প্রতিটি সকালটা সুন্দরভাবে শুরু করার পাঁচটি জরুরী পরামর্শ

সকালে ঘুম থেকে ওঠার ক্ষেত্রে অনেকেরই আলসেমি থাকে। ঘুম ভাঙার পরও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা হয় না। বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে আরেকটুখানি ঘুমিয়ে নিতে চান অনেকেই। এভাবে সকালটা অগোছালোভাবে শুরু হয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সকাল শুরু করতে পারলে দিনটা চমত্কার কাটতে পারে। যুক্তরাজ্যের মেট্রো অনলাইন এক নিবন্ধে সুন্দরভাবে সকাল শুরুর পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছে।

ধাপে ধাপে ঘুম থেকে ওঠা: ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছাড়তে যাদের সময় লেগে যায়, তাঁরা ‘টারগেট টাইম’ থেকে ১৫-২০ মিনিট আগে অ্যালার্ম দিন। বাড়তি সময়টুকুতে ধাপে ধাপে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। প্রথমে চোখ খোলা, তারপর বসা, তারপর উঠে পড়া। নিজেকে সে সময় বোঝানো যেতে পারে যে, যেহেতু ঘুম থেকে উঠতেই হবে সেহেতু গড়িমসি না করে উঠে পড়াই ভালো। ঘুম থেকে ওঠার এই পদ্ধতিটি ঘুম ভাঙার প্রক্রিয়াটিকে শান্ত ও ধীরস্থির করতে সহায়তা করবে।

সকালে উঠে পানি পান: রাতে ঘুমের মধ্যেও আমাদের শরীর হজমের কাজসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জৈবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এতে সকালবেলায় শরীরে পানির ঘাটতি থাকে। ভোরে পরিমাণমতো পানি পান শরীরকে চাঙা ও কর্মক্ষম করে তোলে। তবে একেবারে ভোরে শুধু পানি পানে অনীহা থাকলে বৈচিত্র্য আনতে পারেন। পানির সঙ্গে ফলের রস মিশিয়ে বা নানা ধরনের শরবত বানিয়ে রেখে তা পান করা যেতে পারে।

টেলিভিশনকে না: ঘুম থেকে উঠেই টেলিভিশনের সামনে বসা অনেকের অভ্যাস। কেউ হয়তো ভাবেন, সকাল সকাল খবরের শিরোনাম জেনে রাখা দরকার। সেটি করা যেতে পারে অফিস কিংবা মূল কাজ শুরুর আগের সময়টিতে। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পরপরই টেলিভিশনের সামনে বসলে মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে। টেলিভিশনের নানা খবরাখবর আপনার মনকে অস্থির করে তুলতে পারে। সকালবেলায় এটা মোটেই কাম্য নয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে কাজের প্রস্তুতি নিতে সারা দিনের একটি ছক তৈরি করুন মনে মনে। কিংবা কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়া বারান্দায়, ছাদে কিংবা বাড়ির কাছের খোলা জায়গায় ৫-১০ মিনিট সময় কাটান হেঁটে বেড়িয়ে।

গোসল: সকালে গোসল করার অভ্যাস মনকে সতেজ করে। ঘুমের কারণে অবিন্যস্ত চুল হয় পরিপাটি। ত্বকে আসে নমনীয়তা। গোসলে ত্বক-উপযোগী সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। সকালে গোসলের অভ্যাস কাজের উদ্যম বাড়ায়, শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে, বিষণ্নতা কমায়।

সকালের নাশতা: অনেকেই সকালের নাশতাকে হালকা খাবার হিসেবে বিবেচনা করে অবহেলা করেন। অথচ দুপুরের খাবারের আগেই সাধারণত বেশি পরিশ্রম করা হয়ে থাকে। সেহেতু সকালের নাশতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নাশতা হতে হবে পর্যাপ্ত। যত তাড়াহুড়োই থাকুক, রুটিন করে সকালের নাশতা সারতে হবে। আর সকালে সময়মতো নাশতা না করা নানা রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সকালের যে ১৪টি অভ্যাস আপনার প্রোডাক্টিভিটি বাড়াবে

সময় এবং স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এই কথাটি আসলেই সত্য। সময় একবার চলে গেলে তা কখনোই ফিরে আসবে না। তাই আপনার দিনের ২৪ ঘন্টার মাঝের কোন সময়য় যাতে অযথা নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর মাঝেও নিজের জন্য কিছু সময় বরাদ্ধ রাখতে হবে। সেই সময়টুকু কখনোই নষ্ট সময়ের তালিকায় পড়বে না, বরং আপনার নিজের কর্মক্ষমতা বাড়াবে।

