আপনার সন্তানও শৈশব-কৈশোরকালীন বাতের সমস্যায় কষ্ট পেতে পারে, জেনে নিন লক্ষন, কারন, প্রতিকার

বাতের কারণে কষ্ট পাবার কথা উঠলে প্রথমেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাঠি হাতে বয়স্ক কোনো ব্যক্তির ছবি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে এই বাত শিশু এবং কিশোর বয়সেও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি লাখে প্রায় ৯৪ জন শিশু বা কিশোর বাতের সমস্যায় ভুগছে। ১৬ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কারও যদি এক বা একাধিক অস্থিসন্ধিতে ৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ব্যথা, ফুলে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে নড়াচড়া কমে যাওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে এই অবস্থাকে শৈশব–কৈশোরকালীন বাত বা ডাক্তারি ভাষায় জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস বলা হবে। প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে এই অসুখটি থেমে না থেকে বরং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রোগীর বাকি জীবনের সঙ্গী হিসেবে থেকে যেতে পারে। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে এই অসুখটিকে বাতজ্বরের সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে কিন্তু চলবে না। বাতজ্বর বা রিউম্যাটিক ফিভার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অসুখ।

এই অসুখের অবশ্য বেশ কয়েকটি রকমফের পরিলক্ষিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বাত শুধু এক বা উভয় হাঁটুতে, আবার অনেক সময় হাত বা পায়ের আঙুল, মনিবন্ধ, গোড়ালিসহ অন্য অস্থিসন্ধিগুলোতেও দেখা দিতে পারে। অনেকের আবার চোখের মণিতে প্রদাহ এবং কোমর শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থারও সৃষ্টি হতে পারে। অসুখটির প্রকার ভেদে জ্বর, ত্বকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠা, গলা বা অন্য কোনো স্থানের গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া, লিভার অথবা প্লিহা বড় হয়ে যাওয়াসহ অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়, এমনকি সময়মতো চিকিৎসা না করালে শিশুটি পঙ্গু হয়ে পড়তে পারে। তারা অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা এবং খেলাধুলা করতে না পারার কারণে হীনমন্যতাসহ নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বৈকল্যের শিকার হয়ে পড়তে পারে।

সঠিক কারণটি জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাতে একধরনের ত্রুটির কারণে এই অসুখটির সূচনা হয়। প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রধান কাজই হচ্ছে জীবাণু বা অন্য কোনো বহিরাগত শত্রুকে অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া। এই অসুখকে শরীরের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি ভুলবশত অস্থিসন্ধিকেই আক্রমণ করে বসে যার ফলে সেখানে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে যা বাত আকারে ধরা দেয়। অনেক সময় অসুখটি একই পরিবারের একাধিক মানুষকে আক্রান্ত করে থাকে।

এই রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদানের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলস্টি বা বাতরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অপরিহার্য। রোগটি নির্ণয়ের জন্য কিছু রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে আক্রান্ত অস্থিসন্ধির এক্স-রেসহ আরও কিছু পরীক্ষা করা যেতে পারে।

আজকাল এই অসুখের ভালো চিকিৎসা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে অনেক ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ পাওয়া যায়, যাদের কল্যাণে তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই একজন রোগী অনেক দিন ধরেই এই ওষুধগুলো সেবন করতে পারে। আক্রান্ত অস্থিসন্ধিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি সুফল অর্জন করা সম্ভব। মেথোটেক্সেট জাতীয় ওষুধের দ্বারা অস্থিসন্ধির ক্ষয় রোধের মাধ্যমেও যথেষ্ট সুফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া, বর্তমানে মানব দেহ থেকে সরাসরি কিছু প্রদাহ নিরোধক পদার্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলো আধুনিক চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।

এ কথা ঠিক যে শুধু কিছু ওষুধ প্রয়োগ করেই সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর পাশাপাশি ফিজিওথেরাপিস্ট এবং অকুপেশনাল থেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ব্যায়ামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অনেক সময় হৃত মনোবল ফিরে পেতে মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা এবং চোখ ও দাঁতের জন্য বিশেষ চিকিৎসা নিতে হতে পারে। তবে এতসব সুযোগ-সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া দুষ্কর বিধায় উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বাতের সমস্যা নিরসনে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ইনস্টিটিউট এবং সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছে। সময় এসেছে আমাদের দেশেও এই ধরনের সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে করে এসব শিশু-কিশোরকে স্বাভাবিক জীবনে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি।

