আপনার শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলতে গেলে আগে সেই শিশুর মা বাবার মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বলতে হবে। কারণ শিশুটি তাদেরই গর্ভজাত সন্তান। মা-বাবার ভেতর যদি সম্পর্ক ভালো না থাকে তাহলে ছেলেমেয়েদের মনের গঠন প্রক্রিয়ার ওপরে তারা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইংরেজিতে একটি কথা বলা হয় : একটি মানসিকভাবে অসুস্থ শিশুর পেছনে কাজ করে একটি অসুস্থ পরিবারের প্রভাব।

অসুস্থ পরিবার বলতে তাকেই বোঝায় যেখানে মা-বাবার ভেতরে প্রকাশ্যে সর্বদাই খিটিমিটি বা দাম্পত্য কলহ লেগে আছে। বেশির ভাগ সংসারে বাবারাই প্রধান অভিভাবক বলে গণ্য হয়ে থাকে। বাবার হুকুমই সর্বোচ্চ হুকুম। সেই হুকুম মেনেই যেন সংসার চলে। কিন্তু অনেক বাবা আবার এতই রাগী এবং রুক্ষ যে সংসারে কখনো যদি তাদের হুকুমের নড়চড় হয়, তাহলে বাড়িতে তুলকালাম বেঁধে যাবে। তবে তুলকালাম তখনই বাঁধে যখন মায়েরা বাবার হুকুমের কখনো প্রতিবাদ করেন বা বাড়ির কোনো উঠতি বয়সী শিশু বাবার এতবেশি নিয়মকানুন মানতে রাজি না হয়। বাড়িতে তখন আগুন জ্বলে যায়। প্রায়ই এসব অশান্তির ভেতরে মায়েদেরই নত হতে হয়। শিশুদের কখনো কখনো হার মানতে হয়, কিন্তু তাতে যে সংসারে শান্তির সুবাতাস বয়, তা কিন্তু না। কারণ সবার মনের ভেতরেই রাগ ক্ষোভ বা বেদনা ধুমায়িত হয়ে ঘোরাফেরা করে। সবাই সেই বাড়ির বাবার ওপরে মনে মনে খাপ্পা হয়ে থাকে। এর ফলে মা-বাবার স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন ক্ষুণ্ণ হয়। তাদের ভেতরে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। কয়েকদিন পরই দেখা যায় সংসারের ছেলেমেয়েগুলো অস্বাভাবিক ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

আবার কোনো সংসারে মায়েরা খুব ব্যক্তিত্বশালী হয়, তখন আবার ঠিক উল্টো ছবি দেখা যায়। মায়ের রাগারাগির ভয়ে শিশুরা তটস্ত হয়ে থাকে। তখন অবস্থা আরো খারাপ হয়। কারণ বাবারা তবু কিছুক্ষণের জন্য বাড়িতে থাকে। তারপর বাইরে চলে যায়। তখন শিশুরা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু মায়েরা আবার বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকেন। তখন বাচ্চারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা কমে যায়।

আর শিশুরা একবার যদি অস্বাভাবিক চালচলন শুরু করে, যদি তারা ঠিকমতো স্কুলে না যায়,পড়াশোনা ভালোভাবে না করে, রাতের বেলা না ঘুমায়, মিথ্যা কথা বলে, কথায় কথায় মায়ের সঙ্গে তর্ক করে বা বাবার হুকুম অমান্য করার সাহস দেখায়, খাওয়ার টেবিলে খাবার ছুড়ে ফেলে-তাহলে সেই শিশুটি যে সুন্দর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বড় হচ্ছে এ কথা আর বলা যাবে না। সেই শিশুটিকে আবার সুশীল করে গড়ে তোলা সম্ভব কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সুতরাং যেসব দম্পতির ছোট ছোট বাচ্চা আছে তাদের সর্বদাই একটা সাবধানী পরিবেশের ভেতরে থাকতে হবে।

কিন্তু এভাবে কি কোনো দম্পতি থাকতে পারে ? বা থাকা কি সম্ভব?

