ভাইবোনের মধ্যে অতিরিক্ত রেষারেষির ঘটনাকে অবহেলা করবেন না, দেখুন আপনার করনীয়

আমার বড় মেয়ের বয়স ছ’বছর। ছোট মেয়ে দু’বছরের। দ্বিতীয়বার কনসিভ করার সিদ্ধান্তটা অনেকটা বড় মেয়ের কথা ভেবেই। আমরা দু’জনেই চাকরি করি। ও বাড়িতে আয়ার কাছে থাকে। পাড়াতেও সেভাবে ওর সমবয়সি বাচ্চা নেই, ফলে খেলতে যেতে পারে না। ভেবেছিলাম, আর-একজন কাউকে আনলে ওর খেলার সঙ্গী হবে। মেয়েও বোনকে পেয়ে প্রথম-প্রথম খুব খুশি ছিল। প্রচণ্ড ভালবাসত বোনকে। আগলে আগলে রাখত। কিন্তু মাসতিনেক ধরে দেখছি, বোনকে সহ্যই করতে পারছে না। বোন কাঁদলেই প্রবল মেজাজ খারাপ করে ফেলছে। চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। আমি ছোট মেয়ের দিকে একটু বেশি সময় দিলেও একই ব্যাপার হচ্ছে। বুঝতে পারছি না কীভাবে সামলাব ওকে।

চিত্রিতা রায়, বেলেঘাটা

‘সিবলিং রাইভালরি’ বা একই পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা রেষারেষি ব্যাপারটা মোটেই নতুন কিছু নয়। অনেক বাড়িতেই দেখা যায় এমন। পাশাপাশি বড় হতে গিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসার সঙ্গে সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, একে অন্যের পিছনে লাগা— এর মধ্যে কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। এমনও দেখা যায়, বোনের সঙ্গে দিদির খুনসুটি চলছে সারাক্ষণ। অথচ অন্য কেউ বোনের সমালোচনা করলেই দিদি তার সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া করছে! সাধারণত কৈশোরে এসে ভাইবোনদের এ ধরনের রেষারেষিও অনেকটাই কমে যায়। ভাইবোনদের মধ্যে বয়সের ফারাক বেশি হলে দ্বন্দ্ব কম হয়। ছোট ভাই বা বোনকে অনেকটা বাবা-মায়ের মতো স্নেহে-আদরে আগলে রাখে বড় দাদা বা দিদি। তার সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠে।

আপনার বড় মেয়ের বছরতিনেক বয়সে ওর নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য দ্বিতীয় সন্তান আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আপনারা। এই সিদ্ধান্তে কোনও ভুল নেই। বিশেষ করে আপনারা দু’জনেই যখন চাকরি করেন এবং আপনাদের মেয়েকে অনেকটা সময় আয়ার কাছেই কাটাতে হয়। ছোট বোন জন্মানোর পর আপনার বড় মেয়ের হয়তো ভালই লেগেছিল। এটা অনেকটা খেলনা বা পুতুল পেলে শিশুদের যেমন আনন্দ হয়, তেমনই ব্যাপার। কিছুদিন পর বোনকে নিয়ে ওর প্রাথমিক উত্তেজনা এবং কৌতূহল কমে যাওয়ার পর হয়তো তার মনে হয়েছে, নতুন আগন্তুক বাড়ির অন্য সকলের কাছ থেকে বড় বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। বাবা-মা তো বটেই, আত্মীয়স্বজন সকলেই যেন খালি বোনকে নিয়ে মেতে উঠেছে। তার দিকে কারও খেয়ালই নেই! এরকম যদি মনে হয়, তাহলে সে নিরাপত্তার অভাব থেকে হতাশ বোধ করতে পারে।

বাবা-মা তো বরাবরই অফিসে বেরিয়ে যায় রোজ। কিন্তু বোন আসার আগে বাবা-মা বেরিয়ে যাওয়ার পর আয়ামাসি তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকত। এখন আর তেমনটা হয় না! কারণ স্বাভাবিকভাবেই আয়ামাসি এখন বেশি নজর দেয় বোনের দিকে। আপনি ছোট মেয়েকে একটু বেশি সময় দিলেও আপনার বড় মেয়ে মনে করছে, তাকে অবহেলা করা হচ্ছে। এর ফলে বোনের প্রতি ঈর্ষা বোধ করাটা বিচিত্র নয়। আপনারা যখন বাড়িতে থাকেন না, তখন বোনকে সামলানোর কিছুটা দায়িত্ব কি বড় মেয়েকে দিয়ে রেখেছেন? যদি তা দিয়ে থাকেন, তবে সেই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে না পারলেও ওর মধ্যে বিরক্তি বা ফ্রাস্ট্রেশন জন্ম নিতে পারে। হয়তো সেই বিরক্তি বা ফ্রাস্ট্রেশনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে ওর এই রাগ, চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে দিয়ে।

আপনার বড় মেয়েও কিন্তু বেশি বড় হয়নি। ফলে ওর মনে এরকম বিরক্তির দীর্ঘস্থায়ী হওয়াটা ওর মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। এর প্রতিকার করতে হবে আপনাদেরই। ছোট মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওর দিকেও একটু বাড়তি মনোযোগ দিন। বোনের মতো ওকেও মাঝে মাঝে কোলে নিয়ে আদর করুন। কখনও কখনও ছোট মেয়েকে আয়ার কাছে কিছুক্ষণের জন্য রেখে আপনারা স্বামী-স্ত্রী বড় মেয়েকে নিয়ে বেরতে পারেন। হয়তো একসঙ্গে শপিং করলেন।

কিংবা রেস্তরাঁয় গিয়ে বড় মেয়ের প্রিয় কোনও পদ অর্ডার করে খাওয়াদাওয়াদাওয়া সারলেন তিনজন মিলে। একটু আলাদা মনোযোগ পেলে ওর এই রাগ কমবে নিশ্চয়ই। আপনার ছোট মেয়ে নেহাতই শিশু। ফলে ওর দিকে আপনাকে একটু বেশি মনোযোগ দিতেই হবে। তাই আপনার স্বামীকে বলুন, বড় মেয়ের সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটাতে। যে নিরাপত্তার অভাবে ও ভুগছে, তার কোনও কারণ নেই— এটা ওকে বোঝানোর দায়িত্ব আপনাদেরই। নিরাপত্তাবোধ ফিরে এলে ওর অ্যাগ্রেশন কমবে বলেই আশা করা যায়।