কাঁধের ব্যথায় ভুগছে বিশ্বের ৩ শতাংশ মানুষ; জেনে নিন কারণ ও প্রতিকার

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় ২-৩ শতাংশ মানুষ কাঁধের ব্যথায় ভোগেন। এই কাঁধের ব্যথা কখনো কখনো জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো সাপ্তাহিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান এসকেএফ নিবেদিত ‘ব্যথার সাতকাহন’–এর পঞ্চম পর্বে।

অমৃতা তালুকদারের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং এভারগ্রিন ইয়োগা প্রতিষ্ঠানের যোগ ব্যায়াম প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তনু। অনুষ্ঠানটি ২১ এপ্রিল প্রথম আলো ও এসকেএফের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

শুরুতেই ডা. নজরুল ইসলাম কাঁধের ব্যথার কারণ নিয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, আঘাতজনিত কারণে কাঁধের হাড় ভেঙে গেলে বা লিগামেন্টে ইনজুরি হলে, টিউমার, ইনফেকশন, ইনফ্ল্যামেশন, আর্থ্রাইটিস বা বাত, বয়সজনিত কারণে হাড়ের ক্ষয়—এসব সমস্যার জন্য ব্যথা হতে পারে।

এ ছাড়া অন্য স্থানের ব্যথা, যেমন ঘাড়ের ব্যথা বা হার্টের ব্যথাও কাঁধে আসতে পারে। কাঁধের সবচেয়ে প্রচলিত ব্যথাকে ফ্রোজেন শোল্ডার বলা হয়। এটি হলে ব্যথার পাশাপাশি কাঁধ জমে যায়। অর্থাৎ নাড়ানো যায় না।

প্রাত্যহিক জীবনের কিছু ভুলের জন্যও কিন্তু হতে পারে এই ব্যথা। এ নিয়ে বাপ্পা শান্তনু বলেন, ‘প্রতিদিন ঘাড় নামিয়ে মুঠোফোন ব্যবহার করতে করতে ঘাড়ে ব্যথা হয়। সেটি থেকে কাঁধে ব্যথা হতে পারে। আমরা যদি গঠনগতভাবে মেরুদণ্ডকে ঠিক রাখতে পারি, তাহলে বেশির ভাগ ব্যথা থেকে দূরে থাকা যাবে। আবার ঘুমের বালিশের জন্যও ব্যথা হতে পারে। অধিক মোটা বা পাতলা বালিশ—দুটির জন্য এমন হতে পারে। ঘুমের মধ্যে ঘাড় অনেকক্ষণ কাত হয়ে থাকে।

তাই কান ও কাঁধের দূরত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বালিশ বাছাই করতে হবে। অন্যদিকে যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, তাঁদের কাঁধ ঝুঁকিয়ে কাজ করার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। এ ছাড়া আমাদের দেশের বাসের সিটগুলোও ঠিকভাবে বানানো হয় না। দীর্ঘ ৭-৮ ঘণ্টা ভ্রমণের পর ঘাড়ে-কাঁধে ব্যথা হয়ে যায়। এ জন্য বাস কোম্পানির উচিত প্রফেশনালদের দিয়ে এমনভাবে সিট তৈরি করা, যাতে যাত্রীরা এ ব্যথা থেকে বাঁচতে পারেন। এই দিকগুলো খেয়ালে রেখে মেরুদণ্ডকে সোজা করে রাখলেই ব্যথা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।’

ফ্রোজেন শোল্ডারের ব্যথা এক কাঁধে যেমন হতে পারে, দুই কাঁধেও সমানভাবে হতে পারে। আর ৪০–৬০ বছর বয়সীদের এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়, এমনটাই জানালেন ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, সাধারণত ফ্রোজেন শোল্ডারের কারণ অনেক ক্ষেত্রেই বের করা যায় না। তবে আঘাতজনিত কারণ, দীর্ঘদিন কোনো কারণে কাঁধকে বিশ্রাম দেওয়া, ডায়াবেটিস, হাইপারলিপিডিমিয়া (অধিক মেদ), কার্ডিয়াক ডিজিজেস, প্যারাইলাইসিস ইত্যাদির জন্য এটি হতে পারে। সেটি হলে রোগীদের প্রথম দিকে যে লক্ষণ বেশি দেখা দেয়, তা হলো হাত নাড়িয়ে ঠিকমতো কোনো কাজ করতে না পারা, ঘুমের সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়া। আর সমস্যার একদম শেষ পর্যায়ে কোনোভাবেই হাত নাড়ানো যায় না।

যোগব্যায়ামের মাধ্যমে কিন্তু কাঁধের ব্যথা কমানো সম্ভব। এমন অনেক যোগাসন আছে, যা এ ব্যথা থেকে উপশম দিতে পারে। বাপ্পা শান্তনু এমন কিছু সহজ আসন দেখিয়ে দেন, যেগুলো সবাই করতে পারবেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, কাঁধে ব্যথা হলে এটি নাড়িয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হবে, তাহলে এ অংশে রক্তসঞ্চালন বাড়বে এবং অক্সিজেন চলাচল সহজ হবে। এভাবে ব্যথা কমে আসবে। তবে ব্যথা হলে অবশ্যই ভালো চিকিৎসকের কাছে আগে যেতে হবে।

কাঁধের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে সবার প্রথমে এক্স–রে করতে দেওয়া হয়। ফ্রোজেন শোল্ডারের সমস্যা হলে এক্স–রেতে কিছু পাওয়া যায় না। কারণ, সমস্যাটা লিগামেন্টে হয়। চিকিৎসার জন্য সবার প্রথমে ব্যথার ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম আছে, সেগুলো করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। ব্যায়ামে কাজ না হলে ফিজিওথেরাপি করতে হয়। অতিরিক্ত ব্যথার ক্ষেত্রে কাঁধে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে ব্যায়াম করা লাগে। এতেও কিছু না হলে রোগীকে অজ্ঞান করে শোল্ডার মোবিলাইজ করা হয়। এভাবে চিকিৎসা করলে এ ব্যথা খুব ভালোভাবে নিরাময় সম্ভব বলে জানান ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা না করালে রোগীর আংশিক পঙ্গুত্ব, মাসল অ্যাট্রপির জন্য হাতের হাড় চিকন হয়ে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যা হতে পারে।

ব্যথা কমানোর স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া হয়। ডা. নজরুল ইসলাম এ সম্পর্কে বলেন, সঠিকভাবে এটি দেওয়া না হলে জয়েন্টে ইনফেকশন হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার কমিয়ে এটি দিতে হবে, নইলে সুগার লেভেল বেড়ে যাবে। আর এই ইনজেকশন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমেই দিতে হবে।

ব্যথা প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করাটা জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীদের ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তাঁদের ফ্রোজেন শোল্ডারের সম্ভাবনা বেশি থাকায় শোল্ডার মুভমেন্ট ব্যায়ামগুলো বেশি করে করতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সূত্রঃ প্রথমআলো