হার্ট অ্যাটাক হওয়ার এক মাস আগে থেকেই দেহে এই ৭টি লক্ষন দেখা দেয়

আপনি হয়তো ইতিমধ্যেই জানেন হৃদরোগ এবং স্ট্রোক এখন বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর একটি বড় কারণ। হার্ট অ্যাটাক হয় সাধারণত হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচল কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে। অথবা রক্ত চলাচলের শিরা-উপশিরাগুলোতে কোনো ব্লক হলে হার্ট অ্যাটাক হয়। তবে আগেভাগেই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো ধরতে পারলে হয়তো অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের এক মাস আগে থেকেই দেহ কিছু সতর্কতা সংকেত দিতে শুরু করে। এখানে এমন ৭টি লক্ষণ বাতলে দেওয়া হলো যেগুলো দেখা গেলে বুঝবেন আপনি শিগগিরই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতে যাচ্ছেন। আর লক্ষণগুলো দেখা গেলে দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আসুন জেনে নেওয়া যাক-

১. অস্বাভাবিক রকমের শারীরিক দুর্বলতা: রক্তপ্রবাহ কমে গেলে এবং রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এমনটা হয়। রক্তের শিরা-উপশিরাগুলোতে চর্বি জমে বাধা সৃষ্টি করলে এবং মাংসপেশী দুর্বল হয়ে পড়লে হৃদরোগের প্রধানতম এই লক্ষণটি দেখা দেয়।

২. ঝিমুনি: দেহে রক্তের প্রবাহ কমে গেলে ঝিমুনিও দেখা দেয়। মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ কমে গেলে ঝিমুনির সৃষ্টি হয়।

৩. ঠাণ্ডা ঘাম: রক্তপ্রবাহ কমে গেলে দেহে ঘাম ঝরলে স্যাঁতসেতে ও ঠাণ্ডা ভাব অনুভূত হবে।

৪. বুক ব্যথা: বুক, বাহু, পিঠ এবং কাঁধে ব্যাথা অনুভূত হলে দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বুকে ব্যথা এবং সংকোচন হৃৎপিণ্ডের অসুস্থতার একটি বড় লক্ষণ।

৫. ঠাণ্ডা বা ফ্লু: হার্ট অ্যাটাকের শিকার অনেককেই এক মাস আগে থেকে ঠাণ্ডা-সর্দি বা ফ্লু-তে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে।

৬. শ্বাসকষ্ট: ফুসফুসে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন এবং রক্ত সরবরাহ না হলে এই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। হার্টের সমস্যা থাকলে ফুসফুসে রক্ত চলাচল কমে যায়। আর শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস ছোট হয়ে আসার মতো সমস্যা দেখা যায়।

৭. বমি, বদহজম, তলপেটে ব্যথা: বমিভাব, বদহজম, বুক হৃৎপিণ্ডে জ্বালাপোড়া করা বা তলপেটে ব্যথাও অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে। সুতরাং এই লক্ষণগুলো দেখা গেলেও হৃদরোগের ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

৩০ থেকে ৪০ এর কোঠাতেই হার্ট অ্যাটাক

সাধারণ পঞ্চাশোর্ধ পুরুষদের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে ৩০ এবং ৪০ এর কোঠায় থাকা পুরুষদেরও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার চিত্র বেশ স্বাভাবিক। এমনকি নারীরাও আগের থেকে অনেক বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এই রোগে। বর্তমান সময়ের দৈনন্দিন ব্যস্ততা এবং ব্যাপক চাপে থাকা লাইফস্টাইলই এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং ওয়াশ অব আইপিই গ্লোবালের জ্যেষ্ঠ্য কারিগরি উপদেষ্টা ড. দীনেশ আগারওয়াল বলেন, “২০১৬ সালে যতগুলো হৃদরোগের রোগী আমরা পেয়েছি তার ১৫ থেকে ২০ শতাংশই ইসচেমিক হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের রোগী। ২০২৫ সালের মধ্যে নিরূপণ অযোগ্য রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা”।

এছাড়াও একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের জনগণের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার আগের থেকে ৮ থেকে ১০ বছর এগিয়ে এসেছে। এছাড়াও হৃদরোগে আক্রান্তদের ৪০ শতাংশই ৫৫ বছর বয়সের নিচে। ফরটিস এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউট এবং রিসার্চ সেন্টারের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রিন্সিপাল ড. ভিশাল রাস্তোগি বলেন, “বিশ্ব হার্ট দিবসে, হৃদরোগ এবং হৃদরোগ থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত চেকাপের প্রতি সবাইকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে, ৩৫ বছর বয়সের আগেই অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে যা অনেকেই জানেন না”।

