যে কারনে আদরের ভাই-বোনে সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ে

পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গাকে ভোলা যায়? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে কিংবা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় শুধু নয়, আমাদের প্রায় প্রত্যেকের শৈশবস্মৃতিতে মজুত আছে ভাইবোনের কত গল্প। একসঙ্গে খেলা, স্কুলে যাওয়া, ঘোরাঘুরি, মারামারি, কাড়াকাড়ির এই স্মৃতিগুলো ছাড়া শৈশবের গল্প কেমন পানসে হয়ে যায়!

এক ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা একই মা-বাবার শাসনে-আদরে। তবু পরিণত বয়সে যার যার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। ছেলেবেলায় এ বেলা আড়ি, তো ও বেলা ভাব। বড়বেলায় অত সহজে মান-অভিমানের মীমাংসা হয় না। ছোটখাটো ঘটনার জের ধরেও ভাইবোনের দূরত্ব লম্বা হয়। কখনো মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ।

অনেকেরই ভাইবোনের সঙ্গে সুখস্মৃতিগুলো সুদূর শৈশবের, পরিণত বয়সে এ সম্পর্ক অস্বস্তির ও তিক্ততার।

তিক্ততার সাতকথা

ভাইবোনের সম্পর্কের অবনতির পেছনে দায়ী নানা কারণ। আসবাব ব্যবসায়ী নিজামউদ্দিন (ছদ্মনাম) জানালেন তাঁর অভিমানের কথা। যখন আর্থিক সংগতি ছিল, ভাইবোনদের সাধ্যমতো দিয়েছেন। দুই ভাইকে নিজের বাসায় রেখে পড়িয়েছেন। এখন ব্যবসায় পড়তি অবস্থা, নিজের সন্তানদের পড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। কিন্তু ভাইবোনদের পাশে পাচ্ছেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সে সময় ভাইবোনদের পেছনে টাকা খরচ না করে ব্যাংকে জমালে আজ বিপদে পড়তে হতো না।’

শুধু এমন চাপা অভিমান নয়, স্বার্থের সংঘাতে জন্ম নেয় তীব্র বিরোধও। পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় মতবিরোধ গড়াতে পারে মামলা-মোকদ্দমায়। ভাইয়ের বিয়ের পর ভাবির আগমনে অধিকারবোধের টানাপোড়েনে তৈরি হয় দূরত্ব। আদর্শগত ভিন্নতাও দ্বন্দ্বের কারণ।

আবার ভাইবোনদের মধ্যে কেউ হয়তো সমাজের উঁচু স্তরের বাসিন্দা, আর কেউ আর্থিক অনটনে বিপর্যস্ত। আর্থসামাজিক অবস্থানের পার্থক্যে তাঁরা কেউ কারও জীবনে খাপ খাওয়াতে পারেন না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়েও মনোমালিন্য দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে কথা হলো সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সহজ থেকে জটিল হচ্ছে সমাজ। আগে হয়তো সমাজে সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারায় বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্তকে মেনে নিত সবাই। বোনেরা অধিকারসচেতন ছিলেন না। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলেও প্রতিবাদ করতেন না। স্বামীর অবর্তমানে ভাইয়ের সংসারে আশ্রয় নেবেন, এই ভাবনা থেকেও অনেকে সম্পত্তি নিতেন না।’ মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি অধিকারসচেতন। আইনসচেতনও বটে। আগে প্রথা বা আচারের অজুহাতে যা মানা হতো, এখন সচেতনতার কারণে সেটি মানা হচ্ছে না। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যক্তিত্ব ও স্বার্থের সংঘাত। পাশাপাশি যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে ওঠায় যৌথতার চেয়ে, রক্তের বন্ধনের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি ভাগাভাগির বিরোধে ইন্ধন জোগাতে পারেন বোনের স্বামী বা ভাইয়ের স্ত্রী। তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনে ভাইবোনদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং ভুল-বোঝাবুঝি বেড়ে যায় অনেকগুণ।

শিকড় অনেক গভীরে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বললেন, ভাইবোনের বিরোধের শিকড় থাকে অনেক গভীরে। এই বিরোধের কারণ অনুসন্ধানে ফিরে যেতে হবে শৈশবে। অনেক মা-বাবা এক সন্তানের সঙ্গে আরেক সন্তানের তুলনা করেন, কোনো সন্তানকে হয়তো বিশেষ গুরুত্ব দেন। এতে ঈর্ষা ও ক্ষোভের জন্ম হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। শিশুকে উদারতা, সহমর্মিতা শেখাতে না পারলে বড় হয়ে সে স্বার্থপরের মতো আচরণ করবে সবার সঙ্গেই, এমনকি ভাইবোনের সঙ্গেও।

যদি মায়ের সঙ্গে মামা-খালাদের সুসম্পর্ক না থাকে কিংবা বাবার সঙ্গে চাচা-ফুপুদের বিরোধ চলতেই থাকে—তবে শিশুর অবচেতন মনে ভাইবোনের সম্পর্কের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। আজকাল টিভি সিরিয়ালে পারিবারিক দ্বন্দ্বের যে উৎকট চিত্র দেখানো হচ্ছে, তা-ও শিশুদের প্রভাবিত করছে।

তাজা থাকুক অমূল্য এ সম্পর্ক

ভাইবোনদের সঙ্গেই আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, এ সম্পর্ক ছাড়িয়ে যায় মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের দৈর্ঘ্যকেও। আহ্লাদ, আবদার, ভালোবাসা-খুনসুটি মেশানো কত-না আবেগী মুহূর্ত! অমূল্য এই মুহূর্তগুলো অনেক সময় তুচ্ছ হয়ে যায় বৈষয়িক স্বার্থের কাছে। অন্য ভাই বা বোনকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্রে নামেন অনেকেই। ভাইবোনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে জাহির করতে চান নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। অন্তত নিজের সন্তানদের স্বার্থে হলেও বেরিয়ে আসা উচিত এই মানসিকতা থেকে। নাহলে সন্তানদের মধ্যে ঘনিয়ে উঠবে বিরোধ।

সম্পত্তির চেয়ে যে সম্পর্ক বড় তা বোঝাতে হবে সন্তানকে।

অপেক্ষাকৃত সফল, সচ্ছল ভাই বা বোনটির খেয়াল রাখতে হবে যেন সহজাত এই সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত না হয় অর্থ বা সাফল্যের বিচারে। দীর্ঘদিন রাগ বা অভিমান পুষে না রেখে খোলাখুলি প্রকাশ করলে জটিলতা কমে যায়। কোনো এক তিক্ত অভিজ্ঞতা মিথ্যা করে দিতে পারে না অতীতের সব সুখস্মৃতিকে। অন্য ভাইবোনকে একতরফা দোষারোপ না করে আত্মসমালোচনাও জরুরি। ব্যক্তিত্বের সংঘাত হলে যার যার ভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা বেছে নেওয়া উচিত। নিজেরা বিরোধ মেটাতে না পারলে দ্বারস্থ হওয়া যেতে পারে কোনো নিরপেক্ষ প্রাজ্ঞ ব্যক্তির, যিনি সমঝোতায় সাহায্য করতে পারেন।

নিয়মিত ভাইবোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে, একে অন্যকে বুঝতে চেষ্টা করলে, দুর্দিনে এগিয়ে এলে সম্পর্ক মজবুত হয়, তাজা থাকে আবেগ।