আমাদের প্রতিদিনের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে ১০টি প্রশ্নে চিকিৎসকের পরামর্শ

ডায়াবেটিস

১. আমার মায়ের বয়স ৪৮ বছর। তাঁর অনেক দিন ধরে কোমর ও তলপেটে ব্যথা হয়। ঘনঘন প্রস্রাব হয়, বুকের বাঁ পাশে ধুকধুকানি বেশি হয়। ধুকধুকানির জন্য ইনডিভার সেবন করছেন। এর সমাধান কী? —নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, চট্টগ্রাম।

পরামর্শ: উপসর্গ শুনে মনে হচ্ছে ডায়াবেটিস বা এর সঙ্গে প্রস্রাবে সংক্রমণ আছে। ঘন ঘন প্রস্রাব হলে অবশ্যই এ বয়সে র’ক্তের সুগার পরীক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রস্রাবের সংক্রমণের জন্য প্রস্রাবের রুটিন ও কালচার পরীক্ষা করা জরুরি। বুকের ধুকধুকানির কারণ কী, সেটা নির্ণয় করতে হবে, এমনিতে ওষুধ খেয়ে লাভ নেই।

পরামর্শ দিয়েছেন —ডা. শাহজাদা সেলিম, হযোগী অধ্যাপক, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।

নাক–কান–গলা

২. আমার বয়স ৪০ বছর। এক মাস ধরে আমার গলার ভেতর চুলকানি হচ্ছে, সঙ্গে ব্যথাও আছে, অনেক সময় ঢোঁক গিলতে কষ্ট হয়। ব্যথা বাড়লে কানে ও মাথার পেছনে ব্যথা করে। পাঁচ বছর আগেও আমার এমন অসুখ হয়েছিল। —সন্দীপন বিশ্বাস, নেত্রকোনা।

পরামর্শ: আপনার সমস্যাটি অ্যালার্জির কারণে হয়ে থাকতে পারে। খেয়াল করুন, কোনো নির্দিষ্ট ধরনের বস্তুর সংস্পর্শে এলে সমস্যাটি বাড়ছে কি না। অ্যালার্জির সম্ভাব্য সেই কারণগুলো এড়িয়ে চলুন। কান খোঁচানোর অভ্যাস থাকলে, তা বর্জন করুন। আবার আপনার রিফ্লেক্স ইসোফ্যাজাইটিস নামের সমস্যাও থাকতে পারে (এ সমস্যায় পাকস্থলীতে স্বাভাবিকভাবে থাকা অ্যাসিড খাদ্যনালির দিকে উঠে আসে)। তাই খাওয়া ও শোবার সময়ের মধ্যে অন্তত তিন ঘণ্টার পার্থক্য নিশ্চিত করুন। বেশি রাতজাগার অভ্যাস থাকলে, তা বর্জন করুন। সঠিক সময়ে ঘুমান ও ভোরে ঘুম থেকে উঠুন। আপনি রুপাটিডিন, ওমেপ্রাজল এবং রাতে হালকা মাত্রার ঘুমের ওষুধ সেবন করতে পারেন। তবে সময়–সুযোগমতো একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নেবেন।

পরামর্শ দিয়েছেন— অধ্যাপক ডা. এ এফ মহিউদ্দিন খান, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নাক-কান-গলা বিভাগ, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা।

পক্ষাঘাত

৩. আমার ছোট ভাইয়ের বয়স ১৯ বছর। প্রায় পাঁচ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে কোমরের পেছনে স্পাইনাল কর্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়। দুই পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। সেই থেকে প্রস্রাব–পায়খানার নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে পায়ে কোনো অনুভূতিশক্তি ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অনুভূতিশক্তি ফিরে পেয়েছে। এখন সে পা নাড়াতে পারে। শুরুতে প্রস্রাব করানো হতো ক্যাথিটার দিয়ে, কিন্তু এখন ক্যাথিটার ছাড়াই প্রস্রাব করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত প্রস্রাব–পায়খানায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ইচ্ছা থাকলেও এ সমস্যার কারণে প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করা সম্ভব হয় না। কোথায় এবং কী চিকিৎসা নিলে সে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারে? —তারিক মিথুন, যশোর।

পরামর্শ: মেরুদণ্ডের ভেতর স্পাইনাল কর্ডের ঠিক কোন লেভেলে আঘাত লেগেছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেটা জানা দরকার। একটি ভালো এক্স–রে বা সম্ভব হলে এমআরআই করে সেটা জানা সম্ভব। তারপর পরবর্তী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্বাচন করার জন্য একজন অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন ও ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। অনুভূতি ও প্রস্রাবের ক্ষমতা ফিরে আসতে শুরু করা একটা ভালো লক্ষণ।

