শিশুদের হাঁটা শেখা ও বেবি ওয়াকার নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা যা সব মা-বাবার জেনে রাখা দরকার

অনেক মা-বাবা জানতে চান শিশুকে বেবি ওয়াকার কখন দেবেন, বেবি ওয়াকার কি আসলেই তাড়াতাড়ি হাঁটা শিখতে সহযোগিতা করে, নাকি অন্য কিছু?

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে আসলে শিশুর হাঁটা শেখার উপযুক্ত বয়স কোনটি। সাধারণভাবে শিশুরা নিজে থেকে দাঁড়ানো শেখার ২ থেকে ৩ মাসের ভেতর হাঁটা শেখে। শিশুরা সাধারণত ৯ মাস থেকে ১৫ মাসের ভেতর নিজে নিজে দুই এক কদম পা ফেলতে শুরু করে। এর মানে হলো শিশুরা এসময়ে হাঁটা শেখে৷ অনেক শিশুর একটু দেরিও হয়।

হাল ফ্যাশনে বাংলাদেশের অনেক পরিবার তাদের সন্তানকে তাড়াতাড়ি দাঁড়ানো শেখার জন্য বা হাঁটা শেখার জন্য ওয়াকার দেওয়া শুরু করেছে। ওয়াকারের সুবিধাগুলো কী?

১. ওয়াকার শিশুকে ব্যস্ত রাখে। যখন আপনি কাজে ব্যস্ত থাকবেন, শিশুকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে কাজ শেষ করতে পারবেন।

২. শিশু ওয়াকার বা আপনার হাত ধরে হাঁটলে হাঁটতে উৎসাহিত হতে পারে৷ শিশু ওয়াকার ব্যবহার করে দাঁড়ানো সম্পর্কে ধারণা পায়

৩. ৮ থেকে ১২ মাসের শিশুরা তাদের আশপাশের সবকিছু এক্সপ্লোর করতে ভালোবাসে। ওয়াকারের মাধ্যমে কারও সাহায্য ছাড়া শিশু তার আশপাশের সবকিছু এক্সপ্লোর করতে পারে।

ওয়াকারের উপকারের কথা শেষ, এখন আমরা জানবো ওয়াকার নিয়ে কিছু ভুল ধারণা ও তার সত্যতা।

ওয়াকার নিয়ে ভুল ধারণা ১: ওয়াকার শিশুকে রাখার জন্য অনেক নিরাপদ ব্যবস্থা।

সত্যতা: যেসব শিশু ওয়াকার ব্যবহার করে তাদের ৪০% বিভিন্নভাবে ব্যথা পেয়ে থাকে। ওয়াকারের কারণে শিশু খুব দ্রুত নড়াচড়া বা মুভ করে যার কারণে শিশুর ব্যথা পাওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়। আর শিশু ওয়াকারের কারণে সহজে অনিরাপদ জায়গায় যেতে পারে।

ওয়াকার নিয়ে ভুল ধারণা ২: ওয়াকার শিশুকে হাঁটা শিখতে সহযোগিতা করে।

সত্যতা: ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের রিসার্চ পেপারের মতে, যেসব শিশুরা ওয়াকার ব্যবহার করে, তাদের ভেতর ডেভেলপমেন্টাল ডিলে বা বিলম্বিত বিকাশ দেখা যায়। এছাড়া এ রিসার্চের মতে শিশুর বসা, দাঁড়ানো বা হাঁটায় ওয়াকার কোন সহায়তা করে না।

ওয়াকার যেহেতু শিশুকে সবসময় দাঁড়ানো অবস্থায় রাখে তাই শিশু সঠিকভাবে হাঁটার ব্যালেন্স শিখতে পারে না। এর মানে হলো শিশু যদি বারবার নিজে উঠে দাঁড়ায় ও আবার পড়ে গিয়ে উঠে হাঁটে তাহলে শিশু ভালো ব্যালেন্স শিখতে পারে, যা যুগে যুগে এভাবেই মানুষ শিখে এসেছে।

ওয়াকার নিয়ে ভুল ধারণা ৩: শিশুর বিকাশ ঠিক রাখতে ওয়াকার ব্যবহার পজিটিভ ভূমিকা রাখে।

