ঞাসা। আমাদের বাড়িটা বড়, আড়াইতলা। নীচের তলাতে কোনও শোবার ঘর নেই, কেবল বসবার, গল্প করবার আর রান্না আর ডাইনিং রুম নীচে। আমার শোবার ঘর অবিশ্যি দোতলাতেই, এবং অধিকাংশ শোবার ঘর (দশটা–সব মিলিয়ে) খালিই পড়ে থাকে। বদ্রী আমাকে বলল, আপনি ওপরে চলে যান, কেউ এসে সুটকেস নিয়ে যাবে।
এ বাড়িতে লোকের অভাব নেই, বলতে গেলে, অনেক বেশি। বাবার তা-ই মরজি। যেন মুখ না খুলতেই কেউ হাজির হয়। অবিশ্যি সারা দিন এক রকম কাটে, সন্ধে থেকে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অনেক লোকের দরকার হয়। রোজ সন্ধেতেই বাবার এত গেস্ট আসেন, আর এত রকম, এবং আগেই বলেছি বাবা দেবাদিদেব মহাদেবের মতো বসে থাকেন, সবাই এসে বাবার সঙ্গে কথা বলেন, তারপরে যে যার ড্রিঙ্ক নিয়ে নিজেদের জায়গা মতো ঘরে গিয়ে বসে পড়েন। বাবা তার কয়েকজন বিশিষ্টকে নিয়ে আসর জমান। তারপরে মোটামুটি সকলেই কিছু খেয়ে, রাত্রি দশটা নাগাদ বিদায় নেন। কলকাতায় এমনটি আমি আর কোনও বাড়িতে দেখিনি, আর বাবার ব্যাপার-স্যাপারও আমি বুঝি না।
Chapter - 3
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠবার আগেই, অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভজু, সন্তোষ, হিরা (মেড সারভেন্ট), জানকী (ঠাকুর), ইদ্রিস (বাবুর্চি), বৈদ্যনাথ (খানসামা), মতিয়া (বড়বউদির বাচ্চার জন্য এক সময়ে ওকে আয়া হিসাবে নেওয়া হয়েছিল, তারপরে আর বড়দা–যার নাম ঘোঁতন–তাঁর নিজের বাড়িতে আর যায়নি, এখানেই থেকে গিয়েছে।) সকলেই কপালে হাত ঠেকিয়ে আমাকে নমস্কার করল, কেবল সন্তোষ আর হিরা পায়ে হাত দিয়ে করল, কারণ ওরা ছোট বলে বোধ হয়, কিন্তু আমার খুব অস্বস্তি লাগে, এবং ওদের সকলের চোখেই, নাথুর মতো কেমন একটা অবাক, আরআর ইনকুজিটিভ লুক। যেন নতুন আর অদ্ভুত একটা লোককে দেখছে। কেন তা কে জানে! ওরা সবাই কেমন আছে, এবং ভাল আছে জেনে আমি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম, আর মনে হল যেন, আমি ওদের মুখে হাত চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম।
দোতলার সাউথ ফেসিং বড় বারান্দায় পা দিয়েই আমি থ–থমকে দাঁড়ালাম। মিটার বক্সের নীচেই, দেওয়াল ঘেঁষে এক জন অচেনা ম-মহিলা মানে, একটি মেয়ে বললে যা বোঝায়, সেই রকম, তবু আমি মহিলাই বলতে চাই, দাঁড়িয়ে আছেন, এবং দু হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, নমস্কার, আসুন। আমার নাম রজনী।
আমার মুখ দিয়ে কোনও রকমে বেরোতে পারল, রজনী?
মহিলার গলার স্বরটা, কী বলব, বেশ টানটান–মানে তার টেনে বাঁধলে যে রকম বাজে, অনেকটা যেন সেই রকম; বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু অন্ধ নই, দেখতেই পাচ্ছেন।
তার চোখ–আমি ডেসক্রাইব করতে পারি না, মনে হয় খুব বড় না, অথচ বড়, আর দৃষ্টিটা যেন ডিপ অথচ–অথচ ঝলকানো। অবাক হয়ে উচ্চারণ করলাম, অন্ধ?
রজনী তার সেই স্বরে বললেন, হ্যাঁ, বঙ্কিমচন্দ্রের রজনী তো অন্ধই ছিল।
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ওহ, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি তো–।
সেই রজনী না৷ রজনী বলে উঠলেন।
উনি আমাকে ভুল ভাবছেন, বললাম, না, তা বলিনি, আমি বলছিলাম, আপনি তো মোটেই অন্ধ নন।
রজনী বললেন, অন্তত চক্ষে।
বলে তিনি ঠোঁট টিপে হাসলেন। ওঁকে রোগা মোটা কিছুই বলা যায় না, শর্ট বা টল, তাও না, এবং ফরসা বা কালো, তাও বলা যায় না, কিন্তু ওঁর নাক টিকোলো, ঠোঁট-ঠোঁটকী জানি, সব মিলিয়ে একটা ধারালো ধারালো, অথচ–অথচ, হ্যাঁ সুইট লাগছে। পরেছেন একটা সামান্য শাড়ি, লাল পাড়, হলুদ রঙের, জামাটাও হলুদ, আর ওটাকে কী বলে, উনি বেশ হেলদি। তার মানে পেশি ফোলানো না, হেলদি। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বা আরও অনেকের মতো ধাক্কা দেওয়া শরীর ঠিক না, কিন্তু কী যেন আছে, বলা যায়–শি ইজ চার্মিং। বয়স অবিশ্যি আমি বুঝি না, তবে ফুচকির (আমার ছোট বোন।) বয়সি হবেন বোধ হয়। কোনও অরনামেন্টসই ওঁর গায়ে নেই, মাথায় ওটাকে বলে হর্সটেল, টেনে পিছন দিকে সেই রকম বাঁধা। বললেন, অবিশ্যি আপনি আমাকে তিতির বলেও ডাকতে পারেন।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
রজনী বললেন, কেন আবার, তিতির আমার ডাকনাম।
ওহ্, আমি ভাবলাম, আপনি বুঝি এমনি এমনি পাখির নাম নিয়ে ডাকতে বললেন।
রজনী–মানে তিতির হেসে উঠলেন, আমি তার সাদা ঝকঝকে দাঁত দেখতে পেলাম, বললেন, এমনি এমনি কেউ পাখির নামে ডাকতে বলে নাকি? আমার ডাকনামটাই আপনাকে বললাম, আর এও বলে রাখছি, দয়া করে, তুমি বলবেন, আমি ফুচকির থেকে এক বছরের বড়। এখন আপনাদের গলগ্রহ।
আমাদের গলগ্রহ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
রজনী-মানে তিতির এ বার দেওয়ালের কাছ থেকে এক পা সরে এসে বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু সে সব কথা পরে হবে, এখন আপনি ঘরে চলুন। মেসোমশাই আমাকে আপনার দেখাশোনা করতে বলে গেছেন।
মেসোমশাই কে?
আপনার বাবা। আসুন, আপনার ঘরে আসুন।
এ সময়েই পিছনে পায়ের শব্দে ফিরে দেখলাম, সন্তোষ আমার সুটকেসটা নিয়ে এসেছে। রজনী– মানে তিতির চলে যাচ্ছেন এগিয়ে, আমি সন্তোষের দিকে অবাক চোখে তাকালাম। সন্তোষ বলল, তিতিরদি।
আমি শব্দ করলাম, ওহ!
সন্তোষ আবার বলল, এক বছর হল এসেছেন।
রজনী–মানে তিতিরের স্বর দূরের বারান্দা থেকে আমার কানে এল, আমার পরিচয়টা আমিই দেব আপনাকে, আসুন না।
দেখলাম উনি আমার ঘরের দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। আবার বললেন, সন্তোষ, তুমি সুটকেসটা ওঁর ঘরে রেখে, আগে এক কাপ চা দিয়ে যেতে বলল।
সন্তোষ আর কোনও কথা না বলে, সোজা আমার ঘরের দিকে চলে গেল। রজনী–মানে তিতির কেন জানি না, ওকে আমার তিতির বলতেই ইচ্ছা করছে, রজনী নামটা যেন কেমন, আজকাল শোনা যায় না। তিতির আমার ঘরে ঢুকে গিয়েছেন। আমি সন্তোষের পিছনে পিছনে গেলাম। ওপরতলাটা একেবারে চুপচাপ, যাকে বলে নিঝুম। আমি আমার ঘরে ঢুকে, কিটব্যাগটা রেখে, নিজেই অবাক হয়ে গেলাম, প্রায় চিনতেই পারছি না, এত সাজানো গোছানো। খাট, ড্রেসিংটেবল, ওয়ারড্রব, পড়ার টেবল, বইয়ের আলমারি যেমন ছিল তেমনি আছে, কিন্তু সব যেন নতুনের মতো লাগছে। খাটটার জায়গা বদলানোনা হয়েছে। আমার ঘরটা বারান্দার দিকে এগিয়ে এসেছে, সে জন্য আমি বারান্দার ইস্ট সাইডের বাতাসও পাই। আবার যে সব ঘর বারান্দা থেকে পিছনে গিয়েছে, সে ঘরে সকালের রোদে পড়ে, আমার ঘরে বলতে গেলে কখনওই রোদ পড়ে না, বছরের কোন একটা সময়ে যেন, বেলা খানিকটা পড়ে গেলে, রোদ আসে। খাটটা বারান্দার জানালার দিকে টেনে আনা হয়েছে। কিন্তু আমার ঘরের সবই থাকত একটু এলোমেলো। অবিশ্যি অনেক দিন ব্যবহার করা হয়নি, বন্ধই থাকত, তবু কেমন যেন সব ঝকঝক করছে, তা ছাড়া আমার ঘরের দেওয়ালে কখনও কোনও ছবি ছিল না। এখন দেখছি। দু দিকে মুখোমুখি দেওয়ালে দুটো বড় বড় ছবি টাঙানো রয়েছে, মনে হয় তেলরঙের আঁকা। একটু, অদ্ভুত ধরনের, অনেকটা বিরাট কদম ফুলের মতো, কিন্তু কদম না–একমাত্র কালিম্পং-এর একটা ক্যাকটাসের নার্সারিতেই এ রকম ফুল দেখেছিলাম। আর এক দিকে রয়েছে পাহাড়ি ঝরনার স্রোত, সবুজ ঝোঁপঝাড় আর সোজা দেবদারু গাছ। রজনী, তিতির বারান্দার দিকের জানালাটা খুলে দিচ্ছিলেন, ওঁর গলার স্বর শুনতে পেলাম, পেন্টিং দুটো আপনার ভাল লাগছে?
আমি ওঁর দিকে ফিরে বললাম, হ্যাঁ, মানে বেশ সুন্দর। এগুলো কোথা থেকে কেনা হয়েছে?
তিতির বললেন, কেনা হয়নি, মেসোমশাইকে দু জন আর্টিস্ট প্রেজেন্ট করেছিলেন। এক দিন দেখেছিলাম, ওঁর শোবার ঘরে ও দুটো কাগজে মোড়া, খাটের তলায়। গতকাল আপনার ঘরে টাঙিয়ে দিয়েছি।’
খুশি, কিন্তু একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেলাম, আমি তিতিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। উনিই জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলছেন?
বললাম, না, মানে আমার ঘরে এ সব ঠিক মানায় না।
কেন?
কেন? তা কী করে বলব। বললাম, কখনও টাঙানো হয়নি তো, তা-ই।
তিতির বললেন, কখনও হয়নি, এখন হয়েছে। আপনার ভাল লাগছে তো?
খুব–মানে–এনচ্যানটেড।
দ্যাটস মাচ টু মাচ। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন। অবিশ্যি আপনার ঘরে আপনাকে বসতে বলার কোনও মানে হয় না।
আমার ঘরে সোফা বলতে যা বোঝায়, তা নেই, খান দুয়েক গদি মোড়া চেয়ার, আর একটি স্টিল পাইপের ইজিচেয়ার, যেটাকে ভেঙে ফ্ল্যাট করে নিয়ে শোয়াও যায়। আমি হ্যাঁ’ বলে, একটা চেয়ারে বসেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনি বসুন।
আপনি! আপনাকে আগেই বলেছি, আমাকে আপনি করে বলবেন না। তা হলে বসতেই পারব না।
বলে তিতির ঘাড়ে একটা, কী বলে ওটাকে, ঝটকা দিলেন, আর ওঁর হর্সটেলের গোছা, ওঁর গালে ঝাঁপটা দিয়ে গেল। আমি নিজেকে কেমন যেন বি–বিপদগ্রস্ত বোধ করছি। এক জন মহিলাকে না হয় একটি ইয়ং গার্লকে কেন না উনি ফুচকির থেকে মাত্র এক বছরের বড়। এ বয়সের মহিলাদের ইয়ং গার্লই বলা যায়, একেবারে প্রথম দেখাতেই কী করে তুমি বলব। কখনও তো বলিনি। বললাম, কী করে বলব?
তিতির ঘাড় কাত করে, ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন?
বললাম, এক জন সেলফ-ইনট্রোডিউসড নতুন মহিলাকে—
মহিলা?
মমম-মানে তা-ই তো।
মনে হল, তিতিরের মুখটা যেন লাল হয়ে উঠল, আর চোখে, কী বলে ওটাকে, যেন স্পার্ক দিয়ে গেল একটা, এবং ঠোঁট দুটো যেন টিপে ধরলেন। কয়েক সেকেন্ড পরে বললেন, হ্যাঁ, তা-ই, আমি একটি মেয়ে-ই, কিন্তু আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন, আদারওয়াইজ, আপনার সঙ্গে আমি কথাই বলতে পারব না।
আশ্চর্য, আমি তো এ রকম কথা কখনও শুনেছি বলে মনে হয় না, একমাত্র দিল্লির রত্না ঘোষ ছাড়া। তবে রত্না আবার একটু বেশি ইয়ে, ঠিক স্মার্ট বলব না, কী ওটা আমি জানি না, একটু ভয় পেতাম, যদিও ও দেখতে সত্যি খুবই সুন্দর। ওকে আমি তুমি বলতাম, কারণ মমতা কাকিমা আমাকে শাসিয়ে বলে দিয়েছিলেন, আমি যেন কখনও রত্নাকে আপনি করে না বলি। কিন্তু তিতিরকে ওহ, অকোয়ার্ড, আমি বলতে গেলে হা করে তিতিরের মুখের দিকে তাকিয়েই কথাগুলো ভাবছি। তাড়াতাড়ি মুখটা নামিয়ে ভাবতে লাগলাম, কী করা যায়। তিতিরের স্বর শুনতে পেলাম, খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন নাকি? আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালাম, উনি আবার বললেন, এক বার বলে ফেলুন, তা হলেই এসে যাবে।
মনে আছে, মমতা কাকিমা বলেছিলেন, য়ু স্টার্ট ওয়ানস, দেন ইট উইল বি ইজি’ বলে একটা চোখ বুজিয়ে ঘাড় নেড়েছিলেন, ওটাকে বোধ হয় উইংকিং বলে, কিন্তু আমি সে ভঙ্গির কোনও মানে বুঝতে পারিনি। বললাম, চেষ্টা করব।
করব না, করুন, তার আগে বসুন।বলে তিতির এক পাশে গিয়ে বাথরুমের দরজাটা খুলল, উঁকি মেরে দেখল, আবার বন্ধ করে দিল। আমি বসলাম, উনি আমার দিকে ফিরে দেখলেন, তারপরে এগিয়ে এসে, কাছের একটা চেয়ারে বসে বললেন, সইয়ের বউয়ের বকুল ফুলের বোনঝি জামাই বলে কোনও কথা কখনও শুনেছেন?
প্রায় একটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ শুনলাম বলে মনে হল, তাই জিজ্ঞেস করলাম, কী বললেন?
বললেন না, বললে।
হ্যাঁ, তাই, মানে ব–ব।
বললে, বলুন, বললে।
বললে।
হ্যাঁ, বলছিলাম, সইয়ের বউয়ের, বকুল ফুলের, বোনঝি জামাই, বুঝলেন? তিতির বেশ কেটে কেটে কথাগুলো বলল। আমার মেরিট খুব খারাপ না, তবু কথাগুলো মাথায় ঢুকল না বলেই, মনে রাখা খুব শক্ত হল। জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে কী?
নাথিং। কিছুই না, কারোর সঙ্গে এ রকম কোনও আত্মীয় সম্পর্ক হতে পারে না, যেমন কি না, আমি আপনাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হিসাবে এ বাড়িতে এসেছি, যেটাকে আসলে আত্মীয়তাই বলা চলে না।
আমি শব্দ করলাম, ওহ্।
নিয়ে এসো।’ তিতির বলল দরজার দিকে তাকিয়ে। আমিও তাকিয়ে দেখলাম, হিরা একটা ট্রে নিয়ে ঢুকছে। সেটা এনে টেবলে রাখবার পরে, তিতির জিজ্ঞেস করল, জানকীর সঙ্গে তোমার লাগেনি তো?
হিরা যেন লজ্জা পেয়ে, ঠোঁট টিপে হেসে, মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ল, এবং ও চলে যাবার মুখে, তিতির আবার বলল, কিন্তু তুমি যেন আবার ওদের সামনে বাড়াবাড়ি করে ফেলো না।
হিরা কোনও কথা না বলে, ওর চিবুকটা প্রায় বুকে ঠেকিয়ে বেরিয়ে গেল। হিরাকে তো কোনও দিন এতটা ইয়ে, মানে কেমন যেন লজ্জায় নুয়ে পড়তে দেখিনি। ও ওর সাত বছর বয়স থেকে আমাদের বাড়িতে আছে, ওর মা মরে যাবার পর থেকে। এখন বোধ হয় কুড়ি একুশ হল। তিতির চা করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। চা কাপে ঢেলে, দুধ আর কিছু না জিজ্ঞেস করেই দেড় চামচ চিনি মিশিয়ে, চামচ নাড়তে নাড়তে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আর একটা কাপ ছিল, তার মধ্যে চা ঢালতে ঢালতে বলল, কিন্তু যত দূরের আত্মীয়তাই হোক, আসলে কিছু না থাকলেও, বরাবরই শুনে এসেছি, মহাদেব মুখোপাধ্যায় আমার মেসোমশাই হন।
আমি প্রায় খুশি হয়ে বললাম, ওহ, তাই নাকি?
তিতির ওর চায়ে দুধ, চিনি মিশিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, কিন্তু মেসোমশাই আমাকে তো আগে কখনও চোখে দেখেনইনি, তার শালী, মানে আমার মাকেও জীবনে কখনও দেখেননি। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এ আবার হয় নাকি, বাবা তার শালিকে চেনেন না? আমাদের তো দু জন মাসিমা ছিলেন, এক জন মারা গিয়েছেন, তারা আমাদের এ বাড়িতেও এসেছেন। তিতির আবার বলল, খুব অবাক হচ্ছেন? কিন্তু ব্যাপারটা খুবই ন্যাচারাল। আমার মা ছিলেন, আপনার মায়ের দুর সম্পর্কের পিসতুতো বোন, আপন পিসতুত নন। আপনার মা, আমার মাকে জীবনে ছেলেবেলায় এক বার দেখেছেন, তাও তাদের দুজনেরই বিয়ের আগে। তারপরে আর কেউ কারোকে দেখেননি, কোনও যোগাযোগও ছিল না। মেসোমশাই–মানে আপনার বাবা, কোনও দিন আমার বাবা-মায়ের নামও শোনেননি। কিন্তু মহাদেব মুখার্জিকে কে না চেনে বলুন, আর মা বলতেন, উনি আমাদের মেসোমশাই হন।আপনার চা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
ওহ!’ শব্দ করে, আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
তিতিরও কাপে চুমুক দিল। ওর কথা আমার কেমন একটা অদ্ভুত লাগছিল, ব্যাপারটা এক ধরনের নতুন বিষয় বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। তিতির বলল, তা-ই, কোথায় আর যাই, মেসোমশাইয়ের কাছেই চলে এলাম, উনিও অবশ্য আমাকে সহজেই গ্রহণ করেছেন।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাবা-মা?
তিতির বলল, তারা স্বর্গে চলে গেছেন। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, আবার বলল, আমার আর কেউ নেই ইহজগতে। ভাইবোন নেই, আত্মীয়স্বজন থাকলেও, তাঁদের আমি চিনি না। বাবা লেখাপড়া কিছু শিখিয়েছিলেন, বিয়েটা দিয়ে যেতে পারেননি, বেঁচে থাকলেও পারতেন কি না, জানি না, কারণ তার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল–আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম, কিন্তু আমি আর এখন অবাক না, তিতিরকে আমার পৃথিবীর একটা ইয়ের মতো লাগছে, একটা বিস্ময়ের মতো, যার মধ্যে অনেক কিছু মিশে আছে, যেমন–ভয়, দুর্বিপাক, হেল্পললসনেস, অথচ তিতির কী রকম সহজ, যার আপন বলতে, ওর কথায়, ইহজগতে আর কেউ নেই। কেমন একটা বিস্ময়ের মতো লাগছে না ওকে? ওর মুখে কোনও ছায়া পড়েনি, বলতে বলতে চায়ের কাপে চুমুক দিল, এবং আবার বলল, আমার পরিচয়টা পেলেন?
আমি ঘাড় কাত করে বললাম, অনেকখানি।
তিতির আমার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, যেন কিছু খুঁজল বলে মনে হল, তারপরে বলল, মেসোমশাই আমাকে বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করতে বলেছেন, হাউস-কিপার বলতে যা বোঝায়, যদিও তার তেমন দরকার নেই, একমাত্র এ বাড়ির কাজের লোকগুলোকে ঠিকমতো একটু সামলে রাখা ছাড়া। কারণ দিন বদলায় তো৷
তিতিরের কথা আমি বুঝতে পারলাম না, তাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও একটু হাসল, কেমন এক রকমের হাসি, যার মধ্যে একটা বিশেষ অর্থ আছে যেন। আবার বলল, মানে আমি বলছি, সবকিছুই বদলে যায় তো? যেমন ধরুন, হিরা এখন বড় হয়েছে। মতিয়ার বয়স তিরিশ, স্বামীর ঘরে যায় না, কোনও কাজও ওর নেই, আর বেশি দিন এভাবে থাকলে, মানুষ বদলে যেতে থাকে, এই সব বলছিলাম। তা ছাড়া, কাল রাত্রে মেসোমশাই আমাকে বলেছেন, আপনার কথা। আপনি আসছেন, আমি যেন আপনার ঠিক মতো দেখাশোনা করি। কোনও কিছু অসুবিধা হলে, আমাকে বলবেন।
আমার ভারী অবাক লাগে বাবার কথা শুনে। আমাকে আবার দেখাশোনা করার কী আছে, আর এ বাড়িতে আমার অসুবিধারই বা কী হতে পারে। তিতির নিজেই আবার বলল, আমি অবিশ্যি আপনাদের। সবাইকে চিনি না, বা দেখিওনি। আপনাকে আজই প্রথম দেখলাম। আপনাদের বড়দাকে দেখেছি, আর অপর্ণার সঙ্গে আলাপ হয়েছে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অপর্ণা কে?
তিতির ওর সেই বড় না, ছোট না, একটা গভীরতা আছে অথচ একটা ঝলক দেওয়া সেই চোখে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল, এবং এই প্রথম ওকে অবাক হতে দেখলাম। বলল, সে কী, আপনি অপর্ণাকে চেনেন না, ফুচকি–আপনার।
ওহ, ফুচকি! ওর ভাল নাম যে অপর্ণা, সেটা খেয়ালই ছিল না। বলতে বলতে খুবই লজ্জা পেয়ে গেলাম।
তিতির বলল, অদ্ভুত লোক তো আপনি। আপনার নিজের ভাল নামটা মনে আছে তো?
আমি হেসেই বললাম, মদন।
তিতির ঠোঁটে ঠোঁট টিপে, মুখটা কেন যেন নামিয়ে নিল, তারপরে আবার মুখ তুলে বলল, আপনার বাবা অবিশ্যি আপনার অন্য নাম বলেন।
গবা!’ আমি বললাম।
তিতির মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠল, আমার দিকে এক বার তাকাল। আমি যেন একটু ইয়ে– মানে, বিব্রত হয়ে পড়লাম, জিজ্ঞেস করলাম, নামটা শুনলে হাসি পায়, না? কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই আমাকে এই নামে ডাকা হয়।
তিতির বলল, শুনলে হাসি পায় কি না জানি না, আপনি বললে হাসি পেয়ে যায়। আমার কোন নামটা আপনার মনে থাকবে বলুন তো?
কোন নামটা? তিতিরের ভাল নাম যেন তখন কী বলল—র—রজনী। উঁহু, ওটা যেন ঠিক মনে রাখবার মতো নাম না। বললাম, আ-আপ’
তুমি।’ তিতির বলে উঠল।
বললাম, তুমি যদি কিছু মনে না করে, তা হলে তিতির নামটাই মনে রাখবার মতো।
তিতির মুখ নামিয়ে বলল, আমারও তা-ই মনে হয়। মেসোমশাই আমাকে তিতির পাখি, বা শুধু পাখি বলে ডাকেন, ফুচকি তিতিরদি বলে, বাড়ির সবাই।
এই প্রথম আমার মনে পড়ল, জিজ্ঞেস করলাম, ফুচকি কোথায়, ও কি এ বাড়িতে থাকে না?
তিতির বলল, না, ও স্বামীর কাছেই থাকে। এখন ও কলকাতায় নেই, নর্থ বেঙ্গলে গেছে।
নর্থ বেঙ্গল? কেন?
পার্টির কাজে।
আমার মনে পড়ল, ফুচকি আজকাল পলিটিকস করছে। আগে থেকেই করত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ফুচকি কোন পার্টি করে?
তিতির যেন কেমন একটু হয়ে গেল, যাকে বলা যায়, কোনও উৎসাহ নেই। বলল, ফুচকি ওর নিজের মনের মতো পার্টি পলিটিকসই করে। আমি ও সব বুঝি না, পলিটিকসে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। ফুচকি আর ওর হাজব্যান্ড একই পার্টি করে, ওর হাজব্যান্ড তো এম.পি. আপনি জানেন?