বাত কেন হয়, কিভাবে বুঝবেন:

বাত শরীরের একটি যন্ত্রণাদায়ক রোগ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে বাতের ব্যথা হয়ে থাকে। অস্থিসন্ধিতে ইউরিক এসিড জমা হয়ে এ রোগের উৎপত্তি হয়।

বাত সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৪৫ বছরের পর দেখা দেয়। তবে শিশু এবং তরুণদের সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হতে খুব একটা দেখা যায় না।

বাত কেন হয়

মূত্রের মাধ্যমে স্বাভাবিক যে পরিমান ইউরিক এসিড বেরিয়ে যায়, এর বেশি যকৃত তৈরি করলেই রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অথবা খাবারের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ ইউরিক এসিডের উৎস যেমন লাল মাংস, ক্রিম, রেড ওয়াইন ইত্যাদি গ্রহণ করলে এবং কিডনী রক্ত থেকে যথেষ্ট পরিমাণে তা পরিশোধন করতে না পারলে বাতের উপসর্গগুলো দেখা দেয়।

অস্থিসন্ধিতে ইউরিক এসিড জমার কারণেই বাত হয়ে থাকে। শতকরা ২০ ভাগেরও বেশি রোগীর ক্ষেত্রেই বাতরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকে। যেসব কারণে বাতরোগের ঝুঁকি বাড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ডায়াবেটিস, শরীর মোটা হয়ে যাওয়া, কিডনির রোগগুলো, সিকল সেল এনিমিয়া (এক ধরনের রক্তস্বল্পতা)। নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে তা দেহ থেকে ইউরিক এসিড বের করে দেয়ায় বাধা দেয় এবং প্রকারান্তরে বাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

কিছু কিছু ওষুধ যেমন—অ্যাসপিরিন, বিভিন্ন ডাই-ইউরেটিকস, লিভোডোপা, সাইক্লোস্পোরিন ইত্যাদি অনেক সময় বাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

বাত রোগের লক্ষণ কী

বাতের সমস্যা সাধারণত বৃদ্ধাঙ্গুলিতে প্রথম দেখা দেয়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হচ্ছে প্রদাহ, ব্যথা, অস্থিসন্ধি লাল হয়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি। বাতে পায়ের আঙুল নাড়াতে তীব্র ব্যথা হয়; অনেক সময় রোগীরা বলে থাকে যে, চাদরের স্পর্শেও ব্যথা লাগে। বাতের লক্ষণগুলো খুব দ্রুতই দেখা দেয়, যেমন কখনও কখনও এক দিনের মধ্যেই দেখা দেয় এবং একই সঙ্গে একটি মাত্র অস্থিসন্ধিতে লক্ষণ দেখা দেয়। বিরল ক্ষেত্রে ২-৩টি অস্থিসন্ধিতে এক সঙ্গে ব্যথা হয়। যদি অনেক স্থানে এক সঙ্গে লক্ষণ দেখা দেয়, তবে হয়তো তা বাতের কারণে নাও হতে পারে। তবে চিকিৎসা না করা হলে বাত অস্থি:সন্ধির যথেষ্ট ক্ষতি করতে এমনকি চলন ক্ষমতাও হ্রাস করতে পারে।

শীতে বাড়ে বাতের ব্যথা

ষড়ঋতু বাংলাদেশের এখন মূলত গরম ও শীত এই দুই ঋতুরই প্রাধান্য বেশি। গরমকালে বাতের ব্যথা থাকলেও মানুষকে যতটা না কাবু করে তারচেয়ে শীত ঋতুতেই রোগীর ব্যথা-বেদনা বেড়ে যায়। শীতপ্রধান দেশগুলোতেও এই জাতীয় সমস্যাই মূলত বেশি। আমাদের দেশে শীত পড়তে শুরু করেছে এবং এর তীব্রতাও আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। আর শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাত ব্যথার কষ্টও বাড়তে থাকবে। তাই শীতে কীভাবে ব্যথা-বেদনা থেকে সুস্থ থাকা যায়, তা নিয়ে আজ লিখেছি। স্বাস্থ্য সচেতনতা, চিকিৎসা সুবিধা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি পরিবর্তনের ফলে দিনে দিনে মানুষের বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক, মানসিক শক্তি ও দেহকোষের কর্মক্ষমতা বা সামর্থ্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। টিস্যুর এই সামর্থ্য ক্রমাবনতির হার বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুপাতে হয়।

