Chapter - 1 - সমুদ্র দর্শন
সমুদ্র দর্শন
তেত্রিশ বছর আগের কথা।
ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্কুলের নাম চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল। ক্লাস টিচারের নাম মুখলেসুর রহমান, যদিও সবাই তাকে চেনে দেড় ব্যাটারী নামে। দেড় ব্যাটারী নামকরণের উৎস জানি না। সম্ভবত শারীরিক উচ্চতার সঙ্গে এই নাম সম্পর্কিত। স্যার হলেন বেঁটেখাট মানুষ, ভারিক্কি গড়ন, মিলিটারীর প্যারেডের ভঙ্গিতে হাঁটেন। তাঁর শারীরিক কোন সমস্যা আছে, খানিকক্ষণ পরপর মাথা দুলিয়ে বিচিত্র এক ঋকি দেন। আমরা হাসতে গিয়েও হাসি না। হাসি গিলে ফেলি, কারণ দেড়-ব্যাটারী স্যারের ধমক স্কুল-বিখ্যাত। তার ধমকে প্রতি বছরই নিচের ক্লাসের ভীতু টাইপের কিছু ছাত্র প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে। স্যার নিজেই এদের স্কুলের বারান্দায় নিয়ে গোসল করিয়ে দেন। বিরক্ত গলায় বলেন, এত ভয় পাস কেন রে গাধা? আমি তো শুধু ধমকই দেই। কখনো কি মারি? আমার হাতে কখনো বেত দেখেছিস?
মজার ব্যাপার হচ্ছে স্যারের মারও স্কুল-বিখ্যাত। কি-চড়, কানে মলা, পেনসিলের ডলা, ডাস্টারের বাড়ি–শাস্তির প্রতিটি শাখাতেই তাঁর যথেষ্ট সুনাম আছে, তবে বেত না। স্যারের হাতে বেত আমরা আসলেই দেখিনি।
তেত্রিশ বছর আগে শারীরিক শাস্তি শিক্ষাব্যবস্থার অংগ হিসেবে ধরা হত। বছরের শুরুতে স্কুলের জন্যে চক ডাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে নানান ধরনের বেত কেনা হত। স্যাররা ক্লাসে ঢুকতেন ডাস্টার এবং বেত নিয়ে। পড়া শুরু করার আগে শরীর গরম করে। নেয়ার কায়দায় শাস্তি চলত। বাবা-মা’রা এতে কিছু মনে করতেন না। বরং খুশি হতেন, ছেলে ঠিক জায়গায় আছে। শরীরের যেসব জায়গায় বেতের দাগ পড়বে সেইসব জায়গা বেহেশতে যাবে, এমন কথাও শোনা যেত।
দেড় ব্যাটারী স্যার প্রচলিত প্রথার ব্যতিক্রম ছিলেন না, তবে একটি বিষয়ে অন্য স্যারদের সঙ্গে তার ঘোরতর অমিল ছিল। ছাত্রকে শাস্তি দেয়ার পর তার মন খারাপ হত। তীব্র অনুশোচনায় কাতর হতেন। প্রায়ই এমন হয়েছে যে শাস্তি প্রদানের পর তার রাগ পড়ে গেছে। ছাত্র ব্যথায় কাঁদছে, তিনিও অনুশোচনায় কাঁদছেন। বড়ই মজার দৃশ্য। এর মধ্যেই নানান কাণ্ড ঘটে যেত।
অস্বস্তির সঙ্গে বলছি–ছাত্র পড়ানো ছাড়া অন্য সব কাজ তিনি খুব চমৎকার পারতেন। সম্ভবত এই কারণে তাকে জটিল কোন ক্লাস দেয়া হত না। তিনি ড্রয়িং ক্লাস নিতেন, লাইব্রেরী ক্লাস নিতেন। ড্রীল করাতেন, অন্য স্যারদের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ যদি তাকে অংক বা ভূগোল ক্লাসে আসতে হত–তিনি খুব বিমর্ষ বোধ করতেন। অংক ক্লাসে তিনি আমাদের নামতা ধরতেন। “বল দেখি তিন সাতে কত? না পারলে আজ কিন্তু কিয়ামত। অংক কিছু না, আসল জিনিস নামতা।” ভূগোল ক্লাসে ঢুকতেন একটা গ্লোব নিয়ে। করুণ চোখে গ্লোবটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি সময় পার করে দিতেন।
আমরা এই স্যারকে নানাবিধ কারণে খুব পছন্দ করতাম। প্রথম কারণ, তিনি ক্লাসে কিছু পড়াতেন না এবং পড়া ধরতেন না। বাড়ির কাজ দিতেন, তবে দেখতেন না। দ্বিতীয় কারণ, তিনি আমাদের প্রত্যেকের নামে দু লাইন থেকে চার লাইনের ছড়া বলতেন। উদাহরণ দিয়ে বলি–আমার নাম হুমায়ুন। আমাকে দেখলেই বলতেন,
হুমায়ুন
তোমার নেই কোন গুণ।
আমাদের ক্লাসের ছাত্র হামিদ রেজা খানকে দেখলেই বলতেন–
হামিদ রেজা খান
রাখবে দেশের মান।
আমাদের স্কুলের দপ্তরী রাসমোহন। তাকে দেখলেও বলতেন–
রাসমোহন
তুমি আছ কেমন?
স্যারকে পছন্দ করার তৃতীয় কারণ হল–তিনি ছিলেন আমাদের সংগীত শিক্ষক। আমরা সব ছাত্র তাঁর লেখা এবং তার সুর দেয়া গান সমবেতভাবে গাইতাম, স্যার বিমলানন্দ উপভোগ করতেন। এইসব সংগীতের সবই গণসংগীত। একটা ছিল ছাদ পিটানো গান। আমরা বেঞ্চিতে দু’হাতে ছাদ পিটাবার মত করে থাবা দিতে দিতে গাইতাম–
ঘড়িতে দশটা বাজে
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
বেঞ্চিতে হাত দিয়ে পরপর তিনবার শব্দ–ধপ, ধপ, ধপ]।
ঘড়িতে ১১টা বাজে।
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
[ ধপ, ধপ, ধপ ]
ঘড়িতে ১২টা বাজে
পাঁচটা কেন বাজে না বাবুজী।
[ ধপ, ধপ, ধপ ]
এইভাবে ঘড়িতে পঁচটা বাজলে গান শেষ হত।
স্যারের নিয়ম ছিল ক্লাসে একজন অপরাধ করলে সবার শাস্তি পেতে হত। গণসংঙ্গিতের মতই গণশাস্তি। সে শাস্তিও খুব মজার। সবাইকে বেঞ্চির উপর উঠে দাঁড়াতে বলা হত। আমরা উঠে দাঁড়াতাম। স্যার বলতেন ওয়ান-টু-থ্রী …
আমরা এক সঙ্গে গানের সুরে বলতাম,
“অপরাধ করেছি।”
স্যার বলতেন থ্রী-টু-ওয়ান। আমরা বলতাম,
“ক্ষমা চাই।”
স্যার বলতেন–যা, ক্ষমা করলাম।
এমন একজন বিচিত্র মানুষকে পছন্দ না করার কোন কারণ নেই। সবচে বড় কথা হল–তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষক যিনি বলতেন–পড়াশোনাটা কোন বড় ব্যাপার না রে গাধা। ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়াটা কিছু না। যে কেউ নিয়মমত পড়লে ফার্স্ট সেকেন্ড হবে। বড় ব্যাপার হল …।
বড় ব্যাপার কি তা স্যার বলতেন না। চিন্তিত মুখে আমাদের দিকে তাকাতেন। নিজের মাথা চুলকাতেন, ভুরু কুঁচকাতেন। সম্ভবত কোটি বড় ব্যাপার তা তার নিজের কাছেও স্পষ্ট ছিল না।
সেবার আমাদের ক্লাসের সবাই ফাঁইন্যাল পরীক্ষায় পাস করে সেভেনে উঠেছি। শুধু ফেল করেছে জামাল-কামাল দুই ভাই। দু’জনেই মহাবিচ্ছু। একবার পকেটে করে গুই সাপ নিয়ে এসেছিল। আমরা সবাই ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠলাম–জামাল কামাল দুই ভাই পুরোনো ক্লাসে পড়ে রইল এবং চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তাদের দুঃখে ব্যথিত হয়ে কাঁদতে লাগলেন মুখলেস স্যার। স্যারের কান্নায় দ্রবীভূত হয়েই আমাদের হেড স্যার জামাল কামালকে প্রমোশন দিয়ে দিলেন। আনন্দে সবচে বেশি লাফালাফি করতে লাগলেন আমাদের স্যার। সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হল স্যারের ঘোষণায়। স্যার আমাদের ডেকে বললেন–তিনি আমাদের রেজাল্টে অত্যন্ত খুশি। সেন্ট পারসেন্ট পাস, এরকম কখনো হয় না। কাজেই উপহারস্বরূপ তিনি আমাদের সমুদ্র দেখিয়ে আনবেন। কক্সবাজার নিয়ে যাবেন, দু’ টাকা করে চাদা।
কক্সবাজার কোন হাতের কাছের ব্যাপার নয়, একশ মাইল দূরের পথ। দু’ টাকায় এত দূর যাওয়া, এক রাত থেকে ফিরে আসা কি করে সম্ভব আমি জানি না–স্যার যখন বলেছিলেন কোন একটা ব্যবস্থা হবেই। আমরা চাঁদার টাকা জোগাড় করবার জন্য। প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগলাম। আমাদের সময় বাবা-মা’র কাছ থেকে টাকা বের করা কঠিন ব্যাপার ছিল।
একদিন সত্যি সত্যি পঁয়ত্রিশ জন ছেলেকে নিয়ে স্যার কক্সবাজার রওনা হলেন। মুড়ির টিন জাতীয় বাস। সেই বাস দুলতে দুলতে চলেছে। কিছু দূর গিয়ে অনেকক্ষণ থেমে থাকে। যাত্রী জোগাড় করে আবার হেলতে দুলতে চলে। আজকাল তিন ঘণ্টায় কক্সবাজার পৌঁছা যায়। তখন সময়ের কোন হিসাব ছিল না। আমরা সকাল ন’টায় রওনা হয়ে রাত দশটায় পৌঁছলাম। স্যার আমাদের সমুদ্রে নিয়ে গেলেন না–এক স্কুল ঘরে নিয়ে তুললেন। মেঝেতে চাটাই পেতে দেয়া আছে। চাটাইয়ের উপর খড় বিছানো। সেই খড়ের উপর চাঁদর। আমরা খিচুড়ি খেয়ে ঘুমুতে গেলাম। স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব আমাদের জন্যে খিচুড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। স্যার বলে দিলেন খুব ভোরে উঠতে হবে। ভোরে আমাদের সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবেন, তবে কেউ সমুদ্রে নামতে পারবে না। কেউ যদি সমুদ্রে নামে–মেরে তক্তা বানিয়ে দেবেন। এতগুলি ছেলের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন। তিনি একা মানুষ, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভোরবেলায় সমুদ্র দেখতে গেলাম। সমুদ্র দেখে হকচকিয়ে গেলাম। আকাশের মত বিশাল কিন্তু নিঃস্তব্ধ নয়–প্রাণময়। এমন বিশাল এবং প্রায় জীবন্ত কিছু যে পৃথিবীতে থাকতে পারে তা ছেলেমানুষী কল্পনায় এর আগে কখনো আসেনি। সমুদ্রের তীব্র আকর্ষণী ক্ষমতা আছে। সে সারাক্ষণ ডাকে, আয় আয়–কাছে আয়। সেই আকর্ষণ অগ্রাহ্য করা সম্ভব হল না। স্যারের কঠিন নিষেধ ভুলে গিয়ে জুতা পায়ে ছুটে গেলাম–প্রায় হাঁটু পানিতে। স্যার এসে ঘাড় ধরে শূন্যে ঝুলিয়ে আমাকে নিয়ে এলেন। তারপর শুরু হল মার। কঠিন মার। সমগ্র স্কুল জীবনে আমি প্রচুর শাস্তি পেয়েছি–এমন কঠিন শাস্তি কখনো পাইনি। শারীরিক দুঃখের চেয়েও গভীর অপমানবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করল। স্যার বললেন, এইখানে বসে থাকবি। সমুদ্রের দিকে তাকাবি না–উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে বোস। এখান থেকে এক পা নড়লে টান দিয়ে মাথা ছিঁড়ে ফেলব।
আমি সমুদ্রের কাছে এসে, সমুদ্রের উল্টোদিকে মুখ হয়ে বসে রইলাম, আমার বন্ধুরা মহানন্দে সমুদ্র দেখতে লাগল। দুপুর দশটায় বাসে করে চিটাগাং রওনা হব। সবাই বাসে উঠেছি। বাস ছাড়ার আগে আগে স্যার গিয়ে বাস ড্রাইভারের কানে কানে কি বললেন। তারপর এলেন আমার কাছে। আগের মতই হুংকার দিয়ে বললেন, নাম বাস থেকে। নাম বলছি।
আমি নামলাম। মনে হল শাস্তিপর্ব শেষ হয়নি। স্যার আমাকে সমুদ্রের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, খোল জুতা। জুতা খুলোম। স্যার আমার হাত ধরে হঠাৎ অসম্ভব কোমল গলায় বললেন–চল যাই সমুদ্রে। একবার ভাবলাম অভিমান দেখিয়ে বলি–‘না’। কিন্তু ইচ্ছা করল না। স্যারের হাত ধরে সমুদ্রে নামলাম। তিনি বললেন–ব্যাটা আমার উপর রাগ করিস না। একদল ছেলেকে নিয়ে এসেছি। এদের কেউ সমুদ্রে ভেসে গেলে সমস্যা না? তোকে শাস্তি দেয়া অন্যায় হয়েছে। ভুল হয়েছে। আমি মানুষ। আমি তো ভুল করবই। আমি কি ফেরেশতা যে আমার ভুল হবে না? তোর যতক্ষণ ইচ্ছা সমুদ্রে হাঁটাহাঁটি কর। আর আমার উপর রাগ খুব বেশি হলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সমুদ্রে ফেলে দে। দেখি তোর কেমন শক্তি।
আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখি, স্যার তাঁর পুরোনো অভ্যাসমত কঁদতে শুরু করেছেন।
আমরা টাকা-পয়সা খরচ করে দূরের সমুদ্র দেখতে যাই, অথচ আমাদের আশেপাশের মানুষরাই বুকে সমুদ্র ধারণ করে ঘুরে বেড়ান। সেই সমুদ্র আমাদের চোখে পড়ে না।
.
পঁচিশ বছর পর স্যারের সঙ্গে আবার দেখা। তিনি আজিমপুর কবরস্থানের পাশের রাস্তা দিয়ে হনহন করে যাচ্ছেন। আগের মতই আছেন, শুধু আকাশের শাদা মেঘ ভর করেছে তার মাথার চুলে। তিনিই প্রথম আমাকে দেখলেন–চেঁচিয়ে ডাকলেন, হুমায়ূন না? হুমায়ূন, তোর নেই কো কোন গুণ। আরে গাধা, তুই কেমন আছিস?
সমুদ্র দেখলে সমুদ্রের জল স্পর্শ করতে হয়। আমি কদমবুছি করবার জন্যে নিচু হলাম। স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। লক্ষ্য করলাম বয়সজনিত কারণে স্যারের কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগে আমাদের শাস্তি দিয়ে কাঁদতেন। এখন কাঁদছেন কোন শাস্তি না দিয়েই।
আমি বললাম, কেমন আছেন স্যার?
স্যার চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ভাল আছি রে ব্যাটা। ভাল আছি। প্রেসিডেন্ট মেডেল পেয়েছি, বুঝলি? বেস্ট টিচার হিসেবে প্রেসিডেন্ট মেডেল। কি হাস্যকর কথা। আমি নাকি বেস্ট টিচার! হা হা হা। তিনি হাসছেন। কিন্তু তার চোখ ভেজা।
Chapter - 2 - কবি সাহেব
কবি সাহেব
ভোরবেলা ঘুম ভেঙেই যদি শুনি–কেউ একজন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, চুপচাপ বসার ঘরে বসে আছে, তখন সঙ্গত কারণেই মেজাজ খারাপ হয়। ভোরবেলাটা মানুষের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করার জন্যে আদর্শ সময় না। ভোরবেলার নিজস্ব চরিত্র আছে, আছে কিছু আলাদা নীতিমালা। ভোরবেলার নীতিমালা হলো, ঘুম থেকে উঠে নিজের মতো থাকবে, কোনোরকম টেনশন রাখবে না। হাত-পা ছড়িয়ে চা খাবে। খবরের কাগজ পড়বে। মেজাজ ভালো থাকলে গান শোনা যেতে পারে। মেজাজ খারাপ থাকলে গান শোনারও দরকার নেই। ভোরবেলায় যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তা হচ্ছে–অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা। এই সময়ে কথা বলতে হবে শুধু পরিচিত এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে।
আমার কপাল মন্দ। যারা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তারা ভোরবেলায় আসেন। যারা আসেন তারা সহজে যেতে চান না। ইশারা-ইঙ্গিতে অনেকভাবে তাঁদের বুঝানোর চেষ্টা করি দয়া করে এখন উঠুন। আমার ইশারা-ইঙ্গিত হয় তারা বুঝেন না, নয় বুঝেও না বোঝার ভান করে।
আজ যিনি এসেছেন তাঁকেও আমি বিদেয়-হতে-না-চাওয়া লোকদের দলে ফেললাম এবং মোটামুটি হতাশ হয়েই তার সামনে বসলাম। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের উপর। হালকা পাতলা গড়নের ছোটখাটো মানুষ। গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মাথার চুলও সাদা। কোলের উপর কালো চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছে, কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকতেই তিনি অভ্যস্ত। আমি বললাম, আপনি কি কোনো কাজে এসেছেন?
তিনি মৃদু গলায় বললেন, না।
আমি আঁতকে উঠলাম। যারা সরাসরি বলেন, কোনো কাজে আসেন নি, তাঁরা সাধারণত অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে থাকেন। দুপুরের আগে তাদের বিদেয় করা যায় না।
আমি বললাম, কী জন্যে এসেছেন আমি কি জানতে পারি?
জি পারেন।
দয়া করে বলুন।
আমি মফস্বলে থাকি। শহরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কম। বড় শহর আমার ভালো লাগে না।
আমি ভদ্রলোকের কথার ধরন ঠিক বুঝতে পারছি না। শহর প্রসঙ্গে তার বিতৃষ্ণা আমাকে শোনানোর কারণও আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট হলো না। আমি মনের বিরক্তি চেপে সিগারেট ধরালাম।
শহর পছন্দ করি না, তবু নানা কাজকর্মে শহরে আসতে হয়।
তা হয়। পছন্দ না করলেও এই জীবনে আমরা অনেক কিছু সহ্য করি। আপনি কি চা খাবেন?
জি-না। আমার সামান্য কিছু কথা আছে। কথাগুলো বলে আমি চলে যাব।
আমি আশান্বিত হয়ে বললাম, বলুন। কথা বলে যদি উনি চলে যান তাহলে কথাগুলো শুনে নেওয়াই ভালো। সামান্য কথা বলছেন, তা-ও আশার ব্যাপার, হয়ত, ঘণ্টাখানিকের মধ্যে উদ্ধার পাওয়া যাবে।
আমার বড়কন্যা-বিষয়ে একটি গল্প শোনাব।
শোনান।
আমি অনেক রাত জেগে পড়াশোনা এবং লেখালেখি করি–একরাতে লেখালেখি করছি হঠাৎ শুনি আমার কন্যা খিলখিল করে হাসছে। কিছুক্ষণ থামে, আবার হাসে। আবার থামে, আবার হাসে। আমি বিরক্ত হলাম। তাকে বললাম, হাসছ কেন মা? সে বলল, গল্পের বই পড়ে হাসছি বাবা। আমি বললাম, হাসির গল্প? সে বলল, না দুঃখের গল্প। কিন্তু মাঝে মাঝে হাসির কথা। আমি বললাম, নিয়ে আস। আমার মেয়ে নিয়ে এল। আমি সেই বই পড়লাম। আপনার লেখা বই। আমি আগে কখনো আপনার নাম শুনি নি। এই প্রথম শুনলাম।
এইটা কি আপনার গল্প।
জি।
আপনার গল্প শুনে খুশি হয়েছি। আপনি যে আমার একটি বই পড়েছেন সেটা জেনেও ভালো লাগল।
আমার কথা একটু বাকি আছে।
জি বলুন।
ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, আমি নিজে একটি গল্পগ্রন্থ রচনা করেছি। সেই গ্রন্থটি নিয়ে এসেছি।
এতক্ষণ ভদ্রলোকের আগমনের কারণ আমার কাছে স্পষ্ট হলো। তিনি একজন গ্রন্থকার। গ্রন্থ প্রকাশে আমার সাহায্যের জন্যে এসেছেন। আমার মন খারাপ হলো এই ভেবে যে আমি ভদ্রলোককে কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারব না। তার লেখা যত ভালোই হোক প্রকাশকরা ছাপবেন না। পরিচিতিহীন মফস্বলের লেখকদের প্রতি ঢাকার প্রকাশকদের কোনোই আগ্রহ নেই। আমি বললাম, আপনি কি বইটি প্রকাশের ব্যাপারে আমার সাহায্য চান?
জি-না। বইটি প্রকাশিত হয়েছে।
ভদ্রলোক অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বইটি আমার হাতে দিলেন। আমি বইয়ের পাতা উল্টে চমকে উঠলাম। দুটি কারণে চমকালাম প্রথম কারণ, বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আমার নামে। উৎসর্গপত্রে এমন কথা লেখা হয়েছে–আমি যার যোগ্য নই। দ্বিতীয় কারণ হলো, এই নিরহংকারী চুপচাপ ধরনের মানুষটি একজন বিখ্যাত মানুষ। এতক্ষণ আমি তাকে চিনতে পারি নি। ইনি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা। গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক। বাংলা একাডেমী তার একটি জীবনী গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। লিপির উপর লেখা তাঁর গ্রন্থ ব্রাহমী অথবা ব্রাহ্মী লিপি ও সম্রাট প্রিয়দর্শী পশ্চিম বাংলার বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য।
লিপিতত্ত্বে এদেশে এবং ভারতে তার চেয়ে বেশি কেউ এ সময়ে জানেন বলে আমার জানা নেই।
আমি একই সঙ্গে মুগ্ধ, বিস্মিত এবং লজ্জিত হলাম। এই সরল সাদাসিধা মানুষটিকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি–এ কী কাণ্ড! এতবড় ভুল মানুষ করে? গোলাম মোর্তাজা সাহেব উঠে দাঁড়ালেন এবং হাসিমুখে বলেন, আপনি কি একবার আমাদের হবিগঞ্জে যাবেন? আমার বাড়িতে একরাত থাকবেন?
আমি বললাম, অবশ্যই থাকব।
কথা দিচ্ছেন?
হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি।
আমার মেয়েরা খুব খুশি হবে। এরা যে আপনাকে কত পছন্দ করে আপনি তা কখনো জানবেন না। আমি আমার মেয়েদের জন্যে কিছু করতে পারি নি। আপনাকে নিয়ে গেলে ওদের জন্যে কিছু করা হবে।
আপনি যখন আমাকে যেতে বলবেন, আমি তখনি যাব।
আমি আপনাকে জানাব।
তিনি আমাকে কিছু জানাতে পারলেন না। হবিগঞ্জ ফিরেই অসুখে পড়লেন–প্রাণঘাতী ব্যাধি-ক্যানসার। চিকিৎসার জন্যে গেলেন জার্মানি। পত্রিকা মারফত তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেলাম। মনটা খারাপ হলো। কথা দিয়েছিলাম, কথা রাখা গেল না।
তার প্রায় বছরখানিক পরের কথা–দেওয়ান গোলাম মোতার্জার পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হলো–দেওয়ান গোলাম মোর্তাজার নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে মোর্তাজা সাহেবের স্ত্রী আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন মোর্তাজা সাহেবের মৃত্যুদিবস উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কথা রাখার সুযোগ পাওয়া গেল। আমি তিন কন্যা নিয়ে হবিগঞ্জে উপস্থিত হলাম।
হবিগঞ্জে পৌঁছে মোর্তাজা সাহেবের পরিবারের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেলাম তার সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় নেই। এরা আমার মতো অভাজনের জন্যে ভালোবাসার সোনার আসন বানিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমি একেবারেই হকচকিয়ে গেলাম।
মোর্তাজা সাহেব সেখানে কবি সাহেব নামে পরিচিত। তাঁর বাড়ি হলো-কবি সাহেবের বাড়ি। তার মেয়েদের পরিচয় হলো–কবি সাহেবের মেয়ে।
কবি-পত্নীর নাম আম্বিয়া খাতুন। অসম্ভব রূপবতী, কঠিন ধরনের মহিলা। থাকেন কানাডায়। স্বামীর মৃত্যুদিবস অনুষ্ঠান উপলক্ষে দেশে এসেছেন। স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। লেখক-স্বামীকে পারিবারিক সব দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখতে গিয়ে নিজের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে এখন ক্লান্ত এবং স্বামীর প্রতি কিছুটা হয়তো অভিমানী।
কবি-পত্নী তার সব কন্যাকে স্কুলের ছাত্রদের মতো লাইন করে দাঁড় করালেন। আমাকে দেখিয়ে কঠিন গলায় বললেন, ইনি তোমাদের বাবার বন্ধু। ইনি তোমাদের চাচা। চাচাকে পা ছুঁয়ে সালাম করো।
বড় বড় মেয়ে, সবাই বিবাহিতা। তাদের ছেলেমেয়েরাও বড় বড়। মার কথা শোনামাত্র আমাকে হতচকিত করে এরা একসঙ্গে আমাকে সালাম করবার জন্যে ছুটে এল। একজনকে দেখলাম কাঁদছে।
আমি বললাম, আপনি কাঁদছেন কেন?
সে জবাব দিল না। তাঁর এক বোন বলল, ও তো আপনার কথা শুনতে পাচ্ছে না। ও কানে শুনতে পায় না। বাচ্চা হওয়ার কী এক জটিলতায় ওর কান নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে কোনো প্রশ্ন করলে কাগজে লিখে করতে হবে।
আমার মনটাই খারাপ হলো। আমি এক টুকরা কাগজ নিয়ে লিখলাম–আপনি এত কাঁদছেন কেন?
মেয়েটি তার উত্তরে বলল, চাচা, আপনি অবিকল আমার বাবার মতো। নিরহংকারী সাদাসিধা। আপনাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ছে–এইজন্যে আমি কাঁদছি।
আমি সারাজীবন শুনে এসেছি, আমি অহংকারী। এই প্রথম একটি মেয়ে আমাকে বলল, নিরহংকারী। আমার চোখ প্রায় ভিজে উঠার উপক্রম হলো।
কবি-কন্যা বলল, চাচা, আসুন, আমার বাবার লাইব্রেরিটা আপনাকে দেখাই। আমরা বাবার লাইব্রেরিতে যাই না। আজ আপনার সঙ্গে যাব। আর শুনুন, আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।
আচ্ছা তুমি করেই বলব, তোমরা বাবার লাইব্রেরিতে যাও না কেন?
মা এক কাণ্ড করে রেখেছেন, এইজন্যে যেতে ইচ্ছা করে না।
কী কাণ্ড?
যে কফিনে করে বাবার লাশ জার্মানি থেকে এসেছিল মা সেই কফিনটা লাইব্রেরিতে সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন।
সে কী?
