গ্যাস ওভেন বা চুলা ঘরোয়া পদ্ধতিতে পরিষ্কার করার দারুণ ১০টি কৌশল শিখে রাখুন

মজাদার খাবার রান্না করা মানেই রান্নাঘরের উপর যত ঝক্কি-ঝামেলা। তেল, মশলা, ফেনা, ঝোল পড়ে একেবারে মাখামাখি অবস্থা। রান্নাঘরের আর সব জিনিস পরিষ্কার করা গেলেও খোদ গ্যাস ওভেনটাই রয়ে যায় অপরিষ্কার। দিনের পর দিন ময়লা জমতে জমতে ওভেনে মোটা কালো আস্তর পড়ে যায়, যা পরবর্তীতে পরিষ্কার করা খুব কঠিন হয়ে যায়।

তাই এই ঝামেলা থেকে বাঁচতে মাসে দুই থেকে তিনবার গ্যাস ওভেন পরিষ্কার করা উচিত। বাজারের ক্লিনারগুলো সবসময় ব্যবহার করাটা কঠিন হয়ে যায়, আর তাতে বিপদেরও ঝুঁকি থাকে। তাই ক্লিনারের বদলে রান্নাঘরে থাকা জিনিসপত্র দিয়েই আরামসে চুলা পরিষ্কার করতে পারবেন। অনেকে শুধু গ্যাস ওভেন পরিষ্কারকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন কিন্তু গ্যাস বার্নারের কথা ভুলে যান। গ্যাস ওভেন এবং বার্নার দুটোই পরিষ্কার রাখা উচিত।

আজকের আয়োজনে থাকছে ঘরোয়া উপাদান দিয়ে গ্যাস ওভেন বা চুলা পরিষ্কার করার ১০টি কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত।

১. আলু এবং গ্লিসারিন

আলু এবং গ্লিসারিন চুলার জেদি দাগ তুলতে দারুণ কাজ করে। একটি পাত্রে ৩ চামচ আলুর রস আর ২ চামচ গ্লিসারিন ভালো করে মিশিয়ে নিন। এরপরে এই মিশ্রণ দাগের জায়গায় লাগিয়ে ১৫ মিনিট রেখে দিন। ১৫ মিনিট পরে ব্রাশ দিয়ে ঘষলে জেদি দাগ হবে নিমেষেই উধাও।

২. ভিনেগার

আপনি চাইলে শুধু ভিনেগার দিয়েও গ্যাস ওভেনের যেকোন ধরণের দাগ দূর করতে পারবেন। এবং এই কাজের জন্য প্রথমে আপনাকে ১ লিটার পানি ফুটিয়ে নিতে হবে। এরপর এই ফোটানো পানিতে ৩ টেবিল চামচ ভিনেগার মিশিয়ে নিন।

পানিটা গরম থাকতে থাকতেই সব কাজ করতে হবে, ঠান্ডা হয়ে গেলে এই মিশ্রণ দিয়ে ময়লা উঠানো যাবে না। গরম পানিতে ভিনেগার মিশানোর পরে সেটা গ্যাস ওভেনের দাগের উপর ছড়িয়ে দিন। এরপরে ব্রাশ দিয়ে ঘষে ময়লা তুলে ফেলুন। প্রতিদিন ব্যবহারে এক সপ্তাহের মধ্যেই ওভেন হবে ঝকঝকে পরিষ্কার।

ভিনেগার ও বেকিং সোডা দিয়ে গ্যাস বার্নারও পরিষ্কার করতে পারবেন। ১ টেবিল চামচ বেকিং সোডা এবং আধা কাপ ভিনেগার মিশিয়ে এর মধ্যে বার্নার ডুবিয়ে রাখুন সারারাত। সকালে ব্রাশ দিয়ে বার্নার ঘষে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করুন।

৩. ট্যালকম পাউডার

রূপচর্চায় ট্যালকম পাউডার এক দারুণ কাজের জিনিস। গরমের দিনে ট্যালকম পাউডার শরীরের ঘাম শুষে এক ঝরঝরে অনুভূতি দেয়। মজার ব্যাপার হল, এই পাউডার আপনার গ্যাস ওভেনের ময়লাও শুষে নেবে। দাগের পরিমাণ বুঝে বেশ খানিকটা ট্যালকম পাউডার চুলার উপর ছড়িয়ে দিন।