খুব অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি? জানি না তো? কী নাম?
তিতির খিলখিল করে হেসে উঠে, ওর মুখটা প্রায় টেবিলে নামিয়ে নিল, আর আমি ওর ঘাড়টা দেখতে পেলাম, যেখানে কিছু উড়ো উড়ো চুল, চুলের গোড়ায় এলোমেলো হয়ে আছে। ও তো খুব ফরসা না, ঘাড়টা–মানে, কেমন যেন সুন্দর দেখাচ্ছে না? তিতির হাসির মধ্যেই মুখ তুলে বলল, আপনি নিজের ভগ্নিপতির নামটাও জানেন না। সত্যিই, তাই তো দেখছি, আমি আমার ভগ্নিপতির নামটাও জানি না। নিজেকেই আমার কেমন উল্লুক আর ইডিয়ট মনে হতে লাগল, আমি কিছুই বলতে পারলাম না, লজ্জায় পড়ে গিয়ে চুপ করে রইলাম। তিতির নিজেই বলল, ফুচকির বরের নাম রাখাল রায়।
এবং এম.পি., আমি মনে মনে ভাবলাম, কিন্তু কখনও নামটা শুনে থাকলেও, আমার মনে নেই। তিতির বলে উঠল, কী, এখনও মনে করতে পারছেন না বলে মনে হচ্ছে?
বললাম, না মনে করার আর কী আছে, আপনি তো বলেই দিলেন। আসলে ফুচকি যখন বিয়ে করেছে, আমি তখন দিল্লিতে ছিলাম কি না। আমাকে তপনকাকা এক দিন বললেন, ফুচকি বিয়ে করেছে, এক পলিটিকাল পার্টিলিডারকে। হয়তো নাম বলেছিলেন, আমার মনে নেই।
তপনকাকা কে?
দিল্লিতে যাঁর বাড়িতে আমি ছিলাম।
তিতির যেন খানিকটা ইয়ে মানে আনমাইন্ডফুল দৃষ্টিতে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, অথবা আমি বুঝতে ভুল করছি, ও হয়তো সেই রকম কিছু একটা খুঁজছে আমার চোখের মধ্যে, যদিও জানি না, আমার চোখে খোঁজার কী আছে, আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আমি মুখ ফিরিয়ে নেবার আগেই ও জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনার বড় ভগ্নিপতির নাম আপনার মনে আছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, হিতুদার নাম? শু্যয়র, হিতুদা বিয়ের অনেক আগে থাকতেই আমাদের বাড়ি আসতেন, আমার পনেরো বছর বয়স থেকে ওঁকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছি।
তিতির যেন কেমন একটা ক্রাইসিসে পড়ে গিয়েছে, সেই রকমই ওর মুখের ভাব, এবং ঠিক যেন স্বস্তি বোধ করছে না, বলল, আপনি ফুচকি আর ওর বরের কথা কিছুই জানেন না ভেবে আমার ভারী অবাক লাগছে। আপনি কি নিউজপেপার পড়েন না?
আমি যেন কেমন একটু, ওটাকে বলে, বেয়াকুফ হয়ে গেলাম, এবং প্রায় ক্ষমা চাওয়ার মতো করে, ঘাড় নেড়ে বললাম, না। আগে–পাঁচ-সাত বছর আগে পড়তাম।
আপনি খবরের কাগজ পড়েন না? তিতির এমনভাবে বলল, যেন এ রকম অদ্ভুত কথা আগে কখনও শোনেনি।
বললাম, হয়তো হঠাৎ এক-আধ দিন, চোখের সামনে পড়ে গেল, একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম– মানে, কোনও উৎসাহই পাই না।
কীসে আপনার উৎসাহ? তিতির ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল, আর ওর হর্সটেল চুলের গোছা হেলে পড়ল কাঁধের কাছে।
আমি একটু না ভেবে পারলাম না, তাই তো, কীসে আমার উৎসাহ। ওহহ, মনে পড়েছে, বললাম, মহাভারত আর
মহাভারত? তিতির বলে উঠল।
হ্যাঁ, মহাভারত, নৃতত্ত্ব আর ওটাকে কী বলে, মম–আই মিন, সাইকোলজি আর।
সাইকোলজি?
হ্যাঁ, আর চেস খেলা আর মিউজিক আর–আর কিছু মনে করতে পারছি না।
তিতিরকে মনে হচ্ছে, ও ফ্ল্যাবারগাস্টেড, যে কারণে, ওর ঠোঁট ফাঁক হয়ে রয়েছে, ওর ঝকঝকে সাদা কয়েকটা দাঁত আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি এমন কী বলেছি, যে ও ওরকম করে তাকিয়ে আছে। কোনও বাজে কথা বলে ফেলেছি নাকি? আমি তো সে রকম বলি না। তাই একটু কৌ-কৌতূহল আর ভয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হল বলো তো?
তিতির ঠোঁট বন্ধ করে মাথা নাড়ল, চুলের গোছাও পড়ল, এবং একটু অবাক অবাক স্বরে বলল, না, হয়নি কিছু, আপনাকে আমি অন্য রকম ভেবেছিলাম।
অন্য রকম?
হ্যাঁ। এখন দেখছি, মেসোমশাইয়ের কথাই ঠিক।
কে?
মেসোমশাই, আপনার বাবা।
ওহ, সরি। বাবা কী বলেন?
আপনি যা তা-ই, মনে হয় উনি আপনাকে চেনেন।
তা অবিশ্যি আমি জানি না, তবে বাবাকে আমি ঠিক বুঝি না, ওঁর কথাবার্তাও সবসময় ধরতে পারি না।
অথচ আপনি সাইকোলজিতে ইন্টারেস্টেড।
হ্যাঁ, কিন্তু ইয়ে, মানে–আমি ডিটেকটিভ না, তবে বাবা হিসাবে ওঁকে আমি বুঝি।
তিতির আবার কথা না বলে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, সেই একই, সার্চিং অ্যান্ড আসকিং। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমাকে কী ভেবেছিলেন?
তিতির বলল, ডেঞ্জারাস।
ডেঞ্জারাস?
হ্যাঁ, একটা ভয়ংকর কিছু।
আমি হ হতবাক। আমি ডেঞ্জারাস, ভয়ংকর, তিতির ভেবেছিল। তিতির যেন কেমন এক রকম করে হেসে, উঠে দাঁড়াল, বলল, ভাববেন না, এখন আর সে রকম কিছু ভাবছি না। আপনাকে দেখেই অবিশ্যি মনে হয়েছিল, আমার ভাবনাটা ভুল হয়েছিল। বলতে বলতে ও ওয়ারড্রবের কাছে গিয়ে, পাল্লা খুলে দেখল, আবার বন্ধ করে বলল, আপনি স্নান-টান করুন, ধোয়া জামাকাপড় এখানেই আছে। খেয়েদেয়ে ঘুমোন, বিকালে আপনার কাছ থেকে দিল্লির গল্প শুনব।
দিল্লির গল্প শুনব কথাটা বলার সময়, আপনা থেকেই যেন তিতিরের ঘাড় একটু বেঁকে গেল, আর চোখের তারায় ওটা কী হল, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না; ইশারা না কি? বলতে বলতে ও মুখ ঘুরিয়ে চায়ের কাপ ট্রেতে তুলে নিল, এবং ট্রে হাতে করে, আমার দিকে ফিরে তাকাল। বলল, আমি খাবারের ব্যবস্থা দেখি গিয়ে। এনি স্পেশাল মেনু?
আমি তিতিরকে দেখছিলাম, ওকে ট্রে হাতে ঠিক মানাচ্ছিল কি না, বুঝতে পারছি না, কিন্তু কেন যেন ভাল লাগছে। বললাম, ডালের সঙ্গে ভাজা বড়ি আর ঝোল ভাত।
তিতির শব্দ করে হেসে উঠল, আর ট্রের কাপ ডিশে ঠুংঠাং শব্দ হল। বলল, আপনাকে এ বাড়ির ছেলে বলে মনে হচ্ছে না। দুপুরে এক বোতল কোল্ড বিয়ারও ড্রিঙ্ক করবেন না?
কোন্ড বিয়ার? আমি তো ড্রিঙ্ক করি না।
একেবারেই না?
তা বলতে পারি না। দিল্লিতে জোরজবরদস্তিমানে এক মহিলা, লায়লী সিং-এর জোরজবরদস্তিতে, দু-এক বার তাও আমার ভাল লাগেনি।
তিতির আবার সেই রকম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এবং যাকে বলে অনড়–স্থির। কয়েক সেকেন্ড পরেই, চোখ নামিয়ে যেন ট্রের দিকে দেখল, তারপরে আবার মুখ তুলে বলল, বিকালে।’ বলেই বারান্দার দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল, এবং জানালা দিয়ে ওকে আমি বারান্দা দিয়ে যেতে দেখলাম, তিতিরও এক বার মুখ ফিরিয়ে দেখে গেল। তিতির–আশ্চর্য, এ রকম একটি মেয়ে আমাদের বাড়িতে–পৃথিবীতে যার কেউ নেই, ওর কথায়, ইহজগতে, কিন্তু তিতির আমাকে কোনও দাদারুণ করুণ কাহিনী শোনায়নি, ও চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিয়েছিল, যখন বলল, ওর বাবা মা স্বর্গে চলে গিয়েছেন। আমার বাবাকে ধন্যবাদ। আমি জানি না, তিতির আগে কেমন ছিল, এখন কী রকম, যাকে বলে জীবনযাপন করছে, আমার মনে হল ও যা না, তা-ই হয়ে আছে।
বাথরুমে গিয়ে দেখলাম, বাহ, একটা পাঁচ তারার হোটেল রুমের বাথরুমে এলাম যেন। কী নেই? এমনকী নতুন টুথব্রাশ আর সেফটি রেজার, আফটার শেভিং লোশনও (যা আমি মাখি না।) রয়েছে, যা হোটেলে থাকে না। দাড়ি কামাননি কেন?’ দাড়ি কামাবে, দাড়ি কামাবে আমার মনে পড়ে গেল, আয়নার দিকে তাকিয়ে, এক বার গালে হাত বুলিয়ে আমি ট্রাউজার আর গুরুপাঞ্জাবি খুলে ফেললাম, বাইকটা পায়ের নীচে নামিয়ে দিয়ে, শাওয়ারের মুখটা খুলে দিতেই, মনে পড়ল, দরজাটা বন্ধ করা। হয়নি। তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে, আবার শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালাম, ঠাণ্ডা জল মাথা গা বেয়ে পড়তে লাগল–এটা তো ভালই, বাড়িতে এসে আমি এক জন নতুন মানুষকে দেখলাম, কথা হল, একটি ইয়ে-যার নাম তিতির, না হলে তো একলা চুপচাপ…শাওয়ার বন্ধ করে, চুম্বক থেকে মস্ত বড় সাবানটা টেনে নিলাম। কী সাবান জানি না, চেহারা দেখে আর গন্ধে মনে হচ্ছে, যাকে বলে বিলাসী, তা-ই আমি ইউজ করতে অভ্যস্ত না। ফুচকির বরের সুন্দর কথা, বর’–তিতির বলছিল, মমতা কাকিমাও কথায় কথায় ওর বর তার বর বলেন, শুনতে কেমন ভাল লাগে, কী যেন নাম ফুচকির বরের? রাখালদাস বন্দোনা না, রায় বলছিল, রাখালদাস না, রাখাল রায়, এম পি। হিতুদা, বড়দির বর একটা প্রাইভেট কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। সাবানটা চুম্বকে রেখে, গা হাত পা ঘষে নিয়ে শাওয়ার খুলে দিলাম ফুচকির থেকে এক বছরের বড়, তার মানে কত হল? ছাব্বিশ-তিতির, আহ গাটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে…এখন মনে হচ্ছে, বাড়িতে ফ্যামিলির আরও কেউ থাকা উচিত ছিল, তিতিরকে দেখে সেটা আরও বেশি মনে হচ্ছে, এবং তিতির তো এখন…শাওয়ার বন্ধ করে, ভোয়ালেটা টেনে নিলাম, মনে পড়ল জামাকাপড় কিছু নিয়ে ঢুকিনি, তোয়ালে পরে বেরোতে হবে। আমি সাঁতার কাটতে শিখিনি, তা হলে বেদিং-এর রিয়াল মজাটা পেতাম।
.
ঘুম হল না, আসলে আমি দিনের বেলা কখনও ঘুমোই না, যদিও লাস্ট নাইট ট্রেনে একেবারেই ঘুমোতে পারিনি বলতে গেলে। ভোরবেলা একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন কটা বাজে কে জানে, সারা শরীরে একটা ইয়ে–আলস্য, অথচ আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না, মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ শুয়ে আছি, তাই উঠে বসেছি। কোথাও কোনও শব্দ নেই, বাড়ির কাজের লোকেরা এখনও বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। আমি বারান্দার দিকের পরদাটা সরিয়ে দিলাম, থাম আর কাঠের আর কাচের জাফরি দেখলে, আগের সেঞ্চুরির বাড়ি বলে মনে হয়, এবং ব্যাপারটা তো প্রায় তাই-ই, এ বাড়ি তো মহেশ্বর মুখোপাধ্যায়, আমার ঠাকুরদা করিয়েছিলেন, পরে অবিশ্যি বাবা অনেক রিমডেল করেছেন। বাড়ির দক্ষিণে এখনও সরু ফালি একটা জায়গা আছে, যেখানে কয়েকটি গাছও আছে, একমাত্র রক্তকরবীর খানিকটা দোতলার বারান্দার মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে। লাল না রক্ত–কেন, তাতে কী এমফ্যাসাইজ করা হচ্ছে, ইট’জ রিয়ালি ভারমিলিয়ান-বলতে হয়, সাক্ষাৎ ভারতীয় লাল।
হিরাকে বারান্দায় দেখতে পেলাম, ও চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে আসছে। কী করে জানল, আমি উঠে পড়েছি। ওবেলার খাবার কথা মনে পড়ে গেল–হিরা ঢুকল ঘরের মধ্যে, বলল, মেজদা চা।’ আমি ফিরলাম, রাখো। হিরা আজকাল খুব মাথা নিচু আর কেমন একটা ভাব করতে শিখেছে, যেন চোখের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারবে না, এবং চা রেখে, আমি স্পষ্টই দেখলাম, চোখের পাতা না তুলেই, কেমন এক রকম করে আমাকে দেখে, জিজ্ঞেস করল, চা ঢেলে দিয়ে যাব?
বললাম, না।
হিরা মাথা নিচু করে, বারে বারে ইয়ের–মানে বুকের আঁচল টানতে টানতে চলে গেল, কেন? ওর শাড়িটা তো খসে পড়ে যাচ্ছিল না, একটু বেশি বড় হয়েছে ও, তার জন্য এ রকম করার কী আছে। তিতির ওবেলা যেন কী সব বলছিল ওকে, জানকীর বিষয়, আর ওর বাড়াবাড়ির বিষয়। তিতির নিশ্চয় এ বাড়ির বিষয়ে এখন আমার থেকে বেশি জেনে গিয়েছে–অবিশ্যি আমি এ বাড়ির বিষয় কবেই বা আর তেমন জানতাম। হ্যাঁ, ওবেলা তিতির আমাকে ডালের সঙ্গে বড়ি ভাজা আর ঝোল খাইয়েছিল, টেবলের সামনে সব সময় দাঁড়িয়ে ছিল, ছেলেবেলায় মা যেমন থাকতেন–ঠিক মায়ের মতো না, মা তো অনেক কথা বলতেন। আমি কাপে ছাঁকনি পেতে পট থেকে চা ঢালোম। দুধ, চিনি মিশিয়ে চামচ নাড়বার সময়েই, ভারী পায়ের জুতো–ঠকঠক শুনতে পেলাম, আর আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন ড্রাম বেজে উঠল, হাতের চামচটা এমন কেঁপে গেল, যে খানিকটা চা চলকে পড়ল, জুতো-ঠকঠক শব্দ আমার ঘরের দরজায় এসে থামলবাবা। ওহ, হি লুকস মোর ইয়ং! আমার হিসাবে বাবার বয়স ফিফটিনাইন, র সিল্কের গলাবন্ধ কোট, সাদা ট্রাউজার পরা, প্রায় ছ ফুট হাইট মহাদেব মুখোপাধ্যায় আমার দরজায় দাঁড়িয়ে, যার মাথার চুল ঘন মোটা এবং এখনও কালোর অংশ বেশি, এবং আমার মতো ঘাড় বেয়ে পড়া বড় না হলেও, বেশ বড়, আর এখন কপালের ওপরে বাতাসের ঝাঁপটায় এলিয়ে পড়েছে, মোটা ভুরুর নীচে চোখ দুটো যেন আগের থেকে বেশি ব্রাইট, নিভাঁজ মুখ, যার রং ঠিক কালো বলা যাবে না, চকচক করছে। তিন বছর আগে জানতাম, একটিও দাঁত পড়েনি, এখনও যে তা অটুট আছে, মুখ দেখলেই বোঝা যায়; একটু মোটা অথচ চোখা নাক, ফ্যাটলেস বোনি ম্যান, লুকিং স্ট্রেট অ্যাট মাই আইজ। আমি উঠে দাঁড়ালাম, বুঝতে পারছি না, বাবার ঠোঁটে হাসি আছে কি না, চোখের দৃষ্টিতে কী এক্সপ্রেশন। আমি তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই শুনতে পেলাম, কেমন আছিস গবা?
বলতে বলতেই বাবাও ঘরের মধ্যে ঢুকে এলেন, আমি বলতে গেলাম, ভা–বাবা বলে উঠলেন ভাল। এবং আমার কাঁধে হাত দিলেন, সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকালেন, তারপরে প্রায় বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, মাই সেডুয়ুণ্ড সান–সেডুয়ুণ্ড বাই উয়োম্যান।
আমি বলে উঠলাম, বাবা
কিছু বলতে হবে না।’ বলেই তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে, হঠাৎ দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে, প্রায় শাউটিং যাকে বলে, চিৎকার করে ডাকলেন, পাখি, পাখি। এই যে না আসতে হবে না, আমার জন্য একটু চা পাঠাতে বলো, গবার সঙ্গে বসে খাব।
পাখি! পাখি আবার কে, শুনিনি তো, ওহ, না, তিতির ওবেলা বলেছিল, কিন্তু একমাত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নায়িকার নাম পাখি বলে জানতাম। বাবা যাকে ডাকলেন, অথচ দেখতে পেলাম না, বাবা ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন, বললেন, নে গবা, তুই চা খা, আমি একটু বসি।
বলে বাবা বসলেন একটা চেয়ারে। আমি টেবলের কাছে গিয়ে বললাম, এ চা-টা তুমি খাও, আমি এখনও টাচ করিনি।’
দরকার নেই, তুই খা। আমি তো এ সময়ে বাড়ি এসেই চা খাই না, কিন্তু আজ একটু খাই, তোর সঙ্গে বসি, বোস।
বাবা ঘাড় ঝাঁকিয়ে আমায় চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। আমি চেয়ারে বসে, চামচটা দিয়ে আবার একটু চা নাড়লাম, বাবা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, ফিল করছি, চায়ের কাপ তুলে ইচ্ছা করেই (কেন?) জিজ্ঞেস করলাম, পাখি বলে কেউ এ বাড়িতে আছে, জানতাম না।
বাবা তার মোটা ভুরু একটু কুঁচকে বললেন, কেন, পাখি তোকে রিসিভ করেনি, মানে, তিতির!
ওহ, তিতির! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করেছে, কিন্তু পাখি একমাত্র তারাশঙ্করের উপন্যাসের নায়িকার নাম বলে জানতাম।
বাবা একটু ঘাড় নাড়িয়ে হাসলেন, দাঁত দেখতে পেলাম, যা ভেবেছিলাম, তা-ই, সব দাঁত আছে, বললেন, মে বি৷ উইথ ডিউ রেসপেক্ট টু হিম, আমিও কারোকে পাখি বলে ডাকতে পারি নিশ্চয়, ইট ইজ’ নোবডিজ মনোপলি।’
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না, তা কেন।
কাপে চুমুক দে।’বাবা আমার হাতে ধরা কাপের দিকে চোখ রেখে বললেন।
আমি কাপে চুমুক দিলাম, তেমন ঠাণ্ডা হয়নি। কাপ রেখে বললাম, তোমাকে ভালই দেখছি।
বাবা ঘাড় কঁকিয়ে বললেন, থ্যাংকিউ, বাট আই সি য়ু দি সেম। দু মাস জেল খেটে, কোনও পরিবর্তন হয়নি দেখছি।
আমি আবার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, পরিবর্তন? জেলে থাকাটা একটা গ্রেট টর্চার হয়েছিল।’
তার কোনও সাইন বা রিঅ্যাকশন দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তার আগে শুনি, হোয়াট টাইপ অব টর্চার? ঘানি ঘোরাতে হত? বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। বাবার চোখ কখনও সাদা না, লাইট বাদামি, কিন্তু ঝকঝকে।
আমি বললাম, না না, ঘানি ঘোরাতে দেয়নি, কোনও ঘানিও আমি সেখানে দেখিনি, তবে মডার্ন মেশিন ছিল, তেল পেষাই করার। কিন্তু আমি উডেন পেটি তৈরি করার কাজ করতাম, আর কার্ডবোর্ডের বকস’।
বাবা বলে উঠলেন, কুটিরশিল্পের কাজ শিখেছিস বল?
তিতির ঢুকল ট্রে হাতে নিয়ে বাবার পাখি। এখনও চুল উলটে আঁচড়ানো, কিন্তু পিছনে মস্ত একটা খোঁপা, পাড়হীন সবুজ শাড়ি আর জামা, কিন্তু সিল্ক না, সফট কটনের বলে মনে হচ্ছে, চোখে বোধ হয় একটু কাজল এঁকেছে, আর কিছু না। ও ট্রেটা টেবলের ওপর রেখে, বাবার জন্য চা তৈরি করার উদ্যোগ করে বলল, স্নান না করেই।
বাবা মাঝখানেই বলে উঠলেন, এত দিন পরে গবা বাড়িতে এসেছে, ওর সঙ্গে আগে একটু বসি। হ্যাঁ, তারপর?
বাবা আমার দিকে তাকালেন। আমি তিতিরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বললাম, তা এক রকম কটেজ ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারো, আর সে সব কাজ করতে আমার ভালই লাগত।
ভাল লাগত? অবাক না, ক-কৌতূহল বাবার স্বরে।
আমি বললাম, হ্যাঁ, উডেন পেটি বা বোর্ড বকস বানানোর কাজ খারাপ লাগত না।
কিন্তু তুই যে বললি, গ্রেট টর্চার?
হ্যাঁ, গ্রেট টর্চার, সেটা হল জেলের অন্য ব্যাপার। ওয়ার্ডার আর প্রিজনারদের ব্যাপার, জেলের সিসটেমের ব্যাপার। দ্য হোল সিসটেম ইজ হরিবল। ইউ ক্যান সেহোয়াট ইজ দ্যাট? দ্যাট’জ এ–এ (আমি, একসাইটেড ফিল করছি।) ফ্যাক্টরি ফর ক্রাশিং হিউম্যানিটি।
লেকচারিং?’ বাবা ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকালেন, তার ডান ভুরুর ওপরে শক্ত মোটা এবং প্রায় কালো চুলের একটা গোছা।
বাবার কথা শুনে আমি প্রায় থ–থতিয়ে গেলাম, ঘাড় নেড়ে বললাম, না।
তবে আমাকে ও সব শুনিয়ে লাভ কী। বাবা বললেন, আমি ও সব জানি, সিসটেম অব দ্য জেল, তোমার মানবতা ধ্বংসের কারখানা। সকলেই জানে, ওখানে রেকটিফিকেশন–আই মিন শোধনের জন্য কাউকে আটকে রাখা হয় না। যদিও আমরা জানি, জেলখানাকে আমরা কয়েদিদের স্বর্গরাজ্য করে তুলছি।’ বলে বাবা, বাঁ চোখের পাতা বুজিয়ে ভঙ্গি করে হাসলেন, এবং তিতির বাবার সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দেওয়ার সময়, ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, বসো পাখি, কোনও কাজ নেই তো এখন?
না। বলে তিতির আমার দিকে এক বার দেখল, দৃষ্টি দেখে মনে হল, ও যেন আমার কনসেন্ট চাইছে, বসবে কি না, যদিও ও বসল।
আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলাম, পাঞ্জাবির হাতাটা ঠোঁটে বুলিয়ে নেবার সময়, বাবা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার পকেট থেকে বের করে, আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, এবং এটা নতুন ব্যাপার কিছু না। আমি বললাম, হয়তো তুমি জানো, কিন্তু ওয়ার্ডার আর কয়েদিরাও সকলের মতো জানত, আমি এক জন–মানে এক জন ইয়ে, বিশিষ্ট ম-মহিলাকে দিনের বেলা রাস্তায় জোর করে ধরে চু–চু—-’
বাবা বলে উঠলেন, চুমো, যা তুই মরে গেলেও পারবি না।’
ঠি–ট–ঠিক।আমি ঘাড় কাত করে বলতে গিয়ে, তিতিরের দিকে চোখ পড়ল, ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল, ওর মুখ যেন একটু লাল। আমি বললাম, সে কথা বলে, ওয়ার্ডাররা আমাকে, যা সব গালাগাল দিতে।
খিস্তি দেওয়া যাকে বলে। বাবা বললেন।
আমি বললাম, হ্যাঁ, খুব ইয়ে–মানে যাচ্ছেতাই। প্রথম দিকে দু-একবার সত্যি ঘটনাটা তাদের বোঝাতে চেয়েছিলাম, তারা আমার গালে থাপ্পড় মেরে দিত, আর কয়েদিরাও আমার এমন পেছনে লাগত, আর খারাপ খারাপ কথা বলত, হোয়াট য়ু ক্যানট আটার, আর ইভন রাত্রে শোবার সময়ও তারা খারাপ মজা করার জন্য, আমাকে অলমোস্ট ফিজিক্যালি টর্চার করত।
বাবা হাত তুলে বললেন, ও সব শুনে আমার কোনও লাভ নেই, দোজ আর ভেরি কমন অ্যাফেয়ার্স ইন জেল। তুই এ সব থেকে কী শিক্ষা নিয়েছিস বল।
শিক্ষা?’ অবাক হয়ে বলে আমি এক বার তিতিরের মুখের দিকে দেখলাম, ও আমার দিকেই চেয়ে রয়েছে।
বাবা বললেন, হ্যাঁ, শিক্ষা।
আশ্চর্য, এর থেকে কী শিক্ষা নেব, আমি বুঝতে পারছি না। বললাম শি–শি–শিক্ষা মানে, আমি দেখলাম, এটা একটা ম্যাডনেস, এক জন নিরীহ মানুষের ওপর গ্রেট টর্চার, যাকে বলা যায়, খুবই ইয়ে, দু–দুদ–দুঃখজনক।
দুঃখজনক! শোনো আমার মদনমোহনের কথা। বলে, বাবা তিতিরের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে আমাকে দেখালেন, আর তিতির মুখে আঁচল চেপে, কোনও শব্দ না করে হাসছে, বুঝতে পারছি ওর শরীর কাঁপছে দেখে, মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
মদনমোহন আমার ভাল নাম, যা বাবা নরম্যালি বলেন না, কিন্তু বাবা এত ইয়ে, মানে হতাশ হয়ে পড়লেন কেন? তিনি আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে, একটু যেন একসাইটেড হয়েই বললেন, আরে গাধা, লায়লী সিং তোর সঙ্গে যেভাবে মেলামেশা করত, তাতে, সে তোর কাছে কী চাইত, তা বুঝতিস?