হ্যাঁ, কী ভয়াবহ ব্যাপার দেখুন না। আপনি মাকে একটু বলবেন কফিনটা যেন সরানো হয়। মা আপনার কথা ফেলতে পারবেন না।
কবি-পত্নী আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিলেন না। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তোমার বাবার কফিন সরানো হবে না। এটা তোমার বাবার শেষ স্মৃতিচিহ্ন। তোমাদের ভালো লাগুক না লাগুক-কফিন থাকবে লাইব্রেরিতে।
লাইব্রেরি দেখলাম। বিস্মিত হওয়ার মতোই লাইব্রেরি। সবই মূলত লিপি বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ। দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি। কবি-পত্নী জানালেন, দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু ঢাকা মিউজিয়ামে দেওয়া হয়েছে।
লাইব্রেরিতে বসেই গল্পগুজব হতে লাগল। বড় কেতলী করে চা চলে এসেছে। বাটা ভর্তি পান। যার ইচ্ছা চা খাচ্ছে, যার ইচ্ছা পান খাচ্ছ। একদল আবার খেতেও বসেছে। বাড়ির পাশেই শামিয়ানা খাটানো। খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে শামিয়ানার নিচে। এত লোক কোত্থেকে এল সে-ও এক রহস্য।
গল্প করছেন কবি-পত্নী। আমরা শ্রোতা, ভদ্রমহিলার গল্প বলার ভঙ্গি খুব সুন্দর, মাথা দুলিয়ে হাত-পা নেড়ে গল্প করেন। অত্যন্ত আবেগময় অংশগুলি আবেগশূন্যভাবে বলে যান। শুনতে কেমন কেমন জানি লাগে।
কবি সাহেবের কথা আপনাকে বলি। জমিদারের ছেলে ছিল। রাগ করে সব সম্পত্তি ভাইকে দিয়ে বিবাগী হলো। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তাও ভালো লাগে না। জন্ম ভবঘুরে বুঝলেন ভাই? পথই হলো তার ঘর। কপালের লিখন–বিবাহ হলো আমার সঙ্গে। তখন আবার তার লেখার রোগ মাথাচাড়া দিয়েছে। দিনরাত পড়ে আর লেখে। এই যে বইটা দেখছেন ভাই–এই বই লিখতে কবি সাহেবের লেগেছে সাত বছর। কী কষ্ট করে লিখেছে! বিছানার উপুড় হয়ে বসে লিখত। হাতের কনুই থাকত বিছানায়। ঘষায় ঘষায় কনুই এ ঘা হয়ে গেল। আমি বাজার থেকে তুলা কিনে এনে দিলাম। সেই তুলার প্যাড কনুই-এ রেখে লিখত। সংসার তখন অচল হয়েছে, বুঝলেন ভাই। সম্পূর্ণ অচল। সে তো সংসারে কিছু দেখে না। চালের দাম কত, আলুর দাম কত–কিছুই জানে না। সংসার টানি আমি। স্কুলের অতি সামান্য আয়ে বাঁচার চেষ্টা করি। কবি সাহেবকে কিছু বুঝতেই দেই না। একদিন কবি সাহেব মন খারাপ করে বললেন, আম্বিয়া, সংসারের জন্যে তো আমি কিছুই করছি না। আমি তাকে বললাম, সব মানুষকে আল্লাহ কিছু দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। লেখার দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ তোমাকে পাঠিয়েছেন। তুমি লেখ। সংসার নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
সে-ও ভাবত না। তার ছেলেমেয়ে কয়টা তা-ও বোধহয় সে জানতো না। হাসবেন না ভাই। অতি দুঃখে এই কথা বলছি। একদিন কী হয়েছে শুনুন–আমার মেজো ছেলে অসুস্থ। পেট ফুলে ঢোল হয়েছে। ছটফট করে, নিশ্বাস নিতে পারে না। আমি ছেলেকে কবি সাহেবের পাশে শুইয়ে দিয়ে বললাম তুমি ছেলেটাকে দেখ আমি স্কুলে যাই। স্কুল কামাই দিলে আমার তো চলবে না। স্কুলে গেলাম। ফিরে এসে দেখি–কবি সাহেব লিখতে বসেছে। পাশে আমার ছেলে–এখন যায় তখন যায় অবস্থা। আমাকে দেখে কবি সাহেব বলল, শোনো আম্বিয়া, তোমার এই ছেলের। মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত। আমি তার উপর থেকে ভালোবাসার দাবি উঠিয়ে নিয়েছি। তুমিও উঠিয়ে নাও। তোমার ছেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাবে।
আমি আঁতকে উঠলাম। কী বলে এই লোক! ছেলেকে কোলে নিয়ে দৌড়ে গেলাম এক কবিরাজের কাছে। রিকশাও নিলাম না। কারণ রিকশাভাড়া ছিল না। সেই ছেলেকে কবিরাজ চিকিৎসা করে ভালো করলেন। একদিন ছেলে চলে গেল আমেরিকায়। সেখান থেকে বাবার জন্যে সোনার কলম পাঠাল। কবি সাহেব সেই কলম পেয়ে খুশি। ডেকে সবাইকে দেখায়।
বুঝলেন ভাই, কবি সাহেব ছেলেমেয়েদের দিকে চোখ ফেলে নাই। কিন্তু ছেলেমেয়েরা যে কী ভালো তার বাবাকে বাসে। বাবাকে তারা যত ভালোবাসে তার এক হাজার ভাগের এক ভাগ ভালো আমাকে বাসে না। বাবার কিছু-একটা হলে সব ছেলেমেয়ের খাওয়াদাওয়া বন্ধ।
আরেক দিনের গল্প আপনাকে বলি ভাই। একই সঙ্গে দুঃখের গল্প, আবার হাসিরও গল্প। এই গল্প মনে এলে আমি কখনো হাসি, কখনো চোখের পানি ফেলি। হয়েছে কী শোনেন। এক রাতের কথা–আমি ঘুমাচ্ছিলাম। কবি সাহেব আমাকে ডেকে তুলল। বলল, আম্বিয়া, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখো–কী সুন্দর জোছনা হয়েছে–চলো, জোছনার মধ্যে হাঁটি।
বুঝলেন ভাই? কথা শুনে আমার ভালো লাগল। এইরকম কথা তো কখনো বলে না। ভালো লাগারই কথা। আমি খুশিমনে কবি সাহেবের সঙ্গে হাঁটতে গেলাম। কবি সাহেব হঠাৎ বলল, দেখো আম্বিয়া, মাঝে মাঝে আমার মনটা খুব খারাপ হয়।
আমি বললাম, কেন?
যখন শুনি মানুষের ছেলেমেয়েরা ম্যাট্রিক পাশ করে, ভালো রেজাল্ট করে, তখন একটু আফসোস হয়। মনটা খারাপও হয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন?
কবি সাহেব বলল, তখন মনে হয়, আমার যদি এক আধটা ছেলেমেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করত, আমি লোকজনদের বলতে পারতাম।
কী বলছ তুমি? তোমার যে দুইটা ছেলে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। এত ভালো রেজাল্ট করেছে তুমি জানো না?
পাশ করেছে জানি না তো! কী আশ্চর্য!
কবি সাহেব অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এই রকম একটা মানুষের সঙ্গে ঘর করেছি ভাই। সৃষ্টিছাড়া মানুষ। আমি খুশি যে আমার আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
মা’র কথা শুনে মেজো মেয়ে রাগী গলায় বলল, মা তুমি এটা কী রকম কথা বললে? তোমার আগে বাবা মারা যাওয়ায় তুমি খুশি। তোমার এই কথার মানে কী?
আম্বিয়া খাতুন কঠিন গলায় বললেন, মানে আছে রে মা, মানে আছে। মানে ছাড়া আম্বিয়া খাতুন কথা বলে না। তোর বাবার আগে যদি আমি মারা যেতাম–কে তাহলে এই পাগল মানুষটার সেবা করত? আমি বেঁচে আছি বলেই শেষ সময় পর্যন্ত সেবা করতে পেরেছি। আমি বেঁচে আছি বলেই তোর বাবার মৃত্যুর পর তাঁর নামে ট্রাস্ট করতে পেরেছি। মরে গেলে এইসব হতো না রে মা। বেঁচে আছি বলেই হচ্ছে। তোর বাবার দশ বছরের খাটুনির যে পাণ্ডুলিপি সেটা আমি বেঁচে আছি বলেই প্রকাশ হবে। বেঁচে না থাকলে প্রকাশ হতো না। তোর বাবা সেই পাণ্ডুলিপি নিয়ে কী করত? বালিশের নিচে রেখে ঘুমাতো। কাউকে মুখ ফুটে বলত না-পাণ্ডুলিপিটা প্রকাশ করো তো? বলতো মুখ ফুটে?
না।
এখন যা, মুখে মুখে আমার সঙ্গে তর্ক না করে–তোর বাবার পাণ্ডুলিপি এনে তোর চাচাকে দেখা।
মেয়েরা ছুটে গেল বাবার পাণ্ডুলিপি আনতে।
আমি পাণ্ডুলিপি দেখলাম। আমি কোনো লিপি বিশারদ নই কিন্তু পাণ্ডুলিপি দেখে বুঝলাম–বিরাট কাজ হয়েছে। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক জনাব হারুন-অর রশিদ সাহেব এই পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করেছেন। খুব শিগগিরই তা গ্রন্থাকারে বের হবে।
আম্বিয়া খাতুনের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলাম। গল্পের এক পর্যায়ে তিনি হঠাৎ করে বললেন, ভাই, আপনি কি ভূত-প্রেত এইসব বিশ্বাস করেন?
আমি বললাম, না।
আমিও করি না। আমি কোনো কিছুই বিশ্বাস করি না। ভূত-প্রেতের নানান ঘটনা শুনি। কিন্তু আমি জানি এর কোনো না কোনো ব্যাখ্যা আছে।
আমি বললাম, অবশ্যই আছে।
আম্বিয়া খাতুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমি আমার জীবনের একটা ঘটনা আপনাকে বলব। এই ঘটনার ব্যাখ্যা আমি করতে পারি নাই। কবি সাহেবও পারে নাই। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনি পারবেন।
এ রকম মনে হওয়ার কারণ কী?
কোনো কারণ নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে। গল্পটা বলার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ভাই, আপনি তো অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে কথা বললেন, আপনি কি বুঝতে পেরেছেন আমি কঠিন ধরনের সাহসী মহিলা?
বুঝতে পেরেছি।
আপনি কি বুঝতে পেরেছেন যে আমি কখনো মিথ্যা বলি না?
তা-ও বুঝতে পেরেছি।
তাহলে গল্পটা শুনুন। খুব মন দিয়ে শুনবেন। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের কথা। আমার এক কন্যা জেসমিনের বয়স তখন আড়াই বছর। খুব সুন্দর মেয়ে। ফুটফুটে চেহারা। সারা দিন নিজের মনে খেলে, কথা বলে। আমার বড়ই আদরের মেয়ে। একদিন দুপুর বেলা আমি বাথরুমে গিয়েছি। মফস্বল অঞ্চলের বাথরুম–মূল বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে, নির্জনে। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করা মাত্র আমি একজনের কথা শুনলাম। পুরুষমানুষের গলা। খুব পরিষ্কার স্পষ্ট আওয়াজের কথা। কথাটা সে বলল, ঠিক আমার মাথার ভেতরে। কথাটা হলো–তোমার মেয়ে জেসমিন চৈত্র মাসের বারো তারিখ পানিতে ডুবে মারা যাবে। কিছুই করার নাই। কথা শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি চিৎকার করতে করতে কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ঢুকলাম। কবি সাহেবকে বললাম।
আপনাকে আগে বলা হয় নাই–কবি সাহে ছিল ঘোর নাস্তিক। সে কোনোকিছুই বিশ্বাস করত না। আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল, এটা আর কিছুই না, তোমার মনের বিকার। তোমার মেয়েটা ছোট, পাশেই পুকুর। সারাক্ষণ তুমি মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা করো। এই জন্যে মনে বিকার উপস্থিত হয়েছে। বিকারের ঘোরে এইসব শুনেছ।
কবি সাহেবের কথায় আমার মন শান্ত হলো না। খেতে পারি না। রাতে ঘুমাতে পারি না। চৈত্র মাসের বারো তারিখ আসতে বেশি বাকিও নেই। মনে হলেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কবি সাহেবকে কিছু বলতে গেলে ও শুধু হাসে।
বারোই চৈত্র খুব ভোরবেলা কবি সাহেব আমাকে বলল, তোমার মন যখন এত অস্থির তুমি এক কাজ করো–আজ সারা দিন মেয়েটাকে চোখের আড়াল কোরো না। সারাক্ষণ তাকে চোখে চোখে রাখো। তোমার স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। আমি হেডমিস্ট্রেসের কাছে একটা ছুটির দরখাস্ত লিখে নিয়ে যাব।
কবি সাহেব তা-ই করল। নিজেই একটা ছুটির দরখাস্ত লিখে নিয়ে গেল। আমি সারা দিন জেসমিনকে নিয়ে রইলাম। এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করি না। দুপুরবেলা আমার চোখে মরণঘুম নামল। কয়েক রাত অঘুমো কাটিয়াছি। অবস্থা এমন হয়েছে কিছুতেই চোখ ভোলা রাখতে পারছি না। ঘুমুতে গেলাম জেসমিনকে নিয়ে। দরজা-টরজা সব বন্ধ করে দিলাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যাবেলা। দেখি বিছানায় জেসমিন নেই। বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তারপরই দেখি সে ঘরের মেঝেতে আপন মনে একটা বদনা নিয়ে খেলছে। মনটা শান্ত হলো। মেয়েটাকে কিছুক্ষণ আদর করলাম। বাইরে থেকে কবি সাহেব বলল, আম্বিয়া, আমার কাছে কিছু মেহমান এসেছেন। একটু চা করতে পারবে?
আমি চা বানাতে রান্নাঘরে ঢুকলাম। লাকড়ির চুলা ধরতে একটু সময় নিল। যখন আগুন ধরে উঠল তখনি মনে হলো–জেসমিন কোথায়? ওকে না আমার চোখে চোখে রাখার কথা! আমি ছুটে শোবার ঘরে ঢুকলাম। জেসমিন সেখানে নেই। আমি আর অপেক্ষা করলাম না–দৌড়ে গেলাম পুকুরপাআপনি ড়ে। গিয়ে দেখি–জেসমিন মাঝপুকুরে ভাসছে।
ভাই, আপনি অনেক জানেন। পৃথিবীর অনেক কিছুই দেখেছেন, শুনেছেন। আমার এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন? কবি সাহেবের মতো ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকবেন না, কথা বলুন।
আম্বিয়া খাতুনের কঠিন চোখ দ্রবীভূত হলো। তার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। তিনি আঁচলে চোখ মুছে মেজো মেয়েকে ডেকে সহজ গলায় বললেন, তোর চাচার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। তাঁকে খেতে দে।
Chapter - 3 - লেখালেখি খেলা
লেখালেখি খেলা
ময়মনসিংহে গ্রন্থমেলা হচ্ছে।
আমি এক ফাঁকে একটু দূরে সরে গিয়ে চা খাচ্ছি। তখনি তাকে দেখলাম। অল্প বয়েসী ছেলে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। আমি বললাম, তুমি কি আমাকে কিছু বলবে?
সে বলল, হ্যাঁ।
বলে ফেল।
আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। আপনি ঠিকঠাক জবাব দেবেন। মিথ্যা জবাব না।
আমি বললাম, তোমার কেন ধারণা হল আমি মিথ্যা জবাব দেব?
সে চুপ করে রইল। আমি বললাম, কি তোমার প্রশ্ন?
ব্যর্থ কবিরাই ঔপন্যাসিক হন। আপনি কবি হিসেবে ব্যর্থ বলেই ঔপন্যাসিক হয়েছেন।
আমি বললাম, এটা তো কোন প্রশ্ন না। তুমি আমার উপর একটি বক্তব্য রেখেছ। আমার তো এখানে বলার কিছু নেই। বলতে চাচ্ছিও না।
ছেলেটি রাগী গলায় বলল, আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে আপনি একজন ব্যর্থ কবি।
আমি লক্ষ্য করলাম, ছেলেটির চোখ-মুখ কঠিন হয়ে গেছে। সে কথা বলছে রাগী ভঙ্গিতে। এইসব ক্ষেত্রে ছেলেটি যা বলছে তাতে রাজি হয়ে গেলেই সমস্যা মিটে যায়। রাজি হয়েও যেতাম। নিজেকে ব্যর্থ কবি বলতে আমার অহংবোধ আহত হবে না। কিন্তু ছেলেটির জেদী ভঙ্গি আমার ভাল লাগল না। কাজেই চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে আমি ছেলেটির মতই চোখ-মুখ কঠিন করে বললাম, নিজেকে ব্যর্থ কবি আমি কেন বলব? আমি তো কবিতা লিখি না। কবিতা লিখে যদি ব্যর্থ হতাম তখন বলতাম আমি ব্যর্থ। কবি। আমি যে যুক্তিতে নিজেকে ব্যর্থ গায়ক বা ব্যর্থ অভিনেতা বলব না, একই যুক্তিতে ব্যর্থ কবি অপবাদও মাথা পেতে নেব না।
ছেলেটি আমার যুক্তির ধার দিয়েও গেল না, চোখ-মুখ আরো কঠিন করে বলল, আপনি কবিতা লিখতে পারেন না বলেই উপন্যাস লিখছেন। এটা আপনাকে স্বীকার করতেই হবে।
এটা স্বীকার করলে কি তুমি খুশি হও?
আমার খুশি হওয়া না হওয়া কিছু না, আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে আপনি একজন ব্যর্থ কবি।
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, আচ্ছা বেশ, স্বীকার করলাম।
মুখে স্বীকার করলে হবে না। কাগজে লিখে দিতে হবে।
কাগজ নিয়ে এসো, লিখে দিচ্ছি।
সে কাগজ নিয়ে এল, আমি সেখানে লিখলাম–আমি কবিতা লিখতে পারি না বলেই গল্প-উপন্যাস লিখি। আমি একজন ব্যর্থ কবি। সই করলাম, তারিখ দিলাম। ছেলেটি যুদ্ধজয়ের আনন্দ নিয়ে চলে গেল।
সে কেন এরকম করল?
কোন কারণে সে কি আমার উপর রেগে ছিল? তাকে রাগাবার মত আমি কি করতে পারি? হয়ত আমার লেখা তার ভাল লাগে না। তা তো হতেই পারে। লেখা। ভাল না লাগলে পড়বে না, কিন্তু রাগ করবে কেন? হয়ত সে নিজে একজন কবি। কবিরা অভিমানী হয়, রাগী হয়, এবং কেন জানি খানিকটা ছেলেমানুষও হয়। এদেশের বেশকিছু কবিকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কাব্যপ্রতিভা ছাড়াও আরো যা আছে তা রাগ, অভিমান এবং ছেলেমানুষী।
আমার নিজের কাব্যপ্রতিভা নেই, কিন্তু বাকি তিনটি যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। ময়মনসিংহের ঐ ছেলেটিকে যখন কাগজে লিখে দিলাম–”কবিতা লিখতে পারি না বলেই গল্প-উপন্যাস লিখি” তখন ভুল লিখিনি, ঠিকই লিখেছি। ব্যাপারটা আসলে তাই।
ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম প্রকাশিত রচনা কবিতা। পাঠক-পাঠিকারা শুনে হাসবেন, সেই কবিতা ইংরেজি ভাষায় লেখা। তখন পড়ি বগুড়া জিলা স্কুলে। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখা দিতে হবে। চারটা কবিতা (বাংলায়) জমা দিলাম। স্যার বললেন, হাবিজাবি এইসব কি লিখেছিস? অগা-বগা লিখলেই কবিতা হয়?
আমি মরমে মরে গেলাম। স্যার বললেন, ইংরেজি সেকশান খালি যাচ্ছে, যদি পারিস ইংরেজিতে কিছু লিখে দে। সুন্দর করে একটা Essay লিখে নিয়ে আয়–A journey by boat PapeTi Village carnival.
আমি পরদিন একটা ইংরেজি কবিতা লিখে ফেললাম। কবিতার নাম ‘God’, প্রথম চার লাইন ও
Let the Earth move
Let the Sun shine
Let them to prove
All are in a line.
স্যার বললেন–মন্দ না। শেষে মিল আছে।
কবিতা ছাপা হল। কবির ছবিসহ। বাবা কবিতা পড়ে গম্ভীর গলায় বললেন, মধুসূদন হবার চেষ্টা করছিস না-কি? ইংরেজিতে কে তোকে কবিতা লিখতে বলল? বাংলা ভাষাটা আছে কি জন্যে?
ঘটনার তিন বছর পর বাংলা ভাষায় দুটি কবিতা প্রসব করলাম। ‘প্রসব’ শব্দটা আমার পছন্দ নয় তবু ব্যবহার করলাম এই কারণে যে কবিতা দুটি বের করতে প্রসব যন্ত্রণার মতই যন্ত্রণা হল। রাতে ঘুম হয় না। মাথার ভেতর কবিতার লাইন ঘুরে। পুরো কবিতা না, একটা মাত্র লাইন।
কবিতার ছন্দ-টন্দ কিছুই জানি না, অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, পয়ার, অমিত্রাক্ষর এইসব শুনেছি–কোনটা কি জানি না। অথচ দুটা কবিতা লেখা হয়ে গেছে।
তখন পড়ি ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে। ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছাত্রীরা খুব সাহসী হয়। কাজেই আমিও খুব সাহসী হয়ে এক কাজ করে বসলাম। দুটি কবিতা কপি করে পাঠিয়ে দিলাম দৈনিক পাকিস্তানে (এখন দৈনিক বাংলা)। তবে নিজের নাম দিলাম না। আমার ছোটবোনের নাম দিলাম–মমতাজ আহমেদ শিখু। ছোটবোনের নাম দেয়ার পেছনে যুক্তি হচ্ছে–কবিতা দুটি আমার কাছে পুরুষ কবির কবিতা হিসেবে বেশ দুর্বল মনে হচ্ছিল। তবে মহিলা কবির লেখা হিসেবে মন্দ নয়। দৈনিক পত্রিকার মহিলা পাতায় ছাপা যায়।
আমার এই বক্তব্যে মহিলারা রাগ করবেন না, ফার্স্ট ইয়ারে পড়া একটি বাচ্চা ছেলে এরকম ভাবলে ক্ষতি নেই। এখন আমি এরকম ভাবি না। মেয়েদের ছোট করে দেখার প্রবণতা আমাদের সমাজে আছে। আমার মধ্যে তা নেই। অনেক অনেক আগেই। তা দূর হয়েছে। আমি নিশ্চিত, মেয়েদের মানসিক ক্ষমতা পুরুষদের চেয়ে বেশি। তবে। সেই ক্ষমতার অনেকটাই তাঁদের নষ্ট করতে হয় শিশুদের লালন-পালন করে বড় করতে গিয়ে। কিছু ক্ষমতা নষ্ট হয় স্বামী নামক মানুষটিকে সুখী রাখার নানান প্রক্রিয়া উদ্ভাবনে। তার উপর আছে নিজেকে আড়াল করে রাখার এক বিচিত্র প্রবণতা।
মূল গল্পে ফিরে আসি–ছোটবোনের নামে কবিতা পাঠিয়ে অপেক্ষা করছি। ছাপা হবে এমন দুরাশা নেই–কারণ, শুনেছি সম্পাদকরা অপরিচিত কারোর লেখা পড়েন না। তাঁদের এত সময় নেই।
কি আশ্চর্য কাণ্ড! যে সপ্তাহে কবিতা পাঠালাম, তার পরের সপ্তাহে দৈনিক পাকিস্তানের মহিলা পাতায় দুটি কবিতাই এক সঙ্গে ছাপা হয়ে গেল। শুধু তাই না, সম্পাদিকা একটি চিঠিও পাঠালেন–
“প্রিয় আপা,
কবিতা ছাপা হল। আরো কবিতা পাঠাবেন।”
কি সর্বনাশ! শেষে কিনা মহিলা কবি? সম্পাদিকার চিঠি পাওয়ার পর ঠিক করলাম, না, আর কবিতা না। যথেষ্ট হয়েছে। এবার মন দিয়ে পড়াশোনা করা যাক। কবিতার খাতা নষ্ট করে ফেললাম। কবিতার ভূত মাথা থেকে নেমে গেল।
ছোটবোনের নামে প্রকাশিত আমার সেই দু’টি কবিতার একটির কয়েকটি লাইন তুলে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। কবিতার নাম “একশ’ ফানুস”।
দিতে পার একশ’ ফানুস এনে
আজন্ম সলজ্জ সাধ
একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।
দীর্ঘদিন ধরে গদ্য লিখছি। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়–আহা, কেন লেগে থাকলাম না! সমগ্র মনপ্রাণ দিয়ে কবিতাকে কাছে পেতে চাইলে হয়ত সে কাছে আসত। দরজার ওপাশ থেকে ফিরে যেত না। কিংবা কে জানে সে হয়ত এখনো অপেক্ষা করছে–যদি তাকে ডাকি।
Chapter - 4 - শ্বেতপদ্ম
শ্বেতপদ্ম
আমাদের ছোটবেলায় নাপিতের দোকানে কিছু ‘অতি আবশ্যকীয় চিত্রকলা সাজানো থাকতো। এমন কোন নাপিতের দোকান ছিল না যেখানে (১) তীরবিদ্ধ বোররাকের ছবি, (২) ক্ষুদিরামের ফাঁসির ছবি, (৩) তাজমহলের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি না ঝুলতো। এই তিন ছবির সঙ্গে চুল কাটার কি সম্পর্ক আমি জানি না–নাপিতরা হয়ত জানেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয়নি।
এই তিন ছবির একটি, তাজমহলের প্রচার অনেক বেশি ছিল। প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বসার ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো সূচিকর্ম হিসেবে তাজমহল থাকত। তার সঙ্গে থাকত দু’লাইনের কবিতা–
ভেতরে তাহার মমতাজ নারী
বাহিরেতে শাহজাহান।
সবার শেষে থাকত সৃচি শিল্পীর নাম এবং তারিখ। তারিখের শেষে ইং অর্থাৎ ইংরেজি সন কিংবা বাং অর্থাৎ বাংলা সন। সেই সময়ে বিয়ে নামক ইন্সটিটিউশনে ঢোকার আগে মেয়েদের অবশ্য শিক্ষণীয় কর্মকাণ্ডের একটি ছিল–সেলাইয়ের কাজ। সেলাইয়ের কাজের অনেকগুলি ধাপ ছিল। জরীর তাজমহল হচ্ছে সর্বশেষ ধাপ। সঁচকর্মের এম.ফিল. ডিগ্রীর মত। মেয়ে দেখতে এসে মুরব্বিরা এক পর্যায়ে বলতেন–কই, তাজমহলটা দেখি?
