নতুন সম্ভাবনার হাতছানি গবাদিপ্রাণির হোটেল

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গবাদিপ্রাণির হাট। এই সকল হাটের মধ্যে অধিকাংশ হাট সপ্তাহে একবার বসে তবে এর মধ্যে দেশব্যাপি ৬৪ জেলায় কমবেশি ১৪৮ টির মতো গবাদিপ্রাণির বিখ্যাত হাট রয়েছে যে হাটগুলো সপ্তাহে ২দিন বসলেও এই হাটগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপারিরা গবাদিপ্রাণি এনে ক্রয় -বিক্রয়ের মাধ্যমে হাটটিকে সপ্তাহে ৭দিনও কর্মমুখর রাখেন।

 

 

এই হাটগুলোতে সাধারণত যে সকল প্রাণী অবিক্রিত থাকে সেগুলো হাটের চারপাশে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা শেডে অথবা খোলা আকাশের নিচে বেধে রেখে প্রাণীর পাশে অথবা আশেপাশের বাড়িতে ব্যাপারিরা অবস্খান করে পরের হাটের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

 

 

এ ভাবেই এই হাটগুলোতে সপ্তাহে ৭দিনই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হয়ে থাকে এবং হাটের কার্যক্রম চলতে থাকে। এইসকল জায়গাগুলোতে যেখানে ব্যাপারিদের থাকার জন্যই নুন্যতম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা (ভালো থাকার, খাওয়ার, টয়লেট, গোসলের ব্যবস্থা ইত্যাদি) নেই সেখানে গবাদিপ্রাণির জন্য এই সকল সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত হোটেল ব্যবস্থাপনা থাকবে সেটা তো অকল্পনীয়।

 

 

সেই অকল্পনীয় বিষয়টিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার গবাদিপ্রাণি প্রেমিক মাস্টার শহিদুল ইসলাম। তিনি নিজে ২০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে গরু সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর চট্রগ্রাম ও সিলেটে বিক্রি করে থাকেন।

 

 

তিনি এই ব্যবসা করতে গিয়ে বর্ণিত সমস্যা জীবনে অসংখ্যবার ফেস করেছেন। সেই ২০ বছরের পেইনফুল অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ২০২০সালে প্রথম এ ধরনের একটি ব্যতিক্রম ব্যবসায়িক ধারনা আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত “প্রাণীর হোটেল” করার উদ্যোগ নেন।

 

 

যেখানে প্রাণীরা একটি আরামদায়ক পরিবেশে থাকতে পারবে। পাশাপাশি ব্যাপারীরাও তুলানানুলক কম খরচে থাকতে পারবে।

সরেজমিনে প্রাণীর হোটেলটি ঘুরে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বড়ধুল হাট সংলগ্ন খামার বড়ধুল গ্রামে স্থাপিত প্রায় ২০০ ধারণক্ষমতার এই হোটেলে বর্তমানে নিয়মিত প্রতিদিন গড়ে ১৫০ গরু থাকে এবং ১০জন ব্যাপারী থাকে।

 

 

এই হোটেলে ১টি গরুর থাকা খাওয়া বাবদ ব্যাপারীকে ৫০ টাকা এবং নিজের থাকা বাবদ ১৫০ টাকা পে করতে হয়। এভাবে এই হোটেলটি থেকে শহিদুল ইসলামের দৈনিক গড়ে ৯০০০ টাকা এবং মাসে ২.৫-৩ লক্ষ টাকা আয় হয়ে থাকে। ঈদের সময় গরুর সংখ্যা আর বেশি হয়ে থাকে বলে তিনি জানান।

 

 

এছাড়া তার ওখান থেকে প্রতিদিন 8-১০জন ব্যাপারীর ৮-১০টি টিট্রাকে করে ১৫০-১৬০টি গরু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির উদ্দ্যেশে চলে যায়। চাহিদা থাকায় হোটেলটির পাশে তিনি আরও একখন্ড জমি খুঁজছেন, জমি পাওয়া গেলে তিনি বর্তমান হোটেলটি সম্প্রসারণ করবেন এবং এ ধরনের আরও একটি হোটেল দেয়ার তার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

 

শহিদুল ইসলামের প্রাণী হোটেল ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে সহায়তা করছে পিকেএসএফ ও ইফাদ এর যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত RMTP আওতায় স্থানীয় এনজিও এনডিপি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “নিরাপদ মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার উন্নয়ন” ভ্যালু চেইন উপ-প্রকল্প।

 

 

এই উপ প্রকল্প হতে হোটেলটির আধুনিকায়ন করতে প্রাণীদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের বসার জায়গা, প্রাণী মাপার মেশিন, ড্রেনেজ সুবিধা, আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাপনা, গরম হ্রাসের ব্যবস্থাপনা, মেকানাইজেশন, বায়োগ্যাসের মাধ্যমে নিজস্ব এনার্জি উৎপাদন ইত্যাদি সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে।

 

 

আশা করা হচ্ছে খুব শিঘ্রই এই হোটেলটি গবাদিপ্রাণির জন্য একটি আদর্শিক আধুনিক টু-স্টার হোটেলে পরিণত হবে। এই ধরনের হোটেল ব্যবস্থাপনার কনসেপ্ট দেশে বিদ্যমান অবশিষ্ট ১৪৮টি হাটগুলোতেও ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব, যদি এটা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয় তবে এতে করে একদিকে গবাদিপ্রাণিরা পাবে আরামদায়ক ব্যবস্থাপনা অন্যদিকে এই কর্মকান্ডের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

 

 

লেখক: মজনু সরকার, উপ-ব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ।

তথ্যসূত্রঃ আধুনিক কৃষি খামার