শিশুর রাতে বিছানা ভেজানোর কারণ, প্রতিকার এবং আপনার দায়িত্ব জেনে নিন

রাতে বিছানা ভেজানো শিশুদের জন্য খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।

তবে ৬-৭ বছরের বেশি বয়সী শিশু যদি রাতে বিছানা ভেজায় তবে তা তার নিজের কাছে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

বিছানা ভেজানোর কারণ সম্পর্কে না জেনে অনেকেই বাচ্চাকে বকাঝকা করে থাকেন আবার অনেকে ভাবেন যে বাচ্চা নিজেই এর জন্য দায়ী।

কিন্তু এগুলো ভুল ধারণা। শিশুর এই অভ্যাস বদল করতে চাইলে মা বাবাকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

রাতে বিছানা ভেজানো সমস্যার আদ্যোপান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেল পড়ুন।

যা মনে রাখবেন

মুত্র সাধারণত কিডনিতে তৈরি হয় এবং ব্লাডারে জমা হয়।

ব্লাডার তখন মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠায় যে তা পূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবংপ্রসাব করতে হবে।

অনেক সময় ঘুমের কারণে শিশুরা এই সিগন্যাল বুঝতে পারে না। কিংবা প্রসাব ধরে বা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা তার থাকে না।

অনেক সময় এই কারণে পিতামাতা মনে করেন শিশু বোধহয় অলসতার কারণে এগুলো করছে।

তাই তাকে বকাঝকা বা অন্যান্য বাচ্চার সাথে তুলনা দিয়ে তাকে লজ্জা দিয়ে থাকেন।

এসমস্ত আচরণ মোটেও করবেন না। এতে শিশুর মানসিক স্ট্রেস বেড়ে গিয়ে এ সমস্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এতে শিশু মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে এবং তার মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

তাই মনে রাখবেন-

আপনার সন্তান অনেক সময় এই সিগন্যাল বুঝতে পারেনা বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না যা তার কোন দোষ নয়।

এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

বেশিরভাগ শিশুই বিছানা ভিজায় তবে ৬ বছরের উপরের শিশুর এটি ঘটালে মা বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন।

অবশ্যই এজন্য সন্তানকে শাস্তি, বকাঝকা বা লজ্জা দেওয়া যাবে না।

এ সমস্যা চিরস্থায়ী নয়। এটি ভালো হয়ে যাবে দু-একদিন দেরি হলেও।

বিছানা ভেজানো বন্ধ করতে পরিবারের ভুমিকা

পরিবারের সদস্যরা শিশুর বিছানা ভেজানো বন্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।

আবার পরিবারের সদস্যদের গাফিলতি বা বকাঝকার কারণে এ সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

পিতামাতা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শিশুকে এ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করতে পারেন। যা করতে পারেন তা হল-
ডায়েরিতে নোট রাখুন

চার থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে আপনার সন্তানের এক সপ্তাহের জন্য রাত বিছানা ভেজানোর প্যাটার্ন রেকর্ড করুন।

ট্রিগার সনাক্ত করুন, যে রাতে সে বিছানা ভিজিয়েছে বা শুষ্ক রাতে আপনার সন্তান দিনে কি কি করেছে এবং কোন বিষয়গুলো আলাদা?

খাদ্য, পানীয়, জীবনযাত্রা, পারিবারিক ঘটনা, স্কুলের পরিস্থিতি, দিনের বেলা অন্ত্র এবং মূত্রাশয়ের নমুনা, অথবা পারিবারিক গতিশীলতার সাথে কি কোন সম্পর্ক আছে?

তরল পদার্থ সীমাবদ্ধ করে বেডওয়েটিং বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না। তরল পদার্থ বন্ধ করা সহায়ক নয় বরং ক্ষতিকর হতে পারে।

শিশুদের যথাযথ শারীরিক ফাংশনের জন্য প্রচুর পান করতে হয়, বিশেষ করে গরমের সময়।

তরল পদার্থ সীমিত করা ডিহাইড্রেশন এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে, যা বেডওয়েটিং বাড়াতে পারে।
শিশুর সাথে আলোচনা করুন

আপনার শিশুকে বোঝান যে বিষয়টি খুব স্বাভাবিক। সে কি মনে করে তার বিছানা ভেজানোর কারণ হিসেবে।

সে যেন অস্বস্তিতে না ভুগে তার জন্য মোটা পানিরোধক আন্ডারওয়্যার পরলে কিংবা বিছানায় পানিরোধক সিট বিছিয়ে দিতে পারেন।

তাকে পজিটিভ ভাবতে সাহায্য করুন এবং ভালো অভ্যাস চর্চা করতে উৎসাহিত করুন।

সে বিছানা ভেজালে সকালে গোসল করে স্কুলে পাঠান। অনেকসময় বাচ্চা সে অবস্থায় স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বুলিং এর শিকার হতে পারে।
বিছানা ভেজানো বন্ধে কিছু ভালো অভ্যাসের চর্চা