সত্যতা: গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুরা ওয়াকার ব্যবহার করে তারা তুলনামূলক দেরিতে হাঁটা শিখে। ব্যালেই স্কেলস অব ইনফ্যান্ট ডেভেলপমেন্ট (ব্যালেই থ্রি) হলো যা সাইকোলজিস্টরা শিশুর বয়স অনুযায়ী বিকাশ দেখার জন্য ব্যবহার করে, ১-৪২ মাস বয়সি শিশু। এতে পাওয়া গেছে, যেসব শিশুরা ওয়াকার ব্যবহার করে তাদের মটর স্কিল অন্য শিশু যারা ওয়াকার ব্যবহার করে না তাদের তুলনায় দেরিতে হয়।

ওয়াকার নিয়ে ভুল ধারণা ৪: ওয়াকার শিশুর পা শক্ত করে।

সঠিক তথ্য: বেবি ওয়াকার শিশুকে একটি অ্যাবনরমাল পজিশনে দাঁড় করিয়ে রাখে, হিপ ও হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো। এটা শিশুর জীবনের দীর্ঘ সময়ের হাঁটার ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং শিশুর হিপের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ওয়াকারের কারণে শিশু আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটে যা শিশুর পায়ের ভুল মাসলকে শক্ত করে। স্বাভাবিকভাবে হাঁটা শিখলে শিশু নিজের পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজনে পা উঠানামা করে। পায়ের গোড়ালির, হাঁটুর ব্যবহার সঠিক থাকে।

মূলকথা হলো শিশু নিজে হাঁটা শিখলে তার জয়েন্টে সমস্যা হবে না, মাসলের বিকাশও ঠিক থাকবে। এছাড়া ওয়াকার ব্যবহার করলে শিশু হাঁটা বা দাঁড়ানোর সময় নিজের পা দেখতে পারে না, যা শিশুর ভিজুয়াল পারসেপশনকে ব্যহত করে।

কেন শিশুকে সঠিক সময়ের আগে জোর করে হাঁটাবেন না?

১. জোর করে কোন কিছুর সাহায্যে (ওয়াকার) শিশুকে হাঁটা বা দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হলে শিশু ব্যালেন্স বুঝতে পারে না। ব্যালেন্স বোঝা একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷ শিশু নিজে হাঁটা বা দাঁড়ানো শিখলে নিজের মুভমেন্ট নিজে বোঝা শেখে। ব্যালেন্স রাখতে পারে। শিশু নিজে নিজে সাবধানতা বজায় রাখা শিখে নেয়।

২. শিশুকে যদি কোনকিছু ভর দিয়ে হাঁটা শেখানো হয় তাহলে শিশুর তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। পরে শিশু একা একা হাঁটতেও চাইবে না।

৩. শিশু যখন নিজে নিজে হাঁটা বা দাঁড়ানো শেখে তখন বিভিন্ন মুভমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ফিজিক্যাল স্কিলগুলো শিখে নেয়, যা অন্য কিছু দিয়ে হাঁটা শিখলে শিখতে পারে না। আর আপনি যেমন আপনার লিমিটেশন জানেন শিশুও তা জানে৷ তাই শিশুকে জোর করবেন না।

৪. ট্রাস্ট+ ম্যাস্টারি= সেলফ-কনফিডেন্স। বড়দের মতো শিশু নিজে কিছু করতে পারলে তার নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়বে, এমনকি আপনার প্রতিও। সে জানবে আপনি শিশুকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেন, যুগ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শিশুর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে, তা না হলে এ শিশুর আত্মবিশ্বাস কেমন হবে ভাবুন।

৫. শিশুর বেশ কিছু বিকাশ দেরিতে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মানসিক বিকাশ ও মটর স্কিল দেরিতে হয়।

এখন আসুন জানি ফিজিওথেরাপিস্টরা কী বলেন এ ওয়াকার নিয়ে। ফিজিওথেরাপিস্টদের মতে, ওয়াকার শিশুর জন্য মোটেও নিরাপদ না। ফিজিওথেরাপিস্টদের কাছে অনেক বাবা-মায়েরা আসেন তাদের সন্তানকে নিয়ে যাদের শুধু ওয়াকার দেওয়ার জন্য শিশুর জয়েন্ট, হাড় বা মাসলের সমস্যা হয়েছে। আর কানাডা এপ্রিল ২০০৭ সালে শিশুদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ওয়াকার ব্যান করেছে।

বাবা-মা হিসেবে আসুন সন্তানের বিকাশে সহায়তা করি। সন্তানের বিকাশ বিলম্বিত হলে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে যাই।

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট, ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি, ঢাকা বিশবিদ্যালয়