বলা খুব কঠিন। কারণ তারাও মানুষ। নিজেরদের জীবনে যদি সুবিচার না হয়, জীবন যদি শান্তিতে না থাকে, যদি দাম্পত্য ভালোবাসা না থাকে, তাহলে ভালো মুখ করে সংসারে বা সমাজে চলাফেরা করা সম্ভব নয়। বা আপাতঃদৃষ্টিতে কিছুদিন সম্ভব হলেও বরাবরের মতো সম্ভব হয় না। তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছেলেমেয়েদের ওপর পড়ে। ছেলেমেয়েরা যে কোনো সংসারে বাবামায়ের খুব কাছাকছি অবস্থান করে। তাই তাদের চোখ এড়িয়ে কোনোকিছু পার পেয়ে যাবে এই চিন্তা অবান্তর।

তাহলে সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে?

ছেলেমেয়েরা আমাদের মা-বাবাদের খুবই প্রিয় এক অস্তিত্ব। মা-বাবা যা কিছু তাদের জীবনে করে, তাদের লক্ষ্য থাকে সর্বদাই তাদের ছেলেমেয়েদের সুখ ও শান্তির দিকে। তারা যেমন নিজের মুখের আহার বাদ দিয়ে সন্তান-সন্ততিকে খাওয়ায়, তেমনি তাদের নিরাপদ বসবাসের জন্য এ পৃথিবীটাকে তাদের জন্য সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে যেতে চায়। তবে এসবই মা-বাবার কল্পনার কথা। নিজেদের ভেতরে সম্পর্ক ঠিক না হলে ভবিষ্যতের সবকিছু কেমন যেন ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়ে।

একটি শিশু যদি পরিবারে জন্ম না নেয়, তাহলে সেই পরিবারের মুখ থেকে হাসি চলে যায়। তারা নিজেদের খুবই দুর্ভাগা দম্পতি বলে মনে করে। আবার শিশুটি যেই জন্ম নেয়, তখুনি শুরু হয় দম্পতির ভেতরে টানাপড়েন। কে রাতের বেলা ঘুম ভেঙে উঠে শিশুকে দুধ খাওয়াবে। কে শিশুর সারাদিনের পরিচর্যা করবে, কে অসুখে-বিসুখে রাত জাগবে, বা তাদের প্রতিদিনের চাহিদা মেটাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদিও অনেকে বলে থাকে যে মা-বাবা উভয়েই শিশুটিকে দেখবে, তবুও কার্যত দেখা যায় যে সংসারে মায়ের ঘাড়ে এসেই সব দায়িত্ব বর্তায়। কেউ কোথাও সাহায্য করার থাকে না। তখন মা শিশুকে দেখবেন, সংসার দেখবেন, নাকি বাইরে কাজ করতে যাবেন- সেটা একটা সমস্যা হয়ে দেখা যায় অনেকের জীবনে।

আগে যখন আমাদের যৌথ পরিবার প্রথা ছিল বা এখনো কোনো কোনো সংসারে আছে, সেখানে দেখা যায় একটি শিশুর জন্য একাধিক মানুষ থাকে যারা শিশুটিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, গল্প বলে বা আদর করে সময়ে-অসময়ে রাখতে পারে। আগে যেমন আমাদের সংসারে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছিলেন, তাঁরা অনেক সময় ছোট শিশুদের দেখভাল করতেন, তাদের বায়না সহ্য করতে পারতেন। মা-বাবা বাইরে কাজ করতে গেলে শিশুটিকে কিছুক্ষণের জন্য সঙ্গ দিতে পারতেন। এখন আর সেসব ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে আজকাল মা-বাবারা তাদের শিশুদের নিয়ে এত বেশি চিন্তাগ্রস্ত থাকে যে বয়স্ক মানুষদের যেকোনো উপদেশই তারা তীর্যক দৃষ্টিতে দেখে। তারওপর আজকাল শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এইভাবে প্রতিযোগিতা ঢুকে গেছে যে শিশুদের কোথাও আর ঢিলেঢালা হওয়ার সুযোগ নেই। আজকাল শিশুদের মা-বাবারা অন্য শিশুদের মা-বাবার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কোনো মা-বাবা আজকাল তাদের শিশুদের ঢিলেমি বা লেখাপড়ায় শুধু ভালোভাবে পাস করে যাওয়াটা মন থেকে মেনে নিতে পারে না। তাদের কাছ থেকে উত্তরোত্তর ভালো বা আরো ভালো রেজাল্ট আশা করে। শিশুটি পরীক্ষায় ফল খারাপ করলে মা-বাবা তার সঙ্গে কথা বলে না। স্বামী-স্ত্রীর ভেতর শিশুকে নিয়ে প্রচণ্ড বাগবিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। ফলে শিশুশিক্ষাটা একটা যমযন্ত্রণার মতো প্রতিভাত হয় শিশুটির কাছে।