ভারতের পদ্মশ্রী পদক বিজয়ী ড. কে কে আগারওয়াল বলেন, “পরিসংখ্যান বলছে যে, হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ব্যস্ত জীবনযাপন, চাপ এবং পূর্বের পারিবারিক রেকর্ড এর জন্য দায়ী”।

হার্টের জন্য বিপজ্জনক পাঁচ সময়

আপনার হার্ট বা হৃদপিণ্ডের জন্য কোন মুহূর্তগুলো সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ, রিডার্স ডাইজেস্টের একটি প্রতিবেদনে তা জানিয়েছেন হলিস্টিকের কার্ডিওলজিস্ট ডা. জোয়েল কে. কান।

তিনি বলেন, ২৫ বছর ধরে হৃদরোগীদের চিকিৎসাকালীন সময়ে আমি লক্ষ্য করেছি যে, হার্ট অ্যাটাক সবসময় যথেচ্ছভাবে আক্রমণ করে না। হার্ট অ্যাটাকের জন্য কিছু অনুমেয় ‘ডেঞ্জার জোন’ রয়েছে, বিশেষ করে হৃদরোগী বা হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে এমন লোকদের ক্ষেত্রে। এসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক থাকলে সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে হার্টের সমস্যার সম্ভাবনা কমানো যাবে।

ফ্লু: ফ্লুর উপসর্গ (যেমন- অত্যধিক ক্লান্তি, ব্যথা এবং উচ্চ জ্বর) হার্ট অ্যাটাকের জন্য যথেষ্ট না হলেও, ফ্লুর প্রথম তিনদিন পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা চারগুণ বেশি হতে পারে। এ ভাইরাস কোনো প্রদাহমূলক প্রতিক্রিয়াকে উত্তেজিত করতে পারে যা ধমনী ড্যামেজের কারণ হতে পারে। ধমনীর প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধ করে এমন খাবার খান। ডিহাইড্রেটেড থাকলে রক্ত ঘন হয়, যার ফলে রক্ত জমাটবদ্ধ হতে পারে। জ্বর আপনার হার্ট রেট বৃদ্ধি করতে পারে, যে কারণে হার্টের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়। ফ্লু হওয়ার কয়েকদিন পর মেডিক্যাল সেবা অনুসন্ধান করুন।

খেলাধুলার বড় ইভেন্ট: বিশ্বাস করুন কিংবা না-ই করুন, আপনার দলের জন্য উল্লাসধ্বনি বা উৎসাহদায়ক ধ্বনি আপনার হার্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে- যদি আপনি খেলায় এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গবেষকরা ফুটবলের চারটি বিশ্বকাপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেছেন যে, এই টুনার্মেন্টের ফাইনালের সময় হার্ট অ্যাটাক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হার্ট অ্যাটাকের রেট সর্বোচ্চ হয়েছে যখন প্রিয় দল অন্য দলের বিপক্ষে খেলেছে। যদি আপনি খেলাধুলার চিল্লাফাল্লাকারী সমর্থক হন, তাহলে প্রতিদিন বেবি অ্যাসপিরিন গ্রহণের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। খেলা চলাকালীন সময়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করলে সবচেয়ে ভালো হয়।

ছুটি কাটানোর পরপরই কাজের চাপ: ছুটির দিন বা ছুটি কাটানোর পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে নতুন সপ্তাহের কাজ নিয়ে স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ভোগার ফলে অ্যাড্রিনালিন ও করটিসলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা রক্তচাপ ও রক্ত জমাটবদ্ধতা বাড়াতে পারে। ডা. জোয়েল কে. কান বলেন, ‘প্রশান্তিদায়ক কার্যক্রম যেমন- যোগ ব্যায়াম বা মেডিটেশনের মাধ্যমে সপ্তাহ শুরু করে আমার রোগীরা উপকার পেয়েছেন, এমনকি তা পাঁচ থেকে দশ মিনিটের হলেও।’ কার্যতালিকা লম্বা হলে মানসিক চাপে না ভোগার চেষ্টা করুন, উদ্বেগ হ্রাস করে এমন কিছু শব্দগুচ্ছ মনে রাখুন। মধ্যাহ্নের স্ট্রেস দূর করার একটি ভালো উপায় হচ্ছে লাঞ্চের সময় হাঁটা।