আপনার দিনের সবটুকু সময় যাতে ভালো কাজে ব্যয় হয় সেজন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর রুটিন। রুটিনমাফিক চললে আপনার সব সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার হবে। প্রতিদিন সকালে উঠেই আপনার ঠিক করে নিতে হবে সারাদিন কী কী করবেন। এই সকালের রুটিন ঠিক করে নেওয়ার উপরই নির্ভর করছে আপনার পুরো দিন কিভাবে কাটাবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই ১৪টি অভ্যাস যা আপনাকে আরো উৎপাদনশীল করে তুলতে সহায়তা করবে।

১. সকালে তাড়াতাড়ি উঠুন: যদিও সকল সফল ব্যক্তিদের সবাই সকালে ঘুম থেকে উঠার তালিকায় নেই, কিন্তু তন্মধ্যে বেশীরভাগই সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। রিচার্ড ব্র্যানসন বলেন, “আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন আমি সবসময় নিয়ম মেনে ভোর ৫ টায় উঠার চেষ্টা করি। সকালে উঠার জন্য আমি ব্যায়াম করার সময় পাই এবং পরবর্তীতে পরিবারের সাথে কিছু সময় কাটাতে পারি। এতে আমার মন এবং মস্তিষ্ক উভয়ই খুব ফুরফুরে থাকে যা আমাকে ব্যবসায় মনোযোগী হতে সাহায্য করে।”

ব্র্যানসনের সাথে এমন আরো অনেক সফল তারকা ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা কিনা সকালে উঠেন সবসময়। এর মাঝে রয়েছেন এপল কোম্পানীর সিইও টিম কুক (ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে উঠেন), টুইটারের সিইও জ্যাক ডরসি( ভোর ৫টায় উঠেন), স্টারবাকসের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হাওয়ার্ড স্কাল্টয, যিনি কিনা ভোর ৪ঃ৩০ বাজে ঘুম থেকে উঠেন প্রতিদিন।

জরিপে দেখা গিয়েছে, প্রায় সকল সফল ব্যক্তিত্ব কাজে যাওয়ার বেশ কিছু সময় আগে ঘুম থেকে উঠেন এবং নিজেকে সময় দেন। এতে তারা সারাদিনের কাজ করার উৎসাহ পান।

২. পরের দিন কী কী কাজ করবেন তা আগের দিন বিকালেই ঠিক করে রাখুন: আপনার প্রতিদিনের কাজ তখনই শেষ হবে যখন আপনি জানবেন যে পরবর্তী দিনে আপনার কী কী কাজ করা প্রয়োজন। দিনের কাজ দিনে শেষ করে পরবর্তী দিনে কী কী কাজ করা প্রয়োজন তা সাথে সাথে নোট করে রাখা উচিৎ যেমনটি Shark Tank এর বিনিয়োগকারী কেভিন ও লেরি করেন।

“আমি ঘুমাতে যাওয়ার আগে সবসময় পরবর্তী দিনে কারোর ফোন কিংবা ইমেইল কিংবা কারো সাথে মিটিং এ বসার আগে কী কী প্রয়োজনীয় কাজ রয়েছে তা লিখে রাখি। এতে সবকাজে সমন্বয় রক্ষা হয়। এই কাজগুলো যেকোন রকমের হতে পারে, যেমন আমার মেয়ের স্কুলে ফোন দিয়ে তার খোঁজখবর জিজ্ঞাসা করা। এই কাজগুলো করলে আপনি সেই দিনের পরবর্তী কাজগুলো খুব ভালোভাবে শেষ করতে পারবেন”।

৩. কাজের তালিকার সবচেয়ে কঠিন কাজটি সবার আগে করুন: বিখ্যাৎ লেখক মার্ক তাঈন বলেন, “Eat a live frog first thing in the morning and nothing worse will happen to you the rest of the day.” এই উক্তি দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে নিজের কাজের তালিকায় সবচেয়ে কঠিন যেই কাজটি যা আপনি করতে চান না, সেই কাজটি আগে করুন।

Lifehacker.com এর প্রতিষ্ঠাতা গিনা ত্রাপাঠির মতে, ” আপনি যখন সকালে কাজ করতে বসবেন তখন আপনার মন এবং মস্তিষ্ক একদম ফ্রেশ থাকবে, আপনাকে অন্যান্য আরো দশটা কাজ নিয়ে ভাবতে হবে না। তাই এই সময়ই সবচেয়ে উপযুক্ত নিজের কঠিন কাজ করার জন্য। এর মাধ্যমে আপনার সবচেয়ে কঠিন কাজ সকাল ১০টার মাঝেই শেষ হয়ে যাবে, পরবর্তীতে বাকি কাজ করতে অনেক সহজ হবে।”