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য পরিমাপ করতে হয় তাদের বাহ্যিক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন :

১. তারা যখন অশান্তির ভেতরে থাকে, তাদের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। তারা কারও কথা ঠিকমতো শুনতে পারে না বা শুনতে চায় না।

২. ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না বা জোর করে খাওয়াতে গেলে বমি করে বাইরে ফেলে দেয়।

৩. স্কুলে যেতে চায় না অথবা স্কুলে গেলেও অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মারামারি করে।

৪. তারা প্রচুর মিথ্যা কথা বলে। বাসায় কারণে-অকারণে হিংস্র হয়ে ওঠে, কখনো বা ভাঙচুর শুরু করে, তারা বাসার অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে সর্বক্ষণই কথায় কথায় মারামারি শুরু করে দেয়।

৫. তারা পরিবারের বড়দের সম্মান বা ছোটদের স্নেহ করতে চায় না। মা-বাবার আদেশ বা নির্দেশ শুনতে চায় না।

৬. রাতে ঠিকমতো ঘুমায় না বা ঘুমালেও বারবার জেগে যায়।

৭. কখনো বা শিশুরা বড় মানুষদের মতো বিষণ্ণতায় ভোগে। তখন তারা মা-বাবা বা কারো সাথে কথা বলে না। ঘরের ভেতরে চুপচাপ বসে থাকে।

৮. অনেকে রাতের বেলা বিছানায় প্রস্রাব করতে শুরু করে। অথচ তারা হয়তো বিছানায় প্রস্রাব করা বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছিল।

৯. কখনো গৃহকর্মীদের প্রতি সর্বদাই রাগী বা নিষ্ঠুর ব্যবহার করে। মানুষকে কারণে-অকারণে ভ্যাংচায়।

১০. টাকা-পয়সা চুরি করে। কখনো বা স্কুলের সতীর্থদেরও জিনিসপত্র চুরি করে।
অনেক সময় খারাপ সঙ্গে পড়ে মাদকদ্রব্য খেতে শুরু করে। তখন তাদের ব্যবহারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

১১. পরিবারের একটি শিশু যদি বিপথে চলে যায়, যা প্রায়ই আজীবনের জন্য তা তার মা-বাবার জন্য অশেষ দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে দুঃখের আর কোনো বিকল্প থাকে না।

কিভাবে বাঁচা যায় মানসিক বৈকল্য থেকে :

শিশুটির পাশাপাশি মা-বাবাদের চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের কাছ থেকে কখনোই বড় কিছুর প্রত্যাশা না করা।

তাদের জীবনটিকে সহজ সরল করে রাখা। মা-বাবার নিজেদের ইচ্ছাপূরণের জন্য শিশুকে কখনো বলি হিসেবে ব্যবহার না করা। শিশুদের প্রতি অতিশয় আস্থা না রাখা।

বাইরের মানুষের খারাপ হাতছানিতে শিশুরা সুযোগ পেলে সাড়া দিতে সক্ষম। তাই বলে তাকে সর্বক্ষণের জন্য সন্দেহের ভেতরে রাখা যাবে না।

একটি শিশুকেও গাছের মতো বেড়ে উঠতে দিতে হবে। তার স্বাভাবিক প্রবণতাকে সম্মান করতে হবে। তাকে তার মতো করে শিক্ষা এবং কাজ করতে দিতে হবে। তবে হ্যাঁ, যেন সে খারাপ বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে বিপথে না যায় সেদিকে গোপনে শ্যেন দৃষ্টি রাখতে হবে।

বাবা মায়ের নিজেদের ভেতরে সম্পর্ক ভালো রাখতেই হবে। বাইরে শিশুদের সামনে নিজেদের আদর্শ করে তুলে ধরতে হবে।

আপনারা হয়তো বলবেন, তাহলে আমাদের কী হবে? আমাদের ভেতরে ভুল বোঝাবুঝির সুরাহা কবে হবে? শিশুর ভালোর জন্য আমরা কি নিজেদের জীবন নষ্ট করব? আমাদের সুখ কোথায়?

