আপনার দুর্বল হয়ে যাওয়া দাঁতে ফিলিং করানোর পূর্বে আপনার যা যা জানা বিশেষ প্রয়োজন

যখন একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে তখন তার মুখের ভেতরে কোন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকেনা। এই শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন তার মুখে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করার পথ খুঁজে পায়। তা হতে পারে মায়ের চুমুর মাধ্যমে বা শিশু যখন কোন কিছু চাটে যেমন- খেলনা বা ফ্লোর ইত্যাদির মাধ্যমে। এই ব্যাকটেরিয়াই মুখের ভেতরে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে এবং সারা জীবন এই ব্যাকটেরিয়ার মোকাবেলা করতে হয় তাকে।

কোন কিছু খাওয়া হলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো তা মজা করে খায় বিশেষ করে মিষ্টি জাতীয় খাবার। ব্যাকটেরিয়া তার খাওয়ার পড়ে এমন শক্তিশালী এসিড উৎপন্ন করে যা দাঁতের ক্ষয় করে। আস্তে আস্তে এই ক্ষয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকলে দাঁতে ছিদ্র দেখা দেয়। দাঁতের এই ছিদ্র বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন – ডেন্টাল ক্যাভিটি, ডেন্টাল ক্যারিজ বা দাঁত ক্ষয়।

আমাদের শরীরের চমৎকার একটি ক্ষমতা আছে আর তা হল আঘাত প্রাপ্ত স্থানের মেরামত করতে পারে সে নিজেই। যেমন – শরীরের কোন হাড় ভেঙ্গে গেলে শরীর নতুন কোষ উৎপন্ন করে ভেঙ্গে যাওয়া হাড়কে আঠার মত জোড়া লাগাতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দাঁতের ক্ষেত্রে এমনটা হয়না। শত শত বছর পূর্বে দাঁতের এই ক্ষয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দাঁত ফেলে দিতে হত।

বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ক্ষয় হাওয়া দাঁতকে ফেলে দিতে হয় না। ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের ছিদ্রকে বন্ধ করার পদ্ধতিটিকেই ডেন্টাল ফিলিং বলে। দাঁতের ফিলিং করানোর পূর্বে আপনার যা জানা প্রয়োজন তা নিয়েই আজকের এই ফিচার।

১. কেন ফিলিং করানো প্রয়োজন: যদি খাওয়ার পড়ে ফ্লস ব্যবহার করা ও ব্রাশ করার মাধ্যমে সঠিক ভাবে দাঁত পরিষ্কার করা না হয় তাহলে দাঁতে খাদ্য কণা জমে ব্যাকটেরিয়ার বংশ বৃদ্ধি ঘটে এবং বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয়। এই বিষাক্ত পদার্থ দাঁতের সবচেয়ে বাহিরের স্তর এনামেলের রঙ নষ্ট করা শুরু করে। প্রথমে দাঁতে হালকা হলুদ দাগ দেখা যায় – তারপর গাঁড় হলুদ – তারপর হালকা বাদামী – তারপর গাঁড় বাদামি-ধুসর এবং সবশেষে গাঁড় কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। এই পর্যায়ে যদি ঠিকমত চিকিৎসা করা না হয় তাহলে দাঁতের ঐ অংশে ছিদ্র হওয়া শুরু করে যাকে ক্যাভিটি বলে।

২. দাঁত ক্ষয় হলে কেমন অনুভূতি হয়: দাঁতে ক্ষয় হলে ঠান্ডা পানি পান করলে দাঁত শির শির করার মত অস্থায়ী সংবেদনশীলতা দেখা যায়। মিষ্টি খাবার খেলে সংবেদনশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ঠান্ডা বা গরম খাবার খেলে হালকা ব্যথা হয়। খাবারে কামড় দিলে বা চিবালে ব্যথা করে যা ঘন্টা ব্যাপী থাকে এবং ব্যথা কমানোর জন্য ঔষধের প্রয়োজন হয়।

৩. ডেন্টিস্ট কীভাবে ফিলিং নির্ধারণ করেন: প্রথম দিকে সিলভার অ্যামালগাম ফিলিং বা সিমেন্টের মত গ্লাস আয়োনোমার ব্যবহার করা হত ফিলিং এর জন্য। কিন্তু বর্তমানে কম্পোজিট পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এটি এক ধরণের প্লাস্টিকের মত পদার্থ যা প্রথমে নরম থাকলেও দাঁতের ছিদ্রে বসানোর পর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি দেয়ার ফলে রাসায়নিকভাবে দাঁতের সাথে যুক্ত হয়ে শক্ত হয়ে যায়।

৪. ফিলিং এর পরে কি আশা করতে পারেন: যদি স্থায়ী ফিলিং করা হয় এবং দাঁতের রঙের যৌগ ব্যবহার করা হয় তাহলে খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া শুরু করতে পারবেন। আপনি বুঝতেও পারবেন না কোন দাঁতে ফিলিং করা হয়েছে। আপনি হয়তো হালকা থেকে মাঝারি ধরণের সংবেদনশীলতা অনুভব করবেন যা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।

ফিলিং এ কি ধরণের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, ডেন্টিস্টের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, ডেন্টিস্টের কাছে কত বার যেতে হবে এবং ক্যাভিটির আকার আকৃতির উপর খরচ নির্ভর করে। ফিলিং করানোর পড়ে দাঁতের সঠিক যত্ন নিতে হবে ব্রাশ করা, ফ্লস ব্যবহার করা এবং মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করার মাধ্যমে। সাধারণত ৩-৭ বছর পর্যন্ত ফিলিং ঠিক থাকে। তবে বছরে এক বার চেক আপ করানো প্রয়োজন।

দাঁতের ফিলিং নিয়ে বিস্তারিত

দাঁতের চিকিৎসায় কখন ফিলিং করার প্রয়োজন পড়ে- এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ডা. সৈয়দ তামিজুল আহসান রতন। বর্তমানে তিনি রতন’স ডেন্টালে প্রধান পরামর্শক হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : একজন মানুষের দাঁতে কখন ফিলিং দেওয়ার দরকার হয়?