১০ মিনিট পরে ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করতে শুরু করুন। শুকনো পাউডারের কারণে প্রথমে অর্ধেক ময়লা উঠে আসবে। বাকি ময়লা তুলতে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। পাউডার দিয়ে কম সময়ের মধ্যে চুলার দাগ তুলতে পারবেন।

৪. দুধ এবং কর্নফ্লাওয়ার

রান্নায় তো কতো কর্নফ্লাওয়ার ব্যবহার করেছেন, কখনো কি দাগ তুলতে কর্নফ্লাওয়ার দিয়েছেন? তাও আবার চুলার দাগ? যদি না দিয়ে থাকেন তবে এখন থেকে কর্নফ্লাওয়ারকে স্পট রিমুভার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।

৩ টেবিল চামচ দুধ আর ৩ টেবিল চামচ কর্নফ্লাওয়ার একসাথে মিশিয়ে ঘন পেস্ট বানিয়ে চুলার দাগে ২-৩ ঘন্টা লাগিয়ে রাখুন। ভালো হয় যদি সারারাত চুলায় পেস্ট মাখিয়ে রাখতে পারেন। কয়েক ঘন্টা পরে ব্রাশ দিয়ে ঘষে দাগ তুলে ফেলবেন। এই পদ্ধতিতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে চুলা পরিষ্কার করতে।

৫. তেল এবং ডিটারজেন্ট

ডিটারজেন্ট দিয়ে কাপড়ের দাগ তোলার পাশাপাশি চুলার দাগও তুলতে পারবেন। তবে তার আগে একটু তেল ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে দাগের জায়গায় ১ টেবিল চামচ তেল মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। ১০ মিনিট পরে কাপড় দিয়ে ঘষে ঘষে দাগ তুলুন, অর্ধেক পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এরপর একটা বাটিতে ৩ টেবিল চামচ লিকুইড বা পাউডার ডিটারজেন্ট আর অল্প পানি মিশিয়ে পেস্ট বানান। এবার ব্রাশে এই পেস্ট লাগিয়ে দাগের জায়গাটা ঘষুন বাকি অর্ধেক দাগ তুলতে। আপনি চাইলে তেল বাদ দিয়ে শুধু ডিটারজেন্টও ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ডিটারজেন্টটা গরম পানিতে গুলিয়ে নিতে হবে।

৬. বেকিং পাউডার

গ্যাস ওভেনের দাগ তুলতে বেকিং পাউডারও ট্যালকম পাউডার ও ডিটারজেন্টের মতো সমান কার্যকরী। প্রথমে দাগের জায়গাটা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নরম করে নিন। এবারে ৩ টেবিল চামচ বেকিং পাউডার অল্প পানিতে গুলে ঘন একটি মিশ্রণ বানিয়ে নিন।

এরপর এই মিশ্রণ দাগের জায়গায় লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিন। ৩০ মিনিট পরে জায়গাটা ব্রাশ দিয়ে ঘষুন এবং পানি ঢালুন। দাগ অনেকটাই হালকা হয়ে যাবে, প্রতি সপ্তাহে একবার বেকিং পাউডার ব্যবহারে দাগ আর থাকবেনা।

৭. ইনো, লেবুর রস, ডিটারজেন্ট

বদহজম বা বুক জ্বালা করলে আমরা ইনো গুলে খাই। কিন্তু ইনো যে গ্যাস বার্নার (চুলার মাঝের চাকতি) পরিষ্কার করতেও কাজে আসে সেটা কি জানেন? ইনো দিয়ে গ্যাস বার্নার পরিষ্কার করতে হলে আপনাকে নিতে হবে আধা কাপ গরম পানি, ১ টেবিল চামচ লেবুর রস, ১ প্যাকেট ইনো, এবং ১ চা চামচ লিকুইড ডিটারজেন্ট।

