যেভাবে বুঝবেন কোমর ব্যাথা নাকি কিডনি সমস্যা, জেনে নিন বিস্তারিত

আমাদের দেশে অনেক রোগী আছেন। যারা আসলে জানেন না যে কোনটি কোমর ব্যাথা আর কোনটি কিডনির ব্যাথা। বেশির ভাগ কোমর ব্যাথার রোগী মনে করেন তাদের কিডনিতে সমস্যা হয়েছে। তবে কিছু তথ্য কিংবা উপসর্গ জানা থাকলে নিজে নিজেই বোঝা যাবে ব্যাথা কিসের।

কিডনি রোগীদের উপসর্গ কিংবা ব্যথা
কিডনির ব্যাথা সাধারণত মেরুদণ্ড থেকে একটু দূরে ডান কিংবা বাম পাশে হয়। যা পেছনের পাঁজরের নিচের অংশে অনুভূত হয় এবং এই ব্যাথা নড়াচড়া করে, কোমরের দুই পাশেও যেতে পারে এবং পেছনের নরম জায়গায় অনুভূত হতে পারে।

রোগী নিজেকে অসুস্থ এবং দুর্বল বলে মনে করবে, মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব হবে। শরীরে জ্বর জ্বর ভাব অনুভব হবে এবং তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। প্রস্রাব ঘোলাটে হবে এবং গন্ধ বের হবে।

প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত আসতে পারে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রস্রাব হবে।

কীভাবে বুঝবেন এটি কোমর ব্যথা?
কোমর ব্যথা সাধারণত মাংস পেশি, হাড়, ডিস্ক, জয়েন্ট, নার্ভ কিংবা রগ সম্পর্কিত। এটি নির্দিষ্ট এরিয়াতে হয়ে থাকে। মেরুদণ্ডের নাড়াচাড়া যেমন উঠাবসা, সামনে ঝোঁকা, হাঁটা কিংবা দাঁড়ানো, অনেকক্ষণ কাজ করা এবং শুয়ে থাকার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত এবং এটি নাড়াচাড়ার সঙ্গে কমবে কিংবা বাড়বে।

সাধারণত এই ব্যাথায় জ্বর হয় না। তবে কোনো রোগের কারণে কোমর ব্যাথা হলে জ্বর আসতে পারে যেমন টিউমার এবং রোগী নিজেকে দুর্বল মনে করে না।

মহিলাদের কোমরের ব্যথার রোগ বেশি হওয়ার কারণ কী?

বর্তমানে কোমর ব্যাথা টা খুব কমন হয়ে গেছে। এমন মানুষ খুজে পাওয়া কঠিন যারা কোমর ব্যাথা সহ্য করেনি।

মোট জনসংখ্যার প্রায় 80% মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কোমর ব্যাথায় ভোগে এবং 70 % মানুষের ব্যাথা চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। আসলে কোমর ব্যাথা কোনো রোগ নয়,বরং বিভিন্ন রোগের জন্য কোমর ব্যাথা করে। এটা পুরুষ মহিলা উভয়ের হয়ে থাকে। তবে মহিলাদের কোমর ব্যাথা বেশী দেখা যায়। ভারী কাজ করা,ওজন বৃদ্ধি পাওয়া,বসার সিস্টেম বা অধিক সময় বসে থাকা ইত্যাদি কারণে উভয়ের এই সমস্যা দেখা যায়। আবার এসিডিটির জন্য সাময়িকভাবে কোমরে ব্যাথা করে। তবে মহিলারা তাদের গর্ভকালে এটা বেশী অনুভব করে।

গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা একটি পরিচিত সমস্যা। অন্ত:স্বত্ত্বাদের কাছ থেকে প্রায়ই এ ধরণের সমস্যার কথা শোনা যায়। এছাড়া এ সময় এ ধরণের আরও কিছু সমস্যার কথা শোনা যায়। এসব ব্যথা মাতৃত্বকালীন সময়কে কঠিন করে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চার জনে তিন জন নারী গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যাথা সমস্যায় ভুগে থাকেন। এ সমস্যা সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বিশেষ করে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে বেশি দেখা যায়। মায়ের জরায়ুর যে পাশে বাচ্চা অবস্থান করে সেদিকে ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থায় কোমরে এ ধরনের ব্যথা কারো কারো জন্য তেমন সমস্যার কারণ না হলেও আবার কারও জন্য এটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে

সূতরাং বলা যায় যে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের এটা বেশী হয়। এবার এর কারণ গুলো জেনে নিই।

