যেভাবে লেখাপড়ায় আপনার বাচ্চার মনোযোগ বাড়াবেন

হিয়ানের বয়স আট। ওকে নিয়ে একটা সমস্যায় ভুগছেন ওর মা-বাবা। হিয়ানের মনঃসংযোগ করার ক্ষমতা বেশ কমে গিয়েছে সম্প্রতি। শুধু পড়াশোনায় বলে নয়। গল্পের বই পড়া হোক বা বাড়ির ছোটখাটো কাজে মা-বাবাকে সাহায্য, কোনওটাই ও বিশেষ মন দিয়ে করে না। এই নিয়ে নীতিশ আর সুমনা, মানে হিয়ানের বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ নেই। লকডাউনের ফলে বাড়িতে বসে ক্লাস করার যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে বাচ্চারা যাচ্ছে আজ দেড়বছর হল, এটা তারই প্রভাব কি না ঠিক বুঝতে পারছেন না তাঁরা।

দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসরুম এক্সপিরিয়েন্স থেকে বঞ্চিত ওরা। টিচারদের সঙ্গে মুখোমুখি ইন্টার‌্যাকশনের সুযোগ নেই। বন্ধুদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই। অনলাইনে অ্যাসাইমেন্ট জমা দেওয়া, পরীক্ষা দেওয়ার চাপ। তা ছাড়া আমরা বড়রা এর মধ্যেও যতটা বেরিয়েছি, ছোটরা তো সেভাবে বেরতে পারেনি! ওরা সেই চার দেওয়ালের মধ্যেই বন্দি থেকেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

যদিও এই সবকিছুর সঙ্গেই এতদিনে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে ওরা, কিন্তু অনেক বাচ্চার উপরেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কিছু-না-কিছু। কারও কারও মেজাজে পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। অল্পেতেই রেগে যাচ্ছে, বা ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছে তারা। মনখারাপ-রোগে ভুগছে অনেকে। কারও কারও আবার মনোযোগে ঘাটতি হচ্ছে। কোনও বিষয়েই ঠিকভাবে মনঃসংযোগ করতে পারছে না তারা। এর অবশ্য প্রতিকারও রয়েছে।

প্রথমত গ্যাজেট-অ্যাডিকশন। এতে মনোযোগের ক্ষমতা কমে। আর লকডাউনে এই গ্যাজেট-অ্যাডিকশন প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে। গ্যাজেটের ব্যবহার একেবারে বন্ধ তো করতে পারবেন না, কিন্তু সময় নির্দিষ্ট করে দিন। আর তার বদলে জিগস পাজ়ল বা ক্রসওয়ার্ড জাতীয় খেলা খেলতে উৎসাহ দিন বাচ্চাকে। এতে মাথা খাটে, মন দিয়ে ভাবতে হয়। তা ছাড়া একজায়গায় বসে খেলতে হয় বলে, যাকে ‘ফিজেট করা’ বলা হয়, তার প্রবণতাও কমে যায়। এসবের ফলেই মনোযোগের ক্ষমতা বাড়ে।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে পরিবেশটা খুব জরুরি— বিশেষ করে এখন, যখন ওরা ক্লাসরুম এনভায়রনমেন্টের সুবিধা পাচ্ছে না। বাচ্চা একটা ঘরে ক্লাস করছে, সেই ঘরেরই আর-এক কোণে আপনি মিটিং সারছেন, কিংবা বাচ্চার পাশে বসেই ডোমেস্টিক হেল্পকে নির্দেশ দিচ্ছেন দুপুরে কী রান্না হবে— এতে যদি ওদের মন পড়ার থেকে সরে যায়, দোষ দেওয়া যায় কি? বাচ্চা যখন ক্লাস করবে বা পড়াশোনা, ওকে তার উপযুক্ত পরিবেশ দিন। ওর ঘরে তো বটেই, আশেপাশেও তখন যেন কোনও গোলমাল না হয়, যাতে ওর মন সরে যেতে পারে। ক্লাসের সময় ঘরটা যেন ক্লাসরুমের মতোই হয়। ওকে বলুন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বইখাতা, সব হাতের কাছে গুছিয়ে রাখতে, যাতে বারবার উঠতে না হয়, মন সরে না যায়। ছোট বাচ্চা হলে আপনিই তার দরকারি জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখুন। তা ছাড়া এক-একজন বাচ্চার এক-একরকম অ্যাম্বিয়েন্স পছন্দ। ওর ঘরের লাইটিং বা ছবি ওর পছন্দ অনুযায়ী সাজান, যাতে ওর মন শান্ত এবং খুশি থাকে।

