জেনে নিন অতি পুষ্টিকর টক দই কেন খাবেন এবং কীভাবে খাবেন

দধি বা দই হল এক ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য যা দুধের ব্যাক্টেরিয়ার গাঁজন হতে প্রস্তুত করা হয়। ল্যাক্টোজের গাঁজনের মাধ্যমে ল্যাক্টিক এসিড তৈরি করা হয়, যা দুধের প্রোটিনের ওপর কাজ করে দইয়ের স্বাদ ও এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গন্ধ প্রদান করে। মানুষ ৪৫০০ বছর ধরে দই প্রস্তুত করছে এবং তা খেয়ে আসছে। সারা পৃথিবীতেই এটি পরিচিত। পুষ্টির দিকে দৃষ্টি রাখতে হলে টক দই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ টক দইয়ের উপকারিতা এত রকমের যে, নিয়মিত টক দই একটু না খেলে প্রকৃতপক্ষে একটি সুলভ অথচ পুষ্টি মূল্যবান খাদ্য থেকে নিজেদের বঞ্চিত করা হবে।

সাধারণত আমাদের খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন দই থাকে না। থাকলেও মিষ্টি দই খেতেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু টক দইয়ের উপকার মিষ্টি দইয়ে পুরোপুরি পাওয়া যায় না। দোকান থেকে কেনা মিষ্টি দই উপকারের চেয়ে অপকার করে বেশি। দই পাতার সময় দুধের সাথে চিনি মেশালে হয় মিষ্টি দই। কিন্তু চিনি থাকলেই অ্যাসিড হওয়া থেকে শুরু করে শরীরে নানা দুর্বিপাকের সম্ভাবনা। অন্যদিকে, পুষ্টির দিকে দৃষ্টি রাখতে হলে টক দই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ টক দইয়ের উপকারিতা এত রকমের যে, নিয়মিত টক দই একটু না খেলে প্রকৃতপক্ষে একটি সুলভ অথচ পুষ্টি মূল্যবান খাদ্য থেকে নিজেদের বঞ্চিত করা হবে।

তবে টক দইয়ের উপকার জানার আগে জানা দরকার এ সম্পর্কে প্রচলিত কয়েকটি বদ্ধমূল ধারণার সত্যি-মিথ্যা যাচাই করা। এই ধারণাগুলো হলো – দই খেলে অ্যাসিড হয় – মাংস খাওয়ার পর দই খাওয়া উচিত নয় – দই খেলে ঠাণ্ডা লাগে, গলা নষ্ট হয় দই খেলে অ্যাসিড হতে পারে না। দই নিজেই অন্য খাদ্যের পরিপাক করিয়ে অ্যাসিড নষ্ট করে। মাংস খাওয়ার পর নির্দ্বিধায় খেতে পারেন দই। দইয়ের একটা ধর্মই হলো আমিষকে হজম করানো আর নিরামিষের খাদ্যগুণ বাড়িয়ে দেয়া। দই খেলে ঠাণ্ডা লাগে বা গলা নষ্ট হয় এ ধারণাটাও মিথ্যা। দই যে গলার কোনো ক্ষতি করে না এ এখন পরীক্ষিত সত্য। তবে ফ্রিজে রাখা হিমশীতল দই খেলে গলার ক্ষতি হতেই পারে।

এবার আসুন জেনে নিই দইয়ের কিছু গুণাবলী আর উপকারের কথা –

১) দই থেকে তৈরি ঘোল বা লাচ্ছি যে শুধু মুখরোচক তা নয়, এর উপকারও বিবিধ। পেট গরম হলে, পেটে গ্যাস হলে, এমনকি সর্দি হলেও ঘোল পান করলে উপশম হয়।

২) দই পাকস্থলীতে খাবারের পচন প্রতিরোধ করে। পেটে গিয়ে তৈরি করে ভিটামিন বি। পেটের ভেতরের ঘা সারাতে দই অত্যন্ত কার্যকর। শরীরের উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করার কাজেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

৩) দই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। অকাল বার্ধক্য ও চুল পাকা বন্ধ করে। দই ত্বকে লাগালে ত্বক মসৃণ হয় ও দাগ দূর হয়।

৪) শিশু থেকে বৃদ্ধ – দই সবার জন্যেই পুষ্টিকর। দই মানুষের শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস গ্রহণে সাহায্য করে। এ দুটি উপাদানই শিশুদের মস্তিষ্ক এবং হাড় গঠনে প্রয়োজনীয়।

৫) দই যে আয়ু বাড়ায়, বৈজ্ঞানিকরা আজ নিঃসন্দেহ। দই নানা ধরনের রোগ ঠেকায়, এমনকি ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

৬) অনেকে দুধ হজম করতে পারেন না। এক্ষেত্রে দুধের বিকল্প হিসেবে দই খেতে পারেন।

সতর্কতা

– দই কখনো বেশি বাসি করে বা তিন-চারদিন পরে খাবেন না, এতে বিপদ হতে পারে। Bacterial food poison, Bacterial dysentery বা Fungal food poison-এর সম্ভাবনা রয়েছে। – ঘরেপাতা দই-ই সবচেয়ে ভালো। স্কিমড মিল্ক বা মাখন তোলা দুধ থেকে তৈরি দই হলো সবচেয়ে উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত। এক্ষেত্রে বাড়তি ফ্যাট ও কোলেস্টেরল গ্রহণ থেকেও আপনি মুক্ত থাকবেন।