দীর্ঘমেয়াদে সঠিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে অনুভূতিশক্তি আরও বাড়ানো সম্ভব, প্রস্রাব–পায়খানার নিয়ন্ত্রণও উন্নতি হতে পারে। একেবারে শয্যাশায়ী অবস্থা থেকে অন্তত হুইলচেয়ারে বসে নিজের কাজকর্ম সম্পাদন করার মতো উন্নতি আশা করা যায়। জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট, বিএসএমএমইউ, বারডেম বা নিকটস্থ সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর নিউরোসার্জারি বিভাগে যোগাযোগ করুন।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. মো. নজরুল হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট, নিউরোসার্জারি বিভাগ, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টার, ঢাকা।

ফিজিওথেরাপি

৪. আমার বয়স ৪০ বছর। দুই মাস ধরে আমার পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতার ওপরের অংশে ব্যথা। মাঝেমধ্যে খুব চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়। গোড়ালি অংশটুকু হালকা ফোলা। আমার প্রি ডায়াবেটিস রয়েছে।- পূরবী, চট্টগ্রাম।

পরামর্শ: গোড়ালির ওপর যাতে চাপ না পড়ে, সে জন্য নরম জুতা ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে হিল কুশন ব্যবহার করে জুতা পরতে হবে। পাতলা সুতি কাপড়ে বরফ নিয়ে পায়ের গোড়ালি ও পাতায় ৫-১০ মিনিট মালিশ করতে হবে। এতে ব্যথা ও ফোলা অনেক কমে যাবে আশা করি। বিছানায় সোজা হয়ে বসে পায়ের পাতা টান টান করে সামনে–পেছনে এভাবে ৩০ বার করে দিনে দুই বেলা এই স্ট্রেচিং অনুশীলন করলে অনেক উপকার পাবেন।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. মেহেরুন নেসা (পিটি), ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ।

স্তন ক্যানসার

৫. আমার বয়স ২৫। গত মে মাসে হঠাৎ আমার বাঁ স্তনের নিপলে একটা ছোট অতিরিক্ত অংশ (আঁচিল চেয়ে ছোট) দেখি। সেটার চামড়া ফেটে গিয়ে হালকা র’ক্ত বের হয়। সাত-আট দিনের মধ্যে তা ঠিক হয়ে যায়। এ ছাড়া অন্য কোনো উপসর্গ বা ব্যথা ছিল না। জুলাইয়ে এসে সেই আঁচিলের মতো ক্ষুদ্র অংশের চামড়া আবার উঠে গেছে। আমি অবিবাহিত। আমার পরিবারে কারও স্তন ক্যানসারের ইতিহাস নেই। এ নিয়ে চিন্তার কি কিছু আছে? —নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক

পরামর্শ: আপনি নিজে গোসলের সময় ভালো করে হাত চেপে চেপে নিজের স্তন পরীক্ষা করবেন। কোনো গোটা বা চাকা অনুভব না করলে দুশ্চিন্তার তেমন কিছু নেই। এটি মনে হচ্ছে উপরিভাগের ত্বকের কোনো সমস্যা বা সংক্রমণ, ব্রেস্টে তেমন কিছু নেই। এরপরও সন্দেহ হলে একসময় একজন ব্রেস্ট সার্জন বা চর্ম বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নিতে পারেন।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার, অনকোলজিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।

মেডিসিন

৬. আমার বয়স ১৫ বছর। প্রায়ই মুখে ঘা হয়। এক সপ্তাহ আগে মুখে একটা ঘা হয়েছে, যেটা এখনো শুকায়নি। মুখে ঘা হওয়ার কারণে আমি ঠিকভাবে খেতে পারছি না। এখন আমি কী করব? —জান্নাতুল এষা

পরামর্শ: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বারবার মুখে ঘায়ের কারণ এপথাস আলসার, ভিটামিনের অভাব, দাঁতের ঘর্ষণ বা সংক্রমণ ইত্যাদি। এপথাস আলসার হলে ঘায়ের জন্য কেনালগ বা এপসল–জাতীয় মলম লাগালে আরাম পাবেন। ভিটামিনের জন্য প্রচুর ফলমূল–শাকসবজি খান, দরকার হলে সাপ্লিমেন্ট খান। দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে থাকলে এ ধরনের ঘা বাড়ে। তাই দুশ্চিন্তা করবেন না।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. আ ফ ম হেলাল উদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা।

দাঁত

৭. আমার বয়স ১৭ বছর। আমার মুখের বাঁ দিকের একটি পেষণ দাঁতের মধ্যে গর্ত হয়েছে। খাবার খেতেও সমস্যা হয়। খাবার পেষণ করতে গেলে দাঁতে ঝিনঝিন করে ব্যথা হয়। যার ফলে খাবার এখন মুখের ডান দিক দিয়েই চিবুতে হয়। এই সমস্যা প্রায় এক বছর ধরে চলছে। এই সমস্যার সমাধান কী? —সাব্বির আহমেদ

পরামর্শ: দাঁতের গর্ত বা ক্যারিজ শুরুর দিকে ফিলিং করলে সুস্থ করে তোলা সহজ। কিন্তু মনে হচ্ছে অবহেলার কারণে গর্ত থেকে সংক্রমণ দাঁতের মজ্জাতে পৌঁছে গেছে। এখন দাঁতটিকে সংরক্ষণ করার জন্য রুট ক্যানেল করে পরবর্তী সময়ে ওপরে দাঁতের কৃত্রিম আবরণ বা ক্রাউন লাগিয়ে নিতে হবে।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ, কনসালট্যান্ট, রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান, ঢাকা।