৪. ঠান্ডা পানি পান করুন: পুষ্টিবিদ এবং The One One One Diet এর লেখক রায়ান বাতায়ানেহ বলেন, “আপনি যখন ঘুম থেকে উঠবেন তখন অনেক পানি পান করুন। কারণ আপনি ঘুমের জন্য অনেকটা সময়য় পানি পান করা থেকে বিরত ছিলেন। তাই উঠে পানি পান করুন। পানি পান করলে আপনার দেহের সকল কার্যক্রম সঠিকভাবে হবে।”

৫. মোবাইল ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখুন: জরিপে দেখা গিয়েছে, দিনের সবচেয়ে বেশী সময়য় নষ্ট হয় মোবাইল ফোনের জন্য। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য এমনটা হয়ে থাকে। ঘনঘন ফোনের নোটিফিকেশন দেখার অভ্যাস আপনার কাজে মন বসানোর ক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। আপনার সময় যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য মোবাইল ফোন লকারে রাখতে পারেন, অবসর সময়ে ব্যবহার করতে পারবেন এমন ভাবে ব্যবস্থা করবেন। এতে করে কাজের সময় মনোযোগ বিঘ্নিত হবে না।

৬. আলো জ্বেলে রাখুন: এমন অনেক সময় হয় যে, সকালে ঘুম থেকে উঠতে চাচ্ছেন কিন্তু বাহিরে এখনও কোন আলো নেই। তখন রুমের আলো জ্বেলে রাখুন, ঘুম দৌড়ে পালাবে। এটি প্রাকৃতিক ব্যাপার যে, আপনি যখন আলো জ্বেলে রাখবেন কিংবা আলো দেখবেন তখন আপনার মস্তিষ্কে নিজে থেকেই বার্তা চলে যাবে যে সকাল হয়ে গিয়েছে কিংবা ঘুম থেকে উঠার সময় হয়ে গিয়েছে।

মার্থা জেফারসন হাসপাতালের ডা ক্রিস্টোফার উইন্টার বলেন, “ধরুন আপনি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠতে চাচ্ছেন তখন বাহিরে অন্ধকার, সেক্ষেত্রে আপনি আপনার মস্তিষ্ককে বোকা বানাতে পারেন। আলো জ্বেলে রেখে এই বোকা বানানোর কাজটি করতে পারেন।”

৭. ব্যায়াম করুন: সকালে প্রত্যহ ঘুম থেকে উঠেই প্রথম যেই কাজটি করা উচিৎ তা হলো ব্যায়াম করা। আপনার শরীর যদি সুস্থ থাকে তবে সকল কাজে মন বসবে। ৬৭ বছর বয়সী ব্র্যানসন একজন সাইক্লিস্ট এবং প্রত্যহ দৌড়ান। তিনি বলেন, “আমি আমার বয়সের তুলনায় দ্বিগুণ কাজ করতে পারি আর এর পুরো কৃতিত্ব আমার ব্যায়াম করার। প্রত্যহ ব্যায়াম করলে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে।”

৮. স্বাস্থ্যসম্মত নাস্তা করুন: সকালের নাস্তার উপর অনেকগুলো ব্যাপার নির্ভর করবে। আপনি যদি সকালে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ না করেন তবে সারাদিনের কাজের জন্য শক্তি আপনি পাবেন না।

প্রতিদিন সকালের খাবারের তালিকায় প্রচুর পরিমাণে পানি এবং ফল থাকা উচিৎ। এবং খাবারের তালিকায় আমিষ এবং শর্করার সমন্বয় প্রয়োজন।

৯. ধ্যান করুন: অপরাহ উইনফ্রে এবং আরিয়ানা হাফিংটন এর প্রতিদিন সকালের রুটিন হলো ধ্যান করা। এই ধ্যান করার তালিকায় শুধু যে এই দুইজন রয়েছে তা কিন্তু নয়, আরো অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ধ্যান করলে আপনার মস্তিষ্ক শান্ত থাকে, আপনার ধৈর্য বাড়ায়। যে কোন কাজ করতে পারবেন ঠান্ডা মাথায় আপনি।

১০. পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম: সারাদিন কাজ করার জন্য প্রয়োজন শক্তি, আর এজন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হলো পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম। একজন ব্যক্তির প্রত্যহ সাত থেকে নয় ঘন্টার ঘুম প্রয়োজন। সঠিক সময়ে যাতে ঘুমাতে পারেন সেজন্য ঘুমাতে যাবার ৪-৫ ঘন্টা আগে কোন প্রকার কফি বা চা পান থেকে বিরত থাকুন। রুমের মাঝে শান্ত পরিবেশ তৈরী করুন। দেখবেন সঠিক সময়েই ঘুমাতে পারবেন।

