আপনার শিশুর অতিরিক্ত রাগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

আমাদের পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য তামজীদ। বয়স সবে মাত্র আড়াই বছর। সারাদিন গুটি গুটি পায়ে ঘুরে বেড়ায় আর আপনমনে খেলা করে। তো সেদিন পাশের বাসার তিন বছরের নিশাত তার আম্মুর সাথে বেড়াতে এসেছিল। তামজীদ খুশিমনেই নিশাতের সাথে খেলছিল। তো খেলার মাঝে হঠাৎ চিৎকার। গিয়ে দেখা গেল দু’জনেই সমানতালে চিৎকার করছে আর নিশাত তামজীদকে আঘাত করছে। কারণ হিসেবে জানা গেল তামজীদ তার টেডি বিয়ারটা নিশাতকে দিবে না, আর নিশাত সেটা কেড়ে নিবেই। একপর্যায়ে রাগান্বিত নিশাত মেঝেতে শুয়ে হাত পা ছুড়ে কান্না জুড়ে দিলো। তাকে কোনভাবেই আর শান্ত করা যাচ্ছিল না। অতঃপর বিব্রত হয়ে নিশাতের আম্মু তাকে জোর করে ধরে বাসায় নিয়ে গেলেন।

নিশাতের মতো আপনার সন্তানও কী এইরকম ভাবে রেগে যায়? জেদ করে একটানা চিৎকার করতে থাকে কিংবা রেগে গিয়ে হাত পা ছুড়ে অন্যকে আঘাত করে বসে। তাহলে এই লেখাটা আপনারই জন্য।

ছোট্ট বাচ্চারা কেন জেদ করে অতিরিক্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ করে আসুন সেটা জেনে নিই।

টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum): নবজাতক থেকে চার বছর বয়সের আগ পর্যন্ত একটি শিশু একেবারে নিতান্তই অবুঝ! তখন তার একরোখা আচরণ মূলত তার রাগ আর হতাশার বায়োলজিক্যাল বহিঃপ্রকাশ। এসময় সে হাত পা দিয়ে আঘাত করে, একটানা চিৎকার করে, দম আটকে কাশতে কাশতে বমি করে দেয় কিংবা মেঝেতে উল্টো হয়ে শুয়ে পরে হাত পা ছুড়ে কান্নাকাটি করতে পারে। এগুলোকে বিশেষজ্ঞের ভাষায় টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) বলা হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা হল-কাউকে নিজের কিছু ধরতে দিতে চায়না, কারো সাথে নিজের খেলনা শেয়ার করতে চায়না কিংবা একই বয়সের অন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না। মূলত দুই থেকে চার বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে টেম্পার ট্যান্ট্রাম বেশী দেখা যায়।

টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) কেন হয়? মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex) আমাদের মানবিক আবেগ অনুভুতির প্রকাশ ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেক্ষেত্রে এটি মূলত চার বছর বয়স থেকে পূর্ণতা লাভ করতে শুরু করে। আর ঠিক এ কারনেই চার বছরের আগ পর্যন্ত বাচ্চারা মানবিক আবেগ ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অপরিপক্ব হয়ে থাকে। এই বয়সে বাচ্চাদের মানবীয় আবেগের প্রকাশ ও সামাজিক দক্ষতা সেভাবে বিকশিত হয় না। সে তার মনের ভাব সেভাবে প্রকাশ করতে কিংবা অন্যরা কী বুঝাতে চাচ্ছে তাও ভালভাবে বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারে না। আর তাইতো চার বছরের আগ পর্যন্ত এই ধরনের অবুঝ আচরণ করাকে স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হয়।

একটি বাচ্চার ক্ষেত্রে টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) বা অতিরিক্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ যেসব কারণে হয়ে থাকে

১. সেভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না এবং অন্যের অনুভূতিও বুঝতে পারে না।

২. স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছামতো কিছু করতে না পারলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।

