Chapter - 1
অমৃত কুম্ভের সন্ধানে – কালকূট (সমরেশ বসু)
প্রথম প্রকাশ : অক্টোবর, ১৯৫৪
.
অনেক আশা নিয়ে যারা গিয়েছিল,
আর কোন আশা নিয়ে কোনদিন ফিরে আসবে না
তাদের উদ্দেশে—
– কালকূট
১
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মন যেন এক সর্বনেশে যন্ত্রবিশেষ। বর্ষে বর্ষে ঋতু বদলায়, তার সঙ্গে রূপ বদলায় এই পৃথিবীর। কত তার রূপ, কখনো দেখি জলশূন্য রিক্ত মাঠ, সহস্র ফাটল ফেটে চৌচির হয়ে আছে। সেই ফুটি-ফাটা মাঠের উপর দিয়ে পাগল হাওয়া হা হা করে ছুটে যায়। মনে করি, রিক্তা ধরিত্রী নিঃশব্দ কান্নায় গুমরে উঠছে। অগ্নিশ্রাবী আকাশ। গাছে পাতা নেই, কলকাকলী নেই বিহঙ্গকুলের। বিশ্বসংসার জ্বলছে নিরন্তর।
আবার দেখি, কোনো অদৃশ্যলোক থেকে সহস্র ধারে আসছে বন্যা। আকাশে মেঘের ছড়াছড়ি। ভেসে গিয়েছে মাঠ, সবুজ শস্যে ভরে উঠেছে তার বুক। হঠাৎ হাওয়ার শিউরিনিতে সোহাগী গর্ভবতী কেঁপে কেঁপে উঠছে হাসিতে।
মনের দিকে তাকিয়ে দেখি, সেখানে শূন্য। লোকে বলে, মনের মানুষ মেলে না। তাই কি! মনের সঙ্গে কোনোদিন বোঝাপড়া করলাম না। শূন্য মন নিয়ে আমরা দিবানিশি ছুটে চলেছি বৈচিত্র্যের সন্ধানে। কী চাই জানি নে, পাওয়ার জন্য পাগল হয়েছি। তাই কেউ বলেছে, ‘ব্রেথা তারে খুঁইজে মরা মাটির এই বৃন্দাবনে।’ কেউ বলেছেন, ‘একবার—আপনারে চিনলে পরে, যায় অচেনারে চেনা। মনের এই বিড়ম্বনার কথা আর একজন বলেছেন
‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই।
যাহা পাই তাহা চাই নে।’
বৈচিত্র্যের সন্ধান, আমাদের মনেরই সন্ধান। মানুষ খোঁজার ছলে আমরা মন খুঁজি। তাই বন্ধু যখন বিদ্রূপ করে বললে, ‘কেন যাচ্ছ কুম্ভমেলায়? ধর্ম করতে নাকি?’ ধর্মের নামে যে হিসাবে ধার্মিক বোঝায় তা নই, আবার বিধর্মীও নই। আমরা সেই মানিকবাবুর ‘লেবেল ক্রসিং’-এর নায়কের মতো।
বললাম, ‘দেখতে।’
‘কী দেখতে? লক্ষ লক্ষ ধর্মান্ধ মানুষকে?
ধর্মান্ধ! লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি ধর্মান্ধ হয়, তবে খুঁজেই দেখি না কেন, লক্ষ মনের কোন চোখে পরানো আছে সেই ঠুলি! মনে পড়ছে এক প্রৌঢ়া বিধবার কথা। বাঙালি বিধবা কুম্ভমেলায় গঙ্গার উপরে এক ভাসমান সেতুর কোণে বসেছিলেন আহ্নিক শেষ করে। সন্ধ্যা নামছে। আমিও যাচ্ছিলাম জলের দিকে। মহিলাটির গায়ে পা লেগে গেল। বাঙালির ছেলে আমি। সসংকোচে ক্ষমা চেয়ে হাত বাড়ালাম ওঁর দিকে। উনি তাড়াতাড়ি আমার হাত ধরে চিবুকে হাত দিয়ে সশব্দে আঙুলটি চুম্বন করলেন। স্বভাবতই অনেক কথা হলো। ওঁর একটি কথা এখানে বলবো।
কথার পিঠে কথা দিয়ে একবার কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইলেন। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন মেলার ভিড়ের দিকে। তারপরে বললেন, ‘বাবা, মানুষ মিলে মেলা, মানুষের মেলা। যখন ভাবি, এই লক্ষ লক্ষ মানুষের মেলায় আমিও একজন, তখন সুখে আনন্দে আমি, আর চোখের জল রাখতে পারি নে।’
এখন মনে পড়ছে সে-কথা। কিন্তু তখন বন্ধুকে বলেছিলাম, ‘ধর্মান্ধ কিনা জানি নে, তবে মানুষ দেখতে যাচ্ছি। আমাদের সব কিছুতে সাধ মিটতে পারে। সাধ মেটে না মানুষ দেখে মানুষ চেখে। মানুষের চেয়ে বিচিত্র এ সংসারে আর কী আছে?’
বুঝলাম, বন্ধু খুশি হয় নি। বিদ্রুপে বেঁকে ছিল তার ঠোঁট। অনেক তর্ক সে তখন করেছিল। এখন সে তর্কের কথা তুলে লাভ নেই। তর্ক করেও লাভ নেই। আমরা যা দেখি নি, যা পাই নি, তাই দেখবার ও পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। অজানা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।
সত্যি, অষ্টপ্রহর মানুষের সঙ্গেই বাস করি। মানুষের কত রূপ দেখি। কিন্তু যেখানে চলেছি, সেখানে আরও কত মানুষ, কত তার রূপ! যে প্রতিবেশীকে বছরের পর বছর দেখেও কোনোদিন চোখে পড়ে নি, পরিবেশের গুণে তার বিচিত্র রূপ দেখে আমাদের মন ভুলে যায়। কী কথা! হাজার দিন দেখেও যে মন ভোলে না, সে একদিন সব ভোলে। মন চিনি না। তাই তো বারে বারে রূপ দেখি।
‘জনম অবধি হম রূপ নেহারনু
নয়ন না তিরপতি ভেল।’
এত রূপের ফেরে ফিরি কেন আমরা! মন খুঁজি। লক্ষ রূপের আরশিতে আমরা নিজের বৈচিত্র্যকে দেখি। এই বৈচিত্র্য হলো নিরিখ, যাকে বলে কষ্টিপাথর। দাগ কাটো। সোনা কি লোহা, নিমেষে তা ফুটে উঠবে।
না, আর দেরি নয়। মন চলেছে আগে আগে, এবার পা চালিয়ে দিই। ডুব দেব লক্ষ হুদি কুম্ভ-সায়রে।
পিঠে নিয়েছি ঝোলা, হাতে নিয়েছি ঝুলি। কিন্তু হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফরম দেখে চক্ষুস্থির। তবুও উঠতে পেরেছি, এক সময়ে গাড়িও ছেড়েছে।
এক ফালি ছোট কামরা। জনা আটেকের বসবার জায়গা। কলকাতাবাসী উত্তরপ্রদেশের এক পরিবারের ছ’জন পরিবার বসেছেন প্রায় দু’টো সিট দখল করে। আমিও পেয়েছি খানিকটা। আরও জনা চারেক উপরে নিচে। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!
ছ’জনের পরিবারের চালক যে যুবকটি, সে গোটা তিনেক স্টিট্রাঙ্ক সেঁটে দিল প্ল্যাটফরমমুখো দরজায়। দিয়ে আমার দিকে বীরত্বব্যঞ্জক অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসলো। অর্থ পরিষ্কার। হেসে জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় কী!
আমার আজানুলম্বিত কালো ওভারকোট আর টুপি দেখিয়ে সে ইংরেজি মিশ্রিত হিন্দিতে বললো, আপনাকে দেখাচ্ছে যেন মিলিটারি সেপাই। দরজার দিকে সিরিফ কটমট করে তাকিয়ে থাকবেন। তাহলেই আর কেউ সাহস করে—’
শেষটুকু তার চোখের আধবোজা হাসিতেই পরিস্ফুট। অতএব তার নির্দেশে আমি হলাম এ কুঠরির আর-এক দিকের দ্বাররক্ষী। সন্দেহ ছিল নিজেরই, এ চোখের কটমটানিতে কেউ ঘাবড়াবে কিনা।
এই তো আমরা। কেউ বলতে এলে মন ভারী করি। অথচ সামান্য সুখের জন্য আমরা নিয়ত এমনি অভিনয় করে চলি। নিজের সঙ্গেও করি কিনা কে জানে!
কথায় জানলাম, ছ’জনের পরিবারের দেশ আজমগড় জেলায়। ব্যবসাক্ষেত্র কলকাতা গন্তব্য এলাহাবাদ, কুম্ভমেলা। আমি? আমিও একই পথের যাত্রী। হ্যাঁ? শুনে ভারি খুশি। যুবকটি লাফ দিয়ে উঠে পড়লো ট্রাঙ্কের উপর। নাক ডাকাতে আরম্ভ করলো কম্বল মুড়ি দিয়ে।
পরিবারের মা, মেয়ে আর বউ সামলে দিব্যি এলিয়ে পড়লেন আমার উপরে। ভগবান জানেন, কী খেয়ে ওঁর গতরখানি অমন ভয়াবহ হয়েছে। আমি বেঁকে রইলাম একটা চ্যাপটানো ব্যাগের মতো। ওভারকোটের মহিমায় এত যে ফৌজী কায়দায় কটমট করে তাকালাম, সেদিকে কারুরই হুঁশ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকার ঐকতান শোনা গেল। কিন্তু নথ-নোলকপরা নাকগুলিও যে এমন মেঘগর্জন করতে পারে, তা কে জানতো!
কয়েক হ্যাঁচকাতেই এক্সপ্রেসখানি গজলের দ্রুত লয়ের মতো বাঙলাদেশ পেরিয়ে গেল। মুখ বাড়িয়ে দিলাম বাইরে। অন্ধকারের বুকে অজস্র আলোর সারি, যেন কচি শিশুর হাসকুটে চোখের মতো। অন্ধকার মিহিজামের আলো। যন্ত্রনগরী চিত্তরঞ্জন। সীমান্ত বাঙলার কাঁথামাদুর পচা ছেলে আমরা। বাইরে বড় যাতায়াত নেই। এইটুকুতেই মনে হলো, দেশ ছেড়ে এলাম। এবার মহাদেশের পথে। মহামেলার পথে, লক্ষজনের অকল্পিত বিচিত্র রূপ বিচিত্র নাদে আমার প্রতিটি ধমনীকে ডাক দিয়ে চলেছে। পথে কী আছে কে জানে! মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি কালো কঙ্কালের দু’টি হাত। চমকে উঠলাম। সকলে নিদ্রামগ্ন। আমি প্রহরী।
কঙ্কালসার কম্পিত হাতদু’টো অতিকষ্টে একটি কমলালেবু ছাড়াচ্ছে। এতক্ষণ মুখোমুখি দেখেছিলাম, সামনের সিটে একটি কম্বলের পুঁটুলি। এবার সেই পুঁটুলির মধ্যে দেখছি একটি মুখ। লিকলিকে ঘাড়ের উপর বসানো একটি মাথা। গোঁফ-দাড়ি গজানো শীর্ণ মুখ। কোটরগত চোখ। অস্বাভাবিক উজ্জ্বল সেই চোখের চাউনি। গেঁড়িগুগুলির মতো একরাশ মাদুলি ঝুলছে। কণ্ঠার কাছে।
নিঃসন্দেহে মানুষ। চোখাচোখি হতেই নিঃশব্দে হেসে উঠলো সে। বালকের মতো তার কোটরগত চোখেও হাসির নির্ঝর। ঘাড় বাঁকিয়ে বললো হিন্দিতে, ‘আমি যাব, হ্যাঁ।’
আমাকেই বলছে। অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায়?’
‘কুম্ভমেলায়? কেন, আমি যেতে পারিনে?’
এই সামান্য জিজ্ঞাসায় তার চোখের ব্যগ্রতা দেখে আরও অবাক হলাম। কেন যেতে পারবে না! কিন্তু তার কথা শুনে আমার সন্দেহ হলো, জিজ্ঞেসা করলাম, ‘তোমার কি অসুখ করেছে?’
সে-কথার কোনো জবাব দিল না সে। খানিকক্ষণ ধরে চিবুল কমলালেবু। তারপর আপনা থেকেই বলতে আরম্ভ করলো। তার একটানা কণ্ঠস্বর একান্ত হয়ে গেল ট্রেনের
শব্দের সঙ্গে। বললো, বাড়ি তার বালিয়া জেলায়। কাজ করতো কলকাতার শহরতলীর এক কারখানায়। সেখানে আছে তার বউ, তার ছেলেমেয়ে। বউও কাজ করে। না, তার চেহারা দেখে যেন বয়স ঠিক না করে ফেলি। বয়স তার মাত্র আঠাশ। বউ তার বাইশ বছরের জোয়ানী অওরত। বেচারা তাকে খাওয়া-দাওয়া সবই দিচ্ছিল। সে যে বড় ভালো লড়কী। কিন্তু–
তার রুগ্ন চোখে ফুটে উঠলো অসহ্য যন্ত্রণা। ‘আর সহ্য হয় না এই ব্যামোর কষ্ট, তাই চলেছি কুম্ভমেলায়।’
বললাম, ‘কেন?’
এবার তার অবাক হওয়ার পালা। তাই সেই কোটরগত বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কেন, তুমি জানো না? তবে তুমি কেন চলেছ? জানো না, অসুরের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেবতারা তাঁদের অমৃতকুম্ভ প্রয়াগ-সঙ্গমে লুকিয়ে রেখেছিলেন?’
বললাম, ‘শুনেছি।’
তেমনি মিষ্টি হেসে সে বললো, শুধু শোননি, কেন দুনিয়ার মানুষ যায় সেখানে? কেন মহাপুরুষ সাধুরা আসেন সেখানে স্নান করতে? তাদের চেহারা দেখ নি, কী সুন্দর! কী তার বাঁধুনি! কুম্ভযোগে সঙ্গমে স্নান করলে মানুষ শত বছর পরমায়ু পায়, রোগমুক্ত হয়। তাই তো .. আমি যাচ্ছি।’
বলতে বলতে আলোকিত হয়ে উঠলো তার কালো কঙ্কাল মুখ। বোধ হয় খানিকটা উত্তেজনাও এসেছে তার। কীসের একটা বেগ আসছে তার হৃৎপিণ্ড থেকে। সে তাড়াতাড়ি আবার কম্বল মুড়ি দিল। কম্বলের ভেতর থেকে শুনতে পেলাম একটা ঘড়ঘড় শব্দ, তার সঙ্গে দেহাতী ভাষায় ছন্দিত ঈশ্বরের নাম।
ঘুমন্ত কামরা। বাইরে অন্ধকার। আকাশে অস্পষ্ট নক্ষত্র। গাড়িটা হুড়মুড় করে ছিটকে গেল আরেকটা লাইনে। কত রাত কে জানে!
মিথ্যে বলেনি যুবকটি। ব্যর্থ হয়নি আমার প্রহরা। ফৌজের মতনই বাধা দিয়েছি জন-বন্যার পাগলা গতি।
কিন্তু এই মানুষটি, ওই কম্বলের পুঁটুলিটি কী অপূর্ব! ভাবতে গেলাম, কিন্তু ভাবা হলো না। লোকটির গা থেকে খসে পড়েছে কম্বল। বুকে হাত দিয়ে কাশছে ঘং ঘং করে। কাশির ফাঁকে ফাঁকে বলছে রুদ্ধগলায় : ‘উঃ, বড় তখলিফ, বড় তখলিফ। এখন নয়, হে ভগবান! সে যে অনেক দূর, অনেক দূর।’
কী অনেক দূর! ভীত বিস্মিত হয়ে তার অসহ্য যন্ত্রণা দেখতে লাগলাম। বললাম, ‘কী বলছো?’
সে বললে, ‘খুলে দাও দরজা, জিঞ্জির খুলে দাও। প্রাণ গেল হে ভগবান! এখনো অনেক দূর।’
দরজা খুলে দেব! চাবুকের আঘাতের মতো ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা বাইরে। দরজা খুলে দেব কি!
সে কাশতে কাশতে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘খুলে দাও বাবু, খুলে দাও।’
কথা শেষ হলো না। তার কম্বলের উপর কী যেন চকচক করে উঠলো। তরল পদার্থ। রক্ত। রক্ত তার ঠোঁটের কশে। রাজরোগ যক্ষা।
সে যে অমৃতকুম্ভ সন্ধানের যাত্রী। সে যে শত বছরের পরমায়ুসন্ধানী। এ গাড়ি কি পথ ভুল করেছে!
আর আমি! কত কথা বলেছি নিজের মনে। অমৃতকুম্ভকে হুদিকুম্ভ নাম দিয়ে চলেছি ছুটে। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হলো, কোথায় পালাই। চোখের সামনে কিলবিল করছে জীবন্ত মৃত্যু জীবাণু। পালাও পালাও। বিচিত্রের সন্ধানী, অমৃতের সন্ধানী ভুল করে পা দিয়েছি যমের দোরে।
আশ্চর্য! কেউ উঠলো না ঘুম থেকে। কাশির শব্দে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে শুলো কেউ কেউ। আমি খুলে দিলাম দরজা। বুঝতে পারিনি যে, গাড়ি একটা স্টেশনে এসেছে। ছুটে গেলাম গার্ডের কাছে। গার্ড বললেন, ‘কুড়ি মিনিট দেরিতে দৌড়াচ্ছি আর এখনো রাত রয়েছে, কাকে বলতে যাব বলুন! আপনি তার চেয়ে কামরাটা বদলী করে ফেলুন।’
সেই ভালো, ওই কামরাটি ছাড়া আর সব কামরাতেই আছে অমৃত কুম্ভ! মৃতসঞ্জীবনী। এসে দেখি, ভয়ানক ব্যাপার। ফৌজ নেই দরজায়, বিনা বাধায় ঢুকছে সব বেনো জলের মতো। প্রায় কুড়িখানেক মাথার উপর মাথা। অন্ধকূপ হত্যার জীবন্ত ছবি।
চেঁচিয়ে মারামারি করে কোনোরকমে নেমে এলাম নিজের ঝোলাঝুলি নিয়ে। কিন্তু কেউ দরজা খোলে না। আমি এক দ্বাররক্ষী, পড়েছি অনেক রক্ষীর হাতে। কেউ কথাই বলে না। কিন্তু পড়েও থাকতে পারি না। মন তো আবার বলছে, চলো চলো।
গাড়ি ছেড়ে দেয়। ছুটে গিয়ে উঠলাম একটা আপার ক্লাস কামরায়। তীরের মতো ছুটে এলো কয়েক জোড়া আধ-ঘুমন্ত চোখের বিরক্ত সন্দেহান্বিত দৃষ্টি। গুটিকয়েক অবাঙালি মহিলা ও পরুষ। অস্ত্র ছিল একটি। পরিষ্কার ইংরেজিতে বললাম, ‘একটু বিপদে পড়ে উঠে পড়েছি। যাব এলাহাবাদ। সুযোগ পেলেই নেমে যাব, আপনাদের কষ্ট দেব না।’
চেহারা দেখিয়ে সব বোঝানো যায় না। কথা শুনিয়ে অনুমান করাতে হয়। একটু একটু করে বিরক্ত চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে এলো। তারপর একটু বা কৌতূহল। তারও পরে আপার ক্লাস গদির সামান্য একটুখানি জায়গার প্রতি অঙ্গুলিসঙ্কেতের করুণা।
দাম আছে এই প্রত্যাশিত করুণার। করুণা কেন, সভ্যতাই বলা যাক না। বুঝলাম, দু’টি পরিবার রয়েছে কামরাটিতে। একটি পরিবার অন্ধ্রের, আর একটি মধ্যপ্রদেশের। জায়গা দিলেন অন্ধ্রের এক ভদ্রলোক। এঁরা তীর্থযাত্রী। কলকাতার কালীঘাট দর্শন করে চলেছেন প্রয়াগসঙ্গমের কুম্ভমেলায়। ঘুরেছেন আরও অন্যান্য জায়গায়। প্রয়াগ হয়ে চলে যাবেন দেশে। অনেক কথা হলো। বললেন, ‘আপশোস রয়ে গেল, কল্যাণী কংগ্রেস দেখা হলো না।’
সে আপশোস ছিল আমারও। কিন্তু একটা দেখতে গেলে আর একটা ছাড়তে হবে, উপায় কী? তারপর ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন, ‘আপনি কেন চলেছেন প্রয়াগে?’
ভদ্রলোকেরা তিন ভাই। তিনজনেই অদ্ভুত কালো। যাকে বলে নিকষ কালো। মাথার চুলও তিনজনেরই ঘন কুঞ্চিত। সঙ্গে বড় ভাইয়ের বউ। আজানুলম্বিত বেণী ঝুলে পড়েছে সিটের নিচে। দু’টি কানে গুটি আটেক সোনার মাকড়ি, নাকের দু’দিকে দু’টি নাকছাবি। ঘোমটা নেই। কিন্তু ইংরেজি জানে বলে মনে হয়। তাঁরা তিন ভাই ও এক ভাজ, চারজনেই আমার জবাব শোনার জন্য মুখের দিকে তাকালেন।
লজ্জা পেলাম। বললাম, ‘কেন, যেতে নেই?’
‘নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ইয়ংম্যানেরা তো এ সব বড় একটা—’
বললাম, ‘পছন্দ করে না বলছেন তো? ঠিকই। আমিও মাথা মুড়োতে যাচ্ছি না। দেখুন, আমাদের জীবন বড় সীমাবদ্ধ। গণ্ডীবদ্ধ জীবনদর্শনের কচকচি নিয়ে আমরা দিনগত পাপক্ষয় করি। কিন্তু নিজের দেশের কতটুকু জানি! দেখেছি কতটুকু! আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষ যা নিয়ে মরে বাঁচে (তা ভালো কি মন্দ জানি নে), সে তার জাতীয় বিশেষত্ব নিয়ে যেখানে মিলিত হয়, যেখানে আমাদের সমস্ত জাতি হাসে কাঁদে গান গায়, তাকে ইয়ংম্যান হয়ে আমি অবহেলা করবো কী করে! যদি আমার হাসি পায়, তবে আমি কাঁদবো। যদি নুয়ে আসে মাথা তাকে আমি মিথ্যে অহংকার দিয়ে জোর করে তুলে ধরবো না। আমি যদি থাকতে পারি নিরাসক্ত তা-ই থাকবো। এত বড় দেশ, এত মানুষ, কত তার বৈচিত্র্য! আপনাদের দেখবো বলেই তো এসেছি। না এসে পারলাম না।’
আবার বিচিত্রের কথা। ধক করে উঠলো বুকের মধ্যে। এই একই গাড়ির কয়েকটা বগীর পেছনে রয়েছে সেই মানুষটা। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি তার সেই যন্ত্রণাকাতর মুখ। এতক্ষণ কী করছে সে? কেমন আছে?
এঁরা আমার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছেন কিনা জানি না, বিস্মিত হয়েছেন বুঝলাম। কিন্তু আমার আর কথা বলতে ইচ্ছা করলো না। এঁদের কৌতূহল ছিল অনেক, মেটাতে পারলাম না আর।
কাচের সার্শির বাইরে দেখছি আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। রক্তিমাভা দেখা দিয়েছে পূর্ব দিগন্তে। গাড়ি এসে দাঁড়ালো মোকামাঘাটে। নেমে গেলাম প্ল্যাটফরমে। নিচু প্ল্যাটফরম। উত্তুরে হাওয়া দুরন্ত ঝাপটা মারছে। গায়ের মোটা ওভারকোটটা পর্যন্ত পাতলা কাপড়ের মতো উড়তে লাগলো।
বিহারের চেহারা এখন শ্যামল। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ছোলা আর মটর অড়হরের কিশোরী ডগা দোলাচ্ছে মাথা। মাথা তার হলুদ ফুলে গিয়েছে ছেয়ে।
গাড়ির পেছন দিকে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলাম। আর একবার চমকে উঠলো বুকের মধ্যে। লাল কাঁকরের উপর শোয়ানো রয়েছে সেই মানুষটি। অমৃতসন্ধানী। মুখটি খোলা। শরীর ঢাকা কম্বলে। সে যেন চোখ বুজে ঘুমোচ্ছে!
মনে পড়ছে সেই বালকের মতো আবদারের সুর, ‘আমিও যাব।’ কেন? না, বাঁচবার জন্য।
আমার যাত্রাপথের প্রথমেই বিচিত্র এই মৃত্যু দৃশ্য। কে জানতো, অমৃতসন্ধানীর পেছনে পেছনে মৃত্যু এসে এই কামরায় ওত পেতে ছিল সুযোগের অপেক্ষায়। তাই সে বার বার বলেছিল, ‘হে ভগবান, সে যে এখনো অনেক দূরে।’
গাড়ির দরজায় দরজায় কুম্ভযাত্রীর মারামারি, চিৎকার হল্লা। সবাই যাওয়ার জন্য পাগলের মতো ছটফট করছে। তুমি পড়ে রইলে। সে যে এতদূর, তা আমিও জানতাম না। তোমার হয়ে আমি হাজারটা ডুবও যদি সঙ্গমে দিই তাহলেও তোমার আশা আর কোনোদিন মিটবে না। তুমি পড়ে থাকো, আমাদের পরমায়ু নিয়ে আমরা ছুটে চলি। এটাই নিয়ম।
সত্যি এ নিয়ম বড় বিচিত্ৰ।
কত সুখ দুখ আসে নিশিদিন।
কত ভুলি কত হয়ে আসে ক্ষীণ।
নইলে বাঁচতাম কী করে! মনে পড়ে, একটা আধপাগলের মুখ থেকে একবার শুনেছিলাম, ‘শুনি পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। জল আমাদের দুঃখ, স্থলটুকু আমাদের সুখ।’
সেই অপার দুঃখকে ভুলে থাকা ছাড়া উপায় কী? সামান্য সুখের মুখ দেখলেই দুঃখ ভুলে যাব।
তাড়াতাড়ি সেই আপার ক্লাসে এসে তুলে নিলাম নিজের ঝোলাঝুলি। অন্ধ্রের বড়ভাই বললেন, ‘কোথায় চললেন?’
বললাম, ‘আপনাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি, এবার নেমে যাই।’
‘কেন, বসুন না। শুধু শুধু আর কামরা বদলি করে কী হবে। একেবারেই এলাহাবাদে গিয়ে নামবেন।’
ভাবলাম, উনি হয়তো জানেন না যে আমার তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট। বললাম, ‘উপায় নেই থার্ড ক্লাসের টিকিট।’
কিন্তু ভদ্রলোক কিছুতেই নামতে দিলেন না। মনে হলো তাঁদের সমস্ত পরিবারটিই নামতে দিতে চান না। চোখমুখ কুঁচকে ভদ্রলোক এমন একটি ভাব করলেন যে, সামান্য টিকিটের জন্য আবার এত ভাবনা কীসের। কিন্তু আমি তো জানি, কালো-কোটধারী একজন আর কর্মচারী সময় বিশেষে কী দারুণ বিভীষিকা। অপমানের ভয়টাই বড়। তাছাড়া আর কী!
তবু বসতে হলো ভদ্রলোকের আগ্রহে। বুঝলাম, ওদিকে মধ্যপ্রদেশের পরিবারটি রুষ্ট হয়েছেন। রুষ্টতার সঙ্গে কিছুটা বিদ্রূপ।
সমুদ্রোপকূলবর্তী প্রদেশের মানুষগুলো বোধ হয় একটু বেশি সেন্টিমেন্টাল। নাকি ইংরেজিতে বলে ‘টাচি’, বোধ হয় তাই। অর্থাৎ আবেগপ্রবণ। সেই আবেগপ্রবণতা মধ্যপ্রদেশের লোকের কাছে ন্যাকামো মনে হতে পারে। আমার উঠে যাওয়াতেই বা কী এমন ভদ্রতা প্রকাশ পেতো।
কিন্তু এক-একটা সময় আসে, যখন মনকে দিয়ে যা খুশি তাই করাতে পারি নে। অন্ধ্রের লোক আলোচনা পেড়ে বসলেন ধর্মতত্ত্বের। অথচ মন পড়ে রইলো মোকামাঘাটে। মোকামাঘাটের বিছানো লাল কাঁকরের বুকে, যেখানে শুয়ে রয়েছে আমাদের অনেকের সহযাত্রী। তাছাড়া ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় আমার অধিকারই বা ছিল কতটুকু!
পায়ের কাছেই দেখছি ছেঁড়া কম্বল ঢাকা দিয়ে শুয়ে আছে একটি মানুষ। বেরিয়ে আছে শুধু মুখটি। ঘুমন্ত মুখ। বয়স ঠাওর করা মুস্কিল। মুখের উপর ছড়িয়ে আছে একরাশ রুক্ষ চুল। ভাবলাম, এদেরই কারুর চাকর-বাকর হবে।
গাড়িটা হঠাৎ লোকালের মতো থামতে থামতে চলেছে। শত হলেও পশ্চিমদেশ। ভোরের আলোয় যাকে দেখেছিলাম শ্যামাঙ্গিনী, রৌদ্রালোকে দেখলাম শ্যামাঙ্গিনী কিঞ্চিৎ রুক্ষ। যত দূরে চোখ যায়, শুধু জনহীন মাঠ আর মাঠ। অড়হর, কলাই, মুগ আর মুসুরির মাঠ ঠেকেছে গিয়ে আকাশের গায়ে। মাঝে মাঝে হঠাৎ ক্লান্ত চোখের সামনে ভেসে উঠছে গ্রাম। এ গ্রাম কালকাসুন্দের বনঝোপ আর আম-জাম-সুপুরি-নারিকেলের ছায়া-শীতল গ্রাম নয়। আমবাগান আছে বটে, থোকো থোকো কাঞ্চনবরণী বোলে ভরে উঠেছে তার সর্বাঙ্গ। আর আছে তালবন। তারই ফাঁকে ফাঁকে মাটির দেয়াল আর খোলার ছাউনি দেওয়া বস্তি।
অন্ধ্রের ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন, ‘আপনি বোধ হয় আমার কথা ঠিক ধরতে পারছেন না। না না, আমি আপনাকে খুব বড় কথা কিছু বলছিলাম না। আমি শুধু আপনাকে—’ বলতে বলতে থেমে গেলেন। নিতান্ত হুঁ-হাঁ দিয়ে কাজ সারছিলাম। লজ্জা পেয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখি, তিনি আপন মনে মাথা নাড়ছেন। মাথা নামিয়ে বসে আছেন দুই ভাই। আর তাঁর স্ত্রী তাকিয়ে রয়েছেন বাইরের দিকে। কিন্তু কিছু দেখছেন না। মন-চোখ তাঁর এদিকেই। চোখ দু’টি ছলছল করছে। লজ্জিত করুণ মুখে সামান্য হাসির আভাস জোর করে ফুটিয়ে রেখেছেন তিনি।
তারা চারজনেই যেন বড় বিমর্ষ হয়ে উঠেছেন। মনে মনে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তাড়াতাড়ি বললাম, ‘হ্যাঁ, আপনি বলেছিলেন উপনিষদে যে সমস্ত প্রাকৃত—’
‘না না, অতবড় কথা আমি বলতে পারবো না। আমি বলেছিলাম,’এক মুহূৰ্ত ইতস্তত করে বললেন তিনি, ‘জানেন, আমাদের এই চারজনের পরিবারটি একেবারে অভিশপ্ত। আমি নিজে এক জন সরকারী কর্মচারী, আমার ভাই দু’জনও তাই। আমাদের অর্থের অভাব নেই। শুধু একটি অভাবে আমরা সর্বহারা হয়েছি, আমরা পাগলের মতো ঘুরে মরছি সারা দেশ। এই আমাদের কুলগুরুর নির্দেশ।’
অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন তিনি। উত্তেজনার পাল্লা দিয়ে হু-হ রক্ত ছুটে আসছে তাঁর স্ত্রীর মুখে। স্বামীর দিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে তিনি বোধ হয় নিরস্ত করতে চাইছিলেন স্বামীকে। কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতে পারছিলেন না।
আমার দিকে চোখ পড়তেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আশ্চর্য! মনে হলো, তাঁর ঠোঁট দু’টো কেঁপে উঠলো। তাঁর দক্ষিণী সমুদ্রের অতল ডাগর চোখে ঝিকমিকিয়ে উঠলো অশ্রুর মুক্তাবিন্দু। সপ্তরশ্মি খেলে গেল তাঁর গ্রাম্য নারীর মতো কানে পরা অনেকগুলি পাথরখচিত কর্ণভূষণে। ক্লান্ত কালনাগিনীর মতো পিঠের উপর এলিয়ে পড়ে রইলো রুক্ষ বেণী।
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভুলে গেলাম কুম্ভসহযাত্রীর কথা। কৌতূহলপূর্ণ মন নিয়ে, জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলাম, তিন ভাই ও এক বউয়ের দিকে।
বড় ভাই তাঁর স্ত্রীকে লক্ষ করেই চুপ করে গিয়েছিলেন। আবার বললেন নিচু গলায় ‘জানেন, প্রয়াগের আর-এক নাম তীর্থরাজ। এইবারই আমাদের শেষ, আমাদের আশা-নিরাশার পরীক্ষার শেষদিন এগিয়ে আসছে। এইবারই আমাদের সমস্ত সঞ্চিত পাপ নষ্ট হয়ে যাবে। সংসার পাতবে আমার ভাইয়েরা, আর আমার—’
তাঁকে বাধা দিয়ে এক ভাই নিতান্ত দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলে উঠলেন। মনে হলো, তাঁর স্ত্রীর বিষয়ে কিছু বললেন। তিনিও স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তেমনি দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু বললেন। কিন্তু মহিলাটি কোনো জবাব দিলেন না।
আমি যেন এক রহস্যনাটকের বিস্মিত নীরব দর্শক। ভদ্রলোক এবার হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘আপনি বলছিলেন, অনেক কিছু দেখতে চলেছেন আপনি। আপনার দুর্ভাগ্য যে, আমার মতো একজন লোকের সঙ্গেও আপনার আলাপ হয়ে গেল। কিছু মনে করবেন না, আমি আমাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত একটা কথা আপনাকে বলছিলাম।’
সমস্ত সংকোচ কাটিয়ে আমি বললাম, ‘কিন্তু আপনার কথা আমি কিছু বুঝতে পারি নি।’
তিনি বললেন, ‘ক্ষমা করবেন। আমার স্ত্রীর বড় কষ্ট হচ্ছে। আপনি আসবেন আমাদের ক্যাম্পে। পাণ্ডার কাছে আমাদের খবর পাবেন। আপনি এলে আমরা খুব খুশি হব।’ বলে, তিনি আমাকে সিগারেট দিয়ে আপ্যায়িত করলেন। তাঁর স্ত্রী তাকালেন শান্ত চোখে কৃতজ্ঞতা নিয়ে, তাঁর আত্মভোলা স্বামীর এবং আর আমার দিকে। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা, বোধ হয় আর কৌতূহল না প্রকাশ করবার জন্য।
বুঝলাম, ভদ্রলোকের ধন মান ও বিলাসের তলে বুকে একটি পাথর চেপে আছে। নিজের অজ্ঞাতসারে কয়েক মুহূর্তের জন্য সরে গিয়েছিল সেই পাথর। মন পেতে বসেছিলেন এক অপরিচিত নগণ্যের কাছে।
মন পাতা হলো, মনের কথা হলো না। এখানে পরস্পরকে গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় কী! ভবিষ্যতের আশা রইলো কিনা কে জানে! আশা এইটুকু, পথের দেখা পথেই শেষ হবে না। আমরা সকলেই চলেছি এক মহাসঙ্গমে। সেখানে হবে মিলন, তারপরে বিদায়। মিলন মুহূর্তে এক হয়ে যায় হাসি-কান্না। সেই হাসি-কান্নার কলরোলে যদি শুনে নিতে পারি তাঁর কথাটি, সেটুকু লাভ।
এখন শুধু মনে রইলো, তাঁদের পরিবারের মধ্যে একটা ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে তারই প্রায়শ্চিত্ত করে ফিরছেন তাঁরা। প্রায়শ্চিত্তের শেষ দিন আগত। গরলে হবে অমৃতের উদ্ভব ভরে উঠবে তাঁদের তিন ভাইয়ের সংসার।
এমনি ভরিয়ে তোলার জন্যে ছুটে চলেছে লক্ষ মানুষ। লক্ষ জনের লক্ষ রকম কামনা। আমিও চলেছি তেমনি এক কামনা নিয়ে।
কিন্তু আর কতদূর? পুব আকাশের কোল ঘেঁষে দেখা দিয়েছে বিন্ধ্যাচলের উঁচু-নিচু মাথা। বেলাও হয়েছে মন্দ নয়।
পায়ে মৃদু চাপ অনুভব করলাম। তাকিয়ে দেখি, পায়ের কাছে শোয়া সেই মানুষটি। মুখের চুল সরিয়ে ধূলিরুক্ষ মুখ ভরে হাসছে। তাকাতেই ওই অবস্থাতেই কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করলো।
অবাক হলাম! এদের কারুর লোক নয় নাকি! বললাম, ‘কিছু বলছ আমাকে?’
‘একটা বিড়ি দেন
প্রথমেই বিড়ি, তাও আবার প্রাণের ভাষায়। অর্থাৎ বাঙলা কথায় বুঝলাম, এদের কেউ নয়। বললাম, ‘এখানে উঠলে কী করে?’
হেসে বললো, ‘উঠি নি, উঠিয়ে দিলে নোকেরা। কাল রাতেই আপনার মুখখানি দেখে মনে হয়েছিল, এ আমার চেনা মুখ। এখন দেখছি, ঠিক তাই!’
‘চেনা মুখ? কী করে চিনলে?’
‘কেন! এই তো এতগুলোন মুখ রয়েছে। আমার দেশের মানুষের মতো মুখখানি আর ক্যার আছে, আপনি বলেন।’
ভাবলাম, ধন্য তোষামোদ! কী ভাগ্যি বলে নি বাড়ির কাছের মানুষ! বিড়ি তো নেই। প্রাণধরে দিলাম একটা সিগারেট।
তার কালা মুখের হাসিটি আরও মধুর করে বললো, ‘ছিগরেট দিলেন? তবে এট্টুস নিধমের হাতটা ধরুন, উঠে বসি।’
নিধম মানে অধম করে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু হাত ধরে ওঠাতে হবে কেন বুঝলাম না। বললাম, ‘কেন?’
তেমনি হেসে পায়ের উপর থেকে তুলে নিল ছেঁড়া কম্বলটা। দেখলাম, পা-দুটো হাঁটুর কাছ থেকে বেঁকে ঠেকে রয়েছে পাছার কাছে। উঠে বসতে হয়তো পারে, তবে অবলম্বন চাই।
হাত বাড়িয়ে দিলাম। উঠে বসলো সে। একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘রাস্তায় বসে বসে খাচ্ছিলে, আবার পথে পথে কেন?
‘রাস্তায়?’ হাসতে হাসতে বললো, ‘ভিক্ষের কথা বলছেন? তাই-ই, তবে রাস্তায় তো বসিনি কখনো। পড়ে থাকতাম এক কোণে। রাস্তা আর পথ, যা-ই বলেন এই পেখম থাকতে পাইরলাম না কিছুতেই। দ্যান, দিয়াশলাইটা দ্যান।’
দেশলাই দিয়ে বললাম, ‘যাওয়া হবে কোথায়?’
‘যেখানে সব্বাই চইলছে, সেইখেনে। পেরাগের মেলায়।’
‘আসছ কোত্থেকে?’
‘নদে জিলা। আমঘাটার নাম শুইনছেন, নবদ্বীপের কাছখেনেই? সেইখেনে নক্কীদাসীর আখড়ায় নাম-গান করি। আমি মূল গায়েন।’
বললাম, ‘বৈষ্ণবেরাও কুম্ভের মেলায় যায়?’
সে তাড়াতাড়ি কপালে হাত ঠেকিয়ে বললো, ‘আরে বাপরে, বোষ্টম যাবে না তো যাবে কে? তীখখানি তো বোষ্টমের। ভাগাভাগির কথা যদি বলেন, অন্য মতের সাধকেরা তো জোর করে ভাগ বইসেছে। শিবভক্তরা আইসবে বটে, তবে বিষ্টুভক্তি না চাইলে পেরাগের মাটি আপনার পেন্নাম নেবে না।’
নাকমুখ দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললো, ‘এটা হলো ঝগড়ার কথা। এ কথা বাদ দেন। ওনার কাছে, ভাগাভাগি নাই, জাত নাই। যানার কাছে এলেম, তারে না ডেকে দলের মারামারি করে লাভ?’
বললাম, ‘এলে তো, ওই পা নিয়ে যাবে কী করে?
সে হাসলো। হাসি তার মুখের ভূষণ। অনর্গল ধোঁয়ার জালের আড়ালে আড়ালে দেখলাম ভিজে ওঠা চোখ দু’টো মুছে নিল। বললো, ‘বাবু, আমার নাম মা-খেগো বলা। অর্থাৎ কিনা বলরাম। আমারে জম্মো দিয়ে মা আর সামলাতে পারে নাই, মরে গেছিল। এই পা দু’টোর জন্যিই। জম্মো-লুলা বইসে ছিলেম, কবে সেদিন আইসবে, যেদিন বেরিয়ে পড়বে। তা এই পা দু’টোর জন্যি পড়ে থাকতি বলেন? বুকে হেঁটে যাব।’ বলে, সে গলা ছেড়ে গান ধরে দিল-
‘অগো আইসবে বলে
পথের মাঝে জীবন কেটে গেল,
তুমি এমনি খেলা খেল।
সবুর-মেওয়া রইলো মাথায়,
চইলব এবার যথায় তথায়,
রোদবিষ্টি আশীর্বাদী।
আমার মাথায় ঢেলো।।’
সকলেই কিছুটা চমকে উঠেছিলেন, আমিও। কিন্তু মা-খেগো বলার গলাটি এমনি উদার ও মিষ্টি যে, ভেসে গিয়েছিলাম। লক্ষ্মীদাসীর মূল গায়েন বলে আর অস্বীকার করার উপায় ছিল না বলরামকে।
বোধ হয়, গানটা আরও বাকি ছিল। মধ্যপ্রদেশের সগুম্ফ বিরাটকায় ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘ক্যায়া, অভি গানা ভি শুরু কিয়া?’
বলরাম হাতজোড় করে বললো, ‘আজ্ঞে কী বললেন কর্তা?’
‘উসব কতা ফতা নাহি জানতা, গানা বন্দ কর।
অজেয় হাসি বলরামের। বললো, ‘আচ্ছা বাবু, আর করেগা নেই।
আমি তাকালাম অন্ধ্রের পরিবারটির দিকে। তাঁরা তাকালেন আমার দিকে একটা চাপা ও অর্থপূর্ণ হাসি বিনিময় হলো আমাদের মধ্যে
বড়ভাই বললেন, ‘আপনি এই ভিক্ষুকটিকে চেনেন?’
বললাম, ‘না। চেনা হয়ে গেল।’
বলরাম আমাকে আবার ডাকলো, ‘বাবু।’
বললাম, ‘বলো।’
‘বাবু, মুনিঋষিরা কথা না কইয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। আর আমরা? কাল রাত থেকে মুখ বন্ধ। আর চুপ কইরে থাকতে পারি না। আমার কষ্ট হইবে, সেই ভেবে নক্কীদাসী আমারে এই বাবু-কামরায় উঠিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তুন, নক্কী যদি নরকে থেকেও সঙ্গে নিয়ে যেইতো তবে বাঁচতাম।’
বললাম, ‘লক্ষ্মীদাসীকে ছাড়া বুঝি থাকতে পারো না?’
বলরাম হাসলো মাতালের মতো। বললো, ‘বাবু, পা দুইখান নাই, কিন্তুন মানুষ তো। তাই মানুষ ছাড়া থাইকতে পারি না। থাইকলে নিজে নিজে গান গেইয়ে নিজের পরান তোষ করি। যাচ্ছি পেরাগে জাগ্রত বেণীমাধবের ঠাঁইয়ে। ওঁয়ার কাছে নক্বীদাসী, আপনি, সবাই যাচ্ছেন, সবারে পাব সেখানে। ওই যে বলে না, বলে সে চাপা গলায় গুনগুনিয়ে উঠলো-
‘মাত্তর দু’দিন বইলে কাছে।
মনে কষ্ট হয় পাছে,
তাই, যাবার সময় বইলে গেলে
আরশিখানি লয়ে কোলে।
দেখিস, সে তোর বুকে আছে।’
বলে, সে তার নিজের বুকের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো।
বললাম, ‘বলছ বোষ্টম। গানে ত দেখছি পাক্কা বাউল।’
বলরাম খপাত করে পায়ে হাত দিয়ে বলে ডঠলো, ‘খাঁটি কয়েছেন। আপনি জানেন, জানেন সব। যাবার কথা শোনা ইস্তক মন বাউরা হইছে। আজ পথে আসছি, আর চাইপতে পারি না মনটারে। বাবু, বৈরাগ্য এইলে বেরাগী হয়। আসলে আমরা সব্বাই বাউল। সব গানেতেই আপনি ওইটি পাবেন। আবাগী রাই-কিশোরী যে প্রেমে পাগল হইয়ে পথে পা দিছিল, সেও তো একই ব্যাপার।’
পা ছাড়িয়ে নিতে তাড়াতাড়ি বললাম, ‘পা ছাড়ো হে।’
‘কিন্তু বাবু, আপনি নিশ্চয় গুণী মানুষ। আমারে দুই-একখান পদ শোনান।’
বলরামেরা এমনিতেই পাগল। তাদের খ্যাপালে আর রক্ষে নেই। বললাম, ‘পাগলামি কোর না বলরাম। আমি গুণী নই, গানও গাইতে জানি নে।’
কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না, বলরাম আমার এই নীরস শহুরে বস্তুতান্ত্রিক মনকে ভাসিয়ে নিয়েছে তার নিজের স্রোতে। আমার পথের ক্লান্তি, আমার এতক্ষণের ছোটখাটো সুখদুঃখ, সব ডুবিয়ে দিয়েছে সে। আমার জমকালো ওভারকোটটাকে রেয়াত করলো না একটুও। বাবুর মতো মানলো না বাবু বলে। বিকলাঙ্গ বলরাম সমস্ত আড়ম্বর ও আবরণের ভেতর থেকে টেনে বের করে দিল আমার শুষ্ক দেহের ভেতরের মনটাকে। নিজের সঙ্গে তার তুলনা করতে গেলে কোথায় ঠাঁই পাব জানি না। কিন্তু, অন্ধ সংস্কারের বশেই কি বিকলাঙ্গ বলরাম এমনি নিরত হেসে-গেয়ে মূর্তিমান আনন্দের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে? বিশ্বাস করতে মন চায় না। কুসংস্কারের এক চিমটি বেলুনে-ঠাসা জীবন তো এ নয়! না-থাকা ও না-পাওয়ার বেদনা বলরামের প্রাণে তাড়া দিয়েছে। তাড়া দিয়েছে প্রেমসন্ধানের, ভালবাসার। বলরাম ভালোবাসে জগৎ সংসারকে।
বলরাম কিন্তু আমাকে ছাড়লো না। সে তেমনি গুনগুন করে চলেছে, ‘পথের ধুলো সোনা হইল, এবার চোখের জল দিয়ে রসকলি কাটবো/তোমারে ছেইড়ে তো দিব না।’
গান ছেড়ে আবার কথা আরম্ভ করলো, ‘আর ভাববো না, সে কতদূর। গাড়ি তো একসময় থামবে। সময় হইলে আপনি নামিয়ে দেবে। কী বলেন বাবু অ্যাঁ?’ বলে আবার
গান-
‘সবাই বলে যৈবন জ্বালা,
তবে এ যৈবন যাক চলে যাক।
কী হবে এ কালো কেশে, নীল বেশে
এ পোড়া অঙ্গ তোমার চরণ পাক।’
কী ভাগ্যি, গলা নামিয়ে গাইছিল। মধ্যপ্রদেশের ভদ্রলোকের তন্দ্রা ভাঙছিল না তাতে। অন্ধ্রের পরিবারটি অবাক হয়ে পাগলামি ও পাগলামির দর্শককে দেখছিলেন। বললাম, ‘বলরাম, তোমার প্রথম গানটি বেশ। কার গান ওটি?’
‘বাবু, ও পদ আতাউলের। আতাউল বাউল তার নাম।’
বললাম, ‘তোমাকে একটা গানের লাইন বলি শোনো। তমার ঐ গানের মতোই যেন এটিও—
‘কবে তুমি আসবে বলে রইব না বসে,
আমি চলব বাহিরে।
শুকনো ফুলের পাতাগুলি পড়তেছে খসে,
আর সময় নাহিরে।।’
বলরাম আবার আমার পায়ে হাত দিতে এলো, ‘তবে নাকি জানেন না? আর কবে সে আইসবে, সেই আশায় আমি মরা পা নিয়ে বইসে থাকবো! বাবু, পেরাগের সঙ্গমে কি আর হাঁড়ি ভরা মধু আছে? তা নেই। আছে অমর্ত। অমর্ত-কুম্ভ যে! সে-অমর্ত প্রেম-অমর্ত, ডুবলে পরান শীতল হবে। বা-বা! বা-বা! কী সোন্দর পদ! পদখানি ক্যার বাবু?’
কার পদ! আশ্চর্য! কুম্ভমেলা যাবার পথে কবিগুরুর গান নিয়ে যে এমনি এক মা-খেগো বলার সঙ্গে আলাপ করতে হবে, তা কে জানতো! আর কেমন করেই বা তাকে সে-কথা বলবো!
বললাম, ‘পদকর্তার নাম রবিঠাকুর।’
আলোয় আলো হয়ে উঠলো বলরামের চোখ, ‘রবিঠাকুর! ঠাকুর তো বটেই, রবিও বটে। নইলে এমন পদ বেরোয়! তা উনি কোথাকার বাউল বাবু?’
কোথাকার বাউল! হায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ! বলরাম তোমাকে কোথায় টেনে নিয়ে এলো! তার বুকে ঠাঁই দিয়ে তোমাকে সে খাটো করলো কিনা বুঝলাম না। বললাম, ‘কলকাতা।’
বলরাম বললো, ‘তা হোক। কেঁদুলির জয়দেবের মেলায় নিচ্চয় দেখেছি ওঁয়ারে, এখন মনে নাই। পোষপুণ্যিমেতে সব বাউল বাবাজীকে এখানে আসতেই হবে কিনা একবার!’
জানি, এক কথায় রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিতে পারবো না আমি। দু’কথায় রবিঠাকুরের কল্পিত বাউল-মূর্তি অদৃশ্য হবে না বলরামের মন থেকে। আবার এও ভাবি, বলরামের ভুলই বা কোথায়, যে ভুল ভাঙব! মন যার বাউল হয়নি, তিনি বাউল গান গাইলেন কেমন করে।
আচমকা ঝড় এলো। ঝড়-ই বলি। হঠাৎ একটা তুমুল গণ্ডগোল আর তার সঙ্গে শিলাবৃষ্টির মতো কামরাটার মধ্যে এসে পড়তে লাগলো বাক্স, প্যাটরা, বোঁচকা, পুঁটুলি। প্রতিবাদের অবসর ছিল না। অবসর ছিল না তাকাবার। যে যার মাথা বাঁচাতেই ব্যস্ত। তার সঙ্গে একটা বাজখাঁই মহিলা কন্ঠের চিৎকার, ‘শ্যামা! প্রেমবতী। ইধার, ইধার মে। বুঢ়া কো উঠাও। পাতিয়া, এ পাতিয়া। ছোকরি বহেরা হো গয়ী। শুনতি কি নহি? শ্যামা, হাঁ হাঁ তু কোণে চলে যা।’
মনে হলো, আমার ঘাড়ের উপর একটা দু-মণি বোঝা পড়ল।
তারপর ব্যাপারটা যখন একটু শান্ত হলো, তাকিয়ে দেখি, পিঠের কাছে মস্ত বস্তা। বস্তার উপর হয় প্রেমবতী, নয় শ্যামা কিংবা পাতিয়া। তার পায়ের কাছে জুজুবুড়ির মতো এক ঘাড় নোয়ানো বুড়ো। দরজার কাছে দু’টি যুবতী আর এক প্রৌঢ়া। বুঝলাম, ওই প্রৌঢ়ারই কন্ঠস্বর আমি শুনেছি এতক্ষণ। তারা সকলেই মাল সাজাতে ব্যস্ত। বোধ হয় উঠতে পারার আনন্দেই মহিষাসুরমর্দিনীর মতো আমার ঘাড়ের উপরে মহিলাটি খিলখিল করে হেসে উঠে বললো, ‘আরে বাপরে, গাড়ি মে উঠনা এক আজীব কাম হ্যায়।’
ওদিকে মধ্যপ্রদেশের পরিবারটি যুদ্ধংদেহী অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়তে উন্মুখ। অন্ধ্রের পরিবারটিও সামলাতে ব্যস্ত।
গাড়ি ছেড়ে দিল। তারপরেই আসল যুদ্ধ শুরু। মধ্যপ্রদেশের সেই ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠতেই নতুন দলের প্রৌঢ়া গলা সপ্তমে উঠিয়ে আরম্ভ করলো। যা বললো, তার বাঙলা করলে এই হয়, ‘থার্ড ক্লাসের টিকিটই হোক, আর যা-ই হোক, আমি চড়বই। নিয়ে এসো তোমার পুলিশ আর মিলিটারী। আমাকে মারুক আর কাটুক, আমি কিছুতেই পড়ে থাকতে পারবো না। টাকা নেই বলে কি আমি তীর্থটুকুও করতে পারবো না? খালি তোমরাই যাবে? উঠেছি তো বটেই, এবার তোমার যা খুশি তাই করো।’
তার কথার ফাঁকে ওদিকে দুই যুবতী কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। আমার ঘাড়মর্দিনীও যুবতী। কিন্তু আমার শক্তির তো একটা সীমা আছে! অবাক হয়ে অবশ্য এও ভাবছিলাম যে, যাবে তীর্থ করতে। কিন্তু সঙ্গে এতগুলি অল্পবয়সী মেয়ে নিয়ে কেন? বাঙলাদেশে তো এর ব্যতিক্রমই দেখি।
বললাম, ‘এই, দেখিয়ে, আপ উত্তর যাইয়ে হামারা ঘাড়সে।’
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো মেয়েটি। ভাবখানা, এ আবার কে গা! তারপর হেসে পরিষ্কার গলায় বললো, ‘আরে ভাই সবকোইকা তলিফ, কিসিকো তো একেলি নহি। এ দেখো, আদমিলোগ ঝগড়া কর রহে!’
বলে, সে তার বলিষ্ঠ দেহটি সামান্য সরিয়ে আবার ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়ে হাসলো। অর্থাৎ, হলো তো? কতখানি হলো, সে আমিই জানি। আর খানিকক্ষণ বাদে আমার উঠে পড়া ছাড়া গতি নেই। কিন্তু–
কিন্তু বলরাম কোথায়? বলরাম! মা-খেগো বলা? পায়ের কাছে তাকিয়ে দেখি, একরাশ মাল আমার বুকসমান উঁচু হয়ে আছে। তবে কি চাপা পড়ে গিয়েছে বলরাম? এক সহযাত্রীকে রেখে এসেছি মোকামাঘাটে। বলরামকেও রেখে যেতে হবে নাকি?
কিছুতেই চুপ করে থাকতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি উঠে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে যেখানে-সেখানে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলাম মালপত্ৰ।
যা ভেবেছি, তাই। দেখি বলরাম হাসছে। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। ফুলে উঠেছে কপালটা, রক্ত ফুটে বেরুচ্ছে, তবুও হাসছে। তার হাসি আমার সমস্ত হৃদয় জ্বালিয়ে দিল। মরতে মরতেও সে হাসবে নাকি?
হাসুক। তার মতো হাসি তো সকলের নেই। মুখ গোমড়া করে তুলে বসালাম তাকে। মালপত্র ছুঁড়ে ফেলতে দেখে, নতুন দলের সকলে হা-হা করে তেড়ে এলো আমার দিকে।—’আরে আরে, আদমি আন্ধা না কি? দিলে সব মাল চৌপাট করে।’
বললাম, ‘আন্ধা তো মনে হচ্ছে তোমরাই। তোমরা যে একটা জান চৌপাট করে দিচ্ছিলে।’
জান! জানো কোথায়! এতক্ষণে উঁকি মেরে দেখলে তারা বলরামকে। কিন্তু বলরাম ছিল তার সেই কপাল-ফোলা মুখ নিয়ে। সে-হাসি দেখে আমার গায়ের মধ্যে আরও জ্বলে উঠলো।
এক মুহূর্তের নীরবতা। প্রথমে হেসে উঠলো প্রৌঢ়া। তারপর শ্যামা প্রেমবতীয়ার দল।
হাসির কারণ বুঝলাম না। তাকিয়ে রইলাম বিস্মিত বোকার মতো।
হাসেনি ওদের একজন, সেই বুড়োটি। সে হাতের লাঠির ডগায় নড়বড়ে থুতনিটি রেখে তাকিয়ে দেখছিল আমাকে। মোটা সাদা ভুর তলায় তার সেই চোখে বিরক্তিপূর্ণ অনুসন্ধিৎসা, এতখানি বেলাতেও তার আপাদমস্তক শাল দিয়ে ঢাকা। তার নাকের দু’পাশের গভীর রেখা দেখে মনে হলো, সে বীতশ্রদ্ধ এ জগৎসংসারের উপর। জীবনে হাসির পালা তার শেষ হয়েছে। আর কোনোদিন সে হাসবে না।
হাসি থামিয়ে প্রৌঢ়াই প্রথমে বললো, ‘আহা, বেচারা!’
আর একজন, ‘সাধু নাকি?’
পার্শ্ববর্তিনী, ‘বোধ হয়।
প্রৌঢ়া করুণ মুখে বলে উঠলো, ‘শ্যামা, দিয়ে দে বেচারাকে দু-চার পয়সা।
শ্যামা নামধারিণী অচিরাৎ আঁচলের বদলে ট্যাঁক থেকে এক আনা পয়সা বার করে ছুঁড়ে দিল বলরামের কোলে। তারপর প্রৌঢ়া আমার দিকে ফিরে বললো, ‘আরে ভাই, দেখা নহি উনকো। গোসা না করো।’
বলেই, আবার তারা তাদের মালপত্র গোছাবার জন্য লাফালাফি, ঘাড়ে ওঠাউঠি শুরু করে দিল। যত না মালপত্র সাজায়, তত সামলায় বুড়োকে। বুড়ো যেন তাদের সাত রাজার ধন এক মানিক। কেন, কে জানে! সেই সঙ্গেই স্ব-ভাষায় কী একটা কথা নিয়ে হেসে খুন হচ্ছে সকলে। আর আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে আমাকে। কেন, তারাই জানে!
তারা শুধু খ্যাপা হাওয়ার মতো আসে নি। খ্যাপা তারা নিজেরাও। তাদের হাসি কথা কাজ দেখে তাই মনে হয়। যেন খাঁচার পাখি খাঁচাছাড়া হয়েছে। মাতিয়ে তুলেছে বনপালা।
তাদের চারজনের মধ্যে প্রৌঢ়াসহ তিনজনের দেহে সাবেকী ধরনের সোনার অলংকার। জামাকাপড়েও গ্রাম্য অবস্থাপন্ন পরিবার বলেই মনে হয়। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে এই বাঁধনছাড়া কলকাকলীর মধ্যে তাদের স্বাস্থ্যের ঔজ্জ্বল্য।
মধ্যপ্রদেশের শার্দুল তখনো হাত-পা গুটিয়ে বসে গজরাচ্ছেন। অন্ধ্রের পরিবারটির শান্তিভঙ্গ হয়েছে বিলক্ষণ। তবু মনে হলো, তাঁরা উপভোগ করছেন সমস্ত ব্যাপারটা।
বলরাম বিকলাঙ্গ। পরিচয়ও তার সঙ্গে সামান্য। তবু মনটা আমার বিমুখ হয়ে উঠলো তার প্রতি। কী বলে সে আনিটা নিয়ে হাসছে আমার দিকে চেয়ে! যারা অমনি আঘাত করে তার মাশুল দেয় এক আনা, দিয়ে আবার নির্লজ্জের মতো হাসে, তাদের প্রতি বলরামের এত অনুরক্তি কীসের! বলরামেরা চিরকালই এমনি! ছিঃ, ওর সঙ্গে আর কথা বলবো না।
দু’মিনিট গেল না। বলরাম আবার ডাকলো, ‘বাবু।’
যেন শুনতে পাই নি, এমনিভাবে তাকিয়ে রইলাম অন্যদিকে। কিন্তু বলরাম চাপা ও খুশি গলায় বললো, ‘এতক্ষণে শুকনা খালে জোয়ার এইল। বাবা! এতক্ষণ এই কামরাটাতে বইসে মনে হচ্ছিল না যে পেরাগে যাচ্ছি। এইবার দেখেন তো, কেমন কলর-বলর গমগম কইরছে।’
আমি জবাব দিলাম না। কিন্তু সে আপন মনে বলেই চললো, ‘বুইঝলেন বাবু, বলে মানুষ নিয়ে কথা। বেঁইচে আছি যদ্দিন, তদ্দিন মানুষ ছাড়া গতি নাই। একলা সুখ, একলা দুখ, এ কি হয়! তবে মরণ ঘনাইলে অত কান্না কীসের, অ্যাঁ? ছেইড়ে যাবার ভয়েই তো! আসুক আরো আসুক। কী বলেন বাবু, যে কয় একলা চলি, সে তো চলে দোকলার জন্যি। নইলে চইলতে যাবে কেন, অ্যাঁ?’
কাঁচা কুয়োয় উপরের জল চুইয়ে পড়বেই। তা রোধ করবে কে? বলরামের কথাগুলি ঠিক কানে এসে ঠেকছিল। শুধু ঠেকছিল না, অবাক করছিল আমাকে। শাসন, রাজনীতি, নিরাপত্তাহীন জীবন, সব মিলিয়ে আমাদের মনে অনেক সন্দেহ, অনেক সংশয়, অনেক সঙ্কীর্ণতা। দিবানিশি পা টিপে টিপে চলেছি চোরাবালি এড়িয়ে। এই জীবনেই ফাঁক পেয়ে আবার দৌড় দিয়েছি অমৃত-কুম্ভের সন্ধানে, ভারতের সেই বিচিত্র রূপের রসে ডুব দেব বলে। সে রূপ লক্ষ লক্ষ হৃদয়েরই, কিন্তু বলরামের এ কীসের রস! এ কি তার নিরক্ষর অন্তরেরই বিশ্বাস, নাকি শুধু কথার জাদু! মানুষের প্রতি তার এত টান! নাকি টানটা চার পয়সার!
ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো বলরামের ফোলা কপাল। লাল জায়গাটিতে বিন্দু বিন্দু রক্তও দেখা দিয়েছে। তবু সে হাসছে। অম্লান হাসি দেখে সহজে মনে পড়ে শুধু বৌদ্ধ শ্রমণদের কথা। কিন্তু এ যুগে তা অচল এবং অবিশ্বাস্য। গলায় আমার আপনিই ঝাঁজ এসে পড়লো। বললাম, ‘তোমার কি একটুও চোট লাগে নি?’
বলরাম বললো, ‘চোট আমার লাগে নি বাবু? কিন্তু কাঁদবো কার কাছে বলেন! কাঁদলে লাভ? ওনারা কইবেন, দেখি নাই বাপু। মিটে গেল। তাই বলে পইড়ে থাকবো না, চইলব। চইলতে চোট লাগে না বাবু? আপনার লাগে না?’
আবার সেই কথার ফুল ফোটানো। সে-ফুলে এমন গন্ধও ছিল যে, চট করে জবাবও দিতে পারি না এই সামান্য বলরামের কথার।
সে আবার বললো, ‘বাবু, নোকে সংসার চালায়। সংসারে কত ব্যথা, কত চোট। সেখানে পেটে চোট, মনে চোট। পেটে দানা নাই, বুক-জোড়া মানুষটি নাই, হাজার চোট খেয়েও থেমে আছে কেউ বলেন?’
তর্কের অবকাশ ছিল কিনা জানি নে। কিন্তু হেরে গেলাম। জানি নে, কোন্ পথে আমাকে টেনে নিয়ে গেল। আমাকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে গেল তার স্রোতে। একটা সামান্য নুলা বলরামের কাছে হার মেনে গেল আমার বিদ্যাবুদ্ধি। অন্তত এই মুহূর্তের জন্য সে আমার মনের দুকূল ভাসিয়ে ভরিয়ে দিল।
এর পরে আর ওই চারটে পয়সার কথা বলে তাকে আঘাত দেওয়ার কথা আমার মনে আনতে সংকোচ হলো। আমার মন তো বলরামের মন নয়।
তৃতীয়বার বলরামের হাত এসে ঠেকলো আমার পায়ে। ছি ছি, অমন পায়ে হাত কেন বার বার! বললাম, ‘কী বলছো?’
দেখলাম, বলরামেরও সঙ্কোচ হয়। বললো, ‘অ্যালবাদ ইষ্টিসনে এট্টুস হাত দুইখান ধরবেন, কোনোরকমে একবার টেনে-হিঁচড়ে ফেলতে পারলেই হইবে। আপনি একলা মানুষ, তাই কইলাম।
বলে, সে আমার মুখের দিকে ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে রইলো। সেই চোখে দেখতে পেলাম বোধ হয় বলরামের আসল রূপ। সে রূপ এক বিকলাঙ্গর করুণ অসহায় রূপ এ সংসারের আয়নায় বোধ হয় এটাই তার প্রকৃত মূর্তি। আর এ রূপই বুঝি তাকে দিয়েছে প্রাণ-ভোলানো সুর, গলা, কথা ও মন।
বললাম, ‘পায়ে হাত দিও না। দেব, নিশ্চয় নামিয়ে দেব।’
ব্যস। আবার গুনগুন।
Chapter - 2
২
কথায় বলে, বানের জল একবার ঢুকলে আর রক্ষে নেই। শ্যামার দল ঢুকে আপার ক্লাসের আভিজাত্য ও গাম্ভীর্যে চিড় ধরিয়ে দিয়েছিল। এর প্রতিটি স্টপেজ থেকে কলকল নাদে ধেয়ে এলো বন্যা। এবার সাধারণ পুণ্যার্থীর সঙ্গে সাধু। গণমনের গঠন-প্রকৃতিও এমনি বিচিত্র যে একবার যেদিকে ঢল নামে, সবাই ছুটে চলে সেদিকে। জানি নে, অন্যান্য কামরাগুলির কী অবস্থা। কিন্তু এখানে আমাদের মুখে মুখে ঠেকে গেল। যেমন ঠাসাঠাসি, তেমনি কলরব। শুধু খুশির অন্ত নেই বলরামের।
মানুষ বিরক্তিতে ও হতাশায় হাসে। অন্ধ্রের বড় ভাই তেমনি হেসে বললেন, ‘কিছু করবার নেই, কী বলেন? কী ভাগ্যি, আমাদের গন্তব্য আর বেশি দূরে নয়।’
বললাম, ‘আমাদের সকলের বোধ হয় একটাই গন্তব্য।’
বড় ভাইয়ের মধ্যেও বোধ হয় বলরামের মতো একটা পাগলামি ছিল। বললেন, ‘কী করে বলি বলুন! আমাদের সকলের গন্তব্য এক হতে পারে না। আমি সম্পূর্ণ অন্য পথের যাত্রী।’
বলে, তিনি চুপ করে গেলেন। ঘুরে-ফিরে তাঁর সেই পারিবারিক ট্র্যাজেডির কথাই আসছে। পথ যত সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে, তার পাথরের মতো নিকষ কালো মুখে তত পরিস্ফুট হয়ে উঠছে গভীর ফাটলের চিহ্ন। সম্পূর্ণ অন্য পথের যাত্রী, অথচ চলেছেন সেই প্ৰয়াগেই।
ভয়ংকর অবস্থা হয়েছে মধ্যপ্রদেশের ক্ষিপ্ত অথচ অসহায় শার্দুলের। তারা মহিলাপুরুষ মিলে কিছুক্ষণ রীতিমতো ঝগড়া করেছেন। এমন কি ভয়ও দেখিয়েছেন, কর্তৃপক্ষকে বলে এদের নামিয়ে দেবেন।
কাকস্য পরিবেদনা। কাকেই বা বলা! যাদের বলছেন, তাদের ভয়ের লেশমাত্র নেই। ভয় নেই, আছে শুধু এক বিষম সংশয়। এত কাছে এসেও তাদের শুধু সংশয়, তারা যেতে পারবে কিনা। ভয় তারা পেছনে ফেলে এসেছে। নিষ্ঠুরের মতো এর চুলের মুঠি ধরে, ওর মুখে পা দিয়ে, যেভাবে সবাই হন্যে হয়ে উঠেছে যাবার জন্যে, দেখে মনে হচ্ছে, প্রাণকেও তুচ্ছ করেছে তারা। যে যার নিজের ভাবনায় নিজে উন্মাদ। পাশের মানুষটির কথা ভাববার অবকাশও নেই কারুর। সে যদি অপরের পেষণে পীড়নে আর্তনাদ করে ওঠে, তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই কারুর।
পাগলা হাতি ছুটতে দেখেছিলাম কুম্ভমেলায়। লিখতে বসে সেই উপমা মনে পড়ছে। এক নির্মম প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে সকলে। কে পড়ে থাকবে, কে মরবে, সেটা বড় কথা নয়। আমি যাব। সামনে পড়ে আছে তার জীবন-যৌবন, আজন্মলালিত কাম্যবস্তু, তার ধ্যানধারণা।
বৃথা দোষ ধরেছিলাম শ্যামাদের দলের। এখন আর ছোট কামরাটিতে খুঁজে পাওয়া দায় শ্যামাদের। তারা চারটি মেয়েমানুষ নিজেদের সমস্ত পেষণ যন্ত্রণার মধ্যেও আগলে রেখেছে সেই বুড়োকে। আমি আগলে রেখেছি বলরামকে।
আস্তে আস্তে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে কামরার অবস্থা।
আর কতদূর! দূর নেই আর। ক্রমে এলাহাবাদ শহরের সীমানায় ঢুকলো গাড়ি।
ভেবেছিলাম, সকালেই পৌঁছাবো। চারটের সময় গাড়ি দাঁড়ালো এলাহাবাদে। তা দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই, দেখতে পেলাম দুমদাম করে মালপত্র পড়ছে প্ল্যাটফরমের উপর। পড়ছে আমাদেরই গাড়ির দরজা-জানালা দিয়ে।
এসে পড়েছে। একটিমাত্র কথার অপেক্ষা। সত্যিই এলো কিনা, সন্ধানের প্রয়োজন নেই। শোনামাত্র সংক্ষিপ্ত স্থানে পাক-খাওয়া ঘূর্ণিজলের আবর্ত মুহূর্তে পথ পাওয়ার জন্য ফুলে ফুলে উঠলো। অকস্মাৎ এই স্ফীতিতে একটা তীব্র আর্তনাদ উঠলো সারা কামরাটার মধ্যে। ‘মরে গেলুম বাবারে। মেরে ফেললে, মেরে ফেললে।’
কারুর হাত ভাঙল, পা ভাঙল, গুঁতো খেয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়লো মুখ দিয়ে। এরই মধ্যে বাঁদরের মতো কুলিদের লম্ফ-ঝম্ফ। স্টেশনে মাইকের চিৎকার, হাজার হাজার নরনারীর কলরব। গাড়িটা ফিরোজপুর এক্সপ্রেস। যাত্রীরা নামবার আগেই অন্য যাত্রীর দল ওঠার জন্য ঠেলাঠেলি করছে দরজার কাছে।
প্ল্যাটফরমের উলটো দিকে নামবার সুবিধা নেই। আমার হাঁটু চেপে ধরে চুপ করে বসেছিল বলরাম। বুঝলাম, উপায় নেই। এর মধ্যেই নামতে হবে। আমার এই ক্ষীণ দেহে কখনো শক্তির পরীক্ষা দেব, সেটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু ত্রাণ পেতে হবে।
এক কাঁধে ঝোলা নিলাম। দু’হাতে বলরামকে তুলে বললাম, ‘শক্ত করে গলা ধরে ঝুলে পড়ো।’
শঙ্কিত বলরাম বললো, ‘পারবেন তো ঠাকুর! আমার ঠাকুরের কোনো কষ্ট হবে না তো!’
বাবু থেকে ঠাকুর হয়েছি বলরামের কাছে। এর পরে দেবতা হব। নরাধম পাপিষ্ঠও হতে পারি।
সামনে তাকিয়ে মগজের সমস্ত বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে গেল। এতক্ষণ অপরকে বলেছি, এবার নিজে একটা অন্ধ ক্ষিপ্ত মোষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লাম সামনের দিকে।
অন্ধ্রের বড় ভাইয়ের উৎকণ্ঠিত গলা একবার শুনতে পেলাম, ‘এ কী, মিঃ শুনুন।’ না, শুনব না। নামতে হবে। কতটা এগিয়েছি জানি না, একটা নারীকণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ শুনে তাকিয়ে দেখলাম, শ্যামা। আমার কনুই তার গলায় ঠেকেছে। প্রাণভয়ে চিৎকার করছে : সেই মুক্ত পাখির দল। কোথায় প্রৌঢ়া, প্রেমবতীয়া, পাতিয়া! কোথায় বা বুড়ো! দেখতে পেলাম না, শুধু চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
শ্যামা আমার কনুই চেপে ধরল দু’হাতে। অসহ্য ভার। প্রাণ বেরিয়ে যায়। যেতে দাও যেতে দাও।
হুশ করে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া লাগলো ঘাম ঝরা মুখে। বাইরে এসে পড়েছি। দেখলাম, একসঙ্গে অনেকে এসে পড়েছি। খসে পড়েছে বলরাম ঘাড়ের উপর থেকে। না, তার লাগেনি। সে ভগবানকে ডাকছে।
ওভারকোটটা কে ধরে রেখেছে পেছন থেকে। ফিরে দেখি শ্যামা। উৎকণ্ঠিত চোখে জলের ধারা। অসহায় ভাবে বলে উঠলো, ‘ওদের একটু নামিয়ে দাও বাঙালিবাবু।’
আবার! কিন্তু এবার দু’জন সেপাই এসে পড়েছে। সেপাই ডেকেছেন মধ্যপ্রদেশের সেই ভদ্রলোক। অবস্থা কিছুটা আয়ত্তে এলো যেন।
পরোপকারের নেশা বলে কোনো বস্তু আছে কিনা জানি না। মানুষের মনে মাঝে মাঝে একটা ঝোঁক চাপে। আমারও ঝোঁক চাপল তেমনি। শ্যামার হাতে ঝোলা ফেলে উঠে গেলাম আবার।
প্রৌঢ়া চেঁচিয়ে উঠলো, ‘এই বুড়োকে, দোহাই বাবু, এই বুড়োকে একটু নামিয়ে দাও।’
বলতে না বলতে বুড়ো দু’হাতে চেপে ধরল আমাকে। যেমন করে জলে ডুবন্ত মানুষ কোনো আশ্রয় খোঁজে। ভেবেও দেখে না, আশ্রয়সুদ্ধ সে তলিয়ে যাবে কিনা।
নেমে এলাম। নেমে এসেছে সবাই। কোথায় গেল হা-হুতাশ, যন্ত্রণা, চিৎকার ও কান্না শ্যামা হাসছে। হাউমাউ করে কী সব বলছে প্রৌঢ়াকে আর আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে আমাকে। বুঝতে পারলাম, এমন ভালামোনুষ ওরা কখনো দেখে নি, সে কথাই বলছে আর বোঝাতে চাইছে আমাকে।
বলরাম ডাকলো, ‘ঠাকুর!’
বললাম, ‘ঠাকুর নই, জাত শুদ্দুর আমি।’
কিন্তু বলরামের আছে কথার ফুলবাগান। বললো, ‘কই! আপনার গায়ে মুখে যে নেকা রয়েছে ঠাকুর বলে। তা আমি কেন ঠাকুর, অ্যাই, অ্যাই যে নক্কীদাসী—’
দেখলাম, বলরামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন পেটেন্ট বাঙালি নামাবলীধারী বৈষ্ণব, আর একজন কালো স্থূল চেহারার মেয়েমানুষ।
বুঝলাম, আমঘাটার লক্ষ্মীদাসী এই মেয়েমানুষটি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। থানের উপর নামাবলী। পান-দোক্তা-খাওয়া ঠোঁট ফেটে চৌচির হয়েছে। স্থূল ঠোঁট বিস্ফারিত করে বেচারি হাসতেও পারছে না। বোধ করি তার মূল গায়েনকে রক্ষা করেছি বলেই মুগ্ধ কৃতজ্ঞতায় বাকরহিতা হয়েছে সে।
বললাম, ‘বেশ, এবার চলি বলরাম।’
জবাব দিল লক্ষ্মীদাসী। সেও বললো, ‘ঠাকুর-’
ফিরে তাকালাম তার দিকে। চল্লিশ বছরের লক্ষ্মীর কালো কালো ডাগর চোখ দু’টি এখনও বালিকার মতো কৌতূহলিত ও নম্র। বললো, ‘একবার আমাদের আশ্রমে পায়ের ধুলো দিবেন।’
‘কোথায় তোমাদের আশ্রম?’
‘কোথায় জানি না। দেখি নাই তো কোনোদিন। আশ্রমের নাম ছিরি নন্দগোপাল মাধবাচার্য বাবাজীর মন্দির। আমাদেরও খুঁজে নিতে হবে।
বললাম, ‘পারলে যাব। না যেতে পারলে কিছু মনে কোর না। তবে তোমার মূল গায়েনের গলাটি বড় মিষ্টি। ওর গান শোনবার ইচ্ছা রইলো মনে।’
অন্ধ্রের পরিবারটি নেমে এসেছেন। দেখলাম, ড্রাইভারের উর্দি-পরা একটা লোক তাদের পথ করে দিয়ে নিয়ে চলেছে। সকলেই আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। বড় ভাই বললেন, ‘আমাদের ক্যাম্পটার নাম মনে আছে তো? আসা চাই।’
সাধারণ যাত্রীদের বেরুবার পথে এগিয়ে গেলাম। জানি, আমার দিকে তাকিয়ে আছে বলরাম। জলে ভেসে যাচ্ছে তার দু’চোখ। মা-খেগো বলা মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু!
এই মহামেলার জনারণ্যে আর কোনোদিন ওকে খুঁজে পাব কিনা জানি না।
মানুষের মন-নদীর কূলে সৈকতভূমি, সেখানে দিবানিশি পলি পড়ছে। পলের পলি, মিনিটের পলি, ঘণ্টার পলি, মহাকাল ও যুগের পলি। একটা বেলার মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে এসেছে মৃত-সহ তীব্র স্মৃতি। এর পর হারিয়ে যাবে বলরাম ও
আবার কোনো ঘটনার ঢেউ আছড়ে পড়ে যেদিন জাগিয়ে দেবে এই কুম্ভযাত্রার স্মৃতি, সেইদিন হয়তো এই বিচিত্র মুখগুলি ভেসে উঠবে চোখের সামনে। কত কথা মনে পড়বে।
স্মৃতি যেন কণ্ঠমালা প্রেয়সী। প্রেয়সীর আদরে অবিমিশ্র সুখ থাকে না। সুখ ও দুঃখ, এ দুই ধারার মিলনে সেখানে নোনা জলের ধারাও গড়িয়ে আসে। স্মৃতিও তেমনি। এমন কি কন্ঠলগ্ন হয়েও তীব্র দহন সময়ে সময়ে অনুভব করি আমরা। তবুও স্মৃতি বিনা প্রাণ বাঁচে না।
মাইকে অনবরত বলে চলেছে, ‘কলেরার ইনজেকশন নিতে ভুলবেন না। ভুলবেন না সর্টিফিকেট নিতে। বিনা সার্টিফিকেটে আপনার মেলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ।’
তার ব্যবস্থাও হয়েছে কম নয়। সমস্ত স্টেশনটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে একটি অস্থায়ী কারাগার সৃষ্টি হয়েছে। দরজায় দরজায় ডজন ডজন পুলিশ।
স্টেশনের খোলা আঙিনাতেই ছাউনি পড়েছে মহামারী প্রতিষেধকওয়ালাদের। কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ বাগিয়ে ধরে আছেন চকচকে সিরিঞ্জ আর তুলো।
শ্যামার দল এখানেও হট্টগোল পাকিয়েছে। ইনজেকশন তারা কিছুতেই নেবে না। শুধু শ্যামারা কেন, অনেক শ্যামার দলই মূর্ছিতের মতো পড়ে আছে ছাউনির পাশে। ভগবানের কাছে হত্যে দেওয়ার মতো অসহায়ভাবে পড়ে আছে।
পুন্যার্থী নারীবাহিনীর কোনো কোনো দল তো কান্নার রোল তুলেছে——হে ভগবান, হে মহাদেও, তোমার রাজত্বে এ কী কাণ্ডকারখানা চলছে!’
অবাক হয়ে দেখি পাশে একজন মস্ত মরদ জোয়ান পাগড়ী নিয়ে চোখের জল মুছছে। বললাম, ‘কাঁদছ কেন?’
সে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। বললো, ‘বিনা সুঁইসে ইনলোগ হম কে যানে নাহি দেগা।’
সত্যি, ভগবানের রাজত্বেরই কাণ্ডকারখানা বটে! মরদটিকে দেখে মনে হচ্ছে, সে রাজস্থানের কৃষক। শরীর তার আমার চার ডবল। তার চওড়া থাবাটাই আমাকে বোধ হয় টিপে মেরে ফেলতে পারে। সে যে সামান্য একটি ছুঁচ হাতে বেঁধবার ভয়ে রীতিমতো কান্না জুড়েছে, এ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
কিন্তু চোখে দেখতে পাচ্ছি, শুধু সে কেন, এমনি কয়েক জনেরই চোখ ছলছল করছে। অথচ এই মানুষই হয়তো সামান্য আলপথের জমি নিয়ে দাঙ্গা করে নিজের ও পরের মাথা ফাটায় অনায়াসে। তখন সে রক্ত দেখেও ভীত নয়। হয়তো ধর্মের নাম করে তার নাক কান ফুটো করে দিলেও সে সহ্য করবে। কিন্তু ইন্জেকশন! সে যে বড় সাংঘাতিক।
কিন্তু তেল দাও, সিঁদুর দাও, ভবী ভোলবার নয়। ইন্জেকশন-রূপী দেবতাটি বড় নির্দয়। ছুঁচ হয়ে না ঢুকে সে ছাড়বে না। আর তার পরোয়ানা না পেলে স্বর্গের দরজাও বন্ধ। যারা ভীত অথচ বুদ্ধিমান, তারা কেউ অস্বীকার করছে না। নিচ্ছে আর পালাচ্ছে। ভাবখানা যা হয় পরে দেখা যাবে। এখন তো যাক।
শ্যামার দল শেষটায় টাকা বের করছে। কিন্তু টাকা নিয়ে যারা নিষ্কৃতি দেবে, এ দিনের আলোয়, সহস্র চোখের সামনে তাদের ইচ্ছা থাকলেও লজ্জা বলে একটা বস্তু তো আছে।
বৃথা দেরি করা। যেতে হবে। এদিকে বেলা যায়। ইনজেকশন নিয়ে, এক টুকরো কাগজের শাটিফিকেট পকেটে পুরে বেরুতে গেলাম।
সামনেই দেখি শ্যামা ও প্রৌঢ়া, পেছনে প্রেমবতীয়া, পাতিয়া ও বৃদ্ধ।
শ্যামা উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘চোট লাগে নি?’
ভাবলাম, বলরামের মতো জবাব দিই যে, চোট ছাড়া চলা যায় নাকি? হেসে বললাম, ‘সামান্য। ও কিছু নয়।’
শ্যামা বললো, ‘সচ বলছ?’
‘ঝুটা বলে লাভ কি আমার। নিয়ে দেখো। ‘
এত ভয় যে, শ্যামা আমার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো। বললো, ‘আমাদের এই বুড়ো মানুষটি নিতে পারবে তো?’
বললাম, ‘নিশ্চয়ই। একশোটা নিতে পারবে।’
বলে, হাসতে হাসতে বাইরে এসে দাঁড়াতেই এক কাণ্ড। একটি বাঙালি বৃদ্ধা শণ-নুড়ি চুল উড়িয়ে ভাঙা গলায় খনখন করে উঠলো, ‘দাঁত বের করে নিয়ে তো এলে বাছা। এমনি করে তোমরা প্যাঁক প্যাঁক করে নিলে মড়ারা কি আর আমাদের ছাড়বে? একটু বলে কয়ে ব্যবস্থা তো করতে হয়।
অবাক হয়ে বললাম, ‘আমাকে বলছেন?’
তবে আর কাকে বলবো!’
‘কিন্তু বলে কয়ে কাকে বোঝাব, বলুন তো?’
‘কেন, হিন্দিমিন্দিওয়ালাদের বলে দাও, আমাদের এই বুড়িসুড়িদের সাতকাল গিয়ে এককাল ঠেকেছে। মরি মরব। আমরাও সব ইঞ্জিশন-ফিঞ্জিশন নিতে পারবো না।’
তাই ভালো। ভেবেছিলাম, না জানি কী করেছি। দেখলাম, বুড়ির পাশে বছর ত্রিশ-বত্রিশ বয়সের এক যুবক দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যেই সে আপাদমস্তক মোটা শালে ঢাকা দিয়েছে। শীত আছে সত্যি কিন্তু যুবকটিকে শীতের জুজুবুড়িতে ধরেছে বলে মনে হলো। ঠেলাঠেলির ঠেলায় আমাকে তো সব গরম জামা খুলে ফেলতে হয়েছে।
যুবকটির পাশে দেখলাম একটি অবগুণ্ঠিতা বালিকা। বালিকা উৎকণ্ঠিতা। আমার চোখে চোখ পড়তেই যুবকটি বলে উঠলো, ‘কী করা যায় বলুন তো?’
আমি বললাম, ‘কেন আপনিও নেন নি নাকি?’
যুবকটি লজ্জিত হলো না একটুও। মুখটা আরও করুণ করে বললো, মানে হল গিয়ে, কথা কখনো নিই নি কিনা, তাই বড় ঘাবড়ে যাচ্ছি। দেখুন না, আমার পরিবারটি তো একেবারে মরিয়া হয়ে গেছে দাদা। আর দিদিমার কথা তো শুনলেনই।’
পরিবার অর্থাৎ বালিকাটি। বুড়ি হলো দিদিমা। লোকটির অবস্থা সবদিক দিয়েই কাহিল হয়ে পড়েছে, বুঝতে পারলাম। কিন্তু অবাক ওর কাণ্ড দেখে। ইন্জেকশন যে এমন করালরূপে এখনো দেশে বিরজিত, তা জানতাম না।
বললাম, ‘জানতেন তো আসবার আগেই। ব্যবস্থা একটা করলেন না কেন?’
যেমনি বলা, অমনি যুবকটি শাল খুলে একেবারে রুদ্রমূর্তিতে জ্বলে উঠলো। চেঁচিয়ে বললো, ‘মশাই, এই বুড়ি যত নষ্টের মূল। পইপই করে বলেছিলুম, ছটা টাকা দে দিমা, (অর্থাৎ দিদিমা) মিউনিসিপালের হেলথ্ অফিসারকে মাথা পিছু দু’টাকা করে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে নিই। তখন বলে কত কথা। ছটা টাকা! এখন কোন্ শালা এ বোত্রনি পারো করবে অ্যাঁ?’
যুবক স্বমূর্তিতে বিরাজিত। দিদিমাও কম যায় না আদুরে নাতির চেয়ে। সেও গলা চড়িয়ে বললো, ‘হ্যাঁ রে একালঘেঁড়ে, দু’পয়সা কামাবার মুরোদ নেই, ছটা টাকা আসে কোত্থেকে। আর তখন কি জানতুম যে, ‘মিনসেরা এমনি করে ধরবে!’
যুবক আরও উগ্র হয়ে উঠলো। শাল কোমরে বেঁধে জামার আস্তিন গুটিয়ে বললো, ‘আমি শালা এখুনি ইন্জেকশন নেব, যা খুশি তুই কর।’
সর্বনাশ! বুড়ি একেবারে ক্ষেপে উঠলো। বললো, ‘মাথা কুটে মরব পেল্লাদ, তোর দিমার তালে আজ এখেনেই মিত্যু আছে। খবরদার।’
কিন্তু পেল্লাদ আস্ফালন করতে ছাড়ে না——হোক মরণ তবু নেব।’
বলে, কিন্তু এগোয় না। আর আমিই কি জানতাম যে এলাহাবাদে স্টেশন প্রাঙ্গণে এমনি ও নেহাত বাঙলা নাটক দেখব।
দর্শক অনেক ছিল। বোধকরি ভারতের প্রতিটি প্রদেশের নরনারী দেখলো এই নাটক। প্ল্যাটফরম থেকে জনতা ক্রমে আঙিনাতে ভিড় করতে আরম্ভ করেছে। মহামারী ক্যাম্পের লোকেরা তাড়া দিলেন ভিড় কমাবার জন্য।
ইতিমধ্যে অনেকেই বেরিয়ে গিয়েছে। বুঝলাম, দাঁড়িয়ে থাকা বৃথা। জানি না দিদিমা-নাতির এ নাটকের যবনিকা কিভাবে কখন পড়বে। সরে পড়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
এলাহাবাদ শহর। প্রাচীন হিন্দু-রাজত্বের প্রয়াগ প্রদেশ। শুধু হিন্দুর তীর্থভূমি বলে নয়, যে কোনো ইতিহাস-কৌতূহলিত ব্যক্তি রোমাঞ্চিত হবেন আজকের উত্তরপ্রদেশের এই শহরের ইতিহাস শুনলে।
দলবদ্ধ তরুণীদের কলহাসির মতো অনেকগুলি বেল বাজছে সাইকেল রিকসার। এখানে কর্নবিদারী ভেঁপু নেই। ঘাড় নুইয়ে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে উত্তরপ্রদেশের রিকসাওয়ালারা। সময় নেই আজ তাদেরই পৌষ মাস। এক টাকার জায়গায় চার টাকা চাইলেও না বলার মতো কেউ নেই। রথ যাদের চাই, তাদের আজ রথীদের মনোমতো ব্যবস্থায় রাজি হতেই হবে।
কিন্তু সে-কথা বলছিলাম না। বলছিলাম এ দেশের কথা। বাঙলা থেকে খুব দূরে বলবো না এ দেশকে। বিশেষ এই বিজ্ঞানের যুগে। তা ছাড়া বাঙালি বাসিন্দার সংখ্যাও এখানে কম নয়।
আজ এই দেশের রাজপথের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখছি পিচঢালা রাস্তা, দুপাশে ইমারতের সারি। ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে মোটর লরি আর প্রাইভেট কার। সাইকেল রিকসা আর রকমারি টাঙ্গা। টাঙ্গাগুলিই বোধ হয় প্রাচীন ভারতের ঘোড়ায়-টানা রথের স্মৃতি বহন করছে। মানুষ চলেছে অসংখ্য।
শহরের চেহারা বাঙলার মফস্বল শহরের মতো। বিশেষ, বর্তমান বাঙলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের ছাপ এলাহাবাদে পরিস্ফুট।
কাল থেকে কালান্তর, যুগ থেকে যুগান্তর। কাল যায়, যুগ যায়। যাওয়ার সময় সে তার ছাপ রেখে যায়। সবই মানুষের কীর্তি। মানুষই ভাঙে, আবার মানুষই গড়ে। তবু পেছন দিকে তাকালে আমাদের দু’চোখ জলে ভরে আসে। এ চোখের জল অবস্তুবাদীর নয়, নয় ইতিহাসবিমুখের। বরের গৃহে মেয়ে পাঠাবার জন্য পিতা কত সুন্দর অনুষ্ঠান করেন। মেয়ের প্রতিষ্ঠা, তার নারীত্বের মহিমা প্রকাশের জন্য এক নতুন জীবনে তুলে দিয়ে আসেন তাকে। তবুও যাকে লালন করেছেন, জন্মের পর থেকে যার বিকাশের জন্য প্রতিদিন কষ্ট করেছেন, তারই নব জীবনের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে তিনি কেঁদে ভাসান।
প্রয়াগ নাম আমাদের তেমনি মুগ্ধ করে। হাজার হাজার বছর আগে থেকে ভারতের নামের সঙ্গে প্রয়াগের নাম জড়িত। ভাবি, যে-পথের উপর দিয়ে আজ রিকসায় চেপে চলেছি, একদিন এখানকারই ভয়াবহ বনজঙ্গলের মধ্য দিয়ে অযোধ্যার দশরথ-পুত্র রাম, ভাই লক্ষ্মণ ও স্ত্রী সীতাকে নিয়ে বনবাসের পথে গিয়েছিলেন। দেখতে পেয়েছিলেন দূর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠেছিল ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম থেকে।
কাব্য নয়, বাস্তবে কি একবার চোখ বুজে ভাবতে পারি না, সৎমায়ের তাড়নায় দুইভাই আর এক বউ বহুকাল পূর্বে একদিন ঘর ছেড়ে এ পথে এসেছিলেন! তাঁদেরই নিয়ে আমাদের রাজকথা, কাব্য, গৌরবগাথা, রূপকথা, আমাদের ইতিহাস।
চমকে উঠলাম। হঠাৎ কানে এলো, ‘এই যে বাঙালি ভাই!’
কথার সঙ্গেই জলতরঙ্গের চড়া সুরের মতো এক ঝলক হাসি। হাসি, ঘোড়ার পদশব্দ, ঘোড়ার গলায় বাঁধা বলসের ঘুঙুরে ঝুমঝুম বাজনা
চোখ চেয়েছিলাম কিন্তু মন-চোখ হারিয়ে গিয়েছিল রামায়ণ কাব্যলোকের স্বপ্নরাজ্যে। সুপ্তোত্থিতের মতো চমকে তাকিয়ে দেখি, মাত্র দু’হাত দূরে শ্যামা। টাঙ্গার প্রান্তে বসেছে পা ঝুলিয়ে একটা টাঙ্গারই স্বল্পপরিসর জায়গায় তারা সকলে বসেছে বুড়োকে নিয়ে। বুড়ো রয়েছে মাঝখানে। তাদের টাঙ্গা চলেছে আমারই রিকসার গায়ে গায়ে। এত গায়ে গায়ে যে ঠেকে না যায় আবার।
সামনে পিছনে টাঙ্গা ও রিকসার ভিড়। পথের দু’পাশে ভিড় মানুষের। মেয়ে পুরুষ শিশু ও বুড়ো। সারবন্দী চলেছে সকলে। চলেছে সাধুর দল।
ক্রিং ক্রিং নয়, রিনি-রিনি করে বাজছে রিকসার বেল। তাড়া দিচ্ছে আমার রিকসা শ্যামাদের টাঙ্গাকে।
শ্যামা হাসছে, হাসছে ওদের সমস্ত দলটা। বুড়োটিও কি হাসছে? হাসছে না, কিন্তু নাকের পাশে গভীর রেখা দু’টিতে তার প্রসন্নতার আভাস!
প্রৌঢ়া কী বললো শ্যামাকে। যাত্রী ও যানবাহনের কলকোলাহল ছাপিয়ে গলা চড়িয়ে শ্যামা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কাঁহা জানা হ্যায়?’ বাঙলা করলে বোধ হয় অর্থ দাঁড়ায়, কোথায় যাওয়া হবে?’
বললাম, ‘মেলায়। কুম্ভমেলায়।’
‘সচ্?’ সত্যি! চমকিত বিস্ময় ও মুহূর্তের নীরবতা। আবার হাসি। সে-হাসিতে পথচারী নরনারী চমকায়, জানোয়ার চমকায়। বোধ হয় চকিতের জন্য থমকে যায় অবিরাম বয়ে চলা এই জনসমুদ্রের পায়ের তলার মাটি, উত্তরপ্রদেশের হাল্কা মেঘ-ছাওয়া বেলাশেষের রক্তিম আকাশ, উত্তরের সর্বনাশী বাতাস। কেন না, এ হাসিতে মুক্তির স্বাদ নেই।
কেন এত হাসি, জানি নে। বলরামের যেমন দেখলাম, হাসি প্রাণ, হাসি গান, হাসি অঙ্গের বসন-ভূষণ। বুঝি এদেরও তাই। কিন্তু বলরামের নীরব হাসিতে খুলে যায় প্রাণের বন্ধ দরজা। নীরব অথচ এক প্রাণখোলা মানুষের মুক্তির উদার ডাক। আর এই চড়া হাসির লহরে লহরে অনুভূত হয় এক চাপাপড়া বন্দীর নিঃশব্দ যন্ত্রণার ছটফটানি।
রিকসায় সামনের চাকা গিয়ে ঠেকেছে শ্যামার পায়ের কাছে। ঠেকে ঠেকে তবু ঠেকে না।শ্যামার একটি খেলা আরম্ভ হয়েছে দেখছি। কার সঙ্গে? আমার সঙ্গে, না রিকসাওয়ালার সঙ্গে, তা জানি নে।
বাঙালি ছেলে বলে ভাবি, দেশের মেয়েরা ছাড়া বুঝি কেউ আলতা দিয়ে পা রাঙায় না। কিন্তু শ্যামারও দেখি আলতা রাঙানো পা, প্রজাপতির নকশাকাটা স্যাণ্ডেল, আবার বাঁকা মল। মলের উপরেই পেখম-উন্মুক্ত ময়ূর-ছাপা শাড়ি। তার বলিষ্ঠ অঙ্গ জুড়ে ছড়াছড়ি নৃত্যরত ময়ূরের। খুলে গিয়েছে ধূলিরুক্ষ চুল, সিঁথিতে মেটে সিন্দুর। কাঁচা সোনার স্থূল কাজ-করা কঙ্কণ-শোভিত দু’হাতে কোলের উপর জড়িয়ে ধরেছে একটা পেতলের কলসীর গলা। বসেছে বেঁকে, ঘাড় হেলিয়ে। মুখে তার খেলার হাসি।
সে আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন্ আশ্রমে থাকবে?’
বললাম, ‘জানি নে।’
‘জানো না?’ বোধ হয় নিজেদের মধ্যে সেই কথাটি বলাবলি করে আবার তারা সকলে হেসে উঠলো। কী করে জানবো! যেখানে কোনোদিন যাই নি, দেখি নি কেমন জায়গা, কী রকম আশ্রয়, সেখানে কোথায় থাকবো সেই ভেবে তো বেরুই নি। কী ভেবে বেরিয়েছিলাম, আজ পথ চলতে সব যেন ঘুলিয়ে গিয়েছে। বক্তৃতা আর যুক্তি গিয়েছি ভুলে। ভেঙে পড়ি নি ক্লান্তিতে, তবু মনেও হচ্ছে না কখন কেন বেরিয়েছিলাম।
মনকে জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই। বেরুবার জন্য মন অস্থির হয়েছিল। অস্থিরতা ঘুচেছে, এখন মন পাগল হয়েছে। নিজের সেই পাগল রূপটি দেখতে কেমন জানি নে! এখন চলা নামের মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে। মনের বুকে কান পাতলে শুনি শুধু, চলো চলো চলো। এত মানুষ চলেছে, অবিরাম চলেছে। বন্যার জলে আমি জল হয়ে মিশে গিয়েছি।
কোথায় গিয়ে ঠেকব জানি নে। ঠেকব কি ভেসে যাব তাও জানি নে। আশ্রয়ের কথা কে ভেবেছে!
পথের দু’ধারে চলেছে পাঞ্জাব সিন্ধু বোম্বাই গুজরাট দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ। কী বিচিত্র তার রূপ। কোথাও রঙিন পায়জামা পাঞ্জাবি ও ওড়নার সঙ্গে ঘাড়ের উপর এলানো খোঁপা, দোলানো বেণী। বাঁকা খোঁপায় ফুল গুঁজে রঙিন রেশমী শাড়িতে টেনে দিয়েছে কাছা। গলায় ঝোলানো বেল্টের সঙ্গে খাপে ঢাকা ছুরি, কোমরে তলোয়ার নিয়ে চলেছে পাঞ্জাবী শিখ। হাজার কুঁচি-ঘেরা ঘাগরায় ঢেউ তুলে চলেছে দিল্লিওয়ালী। বিচিত্র বর্ণবহুল চৌদ্দ হাত শাড়িতেও সর্বাঙ্গ উদাস করে চলেছে রাজপুতানী। মাথায় সোনার টিকুলি, হাতে পায়ে সোনা। কারুর বা রুপোর হাঁসুলি, কান-ছিঁড়ে-পড়া ছ-ইঞি ভারী কর্ণাভরণ নাকের দু’পাশে নাকছাবি, কপালে দেশি গোলাপী রঙের সিঁদুরটিপ, সামনে কুঁচি দিয়ে বাঁ-দিকে আঁচল এলিয়ে চলেছে দক্ষিণদেশিনী। বাবরিকাটা, লুঙ্গিপরা, মুখে চুরুট পুরুষবাহিনী। কোথাও চোস্ত পাজামা আর চুড়িদার পাঞ্জাবি, কোথাও নকশা-ফোটানো নাগরা জুতো, ধুতি আর ঝোলা পাঞ্জাবি পরা গোঁফ-পাকানো হিন্দুস্থানের পুরুষ। এরই মধ্যে চোখে পড়ে কাস্তাপেড়ে বাঙলা শাড়ি আর বাঙলা সিঁদুরের আগুনের মত লাল উজ্জ্বল টিপ ও শাঁখা। সর্বহারা শুভ্রবেশিনী বিধবা। ক্বচিৎ বাঙালি কুমারীর মস্ত বড় আঁট খোঁপা, স্নিন্ধ মুখে উত্তরপ্রদেশের ধূলি-রুক্ষতা আর কোঁচা-ঝোলানো কিংবা পায়ের গোড়ালি অবধি মালকোঁচা দেওয়া পুরুষ, আমারই মতো সব টাইপ চেহারার বাঙালি!
দেখে শেষ হয় না, আশ মেটে না পথের এই বিচিত্র রূপ দেখে। ভাবি, যার বেশ এত বিচিত্র, তার হৃদয় ও চরিত্রের গতিবিধি না জানি আরও কত বিচিত্র! সে বিচিত্রকে জানব কেমন করে। মন ভারী হয়ে উঠলো। এত মানুষ, কত রূপ! এ রূপের শেষ রূপ কোথায়! সে রূপকে খুঁজবো, সেই অপরূপকে দেখবো। ভুলি নি তো! ডুব দেব সেই হৃদিকুম্ভে। রূপে তাকে চিনব না, প্রাণে প্রাণে বুঝবো বলে ডুব দিতে চাই। প্রাণের দরজা যদি থাকে বন্ধ, করাঘাত করব। চাবি হয়ে ঘুরবো কুলুপ ছিদ্রের মধ্যে।
কেন এলাম ছুটে উদভ্রান্তের মতো! দেখবো বলেই তো! ভারতের এই বিচিত্র আরশিতে নিজের মুখটি ভালো করে যাচাই করবো বলেই তো এসেছি। সে মুখ আমার মন। আমার ধর্ম।
চলো চলো, আর কত দূর! নিজের মনের কথা নিজে বলতে পারি নে, মা-খেগো বলা হলে হয়তো গান গেয়ে শুনিয়ে দিত আমার মনের কথা।
এরই মাঝে আর এক রূপ যেন মসলিনের ওড়নার সর্বাঙ্গে ধূলিমলিন ন্যাকড়ার তালিতে ভরা। ভারতের দরিদ্র নরনারী এই সমারোহপূর্ণ মিছিলের সবচেয়ে বড় অংশ। জীর্ণ কম্বল, ছিন্ন কাঁথা, ময়লা জামাকাপড়, উস্কোখুস্কো চুল, ধুলো-মাখা মুখ। তাদের ঘাড়ে মাথায় বোঝা। শত মাইল, শত গ্রাম-গ্রামান্তরের ধুলো তাদের সর্বাঙ্গে ছাওয়া। তবু নিজের প্রদেশ-পরিচয় লেখা রয়েছে তাদের মলিন পোশাকে।
এই রূপের স্রোত চলেছে টাঙ্গায়, রিকসায়, পায়ে হেঁটে। দূর-গ্রামের মানুষ এসেছে মোষের গাড়ি, বলদের গাড়ি নিয়ে। ভারতের বর্ণাঢ্য ঐশ্বর্য, ভারতের মলিন ছাইচাপা সোনা। আমি দু’হাতে কুড়িয়ে নেব এই সম্পদ।
চারিদিকে কলকোলাহল। গাড়ির ঘর্ঘর, ঘোড়ার খুরাঘাত, ঘুঙুরের বাজনা, রিকসার জলতরঙ্গ। পথচলতি মেয়েরা গান ধরেছে। মেয়েদের দেখে মনে হয় তারা মারোয়াড়ের ঝি-বহুড়ি। হাত দিয়ে নথ নোলক সাপটে ধরে গান করছে তারা। গান চলেছে একটি টাঙ্গায়, মোষ-বলদের গাড়িতে। এই তো বিরাট মেলা। চলন্ত মেলা। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে হাতে হাত ধরেছে, আঁচলে আঁচল বেঁধেছে সকলে।
তৃয়ার্ত হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, কোথাও হাসি, কোথাও গান, কোথাও কান্না, কোথাও বিবাদ। ভাষা বুঝি নে, ভাব বুঝি নে সকলের।
সব যখন এমনি ভাঙা রেকর্ডের বিকৃত শব্দের মতো তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে, তখন শুধু স্তব্ধ বনের মাঝে যেন একটি ব্যাকুল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘ও নিধিরাম, বাবা নিধিরাম, কোথায় গেলি? আমি যে হাতছাড়া হয়ে গেছি বাপ! আমার হাত ধর, তোর কাছে টেনে নে।’
একটি ক্লান্ত মোটা গলার জবাব শোনা গেল আরও দূর থেকে, ‘এই যে পিসি, আমি এখানে। ভয় নেই, চলো। আমি তোমাকে ঠিক দেখতে পাচ্ছি, তুমি হারাবে না। ভয় নেই!