রূপালী জরীর একটি তাজমহল আমার মাও বানিয়েছিলেন (কবিতা সহ)। সেই তাজমহল দীর্ঘদিন আমাদের বসার ঘরে রবীন্দ্রনাথের ছবির পাশে শোভা পেয়েছে। মা’র তাজমহল দেখে আমি তাজমহলের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। এটাকে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য কেন বলা হয় কিছুতেই বুঝতে পারি না। মসজিদের মত একটা দালান, সুন্দর হলেই বা কতটা সুন্দর হবে? যেমন মস্কোর ঘণ্টা। এটিও সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। ব্যাপার হচ্ছে একটা ঘণ্টা বড় হলেও সেটা ঘণ্টাই। তার সামনে গিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে থাকার কি থাকতে পারে? এরচে’ ব্যবিলনের শূন্যোদ্যানকে অনেক আকর্ষণীয় মনে হয়। নাম শুনলেই মনে হয়–চমৎকার একটা বাগান আকাশে ঝুলছে। ব্যবিলনের শূন্যোদ্যান দেখতে যাওয়া যেতে পারে কিন্তু তাজমহল না।
লেবু কচলে তিতা বানানোর ব্যাপার তাজমহলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, গান লিখে তাজমহলকে শুধু যে তিতা বানানো হয়েছে তাই না–যক্ষতিতা বানানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে–অধিকাংশ কবি তাজমহল নিয়ে কবিতা লিখেছেন তাজমহল না দেখে। এর মধ্যে আছেন কবি রবীন্দ্রনাথ। তাজমহল না দেখেই তিনি যে কবিতা লিখলেন–তার নাম ‘তাজমহল’। তবে তাঁর অতি বিখ্যাত কবিতা ‘শা-জাহান’ অবশ্যি তাজমহল দেখার পরে লেখা পূর্ণেন্দু পত্রী ও সাহিত্যের তাজমহল।]
কবিদের তাজমহল নিয়ে এত যে উচ্ছ্বাস, এত যে লেখালেখি তার সবটাই প্রেম বিরহ নিয়ে। তাজমহলের সৌন্দর্য নিয়ে কাউকে তেমন মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। তাজমহলের সৌন্দর্য হয়ত তাঁদের আকৃষ্ট করেনি–তাজমহলে প্রেমের মীথটাই তাঁদের আকৃষ্ট করেছে। যাঁরা তাজমহল দেখেছেন তাঁরা সবাই যে মুগ্ধ হয়ে আহা-উঁহু করেছেন তা না। অনেকের কাছেই ভাল লাগেনি। অনেকের মধ্যে একজন হলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং (নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কথাশিল্পী)। অন্যজনও অতি বিখ্যাত মানুষ। এলডুস হাক্সলি। তিনি বললেন -”The Taj was a disappointment.
তারপরও প্রতিবছর পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে জড় হয়। তারা ফিরে যায়। তাদের মধ্যে একদল আবার আসে। অনেকের নেশা ধরে যায়। ঘুরে ঘুরে আসতেই থাকে। এমন একজন হলেন–নর্থ ডাকোটায় আমি যে বাড়িতে থাকতাম, তার বাড়িউলী। মহিলার বয়স আশির উপরে। তিনি এ পর্যন্ত চারবার ‘তাজ’ দেখেছেন–আবারো যাবার ইচ্ছা। আমি ‘তাজের’ এত কাছাকাছি থেকেও তাজ দেখিনি শুনে তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি প্রস্তরযুগের একজন মানুষ–‘পিকিংম্যান’। তিনি প্রায় ধমক দেয়ার মত বললেন, দেখনি কেন?
আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, দেখতে ইচ্ছা করেনি।
কেন দেখতে ইচ্ছা করেনি?
আমি তাজমহল সম্পর্কে এত শুনেছি যে দেখতে ইচ্ছা করে না। আমার নিজের কল্পনায় একটা তাজমহল আছে–সেই তাজমহল বাস্তবের চেয়ে সুন্দর বলে আমার ধারণা।
বুড়ি বলল, খুব ভুল বললে। বাস্তবের তাজমহল তোমার কল্পনার চেয়ে অনেক সুন্দর!
আমি বললাম, কি করে বলছ–আমার কল্পনার তাজমহল তো তুমি দেখনি! ।
আমি অনুমান করতে পারি। তুমি আমার উপদেশ শোন–একবার দেখে এসো।
আচ্ছা, সময় পেলে এবং সুযোগ পেলে যাব।
.
সময় সুযোগ দুই-ই পেয়েছিলাম–দেখতে ইচ্ছা করল না। দু’বার খুব কাছ থেকে (দিল্লী) ঘুরে এসেছি। ট্রেনে চেপে ঘন্টা দু-একের মধ্যে আগ্রা যাওয়া যায়–যেতে ইচ্ছা করল না। আমি আমার কল্পনা নষ্ট করতে চাই না। কল্পনা নষ্ট হলে আঘাত পেতে হয়। চীনের মহাপ্রাচীর দেখে এই কষ্ট পেয়েছিলাম। কল্পনায় ভয়াবহ কিছু ভেবে রেখেছিলাম–কাছে গিয়ে মন খারাপ হল। মনে হল–মানুষের ক্ষমতার কি বিপুল অপচয়!
তাজমহল তৈরির কাহিনীও আমাকে কষ্ট দেয়। সম্রাট শা-জাহান যে মূল্যে যমুনার তীরে এ সমাধি সৌধ তৈরি করলেন–সেই মূল্যে প্রেমের সৌধ তৈরি করা যায় না। কিংবদন্তী বলে, ওস্তাদ ইসা আফেন্দি ছিলেন মূল স্থাপত্যবিদ। তিনি কুড়ি হাজার শ্রমিক। নিয়ে বাইশ বছরে শেষ করলেন তাজমহল। সম্রাট দেখলেন। তাঁর কাছে মনে হল–সম্রাটের প্রেমের যথাযথ রূপ দেয়া হয়েছে। তিনি খুশি হলেন–এবং ওস্তাদ ইসা খা আফেন্দির মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দিলেন। যেন এই ওস্তাদ দ্বিতীয় কোন তাজ তৈরি করতে না পারেন। শুধু তাই না–তিনি হুকুম দিলেন ক্যালিগ্রাফারদের চোখ উপড়ে ফেলতে–যেন তাজের ক্যালিগ্রাফির মত ক্যালিগ্রাফি আর না হয়। স্থাপত্য বিভাগের সব। প্রধানদেরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হল। যারা মর্মর পাথর কাটত তিনি তাদের হাত কেটে ফেলার হুকুমও দিলেন। একটি মহান শিল্পকর্মের জন্যে এই ছিল তাদের পুরস্কার।
তাজ নিয়ে প্রচলিত এই কিংবদন্তী আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। প্রথমত, শা-জাহান একজন প্রেমিক মানুষ। পত্নী বিয়োগ-ব্যথায় কাতর। এমন একজন মানুষ–এত নিষ্ঠুর হতে পারেন না। তার চেয়েও বড় যুক্তি হচ্ছে–শাজাহান যমুনার অপর তীরে একটি কালো তাজমহল বানানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। যা হবে মূল তাজমহলের হুবহু ছবি–শুধু তা করা হবে কালো পাথরে। স্থপতিদের তিনি যদি হত্যা করেন তাহলে কারা বানাবে ‘কৃষ্ণতাজ’?
অবশ্যি সম্রাটরা তো সাধারণ মানুষদের মত না। আমাদের কাছে যা নিষ্ঠুরতা তাদের কাছে তা হয়ত না। সম্রাট হুমায়ুনের মত দরদী সম্রাটকেও তো দেখি কত সহজে তার বিদ্রোহী ছোটভাই মীর্জা কামরানের চোখ উপড়ে ফেলার হুকুম দেন। চোখ উপড়ে ফেলার পর সেই অক্ষিগহ্বরে লেবুর রস ঢেলে দেয়া হয়। মীর্জা কামরানের চিৎকারে দিল্লীর পশুপাখি কাঁদতে থাকে। কিন্তু দিল্লীর বাদশাহ হুমায়ূন বিচলিত হন না। তিনি শান্তমুখে তাঁর প্রিয় লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করতে চলে যান।
যাই হোক, এই বহু-বিতর্কিত তাজমহল দেখতে যাবার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত করলাম। তিন কন্যা এবং স্ত্রীকে নিয়ে এক বিকেলে উপস্থিত হলাম তাজের সামনে–।
বিস্ময়ে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল না–মানুষের হাত এই জিনিস তৈরি করেছে। মহান শিল্পকর্মের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালে হৃদয়ে প্রবল হাহাকার তৈরি হয়। চোখে জল আসে। আমার চোখ জলে ভরে গেল। জলভরা চোখে দেখলাম–সম্রাটের স্বপ্ন–মানুষের হাতে তৈরি শ্বেতপদ্ম। আমার কল্পনা। কখনো এর কাছাকাছি যেতে পারেনি।
Chapter - 5 - শিল্পী সুলতান
শিল্পী সুলতান
ভাইবোনদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছি যশোহর। আমাদের লম্বা পরিকল্পনা–যশোহর থেকে যাব কুষ্টিয়া–রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি দেখব। তারপর যাব মেহেরপুর, দেখব আমবাগানে মুজিবনগর। আমরা পনেরোজন মানুষ, সম্বল একটা নয় সীটের মাইক্রোবাস। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার আমাদের কাদের মিয়া। ড্রাইভিং ছাড়া অন্যসব কাজ সে খুব ভাল জানে। আমার প্রবল সন্দেহ সে ডান চোখে দেখে না। রাস্তার ডানদিকে কোন গাড়ি এলে সে মোটেই বিচলিত হয় না। ঐ গাড়ির দিকে সরাসরি। মাইক্রোবাস চালাতে থাকে। আমাদের সবাইকে এক সঙ্গে চেঁচাতে হয়–কর কি? কর কি? কাঁদেরের যন্ত্রণায় গাড়ির ক্যাসেটে গান শোনা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। গান বাজালেই সে মাথা নাড়তে থাকে এবং দু’হাতে স্টিয়ারিং হুইলে তাল দেয়। হাঁটু নাচায়।
এমন বিপদজনক ড্রাইভার নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ কেউ করবে না। কিন্তু আমার উপায় নেই। কাদেরকে নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছি। সে গাড়ি নিয়ে নানান কায়দা-কানুন করে যাচ্ছে। উদাহরণ দেই, ফাঁকা রাস্তায় ঘণ্টায় সত্ত্বর কিলোমিটার বেগে গাড়ি যাচ্ছে। আচমকা সে ব্রেক কষল। আমরা একে অন্যের গায়ে গড়িয়ে পড়লাম। আমি বললাম, কি ব্যাপার কাদের?
কাদের নির্বিকার গলায় বলল, ব্রেক ঠিক আছে কিনা একটু টেস্ট করলাম।
টেস্টে কি পাওয়া গেল, ব্রেক ঠিক আছে?
জি, ঠিক আছে আলহামদুলিল্লাহ।
ভবিষ্যতে এরকম টেস্ট করবে না।
জি আচ্ছা।
আরেক দিনের কথা–হঠাৎ কাঁদেরের দিকে তাকিয়ে দেখি সে আপন মনে হাসছে। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, হাসছ কেন?
সে আনন্দিত স্বরে বলল, গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম স্যার। ঘুম ভাঙার পরে দেখি গাড়ি ঠিকমতই চলছে। এইজন্যে হাসতেছি। আল্লাহপাকের কি কুদরৎ!
তুমি তো আমাদের সবাইকে মারবে।
এটা স্যার ভুল কথা বললেন, হায়াৎ-মউতের মালিক আল্লাহপাক। উনার হুকুম ছাড়া কিছু হবে না।
তোমার অবস্থা যা, আমার তো মনে হয় উনি খুব শিগগিরই হুকুম দেবেন। সাবধানে গাড়ি চালাও, খুব সাবধানে।
আমি স্যার খুব সাবধান। এই প্রথম গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়েছি।
এই সাবধানী ড্রাইভারকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানে মানসিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যাওয়া। যশোরে পৌঁছে ঠিক করলাম–প্রোগ্রাম কাটছাঁট করব। যেখানে না গেলেই নয় সেখানে যাব। যেমন যশোরে দু’টি জায়গায় যাওয়ার কথা–সাগরদাড়ি, মাইকেল মধুসূদনের বসতবাড়ি। এবং নড়াইল, শিল্পী সুলতানের বাড়ি।
সাগরদাঁড়িতে গেলে বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ মাইকেল মধুসূদনের বিখ্যাত মৃত্যুগাথা পড়ে আসা যায়–
“দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে ….
তিষ্ঠ ক্ষণকাল …”
অন্যদিকে আছেন জীবন্ত কিংবদন্তী শিল্পী সুলতান। যিনি ছবি আঁকেন নাচতে নাচতে। ছবি আঁকার সময় অপার্থিব কিছু যেন তাঁর উপর ভর করে। তিনি ঘোরের মধ্যে চলে যান। বিশাল সব ক্যানভাসে যখন তুলি টানেন তখন তাঁর সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপে। এসব অবশ্যি আমার শোনাকথা। তাঁকে আমি কখনো ছবি আঁকতে দেখিনি। তাঁর সম্পর্কে শোনাকথারও কোন অন্ত নেই। বিচিত্র সব গল্প তাঁকে নিয়ে প্রচলিত। একটি হচ্ছে–শিল্পী সুলতানের পাঞ্জাবীর দু’পকেটে দুটি বিড়াল থাকে। তিনি পাঞ্জাবী গায়ে একবার নিউমার্কেটে এসেছেন। এক পকেটমার মানিব্যাগ হাতানোর জন্যে তাঁর পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। বিড়াল তার হাত কামড়ে দিল। শুধু যে কামড়ে দিল তাই না, কামড় দিয়ে হাতে ঝুলতে লাগল। কিছুতেই সেই বিড়াল ছাড়ানো যায় না। পকেটমারকে ঘিরে লোকে লোকারণ্য।
শিল্পী সুলতানকে নিয়ে আরেকটি খবর কয়েকদিন আগে পড়লাম। খবরের ক্যাপশান–‘সুলতানের সমুদ্রযাত্রা। শিল্পী সুলতান ৬০ ফুট লম্বা এক নৌকা বানিয়েছেন। পরিকল্পনা হল–তিনি তার জন্মদিনে নৌকা ভর্তি করবেন তাঁর পোষা। পঞ্চাশটা বিড়াল দিয়ে। তারপর যাত্রা করবেন সমুদ্রের দিকে। আর লোকালয়ে ফিরবেন না।
এত কাছে এসে এমন একজন বিচিত্র মানুষের কর্মকাণ্ড না দেখে আসা অন্যায় হবে। আমরা নড়াইলে যাওয়া ঠিক করলাম। মাইক্রোবাসে সবাই বসলাম গাদাগাদি করে। বোঝার উপর শাকের আঁটির মত স্থানীয় দু’জন গাইডও আমাদের সঙ্গে আছেন। কাদেরকে বললাম–গাড়ি খুব আস্তে চালাবে। যা করতে বলা হয় সে তার উল্টোটা করে। কাজেই সে ঝড়ের গতিতে চলল।
শিল্পী সুলতানের বাড়ি ‘চিত্রা নদীর তীরে। বাড়ির ঠিক পেছনেই শান্ত চিত্রা নদী। কি আশ্চর্য! সেই নদীতে সত্যি সত্যি বিশাল এক রঙিন নৌকা। সমুদ্রযাত্রার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। আমরা নদীর দিকে তাকিয়ে, নৌকার দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম, অপূর্ব! সুলতান সাহেব আনন্দে হেসে ফেললেন। একমাত্র শিশুরাই এত সুন্দর করে হাসতে পারে। তিনি গভীর আগ্রহে বললেন–আমার বাড়িটা দেখুন।
বাড়ির দিকে তাকালাম। প্রাচীন কালের মুনি ঋষিদের তপোবন। তপোবন আমি দেখিনি কিন্তু তপোবনের যে ছবি আমার কল্পনায় আছে তার সঙ্গে সুলতান সাহেবের বাড়ির কোন অমিল নেই। চারদিকে বিচিত্র গাছপালা, লতাগুল্ম। আলো এবং আঁধার। কি পরিষ্কার উঠোন, একটা শুকনো পাতাও নিচে পড়ে নেই। আমি কিছু বলার আগেই সুলতান সাহেব বললেন, কী সুন্দর, ঠিক না?
আমি বললাম, খুবই সুন্দর! এতটা সুন্দর ভাবিনি।
খুশি হয়েছেন?
খুব খুশি হয়েছি।
কাউকে খুশি হতে দেখলে আমার ভাল লাগে।
তিনি ক্রমাগত হাসছেন। তার চোখে-মুখে আনন্দ ঝরে পড়ছে। রোগা লম্বা একজন মানুষ। গায়ে শাদা পাঞ্জাবী। ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে মাথার অগোছালো চুল। স্বপ্নময় চোখ। আমি বললাম, আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি ঢাকার পত্রিকায় আপনার সম্পর্কে যেসব খবর ছাপা হয় তা ঠিক না।
সুলতান সাহেব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ছাপা হয়?
আপনার না-কি পঞ্চাশটা পোষা বিড়াল আছে।
সুলতান সাহেব দুঃখিত গলায় বললেন, কেন যে এরা বানিয়ে বানিয়ে খবর দেয়। আমার বিড়ালের সংখ্যা খুবই কম–মাত্র পঁচিশ।
কত বললেন?
পঁচিশটা। আর কুকুর তার চেয়েও কম–আটটা মাত্র কুকুর।
ও।
আপনি দেখবেন?
জি দেখব।
এরা বড় ভাল।
সুলতান সাহেব ডাক দিতেই প্রকাণ্ড সব কুকুর নানাদিক থেকে বের হতে শুরু করল। এ কী কাণ্ড! আমি জানলাম, প্রতিটি কুকুর এবং প্রতিটি বিড়ালের আলাদা আলাদা নাম আছে। সেই নামে তাদের ডাকলে তারা সাড়া দেয়।
সুলতান সাহেব তাঁর কুকুরদের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, পত্রিকার লোকেরা বানিয়ে বানিয়ে লেখে। এইসব বানানো লেখা পড়ে আমার মনটা খারাপ হয়। এক পত্রিকায় লিখেছে–আমি নাকি বেজী পুষি। পকেটে বেজীর বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াই।
আপনি বেজী পুষেন না?
সুলতান সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, না। আমি সাপ পুষি।
কি পুষেন বললেন?
সাপ। আমার গোটা দশেক কেউটে সাপ আছে। দেখবেন?
আমি আঁৎকে উঠে বললাম, জি না, দেখব না। এরা থাকে কোথায়?
বাগানেই ঘোরাফিরা করে। বড় লক্ষ্মী। যখন এঁকেবেঁকে যায়, বড়ই মায়া লাগে।
আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল–কি শুনছি এসব? বাগানে ঘোরাফেরা করে পোষা কেউটে?
সুলতান সাহেব হাসিমুখে বললেন, লোকজন সাপকে কেন এত ভয় করে আমি কিছুই বুঝি না। আল্লাহ তো এদের খুব পছন্দ করেন।
আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, আল্লাহ এদের পছন্দ করেন?
অবশ্যই করেন। পছন্দ করেন বলেই এমন তীব্র বিষ এদের এতটা করে। দিয়েছেন। অন্য কোন প্রজাতিকে তো এত বিষ দেয়া হয়নি–।
বাগানে ঘুরে বেড়ানোর প্রাথমিক আনন্দ আমার কেটে গেছে। আমি এখন ঘুরছি ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে। আমার দলের অন্যরাও বিচলিত। তবে সুলতান সাহেবের ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা দেখার উত্তেজনায় মনে হচ্ছে তারা খানিকক্ষণের জন্যে সাপের কথা ভুলে গেছে।
চিড়িয়াখানায় নানান ধরনের জীবজন্তু। প্রকাণ্ড এক সারসপাখিও তাদের মধ্যে আছে। আলাদা আলাদা খাঁচায় নানান প্রজাতির বানর। একটি বিশাল আকৃতির বানর। খুব হৈচৈ করছিল। সুলতান সাহেব তাকে আহত গলায় বললেন, তুমি এরকম করছ কেন? তুমি তো বড়ই দুষ্টামি করছ। এরা মেহমান। মেহমানদের সামনে হৈচৈ করা কি ঠিক?
বানর সঙ্গে সঙ্গে ভদ্র হয়ে গেল এবং মাথা চুলকাতে লাগল। যেন সে বলছে–মাফ করে দেবেন স্যার। মিসটেক হয়ে গেছে। আর হবে না।
এর মধ্যে চা দেয়া হয়েছে। চায়ের সঙ্গে দু’তিন রকমের মিষ্টি। নারিকেলের নাড়। এক হিন্দু মহিলা তদারকি করছেন। কঠিন ধরনের মহিলা বলে মনে হল। সুলতান। সাহেব আমাদের সঙ্গে চা খেতে চাচ্ছেন–মহিলা চা দেবেন না। রাগী গলায় তিনি বললেন, লোভ করবেন না। লোভ করা ভাল না। আপনার শরীর কত খারাপ আপনি জানেন না। রোজ আপনাকে অক্সিজেন খাওয়াতে হয়। আজ সকালেও একবার অক্সিজেন খাওয়ালাম।
বিছানার পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। এমন অসুস্থ একজন মানুষকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করা ঠিক না। উঠে দাঁড়ালাম। সুলতান সাহেব বললেন, শরীরটা বড় খারাপ করেছে। ছবি আঁকতে পারছি না। একটা বড় কাজে হাত দিয়েছি–কিন্তু …। আগেও একবার মরতে বসেছিলাম। রওশন এরশাদ আমাকে ঢাকায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। একমাস হাসপাতালে ছিলাম। তিনি রোজ খাবার। পাঠাতেন। যখনই সময় পেতেন আমাকে দেখতে আসতেন।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কোন রওশন এরশাদ?
এরশাদ সাহেবের স্ত্রী।
সে কি!
জানি না কি কারণ। উনি আমাকে বড়ই স্নেহ করেন। উনি কেমন আছেন আপনি কি জানেন?
জি না, আমি জানি না। ঐ মহিলার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই।
আমাকে বড়ই স্নেহ করতেন। মানুষের স্নেহ-ভালবাসা তুচ্ছ করার জিনিস নয়। আমি করি না। ভালবাসা মনে রাখি।
সুলতান সাহেব হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। বিষণ্ণতা তার চোখ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, অনেক কিছু করার শখ ছিল। করতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে সময় বোধহয় ফুরিয়ে গেল।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বললাম, এখন তো ঢাকা হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের কেন্দ্র। ঢাকা থেকে এত দূরে আছেন, আপনার অসুবিধা হয় না?
না। দূরেই ভাল আছি। কোলাহল ভাল লাগে না। এখানে প্রবল শান্তি অনুভব করি। ফার ফ্রম দি মেডিং ক্রাউড।
আপনার রুটিন কি? সময় কাটান কি করে?
বেশির ভাগ সময় বাগানে বসে বসে ভাবি।
কি ভাবেন?
সুলতান সাহেব হাসলেন। তিনি কি ভাবেন তা হয়ত কাউকে জানতে দিতে চান। আমি বললাম, আপনি কি আনন্দে আছেন?
হ্যাঁ, আনন্দে আছি। খুব আনন্দে আছি। একদল ছেলেমেয়ে আমার কাছে ছবি আঁকা শিখতে আসে। এরা মনের আনন্দে কাগজে রঙ লাগায়–দেখে খুব আনন্দ পাই। নৌকা তৈরি শেষ হলে ওদের নিয়ে বের হয়ে পড়ব।
কোথায় যাবেন?
সমুদ্রের দিকে যাব। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন নৌকায় অনেক জানালা?
লক্ষ্য করেছি।
বাচ্চারা বসবে জানালার পাশে। যা দেখবে তার ছবি আঁকবে। ভাবতেই ভাল লাগছে।
আমারও ভাবতে ভাল লাগছে।
আমি বললাম, আজ উঠি।
সুলতান সাহেব বললেন, আরো খানিকক্ষণ বসুন।
বসলাম আরো কিছুক্ষণ। লক্ষ্য করলাম সুলতান সাহেবের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তিনি এই শারীরিক কষ্ট অগ্রাহ্য করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। মনটা খুব খারাপ হল।
বিদায় নেবার আগে সুলতান সাহেবের স্টুডিওতে ঢুকলাম। মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বিশাল এক ক্যানভাস। ছবি অনেকখানি আঁকা হয়েছে। একদল পেশীবহুল নারী পুরুষ কাজ করছে। কি অপূর্ব ছবি! শিল্পী সুলতান তাঁর নিজের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন ক্যানভাসে। ক’জন মানুষ তা পারে?
Chapter - 6 - লাউ মন্ত্র
লাউ মন্ত্র
জামালপুর গিয়েছিলাম, আশেক মাহমুদ কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মুজিবর রহমান সাহেবের বাসায় দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত। খেতে বসেছি–অনেক আয়োজনের একটি হচ্ছে চিংড়ি মাছ এবং লাউয়ের ঘণ্ট। ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেবের স্ত্রী শংকিত গলায় জানতে চাইলেন–লাউ সিদ্ধ হয়েছে কি না। আমি বললাম, হয়েছে। মনে হলো তিনি তবুও নিশ্চিত বোধ করছেন না। পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলেন। সে ও বলল, সেদ্ধ হয়েছে। আমি একটু বিস্মিত বোধ করলাম। খেতে ভালো হয়েছে কি না, ঝাল বেশি কি না সাধারণত এগুলো চাওয়া হয়। লাউ সেদ্ধ হয়েছে কি না, সচরাচর জানতে চাওয়া হয় না। কোনো ব্যাপার আছে কি?
ব্যাপার অবশ্যই আছে। সেটা জানা গেল রাতে গল্পের আসরে। ভদ্রমহিলা একজনের কাছ থেকে ছেলেবেলায় একটা মন্ত্র শিখেছেন। লাউয়ের দিকে তাকিয়ে সেই মন্ত্র পাঠ করলে লাউ সিদ্ধ হয় না। তিনি নাকি অসংখ্যবার পরীক্ষা করেছেন। একবার মন্ত্র পাঠ করবার পর লাউ যতই জ্বাল দেওয়া হোক নরম হবে না। বরং আরো শক্ত হবে। তিনি যখন লাউ রান্না করেন, মন্ত্র ভুলে থাকতে চেষ্টা করেন। তবু এক আধবার মনে পড়ে যায়। তিনি তটস্থ হয়ে থাকেন-লাউ বুঝি সেদ্ধ হয় না।
জগতে প্রচুর মন্ত্র-তন্ত্র আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলে একটি আফ্রিকান দল সঙ্গে মন্ত্র পড়ার গুণীনও নিয়ে এসেছিল। সেই গুণীন বিংশ শতাব্দীর টিভি ক্যামেরার সামনে মন্ত্র পাঠ করেছে, সাদা রঙের মুরগি কেটে খেলার মাঠে রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। মন্ত্রপাঠে শেষ রক্ষা হয় নি–খেলা জেতা হয় নি। ফুটবল খেলা একটা বড় ব্যাপার। এখানে জয়-পরাজয় আছে। জয়-পরাজয় যেখানে আছে সেখানেই মন্ত্র থাকতে পারে। কিন্তু লাউ সেদ্ধ হবে কী সেদ্ধ হবে না, এ নিয়েও যে মন্ত্র থাকতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল।
ভদ্রমহিলাকে বললাম, আপনি আমাকে মন্ত্রটা শিখিয়ে দিন। তিনি চেঁচিয়ে বললেন, কী সর্বনাশ! না! না!
তিনি যদি অন্য একজনের কাছে শিখতে পারেন, আমিও তার কাছ থেকে শিখতে পারি। ভদ্রমহিলা আমার এই যুক্তিতে কাবু হলেন না। আমার মন্ত্র শেখা হলো না।
আমাদের দেশে মন্ত্র-তন্ত্রের একটা প্রবল জোর সব সময়ই ছিল। সব বিষয়ে মন্ত্র ছিল। বসন্ত রোগ দূরীকরণ মন্ত্র। বসন্ত রোগ আনয়ন মন্ত্র। সাপে কাটার মন্ত্র, বশীকরণ মন্ত্র। বিয়ের মন্ত্র, বিয়ে ভাঙার মন্ত্র।
মজার ব্যাপার হলো, একদল শিক্ষিত মানুষ আবার এইসব বিশ্বাস করছেন। শুধু যে বিশ্বাস করছেন তা-ই না নিজেদের বিশ্বাস অন্যদের মাঝে ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।
এই তো সেদিন মাথাব্যথায় কাতর হয়ে আছি। আমার বড় ভাই স্থানীয় বন্ধু টি এন্ড টির মুনীর আহমেদ সাহেব টেলিফোন করলেন। আমি বললাম, কথা বলতে পারছি না মুনীর ভাই, প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা। তিনি বললেন, আপনি টেলিফোন ধরে চুপচাপ বসে থাকুন তো, আমি মাথাব্যথা সারিয়ে দিচ্ছি।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কীভাবে সারাবেন?