৩. অনেকসময় কিছু বিষয় সে তেমনভাবে বুঝিয়ে বলতে পারে না।

৪. বাচ্চা হয়তো অনেক সময় ক্ষুধার্ত থাকে এবং ক্লান্তিবোধ করে।

৫. কিছু কিছু ক্ষেত্রে একঘেয়েমি এবং খারাপলাগা কাজ করতে পারে।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ছোট্ট বাচ্চার প্রতি সব সময় খেয়াল রাখতে হবে। তার প্রয়োজনীয় সকল দিকসমূহ পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) এর ক্ষেত্রে শিশুর মনে যেসব ভাবনা কাজ করে:

এই বয়সে বাচ্চার কোমল মন কোন যুক্তি মানে না। আশেপাশের জগতটা তখন ওদের কাছে অনেক বেশী বিভ্রান্তিকর ও সুন্দর। আমাদের দৃষ্টিতে যা স্বাভাবিক ঠিক তাই ওদের দৃষ্টিতে মজার হয়ে ধরা দেয়। যেমন ধরুন তার দৃষ্টিতে- বাথরুমের কল ছেড়ে রাখলে কি সুন্দর ঝিরঝির করে পানি পরে, আম্মু কেন সেটা বন্ধ করে দেবে? আর সেক্ষেত্রে তো রাগ হতেই পারে। আবার হয়তো দোকানে গিয়ে যে খেলনাটা তার ভাল লেগেছে সুতরাং সেটা তাকে কিনে দিলেই পারে, আর না দিলে সে তো জেদ করতেই পারে। কিংবা পাশের বাসার তামজীদের টেডি বিয়ারটা তার ভাল লেগেছে। সুতরাং সে সেটা কেড়ে নিতেই পারে, এতে আম্মু কেন তাকে বকাঝকা করবেন!

শিশুর মনোজগতে এইরকম বিভিন্ন ভাবনা কাজ করে, ফলে সে তার ভুল আচরণগুলো বুঝতে পারে না। আর তাইতো অতিমাত্রায় অবুঝ হয়ে থাকার কারনে ভালমন্দের পার্থক্যও ধরতে পারে না। আর এই ব্যাপারগুলো তার বয়স অনুযায়ী একবারেই সাধারণ বিষয়। আর এই বয়সে এই ধরনের আচরণের জন্য তাকে কোন প্রকারের শাস্তিই দেয়া যাবে না। বরং কীভাবে তার এই আচরণগুলোকে সামাল দিয়ে তার বড় হওয়ার পথটাকে সাবলীল করা যায় সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।

শিশুর টেম্পার ট্যান্ট্রাম বা অতিরিক্ত রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে?

ছোট বাচ্চাদের অতিরিক্ত রাগ অনেকসময় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে তারা অন্যের এমনকি নিজেরও ক্ষতি করে বসতে পারে। সে এখন অবুঝ আর তার অতিরিক্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ যে কতটা ক্ষতি সাধন করছে, সে সেটা অনুধাবন করতে পারছে না। সেক্ষেত্রে আপনাকে এই সময়টা বাচ্চার প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। তার সকল প্রয়োজন পূরণে এবং তার রাগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সে যেন আপনার সাপোর্টে থেকে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে সাবলীল ভাবে বেড়ে উঠে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুর টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) বা অতিরিক্ত রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে? জেনে নিন:

১. প্রাত্যহিক রুটিন মেনে চলতে চেষ্টা করুন: শিশুর প্রাত্যহিক রুটিন মেনে চলতে চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন বাচ্চার কখন ক্ষুধা লাগছে, সে কখন ক্লান্তিবোধ করছে। তার খাওয়া, ঘুম, বিনোদন ইত্যাদি যেন সময়মতো হয়। সবকিছু নিয়মমতো চললে বাচ্চার মেজাজ ঠিক থাকবে। যার ফলে সে অযথা রাগান্বিতও হবে না।

২. বেছে নিতে সুযোগ দিন: বাচ্চার জন্য কিছু অপশন রাখুন এবং তার মতামতকে প্রাধান্য দিন। তাকে তার পছন্দের জিনিস বেছে নেওয়ার সুযোগ দিন। যেমন: তাকে বলুন যে, তুমি কি খাবে কমলা না আপেল? কিংবা কোন ড্রেস কেনার ক্ষেত্রে, কোন রঙের নিবে লাল না নীল? এভাবে অপশন রাখলে বাচ্চা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে।সে মনে মনে প্রশান্তি-বোধ করবে এবং জেদ করবে না।