ভয় নেই। নির্ভয়ে চলো। কারা কথা বলছে। মানুষ দেখার জো নেই। কথা বলছে ভিড়। এক গানের ভাষা বুঝতে পারি নি, আর-এক গানের ভাষা বুঝতে পারছি। শুনতে পাচ্ছি খোল করতালের ঝিমানো বাজনা, তার সঙ্গে ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ, হরে কৃষ্ণ হরে রাম রাধে গোবিন্দ। ‘
শুনেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বলরামের মুখ। কারা গাইছে লক্ষ্মীদাসীর দল নাকি! রাস্তার বাঁ-দিকে একটা প্লেটে লেখা রয়েছে, কমলা নেহেরু রোড। রাস্তার দু’পাশের কাঁচা অংশে ঝাঁট দিচ্ছে ঝাড়ুদারনীরা। বাঁশের ডগায় ঝাড়ু বেঁধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝাঁট দিচ্ছে, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে যাত্রীদের। এক ফোঁটা জল নেই, ঝাঁট দিয়ে শুধু কেন ধুলো ওড়ানো হচ্ছে বুঝি নে। ধোঁয়ার মতো ধুলো ছেয়ে ফেললো সারাটা রাস্তা। ঝাপসা হয়ে গেল হাজার হাজার মুখ।
এই রাস্তায় আজ আমরা চলেছি, কুম্ভের যাত্রীরা! যদি খুলে দিই এই রাস্তার পুরনো ইতিহাসের পাতা, তবে খুঁজে পাব বুঝি গৌতম বুদ্ধের পদরেণু। কান পাতলে শুনতে পাব বিজয়ী মৌর্য বাহিনীর পদশব্দ। দেখতে পাব মুগ্ধচিত্ত গ্রীক-রাজদূত মেগাস্থিনিসকে, চীন পর্যটক ফা-হিয়েনকে। শুনতে পাব সমুদ্রগুপ্ত ও হর্ষবর্ধনের রথচক্রের ঘর্ঘরানি। পদচিহ্ন খুঁজে পাব হিউ-এন-সাঙ আর শঙ্করাচার্যের!
তবে সে ইতিহাস প্রয়াগের। এলাহাবাদের নয়। গবেষকদের মতে, একসময়ে এই প্রায়াগের নাম ছিল বৎসদেশ। ত্রিশ মাইল দূরে, যমুনাকূলে ছিল তার রাজধানী কৌশাম্বী নগরী। প্রয়াগেরই নাম বৎসদেশ। তারপর মুঘলযুগের দুর্ধর্ষবাহিনী ছুটে এসেছে এই পথের উপর দিয়ে। মুঘলের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবর প্রয়াগে এসে তার নাম রাখলেন ইলাহাবাস। ভিত্তি স্থাপন করলেন ইলাহাবাস দুর্গের। ক্রমে বাদশাহের রম্যভূমি হয়ে উঠেছে এই ইলাহাবাস। জাহাঙ্গীর তৈরি করলেন তাঁর শখের খসরুবাগ। শাজাহান ইলাহাবাসের নাম দিলেন ইলাহাবাদ।
তার পরেও ইলাহাবাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিদ্রোহী বুন্দেলা আর মারাঠাদের নিৰ্ভীক অশ্ববাহিনী। আক্রমণ আর প্রতি-আক্রমণে রক্তে ভেসে গিয়েছে এলাহাবাদের মাটি। কখনো মুঘলদের গোলা আর কখনো মারাঠীদের তলোয়ার অধিকার করেছে এই দেশ।
তারপর অন্ধকার। অযোধ্যার নবাব দেনার দায়ে বিকিয়ে দিল এ দেশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কাছে।
আর আজ চলেছি আমরা। আমরা ঐতিহাসিক যাত্রী নই, কিন্তু ইতিহাস রচিত হচ্ছে। আমাদের মনে। আমাদের ইতিহাস আমরা।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে উলটে পড়বার মুখে সামনে হাত বাড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করলাম। সামনে হাত বাড়িয়ে যে-বস্তুটি ধরলাম, সেটি শ্যামার কলসী। রিকসার সামনের চাকা খানিক বেঁকে দাঁড়িয়েছে। সামনে পেছনে সর্বত্র আচমকা দাঁড়িয়ে পড়েছে চলন্ত মিছিল। পুলিশ হাত তুলেছে মোড়ে।
তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলাম। তাকিয়ে দেখি শ্যামা হাসছে খিলখিল করে।
বললাম, ‘একেবারে দেখতে পাই নি।’
শ্যামা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। বললো, ‘ঘরের কথা ভেবেছিলে বুঝি?’
বলে আবার হাসি। আশ্চর্য! হাসি মেয়েটার রোগ নয় তো?
প্রৌঢ়া জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হয়েছে?’
শ্যামা আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে এবার নিঃশব্দে হাসলো। মুখ ফিরিয়ে বললো, ‘কিছু না, বাঙালি ভাই আমার কলসী বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
কলসী বাঁচিয়ে দিলাম কেমন করে? কলসী ধরে তো নিজেকে বাঁচালাম। অবাক হয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে শ্যামার দিকে তাকিয়ে আমার পথচলা মন চমকে উঠলো।
অমন করে কী দেখছে শ্যামা? ঠোঁটের কোণে তার সেই সর্বক্ষণের হাসি চমকাচ্ছে। তার শাণিত চোখের খর তারা দু’টি নেচে নেচে যেন কী খুঁজে বেড়াচ্ছে আমার মুখে। সে-চোখের দৃষ্টি যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি মনের এক গোপন খেলার দুষ্টুমিতে ভরা।
তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। নিজে অপ্রতিভ হলাম। পথে লজ্জা পেতে হবে, সেকথা ভেবে বেরুইনি। পথে আবার লজ্জা কীসের! পথের দেখা পথেই শেষ হয়ে যাবে। জানি নে শ্যামা কতখানি নির্লজ্জ। জানি নে, শ্যামার এই উদ্ধত চটুলতার মধ্যে তার হৃদয়ের কোন্ গোপন লীলা নিহিত রয়েছে। তার নিজের লীলা নিয়ে সে চলে যাবে এক পথে, আমি যাব অন্য পথে। আমি কেন লজ্জা পাব!
লজ্জা নয়, লোকলজ্জা। সামনে মানুষ, পেছনে মানুষ, মানুষ দিগন্তজোড়া। তার মধ্যে শ্যামা ভিন্ন হয়ে উঠেছে, লোকলজ্জার কারণ সেইটুকুই।
উচ্চকণ্ঠের হাসি একরকম। নীরবে হেসে তাকিয়ে থাকা আর একরকম। অস্বস্তিও তো হয়। বললাম, ‘কী দেখছ?’
বাতাসে ঝরা চুলের গুচ্ছ মুখ থেকে সরিয়ে দিল শ্যামা। তেমনি হেসে গলার স্বর নামিয়ে বললো, ‘আমি কোথায় দেখছি! দেখছ তুমি।’
তা বটে! আজ সকাল থেকে অনেকবার দেখেছি তাকে। ভেবে দেখি নি দেখবো বলে। যে দেখা দেয়, তাকে না দেখে উপায় কী! পথ চলতে আকাশ না-দেখে কে! বাগানে ফুল চোখে পড়ে না কার! শূন্যে ডিগবাজি খাওয়া গান-পাগলা বিহঙ্গ কে না দেখতে পায়!
শুনেছি, তাও অনেকে দেখতে পায় না। আমি যে দেখবো বলেই এসেছি। আর শ্যামাকে দেখতে পাব না, তা কেমন করে হয়!
কিন্তু জিজ্ঞেস করেছিলাম এক কথা একরকম ভাবে। জবাব পেলাম আর-এক কথা, আর এক রকম ভাবে। উপরন্তু পালটা অভিযোগ। এ অভিযোগ, অভিযোগ না হয়ে যদি খেলা হয়, তবে শ্যামার কাছে হার মানা ছাড়া উপায় নেই। এই ব্যাপারে শ্যামাদের কাছে আমরা চিরকাল হার মানি।
আমাকে জবাব না দিতে দেখে শ্যামার চাপা হাসি ফেটে পড়তে চাইল। খানিকটা ঝুঁকে আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কী দেখছিলে?’
শুধু শ্যামাকে দেখছি, সে তো মিছে কথা। তবু বললাম, ‘তোমাকেই। তোমার আলতা রাঙানো পা, তোমার ময়ূর ছাপা শাড়ি…’
তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিল শ্যামা। এই সামান্য কথায় অন্যমনস্কতার ভান করতে হচ্ছে উদ্দাম রহস্যময়ী শ্যামাকে? জনতার মাঝে কী দেখবার জন্য মুখ ফেরাতে হলো তাকে! আমাকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে এই অনুশোচনা, নাকি লজ্জা পেয়েছে?
কিন্তু অপ্রতিভ হতে চায় না শ্যামা। যেন আমার আগের কথা শুনতে পায় নি, এমনি ভাবে ফিরে বললো, ‘গলাটা আমার এখনো ব্যথা করছে। গাড়ির ভিড়ে তুমি আর একটু চাপ দিলে আমাকে মরতে হতো।’
প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে চাইছে শ্যামা নিজেই। কিন্তু রহস্যের আভাস যায় না তার মুখ থেকে তবু। আবার বললো, ‘ওই বাঙালি নুলা সাধুকে তুমি অমন করে ঘাড়ে নিয়েছিলে কেন? তোমার জানো-পহচান নাকি?’
‘না।’
‘তবে?’
বললাম, ‘তুমি আমার মতো এই ক্ষীণ মানুষটার কনুই ধরে ঝুলে পড়েছিলে। কিন্তু তুমি তো আমার জানো-পহচানও নও।’
হাসির সঙ্গে বিস্ময়ের বিদ্যুৎ-রেখা খেলে গেল শ্যামার মুখে। তারপর হেসে উঠে বললো ‘আজীব আদমী!’
হাত উঠেছে পুলিশের। যানবাহনের মিছিল চলতে আরম্ভ করেছে আবার। এক হ্যাঁচকায় শ্যামাদের টাঙ্গা এবার এগিয়ে গেল অনেকখানি। কানে শুনতে পেলাম না, দেখলাম, শ্যামা তার তিন সঙ্গিনীর সঙ্গে কী কথায় হাসিতে মেতে উঠলো।
সামনে তাকিয়ে দেখি, উত্তর-দক্ষিণের লম্বালম্বি রাস্তার পোস্টে লেখা রয়েছে গ্রাণ্ড-ট্রাঙ্ক রোড। আমরা চলেছি পশ্চিম থেকে পুবে। কিছুটা অবশ্য কোনাকুনি। জনসমুদ্রের কলরোলের সঙ্গে মাইক যন্ত্রের সেই চির-পরিচিত কান পচা গান ভেসে আসছে।
মাথা তুলে দেখি, বিস্তৃত মাঠের উপর তাঁবুর সারি। ভাবলাম, এই কি মেলা! বীচিবিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের মতো তাঁবু আর চালাঘরের দিগন্তহীন সমুদ্র একদিকে। কিন্তু কী বিপদ! ঝাড়ুদারনীরা এখানে ধুলো নিয়ে যেন হোলি খেলায় মেতে উঠেছে। বাঁ-দিকে বিশাল প্রান্তর। একগাছা ঘাস নেই, একচ্ছত্র ধুলোর রাজা। জানি নে, কী সুখে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঝাড়ুদারনীরা, আর কী ভেবে তাদের হুকুম দিয়েছেন শহরের স্বাস্থ্যরক্ষী কর্তা। এদেশে একফোঁটা জল নেই!
বেলা যায়। কিন্তু অন্ধকার হয় নি। অথচ সামনে ধুলোয় অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভারী কুয়াশার মতো ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সম্মুখ দিগন্ত। মানুষ তো দূরের কথা, ঘোড়াগুলিও ঘড়ঘড় করে নাক ঝাড়তে আরম্ভ করেছে। অনেকে চলেছে গাধার পিঠে করে। সে বেচারিরাও ভেঁপু ফুঁকতে আরম্ভ করেছে।
আর কী নিদারুণ ব্যাপার! গাড়ি-ঘোড়াগুলি সব ঢালু পথ বেয়ে হু-হু করে নেমে চললো সেই ধুলোমাঠের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম রিকসাওয়ালাকে, ‘ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?’
বললো, ‘বাবু, এখানে সব গাড়ি দাঁড় করাতে হবে। গাড়ির টিকিট নিতে হবে। ছ-আনা পয়সা দিন।’
এ আট আনার পথটুকু দুটাকায় রফা করেও আবার ছ-আনা কীসের?
রিকসাওয়ালা তার ঘর্মাক্ত ধুলোমাখা মুখে একগাল হেসে বললো, ‘কানুন বাবুসাহেব। বাঁধ পর্যন্ত যেতে হলে টিকিট কাটাতে হবে। নইলে রিকসা নিয়ে যেতে দেবে না।’
বলে, সে এদিক-ওদিক একবার দেখে, সোজা একটা টাঙ্গার কাছে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল আমার রিকসা। আবার সেই হাসি। ধুলোয় অন্ধকার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি টাঙ্গাটা শ্যামাদের। রিকসাওয়ালার নজরটা পরিষ্কার। কিন্তু এর জন্য বকশিশ দেওয়ার মতো মনে কোনো প্লাবন আসে নি।
ছ-আনা পয়সা দিয়ে বললাম, ‘জলদি আসবে।’
তাড়াতাড়ি পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে মুখে চাপা দিলাম। বীজাণুর ভয়ে নয়। কেন না, এখানে খারাপ বীজাণু থাকলে, দেবতারও সাধ্য নেই দেহে প্রবেশ করা তিনি রোধ করবেন। কিন্তু দম যে বদ্ধ হয়ে আসছে।
কানের কাছেই একটি শব্দ শুনতে পেলাম, ‘আহা বেচারি!’
মুখ ফিরিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখি শ্যামার মুখ, কিন্তু তার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি, সঙ্গিনীদের মধ্যে আর একজন তাকিয়ে আছে। ধুলো তাদের চোখ বন্ধ করতে পারেনি। সেই সঙ্গিনীর পিছনের দিকে চোখ পড়তেই চমকে গেলাম। সর্বনাশ! বুড়ো আমার দিকে একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এক নজরে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম, লোকটির দোষ নেই। অভিভাবক হয়ে আর কতক্ষণ এ আলাপন সে সহ্য করবে!
শ্যামাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই মানুষটি কি তোমার বাবা?’
‘বাবা! হট্! বাবা কেন হবে?’
কথা কটি অত্যন্ত দ্রুত ছিটকে বেরিয়ে এলো শ্যামার গলা থেকে। ঠাওর পেলাম না, মনে হলো, হেসেই মুখটা সরিয়ে সে অন্যদিকে তাকালো।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে?’
জবাব না পেয়ে মুখ তুলে দেখি, শ্যামা দূরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এমন গাম্ভীর্য ও অন্যমনস্কতা তার। আশ্চর্য! একি ধুলোর ধাঁধা দেখছি, না সত্যি একটা ছায়া ঘনিয়ে এসেছে মুখে! আর কিছু না জিজ্ঞেস করাই উচিত ছিল। কি-ই বা পরিচয়! তবু কৌতূহল চাপতে পারলাম না। বললাম, ‘বলো না।’
অন্ধকারে বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো তীক্ষ্ণ হাসি চমকে উঠলো শ্যামার মুখে। বললো, ‘আমার স্বামী।’
স্বামী! ওই অশীতিপর বৃদ্ধ! এও শ্যামার রহস্য নয় তো! কিন্তু ফিরে আর সে বিষয়ে প্রশ্ন করবার সাধ্য ছিল না আমার।
প্রৌঢ়াকে দেখিয়ে বললাম, ‘উনি?’
তেমনি হেসে শ্যামা বললো, ‘আমার সতীন।’
‘আর এরা দু’জন?
‘একজন আমার সতীনের বোন, আর একজন নোকরানি।’
আমার ঠোঁটের ডগায় হু-হু করে একরাশ প্রশ্ন ছুটে এলো। কিন্তু একরাশ এলেই তো হয় না। রাশ টানতে হয়! জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কী জাত?’
শ্যামা বললো, ‘ভূঁইয়ার।’
ভূঁইয়ার। জানা ছিল আমার। ভূঁইয়ারেরা ব্রাহ্মণ-কায়স্থের মতোই বর্ণ হিন্দু। শুনেছি, তাদের কৌলীন্যপ্রথা বড় প্রবল। মনের মতো পাত্র না জুটলে মেয়েকে অনেক সময় আজীবন কুমারী থেকে বাপের ঘরে কাটাতে হয়। বাঙালির ছেলের কাছে এ জিনিস নতুন নয়। কৌলীন্যপ্রথার কাছে অনেক বাঙালি কুমারী নিজেকে আহুতি দিয়েছেন। ভূঁইয়াদের কথা যখন শুনেছিলাম, তখন বাঙলার কৌলীন্যপ্রথার সঙ্গে তুলনা করতে পারি নি। আজ চোখের সামনেই দেখছি সেই বাস্তব চিত্র।
কিন্তু শ্যামার এমন কী বয়স হয়েছে যে কুমারীত্ব ঘোচাবার জন্য এই লোলচর্ম বৃদ্ধের অঙ্কশায়িনী হয়েছে সে! ভুল ভাবলাম। অঙ্কশায়িনী হয় নি, করা হয়েছে। শুনেছি, এদের অর্থের অভাব নেই। অধিকাংশ ভূঁইয়ার পরিবারই ধনী। সান্ত্বনা বোধ করি সেইটুকুই।
কিন্তু তাকাতে ভরসা পেলাম না আর শ্যামার দিকে। একবেলার পরিচয়। পুণ্যার্থী নয়, বোধ হয় সামান্য একজন মুসাফির ছাড়া তার কাছে আমার আর কোন পরিচয় নেই। আমরা কেউ কারুর জীবন ধারণের রীতি জানি নে। পথ চলার সামান্য হৃদ্যতা। এটা চলতে থাকলে বন্ধুত্ব জন্মায়। বোধ করি, তারই ক্ষীণ সূত্রপাতও হয়েছে। তা ছাড়া শ্যামার মতো মেয়ের অপরিচয়ের বাধা ভেঙে ফেলতে বেশি সময় লাগে না।
তবু তাকাতে পারলাম না। বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো যে হাসি তার মুখে দেখেছি, সে হাসি যে সমস্ত জাতির হৃদয় পুড়িয়ে দিতে পারে। আকাশের বিদ্যুৎ যখন বজ্র হয়ে নেমে আসে তখন রূপবতী সৌদামিনী আগুন হয়ে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে।
চাপা ও তীব্র কণ্ঠে শ্যামা বলে উঠলো, ‘কই, আর কিছু জিজ্ঞেস করলে না?’ বলে হেসে উঠলো খিলখিল করে।
কিন্তু আর ও-হাসিতে ভোলার কিছু নেই। যে বলিষ্ঠ ঘোড়ার দুরন্ত দৌড়ের কান-ফাটানো টকাটক শব্দ শুনে ভেবেছিলাম প্রসন্নময়ের মুক্ত দূত ছুটে আসছে, এখন দেখি সে সার্কাসের ঘোড়া। সে আছে তারের বেড়ার ঘেরাওয়ের মধ্যে। গতি নির্ধারিত তার চাবুকের নির্দেশে।
তার হাসি শুনে প্রৌঢ়া আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হয়েছে রে শ্যামা?’
মুহূর্তে মুখভঙ্গি বদলে শ্যামার ঠোঁট বেঁকে উঠলো। আমার প্রতি বিদ্বেষের বাঁকা কটাক্ষ করে বলে উঠলো, ‘দেখ না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে কত কথা জিজ্ঞেস করছে। ‘ও কে, সে কে, কী জাত? কেন রে বাবা?’
‘তাই নাকি?’
তারা সকলে হেসে উঠলো। যেন আমাকে অপমান করবার জন্যই শ্যামা একটি নিতান্ত গ্রাম্য মেয়ের মতো হঠাৎ ন্যাকা হয়ে উঠলো। যেন প্রতিশোধ নিতে চাইল আমার কোন কৃত অপরাধের।
আমার অপ্রতিভ হবার কথা। কিন্তু শ্যামার এই চকিত রঙ বদলানোর বহুরূপিণী রূপ আমাকে একটুও বাজে নি। তাদের সশব্দ হাসির সঙ্গে আমিও হেসে উঠলাম নীরবে। শ্যামার বিদ্বেষ তো আমার প্রতি নয়। বিতৃয়া তার ওই সংসারের প্রতি। অসতর্ক মুহূর্তে নিজেকে সামান্যতম প্রকাশ করে ফেলতেও মর্যাদাহানি ঘটেছে তার। সেই অপমানের জ্বলুনিটুকু সে রেখে গেল।
আরও কিছু বলবার সাধ ছিল হয়তো শ্যামার। কিন্তু তাদের টাঙ্গা দুলে উঠলো। টিকেট কেটে এনেছে টাঙ্গাওয়ালা।
মনে মনে প্রার্থনা করলাম, বলুক, বলে যাক শ্যামা যা তার প্রাণ চায়। এই জনারণ্য হয়ে উঠুক তার কাছে দুর্গম বন জঙ্গল, আমি রইলাম সেই বনের বিষডোবা হয়ে। সেখানে তার সঞ্চিত বিষ ফেলে দিয়ে সে চলে যাক অমৃতকুম্ভে ডুব দিতে। পুণ্যসঞ্চয়ে ভাসুক প্রাণ-সঞ্চারের সঙ্গম।
কিন্তু তা হয় না। তাদের টাঙ্গার চাকা দু’টো একটা তীব্র আর্তনাদ করে এগিয়ে চলে গেল। ধুলোরাশির উপর ধুলো ছড়িয়ে দিয়ে গেল আরও খানিকটা
কিছুক্ষণের জন্য জনারণ্যের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল আমার কানে। উৎকর্ণ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম শ্যামার দিকে, একবার সেই মিলিত হাসির ঝঙ্কার শুনব বলে।
শ্যামা এদিকে তাকিয়েছিল। গাড়ি চলতে চলতেই ঠোঁটের কোণের বিদ্বেষটুকু অদৃশ্য হয়েছে। বিদ্বেষ নেই, আনন্দ নেই, হাসিও নেই। মুখ তার হঠাৎ ভাবলেশহীন হয়ে উঠেছে, দৃষ্টি চলে গিয়েছে শূন্যে। চোখে তার তীব্রতা নেই, জ্যোতি নেই। সে অন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার পেছনেই চকিতের জন্য জ্বলতে দেখলাম, বৃদ্ধ ব্যাঘ্রের ভূ-ঢাকা একজোড়া চোখ। তারপর ধুলো আস্তরণের ভাঁজে ভাঁজে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই টাঙ্গা।
আর হাসি শোনা গেল না। ধূলি-ধূসরিত এই যানবাহন ও জনতাপূর্ণ প্রান্তর যেন পাতালের বদ্ধ জলের আবর্তের মতো নিঃশব্দে পাক খেয়ে ছটফট করে উঠলো।
Chapter - 3
৩
উঃ, কী ধুলো। ধুলোয় অন্ধ হয়ে গিয়েছে আমার চোখ। মুখ বিস্বাদে ভরে গিয়েছে, কিচকিচ করছে ধুলোয়।
জীবনযুদ্ধে প্রাণ তিক্ত হলাহলে পূর্ণ। পথে বেরিয়েছি নিতান্ত একান্তে নিজের হৃদয় একতারায় সুর তুলে। সেখানেও একটানা আনন্দ থাকবে কে বলেছে! সুরে যদি বেসুর না বাজে, তবে আর বাজিয়ে বেড়াবার কী প্রয়োজন ছিল। কিছুক্ষণ পরেই এলো রিকসাওয়ালা। ধুলোমাঠ থেকে ছুটে বেরিয়ে রাস্তায় উঠলো রিকসা। বাঁধের পথের দু’দিকে বিপণি সাজিয়ে বসেছে ব্যবসাদারেরা। একটি একটি আলো জ্বলে উঠেছে এখানে সেখানে। কোলাহল ক্রমে আরও বাড়ছে।
চোখ ভরে দেখবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এতক্ষণে ক্লান্তি এসে গ্রাস করছে। বুজে আসছে চোখ। বুঝেছি, গন্তব্য আগতপ্রায়। তবু মন বলছে আর কতদূর!
রিকসা থামল। শুনলাম, ‘বাবু, এই যে, বাঁধ।’
তাকিয়ে দেখি সামনেই পথ বন্ধ। বাঁধের উঁচুজমি আড়াআড়ি চলে গিয়েছে উত্তর-দক্ষিণের কোনাকুনি। যেতে হবে বাঁধের ওপরে।
রিকসাওয়ালাকে পয়সা দিয়ে বাঁধে উঠে এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম। অদূরেই গঙ্গা। উত্তর থেকে দক্ষিণে তীব্র স্রোত ছুটে চলেছে। বারো মাসের অন্ধকার গঙ্গার তীর আজ বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করছে। তারই আলোর ঝলক গঙ্গার পূর্বতীরের বাঁকা স্রোতে শাণিত বঙ্কিম অস্ত্রের মতো ঝিকমিকিয়ে উঠেছে।
ওপারের আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি তাঁবু-সমুদ্রের ঢেউ। সন্ধ্যার গাঢ় ধূসরতায় ঢেকে গিয়েছে পেছনের বিস্তৃত ভূমিখণ্ড। আর পূর্বে মাথা উঁচিয়ে উঠেছে উঁচু ভূমির বুকে গাছপালা ঘেরা গ্রাম। হয়তো ওখানেই আছে কোথাও সমুদ্রগুপ্তের উঁচু টিলার বুকে কাটানো কূপ।
আর বিশেষ কিছু চোখে পড়ছে না এখন। দক্ষিণে দেখতে পাচ্ছি ঘষা রুপোর পাতের মতো একটা চলন্ত জলের ধারা।
এই প্রয়াগ। (প্র=প্রকৃষ্ট, যাগযজ্ঞ)। যজ্ঞ অনুষ্ঠানের প্রকৃষ্ট স্থান হলো প্রয়াগ। পুরাণ শাস্ত্রের প্রজাপতি-ব্রহ্মার যজ্ঞবেদী, যজ্ঞের মধ্যবেদী এই প্রয়াগ। প্রজাপত্যের্যজ্ঞ আসীৎ প্রয়াগে। ভারতের আদিম যুগের ধর্মীয় ইতিহাসের লীলাক্ষেত্র। পৃথিবীর প্রথম যজ্ঞের ধূম সঞ্চারিত হয়েছে এখানকার মাথার উপরের আকাশে। প্রয়াগ সেই পূণ্যভূমি।
সিতাসিতে সরিতে যত্র সঙ্গতে
তত্রাহল্প তাসো দিবমুৎপতন্তি
যে বৈ তনুং বিসৃজন্তি ধীরাঃ
তে বৈ জনাসোহমৃতত্বং ভজন্তে।।
কিন্তু তা তো হলো। ঘরবাসী মানুষ পথে বেরিয়েছি। মাথা গুঁজব কোথায়! ঠাঁই নিশানা করে বেরুই নি, খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু এই মুক্ত আকাশের বুকে উত্তরঙ্গ তাঁবু-সমুদ্রের কোথায় ঠাঁই পাব, সে কথা তো একবারও ভাবি নি! মন বাউল হোক, হৃদয় হোক বৈরাগী, তবু ইতিমধ্যেই শীতে যে রকম কুঁকড়ে উঠছি, আচ্ছাদন না পেলে তো নিছক বাউলের মতোই মরতে হবে।
সব ছাড়তে পারি কিন্তু প্রাণ ছাড়তে পারি নে। তাড়াতাড়ি ঠাঁই খোঁজার জন্য নেমে গেলাম বাঁধের নিচে।
বাঁধের নিচে নেমে দেখলাম, জমকালো ব্যবস্থা। সে জমকালো ব্যবস্থা দেখবার মতো চোখ বা মন কোনোটাই এখন নেই। কালকে এ সময়ে প্রায় ঘর ছাড়ার উদ্যোগ করেছিলাম আজ এখনো মাথা গুঁজতে পারি নি কোথাও। চোখ আর মনের দোষ দিতে পারি নে।
সামনে লোক, পেছনে লোক, লোক ডাইনে বাঁয়ে। এখানে কারুর গতি একমুখী নয়। বহুমুখে চলেছে জনতার মিছিল। সকলেই চলেছে আশ্রয়ের সন্ধানে। আমি ঝোলাঝুলি নিয়ে একবার এদিকে ধাক্কা খেয়ে ওদিকে যাই, ওদিক থেকে এদিকে। বেশির ভাগই চলেছে গঙ্গার ওপারে।
ওপারে যাওয়ার জন্য রয়েছে অস্থায়ী সেতু। ভাসন্ত সেতু। আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের জন্যই এই সব সেতুর প্রয়োজন। পাশেই রয়েছে সামরিক বাহিনী এবং পি ডব্লিউ ডি-র ক্যাম্প। উর্দি পরা সৈনিকেরা দেখলাম পুলের উপর যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। সারি সারি আলোক মালা জ্বলে উঠেছে পুলের উপর। তীব্র স্রোতে তার প্রতিবিম্ব হারিয়ে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। মনে হলো, কাছাকাছি দু’টো মাত্র পুল রয়েছে।
কিন্তু ওপারে গিয়েই বা কী করব! যাব কোথায়! দেখতে পাচ্ছি, ওপারে হাল্কা কুয়াশার আড়ালে জ্বলছে অজস্র আলো, অজস্র ধূসর বর্ণের তাবু। মানুষ আসছে শত শত, যাচ্ছে হাজার হাজার। এপারে ওপারে মাইক নিনাদিত স্তোত্র, ভজন কীর্তন ও পুণ্যার্থীর কোলাহলে দিগন্ত মুখরিত। কিন্তু আমি যাই কোথায়!
মন পাগল হয়েছিল, কিন্তু এখন পাগল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় কী করে! সামনেই একটা বটতলায় দেখলাম, থরে থরে খাবার সাজানো রয়েছে। সর্বনাশ! সারা দিনটাতে যে চা-সিক্ত প্রাণ বাউল হয়েছিল, সে প্রাণ খাবার দেখেই মুহূর্তে ভোগের জন্য লালায়িত হয়ে উঠলো। সেই তেল-সিঁদুর আর ভবীর ব্যাপার। পোড়া পেট যে বাউল হয় না, বৈরাগ্যও মানে না। খাবার দেখা মাত্র চকিতে ক্ষুধার্ত চোখ পড়ে ফেললো, ‘খাঁটি ঘিউকে পুরী, দুধকে মালাই, লাড্ডু, প্যাড়া, সন্দেশ…।’ থাক থাকো, আর পড়ে লাভ নেই। ইতিমধ্যেই চোখের ভিতর দিয়ে সে মরমে পশেছে। এবার মরমের রস জিভ দিয়ে গড়াবার যোগাড় হয়েছে। তবে এই প্রয়াগ কা লাড্ডু এখন দিল্লি কা লাড্ডুর সমান। খেলে ভেদবমি হবার আশঙ্কা খুবই, না খেলেও জিভের জল তো কারুর হাতধরা নয়।
একদিকে ‘ইদ্ধে যাও,’ অন্যদিকে ‘উধার হটো,’ নানা প্রাদেশিক বুলি ও ধাক্কা খেতে খেতে সরে এসেছি অনেকখানি। সামনেই দেখলাম, একটা তাঁবুর গায়ে সাইনবোর্ড ঝুলছে, এনকোয়্যারি। দেখি, এনকোয়্যারিতে এনকোয়্যারি করে কিছু মেলে কিনা
আগে থাকতে শুনিনি কিছুই। ভেবেছিলাম, ভারতবর্ষের ধর্মীয় পীঠস্থান প্ৰয়াগ। পাণ্ডাদের জ্বালায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারবো না। আপনিই আশ্রয় যোগাড় হয়ে যাবে। কথায় বলে, ধরলে যম ছাড়তে পারে, পাণ্ডা ছাড়ে না। কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা না ছিল এমন নয়।
বছর কয়েক আগে একবার পুরী যেতে হয়েছিল। অসময়ে, মানে মরসুমের বাইরে। শুনেছি কোনো কোনো সময়ে, বনগাঁয়ের ইয়ে রাজা থেকে শুরু করে ভুতো-গদা-পুঁটীরা, স্বপ্ন-প্রিয় শুভ্রা বাহিনী, আওয়ারা গ্যাং, কলমবিদ্বেষী কেরানী, বাগ্মী অধ্যাপক ও জাদুকরী, কলমবাজ সাহিত্যিক বিদগ্ধজনেরা সকলেই পুরীর সমুদ্রসৈকতে মরসুমী ফুল হয়ে ফুটে থাকেন কিছুদিনের জন্য। মরসুমী ফুল হওয়ার সুযোগ পাইনি। মেঘভারাতুর আকাশ আর নিয়ত-ক্ষিপ্ত ভয়ংকর মূর্তি সমুদ্রের দারুণ ঝাপটায় আমার মতো অনামী ফুলের সব পাপড়িগুলি ঝরে গিয়েছিল।
যাক সে কথা। পুরী স্টেশনে দেখেছিলাম যাত্রীর দ্বিগুণ পাণ্ডাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাদের উপর। যেন একরাশ মানুষের উপর ক্ষুধার্ত সিংহবাহিনী। কে কাকে সাপটে নেবে সেই চিন্তা। আমি একলা মানুষ কোনোরকমে যদিও বা পাণ্ডাব্যুহ ভেদ করে রিকসায় উঠেছিলাম, খানিকটা এগুতেই দেখি এক আধবুড়ো চলন্ত রিকসাতে উঠেই আমার পাশে বসেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার!’ সে একগাল হেসে তার নাম-ধাম পরিচয় দিলে। বুঝলাম, সে একটি পাণ্ডা। আরও বুঝতে হয়েছিল, বাঙলাদেশের অনেক নামী ও মানী পরিবারের পাণ্ডা। অতএব তার নিজস্ব মন্দিরেই আমার প্রথম প্রবেশ। কিন্তু কোনোরকমে যদিও বা তার এঁটো-কাঁটা ছড়ানো ভয়াবহ পিছল কুয়োতলা থেকে ফিরে এসেছিলাম, খেতে বসে কান্না পেয়েছিল।
হলুদ-গোলা ফ্যান হলো ডাল, আর কচুর তরকারি দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলে আলুর তরকারি। কাছে বসে আতিথেয়তা করছিল পাণ্ডা আর হাতির মতো ফোলা দু’টি পা নিয়ে তার বউ। খেতে দিচ্ছিল একটি কলা বউ। ঘোমটার নিচে দেখা যাচ্ছিল তার দোলানো নোলক আর ছুঁচলো স্থূল ঠোঁট।
সে রকম হলে, পরিবেশ একটি বাঙালি গৃহস্থের দ্বিপ্রহরিক রান্নাঘরের সুখে দুঃখে ভরে উঠতে পারত। কিন্তু এখানে স্নেহ ও অনুরাগ-ভরা উপরোধ ও এক হাতা ঘণ্টো ধপাস করে পাশে ফেলে দেওয়ার ব্যাপার নয়। কচু দিয়ে আলুর দাম নেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।
শুনলাম দেড় টাকা এর দাম। দুবেলায় তিন টাকা হয় বটে, আট আনা ছাড় দেওয়া হবে। এ ছাড়া জগন্নাথের মন্দির দর্শন করবার দর্শনী তো আছেই।
মাথায় থাকুন জগন্নাথ ঠাকুর। জানি না, কচুকে আলু করতে পারেন কিনা তিনি। মাথায় দিই তাঁর লীলাভূমির ধুলো নিয়ে। দেড়খানি রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে গলায় জ্বলুনি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম সমুদ্রতীরে। কপাল ভালো, আকাশে ছিল মেঘলা ভাঙা রোদ। দিগন্তহীন শান্ত সমুদ্র প্রাণভোলানো হাসির লহর তুলে সম্বোধন ও সংবর্ধনা জানিয়েছিল আমাকে। সেই ছিল আমার সান্ত্বনা, আমার কচুজ্বলুনি গলায় অমৃতের প্রলেপ, আমার জগন্নাথ দর্শন।
যাক। একেবারে গল্প ফেঁদে বসেছি। প্রয়াগ থেকে ছুটে গেছি সমুদ্রে। গল্প বলার নেশা ছাড়তে পারি নে। কথা হচ্ছিল পাণ্ডা নিয়ে। কিন্তু এখানে পাণ্ডার প্রাদুর্ভাব অন্তত আমার চোখে পড়লো না। পড়লে সদ্গতি হোক আর দুর্গতি হোক, গতি একটা হতো।’এনকোয়্যারি’ ক্যাম্পে ঢুকে দেখলাম, একজন পুলিশ অফিসার বসে কী লিখছেন আর সেপাই একজন রয়েছে দাঁড়িয়ে। বললাম, ‘দেখুন মশাই, আপনাকে একটা কথা—’
অফিসারটি লেখনী বন্ধ করে চকিতে একবার আমার আপাদমস্তক দেখেই আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বললেন, ‘আপ ফোটো খিচনে মাংতা হ্যায় না? আই অ্যাম সরি, মেলাকা ফোটো খিচনা বিলকুল মানা হ্যায়।’
মেলা-কা ফোটো! সামনে আয়না নেই, তবু নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একবার। ধূলি-ধূসরিত জামা-কাপড়ের আসল রঙ চেনা দায়। তাহলে মাথা-মুখের অবস্থা কী হয়েছে, সেটা অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে। কাঁধে ওভারকোট, দু’হাতে ঝোলা। গলায় ক্যামেরাও ঝোলানো নেই, পোশাকটাও আর যা হোক ট্র্যাভেলারের মতো রম্য নয়। ফোটোর কথা কেন এলো ভেবে বিস্মিত হলাম। বুঝে নিলাম, মেলার ফোটো তোলা নিষিদ্ধ হয়েছে। বললাম, ‘ফোটোর কথা বলছি না, এখানে কোথায় আশ্রয় পেতে পারি, বলতে পারেন?
এবার অফিসারটি বিস্মিত হয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, ‘কেন, আপনি যেখানে খুশি আশ্রয় নিতে পারেন। কোনো আশ্রমে কিংবা পাণ্ডাদের ক্যাম্পে। নয় তো আপনি নিজেই বেড়ার ছাউনি দিয়ে আশ্রয়, তৈরি করে নিতে পারেন। কোত্থেকে এসেছেন?’
বললাম, ‘কলকাতা। ‘
অফিসারটি এক মুহূর্ত ভেবে বললেন, ‘আপনি রামকৃষ্ণ আশ্রম কিংবা ভারত সেবাশ্রমের ক্যাম্পে খোঁজ করলে আপনার সুবিধা হতে পারে।’
কেন সুবিধে হতে পারে, সেটা উহ্য রেখেই তিনি আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু আবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে হলো, ‘আচ্ছা বলতে পারেন, সেবাশ্রম সংঘটা কোথায়? কিংবা রামকৃষ্ণ আশ্রম?’
মুখ না তুলেই তিনি বললেন, ‘একটা বাঁধের ওপারে, আর-একটা গঙ্গার ওপারে।’
বলে, তিনি অত্যন্ত দ্রুত গলায় সেপাইটিকে নির্দেশ দিতে লাগলেন। বুঝলাম, আমার এনকোয়্যারির পালা শেষ। এবার আমাকে বাঁধের ওপার অথবা গঙ্গার ওপার বেছে নিতে হবে। যে কোনো ওপার ছাড়া গতি নেই।
এতদুর চলে এসে মনে মনে হাঁপিয়ে মরছিলাম। ভেবেছিলাম, এসে পড়েছি। কিন্তু সে যে কতদূর এখনো, কে জানে!
বাইরে এসে দাঁড়াতেই, মনে হলো শিস দিয়ে উঠলো একটা চাবুক আর সর্বাঙ্গে কেটে বসলো তার আঘাত। একবার শিউরে উঠে সামলাতে না সামলাতে আর-একটা ঝাপটা। সর্বনাশ! শীতের প্রকোপ যে এত ভীষণ তা জানতাম না। তাড়াতাড়ি ঝোলা নামিয়ে ওভারকোট চাপালাম গায়ে।
সন্ধ্যার পরমুহূর্তের এই সময়টা অদ্ভুত হয়ে উঠেছে। ধুলো আর ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে চারদিক। আলো থাকা সত্ত্বেও আপাদমস্তক ঢাকা মানুষগুলি ছায়ামূর্তির রূপ ধরেছে। আধো অন্ধকার মঞ্চের এক গোপন রহস্য, দৃশ্য হয়ে উঠেছে সঙ্গমের উন্মুক্ত আকাশতলে। তারই মাঝে ছায়ামূর্তির খেলা।
এসবই ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত মস্তিষ্কের আজগুবি স্বপ্ন কিনা বুঝতে পারছি না। কাছে এত ভিড় ঠেলাঠেলি, এত কল-কোলাহল, তবু মনে হচ্ছে সবই অনেক দূরে। যেন শীতের নিশীথে আমি দাঁড়িয়ে আছি এক গ্রামের সীমান্ত মাঠে। আমার কানে ভেসে আসছে সেই গ্রামের কোলাহল। অস্পষ্ট, অথচ কত স্পষ্ট। ঝাপসা, অথচ সবই দৃশ্যমান!
হঠাৎ আমার মন বেঁকে বসলো। থাকো, যাব না কোনো আশ্রমের সন্ধানে। একবারও নিজের মন খোঁজার চেষ্টা করলাম না। একটু ছলও খুঁজলাম না। কেবল মনে হলো, এইটুকু দেখবার জন্যই তো এসেছিলাম। এইটুকু আরও প্রাণভরে দেখবো। কী করে মনে এ ভাবের উদয় হয় জানি নে। এ কীসের হতাশা, কীসের গ্লানি বুঝি নে। এ কি নিজের মন থেকেই কোনো অভিমানের সৃষ্টি, না কি নিজেকে পীড়ন করার এক ভয়াবহ বিলাস-বাসনা সুপ্ত রয়েছে আমার মনের মাঝে, তাও আন্দাজ করতে পারি নে। দূরে ফেলে এসেছি জীবনধারণের সংগ্রাম। সেখানে প্রতি মুহূর্তে বাঁচার অভিযান। এখানে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার তেমন কোনো নির্দয় ইচ্ছা নেই, তবুও ভাবলাম, পড়ে থাকবো এই বালুপ্রান্তরে। কেন আবার নিজের ভাবনায় অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করবো এখানেও! রাত কেটে যাবে, সম্ভবত কেটে যাবে এখানে থাকার অঙ্ককযা দিনগুলিও। যে মনকে ফাঁকা ভেবে এসেছি ছুটে, তাকে ভরে নিয়ে যাব চলে। তবু আর টেনে নিয়ে যেতে পারি নে। দেহের চেয়ে মন ভারী। এর বাড়া ভারী সংসারে আর কী আছে!
আমি নয়, হঠাৎ চমকে উঠলো আমার কানের পর্দা। কী শুনলাম! কার গলা শুনলাম! চকিতে শিথিল দেহ ঝাড়াপাড়া দিয়ে উঠলো। তাড়াতাড়ি ভিড়ের দিকে ধুলোভরা দু’চোখ তুলে ধরলেম আকুল আগ্রহে।
দেখতে পেলাম না, কিন্তু আবার শুনতে পেলাম ফাটা বাঁশের চেরা গলা, ‘আর জ্বালাস নি আমাকে পেল্লাদ। এবার আমি গঙ্গায় ডুবে প্রাণটা দেব।’
জবাবে পেল্লাদের ক্ষুদ্ধ হেঁড়ে গলা শোনা গেল, ‘যা খুশি তাই করগে যা। আমি আমার পরিবারকে নিয়ে কাল চলে না যাই তো—’
‘খবরদার পেল্লাদ, দেবতার থানে দিব্যি কাটিস নে।’
‘কাটব। হাজারবার দিব্যি কাটবো। দেখি আমাকে কে কী করতে পারে!’
‘কাট, কাট তাহলে। দ্যাখ, আমিও গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে পারি কি না।’
কিন্তু পেল্লাদের সেই কথা, ‘কাটবই তো। তুই দে ঝাঁপ। শালা জন্মে অবদি পায়ে কোনোদিন ছুঁচ ফোটাইনি! আর তোর কিপটেগিরির জ্বালায় আমাকে তো নিতেই হলো, আমার পরিবারকেও কিনা ছুঁচ ফোটালে! এখন যদি একটা কিছু হয়?’
‘আর আমার এই বুড়ি হাড়ে বুঝি ছেড়ে দিয়েছে রে ড্যাকরা?’
এবার কার মোটা গলা শোনা গেল, ‘আঃ, তোমরা এবার থামো দিকিনি বাপু।’
উঃ, সেই নাটক! এখনো তার শেষ হয়নি। এর দেখছি বিরাম নেই, অঙ্ক নেই, বোধ হয় যবনিকাও পড়বে না। শুধু বহির্দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে মাত্ৰ।
কিন্তু আমার মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠলো। আহা, ফাটা বাঁশের চেরা গলা ও প্রহ্লাদের হেঁড়ে গলা যে এমন মিষ্টি, তা কে জানতো! এ যে ডুবন্ত মানুষের খড়-কুটোর আশ্রয়। কেন পড়ে থাকবে এই বালুপ্রান্তরে! কীসের গ্লানি, কীসের হতাশা!
ওই তো! ওই তো দেখতে পাচ্ছি প্রহ্লাদ ভিড় ঠেলে চলেছে। তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো শাল খুলে পড়েছে। এক হাতে ধরেছে দিদিমাকে, আর এক হাতে বউকে। বউকে তো নয়, প্রহ্লাদের ভাষায় পরিবার। বাব্বাঃ, হারিয়ে যাবার ভয়ে এক হাত ধরার কষাকষি, তার মধ্যেই গঙ্গায় ঝাঁপ দেওয়া ও দিব্যি কাটার ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা চলছে। তাহলে তাদের তিনজনকেই ইন্জেকশন নিতে হয়েছে। যাক, বাঁচা গেল। রুগীকে কোনো কোনো সময় ওই ভাবেই জোর করে ঔষধ দিতে হয়।
ভিড় ঠেলে তাদের কাছে গেলাম। প্রথমেই নজর পড়ল দিদিমার। আর যায় কোথায়? অমনি খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘থাক, আর দাঁত বের করে হাসতে হবে না।’
‘সত্যি! তাড়াতাড়ি দাঁত ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। কী করব! তাদের আগ বেড়ে ইনজেকশন নিয়েছি, অপরাধ তো আমারই।
প্রহ্লাদ বললো, ‘অ্যাই যে মোশাই, ব্যাটারা ছাড়লে না কিছুতেই। কুট করে দিলে ঢুকিয়ে।’ বলেই গলার স্বর পরিবর্তন করে বললো, ‘উঃ, কী ব্যথা! নির্ঘাত আমার জ্বর এসেছে।
অমনি দিদিমা বলে উঠলেন, ‘সেই অলক্ষুণে কথা! কক্ষনো তোর জ্বর আসেনি।’
‘আমি বলছি এসেছে। আমার যদি কিছু হয়-’
হঠাৎ একটা গোঙানি শুনে তাকিয়ে দেখি, বুড়ি দিদিমা উদ্গত চোখের জল চেপে বিড়বিড় করে বলছে, ‘ভগবান, ওর কথা যেন মিথ্যা হয়। আমি এতদূর থেকে ছুটে এসেছি আর আমার পেল্লাদের জ্বর করে দেবে
কী জানি প্রহ্লাদ টের পেয়েছে কিনা, সে কিন্তু গলার স্বর একটু নামিয়েছে। জ্বর আসেনি, প্রহ্লাদের ওটা মন-জ্বর। একবার যখন পেয়ে বসেছে, ও সারতে দেরি হবে। সে আমার উদ্দেশ করে বকবক করেই চললো। ‘মোশাই, এমন কিপটে বুড়ি, রোজ দু’আনা পয়সা দিতে আমার কালঘাম বার করে ছাড়ে। রোজ নয়, মাসে নয়, বছরে নয়, একবারের জন্য ছ’টা টাকা দিলে দিলে তো কাউকেই এ ভোগ পোয়াতে হতো না।’
কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রোজ দু আনাটা কীসের?’
হিক্কা তোলার মতো সরু গলায় হি হি করে হেসে উঠলো প্রহ্লাদ। পরমূহর্তেই আবার বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, ‘আর জিজ্ঞেস করবেন না মোশাই, মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওঃ, দু’টো দিন নিরম্বু উপোস যাচ্ছে! আগে জানলে কোন শালা আসত এখানে!’
কথাটা না বুঝে তার দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে একটু ঝুঁকে গলা নামিয়ে বললো, ‘বুঝলেন না? আপনি দেখছি নেহাত অকম্মা। আরে মশাই, বাবার পেসাদ! বুঝলেন, বাবার পেসাদ। যাকে বলে কলকে সেবা।’
‘মানে গাঁজা?’
প্রহ্লাদ জিভ কেটে বললো, ‘ছিঃ, ও কথা বলতে নেই।’
পাশ থেকে দিদিমার গলা শুনতে পেলাম ‘মরণ! ওর মুণ্ডু বলতে নেই। নেশাখোর যম, তীর্থ করতে এসেও আমার হাড় জ্বালিয়ে খাচ্ছে। বলি ও পাঁচ-বদ্যি, কোমর যে ভেঙে গেল বাবা, আর কদ্দূর?’
এতক্ষণে সামনের লোকটি মুখ ফেরালো। অর্থাৎ পাঁচ-বদ্যি। পাঁচ-বদ্যি কেন, অতবড় চেহারাটার নাম দশ-বদ্যি হলেও ক্ষতি ছিল না। কিন্তু মুখটা দেখে শিউরে উঠলাম। মনে হলো, নিষ্ঠুর লগুড়াঘাতে কেউ ফুলিয়ে দিয়েছে লোকটার মুখ। মাথাটা সামনে পেছনে নোড়ার মতো লম্বা। কপালটা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সামনের দিকে, চোখের কোল দু’টো ঢুকে গিয়েছে ভেতরে। থ্যাবড়া নাক, মোটা ঠোঁট। নাম পাঁচ-বদ্যি। কেন, তা জানি নে। কিন্তু পরনে রয়েছে ফুলপ্যান্ট আর বুশ শার্ট। কোট চাদর কিছুই নেই। তবু এই শীতে সে একটুও কুঁজো হয়ে পড়ে নি। বললো, ‘এই পুলটা পারো হয়ে খানিকটা যেতে হবে।’ বলে, একবার আমার দিকে ফিরল। চোখ না দেখলেও বুঝলাম, আমার দিকেই তাকিয়ে দেখলো সে।
পুল পারো হতে গিয়ে দেখি বাধা। সেপাই ছুটে এসে বললো, ‘এ পুল দিয়ে ওপার থেকে আসা যায়। ওই দক্ষিণের পুল দিয়ে যেতে হবে।’
তাই গেলাম। ভিড় ঠেলাঠেলি করছে পুলের মুখে। যারা এসেছে রিকসায়, টাঙ্গায়, তাদের নামিয়ে দিচ্ছে সেপাইরা। পুলের উপর দিয়ে মানুষ নিয়ে যেতে পারবে না কোন যানবাহন। হেঁটে যেতে হবে। তাই নিয়ে লেগেছে চিৎকার আর গণ্ডগোল।
ভাসন্ত পুল। মানুষের পায়ের চাপে চাপা আর্তনাদে ক্যা ক্যাঁ করে উঠছে। দুলে দুলে উঠছে। বাধা পেয়ে ফুলে ফুলে উঠচে পুলের নিচের জল। চাপা গর্জন তুলে ছুটে চলেছে নিয়তবাহী গঙ্গা।
এখানে শুধুই চলা, শুধুই যাওয়া। যাওয়া-আসা নেই। আমরা সমুদ্রোপকূলের বাঙালিরা গঙ্গায় যাওয়া আসা দেখতে অভ্যস্ত। এ-বেলার জলে আমরা ওবেলা পলিমাটি দেখতে পাই। কিন্তু এখানে নিরবধি সূদুরের ডাক। অজানা ও অচেনার পথে নিরন্তর রোমাঞ্চকর অভিযান। সে অভিযানের প্রত্যাবর্তন নেই।
গঙ্গা পারো হয়ে এসে শীতের ডিগ্রি যেন আর একটু চড়ল। পুলের নিচেই সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে আছে কতকগুলি লোক। চেঁচাচ্ছে, ‘ঘিউ কা দীয়া। চার চার পয়সা। গঙ্গা মাঈকী সেবা করো বাবু।’
দেখলাম, অনেকগুলি জ্বলন্ত প্রদীপ গঙ্গাকিনারের নিস্তরঙ্গ জলে চলেছে ভেসে। ঘৃত-দীপ। জলের বুকে প্রতিবিম্ব পড়ে দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে তার সংখ্যা।
এই দীপ গঙ্গা কীভাবে গ্রহণ করছেন জানি না। চোখে দেখতে পাচ্ছি, ন্যাংটো, আধ-ন্যাংটো হা-ভাতে ছেলের দল ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলে। দু’হাতে সন্তর্পণে নিয়ে চলেছে হয়তো নিজেদের অন্ধকার ডেরায়। কেউ কেউ মেতে উঠেছে খেলায়। ঢেউ দিয়ে প্ৰদীপ সরিয়ে দিচ্ছে গঙ্গার দূর অকূলে।
মাতালের মতো চলেছি। ঠাণ্ডা বালুর মধ্যে গোড়ালিসুদ্ধ পা ডুবে যাচ্ছে। গাঁয়ের বাড়িঘরের আগ-দুয়ার দিয়ে চলার মতো চলেছি তাঁবুর এ-পাশে ও-পাশে। ধুনুচি জ্বালিয়ে এখানে সেখানে বালুর উপর বসে আছে সাধুর দল।
প্রহ্লাদ ডাকলো, ‘ডাক্তারমামা।’
জবাব দিল পাঁচ-বদ্যি, ‘বল্।’
‘আর কত দূর?’
‘এই এসে পড়েছি। ওই যে দক্ষিণপুবে দেখছিস অনেকগুলো আলো জ্বলছে, ওইটে আমাদের আশ্ৰম।
প্রহ্লাদ খুশি হয়ে বললো, ‘বাঃ, বেড়ে আশ্রমটি দেখছি। মাইকে গানও হচ্ছে নাকি ডাক্তারমামা?’ বুঝলাম, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো পাঁচ-বদ্যির আর এক নাম ডাক্তারমামা। যেরকম গম্ভীর দেখছি, ডাক্তার বলেই মনে হয়।
বললো, ‘হুঁ-হুঁ, এ যার তার কাজ নয়। দেখেশুনে এমন জায়গা করেছি, বুঝলে খুড়ি, মনে হবে নিজের ঘরে রয়েছি।’
খুড়ি হলো প্রহ্লাদের দিদিমা। বললো, ‘গুণের শরীর তোমার বাবা। তুমি না থাকলে আর আমার এ-যাত্রা আসা হত না। তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল?’ আপশোসের মধ্যে বোধ হয় প্রহ্লাদের প্রতি অভিযোগ প্রকাশ করলো দিদিমা।
কিন্তু তাতে প্রহ্লাদের কিছু যায় আসে বলে মনে হলো না।
বুড়ি হাঁপাচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে। হাঁপাচ্ছে বোধ হয় প্রহ্লাদের পরিবারও। প্রহ্লাদের পরিবার কিন্তু জোর তেরো-চোদ্দর একটি বালিকা মাত্র। একে ক্লান্তি তায় শীত। বেচারির ঘোমটা খুলে গিয়েছে। প্রহ্লাদের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে চলেছে অন্ধের মতো টলতে টলতে।
পাঁচ-বদ্যি না ফিরেই জিজ্ঞেস করলো, ‘খুড়ি, ওই ছোঁড়াটা কে?’
ছোঁড়া? আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম। কই, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো! দিদিমা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কী জানি, আমি তো জানিনে বাবা।’
আমাকেই বলছে নাকি? সর্বনাশ, প্রথমেই একেবারে ছোঁড়া! তা হলে যা আশ্রয় পাব, বুঝতেই পারছি।
পাঁচ-বদ্যি আমার দিকে ফিরে নীরস গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাওয়া হবে?’
বললাম, ‘কোথাও একটু আশ্রয়ের দরকার।’
ঠেলে-ওঠা কপালটা এগিয়ে নিয়ে এসে প্রায় ধমকে উঠলো, ‘তা আমাদের সঙ্গে কেন?’
অভ্যর্থনার বহর দেখে প্রায় থেমেই পড়লাম। বললাম, ‘থাকতে হবে তো! অন্তত আজকের রাতটার মতো—’
পাঁচ-বদ্যি তেমনি গলায় বলে উঠলো, ‘থাক, ও-সব চালাকি ঢের দেখেছি, এখন কেটে পড়।
নতুন জায়গা। নিয়মকানুন জানি নে। জানি নে এখানকার হালচাল। কিন্তু পাঁচ-বদ্যির ভাষায় কেটে পড়ে, নিজেকে খণ্ডিত করে যাব কোথায়!
একটু আশা নিয়ে তাকালাম প্রহ্লাদের দিকে। প্রহ্লাদ হেসে বললো, ‘দিব্যি আসছিলেন, বাধা পড়ে গেল। যান, কেটেই পড়ুন।’
এমনভাবে বললো, যেন কেটে পড়াটা তার কাছে কিছুই নয়। দিদিমার দিকে তাকালাম। দিদিমা আমার দিকে ফিরে অপ্রসন্ন গলায় বললো, ‘ঝাড়া হাত-পা নিয়ে তো ছুটে এসেছ, তা মাথা গোঁজবার ঠাই করতে পারো নি?’
সত্যি! ভগবানকে পাব বলে দিদিমার মতো পাগল হয়ে আসিনি। আসিনি পুণ্যসঞ্চয়ের কথা ভেবে। মাততে আসিনি তীর্থ নিয়ে। বৈষয়িক বুদ্ধি-বিবেচনা থাকা উচিত ছিল আমারই। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছে বিপরীত। কিছু বললে, উল্টো বিপত্তির লক্ষণ।
চেরা গলা মোলায়েম করে বললো দিদিমা, ‘পাঁচুগোপাল, বলছিলুম, দেশের ছেলে। তীর্থক্ষেত্রে কুকুর-বেড়ালকেও তাড়াতে নেই। ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিবি?’
পাঁচু-বদ্যি বলে উঠলো, ‘ও-সব তুমি বুঝবে না খুড়ি। এর নাম কুম্ভমেলা, বুঝলে? মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে মানুষসুদ্ধ চুরি যায়। রাত্রে যদি গ্যাঁড়াফাই করে ভাগে, তখন?’
কথাটা অপমানকর। কিন্তু প্রতিবাদ নিরর্থক। এদিকে এসে পড়েছি আশ্রমের কাছে। আশ্রম বলতে সুদীর্ঘ ঘেরাওয়ের মধ্যে দেবতার মঞ্চ, আর গোটা দশেক যাত্রীদের তাঁবু। মঞ্চের উপরে কয়েকজন গেরুয়াধারী গান করছেন মাইকের সামনে বসে। জটাজুটধারী ভস্ম-আচ্ছাদিত একজন সাধু বসে আছেন কাঠের সিংহাসনের উপর। কয়েকশো মেয়ে-পুরুষ বসে শুনছে গান।
ঢোকবার মুখে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে নমস্কার করলে দিদিমা। নমস্কার করে উঠে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বললো, ‘পাঁচু, ছেলেটাকে নিয়ে নে। রাত করে যাবে কোথায়?’
‘যেখানে খুশি যাক, তোমার অত ভাবনা কীসের খুড়ি! এখানে ও থাকবে কোথায়?’
বলে সে এগিয়ে গেল। দিদিমা শণনুড়ি মাথাটা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘এস, চলে এস। আমার যেন মরণ নেই, সব হয়েছে একতরো।’
পাঁচ-বদ্যির হুঙ্কারের কাছে এই চেরা-গলার আশ্বাস ও বিশ্বাস অনেক বেশি। কে ভেবেছিল, এলাহাবাদ স্টেশন-প্রাঙ্গণের সেই বুড়ি এমন মহীয়সী মূর্তিতে দেখা দেবে আমার কাছে! ইচ্ছে হলো তখুনি পায়ের ধুলো নিই। কিন্তু আবেগ বাগ মানাতে হলো।
কেন না এখন সংশয় দূর হয়নি।
এবার প্রহ্লাদও বলে উঠলো, ‘চলে আসুন না মোশাই, ডাক্তারমামা ওরকম বলেই থাকে। মাথা খারাপ কি না!’
জানি নে কার মাথা খারাপ। খানিকটা যেতেই পাঁচ-বদ্যি একজন সাধুকে নিয়ে এসে হাজির। মনে হলো বৈষ্ণব। নাকের উপর থেকে মাথা পর্যন্ত পুণ্ড্ররেখা টানা। ঘাড় অবধি চুল। পরনে গেরুয়া কাপড়। বোধ হয় এ আশ্রমের অধ্যক্ষ। আমাকে বললেন পরিষ্কার বাঙলায়। একলা পুরষের জন্য কোনো তাঁবু আমাদের নেই। আপনি সপরিবারে এলে আমরা ব্যবস্থা করতে পারতাম। এখানে সকলেই বউ-ঝি নিয়ে আছেন। আপনাকে তো আমরা থাকতে দিতে পারি নে।’
জানি নে কেমন কেমন করে বুড়ি-বুকে ঠাঁই পেয়ে গিয়েছিলাম। দিদিমা আশ্রমের মধ্যেই গলা চড়িয়ে বলে উঠলো, ‘পাঁচু, এ তোর বড় অন্যায় কিন্তু বাপু! ছেলেটা একলা কোথায় দেখলি তোরা? ও যদি কারুর বউ-ঝিকে উঁকি মেরে দেখতে চায়, তখন বলিস। এখন ও আমাদের তাঁবুতে আমাদের সঙ্গেই থাকবে। এতে যদি না হয়, তবে বলে দে, আমরাও পথ দেখি।’
পাঁচ-বদ্যির ভয়ংকর মুখটা অপ্রতিভ হয়ে উঠলো। সাধুও অবাক হয়েছিলেন। তারা দু’জন বিস্মিত হয়ে পরস্পর মুখ দেখাদেখি করলো। বিস্মিত আমিও কম হই নি। দিদিমা যে এতখানি এগুবে, তা আমিও জানতাম না।’
প্রহ্লাদ মাঝখান থেকে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ বাবা, বলে দেও, তাহলে আমরাও কেটে পড়ি। দেখছ ছেলেটা আমাদের চেয়ে ভদ্রলোকের মতো দেখতে।’
সাধু বললেন দিদিমাকে, ‘না, আপনার সঙ্গে যদি থাকে, তবে আর আমাদের আপত্তি কী?’
তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনি এদের সঙ্গে ব্যবস্থা করে নেবেন। আমি সাধারণ নিয়মের কথা বললাম মাত্ৰ।’
বলে তিনি চলে গেলেন। সকলেই চুপচাপ। পাঁচ-বদ্যি আমার দিকে একবার ক্রুদ্ধ চোখে দেখে দিদিমাকে বললো, ‘এসো, তোমাদের তাঁবু দেখিয়ে দিই।’
একটি তাঁবুর মাঝখান দিয়ে ভাগাভাগি করে এক-একটি পরিবারের আস্তানা করা হয়েছে। মাটির উপর বিছিয়ে দিয়েছে বিচুলি। ব্যবস্থা আছে ইলেকট্রিক আলোর। সত্যি, বাড়ির মতো ব্যবস্থাই বটে।
মনে মনে খুব সঙ্কুচিত হলেও দিদিমার সঙ্গে ঢুকে আগে ঝোলা-মুক্ত করলাম নিজেকে। তারপর ধপাস করে বসে পড়লাম বিচুলির গদিতে।
সকলেরই সেই অবস্থা। সকলেই বসে পড়েছে। কেবল পাঁচ-বদ্যি যাবার আগে বলে গেল, ‘ঘাট হয়েছে আমার তোমাদের আনা। আগে জানলে এ আপদ আমি আনতুম না। বাট, ইও ছোকরা—’
আমাকেই বলছে, তাকালাম তার দিকে। পাঁচ-বদ্যি একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে বুক ঠুকে বললো, ‘মাই নেম ইজ ডক্টর পাঁচুগোপাল রায়। একটু এদিক ওদিক করবে তো, ঘাড়টি মটকে ছেড়ে দেব, মনে থাকে যেন। থাকো আজকের রাতটা, তারপরে তোমাকে কাল আমি দেখছি।’ বলে সে চলে গেল।
আমি বসেছিলাম একটি ভীত সন্ত্রস্ত বালকের মতো। সবই সময়ের ব্যাপার। পাঁচ-বদ্যিকে জবাব দেওয়ার সময় পাব একদিন। আপাতত আমি তার চোখের বিষ। সেই বিষ বুকে নিয়েছে দিদিমা।
তাকিয়ে দেখি, দিদিমা দিব্যি নাতবউ নিয়ে ঘর গোছাবার উদ্যোগ করছে। সে সব দেখার মন ছিল না। দিদিমাকে দেখে ভাবছিলাম একটা কথা। সেই কথা, রূপে তাকে চিনব না। ডুব দেব তার হৃদিসায়রে। রূপের পরে যে রূপ থাকে লুকিয়ে। মনের অন্ধকারে। ক্লান্ত ক্ষুধার্ত দেহ। তবু চোখ ভরে জল এসে পড়ল। উঠতে চাইলাম। আড়ষ্ট হয়ে রইলো হাত-পা। বোধ হয় এই-ই দেখতে এসেছি। যা দেখতে এসেছি, তাই তো দেখছি নিজের অপমানের মধ্যে, অসহায়তার মধ্যে, আমার চোখের জলে।
একটু জলের জন্য হাঁপিয়ে উঠলাম। কোনোরকমে এলাম বাইরে বেরিয়ে। ঘুরে পেছন দিকে গিয়ে দেখি জলের কল রয়েছে। সেখানে ভিড় করেছে মেয়ে-পুরুষ। বাসন মাজছে, হাতপা ধুচ্ছে।
কে বলছে, ‘বিনু, তরকারিটা পোড়ারমুখী পুড়িয়ে ফেলেছিস।’ কে হেসে উঠলো খিলখিল করে বোধ হয় বিনুই। কে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘নেও নেও, বাসনকোসন নিয়ে সর বাপু, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।’
পাশের তাবুতেই নারীকণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, ‘অনিলের শ্বশুরের কথা বলছ তো? সে মিনসে নাকি মস্ত চাকরি করে। ওই গোমরেই তো অনিলের বউ অত বাপ সোহাগী!’ হঠাৎ আমার মনে হলো যেন বাঙলার কোনো মফস্বল শহরের এঁদো গলির বস্তি অঞ্চলে ঢুকে পড়েছি। সন্ধেবেলার বস্তি। চারদিকে কলকোলাহল, ঝগড়া, গান, ফুটকাটা, সাংসারিক প্যাচাল। তারই মাঝে জলের ছড়ছড়, বাসনের ধাতুর খনখন শব্দ।
ভুলে গেলাম তীর্থক্ষেত্র। দাঁড়িয়ে আছি বাঙলাদেশের কোনো এক পাড়ায়। মনটা তাজা হয়ে উঠলো। তাজা হয়ে উঠলো আরও জল দেখে। উঃ, যেন কতদিন গায়ে দিই নি। থাক শীত, তবু গায়ে জল না দিয়ে বাঁচব না।
আর থাক পাঁচ-বদ্যি। কে জানে, রূপে তাকে চিনলাম না। মনের মাঝের অন্ধকারে তার রূপ আরও কত ভয়ংকর, সেটুকু না দেখে গেলেও সে-দেখা আমার পূর্ণ হবে না।
একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিচু হয়ে আবার ঢুকলাম তাঁবুর মধ্যে।
তাঁবুতে এসে তাড়াতাড়ি ঝোলা হাতড়ে বের করলাম সাবান আর গামছা। আগে দেহটি আবর্জনামুক্ত করি, তারপরে অন্য কথা।
কিন্তু বেরুতে আর পারলাম না। দিদিমা বুড়ির চেরাবাঁশের গলা আচমকা তাঁবু কাঁপিয়ে খরখর করে উঠলো, ‘ওমাঃ! একি মেলেচ্ছ কাণ্ড গো বাবা!’
কাকে বলছে! ওরে বাবা, তাকিয়ে দেখি, শ্বেত-পিঙ্গল শণনুড়ি উঁচিয়ে বুড়ি কুঞ্চিত অগ্নিকটাক্ষ আমার দিকেই হানছে। শরীর আমার শুধু সিঁটিয়েই গেল না, আবার একটি কেলেঙ্কারির লজ্জায় ও ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছে?’বলে দিদিমা আবার গলা চড়াল। অর্থাৎ যা আমি সবচেয়ে ভয় পাচ্ছিলাম। বললো, ‘প্যান্ট পরে ইঞ্জিসন না হয় নিয়ে এলে। নইলে যমে ছাড়বে না। কিন্তু দেবতার থানে সাবাং মাখতে যাচ্ছ কী বলে! তীর্থক্ষেত্ত তেল সাবাং-এ অপবিত্তর হয়, তাও জানো না বাছা?’
জানা ছিল না এত বড় কথা। প্রতিবাদও নিরর্থক। কে জানতো যে তেল সাবানে দেবতার মাহাত্মও ধুয়ে যেতে পারে!
কিন্তু মানুষ চেনার বড়াই আর এ জীবনে করবো না। কয়েক মুহূর্ত আগে যার পায়ে হাত দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উন্মুখ হয়েছিলাম, এখন তার কাছ থেকে পালাতে পারলে বাঁচি। স্নেহ ভালবাসা, রাগ ও বিরাগ, এই উভয় ভাব প্রকাশের মধ্যে কি এদের ভাবেরও তারতম্য ঘটে না? অনেক মানুষেরই ঘটে না। সে উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। কিন্তু নিজে বড় একটা সে বিষয়ে ভুক্তভোগী নই। তাই মন বড় সহজেই দমে যায়।
ইচ্ছা থাকলেও এখান থেকে আর পালাবার উপায় নেই। এইটুকুই তো আমার পরম ভাগ্য যে, বুড়ির চেঁচানি শুনে ডাক্তার পাঁচুগোপাল রায় তার ভয়ংকর মূর্তি নিয়ে আসেনি ছুটে।
বিশ্রামের আরামে প্রহ্লাদের রসভরাট গলা গদগদ হয়ে উঠেছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘জানলি দিমা, ছেলেটা একেবারে ভদ্দরলোক।’
দিদিমা বললো, ‘তাই না বটে!’
সেইটাই অপরাধ। সাবান রেখে গামছা নিয়েই বেরিয়ে গেলাম। গায়ে জল লাগিয়ে আর ফিরে আসতে পরি নি। দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার যোগাড়। উঃ বড় ভুল করেছি। এ যে কম্প দিয়ে জ্বর আসার মতো। ম্যালেরিয়ার সর্বনাশা কাঁপুনির মতো হূৎপিণ্ড ছরকুটে যারে দেখছি। উত্তরপ্রদেশের শীত না ব্যক্ত করতে পারি, বাঙলাদেশের জল-হাওয়ায়, এই ম্যালেরিয়া-প্রুফ ক্ষীণ দেহের অভিজ্ঞতাটুকু জাহির করতে পারি খুব। মাসের পর মাস ঘড়ি না দেখে সময় বলে দিতে পারি জ্বর আসার ক্ষণটি লক্ষ করে। এ অভিজ্ঞতা কম নাকি! বেশ বড়-সড় একটি পিলেযুক্ত নিটোল পেট আর কাঠি-কাঠি হাত-পা নেড়ে, ভাসা-ভাসা টানা-টানা চোখে বাঙলার জল-আকাশের দিকে তাকিয়ে তবু আমরা দিব্যি কবিত্ব করি, ‘আয় লো আয় রাই বিনোদিনী, রসের হাটে কালো মানিক করবো বিকিকিনি।’হাড়কাঁপুনিকে বলি, ওদিকে থাক। দোষ ধরো না ভাই। পিলের গৌরব করছি নে। ওই রূপ দেখেও তো শুনেছি, ‘বাইরী বাঙালিনী নাকি, নিশি নিশি গুঞ্জরে।’
মধুর মধুর রসরাজ
মধুর বৃন্দাবন মাঝ।
থাক, রসিকতা আর পোষায় না। উত্তরপ্রদেশের হাওয়া পারে নি, জল যে একেবারে কাবু করে দিল। কোনোরকমে কাঁপতে কাঁপতে তাঁবুতে এসে মনটা একেবারে ভরে উঠলো। বাঃ! প্রহ্লাদের ক্যাটকেটে দিদিমা দেখছি টার্কি মুরগীর মতো বহুরূপিণী। আমার ধারণা ছিল, ওটা তরুণীদের একচেটিয়া। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো! দিব্যি দেখছি, আমার ঝোলা উজাড় করে বিচুলির উপর পাতা হয়েছে কম্বল। ঝোলা শিয়রে রেখে হয়েছে বালিশ। গায়ের কম্বলটিও ভাঁজ করা হয়েছে পায়ের দিকে। এবার শুয়ে পড়ার ওয়াস্তা।
যাক, আর কিছু চাই নে। দেখেই মন গরম হয়ে উঠেছে। শরীর গরম হতে আর কতক্ষণ! তাড়াতাড়ি গা-হাত-পা মুছে গায়ে দিলাম ওভারকোট। সেটি গায়ে নিয়েই বিচুলির ওপর কম্বল শয্যায় অঙ্গ পেতে টেনে নিলাম আর একটি কম্বল।
কিন্তু এতক্ষণ প্রহ্লাদ সপরিবারে, আর্থাৎ দিদিমা সহ আমার দিকে তাকিয়েছিল বিস্ফারিত চোখে। তারপরেই বুড়ির শ্লেষ্মা-জড়িত গলার হাসি তো নয়, হাসির হিক্কা। কিন্তু এও যে সম্ভব, তা জানতাম না। বুড়ি বললো, ‘বলি ও ভালো মানুষের ছেলে, সাবাং তো মাখতে যাচ্ছিলে, তোমার আবার এত ছুঁচিবাই কীসের বাপু?’
বললাম, ‘কিসের ছুঁচিবাই?’
‘এই যে গায়ে জল ঢেলে এলে। বারো জেতের ছোঁয়া নিয়ে আমরাও এসেছি, কিন্তু এই শীতে কি আমরা জল ঢালতে গেছি?’
এখন সত্য বলে বোঝানো নিরর্থক যে ছুঁচিবাই নয়, পরিষ্কার হওয়ার জন্যই জল ঢেলেছি। হয়তো বিশ্বাসই করবে না। তবু এমনি অবিশ্বাস ভালো। কিন্তু চেঁচামেচি যেন না হয়। কিছু না বলে শুধু হাসলাম। দিদিমা আবার বললো, ‘দেখো বাপু, শেষে নিমুনি বাধিয়ে বোসো না। ওসব ঝক্কি পোয়াতে পারবো না।’
কী দরকার পারবার! রাত পোহালে যাদের রেহাই দেব, তাদের ভাবনার প্রয়োজন নেই। ওদিকে খাবার বন্দোবস্তও হচ্ছে বলে মনে হয়। রান্না করা তো এখন আর সম্ভব নয়। চিঁড়েমুড়কি বেরুচ্ছে টিনের পাত্র থেকে। অস্বস্তি ঘিরে ধরল আমাকে। অন্তত খাওয়ার সময়টাও বাইরে থাকতে পারলে হতো। শুয়ে পড়েছি যে!
আবার দিদিমার গলা, ‘নেও দু’টো চিবিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়।’
এরা না জানুক, নিজে তো জানি, চিবোবার স্পৃহা এখন আমার একটুও নেই। গতকাল সকালে বিছানা ছেড়েছিলাম। পথের ধকল কাটিয়ে এবার গা পেতেছি। এই বিশ্রামের ভোগ এখন খাওয়ার চেয়ে বড় ভোগ। কিন্তু পরিস্থিতি আমার এ সত্য ভাষণের মর্যাদা দেবে না।
কথা না বাড়িয়ে, যতটা পারলাম, চিবিয়েই শুতে হলো। এখনো এ আশ্রমের মাইকে দেবমাহাত্ম্য অলোচিত হচ্ছে। সারা কুম্ভমেলা জুড়েই এখনো কলকোলাহল চলছে পুরোদমে। শুধু আমি রয়েছি যেন অনেক দূরে। শুনতে পাচ্ছি আশপাশের তাঁবুগুলিতে বিচিত্র গুঞ্জন। কিন্তু সবই অস্পষ্ট। এটুকু না থাকলে হয়তো গাঢ় ঘুমের আলিঙ্গনে অচেতন হয়ে পড়তাম। অমনি অর্ধচেতন অবস্থায় আমার কানে এলো এক ভাঙা-ভাঙা অর্ধস্ফুট একটি গলার গুঞ্জন—
শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন
যশোদা রাখিল নাম যাদু-বাছাধন।।
দিদিমার গলা। বোধ হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন গলা। আমার কানের শিরাগুলি চকিত মুহূর্তে একেবারে জেগে উঠলো। তারপর কানের পর্দা থেকে একটা বিচিত্র শিহরণ আমার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত করে তুলল।
কৃষ্ণের শতনাম। কোনোদিন জীবনে মুখস্থ হয় নি। মহিমাও কিছু বুঝিনে ও নামের। কিন্তু ভাঙা জড়িত গলার এই বিচিত্র সুর, আমার শৈশবের নিদ্রাহীন চোখের উদ্ভট স্বপ্নের, আমার দুষ্টামির, আমার বিশ্বজোড়া কৌতূহলের সমাপ্তি এনে দিত। আমার শিশুরক্তের শিরায় শিরায় ঘুমের মায়া হয়ে থাকত লুকিয়ে। না-ছোঁয়া থাকলেও সর্বাঙ্গ ভরে থাকত, জড়িয়ে থাকত আমার মায়ের আলিঙ্গন, এমনি ছিল রাত্রের ঘুমে, ভোরের জাগরণে। যে সুরে ঘুম আসত, আবার সেই সুরেই একটু একটু করে খুলে যেত চোখের পাতা।
তারপর জীবনের স্রোতে আমি ভেসে গিয়েছি একটি বৃন্তহীন ফুলের মতো। যৌবন এসেছে অসহ্য বেদনা ও সংগ্রামের ডাক নিয়ে। পায়ের তলার মাটি বাঁচাতে কবে হারিয়ে গিয়েছে সেই সুর। মায়ের রূপ ধরেছে এই কঠিন পৃথিবী।
কিন্তু সেই হারানো সুর যে আমার এই দীর্ঘ জীবনের রক্ত-প্রবাহে অজান্তে অনুসরণ করছে, তা জানতাম না। সমস্ত কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলো। গাঢ় নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম আমি। তখনো একটু একটু কানে আসছে—
কালোসোনা নাম রাখে রাধা বিনোদিনী
কুব্জা রাখিল নাম…
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। খসখস শব্দ হচ্ছে ঠিক কানের কাছেই। কত রাত হবে, কে জানে! শুয়েছিলাম বাইরের পর্দার সামনে। প্রথমটা চোখ মেলতে পারলাম না। পর্দার তলা দিয়ে তীক্ষ্ণ ছুঁচের মতো এসে বিঁধছে কনকনে হাওয়া। কাঁটা দিয়ে উঠছে গায়ের মধ্যে। মনে হলো সর্বাঙ্গ ভিজে গিয়েছে। রক্ত জমে গিয়েছে হাত পায়ের। বিচুলি-শয্যা বরফের মতো ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। দূরাগত মেঘগর্জনের মতো গুড়গুড় করে উঠলো বুকের মধ্যে।
বোধ হয়, এই ভয়ানক শীতেই ঘুমটা ভেঙে গিয়েছে। মেলা নিস্তব্ধ। কোলাহল নেই। হঠাৎ দু-একটা সংক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে দূর থেকে। আচমকা শোনা যাচ্ছে স্খলিত ঘণ্টাধ্বনি। আবার নীরবতা। কেবল কানের কাছে খসখস।
চোখ মেললাম। চোখ মেলেই চমকে উঠলাম। পর্দার কাছেই একজোড়া বুট। তাঁবুর মধ্যে আলো জ্বলছে। একটু একটু করে বুট বেয়ে বেয়ে দৃষ্টি তুললাম। বুটের উপরেই মোটা, খাকি প্যান্ট। হাঁটুর উপর থেকে ভারী কালো কম্বল।
সর্বনাশ! ফ্রাঙ্কেস্টাইন ছবির মনস্টার! পাঁচ বদ্যি! ভয়ংকর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর পাঁচুগোপাল। টের পায় নি যে, আমি জেগে আছি। হাতের আড়ালে আমার চোখের কোলে ছায়া। দেখলাম, ডক্টর পাঁচুগোপাল ঠিক যেন রাত-প্রহরীর মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছে চারদিক। কী দেখছে কে জানে! কিন্তু একটা বুট যদি চাপিয়ে দেয় গলার উপর!
কয়েকটি রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত কাটল বুকের ধুকধুক তালে। তারপর কানে এলো চাপা চিৎকার, ‘শালা, নো জায়গা নট কিচ্ছু। চলো বাহার।’
পরমুহূর্তেই পর্দাটা তুলে বেরিয়ে গেল সে। আর-এক ঝলক কুচো বরফ কে ছুঁড়ে মারল আমার গায়ে। কোনোরকমে হজম করলাম ঠাণ্ডা চাবুকের কষাঘাত।
কিন্তু ডক্টর কেন এই শীতনিশীথে জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছে! ‘নো জায়গা নট কিচ্ছু’র’ বাঙলা মানে তো তাই বোঝায়। বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা। ঘুম আর এলো না। অনেকক্ষণ পড়ে রইলাম। চব্বিশ ঘণ্টার ক্লান্তিতে এখনো চোখ জুড়ে আসারই কথা। কিন্তু আশ্চর্য! এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আর কিছুতেই আসছে না। অনেক সময় অতিরিক্ত ক্লান্তিতে দেহতন্ত্রী যেন টানটান হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে মনটিও। এই হঠাৎ ঘুম-ভাঙা মনেও আমার কোনো শৈথিল্য নেই। সেখানে অনেক তাড়া, অনেক কৌতূহল। মন যেন ছেঁড়া পালের টুকরো ফালির মতো থরথর করে কাঁপছে। হয়তো এর কোন অর্থ নেই, আশা নেই। তবু মন মানে না। মানে নি বলেই তো এসেছি ছুটে। হোক উদ্ভট, অদ্ভুত, অবাক কাণ্ড। তবু আর শুয়ে থাকতে পারি নে। উঠে পড়লাম। উঠে দেখি, প্রহ্লাদকে মাঝখানে রেখে একপাশে তার পরিবার আর-একপাশে দিদিমা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এই ঘুম দেখে হঠাৎ বোঝার উপায় নেই, এরা এসেছে ঘর ছেড়ে দূরে। এসেছে তীর্থ করতে।
বাইরে বেরিয়ে এলাম ওভারকোটের বোতাম এঁটে। কিন্তু এসে কয়েক মুহূর্ত চলৎশক্তি রহিত হয়ে গেল। মনে হলো, মনের আশা মনে নিয়ে ঢুকে পড়ি তাঁবুর মধ্যে। শুনেছি, ইওরোপ শীতপ্রধান দেশ। সেখানকার শীতে জল জমে বরফ হয়। পথে ঘাটে উঠোনে ছাদে বরফ। লোকে পথে বেরুতে ভয় পায়। কিন্তু আমার বাঙালি হাড় যে উত্তরপ্রদেশের গঙ্গার পাড়েই জমে যাওয়ার দাখিল।
পকেটে ছিল মাফলার। বার করে জড়ালাম মাথায়। জুতো মোজা পরেই শুয়েছিলাম। সুতরাং দরকার থাকলেও শীত আটকাবার আর কোনো উপায় ছিল না।
আশ্রমের বাইরের আলোগুলি নেভানো। মঞ্চের পেছনেই অস্থায়ী মন্দির হয়েছে মাটির দাওয়ার উপরে, গোলপাতার বেড়া ও মন্দিরের ঝাঁপ বন্ধ। মঞ্চের উপরে ও নিচে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পুঁটলির মতো দেখাচ্ছে আপাদমস্তক মুড়ি-দেওয়া ঘুমন্ত কতকগুলি মানুষকে। মনে হলো না কেউ জেগে আছে।
আশ্রমের প্রধান গেট দিয়ে বেরিয়ে এলাম। শিশির ভেজা বালি খসখস করছে। চলার সঙ্গে সঙ্গে খসখস শব্দ করে। আটকে যাচ্ছে পা। রাশি রাশি ভেজা বালি জুতোর মধ্যে মোজাসুদ্ধ পা সিক্ত করে তুলছে। অন্ধকারে চিকচিক করে উঠছে বালির বুকে অভ্রকুচি।
পশ্চিমদিকে মুখ করে চলছিলাম। ওপারে অস্পষ্ট এলাহাবাদ দুর্গপ্রাকার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। দুর্গের মাথায় পতাকাটিও লক্ষ করা যায় একটা গাছের ফাঁক দিয়ে। নজরে পড়ে না শুধু সতর্ক প্রহরী।
সম্ভবত কিছুক্ষণ পূর্বেই চাদ ঢলে পড়েছে দুর্গের আড়ালে। তাই পশ্চিমের আকাশে কিঞ্চিৎ আলোর আভাস। কিংবা এলাহাবাদ শহরের আলোকমালার হালকা আভাস মাত্ৰ।
লক্ষ মানুষের মেলা এখন নিঃশব্দ। এই নিঃশব্দের মধ্যে মিশে গিয়েছে ঝিঁঝির ডাক, আমার পদশব্দের খসখসানি। নিয়ত ধাবিত গঙ্গার কলকল ধ্বনি এই নিঃশব্দ রাত্রির সঙ্গীত প্রবাহের মতো চলেছে ভেসে। যেন অদৃশ্যে বসে কোন এক নিঃশব্দের সঙ্গীতবিলাসী নিয়ত জলের বুকে ঢেলে চলেছে ধাতব বস্তু।
সন্ধ্যার সেই আলোর ছড়াছড়ি নেই। এখানে সেখানে দু-একটা আলো জ্বলছে। দিগন্ত জুড়ে তাঁবুগুলি দেখাচ্ছে যেন সমুদ্রসৈকতে নিশ্চল নীরব অসংখ্য পাখির মতো। যেন ধূসর বর্ণের পাখা মেলে বসে রয়েছে বাদুড়ের দল।
আবার সেই স্খলিত ঘণ্টাধ্বনি। কানের কাছেই শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম, কয়েক হাত দূরেই একটা হাতি বাঁধা রয়েছে। সুরের মাঝে ডুবে গিয়ে মানুষ যেমন করে দোলে, হাতিটা তেমনি দুলছে সামনে পেছনে। তারই তালে তালে বাজছে ঘণ্টা।
অদূরেই কিছু পোড়া কাঠ থেকে একটু একটু ধোঁয়া উঠছে। আগুন জ্বালা হয়েছিল, নিভে গিয়েছে। সেই অগ্নিকুণ্ডের গা ঘেঁষেই বালির উপর কয়েকজন শুয়ে আছে আপাদমস্তক ঢেকে। ভাবাও দুস্কর, এই ভয়াবহ শীতের মধ্যে উন্মুক্ত আকাশের তলে কেমন করে মানুষ শুয়ে আছে।
দূরে দূরে কোথাও দু-একটি প্রজ্বলিত আগুনের শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে আগুনের চেয়েও পুঞ্জীভূত ধোঁয়ারাশি।
আচমকা কান ফাটানো দুম-দুম ঝমঝম শব্দে চমকে উঠলাম। উত্তর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, গঙ্গার উপর দিয়ে চলে গিয়েছে রেলওয়ে ব্রীজ। ট্রেন চলেছে তার উপর দিয়ে। মনে হলো, জমাট নৈঃশব্দ্য ভেঙে সেই ঝমঝম শব্দ ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। এখুনি জেগে উঠবে মানুষের মেলা।
কিন্তু ট্রেনের বিলীয়মান শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বালুচর একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। ট্রেন দেখবার জন্যই দাঁড়িয়েছিলাম। এই গাঢ় নিস্তব্ধতার মধ্যে একটি ভাঙা ভাঙা গলা শুনতে পেলাম। যেন কাকে কী বলছে। এই তাঁবু সমুদ্রের মধ্যেই কোথাও কেউ কথা বলছে। কিন্তু কোথায়? মানুষ তো দেখতে পাই নে।
একটু কৌতূহল হলো। কান পাতলাম। কথাগুলি হিন্দি ভাষায় বলছে। কী বলছে? আর একটু এগিয়ে আবার থমকালাম। কথা তো নয়, কে যেন কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘বহুত বহুত পাপ কিয়া ভগবান! হে ঈশ্বর, আমার অর্থ নাও, আমার সোনা নাও, আমার খাওয়া নাও, আমাকে বিবস্ত্র কর, আমার সব নিয়ে, আমাকে মৃত্যু দাও। আমার এই পাপের প্রাণ আমি তোমার পায়ে দিচ্ছি। গ্রহণ করে তুমি আমাকে মুক্তি দাও।’
আমার হাত-পা একেবারে নিশ্চল হয়ে গেল। অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে আমি কার পাপের স্বীকারোক্তি শুনছি! মৃত্যুকামনা শুনছি কার? আমি কোথায় এসেছি, যেখানে মানুষ অসংকোচে প্রকাশ করছে তার পাপ! নিবেদন করছে প্রাণ!
ভুলে গেলাম, আমি এক সভ্য দেশের সৃষ্টি ও কৃষ্টি ভরা নগরের নাগরিক। আমি যেন হাজার বছরের অতীতে এসেছি, ফিরে। কোন্ অদৃশ্য থেকে আমাকে দু’হাতে আলিঙ্গন করলো এই বালুচরের নিশি! নিশি পাওয়া অন্ধ ও বোবার মতো আমি চারিদিকে হাতড়ে ফিরতে লাগলাম।
ওই যে দূরের অগ্নিকুণ্ড ও ধোঁয়া, হয়তো ভরদ্বাজ মুনির যজ্ঞের কাঠ পুড়ছে ওইখানেই। দিনের পর দিন শত শত মানুষ প্রয়াগে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণনাশ করছে! প্রাণনাশের এই ভয়াবহ মহাপুণ্যলীলা আজ ঘিরে ধরল আমাকে। অনেক মানুষ, অনেক মানুষের ছায়া চারিদিক থেকে ঘিরে আসছে আমাকে। ভারতের এক বিস্মৃত যুগের ছায়ারা ভিড় করছে আমার চারপাশে। ওভারকোট পরা একটি ক্ষীণ মানুষরূপী জীবের দিকে তারা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, এ কোন্ দেশের মানুষ! গঙ্গাতীরে তাদের শত শত বছরের এই নির্জন বিচরণক্ষেত্রে রাত্রি নিশীথে এ কোন্ রক্তমাংসের জীব! অনেক পরিবর্তন তারা দিনের পর দিন লক্ষ করেছে। যে অক্ষয়বট গাছের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে ভগবানের কাছে তারা প্রাণ দান করেছে, তাদের সেই অক্ষয়বট অসঙ্কোচে কেটে দিয়েছেন আকবর বাদশা। গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমে দাঁড়িয়ে তারা দল বেঁধে সবাই সেই নিষ্ঠুর কাজ দেখেছে। তারপরও শত শত বছর ধরে তারা দেখে আসছে, মরজগতের লক্ষ লক্ষ নর-নারীকে, তাদের সেই অক্ষয়বটের স্মৃতিচিহ্নে মাথা ঠুকতে। দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছে তারা। সে হাসি কেউ শুনতে পায় না। গঙ্গা ও যমুনার তলে চাপা পড়ে থাকে সেই হাসি। বিদ্রূপে বেঁকে উঠেছে তাদের চোখ, যখন দেখছে মরজগতের মানুষগুলি বেঁচে থাকতে কত ভালোবাসে। পাপকে গোপন করতে তাদের কত আয়াস। মুদ্রা নিক্ষেপ করে কত সহজে সে ঈশ্বরের কৃপালাভ করতে চাইছে। তারা দেখছে, তাদের অক্ষয়বটের পরিবর্তে একটা অন্য বটের ডাল দেখিয়ে পাণ্ডা পয়সা নিচ্ছে মানুষের কাছ থেকে।
তারা ফিসফিস করে কথা বলেছে আর হাওয়ার গায়ে ভেসে বেড়িয়েছে। কেউ জানে না, কিন্তু তারা জানে প্রয়াগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভারতের কী ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
কিন্তু তাদের এই অবাধ মুক্ত বিচরণ সময়ে এ কোন্ জীব! গঙ্গার কোল থেকে একে একে তারা সকলে উঠে এসেছে। তারা কেউ হাজার বছরের, কেউ পাঁচশো বছরের, কেউ দুশো বছরের।
আমি কথা বলতে গেলাম। কিন্তু আমার কথা হারিয়ে গিয়েছে। তারা পরস্পরের গা টিপে হাসছে। আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে আমাকে। তারপর, তাদেরই সমবেত কণ্ঠের হাসির মতো আমার কানে এসে বাজল গঙ্গার কলকল ধ্বনি।
তাকিয়ে দেখলাম, আমার পায়ের কাছে জল। গঙ্গার তীরে এসে পড়েছি। দূর গঙ্গার বঙ্কিম স্রোতে হঠাৎ কারা হেসে উঠছে নিঃশব্দে। বাঁকা স্রোতের আলোর ঝিলিকে হেসে হেসে আবার সেই হাসি হারিয়ে যাচ্ছে স্রোতেরই বুকে। ছায়ারা সব গুপ্ত শত্রুর মতো চোখের সামনে অতলে ডুব দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
কে যেন গান করছে। নারীকণ্ঠের গান। নিশি-পাওয়া মন ভেসে গেল আর এক দিকে। বেহালার চাপা সুরের মতো মিষ্টি গলা অকস্মাৎ এক নতুন স্বপ্নজাল বিছিয়ে দিল বালুচরে।
না, গান তো নয়। সুর করে আবৃত্তি করছে,
চিরং নিবাসং ন সমীক্ষতে যো
ত্যুদারচিত্তঃ প্রদদাতি চ ক্রমাৎ।
কল্পিতার্থাংশ্চ দদাতি পুংসঃ
স তীর্থ রাজো জয়তি প্রয়াগঃ।
কণ্ঠ লক্ষ করে কয়েক পা অগ্রসর হয়েই থামলাম। দেখলাম, গঙ্গার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি নারী। মনে হলো, শাড়ি পরে আছে। আলুলায়িত কেশরাশি ছড়িয়ে পড়েছে তার পিঠ জুড়ে। দূরের অস্থায়ী ভাসন্ত পুলের সামান্য আলোর রেশ এসে পড়েছে তার মুখে। সে আলো সামান্য। তার মুখাবয়বটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাতে। তার সু-উচ্চ নাক, কম্পিত ঠোঁট, নিস্পলক চোখের ঘনপল্লব।
কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখলাম, আপাদমস্তক আবৃত একজন পুরুষ এসে দাঁড়ালো তার পাশে। সেও কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আবৃত্তি করতে লাগলো প্রয়াগস্তোত্র।
আরও খানিকক্ষণ পরে আর একটি মেয়ে এলো, একটি বালকের হাত ধরে। আগে যাকে দেখেছিলাম, তার চেয়ে এর বয়স কম মনে হলো। পুষ্ট যৌবনের চিহ্ন তার সর্বাঙ্গে বঙ্কিম রেখায় উদ্ভাসিত। মুখে তার হাসির আভাস। বালকের সঙ্গে সেও আবৃত্তিতে যোগ দিল।
তাদের নিচু ও চাপা গলার মিশ্রিত আবৃত্তির সুর একাত্ম হয়ে গেল গঙ্গার কলকল ধ্বনিতে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে তারা সকলে চললো দক্ষিণে সঙ্গমের দিকে।
আমি সেই দিকেই এগুলাম। যত সময় যাচ্ছে, উত্তুরে হাওয়া তত যেন ক্ষেপে উঠছে। ওদের মিলিত গলা থেকে ঝাপটা মারছে আমার কানের পর্দায়।
মানুষের দেখা পেয়ে আমিও অনেকখানি যেন নিশিমুক্ত হয়ে উঠেছি আবার, চারিদিক পরিষ্কার হয়ে উঠেছে আমার কাছে।
হঠাৎ মনে হলো, কে যেন আমার পেছনে আসছে! তাকিয়ে দেখলাম। মনে হলো, একটা মূর্তি সরে গেল তাঁবুর অন্ধকার কোলে। হয়তো কোনো মানুষ বেরিয়েছে পথে। বেরুক। সামনে ফিরে আমি ওই চারজনের পিছে পিছে আবার চললাম।
এখনো কত রাত্রি অনুমান করতে পারি নে। কেল্লার পেছনের আকাশ ক্রমে গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। পূর্বাকাশের কোলে দূর ঝুসির পাহাড়ের মতো উঁচু ভূমির অস্পষ্ট রেখা ফুটছে ধীরে ধীরে। বিশাল নিকষ কালো পটে কোন এক অদৃশ্য শিল্পী যন্ত্র দিয়ে খুঁটিয়ে ফুটিয়ে তুলছে নতুন দৃশ্য।
মন্থর গতিতে আমার আগে আগে চলেছে তারা চারজন-দু’টি নারী, একটি বয়স্ক পুরুষ, বালক একটি। তারা মিলিত কণ্ঠে সুর করে আবৃত্তি করে চলেছে প্রয়াগমাহাত্ম্য। চাপা সুর, আবৃত্তিও মন্থর তাদের চলার মতো। সুস্পষ্ট সংস্কৃত উচ্চারণ। এই দারুণ শীতে একটুও বিকৃত শোনাচ্ছে না তাদের গলা।
আমি দূরে থেকে, চলেছি তাদের পেছনে পেছনে। কেন চলেছি, তার সঠিক অর্থ জানি নে। জানি কিঞ্চিৎ প্রয়াগের ইতিহাস। মাহাত্ম জানি নে তার অলৌকিক কীর্তির। আসা মাত্র গণ্ডুষে ভরা গঙ্গাজল নিয়ে দিই নি মাথায়। রাশি রাশি ধুলো ছড়িয়ে দিই নি নিজের গায়ে। তবুও চলেছি তাদের পেছনে পেছনে।
নিশির দলে নিশি পেয়েছে আমাকে। সুরে আমাকে ডাক দিয়েছে। ইতিহাস কথা বলছে। আমার কানে কানে। আমি মন্ত্র বুঝি নে প্রয়াগের। বুঝি নে পুজো।
শ্রাবণ মাসে বাঙলার গাঁয়ের গৃহস্থ মেয়ে-বউরা পুজো করে ‘ঢালা প্যালা’। পুজো করে মাটি ও বনপালার। তার অর্থ বুঝি, হে ধরিত্রী, তুমি উর্বর হও। তোমার প্রতিটি মাটির টুকরো ভরে উঠুক সবুজ শস্যে। আমার পুজো নিয়ে তুমি তৃপ্ত হও, তুমি সিক্ত হও, আমি জীবনভর তোমার সেবা করব।
এই আদিম সংস্কারের মধ্যে দেখি মানুষের বাঁচার অভিযান। নবান্ন উৎসবে শুনি জীবনের জয়গান। ফসলের গুণকীর্তন।
কিন্তু এই বালুচর! ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসের লীলাভূমি। ধর্মীয় ইতিহাসের স্মৃতিভূমি। কিন্তু কেউ এখানে ডুব দেয় না সেই স্মৃতিসাগরে। সন্ধান করে না জ্ঞানের জনপদ ও তার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এই বালুচরের গুণকীর্তন তাহলে কেন বুঝি নে? মানুষের রূপে মুগ্ধ হই। অলৌকিকের অনুভূতিই নেই মনে। কী করে বুঝব!