এক-একজন বাচ্চার শেখার ধরন এক-একরকম। কেউ শুনে বেশি ভাল মনে রাখতে পারে। কারও ভিস্যুয়াল এলিমেন্টস— অর্থাৎ ডায়াগ্রাম, চার্ট, গ্রাফ, ইত্যাদিতে বিষয়টা বেশি মনে গেঁথে যায়। কেউ আবার কোনও চ্যাপ্টার পড়ার পরে যদি সেটা নিজের মতো করে লিখে ফেলে, তাহলে তার আত্মস্থ করতে সুবিধা হয়। বাচ্চার এই বোঝার ধরনটা যদি বড়রা বুঝে সেই অনুযায়ী তাদের পড়ান, তাহলে তাদেরও মন বসাতে সুবিধা হয়।

যে কোনও বড় কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে দিলে, সেই কাজ করতে বাচ্চার সুবিধা হয়। কাজটাও মন দিয়ে করে তারা। এটা পড়াশোনার ক্ষেত্রে তো সত্যি বটেই। বাড়ির কাজের ক্ষেত্রেও। ধরুন আপনি বাচ্চাকে বললেন, নিজের আলমারিটা গুছিয়ে ফেলতে। অনেকেই কিন্তু দোনামনা করবে, কাজটা ফেলে রেখে দেবে। বা করলেও মন দেবে না। কিন্তু এক-একদিন এক-একটা তাক গুছিয়ে রাখতে বলুন, অনেক মন দিয়ে করবে। কাজের জন্য ছোট ছোট সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে গেলে ওকে মনোযোগ দিতে হবে।

প্রতিটা বাচ্চার পছন্দের হবি বা অ্যাকটিভিটি এক হয় না। আপনার বাচ্চা ভালবাসে গিটার বাজাতে, এদিকে আপনি চান ফাঁকা সময়ে ও শুধু বিভিন্ন ধরনের বই পড়ুক— এতে কিন্তু কারওরই লাভ হবে না। হ্যাঁ, বই পড়া নিশ্চয়ই খুব জরুরি। কিন্তু আপনি যদি ওর পছন্দের কাজটা ওকে না-ই করতে দেন, ও-ও কিন্তু আপনার পছন্দের কাজটা মন দিয়ে করবে না। তার চেয়ে মধ্যপন্থায় আসুন। ফাঁকা সময়ে ও ভালবেসে, মন দিয়ে গিটার বাজাক। ভাল ভাল বই ওকে পড়তে দিন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করুন, মতামত বিনিময় করুন। ধীরে ধীরে ওর আগ্রহ বাড়বে। আর যে বিষয়ে আগ্রহ, তাতে যে মনোযোগও থাকবে, সে তো বলাই বাহুল্য!

কাজের মাঝখানে বিরতি অত্যন্ত জরুরি। একটানা যে কোনও কাজ করতে গেলে ক্লান্তি আসে এবং মনঃসংযোগ কমেই, সে কাজে মাথা খাটাতে হোক অথবা হাত-পা। তাই বাচ্চা যাতে নিয়মিত ব্রেক নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। বিকেলে চাইলে একটু খেলে আসুক বা সাইক্লিং করে আসুক। এক্সাররসাইজ় হলে মন ভাল থাকে, মনোযোগে ঘাটতিও কম হয়। নজর রাখুন ওর খাওয়াদাওয়া এবং ঘুমের দিকেও। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খেলে হজমের সমস্যা এবং আরও নানা গোলমাল হতে পারে শরীরে, যার প্রভাব মাথা এবং মনে পড়বেই। একই কথা ঘুমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সারাদিন এমনিই ক্লান্ত লাগবে সারাদিন। কোনও কাজেই মন বসবে না। আর কাজের ভ্যালিডেশন অত্যন্ত জরুরি। যে কোনও কাজ ঠিকভাবে করতে পারলে যদি একবার ‘খুব ভাল’ বলেন, ওর কাজে উৎসাহ বাড়বে। সঙ্গে বাড়বে মনোযোগ।