একজন ৮০ বছরের বৃদ্ধ যেমন কর্মক্ষম থাকতে পারেন, তেমনি আবার ৫০/৬০ বছর বয়সের ব্যক্তিরা ভুগতে পারেন বিভিন্ন ধরনের বার্ধক্যজনিত সমস্যা ও জয়েন্ট বা মাংসপেশির ব্যথায় যাকে আমরা সহজ ভাষায় বাত বলে জানি। সাধারণত মহিলাদের ৪০ বছর পর পুরুষরা ৫০ বছর পর বয়সজনিত জয়েন্টের সমস্যায় ভুগে থাকেন। আমাদের দেশের ৫০ ঊর্ধ্ব জনসংখ্যার শতকরা ৬৫ ভাগ লোক ব্যথাজনিত সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে যেসব জয়েন্ট শরীরের ওজন বহন করে এবং অতিরিক্ত ব্যবহৃত হয় যেমন- ঘাড়, কোমর, স্কন্ধ বা সোল্ডার জয়েন্ট এবং হাঁটু ব্যথার রোগী সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

বাতের ব্যথার অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে ৯০ ভাগ হচ্ছে ‘মেকানিকেল সমস্যা’। মেকানিকেল সমস্যা বলতে মেরুদণ্ডের মাংসপেশি, লিগামেন্ট মচকানো বা আংশিক ছিঁড়ে যাওয়া, দুই কশেরুকার মধ্যবর্তী ডিস্ক সমস্যা কশেরুকার অবস্থানের পরিবর্তনকে বুঝায়। অন্যান্য কারণের মধ্যে বয়সজনিত হাড় ও জোড়ার ক্ষয় বা বৃদ্ধি, রিউমাটয়েড আথ্রাইটিস বা গেঁটেবাত, অস্টিওআথ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস, এনকাইলজিং স্পন্ডাইলোসিস, বার্সাইটিস, টেন্ডিনাইটিস, স্নায়বিক রোগ, টিউমার, ক্যান্সার, মাংসপেশির রোগ, শরীরে ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে, অপুষ্টিজনিত সমস্যা, শরীরের অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি। শীতে এসব সমস্যার ব্যথা আরো বেড়ে যায় এবং রোগী অসুস্থ ও কর্মহীন হয়ে পড়ে।

মানুষের রোগের ভেতর ব্যথা বা যন্ত্রণা একটি অস্বস্তি ও কষ্টকর সমস্যা। আল্লাহতায়ালা আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের জয়েন্ট বা সন্ধি স্বাভাবিক চলাচল এবং কর্ম সম্পাদন করে জীবন নির্বাহের জন্য দিয়েছেন। সাধারণত দুই বা দুইয়ের অধিক হাড় বা তরুণাস্থি শরীরের কোনো এক জায়গায় সংযোগ স্থাপনকারী টিস্যুর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে একটি অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট তৈরি করে। আর এই সংযোগ স্থাপনকারী টিস্যুগুলো হচ্ছে মাংসপেশি, টেন্ডন, লিগামেন্ট, ক্যাপসুল, ডিস্ক, সাইলোভিয়াল পর্দা বা মেমব্রেন ইত্যাদি। এগুলো জয়েন্টকে শক্তি ও দৃঢ়তা প্রদান করে, জয়েন্টের তল বা সারফেসসমূহকে মসৃণ বা পিচ্ছিল রাখে। এছাড়া মেরুদণ্ডের দুটি হাড়ের মাঝে অবস্থিত ডিস্ক সক এবজরবার হিসেবে কাজ করে হাড়কে ক্ষয়ে যাওয়া করে। এসব অস্থি বা জয়েন্টগুলোতে প্রধানত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়, প্রদাহজনিত এবং অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের কারণে ব্যথা-বেদনা সৃষ্টি করে মানুষের চলাচল ও কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটায়।