১১. সঠিক সিদ্ধান্ত নিন: দিনের কখন কোন কাজ করবেন, কোন কাজ করা ঠিক হবে আর কোণ কাজ করা ঠিক হবে না তা ঠিক করুন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ভুল সিদ্ধান্ত নিলে পুরো দিনটিই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আপনার সারাদিনে অনেক কাজ করতে হবে, এর মাঝে আপনি সকালে কি পড়বেন এসব ব্যাপারে সময় নষ্ট না করাই ভালো। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ এক্ষেত্রে উদাহরণ, তিনি প্রায় সবসময় একই রকম পোশাক পরিধান করেন, তার ধূসর রঙ এর টি-শার্ট আর হুডি প্রতিদিনের সঙ্গী। তাই কোন বিষয়ে কতটুকু সময় দিবেন সেক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।

১২. কৃতজ্ঞ থাকুন: সবসময় জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। লাইফ কোচ এবং লেখক টনি রবিনস দৈনিক সকালের একটি সময়য় রয়েছে যখন তিনি তার জীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন সাড়ে তিন মিনিট ধরে তিনটি বিষয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। প্রতিদিন সকালের এই নিয়ম আপনাকে সবসময় পজিটিভ চিন্তা করতে সহায়তা করবে।এমনকি আপনার রাগ এবং ভয়ও এই নিয়মের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে।

১৩. পড়ুন: সফলতার সাথে সবচেয়ে বেশী যে ব্যাপারটি জড়িয়ে রয়েছে তা হলো পড়া। সবকিছু থেকে আপনি শিক্ষা নিতে পারেন। আর সেই শিক্ষাগুলো কখনোই বৃথা যাবে না। পত্রিকা পড়লে পুরো পৃথিবীর খবর জানতে পারবেন, বই পড়লে আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। তাই সবসময় পড়া উচিৎ।

১৪. পরিবারকে সময় দিন: আপনার জীবনে আপনি যাই করছেন তা নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য। দিনের শুরুতে পরিবারকে সময় দিন, পরিবারের বিভিন্ন সমস্যার কথাগুলো শুনুন, সমাধানের চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে সময়য় কাটালে সারাদিনে কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন।

যে খাবারগুলোর যে কোনো একটি দিয়ে দিন শুরু করতে পারেন

সকালের নাস্তায় স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া জরুরি কিন্তু দিনের শুরুতেই বেশি খাবার খাওয়া ঠিক হবে না। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার দেহের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো এবং নানা প্রক্রিয়া জেগে উঠতেও বেশ সময় লাগে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, দিনের শুরুতে হালকা গরম পানি পান করা বা হালকা জল খাবার খাওয়ার মাধ্যমে খাওয়া-দাওয়া শুরু করলে পাকস্থলীর বিপাকীয় প্রক্রিয়া ভালো থাকে। আর ঘুম থেকে ওঠার অন্তত দুই ঘণ্টা পর নাস্তা করা উচিত। তার আগে আপনি চাইলে এই খাবারগুলোর যে কোনো একটি দিয়ে দিন শুরু করতে পারেন। তাহলে আপনাকে আর শরীর বাবাজিকে কোনো চিন্তাই করতে হবে না।

১. মধু ও হালকা গরম পানি: প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস হালকা গরম পানির সঙ্গে এক বা দুই চা চামচ মধু এবং লেবুর রস মিশিয়ে খেলে হজম শক্তি এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এ ছাড়া দেহের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থগুলোও বের করতে সহায়ক এই পানীয়।

২. চুপসানো কাজুবাদাম: দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে থাকার পর সকালে ৫-১০টি কাজু বাদাম খেলে সারাদিন ধরে পুষ্টি ও শক্তির যোগান দেবে। কাজুবাদামের খোসাতে থাকে ট্যানিন যা পুষ্টি শোষণে বাধা দেয়। ফলে সেই খোসাটা পানিতে চুপসিয়ে নিলে তা থেকে সব পুষ্টি উপাদান সহজেই শুষে নিতে পারে আমাদের দেহ।

৩. আমলকি জুস: সকালে খালি পেটে আমলকি জুস পান করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তবে এই জুস পান করার পর ৪৫ মিনিট ধরে চা বা কফি পান করা যাবে না। আর নিয়মিত আমলকি জুস পান করলে আয়ুও বাড়ে। এ ছাড়া পাকস্থলিকে বিষমুক্ত করতে এবং হজম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতেও সহায়ক আমলকি। এ ছাড়াও ত্বক পরিষ্কার, স্বাস্থ্যবান চুল এবং চোখের জ্যোতি বাড়াতেও সহায়ক আমলকি জুস।