প্রথমে পানিতে লেবুর রস আর ইনো ধীরে ধীরে মিশিয়ে নিন। এরপরে চুলা থেকে বার্নার খুলে ইনো-লেবুর মিশ্রণে ১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। বার্নার অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে, যা ময়লা বাকি থাকবে তা লিকুইড ডিটারজেন্ট আর ব্রাশ দিয়ে ঘষে তুলে ফেলুন। গ্যাস বার্নার প্রতি ১৫ দিন পরপর পরিষ্কার করা উচিত।

৮. লেবু এবং লবণ

গ্যাস বার্নার পরিষ্কার করতে লেবুও ব্যবহার করতে পারেন, যদি আপনার বার্নার পিতলের হয়। কারণ পিতলের তৈজসপত্র লেবু দিয়ে ভালো পরিষ্কার হয়। ১টি বড় লেবুর রস চিপে আধা কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে বার্নার ডুবিয়ে রাখুন সারারাত। তারপর সকালে বার্নার উঠিয়ে নিন এবং ঐ লেবুর খোসার মধ্যে ১ চা চামচ লবণ লাগিয়ে খোসা দিয়ে বার্নারটা ঘষে পরিষ্কার করুন। বার্নার পিতলের না হলে এই টেকনিক ফলো করবেন না।

লেবু-লবণের পরিবর্তে লেবু, বেকিং সোডা, এবং ডিটারজেন্টও ব্যবহার করতে পারেন। আধা কাপ গরম পানিতে ৫-৬ ফোঁটা লেবুর রস আর ২ চা চামচ বেকিং সোডা গুলিয়ে বার্নার ১ ঘন্টা ডুবিয়ে রাখুন। তারপর ব্রাশে অল্প ডিটারজেন্ট লাগিয়ে বার্নার ভালোমতো ঘষে নিন।

৯. তেঁতুল এবং ডিটারজেন্ট

তেঁতুল এবং ডিটারজেন্ট দিয়েও সহজে বার্নার পরিষ্কার করতে পারেন। ১ কাপ গরম পানিতে ১ টেবিল চামচ তেঁতুল এবং ১ চা চামচ ডিটারজেন্ট দিয়ে গুলে নিন। বার্নার আলাদা করে এই মিশ্রণে ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন। নির্ধারিত সময়ের পরে ব্রাশ দিয়ে ঘষলেই পাবেন চকচকে ঝকঝকে বার্নার।

১০. হারপিক

যদি আপনার ঘরে লেবু, লবণ, ডিটারজেন্ট, তেঁতুল, বেকিং পাউডার, ভিনেগার এসবের কিছুই না থাকে, স্রেফ হারপিক দিয়ে অনায়াসে কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন। একটি বাটিতে গ্যাস বার্নার নিয়ে তার উপর পরিমাণমতো হারপিক ছিটিয়ে নিন। তারপর ব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে নিন।

সতর্কতা

চুলা পরিষ্কার করার সময়ে পরিষ্কারক দ্রব্য যেন কোনভাবেই গ্যাস সংযোগের পাইপে না ঢুকে যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
গরম চুলা ভুলেও পরিষ্কার করতে যাবেন না। পরিষ্কার করার অন্তত ২ ঘন্টা আগে চুলা এবং গ্যাস বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দিবেন।
পরিষ্কার করার আগে হাতে প্লাস্টিক বা রাবার গ্লাভস পরে নিলে ভালো হয়।

রুক্ষ ব্রাশ, শিরিষ কাগজ, বা খসখসে ও শক্ত কাপড় দিয়ে গ্যাস ওভেন পরিষ্কার করা উচিত না। সবসময় নরম ও পুরনো টুথব্রাশ বা সুতি কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে পরিষ্কার করবেন।
অনেকে সময় বাঁচানোর জন্য ঘষে পরিষ্কার করার বদলে ধারালো জিনিস দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ময়লার আস্তর অপসারণের চেষ্টা করে থাকেন। যেটা একদমই ভুল, তাতে মেটালের ক্ষতি হয়। তাই ধৈর্য্য ধরে সময় নিয়ে নরম জিনিস দিয়ে চুলা পরিষ্কার করবেন।