তাহলে ভাবুন জীবনের শেষে আপনার শিশুটি যদি ভালো মানুষ হয়ে, সুস্থ মানুষ হয়ে বেড়ে না ওঠে, তাহলে আপনার নিজের সব ভালো নর্দমার ভেতরে বাহিত হয়ে যাবে। এর চেয়ে সংসারে শিশুদের না আনাই ভালো!

শিশুর মানসিক দুশ্চিন্তা!

শিশু বয়সে এমন কতগুলো উপসর্গ আছে, যা তার মানসিক দুশ্চিন্তাজাত। কিন্তু এসব আবার কোনো কোনো গভীর অসুখের উপসর্গও বটে। বস্তুত এ অবস্থায় এসব উপসর্গ কোনো গুরুতর অসুখজাত কি না, তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েই কেবল তার আচরণজনিত কারণে হচ্ছে—রায় দেওয়া যায়। তবে প্রয়োজনে শিশুর যথাযথ কেস হিস্ট্রি, শারীরিক পরীক্ষা ও ল্যাব টেস্টের সাহায্য লাগে।

মনে রাখা চাই:

১. শিশু বয়সে অনেক অসুখ যেমন তার মানসিক রোগের সৃষ্টি করে, তেমনি শারীরিক রোগের উপসর্গ নিয়ে আসে।

২. শিশু অ্যাজমার রোগীর কথা ধরা যাক: মা-বাবা সামান্য সর্দি-কাশি হলে ‘বাচ্চার অ্যাজমা অ্যাটাক’ হয়ে যাবে বলে সন্তানকে স্কুলে পাঠান না। এতে সন্তান ক্লাস ও রুটিন পরীক্ষায় পিছিয়ে যাওয়ার জন্য টেনশনে পড়ে যায়। স্কুল কামাই যত চলতে থাকে, ততই শিশু ও মা-বাবা দারুণ চ্যালেঞ্জে পড়ে যান। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সাহায্য নিয়ে এই দুর্ভেদ্য চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মা-বাবার শিশুকে নিয়ে ‘অতি দুশ্চিন্তা রোগ’ থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩.স্কুলের পড়াশোনার বেশ কিছু সমস্যা শিশুর মানসিক উপসর্গ তৈরি করে। স্কুলের পড়া ভালোমতো বলতে না পারা, শিক্ষক–ভীতি, তার মধ্যে আচরণজনিত উপসর্গ তৈরি করে। সে তখন হয়ে পড়ে স্কুল পালানো ছাত্রছাত্রী।এর সঙ্গে শিশুর কোনোরূপ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা তাকে আরও পিছিয়ে দেয়, যেমন সে যদি হয় শ্রবণপ্রতিবন্ধী।

৪. শিশু যদি মৃগীরোগী হয়, বিশেষ করে খিঁচুনি নিরোধক অনেক ওষুধ সেবন তার মনোযোগ ধরে রাখাতে সমস্যা সৃষ্টি করে।

৫. যে শিশু প্রিম্যাচিওর বা জন্মকালীন শ্বাসরোধ জটিলতার শিকার হয়েছে, বুদ্ধি বিকাশে পিছিয়ে আছে, তার জন্য সমানতালে অন্য শিশুদের মতো জীবনযাপন সম্ভব হয় না। ফলে সে হতে পারে মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রোগীও।

৬. যে শিশু ঘন ঘন রক্তে কম গ্লুকোজ মাত্রা অসুখে পতিত হয়, বা অ্যানিমিয়ায়, ইনফেকশনে বা দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়ায় ভোগে, সে শিশু খিটখিটে মেজাজের হতে পারে।

৭. শিশুর মস্তিষ্কের টিউমার বা মস্তিষ্কের যক্ষ্মা রোগ আচরণগত উপসর্গ দিয়ে প্রকাশ পায়।

