আপনার শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা যা করতে হবে, জেনে নিন বিস্তারিত

শীতকাল মানেই ছোট বাচ্চাদের নানারকম অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে। তাই বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো খুবই জরুরি। দেখে নিন কী ভাবে ছোট থেকেই সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত করবেন।

করোনা অতিমারীর যুগে প্রত্যেকে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। কারণ মজবুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই এই ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। সম্প্রতি করোনার নতুন প্রজাতির উপস্থিতি জানার পর ফের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেছে অনেকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আসলে কোষ ও প্রোটিনের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এটি শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠলেও, বাচ্চাদের এই ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে না, তাই এরা যে কোনও সংক্রমণের ক্ষেত্রেই অতিসংবেদনশীল থাকে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক পর্যায় মায়ের কাছ থেকেই সন্তানের শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি সরবরাহ হয়। তাই ধীরে ধীরে এটি বাড়িয়ে যাওয়া জরুরি।

শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি সরবরাহ হয়ে থাকে। এর ফলে বাচ্চার জন্মানোর পর কিছুদিন পর্যন্ত সে নানান রোগ-জীবাণু থেকে নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। শিশু যে ধরনের এবং যে পরিমাণে অ্যান্টিবডি গ্রহণ করে, তা মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্তরের ওপর নির্ভর করে। তবে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

তবে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কী ভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা করে থাকেন অভিভাবকরা। এ ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রতি যত্নবান হন।

স্তন্যপান

শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাকে স্তন্যপান করান। মায়ের দুধে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। স্তনদুগ্ধে শিশুর জন্য উপযোগী পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা, অ্যান্টিবডি, প্রোবায়োটিক্স থাকে। স্তন্যদুগ্ধ পানের ফলে এ সবই শিশুর শরীরে সরবরাহ করা যায়।

ভ্যাকসিন

নানান গভীর রোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য শিশুকে ভ্যাকসিন দিতে ভুলবেন না। জন্মের পর থেকে শিশুদের নানান প্রতিষেধক দেওয়া হয়, যা গভীর রোগ মোকাবিলার জন্য তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি গড়ে তুলতে সহায়ক। তাই নির্ধারিত সময় শিশুকে প্রতিষেধক দিন।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

বাড়িতে কোনও ছোট বাচ্চা থাকলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি সজাগ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বাচ্চারা যে কোনও জিনিসই তুলে মুখে দিয়ে দেয় বা সেগুলির সঙ্গে খেলতে শুরু করে। এর ফলে নানান বিপজ্জনক সংক্রমণের কবলে পড়তে পারে তাঁরা। তাই ঘরদোর, বাচ্চাদের খেলনা, বিছানা, বালিশ পরিষ্কার রাখুন। এ ছাড়াও বাচ্চা একটু বড় হলে তাদের কোনও কিছু খাওয়ার আগে সাবান দিয় হাত ধোয়ার অভ্যাস করান।

পর্যাপ্ত ঘুম

পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে শরীরে সাইটোকিন্স নামক প্রোটিনের উৎপাদন কমে যায়। এই সাইটোকিন্স সংক্রমণের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। বাচ্চাদের দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার ঘুম জরুরি।

খাদ্যাভ্যাস

বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিবর্তন হতে থাকে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস তাদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সংক্রমণের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম করে তোলে। পুষ্টিকর উপাদানের অভাবে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে, যার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই সুষম আহার ও পুষ্টিকর উপাদান বাচ্চাদের সংক্রমণের হাত থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।

বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে এই ১০টি খাবার

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে এমন কিছু উপাদান সম্পর্কে জানানো হল—

১. অ্যান্টিবডির গঠনকে উত্তেজিত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে ভিটামিন সি। টক ফল, জাম, আলু, লঙ্কা, টমেটো, ব্রকোলি-সহ নানান উদ্ভিজ উৎসে এই ভিটামিন উপস্থিত।

২. ভিটামিন ই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফোর্টিফায়েড অন্ন, সূর্যমুখীর বীজ, আমন্ড, সূর্যমুখীর তেল, হ্যাজেল নাট এবং পিনাট বাটারে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই থাকে।

৩. জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘা সারিয়ে তুলতেও সাহায়্য করে। মাছ, মাংস, পোল্ট্রি, দুধ, গোটা অন্ন, বীজ ইত্যাদি জিঙ্কের উল্লেখযোগ্য উৎস।

৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে সাহায্য করে প্রোটিন। মাছ, মেদহীন মাংস, পোল্ট্রি, ডিম, বিনস, কড়াইশুঁটি, সোয়া, নুন ছাড়া শুকনো ফল, নানান বীজ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

শিশুকে রোজ ডিম খাওয়ান? নিরাপদ তো! জেনে নিন…

৫. প্রোবায়োটিকও শরীরের পক্ষে উপকারী। এগুলি এক ধরনের জীবিত ও স্বাস্থ্যোপযোগী ব্যক্টিরিয়া, যা দই, কিমচি, মিসোর মতো খাদ্য পদার্থে উপস্থিত থাকে। অন্ত্র মজবুত করে এই প্রোবায়োটিকগুলি। আমাদের অন্ত্রের খারাপ ব্যাক্টিরিয়াকে দূর করে এবং তাদের বাসা বাঁধতে দেয় না।

৬. ভিটামিন এ, ডি, বি৬, বি১২, তামা, ফোলেট, সেলেনিয়ম এবং আয়রন-সহ অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদানও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত করে।

উপরোক্ত বিষয় নজরে রাখলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সহজ হবে। এর ফলে শিশুর সঠিক বিকাশ হবে এবং তারা স্বাস্থ্যকর থাকবে।