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না তো।
বাবা চেয়ারে হেলান দিয়ে, হাত নেড়ে, তিতিরের দিকে তাকালেন। তিতিরের হাসিটা একটু থেমেছিল, ও মুখ নিচু করে আবার সাইলেন্টলি হেসে উঠল। বাবা আবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর বোঝা উচিত ছিল, উজবুক। বুঝতে পারলে, ওর চাওয়াটা তুই যদি মিটিয়ে দিতে পারতিস, তা হলে, মাতাল হয়ে ও রকম একটা কাণ্ড করত না।
সে আবার কী। কী চেয়েছিল লায়লী সিং আমার কাছে? তা ছাড়া মাতালরা ভেবে চিন্তা করে কিছু করে নাকি? আমি বাবার আইডিয়াটা ঠিক ধরতে পারছি না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী চেয়েছিল লায়লী সিং।
বাবা যেন রেগে উঠলেন, পরে চোখের কোণ দিয়ে তিতিরের দিকে তাকালেন, এবং তিতির হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে, প্রায় অস্পষ্টভাবে আমি আসছি মেসোমশাই’ বলেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি হা করে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম, তারপরে বাবার দিকে তাকালাম। বাবা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যে, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তার চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে, সিগারেট বের করে আমার দিকে এগিয়ে ধরলেন, আমি চমকে উঠলাম, আমার এ দিকে কোনও মনোযোগ ছিল না, কিন্তু আমি এত পারটারবড, স্মোক করতে ইচ্ছা করল না, বললাম, পরে হবে।’
বাবা সিগারেটটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে, লাইটার জ্বালিয়ে ধরালেন, একমুখ ধোঁয়া ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুই কিছুই বুঝতে পারিসনি?
আমি একটু ভেবে বললাম, তুমি যদি আমাকে ইয়ে—মানে লায়লী সিং এর সাইকোলজির কথা বলো–মানে, হোয়াট ইজ দ্য সাইকোলজি বিহাইন্ড হার–
নো মোর অব দ্যাট, কাম স্ট্রেট।
শি ইজ এ পারভার্ট!
তপনের স্ত্রীও। এনি হাউ, তাতে কী হল বল।
মানে, আমি বলছি, পারভারশন ফর পারভারশন, তা আমার কী করে হবে?
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে, আস্তে আস্তে সিগারেটে টান দিতে লাগলেন। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে, য়ু ডিড নট লাইক হার?
আই লাকইড হার। আমি ঘাড় কাত করে বললাম, খুবই হাসিখুশি জোভিয়াল মহিলা, কিন্তু ও কোনও কোনও সময় ইয়ে হয়ে যেত, মানে
হুম। বুঝেছি।’
আমি একটু স্বস্তি বোধ করলাম, বাবাকে আমি বোঝাতে পেরেছি। আবার বললাম, তা ছাড়া আ– আর একটা কথা, ড্রাঙ্কেন অবস্থায়, কে কী করতে পারে, তার কিছু ঠিক থাকে? ওহ, শি বিকামস সো ওয়াইল্ড!
দাঁতালো বুনো শুয়োর। বাবা বললেন, য়ু ডোন্ট নো, হোয়াট দে মে ডু। যাই হোক গবা, জগৎ সংসারটাকে, জগৎ সংসারের মতো করে একটু বোঝবার চেষ্টা কর। তোকে আমি অনেক কিছুই বলেছি, কোনওটাই তোর ঠিক মনের মতো হয়নি, আমি জানি। কিন্তু এ ঘটনা থেকে তোর একটা শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। ব্যাপারটা এমন একটা জায়গায় চলে গেছল, ইট ওয়াজ বিয়ন্ড মাই ক্যালকুলেশন–সে জন্য আমি আমার জানাশোনা কারোকেই দোষ দিতে পারি না। এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে কয়েকটা স্টেট তার পেছনে লেগে গেছল, সেটাও একটা কনসপিরেসি। এ সব জেনেশুনে, আর এদেরই মধ্যে তোকে থাকতে হবে, তোকে তোর নিজের ওয়ে আউট খুঁজে নিতে হবে।’..
আমি ভাবলাম, বাবা থামবেন, কিন্তু সিগারেটে টান দিয়ে, আবার বললেন, ফুচকি ওর স্বামীর সঙ্গে ইলেকশন ক্যাম্পেনে বেরিয়েছে, অ্যান্ড আই বিলিভ ইট হান্ড্রেড পারসেন্ট, দে আর গোয়িং টু মেক দ্য মিনিস্ট্রি। তুই যদি চাস, অপজিট পার্টি থেকেও দাঁড়াতে পারিস, আই শ্যাল অ্যারেনজ ফর এ টিকেট। দেন, হোয়েন য়ু গেট ইনসাইড, সি হোয়াট দি ওয়ার্ল্ড ইজ লাইক। (দিস ইজ লাইফ-মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা মনে পড়ে গেল, যদিও বাবা, সে ভাবে কিছু বললেন না।) আমি তো তোকে আগেই বলেছি, ছুরিটা নিয়ে বোর্ডে মেরেই দ্যাখ না, লক্ষ্যভেদ হলেও হয়ে যেতে পারে।
বাবার সেই কথা, যা আমার কাছে একেবারেই অ্যাবসার্ড মনে হয়, কারণ আমি পারব না বলেই বোধ। হয়। বাবা আমাকে কিছু বলতে ইনসিস্ট না করে, আবার বললেন, যা তোক কোনও কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়। দিল্লিতে যে তোর কিছু হবে না, আমি তা জানতাম, কিন্তু মমতার ভীষণ ইচ্ছা ছিল, তোকে নিয়ে যায়, আমি সেটা বুঝি, আই পিটি হার। বলতে বলতে বাবা উঠে দাঁড়ালেন, সিগারেটটা চায়ের কাপে ফেললেন, টেবলে কোনও অ্যাশট্রে ছিল না, তারপরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তিতিরের সঙ্গে আলাপ হয়েছে?
আমি দাঁড়িয়ে বললাম, হয়েছে।’
বাবা সিগারেটের প্যাকেটটা নিলেন না, লাইটারটা পকেটে রেখে বললেন, আত্মীয়তার কথা আমি কিছুই জানি না, সে সব জানাবারও কেউ নেই, এক দিন একটা চিঠি দিল ওর অবস্থা জানিয়ে, তারপরে চলে এল। আমিও থেকে যেতে বললাম। লোকে অবিশ্যি অনেক কিছু বলাবলি করছে, আমার পরিচিতরাই, তা বলুকলেট দেম, তোর কেমন লাগল ওকে?
এ রকম একটা জিজ্ঞাসার জন্য রেডি ছিলাম না, তাই একটু অবাক হলাম। বাবা আমার ভাল লাগা বা না-লাগার কথা জিজ্ঞেস করছেন? নরম্যালি এ রকম করেন না। আমি বললাম, ভা–ভাল, মানে বেশ ভাল।
বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন, শব্দ করলেন, হুম!’ চলে যেতে উদ্যত হয়ে বললেন, আমি চান-টান করি গিয়ে, পরে আবার কথা হবে। দ্যাট হোকস জগৎ বিশ্বাস আর তুই একই কুপেতে এসেছিস?
আমি অবাক হয়ে বললাম, হ্যাঁ, তুমি জানলে কী করে?
আমাকে অফিসে টেলিফোন করে বলছিল, রেভ্যুলেশ্নরি, হুঃ!’
আমি বললাম, শিক্ষা মন্ত্রকের মিঃ চ্যাটার্জি।
জানি। বাবা বললেন, ওরা স্বামী-স্ত্রী এসেছে, তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আমাকে টেলিফোনে বলছিল। শুনলাম, সেই চন্দন সিংও নাকি লায়লীকে নিয়ে এসেছে?
বাবার দেখছি কিছুই জানতে বাকি নেই, বললাম, হ্যাঁ।
বাবার মোটা ভুরু কোঁচকাল, একটু যেন আনমাইন্ডফুল হয়ে গেলেন, শব্দ করলেন, হুম!তারপরে জুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাবা যেন কিছু ভাবলেন, যা বললেন না, এবং একটা কিছু বোধ হয় তার মাথায় এসেছে, ভেবে আমি কেমন অস্বস্তি বোধ করছি। বাবাকে আমি বুঝতে পারি না, একেবারে পারি না, তা না, পুরো মানুষটিকে বুঝে ওঠা কঠিন। তাকে আমি কখনও মাতাল হতে দেখিনি–অথচ অনেক ড্রিঙ্ক করতে দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বাবার মাতাল না হওয়াটা কেমন যেন ইয়ে, অস্বস্তিকর, মনে হয়, হওয়া উচিত ছিল। বাবা আসলে ব্যারিস্টার, মাত্র বছর। খানেক নাকি কোর্টে গিয়েছেন, তারপরে আর যাননি। বাবা যে কী করেন, তাও আমি সঠিক কিছুই জানি, বাড়ির কারোর মুখেও সঠিক কিছু শুনিনি, বোধ হয় ব্যবসা-ট্যাবসা করেন, তবে নানান অ্যাসোসিয়েশনের তিনি, যাকে বলে প্রধান, তা-ই। রোটারি থেকে নানান ক্লাবের মেম্বার। সেগুলো পোস্টাল চিঠিপত্র থেকেই অনেক সময় জানা যায়, তবু বলব, দেবাদিদেব মহাদেব মুখোপাধ্যায় চিরদিনই আমার কাছে যেন কেমন রহস্যময়।
Chapter - 4
‘আসতে পারি?’ বারান্দার খোলা দরজার সামনে তিতির দাঁড়িয়ে।
আসু–ওহ, এসো। আমি ওকে ডাকলাম। তিতির এল, ওর চোখ আমার দিকে, কিন্তু কী একটা চেঞ্জ যেন দেখছি ওর চেহারায়। পোশাকে না, অথচ কী একটা চেঞ্জ
কী দেখছেন বলুন তো?
ওহ, আশ্চর্য, কিছুই না, কপালে একটা হালকা গোলাপি রঙের টিপ এঁকেছে। বললাম, কপালে টিপটা তুমি এখন পরে এলে, না?
আশ্চর্য, এত সূক্ষ্ম আপনার দৃষ্টি?’ বলতে বলতে ও টেবলের সামনে এল, বলল, আর দিনের বেলা। রাস্তার ওপরে, আপনাকে যে যা খুশি করে যাবে, আপনি তাই করে যেতে দেবেন?
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে?
তাই তো ঘটেছে। লায়লী সিং এসে আপনাকে যা খুশি তাই করে চলে গেল, আপনি কিছুই বললেন না?’ তিতির যেন সিরিয়াস একটা অ্যালিগেশন নিয়ে এল। আমি প্রথমটা কিছু বলতেই পারলাম না। কয়েক সেকেন্ড পরে বললাম, সিচুয়েশনটা তুমি বুঝতে পারছ না। আমি আনমাইন্ডফুলি হাঁটছিলাম, আমি ভাবতেই পারিনি, হঠাৎ কোথা থেকে কী ঘটে গেল।
আপনি লায়লী সিং-এর চুলের মুঠি ধরে, এক থাপ্পড় মারলেন না কেন?
মানে? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে দেখলাম, তিতিরের চোখে মুখে রাগ যেন ইয়ে, মানে দপদপ করছে।
তিতির রীতিমতো শার্প ভয়েসে বলল, মানে আবার কী, আপনি যেই দেখলেন, আপনাকে জড়িয়ে ধরে সে ওই সব করছে, আপনি কেন ওকে একটা ধাক্কা মারলেন না, ফেলে দিলেন না? তারপরে যা হয় হত, দেখা যেত।
কী অ্যাবসার্ড কথা বলছে তিতির! ওকে ঠিক এতটা হেডস্ট্রং তো আমার মনে হয়নি। জিজ্ঞেস করলাম, হোয়ার আই হ্যাড দ্যাট অপরচুনিটি? তা ছাড়া, এক জন–সে যাই হোক–এক জন মহিলাকে আমি হিট করার কথা ভাবতে পারি না।
তার মানে আপনি– তিতির থেমে গেল, মুখটা এক বার নামাল, আবার তুলল, বলল, আপনি এনজয় করেছিলেন।
হোয়াট এ ডিসকভারি! আমি বলে উঠলাম, আর কেমন যেন মেজাজটা, যা আমার হয় না, খারাপ হয়ে গেল, আমি ওর কাছ থেকে সরে গেলাম। মনে হল, শি টু ইজ ম্যাড এগেন, এও একটা ম্যাডনেস ছাড়া আর কিছু না। আমি বারান্দায় বেরিয়ে এলাম, লাল করবী গাছটা যেখানে উঠে এসেছে, তার সামনে রেলিং ধরে দাঁড়ালাম, কিন্তু আমার খারাপ লাগছে, এভাবে তিতিরের কাছ থেকে চলে আসার জন্য। আমার ওকে বোঝাতে পারা উচিত ছিল, বাট অলমোস্ট আমার মুখে একটা থাপ্পড় মারার মতো হঠাৎ এমনভাবে কথাটা বলেছে, যা আটার ননসেন্স, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। এখন ভারী খারাপ লাগছে।
হঠাৎ একটি হাত আমার বাঁ দিকে রেলিঙের ওপরে দেখতে পেলাম, আর পাশ ফিরে দেখলাম, তিতির আমার থেকে ফুট খানেক দুরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ নামিয়ে নীচের দিকে দেখছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই, ও মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল, ওর মুখটা অন্য রকম দেখাচ্ছে, যেন ছায়া পড়েছে মুখে। নিচু স্বরে কেমন একটা দুঃখ ফুটল ওর, বলল, অন্যায় হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি। রাগ করেছেন?
না না। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আমার খুব খারাপ লাগছে, আমি তোমাকে ব্যাপারটা ইয়ে– মানে–মানে বোঝাতে পারিনি। আমি কখনও মিথ্যা বলি না।
বুঝতে পারছি।’ তিতির বলল।
আমি বললাম, আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই যদি একটা ইনসিডেন্ট ঘটে যায়, আমি কী করতে পারি বলল।
তিতির বলল, আর বলতে হবে না, আমি বুঝতে পেরেছি। বলেই তিতির যেন কেমন এক রকম করে হেসে উঠল, আর মনে হল, ওর মুখের স্বাভাবিক রং ফিরে এসেছে, এবং দৃষ্টির সেই ডিপ অথচ ঝলকানো ভাবটাও। ও একটু সরে গিয়ে, ঘাড় ঝাঁকিয়ে ডেকে বলল, ঘরে আসুন।
বলতে বলতে ও আমার ঘরের দিকে গেল, আর ওর পিছনে যেতে যেতে মনে হল, তিতির যেন কেমন মিস্টিরিয়াস হয়ে উঠেছে, এতক্ষণ ও যেন আমার সঙ্গে ইয়ে–ওটাকে বলে, রহস্য করল একটা। আমি ঘরে ঢুকতে, তিতির সিগারেটের প্যাকেট খুলে সিগারেট বের করল একটা। তারপরে টেবলের ড্রয়ার খুলে একটা লাইটার বের করল, যেটা খুবই চেনা, আমি ব্যবহার করতাম। তিতির আমার সামনে এগিয়ে এসে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নিন।
আমি ভেবেছিলাম, ও নিজেই বুঝি স্মোক করতে যাচ্ছে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু না, অনেক মেয়েরাই স্মোক করে। আমি সিগারেটটা নিয়ে ঠোঁটে তুলতেই, তিতির লাইটারটা জ্বালল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এতে ফুয়েল ছিল?
তিতির আগুনের শিসটা আমার সিগারেটের সামনে তুলে বলল, ছিল না, আমি ভরেছি।
আমি সিগারেট ধরালাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি স্মোক করো?
এখনও না।’ তিতির ফুঁ দিয়ে শিসটা নেভাল। ভবিষ্যতে করবে কি না, সে কথা জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই।
তিতির বলল, ঘটনাটা যখন প্রথম শুনি, আমি মনে করেছিলাম, সত্যি। সত্যিই আপনি ও রকম কাজ করেছেন। কিন্তু আপনি কিন্তু সত্যি সৌভাগ্যবান।
সৌভাগ্যবান! তার মানে কী, আমার কী সৌভাগ্য তিতির দেখতে পেল। জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কী রকম?
তিতির বলল, আপনি আপনার সোসাইটি আর ফ্যামিলি থেকে স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন।
স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন, দুটো রীতিমতো কঠিন বাংলা কথা শুনে, আমি তিতিরের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তাকিয়ে রইলাম, মানে ভাবলাম, তিতিরের আসল ইয়েটা কী বক্তব্যটা।
তিতির আবার বলল, কিন্তু হাউ, এটা সম্ভব হল কী করে, বুঝতে পারি না। আপনি তো এ ফ্যামিলিতেই জন্মেছেন, মানুষ হয়েছেন?
হ্যাঁ, তা-ই তো।’
স্ট্রেঞ্জ! আপনার এ কথা মনে হয়নি, এ বাড়ির কারোর সঙ্গে আপনার কোনও মিল নেই?
হবে না কেন, হয়েছে। কিন্তু এ বাড়ির কারোর সঙ্গেই কারোর মিল নেই, সবাই এক-এক রকম।
তা জানি, তবু মিল ছাড়াও পদ্ম হয়, তা জানেন তো?
পদ্ম? ওহ, য়ু মিন কবিতা? হ্যাঁ, অমিল–মানে গদ্যকবিতা হয়।
কিন্তু তারও একটা ছন্দের মিল আছে।’
শুওর, থাকতেই হবে, এমনকী আমি গদ্য ছন্দের গানও শুনেছি।
আপনি ছাড়া, আপনাদের ফ্যামিলির সকলের মধ্যেই সে রকম একটা মিল আছে, গদ্য কবিতার ছন্দের মতো। সেইজন্যই আপনাকে আমি স্বতন্ত্র বলেছি।
ওহ, আচ্ছা!’ বলেও আমি সমস্ত ব্যাপারটা ভাবতে চাইলাম। তিতির ব্যাপারটাকে ঠিক কী আউটলুকে বিচার করছে, আমি পুরোটা ধরে উঠতে পারছি না।
তিতির বলে উঠল, কী হল, চিন্তিত হয়ে পড়লেন?
ভাবছি।
নো, প্লিজ।’ বলে তিতির হেসে উঠল, আর এই প্রথম আমি দেখলাম, তিতিরের জামার কাটটা অদ্ভুত, কেন না, এখন আঁচলটা হঠাৎ খসে গিয়েছে, দেখলাম, ওর সবুজ জামাটার গলা ঘটির মতো গোল, গলা ঘিরে আছে, কিন্তু স্লিভলেস।
তিতির জিজ্ঞেস করল, নীচে যাবেন না?
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, নীচে কোথায়?
আপনাদের বাড়িরই নীচের ঘরে?
কেন?
বাহ্, সেখানেই তো যত মজা। ড্রিঙ্ক টেবলে কত মজার মজার কথা হয়, আমি এনজয় করি। আপনাদের বাড়ির নীচের তলা তো সন্ধেবেলা একটি হরেক জিনিসের কারখানা।
তা ঠিক, জানি, সন্ধেবেলা আমাদের বাড়ির নীচের তলার পরিবেশ অদ্ভুত। অনেকটা, অনেক নাটকের দৃশ্যের মতো। কিন্তু তিতির–তিতির কী এনজয় করে? জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ড্রিঙ্ক করো নাকি?
এখনও না।
স্মোকের মতে, একই উত্তর, যদিও সোজাসুজি না বলছে না। আবার বলল, এই এক বছরে, অনেকেরই সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেছে, তাদের কথাবার্তা শুনতে আমার খুব মজা লাগে। সিনেমা, থিয়েটারের থেকেও। আপনি কখনও যান না?
হ্যাঁ, গেছি, মাঝে মাঝে মন্দ লাগে না, মজাও পাওয়া যায়, কিন্তু রোজ রোজ ভাল লাগার মতো কিছু আছে বলে মনে হয়নি।
তিতির আমার চোখের দিকে ওর সেই চোখে তাকিয়ে, দু-এক সেকেন্ড চুপ করে রইল, আর ঠোঁট টিপে হাসল। বলল, এখন আমার কী মনে হচ্ছে জানেন?
কী?
এ ফ্যামিলির লোকদের সঙ্গে, তাদের ঝি-চাকরের যা আন্ডারস্ট্যন্ডিং আপনার তাও নেই।
সে আবার কী, ঝি-চাকরের সঙ্গে আন্ডারস্ট্যান্ডিং?
বুঝলেন না? ঝি-চাকররা তাদের মনিবদের বোঝে, মনিবরা তাদের বোঝেন, কিন্তু আপনি সেখানেও একসেপশন, আপনি তাদের বোঝেন না, তারাও আপনাকে বোঝে না। ওরা কী মনে করে জানেন? দিল্লির ঘটনা যা রটেছিল, তা-ই সত্যি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি? কিন্তু এ সব নিয়ে ভাববার কথা আমার মনেই হয়নি।
ন্যাচারেলি।
এ বার আমার ইয়ে, মানে খেয়াল হল, ও বেলা সবাই যেন আমার দিকে কেমন করে দেখছিল। নমস্কার ইত্যাদি করা বা হাসা সত্ত্বেও, ওদের সকলেরই দৃষ্টি কেমন এক রকম ছিল, যেন আমাকে নতুন একটা মানুষ দেখছে। বললাম, হ্যাঁ, সকালবেলা ওদের তাকানো আর এক্সপ্রেশন দেখে, আমি একটু অবাক হয়েছিলাম।
তিতির যেন অবাক হয়ে, ভুরু কুঁচকে, ঘাড় কাত করে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই নাকি?
