জেনে নিন কোথায় পাবেন বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শাড়িগুলো

বাঙালী নারীদের সবচেয়ে প্রিয় এবং বহুল পরিধেয় বস্ত্র হচ্ছে শাড়ি। বাঙালী নারীদের অবিচ্ছেদ্য পোশাক শাড়ি। একারনেই হয়ত বলা হয়ে – শাড়িতেই নারী। শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

প্রতিটি অঞ্চলের কোনায় কোনায় লুকিয়ে আছে সুই-সুতার বুনন। এদেশের আনাচে-কানাচে জুড়ে রয়েছে নানান রকমের অসম্ভব সুন্দর সব শাড়ির ইতিহাস। জামদানি, সিল্ক, তাঁত, মণিপুরী – আরো কত কি। যারা শাড়ি ভালোবাসেন তাদের সংগ্রহে এই শাড়িগুলো কম-বেশি থাকবেই। পরতে না পারলেও ঐতিহ্যের কারনে সংগ্রহে রাখেন তাদের। তো চলুন আজ জেনে নেই কোথায় পাবো বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শাড়িগুলো।

১. ঢাকাই জামদানি শাড়িঃ

এদেশে অনেক ধরনের শাড়ি তৈরি হলেও সবচেয়ে নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ডিজাইনের নান্দনিক শাড়ি হচ্ছে জামদানি শাড়ি। কার্পাস তুলা থেকে পাওয়া সুতা দিয়ে তৈরি জামদানি শাড়ি ভালোবাসেন না এমন নারী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সূক্ষ্ণ কাজ আর রুচিশীল ডিজাইনের জন্য এই শাড়ি সবার কাছেই পছন্দের। নিখুঁত এই শাড়িগুলো পুরোটাই বাঙালী তাঁতিরা নিজেদের হাতে বুনে থাকেন। সে কারনে ডিজাইনগুলো হয় ইউনিক এবং মসৃণ।

ঢাকাকে জামদানির আদি জন্মস্থান বলা হয়। তুলা থেকে বানানো সুতা দিয়ে তৈরি এই শাড়িকে তাই বলা হয় ঢাকাই জামদানি। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, নোয়াপাড়া ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে তাঁতিরা ঢাকাই জামদানি শাড়ি বুনে থাকেন। এই শাড়ি বাংলার আভিজাত্যের পরিচায়ক।

২. টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িঃ

ঐতিহ্যবাহী মসলিন শাড়ির তাঁতিদের হাত ধরেই শুরু হয় টাঙ্গাইল এলাকায় তাঁতের শাড়ির প্রচলন। এলাকার নাম প্রচারের সাথে সাথে শাড়ির নামটাই হয়ে যায় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। আরামদায়ক ও কমফোর্টেবল এই শাড়িগুলো যে কোনো বয়সের নারীদের মানিয়ে যায় খুব সহজেই। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই শাড়ি খুবই জনপ্রিয়।

বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় নকশার কারনে এই শাড়ি বহুল সমাদৃত। মূলত এধরনের শাড়ির উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইল হলেও সারা বাংলাদেশেই তাঁতিরা এই শাড়ি বুনে থাকেন। তবে টাঙ্গাইল জেলায় তৈরি হওয়া শাড়িগুলো সৌন্দর্য ও নকশায় বেশি সুন্দর হয়ে থাকে।

৩. রাজশাহীর সিল্ক শাড়িঃ

রেশম সুতা থেকে বোনা এই শাড়ির উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। রেশম সুতা খুবই সূক্ষ্ণ, নরম, মোলায়েম ও মূল্যবান সুতা। এই সুতা দিয়েই তৈরি করা হয় সিল্ক শাড়ি যা দেশ ও দেশের বাইরেও বিপুল জনপ্রিয়।

শুধু এই শাড়ির জন্যই রাজশাহীতে একটি সিল্ক গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে সিল্ক কারখানাও। সিল্কের এই শাড়ি সারা দেশে পাওয়া গেলেও একদম অরিজিনাল শাড়ি পেতে চাইলে রাজশাহী ছাড়া গতি নেই।

