Chapter - 1
প্রতিশ্রুতি
‘Even after all this time
The sun never says to the earth,
“You owe Me”
Look what happens with
A love like that,
It lights the Whole sky’
জোনাথনদাদু কফির কাপটা নামিয়ে বলল, ‘জানিস মালি, কতরকম যে সম্পর্ক হয় পৃথিবীতে! মানুষকে যে কত রকমের সম্পর্ক পেরিয়ে আসতে হয় জীবনে! আমি দেখেছি, মানুষ ভালবেসে বিয়ে করে তারপর দু’জন দু’জনকে কষ্ট দেয়। আবার এ-ও দেখেছি, দু’জন দু’জনকে সারাজীবন ভালবাসলেও কাছে আসতে পারে না। স্পর্শ করতে পারে না। শুধু দূর থেকে ভালবেসে যায়। অনেকটা পৃথিবী আর সূর্যের মতো। দু’জন দু’জনকে ছাড়া থাকতে পারে না, কিন্তু দেখ, আছেও আসতে পারে না। পৃথিবী ছাড়া এই সৌরমণ্ডলের কি সেই ম্যাজিক থাকবে? থাকবে না। আর উলটোদিকে সূর্য না থাকলে তো পৃথিবীরও অস্তিত্ব থাকত না। একে অন্যকে কী অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু দেখ, কাছে আসতে পারে না তারা, এক হতে পারে না। তাই না?’
মালিনী উত্তর দিল না কোনও। আসলে উত্তর দেওয়ার কিছু নেই। জোনাথনদাদু উত্তর পাওয়ার জন্য সব কথা বলে না। এমনিই বলে। ছোটবেলা থেকেই দাদুকে দেখে এসেছে মালিনী। প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল। চুলের রং সাদা হওয়া ছাড়া আর কিছু পালটায়নি লোকটির। সেই একইরকম ভঙ্গিতে কাঠের বারান্দায় বসে থাকা। সেই একইভাবে বারান্দায় হেলিয়ে রাখা ম্যান্ডোলিন। সেই একই সন্ধের মুখে হাতে ধরা কফির কাপ।
মালিনী এখন আর এখানে থাকে না। ছুটিতে ঘুরতে আসে মাঝে মাঝে। ওদের চা-বাগানের এক দিকটায় কাঠের বাড়িতে থাকে জোনাথনদাদু। সঙ্গী বলতে একটি ল্যাব্রাডর আর হুড খোলা জিপ।
জোনাথনদাদু সম্পর্কে কিচ্ছু জানে না ওরা। জোনাথনদাদু নিজে কক্ষনও কিছু বলে না, জিজ্ঞেস করলে শুধু হাসে। বলে, ‘আমি ভুলে গিয়েছি সব কিছু। আমার আর কিচ্ছু মনে নেই। বোধহয় অ্যামনেশিয়া হয়েছে।’ বলে, ‘আর তোরাই বা জানতে চাস কেন? আমি মানুষটাই কি যথেষ্ট নয়?’
অফিস থেকে ছুটি পেলে শিলিগুড়ির বাড়িতে এক-দু’দিন থেকেই রাবাংলার এই চা-বাগানে চলে আসে মালিনী। কলকাতায় থাকতে থাকতে ওর আর শহর ভাল লাগে না। এত মানুষ, গাড়ি, লম্বা স্কেলের মতো বাড়িঘর, ছাই রঙের আকাশ, চিৎকার, হুল্লোড়-একদম ভাল লাগে না ওর। দমবন্ধ হয়ে আসে মালিনীর। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় আচমকা। মনে হয় কে যেন চেপে ধরছে ওর গলা। শ্বাস নিতে পারছে না। মালিনী ঘরের জানলা খুলে দেয়। এসি বন্ধ করে ফ্যান চালিয়ে দেয়। তবু শ্বাস নিতে পারে না যেন। ও পালাতে চায় তখন। সব কিছু ছেড়ে পালাতে চায়। কিন্তু তবু পারে না। রাতের কলকাতা তাড়া করে ওকে। ছাইমাখা চাঁদ তাড়া করে। ওকে তাড়া করে সেই মুখটা!
তবে মালিনী এবার আর কলকাতায় ফিরবে না। যাবে চণ্ডীগড়। কলকাতা ওকে কষ্ট দিয়েছে খুব।
মালিনী পাহাড়ের দিকে তাকাল। আগস্টের তেরো তারিখ আজ। বর্ষা চলছে। সারাদিন বৃষ্টির পর এখন একটু শান্ত হয়েছে আকাশ। দূরে মেঘও ভেঙেছে কোথাও কোথাও। আর সেইসব ভাঙা জায়গা দিয়ে সূর্য তার আলোর চাদর মেলে দিয়েছে। চায়ের পাতলা লিকারের মতো আলোয় ডুবে আছে চারদিক। বারান্দার পাশের অর্কিডের পাতা চুঁইয়ে টপটপ শব্দে জল পড়ছে। ঝিঁঝিরাও ক্রমশ জেগে উঠছে একে একে।
এখানে এলে মালিনীর মনে হয় যেন তাড়া নেই কোনও। যেন যেতে হবে না কোথাও। মনে হয়, এখানে সারা জীবন বসে থাকা যায়। মনে হয়, জীবনে কিছু না হলে কী-ই বা এসে যায়!
মালিনী জানে, এ সবই ক্ষণিকের চিন্তা, অবাস্তব চিন্তা। শহর তার মুখ খুলে রেখেছে। শহর তার পেটের ভেতরের মণি-মাণিক্য আছে দেখিয়ে ডাকছে সকলকে। সেই বিশ্বজোড়া ‘হাঁ’-এর ভেতর মাথা গলাতেই হবে মানুষকে।
অবশ্য, শুধু এটুকুই নয়। পাহাড়ও পালটাচ্ছে দ্রুত। এই যে নিস্তব্ধতা মালিনী দেখছে চারদিকে, তাও তো সারা জীবন থাকবে না। এই যেমন এখনই তো তার হাওয়া লেগেছে। গত দশ মাস আগে শেষবার যখন মালিনী এসেছিল, তখন দেখেছিল এখানে ফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে।
সেই ফ্যাক্টরির প্রস্তুতি এবারে এসে সম্পূর্ণ হয়েছে দেখেছে মালিনী। ওই উঁচু জলের রিজার্ভার, রাক্ষসের মাথার মতো টিনের শেড, বৃদ্ধ নাবিকের চুরুটের মতো চিমনি-পাহাড়ের স্কাইলাইন বদলে ফেলেছে অনেকটা। চারদিকে কোলাহল বেড়েছে। ফ্যাক্টরির ভোঁ বাজছে। চিমনি দিয়ে বুড়ির চুলের মতো ধোঁয়াও বেরোচ্ছে।
‘কী রে মালি, কী চিন্তা করছিস? তোর মনখারাপ?’
‘কই না তো!’ মালিনী হাসল।
‘সত্যি বলছিস?’ জোনাথনদাদু ঝুঁকে বসল চেয়ারে, ‘তোকে ছোট থেকে দেখছি। আগে তো বকবক করে মাথা খারাপ করে দিতিস। আর এখন কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকিস! কেন? বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?’
‘ধ্যাৎ, আমি বুঝি খুব ঝগড়ুটে?’
‘না রে, তোর চোখ দুটো কেমন হয়ে গেছে। তাই বলছিলাম।’ জোনাথনদাদু ফাঁকা কাপটি বারান্দায় কাঠের রেলিং-এর ওপর রাখল, ‘নাকি, অন্য কেউ দুঃখ দিয়েছে তোকে? কী রে, কেউ দিয়েছে দুঃখ?’
‘সত্যি, তুমি না…’ মালিনী বেতের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। আচমকা বহু দূরের একটা মুখ ঝলসে উঠল চোখের সামনে। একটা পাথর বাঁধানো বৃষ্টির রাস্তা ঝলসে উঠল, ঝলসে উঠল ডান গালের লাল তিল। নিজের অজান্তেই মোবাইলের দিকে চোখ গেল ওর। অপদার্থ, ঠান্ডা একটা যন্ত্র। নিস্তব্ধ একটা যন্ত্র। মালিনী জানে আর কোনওদিন ফোন আসবে না।
মালিনী বলল, ‘বুড়ো হলে সত্যিই ভীমরতি ধরে মানুষের। আর নিজের কথা কিছু বলবে না, শুধু অন্যের সব কথা শুনে নেওয়ার চেষ্টা, না? বাদ দাও, আর এক কাপ কফি হবে নাকি?’
‘আর এক কাপ?’ জোনাথনদাদু মাথার স্ট্র হ্যাটটা খুলে চুলে আঙুল ডোবাল, ‘হয়ে যাক, যখন বলছিস। তবে চিনিটা কম দিস। তোর হাত এমনিতেই এত মিষ্টি যে, চিনির প্রায় দরকারই পড়ে না।’
‘হুম, এই বয়সেও খুব কথা বলো তুমি! মেয়েদের মন ভেজাতে ওস্তাদ। যখন ইয়ং ছিলে, কত মেয়ের যে মাথা চিবিয়েছ!’ মালিনী হাসল।
‘আমি এখনও ইয়ং,’ জোনাথনদাদু চোখ পাকাল, ‘আয়্যাম সেভেনটি ফাইভ ইয়ার্স ইয়ং। আর মাথা খাওয়া? তুই জানিস না আমি নিরামিষাশী!’
‘খালি কথা! দাঁড়াও আমি কফি করে আনছি।’ বারান্দার রেলিং থেকে কাপটা তুলে ঘরের ভেতরে চলে গেল মালিনী।
এ বাড়িটা একতলা। কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি। বারান্দা থেকে ঢুকলেই বসার ঘর। তার দেওয়ালে নানা দেশের মুখোশ ঝোলানো। সেই ঘর পেরিয়ে স্টাডি আর তার পাশেই কিচেন। সুন্দর ছিমছামভাবে সাজানো।
মালিনী দু’কাপ কফি তৈরি করে কিচেন থেকে বেরোতেই বারান্দায় কথা শুনতে পেল। আরে, এরই মধ্যে কারা এল? কুলিবস্তির কিছু মানুষজন জোনাথনদাদুর কাছে আসে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা করাতে। তারা এল কি? নাকি বাচ্চারা এল গল্প শুনতে? কিন্তু বাচ্চাদের গলা তো এমন নয়!
ডাইনিং টেবিলের ওপর কফির কাপ দুটো রেখে বারান্দায় বেরিয়ে এল মালিনী।
সন্ধে গাঢ় হয়ে এসেছে আরও। জোনাথনদাদু বারান্দায় ঝোলানো সব আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেই আলোতেই মালিনী দেখল পাঁচজনের দলটাকে। তিনটে মেয়ে আর দুটো ছেলে। সবারই কাঁধে হ্যাভারস্যাক। কোমরে পাউচ। পরনে জিন্স আর উইন্ডচিটার। বয়স কুড়ি-একুশ।
সবার মুখে-চোখেই ক্লান্তির ছাপ। দীর্ঘ পথযাত্রার ছাপ। ওদের কাঁধের ব্যাগ কাঁধেই আছে। শ্বাস পড়ছে দ্রুত। অর্থাৎ সামান্য সময় আগেই ওরা এসেছে।
মালিনীকে দেখে রোগামতো যে-ছেলেটি জোনাথনদাদুর সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে কিছু বলতে গিয়েও যেন থমকে গেল। ছেলেটির চোখে মুগ্ধতা দেখতে পেল মালিনী। এটি নতুন কিছু নয়। গড়পড়তা সব ছেলেরাই মালিনীকে দেখলে মুগ্ধ হয়।
মালিনী সেই দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? তোমরা কারা?’
ছেলেটি হাসল। পাতলা দাড়ির ফাঁক দিয়ে দুটো লম্বা লম্বা টোল জেগে উঠল গালে। পিছনে থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে এল এবার। মেয়েটিকে দেখে সামান্য অস্বস্তি হল মালিনীর। মেয়েটি ভীষণ সুন্দরী। আর কেন কে জানে, মালিনীর চেনা মনে হল মেয়েটিকে। মনে হল, কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু মনে করতে পারছে না কে মেয়েটি! এরাই বা কারা! কেন এই পাহাড়ে এসেছে এরা এমন সময়ে?
মেয়েটি হাঁপধরা গলায় কাতরভাবে বলল, ‘প্লিজ, আপনাদের একটা হেল্পের খুব দরকার।’
‘হেল্প?’ মালিনী অবাক হল।
মেয়েটি কোমরের পাউচ থেকে একটা ছবি বের করে মেলে ধরল ওদের সামনে। তারপর বলল, ‘একে আপনারা চেনেন?’
মালিনী ভাল করে দেখার আগেই জোনাথনদাদু ছবিটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। তারপর এক পলক দেখেই বলল, ‘এই ছবি তোমরা কোথায় পেলে?’
‘আপনি চেনেন?’ মেয়েটির গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে, অবাক হল মালিনী। এই আলোতেও ও বুঝল মেয়েটির মুখ লাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেটা উত্তেজনায় না চোখের জলে, সেটা ঠিক বুঝল না।
মেয়েটি কাঁধের ব্যাগটা রেখে হাঁটু গেড়ে চেয়ারের হাতল ধরে বসল জোনাথনদাদুর সামনে, ‘প্লিজ, বলুন না কোথায় থাকে এ? আপনি জানলে প্লিজ বলুন, আমার খুব দরকার।’
জোনাথনদাদু মেয়েটির ব্যাকুল মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, ‘বলছি, তার আগে বলো তো, তুমি সূর্য, না পৃথিবী?’
১
‘ওই দেখ, তোর ভেতর সূর্য ভাসছে।’
গুন্ডার কথায় চমকে উঠল দিঘি। বুকের ভেতর আচমকা চড়াই ঝাপটাল ছ’টা। দম বন্ধ হয়ে এল মুহূর্তের জন্য। কথাটা কি ইচ্ছে করে বলল গুন্ডা? সব জেনেশুনে এমনভাবে বলতে পারল ও? দিঘি কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিল। চড়াইদের ডানার আঁচড়ে বুকের ভেতরটা জ্বালা করছে।
গুন্ডা আবার বলল, ‘অবশ্য কলেজ স্কোয়ারের এই পুলটাকে কি দিঘি বলা যায়? কে জানে! কিন্তু দেখ, জলে সূর্যের রিফ্লেকশনটা কী দারুণ লাগছে!’
গুন্ডা বড্ড বেশি কথা বলে। একবার শুরু করলে থামতেই চায় না। অন্যের কেমন লাগছে, না লাগছে তা কেয়ারই করে না একদম।
‘আঃ গুন্ডা, তুই চুপ করবি?’ রূপ ধমক দিল, ‘গত দেড় ঘণ্টা ধরে বকে যাচ্ছিস। আর বোর করিস না।’
‘বোর?’ গুন্ডা থমকাল। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঝুলপির পাশ থেকে ঘাম সরিয়ে বলল, ‘কেন, বোর হচ্ছিস কেন? আর চুপ করব কেন? কেউ মরে গেছে নাকি?’
রূপ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ওফ, তুই বড় হবি না? অবস্থার গুরুত্ব বুঝিস না? জানিস না আজ কোন দিন?’
‘আজ? কেন? তুই জানিস না কোন দিন? থারটিন্থ আগস্ট। আর বড় বললি? আর কত বড় হব রে? প্রায় উনিশ বছর বয়স, একশো কুড়ি কেজি ওজন। ছেচল্লিশ কোমর। শালা আর কত বড় হব বল?’
রূপ ওর আইলাইনার লাগানো চোখ ওপর দিকে তুলে কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। বলল, ‘ইউ আর জাস্ট ইনকরিজিব্ল!’
‘শালা, সিগারেট খেয়ে পয়সা নষ্ট করিস। দে না আমায়। একটা মটন রোলের খরচ তো উঠে যায়।’ গুন্ডা রূপের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে দিঘির দিকে ঘুরল, ‘তা ছাড়া, দিঘির আজ তো সেলিব্রেট করার দিন। সেই পার্ভার্টটা আজ বিদেয় হচ্ছে। ইউ শুড থ্রো আ পার্টি।’ গুন্ডা খিকখিক করে হেসে, দুটো হাত ঘষল।
পার্ভার্ট! কথাটা অ্যাসিডের মতো ঢুকল কানের ভেতরে। দিঘি চোয়াল শক্ত করল। ওর মনে পড়ে গেল ঠোঁটের ওপর তিল। মনে পড়ে গেল ভেজা স্বাদ। বুনো জঙ্গলের গন্ধ। আচমকা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল ওর। বৃন্ত দুটো কোনও এক স্পর্শের স্মৃতিতে উন্মুখ হল। শীত করে উঠল দিঘির। দেখল কলেজ স্কোয়ারের জলে সূযর্টা ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পর থাকবেই না!
কিছু থাকে না। দিঘি জানে, কিচ্ছু থাকে না জীবনে। শুধু স্মৃতি থেকে যায়। মনখারাপ থেকে যায়। ছোঁয়া যায় না, এমন একটা কষ্ট ফড়িঙের মতো ওড়ে পাঁজরের আনাচকানাচে।
‘দিঘি, কী হয়েছে?’
দিঘি মুখ তুলে আর্যকে দেখল। কালো টি-শার্ট আর বাদামি জিন্স পরেছে আজ। পিঠে ব্যাগ। ফরসা লম্বা চেহারা একটু এলোমেলো। মুখচোখ লাল হয়ে আছে। গালে দু’দিনের না কামানো দাড়ি।
‘কিছু না,’ দিঘি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘তুমি হাঁপাচ্ছ কেন?’
আর্য হাসল, ‘তোমায় বলেছিলাম যে, পাঁচটায় আসব, কিন্তু স্যার এমন আটকে দিলেন যে… তা ছাড়া, জে ইউ-র ক্যাম্পাস থেকে এই অবধি আসতে গেলে তো হাঁপাতেই হবে। তাও দেখো, জাস্ট ওয়ান আওয়ার লেট।’
দিঘি হাসল। ইচ্ছে করছে না, তবু হাসল। সত্যি আর্য ওর জন্য অনেক করে। না, ও কিছু করতে বলে না, কিন্তু তবু করে। নিজে থেকে করে।
আর্যর পুরো নাম আর্যনীল ঘোষ। যাদবপুরে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ে। থার্ড ইয়ার। বড়লোক বাপের একমাত্র ছেলে। সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ওপর আর্যদের বাড়ি। না, ঠিক বাড়ি নয়, বাংলো। চারটে গাড়ি, শিফ্টে শিফ্টে বদল হওয়া দারোয়ান, মালি, উর্দি পরা কাজের লোক, কী নেই? নেই, আর্যর মা নেই।
তাই বিদেশে আর্যকে পড়তে পাঠাননি ওর বাবা। যদিও ভদ্রলোক মাসের মধ্যে পনেরো দিন বিদেশেই থাকেন। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে হয়তো বিদেশেই ম্যানেজমেন্ট পড়তে চলে যাবে আর্য। ইংল্যান্ডে সেইমতো একটা বাড়িও কিনে রেখেছেন আর্যর বাবা। আর্য নিজে কখনও এসব বলেনি দিঘিকে। বলেছে স্নেহা।
রূপের মতো স্নেহাও দিঘির বান্ধবী। একই সঙ্গে ইকনমিক্স নিয়ে পড়ে। স্নেহারা আবার আর্যদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। সেই সূত্রেই গত বছর স্নেহার জন্মদিনে আর্যর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দিঘির।
স্নেহাদের বাড়িটা আদ্যন্ত ক্লাসিক্যাল। সবাই চৌকো ভারী ফ্রেমের চশমা পরে। দাবার ছকের মতো বারান্দায় বাড়ির বড়রা ডেকচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ে। আনন্দ হলে রবীন্দ্রনাথের গান গায়। দুঃখ হলেও রবীন্দ্রনাথেরই গান গায়। ওদের বাড়ির খাটে উঠতে হলে ফায়ার ব্রিগেডের সিঁড়ি লাগে। এখনও ঠাকুরদাদা ঘড়ি সময় জানায় পাড়া কাঁপিয়ে। ওরা সরগম মেনে হাসে। ওদের স্টাডিতে ঢুকলে মনে হয় আস্ত একটা কলেজ স্ট্রিট।
স্নেহার জন্মদিনে তাই অমন একটা বাড়ির ভেতর জিন্স, টপ, লিপ-স্টাড, রিস্ট-ব্যান্ড পরা ছেলেমেয়েরা ঢুকে নিজেরাই বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছিল। রূপের ঘণ্টায় চারটে সিগারেট ছাড়া চলে না। গুন্ডা কথায় কথায় ‘এফ’ শব্দের হরির লুঠ দেয়। রিধিমার লো ওয়েস্ট জিন্স মাঝে মাঝেই বিপদসীমা লঙ্ঘন করে। ওরা সবাই ‘কোথায় এলাম’ ধরনের মুখ করে বাড়িতে ঢুকেছিল। দিঘির সেই অবস্থা না হলেও অস্বস্তি হচ্ছিল ওরও।
ওরা সবাই জড়সড় হয়ে বসেছিল এক কোনায়। স্নেহার এক মাসিমা পিয়ানো বাজিয়ে পূজাপর্বের একটি গান গাইছিলেন। গুন্ডা বারে বারে হাই আটকাতে আটকাতে বলছিল, ‘এরা সিন্নি খাইয়েই বাড়ি পাঠিয়ে দেবে না তো রে?’
রিধিমা মোবাইলে টেক্সট করে যাচ্ছিল অবিরাম। রূপ ঘনঘন সিগারেটের প্যাকেটে হাত দিচ্ছিল। আর দিঘি বেজার মুখে তাকিয়েছিল সামনে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা গলা ফিসফিস করে দিঘির কানের কাছে বলেছিল, ‘রবীন্দ্রনাথ নিজে শুনলেও হাই তুলতেন। এরাই রবীন্দ্রসংগীতের বারোটা বাজাচ্ছে।’
দিঘি চট করে পিছনে তাকাতেই তামাকের হালকা কিন্তু মিষ্টি গন্ধ পেয়েছিল একটা। আর দেখেছিল মাখনের থেকে ছুরি দিয়ে কেটে বের করা একটা মুখ।
দিঘি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল। কে এমন গায়ের ওপর এসে পড়ছে?
ছেলেটা ফিসফিস করে বলেছিল, ‘হাই, দিস ইজ আর্য। ওয়ান্ট আ রিয়েল পার্টি? জাস্ট ফলো মি। ছাদে আমরা নিজস্ব অনুষ্ঠান করছি।’
দিঘিরা লঘু পায়ে ফলো করেছিল আর্যকে।
কিন্তু সেই সন্ধের পর আর্য ফলো করতে শুরু করে দিঘিকে।
আর্য গুন্ডাকে ঠেলে বসে পড়ল বেঞ্চে। তারপর বাঁ হাতটা দিয়ে দিঘির কাঁধ জড়িয়ে বলল, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড সোনা?’
দিঘি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাতটা সরিয়ে দিল, বলল, ‘নট ইন দ্য মুড।’
‘কেন? আজ তো দারুণ দিন। দ্যাট বাস্টার্ড ইজ গোয়িং আউট।’ আর্য হাসিমুখে বলল, ‘ইউ শুড বি হ্যাপি।’
রূপ বলল, ‘না আর্য, ব্যাপারটা তা নয়। আসলে দিঘির হয়তো সব হিউমিলিয়েশনগুলো মনে পড়ছে। মানে, ওর সঙ্গে যা হয়েছে…’
‘চুপ কর না তোরা।’ দিঘি বিরক্ত গলায় বলল, ‘একটা বিষয় পেলে তোরা এত ড্র্যাগ করিস না!’
‘তা হলে অমন পেঁপেসেদ্ধর মতো মুখ করে বসে আছিস কেন তুই?’ গুন্ডা ফোঁস করে উঠল, ‘তুই মাঝে মাঝে এমন ক্যালানের মতো বিহেভ করিস না!’
দিঘি দু’হাত দিয়ে মুখটা ঘষল। ক্লান্ত লাগছে খুব। ঘুম পাচ্ছে। গতকাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি। কেবল সেইসব কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল সে চলে যাবে। পড়াশোনার বইপত্তর খুলেও এক লাইন পড়তে পারেনি দিঘি। ওর জলে ডুবে থাকার মতো কষ্ট হচ্ছিল। শ্বাস নিতে পারছিল না যেন। ঘাড়ে মুখে জল দিচ্ছিল। তবু পারছিল না মনঃসংযোগ করতে। তারপর একসময় বইপত্তর গুটিয়ে রেখেছিল। বুঝেছিল ওর শত চিন্তাতেও যা হওয়ার তা পালটাবে না, তা হবেই।
যা হওয়ার তা চিরকালই হয়, দিঘি জানে। কেউ কিচ্ছু করতে পারে না। শুধু মাঝখান থেকে কষ্ট আর টেনশন করে মানুষ। মনখারাপ করে। ভয় পায়। দিঘি নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করছিল খুব। তবে পারছিল না। শুধু মনে পড়ছিল দেওয়ালে ঝোলানো গিটারটার কথা। মনে পড়ছিল মাস্কের গন্ধ। দুটো নীল চোখ!
‘কী রে কিছু বলছিস না কেন?’ আর্যকে টপকে গুন্ডা খোঁচা মারল দিঘিকে।
‘কী বলব?’
‘একটা পার্টি দে না। এমন মহান দিনে শালা জলের ধারে বসে অমন দুঃখকষ্টের মুখ করছিস কেন রে?’
‘ইয়েস, লেট্স হ্যাভ সাম ফান।’ আর্য উৎসাহিত হল, ‘অন্তত প্যারামাউন্টে চলো, সবাই একটা করে লেমন ড্রিঙ্ক মেরে আসি।’
দিঘি বলল, ‘তোমরা যাও, আমার ভাল লাগছে না।’
‘ডোন্ট বি আ স্পয়েল স্পোর্ট। চল না।’ রূপ খোঁচা মারল এবার। বলল, ‘রিধিমা আর স্নেহারাও তো অন দ্য ওয়ে। ওদের বলে দিই, ওরাও চলে আসবে। তুই ফালতু ঝামেলা করিস না।’
দিঘি কিছু বলতে গিয়েও পারল না। সাইড ব্যাগ থেকে ট্যাঁ ট্যাঁ করছে মোবাইলটা। ও ফোনটা বের করল। আরে শমীদা!
‘হ্যাঁ শমীদা, বলো।’ দিঘি কানে লাগাল ফোনটা।
‘কী রে তুই কোথায়?’
‘এই কলেজের কাছে। কলেজ স্কোয়ারে বসে আছি। কেন?’
‘না, মানে… তুই…’ শমীদা ইতস্তত করল, ‘তুই ঠিক আছিস তো?’
‘হ্যাঁ, কেন?’ দিঘি বিরক্ত হল।
শমীদা সামান্য তোতলা। দিঘির বিরক্তি বুঝতে পেরে আরও কথা আটকে গেল। বলল, ‘না-ন্-না, তু-তুই র-র-রাগ…’
‘করছি না।’ দিঘি ব্যাপারটা সহজ করার চেষ্টা করল।
শমীদা শব্দ করে হাসল। বলা যায় হাসার চেষ্টা করল। বোঝাতে চাইল যে, একটুও ঘাবড়ায়নি। মানুষটার এই লো-কনফিডেন্সপনার জন্যই দিদিকে ধরে রাখতে পারল না। সবসময় যেন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। যেন ইউনেসকো থেকে সবাইকে খুশি করার কনট্র্যাক্ট শমীকে দেওয়া হয়েছে। অমন ম্যাদামারা হয়ে থাকলে কেউ পাত্তা দেয়? অবশ্য শমী হয়তো তেমন পাত্তা পেতেও চায় না। শুধু পাত্তা দিতে চায়। সবাইকে মাথায় তুলে রাখতে চায়। এই এখন যেমন দিঘিকে চাইছে।
দিঘি বলল, ‘তা হঠাৎ ফোন করলে?’
‘তোর মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ আছে। আটটা নাগাদ পৌঁছে যাচ্ছি।’
‘ইয়ে… মানে… ঠিকঠাক আসছিস তো?’ শমীর গলায় অনিশ্চয়তা।
‘মানে? দিদির কথা বলছ কি?’ দিঘি জানতে চাইল, ‘তুমি একটা কথা কতবার বলবে শুনি? দিদিকে তো নিয়েই যাব।’
‘আসলে মহুল তো, তাই বলছিলাম সব ঠিকঠাক আছে তো? মানে ওর যা মাথা গরম!’
‘এত পাত্তা দাও কেন বলো তো?’ দিঘির বিরক্ত লাগল।
‘কেন দিই?’ বলল শমী, ‘সত্যি এটা ভেবে দেখিনি তো।’
‘ঠিক আছে এখন রাখছি। ঠিক পৌঁছে যাব।’
ফোনটা কেটে খাপে ঢুকিয়ে রাখল দিঘি। সত্যিই মাঝে মাঝে শমীকে খুব করে বকুনি দিতে ইচ্ছে করে ওর। কেন এমন হয়ে থাকে মানুষটা?
মহুলের সঙ্গে শমীর যখন বিয়ে হয় তখন ক্লাস এইটে পড়ে দিঘি। সম্বন্ধ করেই বিয়ে। বিয়ের আগে মাত্র দু’বার শমীকে দেখেছিল ওরা। বেঁটে, ফরসা মানুষ। মুখটা আমুদে। সবসময় একটা হালকা হাসি যেন লেগেই থাকত মুখে। আর মহুল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। হাতে মাথা কাটে টাইপ। নিজেই তখন ব্যাবসা শুরু করেছিল মহুল। ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং-এর ব্যাবসা। মনপ্রাণ দিয়ে ব্যাবসা জমানোর চেষ্টা করত মহুল। প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা এসবের দিকে মোটেই মন ছিল না ওর। তাই বাবা যখন বিয়ের কথা তুলেছিল মহুল দু’দিন সময় চেয়ে ‘হ্যাঁ’ করে দিয়েছিল।
দিঘির আপত্তি ছিল বেশ। কত বয়স তখন মহুলের? বড়জোর পঁচিশ। এই বয়সে এখন কেউ বিয়ে করে? মহুলকে আপত্তির কথা বলেওছিল দিঘি। বলেছিল, ‘কী রে দিদি, তুই এখনই বিয়ে করবি? পাগল হয়ে গেছিস?’
‘কেন? পাগল হওয়ার কথা বলছিস কেন?’
‘বা রে, কেউ এমন হুট বলতে বিয়ে করে নাকি? তাও অ্যারেঞ্জড! ইয়াক্।’
‘বাজে কথা বলিস না। হি হ্যাজ আ গুড প্রসপেক্ট।’
‘মানে? গুড প্রসপেক্ট মানে?’ দিঘির অবাক লেগেছিল। কী বলছে মহুল?
‘মানে?’ মহুল খাটে গুছিয়ে বসেছিল। একটা হালকা চাদর গায়ে পেঁচিয়ে নিয়ে বলেছিল, ‘শোন দিঘি, আমায় বিজনেসের জন্য এটা করতে হবে। আগেকার দিনের রাজ-রাজড়াদের মতো। শমীন্দ্রদের বিশাল বড় কাঠের ব্যাবসা! ওদের ফার্নিচারের ব্র্যান্ড সারা দেশে এত পপুলার, সেখানে বিয়ে হলে আমার ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং-এর ব্যাবসাটার কত লাভ হবে বল তো! বিয়েটা আমার কাছে স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স। নাথিং মোর দ্যান দ্যাট।’
‘ব্যস, শুধু তাই?’ দিঘির অবাক লেগেছিল খুব, ‘তোর শমীদাকে পছন্দ হয়নি? এমনি এমনি বিয়ে করছিস?’
মহুল হেসেছিল খুব। বলেছিল, ‘তোদের এই টিন এজটা ভীষণ ডেঞ্জারাস। আননেসেসারি গ্লোরিফাই করাটা এই বয়সের স্বভাব। আরে বাবা জীবন হল হার্ড রিয়্যালিটির জায়গা। সারভাইভাল অত সোজা কিছু নয়। তা ছাড়া যেদিন শমীন্দ্ররা আমায় দেখতে এসেছিল, তুই বুঝিসনি যে, ছেলেটা একটু ল্যাবাকান্ত টাইপ। একে পকেটে পোরা খুব সোজা।’
‘দিদি তুই একটা যাচ্ছেতাই। আর সে কথাই যদি বলিস তা হলে এটাও জেনে রাখিস যে, শমীদারা তিন ভাই-ই ব্যাবসার পার্টনার। তা ছাড়া শমীদার মাথার ওপর ওর বাবা আছে। তুই যা চাইছিস তা সফল নাও হতে পারে।’
‘আরে দেখ না মজাটা। বাবা চিরকাল চাকরি করে গেল। হোক না বড় চাকরি, কিন্তু চাকরি তো। অন্যের কাছে নিজের সময় আর ইচ্ছে গচ্ছিত রাখা। একটা তিন লাখের গাড়ি। সেকেন্ড হ্যান্ড পুরনো দিনের ফ্ল্যাট। এর বেশি কিছু করতে পেরেছে বাবা? ব্যাবসাই হচ্ছে আসল জিনিস। বাঙালিদের সেই এজ ওল্ড ছুঁতমার্গের আর কোনও জায়গা নেই। অমন টিপে টিপে জীবন কাটাতে ইচ্ছে করে না দিঘি। তাই তো এক বছর চাকরি করে নিজে ব্যাবসা শুরু করলাম। এখনও অনেক কিছু অ্যাচিভ করতে হবে জীবনে। অনেক কিছু। আগে বিয়েটা হতে দে, তারপর দেখ তামাশা।’
সত্যি তামাশাই দেখেছে ওরা। মহুল পুতুলনাচ থেকে সার্কাস সব দেখিয়ে ছেড়েছে সবাইকে। আর দিঘিরা সবাই ট্রাপিজের খেলা দেখার মতো করে তাকিয়ে থেকেছে অবাক হয়ে। কখনও নিজে রাগ করে মহুল চলে এসেছে বাপের বাড়ি। কখনও শমীর মা ফোন করে নালিশ করেছে যে, মহুল বাথরুমে ঢুকে নিজেকে বন্ধ করে নিয়েছে। কখনও আবার মাঝরাতে গাড়ি নিয়ে ক্ষতবিক্ষত শমী এসে বলেছে, মহুল খিমচে এই দশা করেছে ওর।
দিঘিরা প্রথম প্রথম বুঝত না কেন এই অশান্তি হচ্ছে। মা জিজ্ঞেস করত মহুলকে, কিন্তু উত্তর পেত না। বাবা জিজ্ঞেস করত, কিন্তু উত্তর পেত না। এমনকী শমীও বলত না কিছু।
শমীদের অফিস ছিল ক্যামাক স্ট্রিটে। একদিন বাবা সেখানে আলাদাভাবে গিয়ে দেখা করে শমীর সঙ্গে। রাতে যখন মাকে বাবা সেই সাক্ষাতের কথা বলছিল, দিঘি পাশের ঘর থেকে, একরকম আড়ি পেতেই শুনেছিল বাবা-মায়ের কথা।
মা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘এই জন্য? শুধুমাত্র এই জন্য মহুল অশান্তি করছে?’
‘হ্যাঁ,’ বাবাকে দেখতে না পেলেও, দিঘি বুঝতে পেরেছিল যে, বাবা মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। বাবা বলেছিল, ‘গন্ডগোলটা মহুল নিজেই করছে। শ্বশুরমশাইকে বলছে ওর কোম্পানিতে ইনভেস্ট করতে আর ওর ব্র্যান্ডটাকে নিজেদের সিস্টার কনসার্ন হিসেবে তুলে ধরতে। শমীর অন্য ভাইরা এতে আপত্তি করায়, শ্বশুরমশাই মত দিচ্ছেন না। ব্যস, রেগে লাল হয়ে গেছে তোমার মেয়ে! তাণ্ডব শুরু করেছে! শমীকে তো প্রায়ই মারধর করে মহুল। শেষ পর্যন্ত যে কী হবে!’
মা কাঁদছিল। এ ঘরে বসে বিরক্তি আর লজ্জা একসঙ্গে অনুভব করছিল দিঘি। মহুল ওর চেয়ে প্রায় এগারো বছরের বড়, কিন্তু চিরকাল এমন ছেলেমানুষি করে গিয়েছে। দিঘি আর মহুলের ভেতর কে যে বয়সে বড় বোঝা দায়!
সাড়ে ছ’টা বাজে। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। এবার উঠতে হবে। আর্যরও শমীর কাছে নেমন্তন্ন আছে। কলেজ স্কোয়ার থেকে এখন গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউতে যেতে হবে। সেখানে বছরখানেক হল নতুন একটা দু’কামরার ফ্ল্যাট নিয়েছে মহুল। সেখান থেকে ওকে পিক-আপ করে নিয়ে তারপর পার্ক স্ট্রিট যাবে। সেখানকার বড় চৌমাথার মিউজিক স্টোর্সের সামনে ওদের জন্য অপেক্ষা করবে শমী। শমী ওদের রেস্তোরাঁয় খাওয়াবে। কারণ শমীদের দক্ষিণ কলকাতার ওই পেল্লায় বাড়িটায় মহুল আর যাবে না কোনওদিন। ওই বাড়ির লোকদের মুখোমুখি আর দাঁড়াবে না।
অবশ্য শমীর সামনেও যেতে চায় না মহুল। বলে, ‘ওই লাউগাছটার সামনে যেতে আমার ঘেন্না করে।’
শমী ব্যাপারটা ভালই জানে তাই গত পরশু নিজে মহুলকে ফোন না করে, ফোন করেছিল দিঘিকে। তখন কফি হাউজ থেকে বেরিয়ে মেট্রোর দিকে যাচ্ছিল দিঘি। রবীন্দ্রসদনে আর্যর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। ফোনটা পেয়ে সামান্য বিরক্ত হয়েছিল ও। শমীকে মোটামুটি পছন্দই করে দিঘি। কিন্তু শমীর ওরকম দুর্বল পার্সোন্যালিটিটা ঠিক মানতে পারে না। লোকটার ভেতরে কেমন যেন একটা হাহাকার ঘুরে বেড়ায় সবসময়। মনে হয় যেন কোনও গভীর গর্তে পড়ে আছে মানুষটা। কেউ উদ্ধার করার নেই।
দিঘিরও শমীকে ছোটখাটো বিষয়ে উদ্ধার করতে ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে যদি তা মহুল সংক্রান্ত হয়। এমন ন্যাদ্যাবোদা ছেলে দেখলে পিত্তি জ্বলে যায় দিঘির।
তবু ফোনটা ধরেছিল, ‘হ্যাঁ, বলো শমীদা।’ গলার বিরক্তিটা বিন্দুমাত্র লুকোতে চায়নি ও।
‘তুই রাস্তায় আছিস দিঘি?’
আচ্ছা আহাম্মক! কলেজের দিনে বিকেলবেলায় আর কোথায় থাকবে ও? দিঘি বলেছিল, ‘হ্যাঁ, এবার মেট্রো ধরব। তাড়াতাড়ি বলবে একটু, কী দরকার।’
‘ও ব্যস্ত আছিস?’ শমীর গলায় দ্বিধা বুঝতে পেরেছিল দিঘি।
ও বলেছিল, ‘তাতে প্রবলেম নেই। শর্টে বলে নাও কী বলবে।’
‘বলব?’ শমী ইতস্তত করছিল তাও।
‘শমীদা প্লিজ, মেক ইট ফাস্ট।’
শমী গলা পরিষ্কার করে বলেছিল, ‘একটা হেল্প দরকার ছিল। আর্জেন্ট হেল্প।’
‘কী হেল্প?’
‘পরশু আমার বার্থডে দিঘি।’
‘তাই?’ দিঘি কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘হ্যাঁ। থার্টিন্থ আগস্ট। সেদিন আমি তোকে, আর্য আর তোর দিদিকে একটা ছোট ট্রিট দিতে চাই।’
‘তাই? কিন্তু কেন আবার এত ঝামেলা করছ শমীদা? এসব বাদ দাও না। তা ছাড়া আর্য ফ্রি আছে কিনা, বা দিদি ফ্রি আছে কিনা জানি না।’
‘আর্য ফ্রি আছে। তোকে ফোন করার আগে ওকে ফোন করেছি আমি। তুই জাস্ট মহুলকে রাজি করিয়ে নিয়ে আসবি। আটটার সময় পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে বড় মিউজিক স্টোরটার সামনে।’
‘আমি? কেন?’ দিঘির আশ্চর্য লেগেছিল।
‘আরে মহুল কিছুতেই আমার কল রিসিভ করছে না। আমি কুড়িবার ফোন করেছি। প্রতিবার কেটে দিয়েছে। তারপর এসএমএস করে কীসব গালিগালাজ লিখে পাঠিয়েছে দেখ না। প্লিজ দিঘি, তোর দিদিকে একবার নিয়ে আয়। আরে, মাই লাইফ ডিপেন্ডস অন ইট। মহুলকে আমি কি ছাড়তে পারি?’
‘দেখো শমীদা, আমি দিদিকে কী বলব? আর দিদিই বা শুনবে কেন? তুমি জানো না দিদির কেমন জেদ?’
‘প্লিজ দিঘি। মহুল একমাত্র তোর কথাকেই যা একটু গুরুত্ব দেয়। তুই প্লিজ না করিস না।’
শমীর গলাটা শুনে দিঘির মনে হয়েছিল যে-কোনও সময়ে কেঁদে ফেলবে মানুষটা।
‘আরে ঠিক আছে। ডোন্ট বি সো সেন্টি। তুমি এমন কেন গো শমীদা? নিজের বউকে এত ভয় পাও কেন?’
‘আর বউ!’ শমী দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
‘আরে তোমার সঙ্গে না থাকলেও ডিভোর্স যখন হয়নি, তখন বউ-ই। কেন তুমি অনর্থক ভয় পেয়ে এমন করছ?’ দিঘি মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলেছিল কথাগুলো।
‘না দিঘি, অনর্থক নয়… তুই… তুই প্লিজ মহুলকে…’ শমীর গলাটা ভিজে ভিজে শোনাচ্ছিল।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে শমীদা। আমি দিদিকে নিয়ে পৌঁছে যাব। ডোন্ট ওরি। টেক কেয়ার, বাই।’
প্রাথমিক বিরক্তিটা চলে গিয়ে দিঘির বেশ খারাপ লাগছিল শমীর জন্য। শমী হয়তো দুর্বল মানুষ। কিন্তু দুর্বল মানুষরা ভালবাসতে পারবে না এমন তো কোনও আইন এখনও নেই। মহুল যে কেন প্রেমকে গুরুত্ব দেয় না!
এখন মহুলের ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং ব্যাবসা মোটামুটি ভালই চলছে। শমীর বাড়ি থেকে তো চলেই এসেছিল আগে। আর গত বছর বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউতে নতুন একটা ফ্ল্যাটে উঠে গেছে মহুল। বাবার শত অনুরোধেও চিঁড়ে ভেজেনি। মহুল ফিরে আসেনি। এবার মহুলের ইচ্ছে একটা ছোট গাড়ি কিনবে।
মহুলকে মানুষ হিসেবে যতই ডেসপারেট, অ্যারোগ্যান্ট আর সেলফিশ লাগুক না কেন, দিঘির মনে হয় ভেতরের মেয়েটা কিন্তু খুব ভাল। তবে সেই ভাল, নরম মেয়েটার নাগাল পাওয়া যে সহজ নয় তাও জানে দিঘি। সেই নরম মেয়েটার নাগাল কীভাবে পাবে, কীভাবে মহুলকে রাজি করাবে শমীদার নেমন্তন্নে নিয়ে যেতে তাই ভাবছিল দিঘি। ভাবছিল কথাটা কীভাবে বলবে মহুলের সামনে।
রাতে, খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বসতে যাবে, এমন সময় ফোনটা বেজেছিল দিঘির। নামটা দেখে সামান্য চমকে গিয়েছিল ও। মহুল! আরে, দিদিকেই তো ফোন করবে ভাবছিল।
‘বল, দিদি,’ ফোনটা ধরে খাটে গুছিয়ে বসেছিল দিঘি।
‘দিঘি, কেমন আছিস তুই?’
‘ভাল আছি। শোন না, আমি তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম।’
‘আমায়?’ মহুল হেসেছিল। দিঘি বুঝতে পারছিল যে, মহুলের মেজাজ ভাল আছে।
‘হ্যাঁ, তবে আগে তুই বল কেন ফোন করেছিস।’
মহুল খুশির গলায় বলেছিল, ‘শোন না, তোকে কাল আমার সঙ্গে একটা জায়গায় যেতে হবে। কনভ বলেছিল যাবে, কিন্তু আমি রাজি হইনি। দিঘি, তুই যাবি আমার সঙ্গে। কেমন?’
কনভ, মানে কনভ রাঠোর। মহুলের নতুন প্রেমিক। বা বলা যায় প্রেমের লাইনে ইট পেতে অপেক্ষা করা এক প্রত্যাশী। মহুল ছেলেটা সম্বন্ধে তেমন সিরিয়াস নয়। বলে, ‘ছাব্বিশ বছর বয়স, কী রে অত প্রেম? আমার চেয়ে কম সে কম তিন বছরের ছোট। তারপর ওকে দিয়ে আমার ব্যাবসারও কোনও লাভ হবে না।’ তবে কনভ ছেড়ে দেয় না। লেগে থাকে মহুলের সঙ্গে।
কনভ রাঠোর, বিশাল বড়লোকের ছেলে। ওদের গ্রুপ অব কোম্পানিজ আছে। তারই একটা, রাঠোর পার্টিকল অ্যান্ড হার্ড বোর্ড মিল্স লিমিটেডের ডিরেক্টর এই কনভ। যেমন লম্বা তেমন টকটকে গায়ের রং কনভের। দেখলে মনে হয় হিন্দি ছবির নায়ক। থুতনির কাছে একটা কাটা দাগ মুখটার অন্য একটা অ্যাপিল তৈরি করেছে। দিঘির বান্ধবী রূপ তাই বলেছিল একটা গেট টুগেদারে কনভকে দেখে। বলেছিল, ‘এ যে একদম চন্দ্রচূড় সিংহ রে।’
আসলে কনভ পাশের ব্যানার্জি বাড়িতে খুব আসত একসময়। আদিত্যদার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। সেসময়ই ওর আলাপ হয়েছিল মহুল আর দীঘলের সঙ্গে। তবে কনভ আর বেশি দিন দেশে থাকবে না। ওদের ব্যাবসা দেখাশোনার জন্য ওকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যেতে হবে। তবু চলে যাওয়ার আগে ও মহুলকে নিজের দিকে টানতে চেষ্টা করে।
‘এই দিঘি, কী হল, কী ভাবছিস?’ মহুল খুঁচিয়েছিল, ‘উত্তর দিলি না তো! কাল যাবি তো আমার সঙ্গে?’
‘কোথায় যাব?’ দিঘি অবাক হয়েছিল।
‘কাল গাড়ি দেখতে বেরোব। কয়েকটা শোরুমে ঘুরতে হবে। আমি আর তুই যাব। বিকেল তিনটে নাগাদ আমার অফিসে আসবি। কেমন?’
দিঘি হেসেছিল, ‘তা হলে গাড়ি কিনবিই ঠিক করলি?’
‘হ্যাঁ, আর সেটা পছন্দ করতে তুই যাবি আমার সঙ্গে।’
‘দিদি, আমি যাব। কিন্তু আমার একটা কথা তোকে শুনতে হবে তার আগে।’
‘শিয়োর, কী কথা?’ খুশির গলায় জানতে চেয়েছিল মহুল।
‘পরশু তোকে আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে। রাজি তো?’
‘পরশু? কোথায়?’ এবার একটু আশ্চর্য হয়েছিল মহুল।
‘শমীদার জন্মদিন, তোকে নেমন্তন্ন করেছে। আমাকেও। তোকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে দিয়েছিল দিঘি।
‘মানে?’ ফোনের ওপ্রান্ত থেকে ছিটকে এসেছিল মহুলের গলা, ‘কী বললি? শমীর জন্মদিনে আমায় যেতে হবে?’
‘হ্যাঁ, নেমন্তন্ন করেছে যখন, যেতে তো হবেই।’
‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওই জানোয়ারটার জন্মদিনে আমি যাব? আর চল্লিশের বুড়ো ভাম! তার আবার জন্মদিন কী রে?’
‘আঃ, শোন না,’ দিঘি কিছুতেই থামাতে পারছিল না মহুলকে, ‘আরে তুই তো ফোন তুলছিস না। আসলে ওদের বিজনেস হাউসের হয়ে তোর কাছে একটা প্রপোজাল রাখতে চায় ও।’
‘প্রপোজাল?’ আচমকা নরম হয়ে গিয়েছিল মহুলের গলা।
দিঘি বুঝেছিল যে, ওষুধ ধরেছে। মহুল আর শমীর যত গন্ডগোল তো এই বিজনেস নিয়েই। দিঘি তো জানে মহুল বিজনেসের জন্য সব করতে পারে। তাই ঝুঁকি নিয়ে মিথ্যে কথাটা বলেই দিয়েছিল। ভেবেছিল আগে তো মহুল যেতে রাজি হোক। তারপর না হয় শমীকে ব্যাপারটা বলে একটা উপায় বের করা যাবে।
‘তা, কী প্রপোজাল শুনি?’ মহুল সন্দেহের গলায় বলেছিল।
‘সে কি আর আমায় বলেছে? আমরা গেলে খেতে খেতে বলবে। আসলে পার্ক স্ট্রিটে খাওয়াবে তো!’
‘পার্ক স্ট্রিটে! বাড়িতে নয়! ও…’ মহুলের স্বস্তির শ্বাসটা স্পষ্ট বুঝেছিল দিঘি। আর এও বুঝেছিল যে, মহুল আর খুব একটা অরাজি নয়।
মহুল আবার বলেছিল, ‘তা হঠাৎ দু’বছর পর টনক নড়ল বাবুর?’
‘তুই বড্ড বেশি খুঁতখুঁত করিস। আমার মনে হল তোর কাজের ক্ষেত্রে উন্নতি হবে তাই বললাম। এখন বাকিটা তোর ওপর। বল, কী বলব শমীদাকে? যাবি তো?’
ফোনের ওপারে নিস্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল মহুলের গলা। তারপর একসময় জলের গভীর থেকে বুদবুদ ওঠার শব্দে আলতো করে মহুল বলেছিল, ‘হ্যাঁ, যাব।’
ফোনটা রেখে বিছানায় ঠোঁট কামড়ে বসেছিল দিঘি। মহুলকে রাজি করাতে এ কী করে ফেলল ও? যখন জানে যে, মহুল আর শমীদার ভেতরের গন্ডগোলের মূল কারণ মহুলের ব্যাবসার প্রতি আগ্রহ, তখন কেন ও এমন একটা কাণ্ড করল?
দিঘির মাঝে মাঝে নিজের ওপর রাগ হয়। হঠাৎ হঠাৎ ও এমন এক-একটা কথা বলে ফেলে যার খেসারত দিতে গিয়ে নিজেই ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়ে।
সেই রাতে আবার নিজের চারদিকে জালটা দেখতে পেয়েছিল দিঘি। অনিচ্ছাকৃতভাবে ও আবার একটা নতুন ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে গেল না তো? আর আচমকা, একদম আচমকাই, কোনও কারণ ছাড়াই দিঘির চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল একটা হলুদ গিটার, একটা ছাদের ঘর আর এক জোড়া নীল রঙের চোখ।
‘কী হল, প্যারামাউন্টে যাবে?’ আর্য কনুই দিয়ে আলতো ধাক্কা মারল দিঘিকে।
‘না, যাব না,’ বিরক্ত লাগল দিঘির। এমনিতেই মন ভাল নেই তার ওপর এরা এমন শুরু করেছে যে, বিরক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও। ও বলল, ‘তোমার মনে নেই শমীদার ওখানে নেমন্তন্ন আছে?’
‘নেমন্তন্ন!’ আর্যর কাছে যাওয়ার আগেই খপ করে কথাটাকে ধরল গুন্ডা, ‘আমায় বলিসনি তো? কোথায় নেমন্তন্ন? কার কাছে?’
‘তাতে তোর দরকার কী?’ রূপ আর একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
‘সেটা তোকে বলব কেন রে? শালা খাস তো ধোঁয়া, সলিড ফুডের মর্ম তুই কী বুঝবি?’ গুন্ডা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল, ‘শালা ডাল, আলুসেদ্ধ আর পাঁপড়ভাজা খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেল। ড্রেজার নামিয়ে পেট পরিষ্কার করাতে হবে!’
‘বড্ড হ্যাংলা তুই। আর্য আর দিঘির কোথায় নেমন্তন্ন তা জেনে তুই কী করবি? ম্যানার্স, এটিকেট বলেও একটা ব্যাপার আছে গুন্ডা, বুঝেছিস?’
‘ম্যানার্স?’ গুন্ডা ওর মেদবহুল শরীর কাঁপিয়ে হাসল, ‘ওসব ম্যানার্স মারাস না। তোদের তো শালা খিদেই পায় না। বুঝিস খিদে পেলে কেমন লাগে? আমার ফ্যামিলিতে ন’জন থাকে। মাস্টারবেট করার পর্যন্ত প্রাইভেসি পাই না। বাবার চটকল বন্ধ। দাদার কেরানিগিরি আর ঘুষের টাকায় বেঁচে থাকি। দুটো অবিবাহিত পিসি আছে যারা সারাদিন মায়ের পিছনে পড়ে থাকে। ভাইটা সারাদিন গিটার নিয়ে টিং টাং করে মাথা খায়। বউদি রাতে চারটের বেশি রুটি দেয় না আমায়। কী করে যে বেঁচে আছি আমি জানি। যাদবপুরের কলোনি থেকে ওই পশ কলেজে আসতে আসতে জানিস নিজেকে কতটা মেরে ফেলতে হয়? তোর সারা মাসের যা সিগারেটের খরচ না, সেটা দু’বাড়ি টিউশন করে আমায় তুলতে হয়।’
দিঘি দেখল উত্তেজনায় গুন্ডার সারা শরীরে জলের মতো ঢেউ খেলছে। দরদর করে ঘামছে ছেলেটা। দেখে মায়া হল দিঘির। সত্যি গুন্ডাদের অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। না, ও নিজে গুন্ডাদের বাড়িতে যায়নি। কিন্তু স্নেহা গেছে। ওই বলেছে। তবে পড়াশোনায় গুন্ডা খুব ভাল। আর টিউশনিও করে চুটিয়ে। গুন্ডার কথায়, ‘আরে, ও ছাত্র পড়ানো, শিক্ষা দান, ঢপের কনসেপ্ট। আমি জাস্ট খাওয়া-পরার কাজ করি। ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে মাসের শেষে মাইনে আর সন্ধেবেলার টিফিনটা হয়ে যায়।’
রূপ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে দিল আগুনটাকে, তারপর গুন্ডার হাত ধরে ওকে বসাল। ঠান্ডা, নরম গলায় বলল, ‘বাবা রে বাবা, এত সেন্টু খেয়ে যাস কেন তুই? বড্ড অভিমান তোর। মাথাটা ঠান্ডা কর। যা ড্রামা শুরু করেছিলি না, আ পারফেক্ট টিয়ার জার্কার।’
গুন্ডা রূপকে পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘কোথায় রে তোর নেমন্তন্ন দিঘি?’
‘শমীদার কাছে, আজ ওর জন্মদিন।’
‘জন্মদিন! এই বয়সে! শিং ভেঙে বাছুর?’ গুন্ডা আবার উঠে দাঁড়াল, ‘তবে ভাল। সেই জন্যই না খ্যাঁটের বন্দোবস্ত করেছে। শালা, শমীদাটা কিন্তু মাইরি ব্যাপক কিপটে, আর্য আর তোকে খেতে বলল আর আমি বাদ? তা ছাড়া বছরে মাইরি মোটে একটা জন্মদিন ওর। যাক গে, আমি যাব। শমীদাকে ফোন করে বলে দে।’
গুন্ডা শেষ কথাগুলো এমন করে বলল যেন সরকার থেকে সার্কুলার দেওয়া হয়েছে যে, গুন্ডাকে বাদ দিয়ে কোনও নেমন্তন্ন বা অনুষ্ঠান হবে না।
দিঘি চোয়াল শক্ত করল। গুন্ডাটা যদি যায় তা হলে শমীদা একটু অস্বস্তিতে পড়বে। নেমন্তন্ন যে নিছকই বাহানা সেটা তো দিঘি ভাল করেই জানে। হঠাৎ কেন এই নেমন্তন্ন, কেন এই খাওয়ানোর ইচ্ছে, তা শমীদা নিজেই বলেছিল, সে রাত্রেই।
মহুলের ফোনটা ছেড়ে চুপ করে বিছানায় বসেছিল দিঘি। এমনিতেই গত দু’সপ্তাহ ওর মনমেজাজ ভাল নেই। তার ওপর আবার মহুল-শমীর ঝঞ্ঝাটে নিজের বোকামোর জন্যই ঢুকে যাওয়া-সব নিয়েই খুব বিরক্ত ছিল দিঘি। ও ঠিক করেছিল সেই রাতেই শমীদাকে ফোন করে মহুলকে ও কী বলেছে তা বলে দেবে।
একবার রিং হতেই ফোনটা ধরেছিল শমী, ‘এই তোর ফোনের জন্যই এতক্ষণ বসেছিলাম। তা কী খবর? মহুল কী বলল?’
দিঘি বলেছিল, ‘বলেছে আসবে। তবে…’
‘আসবে?’ শমী আনন্দ আর উত্তেজনায় এমন চিৎকার করেছিল যে, ফোনটাকে কান থেকে সরিয়ে নিয়েছিল দিঘি।
শমী বলেছিল, ‘তা মহুল রাজি হয়ে গেল? তুই কী এমন বললি ওকে?’
‘সেটা বলতেই ফোন করেছি।’ দিঘি সংক্ষেপে ঘটনাটা বলেছিল শমীকে।
আঁতকে উঠেছিল শমী, ‘অ্যাঁ, করেছিস কী? এমন বললি কেন?’
‘তো কী বলব? বলব যে, জন্মদিনে শমীদা বউকে সোহাগ করবে বলে ডাকছে।’ মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল দিঘির। আচ্ছা লোক, নিজের কিছু করার মুরোদ নেই, অথচ হাতে লাল পেন নিয়ে অন্যের কাজকর্ম কারেকশন করবে বলে বসে আছে।
‘এখন আমি কী করব?’ অসহায় শুনিয়েছিল শমীর গলা, ‘বাড়িতে যদি জানতে পারে? যদি মহুল এ ব্যাপার নিয়ে হুট করে দাদাকে ফোন করে? একদম সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার।’
দিঘি জানে, বাড়ির ছোট ছেলে হিসেবে শমীর আদর যেমন সবার ওপরে, তেমনই ব্যাবসাপত্তরের ক্ষেত্রে ওর গুরুত্ব সবার নীচে। লো-কনফিডেন্স, সামান্য তোতলা মানুষটা বাড়িতেও কেমন যেন একটু গুটিয়ে থাকে সবসময়।
দিঘি বলেছিল, ‘শোনো শমীদা, অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দিদিকে এ ছাড়া নিয়ে যাওয়ার আর কোনও উপায় ছিল না। তুমি যেমন তেমন একটা ঢপ মেরে দিয়ো না। অত ঘাবড়াচ্ছ কেন? আর তোমার মুখ থেকে ব্যাবসাপত্তরের কথাবার্তা না শুনে দিদি কাউকে ফোন করবে না। ফলে ভয় পেয়ো না একদম। আর শোনো, তোমার গ্যাঁট ভাল করে খসাব সেদিন, তৈরি থেকো কিন্তু, কেমন।’
‘কী রে দিঘি, অমন চুপ করে গেলি কেন বল তো?’ গুন্ডা ভুরু কুঁচকে তাকাল।
‘কোথায়?’ দিঘি উঠল। আর বসে থাকলে হবে না। এবার উঠতে হবে। এখান থেকে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ খুব একটা দূরে নয়। ট্যাক্সি নিয়ে নিলেই হবে।
‘আচ্ছা মুশকিল। গেলি চুপ করে! আর বলছিস, কোথায়?’ গুন্ডাও উঠে দাঁড়াল।
সন্ধে হয়ে আসছে এবার। আশপাশের আলো জ্বলে উঠছে। সাঁতারুরা সামনের জল থেকে উঠে গা মুছছে। গল্প করছে। একটু দূরে জলের এক কোনায় বাঁশের তৈরি আধ-খ্যাঁচড়া খাঁচাটাকে এই সন্ধেবেলা কেমন যেন ধ্বংসস্তূপের মতো লাগছে। পুজো, দুর্গাপুজোর জন্য তৈরি হচ্ছে শহর। অক্টোবরের প্রথমেই এবার পুজো। তার তোড়জোড় সারা শহর জুড়ে চলছে।
রূপ বলল, ‘আমি এবার আসি রে। তোরা যা।’
গুন্ডা বলল, ‘কেন, তুইও চল আমাদের সঙ্গে।’
‘মানে?’ আর্য এতক্ষণে কথা বলল, ‘এই গুন্ডা, তোকে কে নিচ্ছে?’
‘কেন? তুইও দিঘির বন্ধু, আমিও বন্ধু। তুই যেতে পারলে আমিও যেতে পারব।’
‘আমি শুধু বন্ধু নই, বুঝেছিস?’ আর্য গম্ভীরভাবে কথাটা বলে দিঘির দিকে তাকাল।
দিঘি চোখ সরিয়ে নিল আর্যর চোখ থেকে। আর্য শুধু ওর বন্ধু নয়? তা হলে আর্য কে? আর্য বন্ধুর বেশি। সেই জন্যই তো আর্য দিঘিকে আদর করে। চুমু খায়। নির্জনে হাত ধরে বসে থাকে। সেই জন্যই তো আর্য কোথাও ঘুরতে গেলে দামি গিফ্ট নিয়ে আসে। শরীর খারাপ হলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে। সত্যিই তো, আর্য কি শুধুই বন্ধু?
দিঘির বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা কষ্ট পাক খায়। একটা নেই-নেই হাওয়া ঘুরে বেড়ায়। মনে হয়, নির্জন মাঠের ভেতর দিয়ে ছোট্ট একটা মেয়ে হাঁটছে একা। মনে হয়, কেউ নেই তার হাত ধরার। আচমকাই নীল একজোড়া চোখ দেখতে পায় দিঘি। হলুদ গিটার দেখতে পায়। দেখতে পায় ছাদের ঘরে এক পুজোর সকাল। সত্যিই আর্য কি শুধুই বন্ধু নয়?
ভেজা একটা হাওয়া শরীরের ভেতরে পাক খেয়ে গেল দিঘির। আজ তেরোই আগস্ট। আজ মৃত্যুদিন না?
‘জন্মদিন, শমীদার জন্মদিন। ব্যস, আমি যাব।’ গুন্ডা চিৎকার করে উঠল, ‘আজ গেলে শমীদা কিচ্ছু মনে করবে না।’
‘তা হলে ট্যাক্সিতে তুই সামনে বসবি।’ আর্যর গলা দিয়ে রাগ ছিটকে বেরোল।
খিকখিক করে হাসল গুন্ডা, ‘শালা রং নিবি না। মনে থাকে যেন আমাদের পাড়ার ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাস।’
‘তো? মারবি নাকি?’
গুন্ডার হাসি বেড়ে গেল, ‘শালা পিছনের সিটে দিঘিকে একা চাস তো?’
‘শালা, তোকে, শালা…’ আর্য কী বলবে যেন বুঝতে পারল না।
‘চুপ করবি গুন্ডা। আমার অসহ্য লাগছে।’ দিঘি চিৎকার করে উঠল, ‘সবসময় এমন করিস না তো! যাবি যখন চুপচাপ চল।’
কলেজ স্ট্রিট অঞ্চল এই সময়টা জমজমাট থাকে। দোকানিদের বই ফেরির চিৎকার, ট্যাক্সির অনর্থক হর্ন, সোল খয়ে যাওয়া জুতোর মতো এক দিকে কেতরে থাকা বাস আর অটোর অ্যাক্রোব্যাটিক পার হয়ে দিঘিরা ইউনিভার্সিটি গেটের সামনে এল।
রূপ বলল, ‘ও কে, কাল ক্লাসে দেখা হবে। কেমন? বাই।’
দিঘি বলল, ‘তুইও কিন্তু যেতে পারতিস। কোনও প্রবলেম হত না।’
‘আমি? পাগল!’ রূপ আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে কাঠিটাকে টোকা দিয়ে রাস্তায় ফেলে বলল, ‘তোর ওই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান টাইপ দাদা-দিদির পাল্লায় পড়ব ভেবেছিস? এত্ত ঝগড়া কেউ করে! বিশেষ করে তোর দিদি। বাবা, যা এক পিস প্রোডাকশন তোর বাবা-মা দিয়েছে না! বাদ দে। আমি কাটি, বাই।’
রূপ চলে যেতেই আর্য হাত তুলে একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করাল। তারপর কোথায় যাবে বলে গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে গুন্ডার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওঠ।’
গুন্ডা হাসল, ‘দেখিস, যে রেটে তুই দিঘির সঙ্গে চিপকাচ্ছিস, টু-টু জা ফোর না হয়ে যায়!’
কলকাতায় অফিস টাইমের রাস্তা আর বাচ্চাদের ভাতের থালা-দুটোই এক। দিঘি অবাক হয়ে দেখে শহরে রোজ কচুরিপানার মতো গাড়ি বাড়ছে। লোন নিয়ে গাড়ি আর বাড়ি বাঙালির অ্যান্টাসিড অ্যাডিকশনের চেয়েও সাংঘাতিক হয়েছে আজকাল। ছোট ছোট বুট জুতোর মতো দেখতে গাড়িগুলো পোকার মতো ঘুরে বেড়ায় শহরের রাস্তাঘাট দিয়ে। দেখে বিরক্ত লাগে দিঘির। কষ্ট হয়। ভাবে, এত গাড়ির কি সত্যিই দরকার আছে? কত বড় বড় সুন্দর দেখতে বাস বেরিয়েছে এখন। নতুন ভাবে মেট্রো চলছে। অটো, ট্যাক্সিতে বাটি উপচে উঠছে শহরের। তারপরেও এত গাড়ি কীসের জন্য দরকার? অবশ্য ওদেরও এমন একটা ছোট্ট বুট জুতো রয়েছে। আর ওর দিদিও তো গতকাল একটা বুট জুতো পছন্দ করেছে।
ট্যাক্সিতে বসেই গুন্ডা সামনের সিট থেকে পিছন দিকে ঘুরে বসল, বলল, ‘আমি এভাবেই বসব। দেখি কী করিস তুই আর্য।’
আর্য ভুরু কুঁচকে দিঘির থেকে সরে বসল একটু। বলল, ‘গুন্ডা, তোর লজ্জা করে না রে? এমন যেচে নেমন্তন্নে যাস, অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে পিপিং টম হোস, এমন হাতির মতো মোটা তাও গোগ্রাসে গিলিস, লজ্জা নেই তোর?’
গুন্ডা হি হি করে হাসল, ‘যতই যা বলিস, আমি সামনে ঘুরে বসব না। দিঘিকে নিয়ে অসভ্যতা করবি, আমি হতেই দেব না। আর আর্য, ব্যাপারটা ভাব, দিঘি কীরকম রাফ প্যাচের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝছিস না তুই?’
গুন্ডার দিকে তাকাল দিঘি। আবার সেই প্রসঙ্গে ঢুকছে ছেলেটা।
গুন্ডা বলল, ‘তবে আজকের পর থেকে আর সেই জানোয়ারটাকে দেখতে হবে না তোকে, শালাটাকে আরও আগে বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়া উচিত ছিল। তবে বেটার লেট দ্যান নেভার। আচ্ছা দিঘি, মালটা তোকে ঠিক…’
‘চুপ করবি?’ ঝাঁঝিয়ে উঠল দিঘি, ‘বড্ড বাজে বকছিস তখন থেকে, বড্ড বাজে বকছিস গুন্ডা। চুপ কর।’
গুন্ডা থতমত খেয়ে বলল, ‘যাঃ বাবা, আমার ওপর রাগছিস কেন? আমি কী করলাম? তুই ফালতু খচে যাচ্ছিস। যাক গে, যা হওয়ার হয়েছে। ওসব ভুলে যা। নোংরা মানুষদের যত ভুলবি ততই ভাল হবে।’
ভাল? কীসে ভাল হয় মানুষের? কার কথা ভুলতে চায় সে? ভুলে গিয়ে সে কী রাখতে চায় মনে?
দিঘি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। আগস্ট বর্ষার মাস। তবে এবার বৃষ্টি তেমন হচ্ছে না। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে কিছু বিদ্যুতের শিকড় আচমকাই জেগে উঠল আকাশে। হঠাৎ ঠান্ডা হাওয়া ট্যাক্সির জানলা দিয়ে এসে আলতো ছুঁয়ে গেল দিঘির মুখ। অসংখ্য আঠারো বছর বয়সিদের মতো, বর্ষার সম্ভাবনায় দিঘিও কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে।
মহুলের ফ্ল্যাটটা পাঁচতলায়। ছোট, কিন্তু ছিমছাম। দিঘির খুব ভাল লাগে মহুলের ফ্ল্যাটটা। শুধু নির্জনতা, সুন্দর সাজানো বা সাউথ ফেসিং বলে নয়। এই ফ্ল্যাটটা আসলে প্রতীক। মহুলের একা বেঁচে থাকার, সবার মুখে থাপ্পড় মেরে একা বেঁচে থাকার প্রতীক। পরিশ্রম আর নিষ্ঠার জোরে একটা খুব সাধারণ মেয়েও যে কলকাতায় ভদ্রভাবে বাঁচতে পারে, সে ব্যাপারে মহুল একটা উদাহরণ। কে না বিরোধিতা করেছে মহুলের এই শমীর থেকে আলাদা থাকার সিদ্ধান্তের, বাবা-মায়ের থেকে আলাদা থাকার সিদ্ধান্তের, এমনকী দিঘিরও মনে হয়েছিল যে, মহুল বাড়াবাড়ি করছে। শমীর সঙ্গে ঝামেলার জেরে একা একা থাকার কোনও মানে নেই। মনে হয়েছিল যে, শমীকে ছেড়ে চলে আসার পর মহুলের সঙ্গে মা যতই খারাপ ব্যাবহার করুক, তাতে বাড়ি ছেড়ে নতুন ফ্ল্যাটে একা থাকাটা বাড়াবাড়ি।
কিন্তু এখন দিঘি মহুলের বাড়াবাড়ির কারণটা বোঝে। পাখনা মেলে আকাশে ভেসে থাকা পায়রার আনন্দটা বোঝে। ওর মনে হয়, ইস, এমন যদি একটা জীবন পেত ও!
মহুল ওকে এখানে এসে মাঝে মাঝে থাকার কথা বলে। বলে যা খুশি করতে পারে দিঘি এই ফ্ল্যাটে এসে। কিন্তু দিঘি চট করে আসে না। কোথায় যেন বাধে। মহুল ওর নিজের দিদি, তাও মহুলের জিনিস নিতে কষ্ট হয় ওর। ভাবে যেদিন ও নিজে পারবে, সেদিন ও-ও ডানা মেলবে।
পাঁচতলায় লিফ্ট থেকে নেমে দিঘি ডোরবেল বাজাতে যাবে, ঠিক এমন সময় ব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইল বেজে উঠল।
এখন আবার কে? বিরক্ত লাগল দিঘির। কাল টিউশন আছে। স্যার নয় তো! স্যারটা মহা ফাঁকিবাজ। হয় কি নয় কামাই করে।
দিঘি ফোনটা বের করল, আরে, সুবর্ণ! হঠাৎ এ সময়?
দিঘিদের পাড়ায় থাকে সুবর্ণ। সমবয়সি ছেলেটা খুবই ভাল। তবে বেশ রগচটা। ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়ে। দিঘির খুব বন্ধু।
দিঘি ফোনটা কানে লাগাল, ‘হ্যাঁ রে সুবর্ণ, বল কী ব্যাপার?’
সুবর্ণ বলল, ‘দারুণ খবর দিঘি। যাকে বলে পাড়ার ব্রেকিং নিউজ।’
‘কী খবর?’ দিঘি জিজ্ঞেস করল।
সুবর্ণ শ্বাস নিল একটু। খানিকটা যেন মনে মনে গুছিয়ে নিল নিজেকে। তারপর বলল, ‘শুয়োরের বাচ্চাটা এইমাত্র কাটল।’
‘মানে?’ দিঘি বুঝল না ঠিক।
‘আরে ট্যাক্সি ডেকে এনেছিল। তাতে ঢাউস দুটো ব্যাগ আর দুটো ছোট ব্যাগ তুলে মালটা বেরিয়ে গেল এইমাত্র। শালা, পাড়াটা বাঁচল যেন। আবর্জনা দূর হল!’
দিঘি ফোনটা ধরে রইল কানে। ও যেন দেখতে পেল সুকিয়া স্ট্রিটের গলির মুখ দিয়ে একটা হলুদ ট্যাক্সি বাঁক নিয়ে চলে গেল।
কত দূরে গেল ট্যাক্সি? কোথায় নিয়ে গেল মানুষটাকে? কার কাছে নিয়ে গেল? আচ্ছা, যা যা ঘটেছে সবাই তো ভালই হয়েছে বলবে, তা হলে দিঘির এমন লাগছে কেন? এমন চাপা কষ্ট হচ্ছে কেন বুকে?
সুবর্ণ বলল, ‘তোর আজ লাকি ডে দিঘি। আর ভয় পেতে হবে না তোকে। আজ থেকে মন খুলে থাকতে পারবি। সবার কাছে তেরো সংখ্যাটা আনলাকি, তোর কাছে লাকি। তেরোই আগস্ট তোর লাকি ডে, বুঝলি?’
তেরোই আগস্ট! আজ মৃতুদিন না? আর আজকেই এভাবে চলে যেতে হল ওকে? মাথা নিচু করে, একরাশ কলঙ্ক আর অন্ধকার নিয়ে চলে যেতে হল? কার জন্য যেতে হল? দিঘির জন্য?
দিঘির মোবাইল ধরা হাতটা কান থেকে নেমে এল আপনা-আপনি। সুবর্ণ এখনও অনেক কিছু বলছে। কিন্তু পৌঁছোচ্ছে না, দিঘির কাছে কিচ্ছু পৌঁছোচ্ছে না। শুধু বুকের ভেতর চাপ লাগছে ভীষণ। পাঁজর ফাটিয়ে পাথরের দেওয়াল উঠছে যেন। আর সেই দেওয়াল টপকে দিঘি কিছুতেই পৌঁছোতে পারছে না নিজের কাছে।
Chapter - 2
২
বুটটা খুলে রেখে এবার পায়ে জড়ানো ক্রেপটা খুলছে ছেলেটা। মাথা নিচু। ছোট করে কাটা চুলগুলো ঘামে ভিজে সপসপ করছে। জামাটাও শরীরের সঙ্গে লেপটে আছে একদম। ছেলেটা যে বেশ ক্লান্ত তা ওর হাঁপানো দেখে বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটার নাম জয়নাল। জগুদার নতুন বাছাই। বয়স বড়জোর কুড়ি। ছেলেটাকে আজই প্রথম নেটে দেখল রুহান। বলের স্পিড বেশ ভাল। দু’পাশে মুভমেন্টও ভাল। ওদের টিমের এক নম্বর ব্যাটসম্যান বটুক চারবার এজ করেছে ওর বল। আর দু’বার তো একদম মিড্ল স্ট্যাম্পে খেয়েছে।
বটুকের ব্যাটটা সলিড। কিন্তু একটা নতুন ছেলের কাছে ক্রমাগত নাস্তানাবুদ হয়ে জয়নালকে চার অক্ষরের মালা পরিয়ে দিয়েছিল। তার ফলস্বরূপ পরের বলটা বটুক হেলমেটের ভাইজারে খেয়েছে। প্যাড-গ্লাভ্স খুলে, ব্যাট ছুড়ে ফেলে, বটুক রীতিমতো রাগারাগি করে বেরিয়ে গেছে।
খুব মজা লাগছে রুহানের। আনন্দ হচ্ছে। বটুককে একদম পছন্দ করে না ও। স্টার ইউনিয়নের এক নম্বর ব্যাটসম্যান বলে ব্যাটার খুব তেল। তা ছাড়া বেঙ্গলের নিয়মিত ওপেনার। ন্যাশনাল লেভেলে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশের তিনজন ব্যাটসম্যানের সঙ্গে বটুক ঘোষের প্রতিযোগিতা চলছে ইন্ডিয়া স্কোয়াডে ঢোকার জন্য। যদিও রুহান জানে ব্যাপারটা সোজা নয়। ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিম রাবড়ি মালাই নয় যে, চেটেপুটে খেয়ে নেবে। ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আরও অনেক ইকুয়েশন এখানে চলে। রুহান জানে, বটুকও এসবের জন্য বোর্ডের নানা লবিতে সিঁড়ি লাগানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি পারফরম্যান্সও দেখাচ্ছে। এ বছর রঞ্জিতে তিনটে সেঞ্চুরি মেরেছে। যার মধ্যে একটা ডাবল। অসমের সঙ্গে। যদিও সেটার খুব একটা বোধহয় দর নেই, তবু ডাবল সেঞ্চুরি যে-কোনও স্তরের ক্রিকেটেই একটা দারুণ ব্যাপার।
সেই বটুককে জয়নাল এমন ঘোল খাইয়েছে! রুহানের মনে হল ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করবে একবার।
আলাপ তো করবে, কিন্তু আর-একটা অস্বস্তি মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে রুহানের। ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছে ও। ঠিক মনে করতে পারছে না, কিন্তু কোথায় যেন দেখেছে। মানুষের মুখ চট করে ভোলে না রুহান। কিন্তু এটা কেন যে মনে পড়ছে না! মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি লাগল রুহানের। যেন পরীক্ষায় উত্তর লিখতে বসে সব উত্তরই পেটে আসছে, মুখে আসছে না।
আসলে সত্যিকারের পরীক্ষার সময় তো এমনই হত রুহানের। পড়ি পড়ি করেও মনে পড়ত না সঠিক উত্তর। বা গোটা উত্তরটা লিখল, তারপর শেষের আসল পয়েন্টটা আর মনে এল না। ফলে যা হওয়ার তাই হত। রেজাল্ট ভাল হত না।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর অ্যাডিশনালে বায়োলজি নিয়েছিল রুহান। বাবা চাইত ডাক্তার হোক রুহান। সবাই বলেছিল স্ট্যাটিসটিক্স বা মেক্যানিক্স নিতে। তাতে নম্বর উঠত। আর নাইনে বায়োলজি নিলেই কেউ ডাক্তার হয় না। কিন্তু বাবার ছিল গোঁ। বায়োলজি নিতেই হবে। জয়েন্টে বসতে হলে প্রথম থেকে জীববিদ্যাটা পোক্ত করা দরকার।
কিন্তু বায়োলজি বিশেষ মাথায় ঢুকত না রুহানের। এইসব বিজ্ঞানসম্মত নাম। তাদের ল্যাটিন আর গ্রিক অরিজিন। তাদের শ্রেণি, উপশ্রেণি। কর্ডাটা, নন-কর্ডাটা, ভার্টিব্রেটা থেকে শুরু করে অর্থোপোডা, মোলাস্কা ইত্যাদি হাজারও ফ্যাচাংওয়ালা নামের লিস্টি। ওসব কিছুই মনে থাকত না ওর। ভয়ে ঘাম দিত রুহানের। জিব শুকিয়ে আসত। স্যার পড়া জিজ্ঞেস করলে জিবে যেন গিট দিয়ে দিত কেউ। ও কেবল, ‘ওই যে স্যার…’ ‘মানে স্যার…’ বলত। আসলে উত্তরগুলো আশপাশেই উড়ত ওর, কিন্তু তবু ঠিক ধরতে পারত না। তাই ভাল নম্বরও পেত না রুহান। চিরকালই সেকেন্ড ডিভিশন হয়ে রইল ও।
মাধ্যমিকে চুয়ান্ন শতাংশ নম্বর পেয়েছিল রুহান। রেজাল্ট জেনে বাড়ি ফিরে রুহান দেখেছিল বাবা তাড়াতাড়ি চলে এসেছে অফিস থেকে। অস্থিরভাবে পায়চারি করছে বারান্দায়।
রুহানকে দেখে বাবা জানতে চেয়েছিল, ‘কত? লাইফ সায়েন্স আর অ্যাডিশনাল বায়োলজিতে কত?’
নম্বরটা মাথা নিচু করে বলেছিল রুহান। তারপর আর কিছু স্পষ্ট মনে নেই।
শুধু আছড়ে পড়া বেল্ট। চড়। মাটিতে ফেলে গলা টিপে ধরা। আর কাত হয়ে শুয়ে দেখা দূরে মায়ের শঙ্কিত, বিধ্বস্ত মুখ। এটুকুই মনে আছে। ককাই এসে না ছাড়ালে রুহান বাঁচত কিনা কে জানে!
ককাই, মানে রজত রয়। রুহানের কাকা। রুহানের ঠাকুরদা রুদ্রাংশুশেখর রয়, লেক গার্ডেন্সে ওদের বাড়িটা তৈরি করেছিল। দেওয়াল দিয়ে ঘেরা বাড়িটার সামনে ছোট্ট একটা বাগান রয়েছে। নীচতলায় একজন ভাড়াটে রয়েছে ওদের। আর ওপরের তলাটার দুটো অংশ দুই ভাইয়ের।
এ ছাড়াও রুহানের এক পিসি রয়েছে। বাবা আর ককাইয়ের মাঝের বোন। থাকে সল্টলেকে। পিসেমশাইয়ের বড় ব্যাবসা আছে। লেদার এক্সপোর্টের। তবে পিসিমা বিশেষ আসেটাসে না ওদের বাড়িতে।
এসব নিয়ে বিশেষ ভাবে না রুহান। বাবার মৃত্যুর পর থেকে কোথায় যেন আত্মবিশ্বাসে আরও ঘাটতি হয়েছে রুহানের। জানা প্রশ্ন ভুল করে। বাজারে গেলে দরদাম করার মতো মনের জোর পায় না। বাসে কেউ পা মাড়িয়ে দিলে নিজেই ‘সরি’ বলে সরে আসে। রিকশাওয়ালা চার টাকা বেশি ভাড়া চাইলে মুখ বুজে দিয়ে দেয়। এরকম আরও কত কী!
আসলে বাবা যতই বকুক আর মারুক, রুহান জানত যে, বাবা খুবই ভালবাসে ওকে। বাবাকে দেখলে রুহান আলাদা একটা ভরসা পেত।
মাধ্যমিকের রেজাল্টের পর সেই মার দিলেও, বাবাই উদ্যোগ নিয়ে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে একটা স্কুলে ঠিক সায়েন্স নিয়ে ভরতি করিয়েছিল রুহানকে। প্রতিটা সাবজেক্টের জন্য আলাদা করে টিচার রাখার পরেও নিজে বায়োলজিটা দেখত। লজ্জা লাগত রুহানের। ও ভাবত, বাবা যে এত খাটছে, তার ফল কি দিতে পারবে রুহান? ও তো এখনও সব ভুলে যায়। মনে করতে পারে না পুরো উত্তর। ও তো এখনও বিজ্ঞানসম্মত নামগুলোর বানান ভুল লেখে। এখনও ত্রিকোণমিতির ফরমুলা গুলিয়ে ফেলে। তা হলে? ও যখন পারবে না, তখন বাবা কত কষ্ট পাবে! কিন্তু তারপর বাবার চেষ্টা, আত্মবিশ্বাসী চোখ দুটো আর অধ্যবসায় দেখে ভাবত, না, কিছুই অসম্ভব নয়।
ছোট থেকেই ক্রিকেট খেলত রুহান। ফাস্ট বল করত। ভালই করত বলটা। বাবার অধ্যবসায় দেখে ও পড়ার পাশাপাশি খেলাতেও উৎসাহ পেত। ক্রমশ সব বিষয়েই রুহানের চেষ্টাটা বাড়ছিল। এমনকী, ইলেভেন থেকে টুয়েলভে ওঠার পরীক্ষাতেও ক্লাসের বন্ধুদের, স্যারদের, এমনকী, নিজেকে পর্যন্ত অবাক করে উনষাট শতাংশ নম্বর পেয়েছিল রুহান। এক শতাংশ, মাত্র এক শতাংশের জন্য ফাস্ট ডিভিশন পায়নি।
এক রাতে, বাবা আর মাকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুনেছিল রুহান। তার ভেতর রুহানের নামটা আসছিল দেখে কান পেতেছিল ও।
মা বলেছিল, ‘তোমার এমনিতেই মাঝে মাঝে বুকে ব্যথা করে। তারপর অফিসে এত কাজের চাপ। তাই বলছিলাম, অফিস থেকে এসে আর ছেলেটার সঙ্গে বই নিয়ে বসে শরীরের স্ট্রেন কোরো না।’
‘ধুর, কিচ্ছু হবে না,’ বাবার হাসি শুনতে পেয়েছিল রুহান।
‘তোমায় বলেছে,’ মা রেগে গিয়েছিল সামান্য, ‘ভাল কথা বলছি, এসব থামাও। শরীরের যত্ন নাও। তা ছাড়া ছেলের পিছনে এত যে খাটছ, কী লাভ? যা চাইছ তা যদি না হয়? যদি জয়েন্টে সুযোগ না পায়?’
‘তা হলেও ওর এই চেষ্টাটার কথা তো মনে থাকবে। এই পরিশ্রম, ডিসিপ্লিন আর নিষ্ঠাটার কথাটা তো মনে থাকবে। সেদিন ওকে যে বেল্ট দিয়ে পিটিয়েছিলাম তা কি শুধু রেজাল্ট খারাপের জন্য ভেবেছ? তা নয়, একদম নয়। মাধ্যমিকে ওর নিষ্ঠার অভাব ছিল, পরিশ্রমের অভাব ছিল। ডিসিপ্লিন ছিল না ওর। তাই রাগ করে অমন মেরেছিলাম। পরে ভাবলাম, ও তো ছোট। মেরে কী লাভ হবে? তার চেয়ে যদি ওর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চেষ্টা করি তা হলে অন্তত ছেলেটা বুঝবে। সব সময় চাবুক চালালেই কাদায় বসা ঘোড়ার গাড়ি ওঠে না। কখনও কখনও নিজেকেও কাদায় নেমে হাত লাগাতে হয়। আর দেখলে তো এইচ এস-এর কঠিন সিলেবাসেও পাঁচ পারসেন্ট নম্বর বেড়েছে ওর। দেখো না, আর তো মাত্র এক পারসেন্ট। তা হলেই ফার্স্ট ডিভিশন হয়ে যাবে।’
মাত্র এক শতাংশ। মাত্র। এই ‘মাত্র’টুকুই আর ছুঁতে পারল না রুহান। এই ঘটনার চারদিনের মাথায় বাবা হঠাৎ মারা গেল। দিনটা সোমবার ছিল। জুনের মাঝামাঝি। গরমে কলকাতার খুলি ফুটো করে ধোঁয়া উঠছিল যেন। রাস্তায় পিচ গলে বাব্লগামের মতো লেগে যাচ্ছিল জুতোর তলায়। গরম একটা হাওয়া পাক খেয়ে উঠছিল থেকে থেকে।
এর ভেতর বাবা হাঁটছিল। বাস না পেয়ে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের অফিস থেকে হেঁটে ফিরছিল মানুষটা। ফুলবাগানের কাছে এসে আর পারেনি। বসে পড়েছিল রাস্তার পাশের একটা দোকানের সিঁড়িতে। আর ওঠেনি।
বাবা ওঠেনি। রুহানও আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ও আবার নেমে গিয়েছিল পঞ্চাশে। নিষ্ঠা, পরিশ্রম, ডিসিপ্লিন সব জট পাকিয়ে গিয়েছিল মাথায়। মায়ের নামে এমআইএস, বাবার পেনশন আর একতলার ভাড়াটেদের ভাড়ার ভাগ নিয়ে হাঁটতে থাকা সংসারটা যেন হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছিল। উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে কলেজে বি এসসি পাস কোর্সে ভরতি হয়েছিল রুহান। বুঝেছিল, আর কিছু হবে না ওর জীবনে। এবার যদি খেলে একটা চাকরি-বাকরি কিছু জোটে।
কিন্তু তাও তো জুটল না। এটা-ওটা হাবিজাবি কাজ করতে করতে কোত্থেকে যে বয়সটা তিরিশ ছুঁয়ে ফেলল কে জানে! তেমনভাবে কিছুই শেষ করা হল না রুহানের। এমনকী নন্দার সঙ্গে সম্পর্কটাও শেষ করা হল না।
আজ দূরে থেকে জয়নালের বোলিং দেখতে দেখতে খুব ভাল লাগল রুহানের। বহু দিন আগে শোনা বাবার কথাগুলো মনে পড়ে গেল আবার। মনে পড়ে গেল পরিশ্রম, ডিসিপ্লিন আর নিষ্ঠা। রুহান বুঝল জয়নাল ছেলেটির ভেতরে তিনটেই আছে। তবে কতদিন থাকে, সেটাই দেখার।
ডান পা-টা প্লাস্টিকের নিচু টুলটার ওপর থেকে মাঠের ওপর নামিয়ে পিছনে ঘুরল রুহান। আঃ, ব্যথা লাগল! ব্যথাটা গিয়েও যাচ্ছে না। এখনও ভোগাচ্ছে। পা ফেলতে, টানতে কষ্ট হচ্ছে। দৌড়োনো তো দূরের কথা। কবে ভাল করে হাঁটতে পারবে কে জানে! আদৌ পারবে তো কোনওদিন?
হঠাৎ খুব অসহায় লাগল রুহানের। কলকাতায় একজন মানুষও নেই যার কাছে গিয়ে নিজের কষ্টের কথা, যন্ত্রণার কথা বলতে পারে! আর যে ছিল সে তো কলকাতায় থাকে না এখন। তীব্র এক কলঙ্ক নিয়ে সে তো মাথা নিচু করে চলে গেছে কলকাতা ছেড়ে। এখনও রুহান ওই নীল চোখ দুটো দেখতে পায়। এখনও নীল চোখ দুটো ওকে ভরসা জোগায়।
‘কী রে শালা, এতদিন পর মাঠের কথা মনে এল?’ নির্ভুলভাবে গলাটা চিনতে পারল রুহান। জগুদা।
ও আবার পিছনে ঘুরল, ‘আরে জগুদা। কেমন আছ?’
‘তুই কেমন আছিস বল! আর তোর হাঁটুটা?’
‘এই আছে, স্লো রিকভারি হচ্ছে। কবে মাঠে নামতে পারব ভগবান জানে!’
‘তা ভগবান তো সবই জানে। কিন্তু মুশকিল কী জানিস, ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে কোনও ইনফরমেশন শেয়ার করেন না। বহুত খিটকেল পাবলিক। ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার, লোকটা জানে। তাই অন্যের হাতে দেয় না সেই পাওয়ার। পাছে তার গুরুত্ব হারায়!’ জগুদা হাসল।
সাদা টি-শার্ট আর প্যান্ট পরা মানুষটার মুখটা ভাল করে দেখল রুহান। না, এগারো বছরে, মাথায় চুলের রঙের চেয়ে আর বেশি কিছু পালটায়নি। জগুদা রয়েছে জগুদাতেই।
কলেজের ফার্স্ট ইয়ারেই কলেজ টিমে চান্স পেয়ে গিয়েছিল রুহান। তার আগে লেকের মাঠে একটা ছোট্ট কোচিং সেন্টারে ক্রিকেটটা শিখত ও। কলেজের ট্রায়ালে ওই শেখাটা কাজে লেগেছিল।
ফাস্ট বল করত রুহান। খুব বেশি লম্বা নয় ও। এই পাঁচ ফুট সাত আর কী। তাই কলেজের ট্রায়ালে বল হাতে লম্বা রান-আপ নিচ্ছিল যখন, স্যার অবাক হয়েছিলেন, ‘তুমি মিডিয়াম পেসার?’
‘না স্যার, আমি ফাস্ট বল করি।’
ট্রায়ালে কলেজের নামকরা এক সিনিয়র ব্যাটসম্যানকে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল রুহান। তবে সে রাগ করেনি। এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘তোর ল্যাটেরাল মুভমেন্ট খুব ভাল তো! তা আমাদের এখানে তো ঠা ঠা পোড়া রোদে সারাদিন খেলা হয়। এই পেসে বল করে যেতে পারবি তো?’
তা পারত রুহান। ওটাই একমাত্র পারত ও। ওই লাল চেরি ফলের মতো বলটা নিয়ে যখন বোলিং রান-আপ থেকে দৌড় শুরু করত, মনে হত এটাই ওর জীবন। বলের সেলাইয়ের ওপর আঙুল দিয়ে গ্রিপ করে ভাবত, এভাবে, ঠিক এভাবেই ও ধরতে চায় জীবনকে। তারপর সামনে দাঁড়ানো ব্যাটসম্যানের দিকে বলটা করার সময় ও ওর সমস্ত ব্যর্থতা, অপমান আর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ভরে দিত বলটার মধ্যে। চেরি ফলটা রুহানের হাত থেকে বেরোবার পরে পালটে যেত উত্তপ্ত লোহার গোলায়।
এমনই একটা সময়ে কলকাতার একটা নামকরা কলেজের সঙ্গে খেলা ছিল ওদের কলেজের। প্রথমে ব্যাট করে রুহানদের কলেজ খুব অল্প রানে গুটিয়ে গিয়েছিল। লাঞ্চ ব্রেকের সময় সব প্লেয়াররা মাথা নিচু করে বসে ছিল শামিয়ানার নীচে। সেমিফাইনাল ছিল ম্যাচটা। হারলে ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা শেষ। স্যার বলেছিলেন, পরের বছরে আবার চেষ্টা করা যাবে। কেউ যেন মনখারাপ না করে।
পরের বছর, পরের বার। সব পরে। মাকে মাংস করতে বললে মা বলে পরের রোববার। জুতো ছিঁড়ে গেছে বললে, পরের মাসে কেনার কথা বলে। কলেজ থেকে ঘুরতে যাওয়ার কথা হলে মা বলে, এবার না, পরের বার। সব পরে হবে। এই বারের জন্য কিচ্ছু নয়! এই জীবনের জন্য কিচ্ছু নয়! তা হলে এই জীবন কীসের জন্য? মাসের পর মাস নিরামিষ ঘাসপাতা চিবোনোর জন্য? ছেঁড়া জুতো পরে হাঁটার জন্য? কলেজের বন্ধুদের ঘুরতে যাওয়ার সময় স্টেশন অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য? অন্যের সাফল্যে হাততালি দেওয়ার জন্য? এ জন্ম শুধু হাসিমুখে কখন পরের বার আসবে তার অপেক্ষায় থাকার জন্য?
স্যার বলেছিলেন, পরের বার হবে। বলেছিলেন, দুঃখ না করতে। মনখারাপ না করতে। বলেছিলেন, সব বার সবাই পারে না। পরের বার চেষ্টা করা যাবে। মাথা ঠান্ডা রাখতে বলেছিলেন স্যার।
প্রথম ওভারের প্রথম চারটে বলে চারটে চার খেয়েছিল রুহান। তার পরের বল দুটো ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ্য করে করেছিল। রান হয়নি। ব্যাটসম্যানটি ওভারের শেষে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘উই উইল ক্রাশ ইউ। দশ ওভারে খেলা শেষ করে দেব।’
‘মানে?’ টুপি হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল রুহান।
‘শালা, মানে বোঝো না? দেব এবার তোদের।’ ব্যাটসম্যান ছেলেটি হাত দিয়ে অশালীন ইঙ্গিত করেছিল।
রুহানের সারা শরীরের রক্ত জমাট বেঁধেছিল মাথায়। ও একদৃষ্টে তাকিয়েছিল ব্যাট হাতে ছেলেটির দিকে। গন্ডগোল এড়ানোর জন্য রুহানের টিমের একজন সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রুহানকে।
ডিপ থার্ডম্যানে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিল রুহান। খেলায় হার-জিত আছেই, তা বলে এভাবে বলবে? কাছেই রুহানদের টিমের শামিয়ানা টাঙানো ছিল। রুহানকে বাউন্ডারি লাইনে এসে দাঁড়াতে দেখে স্যার এসে দাঁড়িয়েছিলেন কাছে। বলেছিলেন, ‘মাথা গরম করছিস কেন? যে যা বলছে বলুক। কান দিবি না। এবার না-ই পারলাম জিততে। পরের বার না হয় জিতব।’
পরের বার! কেন সব কিছু পরের বার হবে? রুহান চোয়াল শক্ত করে নিয়েছিল।
বল হাতে নিজের দ্বিতীয় ওভার করতে যাওয়ার সময় একবার আকাশের দিকে তাকিয়েছিল রুহান। বিবেকানন্দ পার্কের পাশের বড় বড় গাছগুলোর মাথার ওপর সূর্যটা নতুন মোহরের মতো চকচক করছিল। লেকের দিক থেকে কোনাকুনি হাওয়া বইছিল একটা। বিকেলবেলার ভিড় ধীরে ধীরে বাড়ছিল মাঠের পাশে।
বলটা হাতে নিয়ে দৌড়োনোর সময় রুহানের মনে হয়েছিল পরের বার বলে কিছু নেই এ-জীবনে। আসলে একটাই জীবন। একটাই সুযোগ। ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।
পপিং ক্রিজের কাছে গিয়ে লাফিয়ে উঠেছিল রুহান। না হওয়া থেকে হওয়ার দিকে ছিল সেই লাফ। মাটি থেকে সূর্যের দিকে ছিল সেই লাফ। পরের বারের থেকে এবারের দিকে ছিল সেই লাফ।
একা ছ’টা উইকেট নিয়ে বিপক্ষকে একরকম ধ্বংস করে দিয়েছিল রুহান। ম্যাচ শেষে স্যার জড়িয়ে ধরলে রুহান বলেছিল, ‘স্যার, পরের বার বলে কিছু হয় না। যা করতে হবে এবার করতে হবে।’
ফাইনালেও পাঁচ উইকেট নিয়ে টিমটাকে জিতিয়েছিল রুহান। ম্যান অফ দ্য ম্যাচের হাজার টাকা নিয়ে কিট গুছিয়ে যখন মাঠের বাইরে বেরিয়ে আসছে ঠিক তখনই একজন লম্বা দোহারা চেহারার মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে। ডান হাতটা বাড়িয়ে হেসে বলেছিল, ‘হ্যালো, আজ খুব ভাল খেলেছ। আমার দারুণ লেগেছে। তুমি কি কোনও ক্লাবে খেলো?’
‘আমি?’ লোকটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করেছিল রুহান।
‘হ্যাঁ, তুমি, খেলো নাকি অন্য কোনও ক্লাবে?’
‘না, মানে, তেমন কিছু নয়। এক জায়গায় জাস্ট প্র্যাকটিস করি।’
‘তা খেলবে আমাদের ক্লাবে?’
‘আপনাদের ক্লাবে?’ রুহান কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘হ্যাঁ, স্টার ইউনিয়ন।’
‘আপনি কে বলুন তো?’
লোকটি হেসেছিল খুব। তামাটে লম্বা মুখটায় বাচ্চাদের মতো আনন্দ দেখেছিল রুহান। লোকটি বলেছিল, ‘আমার নাম জগন্ময় মিত্র। তবে ময়দানে সবাই আমায় জগুদা বলে।’
‘তা রুহান, এতদিন মাঠে আসিসনি কেন রে?’ জগুদা জিজ্ঞেস করল।
‘এই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। তার ওপর মায়ের শরীরটা এত খারাপ ছিল যে, বাড়ি থেকে বেরোতেই পারিনি। জানোই তো, মায়ের বাতের ব্যাপারটা এমন হয় যে…’
জগুদা মাথা নাড়ল। পকেট থেকে সিগারেট বের করে বলল, ‘তা অফিস করছিস তো? নাকি সেখানেও ডুব দিয়েছিস?’
রুহান মাথা নিচু করল। গত দশ দিন অফিস যেতে পারেনি। একদম, কোনও কিছু না জানিয়েই যায়নি। তবে একবার অফিসে ফোন করেছিল মাত্র।
জগুদা সিগারেটটা ধরিয়ে অনেকখানি ধোঁয়া বুকের ভেতর নিল। চোখ বন্ধ করে ধোঁয়াটাকে ধরে রাখল খানিক। তারপর বলল, ‘এমন চিরক্যালানে হয়ে থাকলে চলবে? দেখ, সুখেনদা তোকে এই চাকরিটা দিয়েছেন। জানি খুব সামান্য কাজ। তবু এ বাজারে চাকরি তো! তা, সেখানেও লাফড়া করছিস! যে-রুহানকে প্রথম খেলার মাঠে দেখেছিলাম, সেই ছেলেটা কোথায় গেল? তোর কী হয়েছে বল তো? জানিস তো তোদের কোম্পানির অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। তার ওপর এমন কামাই করলে কিন্তু বিপদে পড়বি।’
রুহান জানে কোম্পানি খুব একটা ভাল চলছে না। ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সুখেন বোস রুহানকে পছন্দ করেন। গত বছর একটা ক্যুরিয়র কোম্পানি থেকে চাকরি গিয়েছিল রুহানের। তখন সুখেনদাই এই কনসালটেন্সি ফার্মে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ওকে।
এই কোম্পানিটা বড় বড় স্টিল ফ্যাক্টরির কনসালটেন্সি করে। কিন্তু এই বাজারে অনেক কোম্পানির মতো রুহানদের ফার্মেরও অবস্থা ভাল নয়। গত মাসেই চারজনকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই জগুদা ঠিকই বলছে। রুহানের হঠাৎ গা শিরশির করে উঠল।
জগুদা বলল, ‘আচ্ছা আগে তো তুই খেলার মাঠে অন্তত চাগিয়ে থাকতি। গত মরশুমের থেকে দেখছি মাঠেও তোর কেমন ঢিলে অবস্থা। কেন বল তো?’
মাথা নামাল রুহান। কী যে বলবে ও! সব কথা কি আর জগুদাকে বলা যায়! নিজের অন্যায়ের কথা আর বলে কী করে ও?
রুহান হাসল, ‘এই বাড়ির নানা সমস্যা। চাকরির চাপ। তার ওপর ইনজুরি। আর মন ভাল থাকে, বলো? আর তো প্রথম টিমেও চান্স পাই না।’
‘খেলিস আর মন দিয়ে? যে, পাবি!’ জগুদা রাগের গলায় বলল, ‘যখন তোকে প্রথম দেখেছিলাম কী বল করতিস! বড় একটা জুতোর কোম্পানিতে চাকরিও তো পেলি। কিন্তু রাখতে পারলি কাজটা! জুতোর সোলগুলো টিফিন বাক্সে লুকিয়ে কেন বাইরে আনতে গিয়েছিলি তুই? চাকরিটা খোয়ালি। স্টারও তোকে লাথি মেরে বের করে দিত, যদি না সুখেনদা তোকে বাঁচাতেন। তুই এমন চুরি-ছ্যাঁচড়ামো করবি ভাবিনি কোনওদিন।’
‘ও, সেই কথা তুমি এখনও তুলছ!’ রুহানের খারাপ লাগল, ‘টিফিন বাক্সটা আমার ছিল না জগুদা। অন্য একজনের ছিল। তার ডাবল শিফ্ট ডিউটি ছিল বলে বলেছিল যে, বাড়ি যাওয়ার পথে যেন টিফিন বক্সটা বাড়িতে দিয়ে যাই। আমি কী করে জানব ওর ভেতর দিয়ে জুতোর সোল বাইরে পাচার করছে?’
‘আরে সে তো তুই সবসময় বলিস। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে? তুই গাধা বলে তোর এই দশা!’
‘তা বলে তুমি এমন বলবে?’ রুহানের গলাটা বুজে এল।
জগুদা সিগারেটটা শেষ করে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষল। তারপর বলল, ‘যাক গে, সবাই কী ভাবল গুলি মার। এই চাকরিটা ভাল করে করিস আর পায়ের যত্ন নিস। না হলে কষ্ট বাড়বে। আরও এক-দু’ বছর খেলা আছে তোর।’
জগুদা চলে গেল নেটের অন্য দিকে। প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসল রুহান। সাড়ে দশটা বাজে। আজ ও ক্লাবে এসেছে মূলত ব্রজদার ডাকে। ব্রজদা ক্লাবেরই এক কর্মকর্তা। গতকাল ফোন করেছিল রুহানকে। বলেছিল একটু দরকার আছে। যেন দেখা করে।
ব্রজদা হল সেই ধরনের মানুষ যে, নিজের যে-কোনও কাজে অন্যকে ভিড়িয়ে নিতে পারে। কিন্তু রুহান বুঝছে না ও কী কাজ করে দিতে পারে! ব্রজদাকে মনে মনে খুব একটা পছন্দ করে না রুহান। কিন্তু গত চার মাস ক্লাবের থেকে কোনও টাকা পায়নি। মাসে চার হাজার টাকা করে ক্লাব দেয় রুহানকে। অন্যরা অনেক বেশি পেলেও রুহান যা পায় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। ভাবে, সত্যিই তো কী আর এমন খেলছে যে, বেশি টাকা পাবে! ক্লাব এই যে দেয়, এটাই বেশি।
আজ আগস্টের শেষ দিন। ওদের অফিসে দু’ধাপে মাইনে হয়। চোদ্দো তারিখ আর একত্রিশ তারিখ। আজ এখান থেকে কাকিমার বাপের বাড়ি যাবে একবার তারপর অফিসে ঢুঁ মারবে। মাইনেটা নিতে হবে তো!
‘কী রে, কতক্ষণ এসেছিস?’ পিছন থেকে ব্রজদার গলা পেল রুহান।
ও ঘুরে দাঁড়াল, ‘এই তো খানিকক্ষণ।’
‘তা, কী খবর তোর? টাকাপয়সা লাগবে না? চার মাস পেমেন্ট পাসনি তো?’
অবাক হল রুহান। ভূতের মুখে রাম নাম! ব্রজদার ধান্দাটা কী?
ব্রজদা বলল, ‘হ্যাঁরে, তোর পা কেমন আছে? ক’দিনে সেরে উঠবি মনে হয়?’
রুহান মাথা নাড়ল, ‘জানি না ব্রজদা, ফিজিয়োথেরাপি করাচ্ছি, দেখি কী হয়?’
‘আচ্ছা শোন’, ব্রজদা একটা লাল প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে এনে সামনে রাখল, ‘তোর সেই বন্ধুটির খবর কী বল তো?’
‘কোন বন্ধু? আবেশ?’ রুহান জানতে চাইল।
আবেশ গোস্বামী, রুহানের কলেজবেলার বন্ধু। খেলাধুলোয় যথেষ্ট আগ্রহ আছে ওর। রুহানের সঙ্গে মাঠেও এসেছে বেশ কয়েকবার। আর নিজের অদ্ভুত মিশতে পারার গুণে সবার সঙ্গে আলাপও করে গেছে।
‘ওই যে ফরসা, খুব সুন্দর দেখতে। খাড়া নাক। আরে বুঝতে পারছিস না? আচ্ছা গাধা তো তুই! ওই যে রে তোর বন্ধুটা। যার নীল রঙের চোখ!’
‘ও!’ রুহান চোয়াল শক্ত করল। খুব অপ্রিয় একটা বিষয় ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
‘কোথায় রে ছেলেটা? একদিন তো মাঠে নিয়ে এসেছিলি। হ্যাঁরে, ও তো ব্রাহ্মণের ছেলে। বিয়ে করবে না? যতদূর মনে পড়ে ওর সঙ্গে আলাপের পর জানতে পেরেছিলাম যে, বিয়ে হয়নি। কী রে, ও বিয়ে করবে?’
‘অ্যাঁ?’ ঘাবড়ে গেল রুহান, ‘তা আমি বলব কী করে?’
‘তোর বন্ধু, তুই জানিস না?’
‘বন্ধু ঠিক নয়। আমার চেয়ে প্রায় তিন বছরের বড়। তবে ও আর কলকাতায় নেই। ওসব চিন্তা ছাড়ো ব্রজদা। ওর কেস প্রচুর খিটকেল।’
‘যাঃ!’ ব্রজদা মাথা নাড়ল, ‘শালা, আমার কপালটাই খারাপ।’
ব্রজদার তিন রকমের ব্যাবসা আছে। মিষ্টির দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি আর বিবাহ বন্ধনীর অফিস। তিনটে ব্যাবসাই ভাল চলে। তবু ব্রজদার কথায় কথায় কপাল খারাপের ব্যাখ্যাটা ঠিক বোঝে না রুহান।
‘বাদ দে,’ ব্রজদা পকেট থেকে রুমাল বের করে তালের মতো মুখটা মুছল, ‘ওঃ, শালা পচা ভাদুরে গরম। যা অবস্থা না! তা শোন না, তোর কাকার ডেকরেটিং-এর ব্যাবসা আছে না?’
‘আছে।’ রুহান বলল, ‘কাকার তো ওটাই ব্যাবসা। তা কোনও বিয়ে ফিয়ে আছে নাকি?’
‘ক্যালানে নাকি? ভাদ্র মাসে বিয়ে? আমার ছোট ভাই, লেক গার্ডেন্সেই থাকে। ছেলের জন্মদিন। সেপ্টেম্বরের দশ তারিখ। প্যান্ডেল ফ্যান্ডেলগুলো করে দিতে হবে। কী, পারবি তো? খুব ইম্পর্ট্যান্ট কাজ কিন্তু!’
‘তা এত ডেকরেটার থাকতে আমায় কেন?’
‘সামনে পুজো সবাই বাঁশ-ত্রিপল অন্য জায়গায় ইউজ করে ফেলেছে। তাই তোকে বললাম, ডোবাসনি ভাই! প্রেস্টিজ প্যাংচার হয়ে যাবে।’
রুহান বলল, ‘আরে আমি কী করতে পারি বলো? কাকাকে বলি। দেখি, যদি কাকা পারে। তা বাড়ি ভাড়া নিলেই তো মিটে যায়।’
‘তুই তো ওখানেই থাকিস! ভেতর দিয়ে লর্ডসের মোড়ের দিকে যেতে হলে একটা মাঠমতো পড়ে না? তার পাশের বিরাট বড় বাড়িটাই তো ভাইয়ের। মানে ভাইয়ের ঠিক নয়। ওর শ্বশুরের। ভদ্রলোক মারা যাওয়াতে একমাত্র মেয়েকে সব দিয়ে গেছেন। শাশুড়ি তো আগেই ছিল না। ফলে এখন ভাইয়ের একচ্ছত্র রাজত্ব। ভেতরে একটা লন আছে। দেখলে চোখ ট্যারা হয়ে যাবে। শালা, আমার যদি এমন এক পিসশ্বশুর থাকত!’ ব্রজদা এমন মুখ করল যেন পারলে এখনই একটা অমন শ্বশুর ধরে আনে।
ব্রজদা আবার বলল, ‘শ্বশুরের টাকায় বড়লোক হওয়ার যে কী মজা, কী করে তুই বুঝবি?’
কথাটার ভেতরের বিদ্যুৎটা আলতো করে রুহানের বুকটা ছুঁল আর তার ফলে আঁতকে উঠল ও। শ্বশুরের পয়সায় বড়লোক? ও যত এইসব থেকে পালাতে চায় ততই যেন এই প্রসঙ্গ ধাওয়া করে ওকে। চেপে ধরে।
রুহান নিজে কষ্টের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে বলল, ‘যাক গে, বাদ দাও। কাকাকে বলছি, দেখি যদি পারি।’
‘দেখি বললে তো হবে না। কাজটা করে দিতে হবে। বাড়ির ভেতরের লনে শামিয়ানা টাঙিয়ে প্যান্ডেল হবে। তুই নিজে যাবি কিন্তু।’
‘আমি?’ রুহান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
ব্রজদা হাসল, ‘শোন, এটা তুই যেভাবেই হোক কর। আমি ভাইকে কথা দিয়ে দিয়েছি। আর না করিস না। তা ছাড়া…’
‘কী তা ছাড়া?’ অবাক হল রুহান।
‘চার মাসের বকেয়া পেমেন্টের সঙ্গে এক মাসের বোনাসও দিয়ে দেব। বুঝলি? কিন্তু অনুষ্ঠানের পর। আগে নয়।’
বোনাস? ব্রজদার কথাটা খট করে কানে লাগল রুহানের। হঠাৎ বোনাস? ও তো খেলতে পারছে না। এমন যদি হত যে, দারুণ খেলে টিমকে জিতিয়েছে তা হলে কর্মকর্তারা বোনাসের কথা বলে। এখানে তো তেমন ব্যাপার নেই। চার মাসের টাকা ওর প্রাপ্য, বোনাসটা ভাল শোনাচ্ছে না। কাজটা করার পরিবর্তে টাকা! একটা সূক্ষ্ম অপমান লাগছে রুহানের। অবশ্য এমন টুকটাক অপমান এখন অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গেছে রুহানের। বাইরের লোক তো বাইরের লোক, মা নিজেই কত কথা শোনায়!
আগে কিন্তু মা এমন ছিল না। বরং শান্তশিষ্টই ছিল। রুহানের সব ব্যাপারে খেয়াল রাখত। ইদানীং ব্যাপারটা আর তেমন নেই। বিশেষ করে গত এক বছর ধরে মা যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। সবসময় তেতো মুখে ঘুরে বেড়ায়। হয় কী নয় রুহানকে যা নয় তাই বলে অপমান করে। বাবার মৃত্যুর এত বছর পর মায়ের হঠাৎ মনে হয়েছে যে, বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী রুহান। কেন মনে হয়েছে ও জানে না, কিন্তু আজকাল হয় কি নয় মা বলে, ‘তোর বাবা বেঁচে থাকলে আমায় কি এমন দিন দেখতে হত? তোর জন্য, শুধু তোর জন্য তোর বাবা আজ নেই।’
আসলে বাবার পেনশন, ভাগের বাড়িভাড়া আর রুহানের সামান্য রোজগারে সংসার চালাতে মায়ের কষ্ট হয়। এটা রুহান বোঝে আর এটাও বোঝে যে, পাশাপাশি ককাইয়ের ব্যবসায় গত এক বছর যাবৎ উন্নতি হয়েছে বেশ। ককাইয়ের ছেলে রাজাও ভাল চাকরি পেয়ে বিদেশ চলে গেছে। কম্পিটিশন, মা কম্পিটিশনে কোথায় জানি হেরে যাচ্ছে বলে মনে হয় রুহানের। আর তাই তার শোধ তোলে রুহানের ওপর।
ককাইয়ের প্রথম জীবনে বাবা প্রচুর করেছে ককাইয়ের জন্য। পড়াশোনোয় ভাল ছিল না ককাই। ফেলটেলও করেছে কয়েকবার। বিএ-টাও কমপ্লিট করেনি। তখন বাবাই টাকাপয়সা দিয়ে এই ডেকরেটিং-এর ব্যাবসাটা শুরু করায় ককাইকে।
কিন্তু সব শুরুই তো কারও না কারও হাত ধরেই হয়। ককাইয়েরও হয়েছে। তা বলে সারা জীবন কি তার পায়ে মাথা ঠেকাতে হবে নাকি? তাও ককাই আর কাকিমা অনেক করে রুহানদের জন্য। আর প্রায় সবসময় বলে যে, ‘দাদা না থাকলে আমাদের যে কী হত!’
রুহান ভাবে আর কী করতে পারে ককাই? মাথাটা কেটে তো আর মায়ের পায়ে রাখতে পারে না! আর বাবা ব্যাবসা শুরু করিয়ে দিলেও এখনকার এই সাফল্যের কৃতিত্ব গোটাটাই ককাইয়ের নিজের।
আর কোথায় যেন এটাই ঠিক মানতে পারে না মা। রুহান দেখে কীরকমভাবে পদে পদে ককাই আর কাকিমার দোষ ধরে মা। রুহানের বিরক্ত লাগে। মাঝে মাঝে লজ্জাও। মাকে বলেও সে কথা। কিন্তু মা আমলই দেয় না। বরং উলটে রুহানকে বলে, ‘তোকে অত ওদের ধামা ধরতে হবে না। জানিস তো না কীভাবে তোর বাবার টাকার শ্রাদ্ধ করেছে ওরা। আর আমাকেই এখন ভিক্ষে করতে হচ্ছে।’
ভিক্ষে মোটেও করতে হয় না মাকে। রুহান জানে এখন মায়ের বাড়িয়ে বলা স্বভাব হয়েছে। কিন্তু সেটাকে যে কীভাবে রুহান সামলাবে তা ঠিক বুঝতে পারে না। তা মায়ের খারাপ ব্যাবহারটাকে সামাল দেওয়ার জন্য ককাই আর কাকিমার ফাইফরমাস খেটে দেয় রুহান।
এই আজই তো একটা কাজ নিয়ে বেরিয়েছে কাকিমার। এখন মাঠ থেকে যেতে হবে নিউ মার্কেটের ওখানে। কাকিমার বাপের বাড়িতে। তবে এই ব্যাপারটা মা জানে না। জানলে অশান্তির শেষ রাখবে না। কাকিমাও তাই প্রথমে রুহানকে যেতে বলেও পরমুহূর্তে নিষেধ করেছিল। বলেছিল, ‘রুহান, তুই যাস না। দিদি জানলে আবার অশান্তি করবে।’
রুহান হেসেছিল, ‘বাদ দাও তো। আর জানবে কেমন করে? তুমিও বলবে না, আমিও বলব না। ফলে সব ঠিক আছে।’
কাকিমা বলেছিল, ‘আসলে বুকুটা এতদিন পরে বিদেশ থেকে ফিরল। তাই ওর জন্য ছানাভাপা করেছিলাম।’
‘তুমি দাও না, আমি দিয়ে আসব।’ রুহান একরকম জোর করেই টিফিন বাক্সটা কেড়ে নিয়েছিল কাকিমার কাছ থেকে।
কাকিমার প্রেশারটা বেড়েছে কিছুদিন হল। গত পরশু তো পড়েও গিয়েছিল। ডাক্তার বলছে কমপ্লিট বেড রেস্ট। কিন্তু কোনও মহিলা কবে ডাক্তারের কথা শুনেছে? কাকিমাও শোনেনি। বরং নিজের খুড়তুতো ভাইটির জন্য রান্না করেছে নিজে।
খুড়তুতো ভাই বুকু। মানে বুকুদা। পুরো নাম বিনয়কৃষ্ণ বোস। প্রায় সারা জীবনই হস্টেলে হস্টেলে কাটিয়েছে বুকুদা। তবে ছুটিছাটায় কলকাতায় এলে খুব আসত রুহানদের বাড়ি। তখন খুব আড্ডা দিত, ইয়ারকি মারত রুহানের সঙ্গে। এমনকী পাড়ায় ক্রিকেটও খেলত। রুহান খুব ভক্ত ছিল বুকুদার। তবে একসময় আসা বন্ধ করে দেয় বুকুদা। তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে, ম্যানেজমেন্ট পাশ করে সোজা বিদেশে চলে গিয়েছিল। মাঝখানে শুধু একবার এসে বিয়ে করে আবার চলে গিয়েছিল বউ সমেত। না, বিয়েতে যেতে পারেনি রুহান। তখন খেলতে অসম গিয়েছিল। তবে ফিরে এসে কাকিমার কাছে গল্প শুনেছিল বিয়ের। বর-বউয়ের ছবিও দেখেছিল। খুব মিষ্টি দেখতে বুকুদার বউকে। নামটাও খুব অদ্ভুত। জিয়ানা। নামের অর্থ কী কে জানে! বিয়ের পরে বিদেশ চলে গেলেও প্রথম প্রথম দু’বছর অন্তর মাসখানেকের জন্য আসত বুকুদা। তবে রুহানদের বাড়িতে আসত না। কাকিমা দেখা করতে যেত আর গল্প বলত এসে। বুকুদার সব ব্যাপারেই মুগ্ধ কাকিমা খুব প্রশংসা করত ওদের। তারপর বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় রুহান শুনল একটা মেয়ে হয়েছে বুকুদার। আর তারপরই বন্ধ হয়ে গেল বুকুদার আসা। কাকিমা বলত, ‘চাপ, খুব কাজের চাপ। বুকু উন্নতি করছে খুব।’ বলত, ‘বুকুর বউটাও খুব ভাল হয়েছে, কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেছে। চাকরিও পেয়েছে ওখানে। ওরা একদম মেড ফর ইচ আদার। আচ্ছা, রুহান তুই বিয়ে করছিস না কেন রে? সারা জীবন এমনই থাকবি?’
রুহান হাসত কাকিমার কথায়। কিচ্ছু বলত না। কার কথা বলবে? কী কথা বলবে? ওর রোজগারে বিয়ে করা যায় নাকি এই বাজারে? তা ছাড়া নন্দার ব্যাপারটা তো এখনও…
কত বছর হল বুকুদার বিয়ের? তা প্রায় আট-ন’ বছর তো হবেই। বহু বহু দিন পরে আজ বুকুদার বাড়িতে যাবে রুহান। বুকুদার সামনে দাঁড়াবে। কিন্তু আড্ডা হবে কি? না, হবে না। রুহান জানে আড্ডা হবে না একদম। আচ্ছা, বুকুদা চিনতে পারবে তো ওকে? সেই কুড়ি-একুশ বছর বয়সের বুকুদা এখন চল্লিশ। কোথা দিয়ে কেটে গেল দু’দশক? সম্পর্ককে কীভাবে চিরে দিয়ে চলে যায় সময়?
বুকুদা এখানেও খুব বড় চাকরি নিয়ে এসেছে। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির পঁচিশ-তিরিশ তলা মতো উঁচু পোস্টে আছে। কাকিমার কাছে ছবি দেখেছে বুকুদার। কাঁচা-পাকা চুল। মোটা গোঁফ। সেই পাতলা দোহারা ছেলেটার জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে মোটাসোটা একটা মানুষ। শুধু ঠোঁটের তিলটা একইরকম রয়ে গেছে।
আজ বুকুদার ছুটি। কে জানে কেন ছুটি নিয়েছে! রুহান শুনেছে বুকুদার বউও বড় চাকরি করে এখন। তবে যেহেতু এদিকে আসেনি কোনওদিন, রুহানের সঙ্গেও আলাপ নেই। আজ দেখা যাক আলাপ হয় কিনা।
পায়ের চোটটা ভালই রয়েছে। আজ আর এই অফিস টাইমের ভিড় ঠেঙাতে পারবে না। ক্লাব থেকে বেরিয়েই রুহান ট্যাক্সি ধরল একটা। আজকাল অল্প দূরত্ব হলেও ট্যাক্সিওয়ালারা ‘না’ করে না। তা ছাড়া নিউ মার্কেট চত্বর থেকে নতুন ভাড়া পেতেও সমস্যা হবে না।
কাকিমাদের বাপের বাড়িটা পুরনো হলেও এখনও একটুও জীর্ণ হয়নি। কাকিমার বাবারা চার ভাই। চারজনের জন্য চারটে তলা বরাদ্দ। বুকুদার বাবা নেই। মা আছে। তবে প্যারালিসিস হয়ে গেছে এক দিকে। সঙ্গে সর্বক্ষণের আয়া থাকে। এ বাড়িতেই এসে উঠেছে বুকুদারা। রুহান শুনেছে যে, বুকুদা কোম্পানি থেকে একটা এলাহি ফ্ল্যাট পেয়েছে নিউটাউনে। কিন্তু যায়নি। কারণ জিয়ানার কষ্ট হবে নিউটাউন থেকে ক্যামাক স্ট্রিটে ওর অফিসে রোজ যাতায়াত করতে। তা ছাড়া বুকুদার মেয়েকেও নামকরা একটা স্কুলে ভরতি করা হয়েছে যেটা এই বাড়ি থেকে বেশ কাছে।
ট্যাক্সি থেকে নেমে বুকটা একটু কাঁপল রুহানের। কেন কাঁপল? বহু দিন পরে বুকুদার সামনে দাঁড়াবে বলে? নাকি এমনি এমনি, রুহানের যেমন আচমকা ভয় লাগে, তেমনই হচ্ছে?
বাড়িটা উঁচু। কাঠের সিঁড়ি বসানো। একতলা থেকে আর-এক তলায় উঠতে প্রায় দু’সপ্তাহ সময় লাগার মতো অবস্থা হয়। সিলিং দেখলে মনে হয় কোনও ঐতিহাসিক মনুমেন্টের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে। তবে বাড়ি দেখলে বোঝা যায় যে, কাকিমার বাপের বাড়ির অবস্থা খুবই ভাল। নেহাত ককাইয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে, না হলে ওদের মতো বাড়িতে কাকিমার জীবন কাটে নাকি? কিন্তু কাকিমার কোনও অহংকার নেই। রাগ নেই। সবসময় হাসিখুশি।
বাড়ির একতলায় কাকিমার বাবা-মা থাকেন। প্রথমে সেখানেই গেল রুহান। দরজা খুলল কাকিমার মা নিজে, ‘আরে রুহান! আয় আয়।’
রুহান পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে ভেতরে ঢুকল, ‘দিদা, কাকিমা ফোন করে বলেনি যে, আমি আসব?’
‘আরে ল্যান্ডলাইন খারাপ, মোবাইলেও চার্জ নেই। কী যে বিপদে পড়েছি! তবে খেয়া গতকাল বলেছিল যে, তুই আসবি। কিন্তু কখন সেটা বলেনি। তা খেয়ে এসেছিস? এখানে দুপুরে ভাত খেয়ে যাবি কিন্তু।’
‘না দিদা, আমায় খুব তাড়াতাড়ি অফিস যেতে হবে। এই ছানাভাপাটা বুকুদাকে পৌঁছে দিয়েই কাটব।’
‘তুই অফিস শুরু করেছিস নাকি? পা ভাল হয়ে গেছে? খেলতে গিয়ে এমন চোট পেলি!’ দিদা প্রশ্ন করল।
‘পা, পুরো সারেনি। তবে মায়ের শরীর খারাপ ছিল বলেও যেতে পারিনি। তা আজ মাইনে হবে, তাই…’
‘ও,’ দিদা বলল, ‘শরীরটার যত্ন নিস রুহান। ক্রিকেট খুব কঠিন খেলা।’
রুহান হাসল। তা কি আর ও জানে না? খুব জানে, হাড়ে হাড়ে জানে।
রুহান বলল, ‘দিদা, আমি চট করে বুকুদাকে দিয়ে আসি টিফিন বাক্সটা। আচ্ছা, তোমার কি কিছু বলার আছে কাকিমাকে? থাকলে বলো আমি বলে দেব।’
দিদা হাসল, ‘বলিস অনেকদিন আসে না এদিকে, একবার যেন আসে। রজতকে নিয়ে আসে।’
দিদার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এবার দোতলায় উঠতে হবে রুহানকে। হাঁটুটায় এখনও ব্যথা আছে অল্প। এই এভারেস্ট কীভাবে চড়বে ভাবল ও। তবে চড়তে হবেই। ধীরে ধীরে সিঁড়িগুলো ভেঙে ওপরে উঠল রুহান। ঘাম হচ্ছে বেশ। তবে সবটাই কিন্তু পরিশ্রমের জন্য নয়। টেনশন, আসলে ভীষণ টেনশন হচ্ছে রুহানের। এতগুলো বছর কেটে গেছে। কী জানি বুকুদা কতটা পালটে গেছে! একসময় তো চব্বিশ ঘণ্টা বকবক করে মাথা খেত সবার। মনে আছে ওদের বাড়িতে এলে বাবা বলত, ‘বুকু, বোকো না।’
সেই বেশি কথা বলা, ইয়ারকিবাজ ছেলেটা লোক হতে হতে কতটা পালটেছে কে জানে! আজও বুকুদার সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার দিনটার কথা মনে আছে। মনে আছে বুকুদার সেই বিহ্বল দৃষ্টি। কতই বয়স তখন রুহানের? নয়, কি দশ। তবু আজও সব স্পষ্ট মনে আছে ওর।
সেই দিনের সেই বুকুদা আজ এত বছর পরের রুহানকে দেখে কী বলবে?
ডোরবেলটা টিপে নিজের মনকে স্টেডি করল রুহান। এই বয়সে এমন ব্যাপার নিয়ে নার্ভাস হওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়। বেলের শব্দটা কেমন গির্জার ঘণ্টার মতো। মনে হচ্ছে যেন প্রার্থনা শুরুর সময় হল।
খুট শব্দে এক পাল্লার কফি রঙের দরজাটা একটু ফাঁক হল। রুহান বুঝল ডোর-চেন লাগানো আছে দরজায়। একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ের মাথা দরজার ফাঁক দিয়ে বের হল। চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা। আগে মেয়েটিকে দেখেনি রুহান।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কাকে চান?’
‘বুকুদা আছে?’
‘বুকুদা? ও দাদাকে খুঁজছেন? আপনি রুহানদাদা?’ মেয়েটি হাসল।
আশ্চর্য হল রুহান। ওকে চিনল কী করে?
মেয়েটি দরজা বন্ধ করল দশ সেকেন্ডের জন্য, তারপর খুট করে ডোর-চেনটা খুলে দরজাটা খুলে দিল পুরো। বলল, ‘আসুন, আমি জানতাম আপনি আসবেন।’
রুহান অবাক হয়ে মেয়েটিকে দেখল। এ বাড়িতে যে কাজ করে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি দেখতে ভাল। পালিশ পড়লে সুন্দরী বলেও চালানো যায়। তা মেয়েটির কি কোনও অলৌকিক শক্তি রয়েছে? এভাবে মুখ দেখে সব গড়গড় করে বলে দিচ্ছে?
রুহান বোকার মতো হাসল, ‘তুমি আমায় চেনো?’
‘কেন? কাকিমা তো ফোন করে বলেছিল বউদিকে। বউদি তো বলল যে রুহান আসবে সকালে। তাই বুঝতে পেরেছি।’
রুহান বুঝল মেয়েটি একটু বেশি কথা বলে। অবশ্য এই বয়সে এটা হয়।
দরজা থেকে নরম কার্পেটে ঢাকা মেঝে। এই তলাটা এমন ছিল না আগে। ও বুঝল বুকুদা এসে পালটেছে এসব। জুতোটা কোথায় খুলবে বুঝতে পারে না রুহান। দামি কার্পেটের ওপরে ওর এই ধুলো মাখামাখি স্যান্ডলটা খুব বেমানান লাগল ওর। মেয়েটা হাসল, বলল, ‘এই কোনাতেই ছেড়ে রাখুন। কিচ্ছু অসুবিধে নেই। ধুলো পড়ুক। আমার নাম কলি। আপনি সোফায় বসুন আমি ভেতরে খবর দিচ্ছি।’
বসার ঘরটা নতুন করে সাজানো হয়েছে। ওয়াল টু ওয়াল ক্যাবিনেট, পেল্লায় লেদারের সোফা, দেওয়ালে ঝোলানো পাঁউরুটির মতো চ্যাপটা টিভি, স্প্লিট এসি।
রুহান অদ্ভুত দেখতে গ্লাস-টপের সেন্টার টেবিলে খুব সাবধানে প্লাস্টিকে জড়ানো টিফিন বাক্সটা রাখল। এমন বাড়িতে ঢুকলে সবসময় খুব অস্বস্তি হয় রুহানের। মনে হয়, কী করবে ঠিক জানে না। ও ঘড়ি দেখল, প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। বারোটার ভেতর অফিস গেলে ভাল হত। ওই অবধি বস থাকে এই অফিসে। আরও দিন সাতেকের ছুটি লাগবে। রুহান জানে, পাওয়া কঠিন তবু চেষ্টা করবে। এখন ব্যাপারটা হল এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে! আসলে কুড়ি বছর আগের বুকুদা যে আর তেমন নেই তা বুঝতে পারে ও। সেই পাজামা-পাঞ্জাবি আর ঝোলা নিয়ে চলে আসা মানুষটার এখনকার বাড়িঘর দেখেই তফাতটা করতে পারছে রুহান।
‘কী রে হান? কেমন আছিস?’
প্রশ্নটা বিদ্যুতের মতো আছড়ে পড়ল রুহানের শরীরে। ও চকিতে উঠে দাঁড়াল। প্রায় কুড়ি বছর, তবু গলার স্বর একই আছে!
‘বুকুদা…’ রুহান অবাক হয়ে তাকাল। হুবহু ছবির মতো মানুষটা। শুধু পরনে টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট।
‘আরে দাঁড়ালি কেন? বোস।’ বুকু হাসল।
‘হ্যাঁ…।’ রুহান বসল। এসি চলছে তবু ঘাম হচ্ছে ওর।
‘তারপর বল, কী করছিস হান?’
‘আমি? এই কাকিমার থেকে এটা নিয়ে দিতে এলাম।’ রুহান বুঝল ও ভুল বলছে।
‘তাই, ক্যুরিয়ারের কাজ করছিস?’
হাসল রুহান, ‘চাকরি করি একটা। ছোটখাটো। তেমন সিরিয়াস কিছু নয়।’
‘সিরিয়াস নয়?’ হাসল বুকু, ‘আসলে কিছুই সিরিয়াস নয়, বুঝলি?’
রুহান বুঝল, ওর মতো বুকুও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। ও বলল, ‘বুকুদা, এই টিফিন বাক্সটা রইল। আমি আসি গো। অফিসে দেরি হবে।’
‘তাই? শিয়োর।’ বুকু দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘অনেকদিন পর দেখা হল তোর সঙ্গে। আর এক দিন আসিস, জমিয়ে গল্প হবে।’
‘আসব বুকুদা।’
‘আনা আজ নেই। বাবার কাছে গেছে। তাই আলাপ হল না তোর সঙ্গে। পরে আসিস কিন্তু।’
‘আসব।’ রুহান হেসে দরজার দিকে এগোল।
‘হান,’ বুকু ডাকল পিছন থেকে।
রুহান দাঁড়াল, ‘কী বুকুদা?’
‘মা ভাল আছেন?’
‘হ্যাঁ, তবে এই বয়সে যা হয়। একটু শরীর খারাপ থাকে।’
‘আর…’ বুকু ঠোঁট চাটল। ইতস্তত করল একটু। গোঁফে আঙুল বোলাল, তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘পাড়ার সব ভাল?’
রুহান এই প্রথম সত্যিকারের হাসল, ‘আসি বুকুদা, আর একদিন এসে অনেক গল্প করব।’
‘রুহানদা তুমি এখন এলে?’ অফিসের করিডরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল ব্রত।
ছেলেটা রুহানের চেয়ে বেশ ছোট। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। রুহানের চেয়ে উঁচু পদেই আছে, কিন্তু তবু কখনও রুহানকে অসম্মান করে না বা নিজের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে না। ছেলেটাকে ভাল লাগে রুহানের। এই পৃথিবীতে, যেখানে একে অন্যকে পিষে মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চায়, সেখানে ব্রত অন্যরকম এক মানুষ। ভাল মানুষ।
রুহান একটু খোঁড়াল। খানিকটা ব্রতকে দেখানোর জন্যই যে, ও কত অসুস্থ এখনও। ওর খারাপ লাগল ব্রতর সামনে এমন মিথ্যাচার করতে, কিন্তু যে দশ দিন না আসে তাকে তো এমন একটু-আধটু অভিনয় করতেই হয়। খেলার ভাষায় ওরা বলে প্লে অ্যাক্টিং।
‘কী হল? তোমার পায়ের চোটটা এখনও কমেনি, না?’ ব্রতর গলায় দুঃখ।
‘কী আর করব বল। এমন লাগল যে, প্রায় ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড বানিয়ে ছেড়েছে আমায়। দেখ না অফিসে পর্যন্ত আসতে পারছি না।’
ব্রত বলল, ‘যাও, মাইতিদার কাছ থেকে টাকা নিয়ে নাও।’
মাইতিদা অ্যাকাউন্টসে বসে। সারাদিন পান খায় আর কীসব যোগবিয়োগ করে। তবে মাসের দুটো মাইনের দিনে একটু কথাবার্তাও বলে।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রুহান মাইতিদার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই, মাইতিদা নিস্পৃহ গলায় বলল, ‘তোমার মাইনে এখানে নেই। সাহেবের ঘরে।’
‘অ্যাঁ! স্যার দেবেন?’ ভীষণ অবাক হল রুহান, ‘কেন?’
‘কর্তার ইচ্ছেই কর্ম। আমি কীভাবে জানব কেন?’
রুহান পিছন ফিরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্যারের ঘরের দিকে এগোল। শুনল মাইতিদা নিজের মনে বলছে, ‘আরে বাবা এটা কি স্কুল যে, একটু খুঁড়িয়ে হেঁটে দিলাম আর সব ঠিক হয়ে গেল? তাও যদি ঠিকমতো খোঁড়াত। আসার সময় বাঁ পায়ে খোঁড়াল আর এখন ডান পা খুঁড়িয়ে হাঁটছে! যত্তসব?’
রুহানকে নক করতেও হল না। কাচের দরজার ওপারের থেকে রুহানকে দেখে বস ডেকে নিলেন ঘরে। তারপর একটা খাম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘রুহান, এই যে দু’মাসের মাইনে।’
‘দু’মাসের!’ রুহান ঘাবড়ে গেল।
‘হ্যাঁ, আমরা তোমায় ছেড়ে দিচ্ছি। উই ডোন্ট নিড ইউ এনি মোর।’
‘স্যার…’ কথা শেষ করতে পারল না রুহান। যে-পায়ে চোট নেই সেই পায়েও জোর পেল না যেন! মনে হল ও জলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুহান যেন দেখতে পেল একটা ছেলে ডুবছে! ডুবেই যাচ্ছে!
Chapter - 3
৩
কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে সাইকেল। হলুদ-লাল পাতা নিয়ে ইয়া বড় বড় সব গাছেরা দাঁড়িয়ে রয়েছে আর তার ফাঁকে তুলোর মতো গোল্লা কাটছে হাওয়া। প্রতিটা ঘাসের মাথায় মুকুটের মতো শিশির পায়ের তলায় বুঝতে পারছে ও। পাহাড়ি শহরের ভোর মেঘ সরিয়ে উঁকি দিতে শুরু করেছে ক্রমশ। তার কালো ফিতের মতো রাস্তা, সবুজ রেলিং আর লাল কাঠের বেঞ্চ-সবেতেই মাফলারের মতো জড়িয়ে রয়েছে কুয়াশা। আর তার ঝাঁঝরির ভেতর ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে সাইকেল। শুধু একটা গোলাপি স্কার্ফ উড়ছে। কুয়াশার ভেতর থেকে লোমে ঢাকা কুকুরের জিভের মতো বেরিয়ে রয়েছে সেই ছোট্ট স্কার্ফটা।
ওই স্কার্ফ কার? কে চলে গেল সাইকেল করে? কবে সে মৃদু ঘণ্টি বাজিয়ে এসেছিল পাহাড়ি সেই শহরে? কার কাছে এসেছিল সে? আর কেনই বা অমন করে মিলিয়ে গেল? এখন শুধু শূন্য রাস্তা দেখতে পায় ও। সবুজ রঙের রেলিং দেখতে পায়। লাল বেঞ্চে দেখতে পায় কে যেন ছুরি দিয়ে খোদাই করে রেখে গেছে, ‘আমি তোর জন্য এসেছিলাম…’
‘জিয়ানা ওয়েক আপ, ওয়েক আপ ডার্লিং’, নরম শব্দটা বারবার বাজতে বাজতে জিয়ানাকে প্রায় আইসক্রিম কেটে তুলে নেওয়ার মতো তুলে ফেলল ঘুম থেকে।
ব্লাইন্ডসের ফাঁক দিয়ে আলোর লম্বা চ্যাপটা আঙুলগুলো ক্রমশ ঢুকে আসছে ঘরে। আর সেই আলোর রং দেখে জিয়ানা বুঝল আজ একটু বেশিই ঘুমিয়েছে ও।
‘জিয়ানা ওয়েক আপ, ওয়েক আপ ডার্লিং’-টকেটিভ ঘড়িটাকে থাবড়ে চুপ করাল জিয়ানা। ঘড়িটা অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়ে এসেছিল বুকু। একসঙ্গে হাফ ডজন অ্যালার্ম সেট করা যায়। ঘড়িটা প্রথম প্রথম ভাল লাগলেও এখন কেমন যেন একঘেয়ে লাগে জিয়ানার। আর আজ তো বিরক্তিতে ওটাকে মাটিতে ছুড়ে ভেঙে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে। আর-একটু, ইস আর-একটু যদি ঘুমোতে পারত তা হলে ঠিক বুঝতে পারত কে সেই সাইকেল চালক। দেখতে পারত লাল বেঞ্চে খোদাই করে রাখা পুরো কথাটা।
জিয়ানার মাথাটা ভোঁ হয়ে আছে। এত জীবন্ত ছিল স্বপ্নটা যে, মনে হচ্ছে এখনও পায়ের তলায় শিশির লেগে রয়েছে!
গোলাপি স্কার্ফ। হঠাৎ মনে পড়ল স্কার্ফটার কথা। অন্য স্বপ্নে এটা থাকত না কিন্তু আজ যোগ হয়েছে স্কার্ফটা। সাদা কুয়াশার ভেতর কী সুন্দর উড়ছিল স্কার্ফটা। মনে আছে। সব মনে আছে জিয়ানার। মনে আছে কাকে ও দিয়েছিল গোলাপি স্কার্ফটা। দশ বছর হয়ে গেছে। দশটা বছর হয়ে গেছে! তবু স্বপ্নটা এখনও এত জ্যান্ত! জিয়ানা দু’হাতে মুখ ঢাকল। স্বপ্নটাও যদি এমন দু’হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে পারত!
প্রথম অ্যালার্মটা মিস করে দ্বিতীয় অ্যালার্মটায় ঘুম ভেঙেছে আজ। মানে সাড়ে সাতটা বাজে। সাড়ে ন’টার মধ্যে অফিস ঢুকতে হবে। অবশ্য সেটা খুব একটা অসুবিধে হবে না। ওর বাড়ি থেকে অফিস যেতে পনেরো মিনিট লাগে। তাও জ্যাম থাকলে। কিন্তু আজ একবার মেয়ের স্কুলে যেতে হবে। ক্লাস-টিচারের সঙ্গে দেখা করার আছে। সোয়া আটটায় সময় দিয়েছেন টিচার। কে জানে আবার কী কাণ্ড করেছে? এদেশে এসে বৈভবীর সমস্যা হচ্ছে মানিয়ে নিতে। চার পেরিয়ে পাঁচে পড়েছে মেয়েটা। কিন্তু একেবারে বাপের ফোটোকপি। এ বয়সেই এত গম্ভীর! কথাও বিশেষ বলে না বাড়িতে এসে। খুব করে জিজ্ঞেস করলে দু’-একটা কথা বলে, তাও অনিচ্ছার সঙ্গে।
গতকালই অফিস থেকে আসার পর বৈভবী এসে একটা কাগজ হাতে ধরিয়ে বলেছিল, ‘মাম্মা, এটা ক্লাস-টিচার দিয়েছে তোমার জন্য।’
‘কী এটা?’ অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে ভাঁজ করা কাগজটা নিয়েছিল জিয়ানা, ‘কী, বললি না কী এটা?’
বৈভবী গোমড়া মুখে বলেছিল, ‘দেখছ না স্টেপ্ল করা আছে। আমি জানি না ওটা কী। আর দেখিনি। অন্যের চিঠি দেখতে নেই।’
বৈভবী আর দাঁড়ায়নি। চলে গিয়েছিল নিজের ঘরের দিকে।
চিঠিটা খুলে ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল জিয়ানার। ক্লাসটিচার আর্জেন্টলি দেখা করতে বলেছে পেরেন্টকে। এমন কিছু ডিসকাস করতে চায়, যা ফোনে বলা যাবে না।
অবাক লেগেছিল জিয়ানার, কী এমন কথা রে বাবা! এইটুকু মেয়ের ব্যাপারে কী এমন কথা থাকতে পারে? তবে বৈভবীকে জিজ্ঞেস করেনি কিছু। জিয়ানা জানত লাভ হবে না। ও মেয়ে কিছু করলেও উত্তর দেবে না। তবে রাতে বুকুকে বলেছিল ঘটনাটা। ল্যাপটপ খুলে কী একটা কাজ করছিল বুকু। জিয়ানা গিয়ে বসেছিল পাশে। বুকু তাকাওয়নি। একমনে তাকিয়ে ছিল স্ক্রিনের দিকে।
জিয়ানা অপেক্ষা করেছিল সামান্য। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, ‘বুকু, তোমায় একটা কথা বলার ছিল।’
‘বলো,’ যেন যন্ত্রের ভেতর থেকে উত্তর বেরিয়ে এসেছিল।
‘একটু এদিকে মন দাও।’ বিরক্ত লেগেছিল জিয়ানার।
‘মন দিতে হলে তাকাতে হয় বা দেখতে হয়, এমন ব্যাপার নয়।’
জিয়ানার রাগ হলেও গিলে নিয়েছিল পুরোটা। তারপর মনকে শান্ত করে বলেছিল, ‘তুতুলের স্কুল থেকে কমপ্লেন লেটার এসেছে। কাল দেখা করতে বলেছে।’
‘কমপ্লেন?’ এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল বুকু, ‘কী কমপ্লেন করেছে?’
‘না, মানে স্পেসিফিক কিছু লেখেনি, তবে…’ ইতস্তত করেছিল জিয়ানা।
‘তবে কে বললে কমপ্লেন?’
‘লিখেছে এমন কিছু বলতে চায় যা ফোনে বলা যাবে না।’
‘তার মানে কি কমপ্লেন? অন্য কিছুও তো বলতে চাইতে পারে।’
‘তা পারে…’ জিয়ানার নিজেকে একটু বোকাই লাগছিল।
‘তুতুল বাড়িতেই কাউকে ডিস্টার্ব করে না, তো স্কুলে কী করবে!’ বুকু আবার ল্যাপটপে ফিরে গিয়েছিল।
জিয়ানা সরিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। বুকু যে আর কিছু বলবে না, তা বুঝতে পেরেছিল ও। আর এও বুঝেছিল যে, স্কুলে ওকে একা-একাই যেতে হবে। আসলে বিয়ের পর থেকে একাই সব কিছু করে করে এখন অভ্যেস হয়ে গেছে জিয়ানার।
বিয়ের আগে আগে কিন্তু এত কিছু পারত না ও। সবটাই বাপি করে দিত। মা আর বাপি একদম কাঁটাতার দিয়ে মুড়ে রাখত জিয়ানাকে। ইউনিভার্সিটি যেতে যেদিন দেরি হয়ে যেত মা সেদিন ভাত মেখে খাইয়েও দিত। বন্ধুরা বলত, ‘তোর মা বড্ড বাড়াবাড়ি করে কিন্তু।’
জিয়ানা কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকত। লজ্জা লাগত ওর। বন্ধুরা আরও খ্যাপাত, বলত, ‘সব কিছুতেই তোর মা এত নাক গলায়, ফুলশয্যাতেও কী করবি সেটাও কি তোর মা দাঁড়িয়ে ডিরেকশন দেবে?’
জিয়ানার কান লাল হয়ে উঠত, ও প্রতিবাদ করত। কিন্তু ঠিক পেরে উঠত না। আর ঠিক তখনই সে এগিয়ে আসত। মৃদু গলায় বলত, ‘রাস্তায় পাথরকে কে গার্ড দেয়? হিরেকেই মানুষ আগলে রাখে। তোরা সব বৃথাই হিংসে করিস জিয়ানাকে।’
বন্ধুরা বলত, ‘তোর তো সবটাতেই বেশি বেশি। জিয়ানা বলতে তো তুই অজ্ঞান!’
তখন কতজন যে অজ্ঞান ছিল জিয়ানা বলতে! কিন্তু একজনের জ্ঞান হারানোটাই শুধু চোখে পড়ত ওর। কষ্ট হত। কিন্তু কিছু বলতে পারত না। মায়ের ভয়ে বা ভালবাসায় মায়ের কথাকেই বেদবাক্য হিসেবে মেনে চলত। তাই তো সেই জ্ঞান হারানো ছেলেটাকে অমন ‘না’ করে দিয়েছিল।
তখন গড়িয়ায় থাকত ওরা। গড়িয়াহাট থেকে গড়িয়া যাওয়ার অটো ধরত বাড়ি ফেরার পথে। ও সঙ্গে করে আসত। শেষ দিন ওকে ‘না’ বলে দিয়ে ফুটপাথ টপকে চলে গিয়েছিল অটোস্ট্যান্ডের দিকে। মা দাঁড়িয়ে ছিল ওর জন্য। তখনও ফ্লাইওভার হয়নি গড়িয়াহাটে। আকাশ থেকে রোদ এসে ধুয়ে দিচ্ছিল পথঘাট। পিছন ফিরে একবারও তাকায়নি জিয়ানা। তবু বুঝতে পারছিল একজন শেষবারের মতো দেখছে ওকে। বুঝতে পারছিল ওর পথ অনুসরণ করছে এক জোড়া নীল রঙের চোখ।
বুকুদের দিক থেকে সম্বন্ধটা এসেছিল সেই সময়তেই। ওদের সঙ্গে আগেই বুকুদের এক ক্ষীণ যোগাযোগ ছিল। তারপর সম্বন্ধ আসায় মা একদম ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বলা যায় মায়ের একক প্রচেষ্টাতেই গোটা বিয়েটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সেই মাকে যেন চিনতে পারত না জিয়ানা। বুকুর সঙ্গে জোর করে ঘুরতে পাঠাত ওকে। সিনেমা, রেস্তরাঁয়, শপিং, বুকুর সঙ্গে সব জায়গায় গিয়েছে জিয়ানা। আনন্দ করার চেষ্টাও তো করেছে। ভুলে যেতে চেয়েছে সব কিছু। বুকুকে জড়িয়েই নতুন করে বেঁচে উঠতে চেয়েছে ও। প্রবলভাবে বেঁচে উঠতে চেয়েছে।
দেখাশুনো ও ঘোরাঘুরির শেষে আবার বিদেশ চলে গিয়েছিল বুকু। ওর দু’মাসের ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু যাওয়ার আগে বলেছিল সামনের মাঘে এসে একদম নিয়ে যাবে জিয়ানাকে।
তেসরা ফেব্রুয়ারি বিয়ে হয়ে গিয়েছিল জিয়ানার। সানাই, শব্দ, আলো আর প্রচুর লোকের মাঝে বুকুকে দেখে ওর বুকও কেঁপেছিল একটু। ভালও লেগেছিল যখন লোকে বলেছিল, ‘তোর বর কত নামকরা ইঞ্জিনিয়ার। ফরেনে থাকে। ওখানে শুনেছি দারুণ ফ্ল্যাট পেয়েছে!’
বুকুর গলায় মালা দিয়ে, ওর পাশে বসে খুব ভাল লেগেছিল জিয়ানার। এমন নম্র চুপচাপ মানুষটা যে সম্পূর্ণ ওর, ভাবতে ভাল লেগেছিল। মায়ের মুখের আভা আর বাপির গর্ব দেখে জিয়ানার মনে হয়েছিল, যাক, বাবা-মাকেও খুশি করতে পেরেছে ও। সবার মন রাখতে পেরেছে।
ফুলশয্যার পরের দিন খুব ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল জিয়ানার। শরীরের নরম জায়গায় বুকুর দাঁতের দাগের ওপর হাত বুলিয়ে গত রাতের রোমাঞ্চ মনে এসেছিল ওর। শরীরে পদ্মফুল ফুটেছিল যেন। বালাপোশের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বুকুর তৃপ্ত, ঘুমন্ত মুখটা দেখে জিয়ানার মনে হয়েছিল, যাক, সবার মন রাখতে পেরেছে ও।
নিজেই বুঝতে পারেনি তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল আবার! আর আচমকা, একদম আচমকাই ও দেখেছিল, কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে একটা সাইকেল। হলুদ-লাল পাতার ইয়া বড় বড় সব গাছেরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর তার ফাঁকে তুলোর মতো গোল্লা কাটছে হাওয়া। কালো ফিতের মতো রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে, দূর থেকে আরও দূরে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে সাইকেলটা।
ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসেছিল জিয়ানা। মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে যাবে, মনে হচ্ছিল মরেই যাবে এবার। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটাকে কে যেন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছিল। যেন বুকে চাপ দিয়ে বের করে আনতে চাইছিল সব হাওয়া। দম নিতে পারছিল না জিয়ানা। গলার কাছে যেন আটকে ছিল বল। পেটের ভিতর যেন এক সমুদ্র মাছ দাপাচ্ছিল। কষ্ট হচ্ছিল, ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল জিয়ানার। ও যেন দেখতে পাচ্ছিল দূর থেকে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে বড় বড় দুটো চোখ। দুটো নীল রঙের চোখ। জিয়ানা সেই ভোরবেলা ঘুমন্ত বরের পাশে বসে বুঝেছিল, না, সবার মন রাখতে পারেনি ও। সবাইকে খুশি করতে পারেনি।
পরে, সময়ের সঙ্গে জিয়ানা বুঝেছে সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা যায় না। একসঙ্গে খুশি করা সম্ভব নয়। এই যে সূর্য। এমন প্রতাপশালী, সম্পূর্ণ জীবজগতের নিয়ন্তা। সে-ই কি সবাইকে একসঙ্গে খুশি করতে পারে? তার আলোয় যত জোরই থাকুক না কেন, সে পৃথিবীর এক দিকে দিন করলেও আর-এক দিকে তখন কিন্তু অন্ধকারই থাকে।
বুকুর কাছ থেকে উঠে বিছানার যে-দিকটায় ও শোয়, সেদিকে ফিরে গিয়েছিল জিয়ানা। ও জানত বুকু এখনও অনেকক্ষণ কাজ করবে।
বিয়ের আগের ওই মাস দুয়েকের ঘোরাঘুরির সময়ও বুকু চুপচাপ থাকত, তবে ঠিক এতটা নয়। এখন যেন বুকুর কথা বলতেই কষ্ট হয়। যেন একা থাকতে পারলে বেঁচে যায়। জিয়ানার খারাপ লাগত প্রথম প্রথম, কিন্তু এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। ও নিজে থেকে আর বুকুকে ঘাঁটায় না। কোনও কোনও দিন ইচ্ছে হলে বুকু ওর পাশে শোয়। আবার কোনওদিন ওর স্টাডির ছোট্ট খাটটাতেই শুয়ে পড়ে। তবে কালেভদ্রে শরীরের ডাকে তাড়াতাড়ি বিছানায় আসে বুকু। কিন্তু সেই ডাকও ইদানীং কমে আসছে দ্রুত। আর সত্যি বলতে কী জিয়ানাও আর বুকুর প্রতি শারীরিকভাবে টান অনুভব করে না। ওদের যৌনতা এখন অনেকটাই রিচুয়াল হয়ে গিয়েছে।
গতকাল শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি হয়েছে বেশ। সেপ্টেম্বরের দশ তারিখ আজ। কিন্তু তবু শহরের নানা পকেটে চোরাগোপ্তা অনেক মেঘ লুকিয়ে আছে। এখনও মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে আচমকা। সামনে পুজো, ভগবান জানে বৃষ্টি কতটা ভোগাবে!
গতকাল শেষ রাতে জলতেষ্টায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল জিয়ানার। তখনই দেখেছিল পাশে বুকু নেই। বিছানার ওই অংশটা নিপাট হয়ে আছে। ও জল খেয়ে পরদা সরিয়েছিল। বাইরে রাস্তার হলুদ আলোয় বৃষ্টিটা দেখে কেমন গা-ছমছম করছিল। এসি-তে কুড়ি ডিগ্রি টেম্পারেচার সেট করা ছিল। তাতে কেমন যেন শীত শীত করছিল ওর। চব্বিশ ডিগ্রি সেট করে ও শুয়ে পড়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুম এসে গিয়েছিল।
সাড়ে সাতটা-টা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। প্রথম অ্যালার্মটা মিস করল কী করে ও? এ দেশটাই কি এরকম? লোককে কুঁড়ে বানিয়ে দেয়? ইউএসএ-তে থাকার সময় তো এমন হত না। এই কলকাতার ভেতরে কীসের যেন একটা বীজ আছে। মানুষের মধ্যে সেই ‘কী যেন’ জিনিসটা পুঁতে দেয় এ শহর। মানুষ একটু শ্লথ হয়ে যায়। একটু কম দৌড়োয়। একটু নরম হয়ে যায়। হ্যাঁ, নরম তো হয়েই যায়, না হলে আজ ভোরবেলা ও আবার সেই সাইকেলটা দেখবে কেন? কেন আবার বুক তোলপাড় করে ফুঁড়ে বেরোবে হলুদ-লাল পাতা সেই গাছেরা? কেন এতদিন পরে উড়ে উড়ে এসে স্বপ্নে জড়িয়ে যাবে গোলাপি স্কার্ফ?
বিছানা থেকে উঠে কলিকে চা করতে বলে বাথরুমে ঢুকে গেল জিয়ানা। বৈভবীর মর্নিং স্কুল। কলি ঠিক তৈরি করে পাঠিয়ে দেয়। ওকে চিন্তা করতে হয় না। শুধু অফিস যাওয়ার আগে শাশুড়ির ঘরে যায় জিয়ানা। ভদ্রমহিলার একটা দিক পড়ে গেছে। বারো ঘণ্টার শিফটে দু’জন মহিলা অ্যাটেনডেন্ট সবসময় থাকে। সকাল আটটায় রাতের আয়া চলে গিয়ে দিনের আয়া আসে।
শাশুড়ির কাছে গিয়ে মিনিট দু’-তিনেক দাঁড়ায় জিয়ানা। শাশুড়ির মাথায় হাত বুলিয়ে একটু খোঁজখবর নেয় শরীরের। তারপর আয়াদের ওষুধপত্র কী লাগবে জিজ্ঞেস করে বেরিয়ে আসে। আবার সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে শাশুড়িকে একবার দেখে আসে ও। শাশুড়ি মানুষটা ভাল। অল্প কথা বলেন। বিরক্তি বা রাগ কিছু প্রকাশ করেন না। চেয়ার-টেবিলের মতো পড়ে থাকেন ঘরের কোনায়। কষ্ট হয় জিয়ানার। মনে হয় শাশুড়িকে একটু সঙ্গ দেয়, একটু গল্প করে বসে, কিন্তু পারে না। সময়টাই যে নেই ওর!
শ্বশুরমশাই যতদিন ছিলেন, শাশুড়ি ভালই ছিলেন। কিন্তু শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর শকটা নিতে পারেননি তিনি। বছর না ঘুরতেই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। আর তার ফলে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে যান। মা থাকবে কোথায়? কার কাছে? তাই বিদেশের বাস গুটিয়ে বুকু চলে আসে এখানে। বুকুর যা কোয়ালিফিকেশন তাতে নতুন চাকরি পেতে কোনও অসুবিধেই হয়নি। চিন্তা ছিল জিয়ানার। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ওরও চাকরি পেতে অসুবিধে হয়নি। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটরের চাকরি পেয়ে গিয়েছে জিয়ানা।
অফিস! অফিসের কথা চিন্তা করে এই সকালবেলাতেই একটু মন খারাপ হয়ে গেল ওর। ওদের কোম্পানি ভাল। এম ডি মিস্টার মদন খুরানা মাটির মানুষ। একান্তে জিয়ানাকে ‘বেটি’ বলে কথা বলেন। কিন্তু কলিগরা এক-একজন এক-একটা যন্তর। বিদেশ থেকে এসেছে বলেই কিনা কে জানে, সবার ভেতর একটা কমপ্লেক্স আছে ওকে নিয়ে! কেউই খুব সহজ হতে পারে না। তবে জিয়ানা চেষ্টা করে, সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে।
বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে ড্রেস করে নিল ও। একটা ছাতা নিতে হবে আজ। যদিও গাড়িতেই যাতায়াত করে, তবু যা হুটহাট বৃষ্টি হচ্ছে, কখন দরকারে লাগে কে জানে!
ড্রেস করে ডাইনিং টেবিলে এল জিয়ানা। কলি চায়ের সঙ্গে দুটো মার্জারিন দেওয়া টোস্টও দিয়েছে। শরীর ঠিক রাখা খুব দরকার। ইদানীং একটু মোটা হচ্ছে জিয়ানা। কোমরের নীচে স্ট্রেচ মার্কস দেখা দিচ্ছে। দেখলে মনে হয় যেন মাটিতে লাঙল টানা হয়েছে। দেখতে এত বিশ্রী লাগে! আজকাল লো-ফ্যাট, লো-ক্যালরি খাবারের দিকে মন দিয়েছে ও। এমনিতে জিয়ানা খেতে ভালবাসে, কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে সেন্সর করেছে। প্রায় বত্রিশ হল, শরীরের দিকে নজর দিতেই হবে এবার।
আটটা বাজে, ওরে বাব্বা! লাফিয়ে উঠল জিয়ানা। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এবার যেতেই হবে। স্কুলে কতক্ষণ লাগবে কে জানে! আজ আর শাশুড়ির ঘরে যাবে না।
ও নিজেই গাড়ি চালায়। ফ্রিজের মাথায় ছোট একটা বাক্স থেকে চাবিটা তুলে নিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকল। চট করে একবার নিজেকে আয়নায় দেখে নিল ও। তারপর ব্যাগ আর ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল নীচে কাকিমা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গল্প না জুড়ে দেয়!
ভদ্রমহিলার সব ভাল, শুধু বয়স হয়েছে বলেই বোধহয় একটু বেশি বকেন। বেশি বকা লোক ঠিক সহ্য করতে পারে না জিয়ানা। সে ওর যতই শুভাকাঙ্ক্ষী হোক না কেন। আর এখন তো বেদম তাড়ার মধ্যে আছে। একবার কথার ফুলঝুরি ছুটলে কালীপুজোর আগে থামবে না।
‘আরে জিয়ানা, কেমন আছ?’ কাকিমা একমুখ হাসল।
সর্বনাশ! সব আশঙ্কা কি এভাবেই সত্যি হবে ওর জীবনে? ও বলল, ‘এই চলে যাচ্ছে কাকিমা। আসলে মেয়ের স্কুলে একটা মিটিং আছে তো, তাই একটু তাড়ায় আছি।’
কাকিমা বুঝল বলে মনে হল না। বরং আঁচল ঠিক করে চওড়া হেসে বলল, ‘তা খেয়া যে রান্না করে পাঠিয়েছিল, তা খেয়ে বললে না তো কেমন লাগল?’
‘সেই ছানাভাপা?’ জিয়ানা মনে মনে নিজেকে সাবাশ জানাল। মনে রেখেছে ঠিক! ছানা জিনিসটা একদম সহ্য করতে পারে না ও। তাই মুখেও দেয়নি। বুকু খুব ভালবাসে। গোটাটা ও একাই খেয়েছে।
‘হ্যাঁ, সেই যে রুহান দিয়ে গেল।’
রুহান, নামটা বেশ ভাল লেগেছিল জিয়ানার। যদিও পরিচয় হয়নি। যেদিন ছেলেটা এসেছিল, ও বাড়ি ছিল না। শুনেছে যে, ওদের বিয়েতেও নাকি আসেনি। এখন বিয়েতে কে এসেছিল আর কে আসেনি তা কি আর মনে রেখেছে ও? তবে এটা শুনেছে যে, খেয়াদির জায়ের ছেলে এই রুহান।
জিয়ানা বলল, ‘হ্যাঁ, খেয়েছি তো, খুব ভাল হয়েছে। আসলে নয়-দশ দিন আগের ব্যাপার তো, তাই ঠিক মনে ছিল না।’
‘ও, তো বুকু কেমন আছে?’
জিয়ানা ঘড়ি দেখল। এবার সর্বনাশ হবে। সাড়ে আটটাতেও স্কুলে পৌঁছোতে পারবে না। আর বুকু? সকালে বিছানায় ছিল না। নির্ঘাত স্টাডিতে ঘুমিয়েছে। তাড়াহুড়োয় দেখেও আসতে পারেনি একবার।
ও বলল, ‘ভাল আছে কাকিমা। আচ্ছা, এবার আমি…’
জিয়ানাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কাকিমা বলল, ‘দেখো তো, এক বাড়িতে থাকি আর খবর নিতে হচ্ছে এভাবে। শরীরে গাঁটে গাঁটে এমন ব্যথা যে, সিঁড়ি ভাঙতে পারি না। দিদিও তো শয্যাশায়ী, তাকেও একবার চোখে দেখতে পারি না।’
যে যা পারে না সেটা নিয়ে এত বিলাপ করে কেন, কে জানে! জিয়ানা বুঝল, কাকিমা সহজে ছাড়ার পাত্রী নয়। কিন্তু যা অবস্থা, ওকে ছাড়াতেই হবে।
ও বলল, ‘আসি কাকিমা। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।’
‘দেরি?’ কাকিমা আতান্তরে পড়ল, ‘এঃ, বয়স হয়েছে তো তাই বড্ড বকবক করি। জানো তো, আমার মায়েরও এই স্বভাব ছিল। একবার কথা শুরু করলে আর থামবে না। একবার কী হয়েছিল জানো? বাবা তখন বিহারে পোস্টেড। রেলে চাকরি করত তো, তাই ট্রান্সফারেব্ল জব ছিল। তো হয়েছিল কী…’
‘আসি কাকিমা,’ জিয়ানা আর দাঁড়াল না। বাবার গল্প শুনতে বসে গেলে আজ সারা দিনের কাজ ভন্ডুল হবে। কাকিমার থতমত মুখের ওপর দিয়ে বেরিয়ে এল ও।
ঘুম ভাঙার সময়কার সেই রোদটা আর নেই। বরং তার জায়গায় মেঘ করেছে বেশ। ওদের বাড়িতে কোনও গ্যারাজ নেই। তবে পাশেই অশোকদার গ্যারাজ। সেখানেই ওদের দুটো গাড়ি রাখা থাকে।
আমেরিকায় থাকার সময়ও ওদের দুটো গাড়ি ছিল। তবে দুটোই ছিল বড়। কিন্তু এদেশে এসে দেখেছে যে, পার্কিং-এর ভীষণ অসুবিধে। আর রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা প্রচুর বেশি। তাই এখানে ছোট গাড়ির রমরমা। জিয়ানা নিজের জন্য তাই একটা ছোট গাড়িই কিনেছে। কিন্তু বুকু তা করেনি। বড় গাড়িই কিনেছে।
মেরুন রঙের গাড়িটা শেডের তলায় রাখা ছিল। মাসে পাঁচশো টাকা নেয় অশোক। আর শেডের তলায় রাখলে দেড়শো বেশি। জিয়ানার গাড়ির প্রতি মায়া খুব বেশি, তাই শেডের তলাতেই রাখে।
রিমোট টিপে গাড়ির দরজার লক খুলে গাড়িতে বসল জিয়ানা। নিচু হয়ে উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে আকাশটা দেখল। মেঘ বাড়ছে বেশ। যে-কোনও সময় ঢালবে। জিয়ানা গাড়িতে স্টার্ট দিল।
এই দশ বছরে কলকাতা কত পালটে গেছে! বিয়ের পর বিদেশ গেলেও বৈভবী হওয়া অবধি দু’বছর অন্তর ওরা দেশে আসত। তারপর এই এসেছে। আর এসেই যেন কেমন লাগছে শহরটাকে। প্রথম প্রথম এখানে গাড়ি চালাতে ভয় লাগত ওর। মনে হত এই বুঝি অ্যাক্সিডেন্ট হল। কিন্তু এখন হাত স্টেডি হয়ে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে বেয়াড়া টেম্পো, অটো আর ঠেলাওয়ালারা খুব ঝামেলা করে।
সকালের কলকাতায় অফিস আওয়ার্স শুরু হয়ে গেছে। সবাই সবাইকে টপকে, পিষে এগিয়ে যেতে চাইছে। মেঘ করে আছে বলে একটা ভ্যাপসা গরম লাগছে জিয়ানার, ও সুইচ টিপে কাচ তুলে এসি-টা চালিয়ে দিল।
বৈভবীর স্কুলটা শিয়ালদার কাছে। লেনিন সরণি ধরে বেরিয়ে যাবে। তবে জ্যামের জন্য চট করে বেরোতে পারল না। বারবার লাল আলো, ঠোক্কর আর বেহিসেবি পথচারীদের কাটিয়ে যখন স্কুলে পৌঁছোল তখন আটটা চল্লিশ বাজে। এই রে, বড্ড লেট হয়ে গেছে! গাড়িটা পার্ক করে প্রায় দৌড়ে স্কুলে ঢুকল ও।
স্কুলটা পুরনো। ঐতিহ্যশালী। সামনের বড় উঠোনের মতো অংশটাকে থার্ড ব্র্যাকেটের মতো ঘিরে রেখেছে স্কুল বিল্ডিং।
টিচার্স রুমেই বসে ছিল ম্যাডাম। সুলগ্না সেন। চিঠিতে নামটা দেখেছিল জিয়ানা। বৈভবীর স্কুলে যখন যা হয় জিয়ানাই যায়। তবে বেশি দিন তো হয়নি তাই স্কুলে সবার সঙ্গে জিয়ানার অতটা পরিচয় হয়নি এখনও। তবে সুলগ্নাকে দেখেই চিনতে পারল জিয়ানা। মাজা রং। কিন্তু মুখশ্রীতে অদ্ভুত একটা মন-ভাল-করা ব্যাপার আছে।
‘মিস সেন?’ জিয়ানা টিচার্স রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।
সুলগ্না উঠে দাঁড়িয়ে দু’-এক পা এগিয়ে এল দরজার দিকে, ‘আপনি?’
‘জিয়ানা বোস, তুতু… মানে বৈভবীর মা। আপনি চিঠি দিয়েছিলেন।’
‘ও ইয়েস,’ সুলগ্না হেসে এগিয়ে এল আরও, ‘আসুন আমরা পাশের ঘরে বসি।’
টিচার্স রুমের পাশেই একটা মাঝারি মাপের ঘর। তাতে আলমারি, আরও নানা টুকিটাকি জিনিসের সঙ্গে একটা টেবিল আর চারটে চেয়ারও রয়েছে।
সুলগ্না জিয়ানার মুখোমুখি বসে নিজেই প্রথম কথা শুরু করল, ‘আচ্ছা, মিসেস বোস আমি ডাইরেক্টলি পয়েন্টে আসছি। বৈভবীকে নিয়ে আমাদের একটু চিন্তা হচ্ছে।’
‘কেন?’ একটু অবাক হল জিয়ানা।
‘শি ইজ বিহেভিং কোয়াইট স্ট্রেঞ্জলি।’
‘স্ট্রেঞ্জলি?’ জিয়ানা ওর ব্যাগটাকে কোলের থেকে নিয়ে টেবিলে রাখল।
‘ও কারও সঙ্গে মিক্স করে না। ঠিকমতো কথা বলে না। ক্লাসওয়ার্ক করে না। আচমকা ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। ড্রইং ক্লাসে মরবিড সব ছবি আঁকে।’
‘মরবিড ছবি মানে?’
‘মানে মরা পাখি, মাথা কাটা ভল্লুক, রক্তমাখা ছোরা হাতে মানুষ। মানে এখনও তো ভাল করে আঁকতে শেখেনি, তবু বোঝা যায়। ওর মতো বয়সের মেয়েকে এতটা মরবিড আর ভায়োলেন্ট হতে আগে দেখিনি।’ সুলগ্না চিন্তিত মুখে জিয়ানার দিকে তাকাল, ‘আপনারা বাড়িতে কখনও এমন টের পাননি? মানে, ওর পড়াশোনার বইখাতা ঘেঁটে দেখেননি?’
জিয়ানা একটু লজ্জা পেল। মা হয়ে ও এসব জানে না বলতে সত্যিই খারাপ লাগছে ওর। আসলে বুকু বা জিয়ানা, বৈভবীকে নিয়ে বসার সময় পায় না বিশেষ। ওদের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এমনিতেই সেশনের মাঝখানে এসে ভরতি হয়েছে বৈভবী। সবার চেয়ে একটু পিছিয়েই আছে। আর বিদেশের সঙ্গে পড়াশোনোর ধাঁচেরও একটা পার্থক্য আছে। একটা ছোট্ট মেয়ে এত সব কিছু সহজে মানিয়ে নেবে কেমন করে? তার ওপর ওকে যে-মেয়েটা পড়াতে আসে, সেও যে কতটা ঠিকঠাক পড়াতে পারছে কে জানে? জিয়ানা ভাবল, এবার থেকে পড়াশোনার ব্যাপারটা মাঝে মাঝে দেখতেই হবে ওকে। তবে মরবিডিটির ব্যাপারটা সত্যিই চিন্তার। হঠাৎ দিদির কথা মনে পড়ল জিয়ানার। দিদিও তো এমন ছিল। তা হলে কি দিদির লক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে বৈভবীর মধ্যে? মরবিডিটি কি জিনবাহিত?
সুলগ্না বলল, ‘মিসেস বোস, ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝছেন? আপনাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই এমন কিছু হয় না যাতে ওর এই মরবিডিটি আসবে? কিছু মনে করবেন না, কিন্তু প্রশ্নটা আমায় করতেই হল।’
‘দ্যাটস ও কে,’ জিয়ানা হাসার চেষ্টা করল। পারল না। ও বলল, ‘আপনার কী সাজেশন? ওকে কি কাউন্সেলিং করালে ভাল হয়?’
‘আমি এখনই বলব না, কিন্তু পরে হলেও হতে পারে।’
‘তা হলে এখন কী করব?’ জিয়ানার নিজের কাছেই নিজের গলাটা অসহায় শোনাল।
‘যতটা সম্ভব ওকে চিয়ারফুল রাখুন। ছুটির দিনে ঘুরতে নিয়ে যান, আনন্দ করুন। ওকে বিশেষ একা থাকতে দেবেন না। আর আমরা তো আমাদের মতো করে চেষ্টা করবই।’
জিয়ানা মাথা নিচু করে রইল খানিকক্ষণ। মেয়েটা সত্যিই একা থাকে। ওই শয্যাশায়ী ঠাম্মা, আর আয়া, আর কলি—স্কুল থেকে ফেরার পর তো এদের সঙ্গে ছাড়া আর কারও সঙ্গে কথাই বলে না। ওদের আশপাশে তো কোনও সমবয়সি বাচ্চা নেই যার সঙ্গে একটু খেলবে মেয়েটা। কী যে করবে বুঝতে পারছে না জিয়ানা।
সুলগ্না এবার উঠল, বলল, ‘সরি, এবার আমায় উঠতে হবে, ক্লাস আছে। তবে আই উইল কিপ ইন টাচ উইথ ইউ। বৈভবী খুব সুইট মেয়ে। খুব মিষ্টি মেয়ে। আপনি নজর রাখবেন, কিন্তু টেনশন করবেন না। এভরিথিং উইল বি অলরাইট।’
স্কুল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠল জিয়ানা। সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পার্কিং থেকে বেরোতে যাবে, হঠাৎ বাঁ দিকের কাচে একটা ধপধপ শব্দ হচ্ছে শুনে মুখ ফেরাল ও। দেখল বালা পরা হাত দিয়ে একটা ছেলে মারছে কাচটায়।
‘হোয়াট ননসেন্স!’ জিয়ানার বিরক্ত লাগল, ‘এভাবে কাচে মারছ কেন?’
কাচ বন্ধ থাকায় ক্ষীণভাবে ছেলেটার গলা শোনা গেল, ‘আরে দিদি পারকিন ফি না দিয়েই সটকাচ্ছেন! তাড়াতাড়ি মাল ছাড়ুন।’
‘মাল?’ জিয়ানার রাগ হয়ে গেল ছেলেটার কথায়। এরা এত অসভ্য কেন!
কলেজেও একবার দুটো ছেলে ওকে টিজ করেছিল। ওড়না টেনে ‘মাল’ বলেছিল। ও দু’দিন কলেজে যেতে পারেনি। ভয়ে, লজ্জায়, কষ্টে নিজের ভেতরেই গুমরেছিল সারাটা সময়। ভাল করে খায়নি। ঘুমোয়নি। এমনকী কারও সঙ্গে কথা বলেনি। বারবার ছেলে দুটোর মুখ মনে পড়ছিল। কলেজের ফুটবল টিমের ষণ্ডা টাইপের দুটো ছেলে। ওদের বিরুদ্ধে যে কিছু করবে তাও পারেনি। তৃতীয় দিন কলেজে গিয়েছিল ও। মাথা নিচু করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিল। হঠাৎ কোত্থেকে যে একজন এগিয়ে এসেছিল! এসে সে জানতে চেয়েছিল, ‘তোর মুখচোখ এমন কেন রে? গত দু’দিন আসিসনি কেন? তোকে কেউ কিছু বলেছে?’ এ ছাড়াও একবার সুমন্ত বলে একটা ছেলে চূড়ান্ত অসভ্যতা করতে গিয়েছিল জিয়ানার সঙ্গে। সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল সেই ছেলেটা।
দুটো ক্ষেত্রেই বুকের কাছে ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে ও চোখ তুলে দেখেছিল ওর দিকে সটান তাকিয়ে আছে দুটো বড় বড় নীল চোখ।
জীবন আজ অনেক দূরে বেঁকে এসেছে। অমন নীল রং আর চোখেই পড়ে না জিয়ানার। ছুটিতে একবার ইংল্যান্ডে ঘুরতে গিয়েছিল বুকুর সঙ্গে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কাউন্টিগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে বুকু বলেছিল, ‘দেখো, আকাশটা কেমন চোখের মতো নীল!’
না, সেই নীল নয়। মাথা নামিয়ে নিয়েছিল জিয়ানা। কিছু বলেনি। বুকু ওকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলেছিল, ‘ইস, আমার চোখ দুটো যদি এমন নীল হত!’
ওই চোখ তুলে কেবলমাত্র একজনই তাকিয়েছিল। আর কেউ কোনওদিন পারেনি, কোনওদিন পারবেও না। জিয়ানা বুকুর জ্যাকেটে মুখ গুঁজে কেঁপে উঠেছিল সামান্য। বুঝেছিল এই কম্পনটুকুই একমাত্র ওর ব্যক্তিগত, আর কোনও কিছু নয়।
পার্কিং ফি দিয়ে গাড়িটা বের করে নিল জিয়ানা। এবার অফিস যাবে। আকাশ কালো করে এসেছে। মনে হচ্ছে যেন নোংরা একটা চাদর কেউ টাঙিয়ে দিয়েছে শহরের মাথায়। বিরক্ত লাগছে জিয়ানার। মেঘলা দিনে পলিউশন রেট যেন আরও বেড়ে যায়। ওর মাঝে মাঝে মনেই হয় না যে, এই তেলকালির শহরে ও এতগুলো বছর কাটিয়েছে। মাঝের ন’-দশটা বছর যেন ওকে পালটে দিয়েছে শারীরিকভাবে। যেমন এখন মুখ ফসকে কখনও সখনও বলে ফেলে, ‘আমাদের ওখানে এমন হয় না।’ জিয়ানা মাঝে মাঝে ভাবে, সত্যি মানুষ কখনও কখনও বোঝে না, কোনটা তার দেশ! যেখানে সে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকে সেখানে, না যেখানে তার মন পড়ে থাকে সেখানে।
পার্ক স্ট্রিটে ওদের অফিসটা বেশ বড়। নীচে পার্কিং লট আছে। গত সপ্তাহ থেকে এখানে গাড়ি রাখার সুযোগ পায় ও। কারণ তার আগে গোটা জায়গাটাই একদম বুক্ড থাকত।
দুটো বড় গাড়ির মাঝে নিজের গাড়িটাকে সাবধানে পার্ক করে নামল জিয়ানা। তারপর গাড়ি লক করে এগিয়ে গেল লিফ্টের দিকে।
এই বিল্ডিংটা ছ’তলা। এর ওপরের দুটো ফ্লোর ওর কোম্পানির। ওরা প্রজেক্টের কাজ করে। সিভিল, মেক্যানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইত্যাদি আরও ডিভিশন নিয়ে ওরা ব্যাবসার যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করে। আর এই সবকিছুকে কো-অর্ডিনেট করে, ওদের সেলসের সঙ্গে টেকনিক্যাল ব্যাক-আপ দিয়ে কাজটাকে সিনক্রোনাইজ করাই হল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটরের কাজ। তবে মাঝে মাঝে বেয়াড়া জায়গায় সেলস টিমের সঙ্গে ছুটতে হয় কো-অর্ডিনেটরকে। যদিও এই শেষের ব্যাপারটা এখনও করতে হয়নি জিয়ানাকে। আসলে এত বছর বিদেশের ওয়ার্ক কালচারে ছিল ও, তাই খুরানা ওকে ধাতস্থ হওয়ার জন্য হয়তো তেমন প্রজেক্টে ঠেলছেন না। তা ছাড়া সেলসে পুরনো কমপিটেন্ট লোকের অভাব নেই ওদের। ছ’জন, প্রায় কুড়ি বছরের এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে বসে আছে। তারা খুবই হেল্পফুল আর কাজটাও বোঝে। ফলে কো-অর্ডিনেটরদের চাপ কম।
যদিও অফিসে একটা কানাঘুষো চলে যে, খুরানা জিয়ানাকে বিশেষ চোখে দেখেন তাই এত মাইনে দিয়ে রাখলেও সেফ জোনে খেলতে দেন। জিয়ানা এসব পাত্তা দেয় না। কর্পোরেট সেক্টর হল চাইনিজ চেকার্স-এর বোর্ড। কে কাকে কীভাবে টপকাবে, বোঝা মুশকিল। সবার ভেতরেই একে ওপরকে টপকানোর ইচ্ছে ক্রমাগত চলে। ফলে চোরাগোপ্তা মার, বদনাম, বিপদে ফেলার মতো ঘটনা ঘটতেই থাকে।
জিয়ানার সঙ্গে আরও চারজন প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আছে। শ্যাম ভার্গব, ললিত রায়, শালিনী মেটা আর অনুজ সান্যাল। এদের মধ্যে শ্যাম নিজের চরকায় তেল দিতে পছন্দ করে। কিন্তু শালিনী আর অনুজ হল শয়তানের রিপ্রেজেনটেটিভ। ললিত ছেলেটা ভাল। একটু চুপচাপ, কিন্তু ভাল।
লিফ্টের ভেতরের ফ্যানটা চলছে না আজ। এমনিতেই মেঘের শহর খুব গুমোট, তার ওপর লিফ্টের মতো একটা কফিনে যদি ফ্যান না চলে তা হলে যে কী ঘোরতর অবস্থা হয়, কাকে বোঝাবে জিয়ানা! এই দেশে, মেনটেনেন্স বলে একটা ব্যাপার যে আছে, বোঝাই যায় না। লিফ্টের ফ্যানটা যে খারাপ হয়েছে সেটা জানালেও, জিয়ানা জানে যে, কিচ্ছু ঠিক হবে না। এদেশে সবাই যে-কোনও কাজ কাল করার পক্ষপাতী।
এখন পিক আওয়ার্স, তাই লিফ্টে এ ওর কোলে উঠে পড়ার মতো অবস্থা। গুটখা, পান, নস্যি, সিগারেট-নানারকম গন্ধের মিশ্রণ যেন পাক খাচ্ছে কফিনের মধ্যে। চিরকালই এসব গন্ধে গা গুলোয় জিয়ানার। বুকু যেদিন স্মোক করত সেদিন চুমু পর্যন্ত খেতে দিত না ও। বুকু বলত, ‘আরে বাবা, পুরুষ মানুষ সিগারেট না খেলে মানায়?’ বলত, তবে তারপর বহু দিন আর খেত না। আসলে সিগারেটটা বুকুর নেশা ছিল না কোনওদিনই। মাঝেমধ্যে কলিগদের পাল্লায় পড়ে খেত। তবে বুকু আর সিগারেট খায় না। বছর চারেক হল ড্রিঙ্ক করা শুরু করেছে। মদের গন্ধও ভাল লাগে না জিয়ানার। তবে এখন খুব একটা বেশি সহ্য করতে হয় না সেই গন্ধ।
লিফ্ট থেকে যখন ছ’তলায় বেরোল, জিয়ানার মনে হল স্নান করে বেরিয়েছে। লিফ্ট থেকে বেরিয়েই একটা চৌকো জায়গা, তার এক দিক দিয়ে ছাদের দিকে সিঁড়ি গেছে। এক দিকে ওয়াশরুম আর সোজাসুজি সামনের কাচের সুইংডোর। অফিসে ঢোকার দরজা। কাচটা ফ্রস্টেড, আর তার ওপর লেখা প্রোজেকশন কর্প।
দরজায় বনমালী বসে একটা হাত দেখার বই পড়ছিল। লোকটার দু’হাতে আঙুলে মোটমাট চোদ্দোটা আংটি। এত কীসের বিশ্বাস কে জানে! জিয়ানার মাঝে মাঝে অবাক লাগে। কৌতূহলও হয়। ভাবে জিজ্ঞেস করবে বনমালীকে যে, এইসব বই পড়ে কী জানতে চায় ও? যা হবে তা তো হবেই, সেটাকে জেনে বা বদলে দিতে কেন চায় মানুষ? তবে জিজ্ঞেস করতে পারে না, স্বভাবগত ও পদমর্যাদাগত ব্যাপারটা ওকে গম্ভীর করে রাখে।
ওকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝোঁকাল বনমালী। জিয়ানাও মাথা নাড়িয়ে ঢুকে গেল ভিতরে। ঠান্ডা করিডরে দাঁড়িয়ে শান্তি পেল ও। এখানে ঢুকলে মনেই হয় না পচা ভাদুরে গরমে গোটা কলকাতাটাই তন্দুর হয়ে গেছে।
ন’টা চল্লিশ বাজে, অফিস এখনও তেমনভাবে জমেনি। যতটা দেরি হবে ভেবেছিল, ততটা হয়নি। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল জিয়ানা। ওদের এখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিটেক্টর দিয়ে অ্যাটেডেন্স রাখা হয়। সেসব সেরে ডেস্কে গিয়ে বসল ও।
জিয়ানার সিটটা একদম ধারে। পাশে দেওয়াল। তাতে বড় কাচ লাগানো। জিয়ানার এখানে বসতে ভাল লাগে বেশ। ভেতর থেকে বাইরে দেখা গেলেও বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যায় না। আর অত ওপরে বসে গোটা শহরটাকে কম্পিউটারের রেসিং গেমের মতো মনে হয়। মনে হয় কালো রাস্তা দিয়ে অসংখ্য গাড়ি পাল্লা দিচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। আর একটা সময়ও খুব ভাল লাগে জিয়ানার। সূর্যাস্তের সময়। এত ওপর থেকে ওর মনে হয় ওপরের সূর্য আর মাটির শহরের মাঝে কেমন যেন ভেসে বেড়াচ্ছে ও। ওর মনে হয় একদিন অনেক উঁচু একটা বাড়িতে ও থাকবে।
তবে একদিন থাকবে, আজ নয়। আজ এখন কাজ করতে হবে ওকে। কোরাপুটে ওদের একটা প্রজেক্ট চলছে। ম্যানেজমেন্টের মতে তাতে এক্সপেনডিচার বেশি হচ্ছে। খুরানা বলেছে একটা প্রজেক্ট ট্যালি তৈরি করতে।
প্রায় দু’বছর ধরে প্রজেক্টটা চলছে। জিয়ানার এখানে জয়েন করার অনেক আগে থেকে। কিন্তু প্রথম থেকেই ঝামেলার জন্য কাজে দেরি হচ্ছে। তার মধ্যে বাজেটে দাম বেড়েছে জিনিসপত্তরের। যদিও প্রজেক্ট কনট্র্যাক্ট-এর ক্লজে এস্কালেশনের কথা ছিল, তবু যা এস্টিমেট ছিল খরচ তারও বেশি হচ্ছে। কতটা প্রফিট মার্জিন যে ড্রেন হবে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় আছে ম্যানেজমেন্ট। গত কয়েকদিন ধরে এটা নিয়েই কাজ করছে ও। আজ হোপফুলি শেষ করে ফেলতে পারবে।
ব্যাগটা টেবিলে রেখে কম্পিউটারটা সুইচ অন করল জিয়ানা। বাঁদিকের ড্রয়ার খুলে দুটো প্রজেক্টের কস্টিং ফাইল বের করল। এত বড় প্রজেক্ট, প্রায় সাড়ে চারশো কোটি টাকার। তার হিসেব করা কি চাট্টিখানি কথা! অবশ্য এ তো আর শুধু অ্যাকাউনটেন্টের হিসেব নয়, এর মধ্যে ট্রিগনোমেট্রি, কেমিক্যাল ব্যালেন্স করে নানান রাসায়নিকের ওজন বের করে তার খরচ, অ্যালজেব্রা, লগ, ক্যালকুলাস আরও অনেক কেরামতির অঙ্ক লুকিয়ে আছে।
অঙ্ক করতে ভাল লাগে জিয়ানার। তাই কাজটা করতে ভালই লেগেছে। ও জানে চেপে করতে পারলে লাঞ্চের পরেই হিসেবটা খুরানাকে সাবমিট করতে পারবে। কিন্তু তার জন্য কিছুক্ষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হবে।
কম্পিউটারে স্প্রেডশিটটা খুলে দেখতে যাবে, এমন সময় ফোনটা ক্যানক্যান করে বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ গেল জিয়ানার। মা। মা? এমন সময়! বিরক্তিতে মুখটা বেঁকে গেল জিয়ানার। সত্যি, মায়ের সময়জ্ঞানের তুলনা নেই! ভুলভাল সময়ে ফোন করতে মা ওস্তাদ! ভদ্রমহিলাকে বলে বলে পারে না জিয়ানা যে, এমন করতে নেই। অফিস টাইমে ফোন করতে নেই একদম। কিন্তু জিয়ানা এও জানে যে, ফোনটা ওকে তুলতেই হবে নইলে আর রক্ষে থাকবে না। মা কেঁদেকেটে একশা করবে। মায়ের রাগ, দুঃখ সব চড়া সুরে বাঁধা। একগুঁয়ে বাচ্চার মতো মায়ের যা চাই, তা চাই। ইচ্ছার সামান্য এদিক-ওদিক হলেই কেলেঙ্কারি।
‘বলো মা,’ ফোনটা তুলে বিরক্তি চেপে বলল জিয়ানা।
‘তুই কি আমার ফোন পেয়ে বিরক্ত হলি মিষ্টি?’
জিয়ানা ঠোঁট কামড়াল। এই রে! যতই চাপা দেওয়ার চেষ্টা করুক, মা ঠিক বুঝে ফেলেছে। এসব ব্যাপারে ভদ্রমহিলার একটা নিজস্ব ইন্সটিংক্ট আছে।
জিয়ানা হাসার চেষ্টা করল, ‘না মা, একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করতে হচ্ছে তো, তাই হয়তো তোমার গলাটা অন্যরকম লেগেছে।’
‘তাই?’ ফোনের ওপার থেকে দীর্ঘশ্বাস শুনল জিয়ানা। মা বড্ড বেশি সেন্টিমেন্টাল।
জিয়ানা বলল, ‘মা, একটু তাড়াতাড়ি বলবে কী দরকার?’
‘বলছি,’ মা আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘তোর বাবা বলেছিল তোকে একবার আসতে।’
‘এই তো কিছুদিন আগে গেলাম।’
‘তো? আর আসা যায় না?’
‘ঠিক আছে, যাব।’ জিয়ানা কথা শেষ করে রাখতে পারলে বাঁচে এমনভাবে বলল।
মা তবু ছাড়ল না। বলল, ‘আর সেই ব্যাপারটা নিয়ে কি কিছু ভাবলি?’
‘কোন ব্যাপারটা?’ জিয়ানা কমপিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল। প্রজেক্ট কস্ট বের করার সময় ইলেকট্রিক্যাল এস্টিমেশনে মনে হচ্ছে এরিয়া লাইটেনিং-এ কিছু গড়বড় থেকে গেছে।
‘আঃ,’ মা বিরক্ত হল, ‘তুই শুনছিস না ঠিকমতো। তুতুলের একটা ভাই নেওয়ার ব্যাপারটা। আর দেরি করিস না। একটা বাচ্চার কোনও ভরসা নেই। তাড়াতাড়ি নিয়ে নে। দেখলি তো কী হয় মানুষের জীবনে!’
‘মা,’ জিয়ানা কঠোর হল, ‘প্লিজ, আমায় এবার কাজ করতে দাও। বাপির কাছে আমি ঠিক যাব, বলে দিয়ো, কেমন?’
‘কিন্তু, মিষ্টি তুই কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছিস।’
‘মা, এখন রাখছি, বাই।’ কুট করে ফোনটা কেটে দিল ও।
এটা মায়ের নতুন সংযোজন। দেশে ফেরার পর থেকে শুরু করেছে, ‘আর একটা বাচ্চা নে।’ কেন? একটা সন্তানের নাকি গ্যারান্টি নেই। মাকে বুঝিয়ে পারে না ও যে, মানুষের জীবন টিভি, ফ্রিজ বা মোবাইল নয় যে, গ্যারান্টি কার্ড সমেত আসবে। কিন্তু মা বোঝে না। আসলে মা এমন করে কেন ও বোঝে। নিজের ছোটবেলার দিকে তাকালে মায়ের সেই মুখটা মনে পড়ে ওর। মনে পড়ে শোওয়ার ঘরে দেখা সেই দৃশ্যটা।
তবে যাই ঘটে থাকুক, অতীত তো অতীতই। আর মায়ের সঙ্গে অমন হয়েছে বলে জিয়ানার সঙ্গেও অমন হবে, তা তো নয়। কিন্তু মা কিছুতেই বোঝে না এটা, শুধু চাপ দেয়। নিজের মত অনুযায়ী কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। আর এটা সম্ভব হয় বাপির জন্য। বাপি কেন যে মাকে একটু কিছু বলে না! জিয়ানা মায়ের সঙ্গে না পেরে মাঝে মাঝে বাপির ওপর রাগ করে। কখনও কখনও ভাল-মন্দ কথাও শুনিয়ে দেয় বাপিকে। তবু বাপি কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।
বাচ্চা নেওয়ার কথা আর ভাবতে পারে না জিয়ানা। বাচ্চা নিতে গেলে যেমন সম্পর্ক চাই, বুকুর সঙ্গে তা আর প্রায় নেই। সারাদিন খাটাখাটনির পর জিয়ানার আর ইচ্ছে করে না। তা ছাড়া পুরনো, বহু পুরনো একটা জিয়ানাকে আজকাল ভেতরে আবার টের পায় ও। মনে হয় বহু বহু দিন ঘুমের পর পুরনো সেই মেয়েটা ওর ভেতরে জাগছে। এত বছরের এত ঘটনা সরিয়ে, জিয়ানা বোঝে একজন যেন মাথা তুলছে। যেন তার ফেরত আসার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন হচ্ছে এমন?
জিয়ানা বোতল থেকে জল খেল খানিকটা। তারপর নিজেকে সংযত করে ডুবে গেল কম্পিউটারে। মনে মনে নিজেকে লাঞ্চ অবধি সময় দিল ও। তার ভেতর যে করে হোক এটা শেষ করে খুরানার কাছে সাবমিট করবে।
বারোটা অবধি মন দিয়ে কাজ করে ঠিক কাজটা গুটিয়ে আনল জিয়ানা। এবার শুধু সামারিটা করা বাকি। ও হাঁফ ছাড়ল। সত্যিই খুব জটিল ছিল কাজটা। আর এটাও সত্যি যে, ম্যানেজমেন্টের আশঙ্কাও ঠিক। বেশ কিছু টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়ে গেছে। জিয়ানা জানে এটা নিয়ে সাইট ম্যানেজারদের ওপর একটা স্টেপ নেওয়া হবে।
জিয়ানা উঠল। একটা কফি দরকার। ওদের বড় ঘরের কোনায় কফি মেশিন রাখা থাকে। অফিসে জিয়ানা কফিটা প্রেফার করে। এদের চায়ের যা কোয়ালিটি, মুখে দেওয়া যায় না।
পাশে রাখা একটা পেপার কাপে কফিটা নিল জিয়ানা। গন্ধটাই রিফ্রেশিং। ও চুমুক দিতে যাবে এমন সময় পিছনের থেকে শুনল, ‘আরে জিয়ানা, তুমি খবরটা শুনেছ?’
‘খবর?’ জিয়ানা কাপটা হাতে ঘুরল। ললিত। বেঁটে কালো মানুষটাকে বেশ উত্তেজিত লাগল।
‘আরে বিশাল কেলো!’ ললিত বাঁ হাত দিয়ে টাইয়ের নটটা ঠিক করে বলল, ‘এক সঙ্গে ছ’জন গেছে।’
‘মানে?’ জিয়ানা ভুরু কুঁচকে তাকাল। ললিতের এই এক সমস্যা। কোনও কথা সরাসরি বলে না।
‘প্লিজ কাট দ্য ক্র্যাপ, কী হয়েছে বলো?’
‘বিশাল কেস! পুরো কোম্পানির ব্যাকবোন কেঁপে গেছে।’ ললিত বলল।
‘আরে, কী হয়েছে বলবে, না একশো পাতা ইনট্রো দেবে?’ এবার ঝাঁঝিয়ে বলল জিয়ানা। ও জানে এটা ললিতের ওষুধ।
ললিত বোকার মতো হাসল। বোধহয় জিয়ানার রাগটাকে প্রশমিত করার জন্যই। তারপর বলল, ‘সেল্সের ছ’জন গতকাল একসঙ্গে রিজাইন করে অন্য জায়গায় জয়েন করেছে।’
‘মানে!’ জিয়ানার হাত থেকে কফিটা একটু চলকাল। বলছে কী ললিত?
‘হ্যাঁ, আমাদের সেল্স টিমের ছ’জনকে ওয়াটার বার্ড কোম্পানি জাস্ট একসঙ্গে তুলে নিয়েছে।’
‘সে কী?’ জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
ওয়াটার বার্ড ওদের সবচেয়ে পুরনো কমপিটিটর, আর হার্ড কমপিটিটর। গত মাসেই ওরা একটা সুইডিশ কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। তারপর এ মাসে জিয়ানাদের সেল্সের টিমটাকে এমনভাবে তুলে নিল! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার।
জিয়ানা বলল, ‘তুমি ঠিক জানো?’
ললিত হাসল, ‘সারাদিন কম্পিউটারে মুখ গুঁজে থাকলে জানবে কেমন করে? আরে বাবা, ঘাস খেতে খেতে মাঝে মাঝে আকাশের দিকেও মুখ তুলে তাকাতে হয়। খবরটা অফিসের সবাই জানে আর তোমায় দেখে মনে হচ্ছে যেন গাছ থেকে পড়লে!’
জিয়ানা কফিটা শেষ করে, কাপটা বিনে ছুড়ে ফেলে বলল, ‘তা হলে কী হবে?’
ললিত চলে যেতে গিয়েও দাঁড়াল একটু, ‘কী আর হবে! বাঁশের সময় আসছে। সেল্স থেকে আমাদের ওপর বিশেষ চাপ আসত না। এবার ‘কাম কা বাম্বু লেনা হ্যায় জাম্বো’ হবে। হার্ড ডেজ আর কামিং জিয়ানা, হার্ড ডেজ আর কামিং।’
হার্ড ডেজ। কঠিন দিন। সেল্সের প্রচণ্ড চাপ এবার বুঝতে পারবে জিয়ানা। টেনশন হচ্ছে ওর। সামনে অনেক কাজের লিড। সেসব ফলো-আপ আর তার পরের ধাপের কাজকর্ম খুব কঠিন হয়ে গেল। এভাবে ছ’জন কখনও ছেড়ে যায়!
জিয়ানা নিজের সিটে ফিরে গিয়ে বসল। কিন্তু কম্পিউটারের দিকে না তাকিয়ে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। এ ওকে টপকাচ্ছে, ও একে মেরে বেরিয়ে যাচ্ছে। লোকজন প্রাণ হাতে করে রাস্তা পেরোচ্ছে। হকাররা চিৎকার করছে। আর পুরনো বাড়ির লম্বা লম্বা ছায়া বিপদের রং লাগিয়ে দিচ্ছে সব কিছুতে। কম্পিউটার গেমসের শহরটার দিকে তাকিয়ে রইল জিয়ানা। ও বুঝল, এ খেলার কন্ট্রোল ওর হাতে নেই। কারণ এই বিশাল খেলাটার ভেতর ও নিজেই যে ঢুকে পড়েছে এখন!
Chapter - 4
৪
অফ স্টাম্পের ওপর বলটা ছাড়বে, না খেলবে ভাবতে ভাবতেই মেট্রোটা চলে এল। আদি বিরক্তিতে মাথা নাড়ল শুধু। আর দু’মিনিট সময় পেলে ও ঠিক জিনিসটাকে লাইনে এনে ফেলত।
জিনিস! জিনিসই তো। আদি জানে মেয়েরা জিনিস। একটি মেয়েই ওকে শিখিয়েছিল এটা সেই এগারো ক্লাসে। স্কুলের শিক্ষা। এত সহজে কী করে ভোলে ও? সেই থেকে এই আঠাশ বছর বয়স অবধি ও মেয়েদের এভাবেই দেখে এসেছে।
ট্রেনটা জমাট হয়ে আছে ভিড়ে। বিকেলের দিকের মেট্রোগুলোর এই এক প্রবলেম। তার ওপর স্টেশন বেড়ে যাওয়াতে ভিড়টা বেড়েছে আরও। পিঠের ব্যাগটা ঠিক করে ভিড় ঠেলে একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়াল আদি।
বারাসতে গিয়েছিল ও। ওদের কোম্পানি এখন রিয়েল এস্টেটে নেমেছে। তার যোগাযোগ করতে ওকে যেতে হয়। বস ওকে অফিসে বসে কাজ করতে দেয় না। টো-টো করে ঘুরিয়ে মারে। বর্তমানে উত্তর চব্বিশ পরগনায় ওদের কোম্পানির ব্যাবসা ক্রমশ বাড়ছে।
মার্চেন্ট মাল্টিপল্স লিমিটেড বর্তমানে উত্তর চব্বিশ পরগনার ওপর দৃষ্টি দিয়েছে। ওদের ইস্টার্ন রিজিয়নের ডিরেক্টর গৌর রোশন দিওয়ান বলেন যে, এত বড় একটা টেরিটরি পড়ে রয়েছে আর সেটাকে কেউ ট্যাপ করছে না! এটা তো এবার ধরতেই হবে।
মছলন্দপুরের কাছে চাপাডাঙা গ্রামে একটা পার্টিকল বোর্ডের ফ্যাক্টরি খুলেছে ওদের কোম্পানি। একটা মিনারেল ওয়াটার, ফ্রুট জুসের ফ্যাক্টরিও খুলতে চায়। তার সঙ্গে বারাসত অঞ্চলে বিশাল জমি কিনে রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে।
গৌর রোশন দিওয়ানের বয়স সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ মতো। লম্বা, দোহারা চেহারা। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। মানুষটা খুব মাই ডিয়ার ধরনের। সবার সঙ্গে হেসে, কাঁধে হাত রেখে কথা বলেন। আদিকে বিশেষ পছন্দ করেন। বলেন, ‘আদিত্য, তুমি আমার চোখ। বুঝলে? চোখ যা করে, তোমায় তাই করতে হবে। আমি জানি তুমি তোমার কোম্পানির প্রতি লয়াল থাকবে।’
লয়াল, লয়ালটি। আদি হাসে মনে মনে, কথাগুলোর কি সত্যি কোনও মানে আছে? গৌরের কাছ থেকে ও ভাল মাইনে পায়, তাই সাধ্যমতো কাজ করে। এর চেয়ে বেশি টাকা যদি কেউ ওকে অফার করে তা হলে ও সেখানে চলে যাবে। লয়ালটি ফয়ালটির কোনও দাম আদির কাছে নেই।
আজ বারাসত থেকে দমদম, তারপর সেখান থেকে বেলগাছিয়ায় গিয়েছিল আদি। বারাসতের এই প্রজেক্টটার যারা অ্যাড ক্যাম্পেন করছে তাদের অফিস বেলগাছিয়ায়। সেখান থেকে বেরিয়ে এই মেট্রোটা ধরেছে। আজ দমদম থেকেই পুরো লোড হয়ে এসেছে গাড়ি।
ওর অফিস ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিটে। হাইকোর্টের উলটোদিকে। পুরনো একটা বাড়ির ভেতর ঝাঁ-চকচকে অফিস ওদের। আদি জানে আজকের মিটিং-এর ফলাফল শোনার জন্য গৌর অপেক্ষা করে আছে।
আসলে ওদের এই আবাসন প্রকল্প নিয়ে একটা স্থানীয় সমস্যা হচ্ছে। কিছু লোকাল লোক চাইছে কাজটা পণ্ড করতে। যদিও মস্তান হিসেবে তারা আসছে না, আসছে সমাজসেবী হিসেবে। কিন্তু আদি খবর নিয়েছিল ওদের সম্বন্ধে, এবং জেনেছিল যে, ওরা আসলে মস্তানই।
এমনিতেই অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে নানারকম প্রজেক্ট আটকে আছে। ঘরবাড়ির বুকিং খুব একটা হচ্ছে না। তার মধ্যে একটা প্রজেক্ট যদি ডিলেড হয় তা হলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।
ওই সমস্ত মানুষগুলোর দাবি হল যে, মার্চেন্ট মাল্টিপল্স যে-পরিমাণ জমি কিনেছে তার থেকে একটা অংশ বাচ্চাদের পার্ক করতে দিতে হবে। কারণ, জমিটা যখন কেনা হয়েছিল তখন মার্চেন্ট থেকে বলা হয়েছিল যে, আবাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষদের জন্য এই জমির একটা অংশ থেকে একটা পার্ক তৈরি করে দেওয়া হবে।
আসলে সেটা ছিল জাস্ট কথার কথা। গৌর ভেবেছিল স্থানীয় ক্ষমতাশালী লোকদের কিছুটা দান-দক্ষিণা দিয়ে ব্যাপারটা চাপা দিয়ে দেবে। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক পালাবদল হওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। পার্টির ছত্রচ্ছায়ায় থাকা কিছু উটকো মস্তান সমাজসেবী হিসেবে এসে প্রজেক্ট বন্ধ করে দেবে বলে হট্টগোল করছে।
‘উটকো মস্তান’ কথাটা অবশ্য গৌরের কয়েনেজ। আর প্রথম দিকে আদিও তেমন ভাবত। কিন্তু এখন, মানে, আজকের মিটিং-এর পর আর ভাবছে না। কারণ, রোগা চাপদাড়ির একটা ছেলে আজ মিটিং-এ ছিল যে যথেষ্ট গুছিয়ে কথা বলতে পারে। উটকো মস্তানরা এমন হয় না। ছেলেটাকে সবাই বিল্টু বলে ডাকছিল। যদিও ভালনাম ত্রয়ণ। ছেলেটি বারাসতের নয়। আরও দূরে থাকে। ছেলেটির ভেতরে একটা অদ্ভুত গোঁ দেখেছে আদি। যেন পণ করে নিয়েছে যে, পার্ক না করে দিলে কিছুতেই আবাসন করতে দেবে না। ছেলেটি যে ভোগাবে খুব, বুঝতে পারছে আদি। এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলেটির ভেতরে যে-ধরনের প্রতিরোধ রয়েছে তা অনেকদিন দেখেনি আদি।
অনেকদিন মানে কতদিন? মাস দেড়েক? তাতেই কি অনেকদিন মনে হচ্ছে? সে থাকতে তো এমনটা মনে হয়নি! তা হলে দাদাভাই চলে যাওয়ার পর এমন মনে হচ্ছে কেন? গত দেড় মাস দাদাভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নেই ওর। না, সেইসব কারণের জন্য নয়, এমনিই যোগাযোগ করা হয়নি আদির। এমনি? নাকি আদির ভেতরে একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ রয়েছে? ও তো জানত, তবু ও এমনটা হতে দিল! কেন দিল? আদি কারও জন্য কেয়ার করে না বলে? ওর কারও প্রতি লয়ালটি নেই বলে? ও বিশ্বাস করে না লয়ালটি বলে কিছু আছে বলে? নাকি দাদাভাইকে ভালবাসত না বলে?
প্রশ্ন। জীবন নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন আদির। কিন্তু উত্তর বিশেষ পায় না।
উত্তর চব্বিশ পরগনা ওর কাজের জায়গা হলেও দীর্ঘদিন চাপাডাঙায় যায়নি। অবশ্য তেমন দরকারও পড়েনি। দাদাভাই সব সামলে রেখেছে ওখানে গিয়ে। তবু দাদাভাই ওখানে যাওয়ার আগে তো যেত প্রায়ই। এমনিই সব দেখাশোনা করে আসত। কিন্তু এখন যায় না। দাদাভাইকে এড়াবে বলেই কি?
দাদাভাই কি খুব অসুবিধে করেছিল সবার? হঠাৎ তবে এমন হল কী করে? বাড়িতে চিরকালই সম্পত্তি নিয়ে ভিতর ভিতর একটা চাপা টেনশন চলে। তা বলে তার জন্য এমনটা করতে হবে? না, আদি এসব ব্যাপারে থাকে না। অফিস করে, আড্ডা মেরে বা ডিস্কে গিয়ে সময় কেটে যায় ওর। আর সত্যি বলতে কী, বাড়ির লোকজনও বেশ ভয় পায় ওকে। ও কখন যে কী বলে দেবে সে ব্যাপারে বাবা, মা, সবাই খুব তটস্থ থাকে। আসলে আদি তো বাবা-মাকে উলটোপালটা কথা বলেওছে। আর এখনও বলে। দাদাভাইয়ের মতো এমন চুপ করে থাকার পাত্র নয় আদি। অন্যের ক্ষেত্রে আদি চুপ করেই থাকে। তেমন হলে তো দাদাভাইয়ের জন্য গলা ফাটাত। তা তো করেনি। বরং সে রাত্রে বাড়িতেই ফেরেনি। মদ খেয়ে, ডিস্ক হপিং করে কাটিয়ে দিয়েছিল রাতের অধিকাংশ সময়। তারপর এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সত্যিই সেই ঘুম কি আজও ভেঙেছে?
মাস দেড়েক ধরে এই কথাগুলো কেমন যেন খোঁচাচ্ছে আদিকে। আগে হত না কিন্তু এখন এমন কেন হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছে না। গত দেড় মাসে কি সেক্স কমিয়ে দিয়েছে আদি? তাই কি এমন হচ্ছে?
নিজেরই হাসি পেল। ও জানে এমনটা নয়। তবু মনে হল। গত তিনদিন কারও সঙ্গে শোয়নি আদি। আজ হলে চারদিন হবে। যা ওর কাছে রেকর্ড। রেকর্ড যাতে না হয় সেটা দেখতে হবে। আসলে রিনা, দিয়া বা শালিনী এখন কলকাতায় নেই। তবে মহুল আছে। কিন্তু মহুল কি দেবে? মহুল আজকাল আর তেমন পাত্তা দেয় না আদিকে। দেখা যাক, কিছু না হলে আজ মহুলকে ট্রাই নেবে।
মহুল এক অদ্ভুত মেয়ে। কী জেদি আর একগুঁয়ে রে বাবা! ছোট থেকে পাশের বাড়িতে থাকত। কিন্তু কোনওদিন পাড়ার কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে যেত না। নিজের খেয়াল আর অ্যাম্বিশন নিয়ে থাকত। মহুলকে প্রথম থেকেই পছন্দ ছিল আদিত্যর। কিন্তু মহুল পাত্তা দিত না। আসলে কাউকেই পাত্তা দিত না মহুল। তাতে যেন আরও কাতর হয়ে পড়ত আদি।
একবার ক্লাস টেনে পড়ার সময় তো সত্যি সত্যি হাতে কম্পাস ঢুকিয়ে রক্ত বের করে মহুলের নাম লিখেছিল একটা চিঠিতে। তবে শুধু নামটাই লিখেছিল। পুরো চিঠিটা লেখেনি। অত রক্ত যে দিতে পারবে না সেটা ভালই বুঝেছিল আদি। তবে চিঠিটা পৌঁছে দিয়ে খুব সাবধানে আদি বলেছিল, ‘তোমার নামটা আমার রক্ত দিয়ে লেখা।’
ক্লাস ইলেভেনের মহুল ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ‘কেন? পেনের কালি ফুরিয়ে গিয়েছিল? না যাত্রা দেখছিস আজকাল বেশি? ইউ বয়েজ আর ইনকরিজব্ল। তো বল, আমায় তোর জন্য কী করতে হবে? চুমু খাবি। নে খেয়ে যা। বুকে হাত দিবি। দে। তারপর আমায় রেহাই দে। এসব মেলোড্রামা আমার সামনে আনবি না।’
প্রায় পালিয়ে এসেছিল আদি। কষ্টে দু’রাত ঘুমোতে পারেনি। মাধ্যমিকের সিলেকশনে নম্বরও কমে গিয়েছিল। তারপরও বেশ কিছুদিন লেগেছিল মহুলের শক থেকে নিজেকে বের করে আনতে।
সেই আদিকে দেখলে এই এখনকার আদির হাসি পায়। সেই গালে হালকা দাড়ি, রোগা আর ভিতু ছেলেটার অসহায় মুখ মনে পড়লে আদির মনে হয় কী বোকা, কী বোকা ছিল ও! ‘জিনিস’-এর জন্য এমন মনখারাপ করে কেউ!
তবে সে সময় তো আর মেয়েদের ‘জিনিস’ ভাবত না ও। যাজ্ঞসেনীকে তো নয়ই। যাজ্ঞসেনী আইয়ার। মা বাঙালি, বাবা কেরলের লোক। যাজ্ঞসেনীর বোন কৃষ্ণা পড়ত আদিদের কেমিস্ট্রি ব্যাচে। আর সেখানেই মাঝে মাঝে বোনের সঙ্গে আসত কলকাতার নামকরা কলেজের সেকেন্ড ইয়ার কেমিস্ট্রি অনার্সের যাজ্ঞসেনী। প্রথম দিনই আদিকে দেখে বলেছিল, ‘আরে, আই হ্যাভ সিন ইউ আরলিয়ার। আমাদের কলেজের সায়েন্স ক্যাম্পে তুমি এসেছিলে না লাস্ট ইয়ারে? আরে সেই যে বার্নার উলটে তুমি আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলে খাতায়। তোমার দাদা তাড়াতাড়ি নিভিয়ে দিয়েছিল। হি ওয়াজ দি এক্স স্টুডেন্টস রিপ্রেজেনটেটিভ। কান্ট রিমেম্বার হিজ নেম, বাট আমার মনে আছে যে, হি হ্যাড বিউটিফুল আইজ। বিগ অ্যান্ড ব্লু আইজ। তোমার দাদার অমন নীল চোখ আমি বাঙালিদের মধ্যে দেখিনি। হাউ ইজ হি নাউ?’
যাজ্ঞসেনীর কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল আদি। ওই নরম হাওয়ায় উড়তে থাকা যাজ্ঞসেনীর চুল। ওর হালকা জোড়া ভুরু। বিশাল বড় আকাশজোড়া চোখ। ওর ঘাড়ের কাছে ভেঙে পড়া চুলের কুচি। ছোট ছোট সার দেওয়া বিজ্ঞাপনের মতো দাঁতের সারি। গোলাপি আঙুল। এইসব দৃশ্য যেন ক্রমাগত ছুরি দিয়ে আঘাত করছিল আদিকে। গন্ডগোল হচ্ছে, ঘোরতর গন্ডগোল হচ্ছে বুঝতে পেরেও যেন নিরুপায় হয়ে তাকিয়েছিল আদি। সেই ছুরিকাঘাত থামানোর মতো জোর যেন ছিল না ওর। একসময় কথা থামিয়ে হাত নেড়ে চলে গিয়েছিল যাজ্ঞসেনী, কিন্তু বুঝতে পারেনি যে, পিছনে একজন মানুষ পড়ে রইল। প্রেমে পড়ে রইল সে।
আদির সেই রাতে মনে হয়েছিল, এই মেয়েটির জন্য যা খুশি তাই করতে পারে ও। এই মেয়েটির জন্য শরীরের সমস্ত রক্ত দিয়ে চিঠি লিখতে পারে। পারে সারা জীবন নিজের বুকের ভেতর একে ধরে রাখতে। সাতদিন নাওয়া-খাওয়া প্রায় ভুলে গিয়েছিল আদি। তারপর এসেছিল সুযোগ, যাজ্ঞসেনীর কাছে যেতে পারার সুযোগ। তাই কৃষ্ণার জন্মদিনের নেমন্তন্নটা দু’হাত দিয়ে ভগবানের প্রসাদের মতো গ্রহণ করেছিল আদি। কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। কিচ্ছু করতে পারেনি আদি। যাজ্ঞসেনী ভেসে বেড়িয়েছিল দূরে। আর তার কিছুদিন পর আদি জেনেছিল যাজ্ঞসেনীর মনের কথা।
চাঁদনিতেও নামলে হত, কিন্তু নামল না আদি। এসপ্ল্যানেডে নামবে। একটা ছোট্ট কাজ সেরে তারপর অফিস যাবে।
এসপ্ল্যানেড স্টেশনটা যেন কুয়াশা দিয়ে তৈরি। অন্য কোনও স্টেশন নয়, এই স্টেশনটায় নামলেই কেন যে এটা মনে হয় আদির, ও নিজেই জানে না। মনে হয় দূর কোনও পাহাড়ের প্রচুর কুয়াশা এসে ঢুকে পড়েছে এই মাটির তলায়। কী আছে এসপ্ল্যানেড স্টেশনে যে, এমন মনে হয়? কাউকে এই কথাটা বলতে পারে না আদি। ও জানে কেউ পাত্তা দেবে না। তা ছাড়া ভাববে ইয়ারকি মারছে। আসলে আদির ইমেজের সঙ্গে যেন এইসব কথাবার্তা খাপ খায় না।
আদি ভাবে যে, এই ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে বা ভাঙতে না পেরে কত মানুষের যে ঠিকমতো বাঁচাই হয় না! কত মানুষ যে বলতেই পারে না সে আসলে কী চায়? কত মানুষ ভাল করে তাকাতেই পারে না তার গোপন পছন্দের মানুষটার দিকে। ইমেজ আসলে একটা কারাগার। নিজেকে বন্দি রাখার জায়গা।
আদি ঘড়ি দেখল। এখনও প্রচুর সময় আছে। গৌর বলেছে সন্ধে সাতটার মধ্যে ফিরলেই হবে। ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে পা দিল আদি।
‘এই আদিত্য, এই আদিত্য।’ গলাটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল আদি। আর সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে গুঁতো আর বিরক্তিসূচক শব্দ ভেসে এল একরাশ। আদি দ্রুত ভিড়ের স্রোতকে বাধা না দিয়ে সরে গেল একটা থামের পাশে। প্রচুর মানুষ পিঁপড়ের মতো সার দিয়ে হাঁটছে। তার ভেতর একজন নির্দিষ্ট মানুষকে ঠাহর করা খুব মুশকিল। তবু এদিক-ওদিক তাকাতে থাকল আদি। গলার স্বরটা বেশ চেনা লাগছে। কিন্তু ডাকছে কে? পুজোর মুখের কলকাতা এখন। শহরের সবাই যেন শপিং করতে বেরিয়ে পড়েছে একসঙ্গে। রংচঙে এত মানুষ আর প্লাস্টিকের ব্যাগের খচমচের ভেতরে কে ডাকল আদিকে? ও ভাল করে চারিদিকে তাকাল।
আচমকা ঠাস করে থাপ্পড় পড়ল মাথায়, ‘এই শালা অন্ধ, দেখতে পাচ্ছিস না?’ আদি আচমকা থাপ্পড়ে ঘাবড়ে গিয়ে পিছনে তাকাল। আরে, আবেশ!
আবেশ গোস্বামী। দাদাভাই আর আদির কমন ফ্রেন্ড। ছেলেটা একটু অদ্ভুত। বিশাল বড়লোক মামার বাড়িতে আশ্রিতের মতো থাকে। ছোটবেলায় ওর বাবা অন্য একজনকে বিয়ে করে চলে গিয়েছিল বাড়ি ছেড়ে। আর সেই দুঃখে ওর মা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে। তারপর থেকে আবেশ মামার বাড়িতে মানুষ। ওর ভাষায়, ‘মামার বাড়িতে অমানুষ।’
মামা আবেশকে নিজেদের চালের আড়তে বসাতে চেয়েছিল। তাতে আবেশ বসেনি, বরং বলেছিল, ‘আমি অমন চালবাজ হতে পারব না।’ আদি মাঝে মাঝে ভাবে যে, আবেশের চলে কী করে?
আবেশ ছবি আঁকা শেখায়। আবেশ মাঝে মাঝে কোনও প্রোডাক্টের প্রোমোশনের জন্য খেপ খাটে। কেটারিং-এর দলে ভিড়ে কখনও পরিবেশন করে আসে। কোনও কনট্রাক্টরের অধীনে সাত-দশদিন কাজও করে দেয়। আর এসব সাতপাঁচ কাজ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে ও বলে, ‘এসব করতে করতেই একদিন এমন একটা দাঁও মারব না, তোরা সক্কলে চমকে চোদ্দো হবি!’
না, এখনও পর্যন্ত চোদ্দো তো দূরের কথা, একও হয়নি আবেশের। তবে ওর এই মনখারাপ না করা, সদ্যহাস্যময় চেহারাটা ভাল লাগে আদির। মনে হয় এই পৃথিবীর কোনও কিছুই স্পর্শ করতে পারে না আবেশকে।
‘কী রে শালা? চিনতে পারছিস না?’ আদির থতমত মুখটা দেখে চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল আবেশ, ‘মাস চারেক ছিলাম না আর তাতেই শালা ভুলে মেরে দিলি আমায়? ভুলে গেলি আমি বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলাম বলেই রিনাকে প্রথমবার লাগাতে পেরেছিলি?’
‘তোকে কি ভুলতে পারি রে দালাল?’ আদি শব্দ করে হাসল, ‘তা হঠাৎ এখানে? এতদিন কোথায় ছিলিস?’
‘আমি? কুকুর ধরছিলাম।’ আবেশ ভারিক্কি গলায় বলল।
‘কী ধরছিলি?’ আদি উত্তর শুনে একটু ঘাবড়ে গেল।
‘কুকুর ধরছিলাম রে, কুকুর ধরছিলাম।’ আবেশ এমন করে বলল যেন টেররিস্ট ধরছিল।
‘কুকুর! মানে?’ আদি বুঝতে পারল না আবেশ কী বলতে চাইছে।
‘মানে কুকুর ধরছিলাম। ডগ রে ডগ। শালা নিজের নাম বুঝতে পারছিস না?’
আদি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কুকুর ধরছিল! ছেলেটা বলে কী?
‘মিজোরাম গিয়েছিলাম। ওখানে কুকুর খায় ওরা। তারপর অসম, ত্রিপুরা ইত্যাদি জায়গায় স্ট্রে ডগ ধরছিলাম।’
‘ইয়ারকি মারছিস না তো?’ আদি দেখল দমদমের দিকে যাওয়ার মেট্রো ঢুকল। আবেশ কোন দিকে যাবে?
আবেশ হাসল, ‘আরে না না, ইয়ারকি মারব কেন রে? আমি একটা কনট্রাক্টরের হয়ে কাজের জন্য গিয়েছিলাম নর্থ-ইস্টে। সে ব্যাটা হাফ কাজ করে পার্টির টাকা মেরে পালিয়ে গিয়েছিল। আর আমরা গিয়েছিলাম ফেঁসে। তা সেখান থেকে একজনের হয়ে কুকুর ধরার কাজে লেগে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের আরও ব্যাবসা ছিল। একটা মেয়েও ছিল। ভাবলাম যদি জামাই হওয়া যায়। কিন্তু সেই মেয়ে শালা বহুত খচ্চর। নিজের একটা ডোবারম্যান ছিল। লেলিয়ে দিল। শালা গত চার মাস কুকুরে কুকুরে জেরবার হয়ে গেছি একেবারে! তাই চলে এলাম।’
আদি ঘড়ি দেখল। আবেশ বকতে শুরু করলে মাথা খারাপ করে দেবে। দেরি হয়ে যাবে খুব। তখন আবার গৌরের থেকে ঝাড় খাবে। ফলে এখন যেতে হবে ওকে।
আদি বলল, ‘শোন না, আমায় অফিস যেতে হবে একবার। তুই বাড়িতে আয় একদিন। গল্প হবে।’
‘বাড়িতে? চাঁদু তুমি বাড়িতে থাকো কখন? অফিস, কফি শপ, ডিস্ক আর রংবেরঙের মেয়েছেলের বিছানা ছাড়া তোমায় পাওয়া যায়?’
আবেশ এমন করে কথাগুলো বলল যে, আশপাশের লোকজন ফিরে তাকাল ওদের দিকে। খুব বাজে লাগল আদির। আবেশের হইহই করার স্বভাবটা মাঝে মাঝে খুব অস্বস্তিতে ফেলে ওকে।
আদি বলল, ‘বাজে কথা রাখ। তোর মাইরি সেন্স হবে না কোনওদিন। এই যে আমার কার্ড নে। অফিসে আসিস।’
‘কার্ড?’ আবেশ হিহি করে হাসল, ‘আজকাল মেয়েদের সঙ্গে শুয়েও কি এমনভাবেই কার্ড দিস? দেখাস যে, দেখো কার সঙ্গে তুমি ইয়ে করলে?’
‘শালা, তোর সঙ্গে কি শুয়েছি?’
আবেশ চোখ টিপল, ‘চাস নাকি? আজকাল শালা সবার কী হয়েছে বল তো?’
‘আমি আসছি। তুই ভাট বকে যা।’ আদি এগোতে গেল।
‘শোন না, তোর সেন্স অফ হিউমারটা বরাবর খারাপ।’
‘এগুলো ননসেন্স হিউমার। যাক এবার যেতে হবে আমায়। ওই দেখ আর-একটা মেট্রো ঢুকছে।’
‘ও কে, রাগ করিস না ভাই। শোন না, আমি একদিন তোদের অফিসে যাব। ছোট্ট একটা দরকার আছে। ভয় পাস না। টাকাপয়সা চাইব না।’
আদি হাসল, ‘আসিস অফিসে। এখন ভাগ। আমাকেও যেতে দে।’
কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আচমকা ঝকঝকে রোদ্দুরে এসে পড়ল আদি। পুজোর মুখের কলকাতা একদম ছড়িয়ে রয়েছে সামনে। এত লোক কীভাবে সামলায় এই শহর? আদি দেখল হাতে ব্যাগ নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো মানুষজন খানিকটা যেন ছোটাছুটিই করছে।
বিরক্তি নিয়ে ফুটপাথে নামল আদি। লোককে সঙ্গে ধাক্কা না মেরে এগোনোর উপায় নেই। নেহাত খুব দরকার, তাই এখন এসেছে। বিখ্যাত এক পরোটার দোকানের দু’-চারটে দোকান পরেই ক্যামেরা সারাইয়ের দোকান। সেখানেই যেতে হবে আদিকে। দোকানটা অনেক পুরনো। কিন্তু ক্যামেরাটা এরা খুব ভাল সারায়।
ঠাকুরদার একটা ভাল ক্যামেরা ছিল। ঠাকুরমা সেটা দিয়েছিল দাদাভাইকে। যদিও তা নিয়ে জলঘোলা হয়েছিল বিস্তর। মানে বাবা আর মা-ই মূল জলটা ঘুলিয়েছিল। কিন্তু ঠাকুরমা শোনেনি। ঠাকুরমা কারও কথা শুনত না। দাদাভাইকে নিজের বুকের কাছে আগলে রাখত।
মায়ের বক্তব্য ছিল যে, নাতি তো আদিও। তা হলে আদি পাবে না কেন? আদি তখন ক্লাস টেনে পড়ত। ওর মনে হয়েছিল যে, মা আর বাবা ফালতু ঝামেলা করছে। ওর ছবি তোলার প্রতি আগ্রহই নেই। তা হলে ক্যামেরা নিয়ে কী করবে ও? আর অন্য দিকে দাদাভাই ছবি বলতে পাগল! তো দাদাভাইকে ক্যামেরাটা দিয়ে ভালই করেছে ঠাকুরমা। কিন্তু বাবা-মাকে কে বোঝাবে? দাদাভাইকে তো দু’চক্ষে দেখতে পারে না ওরা। কেন পারে না সেটা জানত আদি। কিন্তু, সেটা কি খুব ন্যায্য কারণ? আদির তো মনে হয় এর পিছনে অন্য একটা কারণ আছে। বাবা-মা না বললেও সেটা আন্দাজ করে ও।
দাদাভাইয়ের তিন-চারটে ক্যামেরা। তার মধ্যে দুটো ডিজিটাল এসএলআর। তবু দাদাভাইয়ের এই মান্ধাতা আমলের ক্যামেরাটা যে কী ভাল লাগত কে জানে! সেটাই একটু চোট পেয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। না, দাদাভাইয়ের হাত থেকে নয়। আদির হাত থেকে পড়েই। চলে যাওয়ার আগে দাদাভাই নিজে এসে এটা দিয়ে গিয়েছিল আদিকে। আদি কিচ্ছু বলেনি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। আসলে বলেনি না, বলতে পারেনি। অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজেকে।
প্রায় সপ্তাহ দুয়েক আগে নিজের আলমারিটা খুলে দরকারি একটা কাগজ খুঁজছিল আদি। তখনই হঠাৎ হাতের ধাক্কায় ক্যামেরাটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল। মানে বাইরে ভাঙেনি। কিন্তু ক্যামেরার ভেতরটা কয়েন ভরতি কৌটোর মতো ঝকং ঝকং করছিল। তখন নেট ঘেঁটে এই দোকানটার নাম পেয়েছিল আদি। আজ ক্যামেরাটা ডেলিভারি নেওয়ার দিন।
ভিড় এড়িয়ে দোকানে গিয়ে ক্যামেরা নিতে আরও আধঘণ্টা কেটে গেল। দোকান থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকাল আদি। হঠাৎ কোত্থেকে এত মেঘ এল! শহিদ মিনারের মাথার ওপর এক বস্তা কালো তুলো কে যেন উলটে দিয়ে গেছে। মেঘ জিনিসটা দু’চক্ষে সহ্য করতে পারে না আদি। বৃষ্টি, কাদা, পট হোল্স, জ্যাম, টেলিফোন বিকল, হাজারও সব সমস্যা। এবার ভাল বৃষ্টি হয়নি বর্ষাকালে। মনে হচ্ছে পুজোতে ভালই ঢালবে। দু’দিন পরেই মহালয়া। বৃষ্টি হলে কোটি কোটি টাকার সব পুজোর যে কী হবে!
ওদের সুকিয়া স্ট্রিটেও বেশ কয়েকটা বড় পুজো হয়। বিশেষ করে ওদের পাড়াতে তো হয়ই। দাদাভাই পুজোর আগে আয়োজনে খাটাখাটনি করত খুব। কিন্তু সপ্তমীর সকালবেলাতেই নিজেকে গুটিয়ে নিত। কেন নিত কে জানে! কোনও পুজোয় দাদাভাইকে পায়নি ও। তবে আদির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাদাভাইয়ের সঙ্গে দূরত্বও বাড়ছিল ওর। আর-একটা সময় পর থেকে দাদাভাই থাকল, কি গেল, সেসব পাত্তাও দিত না আদি।
পাড়ার পুজোয় আদি ঢোকে না কোনওদিনই। এসব উটকো ঝামেলা মনে হয়। আর যেহেতু সবাই আদির তিরিক্ষি মেজাজের কথা জানে, ওকে বিশেষ ঘাঁটায়ও না কেউ। পুজোর দিনগুলোয় ও নিজের পরিচিতদের আড্ডায় যায়। আর প্রচুর ড্রিঙ্ক করে। পুজো নিয়ে আর পাঁচটা বাঙালির মতো মাতামাতি ওর নেই।
তবে নিজে যতই পুজোর থেকে দূরে সরে থাকুক না কেন, আদি পুজোর ইকনমিক ইমপ্যাক্টটা বোঝে। তাই বৃষ্টি হলে কত মানুষের যে কত টাকা মার যাবে, সেটা ভেবে একটা অস্বস্তি হয় ওর।
হঠাৎ মোবাইলটা বেজে ওঠায় সচকিত হল আদি। গৌরের ফোন। ও ফোনটা ধরল, ‘হ্যাঁ, স্যার। আয়াম অন মাই ওয়ে।’
‘আরে ইয়ার, তু তো হামেশা ওয়ে মে হি রহতা হ্যায়। সুন এক বাত। মেরা এক মিটিং হ্যায়। আচানক ফিক্স হুয়া হ্যায়। তো, জরা লেট হোগা মেরা। তুই একটু ওয়েট করিস। আই হ্যাভ সামথিং টু টেল ইউ। কেমন?’ গৌর মাঝেমধ্যে তুই করে বলে আদিকে। বলে, ‘তু তো মেরা ছোটা ভাই হ্যায়।’ আদি কিছু মনে করে না। গৌর খুশি থাকলেই হবে। আর গৌরকে খুশি রাখে ও। আসলে গৌর কখনও প্রশ্ন করে না আদির টাকাপয়সা সামলানো নিয়ে। ঘুষ টুস যা দিতে হয় তাতে আদির কথাই বিশ্বাস করে গৌর। আর আদিও যথাসম্ভব সততা বজায় রাখে। হ্যাঁ, যথাসম্ভব। পুরোটা নয়। প্রতিটা ঘুষে ও পাঁচ পারসেন্ট কাটমানি খায়। আদির এসব ব্যাপারে ছুঁতমার্গ নেই। ওর মনে হয় যে, সমুদ্র থেকে এক ঘটি জল তুললে সমুদ্রের কিছু যায় আসে না। তবে হ্যাঁ, গৌরের কাজকর্ম খুব মন দিয়ে করে ও। সেখানে ফাঁক রাখে না।
‘আরে ইয়ার তু সোচতা বহত হ্যায়। ডোন্ট থিঙ্ক টু মাচ। কুচ রিপ্লাই তো দে।’
‘স্যার আপনি বলেছেন যখন, আমি থাকব।’
গৌর শব্দ করে হাসল, ‘এক আচ্ছা সারপ্রাইজ হ্যায় তেরে লিয়ে। আই থিঙ্ক ইউ উইল লাইক ইট। চলো, বাই ফর নাউ।’
আদি হাসল মনে মনে। গৌর সবার সঙ্গে এমন করে কথা বলে যেন তার কথাই চিন্তা করছে সবসময়। কিন্তু আদি জানে এই মিষ্টি কথার মানুষটার আড়ালে কী ভয়ংকর এক মানুষ রয়েছে! নিজের কাজের জন্য খুন-জখম করা গৌরের কাছে নস্যি।
এই বারাসতে জমিটা নিয়ে যে ঝামেলা হচ্ছে, তাতে ও জানে যে, গৌরের বিরক্তি বাড়ছে। সেটা যদি সহ্যের বাইরে চলে যায় তা হলে গৌর কিছু করতে পারে।
তাই আদি জানে ‘ইউ উইল লাইক ইট-টা আসলে গৌরীয় বচন মাত্র, তার বেশি কিছু নয়।
এক মুহূর্ত ভাবল আদি। অফিসে কাজ নেই তেমন। তাই হুড়োহুড়ি করে না গেলেও চলবে। ও ভেবেছিল ট্যাক্সি নিয়ে যাবে। কিন্তু এবার ভাবল, এখান থেকে অফিসের দূরত্ব একটু বেশি হলেও, হেঁটেই যাবে অফিস। হাঁটতে খারাপ লাগে না আদির।
আবার ভিড় ঠেলে রাস্তা পেরিয়ে অন্যদিকের ফুটপাথে গিয়ে উঠল আদি। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে হেড সেটটা লাগিয়ে নম্বর ডায়াল করল। দেখা যাক কথা বলতে বলতে হাঁটা যায় কিনা।
কলার টিউনে ভারী গলায় একটা পুরনো ইংরেজি গান চলছে। ধরতে দেরি করছে কেন? আদি একবার মাথা ঘুরিয়ে বিপুল জনস্রোত দেখল। তারপর চুলে হাত বোলাল। কলার টিউনে গান বাজছে। সত্যি বড্ড দেরি করছে মেয়েটা। তা হলে কি…
খট শব্দে ফোনটা ধরল কেউ, ‘হ্যালো? আদিত্য?’ আদি থমকাল। বহু দিন পর গলাটা শুনছে। একসময়ের বন্ধুর গলা।
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘হাই কনভ।’
‘হ্যালো? তোর খবর কী?’ কনভ হালকাভাবে জিজ্ঞেস করল।
আদি ভিড় ছাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ। মাতব্বরি মেরে যে হাঁটতে গেল, এতে হিতে বিপরীত না হয়! হঠাৎ বৃষ্টিতে যদি ভিজে যায়? ছাতা তো নেই।
‘হ্যালো আদি! হ্যালো…’ কনভ বুঝতে পারছে না আদি লাইনে আছে, না কেটে গেছে।
লাইন। শব্দটা বড় অদ্ভুত। বিশেষত বাঙালির কাছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব জায়গায় লাইন দিতে হয় মানুষকে। তারপর লাইন বাড়ছে, লাইন করতে হবে, লাইন মারছে—এমন নানারকম ব্যাপারস্যাপার তো আছেই। এই কনভের কথাই ধরা যাক না। আদির চেয়ে দেড়-দু’ বছরের ছোট, কিন্তু তুই-তোকারির বন্ধু। তবে ছিল, এখন আর নেই। এখন তো বহুদিন কথাই হয় না। আর আগে আদিদের বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকত। মহুলের সঙ্গে তো সেখানেই দেখা কনভের।
‘আছি, আছি।’ সামান্য ক্লান্ত গলায় বলল আদি। কনভকে স্রেফ নাচায় মহুল। তেমন পাত্তাই দেয় না। আর সে ব্যাটা এঁটুলির মতো লেগে থাকে মহুলের পিছনে। বিশাল বড়লোকের ছেলে। কাজকর্ম তো করতে হয় না বিশেষ। পঁচিশ লাখের গাড়ি চড়ে। দশটা ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ঘোরে। শুনেছে খুব শিগগিরি বিদেশে চলে যাবে। নিজেকে দায়িত্ব নিয়ে এক পয়সাও রোজগার করতে হয় না। মহুলের কোনওদিন এমন আতা টাইপের ছেলে পছন্দ হয়? তবু মহুল কেন কনভকে এখনও ঝেড়ে ফেলেনি তা আদি জানে না।
‘ক্যা ইয়ার বাত নেহি কর রাহা হ্যায় তু? কী বলতে ফোন করলি?’ কনভের গলায় অসহিষ্ণুতা।
‘মহুলের সঙ্গে দরকার ছিল।’ আদি সামনের সিগনাল বন্ধ দেখে হালকা হেঁটে রাস্তা পার হল। এ দিকটা বেশ ফাঁকা। বড় বড় গাছ আছে। একটু দূরে ইডেন গার্ডেন্স দেখা যাচ্ছে। তার উঁচু লাইট টাওয়ারগুলো ঘিরেও যেন মেঘেদের জটলা বাড়ছে।
‘কী দরকার রে?’ কনভ হালকা চালে প্রশ্নটা করল। কিন্তু প্রশ্নটার ভেতরে একটা পোড়া গন্ধ পেল আদি। জ্বলছে, কনভ জ্বলছে।
আদি বলল, ‘সেটা পার্সোনাল। তোকে বলব না। আর তুই মহুলের ফোন ধরেছিস কেন? মহুল কই?’
‘ও একটু লু-তে গেছে, আর আমি ওর ফোন ধরেছি কেন তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে নাকি?’ কনভ হঠাৎ রেগে গেল।
মনে মনে হাসল আদি। ভাবল, ও তো জানে না আদির সঙ্গে মহুলের কেমন সম্পর্ক। ও ভাবল কনভকে নিয়ে একটু মজা করা যাক।
‘শোন কনভ, রেগে লাভ নেই। আমার আর মহুলের মধ্যে একটা কনফিডেনশিয়াল রিলেশন আছে। সেটা, তোর সামনে ওপেন করব না। তুই ফোন রাখ, আমি পাঁচ মিনিট পরে ফোন করব।’
‘শালা,’ কনভ চিৎকার করল, ‘দু’পয়সার যোগ্যতা নেই আর তুই এখানে মহুলকে নিয়ে এমন বলছিস? জানিস তোর মতো পাতি এগজিকিউটিভ আমার কফি এনে দেয়?’
আদি শব্দ করে হাসল। ওর মজা লাগল খুব। প্রিয় বন্ধু আজ আর এমনি বন্ধুও নেই। আসলে বন্ধুর মধ্যে কখনও সখনও এমন সব ঘটনা বা মানুষ চলে আসে যে, ‘বন্ধু’ শব্দটার মেটামরফসিস ঘটে যায়। ওদের মধ্যে কি সেটা হয়েছে? কীসের জন্য আজ ওরা এমন করছে?
‘সে যাই বলিস। আমায় কিন্তু বি এসসি দু’বার দিতে হয়নি।’ আদি বলল।
‘ইউ ফাকিং…’ কনভ আর কিছু বলার আগে ফোনে আর একটা গলা পেল আদি। মহুল।
‘কার সঙ্গে এমন অসভ্যতা করছ? আর আমার ফোন তোমার হাতে কেন?’ মহুল এমন করে কথাটা বলল যেন এক্ষুনি কনভকে কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে দেবে।
‘আমি… মানে…’ কনভকে তোতলাতে দেখে মজা পেল আদি।
‘আমায় দাও।’ মহুলের গলাটা এবার স্পষ্ট করে এল, ‘হ্যালো, হু ইজ দিস?’
‘হাই মহুল। আদি হিয়ার।’
‘ও হ্যালো ফ…বাডি? ‘ফ’ দিয়ে বহুল প্রচারিত শব্দটা বলতে গিয়ে বলল না মহুল। নিশ্চয়ই কনভ আছে বলেই বলল না।
আদির হঠাৎ খেয়াল হল যে-প্রস্তাব দেবে, সেটা নিয়ে ও কনভের সামনে কথা বলবে কীভাবে? ও ঠিক সময় ফোন করেনি। নিজের ওপরই বিরক্ত লাগল আদির। কনভকে রাগানোর জন্য অতক্ষণ কথা বলা একদম ঠিক হয়নি ওর।
‘হাই, আরে কথা বলছিস না কেন?’ মহুলের গলায় চিরপরিচিত বিরক্তি আর তাড়া।
‘হ্যাঁ, এই তো…,’ আদি নিজেকে গুছিয়ে নিল, ‘এখন কি কথা বলা যাবে?’
মহুল বুঝল সংকেতটা। হালকা গলায় বলল, ‘আদি এক সেকেন্ড,’ তারপর কনভের উদ্দেশে বলল, ‘আরে ফেচ মি সাম কোলা কনভ। আয়াম ডাইং অব থার্স্ট।’
আদি হাসল মনে মনে। কনভকে কাটাতে চাইছে মহুল।
দশ সেকেন্ড পর মহুল বলল, ‘নাউ টক, হি ইজ আউট। কেন ফোন করেছিস? ওয়ান্না ফাক টুডে?’
বড্ড কাঠ কাঠ কথা বলে মেয়েটা। আরে যেখানে শরীরী মিলনের কথা হচ্ছে, সেখান একটু ভালভাবে তা বলবে। না, যা ইচ্ছে তাই বলছে। মহুলকে নিয়ে আর পারা যায় না। আদি সাবধানে আর-একটা রাস্তা পার হয়ে ইডেন গার্ডেন্সের পাশের ফুটপাথ ধরে এগোতে এগোতে বলল, ‘হ্যাঁ মানে… আজ কি তোমার…’
‘ঝেড়ে কাশ না। লাগাবি তার জন্য কত ন্যাকামো!’ মহুলের হুল বড্ড বেশি।
‘তোমার কি এই আটটা নাগাদ সময় হবে?’ আদি জিজ্ঞেস করল।
দীর্ঘশ্বাস শোনাল মহুল, ‘না রে আদি। আজ নয়।’
‘কেন? কত দিন আমরা বেড শেয়ার করি না বলো তো?’
‘আরে বাবা, আমার এখন অন্যরকম দিন চলছে। দ্য রেড সি ইজ ফ্লোয়িং ইয়ার। বোঝ ব্যাপারটা। ইউ হ্যাভ নক্ড অন দ্য রং ডোর ডিয়ার। গো ফাইন্ড সামওয়ান এল্স।’
যা বাবা! বিরক্ত লাগল আদির। শালা আজ দিনটা পুরো ফালতু। হাইকোর্ট যাওয়ার রাস্তায় ঢুকে ঘড়ি দেখল আদি। হঠাৎ অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর। মনে হচ্ছে পার্ক স্ট্রিট গিয়ে কোনও বারে বসে যায়। নয়তো কলেজ স্ট্রিটের গোপন ডেরায় গিয়ে ধোঁয়া টেনে পড়ে থাকে। কারণ ছাড়া, একদম কোনও কারণ ছাড়াই ভদ্র সমাজের দু’পায়ের ফাঁকে লাথ কষিয়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে কোনও পাহাড়ে।
‘কী রে, মুড অফ হয়ে গেল?’ মহুলের গলায় ইয়ারকি।
‘নাঃ। ঠিক আছে।’
‘তোর তো অনেক ক্যান্ডিডেট। যা না একজনের কাছে।’
‘আমি রাখছি।’ মহুলের সঙ্গে আর কথা বলার কোনও পয়েন্ট নেই।
‘ঠিক আছে। পরে কোনওদিন ফোন করিস।’
আদি কিছু বলার আগেই কট করে ফোনটা নিজেই কেটে দিল মহুল।
হাইকোর্টের গথিক চার্চের মতো চুড়োটা দেখে প্রতিদিনই, কেন কে জানে, গা শিরশির করে ওঠে আদির। আজও করল। এখানে আসলে হঠাৎ মনে হয় গোটা দৃশ্যটা উত্তমকুমারের যুগে ফিরে গিয়েছে। প্রচুর লোক সাদা-কালো জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমার যুগ। আর তার ভেতর আজও লাল কোট পরা রং-চটা সাইকেল নিয়ে জিঙ্গল পাগলাকে দেখতে পেল আদি।
লাল কোটটা অবশ্য তেমন লাল নেই আর। বরং মাছের জমাটবাঁধা রক্তের মতো কালচে লাল হয়ে গেছে। জিঙ্গল পাগলা কোটের তলায় একটা শতছিন্ন জামা পরে, যার রং এখন আর বোঝা যায় না। নীচের প্যান্টটা বেগুনি রঙের আর দু’পায়ে দু’রঙের দুটো ছেঁড়া স্নিকার। মাথায় একটা সোনালি রঙের ফিতে ফেট্টির মতো বাঁধা। কাঁচাপাকা চাপ দাড়ি আর রোদে পোড়া তামাটে মুখ দেখলে লোকটার বয়স আন্দাজ করা একটু মুশকিল হয়। তবে ষাট-পঁয়ষট্টি তো হবেই।
কিছু মানুষ আছে যারা জিঙ্গল পাগলার টার্গেট। তাদের দেখলেই এঁকেবেঁকে সাইকেল চালিয়ে তাদের সামনে এসে দু’লাইন গান গায় জিঙ্গল পাগলা। তারপর নিখুঁত ইংরেজিতে বলে, ‘হাই, আয়াম জিঙ্গল অ্যান্ড ইউ আর লিসনিং দ্য ফেমাস সংস। প্লিজ শেয়ার ইয়োর ফরচুন।’ তারপর হাত পেতে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এইসব টার্গেটদের একজন হল আদি। দেখা হলেই দু’টাকার একটা কয়েন জিঙ্গলের বরাদ্দ। কম দিলে জিঙ্গল নেয় না, বেশি দিলেও নেয় না। বরং বলে, ‘গ্রিড ইজ আ ডেড্লি সিন।’
তবে রোজ রোজ এই পাগলামো ভাল লাগে না আদির। না, অবশ্যই দু’টাকার জন্য নয়। ওর ভাল লাগে না ওই নাটুকেপনার জন্য। জিঙ্গল পাগলার ওই সাইকেল চালিয়ে আসা, লাফ মেরে সাইকেল থেকে নামা, গান গাওয়া-এ সবটাই বড্ড নাটুকে মনে হয় ওর। মনে হয় বাড়াবাড়ি। তবু দু’টাকা দেয় আদি। কী করবে? গরিব মানুষ তো!
আজও গরিব মানুষটার নজর এড়াতে পারল না ও। ওকে দেখেই হইহই করে সাইকেল চালিয়ে এসে পড়ল ওর সামনে। তারপর যথারীতি লাফ দিয়ে নামল সাইকেল থেকে। সাইকেলের লগবগে স্ট্যান্ডটা নামিয়ে হাসল চওড়া করে। তারপর দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে গান ধরল, ‘জিঙ্গল বেল জিঙ্গল বেল জিঙ্গল অল দ্য ওয়ে/ তোমার সমস্ত মার এখন আমার গেছে সয়ে,’ গান শেষ করে হেসে দু’হাত পাতল আদির সামনে তারপর বলল, ‘প্লিজ, শেয়ার ইয়োর ফরচুন।’
দু’টাকা রেডি করাই ছিল আদির। ও দিয়ে দিল। জিঙ্গল টাকাটা কোটের ভেতরের পকেটে ঢুকিয়ে আবার সাইকেলে বসে চলে গেল অন্য এক শ্রোতার দিকে।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আদি। পৃথিবীতে এক-এক পিস পাগল আছে বটে! তবে জিঙ্গলের এই সাইকেলটা নিয়ে খুব কৌতূহল হয় ওর। কোনও পাগলের কাছে তো এমন সাইকেল দেখেনি ও। তা হলে? তা ছাড়া লোকটা এত ভাল ইংরেজি বলে কী করে? আর গানের গলাটাও বেশ। লোকটা আসলে কে? ছদ্মবেশী কেউ নয় তো? কোনও গুপ্তচর টর নয় তো? আদি জানে, এসব নয়, তবে কিছু তো একটা গল্প আছেই। আফশোস হয় আদির যে, কোনওদিন এটা জানতে পারবে না ও।
হাইকোর্টের মুখোমুখি বড় সাদা বিল্ডিংটাতেই আদিদের অফিস। মার্চেন্ট মাল্টিপল্স লিমিটেড। ওখানে মান্ধাতার আমলের লিফ্ট চলে। আর তার সামনে সবসময় কেরোসিনের দোকানের মতো লাইন। আদি এই ঠাকুরদা লিফ্টে ওঠে না। বরং কাঠের সিঁড়িটাই প্রেফার করে।
মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের বড় পেতলের নেমপ্লেটটার সামনে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছল আদি। ভেতরটা পুরো এসি। ঘাম গায়ে বসলে ঠান্ডা লেগে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হবে। আসলে বৃষ্টি তো হল না। বরং মেঘ করে পুরোটা ভ্যাপসা হয়ে আছে। সত্যি, পুজোয় না…আদি কাচের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।
কাঠের সিঁড়ি, পুরনো লিফ্ট আর বুড়ো দাদুর মতো বাড়ির ভেতরে এই অফিসটা যেন টাইম মেশিন করে দুশো বছর এগিয়ে যাওয়া কোনও পৃথিবী।
গোটা অফিসটা মার্বেলে মোড়া। ওর ভার্টিকাল ব্লাইন্ডস দেওয়া ঘষা কাচের ঘর সব। আর তার সঙ্গে আছে ঘষা কাচেরই পাঁচ ফুট উঁচু পার্টিশন দেওয়া কিউবিক্ল। এর একটায় বসে আদি।
‘হাই আদি।’ কিউবিক্লে বসে নিজের রোলিফ্লেক্স ক্যামেরাটা সামনের টেবিলে রাখামাত্র ও ডাকটা শুনল। রায়না সেন। গৌরের পিএ। মেয়েটা কাজকর্মে যেমন চৌখস তেমন শরীরেও সাংঘাতিক। তবে খুব বুদ্ধিমতী। প্রথম প্রথম ট্রাই নিয়েছিল আদি। পাত্তা পায়নি। বরং রায়না এমন মুখ করে তাকিয়েছিল যে, আদির নিজেকে খুব চিপ মনে হয়েছিল। তখন থেকে রায়নার প্রতি নিজের মনোভাব বদলেছে ও। তবু আজ শরীর ভায়া একটু গন্ডগোল করছে বলেই বোধহয় রায়নার বুকের দিকে দু’-এক পলক বেশি তাকিয়ে ফেলল আদি। বুকের বোতাম দুটো কি ভেসে উঠছে টপের ওপর দিয়ে?
রায়নার গলার স্বর কঠিন হল, ‘আদি লিসন। মিস্টার কুটিনহো তোমায় ডাকছে। এক্ষুনি।’
স্যামুয়েল কুটিনহো ওদের পার্টিকল্ বোর্ডের জেনারেল ম্যানেজার। সপ্তাহে দু’দিন এখানে আসেন ভদ্রলোক। মানুষটি সত্যি খুব ভাল। বলেন, ‘আমি জিএম বলে স্যরট্যার বলবে না। কল মি স্যাম।’
রায়নার গলার স্বরে সতর্ক হল আদি। নিজেকে মনে মনে ধমকও দিল একটু। তারপর সময় নষ্ট না করে স্যামের ঘরের দিকে গেল।
স্যামুয়েল কুটিনহো। বছর পঞ্চাশের মানুষ। মাথায় ইয়াব্বড় টাক। তবে থুতনিতে ফরাসি কাটের দাড়ি। স্যামকে বললে বলে, ফ্রেঞ্চ নয় পর্তুগিজ কাট। বলে ফরাসিরা আবার এমন শিখল কবে থেকে?
‘কাম ইন,’ আদি নক করার একটু পরে স্যামের গলা শুনল। ও দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। আর সঙ্গে সঙ্গে নদীর ধারে ফুটে থাকা ফুলের অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ এসে নাকে লাগল ওর।
একটি মেয়ে বসে রয়েছে স্যামের টেবিলের এদিকে। কিন্তু দরজার দিকে পিছন বলে মুখটা দেখতে পাচ্ছে না আদি। কে মেয়েটা?
‘বোসো আদি।’ স্যাম মেয়েটার পাশের চেয়ারটা আদিকে দেখাল। আদি বসল। নদীর পাশের ফুলেরা যেন মাতোয়ারা হল আরও একটু বেশি।
‘মিট হার, আওয়ার নিউ পাবলিক রিলেশন অফিসার। ও-ও এবার তোমার সঙ্গে নর্থ চব্বিশ পরগনাটা কভার করবে।’
এবার মেয়েটাকে দেখল আদি। দেখল কর্মক্ষেত্রে ওর রাইভালকে। কিন্তু দেখামাত্র কোথায় কী যেন হল আদির। যেন এমন একটা ঘর শরীরে খুলে গেল যেটার কথা ও নিজেই জানত না। ওর মনে হল, সেই ঘরের মেঝেয় কে যেন রেললাইন পেতে দিয়েছে আর তার ওপর দিয়ে ঝিকঝিক করে চলছে একলা রেলগাড়ি।
কে এই মেয়েটা? এমন পেঁয়াজ রঙের শিফনে মুড়ে কে এল ওর সামনে? সামান্য চাপা নাক। সামান্য লালচে চুল। সামান্য টোল পড়া থুতনি। তবু এই অসামান্য রূপ কার? রেলগাড়িটা বুকের ঠিক মাঝখানে চক্কর খাচ্ছে, খুব চক্কর খাচ্ছে, বুঝল আদি।
আদির ফ্যালফ্যালে দৃষ্টির সামনে মেয়েটা যেন সামান্য হাসল। লজ্জা পেয়ে গেল আদি। লজ্জা পেল ও? ও নিজের হতভম্ব ভাব কাটানোর জন্য বলল, ‘হাই, আয়াম আদিত্য ব্যানার্জি।’
‘হাই,’ মেয়েটা ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। আদির মনে হল বহু দূর কোনও চার্চে অর্গান বেজে উঠল যেন। যেন এবার প্রার্থনা শুরু হবে। মেয়েটা আবার বলল, ‘আয়াম সিংহ, মালিনী সিংহ।’
আদি নিজের বুকের ভেতরের চক্কর মারতে থাকা রেলগাড়িটা দেখে বুঝতে পারল না, কেন সেটা এমন পাক মারছে। বুঝতে পারল না এই মেয়েটি কি অফ স্টাম্পের বাইরের বল না ইয়র্কার!
Chapter - 5
৫
উঠোনের ওপর এসে পড়া রোদটা দেখে রাহি বোঝে যে, সাতটা বেজে গেছে। গানদাদু চলে গেল আজ। মালিদার মাটি কোপানো, নিড়ানো আর জলসাজি হয়ে গেছে। বোঝে পালোয়ান এতক্ষণে লেজ নাড়তে নাড়তে বাবার পিছন পিছন খেতের আল ধরে হাঁটছে। মা পিছনের তরকারি বাগানে গিয়ে খুদেকে দিয়ে আনাজ তোলাচ্ছে। জীবনদার হয়তো মাছ ধরাও হয়ে গেছে অনেকটা। পুশিদির বিড়ালটা পাঁচিলের ওপর বসে থাবা চাটছে এখন। বোঝে একটু দূরের ওই বাড়ির মানুষটারও হয়তো বারান্দায় বসে মাউথঅর্গান বাজানো শেষ।
আসলে রোদটা রাহির অ্যালার্ম ক্লক। ওকে ঘুমের রাজ্য থেকে এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার সিঁড়ি। আজও সেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল রাহি। বিছানায় শুয়ে দেখল বড় উঠোনটায় শিউলি বোঁটার মতো রোদ পড়ে ভেসে যাচ্ছে। খুলে রাখা জানলা দিয়ে শরতের হাওয়া হইহই করে ঢুকে পড়ছে ঘরে। আর উনিশ-বিশ নামের কাঠবেড়ালি পাশের বড় কাঁঠালচাঁপার থেকে দৌড়ে নেমে আসছে জানলার গোড়ায়।
রাহির আজ মাথাটা একটু ধরে আছে। আসলে শুতে শুতে অনেক রাত হয়েছে গতকাল। প্রায় দুটো। সন্ধিপুজো দেখছিল যে। কিন্তু পুরোটা দেখতে পারেনি। সাধুদার কাঁধে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন মা-ই জোর করে শুতে পাঠিয়েছিল। তাই তো উঠতে দেরি হয়ে গেল। আর দিনটা ওকে ফাঁকি দিয়ে গড়িয়ে গেল খানিকটা।
আজ নবমী। ঠাকুরদালান থেকে মন্ত্রপাঠের স্বর হালকা প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে আসছে এদিকে। পুরুতমশাইয়ের সংস্কৃত উচ্চারণটা ভাল। বাবা সকাল দশটার আগে ঢাক বাজাতে দেয় না। বলে, সবার অসুবিধে হবে। আর যখন বাজায় তখনও একটুখানি সময়ের জন্য। কারণ বাবার কথায়, রাহি পছন্দ করে না। মা রাগ করে বলে, ‘আদিখ্যেতা।’ বলে, ‘বাপসোহাগি।’ বলে, ‘তোমার মতো করে মেয়ের মাথা আর কাউকে খেতে দেখিনি আমি।’
বাবা হাসে। কিছু বলে না। আসলে বাবা যেন অন্ধ রাহির প্রতি। রাহির মাঝে মাঝে মনে হয় এত আদর কি ওর প্রাপ্য? বাবা কি একটু বেশিই ভালবাসে না ওকে? একটু বেশিই কি প্রশ্রয় দেয় না? দাদার বেলায় তো বাবা এমন নয়। কারও বেলাই নয়। শুধু রাহি কিছু বললে বাবা না করে না। বা বলা যায় রাহিকে নিজের থেকে একদম কিছু বলতেই হয় না। ওর কী চাই না চাই, সবটাই বাবা যেন কীভাবে বুঝে যায় আর এনে দেয়।
চাপাডাঙার মতো একটা গ্রামে থেকেও কী নেই রাহির? কম্পিউটার থেকে স্কুটি। বাড়িতে ছোট্ট একটা জিম থেকে পাথর বাঁধানো রাস্তা, সব, সব করে দিয়েছে বাবা। ওর বন্ধুরা এসে তো বলে ওদের বাড়িটা ফাইভ স্টার রিসর্ট একটা। বলে, ইস এমন বাবা যদি ওদের থাকত!
এমন বাবা আর কারও থাকতে পারে না। রাহি জানে। এমন ঝাল, টক, নোনতা, মিষ্টির সমান মিশ্রণ আর কারও ভেতর থাকতেই পারে না। না হলে কি আর সবাই এমনি এমনি রাঘব চক্কোত্তির নামে মাথা নোয়ায়? এমনকী অঞ্চলের এমএলএ, এমপি পর্যন্ত বাবাকে খাতির করে। পুলিশ খাতির করে। আবার সাধারণ গ্রামের মানুষ, হাটুরে ভ্যাবাচ্যাকা সব মানুষও ভালবাসে বাবাকে। সবার ভালবাসা পাওয়া অত সোজা নয়। আর সবাই তো ছাড়, একজনের ভালবাসা পাওয়াই কত কঠিন!
একজন! বুকের ভেতরটা চলকে উঠল একটু। একটা মাউথঅর্গান যেন দেখতে পেল ও। দেখতে পেল দুটো অদ্ভুত নীল চোখ।
একেতেই মাথা ধরে আছে, তার ওপর হঠাৎ ‘একজন’-এর কথা মনে পড়াতে মনটা কেমন যেন টলোমলো হয়ে গেল প্রথমেই। বাইরের রোদের দিকে তাকিয়ে রাহির মনে হল, এবারের শরৎটা যেন কেমন। যেন কেমন একটা নিঃসঙ্গতার মতো। একলা মেঘের মতো। বেখেয়ালি ফিঙের মতো।
বিছানা থেকে উঠল রাহি। জানালা দিয়ে দেখল নন্দঢাকি আর তার দুই শাগরেদ পালক লাগানো দুটো ইয়াব্বড় ঢাক নিয়ে যাচ্ছে। না, এখন বাজাবে না। বরং পুজো করবে। ঠাকুরের সিঁদুর থেকে একটু নিয়ে ঢাকের গায়ে লাগিয়ে নন্দ হাঁটু গেড়ে নিজের মনে কীসব প্রার্থনা জানায়। দেখে হাসি পায় রাহির। পুজো-আচ্চার ভেতরের কাজকর্মগুলো ভাল লাগে রাহির। কিন্তু কোথায় জানি মনের ভেতরে ঈশ্বরবিশ্বাসে একটা ঘাটতি আছে ওর। এটা কাউকে ও বলে না। কিন্তু ও নিজে জানে ঠাকুর প্রণাম করা, বা সন্ধিপুজো দেখার উৎসাহটা আসলে বানানো। বাবাকে খুশি করা। বাবার তো দেবদ্বিজে অতিরিক্ত ভক্তি। আসলে বাবাকে খুশি করতে পারলে রাহির নিজের ভাল লাগে। মনে হয় কিছু তো করছে মানুষটার জন্য। দাদা তো আর মানুষ নেই। সবসময় বাবার থেকে দূরে থাকে। তাই রাহি দেখে ওর থেকে বাবা যেন কোনও দুঃখ না পায়।
দুঃখ ব্যাপারটা রাহি পছন্দ করে না একদম। মনে হয় এর মতো খারাপ জিনিস পৃথিবীতে আর নেই। কেন রে বাবা? মানুষ কতদিন বাঁচে যে, তার মধ্যে আবার দুঃখ টুঃখ পেতে হবে? হাসি আর মজা দিয়ে নিজের জীবনটাকে বানানো কি এতই কঠিন? তাই তো রাহি কক্ষনও দুঃখের সাপোর্টার নয়। বরং শাহরুখ খানের সাপোর্টার। ওঃ, কী আনন্দই না করতে পারে লোকটা! সব ছবিতে হাসি আর মজা। না, ঠিক সব ছবিতে নয়। তবে বেশির ভাগ ছবিতে। সেই আনন্দ আর হাসির ছবিগুলোই বেশি করে দেখে রাহি। বারবার দেখে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে। দুঃখ কী ও জানতেই চায় না।
কিন্তু চাওয়ার ওপর যদি সব নির্ভর করত তা হলে পৃথিবীর এত সমস্যা থাকত কি? আর পৃথিবীর কথা বাদ দাও, রাহির নিজেরও কি এত সমস্যা থাকত?
এই চব্বিশ বছর বয়স পর্যন্ত রাহি যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। পড়াশোনা মোটামুটি করেছে, ইতিহাসে অনার্স নিয়ে পাশ করে বাবার প্রতিষ্ঠা করা স্কুলেই চাকরি করছে। তবে মাইনেপত্তর নেয় না। সারাদিন বাচ্চাদের সঙ্গে থাকাটাই ওর আনন্দ। ওর সুখ।
কিন্তু সুখ কি ওর সহ্য হয় না? কষ্ট কি সবার মতো ওকে পেতেই হবে? না হলে, প্রায় মাস দুয়েক হল, কেন ওর এমন মনখারাপ হয়ে থাকে? বুকটা কেন এমন টুপুটুপু গ্লাস ভরতি জল হয়ে আছে? কেন আচমকাই বড্ড কাঁদতে ইচ্ছে করে? মনে হয় সব থেকেও কী যেন নেই? কেন ক্লাসের বাইরের পুকুরটায় পানকৌড়ির ডুব দেখলে মনখারাপ হয়ে যায়? কেন মনে হয় বাগানের এত ফুল অনর্থক ফুটে রয়েছে? মনে হয় কেউ রাহিকে ভালই বাসে না?
কে রাহিকে ভালবাসে না? বাবা, মা থেকে শুরু করে পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব সব্বাই খুব ভালবাসে রাহিকে। এমনকী দাদা যে অমন মানুষ, সেও খুব ভালবাসে ছোট বোনটাকে। তবু কেন মনে হয় কেউ ভালবাসে না? কেন মনে হয় একদিন পুকুরে ডুবে মরবে? সাধুদাকে দিয়ে একশোটা ঘুমের বড়ি কিনে আনিয়ে খাবে? কেন মনে হয় পাগলির মতো কাটিয়ে দেবে জীবনটা?
পাগলি! পাগলিই তো। বাবা তো রাহিকে ‘পাগলি মা’ বলেই ডাকে। আসলে চব্বিশ বছর বয়সই হয়েছে রাহির, কিন্তু মনে মনে বড়টি হয়নি একদম। ও জানে বাবার স্কুল বলেই চাকরি করতে পারছে, না হলে কবে চাকরি চলে যেত ওর! কোনও টিচার যদি টিফিনে শাড়ির আঁচল গুঁজে ছাত্রীদের সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলে, তাকে কি কেউ মানবে? যদি ছুটির পর ঢিল মেরে আম পাড়ে, তার ক্লাসে কি কেউ পড়া করে আসবে?
আসলে চাপাডাঙার সবাই জানে যে, রাঘব চক্কোত্তির ছোটমেয়েটি ছেলেমানুষ। তাই কেউ কিছু ধরে না। বরং উলটে প্রশ্রয় দেয়।
শুধু একজন দেয় না। কারণ সে লক্ষই করে না যে, রাহি বলে একটা মেয়ে এই পৃথিবীতে আছে। সে সারাদিন ফ্যাক্টরিতে কাজ করে আর সন্ধেবেলা মাউথঅর্গান নিয়ে, গিটার নিয়ে বসে থাকে বারান্দায়। আর কখনও কখনও ক্যামেরা কাঁধে গ্রামের পথে বেরিয়ে পড়ে ছবি তুলতে। তলতাবনির জঙ্গলে সে ঘুরে বেড়ায় একা।
তলতাবনির জঙ্গল এই অঞ্চলে বিখ্যাত। বা বলা যায় কুখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই জঙ্গলের একটা অংশকে পরিষ্কার করে হ্যাঙার তৈরি করা হয়েছিল। যুদ্ধবিমান রাখা হত ওখানে। বিদেশি সৈন্যদের জন্য একটা চার্চও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সব কিছুর কঙ্কাল পড়ে আছে। এরোপ্লেনের ভাঙা পাখনা, মেশিনগানের প্রায় নেই হয়ে যাওয়া শরীর, হেলমেটের ক্ষয়াটে মাথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এখানে ওখানে। আর রয়েছে অন্ধ, ফোকলা দৈত্যের মতো হ্যাঙার, লতানো গুল্মে ঢেকে যাওয়া বৃদ্ধ চার্চ।
রাহিদের এই চাপাডাঙা অঞ্চলটা বর্ডারের কাছে। ফলে ছায়াছন্ন কাজকর্ম ভালই হয় এখানে। তা ছাড়া রাজনৈতিক টেনশনও আছে। এই দুইয়ের যোগফলে দু’-চারটে লাশ এখানে ওখানে বাতিল প্লাস্টিকের মতো প্রায়ই পড়ে থাকে। বিশেষ করে এই হ্যাঙার অঞ্চলে। তাই এ অঞ্চলের সবাই তলতাবনির জঙ্গলটা এড়িয়ে চলে। শুধু ওই একজন এসব মানে না। প্রায় দু’মাস তো দেখছে মানুষটাকে। সে এসব কেয়ারই করে না। বরং ফাঁক পেলেই ক্যামেরা কাঁধে ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। ভয় লাগে রাহির। বুক কাঁপে। সেই দুপুরগুলোয় ভাত-ই খেতে পারে না ঠিকমতো। ছাত্রছাত্রীদের খাতা দেখতে বসলে ভুল ঠিক সব গুলিয়ে যায় একদম। নিজেকে এসবের ভেতর জড়াতে চায় না ও। কিন্তু পারে না। কেবলই মনটা গড়িয়ে যায় ওদিকে।
আর সমস্যা হচ্ছে, এসব কাউকে বলতে পারে না ও। এমনকী বন্ধু যে বন্ধু হোমি, ওকেও বলতে পারে না। শুধু মনে হয় ও হাসবে। একদম গুরুত্ব দেবে না। আর হোমির যা পেটপাতলা, দু’দিনের ভেতর চাপাডাঙার লোকাল হেডলাইন হয়ে যাবে খবরটা। তার চেয়ে এই ভাল। বুকের ভেতর টুপুটুপু হয়ে ভরে থাকা জলের গেলাস আর পেটের ভেতর নুড়ি কুড়োনো ডুবুরি নিয়ে এই ভাল বেঁচে থাকা রাহির।
তবে মাঝে মাঝে বাবার পরিচিত কিছু মানুষ ওকে রাজনীতির ময়দানে ডাকে। বলে, ‘তুমি এসো আমাদের সঙ্গে।’ কিন্তু পাত্তা দেয় না ও।
এসব পার্টি-পলিটিক্স বোঝে না রাহি। আর বুঝতেও চায় না। এই ক্ষমতা টমতা দিয়ে কী হবে? যত্তসব ঝঞ্ঝাট! তবু কী অবাক! মানুষ এর পিছনেই অন্ধের মতো ছোটে। দাদাকেই দেখো না।
চাপাডাঙার সবাই দাদাকে ভয় পায় খুব। চমক একটা ত্রাস সৃষ্টিকারী নাম। স্থানীয় এমএলএ সুধাদির খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করে চমক। সেই সুধাদি পর্যন্ত চমককে সমীহ করে।
চমক বেঁটে। পাঁচ দু’-আড়াই হবে। রোগা, দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। দেখলে মনে হয় ভাজা বা সেদ্ধ কোনও মাছ-ই উলটে খেতে পারবে না। কিন্তু চমক খতরনাক ছেলে। রাহি নিজে চমকের কাছে পিস্তল দেখেছে।
চমক বি কম পাশ করার পর বাবা ওকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিয়েছিল। বাবার কথা হচ্ছে, মানুষকে নিজের উপার্জনে দাঁড়াতে হয়। অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে যে-মানুষ ওঠে সে প্রকৃত মানুষ নয়। বাবা নিজের যা-কিছু রোজগার তা নিজেই করেছে। কারও সাহায্য নেয়নি। কিন্তু সবাই তো আর বাবা নয়। আর রাহি জানে, বাবার মতো পরিশ্রমী বা অধ্যবসায় ওর দাদার নেই। চমকের সব কিছুই খুব দ্রুত চাই। ছোট থেকেই। সাইকেল চাই মানে তক্ষুনি চাই। বাইক চাই মানে একদিন দেরি করা যাবে না। এমনকী এই যে দীপাঞ্জলিকে বিয়ে করেছে সেটাও তড়িঘড়ি।
কলেজ থেকেই রাজনীতি করত চমক। কলেজের জিএস পর্যন্ত হয়েছিল। আর তার জন্য যেখানে যেখানে যা যা করতে হয়েছে, করেছে। বোমাবাজি থেকে ক্ষুর রড দিয়ে মেরে বিরোধীদের চোয়াল ভেঙে দেওয়া থেকে ভয় দেখাতে বিরোধী প্রার্থীর বাড়ির কুকুরের গায়ে অ্যাসিড মারা—সব করেছে। আসলে চমক সব করতে পারে। সেই জন্যই সবাই এত ভয় পায় ওকে।
রাহি তো শুনেছে যে, চমক নাকি মানুষও মেরেছে! কিন্তু রাঘব চক্কোত্তির ছেলে বলে পার পেয়ে গিয়েছে। চমক দুর্দান্ত, ডানপিটে আর রগচটা হতে পারে, কিন্তু মানুষ মারবে? এতটা বিশ্বাস করে না রাহি। চমক অমন মানুষ হলে দীপার মতো মেয়ে কি আর ভালবাসত ওকে?
দীপা যেন চমকের উলটো পিঠ। যেমন নম্র, তেমন শান্ত। এই মেয়ে যে কী করে চমকের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল কে জানে!
আজ থেকে পাঁচ বছর আগের কথা। তখন চমক সুধাদির সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেছে। একটা রক্তদান শিবির উপলক্ষে দীপাদের বাড়িতে গিয়েছিল চাঁদা তুলতে। এমনিতে চমক এসব ব্যাপারে থাকে না। কিন্তু দীপার বাবা উমেশ রায় দশ হাজার টাকা দিতে অস্বীকার করেছিল। তাই শুভকাজে দীপার বাবার সম্মতি আনতে সুধাদি চমককে পাঠিয়েছিল।
সেই ছিল দীপা আর চমকের প্রথম দেখা। তারপর যত সময় গড়িয়েছে ওদের সম্পর্ক তত ঘন হয়েছে। দীপার বাবার দুটো পেট্রল পাম্প ছাড়াও চালের হোলসেল কারবার আছে। দুটো মাছের ভেড়িও আছে। ফলে পয়সাওয়ালা মানুষ হিসেবে রাঘব চক্কোত্তিকে সে খুব একটা সমীহ করে না। বরং কিছুটা অবজ্ঞাই করে। আর জোর করে দশ হাজার টাকা আদায়টাকে খুব ভালভাবে নেয়নি ভদ্রলোক। চমকের বিরুদ্ধে থানায় জুলুমবাজির অভিযোগে ডায়েরিও করেছিল। কিন্তু রাঘবের হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা এগোয়নি।
তারপর উমেশ যখন জানল যে, মেয়ের সঙ্গে এই চমকই প্রেম করছে, তখন তো পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। দীপাকে বর্ধমানে পাঠিয়ে দেয়। চমক এক রাতে গিয়ে উমেশের পেট্রল পাম্পে ভাঙচুর চালায়। তারপর সোজা বাড়িতে ঢুকে উমেশকে বন্দুক নাচিয়ে শাসিয়ে আসে। উমেশও বাইরের থেকে গুন্ডা আনিয়ে চমককে মার খাওয়ানোর প্ল্যান করে। কিন্তু পারেনি। সাধুদার জন্য পারেনি।
তারপর মাস তিন-চারেক আচমকাই সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল অশান্তি বোধহয় মিটল। কিন্তু তখনই এক সন্ধেবেলা সব ওলটপালট হয়ে যায়। দিনটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে রাহির। সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল।
‘রাহি,’ মায়ের ডাকে জানলার দিক থেকে মুখ ফেরাল ও। মা পুজোর জোগানের তদারক করে আর খুদেকে দিয়ে আনাজ তুলিয়ে এরই ভেতর চা নিয়ে এসেছে। রাহি মাকে দেখে অবাক হয়ে যায়। কী করে একটা মানুষ এত কিছুর ভার একা সামলায়? মায়ের বিয়ে হয়েছিল আঠারো বছর বয়সে তারপর থেকে এই পঞ্চাশ বছর অবধি মা-ই আসল দশভুজা।
‘হাই মা,’ রাহি বিছানায় বসেই আড়মোড়া ভাঙল।
‘এ কী, নাইটি পরে আছিস?’ মায়ের গলায় বিরক্তি, ‘এমন ছেঁড়াফাটা জিনিস পরিস কেন রে? তোর কিছু নেই নাকি? তা ছাড়া এমন পুজোর বাড়ি কে কখন এসে পড়বে। এমন উদলা হয়ে বসে আছিস!’
‘যা গরম!’ রাহি হাসল।
‘তা এসি চালাসনি কেন? আর শরৎকালে এমন গরম এখন নেই যে, এরকম জামাকাপড় পরতে হবে।’
‘এসি ভাল লাগে না, তুমি তো জানো। কেমন বদ্ধ আর শুকনো মনে হয়। আর তা ছাড়া, আমার ঘরে কেউ আসবে না।’
‘তা হলেও,’ মা চায়ের কাপটা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘এমন জামাকাপড় কেউ পুজোর দিনে পরে?’
‘আচ্ছা বাবা আচ্ছা,’ রাহি বিছানার থেকে উঠে গালটা টিপে দিল মায়ের, বলল, ‘মা, দাদা কোথায় গো?’
‘কেন? কোথায় বেরোল যেন।’
‘আমার স্কুটির হ্যান্ডেল অ্যালাইনমেন্টটা নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে বলেছিলাম ঠিক করিয়ে আনতে। ভেবেছিলাম হোমিকে নিয়ে গোবরডাঙা আর মছলন্দপুরের ঠাকুরগুলো দেখে আসব।’
‘অত দূরে?’ মা আঁতকে উঠল, ‘পাগলি নাকি তুই? তা ছাড়া বাড়িতে পুজো, কত লোকজন এসেছে। কোথায় এখানে থেকে একটু দেখাশোনা করবি, না বাড়ির মেয়ে ধিঙ্গিপনা করতে বেরোবে! যেমন দাদা, তেমন তার বোন। দীপার হয়েছে এক জ্বালা। ও একা কত দিক সামলাবে? এবার একটু সংসারটার টুকটাক কাজের দায়িত্ব নে।’
‘মা,’ রাহি চায়ের কাপটা নিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল, ‘আজকেও তুমি শুরু করলে?’
‘শেষ হয়েছে নাকি যে শুরু করব? একটু বড় হ রাহি। এমন ছেলেমানুষ হয়ে থাকিস না।’
‘মা, প্লিজ তুমি এবার যাও। আমি ফ্রেশ হয়ে নেব এবার।’
বাথরুমটা রাহির খুব প্রিয় জায়গা। এখানে যেটুকু সময় কাটায় মন ভাল হয়ে যায় ওর। বাথরুমের দেওয়াল সমুদ্রনীল রঙের। বাথরুমে গিজার থেকে বাথটব সব আছে। সময় থাকলে বাথটবে শুয়ে পড়ে রাহি। কিন্তু আজ আর সময় নেই। কারণ পুজোমণ্ডপে যেতে হবে। আর দেরি হলে বাবা রাগ করবে। বাবা ওর ওপর রাগ করলে সবচেয়ে কষ্ট হয় রাহির।
আজ ব্রাশ ট্রাশ সেরে শাওয়ার খুলে দাঁড়িয়ে পড়ল রাহি। ঠান্ডা জল মাথা বেয়ে লক্ষ লক্ষ আঙুলে চেপে ধরল শরীরটাকে। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল ও। আর সঙ্গে সঙ্গে চোখের পাতা ফুঁড়ে কোত্থেকে যেন উদয় হল এক জোড়া চোখ। অমন অদ্ভুত নীল রঙের চোখ কোনওদিন দেখেনি রাহি। নিমেষে শরীরে গোলাপকাঁটা জেগে উঠল ওর। বৃন্ত দৃঢ় হল। গরম রক্তের স্রোত চলকে উঠল শিরায়। শ্বাস গাঢ় হয়ে উঠল।
রাহি চোখ খুলল সঙ্গে সঙ্গে। পাগলি, ছেলেমানুষ, যে যাই বলুক, রাহি নিজে জানে ও কতটা বড় হয়েছে। এইসব নিস্তব্ধ আর একান্ত মুহূর্তগুলো ওকে বড় করে দেয় আরও। রাহি বোঝে শরীরের কষ্টের মতো কষ্ট খুব কম আছে পৃথিবীতে। নিজের পছন্দের মানুষের থেকে দূরে থাকার কষ্টও খুব কম আছে।
আজ একটু সময় নিয়ে শরীর মুছল রাহি। বাবার রাগ হতে পারে দেরি হলে, এই সম্ভাবনাটা মনের ভেতরের কোন পুকুরে যে, ডুব মারল কে জানে! বরং নিজের হাতের স্পর্শটা ক্ষণিকের জন্য অন্যের মনে হল। মনে হল একজন পরম যত্ন নিয়ে শরীর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে অতিরিক্ত জলের দৃষ্টি।
স্নান সেরে শাড়ি পরে সামান্যই সাজল রাহি। ও কখনওই কসমেটিক্সের বিজ্ঞাপন হয় না।
শরতের আকাশ আজ দারুণ ফর্মে আছে। দিগন্তজোড়া অ্যাকোরিয়ামের ভিতর হাওয়া মিঠাইয়ের মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। গাছগুলোও যেন আজ বাড়াবাড়ি রকমের সবুজ। এবার পুজোয় টুকটাক বৃষ্টি হচ্ছে। যেমন গতকালও হয়েছিল। কিন্তু কী এক জাদুতে যে এক রাতের ভেতর পুরো দৃশ্যপটই পালটে গেল কে জানে।
রাহি ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়াল। মুগডালের মতো রোদ আকাশের বাটি উলটে গড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সেলোফোনের মতো পাতলা হাওয়া বইছে একটা। একটু দূরে সাধুদা বসে নারকেল ছাড়াচ্ছে। কাল বিজয়াদশমী। বাড়িতে নাড়ু হবে। যদিও অন্য কাজের লোকজনের এসব করার কথা। তারা করেও। তবু এই বিশেষ দিনটায় সাধুদা নারকেলের দায়িত্ব নেয়। নিজে নারকেল ছাড়ায়। দাঁড়িয়ে থেকে কোরানো, পাক, ছাঁচ সব নিজে তদারক করে। সাধুদার রান্নার হাত খুব ভাল। দেশি-বিদেশি নানারকম রান্নায় মানুষটা সিদ্ধহস্ত। আসলে সাধুদা অনেক কিছুতেই সিদ্ধহস্ত। এ অঞ্চলের সবাই জানে রাঘব চক্কোত্তির ডান হাত হল সাধু সেনাপতি।
রাহি জন্মের সময় থেকেই এই মানুষটাকে দেখছে। লম্বা, পাকানো চেহারা। কাঁধ অবধি চুল। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। মেটে মেটে গায়ের রং মানুষটার। ভাল গান করে, তবলা আর বেহালা বাজায়। আর দুর্দান্ত সাহস।
সাধুদা বিয়ে-শাদি করেনি। ওদের এই বিশাল কম্পাউন্ডের একধারে দু’কামরার ঘরে থাকে। নিজেই দুটো ফুটিয়ে খায়। রাহি কতবার বলেছে, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে খাও না কেন সাধুদা? আমাদের রান্না খারাপ?’
সাধুদা উত্তর দিয়েছে, ‘না গো দিদি, খারাপ কেন হবে? আমার পেটেই ভাল জিনিস সহ্য হয় না। কুকুরের পেটে কি আর ঘি সহ্য হয়?’
‘বাজে কথা বোলো না তো।’ রাহি রাগ করেছে। কিন্তু সাধুদা কিচ্ছু মনে করেনি। বাবার চেয়ে প্রায় বছর দশেকের ছোট সাধুদা। মায়ের সমবয়সি। তবু সাধুদা বলে রাহি। জন্মের পর কথা বলার সময় থেকেই ডেকে আসছে এমনভাবে। মা রাগ করত প্রথম প্রথম। কিন্তু সাধুদা হাসত। বলত, ‘থাক না বউঠান। ডাকটাই কি আসল? আসল তো মনটা। কে কাকে কী বলে ডাকে তার চেয়ে জরুরি হল, কে কাকে কী মনে ডাকে।’
ভীষণ সত্যি কথাটা। রাহি ছোটবেলায় না বুঝলেও এখন বোঝে। আসলে যে যতই ওকে ছেলেমানুষ বা পাগলি বলুক, রাহি যে কত কিছু বোঝে তা তো আর অন্যরা জানে না!
সাধুদা হাতের দা-টা পাশে রেখে ফতুয়ার হাতায় মুখ মুছল। মেটে রঙের মুখটা গর্জন তেল লাগানো মূর্তির মতো চকচক করছে। লম্বা লম্বা চুলগুলোর গোড়ায় স্ফটিকের মতো ঝুলছে ঘামের দানা। দেখো তো, পুজোর দিনে কীভাবে খেটে মরছে লোকটা!
রাহি বলল, ‘কী গো সাধুদা একদম তো স্নান করে গেছ। এসব নিজে করো কেন?’
সাধু হাসল, ‘পুজোর শেষের কাজ। অন্যরা কি তেমনভাবে করতে পারবে?’
‘না পারলে অত পিঠে, পায়েস, নাড়ু খেতে হবে না। বাড়ি ভরতি লোকজন আর তুমি এই বয়সে…’
‘বয়স?’ সাধুদা হাসল, ‘বয়স মানে কী? শরীর কতটা পুরনো হল, তাই তো?’
‘আচ্ছা, বাবা আচ্ছা…’ রাহি রাগ দেখাল, ‘কেবল ফিলজফি আর ফিলজফি। পড়াশোনাটা করলে না কেন বলো তো?’
সাধুদা আবার দা-টা তুলে নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে ফলার ধারটা পরীক্ষা করল। তারপর বলল, ‘তুই অত বকিস না তো। যা, মণ্ডপে যা। সারা রাত জেগে সকাল দশটা অবধি ঘুমিয়ে এখন আমার ওপর দিদিমণিগিরি হচ্ছে। দেখ, এরপর থেকে এমন ঘুমোলে নন্দঢাকিকে বলব তোর জানলার পাশে দাঁড়িয়ে অ্যায়সা ঢাক বাজাতে যে তোর যেন চার মাস ঘুম না হয়।’
‘অ্যাঁঃ, সাহস আছে? নন্দদার মাথার পিছনের ওই চারানার চুল তা হলে তুলে নেব আমি।’
সাধুদা হাসল, ‘বড্ড চোপা হয়েছে তোর। যা এখন, আমায় কাজ করতে দে।’
‘ভারী তো মঙ্গলে যাওয়ার রকেট বানাচ্ছ!’
সাধুদা বাঁ হাত দিয়ে একটা নতুন নারকোলের মাথা ধরে দা তুলে কোপ বসাতে বসাতে বলল, ‘যা, মণ্ডপে যা। তবে সাবধানে, আজ ত্রয়ণ এসেছে।’
ত্রয়ণ। নিমেষের জন্য হলেও ভুরুটা একটু কুঁচকে গেল রাহির। ছেলেটাকে দেখলেই নিজের বোকামো মনে পড়ে যায় ওর। আর মনে পড়ে যায় তার পরের ঝামেলাগুলো। এই ছেলেটা আবার আজ এসেছে!
সকালটা আর তেমন ভাল লাগছে না রাহির। রোদটাকে মনে হচ্ছে পুড়ে যাওয়া ডাল। কেন আজ ত্রয়ণ এল? চমক কি ডেকে পাঠিয়েছে? না দীপা? চোয়াল শক্ত করল রাহি। ওর কিচ্ছু করার নেই। ও জানে বাবা অপেক্ষা করছে মণ্ডপে। নবমীর অঞ্জলিটা মিস করা যাবে না। শাড়ির আঁচলটাকে জড়িয়ে নিয়ে মণ্ডপের দিকে হাঁটা দিল রাহি।
রাহির জন্ম এই চাপাডাঙাতেই। সাতচল্লিশে পার্টিশন হওয়ার অনেক আগেই ওর ঠাকুরদারা বাংলাদেশ ছেড়ে এখানে চলে আসে। টাকাপয়সা সঙ্গে আনতে পেরেছিল প্রচুর। আর তার একটা অংশ দিয়েই এই খামারবাড়ির মতো জায়গাটা কেনা হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে মদের ডিলারশিপ, ধান-গমের পাইকারি, কলকাতায় দুটো খুব বড় ওষুধের দোকান, ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি নানা ব্যাবসার মাধ্যমে রাঘব চক্কোত্তি তার সম্পদ আর প্রতিপত্তিকে আরও বহু গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।
আগে এই বাড়ির ভেতর একটা নুইয়ে পড়া ঠাকুরদালান ছিল। কিন্তু বছর চারেক হল সেটার পাশে নতুন ঠাকুরদালান আর মণ্ডপ করা হয়েছে। তবে পাশের পুরনো মণ্ডপটা কিন্তু ভাঙা হয়নি। রাঘবের মতে, এর ঐতিহাসিক একটা গুরুত্ব আছে। আসলে পুরনো মণ্ডপটার বয়স প্রায় চারশো বছর। পাতলা লাল ইট আর চুন-সুরকির গাঁথনি দিয়ে তৈরি। তার ওপর টেরাকোটার কাজ করা। হেরিটেজ বলেই মণ্ডপটাকে ভাঙা হয়নি।
নতুন মণ্ডপটাও পুরনো ধাঁচেই তৈরি। বিশেষ অর্ডার দিয়ে পাতলা ইট আনিয়ে বানানো মণ্ডপের গায়ে পোড়ামাটির মূর্তি বসানো হয়েছে টেরাকোটার শিল্প আনিয়ে। তারপর আলোও লাগানো হয়েছে সুন্দরভাবে। রাতেরবেলা আলো জ্বালাবার পর গোটা মণ্ডপটাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগে।
মণ্ডপের একটু দূরেই ত্রিপল টাঙিয়ে রান্নার বন্দোবস্ত হয়েছে। এমনিতে সবার জন্য খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি আর মিষ্টির বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আর বিশেষ অতিথিদের জন্য পোলাও, দু’-তিন রকমের ভাজা, নিরামিষ তরকারির চারটে পদ, চাটনি, মিষ্টি ও পায়েস হয়েছে।
এই পুজোতে অঞ্চলের সমস্ত মান্যগণ্যদের নেমন্তন্ন করা হয়। আর রান্নার গুণে, ঠাকুরের গুণে বা হয়তো রাঘব চক্কোত্তির গুণেই মান্যগণ্যেরা আসেন পুজোতে। ওদের গেটের বাইরে এই পুজো উপলক্ষে বড় মেলাও বসে। সেখানে যাত্রাও হয়। চক্রবর্তী বাড়ির পুজোর কথা এখানে সবাই জানে।
মণ্ডপের সামনে শামিয়ানা টাঙানো। তার তলায় সার দিয়ে মানুষজন দাঁড়িয়ে। অঞ্জলির প্রস্তুতি চলছে। মণ্ডপের ওপর পুরুতমশাই মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে। আর তার পাশে রাঘব। মানুষটা ভীষণ শান্ত। চোখমুখ দেখলে মনে হয়, কাউকে জোরে কথা বলতে পারে না। এমন দিনেও খুব সাধারণ একটা ধুতি আর খদ্দরের চাদর গায়ে জড়িয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষটা।
রাহি জানে ওকে এই ভিড়ে যেতে হবে না। মণ্ডপের পাশের সিঁড়ি বেয়ে ও গিয়ে দাঁড়াবে বাবার পাশে। এখানে চমকেরও থাকার কথা। কিন্তু দাদাকে চট করে দেখতে পেল না রাহি। মা তো বলল বেরিয়েছে। কিন্তু কোথায় গেছে কে জানে! বাবা যে ভেতরে ভেতরে রেগে আছে তা খুব জানে ও। কিন্তু রেগে থাকলে কী হবে? চমককে বাবা সরাসরি কিছু বলে না। কেন, তা রাহি জানে না।
‘তোর দেরি হল এত?’ দীপার গলার স্বরে পাশে তাকাল রাহি। স্নানটান সেরে দীপা পুরো তৈরি।
রাহি বলল, ‘তুই তো দেখছি অঞ্জলির ইউনিফর্ম পরে ফেলেছিস একদম।’
‘ধ্যাৎ, তাড়াতাড়ি ওপরে চল।’
‘কেন?’ রাহি দীপার তাড়া দেখে অবাক হল।
‘আরে, পনেরো মিনিট ধরে এই অঞ্জলিটা থামিয়ে রাখা হয়েছে তোর জন্য।’
‘সে কী? আমায় তো কেউ কিছু বলেনি।’ রাহির খারাপ লাগল।
‘বাপের আদুরে মেয়েকে কেউ কিছু বলে!’ দীপা হাসল। ভারী সুন্দর হাসি। অন্য কেউ এমন বললে রাহির খারাপ লাগত। কিন্তু এখন লাগল না। কারণ, দীপার কথায় কোনও হুলই ছিল না। দীপা কখনও কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে না।
রাহি জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা ফেরেনি এখনও? দেখছি না তো!’
দীপার মুখটায় হঠাৎ মেঘ করল যেন। চারদিক একবার চট করে দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘গতকাল রাত তিনটে অবধি ওসব খেয়েছে। তারপর একটু আগে বেরিয়ে আবার ফিরে এসে খেতে বসেছে। মা জিজ্ঞেস করছিল। আমার এত লজ্জা লাগছিল বলতে। তাই বলেছি, বেরিয়েছে।’
রাহি দীপার হাত ধরে সিঁড়ির দিকে টানতে টানতে বলল, ‘চল, এখানে দাঁড়িয়ে আর সময় নষ্ট করব না। আর শোন, দাদার এসব করতে লজ্জা লাগে না। তোর কেন লাগছে? তুই তো আর মদ খেয়ে কিছু করিসনি।’
দীপা মাথা নিচু করে নিল।
রাহি গিয়ে দাঁড়াতেই রাঘব হাসল। শান্ত প্রশ্রয়ের হাসি।
রাহি সংকোচের সঙ্গে বলল, ‘বাবা সরি, এত দেরি হয়ে গেল। আসলে, কাল রাতে…’
রাঘব হাত তুলল, ‘বাদ দে, কিচ্ছু দেরি হয়নি।’ তারপর একটু সময় নিয়ে দীপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে, চমক কই?’
দীপার মুখটা আবার কালো হয়ে গেল। মাথা নিচু করে নিল ও।
রাহি অবস্থা সামলাতে বলল, ‘ও জানবে কী করে? দাদা তো সকালবেলা বেরিয়েছে শুনলাম। কেন? মা তোমায় কিছু বলেনি?’
রাঘব অবাক হয়ে গেল। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু পুরোহিত মশাইয়ের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল অঞ্জলি শুরু করার জন্য।
অঞ্জলির মন্ত্র রাহির কানে অর্ধেক গেল, অর্ধেক গেল না। আসলে কোনওদিনই যায় না। আর আজ যেন আরওই গেল না। কেন গেল না ঠিক বুঝতে পারল না ও। আসলে মানুষ নিজেই বোঝে না তার মন তার কাছে নেই। বা হয়তো বোঝে কিন্তু সেটা নিজের কাছে স্বীকার করতে চায় না।
অঞ্জলি শেষ করে নামতেই হোমি এসে ধরল ওকে, ‘এই তুই চা খাস তো সকালে। সেই নিয়েই অঞ্জলি দিলি!’
‘তো?’ অবাক হল রাহি।
‘তো কী রে?’ হোমি চোখ পাকাল, ‘জানিস না এমন করতে নেই।’
হাসল রাহি। হোমিকে হাড়ে হাড়ে চেনে ও। খালি ভড়কি দেওয়ার চেষ্টা। নিজে কিন্তু অঞ্জলি দেয়নি। ঠাকুর টাকুর বিশ্বাস করে না। বলে, ‘আমার সঙ্গে ঠাকুর-দেবতাদের হেভি ক্ষার।’
হোমি মেয়েটা খুব ভাল। এখন এমএ করছে। আর পাশাপাশি ‘হেল্প আর্থ’ নামে একটা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ওরা গাছ সংরক্ষণ নিয়ে কাজকর্ম করে। হোমির কাছে নেচারই হল আসল ভগবান। ও বলে, ‘পুরনো দিনের মানুষ প্রকৃতির পূজা করত। কারণ, তারা সকলে বিজ্ঞানটা বুঝত। আর এখনকার মানুষ বিজ্ঞানে বেশি পণ্ডিত হয়ে গেছে তো তাই বেসিকটা ভুলে গেছে।’
হোমি মাঝে মাঝেই রাহিকে বলে ওদের সঙ্গে যোগ দিতে। বলে, ‘দেখ, তুই রাঘব চক্রবর্তীর মেয়ে। এই অঞ্চলে তোর একটা আলাদা ওজন আছে। তুই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলে কত সুবিধে হবে বল তো? তা ছাড়া জীবনটা শুধু ছেলেমানুষি করে কাটিয়ে দিবি? সাবস্ট্যানশিয়াল কিছু করবি না? তোরা যদি না আসিস তা হলে পৃথিবীতে কাজ হবে কী করে? বোঝ, রাহি বোঝ। পৃথিবীর খুব দুর্দিন। আমাদের কাছাকাছি, পাশাপাশি দাঁড়াতে হবে। বুঝলি?’
‘পৃথিবী?’ হোমির কথায় অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রাহি। কী, বলে কী মেয়েটা? কোথায় পৃথিবী আর কোথায় রাহি? পৃথিবীর দুর্দিনে ও কী করবে? এই বিশাল পৃথিবীর তুলনায় ও কে? ওর কী এমন গুরুত্ব?
রাহি আলতো কিল মারল হোমির পিঠে। তারপর বলল, ‘বিকেলে বেরোবি? স্কুটিটা দাদাকে বলেছি ঠিক করে এনে দিতে।’
‘বিকেলে?’ হোমি একটু ভাবল, ‘মা বলেছিল, বাড়িতে থাকতে। মাসি, গুন্ডা সব আসবে কিন্তু…বাই দ্য ওয়ে, কীভাবে বেরোবি? এই পুজোর দিনে কোনও গ্যারাজ তোর গাড়ি ঠিক করে দেবে?’
রাহি কিছু বলার আগেই পিছন থেকে একটা গলা বলে উঠল, ‘কার ঘাড়ে ক’টা মাথা যে, রাঘব চক্কোত্তির মেয়ের স্কুটি ঠিক করবে না? পুজো হোক বা কারফিউ, গাড়ি ঠিক হবেই।’
রাহি চোয়াল শক্ত করল। ত্রয়ণের গলায় সবসময় কেমন যেন কাঁটা থাকে। সামান্য কথাও কেমন বিষ হয়ে আসে যেন। রাহির বিরক্ত লাগে। আর ওই সিড়িঙ্গে চাপ দাড়িওয়ালা ছেলেটার চেহারাটাও বদখত লাগে। টিপিক্যাল আঁতেল। সব বোঝে আর সব বিষয় নিয়ে শেষকথা বলার জন্য যেন মুখিয়ে থাকে। সবাই ভাবে খুব ভাল ছেলে। কিন্তু রাহি তো জানে ত্রয়ণ কী জিনিস।
‘কেমন আছ হোমি?’ ত্রয়ণ সামনে এসে দাঁড়াল।
‘চলছে।’ হোমি কাঁধ ঝাঁকাল। যেন কাঁধে আরশোলা বসেছে।
ত্রয়ণ এবার তাকাল রাহির দিকে। মুখে চটচটে একটা হাসি। রাহির মনে হল থাপ্পড় মেরে চোয়াল ভেঙে দেয়।
ত্রয়ণ জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছ রাহি? সব ভাল তো?’
রাহি বলল, ‘চলছে একরকম। তুমি হঠাৎ এলে?’
ত্রয়ণ বলল, ‘তোমায় দেখতে ইচ্ছে করল তো। তাই…’
‘মানে?’ রাহি ছিটকে উঠল। হোমির চোখে-মুখেও আশ্চর্য ভাব।
ত্রয়ণ হাসল, ‘জাস্ট জোকিং। সেন্স অব হিউমার তো পুরো নষ্ট হয়ে গেছে দেখছি! জেঠু নেমন্তন্ন করল, আর দিদিও বলল, তাই…’
বাবা তো নেমন্তন্ন প্রতি বছরই করে। আর দিদি মানে দীপা? ও তো ত্রয়ণকে পছন্দ করে না খুব একটা। বলে এই মামাতো ভাইটা নাকি চিরকালের সৃষ্টিছাড়া। বলে, ও একটা কলঙ্ক। সারাদিন মাঠেঘাটে ঘুরে নাকি পার্টি করে বেড়ায়। উমেশ রায়দের বাড়িতে অবশ্য টাকা ছাড়া অন্য কিছুতেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দীপা হয়তো সেই শুনেই বলে।
কিন্তু আসলে তা নয়। পার্টির হয়ে কাজ করা তো খারাপ কিছু নয়। সেই জন্য যে, ত্রয়ণকে খারাপ বলতে হবে তা মানে না রাহি। ত্রয়ণ খারাপ অন্য কারণে। সেটা একমাত্র ও জানে।
হোমি বলল, ‘রাহি, আমি আসি রে। দুপুরে মায়ের সঙ্গে কথা বলে তোকে ফোনে জানিয়ে দেব যে, আদৌ আমার যাওয়া হবে কিনা।’
‘প্লিজ, চেষ্টা করিস। মছলন্দপুরে নাকি জ্যান্ত দুর্গা এসেছে। লক্ষ্মী-সরস্বতী-গণেশ সব নাকি জ্যান্ত। শুধু পেঁচা-ইঁদুর-সিংহ-হাঁসগুলো মাটির। চল না খুব মজা হবে। ক্যামেরা নিয়ে যাব।’
ত্রয়ণ বলল, ‘ফালতু কনসেপ্ট। এসব মানুষজন করে কী করে? পুজোতেও সিরিয়াসনেস নেই। আমি গতকাল দেখেছি। ছাইমাখা মাগুর মাছের মতো লাগছে সবক’টাকে।’
‘হোক, তবু দেখব।’ রাহি বলল।
হোমি আর কিছু না বলে হাত নেড়ে চলে গেল।
ভিড় বাড়ছে ক্রমশ। দ্বিতীয় দফায় অঞ্জলি শুরু হবে। এবার ভিড় যেন আরও বেশি। রাহি জানে ত্রয়ণের সামনে দাঁড়ালে ও আরও মাথা খাবে। ও আলতো পায়ে সরে এল ত্রয়ণের সামনে থেকে। ত্রয়ণও আসত, কিন্তু মোক্ষম সময়ে মা আর দীপা এসে আটকে দিল ত্রয়ণকে।
রাহি কী করবে বুঝতে না পেরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। আর ঠিক তখনই সাধুদা এসে দাঁড়াল ওর সামনে।
‘তুমি? নারকোল দিয়ে রকেট বানানো শেষ?’ রাহি সিরিয়াস মুখে বলল।
‘খালি ইয়ারকি, না?’ সাধু হাসল। তারপর বলল, ‘চল, চমক ডাকছে তোকে।’
‘দাদা!’ রাহি অবাক হল একটু।
‘হ্যাঁ রে, চমক বারান্দায় এসেছিল। মাইকে মন্ত্র শুনে আবার ঘরে ঢুকে গেছে। পরে বেরিয়ে আমায় বলল তোকে ডেকে দিতে।’
‘ওফ! তোমায় কিছু জিজ্ঞেস করলে নাড়ি-নক্ষত্র সব বলে দাও।’
‘ঠিক আছে, চল।’ সাধুদা হাত ধরে টানল রাহিকে।
বারান্দা দিয়ে উঠে বাড়ির একদম অন্য দিকে দোতলায় চমকের ঘর। বাড়ির অন্য কেউ বিশেষ আসে না এখানে। এমনকী মা-ও নয়। যা আসার রাহিই আসে।
এই ঘরের দরজাটা মোটা ঘষা কাচের। স্লাইডিং। সাধুদা গিয়ে টোকা দিল দরজায়। রাহি চাপা গলায় বলল, ‘তুমিও যাবে?’
সাধু নিরুপায় মুখে বলল, ‘কী করব? আমাকেও যে ডেকেছে।’
দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে মিঠে-কড়া একটা হাওয়া এসে ঝাপটা মারল রাহির মুখে। এখনও বোতল খুলে বসে আছে? রাহির মাথা গরম হয়ে গেল।
‘আয়,’ চমক সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘ডেকেছিস?’ রাহি ভুরু কুঁচকে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল। তার মধ্যেও দেখল সাধুদা দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার বাইরে।
‘গন্ধ পাচ্ছিস?’ চমক হাসল।
‘কেন ডেকেছিস বল।’ রাহি বিরক্তি লুকোনোর চেষ্টাই করল না।
‘আরে বলিস না,’ চমক না কামানো গালে হাত ঘষে বলল, ‘বর্ডার থেকে বাইশ পেটি মাল ঢুকেছে। দেখ না জোর করে এক পেটি আমায় গছিয়ে দিল। বললাম নেব না। শোনে কথা? খাঁটি স্কটল্যান্ডের জিনিস। ঝরনার জলে তৈরি। ওক কাস্কে জমানো ছিল বহু দিন। গন্ধে গোলাপ ফেল। তাই আমি এই পুণ্য প্রভাতে চেখে দেখছিলাম।’
‘বাজে কথা বলিস না। বাবাকে সবার সামনে অমন করে হেনস্তা করলি কেন? তোর জন্য সবার সামনে অপমান হতে হল। প্রতিবার আমি আর তুই অঞ্জলিতে থাকি। এবার গেলি না কেন?’
‘এবার?’ চমক একটু অন্যমনস্ক হল যেন। বলল, ‘জীবন কি আর এক থাকে রে রাহি? পালটায়। সব পালটায়। গতবারের আমিটার সঙ্গে এবারে আমিটাও তো এক নই। আমার যে, তৃতীয় চক্ষু খুলে গেছে। তাই ভগবানের দরকার আর আমার নেই।’
‘মানে!’ রাহি অবাক হল। সাতসকালে বড্ড বেশি খেয়েছে কি? অবশ্য, আশ্চর্য কিছু নয়। চমক যখন খায় তখন বাহ্যজ্ঞান থাকে না ওর।
‘বাদ দে,’ রাহির রাগ হচ্ছে খুব। ও বলল, ‘ডেকেছিস কেন? আর সাধুদাকেও বা দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন?’
‘সাধুদা?’ চমক দরজার দিকে তাকিয়ে হাসল আপন মনে। তারপর বলল, ‘লোকটা খুব লয়াল না? কুকুরের মতো।’
‘কী যা তা বকছিস?’ রাহির মাথা ঠিক থাকছে না আর, ‘কেন ডেকেছিস?’
‘গিফ্ট,’ চমক টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা প্যাকেট তুলল টেবিল থেকে। ক্যালকুলেটারের মতো মাপের প্যাক করা একটা জিনিস।
‘কী এটা?’
‘পাম-টপ কম্পিউটার। তোর পুজোর গিফ্ট। মালয়েশিয়ার জিনিস। সরি, দিতে লেট হয়ে গেল।’
‘পাম-টপ!’ রাহি অবাক হল। চমক এমন একটা জিনিস দিল!
‘হ্যাঁ, আর এটা সাধুদার,’ চমক ঘরের কোণে বড় একটা প্যাকেট দেখিয়ে বলল।
‘সাধুদার গিফ্ট?’ রাহি অবাক হল খুব। চমকের কী হয়েছে? কোনওদিন তো সাধুদার জন্য কিছু আনে না! তা হলে?
‘অবাক হচ্ছিস কেন?’ চমক হাসল। তারপর এগিয়ে বিছানার মাথার কাছের থেকে হলুদ তরল পূর্ণ গ্লাসটা তুলে বলল, ‘সাধুদা আমাদের ফ্যামেলির জন্য যা করেছে, তাতে কি এটা ডিসার্ভ করে না?’ তারপর সাধুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটাতে মাইক্রোওয়েভ আছে। তোমার রান্নার সুবিধে হবে।’
সাধু দরজায় বাইরে থেকে ইতস্তত করল।
চমক আবার বলল, ‘কেন এমন করছ? নাও এটা।’
রাহি অবাক হয়ে চমকের দিকে তাকাল। একটু কি বেশি বিষণ্ণ লাগছে দাদাকে? মনটা কি একটু বেশি খারাপ ওর?
‘তোরা আয়।’ চমক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অন্যমনস্কভাবে গ্লাসটা দেখল। রাহি কী বলবে বুঝতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সাধুদাও রাহির পিছন পিছন চলে এল। ঘর থেকে বেরিয়েই রাহির মনে পড়ল, যাঃ স্কুটির ব্যাপারটা যে, জিজ্ঞেসই করা হল না।
আসলে চমককে দেখে কেমন যেন লাগল রাহির। এমন কোনওদিন লাগে না। কেন মনখারাপ চমকের? দীপা জানে কি?
কিন্তু এই নিয়ে বেশি চিন্তা করতে পারল না রাহি তার আগেই হইচই করে খুদে এসে হাজির হল।
সাধু হাতের প্যাকেটটা বেলগাছের গোড়ায় রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে খুদে এমন লাফাচ্ছিস কেন?’
খুদে হাউমাউ করে বলল, ‘পেছনের কাচের ঘরে গোরু ঢুকে গেছে। আর ক্যামেরাদা ওকে বের করতে গেলে…’
পুরো কথা শোনা হল না। ক্যামেরাদা? তবে ও এসেছে? ছমছমে বুক নিয়ে দূরে কাচের ঘরের দিকে তাকাল রাহি। দেখল, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ওদের দিকে আসছে সে। বুকের ভেতরের টুপুটুপু ভরতি জলের গ্লাসটা এবার চলকাল একটু। শয়ে শয়ে ডুবুরি নেমে পড়ল পেটের ভেতর। ওর মনে হল চাপাডাঙার হাওয়ায় কি অক্সিজেন কমে এল হঠাৎ?
Chapter - 6
৬
নীল দুটো চোখ তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। আকাশে এখন আলো। আর তাতে ডুবে এই জঙ্গলের লতাপাতা, গাছপালা ও পুরনো চার্চের গন্ধের মধ্যে নীল দুটো চোখ তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।
জলটা একদম স্থির। কাচের মতো। তলতাবনির এত ভেতরে চট করে কেউ আসে না। ফলে এই ছোট্ট জলাশয়টা প্রায় ব্যবহারই হয় না। কাচের মতো জল বুকে নিয়ে সে শুধু অপেক্ষা করে। কার অপেক্ষা করে?
সেই জলের ধারে ঝুঁকে রয়েছে ও। আর ওর নীল দুটো চোখ তাকিয়ে দেখছে ওকেই। অক্টোবরের প্রায় শেষ এখন। ঠান্ডা গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়তে চাইছে জীবনে, জঙ্গলে। জলের ওপার থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। ভাঙা হ্যাঙার আর আগাছায় ঢেকে যাওয়া চার্চের ফাঁকফোকর দিয়ে টুকরো টুকরো হাওয়ার ভেতর ঢুকে আসছে শীত।
জলাশয় থেকে এক আঁজলা জল তুলে ঘাড়ে মুখে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ভেজা আঙুলগুলো চুলের মধ্যে চালিয়ে দিল কিগান। প্রেশারটা বেড়েছে বোধহয়। ডাক্তারকাকা বলত, ‘ঠাকুরমার ধাঁচ। অল্প বয়স থেকেই হাই প্রেশার।’
হৈমবতী হাসতেন, বলতেন, ‘হবেই তো। আমার নাতি কি অন্যের মতো হবে নাকি?’ অন্যের মতো কী করে হবে কিগান? ঠিকমতো জ্ঞান হওয়ার পর থেকে তো শুধু ঠাকুরমাকেই দেখে এসেছে ও।
পাশের পেয়ারা গাছের ডালে ঝোলানো ক্যামেরাটা খুলে গলায় ঝুলিয়ে নিল কিগান। ক্যামেরাটা দামি। ডিএসএলআর। সিক্সটিন পয়েন্ট ওয়ান মেগা পিক্সেল। কিগানের খুব শখের জিনিস।
গিটার, মাউথঅর্গান আর ক্যামেরা। শখ বলতে এই। এ ছাড়া তো একাই থাকে ও। সেই ছোট্ট থেকে প্রায় একাই থাকে। হ্যাঁ, চেনা-পরিচিতি অনেক হয়েছে জীবনে। কিন্তু বন্ধু? মনে করতে পারে না কিগান।
আসলে যেন কিছুই মনে করতে পারে না ও। সবই যেন কেমন ধোঁয়াশা। যেন সব কিছুর ওপর কয়েক হাজার বছরের ধুলো জমে আছে। আর তার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসে এক-একটা মুখ। এক একটা মুহূর্ত। কিগান বোঝে, ও নিজেই ধুলোয় ঢেকেছে সব। বোঝে, এ ধোঁয়াশাও ওরই তৈরি। আসলে সবকিছু ভুলতে চায় ও। ওর কষ্ট, যন্ত্রণা আর অপমান। সব ভুলে যেতে চায়।
আর-একটা হাওয়ার ওড়না ভেসে এল বিকেলের ওপর দিয়ে। আর সঙ্গে করে নিয়ে এল জল, জঙ্গল আর আলোর গন্ধ।
আলোর গন্ধ থাকে? থাকে। কিগান জানে, প্রতিটা আলোর একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। ছোট থেকেই সকালের প্রথম আলোটা ঘরে ঢোকামাত্র তার গন্ধ পেত ও। উত্তর কলকাতার গলি, ঠাকুরমার চন্দন, ধূপ আর কর্পূর ছুঁয়ে ভেসে আসা অদ্ভুত এক আলোর গন্ধ পেত কিগান। সেই ছোট থেকেই কিগান বুঝেছিল প্রতিটা মানুষের মতো প্রতিটা সময়ের আলোরও আলাদা আলাদা গন্ধ থাকে।
এখন এই জঙ্গলে দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলের আলোর অন্য এক গন্ধ পেল কিগান। ক্যামেরাটা হাতে তুলে ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে দূরে ভাঙা হ্যাঙারের ফাঁক দিয়ে ডুবন্ত সূর্যের দিকে ফোকাস করল ও।
বাবার সবসময়ের সঙ্গী ছিল ক্যামেরা। ছোট থেকেই নাকি ক্যামেরার প্রতি, ছবির প্রতি, বাবার একটা অদ্ভুত আগ্রহ ছিল। ঠাকুরমা বাবাকে প্রথম ক্যামেরা কিনে দিয়েছিল চোদ্দো বছর বয়সে। তারপর থেকে বত্রিশ বছর বয়স অবধি আর কোনওদিনই ক্যামেরা ছাড়া থাকেনি বাবা।
হ্যাঁ, বত্রিশ বছর। বত্রিশ বছর বয়সেই তো মারা যায় বাবা আর মা। তখন চার বছর বয়স কিগানের।
তাই ওর কাছে বাবা আর মায়ের প্রায় পুরোটাই গল্পের মতো করে শোনা, আর প্রচুর ছবির মধ্যে দেখা। তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ একটা বিশাল বড় লেক দেখতে পায় ও। তার পাশের প্লাস্টিকের ওপর পড়ে থাকা একটা অদ্ভুত মাছ দেখতে পায়। দেখতে পায় কোথায় যেন বরফ পড়ছে। আর টেপরেকর্ডারে নিচু স্বরে বাজছে ক্রিসমাসের গান। দেখতে পায় পাথরের বাড়ির মাথায় বসানো চৌকো পাথরের চিমনি দিয়ে গোল্লা গোল্লা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আর অদ্ভুত আলোর ভেতর ঝাঁকড়া লাল মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চেরি ট্রি।
বাবা-মায়ের স্মৃতি বলতে মূলত এই। কিন্তু এর ভেতর বাবা-মা কোথায়? কিগান জানে, যখন-যখন ও এইসব জিনিস দেখেছে ওর দু’পাশে মা আর বাবা থাকত। তাই স্পষ্ট না হলেও মনের মধ্যে, স্পর্শের মধ্যে আর এইসব টুকরো-টাকরা ছবির মধ্যে বাবা-মাকে অনুভব করতে পারে কিগান অর্ক ব্যানার্জি।
বাইশ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিল কিগানের বাবা অর্কপ্রভ। প্রথমে দিল্লি, তারপর চেন্নাই। আর সব শেষে মুম্বই। আর তারপর পঁচিশ বছর বয়সে বিদেশি কাগজে চাকরি নিয়ে সোজা ইংল্যান্ডে।
কিয়েরা ফেরেল ছিল অর্কপ্রভর চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। ওই কাগজেরই স্পেশ্যাল করেসপন্ডেন্ট। নানা জায়গায় কিয়েরার সঙ্গে ঘুরতে হত অর্কপ্রভকে। আর সব জায়গার থেকেই নানা পিকচার পোস্টকার্ড সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠাত অর্কপ্রভ। তাতে নানা ঘটনার কথা সঙ্গে দু’-এক লাইন কিয়েরার কথাও থাকত।
কিন্তু ক্রমশ সেইসব পোস্টকার্ডে ঘটনার কথা কমতে থাকে আর কিয়েরার প্রসঙ্গ বাড়তে থাকে। হৈমবতী বুঝতে পারছিলেন যে, ব্যাপারটা খুব একটা ভাল দিকে গড়াচ্ছে না। ছেলের কথার ভাঁজ কেমন যেন পালটে যাচ্ছে। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেও পারেননি স্পষ্ট করে। শুধু লিখেছিলেন, ভবিষ্যতে যা পদক্ষেপ নেবে অর্কপ্রভ তা যেন বুঝেশুনে নেয়।
তবে সে চিঠি অর্কপ্রভর কাছে পৌঁছোনোর আগেই সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে আর-একটা খাম এসে পৌঁছোয়। চিঠিতে অর্কপ্রভ লেখে যে, সে কিয়েরাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে আর কিয়েরা তাতে রাজি হয়েছে। সেই চিঠির সঙ্গে বারোটা ছবিও অর্কপ্রভ পাঠিয়েছিল। কিয়েরার ছবি। অর্কপ্রভর তোলা।
সেসময় গোটা পরিবারেই এই নিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। বাড়ির লোকজন আর আত্মীয়স্বজন সবাই একজোট হয়ে বলেছিল, অর্কপ্রভকে ত্যাগ করা হোক। বলা হয়েছিল যে, অর্কপ্রভকে সমস্ত অংশীদারী থেকে বরখাস্ত করা হোক ও তাকে যে ত্যাজ্য ঘোষণা করা হল সেই কথাটাও জানিয়ে দেওয়া হোক।
সেই মর্মে হৈমবতীর আর-এক ছেলে সূর্যশেখর চিঠি লিখে জানিয়েও দেয় অর্কপ্রভকে। উত্তরে অর্কপ্রভ নিজেদের বিয়ের ছবি পাঠিয়েছিল। আর লিখেছিল যে, কারও কোনও ভয় নেই। সম্পত্তির এক কানাকড়িও সে দাবি করবে না।
এই সব কিছুর ভেতরই হৈমবতী ছিলেন। কিন্তু কিছুতেই সরাসরি যোগ দেননি। বরং কিয়েরার ছবি দেখে মেয়েটাকে ভালই লেগেছিল ওঁর। যত্ন করে রেখেও দিয়েছিলেন সমস্ত ছবি। সেসব একটু বড় হওয়ার পর হৈমবতীর কাছে কিগান দেখেওছে।
হৈমবতী কিগানকে বলেওছিলেন যে, ‘জানিস তোর মাকে আমার বেশ পছন্দও হয়েছিল। অমন রং, চোখ, নাক। অমন ঘন কালো চুল আর নীল চোখ। ক’জনের হয় রে! শুধু অন্য জাত বলে একটু খটকা লাগছিল। তবে অর্ক যা করেছে ভালই করেছে। কলের পুতুলের মতো অন্যের বেছে দেওয়া মেয়ের সঙ্গে জীবন না কাটিয়ে নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করেছে। সারাজীবন তো এই আফশোস থাকবে না যে, যাকে চাইলাম তাকে পেলাম না!’
মায়ের ছবিগুলো দেখেছে কিগান। এখনও দেখে। নানা জায়গায় নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, বসে রয়েছে মা। কোনও সময় হাসছে, কোনও ছবিতে সামান্য গম্ভীর। আবার কোনও ছবিতে কেমন যেন আনমনা। বাবা যত পেরেছে, মায়ের ছবি তুলে গেছে। যেন সমস্ত রকমভাবে মাকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল বাবা।
কিগান মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকেই দেখতে পায়। যেন মায়ের মুখ-চোখ কেউ যত্ন করে কেটে বসিয়ে দিয়েছে কিগানের মুখে। অমন নীল চোখ আর কারও নেই এ তল্লাটে। সবাই মনে রেখে দেয় কিগানের মুখ। আর ওর ওই নীল চোখ দুটো। নিজের ভেতর মাকে দেখতে পায় ও। দেখতে পায় চৌকো চিমনি দিয়ে ধোঁয়ার গোল্লা উঠছে। আর শুনতে পায় ঠাকুরমার গলা, ‘মাতৃমুখী পুত্র, সুখী হয়।’
‘সুখ’ শব্দটার মানে ঠিক বোঝে না কিগান। ছোট্ট চেরি ট্রি-র কাছে গিয়ে দাঁড়ানো আবছা ছোটবেলাটা কি সুখের মধ্যে পড়ে? বাবা-মায়ের অস্পষ্ট মুখটা কি কোনও অদ্ভুত অনুভূতি এনে দেয় ওকে? নাকি ঠাকুরমার কাছে চলে আসার পর উত্তর কলকাতার সেই লম্বা ছাদ, ঠাকুরমার কাছে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা বৃষ্টি রাত বা গলি ক্রিকেটে সব্য জেঠার বারান্দায় বল তুলে দিয়ে ছয় মারাটা সুখ?
আসলে সেই ছোট্ট থেকে কিগানের জীবনে এমন সব তীব্র বাঁক ও ভাঙন এসেছে যে, সুখ টুখের মতো ব্যাপারগুলো গুলিয়ে গেছে একদম। তবে হ্যাঁ, দুঃখটা স্পষ্ট টের পায় ও। ছোট থেকেই টের পায়।
সিন্থিয়া নামে একজন ন্যানি ছিল কিগানের। মহিলা কালো আর মোটা। মাথায় কেমন ছোট ছোট গোল্লা করে বেঁধে রাখত চুল। বাবা-মা দু’জনকেই কাজে বেরোতে হত বলে সকাল আটটার ভেতর চলে আসত সিন্থিয়া।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। কিগানের মনে আছে ওদের অ্যাপার্টমেন্টের পিছন দিকে যে-লোহার সিঁড়ির পাশে ফুলের টব রাখা থাকত তাতে বৃষ্টির জল জমে একদম উপচে পড়ছিল। আর লাল-হলুদ ফুলগুলো নিরুপায় হয়ে তাকিয়েছিল এ ওর দিকে।
উলটো দিকে একটা বিলবোর্ডের তলায় ধূসর রঙের পায়রারা বসে ছিল সার দিয়ে। কিগান কাচের জানলার গায়ে নাক লাগিয়ে দেখেছিল নীচে ছাতা মাথায় বাবা আর মা একটা গাড়িতেই দৌড়ে উঠে গেল। শুধু গাড়িতে ঢোকার মুখে মা যেন একবার পার্পল ছাতা সরিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়েছিল।
তারপরের সময়গুলো যেন জল পড়ে লেপটে যাওয়া ফাউন্টেন পেনের লেখা। যেন ঘষা কাচের ওপারে কিছু মানুষের নড়াচড়া। যেন বহু দূরের কোনও আবছা গলার স্বর।
কিগানের মনে আছে সিন্থিয়ার দৌড়ে আসা। পুলিশ গাড়ির ভেজা শীতল সারি। অনেক লোক। ক্যামেরা। আর ‘রোড অ্যাক্সিডেন্ট’, ‘রোড অ্যাক্সিডেন্ট’ শব্দ দুটো। কিছু বুঝতে পারেনি কিগান। এখনও যেন কিছু পারে না। শুধু মনে হয় সার বেঁধে বসে থাকা ধূসর পায়রা। মনে হয় পার্পল ছাতা সরিয়ে উঁকি দেওয়া মায়ের হাসি একটা মুখ।
হৈমবতী কারও কথা শোনেননি। প্রচুর পয়সা ছিল। কারও ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না হৈমবতী। তাই নিজেই লন্ডনে গিয়ে নিয়ে এসেছিলেন নাতিকে।
অ্যাপার্টমেন্টে ফরসা মোটা হৈমবতীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগান। ওকে বলা হয়েছিল গ্র্যান্ড মাদার। বলা হয়েছিল, ওঁর সঙ্গে এবার থেকে থাকতে হবে ওকে। হৈমবতী জড়িয়ে ধরেছিলেন কিগানকে। খুব সুন্দর একটা গন্ধ পেয়েছিল কিগান। ঝাঁঝালো, মিষ্টি আর নির্ভরতার গন্ধ। এই গন্ধটা তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসে কিগানের কাছে।
হৈমবতী বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে থাকবে তুমি। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে, কেমন?’
অনেক দূর যেতে হবে। অনেক অনেক দূর যেতে হবে। সেই ছোট থেকে কিগান বুঝেছিল ওকে অনেক দূর যেতে হবে, একা।
আজ দীপাবলী। ফ্যাক্টরি ছুটি। অবশ্য সবার ছুটি নয়। বয়লার একবার ফায়ার করতে সময় লাগে কিছুটা। তাই বয়লার নেভানো যায় না। বয়লার চলছে। কিগানকে শুধু সন্ধের দিকে একবার ফ্যাক্টরিতে রুটিন ভিজিট করতে হবে। গত কয়েকদিন ধরে বয়লার নিয়ে একটা গন্ডগোল চলছে। যদিও সেটা কিগান খানিকটা মিটিয়েছে। তবু পুরোটা মেটেনি। আসলে বয়লারম্যান যারা আছে তাদের মধ্যে সন্ধের শিফ্টে যে থাকে, সেই অজিত ছেলেটা খুব ত্যাঁদড়। কথায় কথায় ইউনিয়ন দেখায়। প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কিগানকে গোটা প্রোডাকশনের চেনটা দেখতে হয়। কারণ, একটা কোথাও গন্ডগোল হলে পুরো প্রোডাকশনের ওপর প্রভাব পড়ে।
রুহান বলেছিল, ‘এসব প্রোডাকশন ম্যানেজার ফ্যানেজার হতে যেয়ো না। পুরো বাঁশের কাজ। থ্যাঙ্কলেস জব। প্রোডাকশন যখন স্মুদ চলবে কেউ নাম করবে না। কিন্তু যখনই আটকাবে, সে এক ঘণ্টার জন্য হলেও, গালাগাল দিয়ে বাপের নাম ভুলিয়ে ছাড়বে। কলকাতা ছেড়ে মরতে কেন যে, অত দূর যাচ্ছ?’
মরতে কি? না, বাঁচতে? কেন কলকাতা ছেড়েছে কিগান? না ছেড়ে কি কোনও উপায় ছিল না?
কিগানের ঘাড়ের কাছটা ব্যথা করছে। মাথাটাও ঘুরছে যেন। প্রেশারটি কি আবার বাড়ল? শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে বেশ। বুকে কষ্ট হচ্ছে। ভেবেছিল সব পিছনে ছেড়ে আসবে। কলকাতার সব ভুলে যাবে এই গ্রামে এসে। কিন্তু গত দু’-আড়াই মাসে তা আর হল কই? এখনও তো কষ্ট হয় ওর। তীব্র একটা যন্ত্রণা পাক খায় শরীরে, মনে। কাউকে বলতে পারে না সে কথা। বলতে পারবেও না কোনওদিন। আসলে ও যে কী মনে করে, তা কোনওদিন বলতে পারবে না দিঘিকে। কোনওদিন বলতে পারবে না যে, দিঘির চুল থেকেও ও অন্য এক আলোর গন্ধ পেত!
একা হতে খুব ভাল লাগে কিগানের। আর এই তলতাবনির জঙ্গল ওকে একা হতে সাহায্য করে। তাই এই পুজোর দিনে ও কোলাহল ছেড়ে ঢুকে এসেছে এই গাছপালাদের ভিড়ে। ছবি তুলেছে মনমতো। আর বসে থেকেছে। হেমন্তের অরণ্যে নির্জন হয়ে যেতে চেয়েছে কিগান।
সূর্যটা আর আকাশে নেই। একটা মনমরা বেগুনি রঙের আলো ধীরে ধীরে চেপে বসছে জঙ্গলের শরীরে। জলাশয়ের ওপারে এলোমেলো ঝোপের ভেতরে জোনাকিরা স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। মশাও মুকুটের মতো ঘন হয়ে আসছে মাথার ওপর। এবার ফিরতে হবে।
কিগান ক্যামেরাটাকে ব্যাগে ভরে জঙ্গল থেকে বেরোনোর জন্য এগোল। এখান থেকে বেরিয়ে সোজা ফ্যাক্টরি যাবে। তারপর বাড়ি।
ফ্যাক্টরির কাছেই একটা বাড়ির দোতলাটা ভাড়া নিয়েছে কিগান। অফিসই রেন্ট দেয়। চমক জোগাড় করে দিয়েছে বাড়িটা।
বুধিয়া নামে বছর আঠারোর একটা ছেলে কিগানের কাজকর্ম আর রান্নাবান্না করে দেয়। কলকাতা থেকে এই চাপাডাঙায় ট্রান্সফার নিয়ে আসার পরে কোথায় থাকবে ঠিক করতে পারছিল না কিগান। তখন ফ্যাক্টরির শশীবাবু আলাপ করিয়ে দিয়েছিল চমকের সঙ্গে। চমকই এই বাড়িটা ঠিক করে দিয়েছিল কিগানকে।
রোগা, বেঁটে আর নিপাট ভালমানুষের মতো চেহারার ছেলেটাকে প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি কিগান। কিন্তু এখন এখানে থাকতে থাকতে ওর দাপট বুঝতে পারছে।
বাড়িটার মালিক মানিক রায়। ভদ্রলোক এখানকার স্থানীয় এমএলএ সুধাদির দলেই আছেন। ওঁর চাল-গমের পাইকারি কারবার আছে। মানুষটা সদাশয়। সর্বক্ষণ হাসি লেগেই রয়েছে মুখে। কিগানকে দেখে বলেছিলেন, ‘আমাদের গ্রামে বহুদিন পর আবার আপনিই সাহেব এলেন।’
‘সাহেব?’ কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
‘নন? এমন সুন্দর গায়ের রং, নীল চোখ, আপনি সাহেব না হলে কি আর এই ভুসোকালি, আমি সাহেব?’
‘আমার বাবা বাঙালি।’ কিগান চেষ্টা করেছিল বোঝাতে, ‘মা আইরিশ, কিন্তু বাবা বাঙালি।’
‘তা হলেও, আমার কী সৌভাগ্য যে আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন!’
কিগান আর কথা বাড়ায়নি। বুঝেছিল যে, কলোনিয়াল হ্যাংওভার কাটতে এখনও অনেক দেরি আছে এদের। গায়ের রঙের জন্য এখনও যে কত কিছু সামলাতে হয় মানুষকে!
তবে সেই সূত্রে চমকের সঙ্গে আলাপ ওর। আর এখন যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তবে সবটাই চমকের দিক থেকে। চমকের একটু হামলে পড়া স্বভাব আছে। মাঝেমধ্যে খাবার দাবার নিয়ে হাজির হয় কিগানের ডেরায়। সঙ্গে মদও আনে। কিগান নিজে এসব খায় না। কিন্তু চমককে বারণও করে না। শুধুমাত্র মাত্রা ছাড়াতে না করে।
আজ কালীপুজো, কিগান জানে চমক আজকেও হানা দিতে পারে বাড়িতে। তবে আজ এসব ভাল লাগছে না কিগানের। আজ চমক আসলে ফিরিয়ে দেবে। কেন, কিগান জানে না, কিন্তু যে-কোনও উৎসবের সময়ই কিগানের মন খুব খারাপ হয়ে থাকে।
আজ আলোর উৎসব। ফ্যাক্টরিটাকেও ছোট ছোট আলো দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। দূরে, বিশাল লম্বা ওয়াটার রিজার্ভারটা দেখা যাচ্ছে। তার লম্বা সেন্ট্রাল কলামে আলোর সাপ পেঁচিয়ে উঠেছে। কিগান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। আর হঠাৎই ওর মনে পড়ে গেল সেই রিজার্ভারটার কথা! মনে পড়ে গেল তার চারপাশে গুটিয়ে আসা সন্ধের কথাও। কিগান মাথা নাড়ল। তারপর সামনের দৃশ্যে মনোযোগ দিল। ওর মনে হল, গোটা ফ্যাক্টরিটাকেই কেমন যেন ভিনগ্রহের আকাশযান মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা কোত্থেকে এল হঠাৎ? আগে তো এখানে ছিল না!
কিগান মেন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। গেটের ডান দিকে সিকিউরিটির ঘর। তাতে চারজন বসে থাকে। বাইরের কেউ ঢুকতে গেলে তাদের আগাপাশতলা চেক করে, ফোটো তুলে তবে ঢুকতে দেওয়া হয়।
আজও গেটের পাশের ঘরে রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন গুরুং বসে ছিল। এখানকার সিকিউরিটি ইন চিফ। কিগানকে দেখে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বলল, ‘কিগানভাই, কার্ড পাঞ্চ করবে না?’
‘না,’ কিগান হাসল, ‘আরে, আমি একরকম ছুটিতেই আছি ক্যাপ্টেন। কিন্তু বাড়িতেও তো কিছু করার নেই, তাই ভাবলাম বয়লারটা দেখে যাই।’
‘একরকম ছুটি মানে?’ গুরুং হাসল, ‘তুমি ছুটি নাও না কেন বলো তো?’
‘নেব, একদিন নেব।’ কিগান হাসল।
‘ঠিক আছে, অন্তত লগ-এ সই করে ঢোকো।’ গুরুং হেসে ঘরের দিকে ইঙ্গিত করল।
ঘরটা ছোট। কেমন যেন গুমোট। এখানে এরা বসে থাকে কী করে, ভাবল কিগান। সই করে ও বেরিয়ে এল ঘরের থেকে।’
গুরুং বলল, ‘আরে চলো আমাদের গ্রামে। দেখবে মন একদম ফ্রেশ হয়ে গেছে। পাহাড়, চা-বাগান, মেঘ, ঝরনা, সুন্দরী মেয়ের দল, কী নেই? চলো একবার, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কী ঠিক হবে? আমার তো কিছু ভুল নেই।’ কিগান হেসে তাকাল গুরুং-এর দিকে।
গুরুং বলল, ‘আমার কি এমনি এমনি বয়স হয়েছে নাকি? সারাজীবন আর্মিতে কি আমি ঘোড়ার ঘাস কেটেছি মনে হয় তোমার? যাক গে, পাহাড়ে চলো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
পাহাড়? কিগান গেছে পাহাড়ে। বেশ কয়েকবার ঘুরতে গেছে কিগান। বহুদিন আগে পাহাড় ওকে কষ্ট দিয়েছিল খুব। তবু পাহাড় খুব পছন্দের জায়গা ওর। সেই পাহাড়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে? সমস্ত কিছু আবার হয়ে যাবে জলের মতো সহজ!
গুরুং ঘর ছেড়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এসে দাঁড়াল কিগানের পাশে। কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ভুল নেই তো? তা হলে এবার বিয়ে করো একটা। দেখবে ঠিক হয়ে যাবে সব।’
সব ঠিক, সব ঠিক হয়ে যাবে। সবাই একসঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা বলে কেন? জীবন কি হিন্দি সিনেমা যে, শেষ হওয়ার আগে সব ঠিক হবে, সব গুছিয়ে উঠবে? কত মানুষ তো অসমাপ্ত কাজ, অসমাপ্ত বন্ধুত্ব, অসমাপ্ত সম্পর্ক রেখে দিয়ে ফট করে মারা যায়। তার বেলা? সব কি ঠিক হতেই হবে? এই ‘সব ঠিক হওয়া’র কনসেপ্টটা ঠিক বুঝতে পারে না কিগান।
তা ছাড়া, বিয়ে! কাকে করবে? সেই কলেজ জীবনে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল জিয়ানাকে। তার এত বছর পরে আর-একজনকে। কিন্তু…কোনওমতে চিন্তার রাশটা থামাল কিগান। যা সম্ভব নয়, তা বলে লাভ নেই। ভেবেও লাভ নেই।
কিগান হাসল, ‘খুব বিয়ের কথা বলছ ক্যাপ্টেন! ভাবির জন্য মন-কেমন করছে?’
‘আর ভাবি,’ গুরুং হাসল, ‘প্রথম প্রথম অমন ছিল। এখন বিয়ের বাইশ বছর হয়ে গেছে। মন আর কেমন করে না।’
কিগান বলল, ‘ঠিক আছে ক্যাপ্টেন, আমি একটু পিছনের দিকে যাব। বয়লার রুমের দিকে। তা হলে আসি?’
ফ্যাক্টরি চত্বরটা বেশ বড়। বয়লার রুম পিছন দিকে। অর্থাৎ, অনেকটা হাঁটতে হবে কিগানকে।
আজ ফ্যাক্টরি প্রায় শুনশান। শুধু হঠাৎ হঠাৎ সিকিউরিটির দু’-চারজন বেতের লাঠি হাতে ঘুরছে। আর কখনও কখনও দু’-একজন লেবারের মুখ দেখা যাচ্ছে।
কিগান হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকাল। নানা রঙের বাজি ফাটছে। কোনওটা লাল, কোনওটা সবুজ, আবার কোনওটা সাদা। মানুষজন প্রাণপণে তথাকথিত বড় অনুষ্ঠানের শেষটা উপভোগ করতে চাইছে।
বয়লার রুমের কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল কিগান। আরে এগুলো কী? এগুলো আবার ব্যাগের বাইরে বেরিয়ে এসেছে? আসলে কেউ দেখেনি কেন? এ শিফ্টে তো অজিত থাকে। ও দেখছে না কেন?
কিগান প্রায় দৌড়ে গেল বয়লার রুমের দিকে। দেখল, বাইরে একটা চেয়ারে বসে সামনে একটা চেয়ারে পা তুলে কানে ইয়ারফোন গুঁজে প্রবল বেগে মাথা নাড়ছে অজিত। মনে হচ্ছে যে-কোনও মুহূর্তে ওর মাথাটা খুলে পড়ে গিয়ে ড্রপ খাবে মাটিতে। কিগানের রাগ হয়ে গেল। আচ্ছা ছেলে তো! কোম্পানি কি ওকে গান শোনার জন্য মাইনে দিচ্ছে নাকি?
‘অজিত।’ কিগান সামনে গিয়ে ডাকল।
অজিত শুনতেই পেল না। বরং মাথা নাড়ার বেগ যেন বাড়ল বেশ। হয়তো গানটা তার ক্লাইমেক্সের দিকে যাচ্ছে।
‘অজিত।’ কিগান এগিয়ে গিয়ে অজিতের কাঁধ ধরে ধাক্কা দিল।
‘অ্যাঁ?’ অজিত ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলল।
‘তুমি গান শুনছ?’
‘তো কী হয়েছে?’ অজিত মুখের ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা মুছে ফেলে ভুরু কুঁচকে তাকাল।
‘কালেক্টর ব্যাগ ফাটছে কী করে? এই দেখো বয়লার রুমের পিছনে আবার ফ্লাই অ্যাশ উড়ছে।’
‘ব্যাগ ফেটেছে!’ অজিত ঠোঁট চাটল। তাকিয়ে দেখল চারদিক। সত্যি পাতলা মিহি ছাই ভেসে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়।
‘না তো এমনি এমনি ছাই উড়ছে নাকি? আর তুমি গান শুনছ?’
অজিত পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলটা কয়েক বার আঁচড়ে নিয়ে বলল, ‘আমি কী করে বুঝব যে, এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যাগ ফেটে আবার বয়লারে ছাই উড়বে?’
‘বুঝতে তো কেউ বলেনি। তোমার তো নজর রাখার কাজ। আর তুমি গান চালিয়ে মাথা নাড়াচ্ছ?’
অজিত হাসল, ‘আপনি ফালতু টেনশন নিচ্ছেন স্যার। কিচ্ছু হবে না। না হয় ছাই উড়ল। গ্রামে ছড়াল। গ্রামের লোকদের একটু অসুবিধে হল। তাই বলে আমরা ভয় পাব কেন?’
‘তর্ক কোরো না।’ কিগান চোয়াল শক্ত করল।
‘রিপোর্ট করবেন তো?’ অজিতের গলায় ধার, ‘করুন রিপোর্ট। আমিও ইউনিয়নে বলব।’
‘ইউনিয়নের ভয় দেখিয়ো না। তুমি কাজে অবহেলা করবে আর ইউনিয়ন দেখাবে?’
অজিত হাসল, ‘আপনি স্যার ফালতু ক্যাচাল করছেন। ব্যাগ ফেটেছে, পালটে দিচ্ছি। ফালতু মটকা গরম করছেন কেন? আর যখন সময় হবে তখন ইউনিয়ন কেন অনেক কিছুই দেখাব। যা আপনি দেখেননি।’
কিগান চোয়াল শক্ত করে তাকাল অজিতের দিকে। ছেলেটা বেঁটে, মোটা। মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল। কিগানের ছ’ফুট দুই চেহারার সামনে লিলিপুট। ও যদি কলেজ জীবনের কিগান হত তা হলে এখনই অজিতকে তুলে দূরে এই ওয়েস্ট বিন-এ গুঁজে দেওয়া ওর কাছে দশ সেকেন্ডের ব্যাপার হত। কিন্তু এ-কিগান সেই কিগান নয়। এ-কিগানের বয়স হচ্ছে। প্রেশারের সমস্যা আছে। হাঁটুতে চোট আছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল সেই দামাল কিগানটাকে খুব দক্ষ হাতে মেরে ফেলা হয়েছে এগারো বছর আগে।
না, সম্পূর্ণ মেরে ফেলা নয়। একজনকে দেখে নিজের অজান্তেই বেঁচে উঠেছিল কিগান। আবার হাসতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও গন্ডগোল হয়ে গেল। আর সেই গন্ডগোলটা এমনভাবে হল যাতে ও ছিটকে পড়ল এত দূরে। আজ কিগানের সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র হারিয়ে গেছে। আজ কিগান সম্পূর্ণ প্রতিরোধহীন। প্রতিক্রিয়াহীন। কিগান বেঁচে আছে বেঁচে থাকতে হয় বলে।
কিগান অজিতের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘এসব কেন বলছ? কাজ করতে বলেছি, করবে। আর যদি কিছু দেখাতে চাও, দেখিয়ো। কেমন?’
অজিত, কিগানের শান্ত গলা শুনেই বোধহয় থমকাল একটু। তারপর ঠোঁট চেটে হেঁ হেঁ করে বলল, ‘না, না, স্যার তা নয়…’
‘গ্রামের লোকজন যদি ফ্লাই অ্যাশ কেন উড়ছে বলে এবার তেড়ে আসে আমি তোমায় এগিয়ে দেব। কেমন! তখন ইউনিয়নে বোলো।’ কিগান অজিতকে কথা শেষ না করতে দিয়ে হাঁটা দিল অন্যদিকে।
ফ্যাক্টরির এদিকটায় অন্ধকার। পিছনের দিক বলেই। বাউন্ডারির ওয়ালের গায়ে একটা বড় ক্র্যাকও দেখা দিয়েছে। কিগান মেনটেনেন্সে খবর দিয়েছিল। এখনও যে কাজ হয়নি বুঝতে পারছে। তবু ক্র্যাকটা কতটা বেড়েছে তা দেখে নেওয়ার জন্য কিগান এগিয়ে গেল।
দেওয়ালটা স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে, মাথায় কাঁটাতারের ফেনসিং। দূরে লাগানো আলোয় আবছাভাবে ফাটলটা দেখা যাচ্ছে। হাত দিল কিগান। একটু বেড়েছে। গত মাসে দেওয়ালের আর-এক দিকে একটা বড় গর্ত হয়ে গিয়েছিল। পাম্প হাউস থেকে দুটো মোটর চুরি যায়। মেনটেনেন্স আর গুরুং চিঠি খেয়েছিল সেজন্য। চিঠি মানে শো-কজ। গুরুং-এর দোষ ছিল না। তবে ওর একটা ছেলে সে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আসলে মেনটেনেন্সের শশীবাবু খুব গেঁতো। চব্বিশ মাসে বছর। করছি করব করে কাটিয়ে দেয় সময়। এই যে, দেওয়ালটা ফেটেছে সেটার দিকে নজরই দিচ্ছে না। একটা কেলেঙ্কারি যখন হবে তখন লেজ ঘাড়ে করে দৌড়োবে।
কিগান ভাবল, কাল সকালেই একবার শশীবাবুকে ঝাড় দিতে হবে। লোকটার নিজের ভালর জন্যই।
ক্যামেরার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আবার ফ্যাক্টরির দিকে গেল কিগান। আর ঠিক তখনই দেখল সিকিউরিটির একটা ছেলে দৌড়ে আসছে ওর দিকে।
‘কী হল?’ কিগান জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘স্যার, বড়সাহেব আর জিএম সাহেব এসেছেন। আপনাকে ডাকছেন। আপনি চলুন।’
‘স্যার!’ কিগান অবাক হল। এই দীপাবলির রাতে স্যার এসেছে? অবাক তো! কেন? অবশ্য ও জানে না প্রতি বছরই আসে কিনা। হয়তো কাজ আছে। কিগান জানে বস ফ্যাক্টরিতে এলে কোথায় বসে। ও সেই দিকে হাঁটা দিল।
গৌর রওশন দিওয়ানের তিরিশ লাখি সিলভার রঙের লম্বা গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে মূল অফিস বিল্ডিং-এর বাইরে। বয়স্ক ড্রাইভারটি বাইরে দাঁড়িয়ে টুপিটা খুলে ঝাড়ছে। লোকটি ভাল। কম কথা বলে, কিগানকে দেখে হাসল। কিগানও হেসে দুটো সিঁড়ি করে লাফিয়ে উঠে গেল ওপরে।
কনফারেন্স রুমের পাশে গৌরের প্রাইভেট চেম্বার। দরজার কাছে গৌরের সর্বক্ষণের সঙ্গী বেয়ারাটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও কিগানকে দেখে হেসে ছোট্ট কলিংবেলটা টিপল। চল্লিশ সেকেন্ড পরে দরজাটা খুলে দিল গৌর নিজে।
আজ সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে অন্যরকম লাগছে মানুষটাকে। গলায় দড়ির মতো মোটা সোনার চেনটা চকচক করছে।
গৌর হাসল কিগানকে দেখে। চওড়া প্রাণখোলা হাসি, ‘আরে কিগান, তু কাঁহা থা ইয়ার? কব সে তুঝে খোঁজ রাহা থা। আর এ কী? দিওয়ালিতেও এমন সাদা-মাঠা ড্রেস পরে আছিস? তু বহত ভেজ হ্যায়। চল অন্দর আ।’
গৌরের কথাবার্তার ধরনটাই এমন। খুব মাই ডিয়ার টাইপ। তাই ‘তুই’ করে বললেও কেউ কিছু মনে করে না।
ঘরে ঢুকে দেখল স্যামও রয়েছে। স্যামুয়েল কুটিনহো এমনি হাসিখুশি। কিন্তু আজ স্যামের মুখ গম্ভীর। হাসিখুশি মানুষটা এমন হয়ে আছে কেন?
কিগান ওদের সামনের সোফায় বসল। টেবিলে খুব দামি স্কচ আর মাংসের দু’-তিন রকমের প্রিপারেশন রাখা।
‘বৈঠা কিউ হ্যাঁয়? এক ড্রিঙ্ক বনা আপনে লিয়ে।’ গৌর সামনে সোফায় শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে বলল।
‘নো স্যার,’ কিগান হাসল, ‘অ্যালকোহল সহ্য হয় না।’
‘তাই!’ গৌর হাসল, ‘আচ্ছা তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। এমন অদ্ভুত নাম কেন তোর? ক্যায়া মতলব হ্যায় ইসকা?’
কিগান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছোট থেকে এক উত্তর বারবার দিতে হয়েছে ওকে। ও বলল, ‘স্যার কিগান মানে লিট্ল অ্যান্ড ফিয়ারি, অর্ক মানে সূর্য, সান।’
‘লেকিন অ্যায়সা মিক্সড নাম কিউ হ্যায় তেরা?’ গৌর যেন আজ গল্পের মুডে রয়েছে।
কিগান বলল, ‘মা রেখেছিল। মা, আইরিশ ছিল। কিয়েরা ফেরেল।’
‘ছিল মানে?’ গৌর আজ একটু বেশি পার্সোনাল হচ্ছে যেন।
‘আই ওয়াজ ফোর, হোয়েন দে বোথ ডায়েড।’ কিগান শান্ত গলায় বলল। আজ নিজের বলা কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ও দেখতে পেল সার সার ধূসর পায়রা। পার্পল ছাতা সরিয়ে উঁকি দেওয়া মায়ের মুখ।
‘সরি। এক্সট্রিমলি সরি।’ গ্লাসটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল গৌর। তারপর হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘রহনে দে উও সব। তারপর বল এই জায়গা কেমন লাগছে?’
‘ভাল। কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট।’
‘তুই তো নিজেই জোর করে এলি।’ গৌর হঠাৎ উঠে এসে কিগানের পাশে বসল। গ্লাসটা আবার তুলে নিল টেবিল থেকে। গোল গোল করে ঘুরিয়ে সরষের তেলের মতো তরলটাকে নাড়াল। তাতে ভাসমান দু’খণ্ড বরফের কিউব পরস্পর ধাক্কা খেল। ঠুংঠাং শব্দ করল। গৌর সেই দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তো, রাঘববাবুর সঙ্গে কথা হল? শুনলাম তো যে, দুর্গাপুজোয় ইউ ওয়্যার ইনভাইটেড।’
অবাক হল কিগান। লোকটা এও জানে? কে খবর দেয় এত?
গৌর হাসল, ‘আরে আমি সব খবর রাখি। তার ওপর তোকে টম ক্রুজের মতো দেখতে, তোর খবর তো হাওয়ার আগে ছুটবে।’
‘হ্যাঁ স্যার, গেছিলাম।’ কিগান কথাটা বাড়তে না দিয়ে ছোট করে বলল।
‘তো? ল্যান্ড নিয়ে কথা হল?’ গৌর সটান তাকাল কিগানের দিকে।
‘স্যার?’ কিগান চমকে গেল একটু।
‘ল্যান্ড, জমি। কথা হল এ নিয়ে?’ গৌর এবার স্থির। গলাটাও আর অত বন্ধুত্বপূর্ণ নেই।
‘কোন ল্যান্ড স্যার?’ কিগান অবাক হল।
গৌর ভুরু কুঁচকে স্যামের দিকে তাকাল, ‘স্যাম আপনে বোলা নেহি ইসকো?’
স্যাম থতমত খেল। বলল, ‘না স্যার, মানে…’
‘হাউ ক্যালাস অফ ইউ।’ গৌর দাঁতে দাঁত ঘষল, ‘ইয়ার, আপ লোক মেরে গান্ডকে পিছে কিউ লগে হো? আর আমারও মাথায় লোক আছে। প্রেসিডেন্ট আমায় ভাল করে বাম্বু দেবে। জুস ফ্যাক্টরির সঙ্গে মিনারেল ওয়াটারের কাজটাও চালু করা দরকার, দ্যাট রাঘব চক্রবর্তী, জমিটা বিক্রি করেও ওই একটা ভাইটাল পিস কেন আটকে রেখেছে বুঝতে পারছি না। আরে বাবা, ফালতু সেন্টিমেন্ট দিয়ে কি জীবন চলে? তা ছাড়া আমি বলেছিলাম, আপনি যা টাকা নেবেন আমরা দেব। আর তাতেই বুড়োর ইগোতে লাগল। বলে আমরা নাকি টাকার গরম দেখাচ্ছি! শালা, ইগোইস্ট! ওই সামান্য কথায় জমিটা আটকে দিয়েছে! তু মুঝে বতা কিগান, মিনারেল ওয়াটার কে লিয়ে ও জমিন তো চাহিয়ে না? নেহি তো ক্যায়সে চলেগা? আর তোকে ব্যাপারটা নিয়ে রাঘববাবুকে বোঝাতে হবে। আমরা অফিশিয়ালি ওঁকে কনভিন্স করতে পারছি না, তু জরা পার্সোনালি দেখ। কাম হোনা চাহিয়ে।’
ওদের পার্টিক্ল বোর্ডের পাশেই মার্চেন্ট মাল্টিপল্স একটা বড় জমি কিনেছে টেট্রাপ্যাকে গ্রেপ আর অরেঞ্জ জুস তৈরি করবে বলে। তার সঙ্গে মিনারেল ওয়াটারও তৈরি করতে চায় ওরা। কিন্তু তার জন্য জমি আর দিচ্ছে না রাঘব চক্রবর্তী। কেন? না ওই জমিটা নাকি স্পেশ্যাল। আর গৌর নাকি অসভ্যের মতো টাকা দেখিয়ে কথা বলেছে রাঘবকে। তাই রাঘব চক্রবর্তী বলেছেন যে, জমিটা বিক্রির জন্য নয়। কিন্তু গৌর কি আর সেসব বুঝবে? ওর তো ব্যাবসা হলেই হয়। এর সবটাই জানে কিগান। কিন্তু তবু গৌরের মুখ থেকে না শুনে নিজে কিছু বলতে চায়নি।
কিগান পুজোর দিন গিয়েছিল বটে ওখানে। রাঘববাবু নিজে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু অমন ভিড়ে কথা হয়নি ঠিক। সামান্য কুশল বিনিময় হয়েছিল মাত্র। আর কিগানের মূল আকর্ষণ ছিল অর্কিড। একটা বড় গ্লাস হাউস করেছে রাঘববাবুরা। সেখানে প্রচুর অর্কিড রাখা। তার ছবি তোলাতেই মূল নজর ছিল। আর সেখানেই হঠাৎ রাঘববাবুদেরই একটা গোরু ঢুকে পড়ে। সেটা বের করতে গিয়ে হাতে সামান্য ব্যথাও পেয়েছিল কিগান। অবশ্য তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাধুদা আর রাহি এসে পড়েছিল।
আচ্ছা, রাঘব চক্রবর্তীর সঙ্গে কি এসব নিয়ে কথা বলতে পারে কিগান? ও তো প্রোডাকশনের দায়িত্বে আছে। পাবলিক রিলেশনের লোকজন এসব সামলাক না। আদিকে বলছে না কেন গৌর?
গৌর একটা চিকেন উইং তুলে কিগানকে বলল, ‘তু তো হিরো হ্যায়। জান পহেচান বড়াহ। তারপর কনভিন্স কর। ফর দ্যাট ল্যান্ড আমি ভাল প্রাইস দেব। টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।’
‘টাকা!’ কিগান বলল, ‘রাঘব চক্রবর্তী তেমন লোক নয়।’
‘দুর,’ গৌর হো হো করে হাসল, ‘কেউই তেমন থাকে না। তাদের তেমন করে নিতে হয়। এভরি ওয়ান ইন দিস ফাকিং ওয়ার্ল্ড ইজ সেলেবল। শুধু প্রাইস ঠিক করতে হয়। জাস্ট নো রাঘব চক্রবর্তীজ প্রাইস। কেমন?’
কিগান ভাবল, ব্যাপারটা যদি তেমন সহজ হত, তবে গৌর কেন পারল না? কেন গৌরের টাকার সঙ্গে গৌরকেও দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন রাঘববাবু? এইসব টাকাপয়সা কোথাও কোথাও ভোঁতা হয়ে যায়। হঠাৎ স্যামের ফোনটা বেজে উঠল। স্যাম পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে নামটা দেখে বিরক্ত হল যেন। বলল, ‘ওঃ, আজকেও পিছু ছাড়বে না।’ তারপর ফোনটা কেটে, একদম সুইচ অফ করে দিল।
গৌর হাসল, ‘কৌন থা স্যাম? গার্ল ফ্রেন্ড?’
‘না স্যার,’ স্যামও হাসল, ‘নট দ্যাট লাকি। ওই প্রোজেকশন কর্পের মেয়েটা।’
‘আরে, মেয়ে? অর, আপনে ডিসকানেক্ট কর দিয়া?’ গৌর চুকচুক শব্দ করে মাথা নাড়ল, ‘আপ পাগল হো?’
স্যাম বলল, ‘স্যার ওই জুস ফ্যাক্টরির প্রজেক্টটা নিয়ে মাথা খাচ্ছে। জাস্ট স্পেসিফিকেশন দিয়েছি সবে, তাতেও দিনে চল্লিশবার ফোন আসছে।’
‘কৌন সা কোম্পানি? কে এমন করছে?’ গৌর আর-একটা বড় ড্রিঙ্ক বানাল।
স্যাম বিরক্ত মুখে নিজের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ‘প্রোজেকশন কর্পের একটা মেয়ে। ওদের ছ’জনকে তো ওয়াটার বার্ড তুলে নিয়েছে। ফলে মেয়েটা সেল্স টিমে নতুন। মাথা খেয়ে নিচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে।’
‘আপ তো লাকি হো।’ গৌর হালকা গলায় কথাটা বলে কিগানের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।
‘না স্যার,’ স্যামের মুখে বিরক্তি, ‘কিছুই এখনও হয়নি, আর মাথা খাচ্ছে! ওই জমিটা যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ তো আর কাজ শুরু করা যাবে না। কে ঝামেলা হ্যান্ডেল করবে?’
‘তা মেয়েটার নাম কী? হ্যাভ ইউ মেট হার?’
‘কলকাতায় একবার মিট করেছি। ম্যারেড। বাট কোয়ায়েট চার্মিং, আই মাস্ট সে।’ স্যাম এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করল, বলল, ‘লাস্ট টেন ইয়ার্স শি ওয়াজ আউট অব ইন্ডিয়া।’
‘তাই? ইন্টারেস্টিং।’ গৌর হাসল, ‘নাম কী?’
‘নাম?’ এক মুহূর্ত ভাবল স্যাম। তারপর বলল, ‘আ লিট্ল আনইউজুয়াল। ইয়েস, বোস, জিয়ানা বোস।’
আলতো একটা কুয়াশার পরদা উড়ল কোথাও? ভোরের কলকাতা থেকে কে যেন লঘু পায়ে হেঁটে এল এত বছর পর। এত বছর পর একটা রোদ এসে পড়ল ক্লাস ঘরে। কে যেন গেয়ে উঠল, ‘আমি কান পেতে রই…’
কিগান বুঝল, এই নীল রঙের গ্রহটা বড্ড বেশি গোল আর বড্ড ছোট। এখানে বারবার যার সঙ্গে দেখা হওয়ার নয়, তার সামনেই পড়তে হয়। যে কথা শুনতে ইচ্ছে করে না, সে কথাই শুনতে হয়। যে স্মৃতি ভুলতে চায় তাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মাথায়। কিগান বুঝল, ও কলকাতা আর অতীত ছেড়ে আসতে চাইলেও তারা ছাড়ছে না কিগানকে।
কিগান মাথা নিচু করল। ভাবল, জিয়ানা কি তবে এই চাপাডাঙাতেও আসবে? আবার কি এই কিগানের দেখা হবে সেই কলেজবেলার কিগানের সঙ্গে?
Chapter - 7
৭
মোবাইল ফোনটা নতুন অফিস থেকে দিয়েছে। কিন্তু খুব একটা দামি নয়। বরং একদম সাধারণ। ছোট রঙিন স্ক্রিন। তাতে ছানাকাটা ছবি আসে। তবু মোবাইল তো! প্রোজেকশন কর্প-এ ওকে সুখেনদাই ঢুকিয়েছেন। আর বলেছেন, ‘আমি দেখি তুই ক’টা চাকরি পালটাতে পারিস। মাইরি রুহান, খেলাটা তো গেছেই, মানুষ হিসেবেও এমন ক্যালাস কেন তুই?’
প্রোজেকশন কর্প-এ সুপারভাইজার পদে ঢুকেছে রুহান। কিন্তু আসলে টুকটাক কাজ ওকে দেওয়া হয়। জব সাইটে মাল পৌঁছে দেওয়া, লেবার পেমেন্টের টাকা নিয়ে যাওয়া, বাজার থেকে খুচখাচ ফিটিং কেনা ইত্যাদি মিসলেনিয়াস কাজ করে ও। মাসে চার হাজার টাকা প্লাস টিএ। কনট্রাক্ট-এ রাখা হয়েছে ওকে। অন্যান্য বেনিফিট নেই।
তবে বেনিফিট টিট নিয়ে কখনওই চিন্তা করে না রুহান। সুখেনদার কল্যাণে চাকরি যে পেয়েছে, এই অনেক। না হলে ওর যোগ্যতায় কি আর এসব হত নাকি? আগের চাকরিটা যেদিন গেল সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে যা হেনস্থা হয়েছিল ও!
মা। মনে পড়লেই ভয় লাগে রুহানের। দিনকে দিন মা যেন আর সহ্যই করতে পারছে না রুহানকে। রুহান সামনে আসলেই যেন মায়ের প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। চাকরি গেল যেদিন সেদিন তো রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল রুহান। ভেবেছিল ডাক্তার টাক্তার ডাকতে হবে বোধহয়।
দু’টি মাসের মাইনের খাম হাতে নিয়ে বাড়িতে ফিরে প্রথমেই তোপের মুখে পড়েছিল রুহান। মা বসে ছিল ঘরে। মুখচোখ লাল। ও বুঝতে পারেনি কেন এমন করে রয়েছে মা। তাই জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ?’
‘তোর মতো জানোয়ার ছেলে থাকলে শরীর, মন সব খারাপ থাকে।’
‘কেন? আমি কী করলাম?’ রুহান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে।
‘জানোয়ার, খেয়ার বাপের বাড়ি গিয়েছিলি কেন তুই?’
‘কাকিমার বাপের বাড়ি? কে বলল তোমায়?’ রুহান অপ্রস্তুত হয়েছিল খুব।
‘ও, লুকিয়ে-চুরিয়ে আজকাল এসব করা হচ্ছে! খেয়ার মা ফোন করে বলছিল যে, তুই খুব ভাল। খাবার পৌঁছে দিয়েছিস। ভাল! হুঁঃ। ঘরের শত্রু বিভীষণ! কাকা-কাকিমা চাকরের মতো খাটাচ্ছে আর তুই খাটছিস। গোরু একটা। সারাজীবন এমন গোরু হয়ে থাকবি তুই? বাবাকে খেয়েছিস এবার আমায় খাবি?’
‘মা,’ রুহান চিৎকার করে উঠেছিল, ‘কী যা-তা বলছ? কেন তোমায় খাব?’
‘অ্যাঁ, আমার জন্য কী করেছিস তুই? কী করেছিস আমার জন্য?’ মা চিৎকার করছিল সমানে, ‘ও, তা করবি কেন? আমার জন্য করলে তো আর আমি ফোন করে তোর নামে অন্যের কাছে সুখ্যাতি করব না। মা তো আপদ, মরলেই হয়!’
‘কেন এমন বলছ মা?’ রুহানের ক্লান্ত লাগছিল, ‘তোমার জন্য কিছুই করিনি আমি?’
রুহানের মনে পড়ে যাচ্ছিল সব। নন্দার মুখটা ভেসে উঠছিল চোখের সামনে।
‘না, কিচ্ছু করিসনি। বরং আমার স্বামীকে খেয়েছিস।’ মা হাঁফাচ্ছিল রীতিমতো।
রুহান কী করবে, কী বলবে, বুঝতে পারছিল না। ও পকেট থেকে মাইনের খামটা বের করে মায়ের দিকে দিয়ে রাগটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, ‘মা, বাদ দাও। এটা রাখো। দু’মাসের টাকা।’
‘দু’মাসের? কেন?’ মা থমকে গিয়েছিল।
ভুল। আবার ভুল। রুহান যে সারাজীবনে কত ভুল করবে! কষ্ট হচ্ছিল নিজের নির্বুদ্ধিতায়। ভাবছিল, কী করতে গিয়ে কী বলে ফেলল।
মা বুঝে গিয়েছিল এক লহমায়। তারপর বলেছিল, ‘ও এই কাজটাও খুইয়েছিস? ইতর একটা! অকম্মার ঢেঁকি! লোকের হয়ে বিনি পয়সায় চাকরগিরি করতে পারো আর একটা ঢঙের চাকরি রাখতে পারো না। তোর জন্য কি এবার লোকের বাড়িতে ঝি-গিরি করব নাকি? ক্লাব থেকেও তো এক পয়সা আনিস না। অমন বাপের এমন অপদার্থ ছেলে হল কী করে?’
মা চিৎকার করতে করতে হঠাৎ টলে পড়ে গিয়েছিল বিছানায়। রুহান ভয় পেয়ে দৌড়ে গিয়েছিল মায়ের দিকে। মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। কোনও কথা বলছিল না। খাবার জলের গ্লাস থেকে হাতে জল নিয়ে মায়ের মুখে ঝাপটা মেরেছিল রুহান।
চোখ মেলে মা বলেছিল, ‘মরিনি এখনও। অত সহজে মরব না। দেখব তুই অধঃপাতের কোন চরম সীমায় যেতে পারিস।’
অধঃপতন! রুহান মাথা নিচু করেছিল। চুরির অপবাদে চাকরি যাওয়া। প্রেমিকাকে অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ছেড়ে আসা। খেলার টিম থেকে বাদ হয়ে যাওয়া। বাবার মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া। আর কোথায় পতিত হবে রুহান? আর কত দূর নামবে ও?
ভাগ্যিস সেপ্টেম্বর থেকেই এই প্রোজেকশন কর্প-এ সুখেনদা ঢুকিয়ে দিয়েছেন রুহানকে। না হলে কপালে যে কত ভোগান্তি ছিল! রুহান এই কাজটা আর হারাতে চায় না। কোম্পানিটা খুব ভাল। এক বছর ভাল কাজ করলে বলেছে পার্মানেন্ট করে নেবে। এবার চাকরি গেলে সুখেনদা আর কিছু করবেন না। মানে, রুহানের আর নিজের কিছু বলার মুখ থাকবে না। তাই কাজটা মন দিয়েই করছে। এই যেমন আজ রোববার, তবু দরকার বলে কাজে বেরিয়েছে।
প্রোজেকশন কর্প ত্রিপুরায় একটা বড় সোয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের অর্ডার পেয়েছে। সেখানে অনেকগুলো রিডাকশন গিয়ার লাগবে। এখন, রিডাকশন গিয়ারের মেক, অর্থাৎ কোন কোম্পানির রিডাকশন গিয়ার হবে তা বলে দেওয়া রয়েছে অর্ডারে। কিন্তু প্রোজেকশন কর্প খুব খারাপ দামে কাজটা নিয়েছিল, তাও দেড় বছর আগের রেটে। কিন্তু সব কিছুরই তো দাম বেড়ে গিয়েছে। ফলে লস নির্ঘাত হবে।
ঠনঠনিয়ায় কিছু দোকান আছে যেখানে ব্র্যান্ডেড কোম্পানির নামে ডুপ্লিকেট জিনিস বিক্রি হয়। প্রোজেকশন কর্প তেমন একজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে মাল নেবে ঠিক করেছে।
আজ রোববার, দোকান বন্ধ, কিন্তু তবু দোকানের লোকটি তার ম্যানেজারকে পাঠাচ্ছে কিছু ক্যাশ নেবে বলে।
নিজের ঘড়িটা বেশ কিছুদিন হল নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এখন আর ঘড়ি টড়ি পরে না রুহান। তা ছাড়া মোবাইল তো সময় বলেই দেয়। মোবাইলেই সময় দেখল ও। দেড়টা বাজে এখন। এবার এখান থেকে কাজ সেরে দেশপ্রিয় পার্কে যেতে হবে। একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আছে। ওই টোয়েন্টি-টোয়েন্টি ধাঁচের। খেললে দু’হাজার টাকা পাওয়া যাবে। একটা মারোয়াড়ি কোম্পানি আয়োজন করেছে টুর্নামেন্টটার। ষোলোটা টিম খেলবে। চ্যাম্পিয়ন হলে পাঁচ লক্ষ টাকা পাবে টিম। তবে টিম মানে নানা ছোটখাটো ক্লাব টিম। তারা বেশির ভাগই কলকাতার এ-ডিভিশন ক্লাবগুলো থেকে প্লেয়ার তুলে আনে। আর টাকার জন্য প্লেয়ারও খেপ খেলে দেয়।
রুহান এসব খেপটেপ খেলত না একদম। ওর মনে হত, ফাস্ট বোলারদের জীবন এমনিতেই প্রচুর চোট-আঘাতের হয়। তার ওপর যদি কেউ বেশি চাপ দেয়, তা হলে খেলোয়াড় জীবন অনেক ছোট হয়ে যাবে। তাই যে যতই টাকার প্রলোভন দেখাক, স্টার ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর রুহান আর এই ছোটখাটো ঘুঘনি-পাউরুটির খেলায় ঢোকেনি।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। তিরিশ বছর বয়স হয়ে গেছে ওর। বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নরা ধরাশায়ী হয়েছে একে-একে। এখন শুধু ভয়, স্টার যদি বাতিল করে দেয় ওকে! যদি বলে দেয়, ভাই এবার এসো। তবে? তবে কী হবে? কোথায় যাবে ও এই বয়সে?
তাই ফসল তুলে নিতে হবে। যেখানে যতটা রোজগার করা যায়, সবটা করে ফেলতে হবে। তবু বহু বছরের অভ্যেস, তাই হালকা দ্বিধা ছিল। কারণ, জগুদা।
জগুদা শুধু স্টার ইউনিয়নে ওকে আনেনি। বরং হাতে ধরে বল করা শিখিয়েছে। বুঝিয়েছে, ফাস্ট বোলিং মানে গায়ের জোর দেখানোই নয় শুধু। এ আরও বেশি কিছু। আরও জীবন্ত কিছু। অতটা দৌড়ে এসে যে অমন জোরে বলটা ছুড়ছে, সে তো শুধু আর নিজের শক্তির পরীক্ষা দিচ্ছে না। সে জীবনীশক্তি আর মস্তিষ্কশক্তিরও পরীক্ষা দিচ্ছে।
জগুদাই প্রথম বুঝিয়েছিল যে, ফাস্ট বল করা মানেই সব বলকে জোরে করতে হবে, এমন নয়। বরং ভাল বোলার সবসময় গায়ের জোরের চেয়ে বুদ্ধিকে প্রাধান্য দেবে। তখন জগুদা একদম চোখে চোখে রাখত রুহানকে। পান থেকে চুন খসলে বকে শেষ করে দিত।
এমনই এক সময় নৈহাটির একটা টিম কলকাতায় এসে রুহানকে ওদের হয়ে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে বলে। বলে, দশ হাজার টাকা দেবে। সে টিম জিতুক বা হারুক, যাই হোক না কেন। রুহানের আনন্দ হয়েছিল খুব। তা ছাড়া সংসারে টাকাটাও দরকার ছিল। তবে লুকিয়ে-চুরিয়ে নয়। ও ভেবেছিল জগুদাকে বলেই যাবে। জগুদার তো না বলার কারণই নেই।
কিন্তু জগুদা রেগে গিয়েছিল ভীষণ। রুহান যখন কথাটা বলেছিল জগুদার হাতে একটা স্টাম্প ছিল। রুহানের কথাটা শুনে জগুদা প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘না, না, একদম নয়। খবরদার ওই পথ মাড়াবি না।’
‘কেন জগুদা?’ রুহান অবাক হয়েছিল।
‘কেন মানে? আমি বলছি বলে।’ জগুদা বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
‘কেন বলছ?’ রুহানের মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। বয়সে যারা বড় হয় তারা মাঝে মাঝে এমনভাবে কথা বলে যেন মাথা কিনে নিয়েছে। সম্মান করা হয় বলে কি যা ইচ্ছে তাই বলবে নাকি!
‘বলছি যখন শুনতে আপত্তি কোথায় তোর?’ জগুদার চোখ দুটো যেন জ্বলছিল।
‘কেন বলবে তো? জানো, ওরা টাকা দেবে? দশ হাজার টাকা।’
‘টাকা?’ নাক কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়েছিল জগুদা, ‘তো? টাকা দেবে তো কী হয়েছে? মাথা কিনেছে নাকি?’
‘আমার টাকাটা দরকার জগুদা। খুব দরকার।’
‘দশ হাজার টাকার জন্য ভবিষ্যতের দশ লাখ বাদ দিবি?’
‘মানে?’ রুহান অবাক হয়েছিল।
‘গাধা তুই? আস্ত গাধা নাকি? স্টার থেকে এবার তোর বেঙ্গলে চান্স হতে পারে। আর সে এমন ভিখিরিগিরি করার জন্য খেপ খেলে বেড়াবে? লজ্জা লাগছে না?’ বিরক্তিতে হাতের স্টাম্পটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল জগুদা।
‘কিন্তু টাকাটা যে এখন ইম্পর্ট্যান্ট।’ রুহান আর কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘ইম্পর্ট্যান্ট। হ্যাঁ, ইম্পর্ট্যান্ট। জানি। কিন্তু শুধু টাকাটাই চিনবি? আর কিছু ভাববি না? এদেশে মানুষ মেরেও হাজার হাজার টাকা রোজগার করা যায়। লোক ঠকিয়ে রোজগার করা যায়। ইম্পর্ট্যান্ট বলে তাই এগুলোও করবি? নাথিং ইজ ইম্পর্ট্যান্ট আনলেস উই মেক ইট সো। আরে টাকাটাই শুধু দেখিস? ডিগনিটি কিছু নয়? ফাস্ট বোলারের শরীরটাই সব। বাজে জায়গায় খেলে এই শরীরটার ক্ষমতা কমাবি কেন? জানিস, এইসব খেপ খেলার মাঠ কেমন হয়? তারপর কত ম্যাচ খেলতে হয়? ফালতু চোট হয়ে গেলে কী করবি? শুধু টাকা আর টাকা। লোভ। এত লোভ কেন তোদের?’
জগুদার উত্তেজিত চেহারা আর চিৎকারে আশপাশে লোক জমে গিয়েছিল। অন্যান্য যারা প্র্যাকটিস করছিল তারা নেট ছেড়ে চলে এসেছিল। দু’-চারজন কর্মকর্তা আশপাশের আড্ডা ছেড়ে উঠে এসেছিল। আর সব্বাই অদ্ভুত এক চোখে দেখছিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রুহানকে।
রুহান, উত্তেজিত জগুদার সামনে থেকে সরতেও পারছিল না। আবার সবার অমন, ‘এই ব্যাটা চোর’ ধরনের দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও খারাপ লাগছিল। আসলে কষ্ট হচ্ছিল রুহানের। মনখারাপ হচ্ছিল। ও কী এমন কথা বলেছে যে, জগুদা এমন রাগ করল? ও তো ইচ্ছে করলে না বলেও খেলতে যেতে পারত। জগুদা জানতে পারত? সততা দেখাতে গিয়ে এ কেমন ঝঞ্ঝাট হল রে ভাই!
জগুদার রাগও যেন কমছিল না। এক নাগাড়ে বলেই যাচ্ছিল যা খুশি কথা। রুহান মাথা নিচু করেছিল শুধু। শেষে জগুদা বলেছিল, ‘আমি যদি শুনি তুই খেলতে গেছিস, তা হলে তোর একদিন কি আমার একদিন। যেমন রাস্তায় ছিলি তেমনই রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেব তোকে।’
জগুদার রুদ্রমূর্তি আর শেষের কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল রুহান। ও রাস্তায় পড়ে ছিল? রাস্তা থেকে ওকে কুড়িয়ে এনেছে? জগুদা এমনটা বলতে পারল!
বাড়ি ফেরার পথে খুব কান্না পেয়েছিল রুহানের। সবার সামনে জগুদা এমন বলতে পারল! মনে হয়েছিল আর মাঠে যাবে না কোনওদিন। কী হবে মাঠে গিয়ে? ও ছোট, সামান্য প্লেয়ার তাই কি ওকে অসম্মান করা, খারাপ কথা বলা সহজ? আর রাস্তার ছেলে তো ও নয়। বাবা যদি অমনভাবে মারা না যেত ও কি আর এই অবস্থায় থাকত? দিব্যি তো রেজাল্ট ভাল হচ্ছিল ক্রমশ। বাবা যে হঠাৎ কেন মারা গেল?
বাড়িতে ফিরে যথারীতি মায়ের গঞ্জনা শুনে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না। তা ছাড়া বন্ধুবান্ধবও তো কেউ নেই রুহানের। আর যে ছিল, সেই কিগান থাকত নর্থে। সুকিয়া স্ট্রিটে।
আচমকা মায়ের ডাক শুনতে পেয়েছিল ও। মুখ ঘুরিয়ে দেখেছিল ছাদের দরজার কাছে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে জগুদা!
জগুদা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে আর মা আবার নেমে গিয়েছিল নীচে।
রুহান যতই রেগে থাকুক বা ওর যতই মনখারাপ হোক কোনওদিনই কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। জগুদাই বলে যে, ওর ফাস্ট বোলার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল এই নরম স্বভাব। পৃথিবীর অধিকাংশ ফাস্ট বোলাররা অ্যাগ্রেসিভ হয়।
রুহান তর্ক করত, বলত, ‘কোর্টনি ওয়াল্শ? তিনি তো অমন নন।’
‘আরে পাগলা,’ জগুদা হাসত খুব, ‘একসেপশন এগজ্যাম্পেল হতে পারে নাকি?’
সেই জগুদা এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল রুহানের। দূরে বজবজ লাইন ও তার সবুজ-হলুদ ট্রেনের দিকে তাকিয়ে জগুদা হাতে ধরা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট ছাদের পাঁচিলের ওপর রেখে বলেছিল, ‘পেঁয়াজি আছে। বুধনের পেঁয়াজি। যদিও এসব খাওয়া আমার ছেলেদের আমি এনডর্স করি না। তাও, আজ খা।’
রুহান কিছু না বলে দূরে তাকিয়েছিল।
জগুদা বলেছিল, ‘কী রে খুব রেগে আছিস? নে, খা তো।’
গোল ঘুঁটের মতো দেখতে পেঁয়াজি হাতে নিয়েছিল রুহান।
জগুদা সামনে দিয়ে যাওয়া ট্রেনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘লোকাল ট্রেনের সঙ্গে দূরপাল্লার মেল ট্রেনের পার্থক্য কী জানিস?’
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল রুহান। ও বুঝেছিল উত্তরটা জগুদাই দেবে।
‘শোন,’ জগুদা শুরু করেছিল, ‘মেল ট্রেন লোকাল ট্রেনের মতো সব স্টেশনে দাঁড়ায় না। সে অধিকাংশ স্টেশন টপকে গন্তব্যের দিকে দৌড়োয়। সে খেয়াল করে না, কার কী মনে হয়। জীবনে দূরে যেতে হলে বারবার থামলে হয় না। লোকাল ট্রেন হয়ে থাকলে, ইন্ডিয়া কাপ আসবে?’
চোখে জল এসে গিয়েছিল রুহানের। ও তাড়াতাড়ি বলেছিল, ‘ওঃ, লঙ্কা এত ঝাল যে, চোখে জল চলে এল।’
জগুদা হেসে বলেছিল, ‘লঙ্কা? আমি বারণ করেছিলাম, তাই দেয়নি। কান্না খারাপ নয়, তবে না আসতে দেওয়াই ভাল। ক্যাকটাসের জলের দরকার হয় না। যত রগড়ানি খাবি, বলের বিষ তত বাড়বে। বুঝেছিস?’
এতগুলো বছর তো বুঝেইছিল রুহান। কিন্তু তাতে হলটা কী? সত্যি কী হল? সব যেন কেমন গুলিয়ে ঘেঁটে গেছে রুহানের। নন্দা, মা, খেলা। সব কিছুতেই এত মার খাচ্ছে যে, কী বলবে? আর কিছু বলতে ইচ্ছে করে না ওর। ভাবতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু জীবন এমন হয়ে গেছে যে, ভাবতেই হয়।
গত দু’দিন আগে হঠাৎ আবেশ এসেছিল বাড়িতে। একদম আচমকা এসেছিল। অবশ্য ও এমনভাবেই আসে। আবার হঠাৎ হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। এমন ছেলে কোনওদিন দেখেনি রুহান। পয়সার জন্য যেন সব করতে পারে আবেশ।
বহু দিন পর আবেশকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল রুহান। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী রে তুই? এতদিন পর? ছিলি কোথায়?’
আবেশ হেসেছিল, ‘দরজায় দাঁড়িয়েই তিনটে প্রশ্নের উত্তর শুনবি?’
‘আয়, আয়।’ রুহান ডেকে নিয়ে গিয়ে আবেশকে নিজের ঘরে বসিয়েছিল।
আবেশ চোখ ঘুরিয়ে ঘরটা দেখছিল ভাল করে। লাল মেঝে। তবে মাঝে মাঝে খোশটা উঠে গেছে। দেওয়ালটার চুনকামে এখন সেঁকা পাঁউরুটির মতো রং ধরেছে। তাতেও ভিভ রিচার্ডস আর ম্যালকম মার্শালের প্রায় জ্বলে যাওয়া পোস্টার। সেগুন কাঠের খাট। যদিও কালো হয়ে গিয়েছে। একটা গদার মতো দেখতে পাখা আর টেবিল চেয়ার। আর টেবিলের তলায় ক্রিকেটের কিট। এইসব সামান্য তুচ্ছ জিনিসপত্রগুলো খুব মন দিয়ে সময় নিয়ে দেখছিল আবেশ।
অবাক হওয়ার সঙ্গে বিরক্তিও লাগছিল রুহানের। ফাটা জামা পরা মানুষকে যদি কেউ খুঁটিয়ে দেখে তার কি বিরক্তি লাগবে না? ও বলেছিল, ‘কী রে শালা, অমন করে কী দেখছিস!’
আবেশ হিঃ হিঃ করে হেসেছিল খুব। বলেছিল, ‘দেখছিলাম যে, ধোনির বাড়ির সঙ্গে তোরটার কতটা মিল!’
‘মারব শালা লাথ,’ রুহান ঠোঁট কামড়ে বলেছিল, ‘তোর মাথা খারাপ?’
‘না রে, তোর খারাপ। ভালই তো খেলতিস! তা এমন ক্যালানে হয়ে গেলি কেন? আর ওই টুকটাক যে ম্যাজিক দেখাতিস, তা কি দেখাস? না সেটাও গেছে?’
রুহান মাথা নিচু করে নিয়েছিল। ম্যাজিক দেখাত বটে রুহান। কিন্তু সে তো সামান্য শখ। আবেশের মনে আছে সেটা!
আবেশ হেসে ওর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলেছিল, ‘তোদের ওই জগু মাস্টার শালা হেভি খিটকেল, তোর পেছনে দিয়ে নিজে লোকাল টুর্নামেন্টে টাকা প্যাঁদাচ্ছে।’
‘মানে?’ সোজা হয়ে বসেছিল রুহান। আবেশ কী বলছে? অবশ্য আবেশ সবসময় এমন ভুলভাল কথাই বলে, ওর কথাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার কোনও মানে হয় না।
আবেশ আর রুহান সেই স্কুলজীবনের বন্ধু। একসঙ্গে সব ক্রিকেট খেলত ওরা। তখন আর একজন, ওদের চেয়ে সামান্য জুনিয়র, তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। আদিত্য। আদি। যদিও আদিকে অনেকদিন দেখে না ও। শুনেছে এখন ভাল চাকরি করে। ব্যস ওইটুকুই।
আর আদির সূত্রে ওদের সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে যেত রুহান। তখন কী করে যেন আদির জ্যাঠতুতো দাদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল। ক্রমশ সেটা বাড়তে বাড়তে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আর আদির সঙ্গে সেই শুরু হয় দূরত্ব। বা বলা যায়, আদি যেন নিজেই ক্রমশ সরিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। কেন, রুহান জানে না। তবে কিগানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা দারুণ ব্যাপার ছিল ওর কাছে। এখনও আছে। শুধু হঠাৎ কী যে হল মধ্যে থেকে!
আজও কিগানকে প্রথম দেখার দিনটা স্পষ্ট মনে আছে ওর।
শীতকাল ছিল সেটা। সকালবেলা আবেশ আর রুহান একরকম হামলা চালিয়েছিল আদিদের বাড়ি। বা আরও সঠিকভাবে বললে আদির ঠাকুরমার কাছে। আদির ঠাকুরমা ছিল অদ্ভুত মানুষ। যেমন সুন্দরী, তেমন পার্সোনালিটি। রান্নাবান্না, সেলাই, কথাবার্তা, সবেতেই দারুণ।
একদিন এই কথাটা এমন করেই বলেছিল রুহান। তাতে ঠাকুরমা বলেছিল, ‘এমন করে বলছিস যেন আবার আমার বিয়ের সম্বন্ধ করতে যাচ্ছিস। এই এত কিছু যা বলছিস সেই পারাগুলো বেঁচে থাকার মধ্যেই পড়ে। তার বেশি কিছু নয়, বুঝলি?’
না, ঠিক বোঝেনি রুহান। ও এমন কথাবার্তা কোনওদিনই ঠিক বোঝে না। মানুষ মাঝে মাঝে বাংলা ভাষাতে কথা বললেও ঠিক বাংলা মানেতে বলে না। কিন্তু রুহান একটা জিনিস বোঝে, যাতে নিজের ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না, তা মেনে নিতে কোনও সমস্যা তৈরি করতে নেই।
আবেশ আর ওর সেই সময় রোববারগুলোর টার্গেট থাকত আদির বাড়িতে গিয়ে ওর ঠাকুরমার হাতের ঘিয়ে ভাজা লুচি আর কালোজিরে দিয়ে আলুর সাদা তরকারি খাওয়া। প্রথম দিন যেদিন গিয়েছিল সেদিনই খেয়েছিল। তার পরে আরও চারদিন খেয়েছিল। এর দু’সপ্তাহ পরে আবেশের প্ররোচনায় আবার হানা দিয়েছিল আদিদের বাড়িতে। মানে ঠাকুরমার কাছে।
সেদিন গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল রুহান। লুচি আর সাদা তরকারির সঙ্গে, চাকা চাকা বেগুনভাজা, কড়াপাকের সন্দেশ আর রাবড়িও রয়েছে।
আবেশ আনন্দের সঙ্গে প্রায় চিৎকার করে বলেছিল, ‘আরেব্বাস, এত কিছু!’
‘আমার নাতির জন্য।’ ঠাকুরমা মুখ টিপে হেসেছিল।
‘কে, আদি? কেন আদির আজ জন্মদিন?’
‘না আদির জন্য নয়, এ আমার বড় নাতির জন্য। বাইরে গিয়েছিল। আজ এসেছে। আসবে একটু পরে। তখন দেখবি। একেবারে রাজপুত্র।’
তা সেই শীতের সকালে প্রথম রাজদর্শন হয়েছিল রুহানের।
এখন কোথায় কিগান? কত মাস হয়ে গেল দেখা নেই! কথা নেই! তখন মোবাইল ছিল না। কথা বলতে পারেনি। কিন্তু এখন তো পারে রুহান। তবে বলে না কেন? লজ্জা? কার লজ্জা? যা হয়েছে তা সত্যিই কি কিগানের জন্য হয়েছে? সবাই তো তাই বলে। শুধু আদি? আদি কী বলে?
‘কী রে শালা, এবার মাটি থেকে উঠে টুঠে যাবি নাকি সমাধি অবস্থায়?’ একটা ছোট্ট বালিশ নিয়ে আধশোয়া অবস্থাতেই আবেশ ছুড়ে মেরেছিল রুহানের দিকে।
রুহান বালিশটা ধরে কোলের কাছে নিয়ে রেখে বসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘বল, কেন এসেছিস?’
‘মার্চেন্ট মাল্টিপল্স লিমিটেড-এর নাম শুনেছিস?’ আবেশ দরজার দিকে তাকিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করেছিল।
‘আরে মা আছে বাড়িতে।’ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রুহান উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘তো, দরজা বন্ধ করে দে। মাইরি, মায়ের কত বাধ্য! শালা, তুই সেই স্কুললাইফ থেকেই ঢ্যামনা রয়ে গেলি। ঘোমটার তলায় খ্যামটা নেচেই বয়স বাড়ল তোর। আমার মুখ খোলাস না। জিয়োগ্রাফির মিসেস বড়ুয়াকে লাগানোর সময় মায়ের ‘নো অবজেকশন’ নিয়েছিলি? আবার তার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছিস? আমায় সিগারেট দেখাচ্ছে!’
‘চুপ কর। প্লিজ চুপ কর।’ রুহান দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
‘শালা, মিসেস রবিনসনের কেস। তুই মাইরি আর ফালতু চো…’
‘চুপ কর না।’ রুহান এবার বালিশটা পালটা ছুড়ে মেরেছিল আবেশকে। তারপর বলেছিল, ‘কী জন্য এসেছিস, বল।’
‘তার চেষ্টাই তো করছিলাম। তুই এমন করলি যেন বাড়িতে বসে অ্যাটম বোমে আগুন লাগাচ্ছি!’ মুখ দিয়ে একটা বিরক্তির শব্দ করে সিগারেট ধরিয়ে শুরু করেছিল আবেশ, ‘আদির সঙ্গে দেখা করতে ওদের অফিসে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া মিজোরাম থেকে এসে কাজেরও দরকার ছিল। তাই…’
‘দাঁড়া, দাঁড়া,’ অবাক হয়েছিল রুহান, ‘মিজোরাম? সেখানে কী করছিলি?’
‘কুকুর ধরছিলাম।’ আবেশ ছোট্ট করে বলেছিল।
‘কুকুর? মানে? কেন?’
‘আচ্ছা মুশকিল! তাতে তোর কী? আমি কুকুর ধরি বা তিমি, তাতে তোর কিছু এসে যায়? কী বলতে এসেছি শোন।’
‘ওকে, ওকে…’ কৌতূহলটা অনেক কষ্টে চেপে রুহান মনঃসংযোগ করেছিল।
‘শোন, মার্চেন্ট মাল্টিপল্স, একটা টোয়েন্টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট করতে চলেছে। ছ’টা টিম তৈরি করে তাদের মধ্যে লিগ সিস্টেমে খেলাবে। সেখান থেকে প্রথম চারজনকে নিয়ে সেমিফাইনাল, তারপর ফাইনাল।’
‘তা, তুই এর মধ্যে এলি কীভাবে?’
‘আরে, আমি আদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম ওর অফিসে। আদিকে ওর বস কথাটা বলছিল আদির কিউবিক্লের সামনে দাঁড়িয়ে। লোকটার নাম গৌর রওশন দিওয়ান। খুব চালাক-চতুর। আর অদ্ভুত ফ্রেন্ডলি। কে বলবে পুরো এই ইস্টার্ন জোনটার মাথা? কোনও ঘ্যাম নেই। তা, আদিকে বলল যে, ওদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর জন্য মুম্বইয়ের একজন নায়ককে ওরা কনট্যাক্ট করছে বিজ্ঞাপনের জন্য। সঙ্গে এখন যেটা বাজারে চলছে, টি-টোয়েন্টি, তাই অ্যারেঞ্জ করতে চায়। সেই নিয়ে একটা রিপোর্ট আদিকে দিয়েছে। তখন আদি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল যে, আমি ভাল খেলতাম। কলেজ খেলেছি। সেকেন্ড ডিভিশন খেলেছি। তখন গৌর আদিকে বলল, তা হলে আমায় গোটা প্ল্যানটার সঙ্গে যোগ করে নিতে। তো, সেই নিয়ে আমি কাজ করছি।’
‘আরেব্বাস, চাকরি! এভাবে পেয়ে গেলি?’ অবাক হয়েছিল রুহান।
‘ইল্লি আর কী? চাকরি নয়, কাজটা করতে হবে। ব্যস। কী টাকাপয়সা পাব জানি না। আদি বলেছিল ওর সঙ্গে দেখা করতে। তাই গিয়েছিলাম। আর গিয়ে এটা জুটে গেল।’ আবেশ সিগারেটটা শেষ করে, ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে গিয়ে ফেলে দিয়ে আবার এসে বসেছিল।
‘সে কী রে! কাজ করবি, টাকার কথা জানিস না!’ খুব অবাক হয়েছিল রুহান।
‘সবসময় টাকাটা দেখতে নেই। এমনিও কাজ করতে হয়, বুঝলি?’
‘অ্যাঁ?’ রুহান ভুরু তুলেছিল, ‘শালা, এ যে, ভূতের মুখে রামনাম। নিশ্চয় কিছু পুল তোর আছে এর ভেতর। নেই?’
‘শোন, ওদের চারিদিকে নানা কাজকর্ম হয়। এই টুর্নামেন্টটা ভাল করে উতরে দিতে পারলে অন্যরকম একটা হিল্লে হয়ে যাবে আমার। বুঝলি?’ আবেশ হেসেছিল।
‘তা আমি কী করব? আমার কাছে কেন এসেছিস?’
‘সেটাই তো বলছি। শোন, নর্থ, সাউথ, ইস্ট আর ওয়েস্ট কলকাতা থেকে চারটে টিম, সঙ্গে নর্থ চব্বিশ পরগনা আর সাউথ চব্বিশ পরগনা থেকে একটা করে মোট ছ’টা টিম করতে হবে। সাউথ কলকাতা থেকে যে-টিমটা হবে তাতে তুই থাকবি।’
‘আমি? হঠাৎ?’
‘মনে হল তোর কথা। বলটা খুব ভাল করতিস তুই। একবার কলেজের একটা ম্যাচে মনে আছে কীভাবে ছ’ উইকেট নিয়েছিলি? তা, পারবি না খেলতে?’
‘পারব। কিন্তু সেই ফর্ম নেই রে আর! ভাল পারি না। কী হয়েছে কে জানে! কিন্তু সত্যি এখন মার খাই খুব। স্টার-এও ফার্স্ট টিমে নেই। আর চান্সও পাব না। আমায় বাছলে তোর বদনাম হয়ে যাবে। ভাল করে ভেবে দেখ।’
‘শালা, বড্ড বাজে কথা বলিস।’ আবেশ বিছানা থেকে উঠে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে, ‘কী হয়েছে তোর রুহান? এমন গোঁত্তা খেয়ে আছিস কেন? সবসময় ‘হবে না’, ‘পারব না’। এমন করছিস কেন?’
‘না, মানে, জগুদা জানলে রাগ করবে।’
খেঁকিয়ে উঠেছিল আবেশ, ‘তোদের সাউথের ক্লাবটাকে কোচ করবে জগুদা। সুখেনদা না কে একজন আছেন তোদের ক্লাবে। সে মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের কনসালটেন্ট। খবর শুনে ও-ই নিজের থেকে লিস্ট ধরিয়েছে আদির হাতে। শালা, স্টারের কর্মকর্তা তো তাই তার চোদ্দো গুষ্টির প্লেয়ার আর কোচদের এনে ঢোকাচ্ছে সব টিমে। বটুক নামে তোদের বেস্ট ব্যাটসম্যানটাকে নর্থের টিমে পুরেছে। সুখেনদাই তোর নাম দিয়েছে। জগু মালটা তেন্ডাই মেন্ডাই করছিল, কিন্তু ধোপে টেকেনি। শালা নিজে কামাবে, কিন্তু তোকে কামাতে দেবে না। গান্ডু!’
‘ওভাবে বলিস না। জগুদা আমার ভাল চায়।’ রুহান নিচু গলায় বলেছিল।
‘সেই জন্য টিমে নেয় না! রোজগারের জায়গায় কাঠি করে! তুই শালা মানুষ হবি না। কী করে যে, মিসেস বড়ুয়াকে তুই…’
‘আঃ, চুপ কর না!’ রুহান যেন জোর পাচ্ছিল না গলায়।
‘শোন, পার ম্যাচ দশ হাজার পাবি। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হলে পনেরো এক্সট্রা। চ্যাম্পিয়ন হলে কুড়ি লাখ টাকা প্রাইজ মানির ফাইভ পারসেন্ট। নেমে পড়। ফালতু মটকা গরম করিস না। নেক্সট সোমবার চলে আসবি এই ঠিকানায়। কনট্র্যাক্ট সই করে যাবি। আর এই নিয়ে একদম ঝোলাবি না।’ আবেশ একটা কার্ড দিয়েছিল ওকে।
আবেশ চলে যাওয়ার পর রুহান মাথা নিচু করে বসে ছিল। কোথায় ছিল আবেশ এতদিন? হঠাৎ কোত্থেকে এসে এমন একটা প্রস্তাব দিয়ে গেল! মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের নাম ও শুনেছে। খুব বড় কোম্পানি। অনেক কিছু বানায়। এদের টুর্নামেন্ট তো বড়ই হবে।
পরের সোমবার কনট্র্যাক্ট সই করে প্রথম ম্যাচের আগাম হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছিল। ভালই লেগেছিল। তবে জগুদা ওখানে বসে থাকলেও একদম কথা বলেনি। এমনকী গত দু’দিন সকালের প্র্যাকটিসেও কথা বলেনি। আজ গেলে খেলাবে কিনা কে জানে! পায়ের চোটটা নেই আর। তবু জগুদা প্র্যাকটিস ম্যাচেও চান্স দেয় না।
নভেম্বরের প্রথম। তবুও গরম আছে বেশ। এই দুপুর দুটোয় সূর্যর যা মেজাজ তাতে মানুষ গলে যেতে পারে। নন্দা বলত, ‘আমার একদম গরম পোষায় না। বিয়ের পর শোওয়ার ঘরে এসি লাগাবে তো?’
বিয়ের পর! আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ যেন মুখটা তেতো হয়ে গেল রুহানের। এই অঞ্চলে প্রচুর বিয়ের কার্ডের দোকান। আজ বন্ধ, কিন্তু তবু তাদের হোর্ডিংগুলো দেখা যাচ্ছে। নন্দা ওকে বিয়ের কথা বলত বারবার। ভালবাসত, খুব ভালবাসত মেয়েটা ওকে। ও-ও তো বাসত। কিন্তু টাকাপয়সার ব্যাপারে এমন খচখচ করত, অপরাধী মনে হত নিজেকে। আর অপরাধবোধ নিয়ে কক্ষনও প্রেমের পূর্ণতা আসে না।
‘আরে দাদা সরি, অনেক দেরি হয়ে গেল।’ আচমকা গলার স্বরে সংবিৎ ফিরল রুহানের। লোকটা ঠিক চিনতে পেরেছে। আসলে রুহান ফোনে বলেছিল যে, আমহার্স্ট স্ট্রিট মোড়ে যে-মিষ্টির দোকান রয়েছে তার সামনে হলুদ রঙের টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও। লোকটা ঠিক চিনেছে।
লোকটা পকেট থেকে একটা দশ টাকা বের করে বলল, ‘নিন, মিলিয়ে নিন, আমি সেই লোক কিনা!’
অফিসে এইভাবে লোক চেনা আর টাকা লেনদেন হওয়ার প্রক্রিয়া ও গল্প যখন প্রথম শুনেছিল, খুব আশ্চর্য হয়েছিল রুহান। যেন ফুটপাথের গোয়েন্দা গল্পের প্লট। কিন্তু তারপর শুনেছিল বহু জায়গাতেই এমনভাবে কেনাকাটা, লেনদেন হয়।
অফিস থেকেই ওকে একটা কাগজে একটা নম্বর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, এই নম্বরের নোট যে দেখাবে তাকে যেন দেওয়া হয় টাকা। লোকটা নম্বর দেখানো মাত্র হাতের প্লাস্টিকে মুড়ে রাখা চোদ্দো হাজার টাকা লোকটার হাতে দিয়ে দিল রুহান। তারপর যেমন হঠাৎ করে এসেছিল লোকটা, তেমন হঠাৎ করে চলে গেল টাকা পাওয়ামাত্র।
এবার মাঠ। রুহান সময় দেখল মোবাইলে। প্রায় তিনটে বাজে। এখান থেকে বাসে করে দেশপ্রিয় পার্ক পৌঁছোতে গেলে এ খেলা তো বাদ দাও, পরের খেলাও শেষ হয়ে যাবে। গা চড়চড় করছে, তবু শিয়ালদার দিকে যেতে থাকা একটা ট্যাক্সি ধরল রুহান।
রুহানের কাছে শুধু ছোট একটা ব্যাগ রয়েছে। তাতে ওর জুতো আর মোজাটা রাখা আছে। বাকি জার্সি তো টিমের কাছেই পাওয়া যাবে।
রুহান ট্যাক্সির জানলা দিয়ে শহর দেখতে দেখতে যেতে লাগল। না, টেনশন হচ্ছে না তেমন। কারণ, জগুদার যা মুড দেখেছে, তাতে ও নিশ্চিত যে, ওকে জগুদা খেলাবে না কিছুতেই। ফলে পুরো ম্যাচ খেললে দশ হাজার। আর রিজার্ভে ফুলদানির মতো বসে থাকলে পাঁচ হাজার। আর সেই পাঁচ তো কনট্র্যাক্ট সইয়ের সময়ই পেয়ে গিয়েছে। ফলে আজ ট্যাক্সি ভাড়াটা গোটাটাই লস। জগুদার যে কী শত্রুতা ওর সঙ্গে!
দেশপ্রিয় পার্কের মাঠটা আলো, হোর্ডিং, নতুন চুনের দাগ আর ম্যাটিং উইকেট দিয়ে সাজানো হয়েছে। আর লোকজনও হয়েছে মোটামুটি।
এই ধরনের রংচঙে ক্রিকেটের একটা মজা আছে। খেলা কী হবে ঠিক নেই কিন্তু হাবভাবে একদম চকচকে মহার্ঘ হয়ে থাকে। মনে হয়, এর চেয়ে ভাল আর কিছু নেই।
ওদের টিমের নাম ‘সাউদার্ন ব্রিজ’। দখিণা বাতাস যে এই হেমন্তের সময় কোত্থেকে বইছে, তা বুঝতে পারল না রুহান। কারণ ট্যাক্সি থেকে নেমেই একদম বাঘের সামনে পড়ল। জগুদা!
এ ক’দিন জগুদা কথা বলেনি। কিন্তু আজ দেখামাত্র দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর নিজের থেকেই এগিয়ে এসে বলল, ‘কনট্র্যাক্ট সই করেই একদম ট্যাক্সি থেকে নামছিস? পরে, ম্যাচ খেললে তো কানে দুল, গলায় হার এসবও চড়াবি!’
রুহান থতমত খেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘না জগুদা, ওই নর্থ থেকে আসছি। অফিসের কাজ ছিল। দেরি হয়ে গেছে তো!’
‘দেরি নয়। অনেক কিছুই হয়েছে। চল তাড়াতাড়ি, ড্রেস করবি। তোকে দলে রাখা হয়েছে।’ জগুদা আর না দাঁড়িয়ে মাঠের লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে।
বাকি পাঁচ হাজার! প্রথম এটাই মনে এল রুহানের। আর সঙ্গে সঙ্গে খারাপ লাগল। ইস, টাকা আর টাকা! শুধু টাকা ছাড়া কি ও নিজে কিছু ভাবতে পারে না? ওর তো ভাবা উচিত যে, নর্থ কলকাতার টিম, ‘গ্লেসিয়ার নর্থ’-এর প্রধান ব্যাটসম্যান বটুককে প্রথম বলেই তুলতে হবে। তা নয়, ও ভাবছে টাকা। কোনও সত্যিকারের স্পোর্টসম্যান এমন ভাবে? ও নিজে দু’বছর আগে এমন ভাবত? নিজের ওপরই নিজের বিরক্ত লাগল রুহানের।
নিজেদের টেন্টে গিয়ে ড্রেস করে এক কোনায় চুপ করে বসল রুহান। প্রতিটা ম্যাচে নামার আগে ও চুপ করে বসে একটু সময়। নিজের ভেতরের বাকি সব কিছু বের করে শুধু খেলোয়াড় মানুষটুকুকে ধরে রাখে।
কিন্তু আজ তখনই এল আবেশ। গলায় অফিশিয়ালের কার্ড আর মুখে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত লোকের বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে এসে বলল, ‘আরে, সেদিন তোকে যে বললাম, প্যান দিতে। তা দিলি না তো নম্বরটা। আরে বাবা, টাকা নিবি আর নিয়ম মানবি না?’
‘প্যান?’ রুহান অবাক হল, ‘কেন, তোকে বললাম না আমার ওসব নেই।’
‘নেই? সে কী?’ আবেশ এমন করে আঁতকে উঠল যেন কলকাতার থেকে হাওড়া ব্রিজ গায়েব হয়ে গিয়েছে!’
‘হ্যাঁ, তোকে বললাম তো। তাতে যা টাকা কাটার তা কাটবি। আমি আর কী বলব? এখন একটু কনসেন্ট্রেট করি! একটু স্পেস দে।’
আবেশ আরও কিছু বলতে গিয়েছিল কিন্তু তার আগেই একটা নরম মেয়েলি গলা আবেশকে পিছন থেকে ডাকল, ‘বাদ দিন। ম্যাচের পরে যা বলার বলবেন, এখন এখানে আমাদের না থাকাই ভাল।’
গলার স্বরের ভেতরে কী ছিল ঠিক স্পষ্ট করে বলতে পারবে না রুহান কিন্তু একটা অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া যেন পাক খেয়ে উঠল রুহানের ভেতরে। সাউদার্ন ব্রিজ! ও নিজের অজান্তেই ঝুঁকে পড়ে আবেশের পিছনে দাঁড়ানো অমন সুন্দর স্বরের অধীশ্বরীকে দেখল।
গোল পাহাড়ি গড়নের মুখ। সামান্য চাপা নাক। কী অদ্ভুত সুন্দর আর মিষ্টি দেখতে! গলা শুকিয়ে এল রুহানের। হাঁটুতে জোর কমে এল হঠাৎ। মনে হল, কিছু না ধরলে পড়ে যাবে এক্ষুনি। এ কে?
‘ওভাবে তাকাস না।’ জগুদা আজ যেন যাত্রা দলের বিবেকের পাঠ নিয়েছে। সবেতেই স্টেজে উঠে নীতিকথা ঝাড়ছে!
রুহান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সামলাল নিজেকে। বলল, ‘না… মানে…ইয়ে…’
‘আমি বুঝতে পারছি, কী!’ জগুদা মুখটা ব্যাজার করল, ‘বটুককে শর্ট বল দিবি না। ভাল পুল করে। আর অফ স্ট্যাম্প-এর বাইরে রাখতে গিয়ে ওয়াইড দিস না।’
রুহান টালুমালু চোখে তাকাল জগুদার দিকে। কী বলছে লোকটা? মাথায় ঢুকছে না কেন রুহানের?
রুহান যেন নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, ‘আচ্ছা জগুদা, ভদ্রমহিলার নাম কী?’
জগুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘আজ মার খাবি। বুঝেছি, খুব মার খাবি।’
মার? সে তো সারাজীবন খেয়েছে রুহান। এখনও খায়। কিন্তু আজ এই মেয়েটার সামনে মার খাবে? এই মেয়েটার সামনে ওকে নাস্তানাবুদ করবে ব্যাটসম্যান? রুহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও জগুদার দিকে তাকিয়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আজ আমায় বোলিংটা ওপেন করতে দাও। তারপর দেখছি।’
জগুদা অল্প হেসে চলে যাওয়ার আগে নিজের মনেই যেন বলল, ‘মালিনী সিংহ। মালিনী সিংহ নাম মেয়েটার। এর বেশি জানতে হলে পারফর্ম কর।’
রুহান দেশপ্রিয় পার্কের নেড়া হতে থাকা গাছের মাথায় বসানো সূর্যের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘শর্ট বা ওয়াইড এবার দেব না। কিছুতেই দেব না।’
Chapter - 8
৮
গুন্ডার পাশে ছেলেটাকে মনে হচ্ছে টুথপিক। তার ওপর এমন আগোছালো জামাকাপড় পরে রয়েছে ছেলেটা যে, আরও হাস্যকর লাগছে। ছেলেটা বিশেষ কথাও বলছে না। শুধু হুঁ হাঁ করছে প্রথম থেকে।
নভেম্বরের বারো আনা হয়ে গেলেও ঠান্ডা তেমন পড়ছে না। দিঘির মনে হয় আজকাল সব কিছুই কেমন যেন উলটোপালটা হয়ে আছে। ঠিকমতো বৃষ্টি হয় না, গরমে ডিম আপনা থেকে সেদ্ধ হয়ে যায়। ঠান্ডা পড়ি পড়ি করেও ঠিক ঠান্ডাও পড়ে না। আজ থেকে দশ বছর আগেও কিন্তু এমন ছিল না। খুব বাজে লাগে দিঘির। চাপা রাগ হয়। মনে হয় কিছু একটা করে। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারে না কী করবে! আসলে দিঘির সমস্যা এটাই। লোকে হয়তো ওকে খুব সাহসী, স্ট্রেট ফরোওয়ার্ড আর অ্যাগ্রেসিভ ভাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে দিঘি বোঝে ও কতটা নিস্তব্ধ, চুপচাপ, ইনট্রোভার্ট। তাই অনেক সময়ই কিছু করতে চাইলেও ঠিক পারে না। ওর গলা বুজে আসে কষ্টে। কিন্তু তবু কিছু বলতে পারে না।
আর কষ্টগুলোও খুব বেয়াড়া ধরনের। জলের মতো। কোথায় যেন পড়েছিল দিঘি যে, পৃথিবীতে সমস্ত জলই নিজেদের ভেতরে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। মানুষের মনের দুঃখগুলোও ঠিক তেমনই। সবক’টা দুঃখই যেন এ ওর ল্যাজা-মুড়ো ধরে রেখেছে। একটায় টান লাগলে সবক’টা এসে হুড়মুড়িয়ে পড়ে এ ওর ঘাড়ে।
এই যে নভেম্বরের প্রায় শেষে এসে ঠান্ডাটা পড়ল না তার জন্য যে মনখারাপটা হালকাভাবে শুরু হয়েছিল সেটা ক্রমশ এ-গলি ও-গলি দিয়ে এসে পড়ল রাজপথে। এই শেষ বিকেলের আলোয় কলেজ স্কোয়ারের জলের পাড়ে বসে আচমকাই যেন জীবনটা ফিরে গেল তিন বছর আগে এক পুজোর সকালে। কেন এমন হল? একটা বিকেল কী করে মনে করায় সকালকে? মানুষের চিন্তার পদ্ধতিটা কী? মনের পদ্ধতিটাই বা কী? দিঘি বোঝে না। যেন খানিক বুঝতেও চায় না। ওর শুধু মনে পড়ে সেই সকালটুকু।
তখন সবে সুকিয়া স্ট্রিটে এসেছিল ওরা। নর্থ কলকাতার সঙ্গে আস্তে আস্তে পরিচয় হচ্ছিল দিঘির। সব যে ভাল লাগছিল তা নয়, কিন্তু তবু একটা অন্যরকমের স্বাদ পাচ্ছিল ও। দেখছিল এখানে এখনও অনেক পুরনো বাড়িঘর থেকে গিয়েছে। জাফরি-আঁটা ছাদ থেকে গিয়েছে। শ্বেতপাথরের টেবিল আর কালো কাঠের চেয়ারওয়ালা কেবিন থেকে গিয়েছে। থেকে গিয়েছে করি বরগার বাড়ি, লম্বা সিঁড়ি, জট পাকানো ইলেকট্রিকের তারের মিটার ঘর। এর মাঝে মাঝে কাচের কনফেকশনারি, মোবাইলের দোকান, অটোমেটিক সিগন্যালও এসে গিয়েছে। দিঘি দেখেছিল গুরুচণ্ডালি দোষের একটা শহর ক্রমশ যেন বদলে দিচ্ছে, মানিয়ে নিচ্ছে তার নিজের বেঁচে থাকার ব্যাকরণ।
অষ্টমীর পুজো ছিল সেদিন। বাদুড়বাগানের প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিয়ে মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরেছিল দিঘি। মা বলেছিল, ‘চল, পাশের বাড়ির মাসিমাকে গিয়ে প্রণাম করে আসি। তুই তো ঠিকমতো কাউকে চিনলিই না এ পাড়ায়।’
আসলে সুকিয়া স্ট্রিটের এই বাড়িটা মা পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। এটা দিঘিদের মামার বাড়ি ছিল। দিঘির দাদু-দিদিমা না থাকলেও, মামা ছিল এক। কিন্তু সে বিয়ে করেনি। এত বড় বাড়িটায় মামা একা থাকত। অবশ্য ঠিক একা নয়। মহুল এসে মাঝে মাঝে থাকত মামার সঙ্গে। ফলে মহুলের সঙ্গে এ পাড়ার সবার পরিচয় ছিল। কিন্তু মামা আচমকা মারা যাওয়ার পর ওরা যখন দক্ষিণ কলকাতা থেকে এখানে এসে উঠল, দিঘি যেন নতুন এক পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। মা নিশ্চয়ই বুঝেছিল দিঘির মনের অবস্থা। তাই দিঘিকে নিয়ে মাঝে মাঝেই এ-বাড়ি ও-বাড়ি গিয়ে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিত। মায়ের ছোটবেলার জায়গা যে। মাকে যে সবাই চেনে এখানে।
সেদিন বাড়িতে পায়েস করেছিল মা। সঙ্গে আলুর দম আর লুচি। তাই থালায় সাজিয়ে নিয়ে মায়ের সঙ্গে পাশের বাড়ির ঠাকুরমার কাছে গিয়েছিল। মা যাওয়ার আগে দিঘিকে বলেছিল, ‘আমি মাসিমা বললেও তুই ঠাকুরমা বলবি। হৈম মাসিমা এক আশ্চর্য মহিলা। চল, তোর ভাল লাগবে।’
সুন্দরী দিঘি বহু দেখেছে। কিন্তু আশি বছর বয়সেও যে, কোনও মানুষ এতটা সুন্দরী থাকতে পারে তা ঠাকুরমাকে না দেখলে বুঝতেই পারত না দিঘি।
সোনার গোল ফ্রেমের চশমা পরে, ঠাকুরমা একটা বই পড়ছিলেন। মাকে দেখে বই রেখে খাট থেকে নেমে এসেছিলেন বৃদ্ধা, ‘আরে মম, তুই?’
মা থালাটা দেখিয়ে হেসে বলেছিল, ‘বলছি, আগে এটা কোথায় রাখব বলো তো?’
ঠাকুরমা বলেছিলেন, ‘কী এনেছিস আবার পাকামি করে?’
‘ওই সামান্য লুচি-আলুর দম আছে।’
‘ও,’ হেসেছিল ঠাকুরমা, ‘দাঁড়া,’ বলে, ‘খুশি, খুশি,’ ডাক দিয়েছিলেন।
মধ্যবয়স্কা একজন কাজের মহিলা ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিল।
ঠাকুরমা বলেছিল, ‘হাতের থালাটা নিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে রাখ। আর দা’ভাই কই?’
খুশি বলেছিল, ‘নিজের ঘরে আছে। ক্যামেরাটা ভেঙে কীসব করছে।’
‘ক্যামেরা ভেঙে?’ ঠাকুরমা ভুরু কুঁচকেছিলেন এক মুহূর্তের জন্য। তারপর হেসে বলেছিলেন, ‘ও লেন্স পরিষ্কার করছে। যা তো, বল আমি ডাকছি।’
‘কাকে ডাকলে গো?’ মা জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কেন, বুঝতে পারছিস না? অর্কর ছেলে, কিগান।’
‘ও,’ মায়ের যেন মনে পড়ে গিয়েছিল সব, ‘তাই তো! দেখো দেখি, আমিও বোকা, সব কেমন যেন ভুলে যাই আজকাল। থাইরয়েডের জন্যই কি? তা, কই ও?’
ঠাকুরমা কিছু বলার আগেই স্বরটা শুনেছিল দিঘি। দরজার বাইরে থেকে নরম একটা স্বর বলেছিল, ‘ডাকছিলে ঠাকুরমা?’
মায়ের সঙ্গে দিঘিও ঘুরে তাকিয়েছিল। আর তাকে দেখেছিল প্রথম। বারান্দা দিয়ে আসা কাচের মতো রোদ এসে পড়েছিল দরজার কাছে। আর সেই রোদের চৌখুপির মাঝে দাঁড়িয়েছিল সে। লম্বা, দোহারা চেহারা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। কোঁকড়া এলোমেলো চুল আর দুটো অদ্ভুত নীল রঙের চোখ।
কোথায় এসে দাঁড়িয়েছিল কিগান? ওই রোদের চৌকোর মাঝখানে? না, দিঘির মনের মাঝখানে? টলমল করে উঠেছিল দিঘির মন। বাঙালিদের এমন নীল চোখ হয়!
ঠাকুরমা আলাপ করিয়ে দিয়েছিল ওদের সঙ্গে। মা কিগানের গাল টিপে, চুল ঘেঁটে আদর করে দিয়েছিল। কথাও বলেছিল কীসব। কিন্তু দিঘির কিচ্ছু কানে ঢোকেনি। ও শুধু দেখছিল কিগানকে। আর ওর বুকের ভেতর একটা গোটা দিঘি টলমল করছিল যেন।
সেই শুরু, তারপর, দিঘি প্রায় রোজই যেত ঠাকুরমার কাছে। ঠাকুরমার কাছে? দিঘি অন্তত তাই বলত মাকে। মাঝে মাঝে অবশ্য কিগানের কথাও বলত। বলত অঙ্ক বা বিজ্ঞানের কোনও কিছু বুঝে নিতে চায় ও কিগানের থেকে। দিঘি বলত, ‘কিগানদা এত ভাল বোঝায় না!’
দিঘি মাকে বোঝাত। নিজেকেও। কিন্তু সব কিছুর তলায় তলায় একটা অবুঝ কাঠবেড়ালি নেচে বেড়াত। সে তার বাদাম খুঁজে বেড়াত। তারপর কোত্থেকে যে কী হল! পুজো শেষ হয়ে, ক্রিসমাস ছুঁয়ে, সরস্বতী পুজো টপকে সময় এসে দাঁড়াল দোলের দিনে। আর সেই দিনের থেকেই কীভাবে যেন পালটে গেল দিঘির বেঁচে থাকা।
‘কী রে, তখন থেকে দেখছি চুপ মেরে আছিস। কী হয়েছে তোর?’ কংক্রিটের বেঞ্চটাতে একটা থাপ্পড় মেরে বলল গুন্ডা।
সামান্য চমকে উঠলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল দিঘি। বলল, ‘না, মানে ভাবলাম যে নভেম্বর শেষ হতে চলল, কিন্তু দেখ, ঠান্ডার নামগন্ধ নেই। ক্লাইমেটের যে কী অবস্থা হয়েছে না! খুব খারাপ সময় আসছে।’
‘আসছে?’ রোগা ছেলেটা এতক্ষণে প্রথম স্পষ্ট ভাষায় কিছু বলল।
দিঘির সঙ্গে স্নেহা, রূপ আর জয়ও তাকাল ছেলেটার দিকে।
গুন্ডা বলল, ‘যাক ত্রয়ণদা, তুমি যে কথা বলতে পারো তা সবাই অন্তত বুঝতে পারল।’
ত্রয়ণ বাঁ হাতের স্টিল ব্যান্ডের সস্তার ঘড়িটা ঠিক করে নিয়ে বলল, ‘তোমাদের তা হলে সত্যি মনে হয় যে, খারাপ সময় আসছে। এখনও আসেনি!’
‘না, মানে…’ জয় চিরকাল সব বিষয়েই কিছু না-কিছু বলতে চায়। কিন্তু কিছুতেই কোনও কথা শেষ করতে পারে না।
‘কী, মানে?’ ত্রয়ণ জয়ের দিকে তাকাল প্রথমে, তারপর সবার দিকে ঘুরে ঘুরে এসে থামল দিঘির কাছে। বলল, ‘আর কত খারাপ সময় আসবে বলে মনে হয় তোমার? তোমাদের কলেজের ভোট সামনে। এই গুন্ডা তোমাদের ক্লাস রিপ্রেজেন্ট করে। ওর কথায় জাস্ট তোমাদের কলেজে ঘুরে গেলাম। ক্যাম্পেনিং দেখলাম। কথা শুনলাম। বুঝলাম যে, কিছুদিনের মধ্যে বোধহয় মারামারিও হয়ে যাবে একচোট। তারপর ভোটে একটা দল জিতবে। ক্ষমতা পেয়ে যাবে। কিন্তু তাতে কি কলেজটার কিছুমাত্র অদল-বদল হবে? পাতি কথায়, উন্নতি হবে কিছু?’
গুন্ডা বলল, ‘কেন হবে না? নিশ্চয়ই হবে। ছাত্রশক্তি, শুভ বুদ্ধি আর পরিশ্রমের ত্রিপাক্ষিক মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে উন্নতি আসতে বাধ্য।’
‘চুপ কর।’ ত্রয়ণ ধমক দিল, ‘এমন জানলে কলকাতার কাজ সেরে ফিরে যেতাম বাড়িতে। তোর কথামতো এখানে আসতাম না।’
‘কেন, কী ভুল বললাম?’ গুন্ডা দূরে একটা বাদামওয়ালাকে হাত দিয়ে ডেকে ত্রয়ণকে প্রশ্ন করল।
ত্রয়ণ আবার সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে তিনটে দল কনটেস্ট করবে। আজ তিনজনেই এজেন্ডা, অবজেক্টিভ, ভিশন ইত্যাদি নিয়ে গালভরা সব ভাষণ দিল। কিন্তু তাতে নতুন কিছু বলল কি? যে যার পার্টির দাদা-কাকাদের বুলিগুলো গড়গড় করে বলে দিল। বক্তৃতা জুড়ে শুধু পার্টি হেড কোয়ার্টারের ইস্তেহারগুলো কে কত ভাল মুখস্থ করেছে তার পরীক্ষা যেন! যখন সব শিয়াল এক স্বরে ডাকে তখন বুঝতে হবে অবস্থা খারাপ হতে বাকি নেই কিছু। শোনো, যে-রাজনীতিতে এত রিজিডিটি চলে আসে, সেটা ব্রেনওয়াশের যন্ত্র হয়ে যায়। আর বরফির মগজ প্রক্ষালন যন্ত্রের ফলে কী হয়েছিল, তা নিশ্চয়ই তোমাদের আলাদা করে বলে দিতে হবে না। স্টুডেন্টদের তো কাজ, সিস্টেমকে প্রশ্ন করা। পুরনো ভুলগুলো শোধরানো। তা না করে তোমরা কী করছ? মান্ধাতার আমলের কয়েকজন নেতার ইগোসমৃদ্ধ, একগুঁয়ে কিছু বুলি আউড়ে চলেছ, আর অন্য পার্টি ক’টা খুন করল, ক’টা রেপ করল, সেই হিসেব দিয়ে নিজেদের ভুলগুলো জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছ। আর বলছ খারাপ সময় আসছে? ওয়েকআপ বাডি। খারাপ সময় চলছে এখন। ছাত্র রাজনীতি হল যাত্রাপালার বিবেকের মতো। দ্য ভয়েস অব দ্য সোল। কিন্তু সেই বিবেক যখন ক্ষমতার ওকালতি করে, জানবে এমন দুঃসময় আর নেই!’
জয় বলল, ‘কিন্তু মূল্যহীন বলছেন কেন? আমাদের এই ইয়ে মানে…চেষ্টা আর ভোট…মানে আমি বলছি যে…’
‘চুপ কর,’ গুন্ডা ধমক দিল, ‘সব বিষয়ে শুধু লাফিয়েই পড়ে, কিছুই বলতে পারে না। তবু কথা বলা চাই। না?’ তারপর ত্রয়ণকে বলল, ‘তুমিও তো সক্রিয় রাজনীতি করো। এখানে বসে যা বলছ তা তোমাদের ওই উত্তর চব্বিশ পরগনার কেষ্টবিষ্টুদের সামনে বলতে পারবে?’
ত্রয়ণ হাসল, ‘বলি তো। আমি তো বলিই। বারাসতে একটা হাউজিং নিয়ে দীর্ঘদিন ঝামেলা চলছে। যে-গ্রুপ প্রোমোটিং করছে তারা তো টাকাপয়সা দিয়ে প্রায় ম্যানেজ করে ফেলেছিল সব নেতানেত্রীকে। ভেবেছিল তাতে হয়তো পার্কের জন্য জায়গাটা না ছাড়লেও চলবে। কিন্তু আমি তো তা হতে দিইনি। লোকাল মানুষকে বুঝিয়েছি। ব্যস, ক্রাউড আমার সঙ্গে। তারাও নাছোড় হয়ে গেছে। অবস্থা খারাপ বুঝে নেতানেত্রীরাও ডিগবাজি খেয়ে এখন আমাদের দাবি সমর্থন করছে। আরে বাবা পাবলিকের বিরুদ্ধে কে যাবে? তা ছাড়া চাপাডাঙাতে একটা গন্ডগোল পাকাচ্ছে। সেখানেও বারাসতের পার্টিটাই মিনারেল ওয়াটার প্লাস জুসের ফ্যাক্টরি খুলতে চায়, কিন্তু সেটা জমি দখল করে। একটা গন্ডগোল হবে। আমি দেখব যাতে জমির গায়ে আঁচড় না পড়ে।’
দিঘির মাথা বোঁ-বোঁ করছে। কী কথা থেকে টেনে নিয়ে কত কথা বলে গেল ছেলেটা! বাব্বা, সারাটা সময় চুপ করে থাকাটা যেন উশুল করে নিল! দিঘিও মানুষের জন্য কিছু একটা করতে চায়, কিন্তু রাজনীতির জার্সি চাপিয়ে নয়। আসলে রাজনীতিটা কোনওদিনই বোঝে না দিঘি। আর সত্যি কথা বলতে কী, বুঝতেও চায় না। নেহাত গুন্ডা ওদের বন্ধু তাই ওর সঙ্গে সঙ্গে থাকে। এই ত্রয়ণ যে এত কিছু বলে দেবে এটা জানলে তেমন কিছু বলতই না দিঘি। এরকম আর্ট ফিল্মের হিরো মার্কা, গায়ে সস্তা সিগারেটের গন্ধওয়ালা ছেলেদের চিরকাল অসহ্য লাগে দিঘির। তবে, কী আর করবে! উঠে চলে যাওয়াটা বড্ড মোটা দাগের হয়ে যাবে। তার ওপর গুন্ডার কাজিন হোমিদির চেনাশুনো এই ত্রয়ণ। ফলে গুন্ডার জন্যই খানিকটা সহ্য করছে ছেলেটাকে।
দিঘি দেখল স্নেহা বড় বড় চোখ করে কথাগুলো শুনলেও, রূপ একের পর এক সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে, পাত্তা দিচ্ছে না। দিঘি ভাবল দিদি এসে পড়লে ও বেঁচে যায়।
ত্রয়ণের কথার ফাঁকেই বাদামওয়ালার থেকে বাদাম কেনা হয়েছিল। সবাই খেয়ে নিলেও রূপ ধরেইনি প্যাকেটটা। গুন্ডা সেটা তুলে নিয়ে বলল, ‘যাই বলো ত্রয়ণদা, পার্টির যারা মাথা, তাদের কথা শুনব না?’
‘শুনবি না কেন? কিন্তু শুনলেই কি মানতে হবে? কেউ মাথার দিব্যি দিয়েছে? প্রশ্ন করবি না পালটা? বাজিয়ে দেখবি না যা বলছে ঠিক বলছে কিনা! জানবি, ছাত্র রাজনীতি হল সমাজের ল্যাবরেটরি।’
জয় বলল, ‘তা ঠিক। তবে শুধু রাজনীতি করেই ইয়ে…মানে কাজ করতে ইয়ে…দরকার কী রাজনীতি? মানে আমি বলতে চাইছি যে…’
‘বুঝেছি,’ ত্রয়ণ আবার ঢিলে ঘড়িটা ঠিক করল, ‘না, মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে রাজনীতির দরকার নেই। তোমরা যদি চাও, এমনিও করতে পারো। তবে তার জন্য কনভিকশন লাগবে। দেখবে রাজনীতির লোকজন সেখানেও খোঁচা দিচ্ছে। তবে তাতে তোমাদের থামলে চলবে না।’
গুন্ডা বলল, ‘হোমিদির “হেল্প আর্থ” তো এমনই একটা সংস্থা।’
‘হ্যাঁ, সেখানে তোমরা এসো। এই যে, বলছিলে না, যে, গরম বাড়ছে। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংকে কমানোর জন্যই তো হোমিরা কাজ করছে। ইউ পিপ্ল ক্যান জয়েন।’ ত্রয়ণ আবার ঘড়ি ঠিক করল।
‘এই আমি উঠি,’ রূপ আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘মাথা ব্যথা করছে।’
‘কেন?’ স্নেহা উদ্বিগ্ন হল। স্নেহার শরীর খারাপ নিয়ে একটা ভয় কাজ করে সবসময়।
‘না, কিছু নয়, এমনি।’
ত্রয়ণ হাসল, ‘ইনডিফারেন্স হল বুর্জোয়াদের লক্ষণ।’
রূপ পাত্তা দিল না। গুন্ডার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার চারটে সিডি নিয়েছিলি। কবে ফেরত দিবি?’
‘আরে ডিভিডি প্লেয়ারটা মা ধরতে দিচ্ছে না। আর দু’-চারদিন সময় দে, দিয়ে দেব। তুই রাগ করিস না।’
রূপ ঠোঁটের কোণে পুরনো দিনের হিন্দি ছবির ভিলেনদের মতো করে সিগারেট ঝুলিয়ে চোখ ছোট করে বলল, ‘রাগ করব কেন? সময়মতো দিয়ে দিস তা হলেই হবে। আমি আসি, বাই।’ রূপ ত্রয়ণের দিকে একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দিয়ে কলেজ স্কোয়ারের ছোট গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
দিঘির অস্বস্তি লাগল খুব। রূপ মাঝে মাঝে এত রুড হয়ে যায় না! খুব খারাপ লাগে দিঘির। আসলে রূপ একটু পাগলাটে ধরনের। যেটা খারাপ লাগে দুম করে বলে দেয়।
রূপ চলে যাওয়াতে স্নেহাও উসখুস শুরু করল। স্নেহার অস্থির হওয়ার লক্ষণই হল শাড়ির আঁচল নিয়ে হাত দিয়ে পাট পাট করা। দিঘি আড়চোখে দেখল স্নেহা আঁচলটা নিয়ে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে। জয়, ত্রয়ণ আর গুন্ডা নিজেদের মধ্যে কীসব কথা বলছে এখন। দিঘি স্নেহার দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে রে?’
স্নেহা বলল, ‘আমাকেও যেতে হবে এবার। বাড়িতে লোকজন আসবে। দেরি হলে মা বকবে খুব! আমায় যেতেই হবে রে।’
দিঘি বলল, ‘কেন?’
স্নেহা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘রূপ চলে গেল। আমিও যাই। রিধিমাটা চলে যাওয়ায় আমাদের গ্রুপটা কেমন যেন হয়ে গেছে! কে রিধিমাকে বলেছিল দিল্লি চলে যেতে?’
দিঘি হাসল, ‘ও, মায়ের বকাটা তা হলে ঢপ?’
স্নেহা কিছু না বলে হ্যাঁ আর না-এর মাঝামাঝি মাথা নাড়াল।
ত্রয়ণের থেকে মুখ ফিরিয়ে এবার দিঘিদের দিকে তাকিয়ে গুন্ডা বলল, ‘শোন, ত্রয়ণদা বলল যে, সামনে “হেল্প আর্থ”-এর একটা ডেমনস্ট্রেশন আছে। কলকাতা থেকে লোকজন গেলে গুরুত্ব আরও বাড়বে। তোরা যাবি?’
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যেতে হবে?’
‘ওই হাবড়া অঞ্চলে।’
‘সেটা কোথায়?’ স্নেহা আবার প্রশ্ন করল।
‘ক্যালানের মতো কথা বলিস না। ওটা নর্থ চব্বিশ পরগনায়।’ গুন্ডা বিরক্ত হল এবার।
‘ওরে বাবা!’ স্নেহার মুখটা লাল হয়ে গেল, ‘মা অত দূর যেতেই দেবে না। আমি যাব না বাবা।’
‘ন্যাকা খুকি আমার!’ গুন্ডা ঝাঁঝিয়ে বলল, ‘তোর বিয়ের সময় কী হবে রে? বাপ-মা ঘরজামাই রাখবে?’
সবার সামনে এমন বলছে দেখে স্নেহা রেগে গেল, ‘হ্যাঁ, রাখবে, তাতে তোর কী রে মোটা?’
‘রাখবে!’ গুন্ডা হঠাৎ অমন বিশাল শরীরটা নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল স্নেহার পায়ের কাছে। বলল, ‘তা হলে আমায় রাখতে বলবি? বাজারহাট সব করে দেব। হাত-পা টিপে দেব। তোদের সবার ব্রা-প্যান্টি-জাঙিয়াও কেচে দেব। আমায় প্লিজ বিয়ে করে ঘরজামাই রাখবি? মাইরি বাড়ির সবার মুখঝামটা আর রুটি-আলুর চোখা খেতে খেতে পেটে চর পড়ে গেল। এই স্নেহা, মাইরি আমায় বিয়ে করবি? বিদ্যা বলছি, তোর ইচ্ছে না করলে তোর সঙ্গে ইয়েও করব না।’
‘মানে?’ স্নেহা আঁতকে উঠল, ‘ওঠ বলছি, মাটি থেকে ওঠ। এমন সিন ক্রিয়েট করছিস কেন? এমন চিপ ইয়ারকি মারবি না।’
গুন্ডা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ত্রয়ণ আর তা বলতে দিল না। বরং গম্ভীর গলায় বলল, ‘গুন্ডা তুই চুপ কর। ছ্যাবলামি করিস না। শোনো তোমরা, হাবড়া খুব একটা দূরে নয়। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে দেড় ঘণ্টার মতো। সকালে যাবে, বিকেলে চলে আসবে। কলকাতার বাইরের কথাও তো ভাবতে হবে তোমাদের। শুধু কলকাতা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়। এই যে দিঘি তুমি গরম কমছে না বলছিলে, আমাদের এই ডেমনস্ট্রেশনটা গাছ কাটার বিরুদ্ধে। ন্যাশনাল হাইওয়েকে চওড়া করার জন্য দু’পাশের মোটা মোটা গাছ কাটা হবে। এটা বন্ধ করা জরুরি। বহু বহু দিন ধরে তিল তিল করে ওই গাছগুলো বেড়েছে। আর কিছু দালাল টাইপের লোক, উন্নয়নের নামে দামি দামি গাছ কেটে পকেট ভরবে, তা হতে দেওয়া যায় না! তোমরা এসো। আসল পশ্চিমবঙ্গকে সামনে থেকে দেখো। কতগুলো শপিং মল, ফ্লাইওভার আর ফাস্টফুড সেন্টার দিয়ে কিন্তু আসল পশ্চিমবঙ্গ তৈরি নয়। আসল পশ্চিমবঙ্গ আরও অনেক জটিল, কঠিন এক জায়গা। যেখানে প্রতিদিন মানুষকে রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। কলেজ স্কোয়্যারের থেকে বেরিয়ে এবার আসল পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানোর সময় এল। বুঝেছ?’
ত্রয়ণের কথা শেষ হওয়ার পর গুন্ডা গর্ব গর্ব চোখ নিয়ে তাকাল সবার দিকে। একটু সময় দিল কথাগুলোকে ওদের মাথার ভেতরে ঘুরতে দেওয়ার। মনের ভেতর নামতে দেওয়ার। তারপর বলল, ‘তো, যাবি তো তোরা?’
‘কোথায় রে?’ হঠাৎ পাশের ছোট গেট দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে উদয় হল আর্য, ‘কোথায় যেতে হবে রে গুন্ডা?’
গুন্ডা নির্লিপ্ত মুখে আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সামনের মাঘে দিঘির বিয়ে। তাই সবাইকে জিজ্ঞেস করছিলাম কনেযাত্রী যাবে কিনা! তা, তুই যাবি তো আর্য?’
‘কী?’ আর্যর ক্লান্ত ফরসা মুখটা আরও লাল হয়ে উঠল। ও দিঘির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলছে ওরা? তোমার বিয়ে? আঠারো বছর বয়সে বিয়ে? মানে?’
দিঘিকে কিছু বলতে না দিয়ে গুন্ডা বলল, ‘হ্যাঁ, কিগানের সঙ্গে ওর বিয়ে। আর আমরা কনেযাত্রী। তুই যাবি না?’
‘কী?’ আর্য ওর পিঠের ব্যাগটা একটা ঝটকায় খুলে ফেলল।
‘আঃ গুন্ডা।’ দিঘি ধমক দিল এবার। গুন্ডার মুখে কোনও ট্যাক্স নেই। ত্রয়ণ বাইরের লোক। তার সামনে এসব কথা বলছে! দিঘি একবার চট করে ত্রয়ণকে দেখে নিল। নাঃ, শোনেনি! এই বালখিল্য ব্যাপার স্যাপার না দেখে একটু সরে গিয়ে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। ভাগ্যিস! না হলে এসব শুনে ফেলত। কী ভাবত কে জানে!
আর্য এবার সরু চোখ করে গুন্ডাকে দেখল। তারপর আচমকা লাথি চালাল, ‘শালা, জলহস্তীর বাচ্চা, একদম ভাট বকবি না। শোন, দিঘির কনেযাত্রী যাবি তোরা, কিন্তু সেটা আমাদের বাড়িতে। কোনও বুড়ো পার্ভাটের বাড়িতে নয়। বুঝেছিস?’
পনেরো বছরের বড়। তার মানে কি বুড়ো? দিঘির এই ‘বুড়ো’ শব্দটা খট করে কানে লাগল। ওর মনে পড়ে গেল, কিগানও ওকে এমন বলেছিল না?
ফোনটা শেষ করে ত্রয়ণ এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, আমি তা হলে এখন আসি। শোনো, আমি যা বলার বললাম। তোমরা নাগরিক হিসেবে ঠিক করবে, কী করা উচিত। কেমন?’
ত্রয়ণ চলে গেলে আর্য বলল, ‘এই গম্ভীর ধরনের লোকটা কে রে? মনে হচ্ছিল খুব কঠিন কিছু বলছিল!’
গুন্ডা বলল, ‘এই ব্যাপারটা তুই ঠিক বুঝবি না। হিউম্যানিটিজের ব্যাপার তো। তোর মতো মিস্ত্রি বুঝবে না।’
‘মিস্ত্রি মানে?’
‘আরে ইঞ্জিনিয়ার আর মিস্ত্রি মানে এক।’ গুন্ডা খিকখিক করে হাসল।
দিঘির ভাল লাগছে না এসব কথাবার্তা। দিদি এলে বেঁচে যায় ও। আজ বাড়িতে যাবে দিদি। মা রাতে খেতে বলেছে দিদিকে। বাবার একটা ভাল প্রোমোশন হয়েছে। তাই সেলিব্রেট করা হবে।
দিঘি মোবাইলটা বের করল পকেট থেকে। দিদিকে একটা ফোন করতে হবে। কাজে থাকলে দিদির হুঁশ থাকে না। এদিকে মা যখন নেমন্তন্ন করেছিল, তখন বলেছিল যে, বিকেল বিকেল পৌঁছে যাবে। এখনই পাঁচটা বাজে। আর কখন আসবে দিদি?
ফোনটা করতে গিয়েও করতে পারল না দিঘি। আর্য গুন্ডার সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করে বসল দিঘির পাশে। বলল, ‘বলো না, কোথায় যাবে তোমরা?’
‘আরে ওই ত্রয়ণ বলে যে-লোকটা এসেছিল, সে আমাদের যেতে বলেছে একটা ডেমনস্ট্রেশনে। “হেল্প আর্থ” বলে একটা সংস্থা আছে। তারা গাছ কাটার বিরুদ্ধে নামবে পথে। তাই আমাদেরও হাবড়ায় গিয়ে যোগ দিতে বলল ওদের কাজে।’
‘ডেমনস্ট্রেশন?’ আর্য তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ‘সে তো খুব ঝামেলার ব্যাপার।
‘কেন, ঝামেলা কেন?’ দিঘি অবাক হল।
‘বোকার মতো প্রশ্ন কোরো না। ডেমনস্ট্রেশন মানে গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে যাওয়া। সেখানে পুলিশ থাকবে। ভুলভাল লোকজন থাকবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস। সেখানে যাবে তুমি? পাগল নাকি? রোম্যান্টিসিজমের একটা মাত্রা থাকবে তো! এ তোমার ওই কথায় কথায় মোমবাতি জ্বালিয়ে ‘রং দে বাসন্তী’-র মতো মার্চ নয়। তা ছাড়া কলকাতা থেকে অত দূরে গিয়ে, জানাশোনা নেই কীসব সংস্থা, তাদের হয়ে গলা ফাটাবে কেন?’
‘ওরে বাবা।’ গুন্ডা অবাক হয়ে তাকাল আর্যর দিকে, ‘তুই তো ফাটিয়ে দিলি একদম। দিঘি তোর সম্পত্তি নাকি যে, এমন করে টার্মস ঠিক করে দিচ্ছিস?’ কথাটা শেষ করে গুন্ডা খুচ করে চোখ টিপল দিঘিকে লক্ষ্য করে।
দিঘি বুঝল আর্যকে তাতানোর জন্য এমন গলা কাঁপিয়ে একটু যাত্রা করে নিল গুন্ডা। আসলে আর্য এসব বোঝে না। সেন্স অফ হিউমার ব্যাপারটাই ওর নেই। সবসময় শুধু পড়া, কেরিয়ার আর দিঘি। এর বাইরে ও কিচ্ছু ভাবে না। এই ক’দিনেই আর্যকে বড্ড ক্লান্তিকর লাগে দিঘির। মনে হয় এ কোন ছেলের সঙ্গে ভাব করল? ভাবে, সত্যিই ভাব আছে তো? কারণ, আর্যর জন্য ওর মনে বিশেষ জায়গা থাকলে কেন সেই পনেরো বছরের বড় মানুষটাকে ভুলতে পারে না ও? কেন ভুলতে পারে না তার গিটারকে? তার এলোমেলো চুলকে? কেন বারবার মনে পড়ে ওই নীল দুটো চোখ?
আর্য গুন্ডার চোখ টেপাটা খেয়াল করেনি। ও তড়বড় করে উঠল আবার ঝগড়া করবে বলে, কিন্তু তার আগেই দিঘির হাতের মোবাইলটা বেজে উঠল।
‘হ্যালো, দিদি? কোথায় তুই?’
মহুল বলল, ‘আমি বেনিয়াটোলা লেনের ক্রসিং-এর সামনে ওয়েট করছি। তাড়াতাড়ি আয় তোরা। দেরি করিস না কিন্তু। রাস্তাটা সরু। এখানে গাড়ি পার্ক করা কিন্তু খুব অশান্তির কাজ। বুঝলি?’
বাঁচা গেল। মনে মনে ভাবল দিঘি। ভাগ্যিস দিদি ফোন করে ডাকল, না হলে আর্য আরও গার্জেনগিরি ফলাত। এসব ক্রমশ অসহ্য লাগছে দিঘির। মনে হচ্ছে একটা ফাঁস ক্রমশ চেপে বসছে ওর গলায়। আর্য বড্ড রুটিন যেন। বড্ড সিরিয়াস। স্বার্থপর। ইঞ্জিনিয়ারিং করে ও ম্যানেজমেন্ট করতে বিদেশে যাবে। ওর ইচ্ছে তার আগে দিঘির সঙ্গে এনগেজমেন্ট করে রাখবে। দিঘির এসব বিরক্ত লাগে। কত বয়স যে, এখনই বিয়ে বিয়ে করে পাগল করে? সবসময় একটা বেঁধে রাখার প্রবণতা। আটকে রাখার প্রবণতা। যেন জোর করে আটকে রাখলেই মানুষ আটকে থাকে। ইস, কী যে ভুল হয়েছিল মাথা গরম করে সুবর্ণর কাছে ওই সব কথা বলে! ব্যাটা সব লাগিয়ে দিয়েছে। আর তার ফলেই তো… মনটা তেতো হয়ে গেল দিঘির।
‘কী রে দিঘি? আবার সমাধিস্থ হয়ে গেলি নাকি? মাইরি এত চাপ নিস কেন তুই? আজকাল প্রায়ই দেখছি কেমন হয়ে যাচ্ছিস। কী রে আশ্রম ফাশ্রম খুলবি নাকি?’ গুন্ডা হিঃ হিঃ করে হাসল।
দিঘি উঠল, ‘চল, দিদি এসে গেছে। আর লেট করা যাবে না। মেন রোডের ওপর গাড়িতে অপেক্ষা করছে।’
জয় আর স্নেহাকে নেমন্তন্ন করেছিল দিঘি। কিন্তু কাজ আছে বলে ওরা যাবে না। রূপ বলেছিল যে, সন্ধে নাগাদ ও পৌঁছে যাবে বাড়িতে। গুন্ডা তো যাবেই। আর সেটাও দিঘির সঙ্গে।
পাড়ায় সুবর্ণকে নেমন্তন্ন করেছে মা। আর কাউকে বলেনি। আসলে কিগান আর দিঘিকে নিয়ে যে-গন্ডগোলটা হয়েছে সেটা স্পষ্টভাবে পাড়ায় কেউ না জানলেও কাজের লোকদের মুখে মুখে দু’-এক লাইন খবর পৌঁছেছে এর-ওর কানে। সুবর্ণ ব্যাপারটা পাঁচকান করেনি। কিগানের কাকাও যা বলার কিগানকেই বলেছে, আর কাউকে বিশেষ জড়ায়নি এর ভেতরে। তবু, আজকাল পাড়ায় ঢুকলেই অস্বস্তি লাগে দিঘির। কেউ না তাকালেও মনে হয় জোড়ায় জোড়ায় চোখ লক্ষ করছে ওকে। মনে হয় ভূতুড়ে মানুষজন নিশ্বাস ফেলছে ওর ঘাড়ের কাছে।
গুন্ডা বলল, ‘আবার স্ট্যাচু হয়ে গেছে! কী কেস বল তো দিঘি? মাদাম তুসোয় ভরতি করে দেব? চল না। সেই আধঘণ্টা থেকে না খেয়ে, না খেয়ে কেমন রোগা হয়ে গেলাম দেখছিস না? আচ্ছা, এখন গেলে মোগলাই পরোটা ফরোটা খাওয়াবে নিশ্চয়ই?’
‘তুইও যাবি?’ আর্য রাগ রাগ চোখে তাকাল গুন্ডার দিকে।
‘হ্যাঁ, যাব। কাকিমা নিজে আমায় ফোন করেছিল। তোর আপত্তি আছে?’
আর্য পিঠে ব্যাগটা নিয়ে বলল, ‘তুই সামনে দিদির সঙ্গে বসবি। আমি আর দিঘি পিছনে বসব।’
‘খুব শখ না? সামনে দিদি, তবু পিছনে বসে অসভ্যতা করার ইচ্ছে!’
‘চল তো,’ দিঘি এবার ধমক দিয়ে গেটের দিকে হাঁটা দিল।
পিছন পিছন যেতে যেতে গুন্ডা বলল, ‘আর্য, মাইরি তুই এমন করিস না যেন আমি তোর পয়সায় খাচ্ছি। দেখ, গরিব ব্রাহ্মণ সন্তান আমি। পইতে ছিঁড়ে গেছে, তবু ইমাজিনারি পইতে হাতে নিয়ে এই তোকে অভিশাপ দিচ্ছি যে, তুই যা চাস তা কোনওদিন পাবি না। দিঘি কেন, কোনও নালাও তোর জুটবে না।’
‘ব্রাহ্মণ সন্তান মানে! তুই আবার ব্রাহ্মণ হলি কবে থেকে রে?’ আর্য খেঁকিয়ে উঠল।
সূর্যটা খসে পড়ে গেছে আকাশ থেকে। তার জায়গায় ছাই মাখা নীল প্লাস্টিক কে যেন ভাসিয়ে দিয়েছে মাথার ওপর। পৃথিবীর সমস্ত বাস ট্রাম আর ট্যাক্সি বোধহয় প্রেসিডেন্সি কলেজের এই সামনেটায় এসে জড়ো হয় শেষ বিকেলে। আর তাদের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রয়েছে ভ্যান, ঠেলা আর প্রচুর উৎকট সবুজ রঙের অটো। গোটা শহরটার রাস্তাই যেন জিগ’স পাজল। সবাই যেন টুকরোগুলো সাজিয়ে নিজের মতো তৈরি করতে চাইছে শহরটাকে। কিন্তু পারছে না। উলটে জট পাকিয়ে দিচ্ছে আরও।
শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটকে বাঁদিকে রেখে দিঘি সোজা হাঁটা দিল। ভিড়ের মধ্যে এগোনো যথেষ্ট কঠিন। তবু চেষ্টায় যে সব কিছু হয় তা ওরা বুঝতে পারল, যখন বড় রাস্তায় এসে উলটোদিকের ফুটপাথে দেখল ইলেকট্রিক ব্লু রঙের ছোট্ট গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়ির কাচ তোলা। দিঘি বুঝল এসি চলছে। দিদির ডাস্টস্মোকে সমস্যা হয়। তাই গাড়িতে সবসময় এসি চলে। ও দেখল গাড়ির স্টিয়ারিং-এর ওপর দু’হাত দিয়ে তাল ঠুকে অল্প মাথা নাড়ছে মহুল। গান শুনছে। মনটা তা হলে ভালই আছে। যাক, বাড়িতে গিয়ে তা হলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সামান্য কারণ নিয়ে ঝামেলা করবে না।
‘হাই দিদি,’ গাড়ির কাচে ঠকঠক করল দিঘি।
মহুল হেসে গাড়ির চাবিটা ঘোরাল। খটখট শব্দে লকগুলো খুলে গেল। মহুল আর্যকে বলল, ‘এই আমার পাশে বস। আর দিঘির সঙ্গে গুন্ডা পিছনে বসবে।’
‘সামনে বসব!’ আর্যর মুখটা শুকিয়ে গেল।
‘হ্যাঁ। আমি কি দিঘির চেয়ে কম সুন্দরী? তা ছাড়া একটা সুন্দর ছেলে আমার পাশে বসলে গাড়ি চালাতে আরও ভাল লাগবে। চল, ওঠ।’
আর্য ব্যাজার মুখে গাড়ির সামনে বসল। পিছনে দিঘির পর সারা গাড়ি কাঁপিয়ে গুন্ডাও উঠল। আর্য শুধু গায়ের জ্বালা মেটাতে বলল, ‘পুলিশ তোমায় ফাইন করবে মহুলদি। প্রাইভেট গাড়িতে লরির মাল তুলছ তো। এক্সট্রা ওজনের জন্য চার্জ নেবে।’
গুন্ডা হইহই করে বলল, ‘তাও যদি পুলিশ জানত আসল মালটা কে!’
কলেজ স্ট্রিট থেকে সুকিয়া স্ট্রিট একটুখানি রাস্তা। কোনও কোনও দিন দিঘি হেঁটেই ফেরে, কিন্তু আজ মহুলের সঙ্গে যাবে বলেই অপেক্ষা করছিল। দিঘি গাড়িতে উঠে বুঝল যে, হাঁটাই সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই জ্যাম, জট কাটিয়ে এগোয় কার সাধ্য! তাও বলতে হবে মহুলের হাত খুব ভাল। এই ক’মাসেই একদম পাকা ড্রাইভার হয়ে উঠেছে। তবু ঠোক্কর খেতে বিচ্ছিরি লাগছে দিঘির। জানলা দিয়ে বাইরের কলকাতাটাকে কেমন যেন কালো আর নোংরা লাগছে। হলুদ, জন্ডিস রোগীর চোখের মতো আলো। ফুটপাথে প্লাস্টিকের তৈরি রোগা রোগা মানুষজন। উপচে পড়া ময়লা। টেরা-বাঁকা চায়ের দোকান। ক্লান্ত দোকানি। শীতের আমেজ-বঞ্চিত একটা শহর। দিঘির খুব বাজে লাগছে। হঠাৎই বাজে লাগছে। পুরনো একটা হিন্দি গান খুব আস্তে চালিয়েছে দিদি। খুব মনখারাপ করা একটা সুর। কথাগুলো কিছু মাথায় ঢুকছে না দিঘির। শুধু মনখারাপ করা সুরটা কী করে যেন লেপটে যাচ্ছে ঘষা কাচের মতো কলকাতার সঙ্গে।
‘হ্যাঁরে দিঘি, ওই মর্কটটা তোকে ফোন করে আর?’ আচমকাই প্রশ্নটা করল মহুল।
‘মর্কট, মানে?’ একটু হকচকিয়ে গেল দিঘি।
‘কে বুঝতে পারছিস না? পৃথিবীতে মর্কট তো একটাই আছে। ওই মিথ্যেবাদী, জাল, জোচ্চোর-তোর শমীদা।’
দিঘি ঠোঁট কামড়াল। দিদির কাণ্ডজ্ঞান নেই একদম। সবার সামনে বাড়ির ঝামেলা এমনভাবে হাট করার মানে আছে কোনও? যদিও বন্ধুরা সবই জানে। তবু, সবাই সব কিছু জানলে কি আর সবার সামনে বলতে আছে? এটাই দিদি বোঝে না। মাঝে মাঝে খুব এমব্যারাসিং লাগে দিঘির। ও আড়চোখে দেখল এতক্ষণ গানের তালে মাথা নাড়ানো গুন্ডা, এই প্রসঙ্গটা উঠতেই জানলা দিয়ে যেন বাইরের প্যারিস শহর দেখতে লাগল!
‘কী রে বললি না, মালটা আর ফোন করে?’
‘না, শমীদা কলকাতায় নেই। সিঙ্গাপুর গেছে। কাদের সঙ্গে যেন মোল্ডেড উডের ফার্নিচারের জন্য কোলাবোরেশন করবে। প্রায় পনেরো দিন থাকবে।’
‘মোল্ডেড উডের ফার্নিচার!’ মহুলের গলায় একটা অদ্ভুত বিস্ময় দেখতে পেল দিঘি।
মহুল আবার বলল, ‘গেছে তো বাপের পয়সায়। একটা ফ্রড, মিথ্যেবাদী! আমায় সেদিন বলল প্রপোজালটার একটা ড্রাফ্ট ওকে দিতে। ও ওর বাবাকে দেখাবে। কিন্তু করল কিছু? সেই আগস্টে ওর জন্মদিনের থেকে এখন নভেম্বরের প্রায় শেষ। বলে কিনা ওর কাছে ফিরে যেতে। কে যাবে ফিরে অমন একটা মিথ্যেবাদীর কাছে? রাতের পর রাত শুধু ওর দাপাদাপি সহ্য করার জন্য? এর চেয়ে কনভ অনেক ভাল ছিল। এখন ভাবছি ওকে পাত্তা দিলেই হত। কিন্তু তারও তো উপায় নেই। সেও তো বিদেশে পালিয়েছে।’
‘দিদি!’ দিঘি রাগের গলায় বলল, ‘শোন, বাজে কথা রাখ। তোকে ছাড়া শমীদা কষ্টে থাকে। তাই তোকে ওর কাছে গিয়ে থাকতে বলে। সেদিন রেস্তরাঁয় তোকে সত্যিই বলেছিল। কিন্তু শমীদার বাবা দু’মাস হল লন্ডনে গেছেন। নিজের কাছে তোকে নিতে চায় বলেই শমীদা চেষ্টা করে। কিন্তু হয়তো পারে না। তা বলে এমন করে বলিস না। সবাই তো আর ভালবাসা এক্সপ্রেস করতে পারে না। কেউ হয়তো শমীদার মতো করে। আবার কেউ হয়তো অন্যভাবে করে। হয়তো চুপ করে…’
নিজেকে অনেক কষ্টে সামলাল দিঘি। কীসব বলে ফেলছিল ও! আজকাল এই হচ্ছে বিপদ। সব কথাই কেমন যেন বেঁকে যাচ্ছে দিঘির। আর চলে যাচ্ছে সেই এক লক্ষ্যে!
‘কিন্তু আমি অমন নই। আমি দিঘিকে ভালবাসি আর খোলাখুলি বলি, না?’ আর্য পিছন ঘুরে সামনের দুটো সিটের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিঘির হাত দুটো ধরার চেষ্টা করল।
‘আবার আলু… মানে ইয়ে শুরু করেছিস?’ গুন্ডা মহুলের কথা ভেবেই নিজেকে সংযত করে নিল।
ঝগড়াটা আরও বাড়ত। যদি না বাড়িতে পৌঁছে যেত ওরা। মহুল গাড়িটা পার্ক করে, নেমে বলল, ‘বাকি ঝগড়াটা বাড়িতে গিয়ে হবে। আর আর্য যখন তখন আমার বোনের গায়ে হাত দিয়ে আলুবাজি করবি না, বুঝেছিস?’
আর্যর থতমত মুখের ওপর সারা শরীর কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠল গুন্ডা।
আর্যর মুখটা দেখে কষ্ট হল দিঘির। ও ধমক দিল গুন্ডাকে, ‘আঃ, থামবি তুই? দশেরার রাবণের মতো লাগছে। চল ঘরে।’
দু’পা এগিয়ে ওদের বাড়ির সিঁড়িতে উঠতে গিয়েও থমকে গেল মহুল, দিঘি আর বাকিরা। মহুল বলে উঠল, ‘আরে আদি! আজ বিকেলে হঠাৎ পাড়ায়?’
দিঘি ঘুরে দেখল আদিত্যকে। ওর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ক্ষণিকের জন্য মনে হল তা হলে সেও কি… না, তা কী করে সম্ভব? সে তো চলে গেছে পাড়া থেকে। কোথায় গেছে কে জানে!
আদি চিরকালীন গম্ভীর। আজ যেন আরও গম্ভীর লাগল। বলল, ‘এমনি। কিছু বলবে?’
মহুল অপ্রস্তুত হল সামান্য। তবু স্মার্টনেস দেখিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, তোর সেই পিডোফিল দাদাটি কই?’
‘মানে?’ আদির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল হঠাৎ, ‘দাদাভাই পিডোফিল নয়, বাজে কথা বোলো না মহুল।’
‘তাই?’ আদির এমন মুখটা দেখেই বোধহয় একটু থমকে গেল মহুল। তারপর লাইট করার জন্য বলল, ‘আরে জাস্ট পুলিং ইয়োর লেগ্স। তা কোথায় কিগানদা?’
আদি চোয়াল শক্ত করে দিঘির দিকে তাকাল একবার। তারপর অনিচ্ছার সঙ্গে বলল, ‘জানি না। দাদাভাই কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না আর।’
কলকাতা একটা ঘষা কাচের শহর। এখানে প্লাস্টিকের মানুষজন থাকে। ময়লা পাতিলেবুর মতো চাঁদ ওঠে এখানকার আকাশে, উত্তর থেকে আঁশটে গন্ধ নিয়ে আসে শীতের না-আসা হাওয়া। এখানে এ ওর গায়ের মাংস খুঁজতে বের হয় মানুষের মতো দেখতে জন্তুরা। বড় বড় ঠোঁট ঝুলিয়ে ব্রিজের মাথায় বসে থাকে চিল। এখানে বকুল ফুলের থেকে মরা ইঁদুরের গন্ধ আসে। দিঘি জানে এখানের ওই দোতলার দক্ষিণের জানলায় আর আলো জ্বলে না। মাস্কের মন-কেমন করা গন্ধ আর আসে না এ পাড়ায়।
দিঘি জানে ওর কাছ থেকে সারা জীবনের মতো চলে গেছে কিগান।
Chapter - 9
৯
পিঠের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে একবার ঘড়িটা দেখল আদি। প্রায় সওয়া পাঁচটা বাজে। গাড়ি এখনও এল না। এই ড্রাইভারটা নতুন। সপ্তাহখানেক হল জয়েন করেছে ওদের কোম্পানিতে। এমনিতে ছেলেটা ভালই। কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন যেন হয়ে যায়। নাম মল্লার। চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়স। গোবেচারা ধরনের। গোল মুখ। ফরসা। একটা ভালমানুষ ব্যাপার আছে চেহারায়। আর বই পড়ে খুব। তাও ইংরেজি বই-ই বেশি।
এ মাস থেকে একটা গাড়ি দেওয়া হয়েছে আদিকে। অবশ্য শুধু আদিকেই নয়, মালিনীকেও। আর সেই গাড়িটাই চালায় মল্লার।
আজ ওদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের থার্ড প্লেস নির্ধারণ ম্যাচ ছিল। ম্যাচটা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার টিমটা জিতে গেছে। ভাল খেলাই হয়েছে। চিফ গেস্ট হিসেবে বাংলার একজন প্রাক্তন রঞ্জি ক্রিকেটারকে আনা হয়েছিল। তিনি যে-গাড়িটায় এসেছিলেন, সেটা ব্রেক ডাউন হয়ে গেছে। তাই অন্য কোনও গাড়ি না থাকায় আদি মল্লারকে গাড়ি দিয়ে পাঠিয়েছে ভদ্রলোককে বাড়িতে পৌঁছে দিতে। তাও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। কোথায় গেল ছেলেটা? বিরক্ত লাগছে আদির। আজ এরপর দুটো কাজ আছে। গৌরের গুরুসদয় রোডের বাড়িতে যেতে হবে আর তারপর সেখান থেকে যেতে হবে দমদম এয়ারপোর্টে। পরশু ওদের এই টোয়েন্টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের ফাইনাল। সেখানে প্রাইজ দিতে মুম্বইয়ের একজন স্টার আসবেন।
এই নায়কটি নতুন। এখনও এর স্টারগিরির সামনে ‘সুপার’ শব্দটি বসেনি। কলকাতায় এই ছেলেটির শুটিং আছে। তার ফাঁকে প্রাইজ দিয়ে যাবে। আজ গৌর বলে দিয়েছে যে, আদি আর মালিনী যেন ওকে রিসিভ করে এয়ারপোর্ট থেকে। তারপর যেন হোটেল অবধি দিয়ে আসে। ফলে কাজ আছে আদির। কিন্তু মল্লার যদি বুঝত! নতুন ছেলেদের নিয়ে এই এক প্রবলেম। তারা কাজের গুরুত্ব বোঝে না।
আদির মনটা একটু খিঁচড়ে আছে। অকারণে রাগ করতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে মল্লারকে ধরে আচ্ছা করে পেটায়। ও আসছে না বলেই তো এখান থেকে বেরোতে পারছে না। যেতে পারছে না পরের কাজে। ও আসছে না বলেই তো মালিনী এখনও ওই দূরে দাঁড়িয়ে অপদার্থটার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে!
ব্যাড, ভেরি ব্যাড। মনে মনে একটা গালাগালি দিল আদি। মেয়েটাকে কত বোঝায়, এমন করে যার তার সঙ্গে কথা বলতে নেই। কিন্তু কিছুতেই বোঝে না মালিনী। বলে, ‘অত বাছাবাছি করে আমি মিশি না। যাকে আমার ভাল মনে হয়, তার সঙ্গেই কথা বলি। বুঝেছ?’
বুঝেছে। মালিনী সিংহ কেমন মেয়ে তা এই ক’মাসে যথেষ্ট বুঝেছে আদি। প্রথম দর্শনে যে কোনও মেয়ে এখনকার আদিকে এমন নাড়িয়ে দিতে পারে, তা আদি ভাবতেও পারেনি। স্যামের চেম্বারে মালিনীকে দেখে একদম বোবা হয়ে গিয়েছিল আদি। নিজের সেই ভিতু পনেরো বছরে ফিরে গিয়েছিল যেন। হাঁটু কাঁপছিল ওর। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
সেদিন স্যামের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর স্যামের সেক্রেটারি রায়না বলেছিল, ‘লুক আউট ব্যানার্জি। ডোন্ট ট্রাই ইয়োর ট্রিক্স।’
ট্রিক্স? না, সেসব তো মাথাতেও আসেনি আদির। সত্যি মাথায় আসেনি। যে-আদি পছন্দসই মেয়ে দেখলেই তাকে জামাকাপড় ছাড়া কেমন লাগবে বিছানায় চিন্তা করে নিত, সে কিনা সেসব ভাবেইনি একদম! আর সেখানে রায়না বলছিল যে, ও যেন ওর ট্রিক্স না দেখায়! আশ্চর্য!
স্যামের চেম্বারের বাইরে মালিনীর সঙ্গে প্রথম কথা হয়েছিল টি-কাউন্টারের সামনে। না, আদি খুব একটা চা খায় না। কিন্তু সেদিন যেই দেখেছিল যে, মালিনী কাউন্টারের সামনে গিয়ে চা নিচ্ছে, ও-ও এগিয়ে গিয়েছিল।
‘হাই!’ মালিনীই প্রথম কথা বলেছিল।
‘হ্যালো।’ আদি নিজেই বুঝতে পারছিল যে, ওকে খুব বোকা বোকা লাগছে।
‘ইউ ওয়ান্ট মি টু পোর সাম টি ফর ইউ?’ মালিনী হেসে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘দ্যাট উইল বি নাইস।’
‘এখানের চা বেশ ভাল।’ মালিনী যেন কতকটা নিজের মনেই বলেছিল।
‘তা ঠিক।’ মাথা নেড়ে আদি ভাবছিল, কী বলা যায়, ‘তোমার বাংলা তো খুব ভাল। এত ভাল বাংলা শিখলে কোথায়?’
মালিনী হেসেছিল আবার। হালকা বাদামি চোখ, গভীর দুটো টোল আর চকচকে বিজ্ঞাপনের মতো দাঁত। আদি একটু বেশিক্ষণই তাকিয়ে ফেলেছিল।
মালিনী চোখে দুষ্টুমি এনে বলেছিল, ‘আমার মা বাঙালি। শান্তিনিকেতনে পড়েছেন। আমি নিজেও রবীন্দ্রসংগীত গাই। আমার বাবা সিকিমের লোক। তাই হয়তো আমায় দেখলে বোঝা যায় না। কেন, দ্য গ্রেট আদিত্য ব্যানার্জির হঠাৎ আমার অরিজিন নিয়ে চিন্তা কেন?’
‘মানে?’ আদি ভুরু কুঁচকেছিল।
মালিনী হেসেছিল, ‘তোমার যা সুখ্যাতি অফিসে! তুমি নাকি লেডি কিলার। রায়না ওয়াজ অল প্রেয়জ ফর ইউ। তাই বলছিলাম।’
‘ও,’ রাগ হয়েছিল আদির। মালিনীর কান ভাঙানো হয়ে গেছে তা হলে! রায়না তো হেভি খিটকেল। আচ্ছা, অমন ভারী বুক নিয়ে, বিপজ্জনক কাটের ড্রেস পরে আসার পরও যদি কোনও ছেলে সেই দিকে না তাকায়, তা হলে সে কি ছেলে? আর রায়নাকে কি কিছু বলেছে আদি? কিছু করেছে? তা হলে? তা হলে কেন ও মালিনীর কান ভাঙাতে গিয়েছে?
আদি দ্রুত চায়ে চুমুক দিয়ে চা-টা শেষ করে পেপার কাপটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে সরে এসেছিল কাউন্টার থেকে। মালিনী বুঝেছিল ব্যাপারটা। দ্রুত এসে দাঁড়িয়েছিল আদির সামনে। বলেছিল, ‘আরে তুমি তো রাগ করলে দেখছি! আই ওয়াজ জোকিং। দেখো তো, ইয়ারকি মারতে গিয়ে তোমার সঙ্গে প্রথমেই একটা বাজে সম্পর্ক হয়ে গেল!’
আদি তাকিয়েছিল মালিনীর দিকে। সুন্দর মুখটায় বিব্রত ভাব দেখতে ভাল লাগছিল না ওর। নিজের স্বভাববিরুদ্ধভাবে ও বলেছিল, ‘না না, ঠিক আছে। আসলে, নিজের সম্বন্ধে এমন কথা শুনতে কার ভাল লাগে বলো তো? তা ছাড়া রায়না এ কথা বলে কী করে? আমি কোনওদিন কিছু করেছি বা বলেছি ওকে? অমন ওয়র্কপ্লেস-এ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট যারা করে তারা ঘৃণ্য প্রাণী। আমি তাদের দলে নই।’
‘আরে আরে, ডোন্ট গেট এক্সাইটেড।’ মালিনী আলতো করে আদির কাঁধে হাত রেখেই সরিয়ে নিয়েছিল, ‘শোনো না, আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। লোকে যতই বলুক যে, কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে আমরা রাইভ্যাল, আমরা কিন্তু তা হব না। বরং অন দ্য কন্ট্রারি, উই উইল বি ফ্রেন্ডস। কেমন?’
কোনও সুন্দরী মেয়ে, যাকে তোমার পছন্দ, সে যদি এমন মসৃণভাবে তোমার সঙ্গে কথা বলে, ‘ফ্রেন্ডস’ বলে হাত বাড়ায়, তা হলে জেনো তোমার ভাগ্য হিন্দি ছবির হিরোর বন্ধুর মতো হবে। জেনো, শুরুর আগেই তোমার গল্প শেষ। এসব আদি খুব ভাল জানে। তাই মালিনীর বাড়ানো বন্ধুত্বের হাত দেখে মনের ভেতর দমকলের ঘণ্টা শুনেছিল ও। বুঝেছিল ‘বন্ধু’ বলে আদেখলার মতো হাতটা ধরলে আদির আর ভবিষ্যতে কোনও চান্স থাকবে না।
ও মালিনীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘হ্যাঁ, আমরা রাইভ্যাল নই, ঠিকই। কিন্তু ফ্রেন্ডস কিনা সেটা ভাবতে হবে। মালিনী, আমার খুব একটা বন্ধুর দরকার হয় না।’
‘কী রে শালা, এখনও যাসনি?’ আবেশের আচমকা গলায় ঘোরটা কাটল আদির।
‘কী বলছিস?’ আদি দেখল একটা প্যাকেট থেকে কিছু খেতে খেতে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আবেশ।
‘বলছি, এখনও যাসনি?’
‘না, এবার যাব। দেখ না, মল্লার গাড়িটা নিয়ে গেছে ওই ক্রিকেটার ভদ্রলোককে পৌঁছে দিতে কিন্তু এখনও ফিরছে না। এদিকে ব্যাটার মোবাইলও নেই যে, ধরব। নাঃ, অফিস থেকে ওকে একটা মোবাইলের বন্দোবস্ত করে দিতেই হবে।’ আদি কথা বলতে বলতে আবেশের ঘাড়ের ওপর দিয়ে পিছনে দাঁড়ানো মালিনীকে দেখল আবার। এখনও ওই অপদার্থটার সঙ্গে কথা বলেই যাচ্ছে। কী কথা আছে অমন একটা লুজারের সঙ্গে? তাও এতক্ষণ ধরে! বুকের ভেতর যে-কাঁকড়াবিছেটা এতক্ষণ হুল ফোটাবে বলে হুমকি দিচ্ছিল, সে এবার হুলটা ফুটিয়েই দিল।
আবেশ বলল, ‘শালা, তোরা এমন কিপটে না! দেখ, খাবারের যে-প্যাকেট করেছিস, তার সিঙাড়াটায় গন্ধ। এত বড় একটা কোম্পানি তোদের, সেখানে এমন জঘন্য খাবার মানুষকে কেউ দেয়?’
আদি বিরক্ত গলায় বলল, ‘ওই শালা রুহানটাকে সাউথ কলকাতার টিমে তোকে কে ঢোকাতে বলেছিল বল তো?’
আবেশ একটা মিষ্টির অর্ধেক কামড়াতে গিয়েও স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল আদির দিকে। তারপর খুব ধীরে ধীরে হাসি ফুটল ওর মুখে, ‘ওরে কাকা! এই কেস!’
‘মানে?’ আদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
আবেশ মিষ্টিটা পুরো মুখে ঢুকিয়ে বলল, ‘মানেটা কি তোকে ডিকশনারি দেখে বোঝাতে হবে? শোন, রুহানও তো আমার বন্ধু। ওর টাকার দরকার। ক্রিকেটটা ও একসময় ভাল খেলত। তাই ভাবলাম ওকে প্রস্তাব দিই। কেন, তোর ভাল লাগেনি? ও তোর বন্ধু নয়?’
‘দেখ। রুহান ইজ ফিনিশ্ড। প্রথম ম্যাচটাতে ঝুলিয়ে লাট করল। তারপর তো আর চান্সই পেল না। শুধু মাঠে আসে আর যায়। দেখ না, আজও এসেছে। খেলা নেই ওদের, তবু এসেছে। মালটা পুরো ফ্রাস্টেটেড, হি ইজ নট মাই ফ্রেন্ড এনি মোর।’
আবেশ খাওয়া শেষ করে কায়দা করে প্যাকেটটা একটু দূরে রাখা বিন-এ ফেলে বলল, ‘শালা, চিরকাল স্বার্থপর রয়ে গেলি! নিজেরটা ছাড়া আর কিছু বুঝিস না, না? মালিনীকে তোর ভাল লাগে আর সেই মেয়েটা রুহানের সঙ্গে গল্প করছে দেখে তোর জ্বলছে! মালিনীকে নতুন ছক করছিস নাকি? সাবধান কিন্তু। দেখিস, এ তোর ওইসব মেয়েদের মতো নয় কিন্তু।’
‘আঃ,’ বিরক্ত লাগল আদির, ‘সব সময় নোংরামো না তোর? আমি মোটেই ওভাবে দেখি না মালিনীকে। বাজে কথা বলবি না।’
‘তাই?’ আবেশ হাসল, ‘বিড়াল বলে, মাছ খাব না। শোন, রুহানকে তো চিনিস। আতাক্যালানে টাইপ। ওর যে প্রেমিকা ছিল না? সেই যে রে নন্দা। তাকেও শালা কোনওদিন কিছু করেনি। তাই হয়তো মেয়েটা ওকে লাথ মেরে বের করে দিয়েছিল জীবন থেকে। ওকে যখনই এই নিয়ে জিজ্ঞেস করি মালটা চুপ করে যায়। শোন না, তুই টেনশন করিস না। আর দেখ না, পরশুর ম্যাচটার পর কোথায় রুহান, কোথায় মালিনী। দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ইয়োর্স ব্রাদার।’
আদি কিছু না বলে শুধু শব্দ করল মুখ দিয়ে। হুঁঃ, পৃথিবী নাকি ওর?
আবেশ এবার কাছে এল আরও। চাপা গলায় বলল, ‘শোন না, একটা মেয়ে আছে। একটু গরিব বাড়ির। কিন্তু ভাল। মাসাজ পার্লারে কাজ করে। টাকার দরকার। প্রাইভেটেও মাসাজ করতে রাজি। তুই দেখবি একবার?’
আদি হাত দিয়ে আলতো ধাক্কায় সরিয়ে দিল আবেশকে, ‘সবসময় ফালতু কথা বলবি না। মটকা গরম আছে, মনে রাখিস এই কাজটা কিন্তু তুই আমার জন্যই পেয়েছিস। ফারদার নোংরামো করবি তো…’
আবেশ খিকখিক করে হাসল, ‘বাব্বা, কাকা যে পুরো খেপে গিয়ে লাল হয়ে গেছে! এর আগে এমন মেয়েদের সঙ্গে তোর যোগাযোগ করিয়ে দিইনি? যাক গে, তোর যখন ইচ্ছে নয় তখন বাদ দে। আর হ্যাঁ, মাইরি এই টুর্নামেন্ট তো শেষ। এরপর কী করব বল তো? ওই গৌর স্যারকে বলে আর একটা কিছু করে দে না ভাই, না হলে খুব বাজেভাবে কেস খেয়ে যাব। জানিসই তো, মামার বাড়িতে অমানুষ আমি। মামি মালটা খুব বিষাক্ত। ভাতের সঙ্গে এমন এমন খিস্তি দেয় না যে, আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। ভাই, এরপর কিছু একটা করে দিস প্লিজ।’
আদির অবাক লাগে মাঝে মাঝে। এ ছেলেটা সত্যিই খুব অদ্ভুত। গালাগালি করো, মারো, বকো, কিছুতেই রাগ করে না। ভুলভাল কাজের সঙ্গে সমানভাবে ইয়ারকি ফাজলামো করে যায়। কোনও কিছুতেই যেন গা করে না।
‘স্যার, এই যে, আমি এসে গেছি।’ এই ডিসেম্বরেও ঘেমে স্নান করে এসে মল্লার দাঁড়াল সামনে। আদি দেখেই বুঝল খুব নার্ভাস হয়ে আছে ছেলেটা। রীতিমতো টেনশনে কাঁপছে ও। ফরসা মুখটা লাল হয়ে আছে একদম। ভেতরে ভেতরে রাগ হলেও আদি এখন ওকে দেখে আর তেমন রাগ করতে পারল না। তবু, সাব-অর্ডিনেটদের চাপে রাখতে হয় সবসময়। কর্পোরেট জগতের এটাই হল প্রথম পাঠ।
আদি গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোমার এত দেরি হল কেন?’
‘সরি স্যার… আমি ইয়ে…’ মল্লার তোতলাতে লাগল ভীষণভাবে।
‘আমি কী? জানো না আমার কাজ আছে? ক’দিন হল কাজে জয়েন করেছ? এরই মধ্যে এসব শুরু করে দিয়েছ?’ আদি গলার স্বরটা রুক্ষ করল আরও।
‘আই সোয়্যার স্যার। আমি ইচ্ছে করে করিনি। পুলিশ ধরেছিল আমায়।’
‘পুলিশ?’ আদি অবাক হল।
‘আমার সিট বেল্ট বাঁধা ছিল না তাই… আমার লাইসেন্স রেখে দিয়েছে স্যার।’ মল্লার কাঁচুমাচু গলায় বলল।
‘এত বেখেয়াল কেন তুমি? আননেসেসারি আমার দেরি হয়ে গেল। গৌর স্যার জিজ্ঞেস করলে কি বলব যে, তুমি ইনএফিশিয়েন্ট বলে এমন হল?’ আদি গলার রুক্ষতা বজায় রেখে বলল।
‘না স্যার, প্লিজ স্যার এমন করবেন না। প্লিজ।’ মল্লার কেঁদে ফেলল প্রায়।
‘ঠিক আছে যাও। গাড়িতে গিয়ে বোসো।’
মল্লার মাথা নিচু করে চলে যাওয়াতে মনে মনে হাসল আদি। ছেলেটা খুব নার্ভাস। বকা খেলে আরও নার্ভাস হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে একটু বোকাও আছে। গৌর রওশান দিওয়ান ডাইরেক্টর। সে একটা ড্রাইভার কী করল না করল তা নিয়ে মাথা ঘামাবে? পাগল নাকি?
মল্লার চলে যেতে আবেশ অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এ কে রে? কোত্থেকে জোগাড় করেছিস? এ তো বার্নার্ড শ’! এমন ইংরেজি বলা ড্রাইভার বাপের জন্মে দেখিনি। ও গাড়ি চালাচ্ছে কেন?’
আদি বলল, ‘তা আমি জানব কেমন করে? নিশ্চয়ই কোনও গল্প আছে।’
‘তা জিজ্ঞেস করিসনি?’
‘অত কৌতূহল আমার নেই। ড্রাইভারের হাল হকিকত জিজ্ঞেস করব! একটা ক্লাস বলেও তো ব্যাপার আছে। নাকি?’
‘আরে, তোদের গাড়ি চালায়। ভদ্র, শিক্ষিত ছেলে, তাকে জিজ্ঞেস করলে দোষ কোথায়? ড্রাইভার বলে কি মানুষ নয়?’
‘ওসব ফালতু ভাষণ রাখ।’ আদি আর একবার দূরে তাকাল। এখনও কথা বলে যাচ্ছে ওরা! কী আশ্চর্য! মালিনী কেন করছে এমন?
আবেশ আর কথা বাড়াল না। বলল, ‘আমার ব্যাপারটা একটু মাথায় রাখিস। আবার কুকুর ধরতে যেতে পারব না ভাই। কেমন? ঠিক আছে, তোরা এগো। আমি কাটি।’
আবেশ চলে যেতেই মালিনীও এগিয়ে এল এবার। আর ওর সঙ্গে সঙ্গে এল রুহান। আদি চোয়াল শক্ত করল। এতক্ষণ খোশগল্প করেও শখ মেটেনি? আচ্ছা বেহায়া তো রুহানটা!
মালিনী কাছে আসতেই আদি কড়া গলায় বলল, ‘এতক্ষণ ওয়েট করছি! কী করছিলে কী? স্যার তো এবার আমায় ঝাড় দেবেন।’
মালিনী ওর টোল পড়া হাসিটা হাসল। বলল, ‘বাহ্ রে, তুমিই তো এতক্ষণ আবেশের সঙ্গে গল্প করছিলে দেখছিলাম। তাই তো আমি রুহানকে আমাদের ওল্ড এজ হোমটার কথা বলছিলাম। রুহান আমায় বলল যে, এবার থেকে ও-ও আমার সঙ্গে রোববার করে যাবে হোম-এ।’
আদি রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোদের ফাইনাল তো পরশুদিন। আজ কী করছিস এখানে? অফিস-কাছারি নেই? শুনলাম কোন একটা চাকরি পেয়েছিস নাকি? তা, চাকরি রাখার ইচ্ছে আছে তোর?’
রুহান এমন আচমকা আক্রমণে থতমত খেল সামান্য। তবু যথাসম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল, ‘না, আমার তো তেমন কাজ থাকে না। তাই, কাছেই বাড়ি বলে চলে আসি। তোকে মাঝেমধ্যে দেখি। কিন্তু এত ব্যস্ত থাকিস বলে কথা হয় না।’
মালিনী বলল, ‘আদি সব সময় ব্যস্ত। তবে সব ম্যাচে তো আর আসতে পারে না। আজ থার্ড পজিশনের খেলা বলে আমরা এসেছি।’
রুহান বলল, ‘সেই তো বলছি। তা কেমন আছিস রে আদি? কাকু-কাকিমা কেমন আছেন? বহুদিন খবর পাই না।’
‘কেন? খবর পাস না কেন? দাদাভাইয়ের সঙ্গে তো তোর যোগাযোগ ছিল।’
‘তা ছিল। তবে সেটাও প্রায় মাস চারেক হয়ে গেল। তুই জানিস কিগানদা কোথায় গেছে?’
‘কেন, তোর কাছে দাদাভাইয়ের মোবাইল নম্বর নেই? ফোন করে খবর নিতে পারিস না? সবসময় এমন প্রশ্ন করে, তুই যে কনসার্ন তা বোঝাতে চাস কেন? তোর এই ভড়ংবাজি অনেক দেখেছি। যারা দেখেনি তাদের দেখা।’ আদি গুলি করার মতো করে কথাগুলো বলে দিল।
রুহান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল শুধু।
মালিনী চট করে বলল, ‘ও কে রুহান, তোমার মোবাইল নম্বর তো নিয়ে নিলাম। শনিবার তোমায় ফোন করে রোববার কখন যাব সেটা ঠিক করে নেব, কেমন? তুমি কিন্তু রোববারটা ফ্রি রেখো। আমরা এবার আসি।’
প্রিয়া সিনেমার সামনে গাড়িটা রাখা ছিল। আদি আর মালিনীকে দেখে মল্লার চটপট দরজাটা খুলে দিল।
গাড়িটা ছোট হলেও নতুন। খুবই আরামদায়ক। প্রথমে মালিনী উঠে বসল। তারপর আদি উঠে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। মল্লারকে বলল, ‘গুরুসদয় দত্ত রোড চলো। স্যারের বাড়ি।’ তারপর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
সন্ধে হয়ে গেছে এখন। ছ’টার শোয়ের ভিড়ে থিকথিক করছে জায়গাটা। গাড়িটা এগিয়ে নিয়ে যেতে মল্লার বেগ পেল বেশ। তারপর মনোহরপুকুর দিয়ে হাজরা রোডের দিকে গাড়ি ছোটাল ও। আদি একবারও তাকাল না মালিনীর দিকে। ও বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। আর তার মাঝেই শুনল মালিনী ফোন বের করে ডায়াল করল। কারও সঙ্গে কথা বলবে। আদি আরও বিরক্ত হল। ও যে রাগ করেছে, সেটা কেন বুঝতে পারছে না মালিনী?
‘হ্যালো জিয়ানাদি, হাউ আর ইউ?’
মালিনীর গলায় নামটা শুনে নড়েচড়ে বসল আদি। আরে, জিয়ানা বোসের সঙ্গে মালিনীর কী কথা থাকতে পারে? প্রোজেকশন কর্পে, ভাল পদেই আছে জিয়ানা। তিরিশের ওপর বয়স ভদ্রমহিলার। সামান্য মোটার দিকে। দেখলে বোঝা যায় যে, এককালে বেশ সুন্দরী ছিল।
প্রোজেকশন কর্প, চাপাডাঙায় ওদের যে নতুন ফ্রুট জুস আর মিনারেল ওয়াটারের প্রোজেক্ট আসছে তার জন্য কোট করছে। তাই জিয়ানা ওদের অফিসে মাঝে মাঝেই আসে। একটা নামী কনসালটেন্সি ফার্মকে এই কাজটার টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট হিসেবে রেখেছে গৌর। কনসালটেন্সি ফার্মটার ঠিক করে দেওয়া টেকনিক্যাল লাইন ধরে সবাইকে কোট করতে হবে।
কাজটার জন্য সারা ভারত থেকে ছ’টা কোম্পানি এসেছে। তাদের মধ্যে জিয়ানা বোসদের প্রোজেকশন কর্পও রয়েছে। আসলে প্রোজেকশন কর্পের বেশ কিছু সিনিয়র সেল্স ইঞ্জিনিয়ার একসঙ্গে রিজাইন করে ওয়াটার বার্ড কোম্পানিতে জয়েন করেছে। এই ওয়াটার বার্ড চেন্নাইয়ের কোম্পানি। এখন ইস্টার্ন ইন্ডিয়ায় ব্যাবসা করতে চাইছে। জীবনদীপের কাছে অফিসও নিয়েছে ওরা। এই চাপাডাঙার কাজটা পাওয়ার চেষ্টা ওয়াটার বার্ডও করছে।
আদির কাছে সব পার্টিই সমান। ওর কাজ হল এইসব কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ নিয়ে যা কথাবার্তা হয়, তা যাতে মসৃণভাবে হয়, তা দেখা। মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন আর পারচেজের সঙ্গে এইসব পার্টির কোঅর্ডিনেশন বজায় রাখতে গিয়ে আদি সবসময় নিজেকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করে। ও জানে যে, এখানে এক্সট্রা টাকাপয়সা খাওয়ার জায়গা নেই। কারণ, ওর হাতে কিছুই নেই। তাই পক্ষপাতহীন অবস্থান নিতে ওর সুবিধে হয় খুব।
মালিনীরও তো তাই অবস্থান হওয়া উচিত। ওর তো জিয়ানাকে মিসেস বোস বলে একটা বিক্রিয়াহীন দূরত্বে রাখা উচিত। কিন্তু কাউকে এমনভাবে ফার্স্ট নেম-এ দিদি বলে ডাকাটা খুব অপেশাদারি হয়ে যাচ্ছে না? গৌর শুনলে কিন্তু বেশ রেগে যাবে!
আদি জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেও কানটা রাখল মালিনীর দিকে। ও শুনল, মালিনী সেই ওল্ড এজ হোম নিয়েই কথা বলছে। সামনের রোববার জিয়ানাকেও যেতে বলছে।
ভুরু কুঁচকে গেল আদির। মালিনী তো কোনওদিন আদিকে বলে না কিছু এই নিয়ে! কেন বলে না? আর এসব ওল্ড এজ হোম টোম করে কী হয়? যত সব ফালতু কাজকম্ম!
ফোনটা রেখে মালিনী ব্যাগ থেকে একটা চকোলেট বের করে আলতো খোঁচা দিল আদির হাতে, ‘খাবে?’
‘কী?’ আদি মুখ ফিরিয়ে বলল।
মালিনী বলল, ‘চকোলেট। খাও না?’
‘না।’ ছোট্ট করে জবাব দিল আদি।
‘কেন?’ মালিনী অবাক হল।
আদি দেখল বাঁ দিকে শিশুমঙ্গল হাসপাতাল আর তার সামনের সিগনালে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনে পিছনে অসংখ্য গাড়ির লাল-হলুদ আলো পিটপিট করছে। আদির এক মুহূর্তের জন্য মনে হল মানুষের চেয়ে কি এখন গাড়ির সংখ্যা বেশি এ শহরে? এত গাড়ি রাত হলে কোন সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ে? তখন তো রাস্তা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে একদম। আচ্ছা, অতিরিক্ত ব্যবহারের পর কি সব কিছুই এমন পরিত্যক্ত হয়ে যায়? তাই কি মালিনীদের ওল্ড এজ হোমের কথা বলতে হয়?
মালিনী আবার বলল, ‘কী হল? খাবে না?’
‘হঠাৎ? আমায় খেতে বলছ!’ আদি গোমড়া মুখে জিজ্ঞেস করল।
‘হঠাৎ নয়,’ মালিনী ওর বিপজ্জনক হাসিটা দিল, ‘আই হ্যাভ সামথিং টু আস্ক ইউ। আ ফেভার। করবে?’
‘তার জন্য চকোলেট দিতে হবে?’
‘না, রায়না বলেছে যে, তুমি নাকি ক্যাশ বা কাইন্ডসের প্রতি দুর্বল।’ মালিনী হাসিটা বাড়িয়ে দিল কয়েক ঘর।
‘মানে?’ আদি প্রায় ছিটকে গিয়ে ঘুরে বসল, ‘রায়না বলেছে যে, আমি ঘুষ খাই? তুমি জানো ও গৌর স্যারের সঙ্গে কখন কখন, কোথায় কোথায়…’
মালিনী আচমকা আদির হাতে চিমটি কেটে থামিয়ে দিল ওকে। আদি দেখল গাড়ির আবছা অন্ধকারের ভেতর মালিনী চোখ দিয়ে ইশারা করে সামনে বসা মল্লারকে দেখাল।
আদি সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল একদম। সত্যি রাগের মাথায় ও একটা ভুল করতে যাচ্ছিল। ও ঠোঁট কামড়ে বাইরের দিকে তাকাল আবার।
মালিনী বলল, ‘আমি কলকাতায় গ্র্যানির সঙ্গে থাকি। সি ইজ সিক। আই নিড টু অ্যাটেন্ড হার ফ্রম সেভেন ও’ক্লক। আমাদের সন্ধের আয়াটা আসবে না আজ। তাই বলছিলাম যে, গৌর স্যারের বাড়িতে যদি আমি না যাই, তুমি স্যারকে একটু ম্যানেজ করে নিতে পারবে না?’
‘তোমার গ্র্যানি অসুস্থ?’ কথাটা বলেই নিজের কানে খট করে লাগল আদির। একটু বেশি কনসার্ন দেখিয়ে ফেলছে কি?
‘হ্যাঁ। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সকালের আয়া আজ সাতটায় চলে যাবে। তাই বলছিলাম আর কী?’
‘ঠিক আছে,’ আদি বলল, ‘তা কোথায় নামাব তোমায়?’
‘একটু যদি কষ্ট করে বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে ড্রপ করে দাও।’ মালিনী দ্বিধার সঙ্গে বলল।
‘এতে কষ্টের কী আছে?’ আদি ঘুরে বসল, ‘বলো না তোমার বাড়ি অবধি দিয়ে আসব। কোনও অসুবিধে হবে না।’
‘না না,’ মালিনী যেন গুটিয়ে গেল একটু, ‘বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে ওই ধাবার সামনে নামিয়ে দিয়ো, তা হলেই হবে। আমি হেঁটে চলে যাব।’
‘ভয় পাচ্ছ?’ আদি সামান্য ব্যঙ্গের গলায় বলল, ‘তোমার বাড়ি চিনতে দেবে না? আমি যদি খারাপ কিছু করি, তাই না?’
‘না না,’ মালিনী অপ্রস্তুত হল, ‘আরে আমার বাড়ি ভিতর দিকে। তোমার ফালতু টাইম ওয়েস্ট হবে। স্যার রাগ করবেন। তার চেয়ে এই ভাল।’
আদি গম্ভীর গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। যেমন তোমার ইচ্ছে।’
বালিগঞ্জ ফাঁড়িটা এখান থেকে কাছে। কিন্তু সেখানেও প্রচুর জ্যাম। এই সন্ধের দিকে কি হঠাৎ করে গাড়ি বেড়ে যায় বাইরে? এই রাস্তার মোড়টা কাটাকুটির মতো। প্রচুর গাড়ি। প্রচুর হর্ন। তার আলো, হইচই, সব মিলিয়ে মানুষের নিজেরই হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। মালিনী সিগনালে গাড়ি থামামাত্র নেমে ওই পাঁচমিশেলি ভিড়ে মিলিয়ে গেল। আদি অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটা পিছনে ফিরে তাকাল না পর্যন্ত!
বুকের ভেতরে কে যেন খুব জোরে গিট বাঁধল একটা। আদির অবিকল সেই যাজ্ঞসেনী আইয়ারের সময়কার মতো মনে হল নিজেকে। বহু বহু দিন পরে আবার তেমন কষ্ট হল ওর। মনে হল পৃথিবীর কেউ ওর কথা চিন্তা করে না।
প্রয়োজন নেই। চিন্তা করার প্রয়োজন নেই একদম। আদি দাঁত চেপে সংযত করল নিজেকে। মেয়েরা চিরকাল এমন হয়। নিষ্ঠুর একটা ফাঁদের মতো, ভেঙে যাওয়া বৃষ্টির স্বপ্নের মতো, হারিয়ে যাওয়া রুবিগুলির মতো। মেয়েরা কোনওদিন নিজেদের বাদ দিয়ে কিচ্ছু দেখতে পায় না। আদি অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে এখন। শীত শীত করছে আদির। সকালে তেমন ঠান্ডা ছিল না বলে স্রেফ একটা ফুলহাতা শার্ট পরে বেরিয়েছিল। কিন্তু এখন ঠান্ডা লাগছে অল্প। ও রাস্তার পাশের বড় বড় গাছগুলো দেখল। নেড়া। কঙ্কালের মতো। আর তার ফাঁক দিয়ে একফালি পাতিলেবুর মতো চাঁদ পড়ে রয়েছে আকাশে।
আর ঠিক তখনই গাড়িটাকে দেখল আদি। অফ হোয়াইট রঙের। নিচু। সোনালি প্লেটিং-এ লেখা নাম। হালকা নীলচে কাচ। আর সেই গাড়ির সামনের সিটে বসে রয়েছে দিঘি!
সোজা হয়ে বসল আদি। এমন একটা গাড়িতে কার সঙ্গে বসে রয়েছে দিঘি? ওর সেই বয়ফ্রেন্ডটার সঙ্গে কি?
ছেলেটাকে একবার-দু’বারই দেখেছে আদি। পাড়াতেই দেখেছে। লম্বা, ফরসা। আলুভাতে মার্কা। নামধাম কিচ্ছু জানে না। তবে দেখলেই বোঝা যায় যে, পয়সাওয়ালা বাপের ছেলে। মনে মনে হাসল আদি। ভালই পাকড়েছে দিঘি। দাদাভাইয়ের মাথা খেয়ে, বদনাম করে এখন ভালই ঘুরে বেড়াচ্ছে দামি গাড়ি চেপে। সত্যিই মেয়েরা পারে বটে। আদির কষ্ট হল দাদাভাইয়ের জন্য। এই মেয়েটার জন্য কী না শুনতে হয়েছে দাদাভাইকে! ওর বাবা-মা তো যা নয় তাই বলেছে। বাবা তো নিজের জুতো ছুড়ে মেরেছে পর্যন্ত দাদাভাইকে। তবু দাদাভাই দিঘির বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। সব কিছু সহ্য করে গেছে মুখ বুজে। টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি। দাদাভাই তো বলতেই পারত। অনেক কথাই বলতে পারত। কিন্তু না, বলেনি। কিচ্ছু বলেনি। সব মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। যেন সব দায় ওর। সব দোষ ওর। কলঙ্ক, পুলিশে দেওয়ার ভয়, সব মাথায় নিয়ে চলে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। কেন গিয়েছিল দাদাভাই? কেন মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটাও করেনি? কার জন্য চুপ করে ছিল ও?
দাদাভাই বরাবরই এরকম। জ্ঞান হওয়ার থেকে দাদাভাইকে অমন ভাবেই দেখে এসেছে। আদি ছোটবেলায় দুষ্টুমি করত আর দোষ চাপাত দাদাভাইয়ের ওপর। সে পাশের বাড়ির কাচ ভাঙা থেকে শুরু করে ফ্রিজ খুলে মিষ্টি চুরি, সবেতেই দাদাভাইয়ের নামটা সামনে এগিয়ে দিত আদি। বাবা আর মা বেদম বকত দাদাভাইকে। ঠাকুরমা সামনে না থাকলে তো চড়চাপ্পড়ও লাগিয়ে দিত। কিন্তু তবু দাদাভাই কিছু বলত না। শুধু মার খাওয়ার পর চিলেকোঠার ঘরে চলে যেত একা। আর আদি দূর থেকে দেখত চিলেকোঠার জানলা দিয়ে দূরে, বহু দূরে তাকিয়ে রয়েছে দাদাভাই। কী দেখত দাদাভাই? বাইরে থেকে তো শুধু আকাশ দেখা যেত। তা হলে আকাশে কি কিছু খুঁজত দাদাভাই? কাকে খুঁজত আকাশে? চিলেকোঠার ঘরটা খুব প্রিয় ছিল দাদাভাইয়ের। সারা ঘরে স্তূপ করা ভাঙা ফার্নিচার, ধুলো-ঢাকা রেডিয়োগ্রাম, পোর্সেলিনের বাসনপত্তর, হরিণের শিং, বহু পুরনো কালো কম্বল ঢাকা ক্যামেরার সরঞ্জাম আর হাজারও কৌটোকাটির ভেতর নিজের মতো করে একটুখানি জায়গা করে নিয়েছিল দাদাভাই। মনখারাপ হলেই চিলেকোঠায় গিয়ে ওই জায়গাটায় বসে থাকত।
বছরখানেক হল চিলেকোঠা ভেঙে নতুন করে একটা বড় ঘর তৈরি করা হয়েছে। দাদাভাই মৃদু আপত্তি করেছিল। বাবা পাত্তা দেয়নি। আচ্ছা, তাই এবার কি কষ্ট পাওয়ার পর আর চিলেকোঠায় ওই জায়গাটা না পেয়ে একদম বাড়ি ছেড়েই চলে গেছে দাদাভাই?
আদি সন্ধের কলকাতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজকাল এত দাদাভাইয়ের কথা মনে পড়ে কেন ওর? যে-মানুষটার সঙ্গে স্কুলজীবন অবধি অত সখ্য ছিল তার থেকে তো স্বেচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল আদি। তা হলে, এখন দাদাভাই চলে যাওয়ার এতদিন পরে কেন এমন মনখারাপ হচ্ছে আদির? এমন চূড়ান্তভাবে কেন মনে পড়ছে ওই মানুষটাকে? তা হলে কি চলে গিয়েই মানুষ প্রকৃতপক্ষে একদম সরে আসে কাছে? তা হলে কি হারিয়ে ফেলার পরই বোঝা যায় জীবনের আসল গুরুত্ব? মানুষের আসল গুরুত্ব?
ছোটবেলায় না বুঝলেও এইট-নাইন থেকেই আদি বুঝত কেন বাবা-মা পছন্দ করে না দাদাভাইকে। সম্পত্তি। সমস্ত কিছুর মূল ছিল সম্পত্তি। এই বিরাট দোতলা বাড়ি। লোহার যন্ত্রপাতি তৈরির বিশাল কারখানা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুন্দরবনের কাছে প্রচুর জমিজায়গা। ওই সবই ছিল দাদাভাইয়ের প্রতি বাবা-মায়ের খারাপ ব্যবহারের উৎস। ঠাকুরমার সামনে বাবা-মা কিছু বলতে পারত না দাদাভাইকে। কিন্তু আড়ালে খুব খারাপ খারাপ কথা বলত বাবা। বাবার মুখ খুব খারাপ। মাঝে মাঝেই বেজন্মা বলে গাল দিত দাদাভাইকে। অবশ্য শুধু দাদাভাইকেই নয়। বাবা রেগে গেলে সবাইকেই এমন অশ্রাব্য গালাগালি করত। তবে দাদাভাইকে খারাপ কথা বলার সময় মাঝে মাঝে মা-ও যোগ দিত। খুব খারাপ লাগত আদির। দাদাভাইয়ের কষ্টের মুখটা দেখলে মনে মনে দমে যেত ও। তবু মা ভাল রান্না করলে লুকিয়ে লুকিয়ে দাদাভাইকে এনে দিত আদি। দাদাভাই দিতে বারণ করত। বলত, ‘অশান্তি হবে, তুই যা আদি।’ তবু আদি শুনত না। ছোট থেকেই আদি জেদি, বাবা-মায়ের বকা বা মারের পরোয়া করত না বিন্দুমাত্র।
বাবা মাঝে মাঝে ঠাকুরমার কাছে গিয়েও দরবার করত। বলত, ‘এই ছেলেটাকে তুমি পুষছ কেন? একে কোনও হস্টেলে বা অরফ্যানেজে দিয়ে দাও।’
ঠাকুরমা বলত, ‘কেন? ও তোদের কী অসুবিধে করছে?’
বাবা গম্ভীরভাবে বলত, ‘দাদা যখন মেম বিয়ে করল, তোমার মনে নেই দাদা কী বলেছিল? বলেছিল, ও আর কোনওদিন এ বাড়িতে আসবে না।’
‘তো? ও তো আসেওনি!’
‘কিন্তু ওর ছেলেকে তুমি নিয়ে এসেছ কেন? আমাদের বংশের মর্যাদা নেই?’
‘বংশমর্যাদার কথা তোকে ভাবতে হবে না। এই যে রাত করে মদ খেয়ে ফিরিস, ঘোড়ার লেজে টাকা বাঁধিস, এতে কি বংশের মর্যাদা বাড়ে ভেবেছিস? বেশি সতীপনা দেখাস না। একটা বাচ্চা ছেলে, বাবা-মা নেই, কোথায় তাকে আগলে রাখবি! না, তার সঙ্গে এমন শত্রুতা করিস সবসময়! তোর গায়ে মানুষের রক্ত নেই?’
বাবা তবু গজগজ করত। বলত, ‘কোথাকার কে! উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ম্লেচ্ছ রক্ত গায়ে। এটা তুমি ঠিক করছ না মা।’
‘শোন,’ ঠাকুরমা তখন সবচেয়ে রাগী গলাটা বের করে আনত। বলত, ‘তোকে বেশি দালালি করতে হবে না। তোর তো সম্পত্তির ভাগ নিয়ে চিন্তা! সব ঠিকমতোই ভাগ করে দেব আমি। আর এ নিয়ে একটা কথা বেশি বললে ফুটো পয়সাও পাবি না, বুঝলি? এখন দূর হ এখান থেকে।’
বাবা দূর হলেও, নিজের অ্যাজেন্ডা থেকে সরত না। হয় কি নয় হেনস্থা করত দাদাভাইকে। খারাপ কথা বলত। অপমান করত। আর সামান্য সুযোগ পেলে তো রীতিমতো মারত। এ সবকিছুই মুখ বুজে সহ্য করত দাদাভাই।
গুরুসদয় দত্ত রোডের গৌরের বাড়িটা দুর্গের মতো। একটা বড় গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর, আর-একটা বড় গেট। তাতে আবার দু’জন দারোয়ান। গৌর নিজে হাসিখুশি হলেও দারোয়ানগুলো হাসলে বোধহয় মাইনে কেটে নেয়। গাড়িটা বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকার পর আদির সংবিৎ ফিরল।
আদি এর আগেও এই বাড়িতে এসেছে। দারোয়ানগুলো চেনা। আদি গাড়িটাকে বাইরে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সামনে। আর ঠিক তখনই ওকে পিছন থেকে ডাকল মল্লার, ‘স্যার।’
বিরক্ত হল আদি। ওর আবার কী দরকার? ও তবু ঘুরল, ‘কী হয়েছে?’
‘স্যার, আপনি ডাইরেক্টর সাহেবকে বলবেন না তো?’
‘কী বলব না?’
‘এই স্যার গাড়িটার লেট হওয়া, আমায় পুলিশে ধরার ব্যাপারটা! বলবেন না তো?’
আদির এই প্রথম হাসি পেল। মল্লারের ফরসা গোলগাল মুখটা দেখে খারাপ লাগল হঠাৎ। মনে হল, এমন একটা ছেলে এরকম একটা কাজ করে কেন? না, কোনও কাজই ছোট নয়। তবু সমাজের একটা প্রচলিত মাপ তো আছে। সেই মাপে ওর তো অন্যরকম কাজ করার কথা।
আদি তবু হাসল না। ওই সেই ব্যাপার। সাব-অর্ডিনেটকে কখনও চাপমুক্ত করবে না। একটা অদৃশ্য সুতো তোমার নিজের হাতে রাখতেই হবে। ও বলল, ‘দেখি। আর আমি কী করব আর করব না তা নিশ্চয়ই তোমায় বলব না!’
‘তবু, স্যার… প্লিজ…’ মল্লার মুখটা কাঁদোকাঁদো করল।
আদি আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে গেল।
বাড়ি নয়, আসলে এটা তিনতলা বাংলো। সামনে খুব সুন্দর লন। তার চারধারে কালো বোল্ডার বসানো রাস্তা। আর রাস্তার একদম শেষে শিল্পীদের প্যালেটের আকারের সুইমিং পুল। এ ছাড়া, গোটা কম্পাউন্ডটাতেই নানারকম গাছ লাগানো। সব কিছুই খুব ভালভাবে মেনটেন্ড। নেপালবাবু বলে একজন গোটা বাড়ির মেনটেনেন্সটা দেখেন।
কম্পাউন্ডে ঢুকতেই আদি নেপালবাবুর মুখোমুখি হল। লোকটা রোগা। প্রায় সবসময়ই খয়েরি আর হলুদের চেক শার্ট পরে থাকে। টেনশন করা নেপালবাবুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আদিকে দেখেই বলল, ‘আরে, সাহেব কখন থেকে ওয়েট করছেন। শরীর তো ঠিক নেই, তাই নানা লোকে আসছে দেখা করতে। আপনার জন্য সামান্য সময় বরাদ্দ করেছেন। তাড়াতাড়ি যান, না হলে বেজায় রেগে যাবেন। এমনিতেই মুড খারাপ।’
মুড খারাপ? আদি একটু দমে গেল। মালিনীরও এখানে আসার কথা ছিল। কিন্তু ও না আসার জন্য যে-ঝাড়টা হবে, সেটা আদিকে একাই খেতে হবে। নিজের ওপরই বিরক্ত হল আদি। কী দরকার ছিল মালিনীর কাজের জন্য ওকে ছেড়ে দেওয়ার? মালিনী কি জানতে পারবে যে, ওর জন্য কত লাঞ্ছনা সহ্য করছে আদি?
দোতলার বৈঠকখানায় বসে ছিল গৌর। সাদা কুর্তা পাজামার ওপর শাল জড়ানো। নিখুঁতভাবে দাড়িগোঁফ কামানো। দেখলে মনেই হচ্ছে না যে, অসুস্থ।
আদিকে দেখে গৌর আজ হাসল না। গম্ভীরভাবে উলটোদিকের সোফাটা দেখিয়ে দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘মালিনী কোথায়? আয়ি কিঁউ নেহি?’
‘স্যার, হার গ্র্যান্ডমাদার ইজ ভেরি সিক। সো…’
‘ও,’ গৌর চোয়াল শক্ত করল, ‘পেটি অজুহাত। ডিসগাস্টিং। তো, তু কব যা রাহা হ্যায় এয়ারপোর্টমে উস মুম্বই কে হিরোকো লানে?’
‘রাতের ফ্লাইট স্যার।’
‘হুম,’ গৌর ঠোঁট কামড়াল। তারপর বলল, ‘বারাসতের হাউজিং কমপ্লেক্সের চারজন টাকা ফেরত চেয়েছে। বলছে, এই ডোলড্রামসে সব গন্ডগোল হয়ে যাবে। ওরা ফ্ল্যাট পাবে না। ভেরি ব্যাড সাইন আদি। আজ চারজন চাইল। কাল চল্লিশজন চাইবে। তু ক্যায়া উখাড় রাহা হ্যায় বৈঠকে?”
গৌরের রাগ দেখে আদি থতমত খেল, ‘স্যার, আমরা লেভেল বেস্ট চেষ্টা করছি। বাট…’
‘ইয়োর বেস্ট ইজ নট গুড এনাফ। আমার ওই হাউজিংটা ঝুলে গেল। চাপাডাঙার ফ্রুট জুস ফ্যাক্টরির জন্য এক্সট্রা জমি নেওয়াটাও ঝুলে গেল। তু ইয়ার ঝক মার রাহা হ্যায় ক্যায়া? সব বহেন…’
‘স্যার, পলিটিক্যাল প্রবলেম হচ্ছে।’
‘আই নো। একজনই সবাইকে খেপাচ্ছে। ত্রয়ণ। শালেকা নাম দেখ! তু উসসে মিল।’
‘স্যার আমি দেখা করেছি।’
‘ঘুটনো মে হ্যায় তেরা দিমাগ? ইনফরমালি মিল। মাল-শাল খাওয়া। ভাল বিছানায় শুইয়ে আন। শরীর গরম, পকেট গরম, ব্যস দেখবি কাম হো গয়া।’
‘কিন্তু স্যার…’
‘চোপ শালা,’ গৌরের মুখ লাল হয়ে উঠেছে, ‘কিন্তু কী বে? না পারলে চাকরি ছেড়ে দে। আই উইল নট লিসন এনি এক্সকিউজেজ এনি মোর। পারলে কর, না হলে ইউ নো দ্য ওয়ে আউট। রাইট?’
আদি মাথা নামাল। গৌর প্যাঁচ দিচ্ছে। চাপ দিচ্ছে। কোনায় ঠেলছে ওকে। আদি যেন দেখতে পেল ওর ভেতরেও একটা মল্লার রয়েছে। দেখতে পেল সে টেনশন আর ভয়ে ঘামছে একা। তার মাথার ওপর চাপ বাড়ছে। কর্পোরেট চাপ। যা বস-রা দেয় সাব-অর্ডিনেটদের। আদি বুঝল এই পৃথিবীতে জায়গা খুব দ্রুত বদলে যায়। নিজেকে ওর মল্লারের চেয়ে বেশি কিছু মনে হল না। আদি বুঝল, সামনে বেশ কঠিন সময় আসছে।
Chapter - 10
১০
গতকাল থেকে ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। কলকাতায় এমন ঠান্ডা আশা করেনি রাহি। বহুদিন পর কলকাতায় এল ও। স্কুল, বাড়ি আর চাপাডাঙার এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতেই সময় কেটে যায় রাহির। কলকাতায় আসার কথা মনে পড়ে না। বা আরও ভাল করে বললে, ইচ্ছেও হয় না।
আসলে পিছনে বনগাঁ আর সামনে বারাসত। এর বাইরে যেতে হয় না রাহিকে। আর কলকাতার কথা মনে পড়লেই কালো ধোঁয়া, প্যাঁচানো ফ্লাইওভার, অটোর গুঁতোগুঁতি আর নাক গলা জ্বালা-পোড়ার কথাই মনে পড়ে ওর। তাই ইচ্ছেই করে না। বাবা-মা বললেও তাই বারবার এড়িয়ে যায়। আর গত কয়েক বছরে যে-ক’বার ঘুরতে গেছে, তখন প্লেনেই গেছে। দমদম থেকে। তাই কলকাতার পেটের মধ্যে আর ঢুকতে হয়নি।
এইবারও কলকাতায় আসার তেমন ইচ্ছে ছিল না ওর। কিন্তু তবু এসেছে দুটো কারণে। এক, হোমি বারবার বলেছে; আর দুই, ত্রয়ণ। ওই ছেলেটা দু’দিন এসে নাকি থাকবে ওদের বাড়িতে। তাই ওকে এড়ানোর জন্যই হোমির কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল রাহি।
বাবা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল খুব। আশ্চর্য হয়ে তাকিয়েছিল খানিকক্ষণ, তারপর হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তা হঠাৎ, এমন ইচ্ছে হল তোর?’
ত্রয়ণের কথা তো আর বলা যায় না। তাই হোমির কথাই বলেছিল বাবাকে। বলেছিল, ‘ওই হোমিটা অনেকদিন থেকে মাথা খাচ্ছে। এবার ক্রিসমাসে ওর মামাতো ভাইয়ের বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে। তাই নাছোড় হয়ে বলছে যে, আমাকেও যেতে হবে। কতবার বললাম যাব না। তবু…’
বাবা বলেছিল, ‘কেন যাবি না? অবশ্যই যাবি। আর স্কুলও ছুটি থাকবে। শোন, আনোয়ার শাহ রোডের ওপর আমাদের নতুন ফ্ল্যাটে থাকবি। কাজের লোকজন সব আছে আর চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ির বন্দোবস্তও করে দেব। একটু ঘুরে আয়। দেখবি ভাল লাগবে। তুই তো বেরোতেই চাস না একদম।’
সত্যিই, বাড়ি থেকে একটু দূরে কোথাও যেতে হলেই আলস্য লাগে রাহির। কেমন যেন ভয়ও করে। কীসের ভয়, কেন আলস্য, এসব বোঝে না ও। কিন্তু হয়, ঠিক এমনটাই মনে হয় ওর। আর এখন তো আরও একটা কারণ হয়েছে। কিগান। বাড়ি থেকে চলে গেলে তো আর কিগানকে দেখতে পাবে না।
শুধু ত্রয়ণ। ওর জন্যই ও যাচ্ছে। অমন রোগা, সিরিয়াস দেখতে ছেলেটা যে কেমন তা একমাত্র রাহি জানে। ইস, নিজের সেই বছর তিনেক আগের ভুলটার জন্য সারা জীবন ছেলেটার সামনে ওকে গুটিয়ে থাকতে হবে। মানুষের একটা ভুল যে জীবনে তাকে কতটা অসহায় করে দেয়!
রাহি কয়েকদিনের জন্য কলকাতায় যাবে শুনে দীপার মুখটা একটু কালো হয়ে গিয়েছিল। আসলে দীপার তো রাহি ছাড়া আর কোনও বন্ধু নেই। বাড়িতে এমনিতেই চমকের ব্যবহারের জন্য দীপা গুটিয়ে থাকে। এ নিয়ে দীপাকে হাজারবার বুঝিয়েছে রাহি, তবু দীপা বোঝেনি। রাহি বলেছে, ‘তুই এমন গুটিয়ে থাকিস কেন রে দীপা? দাদা যা করে তার দায় দাদার। তোর নয়। তা হলে এমন ভয় পেয়ে থাকিস কেন?’
‘না রে, অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হলে হয়তো তোর দাদা এমন থাকত না।’
‘হোয়াট রাবিশ!’ রাহি রাগ করে বলেছিল, ‘বোকার মতো কথা বলিস না। দাদা তোকে প্রায় জোর করে তুলে এনে বিয়ে করেছে। আর অন্য মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে কিছু হত না, বলাটা খুব পাতি শোনাচ্ছে।’
‘না রে রাহি, স্ত্রীদের তো একটা গুণ থাকে। আমার বোধহয় সেটা নেই। কিন্তু দেখ, আমি তো চেষ্টা করি। ওর সব কথা শুনি, সাধ্যমতো যা চায়, যেমনভাবে চায় তাই দিই। তবু আমি ওকে শোধরাতে পারি না। আমি খুব খারাপ!’
রাহি আর কিছু বলেনি। কোনও কোনও মানুষ, নিজের জীবনের কন্ট্রোল নিজে না নিয়ে, শুধু ‘আমি খুব খারাপ’ এই কথাটা ভেবে একটা বর্ম তৈরি করে আর কষ্টের বিলাস দেখায়। দীপার মধ্যে খারাপ গুণ বলতে শুধু এটুকু। তবে এটুকুও যে দীপা বলে তা কেবল রাহিকেই। বাবা, মা বা দাদার সামনে তো প্রায় কথাই বলে না।
দীপা যখন শুনেছিল যে, রাহি কলকাতা চলে যাচ্ছে, তখন খুব ধীর গলায় বলেছিল, ‘তুই চলে যাবি? ঘুরতে?’
রাহি দেখেছিল যে, দীপার চোখ দুটো ছলছল করছে। রাহি হেসে বলেছিল, ‘আরে, তাতে তুই এমন আপসেট হচ্ছিস কেন? জাস্ট চার-পাঁচ দিন তো!’
‘না, মানে…’ দীপা চুপ করে গিয়েছিল। তারপর সামান্য দ্বিধার সঙ্গে বলেছিল, ‘দেখ, ত্রয়ণকে আমি আসতে বারণই করেছিলাম। কিন্তু ও এমন নাছোড়বান্দা…’
‘মানে?’ রাহি সচকিত হয়ে উঠেছিল।
‘না না,’ দীপা বুঝেছিল যে, কথাটা রাহির ভাল লাগেনি। ও বলেছিল, ‘আসলে আমি জানি যে, তুই ওকে পছন্দ করিস না। আমিও করি না। সবসময় বড় বড় কথা! একদম ভাল লাগে না। সত্যি মানুষটাকে লুকিয়ে ও নিজের যে-ইমেজটা প্রোজেক্ট করে তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তবু, কী করব বল? আত্মীয়রাই তো বিষ হয়!’
রাহি পরিস্থিতিটা সহজ করার জন্য বলেছিল, ‘আরে ছাড় তো। খালি বাজে কথা ভাবিস না।’
‘দেখ, হয়তো ও তোকে পছন্দ করে। কিন্তু, সে তো তোকে অনেকেই পছন্দ করে। তাই ওকে আজ বলেওছি। আর ও বলে…’
‘বলেছিস মানে?’ আঁতকে উঠেছিল রাহি। ত্রয়ণকে দীপা এসব বলেছে? উলটে ত্রয়ণ আবার সব বলে দেয়নি তো? ত্রয়ণের কাছে যে ওর গোপন চাবিটা রয়েছে।
দীপা বলেছিল, ‘ও বলে, আমি নাকি ভুল ভাবছি। ওর তোর প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। ও নাকি দেশের কাজের জন্য নিজেকে তৈরি করছে। ওর জীবনে নাকি প্রেমের কোনও জায়গা নেই।’
‘তাই!’ ভুরু তুলে বলেছিল রাহি।
‘আরও বলেছে যে, তুই নাকি ওর টাইপ নোস। তুই বড্ড শ্যালো। তাই…’
‘শ্যালো!’ রাহি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল। শয়তান ছেলে! সবার সামনে এমন করছে যেন কত সাধুপুরুষ! একবার যদি বাবাকে বলে দেয় না যে, ত্রয়ণ কী করতে চায় ওর সঙ্গে, তা হলে ত্রয়ণের বারোটা বাজতে সময় লাগবে না একটুও। আর ও বুঝবে কত ধানে কত চাল!
কিন্তু এক মুহূর্তেই এই চিন্তাটা মাথা থেকে চলে গিয়েছিল রাহির। কারণ ত্রয়ণের বারোটা বাজাতে গেলে ত্রয়ণও ওর বারোটা বাজিয়ে দেবে। রাহি যে ত্রয়ণের কাছে বদ্ধ! তাই তো ত্রয়ণ বলেছিল, ‘তুমি আমারই থাকবে। তবে আমি জোর করব না। যেদিন তুমি রেডি হবে, সেদিনই আমি রাজি।’
শয়তান একটা! আস্ত শয়তান। রাজি! কীসের জন্য রাজি? আর রাজি না হলে কি সবাইকে দেখিয়ে দেবে সব? রাহি মাঝে মাঝে বোঝে না কী করবে! কোথায় যাবে! কার কাছে গেলে এই শাপমুক্তি হবে! একটা ভুলের জন্য কি ওকে সারা জীবন কষ্ট পেতে হবে? ভীষণ দমবন্ধ লাগে রাহির। মনে হয় যেন অক্টোপাস আটকে ধরেছে ওকে। কোথায় গেলে যে নিস্তার পাবে ও!
দীপা বলেছিল, ‘ছাড় তো ওর কথা। তুই চলে গেলে আমার এত খালিখালি লাগে!’
রাহি হেসে বলেছিল, ‘তা হলে তুইও চল আমার সঙ্গে। থাকবি, ঘুরবি। খুব মজা হবে।’
‘আমি!’ মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল দীপার।
নিজের ভুলটা চট করে বুঝতে পেরেছিল রাহি। তাই তো! দীপা যাবে কী করে? মা তো যেতেই দেয় না কোথাও দীপাকে! এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারে না রাহি। ওর শান্ত, নিরীহ, ভালমানুষ মা কেন যে দীপার বাইরে যাওয়া নিয়ে এতটা পজেসিভ হয়ে ওঠে, তার কোনও ব্যাখ্যা পায় না ও। শুধু দেখে যে, দীপার বাইরে যাওয়ার কথা উঠলেই মা গোমড়া হয়ে যায়। বলে, ‘ঠিক আছে। যাক, ঘুরে আসুক। ঝিগিরি করার জন্য বাড়িতে তো আমি রইলামই।’
ঝিগিরি! মায়ের কথা শুনে অবাক হয় রাহি। মা কিন্তু বাড়িতে কুটো ভেঙে দুটো করতে দেয় না দীপাকে। সবসময় আগলে রাখে। বলে, ‘ঠাকুর চাকর আছে কী করতে?’ বলে, ‘হাতের এত সুন্দর গড়নটা নষ্ট হয়ে যাবে যে!’
সেই মা-ই যখন দীপা বেরোবে বললে এমন বলে, তখন খুব অবাক হয়ে যায় রাহি। কেন এমন করে মা? দীপা বাপের বাড়িতেও যেতে পারে না তেমন। গেলেও এক রাতের বেশি থাকতে পারে না। কোনও কেনাকাটা করতে গেলে মা নিয়ে যায় সঙ্গে করে। এমনকী বারাসতের বিউটি পার্লার থেকে লোককে গাড়ি করে নিয়ে আসা হয়, দীপার যখন দরকার পড়ে তখন।
দীপার অমন কালো হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে খুব কষ্ট লেগেছিল রাহির। ও ব্যাপারটাকে সহজ করতে বলেছিল, ‘অবশ্য বোরও হয়ে যেতে পারিস তুই। আমি আর হোমি থাকব। “হেল্প আর্থ”-এর জন্য ব্রোশিয়োরের ডিজাইন দেখতে হবে। তারপর হোমির কাজিন গুন্ডার বাড়িতে ক্রিসমাসের নেমন্তন্ন আছে। তোর ভাল লাগবে না।’
দীপা বিষণ্ণ গলায় বলেছিল, ‘জানি, আমি বোর হয়ে যাব। যখন তোর বিয়ে হবে, দেখবি তখন তোকেও কত জিনিসে বাধ্য হয়ে বোর হতে হচ্ছে।’
বিয়ে! চিন্তা করলেই গায়ে জ্বর আসে রাহির। বুকে কষ্ট হয়। মনে হয় বিয়ে তো করতেই পারে। কিন্তু যাকে ইচ্ছে তাকে কি বিয়ে করতে পারবে? সে তো পাত্তাই দেয় না!
কিগান এত চুপচাপ থাকে যে, মনে হয় নিজেকে যেন লোহার পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রেখেছে। একটা মানুষ এতটা একা থাকতে পারে দেখে মাঝে মাঝে অবাক লাগে রাহির। না, একা মানে একক নয়। ফ্যাক্টরি আর চাপাডাঙার অনেক মানুষই ঘিরে থাকে কিগানকে। তবু, তার ভেতরেও কোথায় যেন মানুষটাকে একা লাগে রাহির। মনে হয়, সবাই যেন ছেড়ে চলে গেছে কিগানকে। মনে হয় জীবনের থেকে বোধহয় আর কিছু পাওয়ার নেই ওর।
রাহি নিজে নিজেই কিগানের কাছে, ওর ঘরে যায়। প্রথম প্রথম কিগান সামান্য আপত্তি করলেও, পরে বুঝেছে যে, রাহিকে বলে লাভ নেই। তখন বলেছে, ‘তুই এত পাগলি কেন রে রাহি?’
‘সে আমি কী জানি? আর তুমি এত একাচোরা কেন? আমি কি তোমায় চিমটি কাটছি যে, বিরক্ত হচ্ছ? মনে রেখো, যে-ফ্যাক্টরিতে চাকরি করো, সেটা কিন্তু আমাদের জমিতেই তৈরি!’
উত্তরে কিগান আর কথা বাড়ায়নি। শুধু হেসেছে।
কিগানের ঘরে গিয়ে ওর বই নাড়াচাড়া করে রাহি। মিউজিক সিস্টেমে গান শোনে। টুকটাক এটা-ওটা গুছিয়ে দেয়। কখনও বাড়িতে নতুন কিছু রান্না হলে গিয়ে দিয়ে আসে।
মাঝে মাঝে রাহি ভাবে যে, কিগান ওকে পছন্দ করে। কিন্তু তারপর হঠাৎই আবার কোনও কোনও সময় এমন চুপ করে যায়, এমন নির্লিপ্ত হয়ে যায় যে, রাহি ঘাবড়ে যায়। মনে হয় কিগান যেন ওকে বহু দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যেন কিগান ওকে চেনেই না!
একবার তো রাহি সাহস করে জিজ্ঞেসও করেছিল কিগানকে। বলেছিল, ‘আচ্ছা, মাঝে মাঝে তোমার কী হয় গো কিগানদা? এমন চুপ করে যাও কেন? কোনও কথা বলো না কেন? বোঝো না যে, তোমার আশপাশের মানুষেরা এতে কষ্ট পায়? অপমানিত বোধ করে!’
কিগান বিহ্বল হয়ে বলেছিল, ‘আমি কথা না বললে লোকে কষ্ট পায়? অপমান বোধ করে? কেন রে? আমি কে এমন মানুষ?’
‘তুমি? তুমি…’ রাহির রাগ হয়েছিল খুব। মনে হয়েছিল কিগানের চুলগুলোকে দু’হাতের মধ্যে ধরে নিয়ে খুব করে ঝাঁকায়। ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে একদম টেনে নেয় বুকের মধ্যে। দাঁতের দাগ বসিয়ে দেয় ঠোঁটে। ওর বুকের ওই তিনটে লাল তিলে। মনে হয়েছিল এমন করে শাস্তি দেয়, যেন আর কোনওদিন ওর প্রতি অমনোযোগী না হতে পারে কিগান।
কিগান হেসে বলেছিল, ‘দুর পাগলি। স্কুলে পড়াতে পড়াতে তুই সবাইকে নিজের ছাত্র ভাবিস, না? শোন, আমি তোর চেয়ে অনেক বড়। প্রায় বুড়ো। আর বুড়োরা একটু একাই থাকে। বুঝেছিস?’
‘এঃ, বুড়ো! তুমি তো থার্টি থ্রি,’ রাগ দেখিয়েছিল রাহি, ‘জানো আমি কত? আমার বয়স কত ধারণা আছে তোমার?’
কিগান মুচকি হেসে বলেছিল, ‘কত হবে? পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন!’
‘কী? আমায় অমন লাগে? আমি অত বুড়ি?’
কিগান বলেছিল, ‘যা পাকা পাকা কথা বলছিস তাতে তো আরও বেশি বলা উচিত ছিল। আমি তো কমই বললাম।’
‘আমি চব্বিশ। তোমার চেয়ে মাত্র ন’ বছরের ছোট।’
‘তুই আমার বয়স জানলি কোথা থেকে রে?’
‘তোমার একটা বইয়ের ভেতরে লেখা আছে। নাম আর বছর। জানো, নয় বছরটা কোনও ডিফারেন্সই নয়। জানো আমার বাবা-মায়ের ডিফারেন্স একুশ বছর। তাই বলছিলাম আমাদের ন’ বছরটা…’
কিগান আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে। আর রাহি বুঝেছিল যে, নিজের অজান্তেই ও অন্য একটা জায়গায় পা দিয়ে ফেলেছে।
এরপর বেশ কিছুদিন যায়নি ও কিগানের বাড়িতে। ভেতরে ভেতরে একটা লজ্জা আর সংকোচ একদম আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল ওকে।
কিন্তু কিগানই তারপর রাহিকে রাস্তায় ধরেছিল একদিন। বলেছিল, ‘কী দিদিমণি, তোদের বাড়িতে কি আর ভাল রান্নাবান্না হচ্ছে না? নাকি আমায় দিলে তোর ভাগে কম পড়ে যাবে?’
রাহি বলেছিল, ‘কম যে পড়বে না তা তোমার চেয়ে ভাল আর কে জানে!’
কিগান হেসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘মেয়েরা বড্ড রাগ করে, তাই না রে?’
রাহি গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘আর ছেলেরা? সবার মাথায় বরফের ফ্যাক্টরি আছে, না? অসহ্য। ছেলেগুলো সব অসহ্য!’
কিগান হেসে বলেছিল, ‘দাঁড়া, তোর বিয়ের সময় তোর বরকে বলব এই কথাটা।’
রাহির ইচ্ছে হয়েছিল বলতে যে, ‘বললাম তো। আমিই বললাম তো আমার বরকে।’ কিন্তু বলেনি। বরং গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘বিয়ে নিয়ে ইয়ারকি মারাটা উনিশশো ষাটের পর একটু ডেটেড হয়ে গেছে, বুঝলে?’
তারপর থেকে কিগানের সঙ্গে আবার সহজ হয়ে গিয়েছে সম্পর্কটা। এই তো কলকাতায় আসবে শুনে কিগান ওকে বলেছিল গিটারের জন্য চার সেট তার কিনে আনতে। টাকাও দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তখন টাকাটা নিলেও এখান থেকে গিয়ে সেটা ফেরত দিয়ে দেবে ও। এটা ও নিজেই কিনে দিতে পারে।
‘কী রে? এমনভাবে কী ভাবছিস তুই?’ হোমির প্রশ্নে ফিরে তাকাল রাহি।
এই ঠান্ডাতেও সন্ধের মুখে স্নান করেছে হোমি। জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে গেলেও মাথার চুলগুলো ভিজে ভিজে লাগছে। যতই গরম জলে স্নান করুক, তবু হঠাৎ করে নতুন জায়গায় এমন করে স্নান করাটা ঠিক নয়। বলেওছিল কথাটা হোমিকে। কিন্তু মেয়েটা শুনলে তো!
রাহি বলল, ‘দেখ, স্নানটা সেই করলি! জ্বর হলে কিন্তু কেলেঙ্কারি হবে।’
‘দুর,’ হোমি সামনের কাচের টেবিলের ওপর থেকে কফির কাপটা তুলে নিয়ে হাসল। তারপর চুমুক দিয়ে বলল, ‘তোদের এই রান্নার লোকটা কিন্তু ব্যাপক কফি বানায়। তা এমন বিরহিণী রাধিকা হয়ে জানলা দিয়ে কী দেখছিস?’
‘বিরহিণী!’ রাহি হাসল, ‘এত উঁচু থেকে শহরটাকে কী অদ্ভুত লাগে, দেখ! মনে হচ্ছে অসংখ্য জোনাকি নেমে এসেছে মাটিতে!’
‘দেখ রাহি, কেস কী বল তো? ছেলেটা কে?’
‘মানে?’ রাহি জানলার পাশের চেয়ারটা থেকে উঠল, ‘কী যা তা বলছিস!’
হোমি হাসল, ‘প্রেমে পড়লে সবাই এত সাবজেক্টিভলি পৃথিবীকে দেখে যে, মনে হয় আর্ট ফিল্মের ডায়ালগ শুনছি!’
‘ওফ, তুই থামবি?’
‘থামব, তবে যদি তাড়াতাড়ি ড্রেস করে নিস, গুন্ডার বাড়িতে সাতটার ভেতর পৌঁছোতে হবে। তাড়াতাড়ি কর না।’
‘ওকে, জাস্ট পাঁচ মিনিট লাগবে। কোনও প্রবলেম নেই।’ রাহি ভিতরের ঘরের দিকে চলে গেল। সাজগোজ করতে সত্যি রাহির খুব একটা সময় লাগে না।
রাহির ছোটবেলা থেকেই উঁচু বাড়িতে থাকার খুব ইচ্ছে ছিল। তাই ওর কথামতোই আনোয়ার শাহ রোডের ওপর এই এত্ত উঁচুতে ফ্ল্যাটটা কিনেছে বাবা। সবাই বারণ করেছিল বাবাকে। বলেছিল, ‘অত দূরে কেন ফ্ল্যাট কিনছেন?’
কিন্তু বাবা কারও বারণ শোনেনি। বরং বলেছিল, ‘রাহির ইচ্ছে হয়েছে, সেটাই তো বড়। আর ইনভেস্টমেন্টও হয়ে থাকল। সমস্যা কোথায়?’
ফ্ল্যাটটা দেখেই ভাল লেগে গিয়েছিল রাহির। চব্বিশ তলার ওপর। জানলা খুললে মনে হয় কে যেন কলকাতাকে সামনে মাদুরের মতো বিছিয়ে রেখেছে। শহিদ মিনারটাও আবছা দেখা যায়! এত হাওয়া যে, বেডরুমে দেওয়াল জোড়া জানলাটা খুলে ওর মনে হচ্ছিল ছোট্ট এক কুচি কাগজের মতো ও হয়তো ভেসেই যাবে কোথাও।
রাহিকে আর কিছু বলতে হয়নি। বাবা বলেছিল, ‘এই নে। এই তোর চাবি।’
কী যে আনন্দ হয়েছিল রাহির! কী যে মুগ্ধ হয়েছিল ও! মনে হয়েছিল মাসের অর্ধেকটা এখানেই এসে থাকবে। আর মনের সুখে কলকাতায় ঘুরবে। কিন্তু এই কিগান এসেই তো সব গন্ডগোলটা বাধাল!
কলকাতায় যে আর আসতেই ইচ্ছে করে না ওর। চাপাডাঙা ছেড়ে যে নড়তেই ইচ্ছে করে না। কেবল মনে হয় কলকাতায় চলে গেলে তো আর কিগানকে দেখতে পাবে না।
বাবা তো একদিন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেছিল, ‘তুই যে বললি কখনও কখনও ওই ফ্ল্যাটটায় গিয়ে থাকবি। যাস না তো!’
রাহি আদুরে গলায় বলেছিল, ‘তুমি চাও আমি চলে যাই?’
‘আরে, না না,’ বাবা অপ্রস্তুত হয়েছিল, ‘তাই বললাম নাকি? আসলে তোর পছন্দ হয়েছিল তো, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।’
মা পাশ থেকে বলেছিল, ‘তোমার কোনও বিবেচনা নেই। পাগলি মেয়েটার কি আর মাথার ঠিক আছে? ওর কথায় নেচে কেউ কি অত টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কেনে? এই তোমার বুদ্ধি!’
বাবা বলেছিল, ‘মেয়ের ইচ্ছেটার চেয়ে কি টাকা দামি?’
‘মেয়েকে নিয়ে তোমার চিরটাকাল আদিখ্যেতার স্বভাব।’ মা পান সাজতে সাজতে বলেছিল।
বাবা সামান্য হেসে বলেছিল, ‘হবে না? মেয়েটা যে আমার।’
শোওয়ার ঘরের বড় আয়নায় জামাকাপড় পালটানোর মাঝে নিজেকে একবার দেখল রাহি। শরীরে কি মেদ কিছুটা কমেছে? খুব চেষ্টা করছে আজকাল যাতে একটু হালকা হয় ও। কিন্তু তবু হচ্ছে না। জল খেলেও যেন ওর ওজন বেড়ে যায়! মা বলে, এমন ফরসা, গোলগালই নাকি ভাল। কিন্তু নিজেকে রাহির মাঝে মাঝে তুলোর বস্তার মতো লাগে। এতটা গোলগাল হওয়াটাও কাজের কথা নয়। টিভিতে বিকিনি পরা মেয়েদের দুর্গম খাঁজওয়ালা শরীর দেখলে বড্ড কষ্ট হয় রাহির। আর তার চেয়েও কষ্ট হয় যখন মনে মনে ও নিজেকে কিগানের পাশে কল্পনা করে। অমন সাঁতারুর মতো একটা মানুষের পাশে নিজেকে খুব বেমানান লাগে ওর। মনে হয় এমন ফিগারের জন্যই কি কিগান ওর দিকে ফিরে তাকায় না?
আজকাল ডায়েট করার চেষ্টা করছে রাহি। কম খায়। হাঁটে। এমনকী ঘরের ভেতর স্কিপিংও করে। কিন্তু তিন-চারদিন করার পরই কেমন যেন একটা দুর্বোধ্য টানে গুচ্ছের কাজুবাদাম, নারকেল, ঘিয়ে ভাজা লুচি খেয়ে ফেলে, আর সমস্ত কিছুই আবার যেমন ছিল তেমন হয়ে যায়। প্রবৃত্তি! প্রবৃত্তিকে সামলানো যে কী কঠিন তা বুঝতে পারে রাহি।
আজও শুধু ব্রা আর প্যান্টি পরে সামান্য সময় নিয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। নাহ্, ফ্যাট, প্রোটিনের বাড়াবাড়ি একটুও কমেনি। থাইতে স্ট্রেচমার্কস এসেছে। জঘন্য। একদম জঘন্য। নিজের ওপর খুব রাগ হল রাহির। একটুও সংযম নেই ওর। থাকলে এমন দুর্ভিক্ষের কারণ ধরনের চেহারা হত না!
নিজেকে দেখলে আরও কষ্ট বাড়বে। তাই চটপট একটা জিন্স, টি-শার্ট আর জ্যাকেট চাপিয়ে নিল রাহি। একটু ঢিলেঢালা কাপড় পরলে মোটা ব্যাপারটা একটু কম চোখে পড়ে।
কলকাতায় এলে জিন্স, টি-শার্ট পরতে পারে রাহি। চাপাডাঙায় পারে না। বা বলা ভাল, মা পরতে দেয় না। বলে, লোকে কী বলবে! মায়ের খুব লোকেদের কথার ভয়। হ্যাঁ, সামান্য গ্রাম্য জায়গায়, এ ওর হাঁড়ির খোঁজখবর বেশি নেয়। নিন্দামন্দও বেশি হয়। তা বলে মানুষ, যা পরতে ইচ্ছে হয়, তা পরবে না? আর টি-শার্ট, প্যান্ট তো খুব ভদ্র পোশাক। কিন্তু মাকে কে বোঝাবে! শাড়ির প্রতি এই অন্ধ আনুগত্যের কোনও ব্যাখ্যা ঠিক খুঁজে পায় না রাহি। তবে এই নিয়ে বিশেষ ঝঞ্ঝাট করে না। মায়ের কথামতোই শাড়ি পরে। আর ইচ্ছে হলে বড়জোর চুড়িদার পরে।
রাহি ঘর থেকে বেরোতেই ছটফট করে উঠল হোমি, ‘এই তোর পাঁচ মিনিট হল? রাহি, কাকিমা বহুত রাগ করছে, বলছে, আর আসতে হবে না। এখানেই রাতের খাবারটা গুন্ডাকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবে।’
‘সরি সরি,’ রাহি ব্যাগটা সোফার ওপর থেকে তুলে বলল, ‘চল, চল। তবে যাদবপুর তো, খুব একটা সময় লাগবে না।’
‘নাঃ, তোকে বলেছে! আজ পঁচিশে ডিসেম্বর। সামনেই বিশাল মল। তার জ্যাম, যাদবপুর থানার জ্যাম, এইট বি-র জ্যাম। পুরো ঝাড় কেস একদম। তুই এত লেট করলি না!’
রাহি বলল, ‘আমি দেরি করলাম? না, স্নান করতে গিয়ে তুই দেরি করলি?’
‘আচ্ছা, আচ্ছা, চল।’ হোমি প্রায় ধাক্কিয়ে রাহিকে বের করে আনল ঘর থেকে।
কলকাতায়, বাবার এক বন্ধু, নিজের একটা গাড়ি চব্বিশ ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য দিয়ে রেখেছে রাহিকে। তাই রাস্তা থেকে ট্যাক্সি ধরার ঝামেলা নেই।
গাড়িতে বসে রাহি বলল, ‘কোথাও থেকে মিষ্টি কিনে নিতে হবে। প্রথমবার তোর কাকুর বাড়ি যাচ্ছি তো!’
‘ধুর, ফর্মালিটি বাদ দে তো!’
‘না, ওটা ভদ্রতা। মিষ্টির দোকান দেখলে গাড়ি থামাস তো।’
‘আমার কাকু-কাকিমা কিন্তু এমন কিছুতে বিশ্বাস করে না। ওরা শুধু আমরা গেলেই খুশি হবে। আজ ওই যিশুর জন্মদিনটা ওদের কাছে খুব আনন্দের। কাকু-কাকিমা সাধ্যমতো চেষ্টা করে এই ক্রিসমাসের সন্ধেটা ভাল করে কাটাতে। আমার কাকিমাকে জাস্ট একবার দেখবি। কাকুকে বিয়ে করলেও বছরের এই দিনটা এলেই কাকিমা বাচ্চা মেয়ের মতো ক্রিসমাস পালন করে।’
গুন্ডা বলে ছেলেটাকে দেখেছে রাহি। ইয়া মোটা চেহারা। দাড়িগোঁফ কামানো। আর খুব ঘামে। ছেলেটা প্রচুর কথাও বলে, যেগুলো আপাতপক্ষে রূঢ় শোনালেও আসলে ছেলেটা যে ভাল সেটাই প্রমাণ করে। কারণ, অমন সহজ-সরলভাবে কথা বলতে অনেকেই ভয় পায়, পাছে অন্যের কাছে নিজের ভালমানুষের ছবিটা বদলে যায়! কিন্তু গুন্ডা অতশত কিছু ভাবে না। বরং নিজের ভাল-খারাপের তোয়াক্কা না করেই সত্যিগুলো স্পষ্ট করে বলে দেয়।
সারা বছর সাধারণভাবে কাটালেও এই পঁচিশে ডিসেম্বর দিনটায় ওরা আনন্দ করে। কয়েকজনকে নেমন্তন্ন করে। কেক কাটে। গুন্ডার ভাই টমটম গিটার বাজিয়ে গানও গায়। তারপর সবাই রাতে ডিনার করে।
শুনেছে, এই সবই হোমির কাছে শুনেছে রাহি। হোমির বাবা-মা চায় না যে, হোমি ওর কাকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখুক। হোমির কাকা খ্রিস্টান মেয়েকে বিয়ে করেছে বলেই ওরা এমন করে। কিন্তু হোমি কোনওদিন কারও কথা শোনে না, বিশেষ করে সেটাকে যদি অন্যায় মনে করে। আর এই স্বভাবের জন্যই তো ‘হেল্প আর্থ’-কে নিয়ে সব বাধা কাটিয়ে মুভ করতে পারে ও।
কাকাকে বাড়ি থেকে বের করা নিয়ে নিজের ঠাকুরদার সঙ্গে প্রায়ই তর্কাতর্কি করে হোমি। বলে এটা জঘন্য অন্যায়। তাই এটার একটা প্রতিকার ও নিজের মতো করে করবে। তবে শুধু অন্যায়ের প্রতিকারই নয়, গুন্ডাকেও খুব ভালবাসে হোমি। এমনকী বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রায় লড়াই করে গুন্ডাকে মাঝে মাঝে চাপাডাঙায় নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখে ও। হোমির বাবা-মাও, কেন কে জানে, গুন্ডাকে সরাতে পারে না।
গাড়িটা থেকে নামতে নামতে একটু অস্বস্তি লাগল রাহির। আসলে কোনওদিন আসেনি তো। তার ওপর ওরা তো সরাসরি নেমন্তন্নও করেনি। কে জানে ওরাই নেমন্তন্ন করেছে, না হোমি নিজে আগ বাড়িয়ে ওকে নিয়ে আসবে বলেছে!
গলিটা সামান্য অন্ধকার। এখন কলকাতার অনেক জায়গাতেই বড় বড় সাদা রঙের আলো লাগানো হয়েছে। এ পাড়াতেও হয়েছে, কিন্তু কোনও কারণবশত এখানের দু’-একটা আলো জ্বলছে না।
গলির পাশ দিয়ে আরও একটা সরু গলি চলে গিয়েছে। হোমির পিছন পিছন সেটাতে ঢুকল ও। এই গলিটা যথেষ্ট স্যাঁতসেঁতে। পায়ের তলায় ইট পাতা। একটু এদিক-ওদিক হলেই কাঁধ ঘেঁষে যাচ্ছে পাশের দেওয়ালে। রাহির মনে হল, গুন্ডা এই গলি দিয়ে কীভাবে রোজ বাড়িতে ঢোকে আর বেরোয়?
গলিটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটা কাঠের দরজা। তবে দরজাটা বেশ ভাঙাচোরা। আর তার গায়ে একটা দুর্বল লেটার বক্স ঝুলছে। দরজাটার মাথায় একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জন্ডিস রোগীর চোখের মতো জ্বলছে। ময়লা আলোয় জায়গাটাকে আরও যেন ময়লা লাগছে। এখানে হোমির কাকারা থাকে?
হোমি দরজার কড়া ধরে খুব জোরে নাড়া দিল। এই রে! দরজাসুদ্ধ খুলে পড়বে না তো! ভয় লাগল রাহির। দরজাটার যে খুব খারাপ অবস্থা!
গুন্ডাই দরজা খুলল। আর রাহি ওই দুর্বল আলোতেই দেখল গুন্ডা একটা পাতলা গোল গলার টি-শার্ট পরে রয়েছে। একটু হাঁফাচ্ছেও যেন।
হোমি ভেতরে ঢুকে বলল, ‘কী রে গুন্ডা, তোর ঠান্ডা লাগছে না?’
‘ঠান্ডা!’ গুন্ডা এমন গলায় বলল যেন এখন জ্যৈষ্ঠের দুপুর।
‘আজ তো দারুণ ঠান্ডা পড়েছে। তোর মালুম হচ্ছে না?’
‘সত্যি দিদি, তুমি কী যে বলো না!’ গুন্ডা সারা শরীর খেলিয়ে হাসল। তারপর নিজের পেটের ওপর চাপড় মেরে বলল, ‘ঠান্ডার সাধ্য আছে আমার এই চাইনিজ ওয়ালকে টপকায়?’
বাইরেটা এমন অগোছালো হলেও ঘরের ভেতরে ঢুকে ভাল লাগল রাহির। ওই দরজা থেকে একটা ছোট্ট উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়েছে রাহিদের। উঠোনের এক পাশে ছেড়ে রাখা কিছু জুতোর পাশে ওরাও জুতো খুলেছিল। ঘরে ঢুকে সেইসব জুতোর মালিকদের দেখল ও।
বেশি নয়, ছ’জন। তিনটে মেয়ে আর দুটো ছেলে। আর ঘরের এক কোণে গিটার কোলে নিয়ে বসে রয়েছে একটা ষোলো-সতেরো বছরের ছেলে। এটা নিশ্চয়ই টমটম।
হোমির গলা পেয়ে ঘরের পরদা সরিয়ে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাও ঘরে ঢুকল। হোমি বলল, ‘কাকু, এই দেখো কাকে এনেছি আমার সঙ্গে। রাহি। আয় রাহি, এই আমার কাকু জয়ন্ত রায় আর কাকিমা শিবানী এমিলিয়া রায়।’
শিবানীকে দেখে একটু অবাক হল রাহি। একদম ওর মায়ের মতো। শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুর সব একরকম। তবে যে হোমি বলেছিল ক্রিশ্চিয়ান? নিজেকে সামলে নিল রাহি। ক্রিশ্চিয়ান মানেই কি আর বিদেশি? অনেক বাঙালি ক্রিশ্চিয়ানও তো থাকে। শিবানীকাকিমা নিশ্চয়ই তেমন একজন।
কাকিমা হেসে বলল, ‘বোসো রাহি। হোমি এলেই তোমার কথা বলে। তাই ভাবলাম একবার নেমন্তন্ন করি তোমায়। না হলে তো আর আমাদের বাড়িতে তুমি আসবে না।’
‘না না, তা কেন?’ রাহি হাসল, ‘আসলে অত দূরে থাকি তো তাই চট করে আসা হয় না। কিন্তু দেখুন, আমি এলাম তো!’
কাকু বলল, ‘বাড়িতে অন্যরা আজ তেমন নেই। আমরাই ক’জন আছি। তো, তোমরা গল্প করো। আমরা বুড়ো-বুড়ি একটু পরে আসছি।’
কাকুরা চলে যেতেই গুন্ডা পুরনো কাঠের সোফাটায় খুব সুন্দর দেখতে একটা ছেলে আর সামান্য চাপা রঙের মেয়ের মধ্যে জোর করে গুঁজে দিল নিজেকে। তারপর রাহির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই রাহিদি, এরা সব আমার বন্ধু। ও হচ্ছে জয়। ওর পাশে স্নেহা, তার পাশে রূপ। আর আমার বাঁ দিকে এইজনের নাম দিঘি আর ডান দিকের এই কার্তিক ঠাকুরটি হল আর্য।’
সবাইকে দেখে ভাল লাগল রাহির। অল্পবয়সি সবাই। ওর চেয়ে সামান্য ছোট।
আর্য বলল, ‘তোমার নামটা খুব আনকমন। রাহি। গ্রেট। গুন্ডার কাছে শুনেছি, তোমাদের নাকি র্যাঞ্চ আছে? তোমরা নাকি সেখানে থাকো?’
‘র্যাঞ্চ!’ হাসল রাহি, ‘তেমন কিছু নয়।’
গুন্ডা বলল, ‘না রে আর্য, গেলে দেখতে পাবি। ব্যাপক ব্যাপার!’
আর্য বলল, ‘নিশ্চয়ই যাব। কিন্তু তোর সঙ্গে নয়। তুই একটা মোটা অসভ্য।’
‘মানে?’ গুন্ডা এমন করে ঘুরল যে, দিঘি উফ করে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে পুরনো কাঠের সোফাটাও আর্তনাদ করল।
‘মানে, আমার আর দিঘির মধ্যে তুই এমন অসভ্যের মতো ঢুকে পড়লি কেন?’
‘অ্যাঁ, আমি অসভ্য?’ গুন্ডা চোখ পাকাল, ‘অসভ্য তো তুই। তোকে নেমন্তন্ন করেছি আজ যে, তুই এসেছিস?’
আর্য গলা তুলে বলল, ‘বেশ করেছি এসেছি। তুই যে বিনা নেমন্তন্নে সব জায়গায় ঢুকে পড়িস! তখন মনে থাকে না? দেখ, তোর বাড়িতে অমনভাবে কেউ এলে কেমন লাগে।’
গুন্ডা বলল, ‘তাও তো খালি হাতে এসেছিস! আর এটা আমার বাড়ি, আমি যেখানে খুশি বসব। ইচ্ছে হলে দিঘির কোলে বসব।’
আর্য উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘তবে রে মোটা। মেরে তোর হাড় ভেঙে দেব।’
‘হাড়?’ খিকখিক করে হাসল রূপ, ‘অমন চর্বি পেরিয়ে অত অবধি পৌঁছোতে পারবি?’
রাহি দেখল, এত সবের মাঝে থেকেও দিঘি কেমন যেন অন্যমনস্ক। কেমন যেন চুপচাপ। মেয়েটা কি কোনও কষ্টে আছে? রাহি এমন মুখ চেনে।
দিঘি উঠে গিয়ে এবার টমটমের পাশের শোকেসটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আলতো গলায় বলল, ‘টমটম একটা গান কর তো। এই পরিবেশটাকে একটু ঠিক কর।’
‘ঠিক কর মানে?’ গুন্ডা তেরিয়া হয়ে উঠল, ‘আর্য দেখ, তোর দিঘি কী বলছে! শালা, আমরা কী…’
‘আঃ,’ এবার হোমি ধমক দিল, ‘গুন্ডা, এত এক্সাইটেড কেন তুই? তখন থেকে আনসান বকে যাচ্ছিস! চুপ করে বোস। একদম লাফাবি না।’
গুন্ডা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল।
হোমি এবার টমটমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী রে গা। গান গা। দিঘি তো ঠিকই বলেছে। গিটার নিয়ে সঙের মতো বসে না থেকে একটা গান শোনা।’
টমটম গিটারটাকে ধরে চোখ বন্ধ করে বসল কিছুক্ষণ। তারপর গিটার স্ট্রাম করে ধরল,
‘Tis true the rain that has no end
It’s hard to find a faithful friend
And when you find one just and true
He’s dropped the old one for the new
Bring back my blue eyed boy to me
Bring back my blue eyed boy to me
Bring back my blue eyed boy to me
That I may ever happy be…’
রাহি শুনল টমটম গানের শেষে ‘Bring back my blue eyed boy to me’ লাইনটা আরও কয়েকবার গাইল। ও দেখল, আর্য উঠে গিয়ে দাঁড়াল দিঘির সামনে। তারপর আলতো হাত ধরে টানল নাচের জন্য। কিন্তু দিঘি আচমকা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল আর্যর হাত। আর্য অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল দিঘির দিকে। আর গুন্ডা সেই দেখে শব্দ করে হেসে বলল, ‘কী রে আর্য, খেলি তো ঝাড়! দিঘির মনে হচ্ছে সেই ব্লু আইড বয়টিকে মনে পড়ছে। কী রে দিঘি, তাই তো?’
রাহি দেখল গুন্ডা হাসছে। স্নেহা আর জয় হাসছে। আর্য দাঁড়িয়ে আছে থতমত খেয়ে। রাহি দেখল দিঘির মুখে ঘন হচ্ছে মেঘ। যিশুর জন্মদিনে মনখারাপের একটা মেঘ যেন পাক খাচ্ছে শহরে। কোথাও কিছু নেই, তবু যেন মনখারাপ তার খয়েরি ডানাটায় ঢেকে ফেলছে মানুষকে। আর নীল চোখের তাকে হঠাৎ খুব মনে পড়ছে রাহির। খুব মনে পড়ছে। আচ্ছা, দিঘি গানটা শুনে এমন হয়ে গেল কেন? ও-ও কি কোনও নীল চোখের মানুষকে চেনে? ওরও কি কোনও নীল চোখের মানুষের জন্য মনখারাপ করে? হাজার হাজার বছর আগে বেথলেহেমের মাথায় যে-নীল রঙের তারাটি এসে স্থির হয়ে গিয়েছিল, এতদিন পরে এই যাদবপুরের ছোট্ট পাড়ার মাথায় সে কি ফিরে এল আবার? গান কি তাকে ফিরিয়ে আনল নতুন করে? নাকি সে ছিলই সারাজীবন? সমস্ত ভালবাসার মানুষদের মাথার ওপর সে জ্বলেই ছিল আজীবনকাল! শুধু আজ তাকে দেখা গেল স্পষ্ট করে!
রাহি দেখল দূরে ঝুলনের মতো সাজানো পুতুলদের মাঝে মেরির কোল আলো করে হাসছেন যিশু। যেন বলছেন, ভালবাসার দিন শুরু হল।
Chapter - 11
১১
চাপাডালির মোড়টায় আজ ভীষণ একটা জট লেগে আছে। বাস, সাইকেল, ভ্যান, রিকশা, অটো আর গাড়ির গিঁটের মধ্যে যেন আটকে আছে সন্ধেটা। ধোঁয়ায় রীতিমতো গলা-বুক জ্বলছে কিগানের। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে! শশীবাবুর যদি কোনও একটা কাণ্ডজ্ঞান থাকে!
গৌর ওকে নামিয়ে দিয়েছে এখানে প্রায় কুড়ি মিনিট আগে। শশীবাবু তখন বলেছিল যে, দশ মিনিটের ভেতরে আসছে। কিন্তু তার এখনও পাত্তা নেই। শশীবাবুর দশ মিনিট কত মিনিটে হয়?
সামনের চায়ের দোকানটা বন্ধ। এর বাইরে একটা ভাঙাচোরা সিমেন্টের বেদির মতো আছে। কাঁধের ছোট ব্যাগটা তার ওপর রেখে বসল কিগান। এমন ভোগাবে জানলে বাস ধরে বেরিয়ে যেত ও। অপেক্ষা করতে ভাল লাগছে না কিগানের। শরীরে একটা কষ্ট হচ্ছে। কেমন যেন ঘুম পাচ্ছে ওর। মনে হচ্ছে যেন কয়েক লক্ষ বছর ঘুমোয়নি। আসলে তা কিন্তু নয়। মাত্র গতকাল রাতটা ঘুমোয়নি কিগান আর তাতেই মনে হচ্ছে যেন যুগ যুগ ধরে জেগে রয়েছে ও।
কলকাতা, বহু মাস পরের কলকাতা ওকে নিশ্চিন্তে রাত কাটাতে দেয়নি। কেন জানে না কিগান, কিন্তু গতকাল সারাটা রাত ও এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছিল। তারপর শেষ রাতের দিকে ও গেস্ট হাউসের বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল একা একা। অবিকল সেই কলকাতা ছেড়ে চাপাডাঙায় চলে আসার আগের রাতের মতো।
হেড অফিস থেকে প্রেসিডেন্ট সাহেব এসেছেন কলকাতায়। দু’দিনের টুর। যাকে বলে ঝটিকা সফর। শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন আর বীরভূমের দিকে জমিও দেখতে এসেছেন। ফ্যাক্টরি বানাতে চান।
গত পরশু সন্ধেবেলা গৌরের ফোন পেয়ে চমকে উঠেছিল কিগান। না, গৌর ফোন করে, কিন্তু এমনভাবে কলকাতায় ডেকে পাঠায় না।
কিগান অবাক গলায় বলেছিল, ‘স্যার, আমায় কলকাতায় যেতে হবে?’
‘কিঁউ, ও কেয়া চান্দ পে হ্যায়?’ স্বভাবসিদ্ধ হালকা গলায় বলেছিল গৌর। তারপর যোগ করেছিল, ‘জাস্ট একদিনের জন্য আসতে হবে তোকে। প্রেসিডেন্ট বুডঢা তোর সঙ্গে দেখা করতে চায়। আই টোল্ড হিম অ্যাবাউট ইয়োর গুড জব। আর বলেছি যে, চাপাডাঙায় তোর ভালই রাজ চলে।’
‘রাজ চলে?’ অবাক গলায় জানতে চেয়েছিল কিগান, ‘স্যার, রাজ চলে মানে?’
‘মানে তুই ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারিস।’
‘স্যার, কী বলছেন?’ কিগানের অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কী বলছে গৌর? আর এমন বলছেই বা কেন?
‘স্যার, আমি কি একদিনেই ফিরতে পারব?’
‘না, ইউ হ্যাভ টু স্টে ফর দ্য ডে। রাতে তোর সঙ্গে মিট করবেন প্রেসিডেন্ট। তু ফিকর না করিও। পূর্ণদাস রোডে আমাদের গেস্ট হাউস আছে। সেখানে রাত কাটাতে পারিস। তবে তোর নিজের বাড়িও তো আছে।’
‘না স্যার, পূর্ণদাস রোড উইল বি ফাইন।’
গৌর দু’-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলেছিল, ‘যেমন তোর ইচ্ছে। তবে কাল দেখা হচ্ছে। কেমন?’
ফোনটা রেখে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল কিগান। গেস্ট হাউসে থাকতে চায় বলায় গৌর হঠাৎ যেমন চুপ করে গিয়েছিল, তাতে তো ভয়ই পেয়েছিল। আসলে গৌর মানুষটা অন্যরকম। হঠাৎ হঠাৎ পার্সোনাল হয়ে যায়। আর একটু হলেই বাড়ি নিয়ে প্রশ্ন করে ফেলছিল আর কী!
বাড়ি! কথাটা চিন্তা করেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিগানের। প্রায় সারাটা জীবন যেখানে কাটাল সেখান থেকে এমনভাবে চলে আসতে হল ওকে? আর এমন একটা বদনাম মাথায় নিয়ে? দিঘি তো সব জানত, তবু একবারও কিচ্ছু বলল না?
দিঘি! কত বছরের ছোট ওর চেয়ে? পনেরো বছরের। দিঘি নিজেই বলেছিল। দিনটা এখনও মনে আছে কিগানের। দোল ছিল সেদিন। নিজের ঘরে বসে কবিতা পড়ছিল কিগান। মনখারাপ করা এক কবির লেখা। আর এতটাই মন দিয়ে পড়ছিল যে, রাস্তার আওয়াজ, হইহুল্লোড়, কিছুই কানে ঢুকছিল না। আর তাই হয়তো ওই আলতো পায়ের শব্দটাও শুনতে পায়নি।
‘তোমায় একটু আবির দেব?’ দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা শুনে মাথা তুলেছিল কিগান। ও একটু চমকে উঠে তাকিয়েছিল পিছন দিকে। দেখেছিল হাতে একটা ছোট প্লাস্টিক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দিঘি। পরনে কুর্তি আর প্যান্ট। গোটাটাই নানা রঙে রাঙানো। গালে আবির। হলুদ রঙের। আর তাতে যেন একদম অন্যরকম লাগছিল ওকে। সেই প্রথম ভাল করে দিঘিকে লক্ষ করেছিল কিগান। কেন করেছিল আজও জানে না।
কিগান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিছু বলছ?’
দিঘি গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘জিজ্ঞেস করছিলাম রোবটরা কি দোল খেলে?’
‘রোবটরা?’ থতমত খেয়ে গিয়েছিল কিগান, ‘অ্যাঁ? রোবটরা? মানে?’
‘মানে, আমি কি তোমায় আবির দিতে পারি?’
‘আমায়?’ খুব কঠিন এক প্রশ্ন যেন। কিগান কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
দিঘি ঠোঁট বেঁকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলেছিল, ‘কী হল? দুটো প্রশ্ন করলাম, একটাও তো উত্তর দিলে না?’
কিগান যেন অন্য একটা দিঘিকে দেখছিল। গত সপ্তাহেও তো দেখেছিল, কিন্তু এমন তো লাগেনি। এই দিঘি যেন হঠাৎ হল মস্ত বড়! ও বলেছিল, ‘আমায় তুমি রোবট বলছ?’
‘তা নয় তো কী? দুর্গাপুজোয় দেখলাম, পুজো শুরুর আগে কাজ করলে, কিন্তু পুজোয় পাত্তা পাওয়া গেল না। কালীপুজোয় বারান্দায় পর্যন্ত এলে না! সরস্বতী পুজোতেও একই সিন! আর আজ দোল, সেখানে কিনা ঘরে বসে বই পড়ছ? রোবট হয়ে বাঁচতে ভাল লাগে?’
‘রোবট?’ হেসেছিল কিগান, ‘না, রোবট কেন? আমার একা থাকতে ভাল লাগে খুব।’
‘একা থাকতে ভাল লাগে?’ দিঘি যেন প্রথম শুনছে এমন কথা। ও ঠোঁট কামড়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। তারপর বলেছিল, ‘এটা তো একটা সাংঘাতিক সাইকোলজিকাল ডিসঅর্ডার।’
‘তাই?’ কিগান অবাক হয়েছিল, ‘তুমি জানো কী ডিসঅর্ডার?’
দিঘি বলেছিল, ‘তা জানি না। তবে হবে কিছু একটা জটিল রকমের, কমপ্লেক্স ডিসঅর্ডার ফর আ কমপ্লেক্স ম্যান।’
কিগান হেসে বলেছিল, ‘দাও, রং দাও। তবে অল্প একটু। আমার রং-টং ভাল লাগে না।’
‘তোমার গার্লফ্রেন্ড তোমায় কিছু বলে না?’ আচমকা প্রশ্ন করেছিল দিঘি।
‘গার্লফ্রেন্ড!’ দিঘির মুখে এই প্রসঙ্গ শুনে আচমকা ধাক্কা খেয়েছিল কিগান, ‘কীসব বলছ তুমি?’
‘কেন? কীসব বলছি মানে?’ দিঘি স্থিরভাবে চোখ রেখেছিল কিগানের চোখে।
‘না, মানে…’ কিগান চুপ করে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, ‘এসব ঠিক জিজ্ঞেস করতে নেই। তা ছাড়া তুমি এখন অনেক ছোট।’
‘ছোট! হ্যালো,’ দিঘি ঠোঁট কামড়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে, ‘আমায় দেখে তোমার ছোট মনে হয়? আয়াম সিক্সটিন। আগেকার দিনে এই বয়সে মেয়েরা মা হয়ে যেত।’
কিগান ভীষণ বিব্রত হয়ে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে। ও জানত যে, দিঘি চটপটে, কথাবার্তাতেও ভাল। কিন্তু ওর ভেতরে যে এমন একটা মেয়ে লুকিয়ে আছে সেটা বুঝতে পারেনি কিগান!
দিঘি আবার বলেছিল, ‘তা, বললে না তো? তোমার গার্লফ্রেন্ড কিছু বলে না?’
কিগান সামান্য হেসে ওর চেয়ারে বসে পড়েছিল, ‘না, বলে না।’
দিঘি ভুরুটা সামান্য কুঁচকে আবার সোজা করে নিয়েছিল। তারপর খুব সাধারণ গলায় বলেছিল, ‘কেন? হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেন্ডকে কিছু বলতে কষ্ট হয়?’
‘না, কষ্ট হয় না।’ কিগান ক্লান্তভাবে হেসেছিল সামান্য।
‘তা হলে?’ দিঘি যেন হঠাৎ অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।
‘কী তা হলে?’ কিগান হাসছিল। টেবিলের পেপার ওয়েটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল একা একা।
‘তুমি বলবে না?’ দিঘির অধৈর্য গলাটা অভিমানের দিকে বাঁক নিচ্ছিল ক্রমশ।
‘তুমি আমার চেয়ে অনেক অনেক ছোট দিঘি।’
‘ও, কাম অন।’ দিঘি এগিয়ে গিয়েছিল কিগানের দিকে, ‘জাস্ট ফিফটিন ইয়ার্স, এটা কোনও পার্থক্য হল!’
‘পনেরো বছর অনেক সময়। আর আমি তো বুড়ো।’ কিগান বইটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বলেছিল, ‘এসব বাদ দাও দিঘি। মনে হচ্ছে দোল খেলতে তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
দিঘি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে, তারপর আচমকা প্রায় লাফিয়ে পড়ে হাতের মুঠোর আবির মাখিয়ে দিয়েছিল কিগানের চুলে, কপালে আর গালে।
কিগান আচমকা এমন ঘটনায় হতচকিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর নিজেকে ছাড়াতে গিয়ে চেয়ারসুদ্ধ উলটে পরেছিল মাটিতে। দিঘিও টাল সামলাতে না পেরে কিগানের বুকের ওপর পরে গিয়েছিল।
শব্দটা ভালই হয়েছিল। দূর থেকে আস্তে হলেও ঠাকুরমার পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিল কিগান। শব্দ শুনে ঠাকুরমা আসছে! আর ও এমনভাবে পড়ে আছে মেঝেতে? প্রায় লাফিয়ে মেঝে থেকে উঠে পড়েছিল কিগান। দিঘিও নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে পড়েছিল।
ঠাকুরমা এসে একটু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল দরজায়, ‘এ কী রে? এমন রং মেখে রয়েছিস যে! আর চেয়ারটা উলটে গেল কী করে?’
কিগান আমতা আমতা করছে দেখে দিঘি চটপট বলেছিল, ‘আরে, তোমার নাতি এত ভিতু। দেখো না, রং দেব বলে পালাতে গিয়ে চেয়ার নিয়ে পড়েছে। তবে আমি ছাড়িনি। তাও ভূত করে দিয়েছি একেবারে। হুঁ, খুব সাহেবিপনা দেখায়। ঠিক করিনি ঠাকুরমা? তুমি বলো, এমন হুঁকোমুখো হয়ে কেউ থাকে?’
ঠাকুরমা হেসে বলেছিলেন, ‘ঠিক করেছিস। ও এমন বুড়োটে হয়ে থাকে না এই বয়সে!’
কিগান অপ্রস্তুত মুখ করে বলেছিল, ‘আমি তো বুড়োই। দিঘির তুলনায় আমি যথেষ্ট বুড়ো। আমার এসব ভাল লাগে না।’
ঠাকুরমা দিঘির হাত ধরে টেনে বলেছিল, ‘চল তো। ওকে অমন করে একাই থাকতে দে। তুই আমার সঙ্গে চল। আজ ভোগ দিয়েছি। বাড়িতে নিয়ে যাবি।’
দিঘি ঠাকুরমার সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও একটু পরে আবার দৌড়ে ঘরে এসে ঢুকেছিল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা আবিরের প্যাকেটটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘এটা ফেলে গিয়েছিলাম। আর বাই দ্য ওয়ে,’ দিঘি গলাটাকে হঠাৎ নামিয়ে বলেছিল, ‘তোমার আফটার শেভটা দারুণ। একদিন দেখো, এটাকে আমি…’
জীবনে যা কিছু অর্ধেক হয়, অসমাপ্ত হয়, তার ভেতরেই নানারকম সম্ভাবনা আর আশঙ্কা লুকিয়ে থাকে। দিঘির চলে যাওয়াটুকুর ভেতরে আশঙ্কাটাই দেখতে পেয়েছিল কিগান। আর অবাকও লেগেছিল। মেয়েটার হলটা কী? দিব্যি আসত পড়া দেখিয়ে নিতে। টুকটাক গল্পও করত। কিন্তু এ তো অন্যরকম হয়ে গেল পুরো! কিগানের মাথার ভেতর কেমন যেন জট লেগে যাচ্ছিল সব। বুকে কষ্ট হচ্ছিল। এমনিতেই নানা চিন্তা ঘিরে থাকে, তারপর আরও নতুন ঝামেলা হওয়ার আশঙ্কায় মুখটা বিস্বাদ লাগছিল।
সত্যিই কি শুধু বিস্বাদ লেগেছিল কিগানের? অমন ঘন বাদামি চুল থেকে ভেসে আসা গন্ধ। নরম স্পর্শ। মনোযোগ। শুধু কি আশঙ্কাই জাগিয়েছিল ওর বুকে? ভাললাগা কি জাগায়নি এতটুকুও?
এই বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে বসে ঠান্ডা হাওয়ার ভেতরে হঠাৎ দু’বছর আগের দোলের দিনটায় যেন মনে মনে ফিরে গেল কিগান। কেমন ছিল সেদিনের রোদ? চুলের ভেতর আবির মাখানো আঙুলগুলো কেমন ছিল? কেমন ছিল সেই ঘন বাদামি চুলের গন্ধ?
আচমকা শীত করে উঠল কিগানের। হিজিবিজি আলো আর আওয়াজ ভরতি এই চাপাডালির মোড়টার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ওই সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িটায় নিজের ঘরটার জন্য মন কেমন করে উঠল কিগানের। সেই চার বছর বয়স থেকে তো ওখানে আছে ও। তা হলে? তা হলে কেন এমনভাবে ওকে চলে আসতে হল? কেন? বারবার কেন ওকেই চলে যেতে হয়? কারও কাছে ও থাকতে পারে না কেন?
‘আরে কিগানদা, তুমি?’
বড় রাস্তার দিকে আলো থাকলেও, এই বন্ধ দোকানের সামনেটা বেশ অন্ধকার। কিগান চোখ কুঁচকে তাকাল। আসলে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল বলে চট করে বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখন একটু তাকিয়ে বুঝল, আরে, ত্রয়ণ যে!
কিগান জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি? এখানে কী করছ? বাড়ি ফিরছ নাকি?’
‘বাড়ি? এখনই?’ ত্রয়ণ হাসল, ‘সুধাদি এসেছেন। ওঁর সঙ্গে এসেছি। তারপর একবার পার্টি অফিসে যাব। আসলে কালচারাল একটা অনুষ্ঠান করার ইচ্ছে আছে সামনের সরস্বতী পুজোয়। সেই জন্য একটু দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে।’
‘কালচারাল অনুষ্ঠান? খুব ভাল।’ কিগান উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল।
‘আর ভাল,’ ত্রয়ণ শ্বাস ফেলল, ‘পার্টিটা শালা নোংরামির জায়গা হয়ে গেছে। নিজেদের পেটোয়া লোক ছাড়া ফাংশনে গাইতে দেবে না। পার্টির ভেতরে যদি এত ভাগ, এত দলাদলি থাকে তা হলে কোনও কাজ হয়? একটা সামান্য ফাংশন, সেই নিয়েই অশান্তি। আর সবকিছুর পিছনে আছে চমকদা। সুধাদিকে কতবার বলি চমকদার ডানা ছাঁটতে, কিছুতেই শোনে না। বলে, ও নাকি দলের অ্যাসেট। তুমি বলো, এই ফাংশনেও চমকদা ছড়ি ঘোরাবে! কাজের কাজ তো একটাও করে না। সমস্ত প্রতিবাদ, সভা, বিক্ষোভ সব জায়গায় আমরা যাব আর চমকদা শুধু মেশিন নিয়ে গুন্ডাগিরি করে বেড়াবে।’
কিগান কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে গেল। আসলে ত্রয়ণের সঙ্গে টুকটাক কথা হয় বটে, কিন্তু সেটা এমন নয় যে, যার জন্য ওকে এত কথা বলবে ছেলেটা। কিগান বুঝল, পার্টির ভেতরেই চমককে নিয়ে ত্রয়ণের একটা সমস্যা আছে। কিন্তু ওকে এসব কেন বলছে ত্রয়ণ তা ঠিক বুঝতে পারছে না।
ত্রয়ণ আবার বলল, ‘মানুষ কি কিছু বোঝে না ভেবেছ? তারা সব বোঝে। সামনের বার ভোটে দেখো না সুধাদির কী দশা হয়! রাস্তার ধারের গাছ কাটায় কমিশন মারবে, বেআইনি প্রোমোটারিতে মদত দেবে, বর্ডার থেকে টপকানো মালে কমিশন খাবে। গোটা উত্তর চব্বিশ পরগনার কাটা তেলের ওপর টাকা ঝাড়বে। পাবলিক এসব বোঝে না? সবাই কি ঘাস খায় নাকি? আর সুধাদির এই সব কিছুতেই চমককে দরকার। আমি বললাম ফাংশনের কথা। বলে, চমককে জিজ্ঞেস করতে হবে। বোঝো, একটা মাধ্যমিক পাশ, তার কাছ থেকে এসব শিখতে হবে আমায়! পলিটিক্সের স্ট্রাকচারটাই এই নেতানেত্রীরা গুন্ডা-বদমাশের হাতে তুলে দিচ্ছে। গভর্নমেন্ট চালানো যে, একটা সার্ভিস, সেটা এরা বোঝে না। সব বাপের তেজারতি পেয়েছে। তুমি বলো, ওয়েল ফেয়ার অব দ্য স্টেট বলে কিছু নেই? সবাই কেন নিজের পকেট ভরবে? তবে তো মুদিখানা খুলে দু’কেজি আটার থেকে আড়াইশো গ্রাম ওজনে মারতে পারত। এই দেখো না, সুধাদি এখানে এসেছে তোমাদের কোম্পানির ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বলবে বলে। বারাসতের ওই হাউজিংটায় একটা চিলড্রেন্স পার্ক করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখন না করে বেরিয়ে যেতে চাইছে। আমরা চেপে ধরেছি। আমাদের বাগে আনতে পারছে না দেখে সুধাদির সঙ্গে মিটিং ফিক্স করেছে। সুধাদির কথাতেই আমি এলাম। আর যেই আমি ন্যায্য কথা বলতে গেলাম, আমায় বলল, তুই গিয়ে পাশের ঘরে ফাংশনের বাজেটটা কর। টাকা খেয়ে সুধাদি সব মেনে নেবে! আর তোমাদের ওই গৌর রওশন দিওয়ান জানোয়ারটা ড্যাং ড্যাং করে বেরিয়ে যাবে পার্ক টার্ক না করে। আমি তখনই সুধাদিকে বলেছিলাম ওই আদিত্য মালটার সঙ্গে দেখা না করতে। কিন্তু সুধাদি যা। দেখা করল। আদিত্য কী যে মন্ত্র দিল, ব্যস, ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়ে গেল। সব শালা করাপ্ট! এত করাপশন থাকলে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আমিও ছাড়ব না। গাছ কাটা নিয়ে অলরেডি সুধাদির সঙ্গে আমার ঝামেলা হয়েছে। এবার সুধাদি বেগড়বাই করলে এটা নিয়েও হবে।’
কিগান কিছু না বলে চুপ করে তাকিয়ে রইল ত্রয়ণের দিকে। না গুঁজে পরা জামাটা সোয়েটারের তলা দিয়ে বেরিয়ে আছে। আবছা আলোতেও দাড়ি আর উসকোখুসকো মাথার চুল দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা রেগে আছে খুব। কিগান জানে, এখানে ওর বদলে অ’বাবু বা ক’বাবু থাকলেও ত্রয়ণ এই কথাগুলোই বলত। কারণ, এখন ত্রয়ণকে বলতে হবে। বদ রক্তের মতো কথাগুলো শরীর থেকে ওকে বের করে দিতে হবে। না হলে ত্রয়ণের কষ্ট হবে। আসলে ত্রয়ণ যে ক্রমশ পার্টির ভেতরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে সেটা বুঝতে পারছে ও। তাই হয়তো ডুবন্ত মানুষদের মতো এলোপাতাড়ি হাত-পা ছুড়ছে।
কিগানের এসব নিয়ে একদমই আগ্রহ নেই। ওর এসব ভাল লাগে না। তবে কেউ বললে ভদ্রতাবশত চুপ করে থাকে। কিগান শুনেছে চমক সাংঘাতিক ছেলে। লোকে বলে চমক নাকি মার্ডারও করেছে। কিন্তু কিগান সেসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। চমক ওর সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করে। তাই ওকে ভালই মনে হয় কিগানের। হ্যাঁ, এসব ব্যাপারে কিগান ‘নাইভ’। মানে দিঘি বলত। কিন্তু তাতে কিছু এসে যেত না কিগানের। তবু দিঘি বলত, ‘যে যা বলে বিশ্বাস করো কেন? কেউ একটু ভাল ব্যবহার করলেই অমন গলে যাও কেন? মানুষকে চিনতে শেখো। শুধু বড়ই হয়েছ বয়সে। বুদ্ধিটা দশ বছরের বাচ্চার মতো। এত নাইভ কেন তুমি?’
এই আধো অন্ধকার জায়গায়, হঠাৎ দিঘির মুখটা মনে পড়ে গেল কিগানের। বুকের ভেতরে কোথাও একটা ছোট্ট নৌকো দুলে উঠল যেন। যেন তার ছইয়ের ওপরে বসা নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে গেল কোথাও। যেন মাঝরাতে আচমকাই ঝরে গেল সমস্ত বকুল। কিগান মাথা নিচু করল।
‘তুমি বোর হচ্ছ, না?’ ত্রয়ণের যেন এতক্ষণে হুঁশ হল, ‘আমি এবার যাব। তবে দেখো কিগানদা, তোমাদের ফ্যাক্টরি নিয়েও ব্যাপক ক্যাচাল হবে। ওই জমিটা নিয়ে রাঘবজেঠু আর গৌরের ভেতর টানাটানিটা ভালই হবে। তুমি দেখো।’
কিগান বলল, ‘মাথা গরম কোরো না ত্রয়ণ। যা হবে তা তো হবেই। তুমি শুধু শান্ত থেকো।’
ত্রয়ণ হাসল, ‘হ্যাঁ, শান্ত থাকব! কোনও সুস্থ মানুষ পারে শান্ত থাকতে? যাক গে, বাদ দাও। তুমি তো চাপাডাঙাতেই ফিরবে। আমার সঙ্গে এখানকার ঠেকটায় চলো না। সুধাদির সঙ্গে গাড়ি করে ফিরবে। এই ভুতুড়ে জায়গায় বসে মশার কামড় খাবে কেন ফালতু?’
‘না গো,’ কিগান হাসল, ‘আমাদের ফাক্টরির শশীবাবু আসবেন গাড়ি নিয়ে। থ্যাঙ্ক ইউ ফর আস্কিং।’
‘ঠিক আছে, তা হলে আসি।’ ত্রয়ণ কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল।
শশীবাবুকে আর একবার ফোন করবে কিনা ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা বের করল কিগান আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা ফোন এল। রাহি। নামটা দেখে কিগান চোয়াল শক্ত করল। আবার এই মেয়েটা কেন? কিগান একটু সময় নিয়ে ফোনটা ধরল, ‘হ্যাঁ, বল।’
‘তুমি কোথায়?’ রাহির গলাটা আনন্দের শোনাচ্ছে।
‘কেন?’ কিগান সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করল।
‘আজ পায়েস হয়েছে। মা বলল তোমায় দিয়ে আসতে। তোমার বাড়িতে গিয়ে দেখলাম তুমি নেই। তাই জিজ্ঞেস করছি।’
‘আমি বারাসতে। আসতে অনেক দেরি হবে।’ কিগান গলাটা যতটা সম্ভব নিরুৎসাহ করে বলল।
‘কত দেরি হবে?’
‘ঠিক বলতে পারছি না। তুই প্লিজ কষ্ট করে আসিস না ওসব দিতে।’
‘কষ্ট করে!’ রাহির গলাটা জেদি বাচ্চার মতো শোনাল।
‘মানে, আনিস না। তা ছাড়া রাতে আর মিষ্টি খাব না।’
‘কিন্তু আমি নিজে শিমুইটা বানিয়েছি। জীবনে প্রথমবার। আর তুমি খাবে না?’
কিগানের অস্বস্তিটা বাড়ল। এই মেয়েটা ভাল কিন্তু কেমন যেন একটু গায়েপড়া। মানুষকে যে স্পেস দিতে হয়, তা মানে না। আর মেয়েটা এমন এমন কাণ্ড করে মাঝে মাঝে যে, কিগানের খুব খারাপ লাগে।
‘কী হল খাবে না?’ বলল রাহি।
‘দেখি কখন ফিরতে পারি। ঠিক বুঝতে পারছি না।’
কিগান আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে কেটে দিল ফোনটা। মেয়েটা বকতে থাকলে বকতেই থাকবে। ওর পরিমিতি বোধটাই নেই। এই কিছুদিন আগেই তো একটা কেলেঙ্কারি করেছিল।
রাহি কলকাতায় গিয়েছিল বড়দিনের সময়। সেখান থেকে ওর গিটারের জন্য চার সেট স্ট্রিং কিনে এনেছে। এটা যে আনবে কিগান জানত। কারণ, ও-ই বলেছিল কিনে আনতে। কিন্তু তারপরেই যেটা বের করেছিল সেটা দেখে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল কিগানের। একটা বেশ দামি রিস্টওয়াচ। আরে, এটা কেন? ভাল তো লাগেইনি বরং খারাপ লেগেছিল কিগানের। ও বলেছিল, ‘এটা কার?’
‘তোমার জন্য এনেছি।’ রাহি হাসিমুখে বলেছিল।
‘আমার জন্য? কেন?’
‘আরে আমাদের ফ্ল্যাটের সামনেই বিশাল বড় মল। সেখান থেকেই আনলাম। পছন্দ হল তাই…।’
‘দেখ রাহি,’ কিগান বোঝাতে চেয়েছিল, ‘আমি এত দামি জিনিস নিতে পারি না।’
‘কেন পারো না?’ রাহির গলার স্বরটা পালটাচ্ছিল।
‘পারি না কারণ, কেন নেব?’
‘কেন নেবে না?’ রাহি নাছোড়বান্দা হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘আশ্চর্য। এটা বুঝতে পারছিস না?’ কিগানের অসহায় লেগেছিল খুব।
‘না, পারছি না। কেন নেবে না তুমি?’ রাহির গলাটা কঠিন হচ্ছিল।
‘কী হিসেবে নেব? হঠাৎ নেবই বা কেন? এত দামি বিদেশি ঘড়ি কেন নেব? তোর বাবা জানতে পারলে রাগ করবেন।’
‘ও, শুধু দামটাই দেখলে?’ রাহির গলার ভেতর থেকে ছিপছিপে নদীর শব্দ পাচ্ছিল কিগান, ‘আমি এত পছন্দ করে আনলাম, সেটা দেখলে না? আর বাবা জানতে পারলে কিচ্ছু বলবে না। আমার বাবা অমন নয়।’
কিগান জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবাকে কি তুই বলেছিস?’
‘বাবাকে?’ এবার সামান্য থমকে ছিল রাহি, ‘না, এখনও বলিনি।’
‘কেন, বলিসনি কেন? বলা উচিত ছিল।’
‘না, বলব না,’ রাহির নদীটা স্পষ্ট হচ্ছিল আরও, ‘কেন বলব? আমার নিজের ইচ্ছে বলে কিছু নেই? আমার কাউকে কিছু দিতে ইচ্ছে করতে পারে না? মেয়ে হয়েছি বলে কি সব সময় অনুমতি নিয়ে চলতে হবে নাকি? ভেবেছিলাম তারের দামটাও নেব না, তোমায় ফেরত দেব তোমার টাকা। কিন্তু তা আর করলাম না। ভাবলাম ঘড়িটা তুমি নেবে। ঠিক আছে, এই রইল ঘড়ি, তোমার ইচ্ছে হলে তুমি পরবে আর না হলে ছুড়ে ফেলে দেবে। বুঝেছ?’ ঘড়িটা ঠক করে টেবিলে রেখে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল রাহি।
ঘড়িটা আজও রাখা আছে। পরা হয়নি। আসলে পরতে ইচ্ছেই করেনি কিগানের। ও বোঝে কেন রাহি বারবার আসে। কেন অমন করে। কিন্তু কিগানের তো কিছু দেওয়ার নেই রাহিকে। কিছু বলার নেই। কিগান তো চিন্তাও করতে পারে না রাহিকে নিয়ে। কিন্তু কীভাবে বলবে মেয়েটাকে? আসলে রাহি তো কিছু বলে না। ও শুধু নিজের মতো করে কাজ করে যায়। আর কিগান কখনও বাধা দিলে রাগ দেখায়। তাই কিগান ধীরে ধীরে বাধাও দেয় না আর। ক্রমশ চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে কিগান। আরও শান্ত, বৃষ্টি শেষের রেন ফরেস্টের মতো একা হয়ে যাচ্ছে কিগান।
কেন এমন হয়ে যাচ্ছে কিগান? কার ওপর রাগ করে ক্রমশ নিজেকে গুটিয়ে, সরিয়ে নিচ্ছে ও? রাতে, চারদিক যখন নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন ওর ঘরের সামনের ব্যালকনিতে গিটার নিয়ে একা একা বসে থাকে কিগান। টুংটাং, বাজায় একটু। তারপর, এমনিই চুপ করে বসে থাকে। দেখে, দূরে ওদের ফ্যাক্টরির লম্বা চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দেখে, সেই ধোঁয়ার অনেক অনেক ওপরে ছড়িয়ে রয়েছে মহাকাশ। ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নীল সব তারা। আকাশের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে হালকা লাগে কিগানের। মনে হয় ওর কোনও ওজনই নেই। কোনও পা নেই। হাত নেই। মনে হয় ওর আসলে কিছুই নেই, কেউই নেই। শুধু অসীম এক শূন্যতা হাঁ করে রয়েছে। এক অদ্ভুত চুম্বক ওকে টানছে সেই অশেষ হাঁ-এর দিকে। কিগানের মনে হয় যে-কোনও মুহূর্তে, যে-কোনও মুহূর্তেই ও গ্যাস বেলুনের মতো ভেসে যেতে পারে, উড়ে যেতে পারে, মিলিয়ে যেতে পারে ওই অন্ধকারে। কিগানের মনে হয়, আসলে ওখানেই যেতে হবে ওকে। অনেক দূর হলেও ওই অন্ধকারেই যেতে হবে ওকে। যেতে হবে, একা।
‘শশীবাবু? আপনি কি আসবেন? মানে আজকের মধ্যে আসবেন?’ কিগান ফোনটা কানে লাগিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল।
শশীবাবু অমাইক গলায় বলল, ‘স্যার, একটা ঝামেলা হয়েছে। গাড়িটার ইঞ্জিনে গন্ডগোল। বুঝতে পারছি না কী হয়েছে! স্যার, আপনি কি আর একটু অপেক্ষা করবেন?’
‘আপনার কত সময় লাগবে?’
‘বুঝতে পারছি না। ড্রাইভারটা মিস্ত্রি ধরতে গেছে।’
‘বোঝো কাণ্ড!’ কিগানের বিরক্ত লাগল, ‘ঠিক আছে, বাদ দিন, আমি অন্য বন্দোবস্ত দেখছি। গাড়ি সারানো হয়ে গেলে সোজা চাপাডাঙা ফিরে যাবেন।’
কিগান মাথা নিচু করে ওই বন্ধ দোকানের থেকে বেরিয়ে এল। এখন চারদিকে খুব ভিড়। যতই চেষ্টা করুক, ভিড় জিনিসটা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না কিগান। কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। এখনও দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাস, ট্রেকার আর শাট্ল গাড়িগুলো দেখে থমকে গেল কিগান। সামনে তিতুমির বাস টার্মিনাসের বিশাল বড় ছাউনিটা দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে বাসে উঠে বসে যাওয়া যায়। কিন্তু যেতে যেতে যা ভিড় হবে বাসটায়, কিগানের দম বন্ধ হয়ে আসবে।
আসলে ছোট থেকেই ঠাকুরমা গাড়িতে ট্যাক্সিতে চড়িয়ে বড় করেছে। অফিসে যেতে ধরত মেট্রো। এমনকী জিয়ানার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়ে সবসময় ট্যাক্সিতে চড়ত কিগান। ট্যাক্সি ছাড়া জিয়ানাকে নিয়ে অন্যভাবে ঘুরতে যাবে ভাবতেও পারত না কোনওদিন। আর সত্যি বলতে কী, ট্যাক্সিতেই তো জিয়ানাকে প্রোপোজ করেছিল কিগান।
গরম ছিল, সেই দিনটা ভীষণ গরম ছিল। পিচ গলে যাচ্ছিল প্রায়। কলকাতার সমস্ত মানুষগুলোকে কারা যেন মিষ্টির রস মাখিয়ে দিয়েছিল। গাছের পাতা নড়ছিল না একটাও। শুধু আস্ত একটা শহর এক কড়াই তেলে টগবগ করে ফুটছিল।
সেকেন্ড ইয়ারে কিগানদের একটা গ্রুপ ছিল বন্ধুদের। তার মধ্যে মৃগাঙ্ক নামে একটা ছেলে জিয়ানার সঙ্গে একদম জোঁকের মতো লেগে থাকত। কলেজে আসার সময় জিয়ানাদের বাড়ি থেকে জিয়ানার সঙ্গেই আসত মৃগাঙ্ক। আর তারপর সন্ধের মুখে আবার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিত একদম। রাগ হত কিগানের। মৃগাঙ্ককে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যেত ওর। মনে হত আচ্ছা করে পিটিয়ে দেয় ধরে।
সেদিন জিয়ানার সঙ্গে সামান্য কারণেই রাগারাগি হয়েছিল কিগানের। জিয়ানা আর শেষ পিরিয়ড থেকে কথা বলছিল না ওর সঙ্গে। কিগানেরও মনে হয়েছিল ফিরে যায় বাড়ি। কিন্তু কেন কে জানে যেতে পারেনি। গ্রুপটার সঙ্গেই হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিল ফোটোকপির দোকান অবধি। মৃগাঙ্ক সেদিনও আঠার মতো লেগেছিল জিয়ানার সঙ্গে। আর জিয়ানাও যেন বড্ড বেশি পাত্তা দিচ্ছিল মৃগাঙ্ককে। এমনকী ফোটোকপি করতে দিয়ে সবার সঙ্গে আড্ডার ফাঁকে টিফিনবক্স খুলে সন্দেশও খাইয়ে দিয়েছিল মৃগাঙ্ককে। এটা আর সহ্য করতে পারেনি কিগান। মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া একটা ট্যাক্সিকে হাত তুলে দাঁড় করিয়েছিল ও। তারপর এক হ্যাঁচকায়, সবার চোখের সামনে দিয়ে জিয়ানাকে টেনে তুলে নিয়েছিল গাড়িতে। জিয়ানার হাতের অর্ধেক সন্দেশ আর টিফিনবক্স ছিটকে পড়ে গিয়েছিল রাস্তায়। ট্যাক্সিতে উঠে কিছু না ভেবে বাবুঘাটের দিকে যেতে বলেছিল কিগান। তারপর জিয়ানার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসেছিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়ানা একদম চুপ করে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। তারপর হঠাৎ এক ঝটকায় ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছিল, ‘এটা কী করলি তুই?’ কিগান উত্তর দেয়নি কোনও। জানলা দিয়ে আসা গরমের হলকায় মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল জিয়ানার। ও দু’হাত দিয়ে কিগানের জামাটা ধরে টেনে, ঝাঁকিয়ে বলেছিল, ‘আমার দিকে তাকা। তাকা আমার দিকে। বল এবার। কেন এমন করলি? সবার মধ্যে থেকে কেন এমনভাবে আমায় নিয়ে এলি তুই? কী ভেবেছিস তুই? কী ভেবেছিস? যা খুশি তাই করবি?’
কিগান মুখ ফেরাচ্ছিল না কিছুতেই। তবু জিয়ানা ঝাঁকিয়ে যাচ্ছিল ওকে। আর প্রশ্ন করছিল, ‘কেন এমন করলি? কেন, বল?’
জিয়ানার গলায় কান্নার আওয়াজ পেয়ে অবশেষে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল কিগান। একটা ফুটন্ত কলকাতার ভেতর জিয়ানার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট হয়েছিল কিগানের। ও আলতো গলায় বলেছিল, ‘আমার রাগ হয়। ভীষণ রাগ হয়।’
‘কেন? কেন রাগ হয় তোর?’
‘আমি তোকে,’ কিগান চুপ করে গিয়েছিল মুহূর্ত কাল, তারপর বলেছিল, ‘আমি তোকে খুব ভালবাসি। তাই তোকে অন্যের সঙ্গে দেখলে আমার…’
ট্যাক্সিটা আচমকা খ্যাঁচ শব্দে ব্রেক করে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আর সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে চিৎকার, গাড়ির হর্ন ভেসে এসেছিল। আর ডুবিয়ে দিয়েছিল কিগানের বাকি কথাগুলো। জিয়ানার উত্তর শোনার আগেই কিগান দেখেছিল ওদের গাড়ির সামনে একজন বৃদ্ধ লজেন্সওয়ালা পড়ে গিয়েছে। না, সেই বৃদ্ধের কিচ্ছু হয়নি। তবে সেই দিনের পর থেকে কিগানের গোটা জীবনের অনেক কিছু পালটে গিয়েছিল।
‘আরে কিগানদা কোথায় যাবে?’ রাস্তায় উঠেই প্রশ্নটা শুনে একটু অবাক হল কিগান, ‘কী হল?’
কিগান দেখল সামনে একটা বড় গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছে চমক।
আজ কি সব পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হবেই? আসলে মাঝে মাঝে এমন একটা দিন আসে যেদিন এমন দেখাসাক্ষাৎ হয়ে যায়।
কিগান বলল, ‘আরে দেখ না, অফিস থেকে গাড়ি আসার কথা। কিন্তু শশীবাবু গাড়ি নিয়ে আসেনি। গাড়িটা খারাপ হয়েছে পথে।’
চমক নিজের দিকের দরজাটা খুলে দিয়ে সরে বসল, ‘উঠে এসো, দাঁড়িয়ে থেকো না।’
কিগান একটু দ্বিধা করল। আসলে সংকোচের কারণ নেই। তবু দ্বিধা হয় কিগানের। কারও থেকে সামান্যটুকু নিতেই দ্বিধা হয়। দিঘি বলত, ‘ইগো, তোমার বড্ড ইগো।’
‘আরে, এসো।’ চমক এমনভাবে বলল যে, কিগানকে এবার উঠে বসতেই হল গাড়িতে। চমক বলল, ‘তোমাদের শশী মালটা খুব হারামি। দেখো, গাড়ি খারাপ হয়নি কিছুই, দত্তপুকুরের ওখানে ওর বাঁধা মেয়েছেলে আছে। সেখানেই আছে। সত্যি কিগানদা তোমার চোখকানগুলো একদম কাজ করে না।’
কিগান হাসল, বলল, ‘সেন্স কাজ করে না বলছিস? তা হয়তো আমি সত্যি ননসেন্স। তবে কী জানিস, ঠিকই বলেছিস, আমার পাঁচটা সেন্স বিশেষ কাজ করে না। আমার যা একটু-আধটু কাজ করে তা হল সিক্সথ সেন্স।’
চলন্ত গাড়ি দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল চমক।
কিগান কী কথা বলবে বুঝতে না পেরে বলল, ‘জানিস, আজ ত্রয়ণের সঙ্গে দেখা হল। সুধাদির সঙ্গে এখানে এসেছে।’
চমক সামান্য হাই তুলে বলল, ‘জানি, সুধাদির সঙ্গে ঢ্যামনাটা এসেছে।
‘তুই জানিস?’ অবাক হল কিগান।
‘তোমার বস গৌরের সঙ্গে তো সুধাদির মিটিং আছে। তোমার ভাইটি তো আমার সঙ্গে কথা বলেই সুধাদি অবধি পৌঁছোতে পেরেছে। গত সপ্তাহতে তো আদিত্য এসেছিল চাপাডাঙায় আমার সঙ্গে দেখা করতে। তুমি জানো না?’
‘আদিত্য চাপাডাঙায় এসেছিল? কই, ফ্যাক্টরিতে তো আসেনি!’ নিজের অজান্তেই কথাগুলো যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল কিগানের।
‘তুমি এটাও জানো না?’ চমক শব্দ করে হাসল, ‘কেন, তোমার সঙ্গে দেখা করেনি?’
‘না, মানে…’ কিগান কথা খুঁজে পেল না।
আদি বেশ কয়েক মাস এখানে আসে না আর। অবশ্য খুব একটা দরকার পড়ে না। শুধু ডিসপিউটেড জমিটা নিয়ে কথা বলতে মালিনী বলে নতুন মেয়েটা এসেছিল। আসলে কিগান বোঝে, কলকাতা থেকে চলে আসার পর আদি আর মুখোমুখি হতে চায় না কিগানের। কেন চায় না? আদিও কি বিশ্বাস করে যে, কিগান অমন কাজ করেছে? নাকি আদি নিজে স্পষ্ট করে জানে কী ঘটেছিল!
চমক বলল, ‘তোমার সঙ্গে কি কোনও খিঁচ আছে তোমার ভাইয়ের?’
কিগান শক্ত হল একটু। তারপর সাধারণ গলায় বলল, ‘আমার দিক থেকে তো কিছু নেই। জানি না ওর মন কী ভাবছে, বা চাইছে। সব তো বোঝা যায় না।’
‘তা ঠিক বলেছ।’ চমক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
চমক চুপ করে গেল আচমকা। কিগান দেখল চমকের গলাটা কেমন যেন ভারী শোনাচ্ছে। ও কথা ঘোরাতে বলল, ‘জানিস ত্রয়ণকে খুব আপসেট দেখলাম।’
‘তাই? আমি সুধাদিকে বলেছিলাম যে, মালটাকে যেন সঙ্গে না রাখে। শালা সমাজসংস্কারক হবে। শুয়োরের বাচ্চার পিছন দিয়ে সমাজ দেব।’
‘চমক তুই মাথা গরম করিস না।’ কিগান সাবধানে বলল।
‘মাথা গরম এখনও করিনি। তবে যেদিন করব ত্রয়ণ কেন, ওর বাপও রেহাই পাবে না। জানোয়ারের এত সাহস ও রাহির দিকে হাত বাড়িয়েছে।’
‘মানে?’ কিগান চমকে উঠল।
‘দীপা বলেছে আমায়। ওর সন্দেহ হয় যে, ত্রয়ণ রাহিকে ডিস্টার্ব করে। ওর নোংরামো বের করছি আমি। কী ভেবেছে, আমি মরে গেছি?’
‘তুই মাথা গরম করিস না।’ কিগান আবার বলল।
চমক হঠাৎ ওর দিকে ঘুরে বসে হাতটা ধরল, ‘রাহি তো তোমার কাছে যায়, ওকে একটু জিজ্ঞেস কোরো তো ত্রয়ণ ওকে বিরক্ত করে কিনা। আমি জিজ্ঞেস করলে ও উত্তর দেবে না। তুমি একটু জিজ্ঞেস করবে তো কিগানদা?’
কিগান কিছু বলার আগেই পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। কার? কিগান ভুরু কোঁচকাল। একটু সময় নিয়ে ফোনটা ধরল তারপর, ‘হ্যালো?’
‘আরে কিগানদা কেমন আছ?’
‘কে বলছ?’ গলাটা চেনা লাগলেও ঠিক চিনতে পারল না কিগান।
‘আমি গো আমি, আবেশ।’
‘আবেশ!’ থতমত খেল কিগান। এতদিন পর আবেশ এল কোত্থেকে!
‘হ্যাঁ দাদা। খুব দরকার, তোমার সঙ্গে খুব দরকার। প্লিজ, কালকে দেখা করতে পারব তোমার সঙ্গে?’
‘আমার সঙ্গে!’ কিগান অবাক হল, ‘তুই জানিস আমি কোথায় থাকি?’
‘জানি দাদা। চাপাডাঙায়। খুব জরুরি কাজ আছে তোমার সঙ্গে।’
কিগান অবাক হল, ‘ঠিক আছে আয়।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ দাদা। কাল বিকেলে যাব। কেমন?’ আবেশ যেমন হঠাৎ করে ফোন করেছিল ঠিক তেমনই হঠাৎ করে কেটেও দিল ফোনটা।
কিগান অন্ধকারের দিকে তাকাল। শীতের হাওয়া ঢুকে আসছে জানলা দিয়ে। অন্ধকার ঘিরে ধরছে ক্রমশ। কী দরকার আবেশের? কেন চমক ওকে এমন অনুরোধ করল? কী জিজ্ঞেস করবে ও রাহিকে? কী করবে ও? এত কিছু পারবে ও? ওর থেকে যার যা দরকার, তাকে-তাকে তারটুকু দিয়ে যেতে পারবে ও? জ্যাকেটের চেনটা গলা অবধি টেনে একটু হেলান দিয়ে বসল কিগান। যেতে হবে, ওকে আরও অনেক দূরত্ব পেরোতে হবে। ও দেখল, সামনের রাস্তাটুকু ঠান্ডা আর অন্ধকার।
Chapter - 12
১২
রবিবার বলে ছুটিটা পেয়েছে। না হলে সরস্বতী পুজোর দিনেও অফিস যেতে হত জিয়ানাকে। বহু বছর পর এবার বাড়িতে সরস্বতী পুজো করছে ওরা। জিয়ানা করতে চায়নি। কিন্তু শাশুড়িমা এমন করে বললেন যে, আর ‘না’ করতে পারেনি। তবে বুকু আপত্তি করেছিল। বলেছিল, ‘আবার এসব ঝামেলা কেন করছ?’
‘আমি করছি না। মা চান তাই। তবে তুতুলের একটা এক্সপিরিয়েন্স হবে। ওর স্কুলের কয়েকজন বন্ধুকে নেমন্তন্ন করব। মা-বাপি আসবে। আমার অফিস থেকে ললিত আর খুরানা স্যারকে ডাকব। একটা ছোট গেটটুগেদারও হয়ে যাবে।’
‘তাই?’ বুকু ল্যাপটপের থেকে মুখ তুলে চশমাটা মাথার ওপর ওর কাঁচা-পাকা চুলের ভেতরে গেঁথে তাকিয়েছিল, ‘তা বেশ। বাট ডোন্ট এক্সপেক্ট মি টু ডু এনিথিং। আমার এসব ভাল লাগে না।’
‘সে তো জানি। এ আর নতুন কী।’ জিয়ানার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। বুকু মাঝে মাঝে এমন ভঙ্গিতে কথা বলে যেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। যেন দু’বেলা প্রণাম করে অটোগ্রাফ নিতে হবে। জিয়ানার ইচ্ছে করেছিল যে, একটা ঝগড়া বাধিয়ে তুলবে।
কিন্তু বুকু সে পথ মাড়ায়নি। বরং আলতো হেসে বলেছিল, ‘তবে আমার একটা আবদার আছে।’
‘আবদার?’ জিয়ানা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
‘ওই লিস্টে আরও তিনজনকে যোগ কোরো। খেয়াদিদের দু’জন আর রুহান।’
‘কে?’ জিয়ানা অবাক হয়েছিল। বুকু নিজে থেকে গেস্টদের নাম বলছে!
‘ওই যে ছানার কী একটা প্রিপারেশন পাঠিয়েছিল না। আমরা তো একটা রিটার্ন থ্যাঙ্কসও দিইনি। তাই বলছিলাম…’
জিয়ানা আর কথা বাড়ায়নি। বলেছিল, ‘ঠিক আছে। তবে দোহাই সেদিন সবার সামনে তোমার কাজ খুলে বোসো না। একটু অ্যাটেন্ড কোরো গেস্টদের।’
বুকু মাথার ওপর থেকে চশমাটা নামিয়ে চোখে দিয়ে আবার ফিরে গিয়েছিল কাজে। আর যেতে যেতে বলেছিল, ‘তুমি তো আছ। জানোই তো এসব আমার আসে না। আরে, ছাগল দিয়ে কি আর হাল চাষ হয়?’
জিয়ানা আর কথা বাড়ায়নি। তবে রুহান আর খেয়াদিদের ও ফোনটা নিজেই করেছিল। মানে প্রথমে খেয়াদিদের তারপর সেখান থেকে রুহানের নম্বর নিয়ে রুহানকে।
রুহান তো আশ্চর্যই হয়ে গিয়েছিল জিয়ানার ফোন পেয়ে। যদিও সম্পর্কে কাকিমা হয়, তবু যেহেতু বুকুকে দাদা বলে তাই জিয়ানাকে বউদি বলেই কথা বলেছিল রুহান। ছেলেটার গলাটা ফোনে একদম বাচ্চাদের মতো লাগছিল।
জিয়ানা বলেছিল, ‘তুমি রুহান বলছ তো? আমি জিয়ানা।’
রুহান এক মুহূর্তও দেরি করেনি, বলেছিল, ‘ও বউদি! বলুন!’
‘তুমি চিনতে পেরেছ? আমি তো ভাই তোমায় কোনওদিন দেখিনি। কীভাবে চিনলে?’
‘বুকুদার বউকে চিনব না? বুকুদা কি যেমন তেমন লোক? কত গুণী মানুষ। আমার ছোটবেলার হিরো যে।’
‘ও বুকুদার জন্য চিনেছ।’ জিয়ানা মজা করে একটু গম্ভীর ভাব দেখিয়েছিল।
‘না বউদি, শুধু তাই নয়। আপনার নামটাও তো জানি। খুব আনকমন। তাই মনে আছে।’
‘তাই? যাক গে, যে জন্য ফোন করেছিলাম। সামনে সরস্বতী পুজোর দিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে এসো। বুকুদা কিন্তু তোমার কথা বিশেষভাবে বলেছে। আর আমি তো বলছিই।’
রুহান হেসেছিল প্রাণ খুলে, ‘বুকুদা বলেছে?’
‘হ্যাঁ, তাই বলছিলাম। জানোই তো কেমন আপনভোলা মানুষ। সে যখন বলেছে, তুমি নিশ্চয়ই খুব স্পেশ্যাল। ভুল কোরো না কিন্তু। দিনটা রবিবার। নিশ্চয়ই অসুবিধে হবে না।’
তা এসেছিল রুহান। আর পুজোর প্রসাদ খেয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে তুতুলের সঙ্গে খেলা করে চলে গেল একটু আগে। তুতুলের খুব পছন্দ হয়েছে রুহানকে। রুহান চলে যাওয়ার সময় খুব কান্নাকাটি করেছে। জিয়ানা অনেক কষ্টে মেয়েকে টেনে এনে ঘরে শুইয়ে থাবড়ে থুবড়ে ঘুম পাড়িয়েছে। কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত ছিল বলেই কিনা কে জানে তুতুল এই বিকেলে ঘুম নিয়ে ঝামেলা করেনি।
তুতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জিয়ানা। আধো অন্ধকার ঘর। তার ভেতর তুতুলের মুখটা অবিকল নিজের মতো লাগছে। মাতৃমুখী কন্যা নাকি দুঃখী হয়। কবে সেই ছোটবেলায় শুনেছিল। আজ আবার হঠাৎ এখন মনে পড়ল। ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল জিয়ানা। ওকেও তো মায়ের মতোই দেখতে। তা হলে? তা হলে কি ও অসুখী?
কিগান অবশ্য বলত, ‘তোর মাকে অনেক সুন্দর দেখতে। ভুল করে তোর প্রেমে পড়লাম। তোর মাকে আগে দেখলে…’
জিয়ানা হাসত, আলতো করে ঘুষি মেরে বলত, ‘লম্পট!’
কিগান বলত, ‘তবে যাই হোক, তোকে তো তোর মায়ের মতো দেখতে অনেকটা। ঠিক আছে, তাতেই হবে।’
কী হবে? কতটা হবে? তাতেই সত্যি হবে তো? সেসব আর জিজ্ঞেস করেনি জিয়ানা। কারণ ও তো তখন জানত কিগান ওর। সম্পূর্ণটাই ওর। তাই প্রয়োজনই হয়নি কিচ্ছু জিজ্ঞেস করার। বরং কিগান কিছু বলতে গেলেই এমন করে তাকাত যেন ও তো জানে কিগান কী বলতে চায়। বরং উলটে ধমক দিত তখন। বলত, ‘আমায় শুধু প্রেম নিবেদন করলে কিন্তু কেমিস্ট্রিতে গোল্লা পাবি। এগজামিনার কিন্তু তোর চাঁদবদন দেখে নম্বর দেবে না। পড়াশোনা করছিস তো?’
কিগান হাসত, বলত, ‘আরে কেমিস্ট্রির সঙ্গে প্রেম করার সারাজীবন সময় পাব। তোর সঙ্গে যদি না পাই! তাই সেরে রাখছি। তোর বাবা-মা যদি আমায় সুযোগ না দেয়! যদি তখন তুই পাল্টি খেয়ে যাস? আয়াম জাস্ট ইউজিং দ্য বেস্ট অপরচুনিটি অফ মাই লাইফ।’
জিয়ানা হাসত। তারপর ঠোঁট উলটে বলত, ‘তা ঠিক। দাঁড়া মাকে আগে তোর কথা বলি। যদি মা অ্যাপ্রুভ করে তা হলে হবে, না হলে এই কেমিস্ট্রির সঙ্গে প্রেম করে কাটাতে হবে সারাজীবন। বুঝেছিস?’
এখন কার সঙ্গে প্রেম করে কিগান? কোথায় থাকে ও? বিয়ে করেছে? কেমন আছে? আর কি জিয়ানার কথা মনে আছে ওর? কে জানে! জিয়ানা তো নিজের হাতেই সব দরজা-জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। নিজের হাতেই তো কাঁটাতার বুনে দিয়েছিল ওর আর কিগানের মধ্যে। আর তারপর থেকে তো ওরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটো দেশ। তারপর থেকেই তো বুকুর সঙ্গে আলাপ। ঘোরাফেরা। বিয়ে। বিদেশ। তুতুল। ওর ভেতর কোথাও তো কিগান নেই। কোত্থাও তো প্রেম আর স্পর্শ করে না জিয়ানাকে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, সত্যি ওই জীবনটা ছিল তো? ওই গোলাপি বা নীল সালোয়ার পরা মেয়েটা সত্যিই ছিল তো? সত্যি ও কোনওদিন লেকের রাস্তা ধরে হাঁটত কিগানের সঙ্গে? কিগান কি দূরে একা দাঁড়িয়ে থাকত কখন বাসে করে এসে নামবে জিয়ানা, সেই অপেক্ষায়? আচ্ছা, সেইসব দৃশ্যের ভেতরের ওই মেয়েটা সত্যি জিয়ানা তো? সে অন্য কেউ নয় তো? কোনও এক অদ্ভুত স্বপ্নের স্মৃতিকে সত্যি ভেবে মাথায় নিয়ে ঘুরছে না তো জিয়ানা?
মা। মাকে কেন যে, এত তাড়াতাড়ি কিগানের কথা বলতে গেল ও!
খোলা জানলা দিয়ে একঝলক হাওয়া এসে জানলার সামনে ঝোলানো উইন্ড চাইমটা একটু নাড়িয়ে দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে টুংটাং শব্দ, জাল থেকে বের করে দেওয়া প্রজাপতির মতো ছড়িয়ে গেল চারদিকে। জিয়ানার খেয়াল পড়ল। ও দেখল তুতুল ঘুমিয়েই চলেছে। গত বছর দশেক এভাবেই কি ঘুমোয়নি জিয়ানা?
খুব আবছা পায়ে বিছানার থেকে নামল জিয়ানা। তুতুলের ঘুম ভীষণ পাতলা। চট করে ভেঙে যায়। রুহানের জন্য যেভাবে মেয়ে কেঁদেছে আজ, তারপর অনেক কষ্টে ঘুম পাড়ানো গেছে। একবার জেগে গেলে খুব মুশকিল হবে।
তবে রুহানকে প্রথম দেখে আজ একটু অবাকই হয়েছিল। আরে এই ছেলেটা রুহান? অফিসে তো দু’-একবার দেখেছে। টুকটাক সাইটের কাজকর্ম দেখাশোনা করে না ও? রুহান যে-পোস্টে আছে তার সঙ্গে জিয়ানার কাজের আকাশ-পাতাল তফাত। ওদের মতো সুপারভাইজারদের সঙ্গে জিয়ানাদের কথাই বলতে হয় না। রুহানকে দু’-একবার পারচেস ডিপার্টমেন্টে দেখেছে ও। তাই আজ বসার ঘরে যখন কলির পিছন পিছন রুহান এসে ঢুকেছিল তখন দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল ও।
আসলে আজকাল মনে হয় পৃথিবীটা দেশলাই বাক্সের মতো ছোট। মনে হয় সবাই এ ওর গায়ে গা লাগিয়ে বেঁচে আছে।
জিয়ানাকে দেখে রুহানও যেন থমকে গিয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আপনিই বউদি? অফিসে আপনাকে দেখেছি না?’
জিয়ানা হেসে বলেছিল, ‘তাই তো! কী অদ্ভুত কোয়েনসিডেন্স।’
জিয়ানার কলিগ ললিতও আশ্চর্য হয়েছিল, ‘আরে, তোমরা রিলেটেড?’
বুকু সোফার এক কোণে রুহানকে হাত দিয়ে বসতে বলে বলেছিল, ‘উই আর অল রিলেটেড। একটা তাস ধরে নাড়ালে গোটা ঘরটাই ভেঙে পড়বে। শুধু আমরা বুঝতে পারি না যে, আমরা যুক্ত। তাই বড্ড বেশি আমি-আমি, আমরা-আমরা করি, বুঝি না যে, এই পৃথিবীর সব কিছুই পরস্পরের সঙ্গে অরগ্যানিক্যালি যুক্ত।’
জিয়ানার হাসি পেয়েছিল। এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকা বুকু হঠাৎ এমন দার্শনিক হয়ে উঠেছিল কেন কে জানে! রুহান বোকার মতো হেসে বসে পড়েছিল বুকুর পাশে। তারপর গল্প জুড়েছিল। আর জিয়ানা অবাক হয়ে দেখেছিল বহু বহু বছর পর বুকু কী সাবলীলভাবে কথা বলছে কারও সঙ্গে!
জিয়ানা মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে আলতো করে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। সকাল থেকে আজ অনেক খাটুনি গেছে। বহু দিন এসব পুজো-আচ্চা করেনি, তাই প্রায় ভুলে গিয়েছিল কতটা ঝঞ্ঝাটের হয়। নেহাত গতকাল থেকে মা এসেছিল। তাই হাতে হাতে করেছে। আর খেয়াদিও এসে করেছে। নীচের কাকিমাও এসেছিল। কিন্তু বাতের ব্যথা বলে করতে পারেনি কিছু। তবে তুতুল প্রথম প্রথম এইসব ফল কাটা, ঠাকুর সাজানো, বাড়ি ঘরদোর সাজানোটা এনজয় করলেও পরে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। আর ওর স্কুলে যে-ক’জন বন্ধুকে নেমন্তন্ন করেছিল, তারাও আসেনি। সবার বাড়িতেই নাকি পুজো হয়। রুহান এসে তুতুলের ওই একঘেয়েমি কাটিয়েছিল।
একটা আড়মোড়া ভেঙে শাশুড়িমায়ের ঘরের দিকে গেল জিয়ানা। আজ সারাটা সকাল হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন মানুষটা। কারও কথা শোনেননি। বরং জড়িয়ে জড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ভাল লাগছে।’
ঠাকুরদেবতার সঙ্গে এই বয়স্ক মানুষগুলোর যে কী সম্পর্ক কে জানে! এত ভক্তি কোত্থেকে পায় এরা? জিয়ানার অবাক লাগে। ভক্তি, ভাব, সমর্পণ এসব তো কই ওর ভেতরে আসে না! যাদের আসে, তারা কী উপায়ে আনে এসব?
শাশুড়িমা এখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। নার্সটিও পাশের চেয়ারে বসে একটু ঘাড়টা এলিয়েছে। গোটা বাড়িটাই কেমন যেন একটু ঝিমিয়ে পড়েছে। জিয়ানার অদ্ভুত লাগল। কলিটা কই? ও-ও কি ঘুমোচ্ছে নাকি? না বাইরে গেছে?
ঠিক তখনই ফোনের রিংটা শুনতে পেল জিয়ানা। পুরনো হিন্দি গানের সুরে মোবাইল ফোনটা বাজছে। ডাইনিং রুমটা এই প্যাসেজের পাশেই। সেখানে ফ্রিজের মাথাতেই রাখা আছে ফোনটা। এসময় আবার কে ফোন করল?
দ্রুত পায়ে খাওয়ার ঘরে গিয়ে ফোনটা তুলল জিয়ানা। ললিত। আরে, ওর আবার কী হল? এতক্ষণ তো এখানেই ছিল।
‘হ্যালো? কী হল?’ জিয়ানা প্রশ্ন করল।
‘জিয়ানা, মানিব্যাগটা বোধহয় তোমাদের বাড়িতে ফেলে এসেছি।’ ললিতের গলায় টেনশনটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
‘সে কী! এখানে ফেলে গেছ?’
‘বোধহয়।’ ললিত বলল, ‘আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আর চারটে ক্রেডিট কার্ড আছে। একটু দেখবে প্লিজ। আমি হোল্ড করছি।’
‘দেখছি,’ জিয়ানা খাওয়ার ঘরটা দেখল। না, নেই। পাশের বসার ঘরটায় দেখল, তাও নেই। বড় লিভিং রুমটায় পুজো হয়েছে। সেখানেও ললিত গিয়েছিল। কিন্তু জিয়ানা খুঁজে দেখল সেখানেও নেই। সর্বনাশ। ললিত অন্য কোথাও ফেলেনি তো? মানে, রাস্তায় পড়ে যায়নি তো?
জিয়ানা চিন্তিত মুখে বলল, ‘ললিত কোথাও দেখছি না তো। তুমি যাওয়ার পর রুহান গেল। তারপর আমি মেয়েকে নিয়ে ঘুম পাড়াতে গেলাম। এর ভেতর…’
ললিত বলল, ‘রুহান আবার…’
‘কী যা তা বলছ!’ জিয়ানা ধমক দিল।
‘না, মানে সরি। তা ঠিক বলছি না। আচ্ছা, একটু ঠান্ডা মাথায় দেখো। পেলে একটা ফোন কোরো প্লিজ। লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড হারালে শালা পুলিশে ডাইরি করতে হবে। বহুত হুজ্জুতের কেস। প্লিজ একটু দেখো।’ ললিত ফোনটা রেখে দিল।
ললিতের কথার ইঙ্গিতটায় মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল জিয়ানার। মানুষ কত সহজে অন্যের দিকে আঙুল তুলে দেয়!
রুহানকে দেখলে বোঝা যায় যে, অবস্থাটা খুব একটা ভাল নয় ওর। কোম্পানিতে যে-পদে চাকরি করে তাতে মাইনে খুবই কম পায়। তবে আজ শুনল খুব ভাল ক্রিকেট খেলে। খেয়াদি বলছিল। কিন্তু রুহান অবশ্য তাতে সায় দেয়নি। বরং বলেছিল, ‘না বউদি। একসময় মোটামুটি খেলতাম। এখন খেলাটা গেছে। ঠিক পারি না খেলতে। প্রথম শ্রেণির দলে চান্স হয় না।’
কথাগুলো এমন বিষণ্ণ গলায় বলেছিল রুহান যে, ওর মুখের হাসিটা দেখে কষ্ট হয়েছিল জিয়ানার। এই কষ্টের ধাঁচটা জিয়ানা বোঝে। কোনও কিছু হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর তবু মানুষ কিছু করতে পারছে না। সব জেনে, সব বুঝেও কিছু করতে পারছে না। তাকে শুধু দেখতে হচ্ছে যে, ধীরে ধীরে সে তলিয়ে যাচ্ছে। এই কষ্টটার মধ্যে যে অসহায়তা লুকিয়ে থাকে, তা নিজে অনুভব করেছে জিয়ানা। তাই রুহানের মুখ দেখে বুঝেছিল ও।
নিছক সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই বলেছিল, ‘ভাল করে মন দিয়ে খেলো, দেখবে ঠিক হয়ে যাবে সব। চিন্তা কোরো না।’
রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসেছিল আবার। বলেছিল, ‘চিন্তা করি না আর।’
ফোনটা আবার ফ্রিজের মাথায় এনে রেখে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল জিয়ানা। সত্যিই তো কোথায় গেল মানিব্যাগটা? ওদের বাড়ি থেকে কখনও কিচ্ছু হারায় না।
অনাবশ্যক কার্পেটগুলো তুলে দিয়েছে ও। তাই শূন্য মেঝের প্যাসেজে পায়ের শব্দ পেয়ে পিছনে ঘুরল জিয়ানা। বুকু। জিন্স আর ফতুয়া পরে এসেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে বেরোবে। রোববার দিন বিকেলে কোথায় বেরোচ্ছে ও? জিয়ানা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
বুকু বুঝল। বলল, ‘আমি একটু বেরোচ্ছি। লন্ডন থেকে ফোন এসেছে। কিছু জিনিস ক্রসচেক করে আজকেই পাঠাতে হবে। কাল মানডে ফার্স্ট আওয়ারে মিটিং আছে।’
‘ও’, কথাটা শুনেও একটু অন্যমনস্কভাবে বলল জিয়ানা। আসলে ললিতের ইঙ্গিতটা মাথা থেকে বেরোচ্ছে না কিছুতেই।
বুকু দেখল জিয়ানাকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু হয়েছে? ইউ লুক লস্ট।’
‘হ্যাঁ,’ বিরক্তটি আর চেপে রাখতে পারল না জিয়ানা, ‘ললিত মানিব্যাগটা খুঁজে পাচ্ছে না। আমায় ফোন করেছিল। বললাম পাচ্ছি না এখানে, তখন রুহানের নামে একটা ইঙ্গিত করল।’
‘রুহানের নামে?’ বুকু এতক্ষণ ঢিলেঢালা ভাবে কথা বলছিল, এবার হঠাৎ যেন টানটান হল, ‘কেন, রুহানের নামে বলছে কেন? মানিব্যাগটা সোফার কুশনের ফাঁকে গুঁজে পড়ে ছিল। আমি তুলে ঘরের ভেতরে টেবিলের ওপর রেখেছি। এর ভেতরে রুহান আসে কোথা থেকে?’
বুকুর চাপা রাগটা কান বা চোখ কিছুই এড়াল না জিয়ানার। ওর অবাক লাগল, যে-মানুষটা কোনও কিছুতেই রিঅ্যাকশন দেয় না সে হঠাৎ এমন রাগ রাগ গলায় কথা বলছে কেন?
বুকু বলল, ‘বোঝো, কেমন লোকজনদের সঙ্গে কাজ করো! যাক গে, আমি আসি।’
বুকু আর না দাঁড়িয়ে ছোট আলমারির মাথা থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে বেরিয়ে গেল। জিয়ানা ঠোঁট কামড়ে বুকুর চলে যাওয়ায় দিকে তাকিয়ে রইল। শেষ কথাটা কি শুধু ললিতের উদ্দেশেই বলা? না, তার ভেতরে ভেতরে জিয়ানার জন্যও বিষ লুকোনো আছে? ললিতের সূত্র ধরে বুকু কি ওকেও কিছু বলে গেল?
মা-বাবা ব্যালকনিতে বসে তখন থেকে গল্প করে যাচ্ছে। খেয়াদিরা অনেক আগেই নীচে চলে গেছে নিজের মায়ের কাছে। জিয়ানার ক্লান্তিটা আবার ফিরে এল। আর এবার সঙ্গে করে নিয়ে এল একটু বিষাদ আর বেশ অনেকটা রাগ। বুকুর শেষ কথাগুলোর মধ্যে সত্যিই কি কোনও ইঙ্গিত ছিল? আচ্ছা, এমন একটা মানুষকে হঠাৎ বিয়ে করতে কেন রাজি হয়েছিল জিয়ানা? শুধু মা বলল বলে? শুধু মায়ের চাপের জন্য? নাকি অমন কেরিয়ার আর উন্নতির সোনার সিঁড়িটা দেখে ওরও মাথা ঘুরে গিয়েছিল? কিগানকে কেন ওর বাবা আর মা পছন্দ করল না?
কিগান নামটা মনে পড়তেই হঠাৎ খচ করে যেন বুকে লাগল জিয়ানার। এক মুহূর্তের ভেতরে কে যেন দুলিয়ে দিল ওর বেঁচে থাকাটুকু। জিয়ানা ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলাতে চাইল। একটু সময় নিয়ে সামলাল ও। তারপর শোওয়ার ঘরের দিকে গেল।
টেবিলের ওপর মেরুন মানিব্যাগটা পড়ে রয়েছে। ও শোওয়ার ঘরের ল্যান্ডলাইন থেকে ললিতকে ফোনে ধরল।
‘হ্যালো?’ ললিত দু’বার রিং হতেই ধরল ফোনটা।
‘তোমার মানিব্যাগ পেয়ে গেছি। বুকু তুলে রেখেছিল। কাল অফিসে দিয়ে দেব। কেমন?’ জিয়ানা দায়সারাভাবে বলল।
‘থ্যাঙ্ক গড।’ ললিতের গলা থেকেই বোঝা গেল যে, ও টেনশনে ছিল।
‘আর টেনশন কোরো না, ঠিক আছে?’
‘না, আর করব না। বাই দ্য ওয়ে, খুরানা স্যার ফোন করেছিলেন। তোমার বাড়ির ডিরেকশন জিজ্ঞেস করছিলেন।’ ললিত বলল।
‘তাই?’ জিয়ানার অবাক লাগল, ‘তা স্যার আমাকেই তো ফোন করতে পারতেন।’
‘জানোই তো স্যারকে। বললেন, তোমার বাড়িতে গেস্টরা রয়েছেন, তাই এসব জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করবেন না। আমি ডিরেকশন দিয়ে দিয়েছি। ঘণ্টাখানেকের ভেতরে পৌঁছে যাবেন।’ ললিত হাসল। তারপর আবার ধন্যবাদ জানিয়ে রেখে দিল ফোনটা।
ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার দিকে গেল জিয়ানা। ওদের বারান্দাটা বেশ সুন্দর। পুরনো দিনের বলে, বড়ও। সাবেক ধরনের গ্রিল দিয়ে ঘেরা। লাল রঙের মেঝে। বাড়ির সব কিছু পালটালেও বারান্দাটা পালটায়নি বুকু। সেই ভিন্টেজ কলকাতার একটা কুচি যেন থেকে গিয়েছে। বারান্দায় প্রচুর গাছ রেখেছে জিয়ানা। সেই জন্যই কিনা কে জানে বারান্দাটা আরও সুন্দর লাগে। দুটো বিনব্যাগ আর একটা ইজিচেয়ার রাখা থাকে বারান্দায়।
জিয়ানা দেখল বাবা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছে। আর মা পাশের একটা বিনব্যাগে বসে নিচু গলায় রবি ঠাকুরের গান গাইছে। জিয়ানা বারান্দায় ঢোকার দরজার থেকে দেখল পুরো দৃশ্যটা। দু’জনের কেউ বুঝতে পারছে না যে, জিয়ানা দাঁড়িয়ে রয়েছে। মা বিভোর হয়ে গাইছে আর বাবা শুনছে। বাবার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মা গাইছে,
‘জাগিবে একাকী তব করুণ আঁখি
তব অঞ্চলছায়া মোরে রহিবে ঢাকি।
মম দুঃখবেদন মম সফল স্বপন
তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী-সম॥’
বাবার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। ছোট্ট, এক কুচি জল চোখের পাতা থেকে দুষ্টু ছেলের মতো লাফিয়ে নেমেছে গালে। তারপর মনমরা, বন্ধুহীন বালকের মতো মাথা নিচু করে হাঁটছে গালের ঢাল বেয়ে। আশপাশের বাড়ির থেকে ধাক্কা খেয়ে আসা নরম আলো বারান্দার সবুজের সঙ্গে মিশে এসে পড়েছে জলের ভেতর। তাতে যেন মনে হচ্ছে নীল এক ফোঁটা জল বয়ে চলেছে একা। দুঃখী মানুষের ভেতরের বরফের পাহাড় থেকে বেরিয়ে সে মিশতে চাইছে সময়ে। মিশতে চাইছে অনন্ত গোধূলির সেই নদীতে। সেই নদী, যেখানে এ গান ‘সত্য’। যেখানে একদিন প্রথম শিখে এ গান একটি বালিকা শুনিয়েছিল তার বাবা-মাকে। সেই পা ভাঁজ করে বসে, সামান্য অপটু হাতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটি বালিকা বহু বহু দিন আগে শুনিয়েছিল,
‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমানিশীথিনী-সম॥
মম জীবন যৌবন মম অখিল ভুবন
তুমি ভরিবে গৌরবে নিশীথিনী-সম॥’
জিয়ানা এখনও দেখতে পায় সেই শেষ বিকেলটা। সেদিনও শীতকাল ছিল। ফুলহাতা গোলাপি সোয়েটার, মাথায় বিনুনি, সামনে রাখা বাদামি হারমোনিয়াম। আর দিদি গাইছিল, সুর করে টেনে টেনে গাইছিল, ‘তু্মি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’।
সেই গোলাপি আলো। পরদার আলতো উড়ে যাওয়া। ছোট্ট সুন্দর আঙুলগুলোর হারমোনিয়ামের ওপর ঘুরে বেড়ানো। আলতো প্রজাপতির মতো একটা চিকন সুর উড়ে বেড়াচ্ছিল ঘরে। আর ছোট্ট জিয়ানা দেখেছিল চেয়ারে বসে রয়েছে বাবা। বিভোর হয়ে শুনছে গান। আর চোখের কোল দিয়ে বয়ে নামছে এক কুচি জল। আনন্দের।
জল তার ধর্ম পালটায়। জীবন পালটে যায় অনেক। নদী ঘুরিয়ে নেয় তার গতিপথ। আর বহু বহু বছর পর তেমনই এক শীতের শেষ বিকেলে বাবা বসে থাকে চুপ করে। সেই গান ফিরে আসে আবার। সেই সুর ফিরে আসে। দুঃখ বেদনা আর ‘সফল স্বপন’, তাও ফিরে আসে। শুধু সে ফিরে আসে না। সেই গোলাপি মেয়েটা আর পা ভাঁজ করে বসাটুকু মনের মধ্যে নিয়ে কাটিয়ে দিতে হয় অনন্ত সময়। জল তার রং পালটে মাথা নিচু করে হাঁটে। জীবন্ত মানুষের ভেতরের একটা মানুষ মরে যায় নিভৃতে।
মা গান শেষ করে এবার তাকাল বাপির দিকে। বিস্মিত গলায় বলল, ‘আরে, তুমি কাঁদছ?’
বাপি তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসল। দু’হাতে চোখের কোণের জল মুছে হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘দুর…কোথায়? তুমি না কী যে বলো।’
বাপির গলাটা ধরা ধরা শোনাচ্ছে। জিয়ানার কষ্ট হল খুব। বাপি চিরকাল নরম সরম মানুষ। জোরে কথা বলতে পারে না। বকতে পারে না। যত কষ্টই হোক, চুপ করে থাকে। তাই লোকজনও খুব করে সুবিধে নেয় তার।
মা বলল, ‘তুমি কাঁদছ কেন? এ বাবা। তোমার বয়স বাড়বে না!’
বাপি ইজিচেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। চোখ পড়ল জিয়ানার ওপর। জিয়ানার অস্বস্তি লাগল। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। বাপি হাসল, ‘আয় মা। বোস।’
মা-ও ঘুরে তাকাল এবার, ‘আরে মিষ্টি তুই? কখন দাঁড়িয়েছিস এসে?’
জিয়ানা আলতো করে হেসে গিয়ে বসল একটা বিনব্যাগে, বলল, ‘এই তো এলাম। তুমি এখনও কী ভাল গাও মা!’
‘তাই? ধ্যাৎ। কতদিন প্র্যাকটিস নেই।’ মায়ের ফরসা মুখটা সামান্য লাল হল। মা লজ্জা পেয়েছে।
জিয়ানা মায়ের হাত ধরে বলল, ‘কেন প্র্যাকটিস করো না? কী ভাল গাও এখনও। বাপি, তুমি কিছু বলতে পারো না?’
‘তোর বাপি কী বলবে? দেখ না গান শুনে কাঁদছে।’ মা বলল।
বাপি হাসল। অপ্রস্তুতের হাসি। সন্তানের সামনে কোন বাবাই বা নিজেকে দুর্বল দেখাতে চায়?
বাপি বলল, ‘তোর মা’র কথায় কান দিস না। শোন, তোরা কথা বল, আমি একটু ভেতরে গিয়ে টানটান হই। পিঠটা ব্যথা করছে।’
মা উদ্বিগ্ন হল, ‘তুমি ওষুধ খাওনি সকালে? আর কেন যে ব্যায়ামটা বন্ধ করো! তোমায় নিয়ে পারি না। ডাক্তারের কথা শুনলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে?’
বাপি বারান্দা থেকে ঘরে যেতে যেতে বলল, ‘এমন টেনশন কোরো না। আমি ঠিক আছি। তোমরা মা মেয়েতে মিলে একটু গল্প করে নাও।’
বাপি চলে যেতেই মা জিজ্ঞেস করল ‘হ্যাঁরে, বুকু কই?’
‘বুকু? একটু বেরিয়েছে। অফিস যাবে বলল।’
‘অফিস? সে তো অনেক দূর। আর তারপর আজ রোববার না? আজও অফিস?’ মা অবাক হয়ে তাকাল জিয়ানার দিকে।
জিয়ানা হাসল, ‘অত বড় চাকরি করে। অত টাকা মাইনে। এমনি এমনি মুখ দেখে দেয়? প্রচুর খাটিয়ে উশুল করে নেয়। কখনও কখনও রাতেও ফেরে না আজকাল।’
‘রাতেও ফেরে না!’ মা ভুরু কুঁচকে তাকাল। তারপর সামান্য দ্বিধার সঙ্গে বলল, ‘তোদের মধ্যে সব ঠিক আছে তো?’
‘মানে?’ জিয়ানা বিরক্ত হয়ে তাকাল, ‘ঠিক আছে মানে?’
‘না…,’ মা ঠোঁট চাটল, ঢোঁক গিলল। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, ‘না, ঠিক বুঝি না তো। তাই ভয় লাগে। বুকু তো এমনিতেই কম কথার মানুষ। তাই…’
‘তাই কী? দেখো, বিয়ের বহু বছর হয়ে গেছে। আমরা তো আর টিনএজার নই যে প্রেমে হাবুডুবু খাব।’
মা বলল, ‘এমন করে বলছিস কেন? আমাদের কথা শুনে কি খুব খারাপ আছিস? এমন বর, এত টাকা, অমন একটা পুতুলের মতো মেয়ে। কোথায় অভাব তোর? এমন ভাব করছিস যেন তোকে হাত-পা বেঁধে আমরা ফেলে দিয়েছি জলে!’
‘শুধু টাকা দেখো না তোমরা?’ জিয়ানার শরীরের ভেতরটা রাগে পাক দিয়ে উঠল।
‘তুই এমন করছিস কেন মিষ্টি? এমন করে কথা বলছিস কেন?’ মায়ের গলা ভারী হয়ে গেল হঠাৎ। মা রুমালটা চেপে ধরল চোখে।
‘আঃ, কাঁদছ কেন?’ জিয়ানার বিরক্ত লাগল।
‘কাঁদছি কেন? বুঝবি। মেয়ে বড় হয়ে তোকে এমন বলুক, তখন বুঝবি। আমরা কি অর্থপিশাচ যে শুধু টাকা চাইব? আমরা তোর ভাল চেয়েছি বলেই…’
‘আর বোলো না।’ জিয়ানা অনেক কষ্টে রাগ সামলাল। ভাল, সবাই এত ভাল চায় কেন কে জানে!
‘তা তুই বা আমার সব কথা শুনিস কোথায়?’ মা সামলে নিয়ে তাকাল জিয়ানার দিকে, ‘বললাম, তুতুলের একটা ভাই বোন নে। শুনছিস আমার কথা?’
‘আশ্চর্য। আমরা আর চাই না।’
‘জীবনে কখন কী হয় তার ঠিক আছে? দেখছিস তো আমাদের। একটু আগে দেখলি তো তোর বাবাকে? এক সন্তান ভাল নয়।’
‘আচ্ছা দুই সন্তান মানে কি ব্যাক-আপ সিস্টেম? মানুষের বদলে আর একটা মানুষ? তোমরা বলো যে, মেটিরিয়াল চিন্তা করো না। কিন্তু দেখো, সেটাই বলছ। কেউ কারও বিকল্প হতে পারে? আমি হতে পেরেছি দিদির বিকল্প? হতে পারলে বাপি এমন কষ্ট পেত? তোমরা কেন এভাবে চিন্তা করো? মানুষ জামাকাপড় নাকি যে, একটা ছিঁড়ে গেলে আর একটা ব্যবহার করা যাবে?’
‘আঃ, তুই এভাবে ভাবছিস কেন?’ মা হাত তুলল, ‘তুতুলের তো একজন সঙ্গীও হবে। সেটা তোরা ভাববি না? শুধু নিজেদের ইচ্ছেটাই দেখবি?’
‘মা,’ জিয়ানা বলল, ‘স্কুল, নাচ, সাঁতার, ড্রইং, গল্পের বই… এরপর আর খেলার সঙ্গী লাগে? তোমাদের সময় এত অলটারনেটিভ ছিল না, তোমরা অনেক সন্তান চাইতে। কিন্তু এখন দিন পালটেছে। আমরা আর ইন্টারেস্টেড নই।’
‘তা হলেও…’ মা বলল, ‘বুকু চায় না? ও খুশি নয় তোকে নিয়ে?’
‘কী মুশকিল!’ জিয়ানা দাঁড়াল, ‘তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলাই বিপদ। সবসময় এক ধাঁচের কথা। কেন এমন বলছ?’
‘আঃ, তোর বড্ড মেজাজ,’ মা বিরক্ত হল, ‘তোর বাপিও বলছিল এই কথাটা।’
‘বাপি বলছিল?’ জিয়ানা ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, বাপি বলছিল যে, তুতুলের আর একটা সঙ্গী হলে ভাল হয়।’
‘মা, কেন সব কিছু বাপির নাম দিয়ে চালাও?’ জিয়ানার বিরক্ত লাগল।
‘না রে সত্যি, তোর বাপি মাঝে মাঝেই বলে।’
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এ মায়ের পুরনো ট্যাকটিস। কোনও কিছু নিজে বলে করাতে না পারলেই বাপির নাম বলে। সেই কিগানের সময়ও এমন করেছিল। জিয়ানা বুঝতে পারে না যে, অতই যদি বাপির বলার ইচ্ছে হয়, বাপি নিজে বলে না কেন?
জিয়ানা বলল, ‘মা, আমি আর সেই ছোট্টটি নেই। বাপির যদি বলার ইচ্ছে হয় নিজে বলে না কেন? সবসময় তুমি বলো কেন?’
‘তোর বাপিকে জানিস না? কত চুপচাপ আর লাজুক মানুষ। জানিস তো সবাই সুবিধে নেয়।’
‘তুমিও নাও মা, তুমিও সুবিধে নাও।’ জিয়ানা ফস করে বলে ফেলল।
‘মানে?’ মা থতমত খেয়ে তাকাল, ‘তুই আমায় এমন বললি?’
‘বাদ দাও। ঘরে চলো। কলিটা যে কোথায় যায়! মাথা ধরেছে খুব, চা খেতে হবে। ভাল লাগছে না।’
মা তাও মাথা নামিয়ে বসে রইল। বিড়বিড় করে বলল, ‘তুই আমাকে এমন করে বললি? আমি তোর মা, তাও বললি? পারলি বলতে? এত বছর হয়ে গেছে, তাও তুই এখনও এমন করে বলিস? তুই ভুলিসনি না রে? সেই ছেলেটাকে ভুলিসনি, না? তোর মাথাটা ও তখন এমনভাবে খেয়েছিল? কী সাংঘাতিক ছেলে রে!’
‘মানে? কী বলছ তুমি? কে সাংঘাতিক? কে মাথা খেয়েছে আমার? তুমি কার কথা বলছ?’ জিয়ানা চোয়াল শক্ত করল।
মায়ের গলায় রাগ, ‘বুঝতে পারছিস না কার কথা বলছি?’
‘শোনো মা,’ জিয়ানা কঠিন গলায় বলল, ‘ওকে অমন মুখের ওপর না করে দেওয়ার পরে ও কিন্তু আর আমায় বিরক্ত করেনি। কষ্ট দেয়নি। আর কিন্তু কিচ্ছু করেনি। জাস্ট উবে গেছে আমার জীবন থেকে। তারপর তো তোমাদের যা ইচ্ছে সেভাবেই আমি থেকেছি। যা বলেছ তাই করেছি। তা হলে আবার পুরনো কথা তুলছ কেন? কেন ওর নামে শাপশাপান্ত করছ? বাপ-মা মরা একটা ছেলে। কেন ওকে নিয়ে তোমার মনে এত বিষ? ও তো তখন কোনওদিন তোমাদের নামে খারাপ কথা বলেনি। যে-ক’বার দেখা হয়েছে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করেছে। তা হলে? তা হলে কেন এমন বলছ? কেন?’ জিয়ানার গলায় হঠাৎই বাষ্প জমল যেন। ব্যথা করে উঠল গলার দু’পাশ। মাথাটাও কেমন যেন ভার হয়ে গেল। ও চোখ বন্ধ করে পাতা উপচে আসা জলটাকে সামলাল। আর ঠিক তখনই যেন দেখল কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে একটা সাইকেল। গোলাপি স্কার্ফ উড়ছে কোথাও। গাছেদের ফাঁকে তুলোর মতো গোল্লা কাটছে হাওয়া।
জিয়ানা চোখ খুলে দেখল মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। জিয়ানা আর কথা না বাড়িয়ে উঠতে গেল। মা চট করে হাতটা ধরল ওর, বলল, ‘মিষ্টি তুই এখনও…তোর… মনে…’
জিয়ানা কিছু বলার আগেই ডোরবেলটা বেজে উঠল এবার। জিয়ানা মায়ের হাত ছাড়িয়ে উঠে পড়ল। কলি এল কি?
দরজাটা খুলে জিয়ানা দেখল মদন খুরানা। হাতে ফুল, চকোলেটের প্যাকেট আর মুখে সেই পরিচিত হাসি। লোকটা বেঁটে। মাথায় বিশাল টাক। ফরসা, মোটা চেহারা। গাল দুটো কাশ্মীরি আপেলের মতো লাল।
জিয়ানা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আসুন স্যার, আসুন। আমি ভাবতে পারছি না আপনি এসেছেন! আয়াম ভেরি গ্ল্যাড।’
খুরানা হাসলেন। বললেন, ‘কিউ, ম্যায় আপনা বেটিকে ঘর নেহি আউঙ্গা?’
‘না না, তা কেন? আসুন স্যার। বসুন।’ জিয়ানা সোফাটা দেখিয়ে হাসল।
খুরানা বসলেন। তারপর চারদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খুব সুন্দর বাড়ি তোমার। ভেরি প্লেজেন্ট। তবে পুজোর বাড়ি এত চুপচাপ কেন? ইতনি সন্নাটা কিউ হ্যাঁয় ভাই? কেউ নেই। আমি খুব লেট করেছি, না?’
‘সবাই চলে গেছে। আমার মা আর বাবা আছেন শুধু।’
‘আর মিস্টার বোস? আর, শুড আই সে ডক্টর বোস? কোথায় তিনি? দেখছি না তো?’
জিয়ানা একটু অপ্রস্তুত হল। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, ‘স্যার ও আপনার জন্য ওয়েট করছিল। কিন্তু হঠাৎ অফিস থেকে এমন একটা ফোন এল যে…মানে ও খুব বলছিল যে, আপনার সঙ্গে দেখা হল না।’
খুরানা হাসলেন, টেবিলে রাখা ফুল আর চকোলেট জিয়ানার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আর একদিন দেখা হয়ে যাবে। কী বলো? আসলে আমারই লেট হয়ে গেল। কী করব? মাঝে মাঝে এমন এমন সব ঝামেলা পপ-আপ করে না! দুটো সাইটে গন্ডগোল হয়েছে। মেশিনারিজ চুরি হয়ে গেছে। সাইটে, লোকাল গুন্ডাদের টাকা দিয়েও যদি এমন প্রবলেম ফেস করতে হয় তবে আর কী বলব। এমনিতেই কম্পিটিটিভ মার্কেট। জানোই তো কী রেটে কাজ করতে হয়। তার ওপর যদি এমন করে চুরিচামারি হয়, বলো, ভাল লাগে?’
জিয়ানা মাথা নিচু করল। কাজের সাইটে সত্যি নানা রকমের অশান্তি লেগে থাকে।
খুরানা এবার হাসলেন। বললেন, ‘বাদ দাও। বোর্ড অব ডাইরেক্টরস-এর মিটিং ছিল গতকাল। এতদিন চুপ করে থাকা ওই নর্থ চব্বিশ পরগনার চাপাডাঙার প্রজেক্টটা আবার জাগছে। তোমায় সেই নিয়ে কাজ করতে হবে এবার। তুমি আর ললিত দেখবে ওটা। কেমন? সরি টু টক অ্যাবাউট বিজনেস টুডে। কিন্তু কাল সকালের ফ্লাইটে আমি ইতালি যাব। ওয়াটারবার্ড বিদেশিদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে গেছে। আমাদের কিছু একটা ট্রাই করতে হবে। তাই…’
‘দ্যাটস ও কে স্যার।’ জিয়ানা হাসল।
‘শোনো ওই পার্টিক্ল বোর্ডের ফ্যাক্টরিতে সব ডিটেলের জন্য ওদের ওখানকার চিফ প্রোডাকশন ইনচার্জ কাম নতুন প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটরের কনট্যাক্ট আমি তোমায় দিয়ে দিচ্ছি। মিট হিম। টেক দ্য নিউ ডিটেলস। আর তারপর কাজ শুরু করো। কেমন?’
‘কোনও প্রবলেম নেই স্যার, আপনি প্রসাদ খাবেন তো?’
খুরানা বললেন, ‘সুগার আছে, কোলেস্টরলও হাই। তাই বলছি যে মিষ্টি দিয়ো না। তোমরা তো খই খাও, না? গিভ মি সাম অব দ্যাট। আর আমি খুব একটা বাইরে খাই না, রেস্ট্রিকটেড ডায়েটে থাকি।’
‘একটা সন্দেশ দিই স্যার? ডায়াবেটিক সন্দেশ। আপনার জন্য আনিয়েছি।’ জিয়ানা অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল।
‘ঠিক আছে,’ খুরানা হাসলেন, ‘তবে তুমি আনো। আমি তোমার মোবাইলে ওই ভদ্রলোকের নম্বরটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। কেমন?’
জিয়ানা যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল, ‘তা কী নাম স্যার ভদ্রলোকের?’
‘নাম?’ খুরানা ভাবলেন একটু। তারপর বললেন, ‘ব্যানার্জি। এই বলেই সেভ করেছি মোবাইলে। পুরো নামটা…দাঁড়াও…’ খুরানা চোখ বন্ধ করে ভাবলেন আরও একটু। তারপর বললেন, ‘পুরো নাম মনে নেই। ইনিশিয়ালটা মনে পড়েছে। কে. এ.। কে. এ. ব্যানার্জি। মনে রেখো, আমাদের প্রজেক্টের জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট লোক। তোমাকে ওর সঙ্গে র্যাপো বিল্ড-আপ করতে হবে। মনে রাখবে জিয়ানা, কাজটা কিন্তু চাই বেটি। অ্যাট এনি কস্ট চাই। তখন তুমি আমায় রসগুল্লা দেবে, আমি তাও খেয়ে নেব। কেমন?’
জিয়ানা হাসল। মনে মনে উচ্চারণ করল দু’বার, কে.এ. ব্যানার্জি। তারপর চলে গেল সন্দেশ আনতে। সন্দেশ, কিন্তু মিষ্টতাহীন।
Chapter - 13
১৩
আজ রোববার। মেঘলা একটা দিন। মার্চের প্রথমে হঠাৎ এখন মেঘ করল কেন? খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল আদি। নর্থ কলকাতাটা বেশ রুক্ষ। দিনকে দিন যেন আরও রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে! আদির ঘর থেকে জানলা দিয়ে একটা হিজিবিজি তারের জটলা দেখা যায়। মনে হয় আকাশটার গায়ে যেন কোনও বাচ্চা ডটপেন দিয়ে অসংখ্য আঁচড় কেটেছে। আদির ওই দিকে চোখ পড়ত না আগে। কিন্তু এখন পড়ে। মনখারাপ করাটাও যেন চোখে পড়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে। কেন এমন একটা আঁচড়-কাটা আকাশ চোখে পড়ে আদির? কেন কষ্ট হয় এত? কোলবালিশটা টেনে নিয়ে পাশ ফিরল ও।
দেওয়ালে একটা বড় পোস্টার লাগানো রয়েছে। অনেকটা খোলামেলা পোশাক পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেগান ফক্স। আধখোলা ঠোঁট। বান রুটির মতো বুকের আভাস। অদ্ভুত ছাই রঙের চোখ। আদি ওই দিকে তাকিয়ে রইল। কার বাড়ির মেয়ে এই মেগান? এমন খোলামেলা পোশাকে সারা পৃথিবীতে কেন বিক্রি করছে নিজেকে? ওর বাবা ওকে বকে না? ওর নিজের খারাপ লাগে না? আচ্ছা, সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর চোখে পিচুটি হয়? মুখে গন্ধ হয়? ওর নখের তলায় ময়লা জমে? একান্তে শব্দ করে ঢেকুর তোলে? নাকে আঙুল দেয়? ওর কষ্ট হলে কাঁদে? কখনও লোকের সামনে বোকার মতো প্রশ্ন করে? খাবার না খেয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় না যে, একদিন তেলেভাজা খাই খুব করে? ইচ্ছে হয়? হয়তো হয়। নিশ্চয়ই হয়। মেগান ফক্সও তো মানুষ। আদি বোঝে না আসলে কী চায় মানুষ! আর তাকে থাকতে হয় কীভাবে!
কোলবালিশে মুখ গুঁজে আড়চোখে পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে রইল আদি। মেগান ফক্সও তাকিয়ে রইল ওর দিকে। আর ক্রমশ মেগান ফক্সের ছবি ছিঁড়ে বেরিয়ে এল গতকাল রাতের সেই মেয়েটা-সুমেধা মোতওয়ানি।
মেয়েটাকে বার থেকে তুলেছিল আদি। গতকাল, প্রায় মাঝরাতে। তুলেছিল? ‘তুলেছিল’ কথাটা এই সকালবেলা নিজের কানেই খট করে লাগল আদির। কেমন অশ্লীল শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব খারাপ একটা ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু গতকাল রাতে তো তা মনে হয়নি।
গতকাল শনিবার ছিল। ছুটি থাকার কথা। কিন্তু এখন শনিবারও কাজ করতে হয়। বেশ কিছু প্রজেক্ট নিয়ে জট পাকিয়ে আছে। সেগুলো না খুলে অবধি শান্তি নেই। গৌর তাই আর ছুটি দেয় না ওকে। আর পারলে রোববারও কাজ করায়।
আসলে ওই টুর্নামেন্টটা করে ওদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বেশ কিছুটা বেড়েছে। আরও কিছু হাউজিং প্রজেক্ট নিয়ে উদ্যোগী হয়েছে গৌর। মানুষজনের থেকে সাড়াও পাচ্ছে। কিন্তু মূল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। বারাসতের প্রজেক্টকে যে সামনে রেখে ওরা এগোবে, সেখানেই তো বাধা। লোকের মনে বিশ্বাস জন্মাতে হলে একটা কমপ্লিট প্রজেক্ট আর ক্লায়েন্ট স্যাটিসফ্যাকশনের সার্টিফিকেটের চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন কিছু হয় না। কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন করলেও যে-কোনও কিছুর পারফরমেন্সই তার আসল বিজ্ঞাপন। তাই গৌর এখন উঠেপড়ে লেগেছে। সঙ্গে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে আদিদেরও। তবু রবিবার ছুটির দিনটা এখনও বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে আদি।
গতকাল অফিস থেকে বেরিয়ে কেমন যেন বদ্ধ লাগছিল আদির। মালিনী অফিসে ছিল না। গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল অন্য কাজে। তাই যেন আরও ফাঁকা আর একা লাগছিল আদির। ট্যাক্সি ধরে সোজা পার্ক স্ট্রিটে চলে গিয়েছিল।
বারের এক কোণটায় একা, ঝুম হয়ে বসেছিল ও। আসলে যেন মদ খাওয়ার জন্য নয়। বরং হইহট্টগোলের মধ্যে একা থাকাটাই আসল উদ্দেশ্য ছিল ওর। গ্লাসের সূর্য রঙের তরলটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে ছিল আদি। দুটো চৌকো স্ফটিকের মতো বরফ ভেসে বেড়াচ্ছিল তরলের ভেতর। যেন আগুন আর বরফের সহাবস্থান। একদম কিচ্ছু আসছিল না মাথায়। আদি শুধু চুপ করে তাকিয়ে ছিল ওই তরলের দিকে। আর কষ্ট হচ্ছিল খুব, গলার কাছে যেন পাথর আটকে ছিল। চারদিকের চিৎকার চেঁচামেচি আর হইহট্টগোলের শব্দ একটা ফোঁটাও আসছিল না ওর কাছে। শুধু এক দীর্ঘ, তীব্র বিষাদ যেন ঘিরে ফেলছিল ওকে। আর আদি অবাক হয়ে দেখছিল, বহু বহু বছর বাদে হারিয়ে যাওয়া দু’-এক কুচি জল কোত্থেকে যেন জমে উঠছিল চোখের কোনায়। আর ঠিক তখনই চোখ তুলে মেয়েটার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল আদির।
দূরে পাঁচ-ছ’টা ছেলেমেয়ের একটা জটলা বসে হুল্লোড় করছিল। তার ভেতরেই একটা পিঙ্ক স্প্যাগেটি টপ আর জিন্স পরে বসে ছিল মেয়েটা। ওই জটলার ভেতরে থাকলেও মেয়েটার চোখ যেন এদিকেই ছিল। আদিকে যেন চোখ দিয়ে আটকে রেখেছিল মেয়েটা।
আদি কি কাঁদছিল? আচ্ছা, কাঁদলেই কি শুধু চোখ দিয়ে জল বেরোয় এমনভাবে? আর অন্য কোনও কারণ কি নেই? কেন চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছিল আদির? কীসের মনখারাপ ওর? ওর জীবনে তেমন তো কোনও অভাববোধ নেই। তা হলে? কেন কষ্ট পাচ্ছিল আদি? কার জন্য কষ্ট পাচ্ছিল?
বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের কোনা থেকে জলটা সরিয়ে রুমাল বের করেছিল আদি। আর দেখেছিল দূর থেকে মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। না, ব্যঙ্গের হাসি নয়। বরং খানিকটা যেন ভরসার হাসি, যেন সাহসের হাসি। মেয়েটা যেন বলছিল, ‘কান্না তো আছেই, কিন্তু তারপর জল মুছে হেসে ওঠাটাই তো জীবন।’ মেয়েটা ওই দূরে বসেই যেন মনে মনে হাত ধরেছিল আদির।
বেশ রাত করেই বেরিয়েছিল আদি। রাস্তায় ইতস্তত জটলা থাকলেও কলকাতারও যেন হাই উঠছিল। কলকাতাও যেন চোখ ঢুলছিল ঘুমে। আদির ইচ্ছে করছিল না বাড়ি যেতে। বরং বিরক্ত লাগছিল বাবা আর মায়ের মুখটা মনে পড়াতে। ওর চলে যেতে ইচ্ছে করছিল অন্য কোথাও। মনে হচ্ছিল স্ট্র হ্যাট পরে জিন্স গুটিয়ে গিয়ে বসে থাকে কোনও শান্ত নীল জলের ধারে। তারপর সেইখানেই বসে থাকে যতক্ষণ না ছিপে ট্রাউট মাছ ওঠে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিল না ট্রাউট মাছ কেমন দেখতে হয়। তবু সেই না দেখতে পাওয়া, অচেনা মাছটাকেই প্রাণপণে ধরতে চাইছিল আদি। আর ঠিক তখনই আবার দেখেছিল সেই পিঙ্ক টপটা।
মাথাটা সামান্য ঘোলাটে লাগছিল আদির। লম্বা লাইটপোস্টগুলো কেমন যেন তেরছাভাবে ঢুকে আসছিল দৃশ্যের ভেতরে। আর সেই আলোকস্তম্ভের তলায় আলতো পায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল সেই মেয়েটা।
‘আর ইউ অলরাইট?’ মেয়েটির গলায় কেমন অদ্ভুত প্রজাপতির শব্দ শুনেছিল আদি। ও ভাল করে চোখ মেলে তাকিয়েছিল।
‘আয়াম।’ ছোট্ট করে মাথা নেড়েছিল আদি।
‘ও। বাট ইউ লুক সিক।’ মেয়েটার গলায় কি উদ্বেগ ছিল?
‘না, আয়াম অলরাইট।’ আদির গলার স্বর নুয়ে আসছিল ক্রমশ।
‘আমার গাড়ি নেই। থাকলে তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিতাম।’ মেয়েটা আলতো করে কাঁধে হাত দিয়েছিল আদির।
‘কিন্তু রাস্তায় তো ট্যাক্সি আছে।’ আদি হেসেছিল। আবছা দুর্বল হাসি।
‘যেতে পারবে তো?’ মেয়েটার গলায় কি সত্যিই উদ্বেগ ছিল?
আদি হাত তুলে সামনে দিয়ে যাওয়া একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়েছিল তৎক্ষণাৎ। হলুদ ট্যাক্সির সামনে থেকে মেঘলা রঙের ড্রাইভারটা মুখ ঝুঁকিয়ে তাকিয়েছিল। আদি বুঝতে পারছিল এমন সময় এই অঞ্চল থেকে এমন অনেক মাতালকে গাড়িতে ওঠাতে অভ্যস্ত এই লোকটা।
আদি মাথা ঝুঁকিয়ে তাকিয়েছিল ড্রাইভারের দিকে। কলকাতা যেন আরও বেঁকে যাচ্ছিল। হালকা একটা হাওয়া পার্ক স্ট্রিটের পুরনো বাড়িগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে আচমকা হামলা চালাতে শুরু করেছিল। হলুদ আলোগুলো যেন নেমে আসছিল নীচে। আদি বুঝতে পারছিল না ট্যাক্সিটা এমন বাঁকাচোরা চ্যাপটা চৌকো শহরের মধ্যে দিয়ে যাবে কী করে! ট্যাক্সিওয়ালা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী হল? কিছু বলবেন? যাবেনটা কোথায়? আচ্ছা মাতালের পাল্লায় পড়া গেছে তো!’
মাতাল? কে মাতাল? আদি বুঝতে পারছিল না ট্যাক্সিওয়ালা কার সঙ্গে কথা বলছে। আচ্ছা, ওর পিছনে কি আরও কেউ এসে দাঁড়িয়েছে? ট্যাক্সিওয়ালা কি তার সঙ্গে কথা বলছে?
‘আচ্ছা মুশকিল।’ ট্যাক্সিওয়ালা গিয়ার পালটে চালাতে শুরু করেছিল গাড়ি। কিন্তু তখনই আবার সেই গোলাপি মেয়েটা। গোলাপি মেয়ে? না, গোলাপি টপ? আচ্ছা, কলকাতাটা গোলাপি নয় তো?
মেয়েটা বলেছিল, ‘আপনি যাবেন? শোভাবাজার।’
শোভাবাজার? আদি তো শোভাবাজার যাবে না। তা হলে? ও মেয়েটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। মেয়েটা কী করে জানল ও শোভাবাজার থাকে? আসলে তো শোভাবাজারে থাকে না আদি। ও অন্য একটা জায়গায় থাকে। যেখানে রাস্তার পাশে অনেক পুরনো বাড়িঘর। যেখানে গাছপালা কম। যেখানে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুরনো শহরটা থেকে গিয়েছে কিছুটা। সেখানে একটা বাড়িতে থাকে আদি। তার জানলা দিয়ে দেখা যায় পুরনো একটা আকাশ। যার গায়ে বাচ্চাদের কাটাকুটি দাগের মতো অসংখ্য তারের রেখা। সেখানেই, হ্যাঁ, সেখানেই থাকে আদি। কিন্তু কী যেন নাম জায়গাটার? শোভাবাজার? না তো, শোভাবাজার তো নয়। তবে কি সত্যিই নেশা হয়ে গেল আদির?
মেয়েটা আলতো ঠেলায় আদিকে তুলে দিয়েছিল গাড়িতে। তারপর গাড়িতে উঠে বসেছিল নিজে।
রাতের কলকাতা ফাটিয়ে হু হু করে ছুটছিল গাড়ি। আদি আলতো কাত হয়ে মাথা হেলিয়ে ছিল। গলার আলগা টাইটা আরও আলগা করে দিয়েছিল ও।
মেয়েটা ঝুঁকে বলেছিল, ‘আর ইউ ফিলিং অলরাইট?’
‘ইয়েস, আমি ঠিক আছি।’
‘আয়াম সুমেধা, সুমেধা মোতওয়ানি। তুমি?’
‘আমি? আমি।’ আদির চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল হাওয়ায়। কলকাতাটা এতক্ষণ বাঁকাচোরা ছিল। এবার যেন আলোও কমে আসছিল তার।
‘কোথায় থাকো?’
মনে হচ্ছিল একটা লম্বা কুয়োর ভেতর শুয়ে ওই ওপর থেকে ঝুঁকে পড়া মেয়েটার গলার স্বর শুনছে ও। স্বরটা যেন আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছিল, যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল শূন্যে। অনেক গভীর এক গর্তের ভেতরে যেন আস্তে আস্তে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছিল আদি। একদম নেমেই যাচ্ছিল…
‘এই যে ওঠো। এই…,’ মেয়েটার আলতো ঠেলায় চোখ মেলেছিল আদি। সরু গলি। চারদিকে ইটের দাঁত বের করা বাড়িঘর। ময়লা বাতিল জামার মতো আলো। এটা কোন জায়গা? এখন ক’টা বাজে? ও আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নেমেছিল। মনে হচ্ছিল যেন পা দুটো শোলার তৈরি আর মাথাটা পারদের। দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়েছিল আদি। তবে এবার আস্তে আস্তে মনে পড়ছিল সব। এটাই বোধহয় শোভাবাজার। আর ওই গোলাপি টপের মেয়েটা এনেছে ওকে এখানে। কী যেন নাম মেয়েটার? কী যেন… ও সুমেধা। আর আদি থাকে যেন কোথায়? ও, ইয়েস, সুকিয়া স্ট্রিট।
আদি ভরসা পেয়েছিল। যাক। মনে পড়েছে, ঠিক আছে, এখন শোলার পা আর পারদের তৈরি মাথাটা বদলে স্বাভাবিক হলেই হয়।
সুমেধা বলেছিল, ‘দোতলায় আমার অ্যাপার্টমেন্ট। চলো একটু ফ্রেশ হয়ে নেবে। তারপর না হয় বাড়ি যেয়ো। কোথায় বাড়ি তোমার মনে পড়েছে?’
আদি হেসে বলেছিল, ‘মনে পড়েছে, থ্যাঙ্কস।’
সুমেধা ওকে আলতো করে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।
সুমেধার ফ্ল্যাটটা ছোট্ট। একটা কিচেন কাম ডাইনিং আর একটা বেডরুম। আর ডাইনিং রুমের পাশে ছোট একটা দু’জন বসার মতো সোফা। আদি বসেছিল সেখানে, হলুদ রঙের সোফাটা বেশ পরিষ্কার। ঘরটাও পরিপাটি করে সাজানো। তবে অবাক হয়ে আদি দেখছিল ঘরের দেওয়ালটার রং গোলাপি।
‘বসো, আমি আসছি।’ সুমেধা ছোট্ট বেডরুমটায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
নিস্তব্ধ শহর। অচেনা বাড়ি। আদির মনে হয়েছিল ও বোধহয় কোনও দ্বীপান্তরে এসেছে। গলার থেকে টাইটা খুলে পাশে সোফায় রেখেছিল আদি। তারপর নিজের মাথার চুল মুঠো করে ধরে ঝাঁকিয়েছিল। এখানে কী করছে ও? অচেনা একটা মেয়ের ফ্ল্যাটে এভাবে বসে আছে কেন? আর তারপরই ওর মনে হয়েছিল, আরে, আজ একবারও তো মালিনী ফোন করেনি ওকে? কেন ফোন করল না মালিনী? কোথায় গেছে যে, একবার ফোনও করতে পারেনি?
আচমকা গরম লাগতে শুরু করেছিল আদির। একটা ঘামের দাগ কে যেন কানের পিছন থেকে ঘাড় অবধি টেনে দিয়েছিল নিমেষে। মাথার পারদগুলো ফুটতে শুরু করেছিল। শোলার পায়ে কে যেন ধরিয়ে দিয়েছিল আগুন। পোড়া গন্ধটা ঠিক পেয়েছিল আদি। বুঝতে পেরেছিল হিংসেয় সমস্ত শরীরে আগুন লেগে গেছে ওর।
ঠিক সেই সময়ে আচমকা দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল সুমেধা। চমকে গিয়েছিল আদি। সুমেধা শুধু একটা তোয়ালের বাথরোব পরে আছে। হাঁটু অবধি এসে রোবটা আচমকা শেষ হয়ে গেছে। আর তার তলায় স্ফটিকের মতো দুটো পা। আচমকা ফুটন্ত পারদটা মাথা থেকে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছিল আদির।
সুমেধা তীব্র চোখে তাকিয়ে একদম গা ঘেঁষে এসে বসেছিল আদির। টাইটা তুলে হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলেছিল, ‘তোমার গালের লাল তিলটা তো খুব সুন্দর! তা তোমার নামটা?’
সুমেধার ক্রস করে রাখা পা বিপজ্জনকভাবে সরিয়ে দিয়েছিল রোবের আড়াল। আর সেই বিপদ-সীমানায় সুমেধার লেসের প্যান্টির সীমান্ত দেখা যাচ্ছিল। পারদ তার অধগতি বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও।
আদি শুকনো জিভে বলেছিল, ‘আদিত্য।’
‘চোপড়া?’ হেসেছিল সুমেধা, ‘আমি তো মোতওয়ানি। তুমি কী?’
‘ব্যানার্জি।’ আদির অবাধ্য চোখ আর নিষেধ শুনছিল না।
সুমেধা টাইটা দরজার পাশে রাখা একটা স্ট্যান্ড ল্যাম্পের দিকে ছুড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছিল আচমকা। বাথরোবের কোমরবন্ধটা একটা ঝটকায় খুলে ফেলে রোবটা নামিয়ে দিয়েছিল শরীর থেকে। তারপর গভীর গলায় বলেছিল, ‘লেট্স মেক ইট ইজি ফর ইয়োর আইজ।’
গোলাপি! ভেতরের অন্তর্বাসদ্বয়ও গোলাপি! আদি হাঁ করে তাকিয়ে দেখেছিল। গোলাপি ব্রেসিয়ারের ভেতর থেকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে বান রুটি। পারদ তার নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে জানান দিচ্ছিল উপস্থিতি।
সুমেধা আদির চোখে চোখ রেখে এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে। তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল আদির সামনে। অস্ফুটে বলেছিল, ‘ওয়ান্ট মি?’
আদির কথা সরছিল না। ঘরটা এবার কেমন যেন রং পালটাচ্ছে মনে হচ্ছিল ওর। সুমেধা ক্রমশ বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে গিয়েছিল ওর দিকে। আর তারপর মাথা নামিয়ে এনেছিল আদির দৃঢ় দুর্বলতায়।
আদি মাথা পিছনে হেলিয়ে তাকিয়েছিল সিলিংফ্যানের দিকে। আর ওর হাত নিজের অজান্তেই চলে গিয়েছিল সুমেধার মাথায়। কতক্ষণ ও বসেছিল ওই অবস্থায়? তরল সূর্য সরিয়ে ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে সাড়া দিয়েছিল শরীর। সুমেধা অনায়াসে উঠে নিজেকে গোলাপি কাপড় মুক্ত করে বসে পড়েছিল আদির ওপর। পাতালযাত্রার আগে অভিযাত্রীর মতো কেঁপে উঠেছিল আদি। হয়তো ভয়েই ধরে ফেলেছিল সুমেধার কোমর। তারপর ঢেউ আর স্রোত। চুলের বাদামি ঝরনার ভেঙে পড়া। চিৎকার আর নখের দাগ। আদি ক্রমশ দেখতে পাচ্ছিল সেই অভিযাত্রীকে। লক্ষ্যে পৌঁছোচ্ছে, ক্রমশ লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সে। আদি দাঁতে দাঁত চেপে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল আর একটু। আর একটু পথ…। বহু দিন পর, আর একটা অভিযান শেষ করতে যাচ্ছে ও।
আর ঠিক তখনই মুখটা মনে পড়েছিল আদির। মাখনের মতো রং। বাদামি চোখ আর সেই ঘূর্ণির মতো টোল। ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মালিনী ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে! সারাদিন পরে, মালিনী এমন সময় তাকিয়ে রয়েছে! সুমেধা পাগলের মতো ছটফট করছে ওর ওপর। সেই দেখেই কি মালিনী হাসছে? নাকি আদির মনখারাপ আর হিংসের পাশাপাশি এমনভাবে শরীর সমর্পণের বৈপরীত্য দেখে হাসছে? কেন হাসছে মালিনী? কার দিকে তাকিয়ে হাসছে?
আদি ওই অবস্থাতেই মাথা সোজা করে তাকিয়েছিল সুমেধার দিকে। গোলাপি লিপস্টিক ছেতরে গেছে। চোখের একটা ফল্স আইল্যাশ খুলে ঝুলছে চোখ থেকে। মাথার চুল ভাঙা, জড়ো করা নুডুলসের মতো লাগছে।
এ কোথায় এসেছে আদি? এ কার ভেতর ঢুকে বসে আছে? হঠাৎ গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল ওর। শরীর গুলিয়ে উঠেছিল। একটা মনখারাপের চাদর ঝপ করে এসে যেন ঢেকে দিয়েছিল ওকে। নিমেষে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল আদি। সুমেধাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে প্যান্টের জিপ টেনে দিয়েছিল। জামা ঠিক করে উঠে পড়েছিল। আর দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল টলমল ভাবে।
‘ইউ বাস্টার্ড,’ সুমেধা খোলা বইয়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল মাটিতে। চিৎকার করে বলেছিল, ‘জানোয়ার। ইমপোটেন্ট। পালাচ্ছিস কেন? কোথায় পালাচ্ছিস? টাকাটা কে দেবে, তোর বাপ? ট্যাক্সির ভাড়া, আমাকে লাগানোর দাম কে দেবে? তোর কোন বাপ দেবে?’
আদি দরজার পাশের ল্যাম্প স্ট্যান্ড থেকে টাইটা তুলে নিয়েছিল। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা পাঁচশো টাকার নোট ছুড়ে দিয়েছিল সুমেধার দিকে।
বাইরে বেরোতে বেরোতে আদি দেখেছিল, সুমেধা ঝাঁপিয়ে পড়ে ছড়িয়ে থাকা নোটগুলো কুড়োচ্ছে। আর দূরে এক কোণে পড়ে আছে গোলাপি রঙের দু’টুকরো কাপড়।
রাতের কলকাতায় ধাক্কা খেতে খেতে হাঁটছিল আদি। যেন দেখতে পাচ্ছিল মালিনী হাসছে। ওর দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত হাসছে হা হা করে। কেন হাসছে মালিনী? এমনভাবে হাসছে কেন? কোথায় শেষ হবে এই হাসি? আদির মাথার ভেতরে টলমল করছিল কলকাতা। বাড়ির রাস্তা যেন খুঁজে পাচ্ছিল না। আচমকা ভূতের মতো কোত্থেকে যেন এসেছিল একটা ট্যাক্সি। আদি কিছু না ভেবে প্রায় ঝাঁপিয়ে উঠে পড়েছিল গাড়িতে। তারপর অবসন্ন গলায় শুধু বলেছিল, ‘সুকিয়া স্ট্রিট।’
এই সুকিয়া স্ট্রিট। কলকাতা শহরের অন্যতম পুরনো বাসিন্দা এই সুকিয়ারা। শুনেছে আদি। তাদের নামেই কি এই রাস্তার নাম? হবে হয়তো। ইতিহাস নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা কোনওদিনই ছিল না আদির। আজও নেই। আসলে স্কুলজীবন থেকে ইতিহাস খুব বোরিং লাগত আদির। তবু উত্তর কলকাতায় থাকা অনেকটা যেন ইতিহাসের বইয়ের পাতার ভেতরেই থাকা। এই গড়পারের রাস্তা। রামমোহন লাইব্রেরি। ওই বিদ্যাসাগরের বাসস্থান। তা ছাড়া পুরনো মিষ্টির দোকান। ঝরোকা লাগানো বারান্দা। কবেকার খিলান দেওয়া বাড়ি। বাদুড়বাগান মাঠ, পুরনো কলকাতার স্কুল। ফুটের তেলেভাজা। লাল রোয়াক। লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঢুকে পড়া গা-ছমছমে মন্দির। এসবের ভেতরেই তো আদির বেড়ে ওঠা। দাদাভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা।
আজ সকালে শুয়ে মেঘলা মার্চের আকাশে ওই হিজিবিজি দাগের মতো তারগুলো দেখে হঠাৎ কেন যে এমন তীব্রভাবে দাদাভাইয়ের কথা মনে পড়ল আদির কে জানে! আসলে তার বলতেই তাতে পেঁচিয়ে যাওয়া ঘুড়ির কথা মনে পড়ে আদির। কালোর ওপর হলুদ গোল্লা আঁকা একটা ইয়াব্বড় চাঁদিয়াল।
তখন সদ্য ঘুড়ি ওড়াতে শিখেছিল আদি। কিগানের সঙ্গে ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়াত। মাঝে মাঝে কিগান উড়িয়ে দিত আর তারপর ঘুড়ির সুতোটা ধরিয়ে দিত আদির হাতে। তখন কোন ক্লাসে পড়ত আদি? ফোর কি ফাইভ। বাবা একটা চাঁদিয়াল কিনে এনে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘আস্তে আস্তে ওড়াবি। যদি নষ্ট করিস আর কিনে দেব না।’
আস্তে আস্তে ওড়াবে মানে? এ কি সাইকেল নাকি যে, আস্তে আস্তে চালাবে? তবু ছাদের ওপর ঘুড়িটা উড়িয়ে খুব সাবধানে টানছিল আদি। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ছিল সেটা। গোটা আকাশটা মোজাইকের মতো ছিটছিট রঙে রাঙানো ছিল। তার ভেতর সাবধানে ঘুড়িটা রেখেছিল আদি। তখন তো আর টাকা পেত না হাতে, তাই সম্পদ বলতে ছিল ওই একটাই ঘুড়ি।
তবু, ছোট ছিল তো, তাই লোভ হয়েছিল হঠাৎ। মনে হয়েছিল আর একটু বাড়ালে কী হবে? ও তো আর কারও সঙ্গে প্যাঁচ খেলতে যাচ্ছে না। মাঞ্জা সুতোই তো ওর নেই। শুধু সাদা সুতো। তাই নিজেই নিজেকে বুঝিয়ে, বাড়িয়েছিল ঘুড়িটা। আর সত্যি বলতে কী দিব্যি উড়ছিল চাঁদিয়াল। ক্রমশ আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল, বাঃ, সত্যিই তো ভাল ঘুড়ি ওড়াতে শিখেছি আমি।
আর তখনই কোত্থেকে যে একটা মুখপোড়া ঘুড়ি এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপর! থতমত খেয়ে ঘুড়ি বাঁচাতে আদি টান দিয়েছিল সুতোয় আর মাখনের মতো সাদা সুতো কেটে গিয়েছিল কুট করে। কিন্তু ঘুড়ির লম্বা সুতোটা ঝুলতে ঝুলতে গিয়ে জড়িয়ে গিয়েছিল ওই অজস্র তারের ভেতরে।
প্রায় দোতলা সমান উঁচুতে ঝুলছিল আদির চাঁদিয়াল। ওর একমাত্র সম্বল। বাবা জানলে তো আজ ভীষণ মারবে! ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল আদির। কষ্ট হচ্ছিল খুব। চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছিল হু হু করে। এবার কী করবে ও?
চিলেকোঠার ঘর থেকে ঠিক এই সময় বেরিয়ে এসেছিল দাদাভাই। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী রে তুই কাঁদছিস কেন?’
ফোঁপাতে ফোঁপাতে আদি বলেছিল কারণটা। দাদাভাই হেসেছিল খুব, ‘এই জন্য কাঁদছিস? বোকা কোথাকার! আমার হাতে পয়সা আছে। তোকে আমি কিনে এনে দিচ্ছি আর-একটা ঘুড়ি।’
‘না, বাবা নিজে কিনেছে ঘুড়িটা। খুব ভাল করে চেনে। ওটাই চাই আমার।’
কিগান কথাটা শুনে চুপ করে চিন্তা করেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, ‘দাঁড়া, আমি দেখছি। তুই কাঁদবি না একদম। কেমন?’
অদ্ভুত এক দক্ষতায় দাদাভাই হাতে একটা লম্বা লাঠি নিয়ে নেমে গিয়েছিল ছাদের কার্নিশে। তারপর ছোট্ট এক লাফে চলে গিয়েছিল পাশের ছাদে। নর্থের বাড়িগুলো গায়ে গায়ে বলে দাদাভাইয়ের সুবিধে হয়েছিল। তবু পাশের ছাদ থেকে খুব সহজে ঘুড়ির সুতোর নাগাল পাওয়া যায়নি। তবে বয়সের তুলনায় লম্বা দাদাভাই অনেক কসরত করে ঘুড়িটা দড়িতে পেঁচিয়ে নিয়ে এসেছিল। তারপর এক হাতে ঘুড়ি আর অন্য হাতে লাঠি নিয়ে এ কার্নিশে আসতে গিয়ে সামান্য টাল হারিয়েছিল। দাদাভাই লাঠিটা ফেলে হাত দিয়ে ছাদের পাঁচিলটা ধরে খুব জোর সামলে নিয়েছিল নিজের পড়ে যাওয়াটা। কিন্তু লাঠিটা পড়ে গিয়েছিল নীচে টালির ছাদ দেওয়া একটা কাঠের দোকানের মাথায়। টালি ভেঙে গিয়েছিল একটা।
সন্ধেবেলা সেই দোকানের মালিক এসে অভিযোগ করেছিল দাদাভাইয়ের নামে। আর দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আদি দেখেছিল বাবা আর মা অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে। দাদাভাই সেদিন মাথা নিচু করে শুনেছিল সব। কিচ্ছু বলেনি। আর আদি মরমে মরে যাচ্ছিল একদম। কষ্ট হচ্ছিল। দাদাভাই যে অন্যায় করেনি সে তো দেখেছিল ও। তবে? তা হলে কেন বলেনি আদি? কেন পারেনি বলতে?
আদি পারে না। আদি ভিতু। ডরপোক আদমি। এই যে দাদাভাইকে বাবা জুতো ছুড়ে মারল। চরিত্রহীন, লম্পট বলে গাল দিল। তখন কিছু বলতে পেরেছিল আদি? বলতে পেরেছিল যে, দাদাভাইয়ের দোষ নয় সবটা? পারেনি। কিচ্ছু পারেনি ও। কিচ্ছু পারে না। এতটা জীবন কি শুধু নিজেরটা দেখেই কাটিয়ে দিল আদি? শুধু স্বার্থপরতা করে কাটিয়ে দিল? আচ্ছা, ও যে এমন তা কি সবাই বোঝে? তাই কি সবাই ওকে এড়িয়ে যায়? তাই কি মালিনী বলেছিল, ‘তুমি আমাদের ওল্ড এজ হোমে যাবে? তোমার ওদের কথা চিন্তা হয়? তুমি কনসানর্ড?’
মোবাইলটা হঠাৎ ক্যাঁক ক্যাঁক করে বেজে উঠল। আবার কে? বিরক্ত হয়ে ফোনটা ধরল আদি। আরে, এ যে চমক! ও হঠাৎ? ও হো, আদির মনে পড়ল, বারাসতের ঝঞ্ঝাটটা যে এখনও মেটেনি!
ফোনটা তুলে আদি যথাসম্ভব নরমভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, বলুন।’
চমক বলল, ‘ছুটির দিনে বিরক্ত করলাম বলে ক্ষমা চাইছি।’
‘আরে এমন বলছেন কেন?’
‘না, আপনাদের জীবন তো আর আমাদের মতো নয় যে, ছুটি বলে কিছু নেই। তাই বলছি আর কী। কিন্তু কী করব বলুন? কিছু তো করার নেই আমার। আমায় তো আমার কাজ করতেই হবে। সুধাদি যে আমায় চিবোচ্ছেন।’
‘ভেরি সরি মিস্টার চক্রবর্তী,’ আদি বিছানায় উঠে বসল। মাথাটা এখনও কেমন যেন বেসামাল লাগছে। মনে হচ্ছে যেন নৌকোয় চড়েছে ও। আর ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকোটা যেন দুলছে অল্প অল্প।
‘আরে আপনি সরি হচ্ছেন কেন?’ চমকের গলাটা হঠাৎ কেমন যেন শান্ত লাগল, ‘আপনার সরি হওয়ার কিছু নেই। আপনারা চান না বারাসতের প্রজেক্টটা শেষ হোক। আপনাদের প্রজেক্ট। আপনাদের টাকা। আমি কী বলব বলুন? আসলে আমি দূত মাত্র। সুধাদি বললেন আপনাদের সঙ্গে কথা বলে জানাতে যে, সুধাদির আর আপনাদের প্রজেক্টের ব্যাপারে আগ্রহ নেই।’
‘আরে আপনি রাগ করবেন না প্লিজ!’ আদির হঠাৎ ঘাম দিল। ও ভেবেছিল ঝঞ্ঝাটটা মিটিয়ে এনেছে। কিন্তু মিটছে কই! এ তো আরও বাড়ছে!
আসলে গৌরের কাছে বকুনি খেয়ে আদি বুঝেছিল যে, ও যদি কিছু না করে, তা হলে সত্যিই ওর চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।
আদি আগেই খবর নিয়ে জেনেছিল সুধারানি সমাজপতি হল এই অঞ্চলের পার্টির সর্বেসর্বা। তাই এই ভদ্রমহিলাকে ধরতে হবে। স্থানীয় লোকেদের কাছ থেকেই সুধাদির সম্পর্কে খবর নিতে শুরু করেছিল আদি। আর তখনই উঠেছিল চমকের নাম।
চমক চক্রবর্তী। চাপাডাঙার নামকরা মানুষ রাঘব চক্রবর্তীর ছেলে। সুধাদির সবচেয়ে কাছের লোক। আদি বুঝেছিল ওর কাজ বাগাতে হলে এই চমককে ওর চাই। তাই সময় বুঝে আর চমকের সাহায্যে ফোনে সুধাদির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ও। সুধাদির সঙ্গে গৌরের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও ঠিক করে দিয়েছিল। শুধু নিজে যায়নি। শরীর খারাপ বলে বসে ছিল বাড়িতে। কারণ সেদিন কলকাতায় দাদাভাই ছিল। দাদাভাই গৌরের সঙ্গে গাড়ি করে নাকি বারাসত অবধি গিয়েছিল। না, গৌর দাদাভাইকে মিটিং-এ নিয়ে যায়নি। কেন নেবে? দাদাভাই তো অন্য জায়গার এমপ্লয়ি। তা ছাড়া প্রোডাকশনের লোক। ম্যানেজমেন্টের লোক তো নয়।
মিটিং সেরে ফিরে পরদিন গৌরের মুখ দেখেই আদি বুঝেছিল যে, মিটিংটা খুব একটা ভাল হয়নি। তাও আদি জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে? গৌর প্রথমে কিচ্ছু বলছিল না, তারপর ওর পেটেন্ট গালি দিয়ে বলেছিল, ‘শালি, ফ্ল্যাট মাঙ্গ রহি হ্যায়।’
‘অ্যাঁ, মানে?’ ঠিক ধরতে পারেনি আদি।
‘তু লিয়াজঁ অফিসার হ্যায় অর ইয়ে নেহি সমঝ পা রাহা হ্যায়? তু ঘণ্টা তরক্কি করেগা। আরে সুধা বলছে যে, ওই কমপ্লেক্সের তিনটে ফ্ল্যাট ওকে ছেড়ে দিতে হবে। তা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনটে ফ্ল্যাট, হ্যাঁ? আমার কি হারামের পয়সা? নিজেরা অশান্তি করে এখন ব্ল্যাকমেল হচ্ছে? দাঁড়াও আমিও দেখছি শালা?’
তা সত্যিই দেখেছে গৌর। আর সেই ব্যাপার নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। বরং আরও ওপর মহলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার জন্য চেষ্টা করছে গৌর। বলছে, ‘বাপেরও বাপ হয়। আই উইল টিচ দেম আ লেসন। শালে, পয়সা কেয়া পেড় পে উগতা হ্যায়?’
পয়সা যে গাছে হয় না তা আদি জানে। পয়সা আসলে মাথায় জন্মায়। পয়সা আসলে আরও দশ লক্ষ পয়সার পেটে জন্মায়। তাই সেই গর্ভযন্ত্রণা টের পায় বলে মানুষ পয়সাকে সন্তানের মতো আগলে রাখে।
আদি আর গৌরকে কিছু বলেনি। কী বলবে? গৌর কারও কথা শোনার পাত্র নয়। নিজে যা ভাল বুঝবে তাই করবে। তিনটে ফ্ল্যাটের দাম সব নিয়ে প্রায় সত্তর-আশি লাখ টাকা হবে। তার চেয়ে কম দামে যদি পার্টির ওপর মহল থেকে কাজটা হাসিল করে নেওয়া যায়! আসলে এই ত্রয়ণ বলে ত্যাঁদড় ছেলেটার জন্যই তো এসব হচ্ছে। আদি এখনও জানে না এরপর কী হবে। আর এর ভেতর এমন ফোন!
চমক বলল, ‘কী হল আদিত্য? আপনি এমন চুপ মেরে গেলেন কেন? সুধাদির কথাটা কানে ঢুকেছে তো?’
‘চুপ মেরে’ কথাটা কানে বাজল আদির। চমকের কথার ভঙ্গির ভেতরেই একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি রয়েছে। ও বলল, ‘আসলে, কী হয়েছে, জানেন তো…ফ্ল্যাটের এত টানাটানি যে…’
‘ঢপ দেবেন না তো। মটকা গরম হয়ে যায়।’ চমকের ভাষা শুনে আদি বুঝল খোলস ছেড়ে আসল মানুষটা বেরোচ্ছে। ও তো শুনেছে চমক কী ধরনের মানুষ!
চমক আবার বলল, ‘ফ্ল্যাটের টানাটানি চলছে, না? পার্কটার জন্য প্রজেক্ট ঝুলে আছে জেনে, পজেশন পাওয়ার সময় ঠিক নেই জেনে ক’জন টাকা ফেরত চাইছে? আমাদের কি গা…মানে ইয়ে মনে হয় নাকি? সুধাদি বলেছে আর ইন্টারেস্ট নেই এ ব্যাপারে। বুঝেছেন?’
আদি বলল, ‘প্লিজ মিস্টার চক্রবর্তী। পুরোটা শুনুন। জানেন তো বাজারের অবস্থা। তিনটে ফ্ল্যাটের দাম বুঝছেন তো? গৌর স্যারকেও বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের সামনে রাখতে হবে কথাটা। এত টাকার ব্যাপার। সময় তো লাগবেই। দেখবেন, নিশ্চয়ই একটা সমাধান আসবে। আসলে আপনাদের ওই ত্রয়ণ ছেলেটা…’
‘কে?’ ফোঁস করে উঠল চমক, ‘ওই বানচোতটার নাম নেবেন না। আপনি আমায় আর সুধাদিকে যোগাযোগ করেছেন। ওই ত্রয়ণের নাম এর মধ্যে আসে কেমন করে? ও কেউ নয়।’
আদি বলল, ‘কিন্তু ওর লিডারশিপেই তো…’
‘কে লিডার? ত্রয়ণ? আর আমরা কী? শুনুন ওসব ফালতু কথা সাইডে রাখুন। আমি আর সুধাদিই মেন লোক। আর সুধাদি বলেছেন যে, ইন্টারেস্ট নেই। বুঝেছেন?’
আদি হাসল মনে মনে। পেয়েছে। একটা সূত্র ও পেয়েছে। ত্রয়ণকে একটা ঘুঁটি যদি করতে পারে তা হলে কাজ হবে হয়তো। কিন্তু তার জন্য সাবধান হতে হবে। আর তার জন্য ওকে সাহায্য নিতে হবে…আদি বুঝতে পারছে যে, সুধারানি সমাজপতির যথেষ্ট আগ্রহ আছে ওদের ফ্ল্যাটের ওপর। তাই চমক এতক্ষণ ধরে কথা বলছে।
ও বলল, ‘আপনি আর একটু সময় দিতে বলুন সুধাদিকে। আমি পার্সোনালি দেখব ব্যাপারটা। কেমন? প্লিজ, আর একটু।’
চমক চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর যেন ভীষণ অনিচ্ছুক, এমনভাবে বলল, ‘আপনি এত করে যখন বলছেন তখন না হয় আমি দেখছি। কিন্তু ঢপবাজি দিয়ে কিছু হবে না বলে দিচ্ছি। আমার দুর্নাম জানেন তো? মার্চেন্ট মাল্টিপল্সকে কীভাবে নর্থ চব্বিশ পরগনা থেকে গোটাতে হয় আমি জানি। বুঝলেন?’
ফোনটা কেটে একটু ঝুম হয়ে বসে রইল আদি। মাথার সেই টলমল ভাবটা অনেকটা কেটেছে। তবু, কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। শালা, ছুটির দিনেও রেহাই নেই। সব কাজ এসে বসবে মাথার ওপর।
আদি ঘড়ি দেখল। সওয়া ন’টা। আরও একটু ঘুম দরকার। শরীরটা কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। বাইরের আকাশটার রং যেন আরও ক্লান্ত করে দিচ্ছে ওকে।
আদি পা গুটিয়ে শুয়ে পড়ল আবার। আজ আর কিচ্ছু করবে না। শুধু আলসেমি করে কাটাবে। কোনও কাজ করবে না। ফোনটাও কি বন্ধ করে রাখবে? কিন্তু যদি মালিনী ফোন করে? তবে? কিন্তু কেন ফোন করবে মালিনী? কী দরকার ওর? ও শুধু তো কলিগ মাত্র। মালিনী তো তা কথায় কথায় বোঝায়। তা হলে রোববার ছুটির দিন ওর গ্র্যান্ড মাদারের ইন্টারেস্টিং কম্পানি ছেড়ে কেন বেকার বেকার ওকে ফোন করবে মালিনী? খেয়েদেয়ে কাজ নেই ওর? আদির ভেতরে একটা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বাচ্চা ছেলে মুখ ভার করে রইল। মনে হল এখনই বাইরে জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় মোবাইলটা। ফালতু একটা যন্ত্র। অকর্মার ঢেঁকি। সকাল থেকে বাজে বাজে ফোন আসবে। কে কোথাকার মাস্তান। কে কোথাকার গৌর। তাদের মাঝে পড়ে ওকে খিস্তি খেতে হবে! এটা কি ছুটির দিন?
আদি ফোনটাকে বন্ধ করে দিল। আর ঠিক তক্ষুনি ঘরে ঢুকল মা। আদির মাথায় যে রক্তটা উঠেই ছিল সেটা যেন এবার ব্রহ্মতালু ভেদ করে পিচকিরির মতো শূন্যে উঠে যেতে চাইল। মা কেন এল এখন? তাও না বলে হুট করে এমন দরজা ঠেলে ঢুকল কেন? কী চাই মায়ের? আবার কোনও ভ্যানতাড়া নিয়ে আসেনি তো?
আদি বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুমি? কী চাই?’
মা একটু আহত হল যেন, ‘কী চাই মানে? এমন করছিস কেন?’
আদি অনেক কষ্টে রাগটা সামলাল। বলল, ‘যা বলতে এসেছ বলো।’
‘তোর কাছে একটা মেয়ে এসেছে।’ মা গম্ভীর গলায় বলল।
‘মেয়ে?’ আদি উঠল। আবার গোটা দৃশ্যটা নৌকোর মতো দুলল সামান্য, ‘কে মেয়ে? কী নাম?’
‘নাম জিজ্ঞেস করিনি।’ মা গম্ভীর গলায় বলল, ‘বসার ঘরে বসে আছে। যা গিয়ে দেখে নে কে। আমায় জ্বালাস না প্রশ্ন করে।’ মা আর দাঁড়াল না। দুদ্দাড় করে চলে গেল।
কে এল এমন সময়? কোন মেয়ে? বিরক্ত লাগল আদির। গতকাল রাতের ওই মেয়েটার তেতো স্বাদ এখনও মন থেকে যায়নি ওর। প্রচুর ঘুমিয়ে গতকাল রাতটাকে দ্রুত মুছে ফেলতে হবে মন থেকে। সেই প্রস্তুতির মাঝে কে এল বাগড়া দিতে?
আদি খাট থেকে নেমে চটিটা পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ওর ঘরের বাইরে লম্বা সবুজ রঙের মেঝের করিডর। তার শেষ প্রান্তে বসার ঘর। হালকা লেবু রঙের পরদা ঝুলছে। আর তার সামান্য ফাঁক দিয়ে একজন মহিলাকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কে বোঝা যাচ্ছে না। আদি বিরক্ত মুখে ঘরটার দিকে হাঁটা দিল।
জুঁই ফুলের গন্ধটা পরদা সরাতেই পেল আদি। আর নিমেষে হাত-পা জমে গেল ওর। মালিনী? ওর বাড়িতে? কেন? তেলরঙে আটকে যাওয়া শ্যামাপোকার মতো দরজার কাছে আটকে গেল আদি। এ মেয়েটা কেন এসেছে এখানে? কে ওকে ঠিকানা দিল এ বাড়ির? মালিনী কি বিশেষ কিছু বলতে এমন ছুটির দিনে এসেছে? আদি কিচ্ছু বলতে পারল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আর ওর মনে হল গতকাল রাতের মতোই আবার কলকাতা কেমন যেন বেঁকেচুরে, ভেঙে, চ্যাপটা হয়ে ধেয়ে আসছে ওর চারদিকে। এ তো মুশকিল হল! এমন ভাঙাচোরা শহরটায় বাঁচবে কী করে আদি?
Chapter - 14
১৪
ললিত ওর দূর সম্পর্কের মামা। মানে মায়ের খুড়তুতো ভাই। আচ্ছা, এটা কি খুব একটা দূরের সম্পর্ক? কে জানে। মা তো বলে, ‘তোর দূর সম্পর্কের মামা।’ কী ভিত্তিতে বলে মা? ললিত খুব একটা যোগাযোগ করে না বলে? না নিজের ভাই নয় বলে? আসলে এইসব কাছের বা দূরের ব্যাপার দিয়ে সম্পর্ক মাপাটা ঠিক বোঝে না দিঘি। দূরের মানুষ মানে কি মনে থেকে দূরে না অবস্থানের থেকে দূরে? আর যে কাছের? সে? পাশে বসে রয়েছে বলেই কি সে কাছের? নিজের চিন্তাগুলো মাঝে মাঝে নিজের কাছেই ধাঁধার মতো মনে হয় ওর। কিন্তু উত্তরও যে পায় না! তাই মনের মধ্যে সবসময় একটা অস্বস্তি হয় ওর।
সার্দান অ্যাভিনিউয়ের ওপর এই বিশাল বাড়িটা আর্যদের। অনেকটা দুর্গের মতো। তিন-চারটে বড় বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে সবসময়। এর কয়েকটায় দিঘি চড়েওছে। আগে কয়েকবার এসেছে দিঘি। বাড়ির ভেতরে সুইমিং পুলও রয়েছে। একটা জিম রয়েছে। কিন্তু কোনওটাই আর্য তেমনভাবে ব্যবহার করে না। শারীরিক পরিশ্রমের ব্যাপারে একটা অনীহা রয়েছে ওর। তাই হয়তো একটু মোটা হয়ে যাচ্ছে। আসলে লম্বা বলে চট করে বোঝা যায় না, কিন্তু যখনই জড়িয়ে ধরে ওকে, ও বোঝে আর্যর শরীরে মেদ বাড়ছে। অবশ্য তা নিয়ে বললে আর্য গা করে না। বলে, ‘অমন সিক্স প্যাক, এইট প্যাক অ্যাব্স বানানো আমার কম্ম নয়। আমি পড়াশোনাতেই ইন্টারেস্টেড। আর পড়াশোনা করতে গেলে অমন শরীরচর্চা হয় না। কোনও পালোয়ান কোনও কোম্পানির সিইও হয়েছে তুমি শুনেছ?’
দিঘি ওকে বাধা দেয়, ‘আঃ, পালোয়ান হতে কে বলেছে? তা বলে ধীরে ধীরে কুমড়োপটাশ হবে! একটু ফ্রি হ্যান্ড তো করতেই পারো। তাতে কি খুব সময় নষ্ট হয়?’
আর্য উত্তরে বলে, ‘দেখো, ওসব আমার দ্বারা হবে না। ব্রেন থাকতে শরীরটাকে খাটিয়ে কী লাভ?’
সব কিছুতেই কি আর লাভ লোকসান হয়? কিন্তু আর্যকে কে বোঝাবে? আর শুধু আর্য কেন? আশপাশের সমস্ত মানুষজনকেই বা কে বোঝাবে? সবাই তো সবসময় লাভ আর লোকসান নিয়ে পড়ে থাকে। সে বাবা-মা বলো আর বন্ধুবান্ধব। সবাই যে কেন সবসময় লাভ হবে কিনা জিজ্ঞেস করে, কে জানে! হয়তো এমনিই বলে। কথার কথা। কিন্তু তবু লাভ-লোকসানটা জীবনের এমন একটা জায়গায় ঢুকে গেছে মানুষের যে, তা উপচে বেরিয়ে আসে। আসলে দিঘিও তো আগে বলত এমন। বলত, ‘কী লাভ বলো?’ কিন্তু আর বলে না। ওই মানুষটা একদিন আলতো করে বলেছিল তো যে, লাভ-লোকসান বলাটা খুব মনোরম কিছু নয়।
দোলের কিছুদিন পরের ঘটনা। মায়ের সঙ্গে হঠাৎই গন্ডগোল হয়েছিল দিঘির। আসলে মা সবসময় পড়া নিয়ে খিচখিচ করত। যেন ও বাচ্চা মেয়ে। আরে বাবা, ওর কি কোনও দায়িত্ব নেই? মাকে তাই নিয়ে বলতেই মা খুব বকেছিল। বলেছিল, ‘বড় হয়ে গেছিস, না? খুব লম্বা-চওড়া কথা শিখেছিস দেখছি! পড়তে বসার নাম নেই শুধু ফালতু গল্প। হয়েছেও সব একগাদা বাজে বন্ধু।’
‘বন্ধুদের নিয়ে কিছু বলবে না,’ দিঘি চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আর আমার পড়া আমি ঠিক পড়ে নেব। আমার জন্য তোমাদের অত ভাবতে হবে না।’
‘মানে?’ মা চট করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সামনে, ‘এত বড় কথা বলছিস তুই? এক দিদি তো হাড় ভাজা ভাজা করে খাচ্ছে। তার ওপর তুইও এমন কথা বলছিস? খুব লায়েক হয়ে গেছিস, না?’
‘দিদিকে মানুষ করতে পারোনি, সেটা কি আমার দোষ?’ দিঘির যে সেদিন কী হয়েছিল!
মা চিৎকার করেছিল আবার, ‘তুই…তুই…অসভ্য মেয়ে। অসভ্যতা করছিস? তোর লজ্জা করে না? তুই এত বড় কথা বলিস? এত বড়…’
‘বেশ করব।’ দিঘি রাগ করে বিছানা থেকে নেমে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে।
‘বেশ করবি?’ মা আর পারেনি। পাশ দিয়ে জোর পায়ে হেঁটে যাওয়া দিঘির হাত ধরে এক হ্যাঁচকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। দিঘিও এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল একদম। মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে।
দিঘি চিৎকার করে বলেছিল, ‘ডোন্ট টাচ মি। জাস্ট ডোন্ট টাচ মি।’
ঠাস করে চড়টা এসে চোয়ালের কাছে লেগেছিল দিঘির। মনে হয়েছিল নিমেষের মধ্যে কে যেন লক্ষ লক্ষ ফোঁটা বিষ ঢেলে দিয়েছে গালে। মাথাটাও সামান্য টাল খেয়ে গিয়েছিল। চোখে জল চলে এসেছিল ওর। মা মারল? এমনভাবে মারল ওকে? গায়ে হাত দিল? কী এমন কথা বলেছিল ও যে, এমনভাবে গায়ে হাত দেবে মা? কেন মা এমন করে? দিদি সারাজীবন এত ঝামেলা করে গেছে, কই তখন তো বাবা-মা কিছু বলতে পারেনি? আজ এখন যত রাগ, তেজ, শাসন সব ওর ওপরে? মা পারত কোনওদিন দিদিকে এমনভাবে মারতে? না, পারত না। কোনওদিন পারত না। তা হলে? ওকে মারল কেন? ও সারাজীবন বাবা-মায়ের কথা শোনে, তাই?
দিঘি মায়ের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিষের ফোঁটাগুলো ক্রমশ গাল থেকে রক্তের সঙ্গে এসে মিশছিল বুকের ভেতরে। মাথাটা পাগল-পাগল লাগছিল। কোথায় গেলে যে বিষগুলো শরীর থেকে বের করতে পারবে বুঝতে পারছিল না। ও কোনওমতে পাতলা স্লিপারটা পায়ে গলিয়ে আর টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। ভেবেছিল চলে যাবে। এদের থেকে অনেক দূরে চলে যাবে।
বাইরে বেরোতেই সন্ধের কলকাতা যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপর। মিষ্টির দোকান, পুরনো বাড়ির বারান্দা, চপের টং, স্ন্যাক্স ভাণ্ডার, বাজারের লোকজন, সব উন্মাদের মতো যেন লাফাচ্ছিল চারদিকে। এই শহরটা কি একটা পাগলাগারদ? এখানে কি কেউ সুস্থ নয়? কেউ স্বাভাবিক নয়? এর ভেতর, সত্যিই তো, কোথায় যাবে, কতদূরে যাবে দিঘি?
সেই বাড়ির দরজাটা খোলা ছিল অর্ধেক। ভেতর থেকে লাজুক কিশোরের মতো একরত্তি আলো এসে পড়ছিল ফুটপাথে। দিঘির চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল ক্রমশ। ছোট্ট লাজুক আলোটা যেন দুলছিল। যেন ডাকছিল ওকে। ও তাকিয়েছিল ওপরের দিকে। দক্ষিণের জানলায় আলো দেখা যাচ্ছিল। নীল, হলুদ, লাল, সবুজ কাচের ওই রঙিন জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল নরম একটা আলো। দিঘির হঠাৎ ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল মাথাটা। ওই লম্বা মানুষটা যেন টানছিল ওকে। ওই দুঃখী মুখ, না কামানো গাল আর ওই নীলচে চোখ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল দিঘিকে। সম্মোহিত খরগোশের মতো দিঘি উঠে গিয়েছিল সিঁড়ি দিয়ে। ঠাকুরমা কই? ওর মনে প্রশ্ন আসেনি। ফ্রস্টেড আলোর করিডর ধরে সাদাকালো দাবার ছকের মতো মেঝে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে, দিঘি এসে থেমেছিল সেই ঘরের সামনে। সেই লেমন রঙের পরদা, তার তলা দিয়ে গড়িয়ে আসা নরম আলো, আর গিটারের টুং-টাং।
কোনওরকম নক করেনি দিঘি। সোজা ঢুকে গিয়েছিল ঘরে। কিগান খেয়ালই করেনি। দিঘি দেখেছিল মাথা নিচু করে মানুষটা দরজার দিকে পিছন করে বসে বাজিয়ে যাচ্ছে গিটার। আচ্ছা মানুষ তো! চেয়ারটার শব্দ করে টেনে তার ওপর ধপ করে বসে পড়েছিল দিঘি। আর সেই শব্দে এবার মুখ তুলে তাকিয়েছিল কিগান। চোখমুখে অবাক ভাব। আসলে হঠাৎ দিঘিকে দেখেই অমন হয়েছিল ওর।
কিগান গিটারটা নামিয়ে রেখে ঘুরে বসেছিল, ‘তুমি?’
‘কেন, আসতে নেই?’ গলায় ধারালো ছুরির মতো কথা ঝুলছিল দিঘির।
‘তা কেন?’ হেসেছিল কিগান, ‘আমি বলতে চাইছি, তোমার কি মুড অফ?’
দিঘি কিছু বলার আগেই করিডরে মায়ের গলার স্বর শুনেছিল। হৈম ঠাকুরমার গলাও শুনেছিল। দিঘি চোয়াল চেপে রাগের গলায় বলেছিল, ‘ওই যে এসেছে। হল তো শান্তি, আমি এবার যাব।’
কিগান হাসছিল তখনও, ‘মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে?’
‘মা? ফালতু যত্ত সব। কী লাভ এমন মা থেকে? এখন আবার ঢং করে ডাকতে এসেছে! এমন মা থাকলে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। ডিসগাস্টিং।’
‘ডিসগাস্টিং!’ কথাটা শুনে হঠাৎ চোখমুখ শক্ত হয়ে গিয়েছিল কিগানের, ‘এমন করে কেউ বলে?’
দিঘি রাগের গলায় বলেছিল, ‘তুমি বুঝবে না। এমন করেই বলে। মা যে কেমন করে আমার সঙ্গে তুমি জানো না। তোমার মা নেই তো, তাই বুঝবে না তুমি।’
‘সেই জন্যই তো বলছি, এমন করে বলতে নেই। মা নেই বলেই বলছি। জানো, আমার মায়ের কথা মনে পড়লেই একটা লাল হয়ে যাওয়া চেরি গাছ দেখতে পাই। মনে হয় বাইরে, কোথায় যেন বরফ পড়ছে। আর টেপ রেকর্ডারে বাজছে ক্রিসমাসের গান। জানো দিঘি, মাকে শেষ যেদিন দেখেছিলাম, একটা পার্পল ছাতা সরিয়ে মা হেসেছিল আমার দিকে তাকিয়ে। ওই শেষ, তারপর আর কিচ্ছু নেই। আমার মা বলতে এইটুকুই। আসলে কিন্তু এইটুকু নয়। এখানে এসে স্কুলে ভরতি হওয়ার পর বন্ধুদের মায়েরা নিতে আসত। ওদের টিফিন মায়েরা তৈরি করে পাঠাত। রেজাল্টের পর মায়েরা যখন ওদের আদর করত, আমি মাথা নিচু করে সরে আসতাম ওদের সামনে থেকে। গলায় কষ্ট হত খুব। বুকে চাপ লাগত। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলতাম। দেখতাম পার্পল ছাতা সরিয়ে একঝলক মায়ের মুখ। মা হাসছে। এই না থাকাটা কি লোকসান? থাকলে তো মা নানা কারণে আমায় বকত। বাধা দিত নানা কাজে। আমারও রাগ হত। কে জানে হয়তো চড়চাপড়ও মারত আমাকে। তা, সেই দিক থেকে বিচার করলে কি তা হলে মায়ের না থাকাটা লাভ হয়েছে? তাও তো নয়। সব কিছু লাভ লোকসানে মাপা যায় না। মা, বাবা, বন্ধু, বান্ধব, ওদের লাভ লোকসানে মাপতে যেয়ো না। নিজেই কষ্ট পাবে। নিজেই পরে বুঝবে যে, কী পেলাম সেটা সবসময় বড় হয় না। মা হয়তো তোমার সঙ্গে আজকে রূঢ় ব্যবহার করেছে, কিন্তু সেটাই কি আসল মা? আমাদের সমস্যা কী বলো তো? মানুষের ভাল ব্যবহার মনে রাখি না। আর একদিনের রূঢ় ব্যবহারটা দিয়েই শুধু তাকে মাপতে যাই। রাগ তো রাগকেই বাড়ায়। তাই বলছি এমন ভেবো না। দেখবে কাল সকালে উঠেই সব ঠিক হয়ে গেছে।’
এর পরেই ঠাকুরমাকে নিয়ে মা ঘরে ঢুকেছিল। ঠাকুরমাও আলতো করে বকেছিলেন দিঘিকে। বলেছিলেন, ‘এমনভাবে হুট করে কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে?’
দিঘি কিছু বলেনি। মাথা নিচু করে বসে ছিল।
মা বলেছিল, ‘খুব অসভ্য হয়ে গেছে আজকাল। একটু টোকা মেরেছ কী রাগ। খুব তেজ দেখাতে শিখেছে! কোত্থেকে শিখছে এসব জানি না? ওইসব বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়েই তো।’
দিঘি চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘দেখলে তো কিগানদা? এর পরও তোমার কথা মাথায় রাখব?’
কিগান হেসে বলেছিল, ‘এর পরেও তো রাখতে হবে। অপ্রিয় হবে জেনেও যদি কেউ তোমায় শাসন করে, উদ্বিগ্ন হয়ে তোমার জন্য ছুটে আসে, তার কথা তো শুনতেই হবে, না?’
‘চল,’ মা এসে হাত ধরে টেনেছিল দিঘিকে।
দিঘি স্থির চোখে শুধু তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। এলোমেলো চুল। কনুই অবধি গোটানো পাঞ্জাবি। সামান্য অন্যমনস্ক চোখ। দিঘির হঠাৎ কষ্ট হচ্ছিল খুব। মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল কিগানকে। রাগ চলে গিয়ে অদ্ভুত এক শূন্যতা চেপে ধরছিল ওকে। মনে হচ্ছিল আজকাল কিগানকে এতটা মিস করে বলেই কি ওর কষ্ট হয় এরকম? তাই কি এমনভাবে মেজাজ হারায়? সারা পৃথিবীকে শত্রু মনে হয়? এসব কি কিগানের জন্যই হয়? আচ্ছা, ও কি খারাপ মেয়ে? বয়সে বড় এমন একজনের প্রতি এই যে টান অনুভব করে ও, এটা কি অনুচিত? সবাই জানলে কি ওকে খারাপ বলবে? তবু সবাইকে খুব বলতে ইচ্ছে করে ওর। সবার কাছে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করে কিগানের জন্য কতটা কষ্ট পায় ও। কতটা মনখারাপ হয়ে থাকে ওর। তবু বলতে পারে না। আর না বলা কথাগুলো ওর ভেতরে বোলতার মতো উড়তে থাকে।
সেদিন মায়ের পিছন পিছন চলে যেতে যেতে, করিডরের মাঝ বরাবর গিয়ে একবার পিছনে ফিরে তাকিয়েছিলে ও। আর অবাক হয়ে দেখেছিল, ঘরের থেকে ওর দিকেও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিগান! ঘরের আলোয় ওর নীল রঙের চোখটা যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল দিঘি। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? দিঘি জানে অমনভাবে দেখতে পাওয়া যায় না। ও চোখের ভুল। নির্ঘাত চোখের ভুল। তবু সেই ভুলটুকু আজও মনের ভেতর রেখে দিয়েছে দিঘি। ও আজও হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পায় একজোড়া নীল চোখ ওকে দেখছে। তখন খুব অস্থির লাগে ওর। তখন এদিক-ওদিক তাকায় দিঘি। মনে হয় গোটা কলকাতাটাকে ওলটপালট করে খোঁজে একবার। মনে হয় বইয়ের মতো কলকাতাকেও ফরফর করে ওলটায়, ঝাঁকায়, মনে হয় এই বুঝি নীলচে মতো বইয়ের পাতার ভেতর থেকে টুপ করে খসে পড়বে ওই চোখজোড়া। তবু, পড়ে না। কলকাতা তার মতোই থাকে-চলমান, ভাবলেশহীন। দিঘি বোঝে আর কোনওদিন ওই চোখজোড়া ফিরে আসবে না। ও নিজেই যে হারিয়ে ফেলেছে তাদের!
আজ আর্যদের বাড়িতে একটা পার্টি আছে। আর্যর বাবা ব্যাবসার কিছু মানুষজনকে নেমন্তন্ন করেছেন। আর আর্য আলাদাভাবে নেমন্তন্ন করেছে নিজের বন্ধুবান্ধবদের। এখনও কেউ আসেনি তেমন। শুধু আর্য গাড়ি পাঠিয়ে সুবর্ণ আর দিঘিকে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়াও জয়, রূপ আর স্নেহা আসবে। গুন্ডা কতটা আসবে বলা যাচ্ছে না। কারণ আর্য ঠিকমতো বলেনি ওকে।
আর্যর ঘরেই বসে রয়েছে দিঘি। ঘরটা খুব সুন্দর। হিন্দি ছবিতে এমন ঘর দেখা যায়। পুরোটা কার্পেট মোড়া। দেওয়ালে বিশাল বড় চ্যাপটা টিভি। এক দিকের দেওয়াল জুড়ে কাচের জানলা। তার সামনে ভার্টিকাল ব্লাইন্ডস। ঘরটা তিনতলায়, তাই সাদার্ন অ্যাভিনিউটা দেখা যায়। ঘরের চারদিকে বই আর ডিভিডি ছড়ানো। খাটের পাশে একটা বেডসাইড টেবিল। তাতে দিঘির একটা ছবি খুব কায়দা করে ফ্রেম করা। ছবিটা দেখেই ছ্যাঁত করে উঠল দিঘির বুক। এটা আর্য প্রায় জোর করে ওর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল চারদিন আগে। দিঘি দিতে চায়নি তবু নিয়ে এসেছিল। বলেছিল, ‘কেন এমন করছ? আমি তো শুধু ছবি চেয়েছি, তাও দেবে না? তোমার এমন রাগ রাগ মুখটা যে কী সুন্দর তা তুমি জানবে কেমন করে!’
জানে, রাগ করলে ওকে যে সুন্দর দেখায় সেটা জানে দিঘি। না, আর্যর কথা নয়। কিগান বলেছিল ওকে। ছবিটা যে কিগানই তুলে দিয়েছিল। এক বর্ষার বিকেলে বাড়ির ছাদে তোলা হয়েছিল ছবিটা। দিঘির স্পষ্ট মনে আছে।
হাতের ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। আর্য কি? সুবর্ণ আর আর্য বিয়ার কিনতে গেছে। অনেকক্ষণই গেছে। আসতে দেরি হচ্ছে বলে কি ফোন করল? দিঘি খাপ থেকে মোবাইলটা বের করে নরম সোফাটায় হেলান দিয়ে বসল। অচেনা নম্বর। কে এটা? অচেনা নম্বর চট করে ধরে না দিঘি। তবু আজ ধরল। কেন, কে জানে, তবু ধরল, ‘হ্যালো?’
‘হাই দিঘি। কেমন আছ?’
গলাটা চট করে চিনতে পারল না দিঘি, ‘কে বলছ?’
‘বলো তো কে?’ ওপারের গলাটা হাসল এবার।
‘সরি, বুঝতে পারছি না।’ কোন মেয়ে ফোন করল ওকে? দিঘির আশ্চর্য লাগছে।
‘আমি হোমি। চিনতে পেরেছ?’
‘হোমি?’ এক মুহূর্ত থমকাল দিঘি। তারপরই মনে পড়ল, ‘আরে হোমিদি।’ বলে উঠল ও।
‘হ্যাঁ আমি। কেমন আছ তুমি?’
‘আমি? ভালই তো।’ দিঘি হাসল। কেমন আছ প্রশ্নটা খুব বোকা বোকা লাগে দিঘির। আচ্ছা, ঘ্যানঘ্যানে লোক না হলে কেউ বলবে যে, ‘আমি খারাপ আছি, অম্বলে ভুগছি। টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে জলের মতো, ঘুম হচ্ছে না।’ লোকে কেন যে ‘কেমন আছ’ ধরনের প্রশ্ন করে ভগবান জানে!
হোমি বলল, ‘সেই গুন্ডাদের বাড়িতে আলাপ হল। তারপর তো ভুলেই গেলে! বলেছিলাম না আমাদের এখানে আসতে? এলে না তো।’
দিঘি শব্দ করে হাসল এবার। শব্দটা ওই দিকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই কতকটা। তারপর বলল, ‘আরে হোমিদি, কলেজ-পরীক্ষা কত কী ঝঞ্ঝাট বলো তো।’
‘তা হলেও,’ হোমি বলল, ‘তোমরা কলকাতার নামকরা কলেজে পড়ো। তোমরা এলে আমাদের কাজটা আরও জোরদার হবে। প্লাস গ্রামবাংলার একটা ট্রেলারও দেখে যাবে।’
‘যাব, নিশ্চয়ই যাব। দেখো, আমরা সবাই যাব।’ দিঘি আশ্বাস দেওয়ার মতো করে বলল।
‘আর দিঘি,’ হোমি এবার যেন সংকোচ করল একটু, ‘আসলে আর একটা কথা ছিল।’
‘কী কথা? বলো না। ডোন্ট হেসিটেট।’
‘কিছু ফান্ড যদি তোমরা জোগাড় করতে পারো ভাল হয়। আসলে, আমরা ঠিক করেছি যে, গ্রামে গ্রামে কিছু মেডিক্যাল ক্যাম্প করব। দু’-একটা ওষুধের কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। ওরাও হেল্প করবে বলেছে। কিন্তু বুঝতেই তো পারছ। বাংলার অজ গ্রাম। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রির দেশ। তার ওপর ম্যালনিউট্রিশন। এ তো আফ্রিকার গ্রাম নয় যে, ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজের ড্রাগের বেআইনি টেস্টিং গ্রাউন্ড পেয়ে মক মেডিক্যাল ক্যাম্প করে ফাটিয়ে দেবে। তাই আমাদের নিজস্ব ফান্ডিংটা খুব দরকার। তোমরা একটু তোমাদের মতো করে দেখবে? কোনও প্রেশার নেই। জাস্ট বাবা-কাকাকে বলে টাকা জোগাড় করা আর বাড়তি, এক্সপায়ার্ড হয়নি এমন ওষুধ জোগাড় করা। যদি একটু দেখো।’
দিঘি বলল, ‘এমন করে বলছ কেন? আমি নিশ্চয়ই দেখব। বাকিদেরও বলব। স্নেহার এক কাকা ওষুধ কোম্পানিতেই আছে। হি মে হেল্প আস।’
‘সরি।’ হোমিও এবার শব্দ করে হাসল, ‘এতদিন পরে ফোন করে শুধু এই চাই, ওই চাই বলে গেলাম। আসলে কলকাতার থেকে দূরে থেকে এমন কাজ করা যে কী কঠিন না! ওষুধের কোম্পানিগুলোর ঝামেলা, পলিটিক্যাল ইন্টারফিয়ারেন্স, লোকজনের অশিক্ষা, ফান্ডের অভাব। ওই সোনালি চতুর্ভুজের কথা শোনো না? স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এসে দেখবে চতুর্ভুজটি ঠিক আছে, কিন্তু সোনালি নয়, তা লোহার। কারাগারের মতো। এত বাধা সামলিয়ে কি সহজে এগোনো যায়? যায় জানো, যদি লোকবল থাকে আর আমাদের কষ্টটাকে যদি ঠিকমতো পুট-আপ করা যায়। তাই বলেছিলাম যে, তোমরা এলে আমাদের খুব ভাল হত।’
দিঘি ফোনটাকে কানের থেকে সরিয়ে নিয়ে মাথাটা ঝাঁকাল একটু। ওরে বাবা, এ যে ভাঙা রেকর্ড একেবারে! কান ঝালাপালা করে দিল।
দিঘি বলল, ‘আমরা নিশ্চয়ই যাব। আর শোনো না, রাহিদি কেমন আছে গো?’
‘রাহি? ওর কথা আর জানতে চেয়ো না। সে তো মীরাবাই হয়ে গেছে।’
‘মীরাবাঈ!’ দিঘির অবাক লাগল, ‘সে কীরকম?’
‘আর বোলো না,’ হোমি গুছিয়ে নিল যেন কথাটা, তারপর বলল, ‘এখানের একজনের জন্য তো রাহি একদম লাট্টু। এদিকে সেই লোকটা মানে, কী…’
‘চুপ কর একদম,’ দিঘি হঠাৎ ফোনের ওপারে আর একটা গলা শুনল। একটু থমকে গেলেও তার পরমুহূর্তেই বুঝল এ রাহির গলা। মানে রাহিও আশপাশেই ছিল। হোমির কথায় লজ্জা পেয়ে এতক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক, দিঘি কে যে অমন পার্সোনাল কথা ওকে শুনতে হবে?
আসলে গুন্ডাদের বাড়িতে সেই ক্রিসমাসের দিনেই দুই বান্ধবীকে ভাল করে লক্ষ করেছে দিঘি। হোমি যেমন প্রচুর কথা বলে, ইয়ারকি করে, তেমনই রাহি আবার তার উলটো।
টমটমের এই ইংরেজি গানটা শুনে রাহির চোখ ছলছল করছিল। দিঘি লক্ষ করেছিল। রাহি দূরে ঝুলনের মতো করে সাজিয়ে রাখা যিশু আর মেরির পুতুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল অপলকভাবে। আর টমটমের গানের সঙ্গে সঙ্গে দিঘি দেখেছিল যে, রাহির চোখের কোণ দিয়ে সামান্য, খুব সামান্য, ভিতু, দুর্বল এক কুচি জল অভ্রর মতো চিকচিক করেছিল। কেন? কেন গানটা শুনে রাহির চোখে জল এসেছিল? নীল চোখের ছেলে মানে তো প্রিয় ছেলে। তা হলে কেউ কি বিশেষ প্রিয় আছে রাহির? তার কথাই বলতে চাইছে হোমি? আর তার কথা বলতে দেবে না বলেই কি ফোনটা কেড়ে নিল রাহি? সত্যিই তো যার জন্য চোখের জল ফেলে মানুষ, তার কথা কি আর লোকের সামনে ফলাও করে বলা যায়? বলা যায় না। দিঘি তো নিজেও বলতে পারে না। সবসময় তো মনে হয় বুকের ভেতর শূন্য একটা হাওয়া পাক মারছে। লাল ধুলো উড়ছে। জং ধরা একটা রেললাইন পড়ে রয়েছে। পাথরের ফাঁক দিয়ে ঘোলাটে চোখ তুলে উঁকি মারছে গিরগিটি। মনে হয়, সব থেকেও কে যেন নেই। কে যেন আর আসে না পাড়ায়। দক্ষিণের জানালার লাল-সবুজ কাচের ফাঁকে আর আলো জ্বলে না। আর আলো জ্বলবে না।
সেদিন যখন টমটম গান গাইছিল, ‘And now he’s gone and left me alone/ An orphan girl without a home’ দিঘিরও তো জল চলে এসেছিল চোখে। মনে হয়েছিল, সত্যিই তো তাই। তা ছাড়া আর কী? শুধু পার্থক্য এই যে, নিজেকে নিজেই একা করেছে দিঘি। কিগান তো প্রথম থেকে দিঘিকে বারণ করত। বোঝাত। নিষেধও করত। এমনকী দু’-একবার রাগও করেছে। কিন্তু দিঘি তো শোনেনি। আর ওর জন্যই কিনা এমনটা হল? কিন্তু কিগান তো কিছু বলল না? মাথা নিচু করে চলে গেল। আর দিঘি? ও কিছু বলতে পারল কি? পারল তো না! রাগ কি অন্ধ করে দিয়েছিল ওকে? কয়েকটা মাত্র কাগজ কি সব গন্ডগোল করে দিয়েছিল?
জানে না। দিঘি কিচ্ছু জানে না। ও শুধু জানে, শূন্য একটা হাওয়া পাক খাচ্ছে একা আর নির্জন রেল লাইন পড়ে রয়েছে দিগন্ত ছাড়িয়ে।
সেদিন গুন্ডাদের বাড়িতে খাওয়ার সময়, দিঘি নিজের থেকেই গিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাহির পাশে। খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড। তোমার কি শরীর খারাপ? মানে, আর ইউ ফিলিং আনওয়েল?’
‘আমার!’ চমকে উঠেছিল রাহি। অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলেছিল, ‘কই, না তো কেন? হঠাৎ তোমার এমন মনে হল কেন?’
‘না, মানে…’ দিঘি আর কথা বাড়াতে চায়নি। বুঝতে পারছিল যে, রাহি অস্বস্তিতে পড়েছে। ও বলেছিল, ‘ইউ সিমড টু বি লিট্ল অফটিউন।’
‘তাই?’ রাহি খাবার প্লেট হাতে হেসেছিল। বলেছিল, ‘আসলে এত ভাল গাইছিল গানটা, তাই…হয় না? খুব আনন্দের কিছু হলেও আমাদের মন একটু খারাপ হয়ে যায়, না?’
‘হ্যালো? হ্যালো?’ দিঘির এবার হুঁশ হল। ফোনের ওপারে রাহির গলা।
রাহি বলল, ‘হ্যালো দিঘি, কেমন আছ?’
আবার সেই প্রশ্ন! দিঘির মনে হল বলে যে, ইকনমিক্সের সেকেন্ড পেপারটা এখনও ভাল প্রিপেয়ার হয়নি। গালে একটা বিরক্তিকর ব্রণ উঠেছে। গতকাল রাতে রুটি খাওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। আর বলে যে, কিগানের জন্য ওর ভীষণ, ভীষণ, ভীষণ মনখারাপ করছে। সব মিলিয়ে খুব বিচ্ছিরি আছে ও। খুব বিদ্ঘুটে আছে।
দিঘি বলল, ‘আমি ভাল আছি। তোমরা সব ভাল তো?’
‘হ্যাঁ গো,’ রাহি হাসল, ‘তুমি এই হোমিটার কোনও কথা ধোরো না কিন্তু। ও আসলে খুব ফাজিল। তা তোমরা আসছ কবে? তোমাদের সঙ্গে আলাপ করে কিন্তু আমার খুব ভাল লেগেছিল। আমি এখানে দীপা আর মাকেও তোমাদের কথা বলেছি। তোমাদের আসতে হবেই কিন্তু। ওই হোমির হিজিবিজি কাজের জন্য না হলেও আমাদের বাড়িতে আসতে হবে। আমি কিন্তু কোনও অজুহাত শুনব না।’
দিঘি বলল, ‘তোমরাও এসো আবার।’
‘নিশ্চয়ই আসব। ঠিক আছে? আজ রাখি, কেমন?’
‘আচ্ছা।’ দিঘি দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। আসলে ওর আর ভাল লাগছে না।
ঘড়ি দেখল দিঘি। পৌনে সাতটা। সুবর্ণ আর আর্যর এত সময় লাগছে কেন? আর অন্যরাও এখনও পৌঁছোতে পারল না কেন? আর কতক্ষণ এখানে একা-একা বসে থাকবে ও সঙের মতো? একটা কি ফোন করে দেখবে? দিঘি ফোনটার দিকে তাকাল। তারপর ভাবল না, দেখবে না। কেন দেখবে? দিঘি যে একা আছে সে ব্যাপারে কি কারও মাথাব্যথা আছে? ও সেধে পড়ে ফোন করতে যাবে কেন?
দিঘি ফোনটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এখানে ঢোকার সময় নীচের লনে যে-পার্টি চলছে সেখানে ললিতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তবে বিশেষ কথা হয়নি। এবার নীচে গিয়ে ললিতের সঙ্গে একটু কথা বললে অন্তত কিছুটা সময় কাটবে।
আর্যদের বাড়িটা দিঘির চেনা। আর্যর ঘর থেকে বেরিয়ে একটা বিরাট বড় বসার ঘর আছে, তার শেষ প্রান্তে নীচে যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে সার দিয়ে সব ছবি আটকানো। সেখানে আর্যদের গুরুদেব থেকে ঠাকুরদা, দাদামশাই, সবার ছবি আছে। সেসবগুলো দেখতে দেখতে দিঘি নীচের হলঘর পেরিয়ে লনে নেমে এল।
লনের একপাশে বেশ বড় সুইমিং পুল। গোটাটা নিয়েই পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। আর পুলের এক পাশে বার কাউন্টার আর অন্য পাশে খাওয়ার বুফে কাউন্টার। তার ভেতরেই খুব নিচু স্বরে মিউজিক বাজছে।
এখানে এসে দিঘির ভাল লাগল। ঘরের দমবন্ধ পরিবেশের চেয়ে এটা ভাল।
যদিও বিশেষ কাউকেই চেনে না। তবু ভাল লাগছে ওর। তার ওপর হালকা একটা হাওয়াও বইছে। বসন্তের হাওয়া এখন দুষ্প্রাপ্য। তবু, দু’-একদিন পথ ভুলে সে এসে পড়েই।
ললিত এক কোনায় দাঁড়িয়ে খুব আলগাভাবে দু’-একজনের সঙ্গে কথা বলছিল। দিঘিকে দেখে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হাত তুলে ওর দিকে এগিয়ে এল। দিঘি পাশ দিয়ে যাওয়া বেয়ারার ট্রে থেকে একটা ফ্রেশ লাইম সোডা তুলে নিয়ে ললিতকে দেখে হাসল, ‘হাই মামু। হোয়াট্স আপ?’
‘আর আপ! সব ডাউন। বুঝলি তো?’ ললিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘কেন?’ দিঘি দেখল একজন সুন্দরী মহিলা এসে চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে দাঁড়াল ললিতের পাশে।
ললিত বলল, ‘দেখ না, মদন পুরীর নেমন্তন্ন ছিল। মালটা আসতে পারেনি বলে ফুলের বোকে হাতে আমাদের মতো দুটো বোকাকে এখানে পাঠিয়েছে।’
‘আঃ, ললিত। মদন পুরী কী? খুরানা স্যার। আর কিপ ইয়োর ভয়েস ডাউন। অন্যরা শুনতে পেলে কী ভাববেন?’
ললিত হাসল, ‘দুর, কে শুনবে? সব মাল খেয়ে টাল হয়ে আছে।’ তারপর দিঘির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাক, আলাপ করিয়ে দিই, দিঘি, ইনি আমার কলিগ। মিসেস জিয়ানা বোস। আর জিয়ানা এ আমার ভাগ্নী, দীঘল। তবে আমরা সবাই ওকে দিঘি বলি।’
দিঘি হাসল, ‘হাই।’
জিয়ানা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দিঘি ইজ আ গুড নেম। তুমি কী পড়ো দিঘি? ডোন্ট মাইন্ড, তুমি বললাম।’
‘শিয়োর। ইকনমিক্স নিয়ে পড়ছি।’
‘গ্রেট! আমার তো ভয়ই লাগে সাবজেক্টটা।’ জিয়ানা হাতে ধরা গ্লাসটা থেকে চুমুক দিল একটু। গাঢ় বাদামি রঙের পানীয়। দিঘি জানে এসব কথার কথা। কোনও উত্তরের প্রত্যাশা নেই।
জিয়ানা সামান্য ক্ষণ চুপ করে যেন কথা হাতড়াল। তারপর বলল, ‘তা দিঘি। কোথায় থাকো তুমি? আমি নিউ মার্কেটের কাছে থাকি।’
‘আমি সুকিয়া স্ট্রিট।’
‘কোথায়?’ সামান্য যেন চমকে উঠল জিয়ানা। হাতে ধরা গ্লাসটা থেকে সিপ নিতে যাওয়া অবস্থায় গ্লাসটাও চলকাল একটু। জিয়ানা আবার বলল, ‘সুকিয়া স্ট্রিট?’
‘সুকিয়া স্ট্রিটের কোথায়?’
‘রামমোহন লাইব্রেরির কাছে। আপনি চেনেন?’ দিঘি প্রশ্ন করল।
জিয়ানাকে কেমন যেন এলোমেলো লাগল হঠাৎ। ও বলল, ‘না, মানে…ইয়ে…তুমি কি একজনকে…বাদ দাও।’
‘কী? আপনি বলতে পারেন।’ দিঘি বলল।
জিয়ানা মাথা নাড়ল জোরে। হাসলও। বলল, ‘বাদ দাও। কবেকার কথা! তোমার জানার কথা নয়। কত বছর হয়ে গেল। জানো একসময় আমি ওখানে যেতাম।’
‘আমিও যেতাম।’ ললিত কথার মধ্যে ঢুকে পড়ল, ‘এখন আর সময় পাই না। এই দিঘি, দিদি ব্যাপক খচে আছে না আমার ওপর?’
‘মা?’ দিঘি হাসল, লাইম সোডায় চুমুক দিয়ে বলল, ‘তা ধরো একটু না হয় রাগল। তাতে কী এমন ক্ষতি হল!’
ললিত ভুরু কুঁচকে, মাথাটা হেলিয়ে তাকাল, ‘তুইও কি রেগে গেছিস?’
‘কেন মামু? আমরা তো জানি যে, তুমি ব্যস্ত।’
‘আর ব্যস্ত!’ ললিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘দেখ না, আমাদের স্যার আসতে পারবেন না বলে আমায় আর জিয়ানাকে পাঠিয়েছেন এখানে। কাউকে চিনি না। শালা বোর হয়ে মরে যাব এবার। তেমন সন্ধেও হয়নি যে, খ্যাটন মেরে কেটে পড়ব। শালা, ওই মদন পুরীটার জন্য যত ঝাড় হল।’
‘স্যারকে অমন নামে ডেকো না। আর কী বাজে কথা বলছ? তোমার নিস তোমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর সেখানে স্ল্যাং ইউজ করে যাচ্ছ তখন থেকে। জাস্ট কন্ট্রোল ইয়োরসেল্ফ।’
‘আর স্ল্যাং! এরা খুব বড় পাম্প, মোটরের ডিলার। তো মাথা কিনেছে নাকি? কী যে বাজে লাগছে না। তার ওপর মদটাও ভাল নয়। জল মেরেছে নির্ঘাত! তা দিঘি, তুই এখানে? দেখলাম, এদের গাড়ি থেকে নামলি?’
দিঘি হাসল। ললিত চিরকাল এরকম। ভাল আর ভুলভাল। মুখের আগল নেই।
দিঘি বলল, ‘আসলে তোমরা যে-কোম্পানির নেমন্তন্নে এখানে এসেছ, সেই অনিল আঙ্কেলের ছেলে আমার বন্ধু। আর্য নাম ওর।’
‘ব-ন-ধু?’ টেনে টেনে উচ্চারণ করে ললিত ফিক করে হাসল, ‘বাঃ, বেশ বড় হয়ে গেলি, বল? বেশ বয়ফ্রেন্ড ট্রেন্ড রাখছিস।’
‘বয়ফ্রেন্ড!’ দিঘি নিজেই ঠিক বুঝল না কেন ও অপ্রস্তুত হল।
‘নয় তো কী?’ ললিত ফিকফিক করে হাসল, ‘না হলে কেউ গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে আসে? ভাল মাছ ধরেছিস।’
ভাল মাছ! দিঘির কান গরম হয়ে গেল হঠাৎ। ললিতের কি নেশা হয়ে গেছে? না হলে এমন অপমানকর কথা বলছে কেন? ইচ্ছে করে বলার লোক তো নয়। তবু এই কথার তো প্রতিবাদ করতেই হয়।
দিঘি বলল, ‘এসব কী বলছ?’
ললিত থমকাল একটু। দিঘির কঠিন চোখমুখ দেখে বুঝল ভুলভাল বলে ফেলেছে। ললিত হাসল। ভাবটা এমন যেদিন কিছুই হয়নি। বলল, ‘আরে জাস্ট ইয়ারকি মারছি। এত বড় হলি এটাও বুঝিস না?’
দিঘি দেখল পাশ থেকে জিয়ানা ইশারায় বলছে যে, ললিত আর নিজের মধ্যে নেই। এটা একদম সহ্য হয় না। দিঘির। সিগারেট, মদ বা অন্য কোনও নেশা একদম ভাল লাগে না ওর। মনে হয় নেশাখোরদের কান ধরে ওঠবোস করায়। নেশা করাটা যে কী চরম ব্যর্থতা মানুষগুলো যদি একবার বুঝত! কিগান কিন্তু একদম নেশা করত না। কোনও নেশাই ছিল না ওর। চা-ও খেত না। ওর কাছে গেলেই কী সুন্দর গন্ধ পাওয়া যেত! এত ভাল লাগত দিঘির! আর সবচেয়ে বেশি ভাল লাগত যখন… কখন? কখন ভাল লাগত দিঘির সবচেয়ে বেশি? যদি অতই ভাল লাগত, তা হলে এমন নষ্ট করল কেন ও সব? আর এখন কেন ঠোঁট শুকনো লাগছে ওর? বুক ধড়ফড় করছে? কেন মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনটাকে?
দিন চলে যায়। খুঁজতে খুঁজতে একটা বাঁক থেকে অন্য একটা বাঁকে ঘুরে যায় দিন। সঙ্গে করে সে আর কিচ্ছু নেয় না। শুধু আলোটুকু নিয়ে চলে যায়। ছোট্ট দীপ্ত সূর্যটাকে নিয়ে চলে গেছে দিন। দিঘির জীবনে এখন সেই আলো নেই। শুধু তার গন্ধের স্মৃতি লেগে আছে।
দিঘি আরও কিছু বলত হয়তো কিন্তু ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। এখন আবার কে? আরে, এ যে বাড়ির নম্বর। মা তো এমন সময় ফোন করে না!
‘এক্সকিউজ মি,’ বলে সরে গিয়ে ফোনটা ধরল দিঘি। বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যালো?’
‘দিঘি…দিঘি…’ মা যেন হাঁপাচ্ছে।
‘কী হয়েছে মা?’ দিঘি ঘাবড়ে গেল একটু।
‘দিঘি…’ মা যেন কথা বলতে পারছে না।
দিঘি চারদিকের মানুষজনকে দেখল। এর ভেতর দাঁড়িয়ে কথা বলা মুশকিল। ও দ্রুত পায়ে একটু দূরে বড় চারটে পান্থপাদপ গাছের কাছে সরে গেল। ফোনটাকে উত্তেজনায় চেপে ধরে বলল, ‘কী হয়েছে মা?’
‘দিঘি রে, শমীকে বোধহয় তোর দিদি মেরেই ফেলল।’
‘কী!’ দিঘির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
‘বসার ঘরের পিতলের ফুলদানি দিয়ে মহুল একদম মাথাটা থেঁতলে দিয়েছে ছেলেটার। অজ্ঞান হয়ে গেছে শমী। কে জানে বাঁচবে কিনা!’ মায়ের কথা কেমন যেন ভয়ের চোটে জড়িয়ে যাচ্ছে।
দিঘি বলল, ‘কী যা তা বলছ…’
‘তুই আয়, এক্ষুনি আয়…’ মা যেন আর কথা বলতে পারছে না।
‘আসছি আমি। ডাক্তারকে খবর দিয়েছ?’
মা জড়িয়ে আরও কিছু বলল। কিন্তু দিঘি শুনতে পেল না স্পষ্ট। ও আর সময় নষ্ট না করে ফোনটা কেটে দিল।
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে দিঘির। কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে যেন। দিদি এটা কী করল? কেন করল? আর ও-ই বা এখন বাড়ি ফিরবে কী করে? আর্য কোথায়? এত ইরেসপন্সিবল কেন আর্য? তবে যে আর্য ওকে আদর করতে করতে বলেছিল কোনওদিন বিপদে একা ছাড়বে না? তা হলে? ও দ্রুত মোবাইলে আর্যর নম্বরটা বের করে কল করল। ওই রিং হচ্ছে। চারটে, পাঁচটা। ছ’নম্বর রিঙে ধরল আর্য, ‘হ্যালো ডার্লিং। বলো।’
দিঘি উত্তেজনা, রাগ আর বিরক্তিতে বলল, ‘হ্যালো? কোথায় তুমি? কিগানদা তুমি কোথায়?’
Chapter - 15
১৫
জয়নালের রাগটা বটুক ওর ওপর দিয়ে নিল! এমন মার বহু দিন খায়নি রুহান। মুখটা তেতো হয়ে আছে পুরো। দেশপ্রিয় পার্কের সিগনালে দাঁড়িয়ে আকাশে সূর্যের দিকে তাকাল রুহান। মরা আলো। মেঘ করে আছে আজ। কিন্তু হাওয়া নেই। গোটা শহরটাই প্রেশার কুকারের মতো হয়ে আছে। কিন্তু সেফ্টি ভালভটা কোথায় কেউ জানে না!
আজ রোববার, রাস্তায় গাড়ি কম। কলকাতার গায়ে কেমন আড্ডা আর ছুটির গন্ধ। তবে বেশিক্ষণ থাকবে না। চৈত্র সেল-এর দোকানপাট খুলল বলে। মাথা নিচু করে রাস্তাটা পার হল রুহান। বুকুদা গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে গেছে দেশপ্রিয় পার্কে। রুহান বলেছিল পাড়ায় যেতে। বুকুদা রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘অন্য দিন যাব।’ রুহান জোর করেনি। তা ছাড়া মা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে কে জানে!
মা দিনকে দিন ইম্পসিব্ল হয়ে উঠছে। পৃথিবীর যাবতীয় আফশোস যেন রুহানের ওপর মেটাচ্ছে। গত সপ্তাহে তো তার মধ্যে আবার হাত ভেঙে ফেলেছে। সে এক কাণ্ড। বাথরুমে স্নান করতে গিয়ে শ্যাওলায় পা পিছলে গিয়েছিল। আসলে বাথরুম পরিষ্কার করে রুহান নিজেই। কিন্তু বাথরুমটা কয়েকদিন পরিষ্কার করতে পারেনি। তাই খুব হালকা শ্যাওলা ধরেছিল। তাতেই যে মা এমন করে পড়ে যাবে বুঝতে পারেনি ও।
বাঁ হাতে চোট পেয়েছে মা। প্লাস্টারের মতো করে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। তারপর থেকে রুহানকে দেখলেই খেপে যাচ্ছে একদম। গতকাল রাতে তো হাওয়াই চটিটা ছুড়ে মেরেছিল। শরীরে কিছুই লাগেনি। কিন্তু লেগেছে মনে।
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল রুহান। ন’টা পঁচিশ। আজ মার খেয়ে তাড়াতাড়ি মাঠ থেকে চলে এসেছিল বুকুদার বাড়ি। ভোরে প্র্যাকটিস ছিল। ম্যাচটা হঠাৎ ঠিক হয়। নিজেদেরই মধ্যে। কিন্তু বটুকটা এমন মারল যে, জগুদা বের করে দিল মাঠ থেকে। চার ওভারে পঁচাত্তর রান। মনে হচ্ছিল হাতে-পায়ে যেন জোর নেই। যেন কেউ নল ঢুকিয়ে শরীরে সমস্ত রক্ত বের করে নিয়েছে। বটুক যেন আজ ঠিক করেছিল ক্লাবের সবার সামনে রুহানের জামাকাপড় খুলবে। জয়নালের কাছে অফ স্টাম্পের বাইরে যতবার নাকানিচোবানি খেয়েছে তার পরের ওভারে তত ঠেঙিয়েছে রুহানকে।
চার ওভারের পর তো রুহানকে এসে বটুক বলেছিল, ‘ছেড়ে দাও রুহানদা। এই বয়সে কি আর এসব খাটনি পোষায়? তার চেয়ে অন্য লাইন দেখো।’
অন্য লাইন? অন্য লাইন মানে? রুহান তাকিয়েছিল বটুকের দিকে। হেলমেট খুলে রিস্টব্যান্ড দিয়ে কপালের ঘাম মুছছিল বটুক। আর হাসছিল। পুরনো রুহান হলে পরের ওভারেই ওর খুলি উড়িয়ে দিত। কিন্তু সেই রুহানটা যে আর নেই। বরং ওর মনে পড়েছিল অন্য একটা কথা। মনে পড়েছিল নন্দার বাবাও এমন বলেছিল না? ‘অন্য লাইন দেখো।’
লাইন। চকচকে একটা রেললাইন পার করে রোজ বাড়ি ফেরে রুহান। দেখে রাতের অন্ধকারে রেললাইনটা মিলিয়ে গেছে কালোর ভেতর আর আবার সকালবেলা জেগে উঠেছে। কখনও দেখে সামনের লেক গার্ডেন্স স্টেশনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজ-হলুদ ট্রেন। মনে হয় যদি মাথা পেতে দেওয়া যেত। যদি এই লাইনটা ধরা যেত!
না, মাথা নামিয়ে নিয়েছিল রুহান। বটুক ইন্ডিয়া ‘এ’ খেলে ফিরেছে সদ্য। সামনে ইন্ডিয়া সিলেকশনেও খুব ভাল চান্স আছে। আজ বটুককে বল করতে যাওয়ার সময় বারবার এই কথাগুলো মনে পড়ছিল ওর। তাই কেমন যেন নার্ভাস লাগছিল। সফল মানুষদের দেখলে কেমন যেন গুটিয়ে যায় রুহান। কেমন যেন ভয় লাগে। মনে হয় ওদের সামনে খুব ছোট্ট লাগছে ওকে।
এর পরই জগুদা মাঠ থেকে তুলে নিয়েছিল ওকে। বলেছিল, ‘দেখেছিস তো, কেন ফাইনালে সেদিন তোকে খেলাইনি? যা বাইরে বোস।’
আর কত বাইরে যাবে রুহান? বন্ধুদের থেকে বাইরে, প্রেমের থেকে বাইরে, মায়ের থেকে বাইরে, সবার থেকে বাইরে সরে গেছে তো। আর কত বাইরে যাবে?
সাইড লাইনে বসে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে রুহান ঠিক করেছিল, না, সবার থেকে সরে যাবে না ও। বরং নিজেই চেষ্টা করবে মানুষের কাছে আসার। আর তাই নিজেই যাবে বুকুদার বাড়ি। ময়দান থেকে খুব একটা দূরে তো থাকে না ওরা!
জিয়ানার সঙ্গে আজকাল প্রায় সবসময়ই কথা হয় রুহানের। আসলে জিয়ানা ওদের বসকে বলে রুহানকে নিয়ে এসেছে ওর সেকশনে। এখানে আর খুচরো ভুলভাল কাজ করতে হয় না। বরং জিয়ানার সঙ্গেই ‘সাইট ইন্সপেকশন’-এ যেতে হয়। তবে হঠাৎ করেই কয়েকদিন হল জিয়ানা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই মাঠ থেকে বেরিয়ে রুহান ঠিক করেছিল যে, ও যাবে একবার দেখতে।
উত্তর চব্বিশ পরগনায়, চাপাডাঙা বলে একটা জায়গায় আদিদের কোম্পানির একটা পার্টিকল্ বোর্ড কারখানা আছে। সেখানে একটা কাজের জন্য প্রোজেকশন কর্প চেষ্টা করছে। ললিত আর জিয়ানার দায়িত্ব এই কাজটা ফলো-আপ করা। কিন্তু এখনও চাপাডাঙায় যেতে হয়নি ওদের। তবে শুনেছে যাবে। জিয়ানা তো বলেছিল, ‘স্যার তো ওখানের একজনকে কনট্যাক্টও করতে বলেছেন। কিন্তু কনসালটেন্টরা বলেছে আগে ওদের সঙ্গে বসতে। অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার ডিসকাস করার আছে। যদি সত্যিই একবার সাইটটা দেখে আসা যেত!’
‘তা যাচ্ছেন না কেন?’
‘আরে জানোই তো প্রেশার কত! ওই লস প্রজেক্টটাও এখন দেখতে হচ্ছে। প্লাস চাপাডাঙায় যাওয়া মানে এক দিন নষ্ট। আর ওই মিস্টার ব্যানার্জি না কে একজন তার সঙ্গে যোগাযোগও হবে কিনা কে জানে! এদিকে সামলে তারপর তো যেতে হবে। তার ওপর শুনলাম ওখানে জমি নিয়ে একটা ঝামেলা চলছে। তাই সাততাড়াতাড়ি গিয়েও কি লাভ হবে?’
‘তা, আমি যাব?’ রুহান নিজেই বলেছিল।
‘তুমি?’ জিয়ানা অবাক হয়েছিল।
‘যাব?’ রুহান আবার জিজ্ঞেস করেছিল।
‘শোনো, টেকনিক্যাল ডিটেল আর স্পেস মেজারমেন্ট করতে হবে। প্লাস আরও টুকিটাকি কাজ আছে। ভাল করে না পারলে তোমার ওপরে সবার ইমপ্রেশন খারাপ হবে। আমার সঙ্গেই যেয়ো।’
জিয়ানা অযাচিতভাবেই রুহানকে নিজের অধীনে নিয়ে এসেছে। ওকে কাজ শেখানোর আর গাইড করার চেষ্টা করছে। কেন করছে, রুহান জানে না। এমনিই করছে হয়তো! ছোট ভাইয়ের মতো দেখে বলেই হয়তো! বুকুদার সঙ্গে আত্মীয়তা আছে বলেই হয়তো! আসলে এই বাজারে কেউ তো কারও জন্য কিছু করে না। আর আত্মীয়রা তো আরওই কিছু করে না। তাই একটু অদ্ভুত লেগেছে রুহানের। প্রশ্নগুলোও তাই আপনা-আপনি তৈরি হয়েছে ওর মনে।
জিয়ানা অসুস্থ। জন্ডিস হয়েছে। অফিসে আসছে না। তাই আজ মাঠ থেকে বেরিয়ে ওর মনে হয়েছিল একবার দেখতে যাবে। আর বুকুদাও তো বলেছিল যেতে। সরস্বতী পুজোর দিন শেষ দেখা হয়েছিল বুকুদার সঙ্গে।
বুকুদা পালটে গেছে অনেক। সেই বকবক করার মানুষটা কেমন যেন চুপ করে গেছে। কেমন যেন সবার মধ্যে থেকে একা হয়ে গেছে। মনখারাপ। মনখারাপ একটা অদ্ভুত রং। রুহানের মনে হয় ও সেই রংটা বুকুদার মুখে দেখতে পায়।
সরস্বতী পুজোর দিন চুপচাপ এক কোণেই বসেছিল রুহান। আর সবার কথা শুনছিল। আসলে বুকুদা আর জিয়ানা বলেছিল বলে ও গিয়েছিল। না হলে অমন বাড়িতে ঠিক কমফর্টেবল বোধ করে না ও। তখনই জিয়ানার বাবা-মায়ের কথার থেকে ও শুনেছিল যে, বুকু চিরকাল চুপচাপ। গম্ভীর। কম কথার মানুষ।
চিরকাল! রুহান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বুকুর দিকে। চিরকাল মানে? যে-বুকুদাকে ও চেনে সে তো ভীষণ ইয়ারকিবাজ ছিল। হাসত, পাড়ায় ক্রিকেট খেলত, মজা করত, আর প্রচুর কথা বলত। মুনাইদি তো নামও দিয়েছিল ‘বকবাস’। সেই মানুষটা চিরকাল গম্ভীর! জিয়ানার বাবা-মায়ের কাছে চিরকাল মানে তো বিয়ের সময় থেকে। তার মানে সেই সময় থেকেই বুকুদা গম্ভীর? নাকি তার একটু আগে থেকে? ওই মুনাইদির বাড়ির সেই ঘটনার থেকে?
তুতুল। ছোট্ট একটা পুতুলের নাম তুতুল। বুকুদার মেয়ে। অদ্ভুত গম্ভীর আর চুপচাপ একটা মেয়ে। রুহান চুপ করে বসে দেখছিল মেয়েটাকে। মাথাভরতি গোল্লা গোল্লা চুল। বড় বড় চোখ। যেন জিয়ানার মুখটাই কেটে বসানো রয়েছে। তুতুলও যেন ওকে দেখছিল। তারপর একসময় উঠে এসে দাঁড়িয়েছিল রুহানের সামনে। বলেছিল, ‘তুমি কি কিডন্যাপার?’
‘মানে?’ খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল রুহান।
‘তোমার কি ছুরি আছে? আর তাই দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে বাচ্চাদের হাত-পা কেটে দিয়ে কি তুমি তাদের বাকেটে বসিয়ে রাখো? তাদের বেগার তৈরি করে দাও?’
‘মা-মানে?’ রুহান খুব ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল।
জিয়ানা সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছিল, আলতো ধমক দিয়ে বলেছিল, ‘আঃ তুতুল! আবার শুরু করলে?’ তারপর রুহানকে বলেছিল, ‘কিছু মনে কোরো না। ও এমন বলে।’
জিয়ানার মা উদ্বিগ্ন গলায় বলেছিল, ‘তুতুলকে কাউন্সেলিং করা মিষ্টি। এমন ভাল নয়, সবসময় এত ভায়োলেন্ট কথাবার্তা ভাল নয় একদম।’
জিয়ানা চিন্তিত মুখে বলেছিল, ‘ওদের স্কুল থেকেও এমন কমপ্লেন করেছে। বুকুকেও বলছি…কিন্তু…’
রুহান আন্দাজ করছিল ব্যাপারটা স্পর্শকাতর দিকে চলে যাচ্ছে। তাই খুব অস্বস্তিতে পড়েছিল। খুব অসহায়ও লাগছিল তার সঙ্গে। ও আড়চোখে তাকিয়েছিল বুকুদার দিকে। দেখেছিল বুকুদা পেপারে মুখ ঢেকে বসে রয়েছে।
জিয়ানা বলেছিল, ‘দেখছ তো মা। ওর কোনও হুঁশ আছে?’
বুকুদা পেপার সরিয়ে মুখ তুলেছিল এরপর, ‘হুঁশ? হয়তো তুতুলের সেটাই বেশি আছে। তাই হয়তো এমন করে বলে ও। ছোট তো, তাই এগুলো উপচে ওঠে ওর ভেতর থেকে। বেরিয়ে পড়ে। আর আমরা দেখি। কী করবে বলো তো ও? সকালবেলা পেপারে দেখে মানুষের মুন্ডু কাটা দেহ। মানুষ মেরে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। বাচ্চারা বুলেট নিয়ে খেলছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মৃত মায়ের সামনে বসে বাচ্চা অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। টিভি খুললেই ব্যাট দিয়ে থেঁতলে মারা মানুষ। হাত-পা কেটে বস্তাবন্দি মানুষ। রক্ত আর রক্ত। খুন। জখম। কান্না আর চিৎকার। আর তার মাঝে মাঝে বডি ডিও আর সফ্ট ড্রিঙ্কস। এ কোন পৃথিবী আমরা ওর সামনে রেখেছি? ও যা দেখবে তাই তো আঁকবে। কোথায় কাউন্সেলিং করাবে? পৃথিবীটা কি ডিজনিল্যান্ড? কোন ডাক্তার চিকিৎসা করবে এই রোগের? সে নিজে হয়তো গ্রামে না গিয়ে ফাঁপানো প্র্যাকটিস খুলে বসেছে শহরে। সে ওষুধ কোম্পানির টাকায় বিদেশ ঘুরতে যায়। যার নিজের জীবনেই এত লোভ আর ভায়োলেন্স সে কী করে চিকিৎসা করবে ওর? গোটা পৃথিবীরই তো কাউন্সেলিং দরকার।’
রুহান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বুকুদার দিকে। এ কোন বুকুদা? ও দেখেছিল জিয়ানাও অবাক। মুখ হাঁ হয়ে আছে। বুকুদা এমন করে কোনওদিন বলতে পারে তা রুহান ভাবেইনি। ছোট্ট তুতুলও ভয় পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল। চুপ করে তাকিয়েছিল বাবার দিকে।
বুকুদা আবার খবরের কাগজটা তুলে মুখ ঢেকে নিয়েছিল। তারপর খানিকটা যেন নিজের মনেই বলেছিল, ‘সুকুমার রায় পড়াও, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ঘরটার দু’দিকে দড়ি বেঁধে কেউ যেন ডুবিয়ে দিয়েছিল গভীর জলের ভেতরে। সবাই চুপ করে গিয়েছিল। সবার চলাফেরাও যেন কেমন স্লথ হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে এসে পড়া ললিতও কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। পুজোর দিনে এমন পরিবেশ, মোটেও ভাল লাগছিল না রুহানের। তাই সবার সামনে ও পকেট থেকে একটা কয়েন বের করে সেটা তুলে ধরেছিল তুতুলের সামনে। বলেছিল, ‘এটা কী বলো তো?’
সবাই তাকিয়েছিল। আর তুতুল পরিবেশের গাম্ভীর্য বজায় রেখে, গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘কয়েন তো। কেন তুমি চেনো না? আমায় জিজ্ঞেস করছ কেন?’
রুহান হেসে বলেছিল, ‘এই দেখো।’ তারপর দু’হাত দিয়ে কয়েনটা চেপে হাতের পাতায় বন্ধ করেই হাতটা খুলে শূন্য হাতের পাতা দেখিয়ে বলেছিল, ‘কোথায় গেল?’
কয়েন গায়েব দেখে তুতুল অবাক হয়েছিল খুব। বলেছিল, ‘সত্যিই তো কোথায় গেল?’
রুহান ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেছিল, ‘তুমি নিয়েছ, ফেরত দাও।’
‘হোয়াট আ লায়ার!’ তুতুল চোখ বড় করে গালে দু’হাত রেখে বলেছিল, ‘আমি নিইনি। সত্যি বলছি। মাম্মাকে জিজ্ঞেস করো।’
‘নাওনি?’ বলেই হাতটা তুতুলের কানের কাছে নিয়ে সেখান থেকে কয়েনটা নিয়ে এসে রুহান চোখ পাকিয়ে বলেছিল, ‘এইটা কী? তুমি না নিলে এটা কোথায় পেলাম?’
প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে তুতুল হেসে উঠেছিল হো হো করে। হাততালি দিয়ে বলেছিল, ‘ও হো, ম্যাজিশিয়ান?’
জিয়ানার বাবা-মাও খুব খুশি হয়েছিলেন। ললিতও হাততালি দিয়েছিল বেশ। আর বুকুদা পেপারটা না সরিয়েই বলেছিল, ‘এখনও এসব পারিস তা হলে?’
পারে। এসব রুহান এখনও পারে। একা-একা রাতে বসে হাত সাফাই প্র্যাকটিস করে ও। ভাল লাগে। নিজের কষ্ট করে শেখা জিনিসটা আর অবহেলায় হারাতে চায় না। মা অবশ্য জানে না। কেউই তেমন জানে না। আর সত্যি বলতে কী, রুহান চট করে এসব অন্যের সামনে বেরও করতে চায় না। মনে হয়, কী হবে নিজেকে জাহির করে? ও তো আর প্রফেশনাল ম্যাজিশিয়ান নয়। এমনি শখের টানে এসব করে। লোকে নাই জানল। তাতে কী এল গেল? কিন্তু সেদিন ঝুলি থেকে বেড়াল বের করতেই হয়েছিল। না হলে যে, ঘরের ভেতর বড্ড মেঘ জমছিল!
লেভেল ক্রসিং-এ গিয়ে দাঁড়াল রুহান। বজবজ থেকে ট্রেন শিয়ালদা যাচ্ছে। ও বুঝল আবার পকেটে নড়ছে ফোনটা। এই রে! ও বের করল। আবার আদি! আশ্চর্য! ফোনটা ধরছে না রুহান। কারণ, ও ধরতে চায় না। এই সিম্পল ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না? বিশেষ করে গত কয়েকবারে যা ব্যবহার করেছে ও, তারপর আর ইচ্ছে করে ফোন ধরতে? ও ফোনটার দিকে তাকাল। বেজে চলেছে। সামনের স্টেশন থেকে লম্বা ভোঁ দিয়ে ট্রেন ছাড়ল। আর তার আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেল ফোনের শব্দ। শুধু কম্পনটা বুঝতে পারল রুহান। ফোনের রিংটা আবার সাইলেন্ট করে দিল। ধরতে সত্যিই ইচ্ছে করছে না। আদির কথাগুলো এখনও স্পষ্ট কানে বাজছে ওর।
মালিনীকে সেদিন আদির বাড়িটা ও-ই চিনিয়ে দিয়েছিল। তারপর নিজে বসেছিল নীচে, মালিনীর গাড়িতে। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনখারাপ হয়ে যাচ্ছিল রুহানের। কত এসেছে এই বাড়িতে। ওই সেই দরজা। ওপরে উঠে যাওয়ার সিঁড়ি। আর ওই দক্ষিণ দিকের সেই জানালা। লাল-নীল-সবুজ কাচ বসানো। ওটাই তো কিগানদার ঘর। ওখানে কত আড্ডা দিয়েছে ওরা। গিটার শুনেছে কিগানদার থেকে। শিঙাড়া আর মুড়ি খেতে খেতে ক্রিকেট দেখেছে। কত রাতে থেকেও গেছে! এই বাড়িটা তো ওর বড় হয়ে ওঠার একটা অঙ্গ। আর তার ভেতর কোত্থেকে যে কী হল! সব ভেস্তে গেল। মাঝপথে খেলা ভেঙে কোথায় যে চলে গেল কিগানদা! জানে না ও। আদিও বলে না। গোটা একটা মানুষ চলে গেল আর কারও যেন সে বিষয়ে হুঁশবোধ নেই!
রুহান মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে নিজেকে। ও কেন নিজের থেকে যোগাযোগ করে না? কেন এমন ও নিজেও প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে রইল? কেন একবারও ও গেল না কিগানদার কাছে? লজ্জা! রুহানের মনে হয় কিগানদাকে যদি জিজ্ঞেস করতে হয় কেন ও চলে এল, কিগানদা নিশ্চয়ই উত্তর দিতে লজ্জা পাবে। তাই, ও সেই অবস্থাটা থেকে পালাতে এসবের ভেতর ঢুকতে চায় না। রুহান জানে না, এটা কতটা জোরালো ব্যাখ্যা। তবু, ব্যাখ্যা বটে একটা, অন্তত নিজের কাছে।
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ও দেখেছিল আদি আর মালিনী এগিয়ে আসছে গাড়ির দিকে। ও সচেতন হয়ে সোজাভাবে বসেছিল। গাড়িটা মালিনীর। ও-ই চালিয়ে নিয়ে এসেছিল। রুহান সামনের সিটে মালিনীর পাশেই বসেছিল।
আদি গাড়ির কাছে এসে খুব বিরক্ত হয়েছে এমন মুখ করে বলেছিল, ‘আরে, তুই? কী করছিস তুই? মালিনীকে বাড়ি চিনিয়ে এনেছিস?’ তারপর মালিনীর দিকে তাকিয়ে রাগের গলায় বলেছিল, ‘এই তোমার সারপ্রাইজ! একটা ভোঁদাই কেষ্ট!’
মালিনী বলেছিল, ‘ছিঃ আদি। ডোন্ট বি রুড। রুহান খুব ভাল ছেলে।’
‘ভাল!’ হেসেছিল আদি, ‘আপনি ভাল মিসেস বড়ুয়া?’
লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল রুহান। কবে স্কুল লাইফে কোন টিচারের সঙ্গে একটু কী হয়েছিল, সেটা কেন বারবার টানে আদি আর আবেশ? অবশ্য ভুলটা ওর নিজের। অল্প বয়সে কেরামতি দেখিয়ে ও কতটা ইরেজিস্টেব্ল সেটা বন্ধুদের বোঝাতে গিয়ে পুরো ঘেঁটে গেছে সব। তখন এমন না করলে মালিনীর সামনে অমন কথা বলতে পারত আদি?
মালিনী জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মিসেস বড়ুয়া মানে?’
আদি ভুরু নাচিয়ে বলেছিল, ‘বলব নাকি রুহান?’ তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, ‘যা পিছনের সিটে বস গিয়ে। সামনে বসেছে!’
‘কী হচ্ছে কী?’ মালিনী অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আদির দিকে, ‘তুমিও তো পিছনে বসতে পারো, না?’
‘ইউ ওয়ান্ট মি টু লিভ?’ আদি ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল মালিনীর দিকে।
মালিনী এক মুহূর্ত আদিকে দেখে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘দ্যাটস ইয়োর চয়েস। ডোন্ট এভার শো মি দ্যাট অ্যাটিটিউড।’
রুহান আর পারেনি। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পিছনের সিটে গিয়ে বসেছিল। বলেছিল, ‘আদি, প্লিজ বাদ দে। আমি পিছনেই বসছি। ছেলেমানুষি করিস না। নে চল।’
মালিনী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু এসব একদম ভাল লাগছিল না রুহানের। ও হাত জোড় করেছিল, ‘প্লিজ মালিনী, আমরা কেউ ক্লাস ওয়ানে পড়ি না। বসলেই হল। গোল্ডিজ অনেকটা দূর আর দেরি কোরো না।’
মালিনী কড়া চোখে আদিকে মেপে গাড়িতে উঠেছিল। আদিও সামনের সিটে বসে মাথা ঘুরিয়ে রুহানকে বলেছিল, ‘আগেই নেমে যেতে পারতিস, ফালতু মালিনীকে রাগিয়ে দিলি।’
মালিনী কিছু বলার আগেই রুহান হেসে উঠেছিল জোরে। যেন আদি খুব একটা মজার কথা বলেছে। ঝামেলার চেয়ে এসব কথা গায়ে না মাখলেই হয়। জীবনে সব কথা ধরলে কষ্ট ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। অন্তত, নানারকম অশান্তি পার হয়ে এই বয়সে এসে পৌঁছে এই সার কথাটাই বুঝেছে রুহান।
সারাটা পথ রুহান কথা বলেনি খুব একটা, শুধু হুঁ হাঁ করে গিয়েছিল। আদিও তেমন কথা বলছিল না। শুধু চাপা গলায় একবার মালিনীকে জিজ্ঞেস করেছিল গতকাল কেন মালিনী ফোন করেনি ওকে! কেন খবর নেয়নি ওর! মালিনী গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘এটা আমার ডিউটির মধ্যে পড়ে না।’
জোকায় পৌঁছোতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। মালিনীর সঙ্গে ঘুরছিল আদি। আর রুহান একটু আলাদা, একলা হয়ে ঘুরছিল। তবু লক্ষ রাখছিল মালিনীকে। কী অসম্ভব যত্নের সঙ্গে ও বয়স্ক মানুষদের পরিচর্যা করছে! কী আন্তরিকভাবে কথা বলছে। যেন সেই মানুষটাই পৃথিবীর কেন্দ্র। মুগ্ধ হচ্ছিল রুহান। এমন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার কথা ও ভাবল কী করে? এ যে অবাস্তব! এমন মেয়েকে তো ‘আপনি-আজ্ঞে’ করবে ওর মতো ছেলে! রুহান তাই ক্রমশ পিছোচ্ছিল। মনে মনে।
বিকেল শুরুর মুখে খেতে বসেছিল ওরা। মালিনী বলেছিল, ‘এই বৃদ্ধ বয়সটা ইজ লাইক উইন্টার। নো ফ্লাওয়ার্স, নো চেরি ট্রি, নো ফ্রুটস, নো নাথিং। শুধু ঠান্ডা, ধূসর একটা ঢালু মাঠ যেন। গুরুত্বহীন, ইউজ্ড আপ ল্যান্ড। লাইক ওয়েস্ট ল্যান্ড। খুব ইনসিকিয়োর্ড একটা সময়। যে-মানুষগুলো সারাজীবন সংসার নিয়ন্ত্রণ করে, একটা পিভটের মতো কাজ করত, হঠাৎ তারা এখন অ্যাপেনডিক্স হয়ে গেছে। জানো, এদের কথা “শুনব না” বলার লোকটুকুও নেই। জানো তো কাউকে “না” বলার চেয়ে অবজ্ঞা করা আরও সাংঘাতিক আঘাত। এরা সেই আঘাতে আহত সব মানুষ। তাই এদের কাছে আমি আসি। আমি তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছি, কারণ, আমি চাই, তোমরাও, ইন ইয়োর ওন স্মল ওয়ে ওদের এন্টারটেন করো। মেক দেম ফিল ইমপর্ট্যান্ট। মেক দেম ফিল ওয়ান্টেড।’
খুবই সামান্য সব কথা। তবু মুগ্ধতা বাড়ছিল রুহানের। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের থেকে দূরে আরও দূরে ছিটকে যাচ্ছিল ও। বরং একসময় মালিনীকে অমনভাবে দেখেছিল বলে নিজের প্রতি কেমন বিরক্তি আসছিল। ওর মনে হচ্ছিল, মালিনীকে ওর সঙ্গে মানাবে না একদম।
খাওয়া শেষে মালিনী একটু উঠে গিয়েছিল ভেতরে। তখন রুহান বলেছিল, ‘আদি, মালিনী সত্যিই খুব অদ্ভুত মেয়ে, বল? অত বড়লোকের মেয়ে হয়ে চাকরি করছে। পাশাপাশি এমন করে আর্তদের, বয়স্কদের সেবা করছে। খুব ভাল মেয়ে, না?’
‘ভাল? তাতে তোর কী রে? ফালতু লোনা করিস না রুহান। এ তোর মিসেস বড়ুয়া নয় যে, লাগিয়ে কেটে পড়বি। শালা, যদি ঢ্যামনামো করতে দেখি না, তবে একদম হাড় ভেঙে দেব তোর, বুঝেছিস?’
আদির বাবা একবার খুব দামি ঘড়ি দিয়েছিল ওকে। তখন ওরা স্টুডেন্ট। হাতে পয়সাকড়ি থাকত না বিশেষ। আর অত সুন্দর ঘড়ি রুহান দেখেওনি কোনওদিন। ও আদিকে বলেছিল, ‘কী সুন্দর ঘড়ি রে আদি, দারুণ দেখতে।’
আদি অবজ্ঞার সঙ্গে বলেছিল, ‘বাবা দিয়েছে। বিদেশি। তোর পছন্দ?’
‘খুব সুন্দর,’ রুহান আলতো করে হাত বুলিয়েছিল ঘড়িটায়।
‘এই নে,’ ঘড়িটা এক নিমেষে খুলে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল আদি।
‘মানে? পাগল নাকি?’ রুহান থতমত খেয়ে গিয়েছিল।
‘কেন? তোর পছন্দ যখন, নে। কোনও প্রবলেম নেই।’
রুহান নেয়নি। কিন্তু ছাত্রজীবনে, অত অবহেলায়, নির্মোহ হয়ে কাউকে ও অমন সুন্দর জিনিস দিয়ে দিতেও দেখেনি।
সেই আদি ওকে অমন কথা বলছে! রুহানের গলার কাছটা ব্যথা করছিল। কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিল একবার জিজ্ঞেস করে, ‘আদি, তোর সেই ঘড়ির ব্যাপারটা মনে আছে?’ কিন্তু জিজ্ঞেস করেনি। রুহান বুঝেছিল ছোটবেলাটা বহু দিন আগে ফেলে এসেছে ওরা। ফেলে আসা সেইসব চিহ্ন ধরে আর অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না। ফলে সময়ের ভাঁজে হারিয়ে যাওয়া সেই আদি, হারিয়েই যায়।
লেভেল ক্রসিং পার করেই বাঁ দিকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কের দোকান দেখল রুহান। একটা ঝাঁজালো কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়ে দেখা যেতে পারে, একবার ভাবল ও। তারপর দাম চিন্তা করে অন্য দিকে দৃষ্টি ফেরাল। কাউন্টারের ওপরে একটা জলের জাগ রাখা আছে। চাইলে নিশ্চয়ই খেতে দেবে। ও দোকানটার দিকে দু’পা এগিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই আবার ফোনটা বাজল। রুহানের রাগ হল এবার। আদির কি এমনি গালাগালি করে শখ মেটেনি যে বারবার ফোন করছে? ভাবল, একবার ধরে শুনেই নেয়, ব্যাপারটা কী। তারপর যদি খারাপ কিছু বলে, তা হলে না হয় কেটে দেবে লাইন। না হলে তো বারবার ফোন করেই যাবে। ও রাস্তার পাশে সরে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। আর তারপরেই আশ্চর্য হল, আরে, এটা কার নম্বর!
রিংটা হচ্ছে এখনও। ফোনটা কাঁপছে। নম্বরটা কিছুতেই চিনতে পারছে না রুহান। আচ্ছা, আদি আবার অন্য নম্বর থেকে ফোন করছে না তো! ধরবে? দ্বিধার সঙ্গে ফোনটা ধরল রুহান, ‘হ্যালো?’
‘এটা কি রুহানবাবুর নম্বর?’ একটা নরম মেয়েলি গলায় প্রশ্নটা এল।
‘আপনি কে বলছেন?’ রুহান পালটা প্রশ্ন করল।
‘এটা কি রুহানবাবুর নম্বর?’ গলাটা এবার যেন সামান্য অধৈর্য।
‘হ্যাঁ, বলছি।’
‘ও,’ গলাটা থমকাল এক মুহূর্ত। তারপর বলল, ‘নমস্কার, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?’
‘নিশ্চয়ই বলা যাবে। তবে তার আগে যদি কাইন্ডলি একটু বলতেন আপনি কে বলছেন?’ রুহান নরম গলায় পালটা প্রশ্ন করল।
‘আপনি আমায় চিনবেন না। আপনার একজন খুব পরিচিত মানুষ আমাকে আপনার নম্বরটা দিয়েছেন। বলেছেন যে, আপনি আমায়, মানে আমাদের হেল্প করতে পারবেন।’
‘তাই? কিন্তু আমি কি জানতে পারি আপনার নামটা?’
‘সরি,’ মেয়েটি হাসল, তারপর বলল, ‘আমার নাম সৌদামিনী চক্রবর্তী। তবে সবাই আমায় রাহি বলে। তা বলি আমার বক্তব্য?’
রাহি? এ কে? রুহান টালুমালু চোখে উলটো সিঁথি কাটা কলকাতার দিকে তাকাল। ভাবল, এ আবার নতুন কে এল ওর ভাঙাচোরা গল্পে?
Chapter - 16
১৬
‘I thought I had forgotten,
But it all came back again
To-night with the first spring thunder
In a rush of rain.
With the wild spring rain and thunder
My heart was wild and gay;
Your eyes said more to me that night
Than your lips would ever say…
I thought I had forgotten,
But it all came back again
To-night with the first spring thunder
In a rush of rain.
লেখাটার নাম ‘স্প্রিং রেন’, বহু দিন আগে পড়া। কিন্তু আজ আবার মনে পড়ল জিয়ানার। যদিও এখন বসন্তকাল নয়। বরং এখন পুরোদস্তুর বৈশাখ। তবু বসন্তের বৃষ্টি মনে পড়ল ওর। আলতো করে গাড়ির বন্ধ জানলায় মাথাটা ঠেকিয়ে হেলান দিল জিয়ানা। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে। রাস্তাঘাট সব সাদা। বৃষ্টির ঝালর এসে ধুইয়ে দিচ্ছে ওদের গাড়ি। ধুইয়ে দিচ্ছে পথঘাট। ওই দূরের ছড়ানো ধানখেত। একলা চাষি। গাছেদের নির্বিবাদী সারি। ধুইয়ে দিচ্ছে ইলেকট্রিকের পোস্ট, মাইল-মাইল চলে যাওয়া তার আর তার ওপরে বসা শালিখ, চড়ুই আর ফিঙে। বহু দিন পরে প্রায় এরকম গ্রামের পরিবেশে বৃষ্টি দেখছে জিয়ানা। গাড়ির এসি-র ভেতরে বসে জলে ঝাপসা কাচ দিয়ে বৃষ্টি দেখছে ও। আর আবার হু হু করে মনে পড়ে যাচ্ছে সব। সেই কলেজের রাস্তা, ক্লাসরুম, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের জল। মনে পড়ে যাচ্ছে গাছের তলায় উলটোনো ছাতা ঠিক করতে চেষ্টা করা সেই লম্বা ছেলেটাকে।
‘আপনার শরীর ঠিক আছে তো ম্যাডাম?’ সামনের সিট থেকে পিছন দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল রুহান।
ম্যাডাম কথাটা শুনতে ভাল লাগে না জিয়ানার। বিদেশে চট করে কেউ এমন ম্যাডাম ট্যাডাম বলত না। ফার্স্ট নেম ধরে ডাকাটাই সেখানে রেওয়াজ। নইলে মিসেস বাসু। এখানে এসে অন্য সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিলেও ‘ম্যাডাম’ ডাকটার সঙ্গে ঠিক এখনও মানাতে পারেনি ও। আর ওর আরও অস্বস্তি হয় যখন রুহান এভাবে ডাকে। এর আগে যেদিন প্রথমবার অফিসে এমন করে ডেকেছিল রুহান, খুব অদ্ভুত লেগেছিল। সত্যি কথা বলতে কী, প্রথমে তো বুঝতেই পারেনি যে, ওকে ডাকছে। নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিল জিয়ানা। শুনছিল কে যেন পাশে দাঁড়িয়ে ‘ম্যাডাম’ ‘ম্যাডাম’ করছে। ও পাত্তা দেয়নি। ওর পাশে শালিনী বসে। হয়তো, শালিনীকে বলছে কেউ।
জিয়ানা পাত্তা দেয়নি অত। ও কাজ করে যাচ্ছিল। হঠাৎ শালিনী বলেছিল, ‘আরে জিয়ানা, স্পেয়ার আস চার্ম। এত কাজ কোরো না। কতক্ষণ থেকে তোমায় ডাকছে। তুমি শুনছই না! তুমি এত কাজ করলে খুরানা স্যার তো আমাদের ওপর রেগে যাবেন।’
‘আমায় ডাকছে?’ একটু বিস্মিত হয়ে চোখ তুলেই থমকে গিয়েছিল জিয়ানা। আরে, রুহান যে! ও বলেছিল, ‘তুমি আমায় ম্যাডাম বলছ কেন?’
রুহান নিচু গলায় বলেছিল, ‘অফিস তো…মানে…’
‘বউদি বাদ দাও, দিদি তো বলতেই পারো। ম্যাডাম ভাল লাগে না।’
‘না, সবাইকেই তো বলি। তাই…ম্যাডামটাই ঠিক আছে।’
জিয়ানা ঠোঁট উলটেছিল। ব্যাপারটা ভাল লাগেনি। কিন্তু এটা নিয়ে তেমন শোরগোল করার মতোও কিছু হয়নি বলে জিয়ানা আর কথা বাড়ায়নি।
রুহান বলল, ‘ম্যাডাম, আপনার কি ক্লান্ত লাগছে? জন্ডিসের পর খুব উইক লাগে। আপনি আজ এতটা দূর না আসলেও পারতেন।’
‘আমি ঠিক আছি,’ জিয়ানা আবার জানলা দিয়ে তাকাল।
জায়গাটার নাম বিড়া। না, জিয়ানা জানত না। একটা ছোট্ট জনবসতির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানের সাইনবোর্ডে নামটা দেখেছে ও। তখনও বৃষ্টির তোড়টা এতটা ছিল না। এখন খুব বেড়েছে বৃষ্টি। তবে রাস্তা বেশ ভাল। ফাঁকা। মাঝে মাঝে দু’-একটা গাড়ি বা ট্রাক আর টোকা মাথায় ভ্যানচালকেরা যাচ্ছে।
এদিকটায় কোনওদিন আসেনি জিয়ানা। আসলে কোন দিকটাতেই বা ও গেছে? আসল সময়টা তো পড়াশোনা করল আর বিয়ের পর বিদেশে গিয়ে কাটল। নিজের দেশ তো দেখাই হল না। না, বিয়ের আগে ঘুরতে গেছে। একবার মা রাগ করে কালিম্পঙের ওখানে এক মামার বাড়িতেও পাঠিয়ে দিয়েছিল। এমনই ছুটকো-ছাটকা ভাবে বেড়িয়েছে জিয়ানা। কিন্তু তা তো নিয়ন্ত্রিত। তাতে তো আর সঠিকভাবে দেশ দেখা যায় না।
এইখানে এসে বেশ ভাল লাগছে জিয়ানার। বৃষ্টি আর গ্রাম। হাইওয়ে দিয়ে নিমেষে মিলিয়ে যাওয়া বাস। এইসব আবার কেমন যেন কলেজ জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। একবার কলেজ পালিয়ে কিগানের সঙ্গে তো এমন করেই বেরিয়ে পড়েছিল ও।
ওদের সঙ্গে বরুণ বলে একটা ছেলে পড়ত। প্রচুর টাকার মালিক ছিল ওর বাবা। বরুণ দেদার খরচ করত। বন্ধুদের খাওয়াত। নিজের গাড়িতে লিফ্ট দিত। সিনেমা দেখাত। তবে ছেলেটা একটু খামখেয়ালি প্রকৃতির ছিল। নিপা বলে বটানি অনার্সের একটা মেয়ের সঙ্গে ভাব ছিল ওর। মেয়েটা রীতিমতো ওকে নিয়ে ছেলেখেলা করত।
এমনই একদিন বরুণ এসে বলেছিল, ‘কিগান, মাইরি খুব বিপদে পড়ে গেছি।’
‘কেন?’ কিগানরা সবাই ক্যান্টিনে বসেছিল। কিগান ঘুগনির চামচটা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘দেখ না নিপা খুব বায়না করছে!’
‘বায়না করছে মানে?’ কিগান ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
বরুণ লজ্জা লজ্জা গলায় বলেছিল, ‘ওর বাড়িটা আজ ফাঁকা আছে। তাই, মানে…’
কিগান হেসে নিচু গলায় বলেছিল, ‘তা আমায় বলছিস কেন? ওসব ব্যাপারে আমি তো হেল্প করতে পারব না। তোর গার্লফ্রেন্ড তুই বোঝ।’
‘না না।’ বরুণ ঠোঁট চেটে তাকিয়েছিল, ‘আসলে সমস্যা হল আমার মোটরবাইকটা।’
‘কেন? আজ যখন বাইক নিয়ে এসেছিস তখন বাইকে বসে বোঁ করে চলে যা। সমস্যা কেন বলছিস?’
‘ওদের ওখানে বাইক নিয়ে গেলে ঝামেলা আছে। বাড়ির বাইরে পার্ক করে রাখতে হবে তো! সবাই দেখে ফেলবে রে শালা। পুরো কেস খেয়ে যাব। নিপা বলছে বাইকটা রেখে যেতে।’
‘তো যা। কলেজের গ্যারাজে রেখে যা।’ কিগান ওর ঘুগনিতে মন দিয়েছিল।
‘দুর। এভাবে হয় না। শোন না,’ এবার বরুণ বায়নার গলায় বলেছিল, ‘তুই বাইকটা নিয়ে যা। একদিন রাখ। কাল নিয়ে নেব।’
‘আমি! পাগল না পেটখারাপ?’ কিগান ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
‘কেন নয়? তুই রাখ। প্রবলেম কী?’
‘শোন, আমার সঙ্গে লাইসেন্স নেই। রাস্তায় যদি পুলিশ ধরে?’
‘এই বৃষ্টিতে পুলিশ ধরবে! ওদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই, না?’ বরুণ এমন করে কথাটা বলেছিল যেন সেদিন সমস্ত পুলিশকে রেনি ডে-র ছুটি দেওয়া হয়েছে।
‘তা ছাড়া,’ বরুণ মিচকের মতো হেসেছিল, ‘আমার বাইকে তেল লোড আছে। তোরা বেরিয়ে যা না।’
‘আমরা মানে?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘ন্যাকা খোকা আমার! সবাইকে যত ঢপ মারো কাকা, আমায় পারবে না। তুই আর জিয়ানা। বেরিয়ে পড় না। কে আটকাবে তোদের? সবে সাড়ে এগারোটা বাজে। কোথাও লং ড্রাইভ মেরে আয়।’
কিগান বলেছিল, ‘দেখ, মাসের শেষ। পকেট মানি কম আছে। তোর তেলের টাকা দিতে পারব না।’
‘তেলের টাকা?’ বরুণ এমন মুখ করেছিল যেন ওর কাছে ওর হৃৎপিণ্ডের দাম নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, ‘তোকে বলেছি দিতে? আমার বাপের প্রচুর হারামের পয়সা আছে। তেলও হয়েছে বলতে পারিস। তার থেকে চার-পাঁচ লিটার গেলে কিস্সু হবে না।’
কিগান আড়চোখে পাশে বসা জিয়ানাকে দেখেছিল। জিয়ানা চট করে নামিয়ে নিয়েছিল চোখ।
কিগান বলেছিল, ‘জিয়ানাকে জিজ্ঞেস কর।’
বরুণ হেসে বলেছিল, ‘শালার পেটে খিদে মুখে লাজ। মারব এক লাথ। দেখছিস না ওর চোখ “হ্যাঁ” বলছে? শালা, প্রেম করতে এসেছে!’
সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল বেশ। একরাশ মেঘ কে যেন লেপে দিয়েছিল কলকাতার চোখে-মুখে। জিয়ানা কিগানের কোমর জড়িয়ে ধরে বসেছিল। আর মোটরবাইক ছুটছিল বিদ্যাসাগর সেতুর দিকে। বৃষ্টি বাড়ছিল ক্রমশ। জলের রেখাগুলো তেরছা হয়ে এসে বিঁধছিল ওদের। সালোয়ারের ওপর দিয়ে যেন জল টোকা মারছিল জিয়ানার শরীরে। কিন্তু কষ্ট হচ্ছিল না। একটুও কষ্ট হচ্ছিল না ওর। বরং আনন্দ লাগছিল। কিগানের কোমর জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে খুব আনন্দ হচ্ছিল জিয়ানার।
সেতু পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে ওরা সোজা যাচ্ছিল। কিগানকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করেছিল জিয়ানা। ওর মনে হচ্ছিল যেন ভার নেই শরীরে। মনে হচ্ছিল এই তো ওই ছায়া রঙের মেঘগুলোর ভেতরে পৌঁছে গেছে ও। কিগান বাইকের গতি বাড়াচ্ছিল ক্রমশ। যেন সত্যিই মেঘের ভেতর চলে যেতে চাইছিল ও। কিন্তু একসময় বৃষ্টি এমন জোরে শুরু হয়েছিল যে, ওরা বাধ্য হয়েছিল বাইকটা থামাতে। যদিও দু’জনে ভিজে গিয়েছিল সম্পূর্ণভাবে, তবু একটা ভাঙা চালার নীচে দাঁড়িয়েছিল দু’জনে।
বৃষ্টিতে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল চরাচর। বাইরে রাস্তার পাশে কাত হয়ে তুমুল ভিজছিল মোটরবাইক। আর ওই আধভাঙা চালার নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল ওরা দু’জন।
আনন্দও যে কষ্টের জন্ম দেয়, সেদিন বুঝেছিল জিয়ানা। এই যে কিগানের সঙ্গে থাকার সময়টুকু, এই যে এই মুহূর্তটুকু, এই বৃষ্টি, নির্জন ছায়াতল, এই জনমানবহীন চরাচর। কিগানের সঙ্গে এই সমস্ত কিছু ভাগ করতে পেরে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল জিয়ানার। আর তারই সঙ্গে যখন মনে পড়ছিল যে, আর কিছুক্ষণ পরেই ওরা আবার ফিরে যাবে যে যার বাড়িতে। ওরা হয়ে যাবে আলাদা। তখন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল ওর।
আর তাই খানিকটা নিজের অজান্তেই জিয়ানা ধরে ফেলেছিল কিগানের হাত। নরম, ভীষণ নরম ছিল কিগানের হাত। জিয়ানার মনে হচ্ছিল নরম পাখি ধরেছে ও। মুখ ঘুরিয়ে দেখেছিল কিগান তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকেই। নরম নীল চোখ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে।
জিয়ানা যেন নড়তে পারছিল না। কেমন যেন বন্ধনে পড়ে গিয়েছিল। নিজের অজান্তেই কিগানের হাতটাকে ও নিজের কোমরে জড়িয়ে নিয়েছিল। তারপর ঘন হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিগানের কাছে। কিগানের ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে ও নামিয়ে এনেছিল কিগানের ঠোঁট। জিয়ানার ঠোঁটের মাঝে কাঁপছিল কিগানের ঠোঁট দুটো। আর সেই ঠোঁট দুটোকে ভরসা দিতেই জিয়ানা আলতোভাবে জিভটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেদিন বৃষ্টির আড়াল নিয়েছিল ওরা। সেদিন আর কোনও আড়াল রাখেনি ওরা। জিয়ানা বুঝেছিল শারীরিক মিলন হয়তো হয়নি। কিন্তু মানসিকভাবে ও আর কুমারী নেই।
তারপর বৃষ্টি থেমেছিল একসময়। ওরা আবার বাইকে চড়ে ফিরে এসেছিল কলকাতায়। ভেজা সপসপে গা নিয়ে বাড়িতে গিয়ে নিয়মমতো জ্বরেও পড়েছিল জিয়ানা। রাতের দিকে জ্বর বেড়েছিল। গরম একটা ভাপ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছিল জিয়ানাকে। শরীরে থাবা বসাচ্ছিল যন্ত্রণা। তবু তারই ভেতরে জিয়ানা যেন টের পাচ্ছিল সেই ঠোঁটের কম্পন। যেন বুঝতে পারছিল নরম ভেজা একটা জিভ এসে গলে যাচ্ছে ওর জিভের ওপর। মনে পড়ছিল কানের কাছে মুখ নিয়ে কিগানের জিজ্ঞাসা, ‘আমায় কেমন খেতে রে?’ জিয়ানার মনে পড়েছিল ওর উত্তরের অপেক্ষা না করে কিগান শান্ত গলায় বলেছিল, ‘Your eyes said more to me that night/ Than your lips would ever say…’
‘I thought I had forgotten,/ But it all came back again/ To-night with the first spring thunder/ In a rush of rain.’ চোখের মাটি ভিজিয়ে বেয়াড়া এক কুচি পুঁচকি জল মাথা তুলল। গাড়ির বাইরেটা সত্যি প্রায় সন্ধের মতো কালো করে আছে। সত্যি আজও সেইরকমই বৃষ্টি হচ্ছে। আজও আশপাশ প্রায় নির্জন। আজও সামনে পড়ে আছে ভেজা হাইওয়ে। সবই এক। তবু কোথায় যেন সব এক নয়। সেই কাত হয়ে থাকা মোটরবাইকটা নেই। সেই ভাঙা চালাঘরটা নেই আর সেই নীল চোখের ছেলেটাও কোথাও যেন হারিয়ে গেছে! হারিয়ে গেছে কি? না হারিয়ে ফেলেছে জিয়ানা! বাবা, মা আর নানান চাপে ও আর ধরে রাখতে পারেনি কিগানকে! আজ এত বৃষ্টিতে কোথায় কিগান? কাকে ভালবাসছে ও? কার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলছে, ‘আমায় কেমন খেতে?’
সামনে ডানদিকে একটা পেট্রোল পাম্প দেখে ড্রাইভার গাড়িটা ঘুরিয়ে দিল। তেল নেবে বোধহয়। জিয়ানা সোজা হয়ে বসে ঘড়ি দেখল। দুপুর একটা বাজে। রুহানের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। জিয়ানা দেখল সামনের সিটে মাথা রেখে চুপ করে বসে আছে রুহান। ছেলেটা ভাল। নির্বিবাদী। কখনও ঝঞ্ঝাট করে না। কখনও ঘ্যানঘ্যান করে না। যা পায়, যেটুকু পায় তাতেই খুশি। এই যে এতটা পথ এসেছে, দু’বার, শরীর কেমন আছে ছাড়া অন্য কিছু জিজ্ঞেস করেনি। একদম ডিস্টার্ব করেনি। ছেলেটার সম্বন্ধে মাঝে মাঝে কৌতূহল হয় জিয়ানার। দু’-একবার বুকুকেও জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু বুকু তো জগদ্দল পাথর। বলেছে, ‘ওই ছোট থেকে চিনতাম। ভাল ছেলে। একসময় ক্রিকেটটাও ভাল খেলত। এখন নাকি আর তেমন ভাল খেলে না।’
‘আর? ভাইবোন আছে? বাবা তো নেই শুনলাম। মা? ওর মা কেমন?’
বুকু যেন ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে, এমন মুখ করে বলেছে, ‘আমি জানব কেমন করে?’
আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি জিয়ানা। আজকাল বুকুর সঙ্গে যোগাযোগের সাঁকোগুলো কেমন যেন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জিয়ানা পড়েছিল যে, প্রাচীনকালে চিন দেশে যোদ্ধারা যখন যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যেত তখন নদী পেরোনোর কাঠের সাঁকোগুলো পুড়িয়ে দিতে দিতে যেত। বুকুও যেন আজকাল সাঁকো পোড়াতে পোড়াতে যাচ্ছে। আর জিয়ানাও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচছে কোথাও! কীসের সমস্যা ওদের ভেতর? জিয়ানা জানে না। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে, ওর তরফ থেকে কি কোনও গন্ডগোল হয়েছে? শরীর দিয়ে যতটা করার তা তো ও করেছে! তবে? তবে যাই হোক, বুকুর ক্রমশ সরে যাওয়াও যেন আরও বেশি করে আজকাল মনে করিয়ে দেয় কিগানকে। না, কিগান ছিলই। তবে এখন যেন কেমন স্পষ্ট হয়ে উঠছে আরও। যেন আরও ঢুকে পড়ছে মনে। মাঝে মাঝে আজকাল খুব দমবন্ধ লাগে জিয়ানার। মনে হয় সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে যদি পালিয়ে যেতে পারত! কিন্তু যাবে কোথায় ও? নিজের থেকে তো আর পালাতে পারবে না। সেটা পারলে কাজের কাজ হত। কিন্তু তা যখন হবে না, তখন আর ভেবে লাভ কী!
জিয়ানা ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়নাটা বের করে চুলটা ঠিক করে নিল একটু। তারপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘রুহান, তুমি খাবে না? খিদে পায়নি?’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম?’ রুহান সামনের সিট থেকে ঘুরে বসল।
‘আর বাড়াবাড়ি কোরো না তো। ড্রাইভারও তো নেই গাড়িতে। এখন ম্যাডাম-ম্যাডাম করছ কেন?’
জিয়ানার কথার ধরনের জন্যই বোধহয় রুহান শব্দ করে হাসল। বলল, ‘ডাকটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। তবে ঠিক আছে। বউদি বলছি। না, বউদি খিদে পায়নি। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় নুডুল্স সেদ্ধ করে খেয়ে এসেছিলাম। অম্বল হয়ে গেছে এমন যে, আর খিদে আসার জো নেই।’
‘সে কী! তুমি নুডুলস সেদ্ধ করেছ মানে? আসলে কিছু মনে কোরো না, তোমায় চিনলেও তোমার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু আমি জানি না।’
‘না না ঠিক আছে,’ রুহান হাসল, ‘আমি আর মা থাকি বাড়িতে। মায়ের হাতটা ভেঙে গেছে। তাই আমিই টুকটাক রান্না করে নিই।’
‘খেয়াকাকিমা হেল্প করে না?’
রুহান একটু চুপ করল। জিয়ানা ওর মুখ দেখে বুঝল প্রশ্নটা এমন হয়ে গেছে যে, উত্তর দিতে গেলে বেশ কিছু সত্যি মিথ্যে ঘেঁটে গুলিয়ে যাবে।
কিন্তু রুহান বলল, ‘আসলে, এখানে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা একটু কেমন হয়ে গেছে যেন। আমি তো তেমন খুব কিছু রোজগার করি না, তাই অবস্থাটাও ভাল নয়। সব মিলিয়ে মা কষ্টে থাকে খুব। হয়তো একটু কঠিন কথাও বলে ফেলে মাঝে মাঝে। কাকিমা যদিও গায়ে মাখে না ওসব। আমাদের কাছে আসতে চায়, কাজ করে দিতে চায়। তবে আমিই বারণ করি। কী হবে অশান্তি এনে সংসারে? বন্যেরা বনে সুন্দর, মানুষ সুন্দর নিজের গণ্ডিতে।’
জিয়ানা বলল, ‘তা বাড়িতে যখন তোমরা দু’জন তখন বিয়ে করো একটা। বউ আসলে মায়ের একজন কম্প্যানিয়ান হবে। প্লাস বউ চাকরি করলে একটা এক্সট্রা হেল্পিং হ্যান্ডও হবে সংসারে। তাই বলছি যত তাড়াতাড়ি পারো একটা বউ এনে ফেলো।’
‘বিয়ে!’ রুহান বাচ্চাদের মতো হাসল আবার, ‘আমায় কে বিয়ে করবে? দুর! চালচুলো নেই। এত বয়স হল ঠিকমতো রোজগার হল না। ময়দানের ডাইনোসর ক্রিকেটার, ক্লাবও টাকা দেয় না ঠিকমতো। বউদি, আমি সব জায়গা থেকেই প্রায় বাতিল। আমায় আর কে বিয়ে করবে? আর তা ছাড়া আমি ওসব স্বপ্ন দেখি না আর। কারণ দুঃস্বপ্ন দেখতে কারই বা ভাল লাগে?’
জিয়ানা হাসল, ‘আচ্ছা ড্রাইভারটা কোথায় গেল বলো তো?’
‘বাথরুম গেছে। ওই পাম্পের পিছন দিকে একটা বাথরুম আছে।’
‘ও!’ জিয়ানা ব্যাগ খুলে চুইংগাম বের করে রুহানকে দিল। তারপর বলল, ‘তা প্রেম তো করতে পারো। তুমি না হয় সেল্ফ প্রোক্লেমড বাতিল ছেলে। কিন্তু জানো তো, মেয়েরা প্রেমে পড়লে আর ওসব দেখে না। জাস্ট অন্ধের মতো ভালবাসাটাই শুধু দেখে।’
‘তাই?’ রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘তাই’ শব্দটা তিরের মতো এসে গেঁথে গেল জিয়ানার শরীরে। সত্যিই কি মেয়েরা প্রেমে পড়লে ভালবাসা ছাড়া আর কিছু দেখে না? তা হলে কি কিগানকে ভালবাসেনি ও? নেহাত মায়ের কথায় এমন করে কিগানকে যে ছেড়ে দিল, তার মানে কি এই যে, ও কিগানের প্রেমে পড়েনি? হ্যাঁ, মা অনেক মানসিক অত্যাচার করেছিল। কোথাও হয়তো বাবারও মায়ের ব্যবহারের দিকটায় নিঃশব্দ সমর্থন ছিল। তা বলেই ও একদম সাত দিনের মধ্যে কিগানকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল জীবন থেকে? এই যে রুহানকে মেয়েদের প্রেম নিয়ে যা বলল তা কি এখনকার সন্ধের বাংলা সিরিয়ালগুলোর থেকে ধার নিয়ে বলার মতো হয়ে গেল খানিকটা? এটা কি শুধুমাত্র বলার জন্য বলল জিয়ানা?
রুহান বলল, ‘আমার একটা প্রেম ছিল বউদি। নন্দা নাম মেয়েটার। তবে এখন আর নেই। ওর একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। কলকাতাতেও থাকে না আর। তবে কোথায় থাকে তা আমি জানি না।’
জিয়ানা দেখল রুহান মাথাটা নিচু করে রেখেছে। হয়তো পুরনো কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। জিয়ানা একটা জিনিস লক্ষ করে দেখেছে যে, স্মৃতি অধিকাংশ সময়ই মানুষকে ডিপ্রেস্ড করে দেয়। হয়তো কোনও কথা মনে করে হালকা হাসি এল, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না বিশেষ। কারণ, তার পিছনেই কষ্ট দুঃখগুলো সিঁদ কেটে ঢুকে পড়ে। কে যে বলেছিল স্মৃতি সততই সুখের! এর মতো দুঃখজনক ব্যাপার খুব কমই আছে।
রুহান বলল, ‘যাক গে, আর ভেবে কী হবে? যা হওয়ার হয়েছে।’
জিয়ানা ঘড়ি দেখল আবার। বলল, ‘সেকেন্ড হাফ হয়ে যাবে চাপাডাঙা পৌঁছোতে। কী জানি আজ আদৌ কাজটা হবে কি না!’
ললিতেরও আজকে আসার কথা ছিল, কিন্তু অন্য কাজ পড়ে যাওয়ায় আর আসতে পারেনি। খুরানা স্যার তো গতকাল বলেওছিলেন, ‘তোমায় আর যেতে হবে না জিয়ানা। অনুজ বা শালিনীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এমনিতেই এমন শরীর খারাপ থেকে উঠলে, তার মধ্যে এসব নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ো না।’
তবু জিয়ানা শোনেনি। খুরানা স্যার সেই সরস্বতী পুজোর সময় এই কাজটাকে একটু গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন। নামও বলে এসেছিলেন কনট্যাক্ট পার্সনের। কিন্তু কাজ তেমন এগোয়নি। ওদের মিজোরামের প্রজেক্টের ব্যাপারে একটা গন্ডগোল হয়েছিল। জিয়ানা সরস্বতী পুজোর পর সেই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আর তার পরেই তো হঠাৎ জন্ডিসে পড়ল।
ইতিমধ্যে ললিত কনসালট্যান্টদের সঙ্গে দু’-তিনবার মিটিং করেছে। তারা টেকনিক্যাল ডেটায় বদল ঘটিয়েছে কিছুটা। সেই ডেটাগুলো কালেক্ট করে এবার আবার অফার দিতে হবে জিয়ানাদের। সঙ্গে ড্রইং। পাইপিং অ্যান্ড ইন্সট্রুমেনটেশন ড্রয়িং, লেআউট আর ফ্লো ডায়াগ্রাম।
কিন্তু ড্রইং দিতে গেলে একবার জায়গাটা তো চাক্ষুস করতে হবে। কনসালট্যান্টরা একটা টোপোগ্রাফির ড্রইং আর সয়েল টেস্টিং রিপোর্ট দিয়েছে। তবু একবার চাক্ষুস দেখা দরকার। এইসব নানা কারণেই জিয়ানা আজ এসেছে এখানে। আর যদি কোনও দরকার পড়ে, তাই সঙ্গে রুহানকেও রেখেছে। কাজটা নিয়ে ওয়াটারবার্ডও খুব চেষ্টা করছে। তাই জিয়ানাদের এখন থেকেই কোমর কষতে হবে।
ড্রাইভারটা এসে পড়ায় জিয়ানা আর কথা বাড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে এটাও দেখল যে, রুহানও কেমন যেন গুটিয়ে নিল নিজেকে।
বৃষ্টিটা কমেছে একটু। তাই আশপাশটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে আরও। পাশে, সিটের ওপর ফাইল পড়ে আছে প্রজেক্টের। তার ওপর মোবাইলটা রাখা। জিয়ানা দেখল মোবাইলটা কাঁপছে। মায়ের নম্বর। বিরক্ত লাগল জিয়ানার। মা বড্ড বেশি জীবনে ঢুকে পড়ছে আজকাল। অনেকটা সেই কলেজ জীবনের মতো। আসলে যত দিন বিদেশে ছিল, মা ফোন করলেও যেহেতু চট করে ওর কাছে চলে যেতে পারত না, সেহেতু এতটা ইন্টারফেয়ার করত না জীবনে। কিন্তু এখন মা চলে আসতে পারে। আর জন্ডিসের সময় তো মা কিছুদিন ছিলও বাড়িতে। ফলে পুরনো মা-টা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। কিন্তু মা তো! কী করবে জিয়ানা? যতই রাগ হোক। একটা ভালবাসাও তো আছে!
‘হ্যালো?’ জিয়ানা ফোনটা ধরল।
‘কোথায় তুই?’ মায়ের গলায় উদ্বেগ।
‘রাস্তায়। চাপাডাঙা যাচ্ছি, কেন?’ জিয়ানা বলল।
‘চাপাডাঙা? কোথায় সেটা?’ মায়ের উদ্বেগ যেন বাড়ল।
‘নর্থ চব্বিশ পরগনা।’
‘সে কী! অত দূর!’ মা আঁতকে উঠল, ‘কীসে যাচ্ছিস? ট্রেনে?’
‘ট্রেনে? কেন, ট্রেনে যাব কেন? অফিসের গাড়ি আছে তো!’
‘আর খেয়েছিস? ভাল করে খেয়েছিস তো? ওষুধ খাচ্ছিস তো?’
‘হ্যাঁ মা,’ জিয়ানার এবার হাসি পেল। সত্যিই এমন করছে মা যেন ও তুতুলের বয়সি! যেন ওকে সব কিছু করে দিতে হয়!
‘ঠিক করে ওষুধ খাস মিষ্টি। খুব কঠিন অসুখ থেকে উঠেছিস। এমন করিস না।’
‘এমন করিস না, মানে?’ জিয়ানা যথাসম্ভব চাপা গলায় বলল।
‘মানে হুটহাট করে অমন দূরে যাস না। গাড়িতে গেলেও শরীরের ওপর চাপটা তো পড়ে! অত চাপ নিস না। জানবি, শরীর ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে। শরীর বাদ দিয়ে কিন্তু কিচ্ছু হবে না।’
‘জানি মা, জানি,’ জিয়ানা নিজেকে সংযত করল। মা বরাবর এমন সময়ে এমন কথা বলে যে, নেওয়া যায় না। টাইমিং এত খারাপ মায়ের!
‘জানলে এত দূর যেতিস তুই?’ মা রাগ করল, ‘তুই কী ভেবেছিস? বড় হয়ে গেছিস? ডাক্তার বলেছেন না যতটা সম্ভব রেস্ট নিতে?’
‘আরে, তুমি চিন্তা করছ কেন?’ জিয়ানা বলল, ‘আমি গাড়িতে চুপ করেই বসে আছি। রাস্তাও খুব ভাল। ফলে কোনও অসুবিধে নেই। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছ! এমনিতেই হাই প্রেশার তোমার। কেন ফালতু মাথা ঘামাচ্ছ এই নিয়ে? এমন ভেবো না। প্লিজ।’
‘ফালতু মানে?’ মা একটু রেগে গেল, ‘সামনে তোকে বাচ্চা নিতে হবে একটা, তার জন্য শরীরটা সুস্থ করে তুলতে হবে না তাড়াতাড়ি?’
‘মানে?’ জিয়ানা অনেক কষ্টে গলার স্বর সংযত রাখল। গাড়ির ভেতরটা বেশ নির্জন। এই জায়গাটা এসব কথা বলার জন্য একদম উপযুক্ত নয়। কিন্তু কে বোঝাবে কাকে? মা যে কেন বোঝে না এসব!
‘মানে,তুতুলের একটা ভাই হওয়া খুব প্রয়োজন। না হলে ও কেমন ভায়োলেন্ট আর একাচোরা হয়ে যাচ্ছে! তোরা যত দ্রুত সম্ভব আর একটা ইসু নে। বুঝেছিস?’
‘মা, কেমন করে এসব বলছ তুমি? আমি তো বলেছি আর না।’
‘তুই ‘না’ বললেই হবে? আমরা আর কতদিন বাঁচব বল? এটা একটা অনুরোধ ধরে নে আমার…মানে আমাদের আর কী? তোর বাপিও তো…’
‘মা প্লিজ, ডোন্ট স্টার্ট ইট অল ওভার আগেন। বাপির নাম দিয়ে আর না। প্লিজ, আর না। অনেক হয়েছে। আমরা অনেক দেখেছি। আর এমন কোরো না।’
‘ও, বাপির নাম দিয়ে বলছি? তোর তাই মনে হয়? শোন মিষ্টি, আমি চাই না আমাদের মতো তোকেও কষ্ট পেতে হোক। দিদির ঘটনা ভুলে গেলি? দুটো সন্তান থাকা কতটা জরুরি জানিস না? এমন করে বলছিস তুই যেন আমরা তোকে মেরে ফেলছি। আমার কথা শোন মিষ্টি। শরীরটা তাড়াতাড়ি সুস্থ করে নে। তারপর…’
‘আমায় রাখতে হবে মা। অফিস থেকে একটা ফোন আসছে। পরে কথা বলছি,’ জিয়ানা মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কেটে দিল ফোনটা। ও জানে মায়ের এই কথা সহজে ফুরোবে না। আর বেশি বললে ওরও মাথা গরম হয়ে যাবে।
‘মিষ্টির দিদি মিঠি। টু সুইট, না?’ দিদি বলত। দিদি বলত আর হাসত। গালে লম্বা লম্বা দুটো টোল জেগে উঠত। বড় বড় চোখ দুটো চকচক করে উঠত। দিদিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত জিয়ানা। এত সুন্দর কী করে দেখতে হয় কোনও মানুষ! পাশাপাশি বড় হয়ে উঠলেও কোনওদিন দিদির প্রতি কোনওরকম হিংসে বা প্রতিযোগিতা অনুভব করেনি জিয়ানা। বরং মনে হত সমান সমান নয়, বেশিটা দিদিরই প্রাপ্য। অত সুন্দর, নরম স্বভাবের কোনও মানুষকে তো সত্যিই নিজের ভাগটাও ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে।
আর সত্যি বলতে কী, জিয়ানার একমাত্র বন্ধু ছিল দিদিই। ভালটা-মন্দটা সবই ও দিদির কাছে এসে বলত। ক্লাস সিক্সের একটা ঘটনা এখনও মনে আছে ওর। সেদিনও এমন আকাশভাঙা বৃষ্টি হয়েছিল।
বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে একটু গম্ভীর হয়েছিল জিয়ানা। দিদিকে বলবে কী বলবে না ভাবছিল ব্যাপারটা। গম্ভীর মুখে টিফিন করে ও বসেছিল ওদের বারান্দায়। কথা বলছিল না বিশেষ।
দিদি গান গাইছিল বসার ঘরে হারমোনিয়াম টেনে। রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দিদির সঙ্গে গান গাইতে বসত জিয়ানা। কিন্তু সেদিন বসেনি। তাই দিদিরও হয়তো মনে হয়েছিল কিছু। আর ক্লাস টুয়েলভের দিদি তো বরাবরই একটু পরিণত ছিল।
জিয়ানা হঠাৎ শুনেছিল সুরের গুঞ্জন থেমে গেল। তবে কি দিদি থামিয়ে দিল গান? দিক। ও তাও বসেছিল। ভাল লাগছিল না যে একদম। স্কুলে শোনা কথাগুলো বড্ড কষ্ট দিচ্ছিল যে!
হালকা চন্দনের গন্ধ পেয়েছিল জিয়ানা। তারপর শুনেছিল, ‘মিষ্টি, কী হয়েছে রে?’
জিয়ানা উত্তর করেনি। চুপ করে বসে ছিল শুধু।
দিদি পাশে এসে বড় হাতলবিহীন চেয়ারটায় বসে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে, ‘এই, কী হয়েছে তোর? এমন মুখ করে বসে আছিস কেন?’
‘কিছু না,’ জিয়ানা ঠোঁট চেপে বসেছিল।
‘সত্যি করে বল না,’ দিদি বলেছিল, ‘সত্যি করে মনের কষ্টটা বল। এমন মনখারাপ করে থাকতে নেই।’
‘দিদি,’ জিয়ানা ঘুরে বসেছিল সামান্য, ‘স্কুলের ওরা যা দেখাল সব সত্যি?’
‘কী দেখাল?’ দিদির গলায় অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল।
‘দাঁড়া।’ জিয়ানা উঠে স্কার্টের পকেট থেকে ছোট্ট একটা কাগজ বের করে এনেছিল, তারপর সেটা দিদির সামনে মেলে ধরে বলেছিল, ‘বাবা-মাও এমন করেছে?’
জিয়ানা এখনও দেখতে পায় ভয়ে আর লজ্জায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দিদির মুখ। জিয়ানার হাত থেকে ছোট্ট পৃষ্ঠাটা নিয়ে নিয়েছিল দিদি। রঙিন পাতলা ছবির বই থেকে ছিঁড়ে নেওয়া একটা পাতা। আর তার দুই দিকেই নানা মাপের রতিচিত্র, নানা ভঙ্গিমায় মিলনরত নরনারীর ছবি। ফোটোগ্রাফ। স্পষ্ট, আলোছায়ার কারিকুরিবিহীন, যৌনতার ক্ষুধার্ত ছবি।
‘এটা কে দিয়েছে তোকে?’ দিদি প্রায় তোতলাচ্ছিল।
‘আমায়? কেন, স্কুলের এক বন্ধু, ইন্দ্রাণী।’
‘ইন্দ্রাণী? মানে ওই ফরসা মতো মিষ্টি দেখতে মেয়েটা?’ দিদি যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, ‘ও তোকে এটা দিয়েছে? ক্লাস সিক্সে পড়ে আর এসব বই…কোথায় পেয়েছে ও?’
‘তা বলেনি। কিন্তু তুই বল এটা সত্যি যে, বাবা-মা এমন করেছে?’
‘কে বলেছে তোকে?’ দিদি এবার গলাটা শক্ত করেছিল।
‘ইন্দ্রাণী বলেছে। আমার একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু ইন্দ্রাণী ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে আমাকে। বলেছে সবার বাবা-মা-ই নাকি এমন করে। এমন করে দিদি? এমন অসভ্যতা করে? নোংরামো করে?’ কষ্টে, কান্নায় গলা বুজে আসছিল জিয়ানার।
‘আচ্ছা বল তো, সিনেমা তো দেখিস। সেখানে যা যা দেখায় তা সত্যি হয়?’ দিদি শান্ত গলায় বলেছিল, ‘হয়, যে একটা মানুষ একাই কুড়িজনকে মেরে শুইয়ে দিচ্ছে?’
‘না। ওটা তো বানানো,’ জিয়ানা বুঝতে পারছিল না দিদি কী বলতে চাইছে।
‘তেমনই এটাও বানানো। এমনভাবে কিছু হয় না। ইন্দ্রাণী তোকে ভুল বলেছে।’
‘কিন্তু ও যে ‘আপন গড’ বলল। বলল, এভাবেই আমরা মায়ের পেটের ভেতর ঢুকে আস্তে আস্তে বড় হই। সেটা? ‘আপন গড’ বলে কেউ মিথ্যে বলে? বল?’
‘না। কিন্তু ও তো ভুলটাকে ঠিক ভেবে আপন গড বলেছে। আর মিষ্টি শোন, যেভাবে আমরা মায়ের পেটের ভেতর জন্ম নিই সেটা এমনভাবে নয়। আরও সুন্দরভাবে। কিন্তু সেটা বললে তুই ঠিক বুঝতে পারবি না এখন। জাস্ট মনে রাখ এমনভাবে মারামারি বাবা-মায়েরা করে না।’
কিন্তু জিয়ানা ছাড়েনি। বলেছিল, ‘কেন বুঝতে পারব না? নিশ্চয়ই বুঝতে পারব। তুই বলে দেখ, আমি শিয়োর বুঝতে পারব।’
‘পারবি?’ দিদি হেসেছিল। পৃথিবীর সেই সবচেয়ে সুন্দর হাসি।
‘হ্যাঁ। তুই বলে দেখ।’
‘বাসাংসি জির্ণানি যথা বিহায়। বল তো, এটার মানে কী?’ দিদি ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘বল, আমি দেখি এটা তুই বুঝতে পারলি কি না!’
‘কী মানে এটার? আমি বুঝতে পারছি না। এটা তো স্যানস্ক্রিট। এটা চিটিং কিন্তু।’
‘না, চিটিং নয়। আমি কী বলছি শোন। এখনও সব কিছু বোঝার মতো বয়স তোর হয়নি। একটা ঘটনার নানারকম ব্যাখ্যা হয়। কিন্তু তার মানে সবটাই ঠিক ব্যাখ্যা তা কিন্তু নয়। তাই বলছি, ইন্দ্রাণী তো তোরই বয়সি, ও তোর মতোই ছোট। সব এখনও বোঝার বয়স ওর হয়নি। তাই বলছি যে, বড় হ, সব জানতে পারবি। আর দে, ছবিটা ফেলে দে।’
দিদি ছবিটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সামনের ড্রেনে। তারপর বলেছিল, ‘যে কথা তোর জীবনকে নষ্ট করে দেয়, হাসি কেড়ে নেয়, সেই কথা শোনার কোনও দরকার নেই। এরপর ইন্দ্রাণী তোকে এমন কিছু বললে তুই আমার ক্লাসে নিয়ে আসবি। কেমন? আর এই নিয়ে একদম মনখারাপ করবি না। এখন চল গান গাইবি আমার সঙ্গে। একা থাকবি না।’
‘বাসাংসি জির্ণানি যথা বিহায়।’ পরে, বছর দুয়েক পরে মানেটা জেনেছিল জিয়ানা। গীতাপাঠ হচ্ছিল বাড়িতে। তখন যিনি পাঠ করছিলেন, তিনি ব্যাখ্যা করতে করতে বলেছিলেন এর অর্থ। তবে সেদিন জিয়ানার পাশে দিদি আর ছিল না। দিদি সামনে, সাদা ফুল দিয়ে সাজানো টেবিলের ওপর মালা পরে ছিল ছবি হয়ে। ছবির মধ্যে থেকে দিদি হাসছিল জিয়ানার দিকে তাকিয়ে। যেন বলছিল, ‘বলেছিলাম না মিষ্টি, বড় হলে জানতে পারবি এর মানে।’
ক্লাস এইটের জিয়ানা দিদির ছবির দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল, সত্যিই কি জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল বাসস্থান, যে দিদি চলে গেল তা ছেড়ে! জিয়ানা বড় হয়ে গিয়েছিল সেদিন। সেই বৃষ্টির বারান্দা থেকে দূরে, চন্দনের গন্ধের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে, জিয়ানা বুঝেছিল আর কোনও দিদি নেই যে পাশে এসে বসবে ওর। যার মনখারাপ হবে ওর মনখারাপে। বুঝেছিল বাদবাকি জীবন গানটা গাইতে হবে একা একাই।
চাপাডাঙায় ফ্যাক্টরিতে যখন ওরা পৌঁছোল, বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু আকাশটা কালো হয়ে আছে এখনও। ওই পেট্রোল পাম্প থেকে এই ফ্যাক্টরি অবধি মোটামুটি তাড়াতাড়িই পৌঁছেছে ওরা। হাবরা স্টেশন আর হাবরা বাজার অঞ্চলটায় ভিড় আর ট্র্যাফিক ছিল বেশ। সেটুকু পার করে চোংদার পর থেকে গাড়ি আবার খুব মসৃণ আর দ্রুত এসেছে। এই দিকটা যে এত সুন্দর তা আগে বুঝতে পারেনি জিয়ানা।
ফ্যাক্টরির গেটটা খোলা ছিল না। ওরা হর্ন দিতেই দারোয়ান এগিয়ে এল। আগে থেকেই সিকিয়োরিটিকে বলা ছিল যে, ওরা আসবে। তবে মিস্টার ব্যানার্জি বলে যে ইনচার্জ রয়েছেন তাঁর সঙ্গে কথা হয়নি। সিকিয়োরিটির হেড গুরুং বেরিয়ে এসে জিয়ানার আইডি দেখে গেটটা খুলে দিতে বলল।
গাড়িটা ধনুকের মতো বাঁকা কালো রাস্তা দিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে।
‘নমস্কার, আমি শশী হালদার,’ জিয়ানা গাড়ি থেকে বেরোতেই একটা লোক এগিয়ে এল, ‘আপনি ভেতরের ঘরে বসুন। ব্যানার্জিবাবু আসবেন। এই সামনে যে অফিস তার ডান দিকের ওই নীল রঙের দরজাটা। বসুন আপনি।’
ফ্যাক্টরিটা বেশ বড়। এরা যে এক্সপানশন করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু জমি নিয়ে কী একটা ঝামেলা আছে, তাই নাকি ঠিকমতো কাজ এগোচ্ছে না। তাই এতদিন এই প্রজেক্টটা উইথহেল্ড ছিল। কিন্তু এখন এদের এমডি গৌর রওশন দিওয়ানের সঙ্গে খুরানা সাহেবের কথা হয়েছে। ওরা নাকি কিছু পজিটিভ ইঙ্গিত পেয়েছে, যার ফলে ওরা আর কাজটা ঝুলিয়ে রাখতে চায় না। তাই ওরা যে-কনসালটেন্সি ফার্মকে কাজে নিযুক্ত করেছে তারা আবার কাজটা নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অফিসটা খুব একটা বড় নয়। অফিসের টেবিলে ফাইল, কাগজ আর পেনের গোছার ভেতর একটা ক্যামেরা আর মাউথঅর্গান পড়ে আছে। অবাক লাগল জিয়ানার। এ কেমন মানুষ রে বাবা! অফিসে কেউ এসব এনে রাখে? জিয়ানা সামনে রাখা দুটো চেয়ারের একটায় বসল। কখন এই ব্যানার্জি আসবে কে জানে!
ফোনটা বাজল হঠাৎ। না, কল নয়, মেসেজ এসেছে। দেখল জিয়ানা। ‘সামনের মানডে প্লিজ ফাঁকা রেখো। গোল্ডিজ-এ একবার তোমায় নিয়ে যাবই। প্লিজ।’ হাসি পেল জিয়ানার। মালিনীটা পাগলি একদম। এই মার্চেন্ট মাল্টিপল্সেই রয়েছে। তবে তার সঙ্গে এই ওল্ড এজ হোম নিয়েও ওর খুব উৎসাহ। অনেকবার বলেছে ওদের হোমে যেতে। কিন্তু সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই এখনও পর্যন্ত হয়নি জিয়ানার। আসলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আলাপ হওয়া কারও সঙ্গে ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া অবধি ঠিক আছে। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। তাই প্রতিবারই মালিনীকে ছুতোনাতায় কাটিয়ে দিয়েছে ও। এই রোববারও তাই দেবে।
হঠাৎ পায়ের আওয়াজে সচকিত হল জিয়ানা। সঙ্গে ঘরের এক পাল্লার দরজাটার নব ঘোরানোর শব্দও পেল। ও নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। সোজা হয়ে বসল। বুঝল কে এ ব্যানার্জি এসেছে। তবে পিছনে তাকাল না। সচেতনভাবেই তাকাল না।
দরজাটা খুলল। পায়ের শব্দটা ভেতরে এল। তারপর বন্ধ হয়ে গেল দরজা আবার। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হল সব। পায়ের শব্দটা থেমে আছে। তবে কি জিয়ানার একবার পিছন ঘুরে দেখা উচিত? ও ইতস্তত করে ঘুরতে গিয়েও পাথর হয়ে গেল নিমেষের জন্য।
বহু বহু জন্মের ওপার থেকে যেন ভেসে আসছে শব্দ। যেন বহু দিন পর নির্জন গুহামুখ ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে ঝরনা। মেঘ থেকে যেন বহু দিন পরে নেমে আসছে বৃষ্টি।
‘কেমন আছিস?’
কেমন থাকে প্রিয় মানুষকে ছেড়ে থাকা মানুষ? ঘুমের মধ্যে পাহাড়ি পথে মিলিয়ে যাওয়া সাইকেল যে আসলে মিলিয়ে যায় না! শরীরের ভেতর সেই রোগা সাইকেলের দাগ বয়ে বেড়ানো মানুষ কেমন থাকে? কতটা কষ্ট পেলে সে একলা হয়ে যায়?
পায়ের শব্দটা পিছন থেকে সামনে এসে থামল এবার। নাকি এক দশকের ওপার থেকে এই সময়ে এসে থামল? জিয়ানা অবশ মাথাটা তুলে তাকাল সামনে। দেখল কে এ ব্যানার্জিকে। সেই একই রকম লম্বা, একই এলোমেলো চুল। দাড়িগোঁফ কামানো। আর একই রকম সেই নীল রঙের চোখ। জিয়ানা দেখল কিগান অর্ক ব্যানার্জি হাসছে। হালকা, তুলোর মতো এক হাসি।
জিয়ানা দেখল, দেখতে থাকল। আর ওর বুকের ভেতর থেকে উড়তে থাকল পায়রা। অসংখ্য সাদা-ধূসর সব পায়রা। জিয়ানা বুঝল ওর চোখের মাটি ভিজে উঠছে আবার। বুঝল ওর ভেতরের বর্ষাকাল আর এ জীবনে শেষ হওয়ার নয়।
Chapter - 17
১৭
লম্বা রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে লেকে। আর তার ধারে সরু কাঠের একটা জেটি চলে গেছে জলের অনেকটা ভেতরে। আর সেই জেটির ধারে বসে কে যেন ছিপ ফেলে রয়েছে জলে। তার পাশে নীল বাস্কেট। ভেতরে অদ্ভুত দেখতে একটা মাছ। জলের ধারে একটা বাড়িও রয়েছে। তার পাথরের দেওয়াল। কাঠের ছাদ আর তার ওপর চৌকো একটা পাথরের চিমনি। গোল্লা গোল্লা ধূসর কাবলি বিড়ালের মতো ধোঁয়া বেরোচ্ছে চিমনি দিয়ে। আর ধোঁয়াগুলো উড়তে উড়তে যেখানে গিয়ে শেষ হচ্ছে, সেখানে সার সার চেরি গাছ। লাল হয়ে আছে তারা। আর ওইটা? ওইটা কে? কে ওই চেরি গাছের সারির পাশে সবুজ বেঞ্চটায় বসে রয়েছে! কে ওটা? ওই তো লাল রঙের জামা আর পার্পল ছাতা মাথায়। কে বসে আছে ও? কে লুকিয়ে রেখেছে মুখ? ঢাকা দিয়ে রেখেছে মুখটা? এক পা-দু’পা করে এগোচ্ছে ও। জলের ওপর দিয়ে বয়ে আসা হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল। তবুও এগোচ্ছে ও। চেরি গাছগুলো নড়ছে খুব। গোল্লা গোল্লা ধোঁয়া ভেঙে যাচ্ছে আকাশে। আর লোকটা বসে রয়েছে মূর্তির মতো।
পার্পল রঙের ছাতার একদম পিছনটায় গিয়ে দাঁড়াল ও। তারপর ধীরে, খুব ধীরে হাতটা দিয়ে ছাতার তলা দিয়ে বাঁ কাঁধটা ধরল। আর সঙ্গে সঙ্গে নড়ে বসল ছাতাটা। সে ঘুরল পিছন দিকে। আর ও দেখল…এ কী! এ যে দিঘি! দিঘি? দিঘি কী করছে এখানে? ও জিজ্ঞেস করতে চাইল কেন এসেছ তুমি দিঘি? কী চাও? কেন? কেন? আমি তো চলে এসেছি। আমি তো আর যাব না তোমার সামনে। আর কখনও এ মুখ দেখাব না তোমায়। আর কোনওদিন…কিন্তু দিঘি মুখ খুলল। কিছু বলবে কি দিঘি? বলছে, ওই তো বলছে দিঘি। দিঘি বলল, কিন্তু কথা কই? এ তো শব্দ। অদ্ভুত ধাতব সুরেলা শব্দ, ক্রমশ বাড়ছে। দিঘি মুখ খুলল আর শব্দটা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সুরেলা ধাতব একটা শব্দ বাড়তে লাগল। তীব্র হতে হতে আচমকা যেন কর্কশ হয়ে গেল। আর চোখ কুঁচকে ঘুম ভেঙে তাকাল কিগান।
ফোনটা বালিশের পাশে পড়ে হিসু করে শুয়ে থাকা বাচ্চার মতো চেঁচাচ্ছে। তীব্র বিরক্তির সঙ্গে ফোনটার দিকে তাকাল কিগান। খুব চোখ জ্বালা করছে। ঘুমটা যে সম্পূর্ণ হয়নি। তার ওপর এমন একটা মুখ দেখল যে এখনও মাথাটা কেমন টালুমালু করছে। এত স্পষ্ট করে দিঘিকে দেখল কেন ও? বুকে যে কী কষ্ট হচ্ছে কিগানের! আর ছোটবেলার সব কিছুর ভেতরে হঠাৎ দিঘি এসে যোগ হল কেন? কার জন্য এল দিঘি তাও অমন একটা ছাতা মাথায়?
চোখ কুঁচকে ফোনটা তুলল কিগান। অচেনা নম্বর। কিন্তু ধরার আগেই কেটে গেল ফোনটা। ওয়ান মিস্ড কল। কিগান বিরক্ত মুখে বোতাম টিপে নম্বরটা দেখল। অচেনা নম্বর। কার হতে পারে? ভাবতে ভাবতেই কট করে চোখে লাগল কিগানের, কম ঘুমের লক্ষণ। ইস ফোনটা সাইলেন্ট করে শুলে ঘুমটাও হত আর দিঘি কী বলতে চাইছিল তাও জানতে পারত! ও আবার পাশ ফিরল। আর তখনই খেয়াল হল পায়ের থেকে মোজাটাও খোলা হয়নি।
কোনওমতে উঠে বসল কিগান। ঘরটা দোতলায় বলে সারা দিন সরাসরি রোদ পায়। খুব তেতে থাকে ছাদ আর দেওয়াল। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে তাই সবার আগে জানলাগুলো খুলে দেয় ও। কিন্তু আজ তাও পারেনি। শুধু জুতোটা খুলেছিল মনে আছে। আর কিচ্ছু মনে নেই। আচ্ছা, দরজাটা বন্ধ করেছিল তো? আসলে এখন আর সর্বক্ষণের ছেলেটা থাকে না। বেশ কিছুদিন আগে ও কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।
ঘরের আলোটা নেভানো রয়েছে, শুধু ফ্যানটা চলছে। তবু গায়ের জামাটা খোলা হয়নি বলেই হয়তো একদম ঘেমে জল হয়ে আছে ও। এখন মে মাসের মাঝামাঝি। গোটা পৃথিবী যেন তেলে ফুটছে। ক’টা বাজে এখন?
মোবাইলটা তুলে সময় দেখল কিগান। আটটা বারো। সন্ধে! মানে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছে মাত্র! তাই শরীরটা এমন ছেড়ে দিচ্ছে আর চোখটা টানছে! ব্যথা করছে! আবার পাশ ফিরল কিগান। গত দু’দিন, দু’রাত সম্পূর্ণ জাগা। তার ওপর পরিশ্রম। শরীর তো, যন্ত্র তো নয়!
গত পরশুদিন বিকেলে হঠাৎ করে বয়লারটা বসে গিয়েছিল। ব্যস, কেলেঙ্কারি। স্টিম ছাড়া ওদের প্রোডাকশন অচল। তাই সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর তার মধ্যে আরও কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল শশীবাবু। সে প্যানিক করে গৌরের অফিসে ফোন করে বসেছিল। ব্যস, আর কী! গৌর তো একদম ফোন করে, চিৎকার করে, একশা কাণ্ড করেছিল। আর জেনারেল ম্যানেজার স্যাম ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল ফ্যাক্টরিতে।
আসলে বয়লারের প্রাণ হল জল। আর সেটা ট্রিট করে বিশুদ্ধ করে ডিমিনারালাইজেশন প্লান্ট। এর সাহায্যে জলের সমস্ত সল্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন আর হাইড্রক্সিল অণু দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়। আর এই অতিবিশুদ্ধ জল ব্যবহার করা হয় বয়লারে।
গত মাস দুয়েক ধরে ডিমিনারালাইজেশন বা ডি এম প্ল্যান্টটা গড়বড় করছিল। সেই কথা বেশ কয়েকবার স্যাম আর গৌরকে জানিয়েছে কিগান। কিন্তু ওরা পাত্তাই দেয়নি। বরং বলেছে যে-প্ল্যান্টের নাকি মেনটেনেন্স ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। আসলে কম দামে একটা ফালতু পার্টির থেকে প্ল্যান্ট কিনেছে গৌর। তখন তো আর কিগান এই ফ্যাক্টরিতে আসেনি। তখন ও কলকাতায়। আর কেনার সময় থেকে নানারকম সমস্যা করছে প্ল্যান্টটা। আজ ভাল্ভ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কাল শেলের ভেতরের রাবার লাইনিং ফুলে উঠছে। পরশুদিন রেজিন ট্র্যাপ ছিঁড়ে অর্ধেক রেজিন ড্রেনে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর গত দু’মাসে তো অ্যাসিড ফিউম লেগে শেলের গায়ের লোহা খয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেতাই কাণ্ড। কতবার কিগান বলেছে ফিউম অ্যাবজরবারের বন্দোবস্ত করতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? আর গত পরশু যেই বয়লার বসে গেছে অমনি সবাই একদম দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে!
এত অল্প সময়ে কোন কোম্পানি থেকে লোক পাঠাবে? কেউ তো আর বসে নেই যে, কখন মার্চেন্ট মাল্টিপল্স-এর ডি এম প্ল্যান্ট বসে যাবে আর ছুটে গিয়ে তা রিপেয়ার করে দেবে!
স্যামের তো মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল। কিগানকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড বস? তুমি থাকতে এমন হল কী করে?’
কিগান অবাক হয়েছিল খুব। আরে, ও কি অরণ্যদেব নাকি? অত টাকা নিয়ে কিপটেমো করলে প্ল্যান্ট তো বসে যাবেই। কিন্তু কিগান জানত এখন এসব কথা বলার সময় নয়। আসলে, সমস্যার সময় আরও সমস্যার কথা বললে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে দেয়।
কিগান বলেছিল, ‘স্যার, এভাবে যে প্ল্যান্ট বসে যাবে তা আমি আগেই বলেছিলাম। কিন্তু সে কথা পরে। এখন কী করা যায় সেটাই দেখতে হবে।’
‘আমি জানি। গৌর ইজ সো স্টাবর্ন। আমিও বলেছি। কিন্তু ওর ওয়ান পাইস ফাদার মাদার। যাক গে,’ স্যাম বিরক্তিতে মাথা নেড়েছিল, ‘এখন কী করতে হবে বলো। এগজ্যাক্টলি কী হয়েছে?’
‘স্যার, আমি দেখলাম যে, ক্যাটায়ন ইউনিটটার বেড প্লেটের স্ট্রেনার ভেঙে গেছে আর সেখান দিয়ে রেজিন বেরিয়ে গোটা পাইপলাইন আর ওয়াটার মিটার পুরো জ্যাম করে দিয়েছে। দিন তিনেকের কাজ।’
‘কী, দিন তিনেকের কাজ?’ স্যাম গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।
‘স্যার, পুরো পাইপ লাইন খুলে আটকে থাকা রেজিন ওয়াশ করে বের করতে হবে। ওয়াটার মিটারটা দেখতে হবে ঠিক আছে কি না। তারপর ক্যাটায়ন শেলটা খুলে বাকি রেজিন বের করে ভাঙা স্ট্রেনারগুলো বের করতে হবে। তার জায়গায় নতুন স্ট্রেনার লাগিয়ে তারপর আবার রেজিন চার্জ করতে হবে। তারপর পাইপ লাইন ফিক্সিংও রয়েছে। স্যার, ইট উইল টেক টাইম।’ কিগান মাথা নেড়েছিল। সময় যে লাগবে তা স্যামকে বোঝাবে কী করে?
স্যাম বলেছিল, ‘ম্যাক্সিমাম টু ডেজ আই ক্যান গিভ। শোনো, ডিপ্লয় অল ইয়োর স্ট্রেন্থ অ্যান্ড মেক ইট হ্যাপেন ইন টু ডেজ। প্রোডাকশনের কী লস হবে জানো?’
‘জানি স্যার।’ কিগান মাথা নামিয়ে চিন্তা করেছিল। তারপর বলেছিল, ‘ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করছি। দেখি কত তাড়াতাড়ি পারি।’
‘কত তাড়াতাড়ি নয় কিগান,’ স্যাম মাথা নেড়েছিল, ‘খুব তাড়াতাড়ি। মেক ইট ফাস্ট বয়ো।’
কিগান হেসেছিল। খুব তাড়াতাড়ি মানে? বেশ বড় এই ক্যাটায়ন ইউনিট। রেজিনও প্রায় দু’হাজার লিটার। চাট্টিখানি কথা নাকি? স্যাম টেকনিকাল লোক নয়, তাই বুঝতে পারছে না। কিন্তু কী বা করা যাবে? কিগান আর সময় নষ্ট করেনি। কাজে হাত দিয়েছিল।
ছ’জন লেবার আর কিগান নিজে। মোট সাতজন মিলে লেগে গিয়েছিল কাজে। স্যাম দাঁড়িয়েছিল প্রথমে। বলছিল, ‘আরও লোক লাগাও।’
হাসি পেয়েছিল কিগানের। আরে লোক লাগলেই কি আর কাজ তাড়াতাড়ি হয়? বরং মাঝে মাঝে বেশি লোক থাকলে জট লেগে যায়, আর কাজ হয় না। কিগান কিছু বলেনি। চুপ করে কাজে মন দিয়েছিল। প্যান্ট গুটিয়ে নিজেও রেঞ্চ হাতে নাটবোল্ট খোলায় মন দিয়েছিল।
কাজ এগোচ্ছিল ভালই কিন্তু হঠাৎ ক্যাটায়ন ইউনিটের একটা লেগ ভেঙে পড়ে গিয়েছিল আচমকা। আর অন্য লেগগুলোও কেমন আলগা হয়ে এসেছিল সিমেন্টের বেস থেকে। কিগানের মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাবে। একটার পর একটা সমস্যা। গৌর যদি ওর কথা শুনত! স্যাম পর্যন্ত মাথায় হাত দিয়ে পাশে পড়ে থাকা একটা মোটা পাইপের ওপর বসে পড়েছিল। কিগান বুঝেছিল কাজটা লম্বা হবে।
তা লম্বা হয়েছে কাজটা। দুটো রাত ধরে কাজ করেছে ওরা সবাই। প্রথম দিন স্যাম রাত দশটা অবধি ছিল। তারপর রণে ভঙ্গ দিয়েছে। কিন্তু কিগান তো আর পালাতে পারবে না। ওর সঙ্গের বিল্টু, নিতাই, জগারাও খাটছে যে! যখন যেমন বলেছে কিগান, তেমনই করেছে। ওদের ফেলে তো আর কিগান গিয়ে আরাম করতে পারে না। তাই সময়ে সময়ে চা-টিফিন, রাতের খাবার সব জোগাড় করেছে। শশীবাবু কিগানের কথামতো এনে দিয়েছে।
আর ছেলেগুলো তাদের চূড়ান্ত পরিশ্রম দিয়ে আজ বিকেল তিনটে নাগাদ শেষ করেছে কাজ। সবারই প্রায় হাত-পা কাঁপছে তখন। চোখ লাল। তবে আনন্দ প্রচুর। একসঙ্গে কাজ করে সফল হওয়ার মতো আনন্দও খুব কম আছে। ওরা শুধু কিগানকে আবদার করে বলেছে যে, একদিন পাঁঠার মাংস-ভাত খাওয়াতে হবে। কিগান সামনের বুধবারই খাওয়াবে কথা দিয়ে শশীবাবুকে সেইমতো নির্দেশও দিয়েছে।
ফোনটা বাজছে আবার। সেই একই অচেনা নম্বর। কে ফোন করছে? মাথাটা টলমল করছে কিগানের। ঘুম চায় শরীর। ফাটা মাটি যেভাবে জল চায়, শরীরও ঘুম চাইছে সেভাবে। কিগান ফোনটা ধরল না। বরং সুইচ টিপে রিংটা বন্ধ করে দিল। আবছা অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের আলোটা শুধু লাফাতে লাগল তিরতির করে। ও শুয়ে পড়ল আবার। ঘুম আসাটা খুব জরুরি। কিন্তু কিগান যা চায় তা আসে না সহজে। ঘুমও এল না। বরং মাথার মধ্যে ভিড় করতে লাগল হাজার চিন্তা। সমস্যা। আসলে সেদিন কাকু ফোন করেছিল যে!
কাকু, মানে আদির বাবা। প্রথম থেকেই যে কাকু ওকে পছন্দ করত না, সেটা ভালই বুঝতে পারত কিগান। সব কিছুতেই বাঁকা কথা বলত। আর ঠাকুরমা না থাকলে সামান্য ভুলেও চড়চাপড় দিত। কিছু বলত না কিগান। ঠাকুরমাকেও নালিশ করেনি কোনওদিন। কারণ, ও বুঝত এতে অশান্তি বাড়বে বই কমবে না। তবে যতটা সম্ভব নিজেকে গুটিয়ে নিত কিগান। তারপর ঠাকুরমা মারা গেল একদিন। স্বাভাবিক মৃত্যু। বয়স হয়েছিল তো অনেক। কিগানের সারা জীবনের ছায়াটা সরে গিয়েছিল। তবে সামলে নিয়েছিল কিগান। ছোটবেলাতেই তো মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল ওর।
ঠাকুরমার মৃত্যুর পর কিগান আরও সরে গিয়েছিল কাকা-কাকিমার থেকে। তবু কাকু আর কাকিমা ওকে যে-কোনও উপায়ে হেনস্থা করতে চাইত।
চারদিন আগের কথা। কিগান লাঞ্চ করছিল বসে। তখনই ফোনটা আসে। কিগান বলেছিল, ‘হ্যাঁ কাকু, বলো।’
কাকু স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, ‘কী রে কেমন আছিস?’
প্রশ্নটা খুব ভাল। কিন্তু উত্তরটা কেমন দেবে বুঝতে পারেনি কিগান। ও অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে, সত্যিই তো কেমন রয়েছে ও? এই প্রায় এক অজ্ঞাতবাসে কেমন আছে কিগান! ও সামান্য ভেবে, একটু অন্যমনস্কভাবে বলেছিল, ‘আমি আছি। চলছে।’
‘মানে?’ কাকুর গলায় বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছিল, ‘মানে? এ কেমন কথা?’
‘আমি ঠিক আছি কাকু,’ প্রশ্নটা যাতে আর না বাড়তে পারে তার জন্য একটা দায়সারা উত্তর দিয়েছিল কিগান।
‘ও!’ কাকু দম নিয়েছিল একটু। বলেছিল, ‘তা, কী ভাবলি তুই?’
কাকু এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে দেখে কিগানের ভাবতে অবাক লেগেছিল যে, এই মানুষটাই ওকে কেমন করে জুতো ছুড়ে মেরেছিল! কেমন অপমান করেছিল! আর সে-ই নিজের থেকে ফোন করেছে! কেন?
কিগান জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি আমার নম্বর পেলে কী করে?’
‘তুই ভুলে গেছিস যে, আমার ছেলে তোদের কোম্পানিতেই চাকরি করে। তোর নম্বর ও-ই দিয়েছে।’
‘ও আদি!’ নিজের মনেই বলেছিল কিগান।
আদি, কাকুর ছেলে। কিন্তু ওরও তো ভাই। সেই ছোট্ট, মিষ্টি, কোঁকড়া চুলের আদি। বায়নাবাজ, গম্ভীর আর রগচটা। তবে তলায় তলায় ভীষণ ছেলেমানুষ। জন্মের পর আদিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতাটা আজও মনে আছে কিগানের। তখন কিগানের বয়স অনেক কম ছিল তবু সেই দিনটা এখনও মনে আছে।
ঠাকুরমার সঙ্গে নার্সিংহোমে দেখতে গিয়েছিল ও। রোববার ছিল সেদিন। বাচ্চাদের দেখতে যেতে দেওয়ার দিন। নার্সিংহোমের লবিতে গিজগিজ করছিল লোক। ভয় লাগছিল কিগানের। ও চেপে ধরেছিল ঠাকুরমার হাত। মনে হচ্ছিল একবার যদি হারিয়ে যায়, তা হলে তো আর ফেরত আসতে পারবে না বাড়িতে। আর যে-ছোট্ট বাচ্চাটা এসেছে তাকেও দেখতে পারবে না।
তবু হারিয়ে যায়নি কিগান। লিফ্টের ভেতর শক্ত করে ধরে রেখেছিল ঠাকুরমার হাত। অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ আসছিল ঠাকুরমার শরীর থেকে। বহু দিনের চেনা সেই গন্ধ। বড় নির্ভরতার সেই গন্ধ।
তারপর আদিকে দেখেছিল কিগান। ছোট্ট বেবিকটে সাদা চাদরে মুড়ে রাখা হয়েছে ফরসা একটা বাচ্চাকে। কিগান অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। যেন, মোমের পুতুল। মোমের সূক্ষ্ম কাজ করা হাত-পা। মাথার চুলগুলো হালকা পশমের মতো। কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। কী সুন্দর দেখতে! কোত্থেকে এল এ? কে হয় ওর? ‘তোর ভাই। দেখ,’ ঠাকুরমা কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলেছিল।
ভাই? ওর ভাই? অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগান। ভাই ঘুমোচ্ছে। সামনে বহু দিনের পথ পাড়ি দিতে হবে, তাই ভাই ঘুমোচ্ছে। কিগান আলতো আঙুলে ছুঁয়েছিল ভাইয়ের গাল। বুঝেছিল আজ থেকে ও বড় হয়ে গেল। দাদা হয়ে গেল।
‘তা কিছু ভাবলি তুই? হ্যালো?’ কাকুর গলায় অধৈর্য।
‘হ্যাঁ,’ সংবিৎ ফিরে পেয়েছিল কিগান, ‘কী বলছিলে?’
‘আজকাল গাঁজা টাঁজা খাচ্ছিস নাকি?’ কাকু পুরনো ফর্মে ফিরছিল।
‘না, সরি। কী বিষয়ে ভাবব বলো তো?’
‘আরে সম্পত্তি বিষয়ে!’ কাকু অবাক হয়েছিল, ‘এমন করছিস যেন ভাজা মাছ উলটে খেতে জানিস না? আরে বাবা ওপরের তলাটা মা তোকে দানপত্র করে দিয়েছিল। সেটা এবার ফেরত দে!’
‘ও! ফেরত চাও ওটা?’ কিগান অবাক হয়েছিল বেশ।
ঠাকুরমা মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে যে-তলায় কিগান থাকত সেটা নিজের নাম থেকে দানপত্র করে দিয়ে গিয়েছিল কিগানের নামে। সেই নিয়ে কাকুর সঙ্গে বিস্তর অশান্তি হয়েছিল ঠাকুরমার। কিন্তু কাকু কিচ্ছু করতে পারেনি। ঠাকুরমা যা ভেবেছিল তার থেকে তাঁকে সরানো যায়নি। কাকু শুধু গজগজ করেছিল একা একা। সেই কাকু এখন সুযোগ পেয়েছে। আর ছাড়ে?
‘শোন কিগান,’ কাকু বলেছিল ‘ফেরত যে চাই তা তুই জানিস। দেখ, তোকে দয়া করে মা এনেছিল বাড়িতে। রেখেছিল। তুই যে দাদার ছেলে সে বিষয়েই আমার সংশয় আছে। অমন নীল রঙের চোখ দাদার ছিল না। যাই হোক, মা যা ভুল করেছে তা তুই শুধরে দে। আমি দানপত্র তৈরি করে নিয়েছি। এসে জাস্ট সই করে দিয়ে যা।’
‘কিন্তু ঠাকুরমা যে…’
‘শোন,’ কাকু কড়া হয়েছিল এবার, ‘মাথাগরম করাস না। তুই এখানে যা করে গেছিস তারপর তুই আর এই পাড়ায় ঢুকতে পারবি ভেবেছিস? তোর লজ্জা লাগবে না? যা বলছি চুপচাপ কর।’
কিগানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল, ‘কাকু, এমন বোলো না।’
‘বলব না মানে? শুয়োরের বাচ্চা,’ কাকু ফোনের ওপারে খেপে উঠেছিল আচমকা, ‘একটা রেপিস্ট তুই, একটা বানচোত। তুই আমায় চোখ গরম করছিস? নেহাত মেয়েটা পুলিশে যায়নি। গেলে তোর পিছনে না রুল দিত ওরা! বড় বড় কথা বলিস না।’
‘কাকু শোনো, আমি…’
‘চুপ কর,’ কাকু ধমক দিয়ে উঠেছিল, ‘যেমন আমার মা! বাহাত্তুরে ধরেছিল বুড়ির! না হলে তোর মতো একটা দোআঁশলাকে কেউ এমন করে নিয়ে আসে! সম্পত্তি দান করে?’
‘ঠাকুরমা সম্বন্ধে কোনও খারাপ কথা বলবে না,’ কিগান কেটে কেটে বলেছিল।
‘এঃ, খুব গায়ে লাগছে, না!’ কাকু বলেছিল, ‘বুড়ি আগে মরলে বাঁচা যেত। তোর মতো হারামির সঙ্গে আমায় কথা বলতে হত না!’
‘কাকু, ঠাকুরমাকে খারাপ কথা বোলো না।’ কিগানের রাগটা বাড়ছিল আচমকা।
‘দাঁড়া জানোয়ার, দিঘির বাপকে গিয়ে বলছি পুরোটা, তারপর তোর বন্দোবস্ত করছি।’
‘তোমার যা ইচ্ছে হয় কোরো,’ দুম করে ফোনটা কেটে দিয়েছিল কিগান।
জীবন একটা অন্ধকার টানেলের মতো। কখন যে শেষ হবে, কিগান জানে না। জানে না সেই অন্ধকার থেকে কখন ঝাঁপিয়ে পড়বে বুনো জন্তু। কাকুর মতো বুনো জন্তু।
জানে না। কিগান অনেক কিছুই জানে না। কেমন যেন একটা ধোঁয়ার ভেতর বেঁচে আছে ও। একরাশ প্রশ্ন দুলছে সামনে। তবে আজকাল কেমন যেন আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছে ও। যেন মনে হয়, যা হওয়ার হোক। মনে হয় আর কত খারাপ হবে ও দেখতে চায়।
নাঃ, আর ঘুম আসবে না। চোখটা বড্ড জ্বলছে! কিগান বিছানার ওপর উঠে বসল। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। ও উঠে ঘরের লাইটটা জ্বালাল। টেবিলে ওটা কী? আশ্চর্য হল কিগান। একটা থালায় কিছু রয়েছে ঢাকা দেওয়া। এ নিশ্চয়ই ওই রাহি পাগলির কাজ। কখন দিয়ে গেল? আগেই কি দিয়ে গিয়েছিল? ঘুম পেয়েছিল বলে লক্ষ করেনি? মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে কিগানের।
মেয়েটা যে কী করে না! কিগান ঢাকনা তুলে দেখল। পরোটা আর মাংস রাখা আছে। আশ্চর্য! এই গরমে কেউ এসব খেতে পারে? বললেই তো রাগ করবে! ও দেখল থালার তলায় একটা খাম।
খাম? হঠাৎ ভুরু কুঁচকে খামটা খুলল কিগান। চিঠি? বোঝো! হাসি পেল ওর। দেখল লেখা আছে, ‘তুমি খারাপ, তোমার বন্ধু আরও খারাপ।’
কিগান হাসল আরও মন খুলে। অনেকক্ষণ পর। না, আসলে অনেকদিন পর এভাবে হাসল কিগান।
রাহির এখন নতুন পাগলামি হচ্ছে ‘হেল্প আর্থ’। ওর বান্ধবী হোমির সঙ্গেও আলাপ আছে কিগানের। মেয়েটা ভাল। কথাও বলে ভাল। ও চায় ওদের সংস্থা ‘হেল্প আর্থ’-কে আরও ছড়িয়ে দিতে। রাহির মুখে শুনেছে যে, কলকাতায় গিয়ে ও কিছু ইয়ং ছেলেমেয়েকে বলে এসেছে এইখানে আসতে। যদিও এখনও কেউ আসেনি। তবে রাহির ধারণা ওরা আসবে। ঠিক আসবে। কিগান আর জানতে চায়নি কিছু। কারণ, তা হলে রাহি আরও বকবক করবে। আর এই সংস্থার জন্য অ্যাওয়্যারনেস বাড়াতে ওরা এই নর্থ চব্বিশ পরগনায় একটা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ করাতে চায়। নামকরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগনার একটা টিম নিয়ে।
সুধাদি ইচ্ছে করলেই এর বন্দোবস্ত করে দিতে পারে সহজে। কিন্তু রাহি তার আগে বলে বসেছে যে, ও নিজে প্লেয়ারদের সঙ্গে যোগাযোগের বন্দোবস্ত করবে।
‘কে বলেছিল তোকে এসব বলতে?’ কিগান সামান্য বিরক্ত হয়েছিল।
‘কেন তুমি হেল্প করবে না আমায়?’ রাহি টেবিলের ওপরে পড়ে থাকা সেই নতুন ঘড়িটা হাতে তুলে বলেছিল।
‘আমি?’ অবাক হয়েছিল কিগান, ‘আমার ভরসায় তুই বলেছিস যে, ম্যাচে প্লেয়ার আনবি, ম্যাচটা অর্গানাইজ করবি? আশ্চর্য!’
‘ঘড়িটা এখনও পরোনি কেন?’ রাহি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কথা ঘোরাস না রাহি। কেন এসবের ভেতরে ঢুকছিস?’
‘তোমার ভরসায়,’ রাহি ঘড়িটা রেখে সোজা চোখ রেখেছিল কিগানের চোখে।
‘মানে?’ কিগান চোখটা সরিয়ে নিয়েছিল চট করে।
‘তুমি অনেক আগে আমায় বলেছিলে, তোমার এক বন্ধু আছে। কলকাতায় ক্রিকেট খেলে। বেঙ্গল টিমে খেলার চান্স আছে। আমার ঠিক মনে আছে। নামটাও মনে আছে। রুহান। রুহান রায়। আমায় ওর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দাও।’
‘তা আর সম্ভব নয় রাহি। আমি পারব না।’
‘কেন? কেন পারবে না? তোমার বন্ধুকে তুমি বলতে পারবে না? তা হয় নাকি?’
কিগান চুপ করে থেকেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে আর কারও তেমন যোগাযোগ নেই। তাই বলছিলাম…’
‘আমি কিচ্ছু শুনব না। খালি পিছলে যাওয়ার ধান্দা, না? শোনো, তোমায় আগের কথা বললে বা জিজ্ঞেস করলেই এমন করে ওঠো কেন বলো তো? তুমি কি সাধু হয়ে গেছ নাকি যে, পূর্বাশ্রমের কথা মনে করতে চাও না? দাও, তোমার বন্ধুর মোবাইল নম্বর দাও।’
মাথা নামিয়ে চুপ করে বসেছিল কিগান। সাধু? ও কি আর সাধু হতে পারল? না, পারেনি। চায়ওনি। ও শুধু চেয়েছে সবার মাথা থেকে দুঃস্বপ্নের মতো মুছে যেতে। আর ফোন নম্বর? সেই ক্রিকেটার বন্ধুটির? মানে রুহানের? রুহানের তো মোবাইল ছিল না। তা হলে? হঠাৎ আবেশের কথা মনে পড়েছিল কিগানের। কিছুদিন আগে আবেশ তো ফোন করেছিল ওকে। ওর কাছে নিশ্চয়ই রুহানের যোগাযোগের নম্বর পাওয়া যাবে।
কিগান তখনকার মতো বলেছিল, ‘আমার কাছে রুহানের নম্বর নেই। জোগাড় করার চেষ্টা করছি। পেলে দিয়ে দেব।’
‘আমায় দিতে হবে না। তুমি ফোন করে কথা বলবে।’
‘আমি?’ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগান, ‘আমি এসব ব্যাপারে জড়াতে চাই না নিজেকে। আর ডিটেল কিচ্ছু জানি না। তার ওপর তোদের কাজ, তোরা করবি।’
‘আমাদের কাজ? এতটা স্বার্থপর কেন তুমি?’ রাহি রেগে গিয়েছিল খুব।
‘শোন রাহি, আমি চেষ্টা করব রুহানের নম্বর জোগাড় করতে। তারপর তোকে ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি কথা বলব না। কেমন? তাতে তুই আমায় যা ভাব, আমি তাই।’
চোয়াল শক্ত করে রাহি বসেছিল কিছুক্ষণ, তারপর দুদ্দাড় করে চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘আমি সাধুদাকে পরশুদিন পাঠিয়ে দেব। তারপর তুমি নম্বর পেলে দিয়ো, না হলে দিয়ো না।’
রাহি চলে যাওয়ার পরই আবেশকে ফোনে ধরেছিল কিগান।
এই ছেলেটাকেও রুহানকে চেনার সময় থেকেই চেনে কিগান। একটু পাগলাটে ধরনের হলেও বুদ্ধিমান ছেলে। তবে ওর সবটা ভাল লাগে না কিগানের। বড্ড বেশি টাকাপয়সায় লোভ ছেলেটার। সেদিন গাড়ির ভেতর আচমকা ওর ফোন পেয়ে তো অবাক হয়ে গিয়েছিল কিগান। আর সত্যিই পরদিন বিকেলে এসে হাজির হয়েছিল আবেশ।
ফ্যাক্টরি গেটে বলে রেখেছিল কিগান। তাই ঢুকতে অসুবিধে হয়নি আবেশের। ওকে দেখে বেশ অবাক হয়েছিল কিগান। হালকা চাপ দাড়ি। শরীরেও মেদ লেগেছে। তবে সেই ফক্কড় ধরনের হাসিটা আছে ঠিক।
‘কী রে তুই?’ কিগান হেসেছিল, ‘এত্তদিন পর! কী ব্যাপার?’
‘কুকুর আর ক্রিকেট,’ হেসেছিল আবেশ।
‘মানে? কী যা-তা বলছিস? হাবিজাবি কথা বলার অভ্যেসটা এখনও গেল না তোর?’
‘আরে বেশ কিছুদিন মিজোরামে ছিলাম। কুকুর ধরছিলাম। তারপর এখানে এসে তোমাদের কোম্পানির হয়ে একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করলাম।’
‘ও, টুর্নামেন্টটায় তুই-ও ছিলি? তাই?’ অবাক হয়েছিল কিগান, ‘আর কুকুরের কেসটা কী?’
‘ও সে অনেক বড় গল্প। বাদ দাও না। শোনো না, তুমি কেমন আছ গো? কলকাতায় তোমার টিকির দেখা তো পেলাম না। আদিকে বলে অনেক কষ্টে তোমার নম্বর পেলাম। কী কেস বলো তো তোমার? আদির সঙ্গে তোমার ঝামেলা হয়েছে?’
‘আমার সঙ্গে?’ কিগান হেসেছিল জোর করে, ‘আরে না না, তা নয়। কোম্পানি আমায় এখানে ট্রান্সফার করেছে। তাই এসেছি। প্লাস, এখানে প্রোডাকশনের প্রচুর চাপ। সময় হয় না যোগাযোগ বা গল্প করার। তাই আর যোগাযোগ করা হয় না। তা তুই কী মনে করে?’
‘আমায় এখানে একটা কাজ দিতে পারবে? আমার খুব সমস্যা চলছে কিগানদা?’
‘কাজ?’ কিগান মাথা নেড়েছিল, ‘কী বলছিস! আমি নিজেই চাকরি করি। কাজ দেব কোত্থেকে?’
‘আমি জানি না। ভাবলাম তোমায় ধরলে কিছু হবে।’
‘আমায়? হঠাৎ এমন মনে হল কেন?’
‘তোমাদের অফিসে গিয়েছিলাম। গৌর স্যারের সঙ্গে তো আলাপ হয়েছিল টুর্নামেন্ট করার সময়। তারপর ওঁকে বলেছিলাম কাজের ব্যাপারে। উনি বললেন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাই আদির থেকে নম্বর নিয়ে তোমার কাছে এলাম। দাদা, জানোই তো, মামার বাড়িতে অমানুষ আমি। একটা স্টেডি কিছু না করলে তো পুরো ঝাড় হয়ে যাচ্ছে। তুমি দাদা উদ্ধার করে দাও।’
সেদিন কিছুই আশ্বাস দিতে পারেনি কিগান। আর বেশি সময় কথাও বলতে পারেনি। তবে সংক্ষেপে রুহানের খবরও নিয়েছিল। প্রোডাকশন চলছিল বলে কিগান উঠে পড়েছিল। বলেছিল পরে কথা বলবে। আবেশ যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল, ‘আমার একটা কাজ কিন্তু দরকার কিগানদা। প্লিজ, দেখো একটু।’
গৌর বলেছে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে? কিন্তু কই, ও তো জানে না? গৌর তো ওকে বলেনি কিছু! অর্থাৎ পাশ কাটানোর জন্য গৌর এসব বলেছে আবেশকে! তবু কিগানের মনখারাপ করছিল। এতদিন পর পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা, তবু ও কিছু করতে পারল না! কিগানের মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে পারলে বেশ হত!
তারপর ওই রাহির সঙ্গে কথা হওয়ার পর আবেশের কথাটা মনে হয়েছিল। রাহিকে রাতের দিকে তাই ফোনে ধরেছিল ও।
‘বলো।’ রাহি গম্ভীর গলায় বলেছিল।
কিগান বুঝেছিল যে, সন্ধেবেলার রাগটা এখনও মাথায় চেপে বসে আছে মেয়েটার। তাই এমন গলায় কথা বলছে। কিগান বলেছিল, ‘তোদের এনজিও টাকাপয়সা দিয়ে লোক রাখতে পারবে? যে প্লেয়ার জোগাড় করবে, স্পনসর ধরবে, সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দেবে। পারবে?’
রাহি চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর বলেছিল, ‘আমি হোমির সঙ্গে কথা বলব এই নিয়ে। কেন?’
কিগান বলেছিল, ‘একটা ছেলে আছে। আবেশ। রুহানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে নিডি ছেলে। তোদের এনজিও-তে কাজে লাগবে। ও সবটা অ্যারেঞ্জ করে দেবে। তোকে ওর মোবাইল নম্বর এসএমএস করে দিচ্ছি। আমার রেফারেন্স দিয়ে কথা বলিস। ওর থেকে রুহানের নম্বর পেয়ে যাবি।’
রাহি গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘ও, তুমি তা হলে জড়াবে না? ঠিক আছে পাঠিয়ে দিয়ো নম্বরটা।’
রাহির সেই অভিমানী গলাটা শুনে খুব হাসি পেয়েছিল কিগানের। আর আজ এই ছোট্ট চিঠিটা পেয়ে আবার মনে পড়ে গেল ওর রাগী মুখ।
দরজাটায় খটখট করে শব্দ হল একটা। কিগানের বিরক্ত লাগল। কে আবার এসেছে এ সময়ে? ওর খেতে ইচ্ছে করছিল না। বিছানাটা আবার খুব টানছিল ওকে। তার মধ্যে আবার কে এল?
জড়ানো পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল কিগান। আরে চমক! দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর সামনে একটা চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। অন্য দিন আলোটাকে ঘোলাটেই মনে হয় কিগানের। কিন্তু আজ যেন আরও অন্ধকার মনে হল। আর সেই আলোর সামনে চমকের কালো ছায়ার মতো শরীরটা দেখে একটু অবাকই হল কিগান। হঠাৎ এমন সময় এল ছেলেটা… এমন সময় তো আসে না খুব একটা!
চমক টলছে। কড়া অ্যালকোহলের গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে। কিগান সরে দাঁড়াল, ‘আয়, ভেতরে আয়।’
চমক হাফ পাঞ্জাবির হাতায় মুখটা মুছে টলমলে পায়ে ঘরে ঢুকল। অল্প আলোর ভেতরেও ফরসা মুখটা লাল হয়ে আছে ছেলেটার।
কিগান চোখটা ভাল করে কচলে নিয়ে সামনের বিছানাটা দেখিয়ে বলল, ‘ওখানটায় বোস। আজ এত গিলেছিস কেন?’
চমক নড়বড়েভাবে বসল বিছানায়। মাথাটা নিচু হয়ে আছে ছেলেটার। চুলগুলো ঝুলছে কপালের ওপর। কোনও কথা বলছে না চমক।
‘কী হল রে? কী হয়েছে তোর?’ কিগান গিয়ে পাশে বসল চমকের।
চমক কোনওমতে মাথাটা তুলল। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। ঠোঁট থেকে একটা সরু লালার সুতো ঝুল খেয়ে জামায় আটকে আছে। চমক বলল, ‘আদিত্য ব্যানার্জি তোমার নিজের ভাই?’
আদিত্য। আদি! কিগান সোজা হয়ে বসল। ভাল করে দেখল চমককে। ছেলেটার সুনাম নেই এই অঞ্চলে। বা বলা যায় দুর্নাম আছে। তার ওপর ওর চোখ দুটোও ভাল লাগল না কিগানের। কিগান সাবধানী গলায় বলল, ‘কেন, কী হয়েছে?’
‘আঃ বলো না,’ চমক পা দুটো তুলে বসল বিছানায়।
‘হ্যাঁ। কেন? কী হয়েছে বল।’
‘তোমার সঙ্গে কি ওর কোনও খিঁচ আছে?’ চমক এলোমেলো হাতে একটা বালিশ নিয়ে বিছানার হেড বোর্ডে রেখে তাতে হেলান দিয়ে বসল।
‘খিঁচ? হঠাৎ এ কথা বলছিস কেন?’ কিগান আরও সতর্ক হল। তা ছাড়া বিরক্তও লাগছে ওর। এ কেমন ঝঞ্ঝাট? কোথায় একটু ঘুমোবে, না, এসে ঝামেলা শুরু করেছে একজন!
‘দেখো গুরু, তখন থেকে আমার প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করে যাচ্ছ! আমার মাইরি ভাল লাগছে না কিন্তু। বলো না যা জিজ্ঞেস করছি!’
‘কী বলব?’ কিগান একটু কড়া হল, ‘এই ভর সন্ধেবেলা এসব গিলেছিস কেন? তোর বাবার এত নাম। সেখানে রাস্তা দিয়ে এমন অবস্থায় হাঁটতে তোর খারাপ লাগে না?’
‘হুঁ, বাপের নাম! ওসব ঢপবাজির বাপ অনেক দেখেছি। বাদ দাও। আদিত্যর সঙ্গে তোমার কী নিয়ে খিঁচ বলো তো?’
‘কিচ্ছু নিয়ে নয়।’
‘আঃ, আবার ঢপ! শালা গোটা দুনিয়াটা ঢপ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না, না? সবাই ভাবে ঢপ মারবে আর বেঁচে যাবে, না? আমি খবর নিয়েছি। তোমাদের মধ্যে খিঁচ আছে। সে যতই লুকোও খিঁচ একটা আছেই।’
‘আর যদি থেকেও থাকে। তাতে তোর কী?’ কিগান আরও একটু কড়া হল।
‘তুমি এখনও ভালবাসো তোমার ওই মাগিবাজ ভাইটাকে?’
‘আঃ চমক। কী হচ্ছে কী? তোকে বলেছি না আমার সামনে এমন করে কথা বলবি না? তাও বলছিস কেন? জানিস না এমন কথা শুনতে আমি অভ্যস্ত নই?’
চমক জুলজুল করে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে ফেলল হঠাৎ। বলল, ‘মাইরি তোমার দম আছে। চমক চক্কোত্তিকে এই অঞ্চলে সবাই ভয় পায়। সামনে দাঁড়ালে মুতে দেয়, আর সেখানে তুমি শালা আমায় হুড়ো দিচ্ছ? জিও ক্যাপ্টেন। কিন্তু যাই বলো আমি জানি এক পিস খিঁচ আছে। আমি ওপর ওপর খবর নিয়ে এটুকু জেনেছি। বলো না, ওই ভাই মালটাকে এখনও ভালবাসো তুমি?’
‘কেন, ভালবাসি কি, না বাসি জেনে কী করবি?’ কিগান গলাটা নরম করল না একটুও।
‘বানচোতটাকে কেলাব। বুঝলে, কেলিয়ে লাট করে দেব শুয়োরের বাচ্চাকে,’ চমকের গলাটা নিমেষে বদলে গেল, ‘ওই জুস আর মিনারেল ওয়াটার না ওর পিছনে দিয়ে দেব একদম। শালা, ঢ্যামনামো হচ্ছে, না?’
‘আঃ তুই এমন ভাষায় কথা বললে বের হ এখান থেকে,’ কিগান সরাসরি বলল।
‘বেরোব বেরোব। তার আগে বলি, জানো কী করেছে? ত্রয়ণকে হাত করতে গেছে তোমার ওই ভাই। বলেছে সুধাদিকে অন্যভাবে ম্যানেজ করতে! হুঁ, সুধাদিকে ম্যানেজ! তাও এই ত্রয়ণটাকে দিয়ে? তুমি বলো একবার! এটা কোনও কথা হল?’
কিগান বলল, ‘তুই বাড়ি যা। ভাল করে স্নান করে ঘুমো। আমারও শরীর ভাল নেই। আমিও ঘুমোব। তুই এখন সুস্থ নেই। কাল সুস্থ অবস্থায় কথা বলবি।’
‘আমি সুস্থ নই? আমার চেয়ে সুস্থ এ তল্লাটে কেউ নেই। তোমার ভাই শেষে ত্রয়ণকে ধরল! আচ্ছা, মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের কি এ অঞ্চলে কাজ করার ইচ্ছে নেই? তোমার ভাই কি বোকা?’
‘দেখ, ও চাকরি করে মাত্র। ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। একদমই লাভ নেই। ওপরের নির্দেশ মতো কাজ করে আদি।’
‘ব্যাঙ করে। ও নিজে লিড জোগাড় করছে। ত্রয়ণ কোন হনু যে, ম্যানেজমেন্ট ওর নাম জানবে? ওই আদি এভাবে এগোচ্ছে। শোনো কিগানদা, যা বলতে এলাম। তোমার ভাইকে সাবধান করে দিয়ো। নেক্সট দু’দিনের ভেতর যদি ত্রয়ণকে সিন থেকে না হাটায়, আমি খেল দেখাব। দেখব তখন কার বাপ বাঁচাতে আসে? আমার পিছনে কাঠি করতে এলে কিন্তু আমি উলটে সবার পিছনে বাঁশ করে দেব। তোমার ভাইকে বলে দিয়ো।’
‘শোন চমক…’ কিগান শান্ত করার চেষ্টা করল চমককে।
চমক পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘শোনো, তুমি শোনো। তোমায় পছন্দ করি তাই বলতে এলাম। না হলে আমার বয়ে গেছে। সোজা তুলব, তলতাবনির জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেব। লোড হাপিস হতে সময় লাগবে না। তাই বলছিলাম তোমার ভাইকে সাবধান করে দিয়ো।’
কিগান কিছু বলার আগে ফোনটা বাজল আবার। সেই অচেনা নম্বর। কার ওটা? ধরবে ফোনটা?
‘কী হল? ধরো,’ চমক এলোমেলো গলায় বলল, ‘ফোনটা ধরো।’
কিগান দ্বিধার সঙ্গে ফোনটা তুলল, কার নম্বর এটা? বলল, ‘হ্যালো?’
‘কিগান?’ গলাটা হঠাৎ জলের মধ্যে একফোঁটা বিষের মতো এসে পড়ল। আবার ফোন করেছে? আবার? কিন্তু অন্য নম্বর থেকে। অন্য নম্বর থেকে? কীসের জন্য এই ফোন? কিগান ফোনটা কানে চেপে বসে রইল। দেখল সামনে বসে থাকা চমকের চোখ ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। ধরে রাখতে পারছে না চমক। নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। কিগান ভাবল ও কি নিজেকে ধরে রাখতে পারবে?
Chapter - 18
১৮
‘আমার তো ইচ্ছে আছে যে, মাসাজ পার্লারের মতো সুড়সুড়ি পার্লার খুলব। লোকজন আসবে। চটপট জামাকাপড় ছেড়ে আন্ডার গার্মেন্টস পরে নরম গদির বিছানায় শুয়ে পড়বে। আর ব্যস, অমনি সুড়সুড়ি দেওয়ার লোক এসে সুড়সুড়ি দিতে থাকবে। ছেলেদের জন্য পুরুষ আর মেয়েদের জন্য মহিলা। প্রতি পনেরো মিনিটে ষাট টাকা। ব্যাপারটা দারুণ হবে, না?’ আবেশ খুব উৎসাহের সঙ্গে সবার দিকে তাকাল।
আবেশের উৎসাহ দেখে হাসি পেল রাহির। একদম ভুলভাল কথার রাজা। মাথায় সবসময় উদ্ভট সব চিন্তা নিয়ে বসে থাকে ছেলেটা। তবে এমনিতে ভালই মনে হয়। অন্তত এখনও পর্যন্ত তো ভাল বলেই মনে হচ্ছে।
আজ পনেরোই জুন। মায়ের জন্মদিন। তাই রাহি ছোট্ট একটা খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করেছে বাড়িতে। মা আপত্তি করেছিল। বলেছিল, ‘বাড়াবাড়ি করিস না রাহি। এই বুড়ো বয়সে এসব করলে লোকে হাসবে।’
রাহি বলেছিল, ‘আমি কী করেছি যে, লোকে হাসবে? তার ওপর তো তোমায় কেকও কাটতে বলছি না, বা মাথায় জোকার টুপি পরে হ্যাপি বার্থডে গান শুনতেও বলছি না। আমি জাস্ট তোমার পঞ্চাশ বছর বয়সটা সেলিব্রেট করতে চাই। হাফ সেঞ্চুরি করলে আর লোকে সেটা জানবে না? আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। খুব ক্লোজ কয়েক জনকে বলব। তুমি প্লিজ না কোরো না।’
মা তাও আপত্তি করেছিল, ‘এমন পাগলামি করিস না রাহি। হঠাৎ হঠাৎ কী যে ভূত চাপে তোর মাথায়!’
রাহি হেসেছিল, ‘ভূত তো ভূত। তুমি আর এ নিয়ে একদম মাথা ঘামাবে না। লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপটি করে বসে থাকবে। যা করার আমি আর দীপা করব। তুমি কিন্তু বাগড়া দেবে না একদম। বুঝেছ?’
মা আর কিছু বলেনি। বরং আজ সকাল থেকেই কেমন যেন একটা লাজুক লাজুক মুখ করে ঘুরছে। বেশ সেজেছে আজকে মা। এমনিতেই সুন্দরী, আজ যেন আরও সুন্দরী লাগছে। এত সুন্দর বলেই বোধহয় অমন গরিব ঘরের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও ঠাকুরদা বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল। বন্ধুরা তো বলে, ‘রাহি তুই তোর মায়ের টেন পারসেন্ট সুন্দরীও নোস।’ একটা ছেলে তো এও বলেছিল, ‘আর বেশি দিন তোদের বাড়িতে গেলে মাইরি তোর মাকে প্রোপোজ করে ফেলব।’
মায়ের জন্য বারাসত থেকে একটা আইপড কিনে এনেছে রাহি। যদিও ভগবান জানে মা ব্যবহার করবে কি না। তা ছাড়া বাবাকেও পইপই করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, রাতে ফেরার সময় যেন অতি অবশ্যই মায়ের জন্য কিছু একটা গিফ্ট নিয়ে আসে। কিন্তু বাবা যে কখন ফিরবে! সেই বনগাঁ গেছে। তার ওপর বিকেল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। বর্ষাকাল পড়তে না-পড়তেই এমন বৃষ্টি ভাবাই যায় না। চাপাডাঙাতে বৃষ্টি হলেই জল জমে যায়। তবে বাবা ফোনে বলেছে যে, চিন্তা নেই। ঠিক পৌঁছে যাবে।
রাহির একটাই ভরসা সাধুদা গেছে বাবার সঙ্গে। এই লোকটা থাকলে রাহির আর চিন্তা থাকে না। এমন জান-কবুল করা লোক কোনওদিন দেখেনি রাহি। একটা মানুষ কীভাবে এতটা নিষ্ঠাবান হতে পারে? এমন নয় যে, সাধুদাকে প্রচুর টাকা দেওয়া হয়। বা বলা ভাল দিলেও নেয় না। খুব সাধারণ ধুতি-ফতুয়া আর হাওয়াই চটি পরে দিন কাটিয়ে দেয়। খাওয়া দাওয়াতেও আড়ম্বর নেই। ওদের বাড়ির চৌহদ্দিতে একাই থাকে। একাই দুটো ফুটিয়ে খায়। কোনও লোভ নেই মানুষটার। কোনও ইচ্ছে নেই। বাবার ইচ্ছেই যেন সাধুদার ইচ্ছে। বাবার কথাতে যেন সব করতে পারে! বা আরও বলা ভাল, এই বাড়ির জন্য যেন সাধুদা সব করতে পারে। রাহি এখনও যে সেই দিনটার কথা ভুলতে পারে না!
সেদিনও বৃষ্টি হয়েছিল খুব। সামনে পরীক্ষা ছিল বলে পড়ছিল রাহি। হঠাৎই ঘরের দরজায় খুব জোরে ধাক্কার শব্দ শুনতে পায় ও। দরজা ধাক্কানোর মধ্যে এমন একটা ব্যাপার ছিল যেন রাহি প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছিল। আর দেখেছিল ওর মায়ের বিভ্রান্ত মুখ।
‘কী হয়েছে মা?’ রাহি ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
‘তোর দাদা…তোর দাদা…’ মা হাঁফাচ্ছিল খুব। মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছিল মায়ের, ‘তোর দাদার হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে আর…ও…ও উমেশ রায়ের…’
‘মা কী হয়েছে?’ রাহির খুব টেনশন হচ্ছিল। মায়ের অমন অবস্থা দেখে হাত-পা কাঁপছিল। ভাবছিল, দাদা নিশ্চয়ই কিছু একটা করেছে। আর এমন দিনে করেছে যখন বাবা নেই বাড়িতে। বাবা সেদিন ব্যাবসার কাজে কলকাতা গিয়েছিল। বৃষ্টির জন্য ফিরবে না জানিয়েও দিয়েছিল।
রাহি বুঝতে পারছিল না কী করবে। ও মায়ের হাত ধরে কাঁপা গলায় বলেছিল, ‘মা, তুমি শান্ত হও মা, শান্ত হও। আর বলো কী হয়েছে? দাদা কী করেছে মা? বলো।’
মা কিছু বলতেই পারছিল না। বরং কোনওমতে বলেছিল, ‘দেখে যা, দেখে যা তুই। ওই শয়তান ছেলেটা উমেশ রায়ের মেয়েকে তুলে এনেছে। ওর এক বন্ধু বলছে আসার পথে নাকি একজনের পায়ে গুলি করেছে। ওরাও তোর দাদার হাতে কোপ দিয়েছে। এখন…এখন কী যে হবে! কী যে…’ মা আর বলতে পারছিল না।
রাহি দৌড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে। দেখেছিল দাদার ঘরের দরজা খোলা। সেখানে এক কোনায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দীপা। আর খাটে বসা দাদার ক্ষতয় খুব দ্রুত হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধছে সাধুদা!
রাহি অবাক হয়ে চমকের নির্লিপ্ত মুখ দেখেছিল। যেন কিছুই হয়নি এমন করে সাধুদার করে দেওয়া ব্যান্ডেজ দেখছিল চমক। রাহিকে দেখে খুশি খুশি গলায় বলেছিল, ‘এই দেখ, দীপাকে তুলে এনেছি। শালারা আটকাতে চেষ্টা করেছিল। পারেনি। আর দেখ, দীপাটা কেমন ফালতু ভয় পাচ্ছে!’
‘তুই এটা কী করেছিস?’ রাহি আতঙ্কিত গলায় বলেছিল, ‘তোর হাতে কোপ দিয়েছে। তুইও নাকি একজনের পায়ে গুলি করেছিস! তুই সত্যিই গুলি করেছিস? জানিস তো কোনও কারণে একবার রক্ত ঝরতে শুরু করলে তা ঝরতেই থাকে। তুই কেন এমন করলি? আর কি ভেবেছিস ওরা ছেড়ে দেবে? এখন যদি বাড়িতে চড়াও হয়? যদি পুলিশ নিয়ে আসে?’
‘আমি গুলি করিনি,’ চমক হেসেছিল, ‘আমার বন্ধুদের থেকে একজন করেছে। তা ছাড়া ওরা এলেও কিছু হবে না। গেটের কাছে চারজন যন্তর নিয়ে তৈরি রয়েছে। ফালতু টেনশন নিস না। কারও ক্ষমতা নেই কিছু করে।’
রাহি দেখছিল যে, ভেজা সালোয়ার পরে এক কোণে দাঁড়িয়ে দীপা কাঁদছে, কেঁদেই চলেছে। খুব খারাপ লাগছিল রাহির। দেখো তো, কী বিপদেই না পড়েছে মেয়েটা!
মা-ও ততক্ষণে চলে এসেছিল ঘরে। কিন্তু কথা বলছিল না কোনও। মা যেন চিরকাল ভয় পায় চমককে। রাহি মোবাইলে বাবাকে ধরার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দুটো মোবাইলের একটাতেও বাবাকে ধরতে পারছিল না ও। দুটোই সুইচড অফ বলছিল।
চমক উঠে এসে বলেছিল, ‘কেন বাবাকে ঘাঁটাচ্ছিস? আমি যা করেছি নিজের দমে করেছি। কারও হেল্প আমার লাগবে না। তুই চিন্তা করিস না। যা গিয়ে পড়তে বোস। আর না হলে মাকে সামলা।’
রাহি কী বলবে বুঝতে পারছিল না। ঠিক তখনই একটা ছেলে ঝড়ের মতো দৌড়ে এসে ঢুকেছিল ঘরে। বলেছিল, ‘ওরা আসছে চমক, অনেকে মিলে আসছে। আমরা যে-ক’জন আছি পারব না। তুই দীপাকে নিয়ে পিছন দিক দিয়ে পালা। শিগগিরি পালা।’
‘পালাব কেন?’ চমক চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে উঠেছিল, ‘আমি, শালাদের…’
‘বসো, চুপ করে বসো।’ হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠেছিল সাধুদা। অমন মুখচোখ কোনওদিন দেখেনি রাহি। সাধুদাকে যেন চিনতেই পারছিল না ও। কালো, নিরীহ মানুষটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল আরও একটা মানুষ। ইস্পাতের তৈরি একটা মানুষ। চমক পর্যন্ত থতমত খেয়ে গিয়েছিল যেন। সাধুদার এমন রূপ তো ও নিজেও দেখেনি।
তবু চমক চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, ‘সাধুদা তুমি যেয়ো না। আমি দেখছি।’
‘চুপ করে এইখানে বসো। এই ঘর থেকে বেরোবে না। দেখছ না মেয়েটা কাঁদছে? ওকে সামলাও। আর কিছু করতে হবে না। যারা আসছে তাদের আমি দেখছি।’
কী ছিল সাধুদার গলায়? রাহি আজও জানে না। তবে যাই ছিল, তা চমককে নড়তে দেয়নি। অমন দাদাটা পর্যন্ত চুপ করে বসে পড়েছিল খাটে। আর রাহি দেখেছিল সাধুদা হাত দুটো জামায় মুছে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছিল। আর যেতে যেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আপনি ভাববেন না। আমি দেখছি।’
রাহি যেন শুনতে পেয়েছিল মা অস্ফুটে বলছে, ‘সাবধানে।’
‘ধ্যাত, সুড়সুড়ির পার্লার মানে?’ হোমি হাসতে হাসতে বলল।
‘মানে সুড়সুড়ির পার্লার।’ আবেশের গলায় ইয়ারকির লেশমাত্র নেই।
‘তোমার এমন ভুলভাল কনসেপ্ট কেন বলো তো?’ হোমি হাসল আবার।
‘আচ্ছা রাহি,’ আবেশ ওর দিকে ফিরল, ‘তুমি বলো, কনসেপ্ট হিসেবে এটা খারাপ? শুনেছি জাপানে ঘুমোনোর পার্লার আছে। সেখানে ওই মানুষগুলো এমন মেশিন বের করেছে যাতে নাকি ঘুমোনোর সময় ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখা যাবে। তো, আমি এখানে তা না পারি সুড়সুড়ির পার্লার তো খুলতেই পারি। আচ্ছা তোমরা বলো, ছোট থেকে এখন অবধি, কার না সুড়সুড়ি খেতে ভাল লাগে? বেশ পিঠে আলতো হাতে সুড়সুড়ি, তারপর চুলের ভেতর নরম করে বিলি কেটে দেওয়া। কী দারুণ ব্যাপার, না!’
‘এ সমস্তটাই বুর্জোয়া চিন্তাভাবনা,’ আড্ডার তাল কেটে দরজার সামনে থেকে ত্রয়ণ বলে উঠল কথাটা।
ওফ। বিরক্তিতে মুখটা আপনি কুঁচকে গেল রাহির। ভেবেছিল এত বৃষ্টিতে আপদটা আসবে না। কিন্তু ঠিক এসেছে! মা যে কেন সব অনুষ্ঠানে ওকে নেমন্তন্ন করে!
আসলে রাহির ইচ্ছেই ছিল না ত্রয়ণকে ডাকার। দীপাও বলেছিল ডাকতে হবে না। কিন্তু মা এসে এই ব্যাপারটায় বাগড়া দিয়েছিল। বলেছিল, ‘ত্রয়ণকে কেন ডাকবি না তোরা?’
‘ডাকব না। ইচ্ছে নেই,’ রাহির রাগ হয়েছিল।
‘ছিঃ। ভাল ছেলে একটা। অন্যের জন্যে খেটে প্রাণপাত করছে। আর তোরা সবসময় ওকে এমন হেলা তুচ্ছ করিস, কেন বল তো?’
‘ওকে আমার ভাল লাগে না,’ রাহি গোমড়া মুখে বলেছিল।
‘ছিঃ ছিঃ, দীপার না ভাই হয় ও? ওর সামনে এমন বলছিস?’
রাহি বলেছিল, ‘ভাই না ছাই! নিজের ভাই নাকি? তা ছাড়া ও ভাল নয়।’
‘বাজে কথা বলিস না। ওকে আমি আসতে বলে দিয়েছি। ও আসবে। একটা ছেলে। একা থাকে। বাড়িতে একটু ভালমন্দ হলে ওকে ডেকে খাওয়াতে ইচ্ছে করে না? এমনিতেই তো দীপার বাড়ির লোকজন বিশেষ সম্পর্ক রাখে না আমাদের সঙ্গে। আর যে রাখে তার সঙ্গে কি অমন করতে আছে? রাহি তুই তো এমন ছিলি না!’
মায়ের কথার তোড়ে দীপা চুপ করে ছিল। হয়তো বাপের বাড়ির লোকজনদের প্রসঙ্গ ওঠাতেই গুটিয়ে গিয়েছিল ও। এটা ঠিক যে, দীপার বাপের বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ নেই রাহিদের। কিন্তু সেটা তো আর দীপার দোষ নয়। চমক নিজেই তো সম্পর্ক রাখে না। মা কেন যে এমন আর্কিটাইপাল শাশুড়ি হয়ে যায় মাঝে মাঝে! আর রাহি তো আর ত্রয়ণের প্রতি ওর বিদ্বেষের আসল কারণটা বলতে পারবে না! তাও মাকে শেষ একবার মত বদলানোর চেষ্টা করেছিল, ‘মা, দাদাও কিন্তু ত্রয়ণকে পছন্দ করে না। একদম পছন্দ করে না।’
‘তোর দাদার কথা বলিস না। রাত বারোটার আগে কোনওদিন ফেরে? ও ফেরার আগেই সবাই খেয়ে দেয়ে চলে যাবে। তুই আর এই নিয়ে একদম তক্কো করবি না। বুঝেছিস?’
‘বুর্জোয়া?’ আবেশ বেশ ঘাবড়ে গেল।
ত্রয়ণ হাত দিয়ে গা আর মাথা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘হ্যাঁ, বুর্জোয়া। সরি, আমি আপনাকে চিনি না, কিন্তু এমন একটা ধারণা যারই মাথা থেকে বেরোবে তাকেই আমি বুর্জোয়া বলে প্রতিবাদ জানাব। অর্থ রোজগার মানে কি নিজের সমস্ত সত্তা বিকিয়ে দেওয়া? শরীর, বা আরও সঠিকভাবে বললে ইন্দ্রিয়কে বিকিয়ে দেওয়াকে কী বলে, জানেন নিশ্চয়ই। তা হলে কেন এমন ভাবেন?’
আবেশ থতমত মুখে বলল, ‘না না, আমি তো জাস্ট ইয়ে…’
‘ইয়ে মানে?’ ত্রয়ণ ধমক দিল। তারপর হোমি আর রাহির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানো, গত কয়েকদিন পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় ঘুরতে ঘুরতে আমার বারবার মনে হয়েছে, এই জেনারেশনের কিচ্ছু হবে না এই “জাস্ট ইয়ে”র জন্য। সবাই এত ক্যাজুয়াল কেন? কেন এমন করে সবাই ঘুরে বেড়ায়? আর বললেই বলে, জাস্ট এমনি! কেউ কোনও কিছু পাত্তা দেয় না। সবারই যেন একটাই লক্ষ্য। অর্থ উপার্জন। টাকা চাই। আরও টাকা চাই। কোলিয়ারি বেল্টগুলোয় গেলাম। জানো চোরাইভাবে খাদান থেকে কয়লা তুলে কী সর্বনাশ করছে মানুষ! স্যান্ড ফিলিং করছে না। ওয়াটার বডির নিয়ম মানছে না। সে যাচ্ছেতাই ব্যাপার! তারপর কাটা তেল। কলকাতায় খণ্ডযুদ্ধ করে গ্রিন অটো চালাচ্ছে। আর অন্য জায়গায়? সেই মান্ধাতার আমলের অটোগুলো। কোথাও কোথাও তো আরও খারাপ অবস্থা। পাতি ভ্যানের সঙ্গে চোরাই পুরনো মোটরবাইকের ইঞ্জিন লাগিয়ে “ভ্যানো” নামে একটা যান তৈরি করে চালানো হচ্ছে। এতে দূষণের পরিমাণটা বুঝতে পারছ? সব বড় বড় মাথারা এই তেলের পিছনে আছে। এর ট্যাঙ্কার আসে। রীতিমতো লাইন দিয়ে বিক্রি হয় তেল। কিন্তু কেউ এর কোনও খবর রাখে? কেউ প্রতিকার করে? না। কারণ ওই “জাস্ট ইয়ে”। সবার টাকা চাই আজকাল। সব্বার শুধু দামি জিন্স, নতুন মোবাইল, অদ্ভুত দেখতে ঘড়ি আর দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য টাকা চাই। তার জন্য “জাস্ট ইয়ে” করতে রাজি তারা। একটা গোটা প্রজন্ম কীভাবে বুর্জোয়া হয়ে গেল! মুক্ত অর্থনীতি চিবিয়ে খেল তাদের। পয়সার জন্য মানুষ এখন কী না করছে। ছিঃ। লজ্জা লাগে আমার। ভীষণ লজ্জা লাগে।’ ত্রয়ণ মাথা নামিয়ে নিল।
‘দারুণ তো,’ আবেশ দু’সেকেন্ড সময় নিয়ে অবাক ভাবটা কাটিয়ে লাফিয়ে উঠল, ‘কাকা, তুমি তো পুরো ঘ্যামচ্যাক জিনিস! বুর্জোয়া না প্রোটোজোয়া কীসব বলে ব্যাপক একটা খিল্লি দিলে তো! আমি স্পেলবাউন্ড!’ তারপর হোমির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একে নিয়ে যাব প্লাস্টিক ম্যানুফ্যাকচারারদের কাছে? অ্যাড পেতে সুবিধে হবে। নেব?’
ত্রয়ণ এবার অবাক চোখে তাকাল রাহির দিকে। অর্থাৎ আবেশ ঠিক কে আর কী বলছে, সেটা বুঝতে পারছে না। স্বাভাবিক। আবেশ যখন ওদের সঙ্গে জয়েন করেছে তখন ত্রয়ণ ছিল না এখানে, আর ত্রয়ণকে জানানোও হয়নি। অবশ্য হোমি বলেছিল যে, ‘ত্রয়ণকে না জানিয়ে এমন একজনকে অ্যাপয়েন্ট করা কি ঠিক হবে?’
‘কেন? হেল্প আর্থ-এর কোনও কাজে ওর পারমিশনের দরকার কেন?’
‘না, পারমিশন নয়। আসলে, সব কাজেই তো ত্রয়ণ থাকে। তাই বলছিলাম আর কী। নিজের থেকে সবটা করে দেয় তো। তাই…’
‘দেখ, কিগানদা বলেছে নিতে। আমরা নেব। আমি বাবাকে বলেছি। বাবাও বলেছে, ভাল অ্যাড পাইয়ে দেবে হেল্প আর্থকে। মাইনে হয়তো বেশি দিতে পারব না, কিন্তু তোর আর আমায় বাদ দিলে যারা কাজ করে, তারা খুব একটা এফিশিয়েন্ট নয়, বা সময়ও দিতে পারে না। মাইনে করা লোক নিলে কাজ ভাল হবে। তা ছাড়া সুধাদিদের সঙ্গে কথামতো ক্রিকেট ম্যাচের সম্ভাবনা আছে। এতে অ্যাওয়ারনেস আর তার সঙ্গে টাকাও আসবে। আমাদের কাজের পেরিফেরিটাও বাড়বে। সব ত্রয়ণকে বলতে হবে না। বুঝেছিস?’
রাহির এমন জোরালো সওয়ালের পর হোমি আর কিছু বলেনি। রাহি নিজেই আবেশকে ডেকে এনেছিল ফোন করে। তারপর কাজের কথা বলেছিল। রাহি ভেবেছিল কলকাতার ছেলে। এমন মফস্সল অঞ্চলে, ছোট্ট একটা এনজিও-র কাজ করতে হয়তো আগ্রহী হবে না। কিন্তু আবেশ এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘কিগানদা বলেছে যখন আমার আপত্তি নেই। আমার একটা কাজ পেলেই হল। তবে মাথা গোঁজার জন্য যদি একটা থাকার বন্দোবস্ত করে দেন ভাল হয়।’ রাহি হেসেছিল। উসকোখুসকো দাড়ি আর একমাথা চুলের ছেলেটাকে দেখে মায়াও হয়েছিল। চোখের মধ্যে একসঙ্গে বুদ্ধি আর অসহায়তা কোনওদিন দেখেনি ও।
রাহি বলেছিল, ‘আমাদের একটা দু’ঘরের অফিস আছে। আসলে সামনেটায় অফিসঘর আর পিছনটা মোটামুটি ফাঁকাই। শুধু পোস্টার, ব্যানার আর ফেস্টুন থাকে। সেখানটা পরিষ্কার করে খাট পেতে দিয়ে আপাতত একটা বন্দোবস্ত করা যেতে পারে। তারপর একটা ঘর দেখে নিলেই হবে। তাতে তোমার যদি আপত্তি না থাকে। আর বাই দ্য ওয়ে। আমরা তুমি তুমি করেই কথা বলব। আপনিটা প্রোটোকলের বাইরে। কেমন?’
‘নো প্রবলেম,’ আবেশের চোখ চকচক করে উঠেছিল।
‘আরে ঘরটা দেখে “নো প্রবলেম” বোলো, আর টাকাপয়সা কত দিতে পারব সেটাও তো জানবে, নাকি?’ অবাক হয়েছিল রাহি।
‘টাকাপয়সা? যা হোক দিয়ো। থাকতে পারব। কাজ করব। এটাই অনেক। জানো, মামার বাড়িতে কেমন জায়গায় থাকতাম আমি? একটা ছোট্ট তিনকোনা ঘর ছিল। সিঁড়ির তলার। তাতে কষ্টেসৃষ্টে একটা ক্যাম্প খাট পাতা যেত। সেখানে শুতাম। আর ট্যাক্সির ভেতরে ছোট্ট পাখা থাকে না? তেমন একটা পাখা চলত মাথার কাছে। তার স্পিড বাড়ালে আবার কিটকিট শব্দ করত। মনে হত আইসক্রিমের কাঠি স্পোকে বেঁধে কেউ সাইকেল চালাচ্ছে। ঘুমোয় কার বাপের সাধ্য! সেখানে একটা সম্পূর্ণ ঘর! ও দেখার কিছু নেই।’
ছেলেটা মিশুকে। করিতকর্মাও। কাজটাও বুঝে নিয়েছে। এর মধ্যে দুটো ছোটখাটো ডোনেশনও জোগাড় করেছে। কিছু করোগেটেড টিনের ফ্যাক্টরি রয়েছে কাছাকাছি। তাদের গ্যালভানাইজিং থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে। কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা তারা কিছুই করছে না। আবেশ তাদের কীভাবে যেন বুঝিয়েছে যে, ‘হেল্প আর্থ’-এর সঙ্গে তাদের নাম জোড়া থাকলে, কেউ আর তাদের দিকে আঙুল তুলতে পারবে না। তাই তাদের উচিত ‘হেল্প আর্থ’-কে সাহায্য করা। আর কী অবাক কাণ্ড, তারা খুব বেশি না হলেও দশ-দশ করে কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছে। অল্প কয়েকদিনেই ছেলেটা ভাল কাজ করেছে।
এ ছাড়াও এত মিশুকে ছেলেও খুব একটা দেখেনি রাহি। এ অঞ্চলের সবার সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। এমনকী চমক পর্যন্ত আবেশের সঙ্গে কথা বলার সময় একটু হাসে। বাবাও যেন সামান্য প্রশ্রয়ের সুরে কথা বলে আবেশের সঙ্গে। আর মা তো একদিন বারাসত থেকে মার্কেটিংও করে এসেছে আবেশকে নিয়ে গিয়ে। এক মাসও হয়নি, কিন্তু মায়ের জন্মদিনে আবেশকে নেমন্তন্ন করতে একটুও দ্বিধাবোধ করেনি রাহি। তবে সবটাই হয়েছে ত্রয়ণ এখানে না থাকার সময়ে।
ত্রয়ণ জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি কিছু মিস করছি? ইনি কে?’
হোমি যে আড়চোখে রাহিকে দেখল সেটা লক্ষ করে রাহি নিজেই বলল, ‘ওর নাম আবেশ। আমাদের হেল্প আর্থ-এর নতুন কর্মী।’
‘কর্মী?’ ত্রয়ণ ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘কর্মী মানে! জানো কর্মী কাকে বলে?’
রাগ হল রাহির। ত্রয়ণের ভাবটা এমন যেন কর্মী শব্দটার ওপর একশো বছর গবেষণা করে এসেছে। ছেলেটার সব বিষয়ে সমালোচনা আর জ্ঞান দেওয়ার স্বভাব। রাহি বলল, ‘জানি। আর না জানলেও তোমার থেকে শুনব না। আবেশ খুব ভাল কাজ করছে। আর যা কাজ করছে তার তুলনায় তেমন টাকা ওকে আমরা দিতে পারছি না।’
‘টাকা?’ ত্রয়ণের ভুরু বিরক্তিতে আরও হিজিবিজি হয়ে গেল, ‘পেড কর্মী? বাবা, হেল্প আর্থ এত বড়লোক হয়ে গেছে যে, মাইনে দিয়ে লোক রাখছে? তোমরা কি জানো না যে, ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না?’
মাথাটা হট করে গরম হয়ে গেল রাহির। ছেলেটা ভীষণ অসভ্য তো! আবেশকে জানে না, চেনে না, তাও এমন করে কথা বলছে! আর ‘হেল্প আর্থ’-এর কে হয় ত্রয়ণ? উপযাচক হয়ে কিছু কাজ করে দেয়। তার মানে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? খুব রাগ হল রাহির। ও বলল, ‘ভদ্রভাবে কথা বলতে গেলে কিন্তু পকেট থেকে পয়সা খরচ হয় না। তা ছাড়া অন্যের সঙ্গে অভদ্রতা করা মানে কিন্তু নিজের আপব্রিঙ্গিংকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এটা বোঝানো যে, তোমার বাবা-মা, তোমাকে শিক্ষা দেয়নি। ফলে এমন কোরো না।’
ত্রয়ণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে রইল। রাহি বুঝল আবার জুতসই কিছু জ্ঞান আর তোতাপাখির মতো চোখা বুলি কপচাবে ছেলেটা।
কিন্তু তার আগেই হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল আবেশ।
রাহিকে বলল, ‘বাঃ, তুমিও তো কম যাও না দেখছি। চলো, তোমাকেই নিয়ে প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে যাই। তুমিও জমিয়ে দেবে।’
রাহি দেখল হোমি আবেশের কথায় হেসে পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। বলল, ‘তা যা বলেছ। আর হবে না? রাহি স্কুলে পড়ায়। দিদিমণি। কম বক্তৃতা করতে পারে ভেবেছ?’
আবেশ হাসল আবার। তারপর ত্রয়ণের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি রাগ কোরো না ভাই। কিগানদা রিকোয়েস্ট করেছিল বলে ওরা আমায় কাজে রেখেছে। টাকার দরকার আমার। অনেক বয়স হল। ভেসে, উঞ্ছবৃত্তি করে কেটে গেল এত বছর। তাই এখন একটা কাজ পেয়ে ভাল লাগল খুব। ভাড়াটে সৈন্য হলেও মন দিয়েই যুদ্ধ করব। তুমি ভেবো না।’
ত্রয়ণ বাঁ হাতের ঘড়িটাকে ঠিক করল। তারপর শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, ‘ও কিগানদা! তাই! রাহি তো আবার কিগানদার কথা ফেলতে পারে না। না?’
‘মানে?’ রাহি আর পারল না। উঠে দাঁড়াল মোড়া থেকে। ছেলেটার তো বড্ড বাড় বেড়েছে!
‘মানে কে এই কিগান অর্ক ব্যানার্জি? এমন লম্বা চওড়া আধা সাহেব আধা বাঙালি মানুষটা কে যে, তার কথা শুনতে হবে? তুমি জানো? জানো ওর পাস্ট লাইফ সম্বন্ধে?’
রাহি মাথা নিচু করল। বাইরে বৃষ্টির শব্দটা বাড়ল বোধহয়। রাত ঘন হল যেন আরও একটু। ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ মনে হল রাহির। যেন মনে হল সব্বাই ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেন অপেক্ষা করছে ও কী বলবে তা শোনার জন্য।
রাহি দেওয়াল ঘড়ির আওয়াজটা শুনতে পেল স্পষ্ট। যেন ত্রয়ণের কথায় সায় দিয়ে বলছে ‘ঠিক ঠিক’। সত্যিই তো কিগানের সম্বন্ধে কী জানে ও? কতটা জানে? সত্যিই তো কে এই কিগান লোকটি? সারাদিন ফ্যাক্টরিতে পড়ে থাকে। রাতে একা বারান্দায় বসে গিটার বা মাউথঅর্গান বাজায়। ছুটির দিনে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এদিক-ওদিক। আর পুরনো দিনের কথা, বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে কিচ্ছু বলে না। যেন সন্ন্যাসী একটা! যেন পূর্বাশ্রমের কথা বলা বারণ মানুষটার।
কিগানের বাড়িওয়ালার কাছে কিগানের ঘরের একটা ডুপ্লিকেট চাবি রাখা থাকে। কখনও সেটা নিয়ে কিগানের ঘরদোর একটু পরিষ্কার করে দিয়ে আসে। তখন ঘরটাকে ভাল করে লক্ষ করেছে রাহি। না, তাতে কিচ্ছু পায়নি বিশেষ। শুধু বইয়ের ভেতর পেয়েছে কিগানের নাম। উপহার হিসেবে লিখে রাখা শুভেচ্ছা। আর হ্যাঁ, পেয়েছে শুকনো পাতার মতো দেখতে একটা কার্ড। বইয়ের ভেতরে গোঁজা। তাতে লেখা-‘আসলে তুমি জলের পাশে নেই। জলই তোমায় ঘিরেছে চারিপাশে। আসলে তোমার আনমনা ওই চোখ। দেখেনি, জল আগুন ভালবাসে।’
অনেকবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখাটা পড়েছে রাহি। একটা ইংরেজি কবিতার বইয়ের সামনের পাতায় মেয়েলি বাঁকা অক্ষরে গোটা গোটা করে লিখে রাখা কবিতা। সামান্য কাঁচা, অল্পবয়সি ছাপ রয়েছে লেখাটায়। বইয়ে নাক ঠেকিয়ে গন্ধও নেওয়ার চেষ্টা করেছে রাহি।
কিগানের ঘরের ভেতরে কোনও কিছু থেকে কিগানের বয়স ছাড়া আর কিচ্ছু জানতে পারেনি রাহি। কোনও ধারণাও পায়নি। শুধু এই একটা লেখা। এতেই যা কিছু রহস্যের আভাস। যা কিছু সংকেত আর কৌতূহল। তবে রাহি জিজ্ঞেস করেনি। কিগানকে জিজ্ঞেস করেনি কিছু। শুধু দেখেছে বিক্রিয়াহীন, সম্পর্কে অনিচ্ছুক একটা নিস্তব্ধ মানুষ। সব কিছুর ভেতরে থেকেও যেন কোনও কিছুতেই নেই। যেন তাকে পোড়ানো যায় না। ভাঙা যায় না। ছেঁড়া যায় না। কিগান যেন কেমন আলো দিয়ে তৈরি মানুষ। দেখা যায়। স্পর্শ করা যায় না। অনুভব করা যায়, কিন্তু আকার দেওয়া যায় না। রাহি ভাবে কিগান যেন আলোর গন্ধ। যেন ঝড়ের সঙ্গে না আসা মেঘ। যেন চিঠির ওপর কোনওদিন না লেখা হওয়া অক্ষর। যেন প্রেমিকের একার দীর্ঘশ্বাস। গোপন। অগোচর।
ত্রয়ণ বলল, ‘দেখলে তো, কিগানদার সম্বন্ধে কিচ্ছু জানো না। ওর কথা বেদবাক্য হিসেবে দেখার কিছু নেই। না, আবেশবাবুকে নিয়েছ বলে বলছি না। হেল্প আর্থ কি তেমন স্বাবলম্বী হয়েছে যেখানে সে নিজে টাকা দিয়ে লোক রাখতে পারবে? আমি সেই প্রশ্ন তুলেছি মাত্র।’
হোমি বলল, ‘না, না, ঠিক আছে। আসলে সুধাদির সঙ্গে সেই যে কথা হল না যে, একটা প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ করা হবে। আমাদের সেসব আয়োজন করতে গেলে তো লোকবল চাই। তুমি অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়ছ দিনকে দিন। আমাদের পড়াশোনা বা অন্য কাজকম্ম আছে। তাই এমন একজনকে আমাদের দরকার যে সারাটা সময় সংস্থাটাকে দেখবে। ম্যাচের আয়োজনও তো যজ্ঞিবাড়ির কাজ। আর আবেশ খুব এফিশিয়েন্টলি কাজ করছে।’
ত্রয়ণ হাসল। রাহির যেন মনে হল তাচ্ছিল্যের হাসি। ত্রয়ণ জিজ্ঞেস করল, ‘তা সেই ম্যাচ সম্পর্কে কিছু কথা এগোল?’
রাহি ঠোঁট কামড়াল। এই প্রসঙ্গটা উঠুক ও চায়নি। কারণ, ব্যাপারটা তো কিছুই হয়নি।
সুধাদি, এই ‘হেল্প আর্থ’-এর অনারারি প্রেসিডেন্ট। তা সুধাদি নিজেই বলেছিলেন যে, এই ক্রিকেটপাগল বাজারে ‘হেল্প আর্থ’ যদি একটি প্রীতি ম্যাচ করতে পারে নামীদামি প্লেয়ারদের নিয়ে, তা হলে ভাল হয়। তখন রাহি যেচে পড়েই দায়িত্বটা নিজে নিয়েছিল। বলেছিল যে, ও যোগাযোগ করে ম্যাচটা আয়োজন করার চেষ্টা করবে। ত্রয়ণ বারণ করেছিল। বলেছিল, ‘এসব কেন করছ? তুমি ক্রিকেট বোঝো? যুবরাজ সিং মার্কা হিরো টাইপ কিছু প্লেয়ার ছাড়া আর কারও নাম জানো? যা পারবে না, তা কোরো না।’
সেদিন চমকও উপস্থিত ছিল সেখানে। ত্রয়ণের কথার উত্তরে রাহি কিছু বলার আগেই চমক দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, ‘না, রাহিই করবে। আর তাতে আমি আছি ওর সঙ্গে। সম্ভব হলে সচিন তেন্ডুলকরকেও আনব।’
তবে সেই অবধিই। চমক তারপর আর কিছুই করেনি। ত্রয়ণকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন কথাটা বলেছিল শুধু। তাই রাহি বিপদে পড়েছিল আরও। আর সেই জন্য কী করবে বুঝতে না পেরে ও গিয়েছিল কিগানের কাছে।
আবেশ রাহির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুহান ব্যাটা যে ঝোলাবে জানতাম। বললাম, আমি যোগাযোগ করে দিচ্ছি। তুমি শুনলে না। আর রুহান কেন? সদ্য একটা টুর্নামেন্ট করেছি আমি, অনেককেই চিনি। তুমি কেন যে নিজের ওপর দায়িত্ব নিলে! তুমি ফোন করলে আর ওই ব্যাটা বলল, আসবে। কিন্তু এল কি? আরে, ওকে আমি ভাল করে চিনি। খুব গেঁতো ছেলে। প্রায় উজবুক। ওর ভরসায় থাকলে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ কেন, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচও হবে না। বুঝলে?’
‘আসলে কিগানদা বলল তো। তাই…’ রাহির গলা অস্পষ্ট হয়ে এল।
‘আবার কিগানদা!’ ব্যঙ্গের হাসি হাসল ত্রয়ণ, ‘লোকটা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানে নাকি? এভাবে বশ করল তোমায়?’
‘বশ? ব্ল্যাক ম্যাজিক?’ রাহি রাগের গলায় বলল, ‘যাকে জানো না তার সম্বন্ধে এমন করে কথা বলো কোন সাহসে?’
ত্রয়ণ হাসল, ‘হুঁঃ, মানুষ নিয়ে কাজ করি আমরা। একটা ভাত টিপে বলে দিতে পারি গোটা হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা। এমন যন্তর অনেক দেখা আছে। যে-মানুষ যত চুপচাপ থাকে সে তত গন্ডগোলের।’
‘হাউ ডেয়ার ইউ?’ রাহির ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে গেল। এমন করে কীভাবে বলতে পারে একজন! তাও অন্যকে না জেনে? আর আবেশই বা চুপ করে আছে কী করে? ও তো কিগানকে চেনে। তা হলে এমন করে চুপ করে আছে কেন আবেশ?
‘তুমি কিছু বলছ না তো?’ আবেশকে লক্ষ্য করে বলল রাহি, ‘তোমার তো এর প্রতিবাদ করা উচিত। আর তুমি বসে এসব শুনছ? ছিঃ ছিঃ!’
আবেশ হাসল, ‘কিগানদাকে ডিফেন্ড করার দরকার হয় না। ও নিজেই সবটা পারে। আর কারও কথায় মানুষের মনের অন্ধকার যায় না। যার যার নিজের একটা করে ধারণা থাকে। সেটা নিজের থেকে দূর হওয়াই ভাল।’
‘এটা ডিফেন্সিভ কথা। শোনো ত্রয়ণ,’ রাহি রাগের গলায় বলল, ‘লোক চরালেই হয় না। তোমরা যারা পলিটিক্সের সঙ্গে অ্যাক্টিভলি যুক্ত তারা সবসময় ভাবো যে, সব বিষয়ে তোমরা পণ্ডিত। সব বিষয়ে তোমরা মাথা গলিয়ে দাও আর মাতব্বরি ফলাও। জানো তুমি? জানো যে, কিগানদাকে খুব দামি একটা ঘড়ি প্রেজেন্ট করেছিলাম আমি। সেটা তো পরেইনি। খুলে পর্যন্ত দেখেনি। তাই বলছি, মানুষ আর ভাত এক জিনিস নয়। সব কিছু এক প্যারামিটারে বিচার করলে হয় না।’
ত্রয়ণ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ হোমি লাফ দিয়ে উঠে দু’জনের মাঝখানে দাঁড়াল। বলল, ‘চুপ। একদম চুপ। তোরা দু’জন কী শুরু করেছিস? আজ কিগানদাকেও নেমন্তন্ন করা হয়েছে। যে-কোনও সময়ে আসবে। তোরা এসব টপিক বন্ধ কর। কাকিমার জন্মদিন, কোথায় আনন্দ করব! না বসেছিস ঝগড়া করতে! কেন বল তো?’
‘আচ্ছা কাকিমা কই?’ আবেশও যেন প্রসঙ্গ পালটাতে পারলে বেঁচে যায়, এমনভাবে বলল।
‘দেখো না,’ রাহি নিজের গলাটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল, ‘বললাম আমি সব আয়োজন করব। কিন্তু তোমরা আসতেই আমায় তোমাদের কাছে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে খাবার দাবারের তদারকি করতে লেগেছে।’
‘তা দীপাই বা কই?’ ত্রয়ণ জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা সহজ শুনতে লাগলেও খুব একটা সহজ নয়। কারণ, ত্রয়ণ জানে যে, দীপা এই বাড়িতে একটু কোণঠাসা হয়ে থাকে। আর আজও তো মা-ই ওকে নিজের সঙ্গে রান্নাঘরে আটকে রেখেছে। কোথায় এখানে এসে সকলের সঙ্গে আড্ডা দেবে, তা না, আটকে রেখেছে! যেন দীপা সাত বুড়ির এক বুড়ি! যেন ওর আনন্দ-আহ্লাদ বলে কিছু নেই!
রাহি তো আপত্তি করেছিল, ‘কেন মা দীপা রান্নাঘরে থাকবে? আমাদের সঙ্গে এসে বসুক না। আর রান্নাও তো সব ঠাকুররাই করবে। তুমি তো জাস্ট সুপারভাইজ করবে। দীপা বোর হবে। বরং আমাদের সঙ্গে এলে আনন্দ করতে পারবে একটু।’
‘আনন্দ করবে? তা বাড়িতে আনন্দ কিছু কম হয় নাকি? বাড়ির বউকে বাইরের লোকের সামনে অত ধিঙ্গিপনা করতে হবে না। খাওয়ার সময় থাকবে, ব্যস। তা ছাড়া ওকে তো দাঁড়িয়ে থেকে শিখতে হবে যে, আমাদের বাড়ির অনুষ্ঠানে কেমন রান্নাবান্না হয়, নাকি?’
ত্রয়ণের প্রশ্নে রাহি থমকাল একটু, তারপর বলল, ‘দীপা জেদ করে মায়ের সঙ্গে রয়েছে রান্নার জায়গায়। ওকে নাকি শিখতে হবে! বোঝো!’
ত্রয়ণ হাসল। ভুরু তুলে অদ্ভুত মুখভঙ্গি করল। যার অর্থ, বুঝেছি। আর বানিয়ে বলতে হবে না।
মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় রাহির। খুব হেল্পলেস লাগে। একটা বোকামোর জন্য, ভুলের জন্য সারাজীবন কি এই ছেলেটার অসভ্যতা সহ্য করতে হবে ওকে! কেন যে সে সময় অমন ভূত চেপেছিল ওর মাথায়! কেন যে স্যারের কাছে…
‘এই গান শুনব। আর এমন গম্ভীর কথাবার্তা ভাল লাগছে না।’ হোমি হয়তো আগাম ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের জন্যই নেমে পড়ল।
‘কী গান? সিডিগুলো আমার ঘরে আছে। চল, বেছে আনবি।’ রাহি মোড়া থেকে উঠল।
‘না আমি যাব না। তুই যা। নিয়ে আয়। ঘুমপাড়ানি গান আনবি না কিন্তু। বেশ নাচা যায় এমন কিছু আন। কাকিমাকেও তা হলে নাচাব আজ।’
‘নাচের মতো?’ রাহি একটু চিন্তিত হল, ‘আমার তো তেমন কিছু নেই। ঠিক আছে তোরা বোস, আমি দেখছি।’
রাহি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বসার ঘর থেকে লম্বা একটা প্যাসেজ চলে গেছে সোজা। তারপর ইংরেজি এল অক্ষরের মতো বেঁকে গেছে বাঁদিকে। ওই বাঁদিকের একদম শেষ প্রান্তে রাহির ঘর। গোটা প্যাসেজটাই গোলাপি মার্বেল মোড়া। আর নরম জ্যোৎস্নার মতো আলোয় ঢাকা।
রাহি ঘরে গিয়ে একটু সময় নিয়ে সিডি খুঁজল। না, তেমন নাচানাচির মতো গান ও শোনে না। তবে বেশ কিছু ভাল সফ্ট রক আছে। তারই দুটো সিডি নিয়ে ঘরের থেকে বেরোল রাহি। আর বেরিয়েই থমকে গেল একদম। প্যাসেজের বাঁ দিকটা গোটাটাই ঘষা কাচে মোড়া। তাতে বৃষ্টি দামাল বেগে তার নখ দিয়ে আঁচড়ে চলেছে। আর সেই কাচের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ত্রয়ণ। মুখে অদ্ভুত গা-ঘিনঘিনে এক হাসি।
রাহি চোয়াল শক্ত করল। করিডরটা নির্জন। বাড়ির সকলে অন্য প্রান্তে ব্যস্ত। আড্ডা ছেড়ে কী অজুহাতে যে এল ত্রয়ণ সেটা বুঝতে পারছে না ও।
রাহি আর ভাবল না কিছু। দ্রুত পায়ে প্যাসেজটা দিয়ে হাঁটা দিল। কিন্তু ত্রয়ণের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা ত্রয়ণ হাত দিয়ে ওর পথটা আটকাল। তারপর এক ঝটকায় রাহির হাত ধরে ওকে টেনে আনল নিজের কাছে।
লাগছে। রাহির হাতে লাগছে। ত্রয়ণ রোগা হলেও শক্তি আছে শরীরে। গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরোচ্ছে ছেলেটার। গা গুলোচ্ছে রাহির। ও বুঝল ত্রয়ণ ওকে টেনে নিয়ে ওর বুক ছোঁয়ার চেষ্টা করছে।
রাহি চাপা গলায় বলল, ‘ছাড়ো, দাদা যদি জানে না!’
ত্রয়ণ হাসল। শয়তানের হাসি। চোখ দুটো যেন জ্বলছে ছেলেটার। গরম শ্বাসের জিভ যেন চাটছে রাহির গাল। প্রতিটা অংশ থেকে লোভ আর অশ্লীলতা টোপাচ্ছে। ত্রয়ণ হিসহিসে গলায় বলল, ‘আমার কাছেও কিন্তু কিছু আছে। দাদা কি সেগুলোও জানবে?’
হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে রাহি বলল, ‘নোংরামো করবে না। ছাড়ো, ছাড়ো বলছি।’
‘আমি করলে নোংরামো! আর তোমরা করলে…আমায় কবে দেবে রাহি? আর তো ভাল লাগে না। কবে দেবে তুমি?’
‘ছাড়ো।’ প্রায় চিৎকার করে সর্বশক্তি দিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল রাহি। তবে বুঝল ত্রয়ণ তারই মধ্যে বুক ছুঁয়ে ফেলেছে ওর।
রাহি যেতে যেতে শুনল ত্রয়ণ বলছে, ‘আমার কিন্তু চাই।’
রাহি প্রায় দৌড়ে প্যাসেজের মোড় ঘুরে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল থতমত খেয়ে। ওর হাত-পা কাঁপছে। উত্তেজনায় মুখ লাল। রাহি দেখল, আবেশ দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে। মুখে প্রায় অদৃশ্য এক হাসি।
কেন হাসছে আবেশ? কী দেখেছে ও? কিছু নজরে পড়েছে? না হলে অমনভাবে হাসছে কেন? রাহি দেখল জ্যোৎস্নার মতো আলোর ভেতরে দুই সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও নিজে। ও ভাবল আবেশ ঠিক কতটা শুনতে পেয়েছে? কতটা জেনেছে? কতটা বুঝেছে? আর এর ফল কী হবে?
Chapter - 19
১৯
বাড়িটা পুরনো। কাঠের সিঁড়ি দেওয়া। এই বালিগঞ্জ অঞ্চলে যে এমন বাড়ি থাকতে পারে তা কল্পনাও করতে পারেনি আদি। বড় লোহার গেট ঠেলে ঢুকে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে প্রথমে একতলার বারান্দায় উঠতে হয়েছে। তারপর ডানদিক দিয়ে উঠে যাওয়া আর-একটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওকে পৌঁছোতে হয়েছে মালিনীদের এই দোতলায়।
দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটা খুব পুরনো। পুরনো হলদেটে কাগজের মতো দেওয়ালের রং। সিলিং-এ কড়িবরগা। উঁচুতে স্কাইলাইট। মোটা দেওয়াল। মনে হয় যে-কোনও সময় গ্র্যান্ডফাদার ক্লক বেজে উঠবে যেন। যেন নুড়িপাথরের রাস্তায় ফিটনের চাকার শব্দ শোনা যাবে যে-কোনও মুহূর্তে।
সাধারণত ভূতের সিনেমায় এমন ধরনের বাড়ি দেখা যায়। এইসব বাড়ির করিডরে একা হাঁটলেই মনে হয় থামে খোদাই করা মূর্তিরা চোখ ঘুরিয়ে লক্ষ করছে মানুষজনকে।
দোতলায় উঠে সবুজ কাঠের পুরনো বড় একটা দরজার সামনে দাঁড়াল আদি। ডানদিকে বড় গোল কলিংবেল। দরজায় কাঠখোদাই করে লেখা-সিংস্।
কলিংবেলটার শব্দটাও পুরনো দিনের মতো গম্ভীর। কেমন যেন থেমে থেমে ঢং ঢং করে বাজল। আর তার একটু পরে খট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ পেল আদি। একজন বয়স্ক পাহাড়ি মানুষ। ফতুয়া আর খাটো পাজামা পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘বোলিয়ে,’ মানুষটার গলার স্বরটাও কেমন যেন খোনা, পুরনো।
‘মালিনী হ্যায় ঘর মে?’
‘আপ কৌন?’ অদ্ভুত দাগধরা মুখটায় খুব সামান্য কৌতূহল দেখতে পেল আদি।
‘আদিত্য।’
‘ও। আপনার আসার কথা ছিল?’ লোকটার বাংলাটা ভাঙা। কিন্তু বোঝা যায় স্পষ্ট।
‘হ্যাঁ। আসার কথা ছিল।’ আদি ছোট্ট করে বলল।
লোকটা ভাল করে আদির মাথা থেকে পা অবধি দেখল। তারপর বলল, ‘আসুন তবে। আর ওই দরজার কাছে জুতোটা খুলে আসবেন।’
বসার ঘরটা পুরো কার্পেটে মোড়া। নরম কার্পেটের ওপর আদির পা দুটো ঢুকে গেল আপনা থেকে। ঘরটা পুরনো সেগুন কাঠের সোফা আর পাথরের মূর্তি দিয়ে সাজানো। একটা গদার মতো দেখতে ফ্যান ক্লান্ত হয়ে ঘুরছে মাথার ওপর। হাওয়া বিশেষ লাগছে না। তবু গরম লাগছে না আদির। বাড়ির ভেতরটা কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে আর ঠান্ডা।
বৃদ্ধ মানুষটি সোফা দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপ বৈঠিয়ে। আমি দিদিকে খবর করছি।’
আদি বসল। কাঁধের ব্যাগটাকে পাশে রেখে, তার থেকে কাগজের একটা তাড়া বের করে কোলের ওপর রাখল। কনসালট্যান্টদের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে এই পেপারগুলো। কিন্তু তাও একবার এখানে বসে দেখে নেবে। কারণ, গৌরকে না হলে বোঝানো যাবে না কিছু।
চাপাডাঙায় মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের জুস আর মিনারেল ওয়াটারের ফ্যাক্টরিটায় যেন ভদ্রা লেগেছে। কাজ যেন এগোচ্ছে না কিছুতেই। পলিটিক্যাল কানেকশন দিয়ে ব্যাপারটা সল্ভ করতে গিয়ে যেন আরও প্যাঁচ খেয়ে গেছে। তবে পাশাপাশি গৌর কাজ এগিয়ে রাখছে। আর এইসব টেকনিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে দৌড়োদৌড়িও শুরু করে দিয়েছে সরকারের ঘরে। আসলে ‘শিল্প স্থাপন করতে চাই’ ধরনের একটা প্রেশার সরকারের ওপর রাখতে চাইছে গৌর।
আজ শনিবার। তার ওপর সারাদিন ধরে টিপটিপ করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। অফিস বেরোতেই ভাল লাগছে না আদির। আসলে শনিবার ছুটি থাকে ওদের। কিন্তু গৌর আজ এক্সিকিউটিভদের নিয়ে স্পেশ্যাল মিটিং ডেকেছে। সামনের বছর একটা জার্মান কোম্পানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যাওয়ার কথা আছে মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের। তার আগে গৌর অন্তত এই নতুন কাজটা শুরু করে দিতে চায়। কিন্তু জমিটা নিয়ে এমন ঘোঁট পেকে রয়েছে! রাঘব চক্রবর্তী ভদ্রলোক অত্যন্ত সজ্জন, কিন্তু তেমনই খুব ঢ্যাঁটা। আসলে গৌরের অভদ্রতায় ভদ্রলোক জমির ব্যাপারটা সম্মানের ব্যাপার করে নিয়েছেন। কিছুতেই টলছেন না। আদি খবর নিয়ে জেনেছে যে, আসলে জমিটা ভদ্রলোকের মেয়ের নামে রয়েছে। অন্তত ত্রয়ণ তো তাই বলেছে। আর জমিটা এমন অদ্ভুত একটা স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে রয়েছে যে, ওটা না পেলে ফ্যাক্টরিটা হবেই না।
আদি গৌরকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, আপনি কি শুধু গভর্নমেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্যই কনসালট্যান্ট অ্যাপয়েন্ট করে নানা কোম্পানির থেকে অফার আনছেন?’
‘না রে আদি,’ গৌর হেসেছিল, ‘শোন, শুধু যে চাপ তৈরি তা নয়। আমি চাই যে, ওয়ান্স দ্য ল্যান্ড ইজ ফাইনাল কাজটাও যেন ঝটপট শুরু করে দিতে পারি।’
‘কিন্তু স্যার, মিস্টার রাঘব চক্রবর্তী তো কো-অপারেট করছেন না। তবে?’
‘মেক হিম ডু সো। আমার কাছে এসব বলে লাভ নেই। শোনো আদি, তোমায় এটা যে করেই হোক করতে হবে। জাস্ট কোথায় কী দরকার আমায় বলো অ্যান্ড আই উইল স্টেপ ইন! কাজটা করতে হবে, ব্যস।’
‘কাজটা করতে হবে,’ ছোট্ট একটা মশা সবসময় কানের কাছে ভনভন করে আদির। ও জানে এই প্রজেক্টটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা না হলে দায় নিতে হবে ওকে। গৌর হয়তো তাড়িয়েই দেবে। এইসব কর্পোরেট জগতে হায়ার অ্যান্ড ফায়ার হল বীজমন্ত্র, যা ম্যানেজমেন্ট সারাদিন জপ করে যায়। সেই দিক থেকে একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কী ব্যস, গর্দান যাবে। আর আদি চায় না ওর গর্দান যাক। তাই মাস দুয়েক আগে এক বিকেলে একটা ফোন করছিল ও।
তবে ফোনটা করার আগে চিন্তা করেছিল অনেক। কারণ, যে-কোনও জায়গাতেই পলিটিক্যাল ফ্যাক্টরটা এখনকার দিনে খুব বড় হয়ে দাঁড়ায়। সব কিছুতেই পার্টির দাদা-দিদিদের একটা অদৃশ্য বরাভয় থাকতে হয়। বিশেষ করে এই ফ্যাক্টরি ধরনের ব্যাপার-স্যাপারগুলোয়। মানে যেখানে অনেক টাকা আর অনেক মানুষজন এসে একত্র হয়। তাই এই ফোনটা আবার অন্য কোনও অ্যাঙ্গেল আনতে পারে কি না সেটা নিয়েই ভেবেছিল আদি।
তবু ফোনটা করেছিল।
চারবার রিং হওয়ার পর ফোনটা তোলা হয়েছিল, ‘হ্যালো?’
‘ত্রয়ণ?’ নিজের গলাটাই নিজের কাছে সাবধানী লেগেছিল আদির।
‘হ্যাঁ, বলছি, আপনি কে বলছেন?’
‘আমি আদিত্য ব্যানার্জি।’
‘আদিত্য ব্যানার্জি?’ ত্রয়ণ থমকেছিল একটু। তারপর বলেছিল, ‘ও, আদি ব্যানার্জি! মার্চেন্ট মাল্টিপল্স। তা হঠাৎ আপনি?’
‘সব কথা ফোনে শুনবেন? আপনি কি কলকাতায় আসেন?’
‘তা আসি মাঝে মাঝে। কেন?’
‘একবার দেখা করার ছিল। জরুরি ভিত্তিতে দেখা করার ছিল,’ আদি কেটে কেটে বলেছিল।
‘আমার সঙ্গে?’ অবাক গলায় জানতে চেয়েছিল ত্রয়ণ।
‘হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে। দরকারটা জরুরি। খুব জরুরি।’
ত্রয়ণ হেসেছিল শব্দ করে। বলেছিল, ‘জরুরি যে বুঝতে পারছি। না হলে ক্যাপিটালিস্ট কখনও ফোন খরচ করে এমনি এমনি?’
‘আপনি যা ভাবেন। কিন্তু কত তাড়াতাড়ি আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন বলুন। আর দেখা হলেও আপনি এইসব ক্যাপিটালিস্ট খোঁচাগুলো ব্যবহার করতে পারবেন।’
ত্রয়ণ হেসেছিল, ‘একেবারেই কি ফোনে বলা যাবে না? সামনে চারদিন কলকাতায় যাওয়ার প্ল্যান নেই আমার।’
‘আমি আসতে পারি আপনি বললে। বারাসতের কাছাকাছি কোনও রেস্টুরেন্টে আসতেই পারি আমি। আপনি বলুন কখন আসব।’
‘আপনি আসবেন!’ ত্রয়ণ চিন্তা করেছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, ‘ঠিক আছে, পরশু আসুন। দত্তপুকুরের কাছে একটা বড় রেস্টোরেন্ট খুলেছে। এদিকে আসার সময় বাঁ হাতে পড়বে। ক্যাসেল ট্রিট। একটা বড় পেট্রোল পাম্প আছে উলটোদিকে। খুব সোজা। দেখবেন, চিনতে অসুবিধে হবে না একটুও। ওখানে আসুন এই বিকেল চারটে নাগাদ। আমি থাকব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। আমি কি আর ফোন করব?’
‘না, তার দরকার নেই। একরকম ফিক্সই তো করলাম। কোনও চেঞ্জ থাকলে আমি ফোন করে বলে দেব আপনাকে।’
‘থ্যাঙ্কস।’ ফোনটা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস আপনা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল আদির। সত্যি, দরকারে মানুষ গাধাকেও বাপ বানায়!
‘দিদির একটু সময় লাগবে। আপনি কি চা খাবেন?’ সেই বয়স্ক মানুষটি এসে দাঁড়িয়েছে আবার।
‘অ্যাঁ?’ আদি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। তারপর কথাটা বুঝতে পেরে বলল, ‘না, তবে এক গ্লাস জল হলে ভাল হত।’
‘জি, আমি এখনই দিচ্ছি।’ লোকটা মাথা নামিয়ে চলে গেল।
এখনও আসতে দেরি হবে? কেন? দেরি হবে কেন? মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল আদির। মালিনী যেন কেমন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে আজকাল। না, কাজকম্ম ঠিকঠাক করছে, কিন্তু তার বাইরে কোথায় যেন একটা ক্যাজুয়াল হয়ে যাচ্ছে আদির সামনে এসে। সকালে যে আদি বলল গৌর জরুরি মিটিং-এ ডেকেছে, তা কি পাত্তা দিল মালিনী? কথা ছিল আদি আসামাত্র বেরিয়ে যাবে। কিন্তু এখন শুনছে যে, সময় লাগবে। কেন? সময় লাগবে কেন? কী এমন রাজকার্য করছে যে সময় লাগবে? গৌর কি কোনও এক্সকিউজ শুনবে? ফালতু গালাগাল খাবে। আদি শুধু শুধু কনসালট্যান্টদের কাছ থেকে তাড়াহুড়ো করে পেপার্স নিয়ে দৌড়ে এল। সকালে খাওয়াও হয়নি। ভেবেছিল অফিসে গিয়ে খাবে। কিন্তু মালিনী এমন ঝুলিয়ে দিল যে, কী বলবে! আদি চোয়াল পিষল। মনে মনে ভাবল, মালিনীকে কি ও বেশি মাথায় তুলে ফেলেছে? মালিনী কি বুঝে ফেলেছে যে, আদি ওর প্রতি দুর্বল? তাই কি এমন করছে?
আসলে আদি দেখেছে, অনেক মেয়েই এমন করে। কোনও ছেলে তার প্রতি দুর্বল বুঝতে পারলেই যেন লেজে খেলাতে শুরু করে। যাজ্ঞসেনী আইয়ারও তো তাই করত। কম ঘোরাত আদিকে? কিন্তু এখন সময়টা অন্য। বয়সটাও। আদিও আর এক নেই। এখন মালিনী যদি প্যাঁচ দিতে চায়, আদিও প্যাঁচ দেবে। দেখবে, কতক্ষণে প্যাঁচ কাটে।
আদি বোঝে জীবন একটা অদ্ভুত টাগ-অফ-ওয়ার। একটা অদ্ভুত মানসিক খেলা। সবসময় যেন দু’জন যুযুধান প্রতিপক্ষ, একে অন্যকে টেনে মাটিতে ফেলার চেষ্টা করছে। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই যেন এমন। সেদিন ত্রয়ণের সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যাপারটাতেও যেন এমনই একটা লড়াই কাজ করছিল।
ক্যাসেল ট্রিট! কেন একটা অমন নাম দেওয়া হয়েছে জায়গাটার তা হয়তো ভগবানও জানে না। ভিনাইল বোর্ডে, পৃথিবীর সমস্ত চড়া রং ব্যবহার করে বড় বড় করে লেখা আছে ক্যাসেল ট্রিট! হয়তো মালিক ভেবেছে যে ইংরেজি নাম ব্যবহার করলেই বোধহয় কৌলীন্য বাড়ে!
রেস্তরাঁটা ছোট। কাঠের চেয়ার, টেবিলে গ্লাসটপ। হালকাভাবে এসি চলছিল। মল্লারকে গাড়িটা একটু দূরে পার্ক করে রাখতে বলে রেস্তরাঁর ভেতরে বসেছিল আদি।
ত্রয়ণ এসেছিল চারটে বেজে দশ মিনিটে।
‘আসুন।’ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল আদি।
কবজিতে ঢিলে হয়ে নেমে যাওয়া ঘড়িটা ঠিক করতে করতে হাসিমুখে এগিয়ে এসেছিল ত্রয়ণ। তবে হাসির ভেতরে কোথায় যেন একটা আবছা সতর্কতা লক্ষ করেছিল আদি।
‘তারপর?’ সামনে চেয়ার টেনে বসে এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে প্রশ্ন করেছিল ত্রয়ণ, ‘এমন জরুরি তলব?’
‘বলছি।’ আদি সময় নিয়েছিল, ‘কী খাবেন বলুন?’
‘আমার তেমন খিদে পায়নি। শশা আর মুড়িতেই আমার চলে যায়।’
‘তাও, কিছু তো একটা খাবেন?’ আদির বিরক্তি বাড়ছিল। যদি তুই এখানে এসে সাধুপনা দেখাবি তো এমন জায়গায় না বসে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে বসলেই পারতি।
ত্রয়ণ যেন মনের কথা পড়তে পেরেই বলেছিল, ‘আমি ভাবলাম আপনি হয়তো সাধারণ জায়গায় কমফর্টেবল বোধ করবেন না। আমাদের আর কী আছে, বলুন না। আমরা মাঠেঘাটে চরে বেড়ানো মানুষ। জল, মাটি, রোদ আমাদের নিত্য সঙ্গী। মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে আমরা কাজ করি। এমন সাহেবি খাবার আমাদের ঠিক রোচে না।’
আদির মনে হচ্ছিল ঠিক কানের পিছনে একটা থাবড়া দেয় ত্রয়ণকে। তবু মাথা ঠান্ডা রেখে বলেছিল, ‘ঠিক আছে। আজ না হয় কিছু খান। একটু অসুবিধে হবে হয়তো। তবু কিছু অর্ডার দিই?’
ত্রয়ণ বিশেষ আপত্তি করেনি এর পর।
খাবারের অর্ডার দিয়ে আদি গুছিয়ে বসেছিল, ‘তা হলে আমি বলি?’
‘বলুন,’ ত্রয়ণ আলতো করে হেলান দিয়ে বসেছিল চেয়ারে।
‘আমাদের দুটো প্রজেক্ট খুব বাজেভাবে হেল্ড-আপ হয়ে আছে এই উত্তর চব্বিশ পরগনায়। কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। এই ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই আমরা। এখন আপনি বলুন কেমনভাবে সাহায্য করতে পারবেন?’
‘শুনুন,’ ত্রয়ণ এবার এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর দু’হাত রেখে বসেছিল, ‘আপনারা যে-পদ্ধতিতে কাজ করেন, তেমন করলে দুটো কেন, দু’হাজার প্রজেক্ট হলেও তা অমন হয়ে থাকবে। কেন আপনারা বারাসতের এই হাউজিংটায় পার্ক আর গ্রিনারি করে দিলেন না? সবটাই অমন কংক্রিট করে দিলেন! শুধু পয়সা দেখলে চলবে?’
শেষের কথাগুলো কেমন যেন টিটকিরির মতো লেগেছিল আদির। ও দম ধরে রাগটাকে সামলেছিল আবার। নিজের ওপরও বিরক্ত হয়েছিল। চাকরির জন্য এমন সব লোকজনকে সহ্য করতে হচ্ছে ওকে!
আদি বলেছিল, ‘দেখুন, বিজনেস মানে প্রফিট। এখন যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। আপনি একটা পথ বাতলান।’
‘কেন, চমক চক্রবর্তীকেও তো ট্যাপ করেছিলেন। তা কী বলল সে?’ ত্রয়ণ হেসেছিল।
আদি দ্রুত হিসেব করে নিয়েছিল, ত্রয়ণের কথাতেই স্পষ্ট যে, দু’জনের মধ্যে যথেষ্ট ঝামেলা আছে। কিন্তু আদি তো আর এর ভেতরে ঢুকতে চায় না। কারণ, তা হলে এই ঝঞ্ঝাট মেটাতে গিয়ে আরও দশটা ঝঞ্ঝাটে ফেঁসে যাবে ওরা।
আদি বলেছিল, ‘দেখুন, কে কী করতে পারল বা পারল না তা আমার কনসার্ন নয়। আমার মনে হয়েছে যে, আপনি ইয়ং, ডায়নামিক। আপনি এর ঠিক একটা পথ খুঁজে বের করতে পারবেন।’
‘বাড় খাওয়াচ্ছেন?’ হেসেছিল ত্রয়ণ, ‘আপনাদের এই গৌর সাহেব তো বারাসতের হাউজিং-এর সামনে, একবার সবার সামনে আমায় বলেছিল, আমার তেল বের করে নেবে। তা হঠাৎ এই তেলের খনির দিকে আবার নজর পড়ল কেন আপনাদের? তা ছাড়া বারাসতে সুধাদির সঙ্গে মিটিং-এও তো আমায় পাশের ঘরে পাঠানো হয়েছিল। এখন সেই বাতিল ছেলেটাকেই দরকার পড়ল? মাইরি, আপনাদের গায়ের কোনও চামড়া নেই! টাকা ছাড়া সত্যিই আর কিছু বোঝেন না।’
খাবার দিয়ে যাওয়ার সময়টায় আদি একটু চুপ করেছিল। কথাগুলো যে ত্রয়ণ ভুল বলছিল তা নয়। সত্যিই তো আদি ওই সুধাদির সঙ্গে দেখা করে মিউচুয়াল বেনিফিটের আশ্বাস দিয়ে গৌরের সঙ্গে মিটিং ফিক্স করিয়েছিল। আর সত্যিই সেই মিটিং থেকে ত্রয়ণকে যে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাও পরে শুনেছে।
আসলে এইসব কিছু হতই না, যদি না সুধাদি চমককে দিয়ে অমন তিনটে ফ্ল্যাটের ডিম্যান্ড রাখত।
আদি বলেছিল, ‘সেটা ভুল হয়েছিল। আমি মিটিং-এ থাকলে কোনওদিনই এমন কিছু হত না।’
ত্রয়ণ খাবার ভাগ করতে করতে বলেছিল, ‘দেখুন, ব্যাবসা করুন। কিন্তু অন্যেরটা মেরে নয়। সবাই যাতে ঠিক থাকে, সন্তুষ্ট থাকে সেটা তো দেখবেন।’
‘ঠিকই তো। তাই তো আপনার কাছে এসেছি। বারাসতের প্রজেক্টের সামনে আপনারা যে প্রতিবাদ, পিকেটিং করছেন তা নিয়ে ডিটেলে কিছু বলছি না। আমরা শুধু চাই যে, অবস্থাটা স্বাভাবিক হোক। চাই, আবাসিকরা নির্ভয়ে এসে ফ্ল্যাটের পজেশান নিক। আমরাও পাশাপাশি বাকি যেটুকু কাজ আছে সেগুলো করে দিই। দেখুন, এখন একটা ডেডলক হয়ে আছে। পার্কের জন্য যে বলা হয়েছিল, সেটা যে-কোনও কারণেই হোক, করা যায়নি। উপরন্তু সেই জায়গায় কংক্রিটের বিল্ডিং উঠে গেছে। অত টাকা লেগেছে। এখন কি আর তা ভেঙে ফেলা যায়?’
ত্রয়ণ খাবার সমেত বলেছিল, ‘পুরোটা হয়েছে কই? থার্টি পার্সেন্টের মতো কনস্ট্রাকশন হয়েছে। সেটাকে ভেঙে ফেলুন। প্রবলেম কোথায়? ভেঙে পার্ক করে দিন।’
‘আরে বললেই হয় নাকি? ওখানে আবাসনের জন্য একটা কমিউনিটি হল হচ্ছে। সেটার কী হবে? ব্যাপারটা বুঝুন। আপনার লোকজন নিয়মিত স্লোগান দিচ্ছে। আমাদের ওয়ার্কারদের কাজে ঢুকতে দিচ্ছে না। এটা তো বুঝতেই পারছেন আমাদের তরফ থেকে কতটা ক্ষতিকারক। তাই বলছিলাম আপনি তো এটা একদম সামনে থেকে লিড করছেন। একটু দেখুন না!’
‘চমকদা, মানে চমক আর কী, আপনাদের কী শর্ত দিয়েছে?’
‘চমক?’ আদি ঠোঁট কামড়াল। দর কষাকষি শুরু হচ্ছে। ও খুব সাবধানে বলল, ‘সেটা ঠিক মানে…আমি মানে ঠিক ওটা…’
‘কেন ন্যাকামো করছেন?’ ত্রয়ণ বিরক্ত হয়েছিল। পাশের পেপার টাওয়াল দিয়ে জামায় পড়া একফোঁটা মাংসের ঝোল মুছে বলেছিল, ‘আমি শুনেছি বলেই বলছি। বলুন।’
‘দুটো ফ্ল্যাট চায়,’ তিনটেকে দুটো করে কমিয়ে বলেছিল আদি।
‘হুম,’ ত্রয়ণ মাথা নেড়েছিল, ‘দুটো ফ্ল্যাট। কীরকম ফ্ল্যাট?’
‘ওই থ্রি বেডরুম।’
‘আপনাদের তো ওখানে ডুপ্লেও আছে, না?’
‘তা আছে।’ আদি বুঝতে পারছিল না। এরপর ত্রয়ণ কী বলবে।
‘কত দাম ডুপ্লের?’
‘ওই ষাট-সত্তর থেকে শুরু,’ আদি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ত্রয়ণের দিকে।
‘দেখুন, পার্ক আপনাদের করে দিতেই হবে। যেভাবেই হোক। বুঝেছেন? এটা আমার প্রেস্টিজের ব্যাপার। ওখানে কোনও কম্প্রোমাইজ নেই।’
‘মানে?’ অবাক হয়েছিল আদি। এত কথা বলার পর এই!
‘মানে পার্ক চাই। বুঝতে পারছেন না?’
‘না। প্রবলেম তো রয়েই গেল তা হলে।’
ত্রয়ণ হেসেছিল, তারপর থেমে কেটে কেটে বলেছিল, ‘আমি তো বললাম পার্ক চাই। কোথায় চাই, কত বড় চাই, তা তো বলিনি।’
‘সরি। এক্সট্রিমলি সরি,’ দরজার দিকে মুখ না তুলেও গলার স্বর আর অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ পেয়ে আদি বুঝল মালিনী এসে গিয়েছে।
এবার আদি মুখ তুলল, ‘সব ঠিক আছে?’
‘হ্যাঁ, ডোন্ট ওরি। স্যার ফোন করেছিলেন। হি হিমসেল্ফ ইজ লেট। সো উই ডোন্ট হ্যাভ টু হেস্ট। আসলে গ্র্যানির কাছে ছিলাম। প্লাস কাল গোল্ডিজের জন্য গিফ্ট প্যাক করছিলাম। ওখানে একজন নতুন মানুষ এসেছেন। তাঁকে কাল ওয়েলকাম করা হবে,’ মালিনী জলের গ্লাসটা টেবিলে রাখল।
‘নতুন মানুষ?’ আদির গোল্ডিজ সম্পর্কে কোনও আগ্রহ নেই। কিন্তু মালিনীর যাতে খারাপ না লাগে তাই বলল।
‘হ্যাঁ, আগে হাইকোর্টের কাছে ঘুরে বেড়াতেন মানুষটি। আ কাইন্ড অফ ভ্যাগাবন্ড ভাবত সবাই। কিন্তু ওঁর ফ্যামিলির লোকজন ওঁকে নিয়ে আসে আমাদের কাছে। অবশ্য আমিই ওঁকে দেখে গিয়েছিলাম নিজের থেকে আলাপ করতে। আ নাইস ফেলো। যদিও একটু মেন্টালি আপসেট আছেন। তবে উই হ্যাভ মেডিসিনাল রেমিডিজ ফর দ্যাট।’
‘অ্যাঁ?’ আদি অবাক হল, ‘তুমি এর মধ্যে রাস্তার একটা ভ্যাগাবন্ডকে নিজের গোল্ডিজে তুলে এনেছ? হ্যাভ ইউ গন ম্যাড? আর কে লোকটা? হাইকোর্টের সামনে মানে তো আমাদের অফিস অঞ্চল। সেখানকার কোন ভ্যাগাবন্ড?’ আদি জলের গ্লাসটা তুলল এবার।
‘আরে লোকটা পিকিউলিয়ার পোশাক পরত। মাথায় টুপি। আর লাল সাইকেল চালাত। মজার মজার রাইম বলত। একদিন বলে-হিকরি ডিকরি ডক/ মানুষ করছে ছক/ দ্য ক্লক স্ট্রাক ওয়ান/ পয়সা ইজ ভগবান। হ্যাঁ, জানি হাস্যকর। ক্রুড। কিন্তু ভ্যাগাবন্ড একটা মানুষ এমন রাইম বানায়! তারপর টাকা চায়। আমার অবাক লেগেছিল। তাই আলাপ করলাম। একটু মেন্টালি অস্থির হলেও বাড়ির ঠিকানা সব বলল। আই কন্ট্যাক্টেড দেম। তারপর ব্যস, ওর বাড়ির লোকজন ওকে গোল্ডিজে নিয়ে এল,’ মালিনী গভীর টোল ফেলে হাসল।
এইসব মুহূর্তের জন্যই বেঁচে থাকে মানুষ। এই পুরনো দিনের বাড়ি। তার শান্ত গম্ভীর পরিবেশ আর এমন মোমের দেশের একটা মেয়ে। তার ঘূর্ণির মতো টোল! আদির মনে হল কেন মালিনী ছ’ফুট দূরের ওই চেয়ারটায় বসে রয়েছে? কেন আদি গিয়ে বসতে পারছে না ওর কোল ঘেঁষে? কেন ওর অমন সুন্দর হাতগুলো ধরতে পারছে না হাতের মুঠোয়? আদির অসহায় লাগছে খুব। কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে গোটা জীবনটাই বৃথা গেল। এত নারীশরীর পেয়েছে ও, তবু কোনওদিন কোনও মেয়ের জন্য এমন ক্ষুদ্র আর তুচ্ছ মনে হয়নি ওর নিজেকে। বরং আরও স্পষ্ট করে বললে, মালিনীর শরীর নিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কিছু মনে হয়নি ওর। বরং ওর ভেতরে যে কোত্থেকে একটা চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলে গজিয়ে উঠেছে, কে জানে! যার কেবল হিংসে হয়, কষ্ট হয়। যে কেবল কোলে মুখ দিয়ে শুয়ে থাকতে চায়। আর চায় মালিনী ভালবাসুক ওকে। শুধুমাত্র ভালবাসুক ওকেই। আর কাউকে নয়।
‘কী হল?’ মালিনী হাসল আবার, ‘এমন পাথরের মতো হয়ে গেলে কেন?’
আদি চোয়াল শক্ত করল। মালিনীর এই দ্বিতীয় ধরনের হাসিটা সহ্য করতে পারে না ও। কেমন যেন একটা পর করে দেওয়া হাসি। দূরে রেখে দেওয়া হাসি। যেন একটা কাঁটাতার তুলে দিল সামনে। এমন হাসির সামনে আদির সমস্ত ইচ্ছে কেমন যেন নিভে যায়। কেমন যেন হ্যাংলা লাগে ওর নিজেকে। মনে হয় বড্ড বেশি লোভ করে ফেলছে বোধহয়।
‘না, ভাবছিলাম। তুমি জিঙ্গল পাগলাকে জোটালে শেষপর্যন্ত!’
‘জিঙ্গল পাগলা! বাট হি ইজ মাইকেল,’ মালিনী অবাক হয়ে হাসল আবার। আদি চোখ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। কী হবে ফালতু কষ্ট পেয়ে? মালিনী কেন বোঝে না? আদি তো খুব বোঝানোর চেষ্টা করে। তবু বোঝে না। হয়তো মালিনীর অন্য কাউকে পছন্দ। অন্য কেউ আছে ওর জীবনে।
আদি বলল, ‘লেট্স মুভ। কনসালট্যান্ট আমায় পেপার্সগুলো দিয়েছে। একবার চোখ বুলিয়ে ইম্পর্ট্যান্ট আসপেক্টসগুলো স্যারকে বলতে হবে। ঠিকমতো দেখাই হয়নি।’
মালিনী বলল, ‘আচ্ছা, তুমি আমায় এই নর্থ চব্বিশ পরগনার কাজের থেকে একটু সরিয়ে রাখছ কেন বলো তো?’
আচমকা প্রশ্নটায় একটু ঘাবড়ে গেল আদি।
আসলে ঘটনাটা সত্যি। নর্থ চব্বিশ পরগনার দুটো প্রজেক্টই একটু বাজে দিকে বাঁক নিচ্ছে। আর ভবিষ্যতে ব্যাপারটা আরও খারাপ হতে পারে। আদি তাই এসবের থেকে একটু সরিয়েই রাখতে চায় মালিনীকে। অন্য প্রজেক্টের কাজ ওকে ডিল করতে বলে। তবে সবটাই করে সন্তর্পণে। গৌরকে বাঁচিয়ে। কারণ আদি চায় না যে, চমক-ত্রয়ণ-সুধাদি এমন সব মানুষজনের পাল্লায় পড়ে মালিনী!
আদি বলল, ‘মানে? তোমার তো অন্য কাজও আছে, না? তা ছাড়া আমি তো দেখছি। আর এতে পলিটিক্স ঢুকে যাচ্ছে। নানারকম লোক তাদের ভেস্টেড ইন্টারেস্ট নিয়ে এসে ঢোকার চেষ্টা করছে। এতে তোমার খারাপই লাগবে। আর আমার তো ম্যানেজ করতে ভালই লাগছে।’
মালিনী তাকিয়ে রইল চুপ করে। তারপর বলল, ‘জানো জোনাথনদাদু কী বলে?’
‘কে?’ আদি বুঝতে পারল না, কী বলতে চাইছে মালিনী।
‘বলে, সেল্ফ হেল্প ইজ দ্য বেস্ট হেল্প। কেন তুমি গার্ড করো আমায়? দেখো না আমি এসব সামলাতে পারি কিনা।’
জোনাথনদাদু! নামটা প্রথম শুনল আদি। আসলে মালিনীর সম্পর্কে শুনতে, জানতে খুব ইচ্ছে করে আদির। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে কোথায় যেন বাধোবাধো ঠেকে ওর। মনে হয় মালিনী যদি অতিরিক্ত কৌতূহল দেখালে রাগ করে? যদি ওর সঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয়! এই যেটুকু স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, সেটাও যদি না করে! তা হলে!
আদি কথা ঘোরাতে বলল, ‘গ্র্যানির শরীর ভাল আছে?’
‘কথা ঘুরিয়ো না।’ মালিনী যেন ধমক দিল, ‘একা একা কি পারছ কোনও কিছুর সমাধান করতে? সব তো তেমনই অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আমি তো কাজে লাগতে পারতাম! তোমার বড্ড ইগো। আই ডোন্ট লাইক দ্যাট!’
আদি ঠোঁট কামড়াল। এ তো উলটো বুঝলি রাম। করতে গেল এক, হয়ে গেল আর এক। এই নিয়ে যদি গৌরকে কমপ্লেন করে মালিনী যে, আদি ওকে প্রজেক্টের ব্যাপারে কর্নার করছে, তবে বড়সড় একটা ঝামেলা অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
মালিনী আবার বলল, ‘গৌর স্যার তো গোটাটা জানেন না যে, তুমি আমায় ছাড়া এমনভাবে মুভ করছ! জানলে… যাক গে। তুমি দাঁড়াও, আমি চট করে ব্যাগটা নিয়ে আসি।’
এখন বৃষ্টি নেই। তবে আকাশ কালো করে এসেছে আবার। নুড়িপাথর ফেলা রাস্তা দিয়ে মালিনীর পাশে হাঁটতে হাঁটতে আদি মাথা তুলে আকাশটা দেখল। বৃষ্টি নামতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে। দুর, এমন দিনে কাজ করতে ইচ্ছে করে কারও? ওর মনে হচ্ছে একটা ছাতার নীচে মালিনীকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে বেরিয়ে যায় শনিবারের এই ভাঙা হাটের কলকাতায়। তা না, এখন গিয়ে গৌরের বকবকানি শুনতে হবে!
মল্লার গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে একটা বই পড়ছিল। ইংরেজি। আদিকে দেখে সোজা হয়ে বইটা হাত দিয়ে লুকোনোর চেষ্টা করল। মল্লারের রকমসকম দেখে হাসি পায় আদির। এখনও পেল। তবে হাসল না। স্বভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, ‘ডিউটিতে গল্পের বই পড়ছ?’
‘না স্যার। মানে…আমি সরি। এক্সট্রিমলি সরি স্যার।’
‘চাকরির তো একটা নিয়ম আছে, নাকি? যেমন তেমন করলেই হল? আমি কি এখন ইচ্ছে হলে দাবা খেলতে বসতে পারি?’
‘না স্যার।’ মল্লারের ফরসা মুখটা লাল হয়ে গেছে ভয়ে।
আদির হাসি পেল খুব, ‘তা হলে? বই পড়ছিলে কেন?’
এবার মালিনী বলল, ‘কী বই পড়ছিলে মল্লার? দেখি না।’
মল্লার ইতস্তত করে বইটা বাড়াল। আদি দেখল ক্ল্যাসিক একটা। চার্লস ডিকেন্সের ‘আ টেল অফ টু সিটিজ’।
ছেলেটাকে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে আদি। এমন একটা ছেলে গাড়ি চালায় কেন?
না, গাড়ি চালানোতে অগৌরবের কিছু নেই। কিন্তু বিদ্যার ব্যবহারিক একটা দিকও তো আছে। ডিকেন্স-পড়া কোনও ড্রাইভার তো আদি জন্মে দেখেনি। মাঝে মাঝে তাই আদির খুব কৌতূহল হয় ছেলেটা সম্বন্ধে। কিন্তু পেশাগত একটা বাধা মনে মনে অনুভব করে ও। ফলে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। তবু, আদি লক্ষ করল, মল্লারের কান লাল হয়ে আছে। ছেলেটা ভয় পেয়েছে খুব। হয়তো ভাবছে গল্পের বই পড়ে খুব জঘন্য একটা কাজ করে ফেলেছে ও।
মালিনী মোবাইলে কী একটা দেখছিল তারপর হাসি হাসি মুখ করে মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল, ‘তোমার বন্ধু রুহান জোক পাঠিয়েছে। বেশ ফানি। শুনবে?’
‘রুহান?’ দপ করে মাথায় আগুন জ্বলল আদির। এত বড় সাহস যে, মালিনীকে আজকাল এসএমএস-ও করে। আর এইসব জোক টোক পাঠানো মোটেও ভাল কথা নয়। এককাঁড়ি অশ্লীল গল্প চালাচালি করা। অসহ্য লাগে!
‘হ্যাঁ, রুহান। আমায় মাঝে মাঝে এসএমএস করে তো ও। যদিও দেখা করার সুযোগ পায় না বিশেষ। গোল্ডিজ-এ তো আসেই না।’
আদি গুম মেরে গেল। রুহান যদি এসএমএস করে, তা করুক না। সেটা ওকে জানানোর কী হয়েছে? এসএমএস করুক, দেখা করুক, গোল্ডিজ-এ যাক-যা খুশি করুক। এসব জেনে আদির কোন লাভটা হবে?
আদি বলল, ‘না, ওই নোংরা জোক শুনব না।’
‘নোংরা!’ মালিনী ভুরু কোঁচকাল, ‘রুহান মোটেই আমায় ডার্টি জোক পাঠায় না। সবাই ডার্টি হয় না আদি। সবাই মেয়েদের অগ্রাহ্য করে না।’
‘মানে?’ আদির মাথার ভেতরে আগুনটা বাড়ল আরও, ‘হোয়াট এগজ্যাক্টলি ডু ইউ ওয়ান্ট টু মিন? আঁকাবাঁকা কথা না বলে স্পষ্ট ভাষায় বলো। কী বলতে চাইছ তুমি?’
‘কিচ্ছু না,’ মালিনী বিরক্ত মুখে বাইরে তাকাল।
‘না, না,’ আদি চোয়াল শক্ত করল, ‘সবাই বলতে কোন দিকে হিন্ট করছ তুমি? কতটুকু জানো তুমি রুহানকে? টাকার জন্য কতটা নামতে পারে ও, জানো?
‘স্টপ ইট আদি। ব্যাকবাইটিং খুব খারাপ লাগে আমার। যেমন খারাপ লাগে মেয়েদের পিছনে ছেলেদের ছোঁকছোঁক করা,’ মালিনীর গলাটাও কঠিন শোনাল।
‘ছোঁকছোঁক?’ আদি ভুলে গেল যে, সামনে মল্লার গাড়ি চালাচ্ছে।
‘কিপ ইট ডাউন,’ মালিনী কড়া গলায় বলল, ‘একটা এসএমএস নিয়ে এমন রিঅ্যাক্ট করছ কেন? কী হয়েছে তোমার?’
‘আমার কিচ্ছু হয়নি। জাস্ট ডোন্ট ওয়ান্ট টু হিয়ার বুলশিট ফ্রম ইউ,’ আদি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘তুমি কী ভাবো? আমি বাচ্চা ছেলে?’
‘মানে?’ মালিনী আচমকা আদির বাঁ হাতটা ধরে টান মারল, ‘কী বলতে চাইছ তুমি? কী বোঝাতে চাইছ? এমন রুডলি কথা বলছ কেন?’
আদি থমকাল এক মুহূর্ত। ভীষণ সুন্দর একটা হাত ধরে রয়েছে ওর হাতটা। গোলাপি পরিষ্কার করে কাটা নখ। মোমের মতো পিছলে যাওয়া আঙুল। হাতের ওপরে পর পর দুটো বাদামি তিল। আদির দম বন্ধ হয়ে গেল, নিমেষের মধ্যে। মনে হল হাতটা ধরে বসে থাকে সারাজীবন। মনে হল এমন হাত পেলে আর কোনওদিন, কোনওদিন কিচ্ছু চায় না ও। আদি নিজেকে সংযত করল, ‘সরি। এক্সট্রিমলি সরি।’
‘নো। আই ডোন্ট অ্যাকসেপ্ট দ্যাট। বলো তুমি, সবসময় এমন অর্ধেক কথা মুখে, অর্ধেক কথা পেটে রাখবে, তা তো হবে না। বলো তুমি, কীসের এত রাগ তোমার?’
‘কিচ্ছু না,’ আদি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সত্যি এসএমএস-এর কথা শুনে অমনভাবে রিঅ্যাক্ট করার কোনও মানেই হয় না।
মালিনী হাতটা সরিয়ে নিয়ে, নিজেও সরে বসল একটু, ‘ঠিক আছে। তবে যা বলার বলে দিলেই পারতে। এমনভাবে রুড হওয়ার কোনও মানে নেই। দেখো আদি, তুমি কিন্তু কিছুই বলো না। এটাও আজ পর্যন্ত বলোনি যে, কিগান ব্যানার্জি, চাপাডাঙার ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ইনচার্জ তোমার কাজিন। তুমি নিজেকে আমার বন্ধু বলো কিন্তু এসব ডিটেল কিছু দাও না। আমি জানি কেন তুমি আমায় চাপাডাঙার কাজটায় যেতে হিন্ডার করো। তোমার কি মনে হয় যে, কিগানের থেকে আমি অনেক কিছু জেনে যাব তোমার সম্পর্কে? আবেশ আমায় বলেছে যে, তোমাদের মধ্যে কিছু একটা প্রবলেম আছে। কিন্তু সেটার জন্য অফিসের কাজ হ্যাম্পার করাটা কি খুব প্রফেশনাল ব্যাপার?’
‘মানে?’ আদির হাত-পা চিড়বিড় করছে, ‘তুমি কী বলতে চাইছ? তুমি জানো পলিটিক্যাল প্রবলেমে কাজটা কেমন গুলিয়ে আছে? জানো, ওদের ডিমান্ডে গৌর স্যার সায় দিচ্ছেন না বলে প্রজেক্টটা ঝুলে আছে? আর গৌর স্যার আবার আমায় চাপছেন কাজটা দ্রুত করানোর জন্য! তুমি কী করবে বলো? আরও কাজ আছে আমাদের, আরও প্রজেক্ট রয়েছে। প্লাস, এই কাজের জন্য শহরেও কো-অর্ডিনেশনের দরকার। সেটা তো করো না। আমায় বললে তোমায় পিক-আপ করতে। কোথায়, কনসালট্যান্টদের ওখানে গিয়ে সকালে পেপার্সগুলো বুঝে তো এলে না! তোমার বাড়ি, তোমার গ্র্যানি, তোমার কাজ, গোল্ডিজ। এগুলোই তো তোমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট বেশি। বলো তো, এটা কি খুব প্রফেশনাল ব্যাপার?’
মালিনীর ফরসা মুখটা লাল হয়ে গেল নিমেষে। ঠোঁট টিপল ও। গালে টোল দুটো জেগে উঠল স্পষ্টভাবে। আদি বুঝল উত্তেজনার চোটে হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছে ও। কিন্তু বলে তো ফেলেছ, আর তো ফেরানোর উপায় নেই। ও চুপ করে মুখ ফিরিয়ে নিল। জানালা দিয়ে এলোমেলো কলকাতা দেখা যাচ্ছে। শনিবারের ছানাকাটা ভিড় দেখা যাচ্ছে। কালো আকাশ দেখা যাচ্ছে জুলাইয়ের।
অফিস পর্যন্ত আর একটা কথাও বলল না মালিনী। সারাটা পথ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই কাটিয়ে দিল। আদির খারাপ লাগছিল। কিন্তু কিছু বলতেও পারছিল না ও। হয়তো একটু বেশিই রাফ হয়ে গিয়েছে কথাগুলো।
অফিসের কাছাকাছি গাড়িটা থামতেই মালিনী স্প্রিং-এর মতো ছিটকে বেরিয়ে গেল গাড়ি থেকে। একবারও ঘুরে তাকাল না আদির দিকে। আদির মুখটা তেতো হয়ে গেল একদম। মনে হল, দুর, আর অফিস গিয়ে কী হবে? নিজেকেই মনে মনে গালাগাল দিল। সত্যিই হঠাৎ হঠাৎ খুব রুড হয়ে যায় আদি! তখন যে ওর নিজেরই হুঁশ থাকে না। কেন যে মাঝে মাঝে এমন হয়ে যায় ও!
মনমরা হয়ে গাড়ি থেকে নামল আদি। বুঝতে পারল না মালিনীকে কীভাবে সামলাবে এবার!
‘আদি,’ একটা ডাক হঠাৎ থমকে দিল আদিত্যকে। খুব পরিচিত গলার স্বর। বহু বহু দিন ধরে শোনা। খুব নির্ভরতার ডাক। ভালবাসার ডাক। ওর মনে হল কোনও জন্মের ওপার থেকে ডাকটা যেন আসছে! আদির হঠাৎ গলার কাছটা ব্যথা করে উঠল। চোখটাও জ্বালা করে উঠল অল্প। বুকের ভেতরের একটা হিজিবিজি কষ্ট যেন আরও কিছুটা হিজিবিজি হয়ে গেল। আদি পিছন ঘুরল।
সামান্য রোগা হয়ে গেছে দাদাভাই। আর কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে। তবে সাদা টিশার্ট আর নীল জিন্স পরা মানুষটা আগের মতোই সুন্দর আছে। আর চোখ দুটোও সেই আগের মতোই একা। নির্জন।
‘দাদাভাই?’ আদির মুখ দিয়ে আপনা-আপনি বেরিয়ে এল কথাগুলো।
‘শোন। তোর সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে। একটু সময় হবে?’
‘সময়?’ আদি কী বলবে বুঝতে পারল না। দাদাভাই এমনভাবে বলছে!
‘একটু সময় দে আদি। জরুরি কথা বলার আছে তোকে। শোন, তোর কিন্তু বিপদ হতে পারে। খুব বিপদ হতে পারে। বুঝলি?’
আদি এখনও তাকিয়ে রইল। কী বলছে দাদাভাই? বিপদ? কীসের বিপদ? আর হলেও দাদাভাইয়ের কী? ও তো দাদাভাইয়ের সঙ্গে আর যোগাযোগই রাখে না। তবে? দাদাভাই চিন্তিত কেন? তবে কি দাদাভাই এখনও ফেলে যেতে পারেনি কিছু? তবে কি সেই ঘুড়ি পেড়ে আনা মানুষটা আজও রয়ে গেছে তেমনই? তার সুতোর টান এখনও ভোকাট্টা হয়নি!
Chapter - 20
২০
আজ রবিবার। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হয় নিম্নচাপ। কারণ, গত দু’দিন ধরে আকাশ এমনই গোলা পায়রার পাখনার মতো মুখ করে রয়েছে। সল্টলেক অঞ্চলটা এমনিতেই নির্জন। আর আজ যেন আরও নির্জন মনে হচ্ছে।
এই বারান্দাটা চওড়া। খুব সুন্দর করে তৈরি। বারান্দার মাঝখানে সিলিং থেকে পাট দিয়ে তৈরি একটা দোলনা ঝুলছে। গড়িয়া থেকে সল্টলেকে বাড়ি করে আসার সময় বাপি নিজে যত্ন করে তৈরি করিয়েছে বাড়ির প্রতিটা অংশ। বিশেষ করে এই বারান্দাটা। ওদের গড়িয়ার বাড়িতে কোনও বারান্দা ছিল না। মায়ের চিরকাল এই নিয়ে আক্ষেপ ছিল। দিদিও বলত, ‘বাপি আমাদের কোনও বারান্দা নেই কেন? জানো, জুলিয়েটদের বারান্দা ছিল। আর সেখানে জুলিয়েট অপেক্ষা করত দাঁড়িয়ে।’
বাপি বুঝত না জুলিয়েট কে। জিজ্ঞেস করত, ‘কে জুলিয়েট? তোদের ক্লাসে পড়ে? কোথায় ওদের বাড়ি?’
‘আমাদের ক্লাসে?’ দিদি হেসেই খুন হত। ফরসা গালগুলো লাল হয়ে উঠত খুশিতে।
‘এ বাবা, বাপি জানে না!’ দিদি বলত, ‘আরে না। জুলিয়েট গো। রোমিওকে যে ভালবাসত, শেক্সপিয়র লিখেছেন না। আমি অ্যাব্রিজড ফর্মে পড়েছি। নাটকটাও ট্রাই করেছিলাম, কিন্তু কেমন যেন ইংলিশ!’
বাপি হাসত। দিদির গালে হাত দিত সস্নেহে। বলত, ‘ও, তাই? ঠিক আছে, আমরা যখন বাড়ি করে যাব, সেখানে খুব সুন্দর একটা ব্যালকনি থাকবে। কেমন?’
মা তখন এসে ঢুকত আলোচনায়। রাগ করে বলত, ‘আহা, কী সোহাগ হচ্ছে! ক্লাস সিক্সের মেয়ে প্রেম করবে বলছে আর বাপ তার জন্য ব্যালকনি বানিয়ে দেবে!’
‘কেন? প্রেম করা খারাপ?’ দিদি জানতে চাইত। বলত, ‘তা হলে শেক্সপিয়ার লিখলেন কেন? ক্লাসে পড়ানো হয় কেন? আচ্ছা মা, তুমি এখনও উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেনের ওই লাভস্টোরিগুলো দেখো কেন? তখন তো খারাপ বলো না?’
মা রাগ করত। ফরসা মুখ লাল করে বলত, ‘তবে রে, মুখে মুখে কথা! এই বয়সে আমরা মা-বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাতাম না। আর তুই এসব নিয়ে কথা বলছিস? সাহস পাস কোথা থেকে এত? কে তোকে সাহস দিচ্ছে?’
দিদি হাসত। বাপিও হাসত। সেই দেখে মা রেগে যেত আরও। বলত, ‘এসব না করে চল, গানের রেওয়াজে বসবি চল।’
দিদি যেতে যেতে হাত তুলে বাপিকে বলত, ‘তা হলে সেই কথা রইল তো?’
বাপি প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে বলত, ‘রইল। সেই কথাই রইল।’
কত ছোট্ট তখন জিয়ানা। কিন্তু আজও যেন ছবির মতো সব ভেসে আসে। ওই দিদির হাত তুলে কথা বলার ধরন। বাবার হাসিহাসি মুখ। সব যেন টলটলে জলের মতো স্পষ্ট। স্বচ্ছ। তবে সত্যিই কি সব মনে আছে? না, এইসব গল্প বহুবার শুনতে শুনতে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে জিয়ানার! আসলে স্মৃতি একটা অদ্ভুত জিনিস। তা এতভাবে পালটে যায় যে, মাঝে মাঝে তার হদিশ পাওয়া যায় না।
তবে এই ব্যালকনিটায় বসলেই দিদির কথা মনে পড়ে জিয়ানার। না, দিদি দেখেনি এই বাড়ি। তবে কেন কে জানে জিয়ানার মনে হয় এই বাড়ির সর্বত্র দিদি ছড়িয়ে আছে।
বৃষ্টিতেও, একটা দোয়েল পাখি সামনের পেয়ারা গাছের ডালে বসে লেজ নাড়াচ্ছে। কী আনন্দ! এমন যদি বৃষ্টিতে ভিজতে পারত ও! কিগানের সঙ্গে ছাড়া কোনওদিন তেমনভাবে বৃষ্টিতে ভেজেনি জিয়ানা। মা ভিজতেই দেয়নি। দিদি চলে যাওয়ার পর মা এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল জিয়ানাকে! দমবন্ধ হয়ে যেত জিয়ানার।
আর কিগান? কেন যে বারবার ভিজতে চাইত! বলত, ‘জানিস, বৃষ্টি হলেই না আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। শেষ মাকে যেদিন দেখেছিলাম, সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। আর মা, পার্পল রঙের ছাতা সরিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখেছিল আমায়। বৃষ্টি হলেই মনে হয় এই বুঝি মা আসবে। এই বুঝি পার্পল ছাতা সরিয়ে উঁকি দেবে আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুখটা।’
এখনও তেমনই রয়েছে কিগান। সেই লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। মাথা ভরতি এলোমেলো চুল। থ্রি-কোয়ার্টার করে গোটানো শার্টের হাত আর সেই অব্যর্থ নীল চোখ। এখনও তেমনই নরম গলার স্বর।
কথা বলতে পারছিল না জিয়ানা। কষ্ট হচ্ছিল ওর। চোখে জল চলে এসেছিল আচমকা। ও শুধু তাকিয়েছিল অবাক হয়ে। কিগান সত্যিই দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে! সেই কলেজের ছেলেটা! সেই গড়িয়াহাটের সামনে শেষ দেখা হওয়া ছেলেটা! আজ এত বছর বাদে একইভাবে এসে দাঁড়িয়েছে ওর সামনে!
কিগান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল জিয়ানার দিকে। যেন ওরও মুখ সেলাই করে দিয়েছিল কেউ। যেন অনেক কষ্টে শুধু বলেছিল, ‘কেমন আছিস?’
জিয়ানার চোখের কোণ দিয়ে জলের রেখা নামছিল। না, মোছার কোনও চেষ্টা করেনি ও। যেন বুঝতেই পারেনি ওর চোখ দিয়ে জল পড়ছে!
কিগান ধীরে ধীরে এসে দাঁড়িয়েছিল ঘরের মাঝখানে। তারপর দু’পাশে দু’হাত ছড়িয়ে বলেছিল, ‘আবার সে আসিয়াছে ফিরিয়া।’ হাসছিল খুব। সেই পাথরের মতো মুখটা ক্রমশ যেন গলে যাচ্ছিল হাসিতে। কিগান বলেছিল, ‘আমি জানতাম, তুই আসবি। তবে আজ আসবি জানতাম না।’
‘তুই জানতিস?’ অবাক হয়েছিল জিয়ানা।
‘হ্যাঁ রে। আমাদের জিএম বলেছিলেন তোদের কোম্পানির কথা। তোর কথাও। তখনই জানতাম একদিন না একদিন ঠিক আসবি তুই। তোদের প্রজেক্টের জন্য সাইট ভিজিট তো করতেই হবে। না?’
‘জেনেও তুই…’ জিয়ানা কথা বলতে পারছিল না। হাতের উলটোপিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলেছিল, ‘জেনেও তুই আমায় ফোন করিসনি?’
‘ফোন?’ অবাক হয়েছিল কিগান, ‘কেন, ফোন করব কেন? আমার তো ফোন করার কথা নয়!’
‘কথা নয় মানে?’ কিগানের মুখে হালকা হাসি দেখে গা-পিত্তি যেন জ্বলছিল জিয়ানার, ‘কেন, আমায় ফোন করতে প্রবলেম কোথায় ছিল? কে বারণ করেছিল ফোন করতে?’
‘বারণ কে করেছিল?’ কিগান নিজের চেয়ারে বসে চুলে হাত ডুবিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, ‘তুই।’
‘আ-,’ চুপ করে গিয়েছিল জিয়ানা। ওর হাত কাঁপছিল তখনও। গলাও স্টেডি হচ্ছিল না। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। ও বারণ করেছিল! ঠিক। ও-ই তো বারণ করেছিল! তা বলে কি সব বারণ শুনতে হবে? ও তো পাহাড়েও ওর পিছু নিতে বারণ করেছিল কিগানকে। কিগান শুনেছিল? ওকে ভালবাসতেও বারণ করেছিল। তাও কি শুনেছিল কিগান? তা হলে, এই কথাটা শুনল কেন? কেন, ওর কথা জানতে পেরেও এমন নির্লিপ্ত, সরে থাকতে পারল কিগান! তা হলে কি এতটা বদলে গেছে ও!
জিয়ানা নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারছিল না। কিছুতেই পারছিল না। একটা ছোট্ট ঘর। তার ভেতরে বসে রয়েছে ও। আর এত বছর পর ওর এত কাছে কিগান! যেন ভাবতেই পারছিল না। ও অবাক হয়ে দেখছিল কিগানের অল্প হাসিহাসি মুখটা। কী করে হাসতে পারছে কিগান! কী করে এমন নিষ্ঠুর আর নির্লিপ্ত থাকতে পারছে ও? জিয়ানার তো বুকের ভেতর লক্ষ লক্ষ হরিণ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর সেখানে কিগান হাসছে!
জিয়ানা রুমাল দিয়ে চোখের কোণটা টিপে টিপে মুছে বলেছিল, ‘অবশ্য তুই ফোন করবিই বা কেন? কবে কী হয়েছিল তা মনেও তো রাখিসনি। আর হয়তো তোর বউ তোকে অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেছে। তা তোর ছেলেমেয়ে কিছু হয়েছে?’
‘না,’ কিগান হাসিহাসি মুখেই মাথা নেড়েছিল। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোর?’
‘এক মেয়ে আছে। তুতুল।’
‘নিশ্চয়ই খুব ছোট্ট!’ কিগানের চোখে এই প্রথম আগ্রহ দেখেছিল জিয়ানা।
‘হ্যাঁ ছোটই। তুই, আমি কেমন আছি জানতে চাইলি, কিন্তু উত্তরটা যে দিইনি সেটা খেয়াল করলি না তো?’ জিয়ানার রাগ হচ্ছিল। কেন হচ্ছিল কে জানে! তবে হচ্ছিল।
‘তুই তো ভালই থাকবি। খারাপ থাকবি কেন?’
‘তোর এতগুলো বছর জানতে ইচ্ছে করেনি আমি কেমন আছি? কোথায় আছি? জানতে ইচ্ছে করেনি যে, আমি কীভাবে আছি?’
‘করেছে তো। কিন্তু ভেবেছিলাম…’ কিগান ঠোঁট কামড়ে টেবিলের দিকে তাকিয়েছিল। একটা গোল কাচের পেপার ওয়েট নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বলেছিল, ‘ভেবেছিলাম, সত্যিই খুব ভেবেছিলাম যে, তোর মা, বাবা বা তুই হয়তো ব্যাপারটাকে ভালভাবে নিবি না। বিশেষ করে তুই যখন অমন করে…যাক গে। বাদ দে। কী হবে আর এসব ভেবে? আমরা এখন বুড়ো হয়ে গিয়েছি। আমাদের দিন গিয়েছে। বাদ দে। তা কী খাবি বল?’
‘কিছু না। আমি কিছুদিন আগে জন্ডিস থেকে উঠেছি।’ জিয়ানা গম্ভীর হয়ে বলেছিল।
‘সে কী তোর শরীর খারাপ! তাও এতটা জার্নি করলি?’ এবার সত্যিই চিন্তিত দেখাচ্ছিল কিগানকে, ‘কেন এভাবে এলি? কনসালট্যান্টরা তো সবটাই দিয়েছিল। তা হলে?’
জিয়ানার ইচ্ছে করছিল না একদম এইসব কথা বলতে। কিন্তু যে-কাজের জন্য গেছে সেটা তো করতেই হবে। ও বলেছিল, ‘আমাদের এমডি খুরানাজি চাইলেন যেন আমরা সাইটটা দেখে তার স্পেস আর লোকেশনটা এগজ্যাক্টলি নিয়ে আসি। কারণ, কনসালট্যান্টরা তো পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে সব দেখে। সাইটে কাজ করাটা বা প্র্যাক্টিক্যালি সব দেখাশোনা করে নেওয়াটা দরকারি। তাই আমি এসেছি।’
‘তুই-ই কেন? আর কেউ নেই!’ কিগান বলেছিল, ‘তুই বলতে পারলি না যে, তোর শরীর খারাপ, তুই পারবি না। অন্য কাউকে যেন পাঠানো হয়।’
‘দেখ, কর্পোরেট অফিসে কাজ করি। উই লিভ ইন আ ওয়ার্ল্ড অব টাফ কম্পিটিটর্স। সেখানে, বেশ কিছুদিন বাড়িতে শুয়েছিলাম। তার জন্য একটা চাপ আছে। তার ওপর যদি বলি যে, যাব না, পারব না। তা হলে তো আরও সমস্যা হবে।’
‘তা বলে এমন শরীর নিয়ে এতটা আসবি? নিশ্চয়ই তোর টাকাপয়সার এতটা অভাব পড়েনি যে, কাজ না করলে ভাত জুটবে না।’
‘না না,’ কিগানের কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলেছিল জিয়ানা, ‘আসলে বিদেশ থেকে এখানে এসে নানারকম কাজের অফার ছিল। কিন্তু এই অফিসটা কাছে। পে-প্যাকও ভাল। খুরানাজিও চমৎকার মানুষ। তাই…আর টাকা কোনওদিন কারও বেশি হয়?’
‘তা ঠিক। আর মানুষ তো ভালটাই চায়।’
‘বুকু তো প্রথমে মৃদু আপত্তি করেছিল। বলেছিল যে, কলকাতার খরচ এত বেশি নয় যে, দু’জনকেই চাকরি করতে হবে। তাও, বাড়িতে বসে কী করব? ভাবলাম পাচ্ছি যখন, তখন লেগে পড়ি।’
‘তা ঠিক। তা তোর হাজব্যান্ড…’
‘বিনয়কৃষ্ণ বোস। দাদু দাদু নাম, না?’ খুব হেসেছিল জিয়ানা। ওই প্রথম। বলেছিল, ‘কিন্তু খুব বড় চাকরি করে। বিদেশি ডিগ্রি। বিদেশি গাড়ি। সে একদম ফাটাফাটি ব্যাপার।’
‘যাক, তোর মা তা হলে খুব খুশি, বল?’ কিগান পেপার ওয়েটটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলেছিল।
‘মা!’ জিয়ানা চোখ তুলে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। তারপর মৃদু গলায় বলেছিল, ‘হ্যাঁ, খুশি। সবাই খুশি।’
কিগান হেসেছিল আবার। নরম গলায় বলেছিল, ‘যাক, তা হলেই হবে। আর বল, কী কী দেখতে চাস? মানে সাইট দেখবি তো?’
জিয়ানার ইচ্ছে করছিল না। তবু বাধ্য হয়েছিল উঠতে। কাজ তো করতেই হবে। কিগানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘মেজারিং টেপ আছে? আমরা আনতে ভুলে গিয়েছি।’
‘ও তোর সঙ্গে লোক আছে?’
‘হ্যাঁ, তোদের পার্কিং লটের ওখানে।’
‘মেজারিং টেপ দিয়ে কী করবি?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘তোদের অ্যাভেলেবেল স্পেসটা এগজ্যাক্টলি মাপব,’ জিয়ানা বলল।
‘নাউ কাম অন। এগজিকিউটিভরা এসব করে নাকি? সত্যি তুই পাগলিই রয়ে গেলি। ওসব করতে হবে না। আমার নিজের করা ড্রইং-এর কপি তোকে আমি দিয়ে দেব। ডোন্ট ওরি। সত্যিই, টেপ দিয়ে তুই মাপামাপি করবি!’
জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। হুবহু সেই গলার স্বর। সেই চাহনি। হুবহু সেই জিয়ানাকে কিছু করতে না দেওয়া। যেন আগলে রাখার ইচ্ছে সমস্ত ছোটখাটো প্রবলেম থেকে। কিগান একইরকম রয়েছে!
জিয়ানা কিগানের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সাইট দেখেছিল তারপর। পাশে হাঁটতে হাঁটতে দু’-একবার হাতে হাতও লেগেছিল। বহুদিন পরে সেই স্পর্শ। সেই চমকে ওঠা। সব ছিল। আর অদ্ভুত এক ভাললাগা ক্রমশ অবশ করে দিচ্ছিল জিয়ানাকে। কিগান যা যা বলে যাচ্ছিল সব যেন ঠিক মন দিয়ে শুনছিলও না জিয়ানা। মনে হচ্ছিল শরীর যেন খুব হালকা হয়ে গেছে! পালকের তৈরি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল সব কিছুই অর্থহীন। সব কিছুই বড় অতিরিক্ত।
আবার কিগানের চেম্বারে ফিরে গিয়েছিল ওরা। চেয়ারে বসে কিগান জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী খাবি বল তো? ফল খাবি? বাতাবি লেবু। জন্ডিসে ভাল শুনেছি। ফ্যাক্টরির পিছনের দিকে লক্ষ্মণ বলে একটা ছেলে থাকে। তার ঘরের পাশে ইয়াব্বড় বাতাবি লেবু গাছ রয়েছে। দাঁড়া কয়েকটা দিয়ে দেব তোকে। সবাই মিলে খাবি।’
‘পাগল নাকি তুই!’ জিয়ানা ভাল করে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। এতগুলো বছরে কি কিচ্ছু বদলায়নি ছেলেটার? না, বদলেছে। ছটফটে কিগান এখন শান্ত হয়ে গেছে অনেক। খানিকটা যেন ক্লান্তও হয়েছে। চোখের সেই চঞ্চলতাটা আর নেই। জিয়ানার মনে হয়েছিল যেন একটা ঘরকে বহু দিন পর দেখছে আবার। শুধু তফাত এই, ঘরটা আগে অগোছালো ছিল আর এখন যেন অনেকটা গুছিয়ে রাখা হয়েছে।
‘কেন, পাগল কেন? তোকে বাতাবি লেবু দিতে পারি না?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘গুডনেস! তুই বড় হবি না?’ জিয়ানা হেসেছিল, ‘বাতাবি লেবু টানতে টানতে আমি অত দূর নিয়ে যাব? আর বাতাবি লেবু খেলে আমার দাঁতে প্রবলেম হয়। তাই খাই না। বুঝেছিস?’
কিগান কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ, তারপর বলেছিল, ‘তা হলে তোকে কী দিই বল তো?’
‘কী আবার দিবি? ধ্যাত,’ হেসেছিল জিয়ানা।
‘না, মানে তোর মেয়ের জন্য অন্তত কিছু! কী নাম যেন?’
‘তুতুল,’ জিয়ানা মোবাইল থেকে বের ছবি দেখিয়েছিল কিগানকে।
‘বাঃ, দারুণ! খুব ভাল,’ কিগান বিহ্বল হয়ে তাকিয়েছিল ছবিটার দিকে। চোখ দুটো ছলছল করেছিল কি মুহূর্তের জন্য? তারপর হঠাৎ বলেছিল, ‘দাঁড়া, একটা অদ্ভুত জিনিস আছে। একটু বড়। দু’ফুট বাই দেড় ফুট মতো। কাচের বাক্সে রাখা।’
‘কী?’ জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
কিগান ওর চেয়ারের পিছনের কাঠের আলমারিটা খুলে খুব সাবধানে একটা কাচের বাক্স বের করে রেখেছিল টেবিলে। আর জিয়ানা অবাক হয়ে দেখেছিল অদ্ভুত সুন্দর দেখতে মাটি দিয়ে তৈরি করা একটা গ্রাম। তাতে কুঁড়েঘর, গোরুর গাড়ি থেকে শুরু করে মেঠো পথ, বোষ্টম বোষ্টুমী সব রয়েছে। সবটাই খুব সুন্দর করে তৈরি করা। অবাক হয়ে দেখছিল জিয়ানা, ‘এটা কোত্থেকে এনেছিস? এত সুন্দর!’
‘কৃষ্ণনগরের মেলার থেকে কিনেছিলাম। এটা নিয়ে যা। তুতুলকে দিবি।’
‘কিন্তু,’ ইতস্তত করেছিল জিয়ানা, ‘অনেক দাম হবে তো!’
‘দাম? হোক না। আর এসব তুই ভাবছিস কেন? তুতুলকে দিস, কেমন?’
তারপর ফেরার পালা। কাচের ওই বাক্সটা কিগান নিজেই বয়ে আনছিল সঙ্গে করে। জিয়ানা হাঁটছিল পাশাপাশি। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পর সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল তখন। আল্ট্রামেরিন আকাশে বাসন্তী আঁচল মেলে বসেছিল রোদ্দুর। ভাঙা মেঘ ফাটিয়ে বের হচ্ছিল সূর্য। আর হাওয়া দিচ্ছিল। ফ্যাক্টরির উঁচু জল ট্যাঙ্কিটা ছুঁয়ে অন্য এক সময়ের হাওয়া যেন বয়ে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তকালের মধ্যে দিয়ে। নিমেষের জন্য। জিয়ানার মনে হয়েছিল যে, ওর জীবন চলে গেছে দশ দশ বছরের পার। মনে হচ্ছিল সেইসব লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার বিকেলগুলোয় ও যেন কোন এক জাদুবলে পৌঁছে গেছে আবার। মনে হয়েছিল বয়স আবার হাঁটছে পিছনের দিকে। আবার নতুন করে আলো ফিরে আসছে জীবনে। মনে হয়েছিল এ জীবন দ্বিতীয়বার ওকে সুযোগ দিচ্ছে বেঁচে ওঠার।
তবু এ মুহূর্ত ভ্রম। এ জীবন ধুলোর তৈরি। জিয়ানারও বাস্তবে ফিরে আসতে সময় লাগেনি বিশেষ। ও দেখেছিল কিগান মাথা নিচু করে হাঁটছে। চুলগুলো কপালের ওপর পড়ে আছে। আগে হলে জিয়ানা হাত দিয়ে সরিয়ে দিত চুলগুলো। কিন্তু সেদিন পারেনি। অদৃশ্য এক কাঁটাতারের দু’পাশ দিয়ে যেন হাঁটছিল দু’জন।
তবু আর পারেনি জিয়ানা। পার্কিং লটের বেশ কিছুটা আগে একটা বন্ধ ড্রায়ার মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল হঠাৎ। সামান্য অন্যমনস্ক কিগানকেও আচমকা হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়েছিল। কিগান একটু আশ্চর্য হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
জিয়ানা কোনও ভণিতা করেনি, সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই আমার ওপর খুব রেগে আছিস, না রে? আমায় খুব ঘেন্না করিস, না?’
‘আমি!’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘না তো কী?’ কেন যে এত রাগ হচ্ছিল জিয়ানার। ওর মনে হচ্ছিল কিগানের জামাটা ধরে খুব ঝাঁকায়। হাতের কাচের বাক্সটা আছড়ে ভেঙে ফেলে।
‘কেন? রাগ করব কেন? ঘেন্না করব কেন?’
‘আমি তোকে অমনভাবে না করেছিলাম। অমনভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তোর রাগ হয় না?’
কিগান হেসেছিল। ভীষণ ক্লান্ত এক হাসি। কষ্টের এক হাসি। তারপর বলেছিল, ‘দেখ জিয়ানা, এটা তোর জীবন। তাতে তুই যা ভাল বুঝেছিস করেছিস। যাকে নিজের কাছে রাখার রেখেছিস। যাকে দূরে ঠেলার ঠেলেছিস। আমি আর কী বলব বল?’
‘দূরে ঠেলার মানে?’ জিয়ানার ভেতরটা পনেরো-ষোলো বছরের বালিকার মতো ছটফট করছিল। ও বুঝতে পারছিল বালিকা বয়স ওর কাটেনি এখনও।
কিগান বলেছিল, ‘বাদ দে না। আমি রাগ করিনি। ব্যস, আর কিছু মনে রাখতে হবে না তোকে।’
‘তুই এখনও ভীষণ নিষ্ঠুর!’ জিয়ানার শরীর খারাপ লাগছিল হঠাৎ। এতটা মানসিক স্ট্রেস যেন নিতে পারছিল না আর।
‘তাই? হবে,’ কিগান মাথা নিচু করেছিল।
‘তা কাকে বিয়ে করলি তুই?’ উলটো খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল জিয়ানা।
‘সে বাদ দে।’
‘ও বলবি না তা হলে? ঠিক আছে। বলিস না। তা এমন একটা ফালতু চাকরি নিয়ে অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে আছিস যে! জীবনে উন্নতি করার ইচ্ছে নেই?’
‘না। নেই রে,’ কিগান হাসছিল। জিয়ানার কথায় কিছুই যেন মনে করছিল না।
‘ও, তোর জীবন তা হলে ভরে আছে, বলছিস?’ জিয়ানা নিজেকেই যেন চিনতে পারছিল না। এসব কেন বলছে ও? এত হিংসে কোথায় লুকিয়ে ছিল?
কিগান তবু রাগ করেনি। বলেছিল, ‘কাকিমা আর কাকু কেমন আছে রে?’
কিগানের মাথা চিরকাল ভীষণ ঠান্ডা। কিন্তু তা বলে এত! জিয়ানার মনে হচ্ছিল কোথায় যেন হেরে যাচ্ছে ও। কোথায় যেন কিগান পিছনে ফেলে বেরিয়ে যাচ্ছে ওকে। কেন এমন মনে হচ্ছিল ওর? কেনই বা বিয়ের পর থেকে মাঝে মাঝেই ওর মনে পড়ত কিগানের কথা? কেন কষ্ট হত? কেন ও মনে মনে চাইত যে, কিগান এখনও ভালবাসুক ওকে? আর সেই কিগানকে এমন অবস্থায় দেখে কি তাই রাগ হয়েছিল ওর? মনে হয়েছিল যে, কিগান ভুলে গেছে? কোথাও কি মনে মনে আশা করেছিল জিয়ানা যে, ওকে ছাড়া ভাল থাকবে না কিগান? আর এমন করে কিগানকে দেখে সেই আশাই কি পূরণ হয়নি? তাই কি ওভাবে রাগ করেছিল জিয়ানা? বোঝে না। মানুষ নিজেকে বোঝে না কিছুতেই। সে শুধু হাত-পা ছোড়ে। ক্ষণিকের আনন্দকে সারাজীবনের ভেবে নেয়। ভেবে নেয় বালির তৈরি ফুলও একদিন তার গন্ধ ছড়াবে। মৃত ধান বেঁচে উঠবে মাঠে!
‘আরে কিগানদা?’ পার্কিং লটের কাছে পৌঁছোতেই আচমকা চিৎকারে থতমত খেয়ে গিয়েছিল জিয়ানা। দেখেছিল গাড়ির সামনে দাঁড়ানো রুহান এগিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে! রুহান চেনে কিগানকে? ভীষণ অবাক হয়েছিল জিয়ানা।
রুহান এসে প্রায় জড়িয়ে ধরেছিল কিগানকে। কিগান হাতের কাচের বাক্সটাকে সামলাতে গিয়ে প্রায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বলেছিল, ‘আরে আস্তে। কেমন আছিস তুই?’
‘তুমি কেমন আছ? তুমি কোথায় আছ? ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ হয়ে গেছে আমার। কেন কলকাতা ছেড়ে বেপাত্তা হলে তুমি? কার ওপর রাগ করে? কী হয়েছিল? আমাকে একবার জানালেও না! পায়ের চোটে কাবু হয়ে কিছুদিন যোগাযোগ করতে পারিনি আর সেই ফাঁকে তুমি পুরো বেপাত্তা! কোথায় ছিলে তুমি?’
‘বেপাত্তা?’ জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে, ‘তুই কলকাতা থেকে বেপাত্তা হওয়ার জন্য এখানে এসে উঠেছিস? কেন? কলকাতায় কী হয়েছে? আর তোর বউ? তোর বউ কিছু বলেনি?’
‘বউ? তুমি বিয়ে করেছ নাকি?’ রুহান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘বিয়ে করেছ মানে?’ জিয়ানা রুহানের কথার ভাবটা ধরে চট করে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে, ‘তুই… তুই যে বললি বিয়ে করেছিস?’
‘আমি বললাম?’ হেসেছিল কিগান, ‘আমি কখন বললাম রে?’
‘তুই বিয়ে করিসনি? কেন?’ জিয়ানা অবাক হয়েছিল।
‘কেন!’ কিগান ইয়ারকি মেরে বলেছিল, ‘সত্যিই তো! ও, ভুলে গিয়েছিলাম বোধহয়। আসলে জানিসই তো আমার খুব ভুলো মন।’
‘তুই…তুই…,’ জিয়ানার গলার স্বর বুজে এসেছিল। ও দেখছিল রুহান কথা বলে যাচ্ছে কিগানের সঙ্গে। কিগানও উত্তর দিচ্ছে সাধ্যমতো। জিয়ানা শুধু ভাবছিল, বিয়ে করেনি! এখনও বিয়ে করেনি কিগান! কেন? কোন দুঃখে বিয়ে করেনি ও? আচ্ছা, আর কোনও প্রেমে পড়েছে কিগান? ভালবেসেছে আর কাউকে? খুব জানতে ইচ্ছে করেছিল এইসব। তারপর আচমকাই রুহান আর কিগানের কথার ভেতর ঢুকে পড়ে কিগানকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমি তোকে ফোন করতে বা টেক্সট করতে পারি? রাগ করবি না তো?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারিস,’ কিগান হেসে ওর ফোন নম্বরটা দিয়েছিল।
‘তুই পালটাবি না?’ গাড়িতে ওঠার আগে জিজ্ঞেস করেছিল জিয়ানা।
কিগান বলেছিল, ‘পালটেছি তো। অনেক পালটে গেছি। কিন্তু কী জানিস, তোরা আমায় অনেক পুরনো দিন থেকে চিনিস তো তাই বেসিকটা ধরতে পারিস। আর বেসিক ক্যারেক্টার তো পালটায় না। তাই ভাবছিস যে, আমি পালটাইনি। কিন্তু পালটে গেছি, জানিস, অনেক পালটে গেছি।’
গাড়িতে ফেরার সময় সামনের সিট থেকে পিছন দিকে ফিরে রুহান বলেছিল, ‘আপনারা ক্লাসমেট ছিলেন! এটা কিন্তু দারুণ ব্যাপার হল। কাজটা পেতে কিগানদা হেল্প করবে।’
জিয়ানা হেসেছিল শুধু। রুহানকে আর কী বলবে? আসলে অন্য মানুষদের সত্যিই কিছু বলার নেই জিয়ানার। যে যেমন খুশি ভেবে নিক। জিয়ানা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। পিছন দিকে ছিটকে যাওয়া মাঠ, মানুষ, গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ও নিজেও যেন ছিটকে যাচ্ছিল কোথাও। কষ্টটা যে গলার থেকে ছড়াতে পারে যেন প্রথম বুঝতে পারছিল ও। রুহান অনেক কথা বলে যাচ্ছিল। কিগানকে ও কীভাবে চেনে। কিগান কেমন। হঠাৎ করে দেখা হয়ে যাওয়াতে ও কতটা খুশি—সব বলে যাচ্ছিল মুখস্থ করা উত্তরের মতো। কিন্তু জিয়ানা শুনছিল না কিছু। ওর শুধু কান্না পাচ্ছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল। বুকুর কথা মনে পড়ছিল না আর। ওর মনে হচ্ছিল কুয়াশার ভেতর থেকে আবার কি বেরিয়ে আসছে সাইকেল? আবার তার ক্রিং কি শুনতে পাচ্ছে ও? জিয়ানার ইচ্ছে করছিল প্রাণপণে দুই হাত দিয়ে কুয়াশা খুঁড়ে ও বের করে আনে ছেলেটাকে। কিন্তু ছেলেটা কি আর সেই সাইকেল চালানো ছেলেটার মতো আছে?
ফেরার পথে গুমার পর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল আবার। রুহানও হতোদ্যম হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। জিয়ানা জানালায় মাথা রেখে দেখছিল বৃষ্টির জল কীভাবে কাচে লেগে ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে।
জীবন ছিটকে যায়। মানুষ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে, ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্য মানুষদের মধ্যে। কিগানকে দেখে জিয়ানার মনে হয়েছিল যে, কিগানও তেমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
‘দিদি চা খাবেন?’ মায়েদের কাজের মেয়েটি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘চা?’ জিয়ানা চিন্তা করল একটু। তারপর বলল, ‘নাঃ, ইচ্ছে করছে না। মা কই?’
‘ঘরে আছে। টিভি দেখছে।’
‘ও,’ জিয়ানা উঠল, ‘আমি ভেতরেই যাচ্ছি। চল।’
মা ঘরে বসে সিরিয়াল দেখছে। শুনেছে, সন্ধেবেলার সিরিয়ালগুলোই দুপুরবেলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায়। মা তো সন্ধেবেলা দেখে। তা হলে দুপুরবেলা আবার কেন দেখে!
‘মা?’ জিয়ানা ডাকল, ‘বাপি কই গো?’
মা টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল জিয়ানার দিকে। বলল, ‘ঘরে রয়েছে। কীসব পেপার্স নিয়ে বসেছে। আয় না, তখন থেকে কী বারান্দায় বসে রয়েছিস!’
‘তুমি তো টিভি দেখছ।’
‘তো কী করব? তুই বারান্দায়, তোর বাপি ব্যস্ত। আমার টিভি ছাড়া আর কে আছে বল?’
জিয়ানা হাসল। মা এমন করে কথাটা বলল যেন টিভি কোনও মানুষ!
‘জানো মা, তোমায় একটা কথা বলার ছিল,’ জিয়ানা বিছানায় আধশোয়া হল।
‘শুনব, তার আগে বল তো, তুতুলকে নিয়ে বুকু কোথায় গেছে?’
‘আরে ওই শপিং মলটায়। কীসব জুতো টুতো কেনার আছে।’
‘অনেকক্ষণ তো হল। এখনও আসছে না কেন বল তো?’ মাকে চিন্তিত শোনাল, ‘তুই একটা ফোন করে দেখ না।’
‘ছাড়ো তো,’ জিয়ানা বিরক্ত হল, ‘সময়মতো ঠিক আসবে।’
‘তুই যেন কেমন!’ মা ভুরু কোঁচকাল, ‘একটা ফোন করতে কী হয় তোর? চিন্তা হয় না রে?’
‘মা, বুকু আছে। তুতুলকে নিয়ে চিন্তা কোরো না।’
মা মাথা নামাল। তারপর বলল, ‘তুই কী বুঝবি? আমি হারিয়েছি তো, আমি জানি। এমন করে মেয়েটাকে অবহেলা করিস না। জানিসই তো মেয়েটা একটু গম্ভীর প্রকৃতির।’
‘আচ্ছা মা, আমি অবহেলা করি? কেন করব? তুতুল ছাড়া আমার বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না যে।’
মা এবার একটু নরম হল। রিমোট দিয়ে টিভিটাকে মিউট করে ঘুরে বসল জিয়ানার দিকে, তারপর বলল, ‘বল, কী বলবি বল। তুতুলের ভাইবোন নেওয়ার কথা ভাবলি?’
‘মা! সত্যি! তুমি পারো বটে!’ জিয়ানা অবাক হয়ে গেল, ‘তোমার মতো এমন ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড আমি জীবনে দেখিনি। কথা হচ্ছিল কী! আর তুমি ঠিক গোরুর রচনার মতো ঢুকে গেলে!’
‘না…’ মা অপ্রস্তুত হল একটু, ‘তোদের ভালর জন্যই বলছিলাম।’
‘জানি মা। কিন্তু আমরাও তো বড় হয়েছি। একটু ভালমন্দ বোঝার মতো বয়সও হয়েছে। এমনভাবে সবসময় বোলো না।’
মা মুখটা গম্ভীর করল, ‘জানি তোরা বড় হয়েছিস। হয়তো একটু বেশিই বড় হয়েছিস।’
জিয়ানার হতাশ লাগল। মা বড্ড বেশি একটা জিনিস নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে। মায়ের সমস্যা হল যা চায় তা চায়ই। যা মাথায় ঢুকবে তা ঢুকবেই। অন্যের কথা চিন্তা করে না মা। নিজের ধারণাটা অন্যের মাথায় ঢোকানোর জন্য কানের কাছে বকেই যায়।
জিয়ানা বলল, ‘মা, কেন সেন্টিমেন্টাল হচ্ছ? আমি আর বুকু আর সন্তান নেব না। আমাদের আর প্রয়োজন নেই। কেন বুঝছ না?’
মা ভুরু কুঁচকে বলল, ‘একটা মেয়ে ইচ্ছে করলে সব পারে। তুই একটু ইচ্ছে কর। তা হলেই ঠিক হবে।’
‘মা!’ জিয়ানা সোজা হয়ে বসল, ‘আমি বারান্দাতেই যাই।’
‘আঃ, বড্ড রাগ তোর। বড্ড জেদ,’ মা বিরক্ত হল, ‘ঠিক আছে আর বলব না। যা পারিস কর। আমাদের আর কী? আমরা তো বুড়ো-বুড়ি। এক পা বাড়িয়েই রেখেছি। তোর জন্য চিন্তা হয় তাই বলছিলাম। সন্তান জীবনের মূলধন। মানুষের প্রাণের আরাম। কেন যে বুঝিস না!’
‘মাগো,’ জিয়ানা শুয়ে পড়ল এবার, ‘সত্যিই মা, তোমার সেল্স-এ যাওয়া উচিত ছিল। এমনভাবে যে কেউ পুশ করতে পারে আমি জানতাম না।’
‘সেই তো। এখন তো বলবিই,’ মা রাগ করল।
‘মা, তোমায় একটা কথা বলব বলে বসলাম। আর তুমি…’
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। বল।’
‘কিগানকে মনে আছে তোমার?’ জিয়ানা মায়ের দিকে তাকাল।
মা কি কেঁপে উঠল একটু? নাকি জিয়ানার চোখের ভুল। মা সময় নিল। চোখের থেকে চশমাটা খুলে হাত দিয়ে চোখের কোণ দুটো টিপে ধরল একটু। তারপর বলল, ‘ওই সুন্দর মতো, নীল চোখের ছেলেটা কি? মানে সেই ছেলেটা তো?’
‘তোমার মনে আছে?’ জিয়ানা অবাক হল।
‘হঠাৎ ওর কথা বলছিস কেন?’ এবার মায়ের গলায় সাবধানতা।
‘ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার।’
‘মানে?’ মা চট করে তাকাল জিয়ানার দিকে। গলায় উদ্বেগ স্পষ্ট।
‘মানে কিগানের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। কাজের সূত্রে একটা ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলাম। সেখানে কাজ করে ও।’
‘লেবার?’ মা মুখে অবজ্ঞার ভাব করল।
‘সে তো আমরা সবাই লেবার। আসলে তা নয়। ও ওই গোটা ফ্যাক্টরিটার প্রোডাকশন ইনচার্জ। আর দেখে তো মনে হল জিএম-র অনুপস্থিতিতে গোটাটা ওই দেখাশোনা করে।’
মা মুখ গোমড়া করে বলল, ‘তুই ওই ফ্যাক্টরিতে আর যাস না।’
‘মানে?’ জিয়ানা অবাক হয়ে উঠে বসল আবার।
‘মানে, ওই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে হবে না তোকে।’
‘আশ্চর্য! কেন? আর কাজের জন্য তো আমায় যেতেই হবে।’
‘মানে তুই যোগাযোগ রাখবি?’ মায়ের গলাটা আর্তনাদের মতো শোনাল, ‘কী বলছিস তুই!’
‘তুমি এভাবে রিঅ্যাক্ট করছ কেন?’ জিয়ানা মাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
‘তোর মনে নেই? সব ভুলে গেছিস? মনে নেই ছেলেটা কোথায় কোথায় ধাওয়া করেছিল! অনেক কষ্টে ওকে ঘাড় থেকে নামানো গেছে। আর সেখানে তুই গিয়ে নিজের থেকে দেখা করেছিস? তোর কি মাথাখারাপ হয়ে গেছে মিষ্টি? তুই পাগল হয়ে গেছিস নাকি? তোর বাপি শুনলে কত রাগ করবে বল তো? তা ছাড়া বুকু যদি জানে?’
‘কী জানবে মা?’ জিয়ানার খুব অসহায় লাগল, ‘আমি কী এমন করেছি? হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেছে আমাদের। ও-ও জানত না। আমিও জানতাম না।’
‘ঠিক আছে।’ মা শান্ত হয়েছিল একটু, ‘দেখা হয়েছে, ব্যস। আর যোগাযোগ করিস না।’
‘মা, যোগাযোগ রাখতে হবে। আমাদের কোম্পানি ওখানে একটা বড় কাজ করছে।’
‘তা হলে তুই যাবি না। অন্য কাউকে পাঠিয়ে দে।’
‘দেখো মা, এমনিতেই অফিসে একটা এনিমিটি সহ্য করতে হয়। খুরানাজি আমায় পছন্দ করেন দেখে অনেকেই পিছনে লাগছে আমার। বলছে যে, আমি নাকি জিরো আউটপুট দিয়ে মাইনে নিচ্ছি। বিদেশ থেকে এসেছি বলে নাকি আমার লেজ আছে। তাই এই কাজে তো আমায় এফর্ট দিতেই হবে।’
‘ছেড়ে দে। কাজটা ছেড়ে দে,’ মা নিশ্চিতভাবে বলল।
‘এমন হয় নাকি? আমার রেপুটেশন বলে কিছু নেই? সবসময় কি আমি পিছিয়ে আসব নাকি? সারাজীবন তো তোমাদের সব কথা শুনলাম। এটা পারব না মা। কাজটার শেষ না দেখে আমি ছাড়ব না। সে তোমরা যাই বলো।’
‘আশ্চর্য! তোর সংসার যখন ভাঙবে তখন ভাল হবে?’
‘সংসার ভাঙবে! কেন?’ জিয়ানার অবাক লাগল।
‘বুকু যদি জানে যে, তোর সঙ্গে এখনও ওই ছেলেটার যোগাযোগ রয়েছে…তা ছাড়া ও-ও তো বিবাহিত নিশ্চয়ই। ওর কথাও চিন্তা কর,’ মা এমন করে বলল যেন মা-ই কিগানের একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী!
‘না, ও বিয়ে করেনি।’
‘অ্যাঁ?’ মা যেন আরও ভয় পেল, ‘অমন সুন্দর দেখতে একটা ছেলে এখনও বিয়ে করেনি!’
‘তো কী হয়েছে মা?’ জিয়ানার খুব অসহায় লাগল, ‘আমার কথাটা তুমি শোনো। ভয় পেয়ো না। আর ও অমন নেই। আমি ফোন করলে খুব নর্মাল কথাবার্তা হয়। কিছুদিন আগে রাতে ফোন করেছিলাম, বলল, খুব ক্লান্ত, দু’রাত ঘুমোয়নি। পরে কথা বলবে। বুঝতে পারছ? তেমন কিছু নয়।’
মা তাও বলল, ‘তোকে আমি চিনি মিষ্টি। এসবে একদম ঢুকবি না। কেন এমন করছিস তুই?’
চেনে? মা জিয়ানাকে চেনে? সত্যিই চেনে? তাই কি অমন করে কিগানের থেকে উপড়ে এনেছিল ওকে? আর এখন যতই আশ্বাস দিক না কেন, মা কি সত্যিই বুঝতে পারছে! ওর মনের ভেতরে যে অদ্ভুত একটা ঢেউ শুরু হয়েছে, তা কি বুঝতে পারছে মা? যতই ও মাকে আশ্বাস দিক যে, সব ঠিক আছে! সত্যিই কি ঠিক আছে সব? থাকলে, কেন কিগানকে বারবার ফোন করতে ইচ্ছে হয় ওর? কেন মনে হয় একটু খবর নিয়ে জানে কিগান কী খেল? কেমন আছে? কেন আজ সকাল থেকে বারবার মনে পড়ছে যে, আজ তেরোই আগস্ট, কিগানের বাবা-মায়ের মৃত্যুদিন? কেন খুব সংযত করে নিজেকে রাখতে হচ্ছে ওর? কেন মনে হচ্ছে এমন বৃষ্টির দিনে যদি একবার কিগানের কাছে যেতে পারত ও! মা কি সত্যিই বোঝে ওকে? মা কি ওকে বোঝে বলেই ভয় পাচ্ছে?
‘মিষ্টি, নিজেকে সামলা। যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। একদম এমন করিস না। কক্ষনও আর পাগলামো করিস না। তোর কিন্তু একটা ছোট মেয়ে আছে।’
‘মা,’ এবার বিরক্ত লাগল জিয়ানার, ‘কেন এমন বলছ! বললাম তো, তোমাদের কথা অনেক শুনেছি। অনেক বোঝা বয়েছি তোমাদের! আর পারব না। আমার জীবনটা কি আমার নয়? শুধু অন্যের মেয়ে, অন্যের বউ আর অন্যের মা হয়েই থাকতে হবে গোটা জীবনটা?’
‘যদি বুকু জানে? তা হলে? তা হলে কী হবে ভাবতে পারছিস?’
‘বুকু জানলে জানবে। বুকুকে অনেক আগেই জানানো উচিত ছিল আমার,’ জিয়ানা রাগের চোটে জোরে জোরে বলল কথাগুলো।
‘কী জানানো উচিত ছিল?’ দরজার থেকে আচমকা বুকুর গলা পেয়ে থমকে গেল জিয়ানা।
বুকুর পাশে বিশাল বড় একটা প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে তুতুল। বুকুর চোখে-মুখে বিস্ময়। কখন ওপরে এল ওরা? জিয়ানা শুনতেই পায়নি। আর কতটা শুনেছে বুকু? জিয়ানার পিঠ দিয়ে একটা হিলহিলে সাপ চলে গেল যেন।
বুকু তাকিয়ে রয়েছে এখনও। চোখে প্রশ্ন। জিয়ানা বুঝতে পারল না কী হবে। কী বলবে। তবে কি এতদিন আড়াল করে রাখা ঘটনাটা এবার প্রকাশ্যে আনতে হবে? তবে কি বুকুকে বলতে হবে, জিয়ানার জীবনে ও-ই প্রথম পুরুষ নয়?
Chapter - 21
২১
স্টেশনটার নাম অশোকনগর রোড। মেন রোড থেকে ঢালু হয়ে রাস্তাটা ঢুকে গেছে স্টেশন চত্বরে। দু’দিকে দোকান। নানা ধরনের দোকান। আর তাতেই রাস্তাটা খুব একটা চওড়া হওয়ার সুযোগ পায়নি। রাহি গাড়িটাকে মেন রোডের ওপরে একটা স্পিনিং মিলের সামনে পার্ক করতে বলেছে। তারপর বড় রাস্তা থেকে হাঁটতে হাঁটতে এসেছে এই স্টেশনে।
টিকিট কাউন্টারের সামনে মানুষের লাইন এঁকেবেঁকে চলে এসেছে রাস্তায়। রুহান লাইনের যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার সামনে কমপক্ষে দশজন আছে। এখান থেকে একেবারে লেক গার্ডেন্সের টিকিট কেটে নেবে ও।
লাইনে দাঁড়িয়ে রুহান দেখল একটু দূরে রাহি কথা বলছে আবেশ আর কিগানের সঙ্গে। ভাল লাগল রুহানের। বহুদিন পর প্রায় একটা গোটা দিন ও কাটিয়ে গেল কিগানের এখানে। অবশ্য আজ রবিবার বলেই সম্ভব হল।
গত পরশু কিগান হঠাৎ ফোন করেছিল রুহানকে। রুহান তখন সবে অফিস থেকে ফিরেছে। কিগানের নামটা দেখে মোটেই আশ্চর্য হয়নি রুহান। এখন কিগানের সঙ্গে দু’-তিন দিন অন্তরই কথা হয়। ও ভেবেছিল এমনিই হয়তো ফোন করেছে কিগান।
ফোনটা ধরে রুহান বলেছিল, ‘হ্যাঁ, বলো কিগানদা। ফ্যাক্টরি থেকে ফিরলে?’
‘শোন, তুই এতটা ক্যালাস হয়েছিস, জানতাম না তো!’
‘মানে!’ কিগানের গলার স্বর শুনে বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিল রুহান, ‘কী হয়েছে গো?’
‘দেখ, তোকে রাহি বলে একটা মেয়ে ফোন করেছিল। মনে আছে? ওকে আমিই বলেছিলাম তোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তখন আমি আমার নামটা বলতে বারণ করেছিলাম, কিন্তু এখন আমি নিজেই তোকে বলছি। কী, ব্যাপারটা কী তোর?’
‘তুমি! তুমি বলেছিলে?’ অবাক হয়েছিল রুহান, ‘তো, সেদিন যখন ফ্যাক্টরিতে গেলাম, কিছু বললে না তো! মাঝে এতদিন কথা হল তাও কিছু বললে না। হঠাৎ এখন বলছ?
‘বললাম তো, আমি চাইনি এর ভেতর আমার নামটা আসুক। কিন্তু দেখ, এবার আমায় বলতেই হচ্ছে। তুই রাহির সঙ্গে একবারও এই নিয়ে আর যোগাযোগ করিসনি কেন?’
সামান্য থমকেছিল রুহান। কী বলবে ও? হ্যাঁ, রাহি ফোন করেছিল ওকে। কথাও হয়েছিল। কিন্তু রুহান তো কোনও ভরসা দেয়নি। বরং খুব নরমভাবেই বলেছিল, ‘দেখুন, ব্যাপারটা আমার পক্ষে খুব কঠিন। আমি তেমন কোনও প্লেয়ার, মানে বড় দরের কোনও প্লেয়ার নই। আমার কন্ট্যাক্টস একসময় ছিল, কিন্তু এখন আর তেমন নেই। তাই বলছিলাম যে, আপনি যেটা বলছেন সেটা বেশ কঠিন হবে।’
রাহি বলেছিল, ‘দেখুন, যিনি আপনার কথা আমায় বলেছেন, তাঁর কথার অনার রাখতে আপনাকে এটা করতেই হবে।’
‘কে বলেছে আমার কথা?’ অবাক হয়ে গিয়েছিল রুহান।
‘সেটা আপনাকে জানাতে পারছি না। সরি। কারণ, ওঁর বারণ আছে। আমার মনে হয় আপনি পারবেন। পুরনো সমস্ত কন্ট্যাক্ট কিন্তু জাস্ট একটা ফোন কলের দূরত্বে থাকে। আপনি আমায় হেল্প করুন প্লিজ। আমাদের “হেল্প আর্থ” অরগানাইজেশনটার কিন্তু একটা ভাল রকমের বুস্ট হবে। আপনি প্লিজ দেখুন।’
‘আচ্ছা…ঠিক আছে…আমি না হয়ে চেষ্টা করব।’
এটাই দোষ রুহানের। ও নিজেও বোঝে। ‘না’ বলবে না কখনও। শত অশান্তি হলেও রুহান ‘না’ বলতে পারে না। তাই নিমরাজি হয়েছিল মাত্র। কিন্তু তারপর আর কিছু করার সময়ও হয়নি। আর সত্যি বলতে কী লজ্জাও করেছিল। ক্লাবে সুখেনদাকে বললেও হয়তো হত, কিন্তু সুখেনদাকে আর কতবার বিপদের মধুসূদন করবে? তাই চুপ করে গিয়েছিল। ভেবেছিল চেপে থাকলে একদিন ঠিক ব্যাপারটা আপসে ধামাচাপা পড়ে যাবে। কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ যে কিগান ফোন করবে সেটা বুঝতে পারেনি রুহান।
‘কী রে বল। এতটা ইররেসপন্সিবল হলি কী করে তুই?’ কিগান যে রেগে ছিল সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিল রুহান।
‘আরে তুমি তো বললে আবেশ এখন ওই চত্বরে আছে। ওকেও তো বলতে পারতে!’
‘না, আবেশকে আমি এই ব্যাপারে খুব একটা ভরসা করি না। টাকা না থাকলে ও এসবের ভেতর ঢুকবে না। তা ছাড়া আমার মনে হয়েছে কাজটা তুই করবি। ব্যস, তুই করবি।’
‘ঠিক আছে।’ রুহান আর কিগানকে উত্তেজিত করতে চায়নি। বলেছিল, ‘পরশু তোমার ওখানে যাব। ওই রাহির সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে তা হলে! কেমন?’
কিগান বলেছিল, ‘সকাল সকাল চলে আসিস। দুপুরে এখানেই খাবি।’
কিগানের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারে না রুহান। কেন এমন আলো-ছায়ার ভেতরে থাকে মানুষটা? কেন সব কিছু স্পষ্ট করে বলে না? কেন এমন একটা কাজ ওকে করতে দিল? কোন ভরসায় দিল? তারপর নিজের নামটাও বা কেন লুকিয়ে রাখতে বলল? যদি রুহানের সঙ্গে ফ্যাক্টরিতে দেখা না হত তা হলে কি এমনভাবে সামনে এসে এই কাজটার জন্য বলত কিগান? কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে কিগান? কার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? হঠাৎ যে একটা মানুষ এমনভাবে বেপাত্তা হয়ে যেতে পারে সেটা তো ভাবতেই পারেনি রুহান। তাই সেদিন ফ্যাক্টরিতে জিয়ানার সঙ্গে পার্কিং লটের দিকে আসতে থাকা মানুষটাকে দেখে সারা শরীরে হঠাৎ বিদ্যুৎ বয়ে গিয়েছিল যেন। সেই লম্বা চেহারা। সেই হেঁটে আসা। সেই প্রথম দিন দেখা রাজপুত্র না?
দৌড়ে গিয়ে কিগানকে জড়িয়ে ধরেছিল রুহান, ‘কিগানদা, তুমি?’
কিগানের হাতে একটা বড় বাক্স মতো কিছু ছিল। সেটা যাতে না পড়ে যায় তাই সামান্য ঘুরে এক হাত দিয়ে রুহানকে ধরেছিল।
রুহান বলেছিল, ‘তুমি? তুমি এখানে? আর আমরা শুধু ভাবছি মানুষটা উবে গেল কোথায়?’
‘তুই আছিস কেমন?’ কিগান অল্প হেসে বলেছিল, ‘তা ছাড়া, আদি তো জানে আমি কোথায় আছি। তুই ওর থেকে খবর পাসনি?’
‘আদি!’ চুপ করে গিয়েছিল রুহান। তারপর বলেছিল, ‘ওর সঙ্গে আর বিশেষ দেখাসাক্ষাৎ হয় না আমার। আর আমিও মানে…কেমন অস্বস্তি হত তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যদিও মোবাইল নম্বর ছিল। তবু…।’
‘ওই নম্বরটা আর নেই,’ কিগান হেসেছিল, ‘নতুন নম্বর নিয়েছি। তবে অফিস তো জানে। আদিও সেখান থেকে জানে।’
রুহান আরও অনেক কথা বলেছিল কিগানকে। মানে, সব যে খুব দরকারি তা নয়। এমনিই সব কথা। একবছর ধরে জমে থাকা সব কথা। ওদের মাঠের কথা। অফিসের কথা। মায়ের কথা। আরও নানা কথা। কিগান শুধু শুনছিল আর হাসছিল। বিশেষ কিছু বলছিল না।
রুহানের অবাক লেগেছিল জেনে যে, জিয়ানা আর কিগান ক্লাসমেট ছিল। ওর মনে হয়েছিল, পৃথিবী সত্যিই খুব ছোট। মনে হয়েছিল, একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে, আসলে প্রত্যেকটা মানুষই পরস্পরের সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে সংযুক্ত।
গাড়িতে আসতে আসতেও রুহান উত্তেজিতভাবে জিয়ানাকে বলছিল কিগানের আর ওর সম্পর্কের কথা। বলছিল কিগানের ঠাকুরমার কথা। বলছিল কীভাবে কিগানের সঙ্গে ওদের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় পর চুপ করে গিয়েছিল রুহান। ও দেখেছিল যে, জিয়ানা কিছু শুনছে না। শুধু সামান্য সায় দিচ্ছে অন্যমনস্কভাবে। তাই চুপ করে গিয়েছিল রুহান। কথা বাড়ায়নি। আর ভেবেছিল, সত্যিই তো, কিগান তো ওর দাদা। ও আনন্দিত হতেই পারে। তা বলে সবাই কি আর ওর মতো আগ্রহী হবে? খামোকা কেন জিয়ানার মাথা খাবে ও? জিয়ানা কেনই বা শুনবে ওর কথা? শুধু তো সহপাঠী। এ ছাড়া কিগান কে হয় জিয়ানার?
লাইনটা এগোচ্ছে না কিছুতেই। যেন শামুকের পিছনে পিছনে হাঁটছে রুহান। ওর পিছনেও আরও মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। তারা উসখুসও করছে। কয়েকজন তো তাড়াও দিচ্ছে। বলছে বনগাঁর ট্রেন চলে আসবে। বলছে শিয়ালদারটাও এই চলে এল বলে।
এই বনগাঁ লাইন সম্বন্ধে খুব ভয় ছিল রুহানের। সবার কাছে শুনত যে, এখানের ট্রেনে ভীষণ ভিড় হয়। তাই যখন ট্রেনে করে আসার কথা হয়েছিল, যথেষ্ট ভয় পেয়েছিল ও। কিন্তু দেখেছে বেশ সহজেই চলে আসতে পেরেছে। কোনও ঝুটঝামেলা বা বাদুড়ঝোলা ভিড়, কিছুই হয়নি। তাই ভেবেছিল যে, চাপাডাঙা থেকে ফেরাটাও অমনভাবেই হবে। বলেওছিল যে, সামনের স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে চলে যেতে পারবে ও। কিন্তু রাহি কিছুতেই রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘একদম না। আমার বিকেলে একটা কাজ রয়েছে অশোকনগরে। তোমায় আমি অশোকনগর রোড স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসব।’
‘না না, তার দরকার নেই। শুধু শুধু অতটা…’ রুহানের খারাপ লেগেছিল। আসলে সংকোচ হয়েছিল খুব। রাহিকে প্রথমে দেখেই বেশ ভাল লেগেছে রুহানের। খোলামেলা, হাসিখুশি একটা মেয়ে।
ছোটবেলায় একবার বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিল রুহান। সে বিশাল বড় বাড়ি। সামনে লন। একদিকে সুইমিং পুল। তার পাশে লম্বা লম্বা গাছেদের সারি। বাড়িটার পিছন দিকে আর একটা ছড়ানো একতলা বাড়ি ছিল। যার একটা অংশ কাচ দিয়ে ঘেরা। রুহান সেই কাচঘেরা ঘরটার ভেতর দেখেছিল একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন গ্র্যান্ড পিয়ানোর সামনে। তাঁর পরনে সাদা হাউজকোট আর পাজামা। তিনি অদ্ভুত এক আনন্দ নিয়ে বাজিয়ে চলেছেন পিয়ানোটা।
রুহান একপাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল সেই বাজনা। দেখছিল বাইরে, কাচের বাইরে অজস্র প্রজাপতি উড়ছে। আর তেরছা করে একটা রোদ এসে পড়েছে সেই ঘরে।
রুহান আজও জানে না, ঠিক কী ছিল সেই দৃশ্যটায়। তবু, অমন সকাল, অমন রোদ, পিয়ানোর টুংটাং আর বাইরে উড়ে বেড়ানো অজস্র প্রজাপতি, রুহানকে বুঝিয়েছিল যে, এ দৃশ্য জীবনে একবারই আসে। আর ফিরে আসে না।
ফিরে আসে না, যা যায় তা আর ফিরে আসে না। বহুবার শুনেছে রুহান। দেখেওছে। ফেলে আসা কৈশোরের মতো আনন্দ, বন্ধুত্ব, নিজের ক্ষমতা। সব চলেই যায়। আর ফিরে আসে না। রুহান ভেবেছিল ছোটবেলায় সেই দৃশ্যটার মতো অনুভূতিও বুঝি এমনই। বুঝি এমনই একবারের জন্য। কিন্তু, অবাক হয়ে দেখেছিল, জীবন মস্ত এক জাদুকর। যখন তুমি ভাববে যে, তার খেলা তুমি ধরে ফেলেছ, ঠিক তখনই সে বের করে আনবে নতুন জাদু। নতুন আনন্দ। যা অবিকল মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তার অতীত অভিজ্ঞতার কাছে।
রুহানেরও তেমন হয়েছিল। কিগানের ঘরে গিয়ে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই কিগান ফোন করে ডেকে পাঠিয়েছিল রাহিকে। বলেছিল, ‘এই রাহি, রুহান এসেছে। তাড়াতাড়ি চলে আয়। ইচ্ছে হলে হোমিকেও বলতে পারিস। মানে সঙ্গে আনতে পারিস।’
ওদিক থেকে কী কথা হয়েছিল তা শুনতে পায়নি রুহান। তবে ফোনটা রেখে কিগান বলেছিল, ‘ওই আসছে পাগলি।’
‘পাগলি?’ ঘাবড়ে গিয়েছিল রুহান, ‘পাগলি মানে কিগানদা?’
‘না রে তেমন নয়,’ হেসেছিল কিগান, ‘সত্যিকারের পাগলি নয়, তবে একরকম পাগলিই বলতে পারিস। আসুক। দেখবি।’
তা দেখেছিল রুহান। মিনিট দশেক বাদেই দেখেছিল। সেই লম্বা কাচের ঘর। সেই ভেসে আসা পিয়ানোর টুংটাং। আর তেরছা হয়ে ভেসে থাকা রোদের চাদর। রুহান দেখেছিল প্রজাপতি উড়ছে। প্রচুর প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। এত প্রজাপতিকে না চিনলেও নিজেকে বিলক্ষণ চেনে রুহান। বোঝে নিজের মনের গতিবিধি। হাওয়া না মেপে, আকাশ না মেপে ওর মন যে বেশ উড়তে পারে তা খুব জানে ও। তাই সতর্ক হয়েছিল রুহান। প্রাণপণে ওর মনের পাখনা দুটোকে বেঁধে যথাসম্ভব নিস্পৃহ চোখে ও তাকিয়েছিল রাহির দিকে। দেখেছিল কুমোরটুলি থেকে তৈরি করে আনা এক জোড়া চোখ তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। যেন মাপছে। চোখের ভেতরে যে এমন টেপ-ফিতে থাকে তা আগে জানত না রুহান!
রুহানের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে রাহি বলেছিল, ‘এই যে কিগানদা তোমাদের জন্য দু’-একটা খাবারের পদ নিয়ে এসেছি। দয়া করে ‘ঘড়ি’ করে রেখো না।’
রুহান ঠিক বোঝেনি কথাটা। তবে রাহির গলায় ঝাঁঝ শুনে এইটা বুঝেছিল যে, এর ভেতরে একটা গল্প আছে।
কিগান কিন্তু রাগেনি। বরং হেসেছিল, ‘কী এনেছিস?’
‘পাঁঠার মাংস, ধোঁকার ডালনা আর শিমুইয়ের পায়েস।’
‘বাবা, এত!’ কিগান হেসে পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘বস। আর মাথাটা একটু ঠান্ডা রাখ। কেমন?’
রাহি নিচু একটা টেবিলে টিফিন বাক্সটা রেখে বলেছিল, ‘মাথা? ঠান্ডা? ঠিক আছে। চেষ্টা করব। কিন্তু তুমি যেভাবে থাকো, তা দেখলে কেউ মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে? বলো? আচ্ছা,’ এবার রাহি ঘুরেছিল রুহানের দিকে, ‘আপনি বলুন তো, মানুষটা কি চিরকাল এরকম?’
‘অ্যাঁ?’ একটু থতমত খেয়ে গিয়েছইল রুহান।
কিগানের কাছে এসে যেটুকু সামান্য সময় পেয়েছিল তাতে টুকটাক সাধারণ কথাবার্তাই বলেছে রুহান। কিগান কেন চলে এসেছে কলকাতা ছেড়ে, কেন এতদিন আলাদা, সরে থেকেছে সবার থেকে তা নিয়ে কিচ্ছু বলেনি। মানে প্রসঙ্গই তোলেনি। কিন্তু রাহির ওই একটা প্রশ্নই যেন রুহানের না বলা প্রশ্নগুলোকে এক ঝটকায় নিয়ে এসেছিল সামনে। রুহান ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
কিগান তবু হাসি মুছে ফেলেনি। বরং বলেছিল, ‘আমার কথাটা কি বেশি ইমপর্ট্যান্ট? না কীসব ম্যাচ না কী করতে চাস সেটা ইমপর্ট্যান্ট?’
‘তুমি চুপ করো।’ রাহি ধমক দিয়েছিল কিগানকে। তারপর রুহানকে বলেছিল, ‘আচ্ছা, কিগানদাকে কতদিন চেনেন বলুন তো আপনি? গত বছরখানেকের ভেতর দেখলাম আবেশ আর আপনি। এই দু’জন পরিচিত আছে মানুষটার। আচ্ছা, ওর কি আর কেউ নেই? ওকে তো জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। কিচ্ছু বলে না। যেন সাধু হয়ে গেছে। পূর্বাশ্রমের কিছু বলা বারণ। আচ্ছা, আপনি বলুন তো, কিগানদা কে?’
কিগান উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার। কোমরে হাত দিয়ে বলেছিল, ‘তোর দিদিমণিগিরি আর গেল না রে দি… মানে রাহি।’
‘কী বললে? দি? মানে?’ রাহি সচকিত হয়েছিল।
‘কোথায়? কী বললাম?’ হেসেছিল কিগান।
রাহি সামান্য হেসে, হঠাৎ আবছা গলায় বলেছিল, ‘আমি ভাবলাম…’ তারপরই হঠাৎ আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়ে রুহানকে চেপে ধরেছিল আবার, ‘কী হল? বললেন না?’
রুহান থেমেছিল এক মুহূর্ত। তারপর একবার তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। বলেছিল, ‘কিগানদা কে জানেন? রাজপুত্র। ছদ্মবেশী রাজপুত্র। এর বেশি আর কেউ কিচ্ছু জানে না কিগানদা সম্পর্কে।’
কিগান এবার হাত তুলেছিল, ‘তোরা থামবি? আচ্ছা রুহান, পাগলিটা ভুল বকছে আর তুইও ওর সঙ্গে তাল দিচ্ছিস? এই জন্য সাতসকালে এখানে এসেছিস তুই?’
রুহান হেসে রাহিকে বলেছিল, ‘বাদ দিন। এবার বলুন, আমায় কী করতে হবে?’
‘আমি তো ফোনে বললাম যে, একটা প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচ করতে চাই। নামকরা প্লেয়ার এনে। তার জন্য টাকাপয়সা স্পনসরশিপ ইত্যাদির বন্দোবস্ত আমি করব। কিন্তু প্লেয়ারদের যোগাযোগ করে একটু যদি তাদের আনার বন্দোবস্ত করে দেন, খুব ভাল হয়।’
‘আচ্ছা,’ কিগান বাধা দিয়েছিল এবার, ‘তখন থেকে আমি দেখছি ব্যাপারটা। কেসটা কী বল তো?’
‘কেস!’ রুহান অবাক হয়েছিল।
‘তখন থেকে দেখছি তোরা একে অপরকে আপনি আজ্ঞে করছিস! তোরা কোন জমানার রে?’
‘তাই তো!’ রাহি কিগানের টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা চুইংগাম মুখে পুরে বলেছিল, ‘ও কে রুহান, যা বলছিলাম। তুমি আমাদের প্লেয়ার জোগাড় করে দাও। আমরা কলকাতা ভার্সেস নর্থ চব্বিশ পরগনার ম্যাচ করব। প্রতিটি দলে তিনজন করে নামকরা প্লেয়ার থাকবে। দারুণ হবে।’
‘কিন্তু,’ কিগান অবাক হয়েছিল, ‘ব্যাপারটা আগে অন্যরকম ছিল না?’
‘হ্যাঁ, ছিল,’ চুলটাকে ঠিক করে সামান্য হেসেছিল রাহি। আর রুহান আবার দেখতে পেয়েছিল রোদ, কাচের ঘর, আর অজস্র প্রজাপতি। প্রজাপতি যে মশার চেয়েও বিরক্তিকর হয় সেটা প্রথম বুঝেছিল রুহান। ও মনের ভাব আড়াল করার জন্য মুখচোখ কুঁচকে, একটা ভয়ংকর কিছু চিন্তা করছে এমনভাবে তাকিয়েছিল রাহির দিকে।
রাহি বলেছিল, ‘আরে সেটাই ঠিক ছিল। তারপর হঠাৎ গতকাল রাতে এই আইডিয়াটা এল আর সঙ্গে সঙ্গে হোমিকে ফোন করে বললাম। ও বলল দারুণ। তারপর আজ সকালে সুধাদিকে ফোনে বললাম। সুধাদিও তো শুনেই খুশি।’
‘সুধাদি! পলিটিক্স ঢোকাবি এর মধ্যে?’ কিগান হাসছিল না আর।
‘কোথায় পলিটিক্স? সুধাদি তো হেল্প আর্থ-এর প্রেসিডেন্ট। আর প্রথম থেকেই তো সুধাদি এটা জানে।’
‘শোন, তোদের ‘হেল্প আর্থ’-কে ক’জন চেনে বল?’
‘মানে?’ রাহি বিরক্ত হয়েছিল, ‘ক’জন চেনে মানে? চিনবে, আস্তে আস্তে চিনবে। আর যদি আমরা এমন কাজ করতে পারি তা হলে আরও দ্রুত অনেক লোকে চিনবে। তা এমন করে বলছ কেন তুমি?’
‘চিনবে…করতে পারি—সব ফিউচার টেন্স। এসব হলে না হয় হেল্প আর্থ-এর পরিচিতি হবে। কিন্তু সুধাদি অলরেডি পরিচিত মুখ। বিধানসভার মেম্বার। একজন নোন পলিটিক্যাল ফেস। তাকে সভাপতি করাটাই তো তোদের ব্লান্ডার! তারপর সে যদি কিছু হেল্প করে, ভোটের জন্য প্রচারে সেই কথা বারবার তুলবে। তখন সেটা কি ভাল হবে?’
‘না, মানে,’ রাহি একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল, ‘দেখো, নামকরা লোকজন থাকলে তো একটু সুবিধে হয়, তাই ওকে রাখা। না হলে…’
‘বাদ দে,’ কিগান এবার তাকিয়েছিল রুহানের দিকে, ‘যা বলল ও, তা তোকে করে দিতে হবে। কোনও বাহানা বা অজুহাত দিবি না। বুঝেছিস?’
‘কিন্তু আমায় কেন? তুমি জানো, আবেশ এ ব্যাপারে অনেক কম্পিটেন্ট। গত বছর তো মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের হয়ে একটা টুর্নামেন্টের আয়োজন করার ব্যাপারটা দেখেছিল। তাই বলছিলাম যে, ও আরও ভাল করতে পারবে।’
‘শোন,’ কিগান থামিয়ে দিয়েছিল রুহানকে, ‘ওটাতে আবেশ মার্চেন্ট-এর পতাকার তলায়, সেই নামের সাহায্যে কাজ করেছিল। এখানে তা কিন্তু নয়। সুধাদির সাহায্য যত কম নেওয়া যায় তত ভাল। সবচেয়ে ভাল হয় ওকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে কাজটা করতে পারলে। আর শোন, এ ব্যাপারে, তুই নিজে প্লেয়ার হয়ে যদি অন্য প্লেয়ারকে অ্যাপ্রোচ করিস কাজটা সহজ হবে।’
‘দেখো কিগানদা,’ রাহি বলেছিল, ‘তুমি অনাবশ্যক সুধাদিকে এমন বলছ। সুধাদিকে আমিই ইনভল্ভড হতে না করেছি। সুধাদির যদি খারাপ উদ্দেশ্য থাকত, তবে কি ও সেটা মেনে নিত?’
‘বোকা মেয়ে,’ হেসেছিল কিগান, ‘সুধাদি খেটে মরতে যাবে কেন? তোরা যখন খাটাখাটনি করে পাহাড়টা তৈরি করবি, দেখবি সুধাদি কেমন করে পার্টির ফ্ল্যাগটা পাহাড়ের মাথায় বসিয়ে গোটা পাহাড়টা নিয়ে যাবে। আচ্ছা, তুই এসব বুঝিস না? তুই বড় হবি না?’
রাহি জেদের গলায় বলেছিল, ‘আমাদের “হেল্প আর্থ” সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটা সংস্থা। আমরা মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তা আমরা চেষ্টা করছি। আর তাতে সুধাদির কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই। আমরাই যা করার করব। ইতিমধ্যে যশোর রোডের ধারে রাস্তা চওড়া করার নামে যেভাবে বড় বড় গাছগুলোকে কেটে ফেলার চেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধে আমরা সর্বাত্মক আন্দোলনে নামব। এতে শহরের ছেলেপুলেরাও আসবে আমাদের পাশে। তাই বলছি, ওসব পার্টি কালারের ভয় আমাদের নেই। আর সত্যি কথা বলতে কী, সব বিষয়েই রিস্ক থাকে। বিফল হওয়ার চান্স থাকে। তা বলে কি হাত গুটিয়ে বসে থাকব নাকি? আমাদের তো কাজ করে যেতেই হবে।’
‘জল খাবি?’ কিগান বিছানা থেকে উঠে এক বোতল জল বাড়িয়ে দিয়েছিল রাহির দিকে, ‘তুই যে এমন ভাল স্পিচ দিস জানতাম না তো? দিদিমণি থেকে তো একটা বেশ নেত্রী-নেত্রী ভাব এসেছে দেখছি? জানিস তো ইউথ অ্যান্ড পলিটিক্স একটা খুব ভাল কম্বিনেশন!’
রাহি হেসেছিল এবার। আর আবার প্রজাপতি দেখেছিল রুহান। বুকের ভেতর যে এমন একটা কাচের ঘর রেখেছিল এতদিন ধরে সেটা তো নিজেই জানতে পারেনি রুহান! তবে সত্যি বলতে কী, তা আর তেমন জানতেও চায় না ও। কী হবে জেনে? রুহান ভালই জানে যে, ওর জীবন কেমন। তাই তখনও নিজেকে সামলে নিয়েছিল। আর ধমক দিয়েছিল নিজেকে। সুন্দরী মেয়ে দেখলে প্রেমে পড়ে যাওয়া এই রোগ যে এমন ক্রনিক আকার ধারণ করেছে, সেটা মোটেও ভাল নয়।
রুহান বলেছিল, ‘আমি বুঝেছি কনসেপ্টটা। নিশ্চয়ই বলব। মানে চেষ্টা করে দেখব। জগুদা, সুখেনদাদের বলে দেখব। তা ছাড়া আরও কিছু সোর্স আছে, মানে ছিল আর কী, তাদেরও বলে দেখব।’
রাহি বলেছিল, ‘দেখো তাড়াতাড়ি করবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক।’
কিগান বলেছিল, ‘ঠিকই, বেশ দেরি হয়েছে।’
রাহি বলেছিল, ‘তো রুহান, তুমি কবে জানাচ্ছ আমায়?’
‘আমি?’ রুহান সময় নিয়েছিল একটু। তারপর বলেছিল, ‘দেখুন, মানে ইয়ে, দেখো, কাল মানে সোমবারই আমি যোগাযোগ করব। তারপর দেখি।’
রাহি উঠে পড়েছিল। বলেছিল, ‘তুমি যাচ্ছ কখন? মানে আজ ফিরছ কখন? বিকেলবেলা কি?’
‘হ্যাঁ,’ কিগান উত্তর দিয়েছিল, ‘ও বিকেলেই যাবে।’
‘এখান থেকে ট্রেনে ভিড় হবে। আমি অশোকনগরে যাব। একটা কাজ আছে, সেখান অবধি পৌঁছে দেব। হাবড়া থেকে হাবড়া লোকাল ছাড়ে। অশোকনগর তার পরের স্টেশন। মোটামুটি বসার জায়গা পেয়ে যাবে।’
‘তা হাবড়াতেই ছেড়ে দিবি,’ কিগান বলেছিল।
‘তা হলে তো একটুও দাঁড়িয়ে গল্প করতে পারব না আমরা। মানে, তুমিও যাবে তো? আর হাবড়া হলে ড্রপ করে দিয়েই চলে যেতে হবে,’ রাহি বলেছিল।
লাইনটা এখনও শামুকের মতো এগোচ্ছে। তবে তাও কিছুটা এগিয়েছে রুহান। সামনে এখন চারজন। আসার সময় আবেশ গাড়িতে উঠে পড়েছিল। বলেছিল, ‘কাজে গিয়েছিলাম বলে আড্ডাটা মিস হল। চল তোর সঙ্গে একটু ফেয়ারওয়েলটাই সেরে আসি।’
আবেশ জানে যে, একটা ক্রিকেট ম্যাচের কথা হচ্ছে। কিন্তু ওকে যে কিছু করতে বলা হচ্ছে না সেটা নিয়ে ওর কোনও হেলদোল নেই। রুহান একবার রাহি আর কিগানের কান এড়িয়ে চাপা গলায় কথাটা পেড়েছিল আবেশের সামনে। বলেছিল, ‘তুই জানিস তো, আমি কেন এসেছি এখানে?’
‘ওই ক্রিকেট তো?’ আবেশ দাড়িতে হাত বুলিয়ে হেসেছিল।
‘হ্যাঁ। তুই জানিস?’
‘শালা, চিরকাল চার অক্ষরের বোকা রয়ে গেলি,’ আবেশ হেসেছিল, ‘হেল্প আর্থ-এ আমি আছি। কাজ করছি। কিগানদার কথায় তোর মোবাইল নম্বরটা আমি রাহিকে দিলাম। আর শালা তুই আমায় এমন প্রশ্ন করছিস আমি জানি কিনা?’
‘না, মানে, দেখ,’ রুহান বলেছিল, ‘আমি বলেছিলাম যে তোকে বলতে। কিন্তু…’
‘দেখ ভাই, বলেনি বেঁচে গেছি। একা মানুষ আমি। কত কিছু করতে হয় জানিস?’
‘না, আমি বলেছিলাম যে তুই খুব সাকসেসফুলি একটা টুর্নামেন্ট সামলেছিলিস।’
‘আমি একা তো নই। একটা টিম সেটা করেছিল। আমিও ছিলাম সেখানে। তা, ভালই হয়েছে। তুই এই কাজটা কর না। এটা একটা নোবেল কজ।’
‘কিন্তু…’ রুহান ইতস্তত করেছিল, ‘তুই রাগ করবি না তো?’
‘খেপেছিস?’ হেসেছিল আবেশ, ‘কাজ না করতে পারলে তো বেঁচে যাই। এ সবই তো এই ছ্যাঁচড়া পেটটার জন্য। তাই, এসব ভাবিস না। তা ছাড়া…’
‘তা ছাড়া?’ রুহান জিজ্ঞেস করেছিল।
‘তা ছাড়া, দেখ না নতুন করে কিছু একটা করতে কেমন লাগে? আর দরকার হলে আমায় বলিস, হেসিটেট করিস না। আমি সাধ্যমতো হেল্প করব।’
‘থ্যাঙ্কস, আমায় তুই বাঁচালি,’ হেসেছিল রুহান।
‘তাই?’ আবেশ সিগারেট ধরিয়ে সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল যেন।
‘ট্রেন লেট আছে,’ টিকিট কেটে সামনে দাঁড়ানো মাত্র আবেশ বলল।
রুহান হাসল, ‘ওঃ, যা লাইন! উইদআউট টিকিটের যাত্রী অনেক কমে গেছে, না?’
‘কিচ্ছু কমেনি।’ আবেশ বুড়ো আঙুল দেখাল, ‘আমিই তো মাঝে মাঝে উইদআউটে যাই। তোরা ভিতুর ডিম তাই পারিস না।’
‘সত্যিই তুমি তাই করো নাকি?’ রাহি অবাক হল।
‘হ্যাঁ,’ আবেশ এমন করে বলল যেন টিকিট কাটলেই ফাইন দিতে হয়, ‘আরে বাবা, এত বড় লাইন কেউ দেয় নাকি? বাচ্চা পেটে নিয়ে এই লাইনে দাঁড়ালে লাইনের সামনে যেতে যেতে সেই বাচ্চার বিয়ে হয়ে যাবে। কেন ফালতু ঝুটঝামেলায় যাব?’
‘এটা কিন্তু অন্যায়,’ রাহি গম্ভীর হল, ‘এমন করবে না।’
‘এই সেরেছে! রাগ করলে নাকি?’ আবেশ থমকাল, ‘দেখো, আবার চাকরি থেকে বের টের করে দেবে না তো? দেখো ভাই, আমি গরিব মানুষ।’
‘এমন করলে দিতেও পারি,’ রাহি গম্ভীরভাবে বলল।
‘অ্যাঁ? সত্যিই? যাঃ, ইয়ারকি মারছ শিয়োর। তুমি রেলের কিছু নও তো?’
রাহি বলল, ‘দেখো, এটা সামাজিক অপরাধ। ট্রেনটা তো হাওয়ায় চলে না, এর একটা খরচ আছে। লোকেদের মাইনে আছে। মেনটেনেন্স আছে। আরও হাজারটা কারণ আছে। তোমার শরীরের যা ন্যূনতম দরকার, তা না দিলে কি শরীর বাঁচে? টিকিটটাও রেলের তেমনই ন্যূনতম দরকার। বুঝেছ?’
কিগান হাসল, ‘আজকাল কী হয়েছে বল তো তোর? কথায় কথায় এমন সব বক্তৃতা করছিস? ত্রয়ণের প্রভাব নাকি?’
‘ত্রয়ণ?’ যেন ছিটকে উঠল রাহি, ‘ওর প্রভাব হতে যাবে কেন?’
‘না, ও তোদের সংস্থার হয়ে কাজ করে মাঝে মাঝে, তাই বলছিলাম।’
‘না, না।’ রাহিকে হঠাৎ অধৈর্য লাগল রুহানের। মেয়েটা এমন করে বলছে কেন?
আবেশ হাসল, ‘ত্রয়ণ তো? আজকাল আর তেমন আসে না। তবে দরকার হলেই আসবে।’
‘বাদ দাও তো,’ রাহি একটা ধমক দিল এবার, ‘আর কিছু বলার নেই তোমাদের? তখন থেকে এক কথা বলছ কেন?’
‘ঠিকই তো!’ কিগান চট করে কথাটা ধরল। রাহি কোনও কারণে বিরক্ত হচ্ছে দেখেই বোধহয় বলল, ‘তা রুহান, কাকিমা কেমন আছেন রে? শরীর ভাল?’
মা? মনে মনে আঁতকে উঠল রুহান। সত্যিই মা এখন একটা আতঙ্ক হয়ে উঠেছে যেন। ওই হাত ভাঙার পর থেকে মা যেন আরও কঠিন আর রূঢ় হয়ে উঠেছে। বেশি বয়সে হাত-পা ভাঙলে যা হয়, সেটাই হয়েছে। সেরে ওঠার পরও হাতটায় তেমন জোর পাচ্ছে না মা। আর তাতেই যেন সব রাগ গিয়ে পড়েছে রুহানের ওপর।
আসলে কাকু-কাকিমাদের আর্থিক অবস্থা এখন অনেক ভাল। ঠিকে লোকের পাশাপাশি একটা সর্বক্ষণের লোকও রাখা হয়েছে। আর রুহানদের একজন মহিলা আসে বাসন মাজা আর ঘরদোর ঝাঁট দেবার জন্য। কিন্তু বাকি তো আরও কাজ থাকে সংসারে। আর সেগুলো করতে হয় মাকেই। ফলে মা ভীষণ রেগে যায় আজকাল। রুহানের মাইনে আর মা’র পেনশন দিয়ে কোনওমতে চলে গেলেও সচ্ছলতা ব্যাপারটা কিছুতেই যেন ঠিক আসে না! ক্লাবের থেকে বহু দিন টাকাপয়সা পায় না রুহান। এমনকী, এ বছর তো চুক্তিই করা হয়নি ওর সঙ্গে। তবু রুহান প্র্যাকটিস অ্যাটেন্ড করে। প্র্যাকটিস ম্যাচে খেলে। টিম মিটিং-এ থাকে মাঝে মাঝে। আর এই ওই কর্তাদের কাছে গিয়ে বলে ওর গত বছরের বকেয়া টাকাটা যেন মিটিয়ে দেওয়া হয়। কর্তারা ‘দেব দেব’ বলে কিন্তু এখনও পর্যন্ত একটা ফুটো কড়িও পায়নি রুহান। তা ছাড়া ব্রজদার ভাইয়ের বাড়ির অনুষ্ঠানের ডেকরেটিভের কাজটা করে দেয়নি বলেও ব্রজদা বকেয়া পেমেন্টে আরও টাইট দিয়েছে।
রুহান জানে ওর খেলোয়াড় জীবন শেষ। জানে, কলেজের সেই জেদি ছেলেটা এখন বুড়ো মেরে গেছে। নুয়ে পড়েছে। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। রুহান বোঝে এবার সরে যেতে হবে। আর এসব মনে এলেই কেমন যেন অসহায় লাগে তার। মনে হয় এত বছর কী করল ও? তবে কি একটা বেসরকারি অফিসে এমন ছেঁড়াখোঁড়া কাজ করে জীবন কেটে যাবে ওর? যে-মানুষটা হওয়ার ইচ্ছে ছিল ছোটবেলায় তা কি আর হওয়া হবে না? এ সব কিছুর উত্তর রুহান জানে। তবু নিজেকে এই প্রশ্নটা বারবার করে সে। ওর মনে হয় অন্তত এই প্রশ্নটুকুর মধ্যে তো কোথাও হলেও একটা ধনাত্মক দিক লুকিয়ে রয়েছে! নিজেকে মানুষ যতদিন প্রশ্ন করে ততদিন তার আশা মরে না।
এইসব চিন্তাভাবনা মাথায় এলেই রুহানের মন আর ঠিক থাকে না। অন্যমনস্ক হয়ে যায় ও। আর কাজকম্মে ভুল করে বসে। গতকালও এমন একটা কাণ্ড হয়েছিল।
সন্ধেবেলা বাড়িতেই ছিল রুহান। ক্লাবে একটা ফাংশন ছিল। তবু যায়নি। না গিয়ে বাড়িতে বসে জোর করে মনখারাপ করছিল ও। ভাবছিল, ও যায়নি, তবু ক্লাব থেকে কেউ একজনও ওকে ফোন করল না! একবারও তো কেউ বলতে পারত, ‘রুহান আয়।’ এটুকুও বলল না? সবাই এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল! রুহান তা হলে আর সত্যিই ক্লাবের কেউ নয়? আর এসব কথা ভাবতে ভাবতেই মায়ের কথাটা ঠিকমতো শুনতে পায়নি।
মা হঠাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল, ‘কোন বাঁদি পেয়েছিস আমায়? তোর গোলাম আমি?’
সাধারণভাবে বললে হয়তো রুহান এটাও মিস করত। কিন্তু মা এত জোরে চেঁচিয়েছিল যে, চমকে উঠে রুহান প্রায় পড়ে যাচ্ছিল খাট থেকে।
‘কী হয়েছে মা?’ রুহান জিজ্ঞেস করেছিল।
‘দামড়া ছেলে, তখন থেকে ডাকছি কানে যাচ্ছে না?’
‘ডাকছিলে? আমি ঠিক…মানে…ইয়ে…’
‘জানোয়ার। ধম্মের ষাঁড়। পয়সা রোজগার না করে বাড়িতে বসে আয়েস করা হচ্ছে? তখন থেকে ডাকছি। চা-পাতা নেই। বলছি নিয়ে আয়। হুঁশ নেই তোর? আমায় গাধা পেয়েছিস? সকালে বাজার করি, রান্না করি, উনো-কোটি-শিব সব কাজ করি। আর এখন এই সময়ে আমাকেই দোকানে যেতে হবে? তোর লজ্জা নেই? তোর কোনও হুঁশ নেই? মা মরলে শান্তি পাবি? বাবাকে তো খেয়েছিস। এখন কি আমাকেও খাবি? এত খিদে তোর! তুই এত রাক্ষস! মা-বাপ কাউকে ছাড়বি না? আমার দোষ হয়েছিল গত জন্মে, না হলে এমন জানোয়ার জন্মায় আমার পেটে? এমন শয়তান আসে? নির্লজ্জ। বেহায়া। ইতর।’
চা-পাতা! তার জন্য এত! রুহানের এখন আর তেমন গায়ে লাগে না এসব। মনে হয়, মা তো সবসময় বলে। তবে হ্যাঁ। এসব শোনার পর মনে হয় ওর আশপাশের পৃথিবীটা অনেক যেন শান্ত, অনেক যেন ধীর হয়ে যায়। মনে হয় সবাই যেন চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। গতকালও তাই হয়েছিল। রাস্তার মানুষ। সামনের লেক গার্ডেন্স স্টেশনের লেভেল ক্রসিং। চায়ের দোকানের বাবলাদা। সবই কেমন যেন মহাশূন্যে হাঁটছিল। চায়ের পাতা কিনে আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিল না রুহানের। ভাবছিল, যার বাঁচার ইচ্ছে নেই, আর মরার সাহস নেই, তেমন মানুষ কী করে?
‘মা আছে। ভালই,’ রুহান বলল।
কিগান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু পারল না। আবেশ বলল, ‘যাঃ শালা, গেট পড়ে গেছে। ওই দেখ ট্রেন আসছে। অ্যানাউন্স করল না তো!’
সত্যিই তো! অবাক লাগল রুহানের। ও বলল, ‘ঠিক আছে, তা হলে আমি আসি। কিগানদা, এতক্ষণ থাকলাম ঠিকমতো কথাই তো হল না। পরে একদিন হবে।’
রাহি বলল, ‘আমার কথাটা ভুলে যাবে না তো?’
‘তোমার?’ রুহান হাসল। বলল, ‘না, এবার সত্যিই দেখব।’
কিগান শুধু বলল, ‘ভাল থাকিস রুহান। মনটা ভাল রাখিস।’
রুহান এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের ওপর বসা মোসাম্বি লেবুওয়ালা, ঠান্ডা শরবতওয়ালা, বাদামওয়ালা আর ছড়ানো ছিটানো মানুষজনদের ফাঁকফোকর দিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড়োল। ফ্লাইওভারটা ভেঙে যখন দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে নামল, দেখল দূর থেকে ট্রেনের সবুজ-ঘিয়ে রঙের মুখটা ছোট্ট বাক্সের মতো দেখা যাচ্ছে। ও একটু ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়াল। মোবাইলটা বের করে অন করল। অনেকক্ষণ বন্ধ ছিল। কে জানে কারা ফোন করছিল!
ফোনটা চালু হওয়ামাত্রই টিংটিং করে বেজে উঠল। একটু অবাক হল রুহান। এমন সময় কে ফোন করল ওকে? আরে, বুকুদা যে!
ট্রেনটা এবার কাছে চলে এসেছে একদম। লোকজন ব্যস্ত আর উদগ্রীব হয়ে যে যার জায়গা নিতে শুরু করেছে। রুহান ভেবেছিল ফাঁকা থাকবে ট্রেন। কিন্তু প্রায় কুস্তি করে ট্রেনে উঠতে হবে। ফালতু গাড়ি করে এল এত অবধি!
ফোনটা বাজছে। এখন ধরলে ট্রেনে উঠতে প্রবলেম হবে। কিন্তু বুকুদার ফোন না ধরলেও বিপদ। রুহান ভাবল যা হবার হবে। ধরেই নিই।
‘হ্যালো বুকুদা, আমি এক্ষুনি ট্রেনে উঠছি। পরে ফোন…’
‘হান, মুনাইয়ের খবর আমায় দিতে পারবি?’
‘কে?’ রুহান যেন বুঝতে পারল না। ট্রেনটাও প্ল্যাটফর্ম ওলটপালট করে ঢুকে পড়ল একদম। চিৎকার চেঁচামেচি আর ঠেলাঠেলিতে রুহান বুঝতে পারল না বুকুদা কী বলছে। শুধু ‘মুনাই’ নামটা কানে বাজতে লাগল। মুনাইদি! এতদিন পর হঠাৎ?
ভিড়ের মধ্যে কিছুটা ভেসে, কিছুটা ধাক্কা খেয়ে ট্রেনে উঠে পড়ল রুহান। এক কোণে দাঁড়ানোর জায়গায়ও পেয়ে গেল। তারপর দেখল হাতের মোবাইলটা। লাইন কেটে গেছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু সত্যিই কি বিচ্ছিন্ন? মানুষ কি সত্যিই একে অপরের থেকে ছিটকে যায়? বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়? মানুষ কি পারে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে? না হলে কেন হঠাৎ বুকুদা এতদিন পরে আবার উচ্চারণ করল সেই নাম? জানতে চাইল তার কথা! কেন?
রুহান দেখল আবার রিং হচ্ছে। আবার স্ক্রিনে ঝলসাচ্ছে বুকুদার নাম। কী বলতে চাইছে বুকুদা? এত বছর পর আবার পুরনো ছবি ঝেড়ে বের করছে কেন? রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ফোনটা কানে লাগিয়ে বলল, ‘বলো বুকুদা।’
Chapter - 22
২২
গাড়িটা শমীদার। বেশ বড়। এসইউভি। চট করে দেখা যায় না রাস্তায়। দেখেই বোঝা যায় খুব দামি। দিঘি বারণ করেছিল। বলেছিল, ‘শমীদা দরকার নেই। ছেড়ে দাও। আর্য তো গাড়ি নেবে বলছে।’
শমীদা শোনেনি। সামান্য তুতলে, হেসে বলেছিল, ‘কেন, আর্যরই কি শুধু গাড়ি আছে? আমার বুঝি গাড়ি থাকতে নেই! আর গাড়ি বুঝি আমি আমার শালিকে দিতে পারি না? আমার বড় গাড়িটা নিয়ে যা।’
‘ঠিক আছে। তবে তোমাকেও যেতে হবে আমাদের সঙ্গে। অত দামি গাড়ির রিস্ক নেবই না আমি,’ দিঘি নাছোড়বান্দা গলায় বলেছিল।
‘আমি? তোদের মধ্যে আমি? না, না,’ শমীদা একটু গুটিয়ে গিয়েছিল।
‘কেন নয়?’ দিঘি হেসেছিল, ‘তুমি বুড়ো হয়ে গেছ নাকি?’
‘হইনি!’ শমীদা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন? তোর দিদি তো বলে…’
‘দিদির কথা বাদ দাও। দিদি অনেককে অনেক কিছু বলে। সব ধরলে চলে না।’
শমী হেসে মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, ‘শুধু বলে না রে, অনেক কিছু করেও।’
দিঘি গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘জানি। বাদ দাও। তুমি চলো না। সপ্তমীর সকাল তো! নিশ্চয়ই ছুটি আছে তোমার! তা হলে যাবে না কেন?’
‘মহুল যাবে?’ খুব সন্তর্পণে প্রশ্নটা করেছিল শমী।
‘দিদি? পাগল! আমরা যাব গুন্ডার দিদির অর্গানাইজেশন, প্লাস ওর বান্ধবীর বাড়ির দুর্গাপুজো দেখতে। অনেক দিন, প্রায় মাস দশেক হল বলেছে। দিদি সেখানে গিয়ে কী করবে?’
‘আমিই বা গিয়ে কী করব বলতে পারিস?’ শমী ওর গদি আঁটা বড় নরম চেয়ারটায় প্রায় ডুবে গিয়েছিল।
‘ধরো, তোমায় আমি বলছি। তুমি যাবে না? শমীদা, এখানে পুজোর সময় ঘরে বসে শুধু শুধু ডিপ্রেসড না হয়ে আমাদের সঙ্গে চলো। ভাল লাগবে তোমার। আর যদি এত বলার পরও না যাও…’ দিঘি ছদ্ম রাগে চোখ পাকিয়েছিল।
‘দিদির মতো মারবি নাকি?’ হো হো করে হেসেছিল শমী। তবু সেই হাসির তলায় ইটচাপা ঘাসের মতো বর্ণহীন কষ্টটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল দিঘি।
গাড়িটা মসৃণভাবে চলছে। শরতের রোদ দুলছে দু’পাশের মাঠে। সবুজ গাছপালার মাথায় নানান পাখি উড়ছে। দূরে মাঠের ভেতর সারি সারি ইলেকট্রিকের পোস্ট কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুপারম্যানের মতো। তাদের মাথা দিয়ে মোটা মোটা তার কোত্থেকে যে কোথায় যাচ্ছে, কে জানে!
সামনে রাস্তাটা কালো, মসৃণ। দু’পাশের গাছগুলো ঝুঁকে পড়ে মাথায় মাথা লাগিয়ে সামনের রাস্তাটাকে কেমন যেন টানেল করে দিয়েছে। ডান দিকের জানলায় বসে এই সবই চুপচাপ দেখে যাচ্ছে দিঘি। দেখছে যত, ততই ভাল লাগছে। কে বলবে কলকাতা শহরে লোকজন উন্মাদের মতো পুজো-পুজো করে লাফিয়ে পড়েছে? যেন হুল্লোড় না করলে আনন্দ হয় না! যেন গভর্নমেন্ট থেকে নিয়ম করে দিয়েছে যে, উন্মত্ত আনন্দ না করলে সবাইকে জরিমানা করা হবে! দিঘির মনে হয়, সত্যিই কি সবাই আনন্দটা মনের ভেতর থেকে করে? নাকি এটাও অন্যের দেখাদেখি, ইচ্ছে না থাকলেও করতে হয় বলে করে!
পুজো আর হুল্লোড় আজকাল আর একদম ভাল লাগে না দিঘির। বিশেষ করে গত বছর থেকে তো অসহ্য লাগছে আরও। দু’বছরের ভেতর জীবন যে কত বদলে যায়! গত দু’বছর আগেও তো এই সপ্তমীর দিনটায় দিঘি কিগানের কাছেই ছিল। আর এখন! এখন কিগান কোথায়?
‘কী রে তখন থেকে কী ভাবছিস অত?’ একদম পিছনের সিট থেকে গুন্ডা গলা বাড়িয়ে আর্য আর দিঘির কানের কাছে বাজখাঁই গলায় বলল।
‘ওফ!’ আর্য বিরক্ত হল, ‘দাঁত মাজিস না? মুখে গন্ধ।’
‘অ্যাঁ, গন্ধ?’ গুন্ডা খেঁকিয়ে উঠল, ‘খুব বাজে ছেলে তো তুই। দাঁড়া, নেমে তোকে ক্যালাব আজকে। খালি বাজে কথা, না?’
‘গন্ধকে কী বলব? সত্যি, তুই খুব নোংরা গুন্ডা,’ আর্য বিরক্তির গলায় বলল।
‘আমি নোংরা! জানিস, রোজ একটা গোটা সাবান দিয়ে স্নান করি। আধ টিউব টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজি। আর আমি নোংরা! জানিস তো যাদের মাথায় স্ক্রু ঢিলে থাকে তারা গন্ধ নিয়েও হ্যালুসিনেট করে। তুই শা—’ সামনে শমীর কথা ভেবেই অনেক কষ্টে জিভের ব্রেক কষল গুন্ডা।
‘আধ টিউব টুথপেস্ট!’ জয়, গুন্ডার পাশে কুঁকড়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে বসে ছিল। তবে এবার যেন একটু দৃশ্যমান হল।
‘হ্যাঁ,’ গুন্ডা বিরাট শরীরটা নিয়ে ঘুরল।
জয় গোল গোল চোখ করে তাকাল, ‘তোর ক’টা দাঁত রে? একশো আঠাশটা? মানে ইয়ে মানুষের তো…’
‘কেন? আমি কুমির?’ গুন্ডা চোখ পাকিয়ে জয়ের দিকে তাকাল।
‘কুমিরের একশো আঠাশটা দাঁত থাকে?’ জয় গুন্ডার চাপে আবছা হতে লাগল আবার, ‘তুই গুনেছিস? কবে ঠিক ইয়ে…’
গুন্ডা আর সামলাতে পারল না নিজেকে। শমীর সামনেই বলল, ‘শালা, আমি কি কুমিরের দাঁতের সেনসাস করি? আর এত ইয়ে ইয়ে করিস কেন? ইয়েতি খুঁজছিস?’
আর্য গম্ভীরভাবে বলল, ‘জয়, জলহস্তী কি কুমিরের দাঁতের সেনসাস করতে পারে? জলে থাকে বলেই কি আর কুমির সম্বন্ধে জ্ঞান থাকবে জলহস্তীর?’
‘শালা,’ গুন্ডা শমীকে আর তোয়াক্কা না করে গাড়িটার ভেতর প্রায় লাফিয়ে উঠল, ‘আজ তোকে…’
দিঘি দেখল ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে। শমী ওর বন্ধু-বান্ধবদের সম্বন্ধে কী ভাবছে কে জানে! ও হাফ টার্ন করে গুন্ডার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, ‘গাড়িটা উলটে যাক চাস? তখন থেকে লাফাচ্ছিস কেন?’
‘আমি লাফাচ্ছি?’ গুন্ডা শান্ত হয়ে বসলেও অভিমানী গলায় বলল, ‘আর্য আমায় এমন বলল, সেটা কিছু নয়, না? আমি মোটা, বেশ হয়েছে। নিজের বাপের পয়সায় খেয়ে মোটা। কার বাপের কী?’
‘তুই বাপ তুলছিস কেন?’ আর্য সিরিয়াস হয়ে গেল হঠাৎ, ‘দেখ গুন্ডা, লিমিট ছাড়াবি না বলে দিলাম। ছোটলোকের মতো কথা বললে…’
‘কী করবি বে?’ গুন্ডাও সিরিয়াস হয়ে গেল হঠাৎ, ‘শালা, লাল্টু ছেলে। ভাতে দিলে গলে যায়, আবার রোয়াব দেখাচ্ছে! দিঘির সঙ্গে চিপকে থাকিস বলে তোর সঙ্গে কথা বলি। নইলে কে পুছত রে তোকে! তোর বাপের টাকা আছে, তাতে তোর এত গরম কেন? শমীদা, এই মালটাকে গাড়ি কাত করে ফেলে দাও তো! তখন থেকে দেখছি দিঘির শরীরে হাত দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। পারভার্ট শালা।’
‘কী বললি?’ আর্য ঘুরে বসে হাত বাড়াল গুন্ডাকে ধরার জন্য। আর্যর পাশে বসা রূপ বাঁ দিকের দরজার সঙ্গে চেপটে গেল একদম।
কিন্তু আর্য ধরার আগেই গুন্ডা খপ করে ওর হাতটা ধরে ঘুরিয়ে ধরল বাঁ হাত দিয়ে আর ডান হাত দিয়ে আর্যর গলার কাছের শার্টটাকে পাকিয়ে মুচড়ে ধরল একদম। হিসহিসে গলায় বলল, ‘শালা, গায়ে হাত দিচ্ছিস? আমি যাদবপুরের ছেলে। এই হাতটা ভেঙে তোর পিছন দিয়ে ঢুকিয়ে দেব, শুয়োরের বাচ্চা। তুই দিঘির বুকে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছিস না?’
‘এই কী করছ? এই,’ শমী ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে পিছনে ঘুরে চিৎকার করে উঠল। তারপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে গাড়িটা সাইড করতে বলে, বলল, ‘গুন্ডা, ছাড়ো ওকে। আরে, তোমরা ছাড়াও।’
জয় আর সুবর্ণ গুন্ডাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। গুন্ডা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘শোন আর্য, ইচ্ছে করলে তোর হাতটা এখনই ভেঙে দিতে পারি আমি। দম নেই যখন, তখন গায়ে হাত তুলবি না। কখনও তোর বাপ তুলিনি। কিন্তু এবার তুলছি। তোর বাপ টাকাই রোজগার করেছে, ছেলে মানুষ করতে পারেনি। আর ফারদার যদি তোর ঢ্যামনামো দেখেছি ল্যাংটো করে ক্যালাব। তোর বাপ-ঠাকুরদা চোদ্দোগুষ্টিকে নিয়ে আয়, তারা আটকাতে পারলে আমায় আটকাক।’
গাড়িটা বাঁ দিক করে দাঁড়িয়ে পড়ল। গুন্ডা প্রায় ধাক্কা মেরে ছুড়ে ফেলে দিল আর্যকে। তারপর গাড়ির দরজা খুলে সুবর্ণকে ধাক্কা মেরে নেমে গেল রাস্তায়। এতক্ষণ সব শান্ত ছিল। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যে কী যে হয়ে গেল!
দিঘি গাড়ি থেকে নামল। কালো বাঁকানো রাস্তার একপাশে সাদা রঙের গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনেই একটা বড় হোর্ডিং। তাতে অল্প কাপড়চোপড় পরে একটা মেয়ে গা-ভরতি গয়না নিয়ে বিজ্ঞাপন করছে। সেই হোর্ডিং-এর তলায় গিয়ে বসে পড়েছে গুন্ডা। আর ওর সামনে জয় আর সুবর্ণ হাত নেড়ে কিছু বোঝাচ্ছে। এদিকে আর্যকে বোঝাচ্ছে শমী আর রূপ।
গোটা দৃশ্যটাকেই খুব বিরক্তির সঙ্গে দেখল দিঘি। এরা বড় হয়েছে? তুই-এর থেকে তুমিতেই একদম এমন মারামারি করতে হবে! দিঘি গাড়ির ভেতর, জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সুগার ফ্রি একটা সফ্ট ড্রিঙ্কস তুলে নিল। তারপর গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দেখল আর্যর মুখটা এখনও টকটকে লাল হয়ে আছে।
সুবর্ণ এবার ডাকল দিঘিকে, ‘এই, তুই এদিকে আয়।’
দিঘি এক চুমুক খেয়ে বিরক্তির সঙ্গে বলল, ‘কেন? আমার ভাল লাগছে না।’
‘আরে, ও বলছে চলে যাবে। বলছে, চাপাডাঙা যাবে না।’
চোয়াল চিপল দিঘি। ন্যাকামো। যদি যাবে তো যাক না। আর্য ফালতু সিন ক্রিয়েট করছে। ও চায়, সবাই মিলে ওকে তোয়াজ করুক। এসব অসহ্য লাগে দিঘির। আর যত দিন যাচ্ছে আর্যর এইসব স্বভাবগুলো যেন আর সহ্য করতে পারছে না দিঘি। আর সত্যি বলতে কী গুন্ডা ঠিকই বলেছে। গাড়ির ভেতর বসে, সত্যিই দিঘির বুক ধরতে চাইছিল আর্য। আজকাল দেখা হলেই আর্য দিঘির গায়ে হাত না দিয়ে কথা বলতে পারে না যেন। একটু একা পেলেই বুকে হাত দেয়। মুখে জিভ ঢুকিয়ে চুমু খেতে চায়। এমনকী একদিন তো নীচেও হাত দিতে গিয়েছিল। বিরক্তিতে সেদিন ছিটকে দূরে চলে গিয়েছিল দিঘি। আর্য রাগ করেছিল খুব। বলেছিল, ‘আমার সব বন্ধুরা, ওদের গার্লফ্রেন্ডদের সঙ্গে শুয়েছে। আর আমিই শালা নিরামিষ হয়ে আছি। এখন কতরকম সুবিধে হয়েছে। শুলে কোনও রিস্ক নেই। তবু তুমি মান্ধাতার আমলের সেন্টিমেন্ট নিয়ে বসে আছ? জানো, আমাদের কলেজের অনেক মেয়ে আমার সঙ্গে শুতে চায়। ইউ শুড কনসিডার ইয়োরসেল্ফ লাকি।’
দিঘির মনে হয়েছিল জুতোটা খুলে ঠাস করে মারে আর্যর গালে। তার বদলে ও বলেছিল, ‘আমি আনলাকিই থাকতে চাই। আমি তোমায় আর সহ্য করতে পারছি না। লেট্স ব্রেক আপ।’
সেদিন আর্যর কোনও কথা শোনেনি দিঘি। সটান চলে এসেছিল। টানা সাতদিন কোনও যোগাযোগও রাখেনি। আর্য অনেক অনুনয়-বিনয় করে আবার দিঘির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। দিঘি বলেছিল, ‘আমি আর একবার এমন হলে কিন্তু চলে যাব। শোনো আর্য, তোমাকে একটা কথা ভাল করে বলি, তোমার প্রেমে কিন্তু আমি অন্ধ বা পাগল নই।’
আর্য ঠিক ছিল কয়েকদিন। তারপর আবার শুরু করেছে। দিঘি বিরক্ত হয়ে তাকাল সুবর্ণর দিকে, ‘গেলে যাবে। আমি আটকাতে যাব না। আর্য আর গুন্ডা, ওরা দু’জনেই বড়, আর এমন ছেলেমানুষি করার কোনও কারণই ছিল না। তাই আমার কিছু করার নেই। যা পারে করুক।’
সুবর্ণ কিছু বলার আগেই আর্য প্রায় দৌড়ে এল, ‘কী বললে তুমি? গুন্ডাকে তুমি আমার সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে রাখলে! একটা ফালতু, পাতি ছেলে, লোফার। তার সঙ্গে আমি এক! ফালতু কথা বলবে না দিঘি। ওর কোনও ক্লাস আছে?’
দিঘি বলল, ‘তোমার আছে? কেন গায়ে হাত তুলতে গেলে তুমি? পারবে ওর সঙ্গে? কেন হুট করে গায়ে হাত দিতে গেলে? এটা কি কোনও ক্লাস বোঝায়? দেখো, তোমার যে-চুলোয় যেতে ইচ্ছে করে, সেখানে যাও। আমার মাথা খেও না।’
‘মানে? ওই হাতির বাচ্চাটার জন্য তুমি আমায় বলছ এসব!’ আর্য চিৎকার করে উঠল, ‘তোমার কাছে ওই হাতিটা বড় হল? তুমি…তুমি একটা… শালা… ইউ…বিচ।’
বোতলটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিয়ে নিমেষের মধ্যে ডান হাতটাকে আর্যর গাল লক্ষ্য করে আড়াআড়ি চালাল দিঘি। চটাস শব্দটা এত জোরে হল যে, দূরে বসা গুন্ডাও তাকাল। তারপর গন্ডগোল দেখে উঠে এগিয়ে এল এদিকে।
‘তুমি আমায়…’ আর্য গালে হাত দিয়ে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘আমায় তুমি…মারলে…কার জন্য মারলে? সবার সামনে আমায় তুমি…’ আর্য হঠাৎ কেঁদে ফেলল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
দিঘি ঘৃণার চোখে দাঁড়ানো থেকে বসে পড়া আর্যকে দেখল। তারপর সরে গেল সামনে থেকে।
‘কী যে করিস না তোরা!’ শমী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। দিঘি বুঝল আসলে ওটা মাথায় হাত। শমীদা চিরকালের ভালমানুষ। এমন অবস্থায় পড়ে খুব নাকাল হচ্ছে। আসলে যে ঝামেলা সবচেয়ে বেশি এড়াতে চায়, সে-ই সবচেয়ে বেশি ফেঁসে যায় ঝামেলায়। শমীকে দেখে হঠাৎ কষ্ট হল দিঘির। কী দরকার ছিল ওর শমীকে এসবের ভেতরে টেনে আনার? এমনিতেই সবসময় একটা টেনশন নিয়ে থাকে মানুষটা। তার ওপর আবার বাড়তি ঝামেলা! শমী বেশ রোগা হয়ে গেছে আজকাল। তাই আরও কেমন যেন অসহায় লাগে ওকে। দিঘির মনে হল শমীর কাছে একবার গিয়ে দাঁড়ায়।
গুন্ডা এগিয়ে এসে বলল, ‘তুই ঠিক আছিস?’
‘গুন্ডা, এখন কথা বলিস না, আর আমাকেও বলাস না,’ দিঘি অন্যদিকে তাকাল। রোদটা এবার চড়া হচ্ছে। গরম বাড়ছে।
গুন্ডা কিছুক্ষণ দেখল দিঘিকে। তারপর নিজেই এগিয়ে গেল আর্যর দিকে। বলল, ‘আর্য, যা হয়েছে ভুলে যা। আয়াম সরি। আর দিঘিও যে মেরেছে তোকে তার জন্য কিছু মনে করিস না। এমন হয় কখনও কখনও। আজ সপ্তমী পুজো। বছরে এই দিনগুলো একবারই আসে। সুতরাং বাদ দে। চল, গাড়িতে ওঠ আর দেরি করিস না।’
আর্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘তোদের সঙ্গে? এক গাড়িতে? আমি যাব না। কিছুতেই যাব না।’
গুন্ডা একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আর্যর দিকে। তারপর বলল, ‘শোন, এমন হয় মাঝে মাঝে। মনে নিস না। চল, আর দেরি করা ঠিক হবে না। হোমিদিরা চিন্তা করবে।’
‘হোমিদি! কে হোমিদি? মফসস্লের কোথাকার কে এক! এনজিও বানান করতে পারে না, এনজিও চালায়! সব সস্তা পপুলারিটির ধান্দা! এমন ব্যাঙের ছাতা টাইপ এনজিও অনেক আছে। আমি হোমি-টোমি কারও জন্য আসিনি এখানে। এসেছিলাম এই দিঘির জন্য। বাট ডিডন্ট নো, দ্যাট সি উইল টার্ন আউট টু বি আ বিচ।’
‘মুখ সামলে কথা বল আর্য,’ গুন্ডা আবার চোয়াল শক্ত করল।
‘না হলে কী করবি? শালা, পেটি মিড্ল ক্লাস।’ আর্য জামার হাত গুটিয়ে এগিয়ে এল গুন্ডার দিকে, ‘মাথামোটা। তুই আমায় পুজো বলে জ্ঞান দিচ্ছিস?’
‘শালা, আজ তোকে…,’ গুন্ডা আবার হাত তুলল। কিন্তু শমী, সুবর্ণ আর জয় এবার তৈরি হয়েই ছিল। একসঙ্গে তিনজনেই ঝাঁপিয়ে আটকাল গুন্ডাকে। তবু, সেই অবস্থাতেই গুন্ডা পা চালাল। আর পায়ের চটিটা খুলে, উড়ে গিয়ে লাগল আর্যর মুখে।
‘তবে রে বানচোত…’ আর্য এবার তেড়ে আসতে গেল। কিন্তু তার আগেই দিঘি গিয়ে দাঁড়াল সামনে। দু’হাত দিয়ে ওকে আটকে বলল, ‘আর একদম না। যাও, বাস ধরে বাড়ি ফিরে যাও। যাও বলছি।’
‘মানে?’ আর্য দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখচোখ লাল।
দিঘি দেখল, জায়গাটা গ্রাম। আর তাই ধীরে ধীরে লোকজন জমছে চারপাশে। ভ্যান দাঁড়িয়ে পড়েছে, সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে কিছু মানুষ। ছেলেমেয়েরাও কিছু জড়ো হয়েছে কলকাতার মানুষদের তামাশা দেখার জন্য। দিঘি দেখল কয়েকজন তো বেশ হাসিহাসি মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে। যেন সার্কাস চলছে। ওর রাগ হল। গুন্ডা আর আর্য কি এসব বুঝছে না? কেন এমন তামাশা করছে? খোলা রাস্তায় মানুষের চোখের সামনে এমন করার মানে কী? ওরা এই সহজ জিনিসটা বুঝছে না কেন যে, মানুষের নিজের সম্মান তার নিজের কাছে! সেটা নিজেকেই সামলে রাখতে হয়! সেটাকে হাটের মধ্যে আনতে নেই!
দিঘি বলল, ‘দেখো আর্য, আর নাটক কোরো না। বাস ধরো, বা চলতি শাট্ল ধরো, ধরে কাটো।’
‘চলে যেতে বলছ? তা তো বলবেই…জানি না আমি? কেন সেদিন ফোনে অমন কিগানদা…কিগানদা করছিলে! সবাই কিগানকে দোষ দেয়, কিন্তু আমার তো মনে হয় তোমার দোষ কিছু কম ছিল না।’
‘মানে? কী বললে তুমি!’ দিঘি অবাক হল।
‘তোমার আর আমাকে দরকার নেই। আমি খুব বুঝি। আমারই ভুল। আমি…’ আর্য রাগে খেই হারিয়ে ফেলল কথার।
‘বাজে বোকো না,’ দিঘি কড়া গলায় বলল, ‘আর দরকার? “বিচ” বলার পর আর কোন মুখে এসব বলছ তুমি?’
‘বেশ করেছি,’ আর্য চিৎকার করল, ‘আমার বাবা কোনওদিন গায়ে হাত দেয়নি আমার। তুমি দিয়েছ। আমি যাব ভেবেছ তোমাদের সঙ্গে? ইউ পিপ্ল জাস্ট গো টু হেল।’
আর্য আর কোনওদিকে না তাকিয়ে হাবড়ার দিক থেকে বারাসতের দিকে যাওয়ার একটা বাসকে হাত দেখিয়ে থামাল। দিঘি দেখল বাসটার গায়ে লেখা আছে ন’হাটা। তলায় বড় করে লেখা ‘ভালবেসো না পার্থসারথী’।
শমী আর্যর পিছনে পিছনে গিয়েছিল। কিন্তু আটকাতে পারেনি।
বাসটা চলে যাওয়ার পর, শমী এসে বলল, ‘এঃ, সপ্তমীর সকালটা কী হয়ে গেল বল তো! তোরা সব নামেই বড় হয়েছিস। আসলে, কিচ্ছু বড় হোসনি। আমি তো ভাবতাম মহুলই এমন রাগী আর রগচটা। দেখলাম দিঘি, তুইও তো কম যাস না রে! যাক গে, চল, আর দেরি করিস না।’
এতক্ষণ রূপ চুপ ছিল। কিন্তু গাড়িতে উঠেই বলল, ‘শমীদা, একটা কথা বলব?’
ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে পিছন ফিরল শমী, ‘বলো।’
‘একটা সিগারেট ধরাতেই হবে এবার। তুমি কিছু মাইন্ড করবে না তো?’
‘তুমি সিগারেট খাও?’ শমী অবাক হল।
এটাই ভাল লাগে দিঘির। শমীদা মানুষটা বড্ড সরল। অনেক ছেলেই মেয়েদের এসব ব্যাপারে আশ্চর্য হলেও সেটা দেখায় না। কিন্তু শমীদা তা মোটেও নয়। না হলে কেউ এমনভাবে বলে?
রূপ বলল, ‘হ্যাঁ, খাই, কেন? প্রবলেম আছে?’
‘না, না,’ শমী একটু ঘাবড়াল, ‘কোনও প্রবলেম নেই। মানে এত অল্প বয়সে এসব খাওয়া তো ভাল নয়। আসলে, কোনওদিনই খাওয়া ভাল নয়। কোনও বয়সেই ভাল নয়। তাই বলছি আর কী?’
‘জানি,’ রূপ গম্ভীর হল, ‘সে তো রাস্তার রোল, কাবাব, কাটা ফল, তেলেভাজা কোনও কিছু খাওয়াই ভাল না। তা বলে কি মানুষ খাচ্ছে না? তুমি খাও না?’
‘তা হলেও,’ শমী বোঝাতে চাইল, ‘দুটো কি এক হল? তোমার এই বয়সে লাংস দুটোর কী অবস্থা হবে বলো তো?’
‘দুর, ছাড়ো না,’ রূপ হাসল, ‘আমি খাচ্ছি একটা। এমন হাই ভোল্টেজ ড্রামার পরে আর কি শান্তভাবে বসে থাকা যায়? ডোন্ট মাইন্ড, কেমন?’
শমীর উত্তরের অপেক্ষা না করেই রূপ সিগারেট ধরিয়ে ফেলল। তারপর দিঘিকে বলল, ‘তোদের মধ্যে যা হল, এর পর কী হবে?’
‘তোকে কোনও ছেলে বিচ বললে, তুই কী করতিস?’ দিঘি পালটা প্রশ্ন করল।
‘আঃ, আমার কথা বাদ দে না। তুই কী করবি?’
‘আমি? তোর কী মনে হয়?’ দিঘি আবার পালটা প্রশ্ন করল।
‘আর সম্পর্ক রাখবি না। অবশ্য আমার…’ কথাটা শেষ না করেই চুপ করে গেল রূপ।
‘বল। তোর, কী?’ দিঘি জানালা দিয়ে আসা হাওয়ার ঝাপটা থেকে চুলগুলো সামলাতে সামলাতে বলল, ‘তোর কী মনে হয় সেটা বল।’
‘আমার মনে হয়, তুই কোনওদিনই আর্যকে সেভাবে ভালবাসতিস না। কিছু মনে করিস না। আমার মনে হয়েছে যে, ও যেন একটা নিয়মের মতো। যেন বয়ফ্রেন্ড থাকতে হয় বলে থাকা। ও তোর জন্য যেমন করত, তুই তো করতিস না। এই যে চলে গেল, তোর তো কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না! কেন বল তো এমন?’
দিঘি উত্তর দিতে গিয়েও থমকাল। আসলে সত্যিই বলেছে রূপ। গাড়িতে একটা ঝগঝম্প টাইপ হিন্দি গান চালিয়েছে শমী। হয়তো মুডটাকে ভাল করার জন্যই। তাই পিছনের সিটে বসা সুবর্ণ, গুন্ডা বা জয়, কেউ কোনও কথা শুনতে পাচ্ছে না।
দিঘি ঠোঁট কামড়ে বাইরের দিকে তাকাল। এই অশোকনগর পেরোচ্ছে গাড়ি। রেল স্টেশনের নামটা দূর থেকে পড়তে পারল দিঘি। যদিও গুন্ডাও গলা তুলে নামটা বলল। রেল গেটটার দুই পাশেই প্রায় বারোটা করে স্পিড ব্রেকার পর পর সাজানো। এত ভাল গাড়িটাকেও ডিঙি নৌকোর মতো মনে হল দিঘির।
পুজোর সকাল বলেই কি লোকের ভিড় বেশি? মাঝে মাঝে দু’-একটা প্যান্ডেল পড়ছে পথে। আর সেখানে তারস্বরে হিন্দি গান বাজছে। দিঘির মনে হল কলকাতা থেকে এত দূরে এসেও সেই বাংলা বইয়ে পড়া মফসস্লের বা গ্রামের পুজো তো পাচ্ছে না! বরং সেই এক প্যান্ডেল-মাইক আর ছিট কেটে বানানো মানুষ। সব যেন একই ফোটোকপি মেশিন থেকে বেরিয়েছে। পুজো এখন আর ভাল লাগে না দিঘির। আর সকাল থেকে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় হঠাৎ যেন সেই না ভাল লাগাটাই কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
দিঘি বলল, ‘ছাড় তো, অন্য কথা বল।’
সিগারেট শেষ করে সেটা টোকা মেরে জানালা দিয়ে ফেলে রূপ হাসল। বলল, ‘তুই কি অন্য কাউকে পছন্দ করিস?’
‘মানে?’ দিঘি চমকে উঠল, ‘এমন বলছিস কেন?’
রূপ চাপা গলায় কী একটা বলতে যাচ্ছিল।
‘এই তোরা দুটো মিলে তখন থেকে কী ফুসফুস করছিস রে?’ পিছন থেকে হুংকার দিল গুন্ডা, ‘জানিস না অন্যদের সামনে এমন লো টোনে কথা বলা খুব অন্যায়। ব্যাড ম্যানার্স।’
‘অ্যাঃ, ম্যানারিজমের রেন অ্যান্ড মার্টিন!’ রূপ ঘুরে বলল, ‘আমি আর্য নই। এমন ক্যালাব না, ওই চর্বির পাহাড় নিয়েও ছত্রিশ ঘণ্টা মাস্ল পেন হবে।’
গুন্ডা হাসল, ‘সে জানি। তুই আসলে ছেলে। সকলকে বোকা বানানোর জন্য বসে হিসু করিস আর…’
‘চুপ কর,’ জয় স্বভাববিরুদ্ধভাবে ধমকে উঠল।
স্বাভাবিক। শমী বসে রয়েছে তো! গুন্ডা মাঝে মাঝে এত বাজে কথা বলে যে, দিঘির বিরক্ত লেগে যায়। দিঘি ভাবল গুন্ডাকে এবার কড়া করে একটা ধমক দেয়। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ শমী সামনের সিট থেকে বলল, ‘এই, তোমাদের কারও কাছে ব্যথার ওষুধ আছে? আমার পেট ব্যথা করছে।’
‘পেট?’ জয় প্রথম উত্তর দিল, ‘আমারও না কেমন যেন মাথাটা ঠিক মানে…’
‘চুপ কর,’ রূপ ধমক দিল, ‘কারও কিছু হলেই তোরও কিছু হয় কেন বল তো? তুই একদম কথা বলবি না। চুপ করে থাক।’
‘তোমার কি খুব ব্যথা করছে?’ দিঘির চিন্তা হল।
‘না। তবে আমি জানি ব্যথাটা বাড়বে। নাভির সোজাসুজি হয় ব্যথাটা। প্রথমে ব্যথাটা অল্প থাকে। তারপর বাড়ে। আমি অন্য দিন ওষুধ খেয়ে ম্যানেজ করি। কিন্তু আজ ওষুধ আনিনি সঙ্গে। আর এখন…’ শমী মুখটা বিকৃত করল।
‘তুমি ডাক্তার দেখাওনি?’ দিঘি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘না। আর, আবার ডাক্তার! কয়েক মাস আগে যা হল!’ শমী পেটটা হাত দিয়ে চেপে ধরা অবস্থাতেও হাসল অল্প।
দিঘি গম্ভীর হয়ে গেল। সত্যি ঠিকই বলেছে শমী। এখনও সেই সন্ধেটার কথা মনে পড়লে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে দিঘির।
মায়ের ফোন পাওয়ার পর আর্যকে ফোন করে ঠিক কী বলছে, তা নিজেরই খেয়াল ছিল না দিঘির। শুধু আর্য বলেছিল, ‘কী বলছ তুমি? কিগান? কোথায় কিগান? কী হয়েছে?’
দিঘি বলেছিল, ‘শমীদা…শমীদা অসুস্থ! তুমি…তোমরা কই?’
‘কী হয়েছে?’ আর্য জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কোথায় তুমি? আমি বাড়ি যাব।’
‘বাড়ি? কেন? পার্টি তো শুরুই হয়নি ঠিক করে!’ আর্য খুব অবাক হয়েছিল।
‘তো? শমীদা অসুস্থ। আমায় বাড়ি যেতেই হবে। আমি…আমি চললাম।’
‘আরে,’ আর্য চিৎকার করেছিল, ‘শমীদা অসুস্থ তো তোমার কী? ফালতু পার্টি নষ্ট করছ কেন আমাদের?’
‘আমার কী মানে?’ রাগে হাত-পা অসাড় হয়ে আসছিল দিঘির।
‘তোমার কে হয় শমীদা? তোমার দিদির ওয়ান্স আপন আ টাইম বর? চেপে বসো। আমরা আসছি। ব্যাপক পার্টি হবে।’
‘আর্য! কী বলছ তুমি?’ দিঘি যেন চিনতে পারছিল না ছেলেটাকে। আলাপ হওয়ার সময় থেকে এই সময়ের আর্য যেন অন্য মানুষ। যেন অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা! কী করে এমন কথা বলতে পারে ও!
‘আমি রাখছি,’ দিঘি বিরক্ত হয়ে আর কথা বাড়ায়নি। ফোনটা কেটে সুইচ অফ করে দিয়েছিল। তারপর প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল বাড়িটার থেকে। বেরোবার পথে ললিত একবার কথা বলতে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু দিঘি পাত্তা দেয়নি বিশেষ। কারণ, কথা বললে দেরি হবে। তা ছাড়া ললিতকে বললেই নানারকম কথার জবাব দিতে হবে। ললিত মামা হলেও সম্পর্ক তো খুব একটা ঘনিষ্ঠ নয়। তাই দিঘির অত কথা বলার ইচ্ছে ছিল না। তা ছাড়া দিদি কী যে কাণ্ড ঘটিয়েছে সেটা তো স্পষ্ট বুঝতে পারছে না!
রাস্তায় বেরিয়েই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গিয়েছিল দিঘি। নর্থে যাবে শুনে ট্যাক্সিচালক বৃদ্ধটি আর ‘না’ করেনি। ট্যাক্সিতে উঠে ফোনটা আবার খুলেছিল দিঘি। কারণ ভেবেছিল, মা তো ফোন করতেই পারে। দিঘিকে তো দরকার হতেই পারে! কিন্তু ফোনটা সুইচ অন করামাত্র আবার ফোন এসেছিল আর্যর। দিঘি আর ধরেনি। কে ধরবে? মাথা গরম হয়ে যাবে আর্যর কথা শুনলে। এখন মাথা ঠান্ডা রাখাই জরুরি। ফোনটা কেটে দিয়েছিল দিঘি। তারপর নিজেই মাকে ফোন করেছিল একটা। এনগেজ্ড। বিরক্তিতে ফোনটাকে আছাড় মারতে ইচ্ছে করছিল ওর। মা কী করছে? কার সঙ্গে কথা বলছে? দিঘি ভেবেছিল একবার দিদিকে ফোন করবে কিনা। তারপর মত বদলেছিল। কে জানে দিদি এখন কেমন মানসিক অবস্থায় রয়েছে! ফোনটাকে মুঠোয় ধরে বসেছিল দিঘি। কলকাতার সন্ধেবেলাটাকে মনে হচ্ছিল প্রকাণ্ড একটা রাক্ষসের হাঁ। মনে হচ্ছিল সমস্ত আলোগুলো তার ঝলমলে ধারালো দাঁত। তারা যেন কামড় দিতে আসছিল দিঘিকে। সমস্তটাই অসহ্য মনে হচ্ছিল দিঘির। মনে হচ্ছিল কেউ নেই ওর যাকে ফোন করতে পারে, যাকে এই অস্বস্তির সময়গুলোয় নিজের মনের অবস্থাটা বলতে পারে। ওর মনে হচ্ছিল এমন সময় যদি, যদি সে থাকত! কিন্তু কী করত থেকে? কোন কাজে আসত? কোন উপকারটা হত তার দ্বারা?
জানে না, দিঘি জানে না। তবু মনে হয়েছিল, যদি থাকত! যদি একবার দিঘির শরীরটা দু’হাতের মধ্যে নিয়ে বলত, ‘ভয় পেয়ো না।’ আচ্ছা, এমন ইচ্ছে হয়েছিল বলেই কি আর্যকে ফোন করে ও ‘কিগান’ বলে ফেলেছিল? ওর অবচেতন কি ওকে কিগানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল?
বিষণ্ণ, অগোছালো কলকাতার ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল হলুদ ট্যাক্সি। সিগনালের লাল-সবুজ আলো, বাসের হর্ন, ট্র্যাফিকের সাদা-কালো মাড়িয়ে ছুটছিল ট্যাক্সি। অদ্ভুত তেতো গন্ধের এক হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছিল চারদিকে। আর তার ভেতর আচমকা, একদম আচমকাই মাস্কের গন্ধ ভেসে এসেছিল দিঘির কাছে! চরাচর জুড়ে এক কস্তুরী গন্ধ পেয়েছিল হরিণী। সে মুখ তুলে তাকিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। আলো ঝলমলে এক জঙ্গল গিলে নিয়েছে তার হরিণকে। হরিণ তার গন্ধটুকু রেখে গিয়েছে শুধু। দিঘি তাকিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। যেভাবে পৃথিবী রোজ যাবতীয় অন্ধকার বুকে নিয়ে তাকিয়ে থাকে সূর্যের দিকে, তার আলোর গন্ধের দিকে।
সপ্তমীর সকাল! সপ্তমীর এক সকালে, প্রথম সেই গন্ধ কাছের থেকে পেয়েছিল দিঘি। সম্পূর্ণ একলা একটা ছাদের ঘরে হরিণকে কাছে টেনে নিয়েছিল ও। আর তার প্রেমের গন্ধ গোটা একটা দেবীপক্ষ বদলে দিয়েছিল ওর।
আজও সেই সপ্তমীর সকাল। খোলা হাওয়ায় আজও কোথায় যেন সূর্য ছড়িয়ে রাখছে তার আলোর গন্ধ। শুধু হরিণ আর নেই।
কারও কাছে ওষুধ নেই। শমী পেটে হাত দিয়ে বসে রয়েছে সামনের সিটে। দিঘির পাশে রূপ কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনছে। পিছনে গুন্ডা, সুবর্ণ আর জয় নিচু গলায় কথা বলছে। আর্যর অমনভাবে চলে যাওয়াটা কারওই খুব একটা ভাল লাগেনি। সেটা নিয়েই হয়তো কথা বলছে!
দিঘির চিন্তা হল, শমীদার শরীরটা কি খুবই খারাপ লাগছে? আসলে মানুষটা এমনিতেই মুখচোরা। আর শরীর খারাপ হলে তো আরওই চুপ করে যায়। সেদিনও তো এমনই চুপ করে ছিল শমী। ট্যাক্সি থেকে নেমে দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে দিঘি দেখেছিল। বসার ঘরে ডাক্তারকাকু বসে ছিল। বাবা আর মা দু’দিকে দাঁড়িয়ে ছিল গম্ভীর মুখে। মহুল একটা সিঙ্গল সোফায় বসে ছিল পা মুড়ে জড়সড় হয়ে। তারপর শমীর দিকে চোখ পড়েছিল দিঘির। সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজের পট্টি। মুখে হালকা লজ্জা লজ্জা হাসি। দিঘিকে দেখে সামান্য তুতলে ক্লান্ত গলায় বলেছিল, ‘আরে তুমি! তোমার শুনলাম নেমন্তন্ন আছে? ছেড়ে এলে কেন?’
দিঘি কিছু বলার আগেই ডাক্তারকাকু বলেছিল, ‘এ কী, তোমায় কথা বলতে বারণ করেছি না? শোনো, মাথা ফাটেনি। কিন্তু কেটেছে আর আশপাশে রক্তও জমেছে। ফলে মাথায় যেন চাপ না পড়ে। ওষুধ দিয়েছি, ঘুমোনোর চেষ্টা করো।’
তখনকার মতো চুপ থাকলেও ডাক্তারকাকু চলে যেতেই শমী আবার কথা শুরু করেছিল। মাকে বলেছিল, ‘আপনি কেন দিঘিকে ডেকে আনলেন? কী এমন হয়েছে আমার?’
মা শমীর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তুমি আবার কথা বলছ?’ তারপর মহুলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোর নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে খুব। মেরে ফেলতে পারলি না ছেলেটাকে!’
মহুল কিচ্ছু না বলে মাথা নিচু করে বসে ছিল।
মা তবু থামেনি, বলেছিল, ‘তোর ব্যাবসা বড় না মানুষ বড়? ওদের ব্যবসায় তোর জিনিসপত্র হয়তো সেভাবে কাজ করবে না, তাই শমীর বাবা-দাদারা আপত্তি করছেন। সেখানে তুই…একদম ছেলেটার মাথায় ওই ফ্লাওয়ার ভাস দিয়ে মারবি? ভাগ্যিস মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিল, তাই এ যাত্রায় বেঁচে গেছে। না হলে কী হত বল তো! শমী তো তোর নামে অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের চার্জও আনতে পারে। ও কোথায় তোকে নিজের কাছে নিতে চায়, আর তুই? ব্যাবসা করে কী করবি? এত এত টাকা দিয়ে কী করবি? ক্রিকেট টিম কিনবি? তুই আমার মেয়ে? তুই এমন হবি ভাবতেও পারিনি। এখন শমীর বাড়ির লোক কী ভাববে? তোর মতো রাক্ষসী আমি কোনওদিন দেখিনি।’
ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছিল দিঘির কাছে। ও মহুলের পাশে বসে বলেছিল, ‘দিদি, তুই ব্যাবসার কারণে এমন করেছিস? হ্যাভ ইউ গন ম্যাড? পাগল নাকি তুই!’
মহুল খুব নিচু গলায়, প্রায় অস্ফুটে বলেছিল, ‘আসলে, ও মিথ্যে বলেছিল। ও জানত যে, ওর বাবা বা দাদা আমার বিজনেসকে নিজেদের সঙ্গে ইনকর্পোরেট করবে না। তাও মিথ্যে বলে…’
‘সেটা তো তোকে পাওয়ার জন্য। তোর সঙ্গে থাকার জন্য। আর তুই সেই রাগে মাথায় মারলি শমীদাকে?’ দিঘি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল মহুলের দিকে। মানুষ এমন করতে পারে? কতটা কেরিয়ারিস্ট হলে এমন পারে? তা হলে কি টাকা আর উন্নতি ছাড়া মহুলের কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়?
দিঘি দেখছিল শমীকে। চোখ বন্ধ করে মাথাটা সোফার ব্যাক রেস্টে হেলিয়ে বসে রয়েছে। যেন ঘুমিয়েই পড়েছে একদম। এমন শান্ত ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়েছিল শমী যে, দিঘির মনে হয়েছিল মানুষটা কি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল?
মা আরও বকেছিল মহুলকে। বাবা তো রাগে কথাই বলছিল না কোনও। সে রাতে কেউ আর খায়নি। মহুলকেও খেতে বলেনি কেউ। শুধু বাবা শমীদের বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিল যে, শমী আর বাড়ি ফিরছে না।
রাতে নিজের খাটে মহুলের দিকে পিছন ফিরে শুয়েছিল দিঘি। ঘুম আসছিল না। নানা কথা মাথায় আসছিল। ভাবছিল গুন্ডা শুধু খবর নিয়েছিল ফোন করে। কই, আর্য তো কোনও ফোন করল না! অমনভাবে চলে এল দিঘি, তবু আর্য তো…গুন্ডা বলছিল বটে যে, আর্য মদ খেয়ে আউট হয়ে গেছে। তবু, দিঘির এমন বিপদ, তবু আর্য অমন মদ খেয়ে আউট হয়ে গেল! ওর একবারও মনে হল না যে, দিঘির খবর নেয়! একবারও মনে হল না যে, দিঘিদের বাড়ির পরিস্থিতিটা কেমন? তার বদলে ও ড্রিঙ্ক করে আউট! এ কেমন মানুষ? এ কেমন সম্পর্ক?
একসময় চোখ বুজে এসেছিল দিঘির, ঠিক তখনই আলতো হাতে মহুল ডেকেছিল ওকে, ‘দিঘি, শোন, ঘুমিয়েছিস?’
‘চেষ্টা করছি। কেন?’ রুক্ষ গলায় বলেছিল দিঘি।
‘জানিস, আমি না মারতে চায়নি। জানি তো ও ভিতু, দুর্বল, জানি তো আমায় ভয় পায় খুব। তবু…’
‘কী তবু?’ দিঘি এবার পাশ ফিরে মহুলের মুখোমুখি হয়েছিল।
‘বলে কিনা ভালবাসে! তাই আমায় পাওয়ার জন্য ও অমন মিথ্যে বলেছে? তুই বল, মিথ্যে বলবে কেন ও? কীসের জন্য বলবে? এত মিথ্যে কেন বলবে ও? আমায় আশা দিয়ে শেষে ভালবাসা? অজুহাত! জানি, ওভাবে মারা খুব অন্যায়। আমার উচিত হয়নি। কিন্তু এমন মাথা গরম হয়ে গেল! আজ দরকারি একটা প্রেজেন্টেশন ছেড়ে এসেছিলাম। আর এসে বলে কিনা ভালবাসার জন্য ও আমার ব্যাবসার কথা তুলে মিথ্যে বলেছে! ওর বাবা-দাদারা কেউ জানেই না। ও ওদের কিছু বলতেই পারেনি! শুধু বলল, ভালবাসে, আমায় নিজের কাছে ফেরাতে চায় বলে এমন করেছে! তুই বল, ভালবাসার নাম দিয়ে কি যা খুশি তাই করা যায়? যা খুশি তা বলা যায়? কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? ভালবাসা? না সত্যি কথা? কোনটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত মানুষের?’
কোনটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত? ভালবাসা না সত্য? দিঘি বাইরের দিকে তাকাল। সত্য নাকি কিছুটা স্থির আর কিছুটা পরিবর্তনশীল। ভালবাসা? সেটাও কি তাই? সেটাও কি পালটায়? আদৌও কি তার রূপ সত্যের মতো?
‘সামনে থেকে বাঁ দিকে,’ গুন্ডা ড্রাইভারকে বলে আবার পিছনের সিটে শরীরটা ছেড়ে দিল। তারপর বলল, ‘ওঃ, এলাম। তবে সোজা যাব রাহিদির বাড়িতে। হোমিদি ওখানেই আছে। ওদের বাড়িতে তো বিরাট পুজো হয়।’
দিঘি সচকিত হয়ে বাইরের থেকে মুখ ঘুরিয়ে গাড়ির ভেতরটা দেখল। অর্থাৎ, প্রায় পৌঁছে গেছে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে বুঝতেই পারেনি কখন সময়টা কেটে গেছে!
‘সে কী রে? তোর দিদির বাড়ি নিয়ে যাবি না?’ রূপ পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।
‘ওই এসে গেছে,’ গুন্ডা বলল, ‘আমি হোমিদিকে এসএমএস মেরে দিয়েছি। ওই দেখ, সামনের বড় গেটটা। ওই যে হোমিদি আর রাহিদি।’
গাড়িটা গেটের কাছে থামল। রাহি আর হোমি হাসিমুখে এগিয়ে এল একসঙ্গে। দিঘিরা দরজা খুলে নামল। দূর থেকে ঢাকের শব্দ আসছে। এখানের হাওয়াটা অনেক পরিষ্কার লাগল দিঘির। শ্বাস নেওয়া যেন খুব সহজ। ও দেখল যে, চারদিকটায় পুজোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফুল দিয়ে সাজানো।
‘নেমে এসো,’ গুন্ডা ডাকল শমীকে।
শমী হাসল আবছাভাবে। দরজা খুলে পা বাড়াল। তারপরই হঠাৎ অদ্ভুত একটা ভোঁতা শব্দ করল মুখ দিয়ে আর ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে।
‘শমীদা?’ দিঘি চিৎকার করে উঠল আতঙ্কে।
জয়, সুবর্ণ আর গুন্ডা থতমত খেয়ে গেল একদম। রূপ মাটিতে বসে পড়ে গায়ে হাত দিয়ে নাড়াল, ‘শমীদা।’
দিঘি স্থির হয়ে দেখল শমী মুখটা নীচের দিক করে পড়ে আছে মাটিতে। কী করবে ও? কী করা উচিত?
ও দেখল হোমি দৌড়ে গেল বাড়ির দিকে। আর রাহি ফোনটা খুলে একটা নম্বর ডায়াল করল, উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘হ্যালো। এক্ষুনি মেন গেটে এসো। খুব বিপদ। একজন পড়ে গেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ সেন্সলেস। এক্ষুনি ডাক্তারকে ফোন করো। আর তুমি এসো, প্লিজ, এক্ষুনি এসো কিগানদা।’
কে? কে আসবে? দিঘির গায়ে যেন বিদ্যুৎ স্পর্শ হল। ও দেখল বহুদিন স্তব্ধ হয়ে থাকা একটা জঙ্গল নড়ছে আবার। তার শুকনো পাতার ওপর মড়মড় শব্দে আসছে কেউ। আসছে? অন্য কেউ? কিন্তু এই নাম আর কারও হতে পারে? আর কেউ থাকতে পারে এই নামে? পাতায় পায়ের শব্দ বাড়ছে। হরিণী তাকিয়ে রয়েছে গহন জঙ্গলের দিকে। আসবে? সেই হরিণ কি আসবে?
মেন গেটের থেকে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল দিঘি। চোখ বন্ধ করল। ভাবল, দেখার তো দরকার নেই। গন্ধই তো ঠিক জানিয়ে দেবে তার উপস্থিতি! কারণ, ঘ্রাণ তো শব্দের আগে পৌঁছোয়। যেমন স্পর্শের অনেক আগে পৌঁছে যায় প্রেম!
Chapter - 23
২৩
‘তোদের প্রজেক্টটার এমন দশা কেন রে? আল্টিমেটলি হবে তো কাজটা? বারবার এত ডেফার করছে কেন?’ জঙ্গলের দিকটায় তাকিয়ে অন্যমনস্ক গলায় জিজ্ঞেস করল জিয়ানা। যেন জিজ্ঞেস করতে হয় বলে করা।
কিগান বলল, ‘আসলে জমিটা নিয়ে এত সমস্যা হচ্ছে। মানে রাঘব চক্রবর্তী বলে যে-মানুষটি আছেন, তিনি এই নিয়ে কথাই বলছেন না। মানে কথা বলার জন্য টেবিলে বসতেই চাইছেন না। অদ্ভুত জেদি মানুষ!’
‘কথা বলতে আপত্তি কোথায়? শুনেছি ভদ্রলোক খুব ইনফ্লুয়েন্সিয়াল, তাই?’
‘হ্যাঁ, খুবই। মানে এই অঞ্চলে তো বটেই, বিরাট ব্যাবসা। ছেলেও পার্টির উঠতি নেতা। ভদ্রলোক যেখানে হাত দেন লোকজন আপনা থেকে বশ হয়ে যায়।’
‘মানে?’ জিয়ানা এখনও অন্যমনস্ক।
‘এই দেখ না,’ কিগান বলল, ‘ওর মেয়ে, রাহি, এখানে “হেল্প আর্থ” বলে একটা সংস্থায় যোগ দিয়েছে। সংস্থাটা ছোট ছিল। কিন্তু মেয়ে যেই যোগ দিল, ব্যস টাকাপয়সার অভাব নেই সংস্থায়। এমনকী আমার একটি পরিচিত ছেলে, আবেশ, মাইনে নিয়ে কাজও করছে ওখানে। কী করে হচ্ছে এসব? ভদ্রলোক পিছন থেকে, মানে আড়াল থেকে ব্যাক করছেন। আবেশ তো বলে অ্যাডভারটাইজ বা হেল্প কোনও কিছুর জন্য গেলে ‘রাঘব চক্রবর্তী’ নামটা অদ্ভুতভাবে কাজ করে।’
‘তো, ওঁর ইচ্ছে না হলে তো তোরা হাতে পাবিই না জমি,’ জিয়ানা নির্লিপ্ত গলায় বলল।
হাসল কিগান, ‘ব্যস, তা হলে তোদের কোম্পানিরও কাজ পাবার আশা গেল।’
‘কাজ পাওয়া!’ জিয়ানা আবছাভাবে হাসল, ‘চারটে ফার্মকে তোদের কনসালট্যান্ট অ্যাপ্রুভ করেছে। তার মধ্যে ওয়াটারবার্ড আমাদের প্রাইম কম্পিটিটর। ওরা যেন তেন প্রকারে কাজটা পেতে চায়। কনসালট্যান্টরাও ওদের প্রেফার করছে। মোটা টাকা দিয়েছে কনসালট্যান্টদের। একজনকে তো শুনেছি সিঙ্গাপুরে ফ্ল্যাট দেবে।’
‘তা দিতেই পারে,’ কিগান বলল, ‘এখানে এত বড় প্রজেক্ট। তারপর এমন একটা সেম প্ল্যান্ট অসমেও হবে। কত টাকার কাজ! কামড়াকামড়ি তো হবেই।’
‘আমার কেরিয়ার গোটাই ডিপেন্ড করে আছে এর ওপর।’
‘কেন? তোর কেন?’ কিগান অবাক হল।
জিয়ানা আলগোছে হাসল, ‘গোটা প্রজেক্টটা দেখছি আমি আর ললিত। খুরানাজি মাথার ওপর আছেন, তবু আউটকামটা তো আমাকেই নিতে হবে প্রথমে। টেকনিক্যাল টিম তো কাজ শুরু হওয়ার পর আসবে।’
‘কনসালট্যান্টরা তো জাস্ট প্রপোজ করতে পারে। গৌর স্যার তার কাছ থেকেই কাজ নেবেন যার দাম কম থাকবে। আর এটা এক্সক্লুসিভলি দেখছে স্যাম আর গৌর স্যার নিজে। দামটা রিজনেবল রাখিস, কাজ পেয়ে যাবি,’ কিগান হাসল।
‘স্যামুয়েল কুটিনহো তো তোর কাছের লোক,’ জিয়ানাও হাসল, ‘তুই দেখ না যাতে কাজটা আমরা পাই।’
‘তাই?’ কিগান ছোট্ট করে হাই তুলল, ‘আগে জমিটা পাক কোম্পানি, নইলে সব বিশ বাঁও জলের তলায়।’
‘তুই হাই তুলছিস কেন?’ জিয়ানা ভুরু কোঁচকাল, ‘রাতে ঘুমোস না?’
‘প্রোডাকশনের খুব চাপ। গত এক সপ্তাহ রাতেও কাজ হচ্ছে। এক্সপোর্ট অর্ডার আছে। বাড়ি ফিরতেও পারি না রোজ।’
‘কেন এত খাটিস কিগান?’ জিয়ানার গলা নরম হয়ে এল হঠাৎ, ‘কার জন্য এত কষ্ট করিস? একা তো মানুষ!’
‘শোন কারও জন্য কিছু করি না। একটা ফ্যাক্টরিতে আছি, তার তো একটা কমিটমেন্ট আছে। তাই কাজটা করি।’
‘কিন্তু তোর শরীরটা দেখবি না? কলেজের সময় যা চেহারা ছিল, তেমনই আছে। সেই বাইশ-তেইশ বছর থেকে এখন। বয়স হলে মানুষ তো একটু আকারে বাড়ে। তুই তো তেমনই আছিস। দেখলে মনে হয় আমার চেয়ে ছোট। অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে এই হয়।’
‘তাই?’ কিগান চুলে হাত ডোবাল, ‘মানুষ তো রোগাই থাকতে চায় আজকাল। তুই তো দেখছি উলটো কথা বলছিস!’
‘না, তোর আর-একটু মোটা হওয়া দরকার। এবার একটা বিয়ে কর। বউ এলে যদি তার কথা শুনিস। আমার কথা কেন শুনবি!’
‘বিয়ে?’ হাসল কিগান, ‘দেখ, একা থাকার একটা আনন্দ আছে। আর একা থাকতে থাকতে এখন এটাই আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।’
জিয়ানা থমকাল একটু। সামনের জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা সবাই তো একাই। আমিও একা। কিন্তু আমার অভ্যেস হল না কেন বল তো!’
‘দুর,’ হাসল কিগান, ‘বাদ দে। তা তুতুল কেমন আছে?’
‘এমন করে বলছিস যেন কত দেখেছিস তুই আমার মেয়েকে! কতবার বললাম আমাদের বাড়িতে আয়। এসেছিস? ফোন করলেই তো কেমন পালাই পালাই, রেখে দিই রেখে দিই ভাব তোর। যেন আমি বাঘ বা ভালুক। কেন বল তো তুই এমন! পালটাবি না কখনও?’
‘ওল্ড হাবিটস ডাই হার্ড! কাকিমা, মানে তোর মা কেমন আছেন? জানেন, তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস!’ কিগান ভুরু নাচিয়ে হাসল।
‘মা?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল জিয়ানা, ‘মা একইরকম আছে। এখনও ভাবে তুই আমায় ভালবাসিস।’
‘তাই?’ কিগান উঠল। বেঞ্চটা বেশ নড়বড়ে।
‘আমি মাকে বলেছি যে, অমন কিছু নয়। বলেছি, আসলে কিগান কোনও দিনই ঠিক ভালবাসেনি আমায়। জাস্ট একটা…জাস্ট…’ জিয়ানা হঠাৎ চুপ করে হাতে ধরা চায়ের গ্লাসটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘তোর আমার ওপর খুব রাগ, না রে?’
‘তাই?’ কিগান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে একটা দশ টাকার নোট দিল দোকানদারকে।
‘হ্যাঁ, তোর মনে হয় না যে, আমি তোকে ঠকিয়ে চলে গেছি!’
কিগান হাসল, ‘জিয়ানা ওসব বাদ দে। পুরনো কাসুন্দি।’
‘না, বল না,’ জিয়ানা ডান হাতটা দিয়ে আলতো করে কিগানের হাত ধরল, ‘তোর মনে হয় না যে, তোর সঙ্গে ঘুরলাম আর যেই প্রতিষ্ঠিত একজনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করল বাবা-মা আর সঙ্গে সঙ্গে আমিও তোকে ছেড়ে তাকে বিয়ে করে নিলাম। তোর মনে হয়নি যে, আমি খুব খারাপ, খুব স্বার্থপর? তোকে ভালবাসিনি একদম!’
‘এসব কেন বলছিস? বাদ দে না। এসব মন থেকে বাদ দে। যা হওয়ার হয়েছে।’
‘না, তুই বল না। তোর মনে হয়েছিল যে আমি লোভী? তোর সঙ্গে চিট করেছি? ঠিক কি না বল? তুই আমায় ঘেন্না করিস, না? আমি ফোন করলেই বুঝতে পারি তুই কেমন যেন পালাই পালাই করিস। কেমন যেন অনিচ্ছার সঙ্গে কথা বলিস। এই যে আমি মাঝে মাঝে তোর সঙ্গে কথা বলি, তোর খোঁজখবর নিই, তোর মনে হয় না বল যে, আমি ন্যাকামো করছি? তোর মনে হয় না যে, এত বছর পর কোত্থেকে উড়ে এসে আবার জুড়ে বসেছি!’
‘কেন বলছিস এমন!’ কিগান হাসল। জিয়ানার চোখমুখ কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছে। যেন ভূতে পেয়েছে ওকে।
‘না, তুই সত্যি করে বল। তোর কি মনে হয়েছে যে, আমি ইচ্ছে করে এসব করেছি, না? মানে তোর সঙ্গে বেশ আনন্দ করলাম তারপর সুবিধেমতো তোকে ছেড়ে দিলাম। আমি খুব স্বার্থপর, না রে?’
‘কী হয়েছে তোর?’ কিগান আবার বলল, ‘এমন করে বলছিস কেন?’
জিয়ানা কিগানের চোখে চোখ রাখল। তারপর আবছা গলায় বলল, ‘জানিস, তোর চোখ দুটো পালটে গেছে। না না, রঙের কথা বলছি না। তোর চোখের ভাবের কথা বলছি। কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে তোর চোখ দুটো। তুই এখন অন্য কাউকে ভালবাসিস, না রে?’
‘জঙ্গলটা যেদিন এগিয়ে আসবে, সেদিন তোমার মৃত্যু হবে।’ তলতাবনির জঙ্গলটা এখানে এসে যখন প্রথম দেখেছিল কিগান, ওর এটাই মনে হয়েছিল। ফ্যাক্টরির সামনে বড় রাস্তা। তার ধারে এবড়োখেবড়ো কিছু সস্তার চা, কচুরি, শিঙাড়ার দোকান। তার পিছনে ফাঁকা জায়গা আর সেখান থেকেই একপা-দু’পা করে তলতাবনির জঙ্গল শুরু।
প্রথমবার ফ্যাক্টরির গেটে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে কেন যে অমন মনে হয়েছিল কিগানের! আসলে জঙ্গল মানে কি শুধুই ঘন গাছ, শুকনো পাতা আর নানা প্রাণী? কিগানের মনে হয় জঙ্গল মানে আসলে অজানা একটা জীবন। মানে অজানা একটা মন। জঙ্গল মানে সেই মনের ভেতরে লুকোনো নানা ইচ্ছে আর কামনার প্রাণীজগৎ।
বিকেলের রোদে একটা কমলা রঙের জঙ্গল পড়ে রয়েছে সামনে। হেমন্তের বেলা শেষ হয়ে আসছে। সূর্যের মরচে ধরা আলোয় সামনের শুকনো গাছপালার স্তূপ থেকে একটা অদ্ভুত লালচে, প্রায় ব্রোঞ্জের রং ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কার জঙ্গল এটা? কার সমস্ত পাতা খসে যাচ্ছে ক্রমশ? কে বড় বেশি সোজাসুজি আর খোলামেলা হয়ে যাচ্ছে?
কারণ ছাড়া, একদম কারণ ছাড়াই সপ্তমীর সকালটা আবার মনে পড়ে গেল কিগানের। বছরখানেক পরেও কি জুঁই ফুলের গন্ধ একই রকম থাকে? গন্ধ কী করে থেকে যায় স্মৃতিতে?
উলটো করে মাটিতে পড়ে ছিল শমী। চোখ বন্ধ। নিথর। হাত লাগাতে ভয় পাচ্ছিল সবাই। দূর থেকে বুঝতে না পারলেও দৌড়ে মেন গেটে আসার পর থমকে গিয়েছিল কিগান। এটা কে? কে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে? ওই যে দোহারা চেহারা, বড় বড় চোখ, নিখুঁত থুতনি? কে ওটা? কিগানের পা কেঁপে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল আবার সপ্তমীর সকাল!
সে এক সপ্তমীর সকাল ছিল। ঠাকুরমা মারা গিয়েছে তখন সদ্য। অন্যান্য বার পুজোয় বাইরে চলে গেলেও সেবার আর যায়নি কিগান। ঠাকুরমা ছাড়া ওদের তলাটা কেমন যেন ফাঁকা আর অসমাপ্ত লাগত কিগানের।
ওদের সুকিয়া স্ট্রিটে বড় পুজো হয়। বাদুড়বাগানের দিকে আড্ডা দিতে যেত কিগান আর রুহান একসময়। কিন্তু বড় হওয়ার পর থেকেই সবই কেমন যেন ছানাকাটা ভিড় হয়ে গিয়েছিল। পুজোর দিনগুলো একা থাকতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত কিগান। কিন্তু সেবার আর যাওয়া হয়নি।
দিনটা এখনও মনে আছে কিগানের। নিজের ঘরে গিটার নিয়ে বসেছিল ও। দূরে আবছাভাবে রাস্তার ট্র্যাফিকের শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে ভেসে আসছিল ঢাকের বাদ্যি। গিটারে আরপিজিও করছিল কিগান। না, কোনও গান নয়। এমনই মনের খুশিতে বাজাচ্ছিল। হঠাৎ পিছনে আলতো পায়ের শব্দের সঙ্গে জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে এসেছিল।
‘তুমি?’ কিগান ঘুরে বসে থামকে গিয়েছিল একদম! এ কে? এমন ফলসা রঙের শাড়ি, ছাড়া চুল, মুক্তোর মালা গলায় তুমি কে এসে দাঁড়ালে আমার সামনে!
‘কেন আসতে নেই?’ দিঘি অভিমানী গলায় বলেছিল।
‘না, না। তবে…এভাবে…মানে… তোমার মা কই?’
‘মা আসেনি। পাঠিয়ে দিয়েছে,’ দিঘি থালায় ঢাকা খাবার দেখিয়ে বলেছিল।
‘ও,’ কিগান বলেছিল, ‘আমায় দাও। আমি রেখে দিচ্ছি।’
‘আমি রাখছি,’ দিঘি কিগানের উত্তরের অপেক্ষা না করে খাবার ঘরে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর খাবার রেখে এসে আবার দাঁড়িয়েছিল সামনে।
‘কিছু বলবে?’ কিগান জিজ্ঞেস করেছিল।
‘আমার ছবি তুলে দেবে একটা?’
‘ছবি?’ কিগান বুঝতে পারছিল যে কষ্ট হচ্ছে ওর। দিঘির শরীর থেকে ভেসে আসা জুঁই ফুলের গন্ধ ক্রমশ অবশ করে ফেলছিল কিগানকে।
‘হ্যাঁ, কেন দেবে না? আমি কি রোজ রোজ শাড়ি পরি নাকি? তুমি এমন করে বলছ কেন?’
কিগান অপ্রস্তুত হয়েছিল একটু। বলেছিল, ‘না না, কেমন করে আর বলছি? ঠিক আছে।’
‘কিন্তু, কোথায় তুলবে? এখানে?’ দিঘি ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলেছিল, ‘ঘরটা যে পুরো বাজারের মতো অগোছালো হয়ে আছে। এখানে তুলবে নাকি?’
‘এখানে?’ কিগান চারদিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হয়েছিল খুব। আসলে একা মানুষ কিগান। আর কোনওদিন ঠিক গোছানোও নয় ও। তাই ঘরবাড়ির অবস্থাটা এমনই হয়ে থাকে। ও বলেছিল, ‘ছাদে যাব।’
শরতের রোদ পুরনো ঘিঞ্জি উত্তর কলকাতাকেও সেদিন নতুন রং করা দেওয়ালের মতো চকচকে করে তুলেছিল। ওদের ছাদটা বিশাল বড়। তার একপাশে সিঁড়ির সঙ্গে চিলেকোঠার ঘর। ছাদে উঠে দিঘি চঞ্চল হয়ে উঠেছিল খুব। বলেছিল, ‘কী দারুণ না তোমাদের ছাদটা! কী বড়! আমাদেরটা ভাল নয়। তার ওপর সবসময় ওঠাও যায় না। আমার কতদিনের ইচ্ছে এমন একটা ছাদওয়ালা বাড়ি থাকবে আমার!’
কিগান কিছু না বলে ক্যামেরা নিয়ে খুটখাট করে কীসব অ্যাডজাস্ট করছিল। দিঘি জানত ক্যামেরাটা দামি খুব, ভাল ছবি ওঠে। কিগান ওর ছবি তুলেছিল বেশ কয়েকটা। শাড়ি পরা দিঘি যেন বড় হয়ে গিয়েছিল এক দিনে। ছবি তুলতে তুলতে কিগান হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিল দিঘির অনবরত কথায়। তারপর একসময় দিঘি রাগ করে বলেছিল, ‘কী তখন থেকে হ্যাঁ হ্যাঁ করছ। আমায় পেঁচার মতো দেখতে?’
‘পেঁচা?’ ঘাবড়ে গিয়েছিল কিগান। দিঘি কি পেঁচা নিয়ে কিছু বলছিল নাকি?
‘আমি বললাম যে, তর্পণ বলে একটা ছেলে আমায় প্রোপোজ করল আর “না” বলতেই বলল আমায় নাকি পেঁচার মতো দেখতে! আর তাতে তুমি “হ্যাঁ” বললে?’
‘তাই?’ কিগান অবস্থা সামলাতে বলেছিল, ‘তা কেন না করলে! খারাপ ছেলে?’
‘খারাপ? পাগল! দারুণ দেখতে। আইআইটি ক্র্যাক করেছে। পরে আইএএস-এ বসবে।’
‘তা হলে?’ কিগান হেসেছিল। তবে কোথায় যেন বুকের ভেতরে রথের চাকা বসে গিয়েছিল সামান্য। ঝুমকোলতার ঝোপে একা বসে থাকা টুনটুনিটা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। একটা ছোট্ট ছেলের হঠাৎ যেন রুবি গুলি হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট মনে পড়ে গিয়েছিল। কেন এমন হচ্ছে? দিঘিকে কোনও ছেলে পছন্দ করেছে। আর তাকে না বললেও, দিঘি ভাল ছেলের দলে তাকে রাখছে বলে অমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল কেন কিগান? নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল কিগানের। বিরক্ত লাগছিল! এ কেমন ছেলেমানুষি রে বাবা! কেন এমন মনে হচ্ছে ওর? কে হয় ওর দিঘি?
‘আমি তোমার সঙ্গে একটা ছবি তুলব,’ দিঘির কথায় হঠাৎ সংবিৎ ফিরেছিল কিগানের।
ও আশ্চর্য হয়ে বলেছিল, ‘আমার সঙ্গে!’
‘হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে! কেন, তুলতে দেবে না!’
‘কিন্তু কে তুলে দেবে?’ কিগান ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিল।
‘আমায় বোকা পেয়েছ, না? চিলেকোঠায় তোমার ট্রাইপড রাখা আছে। ওতে ক্যামেরা বসিয়ে অটোমোডে তোলো। কাটিয়ে বেরিয়ে যাবে, তা হতে দেব না।’
একটা ভাল ট্রাইপড কিগানের নিজের শোবার ঘরে ছিল। কিন্তু চিলেকোঠার ঘরে একটা পুরনো ট্রাইপড রাখা ছিল। সেটার লেভেল গেজটা ঠিক কাজ করে না। কিন্তু নীচে যেতে ইচ্ছে করছিল না কিগানের। আর সত্যি বলতে কী, দিঘির সঙ্গে ছবি তুলতে ইচ্ছে করলেও কোথায় যেন বাধোবাধো ঠেকছিল। নিজেকে খুব বাজে মনে হচ্ছিল কিগানের। পনেরো বছরের ছোট একটা মেয়েকে কেন ভাল লাগবে ওর? মানুষে শুনলে কী বলবে? একই সঙ্গে আকর্ষণ আর বিকর্ষণ হলে কেমন লাগে স্পষ্ট বুঝেছিল কিগান!
ও বলেছিল, ‘সে তো হল, কিন্তু আমার যে একদম ভাল লাগছে না ছবি তুলতে। আসলে আমার ছবি এত খারাপ ওঠে!’
‘ন্যাকামো দেখলে গা জ্বলে যায়!’ দিঘি চুলের ঝাপটা দিয়ে বিরাট বড় চোখ দুটোতে রাগ ফুটিয়ে তুলেছিল অনায়াসে। বলেছিল, ‘দাঁড়াও, আমি আনছি। তোমায় আনতে হবে না।’
চিলেকোঠার ঘরের দিকে দুদ্দাড় করে হেঁটে গিয়েছিল দিঘি। আরে পাগল নাকি মেয়েটা? ঘরটা খুব একটা পরিষ্কার থাকত না তখন। ঝুল, ধুলো-ময়লা অত ভাল শাড়িটায় লেগে যাবে যে! কিগান পিছনে পিছনে ছুটেছিল দিঘির।
চিলেকোঠার ঘরটা ছোট। সামান্য নিচু ছাদ। আর মাত্র একটা জানালা থাকায় একটু যেন আলোও তার কম। ট্রাইপডটা একটা উঁচু তাকের ওপর কেসের মধ্যে ভরে আড়াআড়িভাবে শুইয়ে রাখা ছিল। দিঘি হাত পাচ্ছিল না। কিগান বলেছিল, ‘সরো, আমি দেখছি। পাগলামি কোরো না।’
দিঘি রাগ করে একপাশে সরে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘একমাত্র আমিই বুঝি পাগল? আর তুমি কী? ঘরকুনো!’
এক বাগান জুঁই ফুল। দিঘির শরীর থেকে ফুলের ঝাপটা এসে লাগছিল কিগানের গায়ে। কিগান হাত বাড়িয়ে শরীর প্রসারিত করেছিল ওই তাকটার দিকে। আর ঠিক তখনই হঠাৎ, একদম হঠাৎ বাগানটা এসে ঘিরে ফেলেছিল কিগানের শরীর। নরম একটা শরীর আর দুটো মসৃণ হাত এসে পিছন থেকে জাপটে ধরেছিল কিগানকে। বিদ্যুৎস্পর্শ! ছিটকে উঠেছিল কিগান! এ কী হচ্ছে, ও চকিতে পিছনে ফিরেছিল। দেখেছিল দুটো বড় বড় চোখ!
‘কী করছ তুমি?’ কিগান চাপা গলায় বলেছিল।
‘তুমি আমার হরিণ। তোমার শরীর থেকে এমন মাস্কের গন্ধ পাই কেন আমি?’
‘দিঘি, কী হচ্ছে এসব?’ কিগান হাত দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিল।
‘কেউ আসবে না এখানে। আমি ছাড়া আর কেউ আসে তোমার কাছে? তুমি বোঝো না? কেন বোঝো না তুমি? আর কবে বুঝবে? আর কত নির্লজ্জ হব আমি? তুমি বোঝো না, মাই হার্ট বিট্স ফর ইউ?’
কিগানের প্রতিরোধ ভাঙছিল। জুঁই ফুলের গন্ধে, দিঘির স্পর্শে অবশ হয়ে আসছিল বোধ। তবু ও শেষ চেষ্টা করেছিল, ‘ছোট তুমি। আমার চেয়ে অনেক ছোট।’
‘প্রেমে বয়স বলে কিছু হয়? কে ছোট? কত ছোট? পনেরোটা কোনও সংখ্যা হল? তুমি জানো আমি কতদিন তোমায় বোঝাতে চেয়েছি?’ দিঘির নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল।
‘তুমি…তুমি এমন…’ কিগান কথা বলতে পারছিল না। নিজের হাত দুটো কথা শুনছিল না ওর। কখন, খানিকটা অজান্তেই ও কোমর জড়িয়ে ধরেছিল দিঘির।
দিঘি টেনে নিয়েছিল কিগানের মাথাটা। বলেছিল, ‘তুমি আমার। শুধুমাত্র আমার।’
এরপর রোদ-জলের পৃথিবী, ধুলো-ময়লার পৃথিবী মুছে গিয়েছিল ক্রমশ।
চোখের কোণ দিয়ে ঘরের জানালার কাছের আলোর রংটা হঠাৎ কেমন পালটে গিয়েছিল যেন! কে ওখানে? কিগান এক ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে এসেছিল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিল দিঘির থেকে। তারপর তাকিয়েছিল জানালার দিকে। কে ছিল ওখানে? কেউ কি ছিল? নাকি ভ্রম! কিগান শ্বাস নিয়েছিল বড় করে। দেখেছিল, দিঘি তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। বলছে, ‘কী হল? এমন সরে গেলে কেন? আর…এ বাবা, আমার লিপগ্লস লেগে রয়েছে তোমার ঠোঁটে।’
‘থাক,’ কিগান কথা বলতে পারছিল না, ‘আমি…আমি… মুছে নেব।’
‘আমি মুছে দেব,’ দিঘি এগিয়ে এসে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিল ঠোঁট। কিগান বাধা দিতে পারেনি। কেমন যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল ও।
দিঘি বলেছিল, ‘আজ থেকে তুমি আমার। শুধুমাত্র আমার। যদি কোনওদিন অন্য মেয়ের নাম শুনি, এমন শাস্তি দেব না! সারাজীবন মনে থাকবে।’
কিগান নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলেছিল, ‘এসব আর না বাড়লেই ভাল।’
দিঘি শুধু বলেছিল, ‘তুমি তোমার মাস্কের গন্ধ দিয়ে যেমন আমায় বেঁধে রেখেছ, তেমনই আমিও তোমায় বেঁধে রাখব আমার জ্যাসমিন দিয়ে, সারাজীবন।’
গন্ধবন্ধন! শমীকে পাঁজাকোলা করে তুলে বাড়ির ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে আবার বহু পুরনো সেই বন্ধন, তার টান টের পেয়েছিল কিগান। ওর পা কাঁপছিল, কষ্ট হচ্ছিল বুকে। মনে হচ্ছিল, এখানে না এলেই তো হত!
কিছুটা যেতেই এসে পড়েছিল সাধুদা। কিগানের হাত থেকে নিতে চেষ্টাও করেছিল শমীকে। কিগান দেয়নি। শমী ছোটখাটো মানুষ। হালকা, পাতলা। যেন প্লাস্টিকের তৈরি। আগে দেখা শমীর সঙ্গে এই রোগা হয়ে যাওয়া শমীর যেন আকাশপাতাল পার্থক্য।
কিগানের পাশে হোমি আর রাহি হাঁটছিল। অন্য পাশে মোটা মতো একটা ছেলে। বুঝতে পারছিল হোমির ভাই বা সেরকম কেউ হবে। আর না দেখতে পেলেও বুঝতে পারছিল পিছনের আর তিন-চারজনের মধ্যে দিঘিও আসছে। জ্যাসমিনের গন্ধ এক অদ্ভুত নির্দেশকের মতো নির্দেশ করছিল ওর উপস্থিতি।
রাঘব চক্রবর্তী আর তার সঙ্গে যে চার-পাঁচজন এগিয়ে এসেছিলেন মণ্ডপ ছেড়ে, তাঁদের মধ্যে দু’জন ডাক্তার। দুর্গাপুজোয় অনেকেই নিমন্ত্রিত থাকে রাহিদের বাড়িতে। ফলে ডাক্তার পেতে অসুবিধে হয়নি।
শমীকে নিয়ে সবাই যখন ব্যস্ত হয়েছিল, কিগান দাঁড়িয়ে ছিল একপাশে। কেন শমীর এমন হল বুঝতে পারেনি। আর আরওই বুঝতে পারেনি দিঘিরা এখানে কীভাবে এল! মানে, হোমির ভাইয়ের সূত্রে যে দিঘিরা আসতে পারে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি কিগান।
সুবর্ণ প্রথম কথা বলেছিল কিগানের সঙ্গে। বলেছিল, ‘আরে, কিগানদা! তুমি এখানে! মানে…পাড়ায় তো দেখি না…তাই…’
কিগান কিছু বলেনি। হেসেছিল শুধু। ভেবেছিল সুবর্ণর অ্যাক্টিংটা কাঁচা হচ্ছে। যা হয়েছে, তাতে এই ছেলেটাও তো ছিল। ও তো সবটাই জানে। তবু, কিছু বলেনি কিগান। সরে গিয়েছিল আর একটু দূরে। শুধু দেখেছিল ভিড়ের ভেতর থেকে ওর দিকে মাত্র একঝলক তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে দিঘি।
কিগান আর দাঁড়ায়নি। ও নিজেকেই সরিয়ে নিয়েছিল ওই জায়গা থেকে।
‘কী রে বল, তুই এখন অন্য কাউকে ভালবাসিস, না?’ জিয়ানা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘কী সব ছেলেমানুষি করছিস?’ কিগান হাসল, ‘তোর সায়েন্টিস্টবাবু কেমন আছেন? বুকুদা? আমি বুকুদা বলি?’
‘কথা ঘোরাচ্ছিস? সে আছে, ভালই আছে বোধহয়। তার কথা বাদ দে। আমার কথা শোন। আমি যে মাঝে মাঝে তোকে ফোন করি। মাঝে মাঝে যে তোর কথা জিজ্ঞেস করি। খাবার খাচ্ছিস কিনা ঠিকমতো জিজ্ঞেস করি, তোর রাগ হয়, না রে?’
‘কেন রাগ হবে! তুই তো আমার বন্ধু। বন্ধু তো বন্ধুর কথা জানতে চাইতেই পারে। এতে তো কোনও ভুল নেই,’ কিগান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘বন্ধু!’ হাসল জিয়ানা, ‘তোর মনে আছে, প্রথমবার আমায় যখন প্রোপোজ করেছিলি আমি তোকে না করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমরা বন্ধু। মনে আছে? তুই তখন রেগে গিয়েছিলি খুব। কথা বন্ধ করে দিয়েছিলি আমার সঙ্গে। জিজ্ঞেস করায় বলেছিলি তোর বন্ধুর দরকার নেই। তোর অনেক বন্ধু রয়েছে। মনে আছে তোর?’
কিগান হাসল। মনে আছে, সব মনে আছে ওর। কিন্তু কী করবে? সেই জিয়ানা যে আর নেই। সেই কিগানও যে হারিয়ে গিয়েছে কবে। আসলে মরে গিয়েছে সেই কিগান। পথের ধারে জিয়ানা একসময় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল কিগানকে। একবার তো ফিরেও তাকায়নি চলে যাওয়ার সময়। একা পড়ে থাকতে থাকতে তো মারাই গিয়েছিল কিগান। আর মৃত অবস্থাতেই তো থাকত যদি না দিঘি আসত! যদি না দিঘি স্পর্শ করত ওকে!
‘হাসছিস!’ জিয়ানা উঠল এবার। বলল, ‘জানি। আজ সব কিছুই বড় হাস্যকর লাগে তোর। মনে আছে কিগান, একবার কার্শিয়াং গিয়েছিলি তুই আমায় ধাওয়া করে!’
‘এসব কেন বলছিস জিয়ানা? কেন মাটি খুঁড়ে বের করছিস এসব?’ কিগান আস্তে আস্তে ফ্যাক্টরির দিকে হাঁটতে লাগল।
জিয়ানা ওর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘জানি না, আমার মনে হয়, জীবন কেমন যেন এক জাদু বাস্তব। এই দেখ, একসময় তুই আর আমি কেমন করে থাকতাম আর এখন কেমন করে থাকি। মনে হয় না তোর? সেই বিকেল আর এই বিকেল কেমন জাদুময় আর কেমন বাস্তব?’
‘নোলানের নাম শুনেছিস?’ কিগান জিজ্ঞেস করল।
‘নোলান!’ জিয়ানা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘নোলান, শোনা শোনা মনে হচ্ছে। ঠিক কে বল তো!’
‘ক্রিস্টোফার নোলান। ব্রিটিশ। হলিউডে ছবি তৈরি করেন। ওঁর “দ্য প্রেস্টিজ” ছবিটা দেখেছিস? ওখানে একটা দারুণ কথা জেনেছি। ম্যাজিক সম্বন্ধে,’ কিগান হাসল।
‘কী রে?’ জিয়ানার গলায় কৌতূহল লক্ষ করল কিগান।
কিগান বলল, ‘যে-কোনও ম্যাজিক তিনটে ভাগে বিভক্ত। এক, প্লেজ। মানে ধর, তোকে ম্যাজিশিয়ান একটা টুপি দেখাল। একদম কাছ থেকে দেখাল। দেখলি টুপিটা ফাঁকা। ম্যাজিশিয়ান সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাল করে তোকে দেখতে দিল। তুই দেখলি সত্যি একটা সাধারণ টুপি। ভেতরে কোনও চোরা পকেট বা খুপরি নেই। তুই সন্তুষ্ট হলি। এটাই হল প্লেজ। বুঝলি?’
‘হুম,’ জিয়ানা মাথা নাড়ল, ‘তারপর?’
‘তার পরের ধাপ হল টার্ন। এই ধাপে ম্যাজিশিয়ান একটা খরগোশ বা পাখি সবাইকে ভাল করে দেখিয়ে ঢুকিয়ে দিল সেই টুপির ভেতর। তারপর একটা সাধারণ রুমাল দিয়ে ঢেকে দিল সেই টুপিটা। তুই কী দেখলি? যে, টুপির ভেতর রয়েছে খরগোশ। তারপর জাদুকর হাত ঘুরিয়ে, ছড়ি ঘুরিয়ে নিজস্ব মন্ত্রবলে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল রুমালটা। আর দেখলি, আরে! খরগোশটা গেল কোথায়? টুপি তো ফাঁকা! তুই হতচকিত! সবাই হতচকিত! কিন্তু বল তো, এখানেই কি শেষ হয়ে যায় ম্যাজিকটা?’
‘ম্যাজিকটা?’ জিয়ানা সামান্য চিন্তিত মুখে বলল, ‘না। মানে… আসলে কোথায় গেল খরগোশটা? সেটা না জানলে তো ইনকমপ্লিট থেকে যায় ব্যাপারটা।’
‘ব্রাভো,’ কিগান হাসল, ‘ঠিক বলেছিস। এবার, একজন দর্শককে ডেকে আনল জাদুকর। ডেকে আনল স্টেজের ওপর। তারপর সকলকে অবাক করে দিয়ে তার কোটের ভেতর থেকে বের করে আনল সেই ভ্যানিশ হওয়া খরগোশ। অর্থাৎ, ফিরিয়ে আনল সেই খরগোশটাকে। এইটাই হল প্রেস্টিজ। ম্যাজিকের প্রেস্টিজ। বুঝলি? এই জন্য, এই প্রেস্টিজের জন্য জাদুকর খেলা দেখায়। এই প্রেস্টিজের জন্য মানুষ বেঁচে থাকে। এই প্রেস্টিজের জন্যই তাকে স্যাক্রিফাইস করতে হয় অনেক কিছু। তাকে দাম দিতে হয় অনেক। আমার জীবনে খরগোশটা উধাও হয়েছে। সে এখনও ফিরে আসেনি। আমি এখনও ফিরিয়ে আনতে পারিনি তাকে। আমার জীবনে প্রেস্টিজ পার্টটা আসেনি এখনও। আমি জানি তার জন্য অনেক দাম দিতে হবে আমায়। তাই জাদু-বাস্তবতা বলে কিছু আমার জীবনে নেই। আমার এখনও টার্ন চলছে। খরগোশ এখনও ফিরে আসেনি।’
‘তুই প্রেস্টিজের অপেক্ষা করছিস?’ জিজ্ঞেস করল জিয়ানা।
‘অপেক্ষা করে লাভ নেই। প্রতিটা মানুষকে তা নিজেকেই আনতে হয়। আমি এখনও তা আনতে পারিনি।’
হাঁটতে হাঁটতে কিগানরা এসে পৌঁছোল ফ্যাক্টরি গেটের কাছে।
‘আরে কিগানদা, তোমাদের কথা হয়েছে?’ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চওড়া করে হাসল রুহান।
‘হ্যাঁ, ওই কথা বলছিলাম। তা রাহি কোথায় বল তো?’
‘রাহি? স্কুল থেকে নিশ্চয় ফিরেছে এতক্ষণে। বাড়িতে আছে বোধহয়।’
‘কেন? কথা বলিসনি?’
‘হ্যাঁ, বলেছি। মানে, ওই ম্যাচ নিয়ে আর কী! আসলে বিশেষ কিছু করতে পারছি না গো। সব সম্পর্কে কেমন যেন জং ধরে গেছে। কেউ পাত্তা দিচ্ছে না,’ রুহানের মুখে হঠাৎ রক্ত চলকে উঠল।
জিয়ানা হাসল, ‘তোমার ওই সোর্স অব ওয়াটার নেওয়া হয়ে গেছে তো?’
‘হ্যাঁ,’ রুহান মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘আমি তা হলে…’
জিয়ানা বলল, ‘গাড়িতে বোসো, আমি আসছি।’ তারপর কিগানকে বলল, ‘তো? ঠিক আছে?’
রুহান চলে যেতেই কিগান জিয়ানাকে বলল, ‘এই সামান্য জল নেওয়ার জন্য তোর এতটা আসার দরকার ছিল না।’
‘অফিসে কাজ ছিল না। ভাবলাম, যাই। তোর সঙ্গে দেখা তো হল।’
কিগান হাসল, ‘একদিন বুকুদা আর তুতুলকে নিয়ে আসিস।’
‘তুই আমার প্রেস্টিজ দেখতে চাস?’
‘মানে?’ কিগান অবাক হল, ‘হঠাৎ এমন বলছিস!’
জিয়ানা গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তুই যখন পাহাড়ে সাইকেল নিয়ে একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলি, সেই দিন তোর গলার মাফলারটার কী রং ছিল মনে আছে তোর?’
কিগান হাসল, ‘মনে আছে। গোলাপি। আসলে প্লেজ কেউ ভোলে? তোর মামা যেভাবে আমায় দেখেছিল! তারপর তো টার্ন দেখালি তুই। ভ্যানিশ হয়ে!’
গাড়িটা ফ্যাক্টরি গেট দিয়ে বেরিয়ে ছোট হতে হতে একসময় একদম নেই হয়ে গেল। তবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল কিগান। রোদ কমে আসছে আরও। হাওয়ায় শীতের শিরশিরানি। শুকনো পথের থেকে ধুলো আর পাক খাওয়া পাখির বাসা হঠাৎ শূন্য করে দিল কিগানের মন। ও ভাবল, এটুকু! শুধু এটুকুই জীবন! কিগানের মনে হল অনর্থক এই মরা রোদ, নিস্তব্ধ জঙ্গল, অনর্থক এইসব চলাচল। কী হবে এই জীবন যাপনে? কী আছে এর শেষে? মনে হল, কেন জিয়ানা আসে এখানে? কেন ফোন করে ও? কী চায় ওর কাছে? বড় ক্লান্ত লাগে কিগানের। সারা জীবন ধরে সহ্য করা অপমান, কষ্ট আর যন্ত্রণাগুলোর দিকে ও তাকিয়ে থাকে নিরাসক্তভাবে। মনে হয় এগুলো ওকে করা হয়নি। মনে হয়, কোনও কিছুতেই আর ও নেই।
এই শেষ বিকেলের ঢালু রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে হঠাৎ কিগানের মনে হল, এবার বোধহয় পাল তোলার সময় হয়েছে। চেনা পরিচিত সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু কোথায় যাবে কিগান? কার থেকে দূরে যেতে চায় ও? চেনা-পরিচিতদের থেকে শুধু? নাকি অচেনা মানুষদের থেকেও? কেন যেতে চায়? কেউ ওকে করুণা করছে বলে? নাকি সেই ঘুরিয়ে নেওয়া মুখটার জন্য? পথ আর ফ্যাক্টরির মধ্যে দাঁড়িয়ে কিগান ভাবল আসলে ও কে? পথ? না পথের শেষের কোনও নিশ্চিত গন্তব্য!
পকেটে ফোনটা নড়েচড়ে উঠল হঠাৎ। কিগান বের করল ফোনটা। অফিসের নম্বর। কলকাতা অফিসের।
‘হ্যালো,’ কিগান কানে লাগাল ফোনটা।
‘আরে কাঁহা হ্যায় ইয়ার তু?’ গৌরের গলা।
‘স্যার, ফ্যাক্টরি গেটে।’
‘কেন? গেটম্যানরা সব প্রোডাকশন সামলাচ্ছে নাকি? শোন, একটা সমস্যা হয়েছে। ল্যাব থেকে জানিয়েছে যে, নতুন যে-অ্যাডহেসিভের কেমিক্যাল এসেছে সেটা ভাল নয়। বোর্ডের কোয়ালিটি ঝাড় খাবে। তু আভি উসে ইউজ না করিও। কেমন?’
‘ওকে স্যার,’ কিগান বলল, ‘কিন্তু তা হলে প্রোডাকশনের ব্যাপারে যে একটু চাপ হবে। এক্সপোর্ট মাল। লেটার অব ক্রেডিটের সময় পেরিয়ে যাবে। তখন?’
‘আমি ইমার্জেন্সি বেসিসে অ্যাডহেসিভ পাঠাচ্ছি কিছু। তু দেখ কে প্রোডাকশন না রুকে। নহি তো বাম্বু হো জায়েগা।’
‘ওকে স্যার’, কিগান বলল।
‘আর শোন, তোর ভাইটাকে সামলা তো।’
‘ভাই!’ কিগান সচকিত হল। আদির কথা বলছে কেন গৌর? আদি আবার কী করল?
‘ডর মত্ ইয়ার!’ গৌরের গলায় ইয়ারকির সুর, ‘তোর ক্যাসানোভা ভাই অফিসে প্রেম করছে, জানিস?’
‘অ্যাঁ?’ কিগান থতমত খেল। তবে আশ্চর্য হল না। গৌর মানুষটা এমনই।
এই সিরিয়াস তো এই হাসিখুশি। কাজের প্রেশারটা যথাসম্ভব কমাতে চায়।
গৌর বলল, ‘আরে ওয়ান সাইডেড লাভ। মালিনীর দিকে।’
‘স্যার মানে…,’ কিগান ইতস্তত করল, ‘আপনি জানলেন কী করে?’
‘আমায় বলেনি কিছু। কিন্তু আমি কি গাধা? আদির কাজে প্রবলেম হচ্ছে। একটু র্যাশ হয়ে যাচ্ছে। মাথা গরম করছে। জমিটারও বন্দোবস্ত করতে পারল না এখনও। ছেলেটার বোধহয় চাকরি করার ইচ্ছে নেই। দেখি আর ক’দিন! কী বল!’ গৌর হাসল, ‘যাক গে। তুই প্রোডাকশনের কাছে থাক। গুরুংয়ের কাজ তোকে করতে হবে না। আমার অত শিক্ষিত গেটকিপার না হলেও চলবে। বুঝেছিস! যা, কাম পে লোট আভি। অনেক গল্প করেছিস মেয়েদের সঙ্গে। চল শুরু হো যা।’
কানটা লাল হয়ে গেল কিগানের। গৌর খুব স্পষ্ট করে কথা শুনিয়ে দিল। কে বলল গৌরকে যে, ও জিয়ানার সঙ্গে বসে আছে? আর আদি? প্রেম করছে! চাকরি চলে যাবে নাকি ছেলেটার? গৌর ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নরমে গরমে যা বলল তা ভাল ঠেকল না। তার মধ্যে কিগান শুনেছে যে, এখানে যে জমি নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছে সেটা ওই বিদেশি কোম্পানি, যাদের সঙ্গে মার্চেন্ট মাল্টিপল্স-এর কাজ করার কথা, তারা জেনেছে। আর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দুর্বল বলে তারা এখন হঠাৎ জয়েন্ট ভেঞ্চার নিয়ে গড়িমসি শুরু করেছে। এদিকে এই অঞ্চলে নির্বাচনও আসছে। ফলে সুধাদিও যে বিশেষ হস্তক্ষেপ করবে জমি টমির ব্যাপারে, তা মনে হচ্ছে না। রাঘব চক্রবর্তী ইলেকশন ক্যাম্পেনে টাকা দেয়। তাকে কে ফালতু চটাবে এখন? পুরো ব্যাপারটা বিচ্ছিরিভাবে ঝুলে রয়েছে।
ফোনটা আবার নড়ে উঠল। নম্বরটা দেখল কিগান। অপরিচিত। কে করল ফোন? কিগান কানে লাগাল ফোনটা, ‘হ্যালো।’ কোনও উত্তর নেই, ‘হ্যালো। কে বলছেন?’ কোনও উত্তর নেই। শুধু বাসের আওয়াজ। মানুষের অস্পষ্ট আওয়াজ। আর মাইকে স্লোগান শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। খুব কাছেই কোথায় যেন মিটিং হচ্ছে। ছাত্র, রাজনীতি, সমাবেশ। এসব শব্দ টুকরো টাকরা ভেসে আসছে।
‘হ্যালো। কে বলছেন?’ কিগান আবার জিজ্ঞেস করল। ওপার নিস্তব্ধ। ‘আশ্চর্য, কে আপনি?’
হালকা শ্বাসের শব্দ যেন শুনল কিগান। তারপর কেটে গেল লাইনটা। কিগান অবাক হয়ে নম্বরটা দেখল। বোধহয় বুথ থেকে করা। আজকাল নানারকম নম্বর দেখা যায়। কিন্তু কে যে করল ফোনটা! ছোট্ট কাঁটার মতো প্রশ্নটা ভেতরে পাক খেতে লাগল কিগানের। পাক খেতে লাগল বিকেল শেষের মরচে রঙের আলো। গৌরের গলা। জীবন ক্রমশ জড়িয়ে আসছে। জটিল হয়ে আসছে। আদিকে যে সেদিন কথাগুলো বলল সেটা ছেলেটা শুনল কি? চিন্তা হচ্ছে কিগানের। খুব চিন্তা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোর ভেতর একটা জট পাকানো মেঘ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ও। দেখতে পাচ্ছে যে, ঝড় আসছে। হয়তো জঙ্গলও এগিয়ে আসছে! কে বলতে পারে!
Chapter - 24
২৪
বৃষ্টির পুকুরে যে সাঁতার কাটতে দারুণ লাগে সেটা রাহি জানে। ওদের বাড়ির চৌহদ্দিতে যে-পুকুরটা রয়েছে তার জলটা বেশ পরিষ্কার। সাধুদা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লোক দিয়ে পরিষ্কার করায়। সেই পুকুরটার এক পাশে বেশ কয়েকটা পাম গাছ লাগানো। গাছগুলো খুব একটা বড় হয়নি। তবু ভালই লাগে দেখতে। ওখানে একটা ছোট শেড মতো করে দেওয়া হয়েছে। স্নান করার আগে জামাকাপড় রাখা আর ছাড়া যায়। রাহির ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যায় পুকুরটা। ও দেখল সেখানে উথালপাথাল করে স্নান করছে মল্লার।
ছেলেটা বেশ। গতকালই আলাপ হয়েছে। খুব আমুদে। পড়াশোনা জানে। গল্পের বইয়ের পোকা। কিগানের ভাই আদির অফিস-গাড়ির ড্রাইভার। রাহি জানে কোনও কাজই ছোট বা খারাপ নয়। তবু, সব কিছুরই তো একটা প্রযোজ্যতা আছে। তাই এমন একটা ছেলে এই কাজ করে ভাবতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে রাহির। কিন্তু মাত্র এক সন্ধের আলাপ। তাই, কেন করে এই কাজ? কীসের জন্য করে—জিজ্ঞেস তো করা যায় না! তবে কৌতূহলটা পেটের মধ্যে পাক মারছে। আসলে ছেলেটা এত ভাল যে, রাহির মনে হয় না এমন কিছু জিজ্ঞেস করলে ও রাগ করবে।
পুকুরের পাড়ে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে মল্লারকে প্রবল উৎসাহ দিচ্ছে আবেশ। আজ রোববার। কাজ নেই। তার ওপর প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ডিসেম্বরের মিড্ল-এ এমন বৃষ্টি ভাবা যায় না। আর তার চেয়েও আশ্চর্য হল এই যে, এমন ঠান্ডায় মল্লার কীভাবে পুকুরে স্নান করছে!
রাহি চাদরটাকে ভাল করে জড়িয়ে নিল। আজ দুপুরে অনেক কিছু রান্না করাচ্ছে মা। হঠাৎ করে অতিথি এসে পড়েছে যে! কাল রাতে খিচুড়ি আর চার-পাঁচ রকম ভাজা ছিল। কিন্তু তা বলে তো আর দুপুরেও সেসব খাওয়ানো যায় না। যতই হুট করে এসে পড়া লোক হোক, তারা তো আর সাধ করে আসেনি। বিপদে পড়ে থাকতে এসেছে। আসলে এই চাপাডাঙায় কোথায়ই বা থাকবে আদিরা? যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে গতকাল বিকেল থেকে! তবে আদি আর মালিনী চাপাডাঙায় এসেছিল দুপুর নাগাদ।
বৃষ্টি শুরুর দু’ঘণ্টার ভেতরেই ভয়াবহ আকার নেয় আবহাওয়া। রাস্তাঘাট সব প্রায় আবছা হয়ে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। রাহি শুনেছিল বটে যে, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ হয়েছে। কিন্তু সেটা যে এমন আকার ধারণ করবে তা বুঝতে পারেনি।
চাপাডাঙা নামটা কোনও চাঁপা ফুল গাছ থেকে নেওয়া নয়। জায়গাটা চাপা, মানে নিচু। তাই চাপাডাঙা বলে সবাই। গোটা অঞ্চলটাই কেমন যেন মালসার মতো। চারদিক থেকে এসে জল জমা হয় এখানে। ফলে এই বৃষ্টিতে জল জমতে সময় লাগেনি একদম। রাস্তাঘাট অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। টিভিতে বলছিল যে, ক্লাউড বার্স্ট হয়েছে। মেঘ ফেটে গেছে। তাই এমন প্রলয় নেমেছে পৃথিবীতে।
ক্লাউড বার্স্ট কথাটা শুনে খুব মজা লেগেছিল রাহির। বেলুন তো ফাটে। মেঘও ফাটে! কী করে ফাটে? আর ফাটার পরে কী হয়?
ছোটবেলায় সাধুদার কাঁধে করে মাঝে মাঝে ঘুরতে বেরোত রাহি। সাধুদা ওকে এটা-ওটা শোনাত। গল্প বলত। আর রাহিও প্রশ্ন করে করে মাথা খারাপ করে দিত সাধুদার। তার মধ্যে মেঘ সম্বন্ধেও জিজ্ঞেস করত রাহি। বলত, ‘সাধুদা, ওগুলো কী গো? তুলোর মতো দেখতে?’
সাধু থেমে বলত, ‘আইসক্রিমের বেলুন গো দিদি।’
‘যাঃ, বেলুন তো রবারের হয়। তাতে হাওয়া থাকে।’
‘এটা আইসক্রিমের বেলুন।’
‘আইসক্রিম!’ খুশিতে মনটা নেচে উঠত রাহির, ‘তো বেলুনগুলো ফেটে গেলে কী হয়?’
সাধুদা বলত, ‘আইসক্রিম পড়ে। অ্যাত্তো অ্যাত্তো আইসক্রিম পড়ে।’
আকাশ থেকে আইসক্রিম পড়ে! তারপর থেকে গোল্লা গোল্লা মেঘ দেখলেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত রাহি। ভাবত, একবার যদি, অন্তত একটা মেঘও ফাটে!
মেঘ ফাটে। কিন্তু তা থেকে জল বেরোয় শুধু। দুঃখী মানুষদের, একলা মানুষদের, অপমানিত মানুষদের চোখের জল পড়ে সারা শহর জুড়ে। সারা দেশ জুড়ে। বড় হওয়ার পর সেইসব মেঘে রাহির চোখের জলও গিয়ে জড়ো হয়েছিল। ও বুঝেছিল, সাধুদা ওকে কষ্ট দিতে চায়নি বলেই অমন কথা বলেছিল।
সেই মেঘ ফেটেছে। আর চাপাডাঙা উপচে উঠছে জলে। স্কুল থেকে ফিরে চারদিকটা দেখে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে উঠেছিল রাহি। বৃষ্টি ওর বরাবরের প্রিয়। তারপর শীতকালের নিম্নচাপ আরও মজার। ওর ইচ্ছে করছিল কাগজের নৌকো বানিয়ে ওদের বড় উঠোনটায় ছেড়ে দেয় এক-এক করে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠেছিল রাহির। আরে কিগান! একটু আশ্চর্য হয়েছিল ও। কিগান তো চট করে নিজের থেকে ফোন করে না কখনও। অর্থাৎ দরকারটা খুব জরুরি।
‘হ্যাঁ বলো কিগানদা!’ রাহি ফোনটা নিয়ে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসেছিল। বলেছিল, ‘তুমি কোথায়? ফ্যাক্টরিতে?’
‘হ্যাঁ,’ কিগান চুপ করে ছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, ‘একটা হেল্প করবি?’
‘হেল্প!’ রাহি সোজা হয়ে বসেছিল। কিগান হেল্প চাইছে! এ যে অষ্টম আশ্চর্য! যে-মানুষ খিদে পেলেও বলে না, সে হেল্প চাইছে! ও বলেছিল, ‘আরে নিশ্চয়ই! তুমি এত হেজিটেট করছ কেন?’
‘আসলে একটা ছোট্ট বিপদ হয়েছে। মানে, একটা নয়, দুটো অ্যাকচুয়ালি। আমার ভাই আর ওর এক কলিগ অফিসে এসেছিল। মানে আমাদের ফ্যাক্টরিতে। তারপরই গন্ডগোল হয়েছে।’
‘কী হয়েছে?’
‘ওরা বাড়ি ফিরতে পারছে না,’ কিগান অসহায় গলায় বলেছিল।
‘আরে বাড়ি ফিরতে পারছে না কেন?’ রাহি অবাক হল।
‘কী করে পারবে? আকাশের অবস্থা দেখেছিস?’
‘তাও বটে,’ রাহি বলেছিল, ‘তা তুমি কী বলবে? কী ব্যাপার?’
‘ওরা আজ রাতে থাকবে। না হলে ওরা আর যাবে কোথায় বল?’
‘ঠিক আছে। তো আমি…মানে আমায়…’ রাহি বুঝতে পারছিল না।
‘তোদের বাড়িতে এক রাতের জন্য মেয়েটাকে থাকতে দিবি? মানে কাকাবাবু, ইয়ে তোর বাবার মোবাইল ট্রাই করছি, পাচ্ছি না। ওঁর সঙ্গেই কথা বলতাম। তা তোকেই বলছি। দিবি?’
‘ধ্যাত, এমন করে বলছ কেন তুমি?’ রাহি ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেছিল, ‘এমন ন্যাকামো করো কেন?’
‘না, চিনিস না জানিস না তাই বলছিলাম আর কী! শোন, একবার অন্তত কাকিমাকে বল। আমি না হয় দশ মিনিট পরে কল করছি আর-একবার। আসলে এত বৃষ্টি হচ্ছে! রাস্তাঘাট সব ডুবে আছে। এমন ওয়েদারে এতটা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া তো মুশকিল। আদি আর ওর গাড়ি চালায় যে-ছেলেটা, সে না হয় শুয়ে পড়বে কোনওমতে আমার ঘরে। কিন্তু মালিনী তো পারবে না। তাই তোকে বলছি আর কী! একটু দেখ না কাকিমাকে বলে। আমি মিনিট দশেক পরে ফোন করছি।’
‘আরে আমিই তো বলছি!’ রাহি বলেছিল, ‘আমি সাধুদাকে বলছি ওদের যেন নিয়ে আসে গিয়ে। চারদিকে যেভাবে জল জমে আছে!’
‘না, তুই পাকামো না করে কাকিমাকে জিজ্ঞেস কর। আমি একটু পরে ফোন করছি,’ কিগান ফোনটা কেটে দিয়েছিল তারপর।
মা ঘরে বসে টিভিতে কীসব যেন শো দেখছিল। রাহি গিয়ে দাঁড়াতেই মা বলেছিল, ‘কিছু বলবি? দাঁড়া, ব্রেকটা হোক, তখন বলিস।’
এইসব টিভি সিরিয়াল-গেম শো দু’চক্ষে সহ্য করতে পারে না রাহি। সিরিয়ালে সব চড়া রং মেখে অদ্ভুত ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছে। আর তেমনই গেম শোগুলো। তবু প্রচুর মানুষ কী যে মুগ্ধতা নিয়ে এগুলো দেখে!
রাহি আরও মিনিট চার-পাঁচেক অপেক্ষা করে সুযোগ পেয়েছিল। টিভিতে অ্যাড রোল করতেই মা রিমোট টিপে টিভিটাকে মিউট করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এবার বল, কী বলবি। দরকারি কিছু?’
রাহি মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে বলেছিল, ‘কিগানদা ফোন করেছিল একটা ব্যাপারে তোমার পারমিশন নিতে। মানে, বাবাকে ফোনে পাচ্ছে না। তাই তোমায় জিজ্ঞেস করতে বলল।’
মা চট করে টিভিটাকে দেখে নিয়ে বলল, ‘আরে, যা বলবি তাড়াতাড়ি বল না।’
‘কিগানদার অফিসের একটা মেয়ে এসেছে। কিন্তু এই ওয়েদারে ফিরতে পারছে না। তাই কিগানদা বলছিল যে, আজ রাতটা যদি আমাদের বাড়িতে থাকতে পারে! মানে যদি তোমরা পারমিশন দাও। তা হলেই আর কী!’
‘কে মেয়ে?’ মা একটু ভুরু কোঁচকাল।
‘আমি জানি না,’ রাহি গায়ের চাদরটাকে আবার ভাল করে টেনে জড়াল।
‘কে না কে!’ মা মুখটা গোমড়া করল, ‘আর কিগানের কী আক্কেল! হঠাৎ এমন বেয়ারা আবদার করে কোন সাহসে? চেনা নেই জানা নেই, থাকতে দেব কেন?’
রাহির মাথা গরম হয়ে গেল। মা যেন কত চেনা-অচেনা মানে! যাকে-তাকে বাড়িতে ঢোকায়, এটা-ওটা দেয়। সংসারের গল্প ফেঁদে বসে! আর কিগান কি তেমন ছেলে নাকি! নিশ্চয়ই ভরসা আছে বলেই বলছে। মায়ের যে হঠাৎ হঠাৎ কী হয়! কেমন যেন বাঁকা বাঁকা কথা বলে মাঝে মাঝে। এদিকে কিগান এলে এমন করে কথা বলে যেন এই পৃথিবীতে ওর চেয়ে আপন আর কেউ নেই। তা ছাড়া কিগান সম্বন্ধে মা অমন বলবে কেন?
রাহি জানে যে, কিগান ওকে অন্য কোনও চোখে দেখে না। বা আরও সঠিকভাবে বললে খুব একটা সিরিয়াসনেস নিয়ে ভাবেও না ওর সম্বন্ধে। কিন্তু যখন কারও অন্য কাউকে ভাল লাগে তখন তার তো এমনই লাগে। সেই মুগ্ধতা সে ফেরত পাবে এমন কথা নয়। তবু, শুধু ফেরত পাবে বলেই কি মানুষ দেয়! রাহি জানে সব পথের গন্তব্য থাকে না। কিন্তু পথটাই এত ভাল হয় যে, তাকে না ভালবেসে পারা যায় না।
কিছুদিন আগেও রাহি কিগানের ব্যাপার নিয়ে একটা অদ্ভুত কষ্ট পেত। মন খারাপ হয়ে থাকত ওর। কিন্তু এখন আর হয় না। মানুষের নিজের মনের ভেতরের যুদ্ধ হল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। কিন্তু সেই যুদ্ধ যদি সে থামাতে পারে তা হলে যোদ্ধার সাধক হতে সময় লাগে না। তা ছাড়া, এটা এক ধরনের প্র্যাকটিস। বৃষ্টির জল হাতের পাতায় পড়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে মুঠোবন্দি করার লোভ সামলানোর মতো প্র্যাকটিস।
রাহি বলল, ‘ঠিক আছে, আমি বারণ করে দিচ্ছি!’
‘মানে?’ গেম শো-টা আবার শুরু হয়ে গেছে ব্রেকের পরে। মা তবু টিভির দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে বলেছিল, ‘আমি কি তাই বললাম!’
‘আশ্চর্য! সব কি আর “না” বলে বলতে হয়? এটা তো এমনিই বোঝা গেল। তুমি তো বললে যে চেনাজানা নেই। বললে কিগানদার আক্কেল নেই!’
‘এসব বললাম আমি?’ মা টিভির থেকে সম্পূর্ণ সরে, ঘুরে বসেছিল। বলেছিল, ‘তোরা সবাই আমায় এমন ভুল বুঝিস কেন রে? আমি বললাম তাই? আর তুই কিগানকে আমার নাম করে এসব বললে ও বিশ্বাস করবে?’
‘আমি বলব যে, মা ‘না’ করেছে। সত্যিই তো!’
‘ভারী অসভ্য মেয়ে তো তুই! বাপে তোর মাথাটা পুরোটাই খেয়েছে দেখছি। নিজেকে কী ভাবিস? দু’পাতা ইংরেজি পড়েছিস বলে তোদের দয়ামায়া বেশি? কেন আমরা পারি না মানুষের উপকার করতে?’
‘আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে,’ রাহির হাসি পাচ্ছিল এবার। বলেছিল, ‘তা হলে?’
‘তা হলে মানে? আসতে বলে দে। এক রাতের জন্য একটা অবলা মেয়ে থাকবে। ক্ষতি কী?
‘অবলা না সবলা জানি না। তবে বিপদে পড়েছে।’
‘যা, দাঁড়িয়ে থাকিস না। ফোন করে কিগানকে বল নিয়ে আসতে। তবে যা দুর্যোগ, সাবধানে আসতে বলিস। বিরক্ত লাগে, সারাদিন সংসারের ঘানি ঠেলে একটু যে শান্তিমতো টিভি দেখব তারও উপায় নেই!’
‘এই রাহি তোর ফোন বাজছে। কোথায় কোথায় যে ফেলে আসিস!’ দীপার গলা পেয়ে দরজার দিকে তাকাল রাহি। দীপা ওর মোবাইলটা হাতে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘কোথায় বাজছে?’ রাহি জিজ্ঞেস করল। মোবাইলটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে যে, ‘কে রে? মানে কে ফোন করেছে?’
‘আমি দেখিনি। খাপে ঢোকানো ছিল যে!’
‘কেন দেখিসনি?’ রাহির বিরক্ত লাগল, ‘আমার প্রাইভেট কিছু আছে নাকি?’
‘থাকতেও তো পারে!’ দীপা হাসল। তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, ‘কেন ওই রুহান না কে ছেলেটা আসে না? তোর দিকে কেমন করে তাকায় দেখেছিস?’
‘বাজে বকিস না তো,’ রাহি উঠে গিয়ে এক ঝটকায় দীপার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিল। তারপর দেখল কার মিস্ড কল উঠেছে।
দীপা ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘কে রে, রুহান?’
‘ধ্যাত,’ রাহি বিরক্ত মুখে তাকাল দীপার দিকে।
দীপা হাসল, ‘ছেলেটা কিন্তু বেশ। ভাল, গুডি গুডি। এসব ছেলেকে ইচ্ছেমতো চালানো যায়।’
‘দিঘি ফোন করেছে, দিঘি। হায় ভগবান। তুই এত ভাট বকছিস কেন?’
‘ভাট?’ দীপা চোখ গোল করল, ‘আবেশের সঙ্গে মিশে মিশে কথার বারোটা বাজিয়েছিস দেখছি। বাবা যদি শোনেন না!’
রাহি পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘দিঘি ফোন করেছিল।’
‘দিঘি!’ ভুরু কোঁচকাল দীপা।
‘ওই যে লম্বা মতো মেয়েটা। সামান্য চাপা রং। বড় বড় চোখ। খুব সুন্দর দেখতে। সপ্তমীর সকালবেলা এল না!’
‘ও,’ দীপা মাথা নাড়ল, ‘সেই গম্ভীর মতো মেয়েটা!’
‘আসলে আগে যখন দেখেছিলাম তখন কিন্তু গম্ভীর দেখিনি। সেদিন কেন যে অত গম্ভীর ছিল কে জানে! একদম কথাই বলল না প্রায়।’
‘অবশ্য জামাইবাবুর অমন হঠাৎ করে শরীর খারাপ হলে সবাই একটু ওরকমই হয়ে যাবে।’
রাহি আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটার বোতাম টিপল।
চারবার রিং হওয়ার পর উত্তর এল, ‘রাহিদি, আমি কল করেছিলাম।’
‘আরে অন্য ঘরে ছিল ফোনটা। বলো না।’
দিঘি একটু থামল। তারপর বলল, ‘না, মানে এমনি ফোন করেছিলাম।’
‘এমনি!’ একটু অবাক হল রাহি। গত পরশুও তো ফোন করেছিল। আসলে আজকাল প্রায়ই ফোন করে দিঘি। এটা ওটা কথা বলে। তারপর রেখে দেয়। রাহির একটু অস্বস্তি হয়, অবশ্য ভালও লাগে। যাই হোক, মেয়েটা অন্তত খবরাখবর তো নেয়। এখনকার দিনে ক’জনই বা তা করে! আজকাল সবার জীবনই এত জটিল হয়ে গিয়েছে যে, তার জট ছাড়াতেই গোটা সময়টা কেটে যায়। অন্য কারও খবর নেওয়াই হয় না। তার ভেতরে অন্তত এই মেয়েটা তো ফোন করে!
‘তারপর বলো, কী খবর? পড়াশোনা চলছে?’ রাহি হালকাভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ। এই চলছে। তোমরা ভাল তো?’
রাহি বলল, ‘আমরা আছি মোটামুটি। দেখো না, কাজকম্ম হচ্ছে না কিছু। তোমাদের বললাম আসতে। তোমরা তো একবার মোটে এলে। গাছ কাটার বিরুদ্ধে একটা ক্যাম্পেন করার ছিল, কিন্তু হলই না। তোমরা এলে হয়তো হত।’
‘কেন, হল না কেন?’ দিঘি জিজ্ঞেস করল।
‘আরে, সুধাদি বারণ করল শেষ অবধি। ওদিকে গাছগুলো কাটা হচ্ছে। একটা সংস্থা খুলে বসে আছে হোমিরা। আমি জয়েন করে ভাবলাম একটা নতুন লেভেল-এ নিয়ে যাব। কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছে না। কাছেই হাইওয়ের ওপর পাঁচ কিলোমিটার পরে একটা বস্তি আছে। ভেবেছিলাম ওদের জন্য একটা সুস্থ স্যানিটেশন করে দেব। কিন্তু তাও আটকে আছে। আসলে, একটা ক্রিকেট ম্যাচ করে ফান্ড তুলব ভেবেছিলাম। কত আর অ্যাড তোলা যায় বলো তো!’ রাহি আফশোসের গলায় বলল।
‘কেন, হল না কেন?’ দিঘি আবার জিজ্ঞেস করল।
‘দুর! কানেকশন পাচ্ছি না। রুহান বলে একটা ছেলেকে কিগানদা রেকমেন্ড করল। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল, তবু কিচ্ছু হল না। কী যে করব, বুঝতেই পারছি না!’
‘কি-গা-ন?’ দিঘির গলাটা অন্যরকম শোনাল কি?
‘হ্যাঁ, অবশ্য তুমি জানবে কী করে! আরে, এই যে লম্বা মতো। প্লেয়ার প্লেয়ার দেখতে। নীল রঙের চোখ। আরে যে তোমার জামাইবাবুকে কোলে করে আনল।’
‘কিগান? অদ্ভুত, না?’ দিঘির গলাটা কেমন ভোঁতা মনে হল।
‘হ্যাঁ, নামটা যেমন অদ্ভুত, মানুষটাও। এখানের পার্টিক্ল বোর্ডের কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার। খুব ভাল মানুষ। তবে একটু একচোরা। অন্যকে হেল্প করে, কিন্তু কক্ষনও নিজের সমস্যার কথা অন্যদের বলে না। এখানে সবাই খুব পছন্দ করে,’ রাহি নিজেকে থামাল এবার। হয়তো বেশি বলে ফেলছে।
‘তাই? এত গুণ!’ দিঘির গলায় ব্যঙ্গ স্পষ্ট বুঝতে পারল রাহি।
‘কেন? এমন করে বলছ কেন?’
‘অমন করে শমীদা পড়ে গেল। ডাক্তার এল। আর তাকে শুধু একটু ক্যারি করে দিয়েই কাজ শেষ হয়ে গেল? সেদিন হঠাৎ করে কোথায় চলে গেল তোমার কিগানদা?’ দিঘির গলায় কি রাগ?
রাহি একটু চমকে গেল। কথাটা সত্যিই। সেদিন হঠাৎ কোথায় যে কিগান চলে গিয়েছিল! সবাই শমীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু তার ভেতরই কোথায় যেন চলে গিয়েছিল কিগান! তবে পরে বলেছিল।
রাহি বলল, ‘আরে ফ্যাক্টরি থেকে ইমার্জেন্সি ফোন এসেছিল। বয়লার বসে গিয়েছিল যে!’
‘অলওয়েজ অ্যান এক্সকিউজ!’ দিঘির গলায় রাগ।
‘মানে?’ রাহি অবাক হল, ‘কী বলছ তুমি?’
‘নাথিং,’ দিঘির দীর্ঘশ্বাস শুনল রাহি। দিঘি বলল, ‘বাদ দাও। যে যেমন লোক।’
‘না, তুমি জানো না কিগানদাকে। ও অমন নয়। খুব ভাল।’
‘তাই? তোমায় আরও কিছু ভালত্ব দেখিয়েছে নাকি?’ এমন করে বলছে কেন দিঘি?
‘আরে! এমন করে বলছ কেন? আচ্ছা, ঠিক আছে, পরের বার এসো, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। দেখবে, তোমারও ভাল লাগবে।’
‘ভাল? তা তোমার মনে হচ্ছে ভাল লেগেছে?’ দিঘির গলার ধার যেন বাড়ল।
‘আমার?’ রাহির গলাটা বিষণ্ণ হয়ে এল, ‘না। যাক, ওসব বাদ দাও। আমার ভাললাগার ওপর কিচ্ছু নির্ভর করে না।’
‘ও, আচ্ছা। রাহিদি, মা ডাকছে। আমি এবার রাখি।’ হঠাৎ করে ফোনটা রেখে দিল দিঘি।
মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে অবাক হয়ে সেদিকে তাকাল রাহি। আশ্চর্য পাগলি মেয়ে তো! হঠাৎ এইসব ব্যাপারে এমন রাগ করল কেন? ওর কী প্রবলেম? কিগানকে নিয়ে এত কথা বলে মেয়েটা এমন রেগে গেল কেন কে জানে! মানুষ মাঝে মাঝে এমন ব্যবহার করে যে, খুব আশ্চর্য লাগে। তা ছাড়া, দিঘিকে দেখলে তো বোঝাই যায় না যে, এমন রাগ করতে পারে! আসলে মানুষকে দেখে কি আর বোঝা যায় কিছু? সেদিন শমীর জ্ঞান ফেরার পর কি কেউ বুঝতে পেরেছিল যে, লোকটা একটু আগেই এমন অজ্ঞান হয়েছিল! বরং জ্ঞান আসার পর তো মিটিমিটি হাসছিল। বলছিল, ‘এমন অ্যাটেনশন পাওয়া যায় জানলে রোজ অজ্ঞান হব।’
ডাক্তারকাকু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আগে এমন হয়েছে?’
‘না, মানে…ইয়ে হ্যাঁ। জাস্ট একবার।’ লজ্জা লজ্জা গলায় বলেছিল শমী।
‘সে কী! ডাক্তার দেখাননি? আর কিছু চেঞ্জ এসেছে আপনার শরীরে?’
‘চেঞ্জ?’ একটু ভেবেছিল শমী। তারপর বলেছিল, ‘হ্যাঁ। বেশ কিছুটা রোগা হয়েছি আমি।’
ডাক্তারকাকু আর বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শুধু বলেছিল, ‘এসব অবহেলা করবেন না।’
সেদিন সপ্তমী পুজো ছিল। তবে কেন রাহি জানে না, খুব একটা আনন্দ হয়নি। সবাই এসেছিল। শমীও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবু গুন্ডা-দিঘিদের পুরো গ্রুপটাকেই কে জানে কেন খুব মনমরা আর ডিপ্রেসড লাগছিল। গুন্ডার মতো আড্ডাবাজ ছেলেও গম্ভীর হয়ে ছিল বেশ। কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল হোমি। গুন্ডা কিছু বলেনি।
রাহি আর বিশেষ ঘাঁটায়নি। ওরা দুপুরের ভোগ খেয়ে প্রথম বিকেলেই চলে গিয়েছিল। গোটা ব্যাপারটাই খুব অদ্ভুত, দমচাপা মনে হয়েছিল রাহির। মনে হয়েছিল কোথাও নিশ্চয়ই খুব একটা গন্ডগোল হয়েছে!
‘এই, কী রে? তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছিস! মা ডাকছে যে!’
‘মা?’ অবাক হল রাহি, ‘কই আমি শুনতে পাইনি তো!’
‘তা পাবি কেন? ফোনে তো মগ্ন হয়ে আছিস!’ দীপা বলল, ‘ওদিকে মালিনী সিং তো সিং করে করে রান্না করছে!’
‘মানে?’ রাহি অবাক হল, ‘সিং করে করে মানে? আর রান্না? কেন?’
‘আরে সে এক কাণ্ড। ও বলছে, নেপালি কায়দায় আলু দিয়ে কী একটা তরকারি করবে। মা “না” করেছিল। কিন্তু কী জেদি মেয়ে! এত ভদ্রভাবে জেদ করতে কাউকে দেখিনি। তাই মা শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে করতে দিয়েছে রান্না। মা হাল ছেড়ে দিয়েছে। বুঝেছিস তো!’
রাহি হাসল। বলল, ‘মেয়েটা পারে বটে! সত্যি!’
সত্যি মালিনী সিংহ অদ্ভুত মেয়ে। একই সঙ্গে এমন আগুন আর বরফ ও দেখেনি কোনওদিন। কিগান যখন ঢুকেছিল ওদের নিয়ে, প্রথম দেখেই মালিনীকে ভাল লেগে গিয়েছিল রাহির। অমন রং। গোলাপি মার্বেলের মতো স্কিন। আর ফিগারও গ্ল্যামার ম্যাগাজিন থেকে কেটে বসানো। চুল দেখলে মনে হয় যেন মাথায় কালো সিল্কের কাপড় বেঁধে রেখেছে।
কিগান ওর গার্ডেন আমব্রেলার মতো বড় ছাতাটা বন্ধ করে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলেছিল, ‘কাকিমা আপনাদের বড্ড বিপদে ফেললাম।’
‘সে কী! কেন?’ মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
‘এমন না বলে-কয়ে হুট করে চলে এলাম যে,’ কিগান ছাতাটাকে ওদের বারান্দার পাশে হেলান দিয়ে রেখে বলেছিল, ‘আসলে আদি, মানে আমার ভাই আর মল্লার আমার ওখানেই শুয়ে যেতে পারবে। কিন্তু মালিনীর তো সমস্যা হবে। তাই আপনি এখানে থাকার অনুমতি দিয়ে যে কী উপকার করেছেন!’
মা বলল, ‘আমার মেয়ে যদি হত! তবে? তুমি একে উপকার বলছ কেন? মানুষ মানুষের পাশে না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে? এটা তো মানুষের কর্তব্য!’
রাহির হাসি পেয়েছিল খুব। প্রচুর বাংলা সিরিয়াল দেখার ফল। মা পুরো সিরিয়ালের সংলাপ মুখস্থ করে ঝাড়ছে! এরপর মানুষের কর্তব্য টর্তব্য থেকে বিবেকানন্দের উপদেশে জাম্প করে জীবে প্রেম বললেই পুরো ঝাড় হয়ে যাবে।
কিগান আর অন্যরা বসার ঘরে এসে বসেছিল সোফায়। শুধু মল্লার দাঁড়িয়ে ছিল কোণে।
মা বলেছিল, ‘আরে তুমি বসো, দাঁড়িয়ে কেন?’
মল্লার বলেছিল, ‘আই অ্যাম অলরাইট। আর স্যার আছেন। ওঁর সামনে…’
‘মানে?’ মা অবাক হয়েছিল।
এবার কিগানের পাশে বসা সামান্য শ্যামলা, গোমড়া মুখের আদি বলেছিল, ‘তুমি আবার শুরু করেছ? চুপ করে এই চেয়ারটায় বসো।’
‘ও কে স্যার,’ মল্লার আর সময় নষ্ট না করে একটা বেতের চেয়ারে বসে পড়েছিল।
কিগান তারপর সবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমার ভাই আছে? জানতাম না তো!’
কিগান লজ্জা পেয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে গিয়েছিল।
রাহি কিগানকে বাঁচাতে বলেছিল, ‘আশ্চর্য মা। কিগানদা কতক্ষণ থাকে এখানে? আসে কতটা? সবসময় তো ফ্যাক্টরি নিয়ে পড়ে আছে। আর নিজের হাঁড়ির খবর কি তোমায় দেবে নাকি?’
‘না, না…’ কিগান আমতা আমতা করে কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গিয়েছিল।
তখন আদি বলেছিল, ‘দাদাভাই এমনই। খুব চুপচাপ। খিদে পেলেও কক্ষনও বলে না। এমনকী অনেক অন্যায়ও মুখ বুজে মেনে নেয়।’
‘ধ্যাত,’ কিগান লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল। তারপর কথা অন্য দিকে ঘোরানোর জন্য বলেছিল, ‘আরে, অনেক বেজে গেল। আমায় ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। আদি চল, আমরা যাই।’
‘কোথায় যাবে না খেয়ে?’ মা দাঁড়িয়ে উঠেছিল, ‘আমি সবার জন্য খিচুড়ি করতে বলেছি আজ। সঙ্গে ডিমভাজা, আলুভাজা, বেগুনভাজা আর বেসনে ডুবিয়ে ফুলকপি ভাজা। না খেয়ে যাবে মানে?’
‘কিন্তু, শুধু তো মালিনী থাকবে।’
‘আদি আর মল্লারও থাকতে পারে। আমাদের ঘরের অভাব? তোমার তো শুনেছি ছোট্ট একটা ঘর। তিন জনে শোবে কোথায়?’
‘আমি মাটিতে শুয়ে পড়তে পারব,’ মল্লার নিচু গলায় বলেছিল।
‘কেন, বিছানায় শুলে তোমার সমস্যা হয়?’ মা হেসে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘নট অ্যাট…মানে, হয় না মাসিমা,’ মল্লার ভিতু চোখে একবার তাকিয়েছিল আদির দিকে।
কিগান হেসে বলেছিল, ‘না কাকিমা, আমার প্রবলেম হবে না।’
‘কোনও কথা নয়। ওরা এখানেই থাক। আর বাড়িতে ওর বাবা বা চমক কেউ এখন নেই। ওর বাবা ব্যাবসার কাজে বাইরে আর চমক তো ইলেকশনের জন্য গোটা নর্থ চব্বিশ পরগনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ি খালিই আছে। ওরা সবাই থাকুক।’
‘ও, চমক নেই!’ কিগান যেন স্বস্তি পেয়েছিল কিছুটা। তারপর আদির দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল, ‘তা হলে থাক, কাকিমা যখন বলছেন। এত কাজ ফ্যাক্টরিতে! তিন শিফটে প্রোডাকশন হচ্ছে। আমি তো রাতে ঠিকমতো ঘুমোতেই পারি না।’
আদি বলেছিল, ‘ঠিক আছে। মালিনীর আপত্তি নেই তো?’
‘আমার?’ মালিনীর বাংলায় সামান্য টান লক্ষ করেছিল রাহি। তবে ওই প্রথম ও গলার স্বর শুনেছিল মালিনীর। অদ্ভুত মিউজিক্যাল গলার স্বর।
মালিনী বলেছিল, ‘আমার প্রবলেম হবে কেন?’
‘হবে না! গুড,’ আদি চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, ‘আমি ভেবেছিলাম…যাক গে।’
মালিনী বিরক্ত গলায় বলেছিল, ‘হ্যাঁ, যাক।’
রাহির কানে মালিনীর গলাটা কেমন যেন লেগেছিল। দু’জনের ভেতর কি কোনও গন্ডগোল আছে? হতে পারে। থাকতেই পারে। তাতে রাহির কী? তাই রাহি এই নিয়ে আর চিন্তা করেনি। এরা তো এসেছে মোটে এক রাত্তিরের জন্য।
কিগান চলে যাওয়ার পর মালিনী এসে আড্ডা মারতে শুরু করেছিল রাহি আর দীপার সঙ্গে। ও গান শুনিয়েছিল। নিজের গল্প বলেছিল। বলেছিল ওদের চা-বাগানের কথা। ছোটবেলাকার পাহাড়ে থাকার কথা। বলেছিল জোনাথনদাদু নামে একজন মানুষের কথা। বলেছিল মায়ের মৃত্যুর কথাও।
দীপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আরে তোমাদের চা-বাগান আছে? আর তুমি চাকরি করছ? পাগল নাকি?’
‘তাতে কী হয়েছে? বাবা তো বরং উৎসাহ দেয়। বলে আমার নিজের যোগ্যতায় কিছু করা উচিত। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার চেয়ে নিজের চেষ্টা করে দেখা উচিত। আর আমারও ভাল লাগে। খুব চ্যালেঞ্জিং কাজ।’
দীপা নিচু গলায় বলেছিল, ‘দেখো, রাহিও স্কুলে পড়ায়। সবাই কেমন নিজের নিজের মতো স্বাধীন! শুধু আমার কিছু করা হল না। সবার গলগ্রহ হয়ে রইলাম!’
‘গলগ্রহ কেন?’ মালিনী অবাক হয়েছিল।
‘তুমি গলগ্রহ মানে বোঝো?’ দীপা হেসেছিল ফিক করে, ‘তুমি আর কী কী বোঝো? তুমি তো হেভি মেয়ে!’
‘হ্যাঁ, বুঝব না? আমার মা শান্তিনিকেতন থেকে পড়াশোনা করেছিল মিউজিক নিয়ে। খুব ভাল গান গাইত। মা-ই শিখিয়েছে গান গাওয়া। আর বাংলাটাও। তাও একটা হালকা টান থেকে গেছে, জানি।’
দীপা বলেছিল, ‘তুমি শুনে শুনে এত ভাল শিখে ফেললে আর আমি কিচ্ছু পারলাম না। আমাদের এখানে ইংরেজিটাও ভাল করে পড়ায় না। তা ছাড়া, আমারও দোষ আছে। পড়ায় মনই বসত না। এত উড়ু-উড়ু করত মন! মনে হত পালিয়ে যাই। তারপর রাহির দাদার সঙ্গে প্রেম হল। ব্যস, আরওই সব ডকে উঠল! এখন আর আফশোস করে কী হবে!’
‘ওঃ এই ঠান্ডায় তুমি যা খেল দেখালে না, ইংলিশ চ্যানেল পার হতে পারো তুমি,’ বারান্দায় উঠে আবেশ চিৎকার করে বলল।
‘ইচ্ছে ছিল তো!’ মল্লার বলল।
‘সে কী রে!’ আবেশ কথাটা বলে জানালা দিয়ে হাত নেড়ে ডাকল রাহিকে। রাহি দুটো ঘর ঘুরে বারান্দায় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দেখল, মল্লার ভেজা চুল আর লাল চোখ নিয়ে একটা পাতলা টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যদিও টি-শার্টটা টাইট হয়েছে। এটা চমকের ছিল। দেখে চিনল রাহি। তবে প্যান্টটায় দড়ি রয়েছে বলে সমস্যা নেই।
রাহিকে দেখে আবেশ বলল, ‘বোঝো ছেলের কাণ্ড! বলে কিনা ইংলিশ চ্যানেল পার হবে। আরে এ কি তোর বাংলা-হিন্দি টিভির চ্যানেল পেয়েছিস? ইংলিশ চ্যানেল রে খোকা, ইংলিশ চ্যানেল।’
‘জানি। ম্যাথু আর্নল্ডের কবিতা আছে এর শোর-এর ওপর, ‘ডোভার বিচ’। Ah, love, let us be true/ To one another… দারুণ লেখা!’
‘শালা, তুই কে রে? শেক্সপিয়র? নাকি বিদেশি স্পাই ছদ্মবেশে ড্রাইভার সেজে এসেছিস! তোর গল্পটা কী বল তো!’
রাহি দেখল, আবেশ দু’ঘণ্টার আলাপে খুব মসৃণভাবে তুমি থেকে তুইতে চলে গেল। আর মল্লার সেটা মাইন্ডও করল না।
আবেশ আবার বলল, ‘তোর বসও এত লেখাপড়া জানে না। তুই সত্যি করে বল তো তুই কে? ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নোস তো! বা ক্রিপ্টন গ্রহের কোনও কিপটে বাসিন্দা টাইপ।’
‘না না,’ মল্লার হাসল। গত আঠারো ঘণ্টায় প্রথম। তারপর বলল, ‘না না, তেমন কিছু নয়। আসলে ছোট থেকে হরিদ্বারে মানুষ। এই কনকনে জলে সাঁতার কাটতে অভ্যস্ত। তারপর ইংরেজি মিডিয়ম স্কুলে পড়তাম। মা হঠাৎ মারা গেল। বাবা আবার বিয়ে করল। ব্যস তারপর সব গন্ডগোল। টুয়েলভের পরে আর পড়া হয়নি। কিন্তু ইংরেজি এত ভাল লাগত! এখনও এত ভাল লাগে! তাই ছাড়িনি ভাষাটাকে। কাজ খুঁজতে কলকাতায় আসা। বাবার এক বন্ধুর মাধ্যমে এই কাজটা পাই। আমার খারাপ লাগে না।’
মল্লার কথা শেষ করে হঠাৎই থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। রাহি দেখল মল্লার ওর কাঁধের ওপর দিয়ে পিছন দিকে তাকাচ্ছে। রাহি পিছনে ফিরে দেখল আদি। আবেশও দেখছে একসঙ্গে।
আবেশ আদিকে বলল, ‘শালা, তুই কেমন সারথি পেয়েছিস রে! এ ম্যাথু আর্নল্ড পড়েছে! আর আমি আর্নল্ড বলতে শোয়ারজেনেগার বুঝি! ওফ্, ভাবা যাচ্ছে না!’
‘সরি স্যার,’ মল্লার একদম কাঁচুমাচু হয়ে গেল।
‘কেন, সরি কেন?’ আবেশ উৎসাহের সঙ্গে বলল, ‘ঠান্ডা জলে সাঁতরাতে পারিস, কবিতা পড়িস, গাড়ি চালাস? ইংরেজি জানিস ভাল, তাও “সরি”? আমি তো কিছুই জানি না। তাও “সরি” নই।’
‘মল্লার তুমি তোমার জায়গায় যাও,’ আদি গম্ভীর গলায় বলল।
‘কেন রে শালা? তুই ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন যে, “তোমার জায়গা” বলছিস! এঃ, যেন ফিল্ডিং সাজাচ্ছে! তোমার জায়গায় যাও! মামদোবাজি। আজ রোববার, আজ ছুটি। ও তোর ড্রাইভার নয়। ও স্বাধীন মানুষ! একদম বসগিরি ফলাবি না। ও কত কিছু জানে! আর তুই ওকে দাবিয়ে রাখছিস! এই মল্লার, বল তো, “আমায় দাবায়ে রাখতে পারবা না।” শালা ক্যাপিটালিস্ট পিগ। শ্রেণিসংগ্রাম করে যাদের বাঁচতে হয় তাদের ওপর অত্যাচার? দেব, ত্রয়ণের চার-পাঁচটা স্পিচের সিনপসিস? পেট খারাপে মরে যাবি। শালা ঠাকুরের থালার সাইজের গোল গোল চিংড়ি আর খেতে হবে না। বুঝেছিস!’
‘যা খুশি কর তোরা!’ আদি মুখটা গম্ভীর করে চলে গেল বসার ঘরে। গতকাল আসার পর থেকে শুধু টিভি দেখছে। অবশ্য কী-ই বা করবে?
আদি চলে যেতেই মল্লার বলল, ‘এটা দাদা আপনি কী করলেন? স্যার রেগে গেলে আমার খুব বিপদ হবে। উনি খুব রাগী। আমার নামে যদি গৌর স্যারের কাছে রিপোর্ট করেন আমার খুব সমস্যা হয়ে যাবে। চাকরি গেলে কী খাব? আর কে চাকরি দেবে আমায়?’
‘আমি দেব। আমাদের হেল্প আর্থ-এ আমার হেল্পার। আমার সঙ্গে নানান কোম্পানিতে যাবি। আর আমি একটু ঠেকে গেলেই ইংরেজি বলে ম্যানেজ করে নিবি। কোনও চাপ নেই।’
‘কী যে বলেন দাদা? আমি কি…’
হাতে ধরা ফোনটা কেঁপে, চিৎকার করে উঠল হঠাৎ। রাহি ঘাবড়ে গেল। আবার কার ফোন!
ত্রয়ণ! চমকে উঠল রাহি। হঠাৎ এই সময়ে ত্রণ ফোন করল! তাও ওকে? ইলেকশনের কাজে ত্রয়ণও তো ব্যস্ত। তা হলে হঠাৎ ওকে ফোন!
‘হ্যালো?’ রাহি ফোনটা কানে লাগাল।
‘ঢ্যামনাটা এসেছে?’ ত্রয়ণের গলায় জন্তু ঢুকে আছে যেন!
‘মানে?’ রাহি চমকে গেল। আজকাল ত্রয়ণ বড্ড ঘনিষ্ঠ হয়ে বাজে কথা বলার চেষ্টা করে। সবার সামনে ও যতটা ভদ্র রাহির সঙ্গে একান্তে ততটাই ছোটলোক।
‘ওই মাগিবাজ আদিত্য শুনলাম তোমাদের বাড়িতে ঢুকেছে! শালা কিগানটা ঢুকিয়েছে, না? এক-এক করে শালা সব পেটোয়াগুলোকে ঢোকাচ্ছে।’
‘ত্রয়ণ, কী বাজে বকছ?’
‘বাজে বকছি! খবরদার তুমি আদিত্যর কাছে যাবে না। ও এক নম্বরের মাগিবাজ। লাগিয়ে পেট করে দেবে। আর তুমি তো মাল ঢলানি আছই। শোনো, আমার সঙ্গে শোবে তুমি। আমিই তোমায় লা…’
ফোনটা কেটে সুইচ-অফ করে দিল রাহি। কী নোংরা, কী নোংরা! এমন হতে পারে মানুষ! এমন দু’মুখো? এমন নোংরা? রাহির মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চমককে গিয়ে সব বলে দেয়। কিন্তু তারপরেই আবার ভয় লাগে। ত্রয়ণের হাতে যে মারণাস্ত্র রয়েছে! এদিক ওদিক করলে যদি সব ফাঁস করে দেয়! রাহির মনে হয় একটা অক্টোপাস ওর হৃৎপিণ্ডটাকে ধরে পিষে দিতে চাইছে একদম। রাহি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
‘কী হল?’ আবেশ প্রশ্ন করল।
‘না…কিছু…মানে, কিছু না,’ আবেশের চোখের থেকে চোখ সরিয়ে নিল রাহি।
‘ত্রয়ণ, না?’ আবেশ হাসছে। কেন হাসছে? কী জন্য হাসছে? তবে কি…? সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেল রাহির। আবেশ কি কিছু বলতে চাইছে? কিছু বোঝাতে চাইছে!
আবেশ আবার বলল, ‘একটা কথা বলব?’
কথা! ছ্যাঁত করে উঠল রাহির বুক। কতটা দেখেছে ও? কী দেখেছে?
‘কী কথা?’ রাহি শক্ত হয়ে গেল।
আবেশ হাসল আবার। মল্লারকে ‘ভেতরে যা’ বলে পাঠিয়ে দিয়ে কাছে এসে বলল, ‘যা শুনলে তোমার লাভ হবে।’
রাহি শক্ত শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী বলবে আবেশ? কী বলতে চায় ও?
আবেশ পায়ে-পায়ে এগিয়ে এসে হাসল প্রথমে। তারপর কথা শুরু করল।
Chapter - 25
২৫
হাতে ষাট হাজার টাকার চেক। পিছনে গ্রিলের সবুজ-হলুদ গেট আর কাঠের রেলিং দেওয়া ক্লাব টেন্টের বাউন্ডারি। মাথার ওপর বড় বড় করে লেখা ‘স্টার ইউনিয়ন’। পাশে ভিনাইল বোর্ডে লেখা ‘গ্যালাক্সি ইন দ্য মেকিং’।
আজ থেকে বহু বছর আগে এক ভোরবেলায় জীবনে প্রথমবার এই গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল রুহান। এখনও মনে আছে রুহানের। একটা সস্তার উইন্ডচিটার, সাদা প্যান্ট আর কেডস পরে শীতের ময়দান ভেঙে হাঁটতে হাঁটতে এই গেটটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল ও।
ময়দানের ভারী দুধ রঙের কুয়াশা, শীতের সকালের লাজুক সূর্য আর ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে সব কিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো লেগেছিল রুহানের। মনে হয়েছিল, এসব কি সত্যি হচ্ছে? না স্বপ্নে?
ভোরবেলার মর্নিং ওয়াকার, প্লেয়ারদের হুল্লোড়, পেতল কলসিতে বিক্রি হওয়া চা আর দূরে রাস্তা দিয়ে ঝুলনের মতো চলতে থাকা মানুষজন, কেমন একটা অদ্ভুত শিহরন জাগাচ্ছিল ওর মনে। ক্লাবে ঢুকতে গিয়ে পা কাঁপছিল ওর। এত বড় ক্লাব, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও? যে-মানুষটা আসতে বলেছে, তার কথায় রুহানের ইন্ডিয়া খেলার চান্স আছে। সত্যিই কি আছে? বাংলা থেকে ন্যাশনাল টিমে চান্স পাওয়া খুব কঠিন। পেলেও দু’-চারটে ম্যাচের পর কী যে হয়! সবাই সৌরভ হতে পারে নাকি?
সে সময় সৌরভের কেরিয়ার মধ্যগগনে। জগুদা বলেছিল, ‘ব্যাটসম্যান দিয়েছে বাংলা, এবার বোলার দেবে। রুহান রায়।’
এই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন রুহানের মনে হয়েছিল একদিন যখন ও এই গেট দিয়ে বেরোবে চারদিকে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরবে ওকে। দূরে দাঁড়ানো দামি গাড়িতে বসে থাকবে নন্দা। আর অবলীলায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে কালো সানগ্লাস চোখে দিয়ে রুহান বেরিয়ে যাবে সোঁ করে। রুহান ভাবত একদিন ওর হাতের বলের দিকে, ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা দেশ।
দুটো কাক বসে রয়েছে পাশের কাঠবাদাম গাছটায়। দূরে একটা রংচটা বেঞ্চে জড়াজড়ি করে বসে রয়েছে দু’জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা। কয়েকটা গাধা ঘুরে বেড়াচ্ছে সামনে। একটা বিরক্ত লজেন্সওয়ালা মাঠ ভাঙছে মাথা নিচু করে। আর এসবের মাঝে সবুজ-হলুদ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে রুহান। গেটের কাছে দারোয়ান বলবন্ত পর্যন্ত তাকাচ্ছে না ওর দিকে। আসলে, সারা ভারত কেন, ওর নিজের মা-ই যে ভরসা করে না ওর ওপর।
আজ ওকে ফোন করে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সুখেনদা। একটু অবাকই হয়েছিল রুহান। সপ্তাহ দুয়েক ক্লাবে যেতে পারেনি ও। তাই কি ডেকেছেন? অন্য কেউ হলে ফোনেই হয়তো জিজ্ঞেস করত রুহান। কিন্তু সুখেনদাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না ও। সুখেনদা ওর জন্য এত করেছেন যে, সুখেনদার সামনে মাথা তুলে কথাই বলতে পারে না। তাই খুব জানতে ইচ্ছে করলেও চুপ করে ছিল রুহান।
সুখেনদা সচরাচর সকালের দিকে ক্লাবে থাকেন। কিন্তু স্টারের ইলেকশন সামনে। তাই সুখেনদা আজ মাঠে ছিলেন। রুহানকে দেখে হাত তুলে ডেকে বলেছিলেন, ‘আয়, এদিকে আয়।’
ক্লাবের অফিসের সামনে ছোট একটা বাগান রয়েছে। আর পাশে লনটা মখমলের মতো সবুজ। সেখানে বেতের চেয়ার নিয়ে বসেছিলেন সুখেনদা। পাশে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে গিয়ে বসেছিল রুহান।
সুখেনদা পান খান খুব। দারুণ সুন্দর জর্দার গন্ধ আর দামি পারফিউমের গন্ধ একসঙ্গে মিলে মিশে ভরিয়ে তুলেছিল চারদিক। কেমন যেন ঝিম লেগে যাচ্ছিল রুহানের। সুখেনদা বলেছিলেন, ‘কী রে, তোর পা ভাল আছে?’
‘আছে সুখেনদা।’ রুহান নিচু গলায় বলেছিল, ‘আসলে খুব একটা চাপ পড়ে না তো।’
‘কেন, প্র্যাকটিস করিস না?’
‘করি…মানে…’ রুহান তোতলাচ্ছিল। অফিস থেকে ছুটি পায় কই যে, প্র্যাকটিস করবে রোজ? আর সারাদিন খাটাখাটনির পর ভোরবেলা উঠে আর প্র্যাকটিসে আসতে ইচ্ছে করে না ওর। মনে হয় ঘুমোয়।
ঘুম। আজকাল ঘুম খুব বেড়েছে রুহানের। সারারাত মড়ার মতো ঘুমোয় রুহান। সকালে মা ডাকতে ডাকতে গালাগালি করতে শুরু করে। তবু ওঠে না ও। আর উঠলেও ঢোলে, ঢুলতে থাকে। নাছোড়বান্দা বাচ্চার মতো ঘুম ঝুলে থাকে ওর চোখের পাতায়। প্রায়ই তাই আজকাল সকালে উঠে কাজ ভুলভাল হয়ে যায় রুহানের। এর ভেতর কী করে আসবে ও প্র্যাকটিসে?
‘আর ঢপ মারিস না, ধম্মে সইবে না।’ পিছন থেকে গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিল জগুদা, ‘তোর টিকির দেখা পাওয়া যায়? সুখেনদাকে বুলু দিচ্ছিস?’
‘না, মানে…’ রুহান থতমত খেয়ে চুপ করে গিয়েছিল।
সুখেনদা বলেছিলেন, ‘জগু ঠিকই বলছে। আমি জানি রে। তুই খুব ভাল ছেলে রুহান। কিন্তু ভাল ছেলে দিয়ে স্কুল চলে, ক্রিকেট টিম চলে না।’
‘মানে?’ সুখেনদা কী বলছেন বুঝতে পারেনি রুহান। ও বোকার মতো মুখ করে বলেছিল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না সুখেনদা।’
সুখেনদার মুখে বন্ধুর মতো হাসি ফুটে উঠেছিল। সুখেনদা বলেছিলেন, ‘জানিস ছোটবেলায় আমার খুব ক্রিকেটার হওয়ার শখ ছিল। খেলা হলেই মাঠে যেতাম। সোবার্সের খেলা দেখেছি। জয়সীমার খেলা দেখেছি। টনি গ্রেগকে দেখেছি। মনে হত আমিও আবিদ আলির মতো বল করব। হয়নি। তবে পারত জানিস, আমার ভাই পারত। মনোতোষ। খুব ভাল বল করত। তখন গাওস্কর একদম নতুন, মুম্বইতে একটা খেলায় গাওস্করকে ইয়র্ক করে দিয়েছিল একদম। আমরা সবাই ভাবতাম, খুব বড় বোলার হবে ও। সবাই নাম জানবে ওর। ভাবতাম, আমি যা পারলাম না ও সেটাই পারবে। আর ভাই পারতে শুরুও করেছিল। আন্ডার নাইনটিন খেলে ফিরছিল ভাই। আর তার আগের সন্ধেবেলাতেই খবর পেয়েছিলাম যে, বেঙ্গল টিমে সিলেকশন হয়েছে ওর। আমাদের বাড়িতে সে যে কী উৎসব, তোকে কী বলব। আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম কখন ভাই আসবে। বাবা তো উৎসাহের চোটে পাড়ার সকলকে মিষ্টি দিয়ে এসেছিল। মাকে বলেছিল, “দেখো, যেদিন ইন্ডিয়া খেলবে, সেদিন আমি কী করি। আমি একদম…আমি একদম…” বাবা কথা শেষ করতে পারেনি। বাড়ির বেল বেজে উঠেছিল আচমকা। বাবা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে থমকে গিয়েছিল। পুলিশ। জানিস রুহান, তোর বোলিং অ্যাকশন একদম আমার ভাইয়ের মতো। ঠিক অমন হাত দিয়ে বলের সিম লুকিয়ে রাখা, সামনে ঝুঁকে পড়ে দৌড়। লাফিয়ে ওঠা। অবিকল আমার ভাই। ভাই ফিরেছিল জানিস। সাদা চাদরে মুড়ে, সারা গায়ে বস্তা সেলাইয়ের মতো দাগ নিয়ে। একটা পুঁটলির মধ্যে ফিরেছিল ভাই। রেড রোডে ভাইয়ের ট্যাক্সিকে একদম থেঁতলে দিয়েছিল একটা ডাম্পার। বাবা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। মা কথা বলেনি কতদিন। আর আমি একা-একা হেঁটে বেড়াতাম রাস্তায়। তারপর কতদিন কেটে গিয়েছিল, আমি চারদিকে খুঁজে বেড়াতাম ভাইকে। পেতাম না জানিস। কোথাও পেতাম না। তারপর তুই এলি। আমার মনে আছে, শীতকাল ছিল সেটা। আমি ইডেনের দিকের মাঠটায় বসে ছিলাম। দেখলাম জগু তোর হাতে বল তুলে দিল। তুই বলটা নিয়ে একটা দিক ট্রাউজারে ঘষে সিমটা ধরলি। তারপর বাঁ হাত দিয়ে বলের সেলাইটা লুকিয়ে ঝুঁকে পড়ে দৌড় শুরু করলি। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানিস। এ কে দৌড়োচ্ছে? মনো? কিন্তু মনো তো নেই! তবে? আর তারপর দেখলাম তুই লাফিয়ে উঠলি আর যেন বলটা করল মনো। ভাবলাম, জীবন সমুদ্রের মতো। একসময় সব নিয়ে নিলেও পরে তা ফিরিয়ে দেয়। তুই সত্যিই কী ভাল বল করতিস রে রুহান!’ সুখেনদা একটানা কথা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। সুন্দর তামাকের গন্ধ উড়ে বেড়িয়েছিল চারিদিকে।
জগুদা বলেছিল, ‘তুই সেই খেলাটাকে হাতে ধরে নষ্ট করলি। আশ্চর্য!’
‘সত্যি, তোর কী হল বল তো রুহান?’ সুখেনদার গলায় আর নস্টালজিয়া ছিল না।
‘মানে…আমি….আমার…’ রুহানের কথা ক্রমশ গুলিয়ে যাচ্ছিল।
আসলে কী বলবে রুহান? কার কাছে গিয়ে বলবে? নন্দার ঘটনাটা ঘটার পর থেকে গোটা জীবনটাই কেমন যেন হঠাৎ বদলে গিয়েছিল রুহানের। সেই কনফিডেন্সটাই যেন চলে গিয়েছিল। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল সারা জীবনের জন্য। সেসব কি আর অন্য লোকেরা বুঝবে? যার হয়, একমাত্র সেই বোঝে। আর কেউ বুঝবে? আর কেউ বোঝে না। তাই সুখেনদা বা জগুদা, কাউকেই বলা যে বৃথা, তা বুঝে চুপ করে ছিল রুহান।
সুখেনদা বলেছিলেন, ‘এই নে।’ পাশের টেবিল থেকে একটা খাম তুলে দিয়েছিলেন ওর হাতে। বলেছিলেন, ‘আসিস মাঝে মাঝে। যোগাযোগ রাখিস।’
‘মানে?’ খামটা হাতে নিয়ে বোকার মতো সুখেনদার দিকে তাকিয়েছিল রুহান। কী বলছেন সুখেনদা? যোগাযোগ রাখিস, মানে? আর খাম? কী রয়েছে এতে?
‘তোকে ডিসচার্জ করে দিলাম আমরা। কেমন?’ সুখেনদা নিচু গলায় বলেছিলেন।
‘মানে?’ আরও অন্ধকার হাতড়াচ্ছিল রুহান। ডিসচার্জ? সে তো হাসপাতাল থেকে করে। ও কি রোগী নাকি যে, ডিসচার্জ করল ওকে?
‘ছাগল, আস্ত ছাগল তুই!’ জগুদা রেগে গিয়েছিল, ‘তোকে আর স্টারের দলে রাখা হচ্ছে না, তোর কন্ট্র্যাক্ট শেষ হয়ে গেছে। আর রিনিউ করা হচ্ছে না কন্ট্র্যাক্ট। কেন, তুই এতদিন বুঝিসনি? ওই খামে টাকা আছে। ষাট হাজার। তোর পেমেন্ট।’
‘অ্যাঁ? রুহান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, ‘কিন্তু…আমি…কেন?’
সুখেনদা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিলেন, কিন্তু জগুদা হাত দিয়ে সুখেনদার হাতটা ধরে বলেছিল, ‘আপনি চুপ করুন সুখেনদা। আমি বলছি।’ তারপর রুহানের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলেছিল, ‘দেখ রুহান, তোকে এই ফর্ম নিয়ে এতদিন যে রেখেছি সেটাই তো অনেক। আজকাল প্র্যাকটিসে আসিস না ঠিকমতো। খেলতে পারিস? চোট পেয়ে বসে থাকিস। এত ঝামেলা আমরা সামলাব কেন? তা ছাড়া তোর খেলা শেষ রে। তোর মধ্যে আর বারুদ নেই। ভেবেছিলাম তুই রকেট, দেখলাম বালি ঠাসা দু’নম্বরি রংমশাল। শালা, আবার ‘কেন’ জিজ্ঞেস করছিস! বটুক তো বটুক, সেদিনের ছেলে সতু পর্যন্ত তোকে ফ্রন্ট ফুট পুল করে ছয় মারছে। তুই এখনও ভাবিস ক্লাব তোকে রাখবে? দম নেই, জোর নেই, বলে কাজ নেই। তাও জিজ্ঞেস করছিস? সত্যিই…’ জগুদা এমন করে মাথা নেড়েছিল যেন পৃথিবী রসাতলে গিয়েছে একদম। আর উদ্ধার হওয়ার সুযোগ নেই।
খাম খুলেছিল রুহান, ‘ষাট হাজার!’ রুহান অস্ফুটে বলেছিল। আসলে বহু দিন তো টাকাপয়সা পায় না। এর চেয়ে বেশি টাকা পাওয়ার কথা যে ওর।
‘তো কত দেবে?’ সুখেনদা এবার বিরক্ত হয়েছিলেন, ‘তোর আউটপুট নেই কোনও। ওরা পঁচিশ হাজার দেবে বলেছিল, আমি ষাট করিয়েছি। আর এর সঙ্গে চাকরিগুলো যোগ কর। শোন রুহান, এখন যেখানে আছিস, সেখান থেকে চাকরি গেলে আমার কাছে কিন্তু আর চাকরির উমেদারি করতে আসিস না।’
‘না, না,’ রুহান নিমেষে গুটিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘আপনি রাগ করবেন না সুখেনদা। আসলে, হঠাৎ করে এমন হল তো তাই…’
‘ছাগল একটা,’ জগুদা বলেছিল, ‘কী হল হঠাৎ করে? তুই জানতিস না যে, এমন হবে? তোকে আর টিমে রাখা হত? প্র্যাকটিস ম্যাচেও দু’-তিন ওভারের বেশি দেওয়া হত? আর দেবে কেন? তোর স্পিড গেছে। ফলো থ্রু গেছে। বল ডেলিভারির সময় মাথা স্থির থাকে না। পাড়ার ছেলেরাও তোর চেয়ে ভাল বল করে। শোন রুহান, আর কথা বাড়াস না। এবার যা। মাথা গরম করালে আমি মেরে দেব এবার।’
সুখেনদা হাত দিয়ে চেপে ধরেছিলেন জগুদার হাত, তারপর রুহানকে বলেছিলেন, ‘শোন রুহান, আজ আয়। তুই এই ক্লাবের পুরনো প্লেয়ার। এখানে এসে যখন খুশি প্র্যাকটিস করতে পারিস। এখন আয়।’
পা দুটো লোহার মতো ভারী লাগছিল রুহানের। আর মনে হচ্ছিল, মাথার ভেতর কলকাতার সমস্ত ওভারহেডের তার জট পাকিয়ে গেছে। যখন স্টারে প্লেয়ার হিসেবে রেজিস্টার্ড ছিল, তখন টাকা না পেলেও কেমন যেন একটা শান্তি ছিল মনে। যেন কোথাও একটা নিজের পরিচয় ছিল। মনে হত, আর কিছু না পারলেও ক্রিকেটটা তো ও পারে। কোথাও যেন দাঁড়াতে পারত ও সমাজে। কিন্তু এবার যে সেটাও গেল! মানুষ একটা মুখোশ খোঁজে সমাজের সামনে দাঁড়ানোর জন্য। আর সেই মুখোশটার চারপাশে সে একটা নিজের মতো দেখতে ভদ্র মানুষ তৈরি করে তোলে। সেই মুখোশটাকেই সমাজ চেনে, সমাজ দাম দেয়। তাই মুখোশটা ছাড়া মানুষ খুব অসহায়, নগ্ন।
ষাট হাজার টাকার চেকটা হাতে ধরে নিজেকে তেমনই মনে হচ্ছে রুহানের। অন্য দিন ক্লাবের দারোয়ান বলবন্ত হাসে ওকে দেখলে। আজ কিন্তু বলবন্ত ফিরেও তাকাল না। আচ্ছা, ওর কাছেও কি খবর পৌঁছে গেছে? তাই কি পাত্তা দিচ্ছে না একদম?
গড়ের মাঠটাকে যেন আরও বড় মনে হচ্ছে রুহানের। মনে হচ্ছে এর কোনও শেষ নেই। আজ আর অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না। ভীষণ মনখারাপ লাগছে। যে জন্য নিজের দিকে তাকাত পারত ও, সেই কারণটাও আজ চলে গেল। তবে কেন বেঁচে আছে রুহান? ওর কি মরে যাওয়া উচিত? কী করবে ও? কী করবে? কিগান থাকলে ওর অনেক সুরাহা হত। নানা পরামর্শ পাওয়া যেত। কিন্তু কিগান তো ফ্যাক্টরিতে। ফোন করলে ডিস্টার্ব হবে হয়তো। তা হলে? মোবাইলটা বের করে নামগুলো দেখল রুহান। এবিসি করে আর-এ এসে আটকে গেল রুহান। রাহি। বুকের থেকে পেটের দিকে ছোট করে লাফ দিল একটা মাছ। উড়ে গেল কিছু চড়াই। একটা লাল বল বেরিয়ে গেল ব্যাটের কোণ ছুঁয়ে। দুটো শ্বাস গলার কাছে আটকে গেল অল্প সময়ের জন্য। করবে ফোন?
কিন্তু কোন মুখে করবে? কিগান ওর নাম সুপারিশ করেছিল একটা কাজের জন্য, তার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কিচ্ছু করতে পারেনি। রাহি খুব ভাল মেয়ে, তাই বিশেষ কিছু বলেনি। কিন্তু মনে মনে কী ভেবেছে কে জানে! রুহান তো শুধু রাহিকে দেখবে বলে যায় আর সেই খেলার ব্যাপারে কিছু না বলে চলে আসে। তা, সেই মেয়েকে আচমকা, কী বলতে পারে ও? কী বলা উচিত? আদৌ বলতে পারে কি কিছু?
রুহান আবার ফোনের দিকে তাকাল। রাহি, নামটা এখনও হাইলাইটেড হয়ে আছে। একবার কথা বলতে ইচ্ছে করছে খুব। ও কিছু না ভেবেই কল বোতামটা টিপে দিল, আর সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল রুহানের। এই রে কল তো করে বসল, কিন্তু কী বলবে!
ওই কলার টিউন বাজছে, রবীন্দ্রনাথের গান। জোনাকি নিয়ে। কিন্তু কেটে গেল লাইনটা। একটু ঘাবড়ে আর একটু বিরক্ত হয়ে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে দেখল রুহান। ইউজার বিজি দেখাচ্ছে।
কেটে দিল! জাস্ট কেটে দিল লাইনটা? কী এমন করেছে রুহান যে, এমন ব্যবহার করল রাহি?
কলকাতা বড্ড নিস্তব্ধ আজ। মাঠটা ক্রমশ বড় হচ্ছে। তা হলে এই বড় মাঠটা ভেঙে কোথায় যাবে রুহান? কার কাছে গিয়ে বসবে একটু?
‘কিঁউ রুহান ভাইয়া! তব সে খড়ে কিঁউ হো?’
রুহান মুখ ফিরিয়ে দেখল যে, বলবন্ত ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ওদিকে খইনি ডলছে হাত দিয়ে।
‘না তো,’ রুহান অপ্রস্তুত হল, ‘আসলে…মানে… ইয়ে…’ রুহানের এই এক সমস্যা। সেই ছোট থেকেই প্রশ্নের সামনে পড়লে উত্তর গুলিয়ে যায়।
‘বটুক ভাইয়া বোল রহে থে, কী আপকো নিকাল দিয়া হ্যায় কেলাব সে। সচ হ্যায় কা ভাইয়া?’ বলবন্ত নিজের জায়গা থেকে দু’-চার পা হেঁটে এগিয়ে এল ওর দিকে।
‘বটুক!’ অবাক হল রুহান। ওঃ, তা হলে বটুক জানে! মানে ক্লাবের সবাই জানে? ও জানার আগেই জানে। বলবন্তও জানে? তা হলে বাকি রইল কে?
রুহান কথা ঘোরাতে বলল, ‘অন্যরা কি? লক্ষণ, শিউচরণ, যোগীন্দর?’
‘ওরা আছে। আপনি বোলেন না, সহি হ্যায় কা?’
বলবন্ত পুরনো দিনের লোক। বলা যায় স্টারের ঘরের লোক। ওর কাছে লুকিয়ে কী লাভ? রুহান বলল, ‘হ্যাঁ বলবন্তদা। আমি আর ক্লাবের কেউ নই গো।’
‘এত পুরনো লোককে নিকলিয়ে দিল! কৌনওদিন হামার পিছওয়াড়েপে ভি লাথ মারকে নিকাল দেঙ্গে। বহত চিন্তা কী বাত হ্যায় ভাইয়া। তুম কা কহতে হো? হম ছাপড়া লৌট যায়ে?’
‘আরে?’ রুহান এর ভেতরেও হাসল, ‘সত্যি মাইরি, তোমার আমার কেস এক নাকি? ফালতু ঝাড় হচ্ছে কিন্তু! আমি খেলতে পারছি না তাই বাদ দিয়েছে। তোমার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?’
‘সম্পর্ক নেই? শিয়োর?’ বলবন্ত পারলে গীতা ছুঁইয়ে সাক্ষী দেওয়ায়।
‘না রে বাবা। এত খইনি খেলে বুদ্ধি হবে কোত্থেকে? যাক, আমি আসি।’
‘আসবে? তো অর কভি আয়েঙ্গে নেহি কেলাব মে?’ বলবন্ত প্রশ্ন করল।
‘না, আর আসব না,’ রুহান কেটে কেটে বলল।
বলবন্ত দুঃখিত মুখে বলল, ‘বটুক ভাইয়া ভি কহ রহে থে।’
‘বটুক? কী বলছিল?’ রুহান ভুরু কুঁচকে তাকাল।
‘না, উও তো বদমাস হ্যায়। কুছ ভি বকতা হ্যায়।’
‘তাও,’ রুহান সটান তাকাল বলবন্তের দিকে।
‘বলছিল কী, নিকাল দে নে কে বাদ, ও তো আসবে না। কিস মুহ সে আয়েগা ও?’
‘বাদ দাও,’ রুহান হাসল। বা বলা যায় হাসির মতো ভঙ্গি করল। কোন মুখে আসবে? স্টারকে ও কি কোনও ম্যাচ জেতায়নি? ও কি চিরকাল এমন মার খাওয়া বোলার ছিল? এমন যে কেউ অপমান করতে পারত ওকে? হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল রুহানের। বাবা বলত, যে-মানুষ নিজেকে সম্মান করে না, সে সম্মান আদায়ও করতে পারে না। আজ কথাটার মানে বুঝল রুহান। রুহান নিজে ঠিক থাকলে আজ বলবন্তের থেকে এসব শুনতে হত?
‘আচ্ছা বলবন্তদা, আমি আসি। কাজ আছে,’ রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘ঠিক হ্যায়। লেকিন অগর জিন্দেগিমে কভি মৌকা মিলে তো উস বটুক কো ছোড় না নহি। বহুত গলত বোলতা হ্যায় ও।’
‘কেন? কী বলেছে? আমায় তো ও খারাপ কথা বলেই।’
‘আপকো নহি। মুঝে ভি।’ বলবন্ত মুখটা গোমড়া করে নিল, ‘শালা, বহেনকে, অগর ছাপড়া হোতা তো তোড় দেতে উসকো। হামি বোললাম, রুহান ভাইয়া আচ্ছা পিলিয়ার হ্যায়। আর ও শুনকে উসনে কাহা কি দরওয়ান হো, ওহি রহো, জাদা বাত মত্ করো। আরে, কাল কা লওন্ডা আর ইতনি বড়ি জুবান! আপ উসকো দিখা দে না কি ভালা আদমি কা হি জিত হোতা হ্যায়।’
‘বলবন্তদা, জীবন কি তোমার হিন্দি ছবি না ভোজপুরি সিনেমা? আমি তো চলে যাচ্ছি। আর ফিরব না। বটুক বেঙ্গল খেলছে। ইন্ডিয়া এ-তে সিলেক্টড হয়েছে। সিনিয়র টিমেও হবে। ফলে ভাল কে আর খারাপ কে, গুলিয়ে যাবে সব। আসলে সত্যি-মিথ্যে, ভাল-খারাপগুলো তো গুলিয়েই যায় সব আজকাল। সিনেমায় যা হয়, জীবনে তা তো হয় না বলবন্তদা। জীবনে কিছুই হয় না আজকাল। এখন হয় পারফর্ম, নয় পেরিশ। মাঝামাঝি কিছু নেই। কিছু হয় না। তাই এই সিনেমায় বটুক তোমায় অপমান করলেও সে জিতে যাবে। তুমিই একদিন তার সই নেওয়ার জন্য পিছনে পিছনে ঘুরবে। তার সঙ্গে তোমার আলাপ ছিল বলে লোকের কাছে গল্প করবে। এটাই জীবন বলবন্তদা। এটাই সিনেমার শেষ। যে সফল সে-ই বিজয়ী। মানুষ নয়, আমরা সাফল্য আর পুরস্কার ভালবাসি। আমরা মানুষকে মাপি তার মন, ব্যবহার দিয়ে নয়, তার রোজগার আর নাম দিয়ে। এখানে ভদ্রতা মানে দুর্বলতা। অসভ্যতাই হল কনফিডেন্স। বুঝেছ?’
বলবন্ত মাথা নাড়ল, ‘একটু একটু। ইংরেজি তো জানি না। পর ঠিক হ্যায়। তুম কভি হিম্মত না হার না। অর আতে রহনা কিলাব মে।’
হাসল রুহান, ‘ঠিক হ্যায়। আসি। আবার একদিন দেখা হবে।’
‘জরুর,’ হাসল বলবন্ত। হাত দুটো কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘রাম, রাম।’
কলকাতায় এই ময়দানটা না থাকলে কী হত? এটাকে কলকাতার ফুসফুস বলা হয়। আসলে, রুহানের মনে হয়, এটা ফুসফুস নয়, ভোমরা। কলকাতার প্রাণভোমরা। এটাকে মেরে ফেললে কলকাতাও শেষ।
মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠল রুহান। আজ আর অফিস যাবে না। ইচ্ছে করছে না। তা ছাড়া পকেটে টাকা আছে অনেক। চেক হলেও। যদি হারিয়ে যায়! রুহান জানে আজকের বাজারে এই টাকার কোনও মূল্য নেই। তবু ওই টাকাটা রুহানের কাছে অনেক। ওর হিসেবমতো যদিও দেড় লাখ টাকা ওর পাওনা, তবু যা পাওয়া গেছে তাই অনেক। সুখেনদা তো চাকরি জুটিয়ে দিয়েছে একটা। ক’জন দেয়? আর সেখানে জিয়ানা খুব হেল্প করছে ওকে। এতদিনে পার্মানেন্ট হয়ে যাওয়া উচিত ছিল হয়তো রুহানের। তবু, না হলেও, জিয়ানা ওকে আশ্বস্ত করেছে যে, ওর কোনও ভয় নেই।
ভয়? আর ভয় পায় না রুহান। বাবা, নন্দা, ক্রিকেট—সব হারিয়ে গিয়েছে ওর জীবন থেকে। যা-কিছু ওর শক্তি ছিল, যা-কিছু আনন্দ আর গর্ব ছিল, সব চলে গেছে। কষ্ট আর ভয় পেতে পেতে মানুষ একসময় সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রুহানও হয়ে গেছে। এই কোম্পানিতে যতদিন আছে রুহান, আছে, যেদিন রাখবে না, চলে যাবে। অন্য কোথাও কাজ খুঁজবে। আবেশও তো বেঁচে আছে। তবে ও কেন পারবে না? খুব পারবে। ঠিক পারবে।
আবেশ! আবার মাথার ভেতর চলকে উঠল রাহির নাম। কেন ফোন ধরল না রাহি? যেদিন শেষ ও চাপাডাঙায় গিয়েছিল জিয়ানার সঙ্গে, সেদিনও ফ্যাক্টরিতে কাজ শেষ করে একবার রাহিকে ফোন করেছিল রুহান। রাহি ফোন তোলেনি। ফোন বেজে বেজে থেমে গিয়েছিল দু’বার। কেন ফোন তোলেনি রাহি? কেন তুলছে না ও? ওই একটা ফোনের জন্য কি? ওই ফোনটা ধরেই কি বসে রয়েছে রাহি?
আসলে সেদিন যে কী হয়েছিল। রুহান কেন অমন বলেছিল। কষ্ট হচ্ছিল বলে কি? মা সেদিন খুব খারাপ কথাগুলো বলেছিল বলেই ভেতরে ভেতরে নড়ে গিয়েছিল রুহান? আলগা হয়ে গিয়েছিল ইমোশন? তাই কি অমন বোকামো করেছিল?
কাকিমার জন্য বাজার করে দিয়েছিল রুহান। তাই ভীষণ রেগে গিয়েছিল মা। রবিবার ছিল সেটা। ককাই গিয়েছিল ডেকরেটিং-এর কাজে। কাকিমার জ্বর ছিল খুব। তাই সামান্য কিছু বাজার এনে দিয়েছিল রুহান। কাকিমাদের রান্নার মাসি গুছিয়ে তুলছিল বাজারগুলো, ঠিক তখনই মায়ের চিৎকার শুনেছিল রুহান।
মা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিল, ‘তুই কি ওদের বাজার সরকার? ওদের বাজার করে দিয়েছিস কেন তুই? আমার সংসারের কিছু আনতে বললে তো তখন বাহানা দেখাস। আর এখন?’
‘মা,’ রুহান দৌড়ে গিয়েছিল মায়ের কাছে, ‘এসব বলছ কেন? চলো ওপরে চলো।’
‘কেন? সিঁড়িটা কি কারও বাপের?’
কাকিমা জ্বর গায়েই বেরিয়ে এসেছিল বারান্দায়। বলেছিল, ‘দিদি, আমার ভুল হয়ে গেছে, তুমি রাগ কোরো না।’
‘ভুল তোর হয়নি খেয়া, আমার হয়েছে। এমন ঘরের শত্রু বিভীষণকে কোন আক্কেলে পেটে ধরেছিলাম আমি? বেশ করেছে তোকে বাজার করে দিয়েছে। কিন্তু নিজের মায়ের জন্যও তো কিছু করবে। কিছু করে ও? কিচ্ছু করে? অপদার্থ একটা!’
‘মা,’ রুহান মাকে চুপ করাতে বলেছিল, ‘এমন বোলো না। আমায় কী করতে হবে বলো, করব। তোমার জন্যই তো করব। আর কার জন্য করব?’
‘কেন, দুনিয়ার সব লোক পড়ে রয়েছে। সবাই পড়ে রয়েছে, কর তাদের জন্য। আমার জন্য কিচ্ছু করতে হবে না।’
মা দুমদাম করে পা ফেলে চলে গিয়েছিল ওপরে। রুহানও গিয়েছিল পিছন পিছন। তবে মা পাত্তা দেয়নি। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল দুম করে। রুহানের শত ডাকাডাকিতেও খোলেনি। বরং চিৎকার করে রুহানের বাবার নাম ধরে বিলাপ করতে শুরু করেছিল। বলছিল, রুহান কতটা অযোগ্য। কতটা নিষ্কর্মা। মাকে কত কষ্টে রাখে। একটা রান্নার লোক পর্যন্ত রাখতে পারে না। মাকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পর্যন্ত নিয়ে যায় না। শুধু বাড়িতে রেখে ঝি-গিরি করায়। জঘন্য ছেলে রুহান। শুধু লোকের কাজ করে দিয়ে নাম কিনতে চায়। কোনওদিন, কোনওদিন কিচ্ছু করেনি মায়ের জন্য। এই যে মায়ের এত শরীর খারাপ, তাতে রুহানের হুঁশ নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি।
রুহানের কষ্টটা একসময় বিরক্তিতে পরিণত হয়েছিল। মা এমন বলছে! মায়ের জন্য কিছু করেনি ও? কিডনির যখন প্রবলেম হল, যখন ইউটেরাস বাদ গেল, কে দিল অত টাকা? কে জোগাড় করল? বাবার জমানো টাকা তো প্রায় কিছুই ছিল না। তা হলে, কে আনল টাকা? চিকিৎসা করাল কে? মা কি একবারও জানতে চেয়েছে রুহান কোত্থেকে এত টাকা পেল? কে দিল? চায়নি। কেন? মা শুধু নিজের দিকটাই দেখে, রুহানের দিকটা দেখে না একদম। শুধু নিজের ইগো নিয়ে বসে থাকে। রুহান নিজের ঘরে গিয়ে বসেছিল। আর ঠিক তখনই ফোনটা এসেছিল।
বাসটায় ভিড় নেই বিশেষ। উঠে জানালার ধারের সিট অনায়সে পেয়ে গেল রুহান। কলকাতায় এই নতুন বাসগুলো খুব সুন্দর। ইয়াব্বড় কাচ লাগানো। সিট থেকে হ্যান্ডেল সব ঝকঝকে। মানুষজনও যেন এমন বাসে উঠলে সভ্য হয়ে যায়। রুহানের মনে হয় পকেটমারেরাও এমন বাসে উঠলে ভদ্রভাবে অনুমতি নেবে পকেট মারার আগে। সব দিকেই একটা কেমন যেন ঝকঝকে ভাব এসেছে। কলকাতা বলে মনে হয় না। যদিও অনেকে বলে কার্পেটের তলায় প্রচুর নোংরা, তবু কার্পেটের ওপরটা অনেক পরিষ্কার হয়েছে। রুহান কলকাতা দেখতে দেখতে চলতে লাগল। আর হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। আরে ওটা রাহি না? তাই তো, রাহিই তো। কী করছে রাহি এখানে? বাসটা চলছে, তবু প্রায় লাফ দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে বাস থামাতে বলল কন্ডাক্টরকে। রুহানের চেহারার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে, কন্ডাক্টর থামাল বাসটা। রুহান নেমেই দৌড়োল উলটো দিকে। রাহিকে দেখেছে স্পষ্ট। ভুল হতেই পারে না। ওরা কি পার্ক স্ট্রিটে যাচ্ছে? না কি অন্য কোথাও? রাহি কলকাতায় এসেছে আর একবারও তো তা জানায়নি রুহানকে? সেই ফোনটাই কি দায়ী? সেই জন্যই কি এমন করছে রাহি? নিশ্চয়ই তাই।
‘হ্যালো, রুহান?’ রাহির গলাটা সেদিন উড়ে আসা পালকের মতো করে এসেছিল রুহানের দিকে।
‘হ্যাঁ,’ রুহানের গলা খুব শক্ত হয়ে ছিল।
‘তোমায় ফোন করেছিলাম, কারণ ওই ম্যাচটার জন্য।’
‘ম্যাচ?’ রুহানের রাগ হচ্ছিল, ‘আমি কী করব?’
‘মানে, কী করবে মানে?’ রাহির গলায় বিস্ময়।
‘মানে, কী করব? আমি কী করব?’ রুহানের মাথায় আগুন জ্বলছিল। রাহি সবসময় কাজের জন্যই ফোন করে কেন? ওর কি অন্য কারণে ফোন করতে নেই? ও কি রুহানের গলা শুনে বুঝতে পারছে না যে, ও কতটা কষ্টে আছে? বুঝতে পারছে না যে, রুহানের মনখারাপ? কেন পারছে না বুঝতে?
‘তুমি কী করবে মানে?’ রাহির বিস্ময় বাড়ছিল, ‘তুমি যে বললে দেখবে! কিগানদার কথায় তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম আর তুমি বলছ, কী করবে?’
‘আমি বলেছিলাম যোগাযোগ করতে? বলেছিলাম যে কাজটা করে দেবই? তবে? কেন এমন বলছ তুমি? আমি কি সবার কাছে দাসখত লিখে দিয়েছি নাকি যে, সবার হয়ে এটা-ওটা করে বেড়াব?’
‘কী বলছ তুমি? আমি কী বললাম?’ রাহি ঘাবড়ে গিয়েছিল।
‘তুমি? তুমি কী বলবে? আমি জানি কে কী বলতে পারে। সবাই আসে আর ফর্দ ধরিয়ে দেয় হাতে। আমি মানুষ নই? আমায় কী মনে হয় তোমার? যেমন খুশি বললেই হল? আমি মানুষ নই?’
‘আরে, কী বলছ তুমি? আমি তো জাস্ট ম্যাচ…’
‘পারব না। কিচ্ছু পারব না,’ ফোনটা কেটে দিয়েছিল রুহান।
ফোনটা কেটে দু’মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসেছিল রুহান। আর তারপরেই মাথার ভেতর ঘণ্টা পেটার মতো শব্দ শুনেছিল ও। এই সেরেছে, এটা কী করেছে ও? কার ওপরের রাগ কার ওপর দেখাল? আর তারপর কীসব হাবিজাবি কথা বলল? কেন বলল ও? রুহান তো সত্যিই নিজে বলেছিল যে ও করে দেবে কাজটা। আর এখন তা হলে এমন অসভ্যের মতো বলল কেন? ছিঃ ছিঃ। নিজের গালে থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করছিল রুহানের। মনে পড়ছিল রাহির ওই ভাঁজপড়া থুতনি, অভিমানী চোখ। মেয়েটা কি কাঁদছে এখন? কারণ ছাড়া কথা শুনতে কার ভাল লাগে? আর রুহানের বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, ও এমন করেছে। এমন অসভ্যতা যে ও করতে পারে তা যেন নতুন করে শিখেছিল নিজেই। ও তড়িঘড়ি ফোনটা নিয়েছিল। কিন্তু ফোন করবে কি? কোন মুখে করবে? ও অনেক চিন্তা করে একটা এসএমএস লিখেছিল। লিখেছিল যে, ওর মাথার ঠিক নেই। তাই খুব অন্যায় কথা বলেছে। ও নিঃশর্তে ক্ষমা চাইছে।
এসএমএস-টা পাঠিয়ে চুপ করে বসে ছিল রুহান। মায়ের ঘরের ভেতর থেকে ফোঁপানোর শব্দ আসছিল। আর মোবাইল থেকে কিচ্ছু আসছিল না। লজ্জায়, খারাপ লাগায় আর কষ্টে শীতেও দরদর করে ঘামছিল রুহান। ডিসেম্বরের শেষে যে অমন কেউ ঘামতে পারে রুহান এটাও জানত না। তবে ফোন আসেনি। মেসেজের রিপ্লাই আসেনি। বরং অদ্ভুত এক তাচ্ছিল্য যেন ভেসে আসছিল নৈঃশব্দ্য দিয়ে। মরমে মরে যাচ্ছিল রুহান। ও স্থির হয়ে বসেছিল খানিক। তারপর বালি ভরতি গলা আর চড়াইপাখি ভরতি বুক নিয়ে রাহির নম্বরটা ডায়াল করেছিল। ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরে বসে ছিল।
বন্ধ করে রেখেছে ফোন! গলার বালি ফাটিয়ে কাঁকড়া বেরিয়ে এসেছিল। বুকের চড়াইগুলো কী করে যেন বদলে গিয়েছিল শকুনে। রাহি বন্ধ করে রেখেছে মোবাইল!
সেই শুরু তারপর থেকে রাহিকে আর কিছুতেই ফোনে যোগাযোগ করতে পারছে না রুহান। হয় ফোন বন্ধ, নয়তো রিং হয়ে হয়ে কেটে যাচ্ছে। রাহি ফোন ধরছে না কিছুতেই। কী যে বোকামো করেছে রুহান! নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে ওর। আর ঘটনাটা কিগানকেও বলতে পারছে না। বললে কিগান প্রচণ্ড বকবে। দেখা হলে চড়থাপ্পড় মারতেও পারে। আর কিগানের গায়ে যা জোর। একবার দেখেছিল রুহান। বিশাল কাঠের জামাকাপড় ঠাসা আলমারি একা সরিয়ে দিয়েছিল ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ওই জোর নিয়ে যদি একটা মারে তা হলে দেখতে হবে না রুহানকে। তবে হ্যাঁ, ভয়ও ছিল রুহানের। রাহি আবার বলে দেবে না তো? তাই সেই ঘটনার পরে যখন প্রথমবার কিগান ফোন করেছিল, খুব ভয়ের সঙ্গে ফোন ধরেছিল রুহান। তবে, না কিগান সেসব প্রসঙ্গ তোলেইনি। তখন গিল্টি ফিলিং থেকে একবার মনে হয়েছিল রুহানের যে, কিগানকে বলে। কিন্তু পরক্ষণেই মত বদলেছিল। কিগানের বকুনি শুধু নয়, মনে হয়েছিল যে রাহির সঙ্গে অমন অসভ্যতা করা মানে আসলে কিগানের বিশ্বাস ভাঙা। মানে কিগানের মুখে থাপ্পড় মারা। তাই কিগানকেও কিচ্ছু বলা হয়নি।
শীতের কলকাতা ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। ফুটপাথের চায়ের দোকান। একটা ভিখিরি। বাস স্টপে আগুপিছু করা ভিড়। আর মাথার ওপর ধুলো-ময়লায় আবছা হয়ে যাওয়া একটা রংচটা নীল আকাশ। মানুষের রঙিন জামাকাপড়ের ফাঁকে কোথায় গেল রাহি? রুহান যে স্পষ্ট দেখল। এতটা ভুল দেখবে ও? রাহি একটা জিন্স আর পুলওভার পরে হাঁটছিল। মাথার চুল হর্সটেল করা ছিল। অমন বাদামি চুল, ভাঁজপড়া থুতনি, এতটা ভুল করবে রুহান? পাগল নাকি? কিন্তু সত্যি দেখলে, গেল কোথায়? চারদিকে শীতের নিভে আসা দুপুরে শ্লথ মানুষদের যাতায়াত।
‘কী রে তুই?’ রুহান ঘাবড়ে গেল। আবেশ।
‘তুই?’ রুহান জিজ্ঞেস করল পালটা।
‘আমি কাজে এসেছি। মামার বাড়িতে দরকার ছিল। আর তারপর মার্চেন্টের অফিসে গিয়েছিলাম।’
রুহান কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই সময় ফোনটা বেজে উঠল ওর। বিরক্ত লাগল, কে এখন আবার? লোকজন আর ফোনের সময় পায় না। ফোনটা বের করে একবার থমকাল রুহান। বুকুদা! ধরবে? ইতস্তত করতে লাগল রুহান।
‘ফোনটা ধর। সব জায়গায় ছড়াস না। তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’ আবেশের গলাটা কেমন যেন অচেনা লাগল।
‘কী কথা?’ রুহান দেখল রিং হয়েই চলেছে ফোনে।
‘বলছি, আগে ফোনটা ধর।’
ফোনটা ধরল রুহান, ‘হ্যালো?’
‘নন্দার সঙ্গে তুই কী করেছিস রুহান?’ বুকুদার গলাটা ভোঁতা অস্ত্রের মতো এসে লাগল রুহানের কানে।
নন্দা? নন্দার কথা বুকুদা জানল কী করে? তা হলে কি… তা হলে কি বুকুদা গেছে সেইখানে?
শীতের বিকেল ফেনার বুদবুদে চড়ে নামছে কলকাতায়। রুক্ষ খড়ি ওঠা পথঘাট। উত্তরের খিটখিটে হাওয়া। সেফটিপিন আটকানো মানুষজন সব হঠাৎ উবে গেল রুহানের সামনে থেকে।
কী বলছে বুকুদা? সেই দিনের ঘটনার পর এই প্রতিদান? ওকে প্রশ্ন করছে বুকুদা? নিশ্চয়ই বলা হয়েছে বুকুদাকে, না হলে জানবে কেমন করে? বুকুদার প্রশ্নের ভেতরই তো অবিশ্বাস লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে রয়েছে রাগ। বুকুদা চেনে না রুহানকে? খারাপ কিছু কি করতে পারে ও? তবু এই গলায় কেন কথা বলছে বুকুদা? কেন ক্ষত জায়গায় আরও বেশি করে ক্ষত তৈরি করছে?
‘ছিঃ, হান এটা এক্সপেক্ট করিনি তোর থেকে।’
রুহান দেখল ওর জবাবের অপেক্ষা না করে ফোনটা কেটে দিল বুকুদা। রাগ, মানুষকে ফোন কাটিয়ে দেয়। বিচ্ছিন্ন করে দেয় অপর মানুষের থেকে।
Chapter - 26
২৬
আচমকা গত সাতদিন ধরে শীত পড়েছে কলকাতায়। সামনে সরস্বতী পুজো। অন্যান্যবার এসময় এতটা ঠান্ডা পড়ে না। কিন্তু এবার হঠাৎই শীত পড়ল। যদিও মাঘ মাস, তবু বাঘের গায়ে কাঁটা ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা আর পড়ে না আজকাল। শীতকাল যেন শুধু লোকগাথায় আর যশ চোপড়ার ছবির লোকেশনের ভেতরেই আবদ্ধ হয়ে আছে। তাই গত সপ্তাহ ধরে নেমে আসা আচমকা ঠান্ডায় জিয়ানা বেশ অবাকই হয়েছে।
যখন বিদেশে থাকত, তখন ও ভাল করে টের পেয়েছে, কাকে শীত বলে। আর এখানে ঠান্ডা লাগেই না ওর। তবে এই যে হঠাৎ ঠান্ডা, এটা বেশ উপভোগ করছে জিয়ানা।
শীতে কলকাতা বেশ রঙিন হয়ে ওঠে। গাড়িতে বসে চারদিকে নানা রঙের রং দেখতে পাচ্ছে জিয়ানা। দূরে পেনসিলের মতো শহিদ মিনারের মাথার ওপরও শেষ আলোর রঙে সন্ধে হচ্ছে। দিন নিভে আসছে শহরে।
আজকাল কখনও কখনও চাপাডাঙায় যেতে হয় জিয়ানাকে, তাই খুরানা ওর জন্য গাড়ি দিয়েছেন। ফলে নিজের গাড়িটা বের করে শুধুমাত্র শহরে থাকলে। আজ যেমন শ্যামবাজারের কাছে কনসালট্যান্টদের অফিসে মিটিং ছিল বলে নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল। মিটিং সেরে এখন অফিসে ফিরছে জিয়ানা। খুরানা অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
এই মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের কাজটা নিয়ে প্রথম থেকেই নানা ধানাইপানাই চলছে। এই কাজ হচ্ছে, তো এই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই মনে হচ্ছে এবার প্রাইস ফাইনালাইজ হবে, তো তারপরেই আবার আটকে যাচ্ছে। আসলে জমি নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছে বলে প্রজেক্ট আটকে আছে। কিন্তু এবার খুরানা বলছেন যে কাজ হবেই। খবর নাকি আছে যে, মার্চেন্ট মাল্টিপল্স এবার পুরো ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রজেক্টের জন্য। জার্মান কোন এক কোম্পানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যাচ্ছে ওরা। আর সেই জার্মান কোম্পানি নাকি বলেছে যে চাপাডাঙার এই প্রজেক্ট আর তার সঙ্গে ঝামেলা না মিটলে তারা কাজ করবে না। কারণ, মার্চেন্টের রেপুটেশন যদি খারাপ হয়, তার প্রভাব পড়বে ওদের ওপর। প্রজেক্টের প্রচুর ইন্সট্রুমেনটেশনের কাজ রয়েছে। তার স্পেসিফিকেশনের জন্য গন্ডগোল হচ্ছে। আর তাই নিয়ে আজ একটা ডিসকাশন ছিল জিয়ানার সঙ্গে ওদের। মিটিং-এ ললিতও ছিল। তবে মিটিং থেকে বেরিয়ে ললিত চলে গিয়েছে সুকিয়া স্ট্রিটে নিজের পার্সোনাল কীসব কাজ আছে বলে। দিঘি নামে যে-মেয়েটার সঙ্গে একবার একটা পার্টিতে আলাপ হয়েছিল, তারা থাকে সেখানে। তাদের কীসব প্রবলেম হয়েছে যেন। ললিত ডিটেলে কিছু বলেনি, আর পারিবারিক ব্যাপার বলে জিয়ানাও জোর দিয়ে কিছু জানতে চায়নি। তবে ললিতের মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছিল যে সমস্যাটা গুরুতর।
আজ রুহান নেই সঙ্গে। বম্বে রোডের ওপর একটা কাজ চলছে। তার জন্য কিছু মাল দিয়ে ওকে পাঠানো হয়েছে সাইটে। আসলে রুহানের ওর সঙ্গে থাকাটা অফিসের অনেকেই ভাল চোখে দেখছে না। ললিত বলছিল ওকে। বলছিল, ‘জিয়ানা, তুমি রুহানকে অন্য কাজের জন্যও ছাড়ো মাঝে মাঝে। অফিসে এই নিয়ে কথা হচ্ছে।’
‘কথা হচ্ছে? মানে?’ জিয়ানা সেদিন নিজের ডেস্কে বসে একটা ফাইল ওলটাচ্ছিল। ফাইলটা বন্ধ করে ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ললিতের দিকে।
‘মানে, অন্যরা একটু ডিসকাস করছে এই নিয়ে। বলছে যে, চামচা ছাড়া নাকি জিয়ানা আজকাল নড়তে পারে না।’
‘চামচা! আর তুমি সেসব আমায় বলছ?’
‘শোনো, ভালর জন্যই বলছি। এই যে বেশ কিছুদিন আগে প্রায় গোটা সেল্স টিমটাকে ওয়াটার বার্ডস ছোঁ মেরে তুলে নিল, তাতে খুরানার ওপর ভাল চটেছে বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স। তারপর গত এক বছরে নতুন রিক্রুটরাও ভাল কাজ করতে পারছে না। বিজনেস ফল করেছে। সব মিলিয়ে অবস্থা ভাল নয় একদম। তার কোপটা এসে কিন্তু প্রথমে পড়বে খুরানা তারপর অন্যান্যদের ওপর।’
‘মানে? কোপ মানে?’
‘মার্চেন্টের এই কাজটা না পেলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে। খুরানা আর আমাদের ওপর চাপ আসবে পুরোটা, কারণ কাজটা পারস্যু করছি আমরা।’
‘তো? এই কাজগুলো তো লাইক গেম। ইউ উইন সাম, ইউ লুজ সাম।’
‘আমাদের লুজটা একটু বেশিই হচ্ছে কিনা, তাই সমস্যাটা বেশি।’
‘তো? উপায়?’ জিয়ানা একটু অবাক হয়েছিল।
‘জানো তো, খারাপ সময়ে ছোটখাটো জিনিসগুলোকেও বড় করে দেখানো হয়। তাই বলছি আপাতত রুহানকে একটু ঢিলে দাও। তারপর কাজটা পাওয়ার চেষ্টা করো।’
কলকাতার সিগনালগুলো খুব অদ্ভুত হয়। অনেকক্ষণ ধরে এক রং নিয়ে প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে থাকে। যেমন লাল আলোটা তখন থেকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টে। ফুটপাথের কোনায় তারের জালের একটা খুপরিতে বসে থাকে ট্রাফিক পুলিশ। সেও কি ঘুমিয়ে পড়ে? জিয়ানার গাড়ি নিয়ে সিগনালে আটকালেই রাগ হয়। আর তারপর সিগনাল পেলেও আর-এক সমস্যা। এই শহরটার লোকজন এত ব্যস্ত যে, এক ফুটপাথ থেকে অন্য ফুটপাথে পৌঁছোনোর জন্য এরা আকুল হয়ে ওঠে। তাই চলন্ত গাড়ির ফাঁকফোকরের মধ্যেও লোকজন প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের গুঁজে দেয়। এই ধাক্কা লেগে যায় লেগে যায় অবস্থা। কলকাতায় গাড়ি চালানো যে কী সমস্যা তা বোঝে জিয়ানা। কনসেনট্রেট করতে করতে মাথা পুরো ধরে যায়।
সিগনালটা এতক্ষণে খোলা পেল জিয়ানা। গাড়িটা নিয়ে কাটাতে কাটাতে এগোতে লাগল কলকাতার ভিড়ে। কষ্ট হয় জিয়ানার, কেন জানে না কিন্তু আজকাল স্ট্রেস নিতে কষ্ট হয় খুব। গাড়ি চালানোটা ওর কাছে একটা স্ট্রেস। কিন্তু বুকুর কাছে নয়। ও গাড়ি চালাতে খুব ভালবাসে। এবার একটা হুডখোলা গাড়ি কিনতে চায়। কথাটা বুকুই বলেছে। আজকাল বুকু বেশ বদলে গেছে। কেমন যেন এলোমেলো আর মিশুকে হয়েছে আজকাল। সেই দিনের পর থেকে বুকুর ভেতর থেকে যেন একটা নতুন মানুষ বেরিয়ে এসেছে। আসলে বিয়ের পর থেকে বুকু তো এমন নয়। চিরকালই ও একটু গম্ভীর ছিল। কিন্তু সেই দিনটার পর বুকু পালটে গেছে।
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জিয়ানা কিন্তু প্রথমে বুঝতে পারেনি। বরং দরজার কাছে বুকুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল বুকু কি শুনে ফেলল কিছু? জেনে ফেলল কোনও কথা? জিয়ানা বুঝেছিল যে, নিজের সংসার ওর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
‘কী ব্যাপার?’ বুকু বিস্মিত হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
‘না… মানে…’ মা ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছিল।
‘না, জিয়ানাকে আপসেট দেখাচ্ছে। আর আমার কী জানার ছিল?’
‘কিছু না, পেটি ম্যাটার্স’ জিয়ানা নিজেকে সামলে নিয়েছিল।
‘না, আই থিঙ্ক, সামথিং সিরিয়াস,’ বুকু স্থির হয়ে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
‘না রে বাবা, তেমন কিছু নয়,’ জিয়ানা বিছানা থেকে উঠে আর দাঁড়িয়ে থাকেনি, আবার বেরিয়ে গিয়েছিল বারান্দায়।
তবে ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়নি। বাড়িতে ফিরে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর শাশুড়ির ঘর থেকে ফিরে দেখেছিল বুকু ল্যাপটপ নিয়ে বসে ছিল বিছানায়। তুতুল অন্য দিন নিজের ঘরে শুতে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় বুকুর সঙ্গে খেলা করে। কিন্তু সেদিন ঘোরাঘুরির জন্যই ক্লান্ত ছিল, আর তাই ঘুমিয়ে পড়েছিল আগে।
জিয়ানা শুতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন কিছুটা সময় কাটায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। কিন্তু সেদিন কাটায়নি। ফেসওয়াশ দিয়ে আগেই মুখ ধুয়ে এসেছিল। এবার শুধু ময়েশ্চারাইজার দিয়ে মুখটা আর্দ্র করে শুতে চলে গিয়েছিল বিছানায়।
বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই ও শুনেছিল বুকু বলছে, ‘নট সো ফাস্ট।’
‘মানে?’ জিয়ানা ঘুরে তাকিয়েছিল বুকুর দিকে।
বুকু ল্যাপটপটা বন্ধ করে পাশের টেবিলে রেখে একটা বালিশ কোলে নিয়ে বসেছিল। বলেছিল, ‘বলো এবার। আমার কী জানা উচিত।’
‘মানে?’ আবার প্রশ্ন করেছিল জিয়ানা।
‘হোয়াট ওয়্যার ইউ টকিং অ্যাবাউট। ডোন্ট থিঙ্ক আয়াম ডাম। তোমার মায়ের বাড়িতে কথা বাড়াইনি। কিন্তু এবার বলো। দশ বছরের বেশি বিয়ে হয়েছে আমাদের। কোন কথাটা জানা বাকি আমার?’
জিয়ানা বসে ছিল চুপ করে। এ যেন নতুন পরীক্ষা। এ যেন আবার সিন্দুকের চাবি খুলে বের করে আনা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ম্যাপ। যেন সেই ম্যাপ ধরে এগিয়ে যাওয়া জঙ্গল থেকে আরও গভীরতর জঙ্গলের দিকে।
‘কী হল আনা, বলো,’ বুকু স্থির গলায় বলেছিল, ‘দেখি, তোমায় নতুন করে জানতে পারি কিনা।’
‘কী বলব?’ জিয়ানা ঠিক গোছাতে পারছিল না নিজেকে।
‘তোমার মা অমন মুখ করে বসেছিলেন কেন আনা? তুমিই বা ছলছলে চোখে কেন তাকিয়েছিলে? কেন মাঝে মাঝেই তুমি আনমনা হয়ে যাও? কার কথা চিন্তা করে তোমার চোখে জল চলে আসে? মাঝরাতে কাকে মনে করে তুমি আঁকড়ে ধরো আমায়? তারপর ঘুম ভেঙে আমায় ছেড়ে দাও? কে অলক্ষ্যে রোজ তোমায় এসে দুঃখ দিয়ে যায় আনা? কাকে তুমি আমার থেকে লুকিয়ে রেখেছ? বলো আনা, বন্ধু হিসেবেই বলো। আমাদের যা হওয়ার ছিল হয়েছে। স্বামী বা স্ত্রী হওয়া আমাদের হল না। কিন্তু বন্ধু তো হওয়াই যায়, না?’
‘বন্ধু?’ জিয়ানা অবাক হয়েছিল, ‘তুমি তো একা থাকো। একা মানুষ। তুমি আমার বন্ধু হবে কেমন করে?’
‘আমি একা থাকি, ঠিক। কিন্তু জানো, একা থাকতে ভাল লাগে না আমার। কষ্ট হয়। আমি চিন্তা করে দেখেছি, আমরা যখনই কোনও আনন্দের স্মৃতির কথা ভাবি, সেটা কিন্তু কখনও কোনও একা উপলব্ধি করা ঘটনা হয় না। সবসময় সেটা অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কোনও মুহূর্ত হয়। মুহূর্ত। এমন অসংখ্য মুহূর্ত দিয়েই তো জীবন, মানে সুস্থ জীবন, আনন্দের জীবন তৈরি হয় আনা। একা জীবন তো আনন্দের নয়। আমিও আনন্দে থাকি না। আজ তোমায়, মায়ের সঙ্গে অমন মুখ করে কথা বলতে দেখার পর সারাদিন অনেক ভেবেছি আমি। দেখলাম, স্বামী তো দূরের কথা, কিছুই হতে পারিনি আমি। তাই ভাবলাম, সবচেয়ে কঠিন জিনিসটা চেষ্টা করা যাক একেবারে। বন্ধু। বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করা যাক। জানি সবচেয়ে কঠিন এটা। কিন্তু বিনয়কৃষ্ণ বোস কবে সহজ জিনিস ট্রাই করেছে?’
অবাক হয়ে বুকুর দিকে তাকিয়েছিল জিয়ানা। এটা কি বুকু? ওর চেনা বুকু? এত কথা একসঙ্গে বলতে পারে ও? তাও এমনভাবে? ও বলেছিল, ‘কিন্তু কী বলব তোমায়?’
বুকু হেসেছিল সামান্য। গালে হাত ঘষে বলেছিল, ‘আচ্ছা, সহজ করে দিচ্ছি না হয়। আনা, কে সেই ছেলেটা?’
ধক করে উঠেছিল জিয়ানার বুকটা। আর-এক মুহূর্তের জন্য ওর মনে পড়ে গিয়েছিল সেই নীল রঙের চোখ। উসকোখুসকো চুল। কুয়াশার ঝাঁঝরির মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া গোলাপি মাফলার।
‘কে ছেলেটা জিয়ানা? কার কথা মনে করলে আজও কাঁদো তুমি?’
‘কাঁদি না বুকু। ইচ্ছে করে কাঁদি না। চোখে মাঝে মাঝে জল চলে আসে। সত্যি বলছি, ইচ্ছে করে নয়। এমনি আসে।’
‘তুমি ভালবাসতে তাকে?’
‘আমি?’ জিয়ানা টালুমালু চোখে তাকিয়েছিল বুকুর দিকে, ‘জানি না সঠিক। আসলে ও আমায় ভালবাসত খুব। আমারও ভাল লাগত। বেশ ভাল লাগত, কিন্তু…’ জিয়ানা অবাক হয়ে দেখছিল নিজেকে। কী চায় ও? বুকুর কাছে ভাল হতে? বুকু যাতে কষ্ট না পায়? নাকি তুতুলের জন্য এমন ডিপ্লোম্যাট হচ্ছে ও? কেন এমন রেখেঢেকে কথা বলছে?
‘কিন্তু?’ বুকু সামান্য হেসে ঝুঁকে বসেছিল, ‘কিন্তু কী আনা?’
‘আমি যদি ভালবাসতাম তবে তোমায় বিয়ে করতে রাজি হতাম না। আর জানো, আমি ভেবেছিলাম ও আমায় ভুলে যাবে। বিয়ে করে সংসার পাতবে। কিন্তু…’ জিয়ানা অবাক হয়ে যাচ্ছিল নিজেকে দেখে। ও যে ভালবাসত কিগানকে সেটা স্বীকার করছে না একবারও!
‘আবার কিন্তু?’ বুকু এবার হেসে উঠেছিল জোরে। এটা কোন বুকু? চিনতে পারছিল না জিয়ানা। ভয় লাগছিল ওর। বুকু এমন করে কথা বলছে কেন? ও চুপ করে তাকিয়েছিল বালিশের দিকে। বুকু বলেছিল, ‘তোমার আবার সেই ছেলেটার সঙ্গে এখন দেখা হয়েছে, না?’
কার পার্কে গাড়িটা রেখে বেরোল জিয়ানা। এই বিকেলের শেষ সময়টায় লিফ্টের সামনেটা ফাঁকাই থাকে। গাড়িটা লক করে চাবিটা রাখতে ব্যাগ খুলতেই ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। এমন সময় কে? জিয়ানা দেখল ফোনটা। মা!
মা আর বাপি আজ এসেছে ওদের বাড়িতে। থাকবে। আসলে কাল মায়ের একটা ডাক্তার দেখানোর আছে ওদের বাড়ির কাছে। মায়ের হাঁটুর সমস্যা হচ্ছে একটা। তাই দেখানোটা প্রয়োজন। কাল সকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
তা হঠাৎ মা ফোন করল কেন? জিয়ানা ফোনটা ধরল, ‘বলো, মা?’
‘অলিভ অয়েল নেই রে বাড়িতে? খুঁজছি, কোথাও পাচ্ছি না।’
‘অলিভ অয়েল! কী হবে?’ অবাক হল জিয়ানা।
‘রান্নায় লাগবে। বুকু খেতে পছন্দ করে এমন একটা পদ রাঁধব।’
‘কী রান্না যে অলিভ অয়েল লাগবে?’
‘ওফ, জীবনে রান্না করেছিস তুই যে, জানবি? তা কখন আসবি তুই?’
‘আমি?’ জিয়ানা ঘড়ি দেখল, ‘জানি না। বসের সঙ্গে মিটিং আছে। আটটা হবে। কেন?’
‘এক বোতল অলিভ অয়েল আনিস না।’
‘অলিভ অয়েল! অত রাতে? যদি না পাই? বা ভুলে যাই?’ জিয়ানা হাসল।
‘থাক, তোকে ফোন করাই ভুল হয়েছে। তোর বাপিকে বলছি।’
‘বাপি জানবে কোথায় পাওয়া যায়? মানে, বাপি তো চেনে না সব কিছু।’
‘জিজ্ঞেস করে নেবে। তা ছাড়া আজ বুকুর জন্য এটা রান্না করতেই হবে।’
‘কেন ঝামেলা করছ মা। আর কেন করতেই হবে রান্না?’
‘ছিঃ ছিঃ,’ মায়ের গলায় রাগ, ‘বাস্তবের মাটিতে নাম মিষ্টি। ভুলে গেছিস সব? ভুলে গেছিস যে, আজ বুকুর জন্মদিন? তোর শাশুড়ি বললেন, তুই তো একবারও বললি না। আমার আশ্চর্য লাগছে তোকে দেখে। ছিঃ ছিঃ! আমার মেয়ে হয়ে তুই এমন?’ মা কেটে দিল ফোনটা!
জিয়ানা ঠান্ডাতেও ঘেমে উঠল নিমেষে। তাই তো। এটা যে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল। কেমন করে এটা ভুলল ও? কেমন করে মাথা থেকে বেরিয়ে গেল এটা? কী আশ্চর্য! কিন্তু কিগানের জন্মদিন তো কখনও ভোলে না ও!
লিফ্টের বাক্সটা নীচে নামল পাঁচ-ছ’জনকে নিয়ে। ওপরে ওঠার পথটায় জিয়ানা একা। লিফ্টে উঠে, সানমাইকা লাগানো দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ও। মায়ের ফোনটা কেমন যেন গন্ডগোল করে দিল সব। আজ বুকুর জন্মদিন, আর সেটা ভুলে গেল ও। কী করে ভুলে গেল? দায়িত্ব কর্তব্যগুলো কি ক্রমশ বিস্মৃত হচ্ছে জিয়ানা? আচ্ছা, জিয়ানা কি ভালবাসে বুকুকে? না হলে সেদিন কেন অমন সত্যি-মিথ্যে মিশিয়ে কথা বলল বুকুকে? কেন বারবার নিজের দিকটা ঢেকে ও কথা বলছিল কিগানের দিকটা দেখিয়ে? সেটা কি বুকুর প্রতি ভালবাসার জন্য? না তুতুল এসে গেছে বলে? ওর কি ভয় হয় যে, বুকু ওকে ছেড়ে দেবে? নাকি মা-বাবার কথা চিন্তা হয় ওর? মুখে যতই বলুক ‘ওর জীবন কি ওর নয়’? আসলে জিয়ানা বুঝতে পারছে যে, ও নিজেই আর ওর নিজের জীবনকে নিজের জন্য রাখেনি।
অফিসের ভেতরটা আজ আশ্চর্য রকম নিস্তব্ধ আর ফাঁকা। জিয়ানা নিজের টেবিলে গিয়ে ব্যাগটা রাখল। দূরে খুরানার কেবিনের চেকার্ড কাচের ফাঁক দিয়ে ফাঁকা চেয়ারটা দেখা যাচ্ছে। এখনও ফেরেননি খুরানা। অর্থাৎ, হাতে সময় আছে একটু। জিয়ানা পাশের বিরাট কাচের জানালা দিয়ে শীতের কলকাতার দিকে তাকাল। আলো-জ্বলা একটা শহর। আর রাস্তাগুলো শিরা-উপশিরার মতো জড়িয়ে ধরেছে কলকাতাকে। কে যেন হলুদ থকথকে একটা তরল ঢেলে দিয়েছে সেইসব শিরা-উপশিরায়। আর তার ভেতর ডুবে-ভেসে ছোট ছোট গাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবিকল কম্পিউটার গেমসের স্ক্রিন যেন।
লু-এর দিকে এগোল জিয়ানা। একটু ফ্রেশ হতে হবে। যদিও ওর গাড়িটার কাচ বন্ধ ছিল তবু ধুলোধোঁয়া তো লেগেছে গাড়িতে ঢোকার বেরোনোর সময়। নিজের স্কিন সম্বন্ধে জিয়ানা খুব সচেতন। মেকআপ করার চেয়ে ন্যাচেরাল স্কিন অনেক ভাল লাগে ওর।
লু-এর ভেতরটা কালো গ্রানাইটের দেওয়ালে মোড়া। তার এক দিকটায় আবার গোটা আয়না। সেখানে নিজেকে দেখল জিয়ানা। বয়স হয়েছে মনে হচ্ছে কি? বুকু তেমনই বলেছিল না?
জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বুকুর দিকে। কী করে বুঝল ও যে কিগানের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
বুকু বলেছিল, ‘কী নাম ছেলেটির? নাকি লোক বলব?’
‘কিগান,’ ছোট্ট করে বলেছিল জিয়ানা।
‘কিগান? আইরিশ?’ অবাক হয়েছিল বুকু, ‘বিদেশি প্রেমিক? কলকাতায় পেলে কী করে? ভেরি ইন্টারেস্টিং!’
‘না, হাফ আইরিশ, হাফ বাঙালি। বাবা বাঙালি ছিল। মা আর বাবা একই সঙ্গে মারা যায় অ্যাক্সিডেন্টে। তখন কিগান অনেক ছোট। তারপর ওর ঠাকুরমা লন্ডন থেকে নিয়ে আসে ওকে। সুকিয়া স্ট্রিটে থাকত ওরা। পুরো নাম কিগান অর্ক ব্যানার্জি। কলেজে আলাপ হয়েছিল। আর সেখানেই পছন্দ করেছিল আমায়।’
‘আর তুমি?’ বুকু স্বাভাবিক গলাতেই জিজ্ঞেস করেছিল।
‘আমি?’ সামান্য থমকে ছিল জিয়ানা, ‘আমারও ভাল লাগত। অত সুন্দর দেখতে একজন ছেলে! খারাপ লাগবে কেন? তবে মা সহ্য করতে পারত “না” ওকে। আমায় বকত। আমিও কিগানকে না করে দিয়েছিলাম।’
‘না করে দিয়েছিলে? তা কার জন্য? মায়ের জন্য, না তোমার নিজের জন্য?’
‘দেখো, সেসব জানি না। ওকে না করে দিয়েছিলাম, বাবা-মা খুশি হয়েছিল। আর তারপর তুমি এলে।’
‘ও। হুম্। তা এখন গল্পটা কী?’ বুকুর যেন আগ্রহের সীমা ছিল না।
‘গল্প?’ জিয়ানার বিরক্ত লেগেছিল, ‘গল্প মানে? আমি চাপাডাঙায় যে-প্রজেক্টের কাজে যাই, সেখানকার ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ম্যানেজার হল এই কিগান। প্রায় এক ডিকেড পর দেখা। আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’
‘হঠাৎ দেখা হল? আর তুমি অবাক হলে?’ বুকু অবাক হয়েছিল।
‘হ্যাঁ। আমি এত আশ্চর্য হয়েছি যে, কী বলব। একটা মানুষ এমন বেপাত্তা হয়ে গেল তারপর হঠাৎ এত বছর পর এভাবে দেখা! অবাক হব না?’
‘তা সেই কিগান কী বলল? বিয়ে করেছে?’
‘কিছুই কোনওদিন বলে না কিগান। বরং বসার ঘরে যে নতুন একটা শো-পিস রয়েছে সেটা তুতুলের নাম করে দিয়েছে। আর বিয়ে? না করেনি।’
‘বিয়ে করেনি?’ হেসেছিল বুকু, ‘গ্রেট লাভার।’
‘বাজে কথা বোলো না। কতদিন আগেকার ঘটনা, সেসব দিয়ে রিলেট করছ কেন? এসব একদম নয়।’
‘নয়? তা হলে কাঁদলে কেন জিয়ানা?’ বুকু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কাঁদলাম? জানো, কিগানের কথা মাকে বলেছিলাম। এমনিই বলেছিলাম। মা সেই শুনে এমন আরম্ভ করল, কী বলব তোমায়! আমার এত বছরের সমস্ত কিছুর কি কোনও দাম নেই?’
‘মায়ের দিকটাও ভাবো। তোমার দিদির ব্যাপারটা…’
‘না,’ বুকুকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিল জিয়ানা, ‘দিদির ঘটনা তো দিদির। তাতে আমার দোষ কোথায়? মা চিরকাল দিদির ঘটনা দেখিয়ে আমায় চেপে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটা যে কত বড় অন্যায়!’
‘তাই তুমি কাঁদছিলে?’
‘জানি না কেন কষ্ট হয়েছিল। আমি জানি না। তবে হ্যাঁ, কিগানের কথাটা তোমায় না বলাটা আমার অন্যায় হয়েছে।’
‘দুর,’ হেসেছিল বুকু, ‘একদম নয়। মানুষের জীবনে কত কিছু হয়। কত কিছু ঘটে। সব বলা যায় না। তা ছাড়া আমাদের বর্তমান জীবনে ওর কত দূর প্রভাব?’
‘নেই,’ জিয়ানা মাথা নিচু করেছিল, ‘কোনও প্রভাব নেই।’
‘তা ছাড়া, সবারই বয়স হচ্ছে।’ বুকু হেসেছিল আবার, ‘তোমারও বয়স হয়েছে জিয়ানা। কিগানেরও হয়েছে। আমারও তো হয়েছে। তোমরা কি আর সেই অতীতে ফিরে যেতে পারো? আমিই কি পারি?’
‘তুমি?’ অবাক হয়েছিল জিয়ানা।
‘কথার কথা বলছিলাম। তা কিগানকে একদিন বাড়িতে ডাকো না। আলাপ করি। আড্ডা মারি। নামটা এমন ইন্টারেস্টিং যখন মানুষটাও নিশ্চয়ই হবে।’
‘ও আসবে না। কিছুতেই আসবে না। চিরকালই কেমন যেন ছেড়ে ছেড়ে থাকত ও। কেমন যেন একা থাকত। আর এখন তো দেখলাম পুরো একা হয়ে গেছে। ও আসবে না। এই কিগান সেই কলেজ লাইফের কিগান নয়। ও অন্য মানুষ।’
বুকু বলেছিল, ‘তুমি…মানে তোমার এখনও মায়া আছে না ওর ওপর?’
‘আমার?’ জিয়ানা চুপ করে গিয়েছিল। গলার ভেতর কষ্ট হচ্ছিল একটা। যেন কিছু আটকে গেছে। যেন কিছু বের হতে চেয়েও পারছে না। বুকে চাপ লাগছিল। জল এসে যাচ্ছিল চোখে। কেবল মনে পড়ছিল পাহাড়ি পথে শেষবারের মতো চলে যাচ্ছে একটা সাইকেল। কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতর দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে কিগান।
‘থাকাটাই স্বাভাবিক। ভালও,’ বুকু বলেছিল, ‘যে তোমায় এত ভালবাসল, কিছু না পেয়েও যে তোমায় এত করে মনে রেখেছে তার ওপর মায়া না থাকাটাই অমানুষের কাজ। মায়া, ভালবাসাই তো মানুষের হলমার্ক। তুমি কাজ হয়ে গেলেও ওর সঙ্গে যোগাযোগ রেখো। আমি কিছু মনে করব না। অনেস্টলি।’
সেই রাতের পর থেকে হঠাৎই কেমন যেন বদলে গেছে বুকু। কেমন যেন খোলামেলা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে অস্বস্তি লাগে জিয়ানার। অচেনা ঠেকে। মনে হয় এ বুকুকে তো চেনে না ও। কেন এমন পালটে গেল বুকু? কী হয়েছে ওর? তুতুলও মাঝে মাঝে অবাক হয়। বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। জিয়ানার মাঝে মাঝে ভয় লাগে। মনে হয়, সব ভেঙে যাবে না তো?
তবু তার পাশেও কেন তা হলে কিগানের কথাও মনে পড়ে ওর? কেন কষ্ট হয় কিগানের জন্য? কিগানকে কেন এত ভালবাসতে ইচ্ছে করে ওর? আচ্ছা, ও কি খারাপ মানুষ? নিজের ঘর-সংসার, সিকিয়োরিটি ঠিক রেখে কি ও গোপনে কিগানকে চায়? কিগান কি ওর গোপন জীবন? ওর গুপ্ত সম্পদ? সবার সামনে কি কোনওদিন স্বীকার করতে পারবে না যে, ও নিজেও ভালবাসে কিগানকে? মাঝে মাঝে বড্ড বাজে লাগে জিয়ানার। নিজের ওপর বিরক্তি আসে।
বেশ কিছুদিন চাপাডাঙায় যাওয়া হয়নি জিয়ানার। বলা ভাল ও যায়নি। আগে যেমন দু’-চারবার ছুতোনাতায় গিয়েছিল, এবার আর যায়নি। আসলে শেষ দিনে কিগানের বলা কথাগুলো মনে আছে ওর। প্লেজ, টার্ন আর প্রেস্টিজ। কিগানের জীবনে প্রেস্টিজ আসেনি এখনও। এখনও খরগোশ আসেনি ফিরে। খরগোশ কি আনন্দ? নাকি প্রেম? এতদিন পরেও কিগান কি প্রেমের জন্য অপেক্ষা করছে? কার প্রেমের জন্য? জিয়ানার কি? না অন্য কারও? জিয়ানা তো কথার ভাঁজে নিজেকে কিছুটা এগিয়েই দিয়েছে কিগানের কাছে। কিন্তু কিগান তো তা শুনছে না, বুঝছে না। ও তা হলে কোন খরগোশের ফেরত আসার অপেক্ষা করছে? ম্যাজিক, চিরকালই কিগান ম্যাজিকে বিশ্বাস করত। এখন সেটা আরও বেড়েছে কি? নেহাত মেটাফর হিসেবে কথাগুলো বলে কিগান কী বোঝাতে চেয়েছিল? আর হাসতে হাসতে তো কিগান বলেও দিয়েছিল যে, জিয়ানা ওকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই কি রাগ? কিগান কি এখনও রেগে আছে জিয়ানার ওপর? এখনও কি ও অপমানিত বোধ করে? ওর কি মনে হয় জিয়ানা সুবিধেমতো ওর সাহায্য নিয়ে তারপর সরে গিয়েছে? না হলে অমন হেসে কি কেউ বলতে পারে, ‘টার্ন দেখালি ভ্যানিস হয়ে’? জিয়ানা জানে কিগান ভোলে না কিছু। জানে ওপরের শান্ত, ভদ্র মানুষটার নীচে একটা রাগী আগ্নেয়গিরি চাপা আছে। একবার দেখেছিল কলেজে।
কলেজের অনেক প্রেমিকের মতো সুমন্ত বলে একটা ছেলে ছিল। সে-ও জিয়ানার পিছনে ঘুরঘুর করত খুব। এমনকী, বাড়ির ফোন নম্বর জোগাড় করে বাড়িতেই হুটহাট ফোন করত ছেলেটা। ভাল লাগত না জিয়ানার। বড্ড বিরক্ত লাগত। কেমন যেন গায়ে-পড়া টাইপ ছিল। সুমন্তকে ‘না’ বলে দেওয়ার পরও সুমন্ত শুনত না। বরং দিনকে দিন অসভ্যতা বাড়ছিল ছেলেটার। তারপর একদিন সেটা সীমা ছাড়িয়েছিল।
তখন কিগানের সঙ্গে রাগ-অভিমান চলছিল জিয়ানার। কিগান যাজ্ঞসেনী বলে একটা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সপ্তাহে একদিন অঙ্ক দেখিয়ে দিত। সেটা একদম ভাল লাগত না জিয়ানার। কারণ যাজ্ঞসেনীকে একবার দেখেই জিয়ানা বুঝেছিল যে, মেয়েটার দুর্বলতা আছে কিগানের ওপর। তাই কিগানকে ওই বাড়িতে যেতে বারণ করেছিল জিয়ানা। কিন্তু কিগান শোনেনি। বরং হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘পাগলি নাকি তুই? এসব মাথায় আনছিস কেন? তোকেও তো কত ছেলে পছন্দ করে, তা বলে তুই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিবি? তুই কি পাগল নাকি?’
জিয়ানা উত্তর দেয়নি। সোজা কথা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিগান বোঝানোর চেষ্টা করেছিল ওকে। জিয়ানা কিছু শোনেইনি। পাত্তাই দেয়নি। এমন ভাব করেছিল যেন চেনেই না কিগানকে। বরং দেখিয়ে দেখিয়ে অন্যদের সঙ্গে বিশেষ করে সুমন্তর সঙ্গে কথা বলা বাড়িয়েছিল। আর সেখানেই শুরু হয়েছিল সমস্যা।
টিচার্স ডে ছিল সেদিন। কলেজের অডিটোরিয়ামে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। জিয়ানার ছিল গান আর আবৃত্তি। তবে গানে ও একা ছিল না। শিল্পী বলে একটা মেয়েও ছিল। অনুষ্ঠানের আধ ঘণ্টাখানেক আগে শিল্পীর সঙ্গে গানটা একবার রিহার্স করে নেবে ভেবেছিল জিয়ানা, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না শিল্পীকে।
একতলা, দোতলা কোথাও শিল্পী নেই। তিনতলাটা একদম শুনশান। সেখানে ওঠার পথে হঠাৎ সুমন্তর সঙ্গে দেখা হয়েছিল জিয়ানার। সুমন্তও শিল্পীকে খুঁজতে উঠছিল তিনতলায়। ফাঁকা ক্লাসরুম, নির্জন করিডর। কিন্তু শিল্পী কোথায়? হঠাৎ সুমন্ত বলেছিল, ‘ওই সামনের ঘরটা থেকে আওয়াজ পেলাম মনে হল। চল তো। দেখ হয়তো ফাঁকা পেয়ে কারও সঙ্গে প্রেম করছে।’
‘চল তো। প্রেম করা বের করছি ওর,’ জিয়ানা আগে আগে গিয়েছিল ঘরটায়। তারপর ঘরে ঢুকে থমকে গিয়েছিল, ‘কোথায় রে! কেউ তো নেই?’ ও ঘুরে দরজার দিকে মুখ ফিরিয়েই থতমত খেয়ে গিয়েছিল। একদম সামনে দাঁড়িয়েছিল সুমন্ত। জিয়ানা দেখেছিল সুমন্তর নিশ্বাস ঘন, চোখে জঙ্গলের আলো।
সুমন্ত আচমকা জিয়ানার হাত চেপে ধরে বলেছিল, ‘কেউ নেই তো কী হয়েছে? আমি তো আছি। দেখ, কেউ আসবে না। কেউ জানবে না। আমি ভালবাসি তোকে। তুই আমায় একবার দে। কাউকে বলব না। শুধু তুই আর আমি জানব। আর কেউ জানবে না। সত্যি বলছি। প্লিজ একবার দে…’ জিয়ানা ‘না’ বলছিল ক্রমাগত। কিন্তু কিছুতেই শুনছিল না সুমন্ত। আঁকড়ে ধরে নাকটা জিয়ানার গলার মধ্যে, বুকের মধ্যে চেপে ধরার চেষ্টা করছিল। জিয়ানা প্রাণপণে চিৎকার করছিল। হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছিল সুমন্তকে। কিন্তু লম্বাচওড়া সুমন্তর সঙ্গে পারছিল না। ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল জিয়ানা। ভয়ে লজ্জায় অপমানে কেঁদে ফেলেছিল। সুমন্ত ঠেলতে ঠেলতে ওকে টেবিলে শুইয়ে দিয়েছিল। চেপে বসেছিল ওর শরীরের ওপর। ভয়ে, লজ্জায়, ঘেন্নায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল জিয়ানা।
হঠাৎই হালকা হয়ে গিয়েছিল সব। কোনও চাপ নেই। ভার নেই। কী হল? চোখ খুলে জিয়ানা দেখেছিল শূন্যে উঠে একটু দূরে আছড়ে পড়ল সুমন্ত। সুমন্তর মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে। দু’হাত জোড় করে রয়েছে। আর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিগান।
‘সরি, ভেরি সরি, আমার মাথার ঠিক ছিল না। আমায় ক্ষমা করে দে,’ সুমন্ত পালানোর পথ খুঁজছিল।
‘জানিস তো, তোর মতো চারটেকে একা নিতে পারি আমি। তোর সাহস কী করে হল জিয়ানার গায়ে হাত দেবার?’ কিগানের অমন হিংস্র রূপ আগে কোনওদিন দেখেনি জিয়ানা। কথা শেষ করে কিগান সুমন্তকে কলার ধরে তুলে সজোরে থাপ্পড় মেরেছিল একটা। সুমন্ত ঘুরে পড়ে গিয়েছিল আবার।
‘আরও মার আমায়। কিন্তু প্লিজ, ক্ষমা করে দে। আর কোনওদিন হবে না,’ সুমন্ত প্রায় পায়ে পড়েছিল কিগানের।
‘ছেড়ে দে,’ জিয়ানা অস্ফুটে বলেছিল।
‘আমায় প্লিজ ক্ষমা করে দে।’ সুমন্ত আর দাঁড়ায়নি। দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
‘তুই, হঠাৎ?’ জিয়ানা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
‘হঠাৎ নয়। সুমন্তকে তোর সঙ্গে দেখে লক্ষ রাখছিলাম। শোন, আমার ওপর রাগ করে, আমায় শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনিস না। তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস না, সেটাই যথেষ্ট শাস্তি আমার পক্ষে। আর নতুন করে কিছু করতে হবে না।’
জিয়ানা কিছু বলেনি। শুধু চোখ বন্ধ করে জড়িয়ে ধরেছিল কিগানকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল কিগানকে। বলেছিল, ‘তোকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করব না।’
কিগানকে বিয়ে করেনি জিয়ানা। মা-বাবার কথায় ও ঘুরিয়ে নিয়েছিল নিজের মন। চলে এসেছিল বুকুর কাছে। খরগোশটা ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল। আর ফিরে আসেনি টুপির ভেতর। আর এখন জিয়ানা বুঝেছে খরগোশটাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতাও ওর নেই। সে ইন্দ্রজাল ভুলেছে ও। প্রেস্টিজ বা সম্মান আর ফেরাতে পারবে না জিয়ানা।
নিজের টেবিলে ফিরে এসে ব্যাগ থেকে ময়শ্চারাইজার বের করে মুখে, হাতে মাখল জিয়ানা। পুরনো দিনের কথাগুলো খুব মনে পড়ে আজকাল। কেন পড়ে কে জানে। কিন্তু পড়ে। আর সব কিছুতেই নিজেকে দোষী মনে হয়। কিগানকে যতবার দেখে, ততবার নিজেকে অপরাধী লাগে। কিগানকে ভালবেসে কেন পরে মায়ের কথায় ওকে ছেড়ে এল জিয়ানা? কেন এমন একটা অন্যায় করল ও? ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যিই কি সব ঠিক হয়?
‘স্যার আপনাকে ডেকেছেন।’ জিয়ানা দেখল বেয়ারা ছেলেটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে।
‘আমি আসছি। স্যার কতক্ষণ আগে এসেছেন?’ জিয়ানা জিজ্ঞেস করল।
‘একটু আগে,’ ছেলেটি আর দাঁড়াল না।
খুরানার চেম্বারে চেকার্ড ফ্রস্টেড গ্লাসের দরজায় দাঁড়াতেই খুরানা ‘আও বেটি’ বলে ডেকে নিলেন ওকে। তারপর বসতে বললেন।
জিয়ানা চেম্বারে ঢুকে চেয়ারে বসল। নরম গদিওয়ালা চেয়ার। প্রায় অর্ধেক ঢুকে গেল জিয়ানা। কিন্তু আরাম অনুভব করার আগেই দেখল খুরানার মুখ গম্ভীর। চোয়াল শক্ত। অর্থাৎ টেনশন, চাপ আছে। ওপর থেকে বিস্তর চাপ আছে। আর কর্পোরেট পৃথিবীতে চাপের কনডাকটেন্স খুব ভাল। খুব দ্রুততার সঙ্গে ওপর থেকে নীচে অবধি ছড়িয়ে যায় চাপটা। অর্থাৎ খুরানার ওপর চাপ মানে জিয়ানার ওপর চাপ এল বলে।
‘জিয়ানা, উই মাস্ট গেট দিস প্রজেক্ট। দিস মার্চেন্ট মাল্টিপল্স থিং,’ খুরানার গলাটা কেমন যেন আশঙ্কার মতো শোনাল।
‘শিয়োর স্যার,’ জিয়ানা আশ্বস্ত করার গলায় বলল।
‘না, অত সোজা নয়। বাই হুক আর বাই ক্রুক আমাদের এটা পেতেই হবে। কোম্পানির টপ লেভেল খুব চটে আছে। ন্যারো মার্জিনে তিন-চারটে কাজ ফসকে গেছে। আর নয়। এবার ডু অর ডাই।’
‘কিন্তু বাই ক্রুক!’ জিয়ানা চিন্তিত হল, ‘সেটা কেমন করে সম্ভব?’
খুরানা ঠোঁট কামড়ে নিজের গ্লাস টপ টেবলটার দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, ‘কিগান অর্ক ব্যানার্জি।’
‘হ্যাঁ স্যার?’ জিয়ানা ঠিক বুঝল না।
‘কিগান। প্রোডাকশন ম্যানেজার। গৌর রওশন দিওয়ানের খুব কাছের লোক। তোমার বন্ধু না?’
‘হ্যাঁ স্যার, বন্ধু,’ জিয়ানা সংক্ষেপে বলল।
‘তো ইয়ারি কব কাম আয়েগি?’ খুরানা হাসলেন।
‘মানে স্যার?’ জিয়ানার কেমন যেন গুলিয়ে গেল সব।
‘মানে, বন্ধুকে ধরো। বলো। কাজটা যাতে হয়, বলো। শোনো জিয়ানা, ও কাজটা না পেলে প্রোজেকশন কর্প-এর অবস্থা খুব খারাপ হবে। তাই এটা পেতে হবে আমাদের। যেভাবে হোক পেতেই হবে। বুঝেছ?’
Chapter - 27
২৭
‘ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টি আসছে খুব
আলো ঝলমল কলকাতা ভাসছে
কাগজ-নৌকো, ম্যানহোল ঘূর্ণি
মুঠোয় বেলুন, ন্যাড়া গাছ হাসছে
তবু স্পর্শের বুদবুদ ঘুরে যায়
বৃষ্টির ছাঁটে উঁচু নিচু বাস্তব
হোঁচট খাচ্ছি, দাঁড়িয়ে থাকছি, তাও
শুনশান পথ…চিরদিন বাসস্টপ…
কবিতা বোঝেন? কবিতা?’ ত্রয়ণ হাসি হাসি মুখ করে তাকাল।
‘কবিতা? মানে পোয়েট্রি?’ আদি ভুরু তুলল। মদের গ্লাসটার ধারে আঙুল দিয়ে গোল করে ঘোরাল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমি অন্য কবিতা বুঝি। মানে মহিলা, নাম কবিতা। সোনাগাছিতে থাকে। ক্লাস টুয়েলভে থাকতে গিয়েছিলাম।’
ত্রয়ণ হাসল, ‘যাঃ, তেমন ধরলে আমিও অনেক কিছু বুঝি। কিন্তু, আমি পোয়েট্রির কথা বলছি। যেটা বললাম, সেটার কথা বলছি। আপনি জানেন এসব? মানে বোঝেন?’
‘না,’ আদি হাসল, ‘এসব বুঝে কোনও লাভ নেই। কবিতা একটা সেল্ফ ইনডালজিং আর্ট। স্বার্থপর লোকেদের জন্য। আমার ভাল লাগে না। কী সব ভুলভাল, হাবিজাবি লেখে আর বুঝতে না পারলে, মানে জিজ্ঞেস করলে বলে, এসবের মানে বলতে নেই। কেন রে শালা? মানে বললে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? যত্তসব ফালতুগিরি! আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কয়েক পিস ছিল। এমন টাইপ। অর্থহীন সব সেনটেন্স লিখে কী ঘ্যাম, কী ঘ্যাম! জিজ্ঞেস করলে হাসত। শালা, পুরো মাথা গরম হয়ে যেত আমার। যত্তসব ভাটের জিনিস। বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি আর-একটা ভদকা নেবেন? সঙ্গে মাংসও বলব কি আর-একটু?’
‘তা বলতে পারেন,’ ত্রয়ণ হাসল, ‘আসলে কবিতা আর মানুষ এক। বুঝতে পারলে পারলেন। না হলে ঝাড়। পুরো ট্যান হয়ে যাবে। আমার তো মানুষজন নিয়েই কারবার, তাই কবিতা বোঝার চেষ্টা করি।’
‘ও,’ আদি মাথা নাড়ল। তারপর হাত তুলে বেয়ারাকে ডেকে আরও একটা করে ভদকা আর চিকেনের দু’রকম কাবাব অর্ডার করে গুছিয়ে বসল। বলল, ‘তা, আমরাও তো মানুষের মধ্যেই পড়ি। আমাদেরটা নিয়ে কী ভাবলেন? অনেকদিন তো হয়ে গেল।’
‘তিনটে ফ্ল্যাট। সুধাদি আপনাদের কাছে তিনটে ফ্ল্যাট চেয়েছিলেন। তাই না?’
‘তি—তিনটে?’ আদি চোখ কুঁচকে চিন্তা করার ভান করল।
‘কেন অ্যাক্টিং করছেন দাদা? আমি জানি। সঙ্গে ষাট লাখ টাকা। ইলেকশনের জন্য। সামনে ভোট। নোট তো লাগবেই।’
‘তা হবে হয়তো। কেন?’ আদি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
‘আপনি আমায় দুটো ফ্ল্যাট বলেছিলেন কেন?’
‘আমি যা জানতাম তাই বলেছি,’ আদি বেয়ারার দিয়ে যাওয়া গ্লাসটা থেকে ছোট্ট চুমুক দিল। জিভটা কেমন অসাড় অসাড় লাগছে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বসে আছে ও। বেশ কয়েকটা ড্রিঙ্ক নিয়েছে এর মধ্যে। কেমন যেন নেশা হয়েছে মনে হচ্ছে।
‘আবার ঢপ?’ ত্রয়ণ হাসল, ‘মাইরি, ঢপোলজিতে পিএইচডি করেছেন দেখছি! ভুল করেও একটা সত্যি বলছেন না।’
‘আশ্চর্য,’ আদির বিরক্ত লাগল। ও তো মিথ্যেটাকে আপ্রাণ অভিনয় দিয়ে সত্যি করতে চাইছে। তবু পারছে না! কেন পারছে না? এটুকু তো পারতেই পারে। ধুস, মদ যেন সব গন্ডগোল করে দিচ্ছে।
‘শুনুন,’ ত্রয়ণ বলল, ‘আপনি মিথ্যে বলেছেন, তাই কাজটা এখনও হয়নি।’
‘তা আপনি তো বলেছিলেন যে, বারাসতের এই প্রজেক্টটায় কোন ক্লাবের জমিতে একটা ছোট পার্ক আর পঁচিশ লাখ টাকা দিলেই কেল্লা ফতে হবে। তবে?’
‘তবে এই যে, এখন দাম বদলেছে। আপনারা সুধাদির ডিমান্ড না মেনে, সুধাদিকে বলেছেন যে, দুটো ফ্ল্যাট আর কুড়ি লাখ দেবেন। ঠিক, না? একটা ডুপ্লে বিক্রি করলে আপনারা কত লাভ করেন বলুন তো? তারপর সুধাদিকে অত টাকা, আর আমায় ওই পি-নাট? মামদোবাজি!’
‘আরে কথা হয়েছিল যা তারপর খেলাপ করছেন?’ আদি বিরক্ত গলায় বলল, ‘এটা কি ভদ্রলোকের মতো কাজ হল?’
‘ভ-দ্র-লো-ক?’ ত্রয়ণ একটা মাংসের টুকরো তুলে মুখে পুরে বলল, ‘কে ভদ্রলোক? আপনি? গৌর? মার্চেন্ট মাল্টিপল্স? রাঘব চক্কোত্তি? চমক? কোন শালা ভদ্রলোক? সব এক। এক প্রোডাকশন লাইনের থেকে বেরিয়েছে। প্রত্যেকটা মাল। সুতরাং এসব ফান্ডা দেবেন না।’
‘না, দেখুন, আপনার যদি স্টেক বাড়ে তবে আপনি আমাদের বলেননি কেন?’
‘খিদেটা কার?’ ত্রয়ণ হাসল, ‘আর আমার বলাটা কি ঠিক হত?’
‘তা ঠিক,’ আদি আর-একবার চুমুক দিল গ্লাসে। নাঃ, জিভ সত্যিই অসাড়। কোনও স্বাদ পাচ্ছে না। মাংস মুখে দিলেও মনে হচ্ছে রাবার চিবোচ্ছে। মদটা একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছে। তবে মাথা এখনও কাজ করছে। ত্রয়ণ যে নিজের থেকে কেন যোগাযোগ করেনি সেটা বুঝতে পারছে বেশ। পাওয়ার গেমের নিয়ম একটাই। অন্যকে নিজের কাছে আসতে দাও। তুমি নিজে আর্জ দেখালে তোমার দাম কমে যাবে। কোনও রকম নেগোসিয়েশনে তুমি আর সুবিধে করতে পারবে না। তাই চুপ করে থাকতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে, অন্য পক্ষ কখন আসবে তোমার কাছে।
আদি বলল, ‘তা আপনার নতুন কিছু বলার আছে কি?’
‘আপনারা তো বলবেন,’ ত্রয়ণ হাসল, ‘আমি তো আপনার ডাকে এসেছি। ফালতু আনতাবড়ি কথা বাড়িয়ে লাভ আছে? আপনি কবিতা কেন বোঝেন না জানেন? জানেন কেন কবিতা আপনার ওপর দিয়ে যায়?’
‘না,’ আদি মাথা নাড়ল। নাক আর ভুরুর কাছের সাড় যেন চলে যাচ্ছে।
‘কারণ কবিতায় কিছু সংকেত থাকে। তা আপনি ধরতে পারেন না। জীবনেরও কিছু সংকেত আছে। তাও আপনি ধরতে পারেন না। এত না নিয়ে বেঁচে থাকেন কী করে? কোম্পানি চাকরিতে রেখেছে কেন আপনাকে?’
আদি ঠোঁট কামড়াল। এটা রাগ করার মতো কথা বলছে ত্রয়ণ। কিন্তু মাথা গরম করা ঠিক হবে না। কারণ কাজটা করাতে হবে। বহুদিন যাবৎ ঝুলে আছে ব্যাপারটা। রাঘব চক্রবর্তী লোকটা তো আর কথা বলতেই চাইছেন না। তাই অন্য নানা দিক দিয়ে চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ-ই কিছু করতে পারছে না। আসলে সবার খাই এত বেশি যে, মার্চেন্ট অত খিদে মেটাতে পারবে না। বা বলা ভাল গৌর পারবে না। সব প্রজেক্টের একটা কস্ট আছে। ঘুষ বা কাটমানির জন্য যদি কস্ট বেড়ে যায় তবে আর প্রজেক্ট হবে কী করে? তা ছাড়া, এত টাকা চট করে ব্ল্যাকে দেওয়াও তো একটু সমস্যার। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে আছে খুব।
আদি হাসল, ‘আপনি আমায় অপমান করছেন,আমি জানি। কিন্তু কেন করছেন? আমি তো দূত মাত্র। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছি এই জন্য যে, প্রায় সাত-আট মাস হয়ে গেল। আপনি আমাদের অফার নিয়ে কিছু বলছেন না। কেন?’
‘কারণ অফারটা বাজে,’ ত্রয়ণ সরাসরি বলল, ‘আমার টাকা আর পার্কের কথাটা আপনারা কনফার্ম করেছেন এক মাস পর। কিন্তু এতদিনে আমি খবর নিয়েছি যে, সুধাদিকে আপনারা কত অফার করেছেন।’
‘আমরা তো ভাবলাম আপনি কাজ শুরু করেছেন।’
‘তাই এত মাস পর আমার কথা মনে পড়ল?’ ত্রয়ণ হাসল আবার, ‘ঢপোলজিতে আপনার সত্যিই দক্ষতা আছে। আমায় বোকা পেয়েছেন? অন্যদিকে চেষ্টা করেননি? কেউ কিছু পারেনি বলেই তো আমায় ডেকেছেন, নাকি?’
‘আচ্ছা। বাদ দিন,’ আদির ভাল লাগছে না আর। মাথায় ব্যথা করছে। প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে রাত। তখন থেকে এক কথার চারদিকে গোল গোল করে চক্কর কাটছে। ছেলেটা ঝেড়ে কাশছে না কিছুতেই।
আদি বলল, ‘আপনার কাছে আবার না হয় বলছি। আমরা দশ লাখ দিতে পারব আর পার্কটা করে দেব। রাজি হয়ে যান।’
‘সুধাদিকে ইলেকশনের জন্য অলরেডি কুড়ি লাখ এমনি দিয়েছেন। আমি জানি।’
‘আরে সে তো এমনি। জমির সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। দেখুন, জমি নিয়ে ওঁর দাবি কিন্তু আমরা মানিনি। মানলে আপনাকে বলতাম? তাই বলছি একটু দেখুন।’
‘তিরিশ লাখ, আর পার্ক। এক পয়সা কম নয়,’ ত্রয়ণ চোয়াল শক্ত করল।
‘এ কী! এ যে আগের চেয়েও বাড়িয়ে দিলেন,’ আদির মাথাটা কেমন টলমল করে উঠল।
‘অত বড় জমি পাবেন আর তার দাম দেবেন না, হয়? রাঘব চক্রবর্তী এই জমি আপনাদের দেবে না। ভদ্রলোককে আপনারা অপমান করেছেন। তবে যার জমি সে দেবে আর জলের দামেই দেবে। সেখানে ফ্যাক্টরি করে আপনারা কত কোটি টাকা কামাবেন! আর তার একটা অংশ আমায় দিতে বলছি বলে এমন মরে যাওয়ার মতো ভান করছেন! সত্যিই, ক্যাপিটালিস্ট ঢেমনামি দেখে বমি পায়,’ ত্রয়ণ নাক টানল।
‘আরে আপনি একটু কনসিডার করুন। থার্টি ল্যাক্স ইজ টু মাচ।’
‘শুনুন আদিত্যবাবু,’ ত্রয়ণ লম্বা চুমুকে মদ শেষ করল, ‘আমি পলিটিক্সে আছি। এটা আমার পেশা। ব্যাবসা। গিভ অ্যান্ড টেক। মানুষ আর তার মানসিকতা আমার মূলধন। ব্যবসায় কিচ্ছু টু মাচ হয় না। আমিই পারলে পারব এই জমি আপনাদের দিতে। তেমন উপায় আমার জানা আছে। আর না হলে কেউ পারবে না। বুঝেছেন? আমি কথা বাড়াচ্ছি না আর। অনেকটা ফিরতে হবে। আমি আসি। রাজি থাকলে আপনি আমাকে জানাবেন।’
‘কিন্তু, আপনি বড্ড বেশি বলছেন না কি?’ আদি শেষবারের মতো বলল।
‘না, কিছুই বেশি না। জমিটা থেকে আপনারা যে-প্রফিট করবেন, সেইটা ভাবুন, কিচ্ছু বেশি হবে না। আচ্ছা, থ্যাঙ্কস ফর দ্য ড্রিঙ্ক। আমি আসি।’
ত্রয়ণ চলে যাওয়ার পর নিজের চেয়ারে ঝুম হয়ে বসে রইল আদি। ত্রয়ণ বেয়াড়াপনা করছে খুব। তবে হাতে বোড়েটা নিশ্চয়ই খুব শক্তিশালী ওর।
নেশা হয়েছে আদির। তবে বেহেড অবস্থা নয়। শুধু খুব সামান্য একটা দুলুনি অনুভব করছে ও। মনে হচ্ছে একটা বেঁধে রাখা নৌকো আলতো ঢেউয়ের ধাক্কায় নড়ছে। দোল খাচ্ছে।
ত্রয়ণ ছেলেটা খুব ঘোড়েল। কীসের জোরে যে এমন দাম হাঁকাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝতে পারছে না আদি। তবে ত্রয়ণকে দিয়ে কাজ করানোর একটা রিস্ক আছে। সুধাদি জানেন যে, কাজটা উনি করবেন, সেটা না করলে সুধাদি রাগ করবেন। ফলে ভবিষ্যতে ফ্যাক্টরিতে লেবার বা লোকাল প্রবলেম হলে খুব সমস্যায় পড়বে আদিরা। সুধাদি তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন একদম। তবে ভরসা আছে একটা। সুধাদির বিপরীতে যোগেশ সমাদ্দার বলে যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন তিনি যদি জিতে যান। তিনি ইলেকশন ক্যাম্পেনিং-এর জন্য এসেছিলেন গৌরের কাছে। গৌর বেশি টাকা দেয়নি। কিন্তু জিততে পারলে নতুন পার্টি অফিস বানিয়ে দেবে বলেছে।
ঘোলাটে হয়ে আসছে আদির মাথা। ভদকা তার কাজ দক্ষতার সঙ্গে করছে। আদি তবু নিজেকে গোছানোর চেষ্টা করল। প্রাণপণে চেষ্টা করল উপস্থিত সমস্যাটা থেকে বেরোতে। গৌরের ধৈর্য শেষ হচ্ছে। অবস্থা অনুকূল নয় বুঝতে পেরেও রাগ মেটাতে আদির চাকরিটা খেতেও পারে। তাই মনঃসংযোগ করতে হবে আদিকে।
ও ভুরু কুঁচকে টেবিলের ওপর থেকে একটা পেপার টাওয়েল তুলে নিল। তারপর পেন বের করে লিখল সমস্যাগুলো। ত্রয়ণকে দিয়ে কাজটা করালে সুধাদি চটে যাবেন। সুধাদিকে দিয়ে কাজটা করালে প্রচুর টাকা খসবে, প্লাস ত্রয়ণের কথা অনুযায়ী কাজটাও হবে কিনা সন্দেহ। আর তৃতীয় অপশন হল আবেশ।
ডিসেম্বরে, যেদিন খুব বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল চাপাডাঙায়, তার পরের দিন আবেশ প্রায় চুপি চুপি আদিকে নিয়ে গিয়েছিল একটা নির্জন বারান্দায়। তারপর বসিয়েছিল একটা চেয়ারে। বেশ অবাক হয়েছিল আদি। হঠাৎ আবেশ এমন করছে কেন? ওর আবার কী হল? ছেলেটাকে তো বিশ্বাস নেই। যখন তখন যা খুশি তাই করতে আর বলতে পারে। তাই আদি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী রে এমন লুকোচুরি করছিস কেন? কিছু বলবি?’
‘তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে একটা,’ আবেশ চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলেছিল।
‘কী কেস বল তো? টাকাপয়সা দরকার নাকি তোর? আমি কিন্তু দিতে পারব না।’
‘শালা,’ আবেশ ঠোঁট কামড়ে বলেছিল, ‘সবসময় দোকলাবাজি। টাকাপয়সা চেয়েছি তোর কাছে? এত মেয়েছেলে জোগাড় করে দিয়েছি একসময়, তার পরিবর্তে কিছু বলেছি যে, দে আমায়? টাকাপয়সার কথা উঠছে কেন? তবে হ্যাঁ, টাকাপয়সা আমার দরকার। কিন্তু তোর থেকে নয়। তোর কোম্পানির থেকে দরকার।’
‘মানে?’ আদি অবাক হয়ে গিয়েছিল, ‘একবার বলছিস টাকা চাইছিস না, আবার বলছিস টাকা চাইছিস। কেসটা কী বল তো? গাঁজামদ ধরেছিস নাকি?’
‘ক্রিকেট ম্যাচ করবি?’ আবেশ পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘মানে? ম্যাচ? কীসের?’ অবাক হয়েছিল আদি।
‘বললাম তো, ক্রিকেট। করবি? এখানে, নর্থ চব্বিশ পরগনায়। হেল্প আর্থ-এর সঙ্গে জয়েন্টলি।’
‘দাঁড়া, দাঁড়া,’ আদি থামিয়ে দিয়েছিল, হেল্প আর্থ, মানে তো এই রাহি বলে মেয়েটিদের সংস্থা। না?’
‘ঠিক ধরেছিস। মানে আমি যেখানে কাজ করি আর কী!’
‘তা ওদের সঙ্গে ম্যাচ করলে জমি দিয়ে দেবে?’
‘দিতেও পারে।’ আবেশ হেসেছিল।
‘একটা ম্যাচের খরচ জানিস? মানে বড় স্টার প্লেয়ারদের আনার খরচ জানিস? পড়তায় পোষাবে?’
‘সে জানি না, তবে করলে বলিস।’
‘দেখ আমার তো মনে হয়, এটা ভায়াবেল নয়। একটা ব্যক্তিগত প্রপার্টি আমরা তো জোর করে নিতে পারি না। আর প্রপার্টিটা এ অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী মানুষের। এমন নয় যে, গরিব কৃষক, তার থেকে চাপ দিয়ে নিয়ে নিলাম। বরং তেমন করতে গেলে হাত পুড়বে। আর গৌর স্যার ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর জন্য খরচ করতে পারে, এ জন্য এত খরচ করবে না।’
‘কিন্তু তোদের কত টাকা ওই জমিটার জন্য আটকে আছে বল।’
আদি হেসেছিল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, ধর ম্যাচ হল। কিন্তু রাহির কথায় রাঘববাবু জমিটা দিয়ে দেবেন আমায়? এত সস্তা?’
‘সে দায়িত্ব আমার। সেজন্যই তো আমায় টাকা দিবি তোরা, না?’
‘শালা, হারামিই রয়ে গেলি,’ আদি হেসেছিল, ‘তুই কী করবি শুনি?’
‘জাদুকর কেন দর্শকদের থেকে আলাদা বল তো?’
‘কারণ সে জাদু জানে, দর্শকরা যা জানে না।’
‘ঠিক বলেছিস। দর্শকরা জাদুর ট্রিক্সগুলো জানতে চায়। তারা সুযোগ পেলে জাদুকরের সামনে অনুনয়-বিনয় পর্যন্ত করে। কিন্তু জাদুকর কি ম্যাজিক শেখায় তাদের, শেখায় না। কারণ ম্যাজিকটাই জাদুকরের গুরুত্ব। তার সম্মান। তার সম্ভ্রম আদায়ের জায়গা। সে জানে দর্শক ম্যাজিকের ট্রিক্স জেনে যাওয়ামাত্র জাদুকরকে আর পাত্তা দেবে না। অর্থাৎ জাদুকর তার সম্মান, গুরুত্ব হারাবে। তার বেঁচে থাকার মেরুদণ্ডটাই চলে যাবে। তাই জাদুকর কাউকে কিচ্ছু শেখায় না। নেভার গিভ অ্যাওয়ে ইয়োর সিক্রেটস। আদি, তুই কী করে ভাবলি আমি তোকে বলে দেব আমার ট্রিকটা! বলব না গুরু, বলব না। করলে বল, না করলে যা বললাম ভুলে যা। কেমন?’
তা ভুলেই একরকম গেছে আদি। একটা এত বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কোনওদিন এমন একটা লোকের ভরসায় বসে থাকতে পারে! না বসে থাকবে? তাও এমন লোক যে সব কিছু ঝেড়ে কাশছে না। তাই আবেশের কথায় গুরুত্ব দেয়নি আদি। শুধু, ‘ঠিক আছে, দেখছি,’ বলে চুপ করে গিয়েছিল।
আদি জানে, কলকাতা কেন্দ্রিক একটা টুর্নামেন্ট করে যে-প্রচার আর লাভ মার্চেন্ট করতে পেরেছে, তা উত্তর চব্বিশ পরগনায় করা সম্ভব নয়। এখন যদি এখান থেকে লাভ বা নজর টানতে হয় তবে অনেক বড় বড় প্লেয়ারদের হায়ার করে আনতে হবে। যা একদমই অসম্ভব। মার্চেন্ট অত খরচ আর এখন করবেই না। ফলে গৌরকে গিয়ে বললে আদি ঝাড় খাবে খুব।
তবে এখন ভদকার প্রভাবেই কিনা কে জানে, আদির মনে হচ্ছে, খুব একটা খারাপ কথা বলেনি আবেশ। তবে ব্যাপারটাকে আরও ঠিকভাবে প্রেজেন্ট করতে হবে। আরও ডাউন সাইজ করতে হবে। তা হলে একটা সম্ভাবনা বের হলেও হতে পারে।
দাম মিটিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল আদি। শীত যাই যাই করছে শহর থেকে। বরং বসন্তের অদ্ভুত একটা হাওয়া বইছে এখন। পার্ক স্ট্রিট ক্রমশ নির্জন হচ্ছে। আর আলোর ঝলমলানিও কেমন যেন ম্লান লাগছে আদির। কোথায় যাবে যেন এখন ও? বাড়ি? সেখানে কে থাকে? বাবা? মা? এরা কারা? কেমন দেখতে হয় এদের? কতদিন একসঙ্গে কুড়িটা শব্দ বলেনি এদের সঙ্গে? মাথাটা টিপটিপ করছে আদির। নৌকোর দুলুনি বাড়ছে।
বাড়িতে কাজ হচ্ছে এখন। ওপরে ঠাকুরমার তলাটার পাঁচটা ঘরের তিনটে ঘর খোলা বলে সেখানে মেঝেতে মার্বেল বসাচ্ছে বাবা। দেওয়ালে প্লাস্টিক পেন্ট করাচ্ছে। বাকি দুটো ঘর করাতে পারছে না বলে খুব রাগ বাবার। কারণ ঘর দুটো তালাবন্ধ আর চাবি দাদাভাইয়ের কাছে। বাবার ইচ্ছে পুরো বাড়িটা দখল করার। দাদাভাইকে ইতিমধ্যে ফোন করে বাবা বলেওছে যে, এসে যেন সইসাবুদ করে সম্পত্তি ছেড়ে দেয়। যদিও দাদাভাই আসেনি। বাবা মাঝে মাঝেই এই নিয়ে একা একাই রাগ করে। চিৎকার করে। বলে লম্পট ছেলেটাকে হাতের কাছে পেলে জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে দিতে ইচ্ছে করে।
আদি জানে না, দিঘি কেন অমন করেছিল। অন্তত আদি তো জানে দিঘি বা ওর ওই সুবর্ণ বলে ছেলেটা যাই বলুক, সত্যিটা কী। আদি নিজের চোখের চেয়ে তো আর কাউকে বেশি বিশ্বাস করে না। সত্যিই দাদাভাই মানুষটা যেন কেমন। এমন অপবাদ মাথায় নিয়েও কেউ এরকম চুপ করে থাকতে পারে? হয়তো দিঘির বদনাম চায় না দাদাভাই। এ দেশে তো মেয়েদের নামে খারাপ কথা বলা সবচেয়ে সোজা। আর হয়তো সেই অপবাদের ভয়েই, দিঘির বাবা-মা চুপ করে থেকেছে। হয়তো ভেবেছে, কিগান তো চলেই গেছে আর এসব নিয়ে জলঘোলা করে লাভ কী?
তবে যাই হোক, দাদাভাই মানুষটা কিন্তু বদলায়নি। এখনও সেই ঘুড়ি পেড়ে আনা মানুষটাই রয়ে গেছে। সে বৃষ্টিতে আটকে পড়া অবস্থা থেকে আদিদের থাকার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার ঘটনা বা আদির বিপদের কথা চিন্তা করে তাকে সাবধান করা। সবটাই সেই পুরনো দাদাভাই।
দক্ষিণী হাওয়ায় কেমন যেন ক্লান্ত লাগল আদির। কষ্ট হচ্ছে ওর। একটা অজানা কষ্ট শামুকের মতো গুটিগুটি করে হেঁটে বেড়াচ্ছে চারদিকে। ও মাথা উঁচু করে চাঁদটা দেখল। নানা বাড়িঘরের মাথা ছাড়িয়ে বাল্বের মতো জ্বলে রয়েছে আবছা আকাশে। তার ছোট্ট বাষ্পবৃত্ত কলকাতার পলিউশনে আবছা। বাষ্পবৃত্ত দেখতে অদ্ভুত লাগে আদির। চাঁদের চারপাশে হলুদ মাখনের মতো, গোল চাঁদকে ঘিরে থাকে ওই আভা। দেখলেই দাদাভাইয়ের কথা মনে পড়ে আদির। মনে হয় আদি এত বড় হয়ে গেলেও সমস্ত রকম শাস্তি থেকে আদিকে রক্ষা করতে আজও দাদাভাই সমান তত্পর। সে বাবার থেকে পাওয়া শাস্তিই হোক, বা চমক চক্রবর্তীর স্থির করা শাস্তিই হোক।
চমক! নামটা প্রথম দিন শুনেই খুব অদ্ভুত লেগেছিল আদির। কিন্তু কোনওদিনই তেমন সম্মুখসমরে নামতে হয়নি। তবে চমক যে ওর ওপর খুশি নয় সেটা ও জানে। কিগানই ওকে বলেছে।
সেদিন অফিসের সামনে নেমে ও ভেবেছিল মালিনীর সঙ্গে কথা বলে ওর রূঢ় ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। কিন্তু মালিনী এত রেগে ছিল যে, প্রায় দৌড়ে অফিসে ঢুকে গিয়েছিল। আদি ভেবেছিল পিছন পিছন যাবে। কিন্তু পারেনি। কিগান ওকে ডাক দিয়েছিল।
‘বিপদ?’ প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি আদি। কীসের বিপদের কথা বলছে কিগান? কিগান বলেছিল, ‘তোর ওপর চমক খুব রেগে আছে। বলেছে ত্রয়ণের সঙ্গে জমি নিয়ে ডিল করতে গেলে তোকে দেখে নেবে।’
‘ত্রয়ণের সঙ্গে?’ আদি অবাক হওয়ার ভান করেছিল। বলেছিল, ‘দাদাভাই, তুই ভুল করছিস, ত্রয়ণের সঙ্গে জমি নিয়ে কোনও ডিল আমার হয়নি।’
‘আমার ঠিক ভুলের ব্যাপার নেই,’ কিগান ম্লান হেসেছিল, ‘চমকের ধারণা হয়েছে। নিশ্চয়ই তোকে আর ত্রয়ণকে দেখেছে একসঙ্গে।’
‘ত্রয়ণ তো পার্টির ছেলে। বারাসতের প্রজেক্টে বাগড়া দিচ্ছে বলে কথা বলছিলাম।’
‘চমক ভাবছে ওদের জমির ব্যাপারটা কেন ত্রয়ণকে বলা হবে। তোকে মারবে বলেছে। খুব সাবধানে থাকবি।’
হেসেছিল আদি, ‘তুই তো ভিতু নোস। তবে এমন করছিস কেন? আমি ত্রয়ণকে কিছু বললে তো জানতেই পারতিস। আর চমক কি তবে ছেড়ে দিত আমায়? এতদিন যখন কিছু করেনি, জানবি, কিছু করবে না। তুই টেনশন করিস না। বুঝলি?’
‘তবু, মানে…’ কিগান বলেছিল, ‘ভয় হয় রে আদি। এত খারাপ দেখছি সারা জীবন যে ভয় হয় খুব। কষ্ট হয়। জানি এভাবে তোকে আগ বাড়িয়ে বলাটা হয়তো বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তবু, চিন্তা হয়, জানিস?’
‘না, না’, আদির অপ্রস্তুত লাগছিল, এ মানুষটার কাছে ও চিরকাল হাত পেতে দাঁড়িয়েছে। আর সেই মানুষটাই যদি এমন সংকুচিত হয়ে কথা বলে, তবে কার ভাল লাগে! ও বলেছিল, ‘এমন কেন বলছিস দাদাভাই? তুই তো আমায় বলতেই পারিস। যখন যা ইচ্ছে হয় বলতে পারিস। সারাজীবনই পারিস।’
‘সারাজীবন?’ কিগান অপ্রস্তুত চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়েছিল। বলেছিল, ‘আসলে আমাদের জীবন তো আর একরকম নেই। তাই মানে, আমার জন্য হয়তো তোদের অনেক ঝামেলা আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে।’
‘না, না। তুই ওসব বাদ দে।’ আদি পালাতে চাইছিল ওখান থেকে। এসব একদম ভাল ট্যাকল করতে পারে না ও। তা ছাড়া, আদির কেবল মনে হচ্ছিল যে সত্যিটা জেনেও তো ও কিগানকে বাঁচায়নি। ওর পাশে দাঁড়ায়নি। সারা জীবন যে-মানুষটা ওর জন্য চিন্তা করল, ওর দোষ ঢাকার চেষ্টা করল, তাকে তো কোনওরকম সাপোর্টই করেনি আদি। না, কিগান হয়তো জানত না যে, আদি জানে অনেক কিছু। কিন্তু আদি নিজে তো জানে। তাই নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী লাগছিল ওর। মনে হচ্ছিল কিগানের সামনে দাঁড়ানোর কোনও মুখ নেই আর।
‘তুই ভাল আছিস তো?’ কিগান হয়তো আদির চোখেমুখে অপ্রস্তুত ভাব দেখে সামলে নিয়েছিল নিজেকে।
‘আছি। তুই?’ আদি ব্যস্ততা বোঝানোর জন্য ঘড়ি দেখেছিল।
‘ও, তোর বোধহয় দেরি হচ্ছে, সরি। আসলে চমক খতরনাক ছেলে। তারপর আমায় ডাইরেক্ট বলল তো! তাই তোকে বললাম আর কী!’
‘তুই চিন্তা করিস না। কিচ্ছু হবে না,’ আদি আশ্বস্ত করেছিল।
কিগান যাওয়ার আগে তবু বলেছিল, ‘শোন, যদি কিছু এদিক ওদিক বুঝিস, নির্দ্বিধায় আমাকে বলবি। একদম চুপ করে থাকবি না। জাস্ট আমায় জানাবি। কেমন? কক্ষনও চেপে রাখবি না। বুঝলি, আমি যাই হই না কেন, আজও তোর দাদাভাই।’
চাঁদের দিকে তাকাল আদি। কলকাতার সিলিং-এ আটকে আছে একটা ফ্লুরোসেন্ট বেলুন। ওর মনে হল একটা চাঁদের তলায় কত মানুষ বেঁচে আছে আলাদা আলাদা। দাদাভাই বেঁচে আছে। বাবা বেঁচে আছে। ও বেঁচে আছে। এমনকী, মালিনীও বেঁচে আছে।
‘মালিনী!’ আচমকা নামটা মাথায় আসতেই পেটের ভেতর ফড়িং উড়ল যেন। চাঁদ নিয়ে মালিনী অদ্ভুত একটা কথা বলেছিল না?
মালিনীর সঙ্গে সেই ঝামেলার পর, ও কেমন যেন দূরে দূরে থাকে এখন। আদি যতই কাছে যেতে চায় ততই যেন সরে যায় দূরে। কাজের জন্য যতটুকু বলার ঠিক ততটুকুই বলে। গোল্ডিজ-এও আর আসতে দেয় না আদিকে। এক গাড়িতে করে ঘুরলেও এমন মুখ করে বসে থাকে যেন দু’জনের মধ্যে দেওয়াল আছে একটা। এই যে ওরা একসঙ্গে চাপাডাঙায় ছিল দু’মাস আগের সেই দিনটায়, সেখানেও তো আদি চেষ্টা করেছিল বরফ ভাঙার। কিন্তু পারল কই?
সেই শীতের বৃষ্টির দিনটা অদ্ভুত ছিল। সন্ধেবেলা ওই বিরাট বড় বাড়িটার পিছনের রাস্তায় ছাতা মাথায় একা একা হাঁটতে থাকা মালিনীকে ধরেছিল আদি। ও অবাক হয়েছিল। এমন বৃষ্টির ভেতর কেন ঢাউস ছাতা মাথায় নির্জন রাস্তাটায় হাঁটছে মালিনী?
বাড়ির সীমানার ভেতর পাথর দিয়ে বাঁধানো এমন যে একটা রাস্তা থাকতে পারে তা কোনওদিন ভাবতেই পারেনি আদি। সাদা আর গোলাপি পাথর বাঁধানো রাস্তার পাশে হলুদ ঘোমটা দেওয়া আলো। গোটা চাপাডাঙার চেয়ে ওই জায়গাটা উঁচু বলে জল জমে না। আর সেখানে রং-বেরঙের বড় ছাতাটা নিয়ে হাঁটতে থাকা মালিনীকে কেমন যেন অন্য গ্রহের মনে হচ্ছিল আদির। একটা মেয়ের জন্য যে, ওর মনে এমন কষ্ট হতে পারে তা ভাবতেই পারছিল না আদি। মনে হচ্ছিল কেন হল এমন? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কত মেয়ের সঙ্গে তো সম্পর্ক হচ্ছে আদির, কিন্তু কেউ তো কষ্ট দিতে পারেনি ওকে। সেই যাজ্ঞসেনী আইয়ারের জন্য পাওয়া কাঁচা বয়সের কষ্ট যেন আবার লক্ষ গুণ বেশি হয়ে ফিরে এসেছিল আদির মধ্যে। ও রাহির থেকে একটা ছোট্ট ছাতা নিয়ে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মালিনীর পাশে। মালিনী সামান্য অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘হাই,’ আদি কথা শুরু করেছিল।
‘এমন বৃষ্টি। বাড়ি যেতে পারলাম না। গ্র্যানি যে কী করছে!’
‘তুমি ফোন করে দাওনি?’ আদি মালিনীর সহজ গলা দেখে উৎসাহিত হয়েছিল।
‘করেছি, তবু গ্র্যানি ভাববে। কিন্তু যা ওয়েদার কিচ্ছু করারও তো নেই।’
‘ঠিক বলেছ,’ আদি নরম গলায় সমর্থন করেছিল। তারপর বলেছিল, ‘একটা কথা বলব?’
‘বলো,’ সহজ গলায় বলেছিল মালিনী।
‘তুমি এতদিন ধরে রাগ করে থাকতে পারো কীভাবে?’ কথাটা বলে সামান্য হেসেছিল আদি। ও চাইছিল পরিস্থিতি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে নিতে।
‘রাগ? কেন?’ মালিনী ছাতাটা সামান্য তুলে ধরে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘আমার সঙ্গে কথা বলো না তো আজকাল!’
‘বলি তো। কাজের সমস্ত কথা যতটা সম্ভব বলি,’ মালিনীর গলাটা তখনও ভীষণ সহজ আর স্বাভাবিক ছিল।
‘না, মানে…আগে যেভাবে বলতে…সেভাবে…’
হঠাৎ মালিনী পায়চারির অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, ‘কীভাবে? আমি জানি যে, আমাদের রিলেশন স্ট্রিক্টলি অফিশিয়াল।’
‘মানে?’ আদির অবাক লেগেছিল।
‘মানেটা খুব সোজা। আমাদের ওয়র্ক প্লেস এক। আমরা কলিগ।’
‘শুধু তাই?’ আদির বুকের ভেতরের পারদটা বাড়ছিল ক্রমশ।
‘ঠান্ডা পড়েছে। এমন বৃষ্টি। তোমার অল্পতেই সর্দি লাগে। তুমি ভেতরে যাও।’
‘আমার কথার উত্তর দিলে না কিন্তু। তা ছাড়া তোমার ঠান্ডা লাগবে না?’
‘আদিত্য, উত্তর দেওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু ওয়র্ক এথিক্স মেনটেন করছি।’
আদির ওই ডিসেম্বরের ঠান্ডাতেও মাথা দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছিল। ও বলেছিল, ‘তুমি এমন করছ কেন? মাথা গরম করে কী বলেছি সেটাই বড় হল তোমার কাছে? আর বাকি সব ফালতু, না? আমি ফালতু, না?’
বৃষ্টির রাস্তাটা পাশের নরম আলোর জন্য কেমন মায়াময় লাগছিল। রাস্তাটা বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যেই অনেকটা ঘুরে এঁকেবেঁকে বসানো। সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল ওরা। ডিসেম্বরের ঠান্ডা হাওয়া বৃষ্টির জন্য আরও ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। শরীরে ছোট বাচ্চাদের দাঁতের মতো নরমভাবে কামড় বসাচ্ছিল।
‘তুমি ভেতরে যাও। ঠান্ডা লেগে যাবে,’ কথার উত্তর না দিয়ে বলেছিল মালিনী।
‘তোমার ঠান্ডা লাগছে না? তুমি কেন বাইরে ঘুরছ? আদির রাগ বাড়ছিল।
‘আমাদের পাহাড়ে খুব ঠান্ডা পড়ে। এখানে আমার অসুবিধে হচ্ছে না।’
‘তুমি কেন এমন রোবটের মতো কথা বলছ? গত মাসে তো বাড়ি গিয়েছিলে, তার পরও মন ভাল হয়নি? আচ্ছা ঠিক আছে,’ উত্তেজনায় আদি মালিনীর ছাতার হাতলটা চেপে ধরেছিল, ‘আমায় তুমি ক্ষমা করে দাও।’
‘ক্ষমা? কেন?’ মালিনী অবাক চোখে তাকিয়েছিল, ‘তুমি এমন বোলো না। তুমি আমার কলিগ। তোমার মনে হয়েছে যে, আমার কাজে খুঁত আছে তাই আমায় বকেছ। আমি মাইন্ড করিনি কিছু। আর হ্যাঁ, গত মাসে আমি রাবাংলা গিয়েছিলাম বটে। আর আমার মনও যথেষ্ট ভাল আছে।’
আদি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল মালিনীর দিকে। যেন নিরেট লোহার তৈরি একটা মেয়ে। এমন নিষ্ঠুর হতে পারে মালিনী? রাগের মাথায় অত মাস আগে কী বলেছিল সেটা ধরে বসে রয়েছে এখনও? এ মেয়েকে কী করে বোঝাবে ও? কী করে বোঝাবে কতটা ভালবাসে আদি? কতটা অসহায় বোধ করে ও মালিনীকে ছাড়া?
‘আর কিছু বলবে?’ মালিনী কঠিন মুখ করে তাকিয়েছিল।
আদি ক্লান্ত গলায় বলেছিল, ‘বলছি তো। কিন্তু তুমি তো শুনছ না কিছু। জানো, আমি কোনওদিন কারও সামনে এতটা ছোট হইনি!’
‘ছোট!’ মালিনী ভুরু তুলেছিল, ‘তা হচ্ছ কেন? আমি তো বলিনি হতে।’
‘তা বলোনি। কিন্তু…’ আদি কথা খুঁজে পাচ্ছিল না।
‘আমায় একটু একা থাকতে দেবে? প্লিজ।’
আর দাঁড়ায়নি আদি। মাথা নিচু করে পাথরের রাস্তা দিয়ে ফিরে এসেছিল ঘরে। শুধু আসতে আসতে একবার মাত্র তাকিয়েছিল পিছনে ফিরে। দেখেছিল, তুমুল বৃষ্টিতে, পাথরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মালিনী। বৃষ্টিতে আবছা অবয়বটা কেন যেন অপার্থিব আর দূরের মনে হচ্ছিল আদির। মনে হচ্ছিল মালিনী এক দ্বীপখণ্ড। কিন্তু তাতে পৌঁছোনোর কোনও উপায় আদির আর জানা নেই।
এই ঘটনার পর মালিনী যেন চুপ করে গিয়েছিল আরও। যেন আরও ‘প্রয়োজন ছাড়া কথা বলব না’ ধরনের হয়ে গিয়েছিল। ক্রমশ মন ভাঙছিল আদির। কাজে প্রভাব পড়ছিল। একদিন আর না পেরে দুটো পয়েন্ট ফাইভ ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিয়েছিল। তবু ঘুম আসেনি। শুধু মাথার ভেতরে একটা ভুতুড়ে বাড়ি জেগে উঠেছিল ক্রমশ। মনে হচ্ছিল আর পারবে না। এবার ঠিক মাথার ভেতরটা ফেটে যাবে। ঠিক মরে যাবে। মালিনী তখন বুঝবে, আদি ওর জীবনে কী?
একদিন রাতে তাই আচমকাই মালিনীকে ফোন করেছিল আদি। কোনও কারণ ছিল না। এমনিই রাতে ছাদে পায়চারি করছিল একা একা। হঠাৎ চাঁদটা, তার লেবু রঙের আলো আর শীতের হাওয়া এসে উলটোপালটা করে দিয়েছিল মনটা। ও সাত পাঁচ না ভেবেই ফোন করে দিয়েছিল। চারপার রিং হওয়ার পর গলাটা শুনতে পেয়েছিল আদি। নরম পালক খসে পড়ার মতো শান্ত কিন্তু নিশ্চিত আওয়াজ।
‘হ্যালো, কোনও দরকার আছে?’
‘আমি পাগল হয়ে যাব মালিনী। এমন জ্যোৎস্নায় আমি পাগল হয়ে যাব,’ কোনওরকমে কথাগুলো বলেছিল আদি।
‘এসব বলছ কেন?’ খুব কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করেছিল মালিনী।
‘একবার চাঁদটাকে দেখো। একবার দেখো। দেখো, ওটা তোমার দৃষ্টির সঙ্গে যোগ করাচ্ছে আমার দৃষ্টিকে। তোমার মনের সঙ্গে যোগ করাচ্ছে আমার মনকে। মহাবিশ্ব এই স্যাটেলাইট শূন্যে ছেড়ে রেখেছে শুধু আমাদের দু’জনের মধ্যে যোগাযোগ করানোর জন্য। তুমি দেখো, তুমি একটি বার দেখো,’ প্রায় ভিখিরির মতো করে বলেছিল আদি।
‘তুমি দেখো। ভাল করে দেখো। তাকাও। চাঁদটার দিকে তাকাও ভাল করে আদি।’ মালিনী যেন আদেশ দিয়েছিল।
‘হ্যাঁ, তাকিয়েছি তো। তাকাচ্ছি তো,’ করুণ গলায় বলেছিল আদি।
‘এটা একটা স্যাটেলাইট আদিত্য। ওর আলোটা নিজের নয়। ওটা একটা ড্রাই, ডাস্টি বডি। ওটা তোমাকে আমার সঙ্গে যোগ করছে—হয়তো এটাই বলতে চাইছ। তবে শোনো এটা স্যাটেলাইট তো, তাই একটা ওয়র্ক স্টেশনের সঙ্গে আর-একটা ওয়র্ক স্টেশনের সম্পর্ক ঘটাচ্ছে শুধু। আর কিছু নয়। ডোন্ট ফ্যান্টাসাইজ। একটা সামান্য স্যাটেলাইটকে গ্লোরিফাই করার মানে নেই। বাই, গুড নাইট।’
পাথুরে, শুকনো আর পরের আলো ধার করে বেঁচে থাকা বুদ্ধুটার দিকে আর একবার তাকাল আদি। কলকাতার মাথার ওপর জ্বলে আছে। যেন ভোল্টেজ কম হওয়ার পরে জ্বলে থাকা জন্ডিস রোগীর চোখের মতো বাল্ব। আদির অপরিষ্কার মাথাটার মনে হল, তবু ওটাকে সুন্দর লাগছে কেন? লাগে কেন? এত হাজার হাজার বছর ধরে সব্বাই ওর দিকে তাকায় কেন?
আদির পা দুটো কেমন যেন বেয়াড়াপনা করছে। কোনও কথাই শুনছে না। কলকাতাকে ক্রমশ কেমন যেন শঙ্কু আকৃতির কোনও ফানেলের মধ্যে দিয়ে দেখতে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে ওর। গাড়ি-ট্যাক্সিগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে ওর। উলটো হয়ে যাচ্ছে যেন।
হঠাৎ বুকপকেটে ফোনটা দুটো ছোট্ট পিংপিং শব্দ করে নড়ে উঠল। মেসেজ। এখন মেসেজ? নিশ্চয় সার্ভিস প্রোভাইডার। না হলে এমন রাতে কে মেসেজ করবে ওকে? কার দায় ঠেকেছে?
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেসেজটা কাঁপা হাতে খুলল আদি। আর দেখামাত্র বুক কেঁপে গেল ওর। রুহানের ম্যাসেজ। লিখেছে: Malini’s Granny Hospitalised. Nurs, Holy Grass, Triangular Park ITS urgent.
হসপিটালে গ্র্যানি! মালিনীর। আর মালিনী রুহানকে সেটা জানাতে পেরেছে, আদিকে পারেনি! কত দূর গেছে মালিনী? আর কত অপমান করবে ও আদিকে? এখন রুহানের মেসেজ থেকে ওকে জানতে হচ্ছে এমন একটা খবর! আদির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও কোনও রিপ্লাই করল না। চুপ করে রইল শুধু। সেলটা বন্ধ করে মনে মনে বলল, যাবে না ও। মালিনী কী ভেবেছে, ওরই শুধু রাগ আছে? আদি ফালতু, ফেলনা? ওর রাগ হতে পারে না? আদি যাবে না। তাতে যা হওয়ার হোক, ও যাবেই না। মালিনী সিংহও বুঝবে আদিত্য ব্যানার্জি কে।
Chapter - 28
২৮
আবেশ বলল, ‘তুমি এত দেরি করছ কেন? এখনও মাথা শান্ত করে বলতে পারলে না? কী আশ্চর্য! তাড়াতাড়ি বলো।’
জামরুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। এদিকটায় বেশ ছায়া। মার্চের প্রচণ্ড গরম আর যেখানেই হোক, কিছুতেই বিশেষ সুবিধে করতে পারে না এই বাগানটায়। জামরুল গাছের পাশেই ইয়া মোটা একটা কাঁঠাল গাছ। তার তলায় সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো একটা বেদি রয়েছে। এতক্ষণ সেখানেই বসেছিল রাহিরা। এবার এসে দাঁড়িয়েছে জামরুল গাছের নীচে।
বাগানটা অনেক শখ করে বানিয়েছিল বাবা। ফুলের চেয়ে বাবার বেশি উৎসাহ ফলের বাগানের প্রতি। ছোট থেকেই দেখে আসছে রাহি। বাবা সৌন্দর্যের চেয়ে উপযোগিতাকে গুরুত্ব দেয় বেশি। মা আবার উলটো। ফুল ফুল করে একসময় পাগল ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফলের থেকে বাবা আর ফুলের থেকে মা, দু’জনেই সরে গেছে অনেকটা। বাবা তার কাজকর্ম নিয়ে আর মা সংসার নিয়ে খুব ব্যস্ত। আর বাবা-মায়ের শখ এখন এসে পড়েছে সাধুদার ঘাড়ে।
আজ রবিবার। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। তাই ছুটির দিন হলেও খাতা দেখার চাপ আছে রাহির। সারা সকাল খাতা দেখেছে বসে। সিক্সের হিস্ট্রি খাতা। তারপর এই বারোটা নাগাদ এসে একটা গল্পের বই নিয়ে বসেছিল কাঁঠাল গাছটার গোড়ায়। তার কিছু পরেই এসেছে আবেশ।
আজ ‘হেল্প আর্থ’-ও বন্ধ। আসলে এখন কাজকর্ম একটু কমের দিকে। এই গোটা অঞ্চলটাতেই এখন একটা ভোট ভোট হাওয়া। তাই সুধাদি বলেছে, চমকও বলেছে একটু চুপচাপ থাকতে। তবে বস্তি অঞ্চলের স্যানিটেশনের ব্যাপারটা নিয়ে সুধাদি বলেছিল যে, পার্টির সহযোগিতায় কাজ করতে। কিন্তু হোমি আর রাহি রাজি হয়নি। বাবাও বারণ করেছিল। হেল্প আর্থ-কে একটা রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া নিয়ে আপত্তি আছে ওদের। আর ত্রয়ণও বিরোধিতা করেছিল। বলেছিল যে, রাজনৈতিকভাবে এক্সপ্লয়েটেড হওয়ার কোনও মানেই হয় না। এক্সপ্লয়েটেশন পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ।
বড় বড় কথা বলা ত্রয়ণের যেন জন্মগত স্বভাব। একটা মানুষ সবসময় এমন মুখোশ পরে থাকে কী করে? সবার সামনে ভদ্র আর ভালর উদাহরণ, আর যেই রাহির সঙ্গে একা থাকে অমনি ভেতরের জন্তুটা দাঁত-নখ বের করে। কতদিন, জানে না, কতদিন আর এসব সহ্য করতে হবে রাহিকে! আর দিনকে দিন যেন সমস্যা বাড়ছে। গতকালই তো ত্রয়ণ ভয়ংকর কথা বলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে রাহির মনে হয় ও যেন ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছে জালে। যেন সব চেপে বসছে ওর চারদিকে। এর থেকে যেন বেরোতে পারছে না ও।
‘কী হল?’ আবেশ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছে যে, ও উদগ্রীব।
‘শোনো আবেশ, তুমি যেটা বলছ সেটা কিন্তু খুব সহজ নয়।’
‘সহজ নয়? কেন?’ আবেশ অবাক হল, ‘তোমার জিনিস, তুমি যাকে খুশি দেবে, এতে প্রবলেমটা কী? আর জানোই তো, নানারকম শকুনের দৃষ্টি আছে ওটার ওপর।’
চোয়াল শক্ত করল রাহি। কথার ভেতর কথা লুকিয়ে থাকে। ‘শকুন’ বলতে কী মানে করছে আবেশ তা খুলে না বললেও রাহির কাছে কিন্তু স্পষ্ট। নিশ্চয়ই সেই সন্ধেবেলায় আবেশ কিছু শুনেছিল। বা আরও স্পষ্ট করে বললে, বুঝেছিল। না হলে ও এমন প্রস্তাব দিতই না। সেদিন আবেশ যখন প্রথমে অমন একটা কথা বলেছিল, রাহি সত্যি বলতে কী, খুব আশ্চর্য হয়েছিল।
আবেশ বলেছিল, ‘টাকা লাগবে কিছু। আমার চেনাশুনো ছেলেপিলে আছে কিছু। তাদের হাজার বিশেক টাকা দিলেই এই ত্রয়ণের বাঁদরামো সব ঠিক হয়ে যাবে। ও যে তোমায় বিরক্ত করে, আমি জানি। আর তোমায় দেখে বুঝি যে, সেটার লেভেলটাও খুব হাই। তাই তুমি বললে মালটাকে উচিত শিক্ষা দিতে পারি।’
‘না, না,’ রাহি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আবেশ কতটা জানে সেটার সম্বন্ধে ওকে জিজ্ঞেস করতে বেশ ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল এসব প্রসঙ্গ যাতে না ওঠে। কিন্তু আবেশকে কোনওদিনই ও কর্মচারী হিসেবে দেখেনি। চিরকাল বন্ধুর মতো ব্যবহার করেছে। সেটাই হয়তো ভুল হয়েছে, মনে হয়েছিল রাহির। এমন কেন যে বলছে ছেলেটা! ত্রয়ণ সম্পর্কে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি না করলেই ভাল। যদিও রাহি ভাবে, ঘটনাটা যদি কাউকে বলা যেত তবে খুব ভাল হত। কিন্তু বলবে কাকে? বাবা-মাকে বলা সম্ভব নয়। ত্রয়ণের কাজিন হল দীপা। ওকেও বলা যাবে না। তবে কি হোমি? কিন্তু সেটা আরও ভয়ংকর হবে। তবে? তবে? মাঝে মাঝে মাথা খারাপ লাগে রাহির। কষ্ট হয়। মনে হয় বুকের ভেতর এক দঙ্গল পাগলা হাতি ঢুকে পড়েছে। ত্রয়ণের সামনে আর কতদিন ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে ওকে? তবু আবেশ যা বলেছিল তাতে সায় দিতে পারেনি ও। কারণ, ত্রয়ণকে মারার থাকলে চমককে বললেই হয়।
‘তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? ত্রয়ণ একটা জানোয়ার। নরকের কীট। ওর চরম শাস্তি হওয়া উচিত।’
আবেশকে অমন রাগ করতে কোনওদিন দেখেনি রাহি। ও বলেছিল, ‘বাদ দাও। ওসব ভেবো না।’
আবেশ স্থির হয়ে তাকিয়েছিল রাহির দিকে। তারপর বলেছিল, ‘ত্রয়ণ তো জমিটা বাগাতে চায়, না?’
‘জ-জমি?’ রাহির অবাক হওয়া ক্রমশ বাড়ছিল।
‘ধরো, এমন কিছু হল যে, জমিটা ওর হাত হয়ে মার্চেন্টদের কাছে না গিয়ে তুমি সরাসরি দিলে মার্চেন্টদের? তবে?’
‘কিন্তু জমিটা তো…মানে…’ রাহি তোতলাচ্ছিল।
‘শোনো, আমি জানি, জমিটা তোমার নামে আছে। অর্থাৎ ওটা তোমার জমি। আর এটাও জানি, ত্রয়ণ সেটা তোমার থেকে নিয়ে মার্চেন্টদের দিয়ে দালালি খাবে। তার আগে তুমি যদি সেটা মার্চেন্টদের দিয়ে দাও। তবে ত্রয়ণের থোঁতা মুখ ভোঁতা হবে।’
‘কিন্তু…’ রাহি চুপ করে ছিল। কী বলবে ও? কী বলতে পারে? ত্রয়ণ যখন জানবে তখন যদি ও সব ফাঁস করে দেয়? তবে? তখন কে বাঁচাবে?
‘শোনো, শুধু টাকা নয়, আমরা আরও কিছু চাইব। সেটা হলে কাকুকে, মানে তোমার বাবাকে কনভিন্স করতে অনেক সুবিধে হবে।’
‘আরও কিছু মানে?’ রাহি এই প্রথম আগ্রহী হয়েছিল।
‘মানে, টুর্নামেন্ট। আমরা বলব যে, মার্চেন্টরা যেন ‘হেল্প আর্থ’-এর সঙ্গে জয়েন্টলি একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করে। নামকরা প্লেয়ারদের নিয়ে। আমি এমন একটা টুর্নামেন্ট আগেই কন্ডাক্ট করেছি। এতে ‘হেল্প আর্থ’-এর যে কতটা প্রচার হবে, ভাবতে পারবে না। শোনো রাহি, একটা প্রদর্শনী ম্যাচ করে আর কত টাকা তুলবে? নামকরা প্লেয়ারদের নিয়ে, সামনে একটা নোবেল কজ রেখে যদি টুর্নামেন্ট করতে পারো, তবে দেখবে বাকি জীবনটা আর আমাদের পিছনে ঘুরে তাকাতে হবে না। আর জমিটারও দাম দেবে একটা। জমি ফালতু পড়ে থেকে কী লাভ হচ্ছে বলো? ফ্যাক্টরি হলে স্থানীয় কত লোক কাজ পাবে বলো? আর ত্রয়ণও জোর করতে পারবে না। একটু বাবাকে বোঝাও যে, ইগো আর রাগ ধরে না বসে থেকে এই সুযোগে মানুষের চোখে নিজেদের ভাবমূর্তিটা আরও উজ্জ্বল করে নিতে হবে।’
গোটা ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলে অতটা নয়। এটা বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছিল রাহি। জমিটা রাহির নামে হলেও, সেটা শুধু নামেই। বাবার ইচ্ছেতেই আসলে সব হবে। আসলে জমি নিয়ে ওর কোনও আগ্রহ নেই। সত্যি, বাবা কেন যে ওই জমিটা দেবে না, সেটা বুঝতে পারছে না ও। ইগো এত বেশি কেন হয় মানুষের? ফ্যাক্টরি হলে তো সত্যিই লোকের চাকরি হয়। এতে বাবার সুখ্যাতি আরও বাড়বে। এমন নয় যে-জমিটা খুব কিছু কাজে লাগছে। পড়েই আছে। আর রাহি জানে ও নিজে যদি বাবাকে বলে বাবা অমত করবে না। ওর কথাতেই না বাবা প্রতি মাসে টাকা দিয়ে আবেশকে রেখেছে। ওদের যে পরিমাণ জমিজমা আছে, তাতে এই জমিটা না থাকল, কী গেল তাতে কিছু এসে যাবে না। তবু সুধাদির প্রস্তাব পর্যন্ত বাবা ভদ্রভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে। রাহি বোঝে বাবা যতই ‘না’ বলুক, সুধাদির সঙ্গে বাবার একটা ঠান্ডা লড়াই চলে তলায় তলায়। তবু, রাহি বললে বাবা অমত করবে না। শুধু কাঁটা বলতে ত্রয়ণ। আর ওর হাতের ওই জিনিসগুলো।
‘কী হল? বলো?’ আবেশ অস্থির হয়েছিল।
‘আমি…মানে, আমায় একটু ভাবতে দাও।’ রাহি ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছিল।
‘সময়ই তো নেই। দেখো, আদি আছে। আমি কথা বলিয়ে দিচ্ছি।’
‘না,’ রাহি তীব্র স্বরে বলেছিল, ‘একদম নয়।’
‘আরে, তুমি ভেবো না। আমি সেই সুযোগে প্রাথমিক কথাটুকু বলে রাখি মাত্র।’
‘দেখো, আমার একটু সময় লাগবে। তুমি কিন্তু কিছু কমিট করবে না।’
‘না না,’ আবেশ হেসেছিল, ‘আমার জমি যে, আমি কমিট করব?’
‘তাও, আমি কিন্তু কিছু বলছি না।’ রাহি আর দাঁড়ায়নি।
আবেশ শুধু বলেছিল, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা। মনে রেখো। সঙ্গে ‘হেল্প আর্থ’-এর পাবলিসিটি। তোমার বাবার নাম। ত্রয়ণের মুখে জুতো। শুধু তোমায় রাজি হতে হবে। বুঝেছ রাহি? না বুঝলে, বোঝার চেষ্টা করো।’
বোঝার চেষ্টা করেছে রাহি কিন্তু বুঝতে পারেনি ঠিক। বাবার কাছে গিয়ে বলতেও পারেনি কিছু। আসলে কী বলবে? কতটা বলবে? কীভাবে বলবে? বাবা আজকাল বাড়িতে থাকে খুব কম। ব্যাবসার কাজে খুব ঘোরাঘুরি করে। ব্যাবসা যত বাড়ছে বাবার চাপও তত বাড়ছে। মাঝে মাঝে চিন্তা হয় রাহির। যদি বাবার কিছু হয়ে যায়! এত বড় ব্যাবসাটার তবে কী হবে? দিন দশেক আগে তো এই আশঙ্কার কথা বলেও ছিল বাবাকে। বাবা তখন সবে খেতে বসেছিল। মা, বাবা আর রাহিই কেবল ছিল খাবার টেবিলে। রাহি একবার ভেবেছিল যে, জমির কথাটা তোলে। কিন্তু ভরসা হয়নি। কেন হয়নি ঠিক জানে না। হয়তো ভয় ছিল কথাবার্তার খোঁচায় যদি বেরিয়ে আসে আসল সত্যগুলো। সত্য জীবনের এক মর্মান্তিক দিক। কেন যে প্রয়োজনীয় আর ভাল জিনিসগুলোই তেতো হয়! রাহি বুঝতে পারছিল ও এমন বয়সে পৌঁছে গেছে যেখানে বাবা-মা আর ওর ভেতরে একটা কাঁটাতার উঠে গেছে। ও বুঝেছিল কাঁটাতার পেরোনোর আর কোনও উপায় ওর নেই।
বাবা হয়তো বুঝেছিল সেই দ্বিধা। হয়তো রাহির আপাত স্থিরতাই তার কাছে অস্বাভাবিক লেগেছিল। তাই বাবা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী রে মা? কিছু বলবি?’
‘আমি?’ যেন ধরা পড়ে গেছে এমনভাবে চমকে উঠেছিল রাহি।
‘হ্যাঁ। আজ বড্ড চুপচাপ যে,’ বাবা মৃদু হেসেছিল।
‘না, এমনি। এই ভাবছিলাম তোমার কথা,’ রাহি কোনওমতে বলেছিল।
‘আমার কথা? কেন রে পাগলি?’ বাবার মুখে আনন্দের হাসি দেখেছিল রাহি।
বাবা যে খুশি হয়েছে বুঝেছিল রাহি। হাসি পেয়েছিল ওর। যেই মিথ্যে বলল, অমনি খুশি হয়ে গেল বাবা। কিন্তু যদি সত্যিটা বলত? তবে? তবে কি আর এমন করে আনন্দ পেত বাবা? বরং দুঃখ পেত, হয়তো রাগও করত। কিন্তু দেখো, যেই মিথ্যে করে বলল অমনি সারাদিনের খাটুনিতে ক্লান্ত লোকটা কেমন ঝলমল করে উঠল!
রাহি বলেছিল, ‘না, ভাবছিলাম, তুমি যে এত পরিশ্রম করছ, তার ফলে কিন্তু তোমার শরীর যে-কোনও দিন খারাপ হতে পারে। এমনিতে তোমার সুগার আছে। প্রেশার হাই। দু’বার কিডনি স্টোন হয়েছে। তারপর এত খাটনি। শরীরে দেবে তো? তোমার যদি শরীর খারাপ হয়, তোমার ব্যাবসার কী হবে বলো তো? মানে এত বড় করছ যে ব্যাবসাটা, সেটা দেখবে কে তুমি অসুস্থ হলে?’
বাবা বলেছিল, ‘শোন, শুয়ে-বসে খাওয়া আমার পোষাবে না। আর আমার সঙ্গে যারা আছে, তারা যথেষ্ট বিশ্বাসী আর পরিশ্রমী।’
‘তাও, তোমার দেখা আর অন্যদের দেখা কি এক হল? দাদা যদি তোমার সঙ্গে থাকত, তা হলে না হয় একটা সাপোর্ট হত। কিন্তু তা তো আর হয় না। তাই বলেছি যে, আর এত দৌড়ঝাঁপ কোরো না। কী হবে দৌড়ঝাঁপ করে?’
‘তোর দাদাকে টানছিস কেন এর মধ্যে?’ মা বলেছিল হঠাৎ, ‘তোর বাবার মতো কি সবাইকে টাকার পিছনে দৌড়োতে হবে?’
‘ক্ষমতার পিছনে দৌড় এর চেয়েও সাংঘাতিক।’ বাবা শান্ত গলায় বলেছিল, ‘তোমার ছেলে যেটা করছে সেটা খুব ভয়ংকর। ক্ষমতাকে গ্রাস করতে গেলে একদিন ক্ষমতা মানুষকে গ্রাস করে। আর যেভাবে ও বোমা পিস্তলের ভরসায় বেঁচে থাকে, সেটা আরও মারাত্মক। তুমি ওকে লাই দিয়ো না।’
‘আমি লাই দিচ্ছি?’ মা অবিশ্বাসভরা চোখে তাকিয়েছিল বাবার দিকে।
‘নয়তো কী?’ রাহি পক্ষ নিয়েছিল বাবার, ‘এই যে আজ এমন নেশা করে এসে বমি করতে শুরু করল সন্ধেবেলা, সেই থেকে যে ঘরে গিয়ে পড়ে আছে, দীপাকে বাজে কথা বলছে ক্রমাগত, সে ব্যাপারে মা তুমি কী করছ? তোমার তো ছেলেকে শাসন করা উচিত ছিল, নাকি?’
‘সে কী!’ বাবা চমকে উঠে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে।
‘তোমার আর উঠতে হবে না। দীপা ঘরে খেয়ে নিয়েছে। আর চমকও ঘুমিয়ে পড়েছে।’ মা বাবাকে খাওয়া ছেড়ে উঠতে না করে এক নিশ্বাসে বলেছিল কথাগুলো।
‘তাও, মা তুমি কতদিন দাদার হয়ে সাফাই গাইবে?’ রাহির রাগ হয়ে গিয়েছিল।
‘এই হয়, বয়সে বিয়ে না দিলে মেয়েদের এমনটাই হয়,’ মা রাগে গরগর করতে করতে কথাটা বলে ভস্ম করে দেওয়ার মতো তাকিয়েছিল রাহির দিকে।
‘বিয়ে? এর মধ্যে বিয়ে এল কোত্থেকে?’ রাহি অবাক হয়েছিল ভীষণ।
‘কেন, বিয়ে করবি না তুই?’ মা বলেছিল।
‘আশ্চর্য! এর ভেতর বিয়ে আসে কোত্থেকে?’ রাহি আবার জিজ্ঞেস করেছিল।
‘তোর মতো বয়সে আমার চমক হয়ে গেছে। আর তুই বাড়িতে বসে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে বিবেকগিরি করছিস?’
মায়ের যে কেন হঠাৎ রাগ হয়ে গিয়েছিল ঠিক বুঝতে পারেনি রাহি।
‘আরে, তুমি এমন করে বলছ কেন?’ রাহি আবার জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কেন? আমি তোর মা, তোর বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে পারি না?’
‘নিশ্চয়ই পারো। কিন্তু তা বলে এখন?’
‘কেন? বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে হলে পঞ্জিকা দেখতে হবে নাকি?’ মায়ের রাগ ক্রমশ যেন বাড়ছিল, ‘তোর কাছে চিঠি লিখে পারমিশন নিয়ে বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে হবে?’
‘আরে, তাই বললাম?’ রাহির রাগ হচ্ছিল।
‘তুমি জিজ্ঞেস করো মেয়েকে, কবে বিয়ে করবে ও?’ মা এবার বাবার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
বাবা এতক্ষণ যেন পিংপং খেলা দেখছিল। এবার বলল, ‘এটা কিন্তু সঠিক প্রশ্ন। তা, তুই কবে বিয়ে করবি রে?’
‘বাঃ,’ মা বিরক্তিতে মাথা নেড়েছিল, ‘বাপ এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন কবে বাদামভাজা খাবে!’
বাবা হেসেছিল, তারপর রাহির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোর কি কাউকে পছন্দ? মানে বিশেষ কেউ আছে যাকে তুই বিয়ে করতে চাস?’
‘আমি বিয়ের কথা চিন্তাই করিনি,’ রাহি গম্ভীর গলায় বলেছিল।
‘তোর কি কিগানকে পছন্দ?’ বাবা আচমকা জিজ্ঞেস করেছিল।
‘অ্যাঁ?’ রাহি থতমত খেয়েছিল। তারপর কথাটা বোধগম্য হওয়ার পর আচমকা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল রাহির।
‘তুই তো প্রায়ই যাস ওর কাছে। রান্নাবান্না করেও নিয়ে যাস। তা, তোর কি ওকে পছন্দ?’
‘না, না,’ কোনওক্রমে বলেছিল রাহি। তারপর হেসে ব্যাপারটা হালকা করার জন্য বলেছিল, ‘তোমার মাথায় এসব এল কেন?’
‘না, ভাল লাগতেই পারে। ছেলেটি সুন্দর, আর ভাল। আমার তো ভালই লাগে,’ বাবা হেসে তাকিয়েছিল রাহির দিকে।
‘বোঝো,’ মা বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল রাহির দিকে, ‘সেই জন্যই তোকে বলতাম যে, এমন হুটহাট করে ওর বাড়ি যাস না। এমনিতে একা থাকে, বিয়ে করেনি। লোকে খারাপ কথা বলবে। তা শুনতিস আমার কথা? নে, এখন নিজের বাবাই বলছে।’
‘মানে?’ বাবা থতমত খেয়েছিল, ‘আমি তো এমনি বলছি। আর রাহি যায়, ভাল করে। একটা মানুষ একা থাকে। কী খায় না খায়, রাহি গিয়ে খোঁজখবর নেয়, ভাল করে।’
‘তবে বেশি যাওয়া মোটেও ভাল নয়। তুমিই বলছ বিয়ের কথা। তা হলে, চিন্তা করো, অন্যরা কী বলবে? আর আমার মেয়ের বিয়ে ওর সঙ্গে দেব কেন? অর্ধেক বাঙালি, অর্ধেক সাহেব। চালচুলো নেই,’ মা কথাগুলো বলে তাকিয়েছিল রাহির দিকে।
কিগান। কিগানকে বিয়ে করতে পারলে কেমন হত? রাহি জানে তা সম্ভব নয়। কিগান এক গ্র্যানাইট পাথরের দুর্গ। ওকে ভেদ করা যায় না। কী আছে ওই দুর্গের ভেতরে তাও জানা যায় না। শুধু দূর থেকে দেখা যায় যেন। রাহি বোঝে, এখন আর কিগানের জন্য ওর মন পাগলামোও করে না। আগে যেমন ওর ঘরে ঢুকলে সেই হাওয়ায় জড়িয়ে থাকা মাস্কের গন্ধটা ওকে পাগল করত, এখন আর তেমনটা করে না। বরং শুধু একটা কষ্ট দেয়। ঘাসের ঘন সবুজ রঙের এক কষ্টের ছায়া যেন পড়ে রাহির বুকের মধ্যে। যা কোনওদিন পাওয়া যাবে না, তার সামনে এলে যেমন কষ্ট হয় মানুষের। তবে তা আর পাগল করে না ওকে। বরং শান্ত করে। ওর সীমানাটা বোঝায়। রাহি জানে, কিগান আজও ওর দেওয়া ঘড়িটা পরেনি। আজও বাক্সবন্দি হয়ে ঘড়িটা পড়ে আছে ঘরে। জানে, আজও মাঝরাতে কিগান বসে থাকে অন্য কারও জন্য।
রাতে, নিজের ঘরে বসে রাহি মাঝে মাঝে ওই একলা, নিঃঝুম কিগানের কথা মনে করে। মনে হয় কোথা থেকে এল এই ছদ্মবেশী রাজপুত্র? কোন অভিশাপে সে এমন নির্জনবাসী হয়েছে? কেন অমন শান্ত, স্থিত মানুষটার চোখ দুটো অমন অস্থির? কাকে খোঁজে তারা? কাকে খোঁজে তার মাঝরাতের মাউথঅর্গান? তার গিটারের কর্ড? কে তার মনে, মাথায় পদ্মচিহ্ন এঁকে নির্বাসিত করেছে? আসলে কে এই কিগান অর্ক ব্যানার্জি? কার এই কিগান অর্ক ব্যানার্জি?
রাতে, হাওয়ায় তীব্র হয়ে ওঠে কাঠালচাঁপার মনখারাপ। ওদের নিঝুম বাড়ি আর বাগানের ভেতর ঝিঁঝি-র শব্দ ঘন হয়। চাঁদ গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে লম্বা বাঁশবাগানের মাথায়। রাহি বোঝে, এই রাজপুত্র ওর নয়। এ রাজপুত্রের জীবন অন্য কোথাও রাখা আছে।
সেদিন বাবা-মায়ের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল রাহি। তবু বাবা বলেছিল, ‘আমার মেয়ে যদি কাউকে পছন্দ করে, তবে সে যে-ই হোক আমি তার সঙ্গেই ওকে বিয়ে দেব। আমার মেয়ে যা চায় আমি তাই দেব ওকে। একটা জীবনে যেন কোনও আফশোস না থাকে ওর।’
রাহির খুব ইচ্ছে করছিল সেই সুযোগে জমির কথাটা একবার তোলে। না, ঠিক বিক্রির জন্য নয়। তবে অন্তত কথাটা তুলে বাবার এখনকার মতামতটা জেনে নেওয়া দরকার মনে হয়েছিল ওর। তবু তুলতে পারেনি। সংকোচ হয়েছিল। মনে হয়েছিল এ যেন অপরাধ। যেন না বলে অন্যের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া।
‘মাথা খাও। আরও মাথা খাও মেয়ের,’ মা এঁটো বাসন জড়ো করে সরিয়ে রাখতে রাখতে গজগজ করছিল।
বাবা হেসে বলেছিল, ‘ওর সময়মতো ও ঠিক বিয়ে করবে।’
‘এ কি ট্রেন না প্লেন যে, সময় না হলে ছাড়বে না? আমার হয়েছে বিপদ। বাপ আর মেয়েকে নিয়ে জেরবার হয়ে গেলাম,’ মা গজগজ করতে করতে চলে গিয়েছিল।
‘তুমি আমায় সব দিতে পারো?’ রাহি হেসে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘চেয়ে দেখ,’ বাবা হেসে হাত ধুতে চলে গিয়েছিল।
রাহি দেখেছিল বিশ্বাস আর তার পরের নানা বন্ধুর পথ। দেখেছিল বাবা, মা, আর তার মধ্যে নানা রঙের আবদার, আনন্দ। এসবকে কি তুচ্ছ, নস্যাৎ করে দিতে পারে ও? কার জন্য পারে? কতটা পারে?
‘কী হল? এমন থম মেরে গেলে কেন?’ আবেশ জিজ্ঞেস করল।
‘না, থম মেরে না। আসলে ভাবছিলাম কী হবে,’ রাহি জামরুল গাছের তলা থেকে সরে হাঁটতে লাগল।
‘কী হবে মানে?’ আবেশ অবাক মুখ করে পাশে পাশে হাঁটতে লাগল।
‘মানে দেখো,’ রাহি শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে বলল, ‘আমরা তো কত কিছু প্ল্যান করি, সব কি হয়? বস্তির লোকেদের জন্য সুস্থ স্যানিটেশন, রাস্তার গাছ কাটা আটকানো, কিছুই পারলাম কি? স্যানিটেশনের জন্য নাকি কীসব অনুমতি নিতে হবে। গাছ কাটা নিয়ে বলতে গেলে নাকি সুধাদির সমস্যা হবে। তা এত কিছুর মধ্যে যদি নাই হল ম্যাচ। নাই হল সব। তাতে কী হল?’
‘আরে?’ আবেশ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘এতদিন আমি যে এত দৌড়োদৌড়ি করলাম তার কী হবে? বেশ কিছু টাকার স্পনসর আনলাম। তাদের বললাম যে, এমন একটা ক্রিকেট ম্যাচ হবে, যাতে তাদের নাম ডিসপ্লেড হবে। তার বেলা? এবার তো তারা আমায় চাঁদা তুলে ঠেঙাবে। তখন কী করব আমি? আর এবার তো আর মোটে একটা ম্যাচ নয়। আমি গোটা একটা টুর্নামেন্ট করার কথা বলছি। ভাবতে পারছ কতটা গ্র্যান্ড স্কেলে হবে কাজটা? এখন যদি কিচ্ছু না হয়, অ্যাডভারটাইজাররা কি আমায় রক্ষে রাখবে?’
‘মানে? তুমি তাদের এসব বলেছ কেন?’ রাহির অবাক লাগল।
‘আরে, না বললে কি আর টাকা দিত? সমাজসেবা ক’জন করতে চায়? সবাই তো নাম চায়। আর এরা বিজনেস হাউজ। প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন। প্রফিট ছাড়া ফালতু টাকা ঢালবে কেন? এরা চায় পাবলিসিটি, তাই আমি বলেছি। গত সপ্তাহখানেক ধরে তো এরা ঝালাপালা করে দিচ্ছে আমায়। রাহি তুমি সিরিয়াস হও। দেখো, জমিটা নিয়ে কী করবে।’
রাহি হাসল। আবেশ কাজটা বেশ মন দিয়ে করছে। ‘হেল্প আর্থ’-এর লাভও হচ্ছে। তবে ওর সমস্যা হল এই যে মাঝে মাঝেই লিমিট ক্রস করে যায়। এই যে দুম করে এমন একটা কমিটমেন্ট করে বসে আছে, তার কি কোনও কারণ আছে? শর্ট টার্ম লাভের জন্য এমন মিথ্যে বলার কারণ আছে কি? এতে তো নিজেকেই অপ্রস্তুত আর অপদস্থ হতে হয়। তা ছাড়া, ‘হেল্প আর্থ’-এর তো বদনাম হচ্ছে। এটা কেন বোঝে না ও?
রাহি ভাবল এটা নিয়ে ওকে কিছু বলে, কিন্তু তার আগেই বাধা পেল। দেখল সাধুদা আসছে। বেশ হন্তদন্ত হয়েই আসছে। আর চেঁচিয়ে বলছে, ‘চলো চলো, অতিথি এসেছে। তাড়াতাড়ি চলো।’
‘অতিথি?’ অবাক হল রাহি। এমন দিনে হঠাৎ অতিথি আবার কে?
ফলের বাগানটা বাড়ির পিছনের দিকে। ওর সামনে দিয়ে পাথরের তৈরি একটা রাস্তা ঘুরে সামনের দিকে গেছে। এটা খুব সুন্দর। পথের পাশে একটু দূরে দূরে পুরনো আমলের গ্যাসবাতির মতো ঘোমটা লাইট পোস্ট লাগানো রয়েছে। সন্ধেবেলা তার আলোয় জায়গাটা ভীষণ সুন্দর দেখায়।
রাস্তাটা আগে ছিল না। কিছু বছর আগে তৈরি করা হয়েছে। এক দিকে ভালই হয়েছে। আসলে আগে জায়গাটা জঙ্গলের মতো হয়ে ছিল। সাপ বেরোত প্রায়ই। তাই নিয়ে সাধুদা বলেছিল বাবাকে। বাবা একদম পরিষ্কার করে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।
রাহি আর আবেশের সঙ্গে কথা বাড়াল না। সাধুদার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘কে এসেছে সাধুদা?’
সাধুদা রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘হোমিদিদি।’
‘হোমি?’ আশ্চর্য হল রাহি, ‘তা ও এখানে এল না কেন? ও এ বাড়িতে নতুন নাকি?’
‘না না, আসতেই তো চেয়েছিল। কিন্তু বউরানি বারণ করলেন।’
‘কেন?’ রাহি অবাক হল, ‘মা বারণ করেছে কেন?’
‘কারণ, এমন রোদ, গরম, কলকাতায় ওদের তো আর অভ্যেস নেই। এর আগে একজন এসে অমন মুখ থুবড়ে পড়ল। তাও শীতকালে। আর এখন চৈত্রর শুরু। কিছু হলে কাণ্ডটা কী হবে বুঝতে পারছ? তাই বউরানি আর ঝুঁকি নেননি।’
‘সাধুদা,’ রাহি সাধুদার দিকে তাকাল ভুরু কুঁচকে।
‘কী হল?’ সাধুদাও দাঁড়িয়ে পড়ে পিছন দিকে তাকাল, ‘কী হয়েছে?’
এবার আবেশ কথা বলল, ‘সত্যি সাধুদা, মাইরি তুমি গুপ্তধনের নকশা বলছ নাকি? সোজাভাবে রাহি জিজ্ঞেস করছে কে এসেছে আর তুমি যা পায়ে ধরে সাধা শুরু করলে।’
‘কী বললে পায়ে ধরে সাধা? মানে?’ সাধুদা আবার হাঁটতে শুরু করল।
‘সাধুদা তুমি বলবে?’ রাহি দেখল প্রায় বাড়ির সামনে চলে এসেছে ওরা।
সাধুদা এবার দাঁড়াল। বলল, ‘ওই যে গো হোমিদিদির ভাই, ওই স্বাস্থ্যবান ছেলেটা সঙ্গে লম্বা সুন্দরমতো মেয়েটা।’
‘স্বাস্থ্যবান ছেলে? গুন্ডা? সে ব্যাটা তো মোটা,’ আবেশ খিকখিক করে হাসল, ‘মাইরি, সাধুদা ভদ্রতায় পিএইচডি করেছে। তুমি তো ক্লাস নিতে পারো, কীভাবে ভদ্র হবেন। আর সুন্দর মতো মেয়ে মানে? কোন সুন্দর মতো মেয়ে?’
‘আরে দিঘি এসেছে,’ রাহি বলল।
‘দিঘি? সেই সুকিয়া স্ট্রিটের মেয়েটা?’
‘হ্যাঁ। তো হঠাৎ ও এল যে!’ রাহি যেন কতকটা নিজেকেই প্রশ্ন করল।
‘জানো, মেয়েটাকে কোথায় যেন সুকিয়া স্ট্রিটে দেখেছি। আসলে বহু দিন সুকিয়া স্ট্রিটে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি তো। তাই ঠিক প্লেস করতে পারছি না,’ আবেশকে চিন্তিত দেখাল।
রাহি দেখল, ওর সঙ্গে আবেশ গেলে ভুলভাল আরও বকবে। তাই ওর যাওয়ার দরকার নেই। হয়তো হোমি কোনও পার্সোনাল দরকারে এসেছে।
ও আবেশকে বলল, ‘শোনো, তুমি বরং একবার হিসেবটা গিয়ে চেক করো। মার্চ এন্ড-এ কাগজপত্তর তো জমা দিতে হবে। আজ রোববার, ছুটি পাবে। অন্য দিনগুলো তো নানা কাজ করতে হয়। বুঝেছ?’
আবেশ হাসল। অর্থাৎ, বুঝেছে। মানে, রাহি যেটা বলেছে সেটা বুঝেছে, আর যেটা বলেনি, সেটাও বুঝেছে। তাই আর দাঁড়াল না। হাঁটতে হাঁটতে মেন গেটের দিকে চলে গেল। শুধু যেতে যেতে বলল, ‘আমি অল্প সময়ের জন্য একবার আসব।’
সাধুদা তাড়া দিল, ‘আঃ, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? চলো।’
‘যাচ্ছি তো,’ রাহি জোরে পা চালাল।
দুপুর তার ধারালো জিভ দিয়ে চাটতে শুরু করেছে সবটুকু। মাথার ওপর নীল আকাশটা ঝলসে কেমন যেন সাদা লাগছে। দূরে গাছপালাগুলো প্রদীপের শিখার মতো কাঁপছে। চৈত্র মাসে ভয়াবহ গরম পড়েছে এবার। কাঁঠালতলাটা বেশ ঠান্ডা ছিল। আর এখানে যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরে পড়ছে। রক্ষে এই যে ঘরে এসি আছে।
‘আরে কোথায় ছিলিস তুই?’ ওকে দেখামাত্র প্রায় চিৎকার করে উঠল হোমি।
‘কেন? আবেশের সঙ্গে বাগানে ছিলাম।’
‘ও,’ হোমি হাসল, ‘আমি তো ভাবলাম তোর লাভার বয় এসেছে।’
‘মানে?’ রাহির বিরক্ত লাগল। হোমিটার মুখে কোনও ট্যাক্স নেই। মায়ের সামনে এসব বলার কোনও মানে আছে?
‘মানে রুহান রে। বাব্বা, যখন আসে তখন তোকে এমনভাবে দেখে!’
‘রুহান?’ হঠাৎ পাশের সোফায় বসা দিঘি বলে উঠল।
‘কেন? তুমি চেনো?’ হোমি দিঘিকে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি? না না,’ দিঘি ঠোঁট চাটল, ‘আসলে নামটা আনকমন তো, তাই…’
‘ও, তবে ছেলেটা ভীষণ কমন। আবার আবেশের বন্ধু। কিগানদারও।’
‘কিগানদা কোথায়?’ গুন্ডা জিজ্ঞেস করল গম্ভীর মুখ করে।
‘আছে হয়তো বাড়িতে বা ফ্যাক্টরিতে,’ রাহি হালকা গলায় বলল, ‘কেন?’
‘ও কিছু না,’ দিঘি গুন্ডাকে চুপ করিয়ে বলে উঠল, ‘ওর কথা বাদ দাও তো! কত কিছু বলে। আসলে শমীদার সেই ঘটনার পর গুন্ডার শখ হয়েছিল ওর সঙ্গে আলাপ করার।’
মা এতক্ষণে প্রথম কথা বলল, ‘ছেলেটা ভাল। পরোপকারী। চুপচাপ।’
‘ভাল?’ গুন্ডা আবার ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল।
‘নিশ্চয়ই ভাল,’ দিঘি হাসল, ‘শমীদাকে সেদিন কী হেল্প করল, না?’
‘ভাল কথা, শমীদা কেমন আছেন?’ রাহি জিজ্ঞেস করল।
‘শমীদা?’ দিঘির ছটফটে ভাবটা হঠাৎ যেন কেমন নেতিয়ে এল। গলাটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে এল। যেন জানালায় জ্বলতে থাকা আলো নিভে গেল নিমেষে।
‘কেন? কী হয়েছে?’ রাহির সঙ্গে সঙ্গে মা-ও ঝুঁকে পড়ল এবার।
‘ক্যান্সার হয়েছে শমীদার। প্যানক্রিয়াসের হেড-এ। শেষ স্টেজ। ডাক্তার বলেছেন আর দু’-তিন মাস বড়জোর।’
‘অ্যাঁ?’ মা অবাক হল, ‘কী বলছ তুমি? সেদিন দেখলাম তো। ইয়ং বেশ। এখনই এই রোগ? ভাল করে চেক করা হয়েছে তো?’
‘হ্যাঁ আন্টি। সব করা হয়েছে। আর বেশি দিন নেই।’ দিঘি ক্লান্ত গলায় বলল।
‘ও, সো স্যাড,’ হোমি মাথা নাড়ল, ‘মুম্বই নিয়ে গেলেও হয় না?’
‘না, কিচ্ছু করা যাবে না। ওরাল কেমো চলছে। আর ব্যস, অপেক্ষা। তবে দিদি একবার মুম্বই যাবে। এই বিষয়ে ওপিনিয়ন নিতে।’
রাহির খারাপ লাগল। মানুষের জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে আরও একবার যেন নিশ্চিত হল ও। একটা সুস্থ সবল মানুষের ভেতরে কী আশ্চর্যভাবে যে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে মৃত্যু! রাহির মনে হল কিছু বলা উচিত ওর। কিন্তু কী বলবে? মৃত্যুর কোনও সান্ত্বনা হয় না যে! তাই রাহি চুপ করে রইল।
দিঘিই প্রথম কথা বলল, ‘যাক গে। কী আর করা যাবে। তা রাহিদি, এই যে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম সেটার জন্য তো একবারও খুশি হলে না?’
‘আমার সঙ্গে? সত্যি!’ রাহি অবাক হল।
‘নাকি মিথ্যে! আরে গুন্ডা আসছিল হোমিদির বাড়ি। আমার বাড়িতে মনখারাপ করছিল বলে ঝুলে পড়লাম। বলা যায় একরকম নিজের থেকেই নেমন্তন্ন নিলাম হোমিদির থেকে।’
‘ধ্যাত, কী মিথ্যুক!’ হোমি হাসল, ‘মেয়েটা খুব পাজি। সবসময় এমন করে কথা বলে! আমায় বলল আসবে কিনা। আমি বললাম হ্যাঁ। এতে আমার থেকে নেমন্তন্ন নেওয়ার কী আছে?’
‘তা বেশ তো। তোমরা সবাই এখানে খেয়ে যাবে,’ মা হেসে বলল।
‘মানে?’ হোমি তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠল।
‘মানে খুব সোজা। দুপুর হয়ে গেছে। খেয়ে যাবে। গৃহস্থের একটা কল্যাণ-অকল্যাণ তো আছে, নাকি?’
‘তা বলে খেতে হবে! তুমি একটা মিষ্টি দাও কাকিমা, তা হলেই হবে।’ হোমি প্রতিবাদ করে উঠল।
‘পাকামি করবি না হোমি। যা বললাম শুনবি।’
‘আর আমাদের বাড়ির রান্নাগুলো? সেগুলোর কী হবে?’ হোমি হাসল।
‘তোর মাকে আমি ফোন করছি। আমি বললে ও না করবে না।’
‘না কাকিমা, প্লিজ না। মাকে ফোন কোরো না।’
‘আমি বলছিলাম কী,’ গুন্ডা হাসল, ‘আমি যদি দু’ জায়গাতেই খাই। মানে, আন্টি এত করে বলছেন যখন, তখন না করাটা ঠিক ভাল ঠেকছে না। আমি এখানেও খাব। তারপর হোমিদির বাড়িতেও খাব।’
‘মানে? তুই নিজের চেহারাটার দিকে দেখেছিস? পুরো সুমো রেসলার। আর খাস না। কোনদিন দুম করে ফেটে যাবি,’ হোমি ধমক দিল।
গুন্ডা বলল, ‘সত্যি বলছি, আমি পারব। কাকিমা কষ্ট পাবেন, এটা হতে দেওয়া যায় না। কাকিমা তুমি আমায়, মানে আপনি আমায় খাবার দিন অল্প করে, আমি পারব।’
দিঘি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমায় কিন্তু দেবেন না আন্টি। আমি পারব না।’
‘একটু খাও। মাংস দিচ্ছি,’ মা নাছোড়বান্দা হয়ে বলল।
‘না না,’ দিঘি প্রায় লাফিয়ে উঠল।
মা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সেটা শোনার আগেই রাহির মোবাইলটা নড়ে উঠল। এসএমএস। বিরক্ত লাগল রাহির। এসব ভাল লাগে না ওর। কিন্তু কী আর করবে? ও মোবাইলটা দেখল। এ তো রুহান!
রুহান! তা হঠাৎ করল এসএমএস? অমন খারাপ ব্যবহার করার পর রাহির একটা বিরক্তি এসেছে ছেলেটার ওপর। না, রাগ নয়, বিরক্তি। ছেলেটা কেমন যেন! তোর রাগ হয়েছিল, তুই খারাপ কথা বলেছিস, ঠিক আছে, কিন্তু তারপর বারবার ফোন করা কেন? রাহি মিস্ড কল অ্যালার্টে বহুবার ওর নম্বর দেখেছে, কয়েকবার তো এমনিই উত্তর দেয়নি। একবার-দু’বার তো কষ্ট করে কেটে দিয়েছে ফোন। রাহি বুঝতে পারছিল যে, রুহান বোধহয় ক্ষমা চাইবে, কিন্তু রাহি তেমন পাত্তা দেয়নি। ছেলেটা ওকে যে চোখেই দেখুক না কেন, তাতে ওর কিছু এসে যায় না। রাহি মেসেজটা খুলল। ভুরু কুঁচকে দেখল লেখা আছে-‘আমি শিয়ালদা স্টেশনে আছি। তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে। ফ্রি থাকলে মেসেজ করো। আমি ট্রেন ধরব। খুব আর্জেন্ট।’
রাহি অবাক হয়ে মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। কী লিখেছে এটা? রুহান এসব কী লিখেছে? কেন লিখেছে? কী এমন জরুরি কথা পড়ল? অবাক হয়ে মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল রাহি। কী উত্তর দেবে এর? রাহির কি উত্তর দেওয়া উচিত?
Chapter - 29
২৯
একটা জল ট্যাঙ্ক। উঁচু একটা জল ট্যাঙ্ক। তার শরীর সবুজ টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো। আবছা হয়ে আসছিল আলো। দূরে সোনার কাস্তের মতো চাঁদ জেগে উঠছিল ধীরে ধীরে। ভয় লাগছিল কিগানের। অমন ফাঁকা মাঠ, হিম জড়ানো হাওয়া আর দিঘি! ভয় লাগবে না?
দূরে, রাজারহাট নিউ টাউনের রাস্তা। খেলনার মতো গাড়িগুলো চলে যাচ্ছিল দ্রুত। আরও দূরে ডাইনোসরের পাঁজরের মতো লাগছিল লম্বা বাড়িগুলো। আর এসবের ফাঁক দিয়ে সন্ধে নামছিল আকাশের ঢালু বেয়ে।
ফুল শার্টের হাতাটা গুটিয়ে রেখেছিল কিগান। কবজিতে বাঁধা ঘড়িটা থেকে সবুজ এক আশ্চর্য আলো বলের মতো যেন জেগেছিল শূন্যে। গলা শুকিয়ে আসছিল কিগানের। কষ্ট হচ্ছিল কথা বলতে। মনে হচ্ছিল কেন এখানে এসেছে ও? পাশে ওর গা ঘেঁষে বসে ছোট ছোট কামড়ে চকোলেট খাচ্ছিল দিঘি। হালকা কোকোর গন্ধ, পারফিউমের সঙ্গে মিশে পাক খাচ্ছিল হাওয়ায়। ওরা কেউ কোনও কথা বলছিল না।
দিঘি ফোনে কিন্তু অনেক কথা বলেছিল। কিগান তখন কলকাতায় পোস্টেড। লাঞ্চের পর কাজের চাপ ছিলই না সেদিন। নিজের টেবিলে বসে একটা রুবিক্স কিউব নিয়ে সল্ভ করার চেষ্টা করছিল ও। দুটো লেয়ার মিলিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় লেয়ারটা মেলাতে পারছিল না কিছুতেই। আসলে এর একটা ফর্মুলা হয়। তার শেষটা কিছুতেই মনে পড়ছিল না কিগানের। মানে, একটা অংশ মনে পড়ছিল, বাকিটা পড়ছিল না। কিগান জানে, এটাই ওর সমস্যা। একবার রোখ চেপে গেলে কিছুতেই সেই কাজটা না করে থাকতে পারে না ও। কেবলই মনে হয়, মানুষ হয়ে পারবে না? কিগানের আশপাশ থেকে ক্রমশ মুছে যাচ্ছিল অফিসের হইচই, মানুষজন, ফাইলপত্তর। শুধু একটা ঘনক আর তার ছ’টা তল শুষে নিয়েছিল ওর সমস্ত মনোযোগ। আর ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠেছিল আচমকা।
ফোনটা আসায় একটু চমকে উঠেছিল কিগান। ফোনের সুরেলা গিটারটাও কেমন যেন কর্কশ মনে হয়েছিল ওর। কিউবটায় একটা মোচড় দিয়ে ও বিরক্ত মুখে তাকিয়েছিল ফোনটার দিকে। কে এসময়? আর ও অবাক হয়ে দেখেছিল স্ক্রিনে লেখা উঠেছে ‘দিঘি’।
দিঘি? হঠাৎ দিঘি ফোন করল ওকে? কিউবটা রেখে মোবাইলটা তুলেছিল কিগান, ‘হ্যালো?’
‘তুমি কোথায়?’ দিঘির গলায় টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ।
‘আমি? আমি তো অফিসে। কেন?’ কিগান আশ্চর্য হয়েছিল।
‘দেখা করবে আমার সঙ্গে?’
‘কী?’ ঠিক বুঝতে পারেনি কিগান।
‘বলছি, আমার সঙ্গে আজ দেখা করবে?’
‘তো—তোমার সঙ্গে?’ খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল কিগান। কী বলে কী মেয়েটা?
‘কেন, দেখা করা যায় না? আমি বাঘ, না ভালুক যে, দেখা করবে না?’ দিঘির গলায় ঝাঁঝ। ও বলেছিল, ‘কেন দেখা করবে না?’
‘না, মানে…অফিসে কাজ…ইয়ে…’
‘একদিন কাজ না করলে পৃথিবী রসাতলে যাবে না। তুমি এসো। আমি ইডেন গার্ডেন্সে চার নম্বর গেটের সামনে অপেক্ষা করছি।’
‘আরে!’ কিগান বিপন্ন গলায় বলেছিল, ‘আরে করছ কী? আমি যাব কী করে এখন? হুট করে বেরিয়ে যাওয়া যায় নাকি?’
দিঘি জেদের গলায় বলেছিল, ‘তুমি না এলে আমিই তোমার অফিসে আসছি। তুমি না বললে কি ভেবেছ যে, আমি জানতে পারব না কোথায় তোমার অফিস?’
‘এই সর্বনাশ!’ কিগান ঢোক গিলেছিল, ‘আরে বাবা, অমন কোরো না। তোমার মাথা খারাপ হয়েছে?’
‘কেন, মাথা খারাপের কী হয়েছে?’ দিঘি গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘তুমি এমন বলছ কেন? দাঁড়াও আমি অফিসে আসি তারপর তোমায় দেখাচ্ছি।’
‘আরে! আমি আসছি। দাঁড়াও একটু, আমিই আসছি,’ কিগান তাড়াতাড়ি বলেছিল।
‘দ্যাটস লাইক আ গুড বয়। তাড়াতাড়ি এসো।’
ফোনটা কেটে চুপ করে একটু বসেছিল কিগান। টেবিলের ওপর আধখ্যাঁচড়া রুবিক্স কিউব পড়ে ছিল। জটিল। জীবনের সব কিছুই বড় জটিল। তবে এই ঘনকের ধাঁধার ফর্মুলা আছে। তা দেখে সমাধান করা যায়। কিন্তু জীবনের কোনও ফর্মুলা হয় না। কোনও নিয়ম হয় না। জীবন কক্ষনও নিয়ম মেনে চলে না।
বসের কাছ থেকে ছুটি পেতে সময় লাগেনি কিগানের। তারপর বেরিয়েই একটা অফিসের গাড়ি পেয়ে গিয়েছিল। তাকে বলেছিল ওকে ইডেনের চার নম্বর গেটের কাছে ড্রপ করতে।
একটা লেবু রঙের কুর্তি আর জিন্স পরে ব্যাগ কাঁধে দাঁড়িয়ে ছিল দিঘি। নরম হাওয়ায় উড়ছিল কপালের চুলগুলো। গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়েছিল কিগান। অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল দিঘিকে। বুকের ভেতর আশ্চর্য এক মোচড় অনুভব করেছিল কিগান। মনে হচ্ছিল ওর বুকের ভেতরটাতে কিছু একটা মেলানোর জন্য কে যেন ওর মনটা মোচড় দিচ্ছে প্রাণপণে। তবু মিলছে না। কিচ্ছু মিলছে না। পায়ে পায়ে দিঘির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিগান।
‘যাক, তুমি এলে তবে,’ দিঘি ঠোঁট টিপে হেসেছিল, ‘ভিতু কোথাকার।’
‘হঠাৎ এভাবে? কী ব্যাপার?’ প্রশ্ন করেছিল কিগান।
‘তুমি আজকের আকাশটা দেখেছ?’
‘আকাশ? কেন? সেই তো ছাই রঙের।’
‘ধ্যাত, দুপুরে একটু বৃষ্টি হল না?’ দিঘি বলেছিল, ‘তখন স্যারের কাছে পড়তে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি থামতেই দেখি কেমন দারুণ নীল রঙের আকাশ! ঠিক তোমার চোখের মতো। তাই আর পড়তে ইচ্ছে করল না। স্যারকে বললাম, মাথা ব্যথা করছে।’
‘সে কী? কেন?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘আচ্ছা বোকা তো! তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। তোমার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছিল। তাই চলে এলাম। মনে হচ্ছিল তোমার সঙ্গে একা একা সময় কাটাই।’
‘দিঘি,’ কিগান নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল, ‘আমাদের বোধহয় এসব না করলেই ভাল হয়। আমাদের বয়সের পার্থক্যটা দেখো। অবস্থার পার্থক্যটা দেখো। তোমার গোটা জীবন পড়ে আছে। আর…’
‘আর?’ দিঘি গভীর চোখে তাকিয়েছিল, ‘আর কী?’
‘বলছি। কিন্তু এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে…মানে পরিচিত কেউ দেখলে…তুমি বুঝতে পারছ তো, কী বলতে চাইছি?’
এবার দিঘি চিন্তিত হয়েছিল। ঠোঁট কামড়ে সামান্য চিন্তা করে সামনে দিয়ে যাওয়া একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়েছিল দ্রুত। তারপর উঠে পড়েছিল এক নিমেষে। কিগানকেও ডেকে নিয়েছিল।
‘রাজারহাট, নিউ টাউন।’ ট্যাক্সিওলাকে কথাগুলো বলে গাড়ির সিটে ছড়িয়ে বসেছিল দিঘি।
‘নিউ টাউন?’ কিগান কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘হ্যাঁ। ওখানে কেউ আমাদের ডিস্টার্ব করবে না। কেউ চিনতেও পারবে না।’
‘তা বলে অত দূর?’
‘ধ্যাত, এ তো সত্যিই ভিতু দেখছি!’ দিঘি আলতো হাতে ঘুসি মেরেছিল কিগানকে। বলেছিল, ‘বাদ দাও। কী যেন বলছিলে! “আর” না কী?’
‘হ্যাঁ,’ কিগান দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, ‘বলছিলাম, আমি এসব খেলায় পারদর্শী নই। তুমি হয়তো জানো না যে, কলেজজীবনে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেম ছিল। সে আমায় ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে নেয়। সেটা আমার কাছে একটা মারাত্মক শক ছিল। আমি খুব মনখারাপ করে থাকতাম। একরকম ডিপ্রেশনই বলতে পারো। সেইখান থেকে আমি নিজেকে সামলেছি। নিজেকে ঠিক করেছি। আমি আর-একবার হার্ট ব্রেক নিতে পারব না।’
‘হার্ট ব্রেক? কেন? তোমার কী মনে হয়? আমি হার্ট ব্রেক করব তোমার? তোমায় ছেড়ে চলে যাব? কেন যাব?’
‘কারণ…,’ কিগান মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘যাবে। আমি জানি তুমি যাবে। তোমার অল্প বয়স। প্রচুর ছেলে বন্ধু তোমার। মনও থিতু নয়। আজ আমায় ভাল লাগছে। কাল অন্যকে লাগবে। কিন্তু আমার তখন কী অবস্থা হবে, ভাবতে পারছ? তাই বলছি, এমন কোরো না। প্লিজ।’
দিঘি রাগ রাগ মুখ করে বলেছিল, ‘তোমার আমাকে এতটা শ্যালো মনে হয়? মনে হয় যে, খুব সহজেই আমার মন পালটে যাবে?’
‘দেখো,’ কিগান ঘুরে দিঘির দিকে বসেছিল, ‘তোমার বয়স কম। সামনে পুরো জীবনটা পড়ে আছে। তুমি সামনে আরও অনেক ছেলের সংস্পর্শে আসবে। তারা তোমায় পছন্দ করবে, আর তুমিও পছন্দ করে ফেলবে একজনকে। দেখো, তখন আর এমন মনে হবে না।’
‘মানে!’ দিঘি প্রায় সরে এসে কিগানের বুকের কাছে ঢুকে পড়েছিল।
‘আরে। কী করছ?’ কিগান সরে ট্যাক্সির দরজার সঙ্গে ঘেঁষে বসেছিল। একবার চট করে সামনে দেখে নিয়েছিল। রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে ট্যাক্সিচালক দেখছে না তো ওদের! তারপর বলেছিল, ‘এমন কোরো না। লোকজন দেখছে।’
‘দেখুক। তাতে আমার কী? আর তুমি আমায় একটা সত্যি উত্তর দাও।’
‘কী?’ কিগান জিজ্ঞেস করেছিল। জানালা দিয়ে আসা হাওয়ায় উড়ছিল দিঘির চুল। হালকা শ্যাম্পুর গন্ধ, দিঘির মিন্টের চিকলেটের সঙ্গে মিশে কোথায় যেন একটু বদলে দিচ্ছিল কলকাতাকে। কিগান নিজেকে ঘুরিয়ে নিতে চাইছিল। কিন্তু পারছিল না। দিঘি ডান হাতের সামান্য বাড়িয়ে রাখা নখ দিয়ে আঁকিবুকি কাটছিল কিগানের হাঁটুতে। কিগান নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, ‘কী উত্তর দেব?’
‘তুমি আমায় ভালবাসো না?’ দিঘি আঁকিবুকি কাটা থামিয়ে আলতো করে হাত রেখেছিল কিগানের হাতে।
‘আমি তো সবাইকেই ভালবাসি,’ কিগান স্বাভাবিক গলাতেই উত্তর দিয়েছিল।
‘আবার? আবার ভুলভাল, পাশ কাটানো কথা শুরু করেছ?’ দিঘি আলতো করে চিমটি কেটেছিল কিগানের পায়ে, ‘আর যদি বলো না এমন কথা, এমন রাম চিমটি দেব যে, বুঝতে পারবে!’
‘আরে।’ কিগান হেসে ব্যাপারটা লঘু করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, ‘আমি সত্যিই সবাইকে ভালবাসি।’
‘খুব ঘ্যাম হয়েছে, না? আমি হ্যাংলা? আমার কোনও সম্মান নেই? নিজের থেকে তোমার কাছে এসেছি বলে এত কথা শুনতে হবে?’ দিঘি হঠাৎ ছিটকে গিয়েছিল।
‘আরে!’ কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে, ‘কী হল?’
‘তুমি, আমায় সত্যি করে বলো তো, আমায় তুমি ভালবাসো কি না? আই মিন প্রেম। বুঝেছ, প্রেম?’
কিগান চোয়াল শক্ত করে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। আকাশ থেকে রোদ সরে যাচ্ছিল ক্রমশ। বাইপাসের দু’পাশের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছিল। ক্রমশ নিউ টাউনের দিকে বাঁক নিচ্ছিল গাড়ি। মাথার ওপর মাফলারের মতো পেঁচিয়ে যাচ্ছিল উড়ালপুল। কিগান না তাকালেও বুঝতে পারছিল দিঘি আবার সরে এসেছে ওর দিকে।
‘তুমি এমন কেন করছ দিঘি? এতে কার ভাল হবে?’ কিগান শেষ চেষ্টা করেছিল।
‘তুমি জানো আর্য বলে একটা ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছে আমার। জানো, ও আমায় প্রোপোজ করেছে?’
‘তাই?’ কিগান স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে কোথায় যেন আবার অদৃশ্য হাত এসে রুবিক্স কিউব মোচড়াতে শুরু করেছিল। প্রোপোজ? তা তো করতেই পারে। একটা অল্পবয়সি ছেলে, একটা অল্পবয়সি মেয়েকে প্রোপোজ করতেই পারে। স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু তবু কষ্ট হচ্ছিল কিগানের। কেমন যেন ভারী লাগছিল বুকের ভেতরটা। মনে হচ্ছিল কী হবে আর ওর কাজকম্ম করে? কীসের জন্য বেঁচে থাকবে? ভেতরে রাগও ঘুরপাক খাচ্ছিল একটা। মনে হচ্ছিল আর্য না অনার্য তাকে ধরে বেদম ঠেঙায়।
‘তাই না তো কি মিথ্যে?’ দিঘি রাগের গলায় বলেছিল, ‘ছেলেটা ভাল দেখতে। বিশাল বড়লোক। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। বুঝেছ?’
‘বুঝেছি,’ কিগান হাতের মুঠো শক্ত করে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে।
‘তো? তুমি ভালবাসো আমায়? বুকের ভেতরটা জ্বলছে? হিংসে হচ্ছে?’
‘দিঘি, স্টপ ইট,’ কিগান আর নিতে পারছিল না।
‘কেন, স্টপ করব কেন? তোমাকে আজ বলতেই হবে। সেদিন ছাদে যখন চুমু খেয়েছিলাম সেদিন হোয়াই ডিড ইউ কিস মি ব্যাক?’
‘আমি…আমি…কী করব?’
দিঘি এবার মাথাটা নামিয়েছিল কিগানের কাঁধে, ‘এত ভয় কীসের? আমি তো তোমার।’
কিগানের কষ্ট হচ্ছিল গলার কাছে। মনে হচ্ছিল কোনও পাথর আটকে আছে। মনে হচ্ছিল কে যেন চাড় দিয়ে উপড়ে ফেলতে চাইছে সেই পাথর। কিগান আর পারেনি নিজেকে সামলাতে। আলতো করে জড়িয়ে ধরেছিল দিঘির হাত। বলেছিল, ‘আমার ভয় করে দিঘি। আমি যাকে ভালবাসি সেই আমায় ছেড়ে চলে যায়। বাবা, মা থেকে ঠাকুরমা, সবাই ছেড়ে গেছে আমায়।’
দিঘি বলেছিল, ‘দেখো ঠাকুরমার বয়স হয়েছিল। আর ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছ? তোমার বাবা-মায়েরটা অ্যাক্সিডেন্ট। আর কলেজের প্রেম? দেখো, হয়তো তোমায় ভালই বাসেনি সেভাবে। আমি তোমার। বুঝেছ?’
দিঘি এরপর গাড়ি থামাতে বলেছিল। কিগান ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়েছিল দিঘির সঙ্গে। তারপর দিঘির দেখানো পথেই ওরা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে বসেছিল দূরে এক উঁচু জল ট্যাঙ্কের গোড়ায়।
দিঘি কত কিছু বলে যাচ্ছিল। কত কথা যে জমা ছিল মেয়েটার! কখনও কিগানের হাতে হাত রেখে। কখনও ওর কাঁধে মাথা রেখে। তারপর ব্যাগের থেকে চকোলেট বের করে খেতে শুরু করেছিল। দু’-এক টুকরো জোর করে খাইয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল কিগানকে। কিগানের কেমন যেন হালকা মনে হচ্ছিল সব কিছু। মনে হচ্ছিল এমন সময় আর কোনওদিন আসেনি। সন্ধে তার চাদর বিছিয়ে দিচ্ছিল চরাচর জুড়ে। সোনার কাস্তের মতো চাঁদ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আকাশে।
দিঘি চকোলেট খাওয়া শেষ করে হঠাৎ এসে দু’দিকে পা দিয়ে কিগানের কোলে বসেছিল মুখোমুখি। কিগান বাধা দেয়নি আর। দিঘি কিগানকে দু’হাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরে খুব যত্ন করে ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল। কিগান জড়িয়ে ধরেছিল দিঘির কোমর। বুঝেছিল দিঘির চকোলেটটা ফ্রুট অ্যান্ড নাট।
সেই নিস্তব্ধ তারার সন্ধে, সেই নির্জন মাঠ, লম্বা জল ট্যাঙ্ক, সব উদগ্রীব হয়ে তাকিয়েছিল দু’জনের দিকে। ওরা দু’জন মুহূর্তের মধ্যে জমে গিয়েছিল, যেমন ভাবে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অ্যাম্বারের মধ্যে জমে থাকে পতঙ্গ।
তারপর একসময় দিঘি ঠোঁট সরিয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। অস্ফুটে বলেছিল, ‘কিছু বলো আমায়। এমন কিছু যা তুমি কোনওদিন কাউকে বলোনি। আর কাউকে বলবেও না।’
কিগান স্থির হয়ে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে। হেমন্তের নিস্তব্ধ আবছায়ায় দিঘির চোখ দুটো আটকে ধরেছিল ওকে। পাবলো নেরুদার সেই কবিতা কিগান অস্ফুটে বলেছিল, ‘Don’t go far off, not even for a day, because-/ because-I don’t know how to say it: a day is long/ and I will be waiting for you, as in an empty station/ when the trains are parked off somewhere else, asleep.’
জলের ট্যাঙ্কিটা বেশ উঁচু। সন্ধে হয়ে আসছে আজও। আজও সোনার কাস্তের মতো চাঁদ উঁকি মারছে আকাশে। শুধু ছোট টুনি বাল্বগুলো নামিয়ে আনা হচ্ছে জল ট্যাঙ্কি থেকে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাদিবস ছিল দু’দিন আগে। সেটা শেষ হয়েছে। এবার অলংকার খুলে নেওয়ার পালা।
কিগানের সব মনে আছে। ও আপনমনে হাসল একটু। Don’t go far off, not even for a day.
‘স্যার,’ শশীবাবু কখন এসে দাঁড়িয়েছে পাশে।
‘বলুন,’ কিগান শশীবাবুর দিকে তাকাল।
‘গৌরসাহেব আর শ্যামসাহেব আপনাকে মোবাইলে পাচ্ছেন না বলে আমায় ফোন করেছিলেন। আপনি কিছুক্ষণ পর একটু কল করে নেবেন প্লিজ।’
‘ও, ঠিক আছে।’ কিগান আর দাঁড়াল না। নিজের অফিসের দিকে হাঁটতে লাগল।
মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গেছে বলে সুইচ অফ করে মোবাইলটা চার্জে বসিয়েছে কিগান। তাই গৌর পায়নি। আসলে ওদের ড্রায়ারটা গন্ডগোল করছে। সেটা দেখতেই এতক্ষণ ফ্যাক্টরির মেনটেন্যান্স-এর লোকদের সঙ্গে ড্রায়ারের ওখানে গিয়েছিল কিগান। ওর এয়ার রিসিভার ট্যাঙ্কে কীসব সমস্যা আছে। মেনটেন্যান্স-এর লোকজন কাজ শুরু করে দিয়েছে। সমস্যা জটিল নয়। সারাই হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি।
কিগানের আজ শরীরটা ভাল নেই। ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে। এবার এত গরম পড়েছে যে, রাতে ঘুম আসছে না। তার ওপর প্রোডাকশনের চাপ আছে খুব। ফলে টেনশন থেকেই যায়। সব মিলিয়ে শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। তার ওপর ওদের নতুন ওই ফ্রুট জুস আর মিনারেল ওয়াটারের সেগমেন্টটা খোলা নিয়েও চাপ যাচ্ছে। গৌর আর দেরি করতে চায় না। এতদিন ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে-হবে করে সময় কাটাচ্ছিল। কিন্তু এবার তারা নড়েচড়ে বসেছে। আর সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। গৌর বলেছে অ্যাভেলেবেল ল্যান্ডে কাজ শুরু হবে। আর তারপর ঠিক দরকারমতো বাকিটা নিয়ে তাতেও কনস্ট্রাকশন হবে।
জমিটা নিয়ে রাঘব চক্রবর্তীর স্ট্যান্ড খুব পরিষ্কার। আমার জমি, আমি দেব না। যতটা বিক্রি করার করেছি। আর না। তবে অন্য কেউ হলে মার্চেন্ট মাল্টিপল্স-এর পক্ষে তার হাত থেকে জমি আদায় করা অসুবিধে হত না। কিন্তু রাঘব চক্রবর্তী তো আর এলেবেলে কেউ নন। তাঁরও অনেক অদৃশ্য হাত আছে। ফলে তাঁকে সহজ পথে কাবু করা যাবে না। বরং তাঁর ঘর থেকে মাল সরাতে হলে সিঁদ কাটতে হবে। সেই কাজটাই এখন করার চেষ্টা করছে আদি। যদিও সেটা খুব একটা ভাল লাগছে না কিগানের। কিন্তু যেখানে গৌর ভরসা দিচ্ছে সেখানে ও আর কী করে। তবে এই নতুন কাজটা নিয়ে অন্য একটা ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে কিগানকে। ওয়াটার বার্ডসের থেকে একজন এসেছিল ওর সঙ্গে গোপনে দেখা করার জন্য।
ঘটনাটা গত রবিবারের। দুপুরবেলা ল্যাপটপ নিয়ে সিনেমা দেখতে বসেছিল কিগান। একটা ফরাসি সিনেমা। খুব অন্যরকম। বেশ মন দিয়েই দেখছিল কিগান। হঠাৎ ডোরবেলের শব্দ শোনে ও। আগে ডোরবেল ছিল না ওর। সবে লাগিয়েছে, ফলে এখনও ঠিক শব্দটার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। তাই ওর ঘরেই যে বেল বাজছে সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল ওর। সিনেমাটা পজ করে ও উঠে গিয়েছিল। ওর টুকটাক কাজ করে দেয় বুধিয়া নামের যে-ছেলেটা সে দেশে গিয়েছে এখন।
দরজা খুলতেই সাদা হাফ শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরা একজনকে দেখেছিল কিগান। ভদ্রলোকের বয়স বছর পঞ্চাশ। মাঝারি উচ্চতা। গা দিয়ে খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে। ভদ্রলোকের মুখে ভীষণ ভালমানুষ ভালমানুষ ছাপ। কে লোকটা? জীবনে প্রথমবার দেখছে লোকটাকে। কিগান চিনতে পারেনি। ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ভদ্রলোকটির দিকে।
‘আপনি মিস্টার ব্যানার্জি তো?’ ভদ্রলোকের গলার স্বরটাও খুব সুন্দর, ‘আমিও ব্যানার্জি, শাণ্ডিল্য। পি কে ব্যানার্জি। ভেতরে আসতে পারি?’
‘ভেতরে?’ কিগান অপ্রস্তুত হয়েছিল। লোকটা এত হাসিখুশি আর অমায়িক যে, নিজেরই অস্বস্তি লাগছিল ওর। এমন অচেনা একটা লোক যদি দু’হাজার বছর ধরে চেনে ধরনের ব্যবহার করে, তা হলে কি অবাক লাগবে না?
‘আসুন,’ কিগান সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে হেসে সরে দাঁড়িয়েছিল।
ভদ্রলোক হেসে দরজায় দাঁড়িয়েই ঘরটা দেখে নিয়েছিল একঝলক। তারপর পায়ের স্লিপ-ইন ধরনের শু-টা খুলে রেখে ঘরে ঢুকেছিল। বলেছিল, ‘আপনি বেশ গোছগাছ করে থাকেন তো! যতদূর জানি বিয়ে করেননি। তবু এত ফিটফাট, অবাক লাগছে!’
আসলে এই নয় যে কিগান খুব গোছগাছ করতে পারে। তবে রবিবার সকালটায় ছুটি থাকে বলে নিজের বাড়িঘর নিজেই পরিচ্ছন্ন রাখে।
ঘরে খাট, দুটো ক্যাম্প চেয়ার, আলমারি আর একটা টেবিল। এ ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। ভদ্রলোক গিয়ে একটা ক্যাম্প চেয়ারে বসেছিল, ‘ওঃ, ভীষণ গরম এদিকে। একদম রোস্ট হয়ে গেছি গাড়ি থেকে নেমে আপনার এখানে আসতে গিয়ে। গাড়ির ভেতরটা এসি বলে রক্ষে। কী করে এই মাইক্রোওয়েভে থাকেন মশাই? তারপরও এমন সোনার বরণ ধরে রেখেছেন কী করে?’
কিগান কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না ভদ্রলোক কে! এমন হঠাৎ করে এসে, ঘরে ঢুকে গ্যাঁট হয়ে চেয়ারে বসেছে কেন লোকটা? কিন্তু স্বভাবগত ভদ্রতায় লোকটাকে জিজ্ঞেসও করতে পারছিল না কিগান।
‘আচ্ছা!’ ভদ্রলোক হেসেছিল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, ডোন্ট মাইন্ড। আপনি বিয়ে করবেন না? মানে, কিছু মনে করলেন না তো?’
কিগান ঢোক গিলে তাকিয়েছিল। এ ঘটক নাকি? এসি গাড়ি চড়া ঘটক আগে কোনওদিন দেখেনি কিগান। এ যদি ঘটক হয়, তবে একটা ইউনিক এক্সপিরিয়েন্স হবে। তবে কিগান বুঝতে পারছিল না, এ ঘটক হলে হঠাৎ ওর কথা জানল কী করে!
‘আমার পুরো নাম পুলককুমার ব্যানার্জি। আমার এক শালি আছে। সুন্দরী, গান জানে, ভাল চাকরি করে জিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ায়। মুখার্জি ওরা। একদম পাল্টি ঘর। কী বুঝলেন?’
এ শিয়োর ঘটক। এখন হাইটেক যুগ। তাই নিশ্চয়ই কোনও বিবাহবন্ধনী থেকে এসেছে। এখনকার দিনে খবরাখবর পাওয়া খুব সোজা। ওরাও হয়তো কিগানের খবর জোগাড় করে এসেছে বিয়ের ঘটকালি করতে।
কিগান মৃদু হেসে বলেছিল, ‘কিছু মনে করবেন না, আসলে আমার এখন বিয়ের কোনও ইচ্ছে নেই। তাই, প্লিজ আমাকে আর এসব বলবেন না।’
‘সে কী! বিয়ে করবেন না কেন? আপনার বাড়ির বড়রা কেউ…’
‘মা-বাবা আগেই মারা গেছেন, ঠাকুরমা ছিলেন, কিন্তু তিনিও গত হয়েছেন।’
‘ঠাকুরমাও নেই? সো স্যাড! কী হয়েছিল?’ পুলক খুব গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘বয়স হয়েছিল, হার্ট অ্যাটাকে সব শেষ,’ কিগান সহজ গলায় বলেছিল। ওর বিরক্ত লাগছিল এবার। আচ্ছা মানুষ তো! কে তার ঠিক নেই, উড়ে এসে জুড়ে বসে ক্যুইজ শুরু করেছে!
‘সো সরি,’ পুলক মাথা নেড়ে শোক পালনের মতো মুখ করে বসেছিল।
‘দেখুন, আপনাকে ঠিক চিনলাম না। মানে… আপনি…,’ কিগান ইতস্তত করেছিল।
‘আমি কে আমি বলিনি?’ ভদ্রলোকের যেন ঘুম ভেঙেছিল।
‘না, বলেছেন। কিন্তু আপনি কী জন্য এসেছেন, সেটা বলেননি।’
‘না, আমি বলিনি আমি কে! শুধু নাম বলেছি, তাতে কি আর বলা হয় কে আমি! আমি পুলককুমার ব্যানার্জি, সেল্স ম্যানেজার, ওয়াটার বার্ডস।’
‘ও,’ কিগান এবার বুঝেছিল, ‘কিন্তু আজ সানডে, ফ্যাক্টরি প্র্যাক্টিক্যালি বন্ধ। তা আপনাদের লোক তো এসে ডিটেল নিয়ে গেছে। আপনার আজকে আসার কারণ?’
‘তা নিয়ে গেছে। তারাই বলেছে আপনার কথা। আপনি খুব ডায়নামিক, এনার্জেটিক। তাই ভাবলাম আপনি বুঝবেন। সেই জন্য আপনার সঙ্গে একান্তে দু’-একটা কথা বলার ছিল।’
‘একান্তে?’ এই প্রথম ভুরু কুঁচকেছিল কিগানের। কী বলতে চায় লোকটা?
‘আপনি মিস্টার দিওয়ানের খুব কাছের একজন। এমনকী, কাজটার টেন্ডার কমিটিতেও আপনাকে রেখেছেন মিস্টার দিওয়ান। তাই ভাবলাম আপনাকে বলি। দেখুন মিস্টার ব্যানার্জি, যেসব পার্টিরা রয়েছে, তারা সবাই এক জিনিস কোট করবে। আপনাদের কনসালট্যান্ট তো সবাইকে মেটিরিয়াল ওয়াইজ এক প্ল্যাটফর্মে এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই মেটিরিয়াল তো বাজারেই পাওয়া যায়। সবাই মেক দেখে কিনবে আর সাপ্লাই দেবে। কেউ প্রফিট কম রাখবে ফাইভ পারসেন্ট কেউ আবার টেন পারসেন্ট। কম প্রাইস যার তাকে আপনারা চোখ বুজে কাজ দেবেন। তাই তো? কিন্তু সব দেখার পরও যে, এক্স ফ্যাক্টরটা থাকে সেটা আপনারা দেখবেন না?’
‘মানে?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘আরে ওয়র্কম্যানশিপ। কাজটা কীভাবে করা হবে। সেটা দেখবেন? সেটা দেখেন? না। কারণ, সেটা কিছুতেই দেখা সম্ভব হয় না। যদি ওয়র্কম্যানশিপ খারাপ হয় তবে প্রোজেক্ট কতটা ডিলেড হবে বোঝেন তো? এমনিতেই আপনাদের এত ডিলেড প্রোজেক্ট! কস্ট বেড়ে গেছে নিশ্চয়ই! তার ওপর যদি সাপ্লায়ার ঝোলায়, তবে কোথায় গিয়ে ঠেকবেন বুঝেছেন? তাই বলছি ওয়র্কম্যানশিপটাই কিন্তু আসল। এটা মাথায় রাখবেন।’
কিগান হেসেছিল, ‘সেই জন্য গত চার বছরে আপনাদের ছ’টা বড় বড় প্রোজেক্ট এখনও শেষ হয়নি। জাস্ট সবক’টা হয় হাফ ডান, নয়তো লিটিগেশনে ঝুলে আছে। ওয়র্কম্যানশিপ আপনাদের ভাল হলে এমন হত?’
পুলক একটুও অপ্রতিভ হয়নি। বরং হেসে বলেছিল, ‘সমস্যা সব কাজেই থাকে। দেড়শো কোটি টাকার দুটো প্রোজেক্ট যে দারুণ শেষ করলাম সেটা তো বললেন না! আর হাফ ডান জবের কথা বললেন তো, কিছু মনে করবেন না, আপনাদের দু’-একটা প্রোজেক্টও যে অবস্থায় আছে…’
‘দেখুন, আপনি এত সব কেন বলছেন? আমাদের কোম্পানি পলিসি নিয়ে তো অন্যের মাথাব্যথা না থাকলেও চলবে।’
‘আরে চটছেন কেন?’ পুলক হেসেছিল, ‘আমি চাই না আপনাদের এই কাজটায় এমন হোক। বরং যাতে না হয় তার জন্য আমাদের তরফ থেকে একটা অফার আছে। খুব সহজ, সাধারণ একটা অফার।’
‘মানে?’ কিগানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল।
‘দেখুন, পুরো কাজটা প্রায় দশ-বারো কোটি টাকার। আমরা সবাই কোটেশন জমা দেব উইথ প্রাইস। আপনারা সেটা বিহাইন্ড ক্লোজড ডোর দেখবেন, তারপর আমাদের কাছে রিবেট চাইবেন। মানে কে কত ডিসকাউন্ট দিচ্ছে সেটা জানতে চাইবেন। সেটাও আমরা আপনাদের জমা দেব। তারপর আপনারা সেই মূল প্রাইস থেকে ডিসকাউন্ট বাদ দিয়ে দেখবেন কে লোয়েস্ট দাম দিয়েছে। তাই তো?’
‘হ্যাঁ। তাই।’ কিগান বলেছিল। আসলে এটাই ওদের ওয়ার্কিং পলিসি।
‘আপনি জাস্ট আমাদের বলে দেবেন অন্যান্যরা কত ডিসকাউন্ট দিয়েছে। আমরা সেইমতো আমাদেরটা অ্যাডজাস্ট করে আপনাকে দিয়ে দেব। আপনি সেইমতো অনভলপটা চেঞ্জ করে দেবেন। রাজারহাটে সাউথ ফেসিং টু বেডরুম একটা ফ্ল্যাট আপনার। কেমন?’
‘আরে কিগানভাই, তোমাকেই খুঁজছিলাম!’ সিকিউরিটি অফিসের সামনে থেকে ডাক দিল গুরুং।
‘আমায়? কেন ক্যাপ্টেন?’
‘তোমায় ফোনে না পেয়ে ওই আবেশ ছেলেটি ফোন করেছিল আমায়। তোমায় খুঁজছিল,’ গুরুং সিকিউরিটি অফিস থেকে এগিয়ে এল ওর দিকে।
‘আমায়? কেন?’ অবাক হল কিগান, ‘কিছু বলেছে ও?’
‘না, তা তো বলেনি,’ গুরুং বলল, ‘আর একজন এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’
‘আমার সঙ্গে? কে?’ কিগানের বিরক্ত লাগল। আবার কোনও কোম্পানির লোক নয় তো?
‘তা জানি না। বলেছে যে, আবার পনেরো-কুড়ি মিনিট পরে আসবে। দেখা করা খুব জরুরি। কালকেই ভদ্রলোক সিকিম ফিরে যাবেন।’
‘সিকিম? সেখান থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে কে এল আবার?’ অবাক হয়ে গুরুংয়ের দিকে তাকাল কিগান, ‘ঠিক আছে ক্যাপ্টেন। আসলে একটু তোমার ঘরে বসিয়ো। আমায় বসকে ফোন করতে হবে একবার। ফোনটা সেরে আমি আসছি। কেমন?’
‘আর আবেশ যদি ফোন করে আবার? তখন কী বলব আমি?’
‘বলবে যেন রাতে আমায় ফোন করে নেয়। এখন আমি ব্যস্ত আছি।’
এবার অফিসের দিকে হাঁটা দিল কিগান। অনেকক্ষণ হয়েছে গৌর ফোন করেছিল। তবে আবেশ কেন ফোন করল সেটা নিয়ে খচখচ করছে মনটা। ব্যাটা এমন এমন সব কাণ্ড করে মাঝে মাঝে যে, অস্বস্তি হয় ওর। এই তো কিছুদিন আগেই যা করেছিল!
ছুটি ছিল সেদিন। দুপুরের দিকে রাহির থেকে আনা দুটো ডিভিডি ফেরত দেওয়ার জন্য ওদের বাড়িতে গিয়ে রীতিমতো চমকে গিয়েছিল কিগান। রাহিদের বসার ঘরে একা বসে ছিল দিঘি!
মানুষ যা চায়, তা প্রায় কখনওই হয় না। আর তারপর না হতে হতে, মানুষ যখন ভাবে, থাক হওয়ার দরকার নেই, ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন সব হতে শুরু করে। জীবনের মতো বড় ম্যাজিশিয়ান আর কোনওদিন দেখেনি কিগান। সে এমন সময় ঝোলা থেকে বেড়াল বের করবে যে, মানুষ তার থই পাবে না।
রাহিদের বসার ঘরে ঢুকে তাই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল কিগান। এত সামনে দিঘি! এত কাছে!
দিঘিও কয়েক সেকেন্ডের জন্য অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। তারপর যেন পূর্বজন্মের স্মৃতি ফিরে এসেছে, এমন মুখ করে ভুরু কুঁচকে চোয়াল শক্ত করে নিয়েছিল। আর ঠিক সেই সময়ই ভেতর থেকে এসেছিল আবেশ। বলেছিল, ‘আরে কিগানদা, তুমি একটু বোসো। তোমায় রাহি দেখেছে ভেতর থেকে। বলল বসতে। আসলে আমি দু’-একটা হিসেবের জিনিস দেখানোর জন্য এইমাত্র এসেছি। মার্চের এন্ডে অডিট আছে তো! আমি দেখে নিই, তারপর আসছি। বাই দ্য ওয়ে, ওর সঙ্গে আলাপ আছে তো?’ আবেশ দিঘিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করেছিল।
কিগান কিছু বলার আগেই দিঘি বলেছিল, ‘না নেই। একে আমি চিনি না।’
‘আরে তোমার জামাইবাবুকে সেদিন কোলে তুলে এনেছিল। মনে নেই?’
‘ও,’ দিঘি ছোট্ট করে মাথা নেড়ে ঘরের কোনায় রাখা টিভির দিকে মুখ ফিরিয়েছিল।
আবেশ তাও থামেনি, ‘কিগানদা হেভি লোক। ব্যাপক গিটার বাজায়, মাউথঅর্গান বাজায়, শুনে দেখবে। দারুণ লাগবে তোমার। তা তোমরা গল্প করো। আমরা আসছি এক্ষুনি।’
আবেশ চলে যেতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল কিগান। অবস্থাটা একদম ঘেঁটে দিয়েছিল ছেলেটা। দিঘির সামনে এত কথা বলার দরকার ছিল কি?
কিন্তু ভাবতে ভাবতেই আবার ফিরে এসেছিল আবেশ। বলেছিল, ‘আচ্ছা দিঘি, তুমি না সুকিয়া স্ট্রিটে থাকো? আরে কিগানদাও থাকত। আমি যেতাম একসময়।’
কিগানের মনে হচ্ছিল ধাক্কা মেরে আবেশকে বের করে দেয় ঘর থেকে। ও বলেছিল, ‘যাবি তুই ভেতরে?’
‘যা বাবা! আমার ওপর খচে যাচ্ছ কেন? আচ্ছা, আমি আসছি।’
এসি-র ঠান্ডাতে কেমন যেন কান নাক গরম হয়ে যাচ্ছিল কিগানের। বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। কিন্তু উঠে যেতেও পারছিল না।
‘হাতে ওই দুটো কী তোমার?’ দিঘিই প্রথম জানতে চেয়েছিল।
‘ডিভিডি,’ কিগান অস্ফুটে বলেছিল।
‘এখনও সিনেমা গেলো!’
সেই এক গলা! এক ঝাঁঝ! এক রকম শাসনের ভঙ্গি।
‘তা, মানে ওই আর কী!’ কিগানের মনে হচ্ছিল যে, কথা নয়, ও পাহাড় ঠেলছে।
‘তা সেদিন শমীদাকে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে কেন?’
‘আমি? মানে…’ অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল ধরার মতো কথা খুঁজছিল কিগান।
‘সবসময় পালায়। ভিতু, হেরো,’ দিঘি ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছিল, ‘সেদিন পুজোয় দেখে এমন ভাব করল যেন বাঘ দেখেছে!’
কিগান উঠে পড়েছিল। আর বসার মানে হয় না। দিঘি কি ভুলে গেছে কেন চলে এসেছে কিগান?
‘আবার পালাচ্ছে!’ দিঘি রাগী গলায় বলেছিল।
কিগান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবার। বলেছিল, ‘হ্যাঁ, চলে যাচ্ছি। তুমি বোসো। রেস্ট করো।’
‘কেন?’ দিঘির রাগ উধাও হয়ে হালকা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল গলায়। নাকি সবটাই মনের ভুল ছিল কিগানের?
‘কী কেন?’ রাহি এসে ঢুকেছিল ঘরে, ‘বাইরে থেকে শুনছি দিঘি কীসব বলছে!’
‘না, কিছু না তো,’ দিঘি ব্যাগ খুলে চকোলেট-বার বের করেছিল।
‘তবে?’ রাহির ভুরু কুঁচকে ছিল তাও।
‘কিছু না। এই দুটো ডিভিডি রাখো। আমার কাজ আছে। আমি আসছি,’ কিগান আর কাউকে কোনও কথা বলতে দেয়নি। বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। শুধু বেরিয়ে আসার আগে দেখেছিল দিঘি চকোলেটের টুকরো ভাঙছে। কোকোর মধ্যে দিয়ে উঁকি মারছে শুকনো ফল আর বাদাম। ফ্রুট অ্যান্ড নাট।
‘ওয়ান্ট টু হ্যাভ সাম?’ দিঘি তবু পিছন থেকে ডেকেছিল।
কিগান দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘আমি ফ্রুট অ্যান্ড নাট চকোলেট খাই না।’
‘আরে কিগানভাই,’ গুরুং প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে এসে অফিসে ঢোকার মুখটায় ধরল কিগানকে।
‘আরে ক্যাপ্টেন! তুমি আবার?’
‘কী করব? লোকটা দশ মিনিটেই ফিরে এসেছে। খুব তাড়া দিচ্ছে।’
‘মানে?’ অবাক হল কিগান, ‘তাড়া দিচ্ছে কেন? ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছে নাকি? বললাম না ওয়েট করতে।’
গুরুং কাঁচুমাচু গলায় বলল, ‘আরে পাহাড় থেকে এসেছে। ভাল মানুষ। একবার চট করে দেখা করে নাও না।’
‘ক্যাপ্টেন! তুমি না!’ কিগান রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল, ‘চলো।’
সিকিউরিটি অফিসের সামনে আলো জ্বলছে। এগুলো নতুন লাগানো মার্কারি ভেপার। পুরো জায়গাটাই যেন থইথই করছে আলোয়। আর ভেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটা। সামান্য বেঁটে। মোটা। পাহাড়ি গড়ন। এ কে? কেন এসেছে কিগানের কাছে? কিগান কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। ভদ্রলোকের চেহারার মধ্যে একটা ভালমানুষ ভালমানুষ ভাব আছে। পকেটে হাত দিয়ে ভদ্রলোক এদিক ওদিক দেখছে।
কিগান গিয়ে সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘নমস্কার। আমি কিগান। আপনি আমায় খুঁজছেন?’
ভদ্রলোক হাসল। দেখেই বোঝা গেল যে, আনন্দ হয়েছে ওর।
‘বলুন, আমি কী করতে পারি আপনার জন্য?’
‘অনেক কিছু। অনেক কিছু করতে পারেন। তবে সবচেয়ে আগে দশ মিনিট সময় যদি দেন।’
‘দশ মিনিট?’ কিগান হাসল, একটা জীবন এমনি এমনি কাটিয়ে দিল ও আর একজন মাত্র দশটা মিনিট চাইছে? ও বলল, ‘দিলাম। এবার বলুন, মাত্র দশ মিনিটে কীসের কথা বলবেন আপনি?’
ভদ্রলোক হাসল, বলল, ‘জীবন বদলানোর কথা বলব। নতুন জীবনের কথা বলব। আপনি শুধু একটু মন দিয়ে শুনুন আমার কথা। কেমন?’
Chapter - 30
৩০
আর কতদিন? আর কতদিন সময় আছে? আর কতক্ষণ এভাবে থাকবে মানুষটা? এমন কঙ্কালসার শরীর। সারা দেহে কালো কালো ছোপ, মাথায় খাবলা খাবলা চুল। দেখে মনে হচ্ছে ন্যাশনাল জিয়োগ্র্যাফিক-এ আফ্রিকান কোনও ভীষণ গরিব দেশের মানুষকে দেখানো হচ্ছে। অমন সুন্দর দেখতে ঝকঝকে মানুষটা এমন হয়ে গেছে! উঠতে পারছে না ঠিকমতো। দুর্বলতায় কথা বলতে পারছে না। এমনকী, পেটটাও ডিমভরা মাছের মতো ফুলে রয়েছে। পেটে জল জমে যাচ্ছে বারবার। বের করার সাতদিনের মধ্যে আবার ফুলে উঠছে পেট। শমীদাকে চেনাই যাচ্ছে না একদম। কেবিনের ভেতরে, স্যালাইনের লম্বা স্ট্যান্ডটার পাশে মনে হচ্ছে শমীদা নয়, অন্য কেউ শুয়ে রয়েছে।
শমীদার শরীরটা আবার হঠাৎ খারাপ করেছে গতকাল। তাই ভরতি করা হয়েছে নার্সিংহোমে। আজ মাকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে এসেছে দিঘি। এখন ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে। শমীর কেবিনে শমীর বাড়ির লোকেদের ভিড়। যদিও এতজন লোক আসায় নার্সরা আপত্তি করছিল, কিন্তু ডাক্তার শমীদাদের পরিচিত, তাই নার্সদের আপত্তি ধোপে টেকেনি। তা ছাড়া সত্যিই তো, সবাই জানে মানুষটা আর বেশিদিন নেই। যতই নিয়মে বাঁধো যা হওয়ার তা হবে। যে যাওয়ার, সে যাবে। তাকে বাঁধা যাবে না।
ঘরে অনেক লোক থাকলেও কেউ কথা বলছে না বিশেষ। সবাই চুপ করে দেখছে মানুষটাকে। একটা হালকা ওষুধের গন্ধ উড়ে বেড়াচ্ছে সারা ঘরে। এই গন্ধটা ভাল লাগে না দিঘির। কেমন যেন মনখারাপ আর মৃত্যুর গন্ধ মিশে থাকে এখানে। দিঘি তাই পছন্দই করে না এসব জায়গায় আসতে। তবু মায়ের জন্য আসতে হয়েছে।
মা ঘরের এক কোনায় বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শাড়ির আঁচল গায়ে জড়ানো। চোখ ছলছল করছে। দিঘি বুঝতে পারছে যে-কোনও সময়ে কেঁদে ফেলবে মা। মহুলের সঙ্গে শমীর যেমনই সম্পর্ক হোক না কেন, মা চিরকালই খুব ভালবাসে শমীকে।
মায়ের সঙ্গে কেউ কথা বলছে না বিশেষ। শমীদের বাড়ির লোকজন কেবিনের অন্য দিকে জটলা করছে। নিজেদের বড় অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছে দিঘির। মনে হচ্ছে ওরা যেন অস্পৃশ্য। যেন জোর করে নেমন্তন্ন বাড়িতে ঢুকে পড়া কেউ। এই জন্য এইখানে আসতে চায়নি দিঘি। কারণ, এর আগেও একবার এসে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে দিঘির। তাই আজ মা এখানে আসতে চাওয়ায় প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিল দিঘি। বলেছিল, ‘আমি যাব না। তুমি যাও।’
‘মানে!’ মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল দিঘির দিকে।
‘মানে, তোমার যাওয়ার থাকলে যাও। আমি যাব না। আগের দিন দেখোনি, ওরা কেমন ব্যবহার করে আমাদের সঙ্গে? ভাল করে কথা পর্যন্ত বলে না!’
‘তো?’ মায়ের গলার স্বরে রাগ এসে জমা হচ্ছিল।
‘তো মানে? আমরা মানুষ নই? আমাদের আত্মসম্মান নেই?’
‘এসব এখন বলছিস তুই? একটা মানুষ মারা যাচ্ছে আর তুই আত্মসম্মানের কথা তুলছিস?’
‘কেন তুলব না? আমরা মানুষ নই?’
‘মানুষ? একটা মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সামনে তুই তোর ইগো দেখাচ্ছিস?’
‘মানে? আমাদের সম্মানের মূল্য নেই?’
‘মানুষ বাঁচলে তবে না সম্মান!’ মা এবার রেগে গিয়েছিল খুব, ‘তোরা, এই বয়সের ছেলেমেয়েরা একটুও ছাড়তে শিখিসনি! সবসময় এত আমি-আমি করিস কেন তোরা?’
‘আমি-আমি মানে?’
‘এত ইগো কীসের তোদের? কী এমন রাজ্য জয় করে এসেছিস? কেন মানুষকে মানুষ মনে করিস না তোরা? আসলে কী হয়েছে জানিস, আমরাই আদর দিয়ে মাথা খেয়েছি তোদের। তোদের অ্যাচিভমেন্টের চেয়ে অ্যাটিটিউড বেশি।’
‘যাই বলো, অমন সম্মান বিকিয়ে…’
‘চুপ,’ মা এবার চিৎকার করেছিল, ‘আর একটা কথাও বলবি না। সোজা ড্রেস চেঞ্জ করে চল আমার সঙ্গে। অনেক তর্ক করেছিস। অনেক সুযোগ দিয়েছি তোকে কথা বলার। এই মানুষ হয়েছিস? আত্মসম্মান নিয়ে লেকচার দিচ্ছিস? মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারিস না, আবার আত্মসম্মানের কথা বলিস!’
‘দেখো মা, ওরা দিদির সঙ্গে যা…’ দিঘি তাও বলার চেষ্টা করেছিল।
‘ছিঃ, ছিঃ,’ মা বলেছিল, ‘তুই বলছিস ওরা দিদির সঙ্গে এখন খারাপ ব্যবহার করছে বলে আমরাও করব? এটা মানুষের মতো কাজ হবে? শমী তোকে কত ভালবাসে ভুলে গেছিস? তোর দিদি ওর সঙ্গে কত খারাপ ব্যবহার করেছে ভুলে গেছিস? এমনকী, ছেলেটাকে মেরেছে পর্যন্ত! ভুলে গেছিস সব?’
না, ভোলেনি দিঘি। কিচ্ছু ভোলেনি। সত্যিই দিদি খুব অন্যায় করেছে। কিন্তু সে তো রাগের মাথায়। তখন কি জানত শমীর এমন ভয়ংকর একটা রোগ হবে? রাগের মাথায় যা বলেছে, যা করেছে, সেটার জন্য শমীর বাড়ির লোকজন এখন কেন দিদির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে? শমীর শরীর খারাপের পর থেকে দিদি তো আপ্রাণ খাটছে শমীর জন্য। এমনকী দিদি সব রিপোর্ট নিয়ে মুম্বইও গেছে। তবে কেন শমীর বাড়ির লোকজন দিদির সঙ্গে এমন করছে?
শমী ভরতি রয়েছে দক্ষিণ কলকাতার একটা নার্সিংহোমে। তাই গুন্ডাকেও ডেকে নিয়েছে দিঘি। আসলে একা কেমন যেন ওর অরক্ষিত লাগে। মনে হয় শমীদের বাড়ির লোকেরা ওদের অপমান করবে। গুন্ডা থাকলে কি অপমান আটকাতে পারবে? না, পারবে না, জানে দিঘি। তবু, গুন্ডাকে আসতে বলেছে। কারণ, বন্ধু সঙ্গে থাকলে কোথায় যেন মনে একটা জোর পায় ও।
কিছুক্ষণ আগে অবধি গুন্ডা এই কেবিনেই ছিল। কিন্তু একটু আগে দিঘিকে কানে কানে বলেছিল, ‘আমি বাইরে আছি বুঝলি। মনে হচ্ছে আমি নয়, ছ’টা মানুষ এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে ভিড় করছে। এটা ঠিক নয়। আমি আসি।’ সেই থেকে গুন্ডা দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরে। খারাপ লাগছে দিঘির। কেন যে এমন খারাপ সময় যাচ্ছে! দিঘি যে দিকে তাকাচ্ছে, সেদিকেই সব কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া শমীকেও মুখোমুখি এমন অবস্থায় দেখতে কষ্ট হচ্ছে খুব।
ডাক্তার বলছে আর আশা নেই। বলছে আরও আগে আনলে ভাল হত। প্যানক্রিয়াসের হেড-এ ক্যান্সার। মানে, অন্তত সাধারণ মানুষের কথা অনুযায়ী এটাই হয়েছে শমীর। এটা নাকি একদম শেষ সময়ে ধরা পড়ে। আর তখন কিচ্ছু করার থাকে না। এই রোগটাই নাকি সাইলেন্ট কিলার হিসেবে কুখ্যাত।
নিঃশব্দ ঘাতক। প্রথম দিন শব্দটা শুনে খুব আশ্চর্য লেগেছিল দিঘির। মনে হয়েছিল কোনও খুনি কি এতদিন ধরে তবে ছায়ার মতো অনুসরণ করে শমীর শরীরে পুঁতে দিয়েছিল মারণ বীজ? মৃত্যু এমন! কোনওদিন সরাসরি মৃত্যু দেখেনি দিঘি। আর এবার যখন হবে, সেটা যে এমনভাবে হবে, তা ভাবতেই পারেনি ও। তবে কি মৃত্যু সবার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছে? অপেক্ষা করছে সঠিক সময়ে তার শরীরে বীজ পুঁতে দেওয়ার জন্য? রাস্তাঘাটের এই অসংখ্য মানুষ কি আসলে টাইম বোম? টিকটিক করে কি তারা নিঃশব্দ ঘাতকের ঠিক করে দেওয়া সময়ের দিকে এগিয়ে চলেছে, ফেটে যাবে বলে?
মা কাঁদছে এখন। সরু ধারায় চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। শমীর শরীর খুব দুর্বল। অধিকাংশ সময়ই চোখ বন্ধ করে থাকে। তবে আজ খুলছে মাঝে মাঝে। হাসার চেষ্টাও করছে।
দিঘি দেখল শমী আবার চোখ খুলল। আর তারপর হাতটা কষ্ট করে তুলে ইশারার মতো কী একটা যেন করল। ডাকছে? শমী কি ডাকছে দিঘিকে?
দিঘি দেখল শুধু ও নয়, অন্যরাও লক্ষ করেছে। শমীর এক দাদা এগিয়ে গেল বেডের দিকে। মাথা নিচু করে কিছু বলতে গেল। কিন্তু বাধা দিল শমী। তারপর আবার দিঘির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। ডাকছে, দিঘি বুঝল। ও দেখল, শমীর দাদার মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। কিছুটা রাগও। দিঘিরা এসেছে যখন তখন তো আর ঘাড় ধরে বের করে দিতে পারে না। কিন্তু সবাইকে বাদ দিয়ে যে, শমী দিঘিকে ডাকছে সেটা ভদ্রলোক মানতে পারছে না কিছুতেই।
দিঘি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। দাদাটি সরে গেল বিরক্ত মুখে। দিঘি বেডের পাশের গদি মোড়া টুলটায় বসে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবে শমীদা?’
শমী হাত নেড়ে কাছে ডাকল দিঘিকে। তারপর দুর্বল গলায় বলল, ‘মা কাঁদছে কেন রে?’
‘তুমি রেস্ট করো তো,’ দিঘি হেসে বলল।
‘আমি মরে যাব বলে?’ শমী সামান্য তুতলে বলল।
‘ধ্যাত, বাজে কথা কেন বলো?’
‘ঠিকই তো। মাকে কাঁদতে না কর। তোরা কি আমায় মরার আগেই মারবি? এত কষ্ট দিস কেন রে?’
‘শমীদা,’ দিঘি বলল, ‘তোমায় কিন্তু এত কথা বলতে না করা হয়েছে।’
‘জানিস দিঘি, তোর নাম জানিস কেন দিঘি রাখা হয়েছিল?’
‘না তো? কেন? আর তোমায় কে বলল?’ অবাক হল দিঘি।
‘মহুল,’ শমী সামান্য থামল, ‘প্রথম প্রথম বিয়ে হয়েছে তখন আমাদের। মহুল তখন একটু ভালবাসত আমায়। বলেছিল, দিঘির চোখ দুটো দেখেছ, কী সুন্দর! একদম টলটল করছে। তাই বাবা ওর নাম রেখেছিল দিঘি।’
দিঘি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শমীর দিকে। কেন এমন বলছে শমী? এমন নিচু, দুর্বল গলায়, এমন কমজোরি শরীর নিয়ে কেন ডুবুরির মতো তুলে আনছে সব পুরনো আসবাব?
‘শমীদা এসব বলছ কেন?’
‘তোর চোখ এমনিতেই টলটলে, তাতে আর জল আনিস না।’
‘জল!’ দিঘি চট করে চোখের কোনায় হাত দিল। আরে! তাই তো! কী আশ্চর্য! জল! চোখে জল? ও বলল, ‘দিদি তোমায় এসব বলেছে?’
‘হ্যাঁ, মহুল বলেছে। আচ্ছা, মহুল কবে আসবে রে?’
‘আসবে শমীদা, দু’-চার দিনের মধ্যেই আসবে।’
‘চলে আসতে বল। আর কী হবে? আমার ঘড়ির দম ফুরিয়ে এসেছে। যে-কোনওদিন বন্ধ হয়ে যাবে। তাও ভাগ্যিস…’ শমী চোখ বন্ধ করল।
‘কী ভাগ্যিস? কী ভাগ্যিস শমীদা?’
‘তাও ভাগ্যিস এই রোগটা হল। না হলে তো মহুল পাত্তাই দিত না।’ শমী হাসল।
‘কী বাজে বকছ?’ দিঘির এবার সত্যি সত্যি কান্না পেল।
‘আসলে কী জানিস। ও বড্ড পাগলি। প্রেম সম্বন্ধে ঠিক বোঝে না। ও যে আমায় ভালবাসে সেটাই বোঝে না। অনেকে এমন থাকে, জানিস? ভাবে প্রেম খারাপ জিনিস। ভাবে ভালবাসা দুর্বল মানুষের কাজ। বোঝে না যে, এটাই সবচেয়ে কঠিন। তুই এমন নোস তো?’ শমী হেসে আবার চোখ বন্ধ করে নিল।
দিঘি সরে এল শমীর কাছ থেকে। বসে থাকলে আরও কথা বলবে মানুষটা। তখন সমস্যা হবে শরীরে। ও দেখল মা কাঁদছে এখনও। আচ্ছা মানুষ! এতক্ষণ কেউ কাঁদতে পারে?
ও চাপা গলায় বলল, ‘মা, কী হচ্ছে কী? আর কেঁদো না। শমীদাও বারণ করেছে। ওর সামনে কাঁদলে, ওর কেমন মনে হবে বলো তো?’
‘ঠিক আছে।’ মা বুঝল ব্যাপারটা। তারপর চোখ মুছল। জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলল রে? খারাপ কিছু?’
‘না, না, দিদির কথা জিজ্ঞেস করল,’ দিঘি চাপা গলায় বলল, ‘জিজ্ঞেস করল কবে আসবে। দিদিকে দেখতে চাইছে।’
মা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারল না। ঘরে একজন সিকিউরিটির লোক এসে বলল, ‘চলুন চলুন, টাইম ওভার। এবার বেরোতে হবে আপনাদের।’
এই লোকগুলো ভীষণ রুড হয়। শিক্ষার অভাব থাকে এদের। তবে হয়তো এরা এভাবে বলে কারণ কোনও কোনও লোক এভাবে না বললে শোনেও না। তবু, একজন রোগীর ঘরে এদের আচরণ ভীষণ আপত্তিকর। দিঘির মনে হয় ঠাস করে এক চড় মারে। ও আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এল কেবিনের বাইরে।
গুন্ডা বাইরের করিডরে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিল ফোনে। ওকে দেখে এগিয়ে এল, ‘কী রে? কেমন দেখলি?’
‘কিছু দেখার আছে বলে তোর মনে হয়? আর কতদিন বল? ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে যে, আর সময় বেশি নেই।’
‘এত রোগা হয়ে গেছে যে, তাকানোই যাচ্ছে না,’ গুন্ডা ঠোঁট কামড়াল।
দিঘি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। গত পুজোতেও তো সব একসঙ্গে গেলাম হোমিদিদের ওখানে।’
‘শালা, ওই মালটাই অপয়া,’ গুন্ডা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল।
‘মানে? কে অপয়া?’ দিঘির অবাক লাগল।
‘ওই যে হাইব্রিডটা, শালা,’ গুন্ডা ঘুষি পাকাল, ‘তার ওপর আবার ভালমানুষি দেখানো! এই যে দু’-একবার দেখা হয়েছে, মনে হয়েছে মেরে ওই শুয়োরের বাচ্চাটার চোয়াল খুলে নিই।’
‘আঃ গুন্ডা,’ দিঘি ধমক দিল। গুন্ডা কাকে নিয়ে বলছে স্পষ্ট বুঝতে পারছে ও।
শেষবার ও যখন চাপাডাঙায় গিয়েছিল গুন্ডাকে অনেক বুঝিয়েছিল যাতে ওখানে গিয়ে মাথা গরম করে কিছু না করে বসে। তবে গুন্ডা তো প্রথমে নিয়েই যেতে চায়নি দিঘিকে।
গুন্ডা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই কেন যাবি রে? আমি হোমিদিকে টাকা ফেরত দিতে যাব। তুই যাবি কী করতে?’
‘আমার ভাল লাগছে না ঘরে থাকতে। দমবন্ধ লাগছে। মনখারাপ করছে, চাপাডাঙা কী সুন্দর। আমি যাবই।’
‘আরে সেখানে তো সেই রেপিস্টটা থাকে।’ গুন্ডা বলেছিল।
‘বাজে কথা বলিস না। কে রেপিস্ট? আর যে থাকে, আমার তাতে কী? সে থাকে বলে আমায় ভয় পেতে হবে নাকি? যাওয়া বন্ধ করতে হবে নাকি?’
‘ঠিক বলেছিস,’ গুন্ডা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, ‘শালা, বেশি ভ্যানতাড়া করলে ধাক্কা মেরে মালটার ওপর বসে পড়ব। চিড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে। চল। আর ব্যাটাকে একবার সামনে পেলে, অ্যায়সা…’
‘না,’ দিঘি থামিয়ে দিয়েছিল গুন্ডাকে, ‘খবরদার কিচ্ছু করবি না বলে দিলাম। একটা কথাও বলবি না। যা হয়েছে হয়ে গেছে। আর একটা কথা বললে দেখিস তোকে আমি কী করি। যেমন তোর শরীর মোটা, তেমনই মাথাটাও মোটা।’
‘ঠিক আছে, বলব না,’ গুন্ডা আশ্বাস দিয়েছিল, ‘তবে দেখা তো আর সবসময় হবে না। আমি শিয়োর জানিস, দেখা হবে না। দেখিস তুই।’
জ্যোতিষী হলে গুন্ডার পশার যে জমত না, বলাই বাহুল্য।
আচ্ছা, সেদিন কেন চাপাডাঙায় গিয়েছিল দিঘি? কার টানে? কেন বাড়িতে মন বসছিল না ওর? কেন মনে হচ্ছিল শরীরের ভেতরটা ভারী লাগছে। কষ্ট হচ্ছে। কেন মনে হচ্ছিল যে, কিগানকে দেখতেই হবে একবার? না হলে মরে যাবে? একদম মরেই যাবে? তাই কি এমন নির্লজ্জের মতো গুন্ডার সঙ্গে গিয়েছিল ওখানে? তাই কি গুন্ডা আর হোমিদি, হোমিদিদের বাড়িতে ফিরে গেলেও দিঘি বসেছিল একা রাহিদের ড্রইংরুমে? ওর মন কি হিসেব করেছিল যে, হোমিদির বাড়িতে কিগানের যাওয়ার চান্স নেই, কিন্তু রাহিদের বাড়িতে আছে?
আর তারপর ড্রইংরুমে টিভি চালিয়ে বসে সেই অপেক্ষার মুহূর্তগুলো? দরজার সামান্য আওয়াজে কেঁপে ওঠা সেই মুহূর্তগুলো? মনে মনে তো ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ছিল দিঘি-আসবে, আসবে না। আসবে, আসবে না। তারপর শব্দ হয়েছিল দরজায়। আর বুকের ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠেছিল কাঠবিড়ালি। তবে কি…না, কাঠবিড়ালি তার বাদাম পায়নি। দরজা ঠেলে ঢুকেছিল আবেশ।
আসবে না, আর আসবে না। হাত-পায়ের ভার যেন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল কে যেন সিসে ভরে দিয়েছে শরীরে। মনে হয়েছিল সবচেয়ে বড় ক্রেন এনে সরাতে হবে ওকে। রাগ হচ্ছিল খুব দিঘির। মনে হচ্ছিল কোন বাড়িতে থাকে সেটা তো সপ্তমীর দিন এসে রাহির সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়ে দেখেইছে। এবার সেখানে গিয়ে আচ্ছা করে পেটালেই হয়। রাগে সারা শরীর জ্বলছিল দিঘির। মনে হচ্ছিল কিগানকে পেলে ছিঁড়ে ফেলে দেবে। একদম ছিঁড়েই ফেলে দেবে।
কী ভেবেছে কী ও? কী ভেবেছে? দিঘি ফালতু? এতটা পথ আসার কোনও দাম নেই? ওর অপেক্ষার কোনও দাম নেই? আর ঠিক তখনই, আচমকা, দরজা খুলে গিয়েছিল। আর হরিণী ঝরনার জল খেতে খেতে মুখ তুলেছিল। কস্তুরীগন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস। বহু দিনের পর পরিচিত গন্ধে তীব্র হয়ে উঠেছিল হরিণীর শরীর। আর তারপর সে দেখেছিল তার নীল চোখের হরিণকে।
‘কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস তোরা? নীচে যাসনি?’ মায়ের কথায় ফিরে তাকাল দিঘি। মা এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। চোখ এখনও লাল। মা কাঁদতেও পারে! আসলে কষ্ট দিঘিরও হয়। কিন্তু তবু কিছুতেই এমন সবার সামনে কাঁদতে পারে না ও। একদম পারে না। কান্না ওর কাছে খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার। বাথরুমে স্নান করার মতো। তবু, আজ একটু কেঁদে ফেলেছিল শমীর কথায়। তবে সামলে নিয়েছে দ্রুত।
মা আবার বলল, ‘চল এবার। তোর বাবারও ফেরার সময় হয়ে গেল। আর কী হবে? সব তো শেষ হয়ে গেল। এই বয়সে এমন হয়? মেয়েটাও ছেলেটাকে সারাজীবন শান্তি দিল না আর এমন কপাল যে, একটা রোগ বাসা বাঁধল!’
‘কাকিমা চলো,’ গুন্ডা নরম করে বলল।
নার্সিংহোমটা বেশ বড়। আর একদম গিজগিজ করছে মানুষে। প্রথম তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামলেই বিরাট বড় লাউঞ্জ। তাতে ভিজিটিং আওয়ার্স ভাঙা মানুষের ঢল। কেউ হাসছে, কেউ গোমড়া, আবার কেউ মোবাইল কানে দিয়ে চিন্তিত মুখে ঘুরছে। এর ভেতর দিয়ে এগোতে যথেষ্ট বেগ পেতে হল দিঘিদের।
গাড়িটা বাইরেই রাখা ছিল। মা বলল, ‘গুন্ডা, তোকে বাড়ি ছেড়ে দেব?’
‘আরে ঢাকুরিয়া থেকে যাদবপুর আর কত দূর? তুমি শুধু শুধু এসব ভেবো না। আমি তো হাঁটতে হাঁটতে চলে যাব।’
‘এতটা হাঁটবি?’ মা অবাক হল।
‘কোথায় এতটা? তা ছাড়া আমার শরীরটা দেখেছ? সুন্দরবনের বাঘেদের সাতদিনের খাবার। অন্তত এটুকু হেঁটে হাফবেলায় খাবারটা কমাই।’
‘বাজে বকিস না,’ মা আলতো করে মারল গুন্ডার হাতে। হাসলও একটু।
গুন্ডা বলল, ‘আমি আসি তা হলে? আবার এলে বোলো। এমন অবস্থা, তোমাদের যে আমার বাড়িতে যেতে বলব তাতে…’
‘বাদ দে গুন্ডা,’ দিঘি বাধা দিল, ‘আমরা আসি রে। কেমন? আমায় আবার একবার ক্যামাক স্ট্রিটে নামতে হবে।’
‘ঠিক আছে, আয়,’ গুন্ডা আর দাঁড়াল না।
গাড়িটা গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারে ওঠার পর মা জিজ্ঞেস করল, ‘তুই ক্যামাক স্ট্রিট যাবি? এই সময়ে? কেন?’
‘কাজ আছে,’ দিঘি গম্ভীর গলায় বলল।
‘কী কাজ? আজকাল খুব কাজ দেখাচ্ছিস দেখছি?’ মায়ের গলায় রাগ।
‘তা থাকলে কী করব? আমাদের কলেজের একটা মেয়ে থাকে ওখানে। ওর কাছে যাব। আর শুধু তো পৌনে সাতটা বাজে। কেন এত টেনশন করছ?’
‘আমার আর ভাল লাগে না। তোরা দুই বোন মিলে কি পাগল করে দিবি আমায়? দেখছিস যে সময় খারাপ যাচ্ছে। তার মধ্যে তুই এসব করছিস?’
‘এসব করছি মানে!’ দিঘি বিরক্ত মুখে চোখ কুঁচকে তাকাল মায়ের দিকে।
‘এমন রাত করে বাড়ি ফিরবি? আগে আর্য সঙ্গে থাকত, এখন তাও থাকে না। আমার চিন্তা হয়।’
‘মা, আমি তো স্কুলে থাকতে বন্ধুদের সঙ্গে একা একাও ঘুরতে গেছি। বহুবার ট্রেকিং-এ গেছি। তখন তো তুমি কিছু বলোনি। তা হলে এখন কেন বেকার হাইপার হচ্ছ?’ দিঘি গম্ভীর হল।
‘আমি জানি না বাবা। তোর মতিগতি বোঝা ভার। এই ভাল আছিস, এই খারাপ। কিগান থাকাকালীন কী যেতিস ওদের বাড়ি! তারপর, একদম বন্ধ করে দিলি! তোকে আর কিগানকে জড়িয়ে কীসব রটল। তুই আজ পর্যন্ত তা নিয়ে কিছু বলিসনি। সেও পালাল। তারপর আর্য। তাকেও দূর করে দিলি একদম। আচ্ছা, কী চাস তুই? আমায় শান্তি দিবি না তোরা দুই বোনে?’
দিঘি উত্তর না দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মায়ের এসি সহ্য হয় না বিশেষ। এতক্ষণ নার্সিংহোমের এসি-র পর তাই আর গাড়ির এসি চালায়নি। জানালার কাচ নামানো। বাইরের আওয়াজ আসছে। মা বলছেও কথাগুলো নিচু স্বরে। তবু, ড্রাইভার মধুদা যদি শোনে! মায়ের এই ক্যালাসনেস সহ্য হয় না দিঘির। সবার সামনে কি সব কথা না বললেই নয়?
তবে হ্যাঁ। মায়ের ব্যাপারটা বোঝে দিঘি। কিগানের ঘটনাটা সুবর্ণ সোজা গিয়ে কিগানের কাকাকে বলে দিয়েছিল। তারপর কাকার চিৎকারে যেটুকু হাওয়ায় ছড়িয়েছিল। মা সেটুকুই জানে। তবে মা দিঘিকে জিজ্ঞেস করেছিল। দিঘি বলেনি কিছু আর মা যাতে কিগানের কাকার কাছে এই নিয়ে না যায় সেটাতেও বারণ করেছিল। যদিও মা প্রথমে মানতে চায়নি। রাগ করেছিল খুব। কান্নাকাটিও করেছিল এই বলে যে, ‘আমায় জানতেই হবে, কী কথা রটছে। কিগান তো ভদ্র বলে জানতাম। তার সঙ্গে তোর কীসের সম্পর্ক?’
‘মা,’ দিঘি বলেছিল, ‘লোকে নানা কথা রটায়। এসব নিয়ে মাথা খারাপ কোরো না।’
‘তা হলে ওর কাকা কেন ওকে এমন তুলোধোনা করছে?’ মা জিজ্ঞেস করেছিল।
‘ওর কাকা তো ছুতো করে ওকে বাড়ি থেকে বের করতে চায়। জানো না? পাড়ার সবাই তো জানে।’
‘কিন্তু, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, যা তুই আমায় বলছিস না,’ মা তাও মানেনি।
দিঘি তখন মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল, ‘মা, ভবিষ্যতে আমার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই তোমার? যেটা এমনি গুজবের মতো রটছে, সেটা নিয়ে পাড়ায় তুমি নামলেই লোকে সত্যি বলে ধরে নেবে। তখন? বদনাম কতটা হবে বুঝেছ? বুঝেছ তুমি যে, লোকে কেমন ঢিঢি করবে? তখন পারবে সামলাতে সব কিছু?’
মা আর কিছু বলেনি। এমনকী, কথাটা আর বাবার কানেও তোলেনি। বাবা শান্তশিষ্ট মানুষ। পাড়াতে মেশে না বিশেষ। তাই আর ব্যাপারটা গড়ায়নি বেশি দূর। তবে আজও সময় সুযোগ পেলে মা খোঁচা দিতে ছাড়ে না।
মা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘তা আর্যর সঙ্গে কী হল তোর? সেটা তো বলবি? অমন সুন্দর একটা ছেলে! সবসময় “দিঘি দিঘি” করত, তাকে ঘাড়ধাক্কা দিলি কেন তুই?’
দিঘি চোয়াল শক্ত করল। সপ্তমীর দিনের সেই ঘটনা মা জানে না। শমীকে ও-ই বলতে বারণ করেছিল। আর শমীও বলেনি। সেই দিনের ঘটনার প্রায় দু’সপ্তাহ পর একদিন ফোন করেছিল আর্য। তখন সবে কলেজ থেকে বেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারের জলের পাশে বসে আড্ডা মারছিল ওরা। কলেজে স্পেশ্যাল ক্লাস ছিল ওদের। ফোনটা আসায় বেশ অবাক হয়েছিল দিঘি। না, ফোনটার জন্য নয়, ও অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে, ফোনটা আসার জন্য ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হচ্ছে দিঘি। ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে। তবু নিজেকে সংযত করে ফোনটা ধরেছিল দিঘি।
‘হ্যালো,’ আর্যর গলাটা খুব স্বাভাবিক শোনাচ্ছিল।
‘হ্যাঁ বলো,’ দিঘিও স্বাভাবিক গলায় কথা বলেছিল।
‘তোমার সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে? আমি কলেজ স্ট্রিট মোড়ে ওয়েট করছি।’
‘কেন? তুমি এখানে এসো,’ দিঘি সামান্য হেসেছিল।
‘ওখানে? মানে তোমাদের আড্ডায়? না, তুমি এসো প্লিজ। জাস্ট পাঁচ মিনিট নেব।’
‘তোমাকে কে বলল আমি এখানে থাকব?’ দিঘি প্রশ্ন করেছিল।
‘আমার কাছে খবর থাকে। তুমি তাড়াতাড়ি এলে ভাল হয়। আয়াম ইন আ হারি।’
দিঘি কিছু মনে করেনি। ওর মনেই হয়নি, যে ডাকছে তার তাড়া আছে বলে ওকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। ও বন্ধুদেরকে, ‘জাস্ট একটুক্ষণের জন্য আসছি’ বলে চলে গিয়েছিল।
কলেজ স্ট্রিট মোড়ে দাঁড়িয়েছিল আর্য। বেশ ফিটফাট চেহারা। হালকা গোলাপি টি-শার্ট আর সাদা জিন্স। দিঘি ওর সামনে দাঁড়িয়ে হেসেছিল।
আর্য কোনও ভণিতা করেনি। হাতের প্লাস্টিকের থেকে একটা ব্রাউন খামে মোড়া কিছু বই বের করে এনে বলেছিল, ‘তোমার বইগুলো। গল্পের। আমার কাছে ছিল। রাখো।’
‘পড়া হয়েছে?’ দিঘি জিজ্ঞেস করেছিল।
‘না, সব হয়নি। আর সত্যি বলতে কী, ইচ্ছেও নেই পড়ার।’
দিঘি বইগুলো নিয়ে হেসেছিল শুধু।
আর্য বলেছিল, ‘আমি আসি। গাড়িটা বেনিয়াটোলার সামনে রাখা আছে। শ্রীপর্ণা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। টেক কেয়ার। গুড বাই।’
দিঘি শুধু মাথা নেড়ে হেসেছিল। তারপর ফিরে এসেছিল কলেজ স্কোয়ারে।
ব্রেক আপ এমন হয়! কিন্তু কই ওর তো কষ্ট হল না! বরং বেশ হালকা লাগছিল। মন ভাল লাগছিল। মনে হচ্ছিল-বাঁচা গেল। তবে কি কোনওদিনই ও ভালবাসেনি আর্যকে? জাস্ট এমনি ভাল লাগত? কেন? কেন ভালবাসেনি আর্যকে? কেন ওর মনে জায়গা করতে পারেনি আর্য? কে দখল করে রেখেছে মন? কে বসে রয়েছে সেখানে? সদ্য পুজোয় দেখা সেই লম্বা মানুষটা যেন হঠাৎ ভেসে উঠেছিল সামনে। সেই নীল চোখ। শমীকে কোলে তুলে হাঁটার সময়কার সেই সোজা ভঙ্গি। হালকা মনটা আবার ভারী হয়ে এসেছিল দিঘির। মুখ কালো করে মেঘ জমেছিল মনে। কষ্ট হচ্ছিল ওর। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।
‘মালটা এসেছিল, না?’ গুন্ডা আর জয় প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করেছিল।
‘মানে?’ দিঘি থতমত খেয়ে গিয়েছিল।
‘তোর আর্য। এসেছিল, না? সব শেষ করতে এসেছিল?’
‘বেঁচেছিল কিছু, যে শেষ করবে?’ দিঘি চোয়াল শক্ত করে বলেছিল।
‘এমন বিরক্ত মুখ করে থাকিস না,’ রূপ বলেছিল।
‘না তো!’ দিঘি নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করেছিল।
‘আমার খারাপ লাগছে, জানিস দিঘি। আমার মনে হচ্ছে, যেন আমার জন্যই হল। তবে,’ গুন্ডা সিরিয়াস হতে গিয়েও হেসেছিল, ‘ভালই হয়েছে জানিস। আমাদের মতো অনার্যদের সঙ্গে আর্যর মাখামাখিটা বন্ধ হয়েছে, ভালই হয়েছে।’
ভাল। কত কী-ই যে ভাল হয় সারাদিন, মাঝে মাঝে ভাবে দিঘি। এই যে অন্ধকার পার করে পৃথিবী রোজ সূর্যের দিকে তাকায়। সেটার চেয়ে ভাল আর কী আছে! এই যে বাচ্চারা সার বেঁধে স্কুলে যায়। খেলতে নেমে আপন-পর ভোলে। এই যে অন্ধ মানুষটিকে রাস্তা পার করে দেয় একলা ছেলেটি। কাটা ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্যে হলেও হেসে ফেলে চায়ের দোকানে কাজ করা বালক। প্রেমিকা আচমকা কাঁধে মাথা রাখায় স্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রেমিক। সারা সকাল অপেক্ষার পর বৃদ্ধের হাতে এসে পৌঁছোয় চায়ের কাপ। বিয়ে না হওয়া দিদিটির দিকে তাকিয়ে থাকে কেব্ল-এর মই কাঁধে ছেলেটি! এমন কত ভাল যে রোজ উড়ে বেড়ায় চারিদিকে! দিঘি ভাবে এমনই হয়তো ভাল হয়েছে আর্যর চলে যাওয়া। কোনও মালিন্য নেই, ঝগড়া নেই, মন খারাপ নেই। শুধু চলে যাওয়াটুকু আছে। কারও চলে যাওয়া হালকা করে দেয় মানুষকে। আবার এমনও কেউ হয় যে চলে গেলে তার যাওয়াটুকু চোখে লেগে থাকে সারাজীবন!
‘দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি আসিস,’ মা দিঘিকে নামিয়ে দিয়ে আবার সাবধানবাণী আউড়ে চলে গেল।
সন্ধে হয়ে গেছে। ক্যামাক স্ট্রিট চকচক করছে আলোয়। যেন মিল্কিওয়ের এক টুকরো ভেঙে এনে কেউ তারার গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়েছে সারা জায়গায়।
আসলে একটা নোট নিতে হবে। তাই এখানে আসতে হল দিঘিকে। মেয়েটার বাড়ি একটু এগিয়ে। বড় ফার্নিচারের যে-দোকানটা রয়েছে, তার পাশে একটা মাল্টি স্টোরিড বিল্ডিং আছে। সেখানে। দিঘি নিজে ঠিক বুঝতে পারেনি, তাই একটু আগেই নেমে পড়েছে। যাই হোক, এইটুকু হাঁটতে খুব একটা কষ্ট হবে না।
দিঘি ঘড়িটা দেখে নিয়ে পা বাড়িয়েও থমকে গেল। একদম সামনে আদিত্য! আদিদা! এই ছেলেটার সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলে না দিঘি। ছেলেটা নাকি ভাল নয়। মহুলও একসময় ছেলেটার সঙ্গে ঘুরেছিল কিছুদিন। তবে আদিও খুব একটা মেলামেশা করে না কারও সঙ্গে। ফলে দিঘির সঙ্গে কোনওদিন তেমন করে হাই-হ্যালোও করেনি।
কিন্তু আজ আদি দাঁড়াল, ‘হাই দিঘি।’
‘হ্যালো,’ দিঘি অপ্রস্তুত মুখে দাঁড়াতে বাধ্য হল।
‘কেমন আছ?’
দিঘির অবাক লাগল। এক পাড়ায় থাকে। কথা হয় না। হঠাৎ এমন একটা জায়গায় ‘কেমন আছ’! কী অবাক কাণ্ড! দিঘি বলল, ‘ভাল। তোমরা?’
আদি যেন শুনতেই পেল না। বলল, ‘জানো, দাদাভাই এখন অনেক দূরে থাকে?’
হঠাৎ এমনভাবে কিগানের নাম শুনবে ভাবতে পারেনি দিঘি। ওর বুকের ভেতরে কী যেন একটা ছলাৎ করে উঠল।
‘তাই? ও! মানে…’
‘জানো, দাদাভাই না আর ফিরবে না কোনওদিন।’
‘তাই?’ দিঘির মনে হল কে যেন ওর কানে গরম সিসে ঢালছে। ‘তাই’ ছাড়া আর কিছু বেরোচ্ছে না মুখ দিয়ে!
‘আচ্ছা, তুমি তো দাদাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে একসময়, এখনও বলো?’ আদি আবার জিজ্ঞেস করল।
এবার বিব্রত হল দিঘি। কী হয়েছে আদির? যার সঙ্গে কথাই হয় না, সে আজ এমন ভূতে পাওয়া মানুষের মতো কথা বলছে কেন?
‘আমি? মানে?’ দিঘি তাকিয়ে রইল আদির দিকে।
আদি গলার টাইটা খুলে ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে ঢোকাল। তারপর জামার হাতা দুটো গুটিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘দাদাভাইটা এমন বোকা। খুব বোকা। গোটা সম্পত্তিটা আমায় লিখে দিয়েছে!’
‘ও, কিন্তু এসব আমায়…মানে…’ দিঘি অপ্রস্তুত মুখে বলল।
‘তোমায় বলব না?’
আদি এমন করে বলল যে, মাটি কেঁপে উঠল যেন। যেন টাল খেয়ে গেল কলকাতা। দিঘির মনে হল রাস্তার ওপারের বাড়িঘরগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে না তো ওর মাথায়? ওর মনে হল কে যেন ওর ওপর টন টন সিমেন্ট ঢেলে দিয়েছে। ও আঠায় আটকে যাওয়া মাছির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
আদি হাসল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। বলব না। আসি। ইউ টেক কেয়ার।’
আদি চলে গেলেও নড়তে পারল না দিঘি। কেন এমন বলল আদি? আর কিগান নিজের সম্পত্তি ছেড়ে দিল এভাবে? মানে আর আসবে না কিগান? আর পাড়ায় ফিরবে না? মানে, ওকে আর দেখতে পাবে না? দিঘির হাত-পা কেমন অবশ হয়ে আসছে। কষ্ট হচ্ছে বুকে। তোলপাড় করা কষ্ট হচ্ছে। কেন এমন হল? কেন এমন করল কিগান? কেন করল দিঘি নিজে? শুধুমাত্র হিংসে? মাত্র দুটো কাগজের টুকরো! তাতেই সব শেষ! শেষ কি এমনভাবে হয়? এমন করে কি কোনও কিছু শেষ করা যায়? এ কি মেলা যে, তাঁবু ফেললাম, আর তারপর ইচ্ছেমতো গুটিয়ে নিয়ে চলে গেলাম! শুধু শূন্য মাঠ আর শালপাতা পড়ে রইল পিছনে? কেন এমন করবে কিগান? কোন সাহসে করবে এমন? দিঘির সঙ্গে ওকে এমন করার অধিকার কে দিয়েছে?
পাশেই একটা পানের দোকান। তাতে লোকাল আর এসটিডি কল করার জন্য ফোনও রাখা আছে। দিঘি এগিয়ে গেল, ‘একটা ফোন করব?’
পানওয়ালা তার খয়েরি দাঁত দেখিয়ে হাসল, ‘করুন। আপনাদের জন্যই রাখা।’
দিঘি মোবাইল বের করল না। নম্বরটা ওর মুখস্থ। সেই সপ্তমীর দিন যখন গিয়েছিল, তখন এক সময় লুকিয়ে রাহির মোবাইলে সেভ করা কিগানের নম্বরটা দেখে নিয়েছিল ও। নতুন নম্বর। একবার দেখেই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আসলে দিঘি আন্দাজ করেছিল যে, নম্বরটা নিশ্চয়ই থাকবে রাহির মোবাইলে। তাই ‘তোমার মোবাইলটা কী সুন্দর গো!’ বলে মোবাইল দেখার ফাঁকে নম্বরটা দেখে নিয়েছিল দিঘি। তারপর বেশ কয়েকবার রাস্তা থেকে ব্ল্যাঙ্ক কল করেছে দিঘি। না, কথা বলার জন্য নয়। শুধু একবার কিগানের গলার স্বরটা শোনার জন্য। হয়তো পাগলামি, কিন্তু কী করবে দিঘি? ওর যে শুনতে খুব ইচ্ছে করে!
এখনও রিং করে কানে রিসিভারটা লাগাল দিঘি। রিং হচ্ছে। রিং হয়ে যাচ্ছে। একটা। দুটো। তিনটে। চারটে। কিগান শুনতে পাচ্ছে না? কাছে নেই মোবাইল? নাকি ফ্যাক্টরির মেশিনের আওয়াজে শোনা যাচ্ছে না? আচ্ছা, অচেনা নম্বর বলে কি ধরছে না ফোনটা?
‘হ্যালো?’ আচমকা কিগানের গলা ভেসে এল।
চুপ করে রিসিভার কানে চেপে ধরে রইল দিঘি।
‘হ্যালো, কে বলছেন? প্লিজ কথা বলুন। এমন মাঝে মাঝে কেন ফোন করেন? হ্যালো? কী চান আপনি?’
দিঘি নিজেকে প্রাণপণে বেঁধে ধরে রইল ফোনটা।
কিগান চুপ করল কিছুক্ষণ। নিস্তব্ধ যন্ত্র। যেন অসীম অন্ধকার। অন্তহীন ব্যোম। নিকষ মহাশূন্য। তারপর হঠাৎই আলোর মতো, বহু দিন আগে ভোলা গান মনে পড়ার মতো, ঠোঁটের ওপর অন্য ঠোঁটের নরম স্পর্শের মতো কিগান অস্ফুটে বলল, ‘তুমি?’
Chapter - 31
৩১
লাল বলটা ড্রপ খেয়ে বটুকের মাথা সমান উঠল। বটুক দেরি করল বুঝতে। মাথা বাঁচাতে কোনওমতে হুক করার জন্য ব্যাটটা ঘোরাল। বলটা ব্যাটের কানায় লাগল, তারপর উড়ে গেল ডিপ স্কোয়ার লেগের দিকে। বলটা উড়ছে। নীল আকাশ পিছনে রেখে চেরি ফলের মতো লাগছে বলটাকে। বলটা এমনভাবে উড়ছে যেন আনন্দে বহু দিন পর পাখনা মেলার সুযোগ পেয়েছে। এক মাঠ দর্শক চিৎকার করছে। জালের ফেনসিং-এর ওপারে হাজার হাজার দর্শক লাফিয়ে উঠছে। নীচে একজন ফিল্ডার দৌড়োচ্ছে বল লক্ষ করে। উঁচু হয়ে ভেসে যাওয়া বলটার দিকে সে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। হাত দুটো সামনে মেলে রেখেছে বাটির মতো করে, ঘাসের ওপর দিয়ে সে দৌড়ে যাচ্ছে। আর দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে রুহান। হাত দুটো অর্ধেক তোলা। পারবে? পারবে ক্যাচটা ধরতে? পারবে বটুককে আউট করতে? ওর সব অহংকার ভেঙে দিতে আদৌ পারবে কি?
বলটা উড়ছে এখনও। যেন কখনও আকাশের নীলে নাক ঘষছে, কখনও একটু ছুঁয়ে দিচ্ছে মেঘের সাদাটাকে। কিন্তু পড়ছে না নীচে। কেন পড়ছে না? বলটা উড়ছে, উড়েই চলেছে। আর কী আশ্চর্য! ওই তো বলটার দু’পাশ দিয়ে দুটো সেলোফেন পেপারের মতো পাতলা পাখনা বেরোল। আর তারপরই বলটা হঠাৎ ভোমরার মতো বোঁ করে উড়ে চলে গেল আরও দূরে! মাঠ পেরিয়ে, ফেনসিং পেরিয়ে, দর্শক পেরিয়ে বলটা চলে গেল। আকাশের গায়ে ছোট্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল একদম। রুহান কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দর্শকরা ঢেউ ভাঙার মতো শব্দ করল একটা আর বটুক হাসতে লাগল। ব্যাট হাতে নিয়ে হাসতে লাগল বটুক। আর তারপরই হাসতে হাসতে বটুক…আরে বটুক কই? এ তো আদি! আদি? গলায় টাই, হাতে মোবাইল। পাশে, আরে মালিনী! মালিনীও হাসছে। ওরা কি রুহানকে দেখে হাসছে? কিন্তু রুহান কই? ওই তো একটা হাইওয়ে। ওপাশে জঙ্গল। তলতাবনির? আর আদিরা তো ওই হাইওয়ে দিয়ে হাঁটছে। হাসছে, গল্প করছে। এগোচ্ছে পায়ে পায়ে। আরে, ওটা কী? ট্রাক। হর্ন দিচ্ছে, ট্রাকটা হর্ন দিচ্ছে খুব। খেপা ষাঁড়ের মতো এগিয়ে আসছে। আদিরা শুনছে না। শুনতে পাচ্ছে না একদম। ওরা গল্প করছে। হাসছে। রুহান চিৎকার করছে। সতর্ক করছে। কিন্তু শুনছে না ওরা। ওরা ডুবে আছে গল্পে। হর্নটা বাড়ছে এবার। ট্রাকটা তীব্র গতিতে আসছে। ওরা শুনছে না। ট্রাকটা আসছে…ওরা…তীব্র একটা আওয়াজ…ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠল রুহান। সারা শরীর ঘেমে গেছে ওর। বিছানা ভিজে গেছে। মাথার বালিশও চপচপে। ওর শ্বাস পড়ছে দ্রুত!
‘কী রে, তখন থেকে ডাকছি! কিছু শুনছিস না কেন? কুম্ভকর্ণ নাকি? এই লোডশেডিং-এ এমন ঘুম ঘুমোচ্ছিস যে! বললাম না পাড়ার দোকান থেকে গুঁজিয়া এনে দিতে! কোনও কথা কানে যায় না?’ ট্রাকটা যে আসলে মা, এবার বুঝল রুহান।
‘গুঁজিয়া? কখন বললে?’ রুহান অবাক চোখে তাকাল। ঘুমের ঘোর এখনও কাটেনি।
‘দুপুরে খাবার সময় বলেছিলাম। ভুলে গেছিস?’ মা ফোঁস ফোঁস করল, ‘তা মনে থাকবে কেন? এখন খেয়া কিছু বলুক অমনি তো দৌড়োবি!’
‘মা, কীসব বলছ?’ রুহান বিরক্ত হল, তারপর দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা দেখল, ‘সবে তো সওয়া চারটে বাজে। এখন গুঁজিয়া দিয়ে কী করবে?’
‘আমার শ্রাদ্ধ করব।’ মা চিৎকার করল, ‘জানিস না, পাঁচটার সময় গা ধুয়ে আমি ঠাকুরকে খাবার দিই! অপদার্থ! তোকে কেন যে পেটে ধরেছিলাম আমি?’
‘মা, বাজে কথা বোলো না।’ রুহান চাপা গলায় কথাটা বলে বিছানা থেকে নামল। হাওয়াই চটি গলিয়ে তারপর এগিয়ে গেল বারান্দার ছোট্ট বেসিনটার দিকে।
মে মাস। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। মনে হচ্ছে কে যেন গোটা কলকাতাটাকে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সারা শরীর সবসময় চটচট করছে। গায়ে রসগোল্লার রস মেখে বসে আছে যেন। পাঁচটা নাগাদ একটা কাজ আছে রুহানের। বেরোতে হবে। বুকুদার সঙ্গে দেখা করার ব্যাপার আছে।
বারান্দার বেসিন থেকে মুখেচোখে জল দিয়ে ঘরে এসে রুহান দেখল মা দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘরে। মুখচোখ এখনও থমথমে।
‘কিছু বলবে?’ রুহান জিজ্ঞেস করল।
‘তুই গতকাল কী করেছিস?’
‘আমি, গতকাল!’ রুহান অবাক হল।
‘ন্যাকামো করছিস কেন? জানিস না তুই কী করেছিস?’ মা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
‘আমি কী করেছি?’ রুহানের ফ্রাস্টেটেড লাগল। আশ্চর্য! মায়ের কী হয় মাঝে মাঝে?
‘তুই ঠাকুরপোর এক্স-রে রিপোর্ট এনে দিসনি?’
‘ককাইয়ের? এক্স-রে?’ রুহান অবাক হওয়ার ভান করল। এই রে! মা জেনে গিয়েছে। এবার একটা তুলকালাম হবে। মা কেন যে এত বাড়াবাড়ি করে! বিরক্ত লাগে রুহানের। কিন্তু কী করবে ও? মা তো আর পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে নয় যে, তাকে শাস্তি দেবে! ও মায়ের দিকে নিরুপায় হয়ে তাকিয়ে রইল।
মা বলল, ‘নাটক করছিস? নাটক? লাটুর মা আমায় বলেছে। সে গতকাল নিজের চোখে খেয়ার হাতে ঠাকুরপোর এক্স-রে রিপোর্ট দিতে দেখেছে তোকে।’
‘তো কী হয়েছে? যদি এনে দিয়েই থাকি তবে হয়েছেটা কী?’
‘মানে? তুই কি ওই বাড়ির বাজার সরকার নাকি?’
‘কী বলছ তুমি?’ রুহান চেয়ারের ব্যাকরেস্টে রাখা তোয়ালে তুলে পিঠ মুছল।
‘পায়ে ব্যথা বলে অফিস ডুব দিলি, আর এখন বলছিস কী হয়েছে? যদি এই শ্রমটা অন্যের জন্য খরচ না করে নিজের জন্য করতিস, তবে তো অন্তত দু’পয়সা আসত! তা নয়, তিনি চললেন সমাজসেবা করতে! আপনে শুতে ঠাঁই পায় না, শঙ্করাকে ডাক।’
‘ককাইয়ের শরীর খারাপ। কোমরে ব্যথা। তা হলে রিপোর্ট কে এনে দেবে? কাকিমা যাবে?’
‘কেন, তারা ছেলে জন্ম দেয়নি! সে কোথায়? সাহেব হয়েছে বিদেশ গিয়ে? দু’বছরে একবারও এসেছে? পা দিয়েও নেড়ে দেখেছে, বাপ-মা গেল, না থাকল! খেয়ার তো সবসময় বড় বড় কথা। আমার ছেলে, আমার ছেলে। এখন কোথায় তোর ছেলে! বাপ মরলেও কি মুখে আগুন দিতে আসবে? না বাপের শ্রাদ্ধে কালিয়া কোপ্তা খেতে আসবে?’
‘আঃ মা,’ রুহান চিৎকার করে হাতের তোয়ালেটা ছুড়ে ফেলল।
‘আবার তেজ দেখাচ্ছিস? কেন রে, তোকে ক’টাকা দিয়ে সাহায্য করে তোর কাকা? টাকার তো কুমির! এক পয়সাও দেয়!’
মা চিরকাল ভুলভাল কথা বলে। তবে ইদানীং যেন বেড়েছে আরও! কেন এমন বলে মা? রুহানকে আঘাত করে কীসের এত আনন্দ পায়?
‘মা, তুমি চুপ করবে? না হলে কিন্তু আমি বেরিয়ে যাব!’
‘কেন? আমি দোষ করেছি যে, চুপ করব?’ মা আরও জোরে চিৎকার করল।
‘আশ্চর্য! আমার কাকা হয়। শরীর খারাপ। তার রিপোর্ট এনে দিয়েছি। এতে প্রবলেম কোথায়?’
‘প্রবলেম কোথায়?’ মায়ের গলাটা ভাঙা ভাঙা শোনাচ্ছে এখন। হয়তো এত জোরে চিৎকার করছে বলেই।
‘মা, আস্তে। তোমারও কিন্তু প্রেশার হাই।’ রুহান মাকে শান্ত করতে চাইল।
‘আর দরদ দেখাতে হবে না তোকে। জুতোপেটা করতে হয় তোর মতো ছেলেকে। আমার শরীর খারাপ হলে তোর কী? সব নষ্টের মূল তুই। সব নষ্টের মূল।’
‘কী নষ্ট করেছি আমি?’ রুহানের রাগ হল।
‘সব নষ্ট করেছিস তুই। আবার বড় মুখ করে জিজ্ঞেস করছিস! তোর লজ্জা লাগে না?’
‘মা, বাড়াবাড়ি কোরো না।’ রুহানও এবার রুক্ষ গলায় বলল।
‘আমি বাড়াবাড়ি করছি? আর তুই? নিজের বাপকে খেয়েছিস। নন্দাকে তাড়িয়েছিস। একটা ক্লাবে খেলতিস, সেখান থেকেও পাছায় লাথি মেরে বের করে দিয়েছে তোকে। একটা চাকরি করিস, সেখানেও পার্মানেন্ট হোসনি। কী করেছিস জীবনে? এর বাড়ির তরকারি ওর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া আর অন্যের বাড়ির বাজার সরকারগিরি ছাড়া, আর কী করছিস তুই?’
‘মা, নন্দা এর মধ্যে আসে কোত্থেকে?’ রুহান অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
এটা যে মায়ের নতুন অস্ত্র। নন্দা! মা নন্দাকে দেখেছিল একদিন। তাও সামান্য সময়ের জন্য। তার মধ্যে নন্দাকে মায়ের এমন কী পছন্দ হয়েছিল যে, তার কথা এখন তুলছে মা? নন্দাকে কতটুকু চেনে মা? কতটুকু জানে?
‘আমি জানি। আমি সব জানি। নন্দা এসেছিল আমার কাছে। তুই নাকি টাকা নিয়ে ওকে ছেড়ে এসেছিস! তুই নাকি ওর বাবাকে বলেছিলি, ষাট হাজার টাকা দিন, তা হলে আপনার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব না? সত্যি? এতটা নীচ তুই? এতটা জঘন্য? নোংরা?’
রুহান মাথা নিচু করল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল নিজের অজান্তেই।
মা বলল, ‘তুই এমন! এতদিন বলিনি। কিন্তু লোকের সামনে ভাল সাজার ঢঙ করিস কেন তুই? ভাল হবি তো মনে মনে হ। লোককে দেখাচ্ছিস তুই কত মহান? কিন্তু আসলে কি তাই? আসলে তো তুই একটা অর্থপিশাচ। একটা ভণ্ড। নিজের মাকে যে কষ্ট দেয় সে যে আসলে ঠিক কী সেটা তো আর লোকে জানে না!’
‘মা আর বোলো না।’ রুহান ক্লান্ত গলায় বলল।
‘কেন বলব না? কেন বলব না বল তুই? আমার কথা শুনে কাজ করিস কিছু? নন্দার ব্যাপারটা আজ বলতে বাধ্য হলাম। এত বছর চেপে ছিলাম। আর আজ যখন বললি বাড়াবাড়ি করছি, তখন তোকে বলতে বাধ্য হলাম আমি।’
‘মা এসব বোলো না বলছি।’
‘কেন? বললে কী করবি? মারবি নাকি? টাকা নিয়ে মানুষের সওদা করেছিস আর এখন কি মাকেও মারবি নাকি? তা তুই পারিস। যেমন মানুষ বেচাকেনা করেছিস! ছিঃ ছিঃ, মেয়েটা যখন এসে কেঁদে কেঁদে আমার কাছে বলেছিল, আমার এত খারাপ লেগেছিল! নেহাত তখন অসুস্থ ছিলাম। অপারেশন হয়েছিল, তাই। না হলে দেখতিস তোকে কী করতাম আমি!’
রুহান চেয়ারে বসে দু’হাতে মুখ ঢাকল! মা এসব জানে! নন্দা এসেছিল ওদের বাড়িতে? কখন এসেছিল? তার মানে নন্দার বাবা কথা রাখেনি? বলে দিয়েছিল নন্দাকে! বিশ্বাস বলে সত্যিই কি কিছু নেই? সবটাই ব্যাবসা? লাভ-ক্ষতির হিসেব? হ্যাঁ, টাকা নিয়েছিল রুহান। মাটির সঙ্গে মিশে, লজ্জার মাথা খেয়ে, নন্দার থেকে মন সরিয়ে নিয়ে, টাকা নিয়েছিল। তারপর থেকে কত রাত যে ঘুমোতে পারেনি ও!
মা আবার বলল, ‘তা কী করেছিলি তুই টাকা নিয়ে? কোনওদিন জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু আজ বল তুই। তোকে বলতে হবে। কী করেছিলি সেই টাকাটা নিয়ে? জুয়া খেলেছিলি? না, নেশা-ভাঙ করেছিস? আজ বলতে হবে তোকে! তোর সাধু সেজে থাকা বের করছি। দাঁড়া। বল তুই, বল।’
রুহান আর নিতে পারল না। আলনা থেকে টি-শার্টটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। আর বেশিক্ষণ থাকলে ও পাগল হয়ে যাবে। কারণ, ও জানে মা এবার রাজ্যের দুঃখ তাক থেকে পেড়ে আনবে, আর তারপর সবকটারই কারণ হিসেবে ওর নামটা বসাবে।
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে নামতেও পিছনে মায়ের গলা পাচ্ছিল রুহান। মা তারস্বরে চিৎকার করছে। এতদিন পরে হঠাৎ মায়ের সেই ষাট হাজার টাকার শোক যে এমন তীব্রভাবে দেখা দিল কেন, কে জানে!
পাড়ায় বেরিয়ে আর দাঁড়াল না রুহান। ডান হাঁটুটায় ব্যথা করছে আবার। গতকাল রাতে খাওয়া দাওয়ার পর একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল একা। শুনশান রাস্তায় একটা মাতাল সাইকেল নিয়ে এসে ধাক্কা মেরেছিল সটান। কপাল খারাপ রুহানের। না হলে ফাঁকা রাস্তায় ওর ঘাড়ের ওপরই এসে পড়তে হল মাতালটাকে! ডান হাঁটুতে রুহানের চোট। পুরনো চোটের জায়গায় লেগেছে খুব। খোঁড়াচ্ছে ও।
লেক গার্ডেন্সের লেভেল ক্রসিংটা ফেলা রয়েছে। স্টেশনে ট্রেনটাও দেখা যাচ্ছে। তবে আপ না ডাউন বুঝতে পারছে না রুহান। ও মাথা নিচু করে গেটের তলা দিয়ে গলে গেল। তারপর দু’দিক দেখে হাঁটতে হাঁটতে লাইন পার করে অন্য দিকে গেল। এ দিকে আর লেভেল ক্রসিং-এর তলা দিয়ে যেতে হল না। বরং পাশের ছোট্ট একটা জায়গা দিয়ে গলে রাস্তায় পড়ল রুহান।
সূর্য বড্ড তেতে আছে আজ। কষ্ট হচ্ছে রুহানের। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবে এখানে ট্যাক্সি পাবে না। আরও-একটু হেঁটে যেখানে লেক গার্ডেন্স ফ্লাইওভার শুরু হচ্ছে, সেখান থেকে ট্যাক্সি ধরতে হবে রুহানকে। অন্য দিন হলে হেঁটে যেত রুহান। কিন্তু পায়ে কষ্ট হচ্ছে খুব। তাই লেক রোডে যেতে হলেও ট্যাক্সি করে যেতে হবে। লেক গার্ডেন্সের এই অঞ্চলটা ডেড জোন। কিচ্ছু পাওয়া যায় না। তাই আর-একটু এগিয়ে ট্যাক্সি ধরতে হবে। লেক রোডের বড় কফি শপটায় আজ বুকুদা আসবে। বুকুদা বিকেলে দেখা করতে বলেছে রুহানকে।
সেদিন বুকুদার ফোনটা পেয়ে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল রুহান। এসব কী বলছে বুকুদা? কেন বলছে? রুহান জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বুকুদা শোনেনি কিচ্ছু। শুধু ফোন কেটে দেওয়ার শব্দটা কানে বাজছিল। একঘেয়ে মনমরা একটা শব্দ। ভাল লাগছিল না রুহানের। বুকুদাও ওকে এমন ভাবল! আর কেন ভেবেছে সেটা তো ভালই জানে রুহান। ও তো নিজেই হাতে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল বুকুদাকে।
রুহান ফোনটার কল লিস্টে গিয়ে আবার ফোন করেছিল। দু’বার বেজেই কেটে গিয়েছিল লাইন। বুকুদা যে রেগে আছে বুঝতে পারছিল রুহান। ও মরিয়া হয়ে আবার রিং করেছিল। আবার লাইন কেটে দিয়েছিল বুকুদা। এমন করে ছ’বার রিং করেছিল রুহান। একবারও ধরেনি বুকুদা। রুহান বুঝতে পেরেছিল ভীষণ রেগে গেছে বুকুদা। আর বুকুদার রাগ সাংঘাতিক। কথা বলা বন্ধ মানে বন্ধ। ও তখন একটা এসএমএস করেছিল-‘বুকুদা, প্লিজ ভুল বুঝো না। কোনওদিন সুযোগ পেলে তোমায় বলব সব।’ না, এরও কোনও উত্তর আসেনি।
আবেশ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল শুধু। বলেছিল, ‘কী কেস বল তো? ছেলে ফোন করেছিল না মেয়ে? এমন ল্যাজেগোবরে করল তোকে?’
‘ছেলে। বুকুদা। তুই ঠিক চিনবি না।’
‘ছেলে?’ হেসেছিল আবেশ, ‘তুই মানে…ইয়ে…’
‘শালা। দাদার মতো হয় আমার। রেগে গেছে আমার ওপর।’ রুহান বলেছিল।
‘কে তোর ওপর রাগে না বল তো? শালা, এক নম্বরের ক্যালাস। শোন, তোকে যা বলার ছিল। বোধহয়, চাপাডাঙায় একটাই ম্যাচ হবে। টি-টোয়েন্টি। মানে যেটা তুই করতে পারলি না আর কী। সেখানে একটা টিমে তুই খেলবি?’
‘না।’ রুহান সময় নেয়নি বলতে।
‘কেন? শোন না,’ আবেশ বলেছিল, ‘তোর অপনেন্ট টিমে বটুককে দেব। তারপর বদলা নিয়ে নিস। আর টাকাও পাবি।’
‘না আবেশ। জীবন হিন্দি ছবি নয় যে, বদলা নেব! আমি খেলব না আর। কোনওদিন খেলব না।’
‘কেন? খেলবি না কেন?’ আবেশ ভুরু কুঁচকে ছিল, ‘শালা, বন্ধু বলে বলছি। এমন মেদামারা হয়ে থাকলে চলবে? সবসময় যেন মাইনাস টেন থেকে শুরু করছিস! যেন সারাজীবন মাথার ওপর বৃষ্টি পড়ছে তোর! তুই শালা গোডাউনের ছাতাপড়া পাঁউরুটি।’
‘যাই বলিস। আমি খেলা ছেড়ে দিয়েছি।’ রুহান গম্ভীর গলায় বলেছিল।
‘অ্যাঁঃ, সচিন তেন্ডুলকর। খেলা ছেড়ে দিয়েছি! ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা-বিয়ে করব না! খালি পালানো, না?’ আবেশ দাঁত কিড়মিড় করেছিল, ‘আমায় যে রাহি বলল।’
‘রাহি?’ রুহানের হৃৎপিণ্ড থমকে গেছিল দু’দণ্ড।
‘ওঃ আমার উত্তমকুমার! আমার আমির খান! রুহান-রাহি। যেন যাত্রাপালা! যেই বললাম রাহি বলেছে অমনি নালে-ঝোলে একশা হলি। শালা, মেয়ের কথা শুনলেই টুনি বাল্ব জ্বলে ওঠে, না? শালা, আলুর কোল্ড স্টোরেজ আছে তোর।’
বুকুদার অমন ব্যবহারের পর আর এসব ভাল লাগছিল না ওর। রুহান বলেছিল, ‘রাহিকে দেখলাম মনে হল। এসেছিল এখানে? মানে, তোরা কি এসেছিস?’
‘ও, আজকাল রাহিকে সর্বত্র দেখছিস নাকি?’
‘বাজে কথা রাখ। যা জিজ্ঞেস করছি, বল,’ রুহান কড়া গলায় বলেছিল।
‘না আসেনি। আমি এখানে মার্চেন্টে এসেছিলাম। কাজ ছিল। আর একটু মামার বাড়িতেও দরকার ছিল।’
‘মামার বাড়ি কেন?’ রুহান অবাক হয়েছিল, ‘তোর সঙ্গে তো ওদের কোনও সম্পর্কই নেই।’
‘তাও,’ হেসেছিল আবেশ, ‘আমায় তো ওরাই “অমানুষ” করেছে। মামিমা মারা গেছেন খবর পেলাম। তাই একবার যাব।’
রুহান আর কথা বাড়ায়নি। চলে এসেছিল। তবে খচখচ করছিল মনটা। এ কী হল? বুকুদা এমন রেগে গেল কেন? ওকে ওই বাড়ি থেকে কী বলা হয়েছিল?
মনে আছে রুহানের। সেদিন অশোকনগর স্টেশন থেকে ট্রেন ধরেছিল রুহান। তারপর বুকুদার ফোন পেয়ে ও শিয়ালদায় না নেমে, তার আগেই দমদম নেমে পড়েছিল। বুকুদা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল দমদম স্টেশনের বাইরে। ওকে দেখেই বলেছিল, ‘হান, গাড়িতে ওঠ। কথা আছে তোর সঙ্গে।’
সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের সিগনালে খ্যাঁচ করে থামল গাড়িটা। এমন আচমকা ব্রেক কষায় রুহান প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল গাড়ির সামনের সিটের ব্যাকরেস্টে। থুতনিটা ঘষে গেল। ‘আঃ,’ রুহান কিছু বলার আগেই ড্রাইভারটা জানলা দিয়ে মুখ বের করে সামনের গাড়িতে বসা ড্রাইভারের উদ্দেশে বাছা বাছা বিশেষণ ছাড়ল। তারপর ওর দিকে ফিরে বলল, ‘আপকো লগা হ্যায়? মাফ কর দিজিয়েগা। ও কমবখত আয়সে অচানক ব্রেক দাবায় কে মেরা তো গাড়িহি ঠোক যাতা।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ রুহান সোজা হয়ে বসল। পায়ের হাঁটুতেও জার্ক লেগেছে ভালই। সামনের সিগনালটা লাল হয়ে আছে। সিগনাল টপকে আরও একটু যেতে হবে। তারপর ডান দিকে বাঁক নিতে হবে। ও ভাবল, বুকুদা কি চলে এসেছে? তাড়াহুড়োয় মোবাইলটাও ফেলে রেখে এসেছে বাড়িতে। ঘড়িও পরেনি। ক’টা বাজে কে জানে! লেট হয়ে গেলে কি বুকুদা রাগ করবে? ওর আবার মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। সেই অশোকনগর থেকে ট্রেন ধরে ফেরার দিন, বুকুদার দেখা করতে চাওয়ার কথা।
দমদমে বুকুদার গাড়িতে বসে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল রুহান। কী বলবে বুকুদা?
বুকুদা গম্ভীর হয়ে বসে ছিল। কাঁচাপাকা চুল। একাগ্র চোখ। শক্ত চোয়াল। কিছু জিজ্ঞেস করতে বেশ সংকোচ হচ্ছিল রুহানের। আসলে পুরনো বুকুদা আর এই বুকুদাটা তো এক নয়! এই বুকুদা কেমন যেন ল্যামিনেটেড। মোম পালিশ করা। খুব বড় কাচের দরজাওলা দোকানে ঢুকতে যেমন সংকোচ হয়, এই বুকুদাকে দেখে ঠিক তেমনই সংকোচ হচ্ছিল রুহানের। তবু সাহসে ভর করে ও কাচের দরজার হাতলে হাত রেখেছিল, ‘বুকুদা, কিছু বলবে না?’
‘তোকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করব হান। ঠিকমতো উত্তর দিবি?’
দপ করে মাথায় একটা শিরা জ্বলে উঠেছিল রুহানের। ওর মনে হয়েছিল এই প্রশ্নটা শুনবে বলেই তো এতদিন ধরে ওর মন কুডাক দিচ্ছিল। বহু বছর পর বুকুদাকে প্রথম দেখার সময় থেকেই তো ওর মনে হয়েছিল, কবে সেই প্রশ্নটা করবে বুকুদা? কবে জানতে চাইবে মুনিয়াদির কথা?
মুনিয়াদিরা থাকত লেক গার্ডেন্সে। রুহানদের পাড়ায়। ওদের বড় হলুদ দোতলা বাড়ি ছিল একটা। যার সামনে ছিল লোহার হাফ গ্রিল দেওয়া ব্যালকনি। মুনিয়াদিরা থাকত ওপরে, দোতলায়। আর নীচে থাকত মুনিয়াদির কাকা। সেই ব্যালকনিটায় মুনিয়াদি যখন এসে দাঁড়াত তখন ওদের সারা পাড়াটা ঝলমল করে উঠত।
পাড়ার ক্রিকেটে, খেলোয়ারদের মূল অনুপ্রেরণা ছিল মুনিয়াদি। তাদের খেলার উৎসাহ মুনিয়াদিকে দেখলে চড়চড় করে বাড়ত। আর ঠিক এমনই একটা ম্যাচে, এক রবিবার সকালে বুকুদা প্রথম দেখেছিল মুনিয়াদিকে।
তখন বুকুদা মাঝে মাঝে রবিবার করে আসত রুহানদের পাড়ায়। আর নেমে পড়ত ওদের গলি ক্রিকেটে। কিন্তু বুকুদা খেলতে পারত না খুব একটা। মানে ব্যাট ট্যাটগুলো ঠিকঠাক করতে পারত না। বলটাও বেশির ভাগ ওয়াইড হত।
তেমনই একদিন বুকুদা ছ’টা বলের ছ’টাই ওয়াইড করে ঘেমে নেয়ে যখন দেখল যে, এত পরিশ্রম করেও একটা ওভারই এখনও শুরু হয়নি, তখন পায়ে ব্যথা বলে পথের পাশে বাঁধানো কৃষ্ণচূড়া গাছের গোড়ায় বসে পড়েছিল। আর ঠিক তখনই সেই গাছের পাশের হলুদ রঙের বাড়ি থেকে ঝরনার মতো কলকল করে হাসি ঝরে পড়েছিল পথে।
‘হাসছ কেন?’ বুকুদা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
‘না, এমনি।’ দোতলা থেকে ঝুঁকে মুনিয়াদি কথাটা বলে আবার হেসে ফেলেছিল খিলখিল করে।
‘আরে!’ বুকুদা চিৎকার করে লাফিয়ে উঠেছিল গাছের বাঁধানো জায়গায়।
‘বাঃ, বেশ লাফাও তো!’ মুনিয়াদির হাসি থামছিলই না যেন, ‘তো পায়ে ব্যথা লাগে না?’
বুকুদা চোখমুখ লাল করে, ‘আমি ডিক্লেয়ার দিচ্ছি’ বলে ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে মাঠ, মানে রাস্তা ছেড়েছিল এই বলে যে, বোলিং ডিক্লেয়ার দিল। পরে রুহানকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কে বল তো এই হাস্যকর মেয়েটা?’
‘মুনিয়াদি।’ রুহান উৎসাহের সঙ্গে বলেছিল।
‘আচ্ছা। দেখে নেব ওকে।’ বুকুদা এমন করে বলেছিল যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম বোমার পলতেয় আগুন দিল।
তবে যেভাবে দেখতে চেয়েছিল বুকুদা সেভাবে দেখতে পারেনি। বরং এক মাস পরে নিজেকেই দেখেছিল অন্য রূপে। মুনিয়াদিকে দেখে নেওয়ার জন্য বুকুদা প্রায়ই আসতে লাগল ওদের বাড়ি। যেদিন যেদিন মুনিয়াদিকে দেখে নিত, সেদিন বুকুদার ফুর্তি হত খুব। আর তারপর যেদিন দেখে নিতে পারত না, সেদিন বুকুদাকে দেখলে মনে হত হাওয়া বের করে নেওয়া প্লাস্টিকের পুতুল। তারপর একদিন আর পারেনি বুকুদা। একটা কাগজ চার ভাঁজ করে খামে পুরে রুহানের হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘এটা নিয়ে দৌড়ে চলে যা তো। শুধু মুনিয়ার হাতে দিবি। আর কাউকে দিবি না। কেমন?’
বয়স কম হলেও কাগজটা যে চিঠি তা বুঝতে বাকি ছিল না রুহানের। আর এটাও বুঝেছিল চিঠিটা মুনিয়াদি ছাড়া অন্য কারও হাতে পড়লে বুকুদার দুর্ভোগের শেষ থাকবে না।
হলুদ বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডোরবেল-এ হাত না পেয়ে প্রাণপণে দরজার কড়া নেড়েছিল রুহান আর অবাক হয়ে দেখেছিল দরজাটা ফাঁক হয়ে গিয়েছিল আপনা থেকে। ‘মুনিয়াদি,’ জোরে ডেকেছিল রুহান। আর সেই ডাক শুনে বেরিয়ে এসেছিল ফ্রক পরা বাচ্চা একটা মেয়ে। কে মেয়েটা? রুহান তো আগে দেখেনি কোনওদিন!
‘মুনিয়াদি নেই?’ রুহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘আছে, স্নানে গেছে। তুমি কে?’ মেয়েটা বয়সের তুলনায় বেশ গম্ভীর।
‘আমি রুহান। মুনিয়াদিকে খুব দরকার আছে।’
‘কী দরকার আমায় বলো।’ মেয়েটা রীতিমতো রাগের গলায় কথা বলেছিল।
‘বা রে।’ রুহানেরও রাগ হয়েছিল। বলেছিল, ‘বলছি না শুধুমাত্র মুনিয়াদিকেই বলব।’
‘কে রে?’ মুনিয়াদি চুলে গামছা পেঁচিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।
‘আমি রুহান।’
‘ও।’ মুনিয়াদি হেসেছিল, ‘কিছু বলবি?’
‘হ্যাঁ, একটু প্রাইভেট।’
‘প্রাইভেট?’ মুনিয়াদি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রুহানের দিকে। তারপর বলেছিল, ‘ঠিক আছে। এই তুই ঘরে যা।’ বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হুকুম দিয়েছিল মুনিয়াদি। মেয়েটা অনিচ্ছার মুখ করে চলে গিয়েছিল ভেতরে।
রুহান চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘এটা বুকুদা দিয়েছে, বলেছে তোমাকেই দিতে।’
‘তাই?’ মুনিয়াদি ঠোঁটটা কামড়ে তাকিয়েছিল রুহানের দিকে। তারপর ফিক করে হেসে চিঠিটা নিয়ে বলেছিল, ‘ও, পায়ের ব্যথাটা বুকে উঠেছে?’
মুনিয়াদি চিঠিটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু রুহান তখনও ওই বাচ্চা মেয়েটার অপমান ভোলেনি। ও তাই বলেছিল, ‘কে গো ওই মেয়েটা? আগে তো দেখিনি।’
‘আরে দেখবি কী করে? ওরা তো কানপুরে থাকত। এখন এখানে চলে এসেছে। আমার মামাতো বোন। আলিপুরে থাকে। আজ বেড়াতে এসেছে।’
‘ও।’ রুহান চোয়াল শক্ত করেছিল, ‘বড্ড অসভ্য। কথা বলতেই শেখেনি। কী নাম গো?’
‘ওফ। তুই যা।’ মুনিয়াদি প্রায় দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তবু রুহান চেষ্টা ছাড়েনি। বলেছিল, ‘যাচ্ছি তো। কিন্তু ওই মেয়েটার নামটা কী?’
মুনিয়াদি দরজাটা বন্ধ করতে করতে বলেছিল, ‘ওর নাম নন্দা।’
সেই বয়সটা ছিল জলের মতো। পাহাড়ি নদীর মতো। লাল ফল টুপ করে ঝরে পড়লেও সে নদী তাকাত না। সে নিজের খেয়ালে রাজা। সে নিজের আনন্দে বিভোর। বিশ্বসংসার তার কাছে অবলুপ্ত। সে শুধু আনন্দ জানে, বহতা স্রোত জানে। সেই স্রোতে ভাসার, নিজেই স্রোত হয়ে ওঠার সময় ছিল সেটা। রুহানের মাথাতেই আর ছিল না সেই চিঠির ঘটনাটা। ওর খেলা আর পড়াশুনোর ভেতর ডুবে গিয়েছিল সব।
তারপর হঠাৎ একদিন মুনিয়াদির বাবা এল বাড়িতে। তখন দুপুরবেলা। ভদ্রলোক এসে অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করল। দেখে নেবে টেবে বলল। তারপর ডেকে আনা হল বুকুদাকে। ককাই আর কাকিমা মিলে ঠান্ডা মাথায় বোঝানো শুরু করল। কিন্তু মুনিয়াদির বাবা কিচ্ছু শুনল না। বরং চিৎকার করল আরও। বলা হল বুকুদা অসভ্য, বাজে, ইতর। রুহান দেখেছিল সব। সিঁড়ির কোনায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল বসার ঘরে মাথা নিচু করে বসে সব শুনে যাচ্ছে বুকুদা। কোনও কথা বলছে না। কোনও প্রতিবাদ করছে না।
তারপর একসময়ে বুকুদা উঠে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। রুহান দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওদের বারান্দায়। দেখেছিল রোগা পাতলা বুকুদা চলে যাচ্ছে মাথা নিচু করে। শুধু যেতে যেতে ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে এসে একবার থমকে দাঁড়িয়েছিল বুকুদা। তাকিয়েছিল সেই হলুদ বাড়ির ব্যালকনির দিকে। শূন্য ব্যালকনির রেলিং-এ দুটো চড়াই লাফাচ্ছিল শুধু। শুধু হাওয়া এসে নাড়িয়ে দিচ্ছিল টবের পাতাবাহার। আর রোদ্দুর একা একা দাঁড়িয়ে ছিল পুরনো দেওয়ালে।
এত বছর হয়ে গেছে, তবু, সেই চলে যাওয়াটুকু কী অদ্ভুতভাবে মনে আছে রুহানের! সেই নুইয়ে পড়া রোদ, ঝিরঝির কৃষ্ণচূড়া আর হলুদ বাড়ির সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে চলে যাওয়া বুকুদা। ভালবাসা আর তার থেকে বিতাড়িত মানুষকে সেই প্রথম দেখেছিল রুহান। বুকুদা আর কোনওদিন আসেনি এ পাড়ায়।
পরে মুনিয়াদিরাও বাড়ি বিক্রি করে চলে যায়। তবে ততদিনে রুহানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল সেই ছোট্ট রাগী মেয়েটার। তাই মুনিয়াদিরা চলে গেলেও নন্দার সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ জমাট হয়েছিল রুহানের। আর নন্দার থেকেই ও খবর পেত মুনিয়াদির। নাকতলার ভেতরের দিকে চলে গিয়েছিল মুনিয়াদিরা। ওর বাবার কোম্পানি লকআউট হয়ে গিয়েছিল বলে বড় বাড়িটা বিক্রি করে ছোট্ট বাড়ি কিনেছিল ওরা। আর সেখানেই একটা স্টেশনারি দোকান দিয়েছিল। মুনিয়াদি একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়াবার জন্য চাকরি নিয়েছিল। তারপর হঠাৎ মুনিয়াদির বাবা মারা যায়। মা মুনিয়াদির বিয়ে দিলেও ডিভোর্স হয়ে যায় বছর দুয়েকের মধ্যেই।
এ সবই সেদিন গাড়িতে বসে বলেছিল বুকুদাকে। বুকুদা গাড়িটা নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল সায়েন্স সিটির উলটোদিকের ফুটপাথ ঘেঁষে। রুহানের কথা শোনার সময় একটাও প্রশ্ন করেনি বুকুদা। শুধু সিগারেট ধরিয়ে গেছে একটার পর একটা। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এখনও মুনিয়া নাকতলায় আছে? স্কুলে পড়ায়? আর হান, নন্দার সঙ্গে তোর সম্পর্ক টিকল না কেন রে?’
রুহান দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল, ‘বনিবনা হচ্ছিল না বুকুদা। তাই…’
‘হান, তুই আমায় একবার মুনিয়াদের বাড়িতে নিয়ে যাবি?’
‘আমি?’ একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল রুহান।
‘প্লিজ হান। একবার।’ বুকুদাকে অমন গলায় কোনওদিন কথাই বলতে শোনেনি ও।
রুহান বলেছিল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু দূর থেকে দেখিয়ে দেব। কাছে যাব না। কেমন?’
বুকুদা ম্লান হেসে বলেছিল, ‘নন্দার ব্যাপার নিয়ে তোর আজও খচখচ আছে, না? ঠিক আছে, দূর থেকেই দেখিয়ে দিস। কেমন?’
কেন এত বছর পরও মুনিয়াদির খোঁজ করল বুকুদা? জিয়ানা-তুতুলদের নিয়ে তো ভরাট সংসার। তা হলে? তা হলে কি যা ভরতি দেখায় তা আসলে ভরতি নয়? যা সুন্দর দেখায় তা আসলে গভীর ছলনামাত্র! বুকুদাকে তো ফিরিয়ে দিয়েছিল মুনিয়াদিরা। সেই তরুণ, মনখারাপ করা, রোগা আর নড়বড়ে কনফিডেন্সের বুকুদাকে তো এই বুকুদা পিছনে ফেলে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ মাইল। এখনকার বুকুদা যদি সেদিনের মুনিয়াদির বাবার সামনে দাঁড়াত, তবে কি আর অমনভাবে চলে যেতে বলতে পারত ওরা বুকুদাকে? পারত না, রুহান জানে। এই বুকুদার জন্য গর্ব হয় রুহানের। মনে হয়, একদিন যাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজ সেই ফিরে এসেছে দশ গুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে। অন্ধকারের ভেতর থেকে, পরাজয়ের ভেতর থেকে, অপমানের ভেতর থেকে এই যে চিরন্তন ফিরে আসার গল্প, এটাই তো বাঁচতে শেখায়। তাই বুকুদাকে দেখলে নতুন করে বাঁচতে শেখে রুহান।
তবে মুনিয়াদি নিশ্চয়ই কিছু বলেছিল বুকুদাকে, তাই অমন রেগে ঝাড় দিয়েছিল ফোনে। আসলে সেদিন তো দূর থেকেই বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে চলে এসেছিল ও। ও তো জানে না, তারপর থেকে কতটা কথা হয়েছে বুকুদা আর মুনিয়াদির। তবে এটা জানে যে, বুকুদার কাছে ওর নামে খারাপ রিপোর্ট গেছে।
তা প্রায় পাঁচ মাস বুকুদা যোগাযোগ করেনি রুহানের সঙ্গে। রুহানও নিজের থেকে যোগাযোগ করতে যায়নি। এমনকী বাড়িতেও যায়নি বুকুদাদের। জিয়ানা দু’-একবার ডেকেছিল, তবে এড়িয়ে গেছে। আসলে জিয়ানাকেও তো বলা যায় না কী হয়েছে। ও তো জানে না জিয়ানা কতটা জানে মুনিয়াদি সম্পর্কে। বা আদৌ জানে কিনা! আর দ্বিতীয়ত, জিয়ানা যদি প্রশ্ন করে রুহানের অতীত খুঁড়তে শুরু করে, তবে? রুহান নিজে তো বিপাকে পড়বে। বরং জিয়ানা যখন নিজের থেকে বলেছে যে, আজকাল বুকু খুব উজ্জ্বল থাকে, আনন্দে থাকে, তখন একটা অদ্ভুত ফিলিং হয়েছে রুহানের। ও তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পালটে চলে গেছে অন্য প্রসঙ্গে। মনে হয়েছে যদি বুকুদার প্রসঙ্গ ধরে চলে আসে অন্য প্রসঙ্গ। যদি তাতে কোনওভাবে জড়িয়ে যায় রুহানের নাম! না, এখনও পার্মানেন্ট হয়নি রুহান। তবে জিয়ানা চেষ্টা করছে। কিন্তু সে জন্য নয়। জিয়ানা যদি জেনে যায় যে, বুকুদার পুরনো প্রেমিকার সঙ্গে রুহান আবার বুকুদার দেখা করিয়ে দিয়েছে, তা হলে রুহানের চাকরি পার্মানেন্ট হবে না-এমন ভয় ও পায় না। আসলে ও ভয় পায় ভুল বোঝার। বিশ্বাস হারানোর। ও যদি বিশ্বাস হারায় জিয়ানার, তবে? পছন্দের মানুষের, কাছের মানুষের বিশ্বাস হারানো খুব যন্ত্রণার। প্রতিদিন সেই যন্ত্রণার দেখা পায় ও। তাই জিয়ানার বিশ্বাস আর হারাতে চায় না। ফলে বুকুদার কথা উঠলে খুব যত্নে পাশ কাটিয়ে যায় ও।
সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের সিগনাল পেরিয়ে আবার লেক রোডের মুখে সিগনালে আটকাল ওর ট্যাক্সি। রুহান জানলার থেকে সরে বসল, ভীষণ রোদ উঠেছে। জানলা দিয়ে গরম হলকা এসে পুড়িয়ে দিচ্ছে সব। রুহানের শরীরও কাঁচা লোহার মতো গরম হয়ে আছে। এখন গরম হাওয়া লাগলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে। তখন আরও কেলেঙ্কারি হবে। আবার রাহি শুনলে বলবে, ‘বাচ্চা নাকি?’
এমনভাবে হঠাৎ রাহির কথাটা মনে পড়তে নিজের কাছেই লজ্জা পেল রুহান। ছি ছি। এমন একটা কাণ্ড করে ফেলেছে যে রাহির সামনে যাওয়ার মুখটা নেই ওর। সেদিন কী হয়েছিল হঠাৎ! এমন ভূত যে কেন লাফিয়েছিল মাথায়! আসলে রাহির প্রতি ভাললাগাটা বরাবরই ছিল। তবে সেটা যে আচমকা বেড়ে যাবে তা ঠিক বুঝতে পারেনি রুহান।
সেদিন রবিবার ছিল। ছুটি ছিল রুহানের। বাড়িতেই বসে ছিল। আর কেন কে জানে, সেদিন তীব্রভাবে রাহির কথা মনে পড়ছিল ওর। অমন বাদামি চুল। টোলপড়া থুতনি। অমন চোখ। বিছানাটা মনে হচ্ছিল কাঁটার তৈরি। মনে হচ্ছিল মাথাটা ফেটে যাবে যন্ত্রণায়। চোখ দুটো বেরিয়ে আসবে বাইরে। হঠাৎ ভীষণ জলতেষ্টা পাচ্ছিল রুহানের। রাগ হচ্ছিল। কষ্ট আর হিংসা একই সঙ্গে অ্যাসিডের মতো গড়াচ্ছিল বুকের ভেতর। হঠাৎ এমন তীব্র অস্থিরতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে কী করবে বুঝতে পারছিল না রুহান। কোথায় গেলে, কার সঙ্গে কথা বললে শান্তি পাবে, বুঝতে পারছিল না একদম। আর ঠিক তখনই ফোন করেছিল কিগান।
খুবই অল্প কথা হয়েছিল কিগানের সঙ্গে। কিগান জিজ্ঞাসা করেছিল কেন রুহান আর বিশেষ যায় না চাপাডাঙায়। কেন ফোনও করে না। রুহান কথা বলতে পারছিল না। ও তো আর বলতে পারে না যে, চাপাডাঙাটা ওর এখন চোরাবালির মতো লাগে। যেখানে অসহায়ভাবে ডুবে যাওয়া ছাড়া আর ওর কোনও উপায় নেই। কিন্তু সে ডুবে যাওয়ার কোনও জীবন নেই, বরং মৃত্যু আছে। তাই বিশেষ যায় না ও। তারপর কথা ঘোরাতে ও জিজ্ঞেস করেছিল কিগান কী করছে। আর এই প্রশ্নটা করেই ভুল করেছিল ও। কিগান বলেছিল যে, ও রাহির বাড়ি যাবে দুটো ডিভিডি ফেরত দিতে।
রাহি! নামটা শুনে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল রুহানের। কিগানের থেকে ছিটকে এসে নামটা গুলির মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল রুহানকে। ওর যেন মাথার ব্যথাটা বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ। ও অবসন্ন হাতে কোনওমতে কথা বলে রেখে দিয়েছিল ফোনটা। কিন্তু ফোন তো যন্ত্র। ইচ্ছে হলে সরিয়ে রেখে দেওয়া যায়। কিন্তু মানুষের চিন্তা তো তা নয়। এটাকে সরিয়ে রাখবে সাধ্য কার?
তবে লড়াই করেছিল রুহান। নিজের সঙ্গে তীব্র লড়াই করেছিল। কিন্তু অন্যান্য সব বারের মতো, হারের ট্র্যাডিশন পালটাতে পারেনি। ও বুঝেছিল এমন ছেলেমানুষি কষ্ট আর হিংসের থেকে মুক্তির উপায় একটাই। যোগাযোগ। আর সেটা এক্ষুনি করতে হবে।
রুহান দ্রুত জামাকাপড় বদলিয়ে লেক গার্ডেন্স স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে শিয়ালদা স্টেশন চলে গিয়েছিল।
তখন রীতিমতো হাত-পা কাঁপছিল ওর। কষ্ট হচ্ছিল। ভেবেছিল একবার কি ফোন করবে রাহিকে? কিন্তু তারপর মত পালটেছিল। ভেবেছিল, রাহিকে আচমকা ফোন করে কিছু বললে ও ঘাবড়ে যেতে পারে। ভুল বুঝতে পারে। এ ছাড়া কথা বলার সেই অভিজ্ঞতা তো আর রুহান ভোলেনি। মায়ের ওপর রাগ করে যা ইচ্ছে তাই বলেছিল ও রাহিকে। তারপর থেকে তো রাহি একরকম এড়িয়েই চলে রুহানকে। আর সেই রুহান যদি এমন একটা স্পর্শকাতর ব্যাপার নিয়ে আচমকা ফোন করে তবে আর দেখতে হবে না। তাই ঠিক করেছিল মেসেজ করবে রুহান। নিজের মনে ছড়ানো-ছিটানো সমস্ত সাহসকে একত্র করে এনে তার ওপর ভর দিয়ে রাহিকে একটা এসএমএস করেছিল রুহান।
তবে উত্তর এসেছিল বেশ কিছু পরে ছোট্ট, স্পষ্ট জবাব। রাহি লিখেছিল-‘আজ নয়। আমি ব্যস্ত আছি। লোকজন এসেছে বাড়িতে। পরে একদিন হবে।’
তবু রুহান মানেনি। জেদ করে আরও বড় একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল। লিখেছিল, ‘দেখা করতেই হবে।’
উত্তর এসেছিল আরও দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত, ‘বাচ্চা নাকি? বলছি না, পরে একদিন হবে।’
একদিন হবে। বাবা বলত একদিন হবে। মা বলত একদিন হবে। সবাই বলত একদিন হবে। কিন্তু সেই একদিনটা কই? কবে আসবে সেই একদিন? কবে আর পৃথিবী ভাল করে চোখ মেলে দেখবে যে, রুহান বলে একজন আছে? আর তার পছন্দের জিনিসগুলো একদিন নয়, আজই চাই। অনির্দিষ্ট একদিনের জন্য তার আর ফেলে রাখার সময় নেই।
উৎসাহী চড়াই যেমন আচমকা ভিজে গিয়ে তার সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, রুহানের নিজেকে তেমনই মনে হয়েছিল। অত বড় একটা স্টেশনে, অত মানুষের মাঝে নিজেকে খুব ছোট আর অতিরিক্ত মনে হয়েছিল। বরং লজ্জা লাগছিল ওর। কষ্ট হচ্ছিল। এমন ছেলেমানুষি করার জন্য নিজেকে মারতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল সামনে সার দিয়ে দাঁড়ানো হলুদ-সবুজ ট্রেনের মাথায় বসা পায়রার যে গুরুত্ব আছে, ওর তার সিকি ভাগও নেই। মনে হচ্ছিল ওর কোনও মূল্যই নেই। মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে এসেছিল রুহান। তারপর আর যোগাযোগ করেনি রাহির সঙ্গে।
কফি শপের সামনে এসে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিল রুহান। নামতে গিয়ে পায়ে ব্যথা লাগল আবার। এই শপটার সামনে দিয়ে বহুবার গিয়েছে রুহান। কিন্তু ভেতরে ঢোকেনি। কেমন যেন ভয় আর লজ্জা করে। দেখেই মনে হয় খাবারের দাম বেশি হবে। মানুষজনগুলোও যেন কেমন বেশি চকচকে। একটু যেন অন্যরকম। ভুরুটা যেন সামান্য তুলে একটু অন্যভাবে তাকায় একে অপরের দিকে। এখন ঢুকতে গিয়েও কেমন যেন বুকটা কাঁপল ওর।
‘কী রে! এতক্ষণ সময় লাগল?’ বুকুদা বসে ছিল একটা গোলমতো টেবিলে। সামনে ইয়াব্বড় একটা কফির মগ। বুকুদা জিজ্ঞেস করল, ‘ফোন করছি। বেজেই যাচ্ছে। কেসটা কী তোর?’
‘সরি বুকুদা, তাড়াহুড়োয় ফোনটা বাড়িতে রেখে এসেছি। আর সাইলেন্ট করা আছে তো, তাই হয়তো মা-ও শুনতে পায়নি।’
‘ও।’ বুকুদা একটু হেলিয়ে বসল, ‘কী খাবি? কফি? সঙ্গে?’
‘শুধু কফি।’ রুহান ডান পা-টাকে সাবধানে রেখে বসল। তবে ওর ভাল লাগল যে, বুকুদার গলায় কোনও মেঘ নেই।
‘হান,’ বুকুদা ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আয়াম সরি। লাস্ট টাইম, আই ওয়াজ ভেরি রুড টু ইউ। আসলে এমন একটা কথা শুনলাম। তাই…’
রুহান হাসল, ‘ঠিক আছে বুকুদা, নো প্রবলেম।’
‘না রে হান, এভাবে বলা যায় না। প্রবলেম আছে কি নেই সেটা এভাবে বোঝা যায় না।’
‘তাও। তুমি ভেবো না বুকুদা। সব ঠিক আছে।’ রুহান হাসল।
‘জানিস, মুনিয়ার মাথার অনেক চুল কেমন সাদা হয়ে গেছে! এখন হাইস্কুলে পড়ায়। গম্ভীরও হয়েছে আগের চেয়ে। দেখে এত অদ্ভুত লাগে! মনে হয়, এই মেয়েটাকেই একদিন এত ভালবেসেছি! এই মেয়েটার জন্যই জোর করে একদিন চলে গেলাম বিদেশে! সময় সব কেমন পালটে দেয় জানিস হান। এখন মুনিয়াকে দেখলে আর তেমন উথাল-পাথাল মনখারাপ করে না। শুধু তিরতিরে একটা কষ্ট হয় বুকে। যখন ফোন করে, ওর বাড়িতে গেলে যখন জল নিয়ে এসে বসে, তখন কেমন যেন গ্লাস উলটে পড়ে যাওয়া জলের মতো কষ্ট হয়। মনে হয় কী যেন হল না এ জীবনে।’
রুহান সামনে দিয়ে যাওয়া কফির কাপে ঠোঁট ডোবাল। তারপর বলল, ‘এসব আর ভেবো না বুকুদা। বউদি জানলে কষ্ট পেতে পারে।’
‘জিয়ানা?’ বুকুদা হাসল, ‘না, এসব বলব না ওকে। কী হবে বলে? মুনিয়া এখন আমার বন্ধু ছাড়া তো আর কিছু নয়। ফলে অনর্থক জটিলতা বাড়িয়ে লাভ কী? জিয়ানা শুধু জানে, মুনিয়া নামে একজন পুরনো বান্ধবীর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়েছে। ব্যস।’
হাসল রুহান, ‘সেই ভাল।’
‘দেখ, মুনিয়া আমায় বলেছে তোর আর নন্দার ব্যাপারটা। নন্দা এসে খুব কেঁদেছিল ওর কাছে। রুহান কেন এমন করল? কেন নন্দার বাবার থেকে টাকা নিল! মুনিয়া খুব রেগে আছে তোর ওপরে। আর আমায় যখন বলল তখন আমারও এমন মাথা গরম হয়ে গেল যে, তোকে ফোনে গালাগাল করে বসলাম।’
‘আরে তুমি ছাড়ো না,’ রুহান হাসল আবার, ‘এসব কেন মনে করছ!’
‘না রে হান, হঠকারীর মতো কাজ করা আমার আজও গেল না। গত এক মাস ধরে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল যে, তোর সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু ইগো আমার যে এখনও এতটা অবশিষ্ট আছে বুঝিনি। তারপর গতকাল রাতে তুতুল এমন করে বলল…’ বুকুদা মাথা নাড়ল।
‘কী বলল?’ জিজ্ঞেস করল রুহান।
‘খেলছিল একা একা। কম্পিউটার গেমস। ওই গুলি টুলি করে মারপিটের মতো খেলা। যদিও এসব ওর খেলা বারণ। তবু কাঁহাতক আর একটা বাচ্চাকে এটা না ওটা না বলা যায়! তা হঠাৎ দেখি, নিজের থেকেই খেলা গুটিয়ে নিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম-কী রে খেলবি না আর? তুতুল বলল, ভাবলাম আর মারব না লোকজন। ভাবলাম ক্ষমা করে দিই। কী হবে মারামারি করে! রাগ করে! ঠিক না বাবা?’
বুকু থামল একটু, কফিটায় চুমুক দিয়ে বলল, ‘একটা বাচ্চা এটা জানে আর আমি জানি না? এতদিন ধরে এত কিছু দেখলাম, শেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এটা শিখতে পারলাম না? লজ্জা হল, জানিস হান, এত লজ্জা লাগল! আমি তাই ফোন করলাম তোকে।’
‘ভাল করেছ। তা ডাকলে কেন গো?’
‘তুই আমার রুড ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করিস। আর পারলে নন্দার থেকেও ক্ষমা চেয়ে নিস!’ বুকুদা শান্ত গলায় বলল।
‘ক্ষমা তুমি চেয়ো না বুকুদা। আমি সত্যিই খারাপ কাজ করেছি। অন্যায় বলতে পারো। প্রতারণা বলতে পারো। তবে ক্ষমা চাইতে নন্দাকে ফোন করেছিলাম বহুবার। ও ফোনই ধরেনি। বলেছিল ওর নাকি ঘেন্না হয়।’
‘কেন এমন করেছিস হান? আমায় বল তুই। এত টাকার দরকার কেন ছিল তোর?’
রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই প্রশ্নটা যে কতবার কত লোকের মুখে ও শুনেছে! কিন্তু কোনওদিন উত্তর দেয়নি। আসলে নিজের চূড়ান্ত অক্ষমতার কথা কে আর বড় মুখ করে লোকের কাছে বলতে চায়? ও-ও চায়নি। কিন্তু একদিন তো বলতেই হবে। অন্তত একজনের কাছে তো বলতেই হবে। কিন্তু সে কে? বুকুদা? আর কী বলবে রুহান? বলবে যে, মায়ের অপারেশনের জন্য ষাট হাজার টাকার দরকার ছিল। কোথাও জোগাড় করতে পারেনি ও! আর সেই সময়ই নন্দার বাবাও টাকার অফার করেছিল ওঁর মেয়ের জীবন থেকে সরে দাঁড়াবার মূল্য হিসেবে? এসব সময় নায়করা কী করে? মেয়ের বাবার মুখের ওপর টাকা ছুড়ে প্রেমের জয়গান গেয়ে ফিরে আসে? আর সক্কলের হাততালি পায়? হবে হয়তো। কিন্তু রুহান তো আর নায়ক নয়। ওর মাকে বাঁচানো, প্রেমটাকে বাঁচানোর চেয়ে জরুরি ছিল। তাই হাত পেতে টাকাটা নিয়েছিল রুহান। মাথা নিচু করে নিয়েছিল। কিন্তু এসব কী বলবে বুকুদাকে? বুকুদা কি এসব বুঝবে?
‘আমি অন্য কোনওদিন বলব বুকুদা। প্লিজ আজ নয়। ধরে নাও আমি অর্থপিশাচ।’ রুহান মাথা নিচু করল।
বুকুদা জোর করল না আর। বলল, ‘ঠিক আছে। বাদ দে। আচ্ছা, চাকরি করবি?’
‘মানে?’ রুহান চমকে গিয়ে হাসল।
‘আমাদের অফিসে। তবে বাইরে গিয়ে থাকতে হবে। পার্মানেন্ট চাকরি। করবি?’
‘না গো দাদা। আমি এখানেই ঠিক আছি।’ রুহান মাথা নামিয়ে নিল।
‘সে কী রে!’ বুকুদা অবাক হল।
‘হ্যাঁ। আমার প্রোজেকশন কর্প-ই ভাল। কলকাতা ছেড়ে যাব না। জানি, বাঙালিরা এমন হয়, সবাই বলে। বলে হোম সিক, ভিতু, রিস্ক নেয় না। না, সব বাঙালি নয়, কিন্তু অধিকাংশ। আমিও তো অধিকাংশর দলেই।’
‘তবু,’ ঝুঁকে বসল বুকুদা, ‘কী বলছিস তুই? এমন সুযোগ কেউ হারায়? ওই জিয়ানাদের কোম্পানিতে কবে তুই পার্মানেন্ট হবি তার ঠিক আছে? দেখ, ওর চাকরিই থাকে কিনা! খুব টেনশন যাচ্ছে ওই নর্থ-চব্বিশ পরগনার কাজটা নিয়ে। আমাদের এখানে আয়। তোকে পুনে পাঠিয়ে দেব। ভাল থাকবি।’
‘না গো বুকুদা। আর বোলো না।’
‘এমন জীবনের মানে কী হান? জিয়ানার কাছে শুনলাম, তুই খেলাও ছেড়ে দিয়েছিস! কোনও ক্লাব পাসনি! এভাবে কতদিন চালাবি? জীবনের তো একটা মানে থাকে। একটা তো ড্রাইভ থাকে। একটা উত্তরণ থাকবে না? এমন করে জীবন কাটাবি? পাগল?’
‘জানো বুকুদা, একবার ময়দানের কাছে একটা সাইকেল চড়া পাগল দেখেছিলাম, সে একটা গান গাইছিল-Sing for the song boys, sing for the song/ I do not do things that my heart says wrong। পরে জেনেছিলাম, বেলাফন্টের একটা বিখ্যাত গানের থেকে প্রথম লাইনটা নেওয়া। কিন্তু পরের লাইনটা ওর নিজের তৈরি। আমি এখনও ওই গানটার মতোই চিন্তা করি।’
‘মুনিয়ার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিয়েছিস বলে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তা বলে এটা মানছি না। তুই ভুল করেছিস। আর তুই মনের কথা শুনিস! তা হলে নন্দার সঙ্গে অমন করলি কেন? ক’টা টাকার জন্য?’
‘তুমি বোধহয় আমায় চাকরির কথাটা বলতে ডেকেছিলে, না?’ রুহান বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ। আর ভেবেছিলাম তুই আমায় বলবি নন্দার ব্যাপারটা।’
‘থ্যাঙ্ক হউ বুকুদা। আর নন্দার ব্যাপারটা কিছু বলার নেই। সত্যি টাকা নিয়েছিলাম। নন্দার কাছে দোষ করেছি আমি। তাই তোমায় চোরের মতো বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে চলে এসেছিলাম। আমার গল্প এটুকুই। সবার গল্পে উত্তরণ থাকে না বুকুদা। কারও কারও গল্প আমার মতোও হয়। একটা দিন আরেকটা দিনের মতো করেই কাটে তাদের। তারা শুধু বেঁচে থাকে। আমারও কোনও বড় গল্প নেই, জানি হবেও না। এটাই আমার পক্ষে ঠিক আছে। কেন ঠিক আছে, জানি না। কিন্তু ঠিক আছে।’
বুকুদা কিছু বলতে গিয়েও হাসল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি চাই ঠিক থাকুক। সত্যি, তুই যা করছিস, তাতে আনন্দ পেলেই হল। আয় তবে।’
রুহান হেসে উঠে পড়ল। আর বসার মানে হয় না যে।
রোদটায় এবার কমলা ছোপ লাগছে। লেকের দিক থেকে হাওয়া দিচ্ছে একটা। আর কী আশ্চর্য পায়ের ব্যথাটাও কম! দুপুরের ওষুধ কি এখন কাজ দিচ্ছে?
ফেরার পথটা হেঁটেই ফিরবে। আর ট্যাক্সির খরচ নিতে পারবে না ওর সামান্য পকেট। এই পথটার দু’পাশেই গাছ। উলটোদিকে একটা বড় ফুলের দোকান। তার শোকেসে নানারকম ফুল সাজানো রয়েছে। সেই কাচে রোদের কুচি এসে পড়েছে কিছু। রুহান ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে লাগল। বুকুদা এখনও বসে রয়েছে কফি শপে। কিন্তু ওকে তো ফিরতে হবে। ওর মা বসে রয়েছে। ওকে ওই গুঁজিয়া কিনে ফিরতে হবে মায়ের কাছে। যতই বকুক, মা তো। মায়ের আর কে আছে ও ছাড়া? দুঃখের কথা, রাগের কথা মা আর বলবেই বা কাকে? এই মা, এই শহর, অসম্পূর্ণ সব ইচ্ছে আর একাকিত্ব—এইসব নিয়েই তো রুহান। হয়তো কোনও বলার মতো জার্নি নেই ওর। তবু দূরত্ব পেরোবার, একটা সামান্য মানুষ হয়েও বেঁচে থাকার চেষ্টা তো আছে!
ও দেখল লেকের মাঠে ছেলেরা খেলছে। ক্রিকেট। আরে ওই রোগা কালো ছেলেটা এমন বড় রান-আপ নিচ্ছে কেন? রুহান দাঁড়িয়ে পড়ল মাঠের পাশের খয়াটে রেলিং ধরে। ছেলেটার হাতে বল। মরা লাল রং। সেলাইটাও বোধহয় ছেঁড়া। যারা খেলছে তাদের শরীরও তেমন শক্তপোক্ত নয়। তাদের পরনে হাফ প্যান্ট। এক পায়ে প্যাড। উইকেটে বেল নেই। দেখেই বোঝা যায় আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। তবু এক পায়ে প্যাড, পট্টি লাগানো ব্যাট আর সেলাই ওঠা ডিউস বল নিয়ে ওরা খেলছে। রোগা, কালো ছেলেটা লম্বা রান-আপ নিচ্ছে।
রুহান দেখল কালো ছেলেটা দৌড় শুরু করল। আঙুল দুটো বলের সেলাইকে ধরে রেখেছে। রুহান মাঠের ভাঙা রেলিং-এ হাত দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল। হাওয়া আসছে কোনাকুনি। ভাল ইনসুইং হবে। কিন্তু ছেলেটা কি সেটা জানে? ও কি পারবে বলটাকে ঠিক জায়গায় রাখতে?
রেলিং-এর একটা দিক ভাঙা। রুহান চট করে তার ভেতর দিয়ে গলে আরও কাছে চলে গেল। ওকে দেখতে হবে ভাল করে। ওই ছেলেটা লাফাল। হাতটা মাথার ওপর তুলে ছুড়ে দিল বলটা। শর্ট অব লেন্থ-এ পড়ে বলটা উঠল মাথা সমান। ব্যাটসম্যান বুঝতে ভুল করল আর মাথা বাঁচাতে কোনওমতে ব্যাটটা ঘোরাল। ব্যাটের কানায় লেগে উঠে গেল বলটা। তারপর উড়ে গেল ডিপ স্কোয়ার লেগের দিকে। একটা ছেলে ছুটছে। বলটা ধরবে বলে দুটো হাত বাটির মতো করে ছুটছে। বলটা উড়ে যাচ্ছে। উড়েই যাচ্ছে। রুহান অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল বলটা উড়তে উড়তে বাউন্ডারি পেরিয়ে গেল। ছয়!
বোলার ছেলেটার মুখ ঘামে ভরতি। চোখে কষ্ট। এতটা দৌড়ে এসে বলটা করল, তাতে ছয়! ছেলেটা অসহায়ের মতো তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। এরপর কী করবে ও? কোথায় বল ফেলবে? ব্যাটসম্যানটা হাসছে। হাসবেই তো। ক্রিকেট ব্যাটসম্যানের খেলা। বোলাররা তো শুধু বল করে যাবে। রক্ত, ঘাম এক করে পালিশ আনবে বলে। আর তাকে অন্যরা মারবে। মারবে? শুধু মেরেই যাবে!
‘এই যে ভাই,’ রুহান হঠাৎ হাত তুলে বোলার ছেলেটাকে ডাকল।
‘আমায় বলছেন?’ ছেলেটা হতভম্ব হল।
‘তোমারটা হচ্ছে না।’
‘মানে?’ বোলার ছেলেটা এগিয়ে এল কাছে।
‘মানে,’ রুহান বলটা চেয়ে হাতে নিল, গ্রিপ দেখিয়ে বলল, ‘এভাবে ধরো।’
অন্য ছেলেরা হাসছে। ব্যাটসম্যান ছেলেটা তো কীসব যেন বলছেও।
রুহান পাত্তা দিল না, বলল, ‘বলটার সিমটা তেমন মরেনি এখনও। একদম ব্লক হোলে ফেলবে। দেখো, ব্যাটসম্যান ওপেন চেস্টেড স্টান্স নিচ্ছে। ইয়র্কার দিলে সামলাতে পারবে না। বাঁ পা এগোতেই পারবে না তো। দাও, ইয়র্কার দাও।’
ছেলেটা আবার রান-আপ নিচ্ছে। ব্যাটসম্যান হাসছে। অন্যরাও হেসে কীসব বলছে রুহানকে দেখে। রোদ গাঢ় কমলা হচ্ছে আবার। আবার হাওয়া দিচ্ছে কোনাকুনি। রুহান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে।
ছেলেটা দৌড় শুরু করল। পায়ের তলায় মরা ঘাস থেকে ধুলো উড়ছে। কোনাকুনি হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে শরীর। একাগ্র চোখে, চোয়াল শক্ত করে দৌড়োচ্ছে ছেলেটা। রুহান উত্তেজনায় হাতের মুঠো শক্ত করে তাকিয়ে রইল। দেখল, লাফিয়ে উঠে ছেলেটা ছুড়ে দিল বলটা। পালিশ ওঠা বলটা কোনার থেকে আসা হাওয়ায় বাঁক খেল একবার। তারপর গোঁত্তা খেয়ে ব্যাটসম্যানের ব্যাটের তলা দিয়ে গলে গিয়ে ছিটকে দিল স্টাম্প! ব্যাটসম্যান বাঁ পা নড়ানোর সময় পর্যন্ত পেল না।
বোলার ছেলেটা অবাক হয়ে দৌড়ে এল রুহানের দিকে, ‘আপনি কে স্যার?’
রুহান দাঁড়াল না। হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তেমন কেউ নই।’
ছেলেটা পাশ ছাড়ল না, ‘আমাদের ক্লাবের নাম ইয়ং ফ্রেন্ডস। খুব শখ আমাদের ক্রিকেট খেলার। কিন্তু টাকাপয়সা নেই তো। তাই শিখতে পারি না। চেয়েচিন্তে আনা জিনিসপত্র নিয়ে আমরা ক্রিকেট খেলি। আপনি একটু সময় করে দেখিয়ে দেবেন আমাদের?’
‘আমি!’ অবাক হল রুহান।
আরও ছেলেরা এগিয়ে আসছে। ভিড় করছে রুহানকে ঘিরে। ব্যাটসম্যান ছেলেটা এবার বলল, ‘স্যার, আসবেন? দেখিয়ে দেবেন? দেখুন না আমরা পারি কিনা!’
‘কিন্তু…আমি…’ রুহান টালুমালু চোখে তাকাল ওদের দিকে।
‘সকালে আসবেন স্যার। ছ’টায়। আমরা থাকব। আমার নাম বিশু। আমি বল করি। আমাদের যা আছে তাই দিয়েই দেখিয়ে দেবেন। চারদিকে কত ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয়। আমরা ঠিক পেরে উঠি না। জিতলে টাকা দেয়, জিনিসপত্র দেয়। আপনি দেখিয়ে দেবেন, দেখবেন আমরাও পারব।’
সমবেত আবেদনের সামনে রুহান দাঁড়িয়ে রইল। রোদ নরম হচ্ছে এবার। লেকের দিক থেকে আসা হাওয়ার জোরটাও বাড়ল। ওই স্টাম্প, বল, ওই মাঠ, ওই ঘাম আর রক্ত। সব এখনও ডাকছে রুহানকে। এখনও বলছে ‘চলে আয়’, বলছে ‘খেলবি চল’। রুহান বুঝতে পারছে ভিজে বারুদ শুকিয়ে আসছে। আবার আগুন চাইছে বারুদ। রোগা আবছায়া ছেলেগুলো চকমকি পাথর হাতে ঘিরে ধরেছে ওকে। আর ভিতু, মনমরা, হেরে যাওয়া রুহানকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে অন্য এক রুহান। যে-রুহান একদিন একাই জিতিয়ে দিত ম্যাচ। যে-রুহান দৌড় শুরু করলে ব্যাটসম্যান আড়ষ্ট হয়ে যেত। যে-রুহান বোঝাত ক্রিকেট শুধু ব্যাটস্ম্যান নয়, বোলারদেরও খেলা। বোঝাত, জীবন শুধু মার খাবার জায়গা নয়, পালটা মার দেওয়ার জায়গাও।
‘আসবেন তো?’ বিশু জিজ্ঞেস করল, ‘কাল সকালে আমরা এখানেই থাকব। আসবেন তো স্যার?’
কমলা নিস্তেজ সূর্যের দিকে রুহান তাকাল একবার। ভাবল ডুবন্ত হলেও, সূর্য সূর্যই। প্রাণীজগৎ এখনও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। রুহান হাসল সামান্য। মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘আসব।’
Chapter - 32
৩২
তুতুলের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক আনন্দ বোধ করল জিয়ানা। কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা! নিশ্চিন্তে, কোনও টেনশন, কষ্ট বা মনখারাপ ছাড়াই কী অদ্ভুত ঘুমোচ্ছে! দেখে কোথায় যেন একটা আফশোসের কাঁটা ছোট্ট করে বিঁধলও। ইস, যদি এমন নিশ্চিন্তে ও ঘুমোতে পারত! কতদিন ঠিকমতো ঘুমোয়নি ও। এমন নিথর পাথরের মতো একটা ঘুম খুব দরকার জিয়ানার। যে-ঘুম ওকে ভুলিয়ে দেবে সব।
ভুলতে চায়, এখন সব ভুলতে চায় জিয়ানা। বুকের ভেতরও পাথর ঘোরে যেন। এত কষ্ট কেন হয় ওর? কী নেই? একটা মানুষ যা চায় তার সবটাই তো আছে ওর। তবু কীসের চোরা টান টের পায় ও? কেন চোখ বন্ধ করলেই পাহাড়ি সেই রাস্তাটা দেখতে পায়? কেন দেখতে পায়, কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতরে মিলিয়ে যাওয়া সেই সাইকেলটাকে? ওরও তো মিলিয়ে যেতে ইচ্ছে করে অমনভাবে কুয়াশার ভেতর। দেখতে ইচ্ছে করে কুয়াশার ভেতরের সেই অন্য পৃথিবীটা। যেটা গিলে নিয়েছে কিগানকে।
মা যে কেন অপছন্দ করত ওকে? জিয়ানা বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মা শোনেইনি। বরং কলেজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল কার্শিয়াং। ওর এক মামা থাকত ওখানে।
যেতে চায়নি জিয়ানা। রাগ করেছিল। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। একা একা কেঁদেছিল খুব। কিন্তু মা একদম শোনেনি। লোহার মতো কঠিন হয়ে গিয়েছিল মা। সেই সময় যেন মাকে চিনতেই পারেনি জিয়ানা। মায়ের ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এসেছিল?
শুধু চলে যাওয়ার আগে অনেক কষ্টে কোথায় যাচ্ছে তার ঠিকানা এক বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল কিগানের কাছে।
ছোট্ট, শান্ত, কুয়াশার মাফলার জড়ানো মানুষের মতো শহর কার্শিয়াং। পাহাড়ি পথ। তার দু’পাশে সবুজ গাছ। খাড়া পাহাড়ের ঢাল আর তারই এক কোনায় ছিল মামার বাংলো। কাঠের বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যেত কিছুটা দূরের পিচের রাস্তা। সেই বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকত জিয়ানা। ভাবত আসবে না কি একবারও? কিগান কি একবারও আসবে না?
সপ্তাহ তিনেকের মাথায় এসেছিল কিগান। বাড়ি থেকে নেমে ছোট্ট বাজারটায় শ্যাম্পু কিনতে গিয়েছিল জিয়ানা। আর সেখানেই হঠাৎ, প্রায় মাটি ফুঁড়েই যেন উদয় হয়েছিল কিগান!
এত চমকে গিয়েছিল জিয়ানা! এত আশ্চর্য এক আনন্দ ঘিরে ধরেছিল ওকে যে, কথাই বলতে পারছিল না প্রথমে। সেই ফরসা লম্বা ছেলেটা, গায়ে লাল জ্যাকেট, আর পিঠে ছোট্ট একটা ব্যাগ।
নরম রোদ উঠেছিল সেদিন। হাওয়া দিচ্ছিল ফুরফুরে। কিগানের কপালের ওপরে পড়ে থাকা চুলগুলো উড়ছিল। নীল চোখ দুটো চকচক করছিল।
জিয়ানা যেন পারছিল না আর। মনে হচ্ছিল ঝাঁপিয়ে পড়ে কিগানের ওপর। ওর জামা থেকে ভেসে আসা ব্রুট মাস্কের গন্ধ ভারী করে তুলছিল পাহাড়ি হাওয়া। সব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল জিয়ানার। বাজার, তার লোকজন, সব আবছা হয়ে আসছিল। ঠিক মনে করতে পারছিল না কেন এসেছে ও বাজারে!
অনেকক্ষণ কিগানের সঙ্গে ঘুরেছিল ও। পাহাড়, তার নির্জন রাস্তা। বড় পাথরের ওপর বসে কিগানের হাতটা ধরে রেখেছিল শক্ত করে। মনে হচ্ছিল ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে। তারপর একসময় কিগান বলেছিল, ‘এভাবে থাকার কোনও মানে হয়? চল, আমার সঙ্গে পালিয়ে যাবি।’
‘পালিয়ে!’ ভয়ে গোলাপি হয়ে গিয়েছিল জিয়ানা।
‘ওরা তোকে আমার থেকে সরাবার চেষ্টা করছে।’ কিগান গাঢ়ভাবে চোখ রেখেছিল জিয়ানার চোখে।
কষ্ট হচ্ছিল। জিয়ানার কষ্ট হচ্ছিল খুব। পালিয়ে যাবে? তা হলে মা কী ভাববে? কী বলবে? বাবা? আত্মীয়স্বজনরা? দিদির অমন ঘটনার পর যদি ও এমন করে, তা হলে!
কিগান শান্ত গলায় বলেছিল, ‘এখন বলিস না। একটা দিন ভেবে নে। কাল দুপুর নাগাদ আমি তোদের বাড়ি ছাড়িয়ে আরও ওপর দিকে গেলে পাহাড়ের ধারে যে একটা লাল বেঞ্চ আছে, সেখানে থাকব। দেখবি ওটা পাহাড়ের একটা এন্ড। সবুজ রেলিং দিয়ে ঘেরা আছে জায়গাটা। আমি আসব ওখানে দুপুর দুটো নাগাদ।’
কোথা থেকে একটা সাইকেল জোগাড় করেছিল কিগান কে জানে! সেটা চড়ে ও চলে গিয়েছিল তারপর। জিয়ানাও ফেরার পথ ধরেছিল বাড়ির।
তবে বাড়িতে ফিরে অশান্তি হয়েছিল খুব। মামা-মামি সবাই খুব বকেছিল জিয়ানাকে। এতক্ষণ কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করেছিল। তারপর ফোন করেছিল কলকাতায়।
মনে আছে, খুব কেঁদেছিল জিয়ানা। সারা দুপুর কেঁদেছিল নিজের ঘরে শুয়ে। তারপর বিকেল থেকে হঠাৎ শরীর ম্যাজম্যাজ করতে লাগল। গা, হাত-পা ব্যথা হল। আর সন্ধে থেকে এল ধুম জ্বর। গরম তুলোর ভেতর কে যেন ডুবিয়ে দিল জিয়ানাকে। চোখের সামনে সমস্ত কিছু আবছা হয়ে যেতে শুরু করল। তারপর একসময় নিভে গেল সব।
জ্বলল আবার। ক’টা বাজে তখন? জিয়ানার দু’চোখ দিয়ে গরম জল গড়াচ্ছে। ও দেখতে পাচ্ছিল না ঠিকমতো। শুধু আবছামতো মামার মুখ দেখল। মামি কি জলের গ্লাস হাতে এগিয়ে এল? আর ঘড়ি? দেওয়াল ঘড়িটা কোথায়? কে যেন জলে ডুবিয়ে দিতে লাগল জিয়ানাকে। ভাসাতেও লাগল। আর জিয়ানা দেখল দূরের রাস্তা আর আশপাশের গাছগুলোর গায়ে কে যেন জড়িয়ে দিয়ে গেছে কুয়াশা। একটা সাইকেল চেপে কে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার ঝাঁঝরির ভেতর। তার গলার গোলাপি স্কার্ফ লোমওলা গোল্লা কুকুরের জিভের মতো বেরিয়ে আছে কুয়াশার ভেতর থেকে।
সাতদিন পর সুস্থ হয়েছিল জিয়ানা। ততদিনে বাবা-মাও এসে গিয়েছিল। আর মামার কাছে মা রাখতে চায়নি ওকে। জিয়ানার প্রাণ প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল উৎকণ্ঠায়। কিগানের কী হল? ও কি এসেছিল? ও কি জানে যে, জ্বর হয়েছিল জিয়ানার? ও কি একবার দেখার চেষ্টা করেছিল জিয়ানাকে?
বাড়িতে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি জিয়ানা। শুধু একবার সুযোগমতো কাজের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিল, একটা ছেলে এসেছিল একদিন। মামা নাকি তাকে গেট থেকেই ভাগিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটি লম্বা। পিঠে ব্যাগ ছিল।
‘কিন্তু কী নাম ছেলেটার? মানে ছেলেটা নাম বলেনি?’ জিয়ানা অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
কাজের মেয়েটি অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলেছিল, ‘নামটা মনে নেই। তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস আমার মনে আছে।’
‘কী?’ জিয়ানা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল।
‘ছেলেটার চোখের রংটা একদম নীল। আমি অমন চোখ কোনওদিন দেখিনি।’
জিয়ানা সেদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে গিয়েছিল ওদের বাড়ি থেকে সামান্য ওপরে, সেই পাহাড়ের সবুজ রেলিং ঘেরা প্রান্তে, লাল বেঞ্চটার কাছে। দেখেছিল বেঞ্চের গায়ে ছুরি দিয়ে কেটে খোদাই করা আছে-‘আমি তোর জন্য এসেছিলাম…’
মা-বাবা যে জানত কিগান এসেছে সেটা জিয়ানা বুঝতে পেরেছিল কলকাতায় এসে। বুকুর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধটাও এসেছিল তখন। মা-বাবা আর দেরি করেনি। জিয়ানাকে একদম সাজিয়ে গুছিয়ে বসিয়ে দিয়েছিল পাত্রপক্ষের সামনে। বুকুরা তো একরকম রাজি হয়েই ছিল, এবার এক দেখাতেই সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
সারারাত কেঁদেছিল জিয়ানা। কিন্তু মা এমন শুরু করেছিল বাড়িতে যে প্রতিবাদ করতে পারেনি। এর দু’দিন পরে মায়ের তাড়নাতেই কিগানকে ফোন করে গড়িয়াহাটের মেঘমল্লারের কাছে ডেকেছিল জিয়ানা। কিগান ফোনে অনেক কথা বলেছিল, কিন্তু জিয়ানা উত্তর দেয়নি, শুনতে চায়নি কিছু।
মেঘমল্লারের ওখানে মা-ও গিয়েছিল জিয়ানার সঙ্গে। শুধু ফুটপাথ বদল করে ওই দিকে যায়নি। কিগান অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জিয়ানা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে।
কিগান এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘জি, তুই…মানে… এভাবে…’
জিয়ানা কথা বাড়ায়নি। শরীর কাঁপছিল ওর। মনে হচ্ছিল যে-কোনও সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। আর পারবে না। আর পারবেই না দাঁড়িয়ে থাকতে। ও বলেছিল, ‘কিগান, আমায় ভুলে যা তুই। আমার অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’
‘জি, কী বলছিস?’ কিগান আর্তনাদ করে উঠেছিল।
‘আমায় আর ফোন করবি না কক্ষনও। বুঝেছিস?’ জিয়ানা আর দাঁড়ায়নি। বেগুনি চুড়িদার আর শিফনের দোপাট্টার ঝাপটা মেরে চলে এসেছিল। আর চলে আসতে আসতে, না, একবারও পিছনে ফিরে তাকায়নি। দেখেনি কী করছে দাঁড়িয়ে কিগান। ও শুধু চলে এসেছিল। রাস্তা, ফুটপাথ আর সমস্ত স্মৃতি টপকে ও চলে এসেছিল। শুধু ভেবেছিল, কিগানকে তো বলা হল না ওর লেখা চিঠিগুলো যেন নষ্ট করে দেয়!
কিন্তু কিছু কি নষ্ট করা যায়? মন কি হোয়াইট বোর্ড না স্লেট? একবার লিখে তারপর কি তা আবার মুছে ফেলা যায়? কিগান পেরেছে? ওকে দেখলে তো বোঝা যায় যে, মনের ভেতর অনেক কষ্টের পুঁটলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! আর জিয়ানা? ও নিজেই কি আর পেরেছে মুছে ফেলতে?
দীর্ঘশ্বাসের সংখ্যা কি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে? ক্লান্ত লাগছে মনে হওয়াটাও কি বাড়তে থাকে? জানে না জিয়ানা। আর জানতে ইচ্ছে করে না। যখন বয়স কম ছিল মনে হত পালকের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে যেন। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন পালকগুলো এক-এক করে লোহার করে দিল। এখন এ ঘর থেকে ও ঘর যেতেই সময় লেগে যায়। কষ্ট হয়। মনে হয় লোহার পালক ঝনঝন করে শেকলের মতো বাজছে।
তুতুলের ঘর থেকে এসে একবার শাশুড়ির ঘরে উঁকি মারল জিয়ানা। ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখান থেকেই স্টাডিটা দেখা যায়। সেখানেও লাইট জ্বলছে। অর্থাৎ বুকু কাজ করছে। জিয়ানার কিছু ভাল লাগছে না আজ। কেমন যেন ঝিঁঝি করছে হাত-পা। টেনশন হচ্ছে বলে কি?
কালকে টেন্ডারের প্রাইস ওপেনিং হবে। আসলে এখানে মার্চেন্ট নিজেদের নিয়মে গেছে। প্রথমে সবাই প্রাইস দিয়েছিল। সেটা সিল্ড খামে করে জমা করতে হয়েছে। তারপর ওদের কাছ থেকে পারসেন্টেজে রিবেট চাওয়া হয়েছে। সেটাও সিল্ড খামে জমা করতে হয়েছে। এখন কোটেড প্রাইস আর সিল্ড খামের সেই প্রাইসের ওপর দেওয়া রিবেট থেকে হিসেব করে দেখা হবে যে, কার প্রাইস কম।
আগে পাঁচটা পার্টি ছিল। কিন্তু কনসালট্যান্ট তার থেকে দু’জনকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এখন পার্টির সংখ্যা তিন। আর তার মধ্যে একজন আবার রিবেট জমা দেয়নি। অর্থাৎ শেষমেশ কমপিটিশন দু’জনের মধ্যে। ওয়াটার বার্ডস আর প্রোজেকশন কর্প।
আজ সেই নিয়ে মদন খুরানার সঙ্গে একটা মিটিং হয়েছে। তবে মিটিং নামেই, আসলে খুরানা ডিপ্রেসড ছিলেন খুব। উনি নাকি ভেতরের সোর্স থেকে খবর পেয়েছেন যে, ওয়াটার বার্ডের কোট জিয়ানাদের চেয়ে কম। খুরানা এই কাজটার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে ছিলেন। এমনিতেই বিজনেস একটু ডাউন চলছে তার ওপর গোটা প্রোজেক্টটা কয়েক কোটি টাকার। এটা ফসকালে বড় চোট খাবে প্রোজেকশন। আর তা ছাড়া এটা একটা প্রেস্টিজ ফাইট। সেই যে প্রোজেকশন কর্পের থেকে ছ’জনকে ওরা নিয়ে গেল, তারপর থেকে ওয়াটার বার্ডসকে ঠিক মোক্ষম জবাব দেওয়া হয়নি। এই ছিল সেই সুযোগ। কিন্তু খুরানা বলছেন যে, তা বোধহয় আর হল না।
জিয়ানা বলেছিল, ‘স্যার কিছু ভাববেন না। দেখুন না কাল কী হয়।’
এই প্রথম খুরানা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন জিয়ানার ওপর। বলেছিলেন, ‘তুম বাত হি না করো তো আচ্ছা হ্যায়। বললাম ওই ব্যানার্জিকে ম্যানেজ করো। পারলে না। তোমার পারফরমেন্স এমনিতেই উইক। তার ওপর এই প্রোজেক্টটায় বোর্ড অব ডাইরেকটার্সদের তোমার ওপর নজর ছিল। বাট ইউ ব্লিউ দ্যাট অফ। জানি না তোমার ভবিষ্যৎ কী।’
জিয়ানা জানে ওর ওপরই চাপ আসবে। ললিত এই প্রোজেক্টে থাকলেও শেষের দিকে ওকে অন্য প্রোজেক্টে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে যা চাপ তা আসবে জিয়ানার ওপর। সমস্ত না-পারাগুলোর দায় নিতে হবে জিয়ানাকেই। এটাই সমস্যার। যদিও জিয়ানা চেষ্টা করেছিল। ইচ্ছে ছিল না, তবু কিগানকে বলেছিল ও। একদিন কলকাতায় এসেছিল কিগান। তখন ধরেছিল ওকে। মানে প্রায় জোর করেই ওর সঙ্গে দেখা করেছিল।
দুটো ওষুধ খাওয়ার আছে জিয়ানার। কয়েকদিন ধরে হজমের সমস্যা হচ্ছে ওর। আসলে জন্ডিস হওয়ার পর থেকেই টুকটাক হজমের সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সেটা বেড়ে গেছে। ফলে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে।
ওষুধটা নিয়ে একবার স্টাডিতে গেল জিয়ানা। বুকু এক মনে কথা বলে যাচ্ছে। ও বুঝল বিদেশের অফিসের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সে কথা বলছে। আসলে বড় চাকরি করার এই এক সমস্যা। বুকু এখন একটা কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আছে। আর যে-কোনও উন্নতির সঙ্গে যেটা কমে যায় সেটা হল সময়। একটা সময় আসে যখন মানুষ এমন পজিশনে চলে যায় যেখানে তার আর নির্দিষ্ট কাজের সময় থাকে না। সারাটা দিন তাদের কাজ করতে হয়। বুকু এখন যেমন। এই রাত এগারোটাতেও অফিসের কাজ করে যাচ্ছে।
ওকে দেখে বুকু না তাকিয়েও হাত তুলে দাঁড়াতে বলল। জিয়ানা ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’ বুকু হাতটা তুলে ইশারাতেই বলল, দু’মিনিট দাঁড়াতে। তারপর আবার কথা বলতে লাগল।
পাঁচ মিনিট পর মাথার থেকে হেডফোন খুলে নিয়ে বুকু চেয়ারটায় পাক মেরে ঘুরে বসল। বলল, ‘সামনের মাসে একবার বাইরে যেতে হতে পারে।’
‘তাই? কোথায়?’
‘সুইডেন যাব প্রথমে। তারপর ইটালি আর বেলজিয়াম। দুটো নতুন কোম্পানির সঙ্গে টাই-আপ আছে।’
‘ও,’ জিয়ানা চুপ করল একটু। তারপর বলল, ‘তোমার কাজ শেষ?’
‘না। আরও একটু সময় লাগবে। তুমি শুয়ে পড়তে পারো।’
‘না, ঠিক আছে।’ জিয়ানা চোয়াল শক্ত করল। বুকু যদি জানত যে, আজ আর ওর ঘুম আসবে না, তা হলে এ কথা বলত না।
বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা চালিয়ে দিল জিয়ানা। কীসব নাচ-গান হচ্ছে। দেখে মাথাটা যেন আরও গরম হয়ে গেল। কাল দুপুর দুটোয় ফাইনাল প্রাইস ওপেনিং। কাল সবার সামনে রিবেটের পারসেন্টেজটা খোলা হবে। ব্যাপারটা ক্লিয়ার করতে, পরিচ্ছন্নতা রাখতে সবার সামনে এটা করা হবে। খুরানার যাওয়ার কথা ছিল জিয়ানার সঙ্গে। কিন্তু বুড়ো কাল যাবে না। বলেছেন, ‘আপনা মুহ কালা করওয়ানা হ্যায় ক্যায়া?’
অর্থাৎ জিয়ানাকেই নিজের মুখ কালো করতে হবে। ফাক। একা একা চিৎকার করে উঠল জিয়ানা। কিগান যে এমন করবে ভাবতে পারেনি। ও তো ভেবেছিল কিগানকে একবার বললেই হবে। কিন্তু ও যে কী ভুল করেছিল! এর চেয়ে ওদের স্যামুয়েল কুটিনহোকে হাত করলে কাজ দিত। অন্তত চেষ্টা তো করা যেত। কেন যে ও নিজের হাত পোড়াতে কিগানের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিল?
কিগানকে নিজের গাড়িতেই তুলেছিল জিয়ানা ধর্মতলা থেকে। যদিও কিগান গাঁইগুঁই করছিল, তবু জোর করেছিল জিয়ানা। বলেছিল, ‘আমার কথা শুনবি না?’
রেস্তরাঁটা ছোট হলেও আরামদায়ক। আর এতদিন পরে ঢুকেও জিয়ানা সেই ভিনিগার আর সয়া সসের পেটেন্ট গন্ধটা পেয়েছিল। সেই কলেজ জীবন থেকে এখনও পর্যন্ত এই গন্ধটা পালটায়নি একটুও।
কিগান চেয়ারে বসে মাথা ঘুরিয়ে চারদিকটা দেখে বেশ অবাক গলায় বলেছিল, ‘কী রে তুই আমায় এখানে আনলি?’
‘কেন? এটা খারাপ?’ জিয়ানা হেসেছিল।
‘খারাপ বলছি না। বলছি, আমায় অনেক দূর ফিরতে হবে। তা এই মল্লিকবাজারের এই রেস্টুরেন্টটায় আনলি কেন?’
‘কেন, তোর ভাল লাগল না?’ জিয়ানা একটা পেপার টাওয়েল নিয়ে ভাঁজ করতে করতে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘সেটা প্রশ্ন নয় জিয়ানা। তুই জানিস এসব ঠিক নয়।’
‘কেন? আমরা তো গল্প করছি। তুই জানিস তোর সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে আমার। তোর সঙ্গে সেই পুরনো দিনের মতো কথা বলতে ইচ্ছে করে।’
‘তাই?’ কিগান হেসে মেনুকার্ড তুলেছিল হাতে।
জিয়ানা ছোঁ মেরে মেনুকার্ডটা ছিনিয়ে নিয়ে বলেছিল, ‘তুই ব্যঙ্গ করছিস? আর মেনু দেখছিস কেন? আমরা কী খেতাম ভুলে গেছিস?’
‘কিছুই ভুলে যাইনি জিয়ানা। তবে মানুষ যেমন কিছু জিনিস আর ব্যবহার করে না, তেমন আমিও কিছু স্মৃতি লফ্টে তুলে রেখেছি। আর নামাই না।’
‘আমি নামাই,’ জিয়ানা কথাটা বলে থমকেছিল এক মুহূর্ত। তারপর বেয়ারাকে ডেকে অর্ডার দিয়ে আবার কিগানের দিকে তাকিয়েছিল, ‘এখনও তোর চিকেন উইথ রোস্টেড কাজু পছন্দ তো?’
‘না। আর খাই না ওটা।’
‘তো, না করলি না কেন?’ জিয়ানা উত্কণ্ঠা দেখিয়েছিল, ‘যখন অর্ডার দিলাম, তখন বললি না তো! আমি আসলে পুরনো দিনের মতো ভেবে…’
কিগান হেসেছিল, ‘পুরনো দিনের গায়ে ধুলো জমে আছে। বেশি নাড়াচাড়া করিস না। আমার পুরনো ধুলোয় অ্যালার্জি হয়।’
‘তবু,’ জিয়ানা থমকেছিল কয়েক মুহূর্ত, ‘তোর জানতে ইচ্ছে করে না, কেন তোকে আমি “না” বলেছিলাম?’
‘কারণটা আমি জানি।’ কিগান হেলিয়ে বসেছিল চেয়ারে। তারপর একটা ফর্ক নিয়ে খেলা করতে করতে বলেছিল, ‘তুই আমায় ভালবাসলেও তেমন ভাল বাসিসনি।’
‘মানে?’ জিয়ানা অবাক হয়েছিল, ‘তেমন ভালবাসিনি মানে?’
‘মানে, প্রেম। প্রেমের কথাই বলছিলাম। আমার প্রতি তেমন, কী যেন বলে, ইয়েস মনে পড়েছে, প্রেমাসক্ত, প্রেমাসক্ত হোসনি তুই।’ কিগান হেসেছিল খুব।
‘তোর রাগ হয় না আমার ওপর।’
‘ওটা আগেও জিজ্ঞেস করেছিলি একবার,’ কিগান হাসিটা বাঁচিয়ে রেখে বলেছিল, ‘কেন রাগ করব জিয়ানা? জীবনটা তোর। তুই যা ভাল বুঝেছিস তাই করেছিস। একটাই তো চান্স বল বাঁচার। যে যার মতো বেঁচে তো নেবেই।’
‘তোর সত্যিই কোনও রাগ হয়নি?’ জিয়ানা ঝুঁকে পড়ে গভীরভাবে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
‘না। তবে কষ্ট হয়েছিল খুব, জানিস। আমার তখন পাগলের মতো লাগত। সারা কলকাতায় একা একা ঘুরে বেড়াতাম। কখনও শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে একা একা চলে যেতাম দূরের স্টেশনে। কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মছলন্দপুর, বসিরহাট। কত জায়গায় গিয়েছি। আমার তখন কেমন যেন অস্থির লাগত। মনে হত শরীরের ভেতর লক্ষ লক্ষ চড়াই পাখি ঢুকে গেছে। বুঝতাম না কী করলে শান্তি পাব। কী করলে রাতে আমার ঘুম হবে একটু। তখন এমনও দিন গেছে আমি ফুটপাথে গোটা দিন একা একা বসে থেকেছি। গোটা দিন কাটিয়েছি বাইপাসের ধারে এসে বসা জিপসিদের সঙ্গে। একটা গোটা দিন কথা না বলে থেকেছি। রাসবিহারী মোড় থেকে হেঁটে হেঁটে সুকিয়া স্ট্রিট গিয়ে দেখেছি কত পা হাঁটতে হল। আরও কত কী! কত কী করেছি! তারপর একদিন খবর পেলাম তোর বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর কেমন যেন সব থম মেরে গিয়েছিল। দশদিন প্রায় খেতেই পারিনি কিছু। কথা বলতে পারিনি। সারাদিন ঘর বন্ধ করে বসে থাকতাম। এমন একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে একা কাঁদছি, তখন হঠাৎ পিছন থেকে এসে ঠাকুরমা হাত রেখেছিল কাঁধে। আমি কোনওমতে কান্না চেপে চোখের জল মুছে ঠাকুরমার দিকে তাকিয়েছিলাম। ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ঠাকুরমা আমার এই খারাপ সময়টা আর কতদিন যাবে বলো তো? ঠাকুরমা হেসে বলেছিল, আর দু’মাস। দু’মাস? তারপর? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। ঠাকুরমা হেসে বলেছিল যে, তারপর নাকি এটাই অভ্যেস হয়ে যাবে।’
জিয়ানা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই আমায় ক্ষমা করতে পারবি না?’
‘ক্ষমা!’ দিয়ে যাওয়া খাবার মুখে তুলে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কিগান, ‘কেন ক্ষমার কথা উঠছে? আর কীসের জন্য ক্ষমা?’
‘এই যে তোর এত কষ্ট হল। এই যে তোকে আমি এমন করে সরিয়ে দিয়েছিলাম জীবন থেকে। এই সব কিছুর জন্য ক্ষমা।’
‘ধ্যাত! ওসব বাদ দে। বাদ দিয়ে দে। আর আঁকড়ে ধরে বসিস না, কেমন?’
‘তা হলে যখন রাগ নেই বলছিস, আর একটা উপকার করবি?’ জিয়ানা সাবধানে কথাটা বলে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
উপকার করা কিগানের ফার্স্ট নেচার। কলেজে কারও কিছু সাহায্যের দরকার হলে সবসময় তাদের যার কথা প্রথম মাথায় আসত তার নাম কিগান। জিয়ানা মাঝে মাঝে এই নিয়ে রাগ করত। বলত, ‘না’ বলতে শিখিসনি কেন? ‘না’ বলতে জানাটাও জীবনের একটা শিক্ষা। তুই কি ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো নাকি?
এটা ঠিক, জিয়ানা কক্ষনও কিগানকে কিছু করে দিতে বলত না। তবে দরকারও পড়ত না। কিগান জিয়ানা কিছু বলার আগেই কাজ করে দিত। তবু জিয়ানা নিজের থেকে কক্ষনও কিছু চাইত না।
কিগান বলেছিল, ‘তুই উপকার চাইছিস? উপকার?’
‘একটা হেল্প দরকার। কিন্তু বলতে সংকোচ হচ্ছে আমার।’ জিয়ানা কুণ্ঠিত গলায় বলেছিল।
‘সংকোচ?’ কিগান হেসেছিল, ‘বল না।’
জিয়ানা চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করেছিল। যেন কোনও গভীর জলে ডুব দিতে যাবে এবার। তারপর সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলেছিল, ‘তোদের কন্ট্রাক্টটা আমাদের কোম্পানিকে পাইয়ে দে তুই।’
‘মানে!’ কিগান খাওয়া থামিয়ে তাকিয়েছিল অবাক হয়ে।
‘মানে,’ জিয়ানা কেটে কেটে বলেছিল, ‘তুই এমন একটা ব্যবস্থা কর যাতে করে আমরা কাজটা পাই। না, তোকে ঘুষ অফার করছি না আমি। এর বদলে তোকে কিচ্ছু দেব না। কিন্তু আমাদের কাজটা তোকে পাইয়ে দিতেই হবে। কীভাবে আমি জানি না। কিন্তু দিতে হবে।’
‘এসব কী বলছিস তুই জিয়ানা?’
‘কেন? আমরা কমপিটেন্ট নই? আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচারও খুব ভাল। আর ওয়াটার বার্ডস নামকরা কোম্পানি হলেও প্রচুর কাজকম্ম ওদের ঝুলে আছে। তোদের প্রোজেক্ট এমনিতেই ডিলেড, যদি আরও ডিলে হয়ে যায়! তোদের জার্মানির একটা কোম্পানির সঙ্গে যে জয়েন্ট ভেঞ্চার প্ল্যান হচ্ছে, সেটা কতটা ধাক্কা খাবে বল!’
‘তুই আমায় এসব কী বলছিস জিয়ানা?’ কিগান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এমন করে বলেছিল।
‘আমায় তোকে হেল্প করতেই হবে। তোর কাছ থেকে কোনওদিন কিছু চেয়েছি আমি? আমি জানি গৌর দিওয়ান তোকে খুব কাছের লোক ভাবে। টেন্ডার কমিটিতে তুই আছিস। প্রাইস তুই জানবি।’
‘আমি এটা করতে পারব না জিয়ানা।’ কিগান মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
‘আমার চাকরি চলে যেতে পারে। তুই আমার পজিশনটা বোঝ।’ জিয়ানা হাত বাড়িয়ে কিগানের হাতটা ধরেছিল, ‘তোর কাছ থেকে কোনওদিন কিছু চেয়েছি আমি?’
‘আমি এটা পারব না জিয়ানা।’ কিগান সরিয়ে নিয়েছিল হাতটা।
‘কেন? কেন পারবি না?’
‘আমি পারব না। আমার পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়।’
‘ও,’ জিয়ান চোয়াল শক্ত করল, ‘তুই এভাবে রিভেঞ্জ নিচ্ছিস?’
‘রিভেঞ্জ!’ কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘তাই তো। রিভেঞ্জই তো।’ জিয়ানা উত্তেজিত হয়েছিল, ‘তুই চাস যাতে আমি বিপাকে পড়ি।’
‘কেন চাইব এমন আমি?’ কিগান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
‘কারণ তুই জানিস।’
‘কী কারণ? বল!’ কিগান গম্ভীর গলায় বলেছিল।
‘তোকে আমি যে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম তার রিভেঞ্জ নিচ্ছিস?’
কিগান অবাক হয়ে গিয়েছিল, ‘তুই এসব কী বলছিস?’
‘ঠিক বলছি। তুই যতই নিজেকে মহাপুরুষ দেখাস না কেন আসলে তুই আমায় জব্দ করতে চাস। তুই চাস না যে আমি উন্নতি করি।’
‘তুই জানিস এটা ঠিক নয়।’ কিগান শান্ত হয়ে গিয়েছিল আবার।
‘তুই বল তো, কোনও বাবা-মা তোর আর বুকুর মধ্যে বাছতে বললে তোকে বাছত? তুই জানিস বুকুর কোয়ালিফিকেশন? কত বড় চাকরি করে? কত রোজগার করে? কেন তোকে পছন্দ করত আমার বাবা-মা? বুকু কি তোর চেয়ে যোগ্য নয়?’ জিয়ানার মাথা দিয়ে আগুন বেরোচ্ছিল।
কিগান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা রেখেছিল জলের গ্লাস দিয়ে চাপা দিয়ে। তারপর বলেছিল, ‘পুরনো কথা যখন তুললি, তখন বলি আমি জানি আমি অতটা যোগ্য নই। কিন্তু আই গেস উই ওয়্যার ইন লাভ। আর পছন্দ? বাবা-মা বাদ দে, তুই-ই তো তোর পছন্দটা জানিয়ে দিয়েছিস? ইউ হ্যাড মেড ইওর চয়েস লং ব্যাক।’
কিগান আর দাঁড়ায়নি। চলে গিয়েছিল।
তারপর থেকে জিয়ানা আর যোগাযোগ করতে পারেনি কিগানের সঙ্গে। বেশ কয়েকবার ফোন করেছে জিয়ানা, কিগান ফোন তোলেনি। মেসেজ করেছে তবু রিপ্লাই দেয়নি। হঠাৎ করে কিগান যেন কেমন ‘নেই’ হয়ে গেছে।
জিয়ানার কষ্ট হচ্ছে খুব। রাগের মাথায় ও হয়তো বেশি বলে ফেলেছে। তা বলে কিগান এমন যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে! জিয়ানা জানে ওর অনুরোধটা হয়তো অন্যায় হয়েছে। কিন্তু আর কী করতে পারত! আর কী বলতে পারত! আর যে কিচ্ছু করার ছিল না। আচ্ছা, ও কি বড্ড বেশি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে? বড্ড বেশি ‘আমি আমি’ করে ফেলছে? ও কি সত্যিই এমন?
জিয়ানা উঠল। টিভিটা ভাল লাগছে না। সারা শরীরে অস্বস্তি, টেনশন। কাল ফার্স্ট হাফে অফিস যাবে না। এই এগারোটা নাগাদ অফিসের গাড়ি আসবে। তখন সোজা চাপাডাঙা চলে যাবে। দুটোর ভেতর পৌঁছে যাবে নিশ্চয়ই। জিয়ানার সঙ্গে ললিতও যাবে কাল।
‘তুমি এখনও জেগে আছ?’ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল বুকু।
‘তোমার কাজ শেষ?’ জিয়ানা অবাক হল।
‘হ্যাঁ।’ বুকু হাসল, ‘আজ এত ডিস্টার্বড কেন তুমি? কী হয়েছে?’
জিয়ানা বুকুর দিকে তাকাল। বুকুর মেজাজ আজকাল একদম অন্যরকম থাকে। ওর মনে হল, বুকুর সঙ্গে কথাগুলো শেয়ার করলে কি খানিকটা মনের ভার কমবে?
জিয়ানা শোওয়ার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘এসো, আমি সত্যিই খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছি আজ।’
‘কী হয়েছে?’ বুকু পিছন পিছন এল জিয়ানার।
ঘরে বিছানা করা আছে। জিয়ানা একটা বালিশ তুলে কোলে নিয়ে বসল। মাথাটা দপ্দপ্ করছে রাগে। তবে বুঝতে পারছে না কেন রাগ হচ্ছে এত। কিগান কাজটা করবে না বলেছে বলে, না ও কিগানের সঙ্গে অমন ব্যবহার করেছে বলে? মানুষ মাঝে মাঝে এমন অবস্থায় পড়ে যখন সে নিজেই বোঝে না তার কী করা উচিত।
বুকু বসল বিছানায়, তারপর চশমাটা খুলে হাত বাড়িয়ে রাখল বেড সাইড টেবিলে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে বলবে?’
‘কিগান।’ দাঁত চেপে বলল জিয়ানা।
‘কী করেছে? আবার প্রোপোজ করেছে?’ বুকু হাসল।
‘ধ্যাত,’ জিয়ানা বিরক্ত হল, ‘সবসময় ইয়ারকি মারো কেন আজকাল?’
‘আরে রাগ করছ কেন? তবে কি কিগান বিয়ে করছে? তাই তোমার প্রবলেম হচ্ছে?’
‘আশ্চর্য! আমি মরছি আমার জ্বালায় আর তুমি এমন করছ কেন?’ জিয়ানা জোরের সঙ্গে বলল।
‘আরে, আই ওয়াজ জোকিং। বলো, কী হয়েছে বলো।’
‘আমি কিগানের কাছে একটা ফেভার চেয়েছিলাম কাজের ক্ষেত্রে। ও সরাসরি না করে দিয়েছে!’
‘মানে? কী ফেভার?’ বুকু অবাক হল।
‘আমাদের কোম্পানি ওদের ওখানে টেন্ডার দিয়েছে। আমি বলেছিলাম বন্ধু হিসেবে আমার অপনেন্ট পার্টির কোটটা যেন বলে দেয় ও। যেন কাজটা আমাদের পেতে সাহায্য করে।’
‘মানে!’ বুকু ভুরু কোঁচকাল, ‘তুমি এমন একটা কথা বললে কী করে? আরে, ও তো চাকরি করে। একটা ইন্টিগ্রিটি তো আছে, নাকি?’
‘আরে ওয়াটার বার্ডস, মানে আমাদের রাইভাইলের চেয়ে আমরা সব বিষয়ে কমপিটেন্ট। তাই বলেছিলাম। কোনওদিন ওর কাছে কোনও ফেভার চাইনি। আর ও এমন করল? আমাদের ওয়ার্কম্যানশিপও ওয়াটার বার্ডসের চেয়ে ভাল। তাই বলেছিলাম। হি হ্যাজ দ্য অ্যাকসেস টু দ্য প্রাইস ফোল্ডারস। ওর ইচ্ছে হলেই ও বলতে পারত আমায়। কিন্তু বলল? বলল না!’
‘দেখো, কিগান যে ভাল এতেই প্রমাণ হয়। আর এটা তো এথিকালও নয়।’
‘এথিক্স?’ জিয়ানা উত্তেজিত হল, ‘এথিক্স মানে? জানো, ওয়াটার বার্ডস অন্য চারটে প্রজেক্ট কীভাবে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছিল? সেখানে কোথায় ছিল এথিক্স? তুমি এত বড় চাকরি করো, জানো না জীবনে এথিক্স বলে কিছু হয় না! আসলে এগুলো হল মানুষের ল্যাবেঞ্চুস। কিছু ভিতু মানুষ এসবের আড়ালে নিজের ভয় আর অপদার্থতাকে লুকোনোর চেষ্টা করে। বিজনেস একটা ওয়ার-ফেয়ার। সেখানে সব কিছু চলে। আর কিগানকে আমি অপমান করিনি। কোনও ঘুষ অফার করিনি। বলেছি, বন্ধু হিসেবে একটা ফেভার করতে, পরিবর্তে ওকে কিচ্ছু দেব তো বলিনি। অ্যান্ড হি জাস্ট ওয়াকড আউট।’
‘আচ্ছা, তুমি হলে কী করতে?’ বুকু একটা বালিশ কোলের ওপর টেনে নিয়ে বসল।
‘মানে? আমি হলে নিশ্চয়ই হেল্প করতাম।’
‘না, তুমি যদি কিগান হতে, তবে কী করতে?’
‘আমি? মানে?’ জিয়ানা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
‘তোমায় ভালবাসত সে। তাকে তুমি পাত্তা না দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেছ। তারপর তার দিকে ঘুরেও তাকাওনি। আর সে কলকাতা থেকে দূরে একটা আধা গ্রাম আধা শহর অঞ্চলে পড়ে আছে। বিয়ে করেনি। একা থাকে। প্রায় কেউ নেইও বোধহয়। তারপর হঠাৎ এতদিন পরে তুমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। তোমার এত ভাল পজিশন লাইফে, মোটামুটি সাধারণ মানুষ যা চায় তার সব তোমার আছে। আর সেই তুমি হঠাৎ এমন করে বলছ? এমন করে ফেভার চাইছ? সে কী করবে আনা? সেও তো মানুষ! তুমি হয়তো জানো না কিন্তু আমি জানি। অপমানিত হতে, রিজেক্টেড হতে কেমন লাগে আমি জানি। “কী হয়েছে” মুখে বলা যায়, কিন্তু যাকে সহ্য করতে হয় সে জানে। তাই বলছি, কিগানকে দোষ দিয়ো না। ওর কোনও দোষ নেই।’
জিয়ানা বলল, ‘সে তো অনেক আগের ব্যাপার।’
‘আগের ব্যাপার?’ হাসল বুকু, ‘আগের ব্যাপার বলে, অতীত বলে কিছু হয় না আনা। মানুষ যতদিন বাঁচছে তার জীবনের সমস্ত কিছুই বর্তমান। প্রতিটা কষ্ট, চোট আর অপমান সব বর্তমান।’
‘কিন্তু, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে বসে থেকে লাভ?’
‘আরে এ কি ব্যাবসা নাকি যে, লাভ আর ক্ষতি মেলাতে হবে? হয় না আনা, অত সহজে সব কিছু হয় না। আর আমি জানি তুমি যাই বলো, তোমারও ভাল লাগত কিগানকে। ঠিক না?’ জিয়ানার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসল বুকু।
‘আমার!’ জিয়ানা হতবাকের মতো তাকিয়ে রইল বুকুর দিকে।
‘কেন লুকোচ্ছ আনা? আমি কিচ্ছু মনে করব না। তুমি বলো আমায়, কেন তুমি ছেড়ে দিয়েছিলে কিগানকে? আনা, বলে ফেলো। আমি দেখেছি তোমায় রাতে একা কাঁদতে। বিয়ের পরও দেখেছি, এখনও দেখছি। আমি কোনওদিন কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু আজ বলে ফেলো। আর, লেট্স বি ফ্রেন্ডস।’
জিয়ানা কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল হঠাৎ। কোত্থেকে যে মনের ভেতর এত শুকনো পাতা এসে জড়ো হয়েছে! এত হাওয়াই বা দিচ্ছে কেন? জিয়ানার গলা শুকিয়ে গেল হঠাৎ আর চোখ ভিজে উঠল। তবে কি ঝড়ের পিছনেই মেঘ ছিল?
‘আনা?’ বুকু নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে বসল জিয়ানার পাশে। ওকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমায় বলো আনা। দ্বিধা কোরো না। আমি ভুল বুঝব না।’
জিয়ানা প্রাণপণ সামলানোর চেষ্টা করল নিজেকে। তারপর বলল, ‘মা, মায়ের জন্য। দিদি উনিশ বছর বয়সে একজনের সঙ্গে ভাব করেছিল। মা মেনে নেয়নি। একদিন ছেলেটাকে বাড়িতে ডেকে এনে মা যা নয় তাই বলে অপমান করেছিল। এমনকী মামাকে দিয়ে দু’-চারটে চড়থাপ্পড়ও দিয়েছিল। ছেলেটা মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। তারপর আর কোনওদিন দিদির সঙ্গে দেখা করেনি। দিদি মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছিল খুব। খায়নি। কথা বলেনি। মা দিদিকেও মেরেছিল। বন্ধ করে রেখেছিল ঘরে। এমন প্রায় দশ দিন চলেছিল। তারপর আস্তে আস্তে সব ঠান্ডা হয়ে যায়। দিদি আবার নর্মাল হতে থাকে। টিউশন, কলেজ শুরু করে। আবার হাসাহাসি, লুডো খেলা, গান শুরু করে। আমরা আবার আগের মতো হতে থাকি। তারপর কলকাতায় বর্ষা এল। সেদিন দিদি খুব ভিজে ফিরল কলেজ থেকে। বাড়িতে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা হল। আমরা সবাই লুডো খেললাম, গান গাইলাম। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরলাম। তারপর খিচুড়ি খেলাম। দিদি বলল রাত জেগে পড়বে, সামনে নাকি পরীক্ষা আছে। আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম। শুধু শোওয়ার আগে দিদি আমায় জড়িয়ে ধরল। খুব আদর করল। দু’হাত দিয়ে নিজের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে নিল। তারপর বলল, আমায় ভুলে যাবি না তো? আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম দিদির দিকে। কেন এমন বলছে? দিদি তো এমন করে না! তবে? আমি দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম কেন এমন বলল? পারিনি। ছোট ছিলাম, তাই এই নিয়ে আর বিশেষ কিছু ভাবিওনি। সোজা শুতে চলে গিয়েছিলাম।
‘পরদিন ঘুম ভাঙে চিৎকারে। উঠে জানলা দিয়ে দেখেছিলাম তখনও মেঘ করে আছে। আর বাড়িতে অনেক লোক। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখেছিলাম দিদি শুয়ে আছে মেঝেতে। চাদর দিয়ে ঢাকা। মুখে তুলো। আর ফ্যানের সঙ্গে একটা নাইলন দড়ির ফাঁস দুলছে। দিদি চিঠি লিখে গিয়েছিল। মাত্র এক লাইন-‘আটকাতে পারলে?’ জানো, এই একটা ঘটনার যে কী তীব্র প্রভাব পড়েছিল আমার জীবনে! মা যেন আরও কেমন হয়ে গেল তারপর থেকে। কেমন যেন বদমেজাজি, রুক্ষ। মাকে কাউনসেলিং করানো হয়েছিল। প্রায় বছর দুয়েক লেগেছিল মায়ের ঠিক হতে। কিন্তু তারপর মা আমার ওপর ওভার পজেসিভ হয়ে পড়ে। আর কিগানকে তো সেই জন্যই সহ্য করতে পারত না। জানো, আজও বাপি দিদির কথা মনে করে কাঁদে। যখনই কোনও রবি ঠাকুরের গান শোনে বাপির চোখ ছলছল করে ওঠে। আজও দিদি না থেকেও যে কী ভীষণভাবে আছে তুমি জানো না। দিদি নেই, তবু দিদির জন্যই আমার গোটা জীবনটাই অন্যরকম।’
বুকু মাথা নাড়ল, ‘না, আনা, অন্যরকম নয়। দিদির জন্য নয়। তোমার নিজের জন্যই। ভাল করে ভেবে দেখো, তুমি বুঝবে। আজ তোমায় বলি, আমারও একটি মেয়ের সঙ্গে ভাব ছিল। তোমায় বলেছি তার কথা। হ্যাঁ, মুনিয়া। কিন্তু তার বাড়ির লোকেরা আমায় অপমান করে সরিয়ে দেয়। সেই মেয়েটি এখন স্কুলে পড়ায়। বিয়ে ভেঙে গেছে তার। সে একরকম একাই থাকে। এই যে আমরা, ভালবাসা না-বাসার মধ্যে ঘুরি। কেউ পাই, কেউ পাই না। এতে আদতে কী হয়? মনের মধ্যে একরাশ অভিযোগ আর কষ্ট ছাড়া আর কী বয়ে নিয়ে বেড়াই আমরা? প্রেম এত সুন্দর জিনিস, কিন্তু আমরা সবসময় তার পোড়া ছাইটা বুকে আগলে ঘুরি কেন? এত কষ্ট নিয়ে ঘুরি কেন? দেখো, এত বছর পরেও তোমার চোখ ভিজে গেছে। তুমি আজও কষ্ট পাচ্ছ কিগানের জন্য। তা হলে তার কথা ভাবো আনা। সে কত কষ্ট আর মনখারাপ নিয়ে এতগুলো বছর কাটাল! আমি এই প্রায় মধ্য চল্লিশে এসে বুঝেছি একটা জিনিস, অভিমান করে লাভ হয় না কিছু। কষ্ট বাড়ে শুধু। তুমিও ভুলে যাও। আমি প্রেম ভুলতে বলছি না, কষ্টটা ভুলতে বলছি। তুমি জিজ্ঞেস করো না, আমি এখন এমন হাসিখুশি থাকি কী করে! আসলে আমি দেখেছি হাসির মধ্যে যে সহজ বোধ আছে তা আর কিছুর মধ্যে নেই। তুমি কষ্ট পেয়ো না আনা। জানি তোমার কষ্টটা কাজটা না পাওয়ার জন্য নয়, ওটা কিগানের তোমাকে “না” বলতে পারার জন্য। কিগান যে তোমায় “না” বলতে পারে তা তুমি ভাবতেই পারো না। আর সেখানেই তোমার যত রাগ, যত কষ্ট। তোমার এখনও কিগানের ওপর অধিকারবোধ প্রবল। ছাড়তে হয় আনা, মানুষকে ছাড়তে হয়। তাকে নিজের মতো বাড়তে দিতে হয়।’
‘বুকু, কিন্তু…।’ জিয়ানা অসহায়ের মতো তাকাল।
‘কোনও কিন্তু নয় জিয়ানা। এত বছর বিয়ে হয়েছে আমাদের, কিন্তু কোনওদিন আমরা এভাবে কথা বলিনি। না, আমি বলব না নতুন করে বাঁচতে, বরং বলব ভাল করে বাঁচতে। মনে রাগ রেখো না। আনন্দ রেখো। যা গেছে তাকে কি আর গায়ের জোরে তুমি আটকাতে পারবে? ফেরাতে পারবে? সে চেষ্টা করলে শুধু কষ্টই পাবে।’
‘আমি কী করব?’ জিয়ানা তাকাল বুকুর দিকে।
‘কিচ্ছু করতে যেয়ো না জোর করে। ব্যস।’ বুকু হাত ধরল জিয়ানার।
জিয়ানা বুঝল এই হাতের মধ্যে শাসন নেই, কর্তৃত্ব নেই, স্বামিত্ব নেই, কাম নেই, শুধু বন্ধুত্ব আছে। অগাধ আর অপার একটা বন্ধুত্ব ও খুঁজে পেয়েছে এই হাতের মধ্যে। এক জীবনে একটা ঠিকঠাক বন্ধুত্ব পাওয়া খুব কঠিন। এই বন্ধুত্বটুকু ও আর হারাতে চায় না।
জিয়ানা আলতো করে মাথা রাখল বুকুর কাঁধে। আর বুকুর অলক্ষ্যে পুঁচকি এক কুচি জল চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে গেল। জিয়ানা আঙুল দিয়ে তা মুছে তার নাম দিল, কিগান।
ডোরবেলটা বেজে উঠল হঠাৎ। জিয়ানা আর বুকু দু’জনেই চমকে উঠল। প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। এত রাতে কে এল?
বুকুর সঙ্গে জিয়ানাও উঠে গেল। এমন সময় তো সাধারণত কেউ আসে না! বেলটা বাজল আবার! জিয়ানা ভুরু কোঁচকাল। এত তাড়া! ও দেখল বুকু দ্রুত পায়ে গিয়ে মেন দরজাটা খুলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে ওরা দু’জনে একসঙ্গে চমকে উঠল! আরে এ এখন? এত রাতে? বুকু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘রুহান, তুই!’
Chapter - 33
৩৩
বড় রাস্তার এপার থেকে ফ্যাক্টরিটাকে দেখতে কেমন যেন কেল্লার মতো মনে হয়। উঁচু পাঁচিল। বড় শক্ত লোহার গেট। তার ভেতর থেকে টাওয়ারের মতো উঠে যাওয়া জলট্যাঙ্কি, আর কালো গম্ভীর চিমনি। এই পিচের রাস্তা যদি মুছে দেওয়া যেত, তবে পুরো দৃশ্যটাই অন্যরকম লাগত একদম। পিছনে জঙ্গল আর সামনে কেল্লা। এবং এই দুইয়ের মাঝে কে ও? আদিত্য? আদি? নাকি মনমরা এক মানুষ?
চায়ের দোকানের বেঞ্চটা নড়বড় করছে। তবে দু’দিকে পা দিয়ে সাইকেলে বসার মতো করে বসেছে ও। আর দু’পায়ের ফাঁকে রেখেছে চায়ের গ্লাস।
সন্ধে হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। একটা ঘোলাটে বাল্ব জ্বলছে চায়ের দোকানটার সামনে। ফ্যাক্টরিতে ক্যান্টিন আছে। খাবারের মানও ভাল। তাই হয়তো বাইরে খুব একটা দোকানপাট নেই।
আদি ক্যান্টিনেও চা খেতে পারত। কিন্তু ইচ্ছে হয়নি। সেই দুপুর থেকে একটানা বকবক করে যেতে হয়েছে ওকে। প্রোজেকশন কর্পের লোকজন এসেছে। লোকজন মানে তিনজন। মদন খুরানা, জিয়ানা বোস আর রুহান। রুহান আসলে জিয়ানার সঙ্গে সব জায়গাতেই যায়। ওরা এখনও কথা বলছে। কিন্তু তাতে আর আদির থাকার দরকার নেই। তাই গৌরের অনুমতি নিয়েই ও বাইরে এসে বসেছে।
মিটিং আর মিনিট দশেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তারপর সবাই চলেও যাবে। কিন্তু থাকতে হবে আদিকে। কারণ দুটো-একটা অফিশিয়াল আর একটা ব্যক্তিগত।
অফিশিয়াল কারণটা হল, কিগান আজকের মিটিং-এ ছিল না। ওকে গোটা ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে হবে। কারণ, স্যামুয়েল কুটিনহো গত সাতদিন আগে চাকরি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে জয়েন করেছেন আমদাবাদে। তার জায়গায় একজন নতুন জিএম আসার কথা। কিন্তু সে এখনও আসেনি। তাই কিগানকে আজকের মিটিং-এর সিনপ্সিস দেওয়াটা জরুরি। আসলে কিগান গেছে বসিরহাটে। ওদের কোম্পানির কাজে। তাই মিটিং-এর ব্রিফিংটা গৌর শশীবাবুর ভরসায় রেখে দিতে চায় না। আদিরও থাকতে কোনও আপত্তি নেই। আসলে ফিরতে হলে তো বাড়িতে ফিরতে হবে। সেখানে কে আছে ওর? মা? বাবা? তারা কে? আদি বুঝেছে জীবনে বাবা-মায়েদের নিয়ে একটা মিথ তৈরি করে দেওয়া হয়। ছোট থেকে শেখানোর চেষ্টা করা হয় যে, তারা ভগবান। আসলে পুরোটাই কন্সপিরেসি থিয়োরির মতো। যুগ যুগ ধরে বাবা-মায়েরাই তা তৈরি করে এসেছে। না, ভালবাসা টাসা আছে, নেই তা নয়। কিন্তু একটা সময় পরস্বার্থটাই বড় হয়ে ওঠে। বাবা-মায়েরা একটা সময় পরসম্পত্তির মতো মনে করে সন্তানকে। তাদের ইচ্ছের গণ্ডির ভেতর সন্তান থাকলে তবে সে সুসন্তান। না হলেই অশান্তি, রাগারাগি। সম্পর্ক নষ্ট। এই জন্যই তো বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে আদি।
লোভ। বাবা-মায়ের লোভ দেখলে মাঝে মাঝে ঘেন্না হয় আদির। ওই বাড়ির তিনতলাটা নেওয়ার জন্য বাবা যেন হন্যে হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে সফল হয়েছে বাবা। তবে, না, কিগান বাবার নামে লিখে দেয়নি তিনতলাটা, দিয়েছে আদির নামে। আদি নিতে চায়নি। প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু কিগান শোনেইনি। হেসে বলেছিল, ‘আমার জিনিস তো, নাকি? ঠাকুরমা তো আমায় দিয়ে গিয়েছিল। তা আমার জিনিস তো আমি যাকে খুশি দিতে পারি।’
‘কিন্তু, দাদাভাই, কলকাতায় এলে তুই থাকবি কোথায়?’
‘বোকার মতো কথা বলিস না আদি। তুই থাকতে দিবি না? আর হোটেল, লজ, গেস্ট-হাউস সব বন্ধ হয়ে গেছে, নাকি?’
‘কিন্তু দাদাভাই, সব ভুলে গেলি তুই? বাবা তোকে কত খারাপ কথা বলেছে মনে নেই? মনে নেই কেমন করে অপমান করেছে তোকে?’
‘তো? তুই তো কিছু করিসনি। তাই না!’ কিগান হেসেছিল।
‘আমি?’ আদি থমকেছিল মুহূর্তের জন্য। কিছু করেনি ও। ঠিক। কিন্তু সেটাই কি কিছু করা নয়? কিগানকে বাবা জুতো ছুড়ে মেরেছিল পর্যন্ত। কিন্তু তার কি প্রতিবাদ করেছিল আদি? ও তো চুপ করে ছিল। দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল নিজের ঘরের। তবে?
কিগান বলেছিল, ‘শোন না, এই আদি, আমিও তো খুব কিছু ভালবাসা বা সম্মান কোনওদিন দিইনি কাকু-কাকিমাকে। ফলে ওসব নয়। তা ছাড়া, আরও দুটো কারণ আছে।’
‘কী কারণ?’ অবাক হয়েছিল আদি।
‘একটা এই যে, আমার এই পৃথিবীতে কেউ যদি আপন থেকে থাকে, সেটা হলি তুই। তাই তোকেই তো দেব।’
‘আর অন্যটা?’ জিজ্ঞেস করেছিল আদি।
‘সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। কেমন!’
আর জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারেনি আদি। কিগান যেন একদম কুলুপ এঁটেছিল মুখে। একটা শব্দও বের করতে পারেনি। শুধু বলেছিল, ‘আমি পেপার্স তৈরি করাচ্ছি। তোকে যথাসময়ে ডাকব।’
আজ আদির থেকে যাওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এটা। কিগান বলেছে যে, পেপার্স সব তৈরি হয়ে আছে। আদি এলেই দিয়ে দেবে। তাই আদিকে অপেক্ষা করতে হবে সেই জন্যও।
চা-টা খুব কিছু স্বাদের নয়। কেমন যেন পেঁপেপাতা সেদ্ধ করে তৈরি করা হয়েছে মনে হচ্ছে। তবে সঙ্গের লোকাল বেকারির তৈরি বিস্কিটটা ভাল লাগছে বেশ। ছোট ছোট বাদাম দিয়ে তৈরি। কুকির মতো। সামনের রাস্তা দিয়ে হু হু করে ট্রাক যাচ্ছে। মাল বোঝাই সব ট্রাক। সব বেনাপোল যাচ্ছে। এক্সপোর্ট হবে। বিস্কিটে ছোট ছোট কামড় দিয়ে তাই দেখছে কিগান।
সারাদিনের গরমটা এখন কম। বরং অদ্ভুত একটা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। হয়তো বৃষ্টি হয়েছে কোথাও। জুনের প্রথম এখন। বর্ষা শুরু হবে যে-কোনও দিন। এখানে হাওয়া অনেক পরিষ্কার। আদি বুকভরে শ্বাস নিল। কলকাতায় থেকে থেকে ওরা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন সিন্থেটিক। কেমন যেন মেকি। এই অঞ্চলের হাওয়া-বাতাসের মধ্যে একটা সহজিয়া ভাব আছে। একটা আনন্দ আছে। এই যে আদি এখানে বসে আছে ওর মনে বেশ একটা হালকা ভাব এসেছে এরই মধ্যে। সবসময়ের দমচাপা মনখারাপটা আর নেই। তবে বাড়ি ফিরেই তো আবার চেপে ধরবে সব। আদি এখন বোঝে কেন কিগান আর কলকাতায় থাকতে চায় না!
দিঘির সঙ্গে কিগানের সম্পর্কটা প্রথমে বুঝতে পারেনি আদি। আসলে ততদিনে কিগানের সঙ্গে দূরত্ব অনেক অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তাই অতটা খেয়াল করেনি। তবে বাড়িতে মাঝে মাঝে মাকে কাজের মেয়েটির সঙ্গে চাপা গলায় আলোচনা করতে শুনেছিল আদি। তবে পাত্তা দেয়নি। আসলে ছেলে আর মেয়ের বন্ধুত্বটা মায়ের কাছে অন্যরকম ঠেকলেও আদির কাছে এর কোনও আলাদা গুরুত্ব ছিল না। তাই ও আমল দেয়নি।
ব্যাপার যে আছে সেটা আদি বুঝেছিল এক পুজোর সপ্তমীর সকালে। সাধারণত তিনতলায় বা ছাদে যেত না আদি। তবে সেদিন মায়ের তাড়নায় ছাদে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কী? না, কেব্ল-এর তার নাকি খুলে গেছে বক্স থেকে। পুজো বলে কেউ এসে ঠিক করবে না। তাই মায়ের বকবক থেকে মুক্তি পেতে একরকম বাধ্য হয়েই ছাদে উঠেছিল আদি।
আর ছাদে উঠেই চিলেকোঠায় অস্পষ্ট নড়াচড়ার শব্দ, আলোর হেরফের টের পেয়েছিল আদি। কে আছে ওখানে? দাদাভাই? আদি পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল। জানলার পাল্লা খোলা ছিল। আর আদি তার পাশে দাঁড়িয়ে দম বন্ধ করে দেখেছিল দাদাভাইকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে দিঘি। দু’জনের ঠোঁট একাকার। চোখ বন্ধ। দু’জনেই যেন বিস্মৃত হয়েছে জগৎসংসার।
মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আদি। কী দেখেছে ও? দাদাভাই? কিগান ব্যানার্জি? যে সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটায়, সে দিঘির সঙ্গে? না, বয়সের কথাটা যে মাথায় আসেনি আদির তা নয়। কিন্তু প্রেমের যে বয়স হয় না সেটা ভালই জানে আদি। যাজ্ঞসেনী আইয়ারের ঘটনাটা থেকে তো ও নিজেই শিখেছিল। তাই সেই চিন্তাটা মাথায় এলেও চিন্তাটার চলে যেতে সময় লাগেনি। ও আশ্চর্য হয়েছিল, এমনটা ঘটল কী করে—এই ভাবনায়। কখন হল এসব? আর দিঘিকে যতটুকু ও খেয়াল করেছিল তাতে তো ও কিগানের সম্পূর্ণ বিপরীত। দিঘি খুব হইচই করে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। আর এই বয়সে যা হয়, সুন্দরী মেয়েদের প্রচুর ফ্যান জুটে যায়। তাদের বয়স অল্প হয়। আর তাই তাদের সঙ্গে কানেকশনটা খুব সহজেই হয়। কিন্তু সেখানে কিগান? কিগান এল কীভাবে এর ভেতর? দিঘির সম্পূর্ণ বিপরীত হল কিগান। বইমুখো, বন্ধুবান্ধবহীন, একা থাকতে পছন্দ করা একটা মানুষ। এদের মধ্যে যে কীভাবে প্রেম হল!
আদি সন্তর্পণে সরে এসেছিল জানলার পাশ থেকে। ও চায়নি আর এই দৃশ্যের সাক্ষী হতে। ছাদ থেকে নীচে নামতে নামতে ভেবেছিল, জীবন সত্যিই বিচিত্র। যখনই মানুষ মনে করে সমস্ত খেলা শেষ, ঠিক তখনই জীবন তার টুপির ভেতর থেকে বের করে আনে নতুন খেলা!
আদি জানত, কলেজজীবনে দাদাভাইয়ের একটা প্রেম ছিল। কিন্তু সেটা ভেঙে যাওয়ার পর তো দাদাভাই আর কোনও সম্পর্কে জড়ায়নি। কিন্তু যখন জড়াল তখন এমন একটা মেয়ের সঙ্গে! আশ্চর্য লেগেছিল আদির। তবে, কাউকে বলেনি ও। ঠিক করেছিল কাউকে বলবেও না।
তাই এর পর যখন দিঘির পাড়ার বন্ধু সুবর্ণ অভিযোগ করল ওর বাবার কাছে এসে, তখন ভীষণ অবাক হয়েছিল আদি। কী বলেছে সুবর্ণ? কিগান দিঘির ওপর জোর করেছে? জোর? কিন্তু ছাদে তো ও দেখেছিল দিঘি আঁকড়ে ধরে রয়েছে কিগানকে! যদি কেউ কাউকে আঁকড়ে ধরে তা হলে যে ধরছে তার ওপর জোর করা হয় কী করে? আদির হিসেব মিলছিল না। ওর আরও অবাক লাগছিল যখন শুনেছিল যে, দিঘি নিজে এমন কথা বলেছে!
কিগান কিন্তু কিছু বলেনি। সব মাথা নিচু করে হজম করে নিয়েছিল।
হ্যাঁ, আদি যায়নি। সব জানা সত্ত্বেও ও এগিয়ে যায়নি কিগানের জন্য। হয়তো মনে হয়েছিল অন্যের ঝামেলায় ঢুকব না। বা হয়তো মনে হয়েছিল যে-দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে দাদাভাইয়ের সঙ্গে, তা আর টপকানো সম্ভব নয়। আবার হয়তো যাজ্ঞসেনী আইয়ারের ঘটনাটাও পিছনে টেনেছিল ওকে। ব্যর্থ প্রেম আর তার থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিহিংসার যে কত রূপ আছে তা আজকাল খুব বুঝতে পারে আদি। কিন্তু তখন বুঝত না। আফশোস হয় আদির। কেন বুঝত না ও? কেন বারবার ছাতা নিয়ে না বেরোলেই সেদিনই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়?
‘আরে আপনি এখানে বসে রয়েছেন?’
জিয়ানার গলায় মুখ তুলে তাকাল আদি। বলল, ‘হ্যাঁ, আপনাদের হল?’
‘তা হল,’ জিয়ানা হাসল, ‘আপনাদের প্রোডাকশন ম্যানেজারটি, মানে আপনার দাদা, আসবে কখন?’
‘দাদা? ও আপনি…’ আদি থমকাল সামান্য, তারপর হাসল, ‘কিগানদা যে আমার জ্যাঠতুতো দাদা আপনাকে রুহান বলেছে নিশ্চয়ই!’
‘এগজ্যাক্টলি,’ হাসল জিয়ানা, ‘তবে রুহান আপনাকে একটা কথা বলেনি। কারণ, ও জানতই না তো কী বলবে?’
আদি হাসল, ভদ্রমহিলা কাজটা পেয়ে খুব উত্ফুল্ল। হবেই, এমন একটা কাজ একা জোগাড় করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাই হয়তো একটু অন্যরকম, হিসেবের বাইরে কথা বলছে!
আদি বলল, ‘কী কথা?’
‘আপনার দাদা আমার ক্লাসমেট ছিল।’
‘তাই!’ অবাক হল আদি।
‘আর আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম। যদিও প্রায় দশ বছর যোগাযোগ ছিল না। আসলে বিয়ের পরে বিদেশে চলে গিয়েছিলাম তাই যোগাযোগ ছিল না। বাট আই মাস্ট সে আপনার দাদা খুব ভাল মানুষ।’
খুব ভাল বন্ধু ছিল! তাও সম্পর্ক ছিল না! কেন? আদির কেমন যেন আশ্চর্য লাগল।
জিয়ানা বলল, ‘কিগানটা এত অদ্ভুত, ওর তো টিকির দেখাই পাওয়া যায় না আজকাল। কাজটা পাওয়ার পর কতবার চেষ্টা করেছি ওর সঙ্গে কথা বলার, কিন্তু তেমন করে কথাই বলেনি! এতটুকু বদলায়নি। কেন যে সারা পৃথিবীর ওপর ওর রাগ?’
আদি হাসল, ‘দাদাভাইকে খুব রাগ করতে আমি বিশেষ দেখিইনি।’
‘ওর তো চাপা রাগ। মুখে হাসি থাকলেও তো ভেতরটা আগুন।’
হাসল আদি, ‘আপনি দেখছি খুব রেগে আছেন দাদাভাইয়ের ওপর!’
‘তা একটু আছি। আর থাকব নাই বা কেন? একটু ঠিকমতো কথাও কি বলতে নেই?’
আদি বলল, ‘সে কী! আপনারা আমাদের কাজ করছেন। দাদাভাইয়ের সঙ্গে তো আপনাদের রেগুলার ইন্টার্যাকশন করতে হবে। সেখানে যদি দাদাভাই না কো-অপারেট করে তবে তো বিপদ! আমায় গৌর স্যারকে বলতে হবে।’
‘আরে না না,’ আদিকে থামাল জিয়ানা, ‘কাজের কথা ঠিকই বলে। কিন্তু কাজেই কি পৃথিবী শেষ হয়?’
‘ও,’ হাসল আদি, ‘দাদাভাই তো অমনই।’
‘যাই হোক, থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর টাইম। ওই মিস্টার দিওয়ানের গাড়ি বেরোবে এবার। আমি চট করে একবার ওঁর সঙ্গে দু’-একটা কথা সেরে নি। বাই দ্যা ওয়ে, মালিনীর কী খবর? বহুদিন যোগাযোগ নেই ওর সঙ্গে। ফোন করেছিলাম, বলছে নম্বরের অস্তিত্ব নেই। ব্যাপারটা কী? কোথায় আছে ও?’
‘মালিনী?’ আদির যেন কষ্ট হল কথাগুলো বলতে।
‘হ্যাঁ? কোথায় ও? একদম কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল মনে হচ্ছে!’
‘ও চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এখন লন্ডনে গেছে ওর বাবার সঙ্গে। পরে দেশে ফিরবে। আর হ্যাঁ, ওর নতুন নম্বর হয়েছে। আপনাকে দেব?’
‘না না,’ জিয়ানা হাসল, ‘আমি নিয়ে কী করব আর! তবে, সি ইজ আ গ্রেট গার্ল। যেমন মিষ্টি দেখতে, তেমন ভাল মন। আচ্ছা, আসি।’
আদির মনে হল কে যেন অতিরিক্ত হাওয়া ভরে দিয়েছে ওর ফুসফুসে। মনে হল, এবার হয়তো ফুসফুস দুটো ফেটে বেরিয়েই যাবে মুখ দিয়ে।
মালিনী, মালিনী সিংহ। আদির জীবনে কী অদ্ভুত পরিবর্তন এনে দিয়েছে মেয়েটা। সেই উচ্ছৃঙ্খল, ডোন্ট কেয়ার টাইপ আদির জায়গায় এই আদিটা একদম নতুন। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই চিনতে পারে না ও। ভাবে এই আদিটা এল কোত্থেকে? কোথায় গেল সেই মানুষটা?
আদি এখন চুপচাপ হয়ে গেছে অনেক। সেই ডিস্ক হপিং, সেই লেট নাইট, ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড সব ভুলে গেছে এখন। যে-কোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়ে পড়ার জন্য বিছানাটাও আর টানে না ওকে। এখন শুধু ওর মনের ভেতর বড় বড় চিমনি থেকে বেরোনো ধোঁয়ারা গোল্লা কাটে। মনখারাপের মতো মেঘের তলায় সবুজ ছাতা নিয়ে বসে থাকে একটা বাচ্চা ছেলে। ওর মনের ভেতর নীল-হলুদ গামবুট পরে বাচ্চারা বৃষ্টির জল ভেঙে বাড়ি ফেরে। কষ্ট বলে একটা খিটখিটে আগুন মনের ভেতর বুঝতে পারে আদি। বুঝতে পারে ভীষণ মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ে আর ওর দিকে তাকায় না বলে বজ্রবিদ্যুৎসহ ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে চলে ওর ভাঙাচোরা জীবনে।
কেন আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে না মালিনী? কেন? আদি ওর ওপর রাগ করেছিল বলে? শুধুমাত্র সেই জন্য? সেই জন্য মাত্র একবার ফোন আর একটা এসএমএস করে নিজের কর্তব্য সেরেছে মালিনী? এটুকুতেই কি ফুরিয়ে যায় সব? সারা হয়ে যায় সব কর্তব্য?
নার্সিংহোমটার সামনে দু’-চারটে গাড়ি প্রায় এ ওর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ানোর মতো করে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিন। আদি ট্যাক্সি থেকে নেমে প্রায় দৌড়ে ঢুকেছিল রিসেপশনে। নেশা সম্পূর্ণ কেটে গিয়েছিল ওর। খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল আদি। ‘আসবে না’ ভেবেও না এসে থাকতে পারেনি ও। ‘মালিনীর বিপদ’, এই শব্দ দুটোই একদম অস্থির করে তুলেছিল ওকে। ও তো জানত না মালিনীর গ্র্যানির কী নাম! জানত না কোন রোগের জন্য ভরতি হয়েছেন গ্র্যানি!
রিসেপশনের মেয়েটি চোখ বড় বড় করে আদিকে দেখেছিল। জানতে চেয়েছিল আদি কী চায়? আদি নিজের শ্বাস সংযত করে বলেছিল, ‘খুব বৃদ্ধা কেউ একজন ভরতি হয়েছেন কি এখানে?’
‘খুব বৃদ্ধা মানে? আজ বিকেল থেকে পাঁচজন ভরতি হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা আর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক।’
‘আরে, অনেক বয়স,’ আদি বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
‘সবারই অনেক বয়স। আর ফ্র্যাঙ্কলি অনেক বয়স কথাটা আপেক্ষিক। আপনার যাকে অনেক বয়স্ক মনে হবে, আমার তাকে তেমন মনে না-ই হতে পারে।’
‘কী আশ্চর্য! আমার খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হন উনি,’ আদি মরিয়া হয়ে বলেছিল।
‘তাই? কী নাম ওঁর?’ মেয়েটি ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করেছিল।
‘গ্র্যানি,’ কী বলবে বুঝতে না পেরে আদি বোকার মতো ফস করে বলে ফেলেছিল কথাটা।
‘গ্র্যানি?’ মেয়েটা চমকে গিয়েছিল ভীষণ, ‘মানে?’
‘মানে…ইয়ে…’ আদি তোতলাতে শুরু করেছিল।
‘মানে আপনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, আর আপনি তার নাম জানেন না?’ মেয়েটা ক্রমশ ভুরু দুটো বাঁকিয়ে সন্দেহকে ঢোকার মতো জায়গা করে দিচ্ছিল মনে।
আদি বুঝতে পারছিল না কী বলবে। ঠিক তখনই ও দেখেছিল রিসেপশনের পাশের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে মালিনী।
‘মালিনী!’ আদি প্রায় প্রাণ ফিরে পাওয়ার মতো করে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে।
মালিনী চমকে গিয়েছিল খুব, ‘তুমি!’
‘এলাম।’ আদি আর কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘তোমায় খবর দিল কে?’ মালিনীর অবাক ভাব তখনও কাটেনি।
‘আমায়?’ আদি জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলেছিল, ‘রুহান।’
‘ও, তাই!’ মালিনী হেসেছিল সামান্য, ‘ও আমায় ফোন করেছিল। আমিই তখন বলেছিলাম যে, গ্র্যানি ভরতি হয়েছে। ও জিজ্ঞেস করেছিল আসবে কি না। আমিই বারণ করেছিলাম, বলেছিলাম যে দরকার নেই, এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল। এখন দেখছি ও নিজে না এসে তোমায় পাঠিয়েছে! আশ্চর্য! আর, ফ্র্যাঙ্কলি আদিত্য, তোমারও আসার দরকার ছিল না।’
‘এসব কী বলছ? দরকার ছিল না মানে?’ আদির অসহায় লাগছিল খুব। মনে পড়ছিল ওর মরণপণ প্রতিজ্ঞা যে, আসবেই না। কিন্তু কত সেকেন্ডের জন্য ছিল সেই প্রতিজ্ঞা? মত বদলাতে তো মুহূর্তও লাগেনি ওর। ট্যাক্সি ধরে নিমেষে রওনা দিয়েছিল নার্সিংহোমের উদ্দেশে। আর তারপর মালিনী বলছে দরকার ছিল না আসার!
মালিনী বলেছিল, ‘বাদ দাও। আমায় এখন একটু বেরোতে হবে।’
‘কোথায়?’ অবাক হয়েছিল আদি।
‘ওষুধ আনতে। এরা তো দেবে না। আমাকেই কিনে দিতে হবে।’
‘তুমি আমায় দাও। আমি এনে দিচ্ছি।’ আদি হাত পেতেছিল।
‘ডোন্ট বদার ইয়োরসেল্ফ। এটা কোনও ব্যাপার নয়।’
‘মালিনী,’ আর নিজেকে সামলাতে পারেনি আদি, ‘এবার আমি কিন্তু চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করব। তুমি কী ভেবেছ?’
‘আস্তে,’ মালিনী শান্ত গলায় বলেছিল।
‘এভরিথিং শুড হ্যাভ আ লিমিট। দাও প্রেসক্রিপশন,’ আদি প্রায় ছিনিয়ে মালিনীর হাত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে নিয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘তুমি চুপ করে এখানে তো বসো। একটা কথা বলবে না। খবরদার, একটাও কথা বলবে না। আমি নিয়ে আসছি ওষুধ।’
‘ঠিক আছে। তবে না হলেও…’ মালিনী আলতো গলায় বলেছিল।
‘শাট আপ। তোমার প্রথমেই আমায় খবর দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা দাওনি। আর এখন এসব বলছ? চুপ করে বোসো।’
আদির চোখে-মুখে এমন কিছু একটা ছিল যার ফলে মালিনী রিসেপশনের সামনের সোফায় বসে পড়েছিল চুপ করে। আদি একবার রাগী রাগী চোখ করে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর বেরিয়ে গিয়েছিল। ও নর্থের ছেলে হলেও সাউথ কলকাতাও ওর কাছে অপরিচিত নয়। বিশেষ করে এই ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক চত্বরটা। কলেজ লাইফে ওর প্রচুর বান্ধবী এই অঞ্চলে থাকত। ফলে ওষুধ কোথায় পাওয়া যায় সেটা আদি খুব ভালই জানে।
আধঘণ্টার ভেতরে ওষুধ নিয়ে নার্সিংহোমে ফিরে এসেছিল আদি। দেখেছিল সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে রয়েছে মালিনী।
এর পর সাতদিন গ্র্যানি নার্সিংহোমে ছিল। আর রোজ অফিসের পরে আদি নিয়ম করে আসত নার্সিংহোমে। প্রথম দু’দিন মালিনী আপত্তি করলেও তার পরে আর করেনি। বরং, আদির মনে হত কোথায় যেন মালিনী এক্সপেক্ট করছে ওকে। যেন চাইছে আদি আসুক। ততদিনে মালিনীদের অন্য আত্মীয়রাও এসে পড়েছিল। তারা অন্য বড় নার্সিংহোমেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল গ্র্যানিকে। কিন্তু মালিনী নিতে দেয়নি। অবশ্য তার প্রয়োজনও ছিল না। গ্র্যানি বেশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছিল। আর আট দিনের দিন বাড়িতেও ফিরে গিয়েছিল।
মালিনীও যেন অনেকটা পুরনো মালিনী হয়ে উঠেছিল তারপর। সেই হাসি, অল্প ইয়ারকি আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট মনোযোগ। আদি শ্বাস নিতে পারছিল আবার। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে পাশবালিশে মুখ ডুবিয়ে চিন্তা করতে পারছিল মালিনীকে। শপিং উইন্ডোয় কোনও সুন্দর ড্রেস দেখলে মনে মনে কল্পনা করতে পারছিল মালিনীকে কেমন লাগবে এটা পরলে!
তারপর একদিন মালিনী অদ্ভুত সুন্দর একটা খাবার টিফিন বক্সে করে এনে বলেছিল, ‘এটা তোমার। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেয়ো। আমি বানিয়েছি।’
‘তুমি? তুমি রান্না করেছ!’ আদি অবাক হয়েছিল।
‘হ্যাঁ, করি তো! কেন চাপাডাঙায় করেছিলাম মনে নেই?’
‘তাও…মানে…’
‘এটা নতুন একটা আইটেম। ভাবলাম তোমায় গিনিপিগ করি।’
সেদিন অল্প হাওয়া বইছিল। গাড়িটা দাঁড় করিয়ে মালিনী আর আদি হাঁটছিল ময়দানের ঘাসের ভেতর দিয়ে। দূরে গাড়ির ভেতরে বসে গল্পের বই পড়ছিল মল্লার।
অফিস থেকে কনসালট্যান্টদের ওখানে যাওয়ার কথা ছিল সেদিন। কিন্তু মাঝপথে ওরা জানতে পারে যে, মিটিং ক্যানসেল হয়েছে। তাই আর যেতে হয়নি। তার বদলে, একরকম অফিস ডুব মেরেই ওরা ঘুরছিল ময়দানে।
মার্চের রোদ পশ্চিম থেকে পাকা সুপুরির রং মেখে চুঁইয়ে পড়ছিল মেঘ ফাটিয়ে। পশ্চিমে ভাঙাচোরা কিছু মেঘ জমেছিল সেদিন। আদির ভাল লাগছিল খুব। মানুষ যার কাছে যেতে চায়, যার সঙ্গে থাকতে চায়, তার কাছে পৌঁছোতে পারলে যেমন অদ্ভুত এক হাওয়া বইতে থাকে শরীরে, তেমনই হাওয়ায় ডুবে ছিল আদি। টিফিন বক্সটা হাতে নেওয়ার সময় আলতো করে মালিনীর আঙুলে আঙুল ঠেকে গিয়েছিল। আদির মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তটুকুই আসল। সেই মুহূর্তটুকুই পরম। এর জন্যই এতদিন অপেক্ষা করে ছিল আদি।
সূর্য নিচু হচ্ছিল। দূরে ইডেন গার্ডেন্সের আলোর স্তম্ভগুলোকে মনে হচ্ছিল গল্ফ ব্যাগ থেকে বেরিয়ে থাকা গল্ফ ক্লাব। পাখিরা কিচিরমিচির বাড়িয়ে দিয়েছিল ময়দানের সমস্ত গাছে। দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা মানুষেরা কেমন যেন গতি কমিয়ে দিয়েছিল তাদের।
আর পারছিল না আদি। আর ধরে রাখতে পারছিল না নিজেকে। বুকের ভেতর কষ্টটা যেন বেড়ে গিয়েছিল কয়েক হাজার গুণ। মনে হচ্ছিল এবার বলে দেবে। বলেই দেবে, তাতে যা হওয়ার হোক।
আদি হঠাৎ থেমে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল মালিনীর মুখোমুখি। বলেছিল, ‘মালিনী।’
‘কী আদি?’ মালিনীর গলায় স্বর হাওয়া-মিঠাইয়ের মতো লাগছিল।
আদি! এতদিন পরে? আদির হাত কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল জিভ জড়িয়ে আসবে যে-কোনও সময়ে। তবু ও বলেছিল, ‘মালিনী, আমি…আমি বহুবার ভেবে দেখেছি। বহুবার নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারলাম না। আমি যেখানেই থাকি আমার শুধু তোমার কথা মনে পড়ে। শুধু তোমার কাছে থাকতে ইচ্ছে করে। আমার শুধু ইচ্ছে করে তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে। আমি আর কিছু চাই না। শুধু তোমায় চাই মালিনী। শুধু তোমার হয়ে থাকতে চাই। আমার আর কিচ্ছু ভাল লাগে না।’
মালিনী কোনও কথা না বলে চুপ করে তাকিয়েছিল আদির দিকে।
আদি আবার বলেছিল, ‘মালিনী আমি তোমায় বলছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? বুঝতে পারছ?’
মালিনী কিছু না বলে হেসেছিল শুধু।
আদি আবার বলেছিল, ‘আমি যে তোমায় কী করে বোঝাই? কী করে বলি? আমি…আমার…মানে…দিনগুলো যে কী করে কাটে! মনে হয়…মনে হয়…তুমি…তুমি হাসছ কেন? কিছু বলবে না? সত্যিই কিছু বলবে না?’
মালিনীর মুখে শেষ আলোর রং এসে লেগেছিল। গালের টোল দুটো জেগে উঠেছিল নিখুঁতভাবে। চোখ দুটোর ভেতর যেন সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বাদামি গাছের জঙ্গল। মালিনী হেসে ঠোঁটটা কামড়ে ধরেছিল আলতো দাঁতে। তারপর বলেছিল, ‘আমি কত নম্বর? মানে শুয়ে শুয়ে নয়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত নম্বর?’
সূর্যের পাত আড়াআড়িভাবে এসে যেন দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছিল আদিকে। আচমকা প্রশ্নের ধারে থতমত খেয়ে গিয়েছিল আদি। তারপর বুঝেছিল সারা শরীর জুড়ে অসংখ্য দমকল ঘণ্টা বাজিয়ে মাথার দিকে ছুটছে। ও চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিল মালিনীর দিকে। মালিনী হাসছে! কোনও মানুষ নিজের সমস্তটা অসহায়ের মতো কারও সামনে অপর্ণ করার পর কেউ যদি এমন করে হাসে, তবে সেটাকে কী বলে? অপমান? অবজ্ঞা? নাকি আরও অন্য কিছু?
আদি মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর আচমকা দৌড়োতে শুরু করেছিল। মাঠ ভেঙে, গাছপালাদের পাশ দিয়ে, পিছনে হতভম্ব মালিনীকে রেখে দৌড় শুরু করেছিল আদি। মালিনী ডেকেছিল কি? শোনেনি। শুনতে চায়নি ও। শুধু ও দেখছিল সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাদামি গাছের জঙ্গল থেকে হিংস্র কোনও পশু আক্রমণ করছে ওকে। ওর জীবন বিপন্ন। ওকে পালাতেই হবে না হলে মৃত্যু নিশ্চিত।
দৌড়ে গাড়ির সামনে এসে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়েছিল আদি। পিছনে তাকায়নি। পিছনে ফিরে তাকায়নি একবারও। শুধু দরজাটা খুলে হাতের টিফিন বক্সটা পিছনের সিটে রেখে, নিজের ব্যাগটা তুলে মল্লারকে বলেছিল, ‘ম্যাডামকে নিয়ে যেয়ো। আমার অন্য কাজ আছে।’ তারপর রাস্তা দিয়ে যাওয়া চলতি একটা ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়ে উঠে পড়েছিল। আর মোবাইলটা বন্ধ করে দিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে।
না, এদিক-ওদিক কোথাও যায়নি। বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল আদি। একা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল চুপ করে। মা অবাক হয়েছিল খুব। জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে। কিন্তু বলেনি আদি। কিচ্ছু বলেনি, কাউকে বলেনি। তবু বলতে ইচ্ছে করছিল ওর। মনে হচ্ছিল কে যেন নেই, কার যেন থাকার কথা ছিল। কাকে যেন সব বলতে পারত ও! আর হঠাৎই ওর মনে পড়েছিল দাদাভাইয়ের কথা, কিগানের কথা। যাজ্ঞসেনীর থেকে ফেরত এসে তো কিগানের ঘরের বিছানার ওপরই উপুড় হয়ে শুয়ে কেঁদেছিল। কিন্তু কিগান তো আর নেই। এখন আদি কোথায় যাবে? আদি যাবে না কোথাও। আদি আর যায় না কোথাও। ওর মনে দাদাভাই যেমন ক্রমশ পোর্সেলিনের হয়ে গেছে, তেমন হয়তো ও নিজেও ক্রমশ পোর্সেলিনেরই হয়ে গেছে।
তারপর সাতদিন ছুটি নিয়েছিল আদি। পরদিন সকালে ফোন অন করে মিস্ডকল অ্যালার্টে দেখেছিল একটা ফোন এসেছে মালিনীর থেকে। আর সেই দিন এসেছিল একটা মেসেজ। তাতে মালিনী ছোট করে লিখেছিল, ‘আমায় একবারও কিছু বলতে দিলে না! আমি আর কোনওদিন তোমায় ফোন করব না!’
ফোন করবে না তো করবে না। মহারানি ভিক্টোরিয়া নাকি যে, ফোন করবে না বলে হেদিয়ে মরে যাব? আদি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। মনে মনে ভেবেছিল দাদাভাই সারাজীবন এত কিছু সামলাতে পারলে, ও পারবে না? পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। ওকে যে পারতেই হবে।
সাতদিন পর অফিসে ঢোকার সময় একবার বুকটা হাওয়া লাগা পালের মতো কেঁপেছিল আদির। তবে সামলেছিল ও। ধমক দিয়ে, চোখ পাকিয়ে, ঠিক সামলে নিয়েছিল নিজেকে। তারপর মাথা উঁচু করে ঢুকেছিল অফিসে।
গত চারদিন আগে মালিনী নাকি চাকরি ছেড়ে চলে গেছে! প্রথম বলটাই গুড লেন্থ স্পট থেকে আচমকা লাফিয়ে পাঁজরে আঘাত করেছিল আদিকে। চাকরি ছেড়ে চলে গেছে! মালিনী! সে কী! কিন্তু এখানে তো এমন হুট করে কাজ ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না? তবে? ও গেল কী করে?
আদি খবর নিয়ে জেনেছিল যে, যত ছুটি জমা ছিল তা নিয়ে, আর স্যালারির একটা অংশ ক্ষতিপূরণ বাবদ দিয়ে নাকি চলে গেছে মালিনী। ওর বাবার সঙ্গে গতকালই লন্ডনে উড়ে গেছে ও।
আদি জানত মালিনীদের বাড়ির অবস্থা খুব ভাল। চাকরিটা ও করত শখ করে, আর নিজের পড়াশোনাটাকে কাজে লাগানোর জন্য। তাই হয়তো চাকরিটা ছাড়তে হাত কাঁপেনি ওর। কিন্তু আদিকে একবারও বলল না? একবারও ভাবল না আদির কথা? আদি যে কষ্ট পাবে সেটা মাথাতেও আনল না একবারের জন্য? একটা এসএমএস করেও তো জানাতে পারত!
আদির মনে হচ্ছিল কে যেন ওর শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে। কে যেন মাথা ফুটো করে ঢেলে দিয়েছে অ্যাসিড। নিজেকে কেমন যেন পোড়ো, ফোকলা বাড়ির মতো মনে হচ্ছিল ওর। লু-তে গিয়ে চোখের জল ঢাকার জন্য বারবার জলের ঝাপটা দিচ্ছিল ও। তবু পারছিল না আদি। মেঝেতে বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদেছিল ও। শুনেছিল ভালবাসার কান্নার প্রতিটা ফোঁটা জল যদি মাটিতে পড়ে, তবে সেখানে একটি করে গন্ধরাজ ফোটে। বাথরুমের মেঝেতে অসংখ্য জলের ফোঁটা পড়েছিল। কিন্তু সাদা মার্বেল ফাটিয়ে কোনও ফুল আসেনি। আদি বুঝেছিল, ফুল আসে না। রাজকুমারী কোনওদিন অপেক্ষা করে না রাখাল বালকের জন্য। নদীর পাড়ে একলা বসে থাকা ছেলেটির কাছে কোনওদিন পৌঁছোয় না কোনও চিঠি।
লু থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডর দিয়ে যেতে যেতে আদির মনে হয়েছিল, তবে কি এই শেষ? তবে এইভাবেই শেষ হল ওদের দেখাশোনো? এর পর কী? নিস্তব্ধতা? এর পর কী? পাথুরে একটা উপগ্রহকে জ্বলন্ত ফোসকার মতো বয়ে বেড়ানো আজীবন? আমৃত্যু?
আর-একটা চা বলল আদি। একটু আগে খুরানা-জিয়ানা-রুহান আর গৌরের গাড়ি দুটো বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় জিয়ানা হাত নেড়েছে ওর দিকে তাকিয়ে। রুহান সামনের সিটে বসে ছিল। ও আর আজকে এগিয়ে এসে কথা বলেনি। আদি জানে রুহান আর কোনওদিন এগিয়ে আসবে না হয়তো নিজের থেকে। কিন্তু আদি চায় রুহান আসুক। ও একসময় একদম অনাবশ্যকভাবে খুব বাজে ব্যবহার করেছিল রুহানের সঙ্গে। কেন, ঠিক জানে না। আসলে রুহানের ক্যালাসনেস দেখলে রাগ হত ওর। ওর বন্ধু হয়ে দাদাভাইয়ের ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল বলে রাগ হত। ওর অমন মেরুদণ্ডহীন ভাবে লোকের সামনে দাঁড়ানো দেখে রাগ হত আদির। তারপর মালিনী যখন ওর সঙ্গে কথা বলা বাড়ায় তখন তো রাগটা চরমে ওঠে। রাগ আর হিংসে। তখন মনে হত রুহানকে কুচি কুচি করে কেটেই ফেলে একদম। কিন্তু তারপর যখন মালিনীর বিপদের সময় রুহান এসএমএস করেছিল ওকে, তখন কোথায় জানি মরে গিয়েছিল আদি। কোথায় জানি রুহান একদম শেষ মারটা দিয়ে গিয়েছিল ওকে।
না, ওই মার খেয়ে কষ্ট হয়নি আদির। বরং মরে যাওয়া বাচ্চাটাই যেন জেগে উঠেছিল কোথাও। বেঁচে উঠেছিল কোথাও। কিন্তু আদির গম্ভীর আর বড় হয়ে যাওয়া মানুষটা এখনও বাচ্চাটাকে শেকল খুলতে দিচ্ছে না। ওর ইচ্ছে করছিল রুহানের সঙ্গে ডেকে কথা বলে, কিন্তু কেন যে পারল না! অনেক সহজ জিনিসও বড় হয়ে গেলে কেমন যেন জটিল আর দুরূহ হয়ে যায়!
চা-টা হাতে নিয়ে বসে রইল আদি। আবেশও আজ কেমন যেন এড়িয়ে গেল ওকে। দূর থেকে হাত তুলে চলে গেল।
সন্ধে ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে এখন। মাথার ওপর পাক মারছে মেঘ। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে খুব। বৃষ্টি হয়েছে। খুব কাছেই বৃষ্টি হয়েছে কোথাও। এখানেও নামবে বোধহয়। যা গরম পড়েছে! নামলে ভালই হয়! আদি চায়ের কাপে চুমুক দিল।
ইলেকশনের পর গোটা অঞ্চলটাই কেমন যেন শান্ত হয়ে আছে। এবারও এখানে সুধাদি জিতেছে। এতে একটু ভয় ছিল আদির। জমিটা না আরও জলের তলায় তলিয়ে যায়। কারণ, সুধাদির কোনও ডিমান্ডই তো ওরা মানেনি। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল আদি। এক সকালে যখন কিগানের ফোন পেয়েছিল ও। কিগান বলেছিল, ‘নে, উঠে পড়। জমিটা হয়ে গেছে।’
‘অ্যাঁ?’ খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল আদি।
‘অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। গৌর স্যারকেও বলেছি। উনি আসছেন আজ। তুইও চলে আয়।’
কীভাবে হল, কেন হল, কিচ্ছু জানে না আদি। এ যেন দস্যু মোহন সিরিজ। যেন ‘কীসের থেকে কী হইল আর মোহন পলাইয়া গেল’ ধরনের ব্যাপার। সপ্তাহ দুয়েকের ভেতর ভোজবাজির মতো রাঘব চক্রবর্তী দিয়ে দিলেন জমিটা! তবে না, পুরোটা নয়, সত্তর শতাংশ। আর তাতেই রাজি হয়ে গেলেন গৌর। কারণ, জার্মান কোম্পানিটি নাকি আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়।
তবে কী হল বুঝতে না পারলেও, আপদ যে ঘাড় থেকে নেমেছে তাতেই খুশি আদি। শুধু তাই নয়, আদি গৌরকে বলে এর মধ্যে সুধাদির সঙ্গে মিটিং করিয়েছে একদিন। আর তাতে বলা হয়েছে যে, নতুন ফ্যাক্টরিতে সমস্ত কর্মী এই অঞ্চল থেকে নেওয়া হবে। এতে সুধাদির প্রেস্টিজও বেড়েছে। আর বারাসতের আবাসনের ঝামেলাটার বিষয়েও যে সুধাদি দেখবেন, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
একটা জমির গিট খুলতেই পর পর অনেক কিছু সহজ হয়ে গেছে। আর পুরো ব্যাপারটা কিগান গৌরকে এমন করে বলেছে যাতে মনে হয় আদিরই কৃতিত্বে সব হয়েছে। সেই দাদাভাই। গুড ওল্ড দাদাভাই। ঘুড়ি পেড়ে দেওয়া থেকে আজ পর্যন্ত একই রয়ে গেছে মানুষটা। অপেক্ষা করবে আদি, দাদাভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। যাজ্ঞসেনী আইয়ারের সেই ঘটনার পর দাদাভাইকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস না করে সরে যাওয়াটা খুব ভুল হয়েছে আদির। দিঘির ব্যাপারটায় দাদাভাইয়ের পিছনে না দাঁড়ানোটাও ভুল হয়েছে। অনেক, অনেক ভুল করে এসেছে আদি। এবার সেইসব শুধরে নিতে হবে।
‘দাদা, আপনি কি আদিত্য ব্যানার্জি?’
আদি মুখ তুলে তাকাল। ছেলেটা রোগা। গায়ে গাঢ় রঙের গোল গলার টি-শার্ট। চেহারায় একটা চোয়াড়ে ভাব আছে। আদি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি?’
‘আমি ত্রয়ণদার কাছ থেকে আসছি। ওই সামনে দাঁড়িয়ে চারটে ছেলের সঙ্গে কথা বলছে ত্রয়ণদা। সঙ্গে আপনাদের শশীবাবুও রয়েছেন। আমায় বললেন অসুবিধে না থাকলে যদি একটু আসতেন।’
‘আমি! কেন?’ আদির অবাক লাগল।
‘জানি না দাদা। তবে আপনাদের বয়লারের অ্যাশ আবার উড়ে যাচ্ছে গ্রামে। আপনাদের কিগানবাবু তো নেই। তাই শশীবাবুকে বললাম। উনি ত্রয়ণদার সঙ্গে কথা বললেন আর বললেন যে, আপনি যখন আছেন, তখন…’
‘আচ্ছা, চলো,’ আদি এক চুমুকে চা শেষ করে চায়ের দাম দিয়ে এগোল।
ছেলেটা যতটা বলেছিল তার থেকে আরও কিছুটা দূরে, জঙ্গলের দিকে গিয়ে কয়েকজনকে জটলা করতে দেখল আদি। এদিকটায় আলো নেই বিশেষ। তার ওপর আকাশে মেঘ ঘন হচ্ছে। আদি বুঝল না যে, গ্রাম আর বয়লার যেদিকে, সেদিকে না থেকে এরা জঙ্গলের দিকে কী করছে! শশীবাবুই বা ফ্যাক্টরি ছেড়ে এদের সঙ্গে এখানে কী করছে?
জটলার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল আদি। মানুষগুলোকে আবছা লাগছে। স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না। ও ডাকল, ‘শশীবাবু, শশীবাবু।’
‘শুয়োরের বাচ্চা!’ জটলার থেকে যে এগিয়ে এল গলা শুনে তাকে চিনল আদি। ত্রয়ণ! জায়গাটা একদম নির্জন। আদির মন কুডাক দিল। এখানে এসে ঠিক করেনি ও। একদম বুঝতে পারেনি যে এটা ফাঁদ। ত্রয়ণের গলার স্বর এক নিমেষে ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, একদম অচেনা একটা ছেলের কথা শুনে এভাবে আসাটা মূর্খামি হয়েছে।
আদি দ্রুত পিছু হটল। ত্রয়ণের গলার স্বর ওকে পালাতে বলছে এখান থেকে। কিছুটা দূরেই হাইওয়ে। সেখানে উঠতে পারলে আর কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। আদি পিছন ঘুরে দৌড় লাগানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই মাথার পিছনে ভারী মতো কী একটা এসে ঠক করে লাগল। আদির মনে হল মাথায় যেন চকোলেট বোমা ফাটল একটা। দূরের হাইওয়ের পাশের ঝুপড়ি দু’-একটা দোকান কেমন যেন দুলে উঠে কাত হয়ে গেল। মাথার ওপর ঘন অন্ধকার। চোখের পাতা দুটো ভারী। কালো কাচের ওপার দিয়ে দেখার মতো, আদি জ্ঞান হারানোর আগে দেখল দু’-চারটে আবছায়া মাথা নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়ছে ওর ওপর। তারপর বাকিটা নিস্তব্ধতা।
হলুদ আলোটা কেমন যেন চোখে লাগছে। ভাঙাচোরা এই বাড়িটা কোথায়? ভারী চোখের পাতা কষ্ট করে খুলে আদি তাকানোর চেষ্টা করল। কোথায় রয়েছে ও? আঃ। মাথার পিছনে, ঘাড়ে ব্যথা। হাত তুলতে গিয়ে আবার ব্যথা পেল আদি। আরে, হাত দুটো বাঁধা যে হাতলের সঙ্গে! চেয়ারের হাতল। চেয়ার? ও চেয়ারে বসে রয়েছে? চোখ খুলে তাকাতে গিয়েও পারল না আদি। বিদ্যুৎস্পর্শের মতো একটা ব্যথা ছোবল মারল ঘাড়ে আর মাথায়। কিন্তু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল আদি। চোখ বন্ধ রাখলেও অজ্ঞান হওয়া চলবে না।
‘বানচোতটা নড়ছে।’
‘জল মার। শালা অনেক ঘুমিয়েছে। এবার খাওয়াব মালটাকে। আমায় রেস্টুরেন্টে খাইয়েছিল না? এবার সত্যিকারের জন্য খাওয়াব। পিছন দিয়ে।’ ত্রয়ণের গলা।
নোংরা, তেতো জল ছপাৎ করে এসে মুখে পড়ল আদির। বাধ্য হয়ে কোনওমতে চোখ খুলল ও।
‘কী চাঁদ, আমায় বুলু দিয়ে জমিটা বাগিয়ে নিলে? আমার ক্যাশ মেরে দিলে?’ ত্রয়ণ হাসল।
হ্যাজাকের আলোয় ওর রোগা দাড়িওয়ালা মুখটাকে কেমন যেন বিকৃত লাগছে।
‘আমি…আমি…’ আদির কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে।
‘ন্যাংটো খোকা যে! কথা ফোটেনি?’ ত্রয়ণ ঠাস করে চড় মারল আদিকে, ‘শুয়োরের বাচ্চা, তোকে আজ নামাব, তারপর তোর ওই নীল চোখো দাদাটাকে দেব। আমার প্ল্যান মাটি করা? আমায় বাঁশ দেওয়া?’
‘আমি…আমি সত্যি কিছু জানি না ত্রয়ণবাবু। আমার… আমার কোনও ধারণা নেই…’ আদির কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে। তবু বলল।
‘আজ তোকে আমি দেখছি। তোর দাদার জন্য আমার এখানে আসা বন্ধ হয়েছে। পার্টি থেকে সাসপেন্ড হয়েছি। তোকে ছাড়ব না শুয়োরের বাচ্চা।’ ত্রয়ণ এলোপাথাড়ি হাত-পা চালাল। হাত-পা বাঁধা আদি অসহায়ের মতো সহ্য করল সেইসব।
যন্ত্রণায় শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছে আদির। তবু বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। কেন এমন করছে ত্রয়ণ? ওকে যখন দরকার পড়েনি তখন টাকা দেবে কেন? টাকা না পেয়ে ওকে মারছে ত্রয়ণ! তবে রাহির কথা আসছে কেন? আর কিগান? কিগানই বা এর মধ্যে এল কোত্থেকে?
‘শেষ করে দে শালাকে।’
আদি কেঁপে উঠল। মেরে ফেলবে? মেরে ফেলবে ওকে? কেন? কী করেছে ও? কেন মারবে? কষ্ট হচ্ছে আদির। ভয় লাগছে। ও কোনওমতে বলল, ‘প্লিজ আমায় মারবেন না। আমি তো কোনও ক্ষতি করিনি। প্লিজ।’
‘দালাল। পুঁজিপতিদের দালাল। আমাদের স্বার্থ মেরে ‘ক্ষতি করিনি’! জানোয়ার!’ অন্য একটা ছেলে এগিয়ে এল এবার। হাতে অদ্ভুত দেখতে একটা বন্দুক। দেশি পিস্তলের মতো। কাগজে এর ছবি দেখেছে আদি। তবে কি সত্যিই মারবে ওকে? আদির চোখে জল চলে এল। ও কী করবে? এ কী হচ্ছে? ও শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘মারবেন না। দয়া করে মারবেন না। আমায় মেরে কী হবে?’
‘শালার মুখে ন্যাকড়া মার। মার ন্যাকড়া,’ ত্রয়ণ ধমক দিল।
সঙ্গে সঙ্গে দু’জন এসে ন্যাকড়া গুঁজে মুখটা বেঁধে দিল আদির। আদি দেখল হলুদ হ্যাজাকের আলোয় ছেলেটা দেখছে ওকে। হাতের বন্দুকটা এখনও নামানো। চোখমুখ অসম্ভব শান্ত। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আদির চোখ দিয়ে জল বেরোতে লাগল। আর উপায় নেই। চোখ বন্ধ করে ফেলল আদি। আর তখনই দেখল মালিনীকে! একটা পাহাড়ি বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে রয়েছে মালিনী। হাওয়া দিচ্ছে, আর হাওয়ায় নরম চুল উড়ছে ওর।
দুম্। আদি মাথাটা নামিয়ে ফেলল। যন্ত্রণা হল কি? গুলিটা শরীরে ঢোকার ঠিক কতক্ষণ পরে যন্ত্রণা বোঝা যায়! এক মাইক্রোসেকেন্ড? না দুই? কিন্তু যন্ত্রণা হচ্ছে না কেন? এখনও কি এক মাইক্রোসেকেন্ড সময় পার হয়নি?
দুম্। এবার চোখ খুলল আদি। সামনের ছেলেটা মাটিতে পড়ে আছে, ছটফট করছে। আশপাশের ছেলেগুলো ছত্রভঙ্গ। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আর অন্ধকার বাইরেটায় অনেক পায়ের শব্দ। হল্লার শব্দ। আদি দেখল ত্রয়ণ নিচু হয়ে বন্দুকটা কুড়িয়ে নিমেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর পিছনের হ্যামারটা হাত দিয়ে টেনে হাতটা ওঠাল আদির দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে বাইরের থেকে সাদা বিদ্যুতের মতো কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ত্রয়ণের ওপর। তবু বন্দুকটা চলল। আদি বুঝল খুব গরম একটা ধাতু এসে ডুবে গেল ওর কাঁধের পেশিতে। রক্ত ছলকে উঠল। চেয়ার উলটে পড়ে গেল আদি। ওর মনে হল কে যেন ওর শিরায় পেট্রল ভরে তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
একটা গোলকের ভেতর শুয়ে আছে আদি। ওই ওপরে গোলকের আবছা হলদেটে ছিদ্র। আর তার ভেতর দিয়ে ভেসে আসা কথাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত শোনাচ্ছে। আরে, ওটা কার মুখ? ‘আদি, আদি,’ করে কে ডাকছে? দাদাভাই? আরও সব গলা কার? ছিদ্রটা ছোট হচ্ছে। আগুন ক্রমশ ছড়াচ্ছে শরীরে। আদিকে কি কেউ খুলে ফেলল চেয়ার থেকে? কেউ কোলে তুলল? এটা কীসের গন্ধ? মাস্ক? কে যেন এই গন্ধটা লাগায়? কার থেকে ছোটবেলায় গন্ধটা পেত ও? ছিদ্রটা বন্ধ হয়ে আসছে। সব কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কানে। ও না ভেবেছিল এবার সব ভুলগুলো ঠিক করে দেবে? তা হলে? সেটা কি আর হল না? তবে কি আর নতুন করে সব শুরু করা হল না? ওই তো পাহাড়ি বাংলোর বারান্দা। শূন্য। কে দাঁড়িয়েছিল যেন ওখানে? মালিনী? মালিনী তুমি কোথায়? গাছ চারদিকে। কুয়াশা রিবনের মতো জড়িয়ে রেখেছে গাছকে। তার ফাঁকে ফাঁকে বাঁক থেকে বাঁকে ঘুরে যাচ্ছে পথ। কে চলে যাচ্ছে সেই পথ দিয়ে? আবছা শরীরটা কার? হাঁটার ভঙ্গিটা যে খুব চেনা! কে যাচ্ছে ওই পথ দিয়ে? আচ্ছা, পথ কি শুধু চলে যাওয়ার জন্যই? ফিরে আসার জন্য কি নয়? তা হলে কেন চলে যায় সবাই? কেন ফিরে আসে না কেউ? মালিনী, তুমিও কি শুধু চলেই যাবে? ফিরে আসবে না আর? কোনওদিন ফিরে আসবে না?
Chapter - 34
৩৪
হোমির জন্মদিন আজ। ওর বাবা-মা বেশ অনেককে নেমন্তন্ন করেছে। এত বড় মেয়ের জন্মদিন নিয়ে যে এমন হুল্লোড় কেউ করতে পারে সেই নিয়ে হোমিকে খুব রাগিয়েছে রাহি। হোমি লজ্জা পেয়েছে। বলতে চেয়েছে যে, ওর ইচ্ছে নেই একদম। কিন্তু বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে এসব। কিন্তু রাহি জানে তা কিন্তু একদম ঠিক নয়। হোমির বেশ ইচ্ছে আছে। চোরা চাপা ইচ্ছে আর ভাললাগায় হোমি বেশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। আর তার কারণ যে শুধু জন্মদিন নয়, তাও জানে ও। এই জন্মদিনের ছুতোয় হোমির বাবার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে হোমির দেখা করিয়ে দেওয়াটাও একটা ঘটনা আজ। এটা অবশ্য আগে জানত না রাহি। গতকাল হোমি বলে ফেলেছে। তাও মুখ ফসকে। ছেলেটি গুজরাতে থাকে। ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। হোমির বাবা-মা চায় ওদের দেখাশোনা হোক।
গতকাল হোমি যখন এই কথাগুলো বলছিল, মা সামনে ছিল। ব্যস, আর যায় কোথায়? তারপর থেকে পিন আটকে যাওয়া গ্রামাফোনের মতো মা বলে চলেছে, ‘তুই কবে বিয়ে করবি? তুই কবে বিয়ে করবি?’
বিয়ে? বিয়ের কথা ভাবতেই পারে না রাহি। কেন কে জানে! কিন্তু পারে না একদম। এত বছরে, সেই সতেরো-আঠারো বছরের ওই ভুলটুকু বাদ দিলে ওর ভাল লেগেছে কিগানকে। কিন্তু পাশাপাশি এটা বুঝতেও অসুবিধে হয়নি যে, সেই ভাললাগাটার কোনও পরিণতি নেই। শুধু ভাল লাগাটুকুই তার সীমানা। কারণ, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি কাজের মাধ্যমে কিগান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, রাহির জন্য সে নয়। বিয়ে নিয়ে আর তাই ভাবাই হয়নি ওর।
মা তবু ঘ্যানঘ্যান করছিল। বলছিল, ‘মেয়েদের যৌবন, ঘাসের ডগায় শিশির। এই আছে, এই নেই। তোর কি কাউকে পছন্দ? থাকলে বল। আমরা দেখি।’
রাহি একসময়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে বাবার কাছে নালিশ করেছিল। বাবা তখন প্রায় ধমকের সুরে মাকে বলেছিল, ‘তখন থেকে এক কথা বলছ কেন বারবার? মেয়ে কি জলে পড়ে রয়েছে? ওর যখন ইচ্ছে বিয়ে করবে। তাতে যার সমস্যা হবে সে এসে আমায় বলুক।’
তারপর থেকে মায়ের মুখ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু মুখের মেঘ সরেনি একটুও। সারা সকাল থেকে দুপুর, আর এই বিকেল পর্যন্ত হাতে গুনে দশটা কথাও বলেনি ঠিকমতো। না, রাগ হয়নি রাহির। মা একটু এমনই। রাগ করলে দু’-একদিন কথা বন্ধ করে ভাববাচ্যে চলে যায়, তারপর আবার ঠিক ফিরে আসে। রাহি জানে কাল সকাল থেকে ঠিক হয়ে যাবে সব।
রাহি শাড়িটা দেখে নিল একবার। তাঁতের শাড়ি। একটু ভারী। পানিফলের ভেতরটার মতো রং, তার ওপর ঘন সবুজ পাড় আর তাতে জরির কাজ করা। বাবা যখন বাংলাদেশ গিয়েছিল নিয়ে এসেছে। মা রাগ করেছিল এমন সাদাটে রং দেখে। কিন্তু রাহির পছন্দ হয়েছে। হালকা রং ওর খুব পছন্দ।
শাড়িটা পরে বড় আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল রাহি। তারপর আয়নার পাল্লা খুলে সবুজ রঙের টিপ বের করে দুই ভুরুর মাঝে বসিয়ে দিল। এবার আইলাইনার।
আজ সাজতে ইচ্ছে করছে রাহির। না, হোমির জন্মদিনের জন্য নয়। আজ সাজতে ইচ্ছে করছে, কারণ ও জানে না আজকের পরে আর কোনওদিন ও দেখতে পাবে কিনা কিগানকে।
এতক্ষণে প্যাকিং হয়ে গেছে কিগানের। পাঁচটা নাগাদ গাড়ি আসবে। মালপত্তর চাপিয়ে বেরিয়ে যাবে ও। ট্রেনে গেলেই হয়তো সুবিধে হত। কিন্তু লটবহর নিয়ে এই বনগাঁ লাইনের ট্রেনে যাওয়াটা সমস্যার। তাই অফিস থেকে গাড়ির বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছে।
গত পরশুদিন প্রথম জানতে পেরেছিল রাহি যে, কিগান চলে যাচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু দাদা বলেছিল, ‘আমায় কিগানদা নিজে বলেছে।’
‘মানে?’ রাহির অবাক লেগেছিল খুব, ‘আমায় তো বলেনি!’
‘কাউকেই বলেনি। আমাকেও বলত না, নেহাত শশীবাবু কোম্পানির মানুষ, ওকে ইনস্ট্রাকশন দিতে গিয়ে বলে ফেলেছে যে, চলে যাচ্ছে কিগানদা!’
‘কেন যাচ্ছে? এত কিছুর পর কেন চলে যাচ্ছে কিগানদা?’ রাহির মনের ভেতরটা উলটোপালটা হয়ে যাচ্ছিল। অদ্ভুত শূন্যতা এসে ছড়িয়ে পড়ছিল শরীরে। মনে হচ্ছিল ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন ঝিঁঝি ডাকছে শরীরে।
চমক বলেছিল, ‘জানিসই তো মানুষটা কেমন। কিছু কি বলে? কিচ্ছু বলে না। আমি অনেক পীড়াপীড়ি করার পর বলল যে, নতুন চাকরি পেয়েছে। তাই যাচ্ছে। কে জানে! হয়তো মাইনে বেশি দিচ্ছে!’
চমক আর দাঁড়ায়নি। চলে গিয়েছিল। কিন্তু রাহির মন থেকে খুঁতখুঁতানি যায়নি। টাকা বেশি বলে চলে যাচ্ছে কিগান? শুধু টাকা বেশি বলে! এমন হয় নাকি? ও বিশ্বাসই করতে পারেনি। তাই সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ধরেছিল কিগানকে।
‘হ্যালো? বল,’ চারবার রিং হওয়ার পর ফোনটা ধরেছিল কিগান।
‘তুমি চলে যাচ্ছ?’ রাহি সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল।
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। তারপর কিগান বলেছিল, ‘হ্যাঁ রে। চলে যাচ্ছি।’
‘আমায় বলোনি তো?’ রাহির গলার ভেতর কষ্ট হচ্ছিল।
‘কাউকে বলিনি। আসলে হঠাৎ ঠিক হল তো!’
‘হঠাৎ ঠিক হল! মিথ্যে কথা বলছ কেন?’ রাহির কষ্টটা রাগ হয়ে বেরোচ্ছিল এবার।
‘খুব রেগে গেছিস, না?’ কিগান হেসেছিল।
‘আমি কেন রাগব? আমি কে যে, রাগ করব?’
‘শোন, আমায় যেতেই হত যে। আমায় যেতেই হবে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এভাবেই সারা জীবনটা কাটবে আমার। থিতু হওয়া আমার ধাতে নেই।’
‘আবার বাজে কথা! ভীষণ বাজে কথা বলছ তুমি। একদম এসব বলবে না।’
কিগান হেসেছিল, ‘ওরা টাকাটাও ভাল দেবে বলছে।’
‘আমায় বিশ্বাস করতে হবে এটা?’ রাহি বিরক্ত গলায় বলেছিল।
‘আচ্ছা, আমার টাকার দরকার নেই ভেবেছিস?’
‘বাজে কথা বোলো না। কেন যাচ্ছ তুমি?’
কিগান বলেছিল, ‘সবাইকেই যেতে হয় রে পাগলি। চলে যেতে সবাইকেই হয়। কারওটা চোখে দেখা যায়, কারওটা যায় না।’
‘রাখো তোমার ফিলোজফি। কাল যাচ্ছি তোমার ওখানে। মজা দেখাচ্ছি তোমায়।’
আবার হেসেছিল কিগান, ‘কাল সকাল সকাল আমি কলকাতায় চলে যাব। অফিশিয়াল কাজকম্ম আছে কিছু। তারপর একটু দেখা করব আদির সঙ্গে। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। পরশু দিন আসিস।’ কিগান আর কোনও সুযোগ না দিয়ে কেটে দিয়েছিল ফোনটা।
আজ সেই দিন। সকালে স্কুল ছিল রাহির। যেতে পারেনি। তাই এখন যাবে।
রাহি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, ‘মা।’
মা এল না, কিন্তু দীপা এল দৌড়ে, ‘কী হয়েছে?’
‘টিফিন বক্সটা তৈরি আছে?’ রাহি জিজ্ঞেস করল।
‘টিফিন বক্স!’ দীপা ধরতে পারল না ঠিক।
‘আরে কিগানদার খাবারটা। ট্রেনে করে যাবে, রাত্রে কী খাবে? মাকে বলেছিলাম।’ রাহি অধৈর্য গলায় বলল।
‘ও আচ্ছা,’ দীপা ঠোঁট কামড়াল, ‘আসলে তোর দাদার শরীরটা এত খারাপ হয়েছে যে, আমি ভুলে গেছিলাম রে।’
‘দাদার? দুপুরে তো বললি জ্বর কমেছে,’ রাহি অবাক হল।
গতকাল রাত থেকে হঠাৎ জ্বর এসেছে চমকের। অনেক জ্বর। সকালে ডাক্তারও এসেছিল বাড়িতে। ওষুধ খেয়ে দুপুরে জ্বর কমেছিল। কিন্তু আবার কী হল সেটা ঠিক বুঝতে পারল না রাহি।
‘আর বলিস না। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। অমন মানুষ যন্ত্রণার চোটে কেঁদে ফেলেছে পর্যন্ত। মা বসে আছে ওখানে।’
‘আর আমায় একটা খবর দিসনি!’ রাগ হল রাহির।
‘আরে ডাক্তারকাকুকে ফোন করেছিলাম। ওষুধ বলেছেন। খাইয়েওছি, কমতে সময় লাগবে। তবে কমবে।’ দীপা রাহির হাতটা আলতো করে ধরল, ‘তা ছাড়া তুই বেরোবি। কিগানদা চলে যাচ্ছে। তাই আর ডাকিনি তোকে।’
‘কী যে করিস না!’ রাহি রাগ করে দীপার হাতটা সরিয়ে দিল। তারপর জোর পায়ে হেঁটে গেল দীপাদের ঘরের দিকে। দীপাও পিছন পিছন হাঁটা লাগাল।
কিন্তু ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল রাহি। মা না দাদার ঘরে ছিল? রাহি দেখল চমকের ঘরের বাইরে কাচের টানা দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মা। তা হলে মা কী করছে দরজার বাইরে?
‘মা তুমি এখানে? দাদা একা রয়েছে নাকি ঘরে?’ রাহি অবাক হল।
‘না,’ মায়ের গলার সারা দিনের কাঠিন্য যেন আর নেই। মা বলল, ‘তোর বাবা আছে দাদার কাছে।’
‘বাবা!’ রাহির সঙ্গে সঙ্গে দীপাও অবাক হয়ে তাকাল। বাবা কী করছে চমকের ঘরে?
‘হ্যাঁ, চমকের জ্বর বেড়েছিল। আমি জলপট্টি দিচ্ছিলাম। তখন ঘোরের মধ্যে “বাবা বাবা” করে ডাকছিল ছেলেটা। ভাবলাম ওঁকে একবার ডেকে আনি। আজ তো কাজে বেরোয়নি। ডাকতে যাব বলে উঠেছি, দেখি তোর বাবা স্লাইডিং দরজাটা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেখি ছেলের ওই অবস্থা দেখে চোখ ছলছল করছে।’
‘বাবা!’ দীপা যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
মা কিছু বলার আগেই রাহি এগিয়ে গিয়ে স্লাইডিং পাল্লাটা ফাঁক করল সামান্য আর দেখল বাবা বসে রয়েছে বিছানায়। এক হাতে জলপট্টির কাপড়। অন্য হাত বুলিয়ে দিচ্ছে চমকের মাথার চুলে। আর চমক শান্ত হয়ে শুয়ে রয়েছে।
রাহি অবাক হয়ে দেখল দৃশ্যটা। দাদার তো বাবার সঙ্গে কথাই হয় না প্রায়। দু’জন তো সামনাসামনিই হয় না ঠিকমতো বহু বছর। যেন বোঝে অশান্তি লাগবে, তাই দু’জনেই দু’জনকে এড়িয়ে যায়। আর আজ জ্বরের ঘোরে বাবাকে খুঁজছে দাদা! আর বাবা এসে বসে রয়েছে দাদার কাছে! তা হলে? তা হলে সত্যি কোনটা? ঝগড়াটা না ভালবাসাটা? তবে কি সমস্ত বিভাজন আর বৈরিতার তলায় তলায় জল ঠিক জলের কাছেই পৌঁছোয়? ভালবাসা ঠিক ফুল হয়ে ফুটে ওঠে নির্দিষ্ট আবহাওয়ায়? মত, বিরুদ্ধ মতের বাইরে দাঁড়িয়ে কি মানুষ তা হলে ঠিক খুঁজে পায় তার সরল স্নেহ? বুঝতে পারে এই স্পর্শটুকুই সত্যি, বাকিটা ভান মাত্র, অভিনয় মাত্র?
রাহি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর প্রায় নিঃশব্দে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। কে জানে এর পর যখন চমক সুস্থ হয়ে উঠবে তখন আবার বাবার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হবে! কে জানে তখন আবার দু’জনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে কিনা।
যা খুশি হোক, যেমন খুশি হোক, তা বলে এই মুহূর্তটা তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না। এই দৃশ্যটা তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না। রাহি যেন বুঝল ভবিষ্যতে খারাপ হতে পারে ভেবে, মানুষ কত না সম্পর্কের থেকে পিছিয়ে আসে! কষ্ট পেতে পারে ভেবে সে কত না ভালবাসা হারায়। রাহি যেন বুঝতে পারল জীবনে হাতের কাছে এসে বসে থাকা মুহূর্তকে অবজ্ঞা করার মতো বোকামো আর কিছুই হয় না।
মা নরম গলায় বলল, ‘তোর বাবা যে চমককে কতটা ভালবাসে, ছেলেটা বুঝলই না।’
রাহি মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘সময় চলে গেছে মা? ঠিক বুঝবে, দেখো। আর দাদাও তো খুব ভালবাসে বাবাকে। না হলে কেউ জ্বরের ঘোরে অমন করে নাম ডাকে?’
‘কী জানি!’ মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘বুঝি না রে।’
রাহি হাসল, ‘কী হবে অত বুঝে? শুধু এই দৃশ্যটা দেখো।’
মা বলল, ‘তুই যা। ওদিকে ছেলেটার যাওয়ার সময় হল।’ তারপর দীপাকে বলল, ‘খাওয়ার টেবিলে টিফিন বক্সটা রাখা আছে, ওটা দিয়ে দাও রাহিকে।’
‘মা, আমি যাব? দাদা…’ রাহি ইতস্তত করল।
‘ওষুধ পড়েছে। দেখলি তো শান্ত হয়েছে এখন চমক। এখানে তোর কী কাজ? তুই থাকলে কি আর জ্বর আসবে না?’
‘তা হলে আমি কিগানদাকে এটা দিয়েই চলে আসছি।’
‘না,’ মা জোর গলায় বলল, ‘হোমি নিজে এসে বলেছে তোকে। ওর বাবা-মা এসে বলেছেন আমাদের। সেখানে আমরা যেতে পারছি না কেউ। তুই অবশ্যই যাবি।’
রাহি একবার দীপার দিকে তাকাল। মনে হল, দীপার তো খারাপ লাগতেই পারে।
দীপা হাসল, ‘যা তাড়াতাড়ি। কিগানদা না হলে বেরিয়ে যাবে। আর হোমির ওখান থেকে এসে বলবি ওর হবু বর কেমন হল। বুঝেছিস?’
জুনের তিরিশ তারিখ আজ। এবার বৃষ্টি হচ্ছে না বিশেষ। শুনছে নর্থ বেঙ্গলে বৃষ্টি হচ্ছে বেশ। কিন্তু সাউথ বেঙ্গল শুকনো।
পথে বেরিয়ে হাওয়ায় গরম ভাপ টের পেল রাহি। বাড়িতে এসি আছে বলে বোঝা যায় না যে, কতটা তেতে আছে পথঘাট। রাহি টিফিন বক্সটা নিয়ে গেটের দিকে এগোল। দেখল পুকুরে সাধুদা স্নান করছে।
আজকাল হঠাৎ ভগবানে ভক্তি হয়েছে সাধুদার। কণ্ঠি নিয়েছে। বিকেলের এই সময়টায় স্নান করে জপ করতে বসে। তারপর আবার লেগে যায় কাজে। সাধুদা রাহিকে দেখে হাত তুলল, ‘একা একা যাচ্ছ কোথায়?’
‘কিগানদার বাড়িতে যাব।’ রাহি পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল।
‘একা যাচ্ছ নাকি?’ সাধুদা তাড়াতাড়ি ঘাটের দিকে এগিয়ে এল।
‘হ্যাঁ, কেন?’ অবাক হল রাহি।
‘তোমায় বলেছি না সন্ধের পর একা বেরোবে না? এত বড় কাণ্ড ঘটে গেল আর তুমি…দাঁড়াও আমি যাচ্ছি।’ সাধুদা উঠে এল পুকুর থেকে।
‘সাধুদা!’ রাহি ছদ্ম রাগ দেখাল, ‘কী হবে আমার? তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?’
‘আরে, ভয় পাচ্ছ মানে? ভুলে গেলে কী হয়েছে?’ সাধুদা পরনের ধুতিটার নীচের অংশটা নিংড়ে এগিয়ে গেল পুকুর পাড়ের শেডটার দিকে।
‘আশ্চর্য!?’ রাহি এবার সত্যি রাগ করল, ‘কিচ্ছু হবে না আমার।’
‘সে তুমি জানলে কী করে? ওই জানোয়ারটা কী বলেছে তোমায় বলিনি?’
রাহি চুপ করে গেল। প্রসঙ্গটা ভীষণ অপ্রিয়। কিন্তু সত্যি।
সাধুদা বলল, ‘তুমি দু’মিনিট দাঁড়াও, আমি আসছি। একা তুমি এমন সময় বেরোবে না। শয়তানটা নেই, কিন্তু ওর চেলাচামুণ্ডাগুলো তো থাকতেই পারে। মানুষকে বিশ্বাস করি না। মানুষ যখন-তখন যা-খুশি তাই করতে পারে। তুমি দাঁড়াও একটু।’
সাধুদা যেভাবে দুদ্দাড় করে চলে গেল, সেই দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাহি। এই যে সবাই ওর জন্য দুশ্চিন্তা করে এসব তো হতই না যদি ও একটু সতর্ক হত।
রাহি মাঝে মাঝে ভাবে, জীবনটা যেন দাবা খেলার বোর্ড। এক-একটা ঘটনার গুরুত্ব, পরে কী সাংঘাতিকভাবে বোঝা যায়! সেই আঠারো বছর বয়সে কি ও বুঝতে পেরেছিল এক দিনের একটা ভুলের কত বড় মাশুল দিতে হবে ওকে!
হিস্ট্রির স্যার ছিলেন তিনি। লম্বা, গম্ভীর, চুপচাপ। একা থাকতেন। বিয়ে করেননি। উত্তরবঙ্গের এক ছোট্ট শহরে বাবা-মা থাকত স্যারের। অলক মাস্টারের নাম চাপাডাঙায় অল্পদিনেই ছড়িয়ে পড়েছিল। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বছরের মানুষটার ব্যবহারও ছিল খুব ভাল। ক্লাস টুয়েলভের মাঝামাঝি স্যারের কাছে পড়ার জন্য ভরতি হয়েছিল রাহি। স্যার প্রথমে নিতে চাননি। কিন্তু রাঘব চক্রবর্তীর মেয়ে শুনে নিমরাজি হয়েছিলেন। তবে রাহি দেখত স্যার কেমন যেন আড় হয়ে থাকতেন। ভাল করে কথা বলতেন না ওর সঙ্গে। পান থেকে চুন খসলে বেশ বকাবকি করতেন। রাহিকে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করতেন আর সুযোগ পেলেই এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে, রাহি ভাল ছাত্রী নয়। হয়তো জোর করে পড়াতে হচ্ছে বলে এমন হয়ে ছিলেন স্যার।
মাস দেড়েক পরে রাহিরও যেন কেমন রোখ চেপে গিয়েছিল। স্যার আমায় পাত্তা দেন না? সবার সামনে অপমান করেন? আমায় ছোট করার চেষ্টা করেন? দাঁড়াও, আমিও দেখিয়ে ছাড়ব।
অন্যান্য সব সাবজেক্টের চেয়ে হিস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি সময় দিতে শুরু করেছিল রাহি। পাগলের মতো খুঁটিয়ে টেক্সট পড়তে শুরু করেছিল। কোশ্চেন আনসার লিখতে শুরু করেছিল। কিন্তু তবু, স্যারও কঠিন থেকে কঠিনতর প্রশ্ন রাখতে শুরু করেছিলেন ওর সামনে। মাস দুয়েক পরে ব্যাপারটা যেন ডুয়েল হয়ে উঠেছিল। স্যার রাহিকে প্রশ্ন করে বিপদে ফেলবেন আর রাহি স্যারের যাবতীয় চেষ্টা পণ্ড করে দেবে! তারপর একদিন স্যার পরীক্ষা নিলেন।
প্রচণ্ড পড়াশোনো করে পরীক্ষা দিয়েছিল রাহি। মাথা গুঁজে গোটা সময়টা মন দিয়ে লিখেছিল শয়ে শয়ে বছর আগেকার রাজনীতি আর অর্থনীতির কথা। তারপর লেখা শেষ করে খাতা জমা দিয়ে ভীষণ আনন্দ হয়েছিল ওর। কারণ, ও জানত খুব ভাল পরীক্ষা দিয়েছে।
এরপর পুজো এসে যাওয়ায় পড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্যারও চলে গিয়েছিলেন নিজের বাড়ি। রাহিরাও চলে গিয়েছিল ঘুরতে, কুলু-মানালি।
ঘুরে টুরে চাপাডাঙায় ফিরে এক বান্ধবীর বাড়িতে ফোন করেছিল রাহি। কারণ, পড়া তো শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। আর অন্য সব পড়া বাদ দিয়ে রাহির বিশেষভাবে জানতে ইচ্ছে করেছিল ইতিহাসের যে-পরীক্ষা দিয়েছিল তাতে কী নম্বর পেল ও? কিন্তু বান্ধবীটির উত্তর শুনে আগুন জ্বলে গিয়েছিল মাথায়। স্যার সবার নম্বর বলেছেন কিন্তু রাহিরটা বলেননি। কারণ, রাহির খাতা নাকি হারিয়ে ফেলেছেন স্যার!
খাতা হারিয়ে ফেলেছেন! মামদোবাজি! এতদিন নানাভাবে জব্দ করার চেষ্টা করেছেন, সবার সামনে অপমান করেছেন আর আজ যখন ভাল পরীক্ষা দিয়েছে, যখন সবার সামনে প্রমাণ হয়ে যাবে যে, রাহি আসলে কত ভাল হিস্ট্রিতে, তখনই খাতা হারিয়ে ফেলেছেন! আজ স্যারেরই একদিন কী আমার একদিন। ফোনটা রেখে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল রাহি। স্যার ভেবেছেনটা কী যে, যা খুশি করবেন আর সবাই মেনে নেবে? কোন লাটসাহেব স্যার যে, সবসময় এমন রুড ব্যবহার করবেন?
দৌড়ে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল রাহি। মাথার আগুন পায়েও পৌঁছেছিল বোধহয়, না হলে অত জোরে কোনওদিন সাইকেল চালায়নি ও।
স্যারের পড়ানো ছিল না সেদিন। রাহি কোনওমতে সাইকেলটা রেখে পাগলের মতো ডোরবেল বাজিয়েছিল। একটু পরে দরজাটা স্যার নিজেই খুলেছিলেন, ‘তুমি!’
ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন স্যার।
‘আমার খাতা কই?’ স্যারকে প্রায় ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়েছিল রাহি।
‘অ্যাঁ! খাতা!’ স্যার হকচকিয়ে গিয়েছিলেন।
রাহি পড়ানোর ঘরে গিয়ে প্রায় লাফিয়ে পড়েছিল পড়ার টেবিলের ওপর। সাজিয়ে রাখা খাতা-বই লন্ডভন্ড করে খুঁজছিল ওর খাতা।
‘কী করছ তুমি?’ স্যার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
‘আমার খাতা কই? কোথায় আমার খাতা? আপনি আমায় অপমান করার জন্য নতুন চক্রান্ত করছেন, না? বের করুন আমার খাতা। বের করুন, নইলে কিন্তু খুব দুঃখ আছে আপনার কপালে।’
‘মানে?’ স্যার রেগে গিয়ে এক হ্যাঁচকা টান মেরেছিলেন রাহিকে, ‘তুমি আমায় শাসাচ্ছ? কী ভেবেছ তুমি? নিজেকে কী ভেবেছ?’
আচমকা হ্যাঁচকায় রাহি টাল সামলাতে না পেরে স্যারকে নিয়ে পড়ে গিয়েছিল মেঝের ওপর।
তারপর যে ঠিক কী হয়েছিল মনে নেই রাহির। শুধু মনে আছে স্যারের মুখে চুইংগাম ছিল। স্যারের হাত দুটো ওপর পিঠ বেয়ে আরও নীচের দিকে নামছিল। আর মনে আছে ও নিজে স্যারে ঠোঁট, বুক হয়ে চুমু খেতে খেতে নেমে গিয়েছিল বিপদসীমার কাছে।
বৈরিতা থেকে প্রেম আসে? নাকি শরীর আসে? কোনও গভীর মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ রয়েছে কি এর পিছনে? কেন, যে মানুষটাকে শিক্ষা দিতে ইচ্ছে করে তার সঙ্গেই এমন মিলেমিশে যায় মানুষ? তবে কি শুধু পড়াশোনার জন্যই অমন দম বেঁধে পড়ছিল না রাহি? তবে কি অবচেতনে ও স্যারের মনোযোগ চাইছিল? গম্ভীর, চাপা মানুষটা যে ওকে অবহেলা করছেন সেটা মন থেকে মানতে পারত না বলেই কি ও এমন করত? জানে না, কিচ্ছু জানে না রাহি। ও শুধু জানত যে, এই গম্ভীর চাপা মানুষটা আকর্ষণ করে, প্রচণ্ড আকর্ষণ করে ওকে।
পড়তে বসলে পড়া গুলিয়ে যেত ওর। শুধু স্যারের কথা মনে পড়ত। ওঁর পারফিউমের গন্ধ মনে পড়ত। ভাঁজপড়া থুতনিটা মনে পড়ত। আর তখনই ইচ্ছে করত সব ছেড়ে স্যারের কাছে চলে যায়।
স্যার প্রথম প্রথম বারণ করতেন। বলতেন, বয়সের পার্থক্যের কথা। বলতেন, লোক জানলে কী হবে। বলতেন, রাহির গোটা জীবনটা পড়ে রয়েছে সামনে। কিন্তু ঢেউয়ের মাথায় চড়ে যার সময় কাটে সে কি ভাবে পাড়ে বালি আছে, না পাথর আছে? রাহি তখন উড়ছিল। সময় পেলেই স্যারের কাছে চলে যেত। স্যারকে ছোঁয়ার চেষ্টা করত। স্যার বারণ করতেন প্রথম প্রথম। বলতেন একদিন ভুল হয়ে গেছে একটা, আর এসব না করাই ভাল।
কিন্তু কী যে ভূত চেপেছিল রাহির মাথায়! ও নিজের থেকে যেত স্যারের কাছে। সময় পেলে একদম স্যারের কোলে বসে দু’পা দিয়ে জড়িয়ে ধরত স্যারকে। স্যারও আর পারতেন না সামলাতে। ধীরে ধীরে সব বাধা কেটে গিয়েছিল। রাহি একদম জড়িয়ে পড়েছিল অলক স্যারের সঙ্গে। কেউ জানত না ব্যাপারটা। শুধু জানত ওরা দু’জন।
তারপর একদিন স্যার ক্যামেরা বের করেছিলেন একটা। চ্যাপটা, পাতলা, ডিজিটাল। বলেছিলেন, ‘তোমার ছবি তুলে রাখব আমার কাছে।’
‘ছবি!’ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল রাহি।
‘সম্পূর্ণ ছবি। বন্ধনহীন ছবি,’ স্যার ফিসফিস করে বলেছিলেন।
রাহিকে দু’বার বলতে হয়নি। সমস্ত পোশাক ছেড়ে রাহি দাঁড়িয়েছিল স্যারের সামনে।
ছবিগুলো স্যার নিজের কম্পিউটারে ট্রান্সফার করে নিয়েছিলেন ক্যামেরা থেকে।
রাহির পরে ভয় হয়েছিল। ও জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেউ যদি দেখে ফেলে?’
‘কেউ দেখবে না। আমার কম্পিউটারে কেউ হাত দেয়?’
‘তাও যদি কেউ দেখে ফেলে?’
স্যার হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দেব না।’
স্যার মারা গিয়েছিলেন সরস্বতী পুজোর দিন সকালে।
সেদিন স্কুলে গিয়েছিল রাহি। বান্ধবীরা সব ফিরছিল দুপুরে খিচুড়ি খেয়ে। রাহিও ছিল ওদের সঙ্গে। বড় রাস্তা থেকে যেই বাঁকটা নিতে হয় ওদের বাড়ির দিকে সেইখানে পৌঁছে রাহি দেখেছিল পিলপিল করে মানুষ ছুটছে বড় রাস্তা দিয়ে আরও সামনের দিকে। কী হয়েছে কিচ্ছু বুঝতে না পেরে রাহিরাও এগিয়ে গিয়েছিল।
ভিড় আর জটলাটা দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল রাহি। আর দেখতে পেয়েছিল ভিড়ের মাথা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্রাক। যার সামনের কাচ একদম চুরমার হয়ে গেছে।
কে মারা গেছে? ভিড় ভাঙার ক্ষমতা ছিল না রাহি বা তার বান্ধবীদের। কিন্তু স্বাভাবিক প্রশ্নটা তো আসছিলই মাথাতে। কিন্তু যাকেই জিজ্ঞেস করছিল সেই ঠিক উত্তর দিতে পারছিল না। সবাই ‘জানি না,’ ‘দেখি,’ ‘কেউ হবে একটা’-এসব বলে ভিড় বাড়াচ্ছিল আরও। ঠিক তখনই ভিড় থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটা ছেলে। রোগা, ফরসা, গালে হালকা দাড়ি। কণ্ঠার হাড়টা প্রখরভাবে বেরিয়ে পড়েছে।
ছেলেটা গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বলেছিল, ‘স্যার মারা গেছেন। রান ওভার কেস।’
‘স্যার? কে?’ রাহি জিজ্ঞেস করেছিল।
ছেলেটি গালে হাত দিয়ে থমকেছিল মুহূর্ত কয়েক। তারপর বলেছিল, ‘অলক স্যার। হিস্ট্রি পড়াতেন। সাইকেল করে যাচ্ছিলেন, ট্রাকটা…’
আচমকা আলো কমে এসেছিল রাস্তায়। হাওয়াও যেন মরে এসেছিল আচমকা। পাশে বান্ধবীর দিকে হাত বাড়িয়ে অবলম্বন খুঁজেছিল রাহি। কিন্তু হাত পৌঁছোনোর আগেই ঢলে পড়েছিল ও। পড়ে যেতে যেতে সংজ্ঞার শেষ বোধটুকু দিয়ে বুঝতে পেরেছিল দুটো সবল হাত ধরে ফেলেছে ওকে।
রাহির জ্ঞান ফিরেছিল বাড়িতে। বাবা-মায়ের উদ্বিগ্ন মুখ, দাদার কোঁচকানো ভুরু, এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সাধুদা-সবার ওপর চোখ ঘুরে অবশেষে আর-এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হালকা চাপ দাড়ি আর রোগা মতো ছেলেটার দিকে চোখে পড়েছিল রাহির।
‘এখন কেমন লাগছে?’ মা আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘ডাক্তার আসছে, তুই উঠিস না।’
রাহি কোনও কথা বলতে পারছিল না। শুধু কাঁদছিল। দু’চোখ ছাপিয়ে গরম জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল বালিশের দিকে। স্যার নেই? অলক স্যার আর নেই? এই ছিল, এই নেই? এমন হতে পারে! জীবনে সব কিছু এমনভাবে এক মুহূর্তে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে? পরশুই তো পড়া ছিল, আদর ছিল, ভালবাসা ছিল। আর আজ সব রাক্ষসের মতো একটা ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে শেষ হয়ে গেল? এত সহজ সব শেষ হয়ে যাওয়া? এত সামান্য এই জীবন?
ডাক্তার এসে দেখে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল রাহিকে। বলেছিল দুশ্চিন্তা না করতে। টেনশন না করতে। বাবা চিন্তিত হয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে দরজা অবধি গিয়েছিল। আর সেই সুযোগে মা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমার নাম কী গো?’
ছেলেটি ভুরু কুঁচকে, গালের দাড়িতে হাত বুলিয়ে গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘ত্রয়ণ।’
তারপর থেকে ত্রয়ণ সহজ হয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। ক্রমে জানা গিয়েছিল যে, দীপার কাজিন হয় ও। তবে দীপা তো তখনও বউ হয়ে আসেনি তাই দীপার ব্যাপারটা তখন আলোচনা হত না।
অলক স্যারের বাড়ি থেকে তাঁর বৃদ্ধ বাবা এসেছিলেন। ভদ্রলোক অদ্ভুত শক্ত ছিলেন ওই বয়সেও। ছেলের অমন আচমকা মৃত্যুতেও একদম সোজা হয়ে ছিলেন উনি। ত্রয়ণ আর বন্ধু-বান্ধবেরা সব মালপত্তর বেঁধেছেঁদে লরি বুক করে দিয়েছিল।
রাহি কেমন যেন অবশ আর মনমরা হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল গোটা জীবনটা শূন্য হয়ে গিয়েছে ওর। যেন কোথাও যাওয়ার নেই, কারও কাছে গিয়ে বসার নেই।
সেই সময় ত্রয়ণের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ে রাহির। ত্রয়ণ হেল্প করত নানাভাবে। বাড়িতেও কেউ বিশেষ কিছু বলত না এই নিয়ে। কারণ, সবাই দেখত যে, রাহি আবার হাসছে, আবার ফিরছে স্বাভাবিক জীবনে। তা ছাড়া চমক নিজেই তখন প্রশ্রয় দিত ত্রয়ণকে।
কয়েক মাসের মধ্যেই রাহি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল আবার। মনে হয়েছিল যেন অনেক আগের আবছা কোনও স্মৃতি এই অলোক স্যার। সবটাই যেন ধোঁয়া-কাচের অন্য দিক দিয়ে দেখা। আসলে ওই বয়সটাই অমন। তেলতেলে। কোনও কিছুই যেন আটকে থাকে না মনে। যেন যেটুকু চোখে দেখা যায় সেটুকুই পৃথিবী। যেটুকু হাতে ধরা যায় সেটুকুই নিজের। যেটুকু সময় পাওয়া যায় সেটুকুই জীবন। ত্রয়ণের সঙ্গে বন্ধুত্ব ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠেছিল রাহির।
এরই মধ্যে এইচএস দিয়েছিল ও। তারপর হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে ভরতিও হয়েছিল কলেজে। ত্রয়ণ তখন পার্টির সদস্য। সেই কলেজের জিএস। ফলে বন্ধুত্ব বেড়েই চলছিল ক্রমাগত। আর পরের বছর সরস্বতী পুজোর দিনই হঠাৎ কলেজে ত্রয়ণ প্রোপোজ করে বসেছিল রাহিকে!
রাহি এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আসলে ত্রয়ণ ওর ক্রাইসিসের সময় পাশে ছিল বলে ওর প্রতি একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ভাললাগা ছিল রাহির। কিন্তু সেটা কখনওই ভালবাসা নয়। ফলে ত্রয়ণের প্রোপোজালটা যথেষ্ট হকচকিয়ে দিয়েছিল রাহিকে। তবে, কী করবে, সে ব্যাপারে দ্বিধা ছিল না রাহির। ও ত্রয়ণকে স্বাভাবিকভাবেই ‘না’ বলে দিয়েছিল।
কিন্তু তারপরই ত্রয়ণ পাগলামো শুরু করে। ওর বাড়িতে এসে বসে থাকতে শুরু করে। রাস্তায় ওর সঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে জেদ করতে শুরু করে। রাহি প্রথমে ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিলেও পরে ওর বিরক্তি বাড়তে থাকে। আর তাই একদিন রাহি বিরক্তিটা প্রকাশও করে দিয়েছিল। কড়াভাবে ত্রয়ণকে বলেছিল দূরে থাকতে।
এরপর ত্রয়ণ চুপ করে যায় হঠাৎ। রাহি ভেবেছিল যে, ও বিরক্ত হচ্ছে বুঝতে পেরেই বোধহয় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ত্রয়ণ। ফলে মনে মনে স্বস্তি পেয়েছিল রাহি। ভেবেছিল, ‘যাক বাঁচা গেল।’ কিন্তু বাঁচা যে যায়নি, তা বুঝেছিল সপ্তাহ দুয়েকের মাথাতেই।
বাড়ি ফাঁকা ছিল সেদিন। বাবা-মা নেমন্তন্নে গিয়েছিল বনগাঁয়। আর সেই খবর পেয়েই বোধহয় দুপুরবেলা এসেছিল ত্রয়ণ।
ত্রয়ণকে সেদিন আর এলোমেলো দেখাচ্ছিল না। বরং ভাল জামাকাপড় পরে, দাড়ি সুবিন্যস্ত করে এসে বসেছিল বসার ঘরে। উপায়ন্তর না দেখে ভদ্রতাবশত রাহিও গিয়ে বসেছিল সামনে। বলেছিল, ‘তুমি? হঠাৎ এমন সময়?’
ত্রয়ণ শান্ত, গম্ভীর গলায় বলেছিল, ‘তোমার কাছে এসেছি।’
‘ও,’ বলে একটু থেমেছিল রাহি। তারপর বলেছিল, ‘কেন এমন করছ ত্রয়ণ? তোমায় তো বলেছি…’
‘অলক স্যার পেতে পারলে, আমি পেতে পারি না?’ ত্রয়ণ রাহির চোখে চোখ রেখেছিল।
‘মানে!’ কে যেন ইলেকট্রিকের চাবুক দিয়ে মেরেছিল রাহিকে। কী বলছে ত্রয়ণ! অলক স্যার!
ত্রয়ণ সামান্য হেসে একটা ব্রাউন খাম থেকে দুটো ছবি বের করে সাবধানে রেখেছিল রাহির সামনে। বলেছিল, ‘আমি এটা দেখাতাম না। ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাধ্য হলাম। অলক স্যার তোমায় পেলে আমি দোষ করলাম কোথায়?’
রাহি কোনও কথা বলতে পারছিল না। কাঁপছিল ভয়ে, লজ্জায়। সামনের ছবিগুলো অলক স্যারের তোলা। এগুলো কী করে হাতে গেল ত্রয়ণের? ও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ত্রয়ণ ছবিগুলো গুছিয়ে তুলে বলেছিল, ‘সবক’টা ছবি আমার কাছে আছে। স্যারের মালপত্তর প্যাক করে তোলার আগে কম্পিউটারটা ঘেঁটেছিলাম আমি। তখনই হঠাৎ এটা পেয়ে যাই। কেউ জানে না এর কথা। জানবেও না। শুধু আমি জানব। তবে তার পরিবর্তে আমাকে তোমার কাছে আসতে দিতে হবে। বুঝেছ?’
রাহির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সেদিন ত্রয়ণ ওর শরীরে হাত দিয়েছিল। রাহি চোখ বন্ধ করে সহ্য করেছিল ত্রয়ণের ঠোঁট আর হাতকে। তারপর ত্রয়ণ চরম সীমায় পৌঁছোতে গেলে রাহি কেঁদে ফেলেছিল। ত্রয়ণের পা জড়িয়ে ধরে বলেছিল যেন অমন না করে।
ত্রয়ণ হেসে সরে বসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘ঠিক আছে। অপেক্ষা করব আমি। তবে ওটা আমিই নেব কিন্তু। আর কেউ যেন না নেয়। কেমন?’
‘কেমন?’ শব্দটার ভেতরের প্রচ্ছন্ন হুমকি কান এড়ায়নি রাহির। ও মাথা নিচু করে নিয়েছিল। আর মনে মনে নিজের নির্বুদ্ধিতাকে দোষ দিচ্ছিল কেবল।
তবে তারপর থেকে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল রাহি। পারতপক্ষে ত্রয়ণের সঙ্গে একা থাকত না। অবশ্য ত্রয়ণও খুব বেশি জোর করত না। কখনও সখনও শরীরে হাত দেওয়া আর চুমুর সঙ্গে সেই কথাটা মনে করিয়ে দেওয়া। এভাবেই সময় কাটছিল। এর পর বেশ কয়েক বছরের জন্য পার্টি থেকে ত্রয়ণকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গে। সংগঠনের কাজে। আর রাহিও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল। তবে মনের মেঘ কাটেনি। কারণ, ছবিগুলোর ব্যাপার তো নিষ্পত্তি হয়নি পুরোপুরি। রাহির মনে হত কে জানে ত্রয়ণ কবে আবার নতুন রূপে হাজির হয়!
‘চলো,’ সাধুদা পোশাক পালটে এসে দাঁড়াল সামনে। হাতে সাধুদার বিখ্যাত বেতের হাতলওলা মোটা কাপড়ের ছাতা।
‘এ কী! ছাতা কেন?’ রাহি আশ্চর্য হল।
‘আষাঢ় মাস, বর্ষা আসবে যখন-তখন,’ সাধুদা গম্ভীর হল।
‘সাধুদা, এটা আষাঢ়ে গল্প হয়ে যাচ্ছে,’ রাহি হাসল, ‘গত সাতদিনে বৃষ্টি হয়েছে? আর আকাশ দেখো, একদম স্টেনলেস। তোমার বৃষ্টি কোথায় হচ্ছে? কার মাথায়? রেখে দাও ছাতা।’
সাধুদা হাসল, ‘হবে গো দিদি। আজ বৃষ্টি হবে। আকাশের গন্ধ দেখো না।’
রাহি হাসল, ‘তুমি কে গো সতীনাথ বন্দ্যো…?’
‘মানে!’ সাধুদা হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল।
‘সে আছে একজন। সে আকাশের গায়ে টকটক গন্ধ পায়।’
‘তাই?’ সাধুদা অবাক হল, ‘তা হবে। পৃথিবীতে কতরকম লোক আছে! কম তো দেখলাম না! এই দেখো না, কিগান। যেমন অদ্ভুত নাম, তেমন অদ্ভুত মানুষ। ভালই কাজকম্ম করছিল। তারপর কী হল, হঠাৎ করে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কোথায় না কোথায় যেন চলল। তা কোথায় যাচ্ছে বলো তো?’
‘কোথায় যাচ্ছে তা তো এগজ্যাক্টলি বলতে পারব না। তবে চলে যাচ্ছে।’
সাধুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘সত্যিই তো, কে আছে ওর! থাকার মধ্যে ওই আদিত্য আর কাকু-কাকিমা। আজকালকার দিনে আত্মীয় মানেই তো বিষ। বিষাক্ত। তাদের এড়িয়ে চলাই হয়তো ভাল।’
রাহি জানে সাধুদা কেন এইসব বলছে। সেদিন গুলি লাগা অবস্থায় আদিত্যকে প্রথমে ওদের বাড়িতে আনা হয়েছিল তারপর ওদের গাড়ি করেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বারাসত হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা হওয়ার পর আদিকে ট্রান্সফার করা হয়েছিল কলকাতায়। তবে সেইটুকু সময়ের ভেতর যতটুকু জ্ঞান ফিরেছিল আদিত্যর সেই গোটা সময়টাতেই ও কিগানের উদ্দেশে নানারকম কথা বলে যাচ্ছিল জড়িয়ে জড়িয়ে। তাতে যা বোঝা গেছে সেখান থেকেই মানে করে কথা বলছে সাধুদা। তবে আদিত্য আরও কিছু বলছিল যা রাহি শুনেছে। ওদের বসার ঘরের সোফায় শুয়ে থাকা অবস্থায় আদি বলছিল, ‘দাদাভাই আমি পারিনি…ওই মেয়েটা মিথ্যে…আমি…দাদাভাই আমার ভুল…’
কিগান দ্রুত কথাটাকে ঢেকে দিয়েছিল অন্য কথা দিয়ে। কিন্তু রাহির মনে খচখচ ভাবটা থেকেই গিয়েছে। কিগানকে ওর চিরকাল ছায়ার মানুষ মনে হয়। এই বয়সে এমন একা থাকতে কাউকে দেখেনি রাহি। আর নিজের সম্বন্ধে তো বলতেও চায় না কিছু। তবু সেদিন আদির কথার ফাঁকফোকর দিয়ে মাথা বের করেছিল রহস্যময় কিছু। কী সেই রহস্য? রাহি জানে, এ আর জানা যাবে না কোনওদিন।
সাধুদা বলল, ‘ওই দেখো পশ্চিম আকাশে কেমন মেঘ ঘনাচ্ছে।’
রাহি দেখল সত্যিই তাই। সাধুদা সতীনাথ বন্দ্যো নয় তো?
সাধুদা বলল, ‘সেদিনও এমন মেঘ করেছিল না? সেদিনই তো শেষ বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর দেখো আজ হবে।’
রাহির ভেতরটা কেঁপে উঠল সেদিনের কথা চিন্তা করে। ত্রয়ণ যে এতটা যেতে পারে ও কোনওদিন বুঝতে পারেনি। আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল অন্যভাবে।
‘হেল্প আর্থ’-এর অফিসে একদিন একাই ছিল রাহি। তখন ত্রয়ণ এসে ঢোকে আর শাসিয়ে বলে যে, এবার জমিটা মার্চেন্টের নামে লিখে দিতে হবে রাহিকে। আর রাহি ওর কথা না শুনলে সেইসব ছবি পোস্টারের মতো মারবে চাপাডাঙার দেওয়ালে। ত্রয়ণ চারদিন সময় দিয়েছিল এই কাজটা করার জন্য। খুবজোর মিনিট পাঁচেক ছিল ত্রয়ণ, কিন্তু সেটুকুতেই ভেতরে ভেতরে নাড়িয়ে দিয়েছিল রাহিকে।
ত্রয়ণ বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই ঢুকেছিল আবেশ। ও শিস দিয়ে কিছু একটা গাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রাহিকে হতভম্ব অবস্থায় বসে থাকতে দেখে শিস বন্ধ করে ঘাবড়ে গিয়েছিল খুব। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এমন করে বসে আছ কেন?’
‘কিছু না,’ রাহি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আবেশ চেয়ার টেনে সামনে বসে তাকিয়েছিল রাহির দিকে। তারপর চাপা গলায় বলেছিল, ‘একটা কথা বলব, অভয় দাও যদি।’
‘অভয়!’ রাহি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
‘দেখো, আমি জানি ত্রয়ণ তোমায় কিছু নিয়ে একটা ব্ল্যাকমেল করছে। আমি ওকে এখান থেকেও বেরোতে দেখলাম। না, না, আমায় কিছু বলতে হবে না। তবে আমার মনে হয় জমিটার কেসে ও তোমায় চাপ দিচ্ছে। মার্চেন্টের লোকজন যে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করছে তা তোমার দাদার বন্ধুদের থেকে আমি জেনেছি। নানা কথা হওয়ার পরও মার্চেন্ট তো ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট, কিচ্ছু করছে না। ফলে ওরা অন্য পথ যে ধরবে সেটা গেস করাই যায়। আমি এটাও জানি যে, ওই জমিটা তোমার নামে আছে।’
রাহি কোনও কথা বলতে পারছিল না। আবেশ ওর বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে যা বলছে তা একদম ঠিক। কিন্তু সেই নিয়ে তো বেশি কিছু বলতেও পারছিল না ও।
আবেশ বলেছিল, ‘শোনো রাহি, তোমার দাদাকে এই নিয়ে খুলে বলো। আর ত্রয়ণ কিছু করার আগে তুমি জমিটা মার্চেন্টকে দেওয়ার বন্দোবস্ত করো। তোমার বাবাকে বলো, বোঝাও। ডু এনিথিং। আমার কাছে খবর আছে যে, ত্রয়ণের কিন্তু অ্যান্টিসোশ্যাল এলিমেন্টদের সঙ্গে দহরম মহরম বাড়ছে। ফলে ও কিন্তু সাংঘাতিক মাল। যা করবার তাড়াতাড়ি করো।’
রাহি সে রাতে ঘুমোতে পারেনি। ভয়ে দুশ্চিন্তায় কাঁটা হয়ে ছিল একদম। চমককে যে কিছু বলা যাবে না সেটা একদম নিশ্চিত। বাবা-মাকে বলাও আউট অব কোশ্চেন। তা হলে? কাকে বলবে রাহি? বাবাকে বলে জমিটা দিতে পারেই ও। কিন্তু ওই ছবিগুলো নিয়ে যদি একের পর এক ব্ল্যাকমেল শুরু করে ত্রয়ণ? বাঘ একবার রক্তের স্বাদ পেয়ে গেলে কি আর ছাড়বে? নিজেকে অতি কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছে ও, কিন্তু এবার যে অন্যদিকে হাত বাড়াতে শুরু করেছে ত্রয়ণ। এই লোভের হাত কোথায় গিয়ে থামবে?
সারারাত জেগেই কাটিয়েছিল রাহি। একদম ভোরের দিকে পায়ে পায়ে উঠে গিয়েছিল ছাদে। পূর্ব দিক লাল হচ্ছিল সবে। অল্প অল্প করে মাথা তুলে পৃথিবীর এই অংশের দিকে তাকাচ্ছিল সূর্য। আর সেই আলোর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক শান্তি পেয়েছিল রাহি। ছাদ থেকে দেখেছিল পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে সাধুদা মন্ত্রোচ্চারণ করছে। হাতে জল নিয়ে তা অর্পণ করছে অর্কদেব-এর উদ্দেশে। আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকের মতো কথা বলার লোকটার নাম মাথায় এসেছিল রাহির। অর্ক, কিগান অর্ক ব্যানার্জি।
সকাল সাড়ে আটটায় ফ্যাক্টরিতে যায় কিগান। সেটা রাহি জানত। ও দেরি না করে সাতটা নাগাদ চলে গিয়েছিল কিগানের বাড়িতে। কিগান তখন সবে দাঁত ব্রাশ করে উঠেছিল। কাঁধে তোয়ালে আর সারা মুখে জল নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাহিকে দেখে অবাক হয়েছিল কিগান, ‘তুই? আশ্চর্য তো! এত সকালে কী করছিস?’
রাহি এতটা পথ এলেও কিগানকে দেখেই কেমন যেন পা কাঁপছিল ওর। আগের দিনের থেকে চেপে রাখা যন্ত্রণা আর মানসিক কষ্ট কেমন যেন অবশ করে দিচ্ছিল ওকে। তার ওপর ছিল সারারাত ঘুম না হওয়া। কোনওমতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কিগানের ঘরে গিয়ে চেয়ারে প্রায় অবশ হয়ে বসে পড়েছিল রাহি।
‘কী হয়েছে রে?’ কিগান ঘরে এসে চেয়ারের হাতল ধরে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসেছিল।
‘কিগানদা আমার খুব বিপদ,’ রাহি কোনওমতে কথাটা বলে দু’হাতে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলেছিল।
‘বিপদ!’ কিগান থতমত মুখ করে বিছানায় উঠে বসেছিল।
সময় নিয়েছিল রাহি। মিনিট পাঁচেক সময় নিয়েছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমি কথাটা কোনওদিন কাউকে বলতে পারব না। বাড়ির কেউ জানলে আমায় কেটে ফেলে দেবে।’
‘মানে?’ কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রাহির দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তো আমায় বলছিস কেন?’
কেন কিগানকে বলছে? সত্যিই তো হঠাৎ কিগানকেই বা বলছে কেন? এত লোক থাকতে হঠাৎ কিগানকে বা বলছে কেন? জানে না, কিচ্ছু জানে না রাহি। আসলে জীবনে সব কি আর লজিক দিয়ে মাপা যায়? সব কিছুর পিছনে কি আর ভয়ংকর অঙ্ক থাকে? কিছু জিনিস এমনিই হয়, আপনা থেকে জন্মায়, মনে আসে হঠাৎ করে। তার কোনও তেমন কঠিন লজিক থাকেই না। এটাও তেমন। কিগানের নাম ওই সূর্যোদয়ের সময় কেন মনে এসেছে তা জানে না রাহি। শুধু জানে যে, মনে এসেছে।
রাহি বলেছিল, ‘আমি জানি না কেন তোমায় বলছি। কিন্তু তুমি কি শুনবে না?’
‘নিশ্চয়ই শুনব,’ কিগান হেসেছিল, ‘তুই টেনশন বাদ দিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল।’
তার পরও সময় নিয়েছিল রাহি। মনে মনে গুছিয়ে নিয়েছিল সব। তারপর বলেছিল।
কিগান সব শুনে মাথা নিচু করে বসেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, ‘তুই শিয়োর আর কেউ এসব জানে না? মানে ত্রয়ণ বাদ দিয়ে আর কেউ জানে না?’
‘তাই তো মনে হয়। মানে সত্যিই বলছি আমার ধারণা আর কেউ জানে না।’
‘হুম,’ কিগান ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করেছিল।
‘আমি তখন সত্যিই বুঝতে পারিনি কিগানদা যে, এর ফলে আমায় এত কিছু অশান্তি পোহাতে হবে। আমি যে কী ভুল করেছি! আমি…’ রাহির গলা ভিজে এসেছিল আবার।
‘শোন, ওসব আর ভাবিস না।’
‘অতীতটাকে যদি পালাতে পারতাম! এত আফশোস হচ্ছে,’ রাহি দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছিল।
‘শোন রাহি, অতীত না থাকলে আমরা থাকতাম না। আমাদের জীবনে যা-কিছু ঘটে গেছে জানবি সব কিছুর প্রভাব এই সময়টাতে আছে। ফলে এসব চিন্তা করে আর নিজেকে বিপাকে ফেলিস না।’
রাহি কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে।
কিগান বলেছিল, ‘গৌর স্যার, মানে আমাদের এমডি তোর বাবার সঙ্গে একটু রুড হয়ে গিয়েছিলেন এই জমিটা নিয়ে আলোচনায়। বিচ্ছিরিভাবে টাকা অফার করেছিলেন। এই জমিটা তোর বাবা, মানে কাকুর প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে গেছে এখন। যদি গৌর স্যার এসে কাকুর সঙ্গে কথা বলেন, যদি একটা সমঝোতা করা যায় তবে কি জমিটা মার্চেন্ট পেতে পারে?’
‘দেখো, জমিটা আমার নামে হলেও বাবার কথাই শেষ কথা।’
‘জানি রে,’ কিগান বলেছিল, ‘ঠিক আছে আমি গৌর স্যারের সঙ্গে কথা বলব। তুইও কাকুর সঙ্গে বলিস। ফ্যাক্টরিটা হলে সব স্থানীয় লোক কাজ পাবে। তার ডাউনস্ট্রিম হিসেবেও দেখবি টুকটাক নানা লোকের রোজগার বাড়বে। কাকুকে এগুলো বোঝাতে হবে। আর হ্যাঁ, গৌর স্যার যা ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন সেটা মেটাতে উনি নিজেই আসবেন।’
‘আসবেন! উনি এলে বাবা না করবে না বোধহয়।’ রাহি বলেছিল।
‘ম্যানেজমেন্টের গুঁতো খেয়েছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কাজটা হ্যাম্পার হচ্ছে। প্রজেক্ট ডিলে হচ্ছে। গৌর স্যারকেও তো চাকরি বাঁচাতে হবে, নাকি? দু’বছরের ওপর প্রজেক্টটা ঝুলে আছে। নট আ নাইস থিং ফর গৌর রওশন দিওয়ান। জমিটা কাকু যদি নিজের থেকে দিয়ে দেন তা হলে ত্রয়ণটা অন্য কিছু করতে পারবে না।’
‘কিন্তু যদি করে? ছবিগুলো তো ওর কাছে আছে।’
কিগান বলেছিল, ‘এতদিন এই অঞ্চলে আছি। আমিও তো দু’-চারজনকে চিনি। দেখি। আজ সন্ধেবেলা ত্রয়ণের বাড়ি যাব একবার।’
‘তুমি কী করবে কিগানদা? তোমার কিছু বিপদ হবে না তো?’
‘বিপদকে সবসময় ভয় পেলে চলে না রে মেয়ে। আর একটু-আধটু বিপদ সামলাতে জানি। তুই ভাবিস না।’
‘ত্রয়ণের সঙ্গে খারাপ লোকদের যোগাযোগ আছে। ওরা যদি তোমার ক্ষতি করে?’
‘দুর, ওসব কিচ্ছু হবে না,’ কিগান হেসেছিল, ‘ত্রয়ণের মোবাইল নম্বরটা শুধু আমায় দে একবার।’
মোবাইল নম্বরটা দিয়ে রাহি উঠে পড়েছিল, ‘সত্যিই কিছু হবে না তো?’
‘পাগলি। কিচ্ছু হবে না। তুই নিশ্চিন্তে স্কুল কর। আর রাতে কাকুকে একটু বোঝাস।’
রাতে বাবার সঙ্গে কথা বলেছিল রাহি। বাবা তো প্রথমে শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী ব্যাপার বল তো? জমিটা নিয়ে তুই কী বলছিস?’
‘আমি চাই সবটা না হলেও মার্চেন্ট মাল্টিপল্সের দরকার মতো জমি তুমি দাও বাবা। এই অঞ্চলে একটা প্লাস্টিকের কারখানা আর একটা স্পিনিং মিল গত ছ’মাসে বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষজন কী করবে বলো তো? তুমি জমিটা দিলে ফ্যাক্টরিটা হয়। মানুষগুলো কাজ পায়।’
‘তুই ভুলে গেলি ওই মার্চেন্টের গৌর বলে ভদ্রলোক কেমন অসভ্যের মতো কথা বলেছিল? টাকা কি আমার নেই? অমন করে টাকা নিয়ে কথা বলে যে, তার সামনে আমি আগে যাব? রাঘব চক্রবর্তীর কি এই দশা হয়েছে?’
‘বাবা, আমি জানি সবটা। কিগানদা বলছিল গৌর অনুতপ্ত। ও এসে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। গৌর এলে তুমি বারণ করবে না তো?’
বাবা হেসেছিল, ‘ও, এসব তা হলে তোর আর কিগানের মাথায় এসেছে! না, আমি এখনও অত অসভ্য হইনি যে, মানুষ দেখা করতে চাইলে দেখা করব না। বুঝেছিস?’
তারপর যে কী হল স্পষ্ট জানে না রাহি। শুধু সেদিন রাতে কিগান মেসেজ করে জানাল যে সব ঠিক আছে। ত্রয়ণকে সামলানো হয়েছে। আর যেন দুশ্চিন্তা না করে। রাহি জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কিগান কিচ্ছু বলেনি। শুধু জোর দিয়ে বলেছিল রাহি যেন আর দুশ্চিন্তা না করে।
এর সাতদিনের মাথায় গৌর রওশন দিওয়ান এসে দেখা করেন বাবার সঙ্গে। তার দু’দিনের মাথায় সুধাদি আসে বাড়িতে। তার পরের দিন রাহিকে সই করতে হয় কিছু পেপারে। আর এরপর এক বিকেলবেলা হঠাৎ প্রচুর মিষ্টি আর উপহার ওদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন গৌর রওশন দিওয়ান! চাপাডাঙার চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে যায় যে, রাঘব চক্রবর্তী গ্রামের উন্নয়নের জন্য জমি দিয়েছে। আর অন্য এক দিকে খবর ছড়ায় যে, আদিত্য ব্যানার্জির মধ্যস্থতায় সব হয়েছে।
আর ত্রয়ণ যেন উবে গিয়েছিল পুরো ঘটনাটার থেকে। যেন ত্রয়ণ বলে কেউ ছিলই না এই চাপাডাঙায়।
রাহির খুব অবাক লাগে এখনও। পুরো ব্যাপারটা করল কিগান আর সেখানে ওর নাম পর্যন্ত এল না! জানলই না কেউ! আর সেই মানুষটা এইসব করে দিয়ে আচমকা চলে যাচ্ছে! কেন যাচ্ছে? এমন নির্বিকার, গাছের মতো বিক্রিয়াহীন মানুষ হয় নাকি? এমন আড়ালে থাকা, ছায়ার মতো বেঁচে থাকতে পারে কেউ?
কিগানদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে গাড়িটা। কোম্পানির গাড়ি। পিছনের ডিকিটা খোলা। তাতে মালপত্তর তুলছে আবেশ। সাধুদা দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানেই। মালপত্রেও হাত লাগাল। আবেশ এসেছে! অবশ্য আসবে যে সেটাই স্বাভাবিক।
আবেশ বলল, ‘এত লেট করলে! কিগানদা তো এই বেরোবে এবার।’
‘এত তাড়াতাড়ি?’ অবাক হল রাহি।
‘তা একটু তাড়াতাড়ি বটে। কিন্তু একবার ওদের অফিসে যাবে। কীসব পেপারে এখনও সই করার আছে। যাক গে তুমি তাড়াতাড়ি যাও।’ আবেশ আবার মন দিল মালগুলো গাড়িতে সেট করায়।
‘তুমি স্টেশনে যাবে?’ রাহি জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, তারপর কলকাতায় রাত কাটিয়ে কাল ফিরব। আসলে বস্তির স্যানিটেশনের জন্য যে-প্রকল্পটা জমা দেওয়া হয়েছিল মিউনিসিপ্যালিটিতে সেটার জন্য যেতে হবে একবার। কাল কলকাতা থেকে একদম ওদের অফিস হয়ে তারপর আসব।’
রাহি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। ‘হেল্প আর্থ’ এখন স্যানিটেশন প্রজেক্টটা নিয়ে কাজ করছে। আর আবেশ খুব খাটছে সেখানে। ছেলেটা অদ্ভুত ভাল কাজ করছে। বাবা বলছিল আবেশ চাইলে বাবার ব্যাবসাতেও কাজ করতে পারে। কিন্তু আবেশের যে এই কাজ কী এত ভাল লাগে!
রাহি টিফিন বক্সটা নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে দেখল আকাশটা আরও কালো করে এসেছে। যে ক’দিন বৃষ্টি হয়নি তার শোধ এবার তুলবে হয়তো প্রকৃতি।
ঘরের দরজায় গিয়ে থমকে দাঁড়াল রাহি। রুহান! দরজার দিকে পিছন করে বিছানার ওপর ঝুঁকে কিছু একটা করছে। বহু বহু দিন পর দেখল ওকে। সেই যে এসএমএস করেছিল আসবে বলে, তারপর এই দেখল। কোথায় ছিল ছেলেটা?
‘রুহান?’ রাহি ডাকল।
‘অ্যাঁ?’ কিছুটা চমকে উঠে ঘুরল রুহান।
‘তুমি?’ অবাক হল রাহি।
‘হ্যাঁ, কিগানদার সঙ্গে যাব তো। তাই এলাম।’
‘কেমন আছ?’ রাহি হাতের টিফিন বক্সটা টেবিলে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসল।
‘আছি আমি। ঠিক আছি,’ উজ্জ্বলভাবে হাসল রুহান।
‘আর তো আসোই না।’
‘আসি তো। ফ্যাক্টরিতে কাজ হচ্ছে সিভিলের। তার জন্য তো প্রায়ই আসতে হয়।’
‘আমার সঙ্গে দেখা করো না তো!’ রাহি অভিমানী গলায় বলল।
‘তা ঠিক,’ রুহান আমতা আমতা করল, ‘আসলে… মানে, এখানেই এত কাজ থাকে আর যেটুকু সময় পাই তাতে…মানে…’
‘ও এখন কোচ হয়েছে জানিস,’ বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে হাসল কিগান।
‘মানে! ও তো খেলত! আর এখন কোচ?’
‘হ্যাঁ, কিছু ছেলেপিলেকে ক্রিকেট শেখায়। বিনি পয়সার কোচ। ছেলেগুলোর আর্থিক অবস্থাও ভাল নয়। ওরা সব একসঙ্গে খেলে। টুর্নামেন্টেও যায়। দারুণ ব্যাপার। ওর সময় কোথায়?’
‘ধ্যাৎ,’ রুহান হাসল। পরিষ্কার, খোলা হাসি। বলল, ‘আমি এই ব্যাগটা নিয়ে নীচে যাচ্ছি। তুমি এসো কিগানদা।’
রাহি টিফিন বক্সটা দেখিয়ে বলল, ‘ওতে খাবার আছে। মা দিয়েছে। নিয়ে যাও প্লিজ। দাদার তো জ্বর, তাই আসতে পারল না।’
‘ও, চমক অসুস্থ? আমি একবার দেখে যাব?’ কিগান উদ্বিগ্ন হল সামান্য।
‘কেন?’ হঠাৎ রাগ হল রাহির। ও থামল। রুহান বেরিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল। তারপর বলল, ‘কেন দাদাকে দেখতে যাবে তুমি? আমরা তোমার কে হই? কে হই আমরা তোমার?’
‘আরে, পাগলি, তুই রাগ করছিস কেন?’ কিগান হাসল।
‘কেন যাচ্ছ তুমি কিগানদা? কেন চলে যাচ্ছ? আর চলে যে যাবে তা তো কাউকে বলোনি? কেন বলোনি? কেন?’
‘আমায় তো যেতেই হত রাহি।’
‘কেন? কেন কিগানদা? আমি তোমায় আমার সব কথা বললাম আর তুমি সব ছেড়ে চলে যাচ্ছ সেটা বললে না একবারও? তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? এমন সরে থাকো কেন? এতে কী আনন্দ পাও? এটা কি বীরত্বের খুব?’
‘খুব রেগে আছিস যে! শোন রাহি, আমারও জীবনে কিছু ঘটনা আছে, কিছু কষ্ট আছে। কলকাতা ছেড়ে সেটা এখানেও এসে পড়েছে। তাই আমায় যেতেই হবে এবার। যেতেই হবে।’
‘কী কষ্ট কিগানদা? আমায় বলো,’ রাহি করুণ গলায় বলল।
কিগান হাসল, ‘বাদ দে রাহি। আমি যাচ্ছি, কিন্তু যোগাযোগ তো থাকবে।’
‘এগজ্যাক্টলি যাচ্ছটা কোথায়?’
‘পাহাড়ে। রাবাংলা। ওখানে একটা পার্টিকল্ বোর্ডের ফ্যাক্টরি হয়েছে। সেখানে যাব। আমায় এজিএম প্রোডাকশন করে নিয়ে যাচ্ছে।’
‘ও,’ রাহি মাথা নিচু করল। কষ্ট হচ্ছে গলায়। চোখ উপচে জল আসছে।
‘শোন, ত্রয়ণ এখন জেলে। ভাল কেস খেয়েছে। ভয় পাস না। কিছু হবে না। আর প্রয়োজন হলে আমায় ফোন করিস। চলে আসব।’
‘তুমি আমায় ভুলে যাবে কিগানদা?’ রাহি কেঁদে ফেলল।
‘রাহি মানে জানিস? পথিক। এমন কাঁদিস না। যে পথিক হয়, তাকে বহু দূর যেতে হয়। তোর স্কুল, তোর কাজ, সব নিয়ে তুই ভাল থাকিস। মনখারাপ করিস না। জানিস, জীবন কিন্তু একটা, এটার দাম দিস। কদর করিস। খারাপ হতে, খারাপ করতে তো এক সেকেন্ড লাগে। বুঝলি? চল আমায় যেতে হবে এবার।’ কিগান উঠল।
‘তুমি আমায় ভুলে যাবে?’
কিগান হাসল। তারপর বাঁ হাতটা তুলে কবজিটা দেখাল। রাহি অবাক হয়ে দেখল ওর দেওয়া সেই ঘড়িটা!
কিগান বলল, ‘ভুলব কী করে বল? আমার স্মৃতি আমার শত্রু। তাই তো আমায় পালিয়ে বেড়াতে হয়। তাই তো যাযাবরের মতো ঘুরতে হয় আমায়। বুঝলি?’
গাড়ির পিছনের সিটে বসে জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল কিগান, ‘কাঁদবি না। একদম কাঁদবি না। আমি তো আছি রে। তুই যখনই আমার কথা ভাববি, জানবি আমি তখনই আছি। সশরীরে থাকার চেয়ে মনে থাকাটা বেশি জরুরি, জানিস তো?’
‘তুমি কার জন্য চলে যাচ্ছ?’ রাহি শেষবারের মতো চেষ্টা করল।
‘আমার জন্য। আসি রে রাহি। বুঝলি? যাচ্ছি না কিন্তু, আসছি।’
গাড়িটা ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল দূরে। সন্ধে নামছে এবার। মেঘ করেছে বলেই হয়তো একটু তাড়াতাড়ি নামছে। সাধুদার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতে লাগল রাহি। না, যাবে না হোমিদের বাড়ি। যেতে পারবে না ও। ইচ্ছেই করছে না। জোর করে কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করছে না। তাতে মা বকলে, বকুক। হোমি রাগ করলে, করুক। রাহি শূন্য রাস্তাটার দিকে তাকাল আবার। এই দু’বছরে কী হল ওর জীবনে? আদৌ কিছু হল কি? কিছু মুহূর্তরা বেঁচে থাকল শুধু। কোথাও পৌঁছোল কি রাহি? কিছু সম্পূর্ণ করল কি? কিছুই তো করল না। শুধু এক সময় থেকে হাঁটতে হাঁটতে অন্য সময়ের মধ্যে চলে এল যেন। পথিক কি পৌঁছোনোর জন্য পথে বেরোয়? গন্তব্যেই কি মানুষের আনন্দ? নাকি এই পথটা, এই চলনটারও অন্য একটা মানে আছে? তার অন্য আনন্দ আছে?
সাধুদা বলল, ‘আমার ছাতায় দু’জন আঁটব না। তাড়াতাড়ি চলো।’
‘কেন সাধুদা? তার চেয়ে আজ একটু ভিজি চলো।’
‘পাগল নাকি? আমার কি আর সেই বয়স আছে?’
‘কেন? ভিজতে বয়স লাগে নাকি?’
‘লাগে গো দিদি। সব কিছুর বয়স আছে একটা। ভেজারও আছে,’ সাধুদা হাসল।
‘আমার ভেজার বয়স নেই?’
‘সেটা নিজেকেই ঠিক করতে হয় দিদি। এবার পা চালিয়ে চলো, দেরি কোরো না।’
সাধুদা হনহন করে হাঁটতে লাগল। আকাশ ফাটিয়ে বিদ্যুৎ ছিটকে পড়ল এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আর তার আলোয় দূরে নিজেদের বাড়িটা দেখতে পেল রাহি। ওখানে ফিরতে হবে ওকে। বৃষ্টি আসার আগেই ফিরতে হবে। রাহি বুঝল বৃষ্টিতে ভেজার বয়স ওর আর নেই।
Chapter - 35
৩৫
ঘোলাটে কুয়াশার মশারিতে ঢেকে আছে পাহাড়। মাথার ওপর মেঘ ঝুলে রয়েছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি এসে লাগল মাথায়! এই বুঝি এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে বুক! বিকেল শেষ হচ্ছে এখন। বাংলোর সামনে থেকে পাথর বাঁধানো পথ থাক থাক করে নেমে গেছে নীচে। আর মিশেছে মূল রাস্তার সঙ্গে। এই পাথুরে পথের দু’পাশে ঢালু ঘাসের জমি। তাতে ছোট-বড় নানান অর্কিড আর গাছ লাগানো। তবু পথের দৃশ্য আটকায় না তাতে। কিগান দিব্যি নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায় রাস্তার মানুষজনকে।
এখানে মানুষ বেশ কম। দু’কিলোমিটার নীচে ফ্যাক্টরিটা যেখানে হয়েছে সেখানে তাও মানুষজন আছে। কিন্তু এই অঞ্চলটা প্রায় ফাঁকাই। তবে ভীষণ সুন্দর। কাছেই চা-বাগান আছে একটা। তার কর্মীরাও নীচের বস্তি থেকে আসে।
কোম্পানি থেকে কিগানকে ওই জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেই থাকার জন্য বাংলো দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মানুষজনের থেকে আলাদা পাহাড়ের ওপরে এই ছোট্ট বাংলোটাই বেছে নিয়েছে ও। মানুষজন আজকাল আর ভাল লাগে না কিগানের। মনে হয় একা থাকা সবচেয়ে ভাল। তবে জায়গাটা ফাঁকা বলেই বাংলোর পিছনের উঠোনের মতো অংশটায় দাঁড়ালে ওদের ফ্যাক্টরির চিমনিটা দেখা যায়। সব কিছুর মধ্যে এটাই যা বেমানান লাগে ওর।
এই পাহাড়টাকে দেখেই ভালবেসে ফেলেছে কিগান। প্রথমদিন এসেই মন বসে গিয়েছে ওর। আসলে পাহাড় কিগানের খুব পছন্দের জায়গা। কলকাতা থেকে পালিয়ে আসতে, নিজের থেকে পালিয়ে আসতে কতবার যে ও পাহাড়ে এসেছে তার আর কোনও হিসেব নেই। তাই চাকরির প্রস্তাবটায় প্রথমে মনস্থির করতে না পারলেও পরে মনস্থির করেছিল কিগান। কিন্তু কেন পরে মনস্থির করেছিল? সেটা কি শুধু পাহাড়ের জন্যই? অন্য কিছুর জন্য কি নয়? কলকাতায় যা ওকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল মনে মনে, তা চাপাডাঙাতে এসে পড়াতেই কি ও এই সিদ্ধান্তটা নেয়নি? দিঘির জন্যই কি ও চলে আসেনি এখানে?
ভদ্রলোকের নাম জিতেন্দ্র তামাং। খুব সুন্দর কথা বলেন। তবে একটু নাটকীয়তা আছে কথায়। কিগান যে-কোম্পানিতে এসেছে তার মালিকের পার্সোনাল অ্যাসিট্যান্ট হচ্ছেন এই ভদ্রলোক। কিন্তু কথাবার্তা শুনে কিগানের মনে হয়েছিল যে, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই এককালে স্টেজে কাজ করতেন! তাই অমন নাটকীয়ভাবে দশ মিনিট সময় চেয়েছিলেন।
কিগান ভদ্রলোককে নিয়ে নিজের ঘরে এনে বসিয়েছিল।
তামাং বলেছিলেন, ‘আমি “স্নো ফ্লেকস্ পার্টিকল বোর্ড” থেকে আসছি। রাবাংলায় আমাদের ফ্যাক্টরি। প্রোডাকশন সবে শুরু হয়েছে। তো আমরা আপনাকে আমাদের এজিএম প্রোডাকশনস হিসেবে পেতে চাই।’
‘আমায়?’ খুব অবাক হয়েছিল কিগান।
‘হ্যাঁ, আপনাকে,’ তামাং হেসে বলেছিলেন, ‘মার্চেন্টের চেয়ে অনেক বড় আমাদের গ্রুপ। নানা প্রোডাক্ট আছে। আমরা কোয়ালিটি আর সার্ভিসে বিশ্বাসী। সেখানে কোনও আপস করি না। আমরা চাই আপনি আমাদের হয়ে কাজ করুন। এই নিন আমাদের অফার লেটার। পার অ্যানাম কত পাবেন, গাড়ি, বাংলো সব দেব আমরা। বহু দিন তো প্লেন্স-এ কাজ করলেন, আই উইল অ্যাডভাইস ইউ টু এক্সপ্লোর দ্য মাউনটেন ফর আ চেঞ্জ। লাইফ উইল বি মাচ মোর পিসফুল অ্যান্ড হেল্দি আপ দেয়ার।’
কিগান অবাক হয়ে চিঠির খামটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মানে, অফার লেটার? আপনাকে আমার কথা কে বলল?’
‘স্যাম, স্যামুয়েল কুটিনহো। উনি যে নতুন কোম্পানিতে জয়েন করবেন তার মালিক আমার বসের খুব বন্ধু। তো আমরা ওঁর থেকে জানতে চেয়েছিলাম যে, প্রপার কাজের লোক কোথায় পাওয়া যায়। তখন উনি আপনার নাম বললেন।’
‘ও।’ কিগান কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
‘কাম, জয়েন আস। ইট উইল বি ওয়ান লাইফ অল্টারিং এক্সপিরিয়েন্স। লেট্স জয়েন হ্যান্ডস অ্যান্ড মেক আওয়ার এন্ডেভার আ সাকসেস।’
তামাংয়ের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হাসি পেয়েছিল কিগানের। যেন ‘পৃথিবী বাঁচাও’ আন্দোলন নিয়ে কাজ করছে। তবে কিগান হাসেনি। বরং গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘দেখুন, এখানে আমি ঠিক আছি। আমার ভাবতে সময় চাই একটু।’
‘মিস্টার কুটিনহো যখন বলেছেন তখন আমরা শিয়োর আপনার পোটেনশিয়াল নিয়ে। তা ছাড়া মার্কেটেও খবর নিয়েছি। ঠিক আছে, আমরা আপনার ডিসিশনের জন্য ওয়েট করব। তবে প্লিজ, যা ডিসাইড করবেন, আমাদের ফেভারে করবেন। আমার বস এখন সাউথ আমেরিকায় আছেন। উনি সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আসবেন। কলকাতায় অফিস আছে আমাদের। সেখানে আপনি ওঁর সঙ্গে মিট করতে পারবেন। আমাদের বস দারুণ মানুষ। ইট উইল বি আ ফাইন এক্সপিরিয়েন্স ফর ইউ।’
‘আমি ভাবব,’ কিগান উঠে দাঁড়িয়েছিল।
তামাং উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলেছিলেন, ‘মার্ক মাই ওয়ার্ড, হিল উইল রিজুভিনেট ইউ।’
না, ঠিক করতে পারেনি, কিচ্ছু ঠিক করতে পারেনি কিগান। প্রায় দু’সপ্তাহ কিছুই ঠিক করে উঠতে পারেনি। পাহাড়ের কথা শুনে ইচ্ছে করছিল খুব, কিন্তু অদৃশ্য কোনও এক টান আটকে রেখেছিল ওকে। কেন আটকে ছিল কিগান? যে-মানুষ চলে যেতে চায়, তার কাছে চাপাডাঙা আর রাবাংলার ভেতর তফাতটা কোথায়? তা হলে কেন দ্বিধা হয়েছিল ওর যেতে?
বারান্দার পাশে হেলান দিয়ে রাখা গিটারটা তুলল কিগান। এখানে আসার পর এই গিটারটা বের করেছে আজ। রবিবার বলে আজ ছুটি। সারা দুপুর ঘুমিয়েছে কিগান। ওর কাজের ছেলেটির নাম বাবুলাল। উত্তরপ্রদেশের ছেলে। বয়স তেইশ-চব্বিশ। খুব হাসিখুশি। খালি গলায় গানটাও ভাল গায়। তবে ছেলেটার জাদু তার রান্নায়। ঠাকুরমার পরে এত ভাল রান্না আর খায়নি কিগান। ওর তো ভয় হচ্ছে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই না মোটা হয়ে যায় ও!
বাবুলাল এখন দু’কিলোমিটার দূরের শহরে গিয়েছে। রাতে আজ পরোটা করবে। ময়দা আনতে গিয়েছে তাই। কিগান বারণ করেছিল, কিন্তু শোনেনি ছেলেটা। অল্প কয়েকদিনের ভেতরেই কেমন যেন মায়া পড়ে গিয়েছে ওর বাবুলাল মিশিরের ওপর।
মায়া, স্মৃতি, ভালবাসা এসব মানুষের শত্রু। মানুষকে নিশ্চিন্তে, শান্ত মনে থাকতে দেয় না। শুধু মনের মধ্যে কাঁটাঝোপ পোঁতে এরা। বড় বড় পাথর ছড়িয়ে রাখে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের বিষ মিশিয়ে দেয়। মানুষকে অস্থির করে তোলে। মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে। এই যে কিগান চলে এসেছে এতটা দূরে কিন্তু তার পরেও কি রেহাই পেয়েছে ও? ওর মন কি রেহাই দিয়েছে ওকে? ওকে কি শান্তি দিয়েছে একটুও? তিষ্ঠোতে দিয়েছে? ক্ষত কি গভীরতর হয়নি ওর? এপ্রিলের সেই ফোন কলটা কি ভুলতে পেরেছে ও?
নিজের অফিসেই বসেছিল কিগান। নতুন প্রজেক্টের ফাইলটা দেখছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। একটা ড্রয়িং খোলা ছিল টেবিলে। তার তলায় চাপা পড়ে আর্তনাদ করে উঠেছিল ফোনটা। কিগান দুটো রিং হওয়ার পর বের করেছিল ফোনটাকে। অচেনা নম্বর। কে ফোন করল এখন? অনেক সাপ্লায়ার ফোন করে কিগানকে। তারাই কি কেউ করল? কিগান সামান্য ইতস্তত করে আরও দুটো রিং হওয়ার পর কলটা রিসিভ করে কানে লাগিয়েছিল ফোনটা। কিন্তু ওপার থেকে কথা বলছিল না কেউ। শুধু রাস্তার গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছিল কিগান। আর পাচ্ছিল খুব হালকা শ্বাসের শব্দ। কিগান জিজ্ঞেস করেছিল কে ফোন করছে? জিজ্ঞেস করেছিল কেন এমন মাঝে মাঝে ফোন করে? কিন্তু তবু কোনও উত্তর আসছিল না। কিগান চুপ করে গিয়েছিল তারপর। ফোনের ভেতর থেকে আসা রাস্তার হল্লা, গাড়ির হর্নের শব্দ থেকে মনে মনে আলাদা করে নিয়েছিল ওই প্রায় শব্দহীন শ্বাসের ওঠা-পড়ার শব্দ। তারপর আচমকা, একদম আচমকাই অদ্ভুত এক জুঁই-গন্ধ ভেসে এসেছিল কিগানের কাছে। ভেসে এসেছিল অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত। নরম ঠোঁটের স্পর্শ। জিভের আস্বাদ। ভেসে এসেছিল ছন্দোময় সেই শ্বাস-ধ্বনির উত্তাপ। কিগান চিনতে পেরেছিল! ও অস্ফুটে বলেছিল, ‘তুমি?’
‘কেন? কেন তুমি এসব করছ?’ দিঘির গলা ছিটকে এসেছিল ফোনের ভেতর থেকে।
‘আমি?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘মহান হবে? মহান হবে তুমি! সব বিলিয়ে দিচ্ছ, সবার জন্য কাজ করছ, কিন্তু ধন্যবাদটুকু নেবার জন্য দাঁড়াচ্ছ না! নিজেকে সাধু প্রমাণ করতে চাও? আর আমায়? আমায় কী প্রমাণ করতে চাও তুমি? আমি বুঝি না কিছু, না? আমি জানি না কিছু? কেন তুমি আজও যাজ্ঞসেনী না কে তার চিঠি বুক দিয়ে আগলে রাখো? জি নামে তোমায় লেখা কার চিঠি তুমি যত্ন করে ধরে রাখো! আমি তোমার খেলার জিনিস ছিলাম? অন্য মেয়েদের মনে আগলে রেখে তুমি খেলছিলে আমার সঙ্গে? আমি পুতুল? আমি মানুষ নই? আমার কষ্ট হয় না? আমার মন নিয়ে খেলতে কে অধিকার দিয়েছিল তোমায়? লজ্জা করেনি তোমার? আমি সব কিছু তুচ্ছ করে ভালবেসেছিলাম তোমায় আর তুমি অন্য মেয়েদের চিঠি আঁকড়ে ধরে আমার সঙ্গে…আর এখন সাধুগিরি দেখানো হচ্ছে? কেন আসো তুমি আমার সামনে? কেন? কেন চলে যেতে পারো না? এমন জায়গায় যেতে পারো না যেখানে আর কোনওদিন তোমায় দেখতে হবে না আমায়? চলে যাও তুমি। চলে যাও।’
ফোনটা কেটে দেওয়ার পর নিথর হয়ে চেয়ারে বসেছিল কিগান। এসব কী বলল দিঘি? ‘জি’ লেখা চিঠি! জিয়ানার লেখা কলেজ জীবনের প্রেমপত্র? আর যাজ্ঞসেনী আইয়ারের চিঠি? কিগান তো জানেই না সেসব আছে কিনা। ওর তো ধারণা ছিল ও সবক’টাই নষ্ট করে ফেলেছে। তবে কি পুরনো বইয়ের ভাঁজে ছিল? ওর এক আলমারি পুরনো বই ছিল। দিঘি সেসব এসে ঘাঁটাঘাঁটি করত খুব। তার ভেতরেই কি কিছু ছিল? জিয়ানা ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তো রাগে দুঃখে জিয়ানার সব স্মৃতি মুছে ফেলে দিয়েছিল কিগান। তবে কি একটা চিঠি বেঁচে ছিল? আর সেটা দেখেই কি…
দিঘি যে পজেসিভ ছিল খুব সেটা জানত কিগান। ওর নিজের বান্ধবীদের ও কখনও কিগানের সামনে আসতে দিত না। একবার ওর এক বান্ধবী কিগানের কাছ থেকে গিটার শিখতে চেয়েছিল বলে দিঘি কেঁদেকেটে একশা করেছিল। রাগ করে সাতদিন কথা বলেনি কিগানের সঙ্গে। আর সেই মেয়ের হাতে যখন দু’-দুটো প্রেমপত্র এসেছিল তখন সে তো অনেক কিছুই করতে পারত!
কিগান পাথরের মতো বসে ছিল। এসব কী মনের ভেতর নিয়ে ঘুরছে দিঘি? কিগান তো কোনওরকম শঠতার আশ্রয় নেয়নি। ও তো বলেছিল জিয়ানার কথা। দিঘিকে তো বলেওছিল যে, জিয়ানার পর আর কাউকে ভালই বাসেনি ও। শুধু দিঘি, কিগান শুধু ভালবাসে দিঘিকে। তবে? চিঠিগুলো দেখে কি দিঘির মনে হয়েছিল যে, আজও কিগান যক্ষের মতো আগলে বসে রয়েছে ধ্বংসস্তূপ? দিঘি কিগানকে বিশ্বাস করেনি একটুও। আর তারপর দিঘি কী বলল ফোনে? চলে যেতে বলল? ওর সামনে থেকে চলে যেতে বলল কিগানকে?
সেই অফিসরুমে বসে কিগান সেদিন স্পষ্ট টের পেয়েছিল কোথায় ওর মনের নোঙর গেঁথে রয়েছে! দিঘি চাপাডাঙায় আসে কখনও সখনও আর তাই ওকে দেখার লোভে চাকরিটা নিচ্ছে না ও। ওর মন এখনও চায় দিঘির কাছে যেতে! ওর চোখ এখনও দেখতে চায় দিঘিকে!
নিজের কাছেই যেন উলঙ্গ হয়ে গিয়েছিল কিগান। নিজের মনের ডিসিপ্লিন, মনের পাঁচিল, মনে হচ্ছিল সব যেন কাগজের তৈরি। সামান্য আগুনেই সব ছারখার হয়ে যাবে পুড়ে। নিজেকে হঠাৎ খুব ছোট মনে হচ্ছিল ওর। দিঘি এখনও এত অপছন্দ করে ওকে? তাই এমন করে চলে যেতে বলল? এমন করে তাড়িয়ে দিল ওর জীবন থেকে? আর কিগানও এতটা লোভী? শুধু দিঘিকে একটু দেখার জন্য ও পড়ে থাকতে চায় এই চাপাডাঙায়? এতটা ভিখিরি ও! এতটা কাঙাল!
ড্রয়ার খুলে একটা লম্বা সাদা খাম বের করেছিল কিগান। তারপর তার ভেতর থেকে বের করে এনেছিল একটা ভিজিটিং কার্ড। জিতেন্দ্র তামাংয়ের।
কাজটা পেতে অসুবিধে হয়নি কিগানের। ও শুধু বলেছিল জুলাই থেকে জয়েন করবে। কারণ, গৌরকে বলতে হবে যে, ও ছেড়ে যাচ্ছে চাপাডাঙা। দু’মাসের নোটিশ তো দিতেই হবে। জিতেন্দ্র তামাং আপত্তি করেননি। বরং বলেছিলেন, ‘আপনাকে ডিপ্রেস্ড শোনাচ্ছে। গ্যারান্টি দিচ্ছি পাহাড় আপনাকে সুস্থ করে তুলবে।’
গৌর দিওয়ান প্রথমে কিগানের মুখে কথাটা শুনে আর ওর চিঠিটা দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘ব্রুটাস তু ভি? আরে ইয়ার, তুম লোগ ছোড় কিউ রহে হো সবকে সব?’
‘স্যার, আমার একটু পার্সোনাল প্রবলেম হচ্ছে চাপাডাঙায়,’ কিগান বলেছিল।
‘মাইনে কম লাগছে!’ গৌর জিজ্ঞেস করেছিলেন।
‘না স্যার। মানি ওয়াজ নেভার অ্যান ইস্যু। আমার অন্য সমস্যা আছে। পার্সোনাল।’
কিগানের গলার ভেতর এমন কিছু একটা ছিল যে, গৌর আর বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস না করে শুধু বলেছিলেন, ‘প্রোডাকশন পর অসর আয়েগা।’
‘স্যার, মহারাষ্ট্র থেকে তো আপনাদের নতুন লোকজন আসার কথা। আপনাদের ওখানকার ফ্যাক্টরি আর আমাদের ফ্যাক্টরির ওয়ার্কিং প্রিন্সিপ্ল তো এক। কোনও প্রবলেম হবে না,’ কিগান বলেছিল।
গৌর বলেছিলেন, ‘তু বস ইস টেন্ডার কো যারা সামহাল লে, ফির যো মর্জি আয়ে কর। ইয়ে মিনেরাল ওয়াটার আর জুস কা প্রজেক্ট পুরা বাম্বু হো গয়া হ্যায় মেরা। স্যাম ভি চলা যায়েগা। ফাইনান্স কা চুহে শালে সমঝতা তো হ্যায় নেহি সির্ফ খুজলি করতা হ্যায়। তু ইয়ে দেখ লিও ফির চলে যানা। ঠিক হ্যায়?’
গৌরের ভাব দেখে কিগান বুঝেছিল যে, গৌর খুব টেনশনে ভুগছে। এমনিতেই গৌরের মুখ আলগা। নিজের সাবঅর্ডিনেটদের সঙ্গে মেঠো ভাষায় কথা বলেন। তবে সেদিন যেন আরও বেশি আলগা হয়ে গিয়েছিলেন। চাপ, কিগান বুঝতে পারছিল যথেষ্ট চাপে রয়েছেন গৌর।
টেন্ডার কমিটিতে থাকা নিয়ে যথেষ্ট অস্বস্তিতে ছিল কিগান। জিয়ানার অমন সরাসরি কাজটা পাইয়ে দেবার প্রস্তাবটা ভাল লাগেনি ওর। আর ওয়াটার বার্ডসের ওই ভদ্রলোকের ঘুষের প্রস্তাবটাও মাথাতে ছিল। আর সব কিছুর গতিপ্রকৃতি দেখে ও বুঝতে পারছিল যে, মূল কম্পিটিশনটা হবে ওয়াটার বার্ডস আর প্রোজেকশন কর্পের ভেতরেই। তাই কাজটা নিয়ে মনে মনে একটু বিব্রত ছিল ও।
তবে পিছিয়ে আসেনি কিগান। ও ভেবেছিল, দেখা যাক কী হয়। আসলে ওর সামনে দুটো সমস্যা ছিল। একটা এই কাজ, আর দ্বিতীয়টা হল জমি। ও ভেতর থেকে খবর পেয়েছিল যে, গৌর নিজে সেফ থাকার জন্য পুরো দোষটা চাপাবে আদির ওপর। বলবে, আদির ইনকমপিটেন্সের জন্য এতদিনেও জমিটা পাওয়া যাচ্ছে না। আর তারপর আদির ওপর কোপ পড়বে। তাই ছোট ভাইটাকে কী করে রক্ষা করা যায় সেটাই প্রথমে চিন্তায় ফেলেছিল কিগানকে। কিন্তু জমি সংক্রান্ত কোনও সমাধান মাথায় আসছিল না ওর। কারণ, গৌরের উদ্ধত ব্যবহারে রাঘব চক্রবর্তী এমন চটে আছেন যে, জমি পাওয়া সহজ নয়। আর ম্যানেজমেন্ট ঘুষ বা অন্য কোনও অতিরিক্ত খরচ করতেও রাজি নয়। তাই কিগান বুঝতে পারছিল না কী করা যায়! তবে সমাধান যে হঠাৎই তার কয়েকদিনের মধ্যে নিজে পায়ে হেঁটে বাড়িতে আসবে, তা বুঝতে পারেনি কিগান।
কফি খেতে ইচ্ছে করছে কিগানের। চা-টা ও খায় না। কফিও খেত না। কিন্তু ইদানীং কফির প্রতি একটা ঝোঁক জন্মেছে ওর।
কিগান উঠল। বৃষ্টি যে নামবে তা বলে দিতে হবে না। এখানে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামে। আচমকা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে যায় সব। আচমকা আবার পরিষ্কারও হয়ে যায় চারদিক। তবে একটা অদ্ভুত শিরশিরে ঠান্ডা সেলোফেনের মতো জড়িয়ে থাকে শরীরের সঙ্গে। কিগানের খুব ভাল লাগে এই ঠান্ডাটা।
কফিটা করে একটা বড় মগে ঢালল ও। অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ঠাকুরমা খুব ভাল কফি করত। যদিও খুব সামান্য কয়েকবারই ও খেয়েছে। আর খুব ভাল কফি করত রাহি। একবার জোর করে কিগানকে খাইয়েছিল ও। পাগলি, একদম পাগলি মেয়েটা। তাই তো ওকে সেদিন অমন অবস্থায় দেখে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল কিগান।
সবে মুখটুখ ধুয়ে ঘরে আসছিল, সেই সময়ই অমন উদ্ভ্রান্তের মতো রাহিকে আসতে দেখে কিগান বুঝেছিল বেশ ভালই কিছু গন্ডগোল হয়েছে। তবে কী গন্ডগোল, কোন দিক থেকে গন্ডগোল তা বুঝতে পারেনি।
রাহিকে শান্ত করিয়ে বসিয়ে সময় দিয়েছিল কিগান। আর তারপর শুনেছিল সব কথা।
মানুষ তার একটা জীবনে যে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়! চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষজনের ভেতরে যে কত বিচিত্র গল্প আর অভিজ্ঞতা লুকিয়ে রয়েছে! যখনই কিগানের মনে হয়েছে জীবনের অনেকটাই দেখে ফেললাম, ঠিক তখনই জীবন ওর সামনে নতুন একটা চ্যাপ্টার খুলে ধরেছে। না হলে, রাহির মতো মেয়ের ভেতরে যে এত গল্প লুকিয়ে রয়েছে তা কি আর কিগান বুঝতে পেরেছিল?
সেদিন সব ঘটনা বলে ঝরঝর করে কাঁদছিল রাহি। অল্প বয়সের উত্তেজনা আর ভুলের মাশুল যে কতভাবে দিতে হয় মানুষকে! কিগান চুপ করে বসে কাঁদতে দিয়েছিল রাহিকে। কারণ, কান্নার মতো মানসিক ক্লেনসিং আর কিচ্ছু হয় না। কিগান বুঝতে পারছিল দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট, উত্তেজনা আর টেনশন জমে রয়েছে রাহির মধ্যে। এগুলো বেরিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এত ভার নিয়ে বাঁচা ভাল নয়।
রাহিকে যা বলার বলে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল কিগান। ওর সারা শরীর জ্বলছিল রাগে। এত নীচ হতে পারে কেউ? মুখে বড় বড় বুলি আউড়ে, বড় বড় কথা বলে তলায় তলায় নোংরামো! একটা অসহায় মেয়েকে টর্চার করা! তাকে ব্ল্যাকমেল করা! ত্রয়ণ যে একটা দু’পেয়ে জানোয়ার তা বুঝতে আর অসুবিধে হয়নি কিগানের। তবে কী করবে ও? কী করতে পারে? কোন অস্ত্রে বধ করা যাবে ত্রয়ণকে? মনে মনে সারাদিন যাবৎ কাজের ফাঁকে ফাঁকে হিসেব করছিল কিগান। ও বুঝতে পারছিল সাংঘাতিক কিছু একটা করতে হবে যাতে কোনওদিন ত্রয়ণ এসব করার আগে দশবার ভাববে তার ফলাফল নিয়ে। কিন্তু কীভাবে? কীভাবে করবে কিগান? এত লোক থাকতে রাহি ভরসা করেছে ওকে। তার একটা মর্যাদা তো রাখতেই হবে। কিন্তু কী উপায়ে?
হঠাৎ অজিতের কথা মনে পড়েছিল কিগানের। আগে বয়লার অপারেটার ছিল ছেলেটা। একবার কিগানের সঙ্গে সামান্য ঠোকাঠুকিও লেগেছিল। কিন্তু পরে ফ্লাই অ্যাশ নিয়ে গ্রামের লোকেদের একটা সমস্যায় কিগানই বাঁচিয়েছিল অজিতকে।
সেই অজিত আর চাকরি করে না এখানে। ব্যাবসা করে। না, সোজা ব্যাবসা নয়। বাঁকা ব্যাবসা। স্মাগলিং-এর জিনিস বিক্রি করে। পাইরেটেড ডিভিডি-র একজন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে আর তার সঙ্গে মহাজন আর অটোচালকদের মাঝে কাটা তেলের লিঙ্কম্যান হিসেবেও কাজ করে ও। অজিত এখন আর সেই বয়লার অপারেটরটি নেই। দুটো মোবাইল, গলায় সোনার চেন, আর মোটরবাইক দাবড়ে বেড়ায় চাপাডাঙায়। তবে কিগানের সাহায্য ভোলেনি ও। দেখা হলেই হাসে। বলে, যে-কোনও সোজা দরকার বা বাঁকা দরকারে ওকে যেন বলে কিগান।
কিগান ভেবেছিল অজিতকে কী আর দরকার পড়বে? তাই হেসে এড়িয়ে যেত ছেলেটাকে। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল অজিতই হয়তো উপযুক্ত মানুষ। রাহি না হয়ে অন্য কারও সমস্যা হলে কিগান সরাসরি চমককে বলত। কিন্তু এ ব্যাপারটা চমক জানতে পারলে ত্রয়ণকে কী করবে তার ঠিক নেই, কিন্তু রাহির কপালে যে দুঃখ আছে সেটা বিলক্ষণ জানত ও।
সেদিন অফিস ছুটির পরে অজিতের দোকানে গিয়েছিল কিগান। রাস্তার পাশে একটা ছোট সিডি-ডিভিডি পার্লার লোক দেখানো হিসেবে আছে অজিতের।
দূর থেকে দোকানের সামনে মোটরবাইকটা দেখে অজিত যে দোকানে আছে সেটা বুঝেছিল কিগান। ও কী বলবে মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল।
অজিত দোকানে বসে মুড়ি খাচ্ছিল। পাশে অন্য একটা ছেলেও ছিল। কাঁচা পেঁয়াজের হালকা গন্ধ পেয়েছিল কিগান। অজিত কিগানকে দেখে প্রথমে অবাক হলেও পরে খুশি হয়েছিল বেশ। বলেছিল, ‘আরে স্যার, আপনি?’
কিগান বলেছিল, ‘তোমার সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত দরকার আছে।’
‘আমার সঙ্গে!’ অজিত অদ্ভুত মুখ করে তাকিয়েছিল কিগানের দিকে। মাথার ওপর ঝোলা প্যাঁচানো সাদা আলোয় হয়তো বোঝার চেষ্টা করছিল কী দরকার থাকতে পারে কিগানের! কিগান ইতস্তত করে পাশে বসা ছেলেটাকে দেখেছিল একবার।
অজিত বুঝতে পেরে বলেছিল, ‘এই ন্যাপলা, যা একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক নিয়ে আয়। তাড়াহুড়ো করবি না। ধীরেসুস্থে যাবি।’
ছেলেটা চলে যেতে অজিত বলেছিল, ‘আপনি স্যার ভেতরে চলে আসুন।’
কিগান মাথা নিচু করে দোকানের ভেতরে গিয়ে বসেছিল। তারপর সংকোচের গলায় বলেছিল, ‘স্যার বোলো না অজিত। আমি তো আর তোমার বস নই।’
‘স্যার, স্যার-ই,’ অজিত হেসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘আপনি বলুন কী করতে পারি আপনার জন্য?’
কিগান সময় নিয়েছিল একটু, তারপর বলেছিল, ‘আমার সংকোচ হচ্ছে, কিন্তু উপায় নেই, একটি মেয়ের সম্ভ্রম বিপদে। তাকে উদ্ধার করা দরকার। একটা প্রতিকার করা খুব জরুরি।’
‘মেয়েছেলের কেস!’ অজিত চোখ গোল গোল করে তাকিয়েছিল।
‘একটি ছেলে আমার পরিচিত একটি মেয়ের অশ্লীল ছবি তুলে তাকে ব্ল্যাকমেল করছে। ছেলেটিকে শায়েস্তা করতে হবে,’ কিগান এক নিশ্বাসে বলে দিয়েছিল।
‘অ্যাঁ!’ অজিত থমকেছিল একটু, ‘এ যে খুব বাজে কেস!’
‘কিন্তু কাজটা যে করতেই হবে। নইলে খুব বিপদ হবে যে।’
অজিত হেসেছিল, ‘কে ছেলেটা?’
‘ত্রয়ণ বলে একটা ছেলে আছে। রোগা, চাপ দাড়ি…’
কিগানকে কথা শেষ না করতে দিয়ে অজিত বলেছিল, ‘ওরে শালা, ওই শালা? সে তো খচ্চরের আন্ডিল। আমাদের কাটা তেলের কমিশন খায়। আগে সুধাদির কাছের লোক ছিল, এখন ক্যাঁক খেয়েছে। তা মেয়েটা কে?’
‘সেটা কি জানতেই হবে?’ কিগান ঠোঁট কামড়ে তাকিয়েছিল অজিতের দিকে।
অজিত হেসেছিল, ‘না, স্রেফ কৌতূহল স্যার। পাতি কৌতূহল। তা আপনি কী করতে বলেন আমাকে? শালাটাকে কি মারতে হবে? মানে হাপিস করতে হবে, না দশ-বারোটা ফ্র্যাকচার করলেই কাজ হাসিল হবে?’
‘তা নয় অজিত। ডেডলক মানে জানো?’ কিগান তাকিয়ে ছিল অজিতের দিকে।
‘ডেড মানে তো পটল তোলা। লক মানে তালা। কিন্তু দুটো একসঙ্গে কী হবে জানি না! ডেডলক কেন বলছেন?’
কিগান বলেছিল, ‘দেখো, ব্যাপারটা কতটা সম্ভব আমি জানি না। কিন্তু চেষ্টাটা করতে হবে। মানে ধরো তোমার দিকে কেউ বন্দুক তুলল আর সঙ্গে সঙ্গে তুমিও তার দিকে তাগ করে বন্দুক তুললে। তোমরা কি কেউ কাউকে গুলি করতে পারবে? পারবে অন্যকে মারার চান্স নিতে?’
অজিত ঠোঁট কামড়ে চোখ ছোট করে তাকিয়েছিল মাটির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল ওর মুখে, ‘স্যার, আপনি আমাদের লাইনে এলে ভাল নাম করতে পারতেন।’
কিগান বলেছিল, ‘ত্রয়ণ এখন বাড়িতেই থাকবে হয়তো।’
‘সে যেখানেই থাকুক, মালটাকে আচমকা তুলব, তারপর ঠিক জায়গায় নিয়ে গিয়ে ল্যাংটো করে ওর কুড়িটা ছবি তুলব, তারপর…’
‘ছবিগুলো আমায় দেবে। আমি কথা বলব ওর সঙ্গে।’
‘আপনি থাকবেন?’ অজিত অবাক হয়েছিল।
‘থাকতে যে হবে। না হলে ওর থেকে ছবিগুলো ফেরত আনবে কে?’
অজিত হেসেছিল, ‘আমাকে একটুও ভরসা নেই স্যার? আমি ছবিগুলো ঠিক বের করে আনব ওর থেকে। আর আপনি কী ভাবছেন, আমি বুঝতে পারি না কার ছবি?’
‘মানে?’ ভীষণ অবাক হয়েছিল কিগান।
‘রাহি বলে মেয়েটার ছবি নিশ্চয়ই। এই অঞ্চলে আপনার ও ছাড়া এমন কোনও মেয়ে পরিচিত নেই যার জন্য আপনি এতটা করবেন। আর ত্রয়ণ মালটা যে ওই মেয়েটার পিছনে ঘোরে সেটা আমরা সবাই জানি। এমন সহজ দুয়ে দুয়ে চার কি খুব কঠিন স্যার? আপনি ভাববেন না, নিখুঁত কাজ হবে। আমি আমার মরা মায়ের নামে দিব্বি দিয়ে বলছি ছবিগুলো দেখব না। আপনার কাছে এনে দেব। এটুকু ভরসা করতে পারেন স্যার।’
কিগান কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
অজিত বলেছিল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আমাদের লাইনে প্রচুর খচ্চর সামলাতে হয়। সব খবর রাখতে হয়। আর ত্রয়ণটা তো ভেড়ুয়া। পার্টিতেও ওর অবস্থা খুব খারাপ। বারাসতে আপনাদেরই ওই হাউজিং-এর পিছনে কাঠি করতে গিয়ে পার্টিতে লাথ খেয়েছে। তারপর সুধাদির সঙ্গেও ঝামেলা চলছে। ওর এমনিতে কিছু পেঁচো উঠতি মাস্তান ছাড়া আর কোনও খুঁটি নেই। মালটাকে তুলে নিতে খুব একটা অশান্তি হবে না। শুধু মোবাইল নম্বরটা থাকলে দিন।’
কিগান নম্বরটা নিয়েছিল রাহির থেকে। সেটা দিয়েছিল অজিতকে। বলেছিল, ‘তা কাজটা করতে কীরকম…’
‘আরে স্যার, আপনার থেকে টাকা নেব নাকি? অজিত সামন্তর এখনও এমন অবস্থা হয়নি। যখন খারাপ সময় হবে, আপনার কাছে যাব। যা পারেন তখন হেল্প করবেন, কেমন!’
কিগান উঠে পড়েছিল, ‘তা হলে আমি নিশ্চিন্ত হব তো?’
‘হানড্রেড পারসেন্ট। আপনি চাপ নেবেন না। যা চাপ নেওয়ার আমি নিচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ওই ছবি কারও হাতে পড়বে না। আমিও দেখব না।’
কিগান দোকান থেকে বেরিয়ে এসে বলেছিল, ‘তোমায় কী বলে যে ধন্যবাদ দেব!’
‘কিছু না বলে দিন স্যার। কিছু বলে দেবেন না। আর যা পাই রাতে আপনার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসব। কাকপক্ষীতেও টের পাবে না।
প্রায় রাত দেড়টার সময় বাড়িতে এসেছিল অজিত। কোনও হুড়োহুড়ি বা হন্তদন্ত ভাব নয়। বরং ভাবটা এমন যেন তত্ত্বের মিষ্টি দিতে এসেছে। একটা প্লাস্টিকের থলে হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘এতে দশটা পানু ডিভিডি আছে। আর দুটো পেন ড্রাইভ। আর ওর কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কটাও খুলে এনেছি। ঘরে আর কিছু ছিল না, তা ছাড়া ও বলেছে আর কিছু নেই ওর কাছে। তবে স্যার থাকলেও চাপ নেই। এমন সব ছবি তুলেছি না, ওর চোদ্দো গুষ্টি সাহস করবে না কিছু করতে। বলেছি যে, ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করলে পুরো পোস্টার হয়ে যাবে গোটা চাপাডাঙায়। বানচোতটা ভয়ে প্যান্টে মুতে দিয়েছিল। শালা।’ অজিত হাসছিল খুব, ‘স্যার, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ওকে বলেছি যেন এ তল্লাট থেকে ভাগে। দেখবেন, ও আর এ তল্লাটে থাকবে না।’
অজিত চলে যাওয়ার পর রাহিকে মেসেজ করে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছিল কিগান। রাহি জানতে চেয়েছিল সব। কিন্তু কিগান বলেনি। শুধু বলেছিল, ‘তুই আর এসব নিয়ে ভাববি না। কোনওদিন একদম ভাববি না।’
কফিটা ভালই হয়েছে। কিগানের বেশ ভাল লাগছে খেতে। বাইরে হঠাৎ গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল। বাবুলালটা কী যে করে! চিন্তা হল কিগানের। ছাতাও নিয়ে যায়নি। ভিজলে নির্ঘাত জ্বর হবে। কিগান ভাবল একবার বারান্দায় গিয়ে দেখে। কিন্তু ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। বসার জায়গায় কাচের টেবিলটায় রাখা ছিল মোবাইলটা। নম্বরটা নতুন, কলকাতার দু’-তিনজনকে নম্বরটা দিয়েছে কিগান। তার মধ্যে কেউ ফোন করল কি? কিগান কাচের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
আরে, আদি। স্ক্রিনে নামটা দেখে হাসল কিগান। বহুদিন আগের হারিয়ে যাওয়া ভাইটাকে আবার ফিরে পেয়েছে ও।
ফোনটা ধরে কথা বলতে গিয়ে কেটে গেল হঠাৎ। অবাক হল কিগান। কী ব্যাপার? আদি কি কেটে দিল? নাকি নেটওয়ার্কে গন্ডগোল? ফোন কি করবে কিগান? নাকি অপেক্ষা করবে? আজ রবিবার, আদি কোথায় আছে কে জানে!
ভাবতে ভাবতেই মেসেজ ঢুকল। আদি। লিখেছে একটু পরে ফোন করছে। গৌরের বাড়িতে আছে। অপেক্ষা করছিল। ডাক পড়েছে। কাজ সেরে ফোন করছে।
কিগান হাসল। বুঝল, অপেক্ষা করার সময় ফোন করেছিল আদি। ফোনটা হাতে নিয়েই বারান্দায় গিয়ে বসল কিগান। বেতের চেয়ারের পাশের কফি টেবিলে বড় মগটা আর ফোনটা রাখল। তারপর পা দুটো সামনের কাঠের রেলিং-এ তুলে দিয়ে একটু হেলিয়ে বসল। আদিটা এখন কেমন আছে কে জানে! গুলিটা ভাগ্যিস শরীরে ঢোকেনি। চামড়া ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য কাঁধের পেশির ক্ষতি হয়েছে সামান্য।
টাকা মাটি আর মাটি টাকা। ল্যান্ড, জমি, মাটি, যে নামেই ডাকো না কেন এই পৃথিবীতে এটাই সবচেয়ে দুর্মূল্য বস্তু। এর জন্যই নানা অনর্থ হচ্ছে সারা পৃথিবীতে।
রাহি রাঘব চক্রবর্তীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করাবে এই ভরসায় গৌরের কাছে গিয়েছিল কিগান। ও বুঝতে পারছিল জমিটা এবার না পাওয়া গেলে আদির সমস্যা হবে চাকরি বাঁচানো। আর ভবিষ্যতে কেউ জানে না ত্রয়ণও কিছু করবে কিনা। তাই নিজেদেরই যা করার করতে হবে। কারণ, সাবধানের তো মার নেই।
অফিসের ভেতরের খবর কিগান পেয়েছিল যে, খুব চাপে আছে গৌর। বারাসতের প্রজেক্টে হিসেবমতো লাভ পাওয়া যায়নি। এই প্রজেক্টটাও বছর দুয়েক ঝুলে আছে। আর সবটাই গৌরের ক্যাজুয়াল আর প্রাউড অ্যাপ্রোচের জন্য। কিগান জানে যে, গৌরের মতো মানুষেরা নিজেদেরই নিজেরা পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখে। হয়তো সেটা ভেঙে, নিজের ইগো ডিঙিয়ে ভুলটা রেকটিফাই করতে চায়, কিন্তু কোনও এক অদ্ভুত কারণে নিজের কাছেই তারা বাঁধা পড়ে থাকবে।
কিগান তাই সরাসরি যথাসম্ভব সুর নরম করে, ইগো ড্যামেজ না করে কথা বলেছিল গৌরের সঙ্গে। আদির দিকটা দেখে ও বলেছিল, ‘স্যার, আদি আজ কথা বলছে রাঘব চক্রবর্তীর সঙ্গে, এবার আপনার সঙ্গে সরাসরি বসতে রাজি হয়ে যাবেন বলে মনে হচ্ছে। আপনি স্যার একবার গুড জেশ্চার হিসেবে ওঁর সঙ্গে মিট করুন। ভুলে যান কী হয়েছে। রাজনীতি আর ব্যবসায় কেউ পার্মানেন্ট শত্রু তো আর হয় না। আপনি চলুন স্যার একবার। দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।’
গৌর তাও ইতস্তত করছিল। যেন কোনও ব্যাপারই নয় এমন ভাব দেখিয়ে বলেছিল, ‘আরে ইয়ার, মেরা যানা জরুরি হ্যায় কেয়া?’
‘হ্যাঁ স্যার। গোটা জমির সিক্সটি-সেভেনটি পারসেন্ট পেলেও তো আমাদের কাজ হয়ে যাবে। আপনি একবার চলুন। আপনি বললে আদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করে দেবে। আমি ওখানে থাকি, টেম্পারামেন্ট বুঝি লোকজনের। রাঘব চক্রবর্তী ওই অঞ্চলের বিগ ম্যান। একটা নো উইন সিচ্যুয়েশনে আমরা ফেঁসে আছি। জমিটা আর অন্যভাবে তো পাওয়া গেল না। ম্যানেজমেন্ট তো একটা এক্সট্রা পয়সাও খরচ করেনি বা খরচ করবেও না। আপনি গেলেই স্যার সব মিটমাট হয়ে যাবে।’
গৌর যে নরম হয়ে গিয়েছিল মনে মনে তা বুঝেছিল কিগান। না হলে গৌর কাউকে এতটা কথা একবারে বলতেই দেয় না। তবে কিগান অপেক্ষা করছিল গৌর কী বলে তা শোনার জন্য।
গৌর চিন্তা করার জন্য সময় নিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘তু ইতনা জিদ কর রাহা হ্যায় তো, চল, ফির মিল হি লেতে হ্যায়।’
কিগান গৌরের চেম্বার থেকে বেরিয়েই রাহির সঙ্গে কথা বলেছিল প্রথমে। আর বুঝেছিল যে, রাঘব চক্রবর্তী মেয়ের কথা ফেলতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গে আদিকে ফোন করে কিগান সংক্ষেপে বলেছিল যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ও যেন গিয়ে রাঘব চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে গৌরের সঙ্গে মিটিং-এর দিন স্থির করে। কিগান বলেছিল, ‘আদি প্রশ্ন করিস না। কালকেই গিয়ে মিটিংটা ফিক্স কর। আর জানবি যে, তোকে কিন্তু আমি কিছু করতে বলিনি। তুই সবটা নিজে করছিস। কেমন? মনে থাকবে? আমি কিন্তু এসবের মধ্যে নেই।’
গৌর গিয়ে রাঘব চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করার সাতদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিগান বুঝেছিল, রাঘব চক্রবর্তীর মতো মানুষ টাকা বা ক্ষমতার বশ নয়। এদের দরকার ইগো মাসাজ। তবে রাঘব চক্রবর্তী গৌরের কাছে আদির খুব প্রশংসা করেছিলেন। আর তারপর হাওয়ায় হাওয়ায় এই অঞ্চলে খবরও ছড়িয়েছে যে, গোটা ঘটনাটাই ঘটিয়েছে আদি।
মনে মনে আনন্দ পেয়েছিল কিগান। আদির যে জমি শক্ত হল, তাতে নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল ও। ভেবেছিল, সামান্য কিছু হলেও তো ও কিছু করতে পারল ভাইটার জন্য। পৃথিবীতে এই একজন রক্তের সম্পর্কের মানুষ আছে, যার জন্য এখনও টান আর ভালবাসা অনুভব করে কিগান। মনে হয় ভাইটা ভাল থাকুক।
সব মিটে যাওয়ার পর হালকা লেগেছিল কিগানের। কিন্তু তখন কি বুঝতে পেরেছিল যে, এমন একটা ভয়ংকর সময় অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য?
সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাল কিগান। অন্ধকার হয়ে আসছে সব। পাহাড়ের আলো এত দ্রুত পালটায়! তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি নামবে যে-কোনও সময়ে। কিগানের মনে হল সেই দিন ঠিক এমনই মেঘ করে এসেছিল না!
বসিরহাটে গিয়েছিল সেদিন কিগান। অফিসেরই কাজ ছিল। ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। বাস থেকে নেমে অফিসের গেটে ঢোকার আগেই হঠাৎ আবেশ প্রায় দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কিগানের গায়ে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলেছিল, ‘কিগানদা সর্বনাশ হয়েছে। আদিকে কিছু ছেলে তুলে নিয়ে গেছে তলতাবনির জঙ্গলে।’
‘মানে!’ ছিটকে উঠেছিল কিগান, ‘তোকে কে বলল?’
‘আমি দেখেছি নিজের চোখে। কিন্তু সামনে যেতে পারিনি। সাহস হয়নি। ওরা অনেকে ছিল। অনেকেই ছিল।’
‘কতক্ষণ আগে?’ কিগানের শরীর টানটান হয়ে গিয়েছিল নিমেষে।
‘মিনিট দশেক। আমি কী করব বুঝতে না পেরে চমককে বলেছি। আর তুমি কত দূরে আছ বুঝতে পারিনি বলে ফোন করিনি।’
‘শেষ কোথায় ছিল আদি?’ কিগান প্রশ্ন করেছিল।
‘চায়ের দোকানে লাস্ট বসেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম দোকানে। তা ছাড়া তো দেখলাম ওরা চ্যাংদোলা করে জঙ্গলে নিয়ে গেল আদিকে,’ আবেশ কাঁচুমাচু করে বলেছিল, ‘আমার আর কী করার ছিল বলো?’
কিগান ফোনটা বের করে চমককে ফোন করতে যাবে ঠিক সেই সময়ই চমক এসে পড়েছিল জিপে করে এক দঙ্গল ছেলে নিয়ে। বলেছিল, ‘পুলিশও আসছে। চলো কিগানদা। আমি জানি কে তুলেছে তোমার ভাইকে। শালা ত্রয়ণ আজ এলাকায় ঢুকেছে। তোমার ভাই বানচোতটার সঙ্গে আশনাই করতে গিয়েছিল আর এখন তোমার ভাইকেই বাম্বু দিচ্ছে। চলো।’
বেশি খুঁজতে হয়নি। ভাঙা চার্চের ভেতরে ওরা হদিশ পেয়েছিল দঙ্গলটার। বহুদিন কোনওরকম মারামারিতে যায়নি কিগান। কিন্তু ও বুঝতে পারছিল এবার একটা অশান্তি হবেই। আর সত্যিই ঝড়ের মতোই যেন ঘটে গিয়েছিল সব।
কিগানরা এগোচ্ছিল সবাই। মেঘলা অন্ধকার, জঙ্গল, গাছ ও ভাঙা চার্চের ফাঁকফোকর দিয়ে ছিটকে আসা হ্যাজাকের হলুদ আলো আর তার ভেতরে পায়ের অস্পষ্ট হুটোপাটির শব্দ। দূরে, আবছা মতো চার্চের ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল। একটা ছেলে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সর্বনাশ! এরা যে ভয়ংকর লোক!
আর জঙ্গল মানছিল না কিগান। হাত ছড়ে যাচ্ছিল কাঁটায়, কপাল ঘষটে যাচ্ছিল ডালে, তবু ও প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল চার্চের কাছে। আরও পায়ের শব্দ আসছিল। চার্চের ভেতরের ওরাও বুঝতে পারছিল বাইরে কিছু একটা হচ্ছে। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে গিয়ে বন্দুক হাতে ছেলেটা খুব দ্রুত বন্দুকটা তুলতে গিয়েও পারেনি। কিগানের পাশের থেকে দুম করে পর পর দুটো শব্দ হয়েছিল। চমক গুলি চালিয়েছে! আর কিগান দৌড়ে চার্চের দরজার কাছে পৌঁছে দেখেছিল ছেলেটা পড়ে আছে মাটিতে। ওর একটু পিছনে চিৎকার করছিল চমক আর ওর দলবল। ভেতরের ছেলেগুলোও গতিক সুবিধের নয় দেখে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রয়ণকে দেখেছিল কিগান।
মাটিতে পড়ে যাওয়া বন্দুকটা তুলে ত্রয়ণ তাগ করেছিল চেয়ারে বাঁধা আদির দিকে।
একটা ঘুড়ি ঝুলছিল দূরে। কেটে যাওয়া একটা ঘুড়ি ঝুলছিল। বহু বহু দিন আগে। ধুলো ঢাকা জীবনের তলা থেকে যেন ফুটে উঠেছিল ছবি। ভাই। আদি। কিগান বলেছিল, ‘ভয় পাস না, আমি তো আছি।’
আদি চেয়ারে বসেছিল শক্ত হয়ে, নিথর হয়ে, ভয়ে হলদে হয়ে। কত সেকেন্ড সময় লেগেছিল এসব মনে পড়তে? কত সেকেন্ড সময় লেগেছিল এসব লক্ষ করতে? কিগান জানে না। মনে নেই ওর। শুধু মনে আছে ত্রয়ণের সমান্তরালভাবে তোলা হাত আর ওর নিজের ঝাঁপিয়ে পড়া। তবু গুলি চালানোটা আটকাতে পারেনি কিগান। চমকরা ত্রয়ণকে ধরে ফেলেছিল। আর কিগান হ্যাজাকের আলোয় দেখেছিল চোখ বন্ধ করে চেয়ার সমেত মাটিতে উলটে পড়ে আছে আদি। ওর বাঁ কাঁধ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।
প্রথমে যতটা ভয় পেয়েছিল কিগান, ততটা ভয়ংকর ছিল না ক্ষত। আদি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল শকে।
পুলিশ তারপর দ্রুত এসেছিল। চমকদের জিপে প্রথমে ওদের বাড়িতে গিয়ে ডাক্তার ডেকে প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল আদির। তারপর বারাসত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওকে। আসলে হাসপাতালে পৌঁছোতে ঘণ্টাখানেকের বেশি লেগে যেত। তাই আদির ফাস্ট এডটা বাড়িতেই দেওয়া হয়েছিল।
শক কাটিয়ে নর্মাল অবস্থায় আসতে দু’দিন সময় লেগেছিল আদির। ততদিনে কলকাতার নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওকে। কিগানের স্পষ্ট মনে আছে, সেই বিকেলটায় বৃষ্টি হয়েছিল খুব। কাকু-কাকিমা চলে যাওয়ার পর কিগান ঢুকেছিল আদির ঘরে।
‘দাদাভাই?’ আদি বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে উঠেছিল কিগানকে দেখে।
‘আস্তে। অত দুম করে উঠে বসিস না,’ কিগান একটা টুল নিয়ে ওর বেডের পাশে বসে হেসে বলেছিল।
‘তুই কেমন আছিস?’
‘পাগল ছেলে, তুই কেমন আছিস?’ হেসে পালটা প্রশ্ন করেছিল কিগান।
‘জানিস দাদাভাই,’ আদি বাচ্চাদের মতো গলায় বলেছিল, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে।’
‘সে কী রে? ডাক্তারকে বলিসনি?’ আদি অবাক হয়েছিল।
‘না, ওরা কিছু করতে পারবে না। মনে কষ্ট হচ্ছে তো! মালিনী এলে সব ভাল হয়ে যেত!’
‘মালিনী!’ কিগান অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আদির দিকে।
আদিকে যেন ভূতে পেয়েছিল। যেন হাজার হাজার বছর কথা বলেনি ও। যেন সমস্ত কিছু ওকে বলে দিতে হবে এই মুহূর্তেই। কিগান আটকায়নি। আদি মাথা নিচু করে অনেক কথা বলেছিল সেদিন। মালিনী থেকে জীবন, ছোটবেলা, কিগান ঘুরে আবার ওর সব কথা মালিনীতে এসেই থেমেছিল। তারপর আদি বলেছিল, ‘মালিনী আমায় ভুল বুঝল দাদাভাই। ভাবল আমি খারাপ আদিই থেকে গিয়েছি। বুঝল না ওকে আমি কত ভালবাসি। ভুল বোঝাবুঝি খুব খারাপ জানিস দাদাভাই। কোনও মানুষ কোনও মানুষকে ঠিক বুঝে সরে গেল, একরকম। কিন্তু কেউ কাউকে ভুল বুঝল আর তারপর চলে গেল, এটা খুব খারাপ। সমস্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই খারাপ। দেখ না, আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম যাজ্ঞসেনীর ব্যাপারে।’
‘যাজ্ঞসেনী! তুই ভুল বুঝেছিলি? মানে?’ কিগান অবাক হয়েছিল।
আদি নিচু গলায় বলেছিল, ‘আমার ভাল লাগত ওকে। কিন্তু ও তোর জন্য এমন পাগলামি করত! তারপর সেবার বাড়িতে এল। আর আমি দেখলাম ও তোকে সবার সামনে খাইয়ে দিল। তুই কত হেসে হেসে কথা বললি। ওর হাত ধরলি। ওকে পৌঁছে দিলি বাস স্ট্যান্ড অবধি। আর জানিস দাদাভাই আমি দাউদাউ করে পুড়ে গিয়েছিলাম। তোর ওপর রাগ হয়েছিল। ঘেন্না হয়েছিল। তাই সরে এসেছিলাম তোর থেকে।’
‘তুই পাগল!’ কিগান বলেছিল, ‘হ্যাঁ, যাজ্ঞসেনী আমায় প্রোপোজ করেছিল। চিঠি লিখেছিল। কিন্তু আমি ওকে ভালবাসিনি। আমি সেটা বলেও দিয়েছিলাম ওকে। ভাল করে ভদ্র ভাষায় বলে দিয়েছিলাম।’
‘জানি দাদাভাই। এখন জানি,’ আদি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল, ‘আমি বোকা, একগুঁয়ে আর স্বার্থপর। আমার চোখের সামনে পরদা পড়ে ছিল। আর বয়েসটাও তো কম ছিল। তাই বুঝতে পারিনি। কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন বুঝি। তোর চলে আসার পর বুঝি। দিঘি তোকে অমন অপমান করার পর তুই যখন চুপ করে থাকিস, তখন বুঝি।’
‘দিঘি!’ চমকে উঠেছিল কিগান। আদি কী বলছে?
‘আমি জানি দাদাভাই। আমি এক পুজোর সকালে তোদের দেখেছিলাম।’
কিগান মাথা নিচু করে বসেছিল। আদি দেখেছিল? আদি জানে! এতদিন ধরে ও সব জানে!
আদি বলেছিল, ‘আমার অন্যায় হয়েছে দাদাভাই। আমি জেনেও কিছু বলিনি। তোর অপমান দেখেও কিছু বলিনি। আসলে রাগ ছিল যে তোর ওপর। হয়তো হিংসেও। তোর মতো ভাল নই যে। নিজের কথা না ভেবে যে তোর মতো অন্যকে সাহায্য করতে পারি না। আর এর সঙ্গে যাজ্ঞসেনীর রাগটা ছিলই। আমার খুব অন্যায় হয়েছে দাদাভাই। সারাজীবন তুই আড়াল করে গেলি আমাকে, আর আমি…এই পাপেই হয়তো মালিনী ভুল বুঝল আমায়। চলে গেল আমায় ছেড়ে।’
কিগান টুল থেকে উঠে আলতো করে হাত দিয়েছিল আদির মাথায়। বলেছিল, ‘শোন না, এসব বাদ দে। মালিনীকে একটা ফোন কর।’
আদি শান্ত গলায় বলেছিল, ‘আমায় তুই একটা কথা বলবি দাদাভাই?’
‘বল না,’ কিগান নরমভাবে বলেছিল।
‘কেন তোকে দিঘি অমন বদনাম করল রে? বলবি আমায়? প্লিজ।’
কিগান বসে পড়েছিল আবার। কেন এসব জানতে চাইছে আদি? কী হবে এসব জেনে? আর কবর খুঁড়ে মৃত সম্পর্ক বের করে লাভ কী?
আদি তবু ছাড়েনি, ‘আমায় বল না দাদাভাই। কাউকে তো বলবি। একবার তো বলবি। আমি জানতে চাই। কী হয়েছিল দাদাভাই?’
কিগান ঠোঁট টিপে বসেছিল। ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই ফোন কল। সেই রাগী গলা। ভুল বোঝার গলা।
কিগান বলেছিল, ‘তুই এত স্ট্রেস নিস না। আর দিঘিটা তো পাগলি একটা।’
‘না দাদাভাই, কথা ঘোরাস না। বল আমায়। বল।’
কিগান টুল থেকে উঠে জানলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছ’তলার ওপরে ঘর। বাইরে বৃষ্টিতে আবছা কলকাতাকে দেখে মায়ানগর বলে মনে হচ্ছিল কিগানের। মনে হচ্ছিল যেন অচেনা কোনও দেশে এসে পড়েছে ও। বৃষ্টির ঝালর সাজানো রাস্তা। ছোট ছোট খেলনা গাড়ি দিয়ে সাজানো পথঘাট। রঙিন ছাতা মেলা ফুটপাথ। সবাই চলছে। এক বিন্দু থেকে আর-এক বিন্দুর দিকে। এক সম্পর্ক থেকে আর-এক সম্পর্কের দিকে। এত লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাদের অগুনতি কষ্ট। আর তার ভিতর কিগান কে? তুচ্ছ, ধুলোর বুকে আঁকা নামের মতো মানুষ। কেন আদি জানতে চাইছে ওর কথা? দিঘির বয়স অল্প। কত সম্ভাবনা পড়ে রয়েছে ওর সামনে। কত ভালবাসার মানুষ চাইবে ওকে। সেখানে কিগান কে? বরং আর কয়েক বছর পর হয়তো দিঘির খারাপ লাগবে। হয়তো একসময়, খণ্ড মুহূর্তের জন্য কিগানের প্রতি এই ভালবাসা ওর মনে লজ্জা জাগাবে। হয়তো হাস্যকর লাগবে কিগানকে। তাই, কী হবে আদিকে এসব বলে!
কিগান বলেছিল, ‘পুরনো কথা ভেবে লাভ আছে? বাদ দে না আদি।’
‘না, বাদ দেব না। জানিস একদিন বিকেলে ওকে আমি দেখেছিলাম। তখন হঠাৎ কী হল, কথা বললাম ওর সঙ্গে। তোর কথা তুললাম ইচ্ছে করে। আর কী দেখলাম জানিস? ওর মুখটা নিমেষে পালটে গেল। যেন অপরাধবোধ, কষ্ট আর রাগ এসে মিশে গেল একসঙ্গে। দাদাভাই আর লুকোস না। বল আমায়। কী হয়েছিল বল।’
ফোনটা একবার রিং হতেই এবার ধরল কিগান, ‘হ্যালো, আদি?’
‘দাদাভাই, গ্রেট নিউজ। আমার প্রোমোশন হয়েছে। আর পি আর গিরি করতে হবে না। এখন আমি মার্কেটিং-এ চলে এসেছি। ব্যাপক ব্যাপার। আমায় পুজোর পরে ওরা জার্মানি পাঠাবে,’ আদি থেমে থেমে কথাগুলো বলল।
খটকা লাগল কিগানের। গ্রেট নিউজ বলছে, এদিকে এমন নির্জীবভাবে কথা বলছে কেন আদি? ও জিজ্ঞেস করল, ‘তোর কী হয়েছে আদি?’
‘আমার?’ আদি একইরকম গলায় বলল, ‘কই, কিছু না তো! রবিবার হলেও আজ অফিস খোলা আছে। জার্মানি থেকে ওঁরা এসেছেন তো। তাই আমাকেও আসতে হয়েছে। তারই ফাঁকে গৌর স্যার বললেন খবরটা। মানে এখনও রিট্ন হাতে পাইনি, তবে সাতদিনের মধ্যে পেয়ে যাব।’
‘তুই খুশি হোসনি?’ কিগান জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ রে হয়েছি,’ আদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘বাদ দে। আচ্ছা, জিয়ানা বোস তোর নম্বর চাইছিল। দেব?’
‘জিয়ানা!’ আদি হঠাৎ জিয়ানার প্রসঙ্গ তোলায় কিগান থমকাল। তারপর বলল, ‘না, দিস না। আমি যা ফেলে এসেছি পিছনে, তা আর টানতে চাই না। তুই এড়িয়ে যাস। বা না পারলে বলিস আমি বারণ করেছি দিতে। অবশ্য রুহান যদি দিয়ে দেয় তা হলে অন্য ব্যাপার।’
‘আর দিঘিকে? যদি চায়, দেব?’
কিগান হাসল। বলল, ‘ভাল লাগল তোর প্রোমোশনের কথা শুনে। তা তুই মালিনীকে ফোন করেছিলি? তোকে যে বলেছিলাম খবর নিতে।’
‘মালিনী, দিঘি, জিয়ানা, এরা কারা দাদাভাই? কেন আমরা এদের নিয়ে কথা বলি! দাদাভাই, তার চেয়ে চল আমরা আবার আগের মতো হয়ে যাই।’
‘তাই?’ কিগান হাসল, ‘জীবন কি লেড পেনসিলে লেখা খাতা যে, ইচ্ছেমতো ইরেজার দিয়ে মুছে তুই নতুন করে সব শুরু করবি? না, এটা বাচ্চাদের চোর-পুলিশ খেলা যে, আব্বুলিশ দিলেই সব আবার ইচ্ছেমতো শুরু হবে? আমরা কষ্ট পাই, আনন্দ পাই, যা খুশি তাই হোক আমাদের, তবু যারা এসেছে একবার, যারা ছুঁয়েছে একবার তারা তাদের মতো করে বদলও করে দিয়েছে আমাদের জীবনে। আগের মতো কিচ্ছু হয় না রে আদি। তার চেয়ে যা আছে তা মেনে নে। জীবন অনেক সহজ হবে। বুঝেছিস?’
আদি হাসল, ‘জিয়ানা বোসকে তা হলে…’
‘বললাম তো, না। তবে রুহান যদি দিয়ে দেয় তবে… অবশ্য ওকেও নিষেধ করেছি। যাক গে। দেখ আদি, যা ইচ্ছে হয় করিস,’ কিগান কিছুটা হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো করে বলল।
‘ঠিক আছে রে দাদাভাই, পরে আবার কল করব। এখন রাখি।’ আদি কেটে দিল ফোনটা।
জিয়ানা কেন খুঁজছে ওকে জানে কিগান। না, শুধু ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য নয়। শুধু ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কাজ তো করেনি কিগান। তবে জিয়ানা পাগলি, ওর যা চাই তা চাই। ওকে সামলানোর ক্ষমতা নেই কিগানের। তাই ওর থেকে দূরে থাকাই ভাল।
আসলে প্রোজেকশন কর্পের কাজটা হয়েছে কিগানের জন্য। বা বলা যায় কিগানই কাজটা পাইয়ে দিয়েছে প্রোজেকশন কর্পকে। তবে না, জিয়ানার জন্য নয়। জিয়ানার কথা চিন্তা করে নয়। ওয়াটার বার্ডসের অপমানের শোধ নিয়েছে কিগান। সারাজীবন মুখ বুজে সব সহ্য করা আর মেনে নেওয়া কিগান ওয়াটার বার্ডসের শেষ দিনের কথাগুলো ভুলতে পারেনি।
প্রাইসের ফাইনাল ওপেনিং-এর ঠিক আগের আগের দিন ছিল সেটা। সন্ধে নাগাদ অফিসের কাজ গুছিয়ে বাড়িতে ফেরার তোড়জোড় শুরু করেছিল কিগান। আর ঠিক তখনই মোবাইলে ফোনটা এসেছিল। নম্বরটা সেভ করা ছিল না বলে প্রথমে একটু ইতস্তত করেছিল কিগান। তারপর ধরেছিল, ‘কে বলছেন?’
‘পুলুদা বলছি,’ ওপাশের গলাটা ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে বলেছিল।
‘পুলুদা? মানে, কাকে চাইছেন?’ কিগান বুঝতে পারেনি।
‘আরে কিগানভাই আপনাকেই চাইছি। আমি পুলক ব্যানার্জি। ওয়াটার বার্ডসের।’
‘ও।’ ভদ্রলোকের ছবিটা হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল কিগানের।
‘তা আমরা কাজটা পাচ্ছি তো?’
‘মানে!’ কিগান অবাক হয়েছিল।
‘আরে, পরশুদিন প্রাইসের ফাইনাল ওপেনিং। আমরা পাচ্ছি তো কাজটা? ফ্ল্যাটের কথাটা মনে আছে তো? কোনও চিন্তা নেই। ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়ার সাতদিনের ভেতর আপনি ফ্ল্যাটের চাবি পেয়ে যাবেন।’
‘প্লিজ মিস্টার ব্যানার্জি, এমন বলবেন না। আমি জানি না। আমায় ডিস্টার্ব করবেন না।’
‘মানে?’
‘মানেটা বোঝা কঠিন হল? আর কোন মুখে আপনারা কথা বলেন? গত সপ্তাহে আমি খবর পেয়েছি ভাইজাগে আপনাদের তৈরি করা একটা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের আরসিসি ট্যাঙ্ক ভেঙে পড়েছে। এখনও গ্যারান্টি পিরিয়ডের চার মাস বাকি আছে। কোন মুখে কাজ চান আপনারা? আপনি লোয়েস্ট হলেও আমি গৌর স্যারকে বলব যাতে আপনাদের সম্বন্ধে একবার চিন্তা করে।’
‘কত নিয়েছেন প্রোজেকশন কর্প থেকে?’ আচমকা পুলক ব্যানার্জির গলার স্বর পালটে গিয়েছিল।
‘কী যা তা বলছেন?’ কিগানও গলাটা শক্ত করেছিল।
‘সব জানি। তবে সুবিধে করতে পারবেন না। আপনাদের ফাইন্যান্সে আমাদের লোক আছে। অত সোজা নয় যে, আপনি ঘুষ নিয়ে কাজ দিয়ে দেবেন।’
‘বাজে কথা বলবেন না মিস্টার ব্যানার্জি।’ আচমকা মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল কিগানের।
‘সত্যি কথা লাগছে বুকে? চাকরি ছাড়ার আগে ভেবেছেন যে, মাল্লু গুছিয়ে কেটে পড়বেন?’
‘রাখছি।’ কিগান ফোনটা কেটে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়েছিল। কত বড় সাহস লোকটার! এমন করে কথা বলছে? ও ঘুষ নিয়েছে? ও মাল্লু কামাতে চাইছে? অপমানে ঘেমে গিয়েছিল কিগান। মনে হচ্ছিল হাতের কাছে পেলে লোকটার জিভ ছিঁড়ে ফেলে।
আর সেই মুহূর্তে, জীবনে প্রথমবার ওর ভেতরে নড়ে উঠেছিল এক সরীসৃপ। মনে হয়েছিল, অনেক হয়েছে! অনেক লাঞ্ছনা, অপমান আর মার সহ্য করতে হয়েছে ওকে। আর নয়। এবার অন্তত একবারের জন্য হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর, মারটাকে অন্যদিকে পৌঁছে দেওয়ার সময় এসেছে।
হেড অফিস থেকে প্রাইস আর ডিসকাউন্টের খামগুলো পরের দিন সন্ধেবেলা আসার কথা। আর তা থাকবে কিগানেরই জিম্মায়। কিগান মনে মনে কর্তব্য স্থির করে নিয়েছিল।
পরেরদিন খামগুলো আসতে দেরি হয়েছিল সামান্য। রাত দশটা হয়ে গিয়েছিল। খামগুলো নিজের চেম্বারে রেখে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি কিগান। রুহানকে ফোন করেছিল সোজা। রুহান অত রাতে কিগানের ফোন পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল, ‘তুমি? কী ব্যাপার গো!’
কিগান বলেছিল, ‘তুই কত তাড়াতাড়ি তোদের লেটার হেড, স্ট্যাম্প, খাম আর কোম্পানির সিল নিয়ে আমার কাছে আসতে পারবি?
‘অ্যাঁ? আমি…ইয়ে…কাল…’
‘আজ রাতে। কত তাড়াতাড়ি পারবি? তোদের প্রাইস চেঞ্জ করতে হতে পারে। গোটা প্রাইস ফরম্যাটটা পেন ড্রাইভে করে নিয়ে আর যা যা বললাম সব নিয়ে দুটো ফাঁকা লেটার হেডে সই করিয়ে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আয়। কাজটা যদি চাস রুহান, তবে শোন-আমি তোদের সুযোগ দিচ্ছি অন্য পার্টির প্রাইস দেখে তোদের প্রাইস কমাতে। এখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। আমি ঘরে থাকব। যত দ্রুত পারবি আয়। জিয়ানাকে বাড়িতে গিয়ে আমি যা বললাম বল। দেরি করিস না। দেরি করলে কিন্তু পস্তাবি বলে দিলাম।’
রুহান এমনিতে সরল, একটু কম বোঝে ধরনের হলেও সেদিন কিন্তু বুঝতে ভুল করেনি। বরং রাত পৌনে তিনটে নাগাদ খুরানার নিজস্ব গাড়ি নিয়ে ওর কাছে চলে এসেছিল ঠিক।
খুব সাবধানে ওয়াটার বার্ডসের খামের মুখটা খুলেছিল কিগান। তারপর ওদের প্রাইস আর ডিসকাউন্ট দুটো দেখে নতুন করে প্রিন্ট নিয়েছিল প্রোজেকশন কর্পের পেপারগুলো। কারণ, প্রোজেকশন কর্পের দাম বেশি ছিল। ফলে আবার খাম পালটে নতুন করে সিল করা হয়েছিল প্রোজেকশন কর্পের খামগুলো। তারপর আবার ওয়াটার বার্ডসের খামগুলো খুব সাবধানে বন্ধ করেছিল কিগান। সব করতে প্রায় ভোর চারটে বেজে গিয়েছিল। এর মধ্যে রুহানের মোবাইলে জিয়ানা ফোন করেছিল দু’বার, কিন্তু কিগান ধরেনি। ও দ্রুত মন দিয়ে কাজ সারছিল। আসলে খামগুলো তো বাড়িতে আনার নিয়ম নেই। নেহাত গুরুং বন্ধু মানুষ তাই কিগানের সার্চ হয় না। কিন্তু কিগান জানত সকাল সকাল গিয়ে যদি খামগুলো না রাখে, তা হলে ফাইনান্সের লোকজন চলে আসবে কলকাতা থেকে। তখন ভীষণ বিপত্তি হবে।
সমস্ত কাজ সেরে কিগান আর রুহান পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল কিগানদের ছাদে। শুকতারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। ভোরের আলো ফুটতে বাকি ছিল তখনও। শুধু হাওয়া দিচ্ছিল। খুব হাওয়া দিচ্ছিল। চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল কিগানের।
রুহান জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন এমন করলে কিগানদা?’
‘তোদের লাভ হল তো।’ কিগান হেসেছিল সামান্য।
‘তুমি তো এমন…মানে…’ রুহান যেন কী বলবে বোঝাতে পারছিল না।
‘রাম-রাবণের যুদ্ধ, বুঝলি। আত্মার ভেতরেও নিরন্তর রাম-রাবণের যুদ্ধ চলে। আমি জোর করে রাবণকে বেঁধে রাখি। কিন্তু কতদিন আর রাবণকে বেঁধে রাখব, বল? আমিও তো মানুষ। তাই ভাবলাম একবার রাবণটাকে খুলে দিই। দেখ তো, তুই একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলি। জিয়ানার কত বড় লিপ হল। তোরা কাজটাও পাবি। রাবণ তো ভালই কাজ করল।’
‘কিন্তু তুমি? তোমার কী হবে? এটা তো অন্যায় হল কিগানদা। আমি তো চাকরিতে বাধ্য। কিন্তু তুমি তো এসব শুরু না করলেও পারতে। তুমি আমার হিরো যে!’
‘করলাম। আর তুই জেনে গেলি কিগানেরও একটা অন্ধকার দিক আছে। একটা রাক্ষস কিগানের ভেতরেও আছে, যে খারাপ কাজ করে।’
‘জানো, এখানে আসার আগে, কেন জানি না বউদি, মানে জিয়ানাদি কাঁদছিল। বলছিল, তুমি নাকি চিরকাল এমন, এর মানে কী কিগানদা? চিরকাল এমন মানে? তুমি কেমন?’
‘জিয়ানার কথা বাদ দে।’ কিগান দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। তারপর বলেছিল, ‘জানিস, আমার যখন বয়স অনেক কম আমার মা-বাবাকে তখন হারিয়েছি। কিন্তু মাকে শেষ দেখাটুকু আমার আজও মনে আছে। গাড়িতে ওঠার আগে ছাতা সরিয়ে মা ওপর দিকে তাকিয়েছিল। মায়ের সেই হাসিহাসি মুখটা আজকাল খুব দেখতে পাই। আর সেদিন সামনের বিলবোর্ডের নীচে ধূসর রঙের পায়রারা বসেছিল সার দিয়ে। আজকাল মাঝে মাঝে সেই পায়রাগুলোকে স্বপ্নে দেখি, জানিস। কিন্তু তারা সেখানে বসে থাকে না। যতবারই দেখি, দেখি তারা উড়ছে। চক্কর দিচ্ছে। যেন শকুন। পাখিরা কি মৃত্যু টের পায় আগে থেকে? আমি আজকাল আর বিশেষ কিছু ভাবি না, জানিস। মনে হয় জীবন কিছু মুহূর্তের সমষ্টি মাত্র। আরও স্পষ্ট করে বললে কালেকশন অব মোমেন্টারি ট্রুথ্স। আর এ সত্যিগুলোও খুব পরিবর্তনশীল। তাই কালকে যে রাম, আজ সে-ই রাবণ। আর হিরো? মানুষ অল্প সময়ের জন্যই হিরো থাকে। হিরো দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে ভিলেন হয়ে যায়। কাউকে হিরো ভাবিস না, দেখবি, জীবন অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। আসলে রাতে শান্তিতে ঘুম ছাড়া আর কী চাই আমরা? হিরো আর তার ভক্তদের ঘুম আসে না। তাই সেদিক থেকে দেখলে আমি ভালই করেছি। হিরো কিগানের মৃত্যু হল এই অন্যায় কাজের সঙ্গে। আর হিরো হয়ে থাকতে পারছি না রে আমি। আর বিলবোর্ডের নীচে শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারছি না। আমায় একটু ডানা মেলতে দে ভাই। ঠিক-ভুলের হিসেব ছেড়ে যা ইচ্ছে করছে সেটা একটু করতে দে।’
বাবুলাল ফিরছে না এখনও। সন্ধে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে পাহাড়ি ঢালের অর্কিড। পাহাড়ে সন্ধে বড় নির্জন। এই নির্জনতাই কি চিরকাল খুঁজেছে কিগান? এই অন্ধকার, মেঘ আর একলা বসে থাকাই কি চেয়েছে ও সারাটা জীবন? জীবন! এটাকে কি আদৌ জীবন বলে! বেঁচে থাকা বলে? কিগান কি একাই হতে চেয়েছিল? নাকি প্রেম একা করে দিয়েছে ওকে? সত্যিকারের প্রেম কি একাই করে দেয় মানুষকে? তার কাছে পৌঁছোতে পারল না বলেই কি একা হয়ে যায় মানুষ?
স্মৃতি আর ঝিঁঝিপোকা নির্জনতায় প্রকট হয়ে ওঠে। আজও হল। কিগান হাসল। বাবুলাল আসছে কিনা দেখার জন্য বাংলোর সামনের রাস্তায় নেমে এসেছিল ও। হাতে গিটারটা ছিল। ওখানে যে-বেঞ্চিটা আছে, সেখানে বসে কিগান জি কর্ড ধরল। তারপর জিসিডি সহজ প্রগরেশনে বাজাতে লাগল আপন মনে।
গিটার ওর ভেতরের নদীটাকে খুলে দেয়। আর তার পাশের পাথরের বাড়ির চিমনি দিয়ে কালো গোল্লা গোল্লা ধোঁয়া বের হয় তখন। আর কিগান দেখতে পায় বাবা ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছে মায়ের। নীল গামবুট পরে বসে রয়েছে ছোট্ট কিগান। হাসছে। ওরা সবাই হাসছে।
স্বপ্ন বা কল্পনার কোনও মৃত্যু নেই। কিগান জানে এগুলো কেউ নিতে পারবে না ওর থেকে।
‘বড় মিষ্টি হাত তো তোমার!’
কিগান চমকে উঠে থেমে গেল। সামনে তাকাল। ছাতা হাতে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছেন ওর সামনে। পাহাড়ে যখন-তখন বৃষ্টি নামে, ছাতা এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।
কিগান জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি?’
‘আমি একটু বসব?’ ভদ্রলোক বললেন।
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,’ কিগান হাত দিয়ে সামনের চেয়ারটা দেখাল।
ভদ্রলোক বারান্দায় উঠে বন্ধ ছাতাটা হেলিয়ে রাখলেন দেওয়ালে। তারপর বসে বললেন, ‘পাহাড়ে অনেকে গিটার বাজায়। তবে তোমার হাতটা স্পেশ্যালি মিষ্টি।’
‘থ্যাঙ্কস। আপনি কি গিটার বাজান?’
‘না, এখন আর বাজাই না। এখন ম্যান্ডোলিন বাজাই,’ ভদ্রলোক থামলেন, ‘আমি এখানেই থাকি। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমার বাজনা শুনে লোভ সামলাতে পারলাম না। তুমি ভাই কিছু মনে করলে না তো?’
‘না, না,’ কিগান হাসল। বলল, ‘আমি স্নো ফ্লেকস্-এ জয়েন করেছি নতুন। এখানে থাকি। মানে কিছুদিন হল এসেছি আর কী! আমার নাম কিগান অর্ক ব্যানার্জি।’
‘ইন্টারেস্টিং নেম।’ ভদ্রলোক হাসলেন, ‘তোমার গিটারটা নিতে পারি?’
‘শিয়োর,’ কিগান এগিয়ে দিল।
‘আমি অনেক অনেক আগে গিটার বাজানো ছেড়েছি। তবু চেষ্টা করছি। কলেজ-জীবনে কিটসের একটা চিঠির কয়েকটা লাইনে সুর দিয়েছিলাম। আজ দেখি তোমায় শোনাতে পারি কিনা।’
ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করলেন। তারপর ডি-তে ধরলেন-‘I could be martyr’d for my religion. Love is my religion. I could die for that. I could die for you… The pain would be too great. My love is selfish. I can not breathe without you.’
ভদ্রলোক বাজনা থামিয়ে হাসলেন, ‘সেন্টিমেন্টাল, না? কিন্তু জানো কিগান, সত্যিগুলো চিরকালই সেন্টিমেন্টাল হয়। বাই দ্য ওয়ে আমার নামটা বলা হয়নি। আমি ব্রাউন, জোনাথন ব্রাউন। এই সময়টায় আমি কফি খাই একটু। খুব অসুবিধে না হলে, এক কাপ হবে?’
Chapter - 36
৩৬
ফোনটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল দিঘি। বাইরে, কাচের জানলার ওপারে আজ বৃষ্টি নেমেছে খুব। গড়পাড়ের দিকে জলও জমেছে। রামমোহন মিশন লাইব্রেরির সামনে বাবা আটকে আছে। গাড়িটা খারাপ হয়েছিল বলে আজ গাড়ি ছাড়াই অফিসে গিয়েছিল বাবা। ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টিতে আটকে আছে। আজ যেন ফুটো হয়ে গেছে কলকাতার ছাদ। মা খিচুড়ি বসাতে বলেছে রান্নার মাসিকে। আর গজগজ করছে এমন খারাপ আবহাওয়ার জন্য, বাবার আটকে পড়ার জন্য। সব শুনছে দিঘি। কিন্তু তবু যেন কিছু শুনছে না। বুকের ভেতরের খাঁচাটায় যেন ছটফট করছে একটা চড়াই। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সব বদলে ফেলে। সব আগের মতো করে ফেলে। যখন প্রজাপতির ডানার মতো আলো অন্ধকার টপকে উড়ে উড়ে বেড়াত ও-তেমন করে ফেলে।
আজ প্রজাপতি ঝলসে গেছে আগুনে। সে নির্জীব। সারা শরীর তার পোড়া। ডানা মেলার কৌশলও হয়তো ভুলেছে সে আজ।
দিঘির অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে অসংখ্য ঝিঁঝিপোকা কে যেন ঢুকিয়ে দিয়েছে শরীরে। মনে হচ্ছে সারা শরীর কাঁপছে। হাতে-পায়ে জোর নেই। মাথাও কেমন যেন ঘুরছে। এ কী খবর শুনল ও? রাহি ওকে এমন একটা খবর শোনাল?
আজ কলেজও যেতে পারেনি দিঘি। গত সাতদিন জ্বরে ভুগে গতকাল থেকে ভাল আছে ও। তাই এমন স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় আর রাস্তায় বের হয়নি দিঘি। বা বলা ভাল বেরোনোর ঝুঁকি নেয়নি।
সারাটা দিন পড়াশোনা করেছে দিঘি। কয়েকদিনের পড়া জমে গিয়েছিল। তারপর শেষ বিকেলের দিকে গুছিয়ে রেখেছিল বইপত্তর। ভাল লাগছিল না পড়তে। শুধু মনে হচ্ছিল, সব কেমন যেন ফাঁকা। কী যেন নেই। কী যেন হলে মন ভাল হয়ে যেত। কী করবে বুঝতে পারছিল না। কার সঙ্গে কথা বলবে ঠিক করতে পারছিল না। মোবাইলটা নিয়ে বারবার ফোনবুকে সেভ করে রাখা নামগুলো দেখছিল। মনে হচ্ছিল এত জনের নম্বর সেভ করা আছে, তবু কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না কেন? তারপর ভাল করে ভেবেছিল দিঘি। সত্যিই কি কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? নাকি…
ফোনবুকের ‘কে’ অক্ষরে এসে আটকে যাচ্ছিল ওর চোখ। কিগান। ওর নম্বরটা টানছিল দিঘিকে। ইচ্ছে করছিল ফোন করতে। হাতের আঙুল অস্থিরভাবে এক দ্বিধার ভেতর জড়িয়ে গিয়েছিল। করব? কল করব? পেন্ডুলামের মতো দুলছিল ওর মন। কষ্টে কে যেন ওর শ্বাসনালিটাকে পেঁচিয়ে ফেলছিল রাবার দিয়ে। যেন কেউ জলে ডুবিয়ে দিচ্ছিল ওকে। মনে হচ্ছিল আবহাওয়ায় অক্সিজেন কমে যাচ্ছে দ্রুত। আর তাই থাকতে না পেরে ফোনটা করেছিল শেষ পর্যন্ত। তবে কিগানকে নয়, রাহিকে।
দিঘি বিছানা থেকে উঠে জানলার কাছে দাঁড়াল। বৃষ্টি বাড়ছে। বাবা আসবে কী করে? বাবার নাকি ছাতা ভেঙে গেছে। মা যে অন্য ঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে তা বেশ বুঝতে পারছে দিঘি। তবু চিন্তাটা আবার বেঁকে যাচ্ছে। আবার চলে যাচ্ছে রাহির কথাগুলোর দিকে।
দিঘির ফোনটা পেয়ে রাহি যেন অবাকই হয়েছিল একটু। বলেছিল, ‘আরে, তুমি? এতদিন পর! হঠাৎ! কী মনে করে?’
দিঘি অপ্রস্তুত হয়েছিল। রাহি ঠিকই বলছে। ও বহু মাস ফোন করেনি। আর দীর্ঘদিন যোগাযোগ না করলে চেনা সম্পর্কের ভেতরেও ধুলো আর ঝুল জমে। ময়লা পড়ে। মনের দৃষ্টি আবছা আর তির্যক হয়ে যায়। সহজ হতে চেয়েও মন যেন সহজ হতে পারে না। দিঘিও যেন সহজ হতে পারছিল না। তবু সহজ গলায় বলেছিল, ‘দেখো না প্রজেক্ট, পরীক্ষা আরও কত কিছু ছিল। সব নিয়ে একদম ঘেঁটে ছিলাম। খুব ইচ্ছে হত ফোন করি, কিন্তু এই করব করছি করে করে কেমন যেন পেরিয়ে গেল এক-একটা দিন। তাই ঠিক করলাম যে, আজ আর কেউ আটকাতে পারবে না আমায়। আজ আমি ফোন করবই।’
রাহি হেসেছিল, ‘এমন করে বলছ যেন কঠিন একটা কাজ। তবে আমারও ঠিক হয়নি তোমায় এভাবে জিজ্ঞেস করা, কারণ, আমি নিজেও তো তোমায় ফোন করিনি।’
দিঘির ভেতরটা ছটফট করছিল। মনে হচ্ছিল এসব অনর্থক কথা বলছে কেন ও? কেন সময় নষ্ট করছে এভাবে? ও তো অন্য কথা বলতে চায়। জানতে চায়।
দিঘি বলেছিল, ‘তারপর? কেমন আছ তোমরা? তোমাদের ওখানকার সবাই?’
রাহি সময় নিয়েছিল সামান্য। তারপর বলেছিল, ‘মাঝখানে খুব সমস্যা আর গন্ডগোল হয়েছিল। এখন ঠিক আছে।’
‘সমস্যা!’ দিঘি প্রশ্ন করেছিল।
‘হ্যাঁ, জমি-জায়গা নিয়ে সে তো বিরাট কাণ্ড। আদিত্যর মানে কিগানদার ভাই তো আহত হয়েছিল। তারপর অবশ্য সব মিটে গেছে। ভাগ্যিস কিগানদা ছিল, না হলে যে কী হত?’
‘কিগানদা?’ দিঘির গলা শুকিয়ে আসছিল। মাথা এলোমেলো হচ্ছিল আবার। মনে হচ্ছিল এখানেও লোকটা? তবু যথাসম্ভব গলাটা সহজ রাখার চেষ্টা করছিল। বলেছিল, ‘কেন, কী করেছে আবার?’
‘ও না থাকলে যে কী হত! আদিত্যর বা আমার যে…’ রাহির দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল দিঘি। রাহি বলেছিল, ‘সে অনেক কথা। একদিন বলব। তবে এটুকু বলছি, কিগানদার মতো মানুষ আমি আর দেখলাম না।’
রাহি কিগানের প্রশংসা করছে! মৌমাছি যেন হুল ফোটাল দিঘির বুকে। লোকটার কি সব বিষয়ে হিরোগিরি না করলেই চলে না!
দিঘি ব্যঙ্গ করে বলেছিল, ‘তোমার সবসময় কিগানদার দিকে ঝোল টেনে কথা বলার স্বভাব।’
‘না, একদম না,’ রাহির গলা শক্ত হয়ে গিয়েছিল আচমকা, ‘তুমি জানো না বলে এমন বলছ। কিন্তু আমি তো জানি মানুষটাকে। এমন সেল্ফলেস মানুষ আমি দেখিনি কোনওদিন। যাক, তোমায় আর কী বলব। আসলে কাউকেই আর কিছু বলার নেই। কারণ মানুষটাই তো আর নেই।’
‘মানে!’ দিঘির বুকের ভেতর আচমকা আছড়ে পড়েছিল বিদ্যুৎ। নেই? মানুষটা নেই এর অর্থ কী? ‘নেই মানে? কে নেই?’
‘মানে নেই,’ রাহি থেমেছিল কিছুক্ষণ, তারপর বলেছিল, ‘আর নেই এখানে। চাপাডাঙায়। এখানকার চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।’
‘চলে গেছে!’ দিঘির কথা বেরোচ্ছিল না মুখ দিয়ে।
‘হ্যাঁ, চলে গেছে।’ রাহি থেমেছিল আবার, ‘কী যে হল হঠাৎ! জানো, একদিন বলল চলে যাবে। চলে যাবে অন্য চাকরি নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম। বলল, একলা হতে চায়। কেন চায়, কীসের জন্য চায়। তা বলল না। আমি জানি, প্রথম থেকেই জানি, মানুষটা দুঃখী, একা। তবে এমন হবে বুঝতে পারিনি।’
দিঘি কথা বলতে পারছিল না। হু হু করে গড়পাড়ের জল এসে বুজিয়ে দিচ্ছিল ওর গলা। কথা তলিয়ে যাচ্ছিল স্রোতে। চলে গেল লোকটা! এমনভাবে চলে গেল? কেন গেল? ওর জন্য? ওর ওই ফোনটার জন্য? কী যে ভূত ঢুকেছিল দিঘির মাথায়! কিগান তো চলেই গিয়েছিল কলকাতা থেকে। তার পরেও কেন ওসব বলতে গিয়েছিল ও?
কিন্তু সত্যিই কি চলে গিয়েছিল কিগান? চলে যাওয়া কাকে বলে? সশরীরে চলে গেলেও, আসলে কি কিগান গিয়েছিল? চলে যাওয়া যে কতটা চলে আসা সেটা বুঝতে পেরেছে দিঘি। ও কোনওমতে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোথায় গেল মানুষটা?’
রাহি বলেছিল, ‘পাহাড়ে। নতুন চাকরি নিয়ে চলে গেছে।’
কোথায় গেছে? কোন জায়গায়? কোন কোম্পানি? নতুন ফোন নম্বর নিয়েছে? নম্বরটা কী? রাহির কাছে কি আছে সেটা? রাহি কি একবার দেবে ওকে? বলবে কিগান যাওয়ার সময় ওর কথা একবারও বলেছিল কিনা?
কিন্তু জল ঢেকে দেয় সব। দৃশ্য আবছা হয়ে যায়। শব্দ ডুবে যায়। জল ধর্ম অনুযায়ী আলাদা করে দেয় মানুষকে। দিঘি সেই ডুবে যাওয়া জল পেরিয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। আচমকাই ‘পরে কথা বলছি’ বলে কেটে দিয়েছিল ফোনটা।
আচমকা ফোনটা কেটে দেওয়া কি অসভ্যতা হয়েছে? অন্যায় হয়েছে? জানে না দিঘি। ও জানতেও চায় না। ও যে কথা বলতে পারছিল না! ওর যে কষ্ট হচ্ছে খুব!
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল দিঘি। কলকাতার এই অংশটা পুরনো। অনেক পুরনো। এখানে পুরনো দালান বাড়ি আছে অনেক। ঝুল বারান্দা, লাল রোয়াক, আছে লোহার বিচিত্র কাজের থামওলা পোর্টিকো। ওদের বাড়ির উলটোদিকেই একটা বাড়ি আছে যার সামনে রয়েছে একটা রোয়াক।
দিঘি দেখল সেই নীচের রোয়াকে দুটো বাচ্চা ছেলে কাগজের নৌকো তৈরি করে রাস্তার কোণে জমা জলে ছাড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কাগজের দুটো নৌকো ভাসছে না। এক দিকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে বারে বারে। তবু ছেলে দুটো চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছাতা মাথায় দিয়ে রোয়াক থেকে উপুড় হয়ে ঝুঁকে দুটো ছেলে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নৌকো দুটো সোজা করার। নৌকো দুটো ভাসানোর।
‘কী দেখছিস রে দিঘি?’
মহুলের গলার স্বরে পিছনে ফিরল দিঘি, ‘কিছু না।’
‘এ কী!’ মহুল ওর হাতে খোলা বইটা পাশের টেবিলে উপুড় করে রেখে এগিয়ে এল ওর দিকে, ‘কী হয়েছে তোর? চোখে জল কেন?’
‘কই?’ দিঘি তাড়াতাড়ি চোখটা মুছল। সত্যি কখন যে জল গড়িয়ে নেমেছে সেটা বুঝতেই পারেনি!
‘কী হয়েছে দিঘি?’ মহুল কাছে এসে হাত রাখল মাথায়।
কখনও কখনও মানুষের স্পর্শে স্নেহ থাকে। ভরসা থাকে। ভালবাসা থাকে। আজ হঠাৎ এই সমস্ত কিছু মহুলের স্পর্শ থেকে বুঝতে পারল দিঘি। মানুষ রূঢ় কথায় যত না কাঁদে, ভালবাসায় কাঁদে তার চেয়ে বেশি। দিঘি যেন এই স্পর্শটুকুর অপেক্ষাই করছিল। বাড়তে থাকা জল নরম স্পর্শে এবার ঝোরা হয়ে নামল। দিঘি মহুলকে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল জোরে।
‘এই পাগলি, কী হয়েছে?’ মহুল অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।
দিঘি উত্তর দিল না। বরং আরও জোরে আঁকড়ে ধরল মহুলকে। ঝরনা তার উদ্দামতা বাড়াল আরও।
মহুল আর কিছু বলল না। কাঁদতে দিল দিঘিকে। শুধু ধরে থাকল ওকে। নরমভাবে ধরে থাকল। তারপর একসময় কান্না ধরে এল। দিঘি ঠোঁট কামড়ে মহুলের কাঁধ থেকে মাথা তুলে ধীর পায়ে গিয়ে বসল বিছানায়। ভেজা চোখের পাতা তুলল না একবারও।
মহুল এসে বসল ওর পাশে। বলল, ‘কাউকে কষ্ট দিয়েছিস? না কেউ তোকে কষ্ট দিয়েছে?’
দিঘি ঠোঁট কামড়ে রইল। উত্তর দিল না কিছু।
মহুল হাসল, ‘তুই এখনও একদম পাগলিই রয়ে গেলি! বল না কী হয়েছে?’
দিঘি মহুলের দিকে তাকাল। একদম পালটে গেছে ওর দিদিটা। সেই দাবাখাবা, আত্মকেন্দ্রিক, জেদি মেয়েটা যেন আর নেই। এত দিনকার ঘোলা জল থিতিয়ে এখন টলটলে জলটা পড়ে রয়েছে শুধু। কষ্ট মানুষকে কি থিতিয়ে দেয়? মানুষকে কি স্বচ্ছ আর স্পষ্ট করে দেয়?
মহুল আজকাল মাঝে মাঝেই এসে থাকে ওদের সঙ্গে। এমনকী মাঝে মাঝে শ্বশুর বাড়িতেও যায়। শমীর বাবা আর মায়ের সঙ্গে অদ্ভুত সহজ হয়ে গিয়েছে মহুলের সম্পর্ক। আর কোনও চাহিদা নেই মহুলের। যেন শমীর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও মিশে গেছে জলে আর হাওয়ায়। এ মহুল যেন আগুনে পোড়া। খাঁটি।
মহুল আলতো করে হাত রাখল দিঘির মাথায়। তারপর সরে এল ওর কাছে, ‘কার জন্য এত মনখারাপ করছে তোর? কে তোকে এত কষ্ট দিয়েছে রে? কার জন্য এমন করে কাঁদছিস? আমায় বলতে পারিস তুই। বিশ্বাস করে বলতে পারিস।’
দিঘি ছলছলে চোখ তুলে তাকাল মহুলের দিকে। বলবে? বলতে পারবে সেইসব কথা, যা কোনওদিন কাউকে বলেনি ও? মহুল কি বুঝবে? মহুল কি খারাপ ভাববে ওকে? কিংবা কিগানকে? মহুল কি বুঝতে পারবে কোন স্পন্দনে দিঘি বেজে উঠেছিল কিগানের সঙ্গে?
তবু চূড়া স্পর্শ করতে চায় আকাশ। নদী মিশতে চায় সমুদ্রে। প্রেম চায় তার প্রকাশধর্ম।
দিঘি তাকাল মহুলের দিকে। তারপর নিচু গলায় বলল, ‘তুই ভুল বুঝবি না তো?’
‘না, সারাজীবন তো ভুলই বুঝলাম দিঘি। আর কত ভুল বুঝব বল? তুই বল। বলেই দেখ না তোর দিদি কতটা ভুল বোঝে।’
দিঘি ঠোঁট কামড়ে সংযত করল নিজেকে। বালিশটা নিয়ে কোলের ওপর রাখল। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘জানিস দিদি আমি না খুব ভুল করেছি একটা।’
মহুল বলল না কিছু। স্থির চোখে তাকিয়ে রইল দিঘির দিকে। দিঘি বুঝল মহুল সময় দিচ্ছে ওকে। দিঘিও সময় নিল। গুছিয়ে নিল নিজেকে। বড্ড এলোমেলো হয়ে আছে ও। বড্ড আগোছালো হয়ে আছে। নিজের কথা বলতে গেলে এত আগোছালো হলে চলে না।
মহুল হাতটা ধরল দিঘির। বলল, ‘এবার বল, মন খুলে বল।’
দিঘি সময় নিল আরও একটু। তারপর বলল। সবটা খুলে, গুছিয়ে বলল।
কলকাতায় বৃষ্টি বাড়ল কি? জলও কি ছাপিয়ে উঠল আরও একটু? লাল হলুদ ট্র্যাফিক আলো কি ক্লান্ত মানুষের চোখের মতো জেগে রইল? সার সার গাড়ি, রংবেরঙের হোর্ডিং আর অসংখ্য মানুষজন, সবাই কি ভিজে ভিজে ফিরতে পারল নিজের নিজের গন্তব্যে? আকাশ নেমে এল কি আরও একটু নীচে? বৃষ্টি কি আরও একটু কাছাকাছি এনে দিল জোড়াতালি দেওয়া, রিফু করা মানুষগুলোকে।
কথা শেষ করে দিঘি মাথা নিচু করে বসে রইল। একবারও মুখ তুলে তাকাল না মহুলের দিকে। বালিশের দিকে তাকিয়ে, তার ওপর আঁকিবুকি কাটতে লাগল।
‘তুই ফোন করে ওসব কথা বলেছিস?’ মহুল অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।
দিঘি চোয়াল শক্ত করে মাথা নাড়ল শুধু।
‘তোর মাথা খারাপ! তুই কী না কী চিঠি দেখে অফ অল পিপ্ল সুবর্ণকে গিয়ে অমন কথা বললি! আর ও গিয়ে কিগানদার কাকাকে বলল! তোর মনে হল না যে, কিগানদা ইচ্ছে করলে তোকে বিপদে ফেলতে পারে? তুই কিগানদাকে প্রচুর মেসেজ পাঠাতিস বলছিস, বহুবার ফোন করেছিস-তার রেকর্ড যদি কিগানদার কাছে থাকে! সেসব যদি দেখিয়ে দিয়ে বলত যে, তুই ওকে উসকেছিস? আর সেটা তো মিথ্যেও নয়। তোর কোন বুদ্ধি তোকে এমন একটা কাজ করতে বলল? আর আননেসেসারি মানুষটাকে অপমান করলি, বদনাম দিলি। আর শেষমেশ মানুষটা দূরে গিয়ে একটা জায়গায় থিতু হল সেখানেও তাকে অপমান করলি! ফোন করে বললি সে যেন চলে যায়! যেন দূর হয়ে যায়! তোর কি মাথা খারাপ! আর দেখ তো, লোকটা সত্যিই চলে গেল! কেন এমন করলি দিঘি? মানুষ এমন করে? জেলাসির জন্য এত দূর যেতে হবে? তোর রাগ হয়েছে বলে এমন করতে হবে? অমন একজন মানুষকে অনেকেই ভালবাসবে। সেটাতে আশ্চর্যের কী আছে!’
‘দিদি,’ এবার মুখ তুলল দিঘি, ‘কিন্তু যত্ন করে কেউ প্রেমিকার চিঠি রেখে দেয়?’
‘আরে, তুই পুরনো বই ঘাঁটতে গিয়ে পেয়েছিলি। নিজেই বললি ধুলো জমা ইংরেজি পেপার ব্যাক থ্রিলার। মানুষের কত কিছু এখানে ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়ে যায়। সেসব কি ধরতে হয়? সেসব কি আর মনে রাখতে হয়?’
‘আমার হিংসে হয়েছিল দিদি, মনে হয়েছিল আমায় ভালবাসে বলে, আর ওদিকে অন্য মেয়েদের স্মৃতি আঁকড়ে বসে আছে! আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তুই বল দিদি, আমাদের যা সোসাইটি, কেউ মানবে আমার চেয়ে পনেরো বছরের বড় কোনও মানুষের সঙ্গে আমার রিলেশন? তবু, সব বাদ দিয়ে, সব ভুলে, সবার বিপরীতে গিয়ে ওকে আমি ভালবেসেছি। আর সেখানে অন্য মেয়েদের প্রেমপত্র? আগে রিলেশন থাকতেই পারে, সে নিয়ে তো রাগ নেই আমার। কিন্তু তা বলে এখন? আই লস্ট কন্ট্রোল ওভার মাইসেল্ফ।’
‘জানিস,’ মহুল শান্ত গলায় বলল, ‘আমাদের তো একই রক্ত, আমিও জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কন্ট্রোল লুজ করে বসেছিলাম। তারপর সব হারিয়ে এখন বুঝেছি। শমীর যে ক্যান্সার হয়েছে সেটা আমায় যখন বলেছিল, আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। তারপর দেখলাম ও কাঁদছে। বলেছিলাম, তুমি ভয় পেয়ো না। কিচ্ছু হবে না। জানিস শমী কী বলেছিল? শমী বলেছিল, ও মৃত্যুভয়ে কাঁদছে না, ওর কষ্ট হচ্ছে আমায় দেখতে পাবে না বলে। ওকে তো সারাটা জীবন আমি অপমান করেছি, গালাগালি করেছি, এমনকী মেরেওছি। তাও ভালবাসত এত! ওর জীবনের শেষ ক’টা দিন ওর সঙ্গে ছিলাম। আর থাকতে থাকতে, একটা জিনিস বুঝেছি। আমরা বড্ড বেশি ‘আমি আমি’ করি। আমাদের, নিজেদের গুরুত্ব দিই। আমার দুঃখ, আমার অপমান, আমার পাওয়া-না পাওয়া, এ সবই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে। আমরা ভুলেই যাই আসলে প্রেম কী! শমী যেদিন মারা গেল, তার আগের রাতে আমায় ফিসফিস করে বলেছিল, জানো মহুল, আমি না জলটা দেখতে পাচ্ছি। কালো, স্বচ্ছ এক পুকুর জল। তুমি আমার হাতটা ধরে জলের কিনারা অবধি নিয়ে এসেছ। জলটুকু কিন্তু শুধু আমার। এখানে ডুবে যেতে যেতে আমি শুধু তোমায় দেখব। শেষ অবধি তোমায় চোখে নিয়ে আমি যাব। কে কাকে চোখে রাখে দিঘি? যখন নার্সিংহোম থেকে কাপড়ে মুড়ে বের করে আনল ওকে, তোর মনে আছে খুব হাওয়া দিচ্ছিল সেদিন। মাথার যেটুকু চুল অবশিষ্ট ছিল, সেটুকু কেমন দুলছিল হাওয়ায়! মনে আছে তোর? জানিস দিঘি, আমার আমার করে জীবনটাকে শেষ করিস না। যা তোর, তা তোর কাছেই থাকবে। যা তোর নয়, তা থাকবে না। শুধু নিজের কিছু জোর করে ঠেলে ফেলে দিস না। নষ্ট করিস না। কারণ, এই কাকচক্ষু জলটা অবধি একজন কাউকে লাগে, যাকে পাশে করে হাঁটা যায়। যাকে চোখে নিয়ে নেমে যাওয়া যায় চিরকালীন জলে।’
দিঘি মুখ তুলে তাকাল মহুলের দিকে। তারপর অস্ফুটে বলল, ‘আমি এখন কী করব দিদি?’
‘তুই কি এখনও পছন্দ করিস কিগানদাকে?’
দিঘি কিছু বলতে গিয়েও পারল না। ঠোঁট কামড়ে মাথা নামিয়ে নিল। গলার কাছে যেন আটকে আছে কিছু। স্বর বেরোচ্ছে না একটুও।
মহুল এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখল দিঘির, ‘ফোন নম্বর আছে তোর কাছে?’
দিঘি অসহায়ের মতো মুখ করে তাকাল মহুলের দিকে। বলল, ‘না তো, রাহিদির থেকে নিইনি। মানে…’
‘তা হলে নে,’ মহুল বলল, ‘নিসনি কেন তখন?’
‘না, কী বলব রাহিদিকে? হঠাৎ কোন অজুহাতে চাইব? আর রাহিদি প্রশ্ন করলে সব বলে দিতে হবে। আমি পারব না রে দিদি। আর আমি পারব না। আমি মরে যাব এবার। ঠিক মরে যাব, দেখবি।’
‘বোকার মতো কথা বলিস না,’ মহুল বিছানা থেকে উঠে পায়চারি করল কিছুক্ষণ, আর বলল, ‘বৃষ্টি হচ্ছে এত, নয়তো…’
‘নয়তো?’ দিঘি মাথা তুলে তাকাল মহুলের দিকে।
‘আদিকে বাড়িতে দেখেছি আজ। ওর কাছে শিয়োর পেয়ে যেতিস কনট্যাক্টটা।’
‘আদিদা?’ দিঘি অনিশ্চিত চোখে তাকাল।
‘হ্যাঁ, আদি। যদি একবার যেতে পারতিস!’
‘আমি!’ দিঘির গলায় দ্বিধা।
‘আমি গেলে কেমন লাগবে না?’ মহুল বলল, ‘তবে আজ থাক, কাল যাব।’
‘কাল?’ দিঘি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল আবার। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জানলার কাছে। বৃষ্টি বাড়ল আরও। পাড়ার রাস্তার কোনায় জমা জল বাড়তে বাড়তে রাস্তার মাঝখানটাও ঢেকে গেছে।
‘হ্যাঁ, কাল গিয়ে নিয়ে আসবি।’ মহুল আবার বলল।
‘আদিদাকে তো পাড়াতে পাওয়াই যায় না। ওর দেখা পাওয়াই তো ভার!’ দিঘি জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রেখে বলল।
‘তা হলে কি তুই…’
‘এখন যাব?’ দিঘি জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে মহুলের দিকে তাকাল।
‘এখন? এই বৃষ্টিতে?’ মহুল অবাক হল।
‘দিদি, অনেক দেরি তো হয়ে গেছে অলরেডি। আমার যে কী হচ্ছে মনের ভেতর! আমার যে আর…’ দিঘির গলাও বুজে এল আবার। ও দেখতে পেল লম্বা বারান্দার শেষে একটা ঘর। তাতে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বসে রয়েছে একজন। তার ঝুঁকে পড়া কাঁধ, হলুদ গিটার আর আগোছোলা চুল উড়ছে হাওয়ায়। আর ভেসে আছে, অদ্ভুত এক জঙ্গলের গন্ধমাখা কস্তুরী সুবাস ভেসে আছে হাওয়ায়। শরীর অবশ হয়ে আসছে দিঘির। মাথায় ঝিম ধরছে। দৃষ্টি বুজে আসছে ক্রমশ। মনের ভেতরের হরিণীটা পা দাপাচ্ছে, মাথা নাড়ছে, হৃত্স্পন্দন দ্রুত হচ্ছে তার।
দিঘি বলল, ‘আমি এখনই যাব দিদি। আমায় এখনই যেতে হবে।’
‘ঠিক আছে। বড় ছাতাটা নিয়ে যাস। আর মাকে আমি ম্যানেজ করব।’ মহুল হাসল। তারপর টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখা বইটা তুলে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
দিঘি চট করে নিজেকে দেখে নিল আয়নায়। এলোমেলো হয়ে আছে একটু। বিশেষ করে মাথার চুলটা। আর কান্নার ফলে চোখটা ফুলে রয়েছে বেশ। কিন্তু এখন কি এসব দেখার সময়? আসলে রাহির সঙ্গে কথা বলার পর কেমন যেন গুলিয়ে গিয়েছিল মাথাটা। এখন মহুলের কথায় বেশ মনে জোর পাচ্ছে। তবে একটা ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাবও আছে। যদি আদি না দেয় ফোন নম্বর? যদি আদি ফিরিয়ে দেয়! আর সত্যিই তো, আদি যদি বলে যে, দিঘির জন্যই তো আজ কিগানের এই অবস্থা! দিঘিকে কেন দেবে কিগানের ফোন নম্বর বা ঠিকানা? কেন আবার কিগানকে ঠেলে দেবে দিঘির সামনে?
আর যদি পালটা প্রশ্ন করে, কেন এমন করল দিঘি? কোন অধিকারে করল? তবে? যৌনঈর্ষা! যৌনঈর্ষার কথা কি বুঝবে ও? এর চেয়ে তীব্র মোটিভ কি আর কিছু হতে পারে জীবনে? তবু, ওর ঈর্ষার জন্য কেন কষ্ট পাবে অন্যজন? আদি এসব প্রশ্ন করলে কী বলবে দিঘি?
জানে না, দিঘি কিছু জানে না। শুধু জানে, অন্ধকার সম্পূর্ণ করে আলোকে। এতদিন অন্ধকার বুকে করে বসে ছিল ও। জানত না সেই অন্ধকারের ব্যবহার। কিন্তু আজ বুঝতে পারে, আলোর দিকে গিয়ে তাকে সম্পূর্ণ করাই ওর প্রধান কাজ।
বড় ছাতাটা নিয়ে দরজার কাছে যেতেই প্রথম বাধাটা পেল দিঘি। বাবা। একদম ভিজে কাক হয়ে গেছে। দিঘিকে দেখে বাবা হতবাক হয়ে গেলেও সেটা সামলে নিয়ে হাসল, ‘কী রে ছাতা নিয়ে এখন বেরোচ্ছিস কোথায়?’
‘আমি!’ দিঘি অপ্রস্তুত হল।
‘হ্যাঁ। যা ওয়েদার, আর বেরোস না। তখন থেকে দাঁড়িয়েছিলাম লাইব্রেরির সামনে। ছাতাটাও তো গেছে। তারপর ভাবলাম ছাতা থাকলেও তো কিছু হত না। যা দমকা হাওয়া চলছে! ওয়েট না করে ভিজতে ভিজতে চলে এলাম। তাই বলছি, বেরোস না।’
দিঘি ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকল। বাবা আর পাঁচ মিনিট পরে এলেই হত।
বাবা জলে ভেজা জুতোজোড়া খুলে রাখতে রাখতে বলল, ‘তোর মাকে বল তো একটু আদা দিয়ে চা করতে। আমি স্নান সেরে আসছি।’
‘আমি বলছি।’ দিঘি কিছু বলার আগেই হঠাৎ মহুল বলে উঠল পিছন থেকে, ‘ওকে জাস্ট দশ মিনিটের জন্য যেতে হবে আদির আছে। আমার বিশেষ দরকার। একটা জিনিস আনবে।’
‘আদি? মানে আদিত্য? ওই ব্যানার্জিদের বাড়ি?’ বাবা অবাক হল, ‘কী এমন দরকার এই দুর্যোগে?’
‘আদিদের অফিসের কাজ রয়েছে। ইন্টিরিয়ারের কাল প্রাইস দিতে হবে। ও স্পেসিফিকেশনগুলো নিয়ে এসেছে অফিস থেকে।’
‘ও!’ বাবা বলল, ‘কী যে করিস না তোরা? সবসময় কাজ আর কাজ!’ তারপর দিঘির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সাবধানে যাস।’
দিঘি বলল, ‘বাড়িটা তো এই কোনায়। সাবধানের কী হয়েছে? আমি এখনই আসছি।’
সামনের বাড়ির রোয়াকে ছাতা মাথায় দিয়ে বাচ্চা দুটো এখনও নৌকো ভাসানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু নৌকো কিছুতেই সোজা থাকছে না। বারেবারে কাত হয়ে যাচ্ছে! এত বৃষ্টিতে কি কাগজের নৌকো থাকে? কিন্তু কে বোঝাবে ছেলে দুটোকে? ওরা চেষ্টা করেই যাচ্ছে যে!
পাড়াটা নিঝুম হয়ে আছে একদম। জলে ভেজা ক্লান্ত পায়রার মতো শান্ত হয়ে আছে পথঘাট। হলুদ আলোয় বৃষ্টির রংটাই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। ছাতাটা বড়। অনেকটা ছড়ানো। সেটা মাথায় দিয়ে কোনওমতে জলের ভেতর ছপছপ করে একটু হেঁটে, একটু দৌড়ে এগিয়ে গেল দিঘি। টেনশন হচ্ছে ওর। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। কিন্তু ও জানে, ওকে যেতে হবে। ওই বাড়িটার দরজায় পৌঁছোতে হবে। মনে সাহস আনল দিঘি। ভাবল, আদি যা বলবে বলুক। ও পাত্তা দেবে না। শুধু কিগানের ফোন নম্বরটা পেতে হবে ওকে। যে করেই হোক কিগানের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
বেল বাজাতে আদিদের কাজের মেয়েটা দরজা খুলে দিল।
দিঘি একটু অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘আদিদা আছে?’
‘ছোড়দা?’ মেয়েটা বলল, ‘আছে। আসুন ভেতরে। ছাতাটা এই বারান্দায় মেলে রাখুন।’
‘থ্যাঙ্কস।’ কথাটা বলতে গিয়ে দিঘি বুঝল যে, ওর গলাটা কেঁপে গেল একটু। টেনশন। টেনশন হচ্ছে দিঘির!
‘ছোড়দার ঘরটা…’
‘আমি চিনি,’ দিঘি শেষ করতে দিল না মেয়েটাকে। বলল, ‘আমি যেতে পারি তো?’
মেয়েটা দিঘির মুখ চেনে। তবু কী ভাবল দু’-এক মিনিট। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে।’
বহুদিন পর এ বাড়িতে পা রাখল দিঘি। এই সেই সিঁড়ি। তার ল্যান্ডিং। তাতে বসানো রঙিন কাচ। এই আরও ওপরে তিনতলায় উঠে যাওয়ার সিঁড়ি। আগে আলো জ্বলত ওই ওপরটায়। কিন্তু এখন অন্ধকার। আবছায়া। দেখলে মনেই হয় না ওখানে কেউ ছিল। মনে হয় সমস্ত জীবন অমন অগোচরে, অবহেলায় পড়ে রয়েছে এই তলাটা।
অদ্ভুত এক টান অনুভব করল দিঘি। মনে হল একবার উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে। মনে হল ওপরে গেলেই হয়তো দেখবে লম্বা বারান্দার শেষের ঘরটার পরদা অর্ধেক টানা। শুনবে টুংটাং করে ভেসে আসছে গিটারের শব্দ। এইখানে দাঁড়িয়েও গন্ধের স্মৃতি হঠাৎ যেন ফিরে পেল দিঘি। যেন মনে হল ব্রুট মাস্কের গন্ধে অবশ হয়ে আছে বর্ষার ভারী বাতাস।
আদির ঘরের পরদা উড়ছে। বাড়িটা শুনশান লাগছে বড্ড। কেউ নেই নাকি? দিঘি ঠোঁট চাটল একবার। বুঝতে পারছে না ও কী বলবে! কী করবে! আদির সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম কোন কথাটা বলবে! বা আদৌ ও কিছু বলবে কিনা!
দিঘি দরজার পাল্লায় আলতো টোকা দিল, ‘আদিদা, আছ?’
‘কে?’ ঘরের ভেতর থেকে প্রশ্ন করল আদি।
পরদাটা সরিয়ে ঘরের ভেতর এক পা রাখল দিঘি।
‘আরে তুমি?’ আদি চমকে উঠল, ‘বেল বাজিয়ে তুমিই এলে! আমি তো ভাবলাম বাবা-মা ফিরল বোধহয়।’
‘না, আমি এলাম,’ দিঘি নরম গলায় বলল।
‘এসো এসো,’ আদি হাত দিয়ে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘বসো।’
দিঘি বসল, তারপর ইতস্তত করে বলল, ‘বিরক্ত করলাম, না?’
‘না,’ আদি হাসল, ‘কোনও কাজ করছিলাম না তো! এই ছবি দেখছিলাম।’
দিঘি দেখল খাটের ওপর ছড়ানো আছে প্রচুর ছবি। আর চেয়ারে বসেও, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা যে কিগানের, সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। ও বলল, ‘আসলে, একটা ইয়ে…’
‘কোনও দরকার ছিল?’ আদি বিছানায় বসল।
দিঘি ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘একটা দরকারে এসেছি।’
‘বলো,’ আদি সরাসরি তাকাল দিঘির দিকে।
‘শুনছিলাম তোমার কীসব সমস্যা হয়েছিল। মানে চাপাডাঙায়…’
‘হ্যাঁ,’ আদি বলল, ‘সে একটা গন্ডগোল হয়েছিল। দাদাভাই না থাকলে মারাও যেতে পারতাম। নেহাত দাদাভাই আর কপাল-এই দুটো ফ্যাক্টরের জন্য বেঁচে গেছি।’
‘এখন কেমন আছ?’
‘এখন ভাল,’ আদি হাসল, ‘অফিস করছি তো।’
‘ও,’ দিঘি তাও ইতস্তত করতে লাগল। বলবে? এভাবে বলবে? বলা ঠিক হবে?
কিন্তু না বলেও যে উপায় নেই। আর বেশিদিন এভাবে থাকলে দিঘির ভেতরটা যে ফেটে যাবে একদম। ও যে আর ঠিক থাকতে পারবে না।
দিঘি বলল, ‘আমি জানি যে, কিগানদা চলে গেছে। অনেক দূরে চলে গেছে। আমি কিগানদার মোবাইল নম্বরটা…’
‘দেওয়া যাবে না,’ আদি সহজ গলায় বলল।
‘মানে!’ থতমত খেয়ে গেল দিঘি।
‘মানে,’ আদি হাসল, ‘দেওয়া যাবে না নম্বরটা। দাদাভাইয়ের বারণ আছে।’
‘কিন্তু আমার যে ভীষণ দরকার।’
‘কেন দরকার দিঘি?’ আদি ভুরু কোঁচকাল সামান্য, ‘লোকটা এনাফ হার্ট। আর কষ্ট ডিজার্ভ করে না। ওকে এবার ছেড়ে দাও।’
‘কিন্তু আমি তো…’ দিঘি কাতর গলায় বলল, ‘কষ্ট দিতে চাই না।’
‘তাই?’ আদি বলল, ‘ঘটনা তো অন্য কথা বলে দিঘি। মানুষকে থাপ্পড় মারলে সেটা সহ্য হয় কিন্তু কাউকে দুশ্চরিত্র বলে মানুষের সামনে প্রোজেক্ট করলে সেটা কি মেনে নেওয়া যায়?’
‘আমি ভুল করেছি…ভুল করে…’ দিঘির আবার কান্না পেল হঠাৎ।
‘শোনো দিঘি, কোনও কোনও জিনিস আছে যা ঠিক বা ভুলের ঊর্ধ্বে। তুমি সেটাই করেছ। দাদাভাইয়ের মতো মানুষ, যার গোটা জীবনটা অমন একাকিত্বে ভরা, তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছ তুমি।’
‘কিন্তু আমি তা চাইনি। এমন রাগ হয়ে গেল যে…’ দিঘির কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে।
‘আমি জানি। সেই “জি” লেখা চিঠি। সেই যাজ্ঞসেনীর লেখা চিঠি। নার্সিংহোমে দাদাভাই বলেছে আমায়। “জি” নামে মেয়েটির সঙ্গে দাদাভাইয়ের কলেজ-জীবনে প্রেম ছিল। আর যাজ্ঞসেনীকে দাদাভাই ভালই বাসত না। মেয়েটা একসময় পাগলের মতো প্রেমে পড়েছিল দাদাভাইয়ের। ব্যস, এটুকুই। এমন দুটো চিঠি পুরনো বইয়ের ভেতর ছিল জাস্ট। সেখান থেকে তুমি তিলকে তাল করে দিলে? তারপর ফোন করেও দাদাভাইকে বললে চলে যেতে! এরপর তুমি নম্বর চাইছ? আর কিছু বাকি আছে বলার?’
‘না, তা নয়,’ দিঘি আর্তনাদ করে উঠল, ‘আমার ভুল হয়েছে। মস্ত বড় ভুল হয়েছে। আমি কিগানদাকে একবার দেখতে চাই। একবার ওর কাছে যেতে চাই।’
‘কেন দিঘি? কেন যেতে চাও?’
‘কারণ, কারণ,’ দিঘির শ্বাস দ্রুত হল। জিভ শুকিয়ে এল। কিন্তু আর কিছু বলতে পারল না।
‘জানো, সেদিন নার্সিংহোমে দাদাভাই তোমার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল। সারাজীবন এত কষ্ট সহ্য করেছে লোকটা, কিন্তু কোনওদিন কাঁদতে দেখিনি মানুষটাকে। কিন্তু সেদিন দেখলাম কেঁদে ফেলল। কাচের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল দাদাভাই। দিঘি, তোমার বয়স অল্প। মনও চঞ্চল। কিন্তু জেনো, চোখের জল কিন্তু এমনি এমনি আসে না। আমিও জীবনে ভুল করেছি দিঘি। আমাকেও আমার নিজের ভুল শোধরাতে হবে। আমাকেও পৌঁছোতে হবে তার কাছে। আর যেহেতু ভুল করেছি তাই জানি। দু’দিনের আনন্দ, মজা এক জিনিস, কিন্তু ভালবাসা তা নয়।’
‘আমি জানি আদিদা, তাই…’ দিঘি অনেক চেষ্টা করেও চোখের জলটা আটকাতে পারল না, ‘তাই…নম্বরটা…’
‘দিতে পারব না। প্লিজ, রিকোয়েস্ট কোরো না। কিন্তু,’ আদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘শোনো, দাদাভাই রাবাংলায় আছে। একটা পার্টিকল্ বোর্ডে চাকরি করে। পারলে, ইচ্ছে হলে খুঁজে নিয়ো।’
‘রাবাংলা? সেখানে, মানে অত বড় জায়গায়…’
‘স্নোফ্লেক্স পার্টিকল্ বোর্ড। ব্যস আর কিচ্ছু বলতে পারব না।’ আদি উঠল, ‘কোঁদো না দিঘি। কেঁদে কী হবে? দাঁড়াও তোমায় জল দিই। তুমি চোখ মোছো।’ আদি পরদা সরিয়ে বেরিয়ে গেল জল আনতে।
দিঘি চোয়াল শক্ত করে সামলাল নিজেকে। রাবাংলা, স্নোফ্লেক্স পার্টিকল্ বোর্ড এই ম্যাপ সম্বল করে কি ও খুঁজে পাবে গুপ্তধন? চট করে দরজাটার দিকে দেখল দিঘি। দ্রুত পায়ে উঠে গিয়ে বিছানার ওপর ছড়ানো ছবির ভেতর থেকে দ্রুত হাতে তুলে নিল কিগানের একটা ছবি। তারপর টি-শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে নিল চটপট। ওর কাছে আর কোনও ছবি নেই কিগানের। সব তো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে রাগ করে!
‘জল খাও,’ আদি এক গ্লাস জল হাতে নিয়ে ঢুকল, ‘আর কান্নাকাটি কোরো না। কী লাভ বলো? দাদাভাইয়ের যা হওয়ার তো হল। সে যা কষ্ট পাওয়ার তা তো পেল। সেটা তো আর বদলাতে পারবে না। ফলে আর ভেবো না ওসব নিয়ে।’
দিঘি উঠে দাঁড়াল এবার। বলল, ‘ফোন নম্বরটা না পাওয়া কি আমার শাস্তির অংশ?’
‘না, সব কিছু অত সহজে পেতে নেই দিঘি। মানুষ সহজে পাওয়া জিনিসের কদর বোঝে না। তোমায় তো দুটো পয়েন্টার দিলাম। ইচ্ছে হলে এটা দেখে খুঁজো।’
‘আমি আসি,’ দিঘি বেরোতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। ঘুরে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, একটা উত্তর দেবে আদিদা?’
‘বলো,’ আদি শান্ত গলায় বলল।
‘কিগানদা নার্সিংহোমে কেঁদেছিল কেন? দুঃখে?’
আদি হাসল। হাত দিয়ে এলোমেলো চুল ঠিক করে বলল, ‘বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়, এই এখন যেমন হচ্ছে। কিন্তু তা বলে কি অন্য সময় বৃষ্টি হয় না?’
নৌকোটা কাত হয়ে যাচ্ছে বারবার। ছেলে দুটো তবু ছাড়ছে না। নাছোড়বান্দা হয়ে আঁকড়ে ধরেছে চেষ্টাটাকে। দুটো নৌকো কাগজের গোল্লা হয়ে ভাসছে তো আরও দুটো বানিয়ে আনছে। চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছাড়ছে না একদম। নৌকো ভাসাতেই হবে তাদের।
দিঘি ছাতা মাথায় দিয়ে সামনের দিকে তাকাল। বৃষ্টিতে আবছা হয়ে আছে কলকাতা। কিন্তু এই বৃষ্টি ছাড়িয়ে, মেঘ ছাড়িয়ে যদি মানুষ ওপরে ভেসে ওঠে? সেখানে তো পরিষ্কার আকাশ। কালো গহন মহাশূন্য। রাত্রি। সেই রাত্রি চিরে পৃথিবী কোথায় এগোয়? কার দিকে এগোয়? পৃথিবী এগোয় সূর্যের দিকে। আলোর দিকে। সে বারবার তার হেলে পড়া নৌকোকে সোজা করে। সে বারবার অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলে আলোর দিকে। এই রাত্রির কলকাতাকে বুকে নিয়ে এই মুহূর্তে যেমন পৃথিবী ছুটে যাচ্ছে তার ঔজ্জ্বল্যের দিকে।
মানুষকেও তো এভাবেই খুঁজে নিতে হয় তার নিজস্ব আলো। ঠিক করে নিতে হয় তার পরিক্রমণ রেখা। কক্ষপথ।
হলুদ বৃষ্টির তলায় দাঁড়িয়ে দিঘি দেখল একটা নৌকো ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টি তুচ্ছ করে, জলের রাগ তুচ্ছ করে সে ভাসছে, সে যাচ্ছে। দিঘি বুঝল নোঙর তোলার সময় হল ওর। বুঝল এতদিনে ওকে ওর হরিণ ডাকছে। আলোর ডোরাকাটা জঙ্গলের ভেতর ওর জন্যে অপেক্ষা করছে হরিণ। প্রতীক্ষায় অস্থির হয়ে উঠেছে তার শরীর। সে পা দাপাচ্ছে। মাথা নাড়াচ্ছে। তার শরীর চকচক করছে সূর্যের রশ্মিপাতে।
দিঘি বুঝল ওর সমগ্র পৃথিবী ওই আলোর কস্তুরী গন্ধের দিকেই ছুটে চলেছে। প্রাণপণ।
Chapter - 37
সম্মান
‘মানে!’ মেয়েটা অবাক হয়ে তাকাল জোনাথন দাদুর দিকে।
জোনাথন দাদু হাসল। তারপর নিচু কিন্তু সুরেলা স্বরে বলল,
‘এত কিছুর পরেও
সূর্য তবু বলে না পৃথিবীকে,
“আমার কাছে ঋণী”
পরস্পরের দূরে
তবুও ভালবাসায় ভরে থাকে
আকাশ চিরদিনই…’
মেয়েটা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল জোনাথন দাদুর দিকে। তারপর অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় কিগানদা?’
‘কিগানদা? মানে, কিগান অর্ক ব্যানার্জি?’ মালিনী থতমত খেল। কিগানদাকে একটা মেয়ে খোঁজ করছে? এখানে খোঁজ করছে! ও তাড়াতাড়ি জোনাথন দাদুর হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখল। আরে! কিগানদাই তো! কিগানদা এখন রাবাংলায় আছে? কই, ও জানে না তো! কী করছে কিগানদা এখানে? এখানে কোথায় আছে? গত কয়েকদিনে বিশেষ ঘর থেকে বেরোয়নি মালিনী, তাই দেখতে পায়নি? আর এই মেয়েটা? মেয়েটা কে?
মালিনী বিহ্বল হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তু…তুমি? তুমি কে?’
মেয়েটা এবার জোনাথন দাদুর সামনে থেকে উঠে এসে দাঁড়াল মালিনীর সামনে। বলল, ‘অনেক কষ্ট করে এখানে পৌঁছেছি। বাড়ির থেকে বাবা-মা প্রথমে ছাড়তে চায়নি। বন্ধুরাও প্রথমে আসতে চায়নি সঙ্গে। তারপর রিজার্ভেশন পাইনি, জেনারেল কমপার্টমেন্টে করে এসেছি। তারপর পঞ্চাশ জায়গায় ধাক্কা খেতে খেতে এই অবধি এসে পৌঁছেছি। আপনি বলুন প্লিজ।’
জোনাথন দাদু উঠে দাঁড়িয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘তুই চিনিস মালি? একটু ওপর দিকে পাহাড়ি ঢালের এক বাংলোয় থাকে মানুষটা। অদ্ভুত মানুষ। শান্ত। সহজ। আর হ্যাঁ, দুঃখীও বটে।’
মেয়েটা বলল, ‘আমায় বলে দেবেন প্লিজ। কোথায় থাকে একটু…’
‘আমি নিয়ে যাচ্ছি। চলো,’ জোনাথন দাদু উঠে দাঁড়াল। তারপর মালিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাবি মালি? চল, আমরা সবাই আজ একসঙ্গে যাই। তুই ভেতর থেকে আমার জিপের চাবিটা এনে দে তো!’
ছোট্ট পাহাড়ি রাস্তা, লতানো গাছের মতো পাক খেয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। জোনাথন দাদুর পাশে বসে রয়েছে মালিনী আর ওর পাশে মেয়েটা। পিছনে বাকি চারজন।
পিছনের মোটা ছেলেটা প্রথম কথা বলল, ‘দিঘি, কিগানদা আমাদের খাওয়াবে তো? সকাল থেকে চক্কর কেটে কেটে পেটে জলহস্তী ঘাই মারছে।’
‘বাজে বকিস না গুন্ডা,’ ছোট করে কাটা চুলের মেয়েটা সামান্য বকল, ‘জলহস্তীর পেটে আবার জলহস্তী ঢোকে?’
‘দেখ রূপ, বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করবি না। ভাল হবে না কিন্তু…’
‘ওই দেখো, বাড়ি।’ জোনাথন দাদু রাস্তার একপাশে জিপটাকে পার্ক করে পাশের ধাপ ধাপ করে উঠে যাওয়া রাস্তার শেষে বাংলোটাকে দেখাল।
‘ওটা?’ দিঘি লাফিয়ে নামল। কিন্তু ধাপ বেয়ে না উঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ।
মালিনীও জিপ থেকে নেমে দাঁড়াল। পথের পাশের সামান্য আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে দিঘিকে। যেন জলভরা পাত্র। যেন শ্রাবণের মেঘ। যেন গাছ থেকে খসে পড়বে এমন চেরি ফল। কেন এমন করছে মেয়েটা? কী হয় কিগানের? কে হয়?
জোনাথন দাদু ‘এসো তোমরা’ বলে এগিয়ে গেল। মালিনী মুঠোয় নিজের মোবাইলটা চেপে পা বাড়াল।
কাঠের সিঁড়ির প্রথম ধাপে দাঁড়িয়ে জোনাথন দাদু গলা তুলে ডাকল, ‘কিগান, কিগান।’
মালিনী একবার পিছন ঘুরে দেখল। দিঘিকে কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। ওর সঙ্গের সবাইও কেমন যেন অস্থির। কেন এসেছে এরা? সবাই এমন করে তাকিয়ে রয়েছে কেন? কী ঘটতে চলেছে সামনে? মালিনী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বারান্দার দরজাটার দিকে।
‘ও কিগান ভায়া,’ জোনাথন দাদু ডাকল আবার।
এবার কাঠের বাড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এগিয়ে আসছে। ওই খুলল দরজাটা। আর সামনে ঝোলানো চিকটা নড়ে উঠল। সাদা শার্টের অংশটা দেখা গেল প্রথমে। আর তারপর বারান্দায় এসে দাঁড়াল কিগান।
ছিপছিপে সেই চেহারা। কপালে নেমে আসা আগোছালো চুল। আর অদ্ভুত সুন্দর দুটো নীল চোখ।
‘আরে…’ কিগান জোনাথন দাদুকে দেখে হাসতে গিয়েও আচমকা পাথরের মতো হয়ে গেল। মালিনী দেখল কিগানের চোখ, আর কোনও কিছু নয়, শুধু সবাইকে ভেদ করে দেখছে দিঘিকে! কোনও কথা বলতে পারছে না কিগান। নড়তে পারছে না। চোখ ফেরাতে পারছে না। এ যেন দৃষ্টি-বন্ধন। যেন চিরন্তন মহাকর্ষ!
দিঘি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। কিগান এখনও স্থির হয়ে আছে। যেন বিশ্বাস করতে পারছে না কী দেখছে ও। যেন চোখের পাতা ফেললে ভেঙে যাবে এ দৃশ্য! সামান্য নড়লে নষ্ট হয়ে যাবে সব স্বপ্ন! দিঘি এগোতে লাগল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিগান। জোনাথন দাদু আস্তে হাতের ইঙ্গিত করল বাকি সকলকে। আর সবাই ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে পিছিয়ে গেল। মুখ ফিরিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘাসে। শুধু মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আগে মালিনী দেখল কিগানের বুকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দিঘি। ওর দৃষ্টি আরও ঘন, আরও বদ্ধ হয়ে আছে।
মালিনী আকাশের দিকে তাকাল। কখন যে মেঘ কেটে গেছে, বুঝতেই পারেনি! ও দেখল এক আকাশ তারা ফুটে আছে মাথার ওপরে। যেন বকুল ফুল। যেন হিরের গুঁড়ো। আর সেই নিয়ে পৃথিবী ছুটে চলেছে অনন্তের পথে। এত অর্বুদ প্রাণ, এত অগণিত বৃক্ষসকল, এত অসংখ্য নদী ও জলসংগ্রহ বহন করে, তার সমস্ত নিয়ে পৃথিবী নিজেকে সমর্পণ করছে সূর্যের জীবনে। এ সমর্পণে কোনও দ্বিধা নেই, নেই কোনও বন্ধন। এ সমর্পণ শিশুর হাতে একমুঠো পয়সার মতো, এ সমর্পণ আলোর মতো, গাছ থেকে মাটির বুকে মুখ লুকোনো ফুলের মতো। মালিনী বুঝল আলো মানুষের ভেতরেই থাকে। যেমন সূর্য লুকিয়ে থাকে রাতের অন্ধকার গভীরে। জল সম্পূর্ণ করে আগুনকে আর রাত্রি পূর্ণ করে দিনকে।
মালিনী দেখল চারদিক নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলছে না কোনও। যেন সামান্য শব্দও ভেঙে দেবে এই জাদুবাস্তবতা।
হঠাৎ নিঃশব্দে মোবাইলটা কেঁপে উঠল মালিনীর হাতের মুঠোয়। আর তার তরঙ্গে সর্বাঙ্গ ঝিকিয়ে উঠল ওর। কে ডাকল ওকে? কার মনে পড়ল মালিনীকে? কে এমন মুহূর্তে আসতে চাইছে ওর কাছে? দেখবে? মালিনী কি দেখবে একবার?
ফোনটা কাঁপছে। নিঃশব্দে সে শরীর ঝাঁকিয়ে ডাকছে মালিনীকে। মালিনীর চোখ বন্ধ হয়ে আছে। কে ফোন করল? সে?
তারপর ধীরে ধীরে মুঠো খুলল মালিনী। ধীরে ধীরে চোখ রাখল স্ক্রিনে আর ওর চোখের কোণে ধীরে ধীরে এসে জমা হতে লাগল হিরের কুচি, বকুল ফুল।
এমন দু’-চার কুচি হিরে আর টুপটাপ বকুল ফুলের জন্যই তো বেঁচে থাকে পৃথিবী। বেঁচে থাকে প্রাণীজগৎ। বেঁচে থাকি আমরা।
——