৩. মনোযোগ অন্য দিকে সরাতে চেষ্টা করুন: যখন দেখবেন আপনার সন্তান কোন ব্যাপার নিয়ে রেগে যাচ্ছে, তখন চেষ্টা করুন তার মনোযোগ অন্য কোন দিকে সরাতে। তাকে কোন খেলনা বা কার্টুন দেখিয়ে আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপন করুন, যাতে তার মন অন্য দিকে ঘুরে যায়। এছাড়াও যখন বুঝবেন সে রেগে যাচ্ছে, তখন পারলে মজার কিছু করে তাকে হাসানোর চেষ্টা করুন। যেমন: তার প্রিয় টেডি বিয়ারটা নিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো কণ্ঠে বলুন- লক্ষ্মীসোনা তোমার বন্ধু এখন তোমার সাথে খেলতে চাচ্ছে, তুমি কি এখন তার সাথে খেলবে?

৪. বাচ্চাকে বেশি করে সময় দিন: অনেকসময় ছোট বাচ্চারা অধিক মনোযোগ, আদর-স্নেহ চায়। আর তাইতো অধিক মনোযোগের আশায় জেদ করে কিংবা কান্নাকাটি করে। সুতরাং বাচ্চার প্রতি মনোযোগী হোন, তাকে বেশি করে সময় দিন। তার প্রয়োজনগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন এবং তার ক্ষেত্রে অধিক যত্নশীল হোন। তাকে নিয়ে মুক্ত পরিবেশে ঘুরতে-বেড়াতে যান। সর্বোপরি তার বেড়ে উঠাকে আনন্দময় করে তুলুন।

৫. সরাসরি স্পষ্টভাবে কথা বলুন: ছোট বাচ্চাকে বিভ্রান্ত করে এমন কোন কথা বলবেন না । যখন আপনি কি বলতে চাচ্ছেন তা বুঝতে পারে না, তখন ক্ষেপে যায় এবং অতিরিক্ত রাগ দেখায়। আবার অনেকসময় নিজের মনের ভাবও ভালভাবে প্রকাশ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে বুঝতে চেষ্টা করুন সে কি বলতে বা বোঝাতে চাচ্ছে। যদি তার কথা বুঝতে না পারেন, তাহলে তখন তার মন অন্য কোন দিকে সরাতে চেষ্টা করুন।

৬. অনেকসময় রাগ ইগনোর করুন: অনেকসময় শিশুরা কোন কিছু নেওয়ার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। ধরুন যে টিভি দেখার সময় সে রিমোট নেওয়ার জন্য জেদ করলো। কিন্তু রিমোট হাতে দিলে সে সেটা আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে রিমোটটা তার নাগালের বাইরে রাখুন। সেক্ষেত্রে সে কান্নাকাটি শুরু করলে পাত্তা না দিতে চেষ্টা করুন। কারণ এতে সে সফল হলে তা একসময় তার ব্ল্যাকমেলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। যখন যা চায় তাই দিতে হবে এমন কোন কথা নেই। কাঁদলেই সব কিছু পাওয়া যায় না, তা তাকে বুঝতে দিন।

৭. একই কথা বার বার বলে বোঝান: আপনার সন্তান যখন রেগে যাবে তখন তাকে একই কথা বার বার বলে শান্ত করতে চেষ্টা করুন। আর কখনোই তার সাথে সমবয়সী অন্য কোন বাচ্চা দেখিয়ে তুলনা করতে যাবেন না। যেমন- আমরা অনেকসময় বলে থাকি যে ওই বাবুটা কত্ত লক্ষ্মী আর তুমি একটা পচা। এতে সে কষ্ট পাবে এবং মনে ঈর্ষাভাবের জন্ম নিবে। তারচেয়ে বরং তাকে আদর করে প্রশংসামূলক কথা বলে ভাল আচরণ করতে উৎসাহী করে গড়ে তুলুন।