ঘাড়ে ব্যথা, চিকিৎসা ও পরামর্শ: ঘাড়ের ব্যথা বিভিন্ন কারণে হতে পারে মূলত ঘাড়ের মেরুদণ্ডে যে হাড় ও জয়েন্ট আছে তা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের ফলে তাতে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ঘটে তার লিগামেন্টগুলো মোটা ও শক্ত হয়ে যায় এবং দুটি হাড়ের মাঝে যে ডিস্ক থাকে তার উচ্চতা কমে এবং সরু হওয়া শুরু হয়। আবার অনেক সময় হাড়ের মাঝে যে ডিস্ক থাকে তার উচ্চতা কমে এবং সরু হওয়া শুরু হয়। আবার অনেক সময় হাড়ের মাঝে দূরুত্ব কমে গিয়ে পাশে অবস্থিত স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে ব্যথার জন্ম দিতে পারে।

অনেক সময় স্নায়ু রজ্জু সরু হয়ে যেতে পারে। ফলে ঘাড় ব্যথা ও নড়াচড়া করতে অসুবিধাসহ মাথাব্যথা কিম্বা ব্যথা হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঘাড় ব্যথা ও নড়াচড়া করতে অসুবিধাসহ মাথাব্যথা কিম্বা ব্যথা হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এই ব্যথা অব্যাহত থাকলে ঘাড়ের মেরুদণ্ডের বিকৃতি বা স্পাইরাল ডিফারমিটি দেখা দিতে পারে। এব সমস্যাগুলোকে প্রকারভেদে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয় যেমন- সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস, সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসথোসিস, সারভাইক্যাল রিব, স্টিফ নেক, সারভাইক্যাল ইনজুরি ইত্যাদি।

লক্ষণ : সাধারণত এসব রোগী ঘাড়ের ব্যথাসহ ঘাড় নড়াচড়া করা এবং হাতে ঝিন ঝিন অনুভব করার অসুবিধার কথা বর্ণনা করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে হাতে শক্তি কমে যাওয়াসহ হাতের আঙ্গুলের বোধশক্তির তারতম্যের কথা বলতে পারে। ব্যথা ঘাড় হতে মাথার দিকে উঠতে পারে।

চিকিৎসা : এই রোগের চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো ব্যথা কমানোর পাশাপাশি ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, ঘাড়ের মাংসপেশির শক্তি বৃদ্ধি করা, ঘাড় বা স্পাইনের সঠিক পজিশন বা অবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া এবং যেসব কারণে পুনরায় ঘাড় ব্যথা হতে পারে সে সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে সেভাবে চলার চেষ্টাকরা।

ব্যথা কমানোর জন্য সাধারণত ব্যথানাশক ওষুধের পাশাপাশি থেরাপি চিকিৎসা এসব রোগে অত্যন্ত কার্যকরী। বিশেষ করে পদ্ধতিগত ব্যায়াম যেমন- হাত দিয়ে মাথায় বিভিন্নভাবে চাপ দিয়ে ঘাড়ের মাংশপেশি শক্ত করে, দুই কাঁধ একত্রে উপরে উঠানো, হালকা বালিশ ব্যবহার করা ইত্যাদি। থেরাপিতে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে হিট চিকিৎসা, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, মেনিপুলেশন এবং প্রয়োজন হলে ট্রাকশন এ রোগের উপকারে আসে। ঘাড়কে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া থেকে বিরত এবং সাপোর্ট দেয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সারভাইক্যাল কলার ব্যবহার, মাথার নিচে হালকা নরম বালিশ ব্যবহার করা ইত্যাদি।

কোমর ব্যথার চিকিৎসা ও পরামর্শ: বার্ধ্যক্যজনিত বয়সে কোমর ব্যথার প্রধান কারণ হচ্ছে কোমরের হাড় ও ইন্টারভার্টিক্যাল ডিস্কের ক্ষয় এবং কোমরের মাংশপেশির দুর্বলতা। কোমর ব্যথার রোগগুলোকে আমরা, লো-ব্যাক পেইন/লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস/ প্রোলাপস্ ডিস্ক ইত্যাদি রোগ বলে থাকি। এই রোগের কারণ, প্রক্রিয়া ও চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় ঘাড় ব্যথা বা সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিসের অনুরূপ। তবে রোগীর শরীরের অবস্থান/ পোশ্চার সঠিকভাবে রক্ষার গুরুত্ব দিলে অনেক ক্ষেত্রে কোমরের ব্যথা এড়ানো সম্ভব।