প্রিয়জনের মৃত্যু: গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন এমন হাজার হাজার লোকের ওপর গবেষণা চালিয়ে পেয়েছেন যে, যাদের প্রিয়জন মারা গেছে তাদের সে সপ্তাহে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি ছিল। সুইডিশ গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, কোনো বয়স্ক প্রিয়জন মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকের বর্ধিত ঝুঁকি থাকতে পারে। যদি আপনার প্রিয়জন মারা যায় অথবা আপনি একাকিত্ব বা বিষণ্নতা অনুভব করেন, তাহলে কাউন্সেলিং এবং ডাক্তার, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সাপোর্ট অনুসন্ধান করুন। কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বিষণ্নতা কাটিয়ে তোলে এমন অভ্যাস চর্চা করুন। ঘরে একা একা বসে থেকে বিষণ্নতায় ভুগবেন না।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়: জাপানে ২০১১ সালে সৃষ্ট হাজার হাজার লোকের প্রাণ হরণকারী ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামির প্রথম তিন সপ্তাহে বেঁচে যাওয়া লোকদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের রেট বিগত বছরগুলোর একই ক্যালেন্ডার সপ্তাহের তুলনায় তিনগুণ বেশি ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা লোক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী লোকদের এ ব্যাপারে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

যা হলে বুঝবেন হার্ট অ্যাটাক…

বলা হয় বিপদ কখনো বলে–কয়ে আসে না। বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু—এমনটা আমরা প্রায়ই শুনি। এই রকম হঠাৎ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াকে বলে ‘মুভি হার্ট অ্যাটাক’। তবে বেশির ভাগ সময় হার্ট অ্যাটাকের আগে আমাদের শরীর সংকেত দেয়। প্রথমে বুকে অল্প ব্যথার সঙ্গে একটা অস্বস্তি থাকে। ওই সংকেত বুঝে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ভয়ংকর কোনো পরিণতি থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।

বিভিন্ন কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, মানসিক চাপ ইত্যাদি অন্যতম কারণ। আবার অনেক সময় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে করোনারি রক্তনালি ব্লক হয়ে জায়গাটি বন্ধ হয়ে যায়। কিছু লক্ষণ রয়েছে যা জানা থাকলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক প্রতিরোধে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া যায়। লক্ষণগুলো যদি দীর্ঘদিন বা অন্তত এক মাস ধরে ঘটতে থাকে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

১. বেশির ভাগ সময় হার্ট অ্যাটাকে বুকের মাঝখানে চাপ বোধ হয়, যা কয়েক মিনিটের বেশি সময় ধরে থাকে। ব্যথাটা মাঝেমধ্যে চলে যায়, আবার ফিরে আসে। একটা অস্বস্তিকর চাপ ও ঝাঁকুনি অনুভব হয়।

২. অনেক সময় বাহু, পিঠে, ঘাড়ে, চোয়ালে অথবা পাকস্থলীতেও অস্বস্তি অনুভব হয়।

৩. অনেক সময় বুকে অস্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস ছোট হয়ে আসে।

৪. অন্য লক্ষণগুলোর মধ্যে ঘাম দিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা হালকা মাথাব্যথা হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে আলাদা রকমের হয়ে থাকে। পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম লক্ষণ হলো বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি। তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে অন্য লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায়, যেমন ছোট শ্বাস, বমি বমি ভাব, পিঠে বা চোয়ালে ব্যথা।

সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক শব্দটি থেকেই এর অর্থ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সহজভাবে বললে, সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক হলো নীরবে ঘটে যাওয়া হার্ট অ্যাটাক, যার তেমন কোনও লক্ষণ থাকে না।

তারপরও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কিছু লক্ষণ বের করেছেন যেগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তাদের মতে, এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এমনটি বলার সুযোগ নেই। তবে নিরাপদ থাকতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং এতে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের বেশ কয়েকটি উপসর্গ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- বুক ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট এবং অতিরিক্ত ঘাম। তবে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এগুলো নাও দেখা যেতে পারে কিংবা দেখা গেলেও সবগুলোর পরিবর্তে বরং একটা উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এ কারণে রোগী মনে করবেন তার হার্টে সমস্যা নেই, অন্য কোনও সমস্যা থেকেই এই লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আর তখনই ঘটে বিপত্তি।

হার্ট অ্যাটাক কাদের হয়, কী করবেন?

হার্ট অ্যাটাকের কারণ সাধারনত উচ্চরক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, ধুমপান, রক্তে খারাপ চর্বি অতিরিক্ত মাত্রা ((LDL, Total Cholesterol, Triglyceride), ভালো চর্বির কম মাত্রা (HDL), বংশগত কারন (মায়ের বয়স ৫০ এর নিচে অথবা বাপের বয়স ৪৫ এর নিচে -থাকা অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক হলে ওই পরিবারের সন্তানদের অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের প্রবনতা বেশি থাকে)। এছাড়া অলস জীবন যাপন, মানসিক চাপ ইত্যাদিও কারনে হার্ট অ্যাটাক বেশি হয়।