মেডিটেশন করে সারানো যায়। আমি সিলভা কোর্স নিয়েছি। আপনি টেলিফোন রিসিভার কানে নিয়ে চুপ করে বসুন।
ও আচ্ছা।
ও আচ্ছা না। যা করতে বলছি করুন।
আমি মিনিট পাঁচেক টেলিফোন ধরে বোকার মতো বসে রইলাম এবং এক সময় বলতে বাধ্য হলাম যে আপনার মেডিটেশনে তেমন উপকার হচ্ছে না। যদি কিছু মনে না করেন দুটো প্যারাসিটামল খেয়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকব।
মুনীর আহমেদ সাহেব একসময় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর মতো আধুনিক মানুষ যদি বিশ্বাস করেন–টেলিফোনে মাথাধরা সারানো যায় তাহলে আমাদের অশিক্ষিত মানুষজন মন্ত্র-তন্ত্র কেন বিশ্বাস করবে না?
মন্ত্রপাঠ করে গনগনে কয়লার আগুনের উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য আমেরিকান টিভিতে দেখানো হয়েছিল। ব্যাপারটা আমেরিকানদের উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। একদল সাহেব মন্ত্রতন্ত্রের পক্ষে খুব লেখালেখি শুরু করলেন। তখন ‘কেলটেকে’র (California Institute of Technology) বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন, পরীক্ষাটা তাঁরাও করবেন। তাঁরা থিওরি বের করলেন, হাঁটার কায়দা বের করলেন। যে কায়দায় হাঁটলে কয়লার তাপ পায়ের পাতা পুড়িয়ে ফেলার মতো শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে না। হাজার হাজার দর্শকের সামনে এই পরীক্ষাটি কেলটেকের বিজ্ঞানী করে দেখালেন যে গনগনে কয়লার উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়। এসব বিজ্ঞানীর একজন আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ড. জাফর ইকবাল। তার কয়লার উপর দিয়ে হাঁটা নিয়ে দৈনিক বাংলার ফিচার পাতায় একটি ফিচারও প্রকাশিত হয়েছে।
এইসব ঘটনা মন্ত্র বিশ্বাসী মানুষকে টিলাতে পারে না। যে যা বলুক মন্ত্র আছে এই বিশ্বাসে তারা বোধহয় মনে এক ধরনের ভরসা পান। তন্ত্রের মূল উৎপত্তি নাকি কামরূপ কামাখ্যায়। সেটি নাকি নারী রাজত্ব। নারীরা সবাই মন্ত্র-তন্ত্র এবং বশীকরণ বিদ্যায় অতিশয় পটু। তারা সবাই উদ্ভিন্ন যৌবনা এবং পরীর মতো রূপবতী। কোনো পুরুষ ওই অঞ্চলে চলে গেলে সহজে জীবন নিয়ে ফিরতে পারে না–অসংখ্য তরুণীর মনোরঞ্জন করতে করতেই তার মৃত্যু হয় (বলাই বাহুল্য–সে মরণও স্বর্গ সমান) তবে কেউ যদি ফিরতে পারে সে মহা সৌভাগ্যবান) কারণ সে তন্ত্র-মন্ত্র শিখে আসে। বাকি জীবনটা তন্ত্র-মন্ত্র ব্যবহার করে সুখেই কাটিয়ে দিতে পারে।
ছোটবেলায় দেখেছি গরুর মন্ত্র জানা গুণীন। বছরের একটা বিশেষ সময়ে এরা উপস্থিত হয়। মন্ত্র পাঠ করে গরুর গায়ে ফুঁ দেয়। এই ফুঁ এমনই জোরালো যে আগামী এক বছর কোনো রোগবালাই গরুকে স্পর্শ করে না। মন্ত্রটা পুরোপুরি আমার মনে নেই, তবে মন্ত্রের শুরু এ রকম :
‘গোয়াল ঘরের পাশে।
খুকখুক কাশে
ছেলেমেয়েরা হাসে…’
গুণীনরা শুধু যদি মন্ত্রপাঠ করে চলে যেত তাহলে ব্যাপারটা তেমন অসহনীয় হতো না, কিন্তু মন্ত্র পাঠের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিতান্তই অমানবিক একটা কাজ করে–গরুটাকে হাত পা বেঁধে শুইয়ে লোহা গনগনে গরম করে গরুর গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। চামড়া পুড়ে ধোঁয়া বের হতে থাকে। বেচারা গরু আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে।
এ জাতীয় নির্যাতন শুধু যে পশুদের উপর হয় তা না মানুষের উপরও হয়। খুব শৈশবে দেখা ছবি। গ্রামের একটি তরুণী বধূকে ভূতে ধরেছে। ভূতে ধরলে লজ্জা শরম নাকি থাকে না–মেয়েটি গায়ের কাপড় বারবার ফেলে দিচ্ছে। গ্রামে পর্দা প্রথা কঠিন। কিন্তু ভূত ধরা মেয়েদের জন্যে মনে হয় পর্দা প্রথার কড়াকড়ি তেমন নেই। অনেক পুরুষ মানুষ উঁকি দিয়ে দেখছে। যে ওঝা মন্ত্র পাঠ করছে-সে-ও মাঝ বয়সী। মন্ত্র পাঠ করার ফলে মেয়েটির সারা গায়ে হাত বুলাবার সুযোগ পাচ্ছে। এই কাজটিতে সে আনন্দ পাচ্ছে বলেই মনে হয়। একপর্যায়ে সে মেয়েটির গায়ের সব কাপড় খুলে ফেলল। বড়া আমাদের তাড়া দিল, পুলাপান কী দেখে? দূর হও, দূর। হও। আমরা দূর হলাম। বড়দের জগতের সব কাণ্ডকারখানা আমরা বুঝি না। দূর হওয়াই ভালো। তা ছাড়া ওঝা এখন শুকনা মরিচ পোড়াতে দিয়েছে মেয়েটির দুই নাকের ফুটায় জ্বলন্ত শুকনো মরিচ ঠেসে ধরা হবে। এই দৃশ্য না দেখাই ভালো।
আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় একবার এক বৃদ্ধ মহিলা তার কলেজে পড়া নাতিকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন। নাতিকে খুব লায়েক মনে হলো। তার গায়ে রঙচঙা শার্ট, দিনের বেলাতেও চোখে কালো চশমা। তাঁদের সঙ্গে পেটমোটা কালো ব্যাগ। ভদ্রমহিলা ব্যাগ খুলে নানা কাগজপত্র বের করতে লাগলেন। কাগজপত্রের। সঙ্গে আছে পত্রিকার ক্লিপিং, প্রশংসাপত্র। আমি বললাম, ব্যাপার কী? তিনি বললেন, আগে এইগুলান মন দিয়া পাঠ করেন। পরে কথা বলব। কথার দাম নাই–লেখার দাম আছে।
আমি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে কাগজপত্র পড়ে যা জানলাম তা হচ্ছে–তিনি ক্যানসার, এপিলেপ্সি এবং জলাতংক রোগ সারাতে পারেন এবং গ্যারান্টি সহকারে সারান। এই তিন কালান্তর ব্যাধি যিনি সারাতে পারেন তার অবস্থা দেখে মায়া লাগে। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। শাড়িতে কোনো তালি চোখে পড়ল না, তবে গায়ের চাদরে তালি।
বুঝলেন ভাইডি, আমি তিন ধরনের চিকিৎসক। আফনেরে ভাই ডাকলাম। আফনে আমার মর্ম বুঝবেন।
আমি বোনের মর্ম তেমন বুঝলাম না। ভদ্রমহিলাকে দেওয়া প্রশংসাপত্র দেখতে লাগলাম। একটি প্রশংসাপত্র জনৈক সিভিল সার্জনের দেওয়া। তিনি লিখেছেন (ইংরেজি ভাষায়) এই মহিলা ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে আক্রান্ত একজনকে সারিয়ে তুলেছেন। তিনি তার চাক্ষুষ সাক্ষী। তিনি এই মহিলার সাফল্য কামনা করেন।
যে মানুষ ম্যালিগন্যান্ট টিউমার সারিয়ে তোলে তাকে নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে হৈচৈ পড়ে যাওয়ার কথা। সিভিল সার্জন ভদ্রলোক কোনো হইচই-এ না গিয়ে একটি প্রশংসাপত্র দিয়েছেন।
আমি বললাম, আপনি কী করে রোগ সারান? ওষুধপত্র দেন?
ওষুধপত্র আমার কিছু নাই ভাইডি। আমার আছে মন্ত্র।
মন্ত্র পেয়েছেন কীভাবে?
গায়েবিতে পাইছি। আছরের নামাজ পইড়ে জায়নামাজে বইস্যে তসবি টানতেছি তখন গায়েবিতে পাইলাম।
তিন রোগের জন্যে এক মন্ত্র? না তিন রোগের তিন মন্ত্র?
একই মন্ত্র। তয় ভাইডি পড়নের কায়দা ভেন্ন।
আমার কাছে কী জন্যে এসেছেন?
এইটা কী কথা কলেন ভাইডি? বোন ভাইয়ের কাছে আসবি না?
তা তো আসবেই। তবু আপনার কোনো উদ্দেশ্য থাকলে বলুন।
একটা চিডি যে দেওয়া লাগে ভাইডি। একটা কাগজে লিখে দেবেন–আমার। চিকিৎসায় রোগ সারে। তারপরে নাম সই করবেন।
আমি বিরস গলায় বললাম, ক্যানসার, এপিলেপ্সি এবং জলাতংক এই তিন রোগের যে কোনো একটা যদি আমার হয়, আপনারে খবর দেব। তারপর আপনি এসে মন্ত্রপাঠ করে আমার অসুখ সারাবেন। তখন আমি প্যাডে সুন্দর করে সার্টিফিকেট দেব।
আমার বোন কথা শুনে রেগে গেলেন। খিটমিটে গলায় বললেন, এতগুলান লোক যে চিডি দেল? এরা কী মিথ্যা দেল? এর মধ্যে একজনায় আছে মন্ত্রী। ওরে, সেকান্দর মন্ত্রীর চিড়ি উনারে দেখা।
সেকান্দর মন্ত্রীর চিঠি বের করে দিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্যাডে প্রশংসাপত্র।
কী, ভাইডি দেখলেন?
জি দেখলাম।
বিশ্বেস হলো?
হয় নি।
না হইলে কী আর করা? জোর কইরে তো বিশ্বাস করানো যায় না! তা ভাইডি, জোহর হয়েছে–জায়নামাজ দিতে বলেন, নামাজ পড়া লাগবে।
আপনি নিয়মিত নামাজ পড়েন?
এইটা কী কথা বলেন ভাইডি? সাত বছর বয়স থেইকে নামাজ পড়ি। একবার অসুখে কাজা গেল। কাফফারা দিলাম।
আমি বললাম, ইসলাম ধর্মে মন্ত্র-তন্ত্র নিষিদ্ধ, তা কি জানেন না? আমাদের ধর্মে বলা হয়েছে যারা মন্ত্র-তন্ত্র করে এবং যারা এইসব বিশ্বাস করে তারা কবিরা গুহাহ করে।
সবই জানি ভাইডি। তয় এর মধ্যে বিষয় আছে। তুমি বুঝবা না, তোমার জ্ঞান কম।
আমার বোনকে বিদেয় করতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হলো। বোনের হাঁটুতে বাতের ব্যথা, চিকিৎসা করাবেন। সেই চিকিৎসার খরচ বাবদ একশ টাকা এবং রিকশা ভাড়া বাবদ দশ টাকা দিতে হলো।
তিনটি কালান্তক ব্যাধির চিকিৎসায় যিনি সিদ্ধহস্ত তাঁকে সামান্য হাঁটুর ব্যথায় কাতর হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখলাম।
.
সম্প্রতি আমার বাসায় উইপোকার আগমন ঘটেছে। উইপোকা বই কেটে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। নানান ওষুধপত্র দিয়েও তাদের কাবু করা যাচ্ছে না। এরা শুধু যে বই খাচ্ছে তাই না, বইয়ের আলমিরাও খেয়ে ফেলছে। মন খুব খারাপ, এই অবস্থায় আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক বললেন, উইপোকা এম্নিতে দূর হবে না। এরা ভয়াবহ। সব ছারখার করে দেবে। তবে তিনি উইপোকা দূর করার মন্ত্র জানেন। আমি যদি চাই তিনি মন্ত্র পাঠ করে উইপোকা দূর করবেন। আমি বললাম, মন্ত্রে উইপোকা দূর হবে?
অবশ্যই দূর হবে। মন্ত্র পাঠ করলে রানি উইপোকা মারা যাবে। উইপোকার বংশবৃদ্ধি হবে না।
আপনি কি আগেও উইপোকা দূর করেছেন?
হা করেছি। আপনি পরীক্ষা করে দেখুন। পরীক্ষা করতে তো আপত্তি নেই।
আমি বললাম, এক শর্তে আমি পরীক্ষা করতে রাজি আছি–মন্ত্রটা আপনি কাগজে লিখে দিবেন। তারপর মন্ত্র পাঠ করবেন। ভদ্রলোক রাজি হলেন না। মন্ত্র নাকি শেখাতে নেই। এতে মন্ত্রের জোর কমে যায় এবং যে মন্ত্র প্রকাশ করে দেয় তার ক্ষতি হয়।
যা-ই হোক, আমি উইপোকা তাড়াবার মন্ত্র জোগাড় করেছি। যাদের বাসায় উইপোকা আছে তারা এই মন্ত্রের ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। মন্ত্র পাঠের নিয়ম হলো, উইপোকার কিছু মাটি হাতে নিতে হবে, তাতে সমপরিমাণ লবণ মিশাতে হবে। মাটি এবং লবণ মাখতে মাখতে মন্ত্র পাঠ করতে হবে। অবশ্যই মন্ত্র পাঠের সময় শরীর শুদ্ধ হতে হবে। চোখ থাকবে বন্ধ। মন্ত্র পাঠ হলে–লবণ মাখা মাটি উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে দিতে হবে।
মন্ত্রে কাজ হয় কি?
আমার বেলায় হয় নি। তবে আমি অবিশ্বাসী লোক, আমার বেলায় কাজ না হওয়ারই কথা। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।
(মন্ত্র)
উত্তর দক্ষিণ সান
বজরং প্রমাণ
উই উই সান।
বজরং প্রমাণ
পূর্ব পশ্চিম সান
উই উই প্রমাণ।
কালীর দিব্যি ধরি
অহমন্তি ধাম
দুর্জনং বন্দেৎ
পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণ সান।
উই উই প্রমাণ।
Chapter - 7 - মাসাউকি খাতাঁওরা
মাসাউকি খাতাঁওরা
মধ্যবিত্তদের জীবনে উত্তেজনা সৃষ্টির মতো ঘটনা বড় একটা ঘটে না। তাদের জীবনযাত্রা খাওয়া ঘুমানো এবং টিভি দেখার মধ্যেই মোটামুটি সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমার ছোটভাইয়ের বাসায় ব্যতিক্রম হলো। তাদের বাসায় উত্তেজনা সৃষ্টির মতো একটা ঘটনা ঘটার উপক্রম হলো। শুনলাম, এক জাপানি যুবক নাকি তার বাসায় একমাস থাকবে। জাপান-বাংলাদেশ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের সে একজন কর্মী, বাংলাদেশের গ্রামে দু’বছর কাটাবে। তবে পোস্টিং হওয়ার আগে বাংলাদেশের কোনো এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে তাকে এক মাস কাটাতে হবে, যাতে সে আমাদের রীতি-নীতি, আচার-আচরণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পায়।
জাপানি যুবকের জন্যে আমার ছোটভাইয়ের পল্লবীর বাসায় দোতলায় একটা ঘর খালি করা হলো। জানালায় নতুন পর্দা দেওয়া হলো। বিছানায় নতুন চাদর। টেবিলে ফুলদানিতে গোলাপ। বাথরুমে টয়লেট পেপার। বিদেশি অতিথি। আদর যতের যেন ক্রটি না হয়। এই অতিথি অন্য সব অতিথির মতো নয়। সে হচ্ছে পেইং গেস্ট। যে ক’দিন থাকবে সে-ক’দিনের জন্যে টাকা দেবে। পেইং গেস্ট হলেও তার মূল কাজ আমাদের জীবনযাত্রা লক্ষ করা। আমাদের কালচার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। যেহেতু বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে সে ধারণা নেবে। কাজেই আমাদের সচেতন থাকতে হবে, কোনো ভুল ধারণা যেন সে না পায়।
তার সন্ধ্যাবেলা আসার কথা। বাসার সবাই বিকেল থেকে সেজেগুঁজে অপেক্ষা করতে লাগল। বাচ্চাদের উৎসাহই সবচেয়ে বেশি। তারা কথাবার্তা কীভাবে বলবে তা-ই নিয়ে মহাচিন্তিত। দোকান থেকে কুৎসিত আকৃতির বিশাল সাইজের মিষ্টি আনা হয়েছে, যাতে বিদেশি অতিথিকে মিষ্টির আয়তন দেখিয়ে ভড়কে দেওয়া যায়।
অতিথি এল সন্ধ্যাবেলা। পায়ে বুটজুতা, পরনে চকচকে সবুজ লুঙ্গি, গায়ে ফতুয়া। আমরা তাকে ভড়কাতে চেয়েছিলাম। বিচিত্র পোশাক দিয়ে শুরুতেই সে আমাদের ভড়কে দিল। অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে বো করল। একবার না, কয়েকবার। তারপর হাসিমুখে পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমার নাম মাসাউকি খাতাওরা। আশা করি আপনারা ভালো আছেন। শুভ সন্ধ্যা।
আমরা তার পোশাক দেখে মুগ্ধ। তার দুধে আলতা গায়ের রঙ দেখে মুগ্ধ। তার পরিষ্কার বাংলা শুনে মুগ্ধ। জানলাম প্রয়োজনীয় বাংলা সে জাপান থেকেই শিখে এসেছে।
হাসি-খুশি ধরনের নিতান্তই অল্পবয়স্ক একটি ছেলে। শুনেছি, জাতি হিসেবে জাপানিরা খুব বুদ্ধিমান। একে খানিকটা বেকুব ধরনের মনে হলো। সে প্রথম দিনেই তার বেকুবির অনেকগুলো প্রমাণ দেখাল। বিশাল আয়তনের সাতটি মিষ্টি খেয়ে বলল, মিষ্টিজাতীয় খাবার আমি পছন্দ করি না।
অনেক বাচ্চাকাচ্চা তার জন্যে অপেক্ষা করছে দেখে সে বাচ্চাদের আনন্দ দেওয়া অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে ধরে নিয়ে, ডিগবাজি, পা উপরে মাথা নিচে দিয়ে দাঁড়ানো জাতীয় কিছু খেলা দেখাল এবং এক সময় হুড়মুড় করে পড়ে গিয়ে একটা চায়ের কাপ ভেঙে ফেলে ভাঙা টুকরাগুলোর দিকে খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা ময়লা একশ টাকার নোট মা’র দিকে বাড়িয়ে বলল, দয়া করে কাপের দামটা এখান থেকে রাখুন। কাপ ভাঙায় আমি বিশেষ দুঃখী হয়েছি।
সাতদিনের মাথায় সে ঘরের লোক হয়ে গেল। রান্নাঘরে ঘুরঘুর করে। কাঁচামরিচ ছাড়া ভাত খেতে পারে না। আমার মা অবলীলায় তাকে বলেন, দোকান থেকে আধ কেজি লবণ এনে দাও তো। সে ছুটে যায় লবণ আনতে। মশারি টানানোর জন্যে পেরেক পুঁতে দেয়। একদিন দেখা গেল ঝাড়ু হাতে প্রবল উৎসাহে ঘর ঝাট দিচ্ছে। ভিক্ষুক দরজা ধাক্কা দিলে বলছে মাফ করো।
বাসার পাশে এক ধোপার দোকানে তাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে দেখা গেল। জানা গেল, ধোপাকে সে একশ টাকা দিয়েছে যার বিনিময়ে বোপা তাকে তার টু-ইন ওয়ানটি ব্যবহার করতে দেয়। সে সেখানে জাপান থেকে নিয়ে আসা ক্যাসেটে জাপানি গান শোনে।
তাকে বলা হলো যে, বাসাতেই ক্যাসেট প্লেয়ার আছে। সে ইচ্ছা করলে ব্যবহার করতে পারে। তার জবাবে সে বলল, এই বাসায় সে জাপানি ক্যাসেট বাজাতে চায় না। সে বাঙালি কালচার শিখতে চায়।
আমাদের সঙ্গে থেকে সে যেসব কালচার শিখল তা বাঙালি কালচারে পড়ে না। পারিবারিক কালচার হিসেবে চালানো যায়। কিছু নমুনা দেওয়া যাক।
(১) ঘুমুতে যাওয়ার এবং ঘুম থেকে উঠার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। যার যখন ইচ্ছা ঘুমুতে যেতে পারে। কেউ রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে আবার অনেকে রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে থাকে। কেউ কেউ ওঠে সূর্য ওঠার আগে এবং প্রার্থনা করে (আমার মা)! কেউ সকাল এগারোটায় অনেক কষ্টে বিছানা থেকে নামে (আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা), এক কাপ চা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
(২) দেশের বাড়ি থেকে প্রচুর মেহমান আসে। তখন ঘরের মেঝেতে নানা ধরনের বিছানা করা হয়।
(৩) রবীন্দ্র সংগীত, হিন্দি এবং ইংরেজি–এই তিন ধরনের গান সারাক্ষণ ক্যাসেটে বাজতে থাকে। যদিও কাউকে দেখেই মনে হয় না সে গান শুনছে।
মাসাউকিকে দেখে আমরাও জাপানিদের সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা করলাম। যেমন—
ক) জাপানি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ঠিক না। তারা খানিকটা বেকুব ধরনের হয়। (উদাহরণ : একবার বাসায় একটা মিলাদ হলো। মাসাউকি সেখানে উপস্থিত। পাত্রে করে আতর-ভেজানো তুলা দেওয়া হয়েছে। সবাই তুলা। থেকে আঙুলে খানিকটা আতর মাখিয়ে নাকে দিচ্ছে। তুলার পাত্র মাসাউকির সামনে আসতেই সে পুরো তুলার টুকরা মুখে দিয়ে কপ করে গিলে ফেলে হাঁসের মতো গলা টেনে টেনে কাশতে লাগল)
খ) জাপানিরা খাদ্যের ব্যাপারে গোপালের মতো সুবোধ বালক। তাদের যা দেওয়া হয় সবই খায়। তবে তারা নুডলস খায় না। সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে এলু-বার্তা (আলুভর্তা] এবং তিরিকিরি [তরকারি]।
গ) এদের লজ্জাশরম একটু কম। লুঙ্গি পরে থাকে, ফট করে লুঙ্গি খুলে যায় –তারা তাতে মোটেও বিব্রত বোধ করেনা। শুধু ইয়েই ইয়েই জাতীয় শব্দ করে।
ঘ) জাপানিরা খুব রঙচঙে আন্ডারওয়ার পরে। মাসাউকির লুঙ্গি প্রায়ই খুলে যাওয়ায় তার বিচিত্র কক্ষে আন্ডারওয়ার দেখার সৌভাগ্য আমাদের সবারই হয়েছে।
মাসাউকিকে নিয়ে সবচেয়ে সমস্যায় পড়লেন আমার মা। গ্রামে তাঁর যত আত্মীয়স্বজন আছে তারা সবাই জাপানি দেখার অজুহাতে একবার করে ঢাকা ঘুরে গেল। নিতান্ত অসময়ে ছয়-সাতজন এসে উপস্থিত হয়। তাদের মুখভর্তি হাসি। তারা। খুশি খুশি গলায় বলে, জাপানি দেখতে আসছি। তাদের সেই দেখা তিন-চারদিনেও শেষ হয় না। তারা জাপানি দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিড়িয়াখানা দেখে, ঢাকা শহর দেখে, বলাকা সিনেমাহলে সিনেমা দেখে। দেশে ফিরে যাওয়ার সময় বলে, জাপানি দেইখ্যা বড় ভালো লাগল। অতদিন খালি জাপানি জিনিস দেখছি, এখন আল্লাপাক জাপানি আদম দেখাইল। এরার সব ভালো তবে বাংলা ভাষায় একটু দুর্বল।
তারা দেশে ফিরে অন্যদের খবর দেয়। অন্যরা তখন কাপড়-চোপড় গুছিয়ে ঢাকা রওনা দেয়।
একমাস পার হওয়ার পর মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মাসাউকি বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। বিদায়দৃশ্য যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং হলো। মাসাউকি হড়বড় করে জাপানি ভাষায় একগাদা কথা বলল। মনে হলো, তার মধ্যে গভীর আবেগের সঞ্চার হয়েছে। কারণ কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে আসছিল। আমরা যে তার জাপানি ভাষা একবর্ণও বুঝতে পারছি না তা তাকে বুঝতে দিলাম না। আমরা সবাই খুব মাথা নাড়তে লাগলাম। মার বাসায় কাজের মেয়ে দুজনের একজন গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল–মশা ভাইজান যাইতাছে [মাসাউকি বাসার বাচ্চাকাচ্চা এবং কাজের মানুষদের কাছে মশাভাই হিসেবে পরিচিত]।
মাসাউকির বিদায়ের ছ’মাস পরের কথা। কোরবানির ঈদের ছুটিতে আমরা সবাই পল্লবীর মা’র বাড়িতে জড়ো হয়েছি। এই ঈদ সবাই মিলে মা’র সঙ্গে করি–দীর্ঘদিনের নিয়ম। ঈদের দু’দিন আগে স্যুটকেস হাতে নিয়ে মাসাউকি উপস্থিত। দুটো এক শ’ টাকার নোট বের করে মা’র কাছে গিয়ে সে যা বলল, তা হচ্ছে, তাকে তিনদিনের ছুটি দিয়েছে। সে আমাদের সঙ্গে থাকতে এসেছে। দু’শ। টাকা সে দিচ্ছে খরচ হিসেবে।
মা বললেন, তুমি আমাদের একটা বড় উৎসবের সময় থাকতে এসেছ। আমি খুব খুশি হয়েছি। তুমি থাক। টাকা লাগবে না। এরপর যতবার ছুটি কাটাতে ইচ্ছা করবে চলে আসবে। তবে তোমার থাকতে অসুবিধা হবে। আমার সব ছেলেমেয়েরা চলে এসেছে। বাসা ছোট।
আমার অসুবিধা হবে না। আমি চেয়ারে ‘নিদ্রা’ করব।
বলেই সে দেরি করল না, বসার সোফায় তাঁর বিছানা পেতে ফেলল। ঈদ উপলক্ষে তাকে পায়জামা-পাঞ্জাবি উপহার দেওয়া হলো। সে নিজে গিয়ে একটা টুপি কিনে আনল। ঈদ উৎসবের নিয়ম-কানুন নিয়েও তাকে খুব চিন্তিত মনে হলো। সে কোনো নিয়ম বাদ দিতে চায় না।
গরু কেনার ব্যাপারেও তার আগ্রহ দেখা গেল। সে ঘোষণা করল, গরু কেনার সময় সে সঙ্গে যেতে চায় এবং সে গরুর গোশতের একটা জাপানি প্রিপারেশন আমাদের রেঁধে খাওয়াতে চায়।
আমরা তাকে নিয়েই গরু কিনলাম। গরুর দড়ি ধরে হটিয়ে গরু বাসায় নিয়ে আসার পবিত্র দায়িত্বও তার হাতে পড়ল। সে এক বিচিত্র দৃশ্য! এক জাপানি কোরবানির গরুর দড়ি ধরে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যে-ই দেখছে সে-ই থমকে দাঁড়াচ্ছে। বুঝতে পারছে না–এই জাপানি সাহেবকে গরুর দাম জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কি না। যেহেতু কোরবানির গরুর দাম জিজ্ঞেস করা পবিত্র দায়িত্বের একটি, কাজেই কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে এবং খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে জিজ্ঞেস করছে–গরুর দাম কত?