হ্যাঁ, তোমার কথায় এখন ক্লিয়ার হয়ে গেল।বলে আমি হাসলাম, সিগারেটে টান দিলাম।
তিতির এখনও চোখ নামায়নি, দেখছে, কেন? আমি চোখ ফিরিয়ে নেব কি না ভাবছি, ও বলল, আপনি কি মিস্টিরিয়াস না আর কিছু, আমি বুঝতে পারছি না।’
আমি বললাম, বাবা ছাড়া, আর সকলেই আমাকে একটু ইয়ে মানে বোকা ভাবে।
তিতির কোনও জবাব দিল না, কিন্তু কিছু না বলে, আনমাইন্ডফুল দৃষ্টিতে বাইরের বারান্দার দিকে তাকাল, আর আমার হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে যেতেই, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওহ, তিতিতির, ওবেলা তুমি হিরাকে কী বলছিলে? আমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আর হিরাটা যেন কেমন বদলে গেছে এই তিন বছরে।
তিতির আমার দিকে তাকিয়ে বলল মনে হচ্ছে আপনার? মনে করে দেখুন, ওবেলা আপনাকে আমি, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যাবার কথা বলেছিলাম কিনা? সেটা হিরার জন্যই বলেছিলাম। হিরা এ বাড়িতে সাত বছর বয়সে এসেছিল, এখন কুড়ি। ওর বয়সের সঙ্গে ও বদলেছে, তার সঙ্গে বদলেছে এ বাড়ির চাকর, খানসামা, ঠাকুরদের জগৎটাও। শি ইজ ইন
তিতির থেমে গেল, কী যেন শুনল একটু পাশ ফিরে, তারপরে হঠাৎ দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, আমি মেসোমশাইকে খাবার দিয়ে আসছি।’
তা ঠিক, বাবা বরাবরই বিকালে ফিরে এসে স্নান করে কিছু খাবার খান। আজ তার ব্যতিক্রম হয়ে গেল, আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চা-পান। কিন্তু তিতির কী শুনতে পেল যে, এ রকম করে ছুটে গেল। আমি তো কিছু শুনতে পাইনি। দিল্লি যাবার আগে দেখেছি, বৈদ্যনাথ খানসামাই মেইনলি বাবার দেখাশোনা করত, এখন সেটা তিতির করছে, বোঝা গেল। বাবার ঘরটা তো আমার একটা ঘর ছাড়িয়ে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পরে, সেকেন্ড। তিতির আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ-ই কী এমন শুনতে পেল। অবিশ্যি অনেকেই এ রকম পায়, বৈদ্যনাথকেও দেখেছি, যেখানেই থাকুক, বাবার দরকারের সময়ে, সে ঠিক হাজির হয়েছে। কিন্তু তিতির যেন কী বলছিল, বলতে বলতে সাডেনলি চলে গেল হ্যাঁ, মনে পড়েছে, শি ইজ ইন’–মানে হিরার কথা বলছিল, হিরা ইজ ইন–হোয়াট? লাভ? ডেঞ্জার? ডায়লেমা? অনেক কিছুই হতে পারে। তার আগের কথাগুলো যেন কী বলছিলা, হিরা সাত বছর বয়সে এ বাড়িতে এসেছিল, এখন কুড়ি, এখন ও বদলেছে, ওর সঙ্গে ঠাকুর, চাকর, খানসামাদের জগৎটাও। অদ্ভুত। কথাটার মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত মিনিং আছে বলে মনে হচ্ছে না? হিরার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আর একটা জগৎও বদলে গিয়েছে। চাকর, ঠাকুর, খানসামাদের জগৎ। হোয়াট কাইন্ড অব চেঞ্জ, বদলে যাওয়াটা কী রকম? আমি সত্যি রীতিমতো কিউরিয়াস হয়ে উঠছি–ঘরটা কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে, সন্ধের ছায়া নেমেছে। আমি সরে গিয়ে সুইচ টিপলাম, আলো জ্বলল, আর এই প্রথম দেখলাম, আমার ঘরের আলো নতুন শেডে ঢাকা। নন-ট্রান্সপারেন্ট কাচের চৌকো শেডের গায়ে, ট্রান্সপারেন্ট রানিং হর্স, আলো বেশ সফট। আর একটা সুইচ টিপলাম, আর এক দিকে আর একটা শেড, তার গায়ে ট্রান্সপারেন্ট ফুলের গুচ্ছ, দুইয়ে মিলে কী দাঁড়ায়, জানি না, কিন্তু দেখতে সত্যি সুন্দর লাগছে। আমার ঘরের যে অনেক চেঞ্জ হয়েছে, এই শেড দুটোও তার কারণ, ওবেলা আমার চোখে পড়েনি, দেওয়ালের গায়ে সেই ছবি দুটোর দিকে দেখলাম, আলোয় একটা নতুন এফেক্ট এসেছে। বড় বেশি সুন্দর লাগছে না ঘরটাকে? এত সুন্দর ঘরে আমি থাকিনি, এমনকী আমার খাটের ওপর বিছানায় পাতা বেড কভারটাও যেন কেমন হয়ে উঠেছে। এমনিতেই সেটা সুন্দর, কোন দেশের তৈরি, আমি জানি না, কিন্তু এখন আলোয়, বিছানাটা যেন বদলে গিয়েছে, যা মনের মধ্যেও কেমন একটা ইয়ে এফেক্ট সৃষ্টি করে। তিতির। হ্যাঁ, তিতির অনেক কথা বলছিল তখন, আমাকে আর আমাদের ফ্যামিলির বিষয়ে, অনেকটা হিরার সঙ্গে একটা জগৎ বদলে যাওয়ার মতোই, মিনিংফুল গদ্যকবিতার ছন্দের অমিলের মিল। তার মানে, ও কী বলতে চাইছিল? পার্সোনালিটির যে কোনও তফাতই থাক, আসলে, আমাদের ফ্যামিলির বাকি সকলের মধ্যে একটা মিল আছে? আমার তা নেই? তার মানে কী? আমি একেবারে ইয়ে–ওটাকে বলে বংশছাড়া? তা আবার তিতির ঢুকল ঘরের মধ্যে, আমি বলে উঠলাম, হ্যাঁ, শি ইজ ইন–?
তিতির ওর সেই চোখে, অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ঘরের আলোয়, ওকেও যেন অন্য রকম দেখাচ্ছে, ওর সবুজ শাড়ি, জামা ব্যাকব্রাশ টানা চুল আর পিছন থেকে উঁকি দেওয়া খোঁপা আর ওর মুখের আর হাতের রং আর কপালের ফোঁটা, সবই যেন কেমন বদলে গিয়েছে, এবং চোখের পাতার ছায়ার নীচে আমি ওর চোখের তারা দুটো দেখতে পাচ্ছি না। ও যেন–সেই কী বলে–একটা আনরিয়্যাল অ-অপরূপ ছবি। বলে উঠল, মানে?
আমি বললাম, হিরার কথা বলতে বলতে হঠাৎ চলে গেলে, শি ইজ ইন–হোয়াট?
তিতির অল্প একটা শব্দ করে হেসে উঠে বলল, তখন থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা-ই ভাবছেন নাকি?
না, আরও অনেক কথাই ভাবছিলাম, কিন্তু হিরার কথা যেভাবে তুমি বলছিলে, আমি খুব কিউরিয়াস হয়ে উঠেছি, ভাবতে চেষ্টা করছিলাম, শি ইজ ইন হোয়াট? লাভ? ডেঞ্জার? ডায়লেমা? এমনি সব।
যে তিনটি বললেন, হিরা সেই তিনটিতেই পড়েছে বলে তিতির টেবলের দিকে দেখল, বলল, এখনও কাপ-ডিশগুলো নিয়ে যায়নি। আপনি বসুন।’
পরের কথাগুলো আমার কানে ঢুকল না, তিতির যেন কেমন মিস্টিরিয়াস হয়ে উঠেছে। আমি চেয়ারে বসলাম, তিতির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আমি ভাবলাম, হিরা ভালবাসায়, বিপদে, ওটাকে কী বলেসংশয়, সংশয়ে পড়েছে একসঙ্গে? অদ্ভুত তো? এ রকম হয় নাকি? এক মিনিট না যেতেই, তিতির ফিরে এল, ওর পিছনে পিছনে হিরা। হিরা এখন লাল রঙের শাড়ি পরেছে, কাপড় দিয়ে সারা গা ভাল করে ঢাকা, তবু বুকের কাছে আঁচলটা টেনে টেনে ধরছে। ও প্রায় কালো, একটু শর্ট, শরীরটা যাকে বলে ম্যাসিভা, এ ছাড়া আমার আর কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্তু ওর মাথা-নিচু সেই খুবই। লাজুক ভাবটা আছে। ওর চকচকে মাথার চুলে, চকচকে খোঁপা, কানে দুটো চিকচিক করে কী দুলছে, হাতেও বোধ হয় চুড়ি, যা আমার ও বেলা চোখে পড়েনি, এখন বিশেষ করে পড়ল, তিতিরের মুখে ওর বিষয়ে অদ্ভুত কথা শুনে। ও টেবলের ওপর থেকে কাপ-ডিশগুলো ট্রেতে তুলে নিয়ে, দরজার দিকে চলে গেল, তিতির বলল, যা বলেছি, তা মনে রেখো। ও রকম জড়ভূতের মতো থেকো না, বুঝলে?
হিরা মুখ ফিরিয়ে ঘাড় কাত করল, আর খুব তাড়াতাড়ি আমার দিকে এক বার দেখল, মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। আমি তিতিরের দিকে তাকালাম।
তিতির যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়ে, আমার সামনে চেয়ারে এসে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জড়ভূতের মতো থেকো না মানে বুঝলাম না।
তিতির ওর সেই ডিপ অথচ ঝলকানো চোখে, দরজার দিকে এক বার ইশারা করে দেখিয়ে বলল, এখন যে রকম করছিল, ওটাকেই জড়ভূত ভাব বলে, যেন ভয়ে একেবারে কেঁচো হয়ে আছে, মুখ তুলতে পারছে না, সবসময়ই আড়ষ্ট। ওকে ইজি হতে বললাম, আর বলে দিয়েছি, এখন থেকে ও বেশির ভাগ সময় ওপরেই থাকবে, আপনার দেখাশোনা করবে।
আমার? হিরা? কে–কেন? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। বিশেষ এক জনকে, আমার দেখাশোনা কখনও করতে হয়নি। তিতির এ রকম একটা নিয়ম চালাতে চেষ্টা করছে কেন?
আমার অবাক হওয়াটাকে তিতির যেন তেমন একটা ইয়ে করল না, বলল, হিরাকে আমি একটু সেপারেট রাখতে চাই, এত দিন সে রকম কোনও চান্স পাচ্ছিলাম না, এখন আপনার দেখাশোনার নাম করে, বেশির ভাগ সময় ওকে দোতলায় রাখব। মেসোমশাইয়ের সঙ্গেও আমার কথা হয়ে গিয়েছে।
আমি ইতিমধ্যেই হা করেছিলাম, বললাম, তাই নাকি?
তিতির ঘাড় কঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ। তখন যে আপনাকে বলছিলাম, হিরার তিনটেই হয়েছে, সেজন্যই ওকে একটু সরিয়ে রাখবার দরকার হয়েছে।
তিতির আমার চোখের দিকে তাকাল। এখন কাছাকাছি আমি ওর চোখের তারা দুটো দেখতে পাচ্ছি। আমি এখনও হা করে আছি। তিতির বলল, জানেন তো, প্রেমে পড়লে অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়, বিপদে পড়লে, মনে নানান সংশয় আসে?
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না তো।
তিতির যেন অনেকটা কাচের টুনটুন শব্দের মতো একটু হেসে উঠল, এক বার চোখের পাতা নামাল, আবার আমার দিকে তাকাল, বলল, আপনার কোনও অভিজ্ঞতা নেই?
নাথিং অব দ্য কাইন্ড।বলে আমি হঠাৎ তিতিরের বিষয়ে কিউরিয়াস হয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার আছে?
তিতির বোধ হয় এক্সপেক্ট করেনি, আমি এ রকম একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি, কারণ ওর সেই চোখে প্রথমে একটা চমকানো অবাক দৃষ্টি দেখলাম, তারপরে ওর মুখের রংটা কেমন বদলে গেল, ও মুখ নামিয়ে নিল, মাথা নেড়ে বলল, না।
ওর ভাবভঙ্গি থেকে আমি বুঝতে পারলাম না, সত্যি বলল না মিথ্যা বলল। আমি বললাম, আমারও না।
তিতির চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁইয়ে–ডেঞ্জার আর ডায়লেমাটা কী, আর উইথ হুম শি ইজ ইন লাভ?
সন্তোষ। তিতির বলল, কিন্তু কমপিটিটর অনেক।
কমপিটিটর মানে– প্র-প্রতিদ্বন্দ্বী?
হ্যাঁ, শিভালরি আর জেলাসি রয়েছে অনেকের মধ্যে। এ সব আপনি বোঝেন তো?’ তিতির ঘাড় কাত করে, আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমি একটু থতিয়ে গিয়ে বললাম, তা মানে, হ্যাঁ, অবকোর্স আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
তিতির ঠোঁট টিপে হাসল, আর যেন স্বস্তিবোধ করল, (আমাকে ও কী ভাবছে, জানি না।) বলল, এদের মধ্যে ঠাকুর জানকী হল সবথেকে ডেঞ্জারাস, কিন্তু সবথেকে বেশি ঠাণ্ডা আর অমায়িক।
অমায়িক?
হ্যাঁ, অমায়িক বোঝেন না, অমায়িক?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বুঝি, কিন্তু ডেঞ্জারাস অথচ অমায়িক, মানে?
সেইজন্যই ডেঞ্জারাস বলছি। সে সব সময়েই হিরাকে ভাল ভাল উপদেশ দেয়, বলে, বয়সের রক্ত গরমে, মেয়েরা অনেক কিছু করে বসে, তাদের ফুসলে ফাঁসলে (বুঝতে পারছি না।) ছোঁড়ারা খারাপ করে দেয়, তারপরে ফেলে চলে যায়। তার মানে সন্তোষের বিষয়ে ও সব বলে। অথচ জানকীর বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে, দেশে ওর বউ, ছেলে, মেয়ে, এমনকী নাতি, নাতনিও আছে। সে হিরাকে বলেছে, গ্রামে তার জমিজমা আছে, সে সব সে হিরার নামে লিখে দেবে, হিরাকে সে সুখে রাখবে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
তিতিরের ভুরু কুঁচকে উঠল, খানিকটা যেন বিরক্ত হয়ে বলল, কেন আবার, বোঝেন না, সে চায় হিরাকে সে তার কাছে রাখবে–প্রেম।
প্রেম?
হ্যাঁ, জানকীও হিরার প্রেমে পড়েছে। সে হিরাকে বোঝায় ধর্মের কথা, মেয়েদের কী ভাবে চলতে হয়, সতী কাকে বলে–মানে ভার্জিনিটি, বুঝেছেন তো? (আমি ঘাড় কাত করলাম।) তবু জানকী যখন দেখে ভাল কথায় কাজ হচ্ছে না, তখন সে ঠাণ্ডাভাবেই বলে, ভাল কথায় কাজ না হলে, হিরাকে সে এই জগৎ থেকে সরিয়ে দেবে।
কী করে? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
খাবারের সঙ্গে বিষটিষ মিশিয়ে দিতে পারে। জানকী-ই তো ওদের সবাইকে রান্না করে খেতে দেয়।
এ সব কি তিতির সত্যি বলছে? আমি ভাবতে পারি না, একটা লোক একটা মেয়েকে না পেলে বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে পারে, আবার ভাল ভাল অ্যাডভাইসনা, সেটা হতে পারে, অ্যাডভাইসটা পসিবল, আমার মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি ভাল অ্যাডভাইস করেন, আবার দিস ইজ লাইফ’ বলে ইয়ে করতে পারেন, মানে কাল রাত্রে ট্রেনে যা করেছিলেন, আমি এখনও যার মানে জানি না।
তিতির আবার বলল, রূপচাঁদ ড্রাইভারও হিরাকে চায়–চায় মানে বিয়ে করতেই চায়, সে এখনও গোলমাল? কীসের গোলমাল?
তিতির নাক কুঁচকে, ঠোঁট দুটো কেমন যেন ইয়ে–ফুলে উঠল, আর চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা নালিশ, ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, আপনি কিছু বোঝেন না। আজকাল এ রকম মানুষ আছে নাকি, এ গোলমালের মানে কী? গোলমাল মানে গোলমাল, রূপচাঁদ মতিয়ার বয়ফ্রেন্ড, বুঝেছেন? তা আপনি লাভ বলুন বা যা খুশি, ওদের একটা রিলেশন আছে, সবাই জানে। হয়তো রূপচাঁদকে হিরা বিয়ে করত, যদি না মতিয়ার ব্যাপারটা থাকত, এটা হচ্ছে হিরার ডায়লেমা, কী করবে? আফটার অল সন্তোষ সারভেন্ট ছাড়া কিছু না, সে এখানে খায় থাকে, জামাকাপড় পায়, সামান্য মাইনে পায়, তার পক্ষে ওয়াইফ মেনটেন করা সম্ভব না। কিন্তু ঠিক ভালবাসা বলতে যা বোঝায়, সন্তোষের সঙ্গেই হিরার সেটা আছে।’
আমার একটা নতুন জিজ্ঞাসা মনে জাগল, জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক ভালবাসাটা কী, মানে ভালবাসাটা কী ব্যাপার?
তিতির থমকে গেল, চুপ করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ঠিক সেই রকম, যেন কিছু খুঁজছে। প্রায় কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পরে বলল, জানি না। আমি বলতে চাইছি, সবাইকে বাদ দিয়ে, হিরা মন থেকে সন্তোষকেই চায়, কিন্তু সন্তোষের আর্থিক অবস্থা ওকে চিন্তায় ফেলেছে, রূপচাঁদ যদি মতিয়ার সঙ্গে ইনভলভড না থাকত, তা হলে হিরা ভাল না বাসলেও রূপচাঁদকেই বিয়ে করত, তাতে ওর প্রেস্টিজ বাড়ত, ভালভাবে থাকতেও পারত। এ নিয়ে রূপচাঁদের সঙ্গে সন্তোষের প্রায়ই ঝগড়া লাগে, দু-একবার হাতাহাতিও হয়ে গেছে, কিন্তু কথাটা কেউ-ই মেসোমশাইয়ের কানে তুলতে সাহস পাচ্ছে না। আপনি সব বুঝতে পারছেন, না আমি শুধু বকে মরছি।’
তিতির আমাকে কী ভাবে? আশ্চর্য! হয়তো কোনও কোনও বাংলা কথার মানে আমি সবসময়ে বুঝতে পারি না, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই বুঝতে পারছি, এবং আমার মনে হচ্ছে, আমি একটা অদ্ভুত গল্প শুনছি, যা আমাদের বাড়ির ব্যাপার বলে ভাবতেই পারছি না। বললাম, নিশ্চয়ই পারছি।’
মনে হল, তিতির আমার কথাটা বিশ্বাস করেছে। বলল, এ ছাড়াও ব্যাপার আছে। নাথু তিন-চারদিন তকে তকে থেকে, (বুঝলাম না।) রাত্রে অন্ধকারে হিরাকে জাপটে ধরেছে, তবে সেটা খানিকটা ছিঁচকে (বুঝলাম না।) চোরের মতো কাজ। ওকে বুলডগ মার্কা দেখালেও, নেড়ি কুকুরের থেকে বেশি কিছু না। ইভন হি ক্যান্নট রেপ হিরা, চান্স পেয়ে গেলে, মাঝে মধ্যে সে ও রকম করবে, বাট নট ডেঞ্জারাস, ডেঞ্জারাস ইজ মতিয়া, মতিয়া অ্যান্ড জানকী।
ও বেলাও মতিয়াকে দেখেছি, তার বয়স এখন প্রায় ত্রিশ ছাড়িয়ে গিয়েছে, তাকে বেশ লম্বা-চওড়া বলা যায়, রং ফরসা, নাকে সোনার কী একটা পরে, সবসময়ে খুব সেজেগুজে থাকে। রূপচাঁদকে এখনও দেখিনি, বোধ হয় সে বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল, তার বয়স সাতাশ-আটাশের বেশি না, গায়ের রংটা কালো কুচকুচে, কিন্তু ইয়ে, বেশ হেলদি আর স্মার্ট আর হাসি-খুশি। তাকে আমি মতিয়ার সঙ্গে ঠিক মেলাতে পারছি না, যদিও জানি, তিতির আমাকে বাজে কথা বলবে না। জিজ্ঞেস করলাম, হোয়াই ইজ মতিয়া ডেঞ্জারাস?
তিতির বলল, ন্যাচারেলি হবে। মতিয়ার স্বামী ফিটন চালায়। সে আর একটা বিয়ে করেছে। মতিয়াকে সে আর নেবে না, মতিয়ারও আর কোনও শেল্টার নেই, যে কারণে মেসোমশাই ওকে রেখে দিয়েছেন, প্রাকটিক্যালি কোনও কাজ না থাকা সত্ত্বেও। বাট আফটার অল শি ইজ এ উওম্যান, শি হ্যাজ ডিজায়ার, আর–।
আমি আবার না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, ওটা, মানে ওই ডিজায়ারটা কি থাকতেই হবে, এসেনশিয়ালি?
তিতির আবার আমার চোখের দিকে সেইভাবে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু খুঁজছে, তারপর বলল, জানি না। লোকে তা-ই বলে।
তিতির কিন্তু বলেছিল, আফটার অল শি ইজ এ উওম্যান, শি হ্যাঁজ ডিজায়ার–কথাটার মধ্যে কেমন ইয়ে, একটা ওর নিজের বিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠছে না? ঠিক যেন লোকের কথা ও বলেনি।
তিতির আবার বলল, রূপচাঁদ ওকে মাঝে মাঝে শাড়ি, জামা, সাবান, তেল, স্নো, পাউডার এ সব প্রেজেন্ট করে, লুকিয়ে কখনও-সখনও সিনেমা দেখতেও যায়। হিরাকে যদি সে বিয়ে করে, তা হলে মতিয়া ওকে সব দিক থেকেই হারাবে, এই নিয়ে আজকাল প্রায়ই রূপচাঁদের সঙ্গে মতিয়ার ঝগড়া বিবাদ হয়, মাঝে এক দিন মতিয়া রূপচাঁদকে ঝগড়া করে কামড়েও দিয়েছিল।
কামড়ে দিয়েছিল? আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম।
তিতির একটুওকে বলে উদ্বিগ্ন না হয়ে বলল, হ্যাঁ। সেটা এমন কিছুনা, (আশ্চর্য!) মতিয়ার রেগে ওঠা, কান্নাকাটি করা, ঝগড়া করা, কামড়ে দেওয়া, এগুলো অলমোস্ট ন্যাচারেল, (ন্যাচারেল!) কিন্তু ক্ষেপে গিয়ে ও যদি এক দিন হিরাকে অ্যাটাক করে, বঁটি দিয়ে গলায় কোপ বসিয়েই দেয়–অনেক বার বলেছে, ও হিরাকেবঁটি দিয়ে কাটবে, সেটাই হল ভয়ের। তার চেয়ে ভয়ের হল, ঠাকুর জানকী। ও হিরাকে সবসময় চোখে চোখে রাখবার চেষ্টা করে, নিজের কাছে কাজে আটকে রাখে, যদিও রান্নার কাজে সাহায্যের জন্য আলাদা ঝি আছে, আর সবসময় মেয়েদের ধর্ম কী, তাই বোঝায়, খুব রেগে গেলে, ঠাণ্ডা গলায় বলে, আমার কথা না শুনলে জগৎ থেকে সরিয়ে দেব। হি ইজ মোর ডেঞ্জারাস, ধর্মের কথা বলে, অথচ বয়েস অনেক হয়ে গেছে, কোনও দিক থেকেই হিরাকে সে খুশি করতে পারে না, খুশি করতে পারার মতো কথাবার্তাও বলে না, অথচ ওকে নিয়ে রাখতে চায়। কী বুঝলেন?
বুঝলাম, একটা খুব ইয়ে, ওয়াস্ট ব্যাপার হচ্ছে। কিন্তু ওবেলা তুমি হিরাকে বাড়াবাড়ির কথা কী বলছিলে?
তিতিরের চোখে যেন লাইটনিং হল, বলল, মনে রেখেছেন দেখছি।
বললাম, হ্যাঁ, আমার সামনেই তখন বললে কিনা।
তিতির বলল, সন্তোষের সঙ্গে ও প্রায়ই বাড়াবাড়ি করে ফেলে, হয়তো সকলের সামনেই দুজনে হাসাহাসি করে, হাত টানাটানিও করে।
হাত টানাটানি মানে?
তিতির হঠাৎ আমার হাত ধরে টান দিয়ে বলল, এইরকম।
আমি যাকে বলে, চমকে হাতটা টেনে নিলাম, তিতিরের দিকে তাকিয়ে, ফ্ল্যাবারগাস্টেড হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এর মানে কী?
তিতির আবার প্রায় সেই রকম চোখে তাকাল, তারপরে বলল, আপনাকে ধরে লায়লী সিং যা করতে চাইত, তা-ই, বুঝেছেন?’ বলে ঘাড় কাত করে, অনেকটা যেন চোখের কোণে তারা দুটো এনে আমার দিকে তাকাল–অদ্ভুত দেখাচ্ছে ওকে।
আমি বললাম, বুঝেছি।
তিতির বলল, বাট হিরা অ্যান্ড সন্তোষ ইজ নট পারভারটেড। নীচে যাবেন?
বলতে বলতে ও উঠে দাঁড়াল, এক পলকের জন্যই আমি ওর খোলা পেট একটু দেখতে পেলাম, যদিও ও নাভির নীচে শাড়ি বাঁধেনি, পেটের খানিকটা খোলা। আমি বললাম, যাব। আচ্ছা, একটা ইয়ে আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয়। কেন এ রকম হয়?
কীসের?
এই যে হিরাকে নিয়ে এ সব? বয়সের জন্য?
তা খানিকটা, হিরা যত দিন ছোট ছিল, তত দিন কিছু হয়নি। যতই বড় হতে লাগল, ততই সবাই ওকে ঘিরে ধরতে লাগল।
এটা কি ইনএভিটেবল? হতেই হবে?
তিতির যেন এ বার কেমন চিন্তিত হয়ে পড়ল, ঘোড়া-ছোটা কাচের শেডের দিকে মুখ তুলে তাকাল, তারপরে বলল, উমম, তা ইনেভিটেবল কি না জানি না, অনেক ক্ষেত্রেই এ রকম দেখা যায়। অবিশ্যি তার ডিফারেন্ট ফর্ম আছে, সোশ্যাল স্ট্রাকচারের ওপর নির্ভর করে। তবে এদের মধ্যে যদি আপনি আমাকে সবথেকে খারাপ কে বলতে বলেন, হি ইজ জানকী, আর এই জানকীদের চেহারা আর কথা প্রায় সব সমাজেই একরকম। জানকী ভোরবেলা স্নান করে, পূজা করে, কপালে ফোঁটা কাটে, তারপরে কাজ করতে যায়, তার মুখে কেউ একটিও খারাপ কথা–আই মিন স্ল্যাং অর এনি ভালগার কথা কেউ কখনও শোনেনি, যা বাকিরা প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদের সময় বলে থাকে। সে কোনও দিন নাথুর মতো করবে না, সন্তোষের মতো পাগলামি করবে না, রূপচাঁদের মতো হিরোয়িজ করবে না, গরমমশলা গুঁড়োতে বলে, এক নজরে হিরার দিকে তাকিয়ে থাকবে, তারপরে হঠাৎ বলে উঠবে, তোকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন যেন খাবি খেতে থাকে।
বলেই তিতির খিলখিল করে হেসে, এক দিকে হেলে পড়ল, যে কারণে ওর শাড়ির আঁচল খসে পড়ল, আর আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খাবি খেতে থাকে মানে?
তিতির ওর পাঁচ আঙুলের অদ্ভুত ভঙ্গি করে দেখাল, এ রকম করতে থাকে।
বুঝতে পারলাম না কিছুই, এবং ও এখনও হাসছে, বোধ হয় জানকীর সেই চেহারা আর বলার ভঙ্গিটা ওর মনে পড়ছে। আশ্চর্য, বাইরে থেকে দেখলে, বোঝার উপায় নেই, আমাদের এ বাড়িতে এত সব কাণ্ডকারখানা চলেছে। যাকে বলে, রীতিমতো একটা ফিকশন–শুধু ফিকশন না, প্রায় মিষ্ট্রি আর ক্রাইমের মতো ঘটনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাবা কি এ সব জানেন?