এবার আসুন জেনে নিই টক দই দিয়ে বানানো যায় নানা পদের মজাদার খাবার। দেখে নিন শাহানা পারভীনের তৈরি কয়েকরকম খাবার।

ফলাহার

উপকরণ: টক দই ২ কাপ (পানি ঝরানো), গুঁড়া চিনি দেড় কাপ, পাকা আম ১টি, আপেল ১টি, আঙুর চার-পাঁচটি, পাকা কলা ১টি, বাদাম কুচি ১ টেবিল চামচ।

চকলেট সস: মাখন ১ টেবিল চামচ, কোকো পাউডার ২ টেবিল চামচ, চিনি ২ টেবিল চামচ, ভ্যানিলা এসেন্স ২ ফোঁটা, সামান্য দুধ। সব জ্বাল দিয়ে চকলেট সস তৈরি করতে হবে।

প্রণালি: প্রথমে একটি পরিষ্কার সুতি কাপড়ে বেঁধে দইয়ের পানি ঝরাতে দিন। দইয়ের সঙ্গে পরিমাণমতো চিনি মেশাতে হবে। পরিবেশনের সময় ঠান্ডা দই, ঠান্ডা ফল বাদাম কুচি এবং ওপরে চকলেট সস দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা যায় ডেজার্ট হিসেবে।

দই শরবত

উপকরণ: টক দই ১ লিটার, পানি আধা লিটার, গোলমরিচ গুঁড়া (সাদা ২ চা চামচ, গোলমরিচ (কালো) ১ চা-চামচ, ভাজা জিরা গুঁড়া ২ চা চামচ, ভাজা ধনে গুঁড়া ২ চা-চামচ, পুদিনা পাতা বাটা ২ চা-চামচ, ধনেপাতা বাটা ১ চা-চামচ, কাঁচামরিচ বাটা ২ চা-চামচ, বিট লবণ ও লবণ স্বাদমতো। বরফ প্রয়োজনমতো। চিনি ২ টেবিল চামচ (ইচ্ছা হলে)।

প্রণালি: টক দইয়ের সঙ্গে পানি, জিরা ও ধনে গুঁড়া ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে পাতলা সুতি কাপড়ে ছেঁকে নিন। এবার ছাঁকা দইয়ের সঙ্গে বাকি সব উপকরণ মিশিয়ে বরফ দিয়ে পরিবেশন করুন। দই শরবত পছন্দমতো ঘন বা পাতলা করা যায়।

রায়তা

উপকরণ: ঠান্ডা টক দই ২ কাপ, শসা কুচি ১ কাপ, পাকা টমেটো কুচি ১ কাপ, সেদ্ধ গাজর কুচি ২ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, কাঁচামরিচ কুচি ২টি, পুদিনা পাতা কুচি ১ চা চামচ, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, চিনি স্বাদমতো, লবণ স্বাদমতো, সেদ্ধ আলু (মাঝারি) ১টি, সেদ্ধ ডিম ১টি।

প্রণালি: প্রথমে শসা, টমেটো, গাজর, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, পুদিনা পাতা সব উপকরণ পরিষ্কার করে ধুয়ে ছোট করে কেটে নিন। এরপর সার্ভিং ডিশে দই, আলু, ডিম, চিনি, লেবুর রস, পরিমাণমতো লবণসহ সব উপকরণ একসঙ্গে মেখে পরিবেশন করুন।

দই চিঁড়া

উপকরণ: চিঁড়া ১ কাপ, টক দই ১ কাপ, মিষ্টি দই ১ কাপ (ইচ্ছামতো), পাকা কলা কুচি ১টি, চিনি ২ টেবিল চামচ (ইচ্ছামতো), লবণ স্বাদমতো।

প্রণালি: চিঁড়া পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। ১ কাপ পানি দিয়ে চিঁড়া ভিজিয়ে রাখুন। এবার দই, চিঁড়া, কলা ও সব উপকরণ দিয়ে একসঙ্গে মেখে রেফ্রিজারেটরে রাখুন এবং ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন মজাদার দই চিঁড়া।

ঘরে পাতা টক দই

উপকরণ : দুধ ১ লিটার, পানি ১ কাপ, দইয়ের বীজ (আগের দই) ১ টেবিল চামচ, মাটির হাঁড়ি ১টি।

প্রণালি: দুধে ১ কাপ পানি মিশিয়ে মাঝারি আঁচে পাঁচ মিনিট জ্বাল দিন। দুধে বলক এলে আঁচ কমিয়ে দিন। মৃদু আঁচে ১৫ মিনিট দুধ জ্বাল দিন। দুধ মাঝেমধ্যে নাড়তে হবে। হাঁড়ির তলায় যেন ধরে না যায়। দুধ ঘন হলে চুলা থেকে নামিয়ে নাড়তে থাকুন। দুধ কিছুটা ঠান্ডা হলে মাটির হাঁড়িতে ঢালুন। কুসুম গরম থাকতে দইয়ের বীজ দিয়ে নেড়ে দিন এবং ঢেকে রেখে দিন। চার-পাঁচ ঘণ্টা পর দই জমে যাবে। ঠান্ডা হওয়ার জন্য ফ্রিজে তুলে রাখুন ঘরে পাতা টক দই।