চোখ

৮. আমার বয়স ১৫, আমার চোখে মাইনাস ২.৫০ পাওয়ারের বেশি সমস্যা। এ জন্য আমি চশমা ব্যবহার করি। এই বয়সে কি আমার চোখ আর ভালো হবে? সঙ্গে কী কী খেতে হবে? —জান্নাতুল নাইম

পরামর্শ: ২.৫০ ডায়াপ্টার পাওয়ার হওয়ায় আপনাকে নিয়মিত চশমা পরতে হবে৷ এ বয়সে চশমা ছাড়া চোখ ভালো হওয়ার সুযোগ নেই। না পরলে কম দেখা ছাড়াও মাথাব্যথা হতে পারে৷ কাজেই দূরের দৃষ্টি ধরে রাখা এবং মাথাব্যথা না করার জন্য চশমা পরার বিকল্প নেই। চোখ ভালো রাখতে হলে নিয়মিত সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, ডিম-দুধসহ ভিটামিন এ–সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে৷

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, সহযোগী পরামর্শক, চক্ষু বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।

হরমোন

৯. আমার বয়স ২৫। অবিবাহিত। ওজন ৫৫ কেজি এবং উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। প্রথম থেকেই মা’সিক অনিয়মিত ছিল। ১০ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, মা’সিক হলে বন্ধ হয় না, আবার সাত-আট মাস চলে যায় কিন্তু হয় না। কখনো খুব কম র’ক্ত যায়, কখনো শুধু র’ক্তের চাকা যায়। পাঁচ বছর আগে হাইপোথাইরয়ডিজম ও দুই বছর আগে পিসিওডি ধরা পড়ে। এ অবস্থায় বন্ধ্যা হওয়ার আশঙ্কা কি আছে? আমার কী করণীয়? —নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক

পরামর্শ: হাইপোথাইরয়েডিজম ও পলিস্টিক এভারি সিনড্রোমের কারণেই কম বা অতিরিক্ত মাসিক, অনিয়মিত মাসিক ইত্যাদি হচ্ছে। এই সমস্যাগুলোর যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে। থাইরক্সিনের মাত্রা বারবার র’ক্ত পরীক্ষা করে অ্যাডজাস্ট করতে হবে এবং টিএসএইচ সঠিক মাত্রায় ধরে রাখতে হবে। পিসিওডির চিকিৎসা হলো ওজন ঠিক রাখা ও মা’সিক নিয়মিত করার জন্য কিছুদিন হরমোন বড়ি সেবন। দুটিই হরমোনজনিত সমস্যা এবং ঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু বন্ধ্যাত্ব হবেই তা নয়। ধৈর্য ধরে একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে চিকিৎসা চালিয়ে যান। সন্তান নেওয়ার সময় প্রয়োজনে ওভুলেশনের চিকিৎসা করা যাবে।

পরামর্শ দিয়েছেন— ডা. তানজিনা হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

১০. কিছু লোককে দেখা যায় ছেলে হয়ে জন্ম নিলেও মেয়েদের মতো হাঁটাচলা করে এবং কথা বলে। আমার প্রশ্ন হলো, এটা কি কোনো রোগ এবং এটাকে সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব? —অনুপ চৌধুরী

পরামর্শ: কেউ তৃতীয় লি’ঙ্গের বা হারমাফ্রোডাইট কি না, তা বুঝতে হলে তার বাহ্যিক চেহারার সঙ্গে প্রজন’নতন্ত্র পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কিছু হরমোন পরীক্ষা ও দরকার হলে ল্যাবরেটরিতে ক্রোমাজোমাল অ্যানালাইসিসও করা লাগতে পারে। তৃতীয় লি’ঙ্গের মানুষ মানে যে বাহ্যিকভাবে দেখতে এক লি’ঙ্গের, কিন্তু তাঁর প্রজন’নতন্ত্র অন্য লি’ঙ্গের মতো বা অপূর্ণাঙ্গ প্রজন’নতন্ত্র। ক্রোমোজোম অ্যানালাইসিস করলে পুরুষ না নারী জিন আছে তা বোঝা যায়। আলট্রাসনোগ্রাম করলে ডিম্বা’শয়, জরা’য়ু আছে নাকি শুক্রা’শয় আছে তা বোঝা যাবে।

তবে অনেকেরই আসলে শারীরিক কোনো খুঁত নেই, কিন্তু স্বভাব বা আচরণে বিপরীত লি’ঙ্গের মতো। তাদের ক্ষেত্রে এটি একটি সাইকো সে’ক্সুয়াল সমস্যা। এ ধরনের সমস্যার চিকিৎসায় হরমোন বিশেষজ্ঞ, সার্জন, সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্টের সমন্বিত চিকিৎসা দরকার হয়।