তবুও আমি মোহপাশে আবদ্ধ হয়েছি। মোহ নয়, মুগ্ধ প্রাণ নিয়ে চলেছি আমি। এই মৌন রাত্রি, আলো-আঁধারিতে ওই নারী ও পুরুষ, আর কী বিচিত্র তাদের মিলিত গলার হারমনি। এই সঙ্গীতে নেই যন্ত্রসঙ্গত। যন্ত্র হয়ে উঠেছে তাদের বিভিন্ন গলার সুর। এই সুরের অঙ্গে সুর মিলিয়েছে নিয়তবাহী গঙ্গা।
ক্রমে শেষ হয়ে এলো তাঁবুর সারি। যেন পিছনে ফেলে এলাম লোকালয়। এবার বালু আর বালু। বালুপ্রান্তর! জুতাসুদ্ধ পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে গভীর বালুতে। মনে হলো, অনেক দূরে ফেলে এসেছি কুম্ভমেলা। হারিয়ে গিয়েছে বালুর উপর আঁকাবাঁকা পথের দিশা। বালুর নিচে কোথাও ভেজা মাটির ইশারা। জেগে উঠেছে টুকরো ঘাসবন। জলো ঘাস। আবার বলু।
হাওয়ায় নুয়ে পড়েছে ঘাসের মাথা। ক্রমে হাওয়া দুরন্ত হয়ে উঠেছে। পবন উন্মাদ হয়েছে। শিস দিয়ে চলেছে কানের কাছে। আর কানে ভেসে আসছে ওই সুর। সুর চড়ছে। বেহালার চাপা সুর হয়ে পড়েছে মুক্ত ও ব্যাপ্ত। তারে টান পড়েছে। উচ্চতর গ্রামে মিশেছে হাওয়ায়।
বয়স্ক পুরুষটির কম্বল উড়ছে ফরফর করে। মেয়ে দু’টির আলুলায়িত কেশপাশ শূন্যে আছাড় খাচ্ছে হাওয়ার দমকে।
হাওয়া নয়, নিষ্ঠুর চাবুক। আমার হাত আর পা ফেটে পড়তে চাইছে টনটনানিতে। শিউরে শিউরে উঠছে পায়ের মধ্যে।
একটু পরেই গতি মন্দ হলো সামনের চারজনের। সামনেই ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে বালুচর। ছিল প্রায় বিশ-ত্রিশ হাত দূরে। বুঝতে পারলাম না কতটা নিচু। নীচেও খানিকটা সমতল চর। তারপর দূর-আলোকের অস্পষ্ট রেখায় চকচক করছে জল।
তারা চারজন নেমে গেল নিচের সমতলে। আমি দূরেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারা চারজনও দাঁড়িয়েছে। এবার স্তিমিত হয়ে এসেছে গলার স্বর। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি ও চাপা গুনগুনানি।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো দু’দল। চর বাঁদিকে বাঁক নিয়ে সরে গিয়েছে। কম্বলধারী চলে গেল সেই দিকে। বুঝতে পারলাম না, ওদিকটা আরও নিচু কিনা। কিন্তু তাকে আর দেখা গেল না। তারপরে একটি নারী গেল। সেও হারিয়ে গেল অন্ধকারে। বালকটিকে নিয়ে রইলো আর একজন নারী। কিন্তু আর দাঁড়ালো না। বালকটি এই ভয়াবহ শীতে জামাকাপড় খুলে এগিয়ে গেল জলের দিকে।
শিশু বালকের এই দুঃসহ পীড়নে হৃদয় বিস্মিত ব্যথায় চমকিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তেই, নতুন দৃশ্যে আমার সর্ব চেতনা আড়ষ্ট হয়ে গেল। দেখলাম, সেই মেয়েটিও বিবস্ত্রা হয়েছে। এত শীতেও কোনো তাড়া নেই। সবই মন্থরভাবে চলছে। বিবস্ত্রা হয়ে দাঁড়ালো কয়েক মুহূর্ত।
একেবারে স্পষ্ট নয়, কিন্তু অস্পষ্ট নয়। আমার সভ্যতাগর্বী মন থমকে গেল। নিজেকে আড়াল করার কিছু নেই এখানে। চোখের পাতা একবার চকিতে আনত হয়েও মনের পাতা উঠলো অবাধ্য হয়ে। কোনো পাপ তো করি নি। পালাব কেন।
কিন্তু সে-ও কি আমাকে দেখতে পায় নি! মুক্ত আকাশের তলে, দারুণ হিমেল হাওয়া মুখরিত চরে, মনে আমার অস্পষ্ট ভয় ঘিরে এলো।
শূন্যে-ওড়া কালনাগিনীর মতো তার উড়ন্ত দীর্ঘ কেশরাশি, তার বলিষ্ঠ দেহের সুস্পষ্ট রেখা, তার চাপা গুনগুনানি, সব মিলিয়ে পৃথিবীর চেহারা বদলে গেল আমার চোখের সামনে।
সে নেমে গেল জলের দিকে। চাপা পড়ে গেল গুনগুনানি। কিন্তু আমি তেমনি আড়ষ্ট, স্তম্ভিত। তাকিয়ে দেখি, চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। আলো, এত আলো এলো কোথা থেকে! পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, পূর্বের প্রতিষ্ঠানপুরের আকাশের কোল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। দূর পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে দেখি, কালো অথচ তীব্র আলোকময়ী জলের স্রোতরেখা ছুটে আসছে আমার দিকে। আসতে আসতে আচমকা বাঁক নিয়ে চলে যাচ্ছে এই প্রাক্-ঊষা মুহূর্তে গঙ্গার অস্পষ্ট হিম-বিদ্ধ মুক্তাধবল তরঙ্গের গায়ে গায়ে। এই মুহূর্তে নীল যমুনার রঙ হয়েছে নিকষ কালো। তার দূর পশ্চিমে ঝাপসা রেলওয়ে সেতু। উত্তর কোলে জলের বুক থেকেই উঠেছে দুর্গের পাথুরে ইমারত। কী হাওয়া! প্রাণনাশী ঠাণ্ডা হাওয়ায় যমুনার উত্তর তীরের উঁচু গাছের মাথা দুলছে। যেন ঝাঁপ দিতে চাইছে যমুনায়! ব্যাকুল হাওয়ায় শনশন, যেন কোন অদৃশ্যচারিণীর ব্যাকুল গুনগুনানির মতো আসছে ভেসে। আর মুরারিকায় কালী যমুনার বাঁকা স্রোতে ঝলকিত বাঁকা হাসি। সে হাসি গোপনে হেসে ভেসে চলেছে দূরে। কিছুক্ষণ পরেই আবার গঙ্গার কোল থেকে ভেসে এলো সেই কণ্ঠের বাঁশির সুরঃ
দেবি সুরেশ্বরি ভগবতী গঙ্গে
ত্রিভুবনতারিণী তরল তরঙ্গে।
গঙ্গার অদৃশ্য কোল থেকে উঠে এলো সেই বালক! সে কাঁপছে থরথর করে। দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার ফাঁক দিয়ে এবার বিকৃত শোনাচ্ছে তার উচ্চারণ। শুকনো কাপড় থাবা মেরে তুলে নিল সে গায়ের উপর। বালকের পেছনেই উঠে এলো সে। সর্বচরাচরের মতো সে আরও সুস্পষ্ট। সম্মুখ তার পূর্বদিকে। ঊষার সিন্দুরকণা ছড়িয়ে পড়েছে তার সর্বাঙ্গে। ভেজা চুলের রাশি এলিয়ে পড়েছে তার ঘাড়ে দু’পাশ দিয়ে। তার শরীর অকম্পিত নয়, কাঁপুনি রয়েছে তার গলার স্বরে।
চোখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। নিলামও তাই। ধার্মিকের ভক্তি নেই। চোখে আছে কিঞ্চিৎ নিতান্ত মানুষিক মোহের অঞ্জন। এসেছি যেন বানের জলে ভেসে যাব বলে। ডুব দেব বলে। কিন্তু সত্তা তো পেছন ছাড়েনি। নিজেকে ভুলি কেমন করে!
তবু, আমার নগরসভ্য চোখ দেখেছে অনেক ছবি। বিদেশী শিল্পীদের অসংখ্য ভেনাস, মনের মানসী, নগ্ন নাগরী। দেখেছে দেশি শিল্পীর আঁকা হৃদয়মাধুরী মেশানো নগ্ন-বিচিত্রার ছবি। তা ছাড়াও এ সভ্য চোখ বিষে আচ্ছন্ন দেশের দিগন্তজোড়া দেওয়ালের ছবি দেখে সেলুলয়েডের বুকে বীভৎস নগ্নতা দেখে।
কিন্তু এই নগ্নতা! ওই আকাশের মতো, এই চরের মতো, ওই গঙ্গা ও যমুনার মতো দ্বিধামুক্ত নগ্নতা। নগ্নতা পরিবেশ-অন্ধ। নগ্নতা কী ভয়ংকর অথচ কী অপরূপ!
বুঝি পথ ভুল করেছি! কিন্তু ভুল করে এসেছি কোন যুগে! ভারতের কোন্ বিগত শতাব্দীতে! বিষের ধোঁয়া নিয়ে এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছিলাম সেই বিষের ফোঁটা কপালে নিয়ে। যখন থেকে দেখতে শিখেছি, দেখেছি বিষ ক্ষতে ভরা দেশ। নিরন্নর মিছিল, অবিশ্বাস, ভয়, নিষ্ঠুরতা আর হাহাকার।
তবু আরও দেখি দেখি করে ছুটে এলাম। কিন্তু কোন্ যুগের হাত ধরে এসে এ ছবি এলো আমার চোখের সামনে। এও দেশেরই রূপ। বাছ-বিচারের কী ধার ধারি! যা ভাবতে পারি নি, তাই দেখলাম। তাই তো দেখবো। ঘুরে-ফিরে এ নিজেকেই দেখা। না দেখলে চিনব কী করে? বিস্ময় আর সন্দেহ? তার নিরসন তো পরে।
এবার তারা মিলেছে আবার চারজন। বস্ত্রে আবৃত করেছে নিজেদের। গঙ্গাস্তোত্র শেষ করে নতুন সুরে আবৃত্তি ধরেছে :
প্রাতঃ স্মরামি ভবভীতিমহাতিশান্ত্যৈ
নারায়ণং গরুড়বাহনমজনাভম…
আবৃত্তি করতে করতে এগিয়ে আসছে তারা। নিশ্বাসের তালে তালে যেন ফুটছে দিনের আলো। পুরুষটিকে দেখেই ভড়কে গেলাম। এ যে একমাথা রুক্ষ চুল! আর বিরাট গুঁফো পুরুষ। চোখও বেশ লালবর্ণ। লজ্জা যে ছিল না মনে, তা নয়, কিন্তু এ যে ভয় ধরিয়ে দিল। ধমকালে যাব কোথায়! তা ছাড়া কুম্ভমেলা সম্পর্কে নানান কথা শুনে একটা শিউরোনি ছিল মনের মধ্যে।
কাছাকাছি এসে বয়স্ক পুরুষটি আমার দিকে বারকয়েক দেখলো। সন্দিগ্ধ ও সপ্রশ্ন দৃষ্টি। গলায় তার রুদ্রাক্ষের মালা লোমশ বুক ভরে ছড়িয়ে পড়েছে। ডানায় ও মণিবন্ধে রুদ্রাক্ষের মণিবন্ধনী। কানের ছিদ্রে পরানো রয়েছে রুদ্রাক্ষের কুণ্ডল।
তার পেছনে মেয়েদেরও তাই। মনে হলো, দু’জনেই যুবতী। তাদেরও রুদ্রাক্ষের অলংকার রয়েছে গায়ে। ছেলেটিরও তাই। কিন্তু দেখবার অবসর ছিল না।
আমার কাছে দাঁড়িয়ে যেন অবাক বিস্ময়ে ঘাড় বাঁকিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করলো পুরুষটি। অবিশ্বাস্য হাসি ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখের ভাঁজে ভাঁজে। সঙ্কোচের হাসি। মোটা গলায় জিজ্ঞেস করলো, একেবারে ঠেট হিন্দিতে, ‘আপনি কি সেপাই নন?’
আমি? কোন্ দুঃখে? তাই ভেবেছে বুঝি লোকটি? ওভারকোটটার গুণ আছে দেখছি। বললাম, ‘না তো!’
সে তার বড় বড় দাঁতগুলি বের করে বললো, ‘মহারাজ, আমি ভেবেছিলাম আপনি সেপাই। নমস্কার মহারাজ, নমস্কার। সন্ন্যাসীকে কিছু দান করুন।’
কী ভেবেছিলাম, কী হলো। এ যে দান চায়! কিন্তু নারী-শিশু পরিবৃত, এ আবার কোন রকমের সন্ন্যাসী, তা তো বুঝলাম না! বললাম, ‘তু-আপ-আপনি সন্ন্যাসী?
সে হা-হা করে হেসে উঠলো। বাবা! এ যে অট্টহাসি। মনে হয়, মেয়েরা ও শিশুটি মনে মনে মন্ত্ৰ আবৃত্তি করছে।
সে হেসে বললে, ‘জী মহারাজ, আমি সন্ন্যাসী। অবধূত আমি।’
অবধূত! কথাটি শুনেছি জীবনে কয়েকবার কিন্তু অর্থ জানি নে। তবু অবধূতের সঙ্গে এরা কারা? জিজ্ঞেস করলাম, ‘সন্ন্যাসীজী, অবধূত কাকে বলে বুঝলাম না তো।’
সন্ন্যাসী হেসে পিছন দিকে তাকাল। আমিও সেদিকেই দেখলাম। মেয়েদের মধ্যে যে বালকের হাত ধরে ছিল, সে মাথা নিচু করে হাসছিল। সলজ্জ মিষ্টি হাসি তার মুখে। কুণ্ঠাজনিত লজ্জা। তার বয়স আমার মনে হলো সতেরো-আঠারোর ঊর্ধ্বে নয়। আর একজন, সেও হাসছিল। তার লজ্জা নেই। সে তাকিয়ে ছিল অকুণ্ঠ হাসি নিয়ে। তার বয়স অনুমান করতে পারি নে। সে কিঞ্চিৎ খাটো, কিন্তু বলিষ্ঠ শরীর। একটু স্থূলতার লক্ষণও আছে। আর একজনের চেয়ে তার বয়স কিছু বেশিই মনে হয়। ছেলেটি নিতান্ত শিশু। বোধ হয় আট-নয় বছরের বেশি নয়। তার কাঁপুনি, তার মন্ত্র, বিস্ময়, সব মিলিয়ে সে একটি নিপীড়িত বেচারি মাত্র।
রুদ্রাক্ষ খুলে নিয়ে কাপড় পরিয়ে দিলে এরা যে গৃহস্থের বউ আর ছেলে হয়ে উঠবে এখনি। ওই হাসি-উচ্ছলিত মুখের উপরে ঘোমটা টেনে দিলে, এ মুখের পরিচয় যে বদলে। যাবে মুহূর্তে। সন্ন্যাসী বললো, ‘মহারাজ, আমার তো এখন সময় নেই। অবধূতের অনেক কথা। চলতে চলতে দু’কথায় কিছু বলতে পরি।’
কৌতূহল দুর্নিবার। পেট থেকে পড়েই শিশু অন্ধকারে চেয়ে দেখে অবাক চোখে দেখে দুর্বোধ মনের কৌতূহল নিয়ে, কুতকুতে চোখ বিস্ফারিত করে।
ছাড়ব কেন! শুনেই নিই, কী বলে। তাদের সঙ্গে আবার চললাম উত্তর দিকে।
ইতিমধ্যে মেলা জেগে উঠেছে। কলকোলাহল শুরু হচ্ছে আস্তে আস্তে। এর মধ্যেই কোনো কোনো আশ্রমের মাইকে গীতাপাঠ ও প্রাতঃস্তোত্র আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
সন্ন্যাসী বললো, ‘এক কথায় অবধূত কাকে বলে জানেন? সন্ন্যাসীকেই অবধূত বলে। শৈব উদাসীনকেই বলে অবধূত। তার মধ্যে আছে রকমফের। সকলের তো একরকম নয়। কেউ হংসাবধূত, কেউ ব্রহ্মাবধৃত। কিন্তু ওসবে কিছু যায় আসে না। ওসবে বিলকুল ‘গণ্ডগোল আছে। আসলে দুই দল, মহারাজ। ভগবান মহাদেবের আপনি কটা রূপ দেখতে পান?’ বলে সে আমার দিকে সপ্রশ্ন হাসি নিয়ে তাকাল।
আমি? আমি তো কিছু জানি না। বললাম, ‘আপনিই বলুন।’
সন্ন্যাসী আবার আচমকা হা-হা করে হেসে উঠলো। বললো, ‘যখন তিনি ঘরে যান, তখন তিনি গৃহী। যখন তিনি বাইরে যান, তিনি উদাসীন। আমিও গৃহাবধূত। আমি ঘরে থাকতে পারি, আমি বাইরেও যেতে পারি। আমি কৌপীন আঁটতে পারি, ইচ্ছা করলে নাও আঁটতে পারি। যে-কোন আওরতকে আমি আমার সঙ্গিনী করতে পারি। আওরত মহাদেবী। মহারাজ, আমার মতো অবধূত সিদ্ধিলাভে শিবত্ব প্রাপ্ত হয়।’
হবে হয়তো। কিন্তু গৃহাবধূতের মতো এমন বিচিত্র কথা আর কখনো শুনি নি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা আপনার কারা?’
সন্ন্যাসী কিঞ্চিৎ বয়স্কাকে দেখিয়ে বললো, ‘আমার অবধুতানী। আমার জেনানা। আর ওই আমার লেড়কি আর লেড়কা। ওদের দীক্ষা হয় নি। হবে।’
আমার মাথায় সব জগাখিচুড়ি পাকিয়ে গেল। দেখলাম, লেড়কি নিতান্ত গৃহস্থ লজ্জাবতী বালিকার মতো হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু বালক বেচারি বোধ হয় স্তোত্র ভুলে গেছে। সে আমাকেই দেখছে হাঁ করে। আর অবধূতানী যে একজন খাঁটি মা, তা বোঝা যাচ্ছে তার স্নেহমুগ্ধ চোখ দু’টি দেখে। কোথাও তো এদের সন্ন্যাসের ছাপ দেখি নে!
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কি দান নিয়েই দিন চলে?’
সন্ন্যাসী বললো, ‘সাধুকে দান করবার লোক কোথায়, মহারাজ! আমার ঘর আছে। আছে কিছু ক্ষেতি-বাড়ি। তাইতেই দিন চলে যায়। এখন তীর্থ করতে এসেছি। ভিক্ষামাত্র সার।’
ক্ষেতি-বাড়ির কথা শুনে অবাক হলাম। বললাম, ‘কিন্তু এই ভোর রাত্রে তো কোন সাধুকে স্নান করতে দেখলান না!
সন্ন্যাসী আবার হেসে উঠলো, ‘দেখেন নি, কিন্তু অনেকেই করেছে। সব জিনিস কি দেখা যায়? শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী, এরই নাম মাঘব্রত, কল্পবাসীর অবশ্য কর্তব্য।’
‘বুঝলাম না।’
‘বুঝলেন না? মকর সংক্রান্তি থেকে গঙ্গাচরে বাস করতে হয়। থাকতে হয় উপোস করে। শুনতে হয় ধর্মের কথা। শোনাতে হয়, আপনা সাধন করতে হয়। আর ব্রাহ্মমুহূর্তে নগ্ন হয়ে নাইতে হয়। তবে পরম ব্রত্ম তুষ্ট হন।’
পরমব্রত্নকে তুষ্ট করবার জন্য এই ভয়াবহ শীতে স্নান! অবধূতানীর কথা বাদ দিই। কিন্তু ওই যুবতী আর বালক, ওরা কেমন করে দ্বিধামুক্ত ভাবে নগ্ন হয়ে স্নান করে! আবার আমি তাকাতে আরক্তিম হয়ে উঠলো অবধূতের মেয়ের মুখ। সে এক ভাবী অবধূতানী, কিন্তু গৃহকন্যার চারিত্রিক অলংকার ভরে রয়েছে তার আপাদমস্তকে। তার আলুলায়িত কেশের আড়াল দিয়ে ঢেকেছে সে তার মুখ ও বুক। সামনে যে তার পরপুরুষ!
আমার মনে হলো, সন্ন্যাসী অবধূত হোক, আর গৃহাবধূতই হোক, আমি দেখছি, সে পরম ধার্মিক সদাহাস্যময়, প্রেমিকা স্ত্রীর স্বামী, আদুরে ছেলেমেয়ের বাবা।
এখন আর আমার এগুনো সম্ভব নয়। আবার তাঁবুর সারি আরম্ভ হয়েছে। লোকালয়ে এসে পড়েছি। সামনেই তাঁবুর পায়খানা সারবন্দী। ফিনাইল আর ব্লিচিং পাউডারের হাল্কা গন্ধ লাগছে।
পকেটে হাত দিয়ে ব্যাগ বার করলাম। অবধূতানীর চোখে এবার কৃতজ্ঞতার চড়া হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠলো। বালকটি অপলক বিস্ময়ে দেখছিল আমার পয়সার ব্যাগ। আর কুমারী তার এলোচুলের আড়ালে আড়চোখে দেখছিল, আমি কী করি।
সন্ন্যসীকে পয়সা দিয়ে বললাম, ‘আমার ক্ষমতা কিছু নেই। এই সামান্য…’
সন্ন্যাসী তাড়াতাড়ি জিভ কেটে বিস্ফারিত চোখে বাধা দিল আমাকে, ‘খবরদার মহারাজ, ওকথাটি বলবেন না। আপনার যা কৃপা, সেই ভাগবানের কৃপা। এই কৃপা ভিক্ষা করে বেড়াব আমি সারাদিন। মহারাজ, আজকে নেয়ে উঠে আপনাকে দর্শন করেছি। একদিন সে এমনি করেই হয়তো আমার সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে, কিংবা যাবে। কিন্তু আমি তো কোনোদিন জানাতেও চাইব না! কৃপাভিক্ষাই আমার ভিক্ষা।’
সন্ন্যাসীর হাসিমুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো। লাল চোখ চিন্তামগ্ন। ঠিক চিন্তামগ্ন নয়, যেন পাগলের মতো দিশেহারা হয়ে উঠলো।
বললাম, ‘চলি তাহলে।’
সন্ন্যাসী বললো, ‘মহারাজ, আপনি কোথায় যাবেন?’
আশ্রমের নাম বললাম। সে বললো, ‘তুলসীমার্গের পথ জানেন আপনি?’
তুলসীমার্গ? ভাবলাম, হয়তো মেলার বাইরে কোথাও। বললাম, ‘না তো।’
সে বললো, ‘দু নম্বর পুলের রাস্তা দিয়ে পুবে গেলে নির্বাণী আশ্রম। সেই পুবের রাস্তাই তুলসীমার্গের পথ। সেই পথে গেলে পাবেন ১০৮ শঙ্করাচার্যের আশ্রম। ওই আশ্রমের পেছনে আমার পাতার ঘর। সন্ধ্যাবেলা আপনি আসবেন সেখানে। কৃপা করে আসবেন।’
হঠাৎ কেন তার এই ব্যাকুলতা, বুঝতে পারলাম না। আমার মতো নিতান্ত ধর্মবিমুখ আর বস্তুবাদী মানুষের সঙ্গে তার কী কথা হবে! বললাম, ‘সময় পেলে যাব।’
‘আচ্ছা, মহারাজ, আপ-কা কৃপা।’
বলে তারা সদলবলে এগিয়ে গেল। অবধূতানী বিদায়-নমস্কার জানালো ঘাড় বাঁকিয়ে হেসে। বালকটি দাঁড়িয়েই ছিল আমার দিকে তাকিয়ে। দিদি টের পেয়ে, পেছন ফিরে নিঃশব্দে হেসে উঠলো। হাসিমুখে তাড়াতাড়ি এসে ভাইয়ের হাত ধরে নিয়ে চলে গেল।
বিদায় দিয়েও দাঁড়িয়ে ছিলাম। গৃহাবধূত। তার পিতৃত্ব, তার স্বামীত্ব, তার ঘর ও সংসার এই নিয়ে যদি তার সব সুন্দর হয়ে ওঠে, তবে উঠুক। আজ তার বাইরে তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা আর কী থাকতে পারে।
তাঁবু-লাইনের এপাশ-ওপাশ দিয়ে যেতে যেতে হারিয়ে গেল ওরা চারজন। হারাল না মন থাকে। মানুষী মোহের অঞ্জনটুকু একটি অপরূপ রঙের ছোপ লাগিয়ে রেখেছে মনের মধ্যে। সেই সঙ্গে কিছু বিস্ময়, একটু সংশয়।
ভাবলাম, কোটা সত্য! একদিকে অপরিসীম উদাসীনতা, আর একদিকে সীমাহীন লজ্জা। যেন নিরালায় লজ্জাবতী লতাটির মতো। ডাঁটোসাঁটো লতাটি, দিব্যি চিকন পাতা মেলে সর্বাঙ্গ উদাস করে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। ছোঁয়ামাত্র মুখ ঢেকে মিশে যায় মাটির বুকে। কিন্তু লতা নয়, মানবী যে! সে সন্ন্যাসী-বালা, ঘরে-বাইরে, জীবনে-মরণে নারী আমাদের সঙ্গিনী। নানা বেশে নানান্ সম্পর্কে পরস্পরের অসঙ্গতি চোখে লাগে। বৈচিত্র্যে কৌতূহলী হয়। দুঃখে জানাই সমবেদনা, সুখে দিই সঙ্গ। মনের চারপাশে খাড়া রয়েছে সমাজের প্রাচীর। তাই ভাবি। তাই ভাবলাম। ঘর ছেড়ে চলে এসেছি পথে। ‘কোনো বাঁধন রাখবো না গো’ গেয়ে গেয়ে পথে বেড়ালেও মন মাঝে মাঝে থমকায় বৈকি! সেটুকুনই তো বাঁচোয়া। নইলে আকাশ বাতাস সবই যে একাকার হয়ে যেত। ফুল জল পাতা পাখি—সবই ভিন্ন ভিন্ন বেশে ভিন্ন অনুভূতি জাগায়। গানে আর সুরে আনে বৈচিত্র্য। নইলে চোখ থেকেও কানা। মন থেকেও পাথর।
তাই ভাবি, যে মেয়ে লজ্জায় লজ্জাবতী, সে মেয়েই অকুণ্ঠ উদাসীনতায় প্রকৃতির মতো নগ্ন। কোনটা সত্য?
রূপ দেখে বোঝা যায় না। বোঝা যায় না হাত দিয়ে স্পর্শ করলে। মন দিয়ে ছুঁতে হবে। জানি নে কোথায় নির্বাণী আশ্রম, আর কোথায় তুলসীমার্গের পথ। বালুচরের কোন সীমানায় আছে অবধূতের পর্ণকুটির। তবু দেখার দেখা নয়, দেখার মত করে দেখতে চাই নইলে দেখা সাঙ্গ হয় না। সে হোক ভারতের গৌরব কিংবা হোক কলঙ্ক।
পূর্ব দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালী রোদ। রোদ তো নয়, মৃতের প্রাণসঞ্জীবনী। শীতার্তের ব্যথিত আড়ষ্ট দেহে উ উত্তাপের আলিঙ্গন। কী মিষ্টি, কী সুন্দর, কত আরাম! দু’দিন যাক, আবার এই রোদকেই আড়াল করে গাল দেব মনে মনে। এই-ই নিয়ম।
রোদ উঠেছে। ঝুসির সুদীর্ঘ ছায়া পড়েছে বালুচরের বেলায়। তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে নরনারী। মাইলের পর মাইল জুড়ে গুনগুনানি উঠেছে, নিত্যনৈমিত্তিক কোলাহলে স্নানের জন্য চলেছে সবাই জলের দিকে। একদিকে মাইক-যন্ত্রের যান্ত্রিক চিৎকার মুখরিত হয়ে উঠেছে। আর আশেপাশে দেখছি স্নানার্থী অর্ধনগ্ন সাধুরা চলেছে স্তোত্র আওড়াতে আওড়াতে। কখনো কর্ণবিদারী শব্দ উঠছে, ‘জয় মহাদেও কি জয়’, ‘রাম রাম, সীতারাম’। দূর থেকে ভেসে আসছে অনেক কাড়া-নাকাড়ার আওয়াজ, তার সঙ্গে স্তিমিত শিঙাধ্বনি। জাগছে মেলা। আর দাঁড়াতে পারি নে। আবার তো ফিরে যেতে হবে সেই দিদিমা আর পেল্লাদদের তাঁবুতে। তার চেয়ে খুঁজে নিই আশ্রয়।
কিন্তু কোন দিকে যাই! কোন্ দিকে যাই ভেবে পিছন ফিরতেই দেখি, আপাদমস্তক কম্বলে ঢাকা পাঁচ-বদ্যি। আমার পিছনেই যেন গুপ্ত আততায়ী। কী সাংঘাতিক! পাঁচ-বদ্যি তো নয়, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বইয়ের সেই দৈত্য। কিন্তু কেন, কী করেছি, কারোর বাড়া ভাতে তো ছাই দিই নি! তবে এমন বাঘের পেছনে ফেউয়ের মতো লেগে রয়েছে কেন সে! না, বাঘের পেছনে ফেউ বলি কী করে! শিকারের পেছনে বাঘ। রাত না পোহাতে এ কি বিভ্রাট! মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবু কথা না বলাটা বিসদৃশ দেখায়। হেসেই বললাম, ‘ডাক্তারবাবু যে!’
ডাক্তার মুখিয়ে ছিল। বলামাত্র মাথা থেকে কম্বলটা খুলে ফেললো সে। পরিস্ফুট হয়ে উঠলো তার ভয়ংকর মুখটা। যেন কোমর বাঁধছে। কীসের যে এত রাগ, তা জানি নে। প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, ‘ডাক্তার নয়, ধন্বন্তরি। রোগের ওষুধ জানি।’
সে তো ভালো কথা। কিন্তু কী কথার কী জবাব! পৃথিবীতে একরকমের মানুষ আছে, ভালো বলে মন্দ বলো, তাদের মন পাওয়া দায়। এগুলে ভেড়ের ভেড়ের, পেছু নিব্বংশের বাটা! ছেলেবেলায় দেখেছি, পাড়ার মোড়ে থাকত একটা ছেলে। নাম বেচা। ছেলে নয়, প্রায় মিনসে। বেচা ছিল এমনই এক মানুষ। তার কিছুই করি নি কোনদিন। কিন্তু তার সামনে পড়লেই চোখ কুঁচকে তাকাত খপিসের মতো। আর প্রাণভরে কষাত গাঁট্টা ঘুষি চড়। একেবারে অকারণে। বাড়ি থেকে বেরুনো এক আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাউকে বলতেও বাধতো। খালি মা কালীকে ডাকতাম, ‘হে মা কালী, হয় বেচাদের ও-বাড়ি থেকে উঠিয়ে অন্য পাড়ায় নিয়ে যাও, না-হয় ওর হাত দু’টো দাও ভেঙে।’
এই পাঁচ-বদ্যি যেন তেমনি। আমার ছেলেবেলার বেচা। কিন্তু সেই ছেলেবেলার রাজ্যে আমরাই ছিলাম আমাদের নবাব-বাদশা খলিফার দল। দুর্বল হলে বহু আজগুবি সন্ধিসূত্রে বশ্যতা স্বীকার করতেই হতো।
কিন্তু এখানেও কি সেই! ডানা মেলে উড়ে এলাম পায়রাটির মতো, ওদিকে বাজপাখি ঠোঁট শানাচ্ছে। তবু বললাম, ‘কোথায় চললেন?
ডাক্তার এক পর্দা গলা চড়াল, ‘যেখানেই চলি, তোমাকে চোখে চোখে রাখছি ঠিক। হ্যাঁ।’
আমিও একটু উম্মাতেই বললাম, ‘কেন বলুন তো?’
‘আমার খুশি।’ বলে, ডাক্তার বুক চাপড়াতেই গাদাখানেক ধুলো ঝরে পড়লো তার কম্বল থেকে। আর গলা কী—একেবারে বাজখাঁই! রাগও যেমন হলো, লজ্জাও হলো তেমনি। আশেপাশে লোক। সবাই কৌতূহলী হয়ে দেখছে হাঁ করে।
থামাতে গেলাম। কে শোনে! ডাক্তার ঠিক তেমনি গলায় বলে চললো, ‘মনে করেছে, আমি তোমাকে বেরুতে দেখি নি? রাত করে কেন ক্যাম্প থেকে বেরিয়েছ? কথা নেই, বার্তা নেই, বেরুলেই হলো?’
চেষ্টা করে গলা চড়াতে পারি নে। বললাম, ‘কেন, বেরুনো কি নিষেধ?
‘চোপ! চোপরাও! বলেছিলাম না, তোমাকে দেখে নেব। আই অ্যাম ডক্টর পাঁচুগোপাল রায়।’
তা ঠিকই, কিন্তু এ অপমানের কারণ কী? কারণ কী খ্যাপামির? দেখে নেওয়ার ব্যাপার হলে দেখতে হবে। তা কি এমন করে? স্বভাবতই কৌতূহলী লোক দু-একজন জমেছে আশেপাশে। মেলার ব্যাপার। কে রোধ করবে! হায় রে, এ কোন অমৃতকুম্ভের সন্ধানে ছুটে এলাম! বললাম, ‘ডাক্তার নয়, ধন্বন্তরিই। কী দেখবেন, দেখুন। অত চেঁচাচ্ছেন কেন?’
‘আলবাত চেঁচাব।’ বাঙলায় যাকে বলে তড়পানি, ডাক্তার সেরকম শুরু করলো। তারপর যা হয়। একজন সাধুবেশী মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করলো ডাক্তারকেই, ‘ক্যায়া হুয়া বাবা?’
যা বলো, সবই আগুনে ঘি। সাধুকে তেড়ে গেল, ‘যো হয় সো হুয়া, তুমকো কেয়া? তুম্ আপনা রাস্তা দেখো।’
সাধুর বৈরাগ্যের মিষ্টি হাসি চকিতে উধাও। বেচারা মুখ গোমড়া করে চুপ করে গেল। ডাক্তার আমার মুখের সামনে তর্জনী নেড়ে আবার বললো, ‘আবার আমাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে ধন্বন্তরি বলে?
‘কেন আপনিই তো—’
কে শোনে! কোথায় আগুন লেগেছে না জানলে জল ঢালবে কোথায়! ডাক্তার প্রায় লাফিয়ে ওঠে আর কি! ‘জানো, আমি তোমার বাপের বয়সী?’
তাতে আর আশ্চর্যের কী! বললাম, ‘তা তো দেখছিই। তা আমাকে কেন? বাপের বয়সী আছেন, ঘরে গিয়ে নিজের ছেলেকে শাসন করুন।’
‘কেন, আমার কি ছেলেমেয়ে থাকতে নেই?’
কথার কী অদ্ভুত অসঙ্গতি! ডাক্তারের কোয়ালিটি ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। শেষটায় কি একটা বদ্ধ পাগলের হাতে পড়লাম? বললাম, ‘থাকবে না কেন? একশোটা থাকতে পারে।’
‘একশোটা?’
‘না হয় দুশোটাই?’
‘তার মানে, আমার কিছু নেই? আমাকে আঁটকুড়ো বললি তুই?’
একেবারে ‘তুই’! ট্রেনের ভিড়ে একবার মোষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম বিপদে পড়ে। এও প্রায় তেমনি বিপদ। উদ্ধার পেতে হলে পালটা রূপ ধরতে হবে। উপায় নেই। রুখে-মুখে চড়া গলায় ডাক্তারকে শেষবারের জন্য সাবধান করতে গেলাম।
কিন্তু কাকে বলবো! ডাক্তার ততক্ষণে কম্বলটি বগলদাবা করে হাঁটা ধরেছে। হাঁটছে খ্যাপা মোষের মতোই। পদাঘাতে বালু ছিটকে যাচ্ছে। খানিকটা গিয়ে আবার দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে সেখান থেকেই বললো, ‘আমি আঁটকুড়ো? আচ্ছা, দেখে নেব তোকে, দাঁড়া।’
বলে আবার চলতে আরম্ভ করলো। কোথা থেকে কী হয়ে গেল যেন! ঝড় বয়ে গেল একটা। ছিলাম সুস্থ, করে গেল উদ্ব্যস্ত। এতই আকস্মিক ব্যাপার, এমনিই অদ্ভুত যে, তার না বুঝলাম অর্থ, না কারণ। হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এ যে উন্মাদ!
কে জানতো! কে জানতো, পথে বেরিয়ে এমন মানুষের হাতে পড়বো। ভেবেছিলাম, দু’চোখ ভরে দেখবো। বাজবো আপন মনে, তাল দিয়ে যাব নিজেরই সুর। এ-যে তাল আর সুর, সব ছরকুটে যায়।
তবে হ্যাঁ, বেরিয়েছি, একটা কথা ভাবি নি তো! প্রকৃতির ঘরের কোন্ রূপসী আমার জন্য সাজিয়ে রাখবে শুধু নির্মেঘ আকাশ, ফোটা ফুল আর সুকণ্ঠী বিহঙ্গী! তার বিচিত্র দেহ জুড়ে নেই গুমসোনি গুমোট? ঝড়-ঝঞ্ঝা, দুর্যোগের ঘনঘটা? তবে? পথের দশাই এমনি।
কত রূপ! কিন্তু কই, কালকেও তো ডাক্তারকে এতখানি গণ্ডগোলে মানুষ মনে হয়নি। কিছুটা মনে হয়েছিল, কিন্তু একেবারে এত অসঙ্গত ঠেকে নি। আর, একি শুধু আমার কাছে? এই পাগলামি, খ্যাপামি, এ অসঙ্গতি?
অসঙ্গতি। মনে পড়লো, রাত্রে নিঃসাড়ে ডাক্তারের তাঁবুতে প্রবেশ। জায়গার অভাবে চলে যাওয়া। তারপরে এত কথা। তার শেষের কথাগুলি। শেষের কথাগুলিতে শুধু রাগ নয়। চোখ তার যন্ত্রণায় লাল হয়ে উঠেছিল যে! এই অসঙ্গতির মধ্যে কোথায় একটু সঙ্গতি রয়েছে। বেসুরের মধ্যে সুর। ডাক্তার চলে গেল না, যেন পালাল। পালাল যেন অসহায়ের মতো।
মন ফিরে গেল আমার। যা বলো, তাই বলো। লজ্জা-ঘেন্না-ভয়, তিন থাকতে নয়। উৎসুক হয়ে তাকালাম ডাক্তারের পথের দিকে। ওই যে দেখা যায় এখনো। মস্ত লম্বা মানুষ। ছোট হয়ে আসছে। চলেছে গঙ্গার ধার দিয়ে, উত্তরে। ভুল করেছি। ছেড়ে দেব না, ধরবো ডাক্তারকে।
কী আমার কপাল। পাশে জড়ো হয়েছে সব অবাঙালি মেয়ে-পুরুষ। গুলতানি করছে নিজেদের মধ্যে। আবিষ্কার করছে আমার আর ডাক্তারের সম্পর্ক। দুই বাঙালি আপনা-আপনি ঝগড়া বাধিয়েছে। হবে দুই ভাই, নয়তো বাপ-ব্যাটা। আপসে ঝগড়া মিটিয়ে নাও বাপু। কী বলো, আঁ?
ঠিকই, দাঁড়িয়েছি মঞ্চে, ভূমিকা নিতে হবে না? না নিলে দর্শক ছাড়ে? নিজেই কি ছাড়ি?
সেই ভালো। আপস করবো ডাক্তারের সঙ্গে। হাঁটা ধরলাম। মিলিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারের চেহারা। ডাকলে শুনতে পাবে না। পা চালিয়ে দিলাম দ্রুত। আশ্রয় খুঁজবো পরে।
দোকানপাট খুলেছে। কত দোকান কত রকমের। দেখবার সময় নেই। পদে পদে বাধা, মানুষের দঙ্গল। মেয়েমানুষের হাত ধরে সব লাইনবন্দী হয়ে চলেছে। এঁকেবেঁকে যেতে হয়।
অনেকখানি এসেছি। ডাক্তার তেমনি চলেছে। একেবারে নাক বরাবর। ডাঁকলে শুনতে পাবে কিনা জানি নে। তবু একবার ডাক দিলাম, ‘ডাক্তারবাবু!’
ঠিক শুনেছে। থমকে দাঁড়াল ডাক্তার। বাজে-মাথা-মুড়নো তালগাছের মতো বিরাট চেহারা। হঠাৎ মনে হয়, অনেকদিনের পরিখাবাসী নিগ্রো সৈনিক। পেছন ফিরে একবার দেখলো আমার দিকে। দেখেও আবার চললো হনহন করে।
ডাকলাম, ‘শুনুন ডাক্তারবাবু।
আর নয়। ডাক্তার ততক্ষণে সেতুতে পা দিয়েছে। ওপারে চললো যে! চলুক, ভেবেছি যখন, ডাক্তারকে একবার ধরবই।
ওপারে, কেল্লার প্যারেড গ্রাউণ্ডে এসে ধরে ফেললাম ডাক্তারকে। প্যারেড গ্রাউণ্ড সঙ্গমের ত্রিকোণ ভূমি। এখন মেলার আসর। ডাক্তারকে ধরে ফেললাম একটা ভিড়ের কাছে। অনেক মেয়েপুরুষের ভিড়। কীসের ভিড় না দেখেই ডাক্তারকে ডাকলাম।
বোধ হয় ভিড়ের বাধাতেই দাঁড়াতে হলো ডাক্তারকে। দাঁড়িয়ে আড়চোখে তাকালো আমার দিকে। মুখে কোনো কথা নেই। গুঁতোবার আগে সিং কাত করে যেমন আড়চোখে তাকায় ষাঁড়, তেমনি ভাবখানা ডাক্তারের।
কিন্তু কী যে বলি! আশ্চর্য! এত যে ছুটে এলাম, এখন আর মুখে আমার রা ফোটে না। সত্যি, কী বলব?
সামনেই ভিড়। ভিড়ের কাছেই একটা মস্ত মোটরগাড়ি। গাড়িটাতে রেকর্ডে গান বাজছে সেই মাতাল মেয়ের। মাতলামির হিক্কা আর ‘হম্ পী-কে আয়ে।’ কী যেন হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে গাড়িটা থেকে। কী দিচ্ছে? চা! আরে আরে, তাকিয়ে দেখি, গাড়িটাতে লেখা রয়েছে, ‘অন্নপূর্ণা উইমেনস্ রেস্টুরেন্ট’।
চৌরঙ্গীর কাফেটেরিয়া। কোথা থেকে এসেছে? দিল্লি, না লক্ষ্ণৌ? সামনে যমুনা, আর এই চলন্ত কাফেটেরিয়া। দিব্যি ফোল্ডিং চেয়ার টেবিল পেতে আসর জমিয়ে তুলেছে এই বারো-মাসের বালুচরে। টেবিলে উয় চায়ের কাপে ধোঁয়া। শীতে আঁটোসাঁটো হয়ে সুড়ুত সুড়ুত করে চুমুক দিচ্ছে সুবেশিনী মেয়ে আর সুবেশ পুরুষের দল। ওদিকে কুপন আর ক্যাশ নিয়ে বসেছেন ক্যাশিয়ারবাবু। মোটা-সোটা টেকো মানুষ। শীতে হাত কাঁপছে থরথর করে।
একটু যে ভয় ছিল না তা নয়, তবু বললাম, ‘চা খাবেন ডাক্তারবাবু?’
ডাক্তারের মুখে কথা নেই। আড়চোখে যেমন আমাকে দেখছিল, তেমনি একবার দেখলো অন্নপূর্ণার গাড়ির দিকে। দেখলো চায়ের মজলিসের দিকে। তারপর গাড়ির শো-কেসের খাবারের দিকে তাকিয়ে রহলো একদৃষ্টে।
মৌনতা সম্মতির লক্ষণ কিনা জানি নে। কিন্তু কথা আর ফুটবে বলে মনে হলো না। যেন—যা বলার তা বলা হয়ে গেছে। আর মুখ খুলবে না।
বললাম, ‘দাঁড়ান একটু। আমি কুপন কেটে নিয়ে আসি।’
বলে, কুপন কেটে আগে দু’হাতে খাবারের ডিস নিয়ে এলাম। এসে দেখি ডাক্তার নেই। যেমন হতাশ হলাম, মনটাও খারাপ হলো তত। ডাক্তার একদৃষ্টে তাকিয়েছিল খাবারের দিকে। খাবার নিতে নিতেও তাই লক্ষ করেছি। এর মধ্যে সে কোথায় গেল! মজলিসের দিকে ফিরে দেখি, ডাক্তার দিব্যি চেয়ারে বসেছে! চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে তার টেবিলের একমাত্র সঙ্গিনীর দিকে। পাঁচ-বদ্যির বসার ভঙ্গি ও চোখ দেখে বোধ হয়, চা আর নামছে না সে বেচারার গলা দিয়ে।
আমি তাড়াতাড়ি খাবারের ডিস দু’টো ডাক্তারের সামনে রেখে জল আর চা আনতে চলে গেলাম।
চা আনতে গিয়ে দেখি, মস্ত বড় কিউ পড়ে গিয়েছে। দাঁড়িয়ে পড়লাম সারবন্দী লাইনের পিছনে। একটু অস্বস্তি লাগল। অস্বস্তি লাগলো এই ভেবে, ডাক্তার না আবার সরে পড়ে। কিন্তু লাইনে দাঁড়াতেও বড় আনন্দ হচ্ছে।
সত্যি, মেলা যেন নতুন রূপে জমে উঠেছে। মেতে উঠেছে সকলে। বোধ হয় একেই বলে মেলা। ইংরেজিতে যাকে বলে মুড, সেই মুড এসেছে সকলের মনে। মেলার মুড। অন্তত আমার চারপাশে যা দেখি, তা-ই।
অন্নপূর্ণার গাড়ির রেকর্ডে ‘হম পী-কে আয়ে’র মাতলামি শেষ হয়েছে। হঠাৎ বেজে উঠেছে সেই মান্ধাতা আমলের বাঙলা রেকর্ড। লম্ফর আলোর চেয়ে ধোঁয়া বেশি। রেকর্ডে আর গানের কথা শোনা যায় না। যন্ত্রসংগীতের অস্পষ্ট অথচ কর্ণবিদারী ধ্বনি শোনা যাচ্ছে কাঁসর-ঘণ্টার মতো। তারই ভেতর থেকে পিঁ পিঁ করে শোনা যাচ্ছে, ‘প্রাণের প্রভু রহে প্রাণে, রয় না বাহিরে।’
তা হোক। প্রয়োজন হচ্ছে একটা শব্দের। গান শুনছে ক-জনা? ওদিকে কাড়া-নাকাড়ার ধ্বনি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাঁধের উপর যাচ্ছে যত লোক, নেমে আসছে তার চেয়ে অনেক বেশি। যেন পিলপিল করে নেমে আসছে পিঁপড়ের সারি। আসছে লটবহর নিয়ে টাঙ্গা আর রিকসা, ঘোড়া আর গাধা, লরি আর বেঁটে চ্যাপ্টা প্রাইভেট কার। আর দিগন্তে শুধু মানুষ। নর আর নারী। রঙ আর রঙ। কথা আর কথা। গান আর গান। মাইকের কথা কতবারই বা বলবো।
চারিদিকে এত কোলাহল। কিন্তু ধন্য সেই আর্তস্বর, ‘হেই বাবু ভাইয়া পঞ লোক সকল, হেই ধৰ্মীবাবা।’…আশেপাশের সব গণ্ডগোল ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে সেই অদৃশ্য ভিখারির তীব্র চিৎকার। চিৎকার খাবার-ফেরিওয়ালাদের। আম্রদ। লে সস্তা আদ! পেয়ারার নাম আম্রদ। আদ আর পুরি। পুরি আর প্যাড়া। প্যাঁড়া আর মোম্ফালি। মোম্ফালি হলো চিনেবাদাম। দেখতে পাচ্ছি, ফেরিওয়ালাদের পেছনে লেগেছে পুলিশ। লাইসেন্সের ব্যাপার। হাজার হাজার টাকা জমা দিয়ে দোকান করেছে মহাজনেরা। পেছনে ফেরিওয়ালাদের অনধিকারপ্রবেশে বাধা পড়বেই, কিন্তু তাড়া দেবে কত! কত লাগবে পেছনে! পাঁচিল নেই, গেট নেই। মুক্ত সঙ্গমপ্রান্তর চারিদিকে করছে হা হা। ধাওয়া করবে কোথায়। যাবে এপার থেকে ওপারে। প্রান্তরের এপাশ থেকে ওপাশে। যেখানেই যাবে, মানুষ। মানুষ থাকলেই পেট। আর মেলার মানুষের পকেটের পয়সা। সে তো খাবার সন্ধানী পিঁপড়ের মতো। ফুটোর এপাশ ওপাশ নিয়ে বেরোয়।
যে কিউতে দাঁড়িয়েছি, সেখানে আর এক রূপ। কুম্ভমেলারই ভিন্ন রূপ। কিউ দিয়েছে মেয়েপুরুষ। চোখ-ঝলসে যাওয়া উলেন পোশাকের ছড়াছড়ি। মেয়ে-পোশাক আর পরুষের হাল-ফ্যাশানের আমেরিকান সুট ঝকঝকে আর চকচকে। খুবই দামী নিঃসন্দেহে। এই সাত সকালেই ঠোঁটে আর নখে রঙ মেখেছে। পরিপাটি অ্যালবার্ট ফ্যাশানের চুল।
ওরকম চুল দেখলেই আমার একটি কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে একটা মজুর-বস্তির কথা। বাপ শাসন করছে ছেলেকে। কারখানার মজুর দু’জনই। শাসন নয়, বোধ হয় বিদ্রুপই করছিল ছেলেকে। ছেলের পোশাকের বড় পরিপাটি। তাই বাপ বলছিল, ‘বড়বাজারের ফোকট্ কা পাতলুন, চোরাবাজার কা জুত্তা, ঔর চুল কো সিঙাড়া বনা কর কাহাঁকা লাটসাহিব কা ভাতিজা আইলনে তু?’
বড়বাজারের ফোকটের প্যান্ট আর চোরাবাজারের জুতোর একটা মানে বুঝি। কিন্তু চুলকে সিঙাড়া বানানো? সে আবার কি! পরে শুনেছিলাম ওই অ্যালবার্ট ফ্যাশান হল সিঙাড়া। হেসেছিলাম, কিন্তু সিঙাড়ার সঙ্গে অ্যালবার্টের এই আঙ্গিকগত সাদৃশ্য সত্যই লক্ষণীয়।
যাক সে কথা। পরিবেশটি নতুন রকম। ফ্যাশানটা স্বভাবতই আজকালকার স্টুডিও-ঘেঁষা গ্রেগরি পেক আর সুশান হেওয়ার্ড, দিলীপকুমার আর…। যাক, নাম বাড়িয়ে লাভ নেই। ফ্যানবৃন্দ আহত হতে পারেন। এ বিষয়ে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ অধ্যাপকের বক্তব্য বলার ইচ্ছা রইলো পরে। তা বলে আমার মতো ব্যতিক্রমও আছে বৈকি কিউতে। রাজস্থানী নাগরা আর গালপাট্টা, চৌদ্দ হাত শাড়ি আর তিন ইঞ্চি ডায়মেটারের নথ। তাদের হাসির আর অন্ত নেই। ‘টিকস্’ কেটে চা কিনতে হয়? আজব কাণ্ড! এটা জেনানা-লোকদের চায়েখানা? আরে রাম রাম কহো। এসে পড়, এসে পড়। চার পয়সা দিয়ে ‘টিকস্’ কাটাও আর লাইন দিয়ে পেয়লীভর চা পিয়ে নাও।
চা পাওয়ার ও খাওয়ার এ অভিনব পন্থা দেখবার জন্যই ভিড় করেছে কত মানুষ। পুরুষ আর মেয়েমানুষ। কৃষাণী ঘোমটা-খসা উদাসিনী। এ কি গো বিস্ময়! জেনানা তক লাইন দিয়ে চা খাচ্ছে! দিনে দিনে কতই হবে! তা ছাড়া বে-আব্রু মেয়েদের পোশাকই বা কি! পাকা মেমসাহেব বনে গিয়েছে সব।
খুব গা টেপাটেপি আর হাসাহাসির ধুম। এমন কি পুরুষদের মধ্যেও। আমার সামনেই হাল-ফ্যাশানের স্যুট-পরা এক যুবক। তার সামনে এক সুবেশিনী যুবতী। সম্ভবত স্ত্রী। ভেবেছিলাম, গান কেউ শোনে না, কিন্তু এরা দু’জনে কিউতে দাঁড়িয়ে সেই আলোচনাতেই মশগুল। তারা কান পেতে আবিষ্কার করছে, কী গান বাজছে রেকর্ডে। যুবতী বললো, ‘বোধ হয় ওড়িয়া গান।’ যুবক বললো, ‘আমার মনে হচ্ছে মাদ্রাজী।’
আর আমি বাঙলা গানের এ ভাষা আবিষ্কার শুনে হাঁ। যত অস্পষ্টই বাজুক, তা বলে, ‘প্রাণের প্রভু রহে প্রাণে’ একেবারে ওড়িয়া না-হয় মাদ্রাজী! কপাল আমার বাঙলা ভাষার। ধন্য আমার বাঙলা গানের শ্রোতা!
মেলা সরগরম! এই আবেষ্টনী, আর চেয়ার-টেবিলের ছড়াছড়ি রেকর্ডে কী বাজবে? ঘরছাড়া মানুষের গলায় গান আপনি গুনগুনিয়ে ওঠে। এ পরিবেশ দেখে ভুলে যেতে হয়। অবধূতের কথা। বিস্মৃতি আছে কুম্ভমেলার। শহুরে জীবনের এক নতুন পকেট যেন!
চা পেতেই ছুটে এলাম। ছি ছি, ডাক্তার এখনও মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে কটমট করে। তার টেবিলের এক সুন্দর-মুখ ভালো মানুষ সঙ্গিনী। অবাঙালিনী নিঃসন্দেহে। কোনো কোনো শিকারীর নজরেই বন্দী হয়ে পড়ে শিকার। মহিলাটির অবস্থা প্রায় সেইরকম।
আমি আসতেই বোধ হয় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বেচারি। চোখে তার বাসি সুর্মার দাগ। নেহাৎ বাঙালিনীর মতো চোখ তুলে তাকাল। ভাবখানা, কী রকম মানুষ! একটা পাগলকে বসিয়ে রেখে গেছে এখানে?
অপরিচয়ের মধ্যেও মানুষ কথা বলে বৈকি। বলে নীরবে, চোখে চোখে। মহিলাটি একটি কটাক্ষ করে উঠে গেল। দেখলাম, পেয়ালায় চা রয়েছে এখনো। চুমুক দেবারও সুযোগ পায় নি।
সে উঠে যেতে ডাক্তারও যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। দলা করা কম্বলটা টেবিলে রেখে তাকালো মেয়েটির চলার পথের দিকে। তারপর আমার দিকে। খ্যাপামিটা এখনও একেবারে যায় নি মুখ থেকে। কোনো কথা না বলে দিব্যি পেয়ালা টেনে নিয়ে চুমুক দিল। খাবারটি খাবে না নাকি? কী জানি! যা মানুষ!
ভাবতে না ভাবতেই খাবারে হাত পড়লো ডাক্তারের। যত হাত পড়ে ততই ডাক্তারের ভয়ংকর মুখের নিষ্ঠুর রেখাগুলি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে! অবিশ্বাস্যরকম কোমল হয়ে উঠেছে ডাক্তারের মুখ। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মুখে মানবিক স্ফুরণ। নিজে খাব কী! ডাক্তারের মুখে কোন অদৃশ্য জাদুদণ্ডের স্পর্শ লেগেছে, তাই খুঁজছি। শুধু কোমল নয়, তৃপ্তিতে, সুখে নতুন সুষমায় ভরে উঠেছে ডাক্তারের মুখ!
লোকে বলে, বিশেষ করে গৃহিণীরা বলেন, ‘খাওয়া দেখেও সুখ।’ সে কোন্ খাওয়া? এমনি খাওয়া কি? বিস্ময়ের সঙ্গে খুশির আমেজ দেখা গেল আমার মনে। এ আবার কেমন খুশি, তা তো জানিনে। খেয়ে খুশি বরাবর। খাইয়ে খুশি ততো হই নি কখনো। কী বিচিত্র! আমার ছেলেবেলার বেচা এলো ফিরে। আমার যৌবনে এলো এই কুম্ভমেলার দিগন্তের হাটে পাঁচ-বদ্যির বেশে।
ছেলেবেলায় আমার পিঁপড়ের মতো খুঁটিয়ে বেড়ান সঞ্চয়। সেই সঞ্চয়ের ঐশ্বর্য একদিন ভয়ে দুঃখে আশায়-নিরাশায় দিয়ে দিয়েছিলাম বেচাকে। নোটনের ডালপুরি, লালমোহনের সন্দেশ, লজেন্স, বাখরকানি। কত কি! সেই থেকে সন্ধি স্থাপন হয়েছিল। বেচার খাওয়ায় সুখ পেয়েছিলাম, তা নয়। বরং সঞ্চয়ের শূন্য থলিটা দেখে, লুকিয়ে কেঁদেছিলাম। সন্ধি হয়েছিল চোখের জল দিয়ে। কিন্তু বেচার কথা তো ভুলি নি! ভুলি নি ওর অভিযোগ, ‘আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কেন তুই রোজ খাস?’ দেখিয়ে দেখিয়ে কোনোদিনই খাই নি। ওর দেখার মধ্যে ছিল আমার দেখানো।
দু’টো প্লেটই সাবাড় করেছে ডাক্তার। করে ডাক্তার একটু বা অপ্রস্তুত যেন। তাকাতে পারছে না আমার দিকে। চা-ও শেষ
দেখলাম, ডাক্তারের মোটা স্থূল ঠোঁটজোড়া ভিজে উঠেছে। এবড়ো-খেবড়ো মুখের চামড়া উঠেছে টান-টান হয়ে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। সেলাই বহুল মোটা জামা আর তালি-মারা প্যান্ট। একটা রীতিমতো বলিষ্ঠ মানুষ। কিন্তু কী করুণ।
উঠে গেলাম ক্যাশিয়ারের কাছে। কুপন কিনে খাবার নিলাম। হিসাবের কড়ি পকেটে। টায়টিকে খরচের কড়ি। পথে বেরিয়েছি, এক পয়সা মা-বাপ। না থাকলে কেউ জিজ্ঞেস করবে না। দৈবজ্ঞ মরবে কাঁথা বয়ে।
তবুও। উপোস দেব একটি বেলা। ভাবছ, আবেগে হয়েছি অচৈতন্য। হবেও বা। কিন্তু মনের খুঁতখুঁত রাখব কোথায়! হৃদয়জোড়া বিষকুম্ভ। মনে অশান্তি দিয়ে তাকে আরও ভরে দিই কেন! অমৃতকুম্ভের খোঁজ পাই নে এখনো। ছাড়ি কেন আত্মতৃপ্তিটুকু! চোখের উপর ভেসে উঠছে খালি বলরামের মুখটি।
খাবার দেখে ডাক্তার আরও অপ্রস্তুত। অনুসন্ধিৎসু চোখে তাকালো আমার দিকে। জানি, আমিই আবার রেগে গিয়েছি কিনা, সেটুকুই তার সংশয়।
বললাম, ‘খান।’
খাবারের দিকে দেখে ডাক্তার আবার তাকালো আমার দিকে। তারপর টেনে নিল একটা প্লেট। সে-প্লেটখানিও শূন্য হলো। দু প্লেট এনেছিলাম আবার।
বাকি প্লেটটি দেখিয়ে বললাম, ‘ওটাও খেয়ে ফেলুন।
এতক্ষণে মৌনব্রত ছাড়লো ডাক্তার। বললো, ‘তুমি?’
‘আমি চা খাব।’
ডাক্তার আমার দিকে তাকাল। সর্বনাশ! আবার খ্যাপামির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। কিন্তু খেপল না। খেল না। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বার করলে একটি ছোট কলকে। তেঁতুলবিছের মতো একটি চকচকে লাল গাঁজার কলকে। আবার এ-পকেট ও-পকেট করে বেরুল খানিকটা পাটের ফেঁসো আর নারকেলের ছোবড়া। কিন্তু আর কিছু নয়। বিরক্ত হয়ে সেগুলি পকেটে রেখে বললো, ‘বিড়ি-টিড়ি আছে?’
বিড়ি তো নেই। পকেট থেকে বার করে দিলাম সিগারেট। বুঝলাম, ওই বস্তুটি তেমন মনঃপুত নয়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘পেট ভরেছে আপনার?’
ডাক্তার বললো, ‘পেট আবার কখনো ভরে? না, ভরেছে কোনোদিন কারুর? কি করে ভরবে?’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। ডাক্তার বললো, কালকে যাও বা পেল্লাদের দিদিমা দিত দুটো খেতে, সে তো তুমি পেল্লাদ এসে ঘোচালে।’
বললাম, ‘আমি?’
‘তবে কে?’
‘কী রকম?’
ডাক্তার আবার প্রায় স্বমূর্তিতে দেখা দিল। বললো, ‘ওই যে, বুড়ির মন কেড়ে মেজাজ খারাপ করে দিলে। কিপটে বুড়ি। বুড়িগুলো সব কিপটে! ওরকম ষোলটা বুড়িকে গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছি দেশ থেকে। তখন বলে কত কথা! সব বেটি পাঁচুগোপালের ঘাড় বেয়ে সগে যাওয়ার তালে আছে। যাওয়াব’খন! ভেবেছে, প্রয়াগে এসে সব সগ ধরে ফেলেছে। আবার ফিরতে হবে না?’
বললাম, ‘আপনি নিয়ে এসেছেন নাকি? ‘
‘তবে? কে নিয়ে আসবে? পাঁচুগোপাল ছাড়া আর সব জানে কে? নিয়ে এসেছি, নিজের জানাশোনা আশ্রমে ক্যাম্প খুঁজে দিয়েছি।’
বলে, ডাক্তার আমাকেই যেন আসামী করে ধমকে উঠলো, ‘এমনি নিয়ে এসেছি, অ্যাঁ? এমনি নাকি বল? সবাই কন্টাক্ট করে এসেছে, দু-বেলা খেতে দেবে আর রাত্রে শুতে দেবে পালা করে। তা দু-বেলা ঠিকমতো খেতে দেওয়া দূরে থাকো, রাত্রে একটু শুতে পর্যন্ত দিচ্ছেনা।’
মনটা বিস্মিত ব্যথায় চমকে উঠলো। দু-বেলা দু’টো খাওয়া, আর একটু আশ্রয়ও যে ডাক্তারের কপালে নেই, এতটা তো অনুমান করতে পারি নি। মনে পড়ে গেল, কাল রাত্রে শীতার্ত ডাক্তারের ক্যাম্পে প্রবেশ।—সেই ‘নো জায়গা, নট কিচ্ছু।’ ডাক্তার! পেশা ও বিশেষণের কী বিড়ম্বনা! রহস্যাচ্ছন্ন ব্যাপার। এই পাঁচুগাপোল রায় ডাক্তার হলো কী করে?
ডাক্তার আপন মনে বলেই চললো, ‘এই বুড়িগুলোর একটাও সঙ্গে যাবে? একি গাড়ির টিকিট কেটে আর ভিড় ঠেলে মরতে যাওয়া, যে সগ্গে গিয়ে পৌছুবে! তিন সত্যি করে এলো সব, আর এখানে এসে আমাকে চিনতেই পারে না। দিব্যি নিজেরা খাচ্ছে, সাধুদর্শন করে বেড়াচ্ছে। ভগবান না, সঙ্ দেখতে এসেছে। দেখো তুমি, সবগুলো নরকে যাবে।’
কী করে দেখবো, তা তো জানি নে। ডাক্তারের অবস্থাটা খালি ভাববার চেষ্টা করছি। কিন্তু ডাক্তার থামে না——পেল্লাদের দিদিমার জন্য ক্যাম্পে বলে রেখেছি। এলাহাবাদ ইস্টিশান থেকে নিয়ে এলাম। পথে বললে, পাঁচু, আজ আমার কাছেই খাবি থাকবি। কিন্তু একবার ডাকলে! যখন নিজেরা খেলে? ক্যাম্পের বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখলাম।’
লজ্জায় ও ব্যথায় এতটুকু হয়ে গেলাম। আমিও তখন খাচ্ছিলাম। আমিই কালকের রাত্রিটা ডাক্তারকে উপোসে রেখেছি। নিরাশ্রয় করেছি। তাই ডাক্তার ক্ষেপে উঠেছিল।
তাড়াতাড়ি বললাম, ‘সত্যি, কালকে রাত্রের ব্যাপারটা আমার খুব…’
‘তুমি?’ ডাক্তার আবার ধমকে উঠলো আমাকে। ‘তুমি কী করবে? ওসবে আমার আর বাজে নাকি? তাই ভেবেছ তুমি? আরে ছোঃ! অত সস্তা কলজে পাঁচ-বদ্যির নয়, বুঝেছ? দশ-দশটি বছর সাধু হয়ে সারা দেশ ঘুরেছি। সারাটা দেশ।’
বলে, হাতের বুড়ো আঙুল দু’টি দেখিয়ে বললো, ‘সব নখদর্পণে আছে, যতরকম সাধু আর যতরকম মানুষ। জিজ্ঞেস কর, বলে দেব।’
‘আপনি সাধু হয়েছিলেন?’
‘তবে?’
‘কেন?’
‘কেন আবার! বার করে নিয়ে গেল ঘর থেকে। ঘর-বার সমান করে দিল। জোর করে নিয়ে গেল টেনে।’
‘কে।’
‘কে আবার? যার নেওয়ার জ্বালা, প্রাণের জ্বালা।’
‘ছেড়ে দিলেন কেন?
‘ছাড়াছাড়ির কী আছে? কিছুই ধরি নি, তার ছাড়ব কী! কপনি এঁটেছিলাম, ফেলে দিয়েছি। আছি, যেমন ছিলাম তেমনি। জ্বালা টানে, জ্বালাই নিয়ে আসে। জ্বালা কখনো ছাড়ে?’
বলে, ডাক্তার সোজাসুজি তাকালো চোখের দিকে। তাকিয়ে দেখি ডাক্তারের চোখে মনি নেই। অন্ধকার দু’টি গর্ত শুধু। কোথায় হারিয়ে গিয়েছে চোখের মনি দুটি! অন্ধ গহ্বরে একটা দুর্বোধ্য যন্ত্রণার চমকানি। স্থূল ঠোঁট দুটো ছুঁচলো হয়ে উঠেছে। বিকৃত গলায় বললো, ‘বলো। জ্বালা কখনো ছাড়ে?’
জবাব চায় ডাক্তার। কী জবাব দেব! জ্বালা ছাড়ে কিনা জানি নে। কিন্তু ওই মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন করে বলি যে, ছাড়ে।
ডাক্তার আবার মুখ খুলল। তখনো কে জানতো, অজান্তে এক কুলুপ ছিদ্রে সুড়ুৎ করে ঘুরিয়ে দিয়েছি চাবি। ধাক্কা দিয়েছি বহুদিনের মরচে-পড়া বন্ধ দরজায়। ডাক্তার বললো, ‘কোথায় না গিয়েছি। অসময়ে একলা একলা বরফ ভেঙে ছুটে গেছি হিমালয়ের উপরে মানুষখেকো জন্তু পালিয়ে গেছে, তবু আমি থামি নি। ভীতু কাপুরুষ সাধু পুরুত দরজা খোলেনি মন্দিরের। মরণের ভয়ে, খেতে দেবার ভয়ে। বয়ে গেছে। জীবন-মরণ ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সব জ্বালা জ্বলে-পুড়ে গেছে। আমাকে রুখবে কে? কিন্তু প্রাণ জুড়োল? জ্বালা জুড়োল?’
ডাকলাম, ‘ডাক্তারবাবু।
‘ডাক্তারবাবু?’আবার সেই ভয়ংকর মুখ। ‘আমাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে? আমি ডাক্তারবাবু? জড়ি বুটি ছাড়ি, জড়ি বুটি। রাস্তায় ফেরি করি। দাদ কাউরের মলম তৈরি করে বেচি। নিয়ে দেখ, সারে কিনা। মাদুলি? তাও দিই। তা বলে ডাক্তার?’
সর্বনাশ! আবার সেই মূর্তি। এখন কি আর মনে আছে পাঁচ-বদ্যির, ডাক্তার পরিচয় সে নিজেই দিয়েছে! বলতে গেলে উলটো বিপত্তি হবে। যাক, বলে যাক। চায়ের আসর জমজমাট। বেশি গণ্ডগোল হলে ভিড় বাড়বে। আগেই টের পেয়েছিলাম, ডাক্তার নামের মধ্যে আছে পাঁচুগোপালের বিড়ম্বনা। বুঝলাম, নির্মম বিদ্রুপ মাত্র। খ্যাপার প্রতি শ্লেষ। পাঁচ-বদ্যি আর ডাক্তার পাঁচুগোপাল রায়। ওই নামে নিজেকেও বিদ্রুপ করে সে। করে যে, তাও বোধ করি নিজে সঠিক জানে না। কীসের জ্বালা, সেটুকু জানার বড় ইচ্ছা হলো।
ডাকলাম, ‘পাঁচুগোপালবাবু।’
ডাক্তার তাকাল। অবাক কাণ্ড! সে হাসছে নাকি? এও কি বিশ্বাসযোগ্য? বিকশিত তার বড় বড় দন্তরাজি। যদি হাসি হয়, তবে কী ভয়ংকর হাসি! বললো, মিষ্টি কথা বলা হচ্ছে? দিব্যি ওলটানো চুল, ঠাণ্ডা চোখ, ভালো মানুষের মতো দেখতে। ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানো না। খুব জানি তোমাদের মতো ছোঁড়াদের।’
আমাকেই বলছে। কিন্তু বাধা আর দিচ্ছি নে। তা হলেই ডাক্তারের ক্ষিপ্ততা দেখা দেবে। গলার স্বর নেমে এলো ডাক্তারের। বললো, ‘ওই যে একটি কেটে পড়লো টেবিল ছেড়ে। দিব্যি টানা-টানা চোখ, টিকলো নাক, সুন্দর মুখ। কেমন শান্ত মেয়েটি।’
বুঝতে দেরি হলো না, টেবিল-সঙ্গিনী সেই মহিলাটির কথা বলছে ডাক্তার। কিন্তু বেচারি সত্যি ভালো মানুষ। আমি তো তাই দেখেছিলাম। বললাম, ‘না, সে মহিলাটিকে তো―?’
‘সব করতে পারে।’ বাধা দিয়ে বলে উঠলো ডাক্তার, ‘ওসব ভয়ংকর, সাংঘাতিক। আমার চেয়ে বেশি জানো তুমি?’
তা হয়তো জানি নে। কিন্তু একটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন আছে তো।
ডাক্তার বললো, ‘বিশ্বাস হলো না বুঝি?’ বলে পকেট থেকে বার করলো একটা ময়লা কাগজ। এত ময়লা, কুঞিত চামড়ার মতো হয়ে গিয়েছে। অতি সন্তর্পণে সেই কাগজের ভাঁজ খুলতে চকচক করে উঠলো একটি ফটো। ফটোটি আমার সামনে মেলে ডাক্তার বললো, ‘দেখো তো কেমন?’
সুন্দর, সত্যি সুন্দর! টানা-টানা শান্ত চোখ। সু-উচ্চ নাক। কপালের উপর ঝাঁপিয়ে-পড়া চুলের গোছা। বয়স অনুমান করা শক্ত। তবে তরুণ বয়স, সন্দেহ নেই।
‘কেমন?’
বললাম, ‘সুন্দর।’
‘হুঁ হুঁ, বিষ! ভয়ানক বিষ, সুন্দর বিষ।’
মনে বড় কুণ্ঠা এলো, তবু জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে ইনি?’
শুনতে পেল না ডাক্তার। ভয়ানক বিষ, সুন্দর বিষের দিকেই সব ভুলে তাকিয়ে ছিল সে। গর্তে ঢোকা কালো চোখে তার বিগলিত দৃষ্টি। খাওয়ার সময় যেমন কোমল হয়ে উঠেছিল তার মুখ, এখন এই মুহূর্তে তার চেয়ে সুন্দর হয়ে উঠেছে সেই মুখের শ্রী।
পরমুহূর্তেই ফটোটা কাগজে মুড়ে পকেটে ঢুকিয়ে দিল। বললো, ‘কে, জিজ্ঞেস করেছিলে? আমার বউ ওকে জন্ম দিয়ে মরেছিল।’
‘আপনার মেয়ে?’
জবাব না-দিয়ে ডাক্তার মুখ ঘুরিয়ে নিল।
বুঝলাম, ‘আমার মেয়ে’ কথাটি উচ্চারণ করতে নারাজ সে!
সে বললো, ‘ওই যে ফটোটি দেখলে, বললে বিশ্বাস করবে না, ওই ফটোর মেয়ের চেয়েও তার মা ছিল আরও সুন্দর।’
চারিদিকে কথা, হাসি ও চিৎকার। হ্রেষাধ্বনি আর মোটরের গর্জন। সব মিলিয়ে একাকার। তার মধ্যে পাঁচুগোপালের চাপা মোটা গলা অদ্ভুত মিষ্টি শোনাল। যেন ক্লারিওনেটের খাদের সুরে বেজে চলেছে বিচিত্র রাগিণী।।
ডাক্তার বললো, ‘এই পাঁচুগোপাল, প্রাণগোপাল রায়ের ছেলে বসে আছে তোমার কাছে। চেয়ে দেখো, আমি কী কুৎসিত। চেহারা দেখে মানুষ আমার কাছে আসে না। তবু, সে আমাকে ভালোবাসত। এত ভালোবাসত যে, আমিই এক এক সময় ভাবনায় পড়ে যেতাম। আমার খেতে বসতে শুতে তারও ভাবনার অন্ত ছিল না। ওই মেয়ে জন্ম দিয়ে সে মরে গেল। ভালোবাসার কদর বুঝতে না বুঝতে সে চলে গেল। অন্ধ আর বোবার মতো আমি দিবানিশি হাতড়ে ফিরেছি, খুঁজেছি। মনে হতো, কেউ যড়যন্ত্র করে তাকে লুকিয়ে রেখেছে আমার কাছ থেকে। মানুষের খ্যাপামি কতদিন থাকে? ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি কাঁথায় শুয়ে কাঁদছে সে, আমারই মেয়ের বেশে। প্রথমে বড় রাগ ছিল মেয়েটার ওপর। পাড়ার মেয়েরাই দেখতো ওকে। তা ছাড়া কে বাঁচাবে! দিনে দিনে সেই মেয়ের চোখ ফুটল, নাক ফুটলো, হাসি ফুটলো। মায়ের মতোই। নাম হলো শিউলি। শেফালির মতোই সুন্দর, নরম আর মিষ্টি। নজর যখন দিলাম, আর চোখ ফেরাতে পারলাম না। কাজ করতাম কারখানায়। মন বসত না, কখন বাড়ি আসব, শিউলিকে বুকে নেব, সেই আমার ভাবনা। ওই মেয়েই আমার ধ্যান জ্ঞান, আমার প্রেম। ভালবাসা, আমার স্বর্গ, আমার ভগবান, আমার সব। আদেখলের ঘটি হলে যা হয়! কুঁড়েঘরে রাজকন্যের সাজপোশাক খাওয়া। সবাই হাসত আর ঠাট্টা করত।…বড় হলো, বুলি ফুটল। কী মিষ্টি কথা! প্রাণ ধরে ইস্কুলে দিলাম। দিনে দিনে বড় হলো। আমার ধুলোভরা রোদ-পড়া বাগানে ফুল ফুটল, ছায়া হলো, পাখি ডাকল। লুকিয়ে শুনতাম, মেয়েকে দেখে লোকে বলত পাঁচুগোপালের মেয়ে! কত আমার ভাবনা। অনেক লেখাপড়া শেখাব, গান শেখাব। কত কী!
বলে একটু থামল। আর আমি ভাবছিলাম এমন অভাবিত সুন্দর বিন্যাসও বেরোয় তার মুখ থেকে? গলার স্বরটা আরও নেমে এলো তার, ‘সতেরো বছর হলো। মেয়ের ভরা যৌবন। কিন্তু কী শান্ত! ঠিক তার মায়ের মতো। আমি ছিলাম তার বাপের চেয়েও বড়, তার একলার সঙ্গী, তার বন্ধু। বিয়ের কথা হলে কতদিন বুকে মুখ রেখে বলেছে, বাবা, তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমি পারবো না।’
এই পর্যন্ত বলে আচমকা ব্রেক কষার মতো পাঁচুগোপালের কথা থামল। তাকিয়ে দেখি সারাটা মুখ কুঁচকে বিকৃত হয়ে একেবারে অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। যেমন আচমকা থেমেছিল তেমনি হঠাৎ বললো, ‘মিছে কথা। একেবারে শয়তান। সুন্দরের মধ্যে বিষ। চলে গেল। না বলে না জানিয়ে পালিয়ে গেল একটা ছেলের সঙ্গে। পাড়ারই ছেলে!’
এ পর্যন্ত বলতেই নাটকীয়ভাবে যবনিকা পড়ল। চলন্ত অন্নপূর্ণার আর্দালি টেবিল ওঠাতে এলো। লক্ষ করিনি, কখন আসর ভেঙে গিয়েছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে রেকর্ড। পথের রেস্তোরাঁ গিয়েছে উঠে। উঠে পড়লাম। পাঁচুগোপালের সঙ্গে চললাম পুলের দিকে। বেলা অনেক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে কথা মনে নেই। তাকিয়েছিলাম ডাক্তারের দিকে।
বোধ হয় তার কথা ফুরিয়েছিল। আর কিছু বলার দরকার ছিল না। কিভাবে পাঁচুগোপালের জীবন আজ এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, কেন সে সাধু হয়েছিল, তার কারণ ব্যাখ্যারও আর প্রয়োজন ছিল না। দরকার নেই আর বলার, কেন তার এত হাঁকাহাঁকি, কথার খেই হারানো, পাগলামি আর সুন্দর ছেলেমেয়ে দেখলেই একটা তিক্ত সন্দেহে ও যন্ত্রণায় জ্বলে ওঠা।
জ্বলার কথা তো নিজেই বলেছে সে। ঘরের বাইরে, অসীম সমুদ্র আর বিরাট হিমালয়, কোথাও তার জ্বলার নিরসন হয়নি। সব মিলে সে আজ অস্বাভাবিক, অবাস্তব রূপ ধরেছে। পুল পেরিয়ে গঙ্গার ধারে এসে দাঁড়ালো সে। সাপের মতো এঁকেবেঁকে দাগ পড়েছে। চ্যাটালো পাড়ে। কলকল শব্দ। পাঁচুগোপাল এসে দাঁড়াল।
বললাম, ‘পাঁচুগোপালবাবু, আপনার মেয়ে এখন কোথায়?’
বললো, ‘তা জানলে কি আর ভাবনা ছিল? ভাবি, এ কেমন যাওয়া! একটু কি খোঁজও দিতে নেই? দশ বছর বাইরে ঘুরে এসেও খোঁজ পাই নি।’
তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ। অজান্তে একটি নিশ্বাস পড়লো আমার। আর নয়। এবার আশ্রয়ের সন্ধান না করলে আর নয়।
খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফেরে পরশ পাথর।…
চলে যাওয়ার আগে সেই কথাটিই বার বার মনে পড়ছিল। জীবনভর এই খোঁজার পালা পাঁচুগোপালের শেষ হবে কিনা জানি নে।
খুব উত্তেজনার পর মানুষ যখন ঠাণ্ডা হয়ে যায়, অনেকক্ষণ কাঁদার পর শোকাতুর যেমন নীরব ও বিহ্বল হয়ে পড়ে, পাঁচুগোপাল তেমনি শান্ত হয়ে গিয়েছে।
মুখ ফিরিয়ে বিদায় নিতে গেলাম। পাঁচুগোপাল আচমকা প্রশ্ন করে বসলো, ‘কী করা হয়?’
কী যে করি, সে-জবাব দেওয়া মুশকিল। যা করি, সে কাজটি ভালো কি মন্দ দশজনের বিচার্য। কিন্তু বলতে গেলেই সঙ্কোচ হয়। বিশেষ পাঁচুগোপালের কাছে সাত-পাঁচ ভেবে তবু সত্যি কথাই বললাম।
বললাম, ‘লিখি।’
পাঁচুগোপাল অবাক হল! জিজ্ঞেস করলো, ‘কী লেখ? বই?’
পাঁচুগোপালের বিস্ময় দেখে একেবারে এতটুকু হয়ে গেলাম। কেন, বই লেখাটা কি পাপ? বললাম, ‘হ্যাঁ।’
‘কী বই লেখা হয়? এমনি সব জ্ঞান-ট্যানের বই, না গপ্পো-নভেল?
বুঝলাম, জ্ঞান-ধ্যানের বই বললেই বোধ হয় খুশি হয় সে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, পাঁচুগোপালের কাছ থেকে এরকম প্রশ্ন আশা করিনি।
বললাম, ‘হ্যাঁ, গপ্পো আর নভেলই লিখি।’
পাঁচুগোপাল বললো, ‘তা বুঝেছি! মাথার ওপর রোজগেরে বাপ আছে নিশ্চয়ই?’
‘কেন বলুন তো?’
‘তা নইলে চলে কী করে?’
হঠাৎ জবাব দিতে পারলাম না। চলে কিনা চলে, সে বিষয়ে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করে লাভ কী! বললাম, ‘কেন, বাঙলাদেশের লেখকদের কি চলে না?’
পাঁচুগোপাল বললো, ‘কই, আমাদের কেষ্টকান্ত তো বাপের পয়সাতেই বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে খায় আর কাঁড়ি কাঁড়ি বই লেখে।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেষ্টকান্ত কে?’
‘আমাদের পাড়ার ছেলে।’
বললাম, ‘তা হবে। তবে, আমার বাবা মারা গেছেন।’
পাঁচুগোপাল আরও বিস্মিত হয়ে বললো, ‘তোমার মাথায় তো বাউড়ি কাটা চুলও নেই দেখছি।’
বললাম, ‘কেন? ‘
‘আমাদের কেষ্টকান্ত তাই বলে। বই লিখলে নাকি মাথায় বাউড়ি রাখতে হয়, চশমা পরতে হয়, উড়নি চাপাতে হয়।
পাঁচুগোপালের মুখের দিকে নজর করে দেখলাম। না, ঠাট্টা নয়, কথাগুলি সে সরল বিশ্বাসেই বলছে।
জানি নে, কে কেষ্টকান্ত। তাঁর রচিত সাহিত্য পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বললাম, ‘সকলের তো একরকম নয়। আপনাদের কেষ্টকান্ত হয়তো ওই রকমটি পছন্দ করেন।’ পাঁচুগোপাল একটা দীর্ঘ হুঁ দিল। মানে যার অনেক কিছুই হতে পারে। আবার বললো, ‘আর এ লাইনে কতদিন?’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন্ লাইনে?’
বললো, ‘এই তীর্থ ঘুরে বেড়ানো?’
বললাম, ‘এই প্রথম।
ঘাড় নেড়ে বললো পাঁচুগোপাল, ‘সেইজন্যেই। সেইজন্যেই রাত করে একলা বেরুনো হয়েছিল?’
‘বেরুলে কী হয়?’
‘কী আর হবে! ঘাড়টি মটকে বালুতে পুঁতে রেখে দেবে।
পুঁতে রেখে দেবে! অপরাধ? বললাম, ‘কে? কেন রাখবে?’
পাঁচুগোপাল দ্বিতীয়বার হাসলো। বললো, ‘যার দরকার সে-ই রাখবে। পকেটে নিশ্চয়ই কিছু রেস্তোও আছে?’
রেস্তো মানে পয়সা। তা কিছু তো আছেই। তা বলে সে-পয়সার জন্য একেবারে ঘাড় মটকানো!
পাঁচুগোপাল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলো। বললো, ‘মনে রেখো, এই কয়েক মাইলের মধ্যে সব জায়গায় ওৎ পেতে আছে ভয়ংকর সব মানুষ। অনেকে সাধু বেশেও আছে। সুযোগ পেলেই তারা কখনো ছাড়বে না। আর সাধুদের কাছে রাত্রে কখনো ভিড়ো না।’
বললাম, ‘কই, কাল রাত্রে তো সে রকম কিছু –
‘টের পাওনি। রোজ রাত্রেই কি আর এমনি হয়। তাছাড়া আমি ছিলাম কাল তোমার পেছনে পেছনে। আর-একটা কথা বলি। অনেক পেত্নী আছে এখানে, তারাও ছেড়ে কথা কইবে না।’
পেত্নী! পাঁচুগোপাল যে মনের মধ্যে রীতিমতো একটা ভয় ধরিয়ে দিল! বললাম, ‘পেত্নী! সেটা আবার কী?’
পাঁচুগোপাল মুখ বিকৃত করে বললো, ‘সেটা দেখলেই চোখ খুলে যাবে। আড়ে আড়ে চাইবে, ফিকফিক করে হাসবে, মনে হবে হাতছানি দিয়ে বুকের কাছে ডাকছে, বুঝেছ? খুব সাবধান।’
বলে, মুখ ফিরিয়ে বললো আপন মনে, ‘কত দেখলাম এরকম। এই গেলবারের হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় তিনজনকে এরকম খুন হতে দেখেছি। তারা সবাই তোমার মতো ভদ্দরঘরের ছেলে।
ভয়টা প্রায় চেপে বসলো মনে। বক্তব্য অনুযায়ী পাঁচুগোপাল এ বিষয়ে আমার চেয়ে অভিজ্ঞ নিঃসন্দেহে। তার কথা একেবারে উড়িয়ে দিতেও পারিনে। বললাম, ‘কিন্তু এই তীর্থক্ষেত্রে?’
সে বললো, ‘এইখানেই তো সহজ। তীর্থক্ষেত্তর বলে তো আর কারুর আসতে মানা নেই। দেখতে চাও? অনেক কিছু দেখতে পাবে। দেখিয়ে দেব তোমাকে। মাল-টাল টানা হয়?’
মাল? মানে মদ। বললাম, ‘না। কেন?’
‘সেসব বন্দোবস্তও আছে। এখানে সব পাবে। বে-আইনী চোলাই করা নদ এখানে খুব আসে।’
এতক্ষণে মনে হলো, পাঁচুগোপাল যে দিকটা ইঙ্গিত করতে চাইছে, সেদিকে আমার ভয় নেই। কিন্তু তার কথা শুনে আমি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে রইলাম।
এই দুস্তর বেলাভূমি। চারিদিকে গিজগিজ করছে সাধু-সন্ন্যাসী আর পুণ্যার্থী নরনারীর দল। এই উন্মুক্ত প্রান্তরের বুকে কোথায় থাকতে পারে সেই বেসাতির আস্তানা? জানি নে কোথায় থাকতে পারে! তবে থাকাটা অসম্ভব বলে বোধ হয় না। মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই।
যাবার আগে পাঁচুগোপালকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা বলতে পারেন, এখানে বাঙালিদের আস্তানা আর কোথায় আছে?’
পাঁচুগোপাল বললো, ‘সব জায়গায় আছে, কেন?’
বললাম, ‘আমাকে একটা আশ্রয় খুঁজে নিতে হবে তো!’
‘কেন? তুমি ওই ক্যাম্পে থাকবে না?’
বললাম, ‘কী করে থাকবো বলুন? বলেছিলাম, একটা রাতের জন্য থাকব, আজকে আমাকে নতুন জায়গা দেখে নিতে হবে।’
পাঁচুগোপাল বিস্মিত ব্যাকুল চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। বললো, ‘ও, এতক্ষণ ধরে মনে মনে এই সব মতলব ভাঁজা হচ্ছিল? চলে যাবে বলে বুঝি সব বলছিলে আমার সঙ্গে?’
হঠাৎ করুণ হয়ে উঠলো পাঁচুগোপালের মুখ। এখনো বুঝতে পারলাম না তাকে। বুঝতে পারলাম না মানুষটির সঠিক ধাত। এই একরকম, তার পরেই আর একরকম। কালকেই এই মানুষই আমাকে তাড়াবার জন্য কী না করেছে। সেকথা এখন মনে করিয়ে দিয়ে লাভ নেই। ভেবেছিলাম, পাঁচুগোপালের অপমানের শোধ তুলব। কিন্তু যার শোধ তুলব, তার শোধবোধ কোনোটারই বালাই নেই। সে চলে নিজের হৃদয়াবেগে। হৃদয়াবেগে চলার মানুষের সুখের চেয়ে দুঃখ বেশি। সে-দুঃখ কেউ কেউ রোধ করতে পারে না। কিন্তু নিজে সে সেই দুঃখের বিষয়ে সচেতন নয়। আসলে পাঁচুগোপাল আমাকে কাল অপমান করেনি। ওটাও তার হৃদয়াবেগেরই একটা ঘটনা মাত্র।
পাঁচুগোপাল বললো, বললো খুবই ঠাণ্ডা গলায়, ‘ওখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য কে তোমাকে মাথার দিব্যি দিয়েছে?’
বললাম, ‘দেয়নি। কিন্তু প্রহ্লাদবাবুদের ক্যাম্পটা তো আমার ছেড়ে দেওয়া উচিৎ।’
পাঁচুগোপাল ঈষৎ চটল। বললো, ‘তোমার মাথা। যেখানে উঠেছ, কপালগুণে উঠে পড়েছ। একবার যখন বুড়ি তোমাকে ঠাঁই দিয়েছে, তখন আর ফেরাবে না। তাড়াতাড়ি গিয়ে বুড়ির হাতে খোরাকির পয়সা গুঁজে দাও তো! তোফা খাবে আর বেড়াবে। নইলে মরবে।’
বলে, আপন মনে বললো ফিসফিস করে, ‘এ লাইনে পয়লা হাতে-খড়ি কিনা, তাই এখনো সব ফালতু কথা নিয়ে—’
তবু ভাবছিলাম। শীতের বেলা। দেখতে দেখতে বেলা অনেকখানি বেড়ে উঠেছে। বেলা বাড়ছে আমার। মেলার কোনো বেলা নেই। মেলায় কলরব ও চিৎকার, যাওয়া-আসার শেষ নেই। ভাবছিলাম, প্রাণভরে দু’দিন ঘুরব। কত ঘোরা আমার এখনো বাকি। কত কিছু বাকি। কিন্তু ওই ক্যাম্পে থেকে আমার মনের সুখটুকু, শান্তিটুকু যাবে না তো!
কী ভেবে পাঁচুগোপাল দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো আমার দিকে। বললো, ‘দ্যাখ, একটা কথা বলব?’ গলায় আবার তার খ্যাপামির আভাস। বললাম, ‘বলুন।’
গলা আর একটু চড়িয়ে বললো, ‘তোমার মতো দেখতে ওরকম ছেলে ভালো হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু তুমি যদি চলে যাও, তাহলে সত্যি বলছি, মনে বড় দুঃখু পাব। এই বলে দিলাম।’
বলে, যেমন দ্রুত ঘুরেছিল, তেমনি দ্রুত মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো সে। দাঁড়িয়ে বোধ হয় উৎকর্ণ হয়ে রহলো।
ব্যাপারটা বড়ই হাস্যকর। কিন্তু হাসতে গিয়ে পারলাম না হাসতে। হাসিটা ছুটে আসতে গিয়ে খচ করে আটকে রইলো বুকের মাঝে।
ওই ভঙ্গিতে তাকে এখন যে দেখবে, সে-ই হাসবে। তাই তো হয়। পাঁচুগোপাল তার দুঃখ দিয়ে পরকে হাসায়। ওটাই পাগলের বিড়ম্বনা। মানুষ জ্বলে-পুড়ে পাগল হয়। আমরা পাগল দেখে হাসি। বিশ্বের নিয়মটাই এমনি বিচিত্র।
সেই বিচিত্রের মতোই, পাঁচুগোপালের বিচিত্র মনের গতি কখন এক সময়ে আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বোধ হয় বন্ধুত্ব পেতেছে, পেতেছে মন। ভালোবেসেছে। হৃদয়াবেগের গতিই এমনি।
আসলে বোধ হয় আমাদের মতো ছেলেমেয়েদেরই সে ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। কে জানতো, পাঁচুগোপালের মতো মানুষের সঙ্গে এখানে দেখা হবে। কে জানতো, গলা চড়িয়ে সে আবার বলবে, ‘তুমি চলে গেলে দুঃখ পাব।’ বলে ছেলেমানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে মুখ ঘুরিয়ে। যে অমনি করে বলে, তাকে ছেড়ে গেলে মনের মধ্যে অশান্তি হবে।
বললাম, ‘তাহলে চলুন, যাওয়া যাক।’
পাঁচুগোপাল মুখ ফেরাল না। আড়চোখে দেখলো। দেখে ধীরে ধীরে হাঁটা ধরল।
একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিলাম। নিল না। বললো, ‘ওতে কিছু হয় না। দেও তো দু-আনা পয়সা দেও, একটু নেশা করি।’
বুঝলাম, গাঁজা কেনা হবে। কিন্তু এখানে কোথায় পাওয়া যাবে? দু-আনা পয়সা দিলাম
তাকে।
এদিক ওদিক দেখে, পাঁচুগোপাল একটি সাধুকে ডাকলো, ‘হোই বাবা। ‘
সাধু দাঁড়াল। ভিড়ের ঠেলাঠেলি। বেচারি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেয়া বেটা?’ পাঁচুগোপাল বললো, ‘থোড়া ইধার কৃপা কর বাবা।’
সাধু এলো। পাঁচুগোপাল পয়সা দু-আনা তাকে দিয়ে বললো, ‘থোড়া সপ্তমী কৃপা কর বাবা। অব শহর যানা বহুত মুশকিল।’
সাধু একবার সংশয়ান্বিত নজরে তাকালো আমার দিকে। আমি ভাবছিলাম, সপ্তমীটা আবার কী বস্তু!
সাধু জিজ্ঞেস করলো পাঁচুগোপালকে, ‘কৌনা জমাত?’
পাঁচুগোপাল জবাব দিল, ‘অব ঘর কি জমাত বাবা। চুঁড়তে হ্যায় গুরু। পহলি গুরুকে ছোড় দিয়া।’
সাধু জিভ দিয়ে করুণা ও আক্ষেপসূচক ধ্বনি করে বললো, ‘বিষ্ণু ব্রহচারীকে আশ্রমমে ভেট কর বাবা। গুরু মিল যায়েগা।’
বলে, পয়সা দু-আনা নিল। ঝুলি হাতড়ে বের করে দিল ছোট্ট একটি পুরিয়া। তারপর নমস্কার করে চলে গেল আবার।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সপ্তমীটা কী?’
পাঁচুগোপাল বললো, ‘মহাদেবের ধূমপান। যার নাম গাঁজা। অনেক সাধুদের মধ্যে গাঁজাকে ওই নামে ডাকা হয়।’
বলে পাঁচুগোপাল বিকৃত মুখে বললো, ‘হুঁ, এবার গুরু ধরবো ওর বিষ্ণু ব্রেষ্মচারীর আশ্রম! বলে, কত হাতি গেল তল, মশা বলে কত জল! ভাগ ভাগ।’
ব্যাপারটি সব বুঝলাম না। জিজ্ঞেস করবো ভাবলাম। পাঁচুগোপাল তখন গাঁজা তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছে।
প্রায় পনেরো মিনিট হেঁটে আবার সেই ক্যাম্পে এসে হাজি হলাম। রান্না খাওয়া, মাইকের ধর্মোপদেশ, সব মিলিয়ে আশ্রম একেবারে জমজমাট।
প্রহ্লাদ কোত্থেকে ছুটে এসে বললো, ‘ও বাবা, তোমরা বেড়ে ডুবে ডুবে জল খাও, শিবের বাবাও টের পায় না। আর আমি শালা মুখ চোকাচ্ছি তখন থেকে। খুব তুমি যা হোক ডাক্তার খুড়ো।’
প্রহ্লাদের কথাটা ঠিক অনুমান করতে পারলাম না। ডুবে ডুবে জল খাওয়ার মতো পাপ তো কিছু করিনি। যা করেছি, তা বিশ্ব-সংসারের মতে শিবের বাবাও জানেন বৈকি।
পাঁচুগোপাল ধমকে উঠলো, ‘মাকড়া। কোথাকার কাকে কী বলছিস! ছেলেটা আমাকে দু আনা দিল, তাই দিয়েই তো—’ বলে পাঁচুগোপাল মুঠো খুলে দেখিয়ে দিল পরমবস্তুটি।
প্রহ্লাদ আনন্দে পেল্লাদ হয়ে উঠলো। বললো, ‘মাইরি! ওর চলে না বুঝি? তাই বল। আমি যে এদিকে হেঁপ্পে মরছি খুড়ো তোমার জন্যে।
পাঁচুগোপাল হাত পেতে বললে, ‘কই, দেখি, আগে আসল চীজটি বার কর দিকিনি।’
বলতে না বলতে প্রহ্লাদ কয়েক আনা পয়সা তুলে দিল পাঁচুগোপালের হাতে। পয়সাগুলি পকেটে রেখে পাঁচুগোপাল বললে, ‘চলে আয় আমার সঙ্গে।
প্রহ্লাদের আনন্দ আর ধরে না। পাঁচুগোপালের পেছনে পেছনে চললো ঘাড় উঁচিয়ে। বুঝলাম, ওদের দু’জনেরই এখন অন্য কিছু ভাববার সময় নেই। আমি তো দূরের কথা। ফিরেও তাকালো না। ওতেই আনন্দ। মুঠোয় আছে প্রাণের সার। আর কিছু চাই নে।
কিম্ আশ্চর্য! নেশা নয়, পাঁচুগোপালের কথাই ভাবছি। ভাবতে গিয়ে হাসিও পেল। হাসি নয়, হাসির নামান্তর। নিজের কথা ভেবে কাউকে করুণা করতেও লজ্জা পাই। হাসিটা দুঃখের!
সবাই আমরা মনের মতো বস্তুটি খুঁজছি। মনে মনে খ্যাপা আমরা সবাই। আমাদের রকমারি বিচিত্র বেশ। পাঁচুগোপাল গাঁজা নিয়ে মাতামাতি করছে, যেন ওই ছাড়া আর কাম্য ধন নেই। কখন দেখবো, সব ফেলে চেঁচামেচি হাঁকডাক করে একই মাথায় করে তুলছে সারা কুম্ভমেলা। কিন্তু সবটাই উপরের জিনিস। মনটা কে দেখে!
হেসে ফিরতে গিয়ে দেখি কালকের সেই গেরুয়াধারী। পাঁচুগোপাল যাকে সঙ্গে করে এনেছিল। মন চমকালো। ফাঁড়া কেটেছে কিনা কে জানে! পাঁচুগোপাল তো ঠেকিয়ে দিয়ে গেল।
গেরুয়াধারী বললো, ‘হাসছেন যে?’
বললাম, ‘পাঁচুগোপালের কথা ভেবে।’
গেরুয়াধারী হেসে বললো, ‘আপনার সঙ্গে ওর আলাপ হয়ে গেছে নাকি?’
বললাম, ‘একরকম।’
গেরুয়াধারী হাসলো রহস্যের হাসি। বললো, ‘একরকম তো বটে। কী রকম সেটা বলুন।’
বলে, চোখাচোখি হতেই হেসে উঠলো সরবে। নিজেই বললো আবার, ‘থাক, আপনাকে বলতে হবে না। আন্দাজই করা যাচ্ছে। ও আমাদের কাশীর আশ্রমে এক নাগাড়ে তিন বছর ছিল এক সময়ে। তখন সাধু হয়েছিল। জ্বালিয়ে খেয়েছে আমাদের সবাইকে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন বলুন তো?’
সন্ন্যাসী বিস্মিত হয়ে বললো, ‘ও তো পাগল। বদ্ধ পাগল। আমাদের মোহান্তকেই মারতে গেছল। কোনো কোনো সম্প্রদায়ের কিছু কিছু গুহ্য কর্তব্য করণীয় আছে তো! সেগুলো ও সহ্য করতে পারত না। সাধুদের উপরও ও খুব চটা জানেন তো?’
হবে হয়তো। কিন্তু সেরকম কোনো কথা শুনি নি তার মুখে। কোনো জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইলাম পাঁচগোপালের চলার পথের দিকে। সত্যি, বদ্ধ পাগলই বটে।
গেরুয়াধারী বলে উঠলো, ‘অবশ্য কালকে ওর কথাতেই আপনার কাছে আমাকে আসতে হয়েছিল। যাই হোক, ওগুলো আমাদের কর্তব্য তো!’
তাড়াতাড়ি বললাম, ‘তা তো বটেই।’
সে আবার বললো, ‘তা ছাড়া, আশ্রমে আপনাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে আমার নজর রাখাও কর্তব্য। অর্থাৎ duty। আমি একাধারে এ আশ্রমের হিসাবী, অথাৎ মুহুরী। আর একাধারে কোতোয়াল। বলতে পারেন ম্যানেজার।’
শুনে কৌতূহল হল, জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের আবার এসবও আছে নাকি?’
‘নেই?’ভ্রু তুলে বললো, ‘কী নেই বলুন! একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে যা যা দরকার আমাদের সবই আছে। সব পাবেন এখানে। যা চাইবেন। অফিস চালাতে হলে অফিসার ম্যানেজার চাই, কেরানী চাই। সংসার চালাতে নিয়মের দরকার নেই? দরকার নেই নিষ্ঠার? আশ্রমেরও তেমনি নিয়ম আছে বৈকি। বিশেষ, বাইরে যখন আমরা জমায়েত হই। মোহান্তর নিচে আছে পূজারী, কুঠারী, কারবারী, হিসাবী, কোতোয়াল, ভাণ্ডারী, পাহারাদার, তুরীবাদক। কত কি! নইলে কি মনে করেছেন, এত বড় ব্যাপারটা আপনি আপনি হচ্ছে?
তা তো নয়-ই। কিন্তু এত সব জানতাম না। বাঙলাদেশের কোনো কোনো আশ্রমে আধুনিক নিয়মকানুনের ব্যবস্থার কথা শুনেছি। কারণ, ধর্মের গণ্ডি ছেড়ে সেখানে তাদের গতি সমাজের বুকে। কিন্তু সন্ন্যাসীর আবার এত নিয়ম কানুন কীসের! এ যে জমিদারী সেরেস্তা চালানোর ব্যাপার।
সন্ন্যাসী ব্যাখ্যা করে চললো কার কী কাজ। ভাণ্ডারী দেখবে ভাণ্ডার, পাহারাদার দেবে পাহারা। মনে হচ্ছে বুঝি, এখানে কোথায় কী ঘটছে কেউ জানে না। সব নখদর্পণে আছে। পাহারাদার নজর রেখেছে কড়া। একটু এদিক ওদিক হলে ধরবে এসে চেপে। খোয়া যাবার উপায় নেই কিছু। টাকাপয়সা? সব জমা আছে কারবারীর কছে। কারবারী হলো আশ্রমের ক্যাশিয়ার। টাকা দিচ্ছে নিচ্ছে, হিসাব রাখছে মুহুরী। একটি আধলা এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই। মায় গাঁজা-সুখার হিসাবটি পর্যন্ত। হাতে নিয়ে ডললাম, হাঁক দিলাম আর কলকে ফুঁকলাম, তা নয়। যে যা পাচ্ছ, আগে জমা দাও। তারপর নিজের পাওনাটি নিয়ে ভোগ কর। তুমিও শিব, আমিও শিব। তাহলে আর কি! এসো সবাই মিলে ন্যাংটা হয়ে নাচি। উঁহু! সেটি চলবে না। আইন মেনে চলতে হবে সবাইকে। সন্ন্যাসী তো সকলেই। যে আইন দেখে আর আইন মানে। পূজারী রয়েছে। সময়মতো নিয়মমতো পুজো কর আগে। হ্যাঁ, অন্যায় অপরাধ আছে বৈকি! বিচার হয়। সবাই মিলে যে পঞ্চায়েত তৈরি হয়েছে, সেই পঞ্চায়েত বিচার করে। বিচারকর্তা মোহান্ত বলতে পারো। ওখানে বড় একটা কারুর হাত চলে না। বিচারে সাজা হয়। কতরকম সাজা আছে। জেল ফাঁসি দড়ি কেন? সন্ন্যাসীর সাজা তার চেয়েও কঠিন। কালে বুঝবে না। সাজা মানলে ভালো। নইলে বহিষ্কার! সন্ন্যাসী-জীবনের দফা গয়া। বেরিয়ে গেল তো সে মরে গেল। মৃতের সমান। তার কাজের দায় আর নিচ্ছে কে? অধিকার? সমানাধিকার? ওই কথাটা নিয়েই দেশে আজকাল বড় বাদানুবাদ, হ্যাঁ, তাই তো। যার যেমন, তার তেমন। গুণ বুঝে কদর। কাজ বুঝে দাম। আমি নারকেল গাছ। উঁচু হয়ে মাথা তুলেছি আকাশে। ফল দিই ডাব আর নারকেল। সে এক রস। ঝাপা-ঝোপা ছোট্ট আমগাছাটি দেয় আম। নিংড়ে খাও। সে আর এক রস। যারটি যেমন, তারটি তেমন বলবো। পেয়ারাকে জামরুল বলে খেলে তুমিই ঠকবে। কাজে কুঁড়ে, ভোজনে দেড়ে আর ছাই মেখে জটা নেড়ে সবার উপর তম্বি করে বেড়াবে, সেটি হচ্ছে না। তার কোন অধিকার নেই। সমান অসমান, কোনোটাই নয়।
বলে কী, এ তো দেখছি সংসারের কথা! সমাজের কথা। এই থেকেই আসে রাষ্ট্রের কথা। বললাম, ‘আপনাদের আবার এত নিয়ম কানুন কীসের! ওসব তো আমাদের। সাধারণ মানুষের।’
‘নিয়ম কানুন থাকবে না কেন? বিশ্বের নিয়ম কানুন আছে। দিন হয়, রাত্রি হয়, ঋতু বদলায় সবই সেই নিয়মের মধ্যে। মাস গেলে রোজগারটি করতে হলে, মুখে ভাত গুঁজে ছুটতে হয় না অফিসে? সকাল হলে ঝাঁপ খুলতে হয় না দোকানের? খালি অ্যালাকাড়ি বুঝি ভগবান পাওয়ার বেলায়? সেখানে আইন-কানুন নেই বুঝি? ওটা হলো ফোকোটিয়া, না? তা হবে না।’
‘কিন্তু আমরা তো জানি, সিদ্ধপুরুষেরা ভাবভোলা। সময়জ্ঞান রহিত। কখন কী করেন আর কখন কী বলেন, অন্য মানুষের তো বোঝার উপায় নেই।’
সন্ন্যাসী হাসল। হেসে বললো, ‘সিদ্ধপুরুষ? সে ক’জনা? এই যে দেখছেন, এত বড় কুম্ভমেলা আর দেশের তাবৎ সাধু সন্ন্যাসী যোগী, এর মধ্যে কার সিদ্ধিলাভ হয়েছে, কে বলতে পারে! যার হয়েছে তাকে কে চিনতে পারবে? সে যে কী বেশে, কী রূপে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কে বলবে? তার নিয়ম নেই? তার নিয়মের যে চারা নেই। এই বাহ্যিক জগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ কতটুকু? নিয়ম তার অন্য লোকে, অন্যখানে। সে-নিয়মের সুতোকাঠি কে দেখতে পাবে? তার যে চলতে নিয়ম, নিয়ম খেতে-বসতে।’
বলতে বলতে দিব্যি হাসি-মুখ সন্ন্যাসী গম্ভীর হয়ে উঠলো। চোখের দৃষ্টি তার স্বাভাবিক হয়েছে বলে মনে হলো না। হাত-জোড় করে আপন মনেই বলে চললো, যেখানেই থাকো, এখানে তাকে আসতে হবে। মাঘ মাসের প্রয়াগ ছেড়ে তার কোথাও যাবার উপায় নেই। কিন্তু কে চিনতে পারবে! যে মোহান্তের সঙ্গে বছরের পর বছর ঘুরে বেড়াচ্ছি, হয়তো উনিই সেই মানুষ। দত্তাত্রয়ের পাদুকা-পূজারী হয়তো ছদ্মবেশে ঘুরছে আমারই সঙ্গে সঙ্গে। কে জানে-–’
বলে, আমার দিকে চেয়ে এবার অদ্ভুত হেসে বললো, ‘এমন প্যান্ট পরে আর অলেস্টার গায়ে দিয়ে তিনি হয়তো দিব্যি ভদ্রলোক সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কি করে জানবো!’
আজ ভোরবেলা অবধূতের মুখেও যেন এমনিধারা কথাই শুনেছি। সিদ্ধিপ্রাপ্ত সাধক ভগবান কখন কোন্ বেশে তার সামনে দিয়ে চলে যাবে। খ্যাপা খুঁজে খুঁজে কখন পরশ পাথরটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যাবে নদীর জলে। এমনি একটি বিশ্বাস যেন এদের সকলের মনে রয়েছে। সেই বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে একটি বিচিত্র আবেগ ও ভক্তি। তাই, ওই কথা বলতে গেলেই ভক্তি ও বিশ্বাসের আবেগে সে হঠাৎ অন্য মানুষ হয়ে ওঠে। এখানে আমার বক্তব্য ও মন্তব্য, ও দুই-ই নিষ্প্রয়োজন।
সন্ন্যাসী নিজেই আমায় পরিষ্কার গলায় বললো, ‘যাক, ওসব কথা পরে এক সময় হবে। বিকেলে রামজীদাসী আসছেন। কোথাও যাবেন না যেন।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি কে?’
‘সে কি, রামজীদাসীর কথা শোনেন নি? তিনি একজন সাধিকা। আমাদের মাইকে তো অনেকবার বলা হচ্ছে আজ সে কথা। তিনি প্রতিদিন এক-একটি আশ্রমে ঘুরে বেড়াবেন। খবর পাঠিয়েছেন, আজ এইখানে আসবেন। তিনি হিমাচল প্রদেশের মেয়ে। এলে বুঝতে পারবেন সব। আপনার আর দেরি করাব না, অনেক বেলা হলো।’
বলে, যাবার উদ্যোগ করে ফিরে দাঁড়ালো আবার। বললো, ‘আপনার তাঁবু চিনতে পারবেন তো?’
পারবো না কেন, তাঁবুর সারির দিকে ফিরে তাকালাম। সর্বনাশ! তাই তো, সবই একরকম দেখতে, আর একেবারে গায়ে গায়ে। বেরিয়েছিলাম রাত্রি থাকতে। কোনখান থেকে বেরিয়েছিলাম মনে থাকার কথা নয়। তা ছাড়া এমনিতে বোঝা মুশকিল। সেই রেল কলোনির ব্লকের মতো, না চিনে খালি পরের বাড়ি উঁকিঝুঁকি। নির্দোষকে শুনতে হয় কটুক্তি।
আমার বিভ্রান্তি দেখে গেরুয়াধারী হাসলো। গেরুয়াধারী নয়, কোতোয়ালই বলা যাক। বললো, ‘কেমন, ঠিক ধরেছি তো? অবশ্য দু-একদিন গেলে ঠিক চিনতে পারবেন। তবে প্রথম প্রথম বড় অসুবিধা হয় নিজেই বুঝি। তবে তার দরকার হবে না। ওই যে তাঁবুটা দেখছেন, একটি বুড়ি বসে আছে, তার ডানদিকের তাঁবুটা আপনাদের। দেখবেন, খড়িমাটি দিয়ে হিন্দিতে লেখা আছে বারো নম্বর।
হেসে বললাম, ‘সত্যি, আপনি না বললে ভারি বিপদে পড়তাম। কিন্তু একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করব।’
‘করুন।’
‘আপনি কি বাঙালি?’
কোতোয়াল হাসলো। হাসিটি সব সময়েই একটু অর্থবোধক। বললো, ‘এটা কি খুব বড় কথা? তবে হ্যাঁ, আমি বাঙালি। জন্মেছিলাম বাঙলাদেশেই। দেখুন, মানুষের জিজ্ঞাসার অন্ত নেই, আর অন্ত নেই জবাবের। আমি হয়তো আপনাকে সব কথার জবাবই দিতে পারবো না।’
বলে, হেসে চলে গেল কোতোয়াল। অদ্ভুত ভদ্র তো লোকটি! প্রশ্ন না করার অভিপ্রায় জানিয়ে গেল হাসতে হাসতে।
ওদিকে মঞ্চের উপর মোহান্ত। তার পাশে বসে গায়ক ধরেছে গান। গলা মিলিয়েছে তানপুরার সঙ্গে। একটি করে গান হয়। গানের শেষে মোহান্ত উপদেশ দান করেন, ধর্মের কথা শোনান।
ভিড়ও হয়েছে কম নয়। অধিকাংশই এই আশ্রমের নরনারী নয়। যেখানে হোক ছুটে ছুটে এসে বসেছে সবাই। কোথাও বসে কিছুক্ষণ ধর্মের গীত ও বাণী শোনা নিয়ে কথা। এর মধ্যেই চলেছে দেখছি নানান গল্পগুজব। সামনেই দাঁড়িয়ে হেসে জটলা করছে জনা পাঁচ-ছয় পাঞ্জাবী মহিলা। পায়জামা, পাঞ্জাবি আর ওড়নার রঙ রূপে একগোছা ফুলের মতো রয়েছেন ফুটে। কীসের কথা, বুঝি নে। হাসিতে বাজছে শত নূপুরের রিনিঝিনি। তাই দেখে কয়েকজন মহিলা রয়েছেন চোখ বাঁকিয়ে। ভাবখানা, হাসতে হয় বাইরে গিয়ে হাসো, এখানে কেন?
কয়েক বিঘা জুড়ে আশ্রমের পরিধি। কতকগুলি অপোগণ্ড দিব্যি চালিয়েছে ছুটে ছুটে খেলা। ধরাধরি আর পাকড়াপাকড়ি। তাদের হঠাৎ-হাসির ঝলকে চমকে তুলছে আশ্রমের গুরুগম্ভীর জমায়েত ও পরিবেশ। এদিকে বাতাসে ভাসছে ঘিয়ের গন্ধ। তারই সঙ্গে সঙ্গে যেন বাঙলা রান্নার ফোড়নের পরিচিত গন্ধটিও নাকে এসে লাগছে।
তাঁবুর সামনে এসেও ভাবনা। আধাআধি বখরা। কোন্ দিকেরটি? বোধ হয় বাঁ দিকেরটিই। সামনে পর্দার মতো ক্যাম্বিসের ঢাকনা। তুলে দেখবো হয়তো অন্য লোক।
তুলে দেখলাম, সত্যি তাই। হাঁটু মুড়ে বসে একটি ছোট মেয়ে। বোধ হয় বাঙালি। ফ্রকের ওপর গাছকোমর করে বাঁধা রঙিন তাঁতের শাড়ি। ঘাড়ের কাছে ঝুলছে বাসি বিনুনি। কিছু একটা গালে পুরে, গাল ফুলিয়ে দিব্যি চিবুচ্ছে আর মাথা নেড়ে নেড়ে গুনগুন করছে। এক মুহূর্তের ব্যাপার। নজরটা তীক্ষ্ণ করলাম। সিঁথিতে সিঁদুর রয়েছে মনে হলো। আর মনে হওয়া! মনে হতে না হতেই মেয়েটি অস্ফুট চিৎকারে একেবারে লাফ দিয়ে উঠল। তড়িঘড়ি করে খুললো গাছকোমর। বাঁধা আঁচল খুলেই মাথার উপর টেনে একেবারে কলাবউ! কোল থেকে ছড়িয়ে পড়লো একরাশ টোপা টোপা বিলিতি কুল।
ছি ছি ছি, আমারই ভুল। বালিকা যে আমাদের পেল্লাদের পরিবার। লজ্জার চেয়ে হাসি পেল বেশি। তার চেয়ে বেশি বিস্ময়। এক ফোঁটা মেয়ের সর্বাঙ্গে এ লজ্জা এলো কেত্থেকে! অন্য দেশের মেয়ে কেন, আজ নিজের দেশের এমনি মেয়েরাই তো এ বয়সে বই-শ্লেট নিয়ে দিদিমনির দারস্থ হয়। অবশ্য পুতুলরূপী পুত্রকন্যাদের বিয়ের ভাবনায় এখন থেকেই ভাবী শাশুড়ী হওয়ার মক্শ করা হয়। দিব্যি মাথার উপর বউ দিয়ে, অর্থাৎ ঘোমটা টেনে বউ বউ খেলা হয়।
কিন্তু এ যে সত্যি বউ! মাথায় উঠলো কুল খাওয়া। পরপুরুষের সামনে এ যে রীতিমতো লজ্জাবতী বাঙালি বধূ। কালকেও দেখেছি। কিন্তু শাড়ির আড়ালে প্রহ্লাদের পরিবারটি এত ছোট, তা অনুমান করতে পারিনি। শত হলেও পরস্ত্রী। ইচ্ছে হলেও কী করে বলি, খুকি, কুল কটা খেয়ে নাও। খুকি বলা দূরের কথা, তুমি করে বলাটাই সমীচীন কিনা বুঝতে পারছি নে।
কিন্তু বেচারা এমন জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছু না বলাটাও ঠিক নয়। আহা, ছড়ানো টোপা কুলগুলোও বালিকার আঁচলহারা হয়ে বিষন্ন হয়ে উঠেছে।
না, অত আর অগ্রপশ্চাৎ ভাবা চলে না। বললাম, ‘কুল কটা কুড়িয়ে নাও।’
বলার অপেক্ষা মাত্র। অমনি ছোট্ট হাত বাড়িয়ে টুকটুক করে আঁচলজাত করলো কুলগুলি। করেও আবার দাঁড়িয়ে রইলো তেমনি।
বললাম, ‘এবার খাও। আমি ততক্ষণ জামা কাপড় ছাড়ি।’
বলে, ওভারকোটটা খুলতে গিয়ে দেখি, বালিকা ঘোমটার আড়াল থেকে দিব্যি পিটপিট করে দেখছে আমার দিকে। বোধ হয় যাচাই করা হচ্ছে আমাকে। চোখাচোখি হতেই আবার আড়াল হলো মুখ।
মনে মনে ভারি হাসি পেল। ওভারকোট ছেড়ে জামা খোলবার উদ্যোগ করছি। ভাবছি, প্রয়োজনীয় দু-একটি কথা জিজ্ঞেস করবো কিনা একে। ভাবতে ভাবতেই এক অভাবিত ব্যাপার।
প্রহ্লাদের পরিবার ফরফর করে বাইরের পর্দার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ ঘোমটার আড়াল থেকেই ঝাঁজমিশ্রিত বালিকা কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘কোথায় যাওয়া হয়েছিল। দিমা আসুক, দেখাবে’খনি।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই সে একেবারে অদৃশ্য। বিস্ময়ে আমি জিভটা কামড়ে ফেললাম কিনা সেটুকুও মনে নেই। এ যে বিনা মেঘে বজ্রপাত! জামা খোলার উদ্যোগ করে যেমন দাঁড়িয়েছিলাম, দাঁড়িয়ে রইলাম তেমনি। আমাকেই বললো তো! রীতিমতো শাসন! শাসন নয়, ঝগড়া ঘোষণা করে গেল। আর আমি কোথায় ভাবছি, ঘোমটা-ঢাকা এক লজ্জাবতী বালিকা মাত্র। কুলের শোকে কেঁদে না ফেলে। সে যে এমনিধারা মুখ ঝামটা দিতে পারে কে জানতো! বাইরে মাইকে ব্যাখ্যা হচ্ছে মাণ্ডুক্যোপনিষদ। আর আমি একলা এই তাঁবু কোটরে পাগলের মত হেসে উঠলাম। কুম্ভমেলায় এমনি এক বাঙালি গিন্নিও যে আছে, তা কি কেউ জানে।
একটু পরেই দেখি যে, আবার এসে হাজির। ঘোমটার আড়াল আছে ঠিক তেমনি। এসে ছোট্ট একটি তেলের শিশি রাখল আমার সামনে। রেখে বসল গিয়ে আবার নিজের জায়গায়। যেখানে বসেছিল আগে। বসার পর ঘোমটার আড়াল থেকে শাসানির সুর শোনা গেল, ‘তাড়াতাড়ি নেয়ে এসো। দিমা বলে দিয়েছে। নইলে দেখবে’খন।’
সত্যি আর দেখাদেখির দরকার নেই। কিন্তু তেল মাখব কী করে? তীর্থক্ষেত্রে তো তেল সাবান মাখা বারণ। বললাম, ‘তেল দিলে কে? দিদিমা?’
এক মুহূর্ত চুপ। তারপর একটু চাপা গলা শোনা গেল, ‘না। আমিই এনেছি। চটপট নাও। নইলে দিমা আমার মুণ্ডপাত করবে।’
লুকিয়ে তেল এনেছে! এতখানি দয়া সুবুদ্ধি তার হয়েছে! প্রহ্লাদের পরিবারটি দেখছি শুধ কাঁচা নয়, হৃদয়টি তার রীতিমতো কাঁচামিঠের স্বাদে অপূর্ব। এরপর বালিকা বলে অবজ্ঞা করব তেমন সাহস আমার নেই।
নির্দেশ মাত্র খালি গায়ে বসে গেলাম তেল মাখতে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘দিদিমা কী করছে?’
বালিকার মেজাজটি সব সময়েই যেন চড়ে আছে। বললো, ‘কী আবার করবে, রান্না করছে। তোমাদের মতো তো নয় যে, খালি টো-টো করে বেড়াবে।’
বলার পরই কটাস করে একটি শব্দ উঠলো ঘোমটার মধ্যে। বুঝলাম, একটি ডাঁশা কুলে কামড় পড়ল।
কিন্তু এত ভর্ৎসনা কেন? বকুনিটা প্ৰহ্লাদকে নয় তো? মুখ দেখতে পাচ্ছি নে। কিন্তু বুঝতে পারছি, বালা গিন্নির চোখে-মুখে কথা! জবাব দিতে গেলে এঁটে ওঠা দায় হবে। শত হলেও ওই দিমার নাতবউ তো!
কিন্তু সত্য কোনটি? ওই ঘোমটা, না খর কণ্ঠের ধমকানি? বোধ হয়, উভয়ই। তা হোক, তবু শাসন আর ধমকানির রূপ কী বিচিত্র উপভোগ্য! বিচিত্রের সন্ধানে ফিরি। ঘরের কানাচে চারাগাছের পাতায় পাতায় যে বড় বৈচিত্র্য, তা তাকিয়েও দেখি নে। দেখতে জানি নে, তাই দেখি নে।
একটু বা ভয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার নামটি কী?’
অমনি কুল-পোরা মুখের ফোলা গাল নিমেষে দেখা দিল একবার। দেখা দিল দু’টি ডাগর চোখ। চোখে সেই বকুনির আভাস। ভাবখানা, বউ মানুষের আবার নামের দরকার কী?
তারপরেই ঘোমটার তল থেকে জবাব এলো, ‘কী আবার, ছিরিমোতি বেরজোবালা দেবী।’ অর্থাৎ শ্রীমতী ব্রজবালা দেবী। তাকে বালিকা, তবু ব্রজবালা বলে তো আর ডাকতে পারিনে তাকে! মনে মনে হেসে বললাম, ‘আচ্ছা, তোমাকে আমি না হয় বৌঠান বলেই ডাকব, কী বল?’
‘বৌঠান?’ বলে, বিস্মিত গলার অস্ফুট একটি শব্দ শোনা গেল। তারপরে হাসি। ফিকফিক করে হাসতে হাসতে একেবারে খিলখিল হাসিতে তাঁবু-কুটির চমকে উঠলো। বুঝলাম, কথাটি। ভারি খুশি করেছে তাকে। হাসতে হাসতে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললো, ‘আচ্ছা, বোলো।’
ইতিমধ্যে ঘোমটা উঠে গিয়েছে মাথার মাঝখানে। পরমুহূর্তে আবার অন্য ভাব! বেশ খানিকটা ঝুঁকে, চাপা গলায় চোখ বড় বড় করে বললো, ‘এখানে একটা ভীষণ কিপটে বুড়ি আছে, জানো? ঠিক পয়সা চাইবে তোমার কাছে। সকলের কাছে খেতে চায়। সব্বাই বলেছে, বুড়িটার অনেক পয়সা আছে। তুমি দিও না যেন!
‘তাই নাকি?’ গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘কখনো দেব না।’
ঘোমটাটি এবার ঘাড়ে নেমেছে। কিন্তু সেদিকে ব্রজবালার খেয়াল নেই। বোধ হয়, এতক্ষণে সে একটি সঙ্গী পেয়েছে। কথা তার এখনো শেষ হয়নি। আবার তেমনি চাপা গলায় বললো, ‘জানো, একটা খুব সোন্দর বউ এসেছে এখানে। কী চোখ, কী মুখ! আমার চেয়েও মাথায় বড় বড় চুল। সেই বউটা না, কারুর সঙ্গে কথা বলে না কেন জানো?’
থতিয়ে গেলাম প্রশ্ন শুনে। ‘অ্যাঁ? তা তো জানিনে।’
আমাকে অপ্রতিভ দেখে ব্রজবালার ঠোঁট দু’টি করুণভাবে উলটে গেল। বললো, ‘জানো না তো? তার স্বামী নাকি দশ বচ্ছোর আগে সাধু হয়ে বেরিয়ে গেছে। সেইজন্যে দেওরের সঙ্গে এখেনে এসেছে। এখেনে দেশের সব সাধুটাধু আসে কিনা, তাই এসেছে। যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাই।’
কে সেই নির্বাক সুন্দরী বউ, তাকে দেখি নি, জানিও নে কিছু। ‘তাই নাকি’ ছাড়া ব্রজবালাকে কী বলতে পারি! রীতিমতো সিরিয়াস হয়ে বললাম, ‘তাই নাকি?’
ব্রজর ছোট্ট মুখে কী বিচিত্র ব্যথিত বিস্ময়ের অভিব্যক্তি! বললো, ‘হ্যাঁ গো। আমি দেখেছি যে! আচ্ছা তোমাকে চুপিচুপি দেখিয়ে দেবখনি।’
চুপি চুপি সেই দেখাটা কতখানি বুদ্ধিমানের কাজ হবে জানি নে। আপাতত বলতে হলো, ‘আচ্ছা।’
কিন্তু ব্রজবালার কথা তখনো শেষ হয়নি। রামধনুর রঙের খেলা তার চোখে-মুখে এই একরকম। তারপরেই আর-একরকম। আচমকা তার মুখে ফুটল এক দিশেহারা ভয়ের চিহ্ন। বললো, ‘জানো, এখেনে বড় চোরের উপদ্দোরব।’
উপদ্দোরব নিশ্চয়ই উপদ্রব। ভাষাটাই একটা উপদ্রব বিশেষ। কিন্তু কী চুরি হলো ব্রজবালার? আমার ভাবনার ফাঁকে ব্রজ আবার হেসে কুটিপাটি। বললো, ‘জানো, আজ ভোর রাত্রে সবাই একটা চোরকে তাড়া করেছিল। মেয়েমানুষ চোর!’
মেয়েমানুষ চোর! কিম্ আশ্চর্যম্! এত গুঢ় সংবাদ ব্রজবালা কী করে সংগ্রহ করলো! এ হে রীতিমতো খবরের কাগজের রিপার্টোরের চেয়েও দুরূহ কাজ। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মেয়েমানুষ কী করে জানা গেল?’
ব্রজ কুলের বিচিটিকে এবার মুখ থেকে মুক্তি দিল। চোখ বড় করে বললো, ‘ওমা! সব্বাই বলছে। তা ছাড়া, সে যে আবার এসেছিল। দ্যাখো নি, পুবদিকের বেড়া অনেকটা ভেঙে ফেলেছে। সেখান দিয়ে সকালবেলা মাথা গলিয়েছিল। একজন দেখে ফেললো, তাই তো আবার পালিয়ে গেছে।’ তারপর গলাটি আরও চেপে বললো ব্রজবালা, ‘মেয়েমানুষটা নাকি খারাপ। ওকে ধরতে পারলে না—পুলিশে দিয়ে দেবে বলেছে, হ্যাঁ। ডবল সিরিয়াস হওয়া যায় কিনা জানি নে। আমি গলার স্বরটা অদ্ভুত রকম করে আবার বললাম, ‘তাই নাকি?’
ব্রজ তার ছোট্ট, সুন্দর মুখটি বেঁকিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ গো’
পরমুহূর্তেই ব্রজবালার চোখ দু’টি চকিত আগুনের ঝিলিকে জ্বলে উঠলো। বললো, ‘হ্যাঁ গো! সেই মেয়ে চোরটাকে আমি নিজের চোখে দেখিচি। খু-উ-ব সোন্দর। ধবধবে গায়ের রঙ। একজন নয়, ওরকম অনেক আছে। দিমা বলেছে, ওরা নাকি ছেলেও চুরি করে।’
চোখ কপালে তুলে বলতে হোল আমাকে, ‘সর্বনাশ।’ তারপর বললাম, ‘একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, ‘যাকগে, যার ছেলে নেবে তার ছেলে নেবে। তোমার তো ছেলে নেই।
ওমা? ব্রজবালার ঠোঁট ফুলে উঠলো অমনি ওই টোপা কুলের মতো। পাকা বউটি মতো টেনে দিল ঘোমটা। কী ভাগ্যি, মুখ ঢাকা পড়েনি। দুশ্চিন্তাভরা ডাগর চোখ দুটি তুলে বললো, ‘তা বলে ভাবনা নেই বুঝি? তোমার দাদা বলছিল, ওকেও নাকি চুরি করে নিয়ে যেতে পারে।’
আমার দাদা! মানে পেল্লাদ? তা, ব্রজবালাকে যখন বৌঠান বলেছি, প্রহ্লাদ আমার দাদা বৈকি! কিন্তু কী অকপট হৃদয় ব্রজর! কী অকুণ্ঠ বিশ্বাস! কী অপরূপ তার ভঙ্গি! কে বলবে, এ এক নাবালিকা বধূ! ভারি হাসি পেল। সাহস হলো না হাসতে। তা হলে অনর্থ ঘটবে না!
সত্যিই, পেল্লাদ তো শুধু বর নয়, ও যে ছেলেও বটে! ব্রজর খেলাঘরের ছেলে, ব্রজর আঁচল-চাপা ছেলে, হৃদয়-জোড়া ছেলে, ব্রজর সংসারের একমাত্র ছেলে। হলোই বা সে লিকলিকে কালো গঞ্জিকাসেবী। ব্রজবালার ছোট্ট বুকে ভাবনার অন্ত কোথায়!
কী বিচিত্র সংসার! আর ধন্য প্রহ্লাদের রসজ্ঞান। সে তার এ নাবালিকা প্রিয়াকে কী বলে এমন এক অসহায় ভাবনায় ফেলেছে!
বললাম, ‘তোমার অত ভাবনা কীসের? আমি তো আছি!
বুক ফুলিয়ে বলি নি। খালি গায়ে তৈল মর্দনে বুকটা এমনিতেই টান হয়েছিল একটু। কিন্তু ব্ৰজ বৌঠান তাতে ভরসা পেল বলে মনে হলো না। এক মুহূর্ত দেখলো আমাকে ঘাড় কাত করে। চোখে চাপা সংশয়। তারপর একটি টোপা কুলে কামড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘বে করেছ?’
হঠাৎ বিয়ের কথা! বললাম, ‘কেন?’
ব্রজবালা বললো, ‘আইবুড়ো ছেলেদের ভয়-ই তো বেশি, জানো না?’
জানি নে আবার! কিন্তু ব্রজও যে সেটুকু জানে, তা আবার আমি জানতাম না। দেখি যত, অবাক মানি তত। ব্রজর যৌবনের সোনার কুঁড়ির পাপড়ি এখনো দল মেলেনি। বহু সংসারে আগে-পাছে চোরাবালি। তার রকমই বা কত! সংসারের বোঝা মাথায় নিয়ে, সন্তর্পণে পা টিপে টিপে চলেছে বাঙলার চিরকালের যে মেয়েটি, সে মেয়েটি কিন্তু এর মধ্যেই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে ব্রজবালার মধ্যে। ফুলফলহীন লকলকে লাউ ডগাটির মতো। ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনা তার ওই চরিত্রের মধ্যে। সংসারের ফুল আর ফল চাপা আছে ওই চরিত্রের মধ্যে। চরিত্রই তো রূপ। ওই রূপ-ই তো চরিত্র। হাঁড়ি-কড়া-ঘর-পুরুষ ক্ষেত-খামার-মরাই-লক্ষ্মী, সব আগলে সামলে চলার সংগ্রামী প্রবৃত্তি। ওইটিই তো আদিম প্রবৃত্তি।
ব্ৰজ বালিকা! তা আমি জানি। তবু, সংসারের সব ভালোমন্দ বোঝার মধ্যে তার পাপ কোথায়? অকাল-পক্কতা? কিন্তু ওই দিয়ে তার সংসারের প্রথম পাঠ শুরু। দিদিমণির ক্লাসরুমে যে সে যেতে পারে নি, সেটা জাতির দুর্ভাগ্য। ব্রজর চেয়ে সরলা কে আছে! দিল্লি সেক্রেটারিয়েট থেকে ঘরামি পাড়ার পুরুষটি পর্যন্ত, ব্রজবালাদের না হলে যে সকল সংসারের ভিত-ই বালি আর বালি। ভিত গড়ার সেই বজ্র-আঁটুনি আঠাল মাটি কোথায়! ব্রজকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, ‘বিয়ের কথা বলছ? সে কাজটি আমি অনেক আগেই সেরে রেখে দিয়েছি। ওই মেয়ে-চোর আমার কিছু করতে পারবে না।’
বললো, ‘সত্যি বলছ?’
হেসে বললাম, ‘মিছে মনে হলো?’
ব্রজ গম্ভীর হয়ে বললো, ‘বলা যায় না। আজকালকার ছেলেরা তো এ বয়সে বে করে না। তোমাকে চোখে চোখে রাখা দরকার বাপু। কী জানি কী হয়! বলা তো যায় না!’ ব্রজর শঙ্কাব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে হাসি আর বাধা মানতে চায় না। মনে মনে বলি, বটে! সেই ভালো। এই মেলা জুড়ে খু-উ-ব সোন্দর চোর-মেয়েরা রয়েছে ছেলে ধরার ফাঁদ পেতে। তার মাঝে, ব্রজর চোখে চোখে থাকার চেয়ে নিশ্চিন্ততা আর কী থাকতে পারে!
তবু বললাম, ‘কেন, তোমরা বুঝি আজকালকার ছেলেমেয় নও?’
কোঁচড়ে তার অগুন্তি কুল। আর-একটাতে কামড় বসিয়ে গম্ভীর বালিকা বললো, ‘হলেই বা।’ তারপর মুখের কুলটি গালে আটকে রেখেই বললো চাপা গলায়, ‘তোমার দাদা তো ভালো মানুষ না। ব্যামোয় ভোগে তবু নেশা-ভাঙ করে। যদি আর কিছু করে, তাই দিমা আগে থাকতেই বে দিয়ে দিয়েছে। পুরুষ মানুষ তো!
পুরুষ মানুষ তো! ওই কলঙ্কটি আর আমাদের ঘুচল না। যেমন ওদিকে একটু মাথা বেড়ে উঠলো, দেখা দিল গোঁফের রেখা, আর অমনি আমরা উঠলাম মাথা ঝাড়া দিয়ে। দিবানিশি মন আনচান। গুমরে উঠছে বুকের মধ্যে, পরান যারে চায় তারে নাহি পায়। কোথা গেলে প্রাণসখী, দেখা দেও, এ পোড়া লয়নপথে। অচিরাৎ বাবা মা আর ঠাকমা দিমার দল বিস্মিত উৎকণ্ঠায় চমকিত। ওমা! ড্যাকরার যে মরণ ধরছে গো! ড্যাকরা, অর্থাৎ হাতে পায়ে বেড়ে ওঠা ডাগর ছেলেকে ওটি স্নেহের গাল। মরণ ধরেছে কীসের? না, মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান। অমনি একটি ব্রজবালাকে এনে ঘুরিয়ে দিল সাত পাক। ওই-ই হলো মরণ। ব্যাস, ড্যাকরার সব জারিজুরি খতম। তখন ব্রজবালা একাই একশো।
কথাটা আর নিছক সত্য না হোক, সত্য আংশিক। যুগে যুগে পালটাচ্ছে রূপ। কিন্তু মেয়েদের বেলা? সে তর্ক করবো কার সঙ্গে? প্রহ্লাদ অত বড় একটি প্রমাণ। ব্রজর কাছে হারমানা ছাড়া উপায় কী! তবু বললাম, ‘তা, সে আর কিছু করে না তো?’
দপ করে জ্বলে উঠলো বালিকা ব্রজ। ওইটুকু মেয়ে। খসা ঘোমটা, দোলানো বেণী। ডাগর চোখে চমক কী! যেন ধব্ধকে আগুন! এক ফোঁটা নীল বিষের মতো নাকছাবিটিও জ্বলে উঠল ঝিকিমিকি। কুল মুখে তুলতে ভুলে গেল। বললো, ‘করুক না একবার, দেখি।’ ব্রজর মূর্তি কী! ভয় ধরে গেল আমারই। ওইটুকু মেয়ের এত আত্মসম্মানবোধ! অনাচারে এত ঘৃণা! স্বাধিকার-জ্ঞান এতখানি?
মনে আমার হাসি বিস্ময়, দুই-ই। বললাম, ‘যদি করে?’
‘যদি করে?’ ব্রজ তাকালো তেমনি করেই। অসহায় রাগে বেঁকে উঠলো ঠোঁট। যেন টঙ্কার-দেওয়া ধনুকের ছিলা। আবার বললো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে, ‘ইস্। করুক তো!’
আমিও যেন খেলাচ্ছলেই বললাম আবার, ‘তবু যদি করে?’
ব্রজর চোখে রক্ত ছুটে এলো। তার সারা মুখে চকিত আলোছায়ার ঝিলিমিলি। নিশ্বাস দ্রুত। গলার শিরা থেকে ঠোঁট কেঁপে উঠলো থরথর করে। আচমকা যেন ফণা মেলল ফণিনী। বললো, ‘তবে চলে যাব।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায়?’
বলতে বলতেই দেখি, বালিকার দুই চোখে জলের ধারা। চাপা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বললো, ‘যেখানে মন চায়, চোখ যায়, চলে যাব সেখানে। ঠিক, হ্যাঁ।’
আমি চকিত লজ্জায় ও ব্যথায় এতটুকু হয়ে গেলাম। ছি ছি ছি। মনে মনে হেসে ফেলছিলাম। বালিকা ভেবে তার ছোট্ট হৃদয়টুকুর সঙ্গে পেতেছিলাম খেলাপাতি। কিন্তু সে, খেলা যে বালিকার এতখানি বাজবে, তা কে জানতো! আবার বলি—
জনম অবধি হম রূপ নেহারলু
নয়ন না তিরপিত ভেল।
বাল্যবিবাহের স্বপক্ষে আমার যুক্তি নেই। কিন্তু যে দেহলতায় ফোটে নি ফুল, তার হৃদিসায়রে ফুটেছে ভালবাসার পদ্ম। কে অস্বীকার করবে, বালিকা ভালোবেসেছে। ওই প্রহ্লাদ প্রাণেশ্বর হয়েছে ব্রজর। তাই এত রাগ, এত ব্যথা, এত কান্না।
নিজেকে ধিক্কার দিয়ে তাড়াতাড়ি বললাম, ‘ওকি, তুমি কাঁদছ কেন? আমি এমনি বললাম। তাই কি কখনও হয়? অমন সুন্দর বউ।’
জলভরা চোখেই ব্রজ আমাকে দেখলো একবার চকিতে, তারপর মুখ ফিরিয়ে মুছল চোখের জল। আমি হেসে আবার বললাম, ‘এঃ, তুমি ভারি ছেলেমানুষ বৌঠান। তোমার মতো বউকে কেউ ঠকাতে পারে?’
অমনি হাওয়া এলো, মেঘ গেল। আকাশ নীল ঝকঝকে। ব্রজর আলোকিত মুখে মিটিমিটি হাসি। লজ্জা পেয়েছে একটু একটু।
মনটা তার অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললাম, ‘তা কুম্ভমেলায় কেন এলে ছুটে?’
ব্রজ পরিষ্কার বললো, ‘ওর জন্য।’
ওর জন্য, অর্থাৎ প্রহ্লাদের জন্য। বললাম, ‘কেন?’
ব্রজ বললো, ‘দিমা বললে।’
‘কী বললে?’
ব্রজ একটু চুপ করে রইলো। হাত দুখানি এলিয়ে পড়েছে নিজের ছোট্ট কোলে। দু’টি ছোট ছোট শাঁখায় সোনালি প্যাঁচ, পাতলা নোয়া আর চুড়ি। আবার ঘোমটা দিয়েছে টেনে। টেনে দিতে বড় ভালো লাগে বোধ হয়। বললো, ‘কী আবার! বললে, এখেনে তিপুন্নিতে নাইতে হবে, আর…’
তিপুন্নি হলো ত্রিবেণী। বললাম, ‘আর?’
‘আর ওর যেন ব্যামো সেরে যায়। মতিগতি ভালো হয়। ওর যেন একশো বছর পরমায়ু হয়।’
কী গম্ভীর ব্রজবালা! কত গভীর তার কণ্ঠ, তার যত হাসি, তত রাগ। ততোধিক গাম্ভীর্য। ব্রজবালা বালিকা। আর সমাজ আমাদের অজস্র কুসংস্কারে ঠাসা। অভিলাষ ও অভিপ্রায় নিয়ে আমরা কখনো পড়ি বদ্ধ জলায়, যাই কখনো অন্ধকারে।
কিন্তু কোথায় বালিকা ব্রজবালা! দিদিমার কাছ থেকে জীবনের পাঠ নিয়ে যে কথা সে বললো তাতে দেখি সে বালিকা নয়, যুবতী নয়, বৃদ্ধা নয়, ব্রজবেশিনী সে এক মঙ্গলচারিণী নারী। সুখে, দুঃখে, কামনা ও বাসনায় অতি সাধারণ ও অসাধারণ মানুষী। তার সেই আদিম বাসনা। সেখানে তো কুসংস্কার নেই। কবিগুরুর শেষ জন্মদিবসের উক্তি মনে পড়ছে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সে বিশ্বাস আমি কোনোদিন হারাইনি। সেই মানুষের এক বিচিত্র রূপ নিয়ে সামনে আমার ব্রজ।
ক্ষণিকের জন্য মন আমার আবগে আপ্লুত। রূপমুগ্ধ হৃদয় বোবা হয়ে গেল। মানুষ খোঁজার ছলে খুঁজি মন। সে-কথাটি মনে নেই। রূপসায়রে ডুবে দেখি, তলিয়ে গিয়েছি হৃদিকুম্ভে। ওইটি কি মন?
এসেছিলাম অমৃতের সন্ধানে। তাঁবু-খুপরিতে পেলাম ব্রজবালাকে। বালিকা বধূ। মুখে তার পাকা পাকা কথা। আমার মনে কুসংস্কার নেই। তবু, নব্য-সংস্কারবাদী আমার শহুরে মনের নতুন কাটা খালের জলে আর-এক জলের বন্যা এনে দিল সে। এই পরম বিস্ময় ও খুশিটুকু ঘরছাড়া মনের অনুভূতির থলিতে দিল সে ভরে। আমার পথের সঞ্চয় ও লাভের থলি।
হঠাৎ তাঁবুর পেছন থেকেই শোনা গেল চেরা বংশধ্বনি, ‘বেরজো, মুখপুড়ি গেলি কোথায়?’
বোঝা গেল, রান্নার স্থান তাঁবুর পেছনেই। একাধিক হাতা-খুন্তির ঘটং ঘটং শব্দ আসছে ভেসে। ব্রজ লাফ দিয়ে উঠলো। চেঁচিয়ে বললো, ‘কী বলছ?’
বলেই কুলে কামড়। বিলিতি কুল নামক বস্তুটি দেখছি তার ভারি প্রিয়।
জবাব এলো সেই কণ্ঠে, ‘তেলের শিশিটা কোথায় গেল?’
চমকে উঠে ভীত চাপা গলায় বললো, ‘ও মা গো!’ বলেই গালে হাত। আমারও অবস্থা তথৈবচ। সারা দেহ আমার তৈলাক্ত। যদি আসে তা হলে আর লুকোবার উপায় নেই।
ব্রজ ভীত, কিন্তু ঠোঁটের পাশে তার চাপা হাসির ঝিলিমিলি। চেঁচিয়ে বললো, ‘তেলের শিশি? আমি তো জানি নে দিমা।’
বলেই চাপা গলায় ব্রজর কী হাসি! আমাকে বললো, ‘শিগগির পালিয়ে যাও।’ তাড়াতাড়ি গামছা খুলে দিলাম গায়ে। ব্ৰজ ছোঁ মেরে তুলে নিল তেলের শিশি। তার ছোট্ট দেহের চেয়ে অনেক বড় শাড়ির তলায় তা নিমেষে হলো অন্তর্হিত। কোথায়, তা সে-ই জানে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে তার আবার একটু করুণা হলো বোধ হয়। সে বউ। নাত-বউ। তার হাসি-কান্না সব ছাড়িয়ে তবু সে বালিকা। খেলা তার যাবে কোথায়! আর আমার মতো দেবরের সঙ্গে সে পাতিয়েছে খেলা। ছাড়ে কখনো! কাছে এসে চুপি চুপি বললো। তাও বললো অনেক কষ্টে। মুখ ভরতি যে কুল। বললো, আমার পিছু পিছু এস চলে। জলের কলটা দেখেছ তো? ঢুকে পড়বে আর আমি চলে যাব, অ্যাঁ?’
তাই হোক। চললাম ব্রজবালার পশ্চাতে।
আশ্রম-প্রাঙ্গণ শূন্য। বেলা হয়েছে অনেক। এবেলার মতো অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। জলকলের ধারে এসে দেখি কল অদৃশ্য। একরাশ মহিলার ভিড়। চাকের বুকে মৌমাছির মতো। জলকল এখন নারীবাহিনীর এক্তিয়ারে। সুবোধ ছেলের মতো অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অন্যথায় ছুটতে হয় গঙ্গার ধারে।
ওদিকে দিদিমার গলা শোনা যাচ্ছে, ‘এই তো এখানেই ছিল শিশিটা। কী চোরের জায়গা বাপু! এরকম হলে তো গায়ের কাপড়ও চুরি করে নেবে কখন!’ নিজের মনেই মাথা নেড়ে বললাম, ‘তা কী করে সম্ভব। সে কাজটি তো একজনই পারত। গোপিনীদের বস্ত্র হরণ করা যার অভ্যাস ছিল।’
কিন্তু মনের রসিকতা রইলো মনে। কানে এলো, ‘তুই জানিস বেরজো?’
ব্রজ ধরা পড়লেই আমিও পড়বো। ব্রজ বললো তেমনি ভালো মানুষটির মতো, ‘না তো। আচ্ছা, আমি দেখছি খুঁজে।’
দিদিমা বললো, ‘আর কোথায় দেখবি! আমার বড়ি কটা আর ভাজা হবে না। কী সব্বোনেশে জায়গা বাপু। পাপীগুলাদের পাপের ভয় নেই গো! এই তীখক্ষেত্তোর জায়গা। জাগ্রত ঠাকুরের ঠাঁই। তবে আমিও বলি, যে নিয়েছে…’ সেই মুহূর্তেই শোনা গেল, ‘পেয়েছি দিমা’
‘কোথায় পেলি লো?’
‘এই উনুনের পেছনে।’
‘কই, আমি তো দেখতে পেলুম না।’
তা পারবে কী করে! ব্রজবালা যে জাদু জানে! সে খবর তো রাখে না দিদিমা। কমলের ধারের মহিলারাও ব্যাপারটা লক্ষ করছিল। একটি বিশালবপু বিধবা তখন থেকেই বিষয়টিতে ফুট কাটছিল। এবার আর একজনকে সাক্ষী মেনে ঠোঁট উলটে বললো, ‘মাগীর গলা আছে বাজখাঁই। ওদিকে চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে। দেখলে তো, আশ্রমের তাবৎ বেটিদের চোর করে ছাড়লে বুড়ি!’
কিন্তু কেউ-ই সেই কথার জবাব দিল না। জল না হলে চলবে না। তাতেই ব্যস্ত সকলে। বোধ হয় বিষয়টি নিয়ে ঘোঁট হবে অবসর সময়ে।
কিন্তু বিশালবপুধারিণী ছাড়বার পাত্রী নয়। মুখের একটি বিচিত্র ভঙ্গি করে বললো, ‘আমাকে একবার বললে হতো! মুখ একেবারে থুড়ে দিতুম না!’
বলে, একবার অনুসন্ধিৎসু চোখে তাকালো ভিড়ের দিকে। উদ্দেশ্য বোধ হয়, কথাগুলি তার কেউ শুনছে কিনা। অর্থাৎ গ্রাহ্য হলো কিনা।
হ্যাঁ, একজন তাকিয়েছে তার দিকে। একটি প্রৌঢ়া সধবা। তাকেই বললো, ‘আচ্ছা, তুমিই বলো তো ভাই..’
গণ্ডগোল। একেবারে গণ্ডগোল। সধবা বললো শান্ত কণ্ঠে, ‘কই, আপনাকে তো কিছু বলে নি। সত্যি, চোরের যা দৌরাত্ম! ওইটুকু তো বলবেই!’
আর যায় কোথায়! ক্ষেত্র পাওয়া গিয়েছে। বিশালবপুধারিণী গলা চড়াল, ‘কী রকম! তেলের শিশি রইলো ইয়ের গোড়ায়, আর আমাদের করবে শাপমন্যি! এ যে চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা গো!’
অবস্থা আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। এখানে কোন মধুসূদনই সালিশি করতে সাহস পাবে না। গঙ্গাতেই যেতে হবে দেখছি।
এই সময় যুবতী কণ্ঠ, ‘কই, খনপিসি, তোমার ভাঁজা পড়েছে যে।’
‘পড়েছে? বাব্বা বাব্বা।’ বলেই বিশালবপু, অর্থাৎ খনপিসি সম্ভবত খনা ঠাকরুণ, হুড়হুড় করে ঢুকলো কলে। ধাক্কা খেল অনেকে। কিন্তু সবাই শুধু মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করেই ক্ষান্ত। বুঝলাম, খনপিসি আত্ম-পরিচয়ে ইতিমধ্যেই আশ্রমে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। সকলের চোখে-মুখে সেটাই পরিস্ফুট।
Chapter - 4
৪
দিদিমার হাতের রান্না মিষ্টি শুধু নয়। কুম্ভমেলায় এই বালুচরে, বাঁধাকপির পাতার সঙ্গে বড়ি দিয়ে যে এমন অবিস্মরণীয় নিরামিষ চচ্চড়ি জুটবে কপালে, তা কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি। রাত্রে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দিদিমা দেয় যত গঞ্জনা, তত নিরামিষ ব্যঞ্জনে ভরে ওঠে পাত। একেই বলে বোধ হয়, ভগবান যখন দেয়, ছপ্পড় ফুঁড়ে দেয়। এমন খাওয়া তীর্থক্ষেত্রে। রাজি আছি বারো মাস পড়ে থাকতে এখানে।
কিন্তু প্রহ্লাদ ফেরে নি এখনো। সে-ই দিদিমার ভাবনা। ব্রজবালারও।
আহারের পর বিশ্রাম। বিশ্রাম আর নয়। গত দু-রাত্রির সমস্ত ক্লান্তি আমাকে এই দিনের বেলা একেবারে গ্রাস করে ফেললো।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম, জানি নে। জেগে দেখি, অন্ধকার। ঠাওর করে দেখলাম, কেউ নেই। মেলার চারিদিকের গণ্ডগোলের সঙ্গে আশ্রমের গীত কানে এলো। পর্দা উঠিয়ে দেখি, আশ্রম প্রাঙ্গণে জনসমুদ্র। নারী, পুরুষ ও শিশুর মেলা। জ্বলে উঠেছে আলোর সারি। রঙে রঙে রঙের বান ডেকেছে চারিদিকে। হাসি, কথা ও গানে মুখরিত দিগন্ত।
মনে হয় কত কী না-জানি দেখতে পেলাম না। কত কী না-জানি হারালাম। তাড়াতাড়ি উঠে জামাকাপড় বদলালাম। রাত্রির সেই শীত আবার খুলছে তার মুঠো-করা থাবা। আস্তে আস্তে নেমে আসছে এই বালুচরের উপর তার ভয়ংকর আক্রমণ। এখন থেকেই দিচ্ছে হাড়ে কাঁপুনি।
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালাম। আশ্রমের গেটের সামনে দেখলাম এক আলোর ঝলক। সে আলো শুধু আলো নয়, নারীর রূপের আলো। পৃথিবীতে এত রূপও যে ছিল, তা জানতাম না।
কানের কাছে শুনলাম, কে যেন বলছে ফিসফিস করে, ‘ওই যে, ওই রামজীদাসী আসছেন।’
‘রটি গেল সেই বার্তা’ কান থেকে কানে গেল ছড়িয়ে। এসেছে রামজীদাসী ব্রহ্মচারিণী। শুধু কানে কানে নয়, বুঝি ‘পশিল’ মরমে মরমে। যারা জানে আর জানে না যারা, সকলেরই চোখে অপার বিস্ময় ও কৌতূহল।
দাঁড়িয়েছিলাম, দাঁড়িয়েই রইলাম। পলক পড়লো না চোখের। মনে রইলো না সাড়া।
স্বপন বাধা টুটি
বাহিরে এলো ছুটি
অবাক আঁখি দু’টি
হেরি তারে।
অবকাশ রইলো না ভাববার, রূপ সে কেমন। মনের মাঝে শুধু আপানি গুনগুন করে উঠলো—
যেন মঞ্জুরী দীপশিখা।
নীল অম্বরে রাখে ধরি।
অন্তহীন গুনগুনানি বেজে চললো মনের তলে চাপা বীণার তারে। চোখের দৃষ্টি আটকে ছিল নীল আকাশের গায়ে। আদিম রহস্যসন্ধানী মন বারবার দেখতে চেয়েছে, কী আছে ওই নীল আকাশের ওপারে। ভাবলাম কল্পচারী মনে, ‘মাথার পরে খুলে গেছে আকাশের ওই সুনীল ঢাকনা’। চোখভরা শুধু মানুষের রূপ। মানুষ নয়, মানবী, নারী। এত রূপ! দেখি নি তো কোনদিন। একি ব্রহ্মচারিণী রূপ!
শুনেছি আর পড়েছি, নারীরূপের তীব্র ছটা জ্বালিয়েছে সোনার সিংহাসন। ছারেখারে দিয়েছে রাজ্য। ধসিয়ে দিয়েছে রাজধানী।
প্রাণ নাশ করেছে লক্ষ লক্ষ প্রজার। বিদেশে কেন যাই। নিজের দেশে পদ্মিনীর কথা মনে নেই?
সে রূপ কি এমনি? সে রূপ কি এর চেয়েও বেশি? কে জানে! মরু-জগতের রূপ-পাগল চোখ আমার। রূপ-ক্ষুধায় অম্লান আমার দু’চোখের দীপ্তশিখা! কোতোয়াল বলেছিল। হিমাচলের মেয়ে। ঠিক! এ তো সূর্যছটাদীপ্ত বরফশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গ।
রূপের বর্ণনা আর দেবনা খুঁটিয়ে। কৌতূহলটা প্রকাশ না করে পারবো না। এ কেমন ব্রহ্মচারিণী! প্রাচীন মলমলের মতো শুভ্র সূক্ষ্ম তার শাড়ি। চাপা রুপোলি তার পাড়। আধুনিকতার মতো কুঁচিয়ে আঁচল এলিয়ে দিয়েছে। সারা গায়ে নেই অলংকার। কিন্তু সুদীর্ঘ বেণী কালো সাপের মতো এলিয়ে পড়েছে তার পিঠ বেয়ে। বয়স? সে আনুমানের ক্ষমতা আছে কোন্ পুরুষের!
পদক্ষেপে নেই তার রূপসীর অহংকার। কিন্তু চোখে আছে সচেতন দৃষ্টি। রক্ত-রেখায়িত ঠোঁটে তার চাপা ও মুগ্ধ হাসি। আকর্ণবিস্তৃত কালো চোখে বিচিত্র আলো।
পেছনে তার অনেক নরনারী। একটি পুরুষ চলেছে পাশে পাশে। পোশাকে তার ভারী চাকচিক্য। মাথায় সাদা পাগড়ি। হাতে একখানি সরোদ।
রামজীদাসী গিয়ে বসলো মঞ্চের এক ধারে। বাহু প্রসারিত করে লুটিয়ে প্রণাম করলো মোহান্তকে। ভস্মাচ্ছাদিত জটাজুটধারী মোহান্তের পরনে কপনি। নেত্র রক্তবর্ণ। ফিরেও তাকালো না। শূন্যে তাকিয়ে হাত তুলে আশীর্বাদ করলো।
চাঁদ উঠেছে আকাশে। সুগোল নয়, কানা-ক্ষয়া থালার মতো। হাল্কা কুয়াশা পড়েছে ছড়িয়ে। যেন হাল্কা ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে মেলা। তার মাঝে বালুর বুকে অভ্রকুচির চাপা হাসির ঝিকিমিকি
সমস্ত মেলা জুড়ে মাইক ও জনতার হট্টগোল। আলোয় আলোময় চারিদিক। তাকিয়ে দেখি, যেন কোন্ আধুনিক নগরে আলোকিত কেন্দ্রে এসে পড়েছি। লাল নীল আলোকমালায় সাজানো হয়েছে কোথাও। আধুনিক বিপণির চমকিত আলোক-বিজ্ঞপ্তি। কোনো গাছে রঙিন আলোর ঝাড়। রঙিন হীরা ফলেছে সোনার গাছে। অজস্র ফুলের মতো রয়েছে ফুটে। গোধূলির আধো-আলোয় মাধবীবিতান। আর এই বালুচরের বুকে হাডসন ও অস্টিনের অভিজাত শহুরে হর্ন-নির্ঘোষ। নগর-কেন্দ্রকে মনে করিয়ে দিল বেশি করে। আমাদের সামনে বালু ঠেলে দাঁড়ালো এসে কয়েকটি গাড়ি। বাহারী পোশাক ও রঙের হাট নেমে এলো আশ্রমের মধ্যে।
কোনো এক মহিলা নেমে আসছিলেন চেন-বাঁধা কুকুর সমতে। হয়তো তাঁর আদরের পপি টমি গোছের একটি স্নেহের জীব। বাধা পড়ল। পাহারাদার সন্ন্যাসী আটকেছে তার পথ। আশ্রম-প্রাঙ্গণ অপবিত্র করবেন না মায়জী। কুকুরের প্রবেশ নিষেধ।
তাহলে? রঙ-রঞ্জিত ঠোঁটে বিরক্তির আভাস। তবে যেতে হবে। গাড়ির ভেতর পুরতে হলো আদরের জীবটিকে। সামান্য ফাঁক রেখে তুলে দিতে হলো দরজার কাচ। তারপর ঢুকলেন ভেতরে।
স্যুটপরা তরুণের দল করছে ভিড়। পকেটে দু’হাত, আর চোখে বিস্ময় ও কৌতূহল। চাপা হাসি আর গা টেপাটেপি।
ওদিকে গণ্ডগোল মহিলা চত্বরে। পাঞ্জাবী মহিলাদের রঙিন ওড়নার পালেই হাওয়া বেশি। বেশি কন্ঠের তেজ। দুই অবুঝ ভাষায় লেগেছে কলহ। বাঙালি ও পাঞ্জাবী।
কে বলছে, ‘ওমা, সরবো কোথায় গো আর? এ বেটি বলে কী?’
প্রতিবাদে গাঁক গাঁক করে উঠলো যে নারীকণ্ঠ, তার ভাষা বুঝি নে আমিও। লিখব কেমন করে! সম্ভবত যে স্থানটিতে বসেছে, সেটি কারুর পিতৃপুরুষের কেনা জায়গা নাকি, সেটাই কূট তর্কের বিষয়বস্তু। এর পরের প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই, সারা কুম্ভমেলাটাই কারুর স্বামী বা পিতা কিনেছেন কিনা, সেই বিতর্ক।
শোনা গেল, ‘কী খাণ্ডার মেয়েমানুষ বাবা! আমাদের বাড়ির পাশে যে পাঞ্জাবী বউটা আছে, সে তো এমন ঝগড়ুটে নয়।
কথার মধ্যে কিঞ্চিৎ পশ্চাদপসরণের আভাস। তাকিয়ে দেখলাম, কলপাড়ের সেই বিপুলকায়িনী। বোঝা গেল, তার বাড়ির পাশের প্রবাসিনী পাঞ্জাবী বউয়ের তুলনায় সে কয়েক ডিগ্রি উচ্চে অবস্থান করে। অবশ্যই কলহে। কিন্তু পাঞ্জাবী তীর্থযাত্রিণী তার চেয়েও উচ্চে। বোধ হয় জীবনে একটি নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হলো। উত্তর প্রদেশের মহিলাকুলও কম যাচ্ছে না দেখা গেল।
মাইকে শোনা গেল, ‘জাগ্রত ভগবান এখানে অধিষ্ঠিত। মায়িজী, আপনারা দু’দিনের জন্য ভগবানের নাম করুন। সদা ভগবানের সেবা করুন। ঝগড়া করবেন না। ভগবান বিমুখ হবেন। রামজীদাসী ব্রত্নচারিণী আপনাদের ভগবান শ্রীরামের মহিমা শোনাবেন।’
কথাগুলো বলা হলো হিন্দিতে। উর্দু মিশ্রিত নয়, বরং খানিকটা বাঙলা মিশ্রিত যেন। বুঝতে অসুবিধা হলো না অধিকাংশেরই।
একটু স্তিমিত হলো কলহের কলকণ্ঠ। গুঞ্জন উঠলো তানপুরার তারে। দু’হাত জোড় করে বসেছে রামজীদাসী। নিমীলিত চোখ। জানি নে কী ছিল ওই মুখে। কিন্তু মনে হলো, ওই একখানি মুখ আলো করে রেখেছে সমস্ত মঞ্জু। আবার বলি, সে আলো রামজীদাসীর রূপ-শিখা।
এ রূপ শীতল জলরাশির মতো ঢলঢল নয়। শান্ত গভীর জলের বুকে ভাব-পাগলের অবগাহনের ডাক নেই তাতে। একটি অসহ্য দ্যুতি, একটি দুরন্ত দীপশিখা। কাঁপছে আর জ্বলছে ধিকিধিকি। দর্শক শ্রোতা আর পুণ্যার্থী নরনারী এই দীপশিখারই আলোয় আলোকিত। নিমেষহারা চোখ। মুগ্ধ মনের ছায়াচাপা মুখ
মন ভুলেছিল রূপে। কথাহারা মন কথা বললো এবার। সুদূর হিমাচলের, তার দূর গুহাকন্দরের রহস্যের মতো মনে হলো আমার এই ব্রহ্মচারিণীকে দেখে।
দূরে সরে গেলাম ভিড়ের কাছ থেকে। দূর থেকে দেখবো। একলা একলা দেখবো, মনে মনে দেখবো। ঘুরে গেলাম বেড়ার কাছে। ছিন্ন কম্বল আর কাপড় জড়ানো কতগুলি কালো মূর্তি গায়ে গায়ে জড়িয়ে বসেছে দূরের আধো আলোয়। বেড়ার গা ঘেঁষে বসেছে। এখানে মাথার উপর ঢাকনা নেই। দূরের আধো আলো আর কুয়াশা-চাপা চাঁদের আলো মিলে সৃষ্টি করেছে যেন একটি রহস্যঘন অন্ধকার। লক্ষ করে দেখলাম মূর্তিগুলি সব তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকেই। আরো লক্ষ করলাম, গুটি দুয়েক জ্বলন্ত গাঁজার কলকে, পাঁচুগোপালের ভাষায় সপ্তমী, ঘুরছে সকলের হাতে হাতে। গায়ে মুখে তাদের ভস্মমাখা। বুঝলাম, সকলেই সাধু।
কে একজন সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল হনহন করে। গায়ে ধাক্কা লাগল। তাকিয়ে দেখলাম, কোতোয়াল। ডাকলাম, ‘কোতোয়ালজী, সাধুজী!’
কোতোয়াল ফিরল। বললো, ‘কে? ও! আপনি এখানে কেন, সামনে যান।’
বললাম, ‘না, দূর থেকেই দেখি। দূর থেকেই ভালো দেখা যায়।’
কোতোয়াল একবার তাকিয়ে দেখলে মঞ্চের দিকে। দেখে মুখ ফেরাল। ফিরে রইলো এক মুহূর্ত। জানি নে ভুল দেখলাম কিনা। কিংবা চাঁদের এই কুহকী আলোরই এমনি কারসাজি। কোতোয়ালের সারা মুখে একটি বিচিত্র ভাবান্তর খেলে গেল। সে-ভাবান্তরে গভীর ও থমথমে হয়ে উঠলো তার মুখ। বললো, ‘তাই দেখুন। হয়তো দূর থেকেই ভালো দেখা যায়
আশ্চর্য! কোতোয়াল কথা বললো। কিন্তু আমার মুখের দিকে তাকালো না। বললাম, ‘চললেন কোথায়?
কোতোয়াল এবার হাসলো। বললো, ‘সেই সর্বনাশী ঘুরছে আশেপাশে। দুবার সে চেষ্টা করেছে আশ্রমে ঢোকবার। ঢুকতে পারে নি। বেড়ার ধার দিয়ে গেছে ওই দিকে, পশ্চিমে। দেখি কোথায় গেল! বেড়া ভেঙে ঢুকলে আর রক্ষে নেই। কারোর সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
সর্বনাশী। সে আবার কে? কোতোয়ালের সঙ্গে সঙ্গে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন সর্বনাশীর কথা বলছেন? কে সৰ্বনাশী?’
কোতোয়াল বললো, ‘জানেন না? খবর রাখেন না দেখছি। নারী চোরবাহিনীর সে সেরা মেয়ে। সে তো সব সময়েই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সাংঘাতিক মেয়েমানুষ। পুলিশে ধরে নিয়ে গেলেও যে কী করে বার বার ছাড়া পেয়ে যায়, সেটাই আশ্চর্য।’
খবর ঠিক রাখি নে বটে। তবে শুনেছিলাম ব্রজবালার মুখে। তাকিয়ে দেখলাম, বেড়ার বাইরে চলেছে শত শত নরনারী। চলেছে পুব থেকে পশ্চিমে। উত্তর থেকে দক্ষিণে। এর মধ্যে সেই নারী-চোর কী করেই বা বেড়া ভাঙবে, আর ঢুকবেই বা কী করে! সে তো জাদুকরী নয় যে অদৃশ্য হয়ে ঢুকবে।
বললাম, ‘এত লোকের মাঝে কী করে চুরি করবে সে?’
কোতোয়াল একটু বিচিত্র হেসে বললো, ‘লোকের মাঝেই তো চুরি করে সে। যত মানুষ, তত তার সুবিধে।’
পশ্চিমের বেড়ার ধারের কাছে এসেই থমকে দাঁড়ালো কোতোয়াল। বালুচরের ভিড়টা এদিকে একটু হালকা। তাকিয়ে রইলো সেই ভিড়ের দিকে। তারপর আমাকে বললো, ‘ওই দেখুন, একটি মূর্তি ছুটছে। ছুটে চলেছে গঙ্গার দিকে। লক্ষ করেছেন? ‘
বলা মাত্রই দেখতে পেলাম না। লক্ষ করলাম কয়েক মুহূর্ত। তারপর দেখলাম, সত্যি, ভিড়ের মাঝে ডুব দিয়ে দিয়ে হঠাৎ জেগে উঠছে একটি মূর্তি। মেয়েমানুষ নিঃসন্দেহে। ছোটার বেগে আঁচল উড়ছে তার।
কোতোয়াল বললে, ‘ও যাদের চেনে, তাদের দেখলেই পালায়। তবে, ওর পালানোর কথা বলা যায় না। এই দেখছেন গঙ্গার দিকে ছুটছে। আবার হয়তো এখুনি দেখবেন, ঝুসির কোল আঁধার থেকে পা টিপে টিপে আসছে ক্যাম্পের দিকে। আর-জন্মে বোধহয় চিতাবাঘ ছিল।’
হবে হয়তো। চোর, তাও আবার নারী। ব্রজবালার মুখে যা শুনেছি, তাতে চোরটি যুবতী ও সুন্দরীও সম্ভবত। রহস্যের মধ্যে কিঞ্চিৎ রসিকতার কথাই স্বভাবত মনে আসে।
এমন সময় মাইকে কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকালাম। রামজীদাসী নিমীলিত চোখ খুলেছে। তানপুরার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একটানা গেয়ে চলেছে শুধু, রাম রাম, রাম রাম, রাম রাম, রাম রাম। বারকয়েক রামজীদাসী একক কণ্ঠে রাম নাম গেয়ে গেল। কণ্ঠে কোথাও সঙ্গীত অধ্যবসায়ের কারুমিতি ঠেকলো না কানে। যেন গ্রাম্য বালিকার সরু চাপা কণ্ঠের সুর। একটু পরেই তার কণ্ঠে কণ্ঠ দিল কয়েকজন পুরুষ ও আরও দু’টি নারী। এরা আবার কারা? জিজ্ঞেস করবার জন্য ফিরে দেখলাম, কোতোয়াল নেই, আশ্চর্য তো! চোখে পড়লো, অদুরেই বেড়ায় বাঁশে হেলান দিয়ে একাকী দাড়িয়ে রয়েছে একজন। কোতোয়াল ভেবে কাছে গিয়ে উঁকি দিলাম।
লোকটি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মঞ্চের দিকে। লোক নয়, সাধু নিশ্চয়ই। ঝাপসা আলোয় মনে হলো ফর্সা মুখ। কুঞ্চিত ঘন দাড়ি সেই মুখে। এত শীতেও গায়ে শুধু মাত্র সুতি কাপড়ের গেরুয়া বস্ত্র একখানি। ঘাড় অবধি বেয়ে পড়েছে ঘন চুলের গোছা। জটাজুটের কোনো চিহ্ন নেই। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
মঞ্চের দিকে শুধু দৃষ্টি নয়, বোধ হয় মনটিও পড়েছিল। আমি যে উঁকি দিলাম, প্রথমে নজরেই পড়লো না তার। কোতোয়াল নয় দেখে ফিরতে গেলাম।
হঠাৎ বোধ হয় সংবিত ফিরে পেল সে। পরিষ্কার হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবুজী, আপনি কী দেখলেন?’
সঙ্কুচিত হলাম। উঁকি দেওয়াটা ঠিক হয় নি বোধ হয়। বললাম, ‘আমি একজনকে খুঁজছিলাম। ভেবেছিলাম, আপনিই বুঝি সে।’
ভেবেছিলাম মিটে গেল কথা। কিন্তু সাধুটি হাসলো। হাসিতে তার চাপা উত্তেজনার আভাস। একটু যেন অপ্রকৃতিস্থ! একটু যেন রহস্য করেই বললো, ‘ভেবেছিলেন, আমি-ই সে! হাঃ হাঃ হাঃ—সে কোথায়! তাকে এখানে কোথায় পাবেন আপনি!’
আবার সেই কথা। সেই ভাব। সে আবার বলে উঠলো, ‘আপনি খুঁজছেন, বাবুজী, আমিও খুঁজছি। দুনিয়াভর তাকে খুঁজছি। জীবন কেটে গেল, তবু পাত্তা মিলল না।’
এ কথার কোনো জবাব নেই। কী জবাব দেওয়া উচিত, তাও জানিনে। অতএব সরে পড়াই ভালো।
কিন্তু সে আবার হেসে উঠে বললো, ‘কাকে খুঁজছিলেন বাবুজী?’
বললাম, ‘এ আশ্রমের কোতোয়ালজীকে।’
সাধু বললো, ‘রামানন্দজীকে? এই তো এখান দিয়ে চলে গেল সে।’
রামানন্দ! বললাম, ‘কে রামানন্দ?’
‘কেন, এ আশ্রমের কোতোয়ালজী।’
‘আপনি চেনেন?’
সাধু হাসলো। চাপা গলায় হা-হা করে হেসে বললো, ‘চিনিনে? অনেকদিন থেকে চিনি।’
‘আপনি কি আশ্রমের লোক?’
সাধু বললো, ‘না।’ বলে তাড়াতাড়ি বললো, ‘দেখুন, দেখুন রুক্মিণী নাচছে।
ফিরে তাকালাম। দেখলাম, রামজীদাসী কোমরে বেঁধেছে আঁচল। নেমে এসেছে মঞ্চ থেকে। মঞ্চোপরি মোহান্তর পাশে দেখলাম, যাত্রার দলের পোশাক পরে বসেছে তিনজন। তিনজনই বালক মনে হলো। দু’জনের ধনুকধারী পুরুষের বেশ। আর-একজনের রানীর বেশ বলেই মনে হলো।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার? এরা কারা?’
সাধু হাসলো। তার হাসির মধ্যে কোথায় একটা বিদ্রূপ ও কৌতুকের ছোঁয়া লেগে রয়েছে যেন। সে বললো, ‘ওরা রাম লক্ষণ আর সীতা। সাজিয়ে এনেছে একটি কীর্তন মণ্ডলেশ্বরের দল। রুক্মিণী এবার নাচবে। সে যে রামজীদাসী। মীরাবাঈয়ের কথা শুনেছ বাবুজী? কৃষ্ণদাসী, কৃষ্ণপ্রেমে পাগলিনী মীরাবাঈ। মহাপ্রেমিকা। কিষেণজীর নাম শুনলে প্রেমে অবশ হয়ে যেত রাজরানীর অঙ্গ। আর এই রামজীদাসী রামপ্রেমে পাগলিনী। সে যেখানে যায়, কীর্তন মণ্ডলেশ্বর সেখানেই রাম-সীতার মুক্তি নিয়ে হাজির থাকে। নইলে রামজীদাসী পাগলের মতো ঘুরবে, খুঁজবে, দেখবে। কোথায় সেই মোহন মূর্তি। নাম-গান করতে করতে প্রাণ তার অবশ হয়ে যায়। কখনো নাচে গায় হাসে কাঁদে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘রুক্মিণী কাকে বলছেন আপনি?’
সাধু বললো, ‘কী বলবো তবে? মনিয়াবাঈ?’
‘মনিয়াবাঈ কে?’
‘রামজীদাসীর আর এক নাম ছিল। কিন্তু মনিয়াবাঈ মরে গেছে অনেকদিন।’ বড় কৌতূহল হলো। কুহেলিকাময় চাঁদের আলোয় সাধুর মুখে এক বিস্মৃত যুগের রহস্যকাহিনী যেন উঁকি মারছে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করবার অবসর পেলাম না। বাজনা বেজে উঠলো। সরোদ আর তবলায় বেজে উঠলো নাচের বোল। রামজীদাসী ধরেছে গান।
কৌন বন্ পহুঁছে সখী দো পেয়ারা, দো পেয়ারা
যা’কে ভোজন মেওয়া মিঠাই তে করসে বনবল। করত্ আহারা।।
গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচ। আশ্চর্য! এই নৃত্যভঙ্গিমা, পদ-সঞ্চালন, হাত ও আঙুলের মুদ্রা তো অশিক্ষিত অপটু নাচিয়ে মেয়ের নয়! এ শুধুমাত্র ভাবের ঘোরে ঘুরে ঘুরে নাচ নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে তার নৃত্যকুশলী প্রতিভার অপূর্ব স্ফুরণ। হৃদয়তল ছন্দায়িত হয়ে উঠলো তার নাচের ছন্দে ছন্দে। ভুলে গেলাম, রয়েছি এক বালুচরের আশ্রমে। মনে হলো, কোনো নামকরা নৃত্যকুশলার নাচ দেখতে বসেছি কোথাও।
নাচের নাম জানি নে, তাই বলতে পারবো না। নাচের দোলায় দোলায় রামজীদাসীর রূপের ছটা বিচ্ছুরিত হলো দিকে দিকে। যে রূপ দেখেছি, সে রূপ ছিল ছাইচাপা। নাচের হাওয়ায় উড়ছে ছাই। আর-এক বিচিত্র রূপে রূপবতী হয়ে উঠেছে রামজীদাসী। আধুনিক ভঙ্গিতে পরা তার মলমলের শাড়ি। ভাঁজে তার রূপের শিহরণ। তার পিঠের বেণী চঞ্চল কালো নাগিনীর মতো হিস্ হিস্ করে উঠছে অস্থিরতায়।
যাকে আচোয়ান সরযূ গঙ্গাজল
তে কয়সে পিয়ত্ জঙ্গল জল খাড়া।।
তারপর করুণ কণ্ঠের মিনতি, ‘কহো কহো মেরী রাজা।’ গানের ভাষা দেহাতি মনে হয়। সব কথার অর্থ বুঝিনে। মনে হলো, বনবাসী রামকে জিজ্ঞেস করছে, ‘রাজার ছেলে তুমি। নিয়ত খেতে মেওয়া মিঠাই। কিন্তু বনে এসে তুমি কী করে বনফুল খেয়ে রয়েছো? নির্মল গঙ্গাজল তোমার পানীয়, কিন্তু হে রাম! জঙ্গলের জল তুমি কেমন করে পান করছ? চরণ তোমার নিত পল ‘পর, কেমন করে তুমি ঘুরছ বনে বনে পাহাড়ে পাহাড়ে। ওগো রাজা রাম! ঐ দুঃখ তুমি সয়েছ, আমার যে সয় না।’
একটা মাতন লাগিয়ে দিয়েছে রামজীদাসী। তাকিয়ে দেখি, সভাস্থ সকলের চোখেমুখে একটি ভক্তিরসের ছোঁয়া লেগেছে। রস করুণ, নিঃসন্দেহে। রামজীদাসীর রূপমুগ্ধ মানুষের হৃদয়ে কোনো চোরাপথ দিয়ে এসে পড়েছে একটি ভক্তিরসের শীর্ণধারা। জানি নে, প্লাবনের সৃষ্টি হবে কিনা!
‘আমার পার্শ্ববর্তী সাধু বলে উঠলো, ‘উলারা।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেটা কী?’
‘এই গানের নাম বাবুজী। এদেশের ঝি-বহুড়িরা পালা-পার্বণে এ গান গায়।’ দেখলাম, সাধুর চোখে মুখেও ওই গানের রসের তরঙ্গ লেগেছে।
তারপর শুধু নাচ। ‘সন্ন্যাসীর দিক থেকে চোখ ও কান দুই-ই চলে গেল রামজীদাসীর দিকে। তবু, সন্ন্যাসীকে ছাড়তে মন চাইছে না। একটা তীব্র ও চাপা কৌতূহল অদৃশ্য চুম্বকের মতো টেনে রেখেছে আমাকে। টেনে রেখেছে রুক্মিণী আর মনিয়াবাঈ। শুনতে পাচ্ছি, সন্ন্যাসী বিড়বিড় করছে আপন মনে। অস্পষ্ট কথা আর চাপা হাসি
তবু মন ভাসিয়ে নিয়ে গেল রামজীদাসী। রামজীদাসীর নাচ। নাচ আর বাজনা। সরোদ বাজছে যেন স্রোতস্বিনীর টানে, কিনারে কিনারে নুড়িমালার রিনিঠিনি। তার সঙ্গে তবলা-সঙ্গত। রামজীদাসীর পদক্ষেপের তালে তালে একজন হাতে নিয়ে ঝঙ্কার দিচ্ছে নূপুরের গোছা।
যন্ত্রসঙ্গীতের এই সুর যেন একটি ছবি। একটি নিখুঁত প্রাকৃতিক দৃশ্য। নিরন্তর তানপুরা-ধ্বনি যেন ছবির পিছনের বিস্তৃত অসীম নীল আকাশ। কোলে তার একটি রূপের দ্যুতি। রামজীদাসী।
ভাবের ঘোরে নাচ নয়। নাচে লেগেছে এবার ভাবের ঘোর। কথা ফুটেছে নাচের ছন্দে। সেই নিঃশব্দ কথা হাসি আনন্দের, বেদনা ও অভিমানের, কখনো নির্বাক ব্যথা ব্যক্ত হয়ে পড়েছে দেহ-ভঙ্গিতে। নিথর আড়ষ্ট বঙ্কিম দেহ। তারপরে অকস্মাৎ ব্যথার পাথর সরিয়ে নির্ঝরিণী ছলছল। সর্বাঙ্গ আনন্দে থরথর কম্পিত কিংবা কপট অভিমানে চটুল নারী চোখে হাত দিয়ে খেলে আঁখমিচোলি। আবার ভক্তি-উচ্ছ্বাসে মাটিতে লুটানো প্রণাম। রামকে নিয়ে রামজীদাসীর লীলা। নির্বাক বিস্ময়ে ছেলে তিনটি গোল গোল চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। রাম, লক্ষ্মণ আর সীতা। বেচারিরা অন্যদিকে তাকাবার অবসরও পচ্ছে না একটু।
জানিনে, ভক্তি-উচ্ছ্বাসে কতখানি মেতে উঠেছে মণ্ডপের নরনারী। কিন্তু অভূতপূর্ব স্তব্ধতা বিরাজ করছে সর্বত্র। মোহমুগ্ধ নির্বাক সকলে। যেন তাদেরই নির্বাক হৃদয়ের তালে তালে নাচছে রামজীদাসী।
ভিড় হয়েছে প্রচণ্ড। গেটের সামনে আর বেড়ার ধারে ধারে গিজগিজ করছে কৌতূহলী দর্শকের ভিড়। সারা কুম্ভমেলাটাই ভেঙে পড়েছে যেন রামজীদাসীর নৃত্য-আসরে।
পাশ থেকে সন্ন্যাসী হেসে বললো, ‘একদিন যার নাচ দেখার জন্য লাখপতি ধর্না দিত বন্ধ দরজায়, আজ সে মেলার মাঝে নেচে নেচে ভগবানের সেবা করছে।’
লাখপতি ধর্না দিত! সন্ন্যাসীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই রামজীদাসীর নাচ দেখার জন্য।’
সন্ন্যাসী বক্র হেসে গম্ভীর গলায় বললো, ‘ছি বাবুজী, রামজীদাসী বলতে আছে! আমি বলছি লক্ষ্ণৌয়ের মনিয়াবাঈয়ের কথা। রূপে যার জুড়ি ছিল না দিল্লি-লক্ষ্ণৌয়ের বাঈজীকুলে। মনিয়াবাঈ। কেউ বলত রুক্মিণী। কার ফুলে মধু আছে, ভ্রমর ছাড়া কোন্ রসিক তার সংবাদ রাখে! কলকাতা থেকে, বোম্বাই থেকে রসিক ভ্রমরেরা আসত ছুটে, মনিয়াবাঈয়ের সন্ধানে। সংবাদ চাপা থাকত না তাদের কাছে। কেউ দেখা পেত, কেউ পেত না। সহজ কথা? এ কী। সেই লেড়কি, সেই আওরত, যে সড়ক-কি-কিনারে পেতেছে আপনা বেসাতি? হাসি যার ঠোঁটে লেগে থাকে, নাগরকে খুশি করা ছল-কথা যার মুখে ঝরে হরবখত্? নহি, নহি বাবুজী। সেই রকম বাঈজী ছিল না মনিয়াবাঈ। গানের কলি দিয়ে ভোলানো? আরে রাম রাম!’
বলতে বলতে কিছু ভাবান্তর ঘটল সন্ন্যাসীর মুখে। বক্র হাসিটি চাপা ব্যাথ’য় করুণ হয়ে ওঠে। যদি ঠিক দেখে থাকি, যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে দেখছি ঠিক। দেখলাম কোনো এক সুদূরের বুকে নিবন্ধ তার দৃষ্টি। যেন কোনো এক দূর মঞ্চে, কী এক খেলা খেলছে সে। তার চোখে খেলারই আলোছায়ার ঝিলিমিলি। তার কথাগুলি বুঝলাম। কিন্তু ব্যক্ত করতে পারবো না তার ভাষায়। ঠেট্ হিন্দি নয়। গ্রাম্য ভাষার মধ্যে গ্রাম্য অলংকার দিয়ে কবিতা আবৃত্তির মতো বললো সে। বললো, ‘বাবুজী জানো, অনেক খেলা ভগবান আমাদের দেখাচ্ছে। মনিয়াবাঈকে দিয়ে ভগবান আমাদের একটা খেলা দেখিয়েছে। মনিয়াবাঈ সোনার পালঙ্কে বসে মহারানীর আদর পেয়েছে, কিন্তু বুকের ভেতর তার আঁকা ছিল রঘুনন্দনের মূর্তি। রঘুনন্দন!’ যেন সে ডাক দিল রঘুনন্দনকে। জানি না কে সেই রঘুনন্দন। ব্যাকুল গলায়, জোড় হাতে বললো সন্ন্যাসী, ‘হে মহাপ্রাণ, সাধকগুরু আমার প্রণাম নাও।’ বলে সে চুপ করলো।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘রঘুনন্দন কে?’
বললো, ‘সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসী শুধু কপীন এঁটে জটা বাঁধবার জন্যে? চোখ পাকিয়ে খালি ব্যোম ব্যোম্? উঁহু বাবুজী, সন্ন্যাসী রঘুনন্দনের মধ্যে প্রেমাবতার বাসা নিয়েছিল। যে তার কথা শুনেছে, প্রাণ জুড়িয়েছে তার। মনে হতো, যুগযুগান্তরের কোনো সিদ্ধাচার্য নতুন রূপে এসে দাঁড়িয়েছে তোমার সামনে। সেই রঘুনন্দনের ছায়া পড়েছিল মনিয়াবাঈয়ের বুকে। পর-ছায়া নয়। রঘুনন্দনের সাচ্চা ছায়া। যত ছাড়ো, যত মারো, যত বুক চাপড়াও, সে ছায়া সরবে না। আগুনে ঝাঁপ দেবে? তোমার ছাইয়ের, তোমার আত্মার মধ্যে বিরাজ করবে সে। হা-হা-হা .. লক্ষ্ণৌয়ের রাজ ইমারত, বিজলী বাতি আর সোনার খাট! হীরে-জহরতে ভরা মনিয়াবাঈয়ের সর্বাঙ্গ। বাবুজী, লালসামত্ত পাগলেরা বাঈজীর খোলা গায়ে মদ ঢেলেছে। তার সুন্দর পা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পড়েছে সেই মদ। লোভী কুকুরের মতো কামাসক্ত মানুষ তাই চেটেছে। মানুষ নয়, জানোয়ার। জানোয়ারের উল্লাস। যৌবন যার ক্ষেত-জমিনের মাটির ঢ্যালা। আজকে পাথরের মতো শক্ত, কালকের বর্ষায় সে কাদা হয়ে গলে যাবে। আর এই জানোয়ারের মাঝে পাগলীর মতো খিলখিল করে হেসেছে নটী মনিয়াবাঈ। হেসেছে, নেচেছে, গান করেছে। তারপর জিন্-পাওয়া আওরতের মতো চিৎকার করেছে, লণ্ডভণ্ড করেছে ঘরদোর, ভেঙে দিয়েছে সভা। সেই ভৈরবী মূর্তি দেখে পালিয়েছে কামার্ত পশুরা। মনিয়াবাঈয়ের আর এক নাম ছিল পাগলী বাঈজী। রূপ ছিল তার পাপ। সেই পাপের মধ্যে লুকিয়ে ছিল আলো। সেই আলো যখন জ্বলে উঠত পাপের ভারে, মনিয়া তখন পাগলী হতো। হবে না! আরে বাপরে! রঘুনন্দন এসে দাঁড়াত যে তার সামনে। তার দিব্যদৃষ্টির সামনে। তাকে বুকে নিত, আদর করত, সোহাগ করত। তারপর একদিন—’ বলতে বলতে সে থামল আচমকা। যেন কী কথা মনে পড়েছে হঠাৎ। চাপা উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো, ‘মগর, আখেরি নতিজা কেয়া মিলি? বাবুজী, দেখ, দেখ তো রামজীদাসীকে। হাত রাখো নিজের বুকে। রেখে বলো, কী দেখছ? কী ভাবছ? তোমার মনের মধ্যে এক ছোট্ট রঙদার চিড়িয়া পাখা ঝাপটা দিচ্ছে না? আরে, সরমাচ্ছো কেন বাবুজী? লজ্জা কী? ওই চিড়িয়া তোমার বাসনার সুন্দর মূর্তি। তোমারও নয়, সকলের। সকলের মনেই ওই বিহঙ্গ ছটফট করছে। করবে না? ওই রূপ! ওই বেশ। উর্বশীর জীবন্ত ছায়া। রামজীদাসী নামে, বুকের মধ্যে ধিকি ধিকি, ধুকু ধুকু। নিজের মন চেনে ক’জনা? গৃহী বাদ। সন্ন্যাসী? মন চেনে ক’জনা? বাসনা মরেছে ক’জনার? রামজীদাসী নয়, আগুনের পিছু ছুটছে সব। প্রকৃতি একটা শোধ নিচ্ছে এই রহস্যময়ীকে দিয়ে। ভগবানের মুখে চুনকালি মাখাতে চাইছে। শুনলে লোকে হাসবে, রাগ করবে। লোকে শুধু ওইটুকুই জানে। থাক, থাক ওসব কথা।
সন্ন্যাসী চুপ করলো। দাঁড়িয়েছিল একটা বাঁশ ধরে। সেটা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো এবার। গলায় তার রুদ্রাক্ষের মালা। রুদ্রাক্ষের কুণ্ডল কানে, বলিষ্ঠ হাতে বালা রুদ্রাক্ষের। কপালে অস্পষ্ট পুণ্ড্ররেখা।
সন্ন্যাসী থামল। কিন্তু আমার মন থামে নি। সে তার সবটুকু অনুভূতি দিয়ে কান খাড়া করে রইলো। দেখছি রামজীদাসী হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখ দেখতে পাচ্ছি নে। পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছি, রুপোলি পাড়ের বেষ্টনী ঘিরে রয়েছে তীব্র রেখাঙ্কিত দেহ। তাকে দু’ভাগ করে নেমে এসেছে সুদীর্ঘ কালো বেণী। আর কীর্তন মণ্ডলেশ্বরের গীতকারেরা সকলে মিলে ধরেছে গান।
রামজীদাসী আর মনিয়াবাঈ। মনিয়াবাঈ আর রঘুনন্দন। সব মিলিয়ে একটা অস্পষ্ট অথচ তীব্র রহস্যের দ্বারে দাঁড়িয়ে আছি উৎকর্ণ হয়ে। অতীত ভারতের এক রহস্যদ্বারের সামনে যেন দাঁড়িয়েছি আমি। যেন বিচিত্র রহস্যে ছেয়ে গিয়েছে সারা কুম্ভমেলা। মনিয়াবাঈ আর সন্ন্যাসী রঘুনন্দনের কাহিনী শোনবার জন্য আকুল মন।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সন্ন্যাসীজী, তারপর?’
বুকের খুলে-যাওয়া আবরণ ঢাকা দিল সন্ন্যাসী। হঠাৎ যাওয়ার উদ্যোগ করলো। বললো, ‘পুরনো কথা বাবুজী। এ হলো সন্ন্যাসীদের গুপ্তকথা। আপনাদের শুনতে নেই। ভালোও লাগবে না।’
বলে, সে সত্যি পা বাড়াল। বললাম, ‘যদি বাধা না থাকে, তবে শুনতে চাই।’
সন্ন্যাসী তাকালো আমার দিকে। মন-সন্ধানের তীক্ষ্ণতা তার চোখে। বললো, ‘আপনার আশ্রমের কোতোয়ালের কাছ থেকে শুনে নেবেন বাবুজী। সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের কারুর অজানা নেই এই কথা
বলতে বলতে চলে যেতে চায়। মনে হলো, অনিচ্ছার ছল-হাসি তার মুখে। হয়তো শুনতে পাব না কিছু রামানন্দর কাছে। সন্ন্যাসীর কাছ ঘেঁষে এলাম, জানি নে সাধু-সন্ন্যাসীর মেজাজ। কখন কোন্ ভাবে বিভোর। বেশি বললে যদি আবার গণ্ডগোল ঘটে! তবু বললাম, ভয়ে ভয়ে, ‘অসুবিধে না হলে আপনিই বলুন।’
সন্ন্যাসী বাঁকা হেসে বললো, ‘কেন শুনতে চান? এ এক সন্ন্যাসীর প্রেমকাহিনী। আপনার গৃহী মন বিরূপ হবে।’
হয়তো হবে। তবে গৃহী বলে নয়। অমানুষিক কাহিনী হলে মানুষ দুঃখ পাবে বৈকি। তবুও মনে বড় কৌতূহল। সন্ন্যাসীর আবার প্রেম! সে কি কথা?
বললাম, ‘শুনতে বড় সাধ। সন্ন্যাসীর প্রেমকথা, এযুগে কখনো শুনিনি।’
সন্ন্যাসী আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসলো। হেসে চলতে আরম্ভ করলো আশ্রমের গেটের দিকে। বুঝলাম, নীরবে আহ্বান করছে সে আমাকে। আর একবার দেখলাম রামজীদাসীকে। সত্যি আগুনই বটে! সভাস্থ নরনারী সকলে অপলক বিস্মিত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকেই।
গেটের কাছে এখনো ভিড়। ভিড় ঠেলে বাইরে এলাম। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। যেদিকে তাকাই সেদিকেই লোক। তবে গায়ে গায়ে নয়। সীমাহীন বালুপ্রান্তরের আলোকিত মেলায় ছড়ানো মানুষ।
সন্ন্যাসী চললো পুব-দক্ষিণ কোণ বরাবর। সঙ্গমের এক কোণে। যেখানে সরস্বতী আছে আত্মগোপন করে। ওদিকটায় আলো নেই। কিন্তু আকাশে চাঁদ রয়েছে। প্রবল শীত। তবু উত্তর প্রদেশের আকাশে এখনো যেন শরতের সমারোহ। সমারোহ শুধু মেঘেরই আনাগোনায়। কুয়াশার আবরণ ভেদ করে দেখা যায় না শরতের ঘোর নিলিমা। ঝুসির উঁচু বুকে অড়হরের ক্ষেত ঘন মেঘের মতো লেপটে রয়েছে অস্পষ্ট আলোকিত আকাশে। এদিকটায় বৈদ্যুতিক আলো নেই। কিন্তু মানুষের আনাগোনা কম নয়। অস্পষ্ট ছায়া মিছিল চলছে চারিদিকে।
যত এগুচ্ছি, বালি তত গভীর মনে হচ্ছে, পা ডুবে যাচ্ছে।
সন্ন্যাসী আমার দিকে ফিরে বললো, ‘সন্ন্যাসীর প্রেম-কথা কখনো শোনেন নি?’
তার কণ্ঠস্বরে অবাক হলাম। এক বিচিত্রভাবে ও সুধায়, কথা তার গম্ভীর ও তরল। খুশি ও আনন্দে ভরপুর। বললো, ‘সন্ন্যাসীর প্রেম তার ধ্যানে ও ধর্মে। ধর্মে আর কর্মে তার প্রেম বলে, ওগো দেব, প্রাণেশ্বরী, প্রেয়সী, সন্ন্যাসীনাং সদা সেব্যং পঞ্চতত্ত্ব বরাননে! তবে গোপনে। গৃহী-জগতের বাইরে। প্রেম থাকবে না কেন? তবে এই প্রেমে অনেক আড়ম্বর, অনেক আয়োজন। লোকচক্ষে বড় ভয়ের বিষয়! বসুন বাবুজী, আপনাকে সন্ন্যাসীদের একটি গুপ্ত ক্রিয়ার কথা বলি।’
বলে, সে শিশিরসিক্ত বালির উপরেই বসে পড়ল। আমিও সেখানে বসলাম। আধুনিক শহুরে মনে সাধু-সন্ন্যাসীদের সব উদ্ভট বলে জানি। তবু কৌতূহল ছাড়তে পারি নে।
সে বললো, ‘বাবুজী, সন্ন্যাসীর আছে কুলাচার। কুলাচার কী? আপনি বাঙালি। আপনাদের দেশে কুলাচারী বড় বেশি ছিল। আপনাদের ভক্ত চণ্ডীদাস, কবি-সাধক! শ্রীকৃয়ের প্রেমলীলা গেয়েছেন। তিনিও কিন্তু কুলাচারী। কুল তাঁর রজকী। রামী ধোপানী। ব্রাক্মণী, চণ্ডালী, নটী, ডোমী আর রজকী—এ হলো বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের নির্বাচন। ব্রাক্ষ্মণ তন্ত্রমতে নয়টি কুল। ওই পাঁচ, আর চারটি—বেশ্যা, কাপালী, নাপিতানী, গোপিনী। কোনো কোনো তন্ত্রমতে চৌষট্টি কুল আছে। যবনীও বাদ যায় না তাতে। এসব সাধনমার্গের গুহ্য পদ্ধতি। তবে, এ সবই তন্ত্রমতে। কিন্তু সন্ন্যাসীর তো তন্ত্র নেই। অনেকে কুলাচার-পদ্ধতিতে সাধন করে থাকে। আপনাকে সন্ন্যসীদের কথাই বলি।’ বলে সে আমার মুখের দিকে তাকাল। বোধ হয়, আমি কী ভাবছি, সেটুকু দেখবার জন্য। কিন্তু এসব বিত্তান্ত কম-বেশি শুনেছি। এতে আমার বিস্ময়ের কিছু ছিল না। আমি শুনতে চাইছিলাম, রঘুনন্দন ও রামজীদাসীর কাহিনী।
সে বললো, ‘সন্ন্যাসী আর অবধূতে বড় একটা তফাত নেই। এরা অনেকে জ্যোত্মার্গের সাধন করে। অনেক তার ক্রিয়াকাণ্ড। মূলে বালাসুন্দরী দেবীর আবির্ভাব হলো তার কামনা। ঘৃত কপূরের একটি প্রদীপকে তারা পূজা করে। প্রদীপের চারপাশে সাক্ষী থাকেন কালী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হনুমান আর ভৈরব। এ পূজার উপাচার হলো প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, মতি ও চক্রী। বুঝতে পারলেন না? মদ, মাংস, অন্ন আর পুরি। এ হলো গুপ্ত শব্দ। এ ছাড়া সপ্তমী, ষষ্ঠী। গাঁজা আর তামাক। এ হলো জ্যোত্মার্গে প্রবেশের পন্থা। যে প্রবেশ করে, তাকে আর-একটি ব্রত করতে হয়। তাকে বলে চৈত্র মাসে নবরাত্র ব্রত। এই ব্রতের দিন সন্ন্যাসী চক্র করে আর গুপ্তস্থানে মিলিত হয় আওরতের সঙ্গে। এই মিলন হলো সন্ন্যাসীর গুপ্ত সাধনের সিঁড়ি। একে ছাড়া চলবে না। এর মধ্যে আছে অনেক যুক্তি, কূট বিষয়। আপনি সব বুঝবেন না বাবুজী।’
সন্ন্যাসীর জ্যোত্মার্গে প্রবেশ জানি নে। কিন্তু নানান কথা অনেকবার শুনেছি। শুনেছি, আর বারবারই মনের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন, ‘এসব কেন, কেন?’ যত জিজ্ঞেস করছি, জবাবগুলি ততই অস্পষ্ট হয়ে এসেছে অনুভূতিতে। বুদ্ধিও অনুভূতির অগম্য। নানান্ জনের নানান্ মত। সাধকের সিদ্ধিলাভের বিচিত্র লীলা। নিতান্ত সামাজিক জীব আমরা। আমাদের বলে, তোমরা বুঝবে না। আর আমরা ভাবি, তবে বুঝব না। শেষ পর্যন্ত যা পাই, সে তো মানুষের আর সাধকের আত্মার তৃপ্তি। এখানেই এত ঘোর-প্যাঁচ। কিন্তু কই, বিকলাঙ্গ বলরামকে, তার কথাকে তো এত জটিল মনে হয়নি! সে যেন পরিচ্ছন্ন একটি সুন্দর মানুষ। তার সঙ্গিনী লক্ষ্মীদাসীও তেমনি সুন্দর।
প্রতিবাদ করলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘রঘুনন্দনের কী হল?’
সন্ন্যাসী বললো, ‘রঘুনন্দন আর রুক্মিণীর কথা বলবো বলেই এত কথা বললাম। এমনি বললাম বুঝি তোমাকে এসব? তবে এ বিশ্ব-সংসারে কিছুই গোপন নেই। তাই বললাম। বাবুজী, রামজীদাসীর রূপ দেখে মানুষের চোখ ভুলে যায়। পুরুষের চোখ কিনা! কিন্তু পুরুষের রূপ দেখেও যে মানুষের চোখ ভোলে, তার প্রমাণ ছিল রঘুনন্দন। এই এলাহাবাদেই এক ব্রাক্ষ্মণের ঘরের ছেলে। মানুষ নয়, সাক্ষাৎ শিব-স্বরূপ। শুধু রূপে নয়, গুণেও। সে চোখ তুলে তাকালে, গায়ে হাত দিলে, সারা দেহে কাঁটা দিয়ে উঠত মানুষের। মন্ত্র-তন্ত্র নয়, তার হৃদয়টি ছিল অমনি। তার চরিত্রের গুণে তার কাছে আসত মানুষ তোমার ঐ নিরঞ্জনী আখড়ার সাধুরা রঘুকে বিদ্রূপ করত, ঠাট্টা করত। বলত, সন্ন্যাসী-জীবন তোমার নয়। গোঁফদাড়ি কামিয়ে শাড়ি পরে নবদ্বীপে চলে যাও। তা বললে কি হয়? মহাজ্ঞানী রঘুনন্দন। তর্কে হার মেনে রগচটা সন্ন্যাসীরা খালি ত্রিশূল দিয়ে মাটি খোঁচাত।…এই রঘুনন্দনের সঙ্গে রুক্মিণীর দেখা হয়েছিল হরিদ্বারে। রঘু তখন জ্যোমার্গ সাধন করে নবরাত্র ব্রত উদ্যাপনের আয়োজন করছে।’
শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কোনো এক অতীত যুগের কথা শুনছি। যে ভারতবর্ষকে দেখছি, এ যেন সে ভারতের কাহিনী নয়, কোনও এক হিন্দুযুগের। সন্ন্যাসীকে বাধা না দিয়ে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এসব কত বছর আগের কথা?’
সন্ন্যাসী বললো, ‘তা আজ প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আগের কথা।‘
বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে রামজীদাসীর বয়স কত?’
হেসে বললো ‘সে, কত অনুমান করছেন বাবুজী?’
অনুমান? অনুমান করে নারীর বয়স বলার সাধ্য আমার ছিল না। তবু বললাম, ‘বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ।’
সন্ন্যাসী তেমনি হেসে বললো, ‘আরও কম বললে দোষ হত না। কিন্তু বাবুজী, আরও আট-দশ বছর বাড়িয়ে দিন।’
আরও আট-দশ বছর! চকিতে সেই রূপশিখা, মূর্তি ধরে দাঁড়ালো আলোর সামনে। আশ্চর্য!
শুধু দেহ নয়। মুখখানিতে কোথাও বয়সের দাগ পড়েনি। কম বললে সত্যি ক্ষতি ছিল না।
সন্ন্যাসী বললো, ‘মনে আছে, সে যেদিন এলো, আমাদের আশ্রমের শূন্য বাগানে যেন ফুল ফুটে উঠলো। সন্ন্যাসী বলে তো তার চোখ বন্ধ রাখতে পারি যায় না! হৃদয়ও মরে যায় না। সে এলো। সঙ্গে তার স্বামী। ঝোলা কাঁধে নিতান্ত গেঁয়ো মানুষ। চৈত্র মাস। হরিদ্বারে তখন এমনিতেই ভিড়! কেদারবদরির যাত্রীরা আসতে আরম্ভ করেছে। বরফ-গলা জলের ঢল নেমেছে এদিকে-ওদিকে। রুক্মিণীর স্বামী মোহান্তর অনুমতি নিয়ে খানা পাকাবার আয়োজন করলো আশ্রমে। তারা এসেছে আরও উত্তর থেকে। যাবে বদরিনারায়ণ দর্শনে। আশ্রমের পেছনেই একটি গুপ্তাবাস ছিল। একটি মস্ত গুহামুখ। সেইখানে নবরাত্র ব্রতের ভিড়। আশ্রমের অনেকে সেইখানেই ব্যস্ত। তা ছাড়া ভক্তও এসেছে অনেক। কয়েকজন এসেছে সস্ত্রীক। নবরাত্র ব্রত বড় গোপন বিষয়। তার আয়োজনও চলছিল গোপনে।’
বলে, এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ হেসে উঠলো সন্ন্যাসী। বললো, ‘বড় অদ্ভুত মানুষ ছিল রঘুনন্দন। গুপ্তাবাস থেকে বার বার বেরিয়ে আসে, আর মোহান্তর কাছে এসে খালি বসে। আমার সঙ্গে যতবার চোখাচোখি হয়েছে, ততবারই হেসেছে। অস্বীকার করবো না, সে-হাসি সন্ন্যাসীর শোভা পায় না। সে হাসি গৃহী জোয়ান ছেলের। গোপন প্রেমের। তবে, রঘুনন্দনের মুখে একটা চিন্তাও ছিল বাবুজী। মাঝে মাঝে কালো দেখাচ্ছিল তার আন্ধেরী মুখ। আমি ছিলাম কোতোয়াল। নবরাত্র ব্রতে নিমন্ত্রণ করতে যাব অন্যান্য আশ্রমের সহধর্মীদের। হঠাৎ রঘুনন্দন এসে বললো, কোতোয়ালী, আমি চক্রে থাকতে পারবো না রাত্রে। আমি তাজ্জব। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। বড় সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। নিত্য-মন্ত্র পাঠ করে, নতুন বেশে সেজেছে সে। নেংটির চেয়ে হাঁটু অবধি গেরুয়া ধারণ তার পছন্দ ছিল। গলায় ধুতরার মালা। রুদ্রাক্ষের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাল-গাঁথা হার। হাতে বদরিকা কঙ্কণ। আর প্রবালের মালা দিয়ে জড়ানো জটা। আগুনের মতো তার গায়ের রঙ। ভস্ম মাখা। বুকে, গলায় আর কপালে রক্তচন্দন। যেন সাক্ষাৎ শিব-স্বরূপ! মহাজ্ঞানী রঘুনন্দন। তার ঢিলেঢালা হাসি-খুশি চরিত্রের জন্য সে মোহান্ত হতে পারেনি। সন্ন্যাসীর আখড়া আছে। আবার মঠও আছে। সেখানে মোহান্ত কেউ কাউকে করে দিয়ে যায় না। সন্ন্যাসীরা সবাই মিলে যাকে মোহান্ত করে, সে-ই হতে পারে। কিন্তু মোহান্তর নিজের খুশিতে কাজ চলে না। সন্ন্যাসীদের সকলের মত নিয়ে তাকে কাজ চালাতে হয়। রঘুনন্দনের পক্ষে এসব সম্ভব ছিল না। কিন্তু ধর্মের ইতিহাস ও জ্ঞান পেয়েছিলাম আমরা তার কাছ থেকে। সে জানতো আর বুঝত সকলের চেয়ে বেশি। তার মুখে ওই কথা শুনে আমি ভয়ে বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলাম। শুধু বললাম, ‘কেন?’
সে বললো, ‘আমি কোনো উৎসহ পাচ্ছি না!’
আমি বললাম, ‘চক্রে বসলে উৎসাহ পাবে।’
সে বললো, ‘তা হয় না কোতোয়ালজী। হৃদয়ের আগল বন্ধ। ভগবান আমার সেবায় খুশি হবেন না। এমন সময়ে রুক্মিণী এসে দাঁড়ালো সামনে। আমাকে নয়, রঘুনন্দনকে নমস্কার করলো। রঘুনন্দন বললো, ‘নারায়ণো, বেঁচে থাকো। বলেছিলাম বাবুজী, রুক্মিণী এলে যেন আশ্রমে ফুল ফুটে উঠত। তার রূপ, তার কথা ও নির্মল হাসি সকলেরই বড় চোখে লেগেছিল। সে একটু চঞ্চল। ঝরনার মতো ছলছল তালে চলে। অল্প সময়ের মধ্যেই সকলের স্নেহ পেয়েছিল সে। রঘুনন্দনকে দেখে রুক্মিণী নির্বাক নিথর। চোখে তার আলোর শিখা। তার লজ্জা হলো না, জোড় হাতে দাঁড়িয়ে রইলো সে। শুধু বাতাসে উড়ছে তার খোলা চুল। বাবুজী, রঘুনন্দনের চোখেও দেখলাম তেমনি আলো। সন্ন্যাসীর মুগ্ধতা! সে তো ভালো কথা নয়, কিন্তু দু’জনেই কী সুন্দর! আমি জ্ঞানী নই, সাধনা নেই আমার। তবু আমার মনে হলো আমার সামনে স্বয়ং হরগৌরী রয়েছে দাড়িয়ে। আমার সময় চলে যায়। যেতে হবে অনেক দূরের আশ্রমে। আমি চলে গেলাম। আজ নবরাত্রের শেষ রাত্রি। জোমার্গে যান যেসব সন্ন্যাসী, তাঁদের অনেককেই সংবাদ দিতে হবে।
‘ফিরে যখন এলাম তখন সাঁঝ উতরে গেছে। আশ্রম নিঝুম। কিন্তু কাজকর্ম চলছে ঠিক। তখনো সন্ধ্যাপূজা শেষ হয়নি। মন্দিরে ছিল পাথরের শিবমূর্তি। কিন্তু আখড়া চলে বড় নিয়মে। এ সময়ে সন্ন্যাসীর কর্তব্য হলো মানসী পূজা। চোখ বুজে ভাবতে হয় গুরুর মূর্তি। কল্পনায় বসাতে হয় মন্দিরের বেদীতে। নিত্য গুরুদর্শনের ওই পন্থা। গুরুর পা ধোয়াবে, আস্নান করাবে, ধ্যান কল্পে লেপে দেবে তার সর্বাঙ্গে বিভূতি। পুজো করবে ফুল-চন্দন দিয়ে।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘সন্ন্যাসীরও গুরু থাকে?’
‘কী বললে বাবুজী? সন্ন্যাসীর গুরু থাকবে না? সন্ন্যাসীর কি একজন গুরু? তার যে গুরু অগনন। মূল গুরু, শিক্ষা গুরু, বিভূতি গুরু। সন্ন্যাসীর সাত গুরু। কেউ তাকে দেয় ডোরকৌপিন, কেউ দেয় বিভূতি। কেউ তার শিখা-মুক্তিদাতা গুরু। ষট্কর্মের দীক্ষাগুরু হলো আচার্য।
‘এসে দেখলাম, মোহান্ত স্বয়ং মানসীধ্যানে লিপ্ত। আমাকে বসতে হবে। দেরি হয়ে গেছে। এদিকে এক হাত-পা-মুখ ভরে গেছে ধুলোয়। আখড়ার কিছু সন্ন্যাসীর চোখে-মুখে একটি চাপা আনন্দ ও ব্যস্ততা। নবরাত্রে অংশগ্রহণে খবু উৎসুক তারা। কলিকাল কিনা! সন্ন্যাসী হয়েও সুখের মুখ দেখতে চায় সবাই। আসল সাধক আছে ক-জনা?
‘ভাবলাম, একবার রঘুনন্দনকে দেখে আসি। মন্দিরের পেছনে গিয়ে দেখলাম মহা আয়োজন। জনা-পাঁচেক আওরতকে দেখলাম, তারা সকলেই গেরুয়া ধারণ করেছে। জনা-বারো গৃহী সাধক এসেছে। তারাও পরেছে গেরুয়া কাপড়। সন্ন্যাসীর বেশে সেজেছে সবাই। সকলেই আমাকে নমস্কার করলো। আমি জবাব দিতে পারলাম না। এদের এসব আসর-অনুষ্ঠান আমার কোনোদিনই ভালো লাগে নি। আমাদের গুহ্য ষট্কর্মে কোনোদিনও কোনো বাইরের লোক ঢুকতে পায় না। কিন্তু জ্যোত্মার্গে বাইরের লোককে ঢোকবার অধিকার দিয়ে গেছে আগের সিদ্ধপুরুষেরা। কবে থেকে জানি নে, কিন্তু আমার জীবনে চিরকালই এই নিয়ম চলতে দেখেছি।
‘যে-পাথরের নিচের গুহাঘরে ছিল রঘুনন্দন সেখানটি একেবারে জনহীন। দূর থেকে দেখলাম, অন্ধকার। কাছে এসে ঘরে ঢোকবার মুখে থমকে দাঁড়ালাম। দু’টি মূর্তি কালো পাথরের গায়ে রয়েছে লেপ্টে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, রুক্মিণীর গায়ে গেরুয়া বসন। বাবুজী, রুক্মিণী যে এত সুন্দরী, আঁধার যে জ্যোতিতে ভরে ওঠে রূপে, সন্ন্যাসিনী বেশে তাকে দেখে তা বুঝলাম। আমার চোখের পলক পড়লো না কয়েক মুহূর্ত। রুক্মিণীর হাসিতে সংবিত ফিরে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কী চাও?’
রুক্মিণী জবাব দিল, ‘আমরা পূজা করব।’ আর বলবার দরকার ছিল না। বুঝে নিলাম, রুক্মিণীর সঙ্গে মুখে হোক, মনে মনে হোক, কোন বোঝাপড়া হয়েছে রঘুনন্দনের।
‘রঘুনন্দনের সঙ্গে দেখা করবার অবসর মিলল না। দেখলাম, দীপ জ্বলে উঠেছে ঘরের দু’ধারে দু’টি। একটি মহাদেবের। অপরটি মহাদেবী কালীর। অন্যান্য সন্ন্যাসী-সাধকেরা এসে পড়ল। সেই সঙ্গে ভৈরবীরূপী আওরতেরা। আরম্ভ হলো শিবশক্তি ভৈরবীর উপাসনা, তারপরে প্রসাদ খাওয়া। সে-প্রসাদ শুধু জ্যোত্মার্গের কুলাচারীরাই সন্ন্যাসী হয়েও গ্রহণ করতে পারে।
‘রুক্মিণী গিয়ে দাঁড়ালো রঘুনন্দনের কাছে। রঘুনন্দন তাকে প্রসাদ দিল। তারপর চক্রমধ্যে যা থাকে, তন্ত্রমতে সে-সবই আরম্ভ হলো।
‘পরে দু’দিন আর আমার সঙ্গে রঘুনন্দনের দেখা হয়নি। এমন কি রুক্মিণীকেও দেখতে পাই নি। রুক্মিণীর স্বামীকেও নয়। বাইরে থেকে বিশেষ কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু এ ব্যাপারের পর আশ্রমে কিছু কিছু অনিয়ম দেখা দেয়। ক্রিয়াকাণ্ডে গণ্ডগোল হয়। তৃতীয় দিনে দেখলাম, রঘুনন্দন গঙ্গা থেকে চান করে আসছে। কিন্তু এ সেই আগের রঘুনন্দন নয়। সেই মহাজ্ঞানী হাসি-মুখ সন্ন্যাসী নয়। তার সারা মুখে এক অদ্ভুত পাগলামি। চোখ আধবোজা, সামনাসামনি হলে বললাম, ‘ওঁ নমো নারায়ণ!’ সন্ন্যাসীর মতো জবাব না দিয়ে রঘুনন্দন আমার হাত ধরে বললো, মহাবীর ভাই! কথাটা বড় কানে ঠেকল। সাধারণ মানুষের মতো এমন গদগদ ভাবে কথা বলছে কেন রঘুনন্দন! বললাম, কী বলছ?
‘সে বললো, ভাই, নতুন জ্ঞান লাভ করেছি। অমনি আমারও বুকের মধ্যে আনন্দে ভরে উঠলো। জ্যোত্স্নাগচক্রে নিশ্চয়ই কিছু দর্শন ঘটেছে রঘুর। তাকে হাত ধরে আড়ালে নিয়ে গেলাম। যেমন করে ছোট ছেলে খাবার লুকিয়ে নিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলাম, কী জ্ঞান লাভ করলে?
‘রঘুনন্দন বললো, তা তো জানি নে। বলতে বলতে বাবুজী দেখলাম, তার চোখভরা জল। আর জলভরা মুখে হাসি। চোখের নজর সামনে নেই, পেছনে নেই। উদাসীন স্বপ্নাচ্ছন্ন দৃষ্টি। হঠাৎ চমকে উঠে বললো, শুনেছ?
‘বললাম, কী?
‘বললো, শুনতে পাচ্ছ না?
‘কান পাতলাম। কিছুই তো শুনতে পাচ্ছি না।
‘রঘুনন্দন বললো, শুনতা নহি চিড়িয়া পুকারতি মিঠে বুলি?
‘হ্যাঁ, চারিদিকে গাছে গাছে অনেক পাখি ডাকছে। সে তো সব সময় শুনি।
‘সে বললো, ওই তো সেই আনন্দ, মহানন্দ। তুমি শোনো সব সময়? কই, আমি তো এতদিনে শুনতে পাইনি! দেখতে পাইনি ওই আসমান। এমনি পাগল বাতাস তো লাগেনি। আমার গায়ে। সহজ করে দেখিনি কোনোদিন কিছু। যা সহজ তাই তো সুন্দর। কিছু দেখলাম না, কিছু শুনলাম না, শুধু ছাই মেখে আখড়া নিয়ে পড়ে আছি। জ্ঞান নিয়ে বড়াই করেছি। জ্ঞান কাকে বলে? বুদ্ধিকে? না, ভুল মহাবীর ভাই। বুকের রস না হলে মাথায় ফুল ফোটে না। মাথার সেই ফুলের নাম হলো জ্ঞান। শিকড় তার হৃদয়ে। সে-হৃদয় আমার অন্ধ ছিল। সে অন্ধ চোখ মেলেছে। যখন প্রাণ মানে না, তখন পূজা আপনি করতে হয়। কিন্তু নিয়মের দাস হয়েছি আমরা। এ আর চলে না। মন্ত্র কী? মন্ত্র কি কেউ শেখায়! সে তো প্রাণ থেকে আপনি উঠে আসে। যে-সুরদাস পথে পথে গান গেয়ে বেড়ায়, ওই গানই তো তার মন্ত্র। অমনি সেবা না হলে সব মিথ্যে। আর অমনি সেবা কেমন করে হয়? যখন সহজ চোখে পড়ে বিশ্বরূপ। সেই বিশ্বরূপ তুমি, ভাই মহাবীর।
‘আমি চমকে উঠে বললাম, এসব কি বলছ রঘুনন্দন?
‘সে বললো, মিথ্যে বলি নি তো! তুমি, এই মাটি, এই বাতাস, জল, ওই গান-পাগল পাখি, ওই আকাশ। এর মধ্যেই সেই রূপ ফুটে রয়েছে, দেখতে পাইনি এতদিন।
‘বললাম, শিখাসূত্রত্যাগী সন্ন্যাসী তুমি, ষট্কর্ম শেষ করে পূর্ণ সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত, সপ্তগুরুর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কলিকালের আখড়াশ্রয়ী অবধূত, এসব কী বলছ?
‘রঘুননন্দন বললো, ঠিকই বলেছি ভাই। সপ্তগুরু কেন? গুরু আমার তুমি, এই প্রকৃতি, গুরু আমার রুক্মিণী, এই সংসার, সংসারের সব আদমি আর আওরত, যা অপরুপ, তাই গুরুর রূপ। এর শুরু কোথায় জানি নে। জানি নে বন্ধু, এর শেষ কোথায়। বলে, সে নিজে নিজে গান গেয়ে উঠলো। গানে গানে সে বললো, ওই যে গঙ্গা বয়ে চলেছে, কত রূপরাশি তার চোখে, সেই রূপ দেখে তুই নাচতে নাচতে চললি গঙ্গা। কিন্তু যেখানে তোর শেষ, সেখানে তোর শুরু। যার বুকে ঝাঁপ দিলি তুই, সে যে অসীম কূলকিনারাহীন। আমিও তেমনি ঘাটে ঘাটে ভেসে যাব, মন ভরাব রূপের হাটে হাটে। বাবুজী, রঘুনন্দনের এই রূপ যেন বাওরা সন্তের হাসি-কান্না ভরা বিচিত্র ও অপরূপ। ওই গান সে নিজের মন থেকে বানিয়ে গাইলে। আমার মনে হলো, যেন ঠিকই বলছে রঘুনন্দন। মনে হলো, ঝুটা আমার এই বিভূতি মাখা, জটা রাখা আর আখড়ায় থাকা। মনে হলো, এসব আমার চারপাশের নিগড়। ছুটে ভেঙে বেরিয়ে পড়ি। জানতাম, নিষ্ঠাবান বলতে যা বোঝায়, রঘুনন্দন ঠিক তা ছিল না কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে তার এই বিচিত্র পরিবর্তন কী করে হলো!
সে আবার বললো, সব দেখবে, তার আগে নিজেকে দেখতে হবে না? মনো ব্রহ্মেতি ব্যজানাং। এ কথা তোমাদের বলেছি মহাবীর ভাই, তাকিয়ে দেখি মনের আঁধার যে বড় ভারী। সে তিমিরে কিছুই চোখে পড়ে না। নমোমাহত্যং। কিন্তু কোন সাহসে নমস্কার করবো নিজেকে! খুঁজি, দেখি। এতদিন হরিদ্বারে আছি, তার গাছ-পাথরটুকুও দেখি নি কোনোদিন নিরালায় বসে। মানুষকে মনে করেছি, সব ব্যাটা টাকাখোর আর কামুক। ক্ষমা কর ক্ষমা কর। যে নিজেকে চেনে না, সে পরকে দেখবে কেমন করে!
সন্ন্যাসীর কথা অর্থাৎ মহাবীরের কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক! সে কী! সন্ন্যাসী রঘুনন্দনের কথা তো দেখছি বাউলের গান হয়ে উঠেছে। এ যে সহজিয়া বাউলের কথা। যেন উঁকি দিচ্ছে বলরাম। রঘুনন্দনের এ সহজ কথা সহজ ভাব আমার মনকে নাড়া দিয়ে দিল। হৃদয়ের রস দিয়ে সে জ্ঞানের ফুল ফোটাতে চায় মস্তিষ্কে, রূপে পাগল হওয়া ছাড়া তার গতি কী!
চাঁদ উঠে এসেছে আরো খানিকটা। মাঝে মাঝে মেঘ উড়ে চলেছে চাঁদের মুখ চাপা দিয়ে। হিমালয় থেকে সমুদ্রে, উত্তর থেকে দক্ষিণে তার গতি। মেঘের ছায়া পড়েছে বালুচরে। আলো-ঝিকিমিক বালু-হাসি চাপা পড়ে যাচ্ছে যেন আচমকা কপট অভিমানে। কিন্তু কী শীত! আর এখনো কত ভিড়। কত কোলাহল।
মহাবীর আবার বললো, ‘বাবুজী, রঘুনন্দন চোখের আড়াল হলো। মনে এলো আমার কুসন্দেহ। ভুলে গেলাম তার প্রাণ ভোলানো কথা। মনে করলাম, রঘু-চরিত্রে দুর্বলতা ঢুকেছে। কেন? না, তার কথাগুলি যত মনে আসতে লাগলো সবই যেন ওই রূপবতী রুক্মিণীর কথা মনে করিয়ে দিল। ও তো কথা নয়, বুঝি কথা দিয়ে রুক্মিণীর রূপের আরতি। কপনি-আঁটা সন্ন্যাসী আওরতের সর্বনাশী মায়াজালে ধরা পড়ে মাথার ঠিক রাখতে পারছে না।
‘আশ্রমে এসে দেখি রুক্মিণীকে। গায়ে তার গেরুয়া নেই। পরেছে নিজের শাড়ি। তার রূপের ছটা আখড়ায় ঘরে-মন্দিরে। শুধু দেখতে পেলাম না তার স্বামীকে।
‘মোহান্ত ডেকে বললো, বদরিনাথ দর্শনে যাবে না তুমি?
‘রুক্মিণী হাসলো। সে কী হাসি! সারা দেহ ভরে তার এক বিচিত্র আনন্দ যেন ঝরে পড়ছে। রূপ তার দ্বিগুণ আলোয় উঠেছে ভরে। বললো, না বাবা! এখানে থেকেই তাকে সেবা করে যাব। তোমরা আমাকে আশ্রমে থাকতে দাও। আমি ভগবানের সেবা করব।
‘এরকম অনেক ছিল বাবুজী। ঘর ছেড়ে আসা অভাগিনী চিরজীবন আশ্রমের সেবা করে কাটিয়ে দিয়েছে। আশপাশের গাঁয়ের অনেক বউ-ঝি সারাদিন কাজ করে আশ্রমে। সন্ধ্যা হলে ফিরে যায় ঘরে। কিন্তু এই আগুন কোথায় রাখা হবে, সন্ন্যাসীর আখড়ায়? মোহান্ত জিজ্ঞেস করলো, তোমার স্বামী কোথায়?
‘বললো, তাকে দেখতে পাচ্ছি না বাবা।
‘সন্ন্যাসীদের মধ্যে কেউ বললেন, থাকুক। আপত্তি ছিল কারুর কারুরও। কিন্তু বাপারটার কোনো ফয়সালাই হলো না। সে থেকে গেল আশ্রমে।
‘মুখে কেউ কিছু বললো না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সকলেই কৌতূহলিত সন্দেহে ঘনীভূত হলো। সকলেই চোখে চোখে রাখে রঘুনন্দনকে। আমিও। সবাই ওৎ পেতে আছি, কবে একদিন ধরে ফেলব রঘুনন্দনের অপকীর্তি!
‘কিন্তু বাবুজী, রঘুনন্দন সে ধার দিয়েও গেল না। না, সে জটা মুড়োয়নি, ছাড়ে নি বিভূতি লেপন। কিন্তু সে-মানুষটি আর নেই। সকাল-সন্ধ্যায় পূজা-অৰ্চনায় মন নেই। তার পদে পদে গাফিলতি। সেজন্য কোন অনুশোচনা নেই। বাওরা সন্তের মতো দিবানিশি শুধু গান আত্মভোলা হাসি। ঘোরে এখানে সেখানে। সে ঘোরে বাইরে বাইরে। রুক্মিণী ঝাঁট দেয় আখড়ার উঠোন, লেপা-পোঁছা করে, জল তোলে, প্রসাদ পায়। কতদিন গেছি রঘুর পেছনে পেছনে। সে যেত নিরালায়। গান গাইত আপন মনে : আমার পাখায় যেদিন হাওয়া লাগবে, সেদিন ছুটে যাব তোমার খোঁজে। কখনো বসব তোমার গিরিশৃঙ্গে, ভাসা মেঘে ঠোঁট ঢুকিয়ে মেটাব আমার পিয়াস। তোমার এই ভুবনে কানে কানে শোনা তোমারই রূপগাথা।
‘গান শোনার জন্য ভিড় করতো লোক তার পিছে। তার মতো জ্ঞানী পুরুষের এই রূপ দেখে অবাক হলো অনেকে।
‘আমি খালি ভাবতাম, ওই গানের মালা কে পরিয়ে দিল তার গলায়! কে খুলে দিল এই গীত-নির্ঝরের উৎসমুখ। সন্ধ্যাবেলা মানসীপূজায় বসে, গুরুমূর্তি কল্পনা করতে গিয়ে, বার বার দেখি রঘুনন্দনকে। কানে শুধু তারই কথা—
ব্রহ্ম নামে একটি ফুল ফুটেছে
তার গন্ধ পাগল করেছে আমাকে।
সে ফুলের রূপে আগুন আছে।
তবু আমার চোখে জ্বলে নি!
শুধু আমার অন্ধ হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে বাতি।।
‘বাবুজী, রুক্মিণীর সঙ্গে যখন দেখা হত রঘুনন্দনের, তখন তারা নমস্কার করতো পরস্পরকে। কিন্তু রুক্মিণী চঞ্চল হয়ে উঠত। বুঝতে পারতাম, রঘুনন্দনের সঙ্গ কামনায় পাগলিনী হয়েছে সে। লোকলজ্জার ভয় ভুলে কোন কোন সময় ছুটে যেত রঘুর পেছনে। রঘু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ফিরে যেতে বললেই, ফিরে আসত সে।
‘বাবুজী, রঘুর প্রতি বিদ্বেষ আসত না কারুর। লজ্জার কথা, যাদের আসত, তারা সকলেই রুক্মিণীর প্রতি আসক্ত ছিল। গৃহী শিষ্যকুল আসত ঘন ঘন। নজর শুধু ওইদিকে। আখড়ারও অস্বাভাবিক অবস্থা।
‘হঠাৎ একদিন আখড়ার সকলেই শুনল, রঘু গাইছে, হে ব্রত্ন ও জ্ঞান, তোমার নাম রুক্মিণী। হে পৃথিবী, তোমার নাম রুক্মিণী। এই হিমাচল ও গঙ্গা, এই বিহঙ্গ ও গাছ, এই আকাশ ও মাঠ সকলেই রুক্মিণী নামে ও রূপে সুন্দরী। হে অবধূত-হংস, তুমি আসলে দেহস্থিত একটি নারী। তোমারও নাম রুক্মিণী। এবার আমি যাব তোমার সন্ধানে। সময় হয়ে গেছে আমার। ডাক পড়েছে।
‘বাবুজী, আরও তাজ্জব, নির্ভয়ে রুক্মিণী এসে ফুল, জল, চন্দন দিল রঘুর পায়ে। সকলে স্তম্ভিত। অনেকে রেগে উঠলো। মোহান্ত বললো, অন্যান্য আখড়ায় খবর দিতে হয়। আমাদের আছে অনেক আশ্রম, নির্বাণী, নিরাঞ্জনী, অটল, জুনা, আনন্দ। সকলের মতামত প্রয়োজন।
‘কিন্তু দরকার হলো না। সেই রাত্রি থেকে রঘু নিরুদ্দেশ। রুকমিণী রয়েছে। চকিত হরিণীর মতো কেবলি খুঁজছে। সে যাকে খুঁজছে, আমরা, বিশেষ আমি, খুঁজছি তন্ন তন্ন করে। সারা হরিদ্বারে পাত্তা মেলেনি তার! তাকে কে পাগল করলো বুঝলাম না, কিন্তু সে আমাকে পাগল করে কাঁদিয়ে চলে গেল।
‘দু’মাস ধরে এই ব্যাপার চলছিল। সকলের মনে যে অস্বস্তিটুকু ছিল রুক্মিণীর জন্য, দু’মাস পরে তার স্বামী এসে সেটুকু দূর করলো তার স্বামী এলো। একলা নয়। সঙ্গে আরও কয়েকজন লোক। ছি ছি ছি, আখড়ার বদনাম। সন্ন্যাসীরা জোর করে রেখে দিয়েছে নাকি তার বউকে! তাই সে কেড়ে নিতে এসেছে। যাদের নিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে দু’জন তলোয়ারধারী শিখও ছিল। লোকগুলি যে নিষ্ঠুর প্রকৃতির, সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল না।
‘কে রেখেছ? নিয়ে যাক রুক্মিণীকে। আমরাও তাই চাই। কিন্তু বেঁকে বসলো রুক্মিণী। সে যাবে না। তা বললে তো হয় না। এ ব্যাপারের পর আখড়া তাকে এমনিতেই সরিয়ে দেবে। বদনাম যা হওয়ার, তা তো হয়েছেই।
‘শেষে ওরা জোর করে নিয়ে গেল রুক্মিণীকে। বাবুজী, মিথ্যে বলবো না, আমার বুকে বেজেছিল। কেন বেজেছিল? তাহলে বলি, কে অস্বীকার করবে, সে ছিল আমাদের প্রিয়তম রঘুনন্দনের সাধন-প্রেয়সী? রঘু-রুক্মণী যে একাকার হয়েছিল। বাবুজী, কুলাচারে নারীর সঙ্গ-মধ্যে হৃদয় ও প্রেমের কিছু আছে কিনা জানি নে। থাকলেও বিশ্বাস করতে মন চায় না। ও শুধু সাধনমার্গের যান্ত্রিক ক্রিয়া।
‘কিন্তু রঘু আর রুক্মিণী! কুলাচারের চেয়েও প্রেম বড় হয়ে উঠেছে সেখানে। বাবুজী, হৃদয়ের রসহীন যে চারাগাছ উঠেছিল রঘুর মাথায়, রুক্মিণী তাতে ফুল ফুটিয়েছিল। রঘুর জ্ঞান ও হৃদয়ের মাঝামাঝি বন্ধ দরজার চাবি হয়ে এসেছিল রুক্মিণী। এর পর রঘুকে কে কী দিয়ে রাখবে বেঁধে!’
বলে, মহাবীর উঠে দাঁড়াল। কথা যে এইখানেই শেষ করবে, একেবারে বুঝতে পারি নি। বললাম, তারপর?
‘তারপর কী বাবুজী?’
‘রুক্মিণীর কী হল?’
মহাবীর জবাব দিল, ‘কী হলো, তা ঠিক বলতে পারি নে বাবুজী। তবে বছর না ঘুরতে দেখলাম, রুক্মিণী মানিয়াবাঈ হয়েছে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে?’
সে বললো, ‘তাও ঠিক জানিনে। যতদূর শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে, রুক্মিনীর স্বামীর সঙ্গে যে লোকগুলো এসেছিল তাকে উদ্ধার করতে, তাদেরই কীর্তি এটি। রুক্মিণীকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি তার স্বামী। তার সাঙ্গোপাঙ্গরা নিয়ে তুলেছিল একটা ডেরায়। শুনেছি, সেখানে ছিঁড়ে খাওয়া হয়েছিল তাকে। আর তার কাপুরুষ স্বামী পালিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে।
‘বাবুজী রুক্মিণীকে উদ্ধার করার কিছুই ছিল না। রঘুনন্দন তো আগেই চলে গিয়েছিল। তবু, বদনাম রটে গিয়েছিল আমাদের আশ্রমের নামেই। এমন কি, আমাদের বিভিন্ন আখড়ার দু’-একজন রঘুকে খুঁজে ধরে নিকেশ করে দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত করেছিল। সেটা যত না আখড়ার দুর্নামের জন্য তার চেয়েও বেশি বিরুদ্ধ ধর্মাচরণের জন্য। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তা হলে ঘটনা অনেক দূর গড়িয়ে পড়ত। আর রুক্মিণী! তার তো অপরাধের সীমা ছিল না। অখড়া থেকে তবু বা তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল। কিন্তু অতগুলো লোকের দ্বারা যে দিনের পর দিন ধর্ষিতা হয়েছে, তাকে কি কখনো ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। সে পালিয়ে বেঁচেছিল। তবে, এর জন্য সে আর ডাকেনি লোক-লস্কর, যায়নি পুলিশের কাছে। জানি নে, কে তাকে প্রতিষ্ঠা করে দিল লক্ষ্ণৌয়ের বাঈজী মহলে। কিন্তু তার সারা নামে শহর চঞ্চল হয়ে উঠেছিল।’
একটু থামল মহাবীর। দাঁড়িয়েছিলাম দু’জনেই। সে দূরের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘দেখেছিলাম একদিন। খুবই কৌতূহল ছিল। সেবার লক্ষ্ণৌ গিয়েছিলুম। তখন দুনিয়াজোড়া যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। শহরের বাতিগুলো সব বোরখা পরেছিল। অন্ধকার। কানের পাশ দিয়ে একটা কথা শুনলাম, মনিয়াবাঈ আছে। চমকে উঠলো বুকের মধ্যে। কোথায়? ফিরে দেখলাম, সামনে রাজ-ইমারত। দোতলা কুঠি। উপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রুক্মিণী নয়, মনিয়াবাঈ। একটু আলো এসে পড়েছে ঘরের থেকে। দেখলাম, আঁধারে বিদ্যুৎশিখা স্থির। বাড়ির সামনে কয়েকটি মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। দোতলার বারান্দায় ছায়ার মতো ঘুরছে কয়েকজন লোক। ব্যাপারটা কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু দেখলাম, ছায়াজগতে এক মূর্তিমতী রূপসী উর্বশী। সেখানে বা অন্য কোথাও বাজছিল সরোদের চাপা বাজনা। পুরুষ গলায় চাপা হাসি, কিন্তু মনে হলো, বাঈজী যেন অন্য জগতে রয়েছে। কীসের ঘোরে সে আচ্ছন্ন, কিন্তু সে শুধু তার বাঈজীসুলভ অভিনয়। তার রূপ-পাগলদের একটু নাচানো। সরে এলাম তাড়াতাড়ি। রঘুনন্দনের কথা মনে পড়েছিল। আমার রঘুনন্দন।’
থেমে আবার বললো, ‘তারপর রামজীদাসীকে দেখছি আজ কয়েক বছর। জানিনে এর কী দরকার ছিল। এতে করে ধর্ম কতখানি এগুলো, জানি নে। কেন সে ওই জীবন ছেড়ে এলো চলে! বাবুজী, মানুষের মন। রামজীদাসী আজ উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের এক রহস্যময়ী নারী। তার ধর্মপ্রচারে কতখানি কাজ হবে আমি বুঝিনে। সাধারণ মানুষ দুরের কথা, সাধু-সন্ন্যাসী মহলে তাকে নিয়ে রীতিমতো আলোচনা হয়। নিজের চোখে দেখে এলাম। সে যে আগুন। আগুনের শিখা। কোনদিন আবার কী প্রলয় উপস্থিত হবে কে জানে! আমার সেই ভয়।’
‘তবে যতদূর শুনি, সে এখন নাকি সব সময়েই নামের ঘোরে থাকে। অষ্টপ্রহর নামকীর্তনই তার কাজ। লোকে বলে, রঘুনন্দনের সঙ্গে নাকি তার দেখা হয়েছিল। সেই থেকে সে এ পথে এসেছে। আমি বিশ্বাস করতে পারি নি। এখনো করি না। রঘুনন্দন আর রামজীদাসী আকাশ-পাতাল তফাৎ। তাছাড়া আর একটি কথা শুনেছি।’
মহাবীর থামলো। বললাম, ‘কী?’ মহাবীর বললো, ‘গুজব বলেই মনে হয়। ওই যে দেখলেন সরোদ বাজাচ্ছে একটি লোক, ছিল সে একজন সরকারী কেরানী। ভালো সরোদের হাত। ওটি ওর সাধনার জিনিস। ভারি ওস্তাদ বাজিয়ে। কোন বাঈজী ওকে পেলে বর্তে যেত। লোকটি নাকি নিজের ইচ্ছেয় মনিয়াবাঈয়ের ওখানে যন্ত্র বাজাতে যেত। সে-ই নাকি মনিয়াকে এ পথে নিয়ে এসেছে। সকলেই তো কেটে পড়েছে আজ। শুধু ওই লোকটি ওই মিঠে যন্ত্রটি কাঁধে নিয়ে ছায়ার মতো ফিরছে রামজীদাসীর সঙ্গে সঙ্গে। শুনতে পাই, লোকটি নাকি খুব ভালো। একরকম মৌনব্রত বলা যায়। কথা বলে না কারুর সঙ্গে। এমন কি, রামজীদাসীর সঙ্গেও নাকি তাকে কেউ বড় একটা কথা বলতে দেখে না। এই সরোদের সুরই তার কথা। ওটি না বাজলে রামজীদাসীর রাম-ভজনের নাচ আসে না, পা ওঠে না।’
বলে, মহাবীর একটু হাসলো। বললো, ‘বাবুজী, অনেকেই জানে ওসব কথা, তাই বললাম। এবার আমি চলি।’
বললাম, ‘আপনার রঘুনন্দনের…’
আবার হাসলো সে। সে-হাসির অনেক অর্থ। বললো, ‘আমার রঘুনন্দন। ঝুটা বলেন নি। তবে আমার একলার নয়। আমাদের আখড়ার সুখের সংসারে সে ভাঙন ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বদনামের নয়, একটা নতুন ভাবের ঘোর এনে দিয়েছিল সে।’ বলতে বলতে দেখলাম, মহাবীরের মুখে একটি চাপা বেদনার হাল্কা অন্ধকার চেপে বসলো। চাপা গলায় বললো, ‘সে যে আমাকে পাখির গান শুনিয়ে গেল, সে যে আমাকে এক পাগল প্রেমের পথ দেখিয়ে গেল, সেই হলো আমার কাল। বাবুজী, আমি আর সন্ন্যাসী নই। ঘরে ফিরে যাওয়া মনস্থ করেছিলাম, পারিনি। সেই সহজ আর অসীমকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ভাবি, সহজ আর অসীম, সে যে বুকের রসে মাথার ফুল ফোটানোর সাধনা। সে যে বড় যন্ত্রণার, বড় ব্যথার, মহা আনন্দের—কোনোটাই যে খুঁজে পাই নে।
‘বাবুজী, কুলাচারীর চক্রসাধনে হৃদয়ের স্থান কতটুকু আছে, জানি নে। কিন্তু এ জৈব-সাধনাই ধর্মান্তরিত করে গেল সন্ন্যাসীকে। ভেঙে দিয়ে গেল তার আচার-বিচার। তন্ত্রসাধনায় অভ্যস্ত হয় নি সে। তার জ্ঞানের সুধা হৃদয়ের রসে মিশে ভেসে গেল। যেমন হিমালয় থেকে নেমে ওই গঙ্গা চলেছে দুকূল ভাসিয়ে। প্রেম ও সহজের ওই তো পথ। রুক্মিণীর সঙ্গে রঘুনন্দনের প্রেম ছাড়া আর কী ছিল? কিছু না। নইলে আচারের নিগড় ভাঙত কী করে? তবু ভাবি, একদিনের তো দেখা রুক্মিণীর সঙ্গে। এত আলোড়ন আনল কী করে?’
‘কী জানি! প্রেমের কাজই নাকি অমনি। কখন কোনদিকে চলে, কে জানে! গতি তার নিমেষে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায়।’
বলে, হেসে উঠলো আবার। কপালে হাত ঠেকিয়ে বললো, ‘নমস্তে বাবুজী।’
বলে, আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পুবদিকে চলে গেল। অদূরেই নয়নজুলির মতো একটি অল্প গভীর খাদ গিয়েছে উত্তর দক্ষিণে। আশেপাশে তখনো চলাচল করছে অনেক লোক। সেই বালি-খাদের আড়ালে, লোকারণ্যে হারিয়ে গেল মহাবীর।
Chapter - 5
৫
সুদীর্ঘ কাহিনী। যেন কোনো অতীত যুগের কাহিনী শুনলাম। সব কথার সঠিক অর্থ অনুমান করতে পারিনি। কী করে পারব! আমার নেই কোন অধ্যাত্মবাদের অনুভূতি। নিতান্ত বিজ্ঞানমাশ্রিত মানুষ। জীবনে আছে অনেক বিড়ম্বনা। তার মাঝে ফাঁকতালে এসেছি ছুটে জনসমুদ্রের মহাসঙ্গমে।
তার মাঝে এই কাহিনী, যেন কোনো অতীত অধ্যায়ের পাতা মেলে দিল আমার সামনে। যে রক্তমাংসের উচ্চ-নীচ মানুষ নিয়ে আমাদের কারবার, এ কাহিনীর নায়ক-নায়িকারা সে আওতার বাইরে। বেদাশ্রিত সন্ন্যাসীর প্রেম—সে-ই তো বিচিত্র। অথচ চোখে দেখে এসেছি রামজীদাসীকে! অধ্যাত্মবাদ না বুঝি, রঘুনন্দনের সঙ্গে রুক্মিণীর প্রেম অনুমান করতে পারি। যে প্রেম তাকে ঘরছাড়া করেছিল। ঘর-ই তো। আখড়া, আচার, নিয়ম, পূজা আর খাওয়া, এই মিলে যে অভ্যাসের ঘর তৈরি হয়েছিল, সেই ঘর ভেঙে গিয়েছিল তার।
রঘু-রুক্মিণীর প্রেম আমাদের প্রেম নয়, তবু পলক-শিহরণে কত বিচিত্ৰ দৰ্শন তো আমাদেরও ঘটে থাকে। প্রেমে কত নতুন অনুভূতির বীজ অঙ্কুরিত হয় মনে। কত সময় বেলাশেষের রক্তিম আকাশ দেখে চোখ ভুলে যায়। হাওয়া-দোলা শস্যের হরিৎ সাগরে নিজের প্রাণে লাগে ঢেউ। দূর গ্রামের কোন্ এক অনামী স্টেশনে, ডাগর চোখে কিষাণী কলাবউটিকে দেখে মনে হয় আমাদের ছোঁয়া লাগে অপরূপের। স্টিয়ারিং হুইল চেপে-ধরা যন্ত্রী, আর উদয়াস্ত কলমপেষা মানুষের দল আমরা আচমকা এক সময়ে গুনগুনিয়ে উঠি –
‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না।
মন উড়েছে উড়ুক না রে,
মেলে দিয়ে গানের পাখনা।’
জানি, দিন যাবে না অমনি করে। জানি, মনের রঙিন পাখা মেলে থাকবে না দিবানিশি। তবু, জীবনযুদ্ধের মাঝে, অমনি করেই আমরা হৃদয়ের একটি দিক আঁকড়ে ধরে রয়েছি। হাজার দুঃখ যন্ত্রণা বেদনার মধ্যেও ওই বস্তুটি ছাড়তে রাজি নই।
রুক্মিণীর প্রতি রঘুর প্রেম, আমাদের চোখে কিছু রহস্যময় রহস্যে ঘেরা। মনো ব্রহ্মতি ব্যজনাৎ। কথাটি আমাদের মনে সৃষ্টি করে রহস্যবাদের।
কিন্তু সৌন্দর্য পিপাসুর চোখে এক নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছিল। যে-দিক তার চোখে বুলিয়ে দিয়েছিল শিল্পীর অঞ্জন। যে-চোখ গাছ-গাছালি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। যে-প্রাণ ভুলেছিল বিহঙ্গকুলের গানে। এ তো রক্তমাংসেরই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি। রঘুর সেই সহজ সুন্দরের উপাসনা, সে তো আছে সকলের মনে মনে। আছে অন্যরকমে। আছে সকলের বুকে বুকে। রঙের হেরফের করে আছে।
নইলে ভুলি কেন বাউলের গানে! বাউল তো আমাদের কাছে সাধক নয়। সে শিল্পী। মনের মানুষের খোঁজে সে ফিরছে। ফেরার আনন্দই তার কাছে বড়। সেই আনন্দে গান গেয়ে উঠছে, তার মনেরই মানুষ, ‘আমি কী গান গা’ব যে, ভেবে না পাই।’ সে কণ্ঠে কণ্ঠ দিয়ে আমরাও ‘উঠি যে ফুকারি ফুকারি।’
বুঝলাম, বেদাশ্রিত সন্ন্যাসী রঘু বাউল হয়েছিল। রুক্মিণী, রামজীদাসীর অপূর্ব রূপের মাঝে রয়েছে কোন্ রহস্যময়ী, তা কে জানে! বিংশ শতাব্দীর মধ্যাহ্নে এ যেন কোনো অতীত যুগের নয়িকা এসেছে এ যুগে মানুষের সামনে। কে জানে তার হৃদয়তলে কোন রহস্যের আধার! তার রক্তিম ঠোঁটের কোণে বঙ্কিম রেখার কোন্ গূঢ় তত্ত্বের উঁকি ঝুঁকি! কিন্তু সরোদ হাতে সেই মানুষটি হঠাৎ বড় হয়ে উঠলো চোখের সামনে। সেই সরকারী কেরানী। যে সব ছেড়ে, সরোদের বুকে সুর সাজিয়ে ফিরছে রামজীদাসীর সঙ্গে সঙ্গে। যার সরোদের ঝঙ্কার বিনা রামজীদাসীর সুঠাম পদযুগলে আসে না নাচের জোয়ার।
বহুরূপী ভারতের এও এক রূপ। এই কাহিনী। যা শুনলাম তাতে সারা বালুচর যেন এক বিচিত্র ঝাপসা চেহারায় ভেসে উঠলো চোখের সামনে। যাই, ফিরে গিয়ে দেখি আর একবার সেই সরোদবাদককে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ভেঙে গিয়েছে হয়তো আসর।
Chapter - 6
৬
এখনো চারিদিকে অনেক মানুষ। প্রচণ্ড শীত। হাল্কা কুয়শায় ছায়ার মতো চলেছে সব আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে। বোঝা যায়, তাঁবু-কোটরের দিকেই সকলের গতি। আর দেরি সইছে না কারুর। সারা দিনের পুণ্য সঞ্জয় এবার শীতের কামড়ে কাত করে দিয়েছে। আকাশে চাঁদ এসেছে প্রায় মাঝামাঝি। মেঘ ভেসে চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। আকাশের কোন্ সীমানায় গর্জন করছে অদৃশ্য উড়োজাহাজ।
সপাং করে চাবুকের শব্দ শুনে চমকে উঠলাম। বালুচরে ঢুকেছে টাঙ্গা, চাকা বসে যাচ্ছে। ঘোড়া দৌড়ুতে পারছে না। যাত্রী ও যাত্রিণীরা সকলেই ঘুমে ঢুলুঢুলু। তাকিয়ে দেখি, চাবুক কোমরে গুঁজে টাঙ্গাওয়ালা ঝাঁপিয়ে পড়েছে চাকার উপর। বুঝলাম, একটু বেশি বালির গভীরে ডুবে গিয়েছে চাকা। চাকাটির প্রতি কটূক্তি করে নিজে হাতে চাকা টেনে টাঙ্গা এগিয়ে নিয়ে চললো সে। শুনলাম জড়ানো যাত্রী কন্ঠ, ‘ক্যায়া, বিমারীবালা ঘোড়া লে আয়া? ভাড়া ঠিক নাহি মিলেগী।’
টাঙ্গাওয়ালা যা বললো, তার মানে, ‘হ্যাঁ, কুম্ভমেলায় ভগবান খালি তোমাদেরই ঘাড়ে চেপে রয়েছে! আমি শালা খালি হাতে ফিরে যাব।’
কোনো জবাব শুনতে পেলাম না। টাঙ্গাওয়ালার কথা শুনে হাসতে যাচ্ছিলাম। হাসতে পারলাম না। সত্যি, পুণ্যসয় তো নয়, যেন সওদাগর এসেছে স্বর্ণরেণুর সন্ধানে।
ফিরতে যাব। কে একজন সামনে এসে দাঁড়াল। আমার কাছেই এসেছে বুঝলাম কেননা লোকটি তার বড় বড় দাঁত বের করে গোল গোল চোখে তাকালো আমার দিকে। কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই খানিকটা চাপা উল্লসিত গলায় হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিছু পাওয়া গেল।’
অবাক হলাম। লোকটির আপাদমস্তক দামী শাল দিয়ে ঢাকা। বয়স অনুমান করা মুশকিল। কুহকী চাঁদের আলোয় যেন এক ষড়যন্ত্রীর মুখ ভেসে উঠেছে সামনে! নিশ্চয়ই লোক ভুল করেছে।
বললাম, ‘আমাকে বলছেন?’
লোকটি বিগলিত গলায় ঘাড় নেড়ে বললো, ‘আরে মহারাজ, তবে আর কাকে বলব?’
আরও বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘কী বলছেন?’
লোকটি অদ্ভুত ভঙ্গিতে তেমনি চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কিছু মিলল?’
কী মিলবে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। বরং খানিকটা ঘাবড়েই গেলাম। বললাম, ‘কিসের কী মিলবে, বুঝতে পারছি না তো!’
লোকটি এক মহা-বুদ্ধিমানের মতো ঘাড় দুলিয়ে বললো, ‘কেন গোপন করেছেন মহারাজ। আমি যে সেই অনেকক্ষণ থেকে দেখছি। হুঁ হুঁ, ফাঁকি দেবেন কী করে? আমাকে তো আর দেবেন না। ওকি আর কেউ কাউকে দেয়? কিন্তু কিছু পেলেন কিনা সেইটিই জিজ্ঞেস করছি।’
একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘কী যা-তা বলছেন! কার কাছ থেকে কী পাব?’
লোকটি বললো, ‘কেন, এই যে দু-ঘণ্টা ধরে সাধুজীর সঙ্গে কথা বলছিলেন! ফিসফিস করে কী বলছিলেন সাধুজী! হুঁ হুঁ, বাবুজী, সব দেখেছি। আপনার কপাল ভালো। তাই ওরকম পেয়েছিলেন। কিন্তু মহারাজ, একটু বলে যান, কী পেলেন থোড়া বহুত।’
আশ্চর্য! হাসব কি কাঁদব, বুঝতে পারলাম না। কী বিচিত্র এই লক্ষ মানুষের মেলা।
মনের মাঝে ভিন্ন তরঙ্গ। সেই তরঙ্গে চলেছিলাম ভেসে। ঠেকে গেলাম। মন পাগল হয়েছিল সরোদবাদককে দেখবো বলে। যে সরোদ বাজিয়ে ফিরছে রামজীদাসীর পিছে পিছে। বাজিয়ে দেখবো, তেমন দুঃসাহস ছিল না। আপনি বেজে উঠেছে আপন মনের তারে। তারের টান বড় চড়া। তার মাঝে এ লোকটি যেন ভিন্ন সুরে ঘ্যাং ঘ্যাং করে উঠলো। কে জানতো মহাবীরের সঙ্গে কথার ফাঁকে হয়ে পড়েছি তার নজরবন্দী।
আবার বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘কী পাব বলুন তো?’
লোকটি ঘাড় কাত করে হেসে বললো, ‘আরে বাপরে, সে যদি আমিই জানবো, তবে আর ভাবনা ছিল কী?’
কিন্তু কী যে পাব, তা কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। তাকে যতই বলি, কিছুই পাইনি, তত সে চেপে ধরে।
সে বললো, ‘ওই দেখে দেখে আমার চুল পেকে গেল ভাইয়া। আমাকে তো ফাঁকি দেওয়া যাবে না।’
অতএব আমার কালো চুলের কথায় সে মানবে কেন? মনে মনে বললাম শুধু, ‘কী বিপদ!
সে বলে চললো ঘাড় নেড়ে, ‘মেলায় ঢোকবার মুখে, বাঁধের ওপারে দেখেছেন মস্তবড় পাথরের দোকান?’
বললাম, ‘না তো!’
ভ্রূ নাচিয়ে দুর্বোধ্য হাসি হাসলো সে। বললো, ‘তবে আর কী দেখেছেন? ওই একটি লোক মশাই! লাখপতি। কে চিনত ওকে? ও তো লক্ষ্ণৌয়ের রাস্তায় ভিখ মেগে বেড়াত।‘ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘তারপরে একদিন দেখি, ব্যাটা এক সাধুর পেছনে ঘুরছে। কী ব্যাপার? না, দু’দিন বাদে দেখি, শহরে এক ছোট্ট খুপরি ঘর নিয়ে দোকান করেছে। পাথরের ছোট ছোট কটা শিবলিঙ্গ, মহাদেব বিষ্ণু, এইসব। আরে বাপরে, ক’বছরের মধ্যে দেখি, একেবারে একচেটিয়া কারবার করে ফেলেছে! বুঝেছেন? সেই সাধুসঙ্গ। হুঁ হুঁ, আপনি ভেবেছেন, আমি ব্যাটা বুঝিনে?’
হাঁ করে রইলাম। গূঢ় বস্তু-সন্ধানীই বটে। একেবারে পরমার্থ। সিঁড়ি খুঁজছে মোক্ষলাভের। কী ভাগ্যি, রঘুনন্দনের উপাখ্যান পেড়ে বসিনি তার কাছে। সে পরমার্থ যে এখানে অনর্থ ঘটাত।
জানি নে, কী অলৌকিক বস্তু। মনের অগোচরে দেখি হয়তো লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন! কিন্তু কুম্ভমেলায়? এই বালুচরে? সাধুর পেছনে পেছনে? কই, সেরকম কোনো পন্থার কথা তো মনে আসেনি। পাথর কেন? নিজের রক্ত বিক্রি করেও লাখপতি হওয়ার কল্পনা করতে পারি নে।
বললাম, ‘কই, তেমন কিছু পাই নি তো!’
আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করলো, ‘তবে কী পেলেন?’
মনে মনে বললাম, ‘যা পেয়েছি তা যে বলার নয়। সে তো একটি সুর। ধরাছোঁয়ার বাইরে। ট্যাকে গোঁজা যায় না। পোরা যায় না পকেটে। শুধু কানে শোনা যায়। হেসে ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘কিছুই পাইনি।’
বুঝলাম, বিশ্বাস করতে পারল না আমাকে। চোখে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মুখের হাসিরেখা হয়েছে উধাও। ক্লান্ত জীবের মতো বেরিয়ে পড়েছে জিভ। শাল ঢাকা সত্ত্বেও গায়ে তার মৃদু কাঁপুনি। এ কি রাগ, না হতাশা ঠিক বুঝতে পরলাম না।
এমন সময় ঝনঝন শব্দে ফিরে তাকালাম দু’জনেই। অদূরেই এক বিশাল মূর্তি চলেছে পুবদিকে। একেবারেই উলঙ্গ মূর্তি। মাথার জটা ঠেলে উঠেছে আকাশে। গলায় একরাশ মালা। হাতে একটি সুদীর্ঘ ত্রিশূল। তার গলায় কিংবা ত্রিশুলেই বাঁধা আছে হয়তো কিছু। তারই চাপা ঝনঝন শব্দ বাজছে।
আশেপাশের চলমান নরনারী সকলেই একবার থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে, কেউ কেউ হাত ঠেকাচ্ছে কপালে। চলে-যাওয়া পদ-চিহ্ণের ভেজা বালু নিয়ে দিচ্ছে মাথায়।
আমার সামনের লোকটির গলা দিয়ে একটি বিচিত্র শব্দ উঠলো। তা ভায়ের কি পুলকের, বুঝতে পারলাম না। তাকিয়ে দেখি, সারা মুখে তার হাসির দীপ্তি। হতাশা উধাও। চোখে রোশনাই হাজার আলোর। চকিতে শাল খুলে বাঁধল কোমরে। চাপা গলায় ফিসফিস করে বললো, ‘পেয়েছি পেয়েছি।’
তারপর আমার দিকে তার দীপ্ত চোখের একটি খোঁচা দিয়ে সরে গেল। পা টিপে টিপে অনুসরণ করলো ওই দিগম্বর মূর্তিকে। ছায়ার মতো চললো তার পিছে পিছে। যেন নিঃশব্দ পদসঞ্চারে, শিকারী চলেছে শিকারের কাছে।
হাসতে গেলাম। হাসতে পারলাম না। বালুচরে তাকিয়ে দেখি লক্ষ লক্ষ পদচিহ্ন। বর্ষার ভেজা মাঠে গোরুর পালের মতো লক্ষ মানুষের পায়ের ছাপ সারা চরে। লক্ষ মনে লক্ষ কামনা বাসনা ও প্রবৃত্তি। সকলেই পাগলের মতো ছুটে চলেছে ঈপ্সিত বস্তুর পেছনে।
আর ওই লোকটি। এই সংসারের বেড়াজাল তাকে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখিয়েছে। ও-ই তার সাধনা ধ্যান-ধারণা। তার ভগবান, তার পুণ্য। মিথ্যা সন্দেহে আমার কাছে হতাশ হয়েছে সে। কিন্তু আসা তার মরে নি। মুখে-চোখে তার যে হাসি ও দীপ্তি দেখলাম, সে তো শয়তনের মতো নয়। তাকে শয়তানে পেয়েছে কিনা জানি নে। কিন্তু চোখে-মুখে তার শিশুর সারল্য। লোভ? তা আছে। সংসার তাকে ওই পথ দেখিয়েছে। বয়স হয়েছে তার। এতখানি জীবন সে কাটিয়ে এসেছে ওই স্বপ্ন দেখে। হয়তো অবশিষ্ট আয়ুটুকু নিঃশেষ হবে ওই লাখ টাকার পেছনে। সংসারের এমনি নিয়ম। সারা সংসার দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে এতদিন। কেউ ফিরিয়ে আনেনি। আজ সময় হয়ে গিয়েছে। স্বপ্ন আজ আর স্বপ্ন নয়, স্বপ্নসাধনা। সাধন পাগল।
জানি নে তার ঘর ও ঘরের মানুষের কথা। জীবনভোর হয়তো সে এমনি ‘পেয়েছি পেয়েছি’ বলে উল্লাসে বুক বেঁধে ছুটে চলেছে। ছুটবেও ওই ভয়ংকরী সুন্দরী মরীচিকার পেছনে। তারপর একদিন আসবে। হয়তো শেষ দিন। তার পলকহীন চোখে ফুটে থাকবে অভাবিত বিস্ময়, তীক্ষ্ণ ভ্রুকুটি। দু’ফোঁটা জল।
সেদিন সে-সময় তার চোখে ভাসবে কি এ রাতের দৃশ্য? মনে পড়বে কি আমাকে—যে তার কুম্ভমেলায় সব পেয়েও একদিন মিথ্যাচার করেছিল!
হাসতে পারলাম না। বিদ্রূপে বেঁকে উঠলো না ঠোঁট। সেটা হলেই ভালো হতো। নিষ্কৃতি পেতাম মনের কাছে। হেসে চলে যেতে পারতাম পাগল দেখে!
কিন্তু এই মানুষ! ফিরে দেখি, উধাও হয়ে গিয়েছে। মিশে গিয়েছে পায়ের দাগে দাগে। ঝাপসা জ্যোৎস্নালোকিত বালুচরে পাগলা সংসারের প্রেত হয়ে ফিরছে সে। হা হা করে ছুটছে, পেয়েছি পেয়েছি। ভাবি, কোনও এক পাওনা কি একদিন জুটবে না তার কপালে? ঘুচবে না ফাঁকির পাওনা? যেদিন বুক ভরে উঠবে দুঃসহ আনন্দ ও বেদনায়। নিঃশব্দে তার মন গেয়ে উঠবে, পেয়েছি পেয়েছি।
শীত লাগছে। হিম ঝাপটা লাগছে পুরু জামা ভেদ করে। কোলাহল ঝিমিয়ে আসছে। দ্রুত পায়ে ফিরে গেলাম আশ্রমের দিকে।
ভাঙা আসর, তবু আসর আছে। রমজীদাসী নেই, সরোদবাদক চলে গিয়েছে। চলে গিয়েছে মণ্ডলেশ্বরের দল। মাইকের সামনে বসে দু’টি লোক আধা সুর করে ছড়া কাটছে হিন্দিতে। আসরে কিছু নরনারী, কেউ শুনছে, কেউ ঢুলছে ঘুমঘোরে।
সে ভিড় নেই। গেটের কাছে নেই হাড্ড্সন অস্টিন। বাদককে ভালো করে দেখবো বলে এসেছিলাম। দেখা হলো না।
সেও ঘুরছে একজনের পেছনে। খুঁজছে কিনা কিছু কে জানে! অমনি কোন্ লাখ টাকার মরীচিকার মতো?
ঘুম থেকে উঠে দেখি, কেউ নেই তাঁবুতে। গুলতানি শুনতে পাচ্ছি পেছনে। জামাকাপড় ছেড়ে মুখ ধুতে গেলাম। পেছনটাই দেখছি আসল স্থান। সাংসারিক ব্যস্ততা। হাঁড়ি-কুড়ি উনুন। জলের কলে লাইন। যে রকম ভিড় দেখছি কলে, মুখ ধুতে পাব কিনা কে জানে!
Chapter - 7
৭
রোদ উঠেছে। রোদ তো নয়, যেন কাঁচা সোনা। শীতে অড়ষ্ট শরীরটি যেন কার দুই উয় বাহুতে ধরা পড়ল। সরে গিয়ে দাঁড়ালাম বেড়ার সামনে একলা একলা, খানিকটা রোদ ভোগের জন্য। সরু সরু তল্লা বাঁশের বেড়া। বেশ খানিকটা ফাঁক ফাঁক।
রাতে মেলা, দিনে মেলা। মেলা দেখছি অষ্টপ্রহর জেগেই আছে। এর মধ্যেই ভেসে আসতে আরম্ভ করেছে মাইক-নিনাদ। মানুষের ভিড় দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে। ভিড় যেন একটু বেশি বেশি লাগছে। এর মধ্যেই টাঙ্গাওয়ালার চিৎকার, গাধার ভেঁপু, লরি আর প্রাইভেট কারও দু-চারটে ছুটতে দেখা যাচ্ছে বালুচরের রাস্তায়। বালুচরে রাস্তা তৈরি হয়েছে। বালুর বুকে সাজিয়ে দিয়েছে বিচুলির মতো একরকম ঘাস। তার উপরে মাটি। কিন্তু মাথা খারাপ হয়ে যায় ভাবলে, ওই রাস্তার উপরেও ঝাড়ু, হাতে কেন ঝাড়ুদারনীদের উৎপাত। ধুলো ওড়া তো আছেই। মাটিটুকুও যে বালিতেই মিশে যাবে।
ঘোমটা খসা একদল মেয়ে চলেছে বেড়ার পাশ দিয়ে। কেউ কেউ গান করছে গলা ছেড়ে, কেউ হাসছে খিলখিল করে। মস্ত মস্ত গাই-গোরু নিয়ে চলেছে গোয়ালা। হাঁকছে, ‘দোধ, দোধ চাহি।’ আর ‘গরম গরম দোধ’ হাঁকছে, বড় বড় হাঁড়ি কাঁধে দুধ-ওয়ালারা। মুখে গুঁজেছি টুথব্রাশ। এ সময়ে একটু চায়ের হাঁক শুনতে পাইনে?
‘বাবু! মেরী বাবু।’
চমকে উঠলাম নারীকণ্ঠে! একেবারে কাছে। ব্যাকুল আর ব্যস্ত কণ্ঠ। চকিত ত্রস্ত।
‘বাবু, মেহেরবানি বাবু।’
বলতে না বলতেই গায়ে এসে ঠেকল হাত। বেড়ার ফাঁক দিয়ে। ময়লা হাত, কিন্তু ফর্সা, কিছুটা তামাটে। নখে ময়লা। কিন্তু সরু সরু পুষ্ট আঙুল। মণিবন্ধে কয়েকটা রঙিন কাচের চুড়ি।
তাকিয়ে দেখি, একটি মেয়ে। এলো চুল ঘাড়ের পাশে ছড়ানো। পাশ দিয়ে উঠেছে ছোট্ট ঘোমটা। চোখের অস্থির তারা দু’টিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে হাসি। সরু নাকে ময়লা পেতলের নাকছাবি। সকালের রৌদ্রদীপ্ত মুখে পড়েছে বাঁশের বেড়ার ছায়া। ছায়ার ঝিলিমিলি।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী চাও?’
আঙুল দিয়ে টিপুনি দিল গায়ে। আর এক হাত স্পর্শ করলো কপালে। ঠোঁটে যেন এক নতুন রোশনাই। একটি বঙ্কিম ঝিলিক চকিতে দিল দেখা। ওই হাসিকে কী নাম দেওয়া যায়, জানি নে।
হাসি মুখে করুণ স্বরে বললো, ‘দুঠে পাইসা, মেরী বাবু।’
পয়সা। অর্থাৎ ভিক্ষে। তাই ভালো। ভেবেছিলুম, না জানি কী ঘটতে চলেছে! ভিক্ষে চাওয়ার এ কি রীতি?ঠোঁটে হাসি, চোখে আলো। গায়ে হাত। ভিক্ষের কারুণ্য কোথায়? গলায়? সেটুকু আব্দার বললেই বা ক্ষতি কী?
পকেটে হাত দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম তার আপাদমস্তক। শাড়িখানি মিলের, কিন্তু পাতলা। পালতোলা নৌকো চলেছে কালো পাড়ের ঢেউ তুলে। পরেছে কুঁচিয়ে, ডানদিকে আঁচল এলিয়ে। গায়ে লাল টুকটুকে সস্তা কাপড়ের জামা। একহারা গড়ন। পুষ্ট দেহ। একটু বা বন্য।
ভিখারিনী বটে! পকেটে হাত দিয়ে পয়সা-না-তুলতেই কানে এলো আর্ত চিৎকার, ‘ওগো। সমলাও সেই সর্বনাশী এসেছে গো, সেই হারামজাদী।’
পরমুহূর্তেই নারীবাহিনীর কলকণ্ঠের কোরাস। ঘটনাটা কলের কাছেই। ফিরে তাকাবার আগে হাতে উঠে এলো দুয়ানি একটি। সেটি ভিখারিনীকে দিয়ে ফিরে তাকাতেই সামনে দেখি নারীবাহিনী। আমি ব্যুহমধ্যে বন্দী। আর বেড়ার বাইরে তীক্ষ্ণ নারীকণ্ঠের হাসি, যেন সমস্ত কোলাহলকে খান খান করে হারিয়ে গেল বালুচরে।
প্রথমেই, সেই বিপুলকায়া খনপিসি ঠেলে এলো সামনে। বললো, ‘ভিক্ষে দিয়েছ বেটিকে?’
সমস্ত ঘটনাটি ঘটল এত চকিতে যে, ঠাহর করতে পারলাম না কিছু। খনপিসির ভয়ংকর মুখের দিকে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেলাম। চারিদিকে ক্ষুব্ধ সন্দেহান্বিত কৌতূহলী রকমারী মুখ। কোতোয়ালজীও ছুটে এসেছে।
খনপিসি মুখখানা আরও ভয়ংকর করে জিজ্ঞেস করলো, ‘দিয়েছ কি না?’
ভিক্ষে চেয়েছে। মন চেয়েছে দিতে। দেব না কেন? খানিকটা ঝিমুনো সুরেই বললাম, ‘হ্যাঁ দিয়েছি।’
‘কত?’
‘দু-আনা।’
‘দু-আ—না!’ খনপিসি চোখ কপালে তুলে খালি বললো, ‘মুখ দেখে দিয়েছ বুঝি?’ রীতিমতো ভৎসনার সুর তার গলায়।
‘মুখ দেখে নয়। আপাদমস্তক দেখেই দিয়েছি। কিন্তু অপরাধ?’
একটি নারীকণ্ঠের চাপাধ্বনি, ‘মা গো! কী বলে দিলে?’
সামনে দেখি ব্রজবালা। দিদিমা। সকলের চোখেই অবাক দৃষ্টি।
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
খনপিসি ঝামটা দিয়ে উঠলো, ‘কী হয়েছে? ও হারামজাদী যে নষ্ট মেয়েমানুষ, চোর, সর্বনাশী, তা জানো না?’
সর্বনাশী? ও। সে-ই, শুধু চোর নয়, ছেলে-চোর মেয়ে! সর্বনাশ! তা জানবো কী করে? ভুলেই গিয়েছিলাম। তাই তো, মুখে যে অনেক সর্বনাশের দ্যুতি ছিল।
তাকিয়ে দেখি, ছি ছি! সকলের চোখে ছিঃ ছিঃ কারোর তীক্ষ্ণ খোঁচা। তবু, দেখে ভোলবার অবসর পাই নি। কোনোরকমে ভিক্ষে দিয়েছি মাত্র। কিন্তু মূঢ় বিস্ময়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কী বা উপায় আছে আমার
জীবনে এমন বিব্রতবোধ আর কখনো করেছি কিনা, মনে পড়ে না। তাও ভিক্ষে দিয়ে। আগে জানলে পয়সা দিয়ে কে ওই মহৎ কাজটুকু করতে যেত! মহত্ত্বের অমৃতে যে এত বিষ ছিল, তা জানতাম না। জানতাম না, আমার মধ্যে গোপন ছিল এত কলঙ্ক। কালিমা তার ফুটে বেরুবে এতগুলি মহিলার তীক্ষ্ণ চোখের ধিক্কারে।
মুখ থেকে ব্রাশ নামিয়ে, একটা কিছু বলে ব্যাপারটার ইতি টেনে দিতে গেলাম। হলো না। ততক্ষণে গুঞ্জনের গতি পরিবর্তিত হয়েছে। বলবো কাকে, শুনবে কে! আলোচনা চলছে নিজেদের মধ্যে, কার চোখে প্রথম ধরা পড়েছিল এ দুর্ঘটনা। যে যা-ই বলুক, খনপিসির চোখেই যে প্রথম ধরা পড়েছিল, সেটা প্রমাণ করে দিল তার বিপুল দেহ ও সর্বোচ্চ কন্ঠ, ‘ওমা! জল ভরব কী? তাকিয়ে দেখি, ছুঁড়ি ফিকফিক করে হাসছে আর কী বলছে
যত বলে, ততই সকলের ধিকৃত নজর যেন একরাশ তীরের মতো এসে বেঁধে আমার সর্বাঙ্গে। যেন প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, সর্বনাশের দাগ আছে আমারও গায়ে। আমার চোখে মুখে আমার সর্বাঙ্গে। কারো কারো খ্যাতিকে অকলঙ্ক বলে। কেউ কুখ্যাত হয় কলঙ্কের ডালি মাথায় নিয়ে। এ দু’দিনের মধ্যে বড় একটা চোখে পড়িনি কারুর। আজ সকালের এ সামান্য ঘটনা আশ্রমের সকলের সামনে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাকে। বিশেষ করে বাঙালি মহলে। তার চেয়েও বেশি নারীমহলে। এমন জাদুকরী ক্ষমতা শুধু কলঙ্কেরই আছে। তাই তো। দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করতে সময় লাগে। লেবুর ফোঁটায় ছানা কাটে চকিতে।
ফিসফিস হলো, খিলখিল হলো। সাড়া পড়ে গেল। কে আমি, কোথাকার ছেলে। কার সঙ্গে এসেছি, থাকি কার কাছে! কেন-বা এসেছি এ-ভরা বয়সে!
জটিল প্রশ্ন, কূট তর্ক, সন্দেহ নেই। অথচ আশ্চর্য! ভিক্ষেই দিয়েছি। সর্বনাশীর মুখখানা তো মনে পড়ে না। কানে ভাসছে শুধু তার নির্ভীক তীক্ষ্ণ হাসি।
বলরামের হাসিতে ছিল এক বিচিত্র আনন্দ। শ্যামার হাসিতে চাপা বেদনার ছটফটানি। আর এ হাসি! যেন দুস্তর তেপান্তরের সেয়ানা পাখির ডাক। ডাকে তার আচমকা অট্টহাসি, কে হো কে হো করে ওঠে। একলা পথিক চমকে তাকায় ফিরে। নিরালা ধুধু মাঠের অদৃশ্যচারিণী ভয়ংকরী খেলায় মাতে পথিককে নিয়ে।
ভাবি, যদি সে মেয়ে না হয়ে পুরুষ হতো! চোর হোক, না হয় যদি হত মেয়ে-চোর-ই। হত যদি তেমনি এক সর্বনেশে! তবে কি এমনি করে সবাই মিলে খাউ খাউ করে আসত আমাকে?
ইস্! তাকানো যায় না ব্রজবালার চোখের দিকে। তার কিশোরী চোখে পরিষ্কার, ছি ছি তোমার মনে এই ছিল! আর ডেকো না আমাকে বৌঠান বলে।
যাওয়ার আগে বলে গেল তার দিদিমা, ভিক্ষে দেওয়ার আর লোক পেলে না?
কোতোয়ালজী হাসল একটু বাঁকা মিঠে হাসি। একটু সমবেদনার আভাস। বললো, ‘সাংঘাতিক মেয়ে মশাই। চিতা-বাঘিনীর মতো। চলে ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। দৈনিক এমনি মেয়ে পুরুষ কত ধরা পড়ছে জানেন? পঞ্চাশ ষাট তো বটেই। একশ’ জনও হয়। মেলায় সব ওত পেতে আছে। একটু অসাবধান হয়েছেন তো, গেল।’
তারপর একেবারে অ-সন্ন্যাসীজনোচিত হেসে বললো, ‘ভাল লোককেই পাকড়েছিল।’ বলে, একটু অর্থপূর্ণ হাসি হেসে চলে গেল। কী ভাগ্যি, প্রহ্লাদ কিংবা পাঁচুগোপাল নেই। তাহলে সমালোচনার ভাষা আর একটু সরস হত নিঃসন্দেহে।
ধন্য সর্বনাশী। ঝুসির সর্বনাশী। তাড়াতাড়ি ফিরতে গেলাম তাঁবুর দিকে। কলের দিকে যাওয়ার দুঃসাহস আর হলো না। ফিরতে গিয়ে থামলাম।
সামনে শুধু দু’টি অতিকায় মুগ্ধ চোখ। পথরোধ করেছে একটি মহিলা। ঘাড় হেলিয়ে রয়েছে মুখের দিকে। চোখে নজর কম। তাই, নজর চড়াতে গিয়ে ঠোঁট দু’টি বেশ খানিকটা ফাঁক হয়ে গিয়েছে। মোটা লেন্সের আড়ালে চোখ দু’টি অস্বাভাবিক বড় হয়ে উঠেছে। বলিরেখাবহুল ফর্সা মুখ। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। পাকা অংশই বেশি। পরনে থান। ফিরতে গেলাম। বললো, ‘দাঁড়াও বাবা।’
ঘরপোড়া গোরুর চোখে সিদুরে মেঘ। দাঁড়ালাম। কী বলবে আবার! বললাম, ‘কী বলছেন।’ জবাব পেলাম না। দেখলো খানিকক্ষণ অমনি করে। তারপর কোমল গলায় বললো, ‘বেশ করেছ। এখানে এসে দেবে না তো, কোথায় দেবে? আর দিয়ে আনন্দ ভোগ করে কজনা?’
অবাক হলাম। চকিতে মনটিও উঠলো ভরে নতুন আবেশে। চারিদিকে এত সন্দেহ ও ভর্ৎসনা, নিজের দুঃখ ও বিদ্রুপ-হাসির মধ্যে গুটিয়ে ছিল মনের পাপড়ি। তা যেন নতুন রসে হাওয়া ও রৌদ্রে মেলে দিল দল। কলঙ্কে লাগলো গৌরবের স্পর্শ। মুখ ফুটে বলতে পারলাম না কিছু।
সে আবার বললো, ‘যে দিতে পারে না, তার চেয়ে দুঃখী এ সংসারে কে আছে বল তো বাবা।’
বলে সে তাকালে, লেন্সের আড়ালে তার সেই বিশাল দু’টি চোখ মেলে। একটি লেন্স আবার ফাটা। দেখলাম, তার সেই চোখ দু’টি যেন জলভারে টলমল করছে। অথচ সপ্রশ্ন দৃষ্টি। সামান্য কথা, কিন্তু কী জবাব দেব, ভেবে পেলাম না।
বোধ হয় পানদোক্তা খায়। ঠোঁট দুটিতে লাল ছোপ। গায়ের রঙটি বেশ ফর্সা। আবার হেসে বললো, ‘যে দেয়, সে-ই তো নেয়। সংসারে সবাই আসে দিতে। দিতে আর নিতে। আগে দেও পরে নেও, না-কি বল বাবা, অ্যাঁ? মা ছেলেকে দেয়। আবার ছেলের কাছ থেকে মা হাত পেতে নেয়। বসুমতীকে তুমি দেও, মা বসুমতী তোমাকে দেবে ঘর ভরে। বিদ্বানে তো বিদ্যা দেয়। দেওয়ার চেয়ে সুখ কী আছে?’
মন ভরে উঠলো সঙ্কোচে, আত্মধিক্কারে। ভিখারিনীকে দু-আনা ভিক্ষে দিয়েছি। কিন্তু এত বড় দেওয়া, এত মস্ত দেওয়া তো দিই নি জীবনে কোনদিন। সংসারকে কিছু দেওয়া, সে তো আসল দেওয়া। সে দেওয়ার কানাকড়িটি আছে কিনা নিজের কাছে তা-ই জানি নে। দেব কি! যার আছে থলি ভরতি, সে দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি ফিরছি শূন্য থলি নিয়ে। ভরব বলে। পাব বলে। পেলেও দিতে পারে কজন? পাওয়ার গুমরে মন যে ঠুটো জগন্নাথ সেজে বসে থাকে।
কী কথার থেকে কী! কোন্ দেওয়ার থেকে কোন্ দেওয়ার কথা। একেবারে মাটি থেকে আকাশে। সীমা থেকে অসীমে। আপনি খাটো হয়ে এলো, নুইয়ে এলো মাথা।
সে আবার বললো, ‘দেওয়ার সুখ আছে, বড় ঘেন্নাও আছে বাবা। দিয়ে যার মাটিতে পা পড়ে না। দিয়েছি তো মাথা কিনেছি। দ্যাখো, ক-ত্তো দিয়েছি। ওই হলো ঘেন্না। আবার যার আছে, সে দিতে জানে না। দেওয়ার রীতি জানে না। সে বড় অভাগা। আমি তো এই বুঝি। তুমি কী বল বাবা, অ্যাঁ?’
কী বলব! চোখে তার সেই মুগ্ধ সপ্রশ্ন দৃষ্টি। একটু যেন আত্মভোলা। কণ্ঠে সেই কোমলতা। সকলের আড়ালে কোথাও দাঁড়িয়েছিল সে, আমার দু-আনার দানকে গৌরবান্বিত করবে বলে। তার নাম জানি নে, ধাম জানি নে। থুথুড়ে বুড়ি হলে মনে আসে ঠাকমা দিদিমার কথা। সে তা নয়। যেন খানিকটা মায়ের মতো। কথা তার মায়ের চেয়েও বড়। তার গৌরবে ও সম্মানে যে আমি বাক্যহারা। কী বলব!
বললাম, ‘যা বলেছেন। এর বাড়া আর কি বলব?’
সে তাড়াতাড়ি অসঙ্কোচে আমার হাত ধরে বললো, ‘না না, অমন কথা বোল না বাবা। এখেনে এয়েছেন কত বামুন-কায়েতের মা-বোনেরা। আমার কথার বাড়া সংসারের বড় কথা। ছোট কথাটিও। আমি গয়লার বেটি, গয়লার বেধবা। ছেলে আমাকে যা-ই বলুক আমি গয়লার মা। লোকে আমাকে হিদে গয়লার মা বলে জানে।’
মনে মনে বললাম, জানুক। যে-হিদে গয়লার-ই মা হোক সে, ‘হিদয়ে’ যার সবকিছু সঁপে দেওয়ার অমন ব্যাকুলতা, তার চেয়ে হৃদয়বতী কে আছে! ভাবি, জানি নে হিদের মা কী দিয়ে কত দিয়েছে। কিন্তু যে অমনি করে বলতে পারে, সে দিতেও পারে। তার কথার বাড়া আর কি কথা আছে!
হাত-ধরা হয়ে রইলাম হিদের মা’র। নড়তে পারলাম না। ওদিকে বুঝতে পারছি, খনপিসি বাহিনী দেখছে এ আদিখ্যেতা। তাদের মধ্যে ঘোরতর আলোচনা চলেছে এ নিয়ে। তারপর হিদের মা বললো, ‘তোমাকে বড় ভালো লাগছে বাবা। দিও বাবা, মন চাইলে, থাকলে অমনি দিও যত খুশি।’
বলে, আবার জিজ্ঞেস করলো, নামধাম পরিচয়। জিজ্ঞেস করলো, ‘বাপ-মা আছে?’
বললাম, ‘বাবা নেই।’
সে বললো, ‘আহা, আসলটিই নেই। লোকে বলে, মায়ের চেয়ে বড় কিছু নেই। কিন্তু আমি বলি, না। না বাবা? বাপ থাকলে ছেলের মাথায় ছাদ থাকে। কিন্তু মা যে, কেউ নয়, কেউ নয়।’
বলে, একটু চুপ করে থেকে বললো, ‘তোমাকে বড় ভালো লাগছে বাবা। দু’টো মনের কথা বলি। বসবে?’
বসব? তাই তো, কেমন যেন লজ্জা করছে। খনপিসি-বাহিনী না জানি কি ভাবছে। কিন্তু হিদের মাকে নিরাশ করতে মন চাইল না। বসলাম বালুর উপরে। বললাম, ‘বলুন।’
সে বসলো। বললো, ‘বাবা, ঘরে জ্বালা তাই বাইরে আসি। বাইরে এসে দেখি আরও জ্বালা। অমনি ঘরে ছুটি। কোথা গেলে যে দু-দণ্ড শান্তি পাই! ঘর-বার আমার সমান হয়ে গেছে। বাবা, লোকে আমাকে বলে হিদের মা। কিন্তু হিদে আমাকে মা বলে ডাকে না।’
বলতে বলতে হাসি ও কান্নায় বিচিত্রভাবে থরথর করে কেঁপে উঠলো তার ঠোঁট। পুরু লেন্সের আড়ালে ভেসে উঠলো বিশাল চোখ দু’টি। প্রস্তুত ছিলাম না এমন কথা শোনবার জন্য। বিস্মিত ব্যথায় চমকে উঠলো মনটা। বললাম, ‘কেন?’
সে বললো, ‘আমি যে মায়ের মতো মা নই। আমি যে বউকাটকী, আমি যে ছেলে ভোলানী, আমি যে ঝগড়ুটে, হিংসুটে, লাগানী-ভাঙানী।’
জানি, এর মধ্যে আমার কোনো কথা নেই। তবু না বলে পারলাম না, ‘কে বলে এসব কথা?’
সে বললো, ‘যে বলার। যাদের বলার। নিজেও বলি। বলি, নইলে যে-হিদে আমার হাতে ছাড়া খেত না, সে একবার ডেকে কথা বলে না। তবু আমি মুখপুড়ি এখনো এ হাত পুড়িয়ে খাই। হিদে আমার লেখাপড়া শিখেছে। কলকাতার আপিসে চাকরি করে। কিন্তু ঝি বলেও দু’টো পয়সা দেয় না। কেন? আমি যে তার মা নই।
কিছু বলতে পারলাম না। জানি নে হিদের কথা। জানি নে তাদের ঘরকন্না, কেন বা পুত্রস্নেহ থেকে বঞ্চিত হিদের মা! সব মিলিয়ে সেখানে কোন্ পরিবেশ, কতখানি অবিচার, কে জানে! তবু হিদের মা’র জন্য মনটা ভার হয়ে উঠলো।
নিজের মনেই অভিমান উঠলো সে, ‘না-ই বা ডাকলো, না-ই বা দিল। নিজে দুধ বেচি, খাই। আমার আছ তোমরা, আমার ভাবনা কী? এই তো চলে এসেছি। কে রাখছে তার খবর, কে দেখছে? ওকে হাতে করে না খাওয়লে কী হয়েছে আমার?’
চোখের থেকে চশমা খুলে জল মুছল সে আঁচল দিয়ে। বললো, ‘দিন রাত-ই বলি, মনে বলি। তোমাকেও বললুম, বড় ভালো লাগলো তোমাকে। আমাকে দু-চার আনা পয়সা দেবে বাবা?’
পয়সা? নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমার কাছে পয়সা চাইছে হিদের মা? বললাম, ‘কী বলছেন?’
তেমনি বিশাল মুগ্ধ চোখ দু’টি তুলে বললো, ‘আমাকে দু-চার আনা পয়সা দেবে?’
আচমকা আক্রান্ত শামুকের শুঁড়ের মতো মনটা গুটিয়ে গেল হঠাৎ। এত বলে শেষে পয়সা! জিজ্ঞেস করতে গেলাম, ‘কেন?’ কিন্তু পারলাম না। সেই উন্মুক্ত মুখ, সেই চোখ, তেমনি ঘাড় কাত করা সরল অভিব্যক্তি। ভাবান্তরের লক্ষণ নেই কোথাও। তবু সন্দেহ বিরক্তিতে সিটনো মন খাটো হয়ে গেল বড়। আমাদের ভদ্রতায়, শিক্ষায়, আলাপনে, ভাবনায়, চিন্তায়, আত্মসন্তুষ্টির যে বেড়াখানি দিয়েছি বেড় দিয়ে জীবনের চারপাশে, তার বাইরে গেলেই আমরা পেছিয়ে আসি। দল-মেলা মন আসে গুটিয়ে। আপন গণ্ডিতে আমরা উদার। বাইরে অস্বাভাবিক।
অবকাশ নেই মন যাচাইয়ের। চিরাভ্যস্ত মন-চোখ আমার দেখলো, হিদের মা’র এই সারল্যের পেছনে যেন একটি বাঁকা হাসি রয়েছে উঁকি মেরে। এত যে দানের কথা, মিষ্টি কথা, তার পেছনে কি শুধু ওই দু’-চার আনার অধ্যবসায়! ভাবলে নিজেকেই যেন খাটো লাগে। কলঙ্কে লাগলো আমার দ্বিগুণ অপমানের স্পর্শ। হয়তো এখুনি না চেয়ে, দু-দিন বাদে চাইলে এতখানি মনে লাগত না। দু-দিন কেন, ওবেলা হলেও এতখানি মনে হত না বোধ হয়।
মনের ভাব গোপন করে বললাম, ‘দেব। তাতে কী হয়েছে! দিচ্ছি, এখুনি দিচ্ছি।’ বলে, পকেটে হাত দিতে গেলাম। হিদের মা তাড়াতাড়ি হাত ধরে বললো, ‘দিও’খনি। তাড়া কসের? পালিয়ে তো যাচ্ছ না!’
তা যাচ্ছি না। কিন্তু তাড়া আছে বৈকি। হিদের মা’র কাছে থেকে চলে যাওয়ার তাড়া। সে আবার বললো, ‘তোমার পকেটে ওটি কী বাবা? কলম? কী যে বলে ওটাকে? যাতে আপনি আপনি লেখা যায়?’
কলমে তার আবার কী প্রয়োজন? বললাম, ‘হ্যাঁ, ফাউন্টেন পেন।’
একটু বা অপ্রতিভ হেসে বললো সে, ‘হ্যাঁ, ফাউন্টেন পেন। হিদে লেখে ওই দিয়ে। তা বাবা, আমাকে একখানা চিঠি লিখে দিতে হবে। দেবে তো?’
মন বিমুখ হয়ে উঠেছিল। তবু বললাম, ‘দেব।’
হিদের মা তাড়াতাড়ি কোমরে-গোঁজা আঁচল খুলে বার করলো একটি কাগজ। ভাঁজ-করা, দলা-মোচড়া।
খুলতে দেখলাম, একটি দু-আনা পোস্টেজের খাম। আঁচলে তার হাল এমনি হয়েছে, যেন কুড়িয়ে এনেছে কোথা থেকে।
উঠে দাঁড়িয়েছিলাম চলে যাওয়ার জন্য। কৌতূহল হলো ভেবে, কাকে চিঠি দেবে হিদের মা! বললাম, ‘কাকে লিখবেন?’
সে বললো, ‘হিদেকে। একটু জানিয়ে দিই, কেমন করে আমার হাড় জুড়োচ্ছে এখানে এসে। নইলে আমার মনে শান্তি পাব না।
তা বটে। যাকে যত বেশি দুঃখ দিতে প্রাণ চায়, তাকেই তো দিতে হয় সুখের সংবাদ। তবে হিদের মা’র চোখ দু’টি অমন ভেসে উঠছে কেন!
তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলাম। খনপিসি-বাহিনী তাকিয়ে দেখছে কটকট করে। ওই দৃষ্টিতে দাহিকা শক্তি থাকলে পুড়ে মরতাম নিঃসন্দেহে। ভাবছি, যখন তারা জানবে হিদের মাকে পয়সা দিয়েছি, তখন যদি মুখের সামনে এসে তারা হাসে, তবে আর মুখ লুকোবার জায়গা পাব না।
হঠাৎ নজরে পড়লো ব্রজবালাকে। চোখে-মুখে তার ক্রোধ ও শঙ্কা। এত লোকের মাঝে তাকাতে পারছে না। কিন্তু ভ্রু-জোড়া উঠেছে কপালে।
পেছনে আমার হিদের মা। তাঁবুতে এসে ব্যাগ খুলে কাগজ বার করছি। পেছন থেকে ব্রজবালা এক ঘটি জল নিয়ে এসে দাঁড়াল। মুখ ধোয়ার জল।
জলের ঘটি নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই শঙ্কিত গলায় ফিসফিস করে বললে ব্রজবালা, ‘সেই কিপটে বুড়ি। খবোদ্দার, একটি পয়সাও দিও না।’
বলে, ঘটি হস্তান্তরিত করে চলে গেল। হাসি, বিস্ময়, দুঃখে আমার মনের এক বিচিত্র ভাব। সত্যি, ব্রজবালাই দেখছি আমার প্রকৃত সাথী। এই কিপটে বুড়ির কথা, ওই সর্বনাশীর কথা, গতকাল তো সে আমাকে বলেছিল। আমারই মনে ছিল না।
মুখ ধুয়ে বসলাম কাগজ নিয়ে। বললাম, ‘বলুন, কী লিখতে হবে?’
হিদের মা খামখানি দিয়ে বললো, ‘আগে ঠিকানা লেখো। লেখো, ছিরি হিদয়রাম ঘোষ।’
অর্থাৎ হৃদয়রাম ঘোষ। ঠিকানা লেখা হলো। আবার বললো, ‘এই আশ্রমের ঠিকানাটা চিঠিতে দেও।’
তাই দিলুম। তারপর বললো, ‘লেখো, বাবাজীবন, হিদু বাবা—’
বলে, চুপ করে রইলো অনেকক্ষণ। বুঝলাম, পাতা-ভরতি ইতিহাস লিখতে হবে। এখনো একটু চা জোটেনি এই দারুণ শীতের সকালে। মন ছটফট করছে বেরুবার জন্য। আটকা পড়ে গেলাম। না, নতুন আশ্রমের সন্ধান করতে হবে দেখছি।
হিদের মা হঠাৎ বললো, ‘লিখেছ? এবার লেখো, তোর পায়ে পড়ি বাবা হিদে, নেদো, গোপাল, পারুল, সকলে মিলে কেমন আছিস, ধর্মত জানাস। ইতি তোর—’
ব্যাস? একেবারে ইতি? সে কি! যার মুখের ‘পরে জানিয়ে দিতে হবে সুখের কথা, শেষে তারই একটু সংবাদের জন্য এত ব্যাকুলতা? বললাম, ‘আর কিছু না?’
সে বললো, ‘আর কী আছে বাবা? আমার কথা? পথে পথে, ঘাটে ঘাটে, ঠাকুরের দোরে বলেছি। না বললেও যে শুনতে পায়, সে যখন শোনে নি, তখন চেঠিতে লিখে কী ফল পাব? লেখা অনেক হয়েছে, আর থাক। ওই লিখে দেও।
তাই দিলাম। লিখে দিলাম। কেবল কানের মধ্যে বেজে রইলো হিদের মা’র ক্লান্ত ব্যথিত স্বর। সংসারে আছে কত সুখ দুঃখ। কত রূপে তা কত করুণ ও বিচিত্র। ঘরে বাইরে, মনের গঠনে, সংসারের কাঠামোতে রয়েছে তার জড়। কখনো তার সমূল শেষ দেখি কান্নাতে, কখনো হাসিতে। গতিবিধি তার মানুষের হৃদয় ও মনোজগতে। এর বিজ্ঞান আছে, কিন্তু সীমা নেই।
হিদের মা ঠাকুরের দোরে দোরে বলছে। ঠাকুরের কানে না পৌঁছুক, সে বলা যদি হিদের কানেও পৌঁছুত, হিদের মা’র ঘরে থাকত অমৃতকুম্ভ। হাহাকার করে ছুটে আসত না এখানে। কিন্তু ওইখানে যে সব গণ্ডগোল। সোজা পথ তো সোজা নয়। কখন সে বাঁক নিয়ে নতুন দিকে মোড় ফিরছে, অচিন পথিক তার কী জানে!
চিঠি লিখে দিয়ে পকেটে হাত দিলাম। বিমুখ মন খানিকটা ভিজে উঠেছিল। পকেটে দু’-আনা আছে, চার আনাও আছে। পথের কড়ি, হাত দিলেই হিসেব করতে মন যায়। জানি নে, ভিক্ষে করা হিদের মা’র অভ্যাস কিনা। তবু, একটি টাকা তুলে দিলাম তার হাতে। অস্বীকার করবো না, মনের মধ্যে কিঞ্চিৎ করুণা ও অনুগ্রহের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু না দিলে মন তৃপ্ত হত না।
হিদের মা চোখ তুলে বললো, ‘পুরো একটি ‘টাকা দিলে বাবা?’
বললাম, ‘হ্যাঁ। তাতে কী হয়েছে!’
হিদের মা আঁচলে বেঁধে বললো, ‘বেশ! সকলের কাছে তো চাই নে। যার কাছে মন চায়। বড় অল্প পুঁজি আমার। বড় ভয় করে, তাই আগে থেকেই সামলে চলি।’
আশ্চর্য! এত সামলাসামলি হিদের মায়ের। তবু দেওয়ার কথায় পঞ্চমুখ সে। কিন্তু আর দেরি নয়। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে আসতেই দেখি, ব্রজবাল মুখভার করে তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। মাথায় অর্ধেক ঘোমটা। ও! হিদের মাে টাকা দিয়েছি বলে রাগ হয়েছে তার। হতেই পারে। সে যে আমার সত্যি সখী। পেছনে আমার হিদের মা। দৃপ্ত ক্রুদ্ধ চোখে তার দিকে তাকালো ব্রজবালা। আমি হাসি গোপন করে চলতে উদ্যত হলাম।
ব্রজবালা বললো, ‘দিমা তোমাকে খেয়ে বেরুতে বলেছে।’
‘এখুনি?’
‘হ্যাঁ। আমরা আজ বেরুব।
খুব রাগ করেছে ব্রজ! বললাম, ‘ফিরে আসি, তারপর খাব।’
সে বললো, ‘আমরা এক্ষুনি বেরিয়ে যাব। দেরি হলে, তোমার খাবার ঢাকা দেওয়া থাকবে তাঁবুতে।’
হেসে বললাম, ‘তথাস্তু।’ মনে মনে বুঝলাম, ব্রজর রাগ বাগ মানল না তাতে।
এমন সময় হিদের মা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘বউমা। অ বউমা।’
বলতে বলতে ছুটে গেল গেটের দিকে। অমনি ব্রজ আমার কাছে ছুটে এসে বললো, ‘ওই যে সে-ই।’
‘সে-ই? সেই কে?’
কোথায় ব্রজর রাগ! বয়স যাবে কোথায়! সে চোখ ঘুরিয়ে বললো, ‘সেই যে গো, সেই বউটা। সোয়ামী যার সাধু হয়ে বেরিয়ে গেছে। সেই বউ! সঙ্গে ওই লোকটা ওর দেওর।’
ও! মনে পড়েছে। স্বামী-সন্ধানী বউ। তাকিয়ে দেখলাম। দীর্ঘাঙ্গী এক মহিলা। ফর্সা রঙ। বেশভুষায় আধুনিকা। নীল শাড়ির উপরে হাল্কা গোলাপী রঙের লেডিজ কোট। ঘোমটা ভেঙে পড়েছে ঘাড়ের কাছে। তাকিয়েছে এই দিকে। সকালের সূর্যালোকে ঝকঝক করছে কপালের ও সিঁথির সিঁদুর। পাশে একটি ভদ্রলোক, যুবক। স্বাস্থ্যবান। গায়ে অলেস্টার, চোখে আঁটা সোনালী ফ্রেমের চশমা। মুখে হাসি। হেসে যেন কী বলছে মহিলাটিকে। দাঁড়িয়েছিল হিদের মা’র জন্য। তারপর তিনজনে মিশে গেল জনারণ্যে।
ব্রজ বললো, ‘ওদের দু’টিকে বেশ দেখায় না?’
সত্যি দেখায়। ঠিক কথাটি দেখছি বয়স মানে না! কেন বললো ব্রজ, কে জানে। মনে মনে ভাবলাম, দেখায় হয়তো, মানায় কিনা কে জানে! মানানো যে আলাদা। কিন্তু, হিদের মা দেখছি ভারি ভাব জমিয়ে নিয়েছে।
Chapter - 8
৮
বেরিয়ে এলাম। মেলা তো মেলা। আজ যেন বড় বেশি জাঁকজমক। লোকের আনাগোনাও বেশি। খানিকটা উত্তরে এসে একটি সাইনবোর্ডে চোখ পড়তে থামলাম। বড় তাঁবুর গায়ে সাইনবোর্ড। নর্থ ওয়েস্টার্ন রেস্টুরেন্ট। ব্র্যাকেটে, ভেজিটেরিয়ান। চারপাশে তার কাগজের ফুল আর মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঝকঝকে পোশাকে দাঁড়িয়ে রয়েছে বয়।
উঁকি মেরে দেখলাম, লোক নেই। ভেতরটা যেন অন্ধকার, ফাঁকা। ঢুকে তো পড়ি। চা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। ঢুকে দেখি, টেবিল-চেয়ার পাতা আছে ঠিক। সবই বালির উপরে। কোথাও কোথাও পাতা রয়েছে কাঠের পাটাতন।
বয় এসে দাঁড়ালো ছাপানো মেনু নিয়ে। এ আবার কী! বালুচরে শহুরে স্বর্গ রচনা হয়েছে।
মেনুর প্রয়োজন ছিল না। বললাম, ‘চা আর টোস্ট।’
পরমুহূর্তেই নজরে পড়লো, কোণের চেয়ারে একটি লোক বসে রয়েছে। সামনে টেবিল। টেবিলের উপর ফুলদানি, কাগজ কলম দোয়াতদান। ভদ্রলোক তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকেই। চোখ পড়তেই উপযাচক হয়ে হাত তুলে নমস্কার করলেন। আন্দাজে অনুমান করলাম, তিনি উত্তর-পশ্চিম রেস্তোরাঁর প্রোপ্রাইটর হবেন হয়তো! কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রতি-উত্তর দিলাম। দিতেই উঠে এলেন ভদ্রলোক। ইংরেজিতে বললেন, ‘অর্ডার দিয়েছেন?’
বললাম, ‘দিয়েছি।’
অপরিচিতের সঙ্গে আলাপে যারা দুরস্ত, গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন হয় না তাদের। তাছাড়া, অপরিচিতের সঙ্গে আলাপে যারা আগ্রহান্বিত, আচমকা কোনো প্রশ্ন করতেও তাদের বাধে না। একটু হেসে বললেন ভদ্রলোক, ‘বাঙলা দেশ থেকে আসছেন নিশ্চয়ই?’ কথাটা ইংরেজিতেই বললেন। জবাব দিলাম, ‘কী করে বুঝলেন?’
পরিষ্কার বাঙলায় বললেন, ‘বয়কে যে ভাষায় হুকুম করেছিলেন, তাতেই বুঝলুম আপনি বাঙালি। আমাদের বাঙালি ভায়ারা ওরকম হিন্দি-ই বলেন কিনা! একটু হেসে আবার বললেন, ‘আপনাকে সেজন্য দোষ দিচ্ছি নে। শতকরা সব বাঙালিই তাই বলেন! শুনেই বুঝলুম আপনি বাঙালি।’
বুঝেও না বোঝার মতো করেই অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতে হলো, ‘আপনিও নিশ্চয়ই বাঙালি?’
ভদ্রলোক একটু হেসে, বসে পড়লেন আমার পাশের চেয়ারে। ঠ্যাং দু’টো ছড়িয়ে দিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘কী মনে হয়?’
পালটা প্রশ্ন শুনে বিব্রতভাবে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। রীতিমতো চ্যালেঞ্জের হাসি তাঁর স্থূল ঠোঁট দু’টিতে। বোধ হয় সে অধিকারও ছিল তাঁর। কারুর মুখ থেকে পরিষ্কার বাঙলা শুনে যদি তাকে বাঙালি বলা যায়, তা হলে ইনিও বাঙালি নিঃসন্দেহে। কিন্তু চেহারার কোথাও সে ছাপ নেই।
লম্বায় প্রায় ছ-ফুট লোকটি। কপালটি রীতিমতো চওড়া। কপালের ঠিক মাঝখান থেকে, তীরের মতো ওলটানো ও কোঁকড়ানো চুলের অগ্রভাগ ঘাড়ের কাছে বাবরি পাকিয়ে উঠেছে। রঙটি ফর্সা, কিন্তু পোড়া তামাটে খানিকটা। সবচেয়ে দ্রষ্টব্য হলো তাঁর কপালে ও গালে গভীর রেখা। হাসিতে অমায়িক, রাগলে ওই মুখ ভয়ংকর নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে। পোশাকে, যাকে বলে ফেতো সাহেব। ময়লা জামা, তেলচিটে টাই আর লক্ষ করলে দেখা যায়, পোকা-খাওয়া ছিদ্র জর্জরিত কোট। সব মিলিয়ে বাঙালি বলা মুশকিল।
বলতে গেলাম, অবাঙালি। কিন্তু চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম। ঠোঁটের হাসিটুকু ছিল না চোখে। ছোট গম্ভীর সেই চোখ জোড়াতে উঁকি দিয়ে রয়েছে যেন আর একটি মানুষ। এক ঘরছাড়া, দিকহারা, ঝোড়ো দিনের এক বাউন্ডুলে পথিক। বলে ফেললাম, ‘আপনি বাঙালি।’
ভদ্রলোক এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন হাসিতে, ‘রাইট ইউ আর মাই ব্রাদার। হাত দিন, হাত দিন। অবাঙালিরা আমাকে বাঙালি বলে চিনতে ভুল করে না। কিন্তু দেশি লোককে জিজ্ঞেস করলেই আমাকে অবাঙালি বলে বসে।’ বলে, হাত বাড়াবার অপেক্ষা না করেই ওঁর মস্ত থাবাটি দিয়ে টেনে নিলেন আমার একটি হাত। তারপর চিৎকার করে উঠলেন, ‘হোই রামাইয়া?’
নামের শেষে একটু বিসর্গজড়িত দ্রুত আকস্মিক ছেদ। অর্থাৎ রামাইয়াঃ। হাঁও নয়, হুঁও নয়, অদ্ভুত শব্দের জবাব এলো তাঁবুর ভেতর থেকে। ভদ্রলোক দ্রুত দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলে উঠলেন। তেমনি ভাষায় জবাব এলো ভেতর থেকে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ভদ্রলোকের দিকে।
সন্দেহ হলো। সত্যিই বাঙালি তো লোকটি! না কি স্রেফ ভেল্কি? এ আবার কী ভাষা বলছেন ভদ্রলোক!
বাহাদুরির ভঙ্গি নেই। চাপা উল্লসিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ভাষা বললুম, বলতে পারেন?’
বললাম, ‘না।’
‘তেলেগু ভাষা। আপনার চা দিতে দেরি হচ্ছে কেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলুম। ও বললে, আপনার রুটি সেঁকছে।’
কথা শেষ হওয়ার আগেই চা এসে পড়ল। ট্রের উপরে সাজানো সবই আলাদা আলাদা। এমনকি মাখনটুকুও। ভুলেই গিয়েছিলাম, ঢুকেছি এক সভ্যতাদুরস্ত রেস্তোরাঁয়। টি-পটের ঢাকনা খুলে দেখি, কাপ-তিনেক চা আছে। বয়কে বললাম, ‘আর একটি কাপ দাও।’
প্রোপ্রাইটর বললেন, ‘কেন?’
বললাম, ‘চা খান। ‘
‘না না না।’
অভদ্রতা প্রকাশ পেল কিনা জানি নে। তবু বললাম, ‘না কেন? এত চা কে খাবে? দু’জনের মতোই রয়েছে।’
ঠোঁট উলটে বললেন উনি, ‘ও মশাই বাঙালিদের পক্ষে। নইলে ওটুকু চা আবার একজন কি খাবে! বেশ, আপনাকে আমি সিঙ্গল কাপ দিতে বলছি।’
আমি ওঁর মতো বলে উঠলাম, ‘না না না। আমি আপনাকে আমার টেবিল-সঙ্গী হতে বলছি। আসুন না, চা খেতে খেতে গল্প করা যাক।’
‘ও! আমাকে খাইয়ে-ই পয়সা উশুল করবেন!
বলে হা হা করে হাসি। দরাজ গলায় হাসি। চকিতে ইশারা করলেন বয়কে। বয় কাপ এনে দিল। বললেন, ‘তাহলে আমি চা-টা পরিবেশন করি আর আপনি ততক্ষণ রুটি খেতে থাকুন।’
তাই হলো। চা তৈরি করতে করতেই বকবক করে চললেন উনি, ‘মশাই, খাবার কখনো খুঁতখুঁত করবেন না। ভারি খারাপ জিনিস। আগে আমার ওরকম ছিল। একবার কি হলো জানেন? তখন ছিলুম করাচীতে। পাকিস্তান হওয়ার আগে। শহর খুব ফিটফাট, রাজপথে একটা ভিখিরি দেখতে পাবেন না, এমনি কড়া আইন! ভিতরে যান, বারাকপুরের বস্তি অঞ্চলকে হার মানিয়ে দেবে, এত নোংরা। বিশেষ হাবসী পাড়ায়। যেমন নোংরা, তো দুর্দান্ত। মারামারি তাদের কথায় কথায়। বন্দরের এক হাবসী কুলি-সর্দার ইয়াকুব ছিল আমার বন্ধু। সে একবার নেমন্তন্ন করে বসলো তার ঘরে। খেতে গেলুম। আরে রাম রাম রাম। মশাই ক’দিনের বাসি হাতরুটি, সাদা সাদা পোকা দেখা যাচ্ছে। তেমনি দুর্গন্ধ। তার উপরে, মাংস বলে যা এলো, সে আর চেয়ে দেখা যায় না। কালো রঙ, বোধ হয় কোনো শাক-সবজী ছিল, আর কতগুলো নাড়ি-ভুঁড়ি। তার ওই নোংরা পাজামা দিয়ে রুটি ঘষে তুলে দিল আমার হাতে। কী করি! দ্বিরুক্তি করছি দেখে সে বিদ্রুপ করে বললো, ‘বাঙালি শুনেছি, কলাগাছের ছাল খেতে ভালোবাসে। মাংস রুটি পেয়ার করে না তারা।’ কথাটা বড় লাগল। বাঙালিকে খোঁচা? তাও এই অমৃত-সমান রুটি দিয়ে? ভাবলুম মরার বাড়া ভয় কি? খেয়ে ফেললুম। পেট ভরেই খেলুম। রাস্তায় এসে তুলে ফেললুম সব গলায় আঙুল দিয়ে। তারপর একদিন নেমন্তন্ন করলুম তাকে। ব্যবস্থাও করেছিলুম তেমনি। দু-দিনের পচা পান্তাভাত আর ঝোলা গুড়। খা, কত খাবি।’
বলে, ভদ্রলোক ঘাড় কাত করে তাকালেন আমার দিকে। গভীর বিস্ময়ে স্থানচ্যুত হলো তাঁর মুখের রেখা। বললেন, ‘মশাই, বেমালুম খেয়ে ফেললে! তারপর দিয়ে আর কুলিয়ে উঠতে পারি নে। মঞ্জুরি, কী বলবো আপনাকে, লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলুম। আবার যাওয়ার সময় কী বলে গেল জানেন? বললে, বহুত বঢ়িয়া চীজ খিলায়া দোস্ত। বুঝুন ব্যাপারটা। তাই বলছি, বাইরে যখন বেরুবেন বাইরের মতন হয়ে বেরুবেন। অবিশ্যি চা আপনি কম খান তাতে কিছু নয়। কিন্তু বাঙালি বলে সব জায়গায় নিজের রীতিনীতির খুঁটি আঁকড়ে থাকব, তা করতে গেলে ফ্যাসাদে পড়ে যাবেন। তা হলেই গলায় আঙুল দিতে হবে। আরে মশাই, শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াও তাই সয়। এ তো বাঙালিই বলে।’
পেটরোগা খুঁতখুঁতে বলে দুর্নাম আছে বাঙালির। আমি তার বাইরে নই। তিন কাপ চা একলা খেলে আমাকেও যে গলায় আঙুল দিতে হতো। বিষয়টি তর্কসাপেক্ষ। তবু, আপাত মূল্য আছে এঁর কথার। প্রতিবাদ করতে পারলাম না। বিশেষ, এঁর বাঙালি-জেদ, আর হাবসীর পাত্তা-প্রীতির কথা শুনে। যে বাঙালিকে তিনি বিদ্রুপ করতে চান, সেই বাঙালি নামের জন্য সামান্য এক হাবশী কুলির পচা রুটি মাংস খেতেও পেছপা হননি।
কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই তিনি বলে উঠলেন আবার, ‘বিদেশে কোনো বিষয়ে পেছিয়েছেন তো, আপনি গেলেন। অমনি সবাই যো পেয়ে যাবে। ভেঁটে থাকতে হবে। যখন যেমন, তখন তেমন! লে আও তোমার কী খানা আছে। অত পটপট কীসের? সত্যি, অনেক অখাদ্য খেয়েছি। কিন্তু বমি কোনদিন কারনি আর। থাকগে যাক, ভায়ার নামটা কি শুনি?’ গায়েপড়া অন্তরঙ্গতার হাসি ছড়িয়ে পড়লো তাঁর চোখে-মুখে। সুর ছড়াল চায়ের টেবিলে। টাইপ আসর-জমানো লোকের মতো ‘ভায়া’ শব্দটি তাঁর মুখে একটুও বিচিত্র ঠেকালো না। নাম বললাম।
‘বেশ বেশ। তা এলাহাবাদে কি কোনো আত্মীয়স্বজন আছে?’
‘না।’
‘কোথায় উঠেছেন?’
আশ্রমের নাম বললাম।
আশ্রমের কথা শুনে আবার তাঁর মুখে একটু চাপা হাসির লক্ষণ দেখা গেল। যেন কতদিনের পরিচয় এমনি অন্তরঙ্গ সুরে, একটু রহস্য করে বললেন, ‘তা ভায়া, এ বয়সে এত বৈরাগ্য কেন?
বললাম, ‘বৈরাগ্য নয়। মন টানল, তাই চলে এলাম। দেখবো আর ঘুরব বলে বেরিয়ে পড়লাম।’
চা খেতে খেতে বললেন, ‘কোথায় ঘুরবেন, আর কী দেখবেন?’ মুখে তাঁর কৌতূহল ও বিস্ময়। যেন ঘোরবার দেখবার কিছুই নেই।
বললাম, ‘যা দেখি নি, যেখানে বেড়াইনি, সেই সবই দেখবো, সেখানেই বেড়াব।’ ভদ্রলোক তাঁবুর আধা অন্ধকার কোল থেকে কয়েক মুহূর্ত বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বহু দূরে কী দেখছেন। চোখে তাঁর সেই আলোছায়ার খেলা। তারপর হঠাৎ বললেন, ‘দেখুন, আমি সত্যি মুখ্যু মানুষ। কী বলতে কী বলে ফেলব। অনেকদিন আগে একটা জাপানী কবিতার বাঙলা অনুবাদ পড়েছিলুম।
‘কি করি কোথা যাই,
কোথা গেলে শান্তি পাই?
ভাবিলাম বনে গিয়া,
জুড়াব তাপিত হিয়া।
শুনি সেথা অর্ধরাত্রে,
কাঁদে মৃগী কম্প্রগাত্রে।।’
বলে, তিনি চুপ করে গেলেন। মনে হচ্ছিল, একটা চাপা গভীর অথচ তীব্র আর্তনাদ শুনছি কাছে। তার মধ্যে অনুরণিত এক ঘোর অস্থিরতা। কিন্তু শান্ত। তারপর আচমকা চুপ করে গেলেন। যেন নিঃশব্দ রাত্রে এক পোড়ো বাড়ির দেউড়ি একবার ককিয়ে উঠে থেমে গেল। তারপর অসহ্য নিঝুমতা, অন্ধ নিঃশব্দ রাত্রির আড়ষ্টতা!
বাইরে কোলাহল। তাঁবুর আশেপাশে গণ্ডগোল চিৎকার। সে-কোলাহল ধ্বনি যেন ঝিঁঝির ঝিল্লিরব। বাইরে রৌদ্রালোকিত রূপালী বালুচর। আর কালো রঙের তাঁবুটার মধ্যে এখনো অন্ধকার লেপটে রয়েছে কোণে কোণে।
তাকিয়ে দেখি সামনে আমার নতুন মানুষ! তার বিশাল তামাটে মুখটা উঁচু-নীচু। যেন কোন্ দূর পাহাড়ের গড়িয়ে-পড়া এক পাথর। গভীর ফাটলের মতো মুখের রেখাগুলি তার গভীরতর। চোখ দু’টো পাথরের মূর্তির চোখের মতো নিষ্পলক, উদ্দীপ্ত অথচ অন্ধকার।। যেন এই শিলাখণ্ডের উপর দিয়ে বহু যুগ-যুগান্তরের রোদ বৃষ্টি ঝড় বয়ে গিয়েছে। পোড়া, ধোয়া, বিধ্বস্ত।
কী বলবো ভেবে পেলাম না। উনি এমনভাবে চুপ করলেন, সেটি যেন আর-একজনকে চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো। আমার ঘরছাড়া অবারিত মন, আকুল আগ্রহে মেলে রয়েছে দু-চোখ। ডানা মেলে রয়েছে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। উৎকর্ণ কান, মনের মাঝে উত্তুঙ্গ-মর্ম। মনোবীণার তারে অজানা সুরের ডাক। তাকে যেন দু-হাত মুঠি করে চেপে ধরলেন ভদ্রলোক। আড়াল করে দাঁড়ালেন আমার দিগবিদিক ছোটা পথের সামনে। কী বলব!
এত লোক, এত নারী আর পুরুষ, শিশু আর বৃদ্ধ এসেছে সারা দেশ থেকে। আমিও এসেছি। কে ডাক দিল জানি নে। কী বলে ডাকলো, কী সুরে বাজল সেই ডাকের সুর, তাও বুঝিনি। এ যেন সেই রাধার উক্তির মতোই—খেতে সাধ নেই, শুতে আনন্দ নেই। কোন অতৃপ্তি রেখেছিল চারপাশ থেকে ঘিরে, তাও খুঁজে দেখিনি। মন বললো, রইতে নারি, আর রইতে নারি ঘরে। মন ব্যাকুল হয়েছিল। তার ঝঙ্কার দিল আগ্রহের অঙ্গুলি। তাই বেরিয়ে পড়েছি। দেখবো, ঘুরব, আশা মেটাব। কিন্তু বিচিত্র বেশে এ কোন্ হরিণী সজাগ চোখে দাঁড়ালো আমার সামনে! নিজের মাঝে ছিল অতৃপ্তির কত গভীর উৎস, ভেবে দেখিনি। কিন্তু এ যে সমুদ্র! বুকে যার তীব্র গোঙানি, স্বাদ যার কটু ও লবণাক্ত।
কবিতা চীনে কি জাপানী জানি নে। হৃদয়ে যে-ভাষা জোগায়, সে কাব্যের কোন জাত নেই। সে কাব্য সকল মানুষের। মনে পড়লো, কবে একদিন পাড়ার মুদিখানায় বসে শুনেছিলাম এক পথচারী গায়কের গান—
‘কত ঘাটে ঘাটে বাঁধলাম নৌকা,
তোমার দেখা পেলাম না,
যারে শুধাই, এক জবাব পাই।
‘কার কথা কও, কোন্ জনা।’
শুধায় সবে, শুধাই আমি
শুধায় বনে বনে,
(হায়রে) বনও কাঁদে, কয় আমারে
‘তার দেখা পেলাম না’।।’
সেই একই হাহাকার। তবু কে বসে থাকবে নিশ্চেষ্ট হয়ে? ঠাঁই নেই, তবু বুকে হাত রেখে বসে থাকবো কোন্ সন্ধ্যাতারার দিকে চেয়ে? এক তারার পাশে আর এক তারা, তারপরে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি, অসংখ্য। চোখ মানে না। মন বাধা মানে না। বলরামের কথা মনে পড়ে গেল। আর আমার এই ঘরছাড়া চোখ দেখেছে শ্যামাকে। হাসিতে তার সেই মধ্যরাত্রির বিরহিণী হরিণীর কান্নাও বুঝি ছিল। শুনব বলে আসি নি। না এলে যে শুনতেও পেতাম না। কথা বলতে গেলাম। উনি বলে উঠলেন, ‘যেখানে যাবেন, এটি তো সঙ্গে যাবেই।’ বলে, তাঁর বুকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। তারপর বললেন, ‘এ কি কখনও ভরে?’
বললাম, ‘ভরে না বলেই তো!
অতবড় মানুষটা। হাসিতে কী করুণ ও নিরীহ। বললেন, ‘তবুও ভরতে হবে। কিন্তু ভায়া, ও তো কখনো ভরে না! এ সংসারে কার আছে ভরা ভাত, জানি নে। নিজেরটা তো দেখি, ফুটো পাত্র। যত ভরি, সে তত ঝরে। হিন্দিতে একটা গান আছে জানেন? যমুনা থেকে গাগরি ভরে ভরে বারবার জল নিয়ে এলি তুই ছোকরি, কিন্তু তাজ্জব! ছলকে ছকে বারবার তোর সব জল পড়ে যায়। তুই আবার ছুটিস যমুনার পানে। বলি, এ কি তোর ভরানো ঝরানো খেলা? যমুনার কালো জল কি দুরন্ত ছেলের মতো এতই দুষ্ট যে, সে কিছুতেই তোর কলসীতে থির হতে চায় না? বলে হেসে উঠলেন। একটা তীব্র কনকনে হাওয়া ঢুকলো তাঁবু দুলিয়ে। চকিত ফণার মতো দুলে উঠলো তাঁর তেলচিটে টাইয়ের অগ্রভাগ। বললেন, ‘জন্মে যা ভরে নি, মরণে কি সে ভরবে? তবু – ‘
বলে, এক মুহূর্ত থেমে নিজেই বললেন আবার, ‘তবু মন মানে না, কী বলেন? আগে বোঝাপড়া ওর সঙ্গে, তার পরে তো সব? আপনাদের সেই খ্রীষ্টান কবির কথা মনে আছে তো?’
‘আসার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়
তাই ভাবি মনে।
জীবনপ্রবাহ বহি কালসিন্ধু পানে ধায়
ফিরাব কেমনে?’
আমাদের খ্রীষ্টান কবি বটে! কিন্তু মুখস্থ দেখছি ওঁরই আছে বেশি। আচমকা একটি ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বড় খারাপ নেশা ভাই। এই পথের নেশার চেয়ে খারাপ নেশা আর কিছু নেই। এ ডেকে নিয়ে এসে ছেড়ে দেয়, আর ডাকে না, পেছনে ফিরতেও দেয় না।
বলে, এক চুমুকে ঠাণ্ডা চায়ের কাপটি শূন্য করে দিলেন। আমার চায়ের পাট ফুরিয়েছে অনেকক্ষণ। কিন্তু আটকা পড়েছি আপনা আপনি। যেচে আলাপ করতে এলেন উনি। কিন্তু ওঁর রূপ কী গুণ করলো আমাকে, যেচে বিদায়ের কথা পারলাম না বলতে। শুধু তাই নয়। ওঁর চোখের ওই দূরভিসারী দৃষ্টি, মুখময় ঝড়ের দাগ আর অসহায় হাসি মনের মধ্যে যুগপৎ অকারণ একটু ব্যথা ও কৌতূহল জাগিয়ে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার দেশ কোথায়?’
জিজ্ঞেস করতে আবার হেসে উঠলেন। এবার অট্টাহসি বলা চলে। বললেন, ‘চায়ের আসরটা তা হলে জমেছে ভালো, কী বলেন? দেশ তো ভাই আমার নেই। ঘরকে পর করেছি, পরকে ঘর। এখন সবই দেশ বলে মনে হয়। তবে জন্মেছিলুম বাঙলার এক গাঁয়ে। আঠারো বছর বয়সে সে-গ্রাম ছেড়ে এসেছি। তারপর দেশ থেকে দেশান্তর, যাকে বলে দেশান্তরী।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার বাবা মা আত্মীয়স্বজন, তাঁরা কোথায়?’
‘বাবাকে ভাই কোনোদিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মাকেও হারিয়েছি অল্প বয়সেই। আঠারো বছর পর্যন্ত পেলেছিল এক মাসি। মাসি মারা গেল। তার ছিল কিছু জমি-জমা। দেখলুম, আমার মতো অনেক বোনপো-ভাইপো রয়েছে মাসীর। তারা এসে দাবি করলো ঘরবাড়ি, জমি, গোরু-বাছুর। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি নে। বেঁচে গেলুম। ভেবেছিলাম, কাকে দেব? ভাগীদারের সংখ্যা দেখে চিন্তা ঘুচল। আর আঠারো বছর বয়স। সে যে অথৈ সমুদ্র। তার কূলকিনারা নেই!’
বলতে বলতে তাঁর সমস্ত মুখখানিতে স্বপ্ন নেমে এলো। জানি নে, এ শুধু তাঁর আসরজমানো কথা কিনা। কিন্তু তাঁকে যে কোনো নিশি পেয়েছে, সে-চিহ্ন ফুটে উঠেছে তাঁর মুখের গম্ভীর রেখায় রেখায়। বললেন, ‘ছোটকালে বাঁশঝাড় দেখিয়ে মা বলত, খবরদার, ওদিকে যাসনি। কিন্তু বড় বড় চোখে সারাদিন তাকিয়ে থাকতুম বাঁশবনের ঝুপসি ঝাড়ে। আপনি বাঙলাদেশের ছেলে। জানেন নিশ্চয়ই বাঁশঝাড়ের হাওয়ায় কী এক ‘আয় আয়’ ডাক শোনা যায় অষ্টপ্রহর। লোকে শুনলে হাসবে, আমার মুখে কাব্যি? কাব্যি নয়, এখনো কানে লেগে রয়েছে সেই ডাক। বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে দেখতুম ধুধু মাঠ। কে যেন আমাকে ডাকত ওই মাঠ থেকে। বিশ্বাস করুন। আমাকে ডাকত। লেখাপড়া করতে পারি নি। যেমনি পাখা গজাল, মানে একটু বয়স হলো, অমনি পালিয়ে গেলুম মাঠের উপর দিয়ে। আস্তে আস্তে ভয় ভেঙে গেল মাসি কাঁদত, মাসি আমাকে বেঁধে রেখেছিল। তারপর যেদিন মাসি ছেড়ে দিয়ে গেল সেই সেইদিন কে-ই বা তৈমুরলঙ আর কে-ই বা চেঙ্গিস খাঁ। বেরিয়ে পড়লাম দিগ্বিজয়ে। শুধু একজনের কাছে দাঁড়িয়েছিলুম গিয়ে। সে ছিল আমার সোনার বাঁধন। মাসি ছিল রক্তের, জানেন তো, মানুষের ব্যাপার! রক্তের চেয়ে দামী সোনা। তাকে ছাড়তে পারলে যেন সব ছাড়া গেল। সে কোনো কথাই বলে নি। শুনল, তাকাল, তারপর ঘাড় কাত করে জানালে যাও। চলে গেলুম। কেন যাচ্ছি, কীসের দিগ্বিজয়, কিছুই জানতুম না। তবু বেরিয়ে পড়লুম। সেই দিনটি ছিল আমার বড় আনন্দের দিন, আর আজ ভাবি, কী ভয়ংকর, কী সর্বনাশের দিন ছিল সেটি!’
আমি নিতান্ত বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
জিজ্ঞেস করতে করতেই তাকিয়ে অবাক হলাম। একি, এত অজস্র রেখা তাঁর মুখ ভরতি।
যেন একরাশ শুকনো দগ্ধ বর্ণের তৃণকুটার মুখ একটি। চোখে ব্যক্ত অব্যক্ত যন্ত্রণা। বললেন, ‘কেন? কেন নয়? কোন্ নিশি ডেকে নিয়ে এলো আমাকে, এখন মাথা খুঁড়ে মরছি। ফেরবার জায়গা নেই, এগুবার জায়গা নেই, কোথায় ঘুরে মরছি! কেন এসেছিলুম, কোথায় এসেছিলুম, সব ভুলে গেছি। ঘুরছি শুধু গোলক ধাঁধায়। শুনেছি অনেকে বেড়ায়, বেড়িয়ে লেখে ভ্রমণকাহিনী। আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি নে ওই বইগুলোকে। দু-চক্ষে নয়। ভ্রমণকাহিনী, সে আবার কী? দু-দিন বেড়ানো। তাহলে আমি কী? আমার এ কোন্ সর্বনেশে ভ্রমণ! শুকনো ঝরা পাতা উড়ছে পথে পথে। উঠছি পড়ছি, তারপর একদিন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাব কার পায়ের চাপে। কী যে চাইলুম, আর কী যে পেলুম! বড় ভয়ংকর নেশা ভাই, ভয়াবহ নেশা। ওই নিয়ে আবার লোকে বই লেখে?’
চুপ করলেন। মনে হলো, একটা তীব্র যন্ত্রণার সুর ঢেউ দিয়ে ফিরছে কানের কাছে। ভুলে গেলাম কুম্ভমেলার কথা। ভুলে গেলাম, কোথায় এসেছি। এ যে মাতালের ধিক্কারের কান্না। একদিন যা আকণ্ঠ পানে মাতাল করেছে, আজ তারই বিষক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কিন্তু পথ কি মন্দ? ঘরছাড়া মানুষের সে যে তৃষ্ণার জল। যতক্ষণ সে জীবনস্বরূপ, ততক্ষণ সে আনন্দ অশ্রুভরা। সে ব্যথার ব্যথী। অগতির গতি। নিঃস্বর সঞ্জয়। পথ না হলে চলব কোথায়?
কিন্তু জানি নে, বুঝি নে, পথ কখন এমনি প্রতিশোধ নেয়! আর কী ভয়ংকর তার প্রতিশোধ। সেই প্রতিশোধেরই এক প্রতিমূর্তি যেন আমার সামনে।
হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নামটি কিন্তু জানা হয়নি।’
বলতেই আবার হাসি। উচ্চহাসি হেসে বললেন, ‘নামটা ভাই বড় খারাপ আমার। এই বাউণ্ডুলে জীবনে সেটাও একটা ঠাট্টা। তাহলে আর একটু চা খেতে হয়।’
আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই।’ বলে, বয়কে ডাকবার আগেই উনি নিজেই সেই দক্ষিণী ভাষায় হুকুম করলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কখনো দেশে যান নি?’
বললেন, ‘বাঙলাদেশে? অনেকবার। তবে গাঁয়ে গেছি একবার।’
‘মাত্র?’
‘হ্যাঁ। যুদ্ধের পর গেছলুম, সারাটি দিন ঘুরলুম, কেউ চিনতে পারল না। গাঁয়ের হরে মুদি তেমনি বসেছিল দোকানে। শুধু গায়ের চামড়া তার ঝুলে পড়েছিল থলের মতো। কী বলবো ভাই, আমাকে দেখে বললে, কি মাংতা সাহেব? মনে মনে হাসলুম। বললুম, পৌয়া ভর চিঁড়ে দাও, দো পয়সা কী গুড়। সাহেবকে চিঁড়ে গুড় খাইয়ে তার ভারি আনন্দ। বললে, কার বাড়ি আসা হায়? বললুম, সোনার বাঁধন কি বাড়ি। সে বললে, ও সোনার বেনে? পশ্চিম পাড়ায় আছে বটে দু-ঘর। নাক কি বরাবর চলে যাইয়ে। হাসিও পেল। দুঃখও হলো। সত্যিই সোনার বাঁধনের বাড়ি নাক বরাবরই বটে। গেলুম। গিয়ে দেখলুম, ভাঙা বাড়ি আর ঘন জঙ্গল। সন্ধ্যার অন্ধকারে একটা ভূতুড়ে বাড়ি। বুঝলুম, কেউ নেই। হয়তো আমার সোনার বাঁধন অন্য কোনো দেশে আর কাউকে বেঁধেছে। তার চোখের দিকে তাকালে না বাঁধা পড়ে উপায় ছিল না। ফিরে গেলুম।’
আবার চুপচাপ। চা এলো। এবার দু’টি সিঙ্গল কাপ। বুঝলাম, সেই যে গেলেন, সেই যাওয়া আজও শেষ হয় নি।
বললেন, ‘যদ্দিন আছেন, আসবেন একটু-আধটু। একটু বকব প্রাণভরে, সে-মানুষও পাই নে।’
বললাম, ‘নামটা?’
হেসে বললেন, ‘ভোলেননি দেখছি। হাসবেন না যেন। নাম আমার রমণীমোহন মুখোপাধ্যায়।’ বলে কী হাসি! হাসি আর থামতে চায় না। বললেন, ‘কী আশ্চর্য বলুন তো, টো টো মোহন কিংবা বাউণ্ডুলে মোহন নাম রাখলেই ঠিক হতো।’
স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, চা খেতে ঢুকে এমনি এক রমণীমোহন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হবে। তাঁবুটার অন্ধকার তখনো কাটেনি ভাল করে। বাইরে বালুচরের আকাশ রুপোর পাতের মতো ঝকঝক করছে। আর বসে থাকতে পারি নে। পকেট থেকে পয়সা বার করতে গেলুম।
রমণীমোহন গল্পের নায়কের মতো বাধা দিলেন। বললেন, ‘পয়সাটা ভাই পাওনা থাক, কাল দিয়ে যাবেন।
বুঝলাম, আসবার জন্যই এই কথা। বললাম, ‘যদি না আসি?’
‘তা হলে একলা বসে বসে হাসব।’
অদ্ভুত কথা। দু’জনেই হেসে উঠলাম। বললাম, ‘কিন্তু ব্যবসা করতে বসেছেন। পয়সা না নিলে আসব কি করে?’
তাই তো ফন্দী। হেসে আবার বললেন, ‘দোকানটি আমার এক মাদ্রাজী বন্ধুর। আড়াই হাজার ঢাকা দিয়ে দোকান নিয়েছি। বুঝতেই পারছেন অবস্থা। সকাল থেকে আপনি একমাত্র খদ্দের। তবে সে সম্মান আপনাকে দেব না। আমার আত্মীয়তাটুকুই মেনে নিতে হবে আপনাকে। কী ভাগ্যি আপনি এসেছিলেন। প্রাণে একটু হাওয়া লাগল। আসবেন, আসবেন। রোজ পয়সা নেব, আজকের দিনটি পারবো না ভাই।’
বলতে বলতে উনি গম্ভীর হয়ে উঠলেন আবার। আমার মুখের হাসিটা আড়ষ্ট হয়ে রইলো। এই বিড়াট সুপুরুষ চেহারার মানুষটির ভেতরের সেই ক্লান্ত অসহায় প্রাণটি কখন যে মন দিয়ে কেড়েছে টের পাইনি। যাবার সময় ওঁর এই গাম্ভীর্য খচ করে উঠল বুকের মধ্যে।
একসঙ্গে বাইরে এলাম। রমণীমোহন বলে উঠলেন, ‘আঃ!’
দেখলাম, বুকটা ওঁর ঠেলে উঠেছে সামনের দিকে। মাথাটি উঁচু করে তুলে ধরেছেন দূরের আকাশের দিকে। দু-চোখে মুগ্ধতা। বুঝলাম, নেশা লাগছে। বিষ এখনো মাঝে মাঝে অমৃত হয়ে ওঠে। খোলা আকাশ দেখলেই মন ছুটে যেতে চায়। বোধ হয় ওইটুকুই এখনো প্রাণবায়ু হয়ে আছে।
বললাম, ‘চলি।’
সে-কথার জবাব না দিয়ে বললেন, ‘মানুষের ভিড় একটু বেড়েছে দেখছি। কাল পূর্ণিমা কিনা। স্নান রয়েছে।
পথের মানুষ। বাইরের কথা ভুলতে পারেন না কিছুতেই। বললাম আবার, ‘চলি।’
হাত ধরে বললেন, ‘আসুন।’
খানিকটা গিয়ে ফিরে দাঁড়ালাম। হাসি পেল, লজ্জাও হলো। তবু বললাম, ‘একটা কথা বলব?’
‘একটা কেন, একশোটা বলুন।’
বললাম, ‘কেন এসেছি বলছিলেন, না এলে আপনাকে দেখা হত না তো?’
বলতেই ওঁর ঠোঁট দু’টো বেঁকে উঠেই চকিতে ফেটে পড়লেন হাসিতে! হাসিটা তাকিয়ে দেখতে পারলাম না। ফিরে চললাম। শুনতে পেলাম, চিৎকার করে বলছেন, ‘তাহলে এ যাত্রা আপনার নিষ্ফল তীর্থযাত্রা! কুম্ভ আপনার শূন্যই থেকে যাবে। হা হা হা…।’
উত্তরে হাওয়ায় ভেসে এলো ওঁর হাসি। শূন্য কুম্ভ আমার ভরবে কিনা জানি নে। কিন্তু হৃদিকুম্ভ যে ভরে গিয়েছে মানুষ-রসের স্বাদে। যে মানুষ দেখে স্বাদ মেটে না, সেই অতৃপ্তি উনি বাড়িয়ে দিলেন হাজার গুণ। এ বৈচিত্র্যের শেষ নেই, রূপের সীমা নেই। এ নামেরও মৃত্যু নেই।
হঠাৎ বুকে আমার আনন্দের সীমা রইলো না। চারদিকে মানুষ। বিচিত্র রঙবাহার। কোলাহল, ব্যস্ততা, ব্যাকুলতা, ঊর্ধ্বশ্বাস মানুষ। সকলে চলেছে সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে। মনের মধ্যে বেজে উঠলো সহস্র রাগিণী একই তারের ঝংকারে।
দ্রুত পা চালিয়ে দিলাম পূর্বদিকে। বালি শুকিয়ে ঝুরঝুর করছে। তেতে উঠেছে এর মধ্যেই। শীতে বড় আরাম লাগছে তাতে। পূর্বদিকে সমুদ্রগুপ্তের টিলার দিকে চললাম।
একলা চলছি নে। শত শত লক্ষ লক্ষ চলেছে। যেন আমারই সঙ্গে চলেছে সবাই। যেন চলেছে আমারই পায়ে পায়ে, আমারই হৃদস্পন্দনের তালে তালে, ছায়া ফেলে আমারই হৃদয়সরসী-নীরে। যেন সবারই ডাক পড়েছে আজ পূর্বদিগন্তে।
সত্যি, জনবন্যার ঢেউ বেড়ে উঠেছে অনেকখানি। একটি রাত্রের মধ্যেই সেই বন্যার গতি যেন চারিদিক থেকে পাক খেয়ে খেয়ে আবর্তিত হতে আরম্ভ করেছে। দূর থেকে হঠাৎ দেখলে তাই মনে হয়। কোন্ দিক থেকে আসছে মানুষ, যাচ্ছে কোন্ দিকে, কিছুই ঠাহর করা যায় না।
সামনে উঁচু-নিচু বালুচর। এদিকে তাঁবুর সংখ্যা ক্রমে কমে এসেছে। কমে আসতে আসতে শেষ হয়ে গিয়েছে একেবারে। শুধু সাদা বালু। তার উপর দিয়ে মানুষের বন্যা এ সকালের বেলায় যেন ঘন অরণ্যের সারি হয়ে উঠেছে। টাঙ্গা ছুটে চলেছে। ছুটে নয়, ঠেলে ঠেলে নিয়ে চলেছে। এরই উপর দিয়ে, মানুষের ভিড়ের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে প্রাইভেট মোটরকার। হাওয়ায় উড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বালি।
দেহ শীতার্ত। অথচ আকাশে আশ্চর্য মেঘ ও রোদের সমারোহ। সাদা মেঘের দল চলেছে নীল আকাশের আঙিনা জুড়ে। ছোট ছোট মেঘের টুকরোয় রোদের ছোঁয়া লাগায়, তার ধারে খেলছে রুপোলি ঝিলিমিলি।
ঝুসির গ্রাম থেকে নেমে আসছে উটবাহিনী। পিঠে তাদের কাঠের বোঝা। দূর থেকে দেখা সমুদ্রের ঢেডয়ের মতো দুলতে দুলতে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে আসছে গাধাবাহিনী। তাদের পিঠে শুধু কাঠ নয়। কাঠ, তরিতরকারি, ফল।
মানুষ পশু ও প্রকৃতির বিচিত্র সমারোহ। হাসি ও কলকোলাহল। অন্ধ সুরদাস চলেছে গান গাইতে গাইতে। তার ভাষা বুঝি নে। দরাজ গলায় তার ভৈরবী সুরের মধ্যে শুধু ছড়ার আহ্বান। শুধু ডাক। এই ভিড়, কোলাহলের মধ্যেও সে-সুরে কী বিচিত্র প্রসন্নতা। মুক্তি ও আনন্দের স্বাদে ভরপুর।
তাকিয়ে দেখি, শীত নেই অন্ধ সুরদাসের। খালি গা। ছিন্ন ময়লা উত্তরীয় বেঁধেছে কোমরে। রুক্ষু চুলের জটা উড়ছে বাতাসে। হাতের লাঠিখানি ঘুরে ফিরে চারিদিক দেখে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে থামছে গান। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, সুরদাস হাসছে থেকে থেকে। ডাইনে বাঁয়ে দেখছে, দেখছে আকাশের দিকে। যেন সে সত্যি দেখতে পাচ্ছে! হাসছে, আর তার মাতৃভাষায়, গেঁয়ো টানে থেকে থেকে জিজ্ঞেস করছে, ‘ওগো, শুনছো, ঠিক যাচ্ছি? পথ আমার ঠিক আছে তো?’
কেউ জবাব দেয়, কেউ দেয় না। কেউ বলে, অন্ধ কেন এ পথে? সে হাসে। হেসে হেসে আবার গলা ছেড়ে গেয়ে উঠছে গান।
আমি ভাবি, আমারই পায়ে পায়ে চলেছে মানুষ। অন্ধ সুরদাসের উল্লাস দেখে মনে হলো, সারা মেলা চলেছে ওরই পায়ে পায়ে। চলেছি যেন ওরই গানের সুরে সুরে।
চলেছি মনের বেগে, দেহের বেগে। তবু, আশ্চর্য! এ মন-পবনের নায়ে কোনো এক মেয়ে যেন ক্লান্ত সুরে গান গেয়ে চলেছে আমারই পাশে পাশে। সে যেন গুনগুন করছে—
যে ছিল আমার স্বপনচারিণী।
তারে বুঝিতে পারি নি।
দিন চলে গেছে খুঁজিতে….
ও! মনের দিকে তাকিয়ে দেখি, রমণীসমোহন মুখোপাধ্যায় চলেছেন আমার সঙ্গে সঙ্গে। রেখে এসেছি, ছেড়ে আসতে পারি নি দেখছি। পারা কি যায়? সেই শৈশবের কেষ্টযাত্রার নিমাইয়ের সন্ন্যাসযাত্রার কান্না মনে পড়ছে। স্বামী-সোহাগিনী বিষ্ণুপ্রিয়া নিদ্ৰা যাচ্ছে। নিমাইয়ের অঞ্চল তার ঘুমন্ত শিথিল মুঠিতে চাপা রয়েছে। নিমাই সাশুনয়নে ধরেছে গান—
মায়ার বাঁধন ছাড়া কি গো যায়?
যাই যাই মনে করি, যাইতে না পারি
মহামায়া আমার পিছনে ধায়।।
কে জানে, কাল যেতে পারবো কিনা রমণীমোহনের কাছে। কে জানে, কোনোদিন যেতে পারবো কি না! ঋণ? নিয়েছি, ভোগ করেছি মনোকষ্ট। কিন্তু সে-ঋণে তো বাঁধেনি আমাকে সে! সে যে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাঁধলে, সে যে ধরে রাখলে আমাকে মুক্তি দিয়ে।
তার সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনী, সংক্ষিপ্ততর তার সোনার বাঁধনের কথা। যে কাহিনীর তরী ভাসছে রক্ত আর অশ্রুর নদীতে। জানি, এ চলার পথে হারিয়ে যাবেন উনি। হারিয়ে যাবেন হয়তো সূর্যাস্তের আগে। তবু বুঝলাম, মন-সৈকতে আঁকা রইলো যে রেখা, সে অদৃশ্যে ফিরবে আবার চলার পথে ক্লান্ত মেয়ের মতো। তাকে তো আটকাতে পারবো না।
Chapter - 9
৯
হঠাৎ একরাশ ভিখারির ঝড় এলো বালুচরে। যেন চৈত্র-ঘূর্ণির ঝরাপাতা, ফুটোফাটা। কোথা দিয়ে এলো, কেউ জানে না, কেউ জানে না, এ-ঘূর্ণি যাবে ঘুরতে ঘুরতে কোন্ পথের উপর দিয়ে, কাদের দলে-মাড়িয়ে
হঠাৎ আমরা একরাশ নরনারী পাগলা ঘূর্ণির আবর্তে যেন পথরুদ্ধ, বিব্রত অসহায় হয়ে পড়লাম। হে পুণ্যবান, দাও দাও। হে তীর্থযাত্রী, দাও দাও। হে দয়ালু, হে রাজা রানী, দাও দাও, দাও দাও, দাও দাও।
কিন্তু প্রতিবাদ নেই, ক্রুদ্ধ গর্জন নেই, হা-হা করে বিতাড়ন নেই। সকলেই বিব্রত তবু হাসিমুখর। দিই দিই, দেব দেব, যা আছে তাই দেব। গতিক খারাপ। পকেটে হাত দিলাম। কোনোরকমে একজনের হাতে তুলে দিলাম পয়সা।
দেবার পরমুহূর্তেই সেই হাসি। নিঃশব্দ, নিরালা, দুস্তর তেপান্তরের সেই একাকী পথিকের বুকে আতঙ্ক-ধরানো পাখির বিচিত্র তীব্র হো হো ডাক। সেই লাল জামা, আর পালতোলা ময়ুরপঙ্খী পাড়। তেপান্তরের সেই বন্য বিহঙ্গিনী।
সচকিত চোখে তাকিয়ে দেখি, একলা নয়। অনেক, একরাশ। ভিখারি নয়। ভিখারিনী বাহিনী। বেশভূষায় প্রায় সকলেই একরকম। তার মধ্যেই, ময়লা ছিন্ন শাড়ি ও জামার ভাগ-ই বেশি। রুক্ষ চুল, ধূলি-ধূসরিত মুখ আর লজ্জাহীন ছিন্ন পোশাক! সবচেয়ে আশ্চর্য, তার মধ্যেও সিঁদুরের প্রসাধন, জটায় শুকনো ফুলের সজ্জা! কারুর বুকজোড়া সন্তান।
তারই মাঝে ওই লাল জামা। দলের মধ্যে রয়েছে মিশে। তবু যেন কেমন করে আলাদা হয়ে উঠলো চোখের সামনে। বোধ হয় চোখেরই দোষ। বুঝি দোষ মনের-ই। কে জানতো! না-জেনে আবার পকেট থেকে পয়সা তুলে দিয়েছি তাকে। ছি ছি, কী কলঙ্ক! কী ভাগ্যি, নেই খনপিসি, পিসির বাহিনী।
চোখ পড়তে দেখি, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আবার ঠকেছি, বুঝি তাই। আবার ঠকিয়েছে, বুঝি তাই। দেখি, ঠোঁটের কোণে তার জয়ের হাসি। জয়ের মধ্যেই তো থাকে স্পর্ধা ও বিদ্রূপের ছোঁয়া। ঠোঁটের তীব্র বঙ্কিম রেখায় তার সেই দুর্জয় ছলনার হাসি। চাউনি দেখে চমকে উঠলাম। হেলানো ঘাড়, বাঁকা চোখে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আমাকে।
স্খলিত আঁচল পড়েছে লুটিয়ে বালুচরে। বাতাস থরথর কাঁপছে তার লাল জামায়, তার রুক্ষ চুলে, তার মেটে সিঁদুরের অস্পষ্ট এলোমেলো সিঁথিরেখায়, তার সর্বাঙ্গে। সব মিলিয়ে এই বালুচরের আর এক বেশ যেন দেখা দিয়েছে এই সর্বনাশী উন্মাদিনী যাযাবরীর মধ্যে।
একে রূপ বলবো কিনা জানি নে। কী রূপ বলব, বুঝি নে। একে রূপ বলতে বাধে। অরূপ বলতে সায় পাই নে মনে। এ রূপের খাদ নয়। অথচ মন ভরে উঠছে না অপরূপ বলে। এ কি ইস্পাতের তলোয়ার, নাকি রূপালী রঙের বাঁকা কাষ্ঠখণ্ড মাত্র?
মনের তলে আমার বিস্ময়ের ঘোর। যাযাবরী ভিখারিনীর চোখে-মুখে এত আয়োজনই বা কেন? এত শাণিত দীপ্তি কীসের! করুণা-প্রার্থিনীর এ নির্লজ্জ বহ্নি ছড়ানো কেন? এ কি যাযাবরী রক্ত প্রবাহেরই স্বভাব? নাকি, ঘরছাড়া মেয়ের সেই চিরাচরিত অভিশপ্ত জীবন পয়োনালীর ক্লেদ! অথবা, জীবন-প্রস্তরে ঘা খেয়ে খেয়ে প্রতি মুহূর্তে সে শাণিত ও দীপ্ত।
চোখ সরিয়ে নিলাম। লজ্জা হলো, সঙ্কোচ হলো মনে মনে। নিজেকে আমরা ভুলতে পারি না বোধ হয় ক্ষণেকের তরে। সবাই বলেছে, সে সর্বনাশী। শুধু সর্বনাশী। সর্বনাশেরই আয়োজন তার চোখে-মুখে বেশে।
যে সব হারিয়ে, পথে এসে দাঁড়িয়েছে হাত পেতে, সর্বনাশের আগুন তো জ্বালাবেই, সে। যার কিছু নেই, সর্বনাশের খেলা তো সাজে তারই। তাকে ভিক্ষে দিচ্ছে কেউ কেউ যেচে। কত লুব্ধ চোখের পেছনে, ভিখারিনী হয়েও রানীর মতো মাথা তুলে রয়েছে দাঁড়িয়ে। মাথা নুইয়ে অগ্রসর হলাম পথে। পথিকের স্বভাবসুলভ চাউনি দিয়ে অভিনন্দিত করতে পারলাম না তার দীপ্ত হাসিকে। সে মন নেই, সে সাহসও নেই। ঘূর্ণি ঝড় এল, আবার চলে গেল। যেন সেই রূপকথার কাহিনীর আঁউ মাউ কাঁউ শব্দের মতো ভিখারিনী-বাহিনী ছুটে চললো আবার। ওই শব্দের মধ্যে ব্যাকুলতা, ব্যস্ততা। এ ওকে ধাক্কা দিচ্ছে, ও একে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। পরস্পরের মধ্যে হিসেব হচ্ছে, কে কত পেয়েছে। ঝগড়া হচ্ছে, হাসছে।
সমস্তটা মিলিয়ে শোনাচ্ছে একটা ব্যস্ত ত্রাস আর্তনাদের মতো।
কারা নিজেদের মধ্যে কথায় কথায় বলছে, হিন্দিতে বলছে, ভিখারিনীগুলো মারাঠার আওরত। জানি নে, কোন্ দেশের আওরত। কিন্তু এদের দেখেছি চিরকাল। দেশের মেলায়, বাজারে, শহরে। কলকাতার শহরতলিতে, শনি রবিবারে দেখেছি দল বেঁধে ঘুরতে।
বিদেশে বেড়ানো নাকি কপালে লেখা থাকা চাই। লিখে দেন নাকি কোনো এক বিধাতা। জানি নে, কে সেই বিধাতা, যিনি ঘর-ছাড়ার বৈরাগ্যের তিলক এঁকে দেন কপালে। কিন্তু আমার পোড়াকপালে তো সে-তিলক কোনোদিন পড়েনি জানি। তবু কয়েকবার গিয়েছি নিকট ভারতের এদিকে ওদিকে। কিন্তু ওই জাতের মেয়েদের দেখেছি সর্বত্র।
সেই চিরাচরিত চেহারা। চুল বাঁধার এদের কোনো ছিরিছাঁদ নেই। তবু কেমন একটা রকম আছে। যা শুধু মানায় ওদের রুক্ষ জটায়। কাপড় পরার বিচিত্র ধরন। আমাদের ঘরের মেয়েদের আয়াসসাধ্য দেব-সজ্জার চেয়ে ওদের ময়লা কাপড়ের অনায়াস বেষ্টনী তৈরি করে একটি বিচিত্র ছন্দ। আর কেন জানি নে, ওদের ধূলিমলিন কীটসমাচ্ছন্ন দেহে দেখেছি অটুট যৌবন।
ভাবি, আমরা কত সঞ্চয় করে বেরুই তীর্থযাত্রা পথে। মন্দিরে মন্দিরে ফিরি মাথা কুটে কুটে। ওরা ফেরে শুধু আমাদের পেছনে পেছনে, দু’টো পয়সার জন্য। এত যে তীর্থক্ষেত্রের আনাচে কানাচে ঘুরে ফেরে ওরা, ভগবানের এক ছিটে পুণ্যও কি বর্ষিত হয় না ওদের মাথায়?
কোলাহলমুখর জনবন্যার সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে চলছিলাম, আর ভাবছিলাম এমনি এক দার্শনিক তত্ত্ব! আচমকা কানের কাছে হাসি শুনে থমকে গেলাম। আবার সর্বনাশী! পাশ দিয়ে, আঁচল উড়িয়ে তীরবেগে ছুটে গেল সামনের দিকে। কিছু ঠাহর করার আগেই, চকিতে তার পালতোলা নৌকা-আঁচলের পাশ দিয়ে উঁকি দিয়ে উঠলো দুই খর চোখের দীপ্ত তারা। তারপর নিরালা বনের পাখির ডাকের মতো আকাশে উধাও হয়ে গেল হাসি। পেছনে তাকিয়ে দেখি, তিন-চারটে প্যান্ট-কোট-পরা আধাবয়সী মানুষ লুব্ধ উৎসুক চোখে লক্ষ করছে তার গতিবিধি। পাশ থেকে কে বলে উঠলো, ‘হাসতি হ্যায়।’
ফিরে দেখি অন্ধ সুরদাস। আপন মনে বলছে। তার লাঠি এসে ঠেকছে আমার পায়ের কাছে। চোখের দু’টি পর্দা ঠেলে এসেছে সামনের দিকে। পর্দা দু’টি কাঁপছে থরথর করে। আর হাসছে, হাসতে হাসতে আপন মনেই আবার বলে উঠলো, ‘হাসতি হ্যায় কৌন?’
বলে আবার হেসে উঠলো নিজের মনে। যেন কথোপকথন করছে কারুর সঙ্গে। হাসতে হাসতেই আবার জিজ্ঞাসা করে উঠলো, ‘রাস্তা তো ঠিক হ্যায়?’
জানি নে, এ শুধু তার কথার কথা কিনা। জানি নে, এ শুধু তার স্বগতোক্তি কিনা। তবু বলে ফেললাম, ‘হ্যাঁ, রাস্তা ঠিক আছে।’
‘ঠিক হ্যায়?’ বলে সে আবার হেসে উঠলো। সরল ও বোকাটে মনের অভিব্যক্তির মতো সে-হাসি। তবু যেন, সামান্য একটু বিস্ময়ের ঘোর তার গম্ভীর কণ্ঠে। একটু বা রহস্য ছোঁয়ানো। তেমনি হেসে আবার জিজ্ঞেস করলো, বাবুজী, ‘আপকা-রাস্তা ঠিক হ্যায়?’ বলে সে হাঁ-করা হাসিমুখে তাকিয়ে রহলো আকাশের দিকে। রোদ লেগে চোখের সাদা পর্দা দু’টি রুপোর মতো উঠলো চকচকিয়ে। যেন আকাশের বুকে পেতেছে কান। জবাব আসবে ওখান থেকে। জবাব দিতে গিয়ে থমকে গেলাম। এ আবার কেমন প্রশ্ন? আমি রীতিমতো চক্ষুষ্মান মানুষ। অন্ধকে বাতলে দিচ্ছি ঠিক পথের ঠিকানা। সে উলটে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার ঠিক-ঠিকানা? তবু কথা বলতে গিয়ে আটকালো। পথের ঠিক আছে কিনা কে জানে! কিন্তু এক কথায় তার জবাব দিতে পারলাম না। বিশেষ করে ওই মুখের দিকে তাকিয়ে। আমার জবাব দেওয়ার আগেই সে হেসে উঠলো। এই ভিড় ও কোলাহলের মধ্যে অপূর্ব শান্ত উদাস তার কণ্ঠস্বর। বললো, ‘কোই নহি বতা সক্তা কিধর গয়ী সড়ক, কহাঁ গয়া রাস্তা। হ্যায় না বাবুজী?’
মনে মনে ভাবলাম, তবে কি সে নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করছিল শুধু? রাস্তা তার ঠিক আছে কিনা, এ শুধু জিজ্ঞাসা নিজেকে। এত লোক চমকে ফিরে তাকে বারবার জবাব দিয়েছে, আর সে শুধু এমনি হেসেছে মনে মনে। তারপর আবার নিজেকেই বললো হিন্দিতে, ‘বাবুজী, আমি তো অন্ধ। জন্মান্ধ! মায়ের পেট থেকে পড়ে এক-ই বুলি শিখেছি আমি, রাস্তা ঠিক আছে তো? সারা সংসার যখন চেঁচিয়ে বলে, সব ঠিক হ্যায়, তখন আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। সব ঠিক হ্যায়? দুনিয়ার সব ঠিক আছে? তবে আমি কেন সব কিছুর ঠিক পাইনে? বাবুজী, ওহিসে পুছা কি, আপকা-রাস্তা ঠিক হ্যায়?’
বলে, আবার সে লাঠিটি চারপাশে একবার ঘুরিয়ে বলে উঠলো, ‘রাস্তা ঠিক হ্যায়?’
তারপর তার কম্পিত সাদা পর্দা দু’টি ঠেকে রইলো আকাশে। ওই ভাবেই সে এগিয়ে চললো আমার পাশে পাশে। আর ঘুমন্ত শিশুর দেয়ালা করার মতো তার হাঁ-করা মুখে কখনো হাসি, কখনো গাম্ভীর্য!
কে বলে উঠলো, ‘কা হো সুরদাস, গানা কাহে বন্দ কর দিয়া?’
সুরদাস বোধ হয় গানই ভাঁজছিল। আবার গান ধরল।
সামনে তাকিয়ে দেখি, পথ রোধ করেছে ঝুসির উচ্চ ভূমি। সেই উঁচু জমির উপরে, নিচে থেকে উঠে গিয়েছে সিঁড়ি, হঠাৎ বাঁক নিয়েছে বাঁদিকে। হারিয়ে গিয়েছে একটি বিশাল বটের আড়ালে। তার উপরে, মনে হলো প্রাচীরবেষ্টিত কেল্লা মাথা তুলেছে আকাশে। উত্তরাংশের কার্নিসবিহীন সরল প্রচীর নিচের দিকে নেমে এসেছে। সেই প্রাচীরের গায়ে মস্ত একটি অন্ধ গুহামুখের গহ্বর। গহ্বরমুখ থেকে আর একটি সিঁড়ি নেমে এসেছে বালুচরে। সেই গুহামুখ থেকে পিঁপড়ের মতো পিলপিল করে নেমে আসছে নরনারী। সিঁড়ির ধাপ এমন এঁকেবেকে নেমে এসেছে, চলন্ত নরনারীর বাহিনীকে দেখাচ্ছে যেন দূর-থেকে-দেখা ধীর গতি ঝরনার মতো।
শুনেছিলাম, এটি সমুদ্রগুপ্তের কূপ। কিন্তু কূপ কোথায়? এ যে দেখছি, চারিদিক থেকে একটি সুরক্ষিত সু-উচ্চ গড়ের মতো। হঠাৎ মনে হয়, যেন এক সামরিক গাম্ভীর্যে ও কৌশলে এর চারপাশে গোপন রয়েছে সমরায়োজন।
দু’দিকের দুই সিঁড়ি দেখে বুঝলাম, দক্ষিণেরটি আরোহণী। উত্তরে অবতরণিকা। আরোহণীর মধ্যপথে ঝুরি-নামা প্রাচীন বটগাছ। ছায়া ভরে রেখেছে সিঁড়িতে। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই শত শত বছরের এই অশ্বথের ঝুপসী ঝাড়। মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত, উচ্চভূমির কোলে কোলে, ফাটলে, গর্তে সর্বত্র ছাপ প্রাচীনতার। কেবল সরল ও খাড়া প্রাচীরের রোদচমকিত সাদা রঙ যেন নতুনের ছোঁয়ায় ঝকমক করছে।
আমার পেছন থেকে অন্ধ সুরদাস জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবুজী, সামনে টিলাকে সিঁড়ি হ্যায় না?’
টিলা? সমুদ্রগুপ্তের কূপ নয়? লোকের মুখে মুখেও একই কথা। সমুন্দরগুপ্তের টিলা। কিন্তু এ অন্ধ কেন জিজ্ঞেস করছে? সে কি উঠতে পারবে?
বললাম, ‘হ্যাঁ, সিঁড়ি। কিন্তু, তুমি তো উঠতে পারবে না সুরদাস।’
সে একটু হেসে বললো, ‘নহি সকেঙ্গে?’ বলে ঘাড় তুলে তাকালো উপর দিকে। মুখগহ্বর থেকে বেরিয়ে-পড়া জিভ নাড়তে লাগল। যেন সে দেখতে পাচ্ছে, দেখে নিচ্ছে, কত উঁচু। তারপর বললো, ‘বাবুজী, এ তো আমার পহলী দফা নয়। আরো তো কিনি দফা উঠেছি।’
বলে হাসলো। হেসে ঘাড় ফেরাল ডাইনে বাঁয়ে। দেখলো পেছনে। আবার বললো, ‘বাবুজী, আপ চলা গয়ে?
বললাম, ‘না।’
যেতে পারছিলাম না। সে অন্ধ। কত অন্ধ দেখি পথে পথে। পথ চলতে তাদের সঙ্গে কথা বলিনে। তাকাই নে ফিরে। জিজ্ঞেস করলে জবাব দিই। দয়া হলে অন্ধ ভিখারিকে পয়সা দিই দু’টো। ওই পর্যন্তই।
কিন্তু ফিরে তাকাতে হলো আজ। তাকাতে হলো এই কুম্ভমেলায় এসে। সুরদাস অন্ধ। কিন্তু তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি যেন চক্ষুষ্মানদের মতো। তার ওই আত্মভোলা হাসির মধ্যে কোথায় যেন আত্মগোপন করে রয়েছে এক গম্ভীর সচেতন, অভিজ্ঞ, সহৃদয় মানুষ। এক উদাস কৌতুক ও রহস্যের ছোঁয়া লেগে রয়েছে যেন তার ভাবে-ভোলা মুখে। আমি তাকে দেখছি। কথা শুনে মনে হয়, আমাকে সে তার চেয়ে বেশি দেখছে।
সে তেমনি হেসে বললো, বাবুজী, ‘বোলি হ্যায় সব-কি, চঢ়না মুশকিল, উতারনা সরল! মগর, হম্ তো অন্ধা বাবুজী। জনম সে অন্ধা। হমকো চঢ়না সরল, উতারনা মুশকিল।’
বলে, সে হাসলো আবার ঘাড় কাত করে। এমন হাঁ-করা হাসি যে, তার মুখগহ্বরের মধ্যে আলজিভটি পর্যন্ত নড়তে দেখা যায়।
কিন্তু অবাক হলাম, তার উলটো কথা শুনে। চিরকাল তো শুনে আসছি, উঠতে পারলে নামা যায়! উঠতে পারে ক’জনা! বললাম, ‘ওঠাই তো কঠিন সুরদাস। নামতে পারে সবাই।’
সে বললো, ‘হবে হয়তো। বাবুজী, আপনার আঁখ বন্ধ করে দিই। ধরিয়ে দিই রাস্তা। আপনি চড়ে যেতে পারবেন। কিন্তু নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়বেন। তাই নয়? একবার শোচিয়ে বাবু আঁখ বন্ধ করকে।’
বলে সে দু’টি ঘষা পাথরের মতো চোখ নিয়ে তাকালো আমার দিকে। হাসি চিকচিক করছে তার ওই ঘষা পাথরে।
কিন্তু চোখ বুজে তো নামিনি কখনো। ভাববো কেমন করে! আমি এক শহুরে বুদ্ধি-অভিমানী মানুষ নীরবে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। এ অন্ধ আমাকে বলছে ওঠা-নামার কথা।
সে আড়-মাতালার মতো হাসলো মাথা নেড়ে। ডাকল যেন কোন্ সুদূর থেকে, ‘বাবুজী।’
বললাম, ‘বল।’
‘ওইসা শোচ্না বঢ়ি মুশকিল, হ্যায় না?’ বলে ঘাড় নেড়ে গুনগুন করে উঠলো, আঙুল দিয়ে তাল ঠুকল নিজের লাঠিতে। কী বললো, গানের কথায় বুঝতে পারলাম না। তবে তার ঘাড় দোলানি দেখে বুঝলাম, নিজের বক্তব্যের অর্থ বোঝাচ্ছে সে কোনো এক সজনিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে। তারপর বললো, ‘বাবুজী, চঢ়কে উচা যো মিলি হাতমে, উতরানে কি বখত রাখো সামালকে। নাহি তো, ও গির যায়েগী, ঢুড়না বেকার হোগী। কেঁও কি, তুম তো অন্ধা হ্যায় না? অন্ধা, তুমকো রো’নে পঢ়েগা!
মনে করলাম, এ বুঝি শুধু অন্ধেরই বেদনা। দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ কেমন করে তা অনুভব করবে!
বললাম, ‘তাই হবে হয়তো সুরদাস।’
সে বললো, ‘সায়েদ নহে বাবুজী, সচ্চা। মহাপুরুষ লোক উজান চলে আপনা সাধনপথে। কাঁহে? পাপের দরিয়া বয়ে চলেন তিনি পুণ্যের উজানে। মগর বাবুজী, দরিয়া বয়ে কি নামে আপ্না সাধনপথে? নিচের পথকে হর্ আদমি ডরতা। পাপ ঔর মরণের মায়া তো হ্যায় ওহি রাস্তার কিনারে কিনারে। তবে? হুঁশিয়ার সে চড়ো, মগর উতারো জায়দা হুঁশিয়ারসে। সহজ ভেবে যদি সহজে নামো সজনী, তোমার পা পিছলে কোথায় চলে যাবে, হারিয়ে যাবে কোথায়! গর্দা পড়বে তোমার সারা গায়ে, আর অন্ধ সংসার তখন হাসবে, ধিক্কার দেবে তোমাকে।’
সহজ সমজকে মৎ চলিহো সজনী,
রাস্তা বহুৎ টেঢ়া হ্যায়।।
‘বাবুজী, ক্যায়া হম গলত্ বতায়া।’
অন্ধকারের ঘূর্ণি জলরাশি যেন, আচমকা আলোর মাঝে নির্মলরূপে টলমল করে উঠল। সত্যি, পদস্খলিত মানুষ যখন নামে, মৃত্যু ওত পেতে থাকে তার জন্যে। প্রাণের জিনিস মুঠোয় নিয়ে যখন শিশু নাচে, তখন-ই তো কোন ফাঁকে সব হারিয়ে তার কান্না আসে। মানুষ উঠতে গিয়ে পড়ে না। নামতে গিয়ে পড়ে। পড়বেই তো। নামবার পথে টান যে বেশি! আনন্দে অধীর পদযুগল যে তখন শিথিল ছন্দে চলে নেচে নেচে।
চোখ থাকতে বুঝলাম না। বুঝতে হলো অন্ধের কাছ থেকে। তাকিয়ে দেখি, তার সারা মুখ আলোকময়। আলো তার অন্ধ চোখে, মুখে। তার পাথরের মস্ত শক্ত চওড়া বুকটিতে উজ্জ্বল বর্মের মতো ঝলকিত রোদ! রূপ-অন্ধ চোখে আমি তাকিয়ে রইলাম অন্ধ জীবনসন্ধানীর দিকে।।
সে বললো, ‘বাবুজী, গোঁসা তো করলেন না আপনি?
গোঁসা? রাগ করবো তার উপরে? কেন? বললাম, ‘রাগের কথা তো তুমি কিছু বলোনি সুরদাস?’
সে হেসে বললো, ‘সচ্ বাবুজী? আমি মূর্খ। আমার কথায় সবাই হাসে, গোঁসা করে। বাবুজী, দুনিয়া অন্ধ, সবসে বড়া অন্ধা হাম। সেই জন্যেই তো বারবার বলি, রাস্তা তো ঠিক হ্যায়। সোচ্ বুঝকর চলো সজনী। রাস্তা তো ঠিক হ্যায়?’
বুঝলাম, অন্ধ যা-ই বলুক, যে রাস্তার জন্য, তার অত জিজ্ঞাসাবাদ, তা নিশ্চয়ই ভগবানের দোরগোরায় গিয়ে পৌঁছেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাস্তাটা কীসের সুরদাস? ভগবানের?’
সুরদাস বিনয়ে হাতজোড় করে যেন ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ালো নুয়ে। বললো, ‘বাবুজী, ভগবান কে, তা তো আমি জানি নে। দুনিয়া অন্ধকার। আমি আলো খুঁজে ফিরছি। বাবুজী, আপনি কী খুঁজছেন, সে তো আপনি জানেন। আর রাস্তা? হাজারো রাস্তা পড়ে আছে। কোন্ রাস্তা ধরবেন, সে তো জানে আপনার মন। যর্ মন ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায় রাস্তা।’
বলে হেসে উঠলো। তারপর হঠাৎ বললো, ‘বাবুজী, লকরী কা দুকান হ্যায় না এঁহা?’
দেখলাম, সত্যি, একটি জ্বালানী কাঠের স্তূপ রয়েছে অদূরে উত্তরে। স্তূপের উপর দু’টি কিশোর-কিশোরী দিব্যি গা এলিয়ে দিয়ে রয়েছে পড়ে। বোধ হয় রোদ পোহানো হচ্ছে। বললাম, ‘আছে। কী করে বুঝলে?’
‘হাওয়াসে লকরীকে বাস আতি হ্যায়। হম্কো থোড়া নিশানা দিজীয়ে বাবুজী, হম হুঁয়া হি বৈঠেঙ্গে।’
বললাম, ‘কেন? তুমি ওপরে উঠবে না?’
সে বললো, ‘নহি।’
হাত ধরে তাকে কাঠের স্তূপের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিলাম। দিয়ে বললাম, ‘তুমি কেন এসেছ সুরদাস এই ভিড়ের মেলায়? তোমার তো কষ্ট হবে?’
চলতে গিয়ে দাঁড়ালো সে। বললো, ‘বাবুজী, ঘর ভি অন্ধকার, বহার ভি, তখলিফ হর্ জায়গা পর। তব্ আনন্দ কাঁহা হ্যায়! ‘
বলে সে লাঠি ঠুকে এগিয়ে গেল। এতক্ষণ ভাবি নি। এখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ করলাম সতর্ক দৃষ্টিতে। যদি হোঁচট খায়! কিন্তু সে টুক টুক করে গিয়ে বসলো ঠিক কাঠের গাদার নিচে উয় বালুতে। বসে ফিরল আবার এদিকে। মুখে সেই হাসি। যেন আমার দিকে ফিরে তাকালো বিদায়ের হাসি নিয়ে।
ঘরে ও বাইরে যার অন্ধকার, সর্বত্র যার নিরানন্দ, তার আনন্দ কোথায়? সে কি শুধু এই পথের পরে পথে, পথচলার মধ্যে? টিলাতে ওঠবার সিঁড়িতে পা দিয়ে থামলাম। তাই তো, একটি পয়সাও দিলাম না সুরদাসকে। কিন্তু সেও তো চায়নি। ফিরে দেখি, সে ওই কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে হাসি ও গল্পে মেতে উঠেছে। আর আশ্চর্য! কিশোর-কিশোরী দু’টি দিব্যি তার পাশে এসে বসেছে। হাত তুলে দিয়েছে সুরদাসের ঘাড়ের উপর। আর সুরদাস যেন সদা হাস্যময় একটি আনন্দের প্রতিমূর্তি। শিশুদের সঙ্গে খেলায় মাতা, ওই কি তার আলো খোঁজা?
সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম উপরে। উপরে উঠে সামনে পেলাম একটি পরিষ্কার চত্বর। বাঁয়ে কয়েকটি ছোটখাটো খুপরি। মন্দিরের গম্বুজের মতো সাজানো রয়েছে সেই খুপরির মাথা। ভেতরে সিঁদুরলেপা ছোট ছোট পাথরের নুড়ি। শুধু নুড়ি নয়। ছোটখাটো পাথরের মূর্তিও আছে। কারুর হাত ভাঙা, পা ভাঙা। মুখ ভেঙে গেছে অনেকের। বুঝলাম, বছরের পর বছর এসব খুপরির পাথরের দেবতারা থাকেন নিরালায় ঘুমন্ত, উপবাসী। মরশুম এসেছে, তাই ধোয়া -পৌঁছা হয়েছে। প্রতি খুপরির পাশে বসেছে পাণ্ডারূপী শিখাধারী ব্রাহ্মণ। পরিচয় পাড়ছে দেবতার। দান-ধর্মের উপরোধ চলেছে রীতিমতো গলা ছেড়ে। আর তীর্থযাত্রীর পয়সা ঝুনঝুন বেজে উঠছে খুপরি ঘরে।
বালুচর থেকে উঠে এলাম এক ছায়াচ্ছন্ন গ্রামে। গ্রাম-ই তো। ঝুসি গ্রাম। প্রতিষ্ঠানপুর। প্রাচীন বৎস দেশ। কিন্তু এখানে কোথায় সমুদ্রগুপ্তের কূপ?
বাঁদিকে পাঁচিল ঘেরা বাড়ি। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, গৃহস্থের বাসভূমি। ডাইনে গভীর খাদ, খাদের ভিতরে ঘন জঙ্গলে বাসা বেঁধেছে অন্ধকার। নিচে থেকে সোজা উঠে এসেছে একটি নাম-না-জানা গাছের সবুজ শির। হাত দিয়ে তার পাতা ধরা যায়। এ শীত রুক্ষ ঋতুতে এত দক্ষিণ্যে কে ভরে দিল সারাটি গাছ! এই কি কূপ?
উঁকি দিলাম। খাদের মধ্যে মানুষের ছায়া। গুঞ্জন কলকাকলী। কী ব্যাপার? লক্ষ করে দেখলাম, খাদের গায়ে একটি সরু রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে পিল পিল করে চলেছে মানুষের স্রোত। স্রোত গিয়ে ঢুকছে একটি অন্ধ সুড়ঙ্গে। তাহলে ওই কি কূপ? কিন্তু যাওয়ার পথ কোথায়?
মুখ তুলে তাকালাম খাদের ওপরে, দক্ষিণ দিকে। ওপরেও একটি বাড়ি। পুরনো বাড়ি। গায়ে তার মেরামতের তালি। সেদিকেও চলেছে জনস্রোত। সামনে তাকিয়ে দেখি, উঁচু টিলার মাটি গিয়ে ঠেকেছে পুবের আকাশে। ওই দিক দিয়েই ঘুরে চলেছে সবাই দক্ষিণ দিকে। পাঁচিলের পাশ ঘেঁষে ভেসে গেলাম পথের স্রোতে। এমনি করেই পথ। একজন চলে গিয়েছে কবে। তারই পায়ের দাগে দাগে আর-একজন, তারপর শত শত লক্ষ লক্ষ। পথের পরে পথে, নতুন থেকে নতুনের সন্ধানে। জানি, যাচ্ছি নে কোনো নতুনের সন্ধানে। পথও নতুন নয়। কিন্তু পুরনো পথে আমি তো নতুন। আমার যে সবই নতুন।
পথের ধারে ধারে, দলে দলে সাধু। অপলক চক্ষু আর গম্ভীর মুখ। নজরটি তীর্থযাত্রীদের মুখের দিকে। কোথাও কাঠের আগুন আর গঞ্জিকা সেবন চলেছে। তীর্থযাত্রী ও যাত্রিণীরা কেউ কাছে বসছে আবার বসছেও না।
হঠাৎ দাঁড়াতে হলো। ভয়ংকর ভিড়। সামনে সেই পুরনো ভাঙা বাড়ি। একটা নয়। কয়েকটি ঘর। ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে ছড়িয়ে। সবই ভাঙা, পুরনো, নোনা ধরা। চোখে ভেসে উঠলো, ঘোষপাড়ার দোলমেলার ছবি। কাঁচরাপাড়ার ঘোষপাড়া। তবে তফাত আছে অনেকখানি। সেখানে চলে খোলকরতালের সঙ্গে কীর্তন ও নামগান মেয়ের দল গায়। পুরুষের দল গায়। আবার এরই মধ্যে, কোথাও ভাঙা হারমোনিয়ামের ভাঙা সুর। তার চেয়েও ভাঙা হাঁফ-ধরা রুগ্ন মেয়ের সরু গলায়, ‘পীরিতের রীতি না বুঝিলেন গো সখী’ গান। চোখের কাজলের চেয়ে কালো তার চোখের কোল। হারমোনিয়ামের সাদা রীডের চেয়েও সাদা তার শীর্ণ আঙুলের নখ। বাঙলার দূর জেলার গ্রাম্য বাবুরা দাঁড়িয়ে বাহবা দেন। পকেট থেকে গুনে গুনে পয়সা তুলে দেন তাঁরা। হাল আমলের কথাই বলছি।
সেখানেও এমনি পুরনো বাড়ি রয়েছে কয়েকটি। ভাঙা বাড়ি। কোনটিতে সতীমায়ের স্মৃতি। কোনটিতে বাবার
কিন্তু এখানে গান নেই। হারমোনিয়ামের শব্দ নেই। নেই ভাঙা বন্দরের বারবনিতার আসর। পূর্ণিমার রাত্রে ঘটা করে ফাগ মাখানো, খাওয়ানো আর ভয়াবহ উৎসবের মাতামাতি। এখানে ব্যস্ততা, ব্যগ্রতা, ব্যাকুলতা। যানে দো বাবুয়া। যেতে দাও, দর্শন করতে দাও। আর সমতল থেকে অনেক উঁচুতে, ঝরাপাতা আর পুরনো ইট ছড়ানো, ছায়া-ভরা এই তীর্থাঙ্গন বিষণ্ণ ও উদাসীন। একই সঙ্গে উদার ব্যোম ব্যোম্ শব্দ ও বহু কণ্ঠের আরাধনা, আহবান ও হাসি। এ যেন অনেক বিশাল। আলোর ছড়াছড়ি চারিদিকে। আকাশ যেন হাতের কাছাকাছি। আর বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর বেশ নরনারী, তার ভাষা, তার রূপ।
বুঝলাম, কোনো দেবতা অধিষ্ঠিত আছেন এখানে। তাই ঠেলাঠেলি ও ভিড়। ভাবছিলাম ভিড় ঠেলে ঢুকব কিনা। কে যেন জাপটে ধরল পেছন থেকে। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, শুধু একখানি বহুরঙে রঙিন ছাপা উড়নি। অবাক হয়ে মানুষকে দেখবার জন্য কষ্ট করে ফিরতে হলো। ক্লান্ত কম্পিত একজন মাড়োয়ারী বৃদ্ধা। পোশাক দেখে আমার মনে হলো তাই। বেচারির ঘাড়ের উপর মাথাটি পর্যন্ত ঠকঠক করে কাঁপছে। স্তিমিত দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। শণনুড়ি সাদা চুলে সোনার টিকুলি। গলায় ভরি দশেকের একটি সোনার হার নয়, শিকল বিশেষ। চোপসানো গাল, দাঁতহীন মাড়ির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে জিভ। সর্বাঙ্গে আবিরের মতো ধুলো ছড়ানো।
আমি যে মানুষ, সেটা বোধ হয় খেয়াল-ই নেই। যেন পাথরের মাঝে একখানি খুঁটি ধরে বুড়ি টাল সামলাচ্ছে, বিশ্রাম করছে। সরতে গেলে পড়ে যাবে। কিন্তু আর-কিছু না হোক, বৃদ্ধা যা ভারী, তাতে আমাকেই টাল সামলাতে ব্যস্ত হতে হচ্ছে। কিন্তু বলবো কাকে? যাকে বলব, সে তো ফিরেও দেখছে না। দু-হাতে জাপটে রয়েছে ধরে। আর আশ্চর্য! এমন একটা ব্যাপারের প্রতি এ ভিড়ের ভ্রূক্ষেপও নেই।
কয়েক মিনিট পর বৃদ্ধা হঠাৎ মুখ তুলল। তার মাথাটি দ্বিগুণ জোরে নড়ল ঠকঠক করে। চোখ দু’টি গেল বুজে, মুখটি হাঁ হয়ে বেরিয়ে পড়লো দাঁতহীন মাড়ি। এর নাম হাসি। সত্যি, যেন এক অনির্বচনীয় সুধা ঝরে পড়লো সারাটি মুখে। তারপর দু’হাত দিয়ে আমার মুখে মাথায় বুলিয়ে দিল হাত। দিয়ে আবার হাঁপাতে হাঁপাতে হারিয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে।
বুঝলাম আমার কাজ ফুরিয়েছে। ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে, পুবদিকে এগিয়ে গেলাম। দক্ষিণদিকে ভাঙা পাঁচিলের বেষ্টনী, পুব ও উত্তরে পাতাঝরা গাছের ফাঁকে ফাঁকে আকাশ দিচ্ছে উঁকি। কিন্তু ওসব দিকে মানুষের বড় আনাগোনা দেখছিনে। সকলের ঠেলাঠেলি, মাথা কোটাকুটি মন্দিরের দরজায়।
দক্ষিণের ভাঙা পাঁচিলের উপরে উঁকি মেরে নিচে দেখলাম মানুষের স্রোত। কিন্তু এমনভাবে নেমে গিয়েছে টিলার ঢালু জমি, তার চার পাশে এত ছোটখাটো সুড়ঙ্গ, যেন ভেরী বেজে উঠলে এখুনি তীরধনুক হাতে বেরিয়ে পড়বে শত শত সৈনিক। পুবদিকে গেলাম। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দূর সমতলে অড়হরের ক্ষেত দেখা যাচ্ছে। উত্তর দিকে সমতলে এদেশীয় গ্রাম। আমাদের বাঙলা চোখে কেমন যেন শ্রীহীন ঠেকে এই গ্রামগুলি। গ্রাম নয়, যেন বস্তি। খোলা-ছাওয়া চালাঘর। কোথাও বেড়া ও পাতার ছাউনি নেই। একটি হিন্দি প্রবাদ আছে-
ছাজা বাজা কেশ।
তিনো মিলকে বাঙলা দেশ।।
চিনি…দহি।
বাঙলামে নহি।।
কতখানি সত্য জানি নে। তবে, ঘরছাওয়া ও বাঙলাদেশের ঢাকের বাজনা, এর সঙ্গে পাল্লা চলে না। আর এদেশের তুলনায় বাঙালিনীর কেশ রচনা, সে-কথা বলতে হয় না রূপদর্শীকে। সেই কবরী-বন্ধনে-বাঁধা বাঙালির মন ও হৃদয়-গাছের ফাঁকে ফাঁকে, ওই সমতলের গ্রামেও দেখছি ভিড়।
গ্রাম দেখতে দেখতে চমকে উঠলাম। সামনেই একটি থোকা থোকা ফুলে-ভরা সজনে গাছ। নিজের দেশের গাঁয়ের পথে এর ছড়াছড়ি। কিন্তু এখানে সজনে-সুন্দরীর এ বিচিত্র অঙ্গসজ্জা দেখে ভরে উঠলো চোখ। ভেতরে আমার খুশি-বিষাদের ছায়া। মনে হলো, কত যুগযুগান্ত না জানি আছি দেশ ছেড়ে। সেই বিরহ আমার ঘোচাল এবং বাড়াল এই ফুল সজনে।
সাদা সাদা ফুল। বোঁটায় তার কাঞ্জনবর্ণের ছোঁয়া। সোনা রুপোর অজস্র ঐশ্বর্যে যুবতী সজনে হাসিতে খুশিতে তুলেছে মাথা। তারই মধ্যে নবীনার লাজে ভয়ে সর্বাঙ্গ তার কিছুটা বা নম্র। হাল্কা গন্ধে ভরে উঠেছে তার চারপাশ।
চমক ছিল আরও। সজনের নরম ডাল কেঁপে উঠেছে থরো থরো করে। ফুল পড়ছে তলায়। উপুড় হয়ে ফুল কুড়োচ্ছে এক রক্তাম্বরী। কুড়োচ্ছে আর ভরছে কোঁচড়ে। ব্যাকুল হাতে কুড়োচ্ছে যেন পড়ে পাওয়া অমূল্য ধন।
দেখতে দেখতে দেখলাম। চোখ ফেরাই-ফেরাই করেও দেখতে হলো। রক্তাম্বরীর যে বাঁয়ে আঁচল। আঁচল বেঁধেছে কোমরে। যাকে বলে গাছ-কোমর। বাঙালিনী? এ যে বাঙলা-গাঁয়ের পাড়ায় এসে পড়েছি!
মুখ তুলল রক্তাম্বরী। সর্বনাশ! এ যে সত্যি করালরূপিণী রক্তাম্বরী! কালো মেয়ে। মেয়ে নয়, কালো বউ। না বউ নয়, আর-কিছু। মাথায় তার ঘোমটা নেই। এলানো রুক্ষ চুলের রাশি ছড়িয়ে পড়েছে কোমরের নিচে। কাঁধ-হাতা দৃষ্টিকটু লাল জামা। নিরলঙ্কার দেহ। গলায় মালা রুদ্রাক্ষের। অস্পষ্ট সিঁথি লেপা সিঁদুরে। বাঙলা সিঁদুরে। খাটো আঁটো শক্ত দেহ। বয়স অনুমান করা কঠিন। কিন্তু চোখ দু’টি প্রকৃত রক্তাম্বরীই বটে। জন্মের সময় কেউ বুঝি ফালা ফালা করে কেটে দিয়েছিল ওই চোখের ফাঁদ। নইলে অত বড় চোখ হয় কখনো? এ যে পটে আঁকা কালীর আকর্ণবিস্তৃত চোখ।
ঘাড় ফিরিয়ে ওই বিশাল নিষ্পলক চোখে তাকালে সে আমার দিকে। অসঙ্কোচ দৃষ্টিতে তার কৌতূহল ও বিস্ময়। নাকি ক্রোধ ও সন্দেহ, বুঝতে পারলাম না।
ওদিকে কোলাহলের গুঞ্জন। আর এখানে, এই ঝরাপাতা-ছাওয়া, টিলার বনভূমি হঠাৎ যেন আড়ষ্ট স্তম্ভিত হয়ে রইলো চোখের চাউনিতে! চকিত মুহূর্তে চারদিকে নিঃশব্দ, স্তব্ধ হয়ে গেল।
এ কোন্ বনবিহারিণী কপালকুণ্ডলা পড়লো আমার চোখের সামনে! ঠোঁটে নেই তার বিচিত্র হাসি, ভূ-লতায় নেই এস্ত আহ্বান। কিন্তু এখুনি কি টিলাভূমির এ নিঃশব্দ বনাঞ্চলটুকু আচমকা বিস্ময়ে শিউরে উঠবে এ যুগের কপালকুণ্ডলার কথায়, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’
কিন্তু ঘুমন্ত বনানীর স্বপ্নভঙ্গের মতো শোনা গেল না সেই বিচিত্র কণ্ঠস্বর। উত্তর প্রদেশের টিলাভূমি উঠলো না শিউরে কুম্ভমেলার এই কপালকুণ্ডলার নতুন উপাখ্যানে, তার আগেই কাপালিকের প্রবেশ।
‘নমস্তে বাবুজী, নমকস্ত হই। কাঁহাসে আসতা হ্যায়?’
আসতা হ্যায়? ঘোর বাঙালি। পেছন ফিরে দেখি, রক্তাম্বরী। কালো মুখে আপ্যায়নের বিকট হাসি! লাল ধুতি, লাল চাদর। খোঁচা খোঁচা গোঁফ-দাড়ি ও লাল চক্ষু। তাও আধবোজা কিন্তু উজ্জ্বল। মাথায় পাগলের মতো জট-পাকানো চুল। ওজন বোধ হয় মণখানেক। গলায় রুদ্রাক্ষের বোঝা।
বলতে গেলাম, ‘তুমি’? মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো, ‘আপনি’?
আধবোজা লাল চোখ বিস্ফারিত করে বললো সে, ‘আজ্ঞে আপনি বাঙালি? মানে, দেশের মানুষ?’
তা বটে। আমি যে এ যুগের প্যান্ট-অলেস্টার-শোভিত আধুনিক নবকুমার! কাপালিকদের নিশ্চয়ই এতে বিলক্ষণ ভয় আছে। আমার জবাব শোনবার আগেই সে জবাব দিল। জোড় হাতে, নত হয়ে বিনয়ে গলে পড়লো, ‘আজ্ঞে আমার নাম অদ্ভুতানন্দ ভৈরব। লোকে বলে ভূতানন্দ, নয়তো আজ্ঞে, ভূত-বাবা। আমি কালীসাধক ভৈরব। নিবাস ছিল যশোরে। পাকিস্তান হয়ে গেল, ধর্ম রক্ষে হয় কিনা হয়, সেই ভয়ে আজ্ঞে এখন চব্বিশ পরগনায় বারাসতে আশ্রম করেছি। উনি, আজ্ঞে ওই মেয়েমানুষটি আমার ভৈরবী। বড় আশা ছিল মনে প্রয়াগে তীর্থদর্শন সাধন-ভজন করব। দিলাম আজ্ঞে পাড়ি জয় মা কালী বলে। সে যাক! আজ্ঞে আপনের নিবাস?’
যাক, কথা তাহলে থামল ভূতানন্দ ভৈরবের। কথা তো নয়, যেন ‘আজ্ঞে’ সম্বোধনের মালা গাঁথা। কালীসাধক, কিন্তু কথায় দেখছি হার মানে বৈষ্ণব। বোধ হয় যশোহরের হরিবংশের রক্ত আছে দেহে।
ওদিকে ভৈরবী নির্বিকার। সে ব্যস্ত ফুল কুড়োতে। বোধ হয় নবকুমার থেকে আশ্বস্ত হয়েছে ভৈরবের দর্শনে! জবাব দিতে গেলাম। তার আগেই ভূতানন্দ বলে উঠলো ‘নিশ্চয়ই, আজ্ঞে, কলকাতায় আপনার বাড়ি?’
বললাম, ‘কাছাকাছি।’
হাত জোড় করেই বললো, ‘তবে আসেন আজ্ঞে, আমার আশ্রমে একটু ধূলা দে যান।
তবে মানে কলকাতার কাছাকাছি বলে? তাছাড়া এখানে আবার আশ্রম কোথায়? তার উপরে ভূতানন্দর আশ্রম! ভয় অবশ্য নেই। শত হলেও আধুনিক কাপালিক তো বটে বলি দিতে পারবে না।
গেলাম তাদের সঙ্গে। অদূরে গাছের মাঝখানে হোগলা দিয়ে ঘেরা ঘর। সামনেটি ঝাঁটপাট দেওয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চারপাশে শুকনো পাতার ডাঁই। ভূতানন্দ ভৈরবের আশ্রম। হোগলার মাথায় আবার একটি লাল কাপড়ের ফালি নিশান। চালার ভিতরে একটি টিনের রঙ ওঠা সুটকেশ। অ্যালুমিনিয়ামের থালা দু-একটি। কম্বল-বিছানো বিচালী শয্যা।
ভূতানন্দ তাড়াতাড়ি কম্বলের ছেঁড়া টুকরো দিল পেতে। বললো, ‘বসেন আজ্ঞে, মন খুলে একটু ধর্মের কথা কই। রাতে আজ্ঞে ভল্লুকের ভয় করে, দিনের বেলা কেউ মাড়ায় না এদিকে। আর বাঙালি আসে কিনা তাও জানি নে। যত পাঞ্জাবী, আর মাড়োয়ারী, বলবো আজ্ঞে আপনাকে, যথার্থ জোয়ান জোয়ান মেয়েমানুষ মহা মহা সব সুন্দরীও বটে, আমার আশ্রমের চারপাশে সব, কী বলব, একেবারে দিনমানে, কী বলে, একেবারে ইয়ে করতে বসে। আমি সেরকম মানুষ নই আজ্ঞে, তাই। নইলে পরে আজ্ঞে, খ্যাঁকাড়ি দিলেও শোনে না। অথচ, আমার এখানে না হলে সাধনা চলে না। যাক, আপনি যখন এসেছেন
কথা তার থামল। বুঝলাম, তখন আজ্ঞে, আসুন একটু ধর্মালোচনা করা যাক। কিন্তু আমার মুখে যে ধর্মের বুলি ফুটবে না।
এদিকে ভৈরবী একটি অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিয়ে পা ছড়িয়ে বসলো অদূরে। কোঁচড় থেকে ঢালল সজনে ফুলের গোছা। তারপর বিশাল চোখ দিয়ে আগে দেখলো আমাকে তারপর তার ভৈরবকে। মনে হলো, একটু যেন ফুলে উঠলো নাকের পাটা, ওই চোখেও বা একটু অগ্নিঝলক।
ভেরবীর চোখে-মুখে, গায়ে পায়ে, বসায় নড়ায় একটা আসন্ন দুর্যোগের ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে যেন। ভৈরবী যখন, তখন চোখে কিঞ্চিৎ অগ্নিঝলক থাকাই হয়তো স্বাভাবিক। পাকানো পাকানো ভাবটিও অস্বাভাবিক নয় হয়তো। কিন্ত ভাব-ভঙ্গিটা মোটেই সুবিধের মনে হচ্ছে না।
কিন্তু ভূতানন্দের সেদিকে খেয়াল নেই। সে দিব্যি জমিয়ে বসে বললো, ‘আচ্ছা, দাদাবাবু—’
দাদাবাবু? ভূতবাবা দেখছি আত্মীয়তাতেও দুরন্ত। বুঝলাম, ধর্মালোচনার ভূমিকা বিস্তার করা হচ্ছে। কিন্তু ভূতানন্দর গোল রক্ত চোখের ভাবটি যেন, আটঘাট বেঁধে পাতা হচ্ছে কোনো বিশেষ ফাঁদ। একবার ধরতে পারলে আর রেহাই নেই। হঠাৎ চোখ বুজে ভূ-দু’টি কপালে তুলে বললো, ‘বলেন তো, জগৎটি কার?’
সর্বনাশ! এমন বিরাট প্রশ্ন! ঝুসি-টিলার এ নির্জন স্থানে এত বড় দার্শনিক প্রশ্নও অপেক্ষা করেছিল আমার জন্য, তা জানতাম না। আর প্রশ্নের পরেই ভূতানন্দর চাপা চাপা হাসি, মৃদু মৃদু ঘাড় দোলানি। অর্থাৎ, সহজ কথা নয়। জবাব দিয়ে তবে উঠুন।
জবাব শুনে ভূতবাবা খুশি হবে কিনা জানি নে। তবু বললাম, ‘দেখে-শুনে তো মনে হয়, জগৎটা মানুষেরই। ‘
ভূতানন্দ খুশি হয়েছে বোঝা গেল। চকিতের জন্য চোখ দু’টি খুলে, আবার বুজিয়ে বললো, ‘বেশ বেশ, অর্ধেকখানি বলেছেন। কিন্তু কোন্ মানুষের?’
কোন্ মানুষের? কোন্ মানুষের আবার! আমাদের মতো মানুষেরই। বললাম, ‘বুঝলাম না তো!’
সে চোখ বুজেই বললো, ‘বুঝলেন না?’ চোখ খুলে বললো, ‘পুরুষ মানুষের না মেয়ে মানুষের আজ্ঞে?’
মানুষের এ ভাগাভাগি রীতিতে তো কখনো বিচার করে দিখি নি। কিন্তু ভূতানন্দ যে রকম চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে, বোঝা গেল ওইটাই তার আসল প্রশ্ন। যদি বলি, উভয়েরই, তা হলে সঠিক জবাব হয়। কিন্তু তার মনঃপূত হবে কি? তার চেয়ে ভূতানন্দর জবাবটাই শোনা যাক। বললাম, ‘তা তো ঠিক জানিনে।’
ভূতানন্দর হাসি ও দ্রুত ঘাড় দোলানিতে বোঝা গেল, আমার এ অজ্ঞতাই সে আশা করেছিল। তারপর এক খাবলা মাটি তুলে বললো, ‘এর নাম কী আজ্ঞে?’
শঙ্কিত হলাম। ভূতানন্দ কোনো ভৌতিক ভেলকি দেখাবে না তো? বললাম, ‘মাটি।’
‘আজ্ঞে ঠিক। মা-টি। অর্থাৎ?’
বলেই চকিতে ভৈরবীর দিকে ফিরে বললো, ‘কানটা এদিকে খাড়া রাখিস গো চণ্ডিকে।
চণ্ডিকে অর্থাৎ ভৈরবী, বোঝা গেল। কান খাড়া করতে হবে কেন, বুঝলাম না। কিন্তু ফিরে দেখি, অন্য রকম। ভৈরবীর বিশাল চোখজোড়া দপদপিয়ে উঠলো বারকয়েক। ঠোঁটের কোণে বাঁকা ঝিলিকে তার কপট হাসি না দুরন্ত রাগ, বোঝা মুশকিল। তারপর কান খাড়া করলো কিনা বুঝলাম না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত, সারা দেহে তার একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। দেখা গেল, সেই তরঙ্গের ধাক্কায় সে অন্য দিকে ফিরে বসেছে। কে জানে, ওইটিই কান খাড়া করার ভঙ্গি হয়তো!
ভূতানন্দ ফিরে দেখলো না সেদিকে। সে ভূ নাচিয়ে বলে চললো, ‘এই মাটি আজ্ঞে, আমার মা তা হইলে? আমার মা-টি! অর্থাৎ কিনা, মা ধরিত্রী। তা হইলে, জগত্মনি হইলেই মেয়ামানুষ। কেমন কিনা দাদাবাবু?’
ধরিত্রীকে যখন মা বলেছি, তখন ভূতানন্দর ভাষায় মেয়েমানুষ বলতে আপত্তি কম বললাম, ‘তাই হবে।’
একমণি মাথাটিকে বোঁ করে আর-এক পাক ঘুরিয়ে একেবারে নিশ্চল হলো ভূতানন্দ। বললো, ‘তা হইলে মায়েরও মা আছেন, কেমন কিনা আজ্ঞে?’
ঘাড় নেড়ে সায় দিতে হলো। মা থাকলে, তাঁর মা থাকবেন, এতে আর সন্দেহ কী।
ভূতানন্দ বিস্ফারিত চোখে, ভয়ংকর হেসে বললো, ‘তবে সেই মা কে?’
তা তো জানি নে। আমার এ অজ্ঞতা দেখে ভূতানন্দ খুশি বৈ দুঃখিত নয়! গলা নামিয়ে গভীর স্বরে বললো সে, ‘হুঁ, হুঁ, তোমার নাম জগৎমাতা জগত্তারিণী, শক্তিরূপিণী মা কালী। উনিই আজ্ঞে জম্মো দিলেন, দিয়ে আবার খেলতে লাগলেন। এর নাম মায়ের লীলে।’
বলতে বলতে আরও খানিকটা অগ্রসর হয়ে, গলা আরও নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘কিন্তুন্ একটা কথা হলপ করে কইতে পারি, প্রোয়াগে আজ্ঞে মা কালী নাই।’
চমৎকৃত হলাম। এত বড় গুহ্য সংবাদ তো আমার জানা ছিল না। বললাম, ‘তাই নাকি?’
‘তবে আর আপনারে কী বলতেছি আজ্ঞে? সারা মেলাটা টহল দিয়া আসেন, একটা মুখে যদি, হুস্ হুস্..’
কথার মাঝেই ভূতানন্দ হাততালি দিয়ে উঠলো। দেখলাম, সামনের গাছটিতে দু’টি কাক এসে ডাকছে কা কা করে। তাড়া খেয়ে কাক দুটো পালাল। ভূতানন্দ বিরক্ত হয়ে বললো, ‘মা নাই, মায়ের চ্যালারা সব ঠিক আছে। ওই যে দেখলেন, গায়ের রঙ কালো। ওই কালো কাউয়া আর কুকিল, সব মায়ের চ্যালা। কিন্তু ডাকের ভেদ দেখলেন তো? আচ্ছা, এট্টু বয়েন, চ্যালা যখন আসছে, শান্তিতে বসতে দিবে না। এট্টু জমিয়ে বসা যাক।’
বলে, সে তড়াক করে উঠে, দিব্যি তরতর করে সামনের গাছটায় উঠতে লাগল! অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, গাছটি প্রাচীন ও মস্ত বড় নিমগাছ। আশ্চর্য! কাক তাড়াতে ভূতানন্দ একেবারে গাছে উঠে বসলো! এ যে পাঁচুগোপাল থেকে আর-এক কাঠি উপরে!
ভৈরবীও দেখলাম, ওইদিকেই তাকিয়ে আছে। থাকতে থাকতেই তার সরু ও তীব্র চাপা গলায় ঝঙ্কার শোনা গেল, ‘মরণ! মুখে আগুন!’
এই তার প্রথম কথা। জানি নে, উত্তর প্রদেশের এ টিলাভূমি তার হাজার হাজার বছরের জীবনে এমন কড়া পাকের বিচিত্র বাঙলা কথাকটি আর কোনোদিন শুনেছে কিনা। কিন্তু ওই শব্দেই যেন চমকে উঠলো নির্জন টিলাভূমি। মড়মড়িয়ে উঠলো শুকনো পাতা। আর আমার কানের মধ্যে দিয়ে এক নতুন সুর গিয়ে পশল মরমে। এ কথার স্বাদ মিষ্টি নয়, ঝাল। কিন্তু বড় মিষ্টি ঝাল।
একটু ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’
প্রশ্ন শুনে ভৈরবীর রাগান্বিত কালো মুখে যেন হাসির ঝিকিমিকি দেখা দিল। যাকে বলে রাগের হাসি। বললো, ‘বিষ!’
বিষ? আমার অবাক মুখ দেখে ভৈরবীর হাসি একটু দুর্জয় হলো। বললো, ‘আপনেগো ভৈরব কয় মা কালীর চন্নামিরতো। মুণ্ডু! ওইতে ওনার নিশার মরণ হয়
নিশা অর্থ নেশা। কিন্তু নিমগাছের রসে! জানা ছিল না। আর জানতামও না, সেজন্য কেউ আবার এমন আয়োজনও করতে পারে। ফিরে দেখি, এক হাতে ডাল ধরে, আর-এক হাতে একটি সের-পরিমাণ টিনের কৌটো নামিয়ে আনছে ভূতানন্দ। যেখান থেকে টিনটি খুলেছে, সেখানে তেলের গাদের মতো রসের ধারা নেমে এসেছে কালো নিমডালের গা বেয়ে।
ভৈরবী আবার আমার দিকে ফিরে বললো, ‘বোঝলেন গো দাদাবাবু? ওই যে কইল না, এখানে ছাড়া ওনার সাধনা হয় না, তা এই মরণ-রসের জন্যে। এ ছেড়ে যাবে কমনে?’ কথা কটি নিচু গলায় বললো ভৈরবী। বলে, হাসতে গিয়ে একটা বিষাদের ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে পড়লো তার সারা মুখে। হাসলো। কিন্তু হাসিটি করুণ হয়ে উঠলো হঠাৎ।
ভূতানন্দ খুশি মোরগের মতো তড়িঘড়ি এসে বসলো টিন নিয়ে। বললো, ‘কই গো চণ্ডিকে এট্টু ন্যাকড়াকানি দেও। ছেঁকে নিই।’
আমার দিকে ফিরে বললো, ‘সবই আমার মায়ের লীলে আজ্ঞে। মা নেই কিন্তু মায়ের প্রেত্যক্ষ কিরপা আছেন সবখানে। নইলে বলেন আঁজ্ঞে দাদাবাবু, মায়ের এমন পাদোদকের ভাণ্ডটি কে আমার জন্যে এখানে রেখে দিল! কী বলবো আজ্ঞে, যথার্থ ভালো বস্তু অমর্ততুল্য। আপনারা আঁজে লেখাপড়া জানা ভদ্দরলোকের ছেলে, নইলে, ঘাঁটাঘাঁটি ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে এমন পবিত্তর বস্তু, কী বলবো!
তার ‘কী’ বলবার মানে বোধ হয়, আজ্ঞে দাদাবাবু, আপনিও একবার চেখে দেখতে পারেন। বুঝলাম, কিন্তু নিমের রস নিশ্চয়ই ভয়ংকর কটু স্বাদ হবে। খাবে কী করে? জিজ্ঞেস করলাম, ‘খাবেন কী করে? তেতো হবে না?’
ভূতানন্দর মুখে বোধ হয় রসের ধারা বইতে আরম্ভ করেছে। তাড়াতাড়ি ঝোল টেনে বললো, ‘তিতা? আজ্ঞে, কথাই তো আছে, আগে তিতা পাছে মিঠা। ভোজনে বসে আগে নিমপাতা ভাজা খান না? আগে তো তিতাই লাগবে। সুখের আগে আজ্ঞে দুঃখু! নইলে সুখ হজম হইবে না। বসেন, আজকে সাক্ষাৎ কথা বলব আপনাকে।’
বলে আবার তাড়া দিল, ‘কই লো চণ্ডিকে, ন্যাকড়াখানি দিবি না এমনি ঢেলে দেব?’
কিন্তু চণ্ডিকের গরজ বড় বালাই। হঠাৎ সজনে ফুল মাটিতে রেখে, এলো চুলে ঝাঁকানি দিয়ে রক্তাম্বরী ফণা তুলল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলো, ‘বড় যে কালী কালী হচ্ছে, বলি নজ্জা করে না?’
দুর্বিপাক। বুঝলাম, আমার ওঠার সময় হয়েছে। ভূতানন্দ নিতান্ত বিস্মিত হতভম্ব হয়ে বললো, ‘এই দ্যাখো, কী হইল তোর?’
চণ্ডিকে উত্তেজনাবশত দু’-হাত তুলে আঁট করে বাঁধল চুল। ঠোঁট বেঁকিয়ে তেমনি তীব্র গলায় বললো, ‘কী হইল, তার মরণ-ই তো দেখছি। ভদ্দরনোকের সামনে কইব সে-কথা, অ্যাঁ? বড় যে কালী কালী হচ্ছে, বলি নজ্জা করে না?’
কে বলবে, এটা এলাহাবাদ! কে বলবে, প্রয়াগের কুম্ভমেলা! কে বলবে, এ সেই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানপুর! এখানে বসে যে বাঙলাদেশের গেঁয়ো কোঁদল শুনছি। কোথা থেকে কোথায় এলাম, অমৃতের সন্ধানে! এ যে চিরকালের অমৃত বর্ষণ আরম্ভ করলো চণ্ডিকে আর ভৈরব! ফেলে পালানো ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু ততক্ষণে ভৈরব ভৈরবমূর্তিতে উঠেছে দাঁড়িয়ে। গায়ের রক্তবর্ণ উত্তরীয় টান মেরে কোমরে বেঁধে চিৎকার করে উঠলো, ‘কী! কালীনামের নিন্দে করছিস তুই? এত বড় সাহস?’
ভৈরবী চিৎকার করে না। চিবিয়ে চিবিয়ে বিধিয়ে বলে, ‘কালী নিন্দে করবো ক্যান? তোমার গুণ গাইছি যে গো! বলি, আর কতদিন চালাইবে এমনি করে? এত যে হাঁকাহাঁকি? ও চণ্ডিকে, সজনে ফুল তুলে নিয়ে আয়, চচ্চড়ি হইবে। তা কোন কালী দিয়ে চচ্চড়ি হইবে।’
ভূতানন্দ আমাকে সাক্ষী মেনে বললো, ‘দেখেন, দেখেন আঁজ্ঞে দাদাবাবু, সাবধান করে দেন, নইলে বলি হয়ে যাবে, এই বলে দিলাম।’
কী বিপদ! নিজের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। তার উপর আবার ভৈরবীকে! সে ক্ষমতা আমার নেই।
ভূতানন্দই আবার বলে উঠলো, ‘খুন হইবি চণ্ডিকে। আজ তোর বাপের কেষ্টোরই একদিন কি, আমারই একদিন। খবোরদার।’
বুঝলাম না, কে বাপের কেষ্ট। ভৈরবের মূর্তি দেখলে আতঙ্ক হয়। কিন্তু চণ্ডিকে অবলীলাক্রমে এই মূর্তির আরও সামনে গিয়ে বললো, ‘আমার বাপের কেষ্টোর গুণ আছে। তোমারই কালীনামের মুরোদ নাই। ওই যে বলে না, মুরোদ বড় মান, তানার ছেঁড়া দুইখান কান! জানলেন গো দাদাবাবু…’
কী জানবো, জানি নে। কিন্তু প্রমাদ বড় ভারী। তবু ফিরে তাকাতে হলো ভৈরবীর দিকে। সে তার লাল আঁচলখানি আরও কষে বেঁধে বললো, ‘তখন বোলে কত কথা। রেলের টিকিট ফাঁকি দিয়া আসলো, কইলাম, ওইখানে গিয়া গিলবো কী? বললে, চল না, নাখ নাখ নোক আসবে, আর দেদার চাল ডাল পয়সা দিবে। খাওয়ার আবার ভাবনা? নোকে যেচে দিবে। তা নোক এইখানে কী করতে আসে, সেতো শুনলেন ওনার নিজের মুখে। দিনরাত ওই মরণ-রস পাড়তিছে আর গিলতিছে। দু দিন ধইরা দাঁতে কুটা কাটি নাই গো দাদাবাবু, কুটা কাটি নাই। শীতে মইলাম, এক কণা আগুন নাই। এত এত সাধু হাত পেইতে বেড়াইতেছে, উনি নিচে লামতে পারেন না। অমন গোটা গোটা ফুলগুলান কি কাঁচা চিবুবো?’ বলতে বলতে গলাটা ধরে এলো যেন ভৈরবীর।
কিন্তু ভূতানন্দ এতবড় অপমান আর সইতে পারল না কিছুতেই। বিশেষ আমার মতো একজন অপর ভদ্রলোকের সামনে। কোথায় মৌজ করে একটু ধর্মালোচনা চলবে, তা নয়, শেষে মুরোদ নিয়ে টানাটানি। বড় দুর্বল স্থানে ঘা দিয়েছে ভৈরবী। তাই আমার দিকে আর ফিরে তাকাতে পারছে না ভূতানন্দ। মানুষের সম্মানে আঘাত লাগলে সে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সে সম্মান যদি মিথ্যে হয়, তবে তা সহ্য করা আরও মুশকিল। তখন সে আত্মরক্ষার জন্য শেষ উপায় অবলম্বন করে। ভূতানন্দর অবস্থা যেন খানিকটা তাই। সে রক্তচক্ষু বিস্ফারিত করে বললো, ‘তোর মতো মেয়েমানুষের মুখে এতবড় কথা! বজ্জাত, নষ্ট মেয়েমানুষ কমনেকার! তুই কি আমার ঘরের মাগ যে, তোরে দুবেলা খাওয়াবো বলে কিরা কাটছি মা কালীর দোরে—অ্যাঁ?’
চণ্ডিকা মুহূর্তে মাথা তুলে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়াল। কী চোখ! বিশাল চোখ দু’টিতে তার সত্যি আগুন ঠিকরে পড়ছে। লাল কাপড়ে ঢাকা তার বলিষ্ঠ দেহে কী অপূৰ্ব তেজ! দু’দিনের উপোসী কালো মুখে তার কেউটের ফণার মতো চমকানি। ভৈরবীর রূপ আছে কিনা, সন্ধান করে দেখিনি। কিন্তু কালো মেয়ের এমন বিচিত্র, ভয়ংকর সুন্দর রূপ আর কখনো দেখিনি। জানি নে, এমন রূপের সামনে কোনো পুরুষ কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে কিনা। কিন্তু ভূতানন্দ পারল না।
বোঝা গেল, ভূতানন্দ দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাই সম্মুখ সমর ছেড়ে সে আচমকা পেছন থেকে অক্রমণ করেছে চণ্ডিকাকে। কিন্তু, মানুষ একবার যখন দুর্বলতাবশত পেছনে আশ্রয় নেয়, তখন তার পরাজয় অনিবার্য। সেই পরাজয়েরই শেষধাপে নামল ভূতানন্দ। লাথি মেরে ফেলে দিল সে তার অতি সাধের মাতৃ-পাদোদক। তারপর চেঁচিয়ে বললো, ‘রইলো তোর লজ্জা আর মুরোদ! চললাম আমি। মর তুই এখানে। আর খোল-করতাল এনে তোর বাপের কেষ্টোর ভজনা কর, লোক জুটবে খনি।’
বলে, দুপদাপ করে সোজা উত্তর দিকে গাছের আড়ালে আড়ালে আদৃশ্য হয়ে গেল।
হাসতে হাসতে মাথা ব্যথা! কোথা থেকে কী হয়ে গেল! মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম যেন আপদবিশেষ! কোন্ এক অদৃশ্য অপরাধের খোঁচা এসে যেন লাগলো আমার মনে। মনে হলো, অপরাধের মূল আমি। আমি না থাকলে, এমনি করে হয়তো বলত না ভৈরবী। সম্মানহানিতে অতখানি ক্ষিপ্ত হত না ভূতানন্দ।
কোথায় সমুদ্রগুপ্তের কূপ। আর কোথায় কী!
ফিরে যেতে উদ্যত হলাম। তবু যাওয়ার আগে ভৈরবীর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। কিন্তু তাকিয়ে আর পা উঠলো না। থমকে দাঁড়ালাম।
ভৈরবীর গাল বেয়ে নেমেছে জলের ধারা। কী সান্ত্বনা দেব! যাদের কোনোদিন দেখি নি, জানি নে পরিচয়, তাদের হঠাৎ কলহের মাঝে কী কথা বলবো! যেটুকু জানি, সেটুকু তাদের উপোসের বেদনার কথা। আর যেটুকু ইঙ্গিত দিয়ে গেছে ভূতবাবা, তাকে ভিত্তি করে সান্তনা দেওয়া আমার সাজে না।
তবু এই টিলাভূমির নিরালা গাছের ছায়ায় ওই চোখের জল দেখে বিদায় নিতে বাধল। নিতে হবে জানি। তবু এই মুহূর্তে পারলাম না।
হঠাৎ ভৈরবী আদুরে বউটির মতো বলে উঠলো, ‘দেখলেন তো দাদাবাবু, কেমন করে কইয়া গেল। আজ দশ বছর তোমার সঙ্গে রইছি, আমি কি তোমার কেউ নয়? ওই কথা কইয়া আমারে অষ্টপোহর যাতনা দেয়। তোমার বউ না হইতে পারি, বউ-এর চাইতে বড়, আমি তোমার ভৈরবী। তোমার ধর্মে আমি, কম্মে আমি। তোমার সুখে আমি, দুঃখে আমি। কী বলেন গো দাদাবাবু, অ্যাঁ? কী আর কইছি! দুইদিন খাই নাই, শরীলে তো এট্টু কষ্টও হয়। কিন্তুন, দেখলেন তো’–বলতে বলতে তার ঠোঁট দু’টি কেঁপে উঠে, বিশাল চোখে অশ্রুর বান ডাকল। আর দূরদেশের এ টিলাতে দাঁড়িয়ে আমার বুকের মধ্যে ভরে উঠলো চাপা বেদনা। ভৈরবীর ক্ষুধাও যেমন আত্মপ্রকাশ করেছিল, তেমনি এবার আত্মপ্রকাশ করলো এক প্রেমবতী নারী।
চোখের জল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভৈরবী আবার বললো, ‘বলো, আমি কি তোমার কেউ নয়? সাত পাক ঘুরি নাই ঠিক। ষোল বছরের মেয়া আইজ তিরিশ হইল। দাদাবাবু, এই চইদ্দ বছরে কত লক্ষ পাক দিছি তা জানেন ভগবান। উনি তো সাক্ষী আছেন! তবে? তবে ক্যান দেও ওই খোঁটা? আমি দুঃখু পাইলে তোমার পাপ হইবে না? আমার পুণ্যিও তোমার লাগবে না? মা কালীর নামে ইস্তিরি হইছি, ছান্নাতলায় বিয়ার চাইতে কি তা কম? ক্ষুদায়ও তুমি, ভরা পেটেও তুমি। আর কারে কইব গো, অ্যাঁ? আর কারে কইব?’
জলভরা মুখখানি কাছে এনে সে আমাকেই বললো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো। বলে সে নতমুখে, এলোচুলে দাঁড়িয়ে রইলো আমার সামনে। কোথায় রোষবহ্নি, কোথায় বা চণ্ডিকার চণ্ডালিনী মূর্তি! ক্ষুধা ও প্রেমের অপমানে দুর্ভাগ্যবতী অশ্রু-অন্ধ সেই চিরদিনের পাড়াঘরের মেয়েটি। এই বিরাট তীর্থক্ষেত্রে যখন সবাই দানে ধ্যানে ধর্মে ব্যস্ত-এস্ত উন্মত্ত, যখন আপন মনে মানুষ অরণ্যের বুকে খুশি বিহঙ্গটির মতো ফিরছে মনে আশ মিটিয়ে, তখন সে আমার সামনে খুলে ধরল মানুষের হৃদয় ও দেহের, বাস্তব ও বিচিত্রের এক রূপমহলের দরজা। ভাবি, এই তো বিশ্বের সবটুকু রূপ! হৃদয় ও জঠরের কামনা-বাসনা সৌন্দর্য-ই তো অপরূপ। এর শেষ নেই। এর বাড়া বৈচিত্র্য কই? এরপর বদলে দিল আবার আমার সুর। তাই তো নিয়ম। সুর তরঙ্গে তরঙ্গে শুধু রূপান্তর—ভৈঁরো থেকে গজল, গজল থেকে পূরবী, পূরবী থেকে ইমন, ইমন থেকে বেহাগের অশ্রুভরা অন্ধকার রাতে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকবো মৌন নক্ষত্রের চোখে।
তাই তো! থামবার কী আছে। কী আছে নিরানন্দের। সে তো আমার চলার পথে দিয়েছে নতুন চলার রস। সংযোজন করলো নতুন সুর।
ফিরে তাকালাম। ভূতানন্দর আশ্রম নয়, কুঁড়েঘর। সূর্য খানিক বেঁকেছে মাঝ-আকাশের কোল থেকে। নিম, তেঁতুল, সজনে, পিপুলের ছায়া ঝিলিমিলি। নতমুখী রক্তাম্বরী কালো মেয়ে। পায়ের কাছে তার অভুক্ত হাতের ছোঁয়া সজনে ফুল। মধুলোভী মৌমাছি এসেছে ছুটে, গন্ধে গন্ধে।
ভাবি, নিজের চোখজোড়ার মন ফিরিয়ে দেখি, সারা দেশে এমনি কত কুঁড়ের কত ঝি-বউয়ের পায়ের কাছে পড়ে আছে সজনে ফুলের গোছা। এক ছিটে নুন, দু’ফোঁটা তেল আর এক কাঁসি ভাতের অভাবে এমনি কত সজনে ফুলের গোছা গিয়েছে শুকিয়ে। জানি, যে শুধু করুণার জল দিয়ে ভেজাতে চায় এ বিশ্বের চিঁড়ে, সেও করুণার পাত্র। করুণা করতেও চাই নে। জানি, আমারও ‘মুরোদ বড় মান’। আমার মতো মানুষকে দান-ধ্যান করে শুধু ছেঁড়া কান-ই দেখতে হবে। জানি, তবু সমুদ্রগুপ্তের টিলার উপর এ অভাবিত সজনে ফুলের গোছাও যদি যায় শুকিয়ে, তবে নিয়ত মরুবাসের যে রসটুকু সান্ত্বনা, তাও যে হারিয়ে যাবে বিষবাষ্পে।
অনেক দ্বিধা করে হাত দিলাম পকেটে। ডাকলাম, ‘ভৈরবী!’
ভৈরবী আচমকা ঘোমটা তুলে বললো, ‘আমার নাম তো ভৈরবী নয় দাদাবাবু।’
বললাম, ‘তবে বুঝি চণ্ডিকা?’
তার উপোসী শুকনো মুখে এখনো জলের দাগ। সেই মুখে তার অপূর্ব লজ্জিত হাসি। বললো, ‘না।’
‘তবে?’
‘আমার নাম ময়লা।’ বলতে বলতে তার কালো মুখে চিরুনির মতো সাদা দাঁতের সারি ঝকমক করে উঠলো। বলেও তার এত আনন্দ, উপোসী মুখখানি ভরে উঠলো আলোয়। চমকে ভাবলাম, রহস্য নয় তো!
বললাম, ‘ময়লা? সে আবার কী?’
সে বললো, ‘আমার নাম গো! বড় যে কালো, তাই ছোটকালে নাম রেখেছিল ময়লা।’
বলার সুযোগ পেলাম। যদি কাটিয়ে ওঠা যায় গ্লানিটুকু। বললাম, ‘ময়লা কোথায়? দিব্যি ঝকঝকে দেখছি।’
কাজ করলো ওষুধটি। ময়লা হেসে উঠলো সশব্দে। তবু কী বিচিত্র! চোখের জলের দাগটুকু আছে গালে।
বললাম, ‘আমি কিন্তু আলোই বলবো।’ বলে পকেট থেকে পয়সা নিয়ে বললাম, ‘তা ভৈরবী, কিছু মনে কোর না। দেখা হয়ে গেল পথে, এইটুকুনি লাভ। আবার কে কোথায় যাব! পয়সা কটি রাখো, সজনে ফুলের চচ্চড়ি রেঁধো আজ, কেমন? ‘
কিন্তু গোলযোগ ঘটল। ভেবেছিলাম মেঘ কেটেছে। তবে যে হঠাৎ আবার তার চোখে জল! তাড়াতাড়ি আমার আসনখানি তার লাল আঁচল দিয়ে বৃথাই ঝেড়ে দিল। বৃথা, কেননা ধুলো যাবার নয়। দিয়ে ধরা গলায় বললো, ‘এট্টু বসেন।’
অপ্রস্তুত ও বিব্রত বোধ করলাম। ময়লা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায় তবে ভুল করেছে। পথের নিয়ম ঘরে চলে না, ঘরের নিয়ম নয় পথে। আমরা পরস্পর কৃতজ্ঞ এই পথের দেখাদেখিতে। পরমুহূর্তেই দুশ্চিন্তা হলো। বললাম, ‘ভূতানন্দ ফিরে আসবে তো?’
সে বললো, ‘আসবে না? যাইবে কমনে? দ্যান, পয়সা দ্যান।’
বলে, নিঃসঙ্কোচে হাত পাতল। দিলাম। পয়সা কটি আঁচলে বেঁধে, জল-চোখ টিপে হেসে বললো, ‘ওইরকম কয়। শোনা আমার কপাল দাদাবাবু। কিন্তু সামনে যদি থালায় কইরা কিছু দিতে পারি, তখন কালী নামে কী হাসনের ফোয়ারা, একবার দেইখ্যা যাইয়েন। সুখ বড় বেইমান। ত্যাখন সে-দুঃখর কথা মনে থাকে না। মানুষটারে চিনি তো!’ বলতে বলতে তার কালো মুখে সলজ্জ হাসি ফুটল। লজ্জিত ত্রস্ত চোখে একবার আমার দিকে চেয়ে নত করলো মুখ। বড় বিচিত্র তার এ লজ্জা-হাসিখানা। আমাকে মাঝে রেখে মনের কোন্ গোপন লীলাখেলায় লীলাবতী হয়ে উঠলো সে! বললাম, ‘কিছু বলবে?’
ভৈরবীর এত লজ্জাও ছিল! ঘাড় নেড়ে জানালে, ‘হ্যাঁ।’ তারপর তার ডাগর চোখ মেলে দিল পুবে, গাছের ফাঁকে দূর আকাশের দিকে। বললো, ‘দাদাবাবু, মানুষটার উপর রাগ করবেন না। ও-ই রকম। ছোটকাল থেইকে জানি, ও সাপুড়ে, ডাকাবুকো। আমি ঘোর বোষ্টমের মেয়া। দেখলে চোখ বুজতাম। ওই যে কইল না, তোর বাবার কেষ্টোর-ই একদিন, কি আমার-ই একদিন। আমার বাপ যে কেষ্টোভক্ত বোষ্টম তাই খোঁটা দিল। তা দাদাবাবু বোষ্টমের মেয়া, ওনার কাছ থেকে তফাতেই থাকতাম। ত্যাখন আমার ডাগর বয়স। তা ওই মানুষটি য্যাখন ত্যাখন আমার আগুপিছু ফিরত, চোরের মতো আড়ে আড়ে দেখত, চখে চখে পড়লে হেইসে বলত, ময়লা, কী বাহার তোর কালো রঙখানি। শুইনে ভয় হতো, আর কী হইত আইজও জানি না। মোকে কইত, কালী ময়লার যে রূপ আর ধরে না। ক্যান কি জানি। তারপরে, একদিন তিনো সইন্ধ্যেবেলা আড়ালে আমার হাত দুইখানি ধরে কইল, ময়লা, তোর মধ্যে যে মা কালীর অংশ রইচে লো। তোরে আমার চাই। চাই কইলেই চাওয়া? কী সাহস! ডরে মরি। কয় কী? তবু, মেয়েমানুষের মন তো! কইলাম, কী যেন মনে লইল, হেইসে হেইসে কইলাম, ওমা! ছি, আমি কালা পেঁচি, কালামুখী, মা কালীর সঙ্গে আমার কথা, খাওয়া, বসা। তিনি কইলেন, ময়লা আমার পরান। আমিও যে চখ বুজলে তাই দেখি ময়লা। তোর হাসি কথা, চখের তরাসে তুই সাক্ষাত কালী। তোরে নইলে, নিজের চিতা নিজেরে জ্বালাইতে হইবে। শোনেন কথা।..’
বলে, হেসে উঠলো ময়লা। চোখের জলে, কৈশোরের স্মৃতিতে হাসি কান্নায় কী বিচিত্ৰ রঙের ছোঁয়া লাগিয়ে দিলে সে আমার পথ-চলা-ব্যস্ত মনে! আমি জানি, উত্তর প্রদেশের এ টিলার বুকেও সে লাগিয়ে দিল ওই রঙের ছোপ।
হেসে বললো, ‘মনে মনে বুঝলাম, ময়লা, এইবার মলি। কইলাম, হুঁ, তুমি সবই দেখতে পাও। ভূত-পেরেতও নাকি দেখতে পাও! আমারে এট্টু দেখাইতে পার? কইল, ‘খুব পারি। আমি থাকবো লাটাই চণ্ডীতলায় কাল সন্দেয়, আসিস, ডরাইস্ না, দেখাইব।
গেছিলাম দাদাবাবু, সত্য কইরা আমায় ভূত দেখাইল।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘ভূত দেখতে পেলে?
বললো, ‘হ্যাঁ দাদাবাবু।
হাসি পেল। চেপে গেলাম। অমন সহজ স্বীকৃতি ময়লা ভৈরবীর দ্বারাই বোধ হয় সম্ভব। তবু বললাম, ‘কেমন দেখলে? কী দেখলে?’
নিরাভরণ হাতখানি শূন্যে মেলে দিয়ে সে বললো, ‘কী জানি কী দেখলাম! চখ অন্ধকার, কী দেখাইল, উনি-ই জানেন! খালি বুজলাম, সোসার ওনার বশ। দেব-দেবী যক্ষ রক্ষ, সব-ই ওনার গুণবশ। আমিও বশ হইলাম। এমন বশ হইলাম, বোষ্টমের মেয়া হইয়া কালীভক্তের সঙ্গে সেই রাত্রেই লাটাই চণ্ডীতলা থেইকেই সকলের মায়া কাটাইয়া ওনার সঙ্গে বার হইয়া গেলাম। সেই থেকে ওনার-ই সঙ্গে সঙ্গে। দাদাবাবু, উনি যাইবে কমনে? এমনি কতবার গেল, কতবার আসল। যাওয়া আসা নিয়া সোসার। আর যদি ময়লা হই তোমার জীবনে, তবে ধুইয়া সাফ কইরে যাও, নইলে ময়লা কি সঙ্গ ছাড়ে!’
হাসতে গিয়ে কাঁদল। বললো, ‘তবু দাদাবাবু, আইজ আমার কী পুণ্যি গো! এখানে চাইলের বড় দাম। আলো চাইল, পঁচিশ তিরিশ টাকা মণ। তবু, ওনার সামনে সইজনে ফোলের চচ্চড়ি দিয়ে হাতপোড়া গরম ভাত দুইটে দিতে পারব, নিজেও পাইব। যা শীত! সাপের ছোবল। গতরে এট্টু যুত পাইব, কালীনামের ফোয়ারা ছোটাব। দাদাবাবু, আপনারে পেন্নাম করি।’
ছি ছি ছি, একে রক্তাম্বরী, তায় ভৈরবী! উঠে দাঁড়ালাম তাড়াতাড়ি। সেই করুণা ও কৃতজ্ঞতা। কেন? বললাম, ‘এবারে যাই।’ তবে, তারপরে আবার আবেগবশত না বলে পারলাম না, ‘আলো ভৈরবী, ময়লা ধুয়ে সাফ করার কথা বললে। ময়লা মাথায় নিয়ে তুমি কিন্তু হীরে হয়ে গেছ, ও আর ধুয়ে সাফ হবে না।’
মনে মনে বললাম, তুমি গেলেই ভূতানন্দর জগৎ অন্ধকার। ময়লা হেসে উঠলো। বললো, ‘আসবেন তো আবার দাদাবাবু?’
ফিরে দেখে বুঝলাম, ভৈরবীর চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছে। বললাম, ‘যদি পারি, আসব।’ মনে মনে বললাম, যদি না পারি, তবে এ টিলার ছবি তোমারই মূর্তি ধরে অক্ষয় হয়ে থাকবে আমার চোখে। এ অস্বচ্ছন্দ জীবনের ক্ষেত্রে, বিশেষ উন্নাসিক স্বদেশ-পরিচয়-অজ্ঞ কূপমণ্ডুক শহুরে সভ্যতার কছে সত্য অনেক সময় অসত্য ও অস্বাভাবিক। এখানে যে এমনি এক ময়লা ও ভূতানন্দর দেখা পেলাম, কিছুই নয়, তবু দেখলাম এমনি এক বিচিত্র নাটক, তো হয়ত নিজেই ভুলে যাব এই টিলা থেকে নেমে। তবু জানি, মানুষের ধর্ম, প্রেম ও ক্ষুধার এ ঘটনা অক্ষয় হয়ে থাকবে।
জানি নে, কী শুনলাম। দু’দিনে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, কত কী শুনলাম। মনের অজস্র তারে বাজল কত সুর। আধ্যাত্মের উপলব্ধি নেই। সবই মানুষের মধ্যের হেরফের বলে দেখলাম। এ-ও কি ভৈরবীর কোনো গূঢ় সত্ত্বসূত্রের বন্ধন, নাকি যা শুনলাম তা শুধু মানবমানবীর বিচিত্র প্রেমোপাখ্যান, জানি নে। তবু আমি সাধারণ। সেই সাধারণের হৃদয় তো টাবুটুবু ভরে উঠলো এই হাসি কান্নার কাহিনীতেই।
হঠাৎ কেশো গলার হাসি শুনে চমকে দাঁড়ালাম। একটি দেবদারুর আড়ালে, কপালে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে স্বয়ং ভূতবাবা! বললো, ‘চললেন, আঁজ্ঞে?’
হাসি চেপে বললাম, ‘সে কি, একেবারে এত কাছাকাছি, এখানে যে?’
কিমাশ্চর্যম! লজ্জায় ও বিনয়ে ভূতানন্দ মাটিতে মিশল যে! চোখ পিটপিট করে, গলার রুদ্রাক্ষ খুঁটে, সে এক কাণ্ড। বললো, ‘আঁজ্ঞে দেখলেন তো, সাক্ষাৎ চণ্ডীঠাকরুণ, হেঁ হেঁ।’
মানে বোধ হয়, কী করে আর তবে যাব! বললো, ‘ভৈরবী একেবারে চণ্ডাল। মায়ের চরণামিতোটুকু গেল। আবার আসবেন, মা কালীর কথা বলবো।’
কী ভাগ্যি, ভূত দেখাতে চায় নি! জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে কুপ কোথায়?’
সে বললো, ‘ওই যে পাঁচিল-ঘেরা বাড়ি, ওর উঠানেই দরজা পাবেন।’
‘চলি তা হলে?’
ভূতানন্দ জোড়হাতে বললো, ‘আজ্ঞে।’তারপর ফিসফিস করে বললো, ‘রাগ দেখলেন তো? আসল ভৈরবীর ও-ই লক্ষণ অ্যাজ্ঞে, আর আমি—’
মুখখানি অন্ধকার ও করুণ হয়ে উঠলো তার। ওকে আর সান্তনা দিলাম না। এগিয়ে গেলাম। বুঝলাম, ওই রকম করুণ মুখে জোড় হাতে এবার আর-একজনের কাছে যাবার সময় হয়েছে।
বলতে কি ডিগবাজী-খাওয়া বিটলে পাখিটার মতো, খুশিতে আমার ডানা ঝটপট করে উঠল। একটা মস্ত নিশ্বাস ফেললাম। গুনগুনিয়ে উঠলো মনটি আপনি আপনি, চল চল চল হে আকাশতলে আজ সব-ই খেলা। চল চল।
Chapter - 10
১০
পাঁচিল-ঘেরা বাড়িটির উঠোনের কাছে এসে দেখি, লোকের ভিড়। বেশি নয়। অনেক নারী পুরুষ বসে বসে গল্প জুড়েছে। বোধ হয় বিশ্রাম নিচ্ছে। সামনে দেখি, মন্দিরে যার পট রয়েছে, দেখে মনে হলো গুরু নানক। পাশের সেবাইতও শুভ্র বেশধারী শিখ সম্ভবত। দেখলাম, চরণামৃত বিতরণ হচ্ছে।
উঠানের মাঝখানে, ছাদ থেকে নামার মতো একটি সিঁড়ি-মুখের দরজার ভেতর দিয়ে পিলপিল করে অদৃশ্য হচ্ছে মেয়েপুরুষের দল। সামনে গিয়ে উঁকি দিলাম। কিছু দেখবার উপায় নেই। মানুষের ঠেলায় যেন ওই অন্ধ সুড়ঙ্গ গলে গলে পড়ছে। সিঁড়ি-মুখের কাছটিতে ভিড়ও হয়েছে বেশ।
একটা ব্যাপারে অবাক হলাম। একটি অবাঙালি, রীতিমতো দশাসই চেহারার ভদ্রলোক সিঁড়ি-মুখের কাছে একবার এগুচ্ছেন আর পেছুচ্ছেন। তাঁর হাত ধরে, একেবারে বিপরীত রূপ কাঠিসার একটি মহিলাও আগেপাছে করছেন। এই সিঁড়ির মুখে ভিড়ের মধ্যে তাই নিয়ে সাড়া পড়ে গিয়েছে হাসির
জিজ্ঞেস করলাম একজনকে, ‘কী হয়েছে ভাই?’
শুনলাম, ওই বাবুজী এই সুড়ঙ্গে অবতরণে ভয় পাচ্ছেন। যদি দম আটকে মরে যান, কিম্বা মাটি ধসে চাপা-ই পড়েন।
ভালো। কী দরকার নামবার! কিন্তু ওই তো মুশকিল। শুনলাম ভদ্রলোক বলছেন, ‘ভগবান আমার উপর বিরূপ, আমার কী উপায় হবে?’ আর অতবড় মানুষটাকে ‘ডরপুক’ অর্থাৎ ভীতু বলে একচিলতে মহিলাটি মুখঝামটা দিচ্ছেন।
সাধ আছে, সাহস নেই। কিন্তু ভগবানের যা চরিত্র, তিনি যে নিচের অবতরণিকাকে আরোহণী করে নেবেন, তেমন সম্ভাবনা কম। সুড়ঙ্গের মুখটি যেরকম সরু ও অন্ধকার, সে যে হঠাৎ আলোয় মুখব্যাদান করে বিকৃত হয়ে উঠবে তাও বোধ হয় না। অতএব, ওই চলতে থাকুক।
নেমে গেলাম ভিড়ের মধ্যে মিশে। সিঁড়ির মধ্যপথে গিয়ে মনে হলো, ভালো করি নি নেমে। মাঘ মাসের এই দারুণ শীতে ঘাম ছুটল শরীরে। নিজে চলছি নে। আমি একজনের পিঠে লেপটে আছি। আমার পিঠে আর একজন। যেন দলা পাকানো মানুষের একটা পিণ্ড। নারী পুরুষের বাছ-বিচার নেই। পেছনের চাপ আর-একটু বাড়লেই শেষ। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যদি মরিও, তবুও মাটিতে পড়বো না। এমনি দাঁড়িয়ে মরে থাকবো।
চাপে পড়ে দ্রুত নিশ্বাসে কার গলার ঘড়ঘড় শব্দ উঠেছে। কে যেন ফোঁপাচ্ছে আঁতকে ওঠা চাপা গলায়। মনে হলো, ভালো করিনি। এ যে সত্যি-ই কূপ। পাতালপুরী। ফিরব, সে আশা দুরাশা। লৌহ-দরজা ভাঙা যায়, এই মানুষ-পিণ্ডের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। দেখছি উপরের লোকটির আতঙ্ক অলীক নয়।
হঠাৎ একটু ঠাণ্ডা হাওয়া লাগলো গায়ে। কোত্থেকে এল? বাঁদিক থেকে একটি আলোর রেখা এসে পড়েছে ভিতরে। যেন দুর্ভেদ্য অন্ধকারে এসে পড়েছে সার্চ লাইটের আলো। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনে স্থির হয়ে। ডান দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কোনো এক অন্ধ পাতালপুরী থেকে মানুষ-জলের হোসপাইপ খুলে দিয়েছে কেউ। কিছু দেখতে পাচ্ছি নে। শুধু একটু বুঝছি, দূরে একটা আবর্তিত বন্যা ওদিক থেকে ছুটে এসে এগিয়ে চলেছে ওই সার্চ লাইটের দিকে। এই এক বন্যা। আমার পেছন থেকেও আসছে সিঁড়ি দিয়ে নামা জলপ্রপাতের ধারা-বন্যা। কোন্ দিকে যাই বন্যার মধ্যে! ছিন্ন বস্ত্র, ধূলি-মলিন কম্বল, ত্রিশূল, চিমটা, মতিবাঈ থেকে জর্জেট শাড়ির খসখস, স্বর্ণালঙ্কারের ঝিকিমিকি ঠিনিঠিনি, রঙিন উত্তরীয়, ধুতি ও কোট-প্যান্টের পরিপাটি, সবই ছিল। ছিল না শুধু স্বাভাবিক রূপ। তিক্ত ওষুধ গেলার মতো এক দুরূহ কাজে নেমে এসেছে সবাই। পেটে গেলেই নিরাময়। এখানকার কাজ শেষ করে একবার বেরুতে পারলেই স্বর্গের চাবিকাঠি আপনি এসে জুটবে পকেটে।
দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। যেদিকে হোক চলা ভালো। দাঁড়িয়ে থাকলেই পেষাই। এখানে কী আছে, তাই তো জানি নে। শুধু শুনছি হনুমানজী আছেন। ডান দিকের মোড় নিয়ে, জিজ্ঞেস করলাম একজনকে, ‘এখানে হনুমানজী আছেন?’
সে বললো, ‘জী বাবু!’কিন্তু কী আশ্চর্য, লোকটি ওর মধ্যেই আরম্ভ করলো, ‘হনুমানজীকে একবার এখানে লুকিয়ে থাকতে বলার আর দরকার ছিল না। কেন-না, রামায়ণের অনেক পরে নিশ্চয়ই সমুদ্রগুপ্তের কূপ তৈরি হয়েছিল। হনুমানের লুকিয়ে থাকার কোনো ইতিহাস তাতে থাকতে পারে না।’
কিন্তু ভয়াবহ ভিড়ের মধ্যেও লোকটার খৈনিটেপা মুখে রামায়ণের বিচিত্র বুলি ঝাড়বার বাসনা দেখে অবাক হতে হয়।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি এগুচ্ছ না কেন?’
সে হেসে বললো, ‘মরতে?’ তারপর পকেট থেকে পয়সা বার করে ডান দিকে একটি জায়গা লক্ষ করে ছুঁড়ে দিল। দেখে বুঝলাম, ওইখানেই আছেন তিনি। ওইখানেই ঘূর্ণিজলের আবর্তের মতো নরনারীর রঙ-বেরঙ-এর মাথা পাক খেয়ে উঠছে।
এগিয়ে গেলাম। অস্বীকার করবো না, পুণ্যার্থী নরনারী আমার তুলনায় ধৈর্যশীল, কষ্টসহিষু। এগিয়ে গিয়ে অন্ধকার দেখলাম। মনে হলো, আমার ওভারকোটের বোতামগুলি পড়পড় করে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল। অসহ্য চাপে, মনে হলো কোটটা খুলে পড়েছে, টেনে নিচ্ছে কেউ গা থেকে। ঠোঁটের কোণে চোখের জলের মতো নোনতা ঘামের নির্ঝর এসে পড়ছে।
তারপর টিমটিমে প্রদীপ, তৈলসিক্ত চত্বর, সিঁদুর, ক্ষয়িষ্ণু পাথরের মূর্তি, পাণ্ডা ও পয়সা, সমস্তটা মিলিয়ে মনে হলো, একটা বিচিত্র ছায়ার খেলা।
বেরিয়ে এলাম তন্মুহুর্তেই। কার একটা হাত এসে পড়লো গলায়। পড়ুক। লক্ষ এখন সার্চ লাইট। যেন, মুমূর্ষর জীবনে এখনো আছে জীবনের সাড়, ওই আলোকরেখা।
কার একটা হাত এসে পড়েছে কোমরের কাছে। ওভারকোটের বোতাম তবে খুলেই গিয়েছে। কিন্তু, কিন্তু একি? হাতটা যেন কাশফুলের মোলায়েম সুড়সুড়ির মতো পেটে বুকে হাতড়ে ফিরছে। তারপরেই আটকে পড়া বিছের মতো স্পর্শটি পিছলে নেমে এলো কোমরের নিচে। পরমুহূর্তে আবার বুকে। অন্ধ নাকি? ভিড়ের চাপাচাপি ও ঠাসাঠাসি। একরাশ রুক্ষ চুলের গোছা ঢেকে দিল আমার চোখের দৃষ্টি।
কিন্তু, বুকে হাত? আমার যে সব ওই বুকে। আমার ছুটে আসা, আমার হৃদি-কুম্ভ-সায়রে ডুব দেওয়া, আমার অমৃতকুম্ভ যে ছোট্ট একটি চামড়ার ব্যাগে ভরা। এখানে মনের চেয়ে কাজ দ্রুত।
কোনো বস্তু নয়, বুকের স্পর্শটি চেপে ধরলাম হাত দিয়ে। একটি হাত। নরম নয়, শক্ত কিন্তু ছোট। হ্যাঁচকা দিচ্ছে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। চকিতে চুলের গোছা সরে গেল চোখের কাছ থেকে। অস্ফুট আর্তস্বর। কালো ওভারকোটের তলায় একটি মুখ। একজোড়া চোখে চকিত আলোর মায়াদীপ্তি। সেই চোখে একই মুহূর্তে শঙ্কা ও ক্রোধ, হাসি ও ভিক্ষা মনে হলো, ছিন্ন ময়লা কাপড় জড়ানো ধুলো-মাখা একদল মেয়ে-বাহিনীর ব্যুহ আমাকে ঘিরে ঠেলে নিয়ে চলেছে। হাত ছাড়িনি। চেঁচাব কিনা ভাবছি।
দাবি ও অনুরোধের যুগপৎ চাপা আর্তস্বরে শুনলাম, ‘ছোড় দো, ছোড় না!’
স্বর আমার কানের কাছে। সেই ভয়ংকর টানাটানা চোখ আমার মুখের কাছে। চোখ নামিয়ে তাকালাম। পালতোলা নৌকা-আঁচল শাড়ি। লাল জামা। আর এই অসহ্য ভিড়ের মধ্যে ঠিক সেই মুহূর্তেই অনুভব করলাম, এক অব্যক্ত ভাষাহীন নরম ও বিচিত্র স্পর্শ আমার বুকে।
সর্বনাশী! খনপিসির সর্বনাশী, ঝুসির ভয়ংকরী, ব্রজবালার আতঙ্ক ছেলেচোর। নিরালা মাঠের সেয়ানা পাখি।
ছেলেচোর কোথায়! ও যে আসল প্রাণচোর। সর্বস্ব-চোর। আমার হৃৎপিণ্ডের খোঁজ করছিল মৃত্যুর মতো সর্বনাশী স্পর্শে।
চকিতে কটাক্ষ বিলোল হলো। ঘন হলো স্পর্শ। এই ভয়ংকর পরিবেশে এক বিচিত্ৰ জড়ানো ও সানুনাসিক কণ্ঠ আমার সর্বাঙ্গ আচ্ছন্ন করে দিল, ‘ছোড় দো মেরী বাবু, ছোড় জী।’
যে মুহূর্তে টের পেয়েছি, সে মেয়ে, সেই মুহূর্তেই শিথিল হয়েছে হাতের মুঠো। আমি ভদ্রলোক, আমার আত্মাভিমান আছে। ভদ্রলোক এবং পুরুষ, মনের কানায় কানায় আমার আছে সভ্যতার সংস্কার। আমার অর্থের প্রতি যার লোভ, তার প্রতি আছে ঘৃণা ও ক্রোধ। তবু মাঝারি ঘরের বাঙলার ছেলে, স্পর্শকাতরতা আমাদের পায়ের তলা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। বয়সের তারুণ্য ও উদারতা বাস্তব মানে না নিয়ত। সেখানে বিচিত্র রঙে রঙমহল। তা ছাড়া নারী। নারী নামে ধিক্কার দিচ্ছি নে। নিজের মনকে ফাঁকি দেব কোথায়! হাত আপনি শিথিল হলো। আমার ঘর্মাক্ত মুঠো। সর্বনাশী ছিটকে গেল মুহূর্তে। আমি আশ্রমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আশ্রমে আলোর ছড়াছড়ি খুব। মঞ্জুটিও রীতিমতো সুসজ্জিত। আঙিনায় চোট ছোট গাছের সারি দিয়ে আঁকা হয়েছে ভারতবর্ষ।
ঢুকতে গিয়ে বাধা। জুতো রেখে যেতে হবে। কার কাছে? সে ভাবনা নেই। তার জন্য লোক আছে। জুতো দিন, নম্বরমারা কার্ড নিয়ে যান। কার্ডটি ফিরিয়ে দিলেই জুতো। সেই ভালো।
মঞ্চে গান হচ্ছে। সুরটি ভজনের অনুরূপ। যারা গান করছেন তারাও রীতিমতো সুবেশ তরুণ। কিন্তু ভাষা দুর্বোধ্য। শ্রোতার চেয়ে বেশি শ্রোত্রী। যদি পাপ না হয় তবে বলি, এখানে রূপের বড় ছড়াছড়ি। রূপে ও পোশাকে দশ দিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আশ্রম-প্রাঙ্গণের। তার উপরে তীব্র আলোয় রূপের বাড়াবাড়িও হয়েছে। আশ্রমের সুদীর্ঘ ঘেরাওয়ের মধ্যে বহু ঘর। কল্পবাসীদের নিঃসন্দেহে। কিন্তু কল্পবাসিনীরা যেন বড় বেশি চুমকি বাহার ও হীরে-জহরতের আলোয় পথ দেখে চলেছেন।
মুখে ছিল সিগারেট। একটা বিরক্ত ও গম্ভীর কণ্ঠ ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো কানের কাছে, ‘বাঙালিবাবু?’
কণ্ঠস্বরে কিছু টান ও বিসর্গযুক্ত ইতি। পাঞ্জাবীদের মতো খানিকটা। ফিরে দেখি, মস্ত বড় পুরুষ, গৌরমূর্তি, গৈরিক বেশ। মাথায় চুলের রাশি, নাকে কাপড়। সারা মুখে অত্যন্ত বিরক্তি।
ফিরতে বললো, ‘ফেক দিজিয়ে সিগারেট। মহারাজলোগ্ হরবখত যানা আনা করছেন, তাঁদের নাকে বাস লাগলে আপনার নরকবাস হবে।’
চমকে প্রথমে সিগারেট নেভালাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন, শিখদের আশ্রম?’
সিগারেট নেভাতে দেখে সে একটু বোধ হয় খুশি হল। বললো, ‘না। তবু এ আশ্রমের মহারাজ ওটা পছন্দ করেন না। তাছাড়া শিখভক্ত এখানে সব সময় আসে। আপনারা হরটাইম সিগারেট পিনেসে কৈসে চলেগা! আপলোগ কিসীকো ধরম নেহি মান্তা।’
আপলোগ মানে কৌন লোগ? বাঙালি কি? তেমনই যেন খোঁচাটি। কার ধর্মে সে বাধা দিয়েছে? জিজ্ঞেস করলাম, ‘উও ক্যায়সে, মহারাজ?’
প্রশ্ন শুনে একটু বিব্রত হলো সে। হঠাৎ সে বললো, ‘ওইসা শুনতা হ্যায় বাবুজী। কোলকত্তা কভি নহি দেখা। মগর, উনলোগ বড়ি জাদা সিগ্রেট পিতেঁ হ্যায়।’
প্রতিবাদ নিরর্থক। পালটা অভিযোগ অনেক তোলা যায়। তুলব কার কাছে? যাক। দেখে যাই। সাধু নিজে ধূমবিরোধী। তাই বিরক্ত। কথার দরকার ছিল না, বললেই নিভিয়ে তার মনস্তুষ্টি করতে পারতাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কোন্ আশ্রম, মহারাজ?’
বললো, ‘সাধুবেলা আশ্রম।’ বলে, নিজেই চমৎকৃত হয়ে ফিরে আবার বললো, ‘হিন্দুকো সবসে বড়িয়া আশ্রম বাবুজী। পাকিস্তানের এলাকায় পড়ে এখন বেনারসে আশ্রয় নিয়েছে। লাখ লাখ টাকা আশ্রমের সম্পত্তি। শ’ শ’ আদমি আগে খেত সাধুবেলা আশ্রমে।
লাখ টাকার ঔজ্জ্বল্য আছে সন্দেহ নেই। নেই মিষ্টি ও উদার হাসির স্নিগ্ধতা। জুতো নিয়ে বেরুতে গিয়ে গেটের কাছে চোখ পড়লো, রিডিংরুম। মনটা প্রফুল্ল হলো। টেবিলের উপর অনেক পত্র-পত্রিকা। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক। রাজনীতি, সিনেমা ও সাহিত্য সবই আছে। ইংরেজি, হিন্দি উর্দু, তামিল, মারাঠী, ওড়িয়া সবই আছে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও পেলাম না বাংলা কাগজের একটি টুকরো। কেন, বুঝলাম না। যাকে নইলে চলবে না, শুধু সে-ই নেই?
বেরুবার মুখে একজন বাড়িয়ে দিল খাতা ও কলম। দর্শকের স্বাক্ষর। আপত্তি কী? অনেক প্রদেশের বিচিত্র অক্ষরমালার মধ্যে বাঙলায় লিখে দিলাম নিজের নামটি। নিচে লিখলাম, বাঙলাদেশ।
এ আমার প্রতিবাদ নয়। নয় মনের বিরূপতা। অনেকের মাঝে এ শোভার আধার বাঙলা ভাষা, এ লেখনে শুধু সেই তুষ্টি। রূপের মাঝে অপরূপকে দিলাম বসিয়ে।
বেরিয়ে এসে সোজা পাড়ি পশ্চিমোত্তর কোণে, যেখানে আলোর সারি ও লোকের ভিড়। কিছুটা আসতেই এক বিরাট বাহিনী। নেতৃত্ব করছে পাঁচুগোপাল। পাঁচ-বদ্যি। চোখ বটে তার! দেখেই হুঙ্কার দিল, ‘আই য্যা! চাঁদ, কোথায় ছিলে সারাদিন, অ্যাঁ?’
শোনো এবার বাঙলা কথা। হকচকিয়ে বললাম, ‘কোথায় চললেন?’ সে কথার জবাব না দিয়ে সে বললো, ‘খুড়ি, এই যে তোমার ছিরিমান। হাঁকপাক করছিলে, কোথায় গেল। এবার জিজ্ঞেস করো।’
তাই তো। তাকিয়ে দেখি, আশ্রমের সমস্ত বাঙালি সবলা ও অবলা যে আজ বেরিয়ে পড়েছে আশ্রম খালি করে! কম করে জনা পনেরো তো বটেই। তার মধ্যে কী অপরূপ! পাঁচ-বদ্যির গা ঘেঁষেই খনপিসি। শুনেছিলাম, দুই শক্তি একত্রিত হলে বিস্ফোরণ অনিবার্য। কি চাপা জ্যোৎস্নালোকে দেখলাম, শাল-জড়ানো শীতে কাঁপা খনপিসির মুখখানি বেশ প্রশান্ত। খালি বললো, ‘সেই ছেলেটা না?’
আর একজন বললো, ‘হ্যাঁ।’
দিদিমা বললো, ‘খেয়েছ কিছু সারাদিনে?’
মিথ্যে বলতে হলো। বললাম, ‘হ্যাঁ, খেয়েছি।’
পাঁচুগোপাল বললো, ‘তবে খাওয়া মুখখানি অমন শুকু-শুকু দেখাচ্ছে কেন?’
বললাম, ‘অনেক ঘুরেছি কিনা।’
প্রায় ভেংচে উঠলো পাঁচুগোপাল, ‘থাক, আর পাক দিতে হবে না। পড়েছ বোধ হয় কোনো মায়াবীর পাল্লায়? খবোদ্দার, মরবে। চাঁদপানা মুখ দেখবে আর জানটি নেবে, এর নাম কুম্ভমেলা, বোয়েচ? হ্যাঁ।’
না বুঝে উপায়? তার কথার প্রতিবাদ করছি নে আর।
খনপিসি বললো, ‘নেও, চল বাপু। গায়ের মধ্যে কাঁপুনি দিচ্ছে। কাল আবার পুন্নিমে! আজই এত শীত, কাল না জানি কী হবে!
পাঁচুগোপাল বললো, ‘চল চল।’
হুকুমটা আমাকেই করা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় ঘুরলেন?
চাপা গলায় বললো, ‘নরকে। ঘোরার কি শালা মাথামুণ্ডু আছে?’ গলা ছেড়ে বললো, ‘রামকৃষ্ণ আশ্রম গেলুম, আনন্দময়ী দর্শন করলুম।’
চলতে চলতেই কানে এলো, দিদিমা বলছে, ‘খায়নি তার আমি কী করব, ঘরে-বাইরে কি আমি এই করতেই আছি যে একজনকে না একজনকে চিরকাল ডেকে ডেকে খাওয়াতে হবে? তুই ধরে বেঁধে খাওয়ালেই পারতিস?’
পাশ ফিরতেই চোখে পড়লো ব্রজবালার মুখ। জ্যোৎস্নালোকে দেখলাম। তার অভিমানক্ষুব্ধ দৃষ্টি। চোখে চোখ পড়তেই ঘোমটা টেনে আড়াল করলো মুখ।
কিশোরী হলেও হৃদয় যে তার রাঙা। মনে মনে বলি, সই বৌঠান আমার বোন! দিন যাচ্ছে, শেষ হয়ে আসছে দেখাদেখির পালা। ঘর থেকে এসেছে দূরে। তবু ঘরের হৃদয়, মন আর চোখ ফিরছে সঙ্গে সঙ্গে, পথে পথে। কে এক পথের মানুষ আত্মীয়তা পাতায়। তাকে ঘিরে রাগ হাসি। তার না-খাওয়ার জন্য অভিমান। নিষ্ঠুর ও তিক্ত জীবনে বুঝি এই লোকগুলিই জীইয়ে রেখেছে আমাদের মানবিকতা!
সারা রাত ঘুম হলো না। শীত তো ছিলই। তার উপরে সারা রাত ধরে লোকের চলাফেরা কথাবার্তার বিরাম নেই। কাল পূর্ণিমার স্নান আছে সঙ্গমে। স্নানার্থীদের আগমন হচ্ছে। কিন্তু সে কি সারা রাত ধরে? শুধু তাই নয়। জানি নে কিসের এত গান। তাঁবু-কোটরের শীতেই আমরা আধখানা। আর বাইরে স্নানার্থীদের শীত-কাঁপা মিলিত গলায় গানের শেষ নেই। বুঝতে পারছি, সব দলে দলে আসছে। শুনেছি, সঙ্গমে ভিড় হবে সাংঘাতিক। তাই রাত থাকতেই সবাই ভিড় করেছে এসে আশেপাশে। স্নানের সময় বাঁধা আছে পাঁজি পুঁথিতে। ঠিক সময়টিতে ডুব দিতে না পারলেই ফসকা গেরো। বুঝতে পারছি, দিদিমারও ঘুম নেই চোখে। মাঝে মাঝে তন্দ্রা আবার ভেঙে যাচ্ছে। ঠাকুরের নাম নিয়ে জেগে থাকার প্রয়াস শোনা যাচ্ছে ভাঙা গলায়।
Chapter - 11
১১
শেষ রাত্রের দিকে বুজে আসছিল চোখ। পাঁচুগোপালের চেঁচামেচিতে তা-ও হলো না। তার ‘ওঠো গো ওঠ গো’ ডাকে চারিদিকে দৌড়াদৌড়ি হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। তাঁবুতে তাঁবুতে ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির হিড়িক। তার মধ্যে শীতের কামড়ের হি-হি-হু-হু। আর দিকে দিকে ব্যস্ত উৎকণ্ঠিত গলা।
‘ও নন্দ, নন্দ। আমাকে ফেলে যাসনি যেন।..’
‘ও মাসি, তোমার গমছা কোথা গেল?..’
‘ও মা, কাল যে অত করে বেলপাতা কটা পুঁটলিতে রেখেছিলুম, সেগুলো তো দেখছিনে।…’
‘ননীবালা, আতপচালগুলান নিতে ভুলিস নে লো।..
‘বড় বউমা, ও বড় বউমা, তুমি যে আর শীতে বাঁচচো না বাছা। সধবা মানুষ, পই পই করে রাত থাকতে বলে রেখেছি, সিঁদুরটুকু আঁচলে বেঁধে নিয়ে শোও, সঙ্গমে নাইবার সময় দিতে হবে। তা আর…’
এমনি সব নানা কণ্ঠে সাড়া পড়ে গিয়েছে। এটা নাও, ওটা নাও। বুড়িরা কাঁদছে শঙ্কায় ও উৎকণ্ঠায়। আমাকে নাও, হাত ধর! বুড়োরা গোঙাচ্ছে, হে ভগবান, শক্তি দাও, শক্তি দাও!
অসহ্য শীত। দুরন্ত উত্তুরে হাওয়া। শীত নয়, যেন লক্ষ লক্ষ বিষধর অদৃশ্যে ছোবলাচ্ছে চেরা জিভ বার করে।
কিন্তু সময় নেই, চল চল! সঙ্গমে সঞ্চারিত হচ্ছে অমৃত। জীবন-যৌবন, ধ্যান-ধারণা, কামনা-বাসনার অমৃত-ঢেউ লেগেছে, ডুব দিতে হবে, চল চল।
‘বেরজো, ওঠ। চল্ চল্। পেল্লাদ, দাদুভাই আমার, আমার সোনামানিক, চল্ চল্।’
‘খনপিসি, চল চল।’
‘ওগো তোমরা আমায় ধর, আমার পা টলছে। আমায় নিয়ে চল।’
শীত! সরে যাও। মৃত্যু! দূরে যাও। দুর্বল! শক্তি ধর। অন্ধকার! আলো হও। চল্ চল্। কী পড়লো? ঘটি? থাক। কী রইলো? জামাকাপড়? থাক। সময় নেই! ক্ষণ বয়ে যায়, চল্ চল্!
বাইরে পাঁচুগোপালের তীব্র মোটা গলার ডাক ভেসে আসছে, ‘বেরিয়ে পড়, বেরিয়ে পড়।
শুনছি শুধু ডাক, শুধু চল চল আহ্বান। তবু পড়ে রইলাম। বিস্ময়ে হতবাক, দেহ আড়ষ্ট। মন ছটফট করছে, তবু পড়ে রইলাম।
কে ডাকছে! কে ডাক দিল সবাইকে এমনি করে! কার বাঁশি বাজল! কোন্ মন্ত্র শুনলো সবাই কানে কানে! কেন এত ব্যাকুল হলো! কেন এমন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চললো সবাই! আশ্চর্য! এই ভয়ংকর শীতে সঙ্গমে ডুব দিতে পাগল হলো সকলে?
দিদিমা বলছে, ‘পেল্লাদ, ছেলেটাকে ডাক।’
প্রহ্লাদ ডাকলো, ‘কই দাদা, উঠুন, সব কিন্তু ফাঁক গেল নইলে। উঃ! ও হো হো হো, দি’মা কী শীত রে!’
বেরিয়ে পড়েছে সবাই। খুলে দিল তাঁবুর ঢাকনা। তারপর কে হ্যাঁচকা দিয়ে খুলে দিল আমার কম্বল।
চেয়ে দেখি ব্রজবালা। উল্লাসে, উৎকণ্ঠায় শীতে কাঁপুনিতে অদ্ভুত তার মুখের ভাব। বললো, চাপা গলায় ফিস ফিস করে, ‘চল, চল তাড়াতাড়ি।’
ব্যাকুল ও করুণ আকুতি। তারপর বেরিয়ে গেল দিদিমা আর স্বামী—দুয়ের মাঝে দেহলগ্ন হয়ে। ডাক পড়েছে। ত্রিপূর্ণিতে ডুব দেবে আজ ব্রজবালা। তার জীবনে ডুব দেবে, তার যৌবনে ডুব দেবে, তার শাঁখা-সিঁদুরে, মাছ-ভাতে, স্বামীর পরমায়ুতে আর ভবিষ্যতের জাদুমানিকের অমৃতমন্বিত ওষ্ঠগহ্বরে। কে গান ধরে দিয়েছে—
চল গো তারা ত্বরা করে।
সে যে আর রইবে না রে।
সোনার বরণ কালি হলে।
দেখবি অন্ধকার।
তখন কাঁদবি বসে ধূলায় পড়ে,
দেবতা কাঁদবে দেখে তোরে,
দেখবি, চারদিকে তোর ভরাডুবি,
পাবিনেকো পারাপার।।
তোরা চল গো চল।।
পাঁচুগোপালের গলা শোনা গেল, ‘সবাই এসেছে? চল, এবার পা চালাও।’ পাঁচুগোপাল চালক। পুণ্যসঞ্জয়ের হাত-ধরা খুঁটি। জানি নে, এতে পাঁচুগোপালের কতখানি আনন্দ ও লাভ। কিন্তু তার কণ্ঠে একটা চাপা উল্লাসের ধ্বনি বাজছে।
খনপিসি বলছে, ‘পাঁচুদা, নাপতে ব্যাটা কোথায় গেল?’
জবাব শোনা গেল, ‘আছে, আছে, চল চল। সঙ্গমের ধারে বসে মাথা মুড়োবে, ভাবনা কী?’
মনে হলো ফাঁকা হয়ে গেল আশ্রমটা। সবাই চলে গেল, পড়ে থাকি কেমন করে? ডুব না দিই, একলা থাকবো কেমন করে? আমি যাই তাদের সঙ্গে সঙ্গে। ডুব না দিই, ডুবেই তো আছি।
বেরিয়ে এলাম ওভারকোট চাপিয়ে। সামনে দেখা কোতোয়ালজীর সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হলো, যান নি?’
কোতোয়াল বললো, ‘আমাদের আজ নয়। অমাবস্যার দিন। ওই দিন পর্ণকুম্ভ যোগ আছে। আজকেও কম নয়। গ্রহণ যোগ আছে। কিন্তু সাধু সম্প্রদায় আজকে এ যোগে যোগ দেবেন না।
তাড়াতাড়ি মুখ ধোয়ার জন্য গেলাম পেছনের কল-পাড়ে। গিয়ে অপ্রস্তুত হলাম। ভেবেছিলাম কেউ নেই আশ্রমে। কিন্তু রয়েছে।
দেখলাম, তাঁবুর একপাশে নিরুদ্দেশ-স্বামী-সন্ধানী বৌদি। খসা ঘোমটা। আঁচল এলিয়ে পড়েছে ধুলোয়। সিঁথি ও কপালে সিঁদুর। চোখে জলের ধারা। তাকিয়ে আছেন শূন্য দৃষ্টিতে। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে দেবর। গম্ভীর, ম্লান ও ব্যথিত।
কোনো কথা নেই। দু’জনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপচাপ। আশ্রম পেছনের এই নিরালা প্রাঙ্গণটিও যেন একান্ত হয়েছিল তাঁদের সঙ্গে। গতকাল, দূর থেকে পোশাকের ঔজ্জ্বল্যে তাঁদের এই রূপটি আমার চাখে পড়েনি, মনেও আসেনি। শুধু ব্রজবালার কাছে শুনেছিলাম, বউটি কথা বলে না কারুর সঙ্গে। সে নির্বাক।
ইতিমধ্যে রোদ উঠতে আরম্ভ করেছে। আজ এই সোনার মতো সকালে সবাই মৃত্যুর বিনিময়ে যখন ছুটে চলেছে প্রাণের সঙ্গমে, তখন এই নিরালায় দাঁড়িয়ে তাঁরা দুজন।
তাঁদের পরিচয় জানি নে। জানি নে মন। মনে হলো, এই নিঃশব্দ আসরে বেদনার ও চোখের জলের একটি আবেগময় সুর বাজছিল। এই নিরালা অবসরেই মানুষ তার ব্যথা মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, ব্যথার গৌরবে পারে হাসতে কাঁদতে।
আমি অজান্তে এসে কেটে দিলাম সুর। ভেঙে দিলাম আসর। বৌদি চকিতে একবার আমাকে দেখে ঢুকে গেলেন তাঁবুতে। দেবর রইলেন দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত নতমস্তকে। তারপর ঢুকে গেলেন তিনিও।
আমার মুখ ধোয়া হলো না। কলে গিয়ে জলে হাত দিয়ে চলে এলাম তাড়াতাড়ি।
বাইরে বেরিয়ে আসতে ভিন্ন রূপ। কোনো কিছু ভাববার অবসর ছিল না। চোখ ও মন টেনে নিয়ে গেল আদিগন্ত বালুচরে। দিশাহারা করে দিল আমাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমুদ্র।
কোথায় যাব, কোন্ দিকে যাব তোরা চল গো চল। যে দিকে তাকাই, মানুষ। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ, অন্ধ খঞ্জ। এক বিরাট পাগলা বন্যার ঢল নেমেছে দক্ষিণে। দিগন্তবিস্তৃত মৌমাছিরা চাক ভেঙে যেন কোনো এক সংক্ষিপ্ত সরু পথে উড়ে চলেছে। সেই সরু পথ দক্ষিণে। গঙ্গার এপার ওপারের ছুটে-চলা মানুষ যেন কোন এক নিয়মের বশবর্তী হয়ে চারদিক থেকে এসে এক জায়গায় অগ্রসর হচ্ছে।
দক্ষিণে অগ্রসর হওয়া সম্ভব বোধ হলো না। পুল পেরিয়ে চলে এলাম প্যারেড গ্রাউণ্ডে, বাঁধের নিচে।
সবাই ছুটে চলেছে সঙ্গমের দিকে। দল বেঁধে যাওয়া-আসার পথের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। দাঁড়িয়ে থেকে পরিচালনা করছে উদ্ব্যস্ত ভলান্টিয়ার বাহিনী। দিকে দিকে কর্ণবিদারী তাদের হুইসেলের তীক্ষ্ণ ধ্বনি। ঘন ঘন বিপদ সঙ্কেতে বাজছে বাঁশি।
ধাক্কা খেয়ে সরে গেলাম অনেকখানি। দাঁড়াবার উপায় নেই। সঙ্গমের ঢালুতে বন্যা উদ্দাম হয়ে উঠেছে। মাইক বাজছে বিউগল সঙ্কেত করছে, বয়-স্কাউটবাহিনী করছে কুচকাওয়াজ। প্রধানমন্ত্রী শ্রী জহরলাল নেহরু আসবেন। বাঙলাদেশের কল্যাণী কংগ্রেসের পথে দেখে যাবেন একবার।
বাঁধের উপর উঠছে সারবন্দী হাতির দল। গায়ে তাদের রাজকীয় জরি-মখমলের ঢাকনা। সওয়ার ছাই-মাখা সাধু। সেদিকে ছুটে চলেছে একদল মেয়ে। অবাক হয়ে ভাবলাম, কেন? এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, মেয়েরা দৌড়চ্ছে, আর চেঁচাচ্ছে, ‘হে ভগবান, হে বাবা, থোরা ঠায়রো, ঠায়রো!’
কিন্তু ঘণ্টা দুলিয়ে বাজিয়ে হস্তিবাহিনী উঠে চলেছে। তার মধ্যে একটি মেয়ে ছুটে গিয়ে হাতির গায়ে হাত দিল। হাসিতে আনন্দে অধৈর্য হয়ে কপালে হাত ছোঁয়াবার আগেই, হাতির পেছনের পায়ের লাথিতে সে ছিটকে পড়লো অনেক দূরে।
তবুও, তবুও আবার ছুটল। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, ওরা হাতির পেছনে কেন?’
শুনলাম, হাতি স্পর্শ করে প্রণাম করবে। সে-ই হবে তার পুণ্য। ধন্যি পুণ্য তোরা চল গো চল। প্রাণে ভয়ও কি নেই?
অকস্মাৎ, ‘হট যাও, হট যাও’ শব্দে চমকিত হয়ে সরে দাঁড়াতেই দেখলাম, একদল মানুষ ছুটে আসছে। দলের সামনে ছিন্নভিন্ন ধুলোমাখা আলখাল্লা জড়ানো একদল মানুষ। কিন্তু মানুষ বলে আর তাদের চেনা যায় না। ধূলিমাখা চুল-দাড়িতে ঢাকা পড়ে গিয়েছে তাদের সারা মুখ। পা-গুলি ফুলে ফেটে রক্ত ঝরছে। কাঁধে বড় বড় ঝুলি। তারা দ্রুত পায়ে চলেছে।
তাদের পেছনে পেছনে ছুটছে মেয়ে-পুরুষের দল। আছড়ে পড়ছে তাদের পায়ের তলায়। চিৎকার করে উঠছে, ‘দেয়া কর বাবা, দেয়া কর!’ লুটিয়ে পড়ছে সুবেশ পুরুষ, মহামূল্য অলংকার ও শাড়ি-শোভিতা নারী।
কিন্তু আলখাল্লাবাহিনী নির্দয়। তারা থামতে জানে না।
মানুষ ছুটে ছুটে খাবার ও পয়সা পুরে দিচ্ছে তাদের ঝুলিতে।
একটি অল্পবয়স্কা নবীনা ঘোমটাউলী দু-হাত আড়াল করে দাঁড়ালো একজন আলখাল্লাধারীর সামনে। থামতে হলো আলখাল্লাধারীকে। কিন্তু সৈনিকের লেফ্ট-রাইটের মতো ওঠাপড়া করতে লাগলো তার পা। চুলে ঢাকা চোখে তার ক্রোধ নেই। ব্যস্ততা ও ব্যাকুলতা, মিনতি ও প্রার্থনা।
ঘোমটাউলী সুদৃশ্য রুমাল খুলে কয়েকটা টাকার নোট পুরে দিল তার ঝুলিতে। দিয়ে হাত পাতল।
আলখাল্লাধারী তার আলখাল্লায় খামচা দিয়ে এক চিলতে ন্যাকড়া ছিঁড়ে নিয়ে গুঁজে দিল তার হাতে। দিয়ে, ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে আবার বেরিয়ে গেল।
‘মিল গয়া, মিল গয়া!’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো অনেকে। কিছুই বুঝলাম না। কারা এরা, কী ব্যাপার! জিজ্ঞেস করলাম একজনকে।
সে বললো, ‘ওরা মহাপুরুষ। ওরা এ জীবনে কোনোদিন থামবে না। ওরা ওদের সাধনার প্রথম দিন থেকে ছুটে চলেছে। জীবনভর ছুটবে। এই ওদের সাধনা!’ আশ্চর্য! মানুষের জীবনধারণেই বা তা কী করে সম্ভব, কিন্তু বিতর্ক অনাবশ্যক। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী নাম ওদের?’
সে বললো, ‘জানি নে।’
সালঙ্কারা ঘোমটাউলী আনন্দে খুশিতে হাসতে হাসতে চলেছে তার পরিজনদের সঙ্গে। ওই এক চিলতে ন্যাকড়ার আনন্দ!
আবার ধাক্কা। সরে যাও, ঢল নেমেছে। হা হা করে ছুটে আসছে নরনারী। গতি সঙ্গমের দিকে। সে কি শুধু গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গম! নাকি, বিচিত্র মানুষ সেখানে সঙ্গম তৈরি করেছে সহস্র স্রোতের মিলিত মোহানায়।
স্রোতের টানে ভেসে গেলাম। একদল মেয়ে হাসছে, গান করছে, ঠেলে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। দেখলাম, সকলেই গৈরিকবসনা। যুবতীর সংখ্যা বেশি, প্রৌঢ়া কয়েকজন। যেন দু’টি দল। একদল মেয়ে, ফর্সা লাল টুকটুকে, বোঁচা নাক, টেপা ঠোঁট, খুদে চোখ। খাটো গড়ন। বাকিরা সকেলই আর দশজনের মতো। কটা কটা চুল এলিয়ে, হাসি-খুশি খেলায় তারা বনবালার মতো উদ্দাম হয়ে চলেছে। কারুর কারুর মস্তক মুণ্ডিত। চোখাচোখি হলেই চোখে-মুখে ঝলকে ওঠে হাসি। মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করে ফেললাম একজনকে, ‘আপনারা কোত্থেকে আসছেন?’
শর্বনাশ! এ যে সেই শ্যামাদের দলের মতো কথার পৃষ্ঠে কেবলি হাসি। হেসে একজন বললো, ‘আমরা হরিদ্বার থেকে আসছি। তুমি? ‘
বললাম, ‘বাঙলাদেশ।’
‘কোলকাতা?’
আবার হাসি। জনতাও কৌতূহলিত হয়ে তাকালো এদিকে। এক গৈরিকবসনা বললেন, ‘আমরা অবধূতানী। আমাদের আশ্রম আছে হরিদ্বারে।’
অবধূতানী! মনে পড়লো সেই গৃহাবধূতের কথা। মনে পড়লো তার অবধূতানীর হাসিখুশি মূর্তিখানি। কিন্তু এরা কার অবধুতানী?
এগিয়ে চল, এগিয়ে চল। পথের দু’পাশে ভিক্ষুকের ভিড়। সুস্থ, অসুস্থ, খঞ্জ, বিকলাঙ্গ, অন্ধ। তাদের সামনে বিছানো ময়লা কাপড়ে ডাল চাল ফুল পয়সার ছড়াছড়ি। এরই মধ্যে সাপুড়ে বসে গিয়েছে সাপ নিয়ে। ময়াল ছেড়ে দিয়ে বসেছে ওষধি লতাপাতা ছড়িয়ে। তাদের চিৎকারে কান পাতা দায়।
হটযোগীরা আরম্ভ করেছে যোগ দেখাতে। মাটির তলায় মাথা দিয়ে ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছে পা। কেউ চিৎ হয়ে, খালি গায়ে শুয়ে আছে কণ্টকশয্যায়।
এক জায়গায় দাঁড়াতে হলো। বছর দশেকের একটি ছেলে, ছাই মেখে শুয়ে আছে কাঁটার বিছানায়। মুখ হাঁ করে রয়েছে। জিভে ফোঁড়ানো লম্বা একটি তীক্ষ্ণ সরু ত্রিশূল। তার লাল চোখ বেয়ে জল পড়ছে। কাঁপছে থর থর করে।
বিস্ময়ে ব্যথায় চমকে উঠলাম! এইটুকু ছেলেকে দিয়ে কেন এ ভয়াবহ ধৰ্মলীলা! এ মহামেলায় এমন করুণ দৃশ্যের অবতারণা কেন?
পরমুহূর্তেই মনে হলো, শুধু কি ধর্ম? প্রাণের এ যন্ত্রণার মধ্যে কি ওর কোন সাধনা নেই? বাঙলা দেশে কত ছেলে পথে পথে, বাজারে ট্রেনে এমনি ভয়ংকর সাধনায় ব্যস্ত। সেই সাধনা তাদের পেটের। তাদের বাঁচবার সাধনা।
আমার ব্যথার দৃষ্টিদানে ওর থলি ভরবে না। এই নিদারুণ যন্ত্রণাতেও দেখছি, ওর ব্যাকুল নজর রয়েছে সামনে বিছানো কাপড়ের দিকে। ওর সাধনার ডালি ভরে উঠেছে কিনা, তাই। মেয়েরা ঘিরে রয়েছে ওর চারদিক থেকে। করুণার বিচিত্র শব্দ শোনা যাচ্ছে তাদের মুখে।
থাক করুণা। যা দিয়ে ও মানুষের দৃষ্টিকে খোঁচা দিয়েছে, ওর সেই প্রাপ্য মিটিয়ে এগিয়ে গেলাম।
জলের ধারে এসে সে এক ভয়ংকর ব্যাপার! ধারের কাছে পাঁক হয়ে উঠেছে জল। আর পাঁকের মধ্যে ক্ষিপ্ত মোষের মতো ঠেলাঠেলি করছে মানুষ। মেয়ে আর পুরুষ। বৃদ্ধ ও শিশু। ওদিকে সঙ্গমের বুক জুড়ে নৌকার ভিড়। দড়ির সীমারেখা দিয়েছে বেঁধে যমুনার কোলে। প্রতি মুহূর্তে সেখানে বাজছে ভলান্টিয়ারের হুইসল্, উড়ছে পতাকা। ওইটি হলো ডেঞ্জার জোন। নীল জলের প্রাণ-ভোলানো হাসির ঢেউয়ের তলায় চিরমৃত্যু রয়েছে তার পাকে পাকে, চোরা বালুতে। ওই যমুনার জলে যে মরেছে, সে আর কবে উঠেছে!
ঠেলাঠেলি করছে, তবু উল্লাসের অন্ত নেই! এ ওকে চান করাচ্ছে, ও একে বুকে, করে নিয়ে চলেছে জলে।
‘মহারাজ, মহারাজ’, বলে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল এক বুড়ো। বললাম, ‘কী করব?’
সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল জলের কিনারে। তারপর আমার হাতখানি ধরেই জলে কাদায় মাখামাখি করে উঠে এলো। কী হাসি! ফোকলা দাঁতে এক গাল হেসে কাদা হাতখানি ঠেকিয়ে দিল মাথায়, ‘জীতা রহো বাবা। পানিমে বহুত ডর, সাঁতার নহি জানতো।’
তাই ভালো। আমাকে ধরে সে চান করে নিল। দুঃখের মধ্যে কাদা লাগলো জামা-কাপড়ে।
এখানে লজ্জার অবকাশ নেই। কারুর কাপড় খুলে গিয়েছে, কেউ নিজেই রেখেছে খুলে। কেউ অন্তর্বাসটুকুও পরিত্যাগ করেছে। জামাটি অদৃশ্য হয়েছে গায়ের থেকে। সবই ঠিক। তার পাঞ্জাবী মহিলারা এদিকে যেন বড় উদাসীন। একে তো অধিকাংশই সাঁতার জানেন না। কিন্তু নির্বিকারভাবে তারা কেমন করে শালোয়ার-পাঞ্জাবি খুলছেন। কেমন করে এত লোকের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন দেহে হাসতে হাসতে জলে নেমে আসছেন, জানি নে। হয়তো ওঁদের দ্বারাই সম্ভব এমনি মরালীর মতো জলখেলা।
দেখলাম, একজন মাঝি হাঁকছে, দো দো আনা আসুন। বেশ বড় নৌকা। অনেকে উঠছে। সঙ্গমের মাঝখানের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলাম না। উঠে পড়লাম মাঝির হাত ধরে। পাশে রয়েছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। ঐ নৌকার গলুই সেই বাঙলা দেশের মতো। অল্পতেই ডিঙা টলমল নাচে। অথচ ছোট ছোট ডিঙাতে পাতা রয়েছে গদীমোড়া বেঞি। মাথায় ঢাকনা। কিন্তু এ বড় নৌকাতে ছই বেঞ্চি কিছুই নেই।
আমাদের নৌকা ভরে উঠলো। তবু মাঝি ছাড়ে না। সবাই তাড়া দিল। মাঝির দায় কাঁদছে। সে তখনো হাঁকছে, সঙ্গমে নাইবে এসো, দু-আনা, দু-আনা।
তারপর যখন নৌকা ডুবু-ডুবু হলো, তখন ছাড়ল। মাঝি খেলা জুড়ল ভালো। একি ভয়াবহ নৌকাবিলাস, আমাদের মতো নিতান্ত বেরসিক নরনারী নিয়ে! শুধু হাসির অন্ত নেই কয়েকটি আধুনিক গরম স্যুট-পরা পাঞ্জাবী যুবক ও যুবতীর। অথচ ভয় তাদেরও বেশি। সাঁতার জানে না। আসলে হাসিটাই ভয়ের। নৌকা যত টলমল করে, ততই তারা ভয়ের হাসি দিয়ে জাপটাজাপটি করছে নিজেদের মধ্যে। পুণ্যস্নানের সাত সকালে, চোখে-মুখে মেয়েদের প্রসাধনের পলেস্তারা পড়েছে। জামাকাপড়গুলিও জলে নামার মতো নয়। বাদবাকি সবাই জড়োসড়ো, উদ্ব্যস্ত। একটি বাঙালি পরিবারও উঠেছে দেখছি। তিনটি প্রৌঢ়া আর দুই যুবক। অলেস্টারের কলারে আর মাথায় জড়ানো তোয়ালে। এদিকে আবার ঘাড়ে ক্যামেরা।
কুল্যে প্রায় জনা ত্রিশের উপর নরনারী ভিড় করেছে উন্মুক্ত পাটাতনের উপর। ঘাড়ে মাথায়, বুকে মুখে, কাঁধে কোলে পিঠে। তার মধ্যে মনে হলো দু’টি কিশোরী, একটি কয়েকমাসের শিশুকে নিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পোশাকে চাকচিক্য নেই, কিন্তু অলঙ্কারের বাহুল্য দেখছি খুব। হাতে গলায় কানে সোনা প্রায় অপর্যাপ্ত। তা ছাড়াও একজনের হাতে দেখছি রাশিখানেক বেলোয়ারি চুড়ি। কিন্তু শিশুটিকে এনেছে কেন, বুঝতে পারলাম না।
ডাঙায় জনারণ্য, জলে নৌকারণ্য। দাঁড়ে দাঁড়ে, বৈঠায় বৈঠায়, হালে ঠোকাঠুকি। গলুয়ে গলুয়ে ধাক্কাধাক্কি। মাঝিতে মাঝিতে বিবাদ। হটাও, পাশ দাও। শুধু নৌকার ভিড় নয়, জলের মধ্যে ভিড় মানুষের। কোমরজলে, বুকজলে ডুব আর দারুণ শীতের হিহিক্কার। তার ওপরে নৌকার ধাক্কা। ডুবন্ত অবস্থায় একবার চাপলে আর রক্ষে নেই।
মাঝি বললো, ‘এখানেই নেমে পড় সব।’
প্রতিবাদের প্রচণ্ড কলরব উঠলো। নৌকাই যখন ভাড়া হলো, এত শীঘ্র কেন? মাঝি বললে কী হবে! কেউই নামে না। আরো চল, আরো চল।
চারপাশের নৌকাগুলিতে ঝড় লেগেছে। স্নানের ঝড়। কেউ নৌকা ধরে, কেউ হাত ধরে স্নান করছে। হাসিতে, কান্নায়, কলহে চিৎকারে মুখরিত সঙ্গম।
জলের উপর ভাসছে ফুল বেলপাতা। ঘোলা নীলজলে কোথাও সিঁদুরের গুঁড়ো। কিন্তু আশ্চর্য! এই ঘোলাজলের বুকেও দেখছি, দু’টি রঙের ধারা চলেছে পাশাপাশি। বর্ষা নয়, গঙ্গা তার স্বভাব-গৈরিক বেশ ধারণ করে নি। তার নিরন্তর দক্ষিণাভিমুখী জলের ধারা এখন টলটলে। যত এগিয়ে চলেছে, ততই ঘোলা জল ছাড়িয়ে পরিচ্ছন্ন জলের ধারা দেখা দিচ্ছে।
পাশাপাশি চলেছে যমুনা-গঙ্গা। সাদা নীল দুই ধারা। একজন উত্তর থেকে দক্ষিণে, দৃকপাতহীনা। আর-একজন পশ্চিম থেকে বাঁক নিয়ে দক্ষিণে। সে শুধু বাঁক নয়। বাঁকা তার স্বভাব। একজন রাগে অনুরাগে, যুগান্তের বিরহের বেদনার রঙে নীল। আর একজন সব পাওয়ার আনন্দে বৈরাগ্য-উদাসীন গৈরিক-বসনা। একজন হাসে খিলখিল করে, আর-একজন খলখল হাসিতে উন্মাদিনী। তবুও দু’জনে পাশাপাশি, একই প্রেমের টানে তারা দিগন্তে চলেছে ছুটে। সরস্বতী কোথায়? শুনেছি তিনি গুপ্ত আছেন।
আর নয়। নৌকা থামল। হাওয়া আরো বেশি, ঢেউয়ে দুলছে নৌকা। কিন্তু জল সেই বুক সমান। তার বাইরে চারিদিকে দড়ির বেড়ার পাহারা।
নৌকার পাশে নৌকা। তারই মাঝে প্রাণ হাতে করে স্নান। দুই নৌকার মাঝখানে পেশাই হয়ে মরে গেলেও কেউ রক্ষা করার নেই।
জামাকাপড় ছাড়ার পালা শুরু হলো। ছি ছি, মনে মনে বলি, হে মন! চোখ বন্ধ কর। পাঞ্জাবী মহিলাদের জামা খোলার কাহিনী আর বলবো না ফাঁপিয়ে ফুলিয়ে। কিন্তু তারা নামবেন কী করে? মাঝি বেচারির অবস্থা কাহিল। সবাই তাকে ধরে ডুবে ডুবে পুণ্যিটুকু সঞ্চয় করতে চায়। যৌবন-উচ্ছল হাসি-ছলছল, অর্ধনগ্ন পাঞ্জাবী মহিলাদের পাল্লায় পড়ে, ফোকলা দেঁতো মাঝি হাসিতে বিরক্তিতে ‘হায় রাম হায় রাম’ করে অস্থির। কিন্তু জলে যদি নামা হলো, উঠবার নাম নেই। ধন্য! শীতও কি নেই?
সকলেই জামাকাপড় ছাড়ে, আর চায় আমার দিকে। ভাবটা, কে গো মিনসে? জামাকাপড় খোলে না কেন?
হঠাৎ চমকে উঠলাম চাপা কান্নার ফোঁপানিতে। কে কাঁদে এখানে? সেই দুইজন! যাদের মনে করেছিলাম কিশোরী। সেই তাদের একজন, কোলে যার কয়েকমাসের শিশু।
আর একজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, হাতে যার বেলোয়ারি চুড়ি, ‘রহো, মতো রো। বলছে, কিন্তু চোখে তার ব্যথার ছায়া। মেঘভারাক্রান্ত সেই চোখে জল নামবে যেন এখুনি, কিছুটা বা লজ্জা! লজ্জাটুক লোকের জন্য। কিন্তু লোকের নজর তার দিকে ছিল না। সকলে ডুবে ডুবে পুণ্য-সয়ে মত্ত।
তারা কিশোরী নয়, তরুণী। কিশোরীর ছাপ রয়েছে তাদের মুখে। কিন্তু যখন সবাই হাসিতে, কাঁপুনিতে, স্নানে, কোলাহলে মাতিয়ে তুলেছে সঙ্গম, তখন তারা দু’টিতে কেন পাশাপাশি বসে চোখের জল ফেলছে।
তারা দু’জনে পুঁটুলি খুলল। পুঁটিলির মধ্যে জামাকাপড়। উপরের জামাকাপড়টি দেখে মনে হলো, সাদা মুগার। সকালের রোদের ঝিকিমিকি লেগেছে তাতে। আরও দু’টি বস্তু রয়েছে সেই কাপড়ের উপরেই। দু’টি সোনার বালা।
গরম-জামা-পরানো শিশুটিকে ভেজা পাটাতনের উপরে শুইয়ে দিল। শুইয়ে দিতেই শিশুটি শুরু করলো পরিত্রাহী চিৎকার। কেন জানি নে, মন ব্যস্ত হয়ে উঠলো, কুঁকড়ে রয়েছি। শিশুর এই অসহ্য পীড়ন যেন লাগলো শরীরের প্রতিটি রোমকূপে।
কিন্তু সে-কান্নায় কান দিল না তারা। যে কাঁদছিল, তাকে ধরে দাঁড় করাল আর-একজন। সে দাঁড়াল, কিন্তু সঙ্গিনীর বুকে মুখ রেখে ভেঙে পড়লো উচ্ছ্বসিত কান্নায়। বাতাসে খসে গিয়েছে তার ঘোমটা, উড়ছে রুক্ষ চুলের গোছা। এবার তার সঙ্গিনীও ফুঁপিয়ে উঠে বললো, ‘কাঁদিস নে শিবপিয়ানী, বোন আমার কাঁদিস নে।’
কিন্তু আশ্চর্য! তাদের সঙ্গে নেই কোনো পুরুষ সঙ্গী। এ নৌকায় কোনো মানুষের নজর নেই সেদিকে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। বুঝলাম, সবাই ভাসছে নিজ নিজ হৃদয়াবেগে। সেই তিন বাঙালি প্রৌঢ়ার একজন কাঁদছে জলে দাঁড়িয়ে। ডুব দিয়ে উঠেছে, কাঁপছে শীতে ঠকঠক করে, তবু জলের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে আর ফিসফিস করে বলছে অনেক কথা।
এদিকে শিশুটি, কান্নার আবেগে, নিজের দু’টি পা ধরেছে মুঠি করে, ঢুকিয়ে দিচ্ছে প্রায় নিজেরই মুখে। তারপরেই হঠাৎ কাত হয়ে, উপুড় হয়ে পড়ার মুহূর্তে হাত দিয়ে ধরে ফেললাম। ধরে তুলে নিলাম কোলের উপর
মেয়ে দু’টি অবাক হয়ে তাকালো চোখের জল নিয়ে। তারপর কৃতজ্ঞতা দেখা দিল। এমনকি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একটু যেন হাসলো।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘এমন করে ফেলে রেখেছ কেন ওকে?’
শিবপিয়ানীর সঙ্গিনী বললো, ‘আমরা স্নান করব।’
‘কী স্নান! ভেজা পাটাতনের উপর শিশুকে রেখে পুণ্য করতে নামছে দু’টিতে। নৌকার ভিড়ের চাপেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘বাচ্চাটাকে কেন?’
সঙ্গিনী বললো, ‘ও চান করবে।’
চান? পৃথিবীতে আসতে না আসতে পুণ্যস্নান? জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওকে কেন? তোমরা করলে হত না?’
দুঃখ থাক, বেদনা থাকো, এমন করে কথা শুরুতে তারা দু’জনেই কিছুটা বিব্ৰত, সঙ্কুচিত। একটু চুপ করে থেকে সঙ্গিনী বললো, ‘ওর বাবা নেই, ওকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে, না চান করলে চলবে কেন?’
বলতে বলতেই দেখলাম, সঙ্গিনীর শিবপিয়ানী আবার ব্যাকুল হলো কেঁদে। তারপর দু’টিতে নৌকার ধারে গেল। সঙ্গিনী বললো, ‘ওর মাকে একটু চান করিয়ে দিই। তুমি—’
বাদবাকি চাউনিতেই প্রকাশিত। ‘তুমি বাচ্চাটাকে দেখো।’
ওরা নেমে গেল জলে। ডুব দিল। আর উত্তর প্রদেশের এই দুরন্ত পিতৃহীন শিশু এক অপরিচিত বাঙালির কোলটি কচি কচি পায়ে আছড়ে ঠেলে, শূন্যে হাত তুলে লালা উদ্গীরণ করে মাতিয়ে তুলল। বুঝলাম, যুবতী শিবপিয়ানী বিধবা। এই শিশুর মা।
শিশু মানুষ চেনে না বুঝি এখনো। মানুষের উম্বু কোলটি বুঝেছে। কোলটি পেয়েছে, অমনি চারদিকে আলো ও শব্দের মাঝে তার বিচিত্র জগতে গিয়েছে হারিয়ে।
সকলের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলাম, পুণ্যস্নান দেখবো বলে। কোথা থেকে এসে বুক জুড়ে বসলো এক শিশু। তার পরিচয় জানি নে। কেমন ছিল তার বাপ, কে জানে! ওর ওই মায়ের দেহে অকঙ্কার দেখে অনুমান করতে পারি নি, সে বিধবা। জানি নে, অলঙ্কারের পেছনে কতখানি নিরাপত্তার খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে এই শিশুর জন্য। পিতৃহীনতা বোঝে না, পুণ্য বোঝে না। এই সঙ্গমের বুকে এক বিচিত্র মানুষ, ও এসেছে ওর পরমায়ুর সন্ধানে, এই অমৃতকুম্ভের সঙ্গমে। ওর এই পরমায়ুর সন্ধান পীড়ন মাত্র। পীড়নের পেছনে আছে কুসংস্কার। কিন্তু ওর মায়ের সারা বুক জুড়ে রয়েছে ও। প্রাণের আকাঙ্খার মর্যাদাই এখানে বড়। কুসংস্কার তো, সমাজের অভিশাপ।
ওর বাবা নেই, সেজন্য যতটুকু ব্যথা, ওর বুকজোড়া দাপাদাপি সেই পরিমাণেই উল্লাসের ধ্বনি হয়ে বাজল বুকে। এক সঙ্গীকে হারিয়েছিলাম পথে আসতে। সে আসছিল তার ব্যাধিমুক্তি ও আয়ু সন্ধানের জন্য। আমরা একজন মরি, আর একজন জন্মাই। দিবানিশি এই যাওয়া-আসার মধ্যে আমরা নতুন থেকে নতুনতর। একজনের আকাঙ্ক্ষা পুরাই আর-একজন। একজন পথের শেষে, শুরু করি আর একজন। সেইজন্য আমরা মানুষ, আমরা বন্ধু!
একজন বিড়ম্বিত জীবনের প্রচণ্ড করালরোগ নিয়ে চলে গিয়েছে, আর-একজনকে আলিঙ্গন করছি। ওকে পথে পেলাম, পথেই ছেড়ে দিয়ে যাব। ও বেঁচে থাকুক, পথের এই কামনা নিয়ে ঘরে ফিরে যাব।
শিবপিয়ানী উঠেছে, কাপড় ছেড়েছে। কথায় বুঝলাম, তারা দুই জা। বাড়ি এলাহাবাদ শহরেই।
নতুন কাপড় পরে শিবপিয়ানী পুঁটলি থেকে ফুল বেলপাতা গোছাতে গোছাতে বার বার গুপ্ত কটাক্ষে দেখলো শিশুকে। তার ঘোমটা তুলে হাত বাড়িয়ে বললো, ‘দাও।’
তুলে দিলাম। দু’জনে মিলে শিশুর জামা খুলে, আবার শুইয়ে দিল পাটাতনে। দিয়ে, অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে ছিটিয়ে নাইয়ে দিল তাকে। আর-এক দফা চিলকণ্ঠের চেঁচানি ছাপিয়ে উঠলো। লক্ষ লক্ষ গলার চিৎকার। জামা পরিয়ে তার হাতে পরিয়ে দিল সোনার বালা। তারপর ওকে আবার শোয়াতে গিয়ে অসঙ্কোচে তুলে দিল আমার কোলে।
দিয়ে নিজেরা ফুল বেলপাতা সিঁদুর দিল জলে। হঠাৎ কী হলো জানি নে। শিবপিয়ানীর হাত চেপে ধরল তার জা। কিন্তু শিবপিয়ানী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের হাত থেকে দু’টি সোনার চুড়ি খুলে ফেলে দিল জলে।
শুধু তার জা ম্লান হেসে বললো, ‘পাগলী।’
কিন্তু বাধা দিলেও আক্ষেপ নেই তার আর। এবার আমার দিকে ফিরে একটু হাসলো শিবপিয়ানী। হেসে, দেখলো নিজের ছেলেকে। এবার আর নিজে না বলে, সঙ্গিনী জাকে বললো, ‘ওকে আমার কোলে দাও।
বুঝে, আমি নিজেই শিশুটিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে দিলাম। মাঝি হাঁক দিল, ‘ওঠো ওঠো! আমাকে আবার খেপ দিতে হবে।’ এখনো অনেকেই জলে। শিখ গৃহিণীদের দেখছি এখনো ওঠবার কোনো আগ্রহ নেই। স্বয়ং শিখ পুরুষেরাও নেমেছে
হঠাৎ ওভারকোটে টান পড়তে পেছনে ফিরলাম। দেখি, আলুলায়িত সিক্ত কেশ ও শশু উৎফুল্ল শিখ একজন। চোখে তার রীতিমতো দুষ্টামির হাসি। বলে, ‘আরে ভাই, তুমি, জলে নামছ না কেন?’
সর্বনাশ! জলে নামব কি এইসব জামাকাপড় পরে! বললাম, ‘বিমার হ্যায়।’
যতক্ষণ তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, ততক্ষণে জলের ছিটায় ভিজে উঠেছে আমার ওভারকোট। একলা নয়, সঙ্গিনীসহ হাসিতে চিৎকারের ভয়াবহ জলকেলিতে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। হেসে বললো, ‘আরে ভাই, থোড়া তো লাগাও।’
লাগাব কি! ঠাণ্ডা জলের কয়েকটি ধারা তখন শরীরটাকে কেটে কেটে নিচে নামছে। সকলেই হেসে উঠলো।
মাঝিটাও হাসতে গিয়ে যেন কেঁদে উঠলো। বললো, ‘নৌকা ছেড়ে দেব কিন্তু।’
আবার নৌকার ভিড় ও মানুষের মাথা ঠেলে ফিরে আসা।
পাড়ে এসে, ভিড়ের মধ্যে দেখলাম খনপিসি। প্রায় বিপুলকায় পুরুষের মূর্তি ধরেছে। মাথাটি একেবারে নিরঙ্কুশ মুণ্ডিত। কী কাণ্ড! প্রহ্লাদ, দি’মাও দেখছি ন্যাড়া মাথা।
তখনো নৌকা থেকে নামা হয় নি। প্রহ্লাদ দেখে ফেললো। বললো, ‘এই যে দাদা, বেশ হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন। মাথা মুড়োবেন না?’
হেসে বললাম, ‘না।’
প্রহ্লাদ বললো, ‘কেন? পাপ করেন নি কোনদিন?’
জবাব দিতে গিয়ে হেসে ফেললাম। প্রহ্লাদ বললো, ‘করেছেন নিশ্চয়ই। মুখ দেখেই মনে হচ্ছে। জানেন না।’
‘প্রয়াগে মুড়ায়ে মাথা,
মরগে’ পাপী যথা তথা।
‘মুড়িয়ে নিন, তারপর আবার পাপ করবেন, কিছু হবে না, আগের পাপটা তো কাটান।’
খনপিসি খ্যাঁক করে উঠলো, ‘ছি ছি ছি, কী অনাচ্ছিষ্টির কথা। সঙ্গমে দাঁড়িয়েও মুখের রাখ-ঢাক নেই?’
প্রহ্লাদ অন্যদিকে ফিরে বললো, ‘আর রাখ-ঢাক! শালা এখনো সকাল থেকে দু-হাত এক হলো না, সঙ্গম দেখাচ্ছে!
দু’হাত এক হওয়া মানে, দু’হাতে কলকে ধরা। ভাগ্যি কথাটা খনপিসির কানে যায়নি! ব্রজবালা জলে নেমে কাঁপছে ঠকঠক করে। চকিতে একবার আমাকে দেখলো, তারপর আবার ঘোমটার আড়াল।
আমাদের নৌকা পাড়ে ঠেকলো প্রায় খনপিসি-বাহিনীকে ভেদ করে।
নৌকা থেকে সবাইকে হাত ধরে ধরে নামাল মাঝি। শিবপিয়ানী আর তার জা নেমে দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়িয়ে ছিল বলতে পারি নে। ভয়াবহ ভিড়ের ঝড়ে খাড়া হয়ে ছিল কোনোরকমে।
আমি নেমে আসতে শিপিয়ানীর জা বললো, ‘যাচ্ছি।’
বললাম, ‘আচ্ছা।’
শিবপিয়ানী তার কোলের ছেলেকে ঝাঁকানি দিয়ে বললো, ‘বল্ যাচ্ছি!’ আচমকা ঝাঁকানি খেয়ে শিশু একটু অবাক হয়ে থমকে রইলো। পরমুহূর্তে হাত-পা আস্ফালন করে কয়েকটি দুর্বোধ্য শব্দ করে উঠলো তার মাড়ি দেখিয়ে। শিবপিয়ানী ঘোমটার আড়াল দিয়ে একটি হাসিচকিত কটাক্ষে যেন বলে দিল, ‘দেখলে তো, কেমন বলতে পারে?’ তারপর শিশুকে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল তারা।
একটি নিশ্বাস ফেলে আবার ফিরে দেখতে গেলাম খনপিসি-বাহিনীর দিকে। কিন্তু ও কে? খনপিসির পাশে? সর্বনাশ! সর্বনাশী স্বয়ং! আমারই বুকের মধ্যে কেঁপে উঠলো। না জানি কী দুর্ঘটনা ঘটে যাবে চক্ষের পলকে! কিন্তু কী আশ্চর্য। এত কাছে, প্রায় গায়ে গায়ে, তবু পিসির চোখে একবারও পড়ছে না সর্বনাশী।
আর এ কী বিচিত্র রূপ সর্বনাশীর! এ বিচিত্র বেশ তার কাপড়ে নয়, জামায় নয়, সিঁদুরে। তার সিঁথি-ভরানো সিঁদুরে, তার কপাল-লেপা সিঁদুরে। কপাল ও সিঁথির মেটে সিঁদুরে মাখামাখি হয়েছে সারা মুখ। জলে ভেজা জামাকাপড়। তার বক্ষলগ্ন এক পুরুষ। কালো রোগা ক্ষীণজীবী পুরুষটির গলায় একরাশ মাদুলি। বহুদিনের না কাটানো একমাথা ধূলিরুক্ষ জটের মতো চুল। শীতে কাঁপছে থরথর করে। দু-হাতে আঁকড়ে ধরে আছে সর্বনাশীর বুক ও পিঠ। অসহায় জীবের মতো তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে।
সর্বনাশীর চঞ্চল চোখে কোথায় সেই দুরন্ত কটাক্ষ, কণ্ঠে সেই সেয়ানা পাখির ডাক? গম্ভীর মুখে তার বিষন্ন স্নেহজড়িত হাসি। স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে বক্ষলগ্ন পুরুষটিকে। কী যেন বলছে তাকে আর অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে ঢেলে দিচ্ছে তার মাথায়। পুরুষটি মাথা পেতে জল নিচ্ছে আর শিশুর মতো হেসে উঠছে।
হঠাৎ একটু ধাক্কা লাগলো খনপিসির গায়ে। মুণ্ডিতমস্তক খনপিসি তখন কোমরজলে দাঁড়িয়ে আহ্নিক সেরে নিচ্ছে। বিরক্ত চোখে ফিরে তাকাল। বুঝলাম, এখুনি লাগবে, পিট্রান দিই তার আগেই। কিন্তু অবাক কাণ্ড! খনপিসির বিরক্ত মুখে দেখি হাসির আলো। মুণ্ডিতমস্তক, প্রকাণ্ড মুখে সে-হাসি যে কতখানি বিচিত্র, না-দেখলে বুঝি বোঝা যায় না। কিন্তু কেন? খনপিসি কি সর্বনাশী মেয়েটিকে চিনতে পারল না? পরিবেশে ও কাজের গুণে মানুষের চেহারাও কি বদলে যায়?
তাই। তাই যায়। জানি নে, কেমন করে চিনতে পারলাম সর্বনাশীকে। কিন্তু খনপিসি স্থূল ঠোঁট দু’টি বিস্ফারিত করে জিজ্ঞেস করলো, ‘কে বাছা এটি? তোমার স্বামী?’
সর্বনাশী জবাব দিল ঘাড় নেড়ে, ‘হ্যাঁ।’
বেদনার ছায়া ঘনিয়ে এলো পিসির চোখে। বললো, ‘আহা, ব্যামোয় ভুগছে বুঝি অনেকদিন থেকে?
সর্বনাশীর চোখেও ঘনিয়ে এলো তেমনি ছায়া। বললো, ‘হ্যাঁ, অনেকদিন।’
খনপিসি ব্যথা কাতর চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে দেখলো পুরুষটিকে। ছলছলিয়ে উঠলো চোখ। একটি উদ্ধৃত নিশ্বাসের মধ্যে পরম আশ্বাসের সুরে বলে উঠলো, ‘ভালো হয়ে যাবে মা, আমি বলছি। এত কষ্ট করে সঙ্গমে নিয়ে এসেছ, কে নেবে ওর পেরমায়ু! তোমার শাঁখা সিঁদুর অক্ষয় হোক, চির-আয়ুষ্মতি হও।’
বলে, আকাশের দিকে মুখ তুলে নমস্কার করলো খনপিসি। জানি নে, এই বাঙলা কথার আশীর্বাদের কী বুঝল ওই বিদেশিনী! সে তার বরকে বার বার সঙ্গমের জল দিয়ে সিঞ্চিত করতে লাগল। কিন্তু আমার মনে শুধু বিস্ময় ছিল না। আরো কিছু ছিল।
যা ছিল, তা আমার আনন্দমুখরিত বিস্ময়, শ্রদ্ধা ও বেদনার নমস্কার। নমস্কার মানুষের জীবনের ও হৃদয়ের কোটি কোটি বৈচিত্র্যকে, অপরূপ বিচিত্রকে।
মনে করেছিলাম, ওই মেয়ে শুধু সর্বনাশের হাতধরা সঙ্গিনী। মনে করেছিলাম, সেই সর্বনাশে শুধু পাপলীলা। ধ্বংসের উন্মাদনায় মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধায় ও প্রেমহীনতায়, সে শুধু তার যৌবনের অগ্নিকণা ছিটিয়ে যায় মানুষের চোখে। অস্বীকার করবো না, তার ভ্রষ্ট জীবনে পঙ্কিল হাত থেকে নিজের পয়সার ব্যাগটি বাঁচিয়ে ধিক্কার এসেছিল মনে। ভেবেছিলান, পঙ্কে ডুবে যাওয়ার জন্য যাতে হাত পড়েছিল, তাকে বুকে মুঠি করে ধরে এ কোন্ পয়সাসর্বস্ব অসহায় মানুষ আমি!
আজ সেই পঙ্ক-সঙ্গমের অঙ্কে পঙ্ক? একেই মনের সেন্টিমেন্ট বলে কিনা জানি না। কিন্তু ওই পুরুষটি যদি ওর বর না হতো, হত অন্য কোন পথেরই মানুষ, তাহলেও কি নত হৃদয়ের এ নমস্কারকে ফিরিয়ে নিতে পারতাম? কে পারত? হৃদয়ের কোনও এক অংশ জুড়ে ছিল যার এই লীলাক্ষেত্র, প্রেমে ও স্নেহে যে সর্বনাশী এমন মূর্তি ধরতে পারে, যে এমনি করে অমৃতে হয় একাকার, তাকে পঙ্ক বলে ফিরে যাব, সে দুঃসাহসও আমার নেই।
যেন কারুর কোনোদিন না থাকে।
শুধু খনপিসি নয়, দলের কেউ-ই তাকে চিনল না। সেও চিনল কিনা কে জানে! এখন যদি একবার চোখাচোখি দেখা হয়, তবে হয়তো আমাকেও চিনতে পারবে না, কেন না, আমি যে তার এ জীবনের কেউ নই। এখন সে ডুবে আছে। সেখানে তার নিজের মেলা। সেখান থেকে যখনি উঠবে ভেসে, তখন এই বাইরের মেলা, তখন আমরা, তখন আমি। ভিড় ঠেলে এলাম উপরে। আজ আর না-ই হোক দেখাদেখি। সে যে বিচিত্রের দ্বার খুলে দিয়েছে আমার চোখের সামনে, সেই দোরগোড়ায় জমা হয়ে থাক আমার বিস্ময় ও নমস্কার।
Chapter - 12
১২
উঠে দেখি ঘোড়-সওয়ার ছুটছে! নেহরু আসছেন। মানুষের দুরন্ত গতি অচমকা, দু’দিকে ফিরছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে সঙ্গম।
হঠাৎ ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা স্পর্শে ফিরে তাকালাম। সর্বনাশ! তাকিয়েই লাফিয়ে সরে গেলাম দু’পা। একটি প্রকাণ্ড ময়াল সাপের ল্যাজ এসে ঠেকেছে গায়ে। ল্যাজটি টেনে গলায় জড়িয়ে নিয়ে, একরাশ হলদে দাঁত বের করে হাসলো সাপের মালিক। ভাঙা মোটা গলায় বললো, ‘কুছ ডর নহি বেটা। এ মন্ত্রপূত শিব হার।’
একে তো ভয় পেয়েছিলাম। তার উপরে হেসে হেসে এ ভয়ংকর শিব-হারের কথা শুনে বড় রাগ হয়ে গেল। বললাম, ‘খুব হয়েছে। সাপের ল্যাজ ঠেকিয়ে ছাড়া কি ডাকা যায় না?’
কিন্তু রেয়াত করলো না সে আমার রাগকে। পরনে তার ময়লা গেরুয়া আলখাল্লা বিশেষ। হিসাব করলে মিলবে শতখানেক তালি। চেহারায় খানিকটা ভূতানন্দ ভৈরবের ছাপ। চুল দাড়িও সেই রকমেরই। কিন্তু গলায় এতবড় একটা ময়াল, এই দারুণ ভিড়ের জনতাকেও দূরে সরিয়ে রেখেছিল অনেকখানি। যে দেখে, সেই ভীত চকিত চোখে তাকিয়ে কয়েক হাত তফাত দিয়ে যায়। কাঁধে তার বড়সড় ঝুলি একটি। হাতে বিচিত্র লাঠি। লাঠি নয়, যেন এক আঁকাবাঁকা সাপ।
আমার ক্রুদ্ধ মুখের দিকে সে শিবনেত্রে চেয়ে হাসলো। হেসে বললো, ‘দেখ বেটা বাবুজী, এ যাকে স্পর্শ করে, তার কপাল ভালো। তোরও কপাল আমি খুব ভালো দেখছি বাবুজী।’
বলে, সে সত্যি সত্যি কয়েক মুহূর্ত নিরীক্ষণ করলো আমার কপাল। বুঝলাম, গতিক ভালো নয়। বাপ মা আত্মীয় বন্ধুস্বজন যে-কপাল কোনোদিন ভালো দেখে নি, সে-কপাল আজ অকস্মাৎ এই আলখাল্লাধারীর কাছে ভালো হয়ে ওঠা ভালো নয়। পেছন ফেরার উদ্যোগ করে বললাম, ‘হবেও বা।’
সে তাড়াতাড়ি আমার কাছে এসে বললো, ‘শুন্ বেটা, কোথায় যাচ্ছিস! তোর ভাগ্য ভালো। কপালে তোর শিব লীলা করছে। আজ তোকে আমি মহাদেবের প্রসাদ দান করব।’
বলে, সে চট করে হাত ঢুকিয়ে দিল তার ঝুলিতে। বন্ধ মুঠি বের করে বললো, ‘হাত পাত।’
বুঝলাম, বিপদ বড় দরো। কী দেবে সে হাতে? একবার এক সাপুড়ে এমনি হাত পাততে বলে বেমালুম হাতের উপর ছেড়ে দিয়েছিল একটা জীবন্ত কাঁকড়া বিছে। অবশ্য সে বিছের হুল ছিল না। কিন্তু শিউরুনি তো কাটে না তাতে। এও যদি তেমনি হয়?
বললাম, ‘কী আছে, দেখাও।’ সে বললো, ‘নারাজ ন হো বেটা। হাত পাত, আমি দিচ্ছি।’
কী মুশকিল! এদিকে ভিড় হচ্ছে আমারই চারপাশে। যত আমি চলতে চাই, সে তত আমার পিছনে ধাওয়া করে। হাত পাততে হলো। সে আমার হাতের উপর কী একটা দিল। চেয়ে হঠাৎ মনে হলো, কোন ছোট জাতের পোকা, কিন্তু মৃত। বস্তুটি শক্ত, সরু ও লোমশ।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী এটা?’
সে বললো চাপা গলায়, ‘শেয়ালের শিং।’
শেয়ালের শিং! অনেক চতুষ্পদীয়ের শিং দেখেছি চোখে ও ছবিতে। কিন্তু, এমন অভুতপূর্ব বস্তু তো কখনো দেখিনি, শুনিনি শেয়ালের আবার শিং গজায়! বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা না হয় রইলো কিন্তু শেয়ালের শিং দিয়ে কী রূপ খুলবে আমার কপালের? জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিন্তু কী করবো এ দিয়ে?’
সে বললো হেসে হেসে, ‘তোর কিছু করতে হবে না বেটা। তুই খালি রেখে দিবি। যা করবার, স্বয়ং শিব করবেন। সব শেয়ালের শিং হয় না। যে মহাদেবের সাক্ষাৎ পায়, তারই হয়। কখন? না, যখন মহাদেব কালিকাদেবীর সঙ্গে মিলতে আসেন, তখন যে ‘শিয়াল’ তাঁর সাক্ষাৎ পায়, তারই শিং গজায়! তোর কপাল ভালো, পেয়ে গেলি।’
তা হবে হয়তো। কিন্তু যে সাধনা আমি করিনি, তার ফলে কেন ভাগ বসাই! জানিনে, মহাদেবের দর্শনপ্রাপ্ত কোন সে ভাগ্যবান শেয়াল, আর তার শিং কেটে ভাগ্যবান আজ এই সাধক। কিন্তু আমার ভাগ্যের বড় দুরূহ পথে যাত্রা। এ দিয়ে আমার কী হবে?
আমার দ্বিধান্বিত ভাব দেখে আলখাল্লাধারী তাড়াতাড়ি আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিফিস্ করে বললো, ‘ইস মে বশীকরণ হোতা হ্যায় বেটা। দুনিয়া তোর বশ হয়ে যাবে। মনের মানুষ তোর কাছে আসবে। তোর দিল ভরে দেবে।’
হেসে উঠলাম। যেমন নিয়ে বেরিয়েছিলাম পথে, সেই মনের হাসিটা যেন এই কদিন পরে গঙ্গা-যমুনার তীরে বেরিয়ে এলো স্বরূপে। বশীকরণ, তাও মনের মানুষকে? মনের মানুষ খুঁজতে গিয়ে কেউ বিবাগী। কেউ পেয়ে, না পেয়েও বিবাগী। মনের মানুষ! সে কেমন জানি নে। কোথায় তার বাস, কেমন তার রূপ তাও জানি নে। নিশিদিন তো খালি এই নাম গুনগুন করছি—
ঘুরেছি পথে বিপথে।
গহন বনে বনে।
মন পাখি গেয়েছে শুধু
রয়েছি, তোমারি মনে মনে।।
অকারণে কেন মনের মানুষকে শেয়ালের শিং দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করা! সে যে আড়াল থেকে এই লক্ষ মুখের হাসি দিয়ে আমাকে বিদ্রূপ করবে। বললাম, ‘সাধুজী, এ আমার দরকার নেই।’
কিন্তু সে নিরাশ হবার পাত্র নয়। গম্ভীর মুখে, চোখ ঘুরিয়ে বললো, ‘বেটা, সব দরকার তো তোর বোঝার মধ্যে নয়। এটা তোকে নিতেই হবে। হাওয়া লাগাস নি, পবিত্রজ্ঞানে পাকিটে ফেলে রাখ। আর আমায় খুশি করে দে!’
তাকে খুশি করাটাই বোধ হয় আসল। বুঝলাম, শেয়ালের শিং না গছিয়ে সে ছাড়বে না, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ভাবে, বল?’
সে চোখ বুজল, আবার খুলল। বললো, ‘বেশি নয়, আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়ে দে।’ অচিরাৎ তার বশীকরণ যন্ত্র বাড়িয়ে ধরলাম। আমার শহুরে মূর্তি ধরে বলতে হল ‘এই নাও বাবা, তোমার জিনিস। পাঁচ টাকা দিয়ে এ জিনিস কিনতে পারব না।’
কিন্তু সে আমার চেয়েও অগ্রসর। বললো, ‘কেনাকাটা নয় বাবা, দান। তোমারো দান, আমারো দান। আচ্ছা দু’টো টাকা দে।’
আমি হাতটা আরো এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমাকে রেহাই দাও সাধুজী, দু’টাকা আমার কাছে নেই।’
‘কত আছে বেটা? ‘
মিথ্যের আশ্রয় না নিয়ে আর পারলাম না। বললাম, ‘চার আনা আছে।’
চোখে তার অবিশ্বাস দেখা দিল। অবিশ্বাসী চোখে একবার দেখলো আপাদমস্তক হতাশভাবে ঘাড় নেড়ে বললো, ‘তাহলে ফিরিয়েই নিতে হয়।’
বাঁচলাম। ফিরিয়েই দিতে গেলাম। সে চিন্তিতভাবে বললো, ‘কিন্তু দান তো ফিরিয়ে নিতে পারি না। আচ্ছা দে, চার আনা-ই দে। তোর কপালে ছিল।’
এতখানি যখন হলো, আর একটু হোক। বললাম, ‘তোমাকে চার আনা দিলে আমি কী খরচ করব? দু আনা নাও।’
এবার আর তার মুখে কথা নেই। তীর্থক্ষেত্রে আমার মতো এমন বেয়াদব পুণ্যার্থী থাকতে পারে, এটা বোধ হয় সে ভাবতে পারেনি। সে বড় বিমর্ষ হয়ে পড়লো। কোথায় তার সেই সাধনদীপ্ত চোখ? দেখি, দুর্ভাগার করুণ দু’টি চোখে তার নিরাশার গ্লানি। দু-আনা দিলাম। সে তবু হাত পেতে রইলো।
চলে যাই দেখে ডেকে বললো, ‘বাবুজী, গরীবটাকে একটু চা খাওয়াও। আর কী বলব?’
তার মাঝে এবার আসল মানুষটি দেখা দিয়েছে। জীবনের রসদ খোঁজার এই তার পন্থা। মানুষের আসল মূর্তি দেখা দিলে কে আর তাকে অবহেলা করতে পারে! বললাম, ‘চল। খাওয়াচ্ছি।’
সঙ্গমের এই তাঁবু-সমুদ্রে চায়ের দোকানের অভাব নেই। দোকানে গিয়ে বললাম, ‘তোমার বস্তু তুমি নাও, পয়সা তোমাকে ফেরত দিতে হবে না।’
সে গরম চায়ে ফুঁ দিতে দিতে জিভ কাটল। বললো, ‘আরে বাপরে, ও আমি আর ফিরিয়ে নিতে পারবো না।’
ভাঙি তো মচকাই না। চায়ের গেলাসে ঘন ঘন চুমুক দিয়ে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হলো তার। শেয়ালের শিং দিয়ে বশীকরণ করতে পারল না। ওই চোখ দিয়ে বশীভূত করলো আমাকে চায়ের পরে আরো দু-আনা দিয়ে বললাম, ‘চলি সাধুজী।’
বিস্মিত হাসিটি তার চোখে দেখা দেওয়ার আগেই ভিড়ে মিশলাম।
ভিড়ের মধ্যে হিদের মা। হাত ধরে বললো, ‘বাবা যে!’
ঘুরে ঘুরে দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। আশ্রমমুখী হয়েছিলাম। দেখলাম, হিদের মা’র সামনে একজন সাধু।
বললাম, ‘কী করছেন?’
হিদের মা সাধুকে দেখিয়ে বললো, ‘এই বাবাজীর কাছে বসে একটু কথা শুনছিলুম। বড় সুন্দর কথা বলে। বলে, মা, যে জন্ম-দেনদার, সে যদি মুখ ঘুরিয়ে চলে, পাওনাদার হাসে। তুই খুব হাস, হেসে হেসে বেড়া। মায়ের দেনা শোধ হয় না। তুই মরলে, তোর ছেলে মুখে আগুন দিয়ে কাঁদবে। ভাববে তখন, কেন দেনা শোধ করিনি মায়ের?’
বলে হাসলো হিদের মা। মোটা আর ফাটা লেন্সের আড়ালে সেই মুগ্ধ চোখজোড়া। কিন্তু হাসিটি যেন অসম্পূর্ণ। বললো, ‘তা হলে যাই বাবাজী, আবার কাল আসব, আপনি আমাকে একজন সাক্ষ্মণ সাধু মিলিয়ে দেবেন। আমি তাঁরে ভোজন করাব।’
সাধু ক্ষীণদেহ। জটা প্রকাণ্ড। তবে, এই শীতেও নগ্নদেহ। শুধু কনি আঁটা। বললো, ‘বটে! বেশ তো মা, আমিও ব্রাত্মণ। আমাকে ভোজন করিয়ে দাও।’
হিদের মা এক মুহূর্ত দেখলো সাধুটির দিকে, তারপর বললো, ‘বেশ তো বাবা, বল, তুমিই আমাকে আশীর্বাদ করবে।’
আমি বললাম, ‘তাহলে চলি আমি।’
কিন্তু হাত ছাড়লো না হিদের মা। বললো, ‘যাবে কেন? চল, বাবাজীকে খাওয়াই। দেখে য্যাও।’
বলে, আমার আপত্তি না মেনে হাত ধরে নিয়ে চললো সে আমাকে। এতে আমার কিছুই করবার ছিল না। কৌতূহলও অনুভব করলাম না। বরং খানিক ভয়ই ছিল। হিদের মা খাওয়াবে, কিন্তু কী দিয়ে খাওয়াবে সে!
সামনেই একটি ছোট খাবারের দোকান দেখে দাঁড়ালো হিদের মা। আহ্বান করলো বিদেশী দোকানদার। মেলার তেমন ভিড় নেই দোকানটিতে। পিতলের বড় বড় বাটায় সাজানো রয়েছে প্যাঁড়া, পাকানো খোয়া আর সন্দেশ। পুরিও ভাজা হচ্ছে।
হিদের মা দোকান থেকে জল চেয়ে নিল। নিজের হাতে জল ছিটিয়ে, আঁচল দিয়ে মাটি লেপে সাধুকে বললো, ‘বোসো বাবা।
সাধু বসে বললো, ‘কত খাওয়াতে পারবি মা?’ হিদের মা বললো, ‘যত তুমি খেতে পারো বাবা।’ বলে দোকানদারকে বললো, ‘বাবাজীবনকে খেতে দাও বাবা। পুরী সন্দেশ প্যাড়া, সবরকম দাও।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মখু চুন হয়ে উঠলো। ওকি খাওয়া! এ যে থামতে চায় না। কিন্তু হিদের মা মুগ্ধ চোখে, যেন প্রাণভরে সেই খাওয়া দেখছে। আমার মুখ চুন হলো, কারণ আমার যে এক ভয়। সে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে হিদের মা নিজে। এত পয়সা সে কোথা থেকে দেবে? তবে কি, ভাবতে যতই সংকোচ হোক, তবে কি সেইজন্যেই হিদের মা হাত ধরে স্নেহভরে ডেকে নিয়ে এলো আমাকে?
এবার দোকানীরও চোখে সংশয় দেখা দিল। তার ছোট দোকান, খুবই ছোট। মাল খুবই কম। তবু একজনের পক্ষে সে যে অমানুষিক। কিন্তু তার পেতলের বাটার ভাণ্ডার ফুরিয়ে এলো। যত ফুরিয়ে আসতে লাগল, তত সে সংশয়ান্বিত। একবার দেখছে হিদের মার দিকে, আর একবার আমার দিকে। আমার জামাকাপড়ের দিকে। সে চাউনি দেখে আমার বুকে ধুকপুকু। এ কী বিপদে এনে ফেললো আমাকে হিদের মা!
কিন্তু আশ্চর্য সহজ ও নির্বিকার খাওয়া সাধুর! তার কি একটু কষ্টও হচ্ছে না? দেখতে মানুষটি সে ওইটুকু, কিন্তু পাতা তার কেবলি খালি হয়ে চলেছে। এ কি সে-ই খাচ্ছে, না আর কেউ?
দোকানী না জিজ্ঞেস করে পারল না, ‘আর দেব মায়ীজী?’
হিদের মা বললো, ‘দেবে না বাবা? উনি যত খাবেন, তত দাও। খাওয়াও। খাইয়ে তোমার আমার, সকলের সুখ। কী বল বাবা, অ্যাঁ?’
বলে সে আমার দিকে তাকাল। কিন্তু এত অসহায় বোধ আর কখনো করি নি। যা-ই বলি, যা-ই বল, সংশয় পেরিয়ে সন্দেহ আমার বন্ধমূল হতে চললো। পকেটের মধ্যে আমার পয়সার পুঁটলিটা যেন বন্দী ইঁদুরের মতো লাফালাফি করছে বেরিয়ে পড়বার জন্য। ওটাকে যদি কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারতাম! কিন্তু কে জানতো, এমন বিপদে পড়বো! আমার তো কোনো সন্দেহ নেই, ‘দেওয়ার চেয়ে সুখ কী?’ এই কথা শুনতে হবে আমাকে। কিন্তু এতবড় দুঃখ থেকে কে আমাকে উদ্ধার করবে, হিদের মা’র হাত থেকে রেহাই পাব কী করে?’
যে খাচ্ছে আর খাওয়াচ্ছে, শুধু তারাই নির্বিকার। তৃপ্ত, মুগ্ধ। কেবল স্বস্তি নেই দোকানদারের। দুরন্ত শঙ্কা আমার। আমার শঙ্কিত মুখ দেখেই, সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে দোকানদারের। কে জানে, চোখের ইশারায় পাহারা বসিয়েছে কিনা সে।
দোকানদারকে ঘোষণা করতে হলো, ‘আমার এ-বেলার তৈরি খাবার সব শেষ হয়েছে। টাকা মিটিয়ে তোমরা দুসরা দোকান দেখ।’
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, ‘সত্যি তার সবই শেষ।’
হিদের মা বললো, ‘বাবা, আর খাবে?’
মন খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এখনো তার রেশ যায় নি। কিন্তু মানুষের অতি-মানবিকতায় কিংবা পশুত্বে আমার বিশ্বাস নেই, শ্রদ্ধাও নেই। গল্পের মতো শুনেছি, কোনো এক কালে অমুকে অত খেতে পারত। পারত কিনা জানি নে। কিন্তু আজ চোখের সামনে বিরক্তি ও ভয়ে সে দৃশ্য দেখতে হচ্ছে।
জল খেয়ে মুখ মুছল সাধু। একটি উদ্ধার তুলে, ক্ষুধাতৃপ্ত বললো, ‘না, আর খাব না। আমার পেট ভরেছে।’
তবু ভালো। কিন্তু যা খেয়েছে, তাই যে অনেক। সে অনেকের কী উপায় হবে! মানসচক্ষে দেখতে পেলাম, হিদের মা ওই চোখ দু’টি তুলে আমাকে যেন কিছু বলছে, কী যে বলছে তা মাথায় আসছে না।
হিদের মা বললো সাধুকে, ‘বাবা, আমাকে নিয়ে, আমার কাছে খেয়ে কেউ সুখী নয়। তুমি খুশি হয়ে থাকলে আমাকে আশীর্বাদ কর!’ বলে সে গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করলো লুটিয়ে।
সাধু বললো, ‘তোমার প্রাণে আনন্দ হোক।’
বলে সে চলে গেল। হিদের মা উঠে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করলো দোকানদারকে, ‘কত হয়েছে দাদা তোমার?’
দোকানদার বললো, ‘খুচরা হিসাব ধরি নি ময়ীজী। সের হিসাবে তোমার উনিশ টাকা তিন আনা হয়েছে।
হিদের মা একবার তাকালো আমার মুখের দিকে। তারপর কোমর থেকে বার করলো একটা ময়লা পুঁটলি। খুলতে দেখা গেল, দোমড়ানো নোট আর খুচরো পয়সা। সবগুলি একটি একটি করে হিসেব করলো। আবার আঁচল খুলল। তাতেও কিছু পয়সা ছিল। সেই পয়সাগুলি যোগ করে, কয়েক আনা পয়সা ফের বাঁধল আঁচলে। বাদবাকি সব তুলে দিল দোকানীর হাতে। বললো, ‘গুনে দেখে নাও দাদা।’
অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হিদের মা’র গোনার সঙ্গেই দোকানীর গোনা হয়েছিল। সে টাকাগুলি হাতে নিয়ে, মুগ্ধ চোখে যেন দেবীদর্শন করছিল। তাড়াতাড়ি গদির উপর টাকা রেখে সন্ত্রস্ত গলায় বললো, ‘হিসাব আমার হয়েছে মায়ীজী, ও আমার ভগবানের দান।
হিদের মা ফিরে তাকালো আমার দিকে। চোখে তার জল, মুখে হাসি। তারপর আমার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো বাইরের জনরণ্যের দিকে। ফিফিস্ করে বললো, ‘পাষাণভার নামল আমার বুক থেকে। আনন্দ হোক, আনন্দ হোক প্রাণে। আমার প্রাণের সব নিরানন্দ ধুয়ে মুছে যাক।’
বলতে বলতে কী এক আবেগের তোড়ে ভেসে গেল হিদের মা। আমাকে ডাকলে না, ফিরলে না। কোনো এক মহা আনন্দের সব-ভোলানো হাওয়া এসে টেনে নিয়ে গেল তাকে। ডেকে নিয়ে গেল। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার সব শঙ্কা ভয়, আমার সব অহংকার চূর্ণ করে দিয়ে চলে গেল সে। হিদের মা’র জীবনে যা ভক্তি, যা বিশ্বাস, আমার তা নয়। হয়তো একেই বলে আত্মসম্মোহন। কিন্তু তার এই ভক্তি, বিশ্বাস দিয়েই সে আমার মনের সঙ্কীর্ণতার স্পর্ধাকে ভেঙে দিয়ে গেল। এর অবাস্তবতা, অলৌকিকতা, সব জেনেও তার সব দেওয়ার এ আনন্দের মর্যাদাকে তো অবহেলা করতে পরি নে। যে এমনি করে দিয়ে যায়, তাকে এক টাকা দিয়ে আমি করুণার আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলাম। বিদ্রূপ নয়, কথা নয়, নিজের আনন্দ ও বেদনা দিয়ে সে আমার আত্মপ্রসাদকে ধিক্কার দিয়ে গেল। সে আমাকে সাধু খাওয়ানো শেখাল না। আমার নিজের বিশ্বাসের প্রতি হৃদয়ের সব দ্বার অসঙ্কোচে উন্মোচনের শিক্ষা দিয়ে গেল। তাই সে অমনি করে দেওয়ার কথা বলেছিল। তাই কিপটে বুড়ি মিষ্টি গলায় বলেছিল, ‘আমাকে দু-চার আনা পয়সা দেবে বাবা?’
ব্যাকুল হলাম, ফিরে তাকালাম। নেই, হারিয়ে গিয়েছে হিদের মা। চোখের সামনে শুধু জনারণ্য। হাসিমুখর, কোলাহলপূর্ণ।
Chapter - 13
১৩
সকাল থেকে যেন ঝড়ের গতিতে কেটে গেল এতক্ষণ। সবাই প্রাণভরে ডুব দিল সঙ্গমে। টেরও পাই নি, জানিও নে, কী অমৃতের সঞ্চার হয়েছিল আজ সেখানে! সবাই কি নিয়ে এলো বুক ভরে, কীসের নেশায় মাতাল হলো মানুষ! প্রথম দিন থেকে, পরিচিত সকলের মুখগুলি ভেসে উঠলো চোখের সামনে। সকলের সব কথা।
সত্য, আমি ভগবান পেতে ছুটে আসি নি! ডুব দিতে এসেছিলাম লক্ষ হৃদি-সায়রে। এখন, এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমার সারা বুক ভারী। সে যে কীসের ভারে এমন পাষাণ হয়েছে জানি নে। এত লক্ষ লক্ষ লোক। আমি ডুব দিলাম, কি ডুব দেওয়ার সময় হয়েছে জানি নে। কিন্তু প্রাণভরে একটা নিশ্বাসও নিতে পারছি নে। কিসে ভরে উঠলো মন এমনি করে! আমি কী পেলাম!
দিন শেষ হয়ে আসছে। সারাটি দিন ঘুরছি পাগলের মতো। দেখা হলো অনেকের সঙ্গে। এবার সময় আসছে নিজের সঙ্গে দেখা হওয়ার। আজও এই উত্তর প্রদেশের মাঘের আকাশে মেঘ ছিল। খুব সামান্য। তাতে শেষ রোদের ঝলক লেগেছে। শেষ হওয়ার আগে রঙ ছড়ায় বেশি।
উচিত মনে হলো, আশ্রমে ফিরে যাওয়া। কিন্তু পেটের জ্বালাটি কেমন থিতিয়ে গিয়েছে। ওদিকে বড় টান বোধ করছি না। ব্রজবালার অভিমান-ক্ষুব্ধ চোখ দু’টি দেখতে পাচ্ছি, উঁকি দিয়ে আছে তাঁবুর আড়াল থেকে। তবুও বিরল নৌকা ও স্নানার্থীহীন যমুনার দিকে পা চললো আপনি আপনি।
চলতে চলতে কিসে আটকে গেল পা। অবাক হলাম। কে চেপে ধরেছে পা! ভিক্ষুক। রাগতভাবে তাকাতে গিয়ে দেখি, একমুখ হাসি। বিকলাঙ্গ বলরাম।
বলতে যাচ্ছিলাম, ‘বলরাম যে!’ তার আগেই সে পাগলের মতো গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠল—
‘তুমি কে-এ, পাগলপারা হে!
বহুদিনের চেনা বলে মনে হতেছে,
পাগলপারা হে!’
খোলা গলার এ উদাত্ত স্বর আকাশ ছুঁল গিয়ে। চকিতে মনে হলো, বুকে ছিল আমার স্তব্ধ জলরাশি। সে অশ্রু কিনা জানি নে। তাতে হাওয়া লাগল, ঢেউ বইল, আর পাগলা মাঝির মতো বলরাম সেই জলে চালিয়ে দিল তার পাসি। পাগল তো আমি নই। পাগল যে সে! কৌতূহলী কিছু নরনারীও এ বিচিত্র দৃশ্য দেখছিল। কিন্তু থামাই কী করে! বললাম, ‘বলরাম শোনো। ‘
বলরাম তবু গেয়ে উঠল—
‘বইসেছিলাম বুক পেতে,
আজ ধরা দিলে হে!
পাগলপারা হে!
য্যাতই মাখো ধূলাবালি,
নেপ য্যাতই কালো কালি,
চইলবে না আর ফাঁকিবাজি
ছাইড়ব না আর হে,
পাগলপারা হে।’
বলরামের আনন্দ দেখে, রুষ্ট হতে পারি নে। তবু, কৌতূহলী নরনারীর লজ্জা যে পারি নে কাটাতে। তার হৃদয়াবেগের ধারে লজ্জার অন্ধকার হয় তো কেটে যায়। আমার যে সে উত্তরণ হয়নি। ডাকলাম, ‘বলরাম! ‘
বলরাম হেসে গেয়ে মাতাল। বোধ হয় গানের সুর এখনো নতুন করে ছুটে আসছে তার গলায়। বললো, ‘বলেন।’
বললাম, ‘লোক জমছে।’
‘বেশ, তবে চলেন, কোথায় চইলছিলেন। কিন্তু ঠাকুর! ছেইড়ে দেব না।’
ছি ছি ছি, বলরাম আমাকে বার বার ঠাকুর বলে আমার মানুষিক অস্তিত্বটাকে যেন বেশি করে জানিয়ে দিতে লাগল। বললাম, ‘যমুনার ধারে–-’
কথা শেষের আগেই সে বলে উঠলো, ‘সেই ভালো, সেই ভালো।’
বলে সে আমার আগে, হেঁচড়ে হেঁচড়ে, দু’হাতে ভর দিয়ে চললো। আমাকে সে-ই পথ দেখিয়ে চললো নিয়ে। তার স্বাভাবিক চলার কষ্ট দেখে নিজেরই কষ্ট হয়। কিন্তু তাকে থামানো যাবে না। কেল্লার কোলের যমুনার তীরে এসে সে বসলো। হেসে ঘাড় কাত করে বললো, ‘বইসতে হবে কিন্তুন।’
শুল্ক বালুসৈকত। মাথার গামছাখানি খুলে তাড়াতাড়ি পেতে দিল বলরাম। জানি, আমার অনেক আত্মাভিমান আছে, ধুলোবালির বাছবিচার আছে। তা বলে এখানেও গামছা পাতা কেন? বলরাম এত খুশি, আমি একটু বসতে পারি নে? বললাম, ‘গামছা থাক।’
বলরাম জিভ কেটে মাটি দেখিয়ে গুনগুন করে উঠলো—
‘ভুঁয়ে নি সে বইসবেরে ধন?
বইসবে হিয়ের মাঝখানে।।’
বলে, আঙুল দিয়ে দেখাল খোলা বুক! বললো, ‘ওই গামছা আমার মনে হিদয় কইরে দিলাম, বইসতে হইবে।’
বসলাম। বলরামের কথার বাগানে আমি দীন।
বলরাম বললো, ‘এমন কইরে আর একদিনও যমুনার পাড়ে আসি নাই। যদি আইসলাম। তবে একটু গান গাই, অনুমতি দেন।’
বললাম, ‘গাও।’
অমনি মিষ্টি গলায় যমুনার দিকে ফিরে গান ধরলো সে-
‘যমুনে, এই কি তুমি সেই যমুনা
পোরবাহিনী।
ও যার বিশাল তটে রূপের হাটে
বিকাত নীলকান্তমণি।।
কোথা চারু চন্দ্রাবলী, কোথা সেই জলকেলি
কোথা শ্যাম রাসবিহারী বংশীধারী
বামেতে রাই বিনোদিনী।।’
যমুনার রূপ ফিরিয়ে দিল বলরাম। রঙ বদলে দিল। সন্ধ্যাকাশের রক্তরাগে কালিন্দীর এক অংশ আচমকায় লাল হয়ে উঠেছে। আর সারা ঘননীলে ব্যাকুল কালো চোখের ছলছল ঢেউ। শীত, তবু বাতাস বহে ঝিরিঝিরি। বলরাম বললো, ‘কত চোখের জলে নীল হইছ তুমি, সে আমি জানি।’ তাকিয়ে দেখলাম, বলরাম হাসছে আমার মুখের দিকে চেয়ে। বললো, ‘এই তো সেই জল। ভাবি, এখনো কি বাঁশি বাজে ঠাকুরের! ছুটে ছুটে আসে রাইঠাকরুণ? সুরে তাল নাই। বাঁশি বাজবে, পায়ের মলের তাল বাজবে না?’
বলে তার কী হাসি! হেসে বললো, ‘তা হইলে, এই যমুনার পাড়ে বইসেই কই, একবার কি মনে করতেও নাই? লক্ষ লক্ষ গলা পাইছেন, তাই বুঝি আমারে ভুলছেন।’
বললাম, ‘না, তোমার আশ্রমটি তো চিনি না।’
বললো, ‘ওইতো, কেল্লার কাছেই। নন্দগোপাল মাধবাচার্য বাবাজীর আশ্রম। আজ কিন্তুন্ যাইতে হইবে। আমি কি একলা? আর নোক রইছে বইসে আপনার জন্য। রোজ আমারে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর সে কোথায়?’
বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে বলরাম? লক্ষীদাসী?’
সে বললো হেসে, ‘শুধু নক্কীদাসী কেন? সে আছে, আরো আছে। নিজের চোখে গিয়া দেখতে হবে। যাবেন তো?’
বলরামের মুখের দিকে তাকিয়ে আর ‘না’ বলতে পারলাম না।
প্রাক্-চন্দ্রোদয়-মুহূর্তে প্রদোষকালের মতো হাল্কা অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। দেখতে দেখতে যমুনা কালিন্দী হলো। দুর্গের গাঢ় ছায়া দুলতে লাগলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে। সঙ্গমের কোণ-ভূমিতে অস্থায়ী টাওয়ারটি যেন শহরের ওয়াটার ট্যাঙ্কের মতো দেখাচ্ছে। রাজকীয় অতিথিদের জন্য ওটি তৈরি হয়েছে। সাধারণের আরোহণে চার আনা দর্শনী।
টাওয়ারের পাশ দিয়ে, লোকের ভিড় ঠেলে চললাম বলরামের সঙ্গে সঙ্গে। বলরাম আমার পাশে পাশে। আমার হাঁটুতে ঠেকছে তার মাথা। কী আমার ভাগ্য! জন্মবিকলাঙ্গ এক সঙ্গী আমার। না পাই তার মুখ দেখতে। পাশ ফিরিয়ে না দেখি তাকে। সে চলেছে আমার সঙ্গে, মাটি হেঁচড়ে।
আলো জ্বলে উঠেছে এখানে সেখানে। আজ বড় ভিড়। দোকান সম্ভারে পরিপূর্ণ স্তূপাকার বেলোয়ারি চুড়ি নিয়ে দিকে দিকে বসেছে চুড়িওয়ালী ও ওয়ালার দল। আলো পড়ে রঙের বাহার লেগেছে রামধনুর। ঘিরে বসেছে ঝি-বহুড়িরা। তাদের কলহাসি রঙ ছড়াচ্ছে আরো। এদেশের রেওয়াজ। পালা-পার্বণে, উৎসব-আনন্দে লক্ষপতির বউ থেকে দরিদ্র গৃহিণী সকলেই পরেছে রাশি রাশি কাচের চুড়ি। শখ যাদের আরো বেশি তারা কণ্ঠে পরেছে পুঁতির হার। রঙবেরঙের পুঁতির পাহাড় বসেছে। আজমগড়ের কুমোরেরা ছড়িয়ে বসেছে বিবিধ কারুকার্যপূর্ণ মাটির জিনিস নিয়ে। সিগারেট-ফোঁকা বাবুদের মন-ভোলানো ছাইদানি থেকে, আহা মরি মরি,. ভাবের গাঁজার কলকেটি পর্যন্ত। ফুলদানি, টি-পটেরও অভাব নেই।
পা আর মন ওই দিকে ছুটে যায়। বলরামকে ছেড়ে যেতে পারি নে। এই রাতের ভিড়। বলরামকে কেউ মাড়িয়ে দিলেও তার কিছু করার নেই। সঙ্গে যখন রয়েছি, তাকে তো ছেড়ে যেতে পারি নে। কিন্তু আশ্চর্য! হাতে ভর দিয়ে চলেছে, কিন্তু গুনগুনানির কামাই নেই।
বলরাম ডাকলো, ‘ঠাকুর!’
বললাম, ‘বলরাম, ওই নামটি কি বাদ দেওয়া যায় না?’
বলরাম বললো, ‘মন ডাকে। আমি কি ডাকি? ওইটে আপনার নাম নয়, পরাণ ওই বলে ডাইকল আপনেরে। তাতে তো এই সোসারে কেউ দুঃখু পাইবে না। তবে?’
তবে ওই নামেই ডাকুক বলরাম। দুঃখ পাই নে, ভয় পাই। বললাম, ‘কী বলছিলে?’
বলরাম বললো, ‘বলতেছিলাম, আমার ঠাকুরের মুখখানি অমন শুকু শুকু ক্যান? এই কয়দিনে মুক্তিখানিও বড় রোগা হইয়েছে। কষ্টে আছেন?
যার এত কষ্টের জীবনযাত্রা, সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, কষ্টে আছি কিনা! কিন্তু বলরামের মন ও প্রাণ সম্পর্কে আর সংশয়ের অবকাশ ছিল না। এ সংসারে কতকগুলি চোখ আছে, যাদের কাছে কিছুই ফাঁকি দেওয়া যায় না। তাদের চোখের এক অদৃশ্য মাইক্রোস্কোপ প্রতিটি বিন্দু দ্যাখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। বলরাম দেখেছে ঠিক। আখড়াবাসী মূল গায়েন, সংসারের আসন কথাগুলি দেখছি জানে ঠিক।
বললাম, ‘মেলার ব্যাপার। ঘুরে ঘুরে দিন কেটে যায়, তাই হয়তো—’
বলরাম হঠাৎ থেমে বললো, ‘একা-একা কিনা, তাই! সঙ্গে কেউ থাইকলে চখে চখে রাইখতে পারতো। ব্যামো হইলে যে বড় বিপদ হইবে ঠাকুর। সাবধানে বইয়েন।’
বলে সে বাঁক ফিরে, দু-পাশের তাঁবুর মাঝে সরু পথে পড়ল। দুর্গপ্রাকার সামনেই। কানে এলো খোল-করতালের শব্দ। বাঙলা নাচ-গান চলেছে ভারি উল্লসিত কণ্ঠে।
বলরাম থামল। আমিও থামলাম। একটি তাঁবুর কাছে কে দাঁড়িয়েছিল।
অদূরস্থ একটি হ্যাজাক লাইটের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। তাঁবুর পর্দার বাইরে সে মূর্তি মেয়েমানুষের
বলরাম তাকে কী বলতে গেল। কিন্তু চকিত কটাক্ষের ঝিলিকে সে একবার বলরামকে দেখে ভেতরে ঢুকে গেল।
বলরাম গলা বাড়িয়ে বললো, ‘যাইও না, কারে ধইরে নিয়ে আসছি, একবার দ্যাখ গলা নামিয়ে বললো আমাকে, ‘গোঁসা কইরেছে আমার উপুর। চিনতে পারে নাই। আপনারে।’ বলেই বলরামের হাসি। হাসতে হাসতেই গাইল—
‘মানের বশে যাইও না গো, রখো মিনতি,
ভাবো আমার কি হইবে গতি।’
বুঝলাম, মূল গায়েনের লক্ষ্মীদাসী। আমঘাটার আখড়ার অধ্যক্ষা। রাগ করেছে খুবই। কিন্তু, মধ্যবয়সী লক্ষ্মীদাসীর চোখেও অমন অগ্নিবর্ষণ হয়? বুঝি প্রাণে আগুন আছে আরো অনেক। মধ্যমা ঋতু আশ্বিনের ঢলঢল মদালসা গাঙের বিস্তারে চকিত বাতাসের শিহরণ।
জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম, এত রাগ কেন! তার আগেই আবার দেখা দিল লক্ষ্মীদাসী। চল্লিশ বছরের বালিকা। লজ্জায় বিস্ময়ে ভরে উঠলো তার বালিকার মতো চোখ দু’টি। কিন্তু হাসতে গিয়ে শীতে ফাটাফাটা ঠোঁট বিস্ফারিত হতে পারে না। তাড়াতাড়ি কাছে এসে বললো, ‘ঠাকুর! আসেন, আসেন! মনে পড়েছে?
বলরাম অমনি বলে উঠলো, ‘মনে কি পড়ে গো! মনে পড়াইতে হয়। ধ্যান কইরে নিয়ে আইসলাম।’
কিন্তু লক্ষ্মীদাসী চেয়ে দেখলো না বলরামের দিকে। হাত জোড় করে বললো, ‘ভিতরে আসেন, এট্টুস বইসতে হইবে, এখনি ছাইড়ব না।’
বলরাম বললো, ‘আসেন ঠাকুর।’
দু’টি তাঁবুর মাঝখান দিয়ে এসে উঠলাম একটি উঠোনে। উঠোনের উপরে সতরঞি পাতা। পুবদিকে একটি ছোট পিতলের শিবিকা। মধ্যে রয়েছে ফুটখানেক দীর্ঘ রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি। সামনে নামাবলীধারী কিছু লোক বসে খোল-করতাল সহযোগে ঢুলে ঢুলে দুলে দুলে নাচ-গানে মত্ত। একজন দাঁড়িয়ে ভাবাবেশে হাত তুলে দুলছে। বৈদ্যুতিক আলো নেই। একটি মাত্র হ্যাজাক জ্বলছে। তাঁবু ও হোগলার ঘরগুলিতে কোনো কোনোটাতে জ্বলছে কেরোসিনের বাতি।
বুঝলাম, চারপাশের তাঁবু আর হোগলার ঘরের ঘেরাওয়ের মধ্যে এই উঠোনটি হলো শ্রীআনন্দগোপাল মাধবাচার্যের আশ্রম। সম্ভবত, এই তাঁবু ও ঘরগুলি এ আশ্রমের শিষ্যদের।
আমাকে দেখে একটু বে-তাল হলো আসর। বেশভূষার মিল নেই। বোধ হয় আমার চেহারাতেও বিলক্ষণ গরমিল ছিল আশ্রমের সঙ্গে। নিতান্ত নিরীহ মুখগুলি তুলে বাবাজীরা বড় বড় চোখে কৌতূহলী হয়ে দেখলো। এলাহাবাদ স্টেশনে কাউকে কাউকে দেখেছি এদের লক্ষীদাসীর সঙ্গে। তাদের গায়ে মুখে সর্বদাই গ্রাম্য দরিদ্র বোষ্টমের ছাপ। বুঝলাম, আমার মতো মানুষ এমন আড়ম্বরহীন আশ্রমে আসে না, আসে নি এ ক’দিনে। চোখেই পড়ে না সম্ভবত। আমারও পড়বার কথা নয়। টেনে নিয়ে এলো বলরাম।
আসরের কাছ থেকে খানিকটা দূরে একটি হোগলার ঘরের মধ্যে ঢুকতে হলো। লক্ষ্মী আসন পেতে দিয়ে বললো, ‘বসেন।’
বললাম, ‘দেরী হয়ে যাবে যে।’
বলরাম হাসি মুখখানি তুলে বললো, ‘দেরিতে যে আসছেন। সাধ মিটবে না ঠাকুর, কিন্তু যতটুকুন মিটে ততটুকুন না মিটাইয়ে ছাড়ি কেমনে?’
বলে, লক্ষ্মীর দিকে ফিরে বললো, ‘নক্কীঠাকরুণ, ঠাকুরের মুখখানি বড় শুকু শুক মনে হইতেছে। রাধামাধবের পেসাদ একটুস—’
তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, ‘থাক না—’
বলরাম বললো, ‘থাইকতে নাই। কোনো কিছু থেইমে থাকে না। বুকে হাত দিয়া দেখেন, সেও থেইমে নাই। থাক কইয়ে তারে থামাইয়ে রাইখতে পারেন? যেদিন থাইমবে সেদিন সবই থাইমবে। যতক্ষণ চলে, চইলতে দ্যান ঠাকুর।’
জানতাম, বলরামের সঙ্গে কথায় পারবো না। তার তো শুধু কথা নয়! কথার সঙ্গে ছিল তার কালো মুখের নিরন্তর হাসি। ওই হাসি যেন প্রসন্ন বাতাস, উদার আকাশ। সেদিকে তাকালে মূক-মুগ্ধতায় স্তব্ধ হতে হয়। বলরাম ততক্ষণে চোখ বুজে গুনগুন করে গান ধরেছে-
‘চল চল চল রে মন,
কোথায় খোঁজো মনেরি জন।
তুমি যত চল, সেও চলে,
চলে, দিবানিশি সব্বোক্ষণ।’
ফিরে দেখি লক্ষ্মীদাসী। হাতে দু’টি পিতলের ঘটি। কিন্তু সে নিথর বিহ্বল। তার সেই কালো চোখ দু’টি মেলে, সব ভুলে তাকিয়ে আছে বলরামের দিকে। যেন, গুনগুনানির সুরের মধ্যে ডুবে গিয়েছে, একাত্ম হয়েছে গানে। গানে শুধু নয়, রূপে অন্ধ হয়েছে। আমি একটা মানুষ, তাকে নজরে পড়লো না লক্ষ্মীদাসীর। কী দেখছে অমন করে তার মূল গায়েনের দিকে? গুনগুনানি থামিয়ে চোখ তাকালো বলরাম। তার দিকে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল লক্ষ্মীদাসী। একটি উদ্ধৃত নিশ্বাস চেপে ঘটি দু’টি বসিয়ে দিল আমাদের দু’জনের সামনে। দিয়ে পিছনে এসে ধরে দিল দু’টি শালপাতা। দেখলাম, রয়েছে খানিকটা খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি, খানিকটা খোয়া। বলরামকেও তাই।
বলরাম বললো, ‘আমাকেও দিলে? ঠাকুরের সঙ্গেই?’
বড় লাগে নিজেরই কানে। জানি নে কী দিয়ে বলরামের মন পেয়েছি! একটি সিগারেট ছাড়া তো কিছুই দিইনি। কিন্তু ‘ঠাকুর ঠাকুর’ করে সে এবার আমাকে ঠাকুর বলিয়ে ছাড়বে।
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘আপনেরা খান ঠাকুর।’
বলে, আমাকে লুকিয়ে লক্ষ্মী আড়চোখে দেখল বলরামকে। খেতে খেতে ভাবলাম, না, বলরামকে আমি হিংসে করবো, সেকথা এ বিশ্বে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু সত্যি বলি, ভাবতে পারি নি, বলরামের জীবনের চারপাশে নিরাপত্তার একটি সুরক্ষিত পাঁচিল আছে। তার খাওয়ায় পরায় আহারে বিহারে কোনো সযত্ন হাতের স্পর্শ থাকতে পারে, একথা মনে আসেনি, তাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম পথেরই ভিখারি, তারপরে আখড়ার মূল গায়েন। আজ আমারই এক পংক্তিতে সে আহারে বসেছে। আমার ঢাকা চোখের সামনে বিস্মিত মুক্ত প্রাঙ্গণ কে খুলে দিলে বুঝতে পারলাম না। লক্ষ্মীদাসী, না বলরাম? হৃদয়াবেগ, ভক্তি ও জ্ঞানের পরিচয় মিলেছিল বলরামের গানে ও কথায়। সে একদিক। আর-এক দিক দেখিয়ে দিল তার লক্ষ্মীদাসী।
হঠাৎ লক্ষ্মীদাসী ডাকলো, ‘ঠাকুর।’
তাকিয়ে দেখি, চোখে তার জল। অবাক হয়ে বললাম, ‘কী বলছ?’
লক্ষ্মী বললো, ‘নালিশ আছে, বিচার কইরতে হইবে আপনারে।
বিচার? এত বড় ভয়ানক দায়িত্ব তো আমাকে কেউ কখনো দেয়নি। তাকিয়ে দেখি, বলরামের হাসি এ-কথায় বাগ মানছে না। সে তাড়াতাড়ি বললো, ‘আমারো মন কইরতেছিল গো নক্কীদাসী, আসো, দুইজনে বিচার চাই এনার কাছে। বেশ, তবে বাদী আগে বলুক, আমি হইলেম পিতিবাদী অর্থাৎ কিনা আসামী।’
বলে, বলরাম হেসে উঠলো। সারাদিনের পর পেটে আহার পড়ে ঝিমনো মনটাও গা-নাড়া দিয়ে উঠলো খানিকটা।
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘ওই তো দেখেন মানুষটা। আর এই মেলা। মেলা নয়, যেন শহরের সড়ক। মানুষ হাতি ঘোড়া গাড়ির কামাই নাই। কথা নাই বাত্তা নাই, য্যাখন ত্যাখন বাহির হইয়ে যায়। কোথায় গিয়ে বইসে থাকে। এট্টা বিপদ আপদ হইলে আমি কোথায় যাইব, বলেন তো?’
বলে, চোখের জল নিয়ে তাকালো লক্ষ্মীদাসী। এতক্ষণে বুঝলাম, কেন লক্ষ্মীদাসী অভিমান করেছে। সত্যি, বিকলাঙ্গ বলরাম। বাইরের ভিড়ে তো সর্বক্ষণই তার প্রাণ-সংশয়।
বলরাম অমনি হাসি মুখখানি তুলে বললো, ‘অনুমতি করেন, এইবার এই নিধম জবাব দেউক।’ বলে, লক্ষ্মীর দিকে একবার দেখে সে বললো, ‘ঠাকুর, জন্মোলুলা আমি। এখেনে নক্কীদাসী আমারে আনতে চায় নাই। জোর কইরে আসছি। কিন্তু এখেনে আইসে যে আমি আর থির থাইকতে পারি না! আমার শরীলখানি ভাঙা, মন যে রয় না। সে যে মানে না। কে আমারে ডাইকলো, জানি না। যদি আইসলাম, তবে এই আখড়ায় পইড়ে থাকি কেমনে! ঠাকুর, আমি যে লুলা, এমন কইরে আর কোনোদিন বুঝি নাই। আইজ বার বার দৌড়বার নেগে য্যাখন ছটফট কইরতেছি, পাখা য্যাখন মেইলতে চাইতেছি, ত্যাখন দেখি, এ পাখা উইড়তে পারে না। যদি আইসলাম, তবে যেটুকু ঠেইকতে ঠেইকতে পারি।’
লক্ষ্মীদাসী আমার দিকে ফিরেই বললো, ‘যদি এট্টা বিপদ আপদ হয়?’
বলরাম বললো, ‘অমঙ্গলের চিন্তা নাই। সোসারে সবই আছে, সেই ভেইবে কি বইসে থাকে কেউ?
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘কিন্তু যদি কিছু হয়, তবে আমার আখড়া যে অন্ধকার হইবে। রাধামাধব তো আর কারুর গানে তুষ্ট নয়!
রাধামাধবের অনুভূতি সম্পর্কে আমার নিতান্ত মানুষসুলভ মন চৈতন্যহীন। মনে হলো, যদি বলরামের বিপদ হয়, তবে এক জায়গায় অন্ধকার নেমে আসবেই। তার গান না শুনলে কোনো এক হৃদয়ের রাধামাধব চিরদিনের জন্য দরজা বন্ধ করবে।
বলরাম বললো, ‘নক্কীদাসী, বাইরে কত নোক! সামনে যমুনে কেমন কলকল কইরে বইতেছে। সেখানে তিনি কান খাড়া কইরে রইয়েছেন। আমি যে আসলজনারে গান শুনাইতে চাই।’
বলে, সে হঠাৎ গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠলো-
‘তুমি যেথায় আছ, সেথায় আছি।
আমার মিছা ভাবনা নাই মনে।
তুমি ডাকলে আপনি কপাট খোলে
তোমার বাতাসে তাল দিয়া নাচি।’
আর কথা নেই লক্ষ্মীদাসীর মুখে। দু-চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো সে বলরামের দিকে। কোথায় গেল নালিশ, বিচার! এইটুকুনির জন্যই বোধ হয় নালিশ, এইটুকুনি পেলে আর কিছু চাওয়ার নেই।
কিন্তু অবাক মানল মন। এই বিকলাঙ্গ মূল গায়েন যে এমনি করে একটি নারীর হৃদয় জুড়ে রয়েছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করতে মন চায় না। বুঝলাম, এ সংসারে হৃদয়ের রীতি বড় বিপরীত পথে ধায়।
লক্ষ্মীদাসীর ধ্যান ভাঙাল বলরাম। বললো, ‘কই, তুমি যে ঠাকুরকে কী বলবা বলতেছিলে আমারে। ধইরে নিয়া আসলাম, বল। একবার পরখ কইরে ল্যাও, কারে ঠাকুর কইছি।’
বলে আমাকে বললো, ‘এই গানখানি সেই আতাউল বাউলের, ঠাকুর।’
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘ঠাকুর, আপনারে সেই কইলকেতার রবি বাউলের গান একখানি শুনাইতে হইবে।’
মনটা চমকে উঠলো। আবার সেই কথা। বলরামের গান শুনে এক নিঃশব্দ সুরতরঙ্গ আপনি দোল খাচ্ছিল আমার গলায়, আমার বুকে, আমার রক্তধারায়। জানি নে কে আতাউল, কিন্তু সে কথা ও সুরের রাজা, সন্দেহ নেই। তা বলে রবীন্দ্রনাথকে সেই দলে নিয়ে আসতে আমার সঙ্কীর্ণ মন বার বার বাধা পেল, তবু শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু অঙ্কিত সেই রবি বাউলের একতারা বাজানো মূর্তিখানা বার বার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বললাম, ‘তাঁর অনেক গান। কোন্ গান যে বাউল তা তো ঠিক জানি নে। তাছাড়া আমি তো গান গাইতে পারি নে।’
বলরাম বললো, ‘তা বইললে শুনব না ঠাকুর। ছলছল চোখে, ছলো হাসি হাসো, তোমায় চিনি গো, চিনি। ওনার একখান গান শুনান, যিনি কন—কবে তুমি আইসবে বইলে রইব না বইসে, তানার গান না শুনলে আমার আমঘাটায় ফিরা যাওয়া বেরথা ঠাকুর।’
ধন্য কথা বলরামের, ধন্য তার স্মৃতিশক্তি। একবার বলেছিলাম, ঠিক মনে রেখেছে। তবু, এই বলরাম যেন সুরের নদী। আজ আমি তার সেই সুর-দরিয়ায় ডুব দিয়েছি। মুখে যা-ই বলি, আমার সমস্ত লজ্জা ও অক্ষমতার সঙ্কোচ ধুয়ে দিয়েছে। সুর ও কথা আপনি ভেসে এলো মনে। বাউল গান জানি নে। তবু ধরে দিলাম। আমার জীবন, সমাজ ও পরিবেশ ভুলে এক নতুন সংসারে মেতে উঠলাম
‘আমার মন বলে চাই, চাই, চাই গো—যারে নাহি পাই গো।
সকল পাওয়ার মাঝে আমার মনে বেদন বাজে—
নাই, নাই, নাই গো।।
হারিয়ে যেতে হবে,
আমায় ফিরিয়ে পাব তবে।
সন্ধ্যাতারা যায় যে চলে ভোরের আলোয় জাগবে ব’লে—
বলে সে–যাই, যাই, যাই গো।।’
বলরাম ঝাঁপ দিল প্রায় পায়ের কাছে, ‘তবে, তবে ঠাকুর! ফাঁকি দিয়ে পলাইতে চাইছিলেন?’
লক্ষ্মীদাসীর চোখে জল। বললো, ‘আহা, সন্ধ্যাতারা যায় যে চইলে, ভোরের আলোয় জাইগবে বইলে। কী কথা।’
আমার বিস্ময়ের অবধি ছিল না। উচ্চারণে গ্রাম্য দোষ। তবু রবীন্দ্রনাথের গান যে এই গ্রাম্য অশিক্ষিত মানুষগুলির মনকে এমনি করে ভাসিয়ে দেবে, তা কোনোদিন ভাবিনি। মনে করেছিলাম, সে শুধু আমাদের, আমাদেরই। আমাদের এই বঙ্গ-রঙ্গমঞ্চের চাপা-গলা দুর্বল স্বরের প্যানপ্যানানি-ওয়ালাদের। ফিরে দেখি, হোগলা ঘরের দরজার কাছে জোড় হাতে, দাঁড়িয়ে আরও কয়েকজন। একজন বললে, ‘আর-একখান কিরপা করেন।’
ছি-ছি-ছি। ছিঃ, শেষটায় আমাকে গানের আসরে অনুরোধ!
কিন্তু আর তো বসতে পারি নে। বললাম, ‘আর না বলরাম, এবার উঠব। অন্যদিন হবে।’
বলরাম বললো, ‘আচ্ছা ঠাকুর, এখেনে আর ধইরে রাখব না।’ বলে লক্ষ্মীর দিকে ফিরে বললো, ভাব, মূল গায়েন করবা কিনা?’ বলে হাসতে হাসতে আমার সঙ্গে এলো।
বললাম, ‘তুমি আর এসো না, আমি নিজেই যাচ্ছি।’
বলরাম বললো, ‘নিজে তো যাইতে পারবেন না। আমারে নিয়া যাইতে হইবে।’
বললাম, ‘কোথায় হে?’
সে কথার জবাব না দিয়ে লক্ষ্মীদাসীর দিকে চেয়ে হাসলো। লক্ষ্মীদাসীও। তারপর বললো, ‘চলেন, নিয়া যাই। আমারে রোজ জিজ্ঞেস করে, সে কথার জবাব দিতে পারি না। আজ জবাব দিয়া আস।’
লক্ষ্মী পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়াল। বললো, ‘ঠাকুর, রোজ একবার দেখা দিতে হইবে যদ্দিন আছেন।
বললাম, ‘চেষ্টা করব।’
তাঁবুর বাইরে এসে দেখি, জ্যোৎস্নালোকে ভরে গিয়েছে সারাটি মেলা। আকাশ জুড়ে উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ।
বললাম, ‘বলরাম, এখন আর কোনো আখড়ায় যাব না।’
বলরাম বললো, ‘আখড়ায় নয় ঠাকুর। কিন্তু একবার না গেলে যে চইলবে না।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেখানে কে আছে?’
‘যাইয়া দেখবেন।’
পেছন থেকে ছুটে এলো লক্ষ্মীদাসী। তাড়াতাড়ি একখানি কম্বল মুড়ে দিল বলরামের সর্বাঙ্গে। দিয়ে আবার একবার আমাকে মিনতি করে চলে গেল।
Chapter - 14
১৪
যেতে হলো। বুঝলাম, না গেলে বলরামের পরাজয়! জানি নে আবার সে কী বাধিয়ে রেখেছে কোথায়। সে কেল্লার পথের প্রাচীরের কোলের দিকে এগিয়ে চললো। সারি সারি তাঁবু, জ্যোৎস্নায় দেখলাম নানান রকম নিশান উড়ছে তাঁবুগুলির মাথায়। এদিকটা দোকানপাট কম, সেইজন্য ভিড়ও কম।
একটি গাছতলার তাঁবুর কাছে এসে থামল বলরাম। তাঁবুর সামনে, খানিকটা জায়গা জুড়ে মাথায় সামিয়ানার মতো ঢাকনা দেওয়া। একটি হ্যারিকেন জ্বলছে। সেই আলোয় দেখলাম একটি জ্বলন্ত উনুনে রয়েছে তাওয়া। একজন রুটি করছে, বেলে দিচ্ছে আর-একজন।
আমাকে আর বলরামকে দেখে তারা দু’জনেই ফিরে তাকাল। তাকাতেই চমকে উঠলাম। চমকে ওঠবার মুহূর্তেই একটি চাপা খিলখিল হাসি হঠাৎ বেজে উঠে কুহক বিস্তার করলো। তাওয়াটা ঠক করে নেমে এলো উনুন থেকে। আগুনের আঁচে দেখলাম, হাসিতপ্ত লাল মুখ শ্যামার। ছি-ছি-ছি, এ কোথায় নিয়ে এলো বলরাম! বলতে যাচ্ছিলাম তাকে সেই কথা। তার আগেই বলরাম হাত কপালে ঠেকিয়ে শ্যামাকে দেখিয়ে বললো, ‘রোজ রোজ বলেন, লুলাসাধু তোমার সেই বাবু কোথায়? একদিন ডেইকে নিয়া আস। আজ ধইরে নিয়া আইসলাম।’
মনে করলাম, তাড়াতাড়ি পেছন ফিরি। জীবনে এত বড় লজ্জার সামনে আর কোনোদিন পড়ি নি। কে জানতো, বলরাম আমাকে এইখানে ধরে নিয়ে আসবে! লজ্জার সঙ্গে রাগ হলো। বলরামদের হৃদয়াবেগ লোকলজ্জার ধার ধারে না। সংশয়, সন্দেহ ও রুষ্ট চোখের বাধা মানে না। কিন্তু আমাকেও কি সে তাই ভাবল?
নোকরানী পাতিয়া বেলে দিচ্ছে রুটি, বানাচ্ছে শ্যামা ছোট্ট একটি চারপায়ার উপর বসে, তার চটুল চোখে বিস্ময় ও হঠাৎ-হাসির ঝলকানি। সে উঠে দাঁড়িয়ে আবার হেসে উঠলো। সে হাসি শুনেছিলাম পথে পথে, এক বন্দী বিহঙ্গের পাখা ঝাপটা-খাওয়া শব্দ শুনেছিলাম তখন লৌহপিঞ্জরে। আর এখন, দুর্গকোলে, এই যমুনাতীরের জ্যোৎস্নাভরা হাল্কা কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রি। এ-রাত্রি যেন বদ্ধজলার নিস্তরঙ্গ জল। তাতে রুদ্ধশ্বাস। ব্যথা ও যন্ত্রণা এক নতুন হাসির কুহকজাল ঘিরে আনন্দময়ের রূপে ফুটে উঠতে চাইছে।
আরো শুনলাম। শুনলাম, বুঝি এক তীব্র বিদ্রুপের ধ্বনি অনুরণিত হচ্ছে ওই হাসিতে। যেন আমাকে বিঁধিয়ে বলছে, এসেছ তো? এসেছ!
মনে পড়লো, নিজের অভিশপ্ত জীবন ও হৃদয়ের তিক্ততায় সেদিন শ্যামা হঠাৎ বিচিত্র রূপ ধরে আমার মাথা হেঁটে করে দিতে চেয়েছিল, আমি তখন হেসেছিলাম! আজ এই হাসির সামনে যদি না হাসতে পারি, তবে এই ভীরু দুর্বল চিত্ত নিয়ে লজ্জায় মরে যাব।
ফিরে তাকালাম শ্যামার দিকে। সাজা-গোজার অন্ত নেই। সিল্ক শাড়ি পরে বসেছে রুটি সেঁকতে। উলেন স্কার্ফ এলিয়ে পড়েছে কাঁধের থেকে মাটিতে। তাকিয়ে দেখলাম, বাঁকা চোখে তীব্র অনুসন্ধিৎসা। ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু কেন যেন নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারেনি, বরং হঠাৎ লজ্জায় তার খরহাসির তীব্রতাকে একটু করুণ করে তুলেছে। কাঁচা সোনার অলংকার ঝিক্মিক্ করছে তার হাতে গলায়। তার অপলক চোখের দৃষ্টিটা এমন করে বিঁধে রইলো আমার সারা মুখ জুড়ে যে, মুখ ফেরাতেও পারি নে।
শ্যামা তাড়াতাড়ি নিজের ছোট্ট চারপায়াটি এগিয়ে দিল বললো, ‘বস।’
পাতিয়া যেভাবে রামনাম নিল, তাকে বাঙলা করলে বোধ হয় হবে ‘মরণ’! বলরাম ও হাসল, ‘বসেন ঠাকুর।’
বলরামের গলায় ব্যাকুলতা। ফিরে তাকিয়ে দেখি, তার মুখে পাগলা হাসির বান ডেকেছে। কিন্তু বসব? সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারছি নে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর সব কোথায়?’
শ্যামার হৃদয় বাঁকা! কথার আগেই ঘাড় বেঁকে যায়। যেন তাগ কষছে! বললো, ‘আর কারা?’
বললাম, ‘তোমার সতীন, স্বামী, তারা সব কোথায়?’
ভ্রূ তুলে বললো শ্যামা, ‘না থাকলে বুঝি বসা যায় না?’
এবার কথার সুরও বাঁকা হয়ে উঠলো শ্যামার। চট করে কোনো জবাব যোগাল না মুখে। তার মুখের দিকে চেয়ে চমকে আড়ষ্ট হয়ে উঠলো মন। হাসিটি কেন যাই-যাই করে তার মুখ থেকে? তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন বুকের ভেতরটি পর্যন্ত দেখে নিতে চাইছে।
বললাম, ‘না, বসা যাবে না কেন? এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম।’
শ্যামা বললো, ‘তবে নারাজ কেন?’
নারাজ নই। নারাজ আমার মনের সামাজিকতা, ভব্যতা, লোকলজ্জা। কিন্তু বুঝলাম, ওই বোধগুলি আপাতত বিবেকের আড়াল করে বসতে হবে। মনে করেছিলাম, পথে বেরিয়েছি, লজ্জা ঘেন্না ভয়, তিন থাকতে নয়। ওসব বালাই রাখব না মনে। কিন্তু যে আছে আমার রক্তধারায়, তাকে ছাড়ব বললে ছাড়ানো যায় না। তবু ভাবলাম, শ্যামার কথায় বসতে গিয়ে যদি কোনো বেদনাদায়ক অপমান নিয়ে ফিরতে হয়, আমার চলার পথের ধূলায় তো ফেলে রেখে যাব। যদি না পারি, তবু জানি, জীবন-মনের পলিতে একদিন তা ঢাকা পড়ে যাবে।
বসলাম। তবু বিস্ময়ের সঙ্গে একটা অজানা বিচিত্র অনভূতি ঘিরে রইলো মনে। অজানা, কেননা, শ্যামার হৃদয়ের গতি অজানা। সে খিলখিল করে হাসলে, ঠাট্টা করলে, তাকে বুঝতে পারি। কিন্তু ডেকে বসতে বলে যদি এমনি করে মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকে, যদি তার মনের গোপন লীলা খেলা করতে থাকে মুখের ছায়ায়, তবে থাকি কেমন করে!
পাতিয়া দেহাতি ভাষায়, চাপা স্বরে বিদ্রুপ করে বলে উঠলো, ‘তাহলে রাতে আর রুটি বানানো হবে না তো? আজ এই পর্যন্তই?’
শ্যামা অমনি তার চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে দিল। টানাটা একটু বেশিই হয়েছে। টাল সামলে পাতিয়া বললো, ‘উঃ বাবাগো! নিজের চুল ধরে টানো। আমার কেন?’
বলে, চকিতে একবার আমাকে দেখে, বলরামের দিকে চেয়ে হাসলো। বুঝলাম, শুধু নোকরানী নয়, পাতিয়া নোকরানীর অন্তরালে খুনসুটি করার সইও বটে। কিন্তু পাতিয়ার খোঁচানিতে কাজ হলো। আবার উনুনের ধারে বসলো শ্যামা।
আর বাধা মানল না বলরামের গলা। সে আপন মনে চাপা স্বরে গুনগুন করে উঠল—
‘কত কথা ছিল মনে।
আজ মনে বাহির হইল না,
সখী, একি দায়, সময় যায়,
বুক ফাটিয়ে মুখ খুইল্ল না।।’
ওরা না বুঝুক বলরামের গানের কথা। নিজে তো বুঝি। বুঝে লজ্জায় ও ত্রাসে চমকে উঠলাম। অবস্থাটা কাটাবার কারণে তাড়াতাড়ি কথা বলবার জন্য মুখ তুললাম। শ্যামাও মুখ তুলল। বোধ হয় কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিল, থেমে রইলো।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শ্যামা বললো, ‘কী বলছিলে?’
বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কী কথা বলতে যাচ্ছিলাম, তা নিজেই জানি না। বললাম, ‘কিছু নয়। তুমি কী বলছিলে?’
শ্যামা বললো, ‘বলছিলাম, কোথায় আছ? কোন্ আশ্রমে?’
জবাব দিলাম।
পাতিয়া বিদ্রুপভরে বললো শ্যামাকে, ‘মেহেরবানি করে একটু সরে বস, এবার আমি বানাচ্ছি রুটি।
শ্যামা সে-বিদ্রুপ গায়ে মাখল না। সরে বসলা সত্যি সত্যি। তারপর কেমন আছি, কোথায় ঘুরলাম, কোথায় খাই, সব জিজ্ঞেস করলো। জিজ্ঞেস করলো, জবাব নিল, আর টেরে টেরে চেয়ে হাসলো নিঃশব্দে। বললো, ‘তোমার লুলাসাধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার সঙ্গে দেখা হয় কিনা। এমন আজীব আদমি তুমি?’
এটা বোধ হয় তার ডাকাডাকির কৈফিয়ত। কিন্তু আজীব কেন? বললাম, ‘কেন?’
সে বললো, ‘কী জানি! রেলগাড়িতে সেদিন তোমাকে খুব তখলিফ দিয়েছিলাম, না?’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেইজন্যই ডেকেছ বুঝি?’
সে বললো, ‘হট।’
এমন করে তাকিয়ে ছিল পাতিয়া আর বলরাম, এমন নীরবে শুনছিল, যে আর বসে থাকতে পারলাম না। একেবারে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘উঠি।’
শ্যামা বললো, ‘কাল আসবে তো?’
কেন, জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। পারলাম না। কিন্তু আসা-আসির কথা আদায়ের বাঁধাবাঁধি কেন!
বললাম, ‘যদি পারি।’
বলে, মাথার ছাউনির বাইরে এলাম। বলরাম এলো। গলায় তার গুনগুনানি থামেনি। হ্যারিকেনের আলো কোথায় হারিয়ে গেল। মাঘ মাসে পৌষ-পূর্ণিমার জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়লো গায়ে।
শ্যামার চাপা আহ্বান শোনা গেল, ‘শোনো।’
ফিরে তাকালাম। চাপা বর্ণের খয়েরি সিল্ক শাড়িতে নীল জ্যোৎস্নার ঝরনা গড়িয়ে পড়ল। আর ঝিকমিকিয়ে উঠলো রুপোলি উলেন স্কার্ফ। কাছে এসে বললো, ‘সেদিন রাগ করেছিলে?’
সেদিন মানে একদিনই। বিদায়ের মুহূর্তে চকিতে বদলে যাওয়া মুখে তার সেই তিক্তকথা। না জেনে সেদিন তার বড় তিক্ত বেদনার বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে দিয়েছিলাম। রাগ করবো কেন! দোষ তো আমারই।
বললাম, ‘না, রাগ করি নি তো!’
‘সত্যি? সচ বলছ?’ সংশয়াকুল হাসি তার মুখে।
সংশয় কেন? কেন রাগ করিনি, অত সব কথা বলতে পারবো না বুঝিয়ে। রাগ যে করিনি, করতে পারিনি, সে কথা তো জানি নিজের মনে।
বললাম, ‘মিছে বলবো কেন? সত্যি বলছি।’
এবার হাসির সঙ্গে চোখে তার কৃতজ্ঞতা দেখা দিল। বললো, ‘কাল এসো কিন্তু। এই সময়?’
চোখাচোখি হলো আবার। হাসির সঙ্গে এই বিষন্ন জ্যোৎস্নার মতে। একটা আবেশের লক্ষণ ফুটে উঠেছে তার চোখে। কপালের টিপটি কাঁপছে তার তৃতীয় নয়নের মতো। অনুরোধে মিনতির সুর!
জবাব না দিয়ে চলে এলাম। ভুলি নি, সঙ্গে রয়েছে বলরাম। তবু কথা এলো না। মন চমকাল বারে বারে। মানুষের মন। সে যেন পথের ধারে দোলানো আয়না। লক্ষ চমক তার বুকে।
শ্যামা স্বৈরিণী নয়। এক কুলীন ভূঁইহার ঘরের অশীতিপর বৃদ্ধের যুবতী বউ! হৃদয়ে তার বহু বজ্রের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ রয়েছে চাপা। উৎসবের রাত্রে তা খোলা আকাশের বুকে বহু রঙের সব আলোর ঝাড়ে হাউইয়ের মতো জ্বলে উঠতে চায়। চোখ ও মন ভরে দিতে চায়। উৎসবের বাসর রচনা করতে চায় সর্বত্র, জীবনের বিড়ম্বনার অন্ধকারে। তাই এ সমাজের সব পরিবেশেই সে ভিন্ন ও বিচিত্র।
কিন্তু আমার পথে নেমে আসে যদি অন্ধকার! ভেজা পথে যদি বারে বারে আটকায় পা?
বলরাম বললো, ‘ঠাকুর, আমার উপর রাগ কইরেছেন?’
বললাম, ‘না।’
‘তবে বলি এট্টা কথা?’
‘বল।’
‘বইলব, তার আগে এট্টুস গরম চা পেইলে হইত।’
নাঃ, বলরামই দেখছি ঠিক আছে। মুখ ফেরাতেই দেখলাম চাঁদের আলোয়, এক গাল হাসি তার মুখে। ভিড় এখনো খুব। গাড়ি ঘোড়া ও মানুষের অবিরাম যাওয়া-আসা। জ্যোৎস্না পেয়ে সবাই যেন নতুন করে মেতে উঠেছে।
দোকানের কোনো অভাব নেই। চা নিয়ে বলরাম বললো, ‘ঠাকুর, গুরু ধইরেছেন?’
এ আবার কী কথা! বললাম, ‘গুরু? কেন হে?’
বলরাম বললো, ‘গুরু না হইলে কি চলে? জন্ম থেকে মরণ পর্যন্ত, গুরু আসে যায়, সকলে তো চিনা দেয় না।’ বলে গুনগুন করে উঠল—
‘গুরু বইলে ক্যারে পরনাম করিব মন।
তোর ভিতরে গুরু, বাইরে গুরু,
গুরু অগণন।’
গেয়ে বললো- ‘তার মধ্যে এক গুরু,
সখী গো! এবার গুরু বলে রাখি মাথা
তোমার চরণে,
পেমরীতি বুঝাইলে তুমি অবোধ
জীবনে।’
বললো, ‘বুইঝেছেন? এই গুরু ঠিক না থাকলে, সব বেঠিক।’ বলে হেসে উঠলো।
একটু বুঝি অন্যমনস্ক রইলাম। পরে বললাম, ‘তুমি গুরু করেছ তো, বলরাম?’
বললো, ‘কইরেছি। কিন্তু ঠাকুর, গুরুর সেবা কইরে আমার মনটা ভরে না।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে তোমার সেই গুরু?’
বলরাম বললো, ‘যে নিজে কেন্দে আমাকে কান্দায়।’ বলে সে হঠাৎ চোখ মুছলো। চোখে তার জল! বললো, ‘ঠাকুর, কাইলকে আইসবেন কিন্তুন্। নক্কীদাসী আপনার জন্যে বইসে থাকবে।’
চলে এলাম। শেষ, বলরামের চোখের জলে আজ আমার ডুব দেওয়া সাঙ্গ হলো। জলের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। অনেক, অনেক মুখ মনে পড়ছে। এক লক্ষ মানুষের মুখের মিছিল, আজ তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। কত গুরু। পথে প্রান্তরে, কুটিরে বস্তিতে, ইমারতে ঘরে—অগণিত গুরুকে আমার নমস্কার জানাই।
Chapter - 15
১৫
একেবারে যাবার ইচ্ছা ছিল না বলতে পারি নে। কিন্তু পরদিন সন্ধ্যাবেলায় যেতে পারলাম না। অনেক ঘোরা বাকি ছিল। এখন ঘুরে না নিলে আর হবে না। তবু ভেবেছিলান, সন্ধ্যাবেলা ঘুরে-ফিরে তারপর যাব। সন্ধ্যাবেলায় নৌকায় করে ফিরে আসছিলাম যমুনার ওপার থেকে। হঠাৎ এই মাঘের সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর মতো চকিতে মেঘে ছেয়ে ফেললো আকাশ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ ঝলকে ঝলকিত যমুনা। ঢেউ উঠলো তার বুকে। নৌকা দুলে উঠলো। বাতাস এলো, ঘোর হয়ে এলো অন্ধকার। ঝুসির পাড়ে নৌকা ঠেকাবার আগেই বৃষ্টি নেমে এলো, ঝোড়ো ঝাপটায়। ইচ্ছে করলো গুনগুনিয়ে উঠি—
‘উন্মাদ পবনে যমুনা তর্জিত/ঘন ঘন গর্জিত মেহ,
দমকত বিদ্যুৎ পথতরু লুণ্ঠিত/থরথর কম্পিত দেহ।’
পাড়ে যখন উঠলাম, তখন সর্বাঙ্গ সিক্ত। একে উত্তর প্রদেশের মাঘের শীত। তার উপরে জল। অসহ্য শীতে দাঁতে দাঁত, হাঁটুতে হাঁটু ঠেকে গেল। চারিদিকে সবাই ছুটছে। মানুষ ও জানোয়ার সমান তালে ছুটছে আশ্রয়ের সন্ধানে। দোকানপাট ঝাঁপ ফেলছে তাড়াতাড়ি। কোন রকমে আশ্রমে এসে উঠলাম।
সারারাত্রি প্রায় জল ঝরল। সকালবেলা শোনা গেল, কে একজন বৃদ্ধ সাধু শীতে বৃষ্টিতে বাইরে থেকে মারা গিয়েছে। হিমপ্রবাহের প্রথম শিকার। তারপরেই দারুণ অভিশাপের মতো বালুচরে নেমে এলো ভয়ংকর হিমপ্রবাহ। সারা উত্তর প্রদেশ জুড়েই এক অদৃশ্য ভল্লুক তার থাবা বসাল। ভেঙে যেতে লাগলো মেলা।
খোলা আকাশের বুকে যেসব সাধুরা আস্তানা নিয়েছিল, তারা লোটা কম্বল নিয়ে ছুটল শহরের দিকে। ঝুসির উঁচু জমির কোলে গুহা কেটে আশ্রয় নিয়েছিল যারা, তারা পালাতে লাগল। যাদের ঘর, তাঁবু ধসে ভেঙে পড়েছে, তারা বোঁচকাবুচকি নিয়ে ঘরে অভিযান করলো।
চারিদিকে শুধু পালাই পালাই রব। কোটরে কোটরে কেবল গোঙানি ও যন্ত্রণার ফোঁপানি। ভগবানের কাছে নিবেদন, আবেদন। শীতের তাণ্ডব চারিদিক ছত্রাকার করে দিল। এখন শুধু–
‘আগুন আমার ভাই,
আমি তাহারি গান গাই।’
আগুন, আগুন চাই। মানুষ বেরোয় না। শুধু উটগুলি কাঁপতে কাঁপতে আসে কাঠের বোঝা নিয়ে। এলাহাবাদের বাউন্ডুলে মেয়েপুরুষেরা কেউ বেকার রইলো না। সকলেই বনে বাদাড়ে ঘুরে কাঠ এনে বিক্রি শুরু করলো। আর নিয়ে আসতে-না-আসতে বিক্রি হয়ে যায়। একবেলা খাওয়া না জুটুক, আগুন না হলে চলবে না।
আগুন নিয়ে কাড়াকাড়ি, মারামারি। অর্থবান আশ্রমগুলি ভালো আছে। তাদের কাঠ, আগুন ও ভালো তাঁবুর অভাব নেই। সেখানে নাগারা উলঙ্গ হয়েই বেড়াচ্ছে নির্বিকারভাবে। কিন্তু অধিকাংশ গ্রাম থেকে নিয়ে আসছে কাঠ। এক টুকরো কাঠের জন্য তীর্থক্ষেত্রে কোলাহল ঝগড়ার অন্ত নেই
আমাদের আশ্রমের কাছেই গোলমাল। বেরুতে পারি নে তিন দিন ধরে। ইচ্ছে করলে বেরুনো যেত। কিন্তু এই শীতে কোথায় যাব! তার মধ্যে ভেজা ওভারকোটটি কয়েক মাসের মধ্যে শুকোবে কিনা সন্দেহ। তার ওজন হয়েছে কয়েক মাণ। গোলমাল শুনে বেরিয়ে এসে দেখি, একজন সাধুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দু’জন লোক। সাধুটির হাতে কয়েক টুকরো কাঠ। কী ব্যাপার? না, সাধুটি নাকি কাঠ চুরি করেছে ওই লোক দু’টির দোকান থেকে। কিন্তু সাধু কিছুতেই যাবে না। ভয়ংকর ভয়ংকর সব অভিশাপবাক্য বর্ষিত হচ্ছে তার গলা থেকে। কিছুতেই যখন যাবে না, তখন লোক দু’টি আক্রমণ করলো তাকে। সে পিঠ পেতে নিল সেই পীড়ন। তারপর বললো, ‘বেশ করেছ, মগর লকড়ি দেব না।’
দিল না। লকড়ি না, প্রাণের টুকরো কটি নিয়ে সে ফিরে গেল হাসতে হাসতে। একদিন শহরে গেলাম। ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম দেখলাম। কৌতূহল মিটল আনন্দভবন দেখে। একটু পোস্ট-অফিসে যাওয়ার দরকার ছিল। সেখানে গিয়ে দেখা এক বন্ধুর সঙ্গে। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক বন্ধু। তাঁকে আর এ কাহিনীতে টানব না। কিন্তু কদিন ধরে শুধু শহরেই যাওয়া আসা করলাম। একদিন নিমন্ত্রণ পেলাম, কেল্লার অভ্যন্তরভাগে সবকিছু দেখে নেওয়ার। সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ।
গোলাপী বর্ণের আকবরের দুর্গাভ্যন্তরের সৌধটি, পাঁচিলের বেড়ার মধ্যে নির্জনে দাঁড়িয়ে আছে একলা। পাঁচিলের দরজা সারাদিন বন্ধই থাকে। কারণ ওখানে বারুদের স্তূপ নাকি ঠাসা আছে। সেখানে সাধারণ কর্মচারীদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। মানুষের সঙ্গে যেন এক অতীত সৌধের অদৃশ্য মানুষেরা অবাক চোখ মেলে রইলো অলিন্দে অলিন্দে, গবাক্ষে গবাক্ষে। গবাক্ষে প্রবেশমুখে কোনো দরজা নেই। ছিল না কোনোদিন। মখমলের ভারী পর্দা ঝুলত। সেই পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকত খোলা সঙ্গমের হাওয়া। বেনোয়ারি কাচের ঝাড় বাজত ঠিনিনিনি করে। এখন খোলা গবাক্ষ দরজা দিয়ে হাওয়া ঢুকে পাক খেয়ে ভিতরেই হারিয়ে যায়। আকবরের দুর্গ, দরবার বসতো একদিন এখানে। এখন পুরনো ইমারতের গন্ধে বাতাস ভারী।
বেরিয়ে এলাম। এই সৌধের পূর্বে দ্বিতীয় অট্টালিকার পেছনে জঙ্গল ও পুরনো প্রাচীর। প্রাচীরের নিচেই গঙ্গা। দেখলাম, এক জায়গায় একটি বিশাল বট। আসলের চেয়ে সুদ বেশি। বটের ঝুরি নেমে তৈরি হয়েছে আরও কতকগুলি গুঁড়ি। বটের গভীর ঝাড়ে চারদিকে হাল্কা অন্ধকার। তলায় গোবর দিয়ে সযত্নে লেপা-মোছা রয়েছে। লেখা আছে, অক্ষয়বট।
এই-ই প্রাচীন ও প্রকৃত অক্ষয়বট। কেল্লার অন্য অংশে পাতালপুরীতে অনেক দেবদেবীর সঙ্গেও রয়েছে একটি শাখাপত্রহীন বটের মোটা ডাল। পাণ্ডা বললো, ওটিই আসলে অক্ষয়বট। ইতিহাস তা বলে না। এই কৃত্রিম শাখাটি নিয়ে এক সময়ে কাগজে লেখালেখিও হয়েছিল। ওটি আসল অক্ষয়বট নয়, পাণ্ডাদের পয়সা রোজগারের সিদ্ধিবট হবে হয়তো। শ্রীশিবনাথ কাটজু, এম. এলো. এ, গবেষণা করে জানিয়েছেন, নিরালার এই ঝুরি-নামা বটটি আসল অক্ষয়বট। এর উপরে দাঁড়ালে দেখা যায় গঙ্গা-যমুনার সঙ্গম। আদিগন্ত মেলা ও তাঁবুর সমুদ্র।
একদিন, এই গাছ থেকেই সহস্ৰ সহস্ৰ হিন্দু ঝাঁপিয়ে পড়ে সঙ্গমে প্রাণ দিয়েছেন। তুলসীদাসের শ্রীরামচরিত মানসে আছে—
‘সঙ্গম সিংহাসনু সুধি সোহা।
ছত্র অক্ষয়বট মুনিমন মোহা।।
পূজহিঁ মাধব পদ জলজাতা।
পরসি অক্ষয়বট হরক্ষহি গাতা।।’
হিউ-এন-সাঙ, অলবেরুনী, আকবরের আমলের ইতিহাস-লেখক আবদুল কাদের বাদায়ুনী সকলেই লিখে ও বলে গিয়েছেন।
আর ওই দুরের চর, সঙ্গমের তীরভূমি। কোথায় কোন স্থানটিতে মাথায় রাজমুকুট নিয়ে এসে বসতেন সম্রাট হর্ষবর্ধন? কোথায় বসতো তাঁর পঞ্চবার্ষিকী মহাসভা, যেখানে, যুদ্ধের উপকরণ ছাড়া সবই বিলিয়ে দেওয়া হত দানছত্র খুলে। কিন্তু আশ্চর্য। কুম্ভমেলার ইতিহাস কোথাও নেই। কেবল লক্ষ লক্ষ নরনারী যুগযুগান্ত থেকে পাগলের মতো ছুটে এসেছে, এখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সঙ্গমে। কেউ বলেন, শঙ্করাচার্য এ মেলার প্রতিষ্ঠাতা। কতখানি সত্য তা জানি নে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শঙ্করাচার্য তাঁর প্রচারমঠ করেছিলেন চার জায়গায়। শৃঙ্গগিরিতে শৃঙ্গগিরি মঠ, দ্বারকায় সারদা মঠ, শ্রীক্ষেত্রে গোবর্ধন ও বদরিকাশ্রম অঞ্চলে যোশীমঠ। প্রয়াগের উল্লেখ তো দেখি নে!
ইতিহাসই যখন এলো, তখন শঙ্করাচার্যের কথা আর-একটু বলি। সে ইতিহাস একটু রাজনীতি-ঘেঁষা। এগারো শো বছর আগে আরব সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে তখন ইসলাম ধর্মপ্রচারকেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভারতের দক্ষিণ সৈকতে। ধর্মপ্রচারের নামে, ওটা রাজ্য দখলের ফিকির বলা যায়। আর হিন্দু নিম্নবর্ণের মানুষেরা তখন বর্ণহিন্দুদের দ্বারা এমন ভয়াবহভাবে নির্যাতিত যে, তারা দলে দলে মুসলমান হতে আরম্ভ করলো। মন্দিরে প্রবেশাধিকার তো দূরের কথা, ভগবানকে ডাকবারই অধিকার নেই। ইসলাম ধর্ম উদার মূর্তি ধরে দিল দেখা। রাজায় প্রজায় একসঙ্গে বসে প্রার্থনা করলেও ভগবান অসন্তুষ্ট নন। তখন শঙ্করাচার্য ব্যাপার দেখে ধর্মকে ভেঙে গড়লেন। ইসলাম এক? হিন্দুর ভগবানও এক। উৎপত্তি হলো শঙ্করাচার্যের কেবলাদ্বৈতবাদ। নির্গুণ উপাসনা। এ ধর্মান্দোলনে তখন প্রগতিশীলতার গন্ধ ছিল। আজকে অনেকখানি মূল্যহীন। তবু আজকের ভারতকে অস্পৃশ্যতাবিরোধী অভিযান করতে হয়।
এই আমলেও হয়তো সহস্র সহস্র মানুষ এসেছে কুম্ভমেলায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ দিয়েছে।
আজও আসে, এখনো আসে। আমার মতো কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ দেখেছে। তবু ভাবি, সেদিনও কি এমনি বিচিত্রের মেলা বসতো! এমনি সব বিচিত্র নরনারী আসত তাদের হাসি ও চোখের জল নিয়ে! হয়তো আসতো, এর চেয়েও বিচিত্রতর ছিল তাদের হৃদয়লীলা।
Chapter - 16
১৬
শুনলাম, আগুন লেগেছে প্যারেড গ্রাউণ্ডে। যে আগুন এখন মানুষের প্রাণ, সেই আগুন রুদ্রমূর্তিতে দিয়েছে দেখা। ভয় হলো। প্যারেড গ্রাউণ্ডে বলরাম থাকে। এর পরে একদিনও যাই নি। আগুন লাগার কথা শুনে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, না, বলরামের তাঁবু অক্ষত আছে।
বলরাম বললো, ‘জাইনতাম, ঠাকুর আমার না এইসে পাইরবেন না। ঠাকুর কি আর এমনি কইছি! ওইখানে থেকে উনি পিতিদিন এইসে এইসে জিজ্ঞাসা কইরেছেন, কই লুলাসাধুজী, তোমার বাবুজী তো আইসলেন না? মনে মনে কইছি, রয়েন গো ঠাকরুণ, সময় হইলে আপনি আইসবেন।’
বুঝলাম, শ্যামার কথা বলছে। অভদ্রতার চেয়েও বড় কথা, শ্যামার নিস্পাপ হৃদয়লীলা দু’দিনের জন্য সুর তুলতে চেয়েছিল। তার সেই বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে পারিনি, আমার সমাজবোধের জন্য।
বলরাম বললো, ‘আপনি রোজই শহরে চইলে যান শুইনলাম, কাইল গেছিলাম আমরা আপনার আশ্রমে। গিয়া শুনলাম, আপনি নাই। কেউ কিছু কয় নাই আপনারে?’
অবাক হলাম। তাই তো, কাল ব্রজবালা কী যেন বলছিল। প্রহ্লাদ এ ভয়ংকর ঠাণ্ডায় শয্যা নিয়েছে। ব্রজবালার মন খারাপ। তবু একবার যেন বলেছিল, ‘তোমাকে ডাকতে এসেছিল কারা।’ ভেবেছিলাম, শহরের কেউ হবে। যেভাবে শহরে পরিচয়ের বাড়াবাড়ি ঘটে, কারুর আসা বিচিত্র নয়।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি গেছলে?’
বলরাম বললো, ‘একলা নয়, ওনারা চাইরজন আছিলেন। ওনার সতীন, সতীনের বুইন আর ঝি। আমারে কইলেন, লুলাসাধুজী, আমার সতীন না গেলে তোমার বাবুজী আইসবেন না। চলো ঘুইরে আসি। আপনারে পালাম না। ওনারা অনেক জিনিসপত্র কিনলেন, তারপর আইসে পড়লেন।’
স্তব্ধ হয়ে রইলাম। বলরাম বললো, ‘যাইবেন একবার?’ বলরামেরও হাসিমুখে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।
বললাম, ‘বলরাম, যাওয়া যায় না।’
ফিরে আসবার পথে লক্ষ্মীদাসী ছুটে এলো। বললো, ‘ঠাকুর, আপনে এট্টু বারণ কইরে যান তারে, যেন এমনি করে বাইরে না বইসে থাকে। আবার মেলায় মানুষ বাড়তেছে। কাইলকে কার পায়ের তলায় পইড়ে মাথায় চোট খাইছে। আপনে এট্টু কন, আপনার কথা শুইনবে। কিছু কইলে খালি এক. কথা, নক্বীদাসী! মন যে মানে না গো! তবে আখড়া, ভোগ পূজা রেইখে তুমি আমার সঙ্গে চল। যদি কই, কোথায়? কয়, যেইখানে মন টানে, মন যায়।’
কেঁদে ভাসাল লক্ষ্মীদাসী। বলরাম বললো, ‘নক্কীদাসী, তোমার কাছেই তো পাঠ নিছি—
‘আর বইসে থাকার সময় নাই গো,
বেন্দাবনে বাজছে বাঁশি আমার নাম ধইরে।
তবু বললাম, ‘কিন্তু সাবধান থেকো বলরাম। এভাবে জীবন সংশয় কোর না।’
Chapter - 17
১৭
সত্যি, আবার লোক বাড়তে আরম্ভ করেছে। মাঝে ভাঙন ধরেছিল, ফিরে যাওয়ার তাড়া পড়েছিল একটা। কিন্তু দ্বিগুণ করে ফিরে আসার তাড়া পড়েছে। ঠাণ্ডা কমেছে, হিমপ্ৰবাহ সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আবার রোদ হাসতে আরম্ভ করেছে। প্রত্যহ নতুন নতুন সাধুবাহিনী হাতি, ঘোড়া ও নিশানের মিছিল নিয়ে ছুটে আসছে দূর-দূরান্তর থেকে।
এই প্রথম দেখলাম, উলঙ্গ সন্ন্যাসী উন্মুক্ত কৃপাণ হস্তে ছুটে আসছে অশ্ব-সওয়ার হয়ে। বিশেষ নাগাদেরই এ রুদ্রমূর্তিতে দেখা যাচ্ছে বেশি। তাদের চেহারায়, অস্ত্রে, সর্বদাই তারা ভয়ংকর। কখন থেকে এদের উৎপত্তি, জানি নে। তবে শুনেছি, নগ্নতা বহুদিনের। কৃপাণ কয়েক-শো বছর আগের। অসহায় সাধুদের রক্ষার জন্য চৌদ্দশ’ শকে বালানন্দজী সাধু সংরক্ষণী সশস্ত্র সাধুসেনাবাহিনী তৈরি করেছিলেন। এমনকি এরা অনেক সময় রাষ্ট্রের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছে।
সাধু ও মানুষের ভিড়ে মেলা আবার জমে উঠলো। সামনে অমাবস্যা। মৌনী অমাবস্যা। সেইদিন পূর্ণকুম্ভ স্নান।
একদিন রাত্রিবেলা পাঁচুগোপাল বললো, ‘তুমি সব লিখবে, এখানকার সব কথা?’
বললাম, ‘যদি লিখি?’
‘আমার কথাও লিখবে?’ চেয়ে দেখি, পাঁচুগোপালের সেই চোখে আবার পাগলামির ছায়া। বললাম, ‘লিখতে পারি।’
কেউ ছিল না। তবুও চারিদিক দেখে সে চাপা গলায় বললো, ‘তবে লিখে দিও আমি বলেছি সেইভাবে নয় কিন্তু! লিখে দিও, যদি সে একবার এসে বলে, বাবামণি, তুমি আমায় মাফ কর, তবে, তবেই আমি তাকে…’
কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হলো তার। দুপ্-দাপ্ শব্দে চলে গেল সামনে থেকে। ‘সে’ মানে তার মেয়ে শিউলি। যে তার বাবাকে ছেড়ে গিয়েছে। জানি নে, সে কোথায় আছে। কিন্তু আমি লিখে দিলে যদি সে পাঁচুগোপালকে এসে বাবামণি বলে ডাকে, তবে লিখে দেব। নিশ্চয়ই লিখে দেব। লিখে দেব, ‘শিউলি! কোথায় ফুটেছ, কোথা থেকে ছড়াচ্ছ এত গন্ধ! ডক্টর পাঁচুগোপাল পাগল হয়ে ফিরছে পথে পথে। একবার বাবামণি বলে ডেকে তার কোল ভরে দিয়ে যাও।’
Chapter - 18
১৮
মেলা পাগল হয়ে উঠলো। যে মানুষের বন্যা দেখে এতদিন অবাক হয়েছি, এবার তার অনেক গুণ বেশি। মনে হলো, মানুষ আর ধরবে না সারা মেলায়।
অমাবস্যা নিকটবর্তী। সকালবেলা এসে হাজির বলরাম। এসে বললো, ‘চলেন ঠাকুর।’ বললাম, ‘কোথায় হে?’
বললো, ‘যেখানে যাওয়ার।’
আশ্রমের সবাই অবাক বলরামকে দেখে। শুনলাম, সকলেই বলাবলি করছে, ছোঁড়াটা কোনো গুণ-তুকের ওষুধের সন্ধানে আছে। নইলে, ওসব মানুষের সঙ্গে কেন? ব্রজবালাও আমাকে পর পর ভাবতে আরম্ভ করেছে।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায়? তোমাদের তাঁবুতে?’
সে বললো, ‘না, বেড়াইতে।’
বের হলাম। বলরাম সোজা দক্ষিণে নিয়ে চললো। নিয়ে চললো, যেখানে গৃহবধূদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বুঝতে দেরি হলো না, কেন বলরাম টেনে নিয়ে এসেছে।
দূর থেকেই দেখলাম, জনবিরল গঙ্গার ধারে শ্যামা দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের কাছে তার জলভরা কলসী। কলসীর মুখে ভেজা জামাকাপড়। বুঝলাম, চান করে দাঁড়িয়ে আছে। পরেছে লাল টকটকে শাড়ি। জানি, সে দেখেছে। তবু মুখ ফিরিয়ে আছে অন্যদিকে।
পা আপনি থেমে এলো। বললাম, ‘বলরাম, তুমি তো আনন্দ ছাড়া কিছু জানো না। তবে পথের মাঝে শুধু অনাসৃষ্টি করে এ নিরানন্দকে ডেকে আনছ কেন?’
বলরাম বললো, ‘ঠাকুর, ‘আপনি বইলছেন অনাচ্ছিষ্টি? তবে চোখের জল কি শুধু অনাচ্ছিষ্টি? তবে আনন্দে চোখের জল ফেলেন কেন? ‘
‘এখানে সে আনন্দ কই?’
‘ওই যে। হেসে, কথা কয়ে একজন আনন্দ ছিষ্টি করতে চাইছে, তারে আমি থামাই কেমনে? যে কেন্দে কেন্দে আনন্দ কইরতে চায়, তারে ফিরাই কেমনে? এই যমুনাপারে আপনারা দেখা করেন, কেন্দে ফিরে যান। আমি তাই দেখি। দেইখে ফিরে যাইব। সেই আমার আনন্দ। পথ চলার ওই তো মজা। ওই আনন্দটুকুই তার লাভ।’
‘এই বুঝি তোমার গুরুর শিক্ষা?’
‘হ্যাঁ। কিন্তুন্ সে বলে ওইটুকু নাকি তার দুঃখু। সে-দুঃখু মাইনসের সঙ্গ ছাড়ে না। আমরা আনন্দ-দুঃখু একসঙ্গে থাকি।’
বলে সে হাসলো। এগিয়ে গেলাম। শ্যামা ফিরে তাকাল। কিন্তু এ কী! এতদিন সে অন্য শাড়ি পড়ে রাঙা হাসি হেসেছে। আজ রাঙা শাড়ি পরে এসেছে, কিন্তু সারা মুখে ব্যথা-নীল যমুনার স্থির ও গম্ভীর ছায়া। ভেজা চুল এলানো। বাঁকা চোখে তার অভিমানক্ষুব্ধ তিরস্কার। তাকিয়ে প্রথমে শুধু বললো, ‘মিথ্যুক!’
ওইটকু বলতেই তার গলায় যেন অনেক জোর দিতে হলো। বলরাম বললো, ‘ঠিক। কপট বাক্যিতে ঠাকুর বড়সড়ো দেখতেছি।’
না হেসে পারলাম না। মেনে নিতে হলো শ্যামার অভিযোগ। বললাম, ‘শুনলাম, তোমরা একদিন আশ্রমে এসেছিলে।’
চকিতে ঠোঁট বেঁকিয়ে শ্যামা বললো, ‘মগর, তুমি পালিয়েছিলে। ভীরু! কেন পালিয়েছিলে?’
বললাম, ‘পালাই নি। জানতাম না তোমরা আসবে।’
সে বললো, ‘জানতে। ভয়ে পালিয়েছিলে।’
‘কার ভয়ে?’
‘আমার ভয়ে।’
‘তোমার ভয়ে? কেন?’
শ্যামা চকিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। মুখ না দেখিয়ে বললো, ‘আমি খারাপ আওরত, তাই। তোমাকে তখলিফ দেব, সেই ভয়ে তুমি কথা দিয়েও যাওনি। তুমি এসেছ, চলে যাবে। আমিও চলে যাব। মানুষের সঙ্গে কি মানুষের মিতালি হয় না?’
বলে সে ফিরল। হাস্যময়ী শ্যামার চোখে বহতা যমুনা। বললো, ‘যেয়ে দেখতে, তোমাকে তখলিফ দিতাম না। যত খারাপ ভাব, আমি তত খারাপ নই।’
পরাজয় ধিক্কার দিল আমাকে। শ্যামার লাল শাড়ি নীল হয়ে উঠলো। ও যে ব্যথার রঙ। যমুনার কারসাজি। যমুনাতীরের বাঁশি কবে লোকলজ্জা মেনেছে! সে যে চিরদিন কলঙ্কের ফোঁটা কপালে দিয়ে হাসিয়েছে কাঁদিয়েছে। শুধু মিতালী! শ্যামা আমার মিত্রাণী। মনে মনে কোনো অস্বীকৃতি ছিল না। প্রকাশ্যে লজ্জা ছিল, সে-বাঁধও ভাঙল। তাকিয়ে দেখি, সেই দুরন্ত মেয়ে, কী অসহায়! ডাকলাম, ‘শ্যামা!’
এই প্রথম তার নাম ধরে ডাকা। শ্যামা ফিরে তাকাল। বললাম, ‘ভীরু নই। তোমাকে দুঃখ দিতে চাইনি।’
শ্যামা বললো, ‘তুমি আমার তখলিফ ভাবছিলে? মিথ্যুক। তবে আসো নি কেন?’ বলতে বলতে তার ভেজা চোখে ও বাঁকা ঠোঁটে হাসি দেখা দিল। বললো, ‘এখানে রোজ চান করতে আসব, যে কদিন আছি। আসবে তো? আসতে হবে।’
মনের কথা বলতে পারলাম না। নীরবে স্বীকৃতি দিতে হলো। বলরাম বললো, ‘একখান হিন্দি গান শিখছি এইখ্যানে এইসে-
‘শুন শুন রাধে, মৎ যাইয়ো যমুনাকে তীর
বেন্দাবনকে কুঞ্জ গলিমে কর পকড়ত মরি চীর।’
এবার গানের সঠিক অর্থ বোঝায় কোনো গণ্ডগোল হয়নি শ্যামার। একবার বলরাম, আর একবার আমার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো অপাঙ্গে। হাসলো নিঃশব্দে ঠোঁট বাঁকিয়ে। তারপর বললো, ‘চল।’
‘কোথায়?’
‘আমাদের ওখানে।’
গেলাম। দেখলাম, মিথ্যের আশ্রয় নিতেই হলো। বলতে হলো, আমার সঙ্গে পথে দেখা হয়েছে তাই ধরে নিয়ে এসেছে। প্রৌঢ়া প্রেমবতীয়া আমাকে দেখে হেসে উঠলো। প্রৌঢ়া বললো, ‘লুলাসাধুজীর সঙ্গে তোমার আশ্রমে গিয়েছিলাম। কদ্দিন আছ আর?’
কোনো বিকার না দেখে অবাক হলাম। বললাম, ‘অমাবস্যাটা দেখে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।’
তারপরেই বুড়োর সঙ্গে দেখা। সর্বনাশ! বৃদ্ধ ব্যাঘ্র এক নজরে তাকিয়ে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য! বুড়ো হঠাৎ ফোকলা দাঁতে হেসে বললো, ‘খবর ভালো?’
বললাম, ‘হ্যাঁ।’
বুড়ো বললো, ‘আমার ছোট বউ তোমার কথা খুব বলে।’ তারপর হঠাৎ গুরুগম্ভীর গলায় বললো, ‘ভগবান তোমার ভালো করুন।’
বলে, বৃদ্ধ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দূর আকাশের দিকে।
চোখ তুলে দেখি শ্যামা তাকিয়ে আছে এদিকে।
তারপর দেখা হয়েছে প্রায় প্রতিদিন। শুধু ঘাটে নয়, নাগাবাসুকির মন্দিরে, দারাগঞ্জের বেণীমাধবের স্থানে, ওপারে অড়হরের ক্ষেতের ধারে। বলরাম ছিল সব সময়। প্রৌঢ়া প্রেমবতীয়াও সঙ্গে ছিল দু-একবার। কেবল পাগলের মতো ঘুরেছে লক্ষ্মীদাসী বলরামের পেছনে পেছনে।
অমাবস্যার আগের দিন যমুনার ঘাটে বললাম, ‘পরশু চলে যাব।’
শ্যামা বললো, ‘আমরাও।’ বলে, সে ফিরে তাকালো দূর যমুনার দিকে। রুদ্ধ গলায় বললো, ‘মনে থাকবে?’
‘কী?’
‘এই মেলা?’
‘থাকবে।’
শ্যামা দুর্জয় কটাক্ষ হেনে বললো, ‘মিথ্যুক।’
না, মিথ্যুক নই। জানিনে কিসে ভরে রহলো বুক ও মন। এই ভরা মন নিয়ে আমার চলা। ভুলবো কেমন করে! বলরাম বললো, ‘আমার কী পাওনা হইল?’
বললাম, ‘কিসের পাওনা?’
‘আপনাদের বিদায়ের?’
শ্যামা বললো, ‘আমি দেব তোমাকে, কাল ভোরে, এখানে। তোমার বাবুজী এলে।’
ভোরে যেতে পারলাম না। অনেক বেলা হলো। আশ্রম ফাঁকা। ভিড় দেখে আতঙ্ক হলো। কিন্তু এ তো শুধু ভিড় নয়, পাগলের মতো সবাই দিগ্বিদিক্ ছুটছে। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে, চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে, কাপড়-জামা ছিঁড়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মানুষ চারিদিকে ছুটছে। খুন! মৃত্যু! মরে গেছে, হাজার হাজার মরে গেছে!
কী হল? যাকে জিজ্ঞেস করি, সে-ই ঠেলে ফেলে ছুটে যায়। দু’বার মুখ থুবড়ে পড়লাম। মানুষ কি পাগল হয়েছে?
শুনলাম, মানুষে সাধুতে দলে বিষে প্যারেড গ্রাউন্ডে হনুমানজীর মন্দিরের কাছে মৃতদেহের স্তূপ জমেছে। সাঁকো পারো হতে পারলাম না। ভিড় আর পুলিশের কর্ডন চারিদিকে।
বেলা দশটায় এসে একটার সময় পারো হলাম। সারা মেলা জুড়ে শুধু মৃত্যু-চিৎকার। সে কাহিনী আর বাড়াব না।
কিন্তু বলরামদের তাঁবু কোথায়? বলরাম কোথায়? সব ছিন্ন-ভিন্ন ভাঙা তছনছ চারিদিকে। কাউকে পেলাম না। লক্ষ্মীদাসী, বলরাম, শ্যামা-কাউকে না।
চারিদিকে শুধু মৃতদেহের স্তূপ। তাকে ঘিরে রয়েছে পুলিশবাহিনী। অপরিচিত নারী ও পুরুষ কণ্ঠলগ্ন হয়ে পিযে মরেছে। শিশু চেপটে লেপটে রয়েছে মায়ের বুকে। যে দেহ ও রূপ নিয়ে অনেক লজ্জা, তা আজ ঠাণ্ডা, স্পন্দনহীন স্তূপীকৃত। রঙিড় ওড়না আর সিল্ক শাড়ি, নাগরা জুতো আর কলিদার পাঞ্জাবি, মাথার টিকুলি আর গলার চন্দ্রহার, তারই সঙ্গে ছন্নছাড়ার ছিন্ন বেশ, সব একাকার। কিন্তু সে স্তূপে সাধু একটিও নেই। পুলিশের কর্ডন ভেঙে মানুষ ছুটে আসতে চাইছে। খুঁজছে। বউ-মা, বাপ-ছেলে, আত্মীয়-বন্ধু, সবাইকে খুঁজছে, ডাকছে, পায়ে পড়ছে পুলিশের।
কে একজন চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘সব মাতাল সাধুরা এদের খুন করেছে, খুন।
রাজপুরুষ থেকে শুরু করে সকলের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ক্রোধ ফেটে পড়েছে।
চলে এলাম। দেখলাম, আশ্রমের অনেকে এসেছে হাত-পা ভেঙে। হাত-পা-ভাঙা অবস্থাতেই গোছাতে ব্যস্ত। পালাও পালাও। একদিন যেমন কারুর মুখে পা দিয়ে, কারুর গলা টিপে সবাই এসেছিল, তেমনি করে আজ সব পালাচ্ছে। একদিন পাগলের মতো হন্যে হয়ে সবাই এসেছিল, আজ পাগলের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে সবাই পালাচ্ছে।
সন্ধ্যা হলো। শত শত চিতার আগুন লকলকিয়ে উঠলো প্রয়াগের আকাশে। আগুন লেগেছে ভেবে, ভুল করে বার বার ফায়ারব্রিগেড অ্যালার্ম বাজাল। কিন্তু সে আগুন নেভাবার জন্য কোনো জলাধারা ছুটে এলো না। কার প্রতিশোধ এমন রূপ নিল, কার প্রতিদানের এমন ভয়ংকর মূর্তি দেখা দিল!
ব্রজবালা ডাকল। চমকে উঠলাম। দেখলাম, তারা লটবহর নিয়ে রওনা হয়েছে। কেউ বললো না, শুধু সে বললো, ‘যাবে না? ‘
ঝোলা কাঁধে নিয়ে বললাম, ‘চল।’কিন্তু প্যারেড গ্রাউণ্ডে এসে স্থির থাকতে পারলাম না। ব্রজবালারা চলে গেল। আবার ছুটে গেলাম সেখানে। না, কেউ নেই। শুধু অপরিচিত জনতা ও পুলিশের ভিড়। ফিরে বাঁধে উঠতে গিয়ে, একটি গাছতলায় দেখলাম লক্ষ্মীদাসী, সঙ্গে কয়েকজন ছন্নছাড়া ভীত সন্ত্রস্ত বৈষ্ণব। জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম বলরামের কথা
লক্ষ্মীদাসী আমাকে দেখে শান্ত গলায় বললো, ‘কতবার, কতবার বারণ কইরেছি ঠাকুর। কিন্তু সে যে যাওনের জন্যি আইসছিল, তারে আমি ফিরাইয়া নিয়া যাইব কেমনে?
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে বলরামের?’
একজন বৈষ্ণব ফুঁপিয়ে বললো, ‘বলরাম ওইখানেই আছে।’ বলে, চিতার দিকে দেখিয়ে দিল।
বলরাম নেই? নেই। বলরাম তার কথার ফুলবাগান নিয়ে এখানে এসেছিল। তার মালিনী ছিল লক্ষ্মীদাসী। এখন বাগান দগ্ধ হচ্ছে। বাগানের মালিনী এইখানে বসে আছে। শক্ত হয়ে রইলাম, নিজেকে দু’হাতে চেপে ধরে রইলাম। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলাম না। পরে বললাম, ‘চলো, যাওয়া যাক।’
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘চিতা নিভুক ঠাকুর, পরে যাইব।’
তারপরে ফিসফিস করে বলে চললো, ‘তুমি যেথায় আছো সেথায় আছি, আমার মিছা ভাবনা নাই মনে। তুমি ডাকলে আপনি কপাট খোলে, তোমার বাতাসে বাতাসে তাল দিয়া নাচি।’
বলরামের-ই গান। মূল গায়েনের গান। যার গান না শুনলে লক্ষ্মীদাসীর মন্দিরের ঠাকুর হাসে না, মুখ তোলে না। সে আবার বললো, ‘নিভুক ঠাকুর, তা পরে যাইব।’
সেই ভালো। গভীর রাত্রে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওদের, মানে শ্যামাদের কোনো খবর জানো?’
লক্ষ্মীদাসী বললো, ‘আপনার ওনার?’
আমার ওনার! সে বললো, ‘ওনারে দেখি নাই। ওনার সতীনেরে দেখেছি ঠাকুর, বুক থাপড়াইয়ে কানতেছিল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস কইরতে পারি নাই।’
বুক চাপড়ে কান্না? হাঁটু মুড়ে বসে রইলাম। নতুন করে আর কোনো ভয়ংকরতাই নাড়া দিতে পারল না মনকে। কেবল ভেতরটা অস্থির হয়ে রইলো।
সকালেও চিতা নিভল না। তবু যাত্রা করতে হলো। পলায়মানদের স্রোতে ভেসে গেলাম। আসার জন্য মৃত্যু, এবার যাওয়ার তাড়ায় মানুষ মানুষকে পিষে মারছে।
ভিড়ের মধ্যে ট্রেনের কামরা খুঁজছিলাম। পিঠের ঝোলায় টান পড়ল। ফিরে দেখি প্রৌঢ়া। বলল, ‘উঠে এসো!’ উঠলাম লক্ষ্মীদাসীকে নিয়ে। লক্ষ্মীদাসী বসলো এক কোণে। দেখলাম, তার পাশে প্রেমবতীয়া, তারপরে পাতিয়া, তারপরে শ্যামা। প্রৌঢ়া আর শ্যামা দু’টি সাদা ওড়নার ঘোমটা দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকেছে।
প্রৌঢ়া ফুঁপিয়ে উঠে বললো, ‘আমার বুড়াটা মারা গেল ভাই।’
ফুঁপিয়ে উঠলো প্রেমবতীয়া ও পাতিয়া। কেবল শ্যামার মুখ দেখতে পেলাম না। সারা কামরাই ব্যথা ও শোকের কান্নায় ভরা।
জায়গা ছিল না। মাঝখানে মালের উপর বসতে হলো। শ্যামা ফিরে তাকাল। ওড়না খসে গিয়েছে। সিঁথিতে মেটে সিঁদুর নেই, কপালে নেই টিপ। রাত্রিজাগরণ ও ক্লান্তির ছাপ সারা চোখে-মুখে। অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিল। ও-ই শ্যামার বিধবার বেশ। চোখে মুখে তার ক্লান্তি ও বেদনা ছিল। আর ছিল চাপা সুখের একটি নিগূঢ় ছাপ। কিন্তু বৈধব্যের যন্ত্রণার ছাপ কোথায় যেন আড়াল পড়েছে।
অনেকক্ষণ পর চোখ বুজে আসছিল। ঘাড়ে স্পর্শ পেয়ে ফিরে দেখি শ্যামার হাত। ঠোঁট দু’টি একবার কাঁপল। বললো, ‘আমরা পাটনায় নেমে অন্য গাড়ি ধরব।’
অকারণেই জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ‘কেন?’
ব্যথিত হেসে শ্যামা বললো, ‘ঘরে যেতে হবে না?’
কোনো সঙ্কোচ না করে তার দিকে ফিরে বসলাম। বললাম, ‘বলরাম—’
সে বললো, ‘জানি। তুমি ঘাটে এলে না। তোমার হয়ে তাকে আমি একটা জিনিস দিয়েছিলাম।’
‘কী?
‘আমার একটা আংটি।’
নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। সে বিষন্ন হেসে বললো, ‘একটা কথা বলব? আমাকে কী মনে হল?’
‘এখনো বুঝতে পারি নি।’
‘আমার কিন্তু মনে হয়েছে।’
‘কী?’
‘তুমি নিষ্ঠুর।’
বলতে বলতে তার চোখের কোণ দু’টি চকচক করে উঠলো।
কে জবাব দেবে? বলরাম নেই আজ। কথা নয়, সে যে গান গেয়ে জবাব দিতে পারত! সে আবার বললো, ‘যমুনাপারের ওই ঘাটে অনেকবার একলা গিয়ে অনেক ভেবেছি। তুমি যেখানে আসতে। ভেবেছি, আচ্ছা কী হল?’
বললাম, ‘কিছুই না।’
সে বললো, ‘অনেক কিছু। যমুনার ঘাটে আর আমার মনে রয়েছে তা। এই প্রথম আর…’ চুপ করে আবার বললো, ‘এই শ্যামাকে, নতুন বিধবাকে তোমার মনে থাকবে?’
‘থাকবে!’
সে আবার আমাকে বললো, ‘মিথ্যুক! তুমি বড় মিথ্যুক!’
বলতে বলতে তার গলা রুদ্ধ হলো।
আমার মনের মধ্যে শুধু হু-হু করে উঠলো একটি কথা, আজ বলরাম নেই! নেই! সে ছাড়া যে আমাকে সত্যবাদী বলার আর-কেউ ছিল না।
পাটনা এলো। প্রৌঢ়া বললো, ‘যাই।’
প্রেমবতীয়া, পাতিয়া প্রথম কথা বললো, ‘যাচ্ছি।’ শ্যামা তাকাল, ঠোঁট দু’টি নড়ল।
কী বললো অস্ফুটে, বুঝলাম না। তারপর সাদা ওড়নার ঘোমটা ঢেকে নেমে গেল। অনেক কথা ছটফট করে উঠলো মনের মধ্যে। কিছুই বলতে পারলাম না। কেবল তাকিয়ে রইলাম! যতক্ষণ গাড়ি দাঁড়িয়ে রইলো, প্ল্যাটফরমের ওপর থেকে নতুন বিধবা শুধু অন্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো।
Chapter - 19
১৯
প্যাসেঞ্জার গাড়ি। ঠেকতে ঠেকতে পরদিন সকালে বর্ধমান পৌঁছল। প্রায় পুরো চল্লিশ ঘণ্টা। নতুন গাড়ি ধরতে হবে। লক্ষ্মীদাসীও নেমে গেল। পায়ে হাত দিয়ে বললো, ‘ঠাকুর!’
তাড়াতড়ি পা ছাড়িয়ে বললাম, ‘বলো।’
আশ্চর্য! সে গান গেয়ে উঠলো। এমন মিষ্টি গলাটি লক্ষ্মীদাসীর! তাই তো! সে যে বলরামের গুরু। গুনগুন করে গাইল—
‘মনের আগুন কেউ দেখলো না।
তোমার বাঁশির সুরে বাতাস আগুন।
য্যাখন ত্যাখন আইসে ফাগুন।।
বাজাইয়ে ফিরলে বন্ধু,
আমার মন দেখলো না।’
সে চোখ বুজে গাইতে লাগল। দু’-চোখ দিয়ে নেমে এলো জলের ধারা। মন্দিরে রাধারানী আজ মূল গায়েনের অভাবে নিজে গেয়ে কাঁদছে। তার সঙ্গীরা ঘিরে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমার গাড়ি এলো। চলে গেলাম। অমৃতের সন্ধানে গিয়েছিলাম। কী নিয়ে ফিরে এলাম জানি নে। কেবল যেদিকেই ফিরি, সেদিকেই বড় ভারী। সকলের কথা, সকলের মুখগুলি একে একে মনে পড়ছে।
সেই চেনা মিছিলের মধ্যে দিয়েই দ্বিপ্রহরের নিরালা গ্রামের পথে চলেছি ঘরে। বাগদিপাড়ায় ঢুকে মোড় নিতে গেলাম। কে বললো, ‘ফিরে এলেন গো বাবা? একটু দাঁড়ান।’
কে? বুড়ি অবলা বাগদিনি। সে কেন দাঁড়াতে বললো? আর পথে দাঁড়াতে পারি নে। সে কথা বলে। কিন্তু ঘোমটা তেকে মুখ দেখায় না। মস্ত একটি ঘোমটা টেনে কলসী কাঁখে ফিরে এলো। বললো, ‘জুতা খোলেন।’
‘কেন?’
‘খোলেন না।’
খুললাম। এক কলসী জল পায়ে ঢেলে দিয়ে বললো, ‘তীত্থিখেত্তর থেকে এলেন। পা ধুইয়ে দিতে হয় যে। নিয়ম কিনা!’
ঠাণ্ডা স্পর্শে সমস্ত শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। আর এতক্ষণে সব ঝাপ্সা হয়ে এলো চোখের সামনে।
যাত্রার শেষ কোথায়? ঘরের কাছে এসে বুড়ি অবলা বাগদিনী আমাকে নতুন অমৃত-সন্ধানের জলধারা দিল পায়ে! সন্ধানের শেষ নেই।
***