জাপানি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়ছে। বো করছে, তারপর গম্ভীর গলায় বলছে–ইহা কোরবানির গরু হয়। ইহার দাম অষ্ট হাজার টাকা।
গরুর দাম যতই বলা হোক, প্রশ্নকর্তাকে বলতে হবে–সস্তা হয়েছে। খুব সস্তা। খুব জিতেছেন।
প্রশ্নকর্তা নিয়মমাফিক অষ্ট হাজার টাকা দাম শুনে বলেন, সস্তা হয়েছে।
মাসাউকি বলল, অবশ্যই সস্তা হয়েছে। বারো হাজার চেয়েছিল। আমরা মূলামূলি করেছি। (মূলামূলি শব্দটি সে সম্প্রতি শুনেছে)।
গাবতলী থেকে পল্লবী–অনেকখানি রাস্তা। সারাপথই মাসাউকি গরুর দাম বলতে বলতে এল। বোঝাই যাচ্ছে এই কাজটায় সে প্রচুর আনন্দ পাচ্ছে।
বাসায় পৌঁছে সে গরুকে পানি খাওয়াল। গা ডলে দিল। পানি দিয়ে গোসল দিয়ে দিল।
আমার মা বললেন, মাসাউকি নিশ্চয়ই কোনো চাষি পরিবার থেকে এসেছে। চাষি পরিবারের ছেলে বলেই গরুর প্রতি এত যত্ন। যত্নটা আমার কাছেও বাড়াবাড়ি বলে মনে হলো। সন্ধ্যাবেলা গেল–সে কলা কিনে এনেছে। গরুকে কলা খাওয়াচ্ছে। মাথা আঁচড়ানোর চিরুনি দিয়ে গরুর গলকম্বল আঁচড়ে দিচ্ছে।
যথাসময়ে কোরবানি হয়ে গেল। মাংস রান্না হলো। সবাই খেতে বসেছি, মাসাউকির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে রাস্তা থেকে ধরে আনা হলো। জানা গেল, সে রাস্তার পাশে খুব মন খারাপ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মন খারাপের কী কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সে জবাব দিল না। বিদেশি অতিথি হিসেবে বিশাল মাংসের বাটি এগিয়ে দেওয়া হলো তার সামনে। সে ক্ষীণ গলায় বলল, গরুটাকে অনেক দূর থেকে হাঁটিয়ে আনার জন্যে গরুটার উপর তার মায়া পড়ে গেছে। এই গরুর গোশত সে খেতে পারবে না। গোশত না খাওয়ার এই অপরাধ আমরা যেন ক্ষমা করে দেই। সে শুধু পোলাও খাবে। তার কোনো অসুবিধা হবে না।
আমরা সবাই অবাক হয়ে মাসাউকির দিকে তাকালাম।
ঈদের পরে সে দুদিন রইল। ঘরে এত মাংস–সে একটা টুকরাও মুখে দিল না। দূর দেশের বোকাসোকা একটা ছেলে আমাদের সবার মর্মমূলে বড় ধরনের একটা নাড়া দিয়ে গেল। এর প্রয়োজন ছিল।
Chapter - 8 - ইংলিশ ম্যান
ইংলিশ ম্যান
কক্সবাজারে পর্যটনের কিছু কটেজ আছে। এদের বলে ওল্ড কটেজ। সুন্দর সুন্দর নাম–তন্ময়, তটিনি …। এক সময় এই কটেজগুলি সমুদ্রের কাছাকাছি ছিল। কটেজের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলে সমুদ্র দেখা যেত। আজ আর দেখা যায় না। সমুদ্র দূরে সরে গেছে। কটেজগুলি আলাদা হয়ে গেছে। সমুদ্রের সঙ্গে আজ আর তাদের যোগ নেই। পর্যটন নতুন নতুন কটেজ বানিয়েছে, আধুনিক মোটেল তৈরি করেছে–তন্ময় তটিনিকে নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।
আমি এবার কি মনে করে পুরানো কটেজগুলির একটায় উঠলাম। এই কটেজে রান্না করে খাবার ব্যবস্থা আছে। মনে করলাম, ব্যাপারটা মন্দ হবে না, বাজার করে। রান্নাবান্না করে খাওয়া হবে। পিকনিক-পিকনিক ভাব।
কল্পনা এবং বাস্তবের ভেতরকার দূরত্ব অনেক বেশি। বাস্তবে দেখা গেল, রান্না করে খাওয়ার ব্যাপারটায় যন্ত্রণার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সন্ধ্যাবেলা বাজারে গিয়ে দেখি, অপরিচিত চেহারার কিছু সামুদ্রিক মাছ ছাড়া আর কিছু নেই। গোশত পাওয়া গেল। যিনি গোশত বিক্রি করছেন তিনি নিতান্তই সত্যবাদী। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, কিসের গোশত? তিনি অম্লান বদনে বললেন–বুড়া মহিষ। ইচ্ছা হইলে নেন।
ঢাকার নিউমার্কেট থেকে না জেনে মহিষের গোশত প্রায় রোজই খাচ্ছি। জেনে শুনে বৃদ্ধ মহিষ খাওয়া অসম্ভব। দুটা মুরগী পাওয়া গেল। মুরগী দু’জনও যথেষ্ট অভিজ্ঞ। ঘণ্টা দুই গনগনে আগুনে জ্বাল দেবার পর অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেল। যতই জ্বাল হচ্ছে মাংস ততই শক্ত হচ্ছে।
রাত ন’টায় আমাদের কাজের মেয়েটি এসে বলল, লাকড়ি শেষ হয়ে গেছে। আরো লাকড়ি লাগবে।
আমি লাকড়ি আনতে বের হলাম এবং প্রথমবারের মত উপলব্ধি করলাম, ঢাকার বাসিন্দা যারা গ্যাসের চুলায় রান্না করছেন তারা কত সুখেই না আছেন।
আমাদের খাওয়া শুরু হতে হতে রাত সাড়ে বারোটা বাজল। আমার বড় মেয়ে নোভা খেতে খেতে তার মাকে বলল, নিজে রান্না করে খাওয়ার এই বুদ্ধি আব্দুকে কে দিয়েছে মা?
নোভার মা আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, তোমার বাবার কি বুদ্ধির কোন অভাব আছে যে অন্যদের কাছ থেকে ধার করবে? সে চলে তার নিজের বুদ্ধিতে। সেই বুদ্ধির ফলাফল তো তোমরা দেখছ–সবাই সমুদ্র দেখে, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমুচ্ছে। আমরা কেবল খেতে বসেছি। মুরগী এখনো সিদ্ধ হয়নি।
‘মুরগী সিগ্ধ হচ্ছে না কেন মা?’
‘তোমার বাবা নিজের বুদ্ধি খরচ করে মুরগী কিনেছে তো, তাই সিদ্ধ হচ্ছে না। এই যন্ত্রণার আজই শেষ–কাল থেকে আমরা হোটেলে খাব।‘
খাওয়ার শেষে কটেজের বারান্দায় বিরস মুখে বসে মশার কামড় খাচ্ছি। স্বাস্থ্যকর স্থানের মশারাও স্বাস্থ্যবান হবে, বলাই বাহুল্য। এরা মনের সুখে কামড়ে যাচ্ছে। আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। গতকাল পূর্ণিমা ছিল। আজ পূর্ণিমার দ্বিতীয় দিবস। পূর্ণিমা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়। কক্সবাজার রওনা হবার আগে পঞ্জিকা দেখে। রওনা হয়েছি। সমুদ্রে চাঁদের আলো দেখার মত ব্যাপার। সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্যে
আজ তেমন আগ্রহ বোধ করছি না। বাচ্চারা সব ঘুমিয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের মা যে। পরিমাণ রেগে আছে তাতে মনে হয় না সে আমার সঙ্গে সমুদ্র দেখতে যাবে।
মোটামুটি শীত পড়েছে। চাঁদরে শরীর ঢেকে আমি বসে আছি। এত সুন্দর জোছনা যে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে না। একা সমুদ্রের কাছে যেতেও ইচ্ছা করছে না। সৌন্দর্য একা দেখার জিনিস নয়।
রাত একটার দিকে গুলতেকিন শাল গায়ে দিয়ে বাইরে এসে বলল, চল, তোমার সমুদ্র-জোছনা দেখে আসি।
আমি আমার স্ত্রীর এই বাক্যটির জন্যে তার পূর্বের এক হাজার অপরাধ ক্ষমা করে দিলাম।
সমুদ্রের কাছে কিন্তু যাওয়া হল না। কটেজের বাইরে পা দিয়েই এক ধরনের অতিপ্রাকৃত দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। দৃশ্যটি বর্ণনা করার চেষ্টা করি–
আমাদের কটেজের ডানপাশে অনেকখানি খালি জায়গা। জায়গাটার এক অংশে বেশকিছু বাশ পোঁতা। বাঁশগুলি সুতলি দিয়ে বাঁধা। সেই সব সুতলিতে রঙিন কাগজ, ছেঁড়া কাগজ, কাপড়ের টুকরা সাজানো। বোঝাই যাচ্ছে, যে সাজিয়েছে সে খুব যত্ন করে সাজিয়েছে। কিন্তু সেই সাজানোয় সুন্দরের চেয়ে অসুন্দর অনেক বেশি। তাকালেই মনে এক ধরনের ধাক্কা লাগে।
সাজানোর কাজটি যে করেছে তাকে আমরা এখন দেখলাম। খালি গায়ে রোগা লম্বা একজন মানুষ। তার জ্বলজ্বলে চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে–মানুষটা স্বাভাবিক। নয়। আস্তাকুঁড় থেকে সে রাজ্যের ময়লা নিয়ে এসেছে। ময়লা থেকে বেছে বেছে রঙিন কাগজ নিয়ে সুতলিতে সাজাচ্ছে। কাজটা সে মোটেই হেলাফেলার সঙ্গে করছে না। কয়েকটা রঙিন কাগজের টুকরা বের করে সে প্রথমে তার সামনে রাখে। দীর্ঘ সময় কাগজের টুকরাগুলির দিকে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবে। তারপর একটা একটা করে কাগজ লাগায়। লাগিয়ে দূর থেকে, কাছে থেকে নানানভাবে সে পরীক্ষা করে।
আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, পাগলদের খুব ভদ্র ভঙ্গিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা জবাব দেয়। ভালভাবেই জবাব দেয়। আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি করছেন?
লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। আমি আবার বললাম, আপনি কি করছেন?
লোকটি চিটাগাং-এর কথ্য ভাষায় যা বলল তা হল–তুমি কি দেখতে পারছ না। আমি কি করছি?
আমার প্রশ্নটা ছিল বোকার মত। উত্তর শুনে খানিকটা হকচকিয়ে যেতে হল। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম–সাজাচ্ছেন কেন?
লোকটি সেই প্রশ্নের জবাব দিল না। গভীর মনোযোগে কাগজ বাছতে লাগল। সমুদ্র-জোছনার চেয়ে লোকটির কাণ্ডকারখানা আমার কাছে অনেক আকর্ষণীয় মনে হল। আমি কটেজের বারান্দায় ফিরে গেলাম। গভীর আগ্রহে পাগলের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম। কটেজের নাইট গার্ড আমাকে বলল–এই পাগল অনেকদিন থেকে কক্সবাজারে আছে। সারাদিন সে রঙিন কাগজ খুঁজে বেড়ায়। রাত বারোটার পর থেকে সাজাতে শুরু করে। সাজানো শেষ হলে কয়েকটা ইট বিছিয়ে আগুন জ্বালায়। সেই আগুনে নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খায়। খাওয়া শেষ হবার পর নিজের শিল্পকর্মের সামনে মূর্তির মত বসে থাকে। রাত এই ভাবে কাটিয়ে ভোর হবার আগে আগে আবার বের হয়ে পড়ে রঙিন কাগজের খোঁজে।
নাইটগার্ড যা বলল সবই ঘটতে দেখলাম। যা সে বলেনি বা বলতে ভুলে গেছে তাও দেখলাম। লোকটি যে তার শিল্পকর্ম মুগ্ধ হয়ে দেখে তা না, শিল্পকর্মের সামনে কিছুক্ষণ আত্মভোলা ভঙ্গিতে নাচে।
এই লোকটির অতীত ইতিহাস কি?
কেন সে রঙিন কাগজে ঘর সাজায়? কি ভাবে সে? এই রহস্য কোনদিনও জানা হবে না। জগতের অনেক রহস্যের মত এই রহস্যও ঢাকা থাকবে অনেক দিন।
পাগলদের প্রতি আমার আগ্রহ এবং কৌতূহল সীমাহীন। এদের সবারই আলাদা নিজস্ব লজিক আছে। সেই লজিকের কারণে কাউকে কাউকে দেখা যায় গভীর একনিষ্ঠতায় ট্রাফিক কনট্রোল করছে, আবার কাউকে কাউকে দেখা যায় রঙিন কাগজ জড়ো করে বিচিত্র শিল্পকর্ম তৈরি করছে।
ঢাকা কলেজে যখন পড়ি তখন আমার ক্লাসেরই এক ছাত্রের সঙ্গে আমার। খানিকটা ঘনিষ্ঠতা হয়। চমঙ্কার ছেলে। ভদ্র, বিনয়ী, মেধাবী। দোষের মধ্যে একটিই–বড় বেশি ইংরেজি বলে। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ইংলিশম্যান। ইন্টারমিডিয়েট সে আমার সঙ্গেই পাস করল। স্টার মার্কস পেল। তারপর আর তার সঙ্গে আমার। কোন যোগাযোগ রইল না। দীর্ঘদিন পরের কথা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করছি। হঠাৎ অবাক হয়ে দেখি, আমার ছাত্রদের মাঝে মাথা নিচু করে ইংলিশম্যান বসে আছে। আমি পড়ানো বন্ধ করে বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি অমুক না?
সে স্নান গলায় বলল, ইয়েস স্যার।
‘ক্লাস শেষ হবার পর তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে।‘
‘জ্বি, আচ্ছা স্যার।‘
ক্লাসের শেষে সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। বেচারা লজ্জায় মরে যাচ্ছে। চেয়ারে বসতে বললাম, কিছুতেই বসবে না। খুবই অস্বস্তিকর অবস্থা। তার কাছ থেকে যা জানলাম তা হল–ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর পর তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। শেষ পর্যায়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানো হয়। এখন সে সুস্থ। আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।
আমি তাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিলাম। দীর্ঘদিন পার করে আবার পড়াশোনা শুরু করার সৎসাহস তুচ্ছ করার বিষয় নয়। আমি তাকে বললাম, কখনোই আমাকে স্যার ডাকবে না। আগের মত হুমায়ুন করেই ডাকবে।
আমি দূরত্ব দূর করতে চাইলাম, দূর হল না। রাস্তা ঘাটে দেখা হলে অন্য ছাত্রদের মতই বিনীত ভঙ্গিতে সে আমাকে সালাম দেয়। ক্লাসে মাথা নিচু করে বসে থাকে। আমি প্রায়ই আমার রুমে তাকে ডেকে নিয়ে আসি চা খাবার জন্যে। নানান ধরনের গল্প করার চেষ্টা করি। গল্প জমে না। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, পাগল হবার সময়ের কথা কি কিছু মনে আছে?
সে ইতস্তত করে বলল, না।
‘কোন কিছুই মনে নেই?’
সে চুপ করে রইল। আমি বললাম, যদি মনে থাকে আমাকে বল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
সে নিচু গলায় বলল, পাগল হবার আগের সময়টার কথা মনে আছে।
‘বল শুনি।‘
‘আমি আমার পড়ার ঘরে বসেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম ঘরটা ছোট হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালগুলো আমার কাছে চলে আসছে। তখন ভয় পেয়ে আমি একটা বিকট চিৎকার দেই।‘
‘এর পরের কথা তোমার আর কিছু মনে নেই?’
‘না। শুধু মনে আছে–সারাক্ষণ একটা কুকুরের মুখ দেখতাম। মুখটা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।‘
‘কি রঙের কুকুর?’
‘ঘিয়া রঙের। কুকুরটার শরীর ছোট কিন্তু মুখটা অনেক বড়। গরুর মুখের মত বড়।‘
‘আর কিছু তোমার মনে নেই?’
‘না।‘
ইংলিশম্যান রসায়ন বিভাগে দুই বছর পড়াশোনা করল। থার্ড ইয়ারে উঠে সে আবার পাগল হয়ে গেল। একদিন ক্লাসে এসে উপস্থিত হল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। ভয়াবহ ব্যাপার! আমি তাকে ডেকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। আমি বললাম, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?
সে হেসে বলল, হ্যাঁ, তুমি হুমায়ূন।
আমি একটি এপ্রন এনে তাকে পরতে দিলাম। সে কোন আপত্তি না করেই এপ্রন। পরল। আমি বললাম, তুমি যে কোন কাপড় ছাড়া ডিপার্টমেন্টে এসেছ–এটা কি ঠিক হয়েছে? তোমার বন্ধুরা খুব লজ্জা পাচ্ছে। কেউ কেউ ভয়ও পাচ্ছে। তুমি কি তা বুঝতে পারছ না?
‘পারছি।‘
‘তুমি অসুস্থ।সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টে আসার তোমার কোন দরকার নেই। আর যদি আস কাপড় পরে আসবে, কেমন?’
ইংলিশম্যান ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কাপড় পরলে সে রাগ করে।
‘কে রাগ করে?’
‘কুকুরটা রাগ করে।‘
‘কোথায় কুকুর?’
‘এইখানে নাই। রাস্তায় গেলেই আসে।‘
‘কুকুর রাগ করুক আর যাই করুক–তুমি সবসময় কাপড় পরে থাকবে।‘
‘আচ্ছা।‘
ইংলিশম্যানের এক ভাই পড়তো ফার্মেসী বিভাগে। তাকে খবর দিলাম। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে বড় ভাইকে বাসায় নিয়ে গেল। সমস্যার শেষ হল না। এটা ছিল সমস্যার শুরু। ইংলিশম্যান দু-তিন দিন পর পরই ডিপার্টমেন্টে আসতে শুরু করল। এসেই সে খোঁজে আমাকে। ব্যাকুল হয়ে ডাকে–হুমায়ূন, হুমায়ুন। আমি একদিন তার ভাইকে ডেকে ধমকে দিলাম। এসব কি! অসুস্থ একটা ছেলেকে আটকে রাখতে হবে। তারা ছেড়ে দিচ্ছে কেন?
আমি তখন বাবর রোডের বাসায় থাকি। এক ছুটির দিন ভোরবেলায় সে আমার বাসায় উপস্থিত। আগের মত অবস্থা। গায়ে কোন কাপড় নেই, শুধু মাথায় একটা রুমাল বাঁধা। কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক। আমি বললাম–বাসা চিনলে কিভাবে?
সে হাসল।
আমার বাসা তার চেনার কোনই কারণ নেই। আগে কোনদিন বাসায় নিয়ে আসিনি। ডিপার্টমেন্ট থেকে ঠিকানা জোগাড় করে আসবে, তাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেউ তাকে ঠিকানা দেবে না।
আমি তাকে বসার ঘরে এনে বসালাম। নিজের একটা পুরানো প্যান্ট পরিয়ে দিলাম। সে আপত্তি করল না। বরং আগ্রহ করে পরল। চা খেতে দিলাম। চা খেল।
আমি বললাম, ঠিকানা কোথায় পেলে?
ইংলিশম্যান বলল, ঠিকানা লাগে না। আমি আতংকিত বোধ করলাম। সে তো এখন রোজই এখানে আসবে। আমাকে অস্থির করে মারবে।
যা ভাবলাম তাই ঘটল। ইংলিশম্যান কয়েকদিন পরপরই আসে। তবে বিরক্ত করে না। প্রথম দিন সোফার যে জায়গায় বসেছিল রোজ এসে সেই জায়গাটায় বসে। চা দিলে খায়। ঘণ্টা দুই বসে থেকে চলে যায়। আমি তাকে অনেক বুঝালাম–রোজ এভাবে আসা ঠিক না। অনেক সমস্যা হয়। প্রতিবারই সে আন্তরিক ভঙ্গিতে বলে–আর আসব না। কিন্তু আবারো আসে। ইংলিশম্যানের যন্ত্রণায় অবস্থা এমন হল যে আমি বাসা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতে লাগলাম। নতুন কোন জায়গায় গিয়ে উঠব যাতে সে আমার খোঁজ না পায়। সেটাও সম্ভব হল না। আমার তখন আর্থিক সামর্থ্য নেই বললেই চলে। কোন রকমে জীবন ধারণ করে আছি। নতুন বাসা ভাড়া নেয়ার অবস্থা। নেই। বাবর রোডের যে বাসায় থাকি তা সরকারী বাসা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে বরাদ্দ দেয়া। নামমাত্র ভাড়া। আমি মাটি কামড়ে সেখানেই পড়ে রইলাম। ইংলিশম্যান নিয়তির মতো হয়ে গেল। ধরেই নিলাম সে আসবেই। আসেতই থাকবে। হলও তাই।
পাগলদের প্রতি আমাদের সমাজ খুব নিষ্ঠুর আচরণ করে। এই নিষ্ঠুরতা সবচে’ বেশি দেখা যায় শিশুদের বেলায়। যে কোন কারণেই হোক শিশুরা পাগল সহ্য করতে পারে না।–ইংলিশম্যান যতবার আমার এখানে এসেছে ততবারই শিশুদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে। শিশুরা তাকে তাড়া করে। পাথর ছুঁড়ে। বড়রা তাদের আটকায় না। দূরে দাঁড়িয়ে হাসে। মজা দেখে।
ইংলিশম্যানের উপদ্রব হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেল। চার মাস কেটে গেল, তার দেখা নেই। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আশংকা পুরোপুরি গেল না। এটা হয়ত সাময়িক বিরতি। আবার আসতে শুরু করবে। জীবন অর্থহীন করে দেবে। সে এল না। দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল। মানুষ অস্বস্তিকর স্মৃতি মনে রাখে না। আমিও মনে রাখলাম না। ইংলিশম্যানের কথা ভুলে গেলাম।
এক শীতের সকালের কথা। ছুটির দিন। নিউমার্কেটে এসেছি–কাগজ কিনব। হঠাৎ দেখি ইংলিশম্যান। সুন্দর একটা বাদামী রঙের স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। স্যুটটায় তাকে খুব মানিয়েছে। তার গায়ের রঙ ফর্সা। সেই রঙ যেন আরো খুলেছে। মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চোখে চশমা। চশমার ফ্রেমটাও সুন্দর। ইংলিশম্যানের হাতে একটা শপিং ব্যাগ, অনেক কেনাকাটা করেছে বলেও মনে হল।
আমি একবার ভাবলাম দেখা না করে চলে যাই। পরমুহূর্তেই সেই চিন্তা পাথর চাপা দিয়ে এগিয়ে গেলাম। ইংলিশম্যান আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এল।
আমি বললাম, কেমন আছ?
সে বলল, ভাল। মাঝখানে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। এখন ভাল।
‘করছ কি এখন?’
‘বিজনেস করি। বড় ভাই একটা বিজনেসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।‘
‘কিসের বিজনেস?’
‘ডাই বিজনেস। কাপড়ে রঙ দেয়া হয় যে সেই রঙ।‘
‘একদিন আস আমার বাসায়। ইংলিশম্যান বলল, অবশ্যই যাব। তোমার বাসার ঠিকানা দিয়ে যাও। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি আমার বাসার ঠিকানা জান না?’
‘না। তুমি তো কখনো বাসার ঠিকানা দাওনি।‘
আমি একটা কাগজে বাসার ঠিকানা লিখে দিলাম। ইংলিশম্যান সেই কাগজের টুকরা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, আমি অবশ্যই যাব। আমার বউকে নিয়ে যাব।
আমি বিয়ে করেছি ভাই।
‘কবে বিয়ে করলে?’
‘বেশিদিন হয়নি–মাস চারেক। আমার তো পড়াশোনা কিছুই হয়নি–এদিকে লাবনী জেনারেল হিস্ট্রিতে এ বছর এম. এ. পাস করেছে।‘
‘বাহ, ভাল তো।‘
‘দাঁড়াও তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ও পনীর কিনতে গেছে। ভাই, তোমার কাছে সিগারেট আছে? আমাকে একটা সিগারেট দাও। লাবনীর জন্যে সিগারেট খেতে পারি না।‘
আমার কাছে সিগারেট ছিল না। আমি দু’টি সিগারেট কিনে নিয়ে এলাম। লাবনীর সঙ্গে পরিচয় হল। শ্যামলা রঙের বড় বড় চোখের মিষ্টি একটা মেয়ে। খুব হাসি-খুশি।
ইংলিশম্যান বলল, হুমায়ূন, আমার খুব ভাল বন্ধু। লাবনী বলল, আপনি ভাল বন্ধু, তাহলে আপনি আমাদের বিয়েতে আসেননি কেন?
.
ইংলিশম্যান সম্পর্কে আমার লেখা এখানে শেষ করতে পারলে ভাল হত। তা পারছি না। তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় প্রায় দশ বছর পর। সম্পূর্ণ নগ্ন গায়ে সে বসেছিল ফুটপাতে। তার গা ঘেঁষে একটা ঘিয়া রঙের কুকুর। কুকুরটার মুখ শরীরের তুলনায় বড়। ইংলিশম্যানকে দেখলাম কুকুরটাকে খুব আদর করছে।
পরম রহস্যময় এই জগতের কোন রহস্যই কি আমরা পুরোপুরি জানি?
Chapter - 9 - হিজ মাস্টারস ভয়েস
হিজ মাস্টারস ভয়েস
কুকুর সম্পর্কে আমাদের নবীর (তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক) একটি হাদিস আছে। হাদিসটি হলো নবী তাঁর সাহাবীদের বলেছেন, কুকুর যদি আল্লাহর সৃষ্টির কোনো প্রজাতি না হতো তাহলে আমি কুকুর হত্যার নির্দেশ দিতাম।
এই হাদিসটি আমাকে বলেন আমার একজন প্রকাশক–কারেন্ট বুকস-এর মালিক–বইপাড়ায় যিনি হুজুর নামে পরিচিত। একদিন তিনি আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় এসেছেন। আমি কথায় কথায় তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম–কুকুর সম্পর্কে আমাদের ইসলাম ধর্ম কী বলে? হুজুর আমাকে এই হাদিসটি শোনালেন।
কুকুর সম্পর্কে নবীজি এমন কঠিন মনোভাব প্রকাশ করেছেন–আমার জানা ছিল না। অবশ্যি ছোটবেলায় মাকে দেখেছি কুকুর ঘরে ঢুকলেই দূর দূর করে উঠতেন। কুকুর ঘরে ঢুকলে নাকি ঘর অশুচি হয়। ঘরে ফেরেশতা আসে না। এই প্রসঙ্গে একটা মজার গল্পও আছে। ভয়ংকর পাপী এক লোক–তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সে চি চি করে বলল, ওরে, আমি মরতে চাই না রে। তোরা তাড়াতাড়ি একটা কুকুর এনে আমার পায়ের সঙ্গে বেঁধে দে। লোকটির স্ত্রী অবাক হয়ে বলল, কুকুর বেঁধে রাখলে কী হবে? লোকটি বিরক্ত গলায় বলল, আরে বোকা মাগি, কুকুর বাঁধা থাকলে ফিরিশতা আসবে না। ফিরিশতা না এলে জান কবজ হবে না। সহজ হিসাব।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাণী হিসেবে কুকুর গ্রহণযোগ্য না, বিড়াল গ্রহণযোগ্য। ছোটবেলায় নানীজান বলতেন, খবরদার, বিড়ালের গায়ে হাত তুলবি না। বিড়াল নবীজির খুব পেয়ারা জানোয়ার। নবীজি বেড়ালের গায়ে হাত বুলাতেন। ধর্মীয় ট্যাবু সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে কিন্তু কুকুরের আদর বিড়ালের চেয়ে বেশি।
গ্রামের একটি প্রচলিত গল্পে তার প্রমাণ মেলে। গল্পটি হলো, কুকুর সব সময় প্রার্থনা করে গৃহস্থের সাত ছেলে হোক। সাত সাতটা ছেলে হলে তারা ফেলে-ছড়িয়ে ভাত খাবে! সেখান থেকে সে ভাগ পাবে। আর বিড়াল বলে, গৃহস্থ অন্ধ হোক। অন্ধ হলে গৃহস্থ বুঝবে না–কোন খাবার কোথায়। এই ফাঁকে সে খেয়ে যাবে।
কুকুর প্রাণীটির প্রতি আমার তেমন কোনো মমতা নেই। র্যাবিজ ক্যারিয়ার হিসেবেই আমি কুকুরকে দেখি। বগুড়ায় আমি জলাতঙ্কের এক রোগীকে দেখেছিলাম। না দেখলেই ভালো ছিল। ভয়াবহ দৃশ্য! রোগীর কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছি না। দেওয়া সম্ভবও না। মনে আছে রোগীর বাবা কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে বলছিলেন, আপনারা দোয়া করেন যেন আমার ছেলেটা তাড়াতাড়ি মরে যায়।
পঁচিশ বছর আগের দেখা ছবি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে পড়ে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। যে প্রাণী এই ভয়াবহ ব্যাধির ভাইরাস বহন করে তার প্রতি মমতা থাকার কথাও না। তারপরেও কিছু গোপন ভালোবাসা এই প্রাণীটির প্রতি আমার আছে। আমার সবচেয়ে ছোট ভাইটির জীবন একটি কুকুর তার নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিল। সেই স্মৃতি ভোলা বা ভোলার চেষ্টা করা অন্যায়।
.
অরণ্যচারী মানুষের প্রথম সঙ্গী হলো কুকুর। মানব জাতির ঊষালগ্নে এই সাহসী পশু তার পাশে এসে দাঁড়াল, মানুষকে শক্তি ও সাহস দিল। মানুষকে বলল, আমি আছি। আমি তোমার পাশেই আছি। এখনো গভীর রাতে কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ রাস্তায় হাঁটলে কোত্থেকে একটা কুকুর এসে তার পাশে পাশে চলতে থাকে।
কুকুর প্রসঙ্গে আমার নিজের অভিজ্ঞতার দুটি গল্প বলি :
শহীদুল্লাহ হলে থাকাকালীন ঘটনা। একদিন দুপুরবেলা ঠিক ভাত খাবার সময় কে যেন দরজা ধাক্কাতে লাগল। কলিংবেল টিপছে না, দরজা ধাক্কাচ্ছে–কাজেই ধরে নিলাম ভিক্ষুক। দুপুরবেলা ভাত ভিক্ষা চাওয়ার জন্যে খুব ভালো সময়। আমি দরজা খুলে দেখি বিশাল এক কুকুর। আমাদের দেশি কুকুর এত বড় হয় না। আমি কুকুটাকে কিছু খাবার দিতে বললাম। খাবার দেওয়া হলো। সে খাওয়াদাওয়া করে চলে গেল। পরদিন আবার এল–সেই দুপুরবেলা। আবারও খাবার দেওয়া হলো। তারপর সে আসতেই থাকল। আমার ছোট মেয়ে একদিন বলল, বাবা দেখ, কুকুটা ঠিক দুটোর সময় আসে।
কুকুরের নিশ্চয়ই হাতঘড়ি নেই। ঘণ্টা-মিনিট মিলিয়ে তার খেতে আসার কথা নয় দেখা গেল এই কুকুরটা তা-ই করছে। ঠিক দুটোর সময়ই আসছে। সময় সম্পর্কে প্রাণিজগতের নিশ্চয়ই সে রকম কোনো ঘড়ি আছে, যা ব্যবহার করে ঠিক দুটোর সময় চলে আসে।
এই অদ্ভুত ঘটনা কিছু নিমন্ত্রিত বন্ধু-বান্ধবকে দেখিয়ে তাদের চমৎকৃত করা হলো।
ব্যাপার এমন হলো–ঠিক দুটো বাজতেই আমরা অপেক্ষা করি–কখন সে আসবে। সবদিন আসেও না। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে পর পর চার-পাঁচদিন দেখা নেই। তারপর একদিন সে উপস্থিত। দরজায় মাথা দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। ঘড়িতে বাজছে দুটো। কোথায় সে থাকে–তা-ও জানি না। যেখানে থাকুক সে যে কষ্টে নেই তা বোঝা যায় তার স্বাস্থ্য দেখে। মনে হয় না সে কখনো ক্ষুধার্ত থাকে, কারণ প্রায়ই দেখা গেছে, দুপুরে সে আসছে ঠিকই কিন্তু কিছু মুখে দিচ্ছে না। যেন সে দেখা করার জন্যেই এসেছে। খাবার জন্যে আসে নি।
আমরা কুকুরটার একটা নাম দিলাম, দি ওয়ান্ডারার-পরিব্রাজক। কুকুরদের বাংলা নাম মানায় না বলেই ইংরেজি নাম। তারপর হঠাৎ একদিন দি ওয়ান্ডারার আসা বন্ধ করে দিল। দুপুর হলেই আমরা অপেক্ষা করি, সে আসে না। দুপুরে কেউ দরজা ধাক্কা দিলে আমার বাচ্চারা ছুটে যায়–না, দি ওয়ান্ডারার না–অন্য কেউ। নানা জল্পনা-কল্পনা হয়–কী হলো ওয়ান্ডারের? রাস্তায় গাড়িচাপা পড়ল? নাকি মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল।
একদিন আমাদের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল, দি ওয়ান্ডারার এসে উপস্থিত। তার চেহারা ভয়ংকর। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে–চোখ রক্তবর্ণ, কিছুক্ষণ পরপর চাপা গর্জন। কালান্তক র্যাবিজ নিয়ে সে উপস্থিত। লোকজনের তাড়া খেয়ে সে ফিরে এসেছে পুরানো জায়গায় এবং আশ্চর্য, এসেছে ঠিক দুপুর দুটোয়। কুকুরের বুদ্ধি এবং কুকুরের আবেগ দিয়ে সে হয়ত ধারণা করেছে এই একটি বাড়িতে তার আশ্রয় আছে। এই বাড়ির লোকজন তাকে কিছু বলবে না। তাকে শান্তিতে মরতে দেবে।
আমরা দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে আছি। দরজার বাইরে দি ওয়ান্ডারার। মাঝে মাঝে তার চাপা হুংকার শোনা যাচ্ছে। সে দরজা আঁচড়াচ্ছে। পিপহোলে চোখ রাখলে। তার ভয়ংকর মূর্তি দেখা যায়। আমরা ঘরে আটকা পড়ে গেলাম। হলের দারোয়ানরা খবর পেয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে ছুটে এল। দি ওয়ান্ডারারকে হলের সামনে পিটিয়ে মারা হলো–আমি আমার তিন কন্যাকে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই হত্যাদৃশ্য দেখলাম। দি ওয়ান্ডারার বারবারই তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। তার চোখে ভয় নয়–তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়। কিংবা কে জানে সবই হয়তো আমার কল্পনা–হয়তো কুকুররা বিস্মিত হয় না। মানুষদের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে যুগ যুগ ধরেই তো তাদের পরিচয়। মানুষদের নিষ্ঠুরতায় তারা বিস্মিত হবে কেন?
আরো একটি কুকুরের কথা বলি। প্রায় তেইশ বছর আগের কথা। আমার বাবার তখন কুমিল্লায় পোস্টিং। আমাদের বাসা ঠাকুরপাড়ায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিছাটায় কুমিল্লা যাই। ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। সেবারও তা-ই গিয়েছি। ছুটির পুরো সময়টা আমি বাসাতেই থাকিবই পড়ে এবং গান শুনে সময় কাটাই। গান শোনার রোগ তখন খুব মাথাচাড়া দিয়েছে। বাবা একটি রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছেন। দিনরাত সেটা বাজে। সবার কান ঝালাপালী।
কুমিল্লায় তখন একটাই রেকর্ডের দোকান। 78 RPM-এর ডিস্ক পাওয়া যায়। একদিন ওই দোকানে গিয়ে রেকর্ড খুঁজছি, বাজিয়ে বাজিয়ে দেখছি, কোনটা নেওয়া যায়। কোনো গানই মনে ধরছে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম, দোকানের বাইরে কালো রঙের একটা কুকুর বসে বসে গান শুনছে। হিজ মাস্টারস ভয়েস রেকর্ডের কুকুরের সঙ্গে এই কুকুরটির খুব মিল। বসেও আছে ঠিক সেই ভঙ্গিতে। আমি দোকানদারকে বললাম, এই কুকুরটি কি প্রায়ই আপনার দোকানে গান শুনতে আসে? দোকানদার মহাবিরক্ত হয়ে বলল, কুকুর গান শুনতে আসবে কেন? কী বলেন এইসব? দোকানদারের বিরক্তির প্রধান কারণ হচ্ছে–আমি শুধু তার রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছি, কিনছি না। তা ছাড়া গান শুনতে কুকুর আসে–এই বাক্যটি বোধহয় তাকে আহত করল। রেকর্ডের দোকানের কর্মচারীদের মান-অপমান বোধ তীব্র হয়।
যা-ই হোক, দোকান থেকে বের হয়ে আমি কুকুরটাকে বললাম, গান শুনতে চাইলে আমার সঙ্গে চল। সে আমাকে বিস্মিত করে আমার সঙ্গে রওনা হলো। আমি বাসায় এসে ঘোষণা করলাম, সংগীতপ্রেমিক এক কুকুর নিয়ে এসেছি। গান শুনলে সে পাগল হয়ে যায়। কেউ তেমন উৎসাহ বোধ করল না। আমার ছোটবোন বলল, এমন নোংরা কুকুর সে নাকি তার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখে নি। আমি বললাম, লাইফবয় দিয়ে একটা গোসল দিলেই চেহারা ফিরে যাবে। রেকর্ড প্লেয়ার বাজালে দেখবি কী কাণ্ড ঘটে! সংগীতের সে বিরাট সমঝদার।
লাইফবয় সাবান কিনে এনে তাকে গোসল দেওয়া হলো। সে কোনোরকম আপত্তি করলো না। খেতে দেওয়া হলো। খুব অনাগ্রহের সঙ্গে খেল। যেন খাওয়াটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশ আয়োজন করে রেকর্ড প্লেয়ারে গান দেওয়া হলো। দেখা গেল গানের প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই। সে হাই তুলে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ছোটবোন বলল, আধুনিক গান বোধহয় সে পছন্দ করছে। না। ক্লাসিক্যাল বেইজ-এর কিছু বাজাও। অনেক কিছুই বাজানো হলো। আধুনিক, হিন্দি, গজল, রবীন্দ্রসংগীত। অবস্থার উনিশ—বিশ হলো না। সংগীত-রসিক হিসেবে বাড়িতে ঢুকে সে স্থান করে নিল বেরসিক হিসেবে। তার সব কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রইল খাওয়া এবং ঘুমে। অন্য কিছুই করে না। কুকুর সম্প্রদায়ের প্রধান যে দায়িত্ব-অপরিচিত কেউ এলে ঘেউ ঘেউ করা–সেই সামান্য দায়িত্ব পালনেও তার ঘোর অনীহা। অপরিচিত কেউ এলে সে যা করে–তা হচ্ছে মাথা উঁচু করে খানিকক্ষণ দেখে, তারপর এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে বারান্দায় চলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু পালিয়ে বেড়ায় বলেই তার নাম হলো পলা। [এই পলার উল্লেখ আমার প্রথম গ্রন্থ নন্দিত নরক-এ আছে। রুনু বলছে দাদা, আমাদের পলার নাকটা এত ঠান্ডা কেন?]
খেয়ে খেয়ে এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পলার চেহারা ফিরে গেল কিন্তু সাহস বাড়ল। বরং সাহস কমে গেল–সে বিড়াল দেখলে ভয় পায়, ইঁদুর দেখলে ভয় পায়। মায়ের পোষা মোরগ নিয়মিত তাকে ঠোকর দিয়ে যায়। সে বিরক্ত হয়, কিন্তু রাগ করে না। ঘোঁৎ জাতীয় শব্দ করে, যার মানে হচ্ছে–কেন বিরক্ত করছ? দেখছ না ঘুমুচ্ছি? আমাদের একসময় ধারণা হলো–বেশি খাবার খেয়ে এর এই দশা হয়েছে। পেটে খিদে থাকলে এদের শরীরে রাগ আসে–ঘেউ ঘেউ করে। পলাকে পুরো একদিন উপোস রাখা হলো। তাতে সে মোটেই বিচলিত হলো না। খাবারের সন্ধানে বাইরে কোথাও গেল না। তার মুখের ভাব দেখে মনে হলো–নিয়তিকে সে গ্রহণ করেছে সহজভাবেই। কে জানে সে হয়তো কুকুর সম্প্রদায়ের অতি উঁচু স্তরের একজন সাধু।
পলা নাম বদলে তার নতুন নামকরণ হলো–দি সেইন্ট। ছুটি কাটিয়ে আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। গরমের ছুটিতে আবার গেলাম। এই তিনমাসে দি সেইন্টের, স্বাস্থ্যের অনেক উন্নতি হয়েছে, তবে সাহসের কোনো উন্নতি হয় নি। বাইরের কেউ এলে আগের মতো দৌড়ে ভেতরে চলে আসে। তবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সে দেখলাম এবার বেশ সজাগ। যথাসময়ে খাবার না দিলে রান্নাঘরে ঢুকে মা’র শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে। তবে নিজ থেকে কখনো কোনো খাবারে মুখ দেয় না।
সবচেয়ে যা দুঃখজনক তা হলো, গান বাজালে তার ঘুমের অসুবিধা হয় বলে সে বড় বিরক্ত হয়। উঠে চলে যায়।
একদিন এক কাণ্ড হলো। মুরগি কাটা হচ্ছে। দি সেইন্ট থাবা মেলে মা’র মুরগি কাটা গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে। এমন সময় টেলিফোন ধরার জন্যে মা মুরগি রেখে ভেতরে গেলেন। ফিরে এসে দেখেন দি সেইন্ট ঠিক আগের মতোই থাবা মেলে বসে আছে। কোত্থেকে এক বিড়াল এসে কাটা মুরগি কামড়াচ্ছে। দি সেইন্ট কিছুই বলছে না। সম্ভবত তার ভদ্রতায় বাধছে। মা আমাকে ডেকে বললেন, তুই এই যমের অরুচিকে যেখান থেকে এনেছিস সেখানে ছেড়ে দিয়ে আয়।
আমি মার মতোই রাগলাম এবং দি সেইন্টের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললাম, ফাজিলের ফাজিল–তুমি বিদায় হয়ে যাও। আর কোনোদিন যেন তোমার ছায়া না দেখি। অপদার্থ কোথাকার!
দি সেইন্ট খোলা গেট দিয়ে গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললাম, আপদ বিদেয় হয়েছে। বাঁচা গেছে। ছোট বোন বলল, আপদ মোটেই বিদেয় হয় নি। আপদ হাওয়া খেতে গেছে। হাওয়া খেয়ে ফিরবে। পল ফিরল না। সন্ধ্যার পর থেকে আমাদের খারাপ লাগতে লাগল। আমার মা বললেন, আহা, বেচারা বোকাসোকা–কোথায় আছে কে জানে? আমি বললাম, যাবে কোথায়, খিদে লাগলে নিজেই আসবে।
দি সেইন্ট এল না। পরদিন আমরা খুঁজতে বেরুলাম। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গা দেখা হলো। সে নেই। একটি সামান্য কুকুর আমার কঠিন কথায় মর্মাহত হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমার নিজেরও খুব মন খারাপ হলো। ত্রিশ টাকা খরচ করে কুমিল্লা শহরে মাইক দিয়ে ঘোষণা দেওয়া হলো একটি কালো রঙের দেশি কুকুর হারানো গিয়াছে। কুকুরটার ডান কান সাদা। সে আমলে ত্রিশ টাকা অনেক টাকা। সামান্য কুকুরের জন্যে ত্রিশ টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। তবু খরচ করা হলো। তাতেও লাভ হলো না।
প্রায় এক বছর পর দি সেইন্ট এল। তবে একা না। তার সঙ্গে চারটি ফুটফুটে বাচ্চা। বাচ্চাগুলো কী যে সুন্দর–শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। আমি তখন ঢাকায়। আমাকে টেলিগ্রাম করা হলো–আমি ক্লাস বাদ দিয়ে কুমিল্লায় চলে এলাম। পলার সামনে দাঁড়িয়ে আন্তরিকভাবেই বললাম, পলা, তুমি যে তোমার বাচ্চাদের নিয়ে এসেছ এতে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। আমি আমার ব্যবহারের জন্যে লজ্জিত। যতদিন ইচ্ছা তুমি এ বাড়িতে থাকতে পার।
পলা উঠে এসে আমার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। ঘেউ ঘেউ করে সে তার বাচ্চাগুলোকে কী যেন বলল, বাচ্চারা চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখতে লাগল। হয়ত তার মা বলেছে মানুষটাকে দেখে রাখ। একে যতটা খারাপ ভাবা গিয়েছিল–এ ততটা খারাপ না।
পলা তার বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাসাতেই থেকে গেল। তার বাচ্চারা মার মতো হয় নি। এরা সবাই দুর্দান্ত সাহসী। অপরিচিত কেউ আমাদের বাসায় বাচ্চাগুলোর জন্যে ঢুকতে পারত না। তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত। সে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! তার চেয়েও অবিশ্বাস্য দৃশ্য হচ্ছে–গান বাজলেই সব কটা বাচ্চা এক সঙ্গে ছুটে এসে হিজ মাস্টারস ভয়েসের কুকুরের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে কান উঁচু করে বসে থাকত। তাদের চোখের পলক পড়ত না। যতক্ষণ গান বাজতো ততক্ষণ এরা কেউ নড়তো না।
একজীবনে কত অদ্ভুত দৃশ্যই না দেখলাম!
Chapter - 10 - নুহাশ এবং সে
নুহাশ এবং সে
মাঝে মাঝে খুব সাধারণ কিছু দৃশ্য আমাকে অভিভূত করে। দারুণ মন খারাপ করিয়ে দেয়। বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসছি। সাধারণত ঢাকা-বরিশাল লঞ্চগুলি রাতে চলাচল করে। এক সময় দিনেও লঞ্চ ছিল। আমি নদীর দু’পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে আসব ভেবে দিনের লঞ্চ নিয়েছি। বসেছি ছাদে। প্রচুর বাতাস, প্রচুর রোদ গায়ে মাখছি, চমৎকার লাগছে। হাওয়া এবং রোদ বোধহয় ক্ষুধা বৃদ্ধিতে কাজ করে। দুপুর একটায় ক্ষুধার্ত হয়ে নিচে নামলাম। গরম ভাত, টাটকা ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। লঞ্চের রান্নার কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে–হোটেলের মত এরা প্রচুর মশলা দেয় না। কম মশলায় রাঁধে এবং যত্ন করে রাঁধে। ভরপেট খাবার পরেও খিদে থাকে।
আমি তৃপ্তি করে খেলাম। খাবার পর ডবল পান মুখে দিলাম, সিগারেট ধরালাম, আর তখনি অভিভূত হবার মত দৃশ্যটি দেখলাম। একজন দরিদ্র যাত্রী দুপুরের খাবার। খাচ্ছে। একটা পাউরুটি তার হাতে। পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে দিচ্ছে। অভিভূত হবার মত কোন দৃশ্য নয়। আমাদের এই হতদরিদ্র দেশে শুধু ভাত, শুধু রুটি দিয়ে দুপুরের খাবার অনেকেই খায়। এই দৃশ্য কোন অপরিচিত দৃশ্য নয়। আমরা সব সময় দেখছি। কিন্তু আজকের দৃশ্যটিতে অন্য ব্যাপার আছে। প্রথমত, মানুষটি পাউরুটি খুব আগ্রহ করে খাচ্ছে। তার সমস্ত চিন্তা-চেতনা পাউরুটিতে সীমাবদ্ধ। আশেপাশের জগৎ থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাকে দেখেই মনে হয়–এই শুকনো পাউরুটি চিবিয়ে সে প্রচুর আনন্দ পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মানুষটি খেতে বসেছে বেশ আয়োজন করে। তার সামনে কাঁচের গ্লাস ভর্তি পানি। গ্লাসটার উপর একটা পিরিচ বসানো। সেই পিরিচে এক খিলি সাজানো পান।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত লোকটির খাওয়া দেখলাম। খাওয়া শেষে গভীর তৃপ্তিতে তার পানি খাওয়া দেখলাম। পান মুখে পুরতে দেখলাম। পান মুখে দেয়া মানুষটিকে মনে হল এই পৃথিবীর সুখী মানুষদের একজন। আমার কাছে মনে হতে লাগল, আহা, এই মানুষটা যদি ইলিশ মাছের টাটকা ঝোল দিয়ে গরম গরম ভাত খেতে পারত তাহলে কি গভীর আনন্দেই না সে খেত! এই ঘটনা আমি অনেককে বলেছি, তাদের কেউই বুঝতে পারেনি অভিভূত হবার মত এর মধ্যে কি আছে? আমার এক বন্ধু বললেন–এটা। হচ্ছে এক ধরনের দুঃখবিলাস।, দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে উচ্চবিত্তের মিথ্যা দুঃখ। শখের দুঃখ।
আমি বললাম, মিথ্যা হবে কেন?
সে বলল, মিথ্যা, কারণ তুমি যদি এতই অভিভূত, তাহলে তুমি তাকে বলতে পারতে–ভাই, আপনি আসুন তো, ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাবেন। আমি পয়সা দেব। তুমি তা বলনি। তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছ। অন্যের দুঃখ নিয়ে বিলাস করেছ।
বন্ধুর সঙ্গে আমি তর্কে যাইনি। যেতে পারতাম। ফট করে একজনকে বলা যায় না–আপনি ভাত খান, আমি পয়সা দেব। এই কাজটি তখন করা যায় যখন কেউ খেতে চায়। তাছাড়া ঐ মানুষটি নিজের অর্থে কেনা সামান্য খাবার অতি আগ্রহ করে খাচ্ছে–সেখানে আমি উপদ্রবের মত উপস্থিত হয়ে তার খাওয়া নষ্ট করতে পারি না। আমার প্রস্তাবে লোকটি বলে বসতে পারত–আপনি আমাকে খাওয়াবেন কেন? আপনি। কে? আমি কি আপনার কাছে ভিক্ষা চেয়েছি?
কেউ হয়ত আমার সঙ্গে একমত হবেন না, কিন্তু তবু আমার সব সময় মনে হয় দয়া দেখানোর মধ্যেও এক ধরনের দীনতা আছে। আমি দয়া দেখাচ্ছি, কারণ আমার অনেক আছে। ‘আমার অনেক আছে’–চিন্তাটাই তো এক ধরনের দীনতা।
আমার ছোটভাই গত বছর আমেরিকা থেকে আমার মা’র নামে এক হাজার ডলার পাঠিয়ে দিল। ডলারের সঙ্গে একটা ছোট্ট চিঠি।
আম্মা, আপনাকে এক হাজার ডলার পাঠালাম। একটা বিশেষ উদ্দেশে ডলার পাঠানো হয়েছে। আমি অনেকদিন দেশের বাইরে আছি। এখানে দান-খয়রাতের তেমন সুযোগ নেই। কেন জানি কিছু দান করতে ইচ্ছা করছে–আপনি ডলার ভাঙিয়ে যে টাকা পাবেন তা দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেবেন। তবে আমাদের দরিদ্র আত্মীয়স্বজনদের এই টাকাটা দেবেন না। আমি টাকা পাঠিয়েছি যারা সত্যিকার অর্থেই ভিক্ষুক–তাদের জন্যে।
মা ডলার ভাঙিয়ে প্রায় আটত্রিশ হাজার টাকার মত পেলেন। অনেক টাকা। ফকিরকে ভিক্ষা দেয়ার জন্যে তো প্রচুরই বলা চলে। এক সপ্তাহ ধরে মা সেই টাকা বিলি করলেন। মা’কে সাহায্য করল আমার সবচে’ ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। দু’জনকেই দেখলাম ব্যাপারটায় প্রচুর আনন্দ পাচ্ছে। ফকির ভিক্ষা চাইতে আসে। তার চেহারা, কাপড়-চোপড় দেখে বিবেচনা করা হয় কি পরিমাণ সাহায্য তাকে দেয়া যায়। কেউ পায় ৫০ টাকা, কেউ একশ’। দু’-একজন মহাসৌভাগ্যবান পায় ৫০০ টাকা। এসব ক্ষেত্রে যা হয়–দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে–এবং হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে। মহা বিশৃঙ্খলা, মহা ভিড়ে–কেউ কেউ মারাও যায়। আমিও আশংকা করেছিলাম এরকম কিছু হবে। কেন জানি হল না। মা এক জায়গা থেকে টাকা না দিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলেন বলেই খবরটা তেমন জানাজানি হল না।
টাকা বিলি শেষ হবার পর একদিন মা’র কাছে গিয়েছি। তিনি খুব উৎসাহ নিয়ে গল্প করছেন–টাকা পাবার পর একেক জনের কি অবস্থা হল। আমার তখন মনে। হল–এই দানে যে আনন্দ আমার মা পেলেন তা অন্যকে সাহায্য করার আনন্দ নয়। ক্ষমতার আনন্দ, এই আনন্দের সঙ্গে কিছুটা হলেও দীনতা মিশে আছে।
অন্যের দুঃখে অভিভূত হয়ে যে দান করা হয় তাতে দীনতার গ্লানি থাকে না। সেই আনন্দের ভাগ আমাদের ভাগ্যে জুটে না বললেই হয়। আমি দেখেছি, অন্যের দুঃখে অভিভূত হয়ে যে দান করা হয় তার বড় অংশই করা হয় সাময়িক ঝোঁকের মাথায়। ঝোঁক কেটে গেলে মনে হয়–এটা কি করলাম?
উদাহরণ দেই–আমার এক দূর সম্পর্কের মামার গল্প। তিনি একবার গুলিস্তান থেকে রিকশা করে ফিরছেন–প্রচণ্ড শীতের রাত। হঠাৎ লক্ষ করলেন, ফুটপাতে এক ভিখিরি-পরিবার ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছে। তাদের সম্বল একটামাত্র কাঁথা। কাঁথায় সবার হচ্ছে না। তারা টানাটানি করছে। মামার মন খুব খারাপ হল। বাসায় পৌঁছে কাউকে কিছু না বলে তাঁর নিজের লেপ নিয়ে রওনা হলেন। মামী বললেন, কি করছ তুমি? লেপ নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, চুপ করে থাক। কথা বলবে না। তিনি ওদের লেপ দিয়ে এসে বাসায় ফিরলেন। ততক্ষণে তাঁর ঝোঁক কেটে গেছে। তিনি হায় হায় করছেন–ছয়শ’ টাকা খরচ করে নতুন লেপ বানানো হয়েছে–লেপটা দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। ত্রিশ টাকা দিয়ে একটা পুরানো কম্বল কিনে দিলেই যথেষ্ট হত।
এ জাতীয় ঘটনা আমার নিজের বেলাতেও ঘটেছে। তখন শহীদুল্লাহ হলে থাকি। সন্ধ্যাবেলায় একজন অন্ধ ছেলে এসে উপস্থিত। আমার কাছে সে নালিশ করতে। এসেছে। নালিশ করতে এসেছে অন্ধ কল্যাণ সমিতির বিরুদ্ধে। সে বল পয়েন্টের ব্যবসা করে। বল পয়েন্ট কিনে ছাত্রদের কাছে বিক্রি করে। অন্ধ কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি তাঁকে বলেছিলেন–ব্যবসার জন্যে টাকা দেবেন। এখন দিচ্ছেন না। আমি যদি সেক্রেটারিকে কিছু বলে দেই তাহলে সে টাকাটা পায়। কারণ সেক্রেটারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অন্ধ ছাত্র। আমি দেখলাম–বিরাট যন্ত্রণা। সেক্রেটারীকে কিভাবে পাব? তাকে বলবই বা কি? অন্ধ ছেলেটির জন্যেও মায়া লাগছে। বেচারা কাঁদতে শুরু করেছে। আমি বললাম, ব্যবসা করতে ক্যাপিটেল কত লাগে?