শক্ত বিছানায় শোয়া, কাত হয়ে বিছানায় শুতে যাওয়া, ওঠা, ভারী জিনিস বহন বা তোলা পরিহার করা, নিয়মিত কোমরের ব্যয়াম করা এবং অসমতল জায়গায় ওঠা, ভারী জিনিস বহন বা তোলা পরিহার করা, নিয়মিত কোমরের ব্যায়াম করা এবং অসমতল যায়গায় চলাচল না করা ইত্যাদি। কোমরের ব্যায়ামের ভেতরে উল্লেখযোগ্য চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পিঠ দিয়ে বিছানায় চাপ দেয়া, একই অবস্থায় শুয়ে হাঁটু একত্রে এপাশ ওপাশ চাপ দেয়া, একই অবস্থায় শুয়ে এক পা এক পা করে হাঁটু ভাঁজ করে পেটের সঙ্গে চাপ দেয়া ইত্যাদি। কোমরের ব্যথার রোগীরা ব্যথানাশক ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ মোতাবেক শর্টওয়েভ, আলট্রাসাউন্ট, আই, এফটি কোমরের ব্যায়াম ও হাইড্রোথেরাপি অর্থাৎ পানিতে সাঁতার কাটলে উপকার পেতে পারেন।

স্কন্ধ অস্থিসন্ধি বা সোল্ডার জয়েন্টে ব্যথা, চিকিৎসা ও পরামর্শ

স্কন্ধ অস্থিসন্ধি একটি জয়েন্ট। বয়স ও ব্যবহারজনিত কারণে এসব জয়েন্টের আশপাশের মাংসপেশি, টেন্ডন, লিগামেন্ট, ক্যাপসুল ও বার্সাতে প্রদাহ হতে পারে এবং রোগী জয়েন্ট নড়াচড়া করতে ব্যথা অনুভব করে, ফলে জয়েন্ট নাড়াচাড়া করা থেকে বিরত থাকেন এবং জয়েন্টটি আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে জমতে শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় জয়েন্টের নড়াচড়া করার ক্ষমতা হ্রাস হয় এবং স্টিফনেস ডেভেলপ করে। ডায়াবেটিস, ঘাড়ের ব্যথা ও বুকের সার্জারির কারণেও এ জোড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা : এই রোগের চিকিৎসায় ব্যথা নিবারক ওষুদের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকরী ও প্রধান চিকিৎসা ব্যবস্থা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি। ফিজিওথেরাপিতে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রোমেডিকেল যন্ত্রপাতি যেমন : সর্টওয়েভ ডায়াথার্মি, আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, আইএফটি ব্যবহার করে ব্যথা কমানো যায়। ইলেক্ট্রোথেরাপির সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্টের সচলতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম যেমন- পেন্ডুলার এক্সারসাইজ, মেনুপুলেশন, কৌশলগত ব্যায়াম করা উচিত। এ ছাড়া ফ্রোজেন সোল্ডার রোগীদের নিয়মিত সাঁতার কাটা ও ব্যবহারিক ব্যায়াম যেমন- দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে হাত আস্তে আস্তে উপরে উঠানো, উপরে ঝুলানো পুলির মাধ্যমে দড়ির সাহায্যে হাত উপরে-নিচে করা, তোয়ালে দিয়ে পিঠ মোছা ইত্যাদি। যে জোড়ার ব্যথা সেদিকে কাত হয়ে না শোয়া এবং জোড়ার গরম শেঁক দেয়া ইত্যাদি উপদেশ মেনে চলতে হয়। অনেক সময় সোল্ডার জয়েন্টে ইনজেকশন প্রয়োগ করলেও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

হাঁটুর ব্যথা, চিকিৎসা ও পরামর্শ: হাঁটু মানুষের একটি বড় জয়েন্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়সজনিত ক্ষয়ের জন্য হাঁটুর ভেতরের লিগামেন্ট, মিনিসকাস এবং হাড়ের প্রদাহজনিত পরিবর্তনের ফলে হাঁটুতে ব্যথার সৃষ্টি হয়ে চলাচলে অসুবিধার সৃষ্টি করে। এই রোগ সাধারণত অস্টিও আর্থাইটিস বলে বেশি পরিচিত। সাধারণত আঘাত, শারীরিক ওজন বৃদ্ধি, হরমোনজনিত সমস্যা এই রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

চিকিৎসা : ব্যথা নিবারক ওষুধ দীর্ঘদিন গ্রহণ করতে হয় বলে তাতে নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দেখা দিতে পারে। তাই এই রোগের উৎকৃষ্ট চিকিৎসাব্যবস্থা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি। থেরাপিতে সর্টওয়েভ ডায়াথার্মি, আলট্রাসাউন্ড থেরাপি, কিম্বা আইছ থেরাপি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। নিয়মিত সঠিকভাবে হাঁটুর চারপাশের মাংসপেশীর শক্তি বর্ধন জাতীয় ব্যয়াম দেয়া হয়ে থাকে যাতে জয়েন্টের রেন্জ এবং মাংসপেশির শক্তি বৃদ্ধি পায়। তবে কোনোক্রমেই এমন কোন কাজা বা ব্যায়াম করা ঠিক হবে না যাতে ব্যথা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া রোগীকে কিছু পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে যেমন : হাঁটু অতিরিক্ত ভাঁজ না করা, শরীরের ওজন স্বাভাবিক রাখা কিম্বা অতিরিক্ত ওজন কমানো, হাঁটু কোনো অবস্থায় পুরোপুরি ভাঁজ করা ঠিক হবে না, সেই ক্ষেত্রে নামাজ পড়ার সময় চেয়ার এবং বাথরুম ব্যবহার করার সময় কোমড ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়।

তাই শীতে বাতের ব্যথা নিয়ে কষ্ট না পেয়ে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিতে হবে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যারা বাতের ব্যথায় ভুগছেন তারা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা ও পরামর্শে ভালো থাকতে পারেন। থেরাপি চিকিৎসা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন অত্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। চিকিৎসক আপনার রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা ও পরামর্শ দিলে আপনি অবশ্যই বাতের কষ্ট থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন

পাশাপাশি নিম্নলিখিত পরামর্শমাফিক চললেও বাতের ব্যথা থেকে মুক্ত থাকা যায় :

১. ব্যথা বেশি হলে ৭ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন।

২. নিয়মিত থেরাপি চিকিৎসা নেবেন।

৩. ব্যথার জায়গায় গরম/ঠাণ্ডা শেঁক দেবেন ১০-১৫ মিনিট।

৪. বিছানায় শোয়া ও ওঠার সময় যে কোনো একদিকে কাত হয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে শোবেন ও উঠবেন।

৫. মেরুদণ্ড ও ঘাড় নিচু করে কোনো কাজ করবেন না।

৬. নিচু জিনিস যেমন- পিঁড়া, মোড়া বা ফ্লোরে না বসে চেয়ারে পিঠ সাপোর্ট দিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে বসবেন।

৭. ফোম ও জাজিমে না শুয়ে উঁচু শক্ত সমান বিছানায় শোবেন।

৮. মাথায় বা হাতে ভারী ওজন/ বোঝা বহন নিষেধ।

৯. দাঁড়িয়ে বা চেয়ারে বসে রান্না করবেন।

১০. ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের নির্দেশমতো দেখানো ব্যায়াম নিয়মিত করবেন, ব্যথা বেড়ে গেলে ব্যায়াম বন্ধ রাখবেন।

১১. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, পেট ভরে খাওয়া নিষেধ, অল্প অল্প করে বারবার খাবেন।

১২. সিঁড়িতে ওঠার সময় ধীরে ধীরে হাতল ধরে উঠবেন।

১৩. ঝরনায় বা চেয়ারে বসে গোসল করবেন।

১৪. কোনো প্রকার মালিশ করা নিষেধ।

১৫. দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকবেন না, ১ ঘণ্টা পর পর অবস্থান বদলাবেন।

১৬. শোবার সময় একটি পাতলা নরম বালিশ ব্যবহার করবেন।

১৭. বাইরে চলাফেরা করার সময় কোমরের বেল্ট ব্যবহার করবেন, শোবার সময় ও ব্যায়াম করার সময় অবশ্যই বেল্ট খুলে রাখবেন।

১৮. হাই হিল জুতা ব্যবহার করবেন না, নরম জুতা ব্যবহার করবেন।

১৯. ব্যথা তীব্র হলে উঁচু কমোডে বসে টয়লেট করবেন।

২০. চলাফেরায় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ও রাস্তা এড়িয়ে চলবেন ও সামনের বা মাঝামাঝি আসনে বসবেন।

ব্যথা কমে গেলে নিয়মিত সমতল জায়গায় কমপক্ষে ১ ঘণ্টা হাঁটুন।