ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে আজ হেকেই নিজেকে বদলান

আমরা বদলাচ্ছি। আমাদের চারপাশও বদলে যাচ্ছে। একটু ভেবে দেখুন, পূর্ব প্রজন্মের তুলনায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কত আলাদা। এই সময়ে অনেকে কায়িক শ্রমহীন; ফাস্টফুড, কোমল পানীয়র ওপর নির্ভরশীল; টেলিভিশন, কম্পিউটার, সেলফোনে গেমসের জগতে বন্দী। এসবের পরিণাম হলো নানা ধরনের অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন ডায়াবেটিস।

বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭১ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। এর প্রধান কারণ, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুতগতিতে নগরায়ণ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং মানুষের জীবনধারার দ্রুত পরিবর্তন। পরবর্তী প্রজন্মকে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে আপনার-আমার সচেতনতা জরুরি। একা নিজে পাল্টালে চলবে না, পাল্টাতে হবে নিজের চারপাশও।

ডায়াবেটিস আছে নানা রকম

ডায়াবেটিস প্রধানত দুই ধরনের: টাইপ-ওয়ান ও টাইপ-টু। টাইপ-ওয়ান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যায়। বাংলাদেশে এ রকম ডায়াবেটিসের হার ৫ শতাংশেরও কম। এ দেশে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের হার বেশি। শরীরের অতিরিক্ত ওজন, মেদ-ভুঁড়ি, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ শর্করাজাতীয় খাদ্য বা নিয়মিত ফাস্টফুড কিংবা কোমল পানীয় গ্রহণের অভ্যাস ইত্যাদি কারণে টাইপ-টু ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাবা-মা ও পূর্বপুরুষের ডায়াবেটিস থাকলে বা জন্মের সময় ওজন কম থাকলে ৩০ বছর বয়সের পর এটা দেখা দিতে পারে। আশার কথা, টাইপ-টু ডায়াবেটিস বহুলাংশে প্রতিরোধ করা যায়। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানোর মাধ্যমে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আসুন, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করি

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে রোগীর হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, চোখ, র’ক্তনালি, স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গে জটিলতা দেখা দেয়। তাই প্রতিরোধের দিকে নজর দেওয়া চাই।

*শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবার ও স্কুলে এ বিষয়ে কথা বলা দরকার। ঘরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন। তারপর বাইরে, যেমন অফিসে বা স্কুল-কলেজেও। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতামূলক নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

*ফাস্টফুড ও কোমল পানীয়র প্রতি আসক্তির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নিজেরা জানুন, অন্যদেরও জানান। শিশু-কিশোরদের জানানোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ ধরনের খাবারের মোড়কে খাদ্যমান, ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ থাকতে হবে।

*ধূমপান ডায়াবেটিসের জটিলতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তাই এটা সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়।

*শিশু-কিশোরদের বাড়িতে বসে টেলিভিশন বা কম্পিউটারে সময় কাটানোর চেয়ে বাইরে খেলাধুলা ও শরীরচর্চায় উৎসাহী করে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজে খেলার মাঠের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, সন্তানের লেখাপড়ার পাশাপাশি তার সুস্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিন, স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করুন। প্রয়োজনে কয়েকটি স্কুল মিলে একটি মাঠ ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কুলে ও পাড়ায় মহল্লায় নানা ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়।

*হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট বা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমিয়ে দেবে। এলাকাভিত্তিক ওয়াকিং ক্লাব, সুইমিং ক্লাব, জগিং ক্লাব বা স্পোর্টস ক্লাব গড়ে তুলুন। এলাকার পার্ক, খেলার মাঠ সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে। হেঁটে বাজার করা, বাগান করা, সাইকেল চালানো, সাঁতার ইত্যাদি নানা উপায়ে কায়িক শ্রম বাড়ানো যায়।

*শহরের রাস্তাগুলো যাতে লোকজনের হাঁটাচলার উপযোগী থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দিন। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভবনের ভেতরই যথেষ্ট হাঁটাচলার জায়গা রাখার জন্য বাধ্য করুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন, রিকশা বা বাসের বদলে পা দুটোকে ব্যবহার করতে শিখুন।
*বয়স চল্লিশের বেশি হলে, মুটিয়ে যাওয়া, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে বছরে অন্তত একবার র’ক্তে শর্করার মাত্রা যাচাই করুন। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য নির্দেশ ও চিকিৎসকের উপদেশ মেনে চলুন।

*গর্ভবতী মায়ের অপুষ্টি তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গর্ভকালীন যথাসময়ে অবশ্যই র’ক্তে শর্করা পরীক্ষা করাতে হবে।