সে বলল, তিনশ’ টাকা স্যার।
আমি বিস্মিত। মাত্র তিনশ’ টাকা ক্যাপিটেলে ব্যবসা? মানিব্যাগ খুলে তিনশ’র বদলে তাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে দিলাম। সে খুশি হয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বিদেয় হল। তখন আমার মনে হল–তিনশ’ দিলেই তো হত। দুশ টাকা বাড়তি কেন দিলাম? মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।
কেন আমাদের মধ্যে এই ক্ষুদ্রতা? আমরা কি এই ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠতে পারি না? কেন পারি না?
এক দুপুরের কথা। দরজার কড়া নড়ছে। দরজা খুলে দেখি তিনজন ভিখিরি শিশু। সবচে’ বড়টির বয়স সাত-আটের বেশি না। তার কোলে দু’বছর বয়সী একজন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে তিনজনের মুখই আনন্দে উদ্ভাসিত। তারা জানালো, ভাত লাগবে না। তাদের প্রচুর ভাত আছে। শুধু তরকারি হলেই তারা এখানে বসে খেয়ে নেবে। তরকারি না হলেও অসুবিধা নেই–ডাল দিলেই হবে। তাদের তরকারি দেয়া হল। ইতিমধ্যে আমাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। ওদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল এখনো তাদের খাওয়া হয়নি। ডাল এবং তরকারি নিয়ে বসে আছে। সমস্যাটা কি?
সমস্যা হল ভাত নিয়ে। এদের ভাত আছে ঠিকই–কিন্তু তারা খেতে পারছে না, কারণ ভাত বরফের মত শক্ত হয়ে আছে। এক দলা ভাত, ডীপ ফ্রীজে রাখায় জমে পাথর হয়ে আছে। দু-তিন ঘণ্টার আগে এই ভাত মুখে দেয়া যাবে না। বাচ্চারা বরফের দলায় কামড় বসানোর চেষ্টা করেছে–লাভ হয়নি। দাঁত বসানো যাচ্ছে না।
আমাদের বাসায় দেবার মত ভাত নেই। দিতে হলে নতুন করে ভাত চড়াতে হবে। আমি তাই করতে বললাম। হোক গরম ভাত, রান্না হোক–এরা এক বেলা অন্তত। আরাম করে খাক। ভাত রান্না করে দেয়া হল। কিন্তু এর মধ্যে এরা ডাল এবং তরকারি চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছে। তাতে এদের অসুবিধা হল না–গরম ভাতই শুধু শুধু মুখ ভর্তি করে খাচ্ছে। দু’বছরের শিশুটিও মহানন্দে ভাত চিবুচ্ছে। এ কোন অদ্ভুত পৃথিবী!
আমরা বিশ্বাস করি–পৃথিবীর সব মানুষ একই বাব-মাসন্তান। আমাদের আদি পিতা হযরত আদম, আদি মাতা বিবি হাওয়া। একই বাবা-মা’র সন্তান হয়েও আজ আমরা এমনভাবে আলাদা হয়ে পড়লাম কি করে? একদলের কাপড় প্যারিস থেকে ধুইয়ে আনতে হয়, আরেকদলের কোন কাপড়ই নেই।
কাপড় প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি–আমার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান নুহাশ-এর জন্ম হয়। শীতকালে। মাঘ মাসের দুর্দান্ত শীত। শীতের বিরুদ্ধে সব ব্যবস্থা নেয়া হল। দুটি রুম হিটার। নরম লেপ, মাথায় কান-ঢাকা টুপি, হাতে-পায়ে নরম উলের মোজা। সাধ্য কি শীত তাকে স্পর্শ করে? তবু সারাক্ষণ ভয়–এই বুঝি ঠাণ্ডা লেগে গেল। এই বুঝি বুকে কফ বসে গেল। আরো গরম কাপড় দরকার। খবর পাওয়া গেল, গুলশান মার্কেটে স্লীপিং ব্যাগ জাতীয় এক ধরনের কম্বল পাওয়া যায়। বাচ্চাকে ভেতরে ঢুকিয়ে বোতাম লাগিয়ে দিলে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত।
গেলাম ব্যাগ কিনতে। ফেরার পথে দেখি ঠিক আমার ছেলের বয়েসী একটি ছেলেকে তার মা মেঝেতে শুইয়ে রেখেছে। বাচ্চাটা আছে চটের বস্তার ভেতর। বস্তায় একটা ফুটো করা হয়েছে। ফুটোর ভেতর দিয়ে বাচ্চাটার ফর্সা মুখ বের হয়ে আছে–সে চোখ বড় বড় করে দেখছে চারপাশের অকরুণ পৃথিবী।
আমার প্রচণ্ড ইচ্ছা হল–নতুন কেনা স্লীপিং ব্যাগ জাতীয় কম্বলটি এই বাচ্চাটিকে দিয়ে দেই। তারই এটি বেশি দরকার। মা তার বাচ্চাটিকে এর ভেতর ভরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারবে। তারা থাকবে খোলা বারান্দায়–শীতের প্রচণ্ড হাওয়া এই ব্যাগ ভেদ করে বাচ্চাটির গায়ে পৌঁছতে পারবে না।
আমি নিজেকে সামলে নিলাম। নিজেকে বুঝালাম, এদের এই জিনিস দিয়ে কোন লাভ হবে না। ভিখিরী-মা সঙ্গে সঙ্গে অন্যের কাছে এটা বিক্রি করে দেবে। তাছাড়া বাচ্চাটির শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করে বড় হওয়া দরকার–কারণ তার জন্যে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
নিতান্তই বাজে যুক্তি। নিজের অপরাধবোধ ঢাকার জন্যে তৈরি করা মিথ্যা যুক্তি। তারপরেও মনটা খারাপ হয়ে রইল। গরম কাপড়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা আমার বাচ্চাটির দিকে তাকালেই মনে হত, আরেকটি শিশু আছে যে দেখতে ঠিক তার মত, হয়ত জন্মও হয়েছে একই দিনে–সে খালি গায়ে বাস করছে। তার হতদরিদ্র মা তার শরীরের সবটুক উত্তাপ বাচ্চাটিকে দিতে চেষ্টা করছে। আজকের অতি আধুনিক, সুসভ্য পৃথিবীতে ঐ শিশুটির সম্বল শুধু মা’র বুকের সামান্য উত্তাপ।
Chapter - 11 - বটবৃক্ষ
বটবৃক্ষ
রাত এগারোটায় গাড়িতে উঠলাম। যাব ময়মনসিংহ। ঢাকা থেকে ১২৭ কিলোমিটার পথ। তিন ঘণ্টার বেশি লাগার কথা না, কিন্তু ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। বুদ্ধিমানের কাজ হবে বৃষ্টি থামার জন্যে অপেক্ষা করা। সেই অপেক্ষাটুকু। করতে পারছি না। খবর এসেছে–আমার নানীজানের স্ট্রোক হয়েছে। শরীরের এক অংশ অবশ। মুখের কথা জড়িয়ে গেছে। তিনি আমাকে শেষবারের মত একবার দেখতে চাচ্ছেন। অন্য ভুবনের দিকে যাত্রার আগে আগে সবাই প্রিয়জনদের দেখতে চায়। আমি নানীজানের অতি প্রিয়দের একজন, কারণ তিনি এক অর্থে আমার দুধ-মা। আমার জন্মের পর পর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমাকে লালন করার দায়িত্ব চলে যায়। নানীজানের কাছে। সেই সময় তাঁর নিজের একটি মেয়ে হয়েছে। তিনি তাঁর ডান বুকের দুধ আমার জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বাঁ দিকেরটা তাঁর কন্যার জন্যে। বুকের দুধের কোন আকর্ষণী ক্ষমতা কি আছে? হয়ত আছে। আমি নানীজানের পাশে উপস্থিত হবার জন্য তীব্র ব্যাকুলতা অনুভব করছি।
নানীজান আমার শৈশবের একটি বড় অংশ দখল করে আছেন। চোখ বন্ধ করলেই নানার বাড়ির সব জায়গায় তাঁকে একসঙ্গে দেখতে পাই। এই দেখছি রান্নাঘরে। পিঠা তৈরি হচ্ছে, তিনি বসেছেন সরঞ্জাম নিয়ে, এই দেখছি উঠোনে, ধান শুকানো হচ্ছে, তিনি এক ফাঁকে এসে কাক তাড়িয়ে গেলেন। এই দেখছি পুকুর ঘাটে। বাচ্চারা সবাই পানিতে নামবে–তিনি তাদের একা ছেড়ে দিতে ভরসা পাচ্ছেন না, সঙ্গে আছেন।
রাতগুলি তো অপূর্ব! তিনিই তখন সম্রাজ্ঞী। গল্পের আসর বসেছে। তিনি একের পর এক ভূতের গল্প বলে যাচ্ছেন। রক্ত জমাট করা ভয়ংকর কিছু গল্প আমি নানীজানের কাছে শুনেছি। তাঁর বর্ণনাভঙ্গি খুব সাধারণ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভূতের গল্পগুলি এমনভাবে বলেন যে এসব কিছুই না, সব সময় ঘটছে। পান খেতে খেতে একটু নিচু গলায় গল্প শুরু করবেন। ঘটনাটা কোথায় ঘটল সেই বিষয়ে আগে অনেকক্ষণ ধরে বলেন। তারপর হঠাৎ মূল গল্পে চলে যান–
“কি হল শোন। শীতের রাত, মশারি খাঁটিয়ে শুয়েছি, সঙ্গে আনোয়ারার ছোট মেয়ে। ঘরে একটা হারিকেন জ্বলছে। হঠাৎ দেখি মশারির চারদিকে ছায়ার মত একটা কি যেন ঘুরছে। চরকির মত ঘুরছে। মানুষের ছায়ার মত ছায়া, নাক-মুখ কিছু বুঝা যায় না, তবে চোখ দুটা দেখা যায়–শাদা ছোট ছোট চোখ। আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ডান হাতের আঙ্গুল ছায়াটার দিকে বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম–এইটা কি? এইটা কি? ওমি ছায়াটা আমার আঙ্গুলে কামড়ে ধরল। এই দেখ এখনো দাগ আছে।
আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম আঙ্গুলের দাগ দেখার জন্যে। তারপর ভয়ে ভয়ে বললাম, জিনিসটা কি ছিল?
নানীজান হাই তুলতে তুলতে বললেন, কি আবার? জ্বীন।
যেন জ্বীন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সব সময়ই চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে–সুযোগ। পেলেই মানুষের হাত কামড়ে ধরছে।
.
আমার ঝিমুনীর মত এসে গেছে।
গাড়ি চলছে ঘণ্টায় কুড়ি কিলোমিটার বেগে। বৃষ্টি কমার লক্ষণ নেই। বরং বাড়ছে। দমকা হাওয়া দিচ্ছে। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে গান ছেড়ে দিয়েছি। অলিভিয়া নিউটন জনের লালাবাই–
“Precious baby, sweetly sleep,
Sleep in peace.
Sleep in comfort, slumber deep.
I will rock you, rock you, rock you,
I will rock you, rock you, rock you …”
ঘুমপাড়ানি গান। স্নায়ুকে কেমন অবশ করে দেয়। আমি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছি। গাড়ির ঝাঁকুনি, বৃষ্টির শব্দ, অলিভিয়া নিউটন জনের লালাবাই সব মিলিয়ে অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমি ভাবতে চেষ্টা করছি–পঁচাশি বছর বয়েসী আমার বৃদ্ধা নানীজান ঠিক এই মুহূর্তে কি ভাবছেন। অন্য ভুবনের দিকে যাত্রা শুরুর আগে মানুষ কী ভাবে, একজন অল্পবয়সী মানুষ এরকম অবস্থায় তীব্র হতাশায় ভুগবে। সুন্দর পৃথিবীর কিছুই না দেখে তাকে চলে যেতে হচ্ছে। কিন্তু একজন পরিণত বয়সের মানুষ? সে কি ভাববে? তার ভেতরেও কি হতাশা কাজ করবে? না-কি সে ভাববে -”অনেক তো দেখলাম। আর কত! এবার তোমরা আমাকে বিদায় দাও।”
আমার নানীজান আর দশজন বৃদ্ধার মতই সুখ-দুঃখের জীবন কাটিয়েছেন। সুখ দুঃখ দাড়িপাল্লায় মাপা যায় না। মাপা গেলে হয়তবা তাঁর দুঃখের পাল্লাই ভারি হবে। নিজের জীবনে বেশ ক’জন সন্তানের মৃত্যুশোক সইতে হয়েছে। স্বামী হারানোর ব্যথায় জর্জরিত হয়েছেন। আবার এগারোটি সন্তানকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছেন। প্রথম জীবনে অভাব দেখেছেন। শেষ জীবনে দেখলেন প্রাচুর্য। পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনি, এবং নাতি-নাতনিদের ছেলেমেয়েতে বটবৃক্ষের মত নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোন উৎসব উপলক্ষে সবাই যখন জড় হয় তখন মনে হয় হাট বসে গেছে। নানীজান বসে থাকেন জলচৌকিতে, লাইন বেঁধে তাঁকে সালাম করা হয়। বিশাল ডেকচিতে রান্না বসে। পুত্রবধূরা সেই ডেগ তাঁর সামনে এনে বলে, ‘মা, আপনি হাত দিয়ে একটু ছুঁয়ে দেন। আমরা রান্না বসাব।’ তিনি এক ধরনের গর্ব এবং অহংকারে পাতিল ছুঁয়ে দেন। শুরু হয় উৎসবের বাড়ির রান্না।
ন’ বছর বয়সে বৌ হয়ে এ বাড়িতে এসেছিলেন। পার করলেন আশি বছর। কত দীর্ঘ সময়! দীর্ঘ সময়ের কত না আনন্দ-বেদনার স্মৃতি! সব স্মৃতি পেছনে ফেলে কি করে তিনি যাত্রা করবেন অচেনা ঠিকানায়? পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কেউ কি থাকবে তাঁর পাশে? তাঁর মৃত স্বামী, তাঁর মৃত পুত্র কন্যারা কি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে থাকবে তাঁর পাশে? না-কি যেমন একা পৃথিবীতে এসেছিলেন, তেমনি ফিরেও যাবেন একা? আমি জানি না। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে।
.
রাত তিনটায় ময়মনসিংহ পৌঁছলাম। বাড়ি অন্ধকার। সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুচ্ছে। কলিংবেলের শব্দে বাড়ির মানুষ জেগে উঠল। সবার মুখ হাসি-হাসি। রোগী সামলে উঠেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, এযাত্রা টিকে গেছেন। যে হাত অবশ হয়ে গিয়েছিল সেই হাতে সাড় ফিরে এসেছে। কথা বললে খানিকটা বোঝা যায়।
হৈচৈয়ে নানীজান জেগে উঠলেন। মুখ ভর্তি পান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কি কাণ্ড! তিনি আরো সুন্দর হয়েছেন। দুধে-আলতায় গায়ের রঙ এখন কেমন ঝিকমিক করছে। লাল টুকটুকে ঠোঁট, পান খাওয়ায় আরো লাল দেখাচ্ছে। আমি পাশে বসে বললাম, রাত তিনটায় ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আমাকে টেনে এনে এখন দিব্যি আরাম করে সুপারি খাচ্ছেন। কাজটা কি ভাল হল?
নানীজান হাসতে হাসতে বললেন, এই পাগলা বলে কি?
আমি বললাম, আমি যেমন ভিজতে ভিজতে এসেছি–আপনাকেও এখন ভিজতে হবে। আপনাকে এখন কোলে করে ছাদে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজাব। ছাড়াছাড়ি নেই।
নানীজানের হাসি আর থামে না। মনে হচ্ছে আসলেই তিনি বৃষ্টিতে ভিজতে চান। ডাক্তার তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলেছে। চুপচাপ সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। তিনি তাতে রাজি নন। বাড়ির সবাই জেগেছে, তিনি তাদের সঙ্গে নিশি যাপন করবেন। সবাই চা খাচ্ছে, তিনিও চা খাবেন, গল্প করবেন। যদিও কোন গল্প ঠিকমত করতে পারছেন না। খেই হারিয়ে ফেলছেন। এক কথা থেকে আরেক কথায় চলে যাচ্ছেন। একবার আমাকে বললেন, ‘তোর পরীক্ষা কবে রে? পড়াশোনা ঠিকমত করছিস তো?” তাঁর মনেও নেই পরীক্ষার যন্ত্রণা আমি অনেক অনেক আগে শেষ করেছি।
ভোরবেলা ঢাকা রওনা হব। নানীজানকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা নানীজান, আমাকে আপনি একটা কথা বলুন তো। আপনার কাছ থেকে ঠিক জবাবটা চাই।
‘কি জানতে চাস?’
‘মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাই। মৃত্যুভয় সম্পর্কে জানতে চাই। একজন মানুষ যখন মৃত্যুর খুব কাছাকাছি থাকে তখন তার কেমন লাগে তা জানতে চাই। মৃত্যুর কথা ভাবতে কি আপনার ভয় লাগে?’
নানীজান কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললেন, না, ভয় লাগে না। মৃত্যুর কথা ভাবতে ভাল লাগে।
‘ঠিক বলছেন তো নানীজান?’
‘ঠিকই বলছি।‘
‘এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে না?’
নানীজান এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। হাসলেন। সেই হাসির কি অর্থ কে জানে।
.
ঢাকায় ফিরে চলেছি। সুন্দর সকাল। ঝকঝকে রোদ। গাড়ি ছুটে চলেছে ঝড়ের গতিতে। অলিভিয়া নিউটন জনের গান আবারো হচ্ছে,
“Precious baby, sweetly sleep, sleep in peace.
Sleep in comfort, slumber deep.
I will rock you, rock you, rock you,
I will rock you, rock you, rock you …”
Chapter - 12 - ভাইভা
ভাইভা
চাকরি জীবনের প্রথম দিকে আমার প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন কলেজে পরীক্ষা নিয়ে বেড়ানো। রসায়নের পাস কোর্স, অনার্স, এম, এসসি, সব পরীক্ষাতেই আমি হলাম–বহিরাগত পরীক্ষক। ব্যবহারিক পরীক্ষা নেই, ভাইভা নেই। দূরের সব কলেজে যেতে হয়–পটুয়াখালি, চাখার, বরগুনা, ফরিদপুর …। পরীক্ষা নেয়া খুব যে আনন্দের কাজ তা না, তবে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়। অদ্ভুত অদ্ভুত সব পরিবেশ ও পরিস্থিতি।
একবার মফস্বলের এক কলেজে গিয়েছি। আমাকে থাকতে দেয়া হল এক শিক্ষকের বাসায়। ভদ্রলোকের স্ত্রী বাপের বাড়ি গেছেন। খালি বাসা। আমাদের খাওয়া আসে হোটেল থেকে। মোটা মোটা চালের ভাত। আগুনের মত ঝাল তরকারি। খাওয়ার পর অনেকক্ষণ মুখ হা করে বসে থাকতে হয়।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমুতে গেছি। শিক্ষক ভদ্রলোক মুখ কাচুমাচু করে বললেন–হুমায়ূন সাহেব, আরাম করে ঘুমান, আমি একটা কাজে যাচ্ছি। ফিরতে রাত হবে। তবে দরজা খুলতে হবে না। আমি বাইরে থেকে তালা দিয়ে যাব, যাতে রাতে আপনার ঘুম ভেঙে উঠতে না হয়। আমি বললাম, ফিরতে কত রাত হবে?
‘এই ধরুন, একটা-দুটা।‘
‘কি কাজ এত রাতে?’
‘ইয়ে মানে–একটু তা-টাস খেলি।‘
‘পয়সা দিয়ে খেলেন?”
‘আরে না। পয়সা পাব কোথায়? মাঝে মধ্যে খেলাটা ইন্টারেস্টিং করার জন্যে খুব অল্প স্টেকে খেলা হয়। নিতান্তই নির্দোষ আনন্দ।‘
ভদ্রলোক নির্দোষ আনন্দের সন্ধানে আমাকে তালা দিয়ে চলে গেলেন। বাড়ি থেকে বেরুবার একটি মাত্র দরজা, সেটি তালাবন্ধ। এই অবস্থায় সারাক্ষণ মনে হয় আগুন লেগে গেলে কি হবে? বেরুব কি করে?
দুশ্চিন্তায় অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম হল না। তন্দ্রামত আসে, আবার ভেঙে যায়। আমি ঘড়ি দেখি। রাত দুটার সময় শুরু হল ভূতের উপদ্রব। কলঘরে পানি পড়বার শব্দ হচ্ছে। রান্নঘরে হাড়ি-কুড়ি নড়ছে। ঝপাং করে বাড়ির টিনের ছাদে কি যেন লাফিয়ে পড়ল। সারা বাড়ি কেঁপে উঠল। নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। ছাদে ঝাঁপ দিয়ে যা পড়েছে তা আর কিছুই না, বানর। কিছুক্ষণ পর স্পষ্ট শুনলাম বারান্দায় চটি পায়ে কে। যেন হাঁটছে। একবার এ-মাথায় যাচ্ছে, আরেকবার ও-মাথায়। ঘরের বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় বসে রইলাম। প্রচন্ড বাথরুম পেয়েছে, বাথরুমে যাবার সাহস নেই। সেখানে কল থেকে পানি পড়ছে, পানি পড়া বন্ধ হচ্ছে। আবারো পানি পড়ছে। ঘড়িতে রাত বাজে তিনটা। এত ভয় জীবনে পাইনি।
শিক্ষক ভদ্রলোক রাত তিনটার দিকে নির্দোষ আনন্দ শেষ করে ফিরলেন। আমি
তাকে ঘটনাটা বললাম, তিনি নিতান্তই স্বাভাবিকভাবে বললেন, ও কিছু না, জ্বীন।
আমি বললাম, জ্বীন মানে?
‘এ বাড়িতে একটা জ্বীন থাকে। দুষ্ট প্রকৃতির। আমাদের কিছু বলে না তবে বাইরের কেউ একা থাকলে যন্ত্রণা করে। তবে কারো কোন অনিষ্ট করে না।‘
‘এসব কি বলছেন ভাই?’
‘বিশ্বাস করা না করা আপনার ব্যাপার। আমি নিজেও বিশ্বাস করি না। লোকে যা বলে আপনাকে বললাম। আমার স্ত্রী জ্বীনটাকে কয়েকবার দেখেছেন। ছোট সাইজ। গা ভর্তি পশম।
‘জ্বীনের গা ভর্তি পশম?’
‘জি। খুব নরম।‘
‘আপনি হাত দিয়ে দেখেছেন যে নরম?’
‘আমি হাত দেইনি। আমার স্ত্রী হাত দিয়েছেন। বিড়ালের পশমের মত পশম, তবে আরো সফট।‘
বাকি যে ক’রাত ছিলাম, আমিও ভদ্রলোকের সঙ্গে নির্দোষ আনন্দে যেতাম। উনি হাইড্রোজেন নামের একটা খেলা খেলতেন। আমি পাশে বসে ঝিমাতাম।
.
বরিশাল বি এম কলেজে পরীক্ষা নিতে গিয়েও বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার থাকার জায়গা হয়েছে কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের অফিসে। একটা চৌকি পেতে থাকার ব্যবস্থা। রাতের বেলা ক্যাম্পাস ফাঁফা হয়ে যায়–কোথাও জনমানব নেই। আমি একা বাতি জ্বেলে জেগে বসে থাকি, ভয়ে ঘুম আসে না। গভীর রাতে জানালায় টুক করে। শব্দ হল। আমি ভয়ে শক্ত হয়ে গেছি–আস্তে আস্তে জানালা খুলছে। আমি চিৎকার করে বললাম, কে?
জানালা খোলা বন্ধ হল, তবে সামান্য যা ফাঁক হয়েছে সেই ফাঁক দিয়ে লিকলিকে কালো একটা হাত ঘরের ভেতর ঢুকতে লাগল। মনে হল ঘরে একটা সাপ ঢুকছে। সাপের মাথায় পাঁচটা আঙুল। আমার ধারণা হল–এক্ষুনি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। একধরনের ঘোরের মধ্যে বললাম, কে?
বাইরে থেকে উত্তর এল–স্যার আমি।
‘আমিটা কে?’
‘হুজুরের কাছে আমার একটা দরখাস্ত।‘
আস্তে আস্তে হাতের মুঠি খুলে গেল। টপ করে হাত থেকে একটা কাগজ পড়ল। হাত উধাও হয়ে গেল। সাহস সঞ্চয় করে কাগজ কুড়িয়ে নিলাম। সত্যি সত্যি দরখাস্ত! কেমিস্ট্রি বিভাগের জনৈক বেয়ারা দরখাস্ত করেছে আমার কাছে। বিভাগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মত হল। পরের রাতেও একই ব্যাপার। চেয়ারম্যান সাহেবকে জানালাম। তিনি তাকে ডেকে এনে অনেক ধমকাধমকি করলেন। কঠিন গলায় বললেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাও ভাল কথা, কর। দিনের বেলা কর। রাতদুপুরে উনাকে ভয় দেখাচ্ছ কেন? ধমকে কাজ হল না। পরের রাতে সে আবার এল। সব মিলিয়ে পাঁচ রাত ছিলাম। প্রতি রাতেই এই কাণ্ড ঘটেছে।
পরীক্ষা নিতে গিয়ে ভয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে মজার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। পটুয়াখালি কলেজে পরীক্ষা নিতে গিয়ে এক গায়কের পাল্লায় পড়েছিলাম। সেই গায়কের গানের গলা ছাড়া আর সবই আছে। হাজার হাজার গান তিনি জানেন, সুর। জানেন শুধু গলাটা বেসুরো। তিনি গানের পর গান গেয়ে যেতেন। আমি একমনে প্রার্থনা করতাম–হে আল্লাহ পাক! এই গানের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। তোমার কাছে। আপাতত আর আমি কিছুই চাই না।
গায়ক ভদ্রলোককে অসংখ্যবার আমার বলার ইচ্ছা হয়েছে, ভাই, আমাকে ক্ষমা করুন। এই অত্যাচার সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। তখন বয়স ছিল অল্প, মন ছিল নরম। কঠিন সত্যি কথা বলা সম্ভব হয়নি। পটুয়াখালি থেকে পরীক্ষা শেষ করে চলে আসবার দিন দেখি তিনি গাদা ফুলের একটা মালা হাতে লঞ্চঘাটে উপস্থিত। আমি শুকনো গলায় বললাম, আপনার গান খুব মিস করব। চর্চা রাখবেন। গান-বাজনা চর্চার ব্যাপার।
‘স্যার আপনি কি আমার গান শুনে আনন্দ পেয়েছেন?’