উত্তর : দাঁতের ক্ষেত্রে ফিলিং মানে হচ্ছে কোনো জিনিস ভরাট করা। কোনো জিনিস যদি গর্ত হয়ে যায় সেই জিনিসকে আমাদের পূরণ করতে হবে। রোগীরা বুঝতে পারে, তার কোথায় কখন গর্ত হয়েছে। সাধারণত একে ক্যাভিডি বা ডিকে বলে। এটি বিভিন্ন রকম হতে পারে। ডেন্টাল সার্জনরাই বুঝবেন কোনটাকে কোন ক্যাভিটি বলে। একটি দাঁতে এক জায়গায় গর্ত হতে পারে না। বিভিন্ন জায়গায় গর্ত হতে পারে। যদি পাশে গর্ত হয়, তাহলে কাটাকাটির কোনো প্রয়োজন নেই। এক ধরনের কসমেটিক প্রাকৃতিক রঙের ফিলিং রয়েছে। দিলেই লেগে যায়।

যদি কেউ মনে করেন এখানে আজীবন ফিলিং থাকবে সেটি ভুল। কোম্পানি থেকেই বলে দিচ্ছে দুই/ তিন বছর থাকবে। আমরা যখন ফিলিং করে দেই তখন দাঁত আর ক্ষয় হয় না। তখন ফিলিংটা ক্ষয় হয়, কিন্তু দাঁতটা বেঁচে যায়।

আর যেগুলো মাঝখানে গর্ত হয়, সেগুলোকে ক্লাস ওয়ান ক্যাভিটি বলে। বেশির ভাগ রোগী আমাদের কাছে এই ধরনের ক্ষয় এবং পাশে ক্ষয় নিয়ে আসে। পাশে ক্ষয় কেন হয়? তার ব্রাশের পদ্ধতি হয়তো ঠিক নেই। তখন দেখা যায় ওপরের ও নিচের ১২টি দাঁত তার ক্ষয় হয়ে গেছে। তার গামগুলোও আস্তে আস্তে সরতে থাকে। তখন দাঁতগুলো খুব স্পর্শকাতর হয়ে যায়।

আর দাঁতের মাঝখানে যেই গর্তগুলো হয়ে থাকে, সেগুলোতে খাদ্যকণা লেগেই থাকে। খাবারে এসিড ফরমেশন হয়ে ওপরের লেয়ার বা এনামেলকে গলিয়ে ফেলতে পারে। আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকতে থাকে, ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে থাকে। এতে গর্তটা আরো বড় হতে থাকে এবং ভেতরে ঢুকতে থাকে। যখন প্রথম লেয়ার চলে যায়, দ্বিতীয় লেয়ার আসে তখন রোগীরা একটু শিরশির অনুভব করে। যখন সে এধরনের অনুভূতির পর ডেনটিস্টের কাছে যায়, তাহলে তার ধরা পড়ে যায় কয়টি দাঁতে এ রকম ক্ষয় রয়েছে।

ছয় মাস পরপর বা বছরের একবারও যদি সে চেকআপ করে, তাহলে বছরে একটি দাঁতও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। ব্যথা শুরুর আগে আরো ভালো হয় শির শির শুরুর আগে সে যদি ফিলিং করে। সাধারণত শিরশির বা ব্যথা শুর হলে, দাঁতের গর্ত হলে দাঁত ফিলিং করার প্রয়োজন পড়ে।

প্রশ্ন : একটি ফিলিং দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে, নাকি পড়ে যেতে পারে—এ বিষয়টি কোন কোন শর্তের ওপর নির্ভর করে?

উত্তর : আমরা যে ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করি এর গায়ে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকে, দুই বছর বা পাঁচ বছর। তাই আমি বলি যে দুই বা পাঁচ বছর পর পরিবর্তন করিয়ে নিতে।

প্রশ্ন : কোন ফিলিং দাঁতের জন্য ভালো?

উত্তর : কোনো জিনিসকে অবহেলা করা যাবে না। যখন কোনো ধরনের ফিলিং ছিল না তখন মেটাল ফিলিং ছিল। মার্কারি ফিলিং ছিল। মার্কারি, আলোয় মিশিয়ে ফিলিং দেয়া হতো। একে স্থায়ী ফিলিং বলা হতো। ওই ফিলিং দেখতে এক রঙের। কিন্তু ওই ফিলিংটা এখন আন্তর্জাতিকভাবে বন্ধ। মার্কারি থাকার কারণে এটি কারসিনোজেনিক। এটি থেকে অনেক ক্যানসার ছড়াতে পারে। ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে, স্তন ক্যানসার হতে পারে, অন্যান্য ক্যানসার হতে পারে। এটি বিষাক্ত।