৮. রাগ কমাতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করুন: আপনার সন্তান যখন এই ধরণের আচরণ শুরু করবে তখন তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে চেষ্টা করুন। আবার ধরুন যে, সে বাসায় আগত কোন অতিথির সামনে এই রকম আচরণ শুরু করে দিল তখন তাকে ঠাণ্ডা করতে অন্য রুমে নিয়ে যান। ভুলে কারো সামনে বাচ্চাকে বকা দিবেন না বা গায়ে হাত তুলবেন না। ছোট বাচ্চারা অনেক সংবেদনশীল আর তাদেরও অপমান বোধ আছে। সুতরাং এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

৯. শিশুকে ব্যস্ত রাখুন: আপনার বাচ্চাকে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করুন। তাকে ছবির বই দেখিয়ে মজার মজার ছড়া, গল্প পড়ে শোনান। তার সাথে খেলা করুন, সর্বোপরি তার সাথে একজন শিশু হয়েই মিশুন। তাকে অন্য বাচ্চাদের সাথে মেশার বা খেলার সুযোগ করে দিন। তার দ্বিধা ভাঙ্গাতে বা অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে সাহায্য করুন।

১০. বাচ্চার মন বুঝতে চেষ্টা করুন: মা-বাবারা এমনিতেই সন্তানের মন বুঝতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার বাচ্চা যখন কোন কথা বা বিষয় একেবারেই বুঝতে পারছে না। তখন সেক্ষেত্রে তাকে সে বিষয়ে নিষেধ করেও কোন লাভ নেই। তাকে এটা নিও না, ওটা ধরোনা, ওখানে যেও না ইত্যাদি যত কম বলা যায় ততই ভাল। বরং তাকে যাতে সবকিছুতে নিষেধ না করেই আওতার মাঝে রাখা যায় সে চেষ্টা করুন।

১১. বিপদজনক বস্তু হাতের নাগালের বাইরে রাখুন: আপনার ঘরকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করে তুলুন। আপনার সন্তান এখন অবুঝ। কোনটা তার জন্য বিপদজনক, সে সেটা এখন বুঝে উঠতে পারেনা। সুতরাং তার হাতের নাগাল থেকে বিপদজনক জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলুন। আর তাতে আপনার বারবার সব কিছুতে না বলতে হবে না।

১২. আপনি নিজে শান্ত থাকুন: আপনার সন্তান যখন ক্ষেপে যাবে আপনি তখন মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। ধৈর্য ধরে তাকে সামলাতে চেষ্টা করুন। অনেকসময় হয়তো এই আচরণে বিরক্ত হয়ে রেগে যেতে পারেন। কিন্তু যদি ওর রাগের বিপরীতে আপনিও রেগে গিয়ে বকা বা শারীরিক শাস্তি দেন, তাতে সমাধান কিছুই হবে না। বরং তাতে তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে জেদ আরও বেড়ে যেতে পারে।

টেম্পার ট্যান্ট্রাম (Temper Tantrum) বা অতিরিক্ত রাগ কমাতে শাসন নয় বরং এই বিষয়গুলো মেনে চলুন। ধৈর্য ধরে স্নেহের পরশ দিয়ে বাচ্চাকে আয়ত্তে রাখতে চেষ্টা করুন। তার শৈশবকে সাবলীল ও আনন্দময় করে তুলুন।

জেদী বাচ্চাকে সামলে রাখার আরও ১০টি টিপস

দেখা যাক কী উপায়ে আপনি আপনার বেবির জেদ বা রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন।

কি হয়েছিল বাবু: মনেকরেন, আপনার বাচ্চা একটু আগেই ৩য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করে এখন একটু শান্ত। আর সাথে সাথে আপনি যেয়ে জেরা করা শুরু করে দিলেন। আপনাকে যদি কেউ ঐ সময় এসে জেরা করা শুরু করত, আপনার মাথা ঠিক থাকত? আমি নিশ্চিত থাকত না। তাহলে, আপনার বাচ্চার কাছ থেকে কি ভাবে আশা করেন, সে অনেক শান্ত গলায় আপনার প্রশ্নের উত্তর দিবে। তার রাগ আবার শুরু হয়ে যাবে এবং নিশ্চিত এইবার হবে ৪ নাম্বার বিশ্বযুদ্ধ। আপনার কাজ হবে এখন মাথা ঠাণ্ডা করে ঠোঁটের কোনায় হাসি নিয়ে প্রশ্ন করা “বল, বাবু তোমার এত রাগের কারণ কি? তোমার কি মনে হয় আমি তোমার কোন কথা শুনি না?”

আপনি যখন কোন বয়স্ক মানুষকে বোঝানর চেষ্টা করেন, ঠিক ঐ ভাবে চেষ্টা করুন তাকে বোঝানোর। তবে, অবশ্যই তার মানসিক পরিস্থিতি বুঝে তারপর। আর তার কোনটা ভাল লাগে, কোনটা লাগে না এই বিষয় গুলো আপনি পৃথিবির যে কোন মানুষের থেকে ভাল জানেন।

চেষ্টা করুন বাচ্চার সাথে কথা বলার সময় আপনার রাগ, কথা যেন দুই দিকে থাকে। আপনার কথা বলার সাথে যদি রাগ প্রকাশ পায়, তাহলে বাচ্চাকে কি ভাবে শান্ত রাখবেন?

মাথা ঠাণ্ডা বাবু: আপনার ছোট বাচ্চাটার রাগ ঠিক নিউক্লিয়ার বোমার মত, একটু অসাবধান হলেই সব ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। তাই সব সময় চেষ্টা করুন, সবসময় আদর করে নাড়াচাড়া করার। যদি কখন আপনার বাচ্চা অন্য কাউকে আঘাত করে, কামড়ে ধরে তাহলে প্রথমে তাকে শান্ত করুন, আর শান্ত হওয়ার পর প্রশ্ন করুন “কেউ যদি তোমাকে কামড়ে দিত তাহলে তোমার কি ভাল লাগত?” আরো একটু ভাল ভাবে বোঝানর জন্য চেষ্টা করুন “মনেকর, কেউ তোমার বড় ভাইকে যদি ঠিক ঐ ভাবে আঘাত করে, তাহলে তোমার বড় ভাইও কান্নাকাটি করবে, তখন তোমার খারাপ লাগবে না?”

রাগ রাগ খেলা: আপনার বাচ্চাকে যদি দেখেন কোন ভাবেই বোঝান সম্ভাব হচ্ছে না। তখন, রাগ রাগ খেলা শেখাতে পারেন। আপনার বাচ্চাকে প্রশ্ন করুন “বাবু, তোমার রেগে গেলে কি করতে ভাল লাগে”। তার লিস্ট শোনার পর এই বার আপনার পালা। আপনিও একটা লিস্ট দিন যে গুল রেগে গেলে আপনি করে থাকেন। এইবার আপনার বাবুর সাথে খেলা করুন কিন্তু চরিত্র বদলে নিয়ে। মানে, আপনি রেগে গেলে যা করেন ঐ গুলো আপনার বাচ্চাকে করতে বলুন, আর আপনারটা আপনি নিজে। কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করুন দেখবেন আপনার বাবু আপনাকে কপি করা শুরু করছে। নিশ্চয় আপনার লিস্টে রেগে গেলে তাকে কষ্ট দেয়া এই নীতি থাকবে না।

লক্ষ্মী বাবু: চেষ্টা করেন আপনার বাবুর সাথে সব সময় কথা বলার। আপনার বাবু যে সারা দিন ঘর মাথায় তুলে রাখে তাতো আর না। মাঝে মাঝে সে ভাল কাজও করে। যখন, কোন ভাল কাজ করে তাকে অবশ্যই প্রশংসা করুন। ও যদি অন্য কারোর সাথে শেয়ার করে, তা সে খাবার হউক আর খেলনা হউক, তার প্রশংসা করুন। আপনি ফোনে কথা বলছেন তখন হঠাৎ করে আপনার পাশে চিৎকার শুরু করল, আপনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন, চুপ থাকতে। সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল, অবশ্যই কথা বলা শেষ হওয়ার পর “বাহ!, আমার বাবুতো একদম লক্ষ্মী হয়ে গেছে।” আপনার কাছে যদি এর থেকে ভাল শব্দ জানা থাকে সেই গুলো ব্যবহার করুন।

এসো ভাবি: আপনার বাবু কে শান্ত থাকা শেখাতে পারেন। এই জন্য তাকে বলুন “যখন তুমি রেগে যাবে সাথে সাথে চোখ বুঝে দীর্ঘ শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করো, আর ভাবতে থাক তোমার প্রিয় খাবারে স্বাদ কেমন?”

সমান সমান: মাঝে মাঝে আপনার বাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তার কোন কাজে আপনিও কষ্ট পেতে পারেন। মনে করেন, আপনার পাশের বাসার বাবুটা আপনার বাবুকে গাধা বলে ডাকে। আর বলার সাথে সাথে আপনার বাবু তাকে খামচানো শুরু করে। এখন আর পাশের বাবু আর গাধা বলে না কিন্তু আপনার বাবু তাকে দেখলেই খামচি দিতে যায়। তখন, আপনি তাকে বোঝান তুমি যদি এই খামচানো বন্ধ না কর, তাহলে কিন্তু আমি তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিব অথবা এই ধরনের কিছু একটা। যাতে করে ও বুঝতে পারে যে তার খারাপ কাজে আপনারও খারাপ লাগে।

ভায়োলেন্ট গেইম, ভিডিও, টিভি সিরিজ বন্ধ করুন: আপনার বাচ্চা স্পাইডারম্যানের ফ্যান হয়ে গেছে কিন্তু ঐ সিরিজ গুলো দেখে দেখে। সুতরাং, বেশি বেশি যদি মারামারির গেম খেলে অথবা ঐ ধরনের চ্যানেল গুলো বেশি দেখতে থাকে তাহলে সে চেষ্টা করবে ঐ ভাবেই বিহেভ করতে। এখন চেষ্টা করুন সমস্যার মূলটাকে উপড়ে ফেলতে, বন্ধ করুন মারামারিকে উৎসাহিত করে এমন গেইম, টিভি সিরিজ ইত্যাদি। বাচ্চাকে অভ্যস্ত করুন বাচ্চাদের বিভিন্ন লার্নিং গেইম অথবা টিভি শো/সিরিজে।

প্রশ্রয় না দেয়া: আপনার আদরের বাবু আজ পাশের বাসার বেবি অথবা স্কুলের ফ্রেন্ডকে খামচি দিয়েছে, আর আপনি ভাবলেন অবুঝ বাচ্চা কিছু বোঝে না। পরের দিন এই বাচ্চা দেখা যাবে খেলা করার পুতুল দিয়ে আঘাত করে অন্য বাচ্চার মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে, তখনো কি বলবেন অবুঝ কিছু বোঝেনা। এই ঘটনার জন্য কিন্তু আপনিই দায়ী। প্রথম দিন যদি তাকে বোঝাতে পারতেন এই কাজটা খারাপ, আপনার পছন্দ না। তাহলে, পরের দিন আর ঐ ঘটনা ঘটত না। সুতরাং, প্রথম দিনেই সাবধান।

চিৎকার করে বাচ্চাকে থামাবেন না: মনে করুন হঠাৎ হৈ চৈ শুরু করেছে আপনার আদরের বাবুটা। এবার আপনি আসলেন থামানোর জন্য। কিন্তু এসে আপনিও চিৎকার করা শুরু করলেন। পরে দেখা গেল, আপনার চিৎকার শুনে বাবু আগের থেকেও আরো বেশি জোরে চিৎকার করা শুরু করেছে। কিন্তু, এটা তো হওয়ার কথা ছিলনা। আপনি তো এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য এসেছিলেন।

আপনার বাচ্চাকে কে আপনিই জেদী বানাচ্ছেন? আপনি কোন বাসার কেউ অথবা কাজের মেয়ের ওপর রেগে গিয়ে চিৎকার করলেন। অথবা রাগের প্রকাশ হিসেবে কোন কিছু ছুড়ে মারলেন। একটু পরে আপনি ঠিকি শান্ত হয়ে গেলেন, কিন্তু আপনার আদরের বাবু কিন্তু একটা হাতে কলমে শিক্ষা পেয়ে গেছে। যেখানে শিক্ষক হলেন আপনি নিজেই। আর শিক্ষাটা হল “মাও রেগে যায় এবং সেও রাগের প্রকাশ করে, সুতরাং এটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। এটা নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই”।

সুতরাং, আগে নিজে বন্ধ করেন, তারপর বাচ্চাকে বন্ধ করতে বলেন।