হার্ট অ্যাটাক হলে সাধারনত বুকের মাঝখানে ব্যাথা, ভারি ভারি ভাব- যা গলা, ঘাড়, পিঠ, হাতের বাম হাত বেয়ে ছোট আঙ্গুল, বুকের বাম দিক বা ডান দিক হয়েও ডান হাতের আঙুল, এমনকি পেটের উপরিভাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে (অনেকে এ ব্যাথাকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যাথা মনে করেন), সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাম, বমি, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়সহ অস্থির ভাব হতে পারে। এমনকি রোগী সাথে সাথে মৃত্যুবরণও করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি: হার্ট অ্যাটাকের শুরু থেকে প্রথম এক ঘন্টার মধ্যে শতকরা ২৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়। পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আরও ২৫ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর মৃত্যুবরন করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকে করণীয় কেউ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে প্রথমেই ৩০০ মিলিগ্রাম ইকোসপিরিন, ৩০০ মিলিগ্রাম ক্লোপিডেগ্রেল, ২০ মিলিগ্রাম এ্যট্রোভাষ্টেটিন ২০ মিলিগ্রাম প্যান্টোপ্রাজল খেয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে পৌছে ইনজেকশন স্টেপটোকাইনেজ দিয়ে দিতে পারলে প্রায় শতকরা ২৫ জন রোগী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। পরবর্তীতে করোনারী এজিওগ্রাম করে হার্টের ব্লকের পরিমাণ ও সংখ্যা নির্ধারন করে নিয়ে নিম্নোক্ত তিনটি চিকিৎসার মধ্যে একটি নির্ধারন করতে হয়।

১.ছোট ছোট ব্লকের ক্ষেত্রে প্রধান রক্তনালীতে ৪০ ভাগের নিচে বা শাখা রক্তনালীতে ৭০ ভাগের নিচে থাকলে শুধুমাত্র ঔষধ দ্বারাই চিকিৎসা নিয়ে রোগী ভাল থাকতে পারে।

২.কিন্তু ব্লকের পরিমাণ প্রধান রক্তনালীতে ৪০% ও শাখা রক্তনালীতে ৭০% বা তার অধিক হলে বøকগুলোকে বেলুন দিয়ে পরিষ্কার করে ওইখানে (Stent)(যাহা কালভার্টের মত দেখতে) বসিয়ে দেওয়া হয় অনেকে এই পদ্ধতিকে রিং বসানো বলে থাকে। হার্ট অ্যাটাকের প্রথম ৯০ মিনিট থেকে ৩-ঘন্টার মধ্যে এই পদ্ধতি বøক ছুটিয়ে রিং(Stent)বসিয়ে দিলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়-একেই প্রাইমারি পিসিআই (Primary PCI) বলে-যা বর্তমান বিশ্বে হার্ট অ্যাটাকের সর্বাধুনিক চিকিৎসা, যা আমরাই এদেশের চিকিৎসকরা অহরহই করে চলেছি।

৩.যেসব ক্ষেত্রে রিং (Stent) বসানো সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে বøকগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাস্তা বানিয়ে রক্ত সামনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় -এই পদ্ধতিকে বাইপাস সার্জারি বলা হয়। মোদ্দা কথা হল হার্ট অ্যাটাকের ফলে রক্তনালীতে সৃষ্ট ব্লকের কারনে হার্টের যে অংশ অপর্যাপ্ত রক্ত পায়-সে অংশে উপরোক্ত যে কোন একটি পদ্ধতিতে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত পরিমান রক্ত সরবরাহ করাই মূলকথা।

হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী রোগীদের করণীয়

পুনরায় যেন ব্লক না হয়-সেই জন্যে ওষুধ খাওয়াসহ প্রতিদিন বিকাল অথবা সকালে এক ঘন্টা হাঁটতে হবে। চতুস্পদী জন্তু, ঘি, পামওয়েল খাওয়া বন্ধ করতে হবে। খেতে হবে ইলিশ মাছসহ সামুদ্রিক মাছ, শাক-সবজি, চামড়া ছাড়া হাস-মুরগী, রসুন ইত্যাদি। সর্বোপরি মানসিক চাপ পরিহার করে সহজ জীবন ধারন করে চলতে পারলে হার্টকে সুস্থ রাখা সম্ভব।

হার্ট অ্যাটাক হলে সারা বিশ্বব্যাপী উপরোক্ত তিনটি চিকিৎসার যে কোন একটি চিকিৎসাই বিজ্ঞান সম্মত- শুধুমাত্র ওষুধ ও জীবন ধারন পরিবর্তন করে এই চিকিৎসা করার বিজ্ঞান সম্মত নয়তো বটে বরং এই তত্ব অবাস্তব ও সমাজে ভূল বার্তা প্রেরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতি রোগ হার্ট অ্যাটাক নিয়ে সমাজে ভূল বার্তা প্রেরণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে।

আসুন আমরা এই প্রাণঘাতি রোগ থেকে বাচতে সঠিক চিকিৎসার ব্যাপারে সবাই যত্নবান হই।