‘জি পেয়েছি।‘
গায়ক ভদ্রলোক শুধু গাদা ফুলের মালা নিয়েই আসেননি। ছোট্ট একটা ফ্লাস্ক এনেছেন। ফ্লাস্ক ভর্তি চা।
‘আপনি চা পছন্দ করেন। বাসা থেকে চা বানিয়ে এনেছি। ফ্লাস্কটাও আপনার জন্যে কিনেছি। সামান্য উপহার। দরিদ্র মানুষ।‘
আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। এটা আশা করিনি। ভদ্রলোককে কেবিনে নিয়ে বসালাম। লঞ্চ ছাড়তে দেরি আছে। কিছুক্ষণ গল্প করা যাক। ভদ্রলোক গল্পের ধার। দিয়ে গেলেন না। গাঢ় গলায় বললেন, চলে যাচ্ছেন মনটা খারাপ হয়ে গেছে। লাস্ট একটা গান শুনিয়ে দেই আপনাকে। আপনাকে গান শুনিয়ে খুব আনন্দ পেয়েছি। আপনার মত আনন্দ নিয়ে আর কেউ আমার গান শোনে না। কত ফাংশান হয়, অগা, মগা, বগা স্টেজে উঠে গান গায়। আমাকে কেউ ডাকে না। স্যার গাইব?
আমি বিরস গলায় বললাম, গান। ভদ্রলোক গান ধরল–বিদায়ের গান :
“আমার যাবার সময় হল দাও বিদায়।”
গাইতে গাইতে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। আশ্চর্যের ব্যাপার, তিনি গাইলেন খুব সুন্দর করে। চারপাশে লোক জমে গেল। আমার নিজের চোখেও পানি এসে গেল।
.
পরীক্ষা প্রসঙ্গে আরেকটি স্মৃতির কথা বলি। সঙ্গত কারণেই কলেজের নাম উল্লেখ করছি না।
কেমিস্ট্রির অনার্স ব্যবহারিক পরীক্ষা। পাঁচদিন ধরে চলছে। কঠিন পরীক্ষা। ছাত্র ছাত্রীদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। এর মধ্যে একজনকে দেখে খুব মায়া লাগল। অল্প বয়েসী একটি মেয়ে–খুব শিগগিরই মা হবে। শারীরিক অস্বাভাবিকতার কারণে সে লজ্জিত এবং সংকুচিত। অন্যদের মত সে পরিশ্রমও করতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর পর টুলে বসে তাকে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। পরীক্ষার কাজগুলিও সে ঠিকমত পারছে বলে মনে হচ্ছে না। আমি কলেজের একজন ডেমনস্ট্রেটরকে বললাম, আপনি ঐ মেয়েটিকে সাহায্য করুন। ওকে বলুন চেয়ারে বসে কাজ করতে। তাকে নিচু একটা টেবিল এনে দিন। যন্ত্রপাতিগুলি টেবিলে রেখে সে কাজ করুক। কোন অসুবিধা নেই।
ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার পর হয় মৌখিক পরীক্ষা। সবাই মৌখিক পরীক্ষা দিল, শুধু মেয়েটি দিল না। ইন্টারন্যাল একজামিনার আমাকে জানালেন–আজই মেয়েটির একটি বাচ্চা হয়েছে বলে সে পরীক্ষা দিতে পারেনি। ব্যাপারটা বেশ দুঃখজনক। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে মৌখিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত হলে ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস হবে না। ব্যবহারিক পরীক্ষা ফেল মানে অনার্স পরীক্ষায় ফেল।
ভাইভা শেষ হল। রেজাল্ট শীট তৈরি করতে করতে রাত দশটা বেজে গেল। সীল গালা আনা হল। রেজাল্ট শীট খামে ঢুকিয়ে সীল গালা করা হবে। তখন আমি বললাম, এক কাজ করলে কেমন হয়? চলুন, আমরা সবাই মিলে মেয়েটার বাসায় চলে যাই। ভাইভা নিয়ে আসি।
কেমিস্ট্রির চেয়ারম্যান সাহেব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না। আমি বললাম, মেয়েটার বাসা কোথায় জানেন?
‘বাসা বের করা যাবে তবে শহরে থাকে না। অনেক দূরে থাকে। আপনি কি সত্যি : যেতে চান?’
‘হ্যাঁ চাই।‘
‘ইউনিভার্সিটির কোন সমস্যা যদি হয়!’
‘আমরা অন্যায় তো কিছু করছি না। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে–একজামিনেশন। বোর্ডের সব মেম্বার পরীক্ষার্থীর বাসায় উপস্থিত হচ্ছি।‘
‘এরকম কখনো কি করা হয়েছে?’
‘আমার জানামতে করা হয়নি। তবে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে একজন ছাত্রের ভাইভা নেয়া হয়েছে। চলুন যাই।‘
‘ইউনিভার্সিটি যদি কোন সমস্যা করে?’
‘সেই দায়িত্ব আমার। চলুন যাই।‘
মেয়েটির বাড়ি শহর থেকে নয়-দশ মাইল দূরে। রিকশা করে, ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছি। রাস্তা কারোর চেনা নেই। জিজ্ঞেস করে করে এগুতে হচ্ছে। রাত বারটার দিকে আমরা চারজন শিক্ষক তার বাসায় উপস্থিত হলাম। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। মেয়ের বাবা এবং মা দুজনেই আনন্দে কাঁদছেন। আশেপাশের সব মানুষ খবর পেয়ে উপস্থিত হয়েছে। এমন একটা ব্যাপার যে ঘটতে পারে তা কেউ কল্পনাই করেনি। মেয়ের স্বামী সাইকেল নিয়ে উধ্বশ্বাসে শহরে ছুটেছে। মিষ্টি আনতে হবে।
আমরা ভাইভা নিতে মেয়ের ঘরে ঢুকলাম। মেয়েটি উজ্জ্বল মুখে শুয়ে আছে। তার পাশে ছোট্ট একটি বাচ্চা। আমরা মেয়েটির ভাইভা নিতে এসেছি শোনার পর থেকে সে নাকি খুব কাঁদছিল, এখন চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়েছে। ভাইভা শুরু হল। মেয়েটা বলল, স্যার, আমার বাচ্চাটাকে আগে একটু দেখুন।
আমি বললাম, তোমার বাচ্চা দেখতে তো আসিনি। ভাইভা নিতে এসেছি। আচ্ছা, ঠিক আছে, দেখি তোমার বাচ্চা!
মেয়েটি বাচ্চার মুখের উপর থেকে চাঁদর সরিয়ে দিল।
বাচ্চা ঘুমুচ্ছে। কি সুন্দর ছোট্ট একটা মুখ। মাথা ভর্তি রেশমী চুল। কি ছোট্ট, কি পাতলা ঠোঁট।
মেয়েটির ভাইভা খুব খারাপ হল। সে অধিকাংশ প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারল না। কিন্তু তাতে সে মোটেও নার্ভাস হল না। সহজ গলায় বলল, স্যার, এবারে অনার্স পরীক্ষা আমি পাস করতে পারব না। থিওরী খুব খারাপ হয়েছে। পড়াশোনা করতে পারিনি। কিন্তু আমার মনে কোন আফসোস নেই। আপনারা পরীক্ষা নিতে বাড়িতে এসেছেন এইটা আমার জন্য অনেক। আমার মত ভাগ্যবতী মেয়ে এই পৃথিবীতে নেই। বলতে বলতে মেয়েটি কাঁদতে লাগল।
ঘটনার বর্ণনা এইখানে শেষ করে দিলে পাঠকরা আমার সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা পাবেন। তাঁরা মনে করবেন–হুমায়ূন আহমেদ মানুষটা খুব হৃদয়বান। একজন। ছাত্রী যেন পরীক্ষায় পাস করতে পারে তার জন্যে রাতদুপুরে কত ঝামেলা করেছেন।
ব্যাপার মোটেই তা নয়। নানান সমস্যার কারণে অনেকেই পরীক্ষা দিতে পারে না, পরের বার পরীক্ষা দেয়। এটা তেমন কোন বড় ব্যাপার না। মেয়েটি পরীক্ষায় পাস। করতে পারবে না এ নিয়ে বিচলিত হয়ে আমি গভীর রাতে তার বাড়িতে উপস্থিত হইনি। এই কাণ্ডটি করেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। আমরা ভাইভা নিতে গভীর রাতে ছাত্রীর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছি এই অদ্ভুত ঘটনায় ছাত্রী এবং তার আত্মীয়স্বজনের মনে কি অবস্থার সৃষ্টি হয় তাই আমি দেখতে চেয়েছিলাম। একদল অভিভূত মানুষ দৈখে আমি আনন্দ পেতে চেয়েছিলাম। আমি গিয়েছিলাম সম্পূর্ণ আমার নিজের আনন্দের। জন্যে। মেয়েটি সন্তানের জন্ম দিয়ে আমাকে গাঢ় আনন্দ পাবার একটি সুযোগ করে দিয়েছিল। তাকে এবং তার বাচ্চাটিকে ধন্যবাদ।
Chapter - 13 - হোটেল আহমেদিয়া
হোটেল আহমেদিয়া
আমি একবার একটা ভাতের হোটেল দিয়েছিলাম। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে হোটেলের নাম–আহমেদিয়া হোটেল। আসুন, আপনাদের সেই হোটেলের গল্প বলি।
১৯৭১ সনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়। রোজার মাস। থাকি মহসিন হলে ৫৬৪ নম্বর রুমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলি তখন ছাত্রদের জন্যে নিরাপদ বলে ভাবা হত। কারণ যারা এই সময়ে হলে থাকবে তারা অবশ্যই পাকিস্তান অনুরাগী। হলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করছে। এরা সবাই শান্ত এবং সুবোধ ছেলে। মুক্তিবাহিনীতে না গিয়ে পড়াশোনা করছে। আমার তখন কোথাও থাকার জায়গা নেই। নানার বাড়ি মোহনগঞ্জে অনেক দিন লুকিয়ে ছিলাম। আর থাকা যাচ্ছে না। আমার নানাজান। দীর্ঘদিনের মুসলিম লীগ কর্মী। তখন শান্তি কমিটির সভাপতি হয়েছেন। নানাজানের শান্তি কমিটিতে যোগ দেবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমি আমার নানাজনের জন্যে সাফাই গাইছি না। আমার সাফাইয়ের তাঁর প্রয়োজন নেই। তবু সুযোগ যখন পাওয়া গেল বলি। চারদিকে তখন ভয়ংকর দুঃসময়। আমার বাবাকে পাকিস্তানী মিলিটারী গুলি করে হত্যা করেছে। নানাজান আমাদের সুদূর বরিশালের গ্রাম থেকে উদ্ধার করে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। তাও এক দফায় পারেননি। কাজটি করতে হয়েছে দু’বারে। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাকে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হল। তিনি না বলতে পারলেন না। না বলা মানেই আমাদের দু ভাইয়ের জীবন সংশয়। আমাদের আশ্রয় সুরক্ষিত করার জন্যেই মিলিটারীদের সঙ্গে ভাব রাখা তিনি প্রয়োজন মনে করেছিলেন। তার পরেও আমার মা এবং আমার মামারা নানাজানের এই ব্যাপারটি সমর্থন করতে পারেননি। যদিও নানাজানকে পরামর্শ দিতে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেই সাহস তাদের ছিল না। তারা নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন নিয়তির হাতে। শান্তি কমিটিতে থাকার কারণে মিলিটারীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কত মানুষের জীবন তিনি রক্ষা করেছেন সেই ইতিহাস আমি জানি এবং যারা আজ বেঁচে আছেন তাঁরা জানেন। গুলির মুখ থেকে নানাজানের কারণে ফিরে-আসা কিছু মানুষই পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে মরতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তাঁর মত অসাধারণ একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেলেন, এই দুঃখ আমার রাখার জায়গা। নেই!
মিলিটারীরা নানাজানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত সময়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হয়। বাড়ি ঘুরেফিরে দেখে। একদিন তারা আমাদের দেখে ফেলল। ভুরু কুঁচকে বলল, এরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র? দেখে তো সে রকমই মনে হয়। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে ঘরে বসে আছে কেন? নানাজান কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ঢাকায় পাঠাতে ভরসা পাচ্ছি না বলে আটকে রেখেছি। তবে শিগগিরই ঢাকা পাঠাব।
আমি নিজেও এক জায়গায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছি ৬ নম্বর সেক্টরের সালেহ চৌধুরীকে (দৈনিক বাংলার সালেহ চৌধুরী)। তিনি তখন ভাটি অঞ্চলে প্রবল। প্রতাপে মুক্তিবাহিনী নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি আমার চিঠির জবাব দিলেন না। এটা অবশ্যি আমার জন্যে ভালই হয়েছে। মনের দিক থেকে আমি চাচ্ছি না জবাব আসুক। জবাব এলেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে হবে, এবং অবধারিতভাবে মিলিটারীর গুলি। খেয়ে মরতে হবে। এত তাড়াতাড়ি মৃত্যুকে স্বীকার করে নেবার মত মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। আমি ভীতু হয়ে জন্মেছি।
কাজেই চলে এলাম ঢাকায়, উঠলাম হলে। বলা চলে, হাঁপ ছেড়ে বাচলাম। আমার অতি প্রিয়জন–আনিস ভাইও দেখি হলেই আছেন। আমার পাশের ঘরে থাকেন। ফিজিক্সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তিনি তখন সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করেন, একটা চিত্রনাট্যও তৈরি করেছেন। তার একটা দামী ট্রানজিস্টার রেডিও আছে। সেই ট্রানজিস্টার রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা শোনা হয়। রাত যখন গম্ভীর হয় তখন আমরা চলে যাই ছ’তলায়। সেখানে দুটি ছেলে আছে (দু’ভাই)। তারা প্ল্যানচেটের বিষয়ে না-কি বিশেষজ্ঞ। তারা প্ল্যানচেটে ভূত নামায়। ভূতের মারফতে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কবে দেশ স্বাধীন হবে, এইসব। প্ল্যানচেটে দেশী বিদেশী সবধরনের ভূত আসে। দেশী ভূতদের মধ্যে সবাই আবার ভুবন বিখ্যাত। তাদের ভূত না বলে আত্মা বলা উচিত। নয়ত তাদের অসম্মান হবে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ খুবই মিশুক প্রকৃতির, ডাকলেই চলে আসেন। দেশ কবে স্বাধীন হবে জানতে চাইলে বলেন–ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধরতে শেখ। দু থেকে তিন বছরের মধ্যেই স্বাধীনতা পাবে।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার উপর আমাদের আস্থা কম ছিল বলেই বোধহয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকেও এক রাতে আনা হয়। তিনি এসেই আমাদের স্টুপিড, ননসেন্স বলে গালাগালি করতে থাকেন।
মোটের উপর আমাদের সময়টা ভাল কাটে। ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই পরকাল, আত্মা, সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে নানান জ্ঞান দেয়, শুনতে মন্দ লাগে না। সবচে’ বড় কথা–মিলিটারী এসে ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে, এই সার্বক্ষণিক ভয়ের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি যার আনন্দ কম নয়। কষ্ট একটাই, খাওয়ার কষ্ট। রোজার সময় বলেই সব দোকান বন্ধ। হোটেল তো বন্ধই, চায়ের দোকানও বন্ধ। হলের মেসও বন্ধ। ধর্মীয় কারণে নয়, নিতান্ত বাধ্য হয়েই হলের অনেকেই রোজা রাখছে। সেখানেও বিপদ আছে। বিকেলে ইফতারী কিনতে নিউমার্কেট গিয়ে একজন মিলিশিয়ার হাতে বেধড়ক মার খেল। মিলিশিয়ার বক্তব্য–রোজার দিনে এই ছাত্র নাকি ‘ছোলা ভাজা খাচ্ছিল।
আমি নিজে ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না। খিদে পেলেই চোখে অন্ধকার দেখি। অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রথম এবং শেষ রোজা রেখে রোজা বেঁধে ফেলার যে প্রক্রিয়া করে, আমি তা-ও পারি না। প্রথম রোজাটা রাখি–শেষটা রাখি না, সম্ভব হয় না।
আমি মহাবিপদে পড়লাম। দুপুরে চিনি দিয়ে পাউরুটি খাই–খিদে যায় না। সারাক্ষণ খিদে লেগে থাকে। একদিন দোকান থেকে একটা হিটার কিনে আনলাম, টিনের বাটিতে কিছু চাল ফুটিয়ে নিলাম। ডিম ভাজলাম। লবণ কেনা হয়নি–লবণহীন ডিম ভাজা দিয়ে ভাত খেলাম। অমৃতের মত লাগল। আনিস ভাই এসে আমার সঙ্গে যোগ দিলেন। পরের দিন ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই এসে উপস্থিত। তারা জানতে চায়, তাদের কাছে এলুমিনিয়ামের একটা বড় সসপ্যান আছে, আমরা সেটা চাই কি-না।
আমি বললাম, অবশ্যই চাই।
তখন দুই ভাই মাথা চুলকে বলল, তারা কি আমার সঙ্গে খেতে পারবে? খরচ যা লাগবে দেবে। তারাও নাকি দুপুরে পাউরুটি খেয়ে আছে।
আমি বললাম–অবশ্যই খেতে পারবে।
চতুর্থ দিনে আমাদের সদস্য সংখ্যা হল দশ। অতি সস্তায় দুপুরের খাওয়া। ভাত ডাল এবং ডিম ভাজি। সবাই খুব মজা পেয়ে গেল। আসলে কারোরই তখন কিছু করার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় নামে মাত্র খোলা, কেউ সেখানে যায় না। সবাইকে হলে বন্দী থাকবে হয়। বন্দি জীবনে বৈচিত্র্য হল এই রান্নাবান্না খেলা। আমরা একদিন একটা বড়
ফুলস্কেপ কাগজে লিখলাম–
আহমেদিয়া ভাতের
হোটেল ভাত এক টাকা। ডাল আট আনা। ডিম এক টাকা।
হোটেলের নিয়মাবলী :
১. যাহারা খাদ্য গ্রহণ করিবেন, তাঁহারা সকাল দশটার মধ্যে নাম এন্ট্রি করাইবেন।
২ খাওয়ার সময় ভাত নরম না শক্ত এই বিষয়ে কোন মতামত দিতে পারিবেন না।
ফুলস্কেপ কাগজে আমার ঘরের দরজায় আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়া হল।
এক রোববারে ইমপ্রুভ ডায়েটের ব্যবস্থা হল। ভূনা খিচুড়ি এবং ডিম ভাজা। ভূনা খিচুড়ি কি করে রাখতে হয় তখন জানি না। ভূত বিশেষজ্ঞ দুই ভাই বলল, তারা জানে–খিচুড়ি তারা বঁধবে। এই বিষয়ে কাউকে কোন চিন্তা করতে হবে না। শুধু খিচুড়ি না–তারা নাকি ‘কলিজিও ব্রাধবে।
সকাল থেকে রান্নার আয়োজন শুরু হল। সদস্যদের আগ্রহের সীমা নেই। রান্না শেষ হতে হতে দুটো বেজে গেল। আমরা খেতে বসব, তখন হঠাৎ একজন ছুটে এসে বলল, মিলিটারী হল ঘেরাও করে ফেলেছে। আমরা হতভম্ব। হল কেন ঘেরাও করবে? হল তো খুব নিরাপদ হবার কথা। দেখতে দেখতে হলে মিলিটারী ঢুকে পড়ল। ভেড়ার পালের মত আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল নিচে। সবাইকে লাইন বেঁধে দাঁড় করালো। আমরা আতংকে জমে গেলাম। কি হচ্ছে এসব? সব মিলে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ জন ছাত্র। হলের কিছু কর্মচারী। হলের সামনে সাক্ষাত মৃত্যুদূতের মত একটি মিলিটারি জীপ, একটি ট্রাক এবং মুড়ির টিন জাতীয় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মুড়ির টিন গাড়িটির দরজা-জানালা সব বন্ধ। তবে ভেতরে লোক আছে। কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। গাড়ির একটি ছোট্ট জানালা আধখোলা। জানালার ওপাশে কেউ একজন বসে আছে। বাইরে থেকে আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের বলা হল লাইন বেঁধে সেই জানালার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে। জানালার সামনে দিয়ে যাবার সময়–গাড়ির ভেতরে বসা কেউ একজন হঠাৎ বলে বসে–একে আলাদা কর। তাকে আলাদা করা হয়। এইভাবে চারজনকে আলাদা করা হল। তিন জন ছাত্র। একজন হলের কর্মচারী। তিনজন ছাত্রের মধ্যে একজন আমি।
কি সর্বনাশ! এখন কি করি। মিলিটারী ধরে নিয়ে যাওয়ার নাম তো নিশ্চিত মৃত্যু। এত তাড়াতাড়ি মরে যাব?
আমাদের খোলা ট্রাকে তোলা হল। মিলিটারীরা আমাদের নিয়ে রওনা হল। আমি হলের দিকে তাকালাম, আমার বন্ধুদের দিকে তাকালাম–আমি জানি–এই হল, বন্ধুদের প্রিয় মুখ আমি আর কখনো দেখতে পাব না।
আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল আণবিক শক্তি কমিশন ভবনে। ঐ ভবনটি তখন মিলিটারীদের অস্থায়ী ঘাটির একটি। সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম–আমাদের সবার বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, আমরা দেশদ্রোহী। ঢাকায় গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে–কি ভয়ানক অবস্থা। সেখান থেকে জীপে করে
আমাদের পাঠানো হল বন্দি শিবিরে। বিরাট একটা হলঘরের মত জায়গায় আমাদের। রাখা হল। আরো অনেকেই সেখানে আছেন। সবার চোখেই অদ্ভুত এক ধরনের ছায়া। সম্ভবত মৃত্যুর ছায়া। তারা তাকাচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু দেখছে না। মানুষের প্রধান যে বৈশিষ্ট্য–কৌতূহল–সেই কৌতূহলের কিছুই তাদের চোখে নেই। এখান থেকে একজন একজন করে নিয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরে–তারপরই বীভৎস চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। সে চিৎকার মানুষের চিৎকার নয়–পশুর চিৎকার। এক সময় চিৎকারের শব্দ কমে আসে। শুধু গোঙানির শব্দ কানে আসে। সেই শব্দও যখন কমে আসে তখন শুধু ক্লান্ত কাতরধ্বনি কানে আসে, পানি, পানি …।
আমি আমার পাশে বসা এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম–এরা কি সবাইকে এ রকম শাস্তি দেয়?
ভদ্রলোক আমার প্রশ্নে বিস্মিত হয়ে তাকালেন, জবাব দিলেন না। সম্ভবত এ রকম ছেলেমানুষী প্রশ্নের জবাব দিয়ে তিনি সময় নষ্ট করতে চান না।
অনেককেই দেখলাম নামাজ পড়ছেন। নামাজের সময় নয় তবু পড়ছেন, নিশ্চয়ই নফল নামাজ। কি ভয়াবহ আতংক তাদের চোখে-মুখে!
জিজ্ঞাসাবাদ এবং শাস্তির জন্যে আমার ডাক পড়ল রাত এগারোটার দিকে। ছোট্ট একটা ঘরে নিয়ে আমাকে ঢোকানো হল। সেই ঘরের মেঝেতে তখন একজন শুয়ে আছে। লোকটা উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু মৃদু গোঙানির শব্দ আসছে। মৃত্যুর আগে মানুষ হয়ত এরকম শব্দ করে। মানুষটার গায়ে একটি গেঞ্জী–গেঞ্জীতে চাপ চাপ রক্ত। এ ছাড়াও ঘরে আরো দু’জন মানুষ? আছে। একজনের মুখে শ্বেতীর দাগ। সে গোশত এবং পরোটা খাচ্ছে। অন্য একজনের হাতে এক কাপ চা। সে পিরিচে ঢেলে ঢেলে চা খাচ্ছে। দু’জনের মুখই হাসি হাসি। মেঝেতে একজন মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে তাদের কোন রকম মাথাব্যথা নেই। মৃত্যু তখন এতই সহজ। আমি ঘরে ঢুকতেই মুখে শ্বেতীর দাগওয়ালা মানুষটা বলল (উর্দুতে), আমি খাওয়া শেষ করে নেই–তারপর তোমার সাথে খোশ গল্প করব। আপাতত বিশ্রাম কর। হা হা হা।
লোকটার খাওয়া দেখে এই প্রথম মনে হল–আজ সারাদিন আমি কিছু খাইনি। হোটেল আহমেদিয়ায় আজ ইমপ্রুভ ডায়েট রান্না হয়েছে। আমার বন্ধুরা কি কিছু খেতে পেয়েছে?
না, ঐদিন আমার বন্ধুরা কিছু খেতে পারেনি। আমাদের ধরে নিয়ে যাবার পর–তারা সবাই এসে বসল আমার রুমে। আনিস সাবেত বললেন, হুমায়ূনকে বাদ দিয়ে এই খাবার আমি খেতে পারব না, তোমরা খাও। অন্যরাও রাজি হল না। ঠিক করা হল–যদি আমি জীবিত অবস্থায় ফিরে আসি তাহলে আবারো ইমপ্রুভ ডায়েট রান্না হবে। হৈ চৈ করে খাওয়া হবে। আনিস সাবেত আমার দরজার সামনে থেকে আহমেদিয়া হোটেলের সাইনবোর্ড তুলে ফেললেন।
পরম করুণাময়ের অসীম কৃপায় আমি জীবিত অবস্থায় ফিরে আসি। বন্ধু বান্ধবরা তখন নানান দিকে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়েছে।
আমি ফিরে আসি জনশূন্য ফাঁকা হলে। জীবিত ফিরে আসার উত্তেজনায় দু’রাত আমি এক ফোঁটা ঘুমুতে পারিনি। বার বার মনে হত এটা হয়ত স্বপ্ন। স্বপ্ন কেটে যাবে, আমি দেখব মুখে শ্বেতী দাগওয়ালা মানুষটা বলছে, একে নিয়ে যাও, মেরে ফেল।
দেখতে দেখতে কুড়ি বছর পার হয়ে গেল। আনিস সাবেত মারা গেল ক্যানসারে। বন্ধু-বান্ধবরা আজ কে কোথায় জানিও না। মাঝে মাঝে হলের সামনের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মনে হয়–আবার সবাইকে খবর দেয়া যায় না? আবার কি হিটার জ্বালিয়ে ভূনা খিচুড়ি রান্না করে সবাইকে নিয়ে খাওয়া যায় না? খেতে খেতে আমরা পুরোনো দিনের গল্প করব। যে দুঃসময় পার হয়ে এসেছি সেই দুঃসময়ের কথা ভেবে ব্যথিত হব।
হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের প্রায়ই দেখতে ইচ্ছা করে। হঠাৎ হঠাৎ এক-আধজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। খানিক আগে একজনের সঙ্গে দেখা হল। সে তার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে গাড়ি থামাল। নেমে এসে আনন্দিত গলায় বলল–আরে তুই?
হাত ধরে সে আমাকে টেনে নিয়ে গেল তার ছেলেমেয়েদের কাছে। গাঢ় গলায় বলল, পরিচয় করিয়ে দেই। এর নাম হুমায়ূন আহমেদ। আমরা একবার একটা হোটেল দিয়েছিলাম–আহমেদিয়া হোটেল। হুমায়ূন ছিল সেই হোটেলের বাবুর্চি।
বলতে বলতে তার চোখে পানি এসে গেল। সে কোটের পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতে থাকল। তার ছেলেমেয়েরা বাবার এই কাণ্ডের কোন অর্থ বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আজকালকার ছেলেমেয়ের কাছে আমাদের চোখের এই অশ্রুর কারণ আমরা কোনদিনও স্পষ্ট করতে পারবো না। ৭১-এর স্মৃতির যে বেদনা আমরা হৃদয়ে লালন করি–এরা তার গভীরতা কোনদিনই বুঝবে না। বোঝার প্রয়োজনও তেমন নেই। এরা সুখে থাকুক। কোনদিনও যেন আমাদের মত দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে তাদের যেতে না হয়। এরা যেন থাকে দুধে-ভাতে।