কিছু ভালো অভ্যাসের মাধ্যমে অনেক শিশুর বিছানায় প্রসাব বা বিছানা ভিজানোর সমস্যা দ্রুত সমাধান হয়েছে। এসব ভালো অভ্যাসের মধ্যে রয়েছে-

ইউরিনারি বেড অ্যালার্ম ব্যবহার করা – অনেকের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। সবধরণের বেড অ্যালার্ম ময়শ্চার সেন্সর এবং আল্যার্ম যুক্ত।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং দিনে কয়েকবার প্রসাব করা- শিশুর ব্লাডার যদি খালি থাকে তবে বিছানা ভেজানোর সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। দিনে যেন কিছুক্ষণ পর পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে ব্লাডার খালি করে শুতে গেলে এ সম্ভাবনা অনেকটায় কমে যায়।

দিনের শুরুতে বেশি পানি এবং সন্ধ্যার পর কম পানি পান করা– শিশুদের পর্যাপ্ত পানি করার বিকল্প নেই। কিন্তু এই পানি খাওয়ার পরিমাণটা সন্ধ্যার পরে কম এবং দিনের শুরুতে বেশি করলে রাতে বিছানা ভেজানো কমে যাবে।

কার্বোনেটেড ড্রিংক এবং ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলতে এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করুন – সুস্থ থাকার জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোন বিকল্প নেই। খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত কার্ব এবং শাক সবজি ফলমূল রাখুন। এতে প্রিপাক তন্ত্র এবং অন্ত্র ভাল থাকবে।

রাতে প্রসাব লাগলে উঠে বাথরুমে যেতে উৎসাহিত করুন– রাতে প্রসাব লাগলে সে যেন উঠে বাথরুমে যায় সে বিষয়ে তাকে উৎসাহিত করুন। তবে, খুব জোরজবরদস্তি করবেন না।বাচ্চা যেন রাতে ভয় না পায় সেজন্য ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখতে পারেন।এতে সে বাথ্রুম খুঁজে পাবে সহজে।

বিছানা না ভেজানোর জন্য পুরস্কৃত করুন– যেদিন সে বিছানা ভিজাবে না সেদিন তাকে তার প্রিয় কিছু দিয়ে বা আদর করে উৎসাহিত করুন।

রাতে ঘুম থেকে উঠে প্রসাব করার বিষয়ে বেশি চাপাচাপি করবেন না– এতে তার স্ট্রেস বেড়ে গিয়ে বিছানা ভেজানোর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। উল্টো বেড়ে যেতে পারে।

পরিষ্কার করতে তাকে সাথে নিন- বিছানা ভেজালে বকাঝকা না করে সেগুলো পরিষ্কার করতে তাকে সাথে নিন এতে সে এ বিষয়ে অবচেতন মনে হলেও আরও সচেতন হবে।

বিছানা ভেজানো প্রতিরোধে পরিবারের অন্যান্য ও সহপাঠীদের ভুমিকা

শিশু বিছানা ভেজালে তার ভাইবোন বা পরিবারের অন্য কেউ যেন তাকে লজ্জা দেওয়া বা বকাঝকা না করে সেদিকে খেয়াল করুন।

স্কুলের সহপাঠীরা বিষয়টি জেনে গিয়ে তাকে বুলিং করছে নাকি সেদিকে খেয়াল রাখুন।

তাদের সাথে কথা বলে তাদের সহায়তা নিন। তাদের বোঝান যে এটি তার ইচ্ছাকৃত কোন ভুল বা দোষ নয়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন ?

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তারা পরীক্ষা করে দেখবেন নেউরলজিক্যাল বা জেনিটাল কোন সমস্যার কারণে এটি হচ্ছে নাকি। এছাড়াও-

আপনার সন্তান ৬ বছর বয়সের পরও বিছানা ভেজালে এবং এটা তার অস্বস্তির কারণ হলে।

ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ব্লাডার ট্রেনিং এর মাধ্যমে সন্তানের প্রসাব নিয়ন্ত্রণের ট্রেনিং দিতে পারেন।

যদি আপনার সন্তান ৬বছরের পরও দিনের বেলায়ও বিছানায় বা প্যান্টে প্রসাব করে।

আপনার সন্তান এক বছরের বেশি সময় ধরে রাতে প্রসাব না করে এবং হঠাৎ করে আবার বিছানা ভিজাতে শুরু করলে।

যদি বেডওয়েটিং পরিবারে সমস্যা সৃষ্টি করে।

বিছানা ভেজানোর সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজ উপায় হল পরিবারের সদস্য এবং শিশুর সচেতনতা এবং সঠিক জ্ঞান ও অভ্যাসের চর্চা।