# সাধারণত বিয়ের পর মহিলাদের ওজন অনেকটা বেড়ে যায়। ফলে কোমর ব্যাথা সমস্যাটি দেখা দেয়।

# আবার গর্ভধারণের শুরু থেকেই শরীরের কিছু হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে প্রজেস্টেরন এবং রিলাক্সিন হরমোন সন্তান জন্মদানের প্রস্তুতি হিসেবে কোমরের বিভিন্ন জয়েন্ট এবং লিগামেন্টসকে নরম এবং ঢিলা করে দেয়। এর ফলে মায়ের শরীর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। জয়েন্টের ভার বহন ক্ষমতা কমে যায় এবং হাঁটার সময়, অনেক বসে থাকলে, নিচে চেয়ার থেকে ওঠার সময় বা কোন কিছু তোলার সময় ব্যথা অনুভূত হয়।

# গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ত:স্বত্ত্বার শরীরের ভর-কেন্দ্রও পরিবর্তিত হয় এবং পেটের পেশীগুলো সম্প্রসারিত ও দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে মায়ের Posutre আক্রান্ত হয় এবং পিঠের উপর অতিরিক্ত চাপ পরে।

# যেহেতু মায়ের শরীর এ সময় অতিরিক্ত ওজন বহন করে তাই এ সময় মায়ের শরীরের পেশী এবং জয়েন্টগুলোর উপর চাপ বেশি থাকে। এই কারণে গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যাথা দেখা দিতে পারে।

# এছাড়া মেয়েদের পেলভিসে একজোড়া লিগামেন্ট থাকে যা রাউন্ড লিগামেন্ট নামে পরিচিত। এগুলোর কাজ হোল জরায়ুকে সঠিক স্থানে ধরে রাখা। গর্ভধারণের আগে এ লিগামেন্টগুলো পুরু এবং ছোট থাকে। গর্ভধারণের পড়ে জরায়ুর আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ লিগামেন্টগুলো রাবার ব্যান্ডের মত প্রসারিত হয় এবং পাতলা হয়ে যায়। এ কারণে গর্ভাবস্থায় লিগামেন্টগুলো টান টান অবস্থায় থাকে এবং এতে হঠাৎ কোন চাপ পড়লে ব্যাথা অনুভূত হতে পারে। এ ধরনের ব্যাথাকে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন বলে।

# গর্ভবতী নারীরা যখন হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করেন তখন সাধারণত রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন অনুভূত হতে পারে, যেমন- বিছানা বা চেয়ার থেকে ওঠার সময়। কাশি দেয়ার সময় বা বিছানায় নড়াচড়া করার সময়ও এ ব্যাথা হতে পারে। রাউন্ড লিগামেন্ট পেইনের কারণে শারিরীক ধকল গেলেও চাপা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

# কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় অমরার অবস্থান পরিবর্তন হয়ে গেছে। এর ফলে অসামজ্ঞস্যপূর্ণ একটা চাপ সৃষ্টি হয় এবং পেট ও কোমরে ব্যাথা হয়।

# গর্ভাবস্থায় কোমরে ব্যাথা হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে সায়াটিক নার্ভের উপর অতিরিক্ত চাপ। গর্ভাবস্থায় বড় হয়ে যাওয়া জরায়ুর চাপ যখন শরীরের দুটি সায়াটিক নার্ভের উপর পড়ে তখন কোমরে, নিতম্বে বা উরুতে ব্যাথা হতে পারে। এ ধরনের ব্যাথাকে বলে সায়াটিকা ।এ ধরনের ব্যাথা সাধারণত কোমর বা কোমরের উপরে পিঠের মাঝ বরাবর হয়। এ ব্যাথা কখনো কখনো পায়ের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়।

কিছু কিছু কারণে এ ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেমন- একটানা অনেকক্ষন বসে থাকলে বা দাঁড়িয়ে থাকলে বা ভারী কিছু আল্গালে। রাতের দিকে এ ধরনের ব্যাথা বেশী অনুভুত হয়। গর্ভাবস্থায় সায়াটিকার হওয়া স্বাভাবিক। তারপরও এ ধরনের ব্যথা হলে ডাক্তারকে জানানো উচিত। কারণ তা মারাত্মক কোনো কিছুর লক্ষণও হতে পারে।

এই গর্ভাবস্থার ব্যাথার জন্য পুরুষের তুলনায় মহিলাদের কোমর ব্যাথা বেশী দেখা যায়। অন্যান্য প্রায় সকল কারণ নারী পুরুষ সবার জন্য সমান।