৪. সিলেটের মণিপুরী শাড়িঃ

সিলেট অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য এই মণিপুরী শাড়ি এর টেম্পল মোটিফের জন্য বেশি বিখ্যাত। দৃষ্টিনন্দন এই শাড়ির পাড়ে করা থাকে ট্রেডিশনাল মন্দিরের নকশা। পাড়ের সাথে মিলিয়ে জমিন ও আঁচলেও থাকে হরেক রকমের নকশা। মণিপুরীদের মৈরাংগ ফী নামের এক ধরনের বিশেষ ওড়না থেকে উৎপত্তি হয় এই শাড়ির।

এই শাড়িগুলো গাঢ় বা হালকা যে ধরনের রঙেরই হোক না কেন, পাড়ের রঙ হয় গাঢ় ধরনের এবং পুরো শাড়িটাই থাকে মণিপুরীদের হাতে বোনা। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে এই শাড়ি তৈরি হয় বেশি, যেহেতু মণিপুরী শাড়ির তাঁতিরা ঐ অঞ্চলেই বাস করেন। সিলেটে গিয়ে মণিপুরী শাড়ি আনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছেন।

৫. সিলেটের জুম শাড়িঃ

পাহাড়ীদের তাঁতে বোনা সিলেটের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী শাড়ি হচ্ছে জুম শাড়ি। রেয়ন আর ভিসকস সুতায় বোনা এই শাড়ি কিছুটা পাতলা ধরনের হওয়ায় একে কোটা শাড়িও বলেন অনেকেই।

দেখতে অনেকটা সিল্ক শাড়ির মতন হলেও পরতে আরাম পাওয়া যায় লিনেনের মতনই। রঙও হয় খুব টেকসই। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা – যে কোনো ঋতুর জন্যই এই শাড়ি আরামদায়ক। পুরো বাংলাদেশ জুড়েই এই শাড়ির কদর রয়েছে।

৬. টাঙ্গাইলের খেশ শাড়িঃ

টাঙ্গাইলের কুটির শিল্পের একটি অনন্য সৃষ্টি এই খেশ শাড়ি। এই শাড়ি তৈরি হয় পুরনো কাপড় দিয়ে। এক রঙা শাড়িতে নান্দনিক ডিজাইন সৃষ্টির মাধ্যমে তৈরি হয় খেশ শাড়ি। পুরনো সুতি কাপড় ছিড়ে তা থেকে তৈরি করা হয় খেশ শাড়ির সুতা।

অন্যান্য শাড়ির তুলনায় এই শাড়ি তৈরি বেশ সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্যও বটে। তবে সে তুলনায় এর দাম খুবই কম। কমবেশি সবাই তাই চেষ্টা করেন এই শাড়ি সংগ্রহে রাখার।

৭. কুমিল্লার খাদি শাড়িঃ

খুবই আরামদায়ক এবং কোয়ালিটিফুল শাড়ি হচ্ছে কুমিল্লার খাদি শাড়ি। চরকায় সুতা কেটে খাদি সুতার সাথে কটনের সুতার মিশ্রণ করে তাঁতিদের হাতে বোনা হয় এই শাড়ি। পুরো শাড়ি জুড়েই থাকে নানান রকম নকশা। বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার চান্দিনা খাদি শাড়ির আদি নিবাস।

এখনও এই এলাকায় তাঁতিরা খাদি শাড়ি তৈরি করেন। তবে চরকায় কাটা সুতা থেকে তৈরি খাদি সারা দেশের সব স্থানে পাওয়া যায় না। অরিজিনাল খাদি শাড়ি পেতে চাইলে যেতে পারেন কুমিল্লাতেই।

বর্তমানে মিলের তৈরি নানান রকম বাহারী ডিজাইনের শাড়ি কাপড়ের ভিড়েও নিজ গুণ, ঐতিহ্য ও কারুকাজের মাধ্যমে এই শাড়িগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্থান করে নিয়েছে। এই শাড়িগুলো শুধু বাংলা নয়, নিজ নিজ অঞ্চলের সংস্কৃতিরও ধারক ও বাহক।