৮.যেসব শিশু দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য রোগে ভোগে যেমন: ডায়বেটিস, হিমোফেলিয়া, মাসকুলার ডিসট্রোপি, বাত ব্যাধি, কান বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, তার স্কুল পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায়, সে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হতে পারে।

৯. একইভাবে থাইরোটক্সিকোসিস (থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য), মাইগ্রেন (শিরঃপীড়া), মেদবহুল শিশু, খাটো শিশু নানা রূপ আচরণজনিত উপসর্গ নিয়েও হাজির হয়। শিশু বয়সে একজিমা জাতীয় শিশু অসুখ; চিরস্থায়ীভাবে যা খুব চুলকায় ও তাকে কষ্ট দেয়, তার মধ্যে মানসিক উপসর্গ তৈরি করতে পারে।

১০.শিশু বয়সে মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে শিশু যেসব শারীরিক উপসর্গ প্রকাশ করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ডায়রিয়া, পেটব্যথা, বমি, বারবার প্রস্রাব আসা, বিছানা ভেজানো, খিদে লোপ পাওয়া, খাবার হজমে গন্ডগোল, অখাদ্য খেয়ে ফেলা, মাথাব্যথা, বুকব্যথা ও হাত–পায়ে ব্যথা ইত্যাদি।

শিশুর মধ্যে কোনো শারীরিক অসুখ নেই, কিন্তু মানসিক দুশ্চিন্তা লাঘবের তাড়না থেকে তার মধ্যে এসব উপসর্গ জন্ম নেয়।

শিশুকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে হয় কি ভাবে?

সন্তানের জন্য একটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর এ কারণে বাবা-মায়ের ক্রমাগত চিন্তা করে যান, কিভাবে তারা আরো ভালো কিছু করতে পারেন? এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। যেখানে অনেক বেশি পরিচর্যার সুযোগ আছে। এখানে নিন এমন পরিবেশ তৈরিতে বিশেষজ্ঞের টিপস।

১. শিশুসুলভ হলেও তাদের চিন্তা-ভাবনার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। সব উড়িয়ে দেবেন না। তাদের এই চিন্তার গতিপ্রকৃতি, কর্মকাণ্ড এবং সাহসিকতা সামনে এগিয়ে যাবে। তাই এর সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। একবার বুঝে ফেললে তাদের স্বাস্থ্যকর উপায়ে বড় করে তুলতে আপনার তেমন কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না।

২. শিশুদের আবেগগত বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, আবেগগত বিষয় আত্মস্থ করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা অর্জন করা যায়। শিশুরা যেন নিজের আবেগ সম্পর্ক ধারণা লাভ করে সে জন্য আগে থেকেই শিক্ষা দিন। তাদের এই সব আবেগগুলোর নামকরণ করতে দিন। কোন আবেগকে তারা কি নাম দেয় তা দেখুন।

৩. বাচ্চা কান্না করতে থাকলে থেমে যেতে বলবেন না। তাদের আবেগ বুঝতে হবে। তার আবেগকে নিজের মধ্যে আনুন। যেকোনো আবেগ তাদের মাঝে কাজ করবে। একে চিনিয়ে দিন। এমন হলে কি করতে হবে তা বুঝিয়ে দিন। যদি তাদের আবেগ দমনে বাবা-মা কাজ করেন, তবে শিশুরা এগুলো ভুল উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে।

৪. ওদের সময় দিন। হেসে-খেলে দারুণ সময় কাটান। এমন কাজে ওদের যুক্ত করুন যা করতে দুজনেরই ভালো লাগে। তাদের আবেগ ও চাওয়া-পাওয়া যে গুরুত্বপূর্ণ তার সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। এতে শিশুকাল থেকেই তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে।

৫. বাবা-মা হিসাবে শিশুর খাওয়া-ঘুম বা পোশাকের বিষয়ে খেয়াল দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরও মানসিক চাহিদা রয়েছে। আবেগগত এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এদিকেও নজর দিতে হবে। ধরুন, তাদের জ্বর এলো। সে ক্ষেত্রে কেবল সুস্থ করে তোলাই যথেষ্ট নয়। এ সময়টাতে তাদের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে।