চৌবাচ্চায় মাগুর মাছের চাষ

জয়নাল আবেদীন মাছ চাষ করছেন। তারপরও প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না বিভিন্ন কারণে। তা ছাড়া পুকুরে মাছ চাষ করার মতো জায়গা তো সবার বাড়িতে নেই। শাকসবজি, ফলমূলের মতো চৌবাচ্চায় মাছ চাষ করা যায়। চৌবাচ্চায় মাছ চাষে যেমন বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই, তেমনি ঘরে বসে টাটকা মাছ তো খাওয়া যাবেই,পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হবে। গবেষণার মাধ্যমে ইতিমধ্যে দেশী স্ত্রী- মাগুর ও আফ্রিকান পুরুষ- মাগুরের সংকরায়ণের মাধ্যমে অধিক ফলনশী সংকর মাগুর উদ্ভাবন করা হয়েছে।

 

 

এ মাছের অনেক বেশি গুণ- তিন মাসেই পূর্ণাঙ্গ দেশী মাগুরের আকরর, প্রায় ২০০-২৫০ গ্রাম ওজন হয়। এই সংকর জাতের মাগুর দেখতে দেশী মাগুরের মতো এবং খেতে সুস্বাদু। মাত্র ২ বর্গমিটারের ২.৫থেকে ৩ ফুট গভীর চৌবাচ্চায় প্রতি বর্গমিটারে ৫-৬ ইঞ্চি সাইজের ৪০ টি মাগুরের পোনা ছাড়তে পারেন। ফিশমিল, ব্লাডমিল, খৈল, চালের কুঁড়া, আটা মিশ্রিত খাবার দৈনিক পাঁচ ভাগ হারে দিলে প্রতি বর্গমিটারে তিন মাসে প্রায় ৫০ কেজি মাগুর উৎপাদিত হতে পারে। মাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত আলো-বাতাস দরকার, তাই রোদের তাপে চৌবাচ্চার পানি যাতে গরম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

 

এ ছাড়া প্রতিদিন চৌবাচ্চার পানি নেড়েচেড়ে দিতে হবে। যাদের জায়গা আছে তারা বাড়ির আশপাশে হাইব্রিড মাগুরের চাষ করতে পারেন। আর শহরে যাদের জায়গাস্বল্পতা তারা চাইলে বাসার ছাদে বা বাসার পাশের জায়গায় ৩ ফুট উঁচু চৌবাচ্চা তৈরি করে তাতে মাগুর মাছ অল্প পানিতে এবং বছরে তিনবার এ মাছের চাষ করা যায়। শহরঞ্চলে এসব মাছ কেজি হিসেবে বিক্র হয়। প্রতি কেজি ৭০- ১৮০ টাকা। হাইব্রিড মাগুর পোনা দেশের সর্বত্র পোনা বিক্রয় কেন্দ্রে পাওয়া যায়। আকৃতির ওপর এর দাম নির্ভর করে, যেমন-এক থেকে দুই ইঞ্চি আকৃতির মাছের পোনা ২-৬ টাকা করে। আবার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি নয়। যার ফলে চার মাস পালন করলে লাভ পাওয়া যাবে।

 

 

মাগুর মাছের পোনা উৎপাদন এ ছাড়া এ কাজে যখন অভিজ্ঞ হবেন, তখন নিজেই পোনা উৎপাদন করতে পারবেন। আর পোনা উৎপাদন করলে দুভাবেই লাভবান হবেন। প্রথমত, পোনা বিক্র করে;দ্বিতীয়ত, মাছ বিক্রি করে। সাধররণত মে থেকে আগস্ট মাস মাগুর মাছের প্রজননকাল। এ প্রজনন ঋতুতে ইনজেকশন দেওয়ার ৬ ঘন্টা আগে পরিপক্ক স্ত্রী দেশী মাগুর ও পুরুষ আফ্রিকান মাগুর পুকুর থেকে ঘরতে হবে। স্ত্রী দেশী মাগুরের পেট ডিমে ভর্তি ও ফোলা থাকে। জননেন্দ্রিয় গোল, লালচে ও ফোলা হয়ে থাকে। পেটে চাপ দিলে দু-একটি ডিম বের হয়ে আসে। আফ্রিকান পুরুষ মাছের জননেন্দ্রিয় লম্বাটে ও সূচালো হয়ে থাকে। মাগুর মাছে দুই ধরনের হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। যেমন পিটুইটারি গ্লান্ড (পিজি) ও হিউম্যান করিয়নিক গোলাড্রোটপিন (এইচসিজি)।

 

 

ইনজেকশন দ্রবণ তৈরি করার জন্য পতিত পানি ব্যবহার করা হয়। মাগুর মাছের দেহে সাধারণত ০.৫ মিলির রেশি ইনজেকশন দ্রবণ প্রবেশ না করা ভালো। হাইব্রিড মাগুর উৎপাদনের জন্য শুধু স্ত্রী- মাগুরকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। মাছের পৃষ্ঠদেশের পেছনের দিক থেকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ইনজেকশন দেওয়া হয়। ইনজেকশন দেওয়ার ১৪-১৮ ঘন্টার মধ্যে স্ত্রী মাছের পেটে চাপ দিয়ে পরিষ্কার ট্রে বা থালায় ডিম বের করে নেওয়া হয়। এ সময় পুরুষ মাছের পেট কেটে অণ্ডকোষ বের করে কুচি কুচি কেটে লবণ পানিতে দ্রবণ তৈরি করা হয়। সংগৃহিত ডিমের ওপর অণ্ডকোষ দ্রবণ ঢেলে পাখির পালক দিয়ে ডিম নিষিক্তকরণ করা হয়।

 

 

পরবর্তী সময়ে রেণু পোনা বের হয়। রেণু পোনাকে তিন-চার দিন যন্ত নিলে হয় ধানী পোনা, আস্তে আস্তে তা পোনায় রূপান্তর হয়।
প্রথম দিকে চৌবাচ্চা তৈরি ও অন্যান্য কারণে খরচ বেড়ে যাবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অভিজ্ঞতার কারণে লাভ বেশি হবে। নিজের উদ্যোগে চৌবাচ্চায় মাছ চাষ পরিবারের মাছের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রি করে কমবেশি আয় ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। চৌবাচ্চায় মাছ চাষে বাড়তি কোন শ্রমের প্রয়োজন হয় না। একই সাথে পরিবারের সবাই এ বিষয়াদি হাতে কলমে শিখতে আগ্রহী হয়। এতে পরিবারের পুষ্টির অভাব অর্থাৎ মাছের চাহিদা ও পূরণ হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ ফারমস এন্ড ফারমারস