৪. পেঁপে: সকালে খালি পেটে পেঁপে খেলে পাকস্থলি পরিষ্কার হয় এবং বাওয়েল মুভমেন্ট মসৃণ হয়। তবে পেঁপে খাওয়ার পর এক ঘণ্টা আর কিছু খাওয়া যাবে না। পেঁপে খেলে রক্তে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণও কমে আসে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।

৫. চিয়া বীজ: এই বীজগুলো আসলে পরিপূর্ণ প্রোটিন। এতে জরুরি ৯টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের সবকটিই আছে। এ ছাড়া এসবে আছে জরুরি ফ্যাটি অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং ভিটামিন বি। রাতে এক টেবিল চামচ চিয়া বীজ পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে খেয়ে নিন। নারকেলের দুধ বা কাজুবাদামের দুধের সঙ্গেও খেতে পারেন।

৬. তরমুজ: এই ফলটি শুধুমাত্র খালি পেটেই খাওয়া উচিত। তরমুজ খাওয়ার সেরা সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর। তরমুজে ক্যালোরি কম এবং ইলেকট্রোলাইটস বেশি। গ্রীষ্মের সকালে এই ফলটি খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

৭. তেতো ঘি: এটি একটি আয়ুর্বেদিক রেসিপি। দেশি ঘির সঙ্গে নিম, মানজিষ্ঠা এবং আরো নানা তেতো ভেষজ উপাদান মিশিয়ে এই ঘি তৈরি করা হয়। তেতো স্বাদের যে কোনো ভেষজ দেহকে প্রশমিত ও পরিষ্কার করে এবং জীবাণু নাশক হিসেব কাজ করে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে হালকা গরম পানির সঙ্গে ১ চা চামচ তেতো ঘি খেতে পারেন। তবে এটি খাওয়ার পর অন্তত আধা ঘণ্টা আর কিছু খাওয়া যাবে না। তেতো ঘি রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রদাহ কমাতে এবং রক্ত পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ করতেও সহায়ক।

৮. খেজুর: খেজু্র তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস হিসেবে সবার সেরা। যা দিন শুরু করার জন্য জরুরি। খেজুরে আছে সহজে দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ যা হজম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। কেননা তা পাকস্থলিতে প্রচুর পানি শুষে নেয়। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও খেজুর বেশ কার্যকর। পাকস্থলির অস্বস্তিভাব দূর করতে এবং ডায়রিয়া নিরাময়েও খেজুরে থাকা পটাশিয়াম সহায়তা করে।

৯. রসুন: রসুনের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাংগাল উপাদান। এটি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। সম্প্রতি গবেষণায় বলা হয়, সপ্তাহে অন্তত সাতটি রসুনের কোয়া খেলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে; হৃদরোগ প্রতিরোধ হয়।

১০. ওট: ওটের মধ্যে রয়েছে বেটা-গ্লুকেন সলিউবল আঁশ। এটি উচ্চ রক্তচাপ ও শরীরের বাজে কোলেস্টেরল কমাতে কাজ করে। এটি পাকস্থলীর জন্য হালকা খাবার হলেও সারা দিন আপনাকে কর্মক্ষম রাখবে এবং শরীরের শক্তি জোগাতে বেশ সাহায্য করবে।

১১. ডিম: একটি ডিম খেয়ে সকাল শুরু করা মানে স্বাস্থ্যকরভাবে সকাল শুরু করা। প্রোটিনসমৃদ্ধ এই খাবার সকালের নাশতায় রাখলে শরীরটা বেশ ভালোই থাকে।

১২. ব্রকলি: এই সবজি ফোলেট, ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি’র ভালো উৎস। এটি শরীরকে পরিশোধিত করতে সাহায্য করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে কাজ করে।

১৩. চা: চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ডায়াবেটিস ও ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবারটি স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে। এই জন্য লাল চা বা গ্রিন টি খেতে পারেন।

১৪. দই: দইয়ের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম। তবে এটি মিনারেল, ফসফরাস, ভিটামিন-বি১২, পটাশিয়াম, জিংকের ভালো উৎস। দইয়ের মধ্যে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়া হজমে সাহায্য করে।

ছোট্ট একটি অভ্যাসও আপনার স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সকালের এই সহজ অভ্যাস আপনাকে সারাদিন ধরেই রাখবে সক্রিয় এবং সতেজ।