তিতির হাসি থামার মুখে বলল, কিছুটা অনুমান করতে পারেন। ওঁর চোখকে সব ফাঁকি দিয়ে চলা কঠিন। কিংবা উনি হয়তো সব জেনেই চুপ করে আছেন, ডাজন্ট কেয়ার। আমি তো ওঁকে সুপারম্যান মনে করি।
তা ঠিক, সেটা মনে করাটা, খুব একটা আশ্চর্যের ব্যাপার না, তবে তিতির কী ভেবে বলছে, তা আমি জানি না। তখন বাবা আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে, যে ভাবে তিতিরের দিকে তাকাচ্ছিলেন, এবং তিতির হাসছিল, আমি ঠিক জানি না, দুজনের ইয়ে–মানে আ–আচরণবিধি কী। আমিও তো অনেকের মতো মনে মনে বাবাকে দেবাদিদেব বলি–যাকে সুপারম্যান বলা যায়। তিতিরের হাসির যে ওয়েভটা ছিল, সেটা ওর মুখে ছড়িয়ে গিয়ে, নিঃশব্দ হল, বলল, চলুন, নীচে যাই।
চলো।
তিতির আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বলল, এ ভাবেই যাবেন–আই মিন এই পায়জামা, পাঞ্জাবি পরেই? এগুলো পরে তো শুয়েছিলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তাতে কী হয়েছে, বাড়িতে তো।
তিতির আমার মাথার দিকে দেখে, চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তা ঠিক, তবু সবাই বাইরের লোক তো। আপনি অন্তত চুলগুলো একটু শেপে নিয়ে আসুন।
আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম–হ্যাঁ, মাথাটাকে বুশি মনে হচ্ছে, চিরুনি চালিয়ে মোটামুটি একটা ফর্মে আনা দরকার। চিরুনি তুলে নিয়ে আঁচড়ালাম–খুবই বড় হয়ে গিয়েছে, প্রায় তিন মাসের চুল জমেছে, তবু তিতির অন্তত একটা কথা বলেনি, দাড়ি কামাননি কেন?’ দাড়ি কামাবে’, দাড়ি কামাবে’ আবার মনে পড়ল, এবং দিস ইজ লাইফ’–জানি না ঠাকুর জানকী কী বলে–তিতিরকে দেখতে পেলাম, ও আয়নায় আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অ্যাজ ইফ ওর চোখে খুবই একটা সার্চ মানে এনকোয়ারি। কেন? ও মুখ ফিরিয়ে নিল।
.
..আপনি বিশ্বাস করুন স্যার’ কথার মাঝপথেই থেমে গেলেন শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি, এবং আমাদেরনা, আমার দিকে না, তিতিরের দিকেই বলা যায় তাকালেন, ওঁর চোখে মুখে হাসির স্পার্ক দেখা দিল, একটু যেন চোখের তারাও কেঁপে গেল, যে কারণে আমি তিতিরের দিকে এক বার দেখলাম, তিতিরের ঠোঁট টেপা একটু বা বাঁকানো, সেটা ঠিক হাসি কি না, জানি না। শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি বললেন, আচ্ছা মহাদেবদা, আজ থাক, পরে হবে।
আমরা তখনও বাবার পিছনে। বাবা ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের এক বার দেখে নিয়ে বললেন, আরে ওদের সামনে তোমার এত গোপনীয়তার কী আছে, ওরা তো গবা আর তিতির।
শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি আমার দিকে দেখে, ভুরু কুঁচকে, বলে উঠলেন, গবা! মানে—
বাবা বললেন, তুমি কি আমার ছেলে গবাকেও ভুলে গেলে নাকি?
শ্রীকৃষ্ণনা, কৃষ্ণনা কেষ্টবাবু, বাবা ওঁকে কেষ্ট বলেই ডাকেন, কৃষ্ণবাবু আমার দিকে আবার তাকালেন, ওঁর চশমার ভিতরে চোখ দুটোর পাতা যেন কেমন ইয়ে, কুঁচকে, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল, বলে উঠলেন, ওহ, যে দিল্লিতে ছিল?
বাবা বললেন, হ্যাঁ।
মানে দিল্লির সেই–?
হা, সেই মূর্তিমান অবসিন মদনমোহন, সাবজেক্ট ম্যাটার অব য়োর ওয়ার্ক।
কৃষ্ণবাবু যেন গোটা শরীরে কেমন গুটিয়ে গেলেন, মুখের হাসিতে একটা খুবই লাজুকতা, বললেন, কী যে বলেন।
তিতির হেসে উঠল, আর সেই রকম কাপ-ডিশের ঠুংঠুং শব্দের মতো শোনা গেল, কৃষ্ণবাবু তিতিরের দিকে দেখলেন। বাবা বললেন, কিন্তু ভবেন দত্ত তো তোমার মতে খুব ভাল লেখক, এ রিয়্যাল জিনিয়স, শিবসুন্দরের পূজারি, সে তোমার ঝি ভাগাল কী করে?
কৃষ্ণবাবু যেন আবার সারা শরীরে একটা অস্বস্তিবোধ করলেন, ঠিক আছে মহাদেবদা, পরে কথা হবে।বলেই তিনি সোফা থেকে ওঠবার উদ্যোগ করলেন।
বাবা বললেন, পরে-টরে না, এটা সামান্য ব্যাপার। ভাল ঝিয়ের খুবই অভাব কলকাতার বাজারে জানি, তবু ভবেন দত্তর ওপর তোমার এতটা রেগে যাবার কোনও কারণ নেই।
কারণ নেই?’ কৃষ্ণবাবু এতই ইয়ে, মানে–হার্ট হলেন বাবার কথা শুনে, আমার আর তিতিরের জন্য অস্বস্তি আর থাকল না, বললেন, তা বলে আমার ঝিকে নিয়ে যাবে?
নিয়ে যাবে মানেটা কী, ভবেন দত্তর মতো একজন সাহিত্যিক তোমার ঝিকে নিশ্চয়ই মোয়া হাতে দিয়ে যায়নি। তোমার ঝিয়ের বয়স কত ছিল?
তা ধরুন, সাতাশ-আটাশ হবে।
বাবা মাথা ঝাঁকালেন, আমি অবাক চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তিতিরের দিকে তাকালাম। এখানেও মেড সারভেন্ট নিয়ে কথা হচ্ছে, তাও কিনা কৃষ্ণবাবুর মতো এক জন লোক, হু ইজ এ ফেমাস গান্ধীয়ান– মানে গান্ধী ফিলজফিকাল একটা কী সংস্থার সঙ্গেও উনি জড়িত, এবং দু-একটা বইও বোধ হয় লিখেছেন, তা ছাড়া উনি একজন শিল্প-সাহিত্যের গ্রেট সমালোচক, সে বিষয়ে অনেক বইও লিখেছেন, ভাল বক্তা, একজন ইয়ে কৃকৃ কৃতবিদ্য লোক। আর ভবেন দত্তও একজন এস্টাব্লিশড রাইটার, তার বই পড়তে আমারও ভাল লাগে। তাদের মতো দুজন লোকের মধ্যে ইয়ে নিয়ে! বাবার গলা শুনতে পেলাম, দ্যাখো কেষ্ট, তুমি আর ভবেন দত্ত এক পাড়ায় কাছাকাছি থাকো। যত দূর জানি, কলকাতায় ঝিয়েরা কেউ মুচলেকা দিয়ে চাকরি করে না। হয়তো ভবেন আরও বেশি টাকা দিয়েছে, তা-ই–।
মহাদেবদা, আপনি ভবেন দত্তর কথা জানেন না, ওর চরিত্র।
আহা, অত পার্সোনাল হচ্ছ কেন। তোমার মতে সে একজন জিনিয়স, বড় লেখক। এ সব কথা লাগিয়ে, ভবেন দত্তর চাকরির ক্ষতি করাটা কি ঠিক হবে, অ্যান্ড য়ু বিলিভ, আমি তা করতে যাব? ইমপসিবল! ভবেন দত্ত তোমার বন্ধু, একটা ঝিয়ের জন্য যদি সে বন্ধুবিচ্ছেদ করতে চায় তুমি কী করতে পারো?
কৃষ্ণবাবু খুবই ইয়ে মানে, যাকে বলে ক্ষুব্ধ আর হেল্পলেস চোখে বাবার দিকে তাকালেন, যেটা ওঁর সারা শরীরেও প্রায় ফুটে উঠল, বললেন, চাকরির ক্ষতি করতে বলছি না, কিন্তু এই একটা বিষয়ে ওর এমন ছোঁকছোঁকানি, (বুঝলাম না।) ওকে একটু স্নাবিং দেওয়া দরকার।
বাবা টেবলের ওপর থেকে কী একটা কাগজের তাড়া তুলে নিতে নিতে বললেন, সেটা তুমিই ওকে কোনওভাবে দাও না। তোমার তো অনেক ঘাঁতঘোঁত (বুঝলাম না।) জানা আছে।বলতে বলতে বাবা কাগজগুলোর পাতা ওলটাতে ওলটাতে, এক জায়গায় থেমে পড়তে লাগলেন।
কৃষ্ণবাবু যেন আরও হেল্পলেস হয়ে পড়লেন, বাবার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড সেই রকম চোখে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন, তারপরেই আমাদের দিকে, প্রথমে আমার দিকে তাকালেন, ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল, তারপরেই তিতিরের দিকে তাকাতেই, চোখে মুখে সেই পার্ক। দেখলাম তিতিরও ওঁর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ঠোঁট টিপে হাসছে, কিন্তু ঠোঁট দুটো অনেকটা বেঁকে আছে, আর চোখ দুটো–আশ্চর্য, গোল দেখাচ্ছে। কৃষ্ণবাবু উঠলেন, বাবা কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বললেন, চলে যেয়ো না, খেয়েটেয়ে যেয়ো।
হ্যাঁ দাদা, আমি অন্য ঘরে বসছি। যাবার সময়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ভাল আছ তো? আমি তিতিরের দিকে তাকালাম, তিতির আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে জিজ্ঞেস করছেন।
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, আ–আমাকে? ভালভাল আছি।
কৃষ্ণবাবু জবাব শোনবার জন্য আমার দিকে তাকিয়েছিলেন না, ওঁর দৃষ্টি তখন তিতিরের দিকে, জিজ্ঞেস করলেন, রজনীর কী খবর?
তিতির মাথাটা ঝাঁকাল, না শূন্যে একটা ধাক্কা মারল, বুঝলাম না, কিন্তু কিছু বলল না। কৃষ্ণবাবু ঘর। থেকে বেরিয়ে গেলেন, এবং তিতির যেন এতক্ষণ হাসি চেপে রেখেছিল, হঠাৎ চামচে চামচেয় বেজে ওঠার মতো শব্দে হেসে উঠল। বাবা ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মনে হল বাবার ঠোঁটেও হাসি, অথচ মোটা ভুরু কোঁচকানো, এবং আমার দিকেও এক বার দেখে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল পাখি?
কিছু না মেসোমশাই৷’হঠাৎ খুব ইমপার্সোনাল স্বরে তিতির জবাব দিল, যার ইয়েগুলো আমি ঠিক ধরতে পারছি না। বাবা বললেন, হুম, এসো, বসো তোমরা।
আমরা বাবার সামনে গেলাম, বাবা হঠাৎ ডেকে উঠলেন, বৈদ্য।
বৈদ্যনাথ খানসামা ঘরের দরজার কাছেই ছিল, তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাবা বললেন, দ্যাখ ওই কেষ্টবাবু বোধ হয় অন্য কিছু ড্রিঙ্ক করবে না, ওকে একটু দিশি ওয়াইন দিতে বল। বিলিতি যেন না দেয়।
আজ্ঞে আচ্ছা। বৈদ্যনাথ বেরিয়ে গেল।
তিতির এক বার আমার দিকে দেখল, আমিও দেখলাম, এবং আমি ব্যাপারটা জানি। বাবা তার সন্ধের সমস্ত গেস্টদেরই ফরেন লিকার-মানে সত্যি ফরেন আর কী, বিলিতি যাকে বলে, স্কচ অথবা ফরাসি বা স্প্যানিশ, এই জাতীয় ড্রিঙ্ক অফার করেন না, তার মধ্যে একটা ইয়ে ক্লাসিফিকেশন আছেন। অনেককে ইন্ডিয়ান লিকার দেওয়া হয়। এ বাড়িতে সন্ধেয় যাঁরা আসেন, অলমোস্ট সকলেই ড্রিঙ্ক করেন, মনে হয়, যেন সেজন্যই সবাই আসেন, কেন তা জানি না। আমি বাবার ঘরটার এদিকে ওদিকে দেখছিলাম। এক রকমই আছে, কোনও চেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় একটা বল কাম লাউঞ্জ রুম বলা যায়, নীচের তলার সবথেকে বড় ঘর। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, উত্তরের দেওয়াল ইয়ে, মানে যাকে বলা যায় অর্ধবৃত্তাকার, এবং সমস্ত দেওয়ালটাই গদিমোড়া নিচু আসন, আর ছোট ছোট ড্রিঙ্কস টেবল, ওপরের দিকে কাশ্মীরি ধরনের পেন্টিং করা, মেঝেটা লাল মোজাইকের। প্রায় চৌদ্দ ফুট ছেড়ে এসে, বাকি কুড়ি ফুট মেঝে কার্পেট মোড়া, তিন সেট সোফা। বাঁ দিকের লং দেওয়াল-আলমারিতে হারমোনিয়াম, তবলা, আর ওটাকে বলে মম-মৃদঙ্গ, আরও দু-একটা কী ইন্ডিয়ান ইনমেন্ট আছে। কোনও গায়ক এলে বা গানের আসর বসাতে হলে ওগুলো বের করা হয়। ডান দিকে রেকর্ড প্লেয়ার আর ডিসকের বক্স সাজানো, বাঁ দিকের দেওয়াল-আলমারিতে বই।
ওখানে মাঝে মধ্যে নাচ (বিদেশি) হয়, বিশেষ দিনের বিশেষ পার্টিতে। ক্রিসমাস আর নিউইয়ারস ডে-তে তো হয়ই, তা ছাড়াও বিশেষ কারণে।
গবা কোথাও বেরোবি নাকি?
বাবার গলা শুনে, তার দিকে ফিরে তাকালাম, এবং তারপরে তিতিরের দিকে প্রায় জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে, কারণ বাবার কথাটা–মানে কথার মোটিভটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, কিন্তু তিতির আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন কেমন লজ্জা পেয়ে গেল, বাবার দিকে ফিরে বলল, না, উনি কোথাও বেরোবেন না।
বাবা ভুরু কুঁচকে তিতিরের দিকে তাকালেন, তারপরে আমার দিকে, আবার তিতিরের দিকে, আবার আমার দিকে, আবার তিতিরের দিকে, এবং শব্দ করলেন, উম?’ তারপরে আমার দিকে, হুম!’আবার তিতিরের দিকে, এবং তিতিরের মুখ হঠাৎ লাল দেখাল, ইয়ে, যাকে বলে ঝুপ করে বাবার পায়ের কাছে
বাবা তিতিরের পিঠের ওপর হাত রেখে, মনে হল, তাঁর পায়ের কাছে আরও ক্লোজলি ওকে টেনে নিলেন, বললেন, আরে না না, আই ডিড মিন নাথিং।
বাবা কিছু মিন করতে চেয়েছিলেন নাকি? আমি বুঝতে পারি নি, কিন্তু বাবা আর তিতিরের মধ্যে, খুব একটা ইয়ে মানে, এটাকে ইনটিমেসি বলা যায় কি না বুঝতে পারছি না, তবে এ রকমভাবে বাবার কাছে আদর কাড়তে, ফুচকিকেও কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। দে আর ভেরি ক্লোজ টু ইচ আদার, তাই না? বাবা তিতিরের চিবুক ধরে মুখ তুলে, ওর চোখের দিকে তাকালেন, বললেন, আই ওয়াজ এনজয়িং।
বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বোস না গবা, কিছু ড্রিঙ্ক করবি নাকি?
আনএক্সপেকটেড কিছু না, বাবা বহু বারই আমাকে ড্রিঙ্ক অফার করেছেন, এবং জানেন, আমি ড্রিঙ্ক করি না, করব না। বললাম, না।
লিটল ভারমুথ?
উঁহু’ বলে আমি বাবার পাশের সোফায় বসলাম। তিতির আমার দিকে তাকাল, আমিও ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, এখনও ওর মুখটা প্রায় লাল হয়েই আছে, এ বাবার হাঁটুর ওপর একটা হাত রেখেছে। বাবা তিতিরের দিকে তাকালেন। তিতির বলল, আমি তো সেই খাবার আগে, এক চুমুক।
বাবা যে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেছেন, তা বুঝতে পারিনি, আসলে চোখের দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করেছেন, তাই তিতির এই জবাব দিল। তিতির কি ড্রিঙ্ক করে নাকি? কথা শুনে মনে হচ্ছে, এক-আধ চুমুক ওয়াইন ড্রিঙ্ক করে বোধ হয়। সেটা তেমন ডেঞ্জারাস না, কিন্তু এ বাড়িতে যদি একটি লায়লী সিং বা সুদীপ্তা চ্যাটার্জি থাকে, তাহলে আ—আ—আমি যাব কোথায়? আনথিংকেবল! আমার মেরিয়নের কথা মনে পড়ে গেল, প্রায় তো একটা বাবালিকা, উহ, কী ড্রিংক করতে পারে, কিন্তু ওর পাগলামিটাও ছেলেমানুষের মতো দেখেছি, লায়লী সিংদের মতো না। মেরিয়নের কথা মনে পড়তেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, খোতের খবর কী? মেরিয়ন আর ওদের বাচ্চা ভাল আছে?
বাবা যেন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওদের কথা কি তোর মনে থাকে নাকি?
আমিও অবাক হলাম, বাবা আমাকে কী ভাবেন, ভাইবোনদের কথা আমার মনে থাকে না? মনে থাকে ঠিকই, কে কী করে না করে, আমি তা জানি না। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, এ আবার কী বলছ তুমি?
ঠিকই বলছি। তোকে দেখে তো কিছুই বোঝা যায় না, কেবল চেহারায় একটি রিয়্যাল মদনমোহন। কী বলো পাখি, গবা আমার থেকে দেখতে সুন্দর, না?
তিতির আমার দিকে দেখল, আর আমি সত্যি ইয়ে, লজ্জাই পেয়ে গেলাম, বাবা যে কী বলেন না। আসলে বাবা জানেন, উনি যাকে বলে, খুবই হ্যান্ডসাম–মানে, সুপুরুষ। তিতির বলল, আপনারা দুজনেই সুন্দর, দু রকমের।
আমি বাবাকে বললাম, তুমি যে কী বলো, কোনও মানে হয় না।
বাবা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, যত কথার মানে, তোর হয়। এনি হাউ, ওরা ভালই আছে। মেরিয়নের আর একটা বাচ্চা হয়েছে, মেয়ে। কিন্তু গবা, পাখি কী রকম বাবা আর ছেলের মন রাখল, দেখলি?’
বাবা তিতিরের দিকে তাকালেন, আমিও তাকালাম, তিতির মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, মোটেই না, আমি ঠিকই বলেছি।
বাবা হেসে উঠলেন, তার একটা হাত তিতিরের পিঠে, একটা হাত আমার কাঁধে। তিতির আমার দিকে তাকাল, ওর দৃষ্টিটা যেন কেমন, এক্সপ্রেশানটা ঠিক বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমার মনের মধ্যে যেন কেমন করে উঠল, অনেকটা লাইটনিং অন দ্য ফার হরাইজন।
আহ্ হা মুখার্জি, এনজয়িং ফ্যামিলি লাইফ?’ মোটা ভারী গলার স্বর শোনা গেল পিছনে। আমরা সবাই তাকালাম। বাবা বলে উঠলেন, আরে অভয়, এসো এসো। আমার ছেলে দিল্লি থেকে অনেক দিন পর ফিরেছে, ওর সঙ্গে একটু কথা বলছিলাম।
অভয় গুপ্ত আমার দিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে এলেন। উনি সবসময়েই ধুতি, পাঞ্জাবি ব্যবহার করেন, একজন এক্স-মিনিস্টার, আমাদের বাড়িতে অনেক বার দেখেছি, এবং উনি বাবার সঙ্গে এ ঘরেই বসেন। বললেন, দিল্লি থেকে মানে?
বাবা বললেন, হ্যাঁ, দিল্লি থেকে মানে আমার সেই ছেলে, মদনকে তুমি চেনো না?
নিশ্চয় নিশ্চয়। মোটাসোটা অভয় গুপ্ত আমার দিকে চেয়ে হাসলেন, ভুরু নাচালেন যেন আরও কিছু বললেন বা জিজ্ঞেস করলেন।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাল আছেন?
অভয় গুপ্ত বসতে বসতে তিতিরকে দেখলেন, আর ইয়ে–যদি বলা যায়, তা হলে কেমন যেন খুব বড় করে হাসলেন, বললেন, এই যে চিড়িয়া! একেবারে পদতলে বসে আছ?
তিতির হেসে বলল, হ্যাঁ।’ বলে উঠে দাঁড়াল।
অভয় গুপ্ত তিতিরের ফুট টু হেড দেখে, আমার দিকে ফিরে বললেন, আমরা কী করে ভাল থাকব বলো, তুমি যেখানে ছিলে, সেখানে সবই ভাল।
কেন্দ্র কিনা, গদি বড় নরম। তবে সব বেড়ালের ভাগ্যে সবসময় শিকে হেঁড়ে না। বাবা বললেন।
অভয় গুপ্ত বললেন, তা বলতে পারো। কিন্তু যাই বলল, য়ু ক্যান মেক এ ভলাপচুয়াস উয়োম্যান ফেথফুল বাট নট ওয়েস্টবেঙ্গল।
বাবা বললেন, হ্যাঁ, আঙুর ফল যে কখনও কখনও টক হয়, তা সবাই জানে। পশ্চিমবঙ্গকে তোমাদের রক্ষিতা না করতে পারলে চলবে কেন। বলে বাবা ডাক দিলেন, বৈদ্য।
যাই।‘ দরজার কাছে শব্দ হল, এবং বৈদ্যনাথ এল একেবারে রেডি হয়ে, ট্রের ওপরে স্কচের বোতল আর কোল্ড সোডা আর দুটো গেলাস নিয়ে। তিতির আমার দিকে তাকিয়ে, দরজার দিকে তাকাল। অভয় গুপ্ত বললেন, ও সব কথা থাক, একটু কাজের কথা আছে।
তিতির বলল, মেসোমশাই, আমরা যাচ্ছি।’
বাবা বললেন, আচ্ছা। কিন্তু কেষ্টর পেছনে বেশি লেগো না।
তিতির সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে, দরজার দিকে এগোল। আমি বাবাকে বললাম, তোমরা বসো তা হলে।
বাবা বৈদ্যনাথের হুইস্কি ঢালা দেখতে দেখতে বললেন, হ্যাঁ।
আমি যেতে উদ্যত হতেই, অভয় গুপ্ত বললেন, তুমি কোনও কর্মের না মদন। সেই মা—
নো অভয়, নো ভালগারিটি। বাবা বলে উঠলেন।
একটা দেশীয় শব্দ–।
হ্যাঁ, অনেকটা কান্ট্রি লিকারের মতো, বাট সামটাইমস দ্যাটজ অবসিন। তুমি একটা এক্স-মিনিস্টার মানুষ হয়ে এটা বোঝ না!
অভয় গুপ্ত যে কোনও ভালগার বা অবসিন কথা বলতে যাচ্ছিলেন, তা আমি মোটেই বুঝতে পারিনি। বাবা কী করে বুঝলেন জানি না। অভয় গুপ্ত আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, না হয় লায়লী সিংকে বেটিই বলছি, সেই বেটিকে তুমি একেবারে এপাশে ওপাশে করে।
নো মোর অভয়।
তা হলে আর আমার কিছু বলার নেই।
বলে তিনি গেলাস তুলে নিলেন, আমি একটু হেসে ঘরের বাইরে গেলাম, দেখলাম, তিতির হিরার সঙ্গে কথা বলছে। হিরা এক বার আমার দিকে দেখে, তিতিরের কথায় ঘাড় কাত করে, সিঁড়ির দিকে চলে গেল। দূরে ডাইনিং রুমের দরজার কাছে, বাইরে টেবলের সামনে দাঁড়িয়ে সন্তোষ কাচের গেলাস মুছতে মুছতে এ দিকে দেখছিল, তিতির তা দেখতে পাচ্ছিল না, আমার সঙ্গে সন্তোষের চোখাচোখি হতেই ও মুখ নামিয়ে নিল। নীচের বারান্দার পশ্চিমের এন্ডে, বাঁ দিকে রান্নাঘর, এখান থেকে দেখা যায় না। সেখানে এখন বাবার ফরমায়েশ অনুযায়ী খাবার তৈরি হচ্ছে, এবং এখন সেখানে জানকী ইদ্রিস মতিয়া, এরা সবাই আছে। রূপচাঁদও থাকতে পারে, যদি গাড়ি নিয়ে কোথাও না গিয়ে থাকে। কেবল বদ্রী বাড়ির ভিতরের ব্যাপারে বিশেষ থাকে না। নাথুকে অবিশ্যি গেটেই থাকতে হয়েছে।
চলুন, কেষ্টবাবুর কাছে যাই।’ তিতির বলল। ওর সেই চোখে, কেমন একটা ইয়ে দুষ্টুমি, যেন ইয়ে মানে, চিকচিক করছে।
আমি বললাম, বাবা যেন কী বলছিলেন?
মেসোমশাই ও রকম বলেন। আশ্চর্য, বাবার সঙ্গে তিতিরের একটা অদ্ভুত আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়। বাবা তিতিরকে বোঝেন, পাখি বলে ডাকেন, তিতির বাবাকে বোঝে, অবিশ্যি মেসোমশাই বলে ডাকে। না, এ রকম চিন্তা করার কোনও মানে হচ্ছে না, কেন না, এটা আমার ভাববার বিষয় না।
আসুন।’ তিতির ঘাড় কঁকিয়ে আবার ডাকল। যাব? কৃষ্ণবাবু বোধ হয় আমাকে ঠিক পছন্দ করবেন না, বিরক্ত হবেন।
ওঁর হয়তো ভাল লাগবে না।
আমি বললাম। তিতিরের ভুরু কুঁচকে উঠল, থ্রো করার মতো বলল, সো হোয়াট? আপনি এ বাড়িতে যে ঘরে খুশি যাবেন, কেউ যদি রাগ বা বিরক্তি দেখায়, তাকে বাড়ি যেতে বলা হবে।
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না, তার দরকার কী। লেট দেম, চলো যাই। তিতিরের সঙ্গে বারান্দা দিয়ে এগোলাম। আমি আবার কারোকে শক্ত কথা বলতে পারি না, ইনসাল্ট তো কখনই না। আমরা দুজনেই পরদা সরিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখলাম, কৃষ্ণবাবু কার সঙ্গে যেন গলার স্বর নামিয়ে কথা বলছেন, আর একজন, চশমা চোখে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা গোবেচারির মতো প্রৌঢ় লোক এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন, হাতে একটি কোকাকোলার বোতল। কৃষ্ণবাবু আমাদের না, তিতিরকে দেখতে পেয়েই খুশিতে ঝকমক (কথাটা ঠিক হল?) করে উঠলেন, প্রায় শাউট করলেন, এসো রজনীবালা, এসো।
প্রৌঢ় ভদ্রলোককে আমি চিনি না। কৃষ্ণবাবু যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাঁকে চিনি, উনি লাইফ ইনশিওরেন্সের একজন অফিসার, নম রাম সিনহা। হুইস্কি (ইন্ডিয়ান–অবকোর্স।) পান করছেন, এবং কৃষ্ণবাবু ওয়াইন (ইন্ডিয়ান অলসো)। তিতির প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে তাকাল, ভদ্রলোক কোকাকোলার বোতলসহ উঠে দাঁড়ালেন, হাসলেন ভালমানুষের মতো, বললেন, আমার নাম দয়াল ব্যানার্জি, কথা প্রকাশনী–পাবলিশার, মহাদেবদার সঙ্গে এক বার দেখা করব, উনি জানেন আমাকে।
বোঝা গেল, তিতিরও ওঁকে চেনে না, আমিও কখনও দেখিনি। তিতির বলল, ওই কোণে দেখুন ভিজিটরস স্লিপ আর পেনসিল আছে, আপনার নামটা লিখে বাইরে চাকরকে দিয়ে পাঠিয়ে দিন।
দয়াল ব্যানার্জি তাই করলেন। তিতির কৃষ্ণবাবুর সামনে গিয়ে কেমন টেনে টেনে জিজ্ঞেস করল, কেষ্টবাবু, আপনার মেড-সারভেন্টের নাম কী ছিল?
কৃষ্ণবাবু রাম সিনহার দিকে এক বার দেখে, ভুরু কোঁচকালেন, তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, মেড-সারভেন্টের নাম আবার ভদ্রলোকেরা মনে রাখে নাকি?
রাখে না বুঝি? তিতির ঘাড় কাত করে, স্বরে ঢেউ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, দেখতে কেমন ছিল, সেটা মনে আছে?
আহ্ রজনী, কী হচ্ছে?’ বলে কৃষ্ণবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে এক বার রাম সিনহাকে দেখলেন, বললেন, মহাদেবদার সঙ্গে থেকে থেকে তুমি যা-তা বলতে শিখেছ।
তাই বুঝি? তিতির ওর সেই চোখ, বড় করে, ঘাড় ঝাঁকাল।
কৃষ্ণবাবু হঠাৎ একটা ইয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, মহাদেবদা অবিশ্যি কপাল করে এসেছেন। বলে তিনি তিতিরের দিকে যেন কেমন করে তাকালেন, তারপর উইংক করলেন রাম সিনহার দিকে তাকিয়ে। রাম সিনহা হেসে গেলাস তুলে চুমুক দিলেন। কৃষ্ণবাবু যেন কী একটা ইশারা করলেন, তার কথা শুনে যেন মনে হল, বাবা আর তিতিরকে নিয়ে যেন কিছু বললেন। তিতির হাসল, বলল, সত্যি, নিজেদের দিকে যদি একটু তাকিয়ে দেখতেন কেষ্টবাবু!
কৃষ্ণবাবু বললেন, নিজেদের দিকেই তো তাকিয়ে আছি, আমাদের দেখবার জন্য তো আর পাখি। নেই।
অবকোর্স, হান্ড্রেড পার্সেন্ট ট্র। আমি ভাবছি, আপনারা যার মুণ্ডপাত করবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন, সেই অবসিন রাইটার ত্রিদিবেশ রায়কে, আপনার মেড-সারভেন্ট স্টোরিটা জানাব, উনি সুন্দর করে লিখতে পারবেন।’
এ সব ঘটনা আমি কিছুই জানি না। কৃষ্ণবাবুর মুখ শক্ত হয়ে উঠল, এবং ওঁর চোখ দুটোও চশমার ভিতরে কেমন যেন ইয়ে–লাল স্পার্ক করল। বললেন, মুণ্ডুপাত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছি মানে?’ বলে তিনি এক বার আমাকেও দেখে নিলেন।
লাগেননি? তিতিরের সারা শরীরটা যেন হেসে উঠল, বলল, উইকলি চারটে করে গালাগালির বক্তৃতা দিচ্ছেন, ত্রিদিবেশ রায়ের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন, পোস্টারিং করাচ্ছেন, প্রসেশন বের করাচ্ছেন, উঠে-পড়ে লাগেননি? কে আপনাদের ওই লোকটা নিজেকে আবার লেখক মনে করে? হারাণ মাল, হ্যাঁ, হারাণ মালকে দিয়ে অবসিনের মামলা দায়ের করে দিলেন।
কৃষ্ণবাবু রাগেই কিনা জানি না, যেন কথা বলতে গিয়ে কথা খুঁজে পেলেন না। কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ ধমকে ওঠার মতো বললেন, আমি হারাণকে দিয়ে মামলা দায়ের করিয়েছি? আই হেট টু ডু দ্যাট, তা হলে তো আমি ওর সাক্ষীই হতাম। হয়েছি? ও সব জানে তোমার ওই পাশের ঘরের জজ সাহেবরা, ওঁদের ধারণা, আইন দিয়ে সাহিত্যের বিচার হয়, আর ওই হারাণ মালদের ধারণা তাই। আই ডোন্ট বিলিভ দ্যাট। মাই ওয়ে অব ফাইটিং এগেন্সট অবসিনিটি–আলাদা। আমি সাহিত্য বুঝি, শিল্প বুঝি, আই নো হোয়াট ইজ মূল্যবোধ। হু ইজ ত্রিদিবেশ রায়? আমার মাথাব্যথা সাহিত্যের জন্য।’
তিতির যেন ঠাণ্ডা শরবত পান করার মতো সফট আর আরামের স্বরে বলল, আপনার লেখাগুলো পড়ি তো কেষ্টবাবু, পার্সোনাল গালাগাল কাকে বলে, তা জানি, পড়লে মনে হয়, কেমন যেন হিংসায় পুড়ে যাচ্ছেন। একজন গান্ধীয়ান হিসাবে, এতটা হিংসা কি ঠিক?
বাজে কথা বলো না রজনী। কৃষ্ণবাবু হাত তুলে, ফার্স্ট ফিঙ্গার দেখিয়ে বললেন, তা ছাড়া, মার্কসিস্ট থেকে শুরু করে, জনসংঘি, কে বাকি আছে, ত্রিদিবেশের বিরুদ্ধে বলছে না বা লিখছে না?
দ্যাটজ মোর ইন্টারেস্টিং!’ তিতির ওর সেই চোখে ইয়ে, মানে ঝিলিক ফুটিয়ে বলল, (এখন আমারও কেমন যেন সারপ্রাইজিং লাগছে।) কী করে ওটা সম্ভব হল বলুন তো? এমন ইউনিটি তো দেখা যায় না? সাহিত্যকে বাঁচাবার জন্য?
কৃষ্ণবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, নিশ্চয়ই।
তিতির এ বার খিলখিল করে হেসে উঠল। আমার দু-একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা আমার মনে আছে, মালভা সম্পর্কে ওঁকে লিখতে বলেছিলাম বলে, কী রকম রেগে গিয়েছিলেন। রাম সিনহাও হঠাৎ তিতিরের সঙ্গে হো হো করে হাসতে লাগলেন। কৃষ্ণবাবু ভুরু কুঁচকে রাম সিনহাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি হাসছেন কেন?
রাম সিনহা হাসতে হাসতেই বললেন, সিম্পলি রজনীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে।
আপনি ও সব ছাড়া কিছুই জানেন না। কৃষ্ণবাবু রেগে বললেন, আর তিতিরের দিকে ফিরে বললেন, তোমার এ হাসিটা তোমার বস মহাদেবদা বেশি এনজয় করতে পারতেন।
বস! বাবা তিতিরের বস হবেন কেন। তিতির ঘাড় কাত করে কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকাল, ওর হাসিটা মুখে অন্যভাবে লেগে আছে, বলল, সত্যি? তা হলে সেটা আপনার মহাদেবদাকে বলে আসি।
তিতির দরজার দিকে পা বাড়াতেই, কৃষ্ণবাবু ডেকে উঠলেন, রজনী।
আশ্চর্য, কৃষ্ণবাবুর মুখ কেমন যেন পিটিফুল–হাসিটাও সেই রকম, এবং উনি দু হাত জোড় করে তিতিরের দিকে তাকালেন, আবার বললেন, প্লিজ!
তিতির ওঁর দিকে তাকাল, তারপরে রাম সিনহার দিকে তাকিয়ে আবার হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল, এবং সঙ্গে সঙ্গে রাম সিনহাও, কারণ উনি সিম্পলি তিতিরকে দেখে মুগ্ধ, কিন্তু মুগ্ধ লোক কি এরকমভাবে হাসেন। আমি প্রায় দর্শকের মতোই ব্যাপারটা দেখছি। কৃষ্ণবাবু এক বার আমার দিকে দেখলেন, তারপরে এক চুমুকে ইন্ডিয়ান ওয়াইন শেষ করে দিলেন, এবং ডাকলেন, দিবাকর।
দিবাকর আর এক জন সারভেন্ট, বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি, দরজায় দেখা দিল। কৃষ্ণবাবু। বললেন, ওয়াইন।
দিবাকর কোনও কথা না বলে চলে গেল। ঠিক এ সময়েই মিঃ ঝা ঢুকলেন, এবং ঢুকেই জিভ কেটে একটা অদ্ভুত শব্দ করলেন। তার চোখ লাল, কোঁচা লুটোচ্ছে, মুখ ইয়ে–মানে মুখের ভাব টায়ার্ড। কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, গুরুদেব, আপনি!’ বলেই বাইরের দিকে মুখ করে বললেন, দিবাকর, তুলসীপাতা আর বেলকাট নিয়ে এসো, শুচি হয়ে ঢুকি।
কৃষ্ণবাবু হঠাৎ মিঃ ঝাকে যা বললেন, তা আ–আমার পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব না। তিতির আমার দিকে ফিরে বলল, চলুন বাইরে যাই।
ঠিক তা-ই, বাইরে যাওয়া উচিত, কিন্তু দরজার কাছে মিঃ ঝা তিতিরকে বললেন, চলে যাচ্ছ?
তিতির বলল, হ্যাঁ, তুলসীপাতা আর বেলকাট আমাদের সইবে না।
মিঃ ঝা, অচেনা মানুষকে দেখবার মতো করে, আমার দিকে তাকালেন, ভুরু দুটো এক বার কুঁচকে উঠল, তারপরে হঠাৎ আমাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে শাউট করলেন, হা! মদন কবে এসেছ?
মিঃ ঝা ইয়ে মানে শর্ট ফিগার হলেও, এত জোরে চেপে ধরলেন, ছাড়ানো যাবে না বোধ হয়। ওঁর। সারা গায়ে ইয়ে মানে মদের গন্ধ। বললাম, আজই এসেছি।
মিঃ ঝা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আহ্ মদন, কনট সার্কাসে তোমার বদলে যদি আমি থাকতাম।
তা হলে লায়লী সিং সত্যি রেপড হত।কৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন।
মিঃ ঝা আমাকে ছেড়ে দিয়ে, হাত উলটে কোমরে রেখে, আর এক হাত কপালের পাশে রেখে, কেমন যেন একটা ভঙ্গি করলেন, এবং খানিকটা গানের সুরে বলে উঠলেন, আমি কাকে বলব কী?/হারিয়ে গেছে আমার মায়া নামে ঝি।
তিতির হঠাৎ আমার হাত ধরে টেনে বলল, আসুন।
কিছু আর বলবার বা শোনবার অবকাশ হল না, আমি তিতিরের সঙ্গে বাইরে চলে এলাম। কিন্তু মিঃ ঝাকে আমার বেশ লাগছিল। তিতির বলল, এখন ওখানে কান পাতা যাবে না।বলে আমার হাত ছেড়ে দিল, এবং তারপরে আমার মনে হল, খুব ইয়ে–মানে সহজেই তিতির আমার হাত ধরে টানল। মনে হচ্ছে, যেন অনেক দিন ধরে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, অথচ আজ মাত্র ওবেলা ওকে আমি দেখেছি, অবিশ্যি তিতিরও তাই। কিন্তু যা আমার ভাবা উচিত না, একটা কৌতূহল যাকে বলে, বাবা আর তিতিরের–? না, দ্যাট’জ নট রিয়্যালি ফেয়ার। এ সব নিয়ে আমার চিন্তা করার কোনও মানে হয় না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ওটা কি সত্যি নাকি, এ রকম একটা ইউনিটি হয়েছে দলগুলোর মধ্যে?
অবসিনিটির ব্যাপারে? তিতির বলল, হ্যাঁ, আপনি বুঝি কোনও খবর রাখেন না?’
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না, কিন্তু খুব আশ্চর্যের ব্যাপার তো? কী যেন লেখকের নাম বললে?
ত্রিদিবেশ রায়।
কখনও নাম শুনি নি।
তিতির হেসে বলল, সেটাও খুব আশ্চর্যের ব্যাপার। খবরের কাগজগুলোতে এই নিয়ে রোজই কিছু না কিছু লেখা হচ্ছে।
আমি তো খবরের কাগজ–।
ওহ, পড়েন না, ভুলেই গেছি।’
আমি একটু ইয়ে মানে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভদ্রলোক সত্যি অবসিন লিখেছেন নাকি?
হোয়াট ইজ অবসিন, রিয়্যালি? তিতির ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল, আর আমি কেমন অ-অস্বস্তি বোধ করলাম, বললাম, জানি না।’
তিতির বলল, ইভন গড ডাজ নট নো। কিন্তু কলকাতার পথেঘাটে সো মেনি অবসিন বুকস, পোস্টার, এমনকী মানুষের চালচলন, এত ডার্টস, সে সব দেখে জেনে কি আমাদের এ সব নেতা কর্তাদের কিছু যায় আসে? তবে হঠাৎ ত্রিদিবেশ রায়ের বিরুদ্ধে এ জেহাদ কেন? তার মানে মৌচাকে ঢিল, আর ঢিলের চেহারাটা অবিশ্যিই খুব মধুর না, সো দে আর ইউনাইটেড। ও সব থাক, এখন চলুন, একটু ল অ্যান্ড হোম-এর রুমে যাই, কে কে এসেছেন দেখি।
Chapter - 5
হ্যাঁ, ঠিকভাবে বললে, এ রকম বলতে হয়, ল অ্যান্ড হোম-এর রুম। জাজেস বা ম্যাজিস্ট্রেটস বা পুলিশের অনেক ইয়ে মানে হো-হোমরাচোমরা–মানে কর্তাব্যক্তিরা আসেন, বাবার যাঁরা বন্ধু, এবং তারা সকলে একসঙ্গে বসে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে ভালবাসেন। অবিশ্যি লইয়ার্সরাও অনেকে আসেন, তারাও সেখানেই বসেন, সকলেই ভীষণ ডিবেট করেন, কিন্তু আমি ও সবের কিছুই। বুঝি না বলে, কেবল ইয়ে হা করে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, এবং বলতে গেলে, ঢুকিইনা, ও রকম তাকিয়ে থাকতে হয় বলে, যদিও তাদের অনেকেই আমাকে খুব ইয়ে-স্নেহ করেন। তিতিরের উৎসাহ দেখে আমার খুব অদ্ভুত লাগছে। এক বছর মাত্র এসেছে, এর মধ্যেই বাবার গেস্ট আর বন্ধুদের সঙ্গে ওর বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে। এ বাড়িতে তিতিরের রোলটা কী, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তবে এ বাড়িতে কোনও মেয়ের ঠিক এ রকম রোল ছিল না। কিছুটা বড়দির (তোতা) ছিল, কিন্তু ওর উৎসাহটা বেশি ছিল শিল্পীদের সম্পর্কে, নাচগানের দিকে, এবং বাবার সেই জাতীয় বন্ধুদের বা গেস্টদের সঙ্গে ও খুব মিশত। তিতিরের মতো, সকলের সঙ্গেই মেলামেশা বা কথাবার্তা বলতে পারত না।
দরজার সামনে এসে, আমার এ ঘরে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না ভাবছি, তখনই বাইরে থেকেই শুনতে পেলাম, হেই মাই লাভ, মাই সুইটহার্ট, হোয়্যার ইজ মাই রোজ বাড।বলতে বলতেই, দেখতে পেলাম, একটি হাত তিতিরের কাঁধের ওপর পড়ল।
তিতির ফিরে তাকিয়েই, কেমন খুশি হয়ে উঠল, অন্তত এক্সপ্রেশনটা তা-ই অথচ ওর হাত দিয়ে কাঁধের ওপর থেকে হাতটা আস্তে আস্তে নামিয়ে দিতে দিতে খুশির স্বরে বলল, ওহ, আপনি এসেছেন? আমি আপনার কথাই ভাবছিলাম।
আহ, রিয়্যালি! আয়াম সো ফরচুনেট, বাট অ্যাট দ্য সেমটাইম আয়াম অ্যাফ্রেড!
যিনি চোখ বড় করে এ কথা বললেন, তাঁকে আমি চিনি, কলকাতা কোর্টের তিনি একজন ইয়ে– মানে, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট, মিঃ বাসু। বাবার বন্ধু, হাসিখুশি, সব সময়েই জোভাইল মুডে থাকেন। বিরাট লম্বা চওড়া চেহারা, মাথার পাতলা চুল ধবধবে সাদা, মোটা ভুরু, চোখা নাক। তিতির সন্তোষকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, মতিয়া কোথায়, ডেকে দাও। আচ্ছা, থাক, আমিই যাচ্ছি।
বলতে বলতে ও মিঃ বাসুর দিকে ফিরে বলল, এক মিনিট, আসছি। বলতে বলতে ও রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
মিঃ বাসু সেদিকে তাকিয়ে বললেন, দশ মিনিট অপেক্ষা করতে রাজি আছি, বাট আই মাস্ট হ্যাভ মাই রোজ।
তিতির ফিরে কোনও জবাব দিল না, মিঃ বাসু এ বার আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে, মাথাটা একটু পিছনে হেলিয়ে, ভুরু কুঁচকে দেখলেন, তারপরে বলে উঠলেন, হ্যালো মদন, কবে এসেছ?’ বলে আমার দিকে তার চওড়া মোটা হাত বাড়িয়ে দিলেন।
আমি ওঁর সুন্দর টাই-এর দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, আজ ও বেলা এসেছি।
মিঃ বাসু আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিলেন, (এখনও হাতে বেশ জোর।) বললেন, গুড! ওহ্, মানথস এগো, য়ু ওয়্যার সাচ এ হট স্টোরি ইন আওয়ার ফ্রেন্ড সারকল! আয়াম রিয়্যালি সরি ফর য়ু–আর কোনও কারণে না, অন্যায় না করে তোমাকে পানিশমেন্ট পেতে হল। এমন ব্যাপার যে, মহাদেবেরও কিছু করার ছিল না।
এ ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে বা শুনতে আমার আর ইচ্ছা করছে না। বললাম, যা হবার তা হয়ে গেছে, মানে।
ইয়েস, দ্যাট’জ রাইট, বাট ইট ওয়াজ এ ফিলদি কনসপিরেসি এগেনস্ট য়ু।বলতে বলতেই তিনি গলার স্বর নামিয়ে, প্রায় হুইসপারিং করলেন, লায়লী সিং-এর সঙ্গে তোমার কোনও অ্যাফেয়ার ছিল নাকি?
অ্যাফেয়ার? না না। আমি বলতে গিয়ে ঢোক গিললাম।
মিঃ বাসু আমার হাতে আঁকুনি দিয়ে বললেন, থাকলেও ইট ম্যাটারস নাথিং। মুশকিলটা হচ্ছে, রাস্তায় দিনের বেলা পাবলিকের সামনে ঘটনাটা ঘটেছে কিনা, উই জাজেস আর আওয়ারসেলভ কনভিক্টেডনা, কনভিক্টেড বলব না, আমাকে ঘটনা আর সাক্ষীপ্রমাণাদির ওপরে রায় দিতে হবে, আইনমাফিক বিচারের রায় দেবার দায়িত্ব আমার ওপরে দেওয়া হয়েছে, (কিন্তু এ সব আমার শুনতে ইচ্ছা করছে না।) সমাজের কল্যাণের জন্য, দো আই নো ভেরি ওয়েল, হিউম্যান বিইংস আর ভেরি পিকুলিয়র, তাদের ওয়ে অব লাইফ অ্যান্ড থিংকিং ফার অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য ল, কিন্তু সেটা জাজ হিসেবে না, বি. বি. বি. হিসাবে–আই মিন বঙ্কিমবিহারী বসু।
আহ, কেন যেন ভগবানকে ডাকতে শিখি নি!
আমি জানি লায়লী সিং-এর একটা অবসেশন ছিল তোমার সম্পর্কে!
তিতির এসে পড়ল, ওর হাতে একটি তাজা লাল গোলাপের কুঁড়ি-আহ, ভগবানকে ডাকার কথা ভাবছিলাম, তিতির এসে পড়তেই মিঃ বাসু আমার হাত ছেড়ে দিয়ে, ঝুঁকে নিচু হয়ে পড়লেন, বলে উঠলেন, ওহ মাই ডার্লিং চাইল্ড, মাই সুইটহার্ট, (আরও এক বার বলেছিলেন, সুসুইটহার্ট-মানে কী? তিতির তো হাসছে ঠোঁট টিপে) এই তো আমার পাওনা।
তিতির মিঃ বাসুর কোটের বুকে গোলাপ কুঁড়ি গুঁজে দিতে দিতে বলল, আপনাকে তো বলেছি, যেদিনই আসবেন, আমার কাছ থেকে একটি গোলাপ কুঁড়ি পাবেন।বলতে বলতে ফুলটা গুঁজে দিল, মিঃ বাসু ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, নাউ লেট মি শো মাই প্রাইড টু আদারস, চলো ঘরের মধ্যে।
তিতির আমার দিকে তাকিয়ে, ওর সেই চোখে যেন কী একটা ইয়ে-মানে, ইশারা করল, ঘাড় ঝাঁকিয়ে ডাকল, আসুন!
মিঃ বাসুও ডাকলেন, এসো মদন।
বলে উনি তিতিরকে নিয়ে পরদা সরিয়ে ঢুকলেন, আর পরদাটা আমার গায়ের ওপর এমনভাবে পড়ল, আমার অর্ধেক শরীর ভিতরে, হাফ বাইরে। প্রায় সাত-আটজন বসে ছিলেন, এখানে স্কচ পান চলছে, সকলকেই প্রায় আমি চিনি, এবং অনেকেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, হেইল বি. বি. বি.!
অ্যান্ড হিয়ার ইজ মাই রোজ বাড!’ বলে মিঃ বাসু বুকের দিকে দেখালেন।
এক জন, মিঃ কর, পুলিশের একজন বড় কর্তা, জিজ্ঞেস করলেন, হোয়্যার? অন য়োর কোট অর ইন য়োর হ্যান্ড?
মিঃ বাসু বললেন, দু জায়গাতেই।
সকলেই গলা খুলে হেসে উঠলেন। আর এক জন মিঃ ঘোষ, এ ফেমাস ক্রিমিনাল ল’ইয়ার জিজ্ঞেস করলেন, তা ফুলটি কি তুমি মহাদেবের বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এলে?’ বলে তিতিরের দিকে তাকিয়ে ইয়ে, ভুরু নাচালেন।
মিঃ বাসু বললেন, নো নো, শি ওয়াজ ওয়েটিং ফর মি৷
আহ, হোয়াট এ লাকি ডগ য়ু আর।কয়েকটি স্বর বলে উঠল।
তিতির আবার মিঃ বাসুর হাত কঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে একটু সরল, এবং বলল, আপনি বসুন।
মিঃ বাসু একটি সিঙল সোফায় বসতে গিয়ে বললেন, তুমি কোথায় বসবে?
মিঃ কর বলে উঠলেন, রজনী আমার কাছে বসবে। বলে তিতিরকে ডাকলেন, এসো রজনী, আমার কাছে এসো।
তিতির বলল, আপনারা বসুন, আমি দাঁড়িয়ে কথা বলছি।
এ সময়ে দিবাকর ঢুকল হুইস্কির গেলাস নিয়ে, এগিয়ে দিল মিঃ বাসুর দিকে। মিঃ বাসু গেলাসটি হাতে তুলে নিলেন, আর এ সময়েই কে বলে উঠলেন, আরে তুমি মদন না?
যিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি মিঃ দাশগুপ্ত, হাইকোর্টের বড় কাউনসেল। সকলেই আমার দিকে তাকালেন, এমনকী তিতিরও। আমি একটু হাসবার চেষ্টা করলাম–মানে, হাসলাম, আর স্লাইট ঘাড় ঝাঁকালাম, যার মানে, হ্যাঁ। ক্রিমিনাল লইয়ার মিঃ ঘোষ বলে উঠলেন, আরে তোমার জন্য আমি দিল্লিতে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মহাদেব যেতে দিল না। (ওহ, এগেন দ্যাট এপিসোড।) বলল যে, গিয়ে কোনও লাভ নেই। কিন্তু সেটা আমার ব্যাপার ছিল, লাভ লোকসান কিছু হত কি না।
মিঃ বাসু বলে উঠলেন, কিছুই হত না।
মিঃ ঘোষ বললেন, কী হতে পারত না পারত, য়ু জাজেস ক্যানট সে৷ উই দ্য লইয়ারস নো, কী হতে পারে না পারে। আমরা হওয়াতে পারি, না হওয়াতেও পারি।
নো, নট দ্যাট, ইট ডিপেন্ডস-’ মিঃ দাশগুপ্ত বললেন, তুমি পাঁকাল মাছের মতো খেলতে পারো, কিন্তু জাজমেন্টের পয়েন্ট হচ্ছে ল।
তারপরে সকলেই এমনভাবে ল অ্যান্ড অর্ডার নিয়ে তর্কে মেতে উঠলেন, যেন একটা ঝড় বইতে শুরু করল। তিতির বলে উঠল, উহ আপনারা ভীষণ দলাদলি আর ঝগড়া করছেন, এত কচাকচি কেন?
মিঃ বাসু তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, সরি ডার্লিং, আমরা একদম বোকা, তুমি বসো৷
আপনি বসুন।’ তিতির বলল, আপনার সঙ্গেই আমার দরকার। সে দিন আপনিও আমার কথা এড়িয়ে গিয়ে, পাঁকাল মাছের মতো পালিয়ে গেলেন।
মি?’ মিঃ বাসুর সুন্দর মুখে অ্যাস্টাউন্ডেড ভাব।
হ্যাঁ’, তিতির বলল, আপনি ত্রিদিবেশ রায়ের জাজ, জাজমেন্ট কী হবে আপনি বলুন।
মিঃ বাসুর মুখে হা হয়ে গেল, এবং সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে আবার তিতিরের দিকে এক সেকেন্ড দেখে বললেন, ওহ মাই ডার্লিং চাইল্ড, আমি তার কিছুই জানি না। ত্রিদিবেশ রায়ের মামলা এখনও চলছে।
তিতির মিঃ ঘোষের দিকে তাকাল। মিঃ ঘোষ বললেন, জানি, তুমি আমার দিকে তাকাবে। এসো, তুমি আমার কাছে এসে বসো, আমি বলে দিচ্ছি।’
মিঃ বাসু তিতিরের একটা হাত ধরে বললেন, না, ও আমার পাশে, হাতলের ওপর বসবে, তোমার যা বলার আছে বলো।
তিতির সকলের দিকে চেয়ে হাসল, এবং বলল, আমি কোথাও বসছি না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনছি, বলুন।
মিঃ ঘোষ বললেন, বঙ্কিমরা কী জানে জান তো? সাধারণ লোকদের বুদ্ধিশুদ্ধি নেই, আর কিশোর কিশোরীরাও তাই, তারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমন কিছুই চলতে দেবে না ওরা।
মিঃ বাসু বললেন, দ্যাট’জ ল’
কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস করো, গীতগোবিন্দের জাজমেন্ট কী হবে?’ মিঃ ঘোষ বললেন।
ওটা ধর্মীয় গ্রন্থ, ওটাকে আমার এজলাসে প্রসিকিউশনের জন্য আনছে কে? দ্যাট’জ অলসো ল।
কেবল কৃষ্ণের জায়গায় যদি বঙ্কিমবিহারী বসু করে দেওয়া যায়?’ ঘোষ বলতেই সবাই হেসে উঠলেন।
কিন্তু আমাদের বর্তমান জীবনটা?’ তিতির জিজ্ঞেস করল, যে সমাজ এখন আমাদের চারপাশে, আপনারা, আমরা, এত ফিল্ম পোস্টার, শোজ, অ্যাডভারটাইজমেন্ট–মানে টোটাল চেহারাটা, ইভন পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর নানান কেচ্ছা–এ সব কি কিশোর-কিশোরী আর সাধারণ মানুষকে মোটেই পারভার্ট করছে না? আর এ সব বলতে গেলেই ত্রিদিবেশ
জাজ দাশগুপ্ত বললেন, কিন্তু আমার আদালতে ও সব বিচারের জন্য আনছে কে? কেউ না। আর আনলেও, ওই যে ক্রিমিনাল লইয়ার বসে আছে, ফিল্ম-টিল্ম আর কোম্পানিগুলোর কথা যা বললে, সব তো ওদের সাজেশন নিয়ে করে।
আমি কেমন টায়ার্ড ফিল করছি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, অনেক কথা বলবার আছে, অথচ বলা যাবে না, যেমন, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে, তা হলে ত্রিদিবেশের বিরুদ্ধে লোকটি কে–মানে পাবলিকের সেই লোকটির শিক্ষা আর চরিত্র আর মন আমার ভাবনাটা শেষ হবার আগেই, তিতির বলল, কেষ্টবাবুই ঠিক বলেন, আপনারা কিছু নন।
কে কেষ্টবাবু? দ্যাট কেষ্ট চৌধুরি? এ হোকস, জেলাস র্যাট!’ মিঃ বাসু বলে উঠলেন, আমাদের তো তবু ল পয়েন্টে চলতে হয়, ও সাহিত্যের কী বোঝে?
জাজ দাশগুপ্ত বললেন, সামটাইমস উই জাজেস ক্যান অ্যাপ্রিসিয়েট লিটারেচর, কিন্তু ক্রিটিকগুলো সব
আমি ঘরের বাইরে চলে এসেছি, সত্যি টায়ার্ড। আমি জানি না, বা বুঝি না, এ সব থেকে মানুষের জীবন বা আর্ট অ্যান্ড লিটারেচর কী ইয়ে–মানে বেনিফিট হবে। ওঁরা সবাই তিতিরকে নিয়ে খুব ইয়ে–আর তিতির সকলের সঙ্গেই খুব ইয়ে মানে, সবাইকে ও খুব ইয়ে করতে পারে, কিন্তু বাবার বুক থেকে তিতিরকে (গোলাপকুঁড়িকে?) ছিনিয়ে নেবার কথা কে যেন বললেন? তার মানে কী?
উম! না।
কে? আমি ওপরের বারান্দায় এসে পড়েছি, এবং বাবার ঘর পার হয়ে, যে ঘরটা বারান্দা থেকে সরে গিয়েছে, মানে ইস্ট সাইড ওপনিং–যে দিকে যেতে হলে, প্রায় একটা করিডর রয়েছে, সেখানেই যেন একটা ফিমেল ভয়েস শুনতে পেলাম, আর আমার গায়ের মধ্যে কেমন করে উঠল, একটা প্রায় ভয়ের শিরশিরানির মতো। তারপরেই, ঘরের খোলা জানালা দিয়ে, (ওহ, কেন ভগবানকে ডাকতে শিখিনি।) ঘরের মধ্যে জিরো পাওয়ারের নীল আলোয় দেখতে পেলাম–ইমপসিবল, দু-দুজন ইয়ে, ম্যান অ্যান্ড উয়োম্যান, ওরা ইয়ে–মানে এমব্রেসিং? কিন্তু ইয়ে মানে সে রকম গরম তো নেই, ওরা গায়ে কিছু দেয় নি কেন? দুটো কালো পাথরের মূর্তির মতো ওদের দেখাচ্ছে, এবং আবার আমি ফিমেল ভয়েস শুনতে পেলাম, তোমার খুব সাহস হয়ে গেছে, না? কেউ এসে পড়ে যদি?
কেউ আসবে না। মেল ভয়েস শুনতে পেলাম। কিন্তু আমি এসে পড়েছি যে? কথাটা মনে হতেই, তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দিকে ফিরে গিয়ে, নামতে আরম্ভ করলাম। নীচে আসতেই, তিতিরের সঙ্গে দেখা, ও বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে, আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথায় গেছলেন, কখন। চলে এলেন?
বললাম, এ–এই তো, একটু আগে, ওপরে গেছলাম।
তিতির ওর সেই ডিপ চোখে, দু সেকেন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, সেই রকম, যেন কিছু খুঁজছে, তারপরেই হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আপনি হিরা আর সন্তোষকে ওপরে দেখলেন?
হি-হিরা আর–? আমার চোখের সামনে, এই মাত্র দেখে আসা ছবিটা ভেসে উঠল, এবং উইদন এ মোমেন্ট, আমার মধ্যে একটা কী হয়ে গেল, আমি বললাম, দেখেছি, ওরা একটু ব্যস্ত আছে।
তিতিরের চোখে পলক নেই, আর মনে হল, জীবনে ও এ রকম কথা শোনেনি। তারপরেই ও বলে উঠল, ওহ, আমিই ভুল করেছি হিরাকে ওপরে থাকতে বলে, আরও সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। নীচে সকলের মাঝখানে থাকলে–’কথা শেষ না করেই ও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল।
আমি বললাম, ইয়ে–মানে, লেট দেম বি বিজি, অ্যাঁ?
লেট দেম বি বিজি?’ তিতির থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, কী বলছেন? হিরার যদি একটা কিছু হয়ে যায়কনসেপশন?
অবাক হয়ে বললাম, তাতে কী?
তিতির আরও বেশি অবাক হল। যে কারণে হঠাৎ কথাই বলতে পারল না। কয়েক সেকেন্ড পরে বলল, তারপরে যদি সন্তোষ ভেগে পড়ে, তখন? তখন হিরাকে নিয়ে কী করবেন আপনারা?
ভে–ভেগে পড়ে মা-মানে?
আসুন আমার সঙ্গে।’ বলেই তিতির ওপরে উঠে গেল অন্ধকারে। আমি এত ভাবতে পারি না তিতিরের মতো, এত বেশি দূর পর্যন্ত, কিন্তু ওপরে ওঠাটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না। আশ্চর্য, সন্তোষ চলে যাবে কেন? আর চলে গেলেই কি হিরার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে? মানুষকে অবিশ্যিই ভাবতে হয়, তবু এতটা পরাধীনতা–হ্যাঁ, সমস্ত ব্যাপারেই আমরা বড় ইয়ে–ডিপেনডান্ট, ভিকটিম অব দ্য সারকামসট্যান্সেস। ওপরে এখন কী ঘটছে? তিতিরের যাওয়াটা কি ঠিক হয়েছে? কিন্তু তিতির তো যেন একটা ইয়ে–যাকে বলে অতি আবশ্যিক কর্তব্য পালনে ছুটে গেল। কর্তব্য? কিন্তু ওদের দুজনের ব্যাপারটানা, সন্তোষ নাকি চলে–মানে ভেগে পড়তে পারে। আথিংকে। হঠাৎ আমার চোখ গেল বারান্দার একেবারে এন্ডে, রান্নাঘরের সামনে, জানকী ঠাকুর আর মতিয়া এদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকাতেই ওরা আড়ালে চলে গেল। আমি ওপরেই যাই, অন্তত তিতির যদি খুব রেগে যায়, (তিতিরের মর্যালিটি বিষয়ে আমি কিছুই জানি না) তা হলে ওকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করা যাবে। ভেবে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়েই দেখলাম, সন্তোষ নেমে আসছে, এবং ওহ কী স্বস্তি, ও জামাকাপড় পরে আছে। ও আমার দিকে না তাকিয়েই মাথা নিচু করে নেমে চলে গেল, অথচ কোনও মানে হয় না–এই মাথা নিচু করার। লজ্জা? হ্যাঁ, সেটা বোধ হয় সম্ভব। আমি ওপরে উঠে এলাম, এবং বাবার ঘরের পরের ঘরে এখন বেশি পাওয়ারের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় দেখতে পেলাম, হিরা দু হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে কাঁদছেই তো, কারণ শব্দটা সেই রকমই হচ্ছে, অনেকটা ইয়ে–হেঁচকি তোলার মতো, দু হাত দিয়ে মুখ ঢাকা, আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিতির, শক্ত মুখে, চোখ দুটো কেমন যেন রাগে ঝকঝক করছে। মেরেছে নাকি? সেটা তা হলে খুবই অন্যায় করা হয়েছে। শুনতে পেলাম, তিতির বলছে, জানকী ঠাকুর তোকে কোনদিন বিষ দিয়ে মারবে, সেই তোর ভাল। আমি কোথায় ভাবছি, মেসোমশাইকে বলে সন্তোষের জন্য আর একটা কাজের কথা বলব, যাতে ও বেশি মাইনে পায়, বিয়ে করতে পারে, তা সে সবুর তোদের সইছে না। যা, বেরিয়ে যা আমার সামনে থেকে।
হিরা হঠাৎ নিচু হয়ে পড়ল, ওকে আমি দেখতে পাচ্ছি না, তিতির বলে উঠল, থাক, আমার পায়ে ধরে কিছু হবে না। নিজের পায়ে কুড়োল (কুড়োল! হ্যাঁ জানি।) মারলে, নিজেই মরবে।
বলেই ও ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল, এবং আমাকে দেখে দাঁড়াল। বাঁ হাত দিয়ে দেওয়ালে সুইচ টিপে বারান্দার আলো জ্বালল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল, আর তার মধ্যেই ওর মুখের এক্সপ্রেশন বদলে গেল, খানিকটা হতাশ স্বরে বলল, ওহ, দে আর সো কুইয়ার।
হ্যাঁ, পিপল আর কুইয়ার, কিন্তু–তিতির জিজ্ঞেস করল, আপনি কী ভাবছিলেন?
মা-মানুষের পরাধীনতার কথা।
তিতির আমার চোখের দিকে তাকিয়ে, একটু যেন অবাক হল, ভুরু কোঁচকাল, তারপরে কেমন একটু আনমাইন্ডফুল, এবং তার ওপরে ও যেন কেমন ফ্রিজ হয়ে গেল, কেবল ওর চোখের দৃষ্টি অন্য রকম, ও আমার মুখের দিকে যেন কেমন করে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো যেন চিকচিক করছে। আমি আমার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম।
.
ইয়ে, বাবা আর তিতিরনা, তার আগে সেই হররষ্ট্রিকন ঘটনা আমি এখনও ভুলতে পারছি না, যদিও তার সঙ্গে বাবা আর তিতিরের বিষয়ে চিন্তার কোনও যোগাযোগ ঠিক নেই, অথবা হয়তো আছেও। আসলে আমি পাজলড। লায়লী সিং আমাদের বাড়িতে এসেছিল। ঘটনা দু সপ্তাহ আগের, আমি দিল্লি থেকে ফিরে আসার তিন দিন পরে, বেলা তখন তিনটে হবে, আমাদের বাড়ি সাইলেন্ট, লোকজনরা সবাই ঘুমোচ্ছিল, অথবা আর কিছু করছিল, আমি জানি না, আমি আমার ঘরে ছিলাম। ঘুমোচ্ছিলাম না, চোখ বুজে শুয়ে ছিলাম, তার একটু আগেই চে গুয়েভারার নোটস পড়ছিলাম, আর একটা ইংরেজি সাপ্তাহিক, যাতে এ রকম চিঠি ছাপানো হয়েছে, কলকাতার কোনও কোনও এরিয়ায়, চে গুয়েভারার নীতিতে লড়াই চলছে, এবং সে সব এরিয়া বিপ্লবীদের দখলে, রাস্তায় বেরিয়ে যার কিছুই আমি দেখতে পাইনি। চোখ বুজে শুয়ে আমি সে সব ভাবছিলাম না, আমার ভিতরে কোথায় কতগুলো গোলমাল ঘটছিল–মানে আমার মনে এবং চিন্তার মধ্যে, সেগুলো বোঝবার চেষ্টা করছিলাম। আমার ঘরের দরজা খোলাই ছিল, হঠাৎ একটা খসখস বা আরও কোনও রকম শব্দে আমি চোখ খুলে মুখ ফিরিয়ে দেখতে পাই দরজার সামনে লায়লী সিং, তার হাত ধরে সুদীপ্তা চ্যাটার্জি দাঁড়িয়ে আছেন। পিছনে নাথু, যার চোখমুখের ভাব দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না, গোঁফ জোড়া পাকানো, খাকি ট্রাউজারের ওপর হাতকাটা গেঞ্জি পরা, বলল, মেমসাহেবরা বললেন, আপনার ঘরটা দেখিয়ে দিতে। যেন আমাকে জিজ্ঞেস করবার কোনও দরকার নেই। অবিশ্যি সুদীপ্তা চ্যাটার্জি এ বাড়িতে আরও অনেক। বার এসেছেন, নাথু ওঁকে চেনে, এবং আমার মনে হল, উনিই লায়লী সিং-কে নিয়ে ও রকম একটা। সময়ে এসেছিলেন। উনি হাত নেড়ে নাথুকে বললেন, তুম্ চলা যাও।নাথু চলে গেল। লায়লী সিং-কে। নিয়ে সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ঘরের মধ্যে ঢুকলেন, এবং দরজা বন্ধ করলেন, আমি আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে বসলাম, আমার বুকের মধ্যে ড্রাম পিটতে আরম্ভ করেছে। দুজনের দু রকম পোশাক। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ডার্ক ব্লু টাইট ট্রাউজার-ওটাকে কী বলে আমি জানি না, মনে হয় ওঁর গোড়ালির কাছ থেকে কোমর পর্যন্ত চামড়ার সঙ্গে ইয়ে মানে লেপটে আছে, তার ওপরে বাসন্তী না মাস্টার্ডকালার কলার তোলা ফুলস্লিভ সিনথেটিক জামা, কোমরে চওড়া বেল্ট, আর, ওহ আমি জানি না, লায়লী সিং যা পরে আছে, তাকেই মিনি শাড়ি বলে কি না, কিন্তু সেটা শাড়ি এবং হাঁটুর ওপরে তোলা, টকটকে ইন্ডিয়ান রেড তার রং, আর সেই শাড়িতেই এক দিকের কঁধ ঢাকা, আর এক দিকের কাধ একদম বেয়ার, আই ডোনো রিয়্যালি, এটা কী এবং এভাবে কেউ বাইরে বেরোতে পারে, বিশেষ কোনও শো করা ছাড়া। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দুজনেরই ঘাড় অবধি চুল খোলা, ঠোঁটে মুখে তেমন রং নেই, দুজনকেই কেমন টায়ার্ড দেখাচ্ছে, আর চোখা, যা দেখলে ভয় পাই, ঠিক তাই, লাল। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বললেন, কী করব। মদনবাবু, লায়লী কিছুতেই ছাড়ল না, লাঞ্চ টেবল থেকে জোর করে আমাকে তুলে নিয়ে এল, আপনার সঙ্গে মিট করবে বলে। ও তো কোনও দিন আপনাদের বাড়ি আসেনি, তাই আমাকেই (একটা পাঁচতারা হোটেলের নাম করলেন) হোটেল থেকে নিয়ে আসতে হল।
আমি বলে উঠলাম, ওহ, আচ্ছা বববসুন। কমপেনসেট! আমার মনে পড়ল।
আহ, মাদান!’ লায়লী সিং তখনও সুদীপ্তা চ্যাটার্জির হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল, আমার কানে বো– বোম ফাটল, লায়লী সিং সুদীপ্তাকে ছেড়ে দিয়ে, আমার দিকে দু পা এগিয়ে এল। ওহ, কেন ভগবানকে ডাকতে শিখিনি, ইংরেজিতে বললাম, দয়া করে বসুন মিসেস সিং, আমি দরজাটা খুলে দিই।
ওহ, নো মাদান, দরজা খুলো না। আমাকে লায়লী বলে ডাকো। তোমার যা ইচ্ছা করো, ক্রাশ মি, আয়াম ডায়িং ফর য়ু৷ লায়লী সিং দু হাত বাড়িয়ে দিল, আর আমি দেখতে পেলাম, তার কঁধ ঢাকা আঁচলের ওপরে একটা মস্তবড় বাটারফ্লাই গোল্ডেন ব্রোচ। ঠিক যেন সিনেমা হলের মাথায় বড় পোস্টার, নীচে জনতা সেই দিকে তাকিয়ে টিকেট বুকিংয়ের লাইনে মারামারি করছে, আমার চোখের। সামনে ভেসে উঠল। আমি সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকালাম, উনি কোমরে হাত দিয়ে পা দুটো অনেকখানি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে, ঠোঁট টিপে হাসছেন, এক বার আমাকে, আর এক বার লায়লী সিং-কে দেখছেন। বললেন, আমার জন্য ভাববেন না মদনবাবু, আমি নেই মনে করুন।
তার মানে কী, কেন আমি তা মনে করতে যাব? লায়লী সিং কাঁধের ব্রোচটা এক সেকেন্ডে খুলে ফেলল, আমি বাথরুমের দরজার দিকে তাকালাম। কমপেনসেশন! ওহ, এ বার তোমাকে ডাকতে দাও হে–দরজায় নকিং হল, লায়লী সিং-এর মিনি শাড়ির আঁচল যেন ইয়ে–ঝর্নার জলের মতো গড়িয়ে পড়ছে। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে হতে পারে?
বাবা।!’ আমার মুখ দিয়ে প্রথমেই বেরিয়ে পড়ল।
মহাদেবদা?’ বলতে বলতেই উনি দরজার কাছে গিয়ে, ল্যাচ-কী খুলে হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুললেন। তিতির–তিতির বাবা না। তিতির সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে এক বার দেখল, তারপর ভিতরে লায়লী সিং-এর দিকে, এবং ঘরের মধ্যে ঢুকে এল, আমার দিকে তাকাল, এক্সপ্রেশন–অবাক আর জিজ্ঞাসা। আমি বললাম, মিসেস চ্যাটার্জি আর মিসেস সিং দি–দিল্লিতে থাকেন।
তিতির দুজনের দিকে ফিরে কয়েক সেকেন্ড দেখল, লায়লী সিং আঁচলটা ইয়েবুকে চেপে ধরে আছে, তিতিরকে অবাক চোখে দেখছে এবং সুদীপ্তা চ্যাটার্জিও। তিতির হঠাৎ একটু হাসল, কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করে ইংরেজিতে বলল, আমার নাম রজনীবালা। আমার মনে হয়, আপনাদের কফি পেলে ভাল হয়।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জি ঘাড় অল্প ঝাঁকিয়ে বললেন, রিয়্যালি।
তিতির সেখান থেকেই ভয়েস তুলে উঠল, হিরা। সঙ্গে সঙ্গে হিরা দরজায় দেখা দিল। তিতির বলল, চার জনের মতো কফি নিয়ে এসো।’ বলেই লায়লী সিং-এর দিকে ফিরে হেসে বলল, ডু য়ু মাইন্ড, ইফ আই হেল্প য়ু?’ এবং অ্যানসারের অপেক্ষা না করেই, পড়ে যাওয়া আঁচল বেশ ইয়ে মানে সুন্দর করে গুছিয়ে সাজিয়ে কাঁধের ওপর তুলে দিয়ে, খোলা নাভির অংশ একটু ঢেকে দিয়ে, লায়লী সিং-এর ডান হাত থেকে ব্রোচটা নিয়ে আটকে দিল, আর লায়লী সিং-এর ঠোঁট নড়ল, কী যেন বলল, তিতির হেসে বলল, নো নিড টু মেনশন, প্লিজ সিট ডাউন’ বলে সুদীপ্তা স্যাটার্জির দিকেও তাকাল।
সুদীপ্তা চ্যাটার্জির চোখে এখনও জিজ্ঞাসা আর কৌ–কৌতূহল। লায়লী সিং ওঁর দিকে তাকাল। উনি ইংরেজিতে বললেন, এসো লায়লী, বসি।
লায়লী সিং আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মাদান, আমি তোমার কাছে এসেছি। অসুবিধা হলে তুমি আমার সঙ্গে চলো।
আমি তিতিরের দিকে তাকালাম, তিতির আমার দিকে। লায়লী সিং-এর দিকে ফিরে বলল, আমি আপনাদের ডিসটার্ব করব না। একটু বসুন, কফি পান করুন, এটা আমার কর্তব্য, তারপরে আপনারা বসে গল্প করবেন, আমি চলে যাব।
লায়লী সিং বলে উঠল, আপনার কর্তব্য পালনের কোনও দরকার ছিল না। তার স্বরে ঝাঁজ এবং চোখের দৃষ্টি যেন কেমন, ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। তিতির হাসল, বলল, কিছু মনে করবেন না, কর্তব্যের ফাঁকি দিতে আমি শিখিনি, অতিথিদের সময়োপযোগী সেবা করা আমার কাজ। আপনার আর্জ আপনি দশ মিনিটের জন্য চেপে রাখুন, তারপরেই ঠক্ ঠক্ ঠক্ জুতোর শব্দ বারান্দায়, এগিয়ে এসে থামল আমার দরজায়–বাবা। দরজায় দাঁড়িয়ে বাবা, ঘরের ভিতরে সবাইকে এক বার তাকিয়ে দেখলেন, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, দাদা!’ বলেই তিনি ছুটে গিয়ে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন, বাবা মুখ নিচু করে দেখলেন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি দাঁড়ালেন, বাবা ওঁর মুখের দিকে দেখলেন, তাঁর মোটা এবং লাল ঠোঁটে একটু যেন হাসি, শব্দ করলেন, হুম! তারপর ঘরের মধ্যে ঢুকে, কারোর দিকে না তাকিয়ে, লায়লী সিং-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। লায়লী সিং বাবার দিকে তাকিয়ে, অবাক অস্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করল, কে আপনি?
মদনের বাবা। বাবা বললেন। লায়লী সিং এক বার আমার দিকে দেখল, তারপরে হঠাৎ বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, ওহ, য়ু আর দ্য ফাদার!
আমার পায়ের তলায় মাটি যেন কেঁ–কেঁপে গেল, কিন্তু বাবা কিছুই বললেন না, কেবল থ্যাংকু’ বলে লায়লী সিং-এর পিঠে হাত দিয়ে, ওকে নিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে বললেন, বিমি এসো। বলে দরজার বাইরে বারান্দা দিয়ে চলে গেলেন। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি এক বার পাজলড চোখে আমার আর তিতিরের দিকে দেখে বেরিয়ে গেলেন। তিতির কয়েক সেকেন্ড পরে, আমার কাছে এগিয়ে এল, জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছেন?
আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে–মানে, মাথাটা কেমন ইয়ে হয়ে যাচ্ছে। ভেকান্ট চোখে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললাম। তিতির বলল, মাথাটা ঠিক রাখবার চেষ্টা করুন। আমি যাচ্ছি।’ বলে ও ঘরের বাইরে চলে গেল।
.
তারপরে রাত্রি আটটা পনেরো অবধি আমি ঘরেই ছিলাম। যত দূর মনে পড়ে হিরা আমাকে কফি তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিল, আলোও বোধ হয় ও জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, এবং আমি কখনও বসছিলাম, উঠছিলাম, পায়চারি করছিলাম, খাট থেকে বই আর পত্রিকা খুলে পড়বার চেষ্টা করছিলাম, মাথায় কিছুই ঢুকছিল না, এমনকী এক বার টেবলের ওপরে ট্রানজিস্টারের নবও ঘুরিয়ে ফেলেছিলাম, এবং তখন সংবাদ পাঠ হচ্ছিল, মাঝখান থেকে শুনতে পেয়েছিলাম…আজ বিকালে এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সিম্পোসিয়ামের বিষয়বস্তু ছিল, সাহিত্যে শ্লীলতা। লক্ষণীয় ছিল, বিভিন্ন সাম্যবাদী, গান্ধীবাদী এবং জনসংঘি সংস্থার বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একাধিক প্রবীণ সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আলোচনার সময় মূল আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন ত্রিদিবেশ রায়। তিনিও সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভাপতির বক্তৃতার আগে, ত্রিদিবেশ রায়কে বলতে বলা হলে, তিনি বলেন, বিষয়বস্তুর মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তির ওপর আক্রমণ শুধু চলছে, তার জবাবে শুধু এই বলতে পারি, আমার যে পিপীলিকা’ উপন্যাসের প্রতি এত আক্রমণ, তার একমাত্র কারণ, আক্রমণকারীরা ভীত ও বিরক্ত, কারণ তাঁদের ক্রোধের আগুনে তাঁদেরই মোমের মুখোশ গলে যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ গোলমাল শুরু হয়ে যায়, পরে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি ও কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত হয়। এ ছাড়া আজকের শহরের বিশেষ। ওহ, ম্যাডনেস। আবার নবটা ঘুরিয়ে বন্ধ করে, পায়চারি করছিলাম, এবং নীচের তলায় কী ঘটছিল, কিছুই জানি না, বেরিয়ে যাব কি না ভাবছিলাম, তিতির এসে বলল, নীচে চলুন, মেসোমশাই ডেকেছেন।
দেখেছিলাম, তিতির সেই আগের পোশাকেই, নতুন করে কোনও ড্রেস করেনি–মানে সাজেনি, এবং ওকেও যেন কেমন একসাইটেড অথচ, ওর সেই চোখে একটা মিষ্ট্রির ভাব দেখেছিলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন?
বাহ, তা আমি কী জানি? আপনার বান্ধবীরা সব রয়েছেন।
বান্ধবীরা?
হ্যাঁ, লায়লী সিং, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি—।
তারা কেউ আমার বান্ধবী নন।
তবু মেসোমশাই যখন আপনাকে যেতে বলেছেন, আপনি যান।’তিতির বলেছিল, আর পোশাকটা যদি নিতান্তই বদলাতে না চান, তবে অন্তত মাথাটা আঁচড়ে যান।’ বলে তিতির কয়েক সেকেন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গিয়েছিল। ওকে আমার ঠিক নরমাল লাগেনি। আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, চিরুনিটা তুলে নিয়েও, রেখে দিয়ে, আয়নায় নিজেকে দেখেছিলাম, হ্যাঁ, ঝোঁপঝাড়ের মতো দেখাচ্ছে, সো হোয়াট, আমি এ ভাবেই যাব। মনে মনে বলে আমি নীচে নেমে গেলাম। ড্রাইভার, মতিয়া, জানকী ছাড়া, বাড়ির কাজের লোকেরা বাবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল, আমাকে দেখে সবাই সরে দাঁড়াল, ব্যাপার কী? আমি বাবার ঘরের পরদা তুলে দেখলাম, দরজা বন্ধ, যা কখনও থাকে না। ভিতর থেকে বন্ধ কিনা, দেখবার জন্য ঠেলতেই দরজা খুলে গেল, আর প্রথমেই আমি বাবাকে দেখতে পেলাম, তার গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে চ–চন্দন সিং, আনথিংকেবল, এবং রেকর্ডের মিউজিকের তালে তালে, ঠিক যেন একটা ইয়ে বাঁ-বাঁদরের মতো নাচছে, আর বাবা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, ঘরের অন্য দিকে তাকিয়ে, যেখানে জোড়ায় জোড়ায় অনেকে নাচছেন, লায়লী সিং + মিঃ বি. বি., সুদীপ্তা চ্যাটার্জি + মিঃ কর, মিস রঞ্জনা (এক্স-মিনিস্টার অভয়বাবুর মেয়ে, কখন এসেছে জানি না।) + মিস্টার জগট বিশওয়াস, মিসেস ঘোষ–সেকেন্ড (ক্রিমিনাল লইয়ারের স্ত্রী, কখন এসেছেন জানি না।) + মিঃ চ্যাটার্জি–দিল্লি, বেগম সোফিয়া খান (মিঃ হাবিবুর বিজনেসম্যানের স্ত্রী, কখন এসেছেন জানি না।) + মিঃ দাশগুপ্ত, এই পাঁচ জোড়া নাচছেন, বাকিরা সকলেই ঘরের বিভিন্ন জায়গায় বসেছেন, পান এবং স্মোকিং চলছে, বৈদ্যনাথ দরজায় দাঁড়িয়ে সকলের গেলাসের দিকে লক্ষ রাখছে, কেবল বুঝতে পারছি না, চ–চন্দন সিং বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কেন ও রকম করছে, বাবার যেন কোনও ইয়ে মানে খেয়ালই নেই। আচ্ছা, বাবা কী করেন? হঠাৎ একটা শাউটিং হল, মাদান। মাদান।
লায়লী সিং ছুটে এল এদিকে, সবাই আমার দিকে ফিরে তাকালেন, তার আগেই চন্দন সিং মাদান’ বলে আমার কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরে, ঠিক আগের মতোই নাচতে লাগল, আর লায়লী সিং বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল, বাবা বললেন, গবা এসেছিস? আয়, বোস। লায়লী আজ আমাদের ক্যাবারে ড্যান্স অব ইন্ডিয়ান স্টাইল দেখাবে।
কে যেন আমার নাম ধরে ডেকে উঠলেন, মদন এসো৷’ গলাটা চিনতে পারলাম না, কেন না, আজ সবাই বাবার ঘরে, যে কারণে জায়গার অভাব অনেকে কারপেটের ওপরেই বসেছেন, চন্দন সিং তেমনি করে নেচেই চলেছেন, আমার ঘাড়ে লাগছে–এটা আমার বাবার ঘাড় না, বাকিদের নাচ তখন থেমে গিয়েছে, আমি কানের কাছে শুনতে পেলাম, বসে পড়ুন। পিছন ফিরে দেখলাম, তিতির। ও আবার বলল, পড়ে যেতে পারেন।
আমার ডান দিকেই একটা ছোট টুল ছিল, আমি সেটাতে বসতে গেলাম, চন্দন সিং মেঝেতেই বসে পড়ল এবং শরীর নাচতে লাগল, সেই অবস্থাতেই তিতিরের মুখে আঁচল চাপা, চোখ চিকচিক করছে।
বাবার গলার স্বর শুনতে পেলাম, সমর।
ইয়েস স্যার।সমর জবাব দিল রেকর্ড প্লেয়ারের কাছ থেকে, এ হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যান, শুনেছি বাবার অফিসে কাজ করে। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে স্যার।’ বলেই সুইচ বোর্ডের কাছে গেল, ঘরের মাঝখানে বড় আলোর ঝাড়ে সব আলোগুলো জ্বলে উঠল, আর বাদবাকি সব আলোগুলো নিভে গেল। সমর ফিরে গেল রেকর্ড প্লেয়ারের দিকে, নতুন রেকর্ড চালাল–ক্যাবারে মিউজিক। ঘর ঠিক অন্ধকার না, সবাইকেই স্পষ্ট দেখা যায়। লায়লী সিং বাবার দিকে একবার তাকিয়ে নাচের ফ্লোরে চলে গেল, বাবা সোফায় বসলেন, চন্দন সিং বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়ল মেঝেয়, লায়লী সিং মিনি শাড়ি পরা, হঠাৎ দু হাত দু দিকে ছড়িয়ে দিয়ে, ইয়ে মামা-শ্যামা প্রতিমার মতো ভঙ্গিতে দাঁড়াল, আর তখনই কৃষ্ণবাবু শাউট করলেন, অবসিন, অবসিন। হোয়াই দিস মিনি শাড়ি? ইট’জ অবসিন, শি শু্যড অ্যাপিয়ার উইদাউট দ্যাট আগলি পিস অব ক্লথ।
আশ্চর্য, উনি মিছিল থেকে এখানে কখন এসেছেন? এবং হঠাৎ এত উদারই বা হয়ে উঠলেন কেমন করে যে, লায়লীকে তিনি ভেনাসের মতো ইয়ে মানে নগ্ন দেখতে চাইছেন? অথচ সন্ধেবেলা তো অবসিন লিটারেচর অ্যান্ড আর্টের বিরুদ্ধে মিছিল পরিচালনা করেছেন। হঠাৎ মিঃ বি. বি. বি. বলে উঠলেন, ইমপসিবল, ল ডাজ নট অ্যাপ্রুভ নডিটি, হুইচ মে পারভার্ট অ্যান্ড কোরাপ্ট আনএক্সপার্ট কমন পিপল অ্যান্ড টিন-এজারস।
মিস্টার জগট বিশওয়াস বললেন, আমি কৃষ্ণ চৌধুরিকে সমর্থন করি।’
মিঃ কর বলে উঠলেন, কিন্তু আমি তা করতে দিতে পারি না, আমার একটা রেসপনসিবিলিটি আছে।
লায়লী সিং সেই ভঙ্গিতেই তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। বাবার গম্ভীর গলা শোনা গেল, এখানে কেউ কিছু না, যে যার জায়গায় বসো। সাম পিপল সেজ, ল ইজ অ্যান অ্যাস। সেটা ল এক্সপার্টসদের কার্যকলাপের জন্যই, বাট রিয়্যালি ল ইজ নট অ্যান অ্যাস। কিন্তু মানুষের জীবন আর ল, ইট’জ সামথিং ডিফারেন্ট। এনি হাউ, উই উইল সি লায়লী, দ্যাট শি ইজ বার্নিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। ক্যারি অন লায়লী, স্টার্ট।
সমর মিউজিক থামিয়ে দিয়েছিল গোলমালের মধ্যে, আবার চালিয়ে দিল। লায়লী তার ক্যাবারে ড্যান্স অব ইন্ডিয়ান স্টাইল শুরু করল। আমি ভাবলাম, বাবা আমার বাবা লোকটা কে? হোয়াট হি ডাজ, হোয়াট ইজ হিজ বিজনেস? আমার মাথা যেন ঘুরছে, লায়লী ব্রোচ খুলল, আমি উঠলাম, দরজা ফাঁক করে বাইরে গেলাম, কাজের লোকেরা ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে, সরে দাঁড়াল, আমি সিঁড়ির দিকে যেতে গিয়ে বাইরে যাবার দরজার দিকে গেলাম। ছোট লন পেরিয়ে, গেট ক্রস করবার আগেই, তিতিরের গলা পিছনে শুনতে পেলাম, কোথায় যাচ্ছেন?
আমি না থেমেই বললাম, ঘুরে আসছি। হয়তো তিতির কিছু বলল, আমি শুনতে পেলাম না, এবং সেই দিন রাস্তায় রাস্তায় আমি কতক্ষণ ঘুরেছিলাম জানি না, যখন বাড়ি এসেছিলাম, তখন সব চুপচাপ অন্ধকার। নাথু আমাকে গেট খুলে দিয়েছিল, সন্তোষ আমাকে বাড়ির ভিতরে যাবার দরজা খুলে দিয়েছিল, সিঁড়ি দিয়ে উঠে, দোতলায় অন্ধকারে আমি তিতিরকে চিনতে পেরেছিলাম, কিন্তু দাঁড়াইনি, সোজা আমার ঘরের দিকে গিয়েছিলাম। তিতির আমার পিছনে পিছনে এসে, আমার ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে বলেছিল, টেবলে আপনার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। আমি তিতিরের দিকে তাকিয়েছিলাম, দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ও ঘুমোয়নি, জামাকাপড় কিছুই বদলায়নি, বলেছিলাম, আলো অফ করে দাও, আমি শোব।’ তিতির তবু প্রায় এক মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল, তারপরে আলো অফ করে দিয়ে চলে গিয়েছিল, আমি শুয়ে পড়েছিলাম।
নেক্সট মর্নিং-এ বেলা নটায় তিতির আমাকে সকালবেলার খাবার খেতে যাবার জন্য ডাকতে এসে বলেছিল, মেসোমশাইও আজ সকালে ওঁদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।
কাদের?
মিস্টার জগট বিশওয়াস, মিঃ চ্যাটার্জি, মিঃ চন্দন সিং, লায়লী সিং, মিসেস চ্যাটার্জি, মিস রঞ্জনা।
কোথায় ছিলেন এঁরা?
এ বাড়িতে নীচের তলায়। মেসোমশাইও কাল রাত্রে নীচেই ছিলেন। খেতে আসুন।বলে তিতির দরজার কাছে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, এবিডি ওয়াজ ডায়িং ফর মেসোমশাই, সেই জন্য।’ বলে তিতির চলে গিয়েছিল, আমি ভাবছিলাম, তার মানে কী, কাল রাত্রে–?..
.
হ্যাঁ, ইয়ে, বাবা আর তিতির। পনেরো দিনের মধ্যে মানুষের জীবনে কোনও চেঞ্জ ঘটে কি না, আমি জানি না, কিন্তু আমার মধ্যে ঘটেছে, আর মনে হচ্ছে, সেটা খুব পজেটিভ। আমার মধ্যে যা ঘটেছে, তা–তা কী? তিতির। পজেটিভ, এবং সেটাকে সামথিং রং বলা যায় কি না, আমি জানি না। আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, ঠিক করেছি, কেন না, কোনও দিক থেকেই এ বাড়ি আমার বাসের জায়গা না। তা ছাড়া তিতিরা, তিতির এখন আমার কাছে এলে, আমি ইয়ে–আনিজি ফিল করি, আমি ওর কাছে আর আগের মতো থাকতে পারি না, কারণ, আমার মনের মধ্যে একটা পজেটিভ কিছু ঘটেছে, আর এটা ঘটার আগে আমি কিছুই জানতে পারিনি, অথচ আমি তিতিরের কিছুই জানি না। বিশেষ করে, বাবা আর তিতির কী সম্পর্ক দুজনের মধ্যে? মেসোমশাই এবং ইয়ে–শ্যালিকা কন্যা? সেবা? সেক্রেটারি? অলমোস্ট সবই হতে পারে। কিন্তু প্রায় আঠারো দিনের মধ্যে, সন্ধের গেস্টদের মুখে আমি বাবা আর তিতিরকে নিয়ে অনেক ইয়ে মানে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা শুনেছি। যা শুনে তিতির হেসেছে, বিদ্রূপ করে, অথবা এমনিই, দু-একবার অবিশ্যি ওকে ফ্রাউন করতে বা মুখ শক্ত করতে দেখেছি, এবং দু-একটা কঠিন কথাও বলতে শুনেছি, যা শুনে কমেন্টটররা অনেকেই থতিয়ে গিয়েছেন, অ্যাপলজি চেয়েছেন, কিন্তু তাতেই বা কী? বাবা আর তিতিরের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা দেখেছি, দুজনকে প্রায় বন্ধুর মতো ব্যবহার করতে দেখেছি, যদিও কখনও রেসপেক্টের অভাব দেখিনি, স্নেহ বা আদরেরও না, তথাপি ইয়ে মানে, না পেইন–পেইন–তিতির একটা কষ্ট–আমার, যা একেবার নতুন ঘটনা আমার মধ্যে, এত কষ্ট, যে আমি তিতিরের দিকে ভাল করে তাকাতে পারছি না, নিজের এই কষ্টের জন্য, অপরাধ বোধ করছি। তিতির। ওহ, না না, মালভা না, মিস্টার জগট বিশওয়াস শুনলে হয়তো বলতেন, মাল পড়ে আমার মনে এ রকম ঘটেছে, বাবা আর ছেলে মারামারি–ওহ, না। আমি চলে যাব। শুধু এই একটি কারণেই না, আমার সমস্ত জীবনটার জন্যই।
তিতির এক দিন বলেছিল, ও নাকি হিসাব করে দেখেছে, এ বাড়িতে প্রতি সন্ধে ও রাত্রে নরমালি তিনশো-চারশো টাকা খরচ হয়ে থাকে, বিশেষ উৎসব থাকলে, মিনিমাম হাজার। আমি? আমি কী করছি এখানে, অ্যান একসপেন্স অব হোয়াট? পু–পু-পুত্র? পুত্রের খরচ? বয়স কত? শরীর সুস্থ? দেন? সবই কেমন যেন পজেটিভ হয়ে উঠছে–পজেটিভ আর তিতির তার কারণ। তিতির তিতিরের এক একটা কথা, তিতিরের প্রতিটি বিহেবিয়ার তার কারণ। এ সপ্তাহের মাঝামাঝিও আমি তিতিরের সঙ্গে বাইরে গিয়েছি, ঘুরেছি, বেড়িয়েছি, খেয়েছি, একটা কি দুটো ফিলম শোও দেখেছি, কিন্তু সব সময়ে যেন একটা ছায়া ঘুরছে। সেটা হয়তো আমার মনে, আমার মস্তিষ্কের মধ্যে, কিন্তু ঘুরছে, যা আমি টলারেট করতে পারছিলাম না, এবং আর বাইরে যাইনি। তিতির আমার দিকে তাকিয়ে থাকছে, চুপচাপ, অনেকক্ষণ, ওর সেই চোখে, এবং হঠাৎ জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে? আমি জবাব দিচ্ছি, কিছু না। তথাপি তিতির তাকিয়ে থাকছে, হয়তো বা হঠাৎ ওর চোখে বা ঠোঁটে একটু হাসি ফুটছে, আবার ইনস্ট্যান্ট গম্ভীর, আর চোখে সেই, সেই কিছু খোঁজার মতো দৃষ্টি। ও জানে না, আমার কষ্ট হয়, ও আমার কষ্ট, আর তার জন্য কী রকম অপরাধ বোধ করি, যা ওকে আমি বলতে পারি না। আমি কেন এখানে আছি?
তিতির আমার দরজায় এসে দাঁড়াল। রোদ এখন কোন দিকে? ওর বাঁ দিকের গাল, খোলা চুল, কাঁধ কাটা সাদা জামার ওপরে হলুদ আঁচল লাল দেখাচ্ছে। তা হলে বিকাল, ও সেজেছে, খোলা চুলটাও কখনও কখনও সাজ।
চা খেয়েছেন? তিতির ঘরের মধ্যে এল।
খেয়েছি। আমি ভারতীয় আধুনিক ইতিহাসের পাতা মেলে ধরলাম।
তিতির আমার সামনে, খুব সামনে এসে দাঁড়াল, বইয়ের পাতার ওপরে ওর হাত উলটে মেলে ধরল, আমি ওর দিকে তাকালাম। ও বইটা টেনে, টেবলের ওপর সরিয়ে দিল, বলল, এর চেয়ে মুখ খোলা ভাল৷ ওর সেই চোখের দৃষ্টির মধ্যে কেমন একটা ফার্মনেস। সেটা এখন আমার মধ্যেও আছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বললাম, মুখ খোলার মতো কিছু নেই, ভাবছি চলে যাব।
কোথায়?
যেখানেই থোক, কোথাও।
কেন?
সন্তোষের জীবনও আমার থেকে ভাল, কাজ করে, খায় আর–আর—
প্রেম করে।’ তিতির হাসল, কাপে চামচের ঠুং ঠুং শব্দ বাজল, বলল, কিন্তু মহাদেব মুখোপাধ্যায়ের মতো বাবা ওর নেই।’
তাতে কী? মানুষকে কিছু করতেই হয়।
এ চিন্তা খুব ভাল। জানতে পারি, রিয়্যালাইজেশনটা হঠাৎ কবে হল?
অনেক সময় হঠাৎ হয়।
তিতির কয়েক সেকেন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ওর ঠোঁটের কোণে যেন একটু হাসি চিকচিক করছ, নিচু স্বরে বলল, য়ু আর জেলাস।
জেলাস?
তিতির একটু ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ, অব মোর ফাদার।
আমি জানি না, কেমন করে আমার হাত উঠল, আর শার্পলি হিট করল তিতিরের গালে। তিতির যেন পাথরের মূর্তি, একটু মুভ করল না, হাত তুলল না, ঠিক যেমন মুখ ছিল, তেমনিই, কেবল চোখ দুটো যেন কেমন স্পার্ক করল, আর ঠোঁটের কষে চোঁয়ানো রক্তের বিন্দু। কয়েক সেকেন্ড, তারপরেই ও চলে গেল ঘর থেকে, এবং আমি এখন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছি, কেবল একটা কষ্ট আর রাগ নিজের ওপর, ঘৃণা আর রাগ, আর একটা কষ্ট, ওহ! হোয়াট হ্যাভ আই ডান? পরাজিত অপরাধী কিন্তু জেলাস? কিন্তু এ হাত, ডার্টি ফিলদি হাতটা নিয়ে আমি কী করব? ওহ, দিল্লির কনট সার্কাসের ঘটনার থেকেও এটা বীভৎস! তিতির… তিতির… তিতির… তিতির…ফ্রিজ আমি।…কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, একটা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে, একটি আলো জ্বলল, শেডে ঘোড়া ছুটছে। তিতির দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়েই যেন চমকে উঠল, কেন, আমি তা জানি না, তারপর আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে এল, কাছে এল, আমার সেই–সেই কুৎসিত হাতটাই দু হাতে ধরল, তুলে ওর সেই–সেই গালে চেপে ধরল, আর আমার দিকে তাকাল, চোখ দুটো যেন জলের মধ্যে পাথর টলটল করছে, শুধু বলল, বুঝেছি। বলা মাত্রই আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, আর আমার নিশ্বাস-বন্ধ বুকে তিতিরের মুখ। কোনও ছায়া আমি দেখতে পাচ্ছি না, দেওয়ালে টাঙানো ঝরনার ছবিটা দেখতে পাচ্ছি। তিতিরের নিশ্বাসের আগুনে আমার জমে যাওয়া নিশ্বাস আবার পড়ছে। তিতির আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, বসুন।আমি বসলাম, ও বলল, যাবার আগে আমাকে ডাকবেন।’ যেন কোথাও বেড়াতে যাবার কথা বলল, আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। ও চোখমুখ মুছে, আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করবেন, ভাবছেন?
ইয়ে’–আমি হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠে বললাম, তিতিরের হাত ধরে, আমার সামনে টেনে নিলাম, আমার গলা কঁপছে না, কিন্তু যেন কেমন একরকম শোনাচ্ছে, আমার লিখতে ইচ্ছা করছে। মর্ডান হিস্টরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড মোটামুটি পড়েছি, আর আমি যা দেখেছি, আমার সে সব এক্সপিরিয়েন্স লিখতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু কেন লিখব, আমি এখনও তা জানি না।’
তিতির বলল, হয়তো জীবনকে আপনি একটু নতুন শেপ দিতে চান।
আমি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বললাম, ওহ নো, না না, তা না, আমি ও রকমভাবে ভাবতে পারি না, কিন্তু আমি কিছু বলতে চাই–আমার–আমাদের কথা, এবং আমাদের–এ বাড়ি না, আমাদের মধ্যে, এই ওয়ার্লডে আমি কেন বেঁচে আছি, আর সত্যি বলতে কী, কেন বেঁচে থাকতে চাই। আমি বোধ হয় উপন্যাসের রূপ দিতে চাই, কিন্তু আমার লেখবার কোনও ল্যাঙ্গুয়েজ জানা নেই।
তিতির বলল, আপনার যা জানা আছে, সে ভাবেই লিখবেন, চিরদিনের ল্যাঙ্গুয়েজ বলে, কী আছে?
কিন্তু আমি তিতিরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে, লাইটের শেডের দিকে এক বার তাকালাম, আবার ফিরে বললাম, কিন্তু সব লিখতে গেলে ইয়ে–আমার জীবনের যা অভিজ্ঞতা, ফিলিংস, তা এমনই ক্রুয়েল,শকিং আর এমন নেকেড অ্যান্ড ফিউরিয়াস, যা আমি অসংকোচে লিখতে চাই–প্লিজ তিতির, আমি বক্তৃতা করছি না তো? শোনো, সবাই আমাকে ইয়ে মানে আমার লেখা–অবসিন হয়ে গেলে?
আপনি কেন সে কথা ভাবলেন। আপনি আপনার কাজে বিশ্বস্ত থাকবেন। কে যেন বলেছিলেন, সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়?
নামটা মনে করতে পারছি না। আমি তিতিরের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালাম, ওর সেই চোখের দিকে তাকালাম। তিতির। আমার কষ্ট আমার–আমার, ওহ, না, চোখে যেন জল না আসে, আমার সহযাত্রী। বললাম, বাবাকে বলে আসি।
তিতির জিজ্ঞেস করল, কেন?
বলেই আবার সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ বলা উচিত। কৃতজ্ঞতা ছাড়াও, উনি আপনাকে ভালবাসেন। চলুন আমিও যাচ্ছি।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে, পিছন ফিরে দেখলাম, তিতির আসছে। আমি সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আবার পিছন ফিরে দেখলাম, তিতির আসছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম, নীচে, ডাইনে বাবার ঘর। তিতির নেমে এল।
