যে কারনে শিশুরা মিথ্যা বলা শুরু করে এবং আপনি যেভাবে সামলাবেন

মনে করুন, আপনার ৩ বছরের শিশুকে আপনি জিজ্ঞেস করছেন, তুমি কি দুধ খেয়েছো?, শিশুটি দুধ না খেয়েও বলছে, হ্যাঁ দুধ খেয়েছি।

এখানে শিশুটি আপনাকে ধোকা দেওয়ার জন্য ভুল তথ্য দেয়নি। সে আপনাকে খুশি করার জন্য বা শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ভুল তথ্য দিয়েছে। এ তথ্যকে আমরা মিথ্যা বলতে পারি না। সাধারণত শিশুদের আট বছর বয়সের আগে মিথ্যা বলার মতো মানসিক বিকাশ হয় না।

শিশুরা কেন মিথ্যা বলে?

১. শিশু আগের কোন অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে সত্য স্বীকার করলে শাস্তি পেতে হবে বা তার সঙ্গে কেউ রাগ দেখাবে। শিশু আগের অভিজ্ঞতা থেকে আরও শিখেছে দোষ স্বীকার না করাই ভালো। শিশু দোষ স্বীকার করলে আমরা যদি তাকে শাস্তি দেই তাহলে পরবর্তীতে শিশু শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ভয়ে বারবার মিথ্যা বলবে।

২. যখন শিশুরা কোন ভুল করে তা নিয়ে শিশু লজ্জায় পড়ে, অস্বস্তিবোধ করে। এছাড়া শিশুকে যদি আগে কখনও তার কাজের জন্য লজ্জা দেওয়া হয়ে থাকে তাহলেও শিশুরা মিথ্যা বলে। তাই লজ্জা ও অস্বস্তিবোধ থেকে বাঁচতে শিশুরা মিথ্যা বলে।

৩. ৮ বছর বয়সের আগে শিশুরা বাস্তবতা ও কল্পনাকে আলাদা করতে পারে না। তাই আট বছর বয়সের আগে শিশু কোন ভিন্ন তথ্য দিলে আমাদের ধরে নিতে হবে এটাই তার বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক।

৪. অনেক সময় শিশুরা অন্যদের দেখে মিথ্যা বলা শেখে। যেমন, পরিবারের বড় কোন সদস্য (মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা, দাদি, নানা, নানি বা অন্যান্য) শিশুর সামনে মিথ্যা বললো। শিশু জানতে চাইলো কেন পরিবারের ওই সদস্য মিথ্যা বলেছেন। তখন ওই সদস্য জানালো মাঝে মাঝে প্রয়োজনে মিথ্যা বলা যায়। শিশু যখন দেখবে প্রয়োজনে মিথ্যা বলা যায় বা অন্যরা মিথ্যা বলে কোন সুবিধা পাচ্ছে বা কোন সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারছে, তখন সেও মিথ্যা বলতে উৎসাহিত হবে।

৫. কোন কিছু পাওয়ার জন্য শিশুরা মিথ্যা বলে। যেমন, শিশুকে বলা হলো শিশু রুটি খেলে তাকে আইসক্রিম দেওয়া হবে। শিশু রুটি না খেয়ে জানালো সে রুটি খেয়েছে।

৬. বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে শিশুর মিথ্যা বলার সঙ্গে স্কুলের পরিবেশের সম্পর্ক আছে। যে সব স্কুলে বেশি শাস্তি দেওয়া হয় সেসব স্কুলের শিশুরা বেশি মিথ্যা বলে। কারণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, যে সব স্কুলে শাস্তি বেশি সে সব স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা শাস্তি এড়ানোর জন্য গুছিয়ে মিথ্যা বলে।

শিশুর মিথ্যা বলা নিয়ে ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি কী বলে?

ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজিস্টদের মতে, ছোট শিশুরা বিশ্বাস করে যে কোন পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলা ভুল কাজ। ১০ বছর বয়স হওয়ার পর শিশুদের মিথ্যা সম্পর্কে চিন্তা পরিবর্তন হওয়া শুরু করে। ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের ভেতর শিশুদের মিথ্যা বলা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়। এসময় শিশুদের কাছে ‘মিথ্যা বলা’ সঠিক না ভুল তা নির্ভর করে ওই ঘটনার ফলাফল কী হবে তার উপর। যেমন, যদি শিশু জানে সে মিথ্যা বললে কোন কিছু পাবে তাহলে তার কাছে মিথ্যা বলাই ঠিক মনে হয়। এসময় অন্যকে মিথ্যা বলে মন রক্ষা করা শিশুর কাছে সঠিক কাজ মনে হয়।


শিশুকে কীভাবে সত্য কথা বলতে উৎসাহিত করতে পারেন?

১. সবচেয়ে ভালো উপায় হলো শিশুকে সেই সব গল্প শোনানো যেখানে সত্য কথা বলার সুবিধা বা পুরস্কার সম্পর্কে বলা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় গল্প বা ঈশপের গল্প। চাইলে আপনি নিজেও বয়স অনুযায়ী ছোট বড় গল্প তৈরি করে শুনাতে পারেন।

২. শিশু সত্য বললে তার সততার জন্য প্রশংসা করুন।

৩. শিশুর কাছে আপনি নিজে যে ধরনের আচরণ আশা করছেন, আপনি নিজেও একই ধরনের আচরণ করুন। শিশুর কাছে সত্য কথা আশা করলে নিজেও তার সামনে সব সময় সত্য বলুন। কথা দিয়ে কথা রাখুন।

৪. শিশু মিথ্যা কথা বললে তা সমাধানের ভিন্ন পদ্ধতি খুঁজুন। যেমন, শিশু হোমওয়ার্ক না করে বললো সে হোমওয়ার্ক করেছে। এক্ষেত্রে শিশুকে হোমওয়ার্ক শেষ করতে বলুন ও পরে চেক করুন।

৫. যখন শিশুর বলা মিথ্যার জন্য শিশু বা পরিবার বারবার বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে, সেক্ষেত্রে শিশু ও তার পরিবার একসঙ্গে ফ্যামিলি কাউন্সিলিং ও শিশু একা ইন্ডিভিজুয়াল কাউন্সিলিং-এর জন্য যেতে পারে। আসুন জেনে নেই এসব ক্ষেত্রে সাইকোলজিস্ট কাউন্সিলিং সেশনে কী করেন। সাইকোলজিস্ট শিশুর সঙ্গে কাজ করেন যেন শিশুর উদ্বিগ্নতা ও বিষন্নতা কমে, শিশুর আত্মমর্যাদাবোধ বাড়ে এবং শিশু তার নিজস্বতা বা নিজের গুণগুলো খুঁজে বের করতে পারে। যে সব শিশুর ট্রমা আছে সাইকোলজিস্ট সেসব শিশুর ট্রমা নিয়েও কাজ করে।

যা করবেন না

১. শিশুকে সত্য-মিথ্যা বলা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইন্সট্রাকশন না দেওয়া। যেমন, একবার সত্য বলতে বলে আবার মাঝেমধ্যে প্রয়োজনে মিথ্যা বলা যায় এ ধরনের তথ্য না দেওয়া।

২. শিশুকে মিথ্যা বলার জন্য কী কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হয় এ ধরনের গল্প শুনাবেন না। শিশু যখন দেখবে মিথ্যা বলে সে কোন সুবিধা পাচ্ছে তখন সে শাস্তির কথা ভুলে যাবে।

৩. কোন বিষয়ে কথা দিলে তা রাখার চেষ্টা করুন। না রাখতে পারলে কেন রাখতে পারছেন না তা শিশুকে জানান।

৪. শিশু মিথ্যা বললে তাকে মিথ্যুক বলে ডাকবেন না। পরিবারে ভেতরে বাইরে অন্যদের সামনে তাকে হেয় করে কথা বলবেন না।

৫. সত্য বললে তাকে পুরস্কার হিসেবে কোন উপহার দেওয়া বন্ধ করুন। মনে রাখবেন উপহার দিয়ে কাজ আদায় করার ফলাফল সবসময় ভালো হয় না। পুরস্কার বন্ধ করে দিলে শিশু সত্য বলা বন্ধ করে দেবে।