বাচ্চাদের সামনে যে মিথ্যা কথাগুলো বললে তারা আপনার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে

সন্তান লালন-পালনের সময় আমরা প্রত্যেকেই অল্প বিস্তর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। মিথ্যে কথা বলে বাচ্চাদের খাবার খাওয়ানো বা তাদের কোনও ভুল অভ্যাস ছাড়ানো, এসবই করে থাকি আমরা। তবে লক্ষ্য রাখার বিষয় হল এই মিথ্যাগুলি যেন বাচ্চাদের ওপর কুপ্রভাব না-ফেলে। কোন কোন মিথ্যে কথা বাচ্চাদের বলবেন না তা জেনে নিন—

‘আমি ছোটবেলায় খুব সাহসী ছিলাম’

কম বয়সি বাচ্চারা প্রায়ই কোনও না-কোনও কারণে বা কোনও কিছু দেখে ভয় পায়। তখন তাদরে মনে সাহস জোগানোর জন্য অভিভাবকরা বলে থাকেন যে, তাঁরা ছোটবেলায় খুব সাহসী ছিলেন, কোনও কিছুকে ভয় পেতেন না ইত্যাদি।

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই মিথ্যে সন্তানের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু আপনার সন্তানের মধ্যে সামান্য সাহস থাকা সত্ত্বেও আপনি যদি বার বার আরও সাহসী করে তোলার জন্য তুলনা টেনে আনেন বা নিজের উদাহরণ দেন, তা হলে তার আত্মবিশ্বাস কমে আসতে পারে।

‘আমি তোমরা জন্য অমুক জিনিস নিয়ে আসব’

ধরুন, আপনি কোথাও বাইরে যাচ্ছেন, তখন আপনার সন্তান সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরল। এই পরিস্থিতিতে তাদের শান্ত করে বাড়িতে রাখার জন্য খুব সাধারণ একটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকি। এই যেমন- ‘তুমি বাড়ি থাক, আমি তোমার জন্য অমুক জিনিস নিয়ে আসব।’, বা ‘তুমি আমার কথা শুনলে তমুক জিনিস কিনে দেব’ এই প্রতিশ্রুতি অনেকেই পূরণ করেন না। অর্থাৎ, বাড়ি ফেরার সময় বা সন্তান আপনার কথা শুনলেও তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন না।

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

সাইকোলজিস্টিদের মতে, বাচ্চাদের উৎসাহিত করার জন্য এমন প্রতিশ্রুতি দিতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভুল। সন্তান আপনার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়ে আপনার কথায় রাজি হল। তার পর যদি আপনি তাদের জন্য সেই জিনিসটি নিয়ে না-আসেন, তা হলে অভিভাবকদের ওপর থেকে বাচ্চাদের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী কালে বাচ্চারা মা-বাবার কোনও কথাই শুনবে ও বিশ্বাসও করবে না।

‘তুমি গড গিফ্টেড’

বাচ্চাদের মধ্যে নিজের জন্মের সঙ্গে জড়িত তথ্য জানার আগ্রহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। তাই তারা প্রায়ই অভিভাবকদের জিগ্যেস করতে থাকে যে, তারা পৃথিবীতে কী ভাবে এল ইত্যাদি। এ সময় তাদের জিগ্যাসা দূর করার জন্য অভিভাবকরা বলে দেন যে, ‘তুমি গড গিফ্টেড। ঈশ্বর তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।’

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

সন্তানের প্রশ্নের সঠিক ও সত্য উত্তরই যে দিতে হবে, তার কোনও বাধ্যকতা নেই। কিন্তু তারা যে গড গিফ্টেড, এমন বলাও উচিত নয়। সাইকোলজিস্টদের মতে, এমন ভুল তথ্য বাচ্চাদের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। বাচ্চা যদি জানতে পারে যে, সে গড গিফ্টেড, তা হলে নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট মনে করতে শুরু করবে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের ছোট করবে।

‘আমি এখনই পৌঁছে যাব’

আপনি যত দূরই হোন না-কেন, প্রায়ই বলে থাকেন, ৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব ইত্যাদি। অন্যকে এমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলেও, নিজের সন্তানকে ভুলেও এমন প্রতিশ্রুতি দেবেন না।

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

বাচ্চাদের এমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়। কারণ অভিভাবকরা বাচ্চাদের যখন এমন প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তারা তা পূরণের অপেক্ষায় বসে থাকে। কিন্তু আপনার প্রতিশ্রুতি মতো ৫ মিনিটের মধ্যে আপনাকে কাছে না-পেলে তারা হতাশ হয়ে যায়। বার বার এমন করলে আপনার ওপর থেকে যে তারা শুধু বিশ্বাসই হারাবে তা নয়, বরং রাগী ও খিটখিটে মেজাজেরও হয়ে যাবে।

‘আমি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম’

পড়াশোনার প্রতি বাচ্চাদের রুচি বাড়ানোর জন্য আমরা প্রত্যেকেই বলে থাকি যে, ‘আমি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম।’ কিন্তু এটি সত্যি হলেই এমন কথা বলুন তাদের। এমন কোনও মিথ্যে নিজের সন্তানকে বলবেন না, যা একদিন তার সামনে ধরা পড়ে যেতে পারে। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুবান্ধবরা আপনার গোপন সত্যটি সন্তানের সামনে ফাঁস দিতে পারেন। অথবা এ-ও হতে পারে, আপনার রেজাল্ট সন্তান দেখে ফেলল। তখন তাদের কাছে কিছুই লুকানো থাকবে না।

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

আপনার মিথ্যে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করতে শুরু করবে। আবার আপনার কোনও কথাকেই বিশ্বাস করতে পারবে না। তখন পড়াশোনায় রুচি বাড়ানোর জন্য আপনার প্রচেষ্টাও বিফল হতে পারে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আপনাদের দেখাদেখি বাচ্চারা মিথ্যা কথা বলাকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে।

‘শ্যাওড়া গাছের পেত্নী তোমায় তুলে নিয়ে যাবে’

বাচ্চাদের ভুল করা থেকে আটকানোর জন্য, খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানোর সময় অনেকেই অনেক রকমের ভয় দেখিয়ে থাকি। তার মধ্যে অন্যতম হল শ্যাওড়া গাছের পেত্নীর ভয় দেখিয়ে তাদের দিয়ে কাজ হাসিল করানো।

বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে

বাচ্চাদের ভুল কাজ করা থেকে আটকাতে হলে, তাদের বোঝান যে সেই কাজের কেমন প্রভাব পড়তে পারে। কখনও কোনও কাল্পনিক চরিত্র দাঁড় করিয়ে তাদের ভয় দেখাবেন না। এর ফলে বাচ্চার মনে ভয় দানা বাঁধে। অন্তর থেকে দুর্বল হতে শুরু করে তারা।